ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের যাত্রা, কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার

(ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাসান আল ফিরদাউস; জ্ঞানের আন্দোলন হিসেবে ইন্সটিটিউটের যাত্রা, এর কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন জনাব সা’দ মুসান্না।)

 

সা’দ মুসান্না: ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী? আপনারা কী চাচ্ছেন? নতুন শিক্ষা আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে, এক্ষেত্রে মূল ভিশন কী?

হাসান আল ফিরদাউস: প্রথম বিষয় হচ্ছে, ব্রিটিশদের শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলেছে প্রায় ১৯০ বছরের অধিক সময়কাল ধরে। এ শোষণ-সাম্রাজ্যবাদ পরবর্তী আমাদের বাংলাদেশ। আমরা যদি ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকের কিছু বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করি; যেমন আসাম রাজ্য বা পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কিছুটা উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, প্রস্তাবনা এসেছে।

এরপর ১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, এর আলোচনায় শুধু বাংলা নয়, দক্ষিণ ভারত থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে অনেক কথাবার্তা হয়েছে; হয়েছে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম। কিন্তু এখানে সকল আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে কম আলোচিত বা গুরুত্ব না পাওয়া বিষয় হলো সিলেবাস নিয়ে আলোচনা।

আলোচনা হয়েছে এখানকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, পূর্ববঙ্গের অবস্থা, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব কিংবা অসাম্প্রদায়িকতার বয়ান বা নিজেদের মতো করে আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, তার নিজস্ব সিলেবাস কাঠামো, নিজস্ব মেথড, নিজস্ব চিন্তা। এটা নিয়ে বড় ধরনের কোনো আলাপ আমরা লক্ষ্য করি না।

এর মানে হলো, আমাদের এই সিলেবাসটি মূলত ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রদত্ত একটি সিলেবাস কাঠামো। এর মাধ্যমে আমাদের জাতির চাওয়া-পাওয়া পূরণ কিংবা মুক্তি সম্ভব নয়, এটা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। সুতরাং, আমাদের নিজস্ব মেথড, নিজস্ব চিন্তাধারা, নিজস্ব সিলেবাস প্রয়োজন

যেকোনো জাতি তার শিকড়ের সন্ধান পায় অতীত থেকে। অর্থাৎ অতীতে গিয়েই একটি জাতি তার ভবিষ্যৎকে দেখতে শুরু করে। কাজ ও সমাজ গঠনের যে বয়ান, সেদিকে তাকালে দেখা যায় এগুলো আসে শিক্ষা ও চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকে। এবং বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যে জ্ঞানের স্রোত সমাজে প্রবাহিত হয়, তা-ই মূলত জাতির কাজে, ব্যক্তিত্ব গঠনে, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে

কিন্তু আমাদের দেশে এই জ্ঞানের ধারাটি দাঁড়িয়ে আছে উপনিবেশ কর্তৃক সৃষ্ট মূলনীতির উপর ভিত্তি করে। উপনিবেশ কর্তৃক সৃষ্ট ইতিহাসের বয়ানের উপর ভিত্তি করেই সবকিছু সাজানো হয়েছে। এগুলো আমাদের ভাঙতে হবে। এটা ভাঙতে না পারলে আমরা প্রশ্নাতীতভাবে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের মধ্যেই নিপতিত হয়ে থাকব।

এটিকে ভাঙতে হলে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস লাগবে, নিজস্ব মেথডলজি দাঁড় করাতে হবে। আর সেটা দেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি সব কিছুর মেথডলজি তৈরি করবে, ভবিষ্যতের প্রস্তাবনা দেবে।

এটা হওয়ার জন্য যেমন ব্যক্তিত্বের জাগরণ দরকার, তেমনি এসবের মধ্য দিয়েই জাতির বিবেক স্পন্দন হিসেবে প্রস্ফুটিত হবে। অর্থাৎ একটি সভ্যতার ভিত্তি, একটি রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি শুরু হবে শিক্ষাঙ্গন থেকে

আজকের দিন পর্যন্ত যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকাই, দেখা যাবে সেগুলো রাজনীতির আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং সেই এপ্রোচেই পরিচালিত হচ্ছে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পর্যন্ত রাজনীতির আতূড়ঘর হিসেবেই আছে। কিন্তু একই সাথে প্রশ্ন হলো, এই যে ব্যক্তিত্বের জাগরণ, ভবিষ্যৎ দেখানোর মতো মেথড, ইশতেহার, চিন্তা এখান থেকে উঠে আসছে কি না? কিংবা এই চিন্তা থেকে সেরকম ব্যক্তি তৈরি হচ্ছে কি না? সেই ব্যক্তিরা কি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছে? তারা কি রাষ্ট্র ও সমাজে অবদান রাখছে? এটাই মূলত আউটপুট।

