ভাষার বুননে এক অভিজাত মালয় দার্শনিকের সভ্যতার পুনর্জাগরণের অভিযাত্রা

 

কুয়ালালামপুরের স্পন্দিত হৃদয়ে এক সবুজ শ্যামল অভিজাত এলাকা হিসেবে নিজের সগর্ব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বুকিত তুনকু। মালয়েশিয়ার আল্ট্রা-এলিট বা অতি-ধনিক শ্রেণির পছন্দের আবাসস্থল এটি। তাদের সুউচ্চ অট্টালিকা ও ভিলাগুলোর ভিড়ে সেখানে হঠাৎ চোখে পড়ে এক আন্দালুসিয় স্থাপত্যের দূর্গ প্রাসাদ। যেন পঞ্চদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়াকে কেউ জাদুবলে তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে মালয় ক্রান্তীয় অঞ্চলের বুকে। এটি হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’ (ISTAC)। পাহাড়ের চূড়ায় মশালের মত জ্বলতে থাকা এই স্থাপনাটি একজন সাধারণ দর্শকের চোখেও স্থাপত্যশৈলীর এক অপার বিস্ময়।

ISTAC এর গ্রাউন্ড, Sohail Nakhooda

১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ISTAC, বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার অবক্ষয়ের বিপরীতে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক জবাবের সূচনা করেছিল। অবাক করা বিষয় হলো এই প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা, নকশা, নান্দনিক ভূ-বিন্যাস এবং প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন একজনই—বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ, সৈয়দ মুহাম্মদ নকিব আল-আত্তাস।

আল-আত্তাস একটি ধ্রুব সত্যে বিশ্বাসী ছিলেন যে, ইসলাম একটি সভ্যতা হিসেবে তখনই বিকশিত হবে, যখন ভাষার মাধ্যমে ‘অর্থ’ বা ‘মিনিং’-এর সঠিক বিন্যাস ঘটবে। সেটা বস্তুগত বা অবস্তুগত, সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি সভ্যতার পরিমাপ তো তার জ্ঞান-প্রক্রিয়াকরণ (knowledge-processing) সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের জটিলতার ওপরই নির্ভর করে। আজকের মুসলিম বিশ্বে নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদনের যে দুর্ভিক্ষ চলছে, তার কারণ অনুসন্ধান এবং এর প্রতিকারে নতুন সরঞ্জাম ও সংগঠন তৈরির তাগিদ থেকেই আল-আত্তাসের এই অভিযাত্রা।

এবং বলা বাহুল্য, এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সবচেয়ে গোছানো ও পদ্ধতিগত জবাবটি আল-আত্তাসের মাধ্যমেই এসেছিল।

 

সৈয়দ মুহাম্মাদ নকিব আল আত্তাসের বেড়ে ওঠা

১৯৩১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া আল-আত্তাস ছিলেন জন্মগতভাবেই একজন অভিজাত। তার ধমনীতে বা’লাউই বংশধারার রক্ত প্রবহমান, যা ইয়েমেনের হাজরামাউত অঞ্চল থেকে উৎসারিত হয়ে ৩৭তম প্রজন্মে খোদ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। মাতৃকূলে তিনি তুর্কি অভিজাত রুকেয়া হানুমের মাধ্যমে জোহরের রাজপরিবারের সাথে যুক্ত। আবার তার মা, শরীফা রাকয়ান আল-আইদারুস ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার বোগোর অঞ্চলের সুন্দা রাজপরিবারের বংশধর।

ISTAC এর স্থাপনাশৈলী পরিকল্পনার সময় নকিব আল-আত্তাস

শৈশবে আল-আত্তাস জাভার মাদ্রাসা এবং জোহরের ইংরেজি স্কুলের দোলাচলে বেড়ে ওঠেন। তার মামারা জোহরের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে মামাদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি দুর্লভ মালয় পাণ্ডুলিপি এবং পশ্চিমা ধ্রুপদী সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন। ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞান, পশ্চিমা ক্লাসিকস এবং মালয় সাহিত্যের এই ত্রিবেণী সম্মিলনই পরবর্তীকালে তার আজীবনের কাজের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি মালয়েশিয়ায় ফিরে আসেন এবং মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি Some Aspects of Sufism as Understood and Practised Among the Malays নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই কাজটি তাকে কানাডা কাউন্সিল ফেলোশিপ এনে দেয়, যার মাধ্যমে তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পান। সেখানেই তিনি হ্যামিল্টন গিব, এ.জে. আরবেরি, তোশিহিকো ইজুতসু, সাইয়্যেদ হোসেন নাসের এবং ফজলুর রহমানের মতো ইসলামী অধ্যয়নের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন।

পরবর্তীতে তিনি লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)-এ এ.জে. আরবেরি এবং মার্টিন লিংসের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সেসময়ে মালয়েশিয়ার হাতেগোনা কয়েকজন ডক্টরেটধারীর একজন হিসেবে তিনি দ্রুত মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন পদে আসীন হন। ১৯৭০ সালে তিনি মালয়েশিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এর মালয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের রূপরেখা তৈরি করেন।

