মানুষ ও ইসলামঃ সাংস্কৃতিক সম্পদের আহরণ ও নির্যাস

১ বার পঠিত

একটি জাতি বা সমাজের যেমন অর্থনৈতিক সম্পদ সঞ্চিত থাকে (যেমন জ্বালানী সম্পদ)-যা অব্যবহৃত অবস্থায় মূল্যহীন কিন্তু শক্তির দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ-তেমনি তাদের ইতিহাসে বিশাল সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদও সঞ্চিত থাকে। একটি অযোগ্য ও অক্ষম জাতি হয়তো এমন বিপুল সম্পদের উপর বসে থাকে যা মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন দিতে সক্ষম, কিন্তু এরপরও মানুষ অজ্ঞ, জড়াগ্রস্ত ও বঞ্চিত থেকে যায়। বর্তমানে আমরা এশিয়া ও আফ্রিকায় এমন অনেক জাতিগোষ্ঠীর কথা জানি যাদের বিশাল ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক সম্পদরাজি রয়েছে, কিন্তু তাদেরকে গৎবাঁধাভাবে পশ্চাৎপদ, অজ্ঞ এবং আধ্যাত্মিক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

একটি জাতির সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সংক্ষেপে, একটি প্রজন্ম যদি তাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতে চায় এবং নিজেদের সমাজকে একটি অগ্রগামী ও সৃষ্টিশীল সমাজে রূপান্তর করতে চায়, তাহলে তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার পাশপাশি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে, তারা অন্য কোনো অগ্রগণ্য সমাজকে অন্ধ অনুকরণ করবে। বরং, নিজেদের ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য নিজস্ব অভিজ্ঞতা, মূলনীতি ও গুণাবলির সাথে সাথে একটি নতুন মিশন বা লক্ষ্য থাকাও এক্ষেত্রে আবশ্যক।

সাম্প্রতিক সময়ে, এশিয়া ও আফ্রিকার আলোকিত প্রজন্মসমূহ ইউরোপের দার্শনিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার সরাসরি সংস্পর্শে এসেছে। অতীতে (১৯শ শতাব্দীতে), একজন শিক্ষিত এশীয় ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর শুধু নিজের অভিজ্ঞতাগুলো মানুষকে শোনাতেন এবং মানুষ তা-ই মেনে নিত। এশীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল এটুকুই। তবে বর্তমানে, এশিয়া ও আফ্রিকার মুক্তচিন্তকরা ইউরোপ সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে অবগত; যার পেছনে আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণি, পারস্পরিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক সচেনতা বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের সাথে পরিচিতি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাচ্যের এই মুষ্টিমেয় মুক্তচিন্তকগণ নিজেদের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের ব্যাপারে সজাগ থাকার পাশপাশি আত্মসচেতনও বটে।

আধ্যাত্মিকতা, দর্শন ও জীবনবোধে সমৃদ্ধ এক মহান সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা উপলব্ধি করত পেরেছে যে, নিজেদের শেকড় থেকে ‘সাংস্কৃতিক’ভাবে তারা দেউলিয়াত্বের মধ্যে অবস্থান করছে। ফলে ইউরোপীয় সংস্কৃতির সামান্য লোকমা পাওয়ার আশায় এ অঞ্চলের জাতিসমূহ চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে। এসব মানুষের একমাত্র গর্বের বিষয় হলো-ইউরোপীয় চিন্তকদের ব্যবহৃত কথামালা, চিন্তা ও অভিব্যক্তিগুলো শেখা এবং সেগুলোকে স্মারক হিসেবে নিজেদের দেশে নিয়ে আসা। আমরা লক্ষ করি যে এসব বিষয়ের সাথে আমাদের দুঃখ-দুর্দশা, যন্ত্রণা বা ভাগ্যের কোনো সম্পর্কই নেই। বাস্তবতা হলো, প্রাচ্যের মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণায় ক্লান্ত, আর পাশ্চাত্যবাসী অতিরিক্ত ভোগের ফলে ক্লান্ত! ফলশ্রুতিতে, পাশ্চাত্যবাসীর কথা প্রাচ্যবাসীর কাছে অর্থহীন মনে হয়-যদিও তাদের নিজস্ব পশ্চিমা পরিবেশে কথাগুলো যথাযথ এবং অর্থবহ। কিন্তু যখনই এই ধারণাগুলোকে অন্য কোনো ভিন্ন পরিবেশে নিয়ে আসা হয়, তখন এগুলো শুধুমাত্র প্রদর্শনেচ্ছা ও জাহির করার আকাঙ্ক্ষা ব্যতীত ভিন্ন কিছু হয়ে ওঠে না।