তাই এভাবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন, সেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ এই জায়গায় আপাতদৃষ্টিতে আমরা কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করি না। কেন? আমাদের একাডেমিয়া আজ যেহেতু এ সকল নিয়ন্ত্রণাধীন, সুতরাং প্রত্যেকটি বিষয়েই সেই উপনিবেশিক কাঠামোর ছাপ রয়ে গেছে।

যেমন, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা, কোনোটার সঠিক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ ৪৭-এ মানুষ নেমেছিল অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য। বেকারত্ব, প্রযুক্তির ঘাটতি, কৃষির পর্যাপ্ত উৎপাদনের অসুবিধা এসব কারণে মানুষ দুর্ভোগে ছিল। অনাহার ও খাদ্য সংকট ছিল ব্যাপক। এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না।

৪৭-এর পরে মুসলিম লীগ এলেও, জমিদার প্রথা উঠলেও, তারা অর্থনৈতিক পরিবর্তন, কৃষি, বেকারত্ব, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কোনো ক্ষেত্রেই সঠিক সমাধান দিতে পারেনি। চেষ্টা করলেও তা হয়নি। এক পর্যায়ে তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। পরবর্তীতে অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী উঠে এসেছে।

এরপর ৭১ হলো। আমরা যদি দেখি, একই কারণে ৭১ সংঘটিত হয়েছে। সেই অর্থনৈতিক দুর্দশা, শিল্প প্রযুক্তির অভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতা, সামাজিক নিরাপত্তার সংকট সব মিলিয়ে একই ধরনের ক্রাইসিসের মধ্য দিয়েই ৭১ ঘটেছে। সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার না পেয়ে বারবারই কখনো অস্ত্র ধরেছে, কখনো আন্দোলনে নেমেছে।

আমরা যদি আজকের দিন পর্যন্ত দেখি, গত ষাট বছরে এত গণঅভ্যুত্থান হয়েছে শুধু ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার কারণে। অর্থাৎ প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রকে গঠন করা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে জাতির অধিকার নিশ্চিত করা

আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বই ছিল জাতিকে গড়ার প্রস্তাবনা প্রদান করা। পাশাপাশি জাতি গঠনের শিক্ষা, মানুষ গড়ার গুরুত্ব, জাতিকে ভবিষ্যৎ দেখানোর কাজটা ছিল আমাদের একাডেমিয়ার তথা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনগুলোর। কিন্তু আশানুরূপ হয়নি

এরপর গিয়ে আমরা সবাই দোষারোপ করছি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বা রাজনীতিকে। কিন্তু রাজনীতিও একমাত্র মুক্তির উপায় নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার বা প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের একটি দায় রয়ে গেছে যেটা সবসময় আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

আমাদের ইনস্টিটিউট সেই জায়গা থেকে শিক্ষা আন্দোলনের দায়িত্ব জাতিকে উপলব্ধি করাতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনগুলোর সত্যিকারের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করতে চায়

এবং এটা কিভাবে করবে?

শিক্ষা আন্দোলনকে নিজস্বতা দিয়ে; তথা নিজস্ব ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে, নিজস্ব ইতিহাসচর্চা, নিজস্ব মেথডলজির মাধ্যমে; এভাবে আমরা এমন এক ভবিষ্যতের ইশতেহার বা প্রস্তাবনা তৈরি করতে চাই, যেখান থেকে জাতির বিবেক এবং স্পন্দন জাগ্রত হতে পারে

এটাই মূলত ইনস্টিটিউট প্রাসঙ্গিক করতে চায়। আর এজন্য ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।

 

সম্পূরক প্রশ্নের সাথে কিছু বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে—

ইসলামী সভ্যতার পতন পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থান, তাদের পরিচালিত একটি বিশ্বব্যাপী কাঠামো, এরাই দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই সময়ে সবাই অজানা অবস্থায় নিপতিত। কারণ, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যদি দেখি, সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যা কল্পনাতীত। দ্বিতীয়ত, মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, আত্মিক প্রশান্তি, রূহানী খোরাক এসব ক্ষেত্রে দুনিয়া এক ভয়াবহ শূন্যতার মধ্যে আছে। সত্যিই সারা পৃথিবী এখন অসুখী।

