১. ভূমিকা
আধুনিক সময়ে দ্বীন ও আখলাক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের প্রায়শই এমন এক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে ধর্মকে মনে করা হয় আবেগ ও বিশ্বাসের জগৎ। আর নৈতিকতাকে মনে করা হয় যৌক্তিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যখন আমরা ধর্মতত্ত্বকে একটি ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে চাই তখন এই বিভাজন কি আদৌ টিকে থাকে? এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা নৈতিকতা ও ধর্মের মধ্যকার সংযোগকে নতুনভাবে অন্বেষণ করবো। বিশেষত, এই প্রবন্ধ একটি প্রায়োগিক ধর্মতত্ত্বের (practical theology) দৃষ্টিকোণকে উন্মোচিত করবে, যেখানে ধর্ম ও নৈতিকতার সম্পর্ককে একটি দ্বি-স্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে।
প্রথমত, তাত্ত্বিক স্তর; যেখানে মেটা-এথিক্স ও সংশ্লিষ্ট মৌলিক ধারণাগুলোর আলোকে ধর্ম ও নৈতিকতার ধারণাগত কাঠামো বিশ্লেষণ করা হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রায়োগিক স্তর; যেখানে নৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং তার সামাজিক প্রভাব কীভাবে একটি বিতর্কের জন্ম দেয়-এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।
এই বিশ্লেষণকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে আমরা সমকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু-জেনেটিকীকরণ (Geneticization)-এর আলোচনাও যুক্ত করবো। কেননা, আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে জিন, দেহ এবং সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা, তার নৈতিক জটিলতা এবং ধর্মীয় মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা একটি সময়োপযোগী দৃষ্টিকোণ তৈরি করবে বলে আশা ব্যক্ত করছি।
২. ইসলামে নৈতিকতার ধারণা ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো
ইসলামে দার্শনিক চিন্তাধারায় নৈতিকতা বলতে বোঝায় রূহের এমন একটি দৃঢ় অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য, যা মানুষের কর্মকে পরিচালিত করে। এ ব্যাখ্যার পাশাপাশি, গ্রিক দার্শনিক ধারাতেও নৈতিকতার ধারণা গঠিত হয়েছে-যেখানে আত্মার প্রকৃতি, গুণাবলি এবং ফজিলত (virtue) সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যদিয়ে নৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তি নির্মিত হয় (দ্রাজ ২০০৮, পৃ. ২; ওয়ালজার ১৯৬২, পৃ. ২৩৬-২৫২)।
তবে গ্রিক দর্শনের এ প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি মূলত নীতিশাস্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে আধুনিক চিন্তাচর্চায় এই কাঠামোর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটেছে, যা নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রকে অনেক বিস্তৃত ও বাস্তবমুখীও করে তোলে।
প্রথমত, আধুনিক এই নীতিশাস্ত্র প্রাচীন ভাবনাকে ছাড়িয়ে যুক্তি, জ্ঞানতত্ত্ব এবং অস্তিত্ববাদের মতো প্রমাণভিত্তিক ও প্রায়োগিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রবেশ করে।
দ্বিতীয়ত, জ্ঞানের ক্ষেত্রের বিস্তার, জটিলতা এবং বৈচিত্র্য এতটাই বেড়েছে যে নৈতিক মূল্যায়ন এখন আর স্বতঃসিদ্ধ বিষয় নয়। এর ফলে নৈতিক দর্শনের আরেকটি শাখা তথা “মেটা-নীতিশাস্ত্র” একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মেটা-নীতিশাস্ত্র মূলত বিভিন্ন নৈতিক কাঠামোকে বাইরের একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে-যাতে তাদের মধ্যে থাকা পার্থক্য, মিল এবং কার্যকরী দিকগুলো স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় (আরকৌন ২০০৭, পৃ. ৮৩-৮৪)।
যদি নৈতিকতাকে দর্শনের একটি শাখা হিসেবে ধরা হয়-যেমন গ্রিক ঐতিহ্যে ফ্রোনেসিস (Phronesis) বা যেটি ‘প্রায়োগিক প্রজ্ঞা’ নামে পরিচিত-তবে একে ইসলামী জ্ঞানের প্রাচীন শ্রেণিবিন্যাসে (আল নাদিম, ২০০৯) একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে দেখা কঠিন। এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা উৎসগুলোও তুলনামূলকভাবে সীমিত। কারণ এসব লেখার উৎস প্রধানত দর্শনকেন্দ্রিক রচনাশৈলীর ওপর নির্ভর করে। যা ইসলামের ইতিহাসে পর্যায়ক্রমে বিকাশ লাভ করেছে (মুসা, ১৯৫৩, পৃ. ২২৫; আল জাবিরি, ২০১৪, পৃ. ৯১০)।
তবে যদি গ্রিক দর্শনের প্রভাব বাদ দিয়ে কেবল আরব-ইসলামী ঐতিহ্যকে বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যায় যে নৈতিকতা বিষয়ক গ্রন্থ ও উৎসের পরিমাণ আসলে প্রচুর (ফাখরি, ১৯৯৪; ফাখরি ১৯৭৮, ১:৯১০)। এক্ষেত্রে নৈতিকতা মূলত মানুষের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও ‘ভালো জীবন’ যাপনের পথ নিয়ে আলোচনা করে। এ কারণে এটি হালাল বনাম হারাম অথবা ন্যায় বনাম অন্যায়-এই দ্বৈত বিভাজনমূলক ধারণার চেয়েও অনেক বিস্তৃত এবং গভীর। এজন্য নৈতিকতার ধারণাটি জটিল। কারণ মানব আচরণ নিয়ে আলোচনা করে এমন শাস্ত্র বা জ্ঞানের ক্ষেত্র বহু রকম। এ জটিলতাই স্পষ্ট করে-কেন নৈতিকতাকে ইসলামী জ্ঞানের অন্য শাখা থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে দেখা হয়নি। বরং আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিকতা ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেমন-
- ফিকহ
- উসূলে ফিকহ
- কালাম
- তাসাউফ
- আদব তথা সাহিত্য-যেখানে বিশেষ শ্রেণি-পেশার মানুষদের জন্য (যেমন: আলিম, শিক্ষার্থী, মুফতি, ফকীহ, চিকিৎসক প্রমুখ) একটি আদর্শ বা আচরণবিধি ব্যাখ্যা করা হয়।
এ অন্তর্বিভাজন ও আন্তঃসম্পর্কের কারণে ইসলামী নৈতিকতাবোধ সবসময়ই একটি বহুমাত্রিক এবং সমন্বিত চিন্তার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সৎকর্ম বা ‘পুণ্যকর্ম’-এর ধারণাটি মূলত দুটি দৃষ্টিকোণে বিভক্ত-অস্তিত্বগত (ontological) ও জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological)। এ বিভাজনের লক্ষ্য হলো দুটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা:
-“আমরা কে?”
