১. পৃথিবীতে পরিবার প্রথার অবক্ষয়

 

. সমতা

কমিউনিষ্টগণ সমাজের উৎপত্তি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব মতবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবারের বিলোপ সাধন করে তার স্থলে কম্যুন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিল কমিউনিষ্টরা মানব জীবনের সেই আদর্শ অবস্থাকেই চিত্রিত করেছিলো যাতে মানুষ একসঙ্গে ডরমিটরীতে বাস করে, মেসের হলে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে এবং সন্তান সন্ততিকে রাষ্ট্রের সন্তান বলে গণ্য করে। অনেক কম্যুন সৃষ্টি হয়েছিল বটে, কিন্তু কমিউনিষ্টরা শীঘ্রই বুঝতে পারলো ব্যক্তিগত সংগঠনের এই যৌথ পদ্ধতি ব্যর্থ হতে বাধ্য, তাই চিরাচরিত পরিবারের রূপটিতে থাকলো সাধারণত বাবা মা তাদের সন্তানের প্রতি ভালবাসা, স্নেহ ও স্বাভাবিক মমতা বশে যেসব কর্তব্য পালন করে থাকেন, রাষ্ট্র তার অনেকগুলো দায়িত্ব গ্রহণ করায় পরিবারের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কেবল মাত্র তাদের শৈশবের নির্ভরশীলতা এবং সাহচর্যের স্মৃতি ছাড়া এমন আর কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যার উপর পরিবারের সদস্যরা তাদের সম্পর্ক গড়ে তুলবে

পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার জীবিকা ও চাকুরীর সন্ধানে বিশাল নগর কেন্দ্রিক জনসমষ্টির দিকে জনতার ধাবিত হওয়ার ফলে প্রত্যেকেই হয়ে পড়েছে নাম পরিচয়হীন। নারী পুরুষের মেলামেশা, শিথিল নৈতিকতা, নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা, একধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং সহজাত আত্মস্থ প্রকৃতির চিরাচরিত যথেচ্ছাচার, সব কিছু মিলে পারিবারিক বন্ধনে ধস নামাতে সাহায্য করে। বর্তমান শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যথেচ্ছাচার এবং অবাধ যৌন মেলামেশার মধ্যে পরিবার প্রথার যে কি অধঃগতি হয়েছে তার করুণ অবস্থার প্রকাশ দেখতে পাই, এই মুহূর্তে নগরীগুলিতে যে সব শিশু জন্মগ্রহণ করছে তার শতকরা পঞ্চাশ ভাগের বেশী অবৈধ সন্তান। পরিবার হয়ে উঠেছে জন্তুর পরিবার। এই অর্থে যে কেবলমাত্র ততক্ষণই এর অস্তিত্ব আবশ্যক যতক্ষণ শিশুরা দৈহিকভাবে অসহায় এবং বাবা মা’র নিরবচ্ছিন্ন যত্ন মনোযোগ প্রয়োজন। যে মুহূর্তে তারা বালেগ হয় তখনই বৈষয়িক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় এবং পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে পড়ে। কেবল তাই নয় তার চেয়েও খারাপ, গৃহের বাইরে বাবা মার কর্ম ব্যস্ততা, তাদের মনস্তাত্বিক ক্লান্তি ও অবসাদ এবং গৃহের বাইরে আবেগ পুরণের জন্য মানসিক চাপ, সন্তান সন্ততির অতি অল্প বয়সে পারিবারিক বন্ধন শিথিল করে দেয়, পরিবার বলে দীর্ঘকাল যা পরিচিত ছিল কার্যত তা এখন মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় ধুকছে

নৃতত্ত্ববিদেরাও পরিবার প্রথার পতনে সাহায্য করছে, এই শিক্ষা প্রদান করে যে, মানুষের ভিন্নতর সমাজ ও সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, যেমনটি জীবজন্তু ও আদিম নরনারীদের মধ্যে সাফল্য অর্জন করেছে। মানুষের অবস্থা বিবেচনা করতে গিয়ে তারা যে ক্রমাগতই জন্তু জগতের উল্লেখ করে থাকে তাতে মানুষের মগজ ধোলাই হবার ফলে, তারা এখন ভাবতে শুরু করছে যে, জন্তুর সংগে মানুষের পার্থক্যগুলো হচ্ছে অস্বাভাবিক, এবং ভিন্নতর মানবিক সংঘ, যেমন মাতৃতন্ত্র ও একই সংগে বহুপতি গ্রহণ প্রথার নিয়ম, ইত্যাদির কল্পনা-সর্বস্ব থিওরীর বন্যা পরিবার প্রথাকে চিরাচরিত সম্মানের স্থান থেকে বিচ্যুত করতে সাহায্য করে।

গোটা কমিউনিষ্ট বিশ্বে এবং পাশ্চাত্য জগতে পরিবার প্রথার এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, যা বর্তমানে সমাজের সাধারণ অবক্ষয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংশ্লিষ্ট। নৈতিকতার অবক্ষয়, সমাজ সংহতি এবং পুরুষ পরম্পরায় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার অবক্ষয়ের উপর যেমন এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলেছে, তেমনি এই পরিবর্তনকে প্রভাবিতও করছে। কোনটি কারণ কিংবা কোনটি ফল একথা ধর্তব্যের মধ্যে না এনেই সভ্যতা এবং পরিবার প্রথা মনে হয় একই সঙ্গে টিকে থাকবে, না হয় ধ্বংস হবে। যেহেতু মুসলিম বিশ্ব এবং অবশিষ্ট তৃতীয় বিশ্ব, কমিউনিজম এবং পাশ্চাত্য মতবাদের ধ্বংসকারী আঘাত থেকে তাদের আত্মপরিচয়ে নিজস্বতা রক্ষা করে চলেছে, সে কারণে এই সব সমাজে এখনো পরিবার প্রথা তার মর্যাদার আসন নিয়ে টিকে আছে। ইসলামী সংস্থার টিকে থাকার সম্ভাবনা বৃহত্তর, কারণ তা ইসলামিক আইনের দ্বারা বলবৎ এবং আত-তৌহীদের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কের দ্বারা স্থিরীকৃত, যা ইসলামী ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সারকথা।

 

. সমাজের একটি গঠনমূলক একক হিসাবে পরিবার প্রথা

মানুষের পক্ষে আল্লাহর উদ্দেশ্য পরিপূরণের জন্য প্রয়োজন এই যে, মানুষ বিয়ে-শাদি করবে এবং সন্তান জন্ম দেবে এবং একসঙ্গে বসবাস করবে এবং এভাবে মানবিক সম্পর্কের নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে মানবিক সিদ্ধান্ত এবং কর্মের মাধ্যমে ঐশী অভিপ্রায়ের নৈতিক দিকটি সার্থক হবে। এই নাট্যমঞ্চটিতে রয়েছে চারটি স্তর যথা সে নিজে, পরিবার, গোত্র বা জাতি বা জনগোষ্ঠী এবং বিশ্বজনীন উম্মাহ্ প্রথম স্তরটির আবশ্যকতা স্বতঃপ্রকাশিত, যে কোন নৈতিকতার যে কোন রকমের পরিপূরণের জন্য আবশ্যক হচ্ছে নিজের অহমের সঙ্গে কর্তার একটি নৈতিক সম্পর্কে প্রবেশ। সেই অহমকে বোঝা, তাকে রক্ষা করা ও তার বিকাশ সাধন এবং তাকে নৈতিক মূল্যের সিদ্ধান্তের অধীনে স্থাপন আবশ্যিক। কেননা, এগুলোই হচ্ছে শর্ত, যা বাদ দিলে সৃষ্টিই বাধাগ্রস্থ হবে। তৃতীয় স্তরটি অর্থাৎ গোত্র জাতি বা রেস আবশ্যক নয়, এর প্রকৃতি উম্মাহরই মত, একারণে যে গোত্র, জাতি বা রেস্ অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে যাদের সঙ্গে কোন জৈবিক সম্পর্ক নেই, কিংবা সম্পর্কটি এত দূরের যে, তা কোন তাৎক্ষণিক অনুভূতির বিষয় নয়, কল্পনার বিষয়মাত্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে গোত্র, (জাতি বা রেস) স্তরটি কেবলমাত্র নিয়ন্ত্রণপ্রবণ, কেননা উম্মাহর সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক থাকতে পারে তার সঙ্গে নতুন কিছুই যোগ না করে। এর কাজ হচ্ছে সেই সম্পর্ককে গোত্র (জাতি বা রেস) সদস্যদের মধ্যে সীমিত রাখা এবং যেন সেই সদস্যপদ আর কাউকে না দেওয়া হয় সেই বিধি নিষেধ কার্যকর করা। এর বিপরীতে উম্মাহ সম্পর্ক সৃষ্টি করে ধর্ম বা আদর্শের ভিত্তিতে এবং জন্ম বংশ নির্বিশেষে, ভাষা ইতিহাস বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি সদস্যপদ সম্প্রসারিত করে। উম্মাহর সম্পর্ক হচ্ছে অধিকতর মানবিক এবং তা ব্যক্তির মর্যাদা সংরক্ষণ করে, যেখানে গোত্র (জাতি বা রেস) সর্ম্পক এই মর্যাদাকে লংঘন করে, জন্মের উপর তার সংকীর্ণতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই জন্যই ইসলাম মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসাবে গোত্র, জাতি, রেসকে উন্মূলিত করে এবং তার স্থলে স্থাপন করে বিশ্বজনীন উম্মাহ। প্রাক ইসলামিক জাহিলিয়া ও পশ্চাৎপদতার যুগে গোত্রতন্ত্র বিদ্যমান ছিল। রোমান এবং পার্সিয়ান সাম্রাজ্যে গোত্রতন্ত্র ছিল রোমান ও পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের প্রবল মানদণ্ড। এই দুটি সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের পূর্ববর্তী, যার অবসান ঘটিয়েছিল ইসলাম। এই দুটি সাম্রাজ্য মানুষের কর্মকাণ্ডে এমন সব অপকর্মের জন্য দায়ী ছিল যার জন্যে তাদেরকে নির্মূল করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।

এর ফলে, কেবলমাত্র পরিবারই রয়ে গেল চূড়ান্ত সামাজিক ইউনিট হিসাবে, যার একপার্শ্ব ধারণ করে আছে ব্যক্তি এবং অন্য পার্শ্ব ধারণ করে আছে বিশ্বজনীন উম্মাহ। মহাজাগতিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্বের উপর কুরআন জোর দিয়েছে এভাবে, ইহা আল্লাহর একটি নিদর্শন, তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে পরস্পরের যুগল সৃষ্টি করেছেন, এবং তোমাদের মধ্যে প্রেম ও তারুণ্যের সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম যৌনজীবনকে নিন্দা করে না বরং একে নিষ্পাপ, প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর মনে করে; এবং কেবল এর অনুমতি দেয়না, বরং এই নির্দেশ দেয় যে নর এবং নারী এ সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের সার্থকতা খুঁজে নেবে। যাই হউক, বিবাহের লক্ষ্য পূরণের জন্য, কেবলমাত্র যৌন সম্পর্ককে একমাত্র বিষয় বলে স্বীকার করেনা। যে বিবাহ কেবলমাত্র যৌন সম্পর্ক, যা রোমান্টিক ভালবাসার লক্ষ্য, ইসলাম তাকে ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ঘোষণা করে। বিয়ের ফলে সৃষ্টি হয় এক বিশাল জটিল মানবিক সম্পর্ক যেগুলো নৈতিক নির্দেশমালার একটি বড় অংশের উপকরণ। পরিবারের সদস্যদের প্রতি ব্যক্তির প্রথম কর্তব্যগুলির মধ্যে পড়ে প্রজনন, স্নেহপ্রেম, সমর্থন, সুপরামর্শ, পথনির্দেশ, শিক্ষাদান, সাহায্য এবং বন্ধুত্ব। কুরআনে সমাজ সম্পর্কিত আল্লাহ তা’লার নির্দেশগুলির মধ্যে অতিশয় প্রাধান্য পেয়েছে জুল-কোরা (খেশ, স্বগণ) শ্রেণীটিসংক্ষেপে একথা বলা যায় যে, ঐশী অভিপ্রায় বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম পরিবারকে অপরিহার্য মনে করে এই ধরনের বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে তৌহীদের কথা চিন্তা করা যায়না কারণ আল্লাহকে এক এবং একমাত্র ইলাহরূপে স্বীকার করার মানেই হচ্ছে তাঁরই স্বীকৃতি যাঁর ইচ্ছা এবং আদেশ হচ্ছে মানুষের ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয়, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং মানুষের লক্ষ্য। তৌহীদকে অনুসরণ করার মানেই হচ্ছে আল্লাহর আদেশ যে বাধ্যতামূলক সে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং এই অভিজ্ঞতার মানেই হচ্ছে সব আদেশের মধ্যে যে সব মূল্য নিহিত আর, সেসব বাস্তবে অস্তিত্বশীল উপাদানের মাধ্যমে সেগুলোকে রূপায়িত করার উপায় অনুসন্ধান। এর সমস্ত কিছুই যুক্তির দিক দিয়ে পরস্পর যুক্ত এবং একে অন্য থেকে অবিচ্ছেদ্য। অন্যগুলোকে পূরণ না করে কেবল কোন একটিকে পূরণ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ যে কেবল এইসব মূল্যের বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন তা নয়, তৎসঙ্গে তা করার জন্য পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছেন এবং কি কি উপকরণ আবশ্যক তারও উল্লেখ করেছেন। এগুলো হচ্ছে পরিবার এবং পরিবার প্রথা যে সবের জন্ম দেয় সে সমুদয়। উভয়ের প্রয়োজনীয়তা যুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে। আল্লাহ যে বিশেষ, করে এসবের উল্লেখ করেছেন তাতেই এগুলোর যৌক্তিক আবশ্যকতার সমর্থন মেলে। তাই পরিবারকে বাদ দিয়ে তৌহীদের অস্তিত্ব থাকেনা