আমি অস্তিত্ববাদ নিয়ে পড়াশোনা করেছি এবং এ বিষয়ে আমার কিছু ধারণা রয়েছে। আমি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিকরূপের পাশাপাশি একটি আর্ট বা শিল্পরূপেও অস্তিত্ববাদকে দেখি- শিল্পোন্নত ইউরোপ ও বস্তুবাদী পাশ্চাত্যের যাঁতাকলে আবদ্ধ মানবচেতনার এটি এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি প্রায়শই লক্ষ করি যে আমাদের এশিয়া ও আফ্রিকার মুক্তচিন্তকগণ, যারা নিজেদের দেশীয় ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ সম্পর্কে অজ্ঞ এবং কেবল কোনো একটি পশ্চিমা ভাষা জানেন, তারা ইউরোপ বা আমেরিকায় গিয়ে অস্তিত্ববাদ শিখে আসেন এবং নিজেদের দেশে ফিরে এসে সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিষয়। যখন আমরা এই ‘আমদানিকৃত ধারণাগুলো’ পরখ করি, তখন বুঝতে পারি যে-কিয়ের্কেগার্ডের সময় থেকে শুরু করে সার্ত্রে ও ইয়াসপার্সের সময়কাল পর্যন্ত (অর্থাৎ উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে) যে অস্তিত্ববাদী বিপ্লব সংঘটিতে হয়েছিল, তা মূলত বস্তুবাদী ব্যবস্থা ও ভোগবাদের সেই জঘন্য ও স্থবির করে দেওয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক ধরণের আধ্যাত্মিক ও মানবিক জাগরণ হিসেবেই এসেছিল, যেটি দীর্ঘকাল ধরে পাশ্চাত্যকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার তুলনায় পাশ্চাত্যের এই অস্তিত্ববাদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত নগণ্য ও অপরিণত হিসেবেই গণ্য করা চলে। বিগত এক শতাব্দী ধরে অস্তিত্ববাদের মূল সুর হিসেবে যে ‘উদ্বেগ’ (বস্তুগত জগতের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বা দূরত্ব, দায়িত্ববোধের কারণে উদ্বিগ্নতা, এবং সঠিক পথ বা দিকনির্দেশনা খুঁজে না পাওয়ার অক্ষমতা) লক্ষ করা যায়, এটিই মূলত অস্তিত্ববাদের মৌলিক সমস্যাগুলোর অধিকাংশ সৃষ্টি করেছে। প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক দর্শনের নিকট এই সমস্যাগুলো অনেকটা ‘বর্ণমালা’ শেখার মতোই সহজ কিছু। লাওৎসে, বৌদ্ধধর্ম ও ইসলামী আধ্যাত্মিক দর্শনে এসব বিষয় বহু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল; এ ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা দেখি যে একজন ইরানি মুক্তচিন্তাবিদ ইউরোপে যাচ্ছেন, অথচ ইসলাম বা নিজের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান কেবল সেইটুকুই, যা তিনি ছোটবেলায় নিজের আম্মা বা দাদী-নানীর কাছ থেকে শুনেছেন কিংবা হাই স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়েছেন। তিনি সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন, কিন্তু দেশে ফিরে এসে আমাদের এমন সব প্রাথমিক চিন্তাভাবনা ও ধারণা শোনান, যেগুলো আমাদের স্কুলে বা মাদরাসাগুলোতেই শেখানো হয়।

উদাহরণস্বরূপ, এই মুক্তচিন্তাবিদ ইউরোপে গিয়ে জানতে পারেন যে সার্ত্রে ‘শোয়াযির’ (Choisir – ফরাসি ক্রিয়াপদ, যার অর্থ ‘নির্বাচন করা’) এবং ‘শোয়া’ (Choix – বিশেষ্যপদ, যার অর্থ ‘পছন্দ/নির্বাচন’) নিয়ে আলোচনা করেছেন-যা আমাদের ভাষায় ‘নির্ধারণবাদ’ (Determinism) ও ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ (Free-will) হিসেবে পরিচিত। আমাদের সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে ইসলামী সংস্কৃতির দার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক রচনাবলিতে ‘নির্ধারণবাদ’ ও ‘স্বাধীন ইচ্ছা’র ধারণাগুলো সবসময়ই প্রচলিত ও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার আগে এই মুক্তচিন্তাবিদ যেহেতু এসব ধারণার বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন, তাই তিনি মনে করেন যে নতুন কিছু দেশ ও জাতিকে উপহার দিচ্ছেন!

আমরা লক্ষ করি যে, প্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নিয়তির মধ্যে এক নিখুঁত সামঞ্জস্য রয়েছে। যেমনটা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, একটি জাতি যতই ধনী হোক না কেন, নিজের বস্তুগত সম্পদকে যদি কাজে লাগাতে অক্ষম হয়, তাহলে তারা ক্ষুধার্তই থেকে যায়। একইভাবে কোনো জাতি যদি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ সম্পর্কে সচেতন না হয় এবং সেগুলোকে আহরণ, পরিশোধন ও শক্তিতে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে বিপুল সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদের ভাণ্ডারের ওপর বসে থেকেও তারা অজ্ঞ ও পশ্চাৎপদই থেকে যাবে। কোনো সমাজের ভাগ্য নির্ধারণে সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত সম্পদের ভূমিকার মধ্যেও ঠিক একই ধরনের সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ, যারা নিজেদের সম্পদকে কাজে লাগাতে অক্ষম, তাদের শেষ পর্যন্ত বিদেশিদের নিকট সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয়।

আমরা দেখতে পাই যে সভ্য ইউরোপ-যারা আমাদের সম্পর্কে আমাদের নিজেদের থেকেও ভালোভাবে জানে-আমাদের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদরাজিকে কাজে লাগিয়ে নতুন চিন্তাধারা ও মতবাদের জন্ম দিচ্ছে। যেহেতু আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদকে সচেতনভাবে ব্যবহারের যোগ্য নই, তাই আমাদের মুক্তচিন্তাবিদদের তাদের কাছেই হাত পাততে হয়। অথচ এই মুক্তিচিন্তাবিদরা একবারও ভেবে দেখে না যে, তারা যা গ্রহণ করছে তা আসলে তাদের নিজেদেরই কাঁচামাল! তারা যেহেতু নিজেদের সম্পদকে কাজে লাগাতে অক্ষম, তাই আজ তাদেরকে বর্বর, অজ্ঞ এবং আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত দিক থেকে দরিদ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

সুতরাং, প্রাচ্য যেমন দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিজেদের কাঁচামাল বা প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছে, সেগুলো আহরণ করতে শিখছে এবং পরিশোধন ও জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমে সেগুলোর উপযোগিতা তুলে ধরছে; তেমনিভাবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তাদের একই কাজ করা জরুরি। নিজেদের সাংস্কৃতিক সম্পদকে আহরণ ও পরিশোধনের মাধ্যমে তারা যেমন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করতে সক্ষম হবে, তেমনি গতিশীলতা ও সৃজনশীলতাও অর্জন করবে। প্রাচ্য যেভাবে ইউরোপীয় ভোগ্যপণ্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর ও স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক একই সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণার প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পরিশেষে, আখলাকী ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।

আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা অর্জন করা ব্যতীত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয়; আবার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়াও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা অর্জন করা অসম্ভব। এই দুইটি বিষয় একটি অপরটির উপর নির্ভরশীল এবং একে অপরের পরিপূরক। বস্তুগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র একটি সত্তা গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রয়োজন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চেতনা বা বোধ গড়ে তোলা, একইভাবে পাশ্চাত্যের জন্যও বিষয়টি সত্য। আমাদের তাই কী করা উচিত এবং কীভাবে তা করা সম্ভব?

