আল-বিরুনির দৃষ্টিতে ভারতের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি

৬ বার পঠিত

আবু রায়হান আল-বিরুনি ছিলেন এক অসাধারণ বিশ্বজনীন প্রতিভার অধিকারী। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস ও ধর্মের ইতিহাসসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

আল-বিরুনি মনে করতেন, যেসব ধর্ম ও মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নেই, সেসব ধর্ম ও মতাদর্শ নিয়ে গবেষণা করতে গেলে তথ্যের ঘাটতি ও ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

“এটি এমন এক ব্যাপক ব্যাধি, যার হাত থেকে প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের মতামত উদ্ধৃতকারীদের মধ্যে খুব কম মানুষই রক্ষা পেতে সক্ষম হয়েছেন।”

ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ভূগোল নিয়ে আল-বিরুনি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে মুসলমানদের সামনে তুলে ধরাই ছিলো তাঁর এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য। পরবর্তীকালে গ্রন্থটি ভারততত্ত্ব (Indology) চর্চার ইতিহাসে প্রথম দিককার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

আল-বিরুনির এই গবেষণাপদ্ধতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যের চিন্তা ও বিশ্বাসকে যথাযথভাবে বুঝতে হলে পূর্বধারণার পরিবর্তে প্রয়োজন গভীর অধ্যয়ন, বস্তুনিষ্ঠতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা।

১. ভারততত্ব নিয়ে প্রথম গবেষণাকর্ম।

আল-বিরুনি তাঁর তাহকীকু মা লিল-হিন্দ (تحقيق ما للهند) গ্রন্থে ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ভূগোল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির পূর্ণ নাম হলো—

تحقيق ما للهند من مقولة مقبولة في العقل أو مرذولة

তাহকীকু মা লিল-হিন্দ মিন মাকূলাতিন মাকবূলাতিন ফিল-আকল আও মারযূলাহ।

গ্রন্থটি ১০১৭ থেকে ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ভারততত্ত্ব (Indology) চর্চার ইতিহাসে এটি প্রথম দিককার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য গবেষণাকর্ম হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে।

২. গ্রন্থটি ৮০টি অধ্যায়ে বিভক্ত

ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল-বিরুনির গভীর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায় এই গ্রন্থে। মোট ৮০টি অধ্যায়ে বিভক্ত গ্রন্থটির প্রতিটি অধ্যায় গড়ে চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠার।

গ্রন্থটিতে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য, হিন্দুদের ঈশ্বর-সম্পর্কিত ধারণা, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগৎ, আত্মা ও দেহের সম্পর্ক, আত্মা ও পুনর্জন্ম, স্বর্গ ও নরক, চূড়ান্ত মুক্তির স্বরূপ এবং সেই মুক্তি অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া সৃষ্টির বিভিন্ন ধরন ও সেগুলোর বৈশিষ্ট্যও তাঁর আলোচনায় স্থান পেয়েছে।

৩. হিন্দু ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ

আল-বিরুনির তাহকীকু মা লিল-হিন্দ (تحقيق ما للهند) গ্রন্থে হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থটিতে হিন্দু সমাজের বর্ণপ্রথা ও বিভিন্ন বর্ণের জন্য নির্ধারিত বিধিবিধান, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় ও দেওয়ানি আইনের উৎস, মূর্তি ও মূর্তিপূজা, বলিদান ও প্রায়শ্চিত্তের আচার, পবিত্র স্থান ও তীর্থযাত্রার নিয়মকানুন, দান-দক্ষিণা, বিচারব্যবস্থা এবং শাস্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া পানাহারের শিষ্টাচার, ধর্মীয় উৎসব ও উপবাসের দিন, শুভ-অশুভ দিন সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস, বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের নানা বিষয়ও তিনি গ্রন্থটিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।

৪. ভারতীয়দের গ্রন্থ থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি

আল-বিরুনির তাহকীকু মা লিল-হিন্দ (تحقيق ما للهند) গ্রন্থে ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য, চিন্তাধারা, ভূগোল, ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রসহ ভারতীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংকলিত হয়েছে।

গ্রন্থটি রচনার ক্ষেত্রে আল-বিরুনি একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তিনি নিজের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিবর্তে ভারতীয় চিন্তাবিদ-দার্শনিক ও লেখকদের নিজস্ব বক্তব্যকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ভারতীয়দের রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। এর মাধ্যমে ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস, চিন্তাধারা ও সংস্কৃতিকে তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে যথাসম্ভব নির্ভুল ও বিশ্বস্তভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।

৫. আল-বিরুনি কেন এ ধরনের একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন?

