. পরিভাষা

ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা একটি একক অনন্য ব্যবস্থা; পাশ্চাত্য ভাষাগুলোতে পরিচিত কোন পরিভাষাই ইসলামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। ইংরেজী ভাষায় social order বা সমাজ ব্যবস্থা দ্বারা একটি মূল্য বা মৌলনীতি পদ্ধতি বুঝায়, যা সমাজ জীবনকে শাসন করে; মূল্য কিংবা নীতির যে কোন পদ্ধতির ক্ষেত্রেই এই অভিধা প্রযোজ্য। কারণ যা বিশৃংখলা বলে বর্ণিত হতে পারে তাও সামাজিক জীবনের একটি রূপ বা ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। তাই পুঁজিবাদী, গণসাম্যবাদী, গণতান্ত্রিক, ফ্যাসিষ্ট সমাজ ব্যবস্থা বলা যেমন নির্ভুল, তেমনি ইংরেজ, মার্কিন, ফরাসি, চীনা বা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা বলাও সঙ্গত যখন আমরা social শব্দটির প্রসঙ্গে আসি, যা society শব্দ থেকে নিম্পন্ন একটি বিশেষণ, তখন এর তাৎপর্যটি আরো সীমিত হয়ে পড়ে। society এই শব্দ বা পরিভাষাটি দ্বারা বুঝায় স্বতঃপ্রবৃত্ত কতগুলো মানুষের একটি দল, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্দিষ্ট কতিপয় লক্ষ্য অর্জন। জার্মানরা যাকে আরো সঠিকভাবে বলে সমাজ (Gesellschaft)। একে কমিউনিটি বা সম্প্রদায় অর্থে বুঝলে চলবেনা, যা কিছু-সংখ্যক মানুষের ইচ্ছা বহির্ভুত একটি দল, যারা ভাষা, জাত, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূগোলের দিক দিয়ে এক বা সদৃশ। জার্মানরা এদেরকে বলে Gesellschaft সম্প্রদায় বা সম্মিলিত সংস্থা। সোসাইটি এবং কমিউনিটি একই হতে পারে বা ভিন্নও হতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ফরাসী এবং ইংরেজদের ক্ষেত্রে এই দুয়ের অর্থ একই। কিন্তু জার্মান, শ্লাভ এবং চীনাদের ক্ষেত্রে তা এক বা অনুরূপ নয়। কমিউনিটি সদস্যত্ব স্বাভাবিক এবং অনিবার্য করে তোলে অভিবাসন ন্যাচারালাইজেসন এবং নিয়মিতভাবে সংস্কৃতির অন্তর্গতকরণের মাধ্যমে সদস্যত্ব অর্জিত হয়। বিপরীতপক্ষে, সোসাইটির সদস্যপদ তাৎক্ষণিক, কারণ এই সদস্যতা হচ্ছে একটি সিদ্ধান্তের ফল। এজন্যই প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সদস্যপদ গ্রুপের সকল সদস্য কর্তৃক সমভাবে ব্যবহৃত কোন নাম বা শ্রেণীর দ্বারা সীমিত হয়ে থাকে। এই ধরনের শ্রেণী বা নাম একটি সমবায় গৃহায়ণ সমিতির সদস্যদের আর্থিক স্বার্থ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক মূলের সমুদয় পরিসর পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে- যখন আমরা গ্রুপের অন্তর্গত কোন শ্রেণী বা গ্রুপকে বুঝাতে চাই; রাজনৈতিক সত্ত্বা কদাচিৎ একটি সমাজ বলে গণ্য হয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পাওয়া গেলে যেমন- সুইজারল্যান্ড, যুগোশ্লোভিয়া, এবং সাবেক (USSR) এদের সকলেরই সূচনা সাম্প্রতিককালে এবং এরা বিশেষ উপাদানের ফল। প্রায় সকল রাজনৈতিক সত্ত্বাই কমিউনিটির সঙ্গে অভিন্ন। তাদের এই মিল সামগ্রিক না হলেও প্রায় সামগ্রিক। একারণে রাজনৈতিক অস্তিত্বের ‘জাতি’ অভিধা যৌক্তিকতা লাভ করে। এ কারণে পাশ্চাত্যের রাজনীতি তত্ত্বে রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট চতুঃসীমার মধ্যে একটা অঞ্চল বলে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব, যে চতুর্সীমার মধ্যে একটা কমিউনিটি বাস করে, যার কর্মকান্ড এমন একটি সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক শাসিত হয় যে তার সিদ্ধান্ত বলবৎ করতে ক্ষমতা রাখে

 