এর উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। আমাদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে, স্বাধীনতা ও জাতীয় সত্তা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হলো সেই শত্রু (বা শত্রুরা), যারা আমাদের নিকট থেকে এই বিষয়গুলোকে কেড়ে নিয়েছে। সুতরাং, পাশ্চাত্য কীভাবে আমাদের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছে, এবং কীভাবে প্রাচ্যে এমন এক প্রজন্মের জন্ম দিয়েছে, যারা তাদের চিন্তা, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ভাণ্ডারকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা আমাদের এই সম্পদগুলো হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। প্রাচ্যে নিজেদের লক্ষ্য হাসিলে পাশ্চাত্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, কী পদ্ধতি অবলম্বন করেছে এবং কী কৌশল ব্যবহার করেছে, সেগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। তারা এ কাজে এতটাই সফল হয়েছে যে প্রাচ্য, যা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির উৎস, আঁতুড়ঘর এবং ভিত্তি; তাকে আজ তারা বর্বরতা, পশ্চাৎপদতা ও বিকৃতি, অবক্ষয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। পাশ্চাত্য যে পথগুলো ধরে আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল, আমরা যদি সেগুলো চিহ্নিত করতে পারি, তবেই আমরা সেই পথগুলো অনুসরণ করে পুনরায় আমাদের উৎসের কাছে ফিরে যেতে পারব।

বর্তমান শতাব্দীর মহান আফ্রিকান ও এশীয় চিন্তাবিদগণ, যারা নিজেদের জাতীয় ও সর্বজনীন উপলব্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেছেন, তাদেরকে জানার পরিবর্তে আমরা অত্যন্ত আগ্রহ ও উৎসাহের সাথে ব্রেখট, বেকেট ও তাদের মতো ব্যক্তিদের ব্যাপারে জানার জন্য শক্তি ও শ্রম ব্যয় করছি, যাদের সঙ্গে আমাদের বাস্তব পরিস্থিতির কোনো সম্পর্কই নেই। আমি যদি একজন জার্মান হতাম, তাহলে হয়তো ব্রেখটকে পূজা করতাম(!); কিন্তু যেহেতু আমি একজন পারসিক, তাই তাকে বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয় এবং তিনি আমার ঠিক কী উপকারে আসতে পারেন, সেটিও আমার নিকট বোধগম্য নয়। বাস্তবতা হলো, ব্রেখটের দেওয়া প্রতিকার আমার যন্ত্রণার উপশম ঘটাতে অক্ষম; তার সমস্যাটি হয়তো স্নায়বিক, আর আমার সমস্যা হল পেটের ব্যথা। পাশাপাশি, তিনি দুইটি বিশ্বযুদ্ধ ও তিন শতাব্দী ধরে চলা যন্ত্রসভ্যতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, অথচ বিশ্বযুদ্ধ, যন্ত্রসভ্যতা কিংবা বুর্জোয়া সমাজ-এগুলোর কোনোটির সঙ্গেই আমার কোনো পরিচয় নেই। ফলে তার দর্শন আমার কোনো কাজেই আসবে না। আমার দুশ্চিন্তার বিষয় হলো শীতের জন্য জ্বালানি, ভবিষ্যতের চাকরি আর সন্তানের শিক্ষা; অন্যদিকে তার দুশ্চিন্তা হলো অস্তিত্বগত। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, “এই পৃথিবীতে আমার ভূমিকা কী?” তিনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন যেখানে তিনি সব দিক থেকেই নিরাপদ, আর এখন তিনি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবছেন। এদিকে আমাদের এখনও কাপড় আর জ্বালানি কয়লার অভাব রয়েছে, আর তিনি ভাবছেন ‘নিজেকে’ নিয়ে। সুতরাং, তার সংকট আর আমার সংকট সম্পূর্ণ ভিন্ন।

লেখক ও চিন্তাবিদ খোঁজার ক্ষেত্রে আমাদের এমন ব্যক্তিদের দিকে তাকাতে হবে, যাদের যন্ত্রণা, ইতিহাস, জীবনাবস্থা ও ভাগ্য আমাদের মতোই। আমি চাই আমরা যেনো ব্রেখটের বদলে কাতেব ইয়াসিনকে, জ্যা-পল সার্ত্রে বা আলবেয়ার কামুর বদলে উমর মাওলুদ, উমর ওজগান, ফ্রান্তজ ফাঁনো এবং এমে সেজেরকে চিনি। পশ্চিমা মুক্তচিন্তাবিদদের আমরা যতটা চিনি, নিজেদের চিন্তাবিদদেরকে ততটাই না চিনলে আমরা নিজ জাতিসত্তা থেকেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব।

যাঁরা স্বেচ্ছায় ও সচেতনতার সাথেই প্রাচ্যের বুদ্ধিজীবীদের মনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পশ্চিমা মানুষের অস্তিত্বগত, সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও সামাজিক সমস্যায় কলুষিত করেন এবং ইউরোপীয় সমস্যা ও পাশ্চাত্যের প্রগতিশীল মতবাদের প্রতি তাঁদের মধ্যে চরম মানসিক আচ্ছন্নতা তৈরি করেন; তাঁরা কেবল প্রাচ্যের জনগণ ও তাঁদের বুদ্ধিজীবীদের নিজস্ব মিশন ও বাস্তবতা থেকেই বিচ্যুত করেন না, বরং নিজেরাও কলুষিতকারী ও প্রতারকে পরিণত হন।

পাশ্চাত্য প্রাচ্যের সঙ্গে এমন কী করেছে যে, প্রাচ্য নিজের ইতিহাস হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বস্তুগত সম্পদ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে উঠেছে? এই বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য উমর মাওলুদ (আফ্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ) বলেন,

“একজন মানুষকে অনুগত, বাধ্য ও বিশ্বস্ত জীবে পরিণত করতে হলে আমাদের তার ব্যক্তিত্ব কেড়ে নিতে হবে। কারণ, যতক্ষণ তার চরিত্র থাকে, ততক্ষণ সে কখনো দাস হতে পারে না। আর কোনো জাতির পিঠে ভালোভাবে সওয়ার হতে হলে তাদের কাছ থেকে মানবিক অনুভূতি কেড়ে নিতে হবে, কিংবা অন্তত দুর্বল করে দিতে হবে। প্রাচ্যবাসী যতক্ষণ নিজেকে স্বাধীন, মর্যাদাবান ও যোগ্য মনে করে, ততক্ষণ সে পশ্চিমাদের ছুড়ে দেওয়া এক টুকরো খাবারের আশায় তোষামোদ করবে না, লেজও নাড়বে না।”

সোর্ডেল হলেন আফ্রিকার অন্যতম মহান চিন্তাবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী। জ্যাঁ-পল সার্ত্রের পরিবর্তে যাঁদের সম্পর্কে আমাদের জানার চেষ্টা করা উচিত, তিনি তাঁদেরই একজন। তিনি বলেন,

“দুজন মানুষের মধ্যকার সম্পর্কে, দুটি সমাজের সম্পর্কে এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্কেও রয়েছে এক দ্বন্দ্ব বা দ্বান্দ্বিকতা (Dialectic)। কীভাবে? মা ও শিশুর মধ্যকার দ্বান্দ্বিকতার দিকে তাকান। মা শিশুকে অবজ্ঞা করে, মারধর করে, তাকে অস্বীকার করে এবং প্রত্যাখ্যান করে। আর শিশুটি এসব নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে নিজেই একসময় মায়ের কাছে আশ্রয় নেয়। সে মায়ের কোলে আশ্রয় নেয় এবং মা তাকে গ্রহণ করেন। কেন? কারণ সে আর বিরক্ত করছেনা, সে মাকে আঁকড়ে ধরে আছে, তাঁর অংশ হয়ে গেছে এবং তাঁর কাছেই আশ্রয় নিয়েছে। এটা করতে গিয়ে শিশুটি তার মূল সত্তাকেই অস্বীকার করে, যে সত্তা মাকে ক্ষিপ্ত করে তুলতো, যে সত্তা বলতো, ‘আমি তোমার কথা শুনবো না, তুমি যা-ই বলো, আমার কিছু যায় আসে না।’ কিন্তু এসব ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে চায় বলেই শিশুটি মায়ের কাছে আশ্রয় নেয়।”

এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে আমরা দেখি, শিশুটি মায়ের কাছে অবজ্ঞার শিকার হলেও, সেই অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেই মায়ের আশ্রয় নেয়। এটা দুজন মানুষ এবং দুটি সমাজ, অর্থাৎ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা লক্ষ করতে পারি। এটাই সোর্ডেলীয় দ্বান্দ্বিকতা: উৎকৃষ্ট বনাম নিকৃষ্ট, পশ্চিমা বনাম প্রাচ্যবাসী এবং সাদা বনাম কালো। বাস্তবতা হলো, নিটশে ও হেগেল থেকে শুরু করে ফ্রয়েড ও সিগফ্রিড পর্যন্ত পাশ্চাত্য তার দর্শন দিয়ে শ্রেষ্ঠ জাতি-নিকৃষ্ট জাতি, পশ্চিমা-প্রাচ্য জাতি এবং সাদা-কালোর এই সকল প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ও নৈতিক নৃবিজ্ঞানী আর্নেস্ট রেনানও এ ধরনের অর্থহীন বাজে কথা বলে গেছেন। যেমন: “মানুষের আধ্যাত্মিক জাতি হলো উত্তরাঞ্চলীয় ও পশ্চিমা জাতি।”

হ্যাঁ, আমি নিজের চোখেই তা দেখেছি, প্যারিসের সরবোনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিংশ শতাব্দীতে একজন চিকিৎসক (এম.ডি.) কালো ও সাদাদের কোষের তুলনা নিয়ে গবেষণাপত্র লেখেন। আর বিশ্বখ্যাত একদল অধ্যাপক তাঁকে ডিগ্রি প্রদান করেন, কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মস্তিষ্কের কর্টেক্সের কোষ শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে নিকৃষ্ট, কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের কোষের লেজের বক্রতা শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কম। আমি তখন তাঁকে বললাম, তিনি কোষের লেজ আর নিজের লেজ গুলিয়ে ফেলেছেন!

মহাপ্রতিভাধর বলে কথিত হেগেল বলেন,

“ঈশ্বর ছিলেন এক ‘অবচেতন’ সত্তা, যা প্রকৃতিতে প্রবেশ করলো। তিনি বিকশিত হয়ে উদ্ভিদে প্রবেশ করলেন; আরও বিকশিত হয়ে প্রাণীতে প্রবেশ করলেন… মানুষে… প্রাচ্যের মানুষে…পাশ্চাত্যের মানুষে… জার্মানদের মধ্যে, আর আরও বিবর্তিত হয়ে জার্মান সরকারে প্রবেশ করলেন, এবং অবশেষে সেই রাজ্যে প্রবেশ করলেন, যা এখন আমাদের শাসন করছে।”

কী চমৎকার! দেখুন, হেগেলের সমস্ত যুক্তি-তর্ক কত দূর গড়িয়েছে!

