প্রথম প্রজন্মের মুসলমানগণ যেমন হাসান আল বসরী (রহঃ) মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপণ করেন রহমতের ভিত্তিতে, তাদের পরে আসেন মুতাযিলাগণ, তারা আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপণ করেন আদালতের উপর ভিত্তি করে। মুতাযিলাদের পরে আসেন আশয়ারীগণ তারা আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যকার স্থাপণ করেন কুদরত (শক্তি) র উপর ভিত্তি করে। এরপর আসেন মাতুরিদিগণ তারা আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপণ করেন হিকমতের উপর ভিত্তি করে, এদের পরে আসেন সুফিগণ তারা আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপণ করেন মুহাব্বাত (ভালোবাসা) এর উপর ভিত্তি করে।

এই সকল ধারা সমূহ তাদের এই সকল মূলনীতির উপর ভিত্তি করে আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে এবং আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি হল কুদরত (শক্তি) এটি মুসলমানদের মধ্যে অনেক শক্তিশালী একটি অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছে। সালাফি ধারা এই বিষয়টিকে এক ধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে এটিকে চরম মাত্রায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে।

আমাদের পূর্বপুরুষদের এই সকল চিন্তা জ্ঞানগত ও একাডেমিক গবেষণায় লিখিত গ্রন্থ সমূহে এমনকি মনস্তাত্বিক দিক থেকেও আমাদের পূর্বের প্রজন্ম সমূহের উপর প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য অতীতের এই সকল চিন্তা ধারা সমূহকে যুগের বিভিন্ন দিককে বিবেচনা করে সংস্কার করা হয়নি। তবে এই যুগের প্রখ্যাত মুতাফাক্কির ও দার্শনিক প্রফেসর ডঃ ত্বহা আব্দুর রহমান এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি এই চিন্তায় নতুনত্ত্ব দান করেছেন। তিনি মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে নিরূপণ করেছে দুইটি মিসাক (চুক্তি) এর উপর ভিত্তি করে। সেই মিসাক দুইটি হল,

১। ميثاق الاشهاد (মিসাকুল ইশহাদ)

মিসাকুল ইশহাদ  বা শাহাদাতের মিসাক হল ঈমানের মূল। আমরা আমাদের শাহাদাতের স্বীকৃতি দান করতে গিয়ে ‘আশহাদু’ বলতে মূলত এই শাহাদাতের স্বীকৃতি দিয়ে থাকি। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার শাহাদাতের যে মিসাক, এই মিসাক মূলত কোন ধরণের মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি চেনা ও জানার একটি মিসাক। এই শাহাদাত এক পক্ষীয় নয়। মানুষ তাঁর রবকে দেখার সময় রবও তাঁর বান্দাকে দেখে থাকে। মানুষ তাঁর মহান রবের পবিত্র নাম, সিফাত ও আয়াত সমূহকে প্রত্যক্ষ করার সময় আল্লাহ তায়ালাও তাঁর বান্দাদের কাজ, আমল, নিয়ত ও তাঁদের গোপন বিষয়সমূহকে প্রত্যক্ষ করে থাকেন।

ঈমান ও ইবাদত হল এই মিসাকের একটি দাবী। ইবাদত হল আমাদের অস্তিত্বের ভাষা। মানুষ সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে এই ভাষার মাধ্যমে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে থাকে। অস্তিত্ত্বের ভাষা  হিসেবে ইবাদতের রূহ আমাদের বিবেক (বিজদান) সর্বদায় নবাইয়ন করে থাকে। আর এই নবায়িত বিবেক (বিজদান) আমাদেরকে আখলাক, আদালত ও মারহামাতের দিকে ধাবিত করে। শাহাদাত মিসাকের মাধ্যমে ঈমান ও ইবাদত, রূহের আখলাকে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। দ্বীনী আচরণসমূহ যতবেশী পরিমানে রূহের আখলাকে পরিণত হবে দ্বীনদারিত্ত্বও ততবেশী আখলাক উৎপাদন করবে। ঈমান আখলাক উৎপাদনকারী একটি বিবেকে (বিজদান) রূপান্তরিত হবে। ব্যক্তি তাঁর সকল কাজ থেকেই আধ্যাত্মিক একটি স্বাদ পাবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকল কিছুকে প্রত্যক্ষ করছেন এই চেতনা ও বিশ্বাস, ব্যক্তিকে আখলাক সম্পন্ন হওয়ার দিকে উৎসাহিত করে। এই ধরণের চেতনাকে লালনকারী একজন ব্যক্তির চোখে দ্বীন শুধুমাত্র আদেশ ও নিষেধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সে এমন এক চেতনাকে লালন করে  যেখানে সে আল্লাহকে শুধুমাত্র আদেশ দানকারী ও নিষেধকারী একটি সত্ত্বা হিসেবেই দেখে না। ব্যক্তি যখন শাহাদাতের চেতনাকে ধারণ করে তখন সে সর্বদায় তাকে প্রত্যক্ষকারী /শাহাদাতকারী একটি সত্ত্বা হিসেবে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে থাকে। আখলাকী মূল্যবোধকে শুধুমাত্র পরিপূর্ণতা দানকারী একটি বিষয় হিসেবেই নয়; এটাকে একই সাথে জামাল (সৌন্দর্য) হিসেবেও দেখে থাকে এবং এই জামাল (সৌন্দর্য) মানুষের মধ্যে জ্ঞান, হিকমত, মারেফত ও মুহাব্বতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। এই হিকমত ও মারেফত তাঁর শক্তিকে শাহাদাত থেকে নিয়ে থাকে। হিকমতের মাধ্যমে হাকিকতে উপনীত হওয়ার পথকে দেখিয়ে থাকে।