ইসলামে কমিউনিটির অনুরূপ দুটি শব্দ হচ্ছে শা’স্ত এবং কওম। এদুটি পরিভাষার অর্থ ক্ষুন্ন না করে, অর্থাৎ অভিধায় নির্দেশিত জনগোষ্ঠীর চৈতন্যকে আঘাত না করে, এই পরিভাষা দুটোকে সোসাইটি বুঝাতে ব্যবহার করা যাবে না। আরব, তুর্কী এবং পার্সিয়ানরা প্রত্যেকে একটি শা’স্ত বা কওম-যদি আমরা এর দ্বারা এককে অন্য থেকে আলাদা কমিউনিটি বুঝাতে চাই, যদি ভাষা ও রীতিনীতি, ভূগোল এবং বংশ লতিকার দিক দিয়ে তাদের পার্থক্যের উপর জোর দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য হয়। কিন্তু আলাদা বা পৃথক পৃথকভাবে এগুলো সোসাইটি নয়, কেননা এই শ্রেণীত্ব কেবল তাদের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য নয়, বরং একই সঙ্গে মালয়, ভারতীয়, হাউস, বান্টু এবং শ্লাভ সকলের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য এই সকল সম্প্রদায় এবং আরো অনেকে, যারা ইসলামের পরিমন্ডলভুক্ত এবং এর সংস্কৃতি ও সভ্যতায় অংশীদার বলে দাবী করে তারা, ইসলামের এক এবং অভিন্ন উম্মাহ বা সোসাইটির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। উম্মাহ হচ্ছে একটি বিশ্বজনীন সোসাইটি বা সমাজ, যার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সম্ভাব্য ব্যাপকতর বৈচিত্রের জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়সমূহ। তবে ইসলামের প্রতি তার অঙ্গীকার, তাকে একটি বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থার বলয়ে একত্র করে। বিষয়টি এ কারণেই আরো জটিল হয়ে উঠে যে, প্রতিটি মুসলমান সম্প্রদায়ই ক্ষুদ্র আকারে একটি উম্মাহ। কেননা বিশ্ব উম্মাহ যতদিন না বিধিসম্মতভাবে এমন একটি সরকার বা সংস্থার রূপ গ্রহণ করছে, যা ইসলামী আইনকে বলবৎ করতে পারে, বিশ্ব উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, কার্যকরভাবে বা তার পক্ষে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে, ততদিন বিশ্ব উম্মাহর পক্ষে কথা বলা এবং কাজ করার জন্য প্রতিটি উম্মাহই আবশ্যকভাবে এবং আইনত দায়ী। এর কারণ, এই বাস্তবতাকে ইসলামই সংস্কৃতি ও সভ্যতার, সামাজিক পার্থক্য ও শ্রেণীকরণের, সকল ব্যক্তিগত ও প্রায় সকল সামাজিক আন্তঃসামাজিক কর্মকান্ডে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যমানগুলো সরবরাহ করে। কারণে, ইসলামের ভিত্তিতে সব চিহ্নিতকরণের যৌক্তিকতা অনেক বেশী, কেননা কমিউনিটি বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নয়, বরং বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অংশীদার হিসেবেই তাদের এই পরিচয় তাদের নিজ নিজ কমিউনিটি যে সব উপাদানের কারণে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে সেগুলো অস্বীকৃত হয় না। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য যার ব্যবস্থা করে সেগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত গুরুত্বহীন হওয়ায়, সেগুলোকে স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং তাদের যথাযথ স্থানে সেগুলো স্থাপন করা হয়।

 

উম্মাহ শব্দটি অনুবাদ করা যায়না; এটিকে এর মূল ইসলামী আরবীর রূপেই অবশ্য গ্রহণ করতে হবে এটিজনগোষ্ঠীবাজাতিবারাষ্ট্রেরসমার্থক নয় এই শব্দ ও পরিভাষাগুলো সব সময়ই নিরূপিত হয় race, ভূগোল জাতি ও ইতিহাস, অথবা এগুলোর কোন সংমিশ্রণ দ্বারা। অন্যদিকে উম্মাহ হচ্ছে দেশ বা অঞ্চল অতিক্রমী, যা মোটেই ভৌগোলিক বিবেচনার দ্বারা নির্ধারিত নয়। এর এলাকা কেবল সমগ্র পৃথিবী নয় বরং গোটা সৃষ্টি। উম্মাহ কোন নরগোষ্ঠীর দ্বারা সীমিত নয়। উম্মাহ, race বা নরগোষ্ঠীকে অতিক্রম করে যায় এবং সমগ্র মানবজাতিকে এর বাস্তব অথবা সম্ভাব্য সদস্য বলে গণ্য করে। উম্মাহ রাষ্ট্রও নয়, কারণ তা সকল রাষ্ট্রকে অতিক্রম করে বিশ্বরাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহণ করে, যার মধ্যে স্থান পেতে পারে অনেকগুলো ‘রাষ্ট্র’।

একইভাবে উম্মাহর উপাদানগুলো নিয়েই গঠিত হয় উম্মাহ- যদিও সেগুলো কোন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের আওতায় নাও পড়ে, এমনকি ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তও না হয়। উম্মাহ এক ধরনের জাতিসংঘ, যার থাকবে একটি দৃঢ় এবং সামগ্রিক স্বয়ংসম্পূর্ণ আদর্শ, একটি বিশ্ব সরকার, একটি বিশ্ব সামরিক বাহিনী, তার সিদ্ধান্ত সমূহ বলবৎ করার জন্য উম্মাহ হচ্ছে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা এবং যেআন্দোলন এই সমাজ ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে বা এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তা হচ্ছে উম্মাহতন্ত্র

 

. উম্মাহর প্রকৃতি

. নৃতত্ত্বকেন্দ্রীয়তার বিরুদ্ধে

ইসলামের সমাজব্যবস্থা বিশ্বজনীন, গোটা মানবজাতি এর অন্তর্গত, কেউই এর বাইরে নয়। মানুষ মানুষ বলেই এবং তার জন্মের জন্যই প্রত্যেক ব্যক্তি হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত বা সম্ভাব্য সদস্য, তাকে রিক্রুট করার দায়িত্ব হচ্ছে বাকি সকল সদস্যের। পরিবার, গোষ্ঠী এবং জাতিতে মানুষের স্বাভাবিক বিভাগকে, ইসলাম আল্লাহর সৃষ্টি এবং আল্লাহর নির্দেশিত ব্যবস্থা বলে স্বীকার করে। তবে এই ধরনের গ্রুপকে মানুষের চূড়ান্ত রূপ বলে ইসলাম স্বীকার করেনা, যে-রূপকে ভাল এবং মন্দের একটি চূড়ান্ত মানদণ্ড গণ্য করা হয়ে থাকে। ইসলামে পরিবারের কানুনী ধারণায় সকল আত্মীয়-স্বজনই অন্তর্ভূক্ত, যারা যতো দূরেরই হোক না কেন, একে অন্যের সঙ্গে কোন না কোনভাবে বংশ সূত্রে সম্পর্কিত। কেবল আইন নয়, ইসলাম তাদের পারস্পরিক উত্তরাধিকারগত সম্পর্কও নিয়ন্ত্রণ করে, এবং আইনের সমর্থন দান করে। এ যেমন সত্য, তেমনি ইসলাম গোষ্ঠী এবং জাতির বৃহত্তর গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত করে একে অপরের পরিপূরক ও সাহায্যকারী শক্তি হিসেবে সকলের কল্যাণে কাজ করার জন্য। ব্যক্তিবর্গ অথবা গ্রুপ হোক সকল মানুষের উপর স্থান হচ্ছে আইনের। নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা ও বৈচিত্র হচ্ছে একটি বাস্তব বিষয়, ইহা কিছুটা অতিশয় বাঞ্ছিত বিষয় বটে, আর এটুকু বাদ দিলে ইসলাম একে একটি বাস্তব বিষয় বলেই মনে করে, যার স্থান আইনের নির্দেশের এখতিয়ারে। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যখন নৃতত্ত্ব সর্বস্ব হয়ে উঠে, ইসলাম তাকে কুফর বা ধর্মত্যাগ বলে নিন্দা করে। কারণ এতে করে আইনের এবং ভাল মন্দের ভিন্নতর একটি উৎস স্থাপিত হয়, যেমন খোদ নৃতাত্ত্বিকতা; আইনতত্ত্বের দিক দিয়ে নৃতাত্ত্বিক বিবেচনা মোবাহ (অনুমোদনযোগ্য) এর আওতার মধ্যে পড়ে এবং একদিকে তা হারাম (নিষিদ্ধ) মাকরূহ বলে গণ্য, অন্য দিকে তা ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক) এবং মানদুব (সুপারিশকৃত, অনুমোদিত)।

