এই বছরের রমজানের শেষের দিনগুলো এবং ঈদের মত আনন্দের দিনও দুঃখ ভরাক্রান্ত একটি সময়ে মধ্যে দিয়ে কেটেছে। আপনারা সকলেই জানেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল আল-কুদস। মসজিদে আকসার উপর যে অসম্মানজনক আচরণ করা হয়েছে তা আমাদের হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। সাহায্যের জন্য মুসলমানদের ফরিয়াদ আমাদের কালবে এসে বিঁধেছে।
প্রায় একশত বছর ধরে সমগ্র মানবতার সামনে একটি ট্রাজেডি ঘটে চলেছে। সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে জিম্মিকারী এবং মুসলমানদের সকল শক্তিকে গ্রাসকারী এক ট্রাজেডি। সমগ্র মানবতার সামনে কুদুসে শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে বসবাসকারী একটি জাতির ঘরবাড়ি এবং বসতভিটাকে জোর করে দখল করা হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এখনো প্রায় প্রতিদিন হত্যা করা হচ্ছে। সেখানে বসবাসকারী জনগণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। আর যারা সেখানে অবস্থান করছে তাদেরকেও তাদের নিজেদের ঘরে পরবাসীর মত বসবাস করতে হচ্ছে। তাদের নিজেদের ভুমিকে এক বন্দীশালায় পরিণত করা হয়েছে। দখলদাররা এই সকল করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সকল নবীগণের সিজদাগাহ হিসেবে পরিচিত মসজিদে আকসার পবিত্রতাকে বিনষ্ট করা হচ্ছে। মসজিদে আকসার সম্মান ও মর্যাদাকে আজ ভূলুণ্ঠিত করা হচ্ছে। সেখানে ইবাদত করতে আসা মুসলিমদের উপরে নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
আজকের আলোচনায় আমি এই বিষয়টির রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিককে একপাশে রেখে দিয়ে এই বিষয়টির (ইস্যু) দ্বীন, বিশ্বাস ও সভ্যতার দৃষ্টিকোণ নিয়ে আলোচনা করব। এই আলোচনায় আখলাকী, ইরফানী এবং ইলমী একটি দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করার চেষ্টা করব।
আল-কুদস আমাদের কি হয়?
মসজিদে আকসা আমাদের জন্য কি অর্থ বহন করে ? শুধুমাত্র আমাদের প্রথম কিবলা হওয়ার জন্যই কি আল-কুদস এত বেশী মূল্যবান ? আল-কুদসের জন্য যে আন্দোলন, এই আন্দোলন কেন মুসলমানদের জন্য অভিন্ন আন্দোলন? শুধু তাই নয়, আল-কুদস কেন সমগ্র মানবতার জন্য অভিন্ন একটি বিষয়? এই সকল বিষয়/প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মানবতার জন্য প্রেরিত দ্বীনের স্থায়িত্ত্ব ও ধারাবাহিকতা তিনটি গুরুত্ত্বপূর্ণ মূলনীতির সাথে সম্পর্কিত। এগুলো হল,
- মু’তাকাদাত/ ই’তিকাদসমূহ,
- মুকাদ্দাসাত/ পবিত্রতা বিষয়সমূহ,
- শায়া’য়ির/ প্রতীকসমূহ।
এই বিষয় সমূহ দ্বীনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং অপরিবর্তনীয় মূলনীতি। ফিকহ এবং শরীয়ত পরিবর্তনীয় হওয়ার কারণে সময়ের ব্যবধানে ইজতিহাদ সমূহ পরিবর্তিত হলেও এই তিনটি স্থায়ী/ধ্রুব বিষয় সমূহ কখনোই পরিবর্তিত হবে না। এক অর্থে বলতে গেলে এগুলো ‘অস্পৃশ্য’। এগুলোর মধ্যে কোন ধরণের হ্রাস-বৃদ্ধি দ্বীনের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। এই কারণে এই সকল বিষয় খুবই স্পর্শকাতর বিষয়।
প্রথমটি অর্থাৎ মু’তাকাদাত/ই’তিকাদসমূহ ।
আমাদের আকাঈদ সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহ বিশ্বাস সংক্রান্ত বিষয়সমূহকে তিনটি মৌলিক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছেঃ
- তাওহীদ
- রিসালাত
- আখেরাত
তাওহীদ হল, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করা। রিসালাত হল, পয়গাম্বর ও কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান। আর আখেরাত হল, আখেরাতের প্রতি ঈমান।
দ্বিতীয়টি তথা মুকাদ্দাসাত/ পবিত্র বিষয়সমূহ
মেটাফিজিক্যাল, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ সম্পন্ন, অস্পৃশ্য বিষয় সমূহ, সকল প্রকার মন্দ ও খারাপ থেকে মুক্ত, মহা পবিত্র বিষয় সমূহ। এবং এই মহা পবিত্র বিষয়সমূহের আলোকে কিছু কিছু স্থান, কিছু কিছু সময় এবং কিছু কিছু কাজকে এই কুদসিয়্যাতের /পবিত্রতার সাথে সম্পর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। ইসলামে কুদসিয়্যাতের উৎস মূল হল শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। যিনি আল-কুদ্দুস। কুদসিয়্যাতের মূলে রয়েছে; ত্বাহারাত, পরিচ্ছন্নতা, এবং নাযাফাত। শিরক ও মন্দের প্রতি ধাবিত না হওয়া। অর্থাৎ এখানে নাযাহাত (পবিত্রতা, পরিচ্ছনতা) রয়েছে। নাজাহাতকে রক্ষা করতে হবে। আর এই নাযাহাতকে রক্ষা করা সমগ্র মুসলমানদের দায়িত্ব। এমনকি এই দায়িত্ব শুধু মুসলমানদেরই নয় সমগ্র মানবতার দায়িত্ব।
তৃতীয়টি তথা শায়া’য়ির/প্রতীক বা সিম্বলসমূহ।
শুয়ুর উৎসমূল থেকে আসা শায়া’য়ির, মুসলমান হওয়া ও মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকার চেতনাকে জাগ্রত রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী প্রতীক ও সিম্বলসমূহ। কিছু কিছু স্থান, কিছু কিছু সময় এবং কিছু কিছু ইবাদত হল আমাদের দ্বীন ইসলামের শায়া’য়ির বা সিম্বল।
এই তিন বিন্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আল-কুদস ও মসজিদে আকসার বিষয়টি একজন মুসলমানের জন্য এক দিক থেকে ই’তিকাদী একটি বিষয়। এক দিক থেকে মুকাদ্দাস সংক্রান্ত একটি বিষয় এবং এক দিক থেকে শায়া’য়ির সংক্রান্ত একটি বিষয়। আল-কুদসের বিষয়টি একটি ভূমি ও মালিকানা কিংবা প্রভাব বিস্তার সংক্রান্ত বিষয় নয়। কুদসের বিষয়টি ইলাহী আমানতকে রক্ষা করা সংক্রান্ত একটি বিষয়। হযরত ইবরাহীম থেকে হযরত দাউদ পর্যন্ত, হযরত সুলায়মান থেকে হযরত যাকারিয়া পর্যন্ত, হযরত ইয়াহইয়া থেকে হযরত মুসা পর্যন্ত এবং হযরত ইসা থেকে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পর্যন্ত সকল পয়গাম্বরের আমানত। খাতামূল আনবিয়া রাসূল-ই কিবরিয়া, ইসরা ও মিরাজের মাধ্যমে মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আকসাকে একত্রিত করে এই সকল আমানতকে নিজের উপর নিয়েছেন এবং তার উম্মতের নিকটে আমানত হিসেবে পেশ করেছেন। এই কারণে মুসলমানগণ সমগ্র ইতিহাসকাল জুড়ে এই পবিত্র ভূমিতে শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নয় বরং সকলের হক্ব বা অধিকারকে সবচেয়ে বড় আমানত হিসেবে গণ্য করেছেন।
মহাগ্রন্থ আল কোরআন কোন কিছুর মূল্যকে বুঝানোর জন্য তিনটি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেঃ মুবারাক, মুকাদ্দাস, হারাম।
কোরআনে কারীমে পাঁচটি আয়াতে কুদস ও মসজিদে আকসা যে মোবারাক এই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। আমাদের রব বলেছেন, بَارَكْنَا ف۪يهَاۜ / আমি কুদসকে মোবারক বানিয়েছি। بَارَكْنَا حَوْلَهُ / আমি এর চারপাশকে বরকতময় করেছি। অপর একটি আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানিয়ে দিয়েছেন, بَارَكْنَا ف۪يهَا لِلْعَالَم۪ينَ / আমি কুদসকে সমগ্র মানবতার জন্য মোবারক বা বরকতময় করেছি।
সূরা ইউনুসে কুদসকে مُبَوَّاَ صِدْقٍ / সাদাকাতের স্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটা সিদক এবং সাদাকাতকে রক্ষা করার অর্থ বুঝিয়ে থাকে। এই সিদক এবং সাদাকাতকে রক্ষা করার দায়িত্ব সকল মু’মিনের।
শুধু তাই নয়, কুদস নামটি সরাসরি পবিত্র একটি বিষয় থেকে গৃহীত মুকাদ্দাস একটি স্থান। যেমনটা আমাদের রব সূরা মায়েদায় এই স্থানকে الْاَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ / পবিত্র ভূমি বলে উল্লেখ করেছে।
এই সকল আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, এই কুদসিয়্যাত এবং মোবারকিত্বের কারণ হল সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে সমগ্র মানবতা এই স্থানে ওহীর সাথে সমবেত হয়েছে।
এই স্থানটি মুকাদ্দাস এবং মোবারক হওয়ার কারণ হল প্রায় সকল পয়গাম্বর এই স্থানে বসবাস করেছেন, আকাশের সাথে পৃথিবীর, ফিজিক্সের সাথে মেটাফিজিক্সের সম্মিলন হওয়ার কারণে।
কুদস মুসলমানদের একটি আন্দোলনের বিষয় হওয়ার অন্যতম কারণ হল, এই স্থানটিকে পুনরায় মুবাওয়া সিদক/সাদাকাতের স্থানে পরিণত করা। এই স্থানটি যেন মুবাওয়্যা কিজবে/ মিথ্যার ভূমিতে পরিণত না হয় এজন্যই মুসলমানগণ জীবন দিচ্ছে। মুসলমানদের এই আল-কুদস আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হল এই আরদুল মুকাদ্দাসকে একটি কওমের তথাকথিত আরদ-ই মাওদু (ওয়াদাকৃত ভূমি) হওয়া থেকে রক্ষা করে সমগ্র মানবতার জন্য আরদুল মুকাদ্দাসে পরিণত করা।
সূরা বনী ইসরাইলের প্রথম আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেনঃ
سُبْحَانَ الَّـذ۪ٓي اَسْرٰى بِعَبْدِه۪ لَيْلاً مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ اِلَى الْمَسْجِدِ الْاَقْصَا الَّذ۪ي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ اٰيَاتِنَاۜ اِنَّهُ هُوَ السَّم۪يعُ الْبَص۪يرُ
অর্থঃ পবিত্র তিনি, যিনি নিয়ে গেছেন এক রাতে নিজের বান্দাকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সা পর্যন্ত, যার চারপাশকে তিনি বরকতময় করেছেন, যাতে তাকে নিজের কিছু নিদর্শন দেখান। আসলে তিনিই সবকিছুর শ্রোতা ও দ্রষ্টা।
এই আয়াতে ঈষৎভাবে হযরত পয়গাম্বরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এভাবে বলেছেনঃ আপনি আল্লাহর পয়গাম্বর হলেও, বায়তুল্লাহ এবং মসজিদে হারামের বাসিন্দা হলেও হিকমতপূর্ণ রাত্রি ভ্রমণ করা জরুরী। এবং এই যাত্রার ক্ষেত্রে দুনিয়ার সর্বশেষ পয়েন্ট হল মসজিদে আকসা। যার চতুর্পাশকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বরকতময় করেছেন। সেখানে নির্মিত কোন দালান না থাকার পরেও সেই স্থানকে “الْمَسْجِدِ” নামে অভিহিত করার কারণ হল সেটা সকল পয়গাম্বরের সিজদাগাহ হওয়ায়। আয়াতে উল্লেখিত “الْاَقْصَا” পবিত্রতা, মহিমান্বিতা বুঝানো হয়েছে। যদিও “الْاَقْصَا” প্রচলিত অর্থে দূরের স্থান বলে আখ্যায়িত করে হয়ে থাকে। আমি মনে করি এমন অনুবাদ করা ভুল। এখানে আকসা অর্থ দূরবর্তী কোন স্থান নয় বরং এর অর্থ হল মহান, পবিত্র, মহামান্বিত।