-“আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?”
বলা যেতে পারে, ইসলামী ধর্মতত্ত্ব (theology) এই দুটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছে।
প্রথমত, ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো মানবিক আচরণ ও মহান আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের প্রতি মানুষের মনোভাব। এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে:
- মানবিক কাজ ও ইলাহী কাজের পার্থক্য,
- মানবিক স্বাধীন ইচ্ছা (free will) বনাম নিয়তিবাদ,
- কর্তব্যবোধ ও দায়বদ্ধতা,
- কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক,
- এবং মুক্তি (salvation) ও সুখ (happiness)-এর ধারণা।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো নৈতিক কর্তব্য (moral obligation) এবং এর উৎস ও ভিত্তি। এখানে প্রশ্ন উঠেছে:
- কোনো কাজের মূল্যায়ন যুক্তির ভিত্তিতে হবে, নাকি ঐতিহ্য বা ধর্মীয় বর্ণনার ভিত্তিতে?
- ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে?
এইসব আলোচনার ভিত্তিতে মুসলিম চিন্তাবিদরা অস্তিত্বগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে একটি ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি করেন। যার মূল প্রশ্ন ছিলো:
আখলাকী মূল্যায়নের বিধান বা নীতিমালা কি কেবল ওহীর (revelation) মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, নাকি ওহী কেবল তা প্রকাশ করে বা ব্যখ্যা দেয়?
ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ইসলামী চিন্তায় গড়ে উঠেছে দুটি মুখ্য ধারা:
১. মুতাযিলা ধারা। যাদের চিন্তাকে নৈতিক বস্তুনিষ্ঠতাবাদ বলা হয়। (Ethical Objectivism)
মুতাযিলাদের মতে, ভালো ও মন্দ-এই নৈতিক ভিত্তিগুলো আল্লাহর ইচ্ছার (Divine Will) পূর্বেও স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্বশীল। অর্থাৎ,
- কোনো কাজ ভালো বা মন্দ হওয়ার জন্য আলাদা মানদণ্ড আছে,
- আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সেই মানদণ্ড অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে,
- ওহীর কাজ এখানে কেবল প্রকাশ করা ও ব্যাখ্যা করা, নতুন করে নির্ধারণ করা নয়।
এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আদেশ (command) ভালোকে নির্দেশ করে এবং নিষেধ (prohibition) মন্দকে রোধ করে।
২. আশয়ারী ধারা। নৈতিক স্বেচ্ছাবাদ (Ethical Voluntarism) বা ইলাহী আদেশ তত্ত্ব (Divine Command Theory)।
আশয়ারী চিন্তাবিদরা বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন:
- ভালো ও মন্দ কোনো পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ডে নির্ধারিত নয়,
- বরং আল্লাহ যা আদেশ করেন তা-ই ভালো এবং যা নিষেধ করেন তা-ই মন্দ,
- অর্থাৎ, আদেশই কোনো কাজকে ভালো করে তোলে এবং নিষেধই মন্দ করে তোলে,
- ওহী আসার আগ পর্যন্ত ভালো বা মন্দ বলে কিছু নেই।
এই চিন্তাধারা ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আশয়ারীদের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত (দ্র. ‘আবদুল জব্বার, আল তাফতাযানী, ১৯৯৮, Hourani ১৯৮৫)।
একইসাথে, ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’-এর ধারণা মূলত তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখার উপর দাঁড়িয়ে আছে-
ক. এমন আচরণ যা মানুষের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা বিরোধপূর্ণ (মুলাইমান লিল তাবিয়ী আও মুনাফফিরান)।
খ. কোনো কাজ পরিপূর্ণ বা অপূর্ণ-এই দুটি ব্যাখ্যা যুক্তিসঙ্গত এবং তেমন বিতর্কের সৃষ্টি করে না।
গ. কোনো কাজ আল্লাহর নিকট ন্যায়পরায়ণ বা অন্যায় হিসেবে বিবেচিত, যার ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি নির্ধারিত হয়-এই ব্যাখাই মূলত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু (দ্র. আল রাজী, ১৯৯৭, ১:১২৩; আল শাহরিস্তানী ২০০৯, ৩৬৩; আল তাফতাযানী, ১৯৯৮, ৪:২৮২; আল-কারাফী, ১৯৭৩, ৮৮)।
এ বিশ্লেষণ মূলত মেটা-নীতিশাস্ত্র (meta-ethics) এবং নৈতিক বিধানের উৎস (sources of normative provisions) এর আলোকে বোঝা যায়।
ইতিহাসের ধারায় মূলধারার দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো আশয়ারী মতবাদ। তবে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ও মতবাদ বিকাশের ধারায় মাকাসিদ আশ শরীয়াহ এর ধারণা গড়ে ওঠে।
এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো : আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ইচ্ছাধীন (arbitrary) নয়, বরং তা যুক্তিনির্ভর ও কল্যাণমুখী। যেমন-
- আদেশ এমন কিছুর প্রতি নির্দেশ দেয়, যা কল্যাণ (মাসলাহাত) নিশ্চিত করে।
- নিষেধাজ্ঞা এমন কিছুকে নিষেধ করে, যা বড় ধরণের ক্ষতি (মাফসাদাত) আনে (আল কারাফী, ২:১২৬)।
অন্যভাবে বলা যায়, যে স্বার্থ বা কল্যাণ (সালাহ) কে কেন্দ্র করে পুরস্কার বা শাস্তির ধারণা গড়ে ওঠে তা পারলৌকিক (আখিরাত) অথবা দুনিয়াবি ও পারলৌকিক উভয়ের মধ্যে যৌথ কল্যাণ, এসব শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ এর মাধ্যমেই জানা যায় (al-‘Izz, 1991, 1:5, 10)।
এ তত্ত্বের ভিত্তি মূলত আশয়ারী চিন্তাবিদরাই তৈরি করেন। তারা ফিকহী বিধানসমূহ বিশ্লেষণ করেন, তার পেছনের উদ্দেশ্য ও যুক্তিগুলো চিহ্নিত করেন এবং সেগুলোকে একটি পরিপূর্ণ ব্যাখ্যামূলক কাঠামোতে সাজান।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো মানবীয় আকল একা কোনো কাজের কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণ করতে পারে না। বরং শরীয়তই একমাত্র কর্তৃত্ব, যা আদেশ-নিষেধের উৎস হিসেবে বিবেচিত (আশয়ারীদের মতে)। অন্যদিকে, মুতাযিলাগণ বিশ্বাস করেন যে যুক্তি নিজেই নৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে, যাকে বলা হয় আকলগত দায়িত্ব (আকলী তাকলীফ)।
