ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে চিন্তা উৎপাদনের পথ উম্মুক্তকারী জ্ঞান হল উসূল। এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়  তাহলে দেখা যায়, ইলমুল উসূল শুধুমাত্র ফিকহের নিয়মনীতি উৎপাদনের পদ্ধতি ব্যাখাকারী এবং মূলনীতি দানকারী একটি জ্ঞানই নয়, এটি একই সাথে জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে এর সীমানা নির্ধারণকারী এবং মুসলমানগণ কর্তৃক তৈরিকৃত জ্ঞানসমূহকে দার্শনিক পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালনকারী। বিশেষ করে আইন ও আখলাকের ক্ষেত্রে মুসলমানগণ দার্শনিক পর্যায়ে যে জ্ঞান উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে, তার পেছনে জমিন প্রস্তুত করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে ইলমুল উসূল। এর পাশাপাশি ইলমুল উসূল কাঠামো নির্ধারণকারী, নিয়মনীতি প্রণয়নকারী এবং নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবেও ভূমিকা পালন করে থাকে। এ কারণে উসূলে ফিকহ শুধুমাত্র ফিকহ নয়, জ্ঞানের অন্যান্য শাখা কর্তৃক উৎপাদিত জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতার দলীল হিসেবেও কাজ করেছে।  সংক্ষেপে, দ্বীনের নামে কথা বলার সীমানা নির্ধারণ করেছে এ জ্ঞান। এখানে উসূল কিংবা উসূলে ফিকহ বলতে আমরা শুধুমাত্র জ্ঞানের একটি শাখাকে বুঝাচ্ছি না, উসূল একই সাথে চিন্তা করার একটি পদ্ধতির নাম। কোরআন ও সুন্নত বুঝার ক্ষেত্রে, আয়াত ও হাদীস ব্যাখার ক্ষেত্রে উসূলের নীয়ম-নীতি থেকে সর্বদাই ফায়দা (সুবিধা) নেওয়া হয়েছে। উসূল মুসলমানদের অভিন্ন রেফারেন্সের উৎস হওয়ায় উসূলের নিয়ম-নীতির বাহিরে কোন ব্যাখা-বিশ্লেষণই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। মাকাসিদ নামক পরিভাষাটি ক্ল্যাসিক উসূলের সিস্টেম্যাটিকের মধ্যে ‘ওয়াসফুল মুনাসিব’ এর শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম গাজালী এটিকে জারুরিয়্যাত, হাজিয়্যাত এবং তাহসিনিয়্যাত নামক তিনটি শিরোনামে বিভক্ত করেছেন। তিনি জারুরিয়্যাত নামক শ্রেণিটিকে দ্বীন, জান, মাল, আকল এবং নাসল তথা বংশ সংরক্ষণ নামক পাঁচটি মূল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। মাকাসিদের এমন একটি ধারণা যে আমাদের সময়ের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকরী নয় এটি সকলের নিকটেই বোধগম্য।

এ কারণে বর্তমান সময়ে ইসলামী জ্ঞানসমূহকে কার্যকারিতা, সামঞ্জস্য এবং সামগ্রিকতা দিতে হলে, অর্থাৎ ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে উসূলের সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে মাকাসিদকে তার সংকীর্ণ অর্থ থেকে বের করে দ্বীনের সমগ্র মাকসাদ এবং উদ্দেশ্যসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করবে এমনভাবে নতুন করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ কারণে বর্তমান সময়ে ফিকহের মওজুদ হুকুমসমূহকে প্রযোজ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি প্রয়োজনে নতুন নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য মাকাসিদ সম্পর্কিত ধারণাকে আরও বিস্তারিত করা ও উন্নত করা অতীব জরুরী। অন্য কথায় , মাকাসিদকে শুধুমাত্র মাকাসিদ আশ-শারিয়াহ হিসেবে নয়, সৃষ্টির উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত-তাকবীন), সৃষ্টি এবং জীবনের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুল উমরান), ওহী নাযিলের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত-তানযিল), কোরআনের মূল উদ্দেশ্য (মাকাসিদুল কোরআন), সুন্নতের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুস-সুন্নাহ), মুকাল্লাফিয়্যাতের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত-তাকলিফ) এর মতো দ্বীনের সমগ্র উদ্দেশ্য এবং মাকসাদসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করবে এমনভাবে ব্যাখা করতে হবে।

নিঃসন্দেহে মহান প্রভুর সৃষ্টি এবং তার প্রেরিত দ্বীনের মধ্যে অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন এবং উপকারহীন কোন বিষয় নেই। কিন্তু আমাদের সংকীর্ণ চিন্তা ও ব্যাখা-বিশ্লেষণ আমাদেরকে এ সকল কিছুর দিকে ধাবিত করতে পারে। অর্থহীনতা, উদ্দেশ্যহীনতা এবং উপকারহীনতা নিয়ে ব্যস্ত থাকা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে মাকাসিদ। আমরা যদি দ্বীনের ক্ষেত্রে মাকাসিদের অবস্থান এবং এর অর্থ সঠিকভাবে নির্ণয় করে দ্বীনের রহমত, হিকমত, আদালত এবং মাসলাহাতকে বোধগম্য একটি ভাষার মাধ্যমে নতুন করে উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে আমরা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন এবং উপকারহীন বিষয়সমূহ নিয়ে ব্যস্ত থাকা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব।

মাকাসিদের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে অন্য যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের বিবেচনা করতে হবে, তা হল আহকামসমূহের পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়। এটি আমাদের ফিকহের গ্রন্থসমূহে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়েছে, কিন্তু বর্তমান সময়ের সমস্যাসমূহ সমাধান করবে এভাবে তুলে ধরা হয় হয়নি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহের গতিশীলতার দিক থেকে এ তিনটি মূলনীতি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেঃ

ক) ‘সময় ও স্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে হুকুমের পরিবর্তনের বিষয়টিকে অস্বীকার করা যায় না’।

খ) ‘নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য গ্রহণযোগ্য একটি হুকুমের প্রয়োগ যদি সে লক্ষ্যের বিপরীত কোন ফলাফল দেয়, তাহলে সে সংক্রান্ত হুকুম বাতিল বলে গণ্য হবে’।

গ) ‘নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে যদি কোন হুকুম নির্ধারিত হয়, তাহলে সে লক্ষ্যে পৌঁছার সাথে সাথে সে হুকুমের স্থায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে’।

এ সকল বিষয় যদি বিবেচনায় না নেওয়া হয়, তাহলে আজকের যুগের প্রশ্ন ও সমস্যাসমূহের কোন উত্তর ও সমাধান কেন্দ্রিক কোন ফিকহ তৈরি করা যাবে না।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

১৩০৭ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন।তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন।তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top