 

ইসলাম নৃতত্ত্বের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নয়, যা অতোদুর অগ্রসর হতে পারে যে, এ নিজ খলিফা নির্বাচিত বা যা তার নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। আল-মাওয়ার্দীর সময় থেকে এই অবস্থান বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। অনুকরণ সম্পূর্ণ শরীয়াহ সম্মত হয়, যতক্ষণ তা এইরূপ অনুসরণ একটি নৃতাত্ত্বিক সার্বভৌম সত্ত্বার উপরই কেবল নির্ভর করে, সমগ্র উম্মাহর সঙ্গে একমত হয়ে শান্তি ও যুদ্ধের দায়িত্ব পালনের কর্তব্য এবং এভাবেই তার কর্মকান্ডকে পরিচালিত করার দায়িত্ব- যাতে করে অন্যের মন্দ নিবারণ করা যেতে পারে এবং তাদের কল্যাণ সাধন সম্ভব হয়। এই পন্থাগুলো ছাড়া ইসলাম কোন বৈশেষিকতাকে বরদাশত করেনা এবং এর বিরুদ্ধে যেখানে এবং যখনই বৈশেষিকতা মাথাচড়া দিয়ে উঠে, সকল মুসলমানের উপর সকল শক্তি নিয়ে জেহাদ করার ধর্মীয় দায়িত্ব অর্পণ করে১০। ইসলামী আইনের উৎস যেহেতু ঐশীসম্ভূত অর্থাৎ আল্লাহই যেহেতু এই আইনের উৎস, তাই এই আইন সকলের জন্য সমান, ঠিক যেমন আল্লাহ একক, তিনি সকল সৃষ্টির এবং নিশ্চয়ই সকল মানুষের আল্লাহ। তাই তার আইন এক এবং অভিন্ন। কারও প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব নেই, তার আইনে কোন ব্যতিক্রম নেই। ইসলাম নৃতত্ত্বকেন্দ্রীয়কতাকে বিচ্যুতি গণ্য করে। কারণ পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে আল্লাহর অসীম সত্ত্বার উপর আক্রমণ। আল্লাহ যদি পরম সত্য চূড়ান্ত বিচারক হন, (অর্থাৎ চূড়ান্ত নীতি, মানদণ্ড ও উৎস হন) তাহলে সকল সৃষ্টির মোকাবিলায় তার অবস্থান এক এবং অভিন্ন হবে। কোন নৃতাত্ত্বিক গ্রুপ বা গোষ্ঠীকে তার প্রিয় বলে গণ্য করা, অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিন্ন গণ্য করা তার আইনের ক্ষেত্রে, তার বিশ্বব্যবস্থার ক্ষেত্রে, তার পুরস্কার ও শাস্তি দানের পদ্ধতির বেলায়, কার্যতঃ তার পরমতা বা লোকোত্তরতাকে ক্ষুন্ন করা। পরম সত্য একাধিক এ দাবী স্বতঃবিরোধী এমনি দাবী যে একটি ক্ষুদ্র মনেরও তা বিবেচনার অযোগ্য। একই কথা খাটে নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদের প্রত্যেকটি বিভিন্নতার ক্ষেত্রে, তা মানবিকই হউক, যেমন eudaemonism (এরিষ্টটলের একটি মতবাদ, সুখ হচ্ছে যুক্তিশাসিত সক্রিয় জীবনের ফল) কিংবা সংস্কৃতিকই হউক, যেমন হিতবাদ, রাজনৈতিক উদারনৈতিকতাবাদের এংলো-স্যাকশন ঐতিহ্য, এবং জাতীয়তাবাদ অথবা১১ প্রোটাগরিও মতবাদ, যেমন সুখবাদ, ত্যের নতুন সনাতন ধর্মই হোক।

 

