যে পরিভাষাটি আমাদেরকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে তা হল ‘মুসলিম উম্মাহ’। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন,
إِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ
“তোমাদের এ উম্মত আসলে একই উম্মত। আর আমি তোমাদের রব। কাজেই তোমরা আমার ইবাদাত করো”।
মহান আল্লাহ অন্য একটি আয়াতে বলেন,
وَإِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ
“আর তোমাদের এ উম্মত হচ্ছে একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমাকেই তোমরা ভয় করো”।
আরবীতে ‘উম্মাতুন’ শব্দটি ‘উম্ম’ শব্দের সাথে একই উৎস (মাসদার) থেকে উদগত। উম্মুন অর্থ হল ‘মা’। আমরা একই মায়ের সন্তান। উম্মাহ হওয়ার অর্থ হল, একই মায়ের সন্তান হওয়া। রক্ত এবং দুধের সম্পর্কের ভাইয়ের চেয়ে ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্ব’ কে উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই উম্মাহকে একই সাথে ‘কেন্দ্রীয় একটি উম্মাহ’ হওয়ার দায়িত্বও প্রদান করেছেন। কোরআনের পরিভাষায় ইস্তিখলাফের দায়িত্ব দিয়েছে।
‘কেন্দ্রীয় উম্মাহ’ হওয়ার অর্থ হল দুনিয়ার গতিপথকে নিয়ন্ত্রণকারী উম্মাহ হওয়া। একপাশে ও কিনারায় দাঁড়িয়ে দুনিয়ার ঘটনা-প্রবাহ সমূহের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার নাম কেন্দ্রীয় উম্মাহ নয়।
কেন্দ্রীয় উম্মাহ হল,
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا
এখানে ব্যবহৃত ওয়াসাত শব্দটিকে ‘মধ্যপন্থা’ বলে অনুবাদ করতে পারি না। ওয়াসাত হল জগতের অক্ষ, বিশ্ব জাহানের কেন্দ্র, এমন একটি উম্মাহ যাদের চতুর্দিকে বিশ্বমানবতা ঘূর্ণায়মান হবে, অর্থাৎ আদিল (ন্যায় পরায়ণ একটি উম্মাহ)। মুসলিম উম্মাহ এমন উম্মাহ, যে উম্মাহ আদালতকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করে রাখবে। এই আয়াতের ‘ওয়াসাত’ কালিমার উপর ভিত্তি করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে “মারকাজুল ওয়াসাতিয়্যা সমূহ’’ প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন চরমপন্থীদের মোকাবেলার নামে ‘লিবারেল ইসলাম সেন্টার’ নামক বিভিন্ন ধরণের প্রতিষ্ঠান সমূহ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে।
অথচ আয়াতের পরবর্তী অংশে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘ওয়াসাত’ শব্দের উদ্দেশ্য (মাকসাদ) কি সেটা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন-
أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ
ইসলামের আদালতকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে সমগ্র মানবতার কাছে সাক্ষ্যদাতা হওয়ার জন্য। শহীদ এবং শাহীদ একই সাথে উদাহরণ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বিষয়টি অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এভাবে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ
এই আয়াতের قسط শব্দটি এবং পূর্ববর্তী আয়াতের وَسَطً শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীতে আদালত(ন্যায়-বিচার) প্রতিষ্ঠার জন্য, নিজেদের জীবনে আদালতকে বাস্তবায়ন করে আদালতের প্রতীক হয়ে সমগ্র মানবতার সামনে নিজেদেরকে উপস্থাপন করবে এই উম্মাহ। এভাবে তারা খিলাফাত এবং ইসতিখলাফের দায়িত্ব পালন করবে এবং এভাবেই তারা কেন্দ্রীয় একটি উম্মাহ হবে। এর পাশাপাশি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই উম্মাহকে অন্য একটি দায়িত্ব দিয়ে বলেন;
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল; তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য ৷
تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
“তোমরা নেকীর হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো”।
এই আয়াতের অর্থ এটা নয় যে, তোমরা নিজেরা ঘরের মধ্যে বসে থেকে অন্যকে ভালো কাজের আদেশ দিবে। تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ – এ আমর শব্দটি ক্রিয়াবাচক অর্থে, যা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হল, তোমরা মারুফের আলোকে জীবন যাপন করবে।وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ – এই আয়াতে আমর শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয় উপরোক্ত আয়াতে আমর শব্দটিও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيد এই আয়াতে আমর শব্দটি আচরণ, কর্ম, এই সকল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ
তোমরা অন্যদের সৎকর্মশীলতার পথ অবলম্বন করতে বলো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে যাও।
এসকল আয়াতের মূল কথা হল- তোমরা নিজেদের জীবনে মারুফকে বাস্তবায়ন করবে আর পৃথিবী থেকে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার নির্মূল করবে ও দূর করার চেষ্টা করবে।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ।