ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে চিন্তা উৎপাদনের পথ উম্মুক্তকারী জ্ঞান হল উসূল। এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ যদি বিবেচনায় নেওয়া হয় তাহলে দেখা যায়, ইলমুল উসূল শুধুমাত্র ফিকহের নিয়মনীতি উৎপাদনের পদ্ধতি ব্যাখাকারী এবং মূলনীতি দানকারী একটি জ্ঞানই নয়, এটি একই সাথে জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে এর সীমানা নির্ধারণকারী এবং মুসলমানগণ কর্তৃক তৈরিকৃত জ্ঞানসমূহকে দার্শনিক পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালনকারী। বিশেষ করে আইন ও আখলাকের ক্ষেত্রে মুসলমানগণ দার্শনিক পর্যায়ে যে জ্ঞান উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে, তার পেছনে জমিন প্রস্তুত করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে ইলমুল উসূল। এর পাশাপাশি ইলমুল উসূল কাঠামো নির্ধারণকারী, নিয়মনীতি প্রণয়নকারী এবং নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবেও ভূমিকা পালন করে থাকে। এ কারণে উসূলে ফিকহ শুধুমাত্র ফিকহ নয়, জ্ঞানের অন্যান্য শাখা কর্তৃক উৎপাদিত জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতার দলীল হিসেবেও কাজ করেছে। সংক্ষেপে, দ্বীনের নামে কথা বলার সীমানা নির্ধারণ করেছে এ জ্ঞান। এখানে উসূল কিংবা উসূলে ফিকহ বলতে আমরা শুধুমাত্র জ্ঞানের একটি শাখাকে বুঝাচ্ছি না, উসূল একই সাথে চিন্তা করার একটি পদ্ধতির নাম। কোরআন ও সুন্নত বুঝার ক্ষেত্রে, আয়াত ও হাদীস ব্যাখার ক্ষেত্রে উসূলের নীয়ম-নীতি থেকে সর্বদাই ফায়দা (সুবিধা) নেওয়া হয়েছে। উসূল মুসলমানদের অভিন্ন রেফারেন্সের উৎস হওয়ায় উসূলের নিয়ম-নীতির বাহিরে কোন ব্যাখা-বিশ্লেষণই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। মাকাসিদ নামক পরিভাষাটি ক্ল্যাসিক উসূলের সিস্টেম্যাটিকের মধ্যে ‘ওয়াসফুল মুনাসিব’ এর শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম গাজালী এটিকে জারুরিয়্যাত, হাজিয়্যাত এবং তাহসিনিয়্যাত নামক তিনটি শিরোনামে বিভক্ত করেছেন। তিনি জারুরিয়্যাত নামক শ্রেণিটিকে দ্বীন, জান, মাল, আকল এবং নাসল তথা বংশ সংরক্ষণ নামক পাঁচটি মূল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। মাকাসিদের এমন একটি ধারণা যে আমাদের সময়ের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকরী নয় এটি সকলের নিকটেই বোধগম্য।
এ কারণে বর্তমান সময়ে ইসলামী জ্ঞানসমূহকে কার্যকারিতা, সামঞ্জস্য এবং সামগ্রিকতা দিতে হলে, অর্থাৎ ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে উসূলের সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে মাকাসিদকে তার সংকীর্ণ অর্থ থেকে বের করে দ্বীনের সমগ্র মাকসাদ এবং উদ্দেশ্যসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করবে এমনভাবে নতুন করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ কারণে বর্তমান সময়ে ফিকহের মওজুদ হুকুমসমূহকে প্রযোজ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি প্রয়োজনে নতুন নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য মাকাসিদ সম্পর্কিত ধারণাকে আরও বিস্তারিত করা ও উন্নত করা অতীব জরুরী। অন্য কথায় , মাকাসিদকে শুধুমাত্র মাকাসিদ আশ-শারিয়াহ হিসেবে নয়, সৃষ্টির উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত-তাকবীন), সৃষ্টি এবং জীবনের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুল উমরান), ওহী নাযিলের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত-তানযিল), কোরআনের মূল উদ্দেশ্য (মাকাসিদুল কোরআন), সুন্নতের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুস-সুন্নাহ), মুকাল্লাফিয়্যাতের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত-তাকলিফ) এর মতো দ্বীনের সমগ্র উদ্দেশ্য এবং মাকসাদসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করবে এমনভাবে ব্যাখা করতে হবে।
নিঃসন্দেহে মহান প্রভুর সৃষ্টি এবং তার প্রেরিত দ্বীনের মধ্যে অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন এবং উপকারহীন কোন বিষয় নেই। কিন্তু আমাদের সংকীর্ণ চিন্তা ও ব্যাখা-বিশ্লেষণ আমাদেরকে এ সকল কিছুর দিকে ধাবিত করতে পারে। অর্থহীনতা, উদ্দেশ্যহীনতা এবং উপকারহীনতা নিয়ে ব্যস্ত থাকা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে মাকাসিদ। আমরা যদি দ্বীনের ক্ষেত্রে মাকাসিদের অবস্থান এবং এর অর্থ সঠিকভাবে নির্ণয় করে দ্বীনের রহমত, হিকমত, আদালত এবং মাসলাহাতকে বোধগম্য একটি ভাষার মাধ্যমে নতুন করে উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে আমরা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন এবং উপকারহীন বিষয়সমূহ নিয়ে ব্যস্ত থাকা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব।
মাকাসিদের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে অন্য যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের বিবেচনা করতে হবে, তা হল আহকামসমূহের পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়। এটি আমাদের ফিকহের গ্রন্থসমূহে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়েছে, কিন্তু বর্তমান সময়ের সমস্যাসমূহ সমাধান করবে এভাবে তুলে ধরা হয় হয়নি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহের গতিশীলতার দিক থেকে এ তিনটি মূলনীতি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেঃ
ক) ‘সময় ও স্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে হুকুমের পরিবর্তনের বিষয়টিকে অস্বীকার করা যায় না’।
খ) ‘নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য গ্রহণযোগ্য একটি হুকুমের প্রয়োগ যদি সে লক্ষ্যের বিপরীত কোন ফলাফল দেয়, তাহলে সে সংক্রান্ত হুকুম বাতিল বলে গণ্য হবে’।
গ) ‘নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে যদি কোন হুকুম নির্ধারিত হয়, তাহলে সে লক্ষ্যে পৌঁছার সাথে সাথে সে হুকুমের স্থায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে’।
এ সকল বিষয় যদি বিবেচনায় না নেওয়া হয়, তাহলে আজকের যুগের প্রশ্ন ও সমস্যাসমূহের কোন উত্তর ও সমাধান কেন্দ্রিক কোন ফিকহ তৈরি করা যাবে না।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