দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের ফলে এ দুনিয়ার অনেক বিষয়ের সংজ্ঞাতেই কোনো একতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্য অনেক বিষয়ের মতোই কালচার সম্বন্ধেও হয়েছে নানাবিধ ধারণার উৎপত্তি। বাধ্য হয়েই কালচারের তুলনামূলক আলোচনা করে কালচারের বিবরণ দিতে হয়, তবুও তার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবপর হয় না। সত্যতা ও কালচারের আলোচনা প্রসঙ্গে প্রতীয়মান হয় যে, একটি বিষয়েরই উহ্যরূপ হচ্ছে সভ্যতা এবং তার বাহ্যরূপ হচ্ছে কালচার। সভ্যতার বিচার হয় কালচারের প্রকাশ-ভঙ্গিমায় বা তার বিষয়বস্তুর উৎকর্ষের মানদণ্ডের মাধ্যমে। যেকোনো সভ্যতার উন্নতি বা অবনতি প্রকাশিত হয় তার কালচারের মধ্যে। সভ্যতাকে একটা বিমূর্ত ধারণা বলা যায়, তার মূর্ত ক্রিয়া হচ্ছে কালচার এবং মূর্ত রূপ হচ্ছে কালচার দ্বারা সৃষ্ট বিষয়বস্তু।
সাধারণত উভয় অর্থেই কালচার শব্দটা ব্যবহৃত হয়। কোনো কোনো বিষয়ের রূপায়ণের ভঙ্গিমাকে যেমন বলা হয় কালচার, তেমনি রূপায়িত বিষয়কেও বলা হয় কালচার। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প, সাহিত্য বা অন্যান্য চারু ও কারুশিল্প প্রকাশের পদ্ধতিকে যেমন বলা হয় কালচার, তেমনি সে-পদ্ধতির মাধ্যমে রূপায়িত বিষয়বস্তুকেও বলা হয় কালচার। তাজমহলের গঠন-নৈপুণ্যও যেমন কালচার, তেমনি তাদের বিশিষ্ট আকার ও প্রকারকেও বলা হয় কালচার। প্রকৃতপক্ষে একটি উপায়, অপরটি লক্ষ্য। যেহেতু কোনো একটি বিষয়বস্তু কলাকৌশলের মাধ্যমেই রূপায়িত হয়, অতএব কলাকৌশলকেই প্রথমে কালচার বলা হয়। তবে কলাকৌশল অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এ কারণে তাদের রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ। মানসিক দিক থেকে অবশ্য একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করে দেখা যেতে পারে, তবে বাস্তব জীবনে তাদের মধ্যে রয়েছে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ।
এ কালচার শব্দটি আবার সংস্কৃতি-সহ বিভিন্ন নামে ব্যবহৃত হয়, এমন ভিন্নতার সঙ্গত কারণও রয়েছে। সংস্কৃতি বলতে কোনো বিষয়কে সংস্কৃত (refine) করা বুঝায়। তাকে ইংরাজিতে তরজমা করলে refinement হয়ে দাড়ায়। পূর্বে যা ছিল অসংস্কৃত বা অশোভন তারই পরবর্তী পরিণীত ব্যবস্থাকে বলা হয় সংস্কৃত। যে পদ্ধতির মাধ্যমে তা রূপায়িত হয়, তাকে বলা হয় সংস্কৃতি। এতে কালচাবের উপায় বা রূপায়ণের পদ্ধতিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্কৃতের ভেতরে বিষয়বস্তুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। একটি নিছক ক্রিয়ামূলক পদ অপরটি বিষয়বস্তুমূলক শব্দ।
অন্য আরও একটি দিক থেকে কালচারকে সংস্কৃতি বলাতে রয়েছে ত্রুটি। যেকোনো কালচারের ইতিহাসের আলোচনা করলে দেখা যার তার মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিকতা। কালের দিক থেকে বিচার করলে কালচারের অন্তর্গত বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অধ্যায়কে বলতে হয় অসংস্কৃত, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পরবর্তী অধ্যায়কে বলতে হয় অসংস্কৃত। ঠিক কোন পর্যায়ে এসে একটা বিশিষ্ট পদ্ধতি সংস্কৃত হচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে সে আবার বর্বরতার স্তরে চলে যাচ্ছে, তা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে পরিবর্তন তো নিত্যই হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনটা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী হলেই কেবল তা দৃষ্টিগোচর হয়। কাজেই সংস্কৃতি শব্দের পরিবর্তে ব্যাপক অর্থে কালচার শব্দটির প্রয়োগই বাঞ্ছনীয়। কৃষ্টিও সংস্কৃতির মতোই ক্রিয়ামূলক শব্দ, একারণেই তা অপরিসর গতির জন্য পরিত্যাজ্য।