 

গণ্ডির বাইরে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ

কানাডা ও লন্ডন থেকে ডক্টরেট এবং পাণ্ডিত্য নিয়ে ফিরে আসার পর, মালয়েশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে আল-আত্তাসের প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সেখানে ষাট ও সত্তরের দশকের একাডেমিক পরিবেশ ছিল বিভিন্ন মতবাদের এক রণক্ষেত্র। সদ্য স্বাধীন, দ্রুত শিল্পায়িত এবং জাতিগতভাবে সংবেদনশীল মালয়েশিয়ায় তখন তরুণরা নতুন পথের সন্ধানে ছিল। সেই সময়ে আল-আত্তাস এমন এক ইসলামি ডিসকোর্স বা বয়ান হাজির করলেন, যা একইসাথে অনড় রক্ষণশীলতা এবং আধুনিকতাবাদী সংস্কার—উভয় থেকেই ভিন্ন। আত্তাসের ধাঁচ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঋদ্ধ এবং সভ্যতার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ।

গোটা মুসলিম বিশ্ব তখন আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার সন্ধানে। নুসান্তারা (মালয় দ্বীপপুঞ্জ) অঞ্চলে ধর্মীয় স্রোত প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: ঐতিহ্যবাদী বা ‘কাউম তুয়া’ এবং সালাফি বা ইখওয়ানি প্রভাবিত সংস্কারপন্থী বা ‘কাউম মুদা’। তরুণরা যখন ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বদর্শন বা ‘ওয়ার্ল্ড ভিউ’ হিসেবে খুঁজছিল, তখন সংস্কারপন্থীদের প্রভাব বাড়ছিল।

এখানেই আল-আত্তাস ভিন্ন এক পথের দিশা দিলেন। তিনি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি, আবার আধুনিকতাকেও অন্ধভাবে আলিঙ্গন করেননি। তিনি ইসলামের সভ্যতার গভীরতাকে নতুন করে আবিষ্কারের ডাক দিলেন। তার কাছে ইসলামি ঐতিহ্য কোনো স্থবির অতীত নয়, বরং এটি এক গতিশীল ধারাবাহিকতা। তিনি তথাকথিত ‘সালাফ’ বা পূর্বসূরিদের দোহাই দিয়ে বিগত এক হাজার বছরের জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্জনকে বাতিল করে দেননি। যদিও তার উচ্চমার্গীয় মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা কেবল ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু সামাজিকভাবে তার দর্শন এমন এক আত্মপরিচয় গড়ে তুলেছিল যা নির্দ্বিধায় ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে বিশ্বকে দেখতে শেখায়। যার মূল মালয় সংস্কৃতিতে প্রোথিত থাকলেও শাখা-প্রশাখা ছিল বিশ্বজনীন।

আল-আত্তাসের এই দর্শনের মূলে ছিল একটি গভীর সত্য: “যেকোনো সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হয় ভাষা এবং তার ধারণাগত স্থাপত্য (Conceptual Architecture) থেকে”।

 

ভাষা, চিন্তা ও সভ্যতা

অনেকেই ইসলামের ইতিহাসকে কেবল আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। কিন্তু আল-আত্তাস এখানে অনন্য। তিনি জোর দিয়েছেন ভাষার ওপর—বিশেষ করে কুরআনি আরবি ভাষার ওপর, যা ইসলামী সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি।

কুরআনি আরবির স্বচ্ছতা এর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। ত্রি-মাত্রিক ‘মাদ্দাহ’ বা মূলধাতুর ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই ভাষার একটি সুশৃঙ্খল সেমান্টিক বা অর্থতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে। প্রতিটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট এবং স্থিতিশীল ধারণাগত পরিসীমা আছে। এই কাঠামোর কারণেই মুসলিম অভিধানপ্রণেতারা হাজার বছর ধরে কাজ করে একটি নিখুঁত, বিজ্ঞানসম্মত শব্দকোষ তৈরি করতে পেরেছেন। অর্থের এই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে যে, কুরআনি আরবি অন্যান্য ভাষার মতো নয়। এটা স্থান, কাল বা পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও একটি বস্তুনিষ্ঠ সত্যকে অবিকৃতভাবে বহন করতে পারে।

আল-আত্তাসের মতে, আরবি ভাষাকে কুরআনের ভাষা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণই হলো এর সহজাত স্বচ্ছতা। সেই সময়ে গ্রিকো-রোমান বা পারসিক ভাষাগুলোর মতো আরবি কোনো পৌরাণিক শব্দভাণ্ডারের ভারে ভারাক্রান্ত ছিল না। আরবী ছিল নির্ভুলভাবে ধারণা প্রকাশ করতে সক্ষম এক বিশুদ্ধ ভাষা। এই ভাষাগত ‘মিতব্যয়িতা’ বা ইকোনমি ইসলামকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। এটি এমন এক বিশ্বদৃষ্টি তৈরি করেছিল যা আরবদের গণ্ডি পেরিয়ে পারসিক, আফ্রিকান, তুর্কি, এমনকি মালয়দেরও আকৃষ্ট করেছিল।

