<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>দর্শন &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/thought-and-philosophy/philosophy/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Fri, 07 Aug 2026 08:19:13 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.3</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>দর্শন &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>নকীব আল আত্তাসের চিন্তাবিশ্বঃ দ্বীন, জ্ঞান ও সভ্যতার দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-thought-world-of-naqib-al-attas/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-thought-world-of-naqib-al-attas/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সা'দ মুসান্না]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 03 Apr 2026 14:43:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16713</guid>

					<description><![CDATA[সাইয়েদ মুহাম্মদ নকীব আল আত্তাস একালের অন্যতম মহান দার্শনিক, মুতাফাক্কির ও আলেম। আত্তাসের চিন্তাকাঠামোতে বরাবরই ইসলামী সমাজের মাঝে একটি নিজস্ব ধারণা, বোধ ও চিন্তাকাঠামো তৈরি করার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। মুসলিম সমাজের চিন্তাশীল মানসকে বিকশিত করা, নিজস্ব পরিভাষা তৈরি, এবং ‘প্রত্যাশিত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সাইয়েদ মুহাম্মদ নকীব আল আত্তাস একালের অন্যতম মহান দার্শনিক, মুতাফাক্কির ও আলেম। আত্তাসের চিন্তাকাঠামোতে বরাবরই ইসলামী সমাজের মাঝে একটি নিজস্ব ধারণা, বোধ ও চিন্তাকাঠামো তৈরি করার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। মুসলিম সমাজের চিন্তাশীল মানসকে বিকশিত করা, নিজস্ব পরিভাষা তৈরি, এবং ‘প্রত্যাশিত মুসলমান’ হয়ে ওঠার জন্য উম্মতকে জাগরিত করার লক্ষ্যেই আত্তাস কাজ করে গেছেন। দূরপ্রাচ্য থেকে মুসলিম উম্মাহকে জাগরণের আহ্বান জানানো এই চিন্তাবিদ তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন ইসলামী চিন্তার বিকাশে।</p>
<p>আত্তাস তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে ইসলামী চিন্তাকে কেন্দ্র রেখে করে জ্ঞানচর্চা ও ঐতিহ্যের ইহইয়ার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যেই তিনি International Institute of Islamic Thought and Civilization (ISTAC) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ‘ইসলামী প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমনকি অবকাঠামোগত দিক থেকেও পাশ্চাত্যের থেকে ভিন্ন হয়’ এ বিষয়টিকে তুলে ধরে নিজেই এর ডিজাইন করেছিলেন। এই ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি জীবনের শেষ অবধি ছাত্রদেরকে পড়ানো, গবেষণা, চিন্তাচর্চা ও লেখালেখি অব্যাহত রাখেন।</p>
<p>আত্তাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো “দ্বীন” কে নতুন ব্যাখ্যা করে দিয়ে একটি সভ্যতা নির্মাণের ধারণা আকারে উপস্থাপন করা। এর মাধ্যমে পাশ্চাত্যের অগ্রগতির মুখে আতঙ্কিত হয়ে পড়া মুসলিম আলেম ও চিন্তাবিদদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি ‘ইসলামীকরণ (Islamization)’ এর ধারণা সামনে এনে মুসলিম উম্মাহর সামনে নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেন এবং সেক্যুলারাইজেশনের মুখে মুসলমানদের কী অবস্থান হওয়া উচিত সে বিষয়ে মত প্রকাশ করেন।</p>
<p>এই আলোচনায় আমরা সংক্ষেপে আত্তাসের চিন্তাবিশ্বে একটা অনুসন্ধানী সফরের চেষ্টা করবো। বিশেষত সভ্যতা বিনির্মাণকারী হিসেবে দ্বীন, জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার দর্শন, ইসলামীকরণের ধারণা এবং পাশ্চাত্যের সেক্যুলারাইজেশনের ঢেউয়ের সম্মুখে আমাদের করণীয় নিয়ে আমরা আত্তাসের চিন্তা নিয়ে খানিকটা আলাপ তুলে ধরার চেষ্টা চালাবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বীনের পারিভাষিক অর্থ ও তার ব্যাপ্তি</strong></p>
<p>আত্তাসের মতে দ্বীন শব্দটি ‘দানা’ উৎসমূল থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ হলো ঋণী হওয়া। দ্বীন গ্রহণকারী ব্যক্তিকে বলা হয় ‘দাইন’ অর্থাৎ যিনি ঋণ গ্রহণ করেন। এখানে বিষয়টিকে এভাবে বুঝা যায়- দ্বীন গ্রহণ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মূলত ‘দায়ভার’ গ্রহণ করেন। মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত দ্বীনকে গ্রহণ করার মাধ্যমে মানুষ মূলত দুনিয়াতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতকে আমানত হিসেবে রক্ষা করা এবং ইমার তথা বিনির্মাণ করার দায়ভার গ্রহণ করে।</p>
<p>আত্তাস “দানা” ক্রিয়ার বিভিন্ন রূপ বা রূপান্তর বিশ্লেষণ করে দেখান যে এই পরিভাষাটি আমাদের দ্বীন ধারণা থেকে একটি রাষ্ট্রের ধারণায়, এবং সেখান থেকে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার ধারণায় পৌঁছে দেয়। একইভাবে তিনি দেখান দানা উৎসমূল থেকে রূপান্তরিত আরেকটি শব্দ হচ্ছে মদীনা।</p>
<p>“মদীনা” শব্দের অর্থ শহর—এ কথা উল্লেখ করে আত্তাস বলেন, এখান থেকে বোঝা যায় যে প্রতিটি শহরেরই একজন শাসকের প্রয়োজন, অর্থাৎ একজন ‘দাইয়্যান’-এর প্রয়োজন, যিনি শহরকে আদালতপূর্ণভাবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিবেন।</p>
<p>এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “দানে” শব্দের মধ্যে আদালত, ব্যবস্থা ও কর্তৃত্বের অর্থ নিহিত রয়েছে, এবং এই অর্থগুলো মূলত একটি সামাজিক কাঠামোর দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সামাজিকীকরণ ধারণাটিও “মাদ্দানা” ক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। “মাদ্দানা” শব্দের অর্থ হলো শহরকে ইমার করা, মাদানী (সভ্যতার অধিকারী) হওয়া এবং সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠা।</p>
<p><strong>আত্তাস ব্যাখ্যা করেন যে “সভ্যতা” শব্দটি “তামাদ্দুন” পরিভাষা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধতা বা পরিমার্জন। এই ব্যাখ্যার আলোকে তিনি বলেন, “দীন” শব্দটি মূলত এমন এক স্বাভাবিক প্রবণতার প্রতি ইঙ্গিত করে, যার মাধ্যমে মানুষ ইনসানী সমাজ গঠন করতে চায়, আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে এবং ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।</strong></p>
<p>ফলত, এই ব্যাখ্যা থেকে আত্তাস দেখান, দ্বীন মূলত মানুষের মধ্যে—</p>
<ul>
<li>সমাজ গঠন</li>
<li>আদালত প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা</li>
<li>ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা</li>
<li>সভ্যতা বিনির্মাণ</li>
</ul>
<p>এই বোধগুলো আমাদের মাঝে তৈরী করে, যার মধ্য দিয়ে মানুষ আল্লাহর খলিফা হিসেবে এই দুনিয়ায় তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>জ্ঞান সম্পর্কে আত্তাসের ধারণা</strong></p>
<p>আত্তাস জ্ঞানকে দুইভাগে ভাগ করেন।</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান<br />
২. মানুষের আকল ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান।</p>
<p>আত্তাসের মতে প্রথম প্রকার জ্ঞান, মানুষের অস্তিত্বের রহস্যকে উন্মোচিত করে এবং এর মাধ্যমে মানুষ তার নিজের সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে প্রকৃত অর্থে বুঝতে সক্ষম হয়। আত্তাসের মতে এই জ্ঞানই মানুষের উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান এক্ষেত্রে সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করে।</p>
<p>আত্তাসের দৃষ্টিতে পাশ্চাত্য এবং ইসলামের জ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পার্থক্য এটাই। পাশ্চাত্যের জ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে ভালো নাগরিক বানানো, যেখানে ইসলামে জ্ঞানের লক্ষ্য হলো মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্ককে ভালোভাবে অনুধাবন করা এবং এর মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে বুঝতে পারা।</p>
<p>আত্তাসের ভাষ্য উদ্ধার করছি-<br />
“ইসলামী শিক্ষাপদ্ধতির চূড়ান্ত লক্ষ্য সতিকারার্থে ভালো মানুষ গড়ে তোলা, পাশ্চাত্য সভ্যতার মতো রাষ্ট্রের জন্য সু-নাগরিক গড়ে তোলা না। ভালো মানুষ এর ধারণায় ‘ভালো’ শব্দটি একইসাথে আদবের ধারণাকে প্রকাশ করে, যা মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জীবনকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। আর আদবের তাৎপর্য হচ্ছে জ্ঞান, এ জ্ঞান হিকমত তথা প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত, জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষ্যও এতে প্রকাশ পাচ্ছে; এটি আত্মার অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখী কাজও বটে, যা আখলাকী মূল্যবোধ ও ইখলাসের ফলশ্রুতি। আর এর উৎস দর্শনও নয়, বিজ্ঞানও নয় বরং প্রত্যাদিষ্ট সত্য যা দ্বীন থেকে প্রবাহিত হয়”।</p>
<p>এখানে আত্তাস আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। আত্তাস মানুষের বুদ্ধি সম্পর্কে বলেন:</p>
<p>ইসলামে ‘আকল’ কেবল মস্তিষ্ক নয়। এটি ‘কলব’ নামক আধ্যাত্মিক ইদরাকী কেন্দ্রের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সত্যও মানুষের বুদ্ধির সীমার মধ্যে বোঝা সম্ভব। একে চেতন থেকে আলাদা করবার কোনো প্রয়োজন নেই।</p>
<p>এই কারণে আল-আত্তাস শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামীকরণের উপর জোর দেন। কারণ ভাবজগতে পরিবর্তন না ঘটলে বি-উপনিবেশীকরণ সম্ভব নয়। আর সেটি সম্ভব না হলে মুসলিম জগতের অসুস্থতার নিরাময় হবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বীন, ফিতরাত ও স্বাধীনতা</strong></p>
<p>আত্তাসের মতে দ্বীন ও ফিতরাতের ভেতর গভীর সম্পর্ক ও সাদৃশ্য রয়েছে। আত্তাস দ্বীনকে অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। অর্থাৎ আত্তাসের ভাষায়, দ্বীন হলো মানুষের ফিতরাতের বহিঃপ্রকাশ, মানুষের অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থা। দ্বীনবিহীনতা হলো অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত বিষয়।</p>
<p>আত্তাসের দৃষ্টিতে ফিতরাত হলো সেই মডেল বা ব্যবস্থা, যার উপর ভিত্তি করে মহান আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, এবং এটি আল্লাহর একটা সুন্নত তথা সুন্নাতুল্লাহ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্তাস বলেন, মানুষের প্রকৃতি হলো ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অর্থাৎ একটি সত্যিকার দ্বীনি জীবনযাপন করা মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি। এর প্রেক্ষিতে আত্তাস বলেন, স্বাধীনতা হলো মানুষের প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী জীবন যাপন করা। আত্তাসের মতে, এটি কেবল সচেতন আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই সম্ভব, অবিবেচিত বা অচেতন আত্মসমর্পণ কখনো মানুষের প্রকৃত অবস্থা হতে পারেনা। অসচেতন আত্মসমর্পণ হলো ক্ষণস্থায়ী আবেগ কিংবা মনকে প্রবোধ দেয়ার অবস্থা। কিন্তু সচেতন আত্মসমর্পণ হলো মানুষ যখন আত্মসমর্পণের প্রকৃত অর্থ, যুক্তি এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে বুঝে নিজের প্রকৃত অবস্থাকে কবুল করে নেয়, সে অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এবং এটা কেবল দ্বীনকে গ্রহণ করা, এবং সে আলোকে জীবনযাপন করার মাধ্যমেই সম্ভব।</p>
<p>উপরের আলোচনায়ও আমরা যেমনটা দেখিয়েছি, এখানে আত্তাসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে দ্বীনকে নিছক আচারসর্বস্ব কোনো কিছু হিসেবে ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আত্তাস এখানে বাহ্যিক বেশভূষার কথাও বলছেন না। বরং আত্তাসের দৃষ্টিতে দ্বীনের তাৎপর্য একটি সভ্যতানির্মাণকারী মানসিকতার উৎস হিসেবে, যা মানুষকে ফিতরাতের আলোকে জীবন যাপন করার পন্থা প্রদর্শন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সেক্যুলারায়নের প্রক্রিয়া</strong></p>
<p>সেক্যুলারিজম” শব্দটি “seaculum” মূল থেকে উদ্ভূত “secular” শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে, secular শব্দটি সময় এবং স্থান উভয়ের ভাবনাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আত্তাসের মতে, seaculum শব্দটি ব্যবহৃত হয় “এই যুগ” এবং “এই সময়ের” মধ্যে পৃথিবীতে বিদ্যমান বাস্তবতাগুলোকে চিহ্নিত করতে।</p>
<p>আত্তাসের ভাষায় সেক্যুলারাইজেশন হলো,</p>
<p>‘মানুষের আকল ও ভাষাকে প্রথমে দ্বীনি, তারপর মেটাফিজিক্যাল নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। এর ফলে মানুষের দৃষ্টি আখেরাত থেকে দূরে সরে সম্পূর্ণরূপে এই দুনিয়ার দিকে কেন্দ্রীভূত হয়’। একইসাথে তার দৃষ্টিতে সেক্যুলারাইজেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সামাজিক ঐক্য বা সংহতির প্রতীকগুলো থেকে দ্বীনকে আলাদা করে ফেলা। ফলশ্রুতি, সেক্যুলারাইজেশনের দরুন মুসলিম সমাজের ভেতরকার যে ঐক্য ও পারস্পারিক বোঝাপড়া তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এককথায়, সেক্যুলারাইজেশন মুসলিম সমাজের সামাজিক বুনন (social fabric) কে নষ্ট করেছে।</p>
<p>এর সূত্র ধরে আত্তাস দেখান, মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলারিজমের উদ্ভব বা সেক্যুলারাইজেশনের যে প্রক্রিয়া তার পুরোটাই পাশ্চাত্যের স্থানিক সমস্যা ও প্রেক্ষাপ্ট থেকে উদ্ভূত। পাশ্চাত্যের বিশ্বাসবোধ, তাদের চিন্তার ফলাফল হিসেবে সেক্যুলারিজমের আবির্ভাব ঘটলেও মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা ছিলো একটা আরোপিত প্রক্রিয়া। অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে পশ্চিমা চিন্তাদর্শনের একটা ঢেউ বয়ে যায় দুনিয়াব্যাপী। পাশ্চাত্যের চোখধাধানো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উন্নয়ন থেকে মুসলিম সমাজের ভেতর দুটো শ্রেণি তৈরি হয়-</p>
<ul>
<li>আলেমগণের একটা অংশ একে ফিতনা আখ্যা দিয়ে দূরে সড়ে যান। ফলশ্রুতিতে তারা এই ঢেউকে ঠিকমতো মোকাবেলা করতে পারেননি।</li>
<li>আরেকটা অংশ পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠত্বকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়ে হীনমন্য হয়ে পরে এবং আপোষকামী মানসিকতায় পাশ্চাত্যকেই সকল কিছুর মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে।</li>
</ul>
<p>আত্তাসের দৃষ্টিতে এই দ্বি-বিভাজন, মুসলিম সমাজের মাঝে গুরুতর বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এই হীনমন্য মানসিকতার দরুনই অনেকে ‘ইসলামিক লিবারেলিজেম’, ‘ইসলামিক কম্যুনিজমের’ মতো সংকর ধারণা উপস্থাপন করেছেন, আদতে যা পুরো ব্যবস্থাকেই হুবহু গ্রহণ করে একটা ইসলামী ছাঁচ দেয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুইনা।</p>
<p>আত্তাস দেখাচ্ছেন, সেক্যুলারাইজেশনের ফলে মানুষ নিজেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী অবস্থানে স্থাপন করেছে এবং আল্লাহর সাথে সঙ্গে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করেছে।</p>
<p>আত্তাসের মতে, সেক্যুলারাইজেশনের তিনটি পূরক অংশ আছে:</p>
<ul>
<li>১. প্রকৃতিকে কেবল বৈজ্ঞানিক অবজেক্ট হিসেবে দেখা, এর থেকে আধ্যাত্মিকতাকে বিচ্ছিন্ন করা।</li>
<li>২. রাজনীতিকে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন করা,</li>
<li>৩. মূল্যবোধকে পবিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া বন্ধ করা।</li>
</ul>
<p>এখানে সেক্যুলারিজম এবং সেক্যুলারাইজেশনের পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য।</p>
<ul>
<li>সেক্যুলারিজম হলো একটি আদর্শবাদ, যা মূলত নিজস্ব মূল্যবোধকে চূড়ান্তভাবে ধর্মীয়তার স্থলে বসায়। এস্থলে আত্তাস দেখাচ্ছেন, সেক্যুলারিজম বাহ্যিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দেখালেও আদতে সেক্যুলারিজমের আকাঙ্ক্ষাও মানুষের জীবনে একটা আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা, যা চরিত্রগতভাবে সম্পূর্ণ ধর্মীয়।</li>
<li>সেক্যুলারাইজেশন এমন একটি ধারণা যা মূল্যবোধকে চিরন্তন হিসেবে না ধরে আপেক্ষিক মনে করে। ফলে মানবিক কর্মকাণ্ডের একচ্ছত্র স্বাধীন ও ইতিহাসকে ক্রমাগত অগ্রসরমান এবং স্বাধীনভাবে পরিবর্তনশীল বলে মনে করা হয়। এ দৃষ্টিতে সেক্যুলারাইজেশন একটি অগ্রসরমান বিবর্তন প্রকল্পের মতো।</li>
</ul>
<p>আত্তাসের মতে, এই ধরনের অগ্রগতির ধারণার বিপরীতে মুসলমানরা যে “ঐতিহ্য’ ধারণা ব্যবহার করে, তা কোনো স্থবির অবস্থাকে বোঝায় না। বরং এটি নববী পথ ও পদ্ধতির প্রতি নির্দেশ করে, যা আল্লাহর ওহী ও নির্দেশনার মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। সুতরাং এই ঐতিহ্যও এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন বিকাশ বা উন্নয়নকে প্রকাশ করে।</p>
<p>তবে এখানে যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তা সেক্যুলারাইজেশনের ফলে উদ্ভূত ধারাবাহিক সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া পজিটিভিস্ট ধরনের অগ্রগতি নয়। বরং উস্তাদ এলমালি হামদি ইয়াজির–এর ভাষায়: “ফজিলত ও হাসানাতসম্পন্ন উন্নতির দিকে যে বিষয়গুলো মানুষকে নিয়ে যায়, সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন ও অগ্রগতি।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামীকরণের পন্থা</strong></p>
<p>পশ্চিমে বিদ্যমান আদর্শগুলোর অনুকরণ করে অগ্রগতি সম্ভব নয়; এ কারণে তিনি ইসলামীকরণ ধারণার প্রস্তাব করেছেন। আত্তাসের মতে, ইসলামাইজেশন সেক্যুলার দুনিয়ার প্রেক্ষিতে এক ধরনের বিবর্তন নয়, বরং মানুষের মৌলিক ও স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন।</p>
<p>আত্তাসের দৃষ্টিতে ইসলামীকরণ হলো,<br />
<strong>“Islamization is the liberation of man first from magical, mythological, animistic, national-cultural tradition, and then from secular control over his reason and his language.”</strong></p>
<p>ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার জন্য সর্বাগ্রে জরুরি ব্যবহৃত ভাষার ইসলামীকরণ। আত্তাস উল্লেখ করেন, ভাষা, চিন্তাভাবনা এবং যৌক্তিকতা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত; তাই ভাষা ইসলামীকৃত হলে, স্বাভাবিকভাবেই চিন্তাধারাও ইসলামী মূলনীতি অনুযায়ীই গড়ে উঠবে।</p>
<p>অপরদিকে, আত্তাস ভাষার ইসলামাইজেশন এবং দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার মধ্যেও যোগসূত্র আছে বলে মনে করেন। তার মতে, মুসলিম সমাজে যে অজ্ঞতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তার মূল কারণ মানুষদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়া।</p>
<p>আত্তাস ব্যাখ্যা করেন, ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে কেবল গুনাহ করা নয়, বরং অনৈসলামী ধারণার মাধ্যমে চিন্তাভাবনা শুরু করা। এ কারণে তিনি ভাষার ইসলাকীকরণ এবং সেই অনুযায়ী একটি চিন্তাকাঠামো প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।</p>
<p>তার মতে, জ্ঞানের ইসলামীকরণ করতে হলে প্রথমে শিক্ষা ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাবের দিকগুলো অপসারণ করতে হবে। বিশেষ করে মানবিক জ্ঞানকে পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত করতে হবে । তারপরে ইসলামী জ্ঞান ও মানবিক জ্ঞানের সমন্বয় করে শিক্ষা ব্যবস্থা। গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে জ্ঞানের ইসলামীকরণের একটি মৌলিক নীতিও তিনি হাজির করেছেন যেটা এরকম-</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. ইসলামী প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ।<br />
২. ইসলামী প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে বুঝা।<br />
৩. ইসলামী জ্ঞানের ভাষা আরবির উপর দক্ষতা ।<br />
৪. ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইসলামী জ্ঞানের দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক রূপ ও পটভূমি এবং বিশ্ব ইতিহাস হিসেবে ইসলাম অধ্যয়ন।</p>
<p>আল-আত্তাস মনে করেন শিক্ষাব্যবস্থায় এই ইসলামী বৈশিষ্ট্যকে যদি কার্যকরী করা যায় তাহলেই আমরা ঔপনিবেশিকতার কুফল থেকে মুক্তি পাবো এবং সমাজের ইসলামীকরণ বলতে যা বুঝায় তা তখন দৃশ্যমান হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কোরআনের দৃষ্টিতে সেক্যুলারাইজেশন</strong></p>
<p>আত্তাসের মতে, কোরআনে “সেক্যুলার” শব্দটির সবচেয়ে নিকটবর্তী ধারণা হলো ‘আল-হায়াতুদ্-দুনিয়া’। এই শব্দগুচ্ছের অর্থ দুনিয়ার জীবন বা পার্থিব জীবন। আত্তাস উল্লেখ করেন যে ‘দুনিয়া’ শব্দটি ‘দানা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নিকটবর্তী বা কাছে এনে দেওয়া বস্তু। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দুনিয়া এমন এক বাস্তবতা, যা মানুষের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও চেতনার নিকটবর্তী।</p>
<p>অর্থাৎ, দুনিয়া এমন কিছু যা মানুষকে ঘিরে রাখে এবং প্রভাবিত করে। এর এই প্রভাবের কারণে মানুষের চেতনা কখনো কখনো চূড়ান্ত গন্তব্য—আখিরাত—থেকে সরে অন্য দিকে মনোযোগী হয়ে পড়ে। তবে এখানে কোরআন মানুষকে দুনিয়ার জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বলে না; বরং দুনিয়ার সেই প্রবণতার ব্যাপারে সতর্ক করে, যা মানুষকে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে। কোরআন আমাদের যখন দোয়া শিখায়, তখন দুনিয়া-আখেরাত উভয় স্থানেই হাসানাতের কথা বলে।</p>
<p><strong>এই দিক থেকে বোঝা যায় যে “দুনিয়া” শব্দটি পুরোপুরি সেক্যুলারিজমের সমার্থক নয়। বরং কোরআন যখন দুনিয়ার কথা বলে, তখন এটিকে মানুষের নিকটবর্তী বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরে এবং আখলাকী মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। কিন্তু সেক্যুলারিজম দুনিয়ার জীবনকে আধ্যাত্মিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।</strong></p>
<p>অন্যদিকে আত্তাসের মতে সেক্যুলারিজমকে এক ধরনের অগ্রগতি হিসেবেও দেখা যেতে পারে, তবে এখানে “অগ্রগতি” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তা বোঝা জরুরি। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন, উন্নয়ন ও অগ্রগতি বলতে বোঝায়- রাসূল (সা.), তাঁর সাহাবীগণ, তাদের অনুসারীরা এবং পরবর্তীকালে ইসলামী সভ্যতার ১৪০০ বছরের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা ইসলামের যে সামগ্রিক বোঝাপড়া, সেদিকে ফিরে যাওয়া। অর্থাৎ এটি মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার দিকে তথা ফিতরাত ও দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন।</p>
<p>আত্তাসের মতে, অগ্রগতির ধারণা তখনই প্রকৃত অর্থ বহন করে, যখন তা এমন কিছুর দিকে নির্দেশ করে যা স্পষ্ট, নিশ্চিত, দৃঢ় এবং মূলত পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। এই কারণে যে হাকীকত ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত ও বিদ্যমান, তা মূলত পরিবর্তনের অধীন নয়। তাঁর মতে, পশ্চিমা অগ্রগতিমুখী চিন্তাধারা এমন একটি দ্বীনের উপর নতুন লক্ষ্য আরোপ করতে পারে না, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ইতিমধ্যেই নির্ধারিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সমাপনী</strong></p>
<p>মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সমাধান খুঁজতে ইসলামীকরণ (Islamization) ধারণার মাধ্যমে পথ প্রদর্শন করার চেষ্টা করছেন নকীব আল-আত্তাস। তার এই সামগ্রিক ও আন্তরিক প্রচেষ্টার দরুন তিনি সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারার একজন জীবন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।</p>
<p>গত শতকে ইসলামীকরণ প্রকল্প নিয়ে কমবেশি কাজ হয়েছে। আত্তাসের ইসলামীকরণ চিন্তা খানিকটা ভিন্ন। ফলত, অন্যান্য চিন্তকদের প্রস্তাবনার সাথে আমরা তুলনা করতে গেলে বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে মিলবেনা। তার ইসলামীকরণ প্রস্তাবনাকে কেবল বিদ্যমান বিষয়গুলোকে ইসলামী ধারণায় প্রকাশ করা হিসেবে বোঝা উচিত নয়। আত্তাস বলেন, ইসলামীকরণ কেবল আল্লাহর রাব্বুল আলামীনকে একমাত্র রব হিসেবে, সকল কিছুর নিয়ন্তা হিসেবে গ্রহণ করা এবং ফিতরাত ও ওহীর আলোকে জীবনকে সামগ্রিক পুনর্গঠনের মাধ্যমেই সম্ভবপর হতে পারে।</p>
<p>অন্যদিকে, আত্তাস “দুনিয়া” ধারণায় যে অর্থ প্রদান করেছেন, তা অনুসারে দুনিয়া মুসলমানদের জন্য কাছাকাছি ও উপলব্ধিযোগ্য একটি স্থান। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমকালীন নানান চিন্তকেরা যখন একটি নেতিবাচক বা মুখ ফিরিয়ে নেয়া উচিত এমন একটি বিষয় হিসেবে দুনিয়াকে তুলে ধরেন, তখন আত্তাস দুনিয়াকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে।<br />
এই পর্যায়ে আত্তাসের মতে, ইসলামীকরণ ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ায় মানুষের করণীয় হবে দুটি।</p>
<ul>
<li>মানুষকে নিকটবর্তী এই জগতের সঙ্গে অন্টোলজিক্যাল অর্থে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে,</li>
<li>এবং সেই সম্পর্ক সালিহ আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।</li>
</ul>
<p>আত্তাস তার বিশিষ্ট চিন্তাভাবনাকে প্রকাশ করেছেন প্রত্যাশিত মুসলমান গড়ে ওঠার প্রত্যাশায়। দুনিয়াকে একটি আবাসযোগ্য স্থান হিসেবে নির্মাণের জন্য সংগ্রামের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, মহান আল্লাহর খলিফা হিসেবে সৃষ্টিজগতকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করে ইমার করার জন্য দায়বদ্ধ, এবং মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে প্রচেষ্টারত ব্যক্তিত্বই আত্তাসের চোখে প্রত্যাশিত মুসলমান। মহান আল্লাহ আমাদেরকে ‘বিদ্যমান’ অবস্থা থেকে ‘প্রত্যাশিত’ অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়ার তাওফিক দান করুন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-thought-world-of-naqib-al-attas/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16713</post-id>	</item>
		<item>
		<title>দর্শনের গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/importance-of-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/importance-of-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. সাইয়েদ হোসাইন নাসর]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2025 16:02:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ফিচারড]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শনের গুরুত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[পশ্চিমা দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16061</guid>

					<description><![CDATA[দর্শন বলতে আসলে কি বুঝায় ? প্রথমেই  দর্শনের সংজ্ঞাকে পরিষ্কার করা দরকার। অনেক আধুনিক মুসলিম সংস্কারক ও চিন্তাবিদ, যেমন মুহাম্মদ আবদুহু, দর্শন শব্দটি নিয়ে একটু ভয় বা সন্দেহ পোষণ করেন। যদিও এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা জামালউদ্দিন আফগানি তেহরানে বহু বছর ইসলামী]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দর্শন বলতে আসলে কি বুঝায় ? প্রথমেই  দর্শনের সংজ্ঞাকে পরিষ্কার করা দরকার। অনেক আধুনিক মুসলিম সংস্কারক ও চিন্তাবিদ, যেমন মুহাম্মদ আবদুহু, দর্শন শব্দটি নিয়ে একটু ভয় বা সন্দেহ পোষণ করেন। যদিও এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা জামালউদ্দিন আফগানি তেহরানে বহু বছর ইসলামী দর্শন অধ্যয়ন করেছিলেন, যতক্ষণ না তিনি সরকারের চাপে দেশ ছেড়ে আফগানিস্তান, তারপর তুরস্ক ও মিশরে পালিয়ে যান। একটি বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে বিদ্যমান থাকায় ইসলামী প্রেক্ষাপটে দর্শন শব্দটি একটু অস্পষ্ট মনে হয়। তবে পশ্চিমা ও ইসলামী প্রেক্ষাপটে দর্শনের অস্পষ্টতার ধরন একেবারেই আলাদা। <strong>পশ্চিমে দর্শনের অর্থ অনেক রকম—প্লেটো এবং দেরিদার মত সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষকেও দার্শনিকই ডাকা হয়। এখানে একক কোনও বিশ্বদর্শন নাই, এমনকি অধিকাংশ দার্শনিক অনুসরণ করেছেন, এমন গুটিকয়েক বিশ্বদর্শনও আপনি খুঁজে পাবেন না। ফলে এটা এত বিস্তৃত যে তাদেরকে একই ছাতার নিচে ফেলা যায় না।</strong> পশ্চিমে দর্শন এখন আর হাজার বছর ধরে চলে আসা সেই প্রাচীন ধারণা নয়, যা গ্রিক-রোমান যুগে বা ইসলাম ও পশ্চিমের বহুমুখী চিন্তার সম্মিলনের সময়ে ছিল। <strong>আধুনিক পশ্চিমা দর্শন অনেক সময় সফিয়া বা প্রজ্ঞার বিরুদ্ধে গিয়েছে। কোনো কোনো বিজ্ঞজন এটাকে এখন &#8220;মিসোসফি&#8221; বলে ডাকেন, অর্থাৎ ‘প্রজ্ঞার প্রতি ঘৃণা’, যদিও দর্শনের আসল অর্থ ছিল ‘প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসা’।</strong></p>
<p>ইসলামের ক্ষেত্রে অনেকেই ভুলে যান যে কুরআন নিজেই দুইবার <strong>&#8220;হিকমা&#8221;</strong> শব্দটি উল্লেখ করেছে, যাকে আল্লাহর কাছ থেকে মহান উপহার বলা হয়েছে। এই হিকমাকে ইসলামী আলেমরা গ্রিক শব্দ <em>&#8216;ফিলোসফিয়া&#8217;</em> থেকে আরবীকরণ করে তাকে <strong>&#8220;ফালসাফা&#8221;</strong> হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে ইসলামে দর্শনের বিকাশ একটু ভিন্ন পথে গেছে। আমাদের মাঝে ফালসাফা নামে একটি বিদ্যা ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা- যেমন কালাম এবং অন্যান্য বিষয়ও ছিল, যেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শন না হলেও অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিকই ছিল। <strong>ইমাম আশআরী সুন্নি ইসলামের প্রধান কালামী ধারা আশআরি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি ফালসাফার বিরোধিতা করলেও যুক্তি, কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এমনকি তিনি দর্শনের অস্তিত্বই স্বীকার করতেন না, তবে তিনি যে সকল বিষয়ে আলোচনা করেছেন এগুলো মূলত দার্শনিক বিষয়ই ছিল। এমনকি যারা নিজেদের দার্শনিক বলে দাবি করেননি এনারা সহ সব ধরনের ইসলামী চিন্তাবিদদের কাছে ঈমান ও যুক্তির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা নিজেই একটি দার্শনিক বিষয়।</strong></p>
<p>আপনি বলতে পারেন, <em>দর্শন অনেকটা রাজনীতির মতো। রাজনীতি ভালো বা খারাপ হতে পারে, কিন্তু কোনো সমাজ রাজনীতি ছাড়া চলতে পারে না। একইভাবে, দর্শন ছাড়া কেউ চলতে পারে না। সচেতন বা অবচেতন যেভাবেই হোক, নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই—জীবন, কাজ, নীতি, চিন্তা, কী ভালো, কী খারাপ, কী সত্য, কী মিথ্যা, কী সুন্দর, কী কুৎসিত, এসব নিয়ে একটা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। তাই দর্শন ছাড়া চলা অসম্ভব।</em> গত দুই শতাব্দী ধরে, বিশেষ করে ১৭৯৮-১৮০০ সালে নেপোলিয়নের মিশর আক্রমণের পর থেকে পশ্চিমা চিন্তাধারার আগ্রাসনের মুখে ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় ট্র্যাজেডি হলো- আমাদের নিজস্ব দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে বা এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেকের অস্বীকৃতি। অনেক ইসলামী আন্দোলনে একটা দর্শন-বিরোধী মনোভাব আছে, যদিও তারা মৌলিকভাবে দার্শনিক চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়েছে।<br />
<a href=" https://rkmri.co/5NSNee5SeA2M/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Islami-gyane-usuler-dhara-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>পশ্চিমের এই চ্যালেঞ্জ মঙ্গোল আক্রমণের মতো নয়। মঙ্গোলরা লাখো ঘোড়া নিয়ে এসে জমি ধ্বংস করেছে, লাখো মানুষ মেরেছে, কিন্তু তারা ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি। চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকুর নেতৃত্বে তাদের চ্যালেঞ্জ ছিল তীর-ধনুক আর ঘোড়া, কিন্তু<em> ইসলামের প্রতি পশ্চিমের প্রধান চ্যালেঞ্জটা বুদ্ধিবৃত্তিক।</em> এটা শুধু ড্রোন দিয়ে সেই আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে নিরীহ শিশুদের হত্যার ট্র্যাজেডি নয়, যাদের জন্য কেউ কাঁদে না। আমি ওয়াশিংটনে থাকি, এটা আর সহ্য করতে পারি না। কানেকটিকাটে নীল চোখের শিশু মারা গেলে সবাই কাঁদে, আমিও দুঃখিত হই। কিন্তু পেশোয়ারের কাছে কালো চোখের শিশু মারা গেলে কেউ পাত্তা দেয় না। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ এটা নয়। কিংবা এটা শুধু ড্রোন, কিংবা আইএমএফ-এর অর্থনৈতিক চাপ, বা পশ্চিমা শক্তির হাতে বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় বসানো পুতুল সরকার নয়। বরং পশ্চিমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক, চিন্তার জগতের। আমরা আমাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়েছি, কারণ আমরা একটি সভ্যতা হিসেবে যথেষ্ট ভাবা বন্ধ করে দিয়েছি, সঠিকভাবে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি। যেকোনো মাপকাঠিতে আমাদের সভ্যতা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় চিন্তাবিদ তৈরি করেছে। ইসলামে আলহামদুলিল্লাহ ঈমান এখনো শক্তিশালী হলেও, এটা খুবই দুঃখজনক যে অনেক সংস্কারক সঠিক চিন্তার গুরুত্ব; আব্বাসীয় যুগ থেকে আজ অবধি বিস্তৃত ১১০০ বছরের হিকমা ও ফালসাফার ঐতিহ্যের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেননি।</p>
<p><strong>কুরআনের একটি আয়াত বলে, “আমরা কুরআন নাযিল করেছি যাতে মানুষ তাদের বুদ্ধি ব্যবহার করে।</strong>” আমি এখানে <strong>&#8220;যুক্তি&#8221;</strong> শব্দটি ব্যবহার করছি না, বরং পুরনো ইংরেজি ব্যবহারে <em>&#8220;বুদ্ধি&#8221;</em> বা <em>&#8220;ইনটেলেক্ট&#8221;</em> শব্দটি ব্যবহার করছি, যা এখন হারিয়ে গেছে। আরবিতে এটি বিশেষ্য ও ক্রিয়া উভয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বুদ্ধি শুধু যুক্তি নয়, এটা তার চেয়ে গভীর। <em>পশ্চিমের বড় ট্র্যাজেডি হলো বুদ্ধির মৃত্যু, এটিকে শুধু যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, যার ফলে যুক্তি ও ওহীর, ধর্ম ও বিজ্ঞান, ইহজগত ও পরজগতের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।</em> কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় এটা কখনো ছিল না, কারণ আমাদের আকল শুধু যুক্তিবাদী বয়ান ছিল না। আকল দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সারবত্তা যা আমাদের মৌলিক ও অপরিহার্যরূপে জানতে সাহায্য করত। আমরা সেই সভ্যতার উত্তরাধিকারী। আজ আমরা কুরআন পড়ি বটে, কিন্তু আকল খাটাইনা। ফলে স্পষ্টভাবে ভাবতেও পারিনা। এটা কতটা অদ্ভুত যে, এমন একটি সভ্যতা যে সভ্যতা তাজমহলের মতো জ্যামিতিক নিখুঁত স্থাপত্য, ইসফাহানের মসজিদ বা ফেজের মাদ্রাসার ময়দান তৈরি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম গণিত ও জ্যামিতির ওপর ভিত্তি করে, সেই তার চিন্তা আজ এত দুর্বল, পশ্চিমা চিন্তার চ্যালেঞ্জের মুখে এত নড়বড়ে! আমাদের কণ্ঠগুলো বিশ্ব পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, আমাদের ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আছে, কিন্তু মানবজাতির ভবিষ্যৎ ও চিন্তার প্রশ্নে মুসলিম কণ্ঠ কোথায়? এটা আমাদের নিজেদের দোষ, কারণ আমরা এমন এক সভ্যতার উত্তরাধিকারী যারা কুরআনের ভিত্তিতে স্পষ্ট চিন্তার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। আমরা সেটা করিনা, মাথাটাই খাটাইনা।</p>
<p>আজ পশ্চিম থেকে নানা ধরনের <strong>&#8220;ইজম&#8221;</strong> সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একের পর এক আমাদের উপকূলে এসে আছড়ে পড়ছে। আপনারা সবাই এ ব্যাপারে অবগত, আবার কেউ জেনে নাও থাকতে পারেন। যেমন <em>র‍্যাশনালিজম</em>, <em>এম্পিরিসিজম</em>, <em>হিউম্যানিজম</em>, <em>ইভল্যুশনিজম</em> ; সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে <em>লিবারেলিজম</em>, <em>সোশ্যালিজম</em>, <em>ন্যাশনালিজম</em>, জ্ঞানতাত্ত্বিক যায়গায় <em>সায়েন্টিজম</em>। চতুর্দিকে ভেসে বেড়ানো এই ইজমগুলো আমাদের মন ও চিন্তাকে নানা মাত্রায় প্রভাবিত করছে। ইসলামী বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা এমন যে, ইরান এবং দুয়েকটা দেশ ছাড়া বেশিরভাগ দেশে পশ্চিমা শিক্ষাই প্রাধান্য পায়। উপনিবেশিক যুগ থেকে মিশনারি স্কুলের মাধ্যমে এই প্রভাব চলে এসেছে। মিশর বা পাকিস্তানের ধনী পরিবারের প্রায় ৯০% শিশু পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, মুসলিম স্কুলে নয়। পুরনো মাদ্রাসাগুলো এখন শুধু গরিবদের জন্য। দুই শতাব্দী আগে এমন ছিল না। আজ এই ধরণের লোকেরাই দেশ পরিচালনা করে, কিন্তু পশ্চিমা ইজম দিয়ে তাদের মগজধোলাই হয়ে আছে। ধার্মিকদের মধ্যে কেউ কেউ আমরা নামাজ আদায় করি, কিন্তু বাকি সময় এই ইজমের মধ্যে ডুবে থাকি। ইসলাম এখনো এই ইজমগুলোর পূর্ণাঙ্গ জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পূবাল হাওয়ার মত আমরা নতুন ইজমের অপেক্ষায় থাকি, কেউ কেউ এগুলো গোগ্রাসে গিলে, আবার কেউ টেরই পায়না, তবু এগুলো আমাদের প্রভাবিত করেই চলেছে।</p>
<p>তেহরানে ফরাসি দার্শনিক ফুকোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তখন পশ্চিমেও তিনি খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। এক সন্ধ্যায় আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। তিনি খুবই বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন, কিন্তু আফসোসের বিষয় তিনি ইমানদার ছিলেন না। কিন্তু তিনি আলোচনার জন্য যথোপযুক্ত একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, <em>ফ্রান্সে এখন কেউ আমার কথা শোনে না, কিন্তু একদিন শুনবে।</em> আমি কয়েকজন তরুণ পারসিক ছাত্র ও অধ্যাপককে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, <em>ফ্রান্সে আমার ধারণা জনপ্রিয় হলেই এখানেও তা ছড়িয়ে পড়বে।</em> ঠিক তাই হয়েছিল। ফুকো মারা গেলেন, তারপর দেরিদা এলেন, তিনিও চলে গেলেন, এভাবেই চলছে। আমরা শুধু এই ঢেউয়ের শিকার। কিছু ইজম সামাজিক, যেমন জাতীয়তাবাদ বা সমাজতন্ত্র; কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক। কিন্তু আমরা আজ নিষ্ক্রিয়, ফলে এই ইজমগুলো ক্রমাগত আমাদের উপর হামলে পড়েছে।<br />
<a href=" https://rkmri.co/meyepM5TRSee/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/islam-o-sovvota-01-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>এই তাবৎ ইজমগুলো দর্শনের সঙ্গে যুক্ত, চিন্তার ধরন ও বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি &#8211; র‍্যাশনালিজম তো নিজেই এক ফিলসফি। সে বলে যুক্তিই সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ। কত মুসলিম আছেন, যারা নামাজের সময় ধার্মিক, কিন্তু বাকি সময় র‍্যাশনালিস্ট? অনেক আধুনিক মুসলিম লেখক পশ্চিমা চিন্তার প্রভাবে বিভ্রান্ত। পাশ্চাত্য চিন্তার প্রশ্নে তারা কোনো ডান-বাম হদিস করতে পারেননা। তারা আকল ও রিজন বা ইস্তিদলাল (যুক্তি) এর মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। ফলে তারা বলেন, ইসলাম পুরোপুরি র‍্যাশনাল! এই বিভ্রান্তির কারণে কিছু জায়গায় চরম মৌলবাদ ও প্রযুক্তির পূজার অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা যায়। <strong>মুসলিম বিশ্বের কিছু কিছু যায়গায় আপনি এমনও দেখবেন, যেখানে লেটেস্ট প্রযুক্তির পূজা করা হচ্ছে, মুখে বলা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, অথচ তাদের আসল খোদা এই উন্নত প্রযুক্তি। আবার এরাই অন্তঃসার শুণ্যভাবে চলে আসছে ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধকে হেফাজত করতে। এটি ইসলামী বিশ্বের একটি বড় ট্র্যাজেডি।</strong></p>
<p>আমরা প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না, কারণ আমরা আকল খাটাই না। সব প্রশ্নের উত্তর মুষ্টি বা আবেগ দিয়ে দেওয়া যায় না। আগুন লাগলে বেহালা বাজিয়ে তা নেভানো যায় না, পানির প্রয়োজন। হ্যাঁ ভালো বেহালার সুর দিয়ে খারাপটাকে বদলে দেয়া যায়। ঠিক সেভাবেই ভুল চিন্তার জবাব একমাত্র সঠিক চিন্তা দিয়ে দেওয়া যায়। ভুল চিন্তাকে চিৎকার করে সঠিক করা যায়না। আবেগ কখনো ভুল চিন্তাকে শোধরাতে পারেনা, যেটা কেবল সঠিক চিন্তাই পারে। কুরআন বারবার বলে, যারা সঠিকভাবে আকল ব্যবহার করে, তারা যারা করে না, তাদের সমান নয়। যারা আকল খাটায়, তারাই প্রকৃত মুসলিম। এই শিক্ষা আমরা আজ সত্যিই ভুলে গেছি।</p>
<p>আমি পঞ্চাশ বছর ধরে এই বিষয়ে কাজ করছি, কিন্তু আমাদের অগ্রগতি খুব ধীর। ১৯৭৭ সালে মক্কায় প্রথম বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলনে আমি ড. জোব, ড. নাসিফ ও মরহুম বাংলাদেশি চিন্তাবিদ ড. সাইয়েদ আলী আশরাফের সঙ্গে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলাম। আমি এই চার অগ্রপথিকের একজন ছিলাম। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও শিক্ষামন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমরা সফল হইনি, কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু শরিয়া ফ্যাকাল্টিতেই ইসলামী শিক্ষা দেওয়া হয়, বাকি সব পশ্চিমা বিষয়। মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের আকল দিয়ে এই বিষয়গুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবিনি। এটি সহজ কাজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। একটি অনন্য সভ্যতা হিসেবে ইসলামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমরা কতটা ইসলামী কায়দায় ও স্পষ্টভাবে ভাবতে পারি তার উপর।</p>
<p>এজন্য সবার আগে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাকে পুনর্জাগরিত করতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের, প্রতিটি শাখার মধ্যেই একটি দার্শনিক দিক রয়েছে। এমনকি উসুল ; উসূলুদ্দীন উসুলে ফিকাহ, যা আল-আজহারের মতো ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় জ্ঞান, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক দিক রয়েছে, যা পুনর্জাগরিত করা প্রয়োজন। এমনকি আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের একটি শাখা সেমান্টিকসও (শব্দার্থবিজ্ঞান) উসুলের মধ্যে ভিন্ন কারণে আলোচিত হয়। মোটকথা হলো, উসুলের মতো ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যেও দার্শনিক দিক রয়েছে, যা আমাদের পুনরায় জাগিয়ে তুলতে হবে।</p>
<p>কালাম বা ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আধুনিকতাবাদীদের আক্রমণের মুখে পড়েছে, তবু এটি এখনো টিকে আছে। মিশরে নব্য মুতাজিলা এবং নব্য আশআরি মতবাদও দেখা যায়। সালাফি আন্দোলন অবশ্য এই সবকিছুর বিরুদ্ধে, এমনকি সমগ্র ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু শিয়া সুন্নি নির্বিশেষে যারা নিজেদের ঐতিহ্য গভীরভাবে বোঝেন, সেই দরদি মুসলিমরা কালামের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। এটিকে আমাদের সময়ের জন্য উপযুক্ত করে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, এবং এর দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। এছাড়া, <strong>মা‘রিফাহ বা ইরফান</strong>, <em>যাকে আমরা বাস্তবতার চূড়ান্ত জ্ঞান বলি, সেটা হচ্ছে ইসলামী মেটাফিজিক্স</em>। এটি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এটিকেও পুনর্জাগরিত করতে হবে এবং আমাদের সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক করতে হবে। এবং অবশ্যই এর সাথে ইসলামী বিজ্ঞান, ইসলামি দর্শনের পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে।</p>
<p>যদি আমরা এই সমগ্র বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে পারি, তবে তা আমাদের জন্য এমন একটি কাঠামো দেবে, যার মধ্যে আমরা আধুনিক জ্ঞানের শাখাগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব। এই জ্ঞানের শাখাগুলোর জন্য ইসলামী জবাব, ইসলামী সচেতনতা এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ প্রয়োজন, যা ইসলামী সভ্যতার জীবন্ত কাঠামোয় একীভূত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান ও মানববিদ্যার কথা বলি। ১৯৬৪ সালে আমি <strong>&#8220;ইসলামী বিজ্ঞান&#8221;</strong> নিয়ে একটি বই লিখেছিলাম। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে &#8220;ইসলামী বিজ্ঞান&#8221; শব্দটি ব্যবহার করেছি দুটি কারণে। <em>প্রথমত,  আরব জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে  &#8220;আরবি বিজ্ঞান&#8221; বলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। ইসলামী বিজ্ঞান শুধু আরবদের নয়, পারস্য, তুর্কি, মুসলিম ভারতীয়রাও এতে অবদান রেখেছে। ইবনে সিনা, আল বিরুনির মতো মহান বিজ্ঞানীরা আরব ছিলেন না। দ্বিতীয়ত,  এই বিজ্ঞান ইসলামী ওহীর সঙ্গে যুক্ত। সে সময় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। মুসলিম বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী আমার বিরোধিতা করেন, তারা বলেন &#8211; বিজ্ঞান বিজ্ঞানই, ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের এই দাবী সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।</em></p>
<p>বিজ্ঞান একটি বিশ্বদৃষ্টি ও প্যারাডাইমের উপর নির্ভর করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন নাস্তিক সায়েন্টিস্ট ফিলোসফার আপনাকে এটাই বলবে। সুতরাং মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য ইসলামী বিজ্ঞানকে ইসলামী প্যারাডাইমের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে। আমি পঞ্চাশ বছর ধরে সায়েন্টিজমের সমালোচনা করে লড়াই চালিয়ে আসছি। সায়েন্টিজম ইসলামী বিশ্বের একটি বড় রোগ, পূর্ব আফ্রিকার ম্যালেরিয়ার চেয়েও ভয়ানক। <strong>সৌদি আরব, ইরান, মালয়েশিয়া, মিশর—সব সরকার বিজ্ঞানকে সমর্থন করে, কিন্তু এর প্রকৃতি না বুঝেই। তারা ক্ষমতা ও সম্পদ চায় তাই এরকমটা ভাবে বোঝাই যায়। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরাও ভাবেন বিজ্ঞানই যেহেতু ক্ষমতা দেয়, তাই এটি ইসলামী। তারা ভাবে, আল্লাহ জ্ঞান অন্বেষণ করতে বলেছেন, আর জ্ঞান-বিজ্ঞানই শক্তি। তাই ক্ষমতা প্রদানকারী বিজ্ঞানও ইসলামীই। কিন্তু এমন বিজ্ঞান, যেখানে আল্লাহর অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব অপ্রাসঙ্গিক, যেখানে ক্যাথলিক বা নাস্তিক ফিজিসিস্ট হয়েও নোবেল পুরস্কার জেতা যায়, তা ইসলামী সভ্যতায় স্থান পেতে পারে না।</strong> বেশিরভাগ মানুষেরই এই কথাটা বলার সাহস নেই। অথচ আমি ২৫ বছর বয়সে এ কথা বলেছিলাম, এখনো বলছি।</p>
<p>আমাদের বুঝতে হবে, সায়েন্টিজম গ্রহণযোগ্য নয়। বেশিরভাগ মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপাসনা করেন। তারা বলেন, তারা আল্লাহর ইবাদত করেন, কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময় ঠিকই তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপাসনায় মগ্ন। এটি আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোগ। পরিবেশ সংকট একদিন ঠিকই আমাদের উচিত শিক্ষা দেবে। তখন লোকে এই অন্ধ পূজা বন্ধ করবে। এই রোগ  শুধু ইসলামী বিশ্বে নয়, হিন্দু ভারত, কমিউনিস্ট চীনেও দেখা যায়। মাওসেতুং এর সময় থেকে তারা নাস্তিক হয়েও প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে তাদের উপাস্য বানিয়েছে। তাদেরতো আমাদের মত স্বতন্ত্র আদর্শ নেই, ফলে আমাদেরই এই বিজ্ঞানবাদ থেকে খুব খুব সতর্ক থাকতে হবে।</p>
<p>সায়েন্টিজমের মোকাবিলা করতে হলে আমাদের ইসলামী দার্শনিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, কারণ সায়েন্টিজম নিজেই একটি দর্শন। এটি প্রকৃতি ও জ্ঞানের দর্শন, যা আধুনিক বিজ্ঞান ছাড়া প্রকৃতিকে জানার অন্য সব পথ অস্বীকার করে। এর জবাব শুধু দর্শন দিয়েই দেওয়া সম্ভব। সায়েন্টিজমের বিপদের মোকাবিলা আমরা দর্শন ছাড়া করতে পারি না। আমাদের নিজস্ব দার্শনিক ঐতিহ্য থেকে সঠিক দর্শন নিয়ে এটি মোকাবিলা করতে হবে।</p>
<p>মানববিদ্যার কথা যদি বলি, অনেক দিন ধরেই এটাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণে গড়ে তোলার কথা হচ্ছে। আমি বহু বছর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য অনুষদের ডিন ছিলাম, যা ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানববিদ্যার কেন্দ্র। আমি এই আন্দোলনের একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি—পদার্থবিজ্ঞানে না পারলেও, অন্তত ইতিহাস, সাহিত্যের মতো বিষয়গুলো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ানোর চেষ্টা করেছি। <em>আমরা ইতিহাস ফ্রান্সের চোখে দেখব না, মাঝখানে একটু একটু ইসলামী অংশ যোগ করে দিয়ে। সাহিত্য ইংরেজির দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ব না, শেষে উর্দু সাহিত্যের একটা ছোট অংশ যোগ করে।</em> ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম দেখলে লজ্জা লাগে। <strong>কোনো সভ্যতা কি নিজেকে অন্যের চোখে দেখে? আজ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো ইতিহাসের বেশিরভাগ বই পশ্চিমা বিশ্বদৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে। নৃবিজ্ঞান, ভাষা, এমনকি অন্যান্য বিষয়েও একই অবস্থা। আমাদের সেই আন্দোলনের ফলে ইরানে এ নিয়ে সর্বোচ্চ নেতা ফতোয়া দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন এই বিষয়ে কাজ করে। কিন্তু এখন তারা প্রায় নিজেদের পায়েই কুড়াল মারছে। আমি শীঘ্রই তেহরানে এ নিয়ে একটা লেখা প্রকাশ করতে চাই, কারণ এই কাজে আমি সবার সামনে ছিলাম।</strong><a href=" https://rkmri.co/5eomTMRAoSlM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Sunnat-O-hadis-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>কিন্তু আমাদের সন্তানরা পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়ন ছেড়ে নিজেদের সাহিত্য, শিল্প, চিন্তা, সমাজের গঠন, বা বিশ্বদৃষ্টিকে নিজস্ব সভ্যতার চোখে না জানলে এই সভ্যতা কীভাবে টিকবে? এটা একটা বিশাল বড় সংকট; এখানেও এটা একটা দার্শনিক বিষয়ই। এটা শিক্ষাগত সমস্যা অবশ্যই, তবে <em>শিক্ষার দর্শন শুধু ‘কীভাবে পড়ানো হবে’ তা নয়, ‘কী পড়ানো হবে’ তাও ঠিক করে।</em></p>
<p>আলহামদুলিল্লাহ, সবকিছু অন্ধকার নয়। আলোর আভাস রয়েছে। কিছু মানুষ এখন এই বিষয়গুলো বুঝতে শুরু করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। <em>মরুভূমিতে একজন মানুষের চিৎকারও মূল্যবান, কারণ সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। আমি আশা ও দোয়া করি, আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যাদের কেউ কেউ এখানে উপস্থিত, দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে মনোযোগ দেবে। মা-বাবাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আমি অধ্যাপক হিসেবে অনেক মুসলিম ছাত্র দেখেছি, যারা আমার এক-দুটি বক্তৃতা শুনে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিসিন ছেড়ে ইসলামী অধ্যয়ন বা দর্শন পড়তে চেয়েছে।</em> শোনা মাত্রই তাদের বাবা প্রায় হার্ট এটাক করেন, মা প্রায় মাথা ঘুরে রান্নাঘরে পড়ে যান।</p>
<p><strong>যারা ইসলামকে ভালোবাসেন, আল্লাহর কথা ভাবুন, ইসলামের কথা ভাবুন, ইসলামের জন্য কিছু ত্যাগ করুন। আপনার সন্তানের শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া জরুরি নয়। তাদের পাশাপাশি আমাদের এমন মুসলিমও প্রয়োজন, যারা এই বিষয়ে জান কুরবান করবে। হয়তো তারা কম আয় করবে, কিন্তু উম্মতের জন্য এটি অপরিহার্য। আমি প্রায়শই বলি, এটা ফরজে কিফায়া।</strong></p>
<p>বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য উচিত ইহুদি সম্প্রদায়ের মতো কাজ করা, যারা আমেরিকায় মাত্র পঞ্চাশ বছরে ইহুদি অধ্যয়নের প্রায় সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব গ্রহন করেছে। একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, আমেরিকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদি অধ্যয়নের অধ্যাপকরা এখন ইহুদি। তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। আমি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন দুপুরের খাবারের সময় বন্ধুদের সঙ্গে এই বিষয়ে বলছিলাম। তখন শুধু ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইহুদি অধ্যয়নের অধ্যাপক ছিলেন ইহুদি, বাকি সবাই ছিলেন হিব্রু ও তাওরাত জানা খ্রিস্টান। এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি নিউ জার্সির ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় সেটন হলেও ইহুদি অধ্যয়নের অধ্যাপকরা ইহুদি। <em>আমি আশা করি, ইনশাআল্লাহ, আমার মৃত্যুর পর কয়েক দশক পরে আপনারা যখন বক্তৃতা দেবেন, তখন কেউ ইসলামী বিশ্ব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এই কথা বলতে পারবেন। এটি নির্ভর করবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে ঈমানের সঙ্গে মিলিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর। ঈমান ও আকল—এই দুটি আমাদের জান্নাতের পথে নিয়ে যাবে এবং পৃথিবীতে সফল উম্মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার—আকলের সঠিক ব্যবহারই আমাদের পথ। আলহামদুলিল্লাহ।।</em></p>
<p><strong>অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/importance-of-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16061</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইবনে খালদুন ও ইলমুল উমরান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 31 Jul 2025 15:05:38 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15971</guid>

					<description><![CDATA[&#160; এ প্রবন্ধে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, শুরুতেই তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই, ১. ইবনে খালদুনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। ২. ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরান কী? ৩. সমাজবিজ্ঞান বা Sociology কী? ৪. ইলমুল উমরান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&nbsp;</p>
<p style="text-align: left;"><strong>এ প্রবন্ধে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, শুরুতেই তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই,</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>১. ইবনে খালদুনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>২. ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরান কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৩. সমাজবিজ্ঞান বা Sociology কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৪. ইলমুল উমরান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে পারে?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৫. ইবনে খালদুন বর্তমান দুনিয়ার প্রেক্ষিতে কতটা প্রাসঙ্গিক এবং আমরা তাঁর নিকট থেকে কীভাবে উপকৃত হতে পারি?</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের সামনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, তা হলো ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় যে থিওরিগুলো দিয়েছেন, সেগুলোকে আমরা সমাজবিজ্ঞান বা Sociology নামে অভিহিত করতে পারি কিনা? এ প্রশ্নটিকে আগে সুস্পষ্ট করার জন্য বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান (Sociology) বিভাগের পাঠ্য বই হিসেবে পঠিত এন্থনি গিডেন্সের লেখা Sociology নামক বইটি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই।</p>
<p>আগে দেখা যাক এন্থনি গিডেন্স সমাজবিজ্ঞানকে (Sociology) কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে,</p>
<p>&#8220;Sociology is the scientific study of human social life, groups and societies. It is a dazzling and compelling enterprise, as its subject matter is our own behavior as social beings. The scope of sociology is extremely wide, ranging from the analysis of passing encounters between individuals on the street to the investigation of crime, international relations and global forms of terrorism.&#8221;</p>
<p><em>অর্থাৎ,  সমাজ এবং সমাজের প্রতিষ্ঠানাদির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান। সমাজের মৌলিক উপাদান এবং সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের আচরণকে বিশ্লেষণ করাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের কাজ। যার দরুণ এটি বেশ সমৃদ্ধ এবং প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। সমাজবিজ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত। যেমন, দুজন পথচারীর সাময়িক বিবাদের বিশ্লেষণ থেকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মানুষের জীবনাচরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী সময়োপযোগী আলাপন উপস্থাপন করাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের নিত্যদিনের কাজ।</em></p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর নিজের তৈরিকৃত ডিসিপ্লি­ন ইলমুল উমরানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;انه لما كانت حقيقة التاريخ انه خبر عن الإجتماع الإنساني الذي هو عمران العالم ، وما يعرض لطبيعة ذالك العمران من الأحوال&#8221;</p>
<p>&#8220;ইলমুল উমরান হলো এমন জ্ঞান যা বিশ্বজগতের উমরানের সাথে সম্পর্কিত মানুষের সমাজ এবং প্রকৃতির দাবি অনুসারে তার মধ্যে সৃষ্ট অবস্থাসমূহ এবং সে সকল অবস্থার আবশ্যিক ফলাফল হিসেবে ইতিহাস এবং ইতিহাসের হাকীকতকে বিষয়বস্তু হিসেবে গণ্য করে থাকে।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এন্থনি গিডেন্সের প্রদত্ত সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা এবং ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরানের সংজ্ঞার মধ্যে কতগুলো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।</p>
<p><strong>প্রথমত</strong><strong>, </strong>ইলমুল উমরানের মধ্যে ইতিহাস বড় একটি ফ্যাক্টর।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত</strong><strong>,</strong> ইবনে খালদুনের মতে, সমাজ বলতে মানবসমাজ বুঝানো হয়, সে ক্ষেত্রে মানুষের একত্রে বসবাসের বিষয়টি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। ইবনে খালদুন মানুষের সামাজিক জীবনকে স্বীয় ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়, বরং অত্যাবশ্যকীয় (Imperative) একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। মানবসমাজকে অত্যাবশ্যকীয় (Imperative) একটি বিষয় হিসেবে দেখার অর্থ হলো এ বিষয়টিকে একটি মেটাফিজিক্যাল বিষয় হিসেবে দেখা কিংবা অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা। তাহলে আমরা এ কথা বলতে পারি, সমাজকে অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা ইলমুল উমরানের মূল বিষয়।</p>
<p>অপরদিকে সমাজবিজ্ঞান (Sociology) সমাজকে একটি মওজুদ বা বিদ্যমান বিষয় হিসেবে দেখে। বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞান এ মওজুদ বা বিদ্যমান সমাজের বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থাকে বিশ্লেষণ করে।</p>
<blockquote><p><strong>এখানে আমরা যে মৌলিক পার্থক্যটি দেখতে পাই, তা হলো, সমাজবিজ্ঞানের (Sociology) ক্ষেত্রে ইতিহাস কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। এটি শুধুমাত্র মওজুদ বা বিদ্যমান সমাজকে ব্যাখ্যা করে।</strong></p></blockquote>
<p>অপরদিকে ইলমুল উমরান মানুষকে ও সমাজকে ঐতিহাসিক একটি অস্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করে। ঐতিহাসিক একটি অস্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করার কারণে সে অস্তিত্বটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে তার অস্তিত্বকে ধারাবাহিক রাখে সে বিষয়কে বিশ্লেষণ করে থাকে। এজন্য ইলমুল উমরানের ক্ষেত্রে ‘সময়’ এর ব্যপারটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>যেমন, এ বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য আমাদেরকে মুকাদ্দিমার সূচিপত্র ও এন্থনি গিডেন্সের Sociology বইয়ের সূচিপত্রকে তুলনামূলকভাবে নিরীক্ষণ করতে হবে। এ তুলনামূলক নিরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট একটি ধারণা পাব।</p>