এ সব বিতর্ক ও চিন্তাভাবনা পরবর্তীতে সুবিন্যস্ত হয়ে উসূলে ফিকহ-এ পরিণত হয়। যা নৈতিক বিধান, তার উৎস এবং তা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতি গড়ে তোলে।
উসূলে ফিকহ একটি এমন শাস্ত্র যা ওহী ও আকল এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত। যদিও বিভিন্ন মাজহাবের উসূলবিদদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তি বা বর্জনের ভিত্তিতে পার্থক্য রয়েছে, তথাপি মাকাসিদ আশ শরীয়াহ একটি সামগ্রিক ও যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে শরীয়তের উদ্দেশ্য এবং আখলাকী বিধানগুলোর আকলী ভিত্তি ব্যাখ্যা করে।
এভাবে দেখা যায়-আখলাক, শরীয়ত, আকল ও ইলাহী জ্ঞানের সম্মিলনে একটি পূর্ণাঙ্গ চিন্তাধারার কাঠামো ইসলামী চিন্তায় গড়ে উঠেছে, যা বিভিন্ন মতবাদ ও ফিকহী ব্যবস্থার পটভূমিতে নির্মিত।
৩. জেনেটিকীকরণ ও জেনেটিক হস্তক্ষেপ: আধুনিকতা, নৈতিকতা ও ধর্মতত্ত্ব
জেনেটিক্স-এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রটি কেবল চিকিৎসা বা বংশগতি নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি ক্ষেত্র নয়, বরং এটি আজ আমাদের নৈতিক অবস্থান, আত্মপরিচয় এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানায়ও প্রবেশ করেছে। পূর্বে আমরা যে ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর আলোচনা করেছি, সেই কাঠামো জেনেটিক্সের মতো বিষয়েও কতটুকু প্রযোজ্য-সে প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এ আলোচনার সূচনা।
কেন ‘জিন’ এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আজ জিন বা জেনেটিক উপাদান আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। এটি শুধু বিজ্ঞানই নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা; এমনকি ‘ভালো জীবন’ কেমন হবে সে ভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। অন্যদিকে, এটি এমন এক জটিলতাও সৃষ্টি করেছে যেখানে নৈতিকতা, ধর্ম এবং প্রযুক্তির দ্বন্দ্ব এক নতুন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে।
জেনেটিক্স এখন একটি আন্তঃবিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এই একটিমাত্র বিষয় একযোগে যুক্ত হয়ে গেছে নৈতিক দর্শন, জৈব-নৈতিকতা, সমাজবিজ্ঞান এবং ইসলামী আইনের মতো শাস্ত্রের সঙ্গে। ফলে এটি এখন কেবল বিজ্ঞানীদের নয়, বরং দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক এবং আইনজ্ঞদেরও চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ আলোচনা তিনটি মূল ধারণার উপর ভিত্তি করে আগানো হয়েছে: জেনেটিকীকরণ, জেনেটিক হস্তক্ষেপ এবং জেনেটিক উৎকর্ষতা। এদের মধ্যে জেনেটিকীকরণ সবচেয়ে ব্যাপক ও গভীর ধারণা, যেটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তরও।
জেনেটিকীকরণ বলতে বোঝায় এমন এক প্রক্রিয়াশীল অবস্থান, যার মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞান, জেনেটিক্স, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে যায় যে একজন ব্যক্তিকে বোঝার ভাষাই বদলে যায়। মানুষকে তখন আর শুধু সামাজিক বা নৈতিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং জেনেটিক কোড, ব্লুপ্রিন্ট, বৈশিষ্ট্য ও ম্যাপিংয়ের আলোকে দেখতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতিতে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, মানুষকে এখন তার ডিএনএ-র সংজ্ঞা দিয়েই মূল্যায়ন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে (Ten Have 2001, 4:295)। এটি এমন এক পরিবর্তন, যা মানবজীবনের মৌলিক ব্যাখ্যা ও নৈতিক মূল্যবোধকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
জেনেটিক হস্তক্ষেপ (GI) হলো এই রূপান্তরের বাস্তব প্রয়োগ। এখানে মানুষের জিনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়-কখনো রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময়ের জন্য। আবার কখনো জীবনের মানোন্নয়নের জন্য। এই হস্তক্ষেপ সাধারণত দুটি ধরণের কোষে করা হয়: প্রজনন কোষে (যেমন, ভ্রুণ বা গর্ভস্থ সন্তানের উপর) এবং সোম্যাটিক কোষে (যেখানে হস্তক্ষেপ হয় এমন ব্যক্তির ওপর যিনি সদ্য জন্মগ্রহণ করেছেন)। প্রজনন কোষে হস্তক্ষেপ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হতে পারে, যা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবেও অবক্ষয়ের সূচনাবিন্দু বলা যেতে পারে।
তবে GI-এর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো ‘উৎকর্ষতা বৃদ্ধি’। এটি এমন এক ধারণা, যেখানে মানুষের জৈবিক গঠনে পরিবর্তন এনে তার জীবনে ‘ভালো থাকার’ সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। যেমন-স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, উচ্চতা বৃদ্ধি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করা। Sauvlescu, Sandberg, এবং Kahane (২০১১) এটিকে সংজ্ঞায়িত করেন-“এটি একজন ব্যক্তির জীববিজ্ঞানের এমন পরিবর্তন, যা প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতে তার ভালো জীবনযাপনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।” প্রশ্ন হলো, এই ‘ভালো জীবন’-এর সংজ্ঞাই বা আসলে কে দেবে? এই পরিবর্তন কি ন্যায্য? আর যদি ধর্ম অনুযায়ী মানুষের গঠন পূর্বনির্ধারিত হয়, তবে এর মধ্যে হস্তক্ষেপ কি ইলাহী নীতির লঙ্ঘন নয়?