এখানে “لِنُرِيَهُ مِنْ اٰيَاتِنَاۜ / আমার আয়াত সমূহকে দেখানোর জন্য” দ্বারা আয়াতটি একই সাথে সূরা নাজম এর আয়াতসমূহের মাধ্যমে এবং একই সাথে সুন্নত ও হাদীসের মাধ্যমে মিরাজের দিকে ইশারা করেছে। ইসরা ছাড়া মিরাজ হয় না। মসজিদে আকসার দিকে হিকমাহপূর্ণ রাত্রি ভ্রমন করা ছাড়া মিরাজ হবে না। উম্মতের মিরাজে যাওয়ার পথ মসজিদে আকসা হয়ে যায়। “لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِنْ رُسُلِه۪۠ “/ আমরা পয়গাম্বরদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না, এই আয়াতটি যে অর্থ বহন করে তা মসজিদে হারামের সাথে মসজিদে আকসাকে একত্রে উল্লেখকারী একই অর্থ বহন করে। মূলত, এই আয়াতটি হযরত পয়গাম্বরের খাতামিয়্যাত সম্পর্কে। একই সাথে উম্মতকে সভ্যতার একটি চিন্তাকে অর্জনে সাহায্যকারী আয়াত এটি। এই আয়াত মুসলিম উম্মাহকে সভ্যতার চিন্তা ও দিগন্তকে উম্মোচনে সাহায্য করে থাকে। এই আয়াতটি হযরত আদমের মাধ্যমে শুরু হওয়া, হযরত ইবরাহীমের মাধ্যমে জারী থাকা ইসলাম কিভাবে হযরত পয়গাম্বরের মাধ্যমে ধারাবাহিকতা অর্জন করলো এটার ধারণা দিয়ে থাকে।
আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও মসজিদে আকসা-র জন্য ‘বাইতুল মাকসিদ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামকে একে অপরের থেকে পৃথক করেননি। পৃথিবীতে যত মসজিদ রয়েছে এর মধ্যে শুধুমাত্র তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন মসজিদকে ইবাদতের উদ্দেশ্য যিয়ারত করার জন্য বের হওয়া সমীচীন নয়।
রাসূল করীম (সঃ) বলেছেনঃ
اَ تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ مَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِى هَذَا وَمَسْجِدِ الأَقْصَى / তিন মসজিদে ছাড়া অন্য কোন মসজিদে ইবাদতের উদ্দেশ্য সফর করা যাবে না। সেগুলো হলঃ মসজিদে হারাম, মসজিদে আকসা এবং আমার মসজিদ (মসজিদে নববী)।
এখানে দেখা যাচ্ছে যে, কোরআন ও সুন্নাহ মু’মিনদের হৃদয় ও মানসপটে আল-কুদসের ব্যাপারে বিশ্বজনীন একটি চিন্তা ও চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে। আল-কুদসের ব্যাপারে যে চেতনা সেটা শুধুমাত্র একটি মসজিদের চেতনা নয়। এছাড়াও আল-কুদসের ব্যাপারে যে চিন্তা-চেতনা ও আবেগ সেটা শুধুমাত্র মুকাদ্দাস একটি স্থান সংক্রান্ত চেতনাও নয়। আল-কুদসের চেতনা একই সাথে তাওহীদের চেতনা, একটি উম্মতের চেতনা এবং স্বাধীনতার চেতনা। মূলত, এই চিন্তাই আল-কুদসকে মুসলমানদের জন্য এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে দিয়েছে। আল-কুদস এমন এক চেতনার নাম, যে চেতনা মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন, মুসলিম সত্ত্বার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সকল পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান আনা মুসলমান হওয়ার পূর্ব-শর্ত। আল-কুদসের প্রথম