<p>প্রথমেই যদি এন্থনি গিডেন্সের Sociology বইয়ের সূচিপত্রের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, তিনি প্রথমেই ‘সমাজবিজ্ঞান (Sociology) কী’ এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি বিশ্বায়ন (Globalization) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারপরের অধ্যায়সমূহে তিনি সমাজবিদ্যাগত প্রশ্ন ও উত্তর (Asking and Answering Sociological Questions), সমাজবিজ্ঞানে তাত্ত্বিক চিন্তা (Theoretical Thinking in Sociology), সামাজিক যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন (Social Interaction and Everyday Life), সামাজিকীকরণ, জীবনযাত্রা ও বার্ধক্য (Socialization, Life-Course and Ageing), পরিবার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কসমূহ (Families and Intimate Relationships), স্বাস্থ্য, অসুস্থতা ও অক্ষমতা (Health, Illness and Disability), স্তরবিন্যাস ও শ্রেণি (Stratification and Class) দরিদ্রতা, সামাজিক বাধা ও সমাজ কল্যাণ (Poverty, Social Exclusion and Welfare), বৈশ্বিক বৈষম্য (Global Inequality), লিঙ্গ ও যৌনতা (Sexuality and Gender), বর্ণ, জাতিভুক্ত ও অভিবাসন (Race, Ethnicity and Migration), আধুনিক সমাজে ধর্ম (Religion in Modern Society), গণমাধ্যম (The Media), প্রতিষ্ঠান/সংগঠন ও বিস্তৃতি/নেটওয়ার্ক (Organization and Networks), শিক্ষা (Education), অর্থনৈতিক জীবন ও কর্ম (Work and Economic Life) অপরাধ ও বিচ্যুতি (Crime and Deviance) রাজনীতি, সরকার ও সন্ত্রাসবাদ (Politics, Government and Terrorism), নগর ও নাগরিক অবস্থান (Cities and Urban Spaces), পরিবেশ ও ঝুঁকি (The Environment and Risk) নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে সাধারণত এ সকল বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়।</p>
<p>কিন্তু ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমার দিকে যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো, এর প্রথম অধ্যায়ে তিনি যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হলো একটি জীবসত্তা হিসেবে মানুষ কীভাবে অন্য মানুষের সাথে বসবাস করছে, মানুষের মৌলিকত্বের সাথে এ বিষয়টির সম্পর্ক কী এবং মূলগত দিক থেকে মানুষের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত না হয়েও কীভাবে এটি সমাজে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এবং মানুষ কর্তৃক বসবাসকৃত সমাজের এ ব্যবস্থাপনাটি কার্য ও কারণের সম্বন্ধের (Causality Order) মাধ্যমে তুলে ধরার অর্থ হলো এ বিষয়টিকে অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা। সমাজকে অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে সমাজ কীভাবে অস্তিত্ব ও বিকাশ লাভ করে, সে বিষয়টিকেও তিনি উপস্থাপন করেছেন।</p>
<p>পরবর্তীতে তিনি সমাজ মূলগতভাবে যেমন, ঠিক সেভাবেই বিকশিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দুটি ভিন্ন উপাদানকে উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে <strong>প্রথমটি হলো;</strong> ‘মানুষ যদি এমন একটি আচরণের মধ্যে থাকে যে, আমি যদি আমার নিকটবর্তীজনকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমি নিজেও আমার নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবো না’। সমাজের মানুষ যদি এ ধরনের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে আলোকে তাদের সমাজকে গড়ে না তুলে, তাহলে তারা একত্রে বসবাস করতে পারবে না। যেমন, মানবশিশু খুবই দুর্বল ও অসহায় হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। সমাজ যদি তাকে বড় হওয়ার জন্য ও বেঁচে/টিকে থাকার জন্য সাহায্য না করে, তাহলে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। এক অর্থে ইবনে খালদুন এ বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন, আল্লাহ মানুষকে একটি প্রজাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ যেন এভাবে টিকে থাকতে পারে এজন্য তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে আল্লাহ তায়ালা একটি ‘অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নীতি’ দান করেছেন। সে নীতিটি হলো মানুষজন মুসলিম হোক বা না হোক, তারা যেন একটি প্রজাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, সেভাবেই একে অপরকে রক্ষা করে থাকে। এ বিষয়টি হলো মানুষের সমাজজীবনের পর্যায়, এটি পরবর্তীতে পর্যায় থেকে পর্যায়ক্রমে অতিবাহিত হতে থাকে। অর্থাৎ, <strong>আসাবিয়্যাত হলো মানুষের জীবনকে সমাজবদ্ধভাবে পরিচালনা করার প্রথম ধাপ।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়টি হলো,</strong> একটি সমাজ হিসেবে মানুষের টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশকেও মানুষের বাসোপযোগী হতে হবে। পরিবেশ যদি মানুষের বসবাসের উপযোগী না হয়, তাহলে মানুষের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। যার কারণে মরুভূমিতেও উমরান গড়ে উঠবে না, আবার বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলেও উমরান গড়ে উঠবে না।</p>
<p>এ দুটি মূলনীতি উমরানের জন্য অপরিহার্য।</p>
<p>মানুষের একসাথে বসবাস করার জন্য এ দুটি মূলনীতির সাথে ইবনে খালদুন তৃতীয় একটি মূলনীতি যুক্ত করেন। তিনি বলেন, <strong>যদি কোনো কওম বা গোত্রের নিকট কোনো পয়গাম্বর আসে</strong><strong>, </strong><strong>তাহলে সে পয়গাম্বরের উম্মতের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী চেতনা থাকতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যে চেতনার বলে তারা উম্মতের সকলকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে। আর সে প্রচেষ্টা হতে হবে এমন</strong><strong>, </strong><strong>যেমনটা একজন মা তার সন্তানকে রক্ষা করার জন্য করে থাকেন।</strong></p>
<p>ফলশ্রুতিতে সামাজিক অস্তিত্বের তৃতীয় মেটাফিজিক্যাল মূলনীতিটি হলো ‘নবুওয়ত’। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইবনে খালদুনকে নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা জ্ঞাতসারে হোক কিংবা অজ্ঞাতসারে হোক এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করে থাকেন। এ ‘নবুওয়ত’ এর মাধ্যমে সৃষ্ট আসাবিয়্যাত রক্ত সম্পর্কীয় আসাবিয়্যাতকে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত করে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তাঁর এ সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে একইসাথে একজন পয়গাম্বরকে ইত্তিবা বা অনুসরণকারীদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার প্রথম অধ্যায়ে সাধারণভাবে আল-উমরানুল বাশারীর মধ্যে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর রচিত গ্রন্থ <strong>“আল-মাবাহিসুল মাশরিকিয়্যা”</strong> এর মেটাফজিক্যাল পদ্ধতিকে সমাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। এ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থাকা অতীব জরুরী।</p>
<p>এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ ও ‘উমরান আল বাদাবী’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ অধ্যায়ে তিনি মানুষের জীবনপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দুটি মৌলিক ক্যাটাগরিকে পরস্পর থেকে পৃথকভাবে তুলে ধরেছেন। সে মৌলিক ক্যাটাগরির মধ্যে একটি হলো সে সময়ে মানুষ যাযাবর হিসেবে বসবাস করত। বিশেষত যারা গ্রামীণ জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলো। তাদের যাযাবর হিসেবে বসবাস করার অর্থ আবার এ নয় যে, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা ছিল না। তাদেরও একটি ব্যবস্থাপনা ছিল, ইবনে খালদুন যেটিকে ‘উমরান আল বাদাবী’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। অপরদিকে শহরে বসবাসকারীগণ, যেটিকে তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সত্যিকারের উমরান অবশ্যই শহরের মধ্যে বিকশিত উমরান। এরপর তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ নিয়ে আলোচনা করেন এবং এর পূর্বশর্তসমূহ কী কী সেগুলো নিয়েও আলোচনা করেন।</p>
<p>এক অর্থে বলতে গেলে এন্থনি গিডেন্স তাঁর Sociology নামক গ্রন্থে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার প্রায় সকল বিষয় নিয়েই ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার এ অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ আংশিকভাবে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তবে এন্থনি গিডেন্স সমাজবিজ্ঞান (Sociology) হিসেবে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, সে বিষয়গুলোকে ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমার ইলমুল উমরানের মধ্যকার একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>এখন পর্যন্ত আমরা যে আলোচনা করলাম, তা থেকে বুঝতে পারি যে, বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান বলতে যা বুঝায়, তা ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বের নিকটে খুবই সামান্য। ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞানের যে তত্ত্ব দিয়েছেন তা অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক। বর্তমান সময়ে যে বিষয়কে সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয়, সেটিকে ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরানের মধ্যে একটি অধ্যায়ের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>এরপর ইবনে খালদুন আরেকটু অগ্রসর হয়ে পরবর্তী ধাপে মানুষের একত্রে বসবাস করার ফলে সৃষ্ট ব্যবস্থাপনাসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। <strong>মানুষের তৈরি রাষ্ট্রকে ইবনে খালদুন দুভাগে বিভক্ত করেছেন। একটি হলো ‘মুলক’ অপরটি হলো ‘খেলাফত’।</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের মতে, মুলক (Kingdom) হলো এমন জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, যাদের নিকটে কোনো পয়গাম্বর আসেনি।</p>
<p>আর খেলাফত হলো সে রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা একজন পয়গাম্বরের অনুসারীগণ যখন সে পয়গাম্বরের সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে কোনো আইনী ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলে।</p>
<p>এ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে, মূলকের ক্ষেত্রে আকলী ও আমলী (প্রায়গিক) হিকমত প্রযোজ্য, আর খেলাফতের ক্ষেত্রে শরয়ী হিকমত প্রযোজ্য।</p>
<p>এক স্থানে ইবনে খালদুন বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর আদেশকে ‘মুলক’ এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ করেন, তবে এটি এমন সমাজের জন্য প্রযোজ্য, যে সমাজে পয়গাম্বর আসেননি কিংবা যে সমাজ পয়গাম্বরের সাথে কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি কিংবা সম্পর্ককে বিছিন্ন করে ফেলেছে।”</p>
<p>চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি শহর ও শহরের জীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন। শহরের জীবনের বিষয়টি আসলে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, শহরের জীবন ধারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p><strong>আল ফারাবীর ভাষায়, “মানুষ আখলাকী কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) মূলত শহরের মাধ্যমে লাভ করে থাকে।”</strong></p>
<p>কেননা, একজন মানুষ যত বেশি ও যত ধরনের মানুষের সাথে মিশে, সে নিজেকে তত বেশি বিকশিত করতে পারে। এজন্য যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ইনসানে কামিল কোথায় খুঁজে পাব, তাহলে আমি জবাবে বলব সবচেয়ে বড় ইনসানে কামিল বড় বড় শহরের মধ্যে পাওয়া যায়, গ্রামগঞ্জে কিংবা গুহার ভেতরে ইনসানে কামিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।</p>
<p>যে ব্যক্তি সমাজ থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে গুহার মধ্যে বসবাস করে, তার আখলাকী শ্রেষ্ঠত্ব তো কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে গ্রামে বসবাসকারী মানুষের সুযোগও সীমাবদ্ধ।</p>
<p>অপরদিকে এমন এক ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যার অঢেল সম্পদ রয়েছে এবং সে রাজনৈতিকভাবে অনেক বড় শক্তির নিয়ন্ত্রক কিংবা এমন একজন সেনাপতির কথাই ধরুন, যে অনেক বড় একটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। এ ধরনের মানুষেরা যখন তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাজ করে থাকে, তখন এমন অনেক সময় তাদের সামনে আসে, যখন তাদের পক্ষে আদালত ও আখলাকের মূলনীতিসমূহ মেনে চলা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি তারা সে কঠিন অবস্থাতেও আখলাক ও আদালতের নীতিকে বিসর্জন না দেয়, তবে তখন সে অনুপাতে তাদের আখলাকী পূর্ণতা ফুটে উঠবে।</p>
<p>অনেক হাদীসেও আদিল বাদশাহ ও সৎ ব্যবসায়ীদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে যদি ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই, যদি কোনো ব্যক্তি এ কথা বলে, আমার ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে এজন্য আমি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদীর সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে শুধু নিজেকে রক্ষা করার জন্য একাকী বসবাস করে সেখানে আমার আখলাকী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবো, এমন ব্যক্তির এ আখলাকী সন্ধানের খুব বেশি মূল্য নেই।</p>
<p>সত্যিকার মারেফত হলো অনেক বড় বড় পদে থেকেও নিজেকে আখলাক ও আদালতের মূলনীতির আলোকে পরিচালিত করা।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার চতুর্থ অধ্যায়ে শহর সম্পর্কে অনেক ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে এখানে বিষয়টি শুধুমাত্র শহরের সোশিওলজির সাথে সম্পর্কিত নয়, শহরের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত আরও অনেক বিষয় তিনি এখানে আলোকপাত করেছেন।</p>
<p>মুকাদ্দিমার পঞ্চম অধ্যায় হলো জীবিকা সংক্রান্ত অধ্যায়। এ অধ্যায়ে তিনি জীবিকা অর্জনের উপায়, শিল্প-কৌশল এবং তৎসমুদয়ে ক্রিয়াশীল বিচিত্র অবস্থা ও সমস্যাবলি নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর এ সকল বিষয় সরাসরি অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত। এ অধ্যায়ে তিনি অর্থনীতি সংক্রান্ত এত অসাধারণ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন, যার কারণে শুধুমাত্র মুসলমানগণই নন, অনেক অমুসলিম অর্থনীতিবিদও ইবনে খালদুনকে অর্থনীতির জনক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। পাশ্চাত্যের যে সকল অর্থনীতিবিদগণ ইবনে খালদুনকে অর্থনীতির জনক হিসেবে বিবেচনা করেন, তাঁরা ছোটখাট কোনো অর্থনীতিবিদ নন। তাদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত অর্থনীতিবিদগণও রয়েছেন।</p>
<p><strong>ইবনে খালদুন অর্থনীতিকে ইলমুল উমরানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে দেখে থাকেন এবং স্থায়ী মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে যে বিষয়সমূহ পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়সমূহকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।</strong></p>
<p>এখানে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্য হলো সমাজবিজ্ঞানে শুধুমাত্র পদ্ধতিগত ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় বিষয়সমূহকে অনুসন্ধান করা হয়ে থাকে। কেননা, সমাজবিজ্ঞান সমাজের উৎপত্তির ফলে সৃষ্ট একেবারে মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় বিষয়সমূহ নিয়ে গবেষণা করে না । এর মূল কারণ হলো সমাজবিজ্ঞান স্থায়ী কিংবা অপরিবর্তনীয় কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বর্তমানে বিদ্যমান সমাজসমূহের জীবনধারার মধ্যে তুলনামূলকভাবে পরিবর্তনীয় ও অপেক্ষাকৃত কম পরিবর্তনীয় বিষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত করে এদের লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করে থাকেন।</p>
<p>অপরদিকে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে স্বতন্ত্র পর্যায়সমূহ রয়েছে।</p>
<p><strong>প্রথমটি হলো,</strong> সমগ্র মানবতা ও সমাজের অস্তিত্বের মূলকে গঠনকারী মূলনীতিসমূহকে ইবনে খালদুন অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলশ্রুতিতে এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান ও সাধারণভাবে সমাজবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত যত বিষয় রয়েছে, সকল বিষয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গি স্বতন্ত্র।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়টি হলো,</strong> তিনি চিরন্তন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অপেক্ষাকৃত কম পরিবর্তনীয় ও অধিক পরিবর্তনীয় বিষয়কে পরস্পর থেকে পৃথক করেন। এগুলোকে পৃথক করার পর এদেরকে একটিকে অপরটির সাথে সম্পৃক্ত করে বিশ্লেষণ করেন।</p>
<p><strong>মুকাদ্দিমার সর্বশেষ অধ্যায় হলো জ্ঞান সম্পর্কিত। এ অধ্যায়টি একইসাথে জ্ঞানের ইতিহাস ও জ্ঞানের দর্শন সম্পর্কিত একটি অধ্যায়। শুধু তাই নয়, একদিক থেকে দেখলে এ অধ্যায়কে জ্ঞানের এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়।</strong> ইবনে খালদুন এ অধ্যায়ে সমগ্র মানবতার উদ্ভাবিত জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে তিনি এ অধ্যায়ে জ্ঞান অর্জনের পন্থা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন এবং এ সম্পর্কে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ অধ্যায়কে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, এখানে ইবনে খালদুন চার পর্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<ol>
<li>মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করার কারণে যেখানেই মানুষ রয়েছে সেখানেই সমাজ রয়েছে। সেটি বাদাবী (গ্রাম্য) কিংবা হাদারী (শহুরে) যে কোনোটি হতে পারে। এর অর্থ হলো এটি একটি মুভমেন্ট পয়েন্ট।</li>
<li> তাদের অস্তিত্ব কীভাবে সম্ভবপর হলো এটিকে বুঝার জন্য সহায়ক মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়।</li>
<li> এ সকল বিষয়কে কীভাবে জানা যাবে এ সংক্রান্ত প্রশ্ন।</li>
<li>আমরা এ সকল বিষয় সম্পর্কে কীভাবে জানি সে পন্থাকে নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি অনেক বড় একটি দৃষ্টিকোণ। এ সকল দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার সর্বশেষ অধ্যায়কে দাঁড় করিয়েছেন।</li>
</ol>
<p>এ সকল বিষয়কে সামনে রাখলে দেখতে পাই, বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞানে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে, ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় সে সকল বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় স্বাভাবিকভাবেই তিনি যে সমাজে বসবাস করেছেন সে সমাজের অবস্থা তুলে ধরেছেন। সে সময়ে যেহেতু তিনি অনেক বড় বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালন করেছেন, সেজন্য সে সকল রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়কেও তিনি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি যেটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরেছেন, সেটি হলো ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মেটাফিজিক্স। তিনি রাযীর মেটাফিজিক্যাল তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন, শ্রেণিবিন্যাস করেছেন এবং লিপিবদ্ধ করেছেন।</p>
<p>অপরদিক থেকে দুটি বিষয়কে তিনি পৃথকভাবে তুলে ধরেন,</p>
<ul>
<li><em>চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয়।</em></li>
<li><em>ঐতিহাসিক কারণে অপেক্ষাকৃত কম বা বেশি পরিবর্তনীয়।</em></li>
</ul>
<p>যদিও আমি আমার এ আলোচনায় এন্থনি গিডেন্সের রচিত বইকে কেন্দ্র করে আলোচনা করেছি, তবে বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান একটি নয়। অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞান বা Sociology রয়েছে। যেমন জার্মান সোশিওলজি রয়েছে। যেমন, ম্যাক্স ওয়েবার জার্মান সোশিওলজিকে যেভাবে তুলে ধরেছেন, সেটির ধারণা ব্রিটিশদের সোশিওলজি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অপরদিক থেকে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিলে দ্যুর্খায়েমের সমাজবিজ্ঞান যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাই, জার্মান ও ব্রিটিশ সোশিওলজি থেকে ফ্রান্সের সোশিওলজি সম্পূর্ণ ভিন্ন। Marcel Mauss, Levi Strauss-সহ আরও অনেক ফরাসি সমাজবিজ্ঞানীর দিকে যদি তাকাই, তাহলেও দেখতে পাই, তাঁদের সমাজচিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।</p>
<p>অনুরূপভাবে, Social Theory-র নামে কিংবা সিস্টেম থিওরি হিসেবে গৃহীত অনেক তত্ত্ব রয়েছে, সেগুলোও আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। এছাড়াও মার্কসবাদীদের তৈরি করা সমাজতত্ত্বগুলোও সম্পূর্ণ ভিন্ন। <strong>এ কারণে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞান বুঝালে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটি সমাজবিজ্ঞান নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞানকে বুঝানো হয়। এগুলোর মধ্যে শুধু যে বিষয়টি অভিন্ন সেটি হলো এদের নাম একই, কিন্তু এদের মধ্যে খুব বেশি মিল নেই।</strong></p>
<p>এর কারণ হলো ফ্রান্সের সোশিওলজি ফ্রান্সের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে গবেষণা করেছে এবং সমাজ সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের উত্তর ফরাসি সমাজের উপর ভিত্তি করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।</p>
<p>জার্মান সোশিওলজি জার্মান সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেটির আলোকে তাদের সমাজবিজ্ঞান গঠন করে থাকে। ব্রিটিশরা ইংল্যান্ডের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে ও আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানীরা আমেরিকার সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে সে আলোকে তাদের সমাজবিজ্ঞানকে গড়ে তুলেছেন।</p>
<p>এখানেই ইবনে খালদুন থেকে আমাদের যে বিষয়টি শিখতে হবে সেটি আমরা খুঁজে পাই। ইবনে খালদুন আরব, তুর্কি, বারবার (আফ্রিকান) ও ফ্রাঙ্কদের সমাজবিজ্ঞানকে পরস্পরের চেয়ে ভিন্ন বলে অভিহিত করেন না। তাঁর মতে, সকল মানুষের জন্য ও সমাজের জন্যই প্রযোজ্য, এমন একটি বিষয় রয়েছে। সে বিষয়টি হলো সকল মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে, আর এ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করার মধ্যে একটি সংহতি বা আসাবিয়্যাত রয়েছে। আসাবিয়্যাত বা সংহতি ছাড়া সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা সম্ভব নয়।</p>
<p>এখানে লক্ষ্য করুন, সকল সমাজের জন্য প্রযোজ্য এমন একটি মূলনীতির কথা তিনি এখানে আলোচনা করছেন, সেটি হলো ‘আসাবিয়্যাত’।</p>
<p>ইবনে খালদুন <strong>দ্বিতীয় যে বিষয়টির </strong>প্রতি গুরুত্বারোপ করেন, তা হলো একটি সমাজের বৈশিষ্ট্য সে সমাজের ভৌগলিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে এটি পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত। ফলশ্রুতিতে সে পরিবেশকেও বিবেচনায় নিলে আমরা দেখতে পাই, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধারার সমাজ গড়ে উঠে।</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয় হলো</strong>, যদি মানুষগণ কোনো একজন পয়গাম্বরের অনুসরণ করে, তাহলে রক্তের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিকতার সম্পর্কও ছিন্ন করে সে পয়গাম্বরের অনুসারীদের মধ্যে একটি ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে ও সে পয়গাম্বরের দেখানো পন্থার আলোকে একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠে। আর সে সময়ে ইন্দোনেশিয়াতে বসবাসকারী মুসলমানদের সাথে মরক্কো, সাইবেরিয়া, আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়াতে বসবাসকারী মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তারা একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি সভ্যতা বিনির্মাণের জন্য চেষ্টা করে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ও অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও একজন পয়গাম্বরের অনুসরণের ফলে তাদের মধ্যে খুব শক্তিশালী একটি আসাবিয়াত (সংহতি) গড়ে উঠতে পারে।</p>
<blockquote><p><em>এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বর্তমান সময়ে যদি আমরা সমাজ নিয়ে গবেষণা করতে চাই তাহলে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে সেটি হলো পয়গাম্বররের অনুসরণকারী উম্মাহকে তথা মুসলিম উম্মাহকে একটি অভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এরপর এর নিচে উপবিভাগ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যে ভিন্নতা রয়েছে সেটি তুলে ধরতে হবে। আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী মুসলমানদের ভিন্নতা, উত্তর আফ্রিকাতে বসবাসকারী মুসলমানদের ভিন্নতা, মধ্য এশিয়া ও বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের ভিন্নতাকে তুলে ধরতে হবে। এগুলা একইসাথে এক, আবার একইসাথে এদের মধ্যে ভিন্নতাও রয়েছে। এটিকে আমরা ওয়াহদাতের মধ্যে কাসরাত (একের মাঝে বহুত্ব) বলে অভিহিত করতে পারি।</em></p></blockquote>
<p>এখন যদি রাশিয়ার কথা চিন্তা করি, রাশিয়ার সমাজ কোন মূলনীতিগুলোর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ প্রশ্নও আমাদেরকে করতে হবে। যেমন রাশিয়া যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে ছিল, তখন তারা নিজেদেরকে কম্যুনিস্ট হিসেবে দাবি করত। তবে এর পেছনে রাশিয়ার জাতীয়তাবাদ খুবই শক্তিশালী একটি ফ্যাক্টর ছিলো এবং তারা অন্যান্য অঞ্চলকে রাশিয়ার মধ্যে আত্মীকরণ করার জন্য চেষ্টা চালিয়েছে, তবে এক্ষেত্রে তারা সফল হতে পারেনি। কিন্তু এখন তারা রাশিয়ান জাতীয়তাবাদের সাথে অর্থোডক্সিয়া ধর্মবিশ্বাসকে একত্রিত করে নতুন করে একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p>অনুরূপভাবে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, সেখানে অর্থোডক্স, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা রয়েছে। এরা কেউ কাউকেই পছন্দ করে না। দেশ হিসেবে দেখলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও জার্মানি রয়েছে। ব্রিটেনও ছিল ইতিপূর্বে। কিন্তু এদের মধ্যে অভিন্ন কোনো কিছু না থাকা সত্ত্বেও, পঞ্চাশ বছর আগেও এরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণে একক একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং একটি অভিন্ন সমাজ গঠনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।</p>
<p>আমরা যখন বাইরে থেকে দেখি, তখন আমাদের মনে একটি প্রশ্ন আসে, সেটি হলো এরা কি আদৌ সফল হতে পারবে? আমরা এটি চাই যে তারা সফল হোক, দুনিয়ার সকল মানুষ তাদের মানবিক মর্যাদা নিয়ে আদালত ও শান্তির মধ্যে বসবাস করুক, কেউ কারোর উপর অত্যাচারের স্টীমরোলার পরিচালনা না করুক।</p>
<p>কিন্তু যদি বাস্ততার নিরিখে বিবেচনা করি, তাহলে কী দেখি? তাহলে দেখতে পাই যে, সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ কঠিন সংকটের সম্মুখীন। কেন? কারণ তাদের মধ্যে আসাবিয়্যাত নেই।</p>
<p>এখন বর্তমান সময়ে আমরা ইলমুল উমরানকে কীভাবে ব্যবহার করবো? আমি মনে করি এ নামে ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। তবুও যদি এটিকে আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট সহজভাবে তুলে ধরতে চাই, তাহলে আমরা একে ‘ইলমুল মাদানী’ (সভ্যতা সংক্রান্ত জ্ঞান) হিসেবে অভিহিত করতে পারি।</p>
<p>আমরা দেখতে পাই যে, ইলমুল উমরান বা ইলমুল মাদানী’র মধ্যে একইসাথে বিশ্বাস রয়েছে, আখলাক রয়েছে, রাজনীতি রয়েছে, আইন রয়েছে, একইসাথে সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান রয়েছে, একইসাথে সামাজিক মনস্তত্ত্ব, সাইকোলজি, মেটাফিজিক্স রয়েছে, এক অর্থে বলতে গেলে এর মধ্যে সকল কিছুই রয়েছে। এ বিষয়টিকে যদি বিবেচনায় নেই, তাহলে দেখতে পাই, ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমা আমাদেরকে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে সাহায্য করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইবনে খালদুন ও ইলমুল উমরান নিয়ে আলোচনা করার পর এ কথা অনায়াসেই বলা যায় যে, ইবনে খালদুনকে শুধুমাত্র একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করা একজন মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর কোনো একটি অঙ্গের নামে নামকরণ করার শামিল। যেমন মানুষের চোখ আছে, এখন তাকে শুধুমাত্র চোখ বলে ডাকা কি সমীচীন হবে? মানুষের কান আছে, এখন যদি কেউ তাকে কান বলে ডাকে, তাহলে কেমন হবে? এটি মোটেই ঠিক হবে না।</p>
<p>&#8211; একইভাবে ইবনে খালদুনকে অর্থনীতিবিদ বললেও ইবনে খালদুনের পরিচয়কে অসম্পূর্ণ করে রাখা হবে।</p>
<p>&#8211; ইবনে খালদুনকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলার অর্থ হলো তাঁকে অসম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা।</p>
<p>&#8211; ইবনে খালদুনকে শুধুমাত্র দার্শনিক বলে আখ্যায়িত করাও তাঁর প্রতি অবিচার করার শামিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><em>তাহলে আমরা ইবনে খালদুনকে কী নামে ডাকব? তাঁকে আমরা তাঁর রাখা নামেই ডাকব। সে নামটি কী? সেটি হলো, তিনি হলেন ‘ইলমুল উমরানের প্রতিষ্ঠাতা’।</em></p></blockquote>
<p>আর ‘ইলমুল উমরান’কে বর্তমান ভাষায় আমরা ‘ইলমুল মাদানী’ বা ‘সভ্যতা সংক্রান্ত জ্ঞান’ বলে অভিহিত করতে পারি। ইবনে খালদুন একইসাথে একটি সভ্যতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, কীভাবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, একটি সভ্যতা কোন ধরণের সংকটে নিপতিত হতে পারে এ সকল বিষয়কেও অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। আর সভ্যতা সংক্রান্ত সকল বিষয়কে এভাবে বর্ণনা করার কারণে ইবনে খালদুন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। কেননা আমরা ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ চাই। আমরা যেহেতু ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ চাই, তাই আমাদের অবশ্যই ইবনে খালদুনের মুখাপেক্ষী হতে হবে।</p>
<p>তবে একটি বিষয় না বললেই নয়, ইবনে খালদুনকে বুঝার ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট রয়েছে, অনেকেই তাঁকে না বুঝেই তাঁর ব্যাপারে অপবাদ দিয়ে থাকে। তাঁর কথার উদ্দেশ্য এবং মর্মকে বুঝার পরিবর্তে যদি তাঁকে শাব্দিকভাবে বুঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তাঁকে বুঝার জন্য বর্তমান সময়ে তাঁর শব্দসমূহই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে আক্ষরিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যদি ইবনে খালদুনকে বুঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে মুকাদ্দিমার লাইনসমূহই ইবনে খালদুনকে বুঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p>তাহলে কী করতে হবে?</p>
<p>ইবনে খালদুনের লেখাকে পড়তে হবে, তবে তাকে শুধু আক্ষরিকভাবেই নয় বরং বর্তমান সময় ও তাঁর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে এবং এক্ষেত্রে আমাদেরকে সফল হতে হবে।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার মাধ্যমে যে কাজটি করেছেন সেটিকে আমরা সোশ্যাল অন্টোলজি নামে অভিহিত করতে পারি। আর ইবনে খালদুনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এ সোশ্যাল অন্টোলজি সৃষ্টি করতে পারা। সোশ্যাল অন্টোলজি সৃষ্টি করার দৃষ্টিকোণ থেকেও সত্যিকারার্থেই জ্ঞানের ইতিহাসে এর কোনো তুলনা নেই। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাশ্চাত্যের কিছু চিন্তাবিদ কিছু কিছু কাজ করেছেন যেগুলোকে সোশ্যাল অন্টোলজি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অনুরূপভাবে বিংশ শতাব্দীতেও কিছু দার্শনিক এরকম কিছু করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁদের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। তবে এদের কেউই ইবনে খালদুনের মত এক্ষেত্রে এত গভীর ও সামগ্রিক কোনো কিছু করতে পারেননি। যার কারণে ইবনে খালদুনের সাথে তাঁদের কোনো তুলনাই চলে না।</p>
<p>ইবনে খালদুনের এ সোশ্যাল অন্টোলজির মূল কাঠামোটি কী?</p>
<p>এ বিষয় সম্পর্কে ইবনে খালদুন <strong>প্রথম যে বিষয়টি উল্লেখ করেন সেটি হলো</strong> মানুষ মূলসত্তাগত দিক থেকে দুর্বল একটি সৃষ্টি এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল এক সৃষ্টজীব। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সকলেই এমন। আর সবচেয়ে নির্ভরশীল ব্যক্তি হলো সে, যার অবস্থান সমাজে সবচেয়ে উপরে।</p>
<p>যেমন ধরুন, আপনি এমন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট, যে দেশের জনসংখ্যা ১০ কোটি। এর অর্থ হলো আপনি একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সে দেশের ১০ কোটি মানুষের উপর নির্ভরশীল। তারা আপনাকে তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই আপনি শক্তিশালী। কিন্তু যদি তারা আপনার প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, পরের দিন আপনি সাধারণ একজন নাগরিক ছাড়া আর কিছু নন। মানুষের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ মূলসত্তাগত দিক থেকে দুর্বল এবং অন্যের মুখাপেক্ষী।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় যে বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন,</strong> তা হলো মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য মানুষের সাথে কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগিতার চুক্তি করতে বাধ্য।</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয়টি হলো,</strong> যারা কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগিতার চুক্তি করে, তারা সুযোগ ও সম্ভাবনার আলোকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে। একটি নিজাম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়। সকল মানুষই এমন।</p>
<p><strong>চতুর্থ বিষয়টি হলো,</strong> কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার যে চুক্তি, সে চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠা প্রতিটি ব্যবস্থা (প্রতিষ্ঠান) একটি শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং একটি সমাজের মূল সে সমাজকে গঠনকারী মানুষগণের একে অপরকে সাহায্য ও সমর্থনের ক্ষেত্রে যে শক্তি, সে শক্তির সাথে সম্পর্কিত। পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থনের দিক থেকে মানুষ যত বেশি শক্তিশালী, তাদের বসবাসকৃত সে সমাজও তত বেশি শক্তিশালী।</p>
<p><strong>পঞ্চম বিষয়টি হলো,</strong> হাতে যে শক্তি আছে, তা যত বেশি ব্যবহার করা হবে, তত বেশি বৃদ্ধি পাবে ও বড় হবে। এ বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>সর্বশেষ বিষয় হলো প্রতিটি শক্তিরই একটি সীমা ও শেষ রয়েছে। সীমায় উপনীত হওয়া কিংবা উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া প্রতিটি শক্তিই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার স্থান অন্য শক্তির নিকট ছেড়ে দেয়।</p>
<p>ইবনে খালদুনের এ সোশ্যাল অন্টোলজির মূল ফ্রেমটির তৃতীয় বিষয়টির অর্থাৎ যারা কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার চুক্তি করে, তারা সুযোগ ও সম্ভাবনার আলোকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে এ প্রশ্নের জবাব সমাজবিজ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করে। সমাজবিজ্ঞান শুধু এ কাজটিই করে থাকে।</p>
<p>কিন্তু ইবনে খালদুনের সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এটি শুধুমাত্র একটি বিষয়, এছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>এখন বর্তমান সময়ে আসা যাক। ইবনে খালদুন আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য কী বলেন? বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অনুষদে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হয়। সে সকল অনুষদের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দিকে যদি তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন, সেখানে ঐ সমাজের কোনো কিছু নিয়ে গবেষণা করা হয় না। যেমন, পাকিস্তান বলেন, তুরস্ক বলেন, মিসর বলেন কিংবা বাংলাদেশ বলেন, এ সকল দেশের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে নিজেদের দেশের সমাজ নিয়ে গবেষণা হয় না। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ইউরোপের যে সকল ধারা অনুসরণ করেন, সাধারণত সে সকল ধারার থিওরিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। যেমন, যদি কেউ জার্মান ভাষা জেনে থাকেন, তাহলে তিনি জার্মান চিন্তাবিদগণ জার্মান সমাজকে সামনে রেখে যে সকল থিওরি দিয়েছেন, সে সকল থিওরীকেই শিক্ষার্থীদেরকে শিখান।</p>
<p>আর যারা ইংরেজি জানেন, তারা আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানের থিওরিকে শিক্ষার্থীদেরকে শিখিয়ে থাকেন এবং আমেরিকার সমাজকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে তুলে ধরেন। একইভাবে যারা ফ্রেঞ্চ জানেন, তারাও ফ্রান্সের সমাজকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।</p>
<p>এখন কথা হলো বাংলাদেশের সমাজে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশী যুবকগণ কি সমাজবিজ্ঞান বিভাগসমূহে তাদের নিজেদের সমাজ ও দেশ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়?</p>
<p>এর জবাব হলো, না, পায় না!</p>
<p>একবার চিন্তা করে দেখুন তো, এটি কত মারাত্মক একটি বিষয়!</p>
<p>শুধুমাত্র সমাজবিজ্ঞানই নয়, সকল বিভাগের ক্ষেত্রে এ একই কথা প্রযোজ্য। যারা অর্থনীতি পড়ে, তারা তাদের নিজেদের অর্থনীতি সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিবহাল?</p>
<p>তাহলে ইবনে খালদুন আমাদেরকে মূল যে বিষয়টি শিক্ষা দিয়ে থাকেন, সে বিষয়টি হলো <strong>আমরা যদি সমাজবিজ্ঞান তৈরি করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সমাজবিজ্ঞান তৈরি করতে হবে।</strong> সমাজবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজকে একইসাথে জ্ঞানের বিষয় ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে তৈরি করতে হবে। যদি আমরা আমাদের সমাজকে একইসাথে জ্ঞানের বিষয় ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে তৈরি করতে পারি, তাহলে হয়তোবা আমরা আমাদের সমাজের উপর ভিত্তি করে এমন এমন সব থিওরী সৃষ্টি করতে সক্ষম হব, যেগুলো দেখে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা তাদের সমাজকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ পাবে। পরবর্তীতে তারা নিজেদেরকে পুনর্গঠন করতে পারবে। এটি হয়তো অনেকের কাছে কল্পনাপ্রসূত হতে পারে, কিন্তু এটি মোটেই অসম্ভব নয়। অতীতে তারা মূলত আমাদের সমাজ থেকেই শিখেছে, এখনো যদি আমরা এক্ষেত্রে সফল হতে পারি, তাহলে তারা আমাদের নিকট থেকেই শিখবে। কারণ আমরাই হলাম বিশ্ববিবেক।</p>
<p>এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে সমাজবিজ্ঞান সংক্রান্ত যত বিষয় রয়েছে সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজকে সামনে রেখে তত্ত্ব (থিওরী) ও মডেল দাঁড় করাতে হবে।</p>
<p style="text-align: left;"><strong>আর আমাদের সমাজ কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>আমাদের সমাজ হলো মুসলিম সমাজ। আমাদের সমাজ ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ। এখন যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরেকটু বিস্তৃত করি, তাহলে আমাদের যারা সমাজবিজ্ঞান পড়ে, তাদের মৌলিক দায়িত্ব হলো মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার ঐক্যকে কীভাবে সুদৃঢ় করা যায়, কীভাবে মুসলমানদের মধ্যকার কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায় এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করা।</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>ইনশাআল্লাহ, আমরা ধীরে ধীরে ইবনে খালদুন যেদিকে ইঙ্গিত করেছেন, সে দিক বিবেচনায় রেখে আমাদের সমাজবিজ্ঞানকে নতুন করে গড়ে তুলব। নতুন করে সমগ্র মানবতা আমাদেরকে দেখে নিজেদের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে নিবে। আর আমি বিশ্বাস করি, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ :</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15971</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শ্বেতাংগ দর্শনের মূল কথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-essence-of-white-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-essence-of-white-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 28 Jun 2025 09:03:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15887</guid>

					<description><![CDATA[ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন যে শ্বেতাংগদের প্রতিপত্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। শ্বেতাংগ জাতিগুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য তাদের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। কারণ এটা স্বাভাবিক নিয়মের খেলাফ। রাসেল বিশ্বাস করতেন যে বিগত চার শতকের মতো সুখের সময় শ্বেতাংগদের জন্যে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন যে শ্বেতাংগদের প্রতিপত্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। শ্বেতাংগ জাতিগুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য তাদের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। কারণ এটা স্বাভাবিক নিয়মের খেলাফ। রাসেল বিশ্বাস করতেন যে বিগত চার শতকের মতো সুখের সময় শ্বেতাংগদের জন্যে আর আসবে না। তার মতে শ্বেতাংগ জাতিগুলোর মধ্যে কেবল রাশিয়ানরাই হয়তো এশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এশিয়ার লোকেরা সাম্রাজ্যবাদ ঘৃণা করে এবং তাদের ধারণা রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য নেই। এশিয়ার লোকেরা পাশ্চাত্য জাতিগুলোর শাসনাধীন ছিলো। এরা পাশ্চাত্যবাসীদের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার শিকার ছিলো। রাশিয়ার হাতে এভাবে ব্যবহৃত হবার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। এসব কারণে রাসেল সাহেব ভাবতেন যে এশিয়ায় পাশ্চাত্য দেশগুলোর প্রাধান্যকাল শেষ হয়ে গেছে। তিনি অবশ্য মনে করতেন যে ভারত পাশ্চাত্য ঘেঁষা হয়েই থাকবে। তিনি ধারণা করেছিলেন যে আরব জাহান- মিসর ও পাকিস্তানসহ- কমিউনিস্ট শিবিরে যোগ দেবে।</p>
<p>রাসেল সাহেব এই ভবিষ্যদ্বাণী ব্যক্ত করেছিলেন ১৯৫০ খৃস্টাব্দে। চীনে কমিউনিস্ট সরকার কায়েম হওয়া এবং অপরাপর ঘটনার কারণে এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের অভিমত এই যে এটা হচ্ছে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী মানসিকতার একটা অগভীর বিশ্লেষণ। বার্ট্রেন্ড রাসেল উদার চিন্তাধারার জন্যে খ্যাত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা, এর আদর্শবাদিতা এবং সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এগুলো একজন চিন্তাবিদের বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বব্যাপক পর্যালোচনার পথে বাধা হয়ে থাকে এবং নতুন কোন দৃষ্টিকোণ নিয়ে এগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।</p>
<p><strong>শ্বেতাংগদের শাসনকাল সমাপ্ত। কারণ তাদের সভ্যতার সীমিত প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। অনুসন্ধিৎসু মানব মনকে দেবার মতো কোন বাস্তবধর্মী ধারণা, চিন্তা, নীতি ও মূল্যমান এই সভ্যতার কাছে আর বাকী নেই।</strong> প্রকৃত উন্নতি ও অগ্রগতির পথে পরিচালিত করার জন্যে মানব জাতিকে এই সভ্যতা আর কিছু দিতে সক্ষম নয়। গ্লেট ব্রিটেনে ম্যাগনাকার্টার ফলশ্রুতি-কালে ফ্রান্স বিপ্লবের পরিণতি এবং আমেরিকাতে গণতান্ত্রিক পরীক্ষার ফল হিসেবে ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদানের পর এই সভ্যতা বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এই মূল্যবোধ যদিও অর্ধবিকশিত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সমৃদ্ধ হচ্ছিলো। কিন্তু এগুলো গতিশীল মানব সমাজের জন্যে যথেষ্ট ছিলো না। ইউরোপে এসব মূল্যবোধের বাস্তবায়নের পরও দেখা গেলো এগুলো মানুষের চলার পথের পাথেয় হিসেবে যথেষ্ট নয়।</p>
<p>এই সভ্যতা তার মূল উৎস হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো যে উৎসের সাথে সংযোগ রক্ষা না করতে পারলে সমাজ ব্যবস্থা, নীতিমালা এবং মূল্যবোধ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে না। আর সেই উৎসটি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান। এই ঈমানই সামগ্রিক অস্তিত্বের ব্যাখ্যাদান করে। বিশ্লেষণ করে মানুষের পজিশন এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্য। মূল উৎস হতে বিচ্ছিন্ন এই সভ্যতাটি তাই একটা সাময়িক সভ্যতা। মানব প্রকৃতির গভীরে যা কোনদিন তার শিকড় গাড়তে পারেনি।</p>
<p>স্বর্গীয় উৎস হতে উৎসারিত না হওয়ার কারণে এই সভ্যতা এমন সব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যেগুলো মানব-অস্তিত্ব ও প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক ছিলো। মৌলিকত্ব ও পদ্ধতির দিক থেকে এই সভ্যতা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনগুলোকে অবহেলাই করেছে যেসব প্রয়োজন মানব-সৃষ্টি ও গঠনের বিশেষত্বের কারণে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান। যেসব প্রাথমিক মূল্যবোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সেগুলো করা হলো অবহেলা। এগুলো যে কেবল অবহেলাই করা হয়েছে তাই নয়, বরং এগুলো ভীষণভাবে পদদলিত করা হয়েছে।</p>
<p>এই পরিস্থিতিতেই জন্ম নিলো নেতিবাচক আচরণের প্রচণ্ডতা- একটা মানসিক ব্যাধি। এই ব্যাধির ফলে ধর্মকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে আজকের সভ্যতা। মানব জীবনের বাস্তবতার প্রতি বৃদ্ধাংগুল দেখিয়ে মানবীয় প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে এবং ন্যায়নিষ্ঠ মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে এই সভ্যতা সম্মুখে এগুতে থাকলো।</p>
<p>এথেকেই বুঝা যায় এই সভ্যতাকালে মানবতার দুর্গতির কারণ। গোড়ার দিকে এই সভ্যতা মানবতার সেবা, উন্নতি ও কল্যাণের অভিপ্রায় নিয়েই অগ্রসর হচ্ছিলো। পরে তা গতিপথ হারিয়ে ফেলে। কোন সভ্যতা যখন মানব প্রকৃতি বিরোধী হয়, তখন একটা সংঘাত শুরু হয়। এই সংঘাতের পরিণতি সেজে আসে বিপত্তি, জান-মালের ক্ষতি, হতাশা-নিরাশা, ধ্বংস ও মৃত্যু। এই সংঘাতের শেষ পর্যায়ে অবশ্যম্ভাবী রূপে এই সভ্যতাই হয় পরাজিত। মানব প্রকৃতি হয় বিজয়ী। কারণ সভ্যতার ক্রমবিকাশমান পর্যায়গুলোর চেয়ে মানব প্রকৃতি আরো বেশী উন্নত ও স্থায়ী।</p>
<p>এই মানদণ্ডে বিচার করলে সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে রাশিয়ান, ব্রিটিশ, ফরাসী, সুইডিস, আমেরিকান এবং অন্যান্য সব সাদা আদমীরা একই পর্যায়ের। রাশিয়ানরা বরং বেশী পেছনে। কেননা তাদের স্বৈরাচারী ব্যবস্থাটাই তো পুলিশী নিয়ন্ত্রণ, রক্তপাত, শুদ্ধি অভিযান এবং শ্রম শিবিরে শাস্তি-ব্যবস্থা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। অন্য সব ব্যবস্থার চেয়ে এই ব্যবস্থা মানব প্রকৃতির অধিকতর বিরোধী। অস্তিত্ব, জীবন রহস্য ও বিশ্বজগত সম্বন্ধে মার্কসবাদের অজ্ঞতার কথা না-ই বা বললাম। মার্কসবাদ মানবাত্মা, এর প্রকৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। বস্তুগত লাভ ও জৈবিক ক্ষুধা নিবৃত্তির সংগ্রামে সার্বিক মানবিক কর্মোৎসাহ নিয়োগ করতে মার্কসবাদ চেষ্টিত। মার্কসবাদ সব ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পেছনে কেবলমাত্র উৎপাদন পদ্ধতিকেই ক্রিয়াশীল মনে করে। এই মতবাদ ওসব মানবিক মূল্যবোধ বাতিল করে দেয় যেগুলো পশুর ইতিহাস এবং মানুষের ইতিহাসকে পৃথক রূপ দিয়েছে। এই মতবাদ মানুষের সবচে&#8217; বড়ো কাজটিকে অস্বীকার করে। মার্কসবাদ স্বীকার করে না যে মানব সত্তাই ইতিহাস বিবর্তনের সর্বপ্রধান ইতিবাচক শক্তি। এই মতবাদ ভবিষ্যতকে মানবিক উত্তরাধিকার বিবর্জিত রূপে অংকন করেছে। ধারণা দেয়া হয়েছে মানুষগুলো সব ফিরিশতা সেজে সামর্থ্য অনুসারে উৎপাদন করবে এবং শুধু নিজের প্রয়োজন মতো পরিমিত সম্পদ গ্রহণ করবে। এই মতবাদ এই ধারণাও ব্যক্ত করেছে যে সব ক্রিয়াকাণ্ড সরকার বা নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা ব্যতিরেকেই সম্পন্ন হবে। এর জন্য জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেবার কোন প্রয়োজন নেই। বুর্জোয়া ব্যবস্থা উৎপাটিত হলে এবং সর্বহারাদের নেতৃত্ব কায়েম হলেই মানব-প্রকৃতি ও চরিত্রে এই বিরাট বিপ্লব আপনা আপনি ঘটে যাবে।</p>
<p>মার্কসীয় ঐতিহাসিক মতবাদ মানব-প্রকৃতি এবং মানব-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোকে অবোধগম্য করে তুলেছে। যতদিন পর্যন্ত মানব-প্রকৃতি সম্বন্ধে এই নিরেট অজ্ঞতা বিরাজ করবে এবং যতদিন মার্কসবাদে ওই পৌরাণিক কাহিনী গৃহীত থাকবে, ততদিন কোন বাস্তবমুখীন জীবন ব্যবস্থা আমরা এই মতবাদ থেকে আশা করতে পারি না। আর তাই এই মতবাদ স্বৈরতান্ত্রিক উপায়েই মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে হবে।</p>
<p>মার্কসীয় মতবাদ এবং বাস্তব রূপের মাঝেও আছে আকাশ-পাতালের পার্থক্য।</p>
<p>মূলনীতিগুলো থেকে অনুসৃত নীতিগুলো ভিন্ন মার্কসবাদীরা মার্কসবাদের অতি &#8216;পৰিত্ৰ&#8217; বক্তব্যকেও বর্জন করেছে। অবশ্য তারা এই বর্জনকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার আপ্রাণ কোশেশ করেছে। এই প্রসঙ্গে তারা এই খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়েছে যে মার্কসবাদ ক্রমবিকাশধর্মী। অথচ মার্কসবাদের মতো কড়া গতিহীন ও স্বৈরাচারী মতবাদ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। প্রাকৃতিক আইনের অমোঘ দাবীর কাছে মার্কসবাদের প্রধান নীতিগুলোকে মাথানত করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনি এবং এই জাতীয় রাষ্ট্রের নাগরিক হবার সৌভাগ্য জার আমলেও রাশিয়ানদের হয়েছিলো।</p>
<p>মার্কসবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র উবে যাবার কথা ছিলো। বিগত অর্ধ-শতাব্দীতে সে প্রক্রিয়ার অন্ততঃ সূচনা তো হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু রাষ্ট্র এখনো আছে। দিনের পর দিন তা মোটা হচ্ছে। জনগণের ও তাদের সর্বস্ব রাষ্ট্র গ্রাস করে ফেলছে। মার্কসবাদ অনুসারে স্বাভাবিক পন্থায় সরকার-ব্যবস্থা বিলীন হয়ে যাবার কথা ছিলো। অথচ আজ একটা শক্তিশালী সরকার অবলম্বন করেই মার্কসবাদকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এখন তো বেঁচে আছে শুধু সরকার। ব্যক্তি, জনগণ এবং মানব- প্রকৃতির বিশেষ অধিকার বেঁচে নেই। এগুলো মার্কসবাদের স্টীম রোলারের নীচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।</p>
<p>মার্কসবাদ অবোধগম্য &#8216;বৈজ্ঞানিক&#8217; ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়। রাশিয়ায় যে পুলিসী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা জার আমলেরই পুনরাবৃত্তি। এই পুলিশী ব্যবস্থা সীমিত কালের জন্যে কোন অনুন্নত দেশে প্রবর্তন করা সম্ভব। যেসব দেশ ও জাতি স্বীয় সত্তা সম্বন্ধে সচেতন, তারা এমন ব্যবস্থা বেশী দিন বরদাশত করতে পারে না। যেসব জাতি এই ব্যবস্থার অবিচারের শিকার তারা সহজাত প্রবৃত্তির তাকিদেই মার্কসবাদ বিরোধী। যদিও তারা অতীতে জার ও অন্যান্য ডিকটেটরদের অধীনে অনেক দিন ছিলো। শক্তি প্রয়োগ না করে এবং দমননীতি অবলম্বন না করে মার্কসবাদ টিকে থাকতে পারে না। <strong>কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে জীবনাযাত্রার সব উৎস রাষ্ট্রের কুক্ষিগত করা হয় এবং প্রশাসনিক যন্ত্রের ওপরে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ চক্রটি হয় সব ক্ষমতার মালিক। বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণ মনকে মার্কসীয় ভাবধারায় গড়ে তোলা হয়। তথ্য বিভাগ ও প্রচার যন্ত্রগুলোও রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। কমিউনিস্ট ছাড়া অন্য কোন লোককে শিক্ষালয়গুলোতে শিক্ষক নিযুক্ত করা হয় না। কমিউনিজমের প্রতি আনুগত্যশীল নয় বলে যাকে মনে হয় তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেয়া হয়।</strong> এই ধরনের অনেক কিছুই সেই সমাজে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এতো কড়াকড়ি ও নির্যাতনের মুখেও মানব প্রকৃতি সে মতবাদের প্রতি ঘৃণাভাব প্রদর্শন করে এবং বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ করে। মানব প্রকৃতি দীর্ঘকালের জন্যে এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না। ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন ছাড়া এই মতবাদ বাঁচতে পারে না, এটাই তো এই মতবাদের ব্যর্থতার উজ্জ্বল প্রমাণ।</p>
<p>এই বিশ্লেষণের আলোকে আমরা বলতে পারি যে বাট্রেন্ড রাসেলের ভবিষ্যদ্বাণী এক নড়বড়ে ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। বাস্তব সত্য সীমিত বস্তুবাদী মানসিকতার গণ্ডী ডিংগিয়ে সম্মুখে প্রবাহিত হচ্ছে।</p>
<p>অবশ্য সমস্যাটা সুগভীর এবং সিরিয়াস। আল্লাহ ও তাঁর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে অবস্থিত একটা সভ্যতার সমস্যা এটি। এটা সামাজিক ব্যবস্থা, চিন্তাধারা এবং জাগতিক মতবাদের সমস্যা। স্বর্গীয় উৎস হতে বিচ্ছিন্ন, মানবজীবনের সঠিক ব্যাখ্যাদানে ব্যর্থ এবং বিশ্বলোকের সাথে মানবজীবনের সম্পর্ক নির্ণয়ে অপারগ মতবাদের সমস্যা এটি।</p>
<p>এটা ভয়ানক নেতিবাচক আচরণের সমস্যা। এই মানসিক ব্যাধিটা, রাশিয়ান, আমেরিকান, ইংরেজ, ফরাসী, সুইস, সুইডিস ইত্যাদি জাতিসমূহের এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের এটা সাধারণ ব্যাধি। এই জাতিগুলো আজ এক বিপজ্জনক স্থানে পা রেখে দন্ডায়মান।</p>
<p>এসব দেশে যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত এগুলোর সাধারণ উৎস ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। পুঁজিবাদী আমেরিকায় গীর্জার দ্বার মুক্ত রাখা, কমিউনিস্ট রাশিয়ায় গীর্জা বন্ধ করে দেয়া অথবা সুইডেনের মতো সমাজবাদী দেশে নাস্তি কতাবাদের অবাধ প্রচার ব্যবস্থা করে গীর্জার প্রতি উদাসীনতা দেখানোর মধ্যে বড়ো রকমের কোন পার্থক্য নেই। স্বর্গীয় মতবাদের অণুপ্রেরণায় এগুলোর কোনটাই গড়ে উঠেনি। কাজেই এগুলোর বাহ্যিক পার্থক্য ও সমাজ ব্যবস্থার নানা ঢং আমাদের কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ নয়। কারণ ধর্মীয় মতবাদই তো সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকে, অন্য কোন মতবাদ নয়।</p>
<p>এই মৌলিক উৎস থেকেই সমাজ-ব্যবস্থা ও চিন্তার সঠিক মানদণ্ড পাওয়া সম্ভব। কারণ এটা মানব-প্রকৃতির গঠন-বৈশিষ্ট ও তার প্রকৃত চাহিদাসমূহ পূরণ করতে সক্ষম। এই হলো সমস্যার গভীর ও ব্যাপক বাস্তবতা। এই বাস্তবতা বার্ট্রেন্ড রাসেলের বর্ণিত বাস্তবতা থেকে ভিন্ন। রাসেল ছিলেন প্রচলিত বস্তুবাদী সভ্যতার হাতে বন্দী। পাশ্চাত্যের সব দার্শনিকই তাঁদের পরিবেশ ও নেতিবাচক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত। পাঁচটি শতাব্দীর প্রভাব তাদের চিন্তা ও দর্শনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।</p>
<p>এই দুর্বলতা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কাঠামোকে নড়বড়ে করে ফেলেছে। এর ফলে আত্মা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নিপতিত। মানবতাবাদী মূল্যবোধ লাঞ্ছিত। জীবনে বস্তুগত সমৃদ্ধি অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও কতগুলো অর্থহীন মূল্যবোধ প্রকৃত ও কল্যাণকর মূল্যবোধগুলোকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর ফলে মানবজীবন পশ্চাদমুখীনা অথবা স্থবিরতার শিকারে পরিণত হয়েছে এবং তার ক্রমোন্নতি বাধার সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বস্তুগত জীবনে বিপুল সমৃদ্ধি অর্জন করেও মানব জীবন তার স্বাভাবিক বর্ধন ও ক্রমবিকাশ-বঞ্চিত। বর্তমান সভ্যতা মানব- প্রকৃতিকে উপেক্ষা করছে। একে এড়িয়ে চলছে। এ জন্যে এই মারাত্মক পরিণতি আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p><strong>বস্তুবাদী সংস্কৃতির বাহ্যিক চাকচিক্য যাতে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে না দিতে পারে সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত। এই চাকচিক্যের প্রভাবে বিহ্বল হয়ে আমরা যেন মানব জীবনের নিদারুণ যন্ত্রণা উপেক্ষা না করি। মিসাইল এবং কৃত্রিম উপগ্রহের সমারোহের আড়ালে উঁকি মেরে তাকালে আমরা দেখতে পাবো মানব জাতি কত দ্রুত ধ্বংসের দিকে ছুটে চলছে।</strong></p>
<p>মানুষ আল্লাহর অতি প্রিয় সৃষ্টি। আশরাফুল মাখলুকাত। সে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। পৃথিবীর সবকিছু তারই জন্যে সৃষ্ট। মনুষ্যত্বের মাপকাঠি দিয়ে মানুষের অগ্রগতি বা পশ্চাৎগতি পরিমাপ করতে হয়। তার আত্মিক সুখ মানেই হচ্ছে তার প্রকৃতির সাথে সভ্যতার উপাদানগুলোর সংগতি।</p>
<p>কাজেই আমরা যদি মানবতা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোকে নিম্নগামী, দেখি, মানুষকে প্রেরণা, বৃদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে অধোগামী দেখি, মানুষের মূল দায়িত্ব পালন যদি নিশ্চল দেখি, মানুষকে যদি যন্ত্রণা, উদ্বেগ ও সংশয়বাদে হাবুডুবু খেতে দেখি তাকে যদি মনস্তাত্বিক বিপর্যয়, উন্মাদনা ও অপরাধ-প্রবণতার শিকার দেখি, তাকে যদি উদ্দেশ্যহীন জীবন-যাপন করতে দেখি, মদ-আফিম খেয়ে একঘেয়েমী তাড়াবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত দেখি এবং তাকে যদি স্বীয় সন্তানদের হত্যা অথবা বিক্রি করে রিফ্রিজারেটার অথবা ওয়াশিং ম্যাসিন ক্রয় করতে দেখি তখন আমরা কোন্ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি? মানবতার এই করুণ অবস্থা দেখে আমাদেরকে অবশ্যই বলতে হয় যে এই বিলাস-প্রিয় সভ্যতা মানুষের আত্মিক প্রয়োজন উপক্ষো করে বস্তুগত ও যান্ত্রিক সমৃদ্ধি অর্জন করে মানবতার অবক্ষয় ঠেকাতে পারেনি। মানবতাকে প্রকৃত সুখ দিতে পারেনি। বৈজ্ঞানিক ও বস্তুগত অগ্রগতি এই সভ্যতার ব্যর্থতা ঢাকতে পারেনি। এই সভ্যতা তার সম্মুখে দেখতে পাচ্ছে এক মহাবিপর্যয়। এই সত্যটি অপরিবর্তনীয় থাকছে যে</p>
<p>মানবগোষ্ঠী আরেকটি জীবন-ব্যবস্থার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করছে, যে ব্যবস্থায় ভুল-ভ্রান্তি থাকবে না, যা মানুষের জীবনকে কলুষিত করবে না এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতি, পরিণতি এবং জ্ঞানকেও পণ্ড করে দেবে না। মানুষের জন্যে আজ এমন এক ব্যবস্থা প্রয়োজন যা মানুষকে তার অস্তিত্বের সঠিক উপলব্ধি দান করবে এবং মানুষের উপযোগী ও তার প্রকৃতির সাথে সমিল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তার চিন্তা, বিজ্ঞান ও পরীক্ষণ-পরিণতির সদ্ব্যবহার করবে।</p>
<p>শ্বেতাঙ্গদের দিন ফুরিয়েছে। তারা আর সভ্যতার অঙ্গনে বিশেষ কোন ভূমিকা পালনের অবস্থায় নেই। রাশিয়ান, আমেরিকান, ব্রিটিশ, ফরাসী, সুইস, সুইডিস- সব শ্বেতাঙ্গের জন্যে একই কথা। পাশ্চাত্য মতবাদসমূহ এবং ইউরোপীয় মানসিক ব্যাধি স্কিজোফ্রেনিয়ার পরিণতিরূপেই এই ভূমিকা সমাপ্ত হয়েছে।</p>