আপনি যদি প্রতিটি সেক্টরে লক্ষ্য করেন, দেখবেন সময়কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে আলেমগণ, চিন্তাবিদগণ, দার্শনিকগণ পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ এসময়কাল কে অস্বাভাবিক সময় বা ‘পোস্ট-নরমাল’ নামে অহিবিত করছেন, যেটা আমরা ইশতেহারে বলেছি; কেউ একে ‘হাকিকত-পরবর্তী সময়’ বলে অভিহিত করছেন; কেউ কেউ ইনসান পরবর্তী ‘পোস্ট হিউম্যান’ যুগ বলে উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ এমন এক সময় এসেছে যা আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করছে, হাকিকত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা তা বুঝতেও পারছি না। এতটাই অসহায়তার মধ্যে দিয়ে পৃথিবী হাঁটছে।

ডিজিটালাইজেশন এবং সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল রূপ, জ্ঞানার্জনের নতুন পদ্ধতিতে নানা রকম বিশৃঙ্খলা সবকিছু আমাদেরকে এক প্রকার হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করেছে। এর ফলশ্রুতিতে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যে তরুণ শ্রেণি, যাদের সবচেয়ে বেশি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি হতাশাগ্রস্ত।

তবে আমরা যদি পূর্বের সময়ের দিকে তাকাই, অথবা বাংলার আগের সময়কাল যেটি ছিল; তখন আমরা এক বিশাল সিভিলাইজেশনাল প্রজেক্ট এর মধ্যে দিয়ে সুবিশাল সভ্যতা দাঁড় করিয়েছিলাম, যেখানে ন্যায়ভিত্তিক আদালত ছিল, অর্থনীতি ছিল সুবিন্যস্ত, সংকট থাকলেও মানুষ ভালো ছিল, মানুষ তার ভবিষ্যৎকে খুঁজে পেত। সেই সময় সাক্ষ্য দেয় যে ওই যে মেথড-ফিকহ নির্ভর সমাজ, উসুল ও মেথডলজি নির্ভর সমাজ, যেটা মুসলমানদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল, তা ছাড়া বর্তমান দুনিয়াকে নতুনভাবে দাঁড় করানো, মুক্তির পথ দেওয়া সম্ভব নয়।

অর্থাৎ একমাত্র সমাধান আমরা ঘুরেফিরে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও ইসলামী সভ্যতার পুনঃনির্মাণের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সমাধানের প্রসঙ্গে চিন্তা করলেও দেখা যায়, আমাদের ফিকহ, উসুল, মেথডলজি এই চর্চা আমাদের করতেই হবে। ইসলামী সভ্যতার ধারণাকে পুনরায় চিন্তা করতে হবে, ইতিহাসকে নতুনভাবে বুঝতে হবে, এবং আমাদের সভ্যতার জ্ঞান, মেথডলজি, চিন্তাধারা ও ইতিহাসচর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।

পূর্ববর্তী সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই সাথে ভবিষ্যৎকে দেখতে হবে। এর জন্য অবশ্যই একটি ইনস্টিটিউশনাল উদ্যোগ নিতে হবে, শিক্ষা ও আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম থেকে; যেখানে ব্যক্তিত্ব গঠন হবে, প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, জাতিকে সচেতন করা হবে, বিষয়গুলোকে প্রাসঙ্গিক করা হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে জাতীয় মান উন্নত হবে।

আসলে এটাই আমাদের ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য।

 

সা’দ মুসান্না: আপনারা কী চাচ্ছেন বা আপনাদের অবদানগুলো কী, অথবা কী করছেন?

হাসান আল ফিরদাউস: যেটা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, একটি প্রতিষ্ঠান আসলে কে গড়ে? গড়ে তার শিক্ষকরা, সিলেবাসের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা যদি দেখি, আমাদের দেশে শিক্ষক বলতে যা বোঝায়, আসল অর্থে তা কতজন আছে? শিক্ষক বলতে সত্যিকারার্থে শিক্ষক, চাকরিজীবী না। শিক্ষক বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তিকে, যিনি ব্যক্তিত্ব তৈরি করার জন্য, জাতির ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করেন।

এই যে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক, এটা যে নেই, এমন না। অবশ্যই আছে। যদি আমরা তাদের নিয়ে কাজ করতে পারি, বা কাজ করতে চাই, তাহলে আমার মনে হয়েছে যে, সত্যিই জাতির বর্তমান যুব সম্প্রদায় একটা আশার আলো দেখতে পাবে।

