নকীব আল আত্তাসের চিন্তাবিশ্বঃ দ্বীন, জ্ঞান ও সভ্যতার দর্শন

সাইয়েদ মুহাম্মদ নকীব আল আত্তাস একালের অন্যতম মহান দার্শনিক, মুতাফাক্কির ও আলেম। আত্তাসের চিন্তাকাঠামোতে বরাবরই ইসলামী সমাজের মাঝে একটি নিজস্ব ধারণা, বোধ ও চিন্তাকাঠামো তৈরি করার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। মুসলিম সমাজের চিন্তাশীল মানসকে বিকশিত করা, নিজস্ব পরিভাষা তৈরি, এবং ‘প্রত্যাশিত মুসলমান’ হয়ে ওঠার জন্য উম্মতকে জাগরিত করার লক্ষ্যেই আত্তাস কাজ করে গেছেন। দূরপ্রাচ্য থেকে মুসলিম উম্মাহকে জাগরণের আহ্বান জানানো এই চিন্তাবিদ তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন ইসলামী চিন্তার বিকাশে।

আত্তাস তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে ইসলামী চিন্তাকে কেন্দ্র রেখে করে জ্ঞানচর্চা ও ঐতিহ্যের ইহইয়ার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যেই তিনি International Institute of Islamic Thought and Civilization (ISTAC) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ‘ইসলামী প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমনকি অবকাঠামোগত দিক থেকেও পাশ্চাত্যের থেকে ভিন্ন হয়’ এ বিষয়টিকে তুলে ধরে নিজেই এর ডিজাইন করেছিলেন। এই ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি জীবনের শেষ অবধি ছাত্রদেরকে পড়ানো, গবেষণা, চিন্তাচর্চা ও লেখালেখি অব্যাহত রাখেন।

আত্তাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো “দ্বীন” কে নতুন ব্যাখ্যা করে দিয়ে একটি সভ্যতা নির্মাণের ধারণা আকারে উপস্থাপন করা। এর মাধ্যমে পাশ্চাত্যের অগ্রগতির মুখে আতঙ্কিত হয়ে পড়া মুসলিম আলেম ও চিন্তাবিদদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি ‘ইসলামীকরণ (Islamization)’ এর ধারণা সামনে এনে মুসলিম উম্মাহর সামনে নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেন এবং সেক্যুলারাইজেশনের মুখে মুসলমানদের কী অবস্থান হওয়া উচিত সে বিষয়ে মত প্রকাশ করেন।

এই আলোচনায় আমরা সংক্ষেপে আত্তাসের চিন্তাবিশ্বে একটা অনুসন্ধানী সফরের চেষ্টা করবো। বিশেষত সভ্যতা বিনির্মাণকারী হিসেবে দ্বীন, জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার দর্শন, ইসলামীকরণের ধারণা এবং পাশ্চাত্যের সেক্যুলারাইজেশনের ঢেউয়ের সম্মুখে আমাদের করণীয় নিয়ে আমরা আত্তাসের চিন্তা নিয়ে খানিকটা আলাপ তুলে ধরার চেষ্টা চালাবো।

 

দ্বীনের পারিভাষিক অর্থ ও তার ব্যাপ্তি

আত্তাসের মতে দ্বীন শব্দটি ‘দানা’ উৎসমূল থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ হলো ঋণী হওয়া। দ্বীন গ্রহণকারী ব্যক্তিকে বলা হয় ‘দাইন’ অর্থাৎ যিনি ঋণ গ্রহণ করেন। এখানে বিষয়টিকে এভাবে বুঝা যায়- দ্বীন গ্রহণ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মূলত ‘দায়ভার’ গ্রহণ করেন। মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত দ্বীনকে গ্রহণ করার মাধ্যমে মানুষ মূলত দুনিয়াতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতকে আমানত হিসেবে রক্ষা করা এবং ইমার তথা বিনির্মাণ করার দায়ভার গ্রহণ করে।

