মালেক বিন নবী: চিন্তা ও কর্মের সমন্বিত উত্তরাধিকার

একবিংশ শতাব্দীর একবিংশতম বর্ষে পদার্পণ করে যখন আমরা সময়কে বুকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে চলা ইতিহাসের পাতায় নিজেদের অস্তিত্ব ও অবস্থানকে শনাক্ত করার চেষ্টা করি, তখন আমাদের সামনে ভেসে ওঠে একটি ভয়ানক দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি। এমন একটি দ্বন্দ্বের ফিরিস্তি আমাদের সামনে চলে আসে, যার বিস্তৃতি একেবারে সেই সৃষ্টিজগতের শুরু থেকে ঠিক এই মুহূর্ত অবধি বিদ্যমান। কি সেই দ্বন্দ্ব যা এতখানি ব্যাপক ও বিস্তৃত? তা হচ্ছে হক ও বাতিলের চিরন্তন লড়াই। আমরা আজ উপলব্ধি করছি যে, আমরা এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করছি। গোটা বিশ্বজগত আজ একটি ময়দানের ফলাফলের দিকে চেয়ে রয়েছে, যার এক দিকে রয়েছে ‘ভারসাম্য ও মুক্তি’ অপরদিকে রয়েছে ‘বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংস’। ‘সময়’ নামক ময়দানে আজ ভাগ্য পরীক্ষায় অবতীর্ণ সৃষ্টিজগতের দুই পরাশক্তি ‘হক’ ও ‘বাতিল’। আবহমানকাল হতেই আল্লাহ হকের চাদর ইসলামের গায়েই জড়িয়ে রেখেছেন আর বাতিলের সাইনবোর্ড ঝুলেছে একেক সময় একেক জনগোষ্ঠীর গলায়। ইসলাম তো সেই শুরু থেকে ইসলামই রয়ে গিয়েছে, সকল নবী রাসূলের আনীত শরিয়তের ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু আজ আমরা বাতিলের যে চিত্র অবলোকন করি, ফেরাউনের খোদাদ্রোহী উৎস হতে উৎসারিত এই ধারাটি বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে আজ আমাদের সামনে পাশ্চাত্য ওয়ার্ল্ড ভিউ হিসেবে হাজির হয়েছে। আমরা এই উভয় ধারাকেই সংজ্ঞায়ন করে থাকি সভ্যতা হিসেবে; ইসলামী সভ্যতা এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা।

‘সভ্যতা’ পরিভাষাটির ধারণা কিভাবে আমাদের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াল? এই প্রশ্নের উত্তর যখন আমরা ইতিহাসের মাধ্যমে অনুসন্ধান করব, তখন আমাদের সামনে ‘সভ্যতা’ সংশ্লিষ্ট সকল চিন্তাধারা ও তার ব্যাখ্যাকর্মে প্রতিষ্ঠিত মূল প্রভাবশালী পরিভাষাসমূহের দ্বার উন্মোচিত হতে শুরু করবে। বিভিন্ন সভ্যতার বহুভাষা এবং হরেক রকম সাংস্কৃতিক ধারা থেকে ‘সভ্যতা’ শব্দের উত্থান কিভাবে ঘটল তা সুনিশ্চিত করা খুব মুশকিল। বিশেষত মুসলিম এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার আলোকে এর বিশ্লেষণ আরও কঠিন। তাছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে সভ্যতার ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞায়ন আরও বেশি ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। তবে অধিকাংশ গবেষক এখানে একমত যে, “সভ্যতা হচ্ছে সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক সত্তা”। হান্টিংটন সভ্যতাকে- সময় সাপেক্ষ উৎকর্ষ ও ইতিহাসের প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনে খালদুন, টয়েনবিসহ অন্যান্য সভ্যতা বিশারদগণ ধর্মকে সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মালেক বিন নবীও এই কাতারেই। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যেসকল সভ্যতা বিশারদ এসেছিলেন তাদের তালিকায় বর্তমান মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং মৌলিক ব্যক্তিত্ব হলেন মালেক বিন নবী। কারণ তিনিই আমাদের সামনে সর্বশেষ উচ্চকিত কণ্ঠস্বর এবং চিন্তক যিনি একইসাথে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইসলামী সভ্যতার ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার পরিষ্কার ধারাবিবরণী এবং সুগঠিত বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ইবনে খালদুনের রচনাবলীর মাধ্যমে ১৪শ শতকে সর্বপ্রথম ‘সভ্যতা’ পরিভাষাটি মুসলিম সাংস্কৃতিক ধারায় হাজির হয়। পাশ্চাত্যের ‘Civilization’ পরিভাষার সমতুল্য; বরং আরও ব্যাপক ও সামগ্রিক পরিভাষা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন হাদ্বারাহ’ এবং ‘উমরান’ শব্দদ্বয় এবং এ সংক্রান্ত জ্ঞানের নাম দেন ‘ইলমুল উমরান’। ইবনে খালদুন সভ্যতাকে চিত্রায়ন করেন একটি রাষ্ট্র হিসেবে, যেখানে মানুষ একত্রে বসবাস করবে। তার ধারণাসমূহ মানব ইতিহাসের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ তথা ইসলামের সামগ্রিক কল্যাণকামী বৈপ্লবিক চরিত্রের মাঝে নিহিত।

পরবর্তীতে ১৯ শতকের প্রারম্ভে আধুনিক ইউরোপের সাথে ইসলামের প্রথম আদর্শিক দ্বন্দ্বের সময় ‘সভ্যতা’ পরিভাষার ধারনা মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মাঝে অগ্রগতি লাভ করে। ‘হাদ্বারাহ’ এর ধারনা আরব জগতের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ভাষায় ‘মাদানিয়্যাহ’ বা এর সমর্থক শব্দ ব্যবহার হতো- বিন নবী সেখানে ‘Civilization’-কে উঠিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন।

বিন নবী হালের মুসলিম বিশ্বে উদ্ভূত আধুনিকতাপন্থী ও সংস্কারপন্থী উভয় প্রবণতারই সমালোচনা করেন; যারা কিনা শুধুমাত্র মুসলিম উম্মাহর সংকটের কারণ অগোছালোভাবে খুঁজে বেড়ায় এবং এসব সংকটের উপসর্গের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে থাকে অথচ হাকীকত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেনা! তিনি বলেন

“সুসমন্বিত কোনো বোঝাপড়া না থাকায় এসব সংকট মোকাবেলায় ইসলামী রেনেসাঁর প্রচেষ্টা আলো ছড়াতে পারেনি। এই সমস্যার মূল প্রোথিত ছিল ‘আল মুয়াহহিদ’ পরবর্তী যুগ থেকেই। ইতিহাসের পরিক্রমাই মুসলিমদের উপনিবেশ প্রবণ বানিয়ে দিয়েছে। মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থার পেছনে উপনিবেশই একমাত্র মৌলিক কারণ নয়; বরং উপনিবেশ প্রবণ হয়ে পড়াটাই মূল কারণ।”

বিন নবীর সভ্যতার সংজ্ঞায়নগুলো বড়ই বিচিত্র। একটি সমাজের গুরুতর সংকট মোকাবেলায় সামাজিক সক্ষমতা এনে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে তিনি সভ্যতাকে চিহ্নিত করেন। তাছাড়া সভ্যতা মানব জীবনের নৈতিক ও বৈষয়িক বিষয় সমূহের মাঝে সমন্বয় সাধন করে। যেহেতু ঐতিহাসিকভাবেই একটি সমাজ মানুষের কর্মকান্ডের ন্যায়-সঙ্গতি বা ন্যায্যতা- অন্যায্যতা বিধান করে, সেহেতু সমাজই প্রতিটি সভ্যতা গড়ে ওঠার মূল সোপান।

বিন নবী বলেন, মানুষের নৈতিক ও বৈষয়িক বিষয়াবলীই মানবসমাজে মানুষের জীবনযাত্রার মাঝে সমন্বয় সাধন করে ঐক্য ও সংহতি স্থাপন করে। সামাজিক সত্তা ও সভ্যতার গঠনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি ‘সভ্যতা’কে চিহ্নিত করেন। তার ভাষায়

“মানুষ শিখে কিভাবে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করতে হয় এবং মানবজীবনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও কার্যক্রম আঞ্জাম দেয়ার খাতিরে পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করে।”

মালেক বিন নবীর সভ্যতা সংক্রান্ত সুবিখ্যাত তত্ত্ব হচ্ছে, মানুষ+মাটি+সময় = সভ্যতা। অর্থাৎ সভ্যতা হচ্ছে মানুষ, মাটি এবং সময়ের সমন্বিত মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল। মানুষ যেসব কার্যক্রম সম্পাদন করে তা হচ্ছে এই মানুষ (ইনসান), মাটি (তুরাব), সময় (ওয়াক্ত) এর ফলাফল। এই তিনটি উপাদান সকল সমাজেই বিদ্যমান থাকে, এমনকি সভ্যতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি সমাজের জন্য এসব উপাদান অপরিহার্য। যখন আমরা বৈজ্ঞানিকভাবে- গঠিত ব্যক্তিত্ব, শোষিত মাটি এবং অতিবাহিত হয়ে যাওয়া সময়কে বুঝতে পারবো, তখনই সভ্যতা আমাদের প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবা এবং অগ্রগতির তরে মানবিক সহায়তা প্রদান করবে। এখানে মানুষ হচ্ছে সভ্যতার প্রাথমিক উপাদান এবং যেকোনো সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় শক্তি। বিন নবী এখানে মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে মনোনিবেশ করার চেয়ে শুধুমাত্র পারিপার্শ্বিক অবস্থার সংস্কার করে ফেলার জন্য প্রচেষ্টারত সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন,

“সভ্যতার উত্থান হয় সেই সকল সুসংহত লোকের হাত ধরে, যারা কোনো সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য নিজের মানবিক বৈশিষ্ট্যকে তাদের সুমহান আদর্শের আলোকে গড়ে নেয়।”

এক্ষেত্রে বিন নবীর পরামর্শ হলো, একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠাকামী আন্দোলনের ঐকতান প্রতিষ্ঠিত হওয়া, উদ্দেশ্যসমূহের অভিন্নতা থাকা এবং একই ধরনের লক্ষ্যের প্রতি অভিন্ন উৎস হতে উৎসারিত আন্দোলনের মাঝে সংঘর্ষ এড়িয়ে যাওয়া। এটা হচ্ছে বিন নবীর ‘তাওজীহ’ বা ভারসাম্য বিধায়ক তত্ত্ব। তিনি সংস্কৃতিকে- সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে একজন মানুষের ক্ষেত্রে মূল প্রভাবক হিসেবে দেখেছেন এবং সমাজকে একটি সম্মিলিত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যে কোনো সংস্কৃতির ধরণই এর সভ্যতার গতিবিধি সম্বন্ধে বলে দেয় এবং ইতিহাসে এর গন্তব্য কোথায় হবে তা নির্ধারণ করে দেয়।

মালেক বিন নবীর সমীকরণ অনুযায়ী, একটি সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ার উপরোক্ত তিনটি উপাদানের (মানুষ, মাটি, সময়) সংগঠন ও তার দিক দর্শনের ক্ষেত্রে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে থাকে ধর্ম। ইতিহাসে কিছু ব্যতিক্রম বাদে সকল সভ্যতাই ধর্মীয় আদর্শকে সহায় করে সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণের চেষ্টা চালিয়েছে। যা হোক, বিন নবীর মতে, কোনো ধর্মই সভ্যতার উত্থান ঘটাতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম নয় যতক্ষণ না তা এমন কোনো সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করছে, যা একাধারে মানুষ, মাটি এবং সময়কে সমন্বয় করতে সক্ষম।

বিন নবী সমাজের আধিপত্যের প্রকৃতি ও উৎস নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেখানে যেকোনো কার্যক্রমের উপাদান তিন শ্রেণির কোনো এক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবে। বস্তু, ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ। মানুষের দ্বারা যে সব কাজ সম্পাদিত হয়েছে, তার হিসেবের উপর নির্ভর করবে সভ্যতার সাফল্য।