নুসান্তারা অঞ্চলেও এই ভাষাগত ও ধারণাগত স্বচ্ছতা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সেখানে সচেতনভাবে ও কৌশলগতভাবে মালয় ভাষাকে ইসলামের বাহন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। জাভানিজ ভাষার মতো এটি হিন্দু-বৌদ্ধ মহাকাব্যের অলঙ্কৃত শব্দভাণ্ডারে আচ্ছাদিত ছিল না। ইসলামের প্রচারকরা ধীরে ধীরে মালয় ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ আরবি পরিভাষা যুক্ত করেন, যাতে একটি নতুন ‘সেমান্টিক ফিল্ড’ বা অর্থবোধক ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাদের গদ্য ব্যবহৃত হতো আকিদা বা বিশ্বাসের স্বচ্ছ বয়ানে, আর কবিতার সাথে থাকত গভীর ব্যাখ্যা। ফলে আরবদের মতো মালয়দের ক্ষেত্রেও ইসলাম এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। তারাও একটি মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে একটি সমৃদ্ধ লিখিত সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিল।

 

সভ্যতার ব্যাকরণ : দ্বীন – মদিনা – তামাদ্দুন

মৌখিক ঐতিহ্য থেকে লিখিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে এই রূপান্তর, একটি গভীর সভ্যতার যুক্তি বা ‘লজিক’ উন্মোচন করে। আল-আত্তাস এই যুক্তিকে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত ধারণার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন: দ্বীন (ধর্ম), মদিনা (শহর) এবং তামাদ্দুন (সভ্যতা)।

ইংরেজিতে ‘Religion’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘religio’ থেকে, যার অর্থ মানুষ ও দেবতার মধ্যকার বন্ধন। কিন্তু এই বন্ধনটি কী বা কীভাবে তা পালন করতে হবে, সে সম্পর্কে এটি স্পষ্ট কিছু বলে না। এই অস্পষ্টতা পশ্চিমা ধর্মীয় ইতিহাসে বহু বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। এর বিপরীতে, কুরআনি ‘দ্বীন’ (যা সাধারণত ধর্ম হিসেবে অনূদিত হয়) শব্দটি دِ+ي+ن মূলধাতু থেকে এসেছে, যার সরাসরি সম্পর্ক ‘দাইন’ বা ঋণের সাথে। মানুষের জীবনের অস্তিত্বের জন্য খোদার কাছে যে ঋণ, তা পরিশোধের সেরা উপায় হলো একটি সংগঠিত সমাজ—যেখানে আইন ও বিধিনিষেধ আছে।

অন্য কথায়, ঋণ পরিশোধের উপযুক্ত স্থান হলো শহর বা নগর। এই সামাজিক বিন্যাস প্রকাশ পায় ‘মদিনা’ শব্দে, যা ‘মাদ্দানা’ ক্রিয়া থেকে এসেছে। আর এই মাদ্দানা থেকেই এসেছে ‘তামাদ্দুন’ বা সভ্যতা।

নবীজি (সা.) যখন ইয়াসরিবে পৌঁছালেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে ‘আল-মদিনা’ (দ্য সিটি) রাখলেন, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এখানেই মুসলিমরা শিখল কীভাবে খোদার প্রতি তাদের অস্তিত্বের ঋণ শোধ করতে হয়। হিজরত কেবল স্থান পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল ইসলামী ক্যালেন্ডার ও সভ্যতার সূচনা।

আল-আত্তাস ফরাসি ইতিহাসবিদ নুমা ডেনিস ফাস্টেল দে কুলঞ্জেসের সূত্র ধরে উল্লেখ করেন, গ্রিক ‘পলিস’ (শহর) কখনোই সর্বজনীন হতে পারেনি কারণ তাদের কোনো ‘ইউনিভার্সাল গড’ বা একচ্ছত্র খোদার ধারণা ছিল না। কিন্তু মদিনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘দ্বীন’-এর ওপর, যার শেকড় সেই আদিম প্রতিশ্রুতিতে (রোজ-এ-আলাস্ত)* প্রোথিত, যেখানে মানবজাতি সমস্বরে খোদার প্রভুত্ব স্বীকার করেছিল—”হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।” (আল-আরাফ ৭:১৭২)। তাই দ্বীন ও মদিনার ঐক্যের মধ্যেই একটি ‘কসমোপলিস’ বা বিশ্বজনীন নগরের ধারণা নিহিত।

