বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে মুসলিম যুবকগণ পাশ্চাত্যের বিষয়সমূহ অধ্যয়ন ও গবেষণা করেছিল। তারা ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তাধারার গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণা করছিল। বিজয়ী সভ্যতা এবং তার পতাকাধারী হতে ভয়ভীতি তখন দিন দিন কমে যাচ্ছিল। ভারতীয় মুসলমানগণ উচ্চশিক্ষার জন্য তখন ইউরোপ আসা-যাওয়া করছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইউরোপের বড় বড় শিক্ষাকেন্দ্রে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অবস্থান করে তথাকার জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জন করতে লাগল এবং নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে শ্রেষ্ঠ ও মুক্ত চিন্তাবিদ শিক্ষকদের তত্তাবধানে অর্জন করতে লাগল। তাঁরা পাশ্চাত্য সভ্যতা হতে কেবল পাঠ্য-পুস্তকের মাধ্যমে নয় বরং অধিকতর ভালো প্রতিনিধি ব্যক্তিদের মাধ্যমে পাশ্চাত্য সভ্যতার পরিচয় অর্জন করতে লাগল। পাশ্চাত্যের হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তারা তার শেষ সীমায় পৌঁছে তা সম্পর্কে এভাবে জ্ঞাত হতে চেষ্টা করতে লাগল, যেভাবে কোনো শিক্ষিত ইউরোপিয়ান করতে পারে। সেখানের দর্শন রীতি-নীতি এবং বিভিন্ন চিন্তাধারা বিচার-বিবেচনা করতে লাগল এবং এর গোপনীয় মূলতত্ত্ব ও তার রহস্য পর্যন্তও পৌঁছাতে চেষ্টা করল। তাদের পাশ্চাত্য মনোভাব, স্বভাব, জাতিগত অভিমান এবং উৎকৃষ্ট অনুভূতি দ্বারা ইউরোপীয় জনসাধারণের আত্মগৌরব ও গর্বকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সমাজের নিম্নগামিতা, পতন এবং বুদ্ধিমত্তার অভাবের প্রাথমিক চিহ্ন ও পরিচয় তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। ঐ সমস্ত ভালো ভালো বিষয় ও সাংগঠনিক অংশও তাদের সম্মুখে আসল যা মানবতার জন্য কল্যাণকর হতে পারে। এভাবে ক্ষতিকর ও মানবতার সাথে অংশসমূহও (যা ঐ সভ্যতার ভিত্তিমূলে এই প্রথম হতে অবস্থিত ছিল) তাদের দৃষ্টি হতে আর গোপন রইল না।
এ সমস্ত পর্যবেক্ষণ তাদের মন ও মস্তিষ্কে এমন এক তাৎপর্যপূর্ণ অনুভূতি সৃষ্টি করল যে, যার অর্জন এক দীর্ঘ সময় অবস্থান ছাড়া সম্ভব ছিল না। ইউরোপীয় মতবাদ ও চিন্তাধারার তুলনামূলক অধ্যয়ন সাহসিকতার সঙ্গে তারা সম্পন্ন করেন যা গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া সম্ভব ছিল না। ফলে তার অনুসরণ ও অনুকরণের (পাশ্চাত্য) বন্ধন হতে নিষ্কৃতির জন্য তাঁরা মুসলিম বিশ্বে ইসলামী আদর্শ ও পাশ্চাত্য সভ্যতার বন্ধন হতে নিষ্কৃতির জন্য চেষ্টা করে, তবে এই কাজ সম্ভব নয় ঈমানের স্ফুলিঙ্গ ছাড়া যা এখনও নিভে যায় নি বরং ছাইয়ের স্তুপের মধ্যে লুকায়িত ছিল এবং যে কোন সময় প্রচণ্ড শক্তিতে জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। এই সমস্ত জিনিস স্বচক্ষে দেখার পর তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি পাশ্চাত্য সভ্যতা হতে নিরাশ হয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা ও সাহসিকতার সাথে এর সমালোচনার ইচ্ছা নিয়ে দেশে ফিরে আসলেন। তাতে চিন্তা ও সমালোচনার মধ্যে সীমালঙ্ঘনের অথবা অতিশয়োক্তির ক্রটিও ছিল না, ঘটনার অস্বীকৃতিও ছিল না এবং প্রকৃত অবস্থাকে ভেঙে-চুরে পেশ করবার আগ্রহও তেমন ছিল না।