 

. সমসাময়িক সমস্যাসমূহ

 

. সমতা

আল্লাহ যে নরনারীকে তাদের ধর্মীয়, নৈতিক এবং নাগরিক অধিকারের বেলায় কর্তব্য ও দায়িত্বের দিক দিয়ে সমান করে সৃষ্টি করেছেন এতে কোন সন্দেহ নেই১০। তবে স্বল্প কয়টি ব্যতিক্রম আছে এবং সেগুলো পিতা এবং মাতা হিসাবে তাদের দায়িত্ব ও কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ধর্মীয় পর্যায়ে আল্লাহ তাদের সমতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন (৩: ১৯৫), (৯: ৭১-৭২) এবং (১৬: ৯৭) সংখ্যক আয়াতে। এই আয়াতগুলোই তাদের নৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠিত করে। নাগরিক সমতার বিষয়ে (৬০: ১২), (৫: ৩৮), (২৪: ২) এবং (৪: ৩২) সংখ্যক আয়াতগুলোতে ঘোষিত হয়েছে। (৪: ৩৪) সংখ্যক আয়াতের ভিত্তিতে ইসলাম অসাম্য সমর্থন করে, এই দাবী বিশ্লেষণ করলে বিচারে টিকেনা। প্রথমত এর সম্পর্ক কেবল পারিবারিক ঘরোয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে, একই আয়াতের বাকি অংশে এর প্রমাণ রয়েছে, যে অংশটি প্রথম অংশটি প্রয়োগের শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত- যা সমস্তটুকুই ঘরোয়া পরিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক। সাধারণত অবাঞ্ছিত সাধারণীকরণের পথ প্রশস্ত করার জন্য যুক্তি তর্ক থেকে আয়াতের এই অপর অংশটি বর্জন করা হয়ে থাকে। এই সম্পর্কের বেলায় পুরুষের নিশ্চয়ই অগ্রবর্তীতা রয়েছে কেননা পিতৃতান্ত্রিকতাই পরিবারিক জীবনের একমাত্র রূপ যা মানব জাতি নিজেই পরীক্ষা করেছে সৃষ্টির শুরু থেকে এবং পালন করে এসেছে। পরিবার হচ্ছে একটি গৃহ, যার ডিফেন্সের প্রয়োজন হয় এবং যাকে রক্ষা করার জন্য গৃহের বাইরে সার্বক্ষণিক সংগ্রামের আবশ্যক হয়। স্পষ্টতই পুরুষ এ দায়িত্ব পালনের জন্য রমনীদের চেয়ে প্রকৃতিগতভাবেই অধিকতর ক্ষমতাবান। দ্বিতীয়ত, অসাম্যের যারা ওকালতি করে তাদের ধারণায় এই আয়াতটির ব্যাখ্যা হচ্ছে উপরে উল্লেখিত যে সব আয়াত ধর্ম, নৈতিকতা ও নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলিতে নরনারীর সাম্য প্রতিষ্ঠা করে, সেগুলোর বিপরীতে তার প্রতিস্থাপন।

. ভূমিকার ভিন্নতা

ইসলাম মনে করে নারী এবং পুরুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পৃথক অথচ পারস্পরিক পরিপূরক দায়িত্ব পালনের জন্য১১। মাতৃত্ব, পরিবারের যত্ন এবং ছেলেমেয়েদের লালন পালন, এসব দায়িত্ব ও কর্ম, এবং পিতৃত্ব পরিবারের রক্ষণ, জীবিকা অর্জন। আর সামগ্রিক দায়িত্বের জন্য, পুরুষ এবং নারীর মধ্যে পৃথক দৈহিক মনস্তাত্বিক এবং আবেগাত্বক গঠন আবশ্যক। ইসলাম এই ভিন্নতর পার্থক্যকে নর নারী উভয়ের অস্তিত্বের সার্থকতার জন্য আবশ্যক বলে শ্রদ্ধা করে১২। ভূমিকার স্বাতন্ত্র্য, বৈষম্য বিচ্ছিন্নকরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। উভয় ভূমিকাই একইভাবে ধর্মীয় এবং নৈতিক আদর্শের বা মানদণ্ডের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; এবং উভয়ের পক্ষে আবশ্যক, নারী কিংবা পুরুষের সাধ্যমত সকল বুদ্ধি মেধা, শক্তি ও প্রচেষ্টার প্রয়োগ। একইভাবে ভূমিকার ভিন্নতা নারী এবং পুরুষের কর্মকান্ড যেখানে নিজের সীমা ডিঙ্গিয়ে অন্যের এলাকায় প্রবেশ করে সেই সব এলাকা সম্পর্কে কিছু বলেনা, যেমন বলেনা অন্য সব এলাকা সম্পর্কে, যেখানে নিজের এলাকা থেকে অপর এলাকায় প্রবেশের কথা উঠেনা যেখানে প্রকৃতিগত মানসিক প্রবণতার কারণে তা বাঞ্ছনীয় বা প্রয়োজনে তা উপযোগী মনে হয়, সেখানে নারী এবং পুরুষের কর্মকান্ড একে অপরের এলাকায় অনুপ্রবেশ করতে পারে, আল্লাহ প্রকৃতিতে ভূমিকার যে ভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা লংঘন না করে। অন্যথায় কুরআন রমণীদেরকে যে সব নাগরিক অধিকার দিয়েছে সেগুলো দিত না, এবং এসব নাগরিক অধিকার সম্পর্কে কেউ কখনো কোন প্রশ্ন তোলেনা।

