সিনেমা কি দর্শনের অংশ কিংবা ‘মত’ হতে পারে? সিনেমার মতো ‘ছায়া বাস্তব’ মাধ্যমে দর্শনের মতো বিষয়কে কি কোনোভাবে উপস্থাপন করা যায়? এ দুটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে আজকের আলাপ। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন চর্চার কোন চল নেই আর সিনেমার মত “বিনোদন মাধ্যমে দর্শন অনুসন্ধান তো খুব দূরের কথা। কিন্তু এ আলাপ জরুরি। সিনেমা কিভাবে দর্শনের সাথে সাদৃশ্য বজায় রেখেছে এবং দর্শনের বিভিন্ন অনুষঙ্গকে আত্মীকৃত করে নিয়েছে কিংবা একটা জনঘনিষ্ঠ মাধ্যমে কিভাবে দর্শন কাজ করে, কিভাবে সিনেমার অন্তর্ভুক্ত দর্শন, দর্শকের মন ও আচরণে প্রভাব ফেলে এবং কিভাবে এ মাধ্যমটিকে দর্শকের নতুন রুচি নির্মাণে কাজে লাগানো যায় এ বিষয়ক বিবিধ নিরীক্ষা শুরু করার জন্যই প্রয়োজন এই আলাপ। খুব সংহতভাবে এ আলোচনা করা হয়নি। কেবল এ বিষয়ে আগ্রহ উসকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সিনেমার দর্শন: খুচরা কথায়
•প্লেটোর গুহা রূপক এবং ছায়া-বাস্তবতা
রিপাবলিকের সপ্তম পুস্তকে সক্রেটিস একটি গুহার রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে গুহার শৃঙ্খলিত মানুষের সামনে উপস্থাপিত (আরোপিত?) ছায়া-বাস্তবতা, সত্যের সন্ধান, সত্য গ্রহণে ক্রমশ অভ্যস্ত হওয়া ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ রূপক প্লেটোর ‘আইডিয়া’ এবং ‘ফর্ম’ এর ভালো উদাহরণ। আমাদের দেখা সত্যের বাইরে একটা ভাব-সত্য’ আছে। আমরা কেবল ছায়া-সত্য দেখতে পাই। মূল সত্য দেখতে পাইনা । সত্যকে খুঁজতে হয়। সিনেমাকেও প্লেটোর এ গুহা রূপকের সাথে তুলনা করা যায়। রিপাবলিক থেকে- “আমি বললাম …… গ্লকন, কল্পনা করো, সমগ্র মনুষ্যজাতি মাটির নিচে একটা গুহার মধ্যে বাস করছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের আলোর দিকে গুহার একটি মুখ আছে। মুখটি ভূপৃষ্ঠ থেকে গুহা পর্যন্ত দীর্ঘ। এই গুহার মধ্যে সব মানুষ তাদের শৈশব কাল থেকেই রয়েছে। তাদের পা এবং গলা শেকল দিয়ে আবদ্ধ। ডানে, বাঁয়ে কিংবা পেছনে মুখ ফেরাতে তারা অক্ষম। শেকল তাদের মাথার এরূপ সঞ্চালনকে আটকে রাখে। গুহার দেয়ালের দিকেই তাদের মুখ ঘোরানো। তাদের সম্মুখের দেয়ালটিই কেবল তারা দেখতে পায়।
এবার কল্পনা করো, তাদের পশ্চাতে মাটির উপরে গুহার বাইরে কিছুদূর আগুন জ্বলছে। বন্দি মানুষ এবং বাইরের আগুন- এ দুয়ের মধ্যভাগে রয়েছে উঁচু একটি পথ। তুমি খেয়াল করলে দেখতে পাবে যে এই পথ ধরে তৈরি হয়েছে একটি নিচু দেয়াল, একটি পর্দার মতো। যেমন- ছায়ানৃত্যের নৃত্যশিল্পীরা সামনে থাকে, যে পর্দার উপর শিল্পীরা তাদের পুতুলদের নাচ দেখায়। ছবিটি তুমি দেখতে পাচ্ছ গ্লকন?