আত্তাস “দানা” ক্রিয়ার বিভিন্ন রূপ বা রূপান্তর বিশ্লেষণ করে দেখান যে এই পরিভাষাটি আমাদের দ্বীন ধারণা থেকে একটি রাষ্ট্রের ধারণায়, এবং সেখান থেকে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার ধারণায় পৌঁছে দেয়। একইভাবে তিনি দেখান দানা উৎসমূল থেকে রূপান্তরিত আরেকটি শব্দ হচ্ছে মদীনা।

“মদীনা” শব্দের অর্থ শহর—এ কথা উল্লেখ করে আত্তাস বলেন, এখান থেকে বোঝা যায় যে প্রতিটি শহরেরই একজন শাসকের প্রয়োজন, অর্থাৎ একজন ‘দাইয়্যান’-এর প্রয়োজন, যিনি শহরকে আদালতপূর্ণভাবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিবেন।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “দানে” শব্দের মধ্যে আদালত, ব্যবস্থা ও কর্তৃত্বের অর্থ নিহিত রয়েছে, এবং এই অর্থগুলো মূলত একটি সামাজিক কাঠামোর দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সামাজিকীকরণ ধারণাটিও “মাদ্দানা” ক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। “মাদ্দানা” শব্দের অর্থ হলো শহরকে ইমার করা, মাদানী (সভ্যতার অধিকারী) হওয়া এবং সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠা।

আত্তাস ব্যাখ্যা করেন যে “সভ্যতা” শব্দটি “তামাদ্দুন” পরিভাষা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধতা বা পরিমার্জন। এই ব্যাখ্যার আলোকে তিনি বলেন, “দীন” শব্দটি মূলত এমন এক স্বাভাবিক প্রবণতার প্রতি ইঙ্গিত করে, যার মাধ্যমে মানুষ ইনসানী সমাজ গঠন করতে চায়, আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে এবং ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

ফলত, এই ব্যাখ্যা থেকে আত্তাস দেখান, দ্বীন মূলত মানুষের মধ্যে—

  • সমাজ গঠন
  • আদালত প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা
  • ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা
  • সভ্যতা বিনির্মাণ

এই বোধগুলো আমাদের মাঝে তৈরী করে, যার মধ্য দিয়ে মানুষ আল্লাহর খলিফা হিসেবে এই দুনিয়ায় তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে।

 

জ্ঞান সম্পর্কে আত্তাসের ধারণা

আত্তাস জ্ঞানকে দুইভাগে ভাগ করেন।

১. আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান
২. মানুষের আকল ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান।

আত্তাসের মতে প্রথম প্রকার জ্ঞান, মানুষের অস্তিত্বের রহস্যকে উন্মোচিত করে এবং এর মাধ্যমে মানুষ তার নিজের সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে প্রকৃত অর্থে বুঝতে সক্ষম হয়। আত্তাসের মতে এই জ্ঞানই মানুষের উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান এক্ষেত্রে সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করে।

আত্তাসের দৃষ্টিতে পাশ্চাত্য এবং ইসলামের জ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পার্থক্য এটাই। পাশ্চাত্যের জ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে ভালো নাগরিক বানানো, যেখানে ইসলামে জ্ঞানের লক্ষ্য হলো মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্ককে ভালোভাবে অনুধাবন করা এবং এর মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে বুঝতে পারা।

আত্তাসের ভাষ্য উদ্ধার করছি-
“ইসলামী শিক্ষাপদ্ধতির চূড়ান্ত লক্ষ্য সতিকারার্থে ভালো মানুষ গড়ে তোলা, পাশ্চাত্য সভ্যতার মতো রাষ্ট্রের জন্য সু-নাগরিক গড়ে তোলা না। ভালো মানুষ এর ধারণায় ‘ভালো’ শব্দটি একইসাথে আদবের ধারণাকে প্রকাশ করে, যা মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জীবনকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। আর আদবের তাৎপর্য হচ্ছে জ্ঞান, এ জ্ঞান হিকমত তথা প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত, জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষ্যও এতে প্রকাশ পাচ্ছে; এটি আত্মার অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখী কাজও বটে, যা আখলাকী মূল্যবোধ ও ইখলাসের ফলশ্রুতি। আর এর উৎস দর্শনও নয়, বিজ্ঞানও নয় বরং প্রত্যাদিষ্ট সত্য যা দ্বীন থেকে প্রবাহিত হয়”।