এ কালচারের উৎপত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করতে হলে মানবজীবনের আলোচনাতেই ফিরে যেতে হয়। কারণ মানবজীবনই কালচারের মূল উৎস। কালের আবর্তে মানবজীবন এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এ পরিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রহণ ও দানের ফলেই গড়ে ওঠে মানুষের কালচার। পৃথিবী থেকে অপরিসীম সম্পদ আহরণ করে মানুষ হয়েছে ধনী আর তার মূল্য হিসাবে পৃথিবীকে সে যা দান করে, তারই স্বাক্ষর রয়েছে মানুষের কালচারের। কালচারের উৎপত্তি তাই ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াজাতের ভেতরেই রয়েছ এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের সঙ্গে তার রয়েছে সংযোগ।
অন্য দশটি প্রাণীর মতো মানুষকে আহারের সংস্থান করতে হয়। কেবল আহার নয়, তার পক্ষে পোশাক-পরিচ্ছদ বা আচ্ছাদনেরও প্রয়োজন পড়ে। নানা প্রবৃত্তির দাবি রয়েছে তার জীবনে। সেগুলো অবসান করা তার পক্ষে সহজ নয়। প্রেম বা কাম দ্বারা চালিত হয়ে মানুষ বাধ্য হয়েই আত্মকেন্দ্রিক জীবনের ক্ষুদ্র পরিসর ত্যাগ করে বৃহত্তর পারিবারিক জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা শ্বাপদ হিংস্র অন্তরের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাকে সমাজের অন্য দশজনের সাহায্য নিতে হয়। মূলত জৈবিক প্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হলে পরিশেষে তাকে পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে সুস্বভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিছক আত্মসুখ বর্জন করতে হয়। আবার তার মানসজাত ভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে বেঁচে থাকার পদ্ধতি সে আবিষ্কার করে এবং তাকে রূপদান করে নিজেকে সার্থক মনে করে। আদর্শের প্রতি আস্থা ও তার আকর্ষণ যেমন একদিকে তাকে এ পৃথিবী থেকে নানাভাবে বিষয়বস্তু আহরণের জন্য প্রেরণা দান করে, তেমনি এই দুনিয়াকে তার পছন্দমতো সাজানো গোছানোর দায়িত্বও সে গ্রহণ করে। এ গ্রহণ ও দানের বাহ্যিক রূপই তার কালচার।
নানা ক্রিয়া প্রকাশিত হয় বলে তার মধ্যে রয়েছে নানা বিষয়বস্তু। মানুষের এ গ্রহণ ও দান আবার নানাবিধ কারণ বা ফ্যাক্টরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। খাদ্য নির্বাচনের ব্যাপার, আহার করার পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদের প্রয়োজনীয়তা ও নানাবিধ শিল্পসমূহ অনেকটা পরিবেশের উপর নির্ভর করে, ভারতের কোনো এক প্রদেশের খাদ্য নির্বাচন বা গ্রহণ করার পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশবাসী লোকদের আহার্য বা তার গ্রহণ করার কায়দা থেকে ভিন্ন। অত্যন্ত শীতপ্রধান বলে সে অঞ্চনের পোশাক-পরিচ্ছদের স্টাইল গ্রীষ্মপ্রধান আফ্রিকার লোকদের পোশাক-পরিচছদ থেকে অনিবার্য কারণে ভিন্ন হয়েছে। মেরু অঞ্চলে সহজলভ্য ভল্লুকের লোম থেকে সে-দেশবাসীর বস্ত্রাদি যে তৈরি হবে তাতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঝড়-ঝঞ্জা বা তুষারপাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাদের তুষারেই ঘর তৈরী করতে হয়। মরুভূমিতে বিচরণশীল বেদুঈনের জন্য বৃক্ষপত্রহীন বালুকারাশিতে চামড়ার শিবিরের মধ্যেই আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। বৈচিত্র্যময় জীবনের নানাবিধ প্রয়োজনে এভাবেই মানুষের কালচারে বৈচিত্র্য দেখা দেয় এবং এই বৈচিত্র্য থেকে প্রথমে স্বাদেশিকতা এবং পরবর্তীকালে প্রাদেশিকতার উৎপত্তি হয়। জাতীয় চরিত্র গঠনে পরিবেশের প্রভাব তাই অত্যন্ত শক্তিশালী।