-হ্যাঁ, আমি দেখছি।
-এবার তুমি খেয়াল কর। দেখবে নিচু দেয়ালটির পথ ধরে একদল লোক চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে বিভিন্ন রকম বস্তু আছে; পাথর, কাঠ কিংবা অন্য কিছুতে তৈরি নানা পাত্র, মূর্তি, পশুর প্রতিকৃতি। এরা কেউ কেউ কথা বলছে। কেউ নীরবে অগ্রসর হচ্ছে। আর এ শোভাযাত্রার ছবিটি আগুনের আলোতে গুহার ভেতরে তার দেয়ালে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।
-এটা এক অদ্ভুত ছবি তৈরি করেছ, সক্রেটিস। তোমার বন্দিরাও অদ্ভুত ধরনের বন্দি।
-আমি বললাম, বন্দিরা আমাদের মতোই তাদের মুখ দেয়ালগাত্রে ফেরানো। আলোর প্রতিভাসে তারা কেবল তাদের কিংবা একে অপরের ছায়াই দেখতে পায়।
-একথা সত্য। তাদের মাথা যদি আদৌ সঞ্চালন করতে না পারে তাহলে ছায়া বৈ অপর কিছু তারা কেমন করে দেখবে?
-এখন ধরো, বন্দিরা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করছে। এই আলাপে তারা তাদেরসম্মুখে দেয়ালের ছায়াকেই কি সত্য বস্তু বলে পরস্পরের নিকট উল্লেখ করবে না?
-অবশ্যই তারা তা-ই করবে।
-তাছাড়া মনে করো, গুহার মধ্যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তাহলে বাইরের মিছিলের যে-শব্দ গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হবে, সে-শব্দকে কি তারা তাদের সম্মুখের ছায়াদের উচ্চারিত শব্দ বলেই মনে করবে না?
-নিঃসন্দেহে ।
-তা হলে তাদের কাছে সত্য হচ্ছে প্রতিকৃতির ছায়ামাত্র।
-অবশ্যই তা-ই।
বেশ, এবার দ্যাখো, বন্দিরা যদি মুক্তি পায় এবং তাদের ভুল ভাঙে তা হলে কী ঘটে।” (সপ্তম পুস্তক, ৩৩৩-৩৩৫ পৃ.)
সিনেমা যে দর্শনের ‘মত’ হতে পারে, দর্শনের নানা বিষয়কে ফলপ্রসু উপায়ে তুলে ধরতে পারে এ বিষয়ে গত শতাব্দিতে অনেক সিনে-তাত্ত্বিকগণ আলাপ করেছেন। তাদের আলোচনা-সমালোচনা-সিদ্ধান্তের সারকথা এখানে উপস্থাপিত হয়েছে।
প্লেটোর ‘ছায়া দর্শন’ এর প্রভাবে সিনেমাকে ছায়া-সত্য বা ছায়া-বাস্তবতা হিসেবে দেখা হয়েছে। দর্শন যেখানে বাস্তব বা সত্য কে নিয়ে কাজ করে, সিনেমা কাজ করে কাল্পনিক বা অলীক বিষয়াদি নিয়ে। দর্শনের কাজ সর্বজনীন, কিন্তু সিনেমার কাজ ‘সীমাবদ্ধ’ এবং এটা বিশেষ কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করে। আর দর্শনের কাজ সত্যানুসন্ধান, বিপরীতে সিনেমার কাজ বিনোদন। দর্শন হলো দেখা সত্য থেকে বেরিয়ে ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গি সহযোগে ক্রমাগত আসল সত্যানুসন্ধান। কিন্তু সিনেমা অলীক প্রদর্শন মাত্র, যেখানে বাস্তবতা নেই কিংবা বাস্তবতা অনুসন্ধানের চেষ্টাও নেই। কিন্তু এসব যুক্তি সত্ত্বেও সিনেমা-দর্শন এগিয়ে গেছে।
কারণ, সিনেমা বাস্তবের উপস্থাপনে সক্রিয় হয়েছে। কেবল অলীক কল্পনাশ্রয়ী ও ‘বুর্জোয়া’ মাধ্যমে থাকেনি। সিনেমা ভেরিতে, নিও-রিয়ালিস্ট আন্দোলন ইত্যাদি পর্যায় পার হয়ে সিনেমা এখন বাস্তবের উপস্থাপনও বটে। সিনেমায় ইতিহাস, যুদ্ধ, সত্য ঘটনার উপস্থাপন ঘটেছে। কিন্তু পরিচালকের ‘আরোপ’ বা শেকল থেকে কি সিনেমা বের হতে পারে?