এইখানেই ধর্মীয় চিন্তা, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের প্রয়োজন পড়ে। এখানে প্রায়োগিক ধর্মতত্ত্ব এই সংলাপের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে যা প্রযুক্তি, মানবিকতা এবং ইলাহী নির্দেশনার মধ্যকার সম্পর্ককে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে।
৪. আধুনিককালে জেনেটিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি ফকীহদের নিকট যেভাবে মূল্যায়িত হয়েছে
এ সময়ের ফিকহবিদগণ জেনেটিক হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে যে বয়ানসমূহ গড়ে তুলেছেন, তা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাথে খাপ খায়িয়ে নেওয়ার বৈধতা কিংবা নিষেধ নিয়েই আলাপ করে না; বরং প্রযুক্তি, ধর্মীয় নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শরীয়াহভিত্তিক চিন্তায় ফতোয়া হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা এবং নৈতিক উপলব্ধিকে ব্যবহারিক বিধানে রূপান্তর করা হয়, যেন মুমিন ব্যক্তির আচরণকে দ্বীন অনুযায়ী পরিচালনা করা যায়।
ফকীহগণ যখন জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেন, তখন তারা সাধারণত দুটি প্রধান বিষয় বিবেচনায় নেন প্রথমত, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিটি কতটুকু কার্যকর এবং নিরাপদ। এবং দ্বিতীয়ত, শরীয়ত প্রণেতা আল্লাহর ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য কী হতে পারে এই বিষয়টি বের করা।
যেহেতু কোরআন বা হাদীসে জেনেটিক্স-এর বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই, তাই এখানে ইজতিহাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফকীহগণ কখনো পূর্ববর্তী ফিকহী নজির বা ধরণকে অনুসরণ করেন, আবার কখনো মাকাসিদ আশ শরীয়াহর আলোকে নতুন সিদ্ধান্ত তৈরি করেন।
এই প্রসঙ্গে তিনটি আন্তর্জাতিক ফিকহী প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে-
১. IOMS (Islamic Organization for Medical Sciences), কুয়েত।
২. IFA (Islamic Fiqh Academy), মক্কা।
৩. IIFA (International Islamic Fiqh Academy), জেদ্দা।
IOMS তাদের বিশ্লেষণে জেনেটিক গবেষণাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে বলেছে, এটি মানুষকে আত্মপরিচয়ের উপলব্ধি দেয় এবং আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন প্রকাশ করে। ফলে, তারা একে ফরজে কিফায়া, অর্থাৎ সমষ্টিগত দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করে। তবে তারা সীমাও নির্ধারণ করেছে: জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈধ এবং প্রজনন কোষে পরীক্ষামূলক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ। কারণ এতে বংশপরিচয়ের অবস্থা ও সামাজিক কাঠামো বিঘ্নিত হতে পারে।
১৯৯৮ সালের এক সিম্পোজিয়ামে IOMS আরও বলেছিলো, জেনেটিক গবেষণা অবশ্যই শরীয়তের বিধান ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। গবেষণা যেন মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদাকে হেয় না করে, সেটাই প্রধান শর্ত।
অন্যদিকে মক্কাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান IFA তুলনামূলকভাবে আরও রক্ষণশীল ভূমিকায় নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। তারা মনে করে, কেবলমাত্র অত্যাবশ্যক পরিস্থিতিতে (জরুরীয়াত) -যেমন জীবন রক্ষা বা গুরুতর রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে যথাযথ ঝুঁকি বিশ্লেষণের পরই গবেষণা, পরীক্ষা বা চিকিৎসা করা যেতে পারে। এখানে ধর্মীয় সম্মতি (religiously accepted consent) ও গোপনীয়তা রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
পাশাপাশি IIFA তাদের অবস্থানে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ। তারা সোম্যাটিক কোষে নিরাময়মূলক হস্তক্ষেপের অনুমোদন দেয়। তবে স্পষ্টভাবে একথাও বলছে-এর ব্যবহার শুধুমাত্র তখনই বৈধ, যখন তা ব্যথা উপশম কিংবা রোগ নিরাময় পরিস্থিতিতে হয় এবং বড় ধরণের ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকে। তবে বাহ্যিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, এটা সৃষ্টির মৌলিক রূপ (আসলুল খালিকা) বদলে ফেলে এবং এটি ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত প্রয়োজনের (religious necessity) আওতায় পড়ে না।
এ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা কোনটিতে নিহিত? কারণ মুসলিম সমাজে কোনো কিছু হালাল না হারাম; এ বিভাজনই শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সমস্যা হলো, জেনেটিক্সের ক্ষেত্রে কোরআন বা হাদীসে সরাসরি উল্লেখ না থাকায় ইজতিহাদ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এক্ষেত্রে, ফকীহগণ পূর্ববর্তী আলেমগণের শরীয়তের ব্যাপারে বোঝাপড়া, নীতিমালা এবং মানুষের উপর আল্লাহর হুকুম-নিষেধের দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নেন।
এজন্য জেনেটিক্স বিষয়ে ফতোয়াগুলোকে দুটি বড় শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-
১. চিকিৎসামূলক ফতোয়া: যেখানে মূল শর্ত হলো-প্রয়োগে ভালো ফলাফলের সম্ভাবনা থাকতে হবে এবং তা বড় ধরণের ক্ষতি না ঘটাবে না।
২. মাসলাহা মুরসালা ভিত্তিক ফতোয়া: যেখানে সরাসরি দ্বীনি দলীল নেই তবে মাকাসিদ আশ শরীয়াহর আলোকে, মাসলাহাত (কল্যাণ) বিবেচনায় রায় দেওয়া হয়।
এ দুই শ্রেণির ফতোয়া তৈরিতে জেনেটিক্সের ‘উপকার’ ও ‘ক্ষতি’-এই দুটি বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয় দুটি স্তরে। প্রথমত, ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে, যেখানে জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজে কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলতে পারে তা মূল্যায়ন করা হয়। দ্বিতীয়ত, বিধানগত স্তরে, যেখানে এ প্রযুক্তি শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ে কিংবা চিকিৎসা, অধিকার, অভিভাবকত্ব, বংশ ইত্যাদিতে কী প্রভাব ফেলছে তা বিবেচনা করা হয়।
সবশেষে, এই সমস্ত বিশ্লেষণ শরীয়তের দুটি মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথেও জড়িত-
- মানব জীবন রক্ষা (হিফজুন নাফস)
- বংশধারা সংরক্ষণ (হিফজুন নাসল)
এই আলোকে তিনটি মূলনীতি কার্যকর থাকে-
ক. সবকিছু মূলত বৈধ (আল আসল ফিল আশইয়া আল ইবাহাতুন)
খ. আত্মা ও বংশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা
গ. কল্যাণ অর্জন ও ক্ষতি প্রতিরোধ (জালবুল মানাফি ও দাফউল মাফাসিদ)
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- শুধু উপকারিতা থাকলেই কোনো প্রযুক্তি বৈধ হয় না; যদি সেটি শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করে। কারণ, নৈতিক ক্ষতি উপেক্ষা করে যদি দৈহিক উপকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে তা শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে।
৫. জিনোম ও নৈতিকতার গভীর অবস্থান (Thick Ethics)
বর্তমান জেনেটিক্সের যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের শরীর, বংশ এমনকি ভবিষ্যৎ সন্তান জন্মদানের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও এনে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় নৈতিকতা আর কেবল হালাল-হারামের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রয়োজন হয় এমন এক গভীর নৈতিক দৃষ্টিকোণের, যা মানুষকে শুধু শরীরগত নয়-আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও অস্তিত্বগত সত্তা হিসেবেও মূল্যায়ন করে। আর এই মূল্যায়নের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় ইসলামী ঐতিহ্যের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রের আলোকে-ইলমুল কালাম, দর্শন, ফিকহ ও উসূলে ফিকহ।
এ চারটি ক্ষেত্রকে একত্রে চিন্তা করে আমরা গঠন করতে পারি এক ধরনের “Thick Ethics” বা ‘নৈতিকতা গভীর অবস্থান’। যা আমাদের আচরণের বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণই নয়, বরং মানুষের পরিচয়, ইচ্ছা, উদ্দেশ্য এবং বৃহত্তর জীবনের উদ্দেশ্যের উপর আলো ফেলতে সক্ষম। এ নৈতিকতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়-
- আমি কে?