<p>যেসব মতবাদ, ব্যবস্থা, সংগঠন ও পরিকল্পনার ওপর মানুষের জীবন গড়ে ওঠে সেগুলোকে অবশ্যই যুক্তিনির্ভর হতে হবে। এগুলোতে অবশ্যই মানুষের সঠিক মর্যাদা ও জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ণীত থাকতে হবে। মতবাদের উপস্থাপিত ব্যাখ্যা আর বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক ধারার মধ্যে থাকতে হবে মিল। নির্ভুল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মানব জীবনের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলোর অন্যতম। একে শ্বেতাঙ্গগণ উপেক্ষা করেছে। বরং এর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছে। এদিক থেকে পশ্চিম অথবা পূর্বের মানব রচিত সব ব্যবস্থাই একই ধরনের।</p>
<p>কিন্তু মানুষ অতীতে যা ছিলো আজো তাই আছে। তার চিন্তার উন্মেষ, হৃদয়ের প্রশান্তি, বিশ্বজগত ও জীবনের ব্যাখ্যা এবং স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে সে সবসময় একটা প্রত্যয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। সে এমন এক প্রত্যয় বা বিশ্বাস অনুসরণ করতে চায় যা তার স্বীয় সত্তা, তার কাল ও তার জেনারেশন হতে বৃহত্তর এবং তার বাস্তবতা হতে মহত্তর লক্ষ্যের স্বীকৃতি দেয়। সে চায় যে তার প্রত্যয়বাদ তাকে এমন এক সত্তার সাথে সম্পর্কিত করুক যিনি তাকে পদনির্দেশ ও নিরাপত্তা দান করতে সক্ষম। সে ওই সত্তাকে ভয় করতে চায়, ভালবাসতে চায়। সেই সত্তা থেকে সে তুষ্টি কামনা করবে এবং তাঁর কাছে সব উত্তম কাজ করার সাহায্য লাভের প্রার্থনা জানাবে। তাঁর কাছে পাপ নিয়ে উপস্থিত হতে সে লজ্জাবোধ করবে। এমন এক সত্তার প্রতি বিশ্বাস মানুষের অতীব প্রয়োজন। এথেকেই মানুষ অর্জন করে চিন্তার বিশেষ ধারা; আচরণের নীতিমালা এবং উপাসনার নিয়ম-কানুন। এটা অর্জিত হলে তার সামগ্রিক জীবন সংগতিপূর্ণ হয়। জীবন হতে দূর হয় সব বৈসাদৃশ্য।</p>
<p>দৈহিক ক্ষুধা, বস্তুগত সমৃদ্ধির নেশা ও ইন্দ্রিয় সুখের মাঝে একজন মানুষ কিছুকাল ডুবে থাকতে পারে। কিন্তু মানব সত্তা এই বস্তুগত প্রয়োজন ও প্রয়োজন পূরণের মাঝে নিঃশেষ হয়ে যায় না। বস্তুগত প্রয়োজন মিটে যাবার পরও আরো কিছু প্রয়োজন বাকী থেকে যায়। বরং বস্তুগত প্রয়োজন মিটে যাবার পরে পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সম্পদ দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয় এমন একটা ক্ষুধা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই ক্ষুধা ভিন্ন রকমের। এটা হচ্ছে মানুষের চেয়েও বৃহত্তর এক শক্তি, ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য বিশ্ব হতে বৃহত্তর এক বিশ্ব এবং পার্থিব জগত হতে ভিন্নতর এক জগতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষুধা। মানুষের মন চায় বাস্তব জীবনের আইন এবং তার বিবেকের আইনের মাঝে একটা সম্প্রীতি। তার মন কামনা করে মানুষের ব্যক্তিগত বাস্তবতা এবং বিশ্বলোকের বাস্তবতার মধ্যকার একটা মিল। মনের গভীরে প্রতিটি মানুষ এক আল্লাহর অনুসন্ধান করে ফিরে যিনি একাধারে তাকে নৈতিক এবং সামাজিক আইন নির্দেশ করবেন।</p>
<p>মানব সত্তার গভীরে লুক্কায়িত বিভিন্ন রকমের ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটাবার ব্যবস্থা না। দিয়ে কোন জীবনব্যবস্থাই মানুষের প্রকৃত ও সঠিক সুখ নিশ্চিত করতে গারে না। শ্বেতাংগদের সভ্যতায় এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টটির অভাব রয়েছে। আর প্রধানতঃ এই কারণে মানব সভ্যতায় শ্বেতাংগদের বিশেষ ভূমিকা পালনের দিন শেষ হয়ে গেছে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>এ. কে. এম. নাজির আহমদ<strong>।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-essence-of-white-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15887</post-id>	</item>
		<item>
		<title>এক নজরে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তা-দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 16:10:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15839</guid>

					<description><![CDATA[পৃথিবীর অতীত ইতিহাসে নজর বুলালে সুগভীর পর্যবেক্ষণ বা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ব্যতীতই স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও এটাই প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, একটি সভ্যতা তার ধারক-বাহকদের দ্বারা পরিচালিত হবার পূর্বে উক্ত সভ্যতার উত্থান ও বিকাশ হয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন চিন্তাশীল-দার্শনিকের হাতে।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p dir="ltr">পৃথিবীর অতীত ইতিহাসে নজর বুলালে সুগভীর পর্যবেক্ষণ বা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ব্যতীতই স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও এটাই প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, একটি সভ্যতা তার ধারক-বাহকদের দ্বারা পরিচালিত হবার পূর্বে উক্ত সভ্যতার উত্থান ও বিকাশ হয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন চিন্তাশীল-দার্শনিকের হাতে।</p>
<p dir="ltr">আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তেমনি একজন সুমহান ব্যক্তিত্ব, এ-যুগের ইমাম গাজালী। যার হাত ধরে গড়ে উঠেছে আগামীর বিশ্ব দর্শন। যার ক্ষুরধার লেখনীতে পর্যদুস্ত একালের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিসমূহ। গ্রীক থেকে শুরু করে তথাকথিত মধ্যযুগ পেরিয়ে হাল আমলের আধুনিক সব আখলাকবিহীন দর্শনগুলোকে একের পর এক খণ্ডন করে গেছেন তিনি। বিপরীতে উপস্থাপন করে গেছেন আখলাক-সম্পন্ন, আদালাত-সমৃদ্ধ ও মারহামাতপূর্ণ যুগোপযোগী সব বিশ্ব দর্শন। তৈরি করেছেন নিজস্ব এক পরিভাষার ভাণ্ডার, যা দিয়ে বর্ণনা করে গেছেন তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা। তিনি তাঁর চিন্তাধারায় অনন্য। তাঁর প্রতিটি কর্ম বিশ্বব্যাপী সুপ্রসিদ্ধ সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বিষয়বস্তু।</p>
<p dir="ltr">যুগের মহান এই ব্যক্তিত্ব, তাঁর দর্শন, তাঁর চিন্তাধারা ও তাঁর কর্মসমূহ আমাদের সামনে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছেন এই যুগেরই অপর আরেকজন মহান ব্যক্তিত্ব, হাদীস বিশারদ ও মুজতাহিদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ। অসাধারণ ও সাবলীলভাবে অনুবাদান্তে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক ও শিক্ষাবীদ বুরহান উদ্দীন আজাদ। আর, যুগের ইমাম গাজালীকে উম্মাহর সামনে বাংলা ভাষায় পরিচয় করে দিয়েছে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার।</p>
<p dir="ltr">আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তাধারা ও তাঁর দর্শন নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করাটা একেবারেই অসম্ভব। কারণ, যে দার্শনিক একইসাথে দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটি নিয়ে একত্রে কাজ করে গেছেন, ত্রিশেরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং প্রতিটি বিষয়েই যিনি নিজস্ব পরিভাষার অসাধারণ এক সমাহার তৈরি করেছেন, তাঁকে নিয়ে ক্ষুদ্র একটা প্রবন্ধে বিস্তর আলোচনা কখনই সম্ভব না।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔷উম্মাহর সংকট উত্তরণে প্রণীত দর্শন</strong></p>
<p dir="ltr">মহান এই দার্শনিকের চিন্তাধারার মূলভিত্তি প্রোথিত আছে পাঁচটি প্রশ্নের ভেতরে, যে প্রশ্নগুলো তিনি নিজেই নিজেকে করেছেন। প্রশ্ন পাঁচটি এমন,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আমরা কারা?</li>
<li dir="ltr">২. পাশ্চাত্য সভ্যতা কারা?</li>
<li dir="ltr">৩. পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রকৃতি কেমন?</li>
<li dir="ltr">৪. শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের নামে তারা আমাদের কী দিয়েছে?</li>
<li dir="ltr">৫. আমাদের বর্তমান অবস্থান কোথায় এসে পৌছেছে?</li>
</ul>
<p dir="ltr">যেহেতু মহান এই দার্শনিক উম্মাহর স্বার্থে এবং নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ বা ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য সামগ্রিক বিশ্ব দর্শন প্রণয়ন করেছেন, নতুন দুনিয়ার উসূল উপস্থাপন করেছেন, তাই মুসলিমদের সংকট উত্তরণে তাঁর প্রদত্ত দর্শন ও প্রস্তাবনাগুলোর উপর একনজর বুলিয়ে নেওয়া উচিত।</p>
<p dir="ltr">তিনি মনে করেন, পাশ্চাত্যের জুলুমের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে মুসলিমরা দুই ধরনের সংগ্রাম করছে। যথা,</p>
<ul>
<li>১. জুযয়ী তথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আন্দোলন। এখানে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।</li>
<li>২. কুল্লী তথা সামগ্রিক বা বড় আন্দোলন। এখানে তিনি চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলনকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এ-দর্শনের মাধ্যমে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান চিন্তা ও আখলাক-বিহীন রাজনৈতিক আন্দোলনকে অকার্যকর বলে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্যে,</p>
<blockquote>
<p dir="ltr">&#8220;মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে সমাজ পরিবর্তনের জন্য মুসলিমদেরকে রাজনৈতিকভাবেই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো পথ উন্মুক্ত নেই—এই বিষয়টি এখন সবার মাঝে এমন গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, এই পন্থা ব্যতিত আর কোনো পন্থাকেই মুসলিমরা সহজে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু, রাজনৈতিক বিষয়াবলি বাদেও যে সমাজ পরিবর্তন করা যায়, এই বিষয়টা উম্মাহকে বুঝানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার হলেও সবাইকে আখলাকী ও চিন্তাগত পন্থায় সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা উপলব্ধি করাতে হবে। কারণ, মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হয় চিন্তা ও আখলাকী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।&#8221;</p>
</blockquote>
<p dir="ltr">এই বিষয়কে সামনে রেখেই তিনি তাঁর সকল গ্রন্থ-কে সাজিয়ে নিয়েছেন।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের এমন দর্শনের পেছনে অন্যতম যে বিষয়টি মুখ্য হিসেবে কাজ করেছে, সেটি হলো, মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে বিগত বছরগুলোয় মুসলিমদের চালানো প্রচেষ্টাগুলোকে বিশ্লেষণ করে তিনি এগুলোকে পাঁচভাগে বিভক্ত করেছন। যথা,</p>
<ul>
<li>১. প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>২. রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৩. সেক্যুলারিজমের চিন্তাধারাকে কেন্দ্রে রেখে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৪. পাশ্চাত্যের সৃষ্ট মডারেট চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে মডার্ন ধারার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৫. শক্তির মাধ্যমেই শক্তির জবাব দিতে হবে, এমন ধারণা থেকে চরমপন্থা বা প্রান্তিকতার মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এসকল কারণেই তিনি মনে করেন, আমাদের এখন মৌলিক কাজ হলো, চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলন গড়ে তোলা। তিনি শুধু এটা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি এর উপায়ও বাতলে দিয়ে গেছেন।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, আমরা যেহেতু আমাদের সংকট উত্তরণ করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে প্রথমে এই সংকট নিয়েই পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা আমাদের এই সংকটের বাহ্যিক সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। কিন্তু, অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা তেমন আলোচনা করি না। অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখি, বর্তমানে আমরা বৃহৎ দু&#8217;টি সমস্যার মধ্য দিয়ে আমাদের সময় অতিক্রম করছি। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আল আফাতুল বায়ানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমাদের ভাষাগত সমস্যা।<br />
আমাদের কথ্য, লিখিত, চিন্তাগত ও দার্শনিক ভাষার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। প্রতিটি সেক্টরে আমরা ব্যতিক্রমধর্মী সব ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন করে থাকি। আবার ক্ষেত্রবিশেষে একই ভাষার ব্যবহার বা প্রচলন হলেও তার মধ্যে রয়েছে ভাষার ধরনের ভিন্নতা।</li>
<li dir="ltr">২. আল আফাতুল আমানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমাদের ঈমান, আকল ও চিন্তা একই রেখায় ফাংশন করতে না পারার সমস্যা।</li>
</ul>
<p dir="ltr">যেহেতু আমাদের সমস্যা এখন চিহ্নিত হয়ে গেছে, অতএব এর সমাধানে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। মহান এই দার্শনিক এই সমাধানকল্পে দু&#8217;টি দর্শনকে সামনে নিয়ে আসেন। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আল ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ। অর্থাৎ, জ্ঞানের সাথে বিশ্বাসের সমন্বিত একটি দর্শন।</li>
<li dir="ltr">২. আল ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমান ও আমানত সম্বলিত একটি দর্শন।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এদু&#8217;টোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে তিনি আল ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ নিয়ে একটু বেশি কাজ করে গেছেন। এর উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, এটাকে তিনি শুধু একটা ফিলোসফি হিসেবেই দেখেননি, বরং ফিকহের মতো একটা বিষয়ের সাথেও এটাকে ওতপ্রতভাবে সম্পৃক্ত করেন। পাশাপাশি কালাম ও তাসাওফ—এদু&#8217;টি এবং ফিকহ; জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি শাখাকে তিনি নতুন করে গঠন করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।</p>
<p dir="ltr">ফিকহ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের ফিকহ অনেকটা আমর ও নাহীর উপর ভিত্তি করে রচিত। বর্তমানে, জ্ঞানের এই শাখায় আমান ও আমানতের বিষয়টি বেশ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ইলমুল কালাম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হলো, মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র ইরাদা ও কুদরাতের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। আর, তাসাওফকে তিনি উপরোক্ত দু&#8217;টি শাখার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন। কারণ, ইসতিদলাল, ইসতিমবাত ও ইসতিবসারকে একত্রে বিবেচনা করে থাকেন তিনি। অর্থাৎ, ফিকহ, কালাম ও তাসাওফ—জ্ঞানের এই তিনটি শাখাকে সদা একই রেখায় রেখে কাজ করে যেতে হবে।</p>
<h5 dir="ltr">অন্যান্য দর্শনসমূহ:</h5>
<p dir="ltr"><strong>🔹আল মানহাজ</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর চিন্তাধারা পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে সামনে রেখে তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো আল-মানহাজ, এর অর্থ পদ্ধতি বা পন্থা । তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস-এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক মীরাস পর্যালোচনা করার জন্য নতুন একটা পন্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কীভাবে বুঝবো, সেটার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক সময়ে এসে আমরা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত চিন্তার প্রভাবে সকল কিছুকেই খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি। সকল কিছুকে খণ্ডিত করে দেখা একটি ভুল পন্থা। এই পন্থাটি আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। যার ফলে ইসলামী চিন্তাকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করার সক্ষমতাকেও আজ হারিয়ে ফেলেছি আমরা।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹মডার্নিটি</strong><br />
মডার্নিটি কিংবা আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি রুহুল হাদাসা নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের আধুনিকতা নামে একটি আধুনিকতা রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিকতা একমাত্র কিংবা অনুপম নয়। প্রতিটি চিন্তাই তার মতো করে তাদের নিজস্ব আধুনিকতা তৈরি করতে পারে। পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে, তার কিছু মৌলিক পরিভাষা রয়েছে। যেমন- ধর্মহীন বিশ্বদর্শন (Secular World View), রেশনালিজম, হিউম্যানিজম ইত্যাদি। কিন্তু, আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও পরিভাষার মাধ্যমেই আমাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি আধুনিকতার বিকাশ ঘটাতে পারি। অর্থাৎ আধুনিকতার রূহকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের রূহকে বিনির্মাণ করতে পারলে সেই রূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আধুনিকতার উদ্ভব ঘটবে ।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹আখলাক</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অর্জনকারী বিষয় হলো আখলাক। বিষয়টিতে তিনি অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে দ্বীন ও আখলাকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল ধরণের বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেন। দ্বীনকে আখলাক হিসেবে ও আখলাককে দ্বীন হিসেবে অভিহিত করেন। &#8216;Cogito, ergo sum&#8217; (চিন্তা করি এই জন্যই আছি) চিন্তার বিপরীতে &#8216;আমি আখলাকসম্পন্ন, এই জন্য আমি আছি&#8217;-এই চিন্তার বিকাশ ঘটান।</p>
<p dir="ltr">আখলাকী চিন্তার ক্ষেত্রে মুসলিম আলেমদের চিন্তার সমালোচনা করে বলেন, তাঁদের চিন্তার মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কেননা, আখলাককে তাঁরা পূর্ণতাদানকারী একটা বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু আখলাক পূর্ণতাদানকারী কোনো বিষয় নয়। এটি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। আখলাক ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। আখলাক পূর্ণতার (কামালিয়াত) সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়, এটা অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা দ্বীন ও মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আখলাক ছাড়া দ্বীন হতে পারে না, আখলাক ছাড়া মানুষ হতে পারে না। মানুষের যে সংজ্ঞা, সেই সংজ্ঞার একাংশ জুড়ে আছে আখলাক, বাকি অংশ হলো দ্বীন। তবে উল্লেখ্য বিষয় হলো, এক্ষেত্রে দ্বীন হলো মূল বিষয়।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, রাজনীতি থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ করার চেয়ে দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা আরো বড় ধরণের হুমকি। আর এ বিষয়কে তুলে ধরার জন্য তিনি দাহরানিয়্যাহ নামক একটি পরিভাষা তৈরি করেছেন। দাহরানিয়্যাহ হলো, দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা। আর এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিপদজনক বিষয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹আকল</strong><br />
একজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আকলের উপরেও অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন মহান এই দার্শনিক। এ বিষয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। আকলকে তিনি আকলে মুজাররাদ, আকলে মুয়ায্যাদ ও আকলে মুসাদ্দাদ নামে তিন ভাগে বিভক্ত করেন।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, আকলে মুজাররাদ হলো বুরহানী আকল। এটি এমন আকল, যা দ্বীনি ক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে। এই ধরণের আকল হলো বিমূর্ত (Abstract) ও যান্ত্রিক। এ ধরণের আকল বিজ্ঞানাগারে, কল কারখানায় ও একাডেমিক গবেষণার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু, মানুষের সাথে তার রবের ও মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক এই আকলের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি আমলের মাধ্যমে সজ্জিত আকলকে আকলে মুসাদ্দাদ নামে নামকরণ করেছেন। আর যে আকল আখলাকী মূল্যবোধের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হয়েছে, সেই আকলকে তিনি &#8216;আকলে মুয়ায়্যাদ&#8217; নামে অভিহিত করেন।</p>
<p dir="ltr">তিনি মনে করেন, আকল শুধুমাত্র একমুখী হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ আকলকেই ছোট করা। কেননা, আকল আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত। এজন্য এই নেয়ামতকে বহুমুখী হিসেবে দেখতে হবে। আকল কোনো জাওহার নয়। আকল হলো একটি কর্ম। এই কারণে তিনি তা&#8217;আক্কুলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹ফিতরাত</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান ফিতরাতের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি তাঁর সকল গ্রন্থেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p dir="ltr">কেননা, তাঁর মতে, মানুষের পূর্বে থেকেই দ্বীন বিরাজমান ছিলো। মানুষের সৃষ্টি হয়েছে দ্বীনের পরে। শুধু তাই নয়, খুলক-ও (আলাক) খালকের (সৃষ্টির) পূর্বে সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের সৃষ্টির পূর্বেই খুলক-এর অস্তিত্ব ছিলো। পরবর্তীতে এটা ফিতরাতরূপে মূল্যবোধের একটি ভাণ্ডার হিসেবে মানুষের ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। দ্বীন মানুষের মধ্যে পরবর্তীতে স্থাপিত কোনো বিষয় নয়। বরং, মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্বপ্রাপ্ত মৌলিক একটি হাফিজার (সংরক্ষণশালা) মধ্যে দ্বীনের অর্থের জগত লুক্কায়িত। আর এই হাফিজা বা সংরক্ষণশালার নাম হলো ফিতরাত।</p>
<p dir="ltr">দ্বীন মানুষকে সঙ্গ দানকারী একটি হাকীকত। মানুষ এ হাকীকত থেকে কখনো পৃথক হতে পারবে না। অপর দিকে পয়গাম্বরদের মাধ্যমে যে দ্বীন এসেছে, সেটা মূলত তাজকীর বা স্মারক। অর্থাৎ, মানুষের ফিতরাতের মধ্যে যা রয়েছে, সেটাই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এ কারণে কোরআনকে যাক্কির (স্মারক) এবং পয়গাম্বরকে মুজাক্কির বলা হয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹পরিভাষা</strong><br />
পরিভাষা তৈরি করার ক্ষেত্রেও তিনি অতুলনীয়। কিছুদিন আগে এ ব্যাপারে কামুসু ত্বহা নামে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ত্বহা আব্দুর রহমানের মতে, মুসলিম উম্মাহ পরিভাষাগত একটি আক্রমণের শিকার। এক্ষেত্রে তিনি &#8216;আল-উদওয়ানুল মাফহুমী&#8217; নামক পরিভাষা ব্যবহার করেন।</p>
<p dir="ltr">তিনি বলেন, পরিভাষা তৈরি করা ও পরিভাষার অধিকারী হওয়ার অর্থ হলো, সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়া। কোনো কিছুকে শক্তি প্রয়োগ করে পরিবর্তন করার চেয়ে পরিভাষার মাধ্যমে পরিবর্তন করা বেশি স্থায়ী হয়ে থাকে। পরিভাষার মধ্য দিয়ে বড় বড় পরিবর্তন করা সম্ভব।<br />
এ কারণেই তিনি পরিভাষার উপর এতো বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন, শত শত পরিভাষা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹দর্শন</strong><br />
দর্শনের বিষয়ে, বিশেষ করে দু&#8217;টি ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন, ক্ষেত্রের উপরে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দর্শন মানে হলো প্রশ্ন করা। আর প্রশ্ন করার পন্থা দু&#8217;টি,<br />
১. অপরপক্ষকে চুপ করানো জন্য প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করার এই পন্থা হলো গ্রীক দার্শনিকদের পন্থা। যেমন- সক্রেটিসের প্রশ্ন করার পন্থা।<br />
২. সমালোচনামূলক প্রশ্ন করা। ইম্যানুয়েল কান্ট এই পন্থা শুরু করেন এবং প্রভাবশালী করে তোলেন।</p>
<p dir="ltr">তবে ই&#8217;তিমানিয়্যাহ দর্শনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সুয়াল বা প্রশ্ন নেই। সুয়াল বা প্রশ্নের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সুয়ালিয়্যাত (প্রশ্ন করা) নয়, এখানে উদ্দেশ্য হলো মাসউলিয়্যাত (দায়িত্ববোধ)। সুয়াল-মাসয়ালা ও মাসউলিয়্যাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি এই বিষয়কে তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, প্রশ্ন যখন দায়িত্ববোধের চেতনা জাগ্রত করবে, কেবল তখনই সেটা সত্যিকারের প্রশ্ন হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরণের প্রশ্নই আমাদের সত্যিকারের দর্শন। এ ক্ষেত্রে তিনি &#8216;আস-সুয়াল মাসউল&#8217; পরিভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹চিন্তাগ্রহণ</strong><br />
চিন্তার আদান প্রদান নিয়ে তিনি বেশ ভালোভাবেই পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অন্যের চিন্তা অনুবাদ করে কোনোদিন সত্যিকারের চিন্তা তৈরি করা যায় না। পাশ্চাত্যের দর্শন বিষয়ক যেসব বই অনুবাদ করে আজ সমগ্র বিশ্বে পড়ানো হচ্ছে, সেটার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন,<br />
لن تكون الفلسفة رافعة إلا اذا كانت مبدعة<br />
অর্থ : &#8220;দর্শন কোনো জাতিকে উচ্চমর্যাদায় আসীন করতে পারে না, যদি না সেটা নিজেদের মূল্যবোধের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়। &#8220;</p>
<p dir="ltr">অর্থাৎ, তাকলীদের মাধ্যমে চর্চিত দর্শন কোনোদিন কোনো জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারে না। যদি কোনো জাতি চিন্তার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে চায়, তাহলে তাকে নিজ মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রেখে চিন্তা ও দর্শন তৈরি করতে হবে।</p>
<p dir="ltr">তবে, অন্যের চিন্তা কতটুকু গ্রহণ করা হবে, এ-বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি &#8216;তাকরীরে তা&#8217;বী&#8217; নামে একটি পন্থার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এর অর্থ এটা নয় যে, আমরা কারোর কাছ থেকে কোনো কিছুই নেবো না। তবে, অন্যদের কোনো চিন্তা ও দর্শন অনুবাদ করার ক্ষেত্রে আমাদের তাদাভুলিয়্যার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যে-সকল চিন্তা অনুবাদ করবো, সেই চিন্তার ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিত্তিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। কেননা আমাদের ভাষা ও ধর্ম উভয়টিই ভিন্ন। যেমন- তিনি হেগেল ও নিটশে-কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, এরা অনেক ধর্মতত্ত্বীয় পরিভাষাকে দার্শনিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে।</p>
<p dir="ltr">এ কারণে অনুবাদের সময় আমাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো হলো তাহসিলিয়্যাহ, তাওসিলিয়্যান ও তা&#8217;সিলিয়্যাহ। তাহসিলিয়্যাহ হলো হুবহু অনুবাদ করা। তাওসিলিয়্যাহ হলো, সতর্কতার সাথে বেছে বেছে অনুবাদ করা। তা&#8217;সিলিয়্যাহ হলো, শুধুমাত্র আমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়সমূহকে অনুবাদ করা। আমাকে সেই বিষয়সমূহই অনুবাদ করতে হবে, যেগুলো আমাদের দ্বীন ও ভাষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹দর্শন উদ্ভাবন</strong><br />
মুসলমানদের দর্শন তৈরি করার অধিকার নিয়ে তাঁর এই উক্তিটির উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য-<br />
”উম্মতসমূহের ভিন্নতা প্রাকৃতিক একটি বিষয়। যারা নিজের উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছে, তাঁরা ছাড়া অন্য কেউই এই অমোঘ বিধানকে অস্বীকার করতে পারে না। এই কারণে, যে জাতি পরাজিত ও পরাভূত হয়েছে, তাঁদেরও পুনরায় নিজ-পায়ে দাঁড়ানোর অধিকার রয়েছে। তাঁদেরও অধিকার আছে তাঁদের নিজেদের দর্শনকে তৈরি করার।&#8221;</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, যে সভ্যতা তাঁর যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব নিজের মূল্যবোধের মাধ্যমে দিতে সক্ষম নয়, সেই সভ্যতার পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যে সভ্যতা যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব অন্য সভ্যতা কর্তৃক সৃষ্ট মূল্যবোধ ও জবাবের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেই সভ্যতা আরও বেশি অধঃপতনের শিকার হয়।</p>
<p dir="ltr">তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, যুগের জবাবদানের ক্ষেত্রে অন্যদের তৈরি করা জবাবের মাধ্যমে জবাব দেওয়া। আর এই বিষয়টিই আমাদের পথকে রোধ করে দিয়েছে।</p>
<p dir="ltr">আমরা মুসলিম হিসেবে যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব কীভাবে দিবো এবং আমাদেরকে কীভাবে কাজ করতে হবে, এ বিষয়ে তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় তাঁর অভিমত তুলে ধরেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔷গ্রন্থপঞ্জির দর্শন</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের গ্রন্থগুলোকে দু&#8217;টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. উসূল ও মেথডোলজি</li>
<li dir="ltr">২. উসূলের প্রয়োগপদ্ধতি</li>
</ul>
<p dir="ltr">উসূল ও মেথডোলজি সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>১. ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ।</li>
<li>২. ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ।</li>
</ul>
<p dir="ltr">পরিশেষে জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য তুলে ধরতে হয়। তিনি বলেন,</p>
<blockquote>
<p dir="ltr"><strong>“এমন কোনো জ্ঞান ও আমল নেই, যা দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান ও আমলের চেয়ে উত্তম হতে পারে। দ্বীনি কার্যক্রমের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো চিন্তাকে স্থবির করে ফেলা।”</strong></p>
</blockquote>
<p dir="ltr">অর্থাৎ, যারা জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করবে, তাঁদেরকে সবসময় জ্ঞানগত ও আমলগত দিক থেকে গতিশীল থাকতে হবে। কোনো আন্দোলন যখন তাঁর চিন্তাগত গতিশীলতাকে হারিয়ে ফেলে, তখনই তা কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15839</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম; আকাঙ্ক্ষিত সভ্যতার মূর্ত প্রতীক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 15:31:02 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15835</guid>

					<description><![CDATA[বর্তমানে মানবতার এমন একটি নতুন সভ্যতা খুব বেশি প্রয়োজন, যে সভ্যতার পাশ্চ্যত্য সভ্যতার থেকে ভিন্ন দর্শন এবং বার্তা রয়েছে। পাশ্চ্যত্য সভ্যতার বলতে আমরা এ সভ্যতার কমিউনিস্ট এবং বস্তুবাদী দিক উভয়টিকেই বুঝাচ্ছি। উভয়টিই কোরআন, তাওরাত এবং যাবুরে বর্ণিত সেই অভিশপ্ত গাছের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বর্তমানে মানবতার এমন একটি নতুন সভ্যতা খুব বেশি প্রয়োজন, যে সভ্যতার পাশ্চ্যত্য সভ্যতার থেকে ভিন্ন দর্শন এবং বার্তা রয়েছে। পাশ্চ্যত্য সভ্যতার বলতে আমরা এ সভ্যতার কমিউনিস্ট এবং বস্তুবাদী দিক উভয়টিকেই বুঝাচ্ছি। উভয়টিই কোরআন, তাওরাত এবং যাবুরে বর্ণিত সেই অভিশপ্ত গাছের দুটি শাখা। আর গাছটি হলো বস্তুবাদ।</p>
<p>মানবতার এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যে সভ্যতা আল্লাহ, কোরআন, হাশর, মিজানে বিশ্বাসী; সেইসাথে মানুষের মহৎ মূল্যবোধে বিশ্বাসী। যা ছাড়া মানুষ তার মানবিকতাবোধ হারায় এবং জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলে।</p>
<p>মানবতার এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যে সভ্যতা ধর্ম, বিজ্ঞান, বিশ্বাস, আকল, চেতনাসহ মানুষের আকাঙ্ক্ষিত সবকিছুকে বেষ্টন করে রাখে। এ সভ্যতা যেমন পরকালে মানুষের জান্নাত প্রাপ্তির পথকে সুগম করতে পারে, তেমনি ইহকালে মানুষের জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ্য করে তুলতে পারে। এটি মানুষকে সত্য, শক্তি, নীতি-নৈতিকতা এবং স্বাধীনতার সন্ধান দেয়।</p>
<p>মানুষের এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যা পৃথিবী ও জান্নাতের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এ সভ্যতায় বিশ্বাসী হৃদয়ের সাথে যুক্তিরও ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকে। এ সভ্যতায় মানুষ হাকীকত এবং আকলের দ্বারা পরিচালিত হয়, যা তার উপর আল্লাহর দয়া এবং অনুগ্রহের প্রমাণ।</p>
<p>আমরা এতক্ষণ যে সভ্যতার কথা ভাবছি, তা মূলত ইসলাম ছাড়া অন্য কোনোটিই নয় এবং সেই প্রভু হলেন আল্লাহ, যিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্বজ্ঞানী, যিনি সবকিছু জানেন। জান্নাত ও পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো কিছুই তার জানার বাইরে নয় এবং তিনি ভারসাম্য ও সুসমন্বয়ের অবিশ্বাস্য ও বাস্তবসম্মত উদাহরণ তৈরি করতে সক্ষম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ভারসাম্য এবং সমন্বয়ের সভ্যতা :</strong></p>
<p>ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা মানবতাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থা উপহার দেয়।</p>
<p>ভারসাম্য বলতে আমরা বুঝি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা, অর্থাৎ দুটি প্রান্তিকতার মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করাকে। মানব রচিত কোনো ব্যবস্থা অথবা মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থাই চরমপন্থা বা প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত নয়। একমাত্র ইসলামেই এটি উপস্থিত।</p>
<p>আল কোরআনের মধ্যমপন্থাকে সরল-সঠিক পথ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন যে সূরা দিয়ে শুরু হয়েছে, সে সূরা ফাতিহার একটি আয়াতে এ কথা বলা হয়েছে। একজন মুসলমান প্রতিদিনের নামাজে কমপক্ষে সতেরো বার আল্লাহর কাছে এ আর্জি জানায়,</p>
<p>“হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করো।” (সূরা ফাতিহা : ০৬)</p>
<p>এ সরল-সঠিক পথ আল্লাহর আযাবের ফলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাতিগুলোর পথের সম্পূর্ণ বিপরীত। মধ্যম পন্থাকে ‘মিজান’ বা দাঁড়িপাল্লা হিসেবেও অভিহিত করা হয় যা, যা সীমালঙ্ঘন না করা এবং ওজনে কম না দেওয়া বোঝায়। আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মিজান কায়েম করেছেন। এর দাবি হলো, তোমরা মিজানে সীমালঙ্ঘন করো না। ইনসাফের সাথে সঠিকভাবে ওজন করো এবং ওজনে কম দিও না।” (সূরা আর রাহমান : ৬-৯)</p>
<p>এখানে সীমালঙ্ঘন করা বলতে চরমপন্থা বা প্রান্তিকতা অবলম্বনের প্রবণতা এবং ওজনে কম দেওয়া বলতে সঠিকভাবে ওজন করার ক্ষেত্রে গাফিলতির প্রবণতাকে বোঝায়। আর উভয়টিই নিন্দনীয়।</p>
<p>ইসলামের ভারসাম্যের এই চমৎকার ব্যবস্থা এমন সব পরস্পর বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করেছে, যাদের পারস্পরিক সমঝোতাকে মানুষ কার্যত অসম্ভব মনে করতো। আর এ সমঝোতা এতটাই সুন্দর যে, উভয় পক্ষ কোনো ধরনের সীমালঙ্ঘন ও পারস্পরিক সংঘর্ষ ছাড়াই নিজেদের সীমার মধ্যে অবস্থান নিয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ ইলাহী ও মানবিক বিষয়াবলি, ওহী ও আকল, আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত বিষয়, পরকাল ও ইহকাল, একক ব্যক্তি ও ব্যক্তিসমষ্টি, ধারণাগত ও বাস্তববাদী বিষয়, অতীত ও ভবিষ্যত এবং দায়িত্ববোধ ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্যের মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। এ ভারসাম্য সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও নতুন আবিষ্কার, দায়িত্ব ও অধিকার, স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তন, প্রতিশ্রুতি ও ধৈর্যের মাঝে পুনর্মিলন ঘটায়।</p>
<p>এসবের কারণে মুসলিম উম্মাহ অন্য সব জাতির তুলনায় বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যমপন্থী’ উম্মতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীদের উপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের উপর সাক্ষী।” (সূরা আল-বাকারা : ১৪৩)</p>
<p>আর সমন্বয় বলতে বোঝায় দুটি ধারণা বা মতাদর্শকে এমনভাবে মিলিত করা, যেন একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় এবং একটি অন্যটিকে ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। এটি মানুষের জমিনে বিনির্মাণ, পৃথিবীতে খেলাফতের দায়িত্ব পালন এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদাত করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। ইসলাম বিজ্ঞান ও বিশ্বাস, সত্য ও শক্তি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ক্রিয়াকলাপ, ধর্ম ও রাষ্ট্র, নির্দেশনা ও আইন, ধর্মীয় বিড়ম্বনা ও শাসকদের দায়িত্ব, বস্তুগত সৃজনশীলতা ও নৈতিক উন্নতি এবং সামরিক শক্তি ও মনোবল এর মাঝে সমন্বয় সাধন করে।</p>
<p>ইসলাম এবং বাস্তবতা অনুসারে, বিজ্ঞান বিশ্বাসের সাথে এবং ক্ষমতা সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তারা একে অপরের সাথে সেভাবে সমন্বিত, যেভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস ক্রিয়াকলাপ বা কার্যাবলির সাথে এবং নির্দেশনাসমূহ আইনের সাথে সমন্বিত। ইসলাম যে জীবনের কথা বলে তা মূলত এ সমন্বয়ের উপর ভিত্তি করে গঠিত।</p>
<p>মানবরচিত ব্যবস্থা কিছু মূল্যবোধ এবং বিষয়ের উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করে এবং অন্য বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে এটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এসব ব্যবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চেয়ে উদরপূর্তিকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যা মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। এ ব্যবস্থাগুলো বস্তুবাদী বিজ্ঞানকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়, কিন্তু বিশ্বাসের গুরুত্বকে উপেক্ষা করে। এ ব্যবস্থাগুলো যোগাযোগের সুবিধার প্রতি আগ্রহ দেখায়, কিন্তু জনগণের মধ্যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ গড়ে তোলার গুরুত্বকে উপেক্ষা করে।</p>
<p>আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ মানুষকে তার প্রয়োজনীয় সব কিছুই দেয়। এটি মানুষের শরীর, মন এবং আত্মার ভারসাম্য বিধান করে। এটি মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে যেমন গুরুত্ব প্রদান করে, তেমনি গুরুত্ব প্রদান করে একটি পরিবার এবং একটি সমাজের সদস্য হিসেবেও। এটি মানুষকে তার জীবনের বিভিন্ন ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি সম্বলিত আইনসমূহ সরবরাহ করে। এটি শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, শাসক এবং শাসিতদের সকল চাহিদা পূরণ করে। এটি শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, ধনী-দরিদ্র, আকাশচুম্বী ভবনে বসবাসকারী-গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে গুরুত্ব প্রদান করে।</p>
<p><a href="https://rkmri.co/Ayo3AM0NemMe/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Agami-diner-sovvota-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>ইসলামে বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের সমন্বয় :</strong></p>
<p>বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যকার সমন্বয় সুসমন্বিত ইসলামী ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। অন্যান্য ব্যবস্থায় এটি অনুপস্থিত, উপরন্তু অন্যান্য ব্যবস্থায় সর্বদা বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। ইসলামী ব্যবস্থায় বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানকে এমনভাবে সমন্বিত করা হয়েছে যে, উভয়েই সমান তালে দাঁড়িয়ে থাকে।</p>
<p>মধ্যযুগের ইউরোপ অবিচার এবং হাজার হাজার নিরীহ বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, পণ্ডিত ও তাদের সমর্থকদের উপর পরিচালিত রক্তাক্ত গণহত্যার ইতিহাসে পূর্ণ। ÒIslam and Christianity: Side by Side With Science and UrbanismÓ বইয়ে মুহাম্মদ আবদুহু এ রোমহর্ষক ঘটনাগুলোর কিছু বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আমাদের বোঝা উচিত, মুসলমান হওয়ার কারণে আমরা কতটা ভাগ্যবান, কারণ ইসলাম কখনোই বিজ্ঞান ও উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। যারা বলে যে, ইসলাম বিজ্ঞান ও উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টিকারী, তারা মূলত ইসলাম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ এবং তারা চায় ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো পরিণতি বরণ করুক।</p>
<p>আমরা বৈজ্ঞানিক উন্নতিকে (প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা মানুষের কাজকে সহজ করে তোলে এবং তার সময় ও শ্রম বাঁচায়) একজন মুসলমানের ইবাদত হিসেবেই মানি। বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে তার অংশগ্রহণ এবং উৎকর্ষ সাধন তাকে তার নামাজ-রোজার মতো করেই আল্লাহর নিকটবর্তী করে তোলে। বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ একটি সমষ্টিগত ইবাদত, যা অবশ্যই পালন করতে হবে। বেসামরিক ও সামরিক পর্যায়ে এটির দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য সমগ্র মুসলিম সমাজকেই দায়বদ্ধ থাকত হবে।</p>
<p>বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং চিন্তার প্রতি উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদা। ইসলাম মানুষকে জ্ঞানার্জনের জন্য আহ্বান জানায়, আল কোরআনের প্রথম সাতটি আয়াত যার সাক্ষ্য প্রদান করে। ইসলাম বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের প্রশংসা করে এবং পশ্চাদপদতা ও অজ্ঞতার নিরলস বিরোধিতা করে।</p>
<p>অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলাম কখনো এ ধরনের মিথ্যাচার করেনি যে, “আপনাকে প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে এবং তারপর জানতে হবে আপনি কী বিশ্বাস করেছেন! আপনাকে অবশ্যই অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে! এই না জেনে অনুসরণ করাই তাকওয়ার উৎস!” এসব বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিপরীতে বিশিষ্ট মুসলিম আলেমরা বলেছেন, “আল্লাহ সেসব বিশ্বাসীর আমল কবুল করবেন না, যারা না জেনে, না বুঝে অন্ধ আনুগত্য করে।” তারা বলেন, ওহীতে বিশ্বাসের মূল ভিত্তিই হলো আকল। আকল প্রমাণ করে যে, আল্লাহ আছেন এবং নবুয়তও সংঘটিত হয়েছে। নবুয়তের সীলমোহর এবং কোরআনের মুজিযাগুলোতে অবিশ্বাসীদেরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>“তাদেরকে বলে দাও, তোমাদের প্রমাণ আনো, যদি নিজেদের দাবির ব্যাপারে তোমরা সত্যবাদী হও।” (সূরা আল-বাকারা : ১১১)</p></blockquote>
<p>“আসলে তাদের বেশিরভাগ লোকই নিছক আন্দাজ-অনুমানের পেছনে চলছে। অথচ আন্দাজ-অনুমান দ্বারা সত্যের প্রয়োজন কিছুমাত্র মেটে না। তারা যা কিছু করছে তা আল্লাহ‌ ভালোভাবেই জানেন।” (সূরা ইউনুস : ৩৬)</p>
<p>মধ্যযুগের মানুষেরা পশ্চিমা গির্জাগুলোর প্রচারিত শিক্ষা এই মর্মে ধারণ করতো যে, আকল, যুক্তি, বিজ্ঞান, চিন্তা এবং আইন ওহী বা আসমানী কিতাব, ধর্ম, বিশ্বাস এবং প্রজ্ঞার চরম শত্রু। ইসলামে এই সমস্যা নেই, কারণ এটি আকল এবং ওহী উভয়টিকেই আল্লাহর কুদরতের দুটি চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করে। উভয়টিই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমজাতীয়, উপরন্তু ওহী আকলকে সমর্থন করে এবং মুসলমানদেরকে আকল বোঝা এবং আকলের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য আহ্বান জানায়। মুসলিম আলেমদের মতে, প্রকাশ্য (যাহের) এবং ব্যখ্যাযোগ্য (মুফাসসার) এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। যদি কেউ এর বিপরীত দাবি করে, তবে তা প্রকাশ্য এবং আকল সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির ব্যাপারে যথাসম্ভব চরম অবিচার এবং অপব্যাখ্যার ফলাফল।</p>
<p>এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো,</p>
<p>১. চৌদ্দ শতাব্দী আগে কোরআন নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময়ে অনেক মতাদর্শ এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোরআনের কোনো আয়াতকেই বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত করা সম্ভব হয়নি। এটি কোরআনের অশেষ মুজিযার প্রমাণ।</p>
<p>২. কোরআনকে যদিও শুধুমাত্র বিজ্ঞানের গ্রন্থ বলা হয় না, কিন্তু কোরআন প্রায় সময়ই এমন সব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়, যা কোরআন নাযিলের পূর্বে ভাবাই যেতো না বা কোরআন নাযিলের বহু শতাব্দী পরেও শোনা যায়নি। বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হিসেবে পরিচিত কোরআনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক বৈজ্ঞানিক বই লেখা হয়েছে, একে কেন্দ্র করে অনেক দেশে অনেক সভা-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মক্কার Muslim World League-এর সাথে সম্পৃক্ত একটি স্বতন্ত্র সংস্থা রয়েছে, যা শুধু এ বিষয়টি নিয়েই কাজ করে।</p>
<p>৩. কোরআনের শিক্ষা অবশ্যই সর্বোত্তম আখলাক ও উন্নত চরিত্র গঠনকারী। এ শিক্ষা মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা সৃষ্টি করে যা কুসংস্কার, অনুমান এবং লালসাকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি অন্ধ অনুকরণ এবং নির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী নয়, বরং এটি বৈজ্ঞানিক এবং পরীক্ষামূলক প্রমাণে বিশ্বাসী। এটি কোরআন, হাদীস এবং রাসূল (স.)-এর সীরাতে বিশ্বাসী। এটি বিশ্বাস করে যে মানুষের মন তার জন্য একটি নেয়ামত, যার মাধ্যমে সে সৃষ্টিজগতে যা কিছু আছে, তার সর্বোত্তম ব্যবহারের সর্বোত্তম উপায়গুলো প্রতিফলিত করতে পারে। এর মাধ্যমে সে ইতিহাসের ধারণারও বিকাশ ঘটাতে পারে এবং কীভাবে অতীতকে ব্যবহার করতে হয় তা শিখতে পারে, যে অতীত রবের হুকুমের অপরিবর্তনীয়তার সাক্ষ্য দেয়। নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে উল্লিখিত উপমাগুলো এ আহ্বানেরই পরিচায়ক।</p>
<p>“&#8230;যাদের বুদ্ধি ও বিবেক রয়েছে।” (সূরা আল-বাকারা : ১৬৪)</p>
<p>“&#8230;যারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (সূরা ইউনুস : ২৪)</p>
<p>“&#8230;তাদের জন্য, যাদের জ্ঞান আছে।” (সূরা আল-বাকারা : ২৩)</p>
<p>“&#8230;তাদের জন্য, যারা বোধসম্পন্ন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)</p>
<p>“তাদের জন্য যারা আকলসম্পন্ন।” (সূরা ত্বাহা : ৫৪)</p>
<p>৪. আল কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে আলেমদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-</p>
<p>“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা আয যুমার : ০৯)</p>
<p>“তুমি কি দেখো না আল্লাহ‌ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তারপর তার মাধ্যমে আমি নানা ধরনের বিচিত্র বর্ণের ফল বের করে আনি? পাহাড়ের মধ্যেও রয়েছে বিচিত্র বর্ণের সাদা, লাল ও নিকষকালো রেখা। আর এভাবে মানুষ, জীব-জনোয়ার ও গৃহপালিত জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের রয়েছে। আসল ব্যাপার হলো আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাঁকে ভয় করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ‌ পরাক্রমশালী এবং ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির : ২৮)</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ আকাশ, বৃক্ষ, জীবজন্তু এবং মানব জাতির পরেই আলেমদের কথা বলেছেন, যা নির্দেশ করে যে আলেমরাই তারা, যারা মহাজাগতিক এবং জীববৈজ্ঞানিক বিষয়াবলি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, গভীর জ্ঞান রাখে। তাদের জ্ঞানই তাদেরকে মহান আল্লাহর পরম শক্তি, দয়া, রহমত, ক্ষমা এবং জ্ঞান অনুভব করায়।</p>
<p>৫. নবী-রাসূলগণ এবং সৎকর্মশীলগণের সীরাত আমাদেরকে জ্ঞানের মূল্য এবং গুরুত্ব শিক্ষা দেয় যেন আমরা পৃথিবীতে মানুষকে আল্লাহর খলিফা হিসেবে তার দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো পূরণে সহায়তা করতে পারি। এ জ্ঞানের কারণেই হযরত আদম (আ.) ফেরেশতাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন, এ জ্ঞান হযরত ইউসুফ (আ.)-কে মিশরকে দুর্ভিক্ষের কবল থেকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছিলো, এ জ্ঞানের মাধ্যমে হযরত সোলায়মান (আ.) চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে নিয়ে এসেছিলেন, অন্যান্য নবী এবং বিশ্বাসীগণও এ জ্ঞানের মাধ্যমেই সফলতা লাভ করেছিলেন। এটিই জ্ঞানের উপযোগিতা। ইসলামী সভ্যতার সেরা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এসব মূল্যবোধ ও নীতির বাস্তব প্রয়োগের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিলো।</p>
<p>মুসলমানগণ অনুবাদেও ছিলেন সর্বোচ্চ অবস্থানে, ইতিহাস তাদের অনুবাদ প্রতিভার এ উৎকর্ষের সাক্ষী। তারা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সকলের আগেই এ উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। তারা বিজ্ঞান, গণিত, মেটাফিজিক্সসহ জ্ঞানের সকল শাখায় সংশোধন, বিস্তৃতকরণ, গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে জ্ঞান ভাণ্ডারের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। তারা বীজগণিতের মতো জ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র উদ্ভব করেছেন। তারা যৌক্তিক এবং পরীক্ষামূলক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে পশ্চিমারা তা গ্রহণ করে নেয় এবং আধুনিক পশ্চিমা রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণে তা ব্যবহার করে। নিরপেক্ষ মানসিকতার পশ্চিমারা এ ইতিহাসের সাক্ষী। নিঃসন্দেহে ইসলামী সভ্যতা বহু শতাব্দী ধরেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার পথিকৃৎ ছিলো, আর তখন ইউরোপ অজ্ঞতা, অনগ্রসরতা বা পশ্চাৎপদতায় আবৃত ছিলো। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুসলিম অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যেমন: বাগদাদ, কায়রো, দামেস্ক, কর্ডোভা, আন্দালুসিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ। সারা বিশ্বের ছাত্ররা সঠিক শিক্ষা গ্রহণ এবং নিজেদের দেশকে উন্নয়নের পদ্ধতি শেখার জন্য এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতো।</p>
<p>চিকিৎসা, ফার্মাকোলজি, জ্যোতিষশাস্ত্র, অপটিকস, রসায়ন, গণিত, ভূগোল এবং জ্ঞানের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রে ইসলামী তথ্যসূত্রগুলো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ছিলো। ইসলামী এবং আরব তথ্যসূত্রগুলো বহু শতাব্দী ধরেই চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রধান তথ্যসূত্র ছিলো। আল রাজীর “আল-হাওয়ি”, ইবনে সিনার “আল-কানুন”, ইবনে রুশদের “আল-কুলিয়াত”, আল জাহরাওয়ীর “আল-তাসরিফ লিমান আগাজ আন আল-তালিফ” এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলো ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানের রত্ন ভাণ্ডারের অংশ ছিলো। সে সময়ে মুসলিম পণ্ডিত বা আলেমরা ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতের তারকা; আল-খাওয়ারিজমি, আল-বেরুনি, ইবনে আল-হাইশাম, ইবনে নাফিস, ইবনে আল-বিত্তার এবং আরও অনেকেই যার উদাহরণ। মানবিকের ক্ষেত্রে আল-ফারাবি, আল-গাজ্জালী, ইবনে তোফায়েল, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে খালদুন এবং আরও অনেকেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।</p>
<p>তখন আরবী ছিলো বিশ্বের প্রধান ভাষা, কারণ এটি জ্ঞানের অনূদিত এবং মূল শাখা উভয়টিকেই মূলধারার ইসলামী সভ্যতার সাথে একীভূত করেছিলো। আরবী ভাষার এ ক্ষমতা ও নিপুণতা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং সমাদৃত হয়েছিলো।</p>
<p>মুসলমানদের এই দুর্দান্ত উত্থান সে সময় মুসলিম শহরগুলোর মসজিদ, স্কুল, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল এবং জীবনের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ছাপ রেখে গিয়েছিলো। এটি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনে একটি শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিলো, যে প্রভাব আল্লাহর সাথে তাদের অনন্য সম্পর্ক, তাদের নামাজ, রোজা, যাকাত, সাদকা এবং দাতব্য কাজগুলোতে ফুটে উঠেছিলো। গুস্তাভ লে বন মুসলমানদের এ স্বকীয়, মানবিক ও বিবেকপূর্ণ আচরণ, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও তাদের ভালো আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “আরবদের (মুসলমান) মতো এত বেশি ন্যায়পরায়ণ (আদিল) এবং দয়ালু বিজেতার উদাহরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে নেই।”</p>
<p>প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তার কাছে আত্মসমর্পণ, তার ইবাদত এবং তার স্মরণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো এ সভ্যতা। এ সভ্যতার মুসলমানগণ বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিলো একটি আদিল (ন্যায়ভিত্তিক) সভ্যতা, যেখানে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং যুদ্ধ একে অপরের সাথে মিলেমিশে ছিলো।</p>
<p><a href=" https://rkmri.co/3yyeyyNMEATM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Zubo-jiggasa-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>বিজ্ঞান এবং বিশ্বাস : অবিচ্ছেদ্য</strong></p>
<p>আমরা জ্ঞান এবং যুক্তির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাসী, তবে আমরা এটিও বিশ্বাস করি যে, শুধুমাত্র জ্ঞান এবং যুক্তি মানুষের সকল চাহিদাই পূরণ করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ জ্ঞান এবং যুক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলো আমাদের কিছু চাহিদা পূরণ করে, আবার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে না। নিজেদের ক্ষমতার বাইরের বিষয়গুলোর সামনে উভয়েই অসহায়। উভয়েই অস্তিত্ব, জীবন, মহাবিশ্ব, মৃত্যু এবং অন্যান্য সকল প্রাসঙ্গিক বিষয়ের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম নয়। উভয়ের ক্ষমতাই বস্তুবাদী এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। সুতরাং বোঝা যায়, জ্ঞানের অন্য একটি উৎস অবশ্যই থাকতে হবে যা মানুষকে তার দায়িত্ব-কর্তব্য, পৃথিবীতে তার ভূমিকা এবং সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত অন্তহীন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক্ষেত্রে ওহী-ই একমাত্র উৎস যা মানুষের সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদানের সক্ষমতা রাখে, আর বিশ্বাসই এটির মূল চাবিকাঠি। চিন্তাবিদরা জ্ঞান এবং যুক্তির মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের রহস্য সমাধানের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। উল্টো পরস্পরবিরোধী এবং অযৌক্তিক ফলাফলের কারণে তারা গভীর বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছেন। তাই কোরআনের অকাট্য আয়াত দ্বারা পরিচালিত বিশ্বাসই একমাত্র সমাধান।</p>
<p>ইসলামের মতে মানুষকে বিভ্রান্তকারী প্রধান সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা ঈমান বা বিশ্বাসের রয়েছে, যেমন, মানুষের অস্তিত্ব এবং তার মৃত্যু পরবর্তী অনন্তকালের জীবন। তাছাড়াও বিশ্বাস মানুষকে তার জীবনের অর্থ বুঝতে এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম করে তোলে। সেইসাথে জ্ঞান অর্জনের নামে সীমালঙ্ঘন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লাগাম টানতেও এ শক্তি ব্যবহৃত হয়। আমাদের কাছে এ নিয়ন্ত্রণের অনেক উদাহরণ রয়েছে। চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে নিয়ে আসার পর আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী হযরত সুলায়মান (আ.) বলেছিলেন,</p>
<p>“এ আমার রবের অনুগ্রহ, আমি শোকরগুযারী করি না নাশোকরী করি, তা তিনি পরীক্ষা করতে চান। আর যে ব্যক্তি শোকরগুযারী করে, তার শোকর তার নিজের জন্যই উপকারী। অন্যথায় কেউ অকৃতজ্ঞ হলে, আমার রব কারো ধার ধারেন না এবং আপন সত্তায় আপনি মহীয়ান।” (সূরা নামল : ৪০)</p>
<p>সুলায়মান যখন তার সামনে রানী বিলকিসের সিংহাসন পড়ে থাকতে দেখেন, তখন তিনি আনন্দ বা অহংকারে মত্ত হয়ে একটা মুহূর্তও নষ্ট করেননি, বরং আল্লাহর প্রশংসা করেন।</p>
<p>প্রাচীর নির্মাণ শেষে যুলকারনাইন (আ.) বিনীতভাবে বলেছিলেন,</p>
<p>“এ আমার রবের অনুগ্রহ। কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতির নির্দিষ্ট সময় আসবে, তখন তিনি একে ধূলিস্মাৎ করে দেবেন, আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।” (সূরা কাহফ: ৯৮)</p>
<p>যদি আমরা ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণালী দিনগুলোতে ফিরে যাই, তাহলে আমরা বিশ্বাসের দ্বারা পরিচালিত জ্ঞান কীভাবে গঠনমূলকভাবে মানুষের সেবা, উপকার এবং সুখে থাকার কাজে আসে তার অনেক উদাহরণ দেখতে পাবো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে আমরা পশ্চিমাদের উদাহরণগুলো খুঁজে নেই, যারা জ্ঞানকে কলুষিত করেছে, আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে, গণবিধ্বংসী অস্ত্র আবিষ্কার করে এটির অপব্যবহার করেছে, যা আমাদের জীবনকে একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্নে  পরিণত করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মুহসিনা বিনতে মুসলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15835</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পাশ্চাত্য চিন্তার ভিত্তি ও তার সমালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 27 Apr 2025 15:38:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15793</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিজের অস্তিত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছে। আর এ বিষয়টি মানুষের স্বভাবতাড়িত। সে অপর জনগোষ্ঠীর আচরণকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তবে এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় নিষ্কলুষ কিংবা নিষ্পাপ ছিলো না। যার কারণে এ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিজের অস্তিত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছে। আর এ বিষয়টি মানুষের স্বভাবতাড়িত। সে অপর জনগোষ্ঠীর আচরণকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তবে এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় নিষ্কলুষ কিংবা নিষ্পাপ ছিলো না। যার কারণে এ জানাশোনার সূত্রেই বিভিন্ন চিন্তার বিনির্মাণ ও উৎপত্তি ঘটেছে। চিন্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান দুনিয়া দুটি ভাগে বিভক্ত; আর তা হলো- প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য। তবে এই আলোচনায় মূল বিষয়বস্তু হলো <strong>‘</strong><strong>পাশ্চাত্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>তার</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>ভিত্তি</strong><strong>’</strong><strong>।</strong> আধুনিক যুগে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা হলো পাশ্চাত্য চিন্তাধারা। যা আমাদের অস্তিত্ব এবং চিন্তার মাঝে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, যার দরুন আমাদের দ্বীন, সমাজ-সংস্কৃতি এবং জীবনাদর্শের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে নড়বড় করে দিয়েছে। যা কেবল মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানবতার জন্য চরম অধঃপতন, জুলুম এবং শোষণের দিকে ধাবিত করছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা কিংবা ধর্মহীন যে পাশ্চাত্য তা নিয়ে আলোচনার শুরুতেই কয়েকটি প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির হয়। সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>পাশ্চাত্য বলতে আসলে কী বুঝায়?</li>
<li>পাশ্চাত্য চিন্তার অভিন্ন বা কমন বিষয়সমূহ কি কি?</li>
<li>পাশ্চাত্য চিন্তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ (Hypothesis)।</li>
</ul>
<p>যে সকল বিষয়সমূহের উপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য চিন্তা গড়ে উঠে-</p>
<ul>
<li>মানুষ হলো পরিত্যক্ত একটি সৃষ্টি, যা ইলাহী সমর্থন ও সাহায্য থেকে মাহরুম/বঞ্চিত।</li>