এ ক্ষেত্রেই যুক্তি দেখানো হয়, সিনেমা দর্শন হতে পারে না কেননা এটা দেখা সত্য বা অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দেয়। কারো একপাক্ষিক ‘চাপানো’ প্রদর্শনকে মেনে নেয়, দর্শক এখানে পরিচালকের ‘আরোপিত শৃঙ্খল’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর দর্শন মানে হল এ ‘গুহা” ও ছায়া’র শৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল প্লেটোর এ ধারণাকেও সিনেমা ব্যবহার করে সিনেমাটিক উপায়ে, দর্শনের বিমূর্ত রূপের বিপরীতে মূর্ত বাস্তব হিসেবে। যেমন, ট্রুম্যান শো।
এবার সিনেমায় দর্শন –
সিনেমা দর্শন ব্যবহার করতে পারে, ‘চিন্তন পরীক্ষণ হিসেবে তথা চলমান চিন্তাধারাকে প্রশ্ন করা, চিন্তা-প্রতিচিন্তা উপস্থাপনের মাধ্যমে। কোনো তত্ত্বের নতুন বিবেচনা হাজির করার মাধ্যমে। চিন্তন পরীক্ষণের কিছু কিছু অন্তর্নিহিতভাবেই সিনেমাটিক। এর প্রমাণ দেখা যাবে দেকার্তের ‘ড্রিম হাইপোথেসিস’ প্রভাবিত ‘ম্যাট্রিক্স’ সিনেমায়। দর্শন নিয়ে সিনেমার কাজ বিবিধ হতে পারে। দার্শনিক নিয়ে- ডেরেক জার্মান এর ভিটগেনস্টাইন (১৯৯৩)। চরিত্র কর্তৃক দর্শনের আলোচনা- রিচার্ড লিঙ্কলেটারের ওয়েকিং লাইফ (২০০১)। কিংবা দার্শনিক গ্রন্থের সিনেমাটিক উপস্থাপন- জ্যা জ্যাক আনাউদের ‘দ্য নেম অব রোজ (১৯৮৬)।
কিন্তু সিনেমা চিন্তন পরীক্ষণ তুলে ধরলেও তো এটা সর্বাত্মকভাবে দর্শন কেন্দ্রিক হবে না; বরং এটা হবে শৈল্পিক। শিল্পের কাজ হল কাল্পনিক তাই সত্য থেকে যোজন যোজন দূরে- এ প্লেটোনিক চিন্তা থেকেই এ আপত্তি। যদিও সিনেমা গাঠনিক দিক থেকে শৈল্পিক এ অভিযোগে সিনেমার বাস্তব উপস্থাপনের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।
আর সিনেমার মাঝে অস্পষ্টতা আছে, সুনির্দিষ্টতা নেই, তাই দর্শনের মতো সুনির্দিষ্টতার উপস্থাপন সিনেমায় সম্ভব না। সিনেমা প্রকাশের জায়গা থেকেও দর্শনের মতো স্পষ্ট নয়। বিপরীতে বলা যায়, সিনেমা তো সবসময় দার্শনিক বিষয়াদি স্পষ্টভাবে বুঝাবে না। বিচিত্র উপস্থাপনে দর্শনের নানা অনুষঙ্গ উপস্থিত করা হবে। আর সিনেমা সর্বদা দ্ব্যর্থক ও অনির্দিষ্ট নয়।
যারা সিনেমায় দর্শনের উপস্থাপনে আগ্রহী তাদের চিন্তা হলো, স্বাধীনভাবে যেন দর্শনের উপস্থাপন ঘটে, কেবল কথোপকথনে কিংবা দৃশ্যায়নে নয়; বরং সিনেমার অন্তর্নিহিত অর্থ যেন দর্শন-সঞ্জাত হয়। সিনেমায় যেন কেবল দার্শনিকের দর্শনের বয়ান না থাকে, সেখানে যেন যুক্ত হয় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তির যাচাই-বাছাই, সিরিয়াস চিন্তন। সেখানে দার্শনিক চিন্তা এবং সক্রিয় দর্শন উপস্থাপন থাকবে।