- আমি কী চাই?
- আমার সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তি ব্যবহার আমার আত্মা, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর কী প্রভাব ফেলবে?
প্রসঙ্গে যদি GI-কে শুধু একটি নিরপেক্ষ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হয় তবে এর অজস্র সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দিক উপেক্ষিত। ইসলামে ‘নৈতিকতা’ কেবল আচরণনির্দেশকই নয়। বরং এটি মানুষের অন্তর্নিহিত ইচ্ছা, নফস, নিয়ত এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কেরও প্রতিফলন। তাই শরীয়ত বা ফিকহের আলোকে GI-এর মূল্যায়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আখলাকের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। অন্যথায় আমরা কেবল প্রযুক্তির ফলাফলই বিচার করবো, তার অন্তর্নিহিত নৈতিক বোধ নয়।
এজন্য এখানে প্রায়োগিক ধর্মতত্ত্ব (Practical Theology) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, যেখানে শরীয়তের বিধান, আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা ও সামাজিক বাস্তবতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এটি আমাদের শেখায়-একটি প্রযুক্তি ইসলামে আইনত বৈধ হলেও তা সবসময় নৈতিকভাবে ন্যায়সঙ্গত নাও হতে পারে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের শরীর কেবল একটি জৈবিক গঠন নয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং ইলাহী আমানত। আর তাই, জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আমাদের এই সত্তাগুলোর প্রতিও সমান মনোযোগ দিতে হবে।
৫.১ জেনেটিকীকরণ ও ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নৈতিকতা
জেনেটিক্স বা জিনতত্ত্ব প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি ধারা নয়। এটি মানুষ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কিন্তু এ গভীর রূপান্তরের মুহূর্তে যে ফিকহী আলোচনা প্রায়শই উপেক্ষিত হচ্ছে তা হলো আকীদাগত বা ধর্মতাত্ত্বিক পর্যালোচনা।
- এখানে মূল বিষয় হলো, মানুষ কি শুধুই একগুচ্ছ অণু-পরমাণুর সমষ্টি নাকি তার মধ্যে রয়েছে এক অতীন্দ্রিয় (transcendent) অস্তিত্ব?
- তার আত্মা ও দেহ কি আলাদা নাকি একে অপরের পরিপূরক?
- সে কি শুধুই জিন-নির্ধারিত একটি অস্তিত্ব নাকি নৈতিক চেতনা ও সৃজনশীলতার অধিকারী?
- জিন কি সত্যিই তার আচরণ নির্ধারণ করে, নাকি এতে রয়েছে অতিরঞ্জন বা তথাকথিত ‘gene myth’?
এ প্রশ্নগুলো প্রযুক্তির আলোকে মানুষের স্বাধীনতা এবং আল্লাহর সৃষ্টি এই বিশ্ব-ব্যবস্থাকে নতুন করে ব্যাখ্যার দাবি তোলে (চ্যাপম্যান, ১৯৯৮, ২৯৮-২৯৯; পিটার্স, ১৯৯৭)।
তবে ইসলামী ধর্মতত্ত্বের আলোকে আমরা এই আলোচনাকে দুটি মূল দৃষ্টিকোণে ভাগ করে দেখতে পারি-
এক. মানুষের ধারণা ও মানব প্রকৃতি: আত্মা, শরীর ও জেনেটিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব।
দুই. আল্লাহর সৃষ্টিকর্ম ও মানবিক কর্ম: জেনেটিক হস্তক্ষেপের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ।
৫.১.১ মানুষের ধারণা ও মানব প্রকৃতি: আত্মা, শরীর ও জেনেটিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব
মানুষ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়। বরং এটি এক গভীর দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও নৈতিক বিবেচনার বিষয়। বিশেষ করে জেনেটিক্সের প্রেক্ষিতে যখন প্রযুক্তি মানুষের শরীর ও ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, সেখানে ‘মানুষ আসলে কে’-এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রে চলে আসে এবং কিছু ধারণাও যৌক্তিক হয়ে উঠে।
এক্ষেত্রে, প্রথম ধারণাটি হলো: আত্মাকেন্দ্রিক গ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাচীন গ্রিক দর্শনে মানুষকে বিশ্লেষণ করা হয় মূলত তার আত্মার গঠন ও গুণাবলির মাধ্যমে। এই দৃষ্টিতে আত্মা হলো মানব কর্মের উৎস এবং তিনটি প্রধান শক্তির সমন্বয়ে গঠিত-
- ১. কামনাময় শক্তি (concupiscent)-যা ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং তৃষ্ণা দ্বারা চালিত;
- ২. রোষাত্মক শক্তি (irascible)-যা প্রতিক্রিয়া, আত্মরক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক আচরণ সৃষ্টি করে;
- ৩. বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি (rational)-যা বাকি দুই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সংযত রাখে।
এ তিনটি শক্তির মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখানে আত্মার পূর্ণতার লক্ষণ, যার ফলে জন্ম নেয় চারটি মূল গুণ সংযম, সাহস, প্রজ্ঞা এবং ন্যায়। গ্রিক নৈতিকতা তাই আত্ম-পরিচিতি ও আত্ম-শৃঙ্খলার ভিত্তিতে গঠিত। এই কাঠামো পরবর্তীতে সুফী ধারায়ও প্রতিফলিত হয়, যেখানে আত্মা পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষ তার আসল অবস্থান তথা আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হয়।
দ্বিতীয় ধারণাটি হলো: শরীরকেন্দ্রিক জেনেটিক দৃষ্টিভঙ্গি
জেনেটিক গবেষণা ও বিজ্ঞানের প্রসার বৃদ্ধির ফলে মানুষের ধ্যানধারণায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছে। এখানে আত্মার ধারণাকে পাশে সরিয়ে রেখে মানুষকে বিশ্লেষণ করা হয় জিনের যোগফল হিসেবে। এজন্য প্রশ্ন ওঠে- “মানুষ কি শুধুই জিনসমূহের সমষ্টি?” (ক্যে, ১৯৯২)