শিক্ষক ছাড়া কখনোই কেউ উপমা খুঁজে পায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় না। এটাই যুগে যুগে হয়ে এসেছে। আপনারা যাদের বড় মনে করেন, তারা কারও না কারও ছায়ায় বেড়ে উঠেছে, এটা অনস্বীকার্য।

এই অবস্থান থেকে আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক, যারা রয়েছেন, দেশীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের যেসব শিক্ষক আছেন, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার। শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার, দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য কাজ করছি।

আমার মর্যাদা নির্ভর করে মাতৃভূমির বা দেশের জন্য আমি কী অবদান রাখলাম, সেই প্রশ্নের উত্তরে।

প্রজন্ম তৈরির জন্য চেষ্টা করতে হবে অর্থাৎ একটি স্থায়ী মুক্তির দিকে ধাবিত হতে হলে নিজেদেরকে অবশ্যই জাতির রূহ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং এরপর জাতির বিবেক এবং স্পন্দনে পরিণত হতে হবে। এটা ছাড়া জাতির অবস্থা আমরা বুঝব না, বা ভবিষ্যৎকে দেখাতে পারব না।

এর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে আসবে ভাষা-বাংলা ভাষা, যেটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। এই ভাষাকে জাগ্রত করা, নতুন পরিভাষা সৃষ্টি করা, এটা অপরিহার্য। কারণ আমরা সবসময় দেখেছি, যে কোনো গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে যেমন পরিভাষা প্রয়োজন, তেমনি অন্যান্য সবক্ষেত্রেও নতুন পরিভাষার প্রয়োজন হয়

পরিভাষাগুলোর জন্ম দেয় কারা? এই পরিভাষাগুলো কোনো ব্যক্তিত্ব নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই তৈরী করে। এটাই যুগে যুগে হয়ে আসছে। এজন্য আমরা ভাষার বিনির্মাণ এবং বাংলা ভাষাকে জাগ্রত না করতে পারলে আসলে কোনো কিছুই হবে না।

সেই কারণে আমরা নিরপেক্ষ জায়গা থেকে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে, ভবিষ্যতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি—সব কিছুকে একটি প্রস্তাবনা বা ভবিষ্যতের রূপরেখা হিসেবে দেখানোর মতো একটি মেথডলজি হাজির করতে চাই। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

সেই জায়গা থেকে আমাদের যেসব শিক্ষক বা বড় বড় আলেম আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম সম্মানিত ওস্তাদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ; যার দীর্ঘ দারস, চিন্তা ও মেথড দিয়ে আমরা উপকৃত হয়েছি। ফিলিস্তিনের প্রফেসর ড. আবদুল ফাত্তাহ আল ওয়াইসি; তার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির দিশা শেখার সুযোগ পেয়েছি

আমরা পেয়েছি প্রফেসর ড. ওয়াসফি আশুর, প্রফেসর ড. জাসের আওদা, প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইজ্জেত, যারা মিশরের শ্রেষ্ঠ আলেমদের অন্যতম। তাদের কাছ থেকে আমরা দারস গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি।

আমরা বিখ্যাত সভ্যতাবিশারদ, দার্শনিক প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন উস্তাজকে পেয়েছি। একই সাথে মরক্কোর গাজ্জালি খ্যাত ত্বহা আবদুর রহমান-এর চিন্তা বোঝার জন্য সম্মানিত শিক্ষকের দারস পেয়েছি। আমরা মুক্তি ও সংগ্রামের অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. সামি আল আরিয়ান-কে পেয়েছি।

আমরা পেয়েছি বাস্তবিক বা জীবন্ত কিংবদন্তি হাজী ইব্রাহীম মুরাদ-কে। আমরা পেয়েছি প্রখ্যাত আখলাকবিদ, শহরতত্ত্ব বিশারদ প্রফেসর ড. ইউসুফ ইয়ালানিজকে। একই সাথে পেয়েছি আধুনিক অর্থনীতি এবং ইসলামের প্রাসঙ্গিকতার অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. আসাদ জামান-কে।

আমরা পেয়েছি জর্ডানের ওস্তাদ ড. ইউসুফ আল কুরাইশি, লেবাননের ওস্তাদ প্রফেসর ড ওয়ানিস আল মাবরুককে। এভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বড় বড় শিক্ষকের দারস গ্রহণ করার পাশাপাশি দেশীয় অঙ্গনের যেসব শিক্ষক আমাদের মুগ্ধ করেছেন, সত্যিকারার্থে গড়ে তোলার ভূমিকা রেখেছেন, তাদের আমরা পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের ওস্তাদ বুরহান উদ্দিন আজাদ-এর কথা অবশ্যই বলতে হয়। একই সাথে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় থাকা শিক্ষকগণ আমাদের প্রতিনিয়ত দারস দিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের ক্লাস নিয়েছেন।

আমরা চেষ্টা করেছি এই মডেল ও উপমাগুলো হাজির করতে এবং তাদের সঙ্গে শেখার একটি সুযোগ তৈরি করতে। যা আমাদের ছাত্রদেরকে জাতির রূহ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে অবশ্যই ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

 

সা’দ মুসান্না: আপনাদের অবদানের জায়গা কী কী বা কী কী কাজ হয়?