হাজার বছর ধরে মুসলিমদের দ্বীন, মদিনা এবং তামাদ্দুনের এই সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন হয়নি, কারণ এটিই ছিল তাদের যাপিত জীবন। একজন দ্বীনদার ব্যক্তি মানেই ছিলেন একজন সভ্য মানুষ। এমনকি মিরাজের মতো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার পরও নবীজি (সা.) তাঁর শহর মক্কায় ফিরে এসেছিলেন ইসলামের সভ্যতার কাজ চালিয়ে যেতে। একজন মুমিনের ঈমানের দাবিই হলো নিজেকে, নিজের চিন্তাকে এবং নিজের কাজকে সভ্যতার মানদণ্ডে বিচার করা।

আর এই চিন্তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ISTAC

* ফুটনোট – রোজ-এ-আলাস্ত (روز الست): এটি সূফি মহলে বহুল প্রচলিত একটি ফারসি পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ— ‘আলাস্তু’-র সেই দিন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আরাফ-এর ১৭২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সেই মহান দিনকে এটি নির্দেশ করে, যেদিন সৃষ্টির আদিলগ্নে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত রূহকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আলাস্তু বিরাব্বিকুম?” (আমি কি তোমাদের প্রভু নই?)। উত্তরে সকল রূহ সমস্বরে সাক্ষ্য দিয়েছিল, “বালা!” (হ্যাঁ, অবশ্যই)। ইসলামী দর্শন ও সাহিত্যে মানুষের সাথে স্রষ্টার এই চিরন্তন ও আদিম প্রতিশ্রুতিকে ‘রোজ-এ-আলাস্ত’ বা ‘মিছাক’ (Covenant) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

 

ISTAC: পাহাড়ের চূড়ায় প্রজ্জ্বলিত মশাল

“মনে রেখো, আমরা এমন এক জাতি যারা আশা ও আত্মবিশ্বাস হারাতে অভ্যস্ত নই, এবং তার অনুমতিও আমাদের নেই। নিজেদের মধ্যে কলহ করা, ফাঁকা বুলি আওড়ানো আর নেতিবাচক আন্দোলন করে সময় নষ্ট করা আমাদের সাজে না, যখন যুগের আসল চ্যালেঞ্জ আমাদের গ্রাস করতে আসছে। আসল চ্যালেঞ্জটি বুদ্ধিবৃত্তিক, এবং এর বিরুদ্ধে ইতিবাচক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে—কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার দুর্গ থেকে নয়, বরং সঠিক জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার দুর্গ থেকে।” — আল-আত্তাস, Islam, Secularism, and the Philosophy of the Future (১৯৭৮)

দ্বীন ও তামাদ্দুনের এই ধারণাগত স্থাপত্যের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর। আর তখনই তা সমসাময়িক রাজনীতির মুখোমুখি হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম অভিজাতদের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেওয়া হয়, যার ফলে জ্ঞান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং উচ্চ সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। এই শূন্যতায় বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনগুলো ‘ম্যাস মোবিলাইজেশন’ বা গণজাগরণকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনী ক্ষমতা দখল এবং জাতিরাষ্ট্রের মাধ্যমে শরিয়া কায়েম করা।

আল-আত্তাস এই যুগের হুজুগ বা ‘zeitgeist’-কে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি শরিয়াকে কেবল নিছক আইনশাস্ত্রে (Jurisprudence) নামিয়ে আনার বিরোধী ছিলেন। তার মতে, সত্যিকারের সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হতে হবে জ্ঞানের স্তর থেকে, আর তার কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্ববিদ্যালয়।

ইসলামী স্বর্ণযুগে বায়তুল হিকমাহ, সুফি খানকাহ বা জাওয়িয়া এবং মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। আল-আত্তাসের মতে, এগুলো মসজিদের চারপাশে কেন্দ্র করে জ্ঞানের একটি সঠিক অনুক্রম বা হায়ারার্কি তৈরি করত—যার কেন্দ্রে থাকত ‘বিশ্বজনীন জ্ঞান’’ বা চিরন্তন জ্ঞান (যেমন, জ্যোতির্বিদ্যা), এবং তা থেকে ছড়িয়ে পড়ত মানুষের উপকারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জ্ঞান (যেমন, মেডিসিন)। সভ্যতার নবায়নের জন্য সেই ‘কেন্দ্র’ এবং তার উদ্দেশ্যকে ফিরিয়ে আনা জরুরি ছিল।

১৯৭৭ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে আল-আত্তাস তার এই যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি ফিলিস্তিনি-আমেরিকান পণ্ডিত ইসমাইল রাজি আল-ফারুকির কাছে তার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাসম্বলিত একটি পাণ্ডুলিপি অর্পণ করেন। এই ঘটনাটি পরবর্তীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি, IIIT এর প্রতিষ্ঠাতা

