ইসলামী সভ্যতা; রাষ্ট্রের সীমা পেরিয়ে এক চিন্তার উত্তরাধিকার

আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে আমরা ইতিহাসের যে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছি, তাতে অনেক সময় ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের সীমাবদ্ধ ও সংকুচিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু এগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো মোটেও ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি বা অবসানের তারিখ নয়।

কারণ ইসলামী সভ্যতা কখনোই কোনো একটি রাষ্ট্রনির্ভর, নিছক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড়ায়নি। রাষ্ট্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল বটে, কিন্তু তা কখনোই একমাত্র ভিত্তি ছিল না। ইসলামী সভ্যতা কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বা ক্ষমতাকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা নয়। হ্যাঁ, ক্ষমতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা ছিল বৃহত্তর এক সভ্যতাগত ব্যবস্থার অংশমাত্র। ইসলামী সভ্যতা মূলত একটি সামগ্রিক সভ্যতা; যার কেন্দ্রে ছিল এক সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি, একটি চিন্তাধারা, একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনদর্শন। সেই দর্শনের আলোকে গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চা, শহর-স্থাপত্য, শিল্পকলা, সাহিত্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক কাঠামো।

এ কারণেই বলা হয়, হক ও শক্তিশালী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সভ্যতার যাত্রা কখনো বিলীন হয় না। ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, সেসব অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোথাও উপনিবেশিক শোষণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা ছিল ভয়াবহ; কোথাও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এতকিছুর মধ্য দিয়েও সেই সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন, শহরচিন্তা ও জ্ঞানগত উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্ঞান। বইয়ের পাতায়, আলেম ও চিন্তকদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের সিলসিলার মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা আজও জীবিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যগুলি, মসজিদ, মাদরাসা, সেতু, নগর পরিকল্পনার নিদর্শন, নিজেদের নীরব ভাষায় সেই সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। পাথরে খোদাই করা হাকিকতের রূহ, কারুকার্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা দর্শন আজও আমাদের সামনে উপস্থিত।

ইসলামী সভ্যতায় শহর পরিকল্পনা ছিল গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল। পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব নগর; যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ‘শহরের রূহ’ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই রূহ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে। এক বিন্দু পরিমাণও সে রূহ থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি।

শিল্পকলার প্রতিটি শাখায়; গান, কাব্য, ক্যালিওগ্রাফির রেখায় রেখায় আমরা দেখি সভ্যতার রূহানি ও আধ্যাত্মিক দিক। সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্বকে বোঝার যে চিন্তা সিলসিলা, তা আজও বিদ্যমান। মানবিক মূল্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব, ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য; সবই ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।

রমজান থেকে ঈদ, জিয়াফত থেকে সামাজিক উৎসব সবকিছু আজও আমাদের জীবনে এক গভীর রূহানি আবেশ নিয়ে উপস্থিত।

রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে, কিন্তু সভ্যতা তখনই ধ্বংস হয়, যখন মানুষের চিন্তাগত, নৈতিক, জ্ঞানগত, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক স্তর থেকে সেই সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ মুছে যায়। ইসলামী সভ্যতা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজও নানা রূপে, নানা মাত্রায় আমাদের মাঝে বিদ্যমান।

 

সভ্যতা ও রাষ্ট্র: সম্পর্ক ও বুঝাপড়া

এখানে একটি মৌলিক সভ্যতাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি, সভ্যতা ও রাষ্ট্র কখনোই একার্থক নয়। সভ্যতা মূলত মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, আখলাক, জ্ঞান, রুচিবোধ, নান্দনিকতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সমষ্টিগত রূপ; আর রাষ্ট্র হলো, সেই সভ্যতাগত জীবনের শাসন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি সাময়িক কাঠামো। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের পেছনে থাকা সভ্যতাগত চিন্তা ও মূল্যবোধ যুগের পর যুগ ধরে বহমান থেকেছে। ইসলামী সভ্যতা এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছে।

ইসলামি সভ্যতায় রাষ্ট্র কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না; রাষ্ট্র ছিল একটি উসিলা বা মাধ্যম। রাজনীতি এখানে গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র পথ নয়; বরং রাজনীতি ছিল আখলাক সমৃদ্ধ সমাজ, নৈতিক নগর, সাংস্কৃতিক ভারসাম্য এবং জ্ঞানচর্চার সহায়ক শক্তি। এই কারণেই ইসলামি সভ্যতায় রাজনীতিকে কখনোই সর্বগ্রাসী করা হয়নি; বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা ও জ্ঞান সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।