আজ স্কুলগুলোতে গ্রিক ও পারসিকদের মধ্যকার যুদ্ধকে বলা হয় গ্রিক ও বর্বরদের যুদ্ধ (অথচ পারসিকদেরই সভ্যতা ছিলো অধিক উন্নত)। এই লোকেরা এখনো জানে না যে, গ্রিকরা বর্বরদের হাতে পরাজিত হয়নি, বরং পরাজিত হয়েছে এক মহান সভ্যতার হাতে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি থেকেই শিশুদের মনে এই মিথ গেঁথে দেওয়া হয় যে, পশ্চিমারা প্রাচ্যবাসীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শাখার অধ্যাপক ও চিন্তাবিদরাও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি লালন করেন। উদাহরণস্বরূপ, সমকালীন অধ্যাপক সিগফ্রিড বলেন,

“ঈশ্বর প্রকৃতিতে দুই ধরনের জাতি সৃষ্টি করেছেন: মনিব, যে নির্দেশ দেবে; আর শ্রমিক, যে মান্য করবে। কোনটির প্রয়োজন বেশি? নিঃসন্দেহে শ্রমিকের। প্রতি এক হাজার শ্রমিকের জন্য দুই-তিনজন মনিব প্রয়োজন। তাই ঈশ্বর ইউরোপীয় জাতিকে মনিব এবং প্রাচ্যের জাতিকে শ্রমিক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এ কারণেই প্রাচ্যে বার্ষিক জন্মহার ৩%-৫%, অথচ পাশ্চাত্যে মাত্র ১%।”

সিগফ্রিড একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে ফরাসি একাডেমির সদস্য। তিনি একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ ওঠেনি। তিনি বলেন,

“ফুটপাতে সোনালী চুল ও নীল চোখের সাধারণ শ্রমিক যেই ফরাসী ভদ্রলোককে আপনি উপেক্ষা করে যান, তিনি প্রাচ্যের বিশাল প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরগুলো অনায়াসে পরিচালনা করতে পারেন। অথচ প্রাচ্যে গেলে আপনি এমন সব মহান চিন্তাবিদ ও ব্যক্তিত্বকে দেখতে পাবেন, যাঁরা ছয়জনের একটি প্রতিষ্ঠানও চালাতে অক্ষম। কেন? কারণ পাশ্চাত্যের মস্তিষ্ক সভ্যতা ও সংগঠন গড়ে তোলে, আর প্রাচ্যের মস্তিষ্ক আবেগপ্রবণ, কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় পূর্ণ। তা ছাড়া একজন ইউরোপীয় চল্লিশ বছর ধরে একটি যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু প্রাচ্যবাসী প্রথম ছয় মাসেই সেটি নষ্ট করে ফেলে, তারপরও আরও বিশ বছর সেটি দিয়েই কাজ চালিয়ে যায়।”

(‘জাতিসমূহের আত্মা’ (L’ame des peuples/Spirit of Nations), ফারসি অনুবাদ: জনাব আহমাদ আরাম, তেহরান)

আমি সিগফ্রিডকে বলতে চাই, তিনি যা বলেছেন, তা সত্য; কিন্তু এর সঙ্গে প্রাচ্যবাসী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এর কারণ যন্ত্রের সঙ্গে অপরিচিতি এবং প্রাচ্যবাসীর অধঃপতিত হয়ে পড়া। এমন এক সময় ছিলো, যখন পারসিক মস্তিষ্ক ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল সাম্রাজ্য সংগঠিত ও পরিচালনা করেছিলো। এই সাম্রাজ্যের পরিচালনার ভার ছিলো খাজা নিজামুল মুলকের হাতে; এমন এক সময়ে, যখন সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে হলে বিশটি জাতি, ধর্ম ও জাতীয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। প্রাচ্যের মস্তিষ্ক এমনই ছিলো। আজ প্রাচ্যবাসী যদি তা পারতে অক্ষম হয়ে থাকে, তবে তার কারণ পশ্চিমাদের হাতে তার অধঃপতন, যে ব্যাপারে প্রাচ্যবাসী সচেতন নয়।

ভারতের যে মানুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, তারা কেবল তত্ত্বজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র ও কৃচ্ছ্রসাধনের কাজেই উপযোগী, অথচ তারাই মানুষের জন্য প্রথম সংখ্যাচিহ্ন আবিষ্কার করেছিলো। ইবনে হাইথামের আবিষ্কৃত আলোর প্রতিসরণের সূত্র এবং উমর খৈয়ামের বীজগণিত আজও বৈধ। এগুলো প্রাচ্যের কিছু আবিষ্কার মাত্র। তাহলে আমাদের কেন বলা হয়, প্রাচ্য কেবল তত্ত্বজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র আর আধ্যাত্মিকতার জন্যই উপযুক্ত; বুদ্ধিবৃত্তি, যুক্তিবিদ্যা ও অর্থনীতির জন্য নয়? দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সমস্যাগুলোকে এভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, ইউরোপীয়রা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মৌলিকত্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রাচ্যবাসীকে জাতিগতভাবে নিকৃষ্ট, দুর্বল ও আত্মবিশ্বাসহীন বলে অনুভব করাতে চায়। কেন? কারণ সোর্ডেলীয় দ্বান্দ্বিকতা অনুসারে, একদিকে প্রাচ্যবাসীকে নিজেকে নিকৃষ্ট ভাবতে বাধ্য করা হয় (বিকৃত অতীত, ধর্ম ও ইতিহাসের অধিকারী হিসেবে), অন্যদিকে নিজের হীনমন্যতা থেকে মুক্তি পেতে সে শ্রেষ্ঠ জাতি তথা পাশ্চাত্যবাসীর মতো হওয়ার চেষ্টা করে। প্রাচ্যবাসী শ্রেষ্ঠ জাতির অনুসরণ করলেই সে এমন সব আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে, যা তাকে কালো, প্রাচ্যবাসী, তত্ত্বজ্ঞানপ্রবণ, ধর্মপ্রবণ, বিকৃত ও বুদ্ধিহীন বলে আখ্যায়িত করে। তখন আর তাকে অভিযুক্ত করা হয় না, আর সে নিজের স্বদেশি পোশাকেও থাকে না। ঠিক সেই শিশুটির মতো, যে মায়ের আক্রমণের শিকার হয়েও নিজেই মায়ের কোলে আশ্রয় নেয়। আমি যখন সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিপীড়ক ও নিপীড়িতের সম্পর্ক বোঝাতে ‘মা-শিশুর’ উদাহরণ ব্যবহার করি, তখন তা কেবল উদাহরণ নয়,  বরং এটি একটি বাস্তবতা।