আল-আত্তাস এবং আল-ফারুকির বন্ধুত্ব ষাটের দশকের শুরুতেই জমে ওঠে। ১৯৭৪ সালে আল-আত্তাস আল-ফারুকিকে এক বক্তৃতায় অংশ নিতে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে স্থানীয় মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি তখন ‘আবীম’ (ABIM) বা মালয়েশীয় ইসলামি যুব আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তীতে আল-ফারুকিও টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে আল-আত্তাসকে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমন্ত্রণ জানান এবং ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ মুসলিম সোশ্যাল সায়েন্টিস্টস’ (AMSS)-এর একটি বড় সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেন। আল-আত্তাসের সেই বক্তৃতা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। আল-ফারুকি তখন লিখেছিলেন যে, আল-আত্তাসই হয়ে উঠেছেন এই সংগঠনের “raison d’être” বা “অস্তিত্বের মূল কারণ”। তিনি বলেছিলেন:

“কনভেনশনে আপনার পারফরম্যান্স সম্পর্কে কার্যনির্বাহী বোর্ডের সদস্য এবং অসংখ্য মুসলিম ভাইদের মতামত জানতে চেয়েছিলাম—তারা সবাই আপনাকে নিয়ে গর্বিত… আপনিই মূলত AMSS। ইসলামী চিন্তাধারাকে আপনার শাণিত করা এবং জ্ঞানের ঐতিহ্যে আপনার অবদানই হলো এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য।”

তবে শীঘ্রই তাদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। আল-ফারুকির অনুরোধে আল-আত্তাস “সেকুলারিজমের সাথে সংলাপ” (Dialogue with Secularism) শিরোনামে ৪০,০০০ শব্দের একটি পাণ্ডুলিপি লিখে প্রকাশের জন্য তার কাছে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপির ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে আল-আত্তাসের বারংবার জিজ্ঞাসার কোনো জবাব আসেনি। আল-আত্তাস লক্ষ্য করতে শুরু করেন যে, তার ধারণাগুলো কোনো কৃতজ্ঞতা স্বীকার ছাড়াই বিকৃত আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে তিনি নিজেই তার যুগান্তকারী কাজ ‘ইসলাম, সেকুলারিজম অ্যান্ড দ্য ফিলোসফি অফ দ্য ফিউচার’ বইয়ের অংশ হিসেবে এটি প্রকাশ করেন এবং ভূমিকার মুখবন্ধে “বুদ্ধিবৃত্তিক চোর (plagiarists) ও ভণ্ডদের” দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এক তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছেদ ছিল অত্যন্ত মৌলিক। এটি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অবমাননা ছিল না, বরং আল-ফারুকির সাথে তার দর্শনের গভীর ফাটলও স্পষ্ট করে দিয়েছিল। আল-ফারুকির কাছে “জ্ঞানের ইসলামীকরণ” ছিল মূলত আধুনিক বিষয়গুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নতুন পাঠ্যবই তৈরি করা। সহজ কথায়, তিনি আধুনিক ডিসিপ্লিনগুলোকে “ইসলামী” মোড়কে নতুন করে লিখতে চেয়েছিলেন।

আল-আত্তাস একে অগভীর বা ভাসাভাসা মনে করতেন। তার মতে, জ্ঞান দাঁড়িয়ে থাকে শব্দভাণ্ডার বা পরিভাষার ওপর। মুসলিম বিশ্বদৃষ্টিকে গঠনকারী মূল পরিভাষাগুলোর সংশোধন (Rectification) ছাড়া ইসলামীকরণ প্রজেক্টটি কেবল কিছু কুরআনের আয়াত সংবলিত পাঠ্যবইয়ে পর্যবসিত হবে, যেখানে মূল ধারণাগত সততা বা ‘কনসেপচুয়াল ইন্টেগ্রিটি’ থাকবে না। মানুষের পূর্ণাঙ্গ সত্তার প্রতিফলন ঘটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পুনর্গঠন না করলে এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে তাদের সঠিক অনুক্রমে (Hierarchy) ফিরিয়ে না আনলে মুসলিম মানসের বিভ্রান্তি দূর হবে না।

এই বিভাজন শীঘ্রই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১৯৮২ সালে ওআইসি (OIC) সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ‘জ্ঞানের সমন্বয়’ (Integration of knowledge)-এর জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব দেন। মাহাথিরের এই প্রস্তাব ছিল আল-ফারুকির ‘ইসলামীকরণ’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি—যে পরিভাষাটি আল-আত্তাসের দাবি অনুযায়ী তার মূল কাজ থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। আটটি মুসলিম দেশের সমর্থনে পরের বছর ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া’ (IIUM) প্রতিষ্ঠিত হয়। মাহাথিরের সাথে আল-ফারুকির ঘনিষ্ঠতাই IIUM-এর গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আল-আত্তাসের নিজ দেশে হলেও তা শেষ পর্যন্ত ফারুকির চিন্তাধারারই প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।

