[সমকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (জন্ম- ৫ ডিসেম্বর-১৯১৪ মৃত্যুঃ ৩১ ডিসেম্বর-২০০০ঈসায়ী) ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলীতে জন্মগ্রহণ করেন। উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও তার রচনাবলীর প্রায় সবই উন্নত আরবী ভাষায়। লক্ষ্ণৌ নদওয়াতুল উলামার মহাপরিচালক রূপে কাজ করার পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য শিক্ষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। দু’শতাধিক গ্রন্থপ্রণেতা আল্লামা নদভীর ৭খণ্ডে প্রকাশিত আত্মজীবনী এখন গোটা মুসলিম বিশ্বে সমাদৃত। গোটা মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি প্রায় সারা পৃথিবীই তিনি ভ্রমণ করেছেন। একাধারে আধ্যাত্মিক নেতা, উচ্চপর্যায়ের চিন্তাবিদ, লেখক, সাহিত্যিক ও আন্তর্জাতিক মানের সংগঠক হিসাবে তিনি তার সমকালীন বিশ্বে অভূতপূর্ব স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৯৪ সালে দু’বার তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি ছিলেন শহীদে বালাকোট হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর অধস্তন ৫ম পুরুষ। উত্তর ভারতে শহীদ বেরেলভীর পারিবারিক গোরস্তানেই আল্লামা নদভীও শায়িত আছেন।
১৪ মার্চ ১৯৮৪ জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ প্রাঙ্গণে বিশিষ্ট আলেম, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-শিক্ষক সমাবেশে তিনি একটি মূল্যবান ভাষণ দেন। তাঁর প্রদত্ত এ ভাষণটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে বিধায় আমরা তা সংকলনভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেই।]
উপস্থিত আলেম-ওলামা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও আমার প্রিয় বন্ধুগণ!
আপনাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে দেশ ও জাতির প্রতিটি মুহুর্তের প্রতি সদাসতর্ক দৃষ্টি রাখা। আপনারা এ’জাতির ঈমান ও বিশ্বাসের অতন্দ্র প্রহরী। ইসলামের সাথে এ’দেশের সম্পর্ক কোনো অবস্থাতেই যেন বিন্দুমাত্র শিথিল না হয় সে ব্যাপারে আপনাদেরকে পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে। যে দেশ এবং যে জাতির জন্য আল্লাহপাক আপনাদের নির্বাচিত করেছেন, তাদের ব্যাপারে অবশ্যই আপনাদেরকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। ইসলামের সাথে এ দেশের সম্পর্ক যদি বিন্দুমাত্র শিথিল হয় কিংবা অনৈসলামী কার্যকলাপ ও ইসলামবিরোধী তৎপরতা শুরু হয়, তবে মনে রাখবেন রাসূলের ওয়ারিস ও উত্তরাধিকারী হিসাবে আপনাদেরকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। রাজনৈতিক কর্ণধাররা জিজ্ঞাসিত হবে কিনা প্রশ্ন এখানে নয়। কিন্তু এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই সর্বপ্রথম আলেমদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে যে, তোমাদের চোখের সামনে আমার রেখে আসা দ্বীনের এমন অসহায় অবস্থা কিভাবে হতে পারল? কোন মুখ নিয়ে আজ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছ? প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহ বলেছিলেন- আমি বেঁচে থাকতে দ্বীনের কোন অঙ্গহানি ঘটবে এটা কি করে হতে পারে?