তাহকীকু মা লিল-হিন্দ (تحقيق ما للهند) গ্রন্থের রচয়িতা আবু রায়হান আল-বিরুনি ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে এই গ্রন্থ রচনার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন:

“একদিন আমি আমার শিক্ষক আবু সাহল আত-তিফলিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম, তিনি মুতাজিলা মতবাদ সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেছেন এমন একজন লেখকের সমালোচনা করছেন। কারণ, ওই লেখক মুতাজিলাদের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন।

মুতাজিলারা বলেছিলেন, ‘আল্লাহ নিজ সত্তার মাধ্যমেই জ্ঞানী।’ অথচ ওই লেখক তাঁদের বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যেন তাঁরা বলেছেন, ‘আল্লাহর কোনো জ্ঞান নেই।” এভাবে তিনি পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মুতাজিলা আলেমরা আল্লাহর প্রতি অজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য আরোপ করেন।

তখন আমি বললাম,

“এটি এমন এক ব্যাপক সমস্যা, যার প্রভাব থেকে প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের মতামত তুলে ধরতে গিয়ে খুব কম মানুষই রক্ষা পেতে পেরেছেন।”

আল-বিরুনির এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তাধারা তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা, পক্ষপাত ও পূর্বধারণা কীভাবে সত্যকে বিকৃত করতে পারে। সম্ভবত এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গ্রন্থ রচনার সময় তাঁদের নিজস্ব গ্রন্থ, বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তাধারাকে তাঁদের নিজেদের বক্তব্যের আলোকে যথাযথভাবে বোঝা এবং যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে তা উপস্থাপন করা।

৬. পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার অভাব যেভাবে ভিন্ন ধর্ম নিয়ে গবেষণাকে কঠিন করে তোলে

আল-বিরুনি লিখেছেন:

“কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে দেওয়া এ ধরনের বর্ণনা যদি একই ধর্মের বিভিন্ন মতবাদ বা সম্প্রদায় সম্পর্কে হয়, তাহলে তাদের পারস্পরিক নৈকট্য এবং অনুসারীদের একসঙ্গে বসবাসের কারণে প্রকৃত সত্য তুলনামূলকভাবে সহজেই জানা সম্ভব হয়। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা সহযোগিতা নেই, এমন ভিন্ন ভিন্ন জাতির ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে এ ধরনের বর্ণনা দেওয়া হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যকার দূরত্ব এবং বিষয়টি নিয়ে গবেষণার জটিলতার কারণে এসব বর্ণনায় যেসব অসত্য ও ভুল তথ্য থাকে, তা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। দুঃখজনকভাবে, আমাদের কাছে বিদ্যমান বিভিন্ন মতবাদবিষয়ক গ্রন্থ এবং ধর্ম ও সম্প্রদায় নিয়ে রচিত প্রায় সব বইই এ ধরনের বর্ণনায় পরিপূর্ণ। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান সূত্রগুলোতে পাওয়া তথ্য।”

আল-বিরুনি এখানে দেখিয়েছেন, অপরিচিত কোনো ধর্ম বা সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা ছাড়া অন্যের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করলে ভুল ধারণা সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষত, যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের সরাসরি পরিচয় বা সংলাপের সুযোগ নেই, তাদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক বর্ণনাগুলোর সত্যতা যাচাই করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের বর্ণনা যাচাই না করে গ্রহণ করলে তা শুধু ভুল ধারণার বিস্তারই ঘটায় না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততারও কারণ হয়ে উঠতে পারে।

৭. ইসলামী, গ্রিক ও ইরানি চিন্তাধারার সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা

আল-বিরুনির তাহকীকু মা লিল-হিন্দ (تحقيق ما للهند) গ্রন্থের অধিকাংশ অধ্যায় তিনটি অংশে বিন্যস্ত।

প্রথম অংশে আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আল-বিরুনি তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি ও ব্যাখ্যা সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন।

দ্বিতীয় অংশে ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে সংস্কৃত ভাষায় রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে বিস্তারিত উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন। পাশাপাশি ভারতীয় সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, আইন এবং সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরেছেন।

তৃতীয় অংশে ভারতীয়দের বিশ্বাস ও চিন্তাধারার সঙ্গে ইসলামী, গ্রিক ও ইরানি চিন্তাধারার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন চিন্তাধারার মধ্যে কোথায় সাদৃশ্য রয়েছে এবং কোথায় পার্থক্য রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেছেন।