. বিশ্বজনীনতা

প্রবণতা বা চরিত্রের দিক দিয়ে ইসলামের সমাজব্যবস্থা বিশ্বজনীন১২, যদিও বর্তমানে তা কোন না কোন জাতি থেকে, কয়েকটি জাতির একটা গ্রুপ থেকে বা কতগুলো ব্যক্তির একটি দল থেকে এই প্রবণতা নিঃসৃত হয়ে থাকে, তবুও এটি এমন একটি চরিত্র বা প্রবণতা যা গোটা মানবজাতিকে ধারণ করতে চায়। তাই ইসলামের মৌলনীতির দিক দিয়ে বলতে গেলে কোন আরব, তুর্কী, পার্সিয়ান, পাকিস্তানী অথবা মালয় সমাজব্যবস্থা থাকতে পারেনা, কেবল একটি মাত্র সমাজব্যবস্থা থাকবেতা হচ্ছে ইসলামী সমাজব্যবস্থা অবশ্য যে কোন একটি দেশ বা গ্রুপের মধ্যে ইসলামী সমাজব্যবস্থার সূচনা হতে পারে। কিন্তু তা উর্ধারোহণ করে অনৈসলামিক হয়ে পড়ে যদিনা তা সমগ্র মানব জাতিকে তার পরিমন্ডলে আনয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যায়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের আদর্শ হচ্ছে ইসলামের আদর্শ, যার অভিব্যক্তি ঘটেছে বিশ্ব উম্মাহে। ইহা সময়ের সাথে সংগতিবিহীন একটি মধ্যযুগীয় নিরংকুশ চরম আদর্শ নয়। পশ্চিমা জগতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আদর্শ দেড় হাজার বছর বলবৎ ছিল রোমানদের ‘ইমপেরিয়াম মুন্ডি’ (বিশ্ব সরকার) থেকে রিফর্মেশন পর্যন্ত। ফরাসী বিপ্লবের এনলাইটেনমেন্টের দৃষ্টিতে আবার এর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং তার পরে আবার চেষ্টা করা হয় গণতন্ত্র এবং কমিউনিজমের বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। এই সব ঘটনার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এর আদর্শের শত্রুদের বৈশেষিক জাতীয়তাবাদী ও নৃতাত্ত্বিক নাশকতামূলক কার্যের দ্বারা আদর্শাটি বিকৃত, লংঘিত, ও নিহত হয়েছে এবং তাকে সমাধিস্থ করে রাখা হয়েছে। এই সব আন্দোলনের কোনটিই বিশ্বজনীন আদর্শের প্রতি শত্রুতা ভাবাপন্ন নয়। অথবা আদর্শ হিসেবে এগুলো যে প্রকৃতপক্ষে আদর্শের বিরোধী তেমনভাবেও এগুলোকে বর্ণনা করা যায়না। সংস্কার আন্দোলনের সময় যে সব এথনিক শক্তি, তাদের রাজা রাজড়াদের চারপাশে জনগণকে সংঘবদ্ধ করেছিল, তারা রোমান চার্চ কর্তৃক আদর্শ বিকৃতির বিরোধী ছিল, এবং জাতীয়তাবাদী যে সব শক্তি ফরাসী বিপ্লবে যুক্তি কর্তৃক আদর্শ বিকৃতির মোকাবেলা করেছিল, তারা ছিল ইস্পেরিয়াল ফ্রান্সের পচন দূষণের বিরোধী। একইভাবে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আদর্শের বিপর্যয় ঘটে ইহুদীবাদ ব্যর্থ ও নব্য উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও জোট চালের কারণে। অন্য কথায়, আদর্শটি ব্যর্থ হয়, আদর্শের প্রতি সত্যিকার আনুগত্যের অভাবে, এই আদর্শের অনুসারীদের স্নায়ুতন্ত্র অচল হয়ে যাবার কারণে। আদর্শের প্রতি পাশ্চাত্য জনগণের বিশ্বাস অবশ্য অব্যাহতই থাকে। কিন্তু সমসাময়িক কালের সংশয়বাদের হস্তে চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটেছে এই আদর্শের, কেননা এই সংশয়বাদে কোন কিছুই যে পবিত্র নয়, শুধু তাই নয়, কোন কিছুরই কোন সঠিক বা সুনির্দিষ্ট মানও নেই।

 

. সমগ্রতাতত্ত্ব

ইসলামী সমাজব্যবস্থা একটা সামষ্টিক সমাজব্যবস্থা এই অর্থে যে, মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রত্যেকটি যুগের জন্যই ইসলাম প্রাসঙ্গিক। এই সমাজব্যবস্থার বুনিয়াদ হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায়। এই অভিপ্রায় প্রত্যেকটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেই অপরিহার্যভাবে প্রাসঙ্গিক, কেননা আল্লাহ প্রতিটি সৃষ্টিকে দিয়েছেন তার গঠন, একটি কাঠামো, একটি বিশেষ কর্ম১৩। মানুষ তাদের দৈহিক, বক্তিগত সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতির দিক দিয়ে অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিধানের অধিকারী, যা পালন করা তাদের দায়িত্ব। তাদের কোন কাজই আল্লাহর অভিপ্রায়কে এড়িয়ে যেতে পারেনা, তারা তাদের চেষ্টা সাধনের কোন ক্ষেত্রেই নিজেদের জন্য এমন কোন লক্ষ্য বা প্রকল্প স্থির করতে পারে না, যা শরীয়তের ওয়াজিব ও হারাম ক্যাটাগরির আওতায় পড়েনা। অধিকন্তু, মোবাহ (অনুমোদনযোগ্য) ক্ষেত্রটি, যা ইসলামের বাঞ্চনীয় বিষয় দ্বারা যথাসম্ভব অধিকৃত, তা বিকশিত মানসিকতা এবং মার্জিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। সুস্পষ্ট বিধান ছাড়া (নিয়ম হচ্ছে অনুমতিযোগ্যতা), কোন কিছু নিষিদ্ধ হতে পারেনা১৪। আইনের এই বিধান হচ্ছে নিষিদ্ধ বিষয়ের সীমাকে অন্যায় এবং অবৈধভাবে সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি নিবৃত্তিমূলক আইন- তবে জ্ঞাত তথ্যাদি বিচারের মাধ্যমে- এসবের অজ্ঞাত কোন কিছুর মূল্য বিচারের বিরুদ্ধে নয়। ইসলামের আইনসমূহের ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত, প্রবর্তনা, সম্প্রসারণ এবং অজ্ঞাত তথ্যের অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিদ্যমান ও অস্তিত্বশীল সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রে এসবের প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস, যেমন মূল্যবান তেমনি আবশ্যক। অন্যথায় চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীয়ত আল্লাহর অভিপ্রায়ের যে সামগ্রিক ব্যাপকতার উপর দাঁড়িয়ে আছে, তা সংশয়ের বিষয় হয়ে উঠবে। এই সত্যের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে সেই সমাজব্যবস্থাই হচ্ছে সর্বোত্তম সমাজব্যবস্থা, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য সমস্ত কিছুকে সুবিন্যস্ত করে, সম্ভাব্য কম সংখ্যক বিষয়কে নয়; এবং সেটি হচ্ছে উত্তম গভর্নমেন্ট, যা সবচেয়ে বেশী শাসন করে, সবচেয়ে কম নয়। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী সমাজব্যবস্থা কেবল একটি ক্লাব এবং শিক্ষিত সমাজ, একটি ব্যবসা বাণিজ্যের চেম্বার, একটি ট্রেড ইউনিয়ন, একটি ভোক্তা সমবায় সমিতি বা পাশ্চাত্য অর্থে একটি রাজনৈতিক দল নয়। এ সমস্তই ইসলামী সমাজব্যবস্থার অন্তর্গত এবং আরো অধিক এর এখতিয়াভুক্ত। যেমন, হাসান আল বান্না এই যুক্তিতে বলতেন যে, সমস্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর অভিপ্রায়ের প্রাসঙ্গিকতার কারণেই ইসলামী সমাজব্যবস্থার এই ব্যাপকতা১৫