<li>মানুষকে একাকী ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তার কাজে হস্তক্ষেপ করার মতো কেউ নাই।</li>
<li>সকল কিছুই সময় তথা নির্দিষ্ট কিছু শর্তের আলোকে নির্ধারিত হয়ে থাকে।</li>
<li>সকল কিছুই মানুষ তৈরি করে, এমনকি দ্বীনও মানুষ তৈরি করে থাকে।</li>
<li>সকল কিছুই সম্ভব। যা কিছু মওজুদ (বিদ্যমান) আছে সকল কিছুই মুমকিন মওজুদ<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a> থেকে সৃষ্টি হয়।</li>
<li>মুমকিন মওজুদের বাইরে অন্য কোনো সৃষ্টি নেই।</li>
<li>মানুষ তার নিজের জন্য নিজেই যথেষ্ট।</li>
</ul>
<p>পাশ্চাত্য বলতে মূলত পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান ধর্মকে বুঝিয়ে থাকে। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ক্যাথলিক ধর্ম পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, পরবর্তীতে ১৭ শতাব্দীতে এসে (মার্টিন লুথার কিং এঁর মাধ্যমে) প্রটেস্ট্যান্টরা যুক্ত হয়। পাশ্চাত্যের একটি সংজ্ঞা আছে; তা হচ্ছে- we and the rest অর্থাৎ, আমরা এবং অন্যরা। এখানে “আমরা” বলতে বুঝায় মূলত পাশ্চাত্য বসবাসকারী খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে। তবে ল্যাটিন অ্যামেরিকা বা ব্রাজিল কিংবা উরুগুয়ের খ্রিস্টানরা পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত নয়; পাশাপাশি অর্থডক্স খ্রিস্টান অর্থাৎ রাশিয়ান খ্রিস্টানরাও পাশ্চাত্যের অর্ন্তভুক্ত নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্পেনের ক্যাথলিকরা পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত কিনা, সেটা নিয়েও তাঁদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যার ফলে পাশ্চাত্য চিন্তার প্রতিনিধিত্বকারী মূলত ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, হল্যান্ড এবং আংশিকভাবে ইতালির চিন্তাকে বুঝানো হয়ে থাকে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে এসে অ্যামেরিকা ও কানাডার চিন্তাও এর সাথে (we বা আমরা) যুক্ত হয়।</p>
<p>সপ্তদশ শতাব্দীর পরে এসে আধুনিক পাশ্চাত্য গঠিত হয়। আমাদের সামনে যে পাশ্চাত্য বিদ্যমান তা মূলত ষোড়শ শতাব্দী পরবর্তী পাশ্চাত্য। এ সময়ে ইউরোপে জ্ঞানের যে বিভিন্ন ধারা তৈরি হয়, সেটাই পরবর্তীতে সুগঠিত হয়ে নতুন পাশ্চাত্য গঠন করা হয়। আর সপ্তদশ শতাব্দীতে গঠিত পাশ্চাত্য যে মূলনীতিকে তার movement point হিসেবে গ্রহণ করে &#8211;</p>
<blockquote><p>من عرف نفسه فقد عرف ربه<strong>&#8211;</strong></p>
<p>অর্থাৎ, “যে নিজেকে চিনে সে তাঁর রবকেও চিনতে পারে।”</p></blockquote>
<p>কারণ, এ মূলনীতি ক্যাথলিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, যদি আমরা মানুষ ও প্রকৃতিকে জানতে পারি তাহলে স্রষ্টাকেও চিনতে পারবো। মারেফাতুল্লাহ (স্রষ্টাকে চিনা)-ই উপনীত হওয়ার জন্য ক্যাথলিক চার্চের প্রয়োজন নেই। মুসলমানদের মতো আমরাও প্রকৃতি এবং মানুষকে বিশ্লেষণ করে মারেফাতুল্লাহ-ই উপনীত হতে পারবো। আর এক্ষেত্রে সঠিক পন্থা হলো, মানব সত্ত্বা ও প্রকৃতিকে আকলের মাধ্যমে গবেষণা করা। আকলের মাধ্যমে গবেষণা করার বিষয়টা ক্যাথলিক চিন্তাধারায় ছিলো না। তাই ঐ সময়ের প্রভাবশালী চিন্তা ইসলামী সভ্যতার চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রভাবিত ছিলো। তাদের এ চিন্তা ঊনবিংশ শতাব্দী অর্থাৎ ২০০ বছর পর্যন্ত জারি ছিলো। পরবর্তীতে তারা এটাকে পরিত্যাগ করে।</p>
<p>আর এটা পরিবর্তন করার কারণ হলো- ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তারা একটি চিন্তায় পৌঁছায় সেটা হলো, আকলের মাধ্যমে রবকে জানা সম্ভব নয়। এখানে জ্ঞানের বিষয়বস্তু পরিবর্তন হয়ে যায় এবং মারেফাতুল্লাহকে জ্ঞানের বিষয় থেকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ষোড়শ শতাব্দী পরবর্তী সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য চিন্তায় মূল বিষয়সমূহ ছিলো-</p>
<ul>
<li>প্রাকৃতিক দ্বীন (Natural religion)</li>
<li>প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব (Natural theology)</li>
<li>প্রাকৃতিক আইন (Natural law)</li>
<li>তাবিয়াত দর্শন বা প্রাকৃতিক দর্শন (Natural philosophy)</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক দ্বীন হলো,</strong> মানুষের ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বীন। তারা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দ্বীনের অনুসন্ধান করতো। কারণ তাঁরা ক্যাথলিক চিন্তার মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি কিংবা তাঁদের চিন্তাকে সমাজে প্রভাবশালী করতে পারছিলো না। তারা যে পিছিয়ে ছিলো বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো, তা থেকে বের হওয়ার জন্য একটি প্রাকৃতিক দ্বীনের অনুসন্ধান করছিলো। পরবর্তীতে তারা পরিকল্পনা করে, যেহেতু এই দ্বীনের মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব নয় এবং এর মধ্য থেকে আমরা নতুন কিছু তৈরি করতে পারবো না, এজন্য আমাদের এমন একটা দ্বীন প্রয়োজন যেটা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা প্রাকৃতিক দ্বীন। ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যতা খোঁজার পেছনে অন্যতম কারণ হল, ইসলামী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব হলো,</strong> প্রকৃতির মধ্যকার বিধান নিয়ে গবেষণা করে তথা “আসার’ (পৃথিবীতে যা কিছু আছে বা সৃষ্টি) থেকে “মুয়াসসির” তথা স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সিফাতসমূহকে নির্ণয় করার প্রচেষ্টা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের খালক বা মহান সৃষ্টির মধ্যে যে বিধি-বিধান আছে সেটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। তারই প্রকৃতির মধ্যে যে বিধান দিয়ে দিয়েছেন সেটা গবেষণা করে আল্লাহর অস্তিত্ব এবং সিফাতসমুহকে নির্ণয় করা। এজন্য তারা একটি থিওলজি দাঁড় করায়। তবে সৃষ্টি যার আইন তার, এই বিধান অর্থে না। এমনকি নিউটনের ‘Principia mathematica physics’ বইয়ে এরকম একটা লাইন হুবহু আছে, “সৃষ্টিকে দেখে স্রষ্টাকে খুঁজে বের করা তথা ‘আসার’ দেখে ‘মুয়াসসির’কে খুঁজে বের করা।” এটা ছিলো তাদের ন্যাচারাল থিওলজি। নিউটনের এ বইটি ফিজিক্স, একই সাথে কালামের সাথে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব মূলত ইলমুল কালাম দ্বারা প্রভাবিত, বিশেষ করে ইবনে সিনার থিওরী/তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক আইন হলো,</strong> মানুষের প্রকৃতির মধ্যে মওজুদ (বিদ্যমান) এবং আকলের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব, এমন মূলনীতিসমূহকে খুঁজে বের করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিধানকে মওজুদিয়্যাত ও আকলের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া বিধানের উপর প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ যে ব্যবস্থাপনা হবে সেটা আকল কর্তৃক নির্ধারিত হবে এবং মানুষের প্রকৃতির মধ্যে যে সকল বিষয় আছে সে সকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। প্রত্যেকটা বিষয়েই তারা ব্যাপকভাবে ইসলামী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।</p>
<p>&#8211; <strong>ন্যাচারাল ফিলোসফি বা প্রাকৃতিক দর্শন হলো,</strong> এস্ট্রোনমি, ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি ও বায়োলজির মতো জ্ঞানসমূহ। ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলমানগণ এ সকল বিষয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিলো। পাশ্চাত্য চিন্তার গঠনগত পর্যায়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা ইসলামী চিন্তা থেকে অনেক বেশী প্রভাবিত এবং উপকৃত হয়েছে। এমনকি ইসলামী সভ্যতার অসংখ্য বই পাশ্চাত্য নিজেদের মতো ভাবার্থ করে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছে। সে সময়ের বইগুলোতে এক পাশে ইংরেজি আর অন্যপাশে আরবী, এভাবে অনুবাদ করা হতো।</p>
<p>যেমন &#8211; জন লক ও গ্রটিউস আরবী ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। <strong>Hugo Grotius </strong><strong>এর</strong><strong> On the law of War and Peace </strong><strong>গ্রন্থটি</strong> <strong>ইমাম</strong> <strong>সারাখসীর</strong> <strong>শারহু</strong> <strong>সিয়ারুল</strong> <strong>কাবির</strong> <strong>গ্রন্থের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>অনেক</strong> <strong>মিল</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>এই</strong> <strong>বই</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নকল</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong></p>
<p>তবে এক্ষেত্রে একটা বিষয়ে ঘাটতি আছে। সেটা হল- তারা এসব বিষয় আমাদের কাছ থেকে নিলেও, আমাদের কাছ থেকে যেটা গ্রহণ করেনি তা হলো- নবুয়ত। তারা যা কিছু নিয়েছে, সুন্নতকে একপাশ রেখে, বাইরে রেখে যেভাবে নেওয়া যায়; সেভাবে নিয়েছে। তাই, আমরা এখন তাদের কাছ থেকে যে চিন্তাই গ্রহণ করি না কেন, তা সুন্নতের বাইরে যায়, আমাদের সমাজ বা মন-মানসের সাথে মিলে না। যা আমাদের জন্য মোটেই উপযোগী নয়।</p>
<p>সপ্তাদশ শতাব্দীতে উসমানী খেলাফতের (শুধু উসমানী না, সাফাভী, মুঘল এবং উসমানী)  প্রভাবের কারণে তারা আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করে, মানুষ তার প্রতিষ্ঠিত দুনিয়াতে বসবাস করে। অর্থাৎ আমরা যে শহরে বাস করি সেটা আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমাদের তৈরি করা। এটাকে ইমাম মাওয়ার্দী বা ইসলামী সভ্যতার ভাষায় বলে العقل المكتسب বা মুকতাসাব আকল, যা এক অর্থে সমগ্র মানবতার আর্কাইভ [এখানে মানুষের সকল কিছু রয়েছে]। এটা তারা মুসলমানদের চিন্তাধারা থেকে জানতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইবনে</strong> <strong>খালদুনের</strong> <strong>শ্রেণিবিন্যাস</strong> <strong>অনুযায়ী</strong> <strong>মওজুদাতকে</strong> <strong>দুইভাগে</strong> <strong>বিভক্ত</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়</strong><strong> &#8211; </strong></p>
<ul>
<li>তাবিয়াত বা প্রকৃতি (যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই)।</li>
<li>সংস্কৃতি বা সভ্যতা বা উমরান অথবা কাসবি (যা মানুষের নিজের তৈরি)। এটাকে দুনিয়া বা দুনিয়ার জীবন বলা হয়ে থাকে।</li>
</ul>
<p>ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে &#8216;কাসব&#8217; পরিভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আমরা আমাদের অর্জিত বা কাসবী দুনিয়ায় বসবাস করি। এসব চিন্তা দ্বারা তারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।</p>
<p>সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে যখন তারা ক্যাথলিক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো, তাদের মধ্যে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল সেটা হলো- এ দুনিয়ায় মানুষের খুব বেশী কিছু করা সম্ভব নয়। এই দুনিয়া রুহুল কুদস বা পবিত্র আত্মা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আর এই পবিত্র আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে গির্জা বা গির্জা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুনিয়া। এখানে যা কিছু ঘটছে তা আমাদের চিন্তার বাইরে। ফলে মানুষের কিছু করার নেই বা মানুষ সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এটাই ছিলো তাদের প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু দুনিয়া, সভ্যতা বা সংস্কৃতি বিনির্মাণ করার ক্ষেত্রে ‘ইমারত’ সম্পূর্ণভাবে মানুষের উপর নির্ভরশীল৷ মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা দায়িত্বের অংশ হিসেবে কিংবা আখেরাতে সে যে পরিণতি পাবে, দুনিয়াতে ইমারতের দাবি হিসেবে আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন। “তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা পৃথিবীকে বিনির্মাণ করো।” বিনির্মাণের এই চিন্তা পরবর্তীতে ইলমুল উমরান হিসেবে আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো। এই মূলনীতির কারণে এর উপর ভিত্তি করে আমরা সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি।</p>
<p>কিন্তু, ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাদের চিন্তার মূল বিষয়সমূহ পরিবর্তন হয়ে যায়। এই সময়ে তাদের কিছু নতুন চিন্তা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>ইমানুয়েল কান্ট (Critique of pure reason নামক গ্রন্থে) এর মতে, মানুষ শুধুমাত্র তার আকল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে-ই জানতে পারে।</li>
<li>সংজ্ঞাগত কারণেই মানুষের পক্ষে তার আকল দ্বারা স্রষ্টাকে (ইনশা ও ইহাতা) বুঝতে পারা সম্ভব না। অর্থাৎ, রবকে আকলের মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়; মারেফাতুল্লাহ জ্ঞানের বিষয় নয়; এই বিষয়ে কান্ট সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন।</li>
<li>স্রষ্টা জ্ঞানের কোনো বিষয় নয়। অর্থাৎ, মারেফাতুল্লাহ সম্ভব নয়।</li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে কান্টের সিস্টেমের মধ্যে দ্বৈত একটি বিভাজন রয়েছে–</p>
<ul>
<li>Numen (নুমেন)- ইলাহী বিষয় এবং যা মানুষ জানতে পারবে না।</li>
<li>Phenomen- মানুষের মস্তিস্ক কর্তৃক তৈরিকৃত বিষয়কে জানতে পারবে; অর্থাৎ মানুষের মস্তিস্ক কর্তৃক তৈরিকৃত বিষয়কে জানতে পারবে। সকল ধরনের বিষয়কে মানুষ তৈরি করে; যেমন- পাথর, গাছপালা, সূর্য, মহাকাশ, নিহারিকা, খাবার-দাবার ইত্যাদি।</li>
</ul>
<p>কান্টের চিন্তাধারা Will and Representation (ইরাদা এবং তাসাউর) এবং ফরাসি বিপ্লব- সকল কিছুকে পরিবর্তন করে নতুন একটা বিশ্বব্যবস্থার পথে যাত্রা শুরু করে। এ বিষয়ের ক্ষেত্রে কান্টের পাশাপাশি ফরাসি বিপ্লবও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি বিপ্লবের মূল কথা হলো- <strong>মানুষ</strong> <strong>তার</strong> <strong>পছন্দনীয়</strong> <strong>ও</strong> <strong>ইচ্ছাকৃত</strong> <strong>ব্যবস্থাকে</strong> <strong>নিজের</strong> <strong>মতো</strong> <strong>প্রতিষ্ঠা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>; </strong><strong>একইসাথে</strong> <strong>তা</strong> <strong>ব্যক্তিগত</strong> <strong>ও</strong> <strong>সামাজিক</strong> <strong>ক্ষেত্রেও</strong><strong>।</strong> পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সব-ই মানুষ তৈরি করছে, একই সাথে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তাও মানুষ তৈরি করেছে। কান্টের চিন্তার ভিত্তি হলো, যে নিজেকে চিনতে পারবে, সে নিজেকে চিনতে পারবে। জগতে যা কিছু আছে, তা মানুষ তার নিজের আকলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাই রব এখানে Out of subject অর্থাৎ এ সকল কিছুর বাইরে। তারা আকলের মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা (خلق) পরিবর্তন করে দিলো। আরেকটা হলো امر (পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা &#8211; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিজামে আলাম)-কে পরিবর্তন করলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীতে আরেকটি চিন্তা ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে উঠে, তা হলো- <strong>কান্টের</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>অটনমি</strong> <strong>চিন্তা</strong><strong>।</strong></p>
<p>অটনমি শব্দটি এসেছে, nomos- অর্থ হলো বিধান। Autonomy অর্থ হলো, যে নিজের আইন নিজেই প্রণয়ন করতে পারে। সুতরাং আখলাকী অটনমি হলো, নিজের আখলাককে নিজেই তৈরি করার যোগ্যতা। অর্থাৎ মানুষ তার নিজের আখলাকী বিধানকে নিজেই প্রণয়ন করে। এই ক্ষেত্রে নিজের বিবেক-ই মূল। বিবেক সম্মতি দিলে সে যা ইচ্ছা করতে পারবে। ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে ভালো ও খারাপ নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে। এটাকে তিনি এই বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন- Volenti non fit injura, অর্থাৎ মানুষ তার নিজের ব্যাপারে নিজের ইচ্ছায় যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাকে জুলুম বলা যাবে না। এতে সে আত্মহত্যা বা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। তার সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানুষ তার নিজের উপর জুলুম করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে মানুষ তার নিজের সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাকে আখলাকী দিক থেকে ভুল বলে অভিহিত করা যাবে না।</p>
<p>কিন্তু কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষ নিজের উপর জুলুম করতে পারে, এবং তার নিজের সম্পর্কে অজ্ঞও হতে পারে। যার পরবর্তী ধাপ-ই হলো ইস্তিগনার চিন্তা অর্থাৎ মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করে। মানুষ যখনই তার নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করবে তখনই সে ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে।</p>
<blockquote><p>إن الإنسان ليطغى أن رآه استغنى</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অপর একটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়, রোমান্টিক তথা কল্পনাপ্রবণ আন্দোলন (Romantic Movement)। যার মূল কথা,</p>
<ul>
<li>মানুষ সকল কিছুকে তার নিজের মত বিনির্মাণ করতে পারে; আর এক্ষেত্রে কোন সীমারেখা নাই।</li>
<li>এ বিষয়ে হেগেলের একটি মৌলিক চিন্তা হলো, ‘স্রষ্টা আছে’। এখানে স্রষ্টা আছে এর অর্থ, মওজুদ আছে।</li>
</ul>
<p>আর যেহেতু মওজুদ (বিদ্যমান বিষয়) তাদের হাতে আছে, এজন্য আল্লাহ বা স্রষ্টার প্রয়োজন নাই। স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শুধু মওজুদের উপর ভিত্তি করে তারা সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। পরবর্তীতে হেগেল এই অন্টোলজির মাধ্যমে বা মওজুদিয়াতের উপর ভিত্তি করে সবকিছুকে দাঁড় করায়।</p>
<ul>
<li>স্রষ্টা নামক শব্দকে ব্যবহার না করেও “মওজুদ” নামক পরিভাষা উপর ভিত্তি করে সকল কিছুকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।</li>
<li>হেগেলের পরবর্তী সময়ে এমন একটি ধারণা প্রভাবশালী হয়ে উঠে, স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সমগ্র মওজুদাতকে বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা ও জ্ঞান উৎপাদন করা সম্ভব। [এরই মাধ্যমে হিস্টোরিক্যাল ম্যাটেরিয়ালিজমের বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের জন্ম হয়।]</li>
</ul>
<p>রোমান্টিক আন্দোলন (Romantic Movement)-এর অন্যতম একজন দার্শনিক শিলায়েমাখার (Schleiermacher) নামে একজন জার্মান দার্শনিক (মৃত্যুঃ ১৮৩৪ ) ছিলেন। যিনি একইসাথে একজন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ। তার মতে, মানুষ পরিপূর্ণভাবে তার রবকে ইহাতা বা পরিগ্রহ করতে পারবে না। তবে এর সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে মানুষ স্রষ্টা (মুতলাক বা absolute) সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে। পরবর্তীতে এই সকল অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে দ্বীনকে (ইনশা) বিনির্মাণ করতে পারে। এক্ষেত্রে এ দার্শনিক দু’টি বিষয় উল্লেখ করেন-</p>
<ul>
<li>অনুরূপভাবে স্রষ্টা সম্পর্কে তাসাউর (ধারণা), এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।</li>
<li>যেহেতু স্রষ্টাকে ইহাতা বা পরিগ্রহ করা যাবে না, এজন্য দ্বীনের ভিত্তি হলো ইর‍্যাশনাল বা অযৌক্তিক।</li>
</ul>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা মুসলমানদের দ্বীনকে হক্ব দ্বীন হিসেবে বিবেচনা করে না, কারণ এই দ্বীন আকলের সাথে অনেক বেশী সঙ্গতিপূর্ণ। যেহেতু এই দ্বীন আকল কর্তৃক গঠন করা সম্ভব। তাই এটা হক দ্বীন হতে পারে না। কারণ ইলাহ বা স্রষ্টাকে ইহাতা করা সম্ভব নয়। এজন্য সে পরবর্তীতে সেই মানুষ কর্তৃক একটি দ্বীন এবং ধর্মীয় ভাষা প্রবর্তিত হবে। শিলায়েমাখার এটাকে মানুষের তৈরি বলেন, যার ভিত্তি হলো যুক্তিহীন। এটা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এবং এ অভিজ্ঞতা যেহেতু একজন মানুষ করে, এটা কোন ভাষায় কীভাবে করেছে সেটা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না; একইসাথে এটাকে অবশ্যই যুক্তিহীন হতে হবে। এই সময় একটা বিষয় পরিলক্ষিত হয়, যে দ্বীন যত বেশি অযৌক্তিক হবে, সে দ্বীন তত বেশি হক দ্বীন বলে বিবেচিত হবে। যেমন- খ্রিস্টান ধর্মের যত অযৌক্তিক বিষয় আছে সকল অযৌক্তিক বিষয়কে সে এমন ভাবে সামনে নিয়ে আসছে যেন সেটাই একমাত্র হক্ব দ্বীন। এভাবে শিলায়েমাখার এর এই চিন্তার উপর ভিত্তি করে দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞানকে বিকশিত করা হয়।</p>
<p>এই শতাব্দীতে প্রভাবশালী আরেকটি বিষয় হলো, তারা ইসলামী জ্ঞান ও সভ্যতার দ্বারা উপকৃত হলেও নবুয়তকে গ্রহণ না করার কারণে ধীরে ধীরে নববী হিকমত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এতে তারা শুধু নিজেরাই নয় সমগ্র মানবতাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আধুনিক</strong> <strong>পাশ্চাত্যের</strong> <strong>মূলনীতিসমূহ</strong><strong>&#8211;</strong></p>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা বলতে শুধুমাত্র একটি বিষয় নয়; একইসাথে positivism, historicism, idealism, empiricism, rationalism, existentialism, constructivism, marxisim এই সবগুলো বিষয়ই পাশ্চাত্য চিন্তা। এ সকল বিষয়ের অভিন্ন বিষয়সমূহ আলোচনা করা যাক! এই সকল চিন্তাধারার অভিন্ন কিছু দিক রয়েছে।</p>
<ul>
<li><strong>প্রথম</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong><strong> (</strong><strong>স্রষ্টার</strong> <strong>পক্ষ</strong> <strong>থেকে</strong><strong>) </strong><strong>পরিত্যক্ত</strong> <strong>একটি</strong> <strong>জীব</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে পরিত্যাগের বিষয়টি দুইভাবে হতে পারে- একটি <strong>আধ্যাত্মিক</strong> এবং অপরটি <strong>জাগতিক</strong> দৃষ্টিকোণ থেকে। এখানে পরিত্যক্ত বিষয়টা হচ্ছে passive তথা নিষ্ক্রিয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; যাতে কর্তা নির্দিষ্ট না। তবে খ্রিস্টান ধর্ম অনুযায়ী মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক পরিত্যক্ত। খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীদের মতে, স্রষ্টা মানুষকে পরিত্যাগ করেছে। <em>জন</em> <em>পল</em> <em>সার্ত্রে</em> বলেন, মানুষকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই সে নিজের মত করে জীবন গঠন করতে বাধ্য অর্থাৎ সে আকলের ওপর নির্ভরশীল।</p>
<p>তবে খ্রিস্টান থিওলজিস্টদের মতে,</p>
<ul>
<li>মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক পরিত্যক্ত একটি জীব।</li>
<li>মানুষের একার পক্ষে তার আমল দ্বারা মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। Original sin বা আদিপাপের কারণে আধ্যাত্মিক বা জাগতিকভাবে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। এই জন্য স্বয়ং স্রষ্টাকে এসে এই অরিজিনাল সিন বা আদি পাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করার প্রয়োজন।</li>
<li>এক্ষেত্রে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুলুম, তারা একজন পয়গম্বরকে স্রষ্টা বানিয়েছে আবার ইলাহকে তার মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ত্রিত্ববাদ তথা পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।</li>
</ul>
<p>আবার, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর সময়কালে ডেইস্টরা (যারা নবুয়তকে অস্বীকার করে) বলে থাকে যে, আল্লাহ (স্রষ্টা) দুনিয়াকে সৃষ্টি করেছেন এবং এটাকে পরিচালনা করছেন। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ মানুষকে জাগতিক ভাবে পরিত্যাগ করেননি, একই ভাবে আধ্যাত্মিকভাবেও পরিত্যাগ করেননি। তিনি মানুষকে আকল দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে তারা জাগতিক বা ফিজিক্যাল দুনিয়াকে এবং মানুষের আধ্যাত্মিক জগতকে বিশ্লেষণ করে স্রষ্টা সন্তুষ্ট হবেন এমন একটি জীবন ধারা তৈরি করতে পারবে। এটা ইসলামী সভ্যতার প্রভাবে করলেও তারা এটা কখনো স্বীকার না করার কারণে মনে হত, তারা আকলের মাধ্যমে এটাকে খুঁজে পেয়েছে।</p>
<p>[তবে, এখানে মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহ যদি আধ্যাত্মিক বা জাগতিকভাবে পরিত্যাগ করেন তাহলে কি মানুষের টিকে থাকা সম্ভব? মোটেও সম্ভব না। বরং মহান আল্লাহ মানুষকে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রত্যেক যুগে যুগে নবী প্রেরণ করেছেন। শুধু তাই নয়, হযরত পয়গম্বর (স) এর মাধ্যমে বিশ্বজনীন সুন্নত তথা আল্লাহর রাসূলের ওফাত বা মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর সুন্নত বা সুন্নতের মাধ্যমে তিনি সবসময় আমাদের সাথে আছেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুন্নত ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ জাগতিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে পরিত্যাগ করেছেন এ কথাটা মোটেও ইসলামী চিন্তাধারার আলোকে সঠিক নয়। আমরা যদি পয়গম্বরদের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে পড়ি তাহলে আমরা বুঝতে পারবো এটা একটা বানোয়াট চিন্তাধারা। তবে উনবিংশ শতাব্দীর পরে এরকম কোন চিন্তা আর পরিলক্ষিত হয়নি।]</p>
<ul>
<li><strong>তাদের</strong> <strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষকে</strong> <strong>একাকী</strong> <strong>ছেড়ে</strong> <strong>দেয়া</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>যেমন ফিটশের মতে, কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হচ্ছে, সেই কাজ করার সক্ষমতা। আর সক্ষম হলে সেটা গ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়।মানুষকে যেহেতু একাকী ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাই তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।</p>
<p>লাগামহীন ভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তাঁদের সীমারেখা কে নির্ধারণ করবে? মানুষের সীমারেখা নির্ধারণ করবে অন্যরা। মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে তাহলে এই সমঝোতা সকল কিছুর মূলভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে। মূলত থমাস হবস, জন লক এবং জ্ জ্যাক রুশোর সোসাল কনট্রাক্টের ভিত্তি মাধ্যমেই এই মূলনীতির উৎপত্তি।</p>
<p>তাদের মতে, মানুষের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত-ই সঠিক। এ ক্ষেত্রে মুতলাক হাকীকত বা প্রকৃত সত্য বলতে কোনো বিষয় নেই। কারণ তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন, উদাহরণস্বরূপ সমকামিতা এবং মদকে বৈধকরণের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করতে পারি। [এ সকল কিছু তাদের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সঠিক। আজকে এটা সঠিক, কালকে এটা ভুলও হতে পারে। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধ্রুব সত্য বলতে কিছু নেই।] তাই তাদের নীতি &#8211; by the people, of the people, for the people. সার্বভৌমত্ব জনগণের, কথাটার উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এভাবেই তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার উৎপত্তি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ফলশ্রুতিতে আল্লাহ কিংবা কোন শক্তির সামনে তারা কোনো ধরণের জবাবদিহিতা করতে বাধ্য নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>পাশ্চাত্যের</strong> <strong>তৃতীয়</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>সময়</strong><strong>।</strong> <strong>সকল</strong> <strong>কিছুই</strong> <strong>সময়</strong> <strong>কর্তৃক</strong> <strong>নির্ধারিত</strong><strong>।</strong> এই ক্ষেত্রে কোরআনের এই আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য &#8211;</li>
</ul>
<blockquote><p>وَ قَالُوْا مَا هِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنْیَا نَمُوْتُ و نَحْیَا وَ مَا یُهْلِكُنَاۤ اِلَّا الدَّهْرُ-</p>
<p>অর্থাৎ, আমাদেরকে কোনো কিছুই ধ্বংস বা বিনাশ করতে পারবে না একমাত্র দাহর বা সময় ছাড়া।</p></blockquote>
<p>এখানে সময় বা যামান হলো, প্রদত্ত অবস্থা ও শর্তসমূহ। ফলশ্রুতিতে সত্য হলো, শর্তভিত্তিক বা অবস্থাভিত্তিক। অবস্থা ও শর্তের দাবী যা, সেটাই সঠিক। ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। মূলত Historicism তথা ঐতিহাসিকতাবাদ এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।</p>
<p>সময়ের সাথে এবং শর্তের সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি বিষয় হলো, মানুষের চাওয়া এবং দাবি। তাদের মতে, এটাও সঠিক। যেহেতু এটা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। যাকে নিহিলিজম (Nihilism) বলা হয়ে থাকে।</p>
<p>নিহিলিজম হলো- Universal law of ethics বা বিশ্বজনীন আখলাকী বিধান বলতে কিছু নেই। মূলত মানুষ তার চিন্তার আলোকে সকল কিছুর অর্থবহতা দান করে। অর্থাৎ বিশ্বজনীন কিছু নেই, যা আছে তা টার্ম (শর্ত) এবং কন্ডিশনের (অবস্থা) আলোকে পরিবর্তিত হতে পারে।</p>
<p>[হক এবং সঠিক এর মধ্যে পার্থক্য কী? হক হচ্ছে অপরিবর্তনীয়, ধ্রুব এবং কনস্ট্যান্ট। আর হকের পারিভাষিক অর্থ হলো, সকল অবস্থায় এবং সকল পরিবেশে যা সঠিক। তাদের মতে সঠিক হলো, টার্মস (শর্ত) এবং কন্ডিশন (অবস্থা)। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মতে, মানুষের আকল যখন যে অবস্থায় থাকুক না কেনো, যেভাবে চিন্তা করুক না কেনো যে সময় এবং শর্ত যাই থাকুক না কেনো, সর্বাবস্থায় যা চিরন্তন বলে দাবি করে সেটা হক এবং হাকিকত। যা হক এবং সঠিকের মাঝে মৌলিক পার্থক্য।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>চতুর্থ</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>দ্বীন</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>তৈরি</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>শিলায়েমাখেরের মতে, মানুষ মুতলাককে ইহাতা করতে পারবে না। আর ক্ষেত্রে তিনি কান্টের চিন্তার সাথে সমন্বয় করে বিকশিত করেছেন।</p>
<p>তার মতে মানুষ মহাজগত ও প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করতে করতে এমন এক পর্যায়ে এসে উপনীত হয়, যেখানে সে সৃষ্টির সীমারেখাকে খুঁজে পায়। এটা আকলের সর্বোচ্চ চূড়া। আকল তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সে এমন এক সীমানায় এসে উপনীত হয় যেটা সে অতিক্রম করতে পারে না। এই অবস্থায় সে মুতলাকের মুখোমুখি হয়, আর যখন যে এই মুতলাকের অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন তার জীবনধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তবে মুতলাককে আকলের মাধ্যমে ইহাতা করে, পাশাপাশি তাকে বুঝে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না সে কারণে শুধুমাত্র সে নিজে সেই অভিজ্ঞতাকে লাভ করে৷ সেই বিষয়কেও ভাষায় প্রকার করার মত কোন ভাষা না থাকায় সে সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন একটি ভাষাকে তৈরি করে।</p>
<p>আর এটাকে দ্বীনি অভিজ্ঞতা (Religious Experience) এবং দ্বীনি ভাষা (Religious Language) বলা হয় । এটা মানুষের তৈরি, যা সে গবেষণা করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে আকল আর ইহাতা করতে পারে না। সে যা অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং সেটা মানুষের মাঝে প্রকাশ করে। যেহেতু এটা সে মানুষের সামনে তাদের ভাষায় তুলে ধরতে পারবে না, সে এটাকে অযৌক্তিকভাবে তুলে ধরবে।</p>
<p>আর এই সকল অভিজ্ঞতা ও ভাষা মানুষ কর্তৃক বর্ণিত হওয়ায় সেখান থেকে দ্বীন তৈরি হয়।ফলে দ্বীন হলো মানুষের তৈরি।</p>
<p>তাদের মতে, সবচেয়ে হাকীকী দ্বীন হলো এমন দ্বীন যেটা আকল কর্তৃক সাব্যস্ত নয়। যে দ্বীন আকল থেকে যতবেশী দূরে, সেটা ততবেশী হক। এই জন্য খ্রিস্টান ধর্ম হল হাকিকি দ্বীন।</p>
<p>তাদের এই চিন্তা মতে, বাতিল দ্বীন হলো, যে দ্বীনের সাথে আকলের কোনো সমস্যা নেই; অর্থাৎ, ইসলাম। এজন্য পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরা ইসলামকে মুতলাকের সাথে সম্পর্কিত দ্বীন হিসেবে দেখে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>পঞ্চম</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>সকল</strong> <strong>কিছুই</strong> <strong>সম্ভব</strong><strong>।</strong> এটাকে তারা Contingency বলে থাকে।</li>
</ul>
<p>Contingency এর অর্থ হলো, বর্তমানে যা কিছু মওজুদ (বিদ্যমান) আছে, সেগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে জীবন ধারাকে পরিচালনা করা। আমাদের কালামী ধারায় যে শ্রেণীবিন্যাস তথা <strong>ওয়াজিবুল</strong> <strong>উজুদ</strong> ও <strong>মুমকিনুল</strong> <strong>উজুদ</strong> আছে। <strong>ওয়াজিবুল</strong> <strong>উজুদ</strong> হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি হওয়া আমরা কল্পনা করতে পারি না। আর আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে সবকিছু <strong>মুমকিনুল</strong> <strong>উজুদ</strong>। তারা ওয়াজিবুল উজুদকে অস্বীকার করে। তাদের মতে গ্রহনযোগ্য হলো, মুমকিনুল উজুদ। যেমন &#8211; ঢাকা, আগে ছিলো না, এখন আছে। এর অর্থ এটার অস্তিত্ব বা উজুদ সম্ভবপর। যেমন &#8211; সংখ্যা, যা মানুষের যিহিনে থাকে। যদি যিহিন না থাকে, তাহলেও সংখ্যা হবে। সুতরাং যিহিনও মুমকিনুল উজুদ।</p>
<p>তাদের মতে, ওয়াজিবুল উজুদ<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a> আমাদেরকে মেটাফিজিক্সের দিকে ধাবিত করবে। তাই আমরা এই মওজুদকে পরিত্যাগ করেছি। এটা পাশ্চাত্য চিন্তার মৌলিক একটি বিষয়। ওয়াজিবুল উজুদ ইলাহী জ্ঞান হওয়ার কারণে এর প্রয়োজন নেই। পাশ্চাত্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেটাফিজিক্স পড়ানো হয় না।</p>
<p>তাদের মতে, ওয়াজিবুল উজুদ বা যারুরী, এটা মানতিকের (চিন্তা) সাথে সম্পর্কিত একটি ক্যাটাগরি, উজুদের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়। যা চিন্তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়। এর উপর ভিত্তি করে কোনো জ্ঞান দাঁড় করানো যাবে না। এজন্য তারা এটা গ্রহণ করে না। যেগুলো উজুদের সাথে সম্পর্কিত, অস্তিত্বের (ম্যাটেরিয়ালস্টিক) সাথে সম্পর্কিত সেগুলোর সাথে যারুরিয়্যাত বা আবশ্যিকতাকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। যেমন &#8211; ঢাকা আগে ছিলো না, এখন আছে।</p>
<p>কোনো কিছুর যারুরিয়্যাত আমরা শুধুমাত্র চিন্তা করতে পারি। অন্যথায় যেগুলো মওজুদ আছে, সেগুলার সাথে যারুরিয়্যাতকে সম্পৃক্ত করা যাবে না।</p>
<p>ফলে যা কিছু বাস্তবে আছে, সেগুলা থেকে নতুন নতুন জিনিশ তৈরি করা। আমাদের দুনিয়াতে মুমকিন উজুদ বা সম্ভাব্য সৃষ্টিগুলো সেগুলোকে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করে একটি জীবন ধারা পরিচালিত করতে পারি।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে আমাদের জন্য স্থায়ী অপরিবর্তনীয় কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। যাকে দার্শনিক ভাষায় বলা হয় post truth (হাকীকত পরবর্তী অবস্থা)। ফলে অপরিবর্তনীয় বা সাবিত বলতে কোনো মূলনীতিকে তারা গ্রহণ করে না।</p>
<p>[কন্টেনজেন্সি আজকে আছে, কালকে নাও থাকতে পারে। এই যে বিভিন্ন নতুন নতুন আবিষ্কার, সকল বিষয়ে পরিবর্তনশীলতা এবং এর উপর ভিত্তি করে যা ইচ্ছা তা করতে পারা; এ চিন্তা থেকে তারা আমাদের যে পতনের দিকে ধাবিত করছে, মানুষ বলতে যে জিনস, ইনসান বলতে যে প্রজাতি এই পৃথিবীতে আছে, তা মুমকিন উজুদ বা সম্ভাব্য সৃষ্টি৷ অর্থাৎ, মানুষ না থাকলেও কোনো সমস্যা নাই। তারা রোবটিক টেকনোলজির মাধ্যমে অথবা বায়োলজিকাল টেকনলোজির মাধ্যমে নারী-পুরুষ বা জিনস থাকবে না, এ ধরনের বা আরও উন্নত সৃষ্টি তৈরি করতে পারে। তাদের এখানে কন্টেনজেন্সি মূল বিষয়।</p>
<p>যে সভ্যতা পৃথিবী থেকে আশরাফুল মাখলুকাতের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে চায়; তাঁরাই মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু। যা তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রমাণিত। তারা মানুষকে হোমো-সেপিয়েন্স বা একটি প্রজাতি হিসেবে দেখে। যেমন – মানুষ বানর থেকে বিবর্তিত হয়েছে। মানুষ হলো বিবর্তনের সর্বোচ্চ চূড়া। তার নিচের সকল সৃষ্টি সেকেন্ডারি বা গৌণ সৃষ্টি। যা থাকা বা না থাকায় কিছু যায় আসে না। তাদের মতে, মানুষের চেয়ে উন্নত সৃষ্টি তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষের অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই। এই পৃথিবীতে মানুষ টিকে থাকবে কিনা এ দায়িত্ব মুসলমানদের। আমাদের আন্দোলন মানুষ রক্ষার আন্দোলন। মানুষ রক্ষা হলে ঈমান রক্ষা হবে। এই কারণে এটা বলা যায় যে পাশ্চাত্য সভ্যতা সমগ্র মানবতার শত্রু। কেননা সে মানুষকে তার অবস্থা থেকে সরানোর জন্য সকল প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>ষষ্ঠ</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong> <strong>নিজে</strong> <strong>নিজেই</strong> <strong>স্বয়ংসম্পূর্ণ</strong><strong>।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>মুসতাগনি</strong><strong>।</strong> সূরা আলাক্ব-এ বলা হয়েছে &#8211;</li>
</ul>
<blockquote><p>كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ-  أَن رَّآهُ اسْتَغْنَىٰ-</p></blockquote>
<p>মানুষ নিজেকে যখন মুসতাগনি হিসেবে দেখে, তখন সে তুগইয়ান তথা ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। সীমানাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। যখন এই অবস্থায় উপনীত হয় তখন কি হয়? ইন্না ইলা রাব্বিকা রুজয়া। মানুষ যখন নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে তখন সে ফাসাদ সৃষ্টি করে বা সীমালঙ্ঘন করে। তাই মানুষকে এই চিন্তা থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আগেই মুক্তির উপায় দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, রবের কাছে ফিরে আসতে হবে যেহেতু সীমালঙ্ঘন করেছে।</p>
<ul>
<li>মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন যেহেতু সে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারবে না। এই জন্য তাকে তার রবের কাছে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে।</li>
<li>মানুষ কেন মুসতাগনি নয়? মানুষ মানুষের মুখাপেক্ষী, প্রকৃতির মুখাপেক্ষী, একই ভাবে পয়গম্বর ও আল্লাহর প্রতিও মুখাপেক্ষী। যা আমাদের ভ্রাতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা মুসতাগনি নই। তখন নিজে মুসতাগনির চিন্তায় নিপতিত হবো না।</li>
<li>ইবাদত আমাদের ইহসানের এর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই ক্ষেত্রে যে উবুদিয়্যাত এটা হল মূলত মানুষ যে অমুখাপেক্ষী নয় এটার সর্বোচ্চ চূড়া এবং প্রতিটি ইবাদত বার বার আমাদেরকে এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমি মুসতাগনি নই।</li>
</ul>
<p>এর উপর ভিত্তি করে রিসালাত, আমানত এবং শাহাদাতের মিসাক এ বিষয়গুলোকে পরিপূর্ণভাবে পড়তে পারলে মুসতাগনি বা স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তাধারা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।</p>
<p><strong>আর</strong> <strong>সকল</strong> <strong>পরিবর্তন</strong> <strong>এবং</strong> <strong>পরিবর্ধনের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>একটা</strong> <strong>বিষয়</strong><strong>ই</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>রক্ষা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>;</strong> <strong>তা</strong> <strong>হলো</strong> <strong>ইসলাম</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>মূল্যবোধ</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ ও সংকলনঃ </strong><a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> এই পরিভাষাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ইবনে সিনা। মহান আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টিজগতের সকল কিছুকে বুঝানোর জন্য এই পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> ওয়াজিবুল উজুদ ইসলামী দর্শন ও কালামে বহুল পরিচিত একটি পরিভাষা। এই পরিভাষার উদ্ভাবন করেন ইবনে সিনা। কালাম ও ইসলামী দর্শনে ওয়াজিবুল উজুদ বলতে আল্লাহ রাবুল আলামিনকে বুঝানো হয়ে থাকে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15793</post-id>	</item>
		<item>
		<title>লিবারেলিজম ও লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 15 Apr 2025 14:56:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15761</guid>

					<description><![CDATA[মানবতাকে দীর্ঘ বারোশত বছর আদালত ও মারহামাতের সুশীতল ছায়া দানকারী এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধনকারী ইসলামী সভ্যতার পতনের পরে মানবতাকে জাহেলিয়াত ও জুলুমের নিগূঢ় আধাঁরে নিপতিতকারী বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার যে আধুনিক শোষণ চলছে, এ শোষণকে বুঝার জন্য লিবারেলিজম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানবতাকে দীর্ঘ বারোশত বছর আদালত ও মারহামাতের সুশীতল ছায়া দানকারী এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধনকারী ইসলামী সভ্যতার পতনের পরে মানবতাকে জাহেলিয়াত ও জুলুমের নিগূঢ় আধাঁরে নিপতিতকারী বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার যে আধুনিক শোষণ চলছে, এ শোষণকে বুঝার জন্য লিবারেলিজম কী, লিবারেলিস্টদের ওয়াদা কী, তারা বিশ্বকে মূলত কী দিতে চায়, তাদের তাকলীফ তথা প্রস্তাবনা কী- এ বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝা জরুরী। লিবারেলিজম বিগত প্রায় তিন শতাব্দীব্যাপী প্রভাবশালী ও বিজয়ী একটি চিন্তা। আমরা বর্তমানে কেমন দুনিয়ায় বসবাস করছি, এ দুনিয়ায় কোন কোন চিন্তাধারা প্রভাবশালী, তা যদি আমরা বুঝতে না পারি, তাহলে আমাদের পক্ষে ইসলামের আহ্বান, ইসলামের আদালত, ইসলাম কর্তৃক মানুষকে দেওয়া মর্যাদার বিষয়গুলোকে অন্য কোনো চিন্তার বিপরীতে যৌক্তিক ও বিজয়ী হিসেবে হাজির করা সম্ভব হবে না। লিবারেলিজমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই এ মুহূর্তে আমাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো বর্তমানের এ জাহেলিয়াতকে ভালোভাবে জানা ও বুঝা। হযরত উমর (রা.) এর ভাষায়- &#8220;যে জাহেলিয়াতকে ভালোভাবে চিনতে পারেনি, জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি, তার পক্ষে ইসলামকে খুব ভালোভাবে জানা সম্ভব নয়।&#8221; লিবারেলিজম এবং এর চিন্তাধারা পৃথিবীতে একটি প্রগতিশীল চিন্তাধারা হিসেবে পরিচিত। এ আলোচনার পূর্বে প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে প্রগতিবাদ সম্পর্কে আলোকপাত জরুরী। সাধারণত প্রগতিবাদের দুটি ধারণা পাওয়া যায়:</p>
<p>১. সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও</p>
<p>২. লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ।</p>
<p>কোনো চিন্তাধারার স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো তা আগামীর পৃথিবীকে কী দিতে চায়, মানুষকে কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়, তা তুলে ধরতে পারা: অন্যথায় তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিটি চিন্তাধারার একটি ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন থাকা বাঞ্ছনীয়। যেমন- বর্তমান বস্তুবাদী World View বা বিশ্বদর্শনের একটি ধারণা হলো, যত দিন যাচ্ছে, পৃথিবী তত সুন্দর এবং কল্যাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একইভাবে আমাদের মুসলমানদের একটি শ্রেণির ইতিহাসের ব্যপারে ধারণা হলো যত দিন যাচ্ছে, মানুষ তত খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো এ দুটির একটি ইফরাত, অন্যটি তাফরিত। কারণ সত্যিকারার্থে মানবজাতির ইতিহাসের প্রকৃতি শুধুমাত্র উর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী নয়, বরং তা চক্রাকার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ ব্যপারে বলেন,</p>
<p><strong>&#8220;আমি মানুষের মধ্যে খারাপ দিন এবং ভালো দিনগুলোকে চক্রাকারে আবর্তন করি।&#8221;</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের ইতিহাস দর্শনের দিকে লক্ষ্য করলে আমাদের ইতিহাসের প্রকৃতিতে অনেকটা এ রকমই দেখতে পাবো, কখনো তা উর্ধ্বমুখী, কখনো নিম্নমুখী, আবার কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে উর্ধ্বমুখী হয়েছে, আবার নিম্নমুখী হয়েছে। অর্থাৎ তা একটি আবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এটিই সবচেয়ে যৌক্তিক ইতিহাস দর্শন। ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন থাকার ধারাবাহিকতায় সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদেরও আলাদা আলাদা ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন রয়েছে এবং তারা পৃথিবীকে তাদের ভবিষ্যৎ দর্শনের দিকেই ধাবিত করতে চায়। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ উভয়েই প্রগতি (Progress) চায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো তাদের প্রগতির (Progress) সর্বশেষ পর্যায় কী, তারা কোথায় গিয়ে থামতে চায়? সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদের ক্ষেত্রে প্রগতির সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো শ্রেণি বৈষম্য, অর্থাৎ বুর্জোয়া ও প্রলিটারিয়েতদের মধ্যকার সংঘাত। আর তাদের প্রগতির শেষ পর্যায় হলো শ্রেণিহীন একটি সমাজ বা Classless Society তৈরি, যে সমাজে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো সম্পদ থাকবে না, সবাই সমান থাকবে এবং ধর্মের কোনো স্থান থাকবে না। বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রের যে ধরণ, তাদের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের ধরণ তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের আকাঙ্ক্ষিত সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, পরিবারের সাথে পরিবারের সম্পর্কসহ এ ধরনের বিষয়গুলো নতুন করে বিন্যস্ত হবে। কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিকের মতে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবারের অস্তিত্বই থাকবে না। তারা তাদের এ চিন্তাধারাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, বলকান এবং আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই, তাদের কৃত ওয়াদা এবং তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।</p>
<p>এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের &#8220;অ্যানিমেল ফার্ম&#8221; (Animal Farm), যেখানে সুস্পষ্টভাবে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদের ইতিহাস পড়লেই বুঝা যায়, এটি ছিল মূলত একটি ইউটোপিয়া, যার সাথে মানুষের ফিতরাত ও মানব ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই সাথে এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল একটি আন্দোলন, যে আন্দোলন মানুষের শক্তিকে পুঁজি করে, পুঁজিবাদের প্রতি মানুষের আক্রোশকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল একটি ব্যর্থ বিপ্লব, যা কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির বেশি, কিন্তু শুধুমাত্র সোভিয়েত রাশিয়ার ৭০ বছরের আমলে মারা গেছেন ৬ কোটিরও বেশি মানুষ। একটি বিপ্লব বা একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী পরিমাণ মানুষকে খুন করা হয়েছে! এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পরেই তাদের উপলব্ধিতে এসেছে যে, তাদের এ তথাকথিত মতবাদ প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এবং এ মতবাদ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যদিও বিভিন্ন আদলে তাদের আন্দোলন এখনো জারি আছে, কিন্তু তার অনুভূতি যতদিন যৌবনের তেজ থাকে, শক্তি-সামর্থ থাকে, ততদিনই জারি থাকে, তারপর তারা কেউ ব্যবসা করে, কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঢোকে, তারপর তারা লিবারেলিস্ট হয়ে যায়। এটিই তাদের ইউটোপিয়া। এ ধরণের ইউটোপিয়া লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদের প্রস্তাবিত ভবিষ্যত দর্শনেও পরিলক্ষিত।</p>
<p>সমাজতান্ত্রিক এবং লিবারেলিস্টদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হলো সমাজতান্ত্রিকরা বিপ্লবকে (Revolution) প্রাধান্য দিয়ে থাকে, অন্যদিকে লিবারেলিস্টরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক পরিবর্তন, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন, আইনের পরিবর্তন, সংস্কৃতির পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মৌলিক এ পার্থক্যের দিক থেকে লক্ষ্য করলে উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই ব্রিটেনের কথা উল্লেখ করা যায়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের একটি হলো ব্রিটেন, যে রাষ্ট্র আমূল পরিবর্তনের (Radical change) মাধ্যমে স্থিতিশীলতা লাভ করেছে। ব্রিটেনে সে অর্থে কোনো রক্তাক্ত বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। অনন্য শক্তিধর দেশ জাপানও কোনো রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে সমাজ পরিবর্তনের পন্থা হিসেবে রক্তাক্ত বিপ্লবকে বেছে নেওয়া অন্যতম প্রধান রাষ্ট্র হলো ফ্রান্স। ফ্রান্স আজও স্থিতিশীল হতে পারেনি, আজও হরতালে অগ্নি সংযোগে প্যারিসের রাজপথ পুড়ে যায়। নেপোলিয়নের ফ্রান্সে বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিমাণ মানুষ মারা গিয়েছে, তা অকল্পনীয়। আর তাদের এ বিপ্লবের কারণ হলো যে কোনো মূল্যে প্রভাব বিস্তার। সমাজের একটি অংশ যখন তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করবে এবং যখন তারা শক্তির অধিকারী হবে, তখন সমাজের বাকি অংশ যদি তাদের পক্ষে না আসে বা তাদের মতাদর্শের আলোকে কাজ করতে না পারে, তাহলে তারা যে কোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করবে। তারা হয় তাদের হত্যা করবে, না হয় নির্বাসনে পাঠাবে। এটিই তাদের বিপ্লবের মূল কথা।</p>
<p>একইভাবে লিবারেলিস্টদের চিন্তাধারায় বিপ্লবের পরিবর্তে বিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তাঁদের মূলনীতি হলো Revolution নয় Evolution। অর্থাৎ তারা মানুষকে ধাপে ধাপে পরিবর্তন, পরিবর্ধন এমনকি রূপান্তরের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যায়। লিবারেলিজমের আলোকে সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো শিক্ষা, মিডিয়া, আইন এবং অন্যান্য উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ। যার কারণে আমরা তাদের পন্থা সহজে বুঝতে পারি না। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, <strong>সমাজতান্ত্রিকরা সরাসরি মাথায় আঘাত করে</strong><strong>, </strong><strong>আর লিবারেলিস্টরা এনেস্থিসিয়া দিয়ে অচেতন করে ধীরে ধীরে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে যায়</strong><strong>, </strong><strong>অথচ আমরা টেরও পাই না।</strong> <strong>কিন্তু উভয়টিরই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো মানুষকে শোষণ করা এবং মানুষের উপর আধিপত্য কায়েম করা।</strong></p>
<p>এ সমাজতান্ত্রিক এবং লিবারেলিস্টদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যও রয়েছে, তা হলো উভয়েই নিজেদের চিন্তাধারাকে বৈজ্ঞানিক বলে দাবি করে এবং তারা দাবি করে যে তারা ডগম্যাটিক নয়। তাদের অন্যতম একটি চিন্তাধারা হলো ইউরোপের একজন নিউটনের পূর্বে বিজ্ঞান ছিল না, সবই ছিল থিওলজি বা হিকমা। যেহেতু তারা তার পরবর্তী যুগে বসবাস করছে, তাই তাদের জন্য প্রযোজ্য হলো; বৈজ্ঞানিক নয়, এমন বিষয়গুলোকে ধর্তব্যে না নেওয়া। তারা তাদের নিজ নিজ চিন্তাধারাকে বৈজ্ঞানিক দাবি করার কারণ হলো তারা মনে করে তাদের চিন্তাধারাকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে, এছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পন্থা নেই। আর তা বাস্তবায়িত হলে দুনিয়া একটি সুন্দর দুনিয়া হবে এবং এর ফলে দুনিয়া সমৃদ্ধির সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তারপর আর কোনো ধরনের অনুসন্ধানের প্রয়োজন হবে না। তখন ইতিহাসও তার লক্ষ্যে উপনীত হবে। তারপর তাদের মধ্যে কেউ কেউ &#8220;The End of History&#8221; বই রচনা করবে! অতঃপর তাদের সজ্জিত দুনিয়ায় সকলকে বসবাস করতে হবে।</p>
<p>আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে বলা যায়, সমাজতান্ত্রিক ও লিবারেলিস্টদের দর্শনকে বৈজ্ঞানিক বলার মূল কারণ হলো তাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা। মুসলমানরা আখিরাতের প্রতি যেমন দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তাদের চিন্তাধারার প্রতি তাদের বিশ্বাসও অনুরূপ। অর্থাৎ যে বিষয়টি বৈজ্ঞানিক, সেটিই একমাত্র সত্য। গোটা বিশ্বকেও এ সত্য মেনে নিতে হবে, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, অন্যথায় পরিণতি হবে করুণ। তাদের মতে, তাদের এ প্রগতির সামনে যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে যে কোনো মূল্যে, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সরিয়ে দিতে হবে, এ দুনিয়াতে বসবাস করার কোনো অধিকার তার নেই। সোভিয়েত রাশিয়া এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। তৎকালীন সময়ে যারা পুঁজিবাদ এবং বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী ছিল, তাদেরকে হত্যা করা হতো বা নির্বাসনে পাঠানো হতো। বর্তমানে বলকান, ককেশাস এবং সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তার মূল কারণও এটিই। তাদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সামনে যারাই দাঁড়াবে, যারাই তাদের ভিশনের বিরোধী, তারা একইসাথে উন্নতি, অগ্রগতি এবং প্রগতির বিরোধী, আর এজন্য তাদের যে কোনো মূল্যে নিঃশেষ করতে হবে। লিবারেলিজম নিয়ে আলোচনার সর্বাগ্রে লিবারেলিজমের সংজ্ঞা নিয়ে আলোকপাত জরুরী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এন্ড্রো হেইউড (Andrew Heywood) তার &#8220;Politics&#8221; নামক গ্রন্থে লিবারেলিজমের মূল ধারণা (key-idea) হিসেবে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>১. Individualism.</li>
<li>২. Freedom.</li>
<li>৩. Reason.</li>
<li>৪. Equality.</li>
<li>৫. Toleration.</li>
<li>৬. Consent.</li>
<li>৭. Constitutionalism.</li>
</ul>
<p>এখানে তারা reason এর ক্ষেত্রে progress বা প্রগতিকে এবং equality এর ক্ষেত্রে meritocracy কে প্রাধান্য দিয়েছে। Consent এর ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, চুক্তির ভিত্তিতে সমতা থাকতে হবে। সাদা চোখে এ ধরনের বই পড়লে কেউ লিবারেলিজমের বিরোধিতা করবে না, কিন্তু এর পেছনের দর্শন জানলে যে কেউ আশ্চর্য হয়ে যাবে। তারা আমাদের সবাইকে প্রতারিত করে, পূর্বে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এনেস্থিসিয়া দিয়ে অচেতন করে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হচ্ছে, অথচ আমরা টেরই পাচ্ছি না। কিন্তু যখন এনেস্থিসিয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে, তখন আমরা দেখছি আমাদের কারো চোখ নেই, কারো হাত নেই, কারো পা নেই! এহেন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় হলো আমাদের ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হবে যে, তারা কীভাবে আমাদের প্রতারিত করছে। আর এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জানতে হবে লিবারেলিজম কী, লিবারেলিস্টরা কেমন স্বপ্ন নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছিল এবং তাদের মূল ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন কী। মূলত লিবারেলিস্টদের ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন হলো তারা দুনিয়াকে জান্নাতে পরিণত করবে। কিন্তু তারা কেমন জান্নাতের স্বপ্ন দেখে? লিবারেলিজমের পেছনে কার্যকরী সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। মূলত ব্রিটিশ সম্প্রসারণবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক যে বিকাশ, এ চিন্তার পেছনের মূল চিন্তা হলো লিবারেলিজম। অর্থাৎ ব্রিটিশ পুঁজিবাদের সম্প্রসারণই হলো লিবারেলিজমের মূল লক্ষ্য।</p>
<p>লিবারেলিস্ট অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার &#8220;The End of History and The Last Man&#8221; বইয়ের মূল কথা হলো- &#8220;অর্থনীতির ক্ষেত্রে লিবারেলিজম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেসি। এ দুটি ছাড়া মানুষের আর কোনো গন্তব্য নেই। আর এ গন্তব্যে পৌঁছানোর মানে হলো আর কোনো কিছু অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই।&#8221;</p>
<p>Bernard Mandeville এর বিখ্যাত বই &#8220;The Fable of the Bees&#8221;, তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এ বইয়ে তিনি আখলাক এবং অর্থনীতিকে পরস্পর থেকে আলাদা করছেন। তবে এ আখলাক হলো খ্রিস্টান ধর্মের আখলাক। তার মতে অর্থনীতির মূলভিত্তি হলো সুদভিত্তিক পুঁজিবাদ। এ বইটি মূলত একটি উপন্যাস, যেখানে মৌমাছিদের ঠিকভাবে কাজ না করা, অলস বসে থাকার পেছনে ধর্মীয় (খ্রিস্টান ধর্ম) বৈরাগ্যবাদকে তুলে ধরা হয়েছে। যখন দ্বীন থেকে আখলাককে সরিয়ে নেওয়া হলো, তখন মৌমাছিদের উৎপাদন ব্যপকভাবে বেড়ে যায় এবং তারা সমৃদ্ধি লাভ করে। মৌমাছিরা ঠিকভাবে কাজ না করার কারণ হলো বৈরাগ্যবাদ, আর এ বৈরাগ্যবাদ খ্রিস্টানদের রূহানিয়াত। ম্যান্ডেভিলের ভাষ্যে, &#8220;যদি আমরা উন্নতি এবং অগ্রগতি চাই, তাহলে আমাদের আখলাক ও দ্বীন থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যথায় আমরা উন্নতি করতে পারবো না।&#8221; এ বইয়ের উপর ভিত্তি করে অর্থনীতির জনক হিসেবে পরিচিত এডাম স্মিথ তার &#8220;The Wealth of Nations&#8221; বই লিখেন, যে বইকে অর্থনীতির বাইবেল বলা হয়। এ বই আখলাক এবং অর্থনীতিকে আলাদা করাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। পরবর্তীতে এ বইয়ের উপর ভিত্তি করেই মার্কেন্টালিজম বা ব্রিটেনের অর্থনীতি দাঁড়ায়। এখানেই লিবারেলিস্ট অর্থনীতির বীজ গ্রোথিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উপরোক্ত বিষয়গুলোকে ভালোভাবে না বুঝলে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ বণিক সভ্যতাকে, বর্তমান অর্থনীতির মূল ভিত্তিকে বুঝা সম্ভব নয়। আমরা ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে কথা বলি, ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কথা বলি, কিন্তু আমরা জানি না যে টাকার সংজ্ঞা কী! মার্কেন্টালিজম বুঝা ছাড়া কারো পক্ষে বর্তমান অর্থনীতি নিয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। অর্থনীতি এবং আখলাকের মধ্যকার বিভাজনকে না বুঝে কারো পক্ষে অর্থনীতি নিয়ে কল্যাণমূলক কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদীদের বিখ্যাত ঐতিহাসিক বাকল (Henry Thomas Buckle) বলেন, &#8220;যারা মেধাবী ও গতিশীল, তাদের আখলাককে নয়, বরং মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ মেধা অগ্রসর হয়, শানিত হয়, কিন্তু আখলাক এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা, যার জন্য যা ইচ্ছা তাই করা যায় না।&#8221; অর্থাৎ, তাদের মতে তাদের প্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দ্বীন ও আখলাক। এক্ষেত্রে এ দ্বীন ও আখলাক হলো খ্রিস্টান ধর্ম ও খ্রিস্টানদের আখলাক। একইভাবে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো অধ্যয়ন করি, তখন দেখতে পাই, দ্বীন ও আখলাক বাদ দিয়ে এমন এক ধরনের অর্থনৈতিক দর্শন ও সমাজদর্শন দাঁড় করানো হচ্ছে, যার সাথে আমাদের সমাজের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন আমরা তাদের বর্জনকৃত দ্বীন ও আখলাকের সাথে আমাদের দ্বীন (ইসলাম) ও আখলাককে মিলিয়ে ফেলছি?</p>