এশিয়া ও আফ্রিকার ‘মা’ হলো ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও হল্যান্ড। এসব দেশ যখন আমাদের সংস্কৃতি, জনগণ ও জাতিকে নীচ বলে অভিযুক্ত করে, তখন আমরা তাদের কথা বিশ্বাস করে বসি। এমন অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আগ্রহী কোনো দেশ কী করে? তাদের বর্ণিত সেই ঘাটতিগুলো পূরণ করার ভান করে। একবার তা করা হলে ‘মাতৃদেশ’ সন্তুষ্ট হয়, ফলে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।

একজন মানুষ যখন ‘নিজের মতো করে’ চিন্তা করে, ভোগ করে, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, সৃষ্টি করে এবং পোশাক পরে, তখনই সে স্বাধীন। কিন্তু এখন এই স্বাধীনতার ওপরই আক্রমণ চালানো হচ্ছে, আর সমস্ত আলোচনাই হলো প্রাচ্যকে তার ‘নিজ-সত্তা’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাশ্চাত্যের ভোক্তা কীভাবে বানানো যায়।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় যন্ত্রগুলো যখন থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উৎপাদন শুরু করলো, তখন থেকেই উদ্বৃত্ত পণ্য আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু প্রসাধনীর মতো এসব পণ্য তৈরি হয়েছিলো ইউরোপীয় রুচি অনুযায়ী। একজন আফ্রিকান নারী তা ব্যবহার করবেন কীভাবে? একজন আফ্রিকান নারী যেমন নিজের প্রসাধনী নিজেই তৈরি করেন, তাঁর পোশাকের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য।

গ্রামবাসীদের দামি কোট কিনতে আকৃষ্ট করার জন্য তাহলে কী করতে হবে? তাদের ভোগের ধরন বদলাতে হবে। কিন্তু ভোগের ধরন সহজে বদলানো যায় না, কারণ তা মানুষের ধর্ম, ইতিহাস, সামাজিক অবস্থান, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন গ্রামবাসীকে এমন এক ম্যানিকুইনে পরিণত করার জন্য, যাকে আমাদের ইচ্ছামতো নাচানো যায়, এসবই ধ্বংস করতে হবে। অর্থাৎ, আমাদের জোর করে সবকিছু তাঁর উপর চাপিয়ে দিতে হবে (ব্যক্তির অনুভূতি যা-ই হোক না কেন)।

সংস্কৃতি কী? এটি হলো একটি জাতির আধ্যাত্মিক, মানসিক, নৈতিক ও ঐতিহাসিক সঞ্চয়, ঠিক প্রাকৃতিক সম্পদের মতোই। প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে গঠিত হয়েছে? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাণী ও উদ্ভিদ মাটির গভীরে স্তরে চাপা পড়েছে। অসংখ্য নিয়ামকের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সেগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে রূপান্তরিত হয়েছে। ঠিক তেমনি ইতিহাসজুড়ে একের পর এক প্রজন্মের আবির্ভাব ও বিলুপ্তির ফলে সংস্কৃতিও সঞ্চিত হয় এবং একটি জাতির আধ্যাত্মিক সম্পদ গড়ে তোলে। মৌলিকত্বকে আমরা যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, তা ইতিহাসেরই অংশ, কারণ মানুষের ব্যক্তিত্ব কোনো এক যুগে হঠাৎ শূন্য থেকে গড়ে ওঠে না।

অতএব, একটি প্রজন্মের ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে অতীতের আধ্যাত্মিক, মানসিক, নৈতিক, শৈল্পিক ও ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞান সঞ্চয়ের নিরন্তর প্রবাহের ওপর। কোনো প্রজন্ম তার অতীতের সঞ্চয়কে যতটা গ্রহণ করতে পারে, নিজের শতাব্দীর সৃষ্টিকর্ম থেকে ততটাই উপকার ল্ভা করতে পারে। কোন গাছ সূর্যের আলো, বাতাস ও নাইট্রোজেনকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে? সেই গাছই পারে, যার শিকড় মাটির যত গভীরে প্রোথিত।

যে ব্যক্তি নিজের ইতিহাসকে ধারণ করে এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, সে এমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়, যে নিজের আগামীকালকে বেছে নিতে ও নির্মাণ করতে সক্ষম। যার কোনো অতীত নেই, তার ভবিষ্যৎ থাকা একেবারেই অসম্ভব। যার অতীত নেই, সে শূন্য থেকে শুরু করে, আর যে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে অপরিচিত, সে একজন আদিম মানুষ।

ইউরোপের শোষণবাদী সমাজবিজ্ঞান বুঝতে পেরেছে, প্রাচ্যকে লুট করতে, তার পিঠে সওয়ার হতে এবং সহজে তাকে প্রতারিত করতে হলে তার ব্যক্তিত্ব কেড়ে নেওয়া অপরিহার্য। এটা সম্পন্ন হলে সে গর্বভরে পাশ্চাত্যের অনুসরণ করবে এবং অবর্ণনীয় উন্মত্ততা ও তৃষ্ণা নিয়ে পশ্চিমা পণ্য ভোগ করবে। কারণ, যার ব্যক্তিত্বে ঘাটতি আছে, সে নিজেকে এমন কারও সঙ্গে সম্পর্কিত করে, যার ব্যক্তিত্ব আছে। আর অন্য কারও মতো হয়ে ওঠার একটি উপায় হলো ভোগ; এর মাধ্যমেই মানুষ অনুকরণ করতে পারে। এটি একদম সত্য, কারণ যারা কোনো খ্যাতিমান ব্যক্তির (বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা চলচ্চিত্র তারকা) মতো দেখতে চায়, তারা প্রায়ই তার ভোগের ধরন নকল করে এবং তার মডেলের গাড়ি চালায়।