এখানে আত্তাস আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। আত্তাস মানুষের বুদ্ধি সম্পর্কে বলেন:

ইসলামে ‘আকল’ কেবল মস্তিষ্ক নয়। এটি ‘কলব’ নামক আধ্যাত্মিক ইদরাকী কেন্দ্রের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সত্যও মানুষের বুদ্ধির সীমার মধ্যে বোঝা সম্ভব। একে চেতন থেকে আলাদা করবার কোনো প্রয়োজন নেই।

এই কারণে আল-আত্তাস শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামীকরণের উপর জোর দেন। কারণ ভাবজগতে পরিবর্তন না ঘটলে বি-উপনিবেশীকরণ সম্ভব নয়। আর সেটি সম্ভব না হলে মুসলিম জগতের অসুস্থতার নিরাময় হবে না।

 

দ্বীন, ফিতরাত ও স্বাধীনতা

আত্তাসের মতে দ্বীন ও ফিতরাতের ভেতর গভীর সম্পর্ক ও সাদৃশ্য রয়েছে। আত্তাস দ্বীনকে অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। অর্থাৎ আত্তাসের ভাষায়, দ্বীন হলো মানুষের ফিতরাতের বহিঃপ্রকাশ, মানুষের অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থা। দ্বীনবিহীনতা হলো অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত বিষয়।

আত্তাসের দৃষ্টিতে ফিতরাত হলো সেই মডেল বা ব্যবস্থা, যার উপর ভিত্তি করে মহান আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, এবং এটি আল্লাহর একটা সুন্নত তথা সুন্নাতুল্লাহ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্তাস বলেন, মানুষের প্রকৃতি হলো ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অর্থাৎ একটি সত্যিকার দ্বীনি জীবনযাপন করা মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি। এর প্রেক্ষিতে আত্তাস বলেন, স্বাধীনতা হলো মানুষের প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী জীবন যাপন করা। আত্তাসের মতে, এটি কেবল সচেতন আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই সম্ভব, অবিবেচিত বা অচেতন আত্মসমর্পণ কখনো মানুষের প্রকৃত অবস্থা হতে পারেনা। অসচেতন আত্মসমর্পণ হলো ক্ষণস্থায়ী আবেগ কিংবা মনকে প্রবোধ দেয়ার অবস্থা। কিন্তু সচেতন আত্মসমর্পণ হলো মানুষ যখন আত্মসমর্পণের প্রকৃত অর্থ, যুক্তি এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে বুঝে নিজের প্রকৃত অবস্থাকে কবুল করে নেয়, সে অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এবং এটা কেবল দ্বীনকে গ্রহণ করা, এবং সে আলোকে জীবনযাপন করার মাধ্যমেই সম্ভব।

উপরের আলোচনায়ও আমরা যেমনটা দেখিয়েছি, এখানে আত্তাসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে দ্বীনকে নিছক আচারসর্বস্ব কোনো কিছু হিসেবে ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আত্তাস এখানে বাহ্যিক বেশভূষার কথাও বলছেন না। বরং আত্তাসের দৃষ্টিতে দ্বীনের তাৎপর্য একটি সভ্যতানির্মাণকারী মানসিকতার উৎস হিসেবে, যা মানুষকে ফিতরাতের আলোকে জীবন যাপন করার পন্থা প্রদর্শন করে।

 

সেক্যুলারায়নের প্রক্রিয়া

সেক্যুলারিজম” শব্দটি “seaculum” মূল থেকে উদ্ভূত “secular” শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে, secular শব্দটি সময় এবং স্থান উভয়ের ভাবনাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আত্তাসের মতে, seaculum শব্দটি ব্যবহৃত হয় “এই যুগ” এবং “এই সময়ের” মধ্যে পৃথিবীতে বিদ্যমান বাস্তবতাগুলোকে চিহ্নিত করতে।