তবে ১৯৮৭ সালে আল-আত্তাস তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এক অভাবনীয় সুযোগ—প্রায় এক ‘একচ্ছত্র কর্তৃত্ব’ লাভ করেন। দীর্ঘকাল ধরে তিনি যে ছাত্র ও তরুণ বুদ্ধিজীবীদের গড়ে তুলেছিলেন, তা এক অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে।

ABIM- Malaysian Islamic Youth Movement এর সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং আল-আত্তাসের সম্ভবত সবচেয়ে প্রখ্যাত শিষ্য আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশীয় রাজনীতিতে তখন উল্কার গতিতে উত্থান ঘটিয়েছেন। আনোয়ারের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে আবীম তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে (আনোয়ারের প্রভাবে কৌতুক করে অনেকে ABIM-কে ‘আনোয়ার বিন ইব্রাহিম মুভমেন্ট’ বলেও ডাকত)। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণের ঢেউ এবং মালয়েশিয়ার নতুন মালয় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান—এই দুই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আবীম তখন জনমত গঠনে এক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

১৯৮২ সালে আনোয়ার যখন মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন মালয়েশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক মেলবন্ধনের সূচনা হয়—যার নেপথ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন আল-ফারুকি। শাসনযন্ত্রের ভেতরে ঢুকে আনোয়ার একের পর এক মন্ত্রিত্বের পদ ব্যবহার করে একটি ব্যাপক ‘ইসলামীকরণ কর্মসূচি’ এগিয়ে নিতে থাকেন—ইসলামী অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামের প্রতিফলন ঘটানো পর্যন্ত। ১৯৮৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর, তিনি আল-আত্তাসকে প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক করে ISTAC প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেন। যদিও ISTAC কারিগরিভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তবে এটি IIUM-এর অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়।

১৯৯০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা নিবেদন করে পবিত্র মিরাজের রাতে ISTAC-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। আল-আত্তাস নিজে এর প্রতিটি অংশের নকশা করেছিলেন। সিলিং-এর মুকারনাস থেকে শুরু করে উঠোনের ফোয়ারা—সবকিছুতেই ছিল আল-আত্তাসের সেই উচ্চমার্গীয় ইসলামী সংস্কৃতির ছাপ, যা তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন।

ISTAC এর গ্রাউন্ড, Sohail Nakhooda

ISTAC প্রতিষ্ঠার মাত্র এক দশক পর, ১৯৯৭ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমের বরখাস্ত হওয়ার ঘটনায় পুরো মালয়েশিয়া কেঁপে ওঠে। তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী আনোয়ারের এই পতন ছিল আকস্মিক। এশীয় অর্থনৈতিক সংকট (Asian Financial Crisis) মোকাবিলা নিয়ে সরকারের দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব—মাহাথির এবং তার ডেপুটি আনোয়ারের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। আনোয়ার চেয়েছিলেন পুঁজি বাজারকে শান্ত করতে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে; অন্যদিকে মাহাথির চেয়েছিলেন সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের হটিয়ে দিতে শক্তিশালী আর্থিক সহায়তা এবং কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণ। যা ছিল স্রেফ এক যান্ত্রিক বা টেকনোক্র্যাটিক দ্বিমত, তা দ্রুতই ব্যক্তিগত তিক্ততায় রূপ নেয়—এমন এক সংঘাত, যার ছায়া আজও দেশটির রাজনীতির ওপর বিস্তৃত। ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আনোয়ার ইব্রাহিমকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়।

তরুণ আনোয়ার ইব্রাহিম (বামে) এবং মাহাথির মোহাম্মদ (ডানে), এশিয়া সেন্টিনেল

কিন্তু ১৯৯৭ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমের পতন এবং মাহাথিরের সাথে তার সংঘাতের ফলে আল-আত্তাসও রাজনৈতিক রোষানলে পড়েন। মাহাথির আধুনিকতাবাদী এবং আল-ফারুকির মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন, ফলে তিনি আল-আত্তাসের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখাননি। ২০০২ সালে আল-আত্তাসকে ISTAC থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি তার স্বায়ত্তশাসন হারায়।

অথচ ছাত্র নির্বাচনে কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখা সত্ত্বেও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মাত্র এক দশকে ISTAC এমন সব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছিল যারা আজ বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী। তাদের মধ্যে রয়েছেন তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (MIT) বর্তমান পরিচালক ইব্রাহিম কালিন এবং বসনিয়ার সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি মুস্তফা চেরিচ। ইসলামী সভ্যতার মৌলিক অথচ বিমূর্ত উপাদানগুলো—যেমন শিক্ষার ধারণা, বিজ্ঞানের দর্শন এবং মানব আত্মার মনস্তত্ত্বের ওপর ISTAC অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা গ্রন্থ (Monographs) প্রকাশ করেছিল; যা পরবর্তীতে আরবি, ফারসি, তুর্কি, চীনা, রুশ এবং বসনিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই অ্যানমারি শিমেল, সাইয়্যেদ হোসেন নাসের এবং জাভেদ ইকবালের মতো বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এমনকি তরুণ হামজা ইউসুফও এর অনুরাগী ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে জায়তুনা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