 

ইসলামী সমাজব্যবস্থার সমগ্রত্ব কেবলমাত্র সকল দেশ ও কালের মানুষের বর্তমান কমকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এ সব কর্মকান্ডের কর্তা যে সকল মানুষ এবং যাদেরকে ইসলাম এর অপরিহার্য সদস্য বলে গণ্য করে তাদের সকলেই এ সমাজব্যবস্থার শৃংখলার অন্তর্গত। যেখানে ইসলাম সকল মুসলমানকে তার সকল প্রোগ্রাম ও প্রকল্পের বাধ্যতামূলক সদস্য বলে দাবী করে, সেখানে এ দাবীও করে যে অমুসলমানরাও হচ্ছে এর সম্ভাব্য সদস্য, যাদেরকে ইসলামী সমাজের সদস্য হবার জন্য দাওয়াত জানাতে হবে। তাই ইসলাম সমাজব্যবস্থার কোন শেষ সীমা নেই, কেননা এ পৃথিবীতে জীবন এবং কর্মকাণ্ড হচ্ছে অন্তহীন। কাজেই দায়িত্ব এই যে, যা কিছু বিদ্যমান বা চলমান তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে-উদ্দেশ্য: অস্তিত্বশীল বা গতিশীল প্রত্যেকটি সত্ত্বা। নারী পুরুষ নির্বিশেষে, বা তাদের প্রত্যেককে আল্লাহর অভিপ্রায়ের অধিকতর এবং উৎকৃষ্টতর পূর্ণতা পালনকারী করে তোলা১৬। ফালাহ হচ্ছে এ দুনিয়াকে আল্লাহর একটি জান্নাতে প্রকৃত রূপান্তর, যা হচ্ছে কুরআনের ‘ইস্তিমার আল-আরদ’, (এই ধারণাটির প্রকৃত মানে-পৃথিবীর পুনর্গঠন) এবং মানবজাতিকে বীর, প্রতিভা ও আউলিয়াতে উন্নীতকরণ, যাতে করে আল্লাহর ঈস্পিত নক্সা বা নমুনা সার্থক হয়। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তা করতে গেলে তা ফালাহ হবেনা। ফালাহর দাবী এই যে, এই রূপান্তর সাধনের কর্মকান্ডগুলো আল্লাহর আইনকে পালন করে, কেননা এই কর্মকান্ডগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের মধ্যে ফালাহ্ রূপায়ন।

 