হাসান আল ফিরদাউস: এর উত্তরে বলা যায়, আমাদের যে একাডেমিক কাজ, তা আমাদের একাডেমি বিভাগ সম্পন্ন করে। শিক্ষকদের যেসব কথা বলা হলো, সেগুলো মূলত একাডেমি বিভাগের অবদান। আমরা এ পর্যন্ত এক বছর মেয়াদী কোর্সের তিনটি ব্যাচ সম্পন্ন করেছি। একটি সমাবর্তন হয়েছে, সামনে আরেকটি সমাবর্তন হবে। এছাড়া  আমরা দুই বছর মেয়াদি কোর্স পরিচালনা করছি, যেখানে উলুমুল কোরআন, ইসলামী চিন্তায় হাদিস মেথডলজি, ইলমুল কালাম, উসুল ও মাকাসিদ, বালাগাত মান্তিক, উসুল ও ফিকহ, শরিয়া, ইসলামিক অর্থনীতি, ইসলামী দর্শন থেকে শুরু করে লজিক ও ক্রিটিকাল থিংকিং, অ্যানালিটিক্যাল থিংকিং, ইসলামিক জ্ঞানের উসুল ও মেথডলজি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত দুটি ব্যাচ সম্পন্ন হয়েছে এবং একটি সমাপ্তির পথে রয়েছে

আমরা এই কোর্সগুলোর মাধ্যমে উপরোক্ত বিষয়ের অনেকগুলোর বেসিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে বিশ্বসভ্যতা ও ইসলাম, গণিত, উসুলে সিরাত, ইসলামিক চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (D-8), আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব, তাসাউফ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইভিত্তিক পাঠচক্র পরিচালনা করা হয়। এই ক্লাসগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোর্স সমাপ্ত করছে।

সেই সঙ্গে তারা বাস্তব কাজেও সম্পৃক্ত হচ্ছে। কেউ অনুবাদক হিসেবে অবদান রাখছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গাতে গবেষণামূলক কাজে যুক্ত রয়েছে। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য বা অনুবাদ কাজে অবদান রাখার ক্ষেত্রে আমরা অনেক শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে দেখতে পাচ্ছি। এ পর্যন্ত আমাদের যেসব শিক্ষার্থী কোর্স সমাপ্ত করেছে বা সমাপ্তির পথে রয়েছে তাদের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এই দুই হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তত আমরা একটি বড় ধরনের চিন্তার সাথে, পদ্ধতিগত জ্ঞানের সাথে, সরাসরি শিক্ষকদের সংস্পর্শে আনতে পেরেছি।

আমি মনে করি, আমাদের জন্য এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য এটি একটি নতুন সংযোজন। কারণ, আমাদের ক্লাসগুলো অধিকাংশ নতুন সংযোজন হিসেবে বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

একই সঙ্গে আমাদের গবেষণা বিভাগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অবদান রয়েছে। এখানে ষাটটির অধিক প্রকাশনা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এবং আমাদের প্রকাশনাগুলো মানহীন বা গবেষণা বহির্ভূত নয়, এরকম কোনো লেখা আমরা প্রকাশ করি না। সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই আমরা বই প্রকাশের চেষ্টা করি।

এই সবকিছুই আমাদের নিজস্ব সংযোজন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে কাজ থাকলেও আমরা নতুন করে এগুলোকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ আমরা অগ্রগামী হতে পেরেছি।

আমাদের একই সঙ্গে রোয়াক ব্লগ রয়েছে এবং সেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রবন্ধ রয়েছে, যেগুলো অনুবাদ, মৌলিক লেখনি, সংকলিত লেখা ইত্যাদির অন্তর্ভুক্ত। আমি মনে করি, এগুলো বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় এনসাইক্লোপিডিয়াতে পরিণত হবে এবং হতে যাচ্ছে। যার প্রমাণ রোয়াক ব্লগ দেখলেই বোঝা যাবে।