এ ধারণা মানুষের অভ্যন্তরীণ অর্থবোধ ও আত্মিক গঠনকে উপেক্ষা করে কেবল তার জৈবিক গঠনে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এতে মানুষ হয়ে ওঠে পরীক্ষণযোগ্য, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং প্রকৌশলগতভাবে ‘উন্নয়নযোগ্য’ এক বস্তু। এই অবস্থান আখলাকী অবস্থানের সঙ্গে এক মৌলিক বিরোধে পড়ে। কারণ এখানে ‘মানব মর্যাদা’ নির্ধারিত হয় তার জিনগত গুণাবলির ভিত্তিতে। একইসাথে এই ভিত্তিকে অস্বীকার করে যে সে আল্লাহর প্রতিনিধি।
তৃতীয় ধারণাটি হলো: অন্তঃসম্পর্কিত মানুষ-জিন, পরিবেশ ও নৈতিকতা
তবে হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টের পর এক নতুন ধ্যান-ধারণা সামনে আসে। যেখানে দেখা যায়, মানুষ কেবল জিনের ফল নয়, বরং একটি জৈব-সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সত্তা। সেইসাথে নির্দিষ্ট জিন থাকলেও তা কখন সক্রিয় হবে, কীভাবে প্রকাশ পাবে-তা নির্ধারণ করে।
এটি জিন-নির্ধারণবাদ (genetic determinism)-এর বিরুদ্ধে একটি মৌলিক অবস্থান।এখানে মানুষ হয়ে ওঠে সক্রিয় সত্তা, যিনি নিজের জৈবিক গঠনের বাইরে নৈতিক সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতা ও আত্মিক বিকাশের অধিকারী।
চতুর্থ ধারণাটি হলো ধর্মীয় মূল্যায়ন: আত্মা ও দেহের সমন্বিত স্বরূপ
ইসলামে মানুষ শুধুই শরীর নয়, আবার শুধুই আত্মাও নয়। বরং সে একটি অখণ্ড সত্তা, যার মধ্যে রয়েছে-
- রূহ (আত্মা), যা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত,
- আমানত, যা তাকে দায়িত্ববান করে তোলে,
- আখিরাতমুখিতা, যা তার জীবনকে সাময়িক নয়, অনন্তের দিকে পরিচালিত করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসলামী ধর্মতত্ত্ব কেবল আচরণের বিধান দেয় না; বরং মানুষের স্বরূপ, তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে আখলাকের ভিত্তি নির্মাণ করে।
সুতরাং, জেনেটিক হস্তক্ষেপ যদি মানুষকে কেবল উন্নত জাতের জীববৈজ্ঞানিক বস্তুতে পরিণত করে, তবে তা মানব সত্তার ইলাহী বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে। আবার যদি তা শরীরগত কষ্ট লাঘবে, দায়িত্ব পালনে কিংবা মানুষের হেফাজতে সহায়ক হয়, তবে তা আত্মিক দিক বিবেচনায় বৈধতা পেতে পারে। শর্ত হলো তা মাকাসিদ আশ শরীয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
৫.১.২ আল্লাহর সৃষ্টিকর্ম ও মানবিক কর্ম: জেনেটিক হস্তক্ষেপের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ
জেনেটিক উৎকর্ষতা নিয়ে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো-মানুষ যেন এখন ‘সৃষ্টিকর্তার ভূমিকায়’ অবতীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু ইসলামী চিন্তার কাঠামোতে এ অভিযোগ অনেকক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রযুক্তি ও জ্ঞান মানুষের একমাত্র অর্জন নয়-এগুলোও আল্লাহর ইরাদাতুল খালকের (cosmic will) অংশ। প্রসঙ্গত, ইসলামী আকীদা অনুসারে আল্লাহর ইচ্ছা (ইরাদা) দুই প্রকারে প্রকাশিত হয়-
১. ইরাদাতুল আমর- আল্লাহর আদেশমূলক ইচ্ছা বা শরীয়তভিত্তিক নির্দেশনা।
২. ইরাদাতুল খালক- আল্লাহর সৃষ্টিশীল বা কসমিক ইচ্ছা, যার অধীনে এই জগতে যা কিছু তা সবই ঘটে, এমন ধারণা।
এ পার্থক্য আমাদের শেখায়, যেকোনো কিছু ঘটছে বলেই তা নৈতিকভাবে সঠিক এমন নয়।
এ পৃথিবীতে মানুষের কাজ ইরাদাতুল খালকের অধীনে ঘটলেও তা ইরাদাতুল আমরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা-সে প্রশ্নটিই নৈতিক মূল্যায়নের কেন্দ্র। এর উপর ভিত্তি করেই কোনো কাজের নৈতিক বিচার করা যেতে পারে।
কোরআনে এসেছে: “তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করবে”– এ আয়াতকে ঘিরে মুফাসসিরদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কারো মতে, এ পরিবর্তন ক্ষতিকর হলে নিন্দনীয়, আর উপকারী হলে তা বৈধ। এ পরিবর্তন দুইভাবে বোঝা যায়:
- শারীরিক পরিবর্তন, অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টি করা গঠন বা বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন,
- নৈতিক পরিবর্তন, যেমন ঈমান থেকে কুফরে যাওয়া বা সৎ চরিত্র থেকে বিচ্যুতি।
মূলত, পরিবর্তনটি যদি কোনো অঙ্গ বা বৈশিষ্ট্যকে তার “ফিতরাত” বা প্রকৃতিক কাঠামো থেকে বিচ্যুত করে দেয়, সেটিই হয় প্রকৃত “তাগইর খালকিল্লাহ তথা আল্লাহ প্রদত্ত সৃষ্টিকাঠামোতে পরিবর্তন। তবে, যদি সেই পরিবর্তন রোগ নিরাময়ের জন্য হয়, শরীরকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য হয়, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ”।
এ ধরণের হস্তক্ষেপ আরও একটি বড় নৈতিক সংকট সৃষ্টি করে, তা হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির স্থিতি ও বৈচিত্র্যে হস্তক্ষেপ। যখন সমাজ ‘স্বাভাবিকতা’কে একটি নির্দিষ্ট বর্ণ, আকৃতি, উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার সাথে সংজ্ঞায়িত করে, তখন এই ‘উৎকর্ষতা’র ধারণা মানুষকে জেনেটিক মানদণ্ডে বিভক্ত করতে শেখায়। এতে করে মানুষের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং একটি সম্ভাব্য জৈবিক শ্রেণিবিভাগের পথ খুলে যায়, যা মানব মর্যাদা ও সাম্যের ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
কিন্তু এখানে মূল যে প্রশ্ন থেকে যায় তা হলো-এই পরিবর্তন কি শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনছে, নাকি আমাদের উপর এমন কিছু আরোপ করছে যা প্রকৃতি বা আল্লাহ আমাদেরকে দেননি?