এই বিপ্লবী সমালোচকদের মধ্যে সবচেয়ে অধিকতর বৈশিষ্টমণ্ডিত ব্যক্তি আল্লামা ইকবাল, যার সম্পর্কে বলা যেতে পারে এই শতাব্দীতে তার চেয়ে উন্নত আধুনিক শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিরল, তাকে নতুন প্রাচ্যের সবচেয়ে অধিক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তাবিদ বলা যেতে পারে। প্রাচ্যের গবেষক এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে (তা সত্ত্বেও তাদের অনেকেই পাশ্চাত্য ভ্রমণ ও অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করেছিল) এমন কেউ ছিলেন না, যিনি পাশ্চাত্য সভ্যতা ও চিন্তাধারা তার চেয়ে গভীরতর দৃষ্টির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং এত সাহসের সাথে তার সমালোচনা করেছেন।
মুহাম্মদ ইকবাল এই সভ্যতা গঠনের মৌলিক উপকরণ এবং এর দুর্বল দিকসমূহ ভিতর থেকে পাঠ করেছেন এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলোর শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছতে চেষ্টা করেছেন। যা জড়বাদী প্রবণতাসহ ধর্মীয়, চারিত্রিক এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সাথে পাশ্চাত্য নাগরিকদের বিদ্রোহের কারণে এর ভিত্তিমূলে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। তিনি মন ও অন্তর্দৃষ্টির এই ক্ষতিকে যা এই সভ্যতার বৈশিষ্ট্য, সভ্যতার প্রাণের অপবিত্রতা বা মলিনতা বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন “ইউরোপের সভ্যতা মন ও অন্তর্দৃষ্টির বিনাশের ফলে এই সমাজের প্রাণ পবিত্র রাখতে পারেনি।”
ইকবাল আরো বলেনঃ “আত্মার পবিত্রতা না থাকলে পবিত্র মন, উচ্চ চিন্তাধারা ও সূক্ষ্ম অনুভূতিও বিদ্যমান থাকে না। তার ফলে মন আলোকবিহীন হওয়া এবং জীবন আনন্দবিহীন হওয়া যা এই সভ্যতার উপর সাংঘাতিক প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাকে এক যান্ত্রিক ও কারিগরি রঙ দিয়ে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ হতে এর সংযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে এবং আল্লাহর রহমত হতে একে দূরে সড়িয়ে দিয়েছে”
তিনি বলছেনঃ “এই প্রচুর আনন্দ, এই শাসন, এই ব্যবসা, আলোবিহীন বক্ষে সান্ত্বনা হতে বঞ্চিত। ফিরিঙ্গীরা মেশিনের ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন (তূর পাহাড়ের) উপত্যকাও (যেখানে মূসা আলাইহিস সালামের জন্য আল্লাহ তা’আলার নূর উদ্ভাসিত হয়েছিল।) অন্ধকার হয়ে গিয়েছে তা এখন আর তাজাল্লীর যোগ্য নয়।”
তিনি এই সভ্যতার দীন বর্জিত ভিত্তি এবং দীনবিহীন উপকরণের কথা বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন, যার ধর্ম ও নৈতিকতার সঙ্গে বৈরিতা রয়েছে, এবং যা ইবরাহীম (আ) এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে জড় পদার্থের মিথ্যা উপাস্যদের উপাসক ও পূজক বনে গেছে এবং এক নতুন শিবালয়ের রচয়িতা হয়েছে। তিনি ‘পস চেহ বায়াদ কর্দ’ কাব্য গ্রন্থে বলেছেন- “সাবধান, এই ধর্মহীন সভ্যতা হতে বাঁচতে হবে, কারণ ন্যায়-নীতির অনুসারীদের সাথে এর রয়েছে বৈরিতা।”