অনুবাদের ক্ষেত্রে, এই রোয়াক ব্লগ, প্রকাশনা, পত্রিকা সবকিছুর ক্ষেত্রেই অবদান রেখে যাচ্ছে আমাদের অনুবাদ বিভাগ, যেটি গবেষণা বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয়। গবেষণা বিভাগের অন্যতম একটি বিভাগ হলো ত্রৈমাসিক মিহওয়ার এখন পর্যন্ত আমরা মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশ করেছি। এটি খুবই মৌলিক এবং বড় বড় শিক্ষকদের লেখনি, চিন্তা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। যা যুবসমাজের মাঝে একটি বড় ধরনের আশার সঞ্চার করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্ধশতাধিক পাঠচক্র পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ, এই পত্রিকা ইতোমধ্যে একটি চিন্তাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

আমরা এই সব বিষয়ের পাশাপাশি আমাদের আন্তর্জাতিক বিভাগ, ছাত্র বিভাগ, ছাত্রী বিভাগ, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ, মাদরাসা বিভাগ সবক্ষেত্রে চিন্তাগুলোকে চর্চার জন্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমাদের পাঠচক্রগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।

দারস বাড়ি পাঠচক্রের ব্যানারে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিমাসে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, এই পাঠচক্রগুলো একদিন একটি বড় ধরনের জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।

বাংলাদেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গঠন, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে সংকট আমরা লক্ষ্য করেছি, এই পাঠচক্রগুলো থেকে এবং আমাদের কোর্সগুলো থেকে যে মানুষগুলো গড়ে উঠছে, যারা নিয়মিত চিন্তাচর্চা করছে, দেশ ও জাতি নিয়ে ভাবছে, তারা অবশ্যই অবদান রাখবে।

এই যে অবদান রাখার মতো একটি প্রজন্ম আমরা দাঁড় করাতে পেরেছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান এবং সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 

সা’দ মুসান্না: বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন নিয়ে আপনাদের চিন্তা ও পরিকল্পনা কী?

হাসান আল ফিরদাউস: আসলে এক্ষেত্রে যেটা বলতে হয়, তা হলো পরিকল্পনা আছে বলেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলছি। আমাদের ইনস্টিটিউটের আওতাধীন এতগুলো বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। এখান থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক যে চিন্তাটা করছি, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এসব চিন্তা ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেন আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়, আঞ্চলিক ব্রাঞ্চগুলো যেন শক্তিশালী অবস্থানে আসে। এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠুক যেখানে আপামর সাধারণ জনগণ নিজেদের রূহের খোরাক খুঁজে পাবে, ছাত্ররা তাদের শিক্ষার খোরাক খুঁজে পাবে, চিন্তাশীল যুব সম্প্রদায় তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে। পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তারা সেই ভবিষ্যৎ ও অতীত উভয়কেই চর্চা করতে পারবে, বর্তমানকে বিশ্লেষণ করতে পারবে

এটি একটি জাতিকে দাঁড় করানোর জন্য সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আমি মনে করি, এটি যদি না দাঁড়ায়, একটি জাতি কখনোই দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান বড় ধরনের একটি মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু একটি গণঅভ্যুত্থান দিয়ে আমি আমার জাতিকে গঠন করে ফেলতে পারবো না। একটি জাতির দুই শত বছরে আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি, শিক্ষা কাঠামোর নিজস্ব যে রূপায়ন, সেটি হয়নি। আমরা যদি একটি গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল সত্যিই তুলে ধরতে চাই, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের এ কাজগুলো করতে হবে। আর এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের জন্যই আমরা আমাদের ইনস্টিটিউটের ব্রাঞ্চগুলো, বিভাগগুলো, সকল স্তরেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। এবং এই যে ব্যক্তিরা তৈরি হবে, এক একজন ব্যক্তিই তো এক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান, একটি জাতীয় স্বপ্নের প্রতীক। এজন্য তারা কিভাবে তৈরী হবে, প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি কিভাবে তৈরি করবে, কিভাবে ছাত্রদেরকে স্কলারশিপ দেবে, কিভাবে আন্তর্জাতিক স্কলারদের সাথে পরিচিত করবে, কিভাবে ক্লাসিক জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হবে, পরিভাষার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নতুন পরিভাষার সৃষ্টি করবে, কীভাবে ইলমি সিলসিলার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ইলমি সিলসিলার শুভ সূচনা করবে, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিজেদেরকে কীভাবে গড়ে তুলবে, এই প্রত্যেকটা বিষয় মূলত তারা এখান থেকে শিখছে এবং এই সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে। এটাই আমাদের অঙ্গনকে একটি বড় অবস্থানে নিয়ে যাবে। এজন্য এটাকে বলবেন আমাদের মূল পরিকল্পনা।

