মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর – “আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন”[1] – এই কথার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের যে আকল সেই আকল কর্তৃক আল্লাহ তায়ালার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা সম্ভবপর নয়। তবে তাঁর যে সৌন্দর্য সেটা তাঁর জামাল সিফাতের মাধ্যমে তার সৃষ্টিতে যে অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে সেটার মাধ্যমে একটু হলেও উপলব্ধি করা যেতে পারে।
কেননা মহান প্রভু যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন সেটাকেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে তৈরি করেছেন।[2] এই মহাবিশ্ব হলো, ‘আহসানুল খালিকীন’ মহান প্রভুর এক অপরূপ শিল্পকর্ম। এই ভাবে বিন্দু থেকে সিন্ধু পর্যন্ত সমগ্র মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সৌন্দর্য, সুর, শৃঙ্খলা, পরিমিতি, রুচি, কোমলতা ও স্বকীয়তা বিদ্যমান।

মানুষকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সৃষ্টিকারী আমাদের মহান রব, দ্বীনের প্রতি যেরূপ আবেগ দিয়েছেন অনুরূপভাবে নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যবোধকেও মানুষের ফিতরাতের মধ্যে বপন করে দিয়েছেন। এ কারণে মানুষ তাঁর সৃষ্টির সূচনাকাল থেকেই সঠিক, সুন্দর ও ভালোর মতই নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যের দিকেও ছুটে চলেছে। সকল পয়গাম্বর-ই মানুষকে তাওহীদের পাশাপাশি সুন্দর ও নান্দনিকতাকেও শিখিয়েছেন। এই বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হযরত পয়গাম্বর (স) – এর জীবনও সৌন্দর্য, লাবণ্য, সুষমা ও নান্দনিকতার উপমায় ভরপুর। রাসূলে আকরাম (স)- এর নেতৃত্বে প্রথম মুসলিম প্রজন্ম তথা সাহাবীগণ মদীনায় তাঁদের মসজিদ, তাঁদের কিবলা, তাঁদের আজান, তাঁদের স্থাপত্য, তাঁদের হস্তশিল্পে এবং শহরকে গড়ে তুলেছিলেন। এভাবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁরা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রথম দৃষ্টান্ত রেখে যান। ফলশ্রুতিতে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার প্রথম বীজ মদীনার সমাজেই রোপিত হয়েছিলো। সমগ্র ইতিহাকাল ধরে মুসলমানদের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণাকে গঠনের ক্ষেত্রে তাওহীদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং সদকায়ে জারিয়া, আমলে সালেহ করার নিয়ত ও চিন্তা, শিল্প ও চারুকলার বিভিন্ন শাখার বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার উৎস হলো, কোরআন ও সুন্নত। মূলত ‘ইহসান’ নামক মূলনীতি (সবকিছুকেই সুন্দরভাবে করা ও সর্বদা সর্বোত্তম আচরণ করার নীতি)–ই হলো এই শিল্পকলা ও নান্দনিকতার মূলভিত্তি। ইহসান যেমন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে, একইভাবে তা আত্মিক ও শারীরিক নান্দনিকতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। সাদামাটা হওয়া, যথার্থ উপযোগিতা, প্রশান্তিজ্ঞাপক হওয়া, ব্যবহারযোগ্যতা, সাশ্রয়ী হওয়া, বিনয়ভাব প্রকাশ করা, স্বাভাবিকতা এবং ইহসানের আখলাক এগুলো হলো ইসলামে শিল্পভাবনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা শিল্প ও নান্দনিকতার অসংখ্য সব মহাকীর্তি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইট ও পাথরে জ্ঞান ও হিকমতকে নকশা করে নান্দনিকতার মূর্তপ্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা মসজিদসমূহ, সুর থেকে হৃদয়ে বয়ে যাওয়া সঙ্গীত, সচেতন দ্বীনদারীর মধ্য দিয়ে জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগের ফল হিসেবে গড়ে উঠা শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এবং যতটা সম্ভব সূক্ষ্ম দ্বীনদারীর ছাপ বহনকারী অসংখ্য স্থাপত্যকর্মের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প শুধু পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে শুধুমাত্র একটি শৈল্পিক অলঙ্করণের মতো সূক্ষ্মভাবে গাঁথাই হয়নি, একইসাথে তা পরকালের অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আত্মা ও হৃদয়ের আধ্যাত্মিক আবহতেও গভীর ছাপ রেখেছে।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পাথরখণ্ডগুলো মেহমেদ আগা ও খোজা সিনানের মত বিখ্যাত সব স্থাপত্যবিদের হাতে মসজিদ, ইমারত, সরাইখানা, ফোয়ারা ও সেতুতে রূপান্তরিত হয়ে একটি সৌন্দর্য ও অর্থবহতা তৈরি করেছে। সুলতান আহমেদ, সুলেইমানিয়া, সেলিমিয়া ও অন্যান্য মসজিদসমূহ লাভী, লামী ও দেদে এফেন্দি ও ইত্রি বেয়- এর রঙ, ছন্দ ও সঙ্গীতের স্পর্শে অনুরণিত হয়েছে। সুলেয়মান চেলেবি, ফুজুলী, ইউনুস এমরে ও রুমির বালাগাত ও ফাসাহাতে ভাষা ও সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা ক্যালিওগ্রাফি, জলরঙ ও মনোরম টাইলসের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প ও নান্দনিকতার শ্রেষ্ঠ উপমাকে প্রদর্শন করেছে। ইসলামী শিল্পের এই অমূল্য নান্দনিক কর্মসমূহের সামনে মানুষ তার বিস্ময় ও মুগ্ধতা লুকাতে পারে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলামী সভ্যতা কেবলমাত্র জ্ঞান, চিন্তা ও ইরফানের সভ্যতাই নয়, একই সাথে তা নান্দনিকতা ও শিল্পের সভ্যতাও বটে।