 

একবিংশ শতাব্দীর জন্য শিক্ষা ও প্রতিফলন

ISTAC-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুগুণে বিস্তৃত আল-আত্তাসের আজীবনের সাধনা আমাদের সামনে গভীর চিন্তার খোরাক রেখে গেছে। তার ‘দ্বীন-মদিনা-তামাদ্দুন’ ফ্রেমওয়ার্ক ধর্মের সমসাময়িক সেক্যুলার শ্রেণীবিন্যাস থেকে মুক্তি খোঁজে এবং ইসলামকে একইসাথে একটি ধর্ম ও সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তার মতে, ইসলাম একইসাথে গভীরভাবে ব্যক্তিগত, অধিবিদ্যক (Metaphysical) এবং মনস্তাত্ত্বিক (Psychological); আবার পুরোপুরি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতাগত। ইসলাম যেমন পবিত্রতার (Sacred) কেন্দ্রবিন্দুকে ধারণ করে, তেমনি এর পরিধি পার্থিব জগত (Profane) অবধি বিস্তৃত। একজন মুসলিম নিজেকে গুরুত্বের সাথে ‘মুসলিম’ বলে দাবি করতে পারেন না, যদি না তিনি নাগরিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এবং মানবতার সম্মুখভাগে থাকা বিশ্বজনীন সমস্যাগুলো সমাধানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন।

যেহেতু আমাদের ‘দ্বীন’—অর্থাৎ খোদা ও মানুষের মধ্যকার ঋণের বন্ধন—সেই ‘রোজ-এ-আলাস্ত’-এর আদিম প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে (কেউ তা স্বীকার করুক বা না করুক), তাই যারা এই চুক্তিতে বিশ্বাস করেন, সেই মুসলিমদের ওপর এটি আবশ্যিক যে তারা মানবতার বৃহত্তর সমস্যাগুলো সমাধানে অবদান রাখবেন। ফলে মানবতার নৈতিক ও বস্তুগত সংকটগুলো—যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়, জনমিতিক পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্যের মহামারী এবং অভূতপূর্ব প্রাচুর্যের মুখে চরম অসমতা—মুসলিমদের আলোচনার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত।

এটি অর্জন করতে হলে মুসলিমদের কেবল এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বুঝলেই হবে না (যা আল-আত্তাস তার ‘ইসলাম অ্যান্ড সেকুলারিজম’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন), বরং গত তিন শতাব্দীতে বিশ্বকে আমূল বদলে দেওয়া বস্তুগত বাস্তবতাগুলোকেও বুঝতে হবে। আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে জ্ঞান উৎপাদনের অগ্রভাগে থাকা মুসলিম চিন্তাবিদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত বিশ্বের ‘বেস লেয়ার’ বা মূল ভিত্তিগুলো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখা। আর এর জন্য প্রয়োজন কেবল ‘ইসলামিক স্টাডিজ’-এর গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের ‘বেস লেয়ার’ বা মূল ভিত্তিগুলো (যেমন: এনার্জি সিস্টেম, ফাইন্যান্স, জিওপলিটিক্স) বোঝা।

অগ্রগামী চিন্তাবিদদের (Frontier thinkers) পক্ষে কেবল ‘ইসলামিক স্টাডিজ’-এর সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা আর সম্ভব নয়। আল-আত্তাসের ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ প্রকল্পের উদ্দেশ্য মুসলিমদের গোত্রবাদী বা প্রাদেশিক করে তোলা ছিল না। তার ধারণাগুলোকে পর্যাপ্ত প্রেক্ষাপট ছাড়াই কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক বা তুচ্ছ রাজনৈতিক খুটিনাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা মানে তার উত্তরাধিকারের (Legacy) প্রতি চরম অবিচার করা।