এই মুহূর্তে আপনাদেরকে খুঁটিনাটি মতপার্থক্য শিকেয় তুলে রেখে এক বৃহত্তর ও মৌলিক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটে নিপতিত জাতির এই মুহূর্তে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ পথ-নির্দেশনার বড় প্রয়োজন। ইখলাস ও আত্মত্যাগ এবং প্রেম ও নিঃস্বার্থতা দিয়ে জাতির সেই অংশটিকে প্রভাবিত করুন, যাদের হাতে দেশ শাসনের ভার অর্পিত হয়েছে। কিংবা অদূর ভবিষ্যতে যাদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হতে যাচ্ছে। এ’যুগে শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য অপরিহার্য জ্ঞান, দক্ষতা ও উপকরণ যাদের হাতে রয়েছে, জাতির সে অংশটির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা আপনাদের অপরিহার্য কর্তব্য। তাদেরকে তাদের ভাষায় বোঝাতে হবে। আপনাদের সম্পর্কে তাদের মনে এ বিশ্বাস যেন থাকে যে, অপনারা নিঃস্বার্থ এবং প্রকৃতই কল্যাণকামী । তাদের কাছে যেন আপনাদের কোন প্রত্যাশা না থাকে, বিভিন্ন প্রলোভন ও সুযোগ-সুবিধার কথা হয়ত বলা হবে। এ এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের উপর তখন অটল, অবিচল থাকতে হবে। কেননা আপনাদের বিনিময় আল্লাহর হাতে।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির দিকে আমি আপনাদের সযত্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হলো, এ’দেশের ভাষা (বাংলা ভাষা)-কে আপনারা অস্পৃশ্য মনে করবেন না। বাংলা ভাষা ও তার সাহিত্য চর্চায় কোন পূণ্য নেই, যত পূণ্য সব আরবী আর উর্দুতে-এ ধারণা বর্জন করুন। এটা নিছক মূর্খতা। নিজেদেরকে বাংলা ভাষার বিরল প্রতিভারূপে গড়ে তুলুন । আপনাদের প্রত্যেককে হতে হবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী লেখক, সাহিত্যিক ও বাগ্মী, বক্তা। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় আপনাদের থাকতে হবে দৃপ্ত পদচারণা। লেখনী হতে হবে রসসিক্ত ও সম্মোহনী শক্তির অধিকারী। যেন আজকের ধর্মবিমুখ শিক্ষিত তরুণ সমাজ ও অমুসলিম লেখক সাহিত্যিকদের লেখনী ছেড়ে আপনাদের সাহিত্যকর্ম নিয়েই মেতে ওঠে, বিভোর হয়ে থাকে।
বন্ধুগণ,
উর্দু ভাষার পরিবেশে যে চোখ মেলেছে, আরবী সাহিত্যের খিদমতে যে তার যৌবন নিঃশেষ করছে সে আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্ণ দায়িত্ব সচেতনতার সাথে বলছে-বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ইসলাম বিরোধী শক্তির রহম করমের উপর ছেড়ে দেবেন না। “ওরা লিখবে আর আপনারা পড়বেন” ঐ অবস্থা কিছুতেই বরদাশত করা উচিত নয়।
মনে রাখবেন, লেখনীর এক অদ্ভুত প্রভাব সৃষ্টিকারী শক্তি আছে। লেখনীর মাধ্যমে লেখকের ভাব-অনুভূতি, এমনকি তার হৃদয়ের স্পন্দনও পাঠকের মধ্যে সংক্রমিত হয়। অনেক সময় পাঠক হয়ত তা অনুধাবনও করতে পারে না। ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান লেখকের লেখনী পাঠকের অন্তরেও সৃষ্টি করে ঈমানের বিদ্যুৎ প্রবাহ । হযরত থানভী (রহ.) বলতেনঃ পত্রযোগেও মুরীদের প্রতি তাওয়াজ্জুহ বা মনোযোগ নিবদ্ধ করা যায়। শায়েখ বা পীর তাওয়াজ্জুহ সহকারে মুরীদকে লক্ষ্য করে যখন পত্র লিখেন, তখন সে পত্রের অক্ষরে অক্ষরে থাকে এক অত্যাশ্চর্য প্রভাব শক্তি।
এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। পূর্ববর্তী পূণ্যাত্মাদের রচনা সম্ভার আজও মওজুদ রয়েছে। পড়ে দেখুন, আপনার সালাতের প্রকৃতি বদলে যাবে। হয়ত পঠিত বইটির বিষয়বস্তুর সাথে সালাতের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু তিনি যখন লিখছিলেন তখন তাঁর তাওয়াজ্জুহ ও মনোযোগ সেদিকে নিবদ্ধ ছিল। এখন আপনি তাদের লেখা পড়ে তারপর গিয়ে সালাত আদায় করুন। হৃদয় জাগ্রত এবং অনুভূতি সচেতন হলে অবশ্যই আপনি উপলব্ধি করবেন যে, আপনার সালাতের অবস্থা ও প্রকৃতি বদলে গেছে। অনেকবারই আমার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে। আপনি অমুসলমানদের লেখা পড়বেন, তাদের রচিত গল্প, উপন্যাস ও কাব্যের রস উপভোগ করবেন এবং তাদের লিখিত ইতিহাস নির্দ্বিধায় গলধঃকরণ করবেন অথচ আপনার হৃদয়ে তার কোন দাগ কাটবে না, এটা কি করে হতে পারে? আপনার অবচেতন মনে হলেও ‘লেখা’ তার নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করবেই।