ব্যক্তির ক্ষেত্রে- সামাজিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সভ্যতা তার কার্যক্রম শুরু করে। বিন নবীর আলোচনার এ অংশ একটি সমাজের সম্পর্কের সমষ্টি সম্বন্ধে। সভ্যতার গন্তব্য নির্ভর করে ওই সভ্যতার ব্যক্তিদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের মান বা প্রকৃতির উপরে।
আদর্শের ক্ষেত্রে বিন নবীর কথা হলো, এটি আসে এমন কোনো উৎস থেকে, যেখানে মানুষের মোহ কাজ করে, সাধারণভাবে মানুষ এটা মেনে নিতে চায়। হতে পারে সেটা কোনো ঐশী পবিত্র উৎস অথবা লৌকিক কোনো উৎস। এটি সমাজকে নির্দিষ্ট কোনো মূল্যবোধ বা নীতির দিকে ধাবিত করে। ইসলামী সভ্যতায়, অনুকরণীয় আদর্শিক নির্দেশনা আসে কোরআন এবং সুন্নাহ হতে। বিন নবী সভ্যতাকে এমনভাবে দেখেছেন যে- তা হলো এক ধরণের অভিযাত্রা, যা কোনো প্রাক-সভ্য সমাজকে বৈপ্লবিক আদর্শের বলে বলিয়ান করে, যাতে করে ওই সমাজ ইতিহাসের বুকে পদার্পণ করে সেই মহান আদর্শের আলোকে একটি নিযাম বা সিস্টেম বিনির্মাণ করতে পারে।

আদর্শ, সমাজকে ভিশন প্রদান করে এবং সভ্যতা বিনির্মাণের জন্য মূলনীতি বাতলে দেয়। সেই সাথে এমন এক পন্থা দেখিয়ে দেয়, যা সমাজের সকল সদস্য অনুসরণ করতে পারে। ইতিহাসের বুকে কোন সমাজকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হলে আদর্শ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বস্তু বা অবজেক্টের ব্যাপারে কথা হলো, এটি সরঞ্জাম, নহর- প্রণালী, খনিজ সম্পদ সরবরাহ করে সেই সাথে সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ায় যত প্রকার হাতিয়ার প্রয়োজন তা সরবরাহ করে।

বিন নবী বলেন, কোনো প্রকার ঐতিহাসিক কর্মকান্ড ‘পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক’ ব্যতিরেকে টিকে থাকতে পারে না। এটি তার সমাজের গতিবিধি ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে ‘সমাজ-সাংস্কৃতিক’ দৃষ্টিভঙ্গির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব। উপরোক্ত তিনটি উপাদানের (বস্তু, ব্যক্তি, আদর্শ) পারস্পরিক সম্পর্ক ‘পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক’ তত্ত্বের সারবস্তু নির্দেশ করে। সভ্যতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রে যে কোনো কার্যক্রমের বেলায় এই বিষয়টি উপরোক্ত তিনটি উপাদানের সাথে ন্যূনতম পারস্পরিক সমন্বয় সাধন করে থাকে। কেননা, এই তিনটি উপাদান পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক ব্যতীত কাজ করতে পারে না।

যেহেতু বিন নবী শুরু থেকেই মুসলিম সমাজের পুনর্গঠন, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং যেসব নেতিবাচক বিষয় ইসলামী সভ্যতার পতনকালীন সময় থেকেই মুসলিম সমাজ বয়ে বেড়াচ্ছে, তা থেকে উত্তোরণের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন, তিনি ‘স্বাতন্ত্রের সমাজবিজ্ঞান’র উপর জোর দান করেন। এই নতুন সমাজবিজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় হচ্ছে ‘সমাজ’কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা। তিনি বলেন,

বর্তমান সমাজ একটি ‘স্থবির সমাজ’। পক্ষান্তরে, ঐতিহাসিক সমাজ একটি ‘গতিশীল সমাজ’ (এখানে তিনি ইসলামের সোনালী সমাজ বুঝিয়েছেন)। সুতরাং পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি সমাজের সদস্যদেরকে এমন একটি অবস্থানে সমবেত করা প্রয়োজন- যেখান থেকে তারা সমাজের সুনির্দিষ্ট মিশন এবং ভিশনে পরিণত হয় এমন একটি সাধারণ কার্যক্রমের দিকে ধাবিত হতে পারে।

বিন নবী সভ্যতার পরিক্রমাকে এমনভাবে দেখে থাকেন, “এর ধারণা সংখ্যা ক্রমের মতো, ভিন্ন নয়; বরং একই পথে ধারাবাহিকভাবে বারবার আবর্তন করতে থাকে।” একেক সভ্যতা একেক ধরণের সুনির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী নিজস্ব আবর্তনচক্র পূরণ করে। প্রত্যেক সামাজিক গোষ্ঠীই সভ্যতার বুকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যগত ছাপ রেখে যায় এবং প্রতিটি সভ্যতারই রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। সভ্যতাগুলো যদিও তাদের সম-সাময়িক শর্তাবলীর আলোকে ভিন্ন ভিন্ন, তবে ইতিহাসের পাতায় সকল সভ্যতার পরিক্রমার মূল নকশা কিন্তু প্রায় একই।বিন নবীর মতে, সভ্যতা তখনই তার নিজের চক্রে পরিভ্রমণ শুরু করে যখন ধর্মীয় আদর্শের সাথে তার মৌলিক উপাদান সমূহের সমন্বয় সাধিত হয়। আর তখনই ধ্বংস হয় যখন এর মৌলিক বিষয়াবলী তাদের গতিশীল মিথস্ক্রিয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। প্রতিটি সভ্যতাই ইতিহাসের বুকে তার অবদান রেখে চলে, যতক্ষণ না তার পতন হয়ে যায় এবং মানবতার নেতৃত্ব দান এবং তার উন্নয়ন ঘটাতে অক্ষম না হয়ে পরে। এরপরে আবার নতুন কোনো সভ্যতার পরিভ্রমণ শুরু হয় ইতিহাসের পাতায়। সভ্যতা সমূহের এই ক্ষণস্থায়ী পালাবদল ইতিহাসের বুকে চক্রাকার ঘটনাবলীরই প্রমাণ।

যেকোনো সমাজ এর সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ায় এক সুনির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করবে, এক্ষেত্রে বিন নবী একমত। তার মতে, একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠাকারী সমাজব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে তিনটি স্তরে অবস্থান করে থাকে- প্রাক-সভ্য স্তর, সভ্য স্তর এবং উত্তর-সভ্য স্তর। প্রাক-সভ্য স্তর পার করে একটি সমাজ যখন দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে (সভ্য স্তর) তখন আবার তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। রূহানিয়াত (আধ্যাত্ম), আকলানিয়াত (যুক্তিবোধ), ইহসাস/হাওয়া (অনুভূতি/প্রবৃত্তি)।

সভ্যতার এই চক্রাকার ধারণাটি ইতিহাসে আমাদের অবস্থানকে নির্দিষ্ট করে দেয় এবং পতনের কারণসমূহ বিশ্লেষণে উদ্বুদ্ধ করে। সেই সাথে ভবিষ্যতে অগ্রগতির রাস্তাও দেখিয়ে দেয়। পাশাপাশি এটি সভ্যতার গতিবিধিকে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং এর অন্তর্নিহিত কাঠামোকে বিশ্লেষণ করে মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব নির্ণয় করতে পারে। বিন নবী এই মতবাদটি ইবনে খালদুন থেকে নিয়ে আরও উন্নত করেছেন। তিনি বলেন, মানব সভ্যতা একটি নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে উত্থিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যায়ে (হাওয়া/প্রবৃত্তি) এসে পড়ায় এর সভ্যতাগত মূল্যবোধ নড়বড়ে হয়ে পড়ে, বিচ্যুত এবং বিকৃত হয়। পরবর্তীতে তা নিজের অক্ষ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়। বিচ্যুতির এই পরিভ্রমণই বিন নবীর “Cyclical Theory” এর প্রাসঙ্গিকতা উপস্থাপন করে।

সভ্যতার দাওরানের মাঝে এই তিন পর্যায়ের মাধ্যমে ‘সভ্যতা’ এক পরিস্থিতি থেকে অন্যটিতে একদম স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্থানান্তরিত হয় না; বরং সমাজ এবং মানব সত্তার মাঝে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের গভীর ছাপ রেখে যায়। সভ্যতার তিনটি মৌলিক উপাদান- মানুষ, মাটি ও সময়ের মাঝে ঐতিহাসিক সুদৃঢ় সমন্বয় সাধনে ‘ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনাপ্রবাহ’ অতীব প্রয়োজনীয়। এই সমন্বিত রূপটি একটি সভ্যতার জন্ম ও তার ঐতিহাসিক কর্মকান্ডের প্রারম্ভিক অবস্থানকে নির্দেশ করে। তবে এই পর্যায়ে এসে, এর সামাজিক মূল্যবোধ তখনও ‘হাকীকত’ এর উপর স্থির হতে পারে না।

প্রত্যেকটি সভ্যতার ঊষালগ্নে একটি ধর্মীয় আদর্শ সেই সভ্যতার অগ্রগতির বীজ বপন করে। তখন রূহানিয়াত (আধ্যাত্মিক পর্যায়) জনজীবন ও সমাজকে প্রভাবিত করে থাকে। যখন পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড় হয় তখন সমাজের ছন্নছাড়া মানুষটিও একজন সুসংহত মানুষে পরিণত হয়। যখন ধর্মীয় আদর্শ প্রসারিত হতে থাকে তখন পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক তার সবচেয়ে উপযুক্ত স্তরে অবস্থান করতে থাকে। এমতাবস্থায়, একটি নতুন ব্যবস্থা ও নতুন মানদন্ড প্রতিষ্ঠা করায় সভ্যতাকে কিছু নতুন চাহিদা বা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ক্রমে রূহানিয়াতের পর্যায় দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে; সভ্যতার অগ্রগতি, বৈষয়িক চ্যালেঞ্জের উত্থান ইত্যাদির মাধ্যমে এবং এক পর্যায়ে সভ্যতা দ্বিতীয় স্তর অর্থাৎ আকলী (যুক্তিবাদী) পরিবেশের দিকে ধাবিত হয়।

সভ্যতা যখন ইতিহাসের পাতায় উন্নতি করতে থাকে, তখন এর সব কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায় ‘কারণ’ (The Reason/ Cause)। আকলী বা বুদ্ধি কেন্দ্রিক অবস্থানে যখন সভ্যতা পৌঁছে, সমাজ তখন সবচেয়ে বেশি উন্নত পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক উপভোগ করলেও এর সাথে সাথে কিছু সুনির্দিষ্ট ত্রুটি বিচ্যুতির দুর্ভোগও পোহাতে শুরু করে। মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায়, সামাজিক কার্যক্রম সম্পাদনের সময় এক পর্যায়ে জনগণ নিজেদের উপর ‘পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’-কে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। তখন শুরু হয় বিভিন্ন গোলযোগ এবং সভ্যতার উৎসসমূহ মৃত হয়ে পড়ে (জ্ঞান, আদর্শ) যা এক পর্যায়ে তাদের নিষ্কৃয়তা এবং পতনের দিকে ধাবিত করে।

সভ্যতার ইতিহাসের মাধ্যমে জানা যায়, এই প্রক্রিয়াটি জনসাধারণের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজের নৈতিক কাঠামোকে ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করে থাকে। কেননা, এসকল বিষয়াদি তখন আর জনসাধারণের আখলাকে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারে না। যখন আকলী উৎসসমূহ জনসাধারণের কর্মকান্ডের লাগাম হারিয়ে ফেলতে শুরু করে, সভ্যতা তখন একটি নতুন পরিবেশের মুখোমুখি হয়; যেখানে প্রবৃত্তি (হাওয়া) বা প্রবৃত্তিগত শক্তি রূহানিয়াত এবং আকলানিয়াতের উপর বিজয়ী হয়ে যায়। জনগণ তখন যাচ্ছেতাই কারবার ঘটাতে পারে, কারণ তখন আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো সুবিন্যস্ত কোনো ব্যবস্থা মওজুদ থাকে না, থাকলেও কার্যকর হয় না।

সভ্যতা তখন ‘উত্তর-সভ্য’ স্তরে প্রবেশ করে এবং এর মূল্যবোধ মানব, মাটি এবং সময়ের সাথে এক নতুন সমন্বয়ের পথে এগিয়ে যায়। এই তৃতীয় পর্যায়ে- সামাজিক সম্পর্ক ধর্মীয় আদর্শকে অগ্রাহ্য করে বা সমাজ আর জনগণের কুপ্রবৃত্তি বা হাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। বিশৃঙ্খলা এবং অনাচার বিরাজ করে, রূহানিয়াতের কর্তৃত্ব থেকে মানুষের খাহেশাত বা নাফসিয়াত ক্রমান্বয়ে স্বাধীন হতে শুরু করে। প্রবৃত্তি সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে গেলে মানুষের তাকদীর তার অধীনস্ত হয়ে যায়, সভ্যতার তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়, সামাজিক কর্মকান্ডে ধর্ম তার প্রাসঙ্গিকতা পরিপূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে, সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায়, এভাবেই একটি সভ্যতা ‘সভ্যতার চক্রের’ শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়। যখন রূহানিয়াতের প্রেষণা ব্যর্থ হয় তখন আকলী (Rational) কর্মকান্ডও আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়।