ইসলামী সভ্যতা আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র একটি মাধ্যম, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রাজনীতি এখানে কখনোই গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র উপায় ছিল না; বরং রাজনীতি ছিল একটি উসিলা। রাষ্ট্র ও রাজনীতি নৈতিক সমাজ, আখলাক সমৃদ্ধ নগর, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন এবং জ্ঞান ও রুচিবোধের সেবক হিসেবে কাজ করত।

ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আলেমদের জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব দৃঢ় হয়, মানুষ তার আত্মিক শান্তি খুঁজে পায়, রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল এসবের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা। এখানে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওয়াক্‌ফ ছিল ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অবকাঠামো, যা রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়েও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, মুসাফিরখানা, খাদ্য ব্যবস্থা, পানি ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছিল। আধুনিক রাষ্ট্র যে সামাজিক সেবাগুলোকে আজ ‘ওয়েলফেয়ার’ বলে চিহ্নিত করে, তার বড় অংশই ইসলামী সভ্যতায় ওয়াকফের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হলেও সমাজ ভেঙে পড়েনি; সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ রাজনীতি, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা, নগর বিনির্মাণ, সবকিছুই ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।

এই ইবাদতসম রূপেই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়েছিল। নগরগুলো মানুষের জন্য গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়। এমনকি কোথাও ক্ষমতার প্রকাশ থাকলেও, এক পর্যায়ে তা মানুষের কল্যাণের দিকেই নিবেদিত হতে বাধ্য হতো। কারণ সমাজ, জ্ঞান ও আলেমদের ভূমিকা ছিল আখলাক বিনির্মাণে কেন্দ্রীভূত। ফলশ্রুতিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ইসলামি সভ্যতা মানবতাকে দিয়ে গিয়েছে। কারণ ইসলামি সভ্যতার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না রাষ্ট্রকে, সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রকে বা নির্দিষ্ট কিছু দ্বারা দখল করা। একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সকলের কল্যাণ।

ব্রিটিশ জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করতে শিখেছি যে রাষ্ট্র দখল করলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়, বা কোনো কিছুকে দখল করে নিলেই সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এটিও আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মিরাস নয়। আমাদের পূর্বপুরুষগণ একটি সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিলেন, যেখানে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, জ্ঞান ও চিন্তা, শহর, স্থাপত্য, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি থেকে পরিবেশ সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি সিভিলাইজেশনাল বা সভ্যতাগত ক্ষেত্র, রাষ্ট্র বা দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এখানে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ হল, এই সভ্যতা বিনির্মাণের কাজটি সকল মানুষ করতে পারত। এই কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো সমাজ, এবং সমাজ শক্তিশালী হতো। সমাজ শক্তিশালী হলে সেখান থেকে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসত। অর্থাৎ এই চিন্তাধারা মূলত মানুষকে কনভেন্স করত, মানুষের উপর প্রভাব সৃষ্টি করত। মানুষ নিজের আকল খাটিয়ে তার সঠিক কাজের ক্ষেত্র, অবদানের জায়গা, নিজের উপকারের ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারত এবং সে অনুযায়ী অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমরা সেই জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছি।

পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের উপর একচ্ছত্রভাবে রাজনীতি করেছে, কিন্তু সেই রাজনীতি বহুক্ষেত্রেই আমাদের স্বাধীনতা দেয়নি। তারা চাপিয়ে দেওয়া শিখিয়েছে, জোরপূর্বক দখল, ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনীতি চাপিয়ে দেওয়া, ঋণ চাপিয়ে দেওয়া। কৃষি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে শোষণ এবং শোষণ নিয়ে কিছু বলা যাবে না, এই ধরনের চিন্তা চাপিয়ে দেওয়া; সবই তারা করেছে। অথচ ইসলামি সভ্যতার মূল পন্থা ছিল ইক্বনা অর্থাৎ কনভেন্স করা। কনভেন্স করেই এগিয়ে যাওয়া।

এই কনভেন্সের সবচেয়ে বড় নমুনা আমরা পাই প্রতিটি স্থাপত্যে। স্থাপত্য যখন চিন্তার ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেটিও ছিল কনভেন্সের একটি অংশ। মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিশীলতা, সর্বোচ্চ চিন্তা এবং সর্বোচ্চ হাকিকতের দিকে ধাবিত করার একটি মাধ্যম ছিল এটি। তাই ইসলামী সভ্যতায় ইস্তাম্বুল থেকে আন্দালুস, ইস্পাহান থেকে কুতুব মিনার- কোনো স্থাপত্যই শুধু ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়। এগুলো ছিল একেকটি চিন্তা ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ।