আত্তাসের ভাষায় সেক্যুলারাইজেশন হলো,

‘মানুষের আকল ও ভাষাকে প্রথমে দ্বীনি, তারপর মেটাফিজিক্যাল নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। এর ফলে মানুষের দৃষ্টি আখেরাত থেকে দূরে সরে সম্পূর্ণরূপে এই দুনিয়ার দিকে কেন্দ্রীভূত হয়’। একইসাথে তার দৃষ্টিতে সেক্যুলারাইজেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সামাজিক ঐক্য বা সংহতির প্রতীকগুলো থেকে দ্বীনকে আলাদা করে ফেলা। ফলশ্রুতি, সেক্যুলারাইজেশনের দরুন মুসলিম সমাজের ভেতরকার যে ঐক্য ও পারস্পারিক বোঝাপড়া তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এককথায়, সেক্যুলারাইজেশন মুসলিম সমাজের সামাজিক বুনন (social fabric) কে নষ্ট করেছে।

এর সূত্র ধরে আত্তাস দেখান, মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলারিজমের উদ্ভব বা সেক্যুলারাইজেশনের যে প্রক্রিয়া তার পুরোটাই পাশ্চাত্যের স্থানিক সমস্যা ও প্রেক্ষাপ্ট থেকে উদ্ভূত। পাশ্চাত্যের বিশ্বাসবোধ, তাদের চিন্তার ফলাফল হিসেবে সেক্যুলারিজমের আবির্ভাব ঘটলেও মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা ছিলো একটা আরোপিত প্রক্রিয়া। অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে পশ্চিমা চিন্তাদর্শনের একটা ঢেউ বয়ে যায় দুনিয়াব্যাপী। পাশ্চাত্যের চোখধাধানো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উন্নয়ন থেকে মুসলিম সমাজের ভেতর দুটো শ্রেণি তৈরি হয়-

  • আলেমগণের একটা অংশ একে ফিতনা আখ্যা দিয়ে দূরে সড়ে যান। ফলশ্রুতিতে তারা এই ঢেউকে ঠিকমতো মোকাবেলা করতে পারেননি।
  • আরেকটা অংশ পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠত্বকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়ে হীনমন্য হয়ে পরে এবং আপোষকামী মানসিকতায় পাশ্চাত্যকেই সকল কিছুর মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে।

আত্তাসের দৃষ্টিতে এই দ্বি-বিভাজন, মুসলিম সমাজের মাঝে গুরুতর বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এই হীনমন্য মানসিকতার দরুনই অনেকে ‘ইসলামিক লিবারেলিজেম’, ‘ইসলামিক কম্যুনিজমের’ মতো সংকর ধারণা উপস্থাপন করেছেন, আদতে যা পুরো ব্যবস্থাকেই হুবহু গ্রহণ করে একটা ইসলামী ছাঁচ দেয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুইনা।

আত্তাস দেখাচ্ছেন, সেক্যুলারাইজেশনের ফলে মানুষ নিজেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী অবস্থানে স্থাপন করেছে এবং আল্লাহর সাথে সঙ্গে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করেছে।

আত্তাসের মতে, সেক্যুলারাইজেশনের তিনটি পূরক অংশ আছে:

  • ১. প্রকৃতিকে কেবল বৈজ্ঞানিক অবজেক্ট হিসেবে দেখা, এর থেকে আধ্যাত্মিকতাকে বিচ্ছিন্ন করা।
  • ২. রাজনীতিকে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন করা,
  • ৩. মূল্যবোধকে পবিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া বন্ধ করা।

এখানে সেক্যুলারিজম এবং সেক্যুলারাইজেশনের পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য।