তিনি আরো বলেন-
“এ সকল ফিতনা-ফাসাদ আরো ফিতনা-ফাসাদের জন্ম দিচ্ছে, যেই লাত ও উযযাকে কাবা শরীফ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সে গুলোকে আবার সেখানে আনা হচ্ছে।”
“এর জাদুর দ্বারা আত্মার চক্ষু অন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্রাণ পানির অভাবে পিপাসায় মৃত্যুবরণ করছে। ”
“অশান্তির স্বাদ আত্মা হতে পালিয়ে যায়, বরং আত্মা এই মার্টির মূর্তি হতে আলাদা হতে চায়। ”
এই সভ্যতার রীতিনীতি হলো লুণ্ঠন করা, এবং মানুষ হত্যা করা, এবং এর কাজ ও উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা ও সওদাগরী। জগতের নিরাপত্তা, শান্তি এবং নিঃস্বার্থ ভালবাসা এবং অকপট নিষ্ঠা তখনই ভাগ্যে জুটতে পারে, যখন এই নতুন সভ্যতার রীতিনীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি আরো বলছেনঃ “নতুন সভ্যতার রীতিনীতি হলো মানুষ হত্যা করা, এটা সভ্যতা নয় বরং এটা ব্যবসা, উদ্দেশ্য রক্ত শোষণ। ”
“যতক্ষণ এই আধুনিক রীতিনীতি ধ্বংসপ্রাপ্ত না হবে দীন, সৎ বুদ্ধি ও সঠিক সভ্যতার অবক্ষয় হতেই থাকবে।”
এই সভ্যতা যদিও অতি আধুনিক, কিন্তু এর ভিত্তি মূল অতি দুর্বল ও পদে পদে ত্রুটি-বিচ্যুতির শিকার, ফলে এর পতন আসন্ন। এই সভ্যতায় ইয়াহুদী ধুর্তরা যে ক্ষমতা অর্জন করেছে তার প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে যে অনতিবিলম্বে ইয়াহুদীরাই এর মালিক হয়ে যাবে।
তিনি বলছেনঃ- “এই আধুনিক সভ্যতা মৃত্যু যন্ত্রণায় উপনীত হয়েছে, সম্ভবত গির্জার রক্ষক
হবে এই ইয়াহুদীরা। কিন্তু নিদর্শন দেখ এখন মনে হচ্ছে মৃত্যু শয্যায় স্বাভাবিক মৃত্যুর বদলে এ সভ্যতা আত্মহত্যা করবে।
ড.ইকবাল বলেন, “তোমার সভ্যতা নিজের খঞ্জর দ্বারা আত্মহত্যা করবে, কোন ভঙ্গুর শাখার উপর যদি বাসা বানান হয়, তবে তা অস্থায়ী হয়। ”
এই সভ্যতা দীন ও নৈতিকতার রক্ষাকবচ ছাড়াও আল্লাহ তা’আলার ভয়-ভীতির সহায়তা ছাড়া প্রকৃতিকে জয় করার দুর্গম পথ অবলম্বন করেছে, এর কৃতকার্যতা এর অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। ভয় হচ্ছে যে, এটা নিজেই অচিরে নিজের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। তিনি বলছেনঃ
“সেই নির্লজ্জ চিন্তাবিদ যে প্রকৃতির শক্তিগুলোকে নগ্ন করেছে তাদেরই তড়িতাঘাতে তার বাসস্থান বিপদগ্রস্ত।”
‘সুদ ও লাভ’ এবং ‘প্রতারণা ও কৌশল’-এর এই জগত, যার রচয়িতা হলো ফিরিঙ্গিরা। এখন তা মৃত্যুমুখে পতিত এবং আর একটি নতুন দুনিয়ার উত্থান ঘটছে। এ ব্যাপারে ইকবাল স্পষ্ট করে বলেন
“নতুন দুনিয়া সৃষ্টি হচ্ছে ঐ বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ জগত মৃত্যুবরণ করছে, ফিরিঙ্গি জুয়াড়ীরা যাকে বানিয়েছে জুয়ার আড্ডাখানা। ” তিনি বলেন, এই সভ্যতা বিজ্ঞানের আলো দ্বারা আলোকিত এবং জীবনের উত্তাপে দীপ্ত বটে, এমনকি তা বিজ্ঞান ও শিল্পের মাঝে নিজ প্রতিভা ও দক্ষতা প্রকাশও করে থাকে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তা বিপ্লবী আবিষ্কার ও নতুন ভাব প্রকাশ করার শক্তি হারিয়েছে। সেখানে বুদ্ধির উন্নতি আত্মার ক্ষতি, এর পরিচালক নিজেই অনুসরণ ও অনুকরণের গোলাম এবং ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে। এর কেন্দ্র এখন প্রেমিকের চিৎকার, সাধকের কর্ম, পয়গম্বরী সাহসিকতা হতে বঞ্চিত। ড. ইকবাল স্মৃতি থেকে বলেনঃ “আমি সে কালের স্মরণ করি, যেকালে আমি ছিলাম ফিরিঙ্গীদের শুঁড়ীখানায়। তাদের মদের পেয়ালা (বাদশা) সিকান্দরের আয়না হতে বেশি উজ্জ্বল ছিলো।