পরিবেশ ব্যতীত কালচারের বিবর্তনের মূলে অর্থনৈতিক কারণও ক্রিয়াশীল। আবার অর্থনীতির মানসজাত নানাবিধ মানেরও (value) রয়েছে সম্বন্ধ। এসব মান (value) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে থাকে ক্রিয়াশীল এবং উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গুহামানব প্রথমে তার নিজের প্রয়োজনের জন্য বন্য পশু শিকার করতো। যৌন-জীবনের তাগিদে নারীর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রচণ্ডভাবে স্বীকৃত হওয়ার ফলে সে তার লক্ষ্য পরিবর্তনে বাধ্য হয়। তখন শুধু নিজের জন্য নয়, তার নিজের ও যৌন-সঙ্গীর জন্য শিকার করা তার পক্ষে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পশুচারিক পর্যায়ে কেবল যৌন-সাথী নয়, দলের অপরাপর লোকের সুখ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখাও তার পক্ষে কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে জীবনের নানা দাবির ফলে বিভিন্ন মানের উৎপত্তি ও পরিবর্তনের ফলে মানুষ তার উৎপাদন-ব্যবস্থা ও তার লক্ষ্য পরিবর্তন করে। অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণগুলোর মধ্যে যে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ রয়েছে, সে সত্য অনস্বীকার্য।
তবুও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে মানুষের মৌলিক ঐক্য থাকে বলেই বিভিন্ন মানুষের জীবনে ও তার প্রকাশ-ভঙ্গিমায় রয়েছে সাদৃশ্য। যূথচারী প্রবৃত্তি (Gregarious instinct) আছে বলেই মানুষ কাজে ও অকাজে একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয় এবং একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে স্বীকার করে। মাতৃ স্নেহ, পিতৃ-স্নেহ বা অপত্য স্নেহ, প্রেমিক-প্রেমিকার আসক্তি সকল দেশেই একই ভাবে প্রকাশিত। প্রেম, স্নেহ, মমতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো সকল দেশের মানুষকেই সমানভাবে আকর্ষণ করে।
জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব মানের (value) উৎপত্তি হয়, তাদের দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বণ্টনের পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন দেখা দেয়, মানবজীবনে আদর্শের উৎপত্তির পরে তা আরও প্রকট হয়ে পড়ে। আদর্শের পার্থক্যের ফলে কোনো একটি আদর্শের রূপায়ণকে যদিও বা একদল মানুষ অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করে, সেই আদর্শকেই অপর একদল মানুষ অবশ্য পরিত্যাজ্য বলেই গণ্য করে।
এ দুনিয়ায় সাধারণভাবে নানা আদর্শ প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, সর্বোপরি কেউ না কেউ নানা আদর্শ প্রচার করেছেন এবং যে সব আদশের রূপায়নের জন্য আজীবন সাধনা করেছেন। মহামতি সক্রেটিস আদর্শ প্রচার করেছেন বলেই হেমলক পান করতে বাধ্য হয়েছেন। স্পিনোজা রক্ষপতির সন্তান হয়েও অম্লানবদনে পিতৃস্বত্ব পরিত্যাগ করেছেন। মুডি উলটের সত্যের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করে সর্বস্ব ত্যাগ করে আত্মীয়-স্বজন ও পুত্র-কন্যার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করেছেন। এসব আদর্শের কার্যকারিতা মানবজীবনের পটভূমিতে পরোক্ষভাবে ক্রিয়াশীল। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে এরা তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করেনি।
