আমাদের যুবক ভাইগণ অধিকাংশ সময় আমাদেরকে প্রশ্ন করেন যে, উস্তাজ কোন কোন বই পড়ব? অথবা কোন কোন লেখকের বই পড়ব?
আমি কোন লেখকের নাম বা বইয়ের নাম বলতে পছন্দ করি না। তার চেয়ে আমি বলে দেই যে, কিভাবে পড়া উচিত অথবা কোন ধরণের গুণাবলী সম্পন্ন লেখকদের বই পড়া দরকার?
তবে সব সময় আমাদের যে বইটি পড়তে হবে তা হলো, মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। এই গ্রন্থ যেন আমাদের সকল অধ্যয়নের কেন্দ্র বিন্দু হয়। তবে কোরআনকে অধ্যয়ন করার সময় দুইটি বিষয়ের প্রতি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
১. কোরআনকে এমনভাবে অধ্যয়ন করতে হবে যেন আমাদের উপর নাযিল হচ্ছে এই ভাবে।
আল্লামা ইকবালের একটি বিখ্যাত কথা আছে, ‘ মহাগ্রন্থ আল কোরআন চৌদ্দশত বছর পূর্বে নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স.) উপর নাযিল হয়েছে। কিন্তু আমি যখন পড়ি তখন এমন ভাবে পড়ি যেন কোরআন ঐ সময় আমার উপর নাযিল হচ্ছে’।
২. মহাগ্রন্থ আল কোরআনকে এই মহাবিশ্বের একটি অনুবাদ হিসেবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
এর পর যে কাজটি করা প্রয়োজন সেটা হলো; মানুষ, ওহী ও প্রকৃতিকে একে অপরের থেকে পৃথক না করে পড়া প্রয়োজন। এই তিনটি বিষয়কে একত্রিতকারী বিষয় সমূহ পড়া উচিৎ। যদি শুধুমাত্র ওহী কে পাঠ করে মানুষ ও মহাবিশ্বকে পাঠ না করি তাহলে ওহীকে ভালো ভাবে বুঝতে পারব না। আবার, যদি শুধুমাত্র মানুষকে পাঠ করে ওহী ও মহাবিশ্বকে পরিত্যাগ করি তাহলেও একই অবস্থা হবে। এই অবস্থায় আবার মানুষকে বুঝতে পারব না। কারণ মানুষের অবস্থা ও পরিচয়কে আমাদের সামনে সবচেয়ে সুন্দর ভাবে তুলে ধরে আল কোরআন।
একই ভাবে ওহী ও মানুষকে বাদ দিয়ে যদি শুধুমাত্র মহাবিশ্ব বা প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করি তাহলে naturalism বা প্রকৃতিবাদ নিয়ে একটি ভিন্ন কিছু সৃষ্টি হবে।
প্রথমত, এই বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
এরপর, নিমোক্ত চারটি গুণাবলীর অধিকারী লেখককে খুঁজে বের করে তাদের লেখাকে পড়তে হবে,
- বস্তুর সাথে অর্থকে একত্রিত করবে।
- আকল ও ক্বলবকে একত্রিত করবে।
- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে একত্রিত করবে।
- পুরাতন ও নতুনকে একত্রিত করবে।
অর্থাৎ প্রাচীন বা পুরাতনকে পড়বে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে পড়বে এবং আকল ও ক্বলবকে একত্রিত করবে। এর পাশাপাশি সেই আলোকে নিজে জীবন যাপন করবে। শুধুমাত্র জানলেই হবে না, সেই জানাকে বা জ্ঞানকে নিজের জীবনেও বাস্তবায়ন করবে। এই ধরণের লেখকদেরকে খুঁজে বের করে যদি পড়তে পারি, তাহলে আমি মনে করি যে, কোরআনুল কারিমের প্রথম আদেশের দাবীকে বাস্তবায়ন করতে পারব। কারণ ‘ইকরা’ -এর অর্থ শুধুমাত্র পড়া নয়। আয়াত সমূহকে যদি সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে এর অর্থ হলো, মানুষ, ওহী এবং প্রকৃতিকে এক সাথে পড়া।
আমি আমার যুবক ভাইদেরকে আরও একটি বিষয় বলতে চাই সেটি হলো, আমি কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পড়াশুনা করিনি। অর্থাৎ হাকীকত সমূহকে ব্যক্তির উপর নির্মাণ করিনি। পড়ার ক্ষেত্রে আমার মূলনীতি ছিল, একটি বিষয়ে যদি পাঁচটি চিন্তা থাকে তাহলে সেই পাঁচটি চিন্তাকেই পড়ে সেগুলোর মধ্যে যেটাকে বেশী যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে সেটাই গ্রহণ করেছি।
দুই ধরণের বই রয়েছে,
- যে বই চিন্তা করায়,
- যে বই চিন্তা করতে শেখায়,
যেমন উসূল ও মেথডোলজি আমাদেরকে চিন্তা করতে শেখায়। কিভাবে সঠিকভাবে চিন্তা করতে হবে।
যেমন পদার্থ বিজ্ঞান, এই প্রকৃতি কিভাবে চলে, কিভাবে কাজ করে এই সকল বিষয় শিখিয়ে থাকে, কিন্তু এই প্রকৃতির অর্থ কি? পদার্থ বিজ্ঞান এই বিষয়টি আমাদেরকে শিক্ষা দিতে পারে না। অর্থাৎ প্রকৃতিকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? এর পেছনে কি হিকমত রয়েছে? এই বিষয় সমূহ পদার্থ বিজ্ঞান ব্যাখা করতে পারে না।
আমাদের সভ্যতায় জ্ঞান দ্বারা তিনটি বিষয় বুঝায়। সেগুলো হলো;
- জ্ঞান,
- হিকমত
- মারেফাত
জ্ঞান হলো তথ্য উপাত্ত; হিকমত হলো কেন এবং কিভাবে এই প্রশ্নের জবাব, মারেফাত হলো উদ্দেশ্য।
এই সকল গুণাবলীকে ধারণকারী বই ও লেখকদেরকে খুঁজে বের করে যদি পড়তে পারি তাহলে সত্যিকারের পড়া হবে বলে আমি মনে করি।।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