. প্রদর্শনী এবং গৃহবন্দীত্ব

এ ব্যপারে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ্ তায়ালা চাননি, মুসলিম মহিলারা পর্দার অন্তরালে অথবা হারেমের চৌদেয়ালের মধ্যে সমাজ থেকে আলাদা হয়ে গুটি পোকার খোলসের মধ্যে নিজেকে বন্দী করবে, বরং এই সাক্ষ্যই রয়েছে যে, তাদের সরকার পরিচালনায় অংশ গ্রহণের অধিকার থাকবে যেমনটি দেখতে পাই (৬০: ১২) সংখ্যক আয়াতে, অধিকার থাকবে জনজীবনে অংশ গ্রহণের, যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে (৯: ৭১-৭২) সংখ্যক আয়াতে, এমনকি যুদ্ধ বিগ্রহে, যার উল্লেখ রয়েছে (৩: ১৯৫) সংখ্যক আয়াতে। স্পষ্টতই এধরনের অংশগ্রহণ বোরকা এবং সমাজ বিচ্ছিন্নতার বিপরীত, এবং মুসলমান মহিলাদের জন্য অচিন্তনীয়। ইসলাম যা পরিহার করার জন্য সবচেয়ে যত্নবান তা হচ্ছে সেই ধরনের প্রদর্শনী যা নৈতিকতাহীনতা ও ব্যভিচারের পথে পরিচালিত করে১৩। এখানে দুটি আদেশ রয়েছে, একটি সাধারণ আদেশ যা নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য সমান গুরুত্বের সঙ্গে ব্যক্ত হয়েছে, যদিও বা পুরুষের জন্য অধিকতর গুরুত্বের সাথে আলোচিত না হয়ে থাকে, কেননা পুরুষের কথা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে১৪। দ্বিতীয় আদেশটির বিষয়, স্ত্রী লোকের যা উপরে উল্লেখিত যথা (২৪ : ৩০-৩১) সংখ্যক একই আয়াতে বিদ্যমান। একথা সত্য যে কুরআন স্ত্রীলোকদেরকে তাদের গা ঢাকতে বলেছেন। কিন্তু কুরআন প্রকাশ্যে সেই সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে তা থেকে রেহাই দিয়েছে যেগুলো মহিলারা তাদের ইসলাম-নির্দেশিত পেশা এবং ভাগ্য পরিপূরণ করতে হলে প্রথা অনুসারে অনাবৃত রাখতে বাধ্য। নারীর সৌন্দর্য ও অলংকারের ইচ্ছাকৃত প্রদর্শনী পুরুষকে প্রলুব্ধ করে এবং সে কারণে তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, তবে যারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং যে সব প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ সংশ্লিষ্ট মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনা, যেমন তার পিতা, ভ্রাতা, পুত্র অথবা চাচা, মামার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নয়১৫। ইসলামে প্রলোভন পরিহার করে চলা একটি উচ্চ নৈতিক আদর্শ। এর সঙ্গে সমাজে তার রমনীর ইসলামী দায়িত্ব পালনের কোন সম্পর্ক নেই, আসলে, মহানবীর সময় থেকে দেখা গেছে মহিলারা এই সব ইসলামী দায়িত্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে পালন করেছেন, এমনকি পবিত্র কাবাগৃহে তাদের মুখ, হাত ও পা খোলা রেখে।