. স্বাধীনতা

ইসলামী সমাজব্যবস্থা একটি স্বাধীন সমাজব্যবস্থা। যদি শক্তি প্রয়োগে এই সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা জনগণের উপর জবরদস্তির মাধ্যমে তার কর্মসূচি কার্যকর করতে চায় তাহলে সেই সমাজব্যবস্থা তার ইসলামী কক্ষ থেকে বিচ্যুত হবে। রেজিমেন্টেশন তো আবশ্যক হতেই পারে; কিন্তু তা বৈধ হতে পারে যদি তা কেবল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। এর পূর্বে, ইসলামে রেজিমেন্টেশন প্রবর্তনের ক্ষেত্রেই সূরার (পরামর্শ) সিদ্ধান্ত আবশ্যক এবং রেজিমেন্টশন যে কোন অবস্থায় কেবল সাময়িক এবং বিশেষ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। যখন রেজিমেন্টেশনই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় এবং নীতিগতভাবে জোর জবরদস্তির উপর নির্ভর করা হয়, তার ফল ঐশী নমুনার সফল বাস্তবায়নও হতে পারে, কিন্তু এ এমন এক ধরনের বাস্তবায়ন যার মূল্য হচ্ছে উপযোগীতামূলক, নীতিসঙ্গত নয়; কারণ এ বাস্তবায়ন নৈতিকতাসম্পন্ন হতে হলে এই প্রয়াসে যারা অংশগ্রহণ করবে তাদেরকে তা করতে হবে স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে, মূল্যের প্রতি বা সংশ্লিষ্ট ঐশী নমুনার প্রতি ব্যক্তিগত অঙ্গীকার হেতু একটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত হিসেবে১৭। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, উপযোগীতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ উভয়েরই বাস্তবায়ন ইসলামের লক্ষ্য। কিন্তু নৈতিকতাকে বাদ দিয়ে উপযোগীতাকে ইসলাম সহ্য করেনা এবং এর প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন করেনা। ইসলামের দৃষ্টিতে দুটি একই সঙ্গে রূপায়িত হলেই তা হয় যথার্থ বাস্তবায়ন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কুরআনের এই শিক্ষা দিয়েছেন সুষ্পষ্ট ভাষায়। মানুষকে সৃষ্টি করা হচ্ছে- এই ইঙ্গিত পেয়ে ফেরেস্তারা, যারা কোন অন্যায় করতে পারেনা, কেবল আল্লাহর আদেশ পালন করে, তারা আপত্তি করে বসল, ‘তাহলে কি আপনি (হে আল্লাহ) এমন কোন প্রাণীকে সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন যে দুর্নীতি, ঝগড়া ফ্যাসাদ ও খুনাখুনি করবে, অথচ আমরা আপনার স্তুতি ও প্রশংসায় নিয়্যত আছি? আল্লাহ জবাবে বললেন, আমার একটি উদ্দেশ্য আছে যা তোমরা জাননা১৮। মানুষেরা যদি ফেরেশতাদের মত মন্দ কর্মে অক্ষম হত, তাদের কর্মকান্ড অবশ্যি আল্লাহর প্রত্যেকটি ইচ্ছা বা নির্দেশকে পালন করতে পারতো- কিন্তু তারা নৈতিক জীব হতোনা। নৈতিকতা হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায়ের শীর্ষবিন্দু। তাহলে নিশ্চয়ই মানুষের কাছ থেকে দাবী করা হয় তার সর্বোত্তম অংশ, কারণ যে অভিপ্রায়ের মধ্যে নৈতিকতার নির্দেশনা নেই তা ঐশী অভিপ্রায় হতে পারেনা, তা স্ববিরোধী হয়ে পড়বে। কুরআনের অন্য একটি আয়াতে একই সত্যের উপর প্রথমোক্ত আয়াতটি থেকে আরো নাটকীয়ভাবে এবং একইরূপ প্রাঞ্জল ভাষায় জোর দেওয়া হয়েছে- “আমরা আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং পর্বতসমূহের উপর আমাদের আমানত অর্পণ করেছিলাম” আল্লাহ বললেন। “কিন্তু তারা ভয়ে তাতে সম্মত হলনা, মানুষ তা বহন করল১৯।” আসমানে এবং জমিনে আল্লাহর অভিপ্রায় প্রাকৃতিক আইনের অনিবার্যতায় কার্যকর হচ্ছে, আকাশ ও পৃথিবীর কোন সৃষ্টিই তা পালন করতে বা লংঘন করতে পারেনা স্বাধীনভাবে। তাই তাদের এই রূপায়ণ নৈতিকতামন্ডিত নয়। কেবলমাত্র মানুষই নৈতিক সত্ত্বা, কারণ আল্লাহর নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সে-ই স্বাধীন, এজন্য কেবল মানুষই আল্লাহর ‘আমানত’ বহন করে২০। মূল্যের বাস্তবায়নের জন্য মানুষকে জবরদস্তিভাবে এই রূপায়ণে বাধ্য করা না হলে, এর মানে অবশ্য এই হবে যে, মানুষ যাতে স্বেচ্ছায় এতে অংশগ্রহণ করতে পারে, তার জন্য তাদেরকে দাওয়াত করতে হবে। এর অর্থ এই যে, মূল্য বাস্তবায়ন নৈতিকতামন্ডিত হতে হলে, তার তাৎপর্য এ ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা যে, মানুষকে শিখাতে হবে এবং তার মধ্যে এ প্রত্যয় সৃষ্টি করতে হবে যে, মূল্যগুলো হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধভাবে মূল্যবান এবং ঐশী নির্দেশনাগুলো হচ্ছে বাঞ্ছিত নমুনা। এতে করে, ইসলামী সমাজব্যবস্থা বিশাল পরিসরে একটি সেমিনার বা পাঠশালা হয়ে উঠে, যেখানে গভর্নমেন্ট এবং নেতৃত্বের কাজ হচ্ছে শিক্ষাদান, শিক্ষিত করে তোলা, বিশ্বাস জন্মানো, অভীষ্ট স্থিরকরণ, জ্ঞানদান ও পরিচালনা।

 

. মিশন

উম্মাহ প্রকৃতির কোন আকস্মিক উদ্ভব নয়, এর অস্তিত্ব নিজের জন্য নয়, এবং সদস্যদের জন্য তো নয়ই, কেবল মাত্র আল্লাহর অভিপ্রায়ের একটি মাধ্যম হিসেবেই এর অস্তিত্ব, যা উম্মাহর মাধ্যমে দেশ ও কালের মধ্যে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে। এ হচ্ছে আল্লাহর চূড়ান্ত ওহীর ছক, তার অভিপ্রায়ের একটি মাধ্যম। এ হচ্ছে সেই বিন্দু যেখানে জগতের সঙ্গে ঐশী সত্তার মিলন ঘটে। এখানে জগতের সূচনা করা হয়েছে- ঐশী লক্ষ্য রূপায়নের পথে তার অন্তহীন অগ্রযাত্রায়। আল কুরআন যেমন স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, উম্মাহর অস্তিত্ব এই জন্যই যাতে আল্লাহর কালাম হতে পারে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ২১

 

 

টীকাঃ

১. আধুনিক কালে পাশ্চাত্য জগতে এর মোকাবেলার জন্য একটি সাধারণ প্রয়োজন ও সিদ্ধান্ত বিভিন্ন সংস্থার ব্যবস্থা করেছে যেমন বাণিজ্যিক কোম্পানিসমূহ, কর্পোরেশনস এবং সকল রকমের সমবায় সমিতিস্বরূপ আর্থিক সংস্থাসমূহ (বাকিতে পণ্য বিক্রয়, ব্যয় সংকোচ, ভোক্তাগণ, গৃহায়ণ, বেচাকেনা ইত্যাদি। কিন্তু কখনো কোন রাষ্ট্রের জন্য নয়, এটি সম্পূর্ণভাবেই এখনিক বৈশিষ্ট্যেরউপর নির্ভর করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণ এবং সে কারণে চিরন্তন, দ্রঃ Robert K. Merton, Social Theory and Social Structure (Glencoe Illinois. The Free Press 1962) পৃঃ ৩৯৩।

২. পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে ইহাই রাষ্ট্রের চিরাচরিত এবং ক্লাসিক্যাল সংজ্ঞা। ইহা ইসলামী রাষ্ট্রের বিপরীত। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র অঞ্চল এবং এথনিক সংস্কৃতিক ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চৌহদ্দির দ্বারা সীমিত নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ: ‘t George H. Sabine. A History of Political Theory. (New York: Henry Holt and Co 1947) পৃষ্ঠা 746-65, Ges James B. Hastings, Encyclopedia of The Social Sciences, s.v. “The State”.