বিন নবী বলেন,

ইতিহাস আমাদের এটা দেখিয়েছে যে, প্রকৃতপক্ষেই প্রাক-সভ্য, সভ্য, এবং উত্তর-সভ্য এই তিনটি পর্যায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে প্রত্যেক সভ্যতা এর কোনো না কোনো পর্যায়ে অবস্থান করে এবং সে স্তরের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যাবলী ধারণ করে।

বিন নবী সভ্যতা পাঠ ও তার বোঝাপড়ার পদ্ধতি বের করতে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের দিকে নজর দিয়েছেন। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বৈশিষ্ট্যাবলী নিরূপণ করতে তিনি সমাজের ঐতিহাসিক পথপরিক্রমাকে মনস্তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালিয়েছেন।

প্রাক-সভ্য সমাজে তিনি জনসাধারণকে দেখেছেন সহজাত মানুষ হিসেবে। যেমন রাসূল (সা.)-এর জমানার আরব বেদুঈনগণ, যারা কিনা সভ্যতার পরিক্রমণ চক্রে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যদিও প্রতিটি সমাজই সভ্যতার মৌলিক তিনটি উপাদান (মানুষ, মাটি ও সময়) এর অধিকারী, তবুও একটি সভ্যতায় পরিণত হতে হলে প্রতিটি প্রাক-সভ্য সমাজের অবশ্যই একটি মূল চালিকাশক্তির প্রয়োজন। ধর্মীয় আদর্শ ব্যতীত তাদের সভ্যতার চাকা এক চুলও অগ্রসর হবে না। যদি ধর্মীয় আদর্শের অবকাঠামোর ভিতরে থেকে কোনো সমাজ- মানুষ, মাটি ও সভ্যতার মাঝে গতিশীল কোনো মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে সমর্থ না হয়, তবে সেই সমাজ কখনোই সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে না বা দুনিয়ার বুকে কোনো সামগ্রিক মনো-সামাজিক রূপান্তরের সাক্ষী হতে পারবে না।

একটি সভ্যতার উত্থান ঠিক তখনই হতে শুরু করে যখন কোনো সভ্য সমাজ তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেদের পরিবর্তন করতে শুরু করে। ‘সভ্যতার পর্যায়’ মূলত কোন সমাজের পক্ষে তাদের নিজস্ব বিশ্ব দর্শন এবং সংস্কৃতি কায়েম করার ক্ষমতাকে চিত্রিত করে থাকে। যখন মানুষ সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে তখন পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক সবচেয়ে মজবুত অবস্থানে থাকে। এক্ষেত্রে সমাজ তার সভ্যতাকে হেফাজত করতে সক্ষম হয় এবং তার উন্নয়নের গতিকে সাবলীল রাখতে পারে। জনগণ তখন সামাজিক নিরাপত্তা লাভ করে থাকে এবং সমাজ তার সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলে।

যখন সভ্যতা ‘উত্তর-সভ্য’ পর্যায়ে পৌঁছে, তখন এটি আর খুব বেশি গতিশীল থাকে না এবং তার সভ্যতায়ন সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে পতনের দিকে এগিয়ে যায়। অতএব, ধর্মীয় আদর্শ তখন আর সভ্যতাগত মূল্যবোধসমূহকে ধারণ করতে পারে না। সেই সাথে পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কেরও অবক্ষয় হতে থাকে। তবে পতন এখনও মুকাদ্দার (অনিবার্য) নয়, ভিন্ন একটি সভ্যতায়ন কার্যক্রম হয়ত সেই সমাজকে তার পতনের অতল গন্তব্য থেকে বাঁচাতে পারে। একবার যদি সভ্যতা তার সাংস্কৃতিক বলয় হারিয়ে ফেলে, তখন তার আদর্শিক ভিত্তি ভেঙ্গে পড়ে এবং সংস্কৃতি আর কোনোভাবেই অগ্রসর হতে পারে না।

বিন নবী তার সভ্যতা পর্যালোচনার ‘তৃতীয় পর্যায়’ (উত্তর-সভ্যতা) থেকে বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সামনে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান খোজার চেষ্টা করেছেন। যেখানে এই সভ্যতার আগের পর্যায়গুলোর তুলনায় এই পর্যায়ে এসে তার আদত চিন্তা এবং কার্যক্রম থেকে ব্যাপক বিচ্যুতি ঘটেছে। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে, সমাজকে অবশ্যই তার আসলিয়াত এবং গতিশীল বৈশিষ্ট্য ফিরে পেতে হবে। আর এটা সম্ভব হবে এমন এক নতুন মানুষ তৈরি করার মাধ্যমে, যিনি কিনা প্রাক-সভ্য পর্যায়ের বৈশিষ্ট্যাবলী থেকে মুক্ত থাকবেন। তিনি ধর্মীয় আদর্শের সাথে মিলিয়ে মানুষ, মাটি এবং সভ্যতাকে একটি নতুন আঙ্গিকে পাঠ করতে পারবেন। বিন নবীর মতে, “আমাদের অবশ্যই আমাদের সভ্যতার পর্যায় সম্পর্কে জানতে হবে এবং আমাদের পশ্চাতপদতা সম্পর্কেও। সামাজিক সমস্যাসমূহ ঐতিহাসিক; কোনো এক পর্যায়ে সভ্যতার উৎকর্ষের জন্য যে বিষয়টি উপযুক্ত, সেটি অন্য পর্যায়ে গিয়ে ক্ষতিকরও প্রমাণিত হতে পারে।”

সমাজের ক্রমবিকাশকে বিন নবী সামাজিক মনস্তত্বের দৃষ্টিভঙ্গী থেকেও দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি সমাজের উন্নতির পথে তিনটি সময়কালের (ব্যাপ্তি/যুগ) সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন; বস্তুর ব্যাপ্তি, জনগণের ব্যাপ্তি এবং আদর্শের ব্যাপ্তিকাল। এই ‘তিন ব্যাপ্তি’ ধারণাকে তিনি পরিষ্কার করার জন্য উক্ত তিনটি বিষয়ের মাঝে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা দেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি সমাজেরই নিজস্ব জটিল সাংস্কৃতিক জগত বিদ্যমান থাকে যেখানে- বস্তু, জনগণ এবং আদর্শ, সমন্বিত সামাজিক কার্যক্রমের মাঝে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে।

সমাজের বস্তুগত ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে- সমাজ, বস্তুর প্রভাবে সৃষ্ট গন্ডী অনুযায়ী তাদের সংবিধান (মানদন্ড) এবং আইন (নীতিমালা) প্রণয়ন করে। সংবিধানের প্রকৃতি এবং মান মানুষের মৌলিক চাহিদার মুখাপেক্ষী, এটি মানুষকে ‘বস্তু’র উপরে নির্ভরশীল করে। বিন নবীর রায় হলো, বস্তুসমূহের ব্যাপ্তির অভিজ্ঞতা একটি মানব সমাজ প্রাক এবং উত্তর-সভ্য পর্যায় লাভ করে। আজকের মুসলিম সমাজে এই বস্তু মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এমনকি রাজনৈতিক পর্যায়ে পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে। যখন মনস্তাত্ত্বিক এবং নৈতিক দিক দিয়ে কোনো সংস্কৃতি বস্তু কেন্দ্রিক হয়, তখন ‘বস্তু’ মূল্যবোধের তালিকায় সবার উপরে অবস্থান করে। সংবিধান বা সামগ্রিক বিবেচক দৃষ্টিভঙ্গী তখন গুণগত না হয়ে সংখ্যাগত হবে। তখন সব কিছুকে বিবেচনা করা হবে বস্তুবাদ দিয়ে; আখলাক বা মূল্যবোধ দিয়ে নয়।

জনগণের ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে- বস্তু নয়; বরং ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানবিক উপমা এবং উদাহরণকে কেন্দ্র করে সমাজ তার মানদন্ড সাজায়। এই যুগে বস্তুর ব্যাপ্তি এবং আদর্শের ব্যাপ্তি হয়তো ব্যক্তিত্বের ব্যাপ্তির সাথে একীভূত হয়ে যেতে পারে। এমন একটি সমাজের উদাহরণ হিসেবে বিন নবী জাহেলি যুগের আরব সমাজকে উদাহরণ হিসেবে পেশ করেন; যেখানে তারা গোত্র ভিত্তিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে তাদের আদর্শকে সন্নিবেশিত করেছিল। বর্তমান মুসলিম সমাজে বস্তু এবং ব্যক্তি উভয়ের একাধিপত্যের মাঝে এক ধরণের সম্মিলন লক্ষ্য করা যায়। একে বিন নবী ক্ষতিকর বলেছেন, বিশেষত নৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তা আরো ভয়ানক।
একটি সমাজ তার ইতিহাসের বুকে তার কোন অবস্থান বজায় রেখেছে? সমাজটি কি উৎকর্ষের পথে রয়েছে নাকি পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে? এসব নির্ণয়ের জন্য সমাজের গতিবিধি, তার মূখ্য ভূমিকা পালনকারী মূল্যবোধসমূহের পরিমাপ জানতে হলে উক্ত ‘তিন ব্যাপ্তি’ তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। হয়তো দেখা যাবে সমাজ এমন একটি অবস্থানে আছে, যেখানে বস্তুবাদ, ব্যক্তিবাদ এবং আদর্শবাদ সমন্বিত একটি অবস্থানে আছে। চিন্তাগত এবং বৈশিষ্ট্যগত দিক দিয়ে এক সমাজ থেকে অন্য সমাজকে আলাদা করতে গেলে দেখা যাবে- অবশ্যই উক্ত তিন বিষয়ের কোনো একটি বিষয় অপর দুটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এর দ্বারাই বোঝা যাবে কোনো সমাজের ভিত্তি কী? আর এদের গতিবিধিই বা কোন দিকে। অর্থাৎ ব্যাপ্তি ও তার প্রাধান্য পর্যালোচনার মাধ্যমে কোনো সমাজ উক্ত তিন বিষয়ের (বস্তু, ব্যক্তি, আদর্শ) কোন বিষয়টিকে সামনে রেখে সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে তা উন্মোচিত হবে।

একটি সমাজ কিভাবে সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়? কোন পন্থায় কাজ করে সভ্যতা গড়তে চায় এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এর মূল্যবোধগুলো এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে কিভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে? তার সামগ্রিক চিত্র ধারণ অর্থাৎ একটি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্বতা যাচাই করবে, এমন একটি মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এই ‘তিন ব্যাপ্তি’ তত্ত্বটি। এই যুগসমূহ, সমাজের উৎকর্ষের যেকোনো অবস্থানে একে প্রভাবিতকারী সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক বলয়ের চিত্রায়ন করে থাকে।
বিন নবীর মতে, যেকোনো সভ্যতার তিনটি বিষয় (বস্তু, ব্যক্তি, আদর্শ) উন্নত হওয়ার পূর্বেই এ সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক সুসংহত হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে ব্যক্তিত্বে যুগের সন্নিবেশিত হওয়া। বস্তু এবং আদর্শের অবস্থান খুব মামুলি থাকা অবস্থায়ই সমাজ তার কার্যক্রম শুরু করে দেয় (আর এখানে মূল উপাদান হচ্ছে সুসংহত ব্যক্তিত্ব)। ব্যক্তিত্ব তখন পরিবর্তিত হয় এবং ‘সম্পর্কে’র একটি নতুন অধ্যায়ের মাঝে প্রবেশ করে। তেমনই আবার আদর্শ এবং বস্তু যখন অপরিণত থাকে তখনই ‘পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক’ কাজ করতে শুরু করে দেয় (অর্থাৎ এখানেও ব্যক্তিই পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি)।

পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে যখন কোনো সমাজ খুব জোরালোভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকে তখন ‘আদর্শ’ সামাজিক রক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। একটি সমাজের পক্ষে পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক ব্যতীত কখনোই তাজদীদের পথে হাঁটা সম্ভব নয়। আদর্শ এককভাবে কখনোই কোনো সভ্যতার উৎকর্ষ বা অবক্ষয়ের ন্যায্যত বিধান করতে সক্ষম নয়। একে অবশ্যই পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের সাথে একীভূত হতে হবে। একটি সমাজের ইতিহাস- একটি ধর্মীয় আদর্শ হতে শুরু হওয়া পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের ইতিহাস বৈ ভিন্ন কিছুই নয়।

বিন নবী মুসলিম দুনিয়াকে প্রাক-সভ্য পর্যায়ে রেখেছেন, যেখানে কোনো সমাজ একটি নতুন সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ায় প্রবেশের জন্য সংগ্রাম করে থাকে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় গতিশীল সভ্যতায়ন পক্রিয়াকে বিস্তীর্ণ বোঝাপড়ায় নিয়ে আসতে- বিন নবী সভ্যতার ধারাকে বিশ্লেষণের বিভিন্ন পর্যায়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। তার তিন উপাদান তত্ত্ব, দাওরান তত্ত্ব, তিন পর্যায় তত্ত্ব, তিন ব্যাপ্তি তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে একই বিষয়ের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ।