শাহাদাতের মিসাকে কোরআনে কারীমের সূরা আরাফে এই ভাবে তুলে ধরা হয়েছেঃ

﴿وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَا ۛ ﴾

অর্থাৎ, “আর হে নবী! লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিলঃ নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব , আমরা এর সাক্ষ দিচ্ছি”।

মহান প্রভু সূরা আলে ইমরানে এই বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্টভাবে এই ভাবে উল্লেখ করেছেনঃ

قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَىٰ ذَٰلِكُمْ إِصْرِي ۖ قَالُوا أَقْرَرْنَا ۚ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ﴾)

অর্থাৎ, আল্লাহ জিজ্ঞেস করেনঃ তোমরা কি একথার স্বীকৃতি দিচ্ছো এবং আমার পক্ষ থেকে অংগীকারের গুরুদায়িত্ব বহন করতে প্রস্তুত আছো ? তারা বললো, হ্যাঁ, আমরা স্বীকার করলাম। আল্লাহ বললেনঃ আচ্ছা, তাহলে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম। [2] এই আয়াতের আলোকে যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাই যে, আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক পারস্পারিক একটি শাহাদাতের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে বিনির্মিত হয়েছে।

কোরআন তাঁর নিজের জন্য নির্দিষ্ট তামছিলি পন্থার আলোকে মানুষের রূহের জগতের অবস্থাকে তুলে ধরেছেন। তবে দুনিয়ার জগতে এসে এই মিসাক ফিতরাতে পরিণত হয়েছে। ফিতরাত হল শাহাদাত মিসাকের মেমোরি। প্রতিটি মানুষই এই ফিতরাত নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দ্বীন হল ফিতরাত। দ্বীনকে কোরআনে ফিতরাত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার কারণও এটাই।

( ﴿فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ

অর্থাৎ, কাজেই তুমি একনিষ্ঠ হয়ে তোমার সকল কিছু নিয়ে এ দ্বীনের দিকে মনোনিবেশ করো। আল্লাহ মানুষকে যে ফিতরাতের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন সেই দিকে ধাবিত হও। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন ধরণের পরিবর্তন হতে পারে না। মূল্যবোধের মাধ্যমে সজ্জিত সঠিক দ্বীন এটাই।

 

২। ميثاق الامانة (মিসাকুল আমানা)

এই মিসাক অনুযায়ী সকল কিছুই মানুষকে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। মহাবিশ্ব ও বিশ্বসৃষ্টির সাথে মানুষের সম্পর্ক সার্বভৌমত্ব ও মালিকানার উভর ভিত্তি করে নয়, বরং আমানতের উপর ভিত্তি করে। মানুষ এই পৃথিবী ও সৃষ্টি জগতের মালিক নয়; আমানতদার। প্রথম মিসাক , আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তিকে নির্ণয় করে থাকে আর এই দ্বিতীয় মিসাক মানুষের সাথে দুনিয়ার ও সৃষ্টিজগতের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিকে নিরূপণ করে থাকে। প্রথমটিতে আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়াতকে স্বীকৃতি দেয় আর দ্বিতীয়টিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মালিকানার স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে আমরা ঘোষণা দিয়ে থাকি যে, আমরা মানুষের উপরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করব না এবং পৃথিবীতে নিজেদের রাজত্বও প্রতিষ্ঠা করব না। আমরা স্বীকৃতি দিয়ে থাকি যে, আমাদের কাছে যা কিছু আছে সেগুলোর উপর একচ্ছত্র মালিকানার (মুতলাক মূলকিয়াত) দাবী করব না। আমাদেরকে যা কিছুই দেওয়া হয়েছে সকল কিছুই হল আমানত এবং কোন আমানতেরই খেয়ানত করব  না বলে স্বীকারোক্তি দিয়ে থাকি।