. শাদী এবং তালাক

সকল নারী এবং পুরুষের জন্য শাদী হচ্ছে একটি ধর্মীয় এবং নৈতিক নির্দেশ১৬। উচ্চ যৌতুকের দাবী, গৃহের অভাব, শিক্ষা এবং চাকুরী, নারী এবং পুরুষ কারোরই বিয়ের পক্ষে বাধা বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। পশ্চাত্য জগতে এগুলো প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে, কারণ পশ্চিম বৈষয়িক সাফল্যের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং পশ্চাত্যের লোকেরা যৌন পবিত্রতার উপর কোন গুরুত্বই দেয় না। যেহেতু পারিবারিক ইউনিটটি আণবিক একক, এজন্য বিয়ের পূর্বেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা দম্পতির জন্য আবশ্যক। এর বিপরীত ইসলামী পরিবার হচ্ছে একটি সম্প্রসারিত মডেল, যার মধ্যে বাবা, মা দাদা, দাদী, পুরুষ এবং তাদের পুত্র সন্তান-সন্ততিগণ সকলেই অন্তর্ভূক্ত। যেহেতু শরীয়ার বিধান মতে রমণীরা তাদের স্বামীদের সাহায্য সমর্থন লাভের অধিকারী, অথবা তারা যাদের উপর নির্ভরশীল তাদের সাহায্য সহযোগিতায় যেহেতু পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুসরণে ইসলাম বয়স্ক পুরুষের উপর রমণীদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব অর্পণ করে সেজন্য বেশীর ভাগ মুসলিম পুরুষ এবং নারী তরুণ বয়সে বিয়ে করে তারা বিয়ের পূর্বে পুরুষের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সামর্থ্যকে বিয়ের প্রশ্নে অপ্রাসঙ্গিক গণ্য করে। দুর্ভাগ্যক্রমে এক আশংকাজনক হারে মুসলিম তরুণরা পাশ্চাত্য ধ্যান ধারণায় দীক্ষিত হয়ে পড়েছে; এর ফল এই হয়েছে যে, ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়াস এবং এভাবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর পর্যন্ত বিবাহ স্থগিত রাখা, তাদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ একটি দুঃখজনক করুণ পরিণতি। প্রথমতঃ ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোন মন্দ জিনিস নয়, কিন্তু এর পেছনে যে মূল্য কাজ করছে তা নিশ্চয়ই মন্দ হতে পারে। এই নীতিকে গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে একটি জড়বাদী বিশ্বদৃষ্টিকে অপরিহার্য আদর্শরূপে পূর্বাহ্নে স্বীকার করে নেওয়া এবং এর অনুসরণের অর্থ হচ্ছে সম্প্রসারিত পরিবারের স্থলে আনবিক পরিবারকে শ্রেষ্ঠতর মনে করা। এটিও প্রকারান্তরে অতিরঞ্জিত ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ ও মন্ময়তার পরিণতি। ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উচ্ছৃংখলতা এবং শৃংখলা আনয়নে অসাধ্যতার পূর্বশর্ত। দ্বিতীয়ত বিয়ে স্থগিত রাখা নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রলোভনের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। বিয়ে হচ্ছে সতীত্ব ও সৎগুণের ঢালস্বরূপ। তৃতীয়ত প্রশস্ত সম্প্রসারিত পরিবারে অল্পবয়সে বিয়ের ফলে দম্পতির জন্য কোন অসম্ভব দাবী দাওয়া জন্মায় না। নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই স্কুলে যোগদান বা কর্মক্ষেত্রে যাওয়া সম্ভব, কেননা তাদের অনুপস্থিতেও সবসময়ই পরিবার চালানো এবং ছেলে মেয়ে লালন দানের জন্য ঘরে থাকবে স্নেহময় আত্মীয় স্বজন। তাই ইসলাম সকল মুসলমানকেই বিয়ে করার এবং যৌবনের প্রথম দিকে বিয়ে করার ও সবসময়ই প্রশস্ত সম্প্রসারিত পরিবারে জীবন যাপনের নির্দেশ দেয়।

. প্রশস্ত সম্প্রসারিত পরিবার

আল্লাহ তায়ালা পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার প্রশস্ত সম্প্রসারিতরূপে। শরীয়াহ্ পরিবারকে আঁট সাঁট করে বেঁধেছে আইনের মাধ্যমে যাতে, আশ্রিতদের বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ভরণ পোষণ বাধ্যতামূলক- এবং যাদের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টন আবশ্যক১৭। সাধারণভাবে বলা যায় যে, যে কোন স্বজনই আশ্রিত, তার সম্পর্কটি যত দূরেরই হোক না কেন, যদি সে অভাবগ্রস্থ হয় এবং সংশ্লিষ্ট আত্মীয়টির চাইতে নিকটতর কোনো বয়স্ক সমর্থ পুরুষ আত্মীয় তার না থাকে। দাদা দাদী, নাতি-নাতনি, পিতৃব্য এবং তাদের সন্তান- সন্ততির অগ্রাধিকার রয়েছে। রক্ত সম্পর্কিত বা agnate স্বজনেরা জ্ঞাতি সম্পর্কিত বা cognate স্বজনের চাইতে অগ্রাধিকার পায়। কার্যত মুসলমান পরিবার কুড়িজন বা সমসংখ্যক ব্যক্তি নিয়ে গঠিত, যারা সকলে বাস করে একটি বহুকেন্দ্রিক প্রাঙ্গনে, যাদের একটি মাত্র রান্নাঘর এবং একটি মাত্র দেওয়াল থাকে, যেখানে মুরব্বীজনের চারপাশে সকল সদস্যরা জমায়েত হয় এবং মেহমানদেরকে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

মুসলিম পরিবারের মধ্যে জেনারেশন গ্যাপ বলে কিছু নেই, কারণ তারা সকলে একত্রে বাস করে এভাবে তরুণদের সমাজবদ্ধতা সাংস্কৃতিক অন্বয় সবসময় সম্পূর্ণ হয়, যাতে ঐতিহ্য সংস্কৃতির প্রবহমানতা নিশ্চিত হয়, সম্ভাব্য স্বল্পতম অপমিশ্রণের সাথে এখানে অতীত অবিকৃতভাবে সম্পর্কিত থাকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে। সম্প্রসারিত পরিবারের আর একটি সুবিধা এই যে, এই পরিবার যখনই এর কোন সদস্যের প্রয়োজন হয তৎক্ষণাৎ তাকে সাহচর্য দিয়ে থাকে এবং বিদ্যমান মেজাজ অনুসারে সাধারণ পছন্দ ও নির্বাচনের অবকাশ থাকে প্রচুর। সবসময়ই কেউ কেউ না কেউ প্রস্তুত থাকে, সঙ্গে খেলাধুলা করার জন্য, হাসি মশকরা করার জন, আলোচনা করার জন্য, একসঙ্গে চিন্তা করার জন্য, একসঙ্গে ক্রন্দনের জন্য এবং আশা করার জন্য। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব শর্ত। একটি প্রশস্ত পরিবারে কখনো একটি শিশুর অভাব নেই। একটি বয়স্ক লোকের অভাব নেই, একটি মহিলার অভাব নেই। অন্য সকলের চেয়ে একজন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞের অভাব নেই।

একথা সত্য, সম্প্রসারিত পরিবার তার সাফল্যের উপর শৃংখলা, নিয়মানুবর্তিতা এবং পারস্পরিক ত্যাগ আরোপ করে। কোনো কোনো সময় তা ব্যক্তিগত গোপণীয়তাকে কমিয়ে দেয়। কিন্তু জীবন এবং এই পৃথিবী আমাদেরকে নিয়মানুবর্তিতা ও ত্যাগ ছাড়া আমাদের জীবন চালানোর অনুমতি দেয়না। ব্যক্তি মানুষের জন্য এ পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু নিশ্চয়ই নিজেকে নিয়মানুবর্তী করা এবং অন্যের জন্য, পরহিতার্থে কোরবানী করা ভাল কাজ। আমাদের জন্য সর্বোত্তম হচ্ছে গৃহে আমাদের যারা ভালবাসে এবং আমরা যাদের ভালবাসি, তাদের হাতে নিয়ম শৃংখলা শিখি, অপরিচিতদের হাতে নয়।