আল-বিরুনির এই গবেষণাপদ্ধতির বিশেষত্ব হলো, অন্য কোনো চিন্তাধারার সঙ্গে তুলনা করার আগে তিনি ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তাধারাকে তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এরপর ইসলামী, গ্রিক ও ইরানি চিন্তাধারার সঙ্গে সেগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। এভাবে তিনি একদিকে ভারতীয় সভ্যতাকে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের আলোকে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন সভ্যতার চিন্তাধারার মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যও স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন।

৮. হিন্দুদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গ্রন্থ রচনা

আল-বিরুনি গ্রন্থটির বিভিন্ন অধ্যায়ের শেষে তাঁর গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। ফলে প্রতিটি অধ্যায়ই একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগতভাবে বিন্যস্ত হয়েছে।

গ্রন্থটি রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিলো ইসলামী বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান থেকে ভিন্ন ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তাধারা সম্পর্কে মুসলমানদের সঠিক ধারণা দেওয়া। বিশেষত সিন্ধু, পাঞ্জাব, কাবুল ও গজনির মতো অঞ্চলে হিন্দুদের পাশাপাশি বসবাসকারী মুসলমানরা যাতে ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে বুঝতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা ছিলো গ্রন্থটির অন্যতম লক্ষ্য।

আল-বিরুনির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যাঁরা ধর্মীয় বিষয়ে হিন্দুদের সঙ্গে আলোচনা বা বিতর্ক করতে চান কিংবা তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, তাঁদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান সরবরাহ করাও ছিলো এই গ্রন্থ রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, আল-বিরুনি কেবল ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য সংকলন করেননি, বরং দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও সংলাপের পথও উন্মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

৯. হিন্দুদের বিশ্বাসকে সরাসরি তুলে ধরার পদ্ধতি

আল-বিরুনির দৃষ্টিতে তাহকীকু মা লিল-হিন্দ কোনো বিতর্কমূলক গ্রন্থ নয়। এ কারণে হিন্দুদের যেসব ধর্মবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানকে তিনি ভুল বলে মনে করতেন, সেগুলোর প্রতিবাদ কিংবা খণ্ডন করার চেষ্টা করেননি। এমনকি সেসব বিশ্বাসের বিপরীতে নিজের মতামত তুলে ধরে কোনো পাল্টা যুক্তিও উপস্থাপন করেননি।

হিন্দুদের বিভিন্ন বর্ণনায় কিছু ঐতিহাসিক অসংগতি চিহ্নিত করলেও তিনি সাধারণভাবে তাঁদের ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তাধারাকে তাঁদের নিজস্ব বক্তব্যের আলোকে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি যেখানে প্রাসঙ্গিক মনে করেছেন, সেখানে ইসলামী ও গ্রিক চিন্তাধারার সঙ্গে হিন্দু চিন্তার সাদৃশ্যও আলোচনা করেছেন।

আল-বিরুনির এই গবেষণাপদ্ধতির বিশেষত্ব হলো, কোনো বিশ্বাসের সমালোচনা বা খণ্ডন করার আগে সেটিকে তার অনুসারীদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যথাযথভাবে বোঝা ও উপস্থাপন করা। অর্থাৎ, তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দুদের বিশ্বাসকে খণ্ডন করা নয়; বরং তাঁদের বিশ্বাস ও চিন্তাধারাকে যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে বোঝা এবং অন্যদের সামনে বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরা।

১০. ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে আল-বিরুনির এটিই প্রথম গবেষণা নয়

পুনর্জন্ম, মূর্তিপূজা এবং সৃষ্টির সর্বেশ্বরবাদী ধারণার মতো বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আলোচিত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে গিয়ে আল-বিরুনি কেবল গ্রিক দর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সুফী ও খ্রিষ্টীয় চিন্তাধারারও উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয়ের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেছেন।

তবে তাহকীকু মা লিল-হিন্দ (تحقيق ما للهند) ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে আল-বিরুনির প্রথম গবেষণাকর্ম নয়। ভারতীয় জ্ঞান, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারা নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান এই গ্রন্থ রচনার বহু আগেই শুরু হয়েছিলো।

১১. মুসলমানদের কাছে ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস তুলে ধরাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য

আল-বিরুনি তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, তাহকীকু মা লিল-হিন্দ রচনার আগে তিনি হিন্দুধর্মের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। প্রথমটি ছিলো সাংখ্য (Sāṃkhya), যেখানে জগতের বিভিন্ন সত্তার স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি ছিলো পতঞ্জলি (Patañjali), যেখানে জাগতিক ও বস্তুগত বন্ধন থেকে আত্মার মুক্তি লাভের বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে।