এ প্রশ্নগুলোর জবাবেই নির্ধারিত হয় একটি প্রযুক্তির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। পরিবর্তন তখনই ন্যায্য, যখন তা আল্লাহ প্রদত্ত সৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং আত্মসন্তুষ্টি কিংবা সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে আরোপিত হয় না। আর এই পার্থক্য মূলত কোনো কিছু ঘটতে পারা (Cosmic Will) ও কিছু ঘটানো উচিত কিনা (Religious Will) এই দুইয়ের মাঝে নিরূপণ করা হয়। এটাই ইসলামী নৈতিকতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্রে থাকা উচিত।
এ বিবেচনার কাজটি শুধু বিজ্ঞানীদের নয়; বরং ধর্মতাত্ত্বিক, নীতিবিদ ও ফকীহদেরও দায়িত্ব। যারা শরীয়ত ও ঈমানী বোধের আলোকে প্রযুক্তির নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে সক্ষম। কারণ প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হোক, ন্যায়ের প্রশ্নটা থেকে যায় মানুষের ইচ্ছা আর মহান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যের মাঝে।
৫.২ জেনেটিকীকরণ ও ফিকহ এর কাঠামোগত বিশ্লেষণ
আধুনিক জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে যে আলোচনা চালু আছে, তা অনেক সময় শুধুমাত্র ব্যবহারিক সুবিধা-অসুবিধার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়, যাকে “thin utilitarian view” বলা হয়। এটি কেবল উপকারিতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে নৈতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু ইসলামী চিন্তায়, বিশেষ করে ফিকহী ঐতিহ্যে এ ধরনের সরলীকৃত ধারণা যথেষ্ট নয়। বরং এক্ষেত্রে একটি “thick” বা গভীরতর নৈতিক মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়, যেখানে ফিকহ ও ধর্মতত্ত্ব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করে। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো-ফিকহকে একটি নিছক আইনগত কাঠামো হিসেবে না দেখে নৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এই নৈতিকীকরণ (ethicization) ঘটানো সম্ভব দুটি উপায়ে।
প্রথমত, আইনগত বিশ্লেষণ থেকে নৈতিক বিশ্লেষণের দিকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ফিকহী ঐতিহ্যের বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডারকে নৈতিক চিন্তার ইতিহাস ও সমসাময়িক আলোচনার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ফিকহের পদ্ধতিগত গঠন সাধারণত তিনটি বৈশিষ্ট্যের উপর দাঁড়িয়ে। যেমন-
- বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার পরস্পর সংযুক্ততা,
- নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে অতীতের বিধান খুঁজে পাওয়া
- সমস্ত কিছুকে মৌলিক মূলনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা।
জেনেটিক হস্তক্ষেপ (GI) এমন একটি বিষয়, যা ফিকহ ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন নৈতিক ইস্যুর আলোকে বিবেচনা করে এসেছে। যেমন জীবন শুরুর পর্যায়, দেহের অখণ্ডতা, আত্মরক্ষা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ। GI প্রয়োগ করা হয় নিষিক্ত ডিম্বাণু, ভ্রুণ ও দেহে এবং প্রত্যেকটি পর্যায়ে একেকটি বিশেষ নৈতিক ও শরয়ী প্রশ্নের জন্ম দিয়ে।
GI যদি শরীরের উপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠে-এই হস্তক্ষেপ কি মানব দেহের মর্যাদাকে অতিক্রম করছে কিনা? এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে: “আল-আদামিয়্যা” মানে হচ্ছে মানুষের দেহগত মর্যাদা, যা জীবিত হোক বা মৃত; আলাদা গুরুত্ব রাখে। এই ধারণার ভিত্তিতে ক্লাসিকাল আলেমরা এমনকি মৃতদেহ বিকৃত করাকেও নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ মানব মর্যাদা শরীরের প্রত্যেক পর্যায়ে জারি থাকে।
GI-র বিষয়টি শরীয়তের দুটি মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্তঃ প্রথমত, আত্মরক্ষা (হিফজুন নাফস)। এবং দ্বিতীয়ত, বংশধারা রক্ষা (হিফজুন নাসল)। আত্মরক্ষা কেবল প্রাণ রক্ষার বিষয় নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে জীবনের ভারসাম্য রক্ষা এবং এমন যেকোনো হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সাবধান থাকা, যা জীবনকে বিকৃত বা বিকল করে দিতে পারে। হোক তা তাৎক্ষণিক কিংবা সম্ভাব্য। এই আত্মরক্ষার ধারণা কেবল বাস্তব আত্মা নয়, সম্ভাব্য আত্মা বা অনাগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
একইভাবে, বংশধারা রক্ষার দায়িত্বও GI-র আলোচনার সাথে যুক্ত। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, বরং গোটা মানবজাতির বংশগত ও উত্তরাধিকারিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। জেনেটিক হস্তক্ষেপ অনেক সময় এমনভাবে পরিকল্পিত হয়, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর বর্তমানের সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক পক্ষপাত চাপিয়ে দেওয়া হয়-যা একটি নৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে। শরীয়ত এখানে মানুষকে কেবল শারীরিক রূপের হেফাজতকারী হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ মানবসমাজের প্রতি দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবেও দেখে।
অন্যদিকে, সন্তান জন্মের প্রক্রিয়া ইসলামে শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং এটি একটি অধিকার-ভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এখানে রয়েছে ধর্মীয় অধিকার, সামাজিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব, যা কেবল মা-বাবা বা দম্পতির নয়, বরং ভবিষ্যৎ সন্তান ও সমাজের প্রতিও দায়বদ্ধ। GI-র আলোচনায় তাই এই অধিকারের কাঠামোও অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে।
৫.৩ জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রে কর্তৃত্ব
ফিকহবিদগণ সাধারণত কোনো বিষয়ের শরীয়ত ভিত্তিক বৈধতা নির্ধারণে কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তি) বা মাসলাহা (সমষ্টিগত কল্যাণ) পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এ পদ্ধতির মাধ্যমে তারা আল্লাহর ইচ্ছা বা নির্দেশনা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে। কিন্তু এ পদ্ধতি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট কিংবা বহুবিধ শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সংযুক্ততা পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে সবসময় সক্ষম হয় না।