আমি মনে করি, আপনাদের জন্য এটা বড় লজ্জার কথা, বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত না হলে আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না যে, এ দেশ, যে দেশে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক আলেমদের জন্ম হয়েছে, সেখানে বাংলায় কোরআনের প্রথম তরজমাকারী হচ্ছেন একজন হিন্দু সাহিত্যিক। এ’দেশের মুসলিম সাহিত্যিকদেরকে বিশ্বের দরবারে আপনারা তুলে ধরুন। নজরুল ও ফররুখকে তুলে ধরুন, তাদের অনবদ্য সাহিত্য কর্মের কথা বিশ্বকে অবহিত করুন। নিবিষ্ট মন ও গবেষকের দৃষ্টি নিয়ে তাদের সাহিত্য পড়ুন, অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করুন এবং আল্লাহ তাওফীক দিলে। আরবী ভাষায়ও তাদের সাহিত্য পেশ করুন। কত শত আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাহিত্য প্রতিভার জন্ম এ দেশে হয়েছে। তাদের কথা লিখুন, বিশ্বের কাছে তাদেরকে তুলে ধরুন। আল্লাহর রহমতে এমন কোন যোগ্যতা নেই যা আপনাদেরও দেয়া হয়নি। আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে এমন অনেক বাঙ্গালী ছাত্র আমি দেখেছি, যাদের মেধা ও প্রতিভার কথা মনে হলে এখনও ঈর্ষা জাগে। প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষার সময় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ছাত্ররা তাদের মোকাবিলায় একেবারেই চুপসে যেত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে মানপত্র দেয়া হয়েছে। আমার-এ ধারণাই ছিল না যে, এত সুন্দর আরবী লেখার লোকও এখানে রয়েছে। কখনও হীমন্যতার শিকার হবেন না। সবরকম যোগ্যতাই আল্লাহ আপনাদের দান করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এগুলোর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।
আমার কথা মনে রাখবেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিতে হবে। দু’টি শক্তির হাত থেকে নেতৃত্ব ছিনিয়ে আনতে হবে। অমুসলিম শক্তির হাত থেকে এবং অনৈসলামী শক্তির হাত থেকে। অনৈসলামী শক্তি বলতে সেই সব নামধা রী মুসলিম লেখক, সাহিত্যিকের কথাই আমি বোঝাতে চাচ্ছি, যাদের মন-মগজ এবং চিন্তা ও কর্ম ইসলামী নয়। মোটকথা, এ উভয় শক্তির হাত থেকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব ছিনিয়ে আনতে হবে। এমন অনবদ্য সাহিত্য গড়ে তুলুন, যেন অন্যদিকে কেউ আর ফিরেও না তাকায়।
মোটকথা, হিন্দুস্থানে উর্দু সাহিত্যকে আমরা অন্যের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেইনি। ফলে আল্লাহর রহমতে সেখানে একথা কেউ বলতে পারেনা যে, মাওলানারা উর্দু জানে না কিংবা টাকসালী উর্দুতে তাদের হাত নেই। এখনও হিন্দুস্থানী আলেমদের মধ্যে এমন লেখক, সাহিত্যিক ও অনলবর্ষী বক্তা রয়েছে, যাদের সামনে দাঁড়াতেও অন্যরা সংকোচ বোধ করে। বাংলাদেশে আপনাদের তাই করা উচিত। আমার কথা আপনারা লিখে রাখুন। দীর্ঘ জীবনের লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন কিংবা বিমাতাসুলভ আচরণ এ দেশের আলেম সমাজের জন্য জাতীয় আত্মহত্যারই নামান্তর।
প্রিয় বন্ধুগণ!
আমার এই দু’টি কথা মনে রাখুন। এর বেশী কিছু আমি বলতে চাই না। প্রথম কথা হলো-এই দেশ ও জাতির হিফাযতের দায়িত্ব আপনাদের। ইসলামের সাথে এ দেশের সম্পর্ক কোনো অবস্থাতেই যেন শিথিল হতে না পারে। অন্যথায় আপনাদের এই শত শত মকতব, মাদ্রাসা মূল্যহীন হয়ে পড়বে। আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আমার কথায় দোষ ধরেন না। আমি মাদ্রাসারই মানুষ, মাদ্রাসার চৌহদ্দিতেই কেটেছে আমার জীবন। আমি বলছি, আল্লাহ না করুন ইসলামই যদি এ দেশে বিপন্ন হয়, তবে মকতব, মাদ্রাসার কোনই যৌক্তিকতা নেই। আমাদের পয়লা নম্বরের কাজ হচ্ছে এ’দেশে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করা। ইসলামের সাথে জাতির সম্পর্ক অটুট রাখা । দ্বিতীয় কাজ হলো, যেকোনো মূল্যে দেশ ও জাতির নেতৃত্ব এবং সঠিক পথ নির্দেশনা নিজেদের হাতে নিতে হবে। আর তা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাধান্য অজর্ন ছাড়া কখনও সম্ভব নয় ।