মদ্য বিক্রেতার উন্মত্ত চক্ষু মদ্যের রক্ষক, মদ্যপানকারীদের জন্য পানপাত্র পরিবেশনকারীই পয়গাম্বর।
এর দীপ্তি কালীমবিহীন (অর্থাৎ মুসা কালীমুল্লাহ ছাড়া যার উপর তুর পাহাড়ে দীপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল) এবং এর অগ্নি শিখা খলীলবিহীন (অর্থাৎ ইবরাহীম খলীলের উপর অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল)
এখন অগ্নিশিখা থাকলেও খলীল নাই । ভয়হীন বুদ্ধি প্রেম সামগ্রীর লুণ্ঠনকারী।”
ইকবাল আরো লিখেন-
“তার ভালবাসায় অশান্ত হৃদয়ের অস্থিরতা নাই, এই মদ্য গৃহের মদ্যপায়ীর নাই প্রেমাসক্তের পদচারণা”।
তিনি এই সভ্যতার আলোকিত চেহারা ও তৎমাসাচ্ছন্ন অন্তরের ছবি এভাবে অঙ্কিত করেছেনঃ
“ইউরোপে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলো আছে যথেষ্ট,
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এতে নেই অমৃত ঝর্ণা, আছে শুধু গাঢ় অন্ধকার।
গঠনের সৌন্দর্য্যে জাঁকজমক ও পরিচ্ছন্নতায় ব্যাংকসমূহের দালানগুলো গির্জা অপেক্ষা বহু উচ্চ।
তাতে চলে প্রকাশ্যে সুদের ব্যবসা, প্রকৃতপক্ষে ওটা জুয়া,
একজনের লাভ কিন্তু লক্ষ লক্ষ লোকের আকস্মিক মৃত্যু।
এই বিজ্ঞান, এই প্রজ্ঞা, এই চিন্তা রক্ত খায় চুষে,
কিন্তু মুখে ফুটে সাম্যের বুলি।
বেকারত্ব, উলঙ্গপনা, মদ্য পান, দারিদ্র্য
এগুলোই পাশ্চাত্য শাসন ও সভ্যতার অসংখ্য কীর্তি।
যে জাতি আসমানী ওহি হতে বঞ্চিত,
ঐ জাতির শেষ সীমা হলো বিদ্যুৎ ও বাষ্প।”
পাশ্চাত্য সভ্যতা, এর ভিত্তিসমূহের এবং এর চিন্তা, গবেষণার পদ্ধতির উপর এই ধরনের সমালোচনা ও পর্যালোচনা রয়েছে। তাঁর মাদ্রাজে প্রদত্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণে যা “Reconstruction of Religious Thought in Islam” নামে প্রকাশিত বয়েছে। প্রকৃত পক্ষে তাঁর ভাবনা আরও গভীর ও বিস্তারিত। কারণ জ্ঞান ও দর্শনের ভাষা কবিতা ও সাহিত্যের ভাষার মোকাবিলায় জ্ঞানের কথা গভীরভাবে প্রকাশের অধিক শক্তি রাখে। তিনি পাশ্চাত্যের জড়বাদী সভ্যতার গঠন ও স্বভাব এবং বর্তমান মানব জাতির (যারা এর প্রতিনিধি এবং পতাকাবাহক) উপর এর কুপ্রস্তাবের বিশদ বর্ণনা দিয়ে বলছেনঃ
“বর্তমান যুগের সমালোচনামূলক দর্শন এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের পারদর্শিতা মানুষের যে অবস্থা করেছে তা বড়ই নিকৃষ্ট ব্যাপার। এর প্রাকৃতিক দর্শন নিশ্চিতভাবে একে এই যোগ্যতা দিয়েছে যে, প্রকৃতির শক্তিসমূহকে কাজে লাগাতে পারে, কিন্তু তা করেছে তার ঈমান ও বিশ্বাসের ধনকে কেড়ে নিয়ে।”
তিনি আরো বলেনঃ