<p>আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, &#8220;আমরা দুনিয়া ও আবিরাত উভয় জগতে কণ্যান চাই&#8221; এবং আল্লাহ বলেন, &#8216;দুনিয়ায় তোমাকে যে অংশ দেওয়া হয়েছে, সেটি তুমি ভুলে যেও না। আমাদের মূল সমস্যা হলো আমরা স্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক নিত্তপণ করতে পারছি না, সমন্বয় করতে পারছি না। সমন্বয় করতে না পারার মূল কারণ হলো দ্বীনের ব্যাপারে প্রান্তিক ধারণা। ইসলামে দ্বীন ও দুনিয়ার স্বরূপ তেমন তা সঠিকভাবে না জানার কারণে কেউ শুধু দ্বীনের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে, আবার কেউ শুধু দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। অথচ দুটোই ইসলামের আদালতকে খারিজ করে দিচ্ছে। এ বিষয়টি আমাদের বুঝা প্রয়োজন, সেই সাথে আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে যে, বর্তমান ব্যবস্থায় দ্বীন বলতে যে খ্রিস্টানদের ধর্ম এবং আখলাক বলতে যে খ্রিস্টানদের আখলাককে বুঝানো হয়, এর সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ এবং লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ উভয়টিই দ্বীন ও আখলাককে প্রধান শত্রু মনে করে, এক্ষেত্রে তারা এক। তাদের পার্থক্য হলো মালিকানা নিয়ে ধারণার ক্ষেত্রে। লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ মালিকানা রক্ষার চেষ্টা করে, আর সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ মালিকানা উৎখাতের চেষ্টা করে, অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানা বলতে কিছু থাকবে না।</p>
<p>বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষ সম্পদের মালিক নয়, মালিক হলো এরিস্ট্রোক্রেটরা। স্পেন ছাড়া সমগ্র ইউরোপে দশ হাজার এরিস্ট্রোক্রেট আছে, যাদেরকে Land Lord বলা হয়। মূলত তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য প্রণিত ব্যবস্থাই হলো লিবারেলিজম। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনের কথা বলা যায়, ব্রিটেনের অর্থনীতি ভূমি মালিকানার সাথে সম্পর্কিত। যেমন- ব্রিটেনের পার্লামেন্টে দুইটি হাউজ রয়েছে, হাউজ অব কমন্স এবং হাউজ অব লর্ডস। হাউজ অব কমন্সের সদস্য সংখ্যা ৬৫০ জন এবং হাউজ অব লর্ডসের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০০ জন। প্রকাশ্যে হাউজ অব কমন্স এর বির্তক প্রচারিত হয়, কিন্তু কোনো নীতিই হাউজ অব কমন্সে পাস হয় না। অর্থাৎ এটি একটি কমিটি ছাড়া কিছুই নয়। সেই সাথে হাউজ অব কমন্সে যারা নির্বাচিত হয়, তাদেরকে এরিস্ট্রোক্রেটরা প্রোপাগান্ডার জন্য টাকা, ঘুষ প্রদান করে। অন্যদিকে আমেরিকার ধর্ম হলো Civil Religion। এই Civil Religion-ই তাদের প্রথম মূলনীতি। তাদের দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, ব্যক্তিগত সম্পদে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না। মূলত এরিস্ট্রোক্রেটদের মালিকানা সু-সংহত করবে, তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করবে এ ধরনের পদ্ধতিই লিবারেলিজম।</p>
<p>এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় দার্শনিক, লিবারেলিজম চিন্তাধারার বড় অগ্রপথিক জন লক এর বিখ্যাত বাণী, <strong>&#8220;</strong><strong>প্রথম মালিকানা কীভাবে অর্জিত হলো তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই</strong><strong>, </strong><strong>মালিকানা অর্জিত হওয়ার পর তা রক্ষা করাই হলো মূল বিষয়।&#8221;</strong> এ অনুসারে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বাংলা অঞ্চলসহ গোটা পৃথিবী থেকে যত কিছু লুট করে নিয়ে সংরক্ষণে রাখা হয়েছে, এগুলোর জন্য কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে তারা রাজি নয়, বরং তাদের চিন্তার বিষয় হলো কীভাবে এসব সম্পদ তারা রক্ষা করবে। আমাদের দেশে যদি কেউ ব্যাংকে মোটা অংকের টাকা জমা দিতে যায়, প্রশাসন প্রথমেই তারা টাকার উৎস অনুসন্ধান করবে। অন্যদিকে আমেরিকাতে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে দুই ট্রিলিয়নের বেশি টাকা পাচার হয়। টাকা পাচারকারীদের জান্নাত হলো আমেরিকা এবং কানাডা। অথচ এসব দেশে এ টাকার উৎস নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থাই নেই। একইভাবে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জন লক বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>রাষ্ট্র হলো মালিকানা রক্ষা করার জন্য গঠিত একটি ব্যবস্থা। মালিকানা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্র মানুষকে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারে।&#8221;</strong></p>
<p>ব্রিটেন এরিস্ট্রোক্রেটদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যেখানে তারাই সম্পদের মালিক। সম্পদের মালিকানা রক্ষায় তাদের নীতি হলো &#8220;যে মালিকানার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।&#8221; অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো এরিস্ট্রোকেটদের ভূমির মালিকানা রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। মার্কস তার &#8220;Das Capital&#8221; বইয়ে তৎকালীন লন্ডনের অবস্থা তুলে ধরেছেন। এ বইয়ে তিনি শ্রমিকদের উপর কৃত অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। লন্ডনের ফ্যাক্টরিগুলোতে বিভিন্ন শর্তের আলোকে মানুষকে কাজ করানো হতো। সে শর্তগুলো এতটাই কঠিন ছিল যে, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যুবকরা তাদের যৌবনের উৎসাহ, উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলতো, শিশুরা হারিয়ে ফেলতো শৈশবের কোমলতা। তার এ বই মূলত ক্যাপিটালজমের নির্মম জুলুম-নির্যাতনের বর্ণনা, যেখানে তিনি লন্ডনকে এ জুলুম-নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে, এ জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছিলো এরিস্ট্রোক্রেটরা। তাদের সম্পদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, অন্যদিকে প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণি দিন দিন দরিদ্র হচ্ছিলো, নির্যাতিত, নিপিড়ীত হচ্ছিলো।</p>
<p>তারা তাদের শিল্পের বিকাশের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশকে শেষ করে দিয়েছে, বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন অঞ্চলকে শোষণ করেছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, সে সময়ে জন লক, জন স্টুয়ার্ট মিল, থমাস ম্যালথাস-সহ বড় বড় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীদের ভূমিকা কী ছিল? তিক্ত হলেও সত্য, তারা জুলুমকে গ্রহণযোগ্য বানানোর জন্য এবং সমগ্র পৃথিবীতে একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার জন্য তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। যেমন- জন লকের তত্ত্ব। এর উদাহরণ আমরা এডাম স্মিথের পুঁজি সম্পর্কিত বইগুলোতেও দেখতে পাই। তার মতে প্রাকৃতিক সম্পদ বা নগদ টাকা পুঁজি নয়, পুঁজি হলো শ্রম। তাদের চিন্তাধারা, ব্যবস্থাকে সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই মূলত তারা এ ধরনের তত্ত্ব আবিষ্কার করতো। সামগ্রিকভাবে তাদের লক্ষ্য ছিল মালিকানার উপর ভিত্তি করে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যে ব্যবস্থা মালিকানা বৃদ্ধি করবে, ধনীদেরকে আরও ধনী বানাবে। সেই সাথে অন্য মানুষের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তারা তৈরি করবে, যেটি বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করবে।</p>
<p>সে সময়ে এত বিস্তৃত অর্থে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস শিল্পায়নের সাথে জড়িত। শোষিতরা যেন তাদের ফ্যাক্টরিতে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতে পারে, সেই মানে তাদেরকে উন্নীত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। এটিই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ইতিহাস। আর তালের ব্যবস্থার অধীনে মানুষকে কাজ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে নিয়ে আসা হয় ব্যক্তিস্বার্থকে। মানুষের মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তুমি যদি কাজ করো, তাহলে তুমি ধনী হতে পারবে, যাকে বলা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। এখানে আখলাক এবং দ্বীনের কোনো স্থান নেই। ডেভিড হিউম বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>যদি আমরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই</strong><strong>, </strong><strong>তবে তাদেরকে ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ধাবিত করতে হবে। কেননা ব্যক্তিস্বার্থ এমন একটি বিষয়</strong><strong>, </strong><strong>যা তাকে ব্যবস্থা (</strong><strong>System) </strong><strong>থেকেই অর্জন করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যার কারণে তাকে অবশ্যই ব্যবস্থার অধীনে আসতে হবে।&#8221;</strong> ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ছুঁটে চলা মানুষের চিন্তায় থাকে সে কীভাবে কর্পোরেট, ব্যবস্থার (System) একজন ভালো শ্রমিক হবে। ব্যক্তিস্বার্থকে ব্যবহার করে মানুষকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি আমরা ফেরাউনের শাসনব্যবস্থায়ও দেখতে পাই। ফেরাউন তার জাতির উপর সবচেয়ে বেশি জুলুম করতো, তাদেরকে নিগৃহীত করতো, নিপীড়িত করতো, অসম্মানিত করতো, তবুও তারা ফেরাউনের আনুগত্য করতো, কারণ তারা ছিল ফাসেক জাতি। আর ফাসেক হলো তারা, যারা আল্লাহ এবং রাসূলের (স.) চেয়ে, আল্লাহর জন্য সংগ্রামের চেয়ে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ, সম্পদ, পরিবারকে বেশি গুরুত্ব বা প্রাধান্য দেয়। এমনকি কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ছুটে বেড়ায়, শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন গঠন করে, তাহলে সে সারাদিন আল্লাহকে স্মরণ করলেও, নামাজ পড়লেও সে ফাসেক জাতিরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আর এটি করতে পারলেই তারা সফল। এ লক্ষ্যেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সকল ব্যবস্থা তাদের চিন্তার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। একজন মুসলমানের উচিত এ ব্যপারে সজাগ থাকা। কারণ যে ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে না ছুটে মানুষের কল্যাণের পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর এ বিষয়টি আল্লামা ইকবাল তার &#8220;আসরারে খুদী ও রমুজে বেখুদী&#8221;তে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। এজন্য আমাদের খুদীকে বিকশিত করতে হবে, ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করতে হবে। একইসাথে এর মাধ্যমে যেন সমাজের মানুষ উপকৃত হয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়, তারা যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্রীড়নকে পরিণত না হয়, সে আলোকে কাজ করা আমাদের আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। শুধুমাত্র অর্থের পেছনে ছুটে বেড়ালে আমাদের জীবন হবে লাঞ্চিত, নিপীড়িত।</p>
<p>দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম একজন শেয়ার হোল্ডার। তিনি নিজেও একজন লর্ড ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, By the natural growth of civilization, power passes individual to masses. And the worth and importances of an individual as compared with the mass sink into grater and grater insignificance! অর্থাৎ, &#8220;সভ্যতার ক্রমবিকাশের যে প্রাকৃতিক গতিধারা, তা ক্ষমতাকে ব্যক্তির হাত থেকে একটি গোষ্ঠীর হাতে নিয়ে যায় (এখানে গোষ্ঠী বলতে সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি) এবং যখন ব্যক্তির মূল্য বা গুরুত্বকে এ গোষ্ঠীর সাথে তুলনা করা হয়, তখন ব্যক্তি মূল্যহীন হয়ে পড়ে।&#8221; ব্যক্তি যদি মূল্যহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সে কাজ করবে কেন? মূলত এটিই হলো লিবারেলিজম। তাদের ভাষ্যে, &#8220;সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে গোষ্ঠীসমূহের শক্তি আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। এখানে মূল বিষয় হলো বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ, এখানে ব্যক্তির ভূমিকা অর্থহীন। এখানে ব্যক্তি উৎপাদনের একটি উপাদান মাত্র।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যে শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে মানুষ বসবাস করবে এবং এ শিক্ষাব্যবস্থাকে অবশ্যই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি উপ-শাখা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।&#8221;</strong> অর্থাৎ তারা মনে-প্রাণে এটিই বিশ্বাস করাবে যে, আমাদের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে হয় ইউরোপ, না হয় আমেরিকা। মূলত এসব কারণেই আমাদের ফিকহ ভিত্তি হারিয়েছে, মুসলমানরা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে, মাদরাসাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে, তার স্থলে বর্তমান ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেছে। তারা শুধুমাত্র এ শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, সেই সাথে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে যে, এর চেয়ে ভালো কোনো ব্যবস্থা হয় না। আর তাদের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তাদের দুটি পন্থা রয়েছে-</p>
<p>১. অর্থনৈতিক শক্তি।</p>
<p>২. মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।</p>
<p>পূর্বে লিবারেলিস্টদের অর্থনৈতিক শক্তি আলোচিত হয়েছে। এবারের আলোচ্য বিষয় তাদের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি। মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তৎকালীন সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উপন্যাস (যেমন- ড্যানিয়েল ডিফোর &#8220;রবিনসন ক্রুসো&#8221;), আর বর্তমানে সিনেমা। অর্থনীতি আর মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা বুঝানোর চেষ্টা করে যে, এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতে পারে না। তারা বলে, তারা প্রতিটি ব্যক্তিকে শক্তিশালী বানায়, তাকে Freedom বা মুক্তি নেয়, Reason বা মুক্তচিন্তা দেয়, Equality বা সমতা দেয়, Toleration বা ধৈর্য্য শেখায়, Consent বা একতা শেখায়, Constitutionalism শেখায়। আদতে তারা শক্তিশালী করার নামে মানুষকে নফসের দাস হিসেবে গড়ে তুলে, মানুষের নফসের চাহিদা, আবেগ, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাকেই মানুষের স্বপ্নে পরিণত করে, এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যতটুকু স্বাধীনতা দরকার, ততটুকু স্বাধীনতার ব্যবস্থাই তারা করে। মূলত পুঁজিবাদ কোনো পণ্য বানানোর পূর্বে তার ক্রেতা বানায়। তাদের প্রদত্ত স্বাধীনতা হলো মানুষের জৈবিক চাহিদা বা নফসের চাহিদা পূরণ করার স্বাধীনতা, সেই সাথে যতদিন কেউ পুঁজিবাদের সেবা করবে, ততদিন সে স্বাধীন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো &#8216;American Dream&#8217;।</p>
<p>American Dream হলো একজন সঙ্গী, একটি কুকুর, দুইটি সন্তান, খাবার ভর্তি একটি ফ্রিজ, একটি ভালো গাড়ি। আর এটি কিন্তু বর্তমানে Dream of the World, যুব সমাজের স্বপ্ন! ইসলাম মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। কিন্তু একইসাথে ইসলাম মানুষকে শেখায় মানুষের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে শুধুমাত্র কয়েকটি বৈষয়িক বিষয়ের মধ্যে নামিয়ে আনা মানবতার প্রতি অপমান, কারণ মানুষ হলো খলিফাতুল্লাহ। এজন্য আমাদের জীবনে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। কাদেসিয়ার যুদ্ধের আগে পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের সামনে রিবঈ (রা.) এর ভাষণ এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন, <strong>&#8220;আল্লাহ আমাদরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর গোলাম বানানোর জন্য, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে আখিরাতের বিশালতার দিকে ধাবিত করার জন্য। আমরা বিভিন্ন ধর্ম কর্তৃক সৃষ্ট মানুষের গোলামী থেকে মানুষকে মুক্ত করে ইসলামের আদালতের দিকে নিয়ে যেতে চাই।&#8221;</strong> অথচ আমরা গোলামী করি কোম্পানির! আমাদের জীবনের স্বপ্ন একটা কোম্পানির কর্পোরেট অফিসার হওয়া। আমরা আমাদের জীবনকে American Dream এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি, অথচ আমাদের জন্য সমগ্র পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, সমগ্র মহাকাশ, মহাজগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে! আমরা যদি শুধুমাত্র আমাদের জীবনকে, জীবনের লক্ষ্যকে কয়েকটি বস্তুগত চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখি, সেটি হবে আমাদের নিজেদের প্রতিই অপমান। কারণ, আমরা হিবাতুল্লাহ (আল্লাহর দেওয়া উপহার)। আমাদের ভেতরে আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া রূহ রয়েছে। এজন্য আমাদের সর্বপ্রথম আমাদের মানবিক মর্যাদা বা খুদীকে আবিষ্কার করতে হবে।</p>
<p>লিবারেলিজমের দর্শনকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, লিবারেলিজম নামে যা দেখানো হয়, তা Irony ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে ইউরোপের অনেক ভালো ভালো চিন্তাবিদও রয়েছেন, যাদেরকে ভালোভাবে পড়া উচিৎ। <strong>কেউ যদি পুঁজিবাদকে ভালোভাবে খণ্ডন করতে চায়, তাহলে তার জন্য মার্কস এর &#8220;Das Capital&#8221; পড়াই যথেষ্ট। কেউ যদি ড্যানিয়েল ডিফোর &#8220;রবিনসন ক্রুসো&#8221; কে খন্ডন করতে চায়, তাহলে তার উচিত Michel Tournier রচিত &#8216;Friday&#8217; নামক গ্রন্থটি পড়া। কেউ যদি লিবারেলিজমকে খণ্ডন করতে চায়, তাহলে তার জন্য বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক কার্ল স্কিমিদ এর বইগুলো পড়াই যথেষ্ট।</strong> তার একটি বিখ্যাত বই হলো &#8220;Political Theology: Four New Chapters on the Concept of Sovereignty&#8221;। কার্ল স্কিমিদের মতে, <strong>&#8220;সত্যিকারের লিবারেলিজম আমাদের সামনে উপস্থাপিত লিবারেলিজমের সম্পূর্ণ বিপরীত।&#8221;</strong> এটিই মূলত লিবারেলিজমের সার-নির্যাস।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এবারের আলোচ্য বিষয় এ লিবারেলিস্টরা কেমন দুনিয়া চায় বা তাদের ওয়াদাকৃত জান্নাতের স্বরূপ কেমন। লিবারেলিস্টদের লক্ষ্য হলো World State বা বিশ্বরাষ্ট্র। তাদের মতে বিশ্বরাষ্ট্রই হলো ইতিহাসের সর্বশেষ পর্যায়, তারপর আর কিছু নেই। বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে, আর এটি তারা প্রতিষ্ঠা করবে, যারা এ চিন্তাধারায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ এরিস্ট্রোক্রেট, ডেমোক্রেটিক, ক্যাপিটালিস্ট চিন্তাধারায় বিশ্বাসীরা। অন্যদের দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ বিশ্বরাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন হবে তা সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক, ব্রিটেনের ইতিহাসে এংলো স্যাক্সন ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে বড় দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব, এ কথা অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রযুক্তি দুনিয়ার অনেক কিছুই তার &#8220;Principia Mathematica&#8221; এর উপর নির্ভরশীল। Logic and Linguistic এ তার ভূমিকা অনন্য, এক্ষেত্রে তার বিকল্প নেই। বার্ট্রান্ড রাসেলেরই স্বপ্ন ছিল বিশ্বরাষ্ট্র। লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত এ জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি তিনি। তার রচিত &#8220;Scientific Outlook&#8221; বইটি লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাতের রূপরেখা।</p>
<p>তিনি বিশ্বরাষ্ট্রকে তুলে ধরছেন এভাবে, &#8220;লিবারেলিজমের উপর ভিত্তি করে যে আধুনিক সমাজ তৈরি হবে, সেটি হবে প্রোপাগান্ডার উপর ভিত্তি করে। আর এ প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা মানুষকে বুঝাবে। এ পদ্ধতিতে তৈরিকৃত প্রোপাগান্ডাই হবে আধুনিক সমাজের মূলভিত্তি অর্থাৎ Advertisement&#8221;। রাসেলের এ কল্পিত দুনিয়ায় গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না, কারণ গণতন্ত্র থাকলে বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। Oligarchy এর উপর ভিত্তি করে বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, আর এ Oligarchy ভূমির উপর ভিত্তিশীল হবে না, এটি হবে বিজ্ঞানীদের একটি সমাজ অর্থাৎ Scientific Oligarchy, যেখানে বিজ্ঞানীগণ হবেন মূল স্তম্ভ। তিনি তার বইয়ে বলছেন, উদাহরণ স্বরূপ রাশিয়ার কথাই ধরা যাক, আজকের গতিশীল ও মেধাবীরা একবার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার পর প্রথম দিকে অধিকাংশ মানুষের বিরোধীতার সম্মুখীন হলেও তাঁরা তাঁদেরকে ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখতে সক্ষম হবে। দিন যত অতিবাহিত হবে ক্ষমতা ততই বংশগত অলিগার্কদের হাত থেকে বুদ্ধিজীবী অলিগার্কদের হাতে চলে যাবে। যে সকল দেশ দীর্ঘদিন যাবত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে সেই সকল দেশে এই অলিগার্কদের একচ্ছত্র আধিপত্য অগাস্টাসের রোমের মত ডেমোক্রেসির ছায়াতলে আশ্রয় নিতে পারবে। তবে অন্যান্য স্থানে এই অলিগার্কদের মুখোশ খুব দ্রুতই খসে পড়তে পারে। যদি নতুন ধরণের একটি সমাজকে তৈরি করতে হয় তাহলে সেখানে চিন্তাগত Oligarchy অবশ্যম্ভাবী। এখানে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, নতুন এক ধরণের অলিগার্ক গড়ে উঠবে আর এই অলিগারশিক গ্রুপ (মানুষের মধ্যে ছোট্ট একটি গোষ্ঠী) রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাকে ব্যবহার করবে এবং তাঁদের শাসন ব্যবস্থা যেন মানুষের সামনে গ্রহণযোগ্যতা পায় এই ভাবে তাঁরা মানুষকে কনভিন্স করার চেষ্টা করবে। আর এই ক্ষেত্রে প্রপাগাণ্ডা হবে তাঁদের মূল হাতিয়ার।</p>
<p>এরপর তিনি আরও বলেন, সে অলিগার্কদের মধ্যে মাঝেমধ্যে সমস্যা হলেও, দিনশেষে অলিগার্কদেরই একটি শ্রেণি সমগ্র পৃথিবীর ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবে এবং একটি বিশ্বব্যপী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে; এক্ষেত্রে রাশিয়া একটি উদাহরণ। তাদের এ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বরাষ্ট্র খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। অর্থাৎ ছোট একটি গোষ্ঠী সমগ্র দুনিয়াকে শাসন করার জন্য একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে এবং এবং সমগ্র দুনিয়াকে তাঁরা সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন করবে! সমগ্র মানবতার ভবিষ্যতের জন্য লিবারেলিস্টদের এটাই হলো ওয়াদা! এমন একটি সমাজই সবচেয়ে অগ্রসর সমাজ বলে বিবেচিত হবে! রাসেলের ভাষায়, তাদের এ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বরাষ্ট্র খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। এই উভয় অবস্থায় একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আর সেটা হলো; যেকোনো অবস্থায় তাদের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিকে ধারণ করতে হবে। অন্যথায় তাঁদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভবপর হবে না। বৈজ্ঞানিক পন্থা সর্বদায় সংগঠন (Organization) চায়, আর বিজ্ঞান যত বেশী অগ্রসর হবে তাঁর কাঙ্ক্ষিত সংস্থাও ততবেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে! তাঁরা কেমন একটি সংগঠন (Organization) চাচ্ছে? এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ! কেননা যে ব্যক্তি এই কথা বলছেন তিনি মার্ক্সিস্ট কিংবা সোশ্যালিস্ট কোনো ব্যক্তি নন। এই ব্যক্তি একজন ব্রিটিশ লর্ড। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দার্শনিকদের একজন। এই ব্যক্তি এই সব কথা বলছে। এই ব্যক্তি মানবতার জন্য এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, এখানে যুদ্ধকে এক পাশে রেখে চিন্তা করলে আন্তর্জাতিক একটি ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স এবং ট্রেড সিস্টেমের দরকার, যার মাধ্যমে শুধু কিছু দেশ নয়, সকল দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতি নিশ্চিত হবে। এর মানে কী? International Organization of Credit and Banking এর মানে কী? এর অর্থ হলো সকল অর্থনৈতিক লেনদেন একটি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। কাকে কত ঋণ দেওয়া হবে, কোন খাতে দেওয়া হবে, কোন খাতে দেওয়া যাবে না, এই সকল বিষয়ই একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। রাসেলের মতে, এ ধরণের বিশ্বরাষ্ট্রের সুবিধাসমূহ হবে অনেক বেশি। প্রথমত যুদ্ধের কোনো ভয় থাকবে না। তবে অস্ত্র তৈরি করার জন্য যে প্রতিযোগিতা করা হচ্ছে নিঃসন্দেহে সেটা বৃথা যাবে না। বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ও রাসায়নিক অস্ত্র থেকে উপকৃত হতে হবে যেন কেউ শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পারে। কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা কখনো কখনো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবর্তিত হলেও হতে পারে। কিন্তু এটি শুধুমাত্র ব্যক্তি পরিবর্তন করবে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। এটি তার স্বকীয়তা রক্ষা করার জন্য যে কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা চালাতে পারবে। যদি এ রকম একটি বিশ্বরাষ্ট্রকে কোনো প্রজন্ম একবার ধরে রাখতে পারে, তাহলেই এটি স্থিতিশীল হবে। কীভাবে স্থিতিশীল হবে? এর জবাবে রাসেল বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক সুবিধা অর্জিত হবে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার কারণে অপচয় বলতে কোনো কিছু থাকবে না, পেশাগত জীবনে কোনো ধরণের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে না, দরিদ্রতা থাকবে না, খারাপ ও ভালো দিন চক্রাকারে আবর্তিত হবে না, যারা কাজ করবে তাঁরা আরাম আয়েশে জীবন যাপন করবে। আর যারা কাজ করতে অনাগ্রহ দেখাবে তাঁদের স্থান হবে জেলখানা। অর্থনীতিকে জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজে লাগানো হবে। (অর্থাৎ কতজন মানুষ জন্ম নিবে এটা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের উপর)। হয়তোবা সকল মানুষকে শুধুমাত্র একটি স্থলভূমিতে রাখা হবে। মানুষের জীবনকে হুমকিতে ফেলে দিতে পারে এমন ধরনের সকল বিষয়কে উৎখাত করা হবে এবং অকাল মৃত্যুর হার কমে আসবে।</p>
<p>বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর এই চিত্রিত বিশ্বরাষ্ট্রকেই জান্নাত হিসেবে অভিহিত করেন! এমন একটি রাষ্ট্রই হলো লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাত। আর তাঁদের এই জান্নাতে মানুষের অবস্থা কেমন হবে এটা রাসেলের মুখেই শুনা যাক, <strong>“আর এ ওয়াদাকৃত জান্নাতে মানুষ সুখী হবে কি হবে না সেটা আমি জানি না। বসবাস করার জন্য সকল কিছুকে অর্জন করার পর মানুষ সুখী হবে কি হবে না সেটার জন্য কি করা প্রয়োজন সেই শিক্ষা হয়তোবা জৈব রসায়ন (Biochemistry) দিবে।&#8221;</strong> এখানে রাসেল বায়োকেমেস্ট্রির কথা কেন আনলেন? এর অর্থ হলো মানুষকে সুখে রাখার জন্য ঔষধ তৈরি করা হবে। মনে করেন আজকে আপনার মন খারাপ, একটা ট্যাবলেট খেয়ে নিবেন যা আপনাকে খুশিতে রাখবে। এরপর সে প্রশান্তি অনুভব করবে। লিবারেলিস্টদের চিন্তাধারায় সুখ বলতে এতটুকুই। এখন কথা হলো নেশা করার সাথে সুখ পাওয়ার জন্য ঔষধ খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কি? মানুষকি তাঁর ব্যথা কিংবা দুঃখকে ভুলে থাকার জন্য নেশা করে না? একবার চিন্তা করুন মানুষকে জৈব রসায়ন (Biochemistry) এর মাধ্যমে সুখী করার চিন্তা কেমন একটি চিন্তাধারা!!</p>
<p>শুধু তাই নয় দেখুন লিবারেলিস্টরা তাঁদের জান্নাতে মানুষ সুখে রাখার জন্য কোন ধরণের প্রস্তাবনা পেশ করে। রাসেলের ভাষায়, কেউ কেউ মানসিক অশান্তির কারণে অরাজকতা সৃষ্টিকারী হতে পারে বলে তাঁদেরকে দমিয়ে রাখার জন্য বিপজ্জনক কিছু খেলাধুলার আবিষ্কার করা যেতে পারে। জুলুমকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়ে খেলাধুলাতে স্থানান্তর করা হবে। প্রস্তাবিত সমাধানের দিকে খেয়াল করুন। আর খেলাধুলার ক্ষেত্রে কী এখন এগুলোই হচ্ছে না? বর্তমানে ক্রীড়াজগতে আমরা তাকালে দেখতে পাই যে বিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে এবং সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যদি খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, মানুষের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কমিয়ে আনা ও তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রিত একটি স্রোতের দিকে ধাবিত করা। <strong>তিনি আরও বলেন, ফুটবলের পরিবর্তে আকাশ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা যেতে পারে। এক দিক থেকে দেখলে রাসেলের এই প্রস্তাবনা হলো, রোমানদের গ্লাডিয়েটরের আধুনিক রূপ! তদের প্রস্তাবিত জান্নাতে মানুষকে গ্লাডিয়েটর হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়</strong>। তাঁদের চিন্তার সীমানা এতটুকুই।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, মৃত্যু যখন মানুষের হাতের মুঠোয় থাকবে, বিজয়ের নেশায় মৃত্যুর দিকেও ধাবিত হওয়া থেকে দ্বিধা করবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে উপর থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষকে বিনোদন দেওয়া ছাড়া হয়তো অন্য কিছু হবে না, হয়তো এমন দিনও আসবে যখন তাঁকে বীরের মর্যাদা দেওয়া হবে। অর্থাৎ এমনভাবে প্রোপাগান্ডা চালানো হবে যে, অমুক ব্যক্তি এত হাজার ফিট উপর থেকে গড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। সে সকলের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ইত্যাদি বলে মানুষের নিকটে এই ধরনের খেলাকে গ্রহণযোগ্য করা হবে। রাসেলের ভাষায়, এ ধরণের আরো অনেক পন্থা অবলম্বন করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সুনিয়ন্ত্রিত একটি শিক্ষাব্যবস্থা ও খাদ্যব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার অরাজকতার চিন্তা ও অন্যান্য অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।</p>
<p>আর মানুষের জীবন ধারাকেও একটি সানডে স্কুলের কোচিং সেন্টারের মত নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অবশ্যই সেখানে একটি বিশ্বজনীন ভাষা তৈরি করা হবে। আর এই বিশ্বজনীন ভাষাটি কেমন হবে? এই ক্ষেত্রে রাসেলের প্রস্তাবনা হলো, এই ভাষা হবে হয় এসপেরান্টো (Esperanto), আর না হয় পিডগিন ইংলিশ (Pidgin English)। আর অতীতের অনেক কিছুকেই এই ভাষায় অনুবাদ করা হবে না। কেননা ঐ সকল চিন্তা এই ভাষার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না। যারা ইতিহাস নিয়ে কাজ করবে তাঁরা ‘হ্যামলেট’ এবং ‘অথেলোর’ মত গ্রন্থসমূহকে ব্যাখ্যা করার জন্য সরকার থেকে অনুমতি নিতে পারবে তবে এগুলা জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে। শিশুদেরকে রেড ইন্ডিয়ান ও অন্য কোনো জাতির ইতিহাস পড়ার সুযোগ দেওয়া হবে না!</p>
<p>এটিই লিবারেলিজমের ওয়াদাকৃত জান্নাত। এখানে আমরা হয় তাদের ব্যবস্থার গোলাম হবো, অন্যথায় আমাদের জায়গা হবে কারাগারে। এ জান্নাতে মানুষের সুখ মূখ্য নয়, বরং তারা মানুষকে কল্পিত সুখে ডুবিয়ে রাখবে মাদক ও ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে। আর তাদের ভাষা হিসেবে পিডগিন ইংরেজিকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো এ ভাষায় ব্যাকরণ মুখ্য নয়, শুধুমাত্র ভাব প্রকাশই মুখ্য। ভাষা হলো চিন্তা ও ধারণা প্রকাশের বড় একটি মাধ্যম। প্রতিটি ভাষাতেই মূল্যবোধের কথা উল্লেখিত আছে, স্রষ্টার কথা উল্লেখিত আছে। প্রতিটি ভাষাতেই ভালোর কথা বলা হয়েছে, খারাপের কথা বলা হয়েছে, জাতির বীরত্বের গৌরবের কথা বলা হয়েছে। আর এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এমন দুনিয়ার জন্য তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে পিডগিন ইংরেজিকে (Pidgin English)। আর পূর্বের বইগুলো এ পিডগিন ইংরেজিতে অনূদিত না হওয়ার কারণ হলো এর ফলে উদ্ভূত আবেগকে তারা অর্থনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে সমর্থ হবে না। সেই সাথে তারা সকলকে অতীত ভুলিয়ে দিয়ে অতীত ইতিহাসের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কবিহীন এক জাতিতে রূপান্তরিত করতে চায়। আর সত্যিকার ভালোবাসার ধারণা মুছে দিয়ে এর পরিবর্তে তাৎক্ষণিক বিনোদনের ব্যপারগুলোকে তুলে ধরতে চায়, যা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সহায়ক। এখন যদি আমরা বর্তমান দুনিয়ার সাথে তাদের ওয়াদাকৃত জান্নাতকে মিলিয়ে দেখি, তবে কী দেখবো? আমেরিকার প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, তাহলে আমেরিকা চীনের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে রাশিয়ার সাথে কেন সংঘর্ষে গেলো? কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বিশ্বরাষ্ট্র একটু হলেও ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্প চীনের দিকে নজর দিতে গিয়ে রাশিয়ার দিকে নজর দিতে পারেনি, যে কারণে ন্যাটো দুর্বল হয়ে গিয়েছে। যায়নবাদী সভ্যতা ন্যাটোর মাধ্যমেই ইউরোপে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। আর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কিন্তু মানুষ মারা গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না, কিন্তু যেকোনো মূল্যে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে, ন্যাটোর অবস্থান ঠিক রাখতে হবে। এটিই হচ্ছে মূল ব্যপার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ বিষয়গুলোকে আমাদের সামগ্রিকভাবে পড়তে ও উপলব্ধি করতে হবে। নিজে উপলব্ধি করে অপরকে উপলব্ধি করানো, মানুষের সামনে তুলে ধরা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আমাদেরকে মুসলমানদের মধ্যকার সাহায্য ও সম্প্রীতির জাগরণ ঘটাতে হবে, ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে দিতে হবে, সেই সাথে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ডি-৮ এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাধ্যমে এ উদ্যোগ আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে আর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অথচ এই ডি-৮ ছিল একবিংশ শতাব্দীর যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় আশার বাতিঘর। ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রায় পরিণত হয় ১৯৯৭ সালে, অন্যদিকে আমাদের অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা ইসলামিক দিনারের ধারণা সৃষ্টি হয় ১৯৭৪ সালে। আমাদেরকে লিবারেলিস্টদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজস্ব অর্থনেতিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে এ মুহূর্তে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন সবচেয়ে বেশি জরুরী। আমাদেরকে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।</p>
<p>লিবারেলিস্টদের বৈজ্ঞানিক রূপরেখার জবাব আল্লামা ইকবাল ১৯৩২ সালেই দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমাদের বড় বড় আলেমগণ আমাদের সতর্ক করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তারা কাজ করেছেন। আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচ এক অর্থে তাদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো সতর্কবার্তা। কিন্তু আমরা এখনো নিজেদেরকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারি না, যার ফলে তাদের কৌশল গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের। যদি আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা না করি, তাহলে আমরা ধাপে ধাপে বিশ্বরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ শিকারে পরিণত হবো। কিন্তু আমরা যদি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, কাজ করি, তাহলে সফলতা অবশ্যই আসবে, এটি আল্লাহর ওয়াদা। এ লক্ষ্যে যদি আমরা ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারি, তবে তা বিশ্বের ১৯০ কোটি মুসলমানের আশার আলো হবেই। <strong>জুলুম কখনোই চিরস্থায়ী হয় না, আজ হোক বা কাল, জুলুমের পতন ঘটবেই। কিন্তু এ পতন কতটুকু ত্বরান্বিত হবে তা নির্ভর করে আমাদের চেষ্টা ও কাজের উপর।</strong> ফেরাউনী সাম্রাজ্যের যদি পতন হতে পারে, রোম সাম্রাজ্যের যদি পতন হতে পারে, সাসানীদের যদি পতন হতে পারে, এই যায়নবাদী সভ্যতারও পতন অবশ্যই হবে এবং তা হবে আমাদের হাত ধরেই, ইনশাআল্লাহ।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 370px; top: 3755.56px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15761</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে পর্দার দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 12 Mar 2025 13:29:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[উসূল ও মেথডোলজি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15602</guid>

					<description><![CDATA[সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি ছাড়া সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে, সকল সংস্কৃতিতে, সকল সভ্যতায় এবং সকল আখলাকী ব্যবস্থায় মানুষের জন্য মূল বিষয় হল নিজেকে আবৃত করে রাখা। মানুষ, তাঁর শরীরকে আবহওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকে কিংবা ঠাণ্ডা ও গরম থেকে রক্ষা করার জন্যই নয় একই সাথে আধ্যাত্মিক একটি মূল্যবোধকে সামনে রেখে নিজেকে আবৃত করে থাকে।</p>
<p>সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ পোশাক পরিচ্ছদের দিকে আরও বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। সকলেই জানেন যে, আজ থেকে একশত বছর পূর্বেও নারীরা খ্রিষ্টান কিংবা ইয়াহুদী, যে ধর্মেরই হোক না কেন মুসলমান নারীদের মত তারাও পর্দা করত। কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে সকল ক্ষেত্রের মত এই ক্ষেত্রেও মানবতা অনেক বড় একটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আধুনিক সময়ে পর্দাকে এতটা প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে, যা জীবনের সাথে সম্পর্কহীন একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একদিকে পর্দাকে তুচ্ছ ও প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখানো হয়েছে আর অপর দিকে শরীর প্রদর্শনকে আকর্ষণীয় ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিক সময়ে শোষণের একটি ক্ষেত্রে হিসেবে মানুষের শরীরকে বেঁছে নেওয়া হয়েছে। নারী, পুরুষ কিংবা শিশু সকলের শরীরকেই যথেচ্ছাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের দিকে শুরু হওয়া যৌন বিপ্লবের মাধ্যমে শরীরকে মালিকানাধীন একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। যা পরবর্তীতে শরীরকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করে এবং শরীর প্রদর্শন ফ্যাশনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ‘ফ্যাশন’, ‘স্বাধীনতা’ কিংবা সর্বজনীনতার নামে বিভিন্ন পন্থায় মানুষের সামনে এই যৌনতাকে তুলে ধরার ফলে সমগ্র দুনিয়াজুড়ে মানবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমস্যার সম্মুখীন।</p>
<p>ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে নতুন <strong>ভার্চুয়াল স্ক্রিন সভ্যতা </strong>প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই সভ্যতায় বিনোদন কেন্দ্রিক একটি <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাক</strong> প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এই সভ্যতায় মানুষ; তাঁর নিজের সাথে, অন্যদের সাথে এবং মহাবিশ্বের সাথে সম্পর্ককে হাকীকতের উপর ভিত্তি করে নয় বরং চিত্র ও ছবির উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে। এই সভ্যতায় আকলের বদলে চোখ-ই হয়ে উঠেছে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। একই এই সভ্যতার বড় কাজ হল, চিন্তা করার বদলে দেখা। অর্থাৎ এই <em>ভার্চুয়াল</em> <em>স্ক্রিন</em> <em>সভ্যতা</em>  আকলের উপর চোখকে এবং চিন্তা করার বদলে দেখাকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর এই সভ্যতায় ‘চোখ’ নাজার ও মুশাহাদা (অবলোকন) &#8211; এর উপাদান হওয়ার পরিবর্তে কামনা-বাসনা ও শাহওয়াতের উপাদানে পরিণত হয়েছে। আর এই বিষয়টি পর্দার ফিতরাতী, দ্বীনী, আধ্যাত্মিক ও মেটাফিজিক্যাল অর্থকে হারিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে এবং ইলাহী উদ্দেশ্যকে বিলীন হওয়ার ক্ষেত্রে এমনকি আখলাকী ভিত্তি থেকেও সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। ভিজুয়াল ইদরাকের আধিপত্য এমন অনেক গায়রে আখলাকী বিষয়কে দৃশ্যায়িত করেছে যা আমাদের কল্পনারও অতীত। <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য মানুষকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করে তার গোপনীয়তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এমন অনেক ক্ষেত্র তৈরি করেছে যা মানুষকে সাময়িক কিছু আনন্দ দেয়, এবং তাকানোকে শাহাওয়াতে এবং দেখাকে কামনায় পরিণত করেছে। ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য আকলের ইদরাককে দুর্বল করেছে, এবং কলবের ইদরাককে মৃত্যুঝুকিতে ফেলে দিয়েছে। </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র ইসলামের অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত নীতিমালাসমূহ মানুষকে আবৃত হওয়ার দিকে আহবান জানিয়ে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন ও ডিজিটালাইজশন কর্তৃক ছুড়ে এই সকল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় মহাপর্বতের ন্যায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের এই মূলনীতিগুলো চাচ্ছে মানুষকে হায়া ও সতীত্বের দিকে ফিরিয়ে আনতে। তবে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন এবং ডিজিটালাইজেশন কর্তৃক সৃষ্ট চাপের পাশাপাশি নিম্নোক্ত কারণসমূহও এই একই সমস্যাকে আরও বেশী ঘনীভূত করেছে।</p>
<ul>
<li>১। আধুনিক সময়ে এসে নারী ও পর্দার বিষয়কে ইসলামের মূলনীতির আলোকে সঠিকভাবে বিনির্মাণ করতে ব্যর্থ হওয়া।</li>
<li>২। মুসলমানদের নিকটে পর্দার হিকমত ও দর্শনকে ভালোভাবে তুলে ধরতে না পারা এবং এই ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করা।</li>
<li>৩। পর্দাকে যেন শুধুমাত্র নারীদের জন্যই আবশ্যক এই ধারণার ব্যাপক প্রসার।</li>
<li>৪। পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি।</li>
<li>৫। কখনো কখনো পর্দাকে নারীদের সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের একটি বিষয় হিসেবে না নিয়ে বরং সেটাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৬। নারীদের পর্দার পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হিজাবকে পরিত্যাগ করা এবং হিজাব ত্যাগ করাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৭। হিজাব পরিধানকারী নারীদেরকে ইসলামের প্রতিনিধি রূপে তুলে ধরে তাঁদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।</li>
</ul>
<p>উপর যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, এই সকল বিষয়সমূহ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পর্দার বিষয়টিকে আরও কঠিন করে ফেলেছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঘটে যাওয়া এই সকল সমস্যাসমূহ আসলে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, একই সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ধর্ম এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছে। আর এই বিষয়টি হিজাবের বিষয়টির রূহ ও মাকসাদকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোন থেকে প্রভাবিত করেছে এবং পর্দার আধ্যাত্মিক, রূহী এবং মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।</p>
<p>এই সকল বিষয়কে সামনে রেখে আমি <strong><em>ইসলামের</em> <em>পর্দা</em> <em>দর্শন</em> <em>এবং</em> <em>নতুন</em> <em>একটি</em> </strong><em><strong>দৃষ্টিভঙ্গি</strong>  </em>এই বিষয়ে কিছু চিন্তা আপনাদের নিকটে পেশ করতে চাই।</p>
<p>ইসলামের সকল বিষয়কে নারীদেরকে কেন্দ্র করে আলোচিত হওয়ার ফলে আল্লাহর নারী বান্দাদের উপর যে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এই বিষয় সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। এই কারণে পর্দার বিষয়টিকে নারী কিংবা পুরুষকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এই বিষয়টিকে আমি ‘মানুষ’ এর উপর ভিত্তি করে আলোচনা করতে চাই এবং আমি সুস্পষ্ট করতে চাই যে এই বিষয়টি শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। একই সাথে আমি এই বিষয়টিও তুলে ধরতে চাই যে পর্দার বিষয়টি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক অর্থবোধক।</p>
<p>পর্দার বিষয়টিকে পাঁচটি দিক থেকে বিবেচনা করে পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করানোর চেষ্টা করব। সেগুলো হলোঃ</p>
<ul>
<li>১. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>ফিতরাতী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em>  অর্থাৎ পর্দার স্বয়ং মানুষের সাথে সম্পর্কিত দিক।</li>
<li>২. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>কালামী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> অর্থাৎ মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা।</li>
<li>৩. পর্দার ব্যাপারে ফিকহী দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা ।</li>
<li>৪. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>আখলাকী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> , অর্থাৎ পর্দার নৈতিক দিক।</li>
<li>৫. পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ পর্দার সৌন্দর্যগত, শোভাগত এবং চারিত্রিক দিক।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>১</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিতরাতী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>পর্দার বিষয়টি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ফিতরাতী একটি বিষয়। ফিতরাত হলো, সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে দেওয়া মূল্যবোধের এক রত্নভাণ্ডারের নাম। অন্য কথায়, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে আপলোডকৃত ইলাহী এক সফটওয়্যারের নাম হলো ফিতরাত। আবৃত করে রাখা, আদব, হায়া ও সতীত্বের মত অনুভূতিসমূহ মূলত এই মেমোরির মধ্যে তথা ইলাহী সফটওয়্যারের মধ্যে রক্ষিত মূল্যবোধ থেকেই উৎসারিত হয়ে থাকে। নিজের গোপনীয়তাকে রক্ষা করে যে ভালো, সঠিক ও সুন্দর এবং শরীর প্রদর্শন করা যে খারাপ, কুৎসিত ও ভুল,  এই সকল বিষয়সমূহ মানুষের এই মূল্যবোধের ভাণ্ডারের মধ্যে মওজুদ রয়েছে।</p>
<p>পর্দার ফিতরাতী দৃষ্টিকোণের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাকে আমরা কোরআনে কারীমে বর্ণিত হযরত আদম ও হযরত হাওয়ার কিসসার মধ্যে দেখতে পাই।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1"><sup>[1]</sup></a>  এই কিসসা অনুসারে হযরত আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে সকল ধরণের নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে রাখেন এবং  তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন; ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ কিন্তু শয়তান তাঁদেরকে প্রতারিত করে এবং তাঁদের গোপনাঙ্গকে একে অপরের নিকটে উন্মুক্ত করার জন্য তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে, “তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”। শয়তান কসম খেয়ে তাঁদেরকে বলে যে, “ আমি নিঃসন্দেহে তোমাদের কল্যাণকামী”। এই ভাবে আদম ও হাওয়া উভয়কেই প্রতারিত করতে সক্ষম হয় এবং নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার সাথে সাথে লজ্জাস্থান পরস্পরের সামনে খুলে যায়। অতপর তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থানকে আবৃত করার জন্য জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জাস্থানকে ঢাকার চেষ্টা চালায়। এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে ,শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?  তাঁরাও বলে উঠে, “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি৷ এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো, এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো ৷” কোরআনে কারীম এই কিসসাকে এই নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে শেষ করেছে,</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ</p>
<p>অর্থাৎ, হে বনী আদম! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশ-ভূষার জন্য। আর তাকওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোত্তম। এটা আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2"><sup>[2]</sup></a></p></blockquote>
<p>এ কিসসা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে বাশারিয়্যাত থেকে আদামিয়্যাতের দিকে এবং আদামিয়্যাত থেকে ইনসানিয়্যাতের দিকে যাত্রাকালে মানুষ সর্বপ্রথম যে বিষয়টিকে উপলব্ধি করে সেটা হল মানুষের ফিতরাতের মধ্যকার আবৃত করার বিষয়টি। আর বিষয়টি না শুধু নারীর জন্য আর না শুধু পুরুষের জন্য। আবৃত করার বিষয়টি নারী ও পুরষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই প্রযোজ্য একটি বিষয়।</p>
<p>আর আলোকে এই কথা বলা যায় যে, পর্দার বিষয়টি আসমানী একটি নিয়ামত। আবৃত করার বিষয়টি মানুষের জন্য একটি তাকওয়া অর্থাৎ রক্ষা করা, পরিশুদ্ধ করা, সুন্দর করা ও ইজ্জত সম্পন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অন্যতম একটি নিয়ামত। এ নিয়ামতটি আমাদেরকে ইহসানের চেতনা দান করে এবং যেন আমরা সর্বদায় আল্লাহকে দেখছি এমন ভাবে আচরণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। আর এটা কেবলমাত্র তাকওয়ার পোশাক পরিধান করার মাধ্যমেই সম্ভব।</p>
<p>আর তাকওয়ার পোশাক কেবলমাত্র বাহ্যিক একটি পোশাক-ই নয়। তাকওয়ার পোশাক হল, মানুষকে স্বয়ং তার নিজের প্রতি, সৃষ্টিজগত ও রবের প্রতি দায়িত্ববান করে তোলা। আর এই দায়িত্ববোধ বাহ্যিক পোশাককে অর্থবহতা দান করে, পর্দার মধ্যে রূহ প্রদান করে এবং সকল প্রকার পর্দার চূড়া হলো এ দায়িত্ববোধ। তাকওয়ার পোশাক বিহীন শরীর রসকষবিহীন একটি অবয়ব ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>২</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>কালামী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>অনেকেই ধারণা করেন যে, পর্দা শুধুমাত্র মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি বিষয়। আসলে ব্যাপারটি এমন নয়। পর্দার একই সাথে আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি দিকও রয়েছে। কেননা মানুষ  ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ক শুধুমাত্র খালেক-মাখলুক কিংবা রুবুবিয়্যাত-উলুহিয়্যাত- এর সম্পর্কই নয়। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার এই সম্পর্ক একই সাথে শাহিদ-মাশহুদেরও সম্পর্ক। এ সম্পর্কের দাবি অনুযায়ী মানুষ সর্বদা আল্লাহকে স্মরণে রেখে পথ চলে। কোরআনে কারিমে এই সম্পর্ককে নিম্নোক্তভাবে  তুলে ধরা হয়েছেঃ</p>
<blockquote><p>اَیَحۡسَبُ اَنۡ لَّمۡ یَرَهٗۤ اَحَدٌ</p>
<p>অর্থাৎ, সে কি ধারণা করে যে, তাকে কেহই দেখছেনা?<a href="#_ftn3" name="_ftnref3"><sup>[3]</sup></a></p>
<p>وَ هُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ</p>
<p>তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। <a href="#_ftn4" name="_ftnref4"><sup>[4]</sup></a></p>
<p>فَاَیۡنَمَا تُوَلُّوۡا فَثَمَّ وَجۡهُ اللّٰهِ</p>
<p>তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও সেই দিকেই আল্লাহকে পাবে।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5"><sup>[5]</sup></a></p></blockquote>
<p>শুধু তাই নয় শাহিদ ও মাশহুদের এই সম্পর্ক একটি মিসাক (শাহাদাতের মিসাক) এর উপর নির্ভর করে। এই মিসাকের আলোকে মানুষ তার সৃষ্টির পূর্বেও আলমে আরওয়াহ/রূহের জগতে তাঁর রবের একত্বে ও মহত্বে স্বাক্ষ্য প্রদান করেছে। কোরআনের ভাষ্যমতে,</p>
<blockquote><p>وَ اَشۡهَدَهُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ ۚ اَلَسۡتُ بِرَبِّکُمۡ ؕ قَالُوۡا بَلٰی ۚۛ شَهِدۡنَا</p>
<p>অর্থাৎ, আর তাদেরকেই সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ; এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’<a href="#_ftn6" name="_ftnref6"><sup>[6]</sup></a></p></blockquote>
<p>আর সৃষ্টির পরে দুনিয়াতে এসেও মানুষ তাঁর মহান প্রভুর নাম, আয়াত, সিফাত ও নিয়ামতসমূহকে অবলোকন করছে। আল্লাহ তায়ালাও তাঁর বান্দার সকল অবস্থা, কাজ, নিয়ত ও গোপন বিষয়ের সাক্ষী। <strong>“ وَ اللّٰهُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَهِیۡدٌ /আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী”।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7"><sup>[7]</sup></a></strong> যার কারণে পর্দা শুধুমাত্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘আমার চোখে’ কিংবা বাহিরের ‘অন্যদের চোখে’ কেমন লাগলো এর সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, আমার রব আমাকে কেমন দেখছেন এর সাথেও এই বিষয়টি সম্পর্কিত। কেননা কোন দৃষ্টি-ই মহান প্রভুর দৃষ্টির চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়। <strong>কলবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা হলো চোখ। এ চোখকে যারা রক্ষা করতে পারবে তাঁরা আল্লাহর নজরগাহ হিসেবে আখ্যায়িত কলবকেও রক্ষা করতে পারবে। হাদীসে যেমনটা বর্ণিত হয়েছে; “إِنَّ اللهَ تعالى لَا ينظرُ إلى صُوَرِكُمْ وَأمْوالِكُمْ ، ولكنْ إِنَّما ينظرُ إلى قلوبِكم وأعمالِكم / নিশ্চয় আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না তোমাদের শরীর এবং তোমাদের আকৃতির দিকে, বরং দৃষ্টি দিবেন তোমাদের অন্তর ও তোমাদের কর্মসমূহের দিকে”।</strong></p>
<p>এখানে আমাদের মনে এমন একটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারেঃ “ অগণিত গ্যালাক্সির স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা আমার পোশাক-আশাক কিংবা চুলের স্টাইলের দিকে কেনই বা নজর দিবেন?” এখানে মূল বিষয়টি আসলে পোশাক-আশাক কিংবা চুল দাঁড়ির সাথে সম্পর্কিত নয়। এখানে মূল বিষয়টি আসলে মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমতের সাথে সম্পর্কিত। কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমত সম্পর্কে অবহিত করেছেন এবং তাঁদের ফিতরাতের মধ্যে যে মূল্যবোধ দিয়েছেন সেই মূল্যবোধের দাবির আলোকে বসবাস করতে বলেছেন। তাঁরা তাঁদের রবের উপর ঈমান আনবে কি আনবে না এটা তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। পর্দা ও শরীরকে আবৃত করে রাখার বিষয়টিও মহান প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষের নিকট চাওয়া সেই সকল মূল্যবোধসমূহের মধ্যকার একটি । মূলত, পর্দার বিষয়টিকে শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ একটি বিষয় বলে ধারণা করার কারণে অনেকেই এই ধরণের প্রশ্ন করে থাকেন। অনেকেই আবার আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে পর্দাকে শুধুমাত্র নারীদের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখে থাকেন। বিশেষ করে <strong>আধুনিক সময়ে পর্দাকে বাহ্যিক একটি বিষয় হিসেবে উত্থাপন করে একে আদর্শিক একটি  সংঘর্ষের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যা খুবই বিপদজনক একটি দৃষ্টিভঙ্গী। অথচ পর্দা আদর্শিক (Ideological) কোন প্রতীক নয়; পর্দা হল বিশ্বাস, ইজ্জত-আব্রু ও সম্মানের প্রতীক। ফিতরাত, ইজ্জত, সতীত্ব, ব্যক্তিত্ব ও ইস্তিকামাতের বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশের নাম হল পর্দা।</strong> এর আলোকে পর্দা আদবকে সজ্জিত করে এবং মানুষকে পরিশুদ্ধ একটি রূহের মাধ্যমে বসবাস করতে সাহায্য করে। পর্দা নিভপ্ল একটি আলামত কিংবা কোন প্রতীক নয়, পর্দা হল একটি আয়াত। প্রতীক হল জাগতিক ও শারীরিক একটি বিষয় অপরদিকে আয়াত হলো আধ্যাত্মিক ও রূহী একটি বিষয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিকহী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong><strong>  </strong></h5>
<p>আমাদের অধিকাংশ আলেম-ই পর্দার প্রকৃতি ও সীমানাকে, শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে আওরাত ও ফিতনার উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোরআন ও সুন্নতের নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করে আঞ্চলিক ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়কে দ্বীনি বিধানের সাথে সম্পর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের অসামঞ্জস্যতাকে বৈধতাদানকারী, পুরুষদেরকে কেন্দ্রে রেখে পর্দার ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি  দাঁড় করানো হয়েছে সেটা ধর্মীয় নয় বরং সাংস্কৃতিক। পর্দাকে যদি শুধুমাত্র আওরাত<a href="#_ftn8" name="_ftnref8"><sup>[8]</sup></a> ও ফিতনা নামক পরিভাষাদ্বয় এর উপর ভিত্তি করে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে,</p>
<ul>
<li>১। পর্দাকে কেবলমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিন্যস্তকারী একটি বিষয় হিসেবে দেখা হবে।</li>
<li>২। পুরুষরা যেন ফেতনায় পতিত না হয় এই কারণে নারীদেরকে পর্দা করার আদেশ করা হয়েছে, এমন একটি ধারণা তৈরি হবে। অথচ এরকম চিন্তা ইলাহী হিকমতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।</li>
<li>৩। পর্দার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাহ্যিক বিষয় সমূহকেই আবশ্যকীয় বলে পালন করা হবে এবং পর্দার রূহকে উপেক্ষা করা হবে।</li>
</ul>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে প্রথমে পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,</p>
<blockquote><p>قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ</p>
<p>অর্থাৎ, মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করবে। <a href="#_ftn9" name="_ftnref9"><sup>[9]</sup></a></p></blockquote>
<p>পুরুষদের পরে নারীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,</p>
<blockquote><p>وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ</p>
<p>অর্থাৎ, আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করে।<a href="#_ftn10" name="_ftnref10"><sup>[10]</sup></a></p></blockquote>
<p>এই সকল আয়াতকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পর্দার বিষয়টি শুধুমাত্র নারীদের জন্যই নয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা নারী ও পুরুষ একে অপরকে পরস্পরের জন্য পর্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মহান প্রভুর ভাষায়, <strong>“ هُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّهُنَّ / তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ”। <a href="#_ftn11" name="_ftnref11"><sup>[11]</sup></a></strong></p>