৩. Al Zubaydi, Taj al Arus. vol. 9 ৪. ইহাই তোমার উম্মাহ, এক, ঐক্যবদ্ধ এবং পরস্পর অন্তর্নিহিত এবং আমি তোমাদের প্রভু এবং আমারই ইবাদত কর (২১: ৯২)।

৪. দেখুন লেখকের On Arabism: Urubah and Religion: An Analysis of the Fundamental Ideas of Arabism and of Islam as its Highest Moment of Consciousness (Amsterdam: Djambaton 1962) অধ্যায়-৬।

৫. শরীয়ার বাধ্যতামূলক প্রকৃতি ঐশী নির্দেশের ক্ষেত্রে সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য, ব্যতিক্রমহীনভাবে এবং কোন বৈষম্য না রেখেই, কারণ ইসলামী মূল্যসমূহের লক্ষ্য হচ্ছে সকল মানুষ। এজন্য মুসলমান মুসলমান কর্তৃক সকল মানুষকে ইসলামে যোগ দেবার জন্য আহ্বান করা উচিত, কারণ মুসলমান ইসলামী ওহীর এই আদর্শিক উপাদানগুলো সম্পর্কে নিজেরা সচেতন। এই বিষয়টির আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, এই গ্রন্থকারের “On the Nature of Islamic Dawah,” Intenational Review of Mission, Vol. 65, No. 260 (October 1976) .

৭. হে মানবজাতি, আমরা তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী করে সৃষ্টি করেছি, তোমাদেরকে জাতি এবং গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ ও সদাচারী সেই-ই আল্লাহর কাছে উত্তম (৪৯: ১৩)।

৮. প্রাগুক্ত।

৯. একাধিক খেলাফতের বৈধতা আল আশআরী সমর্থন করেছিলেন এবং আল-মাওয়ার্দি নিন্দা করেছিলেন, যাই হউক, সে সময়ে ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদদের অভিমত প্রায় ঐক্যমতে উপনীত হয়েছিলো- সহনশীলতার অনুকুলে। প্রশ্নটি ছিল কর্ডোভার উম্মাইয়া খিলাফত ও মিশরের ফাতেমী খিলাফতের।

১০. এবং বিশ্বাসীদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাদের মধ্যে আপোষ মীমাংসার চেষ্টা কর, এর পরও যদি দু’দলের কোন একটি আগ্রাসন চালায়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তাদের বোধোদয় হয় এবং দুইয়ের মধ্যে সুবিচারের ভিত্তিতে মীমাংসা করে দাও, ন্যায় পরায়ণ হও এবং সুষম আচরণ কর, কারণ আল্লাহ ন্যায়চারীকে পছন্দ করেন (৪৯: ৯)।

১১. দ্রঃ এই গ্রন্থকারের প্রবন্ধ On the Metaphysical Status of Values in the Western and Islamic Tradition, Studia Islamica, Fascicle xxviii 19681, pp. 29-62.

১২. মুমিনেরা অবশ্যই পরস্পর পরস্পরের ভাই, তারা সবাই মিলে একই ভ্রাতৃ সমাজ (৪৯: ১০)… এই তোমাদের উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ ও অবিচ্ছেদ্য এবং আমি তোমাদের প্রভু, আমারই ইবাদত কর (২১: ৯২)।

১৩. (কুরআন ২৫: ২) ইসলামের বিশ্বজনীনতা এই সত্যে উদ্ভাসিত যে, মানুষ হিসেবেই সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করে ইসলামের বিধি বিধানগুলো ঘোষিত হয়েছে। এর সামগ্রিকতাও সুস্পষ্ট এই সত্যে যে, যেখানে ইসলাম মানুষের জীবনের কোন আচরণের জন্য বিশেষভাবে কোন আইন প্রণয়ন করেনি, সেক্ষেত্রে তার দায়িত্ব অর্পণ করেছে মুসলিম সমাজের উপর, মুসলমান তার প্রাত্যহিক জীবনের সকল কর্মকান্ড এবং সমস্যার ক্ষেত্রে ওহী বা প্রত্যাদেশের প্রয়োগ করতে বাধ্য। আল্লাহ যেরূপ কুরআনে ঘোষণা করেছেন (৬: ৩৮) সে মতে উজতিহাদ হচ্ছে সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক একটি বিশ্বজনীন দায়িত্ব।

১৪. এটি হচ্ছে আইন প্রণয়নের সাধারণ মৌলনীতির অন্যতম (Al-qawid al – kullah) Subhi al Mahmasani: Falsafat al Tashri fi al Islam (Beirut, Dar al-Ilm al Malayin, 1380/1961) পৃষ্ঠা 261 ff. আবদাল ওয়াহহাব খাল্লাফ এগুলোকে বলেছেন, “Al qawaid al usuliyah al tashriiyah” এর সাধারণ নীতিমালা, বলে থাকেন। দ্রঃ তার Ilm al Usul al Fiqh (Cairo: Dar al Qalam 1392/1972) pp 197 ff.

১৫. Ishaq Misa al Husayni, Al Ikhwan al Musliman (Beirut: Dar Beirut al Tibaah wa al Nashr 1955) p. 79.

১৬. কিভাবে আমরা কিছুই বাদ দেইনি, সমস্ত কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং বিচার দিবসে সকলকে

আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে বিচারের জন্য (৬: ৩৮)।

১৭. আমরা তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্যসহকারে, যে কেউ এ কিতাব দ্বারা চালিত হতে চায়, সেতো তা করে তার নিজের কল্যাণের জন্যই আর যে কেউ ভ্রান্ত পথে চলে তাতে তো তার নিজেরই ক্ষতি হয়। হে মোহাম্মদ, তুমি এ সত্য প্রচার ও সতর্ক করা ছাড়া অতিরিক্ত কিছু করতে পারনা (৩৯: ৪১)।

১৮. এবং যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদের বললেন, তিনি আদম সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন এবং পৃথিবীতে তাকে তাঁর প্রতিনিধিরূপে স্থাপন করবেন, তখন ফিরিশতারা বলল, আপনি কেন পৃথিবীতে এমন এক প্রাণীকে সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন সে রক্তপাত ঘটাবে এবং খারাপ কর্ম করবে; অথচ আমরা আপনার ইবাদত এবং নিত্য আপনার মহিমা কীর্তন করি। আল্লাহ জবাব দিলেন, আমার অন্য একটি লক্ষ্য আছে, যা তোমরা জাননা (২: ৩০)।