আমানতের মিসাককে কোরআনের সূরা আহযাবে এইভাবে বিবৃত করা হয়েছে;

﴿إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ  ﴾

অর্থাৎ, আমি এ আমানতকে আকাশসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতরাজির ওপর পেশ করি, তারা এই আমানতকে বহন করতে রাজি হয়নি এবং তা থেকে ভীত হয়ে পড়ে।  কিন্তু মানুষ এই আমানতকে গ্রহণ করেছে।

এখানে উল্লেখিত আমানতকে মুফাসসিরগণ ঈমান, তাওহীদ, তাকলিফ, ইরাদা, আকল, খেলাফত, বেলায়াত, ওয়াদা সহ আরও অনেক পরিভাষার মাধ্যমে তাফসীর করেছেন। তবে এখানে আমানত বলতে এই সকল কিছুকেই বুঝানো হয়েছে এবং আমি মনে করি যে এই সকল কিছুকে একসাথে উল্লেখ করাটাই সবচেয়ে যৌক্তিক হবে। আয়াত থেকেও এই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এই মিসাকের তাকলিফ (প্রস্তাবনা) শুধুমাত্র মানুষ নয়, সকল সৃষ্টির প্রতিই করা হয়েছে। এখানে এই তাকলিফ কিভাবে করা হয়েছে; হাকিকি অর্থে , মাজাযী অর্থে, নাকি ইতিবারি (আপেক্ষিক) এই ধরণের প্রশ্নের চেয়ে এখানে গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় হল এই তাকলিফ (প্রস্তাবনা) কে মাখলুক বা সৃষ্টির ইচ্ছার উপড়ে ছেড়ে দেওয়া। তাঁরা চাইলে গ্রহণও করতে পারে আবার না চাইলে এই আমানতকে গ্রহণ নাও করতে পারে। তবে এখানে মানুষ কর্তৃক এই আমানত গ্রহণের বিষয়টি নিঃসন্দেহে লক্ষ্যণীয়।

মানুষ পৃথিবীতে তাদের জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে যদি এই আমানতের খিয়ানত করে তাহলে এটাই হবে সবচেয়ে বড় খারাপ বিষয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾

অর্থাৎ, “হে ঈমানদরগণ! জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, নিজেদের আমানতসমূহের খেয়ানত করো না”। [2]

আমাদের চারপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, পরিবার, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ, পদ-পদবী, সংক্ষেপে বলতে গেলে আমাদের জীবনের সকল কিছুই এক একটি আমানত এবং এই সকল আমানত সম্পর্কে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে। এই কারণে এই সকল আমানতকে আমারা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে বাধ্য। এই বাধ্যবাধকতা আখলাক স্বয়ং নিজে। মানুষ তাঁর প্রথম মিসাকের মাধ্যমে অর্জিত ঈমান ও শাহাদাতকে, আমানতের আখলাকের মাধ্যমে সুষমা মণ্ডিত করতে সক্ষম হবে।

 

আজ আমাদের রহমতের সাথে আদালতের, হিকমতের সাথে ভালোবাসার (মুহাব্বত) সম্পর্ককে  আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা (কুদরত) এর উপর বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রতিফলিত করতে হবে। এবং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে স্থাপন করার ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবতে হবে এবং বর্তমান যুগকে সামনে রেখে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে নির্মাণ করতে হবে মিসাক (চুক্তি) এর উপর ভিত্তি করে আর সেই চুক্তি হল, মিসাকুশ শাহাদা  এবং মিসাকুল আমানা। আমরা যদি এই চিন্তার আলোকে আমাদের ধর্মীয় চিন্তাকে পুনর্গঠন করতে পারি তাহলে এটা আমাদেরকে সেই মেথডোলজির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে যেই মেথডোলজি আমাদের পূর্বে অনেক বড় বড় স্কলারের জন্ম দিয়েছিল।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

১০৬৯ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন।তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন।তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top