আধুনিক যুগে এসে ইসলামী সভ্যতা তাঁর নান্দনিকতা ও শিল্পমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীরতাকে হারানো শুরু করেছে। ইসলামের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণা আমাদের শহর, মেট্রোপলিস, মেগাপলিসগুলোতে তো নয়ই, আমাদের মসজিদ স্থাপত্য ও শিক্ষাকেন্দ্রসমূহেও প্রতিফলিত হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য ইসলামী শিল্পকলার অনেক দিক শুধুমাত্র চর্চার অভাবে আজ বিলুপ্তির পথে! এক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ বিগত কয়েক শতক ধরে যে কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছে ইসলামী শিল্পকলা বিলুপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এর প্রভাব রয়েছে। মুসলমানগণ অতীতে শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে অসাধারণ সব উপমা সৃষ্টি করলেও, সেই উপমাসমূহের উপর ভিত্তি করে আধুনিক যুগের নান্দনিকতা ও শিল্পের দৃষ্টিকোণকে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মৌলিক ছাপ ও কাজ তৈরিতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।
শিল্প হলো এমন একটি বিষয়, যেখানে নির্দিষ্ট কোন একটি কাজের নান্দনিক অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেটাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবে শুধুমাত্র কিছু ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। শিল্পের অনেক মৌলিক শাখাকে উপেক্ষা করে সেটাকে শুধুমাত্র সঙ্গীত, নাটক, সিনেমার মতো ভিজুয়্যাল কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ মনে করা এবং এই ক্ষেত্রগুলোর ছায়াতলে আটকে পড়া অনেক বড় একটি সমস্যা।

একইভাবে, শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে মুসলমানরা শতাব্দীকাল ধরে যে শিল্পকর্মগুলো সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর মাধ্যমে তাঁরা শিল্প, সৌন্দর্য ও পরিশীলিত রুচিবোধকে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে মেটাফিজিক্স ও অতীন্দ্রিয়তাকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়ার যে মনোভাব, এর প্রভাবে ইসলাম ও শিল্পকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা রীতিমত ভুল একটি চিন্তা।
পরিশেষে বলতে হয়, শুধুমাত্র অতীতের শিল্পকর্মসমূহকে প্রদর্শন করে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতাকে তুলে ধরা ও পরিচিত করানো সম্ভবপর নয়। ইসলামী শিল্পকলার ধারণাকে আধুনিক যুগে আবারও সকল বৈচিত্র্যসহ মৌলিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করা এবং সমগ্র মানবজাতির প্রশংসার জন্য উপস্থাপন করা, সৌকর্যময়তার প্রতীক হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আল্লাহর সৌন্দর্যে সম্মানিত হতে ইচ্ছুক সকল মুমিনদের উপর একটি আবশ্যকীয় দায়িত্ব।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ।
[1] মুসলিম, ঈমান, ৪।
[2] আস-সাজদা, ৭৭।