আর সিনেমায় প্রচলিত কথ্য ও লেখনী মাধ্যমের দর্শন চর্চার চাইতে সক্রিয় এবং ফলপ্রসূ দর্শন চর্চা সম্ভব। বিমূর্ত চিন্তার মূর্ত এবং জীবন্ত উপস্থাপনে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শন চর্চা করা যায় সিনেমায়। মজার বিষয় হলো, প্লেটোর গুহা থেকে বের হওয়ার সাহস দেখানো হচ্ছে এখন সিনেমায়, ট্রুম্যান শো। মূলত, সিনেমায় দর্শন হবে বিদ্যমান চিন্তার উপস্থাপন, নতুন চিন্তার উদ্বোধন, আমাদের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত চিন্তায় ধাক্কা দেওয়া, নতুন অভিজ্ঞতা প্রদর্শন। বাহ্য সত্য ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব প্রদর্শনে সত্যের পথে যাত্রা যেমন ডেভিড লিঞ্চের ‘মুলহোল্যান্ড ড্রাইভ’। সিনেমা কেবল দর্শন বুঝার উৎসই হবে না কিংবা বিদ্যমান দার্শনিক চিন্তাধারার প্রতিফলন হবে না; বরং স্বাধীন ও সক্রিয় চিন্তার উৎসে পরিণত হবে।
কিন্তু আলোচনা চলল। বলা হলো সিনেমা তো আর নিজে নিজে দর্শন বলে না। বলেন নির্মাতা বা দার্শনিক। আবারো শৃঙ্খল ও আরোপ। পরিচালক এখানে ‘বিশেষ’ বিষয়। উপস্থাপন করেন, সর্বজনীন নয়। কিন্তু দর্শকেরও তো একটা ‘নেওয়া’র মতো বিষয় রয়েছে। দর্শক কিভাবে বিষয়টাকে নিবে তার উপরও নির্ভর করে সিনেমাটি সত্যিই ‘দর্শন’ কিনা। এখানেই প্যারাডক্স। দর্শকের সামনে উপস্থাপিত ছায়া-বাস্তবতা কিংবা বাস্তব থেকে বের হওয়ার স্বাধীনতা কি তার আছে? এ স্বাধীনতা অর্জনই দর্শন। দর্শনের ভেতর দর্শন।
শুরু হলো দর্শকের স্বাধীনতা এবং আরোপ বিতর্ক। যদি সিনেমাকে পরিচালক- কেন্দ্রিকই ধরে নেওয়া হয়, তবে পরিচালকের আগ্রহ, ইচ্ছা, ব্যাখ্যাকে কে ঠিক করবে? আর সবসময় পরিচালকের দার্শনিক মন থাকে না। হয়তো কোনো আইডিয়াকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি গড়ে উঠেছে, দর্শক-সমালোচক পরবর্তীতে দর্শন আবিষ্কার করে নিল। দর্শক এক্ষেত্রে স্বাধীনতা লাভ করে। কখনো কখনো পরিচালকের শৈল্পিক উপস্থাপনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে। এটাই হল দর্শক-কেন্দ্রিক ব্যাখার মূলকথা এবং ‘আরোপে’র শৃঙ্খল ছুঁড়ে ফেলে স্বাধীন হওয়া। আমরা যখন কোনো গল্প-উপন্যাস পড়ি, তখন কেবল লেখক আমাদের সামনে থাকে না, থাকে আমাদের বাস্তবতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা। এর ফল হয় মিশ্র কিংবা একটা আলাদা সত্যে উপনয়ন। সময়ের আবর্তনে ওই গল্পের অর্থ- ব্যাখ্যা বদলে যায়। এখানেই দর্শকের স্বাধীনতা। তাই, সিনেমাটিক ‘আরোপের যুক্তি ধোপে টিকে না। এখানেই দর্শককে ‘ট্রুম্যান’ হয়ে উঠতে হয়। আর না হতে পারলে তিনি গুহাবাসীই থেকে যান। আসলে সিনেমা ও দর্শনের অবস্থান কাছাকাছি। উভয়ের মাঝে অনেক মিলের জায়গা রয়েছে। পার্থক্য ঘটে কেবল সত্য উপস্থাপনের মাত্রায় এবং উপস্থাপন প্রক্রিয়ায়।
• রাষ্ট্রদর্শন আর সিনেমার মোকাবেলা
দর্শনের মূল প্রশ্নগুলো যেমন, মানুষ কী ও কেন, হক ও হাকীকত কি, মানুষ ও খোদার মধ্যকার সম্পর্ক কী ইত্যাদির একটি যৌক্তিক পরিণতি ঘটে রাষ্ট্রদর্শনে এসে। এ আলোচনায় তাই রাষ্ট্রদর্শনের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সাপেক্ষে সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা হলো-
চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস (১৯৩৬) নিয়ে গৌতম ভদ্র লিখেছেন, ‘মডার্ন টাইমস ছবির দুটি ধারা। একটা যন্ত্র সভ্যতার সমস্যা এবং অন্যটা ক্ষুদে মানুষ বা ভবঘুরের স্বপ্ন। এই ছবিতে দুটি বিপরীতমুখী ধারার সংঘাত দেখা যায়। একদিকে ছবির প্রথমে ও কয়েকটা জায়গায় যন্ত্রসভ্যতার কাছে ব্যক্তিসত্তার অবলোপ, অন্যদিকে বেশির ভাগ দৃশ্য সিটি লাইটের প্রণয় ভাবালুতা এবং ভবঘুরের স্বপ্ন। চ্যাপলিন মূলত নিজের দেখা অভিজ্ঞতার বয়ানই চিরচেনা ভবঘুরে ভঙ্গিতে এ সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছেন। “ started from an abstract idea, an impulse to say something about the way life is standardized and channelized, and men turned into Machines- And the way I felt about it” (গৌতম ভদ্র, চার্লি চ্যাপলিন ও মার্কিন সমাজ, ৭৮-৮০ পৃ.)
মার্ক্স তার Economic and Philosophical Manuscripts of 1844 এ পুঁজিবাদী সিস্টেমে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে চার ধরণের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। উৎপাদিত পণ্য, (মানসিকভাবে) উৎপাদনের কাজ, মানবপ্রকৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ, অন্যান্য শ্রমিকদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।
গৌতম যেন মার্ক্সের শ্রমিক শ্রেণির বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বের তাফসীর করছেন- কাজের মধ্য দিয়েই মানুষের সত্তার বিকাশ হয়। কিন্তু যন্ত্রের আধিপত্যে কাজ তার সব ছন্দ হারিয়ে ফেলে। কাজের ফল ও সময়ের উপর কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সব কিছুই অন্যের ইচ্ছাধীন, মানুষ শুধু একঘেঁয়েভাবে কাজ করে। কাজের গতির পরেও নিয়ন্ত্রণ অন্যের। ইচ্ছামত তাকে বাড়ানো কমানো হয়। মানুষকে তাতে সাড়া দিতে হয় মাত্র। মানুষের ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে তার কাজের বিচ্ছিন্নতাই গোটা ছবির প্রথম দৃশ্যের মূল বিষয়। (ভদ্র, ঐ, ৮০ পৃ.)। মার্ক্সের মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অবশ্য শর্ত হলো শ্রমিক শ্রেণি সমূহের ক্রমবর্ধমান দুর্দশায়নের সূত্র (Law of immiserization of the working classes), যা এ সিনেমায় দেখানো হয়।
• কনফুসিয়ানিজম এবং এশিয়ান ভ্যালুজ
অমর্ত্য সেন বলছেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ায় কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ন্যায্যতা দেয়ার প্রয়োজনে প্রায়ই এশিয়ান ভ্যালুজের মতো বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। আর এটা স্বাধীন ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে আসেনি, এসেছে ঐসব কর্তৃপক্ষ তথা সরকারি আমলা ও মুখপাত্র কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রের