ইসলামী সভ্যতার বিশ্লেষণ :

সভ্যতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের আসাবিয়্যাহ তত্ত্বকে আর এক ধাপ অগ্রসর করে মালেক বিন নবী সভ্যতার বিবর্তনের তত্ত্ব হাজির করেন, যা আমাদের কাছে ইতোমধ্যে ‘তিন দাওরান তত্ত্ব’ বা চক্রায়ন তত্ত্ব হিসেবে পরিচিত। এই তত্ত্বকে সামনে রেখে বিন নবী তার ‘ইসলামী সভ্যতা’ বিশ্লেষণ সন্নিবেশ করেন। তিনি মুসলিম ইতিহাস ও সভ্যতাকে তিন স্তরে ভাগ করেন।

প্রথম স্তর হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে আল-কোরআনের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজব্যবস্থা যা সিফফিনের যুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। জীবন্ত এই সমাজের ধারাবাহিকতা এসে ভ্রাতৃঘাতী এক যুদ্ধের কাছে পরাস্ত হয়ে যায়। মুসলিম সমাজের ভ্রাতৃত্ব তথা পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কে আমানত এবং সালামতের ভিত্তি একেবারে লন্ডভন্ড হয়ে যয়। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে থাকে। সত্যিকারার্থে তাওহীদ এবং ভ্রাতৃত্বের বলে বলিয়ান ইসলামী সমাজের সংহতি তখন থেকেই দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। অনেক বড় বড় পরিবর্তন অর্জিত হতে থাকে। ইসলামী সভ্যতা বড় বড় সব প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে যায়। পরবর্তীতে ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানতাত্ত্বিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাসে এর প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী।

দ্বিতীয় পর্যায় হলো ইসলামের স্বর্ণযুগ, এসময় দুনিয়ার বুকে একমাত্র পরাশক্তি ছিল ইসলাম। এসময় মানবতা উন্নতি এবং ভারসাম্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে। এই সময়কালের ব্যাপ্তি বিন নবীর হিসেব অনুযায়ী আল মুয়াহহিদ যুগ পর্যন্ত। আল মুয়াহহিদগণ উত্তর আফ্রিকা এবং মাগরিব অঞ্চলে ইসলামী শাসন জারি রাখেন এবং পশ্চিমে ইসলামী সভ্যতার মশাল প্রজ্বলিত রাখেন।

সর্বশেষ পর্যায় হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন, আল মুয়াহহিদ পরবর্তী যুগকে। এই সময়কাল একেবারে আমাদের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই যুগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জড়তা, অবক্ষয়, বিচ্যুতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পচন। ইতিহাস পর্যালোচনার এ পর্বে এসে বিন নবী ইউরোপীয় সভ্যতার উত্থান, বির্বুন ও এর গঠনগত উপাদানসমূহের বিশ্লেষণ করে দেখান; নগরগুলো থেকে বস্তুবাদের বিকাশ ঘটেছে। খৃষ্ট ধর্ম তার সাথে আপোষকামী মেজাজের সাথে গতিশীল একটি আবহ তৈরি করে দিয়ে একে আধিপত্য বিস্তারের নৈতিক শক্তি যুগিয়েছে। সেই ক্রুসেড থেকে শুরু করে শিল্প বিপ্লব হয়ে বিভিন্ন বিপ্লবের ধোঁয়া তুলে এই ধারা সর্বশেষ নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চ‚ড়ান্ত বিকৃতি ঘটিয়েছে। বিন নবী বিশ্বাস করতেন, উপনিবেশ ছিল পাশ্চাত্যের সামগ্রিক সভ্যতাগত এজেন্ডার একটি অংশ মাত্র।

[ দ্রষ্টব্য : এখানে একটি বিষয় খোলাসা করার দাবি রাখে, বিন নবী যে সময়কাল থেকে ইসলামী সভ্যতার উৎকর্ষের যুগকে শেষ করে দিয়ে ইসলামী সভ্যতার পতন কালের সূচনা চিহ্নিত করেছেন সেটা হচ্ছে প্রায় ১৩০০ সালের কাছাকাছি একটা সময়। এটা যদি আলজেরিয়ার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয় তবে ঠিক আছে। তবে যখন সার্বিকভাবে ইসলামী সভ্যতার পতনকাল নির্দিষ্ট করতে যাই, তখন আমাদের অনেক স্কলারই আরবী রেফারেন্স থেকে তথ্যাবলী সংগ্রহ করায় স্পেনের পতনের পর থেকেই ইসলামী সভ্যতাকে এক অন্ধকার অধ্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসেন। কারণ পরবর্তী ইসলামী সভ্যতার ঐতিহাসিক সোর্সগুলো সাধারণত তুর্কি এবং ফার্সীতে। সঙ্গত কারণেই এসবের হদিস আমাদের সামনে সহজে আসে না। তাছাড়া পাশ্চাত্য নিয়ন্ত্রিত একাডেমিক সিস্টেম কোনোমতেই চায় না যে, এসব বয়ান উদ্ভাসিত হয়ে তাদের সামনে কোনো জোড়ালো বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাক। তাই সর্বদা এসব অপ্রাসঙ্গিকই থেকে যায়। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় এটাই যে, কোনো সভ্যতায় স্থবিরতা চলে আসতে শুরু করা এবং চূড়ান্ত পতন হয়ে যাওয়ার মাঝে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। আমরা এখানে দুটি বিষয়ের মাঝে গুলিয়ে ফেলি। আমরা খুব অসচেতনভাবেই এই মতামতটি গ্রহণ করে নেই যে, ১৩ শতকের পরে ইসলাম আর অগ্রসর হয়নি। এই মতবাদটি প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়। কারণ সর্বশেষ খেলাফত উসমানী সালতানাত বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কিসের বলে তিন মহাদেশ শাসন করে বিজয়ী সভ্যতা হিসেবে টিকে ছিল, সেই সূক্ষ্ম প্রশ্নটির উত্তর আমরা না খুঁজেই ইসলামী সভ্যতার এক ক্রনোলজিক্যাল ইতিহাস পড়ে থাকি। যা সম্পূর্ণরূপে বৃটিশ একাডেমিয়ার তৈরি প্রোপাগান্ডা। যদি তাই না হয় তবে ১৩ শতক থেকেই প্রতিষ্ঠা পাওয়া পৃথিবী বিখ্যাত উসমানী, দিল্লি, মুঘল, বাঙলা শাহী সালতানাতের অবস্থান ইতিহাসের পাতায় এত উজ্জ্বল কিসের ভিত্তিতে? নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখব ১৬৮৩ সালের ভিয়েনা অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মূলত পৃথিবীর আনাচে কানাচে ধীরে ধীরে মুসলিমদের রাজনৈতিক পতন হতে শুরু করে (সময়টা প্রায় সতের শতক! অথচ তের শতকের বয়ানের ধুম তুলে মাঝের পাঁচশো বছরকে অন্ধকার যুগ বলে ইতিহাসের পাতা থেকে বেমালুম গায়েব করে দেয়া হচ্ছে!!)। তবে ইউরোপের তুলনায় মুসলিম জাহানের পশ্চাৎপদতার হিসেব কষতে গেলে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতা তার আপন গতি বজায় রেখেই চলছিল। তবে একটা সময়ে এসে ইউরোপে নতুন কিছু হয়, যার সাথে মুসলিম বিশ্ব যে কোনো (পজিটিভ/নেগেটিভ) কারণে হোক, পাল্লা দিতে ব্যর্থ হয়। এই আলাপ বড় দীর্ঘ, আমরা বিজয়ী সভ্যতা নই বলে আমাদের বয়ানগুলো আমরা নিজেদের ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। বরং পাশ্চাত্য কর্তৃক প্রচলিত ও বিভ্রান্তিমূলক মতবাদ গিলতে বাধ্য হই।]

সভ্যতা বিশ্লেষণের এ পর্যায়ে এসে বিন নবী ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দুই সভ্যতার মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন। সভ্যতার উৎস সমূহ কালোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও যুগের আলোকে তার বহমানতা টিকিয়ে না রাখতে পারার দরুণ ইসলামী সভ্যতা মুখ থুবড়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছে। অন্য সভ্যতাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে মুসলিম দুনিয়া উপনিবেশিত হওয়ার আগেই হয়ে গিয়েছে উপনিবেশপ্রবণ। অর্থাৎ এর যমিনে যে কেউ এসেই নিজের কব্জা জমিয়ে ফেলতে পারে। অপরদিকে সময়ের পরিক্রমায় বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ফেরাউন-গ্রীক-রোমান সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে পাশ্চাত্য লন্ডনী সভ্যতা ঠিকই তার বিজয়ডঙ্কা বাজিয়েছে। তারা নিজেদের সভ্যতাকে এমন একটি মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যাকে আমরা উপনিবেশবাদ এবং বিজ্ঞানবাদের সমন্বিত সাম্রাজ্যবাদী চেহারায় দেখতে পাই। সবশেষে এই সভ্যতার হাজার মুখোশের আড়ালের আসল রূপ হলো আধিপত্যবাদ।

বিন নবীর এই ‘উপনিবেশ প্রবণ’ এবং ‘উপনিবেশায়ন’ তত্ত্বের সাথে ইবনে খালদুনের চিন্তাভাবনার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। ইবনে খালদুনের ভাষায়, “The conqured people adapt the forms, ideas and manners of the conquiring people.”

বিজিত জাতি বিজেতাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। কারণ বিজিত জাতির প্রতিরোধ শক্তি ফুরিয়ে যায়। প্রতিরোধ করতে সক্ষম এমন সকল আদর্শ, মূল্যবোধ, চেতনা, বিশ্বাস এতটাই দুর্বল হয়ে যায়, তা দিয়ে আর বিজেতার শক্তিশালী আগ্রাসনকে মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না। তখন বিজেতা এসে পরাজিতের ঘাড়ে চড়ে বসে এবং তার নিজস্ব মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বিজিতের উপর চাপিয়ে দেয়।

শুধু যে বহির্গত শক্তিই মুসলমানদের উপর তাদের সিস্টেম চাপিয়ে দিয়েছে এমনটা নয়। একটি উপনিবেশিত অঞ্চলের মানুষ হিসেবে আমাদেরও এই অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, পাশ্চাত্যের বহু কিছুই আমরা আপন করে নিয়ে তথাকথিত জাতে উঠবার প্রচেষ্টা চালিয়েছি বারংবার। ইসলামের কি নিজস্ব শক্তি ছিল না এসব প্রতিহত করার? অবশ্যই ছিল, আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। খেয়াল করে দেখলে- মুসলিম উম্মাহর সদস্যগণ যত জায়গায়ই উপনিবেশ বা সাম্রাজ্যবাদী জুলুম থেকে মুক্তি পেতে কোনো পরিবর্তন ঘটিয়েছে, সেখানে মূল হাতিয়ার ছিল ইসলাম। তবে আফসোসের বিষয়, নিজেদের বয়ানকে, নিজেদের নিযাম ও সভ্যতাকে পুনরায় সুসংহত করতে না পেরে এখনো আদর্শিকভাবে পাশ্চাত্যের চিন্তাধারার গোলামী করে চলছি। এসব ঘটনা প্রবাহ তাহকীকের বিষয়টি বহু গভীর ও বিস্তর।

যা হোক, প্রশ্ন হলো, কেন এই পশ্চিমানুসরণ? কেন উপনিবেশ মুক্ত হবার পরও আমরা পাশ্চাত্যের ছত্রছায়া থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারি না! উত্তর হল-অনেকদিন ধরে ইসলামের মধ্যে কোনো জাগরণ আসেনি। রেনেসাঁ বা ইহইয়া ঘটেনি। তাই শক্তিমানের মুখাপেক্ষী হওয়াটা অতি স্বাভাবিক। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দিকে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের হীন অনুকরণমূলক বিশ্লেষণে বিন নবীকে যে বিষয়টি রাহ দেখায়, তা হলো ইসলামের প্রতি তার বিশ্বস্ততা এবং ইবনে খালদুনের অনুসরণ। তিনি বলেন, আল মুয়াহহিদ যুগের কর্মনীতি নিয়ে পড়ে থাকায় আলেমগণ ইতিহাসের বুকে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি (ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ) সম্পাদন করে শেষ করতে পারেননি। তারা শুধু প্রাক-আল মুয়াহহিদ সংস্কৃতি থেকে নতুন যুগের সংস্কৃতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে মানুষের আত্মা ও মানসিকতার পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন থাকতেন বলে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাদীক্ষার ধারাকে টিকিয়ে রাখতে চাইতেন। আধুনিক যুগের মোকাবেলায় সেগুলোকে হালনাগাদ না করে শুধুমাত্র সংরক্ষণের প্রয়াস চালিয়েছেন। আর মৃত জ্ঞানের মশাল দিয়ে আধুনিক সময়ের জাহেলিয়াতকে দূরীভূত করাটা দুঃসাধ্য ব্যাপার।