গতকালও আমি ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত সম্বর্ধনা সভায় বলেছি যে, আমার খুবই আফসোস হচ্ছে-আমি আপনাদের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলতে সক্ষম নই। আপনাদের ভাষায় আপনাদের সম্বোধন করতে পারলে আজ আমার আনন্দের সীমা থাকত না। ইসলামের দৃষ্টিতে কোন ভাষাই বিদেশী কিংবা পর নয়। পৃথিবীর সকল ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রত্যেক ভাষারই রয়েছে নিজস্ব কতগুলো বৈশিষ্ট্য। ভাষা বিদ্বেষ হল জাহেলিয়াতেরই উত্তরাধিকার। কোনো ভাষা যেমন পূজনীয় নয়, ঘৃণ্যও নয়। একমাত্র আরবী ভাষাই পেতে পারে পবিত্র ভাষার মর্যাদা। এছাড়া পৃথিবীর আর সব ভাষাই সমমর্যাদার অধিকারী। মানুষকে আল্লাহপাক বাকশক্তি দিয়েছেন এবং যুগে যুগে মানুষের মুখের ভাষা উন্নতি ও সমৃদ্ধির বিভিন্ন সোপান অতিক্রম করে বর্তমান রূপ ও আকৃতি নিয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। মুসলমান প্রতিটি ভাষাকেই মর্যাদা ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে। কেননা মনের কথা ফুটিয়ে তুলতে পৃথিবীর সকল ভাষাই আমাদেরকে সাহায্য করে।
প্রয়োজনে যে কোনো ভাষা শিক্ষা ইসলামের নির্দেশ। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রা.) কে হিব্রু ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ হিব্রু হচ্ছে নির্ভেজাল ইহুদী ভাষা। দেশের ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আমরা যদি উদাসীন ও নির্লিপ্ত থাকি, তবে তা স্বাভাবিক ভাবেই অনৈসলামিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। ফলে যে ভাষা ও সাহিত্য হতে পারত ইসলাম প্রচারের কার্যকর মাধ্যম, তাই হয়ে দাঁড়াবে শয়তানের শক্তিশালী বাহন। আপনাদের এখানে কলিকাতা থেকে অশ্লীল সাহিত্য আসছে। সাহিত্যের ছদ্মাবরণে কমিউনিজমের প্রচার চলছে। ইসলামী মূল্যবোধ ধ্বংসের মাল-মশলা তাতে মিশানো হচ্ছে। আর সরলমনা তরুণ সমাজ গোগ্রাসে তা গিলছে। এর পরিণতি কখনও শুভ হতে পারে না।
ভাইসব,
আপনারা তিরমিযী, মিশকাত কিংবা মিযানের শরাহ্ লিখতে চাইলে তা আরবী, উর্দুতে লিখুন, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু জনগণকে বোঝাতে হলে জনগণের ভাষাতেই কথা বলতে হবে। আমি আপনাদের খিদমতে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই-পাক ভারতে হাদীস শাস্ত্রের পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যাখ্যা গ্রন্থ লেখা হয়ে গেছে। সেখানে নতুন সংযোজনের বিশেষ কিছুই নেই। আপনাদের সামনে এখন পড়ে আছে কর্মের এক নতুন বিস্তৃত ময়দান। দেশ ও জাতির উপর আপনাদের নিয়ন্ত্রণ যেন শিথিল হতে না পারে। আপনাদের দেশের মানুষ যেন মনে না করে যে, দেশে থেকেও আপনারা বিদেশী, স্বদেশের মাটিতে এই প্রবাস জীবন অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। মনে রাখবেন, এ দেশের মাটিতেই আপনাদের থাকতে হবে এবং এদেশের জনগণের মাঝেই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। এদেশের সাথেই আপনাদের ভাগ্য, আপনাদের ভবিষ্যৎ জড়িত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ “হে মুসলমানগণ! তোমাদের খুন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের আবরু ইজ্জত পরস্পরের জন্য হারাম।”
ভাষাগত পার্থক্যের কারণে কোনো মুসলমান ভাইকে অপমান করা, তার ইজ্জত আবরু লুণ্ঠন করা কিংবা তাকে হত্যা করা সম্পূর্ণ অবৈধ, হারাম ও জুলুম । “প্রতিটি বস্তুর আল্লাহপাক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ও স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছেন।” কোনো মুসলমানের জন্য সে সীমা লংঘন করা বৈধ নয়। সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটান, কাব্যের রস উপভোগ করুন, কিন্তু অতিরঞ্জন করবেন না। তবে সব ভাষাকে স্ব-স্ব মর্যাদায় রেখে মাতৃভাষাকে ভালবাসা, স্বীয় অবদানে তাকে সমৃদ্ধ করে তোলা শুধু প্রশংসনীয়ই নয়, অপরিহার্যও বটে।
[মূল উর্দু থেকে তর্জমাঃ মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ। দৈনিক ইনকিলাব -এর সৌজন্যে ।]