আশেপাশে থাকা লোকদের পক্ষ থেকে।” মূলত এশিয়ান ভ্যালুজের পক্ষভুক্ত লোকেরা কনফুসিয়াসের ‘আনুগত্য’ তত্ত্বকে ধার করে তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে জায়েয করে। যদিও অমর্ত্যের মতে, “কনফুসিয়াস কখনো রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্যেকে সমর্থন করেননি।” ঘিলু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কিভাবে রাজপুত্রের সেবা করতে হবে? কনফুসিয়াসের উত্তর ছিল, “তাকে সত্য বল, যদিও সে আহতবোধ করে।” বেইজিং ও সিঙ্গাপুরের সেন্সরশীপের দায়িত্ব অধিকারীরা অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। কনফুসিয়াস বাস্তব সতর্কতা এবং কৌশলের বিরুদ্ধে নন, কিন্তু খারাপ সরকারের বিরোধিতা করার পরামর্শ দিতেও ভুল করেননি। “যখন রাষ্ট্রে ভালো পথ (ইয়াঙ) বজায় থাকে, তখন বলিষ্ট কণ্ঠে বল এবং সাহসের সাথে কাজ করে যাও, কিন্তু রাষ্ট্র যখন পথ হারায় (ইন), সাহসের সাথে কাজ চালিয়ে যাও এবং নম্রভাবে কথা বল।” বস্তুতঃ কনফুসিয়াস এ বাস্তবতা দেখিয়ে। দিয়েছেন যে কল্পিত এশিয়ান ভ্যালুজের গঠনের দুটি স্তম্ভ তথা পরিবারের প্রতি ভক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, পরস্পরের মাঝে তুমুল সংঘাত ঘটতে পারে। এশিয়ান ভ্যালুজের অনেক প্রবক্তাই পরিবারের ভূমিকার প্রসারণের অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রের ভূমিকার কথা বলেন, কিন্তু কনফুসিয়াসের দর্শন মতে দুটির মাঝে সংঘাত থেকেই যাবে। (অমর্ত্য সেন : Development as Freedom, PP, ২৩১-২৩৫ )
•দুটি সিনেমায় নজর
এবার এশিয়ান ভ্যালুজ রক্ষাকারী ‘দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ান’ (লি কুয়ান ইউ এর কথামতে) দুটি সিনেমায় নজর দিই।
হিরো (২০০২)- ‘তিনজন আততায়ীর একীভূত চীনের প্রথম রাজাকে (চিন শি হুয়াও) হত্যার ইচ্ছা, হত্যার ব্যাপারে দ্বিধা (কারণ, একীভূত চীনের জন্য রাজাই যোগ্য), অন্তর্দ্বন্দ্ব, সবার মৃত্যু। এ সিনেমায় বারবার ব্যবহৃত থিয়ানসিয়া তথা ‘আকাশের নিচের সকলে বলতে প্রাচীন চীনে বুঝাত, আসমান জমীন যা স্বর্গীয়ভাবে সম্রাটকে শাশ্বত বিধানমতে প্রদান করা হয়েছে। আর এ শব্দটিই একীভূত চীনের স্বপ্নকে সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।
এ সিনেমায় রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্রের ‘আনুগত্য’ পূর্বক যে আত্মত্যাগ এবং চিন্তার প্রদর্শনী ঘটে, তা কর্তৃত্ববাদী সরকারকেই কেবল শক্তিশালী করে এবং করবে এবং সকল স্বৈরাচারীই জনগণকে এ ধারণা দিতে চেষ্টা করেন যে, দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতি রক্ষার জন্য তিনিই কেবল যোগ্য। হিটলার এরকমই করেছেন আর ট্রাইয়ুম্প অব উইল -এ লেনি রেইফেন্সটাল এই জিনিসই দেখিয়েছেন।
• সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ‘অপর’ পক্ষ-
