আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানকে এই শতাব্দীর গাজ্জালী বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। কেননা তিনিও গাজ্জালীর মতই যুগ জিজ্ঞাসার জবাবকে ইসলামের আলোকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং চিন্তা ও দর্শনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নতুন প্রস্তাবনা দিয়েছেন।
এই ক্ষেত্রে তিনি আকলকেও নতুন ভাবে সংজ্ঞায়িত করে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-লিসান ও’য়াল মিযান আবি’ত তাকাওসিরুল আকলিয়্যা ( ভাষা ও মানতিক অথবা আলকের বহুত্ব) এবং রুহুল হাদাসা (আধুনিকতার রূহ) নামক গ্রন্থদ্বয়ে এই বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান আকলকে জাওহার (মূলসত্ত্বা) হিসেবে নয় বরঞ্চ তিনি আকলকে মানুষের একটি কার্যকলাপ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং আকলকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। তাঁর মতে এই তিন প্রকার আকল হল ;
১। আকল-ই মুজাররাদ,২। আকল-ই মুসাদ্দাদ,৩। আকল-ই মুয়াইয়্যাদ।
আকল-ই মুজাররাদ হল, এমন আকল যা শুধুমাত্র বিশ্বসৃষ্টির বাহ্যিক বিষয় সমূহকে দেখতে পায় ও খুঁজে পায় এবং এর উপর ভিত্তি করে সকল কিছুকে গড়ে তুলে। এই আকল হল এমন এক আকল, যা বিশ্বসৃষ্টির হাকিকতকে খুঁজে পায় না। এই আকল হল তাওসিফি আকল যা আমাদেরকে শুধুমাত্র ঠিকানার দিকেই ইঙ্গিত করেই ক্ষান্ত থাকে। শুধুমাত্র একটি জগত অর্থাৎ মূলকের (বস্তুগত) জগতকে প্রত্যক্ষ করে থাকে, শাহাদাতের জগতকে পর্যবেক্ষণ করাকেই যথেষ্ট মনে করে। তবে মালাকুতের জগতকে দেখতে পায় না, আলামূল গায়েব বা অদৃশ্যমান জগতের ব্যাপারে বেখবর ও উদাসীন এক আকল।
মুজাররাদ আকল একই সাথে আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল। অপরের উপর নির্ভরশীল এবং উপাদান নির্ভর। এই আকল সামগ্রিক উদ্দেশ্যকে বুঝতে, মাকাসিদকে উপলব্ধি করতে, ইজতিহাদ ও ইসতিমবাদ করতে অক্ষম। এই আকল শুধুমাত্র আক্ষরিক ও যাহিরি বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
আকল-ই মুসাদ্দাদ হল এমন আকল যা আমল ও আচরণের দ্বারা সজ্জিত। শুধুমাত্র তত্ব বা থিওরী নির্ভর নয় একই সাথে বাস্তবমুখী ও আমল নির্ভর। দুনিয়াতে কিভাবে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে ও মাফসাদাত কে দূরীভূত করতে হবে এই আকল তা জানে। অর্থাৎ কোন কিছুকে সে যখন বিশ্লেষণ করে তখন সে একশত বছর কে সামনে রেখে চিন্তা করে। কতটুকু ক্ষতি করতে কিংবা উপকার বইয়ে নিয়ে আসবে এই সকল বিষয়কে সে সামনে রাখে।
মুসাদ্দাত আকল উদ্দেশ্যকে খুঁজে পায় ও হিকমতকে বুঝতে পারে। শুধু তাই নয়্ হুকুম সমূহ যে সকল মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সেই সকল মূল্যবোধ সমূহকে পর্যন্ত জানতে ও বুঝতে পারে।
আকল-ই মুয়াইয়্যাদ হল এমন আকল যা বিশ্ব প্রকৃতির গোপন ও সুক্ষ্মতি সূক্ষ্ম বিষয় সমূহকেও চিনতে পারে। সৃষ্টির রহস্য অর্থাৎ সৃষ্টির হাকিকত সম্পর্কেও অবগত।
ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর করা আকলের এই শ্রেনী বিন্যাসকে উসূল, কালাম, ফিকহ, তাসাউউফ এবং মানতিকের মত জ্ঞানের শাখা সমূহকের উপর প্রয়োগ করেছেন এবং পাশ্চাত্য চিন্তা ও দর্শনের প্রতি তাঁর যে অভিযোগ সে অভিযোগকেও এর উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।
তাঁর মতে ঈমান হল, আকল- ই মুজাররাদ; আমল হল আকল-ই মুসাদ্দাদ, আর আখলাক ও ইখলাস হল আকল-ই মুয়াইয়্যাদ।
একই সাথে তিনি মনে করেন যে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা শুধুমাত্র মুজাররাদ আকলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাদের চিন্তায় মুসাদ্দাদ ও মুয়াইয়্যাদ আকলের স্থান নেই। একই সাথে আকলের ব্যাপারে তাঁর এই শ্রেণী বিন্যাসের মাধ্যমে অর্থাৎ তাকাওসুরুল আকলিয়্যার (আকলে বহুত্ব) মাধ্যমে এরিস্টটলের মানতিকের বিপরীতে ইসলামের মানতিককে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি ইলমূল মানতিককে ‘লুযুম’ পরিভাষার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং উসুল ও মানতিকের মধ্যকার সম্পর্কেও এই পরিভাষার উপর ভিত্তি করে করেছেন।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