আর অন্যদের ক্ষেত্রে যদি দেখি, বিশেষ করে আমরা যাদের সবচেয়ে নিজস্ব ও কাছের মনে করি, যাদের ইলমি চর্চার বদৌলতে বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত ইলমি চর্চা যে শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষ করে দেওবন্দী ঘরানার যে মাদ্রাসাগুলো। এই সকল মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে যেন আমরা সুন্দরভাবে তাদের সাথে বসে একত্রে বিভিন্ন রিসার্চ উপহার দিতে পারি, তাদের থেকে আমরা উপকৃত হতে পারি, তাদের সাথে মিলে জাতির প্রস্তাবনা, ইসলামী জ্ঞান চর্চা, সমাজতত্ত্ব, জাতীয় সংহতির যে আলাপ, সেগুলো আমরা করতে পারি।

এই যে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর ক্ষেত্রে এবং একই সাথে মাদ্রাসা কাঠামোর ক্ষেত্রেও, এই পরিবেশটা যদি আমরা তৈরি করতে পারি, এখান থেকে অনেক ইন্সটিটিউশন, প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় মানের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে, যারা দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখানে যারা কাজ করছে আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যের আলোকে আমরা তাদের সাথে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করব, সহযোগিতা করার চেষ্টা করব, সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করব।

 

সা’দ মুসান্না: সর্বশেষ প্রশ্ন-এ ক্ষেত্রে আসলে কোন বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বা বাঁধা হিসেবে দেখছেন?

হাসান আল ফিরদাউস: বাঁধা বলতে আমার কাছে এখানে যেটা মনে হয়েছে, তা হলো, ইতিপূর্বে যেটা বললাম, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মনে করি সব পরিবর্তন হয়ে যাবে, অর্থাৎ এই যে সাময়িক চিন্তা করা এবং একপেশে চিন্তা করা, শুধুমাত্র রাজনীতি দিয়েই কিংবা শুধুমাত্র একটা বিষয় দিয়েই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যাবে, এই মনোভাবটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এটা কেন আমি একটা জাতির জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখি তার কারণ হচ্ছে, অবশ্যই রাজনীতি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, কিন্তু এটাকে যখন একমাত্র পয়েন্ট হিসেবে বা প্রধান পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়, তখন কিন্তু আমরা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ পাই না। যেমন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এসব গড়ে তোলার প্রতি কারো কোনো আগ্রহ থাকে না, শক্তি খুঁজে পায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় না। আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে এটা সবচেয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ

কেউ সত্যি খুঁজে পাওয়া, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার যে উৎসমূল, সেটাই শুরুতেই নিঃশেষ করে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি আমি দেখছি তা হলো, এই দেশকে শক্তিশালী করবে, সভ্যতাকে শক্তিশালী করবে, একটা সিভিলাইজেশনাল প্রজেক্ট দাঁড় করাবে, এ ধরণের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা কি? আমি শক্তিশালী হয়ে রাষ্ট্রকে দখল করবো, দেশকে দখল করবো, এইটাই মূল চিন্তা। যখন আমি শক্তিশালী হয়ে দেশকে দখল করবো, তখন কিন্তু আমার সাথে যাদের চিন্তার মিল নেই আমি তাদের বিরোধিতা করবো। সেটা গুপ্তভাবে হোক কিংবা প্রকাশ্যভাবে হোক। এই গুপ্ত কিংবা প্রকাশ্য বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত দেশের ক্ষতি করছে, জাতির মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করছে। এটা শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠান নয়, সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য সমানভাবে চ্যালেঞ্জ।

এ কারণে আমরা মনে করি, নানাবিধ বাঁধা এ পর্যন্ত এসেছে। এরপর এসেছে তীর্যক মন্তব্য, মিথ্যাচার, নানাবিধ জুলুম, মনস্তাত্ত্বিকভাবে হোক, মন্তব্যের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্যান্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে হোক; এসব এসেছে কিছু অদূরদর্শী, অপরিণামদর্শী গ্রুপের দ্বারা, যারা মনে করে যে একমাত্র আমরাই শক্তিশালী হব, আমরাই রাষ্ট্রকে দখল করবো, আমরাই ইসলামের ঠিকাদার। আর ইসলাম নিয়ে কাজেরও আমরাই ঠিকাদার। এটা যে কোনো পন্থীর জন্যই জাতীয় দিক থেকে দুঃখজনক।