. পেশাজীবি মহিলা এবং ইসলামী শ্রমিক

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জনের জন্য কোন না কোন পেশার মাধ্যমে এত বিপুল সংখ্যক মুসলমান মহিলা পাশ্চাত্যের অনুকরণে পেশার অনুসন্ধানে ব্যস্ত যে, এ সমস্যার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কি সে সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক।

বিপুল পরিমাণে সংখ্যাগুরু মুসলিম মহিলাদের ক্ষেত্রে অতি সামান্য সন্দেহের অবকাশ আছে, অথবা এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, তারা গৃহিনী এবং মাতা হিসাবে একটি সার্বক্ষণিক স্থায়ী পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন যে এধরনের পেশার জন্য অনেক বেশী: প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, গৃহের বাইরের যে কোন পেশার চাইতে এই পেশাকে রান্না বান্না এবং গৃহস্থালীর টুকিটাকি কাজ বলে বর্ণনা করা একটি মহৎ পেশাকে বিকৃত করা মাত্র এই পেশাতে বৃদ্ধ তরুণ নির্বিশেষে সকল মানুষের যত্ন নেয়া একটি স্বাভাবিক দায়িত্ব। বলা বাহুল্য পৃথিবীতে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ। এজন্য আবশ্যক পরিণত প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, শিল্প কৃশলতা, সৃজনশীলতা, সদাপ্রস্তত রসবোধ এবং অভিজ্ঞতা, যা ব্যক্তির সাধ্যায়ত্ব। অবশ্যই ব্যক্তির জন্য প্রশিক্ষণ হচ্ছে একটি সার্বক্ষণিক ব্যাপার, গৃহপরিচালনার নিয়মানুবর্তিতার ক্ষেত্রেই হোক, অথবা শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাস মনস্তত্ব এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই হোক।

পরিবার গঠন, সন্তান জন্মদান সন্তান লালন পালন একটি বিশ্বজনীন পেশা হলেও, সত্য অনস্বীকার্য যে, এই সব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রমণীর সারাজীবনের কর্মশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়না সম্প্রসারিত পরিবারের সদস্য হিসাবে তার নিজের দিক থেকেই হউক, অথবা তার স্বামীর দিক থেকে হউক, স্ত্রীলোক পায় তার সহকারী এবং সেই কারণে অধিক পরিমাণ অবকাশ। তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা দুই বা তিন যুগের বেশী স্থায়ী হতে পারেনা। তার জীবন হতে পারে আরো তিনযুগ দীর্ঘস্থায়ী। এটা কি যুক্তিসঙ্গত যে মুসলিম মহিলা এই মূল্যবান সময় ব্যয় করবে পারিবারিক খোশগল্প এবং পরচর্চায়, যখন ইচ্ছা করলে তারা উম্মাহকে সাহায্য করতে পারে, তাদের মেধা এবং ক্ষমতা দিয়ে? একইভাবে এও হতে পারে, এমন সব মহিলাও থাকতে পারে যাদের জীবনে বিবাহের সৌভাগ্য ঘটেনা বা যারা সন্তান ধারণ করতে পারেনা, এবং একটি সম্প্রসারিত পরিবারে জীবন যাপনও যাদের জন্য সম্ভব নয়। ইসলাম তাদের জীবন সম্পর্কে কি চিন্তা করে?

প্রত্যেক পুরুষের মতই প্রত্যেক রমণীকেও তার মেধা এবং সর্বোৎকৃষ্ট বৃত্তি অনুসারে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের দায়িত্ব পালন ও উম্মাহর কল্যাণ সাধন করতে হবে। আজকের দিনে এই নির্দেশ দ্বিগুণ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে, কেননা উম্মাহর অবক্ষয় হয়েছে এবং কার্যত উম্মাহ এখন সুপ্ত, ঘুমন্ত। কাউকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়না বা অব্যাহতি দেওয়া উচিত নয়। আমাদের বর্তমান অবস্থার দাবী এই যে, প্রত্যেক মহিলাকে কমপক্ষে তার জীবনের একটা অংশে হতে হবে পেশাজীবি মহিলা। এই সময়টি হতে পারে তার ছাত্রী জীবনকালে, সে যদি সম্প্রসারিত পরিবারে বাস করে, তাহলে তার মাতৃত্বের সময় অথবা তার মাতৃত্বের কাল অতিক্রান্ত হবার পর।

তার প্রথম কাজ হচ্ছে একজন ইসলামী কর্মী হিসাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ, ইসলামী জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি তার মন মানসকে জাগ্রত করা এবং তার দ্বারা তার মন মানসের পরিপুষ্টি, ইসলামিক ক্রিয়া কলাপের নিয়মানুবর্তিতা অর্জন করা এবং তার অনুশীলন। তদুপরি ইসলামী আন্দোলন তাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করবে তা বহনের জন্য নিজেকে প্রস্তত করা। অন্যান্য মুসলমানদেরকে জাগ্রত করা এবং শিক্ষাদানের জন্য, তাকে অর্জন করতে হবে কলা কৌশল ও দক্ষতা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মনিয়োগের জন্য তাদেরকে সংহত করা। এবং নগর ও গ্রামে সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য যে সব দক্ষতা প্রয়োজন নিজের মধ্যে সেগুলো বিকশিত করতে হবে। তার সামাজিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তাকে ইসলামী দায় দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের জন্য মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে এবং মুসলমানরা আল্লাহ এবং উম্মাহর প্রতি যে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য, শিক্ষা এবং মহৎ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাদেরকে সেই সব দায়িত্ব পালনে তৎপর করে তুলতে হবে। বাস্তবে ক্রিয়াকাণ্ডের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই নারীর জন্য উন্মুক্ত, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তার প্রয়োজন ভিসম্ভাবিত এমন সব পেশা রয়েছে যেগুলো কেবল নারীদের দ্বারাই পরিচালিত হতে পারে তবে বর্তমান প্রজন্মে নারীদের ক্রিয়া কর্ম সংহত করার জন্য যে প্রয়াসই চালানো হউক না কেন, মুসলিম সমাজের তার চাইতে অনেক বেশী প্রয়োজন রয়েছে, মুসলিম মহিলা কর্মীদের

