মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর – “আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন”[1] – এই কথার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের যে আকল সেই আকল কর্তৃক আল্লাহ তায়ালার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা সম্ভবপর নয়। তবে তাঁর যে সৌন্দর্য সেটা তাঁর জামাল সিফাতের মাধ্যমে তার সৃষ্টিতে যে অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে সেটার মাধ্যমে একটু হলেও উপলব্ধি করা যেতে পারে।

কেননা মহান প্রভু যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন সেটাকেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে  তৈরি করেছেন।[2] এই মহাবিশ্ব হলো, ‘আহসানুল খালিকীন’ মহান প্রভুর এক অপরূপ শিল্পকর্ম। এই ভাবে বিন্দু থেকে সিন্ধু পর্যন্ত সমগ্র মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সৌন্দর্য, সুর, শৃঙ্খলা, পরিমিতি, রুচি, কোমলতা ও স্বকীয়তা বিদ্যমান।


মানুষকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সৃষ্টিকারী আমাদের মহান রব, দ্বীনের প্রতি যেরূপ আবেগ দিয়েছেন  অনুরূপভাবে নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যবোধকেও মানুষের ফিতরাতের মধ্যে বপন করে দিয়েছেন। এ কারণে মানুষ তাঁর সৃষ্টির সূচনাকাল থেকেই সঠিক, সুন্দর ও ভালোর মতই নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যের দিকেও ছুটে চলেছে। সকল পয়গাম্বর-ই মানুষকে তাওহীদের পাশাপাশি সুন্দর ও নান্দনিকতাকেও শিখিয়েছেন। এই বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হযরত পয়গাম্বর (স) – এর জীবনও সৌন্দর্য, লাবণ্য, সুষমা ও নান্দনিকতার উপমায় ভরপুর। রাসূলে আকরাম (স)- এর নেতৃত্বে প্রথম মুসলিম প্রজন্ম তথা সাহাবীগণ মদীনায় তাঁদের মসজিদ, তাঁদের কিবলা, তাঁদের আজান, তাঁদের স্থাপত্য, তাঁদের হস্তশিল্পে এবং শহরকে গড়ে তুলেছিলেন। এভাবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁরা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রথম দৃষ্টান্ত রেখে যান।  ফলশ্রুতিতে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার প্রথম বীজ মদীনার সমাজেই রোপিত হয়েছিলো। সমগ্র ইতিহাকাল ধরে মুসলমানদের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণাকে গঠনের ক্ষেত্রে তাওহীদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং সদকায়ে জারিয়া, আমলে সালেহ করার নিয়ত ও চিন্তা, শিল্প ও চারুকলার বিভিন্ন শাখার বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার উৎস হলো, কোরআন ও সুন্নত। মূলত ‘ইহসান’ নামক মূলনীতি (সবকিছুকেই সুন্দরভাবে করা ও সর্বদা সর্বোত্তম আচরণ করার নীতি)–ই হলো এই শিল্পকলা ও নান্দনিকতার মূলভিত্তি। ইহসান যেমন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে, একইভাবে তা আত্মিক ও শারীরিক নান্দনিকতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। সাদামাটা হওয়া, যথার্থ উপযোগিতা, প্রশান্তিজ্ঞাপক হওয়া, ব্যবহারযোগ্যতা, সাশ্রয়ী হওয়া, বিনয়ভাব প্রকাশ করা, স্বাভাবিকতা এবং ইহসানের আখলাক এগুলো হলো ইসলামে শিল্পভাবনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

 ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা শিল্প ও নান্দনিকতার অসংখ্য সব মহাকীর্তি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইট ও পাথরে জ্ঞান ও হিকমতকে নকশা করে নান্দনিকতার মূর্তপ্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা মসজিদসমূহ, সুর থেকে হৃদয়ে বয়ে যাওয়া সঙ্গীত, সচেতন দ্বীনদারীর মধ্য দিয়ে জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগের ফল হিসেবে গড়ে উঠা শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এবং যতটা সম্ভব সূক্ষ্ম দ্বীনদারীর ছাপ বহনকারী অসংখ্য স্থাপত্যকর্মের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প শুধু পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে শুধুমাত্র একটি শৈল্পিক অলঙ্করণের মতো সূক্ষ্মভাবে গাঁথাই হয়নি, একইসাথে তা পরকালের অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আত্মা ও হৃদয়ের আধ্যাত্মিক আবহতেও গভীর ছাপ রেখেছে।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পাথরখণ্ডগুলো মেহমেদ আগা ও খোজা সিনানের মত বিখ্যাত সব স্থাপত্যবিদের হাতে মসজিদ, ইমারত, সরাইখানা, ফোয়ারা ও সেতুতে রূপান্তরিত হয়ে একটি সৌন্দর্য ও অর্থবহতা তৈরি করেছে। সুলতান আহমেদ, সুলেইমানিয়া, সেলিমিয়া ও অন্যান্য মসজিদসমূহ লাভী, লামী ও দেদে এফেন্দি ও ইত্রি বেয়- এর রঙ, ছন্দ ও সঙ্গীতের স্পর্শে অনুরণিত হয়েছে। সুলেয়মান চেলেবি, ফুজুলী, ইউনুস এমরে ও রুমির বালাগাত ও ফাসাহাতে ভাষা ও সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা ক্যালিওগ্রাফি, জলরঙ ও মনোরম টাইলসের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প ও নান্দনিকতার শ্রেষ্ঠ উপমাকে প্রদর্শন করেছে। ইসলামী শিল্পের এই অমূল্য নান্দনিক কর্মসমূহের সামনে মানুষ তার বিস্ময় ও মুগ্ধতা লুকাতে পারে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলামী সভ্যতা কেবলমাত্র জ্ঞান, চিন্তা ও ইরফানের সভ্যতাই নয়, একই সাথে তা নান্দনিকতা ও শিল্পের সভ্যতাও বটে। 

 আধুনিক যুগে এসে ইসলামী সভ্যতা তাঁর নান্দনিকতা ও শিল্পমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীরতাকে হারানো শুরু করেছে। ইসলামের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণা আমাদের শহর, মেট্রোপলিস, মেগাপলিসগুলোতে তো নয়ই, আমাদের মসজিদ স্থাপত্য ও শিক্ষাকেন্দ্রসমূহেও প্রতিফলিত হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য ইসলামী শিল্পকলার অনেক দিক শুধুমাত্র চর্চার অভাবে আজ বিলুপ্তির পথে! এক্ষেত্রে মুসলিম  উম্মাহ বিগত কয়েক শতক ধরে যে কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছে ইসলামী শিল্পকলা বিলুপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এর প্রভাব রয়েছে। মুসলমানগণ অতীতে শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে অসাধারণ সব উপমা সৃষ্টি করলেও, সেই উপমাসমূহের উপর ভিত্তি করে আধুনিক যুগের নান্দনিকতা ও শিল্পের দৃষ্টিকোণকে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মৌলিক ছাপ ও কাজ তৈরিতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।

শিল্প হলো এমন একটি বিষয়, যেখানে নির্দিষ্ট কোন একটি কাজের নান্দনিক অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেটাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবে শুধুমাত্র কিছু ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। শিল্পের অনেক মৌলিক শাখাকে উপেক্ষা করে সেটাকে শুধুমাত্র সঙ্গীত, নাটক, সিনেমার মতো ভিজুয়্যাল কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ মনে করা এবং এই ক্ষেত্রগুলোর ছায়াতলে আটকে পড়া অনেক বড় একটি সমস্যা।

একইভাবে, শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে মুসলমানরা শতাব্দীকাল ধরে যে শিল্পকর্মগুলো সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর মাধ্যমে তাঁরা শিল্প, সৌন্দর্য ও পরিশীলিত রুচিবোধকে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে মেটাফিজিক্স ও অতীন্দ্রিয়তাকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়ার যে মনোভাব, এর প্রভাবে ইসলাম ও শিল্পকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা রীতিমত ভুল একটি চিন্তা।

পরিশেষে বলতে হয়, শুধুমাত্র অতীতের শিল্পকর্মসমূহকে প্রদর্শন করে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতাকে তুলে ধরা ও পরিচিত করানো সম্ভবপর নয়। ইসলামী শিল্পকলার ধারণাকে আধুনিক যুগে আবারও সকল বৈচিত্র্যসহ মৌলিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করা এবং সমগ্র মানবজাতির প্রশংসার জন্য উপস্থাপন করা, সৌকর্যময়তার প্রতীক হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আল্লাহর সৌন্দর্যে সম্মানিত হতে ইচ্ছুক সকল মুমিনদের উপর একটি  আবশ্যকীয় দায়িত্ব।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

[1] মুসলিম, ঈমান, ৪।

[2] আস-সাজদা, ৭৭।

৬৪৫ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top