আমরা চেষ্টা করেছি, কোনো ধরনের সংঘাতে না গিয়ে, কোনো ধরনের সংঘর্ষে না গিয়ে, শক্তিশালী দলিল, যুক্তি এবং আমাদের কাজের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে।

এরপরও একটা বিষয় রয়েছে, সেটা হলো, অনেকেই চেয়েছে আমাদের উপর রাজনৈতিক প্রলেপ দিয়ে দেওয়া কিংবা কোনো কোনো গুপ্ত সংগঠনের সাথে মিলিয়ে ফেলা। এক্ষত্রে আমি বলবো, ইসলামের কোনো কিছুই গোপন নয়; ইসলাম সব কিছু প্রকাশ্যে রেখেছে। আমরা এই গুপ্ত নীতির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি। এবং এই বিরোধিতার কারণেই আমরা পূর্বে যে জুলুমের কথা বললাম, তার শিকার হয়েছি। একইভাবে জাতির যে সাংস্কৃতিক বিভাজন, জাতির যে আস্থা, সেটা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই নষ্ট হয় এই গুপ্ততার কারণে।

এটা যখন নষ্ট হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মতো যারা নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে জাতি গঠনের কাজ করতে চায়, তাদেরকেও মানুষ এই গুপ্তদের সাথে মিলিয়ে ফেলে। এটা শুধু আমাদের ক্ষেত্রে নয়, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল এটার ভুক্তভোগী। প্রত্যেকটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও এটার ভুক্তভোগী। মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে, কার উপর আস্থা রাখবে, এটা খুঁজে পাচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য বড় ধরনের বাঁধা।

এজন্য আমরা এই ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা জাতির মান উন্নয়নের জন্য, নিজেদেরকে জাতির রুহ হিসেবে গঠন করার জন্য, জাতির ব্যক্তি সমাজকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে চেষ্টা চালাচ্ছি। এই চিন্তাটাকে প্রাসঙ্গিক করার জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোনো নিয়ন্ত্রণাধীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে এসব করা সম্ভব নয়; বরং উল্টো, এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান দিয়েই রাজনীতিকে গঠন করা সম্ভব, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া সম্ভব, সাংস্কৃতিক ইশতেহার দেওয়া সম্ভব।

সুতরাং এই ধরনের প্রতিষ্ঠান কখনো কোনো দলের আওতাধীন হয়ে, কারো সহযোগিতা নিয়ে চলতে পারে না। এই ধারণা যদি কেউ করে থাকে বা এই ধরনের ভুল প্রত্যাশা যদি কারো থাকে যে আমরা তাদের সাথে যুক্ত হব, আমরা সেটা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি ইতিপূর্বে, এবং করে যাবো।

দ্বিতীয়ত, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই, শিক্ষা আন্দোলন হিসেবেই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই শিক্ষা আন্দোলনকে কোনোভাবেই বিতর্কিত করা, মিথ্যাচার করা, বিভিন্ন জুলুমের সম্মুখীন করা যাবে না। আমরা কারো বিরোধী নই, আমরা কারো বিকল্প নই। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে এতটুকু স্পষ্ট যে আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তায় সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ডকট্রিনের আলোকে আমাদের লক্ষ্যপানে পরিচালিত হচ্ছি।

সুতরাং এটার মাধ্যমে সকলের উপকৃত হওয়ার একটি সিলসিলা তৈরি হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আমরা দৃঢ় থাকবো এবং যত বাধাই আসুক, চ্যালেঞ্জ আসুক, আমরা তা মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাবো।

১২০ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of হাসান আল ফিরদাউস

হাসান আল ফিরদাউস

সংগঠক এবং সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক হাসান আল ফিরদাউস-এর জন্ম টাংগাইল জেলায়। পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উসূল, ফিকহ এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর বড় শিক্ষকদের সাহচর্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্কলার ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে নানাবিধ গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। একইসাথে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সম্পাদকও।
Picture of হাসান আল ফিরদাউস

হাসান আল ফিরদাউস

সংগঠক এবং সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক হাসান আল ফিরদাউস-এর জন্ম টাংগাইল জেলায়। পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উসূল, ফিকহ এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর বড় শিক্ষকদের সাহচর্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্কলার ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে নানাবিধ গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। একইসাথে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সম্পাদকও।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top