<p>খাজানের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ তাঁর <em>“</em><em>কোরআনে</em> <em>কারীমের</em> <em>আয়াতের</em> <em>নূরের</em> <em>আলোকে</em> <em>খাতুন</em><em>”</em>  নামক গ্রন্থে বলেন, “<strong>“আমাদের আলেমগণ পর্দা সংক্রান্ত সকল বিধানসমূহকে ‘ফিতনার ভয়’- এর মত ধারণামূলক একটি হিকমতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার কারণে এ বিধানসমূহ কখনো কখনো এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে নারীগণ সূর্যের নূর থেকে জ্ঞানের আলো পর্যন্ত অনেক বিষয় থেকেই বঞ্চিত হয়েছে। অথচ, জ্ঞান ও ঈমানের আলো কখনো ফিতনা হতে পারেনা। যদি ফিতনা থেকেই থাকে তা থাকার সম্ভাবনা পুরুষদের চোখে, অন্তরে ও ভাষায়। তাই ফিতনা থেকে যদি নিষ্কৃতি পেতেই হয়, তবে পুরুষদের চোখে নিকাব, কলবে আদব এবং মুখে লাগাম লাগানোই হবে মোক্ষম তদবীর। </strong></p>
<p>এ কারণে সকল আসমানী দ্বীন কর্তৃক গৃহীত পর্দাকে কেবল ফিতনার সাথে সম্পর্কিত করার অধিকার কারোর-ই নেই। কেননা ইসলাম আনীত পর্দার বিধানটি শুধুমাত্র নারীদের মুখমণ্ডল ও শরীরের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, একই সাথে তা তাঁদের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকারের সাথেও সম্পর্কিত। পর্দাকে কখনোই “ আওরাতের পর্দা” হিসেবে আদেশ করা হয়নি। পর্দাকে সম্মানের প্রতীক, ইসমাতের চাদর এবং সম্মানের ইহরাম হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। ঘরের মধ্যে নারীরা যে অংশে অবস্থান করেন সেই অংশকে হেরেম বলার কারণ হল হুরমাত বা  সম্মানের কারণে। কাবাকে যে উদ্দেশ্যে হারাম বলা হয়ে থাকে, নারীরা যে ঘরে অবস্থান করে সেই ঘরকেও এজন্যই হারাম বা হারেম বলা হয়ে থাকে”।</p>
<p>সংক্ষেপে বলতে গেলে উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ মতে ইসলামের পর্দার বিষয়টি সকলের জন্যই আবশ্যকীয়। যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই পরিগ্রহ করে থাকে। হায়া ও সতীত্বকে রক্ষা করা এবং এ চেতনাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব শুধুমাত্র নারীদের-ই নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপরেই এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য সেটা পর্দার সীমা ও পরিসীমার সাথে সম্পর্কিত। যেমনটা আয়াতের ধারাবাহিকতায় এসেছে, “  وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِهِنَّ / তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে”।<a href="#_ftn12" name="_ftnref12"><sup>[12]</sup></a> এ আদেশের মাধ্যমে হিজাবকে নারীদের জন্য পর্দার একটি পরিপূরক বিষয় হিসেবে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>পর্দার ব্যাপারে যে ফিকহী দৃষ্টিকোণ রয়েছে তাঁর মধ্যে অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার সম্পর্ক। প্রথমত আমি বলতে চাই যে, মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার যে সম্পর্ক, তা মালিকানার কোন সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্ক হল আমানতের সম্পর্ক। আধুনিক সময়ে আমরা একটি কথা অনেক বেশী শুনে থাকি, সে কথাটি হলো, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”। এটাকে অনেক সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে  ব্যক্তি স্বাধীনতা হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সাথে তাঁর রবের যে মিসাক (চুক্তি) তাঁর মধ্যে অন্যতম একটি হলো আমানতের চুক্তি (মিসাক)। এ মিসাক বা চুক্তি অনুযায়ী সকল কিছুকেই মানুষের নিকটে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজগতের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্ক প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা মালিকানার সম্পর্ক নয়। মানুষের সাথে মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক সে সম্পর্ক হলো আমানতের সম্পর্ক। ফলশ্রুতিতে শরীর আমাদের মালিকানাধীন কোন বিষয় নয়, আমাদের নিকট আমানত।</p>
<p>এ মিসাকের  (চুক্তি) মাধ্যমে আমরা সাক্ষ্য দিয়ে থাকি যে আমরা আমাদের শরীরের উপর আধিপত্য ও প্রভুত্ব কায়েম করব না। আমরা বুঝতে পারব যে, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”, এ কথা বলার অধিকার আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি উপলব্ধি করতে পারব যে, আমি আমাকে অন্যের সামনে একটি পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারি না। এই মিসাক আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমার শরীর হল আমার নিকট রাখা একটি আমানত এবং কোন অবস্থাতেই আমি এই আমানতের খেয়ানত করতে পারি না। যেমনটা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন,</p>
<blockquote><p> “ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَخُوۡنُوا اللّٰهَ وَ الرَّسُوۡلَ وَ تَخُوۡنُوۡۤا اَمٰنٰتِکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ</p>
<p>তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, আর যে বিষয়ে তোমরা আমানাত প্রাপ্ত হয়েছ তাতেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না”। <a href="#_ftn13" name="_ftnref13"><sup>[13]</sup></a></p></blockquote>
<p>পর্দার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অপর একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পর্দাকে এমনভাবে তুলে ধরা যা নারীদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই ক্ষেত্রে “ নারীদের আওয়াজ হলো আওরাত, তাঁদের মুখমণ্ডল ও হাত-পা হলো আওরাত” এ ধরণের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবের বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। <strong>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে , “وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا / তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে” এই কথা বলার পরেও, এবং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবু বকরের (রা) কন্যা, হযরত আসমার (রা) উপর ভিত্তি করে নারীদের পর্দার সীমানাকে উম্মতের সামনে সুস্পষ্ট করে দেওয়ার পরেও<a href="#_ftn14" name="_ftnref14"><sup>[14]</sup></a> বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে কিছু কিছু আঞ্চলিক পোশাকের উপর ভিত্তি করে জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার মত প্রান্তিক চিন্তাকে মেনে নেওয়া হয়েছে।</strong> অথচ নারীদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী রেখে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা পর্দার উদ্দেশ্য নয়। পর্দার উদ্দেশ্য হলো নারীগণ যেন নিরাপত্তা ও শালীনতার সাথে সমাজের সকল স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং নর ও নারী উভয়ের জন্যই এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে তাঁরা মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালো কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করা এবং দ্বীনের রহমত ও হিকমতকে প্রচারের দায়িত্ব নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উভয়কেই দিয়েছেন। মহান প্রভুর ভাষায়ঃ</p>
<blockquote><p>وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ یُطِیۡعُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ</p>
<p>অর্থাৎ “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা নামাজ আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।আল্লাহ শীঘ্রই এদের উপর দয়া (মারহামাত) করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।</p></blockquote>
<h5><strong>৪</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>দৃষ্টিভঙ্গী</strong></h5>
<p>প্রথমত এই বিষয়টি সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, দ্বীন ইসলামে আখলাক ফিতরাতের থেকে, কালাম কিংবা ফিকহ থেকে আলাদা বিভাগে অবস্থানকারী কোন বিষয় নয়। জোর দিয়ে বলতে চাই যে, “ কোন কিছু  আখলাকী” এর অর্থ মোটেই এই নয় যে তা ঐচ্ছিক একটি বিষয়”। কোন কিছু আখলাকী এর অর্থ হলো, তা আবশ্যক একটি বিষয়। যারা আখলাককে ‘হলেও চলবে না হলেও চলবে’ এমন একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন তাঁরা মূলত দ্বীনের মধ্যে আখলাকের অবস্থানকে নির্ণয় করতে পারেন না। কেননা ইসলামে আখলাক পরিপূর্ণতাদানকারী কোন বিষয় নয়, আখলাকের বিষয়টি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। অনুরূপভাবে একথা বলাও সম্ভবপর নয় যে, দ্বীন ও আখলাক আলাদা আলাদা বিষয়। দ্বীন থেকে আখলাককে আলাদা করে ফেলার অর্থ হল, স্বয়ং দ্বীনকেই আলাদা করে ফেলা। দ্বীন ও আখলাক যেমন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ অনুরূপভাবে দ্বীনের আহকাম কেও আখলাক থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা যায় না। কেননা, <strong>“ الاخلاق عقل الأحكام / আখলাক হলো, আহকামের আকল”। </strong> পর্দার আখলাকী ভিত্তি হলো হায়া। আমরা অনেকেই মনে করে থাকি যে, হায়া মানে হল লজ্জাশীলতা, আসলে তা নয়। হায়ার অর্থ আরও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। হায়া ও হায়াত একই উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে। হায়ার অপর নাম হল হায়াত। হায়া অনেকটা তাকওয়ার মত আল্লাহর প্রতি দায়িত্বানুভূতির চেতনা। হায়া স্বয়ং কল্যাণ।<a href="#_ftn15" name="_ftnref15"><sup>[15]</sup></a> হায়া হল কুল্লি একটি আখলাক। কুৎসিত, অসুন্দর ও  বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং ভাল, সুন্দর ও সঠিককে মেনে চলার নাম হল হায়া। হায়া হল এমন এক চেতনার নাম, যে চেতনা আমাদেরকে খারাপের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহ যে আমাদের সব কিছুই দেখছেন এ বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দিবে। অপরদিকে পর্দা ও হিজাব মানুষের হায়াকে লালিত করে। আর রূহ এখান থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। রূহ হল পানির মত। যে পাত্রে যায় এই পাত্রের-ই আকার ধারণ করে।</p>
<p>রাসূলে আকরাম  (স) একটি হাদীসে হায়াকে, ইসলামের মূল আখলাক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, <strong>“ إنَّ لِكُلِّ دينٍ خُلُقًا، وإنَّ خُلُقَ الإسلامِ الحياءُ / প্রতিটি দ্বীনের-ই মৌলিক একটি আখলাক রয়েছে। ইসলামের মূল আখলাক হল হায়া”।<a href="#_ftn16" name="_ftnref16"><sup>[16]</sup></a></strong> এর আলোকে হায়া শুধুমাত্র একটি মূল্যবোধের নাম নয়। হায়া হল মূল্যবোধ উৎপাদনকারী কুল্লি একটি আখলাকের নাম।</p>
<p>রাসূল (স) হায়া ও ঈমানকে একে অপরের থেকে আলাদা কোন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি বলেন,</p>
<blockquote><p>الحياء شعبة من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের একটি শাখা।<a href="#_ftn17" name="_ftnref17"><sup>[17]</sup></a></p>
<p>الحياء من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের অংশ।<a href="#_ftn18" name="_ftnref18"><sup>[18]</sup></a></p>
<p>الحياءُ والإيمانُ قرناءُ جميعًا فإذا رُفِع أحدُهما رُفِع الآخرُ</p>
<p>অর্থঃ ঈমান ও হায়া হলো ভাইয়ের মত। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।<a href="#_ftn19" name="_ftnref19"><sup>[19]</sup></a></p></blockquote>
<p>রাসূলে করীম (সঃ) হায়াকে অন্য একটি হাদীসে সকল পয়গাম্বর কর্তৃক আনীত অভিন্ন একটি মূল্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<blockquote><p>إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحى فاصنعْ مَا شئْتَ</p>
<p>অর্থাৎ, সমগ্র মানবতা, প্রথম দিন থেকে এমন একটি কথা জানেন যে কথার ব্যাপারে সকল পয়গাম্বর ঐকমত্য পোষণ করেছেন সেটা হলো, যদি হায়া না থাকে তাহলে যা ইচ্ছা তাই করতে পার।<a href="#_ftn20" name="_ftnref20"><sup>[20]</sup></a></p></blockquote>
<h5>৫। <strong>পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>দ্বীনের প্রতিটি হুকুমের-ই নান্দনিক বা সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। ইসলামের প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রেই আল্লাহর জামাল নামের একটি প্রতিফলন দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন শাহাদাতের চেতনার অধিকারী হয় তখন সে এমন এক অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনে যা তাঁকে প্রতিমুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছে। আখলাকী মূল্যবোধ ও দ্বীনের বিধানসমূহকে শুধুমাত্র কামাল (পরিপূরক) হিসেবেই নয়; জামাল হিসেবেও দেখে থাকে এবং এই জামাল মানুষের মধ্যে জ্ঞান, হিকমত, মারেফত ও মুহাব্বতে রূপান্তরিত হয়।</p>
<p>পর্দার দায়িত্ব শুধুমাত্র শরীরকে ঢেকে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার একই সাথে নান্দনিক ও সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, <strong>“ قَدۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکُمۡ لِبَاسًا یُّوَارِیۡ سَوۡاٰتِکُمۡ وَ رِیۡشًا / আমি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার ও শোভা বর্ধনের জন্য তোমাদের পোশাক পরিচ্ছদের উপকরণ অবতীর্ণ করেছি”।</strong> এই আয়াতের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষের জন্য পর্দার একই সাথে  সৌন্দর্যগত একটি দিকও রয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত رِیۡشً/রিশ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল পাখির পালক। <strong>কোরআনের ভাষায় রিশ দ্বারা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার সর্বোচ্চ চূড়া বুঝানো হয়ে থাকে।</strong> ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর ভাষায়, رِیۡشً/রিশ হল পর্দার সৌন্দর্যগত দিক। অর্থাৎ رِیۡشً/রিশ যিনাতেরও উপরের একটি সৌন্দর্যকে বুঝিয়ে থাকে। তবে কোরআনে রিশ শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই নয়, আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকেও ব্যক্ত করে থাকে। অপর একটি আয়াতে মহান রব কাবা ঘরকে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকারী জাহেলী সমাজকে এই অবস্থা থেকে বিরত রাখার জন্য বলেছেন, <strong>“یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ / হে আদম সন্তান! মসজিদে যাওয়ার সময় সাজসজ্জা করো”। <a href="#_ftn21" name="_ftnref21"><sup>[21]</sup></a></strong> এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে লঙ্ঘন না করা। তাছাড়া এখানে নির্দিষ্ট কোন অবয়ব কিংবা পোশাকের কথা বলা হয়নি। অন্যথায় আবহাওয়া ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে পোশাক আশাকে ভিন্নতা একটি রহমত স্বরূপ। ইসলাম পোশাকে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন পোশাক বা ধরণ চাপিয়ে দেয়নি। ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে মেনে চলার পরও যদি কেউ কারোর উপর পোশাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ধরণকে চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেটা হবে এই রহমতকে লঙ্ঘন করার শামিল।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের ভাষায় দুই ধরণের সৌন্দর্য রয়েছে। একটি হল <strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong> অপরটি হলো <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>।</p>
<p><strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>, তার নামকে তিনি রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে ( Roman Mythology)<a href="#_ftn22" name="_ftnref22"><sup>[22]</sup></a> আলোচিত প্রেম, সৌন্দর্য ও কামনার দেবী ভেনাস থেকে নিয়েছেন। আর সেটা গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে (Greek Mythology) আলোচিত আফ্রোদিতি থেকে এসেছে। এটার দ্বারা শুধুমাত্র শারীরিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর এর উৎস হলো জাগতিক আবেগ ও অনুভূতি। এটা শুধুমাত্র আবেগকে উদ্বেলিত করে থাকে, প্রভাবিত করে, কিন্তু প্রতারণামূলক। <strong>মানুষকে</strong> <strong>বস্তুগত জগৎ</strong> <strong>ও</strong> <strong>বাহ্যিকতার</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বন্দী</strong> <strong>করে</strong> <strong>ফেলে</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>অপরটি</strong> <strong>হল</strong> <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong><strong>।</strong> এই সৌন্দর্যের নামকে তিনি হযরত ইউসুফ (আ) থেকে নিয়েছেন। ইউসুফী সৌন্দর্যের ভিত্তি হল, শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রূহী সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দের চেয়ে চোখের নূর ও কালবের প্রশান্তি রয়েছে। এই সৌন্দর্য শুধুমাত্র বাসারকেই (দৃষ্টিকেই) নয়, বাসিরাতকেও (দূরদৃষ্টি) উদ্দেশ্য করে কথা বলে। প্রভাবিত করে কিন্তু প্রতারিত করে না। মানুষকে সুন্দর ও নান্দনিকতার দিকে পরিচালিত করে। হাদীসের ভাষ্য মতে, <strong>“إنَّ اللهَ جميلٌ يُحبُّ الجمالَ / আল্লাহ তায়ালা সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন”।<a href="#_ftn23" name="_ftnref23"><sup>[23]</sup></a></strong></p>
<p>সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ব্যাখ্যানুসারে হযরত ইউসুফের তিনটি পোশাক পর্দার তিনটি ধরণ ও তিন বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে।</p>
<p>প্রথমটি হল মিথ্যাবাদী পোশাক। ‘ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে’ এই কথা বলার জন্য ইউসুফ (আ) এর ভাইয়েরা তাঁদের বাবার নিকট রক্তমাখা যে পোশাক নিয়ে যায় এই পোশাক। “ وَ جَآءُوۡ عَلٰی قَمِیۡصِهٖ بِدَمٍ کَذِبٍ ؕ / আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল”।<a href="#_ftn24" name="_ftnref24"><sup>[24]</sup></a></p>
<p>দ্বিতীয় পোশাক হলো, ছেঁড়া পোশাক কিন্তু সেই শার্ট সামনে থেকে নয়, বরং পেছন থেকে ছেঁড়া ছিলো। সে পোশাক ছিলো এমন পোশাক যা তাঁর পরিধানকারীকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে হায়া’র দিকে ধাবিত করেছিলো। “وَ اِنۡ کَانَ قَمِیۡصُهٗ قُدَّ مِنۡ دُبُرٍ فَکَذَبَتۡ وَ هُوَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ  / আর তার জামা যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয় তাহলে সে (মহিলা) মিথ্যা বলেছে এবং সে (পুরুষ) হচ্ছে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত”।<a href="#_ftn25" name="_ftnref25"><sup>[25]</sup></a></p>
<p>তৃতীয় পোশাক হলো, অন্ধ চোখকে উন্মীলিতকারী পোশাক। এ পোশাকের আধ্যাত্মিক একটি ঘ্রাণ ও সুন্দর একটি দিক রয়েছে। যা চোখকে খুলে দেয় এবং বাসিরাতকে (দূরদৃষ্টি) বৃদ্ধি করে। এর ঘ্রাণ এমনকি হযরত ইয়াকুবের অন্ধ হয়ে যাওয়া চক্ষুকে খোলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিলো। আর এটা হল এমন জামা যা চক্ষুকে উম্মুক্ত করে দেয় এবং বাসিরাতকে লালিত করে। <strong>“اِذۡهَبُوۡا بِقَمِیۡصِیۡ هٰذَا فَاَلۡقُوۡهُ عَلٰی وَجۡهِ اَبِیۡ یَاۡتِ بَصِیۡرًا / তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও, অতঃপর সেটি আমার পিতার চেহারায় স্পর্শ করাও। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন”। <a href="#_ftn26" name="_ftnref26"><sup>[26]</sup></a></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি জানি যে সকল বিষয়ের মত পর্দা নিয়েও তোমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আর এর পেছনে অনেক অভ্যন্তরীণ ও বহির্গত কারণ রয়েছে সেটাও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে নয়। আমাদের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনাসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের এই সকল জেরা ও জিজ্ঞাসাসমূহ যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং আমাদেরকে আমাদের রবের দিকে ধাবিত করে। অন্যথায় এসকল জিজ্ঞাসা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর অন্য কোনকিছু বয়ে আনবে না। যেসকল আত্মজিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণ আমাদের মূল্যবোধকে বিনাশ করে দেয় তা সঠিক কোন জিজ্ঞাসা বা বিশ্লেষণ হতে পারে না।</p>
<p>হিজাব কিংবা পর্দাকে ছেড়ে দেওয়া শুধুমাত্র হিজাব ও পর্দাকে ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। কেননা পর্দা হলো মহান প্রভুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার একটি বহিঃপ্রকাশ। পর্দা মানুষকে তার অবস্থান সম্পর্কে  সচেতন করে তুলে এবং মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ একটি জীবনধারা অর্জনে সাহায্য করে। আর এ ক্ষেত্রে শুধু পর্দা করলে কিংবা হিজাব পরিধান করলেই হবে না, আমি কেন পর্দা করি, কেন হিজাব পড়ি এই বিষয়কে কোরআনের আলোকে জানতে হবে এবং আল্লাহর আখলাককে আখলাকাসম্পন্ন হতে হবে। আমরা যদি এই চেতনাকে ধারণ পর্দা করতে পারি তখন-ই কেবলমাত্র আমাদের নিজেদেরকে ইস্তেকামাতের পথে দৃঢ় রাখতে পারবো।</p>
<p>সমাজবিজ্ঞানে হাবিটাস (Habitus) নামে একটি পরিভাষা রয়েছে। হাবিটাস (Habitus)  ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিতকারী এবং আমরা যে সমাজে বসবাসকরী সেই সামাজিক জীবন। বিগত শতাব্দী পর্যন্ত  হাবিটাস (Habitus) ছিল পর্দার প্রভাবাধীন, অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ-ই পর্দা করত। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে এই হাবিটাস (Habitus)- এ পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষ পর্দাকে পরিত্যাগ করে শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমি জানি আমাদের তরুণ-তরুণীরা স্বাধীনতাকে অনেক বেশী পছন্দ করে। তবে নফসের নিকট আত্মসমর্পণ করার নাম স্বাধীনতা নয়। অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনুসরণ করে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোকে মেনে  জীবন পরিচালনা করাকেও স্বাধীনতা বলে না। সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো, আমাদের উপর বৈশ্বিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই সকল হাবিটাস (Habitus)- এর নিকটে আত্মসমর্পণ না করা</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> সূরা আরাফ, ১৯-২৩।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> আরাফ, ২৬।</p>
<p><a href="#_ftnref3" name="_ftn3">[3]</a> বালাদ, ৭</p>
<p><a href="#_ftnref4" name="_ftn4">[4]</a> হাদিদ, ৪</p>
<p><a href="#_ftnref5" name="_ftn5">[5]</a> বাকারা, ১১৫।</p>
<p><a href="#_ftnref6" name="_ftn6">[6]</a> আরাফ, ১৭২।</p>
<p><a href="#_ftnref7" name="_ftn7">[7]</a> বুরুজ, ৭।</p>
<p><a href="#_ftnref8" name="_ftn8">[8]</a> আওরাত বলতে আমাদের ভাষায় মেয়েলোক বা নারী জাতি বুঝায়। কিন্ত আরবী ভাষায় এর মানে হয় বাধা ও বিপদের জায়গা এবং যে জিনিসের খুলে য়াওয়া মানুষের জন্য লজ্জার ব্যাপার এবং যার প্রকাশ হয়ে পড়া তার জন্য অস্বস্তিকর হয় এমন জিনিসের জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া কোন জিনিসের অসংরক্ষিত হওয়া অর্থেও এর ব্যবহার হয়। (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref9" name="_ftn9">[9]</a> নূর, ৩০।</p>
<p><a href="#_ftnref10" name="_ftn10">[10]</a> নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref11" name="_ftn11">[11]</a> বাকারা, ১৮৭।</p>
<p><a href="#_ftnref12" name="_ftn12">[12]</a> সূরা নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref13" name="_ftn13">[13]</a> আনফাল, ২৭।</p>
<p><a href="#_ftnref14" name="_ftn14">[14]</a> আবু দাউদ, লিবাস, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref15" name="_ftn15">[15]</a> মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ৩৭।</p>
<p><a href="#_ftnref16" name="_ftn16">[16]</a> ইবনে মাজা, যুহুদ, ১৭।</p>
<p><a href="#_ftnref17" name="_ftn17">[17]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৮; নাসাঈ, ঈমান, ১৬।</p>
<p><a href="#_ftnref18" name="_ftn18">[18]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৯।</p>
<p><a href="#_ftnref19" name="_ftn19">[19]</a> হাকিম, <em>মুসতাদরাক</em><em>,</em> ৫৮।</p>
<p><a href="#_ftnref20" name="_ftn20">[20]</a> বুখারী, আদব, ৭৮।</p>
<p><a href="#_ftnref21" name="_ftn21">[21]</a> আরাফ, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref22" name="_ftn22">[22]</a> Venus is a Roman goddess, whose functions encompass love, beauty, desire, sex, fertility, prosperity, and victory. In Roman mythology, she was the ancestor of the Roman people through her son, Aeneas, who survived the fall of Troy and fled to Italy. Julius Caesar claimed her as his ancestor. Venus was central to many religious festivals and was revered in Roman religion under numerous cult titles. (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref23" name="_ftn23">[23]</a> মুসলিম, ঈমান, ১৪৭।</p>
<p><a href="#_ftnref24" name="_ftn24">[24]</a> ইউসুফ, ১৮।</p>
<p><a href="#_ftnref25" name="_ftn25">[25]</a> ইউসুফ,২৭ ।</p>
<p><a href="#_ftnref26" name="_ftn26">[26]</a> ইউসুফ,৯৩ ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15602</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের পর্যালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 06 Feb 2025 16:37:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15526</guid>

					<description><![CDATA[পূর্ণ মানব (আদর্শ মানব) কে, তা জানা একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যক্তির প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রতিটি মতাদর্শেই আদর্শ মানবের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়। যেহেতু আমরা ইসলামের পূর্ণ ও আদর্শ মানবের প্রতিকৃতি ও স্বরূপ জানতে চাই, সেহেতু প্রচলিত অন্য সব]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পূর্ণ মানব (আদর্শ মানব) কে, তা জানা একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যক্তির প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রতিটি মতাদর্শেই আদর্শ মানবের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়। যেহেতু আমরা ইসলামের পূর্ণ ও আদর্শ মানবের প্রতিকৃতি ও স্বরূপ জানতে চাই, সেহেতু প্রচলিত অন্য সব মতবাদের আদর্শ মানবের প্রকৃতির পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব। গত দিনের আলোচনায় বিভিন্ন মতবাদ সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি। আজকে আমাদের আলোচনা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ দিয়ে শুরু করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক</strong> <strong>মতবাদের</strong> <strong>সার</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সংক্ষেপ</strong></h4>
<p>প্রাচীন দার্শনিক ভাবনায় মানুষের অস্তিত্বের মূল বিষয় ছিল তার বুদ্ধিবৃত্তি। তাদের মতে, মানুষের আমিত্ব হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি বা আকল। যেমনভাবে মানবদেহ তার ব্যক্তিত্বের অংশ নয় তেমনিভাবে তার আত্মিক ও মানসিক শক্তি ও ক্ষমতা তার ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সত্তা নয়। মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল হলো তার চিন্তা করার শক্তি ও ক্ষমতা, মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো যা দ্বারা সে চিন্তা করে।</p>
<p>মানুষ যা দ্বারা চোখে দেখে তা চিন্তার একটি উপকরণ মাত্র, তেমনি যা দ্বারা কল্পনা করে, যা দ্বারা চায়, যা দ্বারা ভালোবাসে বা মানুষ যে সত্তার কারণে জৈবিক চাহিদার অধিকারী, এ সবই চিন্তা সত্তার একেকটি উপকরণ। মানব সত্তার মৌল উপাদান তার চিন্তাশক্তি। তাই পূর্ণ মানব তিনিই, যিনি চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌছেছেন। চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌছার অর্থ বিশ্ব ও অস্তিত্বজগতকে ঠিক যে রূপে আছে সে রূপেই উদঘাটন করা ও জানা।</p>
<p>এ মতবাদ বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলকে মানব সত্তার মৌল উপাদান বলে জানে। এ ছাড়াও বিশ্বাস করে যে, বুদ্ধিবৃত্তি বা চিন্তা-শক্তির দ্বারা বিশ্বকে তার প্রকৃত রূপে উদঘাটন করা সম্ভব। আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি অস্তিত্বজগতকে তার আসল রূপে নিজের মধ্যে প্রতিফলিত করার ক্ষেত্রে সক্ষম। ঠিক আয়নার মত বিশ্বজগৎ তার প্রকৃত রূপ নিয়ে এতে প্রতিফলিত হয়।</p>
<p>ইসলামের দার্শনিক সমাজে যারা এ ধারণাকে গ্রহণ করেছেন তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ও কোরআনের আলোকে ঈমান বলতে বিশ্বকে ঠিক যেমনভাবে আছে তেমনভাবে জানার কথাই বোঝানো হয়েছে। ঈমান অর্থ বিশ্বজগতের স্রষ্টা, বিশ্বে বিরাজমান শৃঙ্খলা, প্রচলিত বিধান, বিশ্বের গতি ও লক্ষ্য এগুলোকে জানা। তাঁরা বলেন, কোরআনে যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, বিশ্বজগৎ আল্লাহর সৃষ্টি এ বিষয়ে বিশ্বাস, আল্লাহ্ বিশ্বজগতকে লক্ষ্যহীন ছেড়ে দেননি, বরং একে হেদায়েত ও পরিচালনা করছেন, যেমন নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত করছেন তা জানা, সবকিছু আল্লাহ্ থেকে এসেছে এবং তাঁর প্রতিই প্রত্যাবর্তনকারী প্রভৃতি- এ বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো বিশ্বজগতকে তার প্রকৃতরূপে জানা। তাঁরা ঈমানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ঈমান জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ব্যতীত কিছু নয়। অবশ্য তাঁদের এ প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের অর্থ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা আংশিক জ্ঞান নয়, বরং এ জ্ঞান দার্শনিক ও প্রজ্ঞাগত। দার্শনিক জ্ঞানের অর্থ বিশ্বের উৎপত্তি ও পরিসমাপ্তি, অস্তিত্বের ধারা ও পর্যায়কে সামগ্রিকভাবে জানা ও উদঘাটন করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>এ</strong> <strong>মতাদর্শের</strong> <strong>বিপরীত</strong> <strong>মতবাদ</strong></h4>
<p>এ মতাদর্শ যা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ বলে আমরা উল্লেখ করেছি এর বিপরীতে বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে যেগুলো এ মতবাদের বিরোধী ও সমালোচক। মুসলিম বিশ্বে প্রথম যে মতবাদটি এ মতবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সেটা হলো ইশরাকী-সূফী-খোদাপ্রেমী মতবাদ। এরপর রয়েছে আহলে হাদীসের অনুসারীরা। শিয়াদের মধ্যে আখবারী এবং সুন্নীদের মধ্যে হাম্বলী ও আহলে হাদীসগণ আকলের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের অস্বীকার করেছে। তাঁরা বলছেন, দার্শনিকরা আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপারে যত বেশি গুরুত্ব দেয় আকলের গুরুত্ব এত অধিক নয়।</p>
<p>এদের থেকেও ইন্দ্রিয়বাদীরা বর্তমান সময়ে বুদ্ধিবৃত্তির চরম সমালোচক। বিগত তিন-চার শতক ধরে ইন্দ্রিয়বাদীদের জয়-জয়কার। তাদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিকে যতটা মূল্য দেয়া হচ্ছে, তা এতটা মূল্যের অধিকারী নয়। আকলের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই, বরং আকল ইন্দ্রিয়ের অনুগত। মানবের মূল তার ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতিসমূহ। আকল খুব বেশি হলে যা করতে পারে তা হলো ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের উপর কাজ করা। যেমন কোনো কারখানার কথা যদি আমরা চিন্তা করি, সেখানে কাঁচামাল প্রবেশ করে, তারপর কারখানার মেশিনের মধ্যে তা মিশ্রিত হয়ে বিভিন্ন রুপ ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ কাপড় বুনন কারখানায় প্রথমে তুলা থেকে সুতা বের করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে বুননের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাপড়ের আকৃতি দেয়া হয়। তেমনি আকল মেশিনের মতো শুধু ইন্দ্রিয়লব্ধ কাঁচামালকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট আকৃতি দেয়। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ তার নিজের স্থানে এখনও অটল। এখানে আমরা অবশ্য সে বিষয়ে আলোচনা করব না, বরং এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করার চেষ্টা করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইসলামে</strong> <strong>বুদ্ধিবৃত্তির</strong> <strong>মৌলিকত্ব</strong></h4>
<p>বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদে কয়েকটি বিষয় আছে যার প্রতিটিকে যাচাই করে দেখব যে, সেগুলো ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা। প্রথম বিষয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও জ্ঞানের মৌলিকত্ব। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও জ্ঞানের অর্থ হলো আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি বিশ্বের বাস্তবতাকে আবিষ্কার করার ক্ষমতা রাখে এবং এ জ্ঞান মৌলিক, নির্ভরযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ।</p>
<p>অনেক মতবাদই বুদ্ধিবৃত্তির এরূপ ক্ষমতা ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী নয়। এখন আমরা দেখব ইসলামী উৎসগুলো থেকে আমাদের নিকট এ ধরনের দলিল-প্রমাণ রয়েছে কিনা যে, বুদ্ধিবৃত্তির এরূপ ক্ষমতায় আমরা বিশ্বাসী হতে পারি। ঘটনাক্রমে আমাদের হাতে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত দলিল রয়েছে যাতে আমরা বলতে পারি, ইসলামের মতো কোনো মতাদর্শেই আকলকে এত অধিক পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়নি বা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আকলকে অন্য কোন ধর্মেই ইসলামের মতো গুরুত্ব দেয়া হয়নি।</p>
<p>আপনি খ্রিষ্টধর্মকে ইসলামের সঙ্গে তুলনা করে দেখুন, খ্রিষ্টধর্ম ঈমানের দৃষ্টিতে আকলে প্রবেশের বিরোধী। তাদের মতে, মানুষ যখন কোনো কিছুর উপর ঈমান আনবে তখন এর উপর চিন্তা করার অধিকার তার নেই। চিন্তা যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তির কাজ তাই বিশ্বাসগত বিষয়ে চিন্তার অবকাশ নেই। যে বিষয়ে ঈমান রাখতে হবে সে বিষয়ে চিন্তা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আকলকে &#8216;কি&#8217; ও &#8216;কেন&#8217; এ ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া যাবে না। একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি, বিশেষত চার্চের অধিপতির দায়িত্ব হলো ঈমানের গণ্ডিতে যুক্তি, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রবেশকে প্রতিহত করা। মূলত খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।</p>
<p>ইসলামের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক এর বিপরীত অবস্থা দেখি। ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়ে (উসূল) বুদ্ধিবৃত্তি ব্যতীত অন্য কিছুর প্রবেশ নিষিদ্ধ। যেমন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় আপনার ধর্মের একটি মৌলিক বিষয় বলুন। আপনি হয়তো বললেন, তাওহীদ (একত্ববাদ)। এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, কেন আপনি এক আল্লাহতে ঈমান এনেছেন? আপনাকে অবশ্যই এজন্য যুক্তি পেশ করতে হবে যেহেতু ইসলাম আকল ব্যতীত আপনার নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে না। যদি বলেন, &#8220;আমি এক আল্লাহয় বিশ্বাস করি, কিন্তু এর পেছনে কোন যুক্তি পেশ করতে পারব না। আমার দাদীমার থেকে শুনে আমি বিশ্বাস করেছি। অবশেষে এক সত্যে পৌঁছেছি যেভাবেই হোক দাদীমার কাছে শুনে অথবা স্বপ্ন দেখে।&#8221; ইসলাম বলে, &#8220;না, যদিও এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হও, কিন্তু এ বিশ্বাসের ভিত্তি স্বপ্ন বা পিতা- মাতার অন্ধ অনুকরণ অথবা পরিবেশের প্রভাবে হয়ে থাকে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।&#8221; কেবল চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর যুক্তির ভিত্তিতে যদি আপনি ঈমান আনয়ন করেন তবেই তা গ্রহণ করা হবে নতুবা নয়।</p>
<p>খ্রিষ্টবাদে ঈমানের গণ্ডিতে আকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটাই খ্রিষ্টবাদের ভিত্তি। একজন খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তির দায়িত্ব হলো এই গণ্ডিতে আকল ও চিন্তার প্রবেশকে রোধ করা। ইসলামে ঈমানের গণ্ডিতে আকলের স্থান সংরক্ষিত। আকল ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর এ গণ্ডিতে প্রবেশাধিকার নেই।</p>
<p>ইসলামের উৎসসমূহে অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহতে আকলকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন দেখা যায়। প্রথমত কোরআন সব সময়ই বুদ্ধিবৃত্তির প্রশংসা করেছে। তদুপরি আমাদের হাদীস গ্রন্থসমূহেও বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব ও মৌলিকত্ব এতটা প্রকট যে, এ গ্রন্থসমূহ খুললেই দেখা যায়, তাতে প্রথম অধ্যায় হিসেবে কিতাবুল আকল এসেছে এবং এ অধ্যায়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তির পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে।</p>
<p>ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) আকল সম্পর্কিত একটা আশ্চর্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, &#8220;আল্লাহপাকের দু&#8217;টি হুজ্জাত (দলিল) রয়েছে। এ দু&#8217;টি হুজ্জাত হচ্ছে দু&#8217;টি নবী। একটি অভ্যন্তরীণ নবী বা আকল, দ্বিতীয়টি বাহ্যিক নবী অর্থাৎ আল্লাহ্র প্রেরিত পুরুষগণ যাঁরা নিজেরা মানুষ এবং অন্য মানুষদের দীনের দিকে দাওয়াত করেন। আল্লাহপাকের এ দু&#8217;টি হুজ্জাত একে অপরের পরিপূরক অর্থাৎ যদি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি থাকে, কিন্তু পৃথিবীতে কোনো নবী প্রেরিত না হয়, তবে মানুষের পক্ষে সফলতার পথ অতিক্রম করা সম্ভব হবে না। তেমনি যদি নবী থাকেন, কিন্তু মানুষ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী না হয় তাহলেও সে সাফল্য লাভ করতে পারবে না। আকল ও নবী একসঙ্গে একই দায়িত্ব পালন করে।&#8221; এর চেয়ে উত্তমরূপে আকলকে সম্মানিত করা ও পৃষ্ঠপোষকতা দান আর কোনভাবে সম্ভব কি?</p>
<p>এ ধরনের বর্ণনা ও রেওয়ায়েত সম্ভবত আরো শুনে থাকবেন। যেমনঃ</p>
<blockquote><p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>নিদ্রা</em> <em>অজ্ঞের</em> <em>ইবাদত</em> <em>হতে</em> <em>উত্তম</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>খাদ্যগ্রহণ</em> <em>মূর্খের</em> <em>রোযা</em> <em>অপেক্ষা</em> <em>উত্তম</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>নিরবতা</em> <em>অজ্ঞের</em> <em>কথা</em> <em>হতে</em> <em>শ্রেয়</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>আল্লাহ্</em> <em>কোনো</em> <em>নবীকেই</em> <em>তাঁর</em> <em>আকল</em> <em>পূর্ণতায়</em> <em>পৌছা</em> <em>ও</em> <em>সমগ্র</em> <em>উম্মত</em> <em>থেকে</em> <em>তাঁর</em> <em>বুদ্ধিবৃত্তি</em> <em>উচ্চতর</em> <em>হওয়ার পূর্বে প্রেরণ</em> <em>করেননি</em><em>।’ </em><em> </em></p></blockquote>
<p>আমরা রাসূল (সা.)-কে বুদ্ধিবৃত্তির সমগ্র রূপ বলে জানি। আমাদের এ ধারণা খ্রিষ্টবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যশীল। যেহেতু তারা বুদ্ধিবৃত্তি থেকে দীনকে পৃথক বলে জানে। কিন্তু আমরা আমাদের নবীকে আকলের পরিপূর্ণ রূপ মনে করি।</p>
<p>সুতরাং জ্ঞান ও প্রামাণ্যের ক্ষেত্রে আমরা আকলকে দলিল বলে জানি এ অর্থে যে, বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে বাস্তব জ্ঞান ও পরিচয় লাভ সম্ভব। দার্শনিকদের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম সমর্থন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক</strong> <strong>মতবাদের</strong> <strong>দু</strong><strong>&#8216;</strong><strong>টি</strong> <strong>ত্রুটি</strong></h4>
<p>দার্শনিক মতে মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি। এ ছাড়া বাকী যা আছে সেগুলো অপ্রধান এবং এগুলো মাধ্যম বৈ কিছু নয়। শরীর আকলের জন্য যেমনি একটি মাধ্যম, তেমনি চোখ, কান, ধারণক্ষমতা, কল্পনাশক্তি ও অন্য যে সকল যোগ্যতা আমাদের মধ্যে বর্তমান সেগুলোও আমাদের মূল সত্তা ‘আকল’র একেকটি মাধ্যম।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো দলিল ইসলামে রয়েছে কি? না, এ ধরনের বক্তব্য যে, আমাদের মূল সত্তা শুধু আকল- এর সপক্ষে কোনো দলিল বা প্রমাণ ইসলামে নেই। ইসলাম এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে যে, আকল মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের একটি অংশ, তার সমগ্র অস্তিত্ব নয়।</p>
<p>দ্বিতীয় বিষয় হলো আমাদের অধিকাংশ দর্শনের গ্রন্থে ঈমানকে শুধু জ্ঞান বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, ইসলামে ঈমানের অর্থ বাস্তব পরিচিতি বা জ্ঞান। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ আল্লাহকে জানা, তদ্রূপ রাসূল (সা.)-কে জানা। ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের অর্থ ফেরেশতাদের পরিচয় লাভ, আখেরাতের প্রতি ঈমানের অর্থ আখেরাতের পরিচয় জানা। কোরআনে যেখানেই ঈমান এসেছে এর অর্থ বাস্তব জ্ঞান ও পরিচিতি ছাড়া আর কিছু নয়। এ বিষয়টি কোনক্রমেই ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। ইসলামে ঈমানের অর্থ শুধু পরিচিতি নয়, বরং এর চেয়ে বেশি কিছু। পরিচিতি অর্থ হলো জানা। যিনি পানিবিজ্ঞানী তিনি পানিকে চেনেন। যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী তিনি জ্যোতিষ্ক সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তদ্রূপ যিনি সমাজবিজ্ঞানী তিনি জানেন সমাজকে, যিনি মনোবিজ্ঞানী তিনি মনকে বোঝেন, যিনি প্রাণীবিজ্ঞানী তিনি প্রাণীদের সম্পর্কে জানেন অর্থাৎ এঁরা সবাই নিজেদের সম্পৃক্ত বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন। ঈমানও কি কোরআনে এরূপ জানা অর্থেই এসেছে? আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ কি শুধুই তাঁকে বোঝা ও অনুভব করা? না, এমন নয়। এটা ঠিক যে, পরিচয় লাভ ঈমানের শর্ত ও অংশ। পরিচিতি ব্যতীত ঈমান অর্থহীন, এটা সত্য, কিন্তু শুধু জানাও ঈমান নয়।</p>
<p>ঈমান এক প্রবণতা যার মধ্যে আনুগত্যের প্রবণতা রয়েছে, প্রেম ও ভালবাসার প্রবণতা রয়েছে, স্রষ্টার প্রতি আত্মনিবেদনের প্রবণতা রযেছে, কিন্তু জ্ঞানের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা অনুপস্থিত। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যোতিষ্কমণ্ডলী সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন- এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি জ্যোতিষ্কসমূহের প্রতি অনুরক্ত। তদ্রূপ একজন খনিজবিজ্ঞানী বা পানিবিজ্ঞানী- এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি খনিজ বা পানির প্রতি আসক্ত। বরং এ ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে যে, মানুষ কোনো বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, কিন্তু তা থেকে বিতৃষ্ণ। বিশেষত রাজনীতিতে শত্রুকে মানুষ নিজের থেকেও ভালোভাবে চেনে। উদাহরণস্বরূপ কোন ইসরাইলী হয়তো আরব ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ; হয়তো ইসলাম সম্পর্কেও তার জ্ঞান অত্যন্ত গভীর। ইসরাইলে মিশর, সিরিয়া, আলজেরিয়া বা ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুসলমানদের মধ্যকার এরূপ বিশেষজ্ঞ অপেক্ষা অনেক বেশি এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রশ্ন হলো এরূপ মিশর বিষয়ক ইসরাইলী বিশেষজ্ঞ কি মিশরের প্রতি আনুগত্যশীল? কখনই নয়। তদ্রূপ মিশরে কোন ইসরাইল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তো তিনি ইসরাইলের প্রতি অনুরক্ত নন, বরং তিনি হয়তো ইসরাইলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। (যেহেতু ইসরাইল আরবদের প্রতি শত্রুপরায়ণ সেহেতু আরবরাও তাদের প্রতি সন্দেহ পরায়ণ।)</p>
<p>আলেম সমাজ যে বলেন, “ঈমান অর্থ শুধু জ্ঞান অর্জন নয় (যা দর্শন দাবি করে)” এর সপক্ষে সর্বোত্তম প্রমাণ খোদ কোরআন। যেহেতু কোরআন ঐ সকল ব্যক্তিকে আমাদের নিকট পরিচিত করিয়েছে যারা আল্লাহ পাককে সবচেয়ে উত্তমরূপে চেনে, সে সকল নবী ও আউলিয়াকেও উত্তমরূপে চেনে, কিয়ামতকেও ভালোভাবে জানে, কিন্তু ঈমানদার নয় বরং কাফের। যেমন শয়তান। শয়তান কি আল্লাহকে চেনে না? শয়তান তো বস্তুবাদীদের মতো নয় যে, আল্লাহকে চেনে না, বরং সে আল্লাহকে চেনে, কিন্তু আল্লাহপাকের বিরোধী। শয়তান আমার বা আপনার থেকে অনেক ভালোভাবে আল্লাহকে চেনে। কয়েক হাজার বছর সে আল্লাহর ইবাদত করেছে। কোরআন আমাদের বলছে, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনো এবং আমরাও ঈমান এনেছি।</p>
<p>কিন্তু শয়তান কি ফেরেশতাদের চেনে না? না বরং সে ফেরেশতাদের চেনে, তাদের সঙ্গে সহস্র বছর এক সঙ্গে ছিল, আমাদের তুলনায় হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে সে উত্তমরূপে জানে। নবীদেরও তদ্রূপ খুব ভালোভাবে চেনে ও জানে। কিয়ামত সম্পর্কে আরো উত্তমরূপে জানে (এ কারণেই আল্লাহর নিকট কিয়ামত পর্যন্ত সময় চেয়েছে)। কিন্তু এত কিছু জানার পরেও কেন কোরআন তাকে কাফের বলে সম্বোধন করছে? কেন বলছে, &#8220;সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত&#8221;? (সূরা সোয়াদ: ৭৪)</p>
<p>যদি ঈমানের অর্থ শুধু &#8216;জানা&#8217; হতো (যেরূপ দর্শন বলছে), তাহলে শয়তান প্রথম মুমিন বলে পরিচিত হতো। কিন্তু জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সে মুমিন নয়। কারণ সে অস্বীকারকারী জ্ঞানী অর্থাৎ যদিও সে সত্যকে জানে তদুপরি তার বিরোধীতা করে এবং সেটার প্রতি আনুগত্যশীল নয়। সে এ সত্যের প্রতি রুজু করে না বা তার প্রতি ভালোবাসাও অনুভব করে না। ফলশ্রুতিতে সে দিকে সে ধাবিতও হয় না।</p>
<p>সুতরাং ঈমান কেবল &#8216;পরিচয়&#8217; নয়। এ জন্যই অনেক প্রজ্ঞাবান দার্শনিক সূরা ত্বীন-এর</p>
<blockquote><p>لَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ فِيٓ أَحۡسَنِ تَقۡوِيمٖ</p>
<p>ثُمَّ رَدَدۡنَٰهُ أَسۡفَلَ سَٰفِلِينَ</p>
<p>إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ</p></blockquote>
<p><strong>এ আয়াতের তাফসীর এভাবে করেছেন যে, إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ অর্থাৎ তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা ও وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ অর্থাৎ ব্যবহারিক প্রজ্ঞা। এটা ঠিক নয়। إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ -এর মধ্যে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা অপেক্ষা উচ্চতর অর্থ নিহিত রয়েছে। তবে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা তার অংশ ও ভিত্তি হলেও প্রজ্ঞা, অনুধাবন, জ্ঞান, পরিচয় ও জানাই পূর্ণ ঈমান নয়, বরং ঈমান জ্ঞান ও জানা-বুঝা থেকে বড় অন্য কিছু।</strong></p>
<p>এখানে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি বিষয় তুলে ধরেছি। <strong>প্রথমত</strong>, আকল প্রামাণ্য দলিল, আকল দ্বারা গৃহীত বিষয় বিশ্বাসযোগ্য এবং আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে সঠিক পরিচয় লাভ সম্ভব- এ বিষয়গুলো সত্য এবং ইসলাম তা গ্রহণ করে। <strong>দ্বিতীয়ত</strong> আকল মানুষের একক মূলসত্তা- ইসলাম এটাকে গ্রহণ করে না। <strong>তৃতীয়ত</strong> ঈমানের অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুধাবন, জানা ও পরিচয় লাভ ব্যতীত অন্যকিছু নয়- ইসলামের দৃষ্টিতে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ঈমানের</strong> <strong>মৌলিকত্ব</strong></h4>
<p>ঈমান ও পরিচয়কে একই জানি অথবা পরিচয়কে ঈমানের একাংশ জানি, এখন যে বিষয়টি আমাদের নিকট লক্ষণীয় তা হলো ঈমান ও পরিচিতির মৌলিকত্ব রয়েছে কি? নাকি মৌলিকত্ব নেই বরং এ দু&#8217;টি আমলের (কার্যের) পূর্বশর্ত মাত্র। এ ক্ষেত্রেও দু&#8217;টি বড় মতাদর্শের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>ঈমানের মৌলিকত্বের অর্থ কি? এর অর্থ ইসলাম যেভাবে ঈমানকে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছে তা এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে, ঈমান মানুষের আমলের বিশ্বাসগত ভিত্তি। অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীতে অবশ্যই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবে এবং কাজ করবে এবং এ চেষ্টা ও কার্যক্রম এক বিশেষ পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি অনুযায়ী হতে হবে যার ভিত্তি বিশেষ চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। অন্যভাবে বর্ণনা করলে যেহেতু মানুষ চায় বা না চায় তার সকল কর্মকাণ্ড চিন্তাগত এবং যদি সে তার ব্যবহারিক জীবনে নিজের উদ্দেশ্যে পৌঁছতে সঠিক একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে চায় তবে তা চিন্তা ও বিশ্বাসের বিশেষ ভিত্তি ব্যতীত সম্ভব নয়। এ কারণেই তাকে চিন্তা ও বিশ্বাসের একটি ভিত্তি দিতে হবে যাতে তার উপর ভিত্তি করে সে তার চিন্তার কাঠামো নির্মাণ করতে পারে। যেমন কোন ব্যক্তি যদি একটি দালান নির্মাণ করতে চায় তাহলে তার লক্ষ্য চার দেয়াল, ছাদ, দরজা-জানালা বিশিষ্ট ঘর নির্মাণ করা, কিন্তু সে এগুলো নির্মাণের পূর্বে ভিত্তি বা স্তম্ভ তৈরি করে যার বেশ কিছু অংশ মাটির নীচে গ্রোথিত করে যদিও এটি তার লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু সে এটা করে যাতে করে দালানের ভিত্তি মজবুত হয় এবং তা ভেঙ্গে না পড়ে। এজন্যই ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ কমিউনিজম কতগুলো চিন্তা ও বিশ্বাসের সমষ্টি যার ভিত্তি বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নৈতিকতা সম্পর্কিত মৌলিক কাঠামোটি বস্তুবাদের মৌলিক চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তির উপর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু একজন কমিউনিস্টের এটা লক্ষ্য নয় অর্থাৎ বস্তুবাদ তার লক্ষ্যও নয় এবং তার নিকট এর মৌলিকত্বেরও মূল্য নেই। (প্রকৃতপক্ষে যাঁরা বস্তুবাদের ফাঁদে পা দিয়েছেন তা গীর্জাসমূহের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাসমূহ, বিশেষত স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে যুক্তিহীন দ্বন্দ্বের কারণে। যার ফলে ইউরোপে এ চিন্তার উদ্ভব ঘটেছিল যে, হয় মানুষ স্বাধীন হয়ে সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ঈশ্বরকে দূরে ছুঁড়ে ফেলুক নতুবা নিজেকে অধিকারহীন ও বন্দি বলে জানুক। এর জন্য সর্বোত্তম পথ হিসেবে ধর্মের মূলোৎপাটনকে গ্রহণ করেছিল।)</p>
<p>কিন্তু সে চিন্তা করে (ভুল চিন্তা করে) বস্তুবাদ ব্যতীত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মৌল চিন্তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আর তা ব্যাখ্যা করার জন্যই বস্তুবাদের মৌলিক চিন্তাকে গ্রহণ করে। সম্প্রতি পৃথিবীতে কয়েকজন কমিউনিস্ট ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে যাঁরা বস্তুবাদকে কমিউনিজম থেকে পৃথক মনে করেন। তাঁরা বলেন, &#8220;আমাদের জন্য বস্তুবাদ কোন মৌলিকত্ব তো রাখেই না, বরং বস্তুবাদকে এক অখণ্ডনীয় মৌলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার কোন প্রয়োজনই নেই। আমরা কমিউনিজম চাই যদিও তাতে বস্তুবাদের অস্তিত্ব না থাকে।&#8221; বর্তমানে পৃথিবীর আনাচে কানাচে অনেক কমিউনিস্ট নেতাই ধর্মের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি পরিহার করার কথা বলছেন।</p>
<p>এটা এ কারণে যে, তাঁদের জন্য এ মৌল চিন্তার প্রতি বিশ্বাসের কোন মৌলিকত্ব নেই। এটা শুধু চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি ব্যতীত কিছু নয়। যেহেতু জীবনাদর্শ বিশ্বদৃষ্টি ব্যতীত সম্ভব নয় সেহেতু এ বিশ্বদৃষ্টিকে (বস্তুবাদ) দালানের নীচে স্থাপন করা হয় যাতে করে জীবনাদর্শ স্থাপিত ও অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো জীবনাদর্শ।</p>
<p>কিন্তু ইসলামে কিরূপ? ইসলাম কি ইসলামী বিশ্বাস, যেমন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস, নবী ও ওলীদের প্রতি বিশ্বাস, কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস এগুলোকে শুধু এজন্য বর্ণনা করেছে যে, চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে? ইসলাম কি এজন্য এ মৌল চিন্তাসমূহকে উপস্থাপন করেছে যাতে করে জীবনাদর্শকে এ মৌল চিন্তার উপর ভিত্তি করে স্থাপন করতে পারে এবং এটাই (জীবনাদর্শই) তার উদ্দেশ্য? যদি তা-ই হয় তবে এ মৌল চিন্তার (ঈমান) কোন মৌলিকত্ব নেই। না, এমনটি নয়। এ মৌল চিন্তা ইসলামী জীবনাদর্শিক চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি বটে, তবে তার মূল্য শুধু ভিত্তি হিসেবে নয়। ঈমান চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি এবং ইসলামী জীবনাদর্শ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ঈমান ভিত্তি হিসেবে মূল্য ছাড়াও মৌলিকত্বের অধিকারী ও লক্ষ্য হিসেবেও পরিগণিত।</p>
<p>সুতরাং এ ক্ষেত্রে দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক যে, ঈমান শুধু আমলের পূর্বশর্ত হিসেবে নয় বরং এর মৌলিকত্বের কারণে মূল্যের অধিকারী। এ রকম নয় যে, শুধু কর্ম ও প্রচেষ্টাই সব কিছু। বরং যদি আমল থেকে ঈমানকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, একটি ভিত্তিকে নষ্ট করা হলো। তেমনিভাবে যদি আমলকে ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় অন্য স্তম্ভটি ধ্বংস করা হলো। এজন্যই কোরআন সব সময় বলেছে, ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ &#8220;যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে।&#8221; যদি আমলহীন ঈমান হয়, তবে সেখানে সাফল্যের একটি স্তম্ভ আছে, অন্যটি অনুপস্থিত। অপর দিকে ঈমানহীন আমলও তদ্রূপ।</p>
<p>সাফল্যের তাঁবু একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানের সত্তাগত মূল্য ও মৌলিকত্ব রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের পূর্ণতা এ পৃথিবীতে এবং বিশেষত আখেরাতে এটাই যে, সে ঈমানের অধিকারী। কারণ ইসলামে আত্মা স্বাধীন এবং পূর্ণতার অধিকারী, তার মৃত্যু নেই। যদি আত্মা (ঈমানের মাধ্যমে) পূর্ণতায় না পৌঁছায়, অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত হয় তাহলে কখনই সফলতায় পৌছতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কোরআন</strong> <strong>ও</strong> <strong>নাহজুল</strong> <strong>বালাগাহ্</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>এর</strong> <strong>সপক্ষে</strong> <strong>দলিল</strong></h4>
<p>কোরআন এ বিষয়ে বলছে,</p>
<blockquote><p>وَمَن كَانَ فِي هَٰذِهِۦٓ أَعۡمَىٰ فَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ أَعۡمَىٰ وَأَضَلُّ سَبِيلٗا</p>
<p>&#8220;যে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে অন্ধ, আখেরাতেও সে অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।” (সূরা ইসরা: ৭২)</p></blockquote>
<p>ইমামগণ এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এর তাফসীরে বলেছেন, এর অর্থ এমন নয় যে, কারো বাহ্যিক এ চক্ষু পৃথিবীতে অন্ধ হলে আখেরাতেও সে অন্ধ থাকবে। যদি এরূপ হতো, তবে আবু বাসির যিনি ইমাম সাদিক (আ.)-এর একজন অন্ধ সাহাবী ছিলেন তিনি পরকালীন দুনিয়াতেও শোচনীয় অবস্থায় পড়বেন। না, বরং এর অর্থ হলো যে, কারো অন্তর্চক্ষু যদি সত্যকে, তার স্রষ্টাকে, মহান আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং অন্যান্য যে সব বিষয়ে ঈমান বা বিশ্বাস থাকা উচিত তা থেকে অন্ধ হয়, তবে সে আখেরাতে অন্ধ হিসেবে পুনরুত্থিত হবে, এর অন্যথা সম্ভব নয়। যদি ধরে নিই, এ পৃথিবীতে একজন মানুষ যত প্রকার ভালো কাজ করা সম্ভব তা করে, সৎকর্মের আদেশ ও অসৎকর্মের নিষেধের দায়িত্ব পালন করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দুনিয়াবিরাগী ব্যক্তির ন্যায় জীবন যাপন করে, সে সাথে নিজের জীবনকে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য নিবেদিত করে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না, পরকাল ও ইহকালকে চেনে না- এরূপ ব্যক্তি অন্ধ, তাই পরকালীন দুনিয়াতেও সে অন্ধ।</p>
<p>সুতরাং এটা ঠিক নয় যে, ঈমান শুধু চেষ্টা-প্রচেষ্টার পূর্ব প্রস্তুতি এবং ব্যক্তির আমল ঠিক হলেই চলবে, ঈমানের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের কথা অর্থহীন। ফখরে রাজী বলেন,</p>
<p>&#8220;আশংকা আমার,</p>
<p>চলে যাব বিশ্বের প্রাণ না দেখে,</p>
<p>চলে যাব বিশ্ব ছেড়ে বিশ্বকে না দেখে,</p>
<p>দেহের বিশ্ব ছেড়ে যাব মনের বিশ্বে ও প্রাণে,</p>
<p>দেহের বিশ্বে মনের বিশ্ব না দেখেই তাঁর পানে।&#8221;</p>
<p>অর্থাৎ আমার আশংকা এটি যে, এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, অথচ তা এ বিশ্বকে না দেখেই। তাঁর এ কথার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, বিশ্ব বলতে পৃথিবীর মাটি, পাহাড়, সমুদ্র, তারকারাজি আর ঘরবাড়ি বোঝাচ্ছেন এবং এ সব না দেখেই চলে যাওয়ার জন্য চিন্তিত, বরং তাঁর আশংকা হলো এখানে যে, তাঁর অন্তর্চক্ষু উন্মোচিত যদি না হয় তবে বিশ্বের প্রাণ, এর উৎস ও সৃষ্টিকর্তাকে অনুধাবন- যাকে ইসলাম ঈমান বলেছে তা না করেই এ বিশ্ব ছেড়ে চলে যাবেন। তিনি বলছেন, যদি এ দেহের বিশ্বে মনের বিশ্বকে অনুভব না করি, তবে যখন দেহের বিশ্ব ছেড়ে প্রাণ ও মনের বিশ্বে গমন করব তা কিরূপে অনুভব করব? যেখানে সম্ভব ছিল সেখানেই পারিনি, তাই আফসোস। এ দু&#8217;টি পঙতিতে কোরআনের উপরোক্ত এ আয়াতেরই অর্থ করেছেন।</p>
<p>কোরআন অন্য একটি আয়াতে বলছে,</p>
<blockquote><p>قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِيٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرٗا</p>
<p>قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ</p>
<p>(সূরা ত্বাহা: ১২৫-১২৬)</p></blockquote>
<p><strong><em>কিয়ামতের</em></strong> <strong><em>দিন</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>বান্দাকে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>হিসেবে</em></strong> <strong><em>পুনরুত্থিত</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>হবে</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>প্রতিবাদ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>বলবে</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>প্রভু</em></strong><strong><em>! </em></strong><strong><em>কেন</em></strong> <strong><em>আমাকে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>পুনরুত্থিত</em></strong> <strong><em>করেছেন</em></strong><strong><em>? </em></strong><strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>পৃথিবীতে</em></strong> <strong><em>চক্ষুষ্মান</em></strong> <strong><em>ছিলাম</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>কেন</em></strong> <strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong><strong><em>? </em></strong><strong><em>তার</em></strong> <strong><em>প্রতি</em></strong> <strong><em>বলা</em></strong> <strong><em>হবে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>পৃথিবীতে</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>চক্ষুর</em></strong> <strong><em>অধিকারী</em></strong> <strong><em>ছিলে</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>এখানের</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>প্রযোজ্য</em></strong> <strong><em>নয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্য</em></strong> <strong><em>রকম</em></strong> <strong><em>চক্ষুর</em></strong> <strong><em>প্রয়োজন</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তোমার</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>চক্ষু</em></strong> <strong><em>ছিল</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>নিজেই</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>করেছ</em></strong> <strong><em>তাই</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8220;</em></strong> أنك آيائنا আমাদের নিদর্শনসমূহ এ পৃথিবীতে ছিল, তুমি এ নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে আমাদের দেখা, অনুধাবন এবং সত্যকে উদ্ঘাটনের পরিবর্তে সেখানে নিজেকে অন্ধ করে রেখেছিলে। সেজন্যই প্রকৃত বিশ্বে এসে অন্ধ হিসেবে পুনরুত্থিত হয়েছ।</p>