এই সব সংকট মোকাবেলায় জামালুদ্দীন আফগানী বলেছিলেন, ইসলামের মধ্যে রিফর্মেশন দরকার। মালেক বিন নবী এই ইহইয়া বা নাহদ্বা ঘটাতে চান নৈতিক শক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে। কারণ তিনি মনে করেন, মুসলিম উম্মাহর শক্তি হচ্ছে কুরআনি নৈতিকতা। ঐ নৈতিক শক্তিবলেই সে বারবার জাহেল শক্তিকে পরাস্ত করে ইতিহাসের ধারায় সকল সংকট থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে।

বিন নবী বলতেন,

“সভ্যতা কোনো কুড়িয়ে পাওয়া বা অনুকরণ কিংবা ধার করার মতো কোনো বিষয় নয়; এমনকি এটি কোনো সংগ্রহশালাও নয়। এটি একটি নির্মাণের বিষয়। এটি পুরোপুরি একটি স্থাপত্য।”

সুতরাং ইসলামী সভ্যতার পুনঃনির্মাণ অত্যাবশ্যক, কেমন হবে সেই নির্মাণশৈলী তার একটি ধারণা তিনি দিয়েছেন এভাবে- “ইসলামী সংস্কৃতি পুনর্গঠনের যেকোনো পদক্ষেপ অবশ্যই রাজনৈতিক শক্তিতে একটি স্বচ্ছ মতবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুরু হতে হবে। এর মূল মুদ্দা হবে ইসলামের দিকে ফিরে আসা, বিশেষত তিনটি মৌলিক ফিল্টার; ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং উসুলের মাধ্যমে কুরআনের মর্ম অনুধাবন ও তার প্রয়োগ।”

মুসলিম উম্মাহর উপর ধেয়ে আসা এই ঝড় ঝাপ্টাকে তিনি সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ মনে করতেন। কারণ এই বিভীষিকা মোকাবেলা করতে না পারলে মুসলিম সমাজ কখনো জাগবেনা। ফিলিস্তিন বিপর্যয় সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, এই বিপর্যয় মুসলিম সমাজের ঘুম ভাঙ্গাবে। বিন নবীর আরেকটি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল এরকম যে, ইসলামী শক্তির ভরকেন্দ্র একদিন আরব জগত থেকে এশিয়ায় চলে যাবে। সেখানেই নতুন সভ্যতার সূচনা ঘটবে। সেই সভ্যতার প্রতীক হিসেবে তিনি আল্লামা ইকবালকে চিহ্নিত করেছিলেন।


সভ্যতার অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বড় বড় দুটি প্যারাডাইম মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে : ইতিহাস দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞান। বিন নবী সভ্যতার অধ্যয়নকে একটি অনন্য ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার মেথডোলজি এবং ধারণাসমূহ সমাজবিজ্ঞান থেকে পরিচালিত হয়। সকল ধর্মের বিশদ অধ্যয়ন এবং আল-কোরআনের যথার্থ জ্ঞান থাকার কারণে বিন নবী খুব সহজেই ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে সেক্যুলার এবং বস্তুবাদী ধ্যান ধারণা পরিহার করতে পারতেন।

সভ্যতা অধ্যয়ন সংক্রান্ত ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রভাবশালী প্যারাডাইম, প্রভাবশালী চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি প্রদানকারী, যা বিন নবীর ধ্যান ধারণা, পরিভাষা, মেথডোলজি ইত্যাদির সাথে তুলনার দাবি রাখে, তাদের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- ইতিহাস দর্শনের প্যারাডাইম দিয়ে যারা সভ্যতা অধ্যয়ন করেছেন তাদের মাঝে তিনটি চিন্তাধারা সভ্যতা অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একই প্যারাডাইম ব্যবহার করেছে; চক্রায়ন দৃষ্টিভঙ্গি, উৎকর্ষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবতার নিত্যদিনের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই সব পরিভাষা মানবতার ইতিহাসে সভ্যতার পরিবর্তনের ধারাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে মূল দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। সেই সাথে যেসব চিন্তাধারা সভ্যতার পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ ও স্বতন্ত্র ধারণায় পরিণত করছে, তাদেরকেও সন্নিবেশিত করে থাকে।

১৯ শতকে ফ্রেডরিক হেগেল, অগাস্ট কোঁতে ও কার্ল মার্ক্সের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘উৎকর্ষ’ কেন্দ্রিক চিন্তাধারাটি। যারা ইতিহাসকে একটি প্রগতিশীল বিষয় হিসেবে দেখে থাকে। হেগেলের ডায়ালেক্টিক মতবাদ অনুসারে, ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার প্রগতি ও মানুষের স্বাধীনতার কাহিনী। এই চিন্তাধারায় হেগেলের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত অপর কর্ণধার হচ্ছে কার্ল মার্ক্স। হেগেল যেখানে ডায়ালেক্টিক মতবাদকে মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে, কার্ল মার্ক্স সেখানে একে অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। এই ধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কোঁতে, ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ডারউইনের বিবর্তনবাদ এবং ভৌত বিজ্ঞানের উন্নয়নকে সামনে নিয়ে আসে।

বিন নবী বলেন, অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাবলির বর্ণনা দিয়ে গেছেন (জাহেরী ইতিহাস) কিন্তু সে সব ঘটনাবলির যৌক্তিক হাকীকত (বাতেনী ইতিহাস) সম্বন্ধে কোনো গঠন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ঘটাননি। বিন নবী দেখেন, হেগেল এবং মার্ক্স উভয়েই তাদের তত্ত্ব সমূহের দ্বারা মানব সমাজের পরিবর্তনকে অর্থনীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালাচ্ছে। তিনি হেগেলের দর্শনকে পরিবর্তনের জন্য অনুঘটক হিসেবে দেখেন, মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের জন্য প্রশংসাও করেন। তবে বলেন, তাদের ধারণাসমূহ একটি সভ্যতার উত্থানের গতিসত্তাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নয়।

ইতিহাস কেন্দ্রিক হওয়ার বদলে মাত্রাতিরিক্ত তত্ত্বকেন্দ্রিক হওয়া ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউরোপ ভিত্তিক হওয়ার কারণে বিন নবী ‘ইতিহাসের উৎকর্ষ’ কেন্দ্রিক চিন্তাধারাটির ব্যাপক সমালোচনা করেন। কেননা, এই ধারাটি সভ্যতার বহুমাত্রিক ঘটনাবলি সংক্রান্ত জটিলতাকে উপেক্ষা করে ইতিহাসের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কিছু চলকের উপর নির্ভর করেই নিজেদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চালিয়ে গিয়েছে। সুতরাং এর পক্ষে সামগ্রিক কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়।

বিন নবী ইবনে খালদুন এবং আর্নল্ড টয়েনবীর ‘দাওরান (চক্রায়ন)’ চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি নিজেকে এই ধারার পন্থা ও পদ্ধতির উত্তরাধিকার হিসেবে দেখতেন। এই ধারাটি ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনকে একটি চক্রাকার ছাঁচের মধ্যে নিয়ে আসে। ইতিহাসবিদগণের তথ্য বিশ্লেষণের পরে এই ধারার চিন্তাবিদগণ ইতিহাসের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি সার্বজনীন প্যাটার্ন নির্দিষ্ট করতে সক্ষম হন।

মুকাদ্দিমায় সর্বপ্রথম ইবনে খালদুন ইতিহাসের নীতিমালা ও প্রক্রিয়াসমূহ নিয়ে তাহকীক করেন। সমাজের প্রকৃতি ও এর পরিবর্তনের উপর তার এই অধ্যয়ন তাকে এমন একটি বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়, যাকে তিনি ‘ইলমুল উমরান’ হিসেবে অভিহিত করতেন। এটি মূলত সভ্যতা বিজ্ঞান; যেখানে প্রজন্ম সমূহ ও তাদের কর্মধারা সভ্যতার দিক-দর্শন ঠিক করে থাকে। তাঁর ‘আসাবিয়্যাহ’ তত্ত্ব হচ্ছে সেই শক্তি, যা ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনে অংশ নেয়া বিভিন্ন সভ্যতার উত্থান, বেড়ে ওঠার মত বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করে থাকে। সেই সাথে এটি রাজবংশ ও রাষ্ট্রের ধারণার পার্থক্য গড়ে দেয়।

টয়েনবি বিশ্ব ইতিহাসকে সভ্যতাসমূহের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন এবং সভ্যতাকে তিনি উত্থান-পতনের পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনিও ইবনে খালদুনের মতো খুব দৃঢ়ভাবে মনে করতেন, একটি সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া সবসময় ওই সভ্যতার পতন ও ভাঙ্গনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায়।


অধিকাংশ স্কলারের মতানুযায়ী, বিন নবী তাঁর আদর্শ, পদ্ধতি এবং চিন্তার দিক দিয়ে দ্বিতীয় ইবনে খালদুন ছিলেন। কেননা, গত ৫০০ বছরে ইবনে খালদুনের পরে আমরা একমাত্র মালেক বিন নবীকেই মৌলিক এবং প্রতিভাধর সভ্যতা বিশ্লেষক হিসেবে পাই। ইতিহাসের বুকে ঘটা আকস্মিক ঘটনাবলি এবং সভ্যতার পরিক্রমা, উভয় ধারণাই বিন নবীর মনোনিবেশ আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। তিনি বলতেন, প্রগতিশীল উন্নয়নের শর্তাবলি ও পতনের কারণ সমূহের মধ্যকার সম্পর্কে এক ধরণের সংলাপের আয়োজন করতে সক্ষম এই চক্রাকার গতিবিধির ধারণাটি। ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সভ্যতাকে একটি স্বতন্ত্র ‘মাপকাঠি’ হিসেবে ব্যবহার করতে; বিন নবী ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রতত্ত্বকে নিয়েছেন সামাজিক ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রে একটি বোধগম্য একক হিসেবে। ইতিহাস বিশ্লেষণের একক হিসেবে টয়েনবির ‘সভ্যতা’র ব্যবহার, তার চক্রায়ন ধারণাও বিন নবীর ধ্যান-ধারণাকে প্রভাবিত করেছিল।

বিন নবী তার সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সামাজিক ঘটনাবলিকে পর্যালোচনা করার জন্য সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন এবং সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ার মাঝে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটি মুসলিম রেনেসাঁ ঘটাবার তরে বিন নবীর জন্য সমাজবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি সভ্যতার পক্ষে গতিশীল মিথস্ক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে ‘ধর্ম’কে তিনি সামাজিক মূল্যবোধ এবং ঐ সভ্যতার অনুঘটকের মাঝে সমন্বয়ক হিসেবে দেখেছেন। সভ্যতার মূল পরিবর্তন সাধন করে ফেলে, এমন একটি উপাদান হিসেবে তিনি মানুষকে বিবেচনা করেছেন। তবে তিনি দুই প্রভাবশালী প্যারাডাইম; ইতিহাস দর্শন ও সমাজবিজ্ঞান, তিনটি চিন্তাধারা এবং সভ্যতার অধ্যয়নের ক্ষেত্রে আরো অন্যান্য পন্থা-পদ্ধতির দ্বারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

বিন নবীর বুদ্ধিবৃত্তিক সত্ত্বায় অনেক কিছুরই আছর খেয়াল করা যায়; কোরআন-সুন্নাহ, মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন, মনস্তত্ত্ব, ন্যাচারাল সায়েন্স, দর্শন, সভ্যতার বোঝাপড়া সংক্রান্ত প্রথাগত দুই প্রভাবশালী প্যারাডাইম- সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস দর্শন ইত্যাদি।

সমাজবিজ্ঞানের আধুনিক সব আবিষ্কার ও অগ্রগতির উপর ভিত্তি করে তিনি আল-কোরআনকে এক নতুন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করেন। ‘দাওরান তত্ত্ব’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আল-কোরআনের প্রসঙ্গ আনেন। কোনো সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় আদর্শের কাজ কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস চালান। সেসাথে ইতিহাসের ক্ষেত্রে কোরআনী মূলনীতির অকাট্যতা প্রমাণ করেন।

বিন নবী এই আয়াতকে তার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا۟ مَا بِأَنفُسِهِمْ
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই, আল্লাহ কখনোই কোনো কওমের অবস্থানকে পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই পরিবর্তন সাধন করে।” -সূরা রা’দ, আয়াত : ১১