“বর্তমান সময়ে বুদ্ধিমত্তার উৎকর্ষের দ্বারা মানুষের আত্মা মৃত্যুবরণ করেছে। অর্থাৎ মানুষ নিজের বিবেক ও অন্তর হতে নিরাশ হয়ে গিয়েছে। চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, তার অস্তিত্ব তার সত্তার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। রাজনৈতিক দিক দিয়ে দেখলে দেখা যায়, একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। তার এমন ক্ষমতাও নেই যে, সে নিজের নির্দয় আত্মম্ভরিতা এবং ধন-দৌলতের সীমাহীন ক্ষুধার উপর জয়ী হতে পারে। এ সমস্ত কারণেই এই সভ্যতার প্রভাবাধীন জীবনের উচ্চ স্তরের জন্য চেষ্টা ও আগ্রহ ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং এই কথা বলা সঙ্গত, তারা প্রকৃতপক্ষে জীবন হতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের দৃষ্টি বাস্তব পদার্থের উপর যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যা চক্ষুর সম্মুখে, এ কারণে তাদের সম্বন্ধ অস্তিত্বের গভীরতা হতে কর্তিত হয়ে গিয়েছে। হাক্সলি (Huxley)-র ও এই সন্দেহ ছিল। এবং যা তিনি দুঃখের সঙ্গে প্রকাশও করেছিলেন। বস্তুবাদী মনোভাবের ক্রমোন্নতি তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে অবশ করে দিয়েছে।”
“বর্তমান সময়ের ধর্মহীন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই, তুলনামূলকভাবে বেশি প্রশস্ত এবং তার আবেগ ও উদ্যমের অবস্থাও কোন নতুন ধর্মেরই অনুরূপ। কিন্তু তার ভিত্তি হেগেল (Hegel) -এর ‘বিপরীত মতবাদ (Philosophy of Opposites)’ অনুসরণকারীদের উপর স্থাপিত, তাই তিনি এর বিরুদ্ধাচরণ করেন। যা এর জন্য জীবন ও শক্তির ঝর্ণা হতে পারত।”
আল্লামা ইকবাল পাশ্চাত্য সমাজকে এমন এক সংগঠন বলে গণ্য করেন যার পেছনে কেবল পশুসুলভ দড়ি টানাটানি কার্যকর রয়েছে। তিনি এটাকে এমন এক সভ্যতা বলেন যা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের প্রতিদ্বন্দ্বীতার কারণে নিজের আধ্যাত্মিক ঐক্য হারিয়ে ফেলেছে।
তিনি একজন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্র উভয়কে বস্তুবাদী বৃক্ষের দুটি শাখা এবং এক বংশের দুটি পরিবার বলে আখ্যায়িত করেন, যার একট প্রাচ্যের আর একটি পাশ্চাত্যের। কিন্তু বস্তুবাদী চিন্তা জীবনধারা ও মানুষ কে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে উভয়ে যেন এক প্রাণ দুই দেহ। সাইয়্যেদ জামালউদ্দীন আফগানীর সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক সাক্ষাত তিনি তার ভাষায় বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে
“দুই দলই অশান্ত, দুই দলই খোদার পরিচয় রাখে না এবং মানুষের সাথে প্রতারণাকারী।
এক দলের জন্য জীবন নির্গমন আর একদলের জন্য কর আদায়, এই দুই প্রস্তর মাঝে মানুষ কাঁচসম।
এক দল জ্ঞান, ধর্ম ও প্রযুক্তিতে ভঙ্গুরতা নিয়ে আসে। আর অন্যদল শরীর হতে প্রাণ, হাত হতে খাদ্য ছিনিয়ে নেয়! দুই দলই পানি ও কাদার মধ্যে ডুবে গেছে, দুই দলের শরীর আলোকিত, অন্তর অন্ধকার।
জীবন (হয়) দগ্ধ হওয়া অথবা গঠন করা, কাদার মধ্যে আত্মার বীজ ঢেলে দেওয়া
দরিদ্ররা আকাশকে হারিয়ে ফেলেছে, তারা পেটের মধ্যেই পবিত্র প্রাণের সন্ধান করে!
পবিত্র প্রাণ শরীর হতে রঙ ও গন্ধ গ্রহণ করে না, সমাজতন্ত্র শরীর ছাড়া কিছুর ধার ধারে না।
সত্যের পরিচয়বিহীন সেই নবী যার দীন পেটের সাম্যের উপর ভিত্তি করে বিদ্যমান।
ভ্রাতৃত্বের স্থান অন্তরে, এর বীজ অন্তরেই থাকতে হবে, পানি ও কাদায় নয়।”