টীকা

১. দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখুন Norman W. Bell Ges Ezra F. Vogel. eds. The Family (Glencoe. Illinois: The Free Press 1960) অধ্যায়-৪।

২. William F. Kenkel. The Family in Perspective (New York: Meredith Corporation, 1973).

৩. তোমাদের এই উম্মাহ্ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমার দাসত্ব কর (২১: ৯২) তোমাদের মধ্যে হউক এমন এক উম্মাহ্ যা মানুষকে সৎ কাজের দিকে আহ্বান করে, সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কর্ম নিষেধ করে, এরাই সফলকাম (৩: ১০৪)।

৪. তোমাদের এই উম্মাহ্ এক, ঐক্যবদ্ধ, অবিভাজ্য, আমি তোমাদের একমাত্র রব। আমাকে ভয় কর। তা সত্বেও মানুষ নিজেদেরকে দল উপদলে বিভক্ত করে এবং প্রত্যেকে নিজের জবস্থান নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। কিন্তু তারা তাদের বিভ্রান্তিতে ও কেবল অল্প সময়ই স্থায়ী হবে (২৩: ৫৪)। জাহিলিয়ার দিনগুলোর মত অবিশ্বাসীদের অন্তর উত্তেজনা ও বিক্ষোভে কম্পিত হয়, কিন্তু আল্লাহর নবী এবং বিশ্বাসীদের হৃদয় স্বীকৃতিতে ও আত্মপ্রত্যয়ে স্বস্তিভোগ করে। “কারণ তারা এর উপযুক্ত এবং এর জন্য নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী… আল্লাহ সবকিছু অবগত”। আল্লাহ তাদেরকে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা হচ্ছে পবিত্রতা ও সৎকর্মের দায়িত্ব (৪৮: ২৬)।

৫. ইহা আল্লাহর এক নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে, তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের মধ্যে আনন্দ পেতে পার এবং তিনি তোমাদের ও তাদের মধ্যে মহব্বত ও করুণা সৃষ্টি করেছেন। যারা চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য এটি নিশ্চয়ই একটি মহাসাক্ষ্য (৩০: ২১)।

৬. তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদেরই, যেন তোমরা পবিত্রভাবে তাদের সঙ্গে মিলিত হও, তাদের সঙ্গে যখন ইচ্ছা তোমরা মিলিত হও, কিন্তু তৎপূর্বে কিছু সৎকর্ম করে নাও; আল্লাহকে ভয় কর ও স্মরণ রাখ যে, তার সম্মুখে তোমাকে দাঁড়াতে হবে। হে নবী, বিশ্বাসীদের জন্য শুভ সংবাদ দাও (২: ২৩) এবং তারা যদি আপোষ মীমাংসা চায়, তাহলে তাদের স্বামীদের জন্য উত্তম হবে তাদেরকে আবার গ্রহণ করা। দয়া ও মমতার দিক দিয়ে রমনীদের একই অধিকার আছে পুরুষদের উপর, যেমন আছে পুরুষদের তাদের উপর (২: ২২৮)।

৭. তোমাদের স্ত্রীগণের সাথে ভাল ব্যবহার কর এবং তাদের প্রতি সদয় হও, কারণ তারা তোমাদের অংশীদার এবং ওয়াদাবদ্ধ সাহায্যকারিনী। স্মরণ রাখ যে, তোমরা তাদেরকে তোমাদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছো এবং কেবল আল্লাহর সম্মতি নিয়ে, আল্লাহর আমানত হিসেবে তোমরা তাদের ভোগ করেছো। (Haykal. The Life of Mohammad “Farewell Pilgrimage” p. 446)

৮. সাক্ষী হিসেবে দ্রষ্টব্য একমাত্র বহু সংখ্যক আয়াত যাতে ‘qurba’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (২:৭৭, ৪:৭) ইত্যাদি ।

৯. পরিবার হচ্ছে একমাত্র এলাকা যেখানে কুরআন সাধারণ নীতিমালা ও চূড়ান্ত খুঁটিনাটি বিধি বিধানের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক গণ্য করেছে, যা আমরা দেখতে পাই বিবাহ, তালাক, ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত কুরআনের আইন কানুন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে (যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে)। কুরআন কেবল সাধারণ নীতিমালা দিয়েছে এবং অতি সামান্য খুঁটিনাটি বিধি-বিধান দিয়েছে, কিংবা মোটেই কোনো খুঁটিনাটি বিধান দেয়নি।

১০. পুরুষ বা নারী যে কেহ হউক, যে ঈমান আনয়ন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সৎ কাজ করে, তাকে দেওয়া হবে একটি মহৎ জীবনের মর্যাদা এবং তারা যে সব সৎকর্ম করেছে তার অনুপাতে। তাদেরকে উপকৃত করা হবে (১৬: ৯৭)।

১১. আল্লাহ কাউকে কাউকে যা দিয়েছেন এবং কাউকে কাউকে যা দেননি, তোমরা ঈর্ষাবশত তা কামনা করোনা। পুরুষ এবং নারী প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে যে কর্ম করেছে তার কর্মের দায়িত্ব তারই। আল্লাহর কাছে তার প্রাচুর্য থেকে প্রার্থনা কর, তিনি সবকিছু জানেন (৪: ৩২)।

১২. তাদের রব তাদেরকে এই উত্তর দিয়েছেন যে, তাদের কোন সৎকর্মই তিনি নষ্ট হতে দেবেন না। পুরুষই করুক কিংবা স্ত্রীলোকেই করুক, তারা একে অন্য থেকে সৃষ্ট (৩: ১৯৫)।

১৩. (হে রমনীগণ) প্রাক ইসলামী রমণীদের মত তোমরা নিজেদেরকে প্রকাশ করোনা (৩৩: ৩৩)। হে মোহাম্মদ, বিশ্বাসী পুরুষগণকে বল, তারা তাদের সততা রক্ষা করার জন্য যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত করে, এটি হচ্ছে তাদের জন্য শোভন পবিত্র পন্থা লক্ষ্য কর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। বিশ্বাসী মহিলাগণকেও বল, তাদের সতীত্ব রক্ষা করার জন্য, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত করে এবং তাদের অলংকার কিংবা সৌন্দর্যের, যা স্বভাবতই ব্যক্ত, তাছাড়া অন্য কিছু তারা যেন প্রদর্শন না করে (২৪: ৩০-৩১)।