১৯. আমরা আমাদের আমানত-আকাশমন্ডল, পৃথিবী এবং পর্বতমালার উপর অর্পণ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাতে ওরা ভীত হয়ে পড়ে এবং সে আমানত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, অবশ্য মানুষ সে আমানত গ্রহণ করে এবং বহন করে (৩৩: ৭২)।

২০. প্রাগুক্ত।

২১. তোমরা যদি মোহাম্মদ (সা.) কে সাহায্য না কর, তাতে কিছু আসে যায়না, কারণ আল্লাহ তাঁকে এই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অবিশ্বাসীদেরকে অবনমিত করেন এবং আল্লাহর বাণীকে উচ্চতম মর্যাদা দান করেন, তিনি সর্ব ক্ষমতাসম্পন্ন এবং জ্ঞানময় (৯: ৪০)।

 

অনুবাদঃ অধ্যাপক শাহেদ আলী।

৫৩২ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী (১৯২১-১৯৮৬) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অথরিটি হিসেবে সুপরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। তার জন্মভূমি ফিলিস্তিনে কলেজ শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৪১ সালে তিনি বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক; যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর নেওয়ার পর ১৯৫২ সালে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন । ফারুকী এ সময়ে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি- এ তিনটি ভাষায় গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ এ চার বছর ইসলামের ওপর উচ্চতর অধ্যয়ন ও গবেষণা করে কাটান। পরবর্তীতে মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলাম ধর্ম ও আমেরিকার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মের ওপর পোস্ট ডক্টরেট করেন। ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয় । স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৪৫ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ফিলিস্তিন সরকারের গ্যালিলির জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন। এভাবে প্রশাসনিক ক্যারিয়ার দিয়ে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার প্রশাসক জীবনের অবসান ঘটে, যখন ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী ইসরাইলী দখলদার বাহিনী ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে ফিলিস্তিনীরা নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে যান। হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মুসলিম পরিবারের মতো ফারুকীর পরিবারও ফিলিস্তিন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে লেবাননে আশ্রয় নেন। এ ছিলো ফারুকীর জীবনের সন্ধিক্ষণ মুহূর্ত। শত অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি নিজের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার গঠনে সফল হন। আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত করাচীর ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক রিসার্চ এ অধ্যাপক হিসেবে, ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমেরিকার টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে Islamic and History of Religions এর অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । এছাড়া তিনি বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়ালিজম-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ইসমাইল ফারুকী শুধু আত্মিকভাবে ইসলামের ধারণা ও মূল্যবোধকে তুলে ধরেননি; নিজের কাজকর্ম, গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন। ড. রাজী বহু আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ম্যাগাজিনে শতাধিক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন। তার প্রকাশিত The Cultural Atlas of Islam, Historical Atlas of the Religions of the World, Trialogue of the Abrahamic Faiths, Christian Ethics, Al Tawhid : Its Implications for Thought and Life. প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৯৮৬ সালের ২৪ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজ বাসায় আততায়ীর গুলিতে অধ্যাপক ইসমাইল রাজী আল ফারুকী ও তার স্ত্রী লুইস লামিয়া ফারুকী শহীদ হন। এ শাহাদাতের মধ্য দিয়ে এ কালে মুসলিম চিন্তার জগতের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা খসে পড়ে এবং একজন সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবীর কর্মঘন জীবন নীরব হয়ে যায়। তথাপি বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামি চিন্তার বিকাশে অগ্রপ্রতীক হিসেবেই বিবেচিত ড. ফারুকী।
Picture of ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী (১৯২১-১৯৮৬) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অথরিটি হিসেবে সুপরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। তার জন্মভূমি ফিলিস্তিনে কলেজ শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৪১ সালে তিনি বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক; যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর নেওয়ার পর ১৯৫২ সালে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন । ফারুকী এ সময়ে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি- এ তিনটি ভাষায় গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ এ চার বছর ইসলামের ওপর উচ্চতর অধ্যয়ন ও গবেষণা করে কাটান। পরবর্তীতে মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলাম ধর্ম ও আমেরিকার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মের ওপর পোস্ট ডক্টরেট করেন। ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয় । স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৪৫ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ফিলিস্তিন সরকারের গ্যালিলির জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন। এভাবে প্রশাসনিক ক্যারিয়ার দিয়ে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার প্রশাসক জীবনের অবসান ঘটে, যখন ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী ইসরাইলী দখলদার বাহিনী ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে ফিলিস্তিনীরা নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে যান। হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মুসলিম পরিবারের মতো ফারুকীর পরিবারও ফিলিস্তিন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে লেবাননে আশ্রয় নেন। এ ছিলো ফারুকীর জীবনের সন্ধিক্ষণ মুহূর্ত। শত অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি নিজের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার গঠনে সফল হন। আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত করাচীর ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক রিসার্চ এ অধ্যাপক হিসেবে, ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমেরিকার টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে Islamic and History of Religions এর অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । এছাড়া তিনি বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়ালিজম-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ইসমাইল ফারুকী শুধু আত্মিকভাবে ইসলামের ধারণা ও মূল্যবোধকে তুলে ধরেননি; নিজের কাজকর্ম, গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন। ড. রাজী বহু আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ম্যাগাজিনে শতাধিক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন। তার প্রকাশিত The Cultural Atlas of Islam, Historical Atlas of the Religions of the World, Trialogue of the Abrahamic Faiths, Christian Ethics, Al Tawhid : Its Implications for Thought and Life. প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৯৮৬ সালের ২৪ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজ বাসায় আততায়ীর গুলিতে অধ্যাপক ইসমাইল রাজী আল ফারুকী ও তার স্ত্রী লুইস লামিয়া ফারুকী শহীদ হন। এ শাহাদাতের মধ্য দিয়ে এ কালে মুসলিম চিন্তার জগতের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা খসে পড়ে এবং একজন সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবীর কর্মঘন জীবন নীরব হয়ে যায়। তথাপি বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামি চিন্তার বিকাশে অগ্রপ্রতীক হিসেবেই বিবেচিত ড. ফারুকী।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top