মানুষের অবস্থান, ইতিহাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষের প্রভাব, মানবতার দশা ইত্যাদির পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই আয়াতটি একটি ফ্রেম গঠন করে দেয়। বিন নবী মনে করতেন, একটি সভ্যতায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হলে একটি সমাজের পক্ষে অবশ্যই তার জনগণকে সাধারণ সহজাত অবস্থান থেকে একটি বিশিষ্ট পর্যায়ে উঠিয়ে আনতে হবে।

ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন প্রক্রিয়া বুঝার ক্ষেত্রে আল-কোরআনের মূলনীতিসমূহ আমাদের অনেক সাহায্য করে, আবার ইতিহাসের তাহকীক কোরআনী মূলনীতিসমূহ প্রমাণ করে এবং এর প্রায়োগিক দলীল উত্থাপন করে। আধুনিকতাবাদী বা সেক্যুলার চিন্তা ভাবনা ধর্মকে মানব সভ্যতার কোনো সক্রিয় প্রভাবকের তালিকা থেকে বিলকুল খারিজ করে দেয়; বিন নবী আজীবন এর বিরোধিতা করে এসেছেন। তিনি সর্বদা এটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, সকল নবী রাসূলগণ হতে আসা ওহীর শিক্ষা বা আল-কোরআন মানব সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মুসলিম উম্মাহর পশ্চাতপদতার সমস্যা নিরসনার্থে ইতিহাসের কিছু প্যাটার্নকে একেবারে স্থায়ী মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমনটা আল-কোরআনে বিবৃত হয়েছে। সেই সাথে ইবনে খালদুন তার ইতিহাসের কানুন, সার্বজনীন কায়দা, ইতিহাসের পট পরিবর্তন সংক্রান্ত দাওরান তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে এসেই মূলত বিন নবী তার বুদ্ধিবৃত্তিক সত্ত্বাকে কুরআন এবং সুন্নাহ দ্বারা প্রভাবান্বিত করে ফেলেন।

মুসলিম উম্মাহর মাঝে সংস্কারবাদী চিন্তাভাবনা কিছু পরিভাষাকে ব্যানার করে সামনে এগিয়ে যায়; যেমন তাজদীদ, ইসলাহ, নাহদ্বাহ (নবায়ন, সংশোধন, পুনর্জাগরণ) ইত্যাদি। এগুলো ছিল ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাজির হওয়া কিছু প্যারাডাইমের বহিঃপ্রকাশ। ইবনে ওয়াহাবের আন্দোলন ইসলামের মৌলিক এবং আদত ওয়ার্ল্ড ভিউয়ের পুনর্জাগরণ চাইত; যেখানে ‘তাওহীদ’ সকল কিছুর কেন্দ্রে অবস্থান করে। আফগানী ছিলেন অপর সংস্কারবাদী ব্যক্তিত্ব যিনি একই প্যারাডাইমের আলোকে কাজ করেছেন। তার কথা ছিল ইসলামের মৌলিক শিক্ষা যেকোনো সংস্কার, পুনর্জাগরণ এবং সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব শর্ত। বিন নবী তার বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডে এসব আন্দোলনের মূল চিন্তাসত্ত্বা লালন করতেন। তিনি নিজেকে তাজদীদপন্থীদের সিলসিলার ফসল হিসেবে বিবেচনা করতেন।

তাজদীদের বেলায় বিন নবী একটি সামগ্রিক বোঝাপড়ায় উপনীত হতে মনস্তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বুঝতে চাইতেন কিভাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তিত হতে পারে এবং সভ্যতার উৎকর্ষের সাথে সাথে কিভাবে এর অগ্রগতি হয়। তিনি এটাও বুঝতে চাইতেন যে, ধর্মীয় আদর্শ কীভাবে সামাজিক মূল্যবোধের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে মানুষের ভিশনের উন্নয়ন ঘটায়।

বিন নবী ফ্রয়েড এবং জাঙ্গের ‘ধর্মের অবস্থা ও কর্মকান্ড’ সংক্রান্ত মনস্তত্ত্ব এবং উন্নয়নশীল মনস্তত্ত্বকে সমর্থন করে লিখেন, “ধর্মীয় আদর্শ মানুষের রুহকে যাবতীয় প্রবৃত্তির নাগপাশ থেকে মুক্ত করে রুহানিয়াতের অধিনস্ত করে দেয়।” ফ্রয়েড যেখানে ব্যাঙ্গার্থে বলেছিল, ধর্ম হচ্ছে আফিমের মতো। বিন নবী এখানে তাদের বিপরীতে একদম ইতিবাচকভাবে সুর মিলিয়ে ফ্রয়েডদের এক প্রকার তামাশাই করেছেন বলা যায়।

বিন নবী মূলত ইবনে খালদুনের “আসাবিয়্যাহ তত্ত্ব” থেকেই তার পর্যায়সমূহের ধারণাকে উন্নত করে, সমাজের মনস্তাত্ত্বিক অগ্রসরতাকে বিশ্লেষণ করতে আধুনিক মনস্তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেন, সমাজ ও জনগণ অবশ্যই অভিন্ন তিনটি ঐতিহাসিক স্তরের মধ্য দিয়ে যাবে; বস্তুর ব্যাপ্তি, ব্যক্তিত্বের ব্যাপ্তি এবং আদর্শের ব্যাপ্তি।

বিন নবীর সভ্যতার বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে অপর যে বিষয়টি প্রভাবিত করেছিল, তা হলো দর্শন। দর্শন, কার্তেসিয়ান তত্ত্ব, দার্শনিক আলাপে আধুনিকতা ইত্যাদি। তিনি ইবনে তোফায়েল, ড্যানিয়েল ড্যাফো, ইবনে রুশদ এবং ইমাম গাযযালীর চিন্তা ভাবনা দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন। দেকার্তে থেকে বিন নবী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি ধার করেছেন তা হলো তার বিশ্লেষণ পদ্ধতি।

বিন নবী ছিলেন সেই গুটিকয়েক তাত্ত্বিকদের একজন যারা কিনা সভ্যতাকে একটি বহুমুখী ঘটনা প্রবাহের সমষ্টি হিসেবে দেখতেন। তার অবদানগুলোকে প্রথাগত খন্ডিত স্ববিরোধী প্যারাডাইম সমূহের বিকল্প হিসেবে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ক্রমবিকাশ’ বলাটাই সমীচীন। বিন নবী একই সাথে একজন নেযাম নির্মাতা এবং তাত্ত্বিক ছিলেন। বিন নবীর সময়কালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ তাকে সভ্যতার সিস্টেমেটিক অধ্যয়ন শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে। তৎকালীন মুসলিম উম্মাহ বিশেষত আলজেরিয়ার আর্থ সামাজিক পরিবেশে মুসলিমগণ যে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন, তিনি এসবের যথার্থ সমাধান খুঁজে বের করতে এই সভ্যতা বিশ্লেষণের প্রয়াস চালান। প্রায়োগিকভাবে বিন নবী ইতিহাসবিদগণের পদ্ধতি প্রয়োগ করেন কিন্তু জ্ঞানচর্চা বা বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে বিভিন্ন সভ্যতা পর্যালোচনাকারী ধারার সমন্বয় সাধন করেন। এখানে মূল ব্যাখ্যাকারী ধারাগুলো ছিল- ঐতিহাসিক ধারা, সামাজিক ধারা এবং সাংস্কৃতিক ধারা। যদিও এরা স্বতন্ত্রভাবে সভ্যতা বিশ্লেষণ করে থাকে, তবে বিন নবী এখানে এসব কিছুর সম্মিলন ঘটাতে সক্ষম হন।


একটি সার্বজনীন সূত্র হলো কোনো ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকান্ডকে বুঝতে হলে সেই ব্যক্তির সময়কে খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। অন্যথায় তার চিন্তাভাবনার সঠিক প্রয়োগ আমাদের দ্বারা সম্পাদিত হবে না। সে অনুযায়ী মালেক বিন নবীর চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কাজ করতে হলে বা তাকে আরো সামনে অগ্রসর করতে হলে আমাদের জন্য বিন নবীর সময় ও তার ব্যক্তিত্বের গঠনকে খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। সুতরাং আলজেরিয়ার এ মহান দার্শনিক, প্রথিতযশা সমাজবিজ্ঞানী এবং লড়াকু বুদ্ধিজীবীকে ভালোভাবে জানতে হলে আমাদের সেই ১৯ শতকের ফরাসি উপনিবেশের কাছে পরাধীন অধুনা বিশ্বের আয়তনে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ আলজেরিয়ার কাছে ফিরে যেতে হবে। দেখতে হবে তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশে কিভাবে মালেক বিন নবী বেড়ে উঠেছিলেন আর কোনো ওয়ার্ল্ড ভিউয়ের ছাঁচে ফেলে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মানসকে গঠন করেছিলেন। তবেই তার আসল সত্ত্বাকে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।

মালেক বিন নবীর জীবনী খুব গোছালোভাবে পাওয়া যায় না, তার আত্মজীবনী “The Memories of the Witness of the Century”তে ১৯০৫ সালে তার জন্ম থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সময়কাল বিবৃত হয়েছে। তবে তার বই সমূহ থেকে তার সমসাময়িক পরিবেশ, লেখালেখি এবং সেই সময়ের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

মালেক বিন নবী পূর্ব আলজেরিয়ার কন্সটান্টাইন শহরে এক দরিদ্র পরিবারে ১৯০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবের স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে বিন নবী লিখেন, “অতীত, কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে এবং এক নতুন ভবিষ্যৎ উদিত হচ্ছে”। এখানে মূলত আলজেরিয়ার উপনিবেশিত হয়ে পড়ায় সেখানে ইসলামী সভ্যতার পতন এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতিষ্ঠাকে বুঝিয়েছেন। আলজেরিয়ায় উপনিবেশকালীন সময়ে সেখানকার ইসলামী পরিবেশ সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছে। এটিই মালেক বিন নবীর ব্যক্তিত্ব গঠনের সবচেয় বড় নিয়ামক শক্তি। ফরাসী উপনিবেশের অধীনে তিনি দেখেন-আলজেরিয়া থেকে লোকজন গণহারে হিজরত করে পূর্বে অবস্থিত আরব অঞ্চলগুলোতে চলে যাচ্ছে, এমনকি সেই তালিকায় তার অনেক নিকটাত্মীয়রাও ছিল।

উপনবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ খুব নাটকীয়ভাবে আলজেরিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে পরিবর্তন করে দেয়। সেখানকার ইসলামী আবহ নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে, ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। তবে একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ তখনও বিপদ মুক্ত ছিলেন না। তাই বিন নবী এটা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন, পরিবারের সূক্ষ্ম অবস্থান থেকে শুরু করে একেবারে সমাজের বৃহৎ পর্যায় পর্যন্ত সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম।

ইসলামী সভ্যতার পতনের পর থেকে আলজেরিয়ায় ‘যাওইয়াহ’ নামক এক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেখানে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাকে কোনো রকম টিকিয়ে রাখে। কাহিনীকারগণ জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখেন, সেই সাথে মসজিদ এবং মাদরাসাসমূহও বিন নবীর শিক্ষা দীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছোটবেলা থেকেই বিন নবী বেশ মেধাবী ছিলেন। স্কুলে পড়াকালীন তিনি বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়ে মাদরাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। মাদরাসায় এসে তার চিন্তাভাবনা প্রসারিত হতে শুরু করে। এতদিন তিনি নিজ চোখে দেখে আসা বা গুরুজনদের কাছ থেকে শুনে আসা উপনিবেশক শক্তিগুলোর নির্মমতা ও মুসলমানদের অসহায়ত্বের কথা শুনে উদ্বিগ্ন হতেন। ব্যতিক্রম কিছু করার তাড়না অনুভব করতেন। কিন্তু মাদরাসার বৃহৎ পরিসরে এসে তিনি তার চিন্তা-ভাবনাগুলো বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে সেগুলোকে আর বিস্তৃত করার অবকাশ পান।

এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মদ আব্দুহু এবং রাশিদ রিদ্দার লেখালেখির সন্ধান পান। তাদের লেখা বিন নবীর তরুণ মনে পরিবর্তনের ঝড় তোলে। আব্দুর রহমান কাওকাবীর ‘উম্ম-আল-কুরা’ পড়ে তিনি বিপ্লবের ভাবনায় বিভোর হয়ে যান, কারণ বইটি লেখাই হয়েছিল তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর রেনেসাঁকে উপজীব্য করে। তার মাদরাসার পাশেরই এক ক্যাফেতে আলজেরিয়া মুক্তি আন্দোলনে অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন জামেয়াতুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবি, সংস্কারক এবং রাজনীতিবিদ শায়খ আহমাদ বিন বাদিসকে ঘিরে মাদরাসা ছাত্রদের সমন্বয়ে একটি চক্র গড়ে উঠেছিল। যারা আলজেরিয়ার মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপরে নিয়মিত আড্ডা পরিচালনা করতেন। বিন নবীও এখানে জড়িত ছিলেন। তারা সকলেই চাইতেন পরাধীন আলজেরিয়ার স্বাধীনতা এবং ইসলামী সমাজের নাহদ্বা বা পুনর্জাগরণ।

