মানুষের মন-প্রাণ, তার নাফস তো খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাসে গড়ে উঠেছে। সকালে খাবার, রাতে খাবার। জান্নাতেও তো এমনই ব্যবস্থা আছে। আল্লাহ বলেছেন, “সেখানে তাদের সকাল-সন্ধ্যায় রিযিক দেওয়া হবে।” 

একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, জান্নাতে কি রাত থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? লোকটি বলল, ❝আল্লাহ তো বলেছেন সকাল-সন্ধ্যা রিযিকের কথা।❞

 রাসূল ﷺ বললেন, এখানে সকাল-সন্ধ্যা বলতে শুধু সময়ের হিসাব বোঝানো হয়েছে।

আমাদের নাফস তো সারাদিন খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত। তাই আল্লাহ  এ অভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখতে বলেছেন। আগের উম্মতদের রোজা রাখা ছিল খুব কঠিন, তাদের সকালের খাবার একদম বন্ধ, রাতের খাবারও আসত না। কিন্তু এই উম্মত মুহাম্মদির  প্রতি আল্লাহর দয়া  সম্মান দেখুন। তিনি আমাদের রোজায় সকাল-রাতের খাবার আহরণের ব্যবস্থা  রেখেছেন। শুধু দিনের নির্ধারিত সময়ে খাওয়া বন্ধ। আর সেহরির সময় খেয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। নবীজি সেহরিকে ❝বরকতময় সকালের খাবার❞ বলেছেন। এই সংযম, এই সময়-নিয়ন্ত্রিত বিরতিই হলো সাওম বা রোজা।

রোজা হলো এমন একটি অভ্যাস থেকে বিরত থাকা, যে অভ্যাসের সঙ্গে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত।(খাওয়া-দাওয়া, শাহওয়াত) যখন নফসকে সেই পরিচিত অভ্যাস থেকে আটকানো হয়, তখন তা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ কষ্টের মধ্য দিয়ে শরীরকে আমরা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করি। কারণ নাফস যখন শাহওয়াতের পেছনে ছোটে, তখন সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ থেকে দূরত্ব যত বাড়ে, বরকত তত কমে যায়। আর যখন কোনো কিছু থেকে বরকত সরে যায়, তখন তা ক্ষীণ হয়, লাঞ্ছিত হয়, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।

কিন্তু যখন নফস তার অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে বিরত রেখে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে ফিরে আসে, তখন তার নৈকট্য বৃদ্ধি পায়। আর আল্লাহর নৈকট্য যত বাড়ে, ততই বরকত নেমে আসে। বরকত নেমে এলে তা পরিশুদ্ধ হয়, বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয়। যাকাত মানে-ই হলো বৃদ্ধি, কল্যাণে পরিপূর্ণতা। 

মানুষকে আল্লাহ শুন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। তার শুন্য হৃদয়ে রেখেছেন ঈমান, জ্ঞান, হিকমত, বুদ্ধি, বোঝার ক্ষমতা, শান্তি, গাম্ভীর্য। আর এগুলো হলো  কালবের সৈন্য। অন্যদিকে রয়েছে রাগ, ভয়, লোভ, ক্রোধ, ছল-চাতুরি, হিংসা, কাপুরুষতা, কৃপণতা এগুলো নফসের সৈন্য।

যখন মানুষ নফসের অভ্যাস থেকে বিরত থাকে, তখন সে যেন নিজের সত্তাকেই আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর যখন আল্লাহ সেই আত্মসমর্পণ কবুল করেন, তখন তিনি তাকে ঈমান, বুদ্ধি, সৎকর্ম ও কল্যাণ দিয়ে সমৃদ্ধ করেন। সে পরিশুদ্ধ হয়, পূর্ণতা লাভ করে।

এভাবেই রোজা হয়ে ওঠে দেহের যাকাত।

তুমি কি লক্ষ্য করো না রোজাদাররা ইবাদতের মাঝে কী অপূর্ব স্বাদ অনুভব করেন? কীভাবে তাদের অন্তর প্রশান্ত, নীরব ও স্থির হয়ে ওঠে?

এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“নিশ্চয় প্রত্যেক কিছুরই যাকাত রয়েছে, আর দেহের যাকাত হলো রোজা।”

যখন মানুষ রোজা রাখে, তখন তার উপর বরকত নেমে আসে। তার অন্তরে প্রতিটি কল্যাণের বীজ বিকশিত হতে থাকে, সৎগুণগুলো বেড়ে ওঠে, আর বরকতের ছোঁয়ায় সে মর্যাদায় উন্নত হয়। কিন্তু যদি এই গুণগুলোর উপর থেকে বরকত সরে যায়, তবে সেগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে, কোনো ফল দেয় না, কোনো আলো ছড়ায় না।

আল্লাহ তাআলা এই রোজাকেই বানিয়েছেন বরকত অবতীর্ণ হওয়ার একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে কল্যাণ বাড়ে, অন্তর পবিত্র ও  বিকশিত হয়, আর তার নফস কল্যাণে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

বান্দা নিজের অভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখার কারণে আমাদের প্রতিপালক বান্দার এই কর্মকে মহিমান্বিত করেছেন।

 রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, তবে রোজা ব্যতীত। নিশ্চয়ই রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দিয়ে থাকি। আমার বান্দা আমারই জন্য তার খাদ্য, পানীয় ও কামনা-বাসনা ত্যাগ করে’।”

এই কথা সেই বাণীরই প্রতিধ্বনি যেখানে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে একটি তার ইফতারের সময়, আরেকটি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে।”

“আমার বান্দা যদি এক বিঘত আমার দিকে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই।” বান্দা যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য দিনের বেলায় নিজের অভ্যাস, খাওয়া ও পান করা ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন আল্লাহ তার এ সামান্য ত্যাগকেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন:

“আমার বান্দা আমার জন্য তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করেছে।” তারপর বলেন: “এটি আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।”

অর্থাৎ এর সওয়াব তিনি অন্য কারও ওপর ন্যস্ত করেন না। অন্যান্য আমল বান্দার জন্য নির্ধারিত হলেও রোজা বিশেষভাবে আল্লাহর জন্য, কারণ এটি বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ নয়; বরং অন্তরের নিয়ত ও আত্মসংযম নিজের অভ্যস্ত প্রবৃত্তিকে দমন করা।

নবী ﷺ বলেছেন:

“রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে একটি ইফতারের সময়।”

এ আনন্দ হলো বরকত নেমে আসার আনন্দ, দেহের যাকাত আদায়ের প্রশান্তি। কারণ তখন নফসের কষ্ট লাঘব হয়, অন্তর হালকা হয়ে আসে।

“অন্য আনন্দটি হবে তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময় যখন সে তার প্রতিদান প্রত্যক্ষ করবে।”

এ কারণেই বান্দাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এক মাস রোজা রাখতে, এরপর শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখতে যেন সে পুরো বছর রোজাদারের সওয়াব পায়। কারণ একটি সৎকর্মের প্রতিদান দশ গুণ। ত্রিশ দিন মানে তিনশ দিনের সমান, আর ছয় দিন মানে ষাট দিনের সমান।

 যদি তার সারা জীবনের হিসাব এভাবে সিয়ামের উপর হয়, তাহলে বরকত তার উপর স্থায়ী হয়ে যাবে, সর্বদা কল্যাণ প্রবাহিত হতে থাকবে। যে ব্যক্তি এই সুন্নতের প্রতি আগ্রহী হয়, সে মূলত চায় তার নাফসের জন্য এই বরকত স্থায়ী হোক, যেন তার দেহ ও অন্তর উভয়ই পবিত্র, বিকশিত ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।

 

মূলঃ আল-হাকীম আত-তিরমিযী।

অনুবাদঃ মু. সাইফুদ্দিন।

৪১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।
Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top