ধর্মের প্রবর্তনও এক হিসেবে আদর্শেরই অভিনব পদ্ধতির রূপায়ণ। তবে ধর্মাশ্রিত আদর্শের রূপায়ণের জন্য মহামানবেরা অমানুষিক দুঃখ কষ্ট ও অভূতপূর্ব নির্যাতন সহ্য করেছেন। মুখ্যত মানবজীবনের মুক্তির জন্য সিংহাসন ত্যাগ করে বুদ্ধদেব যে বাণী প্রচার করেছিলেন, তার আদর্শিক প্রেরণার উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল মানুষ অভিনব জীবন-পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে পাক-ভারতের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন বৌদ্ধবিহার। সংগ্রাম-উৎসাহী জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সম্রাট অশোক সহিংস নীতি পরিত্যাগ করে অহিংসার প্রচারকরূপে এজগতে স্থায়ী শ্রদ্ধার আসন লাভ করেন। সে আদর্শের প্রেরণাই তাঁকে নানা স্থানে বাণী প্রচারের জন্য ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করেছে।
তেমনি সহায় সম্বলহীন নিরীহ মেষপালক যীশুর বাণী শুনে অপর একদল মানুষের জীবনে দেখা দিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদ অর্থাৎ সোজা কথায় মানব-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে দেখা দেয় অভূতপূর্ব কালচার। সে কালচার যেমন ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি ও ম্যাডোনা চিত্রে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি রোমান ক্যাথরিকদের গলায় ঝুলানো ক্রসের প্রতীক বা চার্চের গঠনশিল্পেও প্রকাশ পেয়েছে। এ দুনিয়ার সন-তারিখ গণনার ক্ষেত্রেও সে কালচারের রয়েছে ছাপ। আজও খৃষ্ট-পরবর্তীতে এসে এ’দুনিয়ার কাল-কে যেমন বিভক্ত করা হয়েছে, তেমনি খৃষ্ট-পূর্ব সে কালের গণনাও চলেছে যীশুখ্রীষ্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে। সে কালচার নানা দেশে নানারূপ পরিগ্রহ করলেও তার রয়েছে এক সাধারণ পরিচয়।
ইসলাম ধর্ম আরবের বুকে প্রচারিত হয়েছে অশিক্ষিত মূর্তি-পূজক, কলহপরায়ণ, গোত্র-সর্বস্ব, নানাদলের মানবের মধ্যে। অল্প সংখ্যক নগরবাসী ব্যবসায়ী ও নানাবিধ গোত্রের লোকের মধ্যে প্রচারিত হলেও, এ ধর্ম-ভিত্তিক আদর্শ আলোর মতো পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আরববাসী সাধারণ মানুষের আহার্যের বস্তু বা পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদ এ দুনিয়ার সকল ইসলামপন্থী মানুষ গ্রহণ করেনি, করতেও পারবে না। তবে আদর্শের ক্ষেত্রে এ দুনিয়ার সকল মুসলিমের মধ্যে রয়েছে ঐক্য-সূত্র। তাদের জীবনের মুল্যমানগুলোও সে আদর্শের আলোকেই বিবর্তিত হয়েছে।
সুদূর স্পেনের পুরাতন স্মৃতিবিজড়িত কর্ডোভার মসজিদ ও ঢাকার যেকোনো মসজিদ একই আল্লাহর উপাসনার উদ্দেশ্যে নির্মিত বলে সহজেই বোঝা যায়। এদের গঠন–নৈপুণ্যের এবং কলা–কৌশলে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে সত্যি, তবুও তাদের সাধারণ পরিচয় লাভে কোন কষ্ট হয় না। লুঙ্গি পরিহিত সুমাত্রা বা জাভার মুসলিম ও কোট–প্যান্ট–টাই পরিহিত ইংল্যাণ্ডের নব্য–দীক্ষিত মুসলিমের মধ্যে বেশভূষা বা চালচলনে পার্থক্য থাকতে পারে, তবে জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে তাদের ধারণায় রয়েছে ঐক্য। এখানেই রয়েছে ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত কালচারের সঙ্গে অন্যান্য আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত কালচারের প্রভেদ।
মানবজীবনের ঐক্য-সূত্রের আবিষ্কার ও তার প্রচারণা কেবল দার্শনিকেরা করেননি। সাহিত্যিকদের দ্বারাও সে-সত্য প্রচারিত হয়েছে। মানবজীবনের কৃতকার্যের ফল ভোগের জন্য পরলোকের অপেক্ষা করতে হয় না, ইহলোকেও সে বিচার হয় এবং এ-বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে তারা তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ এ-জীবনেই করে, যার প্রচারণা মহাকবি হোমার বা বাল্মীকিও করে গেছেন। ট্রয়-ধ্বংস বা রাবণের পুরী নাশ এ নিয়মেই হয়েছে বলে হোমার-বাল্মীকি সুললিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। সুদূর অতীতের সাহিত্য ছাড়াও ঐতিহাসিক সাহিত্যেও তার প্রমাণ রয়েছে। কালিদাসের শকুন্তলা বা শেক্সপীয়রের নাটকাদিতেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। এতে মানবজীবনের সাধারণ পরিণতি সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ফলে পরবর্তীকালে কোথাও অমোঘ নিয়তি কর্তৃক মানবজীবনের লাঞ্ছনা, কোথাও মানুষের দ্বারা মানুষের বিড়ম্বনার ইতিহাস চিত্রায়ণের মধ্যেও সেই একই মানুষের পরিণতি দৃষ্টিগোচর হয়। তাতে একদিকে যেমন মানবতাবোধের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছে, তেমনি মানবতাবাদেরও উদ্ভব হয়েছে। তবে ধর্মীয় জগতের আলোড়নের মতো এসব মতবাদ মানুষের জীবনকে তেমন প্রচণ্ডভাবে পরিবর্তন করতে সমর্থ হয়নি।
তার কারণও সুস্পষ্ট। ধর্মের মধ্যে রয়েছে সামগ্রিকতা। ধর্ম শুধুমাত্র প্রত্যয়শীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মের মধ্যে মননশীলতা, আবেগ (emotion) ও ইচ্ছাশক্তির (will) পরিস্ফুটন ও বিকাশের উপাদান রয়েছে। দর্শন বা সাহিত্য যেভাবে মানবজীবনের চিন্তাশীলতা বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হয়, সেভাবে মানবজীবন নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো রীতিনীতি মানব–মানসে প্রতিষ্ঠিত করতে সামর্থ্য হয় না। এজন্যই বর্ষ–প্রবর্তনের ফলে মানবজীবনে দেখা দেয় প্রচণ্ড বিপ্লব।
মানবজীবনের সামগ্রিক বৃত্তিসমূহের সন্তোষবিধানে সক্ষম বলেই ধর্ম থেকে প্রচারিত আদর্শ জীবনের নানাক্ষেত্রে নানাভাবে প্রকাশিত হয়। চিত্রশিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি নানাক্ষেত্রে সে আদর্শ রূপায়ণের মাধ্যম মাত্র। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক কারণগুলো আদর্শিক কারণের তুলনায় হীন ও দুর্বল এবং ধর্মীয় আদর্শিক কারণের তুলনায় আরও ক্ষীণ বলেই স্থান, কাল, জাতি, বর্ণ প্রভৃতির গণ্ডি পেরিয়ে ধর্মীয় আদর্শের প্রেরণায় মানুষ ঐক্যসূত্রে নিজেদের গর্বিত করতে এতো আগ্রহ প্রকাশ করে।
অপরদিকে বিভিন্ন ধর্মের দ্বন্দ্ব এবং সংজ্ঞা নিয়ে যে বিবাদ রয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তিকামী মানবতাবাদীদের একান্ত সাধনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বিভিন্ন ধর্মের আচারগত রূপ পরিত্যাগ করে তাদের অন্তর্নিহিত মানবতাবাদের মৌলিক রূপটি সর্বসাধারণ মানুঘের সামনে তুলে ধরাতে। অন্যদিকে বর্ণের, ভাষার বা ভৌগোলিক পরিবেশের অবস্থা অস্বীকার করে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভিত্তিতে মানবগোষ্ঠীকে ভাগের কারণে সৃষ্ট এ বৈষম্য নিরসনের জন্য নানাদিক থেকেও আসছে আহ্বান।
একেও মানবতাবাদের অন্য সংস্করণ বলা যায়। তবে ভেবে দেখবার বিষয় যে, উভয় মানবতাবাদই মানুষের মৌলিক ঐক্য আবিষ্কারে সক্ষম হলেও সে মানবতাবাদকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতির উত্তরে তারা একমত হতে পারেনি। এ-কথা অবশ্য অনস্বীকার্য যে পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্য ব্যতীতও এ দুনিয়ার জীব হিসাবে মানুষের রয়েছে সাধারণ পরিচয়। জীবনের নানাক্ষেত্রে কীভাবে জীবন পরিচালনা করলে দুনিয়ার সকল মানুষই সন্তোষ লাভে সামর্থ হবে, সে পদ্ধতি আবিষ্কারই বর্তমান জগতের একমাত্র কার্য। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্য মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানে সক্ষম হলেও মানুষের সামগ্রিক জীবনের বিধানারোপের ক্ষেত্রে সমর্থ হবে কিনা তাই প্রণিধানযোগ্য বিষয়।