<p>সূরা মুতাফফিফীন বলছে,</p>
<blockquote><p>كَلَّآ إِنَّهُمۡ عَن رَّبِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ لَّمَحۡجُوبُونَ</p>
<p>&#8220;কখনই নয়, নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালক হতে সেদিন পর্দাবৃত থাকবে।&#8221; (সূরা মুতাফফিফীন : ১৫)</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ এদের পরিত্যাগ কর। এদের উচিত ছিল পৃথিবীতে তাদের চক্ষুর সম্মুখ হতে গাফিলতির পর্দা উন্মোচন করা ও দেখা। ঈমানের অর্থ এটাই- হে মানুষ! তুমি এ পৃথিবীতে আগমন করেছ যাতে এ পৃথিবীতেই চক্ষুর মাধ্যমে ঐ পৃথিবীকে দেখতে ও কর্ণের মাধ্যমে ঐ পৃথিবীকে শ্রবণ কর।</p>
<p>আমি সব সময়ই এজন্য আনন্দিত যে, আমাদের যুবকরা বিশেষ করে নাহজুল বালাগার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দান করছে। নাহজুল বালাগার বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। দেখবে নাহজুল বালাগাহ্ এরূপ চক্ষু ও কর্ণ সম্পর্কে কি বলে।</p>
<p>নাহজুল বালাগাহ্ ঈমানের ক্ষেত্রে মৌলিকত্বে বিশ্বাসী। ঈমানের মূল্য শুধু চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং চিন্তা ও ভিত্তি ছাড়াও মৌলিক হিসেবে নাহজুল বালাগাহ্ ঈমানকে উল্লেখ করেছে।</p>
<p>আলী (আ.) নাহজুল বালাগায় আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের (আহলুল্লাহ্) সম্পর্কে বলেন,</p>
<blockquote><p>يَتَنَسَّمُونَ بِدُعَائِه روح التجاوز</p>
<p>&#8220;এরা এমন বান্দা যে, যখন তারা দোয়া করে ও তওবায় নিমজ্জিত হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্তির সমীরণ নিজেদের মধ্যে অনুভব করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>আলী (আ.) আরো বলেন,</p>
<blockquote><p>إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَعَلَ الذِّكْرَ حِلاءً لِلْقُلُوْبِ تَسْمَعُ بِهِ بَعدَ الوقرة وَ تُبْصِرُ بِهِ بَعْدَ الْعَشْوَةِ وَ تَنقَادُ بِهِ بَعْدَ الْمَعَائِدَةِ وَ مَا بَرِحَ اللَّه عَزَّتْ الأَؤُهُ فِي الْبُرْهَةِ بَعْدَ الْبُرْهَةِ وَ فِي أَزْمَانَ الفَتَرَتِ عِبَادٌ نَاجَاهُمْ فِي فِكْرِهِمْ وَ كَلَّمَهُمْ فِي ذَاتِ عُقُولِهِمْ</p></blockquote>
<p><strong>&#8220;নিশ্চয় মহান আল্লাহ্ তাঁর স্মরণকে মানুষের আত্মার উজ্জ্বলতার কারণস্বরূপ করেছেন, যে কারণে (আত্মার স্বচ্ছতার কারণে) সে বধিরতার পর শ্রবণশক্তি, অন্ধত্বের পর দৃষ্টিশক্তি লাভ করে এবং নাফরমানীর পর আনুগত্যের পথ গ্রহণ করে, সকল অবস্থায় অফুরন্ত নেয়ামত দানকারী আল্লাহর জন্য নিজেকে নিবেদিত করে। সকল কালেই একদল ব্যক্তি রয়েছে যাদের চিন্তার মাধ্যমে আল্লাহ্ গোপন রহস্যের ভেদ উন্মোচন করেন। আর আকলের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলেন।” (নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ২২২)</strong></p>
<p>সুতরাং আমি এখানে যে বিষয়টি বলতে চাই তা হলো আল্লাহর পরিচয় জানা, তাঁর ফেরেশতাদের পরিচয় জানা (যাঁরা অস্তিত্বজগতের জন্য মাধ্যম), তাঁর প্রেরিত নবী ও আউলিয়াগণের পরিচয় জানা (যাঁরা অন্য একভাবে আল্লাহর নেয়ামত সৃষ্টির নিকট পৌছানোর মাধ্যম), আমাদের এ পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্যকে জানা, আখেরাত ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনকে জানা এ সবই মৌলিক। সত্যের প্রতি ঈমান যেমন মৌলিক তেমনি তা চিন্তা, বিশ্বাস ও ইসলামী জীবনাদর্শের ভিত্তিও বটে। কেবল একশ&#8217; ভাগ মৌলিক এরূপ কোন ঈমানই পারে একটি জীবনাদর্শের জন্য সর্বোত্তম চিন্তা ও বিশ্বাসগত ভিত্তি হতে। সুতরাং কখনই আমলের জন্য যেমন ঈমানকে বিসর্জন দেয়া যুক্তিযুক্ত নয় তেমনি ঈমানের জন্য আমলকে বিসর্জন দেয়াও অযৌক্তিক। এদের কোনটিকেই অন্যটির জন্য বিসর্জন দেয়া যাবে না।</p>
<p>সুতরাং দর্শনের পূর্ণ মানব, পূর্ণ মানব নয় বরং অপূর্ণ মানব। অপূর্ণ মানবের অর্থ কি? অপূর্ণ মানব সে, যে পূর্ণতার অংশবিশেষ ধারণ করে। দর্শন বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতার ক্ষেত্রে মৌলিকত্বে বিশ্বাসী তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু দর্শনের পূর্ণ মানব মানবের পূর্ণতার অন্যান্য দিকগুলোকে উপেক্ষা করে শুধু আকলের পূর্ণতার মধ্যে তার পূর্ণতাকে খোঁজে। তাই এ মানব অপূর্ণ অথবা অর্ধপূর্ণ যা জ্ঞানের এক প্রতিমূর্তি বৈ কিছু নয়, জ্ঞান ব্যতীত সকল কিছু তার নিকট অনুপস্থিত। এরূপ মানব এমন এক অস্তিত্ব যে শুধু জানে, কিন্তু আবেগ, উত্তাপ ও গতিহীন এবং সৌন্দর্য বিমুখ। যে অস্তিত্বের সমগ্র শিল্প শুধু জ্ঞানের মধ্যে নিহিত সে অস্তিত্ব এক বিচ্ছিন্ন বিশ্বের মত পরিত্যক্ত। এটি ইসলামের পূর্ণ মানব নয় বরং ইসলামের অর্ধ মানব।</p>
<p>আকল ও বুদ্ধিবৃত্তির মূল্যের ক্ষেত্রে ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর হাদীসটি আপনাদের জন্য ব্যাখ্যা করার সময় হলো না। এ প্রসঙ্গে প্রচুর কথা রয়েছে। যদি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই তাহলে আরো দু&#8217;টি বৈঠক প্রয়োজন। সে সময় হাতে নেই বলে বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ সম্পর্কিত আলোচনা এখানেই শেষ করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15526</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল্লামা ত্বহা আবদুর রহমান ও তাঁর চিন্তাদর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahman-and-his-philosophical-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahman-and-his-philosophical-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 26 Oct 2024 15:20:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইলমুল কালাম]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15152</guid>

					<description><![CDATA[আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বহুমাত্রিক একজন আলেম ও চিন্তাবিদ। তাঁর মতো চিন্তাবিদের চিন্তাধারা একটি প্রবন্ধের মধ্যে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। বিগত পঞ্চাশ বছরের চিন্তাগত জীবনে তিনি দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটির মতো বিভিন্ন বিষয়ে ত্রিশের অধিক গ্রন্থ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বহুমাত্রিক একজন আলেম ও চিন্তাবিদ। তাঁর মতো চিন্তাবিদের চিন্তাধারা একটি প্রবন্ধের মধ্যে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। বিগত পঞ্চাশ বছরের চিন্তাগত জীবনে তিনি দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটির মতো বিভিন্ন বিষয়ে ত্রিশের অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই সকল গ্রন্থে স্বতন্ত্র একটি ভাষার মাধ্যমে তিনি শত শত পরিভাষা তৈরি করেছেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান বিভিন্ন সময়ে আমাদের সামনে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময়ে তাঁর বয়স ২৩-২৪ বছর। সে সময়ের একজন যুবক হিসেবে তাঁর মানসপট কীভাবে পরিবর্তন হয়েছিল সেটা তিনি আমাদেরকে অবহিত করেছেন। এ সময়ে তিনি সাহিত্য ও কবিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রাক্কালে নিজেকে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো করেন-</p>
<ul>
<li>১. ما كنه العقل الذي هزم العقل المسلم অর্থাৎ, দৃশ্যমানভাবে হলেও মুসলমানদের আকলকে বিপর্যস্ত করে এমন আকলের প্রকৃতি কী?</li>
<li>এখানে তিনি পাশ্চাত্যের আকলের প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।</li>
<li>২. ماذا صنع الاستعمار بنا অর্থাৎ, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আমাদের জন্য কী বইয়ে এনেছে?</li>
<li>আপনারা জানেন মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া ফ্রান্সের শোষণাধীন ছিল। ত্বহা আব্দুর রহমান যখন ছোট ছিলেন তখনও মরক্কো-সহ ঐ অঞ্চলে ফ্রান্সের শোষণ ও শাসন অব্যাহত ছিল।</li>
<li>৩. من نحن بعد الإستعمار অর্থাৎ শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের পর আমরা কোন অবস্থায় এসে উপনীত হলাম?</li>
</ul>
<p>তিনি বলেন, এই তিনটি প্রশ্ন আমি নিজেকে করি এবং এর সাথে আরও দু’টি প্রশ্নকে যুক্ত করি।</p>
<ul>
<li>ক. من نحن অর্থাৎ, আমরা কারা?</li>
<li>খ. من هذا الاخر অর্থাৎ, অন্যরা কারা?</li>
</ul>
<p>তাঁর ভাষ্যমতে, এই পাঁচটি প্রশ্নকে সামনে রেখে তিনি তাঁর চিন্তাজগতকে নতুন করে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। আমরা তাঁর সকল গ্রন্থ সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই যে, তিনি কোনো গ্রন্থই পরিকল্পনাহীনভাবে রচনা করেননি।</p>
<p>তিনি তাঁর মানসপটে অঙ্কিত প্রজেক্টকে (কর্ম-পরিকল্পনা) শক্তিশালী চিন্তা ও লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে শোষণ ও পাশ্চাত্যায়ন (Westernization)-কে العباد البنيوية (কাঠামোগত একটি গণহত্যা) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা শোষণ, পাশ্চাত্যায়ন মুসলিম উম্মাহর সকল প্রতিষ্ঠান ও চিন্তাকে ধ্বংস করে দেয়। এই অবস্থা থেকে মুসলিম উম্মাহ কীভাবে উদ্ধার হতে পারে এই বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো, ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তা ও প্রজেক্টসমূহকে (কর্ম-পরিকল্পনা) বিশেষ করে আধুনিক সময়ে এসে মুসলিম উম্মাহর সৃষ্ট আন্দোলনসমূহের মধ্যে কোথায় স্থান দেবো? ক্ল্যাসিক ইসলামী চিন্তার মধ্যে তাঁর স্থান কোথায়?</p>
<p>শুরুতেই আমরা প্রথম প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। তাঁর মতে, শোষণ ও পাশ্চাত্যায়নের বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর দু’ধরণের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে একটি ছোট বা (জুযয়ি) আর অপরটি সামগ্রিক/বড় (কুল্লি)। ছোট (জুযয়ি) আন্দোলনগুলো হলো রাজনৈতিক আন্দোলন। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যতগুলো রাজনৈতিক আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করেছে সবগুলোই হলো ছোট বা জুযয়ি আন্দোলন। আর বড় বড় আন্দোলনসমূহ হলো চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলন। এ ক্ষেত্রে তাঁর এই বাণীটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ :</p>
<blockquote><p>يكاد يكون مستحيلاً اقتناعنا بوجود أداة تغيير غير سياسة في الواقع المعاصر</p>
<p>অর্থাৎ : আধুনিক দুনিয়াতে সমাজ পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি ছাড়াও যে অন্য পন্থা রয়েছে এই বিষয়টির ব্যপারে কনভিন্স করা এক প্রকারের অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।</p></blockquote>
<p><strong>অর্থাৎ, যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয় তাহলে রাজনৈতিকভাবেই আনতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। এ বিষয়টি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যেন এর বাহিরে অন্য কোনো পন্থাতেই সমাজ পরিবর্তন করা যেতে পারে না।</strong></p>
<blockquote><p>ولكن ما من سبيل الا ان نقلب هذا المستحيل</p>
<p>কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই।</p></blockquote>
<p><strong>অর্থাৎ রাজনীতি ছাড়াও যে সমাজ পরিবর্তন করা যায় এই বিষয়টি আমাদেরকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং তাঁদেরকে এই ব্যপারে কনভিন্স করতে হবে। বিষয়টি অনেক কঠিন হলেও এই কাজে আমাদেরকে সফল হতে হবে।</strong></p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান বলতে চেয়েছেন, মৌলিক পরিবর্তন চিন্তা ও আখলাকী পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়। বিষয়টিতে তিনি ব্যাপক জোর দেন এবং তাঁর সবগুলো গ্রন্থ এই চিন্তার আলোকে সুসজ্জিত করেন।</p>
<p>এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মুসলিম উম্মাহ শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে সকল তাজদীদ ও ইহইয়া আন্দোলন শুরু করেছিল সেগুলোকে আমরা পাঁচভাবে বিভক্ত করতে পারি :</p>
<ul>
<li>১. সমস্যাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনাকারী এবং নতুন করে ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টাকারী আন্দোলনসমূহ।</li>
<li>২. মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে (সেকুলারিজম) ধারণ করে সেটার আলোকে চলতে হবে এমন আন্দোলনসমূহ।</li>
<li>৩. রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশকারী ইসলামপন্থী দলসমূহ। তাঁদের স্লোগান হলো, الاسلام هو الحل অর্থাৎ ইসলামই হলো একমাত্র সমাধান।</li>
<li>৪. পাশ্চাত্যে সৃষ্ট চিন্তাধারা ইসলামী চিন্তার মধ্যে প্রয়োগকারী মডার্ন ধারাসমূহ। তাঁদেরকে তিনি “তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস” নামক গ্রন্থের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন।</li>
<li>৫. শক্তিকে শক্তির মাধ্যমে জবাব দিতে হবে। এই গ্রুপের দ্বারা তিনি বিভিন্ন চরমপন্থী গ্রুপকে বুঝিয়েছেন এবং তাঁদেরকে নিয়ে سؤال العنف নামক একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।</li>
</ul>
<p>আচ্ছা! তাহলে এখন মূল কাজ কী? আমাদেরকে কী করতে হবে? এখানে মৌলিক কাজ হলো চিন্তাগত ও আখলাকী একটি চিন্তা গড়ে তোলা। এটা কীভাবে শুরু করতে হবে?</p>
<p>এক্ষেত্রে তিনি বলেন, আমাদেরকে দুটি আপদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। তাঁর মতে, সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে পরিগ্রহকারী দুটি আপদ রয়েছে।<strong> প্রথমটি ‘আল-আফাতুল বায়ানিয়্যাহ’, দ্বিতীয়টি ‘আল-আফাতুল ইমানিয়্যাহ’।</strong></p>
<p>প্রথম আপদ তথা <strong>আল-আফাতুল বায়ানিয়্যায়</strong> শুরুতে যে বিষয়টি আসে তা হলো আমাদের ভাষাগত সমস্যা। অর্থাৎ, আমরা সমগ্র উম্মাহ যে ভাষায় কথা বলি সে ভাষায় চিন্তা করি না। আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেই ভাষায় দর্শন তৈরি করি না। কিংবা আমাদের চিন্তায় আমরা কথা বলি না। আমরা যে দার্শনিক চিন্তার অধিকারী সেই চিন্তাকে তুলে ধরি না। এ কারণে তিনি এটাকে ‘আল-আফাতুল বায়ানিয়্যাহ’ বলেন।</p>
<p>আমরা দেখি, ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর জীবনে শুরুর দিকের বড় একটি অংশ ভাষা, মানতিক ও দর্শন শিক্ষায় ব্যয় করেন। ভাষা ও মানতিক নিয়ে তাঁর গবেষণাসমূহ আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, স্বতন্ত্র একটি ইসলামী দর্শনের জন্য এ দুটি বিষয়ের বিকল্প নেই।</p>
<p>তাঁর মতে, সর্বশেষ ইলাহী দ্বীন ইসলামকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবতার মুক্তির জন্য প্রেরণ করেছেন। আর এই দ্বীনের মূল গ্রন্থকে তিনি একটি ভাষার মাধ্যমে সমগ্র মানবতার নিকট পৌঁছে  দিয়েছেন। যদি এই ভাষার মাধ্যমে চিন্তা ও দর্শনকে তৈরি করা না যায় তাহলে আর কোন ভাষায় করা সম্ভবপর হবে? এই কারণে তিনি এ বিষয়ে ব্যাপক জোর দেন এবং এ সমস্যাকে সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালান।</p>
<p>তাঁর মতে, কোনো চিন্তা ‘ফিলোসফি’ নামে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য প্রাচীন গ্রীসে কিংবা পাশ্চাত্যে তৈরি হওয়া শর্ত নয়। সকল জায়গার সকল সংস্কৃতির মানুষই দর্শন ও চিন্তা তৈরি করতে পারে। শুধু তাই নয়, চাইলে তারা বিশ্বজনীন ফিলোসফিও সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রসর ভাষা হলো আরবী। এ ভাষার মাধ্যমে এমন বড় বড় বিশ্বজনীন চিন্তা তৈরি করা যেতে পারে। আর এ কাজ সবচেয়ে ভালো ও উত্তমভাবে করতে পারে মুসলিম উম্মাহ। এ বিষয়ে তিনি অনেক বেশি জোর দেন।</p>
<p>দ্বিতীয় আপদ হলো, <strong>‘আল-আফাতুল ঈমানিয়্যাহ’</strong>। এর মাধ্যমে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন? তাঁর উদ্দেশ্য হলো, আমরা আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে এখনো জীবনের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি। অর্থাৎ আমাদের ঈমান চিন্তা তৈরি করতে পারছে না। কেননা ঈমান একইসাথে চিন্তাকারী একটি আকল। কিন্তু আমরা ঈমানের মাধ্যমে চিন্তা করি না। একারণে তিনি দ্বিতীয় বড় আপদকে ‘আল-আফাতুল ঈমানিয়্যাহ’ নামে নামকরণ করেন।</p>
<p>এ বিষয়ে তিনি সমাধান হিসেবে কী পেশ করেন?</p>
<p><strong>এই দুটি বিষয়কে অতিক্রম করার জন্য সমাধান হিসেবে তিনি দুটি ফিলোসফি (দর্শন) সম্পর্কে আলোকপাত করেন। প্রথমটি ‘আল-ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ’। দ্বিতীয়টি ‘আল-ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’।</strong></p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানকে বুঝতে চাইলে এই পরিভাষাসমূহকে এভাবেই ব্যবহার করতে হবে। এসকল পরিভাষা অনুবাদ করে বুঝা সম্ভব নয়। তাদাভুলিয়্যা’র দ্বারা উদ্দেশ্য, জ্ঞান ও বিশ্বাসকে একত্রিত করে দর্শন তৈরি করা। আমাদের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র একটি ফিলোসফির প্রয়োজন যেটাকে তিনি এই নামে অভিহিত করেন। এ বিষয়গুলো তিনি তাঁর গ্রন্থসমূহে অসাধারণভাবে তুলে ধরেন। এই দর্শনের কেন্দ্রে রাখেন ভাষাকে।</p>
<p>অপরদিকে ‘আল-ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ পরিভাষাটি তিনি আমান ও আমানত নামক পরিভাষাদ্বয়কে একত্রিত করে তৈরি করেন। এক্ষেত্রে তিনি ঈমান (বিশ্বাস)-কে কেন্দ্রে স্থাপন করেন এবং এটাকে তিনি মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানকে বুঝার জন্য এই পরিভাষা দু’টি (তাদাভুলিয়্যাহ, ই’তিমানিয়্যাহ) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভাষাতত্ত্ব, মানতিক ও দর্শনে পারদর্শী বিশেষজ্ঞদের এই বিষয়ে আলোচনা করা উচিত।</p>
<p>তবে আমাকে যে বিষয়টি বেশি আগ্রহী করে সেটা হলো, তাঁর আল-ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ। আমি এ বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করার চেষ্টা করবো। কেননা বিষয়টি তিনি শুধুমাত্র একটি ফিলোসফি হিসেবে বিবেচনা করেননি। যেমন, ফিকহকেও তিনি এই পরিভাষার উপর ভিত্তি করে দাঁড় করাতে চান। এজন্য তিনি ফিকহুল ইতিমানিয়্যাহ নিয়েও কাজ করেছেন। বিশেষ করে জ্ঞানের তিনটি শাখা তিনি নতুন করে গঠন করার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেন। সেগুলো হলো, ফিকহ, কালাম ও তাসাউফ।</p>
<p>তাঁর মতে, আমাদের ফিকহ অনেকাংশে আদেশ ও নিষেধের উপর ভিত্তি করে গঠিত। একারণে তিনি আমাদের ক্ল্যাসিক ফিকহের নাম দিয়েছেন ‘ফিকহুল ই’তিমান’। এই ফিকহে ই’তিমান তথা আমান ও আমানতের বিষয়টি দুর্বল অবস্থায় রয়ে গেছে। একারণে তিনি তাঁর দ্বীনুল হায়া নামক গ্রন্থের প্রথম খন্ডে ফিকহুল ই’তিমানের উসূলকে তুলে ধরেছেন।</p>
<p>ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তাবনা হলো, মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র ইরাদা ও কুদরাতের উপর ভিত্তি করে নয়; বরং মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। তাজদীদু ইলমুল কালাম নামক গ্রন্থে তিনি এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে ই’তিমানী দর্শন সামনে রেখে নতুন করে তৈরি করার প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।</p>
<p>অপরদিকে তাসাউফকে তিনি এই দুই জ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তাঁর মতে, ইসতিদলাল, ইসতিমবাত এবং ইসতিবসারকে একত্রে বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ, ফিকহ, কালাম ও তাসাউফকে একত্রে বিবেচনা করতে হবে। তবে এখানে তিনি তাসাউফ বলতে বর্তমান সময়ের জ্ঞানহীন তাসাউফের কথা উল্লেখ করেননি। তাসাউফকে তিনি জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে নতুন করে বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেও একজন তাসাউফপন্থী আলেম ও একটি তরিকতের সদস্য। তবে তাসাউফকে জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি অনেক বেশি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।</p>
<p>এসকল দৃষ্টিকোণ সামনে রেখে আমরা ত্বহা আব্দুর রহমানের গ্রন্থগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করতে চাই। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের অর্ধেক উসূল ও মেথডোলজি নিয়ে আর বাকি অর্ধেক এই সকল উসূলের প্রয়োগ নিয়ে। অর্থাৎ, তিনি তাঁর রচিত উসূলকে তাঁর নিজের গ্রন্থসমূহেই প্রয়োগ করেছেন। যেমন, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভকারী গায়রে আখলাকী বিষয়টিকে তিনি বিশ্লেষণ করার সময় তাঁর ই’তিমানিয়্যাহ দর্শনকে সামনে রাখেন এবং এর আলোকে সমাধান পেশ করার চেষ্টা করেন। কিংবা আকলের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার সময় তাদাভুলিয়্যাহ দর্শনকে সামনে রাখেন এবং এর আলোকে উত্তোরণের পথ বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।</p>
<p>সুবরু মুরাবিতা নামে তাঁর একটি গ্রন্থ রয়েছে। এখানে তিনি সৌদি আরব ও ইরান নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেন। মূলত রুহুদ্বীন (দ্বীনের রূহ) নামক গ্রন্থকে এই দুই দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সামনে রেখে রচনা করেন এবং এই বইয়ে তিনি দ্বীন ও রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সমাধানমূলক তত্ত্ব তুলে ধরেন। একইভাবে আমরা যখন তাঁর সুয়ালুল উনফ নামক গ্রন্থটি পাঠ করি তখন দেখতে পাই, মুসলিম উম্মাহকে পরিগ্রহকারী বিশৃঙ্খলা, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।</p>
<p>পূর্বে আমি যেমনটা উল্লেখ করেছি আমরা তাঁর গ্রন্থসমূহকে দু’ভাগে বিভক্ত করতে পারি। একভাগ হলো উসূল ও মেথডোলজি সংক্রান্ত আর অপর ভাগ হলো জীবনের বিভিন্ন প্রায়োগিক দিক নিয়ে।</p>
<p>উসূল ও মেথডোলজি সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহ আবার দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর মধ্যে এক ভাগ হলো ‘ফালসাফাতুল তাদাভুলিয়্যাহ’ সম্পর্কে আর অপরভাগ হলো ‘ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ সম্পর্কে।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর চিন্তা পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে সামনে রেখে তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো আল-মানহাজ। অর্থাৎ পদ্ধতি বা পন্থা। <strong>তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস</strong> &#8211; এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক মিরাস (ঐতিহ্য) পর্যালোচনা করার জন্য নতুন একটি পন্থার প্রস্তাবনা দিয়েছেন। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য (মিরাস)-কে কীভাবে বুঝবো? যদিও অনেকেই বলেন যে, এই গ্রন্থটি তিনি মুহাম্মাদ আবিল আল-জাবিরিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন এবং তাঁর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আসলে বিষয়টি এমন নয়। অর্থাৎ ত্বহা আব্দুর রহমান অন্যকে খণ্ডন করার পন্থা অবলম্বন করেন না। তিনি একজন বিনির্মাণকারী। তিনি কাউকে বিরোধী হিসেবে গণ্য করে তাকে খণ্ডন করেন না; বরং যেটা হাকীকত ও সত্য সেটাকেই তিনি সর্বোচ্চ যুক্তি ও দলীল দিয়ে তুলে ধরেন। এ কারণে তিনি একজন অসাধারণ নির্মাতা। তবে তিনি জাবিরি’র বয়ান, বুরহান ও ইরফান নামক ত্রয়াত্মক শ্রেণিবিন্যাস এবং এর উপর ভিত্তি করে ইসলামী চিন্তাধারাকে সরলীকরণের কঠোর সমালোচনা করেন। এই ক্ষেত্রে তিনি তাকামুলী তথা উৎকর্ষতার পন্থাকে প্রস্তাব করেন। এই তিনটিকে তাদাখুলিয়া তথা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।</p>
<p>তাঁর মতে, আধুনিক সময়ে এসে আমরা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত চিন্তার প্রভাবে সকল কিছুকেই খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি। সকল কিছুকে খণ্ডিত করে দেখা ভুল একটি পন্থা। এই পন্থাটি আমাদের মঝে প্রভাব বিস্তার করার কারণে ইসলামী চিন্তা সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করার সক্ষমতাকেও আজ হারিয়ে ফেলেছি। এই পন্থা বা মেথডকে তিনি মানহাজের অংশে ভাষা, মানতিক ও দর্শনের পাশাপাশি উসূলুল ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করেন।</p>
<p><strong>তিনি অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও ৫৮০ পৃষ্ঠার বিশাল একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম হলো, আত-তা’সিসুল ই’তিমানি লি ইলমিল মাকাসিদ। অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ইলমুল মাকাসিদের ই’তিমানি ভিত্তিসমূহ। আমার মতে, এই গ্রন্থটি মাকাসিদ নিয়ে লেখা বিগত ২০ বছরের সবচেয়ে সেরা গ্রন্থ।</strong> আর এই গ্রন্থের পর এই বিষয়ে যারা লেখালেখি করেছেন তাঁরা তাঁদের চিন্তাকে পুনর্বিবেচনা করবেন বলে আমার বিশ্বাস। কেননা তিনি মাকাসিদের শরয়ী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ যেটা শরয়ী সেটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য?  আর যেটা গ্রহণযোগ্য সেটা কতটুকু শরয়ী? আমরা ইলাহী মাকসাদ বা উদ্দেশ্যকে এত সু-স্পষ্টভাবে কীভাবে উল্লেখ করতে পারি? এই শক্তি আমরা কোথায় পাই? এই বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এসকল দৃষ্টিকোণ থেকে এ গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ।</p>
<p>আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, <strong>ত্বহা আব্দুর রহমানের অন্যতম একটি গ্রন্থ হলো রুহুদ দ্বীন</strong>। এ গ্রন্থে তিনি দ্বীন ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র সেকুলারিজমের দৃষ্টিকোণ থেকেই অর্থাৎ দ্বীনের রাজনীতিকরণ কিংবা রাজনীতির দ্বীনিকরণ নিয়েই আলোচনা করেননি। এ গ্রন্থে একইসাথে তিনি তাদবীর ও তায়াব্বুদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নতুন একটি উসূল দাঁড় করিয়েছেন। তায়ায়্যুশী আমলের সাথে তায়াব্বুদী আমলকে কীভাবে একত্রিত করতে পারি এবং ইসলাম এই বিষয়টি কীভাবে তুলে ধরেছে সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তিনি বিভিন্ন পরিভাষার পাশাপাশি যে পরিভাষার ব্যপারে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন সেটি হলো ‘তুরাস’। যে চিন্তা তাঁর অতীতকে অস্বীকার করে সেই চিন্তার পক্ষে নতুন কোনো প্রস্তাবনা দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, তাঁর পক্ষে নতুন কোনো চিন্তাও দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তিনি তাকদীস ও তাহকীর তথা তুরাসকে পবিত্র বলে গণ্য করা থেকেও বিরত থাকেন আবার সেটাকে হেয় প্রতিপন্ন করা থেকেও বিরত থেকে অতীত থেকে  শিক্ষা নেওয়ার পন্থা তথা তাকদীরের পন্থাকে বেছে নেওয়ার পক্ষে মত দেন।</p>
<p>মডার্নিটি কিংবা আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি রুহুল হাদাসা নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের আধুনিকতা নামে একটি আধুনিকতা রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিকতা একমাত্র কিংবা অনুপম নয়। প্রতিটি চিন্তায় তাঁর মতো করে তাঁদের নিজস্ব আধুনিকতা তৈরি করতে পারে। পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর কিছু মৌলিক পরিভাষা আছে। যেমন, ধর্মহীন বিশ্বদর্শন (Secular World View), রেশনালিজম, হিউম্যানিজম ইত্যাদি। কিন্তু আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও পরিভাষার মাধ্যমে আমাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি আধুনিকতার বিকাশ ঘটাতে পারি। অর্থাৎ আধুনিকতার রূহকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের রূহকে বিনির্মাণ করতে পারলে সেই রূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আধুনিকতার উদ্ভব ঘটবে।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তায় অপর আরেকটি বিষয় হলো আখলাক। এই বিষয়েও তিনি অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে দ্বীন ও আখলাকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল ধরণের বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দ্বীনকে আখলাক হিসেবে ও আখলাককে দ্বীন হিসেবে অভিহিত করেন। ‘Cogito, ergo sum’ (চিন্তা করি এই জন্যই আছি) চিন্তার বিপরীতে ‘আমি আখলাকসম্পন্ন, এই জন্য আমি আছি&#8221; এই চিন্তার বিকাশ ঘটান। আখলাকী চিন্তার ক্ষেত্রে মুসলিম আলেমদের চিন্তার সমালোচনা করে বলেন, তাদের চিন্তার মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কেননা তাঁরা আখলাককে পূর্ণতা  হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু আখলাক পূর্ণতাদানকারী কোনো বিষয় নয়। এটি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। আখলাক ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। আখলাক পূর্ণতার (কামালিয়াত) সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়, এটা অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা দ্বীন ও মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আখলাক ছাড়া দ্বীন হতে পারে না, আখলাক ছাড়া মানুষ হতে পারে না। মানুষের যে সংজ্ঞা সেই সংজ্ঞার একাংশ জুড়ে আছে আখলাক আর বাকি অংশ হলো দ্বীন। তবে এক্ষেত্রে দ্বীন হলো মূল।</p>
<p>তাঁর মতে, রাজনীতি থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ করার চেয়ে দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা আর বড় ধরণের হুমকি। আর এ বিষয়কে তুলে ধরার জন্য তিনি দাহরানিয়্যাহ নামক একটি পরিভাষা তৈরি করেন। দাহরানিয়্যাহ হলো, দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা। আর এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিপদজনক বিষয়।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান ফিতরাতের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি তাঁর সকল গ্রন্থেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। কেননা তাঁর মতে, দ্বীন মানুষের পূর্বে ছিল। মানুষের সৃষ্টি হয়েছে দ্বীনের পরে। শুধু তাই নয়, খুলক-ও (আখলাক) খালকের (সৃষ্টির) পূর্বে। মানুষের সৃষ্টির পূর্বেই খুলক ছিল আর এটা ফিতরাতরূপে মূল্যবোধের একটি ভাণ্ডার হিসেবে মানুষকে দেওয়া হয়েছে। দ্বীন মানুষের মধ্যে পরবর্তীতে স্থাপিত কোনো বিষয় নয়। দ্বীনের অর্থের জগত মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্বপ্রাপ্ত মৌলিক একটি হাফিজার (সংরক্ষণশালা) মধ্যে লুক্কায়িত। আর এই হাফিজা বা সংরক্ষণশালার নাম হলো ফিতরাত। দ্বীন মানুষকে সঙ্গ দানকারী একটি হাকীকত এবং মানুষ এ হাকীকত থেকে কখনো পৃথক হতে পারবে না। অপর দিকে পয়গাম্বরদের মাধ্যমে যে দ্বীন এসেছে সেটা মূলত তাজকীর বা স্মারক। অর্থাৎ, মানুষের ফিতরাতের মধ্যে যা রয়েছে, সেটাই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এ কারণে কোরআন যাক্কির (স্মারক), পয়গাম্বর মুজাক্কির। মিসাকুর রিসালার সাথে মিসাকুশ শাহাদাকে ত্বহা আব্দুর রহমান সূরা আরাফের ১৭২ নং আয়াতের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<blockquote><p>(وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَا)</p>
<p>অর্থ : “আর হে নবী! লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা, যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন : ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলেছিল, নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব, আমরা এর সাক্ষ্য দিচ্ছি।”</p></blockquote>
<p>এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে তিনি বলেন, আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক হলো শাহাদাতের উপর ভিত্তি করে।</p>
<p>আর দ্বিতীয় মিসাক হলো, মিসাকুল আমানা। এটাকে তিনি সূরা আহযাবের ৭২ নং আয়াতের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<blockquote><p>إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ ۖ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا</p>
<p>অর্থ :  “আমি এ আমানতকে আকাশসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতরাজির ওপর পেশ করি। তারা একে বহন করতে রাজি হয়নি এবং তা থেকে ভীত হয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ একে বহন করেছে, নিঃসন্দেহে সে বড় জালেম ও অজ্ঞ।”</p></blockquote>
<p>আর তৃতীয়টি তথা মিসাকুর রিসালাকে তিনি দাঁড় করিয়েছেন সূরা বাকারার ১৫১ নং আয়াতের উপর ভিত্তি করে।</p>
<blockquote><p>كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِّنكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ</p>
<p>অর্থ : “যেমনিভাবে (তোমরা এই জিনিসটি থেকেও সাফল্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছো যে) আমি তোমাদের মধ্যে স্বয়ং তোমাদের থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শুনায়, তোমাদের জীবন পরিশুদ্ধ করে সুসজ্জিত করে, তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় এবং এমন জ্ঞান তোমাদের শেখায়, যা তোমরা জানতে না।”</p></blockquote>
<p>মিসাকুশ শাহাদা ফিতরাত হিসেবে মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্ব লাভ করেছে, মিসাকুল আমানা মূলত মূল্যবোধ হিসেবে এসেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে উভয়টি মূলত মূল্যবোধ। একটি হলো ঈমান অপরটি হলো আখলাক। এগুলো মানুষের মধ্যে একটি সফটওয়্যার হিসেবে মানুষের অস্তিত্ব লাভের সাথে সাথে অস্তিত্ব লাভ করেছে কিন্তু তা আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। আর মিসাকুর রিসালা হলো এটাকে পূর্ণতাদানকারী একটি বিষয়। এ দু’টি বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই মহান আল্লাহ পয়গাম্বর পাঠিয়েছেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানের অপর একটি গ্রন্থ হলো, <strong>আল-মানতিক ওয়ান নাহও’স সূরী</strong>। এই গ্রন্থে তিনি সূরী মানতিক ও নাহু’র মাধ্যমে ইসলামের মূল্যবোধসমূহকে অপর মানুষের নিকট উত্থাপনকারী একটি ভাষা হিসেবে আরবী ভাষা নিয়ে বিশ্লেষণ করেন।</p>
<p><strong>দর্শনের বিষয়ে বিশেষ করে দু’টি ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন এবং এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দর্শন মানে হলো প্রশ্ন করা। আর প্রশ্ন করার পন্থা দু’টি :</strong></p>
<ul>
<li><strong>১. অপরপক্ষকে চুপ করানো জন্য প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করার এই পন্থা হলো গ্রীক দার্শনিকদের পন্থা। যেমন, সক্রেটিসের প্রশ্ন করার পন্থা।</strong></li>
<li><strong>২. সমালোচনামূলক প্রশ্ন করা। ইম্যানুয়েল কান্ট এই পন্থা শুরু করেন এবং প্রভাবশালী করে তুলেন।</strong></li>
</ul>
<p><strong>তবে ই’তিমানিয়্যাহ দর্শনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সুয়াল বা প্রশ্ন নেই। সুয়াল বা প্রশ্নের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সুয়ালিয়্যাত (প্রশ্ন করা) নয়, এখানে উদ্দেশ্য হলো মাসউলিয়্যাত (দায়িত্ববোধ)। সুয়াল-মাসয়ালা ও মাসউলিয়্যাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি এই বিষয়কে তুলে ধরেন এবং মনে করেন, প্রশ্ন যখন দায়িত্ববোধের চেতনা জাগ্রত করবে কেবল তখনই সেটা সত্যিকারের প্রশ্ন হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরণের প্রশ্নই আমাদের সত্যিকারের দর্শন। এ ক্ষেত্রে তিনি ‘আস-সুয়ালুল মাসউল’ পরিভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।</strong></p>
<p>পরিভাষা তৈরি করার ক্ষেত্রেও তিনি অতুলনীয়। কিছুদিন আগে এ ব্যপারে কামুসু ত্বহা নামে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানের মতে, মুসলিম উম্মাহ পরিভাষাগত একটি আক্রমণের শিকার। এ ক্ষেত্রে তিনি <strong>‘আল-উদওয়ানুল মাফহুমী’</strong> নামক পরিভাষা ব্যাবহার করেন।</p>
<p>তিনি বলেন, <strong>“পরিভাষা তৈরি করা ও পরিভাষার অধিকারী হওয়ার অর্থ হলো সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়া। কোনো কিছুকে পরিভাষার মাধ্যমে পরিবর্তন করা শক্তি প্রয়োগ করে পরিবর্তন করার চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়ে থাকে। পরিভাষার মধ্য দিয়ে বড় বড় পরিবর্তন করা সম্ভব”।</strong></p>
<p>এ কারণেই তিনি পরিভাষার উপর এত বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন  এবং শত শত পরিভাষা তৈরি করেছেন।</p>
<blockquote><p>অনুরূপভাবে তিনি আকলের বিষয়েও অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। আকলকে <strong>তিনি আকলে মুজাররাদ, আকলে মুয়ায়্যাদ ও আকলে মুসাদ্দাদ নামে তিন ভাগে বিভক্ত করেন।</strong> <strong>তাঁর মতে, আকলে মুজাররাদ হলো বুরহানী আকল।</strong> এটি এমন আকল যা দ্বীনি ক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে। এই ধরণের আকল হলো বিমূর্ত (Abstract) ও যান্ত্রিক। এ ধরণের আকল বিজ্ঞানাগারে, কল কারখানায় ও একাডেমিক গবেষণার কাজে লাগতে পারে কিন্তু  মানুষের সাথে তাঁর রবের ও মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক এই আকলের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি আমলের মাধ্যমে সজ্জিত আকলকে ‘আকলে মুসাদ্দাদ’ নামে নামকরণ করেছেন। <strong>আর</strong> <strong>যে আকল আখলাকী মূল্যবোধের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হয়েছে সেই আকলকে তিনি ‘আকলে মুয়ায়্যাদ’ নামে অভিহিত করেন।</strong> তিনি মনে করেন, আকল শুধুমাত্র একমুখী হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ আকলকেই ছোট করা। কেননা আকল আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত। এজন্য এই নেয়ামতকে বহুমুখী হিসেবে দেখতে হবে। আকল কোনো জাওহার নয়। আকল হলো একটি কর্ম। এই কারণে তিনি তায়া’ক্কুলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p></blockquote>
<p>এখন আমি তাঁর গ্রন্থসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরতে চাই।</p>
<p>প্রথমত, মেথডোলজি সংক্রান্ত গ্রন্থ। এ সম্পর্কে রচিত তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ফিকহুল ফালসাফা। চার খণ্ডে বিভক্ত করে তিনি এ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তা দুই খণ্ড প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে তিনি বলেন, অন্যের চিন্তা অনুবাদ করে কোনোদিন সত্যিকারের চিন্তা তৈরি করা যায় না। পাশ্চাত্যের দর্শন বিষয়ক যে সব বইকে অনুবাদ করে আজকে সমগ্র বিশ্বে পড়ানো হচ্ছে, সেটার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন,</p>
<p><strong>لن تكون الفلسفة رافعة إلا اذا كانت مبدعة</strong></p>
<p><strong>অর্থ : “দর্শন কোনো জাতিকে উচ্চমর্যাদায় আসীন করতে পারে না, যদি না সেটা নিজেদের মূল্যবোধের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়।”</strong></p>
<p>অর্থাৎ, তাকলীদের মাধ্যমে চর্চিত দর্শন কোনোদিন কোনো জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারে না। যদি কোনো জাতি চিন্তার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে চায়, তাহলে তাকে নিজ মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রেখে চিন্তা ও দর্শন তৈরি করতে হবে। নাসক মাসক নিয়ে আসে। নাসক হলো কোনো কিছুকে ফটোকপি করা। আর ফটোকপি মাসক’কে নিয়ে আসে। মাসক কী? মাসক হলো, ফটোকপির মাধ্যমে অন্যদের অনুবাদ করে তাদের চিন্তাকে নিয়ে আসলে সেটা একটি জাতিকে বিশেষভাবে মুসলিম উম্মাহকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করে দিবে।</p>
<p>তিনি ‘তাকরীবে তা’বী’ নামে একটি পন্থার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এর অর্থ এটা নয় যে, আমরা কারোর কাছ থেকে কোনো কিছুই নেবো না। তবে আমরা অন্যদের কোনো চিন্তা ও দর্শন অনুবাদ করার ক্ষেত্রে তাদাভুলিয়্যার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যে সকল চিন্তা অনুবাদ করবো, সেই চিন্তার ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিত্তিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। কেননা আমাদের ভাষা ও ধর্ম উভয়টিই ভিন্ন। যেমনঃ তিনি হেগেল ও নিটশে-কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, এরা অনেক ধর্মতত্ত্বীয় পরিভাষাকে দার্শনিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে। এ কারণে আমরা যখন অনুবাদ করবো তখন আমাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো হলো তাহসিলিয়্যা, তাওসিলিয়্যা ও তা’সিলিয়্যা। তাহসিলিয়্যা হলো হুবহু অনুবাদ করা। তাওসিলিয়্যা হলো, সতর্কতার সাথে বেছে বেছে অনুবাদ করা। তা’সিলিয়্যা হলো, শুধুমাত্র আমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়সমূহকে অনুবাদ করা। আমাকে সেই বিষয়সমূহই অনুবাদ করতে হবে, যেগুলো আমাদের দ্বীন ও ভাষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।</p>
<p>ফিকহুল ফালসাফার দ্বিতীয় খণ্ড হলো আল-কাওলুল ফালসাফিয়্যু অর্থাৎ দার্শনিক কথন কী? এ গ্রন্থে তিনি পরিভাষা ও এটিমলজি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি বলেন,</p>
<p>فالقول الذي لا يتصل بترثه لا يمكن ان يكون إبداعا</p>
<p>অর্থাৎ, “ইতিহাস ও ঐতিহ্যের (তুরাস) সাথে যে কথার সম্পর্ক নেই, সেই কথার পক্ষে নতুন কোনো প্রস্তাবনা পেশ করা সম্ভব নয়।”</p>
<p>এ ক্ষেত্রে তিনি আল আকলানিয়্যাতুল ইবারিয়্যার সাথে আল আকলানিয়্যাতুল ইশারিয়্যার মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপন করার পাশাপাশি কালাম ও তাসাউফের মধ্যেও সম্পর্ক স্থাপন করেন। আল আকলানিয়্যাতুল ইবারিয়্যা ও ইশারিয়্যা নিয়ে আলোচনা করার সময় প্লেটো, দেকার্ত ও হাইডেগারকে উদ্দেশ্য করে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।</p>
<p>তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ হলো আল-লিসান ওয়াল মিযান ওয়া’ত-তাকাওসুরুল আকল। এ গ্রন্থে তিনি মানতিক ও আকলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বইয়ে তিনি বলেন,</p>
<p>ان الاتصال الإنسان باللامتناهي الكامل من جهة ما يدفعه الي دوام طلب الزيادة في التعقل بدرجات تعلو علي واقع تعلقه</p>
<p>অর্থাৎ, “অসীমের (ইনফিনিটি) সাথে মানুষের যে সম্পর্ক, সেটা সর্বদা তার তা’য়াক্কুলী (চিন্তা করার) শক্তিকে বিকশিত করে থাকে এবং চিন্তা করার ক্ষেত্রে সে যে অবস্থায় আছে তাকে সেই অবস্থা থেকে তাঁর অবস্থানকে সর্বদা উচ্চ পর্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।”</p>
<p>এ গ্রন্থে তিনি তিনটি ধারার তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন। গাজালিয়্যা, রুশদিয়্যা ও খালদুনিয়্যা নামে গাজ্জালী, ইবনে রুশদ ও ইবনে খালদুনের তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন।</p>
<p>একইসাথে তিনি আল-খিতাবিয়্যা, আল-হিজাজিয়্যা ও আল-মাজাজিয়্যার পন্থাকেও বিশ্লেষণ করেছেন।</p>
<p>মেথডোলজি সম্পর্কে তাঁর চতুর্থ গ্রন্থ হলো আল হাক্কুল আরাবী ফি’ল ইখতিলাফিল ফালসাফিয়্যা। এ গ্রন্থে তিনি মুসলমানদের দর্শন তৈরি করার অধিকার নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর এই উক্তিটি প্রণিধানযোগ্যঃ</p>
<p>ان الاختلاف الأمم ظاهرة طبيعية لا ينكرها إلا من يري في الاختلاف زوال سلطانه</p>
<p>অর্থাৎ, “উম্মতসমূহের ভিন্নতা প্রাকৃতিক একটি বিষয়। যারা নিজের উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছে, তাঁরা ছাড়া অন্য কেহই এই অমোঘ বিধানকে অস্বীকার করতে পারে না।”</p>
<p>لذالك لا بد من اثبات هذا الحق للأمم المهزومة كما المنتصرة</p>
<p>অর্থাৎ, “আর এই কারণে যে জাতি পরাজিত ও পরাভূত হয়েছে, তাঁদেরও পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অধিকার রয়েছে। তাঁদেরও অধিকার আছে তাঁদের নিজেদের দর্শনকে তৈরি করার।”</p>
<p>এই গ্রন্থের শুরুতেই তিনি বলেন, যে সভ্যতা তাঁর যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব নিজের মূল্যবোধের মাধ্যমে দিতে সক্ষম নয়, সেই সভ্যতার পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যে সভ্যতা যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব অন্য সভ্যতা কর্তৃক সৃষ্ট মূল্যবোধ ও জবাবের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেই সভ্যতা আরও বেশি অধঃপতনের শিকার হয়।</p>
<p>আমরা মুসলিম হিসেবে যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব কীভাবে দিবো এবং আমাদেরকে কীভাবে কাজ করতে হবে, এ বিষয়ে তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় তাঁর অভিমত তুলে ধরেছেন।</p>
<p>মেথডোলজি সম্পর্কে তাঁর পঞ্চম গ্রন্থ হলো আল-হাক্কুল ইসলামী ফিল ইখতিলাফিল ফিকরি। এ গ্রন্থে তিনি চিন্তাগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন এবং ইসলামী চিন্তাকে কীভাবে নবায়ন করে তুলে ধরা যায় এ বিষয় নিয়েও আলোকপাত করেছেন। এ গ্রন্থেই তিনি বলেছেনঃ</p>
<p>ان من العجز ان نرضي باجوبة غيرنا</p>
<p>“আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো যুগের জবাবদানের ক্ষেত্রে অন্যদের তৈরি করা জবাবের মাধ্যমে জবাব দেওয়া।</p>
<p>التي انتهت بهم طريق مسدود</p>
<p>আর এই বিষয়টিই আমাদের পথ রোধ করে দিয়েছে।</p>
<p>بل طريق يقلب الوسائل والمقاصد الي اضدادها</p>
<p>শুধু তাই নয়, এটা মাকসাদ ও ওসিলার স্থানকে পরিবর্তন করে দিতে পারে, যা আমাদের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হয়ে যেতে পারে।”</p>
<p>অর্থাৎ মাকসাদের স্থান ওসিলা আর ওসিলার স্থান মাকসাদ দখল করে নিতে পারে। যার ফলে আমাদের উদ্দেশ্যই পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।</p>
<p>আত-তাওয়াসুল ওয়াল হিজাজ নামে ভাষাতত্ত্বের উপরে তাঁর আরেকটি গ্রন্থ রয়েছে। এ গ্রন্থে তিনি ভাষাগত যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>আমি মনে করি, ত্বহা আব্দুর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো সুয়ালুল আখলাক। একটু পূর্বেই আমি যেমনটা উল্লেখ করেছি, তিনি আখলাককে কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) দানকারী কোনো বিষয় নয়; বরং অস্তিত্বদানকারী একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি আখলাককে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আখলাককে দ্বীন থেকে এবং দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা সম্ভব নয়। যদি পৃথক করা হয়, তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে -এই সকল বিষয় নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।</p>
<p><strong>বুয়ুসুদ দাহরানিয়া</strong> তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এ গ্রন্থটিতেও তিনি আখলাক নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দ্বীন থেকে আখলাককে পৃথক করে ফেললে কোন ধরণের সমস্যা তৈরি হতে পারে -এই বিষয়টি তিনি ই’তিমানি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন। ই’তিমানি দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এ গ্রন্থটি সুয়ালুল আখলাকের ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য করা যায়।</p>
<p>এ গ্রন্থের সাথে সম্পর্কিত আরও একটি গ্রন্থ রয়েছে, সেটি হলো <strong>শুরুদু মা বা’দাদ দাহরানিয়্যা</strong>। এ গ্রন্থে তিনি সমগ্র মানবতার আখলাক নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশ্চাত্য চিন্তা সমগ্র মানবতাকে কীভাবে আখলাকের বাহিরে ঠেলে দিয়েছে- এ বিষয় নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এ গ্রন্থে বিশেষভাবে তিনি মনোবিশ্লেষকদের নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড,  ফ্রিডরিখ নিটশে, লুইস দি লসাদে, লাকান-সহ আরও অন্যান্য মনোবিশ্লেষকদের চিন্তাকে খণ্ডন করেছেন। কেননা এ সকল চিন্তাবিদরা মানুষকে কামুক একটি জীব হিসেবে অভিহিত করে ইনসানকে শুধুমাত্র চাহিদার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। আবার বুঝতেও খুব কঠিন। অর্থাৎ বুয়ুসুদ দাহরানিয়া নামক গ্রন্থে তিনি আলোচনা করেছেন, মানুষ যদি দ্বীন থেকে আখলাককে আলাদা করে ফেলে, তাহলে একদিন সে তাঁর নিজেকেও আখলাক থেকে আলাদা করে ফেলবে। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি শুরুদু মা বা’দাদ দাহরানিয়্যা নামক গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, মানুষ কীভাবে আখলাক থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং এর পর্যায়সমূহ কি হতে পারে।</p>
<p>আল-আমালু’দ দিনিয়্যু ওয়া তাজদিদুল আকল নামেও তাঁর একটি গ্রন্থ রয়েছে। এ গ্রন্থে তিনি আমল ও আকলের পুনর্জাগরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থ থেকে আমি দু’একটি লাইন পাঠকদের উদ্দেশ্য উল্লেখ করতে চাই-</p>
<p>ليس هناك من علم ولا عمل فائقين مثل المتعلقين بالدين</p>
<p>“এমন কোনো জ্ঞান ও আমল নেই, যা দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান ও আমলের চেয়ে উত্তম হতে পারে।”</p>
<p>لذالك كان الجمود هو العدو الأساسي لفاعلية الدين</p>
<p>“দ্বীনি কার্যক্রমের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো চিন্তাকে স্থবির করে ফেলা।”</p>
<p>অর্থাৎ যারা জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করবে, তাঁদেরকে সবসময় জ্ঞানগত ও আমলগত দিক থেকে গতিশীল থাকতে হবে। কোনো আন্দোলন যখন তাঁর চিন্তাগত গতিশীলতাকে হারিয়ে ফেলে, তখনই তা কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।</p>
<p>তাঁর অপর একটি গ্রন্থ হলো <strong>উসূলিল হিওয়ার ওয়া তাজদিদু ইলমিল কালাম</strong>। তাঁর এ গ্রন্থটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থে তিনি আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে তিনি এই গ্রন্থে ইলমূল মানতিকের মধ্যকার যে ডায়ালগ রয়েছে, সেই ডায়ালগকে নিয়েও আলোচনা করেছেন এবং এটাকে মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান শুধু থিওরীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। আমলী দিকের প্রতিও তিনি তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। এই বিষয়ে লেখা তাঁর অন্যতম গ্রন্থ হলো <strong>সুয়ালুল আমল</strong>। সেখানে তিনি বলেন,</p>
<p>كل علم ليس تحته عمل فغير معتبر</p>
<p>অর্থাৎ, “যে জ্ঞান আমল দ্বারা সজ্জিত নয়, সেই জ্ঞান খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়।”</p>
<p><strong>তাঁর অপর একটি গ্রন্থ হলো মিনাল ইনসানিল আবতার ইলা ইনসানিল কাউসার। অর্থাৎ একমুখী ইনসান থেকে বহুমুখী ইনসানের দিকে। আবতার ইনসান হলো একমুখী ইনসান। সে শুধুমাত্র বস্তুজগত নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু কাউসার ইনসান বস্তুজগত (মুলক) ও আধ্যাত্মিক (মালাকুত) জগতকে একসাথে বিবেচনা করে।</strong> এ গ্রন্থটি দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে শিক্ষা দর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে আর দ্বিতীয় ভাগে দার্শনিক ধারণা নিয়ে আলোকপাত করা  করা হয়েছে। তবে উভয় অধ্যায়েই ইনসানকে তিনি কেন্দ্রে রেখেছেন।</p>
<p>তাঁর অন্যতম আরেকটি গ্রন্থ হলো <strong>দ্বীনুল হায়া</strong>। এ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে তিনি ই’তিমানি আখলাকের দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং আখলাককে আসমাউল হুসনার উপর ভিত্তি করে বিশ্লেষণ করেছেন। এ খণ্ডে তিনি হুদুদুল্লাহ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন।</p>
<p>দ্বীনুল হায়ার দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সৃষ্ট গায়রে আখলাকী চ্যালেঞ্জকে কীভাবে মোকাবেলা করা যায় এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে হায়ার আখলাকের মাধ্যমে এই সঙ্কটকে আমরা কীভাবে মোকাবেলা করবো সে বিষয়টি দার্শনিক যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন।</p>
<blockquote><p><strong>দ্বীনুল হায়ার তৃতীয় খণ্ড হলো রুহুল হিজাব</strong>।  এই গ্রন্থটি অসাধারণ একটি গ্রন্থ। হিজাবের ফিতরী ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র শরীর ঢাকার নামই হিজাব নয়। শরীরকে আবৃত করার পাশাপাশি হিজাব একইসাথে রবের নিকটবর্তী কীভাবে হবো,সেই বিষয়টিও শিক্ষা দেয়। তাঁর ভাষায়ঃ</p>
<p>ان الحجاب لباس معنوى يكشف عن اداب التقرب الي الله</p>
<p>অর্থাৎ, “হিজাব হলো আধ্যাত্মিক একটি পোশাক। আমরা কীভাবে আল্লাহর নিকটবর্তী হবো, হিজাব আমাদেরকে সেই শিক্ষা দিয়ে থাকে।”</p></blockquote>
<p>আল মাফাহিমুল আখলাকিয়্যা নামে দুই খণ্ডের আরও একটি গ্রন্থ রয়েছে।</p>
<p>যুগের গাজ্জালী খ্যাত মহান এই মনীষীর চিন্তা ও দর্শনকে বুঝে আল্লাহ আমাদের কাজ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 758px; top: 1160.45px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahman-and-his-philosophical-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15152</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে সুখের দার্শনিক ভিত্তি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/philosophical-basis-of-happiness-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/philosophical-basis-of-happiness-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 23 Oct 2024 14:21:52 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15121</guid>

					<description><![CDATA[দর্শনশাস্ত্র যে সব বিষয় আলোচনা করেছে তন্মধ্যে মানব জাতির ইতিহাসে সুখের প্রশ্নটি হচ্ছে একটি অত্যন্ত পুরনো বিষয়। বিষয়টি ব্যবহারিক বা প্রয়োগীয় দর্শনের অন্তর্ভুক্ত। নীতিশাস্ত্র ও সমাজতত্ত্ব বিশারদ বিজ্ঞ পণ্ডিতগণ এর প্রকৃতি শর্তাবলী, কারণ, বাধাপ্রতিবন্ধকতা ও অসঙ্গগতিসমূহ আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন। যদি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দর্শনশাস্ত্র যে সব বিষয় আলোচনা করেছে তন্মধ্যে মানব জাতির ইতিহাসে সুখের প্রশ্নটি হচ্ছে একটি অত্যন্ত পুরনো বিষয়। বিষয়টি ব্যবহারিক বা প্রয়োগীয় দর্শনের অন্তর্ভুক্ত। নীতিশাস্ত্র ও সমাজতত্ত্ব বিশারদ বিজ্ঞ পণ্ডিতগণ এর প্রকৃতি শর্তাবলী, কারণ, বাধাপ্রতিবন্ধকতা ও অসঙ্গগতিসমূহ আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন। যদি সুখ ও দুঃখ বা দুর্ভাগ্যের প্রশ্নটি জল্পনাধর্মী দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় উত্থাপিত হয়, তখন এটি সমস্যার একটি ছোটখাট বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত থাকে, অর্থাৎ সুখ (এবং দুঃখ) কি দৈহিক ও বস্তুগত? অথবা এটা কি নিম্নে বর্ণিত দুই প্রকার? যেমন:</p>
<ul>
<li>১. শারিরীক ও বস্তুগত সুখ।</li>
<li>২. আধ্যাত্মিক ও মানসিক সুখ।</li>
</ul>
<p>ধর্মতত্ত্ববিদগণ এ প্রশ্নটি আলোচনা করেছেন। তার কারণ এই যে, তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে- আধ্যাত্মিক এবং মানসিক সুখ-দুঃখ অনেক মহান, অনেক বড়। বু-আলী, (আবু আলী ইবনে সিনা), ইউরোপে যিনি এভি-সেনা নামে পরিচিত, তাঁর লিখিত &#8216;ইশারাত&#8217; পুস্তকের ৮ম অধ্যায় এবং সদরুল মোতাআলেহীনের লিখিত &#8216;আসদার&#8217; গ্রন্থের ৪র্থ বিষয়টি আলোচনাকালে, সুখ প্রশ্নটির শুধু এ দিকটি বিবেচনা করেছেন এবং এর অন্যান্য দিক বাদ দিয়েছেন। অপরদিকে আমরা আজ পর্যন্ত ইসলামী ও অনৈসলামী দর্শন পুস্তকে এ বিষয়টি সম্পর্কে কোন সর্বাত্মক ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দেখতে পাইনি। <em>যদিও এ রচনায় পাঠক যা কিছু পাবেন, তা আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বলে বিবেচিত হতে পারে না, তবুও এটাকে একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ বা সাধারণ আলোচনা বলা যেতে পারে।</em> এখানে যেসব প্রশ্ন ও আলোচনা উঠে আসে তা নিম্নরূপ:</p>
<ul>
<li>১. সুখ কি?</li>
<li>২. সুখ ও আনন্দ।</li>
<li>৩. মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবেই সুখের আকাঙ্খা করে?</li>
<li>৪. সুখ ও ব্যাকুল বাসনা।</li>
<li>৫. সুখ ও সন্তুষ্টি।</li>
<li>৬. একটি সামাজিক আলোচনা।</li>
<li>৭. সুখের প্রকারভেদ।</li>
<li>৮. সুখের স্তর বা পর্যায়।</li>
<li>৯. সুখের উপাদান ও কারণসমূহ।</li>
<li>১০. ধারাবাহিক আলোচনা সম্পর্কে একটি জরীপ।</li>
<li>১১. সুখলাভের জন্যে মানুষের কি হিদায়াতের প্রয়োজন?</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রথমেই সুখ এবং দুঃখ শব্দ দু&#8217;টির অর্থ সুস্পষ্ট বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে যদি কোন জটিলতা ও অসুবিধা থেকে থাকে, তা অন্যান্য সমস্যার সাথে সম্পর্কিত। কারণ আপনি যদি কোন ব্যক্তির কাছে জানতে চান যে, তিনি সুখ কামনা করেন কিনা, তখন বিনা দ্বিধায় তিনি ইতিবাচক জওয়াব দেবেন এবং আপনি যদি প্রশ্ন করেন &#8220;দুঃখ সম্পর্কে কি মত, তাও চান কি না?&#8221; তখন নিঃসন্দেহে একটি নেতিবাচক উত্তর আপনার কানে পৌঁছবে। কেউ এ প্রশ্ন সম্পর্কে একটুও এমন চিন্তা করে না এবং কেউই একথা বলে না যে- &#8220;প্রথমে সুখ ও দুঃখের অর্থ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দাও, যাতে করে আমি কোনটি চাই সে সম্পর্কে ভেবে দেখতে পারি।&#8221; সুতরাং সব মানুষের কাছেই সুখ এবং দুঃখের সুস্পষ্ট অর্থ আছে, কাজেই এগুলো এমন সব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যাদের কোন সংজ্ঞার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি বলতে চাই যে, সুখের কোন সংজ্ঞাদানের প্রয়োজন নেই একথা মনে করা যথেষ্ট নয়। অনেক ধারণাই প্রথমে এরকম মনে হয়, কিন্তু যখনই আমরা দ্বান্দ্বিক বা প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি ব্যবহার করি এবং সে অর্থকে এর সাথে কাছাকাছি অন্যান্য অর্থের সাথে তুলনা করি ও বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা দেখতে পাই যে সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার ধারণা ক্রমেই এক ধরনের জটিলতা ও অস্পষ্টতার দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>অনেকেই সুখ শব্দটিকে আনন্দ, প্রশান্তি, সাফল্য, আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি, পরমানন্দ এবং বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে সন্তুষ্টি লাভ ও অনুরূপ আরো কিছু বিষয়ের সমার্থবোধক বলে মনে করেন। কিন্তু যখনই আমরা সুখ শব্দটিকে এর প্রত্যেকটির সাথে তুলনা করি তখন আমরা দেখতে পাই যে ঐগুলো অর্থের দিক থেকে সঠিক ও যাথাযথ হলেই ধারণা হিসেবে সবগুলি এক নয়। সুতরাং প্রথমেই তাদের তুলনা করা প্রয়োজন, যাতে করে পরবর্তী সময়ে এসব তুলনার ভেতরেই আমরা সুখের সঠিক অর্থ খুঁজে পেতে পারি।</p>
<p>সুখ শব্দটি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সাহায্য অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে কিনা, যাতে করে পৃথিবীতে বিভিন্ন উপলক্ষে যে ব্যক্তি সাহায্য লাভ করে তাকে আমরা সুখী বলতে পারি। এজন্যে সুখ ও আনন্দের শব্দগত মৌলিক অর্থ আলোচনার কোন প্রয়োজন নেই। অপরদিকে এর বিপরীত অর্থে আমরা দুঃখ শব্দটিকে বিবেচনা করতে পারি। অথবা দুঃখ মানে তাই- যা শুরু থেকে গভীর বেদনা, ব্যথা ও দুর্ভাগ্যের অর্থে ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে সুখ শব্দটি ঠিক তার বিপরীত মানে বুঝায় অর্থাৎ বেদনা ও কষ্ট থেকে মুক্তি।</p>
<p>বাহ্যত অভিধানগত অর্থে আমরা এ দু&#8217;টি শব্দের বিপরীত অর্থ দেখতে পাই না, কিন্তু সাধারণ ও বিশেষ অর্থে ব্যবহারকালে সুখ ও দুঃখ শব্দ দু&#8217;টিকে বিপরীত অবস্থানে রাখতে হয়। আল-কোরআনেও এ ধরনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় যেমন, <strong>&#8220;সেদিন যখন উপস্থিত হবে, তখন কারো পক্ষে তাঁর (আল্লাহর) অনুমতি ছাড়া কোন কথা বলা সম্ভব হবে না, অনন্তর এদিন কিছু লোক হবে হতভাগ্য, আর কিছু সৌভাগ্যবান, যারা হতভাগ্য হবে তারা দোযখে যাবে- আর যারা সৌভাগ্যবান হবে তারা জান্নাতে যাবে।&#8221;</strong> <strong>(১১: ১০৫-১০৮)</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সুখ ও আনন্দ</strong></h4>