বিস্ময় ও আত্ম-সংশয়ের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া মুসলিমদের চালিত করতে আল-আত্তাস আমাদের শব্দভাণ্ডার ও আত্মবিশ্বাসের সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ওহীর ওপর ভিত্তি করে শব্দগুলোর পুনর্ব্যাখ্যা করতে হয়—যাতে আমরা বাইরের জগতের সেরা জিনিসগুলো ছেঁকে নিতে পারি, এবং কৌতূহল ও প্রত্যয়ের সাথে নতুন পথে পা বাড়াতে পারি।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আল-আত্তাসের কৌশল একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতা পুনর্জাগরণের যেকোনো প্রচেষ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। যুগের চেয়ে অগ্রবর্তী থেকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন যে জ্ঞান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো সভ্যতা নবায়নের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে তিনি এও স্বীকার করেছিলেন যে, তার পরিকল্পিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি অনিবার্যভাবে পরীক্ষামূলক হবে এবং এতে ভুল সংশোধন ও নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়বে। এই বিশালত্বের সমস্যার সমাধানে আমাদের অবশ্যই সভ্যতার পরিবর্তনের একটি সুদীর্ঘ মেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি (longue durée view) গ্রহণ করতে হবে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আল-আত্তাসের ধারণা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্থায়ী কেন্দ্রটিকে ফিরিয়ে আনা যা ব্যক্তির নিজের প্রতিচ্ছবি—যা জ্ঞানের একতা বজায় রাখবে এবং এর লক্ষ্যের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য স্পষ্ট করবে। এই পরিবেশে অর্জিত প্রতিটি বিশেষায়িত জ্ঞানই এই মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করবে। তবে এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, গত তিন শতাব্দীকে যা আলাদা করেছে তা কেবল জ্ঞানের অগ্রভাগের ছোটখাটো উদ্ভাবন নয়, বরং প্রকৃতি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই উদ্ভাবনগুলোর ‘শিল্প-পর্যায়ে পদ্ধতিগত প্রয়োগ’। এই প্রক্রিয়াই আমাদের ক্রমবর্ধমানভাবে মার্শাল হজসনের ভাষায় একটি ‘প্রযুক্তি-নির্ভর’ (technicalistic) সমাজে বন্দি করে ফেলেছে।

এমনকি একটি ইতিবাচক পরিস্থিতিতে যদি আল-আত্তাসের ভিশন অনুযায়ী জ্ঞানের সঠিক অনুক্রম ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিতও হয়, তবুও মুসলিমরা মানবতার স্তরে কার্যকর পরিবর্তন তখনই আনতে পারবে যখন—এই বিশ্বদৃষ্টিকে বৃহত্তর পরিসরে বস্তুগত বা মেটেরিয়াল লেভেলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

এটি অর্জনের জন্য মুসলিমদের কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা কল্পনা করা উচিত? কীভাবে আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করব, টিকিয়ে রাখব এবং বড় করব? আমরা কি এখনও ISTAC-এর মতো জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর নির্ভর করব? আল-আত্তাসের মতো স্বপ্নদ্রষ্টাদের কি সরকারের ভেতর এমন কোনো উচ্চপদ দেওয়া উচিত—যেমনটি চীনের সরকারে ওয়াং হুনিং-এর অবস্থান—যাতে ভিশনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে? নাকি আমাদের উচিত সেই হারিয়ে যাওয়া অভিজাত মুসলিমদের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা? যদি তাই হয়, তবে একটি সম্মানজনক উচ্চ-সংস্কৃতি (High culture) পুনর্নির্মাণের জন্য কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যাতে মুসলিম অভিজাতরা একত্রিত হতে আগ্রহী হন? এগুলো কঠিন প্রশ্ন যার কোনো সহজ উত্তর নেই, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার পুনর্জাগরণের যেকোনো সিরিয়াস প্রচেষ্টার জন্য এগুলো অত্যন্ত জরুরি।

RZS CASIS

আল-আত্তাস এখন ৯৪ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। সম্ভবত তার সর্বশেষ বই, ‘ইসলাম: দ্য কভেন্যান্টস ফুলফিলড’, দুই বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের এই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের কোনো একক জাদুকরী সমাধান হয়তো কারোর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়, তবে আল-আত্তাস নিঃসন্দেহে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি প্রশস্ত করে দিয়েছেন।

“তারা হলেন সেই মশাল যা দুর্গম পথে আলো দেখায়; আমাদের হাতে যখন এমন মশাল আছে, তখন মোমবাতির আর কী প্রয়োজন?”

অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান। 

লেখক পরিচিতি: মোহাম্মদ বিন আব্দুল মজিদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কৌশলবিদ (Strategist) হিসেবে যোগদানের আগে তিনি মালয়েশীয় ফেডারেল সরকারে ‘পলিসি ইকোনমিস্ট’ বা নীতি-অর্থনীতিবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি কুয়ালালামপুরে বসবাস করছেন।

 

অধিকতর পাঠের জন্য:

  • Islam, Secularism, and the Philosophy of the Future, Syed Muhammad Naquib Al-Attas
  • The Concept of Education, Syed Muhammad Naquib Al-Attas
  • Islam: The Covenants Fulfilled, Syed Muhammad Naquib Al-Attas
  • Preliminary Statement on a General Theory of the Islamization of the Malay Archipelago, Syed Muhammad Naquib Al-Attas
  • ISTAC Illuminated: A Pictorial Tour, Sharifah Shifa Al-Attas
  • The Origins of Malay Nationalism, William Roff
  • Islamic Revivalism in Malaysia: Dakwah among the Students, Zainah Anwar
  • The Educational Philosophy and Practice of Syed Muhammad Naquib Al-Attas: An Exposition of the Original Concept of Islamization, Wan Mohd Nor Wan Daud
  • Islamization of Knowledge, Ismail Al-Faruqi and Abdul Hamid Abu Sulayman
২০৬ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।
Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top