 

স্থাপত্য: চিন্তা ও আখলাকের দৃশ্যমান ভাষা

ইসলামী সভ্যতায় স্থাপত্য ছিল এক ধরনের নীরব দাওয়াত। এটি কেবল ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়; বরং চিন্তা, দর্শন ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েই মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিবোধ, সর্বোচ্চ শালীনতা এবং তাওহিদের চিন্তার দিকে আহ্বান জানানো হতো।

ইসলামী সভ্যতার স্থাপত্য কখনোই ইট-পাথরের সমষ্টি ছিল না। কর্ডোভার মসজিদের অসংখ্য খিলান বহুত্বের ভেতর ঐক্যের- ‘ওয়াহদাত’-এর ঘোষণা দেয়। আল-হামরার দেয়ালে খোদাই করা “লা গালিবা ইল্লাল্লাহু” কোনো সামরিক বিজয়ের ঘোষণা নয়; বরং ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের স্থায়ী স্মারক। একইভাবে ঝিনাইদহের মোহাম্মাদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানা, দারসবাড়ি (ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও কিছুটা হলেও টিকে আছে), খুলনার খান-জাহানের মসজিদও একইভাবে ওয়াহদাতের ঐক্যের দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

অর্থাৎ প্রতিটি জায়গায়; এই সভ্যতা ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একই সাথে হক্ব ও হাকিকতের চিন্তা, যার প্রস্ফুটিত রূপ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সকল অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেটি পেরেছিল বলেই সেই চিন্তার ভাষা আজও আমাদের আন্দোলিত করে। এর ছোট্ট নমুনা হলো- প্রতিটি মসজিদের পাথর, যা এখনও যেন ধ্যানে মগ্ন। সৌন্দর্য যেন জিকিররত, জ্ঞান যেন এখনও নূর ছড়াচ্ছে।

 

বাংলার ইসলামী সভ্যতা: আখলাক ও মূল্যবোধের সভ্যতা’

বাংলার ইসলামী সভ্যতা এবং বাংলায় ইসলামের আগমন ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ৩০০ বছর ধরে আলেমগণ, সুফি ও ব্যবসায়ীগণ আখলাকের দাওয়াত ও বাস্তব উপমা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এর ফলে সমাজ ও ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানসহ নানাবিধ উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এর ফলেই বিনা রক্তপাতে এখানে একটি বিজয় সাধিত হয়েছিল। এই বিজয়ের মূল ধারক ও বাহক ছিলেন সুফি দরবেশ, আলেম ও আখলাকসম্পন্ন ব্যবসায়ীগণ। তাঁরা এখানে সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

ফলশ্রুতিতে এই সুফি আলেমদের প্রভাবে ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের আখলাক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার ফলে যুগ যুগ ধরে সকল ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে একটি শক্তিশালী, আস্থাশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। দুনিয়ার চার ভাগের একভাগ অর্থনীতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। কৃষি, সমুদ্রাঞ্চল স্থাপনা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও শহর, নদীমাতৃক অঞ্চলে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সবকিছুই শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছিল।

ব্রিটিশ উপনিবেশের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও প্রায় ২০০ বছরের নিকৃষ্ট শোষণ চালানো হয়। আমরা হারিয়েছি আমাদের হাফেজা, স্থাপনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনি কাঠামো, সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক নীতি, বিশাল ওয়াক্‌ফ জমি, বনাঞ্চল ও প্রাণ প্রকৃতি। তবু এই ক্ষতির মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, পারিবারিক মূল্যবোধ আজও টিকে আছে।

ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ষাট গম্বুজ মসজিদ আমাদের দেখায়, তাঁরা শুধু জিকিরের মজলিশে নিমজ্জিত ছিলেন না; পানির নহর, অর্থনীতি, কৃষি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কত ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা এমন সিলসিলা তৈরি করেছিলেন, যেখানে নদী, বাতাস ও আলোকে উপেক্ষা করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানায় আজও মানুষের খাবারের ব্যবস্থার নিদর্শন দেখা যায়। অর্থাৎ একত্রে বসা ও মানুষের সাথে মেশার সংস্কৃতি আজও রমজান, ঈদ, শবে বরাত, মিলাদ ও মিরাজের মাধ্যমে বিদ্যমান।