নাইন ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে আমেরিকা সারা বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ঠিক প্রচলিত যুদ্ধ নয়; বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের সহায়তাকারী সরকারকে সর্বোতভাবে প্রতিরোধ, আক্রমণ। ‘অপর’ ধারণা একসময় প্রাচ্যে তথা পাশ্চাত্যের অপর যেকোনো অঞ্চলে পাশ্চাত্যের উপনিবেশকে বৈধতা দিয়েছিল, আবার তা এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাশ্চাত্যের ‘নয়া-উপনিবেশায়নে’ ভূমিকা রাখছে। মূলত ইসলাম ও মুসলিম ‘অপর’কে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে সন্ত্রাসী হিসেবে, আধুনিকতা ও সভ্যতার শত্রু হিসেবে। “বুশ যখন বলেন, তারা কেন আমাদের ঘৃণা করে?” তখন এটা সে দার্শনিক বিভাজনকেই স্পষ্ট করে তোলে যেখানে পাশ্চাত্যের বাইরের লোকদের সাথে সভ্য পাশ্চাত্যের সম্পর্ক হলো, ‘নিজ’ পাশ্চাত্য ও ‘অপর’ প্রাচ্য। আর এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যকেই ধরা হয়েছে ‘অপর’ হিসেবে। যেখানে ইসলামের যেকোনো উপস্থিতিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। জন্ম নেয় ইসলামাতঙ্ক। আর এ ‘দেখা’ এবং ‘দেখানো’ তে ভূমিকা রেখেছে পাশ্চাত্যে নির্মিত সিনেমা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশীদার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সিনেমা। (এডোয়ার্ড সাঈদ এর কাভারিং ইসলাম দ্রষ্টব্য)। যুক্তরাষ্ট্র-বনাম তারা এ চিন্তার একটা ধারণাগত কাঠামো নির্মাণ, সত্যিকার অর্থে এ ভান করা যে, মূল বিবেচনা হল জ্ঞানতাত্ত্বিক ও স্বাভাবিক- আমাদের সভ্যতা পরিচিত এবং সর্বজন গৃহীত, তাদেরটা ভিন্ন এবং অদ্ভুত- অথচ আসলে আমাদেরকে যে কাঠামো তাদের থেকে ভিন্ন করে তোলে তা যুদ্ধমান, কৃত্রিমভাবে গঠিত এবং পরিস্থিতি সাপেক্ষ’- বলেছেন সাঈদ।
মূলত সাম্রাজ্যবাদের শত্রু যে যখন, তখন সে আঙ্গিকেই সিনেমা সাম্রাজ্যবাদের দোসর হিসেবে নির্মিত হয়েছে। গৌতম ভদ্রের বইতে দেখা যাবে গত শতাব্দীর প্রথম অর্ধশতকে তারা কম্যুনিজম বিরোধী সিনেমা বানিয়েছে। আবার বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে আরব বিরোধী, প্রো-জায়নিস্ট সিনেমা কিংবা এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সিনেমা ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভিন্ন ধারাও আছে যেমন লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সিনেমা কিংবা আফ্রিকায় ওসমান সেমবেনের সিনেমাকে যদি ওই হিসেবে ধরা যায়। সিনেমায় আইডেন্টিটি পলিটিক্স এবং বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের প্রভাব সমাজে পড়ছে।
জোগাড় যন্তর :
১. Shadow Philosophy: Plato’s Cave and Cinema, Nathan Andersen, Routledge, 2014
২. রিপাবলিক (সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, বাংলা একাডেমি, ১৯৭৬)