১৪. প্রাগুক্ত।

১৫. রমণীগণ কেবলমাত্র তাদের স্বামী ও পিতামাতাগণ ছাড়া আর কাউকে তাদের সৌন্দর্য এবং অলংকার প্রদর্শন করবেনা (২৪: ৩১)।

১৬. ইহা তার একটি নির্দশন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন যেন তোমরা তাদের মধ্যে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন মহব্বত ও দয়ামায়া, যারা চিন্তাভাবনা করে, তাদের জন্য এগুলো হচ্ছে তাৎপর্যপূর্ণ ও নিদর্শন (৩০: ৩১)।

১৭. শরীয়াহর যে কোন কিতাব দেখুন (যেমন ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের খুঁটিনাটির জন্য আল যাজিরির আল ফিকহ আল মাযাহাব আল-আরবাসা।)

 

অনুবাদঃ অধ্যাপক শাহেদ আলী।

৩৬৫ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী (১৯২১-১৯৮৬) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অথরিটি হিসেবে সুপরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। তার জন্মভূমি ফিলিস্তিনে কলেজ শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৪১ সালে তিনি বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক; যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর নেওয়ার পর ১৯৫২ সালে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন । ফারুকী এ সময়ে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি- এ তিনটি ভাষায় গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ এ চার বছর ইসলামের ওপর উচ্চতর অধ্যয়ন ও গবেষণা করে কাটান। পরবর্তীতে মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলাম ধর্ম ও আমেরিকার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মের ওপর পোস্ট ডক্টরেট করেন। ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয় । স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৪৫ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ফিলিস্তিন সরকারের গ্যালিলির জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন। এভাবে প্রশাসনিক ক্যারিয়ার দিয়ে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার প্রশাসক জীবনের অবসান ঘটে, যখন ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী ইসরাইলী দখলদার বাহিনী ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে ফিলিস্তিনীরা নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে যান। হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মুসলিম পরিবারের মতো ফারুকীর পরিবারও ফিলিস্তিন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে লেবাননে আশ্রয় নেন। এ ছিলো ফারুকীর জীবনের সন্ধিক্ষণ মুহূর্ত। শত অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি নিজের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার গঠনে সফল হন। আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত করাচীর ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক রিসার্চ এ অধ্যাপক হিসেবে, ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমেরিকার টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে Islamic and History of Religions এর অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । এছাড়া তিনি বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়ালিজম-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ইসমাইল ফারুকী শুধু আত্মিকভাবে ইসলামের ধারণা ও মূল্যবোধকে তুলে ধরেননি; নিজের কাজকর্ম, গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন। ড. রাজী বহু আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ম্যাগাজিনে শতাধিক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন। তার প্রকাশিত The Cultural Atlas of Islam, Historical Atlas of the Religions of the World, Trialogue of the Abrahamic Faiths, Christian Ethics, Al Tawhid : Its Implications for Thought and Life. প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৯৮৬ সালের ২৪ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজ বাসায় আততায়ীর গুলিতে অধ্যাপক ইসমাইল রাজী আল ফারুকী ও তার স্ত্রী লুইস লামিয়া ফারুকী শহীদ হন। এ শাহাদাতের মধ্য দিয়ে এ কালে মুসলিম চিন্তার জগতের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা খসে পড়ে এবং একজন সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবীর কর্মঘন জীবন নীরব হয়ে যায়। তথাপি বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামি চিন্তার বিকাশে অগ্রপ্রতীক হিসেবেই বিবেচিত ড. ফারুকী।
Picture of ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী

ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী (১৯২১-১৯৮৬) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অথরিটি হিসেবে সুপরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। তার জন্মভূমি ফিলিস্তিনে কলেজ শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৪১ সালে তিনি বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক; যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর নেওয়ার পর ১৯৫২ সালে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন । ফারুকী এ সময়ে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি- এ তিনটি ভাষায় গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ এ চার বছর ইসলামের ওপর উচ্চতর অধ্যয়ন ও গবেষণা করে কাটান। পরবর্তীতে মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলাম ধর্ম ও আমেরিকার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মের ওপর পোস্ট ডক্টরেট করেন। ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয় । স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৪৫ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ফিলিস্তিন সরকারের গ্যালিলির জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন। এভাবে প্রশাসনিক ক্যারিয়ার দিয়ে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার প্রশাসক জীবনের অবসান ঘটে, যখন ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী ইসরাইলী দখলদার বাহিনী ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে ফিলিস্তিনীরা নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে যান। হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মুসলিম পরিবারের মতো ফারুকীর পরিবারও ফিলিস্তিন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে লেবাননে আশ্রয় নেন। এ ছিলো ফারুকীর জীবনের সন্ধিক্ষণ মুহূর্ত। শত অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি নিজের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার গঠনে সফল হন। আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত করাচীর ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক রিসার্চ এ অধ্যাপক হিসেবে, ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমেরিকার টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে Islamic and History of Religions এর অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । এছাড়া তিনি বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়ালিজম-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ইসমাইল ফারুকী শুধু আত্মিকভাবে ইসলামের ধারণা ও মূল্যবোধকে তুলে ধরেননি; নিজের কাজকর্ম, গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন। ড. রাজী বহু আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ম্যাগাজিনে শতাধিক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন। তার প্রকাশিত The Cultural Atlas of Islam, Historical Atlas of the Religions of the World, Trialogue of the Abrahamic Faiths, Christian Ethics, Al Tawhid : Its Implications for Thought and Life. প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৯৮৬ সালের ২৪ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজ বাসায় আততায়ীর গুলিতে অধ্যাপক ইসমাইল রাজী আল ফারুকী ও তার স্ত্রী লুইস লামিয়া ফারুকী শহীদ হন। এ শাহাদাতের মধ্য দিয়ে এ কালে মুসলিম চিন্তার জগতের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা খসে পড়ে এবং একজন সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবীর কর্মঘন জীবন নীরব হয়ে যায়। তথাপি বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামি চিন্তার বিকাশে অগ্রপ্রতীক হিসেবেই বিবেচিত ড. ফারুকী।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top