শোষক চায় তার যন্ত্রগুলো সবসময় চলুক। শুধু তা-ই নয়, সে চায় সমস্ত মৌলিকত্ব, ধর্ম, রুচি ও নানা প্রতিভা ধ্বংস হয়ে যাক, যাতে সব জাতিকে তার পণ্যের ভোক্তায় রূপান্তরিত করা যায়। এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য শোষক কোনো জাতিকে তার ব্যক্তিত্ব, অর্থাৎ যে বৈশিষ্ট্যগুলো একটি সংস্কৃতিকে অন্য সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে, তা থেকে বঞ্চিত করার উপায় খুঁজে বেড়ায়। সুতরাং একটি প্রজন্মকে গাছের মতোই তার শিকড় থেকে ছিন্ন করতে হবে, যাতে শোষক যেভাবে খুশি তাকে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

একটি জাতিকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা, সংস্কৃতি থেকে বঞ্চিত করা এবং এর ফলে বর্তমান প্রজন্মকে নিজেদের সাংস্কৃতিক সম্পদ থেকে মাহরূম করার প্রক্রিয়া এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেসব সংস্কৃতি সবচেয়ে গৌরবময় ধর্মের অধিকারী ছিলো, সবচেয়ে প্রগতিশীল দার্শনিক চিন্তার জন্ম দিয়েছিলো, সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্পকলা সৃষ্টি করেছিলো, সবচেয়ে মহান সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো এবং মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতার অবদান রেখেছিলো, আজ তারা নিজেদের অতীত সম্পদ থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যে, এমন এক ধরনের মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে যাকে নতুন করে শিখতে হচ্ছে কীভাবে পোশাক পরতে হয়, কীভাবে খেতে হয়, কীভাবে পড়তে ও লিখতে হয়! এসব সমাজ কেন দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে? অথচ পাশ্চাত্য ও এর চিন্তাবিদরা ঠিকই এই সংস্কৃতিকে আত্মসাৎ করে নিজেদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চলমান রেখেছে।

ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টধর্মের ইসলামীকরণের চেষ্টা প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদের জন্ম দিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী যে খ্রিষ্টধর্ম পশ্চাৎপদতার কারণ ছিলো, এভাবেই তা ইউরোপের নির্মাতা ও প্রাণশক্তি সঞ্চারকারীতে রূপান্তরিত হলো। আমাদের যা বলা হয়, তার বিপরীতে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা ধর্মকে অস্বীকার করার মাধ্যমে গড়ে উঠেনি, বরং একটি বিকৃত ও বৈরাগ্যবাদী ধর্মকে সমালোচনামুখর, প্রতিবাদী ও ইহজাগতিক খ্রিষ্টধর্মে রূপান্তরের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার স্রষ্টা ছিলো প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ; বস্তুবাদ কিংবা ধর্মবিরোধী মনোভাব নয়, যার অস্তিত্বই রেনেসাঁর সময় ছিলো না।

ক্যাথলিক থেকে প্রটেস্ট্যান্টে রূপান্তরের অর্থ ছিলো একটি বিকৃত ধর্মীয় চেতনাকে একটি সামাজিক ধর্মীয় চেতনায় পরিণত করা, যে চেতনা শতাব্দীর পর শতাব্দীর পশ্চিমা পশ্চাৎপদতা ও জড়তার ওপর আজকের এই পাশ্চাত্য সভ্যতা গড়ে তুলেছে। আমি এখন যা উল্লেখ করতে যাচ্ছি, তা-ই রেনেসাঁর সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা: রেনেসাঁয় কোনো সাংস্কৃতিক সম্পদই (ধর্মসহ) অস্বীকার করা হয়নি। হিটলারই দাবি করেছিলো যে, সে ইতিহাস নির্মাণ করছে। আপনি যদি এখন ইতিহাস নির্মাণ শুরু করেন, তবে যা গড়বেন, কেবল সেটুকুই আপনার থাকবে! হিটলার অতীতের সঞ্চয় ধ্বংস করা ছাড়া আর কী করেছে?

রেনেসাঁ কী ছিলো? এটি ছিলো গ্রিক সাংস্কৃতিক উপাদানের পুনর্জাগরণ, যা মধ্যযুগে অজানা ছিলো। সুতরাং আজকের ‘মহান’ পশ্চিমা সভ্যতা পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর সেইসব চিন্তাবিদের সৃষ্টি, যাঁরা খ্রিষ্টধর্মকে সচেতনভাবে ‘জানার’ জন্য গ্রিক ও রোমান সাংস্কৃতিক সম্পদ (পাশাপাশি নিজেদের বিশ্বাস ও আবেগের বিপুল ভাণ্ডার) আহরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা এগুলোকে সচেতনতা সৃষ্টিকারী শক্তিতে রূপান্তর করতে পারেন। আর তাঁরা সফলভাবেই তা করেছেন। আমাদের কেন সত্যটা বলা হয় না?

আমাদের বলা হয়, এসব চিন্তাবিদ ধর্ম ও অতীতকে ছুড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে গেছেন এবং হঠাৎ করেই এক নতুন সভ্যতাকে আলিঙ্গন করেছেন! কিন্তু খালি হাতে তাঁরা এগোতে পারলেন কীভাবে? খালি হাতে এগোতে চাইলে শূন্য থেকে, আদিম অবস্থা থেকেই শুরু করতে হয়। বরং তাঁরা সচেতনভাবেই সঠিক পথে অতীতে ফিরে গিয়েছিলেন, আর আরবদের মাধ্যমে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলকে জানার পরিবর্তে নিজেদের মতো করে জানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আজ আমরা দেখি, উন্নত ইউরোপীয়ান শিক্ষা লাভ করেছেন এমন এশীয় ও আফ্রিকান প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও নেতারা আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের স্বদেশি পোশাক-আশাকে উপস্থিত হন। কেন? কারণ, তাঁরা জানেন, গত দুইশ বছর ধরে ‘শোষণ’ তাঁদের এই কথা বোঝাতে চেয়েছে যে,