ফকীহরা সাধারণত প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু সে প্রযুক্তি নিজেই আদতে কী বোঝায় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। প্রযুক্তিকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন এটি ‘উন্নয়ন’ ও ‘প্রগতি’র স্বাভাবিক ও অবধারিত রূপ। অথচ সিমন্সের মতো কিছু ধর্মতাত্ত্বিক সতর্ক করে বলেছেন যে প্রযুক্তি হলো একধরনের ‘অপ্রাকৃতিক শক্তি’। এটি কেবল নিরপেক্ষ একটি হাতিয়ার নয়-বরং এর মধ্যে বাজারের চাহিদা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সাংস্কৃতিক চাপ সক্রিয়ভাবে কাজ করে।
হ্যাবারমাস এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে কেবল উপকার বা অপকারের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে একটি গভীর অস্তিত্বগত সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি এমন এক প্রক্রিয়া চালু করে দেয় যেখানে এক সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়। তারপর সেই বাস্তবতা থেকে জন্ম নেয় নতুন সম্ভাবনা এবং এই চক্র অব্যাহত থাকে। এর ফলে মানুষের আত্মপরিচয়, নৈতিক কর্তৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। হেলমুথ প্লেসনারের মতে, এখানে মানুষ কেবল একটি দেহ নয়, বরং আত্মার অধিকারী এক সত্তা। এই ভাবনা থেকে স্পষ্ট হয়-জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরকে বদলে ফেলার প্রবণতা মানুষকে তার নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য ও দায়িত্ববোধ থেকে সরিয়ে নিতে পারে।
আধুনিক জেনেটিক হস্তক্ষেপ এমন এক ক্ষমতা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীর, গঠন এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়ে উঠছে। এর ফলে ভবিষ্যতের মানুষের ওপর বর্তমানের একটি একচ্ছত্র কর্তৃত্ব তৈরি হচ্ছে-যেটিকে হ্যাবারমাস বলেছেন “বর্তমান জীবিতদের দ্বারা ভবিষ্যতের মানুষকে মৃতদের অনুগত বানিয়ে ফেলা”।
যদিও ফিকহে এমন কিছু নীতিমালা রয়েছে যেগুলো আগাম ক্ষতির পথ রোধ করতে ব্যবহৃত হয়-যেমন ‘সাদ্দুয যারাই’ বা ‘ক্ষতির সম্ভাবনামূলক উপায় বন্ধ’ করার পদ্ধতি। তবু এই পদ্ধতি এতটা গভীর নয় যে তা জেনেটিক্সের মতো বহুস্তরীয় প্রযুক্তিগত-নৈতিক সংকটকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারে।
জেনেটিকীকরণ এই প্রেক্ষাপটে তিনটি বড় দার্শনিক সংকট তৈরি করে-
প্রথমত, এটি ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়। মানুষের সব আচরণ যদি জিন দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবে তার স্বাধীন নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, এটি আত্মপরিচয়ের ধারণাকে প্রভাবিত করে-মানুষকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে যে সেকে।
তৃতীয়ত, এটি ব্যক্তিত্ব অর্জনের আগের জীবন ও মানব মর্যাদার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে-যা মানুষকে আরেকটি পরীক্ষার বস্তুতে রূপ দেয়।
অন্যদিকে, পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান তার গবেষণার সীমা ছুঁয়ে ফেললে আবার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এতে করে একটি বাস্তবতা থেকে আরেকটি সম্ভাবনার দিকে প্রযুক্তির গতি চালু থাকে, যেন কোনো থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ফিকহ মূলত প্রচলিত পদ্ধতির আলোকে এই পরিবর্তনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজনে বিধান নির্ধারণ করে থাকে। তবে দার্শনিক ভিত্তিতে গঠিত গভীর নৈতিকতা বা “থিক এথিক্স” প্রযুক্তির আগাম সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন থাকতে সাহায্য করে। এটি বিজ্ঞানকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে, বরং নৈতিক চিন্তার আলোকে প্রযুক্তির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর মাধ্যমে মানুষকে তার প্রকৃতি পরিবর্তন না করে বরং সেই প্রকৃতিকে সম্মান করার শিক্ষা দেয়।
শেষকথা
ব্যবহারিক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ গ্রহণ থেকে দেখলে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি-আধুনিক বাস্তবতা ও ধর্মীয় নির্দেশনার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে গড়ে ওঠে। একদিকে ওহী বা ইলাহী বার্তা, আরেক দিকে সমসাময়িক জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা-এই দু’য়ের সম্মিলনে গড়ে ওঠে একটি প্রাসঙ্গিক এবং কার্যকরী ধর্মীয় চেতনা।
এ সংলাপের প্রতিফলন দেখা যায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় পটভূমি থেকে আসা আলেম, চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে, যারা আধুনিক বিজ্ঞান বা সামাজিক পরিবর্তনের আলোকে ধর্মীয় প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম আর একপাক্ষিক, নির্দিষ্ট কিংবা অপরিবর্তনীয় কিছু নয়; বরং এটি একটি চলমান, বহুমাত্রিক ধারণা-যেখানে ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা এবং সময়ের জ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে।
এ চলমান ধর্মীয় চেতনার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একত্রে কাজ করে-যেমন ফিকহ, উসূলে ফিকহ ও আকীদা, যেগুলো নৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও শরীয়তের উৎস বিশ্লেষণ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যা আজ আর শুধুমাত্র বাহ্যিক পরিপ্রেক্ষিত নয়, বরং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপায়িত করতেও ভূমিকা রাখে।
এ বিস্তৃত ও বহুস্তরীয় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে “থিক এথিক্স” বা গভীর নৈতিকতা, যা এখন আর কেবল শাস্ত্রনির্ভর নয়-বরং একটি আন্তঃবিষয়ক পদ্ধতির মাধ্যমে গঠিত। এটি একইসঙ্গে আংশিক বিষয়ের ভেতর সামগ্রিকতা খুঁজে পায়, আবার সামগ্রিক কাঠামোর মাধ্যমে আংশিক সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করে। এভাবে এটি ফিকহী ঐতিহ্যকে বিশ্লেষণ করে এমনভাবে, যাতে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রক্ষা পায় এবং সমসাময়িক সমস্যাও মোকাবিলা করা যায়।
এ দৃষ্টিকোণে মানুষ আর কেবল শরীর নয়, কেবল জিনের সংমিশ্রণও নয়, বরং সে এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা, যার মধ্যে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দুইটি দিকই আছে। সে যেন একটি ছোট জগৎ (microcosm), যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন দেখা যায়।
এ চিন্তা অনুসারে, মানুষ তার দেহের উপর কেবল অধিকারী নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা। তার নৈতিক দায়িত্ব ও জীবনের ছন্দ এই বোঝাপড়ার মধ্যেই প্রকাশ পায়। যেখানে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও প্রয়াস ক্রমাগত ইলাহী ইচ্ছার সন্ধানেই পরিচালিত হয়। এমন একটি পথ ধরে, যেখানে আল্লাহর ইরাদাতুল খালক (যা জগত পরিচালনা করে) এবং ইরাদাতুল আমর (যা মানুষের জন্য বিধান) একত্রে মানুষের কাজ ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়।
অনুবাদ: মুশফিকুর রহমান।