  • সেক্যুলারিজম হলো একটি আদর্শবাদ, যা মূলত নিজস্ব মূল্যবোধকে চূড়ান্তভাবে ধর্মীয়তার স্থলে বসায়। এস্থলে আত্তাস দেখাচ্ছেন, সেক্যুলারিজম বাহ্যিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দেখালেও আদতে সেক্যুলারিজমের আকাঙ্ক্ষাও মানুষের জীবনে একটা আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা, যা চরিত্রগতভাবে সম্পূর্ণ ধর্মীয়।
  • সেক্যুলারাইজেশন এমন একটি ধারণা যা মূল্যবোধকে চিরন্তন হিসেবে না ধরে আপেক্ষিক মনে করে। ফলে মানবিক কর্মকাণ্ডের একচ্ছত্র স্বাধীন ও ইতিহাসকে ক্রমাগত অগ্রসরমান এবং স্বাধীনভাবে পরিবর্তনশীল বলে মনে করা হয়। এ দৃষ্টিতে সেক্যুলারাইজেশন একটি অগ্রসরমান বিবর্তন প্রকল্পের মতো।

আত্তাসের মতে, এই ধরনের অগ্রগতির ধারণার বিপরীতে মুসলমানরা যে “ঐতিহ্য’ ধারণা ব্যবহার করে, তা কোনো স্থবির অবস্থাকে বোঝায় না। বরং এটি নববী পথ ও পদ্ধতির প্রতি নির্দেশ করে, যা আল্লাহর ওহী ও নির্দেশনার মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। সুতরাং এই ঐতিহ্যও এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন বিকাশ বা উন্নয়নকে প্রকাশ করে।

তবে এখানে যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তা সেক্যুলারাইজেশনের ফলে উদ্ভূত ধারাবাহিক সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া পজিটিভিস্ট ধরনের অগ্রগতি নয়। বরং উস্তাদ এলমালি হামদি ইয়াজির–এর ভাষায়: “ফজিলত ও হাসানাতসম্পন্ন উন্নতির দিকে যে বিষয়গুলো মানুষকে নিয়ে যায়, সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন ও অগ্রগতি।”

 

ইসলামীকরণের পন্থা

পশ্চিমে বিদ্যমান আদর্শগুলোর অনুকরণ করে অগ্রগতি সম্ভব নয়; এ কারণে তিনি ইসলামীকরণ ধারণার প্রস্তাব করেছেন। আত্তাসের মতে, ইসলামাইজেশন সেক্যুলার দুনিয়ার প্রেক্ষিতে এক ধরনের বিবর্তন নয়, বরং মানুষের মৌলিক ও স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন।

আত্তাসের দৃষ্টিতে ইসলামীকরণ হলো,
“Islamization is the liberation of man first from magical, mythological, animistic, national-cultural tradition, and then from secular control over his reason and his language.”

ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার জন্য সর্বাগ্রে জরুরি ব্যবহৃত ভাষার ইসলামীকরণ। আত্তাস উল্লেখ করেন, ভাষা, চিন্তাভাবনা এবং যৌক্তিকতা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত; তাই ভাষা ইসলামীকৃত হলে, স্বাভাবিকভাবেই চিন্তাধারাও ইসলামী মূলনীতি অনুযায়ীই গড়ে উঠবে।

অপরদিকে, আত্তাস ভাষার ইসলামাইজেশন এবং দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার মধ্যেও যোগসূত্র আছে বলে মনে করেন। তার মতে, মুসলিম সমাজে যে অজ্ঞতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তার মূল কারণ মানুষদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়া।

আত্তাস ব্যাখ্যা করেন, ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে কেবল গুনাহ করা নয়, বরং অনৈসলামী ধারণার মাধ্যমে চিন্তাভাবনা শুরু করা। এ কারণে তিনি ভাষার ইসলাকীকরণ এবং সেই অনুযায়ী একটি চিন্তাকাঠামো প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তার মতে, জ্ঞানের ইসলামীকরণ করতে হলে প্রথমে শিক্ষা ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাবের দিকগুলো অপসারণ করতে হবে। বিশেষ করে মানবিক জ্ঞানকে পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত করতে হবে । তারপরে ইসলামী জ্ঞান ও মানবিক জ্ঞানের সমন্বয় করে শিক্ষা ব্যবস্থা। গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে জ্ঞানের ইসলামীকরণের একটি মৌলিক নীতিও তিনি হাজির করেছেন যেটা এরকম-

