মহাগ্রন্থ আল-কোরআন যে সকল মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে, ইতিহাস তার মধ্যে অন্যতম। এই অর্থে কোরআনের মৌলিক বিষয় সমূহের একটি হল ‘ইতিহাস’।
মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ইতিহাসের কোন বই না হওয়া সত্ত্বেও এর দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ শুরু থেকেই ইতিহাসের ব্যাপারে জোর দিয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে মুসলিমগণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে পাঠ করেছেন ও বিশ্লেষণ করেছেন। আর সেটা হল, তারা ইতিহাসকে দেখেছেন ‘ইবরাত’ হিসেবে।
এই কারণে মুসলিম চিন্তাবিদগণ ‘তারিখ (ইতিহাস)’ ও ‘ইবরাত’ নামক পরিভাষাদ্বয় একত্রে ব্যবহার করেছেন।
যেমন ইবনে খালদুন তাঁর লেখা ইতিহাস গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, ‘ কিতাবুল ইবার’ তথা ইবরাতের গ্রন্থ। কেননা, ইবরাত (عبرة) হল; মহাবিশ্ব নিয়ে এবং একই সাথে আল্লাহ তার এই সৃষ্টির উপর যে বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো নিয়ে এবং সর্বোপরি সুন্নাতুল্লাহ নিয়ে চিন্তা করা। কঠিন অভিজ্ঞতা সমূহকে আকল দিয়ে চিন্তা (তাফাক্কুর) করে দূরদৃষ্টি দিয়ে শিক্ষনীয় বিষয় সমূহ খুঁজে বের করা।
ইবরাত (عبرة) এর শাব্দিক অর্থ, ঘটনা সমূহের কারণ এবং ফলাফলের উপরে দূরদৃষ্টি দেওয়া, গভীর ভাবে চিন্তা করা এবং দেখা থেকে শিক্ষা খুঁজে বের করা। মূলত ইবরাত (عبرة) হল; শব্দবিহীন এবং উচ্চারণবিহীন ইলাহী একটি ওয়াজ।
একই ভাবে ধর্মের ইতিহাসবিদ নামে খ্যাতি অর্জনকারী প্রখ্যাত শাহরাস্তানী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ , ‘ মিলাল ওয়ান নিহাল’ কেও একই দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন ধর্ম, মাজহাব ও চিন্তাগত ধারাসমূহকে নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এই সকল বিষয়কে নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা চিন্তা করতে পারে তাঁদের জন্য শিক্ষা (ইবরাত) আর যারা শিক্ষা নিতে পারে তাঁদের জন্য চিন্তার উসিলা হয়’।
অনুরূপভাবে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর সময়কালের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উসামা ইবনে মুনকিযও তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, ‘কিতাবুল ই’তিবার’। এই গ্রন্থেও ইতিহাসকে তিনি ইতিবারের সিলসিলা হিসেবে দেখেছেন ও দেখিয়েছেন।
ইতিহাসকে পাঠ করার ক্ষেত্রে মুসলিম ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদগণের ‘ইতিবারমূলক’ এই দৃষ্টিভঙ্গীকে যদি সামনে রাখি তাহলে দেখতে পাই যে, ইতিহাসকে তারা অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহের বিস্তারিত বিবরণকে তুলে ধরার জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি। কিংবা তারা অতীত বিতর্ককে উস্কে দেওয়ার জন্যও ইতিহাস রচনা করেননি।
বরঞ্চ তারা ইতিহাস রচনা করেছেন,
- ১। এমন একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যা আমাদেরকে এমন এক চেতনার প্রদীপ দান করবে যেটার উপর ভিত্তি করে আমরা সঠিকভাবে আমাদের দুনিয়াবী অভিযাত্রাকে পরিসমাপ্ত করতে পারব।
- ২। ইতিহাস শুধুমাত্র অতীত ঘটনা প্রবাহের সমষ্টি নয় বরং ইতিহাস হল এমন একটি গতিশীল প্রক্রিয়ার নাম যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গীর (তাসাউউর) – সাথে প্রতি মুহূর্তে জীবন্ত থাকে।
- ৩। ইতিহাস সময়ের কোলে অবস্থান করলেও সময়ের উর্দ্ধে উঠে শাশ্বত একটি বিশ্বাস, মূলনীতি ও মূলবোধের প্রতিফলন করে থাকে।