ফরাসী শোষণ ও প্রহসন তার ভাবনার জগতে সুপ্ত বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে দেয়, সমাজের দুর্দশা, জনগণের দুর্ভোগ, সর্বোপরি ইসলামের পতন কেন্দ্রিক সকল সমস্যা একে একে তার চিন্তার ক্যানভাসে ধরা দিতে থাকে। তিনি আগামীর সংকট মোকাবেলার খাতিরে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে থাকেন। সময়ের পরিক্রমায় এক পর্যায়ে তার মাদরাসা শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হয়। বেকার বিন নবী এবার কর্মসংস্থানের নিয়তে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে এসে হাজির হন।

এখানে এসে তিনি যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো চাকরি পাননি, অথচ তার চেয়ে যথেষ্ট কম যোগ্যতা সম্পন্ন ফরাসী একই জায়গায় চাকরি পেয়ে যায়। ভাগ্যের অন্বেষণে আলজেরিয়া ছেড়ে ফ্রান্সে অভিবাসী আলজেরীয় মুসলিমদের করুণ দশা প্রত্যক্ষ করে তিনি পাশ্চাত্যের বর্ণবাদী চেহারা আরো স্পষ্টভাবে দেখতে পান। এরপর ফ্রান্স ছেড়ে স্বদেশে ফিরে আসেন, এখানেও ভাগ্যের সাথে কোনো সদগতি হয় না।
১৯৩০ সালে তাকদীর ফের তাকে ফ্রান্সে নিয়ে যায়। এখানে তিনি প্যারিসের ইন্সটিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে আইন পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় যথেষ্ট ভালো করা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের জালিয়াতির কারণে সেখানে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। কারণ সেখানে মেধার চেয়ে মূল্যবান ছিল ফরাসী সরকারের উপনিবেশিত অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য প্রণীত বর্ণবাদী নীতিমালা। অতঃপর বহুকষ্টে সেখানকার একটি যন্ত্রকৌশল স্কুলে ভর্তি হন এবং একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বের হন। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরেও কোনো চাকরির ব্যবস্থা তিনি করতে পারলেন না। টিকে থাকার আশা আরো সংকীর্ণ হয়ে আসে। আর এবার তিনি আরো ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়েন। এবার তাকে দেশে ফেরার জন্য ভিসাও দেয়া হচ্ছিল না। শেষমেশ তার এক বন্ধু কর্তৃক পরিচালিত প্রবাসী আলজেরীয় শ্রমিকদের নিয়ে স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানেও তিনি স্বভাববশত আলজেরীয় শ্রমিকদের নিজ পিতৃভূমির আজাদীর জন্য উজ্জীবিত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন টের পেয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ স্কুলটি বন্ধ করে দেয়।

জীবনের এত ঘাত প্রতিঘাত পাড়ি দিয়ে এসে যুবক বিন নবী নিজের এবং জাতির ভবিষ্যতের হিসেব কষতে থাকেন। তার সংগ্রাম মুখর জীবনের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ, বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যাবাদের নিষ্ঠুর কর্মযজ্ঞ, পাশ্চাত্যের শক্তিমত্তা, তাদের দুর্বলতা ও অসংগতিগুলো খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেন। এরই মাঝে বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা।

পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তীকালের ঘটনা প্রবাহ বিন নবীকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি উপলব্ধি করেন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে রুখতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রতিরোধই যথেষ্ট নয়। সমানতালে আদর্শিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাধ্যমেও সাম্রাজ্যবাদকে ধরাশায়ী করা প্রয়োজন। এই ভাবনা থেকেই উৎসারিত হয় পরবর্তী জীবনে তার যত বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আদর্শিক কর্মনামা।


বিন নবী পাশ্চাত্যকে একদম ভেতর থেকে বুঝার সুযোগ পেয়েছিলেন। এর অন্তর্নিহিত অসারতার ব্যাপারগুলো খুবই সূক্ষ্মভাবে ধরতে সক্ষম হন। তার সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই যখন পাশ্চাত্যের চাকচিক্যে মোহিত হয়ে নিজেদের জাতিকে সভ্যতার আলো দেখানোর স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই তিনি সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে পাশ্চাত্যের অন্তসার শূন্যতার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হাজির করে একেবারে অন্তর্ভেদী সমালোচনার বাণ হেনে চলেন। সুতরাং অনেক চিন্তাবিদ সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা পর্যালোচনা করলেও এক্ষেত্রে বিন নবীর জুড়ি মেলা ভার।

বিন নবীর প্রথম বইতে তিনি আল-কোরআনের মূল প্রতিপাদ্যকে পুণর্মূল্যায়ন করেন, সেই সাথে বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তার তত্ত্বগুলোকে বিশদভাবে উল্লেখ করেন। বিন নবীর মতে, “ধর্ম হলো উসূলে নিজামের মধ্যকার এমন একটি আইন, যা মানব আত্মাকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে তোলে।” পরবর্তীতে তিনি যখন ফ্রান্সে আর অন্যান্য মুসলিম চিন্তকদের সাথে মিলিত হন তখন ইসলামকে তিনি এক মহাবৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কার করেন। তিনি ইসলামকে একটি ধর্ম, জীবন ব্যবস্থা, সামাজিক প্রেষণা উৎপাদক, সংস্কৃতি এবং সভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
শিক্ষাগত সমস্যা মুসলিম বিশ্বের এমন এক সমস্যা যা বিন নবীকে বার বার উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তখন প্রহসনমূলক উপনিবেশক শাসনাধীন আলজেরিয়ায় ভিশন, মেথডোলজি, মাকাসিদসহ সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। তার মনন, আত্মা সবসময় সেই কারণটাই খুঁজে ফিরত যার কারণে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা পশ্চাৎপদতা বরণ করল এবং আধুনিক (ফরাসী এবং পাশ্চাত্য) শিক্ষাপদ্ধতি এতটা অগ্রসর হয়ে গেল!
অবশ্য বিন নবী তার The Quranic Phenomenon বইতে কোরআন অধ্যয়ন ও তাফসীরের চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী ধারার সংস্কারের সুপারিশ করেন। এখানে তার কথা হলো, হালের মুসলিম যুব সমাজ পশ্চিমা শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে এক ধরনের বিশ্বাস সংকটে ভুগতে শুরু করেছে এবং ইসলামকে বোঝার জন্য পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিস্টদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই আত্মঘাতী ধারা থেকে ইসলাম ও মুসলিমদের হেফাজত করতে হলে আল-কোরআন ব্যাখ্যার নতুন পদ্ধতি চালু করার কোনো বিকল্প নেই।

 

ফ্রান্সে থাকাকালীন বিন নবী তার চিন্তা-ভাবনাগুলোকে বিস্তৃত করে চলছিলেন। সেখানকার সেক্যুলার ভিশন এবং পাশ্চাত্য মিশনের সাথে বিন নবীর ইসলামী সভ্যতা ভিত্তিক চিন্তাভাবনায় প্রায়ই সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হতো। জীবনের বড় একটা সময়ে এই দ্বৈতত্ব তাকে তাড়া করে ফিরেছে। বিন নবী এটা খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে, ইউরোপ এবং আলজেরিয়ান মুসলিম আবহে কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রা এবং চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। এই দুটি প্রসঙ্গ বিন নবীর ‘প্রাকৃতিক সহজাত মানুষ’ ও ‘সভ্য মানুষ’ সংক্রান্ত ধারণাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ে চিন্তা ভাবনার জগতে তিনি এক নতুন ধরনের ট্রেন্ড লক্ষ্য করেন। সমাজের তাজদীদের ক্ষেত্রে আলজেরিয়ায় ‘ওলামা আন্দোলন’ একটি অভূতপূর্ব ধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বিন নবী ছিলেন একাধারে উপনিবেশিত আলজেরিয়ার নাগরিক, দু’টি শিক্ষাব্যবস্থার ছাত্র। ইউরোপিয়ান উপনিবেশকদের খুব ভালোভাবে বুঝতে পারতেন তিনি। আর এই বোঝাপড়াই তার ‘উপনিবেশক-উপনিবেশিত’ এবং ‘উপনিবেশ প্রবণতা’ ধারণা সমূহকে এতটা গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে।

ইউরোপিয়ান চিন্তাধারার সাথে খুব ভালোভাবে পরিচিত হয়ে যাওয়ায় বিন নবী অতি সত্বর তার বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে তার আগ্রহ সরে দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানে চলে আসে। পর্যায়ক্রমে মুসলিম চিন্তায় তাজদীদ, অ-উপনিবেশকরণ আন্দোলন, আলজেরিয়াসহ গোটা মুসলিম উম্মাহর মাঝে ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের চিন্তা-ভাবনা ও কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি আলজেরিয়ায় উলামা আন্দোলনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন এবং ‘ইসলাহ’ এবং ‘মাগরেব (উত্তর আফ্রিকা) ঐক্য’ এর ভিশন ও মিশন সমূহের বেশ জোড়ালো প্রচারণা চালান। সামাজিক নেতৃত্বের বিষয়টি যতক্ষণ না রাজনীতিবিদদের উপর সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয়া হলো; তার আগ পর্যন্ত একটি মুক্ত ও স্বাধীন আলজেরিয়ার লক্ষ্যে গঠিত হওয়া ইসলাহপন্থী ‘ওলামা আন্দোলেনে’ বিন নবী বেশ অভিভ‚ত এবং আশাবাদী ছিলেন। কেননা, তিনি রাজনৈতিক কার্যক্রমের উপরে শিক্ষা সংক্রান্ত ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ায় উলামা আন্দোলন চালকের আসন থেকে ছিটকে যায়।

এসময় তিনি লিখেন In The Whirlwind of the Battle বইটি, এতে তিনি তার এতকালের মুসলিম পুনর্জাগরণবাদী চিন্তা-ভাবনা সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরেন এবং সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাব্যতা নিরুপণ করার চেষ্টা চালান। এই বইটি আলজেরিয়া বিপ্লব ও স্বাধীনতার প্রাক্কালে প্রকাশিত হয়।
গত শতাব্দীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দুনিয়ায় অনেক অবকাঠামোগত পরিবর্তন সাধিত হয়। উপনিবেশসমূহ স্বাধীন হতে শুরু করে, জাতিরাষ্ট্রসমূহ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। মানুষের জাতীয়তা শতধাবিভক্ত হয়ে যেতে থাকে। এমনই এক অভিজ্ঞতার মাঝে বিন নবী সমকালীন কিছু ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে ব্যাপক প্রভাবিত হয়ে পড়েন। ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক হুসাইনের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রচেষ্টাসমূহ, ১৯৫২ সালের মোহাম্মাদ নাজিব ও জামাল নাসেরের রাজা ফারুক বিরোধী বিপ্লব এবং ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং এ আফ্রো-এশিয়ান মহা সম্মেলন অন্যতম। এসব ঘটনা প্রবাহের মাঝে বিন নবী এক নতুন দিনের লুকোচুরি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আফ্রো-এশিয়ান জনতা শির উঁচু করে দাঁড়াবে। এক নয়া সভ্যতার সূচনা করবে; এই ভাবনাকে সামনে রেখে তিনি একটি বইও লিখেন Afro- Asiatism। যদিও এর পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা, আশানুরূপ তেমন কিছুই ঘটাতে সক্ষম হয়নি মজলুম জনতা!

আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পূর্ব মুহুর্তে একজন রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে মিসরে থাকাকালীন বিন নবী ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং বুদ্ধিজীবীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি আরব বুদ্ধিজীবীদের ইসলামী সমাজের তাজদীদ ও ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেন। আলজেরিয়ার স্বাধীনতার প্রাক্কালে তিনি তার সাংস্কৃতিক এ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইকে আরো জোরদার করেন। আলজেরিয়ার উপনিবেশিক শক্তির নির্মম দমন, পীড়ন, অত্যাচারের দিকে বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে তিনি লিখেন S.O.S Aljeria। বিন নবী কখনোই আলজেরিয়ায় সমস্যা কে মুসলিম উম্মাহর সার্বিক সংকটের ক্যানভাস থেকে আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেননি। তিনি এটাকে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ ও সংস্কৃতির সংকট বলেই মনে করতেন। তার মতানুযায়ী, আলজেরিয়ার সমস্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই, সেরকম ব্যাখ্যা করতে গেলে সাম্রাজ্যবাদই সুযোগ নেবে মাত্র। এই সময় বিন নবী মুসলিম সংস্কৃতির উত্থান-পতন, মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনরুত্থান, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও আধিপত্যবাদি প্রহসনের মুখে মুসলমানদের আদর্শিক সংকট ও সম্ভাবনাকে মূল্যায়ন করে ব্যাপক লেখালেখি ও বক্তৃতা চালিয়ে যান। এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে তার কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়-

১. The Problem of Culture.
২. The Ideological Struggle in Colonised Countries.
৩. The New Social Edification.
৪. The Idea of an Islamic Common Wealth.

ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে জটিল সমস্যাসমূহের সমাধানকল্পে তিনি উন্নয়নশীল বিশ্ব বিশেষত মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও দলগত সমন্বিত কাজে বিশ্বাস করতেন। মুসলিম বিশ্বের আনাচে কানাচে ‘আলেম’ গণের মাধ্যমে উদ্ভূত সংস্কার আন্দোলনের সাথে তার সবচেয়ে সুদৃঢ় সম্পর্ক ছিল।
মহান রাহবার মালেক বিন নবী ১৯৭১ সালের ৩১শে অক্টোবর আলজেরিয়ায় ইন্তিকাল করেন। তার সম্পর্কে বলা হয়, আলজেরিয়ার মাটি থেকে উঠে আসা সর্বকালের সেরা মুসলিম চিন্তক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, তিনি যে মাটির সন্তান, সে মাটি তাকে গ্রহণ করতে পারেনি। তিনি যে জাতির কল্যাণে নিজের সমগ্র জীবন বিলিয়ে দিলেন, সেই জাতি তার কদর করতে পারেনি।


তিনি বলতেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আগে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আদর্শিক ভিত্তি প্রস্তুত করা। এই আদর্শিক ভিত্তি মজবুত হয়নি বলেই মুসলিম দেশগুলো বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের আশেপাশে স্বাধীনতা লাভ করলেও আদর্শিক ও ব্যবস্থাগতভাবে এখনো পাশ্চাত্যের হাতেই বন্দী আছে। এই চিত্র যেমন পশ্চিমের আলজেরিয়াতে দেখা যায়, ঠিক তেমনই পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটেও আমরা একই দৃশ্য অবলোকন করি। যাইহোক বিন নবী এটা দৃঢ়ভাবে মনে করতেন, ইতিহাস তার শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং আর একবার ইতিহাস পুনর্জীবন লাভ করতে যাচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গীকে সামনে রেখেই তিনি কোনো প্রকার ফলাফলের চিন্তা না করে ইসলামী সভ্যতার পুনরুত্থানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে গিয়েছেন। যার দরুন আমরা আজ পেয়েছি এই বিশাল সুগঠিত চিন্তা জগতের এক উন্মুক্ত উত্তরাধিকার।

 

মরহুম মালেক বিন নবির উপর মোটামুটি বিস্তৃত একটি ওভারভিউ পাওয়ার পর এবার আমাদের সামনে একটি আত্মপর্যালোচনার পালা। এসব ক্ষেত্রে বিশেষ করে ব্যক্তিত্ব ও চিন্তা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজ্ঞতা বেশ হতাশাজনক। কেননা, আমরা সঠিকভাবে চিন্তাচর্চা করতে জানি না, আমরা সাধারণত যা করি- তা হচ্ছে এক প্রকার ধারাভাষ্য প্রদান। এককথায় অপচর্চা। কিভাবে? আমরা পড়ি, প্রচুর পড়ি। বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে পড়ি, তাদের চিন্তার সাথে পরিচিত হই। কিন্তু সেই চিন্তা চর্চা করা আর হয়ে ওঠে না। দিনশেষে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির দৌড় ঠিক ঐ পর্যন্ত গিয়েই ঠেকে যে, ইনি এটা বলেছেন আর উনি ওটা বলেছেন! এনার বই এটা আর উনি ওই বইতে ওটা লিখেছেন। এক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা পুরোটাই রেফারেন্সময়!!

এটাতো আল্টিমেটলি তাই হলো যে- ধারাভাষ্যকার, যিনি ময়দানের সব খুঁটিনাটি জানেন কিন্তু খেলায় তার নিজস্ব কোনো অবদান নেই, রাখার সুযোগও নেই। আমাদের দেশে মৌলিক চিন্তা চর্চা ও জ্ঞান চর্চা একেবারে নেই বললেই চলে। কিভাবে থাকতে পারে? আমরা যেখানে ধারাভাষ্যকারগীরীকে বুদ্ধিবৃত্তির মর্তবা দিয়ে রেখেছি। দিন দিন বুদ্ধিবৃত্তির পরিভাষা হীন থেকে হীনতর হতে হতে এ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। এসবের পেছনে না দৌড়ে আমাদের কি উচিত ছিল না সুগঠিত পন্থায় চিন্তা এবং জ্ঞানকে সত্যিকারার্থে অগ্রসর করার প্রচেষ্টা চালানো? মৃত জ্ঞান ও খন্ডিত আদর্শকে সংস্কার ও পুনর্জাগরিত করে একটি সার্বজনীন ও সমন্বিত ব্যবস্থা বিশ্ব মানবতার সামনে তুলে ধরা! যেমন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন আমাদের মহান পূর্বপুরুষগণ।

মালেক বিন নবীর মতো মহান সভ্যতা বিশারদ আলিমের ইন্তিকালের অর্ধশত বর্ষ পরে এসে আমরা যখন তাকে, তার চিন্তাবৃত্ত নিয়ে চর্চা শুরু করছি; সেখানে আগামী পঞ্চাশ বছরে যদি এই বাংলার জমিন থেকে দ্বিতীয় কোনো বিন নবী না উঠে আসে, তো কি লাভ এই চিন্তাচর্চা দিয়ে? যেই ব্যক্তিত্ব আমাদের সামনে হিম্মতের জলজ্যান্ত উদাহরণ; তার উত্তরাধিকারকে অগ্রসর করার জন্য আমরা যথাযোগ্য প্রমাণিত হতে পারি না?
অত্র অঞ্চলে ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে কোনো সেক্টরেই নিজস্ব কোনো ডিসকোর্স দাঁড়ায়নি। ব্যক্তি- সমাজ- সংস্কৃতি, ধর্ম- রাজনীতি- অর্থনীতি, শিক্ষা- প্রশাসন- আইন কোনো সেক্টরেই নয়। সব সেক্টরেই আমাদের চলতে হচ্ছে ধার করে। যার ফলে দেখা যায় অন্য ভূখন্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিস্টেম আমদানী করে সেটা আমাদের সাথে খাপ খাওয়াতে পারিনা। যার ফলে কোথাও সুষ্ঠু ভারসাম্য বিধান তো হচ্ছেই না; বরং বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, অরাজকতায় ছেয়ে গেছে জনজীবনের প্রতিটি স্তর। এটা শুধু বাংলাদেশেরই চিত্র নয়; বরং উম্মাহর প্রতিটি দেশ এই সংকটের ভয়াবহ শিকার। এখান থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন সভ্যতার কক্ষপথে প্রবেশাধিকার নিতে হলে আমাদের প্রয়োজন সেই মানুষ, যিনি নিজের মাটি এবং সময়ের সাথে এক মজবুত ও যথোপযুক্ত অন্বয় সাধন করবেন। মালেক বিন নবীর চিন্তা এখানেই আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।

আল্লাহর অশেষ করুণায় এখন পর্যন্ত মুসলিম ভূখন্ডগুলোর বস্তুগত কোনো ধরণের সংকট মজুদ নেই। তবে বর্তমানে আমরা আমাদের অক্ষমতার দরুন পাশ্চাত্য সৃষ্ট কৃত্রিম সংকটের মাঝে আপতিত হয়েছি। নিজেদের সম্পদ/নেয়ামত নিজেরা ভোগ না করে শোষকদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছি। কেন? কারণ আমরা আদর্শিকভাবে শক্তিশালী নই। আমাদের আদর্শের উৎস এক ও অভিন্ন একইসাথে শাশ্বত হওয়া সত্তে¡ও আমরা তা থেকে কোনো প্রকার ফায়দা তুলতে পারছি না। উল্টো এসব হাতিয়ার ব্যবহার করে নিজেদের মাঝেই একে অপরকে ঘায়েল করে চলেছি। এভাবে চলতে থাকলে ইসলামী সভ্যতার পক্ষে আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সুতরাং আদর্শকে শক্তিশালী করতে হলে আমাদের যুগের আলোকে আদর্শের উৎসসমূহকে নির্ভুলভাবে বুঝার জন্য নতুন মেথডোলজি আবিষ্কার করতে হবে। যার কথাই বিন নবী আল-কোরআনের ব্যাখ্যায় নতুন মূলনীতি প্রচলনের প্রস্তাবনার মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।

ইতিহাসের পর্যায় ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের বিচারে আমরা বুঝতে পারছি যে, ইসলামী সভ্যতা আজ এমন এক মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে দু’টি পথ খোলা রয়েছে।

এক. ইসলামী সভ্যতা পরাজয় বরণ করে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।
দুই. নতুন একটি সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা আবার পুনর্জাগরিত হবে।

আজ মানবতা ইসলামের দিকে চেয়ে আছে, ইসলাম চেয়ে আছে মুসলিমদের পানে। ইসলামী সভ্যতার এই সংকটকালে আমরা যদি ইসলামী সভ্যতাকে হেফাযত করে নতুন একটি সভ্যতায়ন প্রক্রিয়ার শুরু না করতে পারি, তবে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতেই জিল্লতি বরণ করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। কেননা, ইসলাম সার্বজনীন, ইসলামের নবী বিশ্বজনীন, ইসলামি আদর্শের উৎস আল-কোরআন সমগ্র মানবতার জন্য হেদায়েত। সুতরাং এসব উপাদান বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলা কোনো সভ্যতা কখনো মৃত্যুবরণ করতে পারে না। একে পতিত হতে দেয়া যায় না; কারণ সমগ্র মানবতার মুক্তির জন্য সর্বশেষ মাধ্যম হিসেবে যে পন্থা আল্লাহ তার রাসূলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর ধারাবাহিকতা যদি আমাদের গাফিলতির কারণে কোনোক্রমে ব্যাহত হয়, তবে আমার কি জবাব দেব? এ ধরনের চিন্তা থেকেই হয়তো বিন নবীর মতো মহান মানুষগণ কোনো বাধা-বিপত্তি কিংবা তাড়না-প্রবৃত্তির তোয়াক্কা না করে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে গিয়েছেন শেষ নিঃশ্বাস অবধি।

ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। মহান রাহবারগণের দোয়া ও মুজাহাদার বদৌলতে অবশ্যই অবশ্যই এই জমিন থেকে ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হবে ইনশাআল্লাহ। সেদিনকার ইতিহাসের পাতায় বিন নবীদের তালিকা এতটা সংক্ষিপ্ত হবে না, ইবনে খালদুন একাই হাজার বছর সমাজবিজ্ঞানের আকাশে দ্যুতি ছড়াবেন না। শত খালদুনের চিন্তা ও অবদানের রৌশনিতে আলোকিত বসুন্ধরায় মানব সভ্যতার প্রতিটি বাঁকের হিসাব নিকাশে ব্যাপৃত থাকবেন হাজারো বিন নবী।

গ্রন্থঋণ :
১. The Socio-Intellectual Foundations of MALEKBENNABIÕSAPPROACH to CIVILIZATION- IIIT Books- In- Brief Series (2013) by International Institute of Islamic Thought.
২. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন (২০১০) , ফাহমিদ-উর-রহমান।

১৩০১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of হিশাম আল নোমান

হিশাম আল নোমান

পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। আগ্রহ ইতিহাস, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ইসলামী সভ্যতা ও ভাষার উপর। দীর্ঘদিন যাবত লেখালেখি, চিন্তাচর্চা ও অনুবাদের সাথে যুক্ত আছেন। ত্রৈমাসিক মিহওয়ার, অনলাইন পোর্টাল রোয়াক সহ আরও বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত লেখা অব্যাহত রেখেছেন।
Picture of হিশাম আল নোমান

হিশাম আল নোমান

পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। আগ্রহ ইতিহাস, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ইসলামী সভ্যতা ও ভাষার উপর। দীর্ঘদিন যাবত লেখালেখি, চিন্তাচর্চা ও অনুবাদের সাথে যুক্ত আছেন। ত্রৈমাসিক মিহওয়ার, অনলাইন পোর্টাল রোয়াক সহ আরও বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত লেখা অব্যাহত রেখেছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top