বিজেতা হলেন হযরত দাউদ (আঃ), তিনি ইসলামের একজন নবী। সেখানে মসজিদ নির্মাণকারী হলেন হযরত সুলায়মান (আঃ), তিনিও ইসলামের একজন নবী। সেই মসজিদের দেখভাল করেন যারা, হযরত যাকারিয়া (আঃ), হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), তারাও ইসলামের পয়গাম্বর। সেখানে অবস্থিত মসজিদের জন্য উৎসর্গিত হযরত মারইয়াম কোরআনে দৃষ্টিতে মহান ও মহিয়সী একজন নারী। কওমকে এই অঞ্চলে হিজরত করার ব্যাপারে উৎসাহিতকারী হযরত মুসা (আঃ)ও ইসলামের একজন নবী। এই অঞ্চলে দুনিয়ায় আগমনকারী এবং তার দাওয়াতকে সমগ্র মানবতার নিকট এই অঞ্চল থেকে প্রচারকারী হযরত ঈসা (আঃ)ও ইসলামের একজন নবী।
এই চিন্তা ও চেতনার কারণেই রাসূল (সঃ) কর্তৃক হাদীসসমূহে লক্ষ্য হিসেবে প্রদর্শিত আল-কুদস তার ওফাতের ছয় বছর পরে ইসলামের শহরের পরিণত হয়। ইসলামের ইতিহাসে কুদস এক অভিন্ন স্থান দখল করে আছে।
প্রথমত, হযরত উমরের মাধ্যমে আদালতের দেখা পায়।
দ্বিতীয়ত, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর আমানের মাধ্যমে শান্তির স্থানে পরিণত হয়।
তৃতীয়ত, ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের মাধ্যমে এই পবিত্র ভূমি পুনরায় শান্তির শহরে (দারু’স-সালাম) রূপান্তরিত হয়।
উসমানী খিলাফতের সুলতানগণ মক্কা ও মদীনাকে এক হারাম এবং কুদসকে অপর হারাম হিসেবে গণ্য করে নিজেদেরকে ‘খাদেমূল হারামাইন’ এবং ‘হামিউল কিবলাতাইন’ বলতেন। আল-কুদস যখন থেকে মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়েছে তখন থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে এখনো যুদ্ধ-বিগ্রহ বিরাজ করছে। উম্মাহ যেন তার প্রাণকে হারিয়ে ফেলেছে।
যদি কুদসের চিন্তাকে লালন না করা হয়, তাহলে সমগ্র উম্মাতই ফিলিস্তিনে পরিণত হবে।
এক অর্থে বলতে গেলে হয়েছেও তাই। মুসলমানগণ যখন কুদসের চেতনাকে সঠিকভাবে লালন করতে পারবে, কুদসের পতাকাকে হৃদয়ে ধারণ করবে, মু’মিনগণ যখন কুদসের চেতনাকে মানসপটে লালন করবে, তাওহীদের চেতনা ও উম্মাহর ধারণা নিয়ে পথ চলবে, তখনই কেবল কুদসের মত সমগ্র দুনিয়াও তাদের জন্য এক বসবাসযোগ্য দুনিয়ায় রূপান্তরিত হবে এবং সমগ্র মানবতার জন্য মুবাওয়্যা সিদক/সাদাকাতের ভূমিতে পরিণত হবে।
আজ মানুষের জন্য একটি মারহামাতের চুক্তির প্রয়োজন। আর এই চুক্তি যে স্থানে স্বাক্ষরিত হবে সেই স্থান হল কুদস। আসুন, দুনিয়ার সকল ধর্মের মানুষকে কুদসে একত্রিত করি। একটি মারহামাতের চুক্তি নিয়ে কাজ করি। আর এই চুক্তিতে যে সকল ক্রাইটেরিয়া থাকবে সেটাকে আমরা ‘কুদস ক্রাইটেরিয়া’ নাম দেই। এই কুদস ক্রাইটেরিয়া সমূহ দুনিয়ার সকল মানুষকে তার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার ক্রাইটেরিয়া হিসেবে পরিগণিত হোক। এই কুদস ক্রাইটেরিয়া সমগ্র মানবতার শান্তির অতন্ত্র প্রহরী হোক।
সর্বশেষ হযরত মুসা (আঃ) ভাষায় দোয়া করতে চাইঃ
“قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ”
মূসা শপথ করলো, “হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি এই যে অনুগ্রহ করেছো, এরপর আমি আর অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না৷”
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