১. ইসলামী প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ।
২. ইসলামী প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে বুঝা।
৩. ইসলামী জ্ঞানের ভাষা আরবির উপর দক্ষতা ।
৪. ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইসলামী জ্ঞানের দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক রূপ ও পটভূমি এবং বিশ্ব ইতিহাস হিসেবে ইসলাম অধ্যয়ন।

আল-আত্তাস মনে করেন শিক্ষাব্যবস্থায় এই ইসলামী বৈশিষ্ট্যকে যদি কার্যকরী করা যায় তাহলেই আমরা ঔপনিবেশিকতার কুফল থেকে মুক্তি পাবো এবং সমাজের ইসলামীকরণ বলতে যা বুঝায় তা তখন দৃশ্যমান হবে।

 

কোরআনের দৃষ্টিতে সেক্যুলারাইজেশন

আত্তাসের মতে, কোরআনে “সেক্যুলার” শব্দটির সবচেয়ে নিকটবর্তী ধারণা হলো ‘আল-হায়াতুদ্-দুনিয়া’। এই শব্দগুচ্ছের অর্থ দুনিয়ার জীবন বা পার্থিব জীবন। আত্তাস উল্লেখ করেন যে ‘দুনিয়া’ শব্দটি ‘দানা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নিকটবর্তী বা কাছে এনে দেওয়া বস্তু। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দুনিয়া এমন এক বাস্তবতা, যা মানুষের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও চেতনার নিকটবর্তী।

অর্থাৎ, দুনিয়া এমন কিছু যা মানুষকে ঘিরে রাখে এবং প্রভাবিত করে। এর এই প্রভাবের কারণে মানুষের চেতনা কখনো কখনো চূড়ান্ত গন্তব্য—আখিরাত—থেকে সরে অন্য দিকে মনোযোগী হয়ে পড়ে। তবে এখানে কোরআন মানুষকে দুনিয়ার জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বলে না; বরং দুনিয়ার সেই প্রবণতার ব্যাপারে সতর্ক করে, যা মানুষকে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে। কোরআন আমাদের যখন দোয়া শিখায়, তখন দুনিয়া-আখেরাত উভয় স্থানেই হাসানাতের কথা বলে।

এই দিক থেকে বোঝা যায় যে “দুনিয়া” শব্দটি পুরোপুরি সেক্যুলারিজমের সমার্থক নয়। বরং কোরআন যখন দুনিয়ার কথা বলে, তখন এটিকে মানুষের নিকটবর্তী বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরে এবং আখলাকী মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। কিন্তু সেক্যুলারিজম দুনিয়ার জীবনকে আধ্যাত্মিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

অন্যদিকে আত্তাসের মতে সেক্যুলারিজমকে এক ধরনের অগ্রগতি হিসেবেও দেখা যেতে পারে, তবে এখানে “অগ্রগতি” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তা বোঝা জরুরি। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন, উন্নয়ন ও অগ্রগতি বলতে বোঝায়- রাসূল (সা.), তাঁর সাহাবীগণ, তাদের অনুসারীরা এবং পরবর্তীকালে ইসলামী সভ্যতার ১৪০০ বছরের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা ইসলামের যে সামগ্রিক বোঝাপড়া, সেদিকে ফিরে যাওয়া। অর্থাৎ এটি মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার দিকে তথা ফিতরাত ও দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন।

আত্তাসের মতে, অগ্রগতির ধারণা তখনই প্রকৃত অর্থ বহন করে, যখন তা এমন কিছুর দিকে নির্দেশ করে যা স্পষ্ট, নিশ্চিত, দৃঢ় এবং মূলত পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। এই কারণে যে হাকীকত ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত ও বিদ্যমান, তা মূলত পরিবর্তনের অধীন নয়। তাঁর মতে, পশ্চিমা অগ্রগতিমুখী চিন্তাধারা এমন একটি দ্বীনের উপর নতুন লক্ষ্য আরোপ করতে পারে না, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ইতিমধ্যেই নির্ধারিত।

 

সমাপনী

মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সমাধান খুঁজতে ইসলামীকরণ (Islamization) ধারণার মাধ্যমে পথ প্রদর্শন করার চেষ্টা করছেন নকীব আল-আত্তাস। তার এই সামগ্রিক ও আন্তরিক প্রচেষ্টার দরুন তিনি সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারার একজন জীবন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

গত শতকে ইসলামীকরণ প্রকল্প নিয়ে কমবেশি কাজ হয়েছে। আত্তাসের ইসলামীকরণ চিন্তা খানিকটা ভিন্ন। ফলত, অন্যান্য চিন্তকদের প্রস্তাবনার সাথে আমরা তুলনা করতে গেলে বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে মিলবেনা। তার ইসলামীকরণ প্রস্তাবনাকে কেবল বিদ্যমান বিষয়গুলোকে ইসলামী ধারণায় প্রকাশ করা হিসেবে বোঝা উচিত নয়। আত্তাস বলেন, ইসলামীকরণ কেবল আল্লাহর রাব্বুল আলামীনকে একমাত্র রব হিসেবে, সকল কিছুর নিয়ন্তা হিসেবে গ্রহণ করা এবং ফিতরাত ও ওহীর আলোকে জীবনকে সামগ্রিক পুনর্গঠনের মাধ্যমেই সম্ভবপর হতে পারে।

অন্যদিকে, আত্তাস “দুনিয়া” ধারণায় যে অর্থ প্রদান করেছেন, তা অনুসারে দুনিয়া মুসলমানদের জন্য কাছাকাছি ও উপলব্ধিযোগ্য একটি স্থান। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমকালীন নানান চিন্তকেরা যখন একটি নেতিবাচক বা মুখ ফিরিয়ে নেয়া উচিত এমন একটি বিষয় হিসেবে দুনিয়াকে তুলে ধরেন, তখন আত্তাস দুনিয়াকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে।
এই পর্যায়ে আত্তাসের মতে, ইসলামীকরণ ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ায় মানুষের করণীয় হবে দুটি।

  • মানুষকে নিকটবর্তী এই জগতের সঙ্গে অন্টোলজিক্যাল অর্থে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে,
  • এবং সেই সম্পর্ক সালিহ আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

আত্তাস তার বিশিষ্ট চিন্তাভাবনাকে প্রকাশ করেছেন প্রত্যাশিত মুসলমান গড়ে ওঠার প্রত্যাশায়। দুনিয়াকে একটি আবাসযোগ্য স্থান হিসেবে নির্মাণের জন্য সংগ্রামের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, মহান আল্লাহর খলিফা হিসেবে সৃষ্টিজগতকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করে ইমার করার জন্য দায়বদ্ধ, এবং মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে প্রচেষ্টারত ব্যক্তিত্বই আত্তাসের চোখে প্রত্যাশিত মুসলমান। মহান আল্লাহ আমাদেরকে ‘বিদ্যমান’ অবস্থা থেকে ‘প্রত্যাশিত’ অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়ার তাওফিক দান করুন।

৯ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of সা'দ মুসান্না

সা'দ মুসান্না

পড়াশুনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে। নিয়মিত পড়াশুনা ও চিন্তাচর্চার বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত আছেন। আগ্রহ ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও সভ্যতা অধ্যয়নে। ত্রৈমাসিক মিহওয়ারের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of সা'দ মুসান্না

সা'দ মুসান্না

পড়াশুনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে। নিয়মিত পড়াশুনা ও চিন্তাচর্চার বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত আছেন। আগ্রহ ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও সভ্যতা অধ্যয়নে। ত্রৈমাসিক মিহওয়ারের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top