এসব গ্রন্থের অনুবাদ ও দীর্ঘ অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে আল-বিরুনি ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস, চিন্তাধারা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর তিনি তাহকীকু মা লিল-হিন্দ রচনায় মনোনিবেশ করেন। ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে নিজের অর্জিত জ্ঞানের ওপর আস্থা রেখেই তিনি এমন একটি গ্রন্থ রচনা করতে চেয়েছিলেন, যার মাধ্যমে মুসলমানরা অন্য কোনো গ্রন্থের সাহায্য ছাড়াই ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ও যথাযথ ধারণা লাভ করতে পারবেন।

১২. রাজনৈতিক ইতিহাস ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে নীরবতা

তবে কয়েকটি কারণে গ্রন্থটি সমালোচিতও হয়েছে। যেমন, হিন্দুধর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ বেদ ও উপনিষদের কোনো উল্লেখ এতে পাওয়া যায় না। অথচ ধর্মীয় গুরুত্বের বিচারে এই গ্রন্থগুলোকে ভগবদ্গীতা ও পুরাণের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

এ ছাড়া ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ভারতীয় ভূখণ্ডে উদ্ভূত বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের মতো অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও গ্রন্থটিতে খুব সীমিত আলোচনা করা হয়েছে। কোথাও কোথাও এসব বিষয়ের কোনো উল্লেখই পাওয়া যায় না। পাশাপাশি গ্রন্থটির সব অধ্যায়ে সমান গুরুত্ব ও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়নি। কোনো কোনো অধ্যায়ে বিষয়বস্তুর বিস্তৃত আলোচনা থাকলেও অন্য কয়েকটি অধ্যায় তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। এসব সীমাবদ্ধতার কারণেও গ্রন্থটি সমালোচনার মুখে পড়েছে।

১৩. হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসের অসংগতি যেভাবে আল-বিরুনির গবেষণাকে কঠিন করে তুলেছিলো

ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চিন্তাধারা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আল-বিরুনিকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।

হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন বর্ণনা ও তথ্যের মধ্যে প্রায়ই পরস্পরবিরোধিতা দেখা যেত। আবার একই সমাজের জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের ধর্মীয় উপলব্ধির সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তাধারারও যথেষ্ট পার্থক্য ছিলো। আল-বিরুনি মনে করতেন, বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে পার্থক্যের কারণেই মূলত এই ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। গ্রিক ও ভারতীয় উভয় সংস্কৃতিতেই তিনি এমন পার্থক্য লক্ষ করেছিলেন। ফলে একই ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথভাবে বোঝা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরা তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

১৪. বিভিন্ন ধর্মের বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিলেন আল-বিরুনি

আল-বিরুনি ধর্মীয় কালপঞ্জি ও ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম নির্ধারণের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মের উৎসব, উপবাস ও গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর বিবরণ অত্যন্ত সতর্কতা ও গবেষণাগত নির্ভুলতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন ধর্মের বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের পদ্ধতিও নির্ধারণ করেছিলেন এবং এ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সারণি তৈরি করেছিলেন।

এমনকি বিভিন্ন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর মধ্যে তুলনামূলক আলোচনাও করেছেন তিনি। উদাহরণস্বরূপ, ইহুদিদের উৎসব ও পবিত্র দিনগুলোর হিসাব নির্ণয় করতে গিয়ে তিনি ইহুদি পণ্ডিতদের অনেক আগেই ইহুদি ধর্মের ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম নির্ধারণের একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। হিন্দুদের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর উপস্থাপিত তথ্য ও বিশ্লেষণেও একই ধরনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।

১৫. বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে আল-বিরুনির এই গ্রন্থ

আল-বিরুনির এই বিখ্যাত গ্রন্থটি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সি. এডওয়ার্ড সাখাউ (C. Edward Sachau) গ্রন্থটি সম্পাদনার পাশাপাশি ১৮৮৩–১৮৮৪ সালে জার্মান ভাষায় এবং ১৮৮৭–১৮৮৮ সালে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। ১৮৮৭ সালে গ্রন্থটির সম্পাদিত আরবি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। একই বছর ভূমিকা ও টীকাসহ Alberuni’s India নামে এর ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৫৮ সালে হায়দরাবাদে এবং ১৯৮৩ সালে বৈরুতে গ্রন্থটির দুটি পৃথক আরবি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তুরস্কে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকের বছরগুলোতে কিভামুদ্দিন বুরসালান গ্রন্থটি তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করেন। তবে তাঁর অনুবাদটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে। বুরসালানের নিজ হাতে লেখা অনুবাদের মূল পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে তুর্কি ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন

লেখাটি শেয়ার করুন

মতামত প্রকাশ করুন

অনুদান দিন
Scroll to Top