শরফুদ্দিন আবু দাওয়ামার রেখে যাওয়া ফিকহি সিলসিলা, হাদিসের দারস, দারসবাড়ির জ্ঞান; সবই আজও সুফি আলেমদের মাদরাসা ও মসজিদের মাধ্যমে নানাভাবে বিদ্যমান। মক্তব সংস্কৃতি, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, একত্রে ইফতার, সহযোগিতা, গোশত বণ্টন, একজনের দ্বারা বহু মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার সংস্কৃতি আজও জীবিত।

সব সংকটের মধ্য দিয়েও আমরা একদিনের জন্যও আজান বন্ধ হতে দেইনি। নবী(সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো পরাস্ত হয়নি। কারণ বাংলার ইসলামী সভ্যতা কোনো স্থান দখল করেনি, স্থানকে আপন করে নিয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকাশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকল্প, অর্থনীতি ও কৃষির পুনরুত্থান সবই তাঁদের অবদান।

এত শোষণের পরও যদি এত কিছু টিকে থাকে, তবে এটুকুই বলা যায়, আমরা এমন একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক, যার রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পতন হলেও চিন্তা ও আখলাকি সিলসিলা শক্তভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি সভ্যতায় প্রতিটি শহর নিরাপদ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানরা শাসন করলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করেছে।

এই সভ্যতা কোনো ধর্ম, জ্ঞান বা ভাষাকে নষ্ট করেনি, বরং বিকশিত করেছে। এর বড় প্রমাণ বাংলা ভাষা। মুঘলদের চারবাগ সংস্কৃতি, পানির ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনায় জান্নাতের ধারণাকে দুনিয়ার নৈতিক ও শালীন রূপে প্রকাশ করা হয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা আজও একসাথে বসবাসের অবস্থান ধরে রাখতে পারছি, এটাই ইসলামী সভ্যতার অবদান।

 

সভ্যতা কেন বিলিন হয়নি?

সভ্যতা তখনই বিলুপ্ত হয়, যখন মানুষের চিন্তা থেকে নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও হাকিকতের অন্বেষণ মুছে যায়। যে সভ্যতা আখলাককে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, সে সভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের ভিত নিজেই ক্ষয় করে। ইসলামী সভ্যতা কখনোই আখলাককে প্রান্তে ঠেলে দেয়নি; বরং সভ্যতা ও আখলাককে সমার্থক করে তুলেছিল। এই কারণেই রাজনৈতিক পতন, উপনিবেশিক শোষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসলামী সভ্যতা সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি।

ইসলামী সভ্যতা কখনোই শুধু ক্ষমতা বা রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়নি। এটি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত, হাকিকত অন্বেষী এবং মানবতার কল্যাণমুখী এক সভ্যতা। মানুষকে সে দেখেছে সভ্যতা বিনির্মাণের কারিগর হিসেবে, আয়াত হিসেবে। ফলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লেও চিন্তা, আখলাক, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের সিলসিলা আজও বহমান। আন্দালুস থেকে আনাতোলিয়া, মদিনা থেকে বাগদাদ, শাম থেকে দিল্লি, ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকা; রাষ্ট্রীয় পতন সত্ত্বেও এই নগরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় জাগরণসহ নানা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের জন্য ছায়ার ভূমিকা পালন করেছে। ইবনে সিনা, ফারাবী, ফখরুদ্দিন রাজী, ইবনে খালদুনের মতো চিন্তকরা এমন জ্ঞান রেখে গেছেন, যার ওপর আজকের দুনিয়া এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

এই সভ্যতা ইতিহাসকে জাদুঘরের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। আন্দালুস, বাংলা, মুঘল বা ইস্তাম্বুল; সবখানেই সুর এক, বাদ্যযন্ত্র আলাদা। রূহানি আবেশ ও আখলাকি পরশ একই। এ কারণেই ইসলামী সভ্যতা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের গভীরে প্রথিত হয়েছে, আজও যা প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক।।

৪১৪ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of হাসান আল ফিরদাউস

হাসান আল ফিরদাউস

সংগঠক এবং সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক হাসান আল ফিরদাউস-এর জন্ম টাংগাইল জেলায়। পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উসূল, ফিকহ এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর বড় শিক্ষকদের সাহচর্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্কলার ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে নানাবিধ গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। একইসাথে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সম্পাদকও।
Picture of হাসান আল ফিরদাউস

হাসান আল ফিরদাউস

সংগঠক এবং সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক হাসান আল ফিরদাউস-এর জন্ম টাংগাইল জেলায়। পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উসূল, ফিকহ এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর বড় শিক্ষকদের সাহচর্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্কলার ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে নানাবিধ গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। একইসাথে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সম্পাদকও।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top