“তোমাদের নিজস্ব কোনো স্বদেশি পোশাক ছিলো না, ‘আমরা’ তোমাদের গায়ে তা চাপিয়ে দিয়েছি। তোমাদের কোনো ভাষা ছিলো না, আমরা তা শিখিয়েছি। তোমাদের কোনো অতীত ছিলো না, আমরা তোমাদের বর্তমান দিয়েছি। তোমরা সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত ছিলে না, আমরা তোমাদের সভ্য করেছি।”

সব মিলিয়ে, শোষকেরা কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের এমনভাবে গড়ে তুলেছিলো, যাতে তারা মনে করতে থাকে, দাসত্ব আর নাচ-গান ছাড়া তারা আর কোনো কাজেরই নয়। যে কৃষ্ণাঙ্গ নেতা তাঁর স্বদেশি পোশাক পরেন, তিনি নিজের প্রতি আস্থা (Faith) সৃষ্টি করতে চান। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটি অতীতেও ভালো মানুষ ছিলেন, ভালো চিন্তাবিদ ছিলেন, মানব সভ্যতার অংশীদার ছিলেন এবং মানবজাতির অবস্থার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।

বর্তমানে তানজানিয়ার বুদ্ধিজীবীরা ইংরেজিতে কথা বলেন, কারণ শৈশব থেকেই তাঁরা ইংরেজি শিখেছেন। কিন্তু তাঁদের প্রেসিডেন্ট (জুলিয়াস কে. নিয়েরেরে) বলছেন, তাঁদের সোয়াহিলিতে ফিরে যাওয়া উচিত, যে ভাষা দেশটির স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যবহার করে। তাঁদের প্রেসিডেন্ট একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিসরে সুপরিচিত চিন্তাবিদ। তিনি কোনো ‘সেকেলে’ প্রতিক্রিয়াশীল নন। কেন? কারণ, তানজানিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ যতদিন না উপলব্ধি করবে যে, বিদেশি ভাষা ছাড়াও কথা বলা সম্ভব, ততদিন সে নিজেকে এমন এক বোকা ও আধা-বর্বর মনে করতে থাকবে, যাকে ইউরোপীয়দের সঙ্গে নিজেকে জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সভ্য করা হয়েছে। নিজেদের মধ্যে আস্থা, চরিত্র, আধ্যাত্মিকতা ও মৌলিকত্ব সৃষ্টি করতে হলে সোয়াহিলি শিখতে হবে এবং ইংরেজি ছুড়ে ফেলতে হবে। আর এই অভিজ্ঞতা সম্ভব কেবল তখনই, যখন তারা ইউরোপীয় সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের কাছে ফিরে আসতে এবং নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করতে পারবে।

আমরা প্রাচ্যবাসীরা মানব-ইতিহাসজুড়ে সভ্যতার নির্মাতা ও মানবজাতির শিক্ষক ছিলাম; এমনকি আজ আমাদের কাছে মানবজাতির বিশাল ও গভীর সাংস্কৃতিক, মানসিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার এক সংগ্রহশালা রয়েছে। তাহলে আমরা কেন নিজেদের ওপর নির্ভর করে এসব আধ্যাত্মিক সম্পদ (যা অজানা ও অলস পড়ে আছে) আহরণ ও পরিশোধন করতে, সেগুলোকে পুনর্জীবিত করতে এবং চেতনা-উন্মেষকারী ও প্রতিবাদী শক্তিতে রূপান্তর করতে পারবো না? হ্যাঁ, আমাদের পায়ের নিচে খনি ও সমৃদ্ধ সমুদ্রের মতো এসব বিপুল সম্পদ রয়েছে, কিন্তু আমাদের তা থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে যে, নিজেদের ব্যক্তিত্ব ফিরে পেতে আমাদের অন্যদের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। আমাদের তাহলে কী করা উচিত?

স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে এবং নিজেদের চিনতে এই শূন্যস্থান আমাদেরকে মেরামত ও পূরণ করতে হবে। অতীতের যেসব ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক উপাদান কুসংস্কার ও নিদ্রাকর্ষক বিষয়ে পরিণত হয়ে আমাদের সমাজে জড়তা ও অবক্ষয় ডেকে এনেছে; সেগুলোকে বাছাই করে সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তর করার সামর্থ্য আমাদের অর্জন করতে হবে।

পশ্চিমারা আফ্রিকানদের সঙ্গে যা করেছে, তার বিপরীতে আমাদের অতীতকে তারা অস্বীকার করেনি, বরং রূপান্তরিত করেছে। আর আমরা যখন আমাদের নিজেদের নতুন প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালাম, তখন সেটিকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম। ফলস্বরূপ আমরা আমাদের ‘রূপান্তরিত’ অতীত ও ধর্মের দিকে, পাশাপাশি ইউরোপীয় মতবাদ ও সংস্কৃতির দিকেই ছুটতে শুরু করলাম।

নিজেদের উপর আরোপিত এইসব প্রতিচ্ছবিকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া, প্রাচ্যের জনগণের নিকট বাস্তবতাকে সঠিকভাবে তুলে ধরা এবং আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ আহরণ ও পরিশোধন করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তবে পাশ্চাত্য যেভাবে আমাদের জন্য তা করে দিয়েছে সেভাবে নয়; বরং আমাদের জনগণ ও সমাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এক সচেতন পদ্ধতি ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। অর্থনীতিতে আমরা যেভাবে কাঁচামালকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বিশাল শিল্প ও উৎপাদনব্যবস্থা শুরু করি, চিন্তা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলার কাজে সেই একই চেতনাকে, বিশ্বাসকে আমাদের ধারণ করতে হবে।

অনুবাদঃ সালমান মাহফুজ

লেখাটি শেয়ার করুন

মতামত প্রকাশ করুন

অনুদান দিন
Scroll to Top