<p>সুখ এবং আনন্দ শব্দ দু&#8217;টি অর্থের দিক থেকে খুবই কাছাকাছি (দুর্ভাগ্য ও বেদনার ন্যায়), কিন্তু তারা সমার্থবোধক নয়। আনন্দলাভ করা ও সুখ হাসিল করা একই কথা নয়। ঠিক একইভাবে ব্যথা-বেদনা সহ্য করাকে পুরোপুরি দুর্ভাগ্য বলা যেতে পারে না। কেননা আনন্দের পেছনে আসতে পারে অনেক ব্যথা-বেদনা, যেমনিভাবে আবার ব্যথা-বেদনা ও মহত্তর, বৃহত্তর গুরুত্বপূর্ণ আনন্দের ভূমিকা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এটাও সম্ভব যে আমরা একটি আনন্দলাভ করি, আর তারই ফলশ্রুতিতে আরো বৃহত্তর, মহত্তর ও গুরুত্বপূর্ণ আনন্দ হারিয়ে ফেলি, অথবা একটি বেদনা, একটুখানি কষ্ট আরে। কঠিন ও তীর ব্যথা-বেদনাকে প্রতিরোধ করে।</p>
<p>এ সমস্ত ক্ষেত্রে আনন্দ ও বেদনার বাস্তবতা অক্ষুণ্ণ থাকে অর্থাৎ আমাদের মনে করা উচিত নয় যে, আনন্দ আরো একটি বৃহত্তর বা মহত্তর আনন্দের পথ বেঁধে দেয়, অথবা আরো বেশী ব্যথা-বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাকে আর আনন্দ বলা যাবে না। কিন্তু এমনি ধরনের আনন্দ সুখ নয়। একইভাবে যখন একটি ব্যথা বা বেদনা আরো বড়ো আনন্দের ভূমিকা গ্রহণ করে অথবা কঠিন যন্ত্রণা বা বড়ো কষ্ট নিবারণ করে, তাকে অবশ্যই বিরূপ দৃষ্টিতে দেখা উচিত হবে না।</p>
<p>আমরা যখন কোন কিছু লাভ করি, কোন কিছু পাই, তখন যদি আমাদের মনে কোন দুঃখ বা অনুতাপ না আসে, আমরা যদি দুঃখিত না হই, তাহলে সেটাই সুখ এবং দুঃখ-দুর্দশা হচ্ছে যে জিনিস বা বিষয়ের কোন কারণ কোনক্রমেই আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি না. খুজে পাই না, তা সয়ে যাওয়া, অর্থাৎ মানুষ তার চূড়ান্ত আকাঙ্খা বা কামনা-বাসনার জন্যে হয় বোধকে বেছে নিয়েছে এবং দুঃখকে গ্রহণ করেছে, ঠিক তার বিপরীত কারণে, অর্থাৎ যা তার সব সময় পরিহার করা উচিত। <strong>অন্যকথায়, সুখ হচ্ছে মানুষের নিঃশর্ত ইচ্ছা অভিলাষ, আর কষ্ট বা দুঃখ হচ্ছে তা নিঃশর্ত বিতৃষ্ণা বা ঘৃণা।</strong> সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি বা একটি ধর্ম অথবা বিশেষ চিন্তাধারা দাবী করে যে, সে মানব জাতির জন্যে সুখ বয়ে আনছে, তাহলে তার মানে হবে- &#8220;আমি যে বিষয়ে পথ নির্দেশ দেয়ার দাবী করছি, তা যা ধারণা করা হয় তার চাইতে অধিকতর উৎকৃষ্ট নয়।&#8221; কিন্তু আনন্দ সে রকম কিছু নয়। কেউ যদি দাবী করে যে সে আনন্দ দিচ্ছে, তাতে যদি আরো গভীর বেদনা বিজড়িত থাকে অথবা আরো মহত্তর বা বৃহত্তর আনন্দ হারিয়ে যায়, তবুও ব্যাপারটি ভিন্ন।</p>
<p>আনন্দ মানুষ অথবা অন্যান্য প্রাণীর বিশেষ ক্ষমতা এবং সামর্থ্যের সাথে সম্পর্কিত থাকে, কিন্তু সুখ মানুষের সামগ্রিক ক্ষমতা, সামর্থ্য ও জীবন ধারণের পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। আনন্দ প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর বিষয়ের নিয়ন্ত্রক। অপরদিকে যা কাম্য এবং কাম্য নয়, সুখ তারই ওপর আধিপত্য করে। আনন্দ বর্তমান সময়ের সাথে সম্পর্কিত, অপরদিকে সুখ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়ের সাথেই সমানভাবে অন্বিষ্ট। আনন্দ ও বেদনা মানুষের জীবনের প্রত্যেকটি দিকের সাথে পৃথক পৃথকভাবে জড়িত, অপর দিকে সুখ হচ্ছে একটি সামগ্রিক ব্যাপার।</p>
<p>এ কারণে আনন্দ ও বেদনার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ, কিন্তু সুখ ও তার বিপরীত অনুভূতিকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা খুবই কষ্টকর এবং কোন কোন সময় দুঃসাধ্য। একজন মনস্তত্ববিদ, যিনি শুধু মানসিক প্রক্রিয়াকেই স্বীকৃতি দেন, তিনি আনন্দ ও বেদনা সম্পর্কে তাঁর মতামত দিতে পারেন, অপর- পক্ষে সুখ ও দুঃখ সম্পর্কে মতামত পেশ করা দার্শনিকের কাজ, কেননা তিনি পৃথিবীকে তার সমাজ ও মানুষকে জানার ও চেনার দাবী করেন। সুখ ও দুঃখ সম্পর্কে সে দার্শনিকের মতামত নির্ভর করে পৃথিবী ও মানুষ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের ওপর। একারণে সুখ সম্পর্কে দার্শনিকেরা যে পরামর্শ, উপদেশ বা মতামত দেন, তা একই ধরনের নয়। প্রত্যেকেই এক্ষেত্রে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের একজন মনে করেন আনন্দলাভই হচ্ছে সুখ, কিন্তু আরেক জনের মতে আনন্দ বিসর্জন দেয়া এবং ইচ্ছা দমন করাই হচ্ছে সুখ। কেউ বা পার্থিব বিষয়ের প্রতি মনযোগ নিবদ্ধ করেন, আর অপর কেউ মনোযোগ দেন আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রতি। তাদের একজন মনে করেন বর্তমান মূহুর্তই গুরুত্বপূর্ণ, আরেক জনের মূলমন্ত্র ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। কিন্তু যেহেতু আদশ ও বেদনা অহংয়েরই বিশেষ কর্ম-ফসল বা পরিণতি, সে কারণে সেগুলো গভীর অনুসন্ধান ও পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল এবং সেগুলো সম্পর্কে ঐক্যমতে উপনীত হওয়া সহজ।</p>
<p>মানুষ সুখ কামনা করে, এটা তার দাবী, কিন্তু তারপরও কেন সে বিভিন্ন লক্ষ্য অনুসরণ করে বা সুখ লাভের জন্ম বিভিন্ন উপায় বা পথ অবলম্বন করে। এর কারণ হচ্ছে এই যে, তাদের ব্যক্তিগত চিন্তা পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে অথবা তারা মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে রচিত বিশেষ কোন চিন্তাধারা বা ধর্মের সাথে জড়িত। এর আরো একট কারণ আছে, যা আমরা &#8216;সুখ কি নিরপেক্ষ বা আপেক্ষিক&#8217;-এ প্রশ্নের সাথে আলোচনা করবো।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবেই সুখের আকাঙ্ক্ষা করে? </strong></h4>
<p><em>সুখ ও আনন্দের মধ্যে আমরা যে পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছি, তাতে</em> <em>দেখা যায় যে আনন্দ একমুখী, কিন্তু সুখ বহুমুখী। </em>আনন্দ হচ্ছে মানুষের অহংয়ের বিশেষ সৃষ্ট অবস্থার একটি দিক এবং বিবেকের অনুমোদন সাপেক্ষ। অপরদিকে সুখ হচ্ছে একটি সাধারণ ও পৃথক বিষয়, যা সকল আনন্দ বেদনার তুলনা ও হিসেব নিকেশ করে পাওয়া যায়। মানুষ সুখের ধারণা লাভ করেছে আনন্দ ও বেদনাকে তুলনা করার সামর্থের মধ্য দিয়ে, তার বিভিন্ন দিক অধ্যয়ন করে, মহত্তর ও ব্যাপক আনন্দ লাভ ও সার্বিকভাবে উপভোগের একটি পন্থা গ্রহণ করে এবং সকল দুঃখ যাতনাকে নিঃশেষ করে দিয়ে। কিন্তু আনন্দ হচ্ছে একটি মানসিক অবস্থার নাম, যা নির্ভর করে কোন কিছু বা একটি শক্তি বা সামর্থ্য বা মানব দেহের নমনীয়তার ওপর। কাজেই আনন্দ ও বেদনাকে প্রকৃতি ও সহজাত বৃত্তির দ্বারা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায়।</p>
<p>কিন্তু সহজাত বৃত্তি ও প্রকৃতির দ্বারা সুখ ও দুঃখকে চেনা যায় না, বুদ্ধিবৃত্তিই এ কাজ করতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তি সরাসরি পৃথকভাবে চিহ্নিত করার দাবী করে কিনা, নাকি মানুষকে সুখের দিশারী চিন্তাধারা বা ধর্মের দিকে পরিচালিত করে, সেটা ভিন্ন কথা। তবে একথা ঠিক যে, যেকোনভাবেই হোক, সহজাত বৃত্তি এ কাজ করতে পারে না। <strong>সুতরাং একথা সত্যি নয় যে- প্রত্যেক মানুষই প্রকৃতগতভাবে সুখ কামনা করে এবং সর্বদাই তাই চায়। মানুষ যা চায় তা হচ্ছে আনন্দ। </strong></p>
<p>কোন মানুষ সঠিক পথ বাছাই করুক বা না করুক, যেকোন অবস্থায় সে সুখ চায়। <em>একথা আমরা একমাত্র তখনই বলতে পারি, যখন সে সঠিক হিসেব-নিকেশ করে, লাভ-ক্ষতির তুলনা করে এবং এর মধ্য থেকে একট পথ নির্বাচন করে।</em> কাজেই মানুষ প্রকৃতগতভাবেই সুখ চায় কিনা- এই প্রশ্নের জওয়াবে একথা অবশ্যই বলতে হবে যে- যদি এর মানে এই হয় যে, সব মানুষই হারানো সুখের পেছনে দৌঁড়ায়, কিন্তু শুধুমাত্র তারা পার্থক্য করার সময়ে প্রায়ই ভুল করে, তাহলে একথা ঠিক নয়। কেননা মানুষ প্রায়শই প্রকৃতিকে অনুসরণ করে, বুদ্ধিবৃত্তিকে নয় এবং তারা আনন্দ চায়, সুখ নয় এবং যদি এটা বুঝায় যে, মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তি সুখকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে, স্বাভাবিকভাবে তা পেতে চায়, তাহলে এটি হবে একটি সঠিক কথা বা বক্তব্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সুখ ও ব্যাকুল বাসনা</strong></h4>
<p>প্রত্যেক মানুষেরই অবশ্যই বেশ কিছু ইচ্ছা আছে এবং সেগুলো পূরণ করার প্রবল আকাংখাও আছে। যদি তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, কোন কোন জিনিসে তার সুখ নিহিত আছে, যাতে করে সে তা হাসিল করতে পারে। সে তখন তার প্রয়োজন ও ব্যাকুল বাসনাগুলোকে সামনে নিয়ে আসবে।</p>
<p>কিছু লোক মনে করেন যে সুখ হচ্ছে ব্যাকুল বাসনার নিবৃত্তি ও আকাংখা পূরণে সাফল্য লাভ এবং যে কেহ এসবের নাগাল পেয়েছে, সে পরিপূর্ণ সুখ লাভ করেছে এবং যে কোনটাই পায়নি সে পুরোপুরি অসুখী অথবা যে তার কিছু বাসনা পূরণ করেছে, সে তার প্রাপ্তি বা সাফল্যের অনুপাতে কিছু সুখও লাভ করেছে। কাজেই তার সাথে যে অবিচার করা হয় নাই। শুধু তাই নয়, বরং একটি শ্রেণীর সদস্য হিসেবে কিছু কল্যাণও সে হাসিল করেছে।</p>
<p>কিন্তু আমরা বলতে পারি যে, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ আনন্দ লাভ এবং সর্বাধিক দুঃখ-বেদনা দূরীকরণ বা হ্রাসকরণই হচ্ছে সুখ। অন্য কথায় একজন মানুষ যখন যে কোন পরিস্থিতিজাত প্রতিবন্ধকতা এবং অসামঞ্জস্য ও বৈপরিতোর কারণে ব্যথা-বেদনা ও দুখ-যন্ত্রণা অতিক্রম করার জন্যে স্বীয় বস্তুগত ও বুদ্ধিগত সম্পদের সুসামঞ্জস্য ব্যবহার করে, তখন সুখ সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে একথা সত্য বলে মেনে নেয়া হয় যে- মানুষ তার জন্মগত ক্ষমতা ও সামর্থ্য সম্বন্ধে সচেতন এবং সৃষ্ট জগতের স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে উক্ত ক্ষমতা ও সামর্থ্য ব্যবহারের সম্ভাবনা অনুধাবন করতে সক্ষম।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে এটা উল্লেখযোগ্য যে, কোন কোন সময় সমাজের শোষিত ও দুর্বল শ্রেণীর লোকজন এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে যে- শোষকেরা প্রয়োজন মনে করে বস্তুগত যেসব সুযোগ-সুবিধা তাদের দিচ্ছে তারা তাতে সুখী। বাস্তবে তারা যখন ধড়িবাজ, সুবিধাবাদী ও স্বার্থপর লোকদের শোষণের কাছে আত্মসমর্পণ করছে, তখন তাদের সুখকে প্রকৃত সুখ বলা যেতে পারে না। এই ভাবে যে অন্যায়-অবিচার হচ্ছে, তা অসন্তোষের কারণে সৃষ্ট জুলুম না-ইনসাফীর চেয়ে অধিকতর বেদনাদায়ক ও করুণ। কারণ যারা অন্যায়-অবিচার অনুভব করে, তাদের জন্য সেটা যন্ত্রণাদায়ক অসুখের মতোই যা রোগীকে বাধ্য করে প্রতিকার খুঁজে বের করার জন্যে। কিন্তু যারা জুলুম, না-ইনসাফী অনুভব করে না, তাদের জন্যে সেটা ব্যথাহীন অসুখের মতোই। আর সাধারণতঃ ব্যথাহীন অসুখের রোগীরা রোগের প্রতিকার বা ঔষধ তালশ করা থেকে বিরত থাকে।</p>
<p>সমাজের স্বচ্ছল শ্রেণীর লোকেরা দুর্বল শ্রেণীর সবচাইতে বড়ো খিদমত যা করে তা হচ্ছে, তাদের (দুর্বল শ্রেণীর লোকজন) মধ্যে সন্তুষ্টর মনোভাব সৃষ্টি করে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়। কিন্তু সুখ মানে শুধুমাত্র কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ নয়। এর মানে ব্যথাবেদনা না থাকা নয়, সুখ মানে হচ্ছে সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ পরমানন্দ কল্যাণ লাভ করা। আগেই বলা হয়েছে যে, এধরনের কষ্ট ও যন্ত্রণাকে চোখ ও দাঁতের ব্যথার সাথে তুলনা করা যেতে পারে না এবং যে কোন ক্ষেত্রে এগুলোর দূরীকরণকে খিদমত হিসেবে হয়তো চিন্তা করা হবে না। সামাজিক সতর্কতা আসে এধরনের কষ্ট-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে এবং এক্ষেত্রে এসব কমিয়ে দেয়া হচ্ছে আরেকটি পাপ ও অপরাধ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সুখের প্রকারভেদ</strong></h4>
<p>সুখকে যদি আমরা মানুষের ওপর আরোপ করি যে, মানুষ হচ্ছে দেহ ও আত্মার সমন্বয়, তাহলে এটা হবে শুধু এক প্রকার। কিন্তু আমরা দেহ ও আত্মাকে যদি পৃথক পৃথক অস্তিত্ব মনে করি, তাহলে বলতে হবে সুখ দুই প্রকার- শারীরিক ও আধ্যাত্মিক। আনন্দের স্থিতিশীলতা, তীব্রতা, শক্তি অথবা দূর্বলতা অনুযায়ী এবং দৈহিক ব্যথা-বেদনার সর্বাধিক মাত্রায় উপশম বা দুরীকরণের মাধ্যমে আমরা সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণরূপে যে শারীরিক আনন্দ লাভ করি তাই হচ্ছে শারীরিক সুখ। আধ্যাত্মিক সুখ হচ্ছে সামগ্রিক ও পরিপূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক আনন্দলাভ এবং আধ্যাত্মিক জীবনে দুঃখ বেদনার হাত থেকে সর্বাধিক মাত্রায় মুক্তি। আমরা দেহের প্রতিটি অংগের সুখকে পৃথক করতে পারি এবং দেহের শক্তি ও অংগের ভিত্তিতে ভাগ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ দৃষ্টির সুখ, শ্রবণের সুখ, যুক্তির সুখ ইত্যাদি। সে যাহোক, যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন, সুখ আনন্দ থেকে পৃথক। দৃষ্টির সুখ দৃষ্টির আনন্দ থেকে পৃথক। কোন কিছু চোখের জন্যে আনন্দদায়ক হতে পারে, কিন্তু যেহেতু তা দৃষ্টিশক্তির জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে, সে কারণে সেটা সুখ বলে বিবেচিত হতে পারে না। আনন্দের কথা বাদ দিলে যখন কোন কিছুর সুখের কথা বলি, তা সে হোক মানুষের, দেহের অথবা আত্মার বা দেহের কোন অঙ্গের সুখ, তখন তার সামগ্রিক গুরুত্বকে আমরা অবহেলা করতে পারি না বা বাদ দিতে পারি না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সুখের স্তর যা পর্যায়</strong></h4>
<p>আনন্দ ও বেদনা, সুখ ও দুঃখের প্রধান ভিত্তি, তাদের প্রত্যেকের স্তর বা পর্যায় আছে। ব্যক্তিভেদে তাদের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। আনন্দে অনুভূতি বা উপলব্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, তা শুধু দৈহিক তৃপ্তি বা উপভোগের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠে না, বরং বৃদ্ধিগত নান্দনিক এবং ধর্মীয় উপলদ্ধিতেও সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। প্রকৃতিগতভাবেই বিভিন্ন যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী সুখের পর্যায় ও স্তর বিভিন্ন এবং সকল মানুষই সমপর্যায়ে সুখ ভোগ করতে পারে না। অধিকন্তু বাইরের উপাদানগুলো যা মেধাকে সক্রিয় রাখে অথবা বেদনা ও দুঃখ যন্ত্রণাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা সব মানুষের জন্যে সমান নয়। সুতরাং এসব উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে সুখও বিভিন্ন ধরনের হয়। সুখ হচ্ছে একট সামগ্রিক প্রাপ্তি বা লাভ।</p>
<p>এ সামগ্রিক প্রাপ্তির ব্যাপারটি পূর্ণাঙ্গভাবে সর্বোচ্চ সীমারেখার মধ্যে অথবা অন্যভাবে হতে পারে। একারণে সুখের বিভিন্ন পর্যায় ও স্তর লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>এ পর্যন্ত আমরা যা কিছু ব্যাখ্যা করেছি তাতে দেখা যায় যে সুখ পুরোপুরি নির্ভর করে গতি, বিবর্তনমূলক কার্যধারা ও মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার আলোকে পূর্ণত্ব অর্জনের ওপর। <strong>সুতরাং, সুখ পূর্ণতার সাথে সম্পর্কিত।</strong> কিন্তু গতি ও আন্দোলনের মধ্যে এমনিতে কোন পূর্ণতা নেই, কিন্তু এগুলো হচ্ছে পূর্ণতালাভ তথা সুখলাভের মাধ্যম বা উপায়। সুখ ও পূর্ণতা একই নিয়মের অধীন।</p>
<p>এখন আমরা সুখের উচ্চতর অর্থের দিকে যেতে পারি এবং সুখ ও অস্তিত্বকে পাশাপাশি ২ জন অশ্বারেহী ব্যক্তির মতো মনে করতে পারি। প্রতিটি সৃষ্ট প্রাণীই তার ক্রমঃবিকাশ ও বর্ধনের ক্ষমতার অনুপাতে সুখভোগ করে। অস্তিত্বের চিরস্থায়ী উৎস ও উৎপত্তি থেকে সৃষ্ট বক্ররেখার সাথে যতটুকু নৈকট্য বা সম্বন্ধ থাকে, ক্রমবিকাশের ক্ষমতাও সে অনুপাতে হয়। এবং মানুষ এ উৎপত্তি বা মূলের যত কাছাকাছি থাকে, সুখ থেকে উপকৃত হওয়া বা কল্যাণ লাভ ঠিক সে অনুপাতেই তার হয়ে থাকে এবং উৎপত্তি বা মূল থেকে যত দূরে থাকে সে অনুপাতে কষ্টও ভোগ করে। মানুষের সব ধরনের সুখলাভের শক্তি বা যোগ্যতা সৃষ্টি হয় আল্লাহর নৈকট্যলাভের কতটুকু শক্তি বা যোগ্যতা তার আছে তা দিয়ে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সুখের উপাদান বা কারণ</strong></h4>
<p>যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষতঃ বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করা হয়, সুখের উপাদান হচ্ছে তন্মধ্যে অন্যতম।</p>
<p>এক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন আছে, উদাহরণস্বরূপ নীচে কয়েকট দেয়া গেল-</p>
<ul>
<li><strong>১.</strong> যেসব কারণ মানুষকে যথর্থাই সুখী করে, আসলে তার কোন অস্তিত্ব আছে কি? অথবা সুখ কি শুধুই স্বপ্ন বা কল্পনা? দুঃখ, বেদনা, কষ্ট এবং সে ভয়ের কারণগুলোই কি শুধু পৃথিবীতে সৃষ্টি করা হয়েছে? প্রাচীন ও আধুনিক দার্শনিকগণ, যারা শিল্প-সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ইত্যাদির প্রতি ঘৃণা পোষণ করে তাঁরা এই মত পোষণ করেন। স্পষ্টতঃ এমনি ধরনের চিন্তাধারার সাথে খোদায়ী দর্শনের কোন মিল নেই, ধর্মতাত্ত্বিক দার্শনিকদের মধ্যে এমন কোন লোক খুঁজে পাওয়া যায় না, অথচ বস্তুবাদী দর্শন এ ধরনের বহু লোকের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি আলোচনা করার ক্ষেত্র এটা নয়।</li>
<li><strong>২.</strong> সুখের উপাদান বা এর পেছনে যে কারণ নিহিত রয়েছে তাই কি শুধু খুঁজে বের করতে হবে, অথবা এটা কি বিভিন্ন উপাদান বা কারণের ওপর নির্ভরশীল?</li>
<li><strong>৩.</strong> সে উপাদান বা কারণ (বা উপাদানগুলোও বা কারণসমূহ) কি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অস্তিত্বে বিদ্যমান অথবা এটা কি বাইরের জগতে আছে এবং সেখান থেকেই তা হাসিল করতে হবে? অথবা কারণ বা উপাদান- সমূহের একাংশ কি ভেতরের এবং অপরাংশ বাইরের?</li>
<li><strong>৪.</strong> যদি এসব উপাদান বা কারণসমূহ মানব প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে বিস্তমান থেকে থাকে, সেগুলো কি তার দেহে এবং শারীরিক শক্তি, অথবা তার আত্মায় এবং আধ্যাত্মিক শক্তিতে? অথবা কোন অংশ তার দেহে এবং কিছু তার আত্মায়?</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>এগুলো অসংখ্য প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো আলোচনার সূত্রপাত ঘটায় এবং যে সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা করা হয়েছে, সংক্ষেপে এসবই প্রশ্ন করে, &#8220;সুখের উৎস কোথায়&#8221;?</p>
<p>যেমন আমরা জানি, কিছু লোক দাবী করছে যে নিজের ভেতরেই সুখ অন্বেষণ করতে হবে। এসব চিন্তাবিদদের অধিকাংশই সুখকে ব্যথা-বেদনার হাত থেকে মুক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন এবং বিশ্বাস করেন যে বহির্জগতের সংস্পর্শে এসে কলুষিত হলে ব্যথা-বেদনা ও দুঃখ-যন্ত্রণার সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তি নিজেকে যত বেশী বাইরের জগৎ থেকে আলাদা রাখে এবং এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে ততবেশী সুখের কল্যাণ প্রাপ্ত হয়, যা (সুখ) আসলে ব্যথা-বেদনার হাতে মুক্তিলাভ ছাড়া আর কিছুই নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ভারতীয় দর্শনে, সুফীবাদ এবং বুদ্ধের চিন্তাধারায়, গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ডাইওজিনিসের ন্যায় গ্রীক বৈরাগ্যবাদী দার্শনিকদের দর্শনে এবং মেইনস ও তাঁর অনুসারীদের শিক্ষায় আমরা এমনি ধরনের ভাবধারার সন্ধান পাই।</p>
<p>দুর্ভাগ্যবশত এ চিন্তা-পদ্ধতি যা দার্শনিক বৈরাগ্য ধর্মীয় মতবাদের ফসল এবং ইসলামী একত্ববাদের সম্পূর্ণ বিরোধী ও বিপরীত, তা এ চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ও অভ্যস্ত লোকজনের সাথে মেলামেশা ও এ সম্পর্কিত চিন্তাধারার প্রচারণার ফলে মুসলমানদের মধ্যে বহুল পরিমাণে প্রচলিত হয়েছে। কঠোর সংযম, খোদাভক্তি, সংসারত্যাগ অথবা এমন কি সুফীবাদের নামে মুসলমানদের মধ্যে এ চিন্তাধারায় প্রচলন হয়েছে এবং সেটা তাদের মধ্যে এমনভাবে বহুমূল হয়েছে যে, কিছু কিছু অজ্ঞ মূর্খ লোকদের ধারণা অনুযায়ী ইসলামী দৃষ্টিভংগীতে এ চিন্তাধারার প্রয়োজন আছে।</p>
<p>আরেক দল মনে করেন বাইরের দুনিয়াই হচ্ছে সুখের উৎস। তাঁরা বলেন যে মানুষ এ পৃথিবীর একটি অংশ, প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা সে প্রভাবিত হয় এবং এ কারণেই সে বেঁচে থাকে এবং পৃথিবীর আনন্দ উপভোগ করে। মানুষের নিজস্ব বলতে যা আছে তা হচ্ছে দারিদ্র ও অভাব। কিছু পার্থিব উপাদান বা কারণের প্রতিকূলে এক ধরণের স্নায়বিক সংবেদনশীলতা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলে তখন আনন্দের সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ- মানুষ কোন কিছুর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তখন তার দৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত স্নায়ুতে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, অথবা মুখগহ্বর জিহ্বা ও পরিপাক যন্ত্রে খাদ্যের সংস্পর্শে যে প্রতিত্রিয়ার সৃষ্টি হয় বা একজন পুরুষ ও নারী যখন একে অপরকে স্পর্শ করে, তখন তাদের মধ্যে স্পর্শের যে অনুভুতি বা বোধ জন্মে, তারই ফলে এক ধরনের স্নায়বিক সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক ক্রিয়ার আমরা আনন্দলাভ করি। একমাত্র যে জিনিষটি মানুষের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হতে পারে বলা যায় তা হচ্ছে খাদ্যের অপ্রাচুর্য অথবা অন্যান্য দোষত্রুটি বা অভাবের কারণে মানবদেহে ব্যথা-বেদনা ও দুঃখকষ্ট দেখা দিতে পারে।</p>
<p>এ মতাবলম্বীদের মতে সুখ পুরোপুরিভাবে বাহ্যিক কারণ বা জ্ঞানদানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কষ্ট বা দুঃখ মানুষের অভ্যন্তরে সৃষ্ট কোন কারণে হতে পারে এবং সে কারণে পার্থিব প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির স্বল্পতা হতে পারে, অথবা এর একটি বাহ্যিক কারণও থাকতে পারে যেমন কোন ব্যক্তি ব্যথা-বেদনা অনুভব করে বা কষ্ট পায় যদি সে কারো হাতে মার খায়, অথবা কারাবন্দী হয় বা তার অধিকার যদি কেউ কেড়ে নেয়। সুখের উপাদান বা কারণ সম্পর্কে এটাই হলো জড়বাদী চিন্তাধারা।</p>
<p>এসম্পর্কে একটি তৃতীয় মত আছে, তা হচ্ছে সুখ শুধু আভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কারণ বা উপাদানের নির্ভর করে, এমনি ধরনের বিশ্বাস প্রকৃত বিষয়ের অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি। মানুষকে এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যে, সে বাহ্যিক উপাদান বা কারণ বাদ দিয়ে চলতে পারে না এবং এগুলোর সাহায্য ছাড়া পূর্ণতা ও সুখ হাসিল করতে পারে না (অথবা দার্শনিক পরিভাষায় মানুষ তার অস্তিত্ব ও আভ্যন্তরীণ অবস্থা থেকে স্বাধীন নয়)। অথবা সে এমন কোন অপ্রধান ও পরগাছা জাতীয় জীব নয় যে, তার সব আনন্দই বাইরে থেকে আসবে। মানুষের দেহের আধ্যাত্মিক রাজ্যে কিছু আনন্দের কেন্দ্র আছে, সেগুলো সে যদি কাজে লাগাতে পারে, ব্যবহার করতে পারে, তাহলে তা বস্তুজাগতিক কেন্দ্র থেকে বৃহত্তর, মহত্তর ও সমৃদ্ধ হবে। জড় স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার দ্বারাই শুধুমাত্র আনন্দের সৃষ্টি হয়, এরূপ ধারণা করা ভুল। এমন কিছু আনন্দ থাকতে পারে, যার কোন বাহ্যিক বা স্নায়বিক উৎপত্তি কেন্দ্র নেই এবং বাইরের জড় উপাদানের সাথে তার কোন যোগাযোগ নেই।</p>
<p>এখানে আমরা এ দাবী খণ্ডন বা গ্রহণ কোনটাই করতে পারি না অথবা কারণ দর্শাতে পারি না। কিন্তু আধ্যাত্ম বিদ্যায় পারদর্শী পণ্ডিতগণ এ মত পোষণ করেন। মহান গূঢ় রহস্যবাদী পণ্ডিতগণ এ ধরনের আনন্দের প্রচলন করতে চেয়েছিলেন এবং এমনি ধরনের আনন্দের তুলনায় বস্তুগত আনন্দ যে একেবারেই তুচ্ছ তা বিবেচনা করতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁদের মতে মানুষ এমন এক মৌলিক সৃষ্টি যে, সে নিজেই নিজেকে আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু ও সুখের বিশাল সমুদ্রে পরিণত করতে পারে।</p>
<p>মাওলানা জালালউদ্দীন রুমী এ কেন্দ্রের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এবং ইঙ্গিতে বলেছেন, দেহের অভ্যন্তরে এ মহান উৎসমূল ও সমুদ্রের মোকাবেলায় বাইরের আনন্দের উৎসগুলো অতি তুচ্ছ এবং কিছুই না। মদ্যপানের ভেতরেই যে আনন্দের সন্ধান করে, তাকে উদ্দেশ্য করে রুমী বলেছেন-</p>
<p>কি করতে চাও তুমি নিজেকে সে সমুদ্র দিয়ে ওসব অস্তিত্ব থেকে তুমি কোন</p>
<p>অনস্তিত্ব খুঁজে পেতে চাও?</p>
<p>তুমি সুখী, তুমি ভালো, তুমি প্রতিটি আনন্দের খনি, উৎস?</p>
<p>তাহলে তুমি শরাবের কাছে কাছে কেন</p>
<p>অনুগ্রহ ভিক্ষা কর?</p>
<p>সুরা কি, অথবা মৈথুন বা সংগীত কি,</p>
<p>এর কোনটি থেকে তুমি চাও আনন্দ ও কল্যাণ?</p>
<p>তুমি কি বাজে বই থেকে জ্ঞান তালাশ করছো?</p>
<p>ভূসির মিঠাইয়ের মাঝে স্বাধ খুঁজে বেড়াচ্ছো?</p>
<p>মানুষ হচ্ছে অস্তিত্ব, নির্যাস সার,</p>
<p>আর পৃথিবী হচ্ছে বাহ্যিকে অবয়ব, প্রতিমূতি,</p>
<p>সবকিছুই ছায়া ও অপ্রধান</p>
<p>কিন্তু তুমি হচ্ছো উদ্দেশ্য।</p>
<p>সূর্য কখন অনুর কাছে ঋণ ভিক্ষা করেছিল?</p>
<p>প্রেমদেবী ভেনাস কখন একটি পেয়ালার পরিবর্তে মদের বৃহৎপাত্র চেয়েছিল?</p>
<p>তুমি হচ্ছো এমন এক আত্মা, যাতে কোন আনন্দ নেই,</p>
<p>মাতলামি ও নেশার হাতে বন্দী তুমি,</p>
<p>আহা সূর্য জটিলতার হাতে বন্দী, কি দুঃখ!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পৃথিবীর অধিকাংশ পণ্ডিত ব্যক্তিই সুখকে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ বা উপাদানের সাথে সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করেন, যদিও কারণ বা উপাদান গুলোর মূল্য ও প্রভাবের পরিমাণ নিয়ে বিরাট মতপার্থক্য আছে।</p>
<p>এরিস্টটল এসব ফ্যাক্টরকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেনঃ বাহিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক। এর প্রত্যেকট আবার তিনটি অপ্রধান ভাগে বিভক্ত-</p>
<ul>
<li>১. বাহ্যিক কারণ বা উপাদানসমূহ- ধন সম্পদ, পদমর্যাদা, পরিবার ও গোত্র।</li>
<li>২. শারিরীক কারণ বা উপাদানসমূহ- স্বাস্থ্য, শক্তি সৌন্দর্য।</li>
<li>৩. আধ্যাত্মিক কারণ বা উপাদানসমূহ- জ্ঞান, সুবিচার ও সাহস।</li>
</ul>
<p>স্পষ্টতঃ সুখের কারণ বা উপাদানগুলোকে উপরোক্ত তিনটি কারণ বা উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না এবং এদের প্রত্যেকটির মধ্যে অন্যান্য কারণগুলোও উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন প্রগতির সহায়ক সামাজিক পরিবেশ, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, অনুকূল, প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থা, উত্তম জাতি বা বংশ, ছোট ছেলেমেয়ে, যোগ্য স্বামী কিংবা স্ত্রীল, বিশ্বস্ত ও অকপট বন্ধু। এসবই বাহ্যিক কারণ বা উপাদান, এরপরে আছে উত্তম কণ্ঠস্বর, কাজ, সৎকাজ, এগুলো হচ্ছে শারীরিক কারণ বা উপাদান এবং সর্বশেষে আছে ঈমান, মহান অনুভূতি বা মনোভাব, মানসিক স্বাস্থ্য, দৃঢ় ইচ্ছা, শৈল্পিক ও কারিগরি প্রতিভা- এসবই হচ্ছে আধ্যাত্মিক ফ্যাক্টর।</p>
<p>দেহ ও আত্মার মধ্যে কতগুলো সাধারণ ফ্যাক্টর আছে। যেমন- ইবাদত, আর কতগুলো যেমন বই-পুস্তক এসবই তিনটি প্রধান কারণ বা উপাদানের মধ্যে শামিল রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ধারাবাহিক আলোচনা সম্পর্কে একটি জরিপ</strong></h4>
<p>আরো কতগুলো বিষয় আছে, যেমন- প্রভাববিস্তারকারী কারণ বা উপাদানগুলোর মূল এবং পরিমাণ, উদাহরণস্বরূপ কোনটি প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদার এবং কোনটি দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদার অন্তর্ভুক্ত। অন্যকথা প্রত্যেকটির মর্যাদার শতকরা একভাগ দশভাগ, না আরো বেশী? সুদীর্ঘ আলোচনা বা ব্যখ্যা পরিহার করার উদ্দেশ্য এসব বিষয় এখানে আলোচিত হবে না।</p>
<p>আরেকটু চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে, সুখের জন্য কোন ফ্যাক্টরটি মৌলিক, যা ছাড়া চলে না এবং কোনটি মৌলিক নয় অর্থাৎ যা সুখের পূর্ণতা বৃদ্ধি করতে পারে, তবুও তার অনুপস্থিতি সুখকে দুঃখে রূপান্তরিত করে না?</p>
<p>তবু আরো একট বিষয় থেকে যায়, তা হচ্ছে এসব কারণ বা উপাদানগুলোর মধ্যে কোনটি প্রত্যক্ষ এবং কোনটি পরোক্ষ?</p>
<p>অধিকন্তু, এসব উপাদান বা কারণগুলো কি পরিবর্তনযোগ্য বা নিত্য বা অপরিবর্তনীয়? যে জিনিস একবার মানুষের জন্য সুখের কারণ বা উপাদান ছিল, তা কি সবসময় তাই আছে এবং ভবিষ্যতেও সেরকম থাকবে? অথবা এটা কি সম্ভব যে কোন বিষয় কোন এক যুগে বা সময়ে সুখের কারণ বা উপাদান হবে এবং ভিন্ন সময়ে বা যুগে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সুখের জন্যে কি একটা সর্বাত্মক পরিকল্পনা তৈরী করা সম্ভব যদিও ওহী</strong> <strong>এবং নবুয়তের মাধ্যমে সুখলাভ করা সবযুগের জন্য যথেষ্ট? অথবা এটা কি মূলত অসম্ভব ও অসাধ্য ব্যাপার? </strong>যারা ধর্মের বিরুদ্ধে, তারা এ যুক্তি দেখিয়েছে এবং দাবী করেছে যে, অতীতে ধর্ম মানবজাতির সুখ ও প্রগতির কারণ ছিল, কিন্তু বর্তমান যুগে দুর্ভাগ্য, প্রতিবন্ধকতা ও অবক্ষয়ের কারণ হচ্ছে এই ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিকোণ বিষয়টি মনোযোগের দাবীদার এবং অনুসন্ধানযোগ্য। বিশেষতঃ শেষ ধর্ম হিসেবে যখন এর নির্দেশাবলী সবযুগের জন্যে প্রদান করা হয়েছে।</p>
<p>এতে কোন সন্দেহ নেই যে সুখের কিছু কারণ বা উপাদান পরিবর্তনশীল, একইভাবে অপর কতগুলো নিত্য বা অপরিবর্তনীয়। কিন্তু কোনটি পরিবর্তনশীল এবং কোনটি স্থির বা অপরিবর্তনীয়, তা স্থির করার জন্যে আমাদের একটি নির্ণয়ক খুঁজে বের করতে হবে। একথা কি বলা যেতে পারে যে, প্রত্যক্ষ কারণসমূহ বা উপাদানগুলো অপরিবর্তনীয় এবং পরোক্ষগুলো পরিবর্তনশীল এবং সুখ ভোগের বিধিসমূহ প্রত্যক্ষ কারণ বা উপাদানসমূহের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে অপরিবর্তনীয় এবং যখন সেগুলো সিদ্ধান্তকারী কারণ বা উপাদানের সাথে সম্পর্কিত হয় তখন পরিবর্তনশীল হয়? যদি আমরা ইসলামী আইনকানুন সম্বন্ধে এ আলোচনা চালিয়ে যেতে চাইতাম, তাহলে আমাদের সামনে এক বিরাট অধ্যায় এসে হাজির হতো।</p>
<p>ভিন্ন একটি প্রশ্ন হচ্ছে, সুখ কি নিরপেক্ষ না আপেক্ষিক? যে বিষয় বা জিনিস সুখ সৃষ্টি করে, তা কি সব ব্যক্তি, জাতি, প্রত্যেক অঞ্চল ও প্রত্যেক বংশের জন্যে নির্ভুলভাবে সমান বা একই? অথবা সে একই জিনিস বা বিষয়গুলো কি বিভিন্ন ব্যক্তি, অথবা ন্যূনপক্ষে বিভিন্ন জাতি, অঞ্চল এবং বংশের চিন্তাপদ্ধতি, অভ্যাস, দৈহিক ও মানসিক কাঠামো ও ধরনের পার্থক্যের কারণে অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন হবে? সমগ্র পৃথিবী, সব ব্যক্তি, সকল জাতি এবং অঞ্চলের জন্যে এমন কোন একটি আইন পাওয়া যেতে পারে কি যা সমানভাবে সুখ সৃষ্টি করতে পারে? অথবা পারে না? এ বিষয়টিও ইসলামী আইনে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে অবধানযোগ্য।</p>
<p>এগুলো হচ্ছে আলোচনার বিষয়, যার জন্যে আমরা শুধুমাত্র একত্র সমাবিষ্ট বহুদৃশ্যপূর্ণ সুদীর্ঘ চিত্র তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছি। অন্যথা একটি বই লিখেও বিষয়গুলোর প্রতি প্রয়োজনানুরূপ সুবিচার করা সম্ভবপর হতো কি না সন্দেহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষের কি সুখ লাভের জন্য হেদায়েতের প্রয়োজন? সুখ যদি শুধুমাত্র আনন্দ ও ব্যাথা-বেদনাজনিত কষ্টের সমন্বয়ে সৃষ্টি হতো এবং আনন্দ ও বেদনা দুটি যদি প্রত্যেকটি প্রাণীর সীমিত শারীরিক যন্ত্রণা ও আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, স্বাভাবিক দৈহিক পৃষ্টসাধন ও বৃদ্ধির পাশাপাশি সহজাত বৃত্তিগত কারণেই সে সম্পর্কে জ্ঞাত থাকতো, তাহলে হিদায়াতের কোন প্রয়োজন হতো না। আবার, মানুষ নিজের বুদ্ধি ও জ্ঞানের সাহাযো যা কিছু বুঝতে পারে, তাতেই যদি মানুষের প্রয়োজন সীমাবদ্ধ থাকতো এবং এভাবেই নিজের সুখের একটি সুদীর্ঘ চিত্র সে দেখতে পেতো, তাহলে এটা তার পক্ষে জ্ঞান, কলাকৌশল, সভ্যতার অগ্রগতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে ক্রমেই নিজস্ব পথে অগ্রসর হওয়ার জন্যে যথেষ্ট হতো।</p>
<p><strong>কিন্তু সুখ শুধুমাত্র স্বভাবজাত আনন্দ ও বেদনার একটি প্রশ্ন নয়।</strong> অথবা এটি কতগুলো লক্ষণীয় প্রয়োজনও নয়, যেমন অসুস্থতা অথবা নিরাপত্তাহীনতা, যার ফলে আমরা হয়তো বলতে পারি যে মানুষ পরিণামে তার প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিরাপত্তার পথ খুঁজে পেতে পারে এবং সুখের উপায় বের করতে পারে। মানুষের প্রয়োজন একটি বা দুটিতে সীমিত নয়।</p>
<p>মানুষের জন্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট, তা হচ্ছে মানুষ নিজেই এবং তার সহজাত প্রতিভা ও প্রচ্ছন্ন কর্মক্ষমতা। শিল্প ও বিজ্ঞানে মানুষ বিরাট অগ্রগতি সাধন করেছে এবং ঘনবস্তু, উদ্ভিদ ও জীবন্ত প্রাণীদের বিশ্বে বহু আবিষ্কার হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ এখনও একটি অজানা রাশি।</p>
<p>মানবজাতি এখন পরমাণুর প্রাকৃতিক গঠন এবং মহাশুন্যের প্রকৃতি সম্বন্ধে একমত হতে সক্ষম হয়েছে। পরমাণু এবং মহাশুন্য সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যার ওপর যে সব মতামত দেখা যায়, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়া সহ সর্বত্র একই ধরনের। সে যাহোক, সুখের উপাদান কি এবং পরিপূর্ণ সুখ হাসিলের জন্যে মানুষ কোন পথ অবলম্বন করবে সে সম্পর্কে পর্যন্ত ঐকামত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পঁচিশ শতাব্দী পূর্বে এমনি ধরণের প্রশ্নে পণ্ডিত ও দার্শনিকের মধ্যে যে মতপার্থক্য ছিল, তা এখনো তাছে। কিন্তু কেন? কারণ পরমাণুর অভ্যন্তরে কি আছে, তা আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু মানুষ আজো আমাদের অজানা রয়ে গেছে। মানুষের সুখের জন্যে পরিকল্পনা তৈরী করা নির্ভর করে মানুষের সকল প্রাতিভা, ধারণক্ষমতা, যোগ্যতা ও অর্জিত গুণরাজি এবং তার বিবর্তনবাদী প্রতিক্রিয়ার ওপর। এ সবকিছুই অনন্ত অসীমের দিকে পরিচালিত করে। সুখ কি সকল প্রতিভার বিকাশ সাধন, সকল ধারণক্ষমতার পূর্ণতা, সকল শক্তির সক্রিয়তা। এক মানুষকে অস্তিত্বের শীর্ষ পরিচালনাকারী সোজাপথ অনুসরণ ছাড়া অন্য কিছু?</p>
<p>অপরদিকে, এ বিষয়ে কি ঐক্যমতে পৌঁছা যেতে পারে যে, যদি তেমন কোন মহান প্রয়োজন থেকে থাকে, যা পূরণ না হওয়ার কারণে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে অথবা এমন কি মানব জাতির ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তাহলে সৃষ্টির মহান, সুসামঞ্জস্য ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতি, যা সব সময় প্রয়োজন পূরণকালে স্বীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে থাকে, তা এধরনের একটা শূন্যতাকে মেনে নেবে, এ প্রয়োজনকে অবহেলা করবে এবং মানবীয় দৃষ্টির বাইরের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারার সীমারেখা অর্থাৎ ওহীর সীমারেখা থেকে পূত-পবিত্র, সুযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জ্ঞান দানের উদ্দেশ্যে মানবজাতিকে হিদায়েত করতে অস্বীকার করবে?</p>
<p>ইবনে সিনা তাঁর লিখিত আন-নাজাত পুস্তকের শেষাংশে বলেছেন, <strong>&#8220;মানবজাতির প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তির, যে তাকে অলৌকিক মদদ দিয়ে পথপ্রদর্শন করে পরিচালনা করবে। মানুষের উদবর্তন বা পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্যে এ প্রয়োজন অনেক বেশী, অনেক বড়ো, মহত্তর। চোখের পাতার জন্যে সৃষ্ট চোখের লোমের প্রয়োজন আছে, চোখের জন্যে ভ্রুর অথবা পায়ের পাতার জন্যে প্রয়োজন আছে পায়ের নীচে খালিস্থান বা ফাঁপা জায়গা। কিন্তু মানবজাতিকে অলৌকিক সাহায্য দিয়ে পথপ্রদর্শন করার যোগ্য একজগুন লোকের প্রয়োজন এসবের চাইতে অনেক বেশী।&#8221;</strong> যদিও উপরোক্ত জিনিসগুলো স্বত্বই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তাদের সৃষ্টির জন্যে সেগুলো কোন বিশেষ বা জরুরী প্রয়োজনের প্রতিনিধিত্ব করে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> আহমদ ইয়াহিয়া খালেদ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/philosophical-basis-of-happiness-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15121</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সিনেমার দর্শন এবং সিনেমায় দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/philosophy-of-cinema-and-philosophy-in-cinema/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/philosophy-of-cinema-and-philosophy-in-cinema/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 16 May 2023 12:40:46 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14453</guid>

					<description><![CDATA[সিনেমা কি দর্শনের অংশ কিংবা &#8216;মত&#8217; হতে পারে? সিনেমার মতো &#8216;ছায়া বাস্তব&#8217; মাধ্যমে দর্শনের মতো বিষয়কে কি কোনোভাবে উপস্থাপন করা যায়? এ দুটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে আজকের আলাপ। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন চর্চার কোন চল নেই আর সিনেমার মত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সিনেমা কি দর্শনের অংশ কিংবা &#8216;মত&#8217; হতে পারে? সিনেমার মতো &#8216;ছায়া বাস্তব&#8217; মাধ্যমে দর্শনের মতো বিষয়কে কি কোনোভাবে উপস্থাপন করা যায়? এ দুটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে আজকের আলাপ। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন চর্চার কোন চল নেই আর সিনেমার মত &#8220;বিনোদন মাধ্যমে দর্শন অনুসন্ধান তো খুব দূরের কথা। কিন্তু এ আলাপ জরুরি। সিনেমা কিভাবে দর্শনের সাথে সাদৃশ্য বজায় রেখেছে এবং দর্শনের বিভিন্ন অনুষঙ্গকে আত্মীকৃত করে নিয়েছে কিংবা একটা জনঘনিষ্ঠ মাধ্যমে কিভাবে দর্শন কাজ করে, কিভাবে সিনেমার অন্তর্ভুক্ত দর্শন, দর্শকের মন ও আচরণে প্রভাব ফেলে এবং কিভাবে এ মাধ্যমটিকে দর্শকের নতুন রুচি নির্মাণে কাজে লাগানো যায় এ বিষয়ক বিবিধ নিরীক্ষা শুরু করার জন্যই প্রয়োজন এই আলাপ। খুব সংহতভাবে এ আলোচনা করা হয়নি। কেবল এ বিষয়ে আগ্রহ উসকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।</p>
<h3><strong>সিনেমার দর্শন: খুচরা কথায়</strong></h3>
<p><strong>•প্লেটোর গুহা রূপক এবং ছায়া-বাস্তবতা</strong></p>
<p>রিপাবলিকের সপ্তম পুস্তকে সক্রেটিস একটি গুহার রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে গুহার শৃঙ্খলিত মানুষের সামনে উপস্থাপিত (আরোপিত?) ছায়া-বাস্তবতা, সত্যের সন্ধান, সত্য গ্রহণে ক্রমশ অভ্যস্ত হওয়া ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ রূপক প্লেটোর &#8216;আইডিয়া&#8217; এবং &#8216;ফর্ম&#8217; এর ভালো উদাহরণ। আমাদের দেখা সত্যের বাইরে একটা ভাব-সত্য&#8217; আছে। আমরা কেবল ছায়া-সত্য দেখতে পাই। মূল সত্য দেখতে পাইনা । সত্যকে খুঁজতে হয়। সিনেমাকেও প্লেটোর এ গুহা রূপকের সাথে তুলনা করা যায়। রিপাবলিক থেকে- “আমি বললাম &#8230;&#8230; গ্লকন, কল্পনা করো, সমগ্র মনুষ্যজাতি মাটির নিচে একটা গুহার মধ্যে বাস করছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের আলোর দিকে গুহার একটি মুখ আছে। মুখটি ভূপৃষ্ঠ থেকে গুহা পর্যন্ত দীর্ঘ। এই গুহার মধ্যে সব মানুষ তাদের শৈশব কাল থেকেই রয়েছে। তাদের পা এবং গলা শেকল দিয়ে আবদ্ধ। ডানে, বাঁয়ে কিংবা পেছনে মুখ ফেরাতে তারা অক্ষম। শেকল তাদের মাথার এরূপ সঞ্চালনকে আটকে রাখে। গুহার দেয়ালের দিকেই তাদের মুখ ঘোরানো। তাদের সম্মুখের দেয়ালটিই কেবল তারা দেখতে পায়।</p>
<p>এবার কল্পনা করো, তাদের পশ্চাতে মাটির উপরে গুহার বাইরে কিছুদূর আগুন জ্বলছে। বন্দি মানুষ এবং বাইরের আগুন- এ দুয়ের মধ্যভাগে রয়েছে উঁচু একটি পথ। তুমি খেয়াল করলে দেখতে পাবে যে এই পথ ধরে তৈরি হয়েছে একটি নিচু দেয়াল, একটি পর্দার মতো। যেমন- ছায়ানৃত্যের নৃত্যশিল্পীরা সামনে থাকে, যে পর্দার উপর শিল্পীরা তাদের পুতুলদের নাচ দেখায়। ছবিটি তুমি দেখতে পাচ্ছ গ্লকন?</p>
<p>-হ্যাঁ, আমি দেখছি।</p>
<p>-এবার তুমি খেয়াল কর। দেখবে নিচু দেয়ালটির পথ ধরে একদল লোক চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে বিভিন্ন রকম বস্তু আছে; পাথর, কাঠ কিংবা অন্য কিছুতে তৈরি নানা পাত্র, মূর্তি, পশুর প্রতিকৃতি। এরা কেউ কেউ কথা বলছে। কেউ নীরবে অগ্রসর হচ্ছে। আর এ শোভাযাত্রার ছবিটি আগুনের আলোতে গুহার ভেতরে তার দেয়ালে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।</p>
<p>-এটা এক অদ্ভুত ছবি তৈরি করেছ, সক্রেটিস। তোমার বন্দিরাও অদ্ভুত ধরনের বন্দি।<br />
-আমি বললাম, বন্দিরা আমাদের মতোই তাদের মুখ দেয়ালগাত্রে ফেরানো। আলোর প্রতিভাসে তারা কেবল তাদের কিংবা একে অপরের ছায়াই দেখতে পায়।</p>
<p>-একথা সত্য। তাদের মাথা যদি আদৌ সঞ্চালন করতে না পারে তাহলে ছায়া বৈ অপর কিছু তারা কেমন করে দেখবে?</p>
<p>-এখন ধরো, বন্দিরা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করছে। এই আলাপে তারা তাদেরসম্মুখে দেয়ালের ছায়াকেই কি সত্য বস্তু বলে পরস্পরের নিকট উল্লেখ করবে না?</p>
<p>-অবশ্যই তারা তা-ই করবে।</p>
<p>-তাছাড়া মনে করো, গুহার মধ্যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তাহলে বাইরের মিছিলের যে-শব্দ গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হবে, সে-শব্দকে কি তারা তাদের সম্মুখের ছায়াদের উচ্চারিত শব্দ বলেই মনে করবে না?</p>
<p>-নিঃসন্দেহে ।</p>
<p>-তা হলে তাদের কাছে সত্য হচ্ছে প্রতিকৃতির ছায়ামাত্র।</p>
<p>-অবশ্যই তা-ই।</p>
<p>বেশ, এবার দ্যাখো, বন্দিরা যদি মুক্তি পায় এবং তাদের ভুল ভাঙে তা হলে কী ঘটে।” (সপ্তম পুস্তক, ৩৩৩-৩৩৫ পৃ.)</p>
<p>সিনেমা যে দর্শনের &#8216;মত&#8217; হতে পারে, দর্শনের নানা বিষয়কে ফলপ্রসু উপায়ে তুলে ধরতে পারে এ বিষয়ে গত শতাব্দিতে অনেক সিনে-তাত্ত্বিকগণ আলাপ করেছেন। তাদের আলোচনা-সমালোচনা-সিদ্ধান্তের সারকথা এখানে উপস্থাপিত হয়েছে।</p>
<p>প্লেটোর &#8216;ছায়া দর্শন&#8217; এর প্রভাবে সিনেমাকে ছায়া-সত্য বা ছায়া-বাস্তবতা হিসেবে দেখা হয়েছে। দর্শন যেখানে বাস্তব বা সত্য কে নিয়ে কাজ করে, সিনেমা কাজ করে কাল্পনিক বা অলীক বিষয়াদি নিয়ে। দর্শনের কাজ সর্বজনীন, কিন্তু সিনেমার কাজ &#8216;সীমাবদ্ধ&#8217; এবং এটা বিশেষ কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করে। আর দর্শনের কাজ সত্যানুসন্ধান, বিপরীতে সিনেমার কাজ বিনোদন। দর্শন হলো দেখা সত্য থেকে বেরিয়ে ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গি সহযোগে ক্রমাগত আসল সত্যানুসন্ধান। কিন্তু সিনেমা অলীক প্রদর্শন মাত্র, যেখানে বাস্তবতা নেই কিংবা বাস্তবতা অনুসন্ধানের চেষ্টাও নেই। কিন্তু এসব যুক্তি সত্ত্বেও সিনেমা-দর্শন এগিয়ে গেছে।</p>
<p>কারণ, সিনেমা বাস্তবের উপস্থাপনে সক্রিয় হয়েছে। কেবল অলীক কল্পনাশ্রয়ী ও &#8216;বুর্জোয়া&#8217; মাধ্যমে থাকেনি। সিনেমা ভেরিতে, নিও-রিয়ালিস্ট আন্দোলন ইত্যাদি পর্যায় পার হয়ে সিনেমা এখন বাস্তবের উপস্থাপনও বটে। সিনেমায় ইতিহাস, যুদ্ধ, সত্য ঘটনার উপস্থাপন ঘটেছে। কিন্তু পরিচালকের &#8216;আরোপ&#8217; বা শেকল থেকে কি সিনেমা বের হতে পারে?</p>
<p>এ ক্ষেত্রেই যুক্তি দেখানো হয়, সিনেমা দর্শন হতে পারে না কেননা এটা দেখা সত্য বা অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দেয়। কারো একপাক্ষিক &#8216;চাপানো&#8217; প্রদর্শনকে মেনে নেয়, দর্শক এখানে পরিচালকের &#8216;আরোপিত শৃঙ্খল&#8217; দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর দর্শন মানে হল এ &#8216;গুহা” ও ছায়া&#8217;র শৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল প্লেটোর এ ধারণাকেও সিনেমা ব্যবহার করে সিনেমাটিক উপায়ে, দর্শনের বিমূর্ত রূপের বিপরীতে মূর্ত বাস্তব হিসেবে। যেমন, ট্রুম্যান শো।</p>
<h3><strong>এবার সিনেমায় দর্শন &#8211;</strong></h3>
<p>সিনেমা দর্শন ব্যবহার করতে পারে, &#8216;চিন্তন পরীক্ষণ হিসেবে তথা চলমান চিন্তাধারাকে প্রশ্ন করা, চিন্তা-প্রতিচিন্তা উপস্থাপনের মাধ্যমে। কোনো তত্ত্বের নতুন বিবেচনা হাজির করার মাধ্যমে। চিন্তন পরীক্ষণের কিছু কিছু অন্তর্নিহিতভাবেই সিনেমাটিক। এর প্রমাণ দেখা যাবে দেকার্তের &#8216;ড্রিম হাইপোথেসিস&#8217; প্রভাবিত &#8216;ম্যাট্রিক্স&#8217; সিনেমায়। দর্শন নিয়ে সিনেমার কাজ বিবিধ হতে পারে। দার্শনিক নিয়ে- ডেরেক জার্মান এর ভিটগেনস্টাইন (১৯৯৩)। চরিত্র কর্তৃক দর্শনের আলোচনা- রিচার্ড লিঙ্কলেটারের ওয়েকিং লাইফ (২০০১)। কিংবা দার্শনিক গ্রন্থের সিনেমাটিক উপস্থাপন- জ্যা জ্যাক আনাউদের &#8216;দ্য নেম অব রোজ (১৯৮৬)।</p>
<p>কিন্তু সিনেমা চিন্তন পরীক্ষণ তুলে ধরলেও তো এটা সর্বাত্মকভাবে দর্শন কেন্দ্রিক হবে না; বরং এটা হবে শৈল্পিক। শিল্পের কাজ হল কাল্পনিক তাই সত্য থেকে যোজন যোজন দূরে- এ প্লেটোনিক চিন্তা থেকেই এ আপত্তি। যদিও সিনেমা গাঠনিক দিক থেকে শৈল্পিক এ অভিযোগে সিনেমার বাস্তব উপস্থাপনের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।</p>
<p>আর সিনেমার মাঝে অস্পষ্টতা আছে, সুনির্দিষ্টতা নেই, তাই দর্শনের মতো সুনির্দিষ্টতার উপস্থাপন সিনেমায় সম্ভব না। সিনেমা প্রকাশের জায়গা থেকেও দর্শনের মতো স্পষ্ট নয়। বিপরীতে বলা যায়, সিনেমা তো সবসময় দার্শনিক বিষয়াদি স্পষ্টভাবে বুঝাবে না। বিচিত্র উপস্থাপনে দর্শনের নানা অনুষঙ্গ উপস্থিত করা হবে। আর সিনেমা সর্বদা দ্ব্যর্থক ও অনির্দিষ্ট নয়।</p>
<p>যারা সিনেমায় দর্শনের উপস্থাপনে আগ্রহী তাদের চিন্তা হলো, স্বাধীনভাবে যেন দর্শনের উপস্থাপন ঘটে, কেবল কথোপকথনে কিংবা দৃশ্যায়নে নয়; বরং সিনেমার অন্তর্নিহিত অর্থ যেন দর্শন-সঞ্জাত হয়। সিনেমায় যেন কেবল দার্শনিকের দর্শনের বয়ান না থাকে, সেখানে যেন যুক্ত হয় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তির যাচাই-বাছাই, সিরিয়াস চিন্তন। সেখানে দার্শনিক চিন্তা এবং সক্রিয় দর্শন উপস্থাপন থাকবে।</p>
<p>আর সিনেমায় প্রচলিত কথ্য ও লেখনী মাধ্যমের দর্শন চর্চার চাইতে সক্রিয় এবং ফলপ্রসূ দর্শন চর্চা সম্ভব। বিমূর্ত চিন্তার মূর্ত এবং জীবন্ত উপস্থাপনে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শন চর্চা করা যায় সিনেমায়। মজার বিষয় হলো, প্লেটোর গুহা থেকে বের হওয়ার সাহস দেখানো হচ্ছে এখন সিনেমায়, ট্রুম্যান শো। মূলত, সিনেমায় দর্শন হবে বিদ্যমান চিন্তার উপস্থাপন, নতুন চিন্তার উদ্বোধন, আমাদের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত চিন্তায় ধাক্কা দেওয়া, নতুন অভিজ্ঞতা প্রদর্শন। বাহ্য সত্য ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব প্রদর্শনে সত্যের পথে যাত্রা যেমন ডেভিড লিঞ্চের &#8216;মুলহোল্যান্ড ড্রাইভ&#8217;। সিনেমা কেবল দর্শন বুঝার উৎসই হবে না কিংবা বিদ্যমান দার্শনিক চিন্তাধারার প্রতিফলন হবে না; বরং স্বাধীন ও সক্রিয় চিন্তার উৎসে পরিণত হবে।</p>
<p>কিন্তু আলোচনা চলল। বলা হলো সিনেমা তো আর নিজে নিজে দর্শন বলে না। বলেন নির্মাতা বা দার্শনিক। আবারো শৃঙ্খল ও আরোপ। পরিচালক এখানে &#8216;বিশেষ&#8217; বিষয়। উপস্থাপন করেন, সর্বজনীন নয়। কিন্তু দর্শকেরও তো একটা &#8216;নেওয়া&#8217;র মতো বিষয় রয়েছে। দর্শক কিভাবে বিষয়টাকে নিবে তার উপরও নির্ভর করে সিনেমাটি সত্যিই &#8216;দর্শন&#8217; কিনা। এখানেই প্যারাডক্স। দর্শকের সামনে উপস্থাপিত ছায়া-বাস্তবতা কিংবা বাস্তব থেকে বের হওয়ার স্বাধীনতা কি তার আছে? এ স্বাধীনতা অর্জনই দর্শন। দর্শনের ভেতর দর্শন।</p>
<p>শুরু হলো দর্শকের স্বাধীনতা এবং আরোপ বিতর্ক। যদি সিনেমাকে পরিচালক- কেন্দ্রিকই ধরে নেওয়া হয়, তবে পরিচালকের আগ্রহ, ইচ্ছা, ব্যাখ্যাকে কে ঠিক করবে? আর সবসময় পরিচালকের দার্শনিক মন থাকে না। হয়তো কোনো আইডিয়াকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি গড়ে উঠেছে, দর্শক-সমালোচক পরবর্তীতে দর্শন আবিষ্কার করে নিল। দর্শক এক্ষেত্রে স্বাধীনতা লাভ করে। কখনো কখনো পরিচালকের শৈল্পিক উপস্থাপনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে। এটাই হল দর্শক-কেন্দ্রিক ব্যাখার মূলকথা এবং ‘আরোপে&#8217;র শৃঙ্খল ছুঁড়ে ফেলে স্বাধীন হওয়া। আমরা যখন কোনো গল্প-উপন্যাস পড়ি, তখন কেবল লেখক আমাদের সামনে থাকে না, থাকে আমাদের বাস্তবতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা। এর ফল হয় মিশ্র কিংবা একটা আলাদা সত্যে উপনয়ন। সময়ের আবর্তনে ওই গল্পের অর্থ- ব্যাখ্যা বদলে যায়। এখানেই দর্শকের স্বাধীনতা। তাই, সিনেমাটিক ‘আরোপের যুক্তি ধোপে টিকে না। এখানেই দর্শককে &#8216;ট্রুম্যান&#8217; হয়ে উঠতে হয়। আর না হতে পারলে তিনি গুহাবাসীই থেকে যান। আসলে সিনেমা ও দর্শনের অবস্থান কাছাকাছি। উভয়ের মাঝে অনেক মিলের জায়গা রয়েছে। পার্থক্য ঘটে কেবল সত্য উপস্থাপনের মাত্রায় এবং উপস্থাপন প্রক্রিয়ায়।</p>
<p><strong>• রাষ্ট্রদর্শন আর সিনেমার মোকাবেলা</strong></p>
<p>দর্শনের মূল প্রশ্নগুলো যেমন, মানুষ কী ও কেন, হক ও হাকীকত কি, মানুষ ও খোদার মধ্যকার সম্পর্ক কী ইত্যাদির একটি যৌক্তিক পরিণতি ঘটে রাষ্ট্রদর্শনে এসে। এ আলোচনায় তাই রাষ্ট্রদর্শনের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সাপেক্ষে সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা হলো-</p>
<p>চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস (১৯৩৬) নিয়ে গৌতম ভদ্র লিখেছেন, &#8216;মডার্ন টাইমস ছবির দুটি ধারা। একটা যন্ত্র সভ্যতার সমস্যা এবং অন্যটা ক্ষুদে মানুষ বা ভবঘুরের স্বপ্ন। এই ছবিতে দুটি বিপরীতমুখী ধারার সংঘাত দেখা যায়। একদিকে ছবির প্রথমে ও কয়েকটা জায়গায় যন্ত্রসভ্যতার কাছে ব্যক্তিসত্তার অবলোপ, অন্যদিকে বেশির ভাগ দৃশ্য সিটি লাইটের প্রণয় ভাবালুতা এবং ভবঘুরের স্বপ্ন। চ্যাপলিন মূলত নিজের দেখা অভিজ্ঞতার বয়ানই চিরচেনা ভবঘুরে ভঙ্গিতে এ সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছেন। “ started from an abstract idea, an impulse to say something about the way life is standardized and channelized, and men turned into Machines- And the way I felt about it” (গৌতম ভদ্র, চার্লি চ্যাপলিন ও মার্কিন সমাজ, ৭৮-৮০ পৃ.)</p>
<p>মার্ক্স তার Economic and Philosophical Manuscripts of 1844 এ পুঁজিবাদী সিস্টেমে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে চার ধরণের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। উৎপাদিত পণ্য, (মানসিকভাবে) উৎপাদনের কাজ, মানবপ্রকৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ, অন্যান্য শ্রমিকদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।</p>
<p>গৌতম যেন মার্ক্সের শ্রমিক শ্রেণির বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বের তাফসীর করছেন- কাজের মধ্য দিয়েই মানুষের সত্তার বিকাশ হয়। কিন্তু যন্ত্রের আধিপত্যে কাজ তার সব ছন্দ হারিয়ে ফেলে। কাজের ফল ও সময়ের উপর কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সব কিছুই অন্যের ইচ্ছাধীন, মানুষ শুধু একঘেঁয়েভাবে কাজ করে। কাজের গতির পরেও নিয়ন্ত্রণ অন্যের। ইচ্ছামত তাকে বাড়ানো কমানো হয়। মানুষকে তাতে সাড়া দিতে হয় মাত্র। মানুষের ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে তার কাজের বিচ্ছিন্নতাই গোটা ছবির প্রথম দৃশ্যের মূল বিষয়। (ভদ্র, ঐ, ৮০ পৃ.)। মার্ক্সের মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অবশ্য শর্ত হলো শ্রমিক শ্রেণি সমূহের ক্রমবর্ধমান দুর্দশায়নের সূত্র (Law of immiserization of the working classes), যা এ সিনেমায় দেখানো হয়।</p>
<p><strong>• কনফুসিয়ানিজম এবং এশিয়ান ভ্যালুজ</strong></p>
<p>অমর্ত্য সেন বলছেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ায় কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ন্যায্যতা দেয়ার প্রয়োজনে প্রায়ই এশিয়ান ভ্যালুজের মতো বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। আর এটা স্বাধীন ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে আসেনি, এসেছে ঐসব কর্তৃপক্ষ তথা সরকারি আমলা ও মুখপাত্র কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রের আশেপাশে থাকা লোকদের পক্ষ থেকে।” মূলত এশিয়ান ভ্যালুজের পক্ষভুক্ত লোকেরা কনফুসিয়াসের &#8216;আনুগত্য&#8217; তত্ত্বকে ধার করে তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে জায়েয করে। যদিও অমর্ত্যের মতে, “কনফুসিয়াস কখনো রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্যেকে সমর্থন করেননি।” ঘিলু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কিভাবে রাজপুত্রের সেবা করতে হবে? কনফুসিয়াসের উত্তর ছিল, “তাকে সত্য বল, যদিও সে আহতবোধ করে।” বেইজিং ও সিঙ্গাপুরের সেন্সরশীপের দায়িত্ব অধিকারীরা অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। কনফুসিয়াস বাস্তব সতর্কতা এবং কৌশলের বিরুদ্ধে নন, কিন্তু খারাপ সরকারের বিরোধিতা করার পরামর্শ দিতেও ভুল করেননি। “যখন রাষ্ট্রে ভালো পথ (ইয়াঙ) বজায় থাকে, তখন বলিষ্ট কণ্ঠে বল এবং সাহসের সাথে কাজ করে যাও, কিন্তু রাষ্ট্র যখন পথ হারায় (ইন), সাহসের সাথে কাজ চালিয়ে যাও এবং নম্রভাবে কথা বল।” বস্তুতঃ কনফুসিয়াস এ বাস্তবতা দেখিয়ে। দিয়েছেন যে কল্পিত এশিয়ান ভ্যালুজের গঠনের দুটি স্তম্ভ তথা পরিবারের প্রতি ভক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, পরস্পরের মাঝে তুমুল সংঘাত ঘটতে পারে। এশিয়ান ভ্যালুজের অনেক প্রবক্তাই পরিবারের ভূমিকার প্রসারণের অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রের ভূমিকার কথা বলেন, কিন্তু কনফুসিয়াসের দর্শন মতে দুটির মাঝে সংঘাত থেকেই যাবে। (অমর্ত্য সেন : Development as Freedom, PP, ২৩১-২৩৫ )</p>
<p><strong>•দুটি সিনেমায় নজর</strong></p>
<p>এবার এশিয়ান ভ্যালুজ রক্ষাকারী &#8216;দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ান&#8217; (লি কুয়ান ইউ এর কথামতে) দুটি সিনেমায় নজর দিই।</p>
<p>হিরো (২০০২)- &#8216;তিনজন আততায়ীর একীভূত চীনের প্রথম রাজাকে (চিন শি হুয়াও) হত্যার ইচ্ছা, হত্যার ব্যাপারে দ্বিধা (কারণ, একীভূত চীনের জন্য রাজাই যোগ্য), অন্তর্দ্বন্দ্ব, সবার মৃত্যু। এ সিনেমায় বারবার ব্যবহৃত থিয়ানসিয়া তথা ‘আকাশের নিচের সকলে বলতে প্রাচীন চীনে বুঝাত, আসমান জমীন যা স্বর্গীয়ভাবে সম্রাটকে শাশ্বত বিধানমতে প্রদান করা হয়েছে। আর এ শব্দটিই একীভূত চীনের স্বপ্নকে সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।</p>
<p>এ সিনেমায় রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্রের &#8216;আনুগত্য&#8217; পূর্বক যে আত্মত্যাগ এবং চিন্তার প্রদর্শনী ঘটে, তা কর্তৃত্ববাদী সরকারকেই কেবল শক্তিশালী করে এবং করবে এবং সকল স্বৈরাচারীই জনগণকে এ ধারণা দিতে চেষ্টা করেন যে, দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতি রক্ষার জন্য তিনিই কেবল যোগ্য। হিটলার এরকমই করেছেন আর ট্রাইয়ুম্প অব উইল -এ লেনি রেইফেন্সটাল এই জিনিসই দেখিয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>• সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও &#8216;অপর&#8217; পক্ষ-</strong></p>
<p>নাইন ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে আমেরিকা সারা বিশ্বব্যাপী &#8216;সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ঠিক প্রচলিত যুদ্ধ নয়; বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের সহায়তাকারী সরকারকে সর্বোতভাবে প্রতিরোধ, আক্রমণ। &#8216;অপর&#8217; ধারণা একসময় প্রাচ্যে তথা পাশ্চাত্যের অপর যেকোনো অঞ্চলে পাশ্চাত্যের উপনিবেশকে বৈধতা দিয়েছিল, আবার তা এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাশ্চাত্যের &#8216;নয়া-উপনিবেশায়নে&#8217; ভূমিকা রাখছে। মূলত ইসলাম ও মুসলিম &#8216;অপর&#8217;কে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে সন্ত্রাসী হিসেবে, আধুনিকতা ও সভ্যতার শত্রু হিসেবে। “বুশ যখন বলেন, তারা কেন আমাদের ঘৃণা করে?&#8221; তখন এটা সে দার্শনিক বিভাজনকেই স্পষ্ট করে তোলে যেখানে পাশ্চাত্যের বাইরের লোকদের সাথে সভ্য পাশ্চাত্যের সম্পর্ক হলো, &#8216;নিজ&#8217; পাশ্চাত্য ও &#8216;অপর&#8217; প্রাচ্য। আর এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যকেই ধরা হয়েছে &#8216;অপর&#8217; হিসেবে। যেখানে ইসলামের যেকোনো উপস্থিতিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। জন্ম নেয় ইসলামাতঙ্ক। আর এ &#8216;দেখা&#8217; এবং &#8216;দেখানো&#8217; তে ভূমিকা রেখেছে পাশ্চাত্যে নির্মিত সিনেমা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশীদার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সিনেমা। (এডোয়ার্ড সাঈদ এর কাভারিং ইসলাম দ্রষ্টব্য)। যুক্তরাষ্ট্র-বনাম তারা এ চিন্তার একটা ধারণাগত কাঠামো নির্মাণ, সত্যিকার অর্থে এ ভান করা যে, মূল বিবেচনা হল জ্ঞানতাত্ত্বিক ও স্বাভাবিক- আমাদের সভ্যতা পরিচিত এবং সর্বজন গৃহীত, তাদেরটা ভিন্ন এবং অদ্ভুত- অথচ আসলে আমাদেরকে যে কাঠামো তাদের থেকে ভিন্ন করে তোলে তা যুদ্ধমান, কৃত্রিমভাবে গঠিত এবং পরিস্থিতি সাপেক্ষ&#8217;- বলেছেন সাঈদ।</p>
<p>মূলত সাম্রাজ্যবাদের শত্রু যে যখন, তখন সে আঙ্গিকেই সিনেমা সাম্রাজ্যবাদের দোসর হিসেবে নির্মিত হয়েছে। গৌতম ভদ্রের বইতে দেখা যাবে গত শতাব্দীর প্রথম অর্ধশতকে তারা কম্যুনিজম বিরোধী সিনেমা বানিয়েছে। আবার বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে আরব বিরোধী, প্রো-জায়নিস্ট সিনেমা কিংবা এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সিনেমা ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভিন্ন ধারাও আছে যেমন লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সিনেমা কিংবা আফ্রিকায় ওসমান সেমবেনের সিনেমাকে যদি ওই হিসেবে ধরা যায়। সিনেমায় আইডেন্টিটি পলিটিক্স এবং বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের প্রভাব সমাজে পড়ছে।</p>
<p>জোগাড় যন্তর :</p>
<p>১. Shadow Philosophy: Plato&#8217;s Cave and Cinema, Nathan Andersen, Routledge, 2014<br />
২. রিপাবলিক (সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, বাংলা একাডেমি, ১৯৭৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/philosophy-of-cinema-and-philosophy-in-cinema/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14453</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ফিলোসফি অফ সায়েন্স: কুরআনী দৃষ্টিকোণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/philosophy-of-science-views-of-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/philosophy-of-science-views-of-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 24 Mar 2023 12:09:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7682</guid>

					<description><![CDATA[বিজ্ঞানের দ্বারা জ্ঞানের এমন একটি শাখাকে বুঝানো হয় যা বস্তুগত দুনিয়া নিয়ে আলোচনা করে। ফিলোসফি অফ সায়েন্স বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত এমন দার্শনিক সমস্যার সমাধান করে। এগুলোর মাঝে ২ টি সমস্যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ &#8211; ১/ বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কিভাবে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিজ্ঞানের দ্বারা জ্ঞানের এমন একটি শাখাকে বুঝানো হয় যা বস্তুগত দুনিয়া নিয়ে আলোচনা করে। ফিলোসফি অফ সায়েন্স বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত এমন দার্শনিক সমস্যার সমাধান করে। এগুলোর মাঝে ২ টি সমস্যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ &#8211;</p>
<ul>
<li>১/ বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কিভাবে বিকশিত হলো ?</li>
<li>২/ বৈজ্ঞানিক গবেষণার চিরন্তন মূলনীতিগুলো কি ?</li>
</ul>
<p>এখানে আমরা কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইটা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞানতত্ত্বীয় সমস্যা</strong></p>
<p>কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবিক অর্থেই আমাদের অন্তরের বিশাল স্বাধীনতা রয়েছে। এ সঙ্ক্রান্ত কিছু আয়াত হলো-</p>
<p>وَ فِی الْاَرْضِ اٰیٰتٌ لِّلْمُوْقِنِیْنَۙ</p>
<p>দৃঢ় প্রত্যয় পোষণকারীদের জন্য পৃথিবীতে বহু নিদর্শন রয়েছে।</p>
<p>وَ فِیْۤ اَنْفُسِكُمْؕ اَفَلَا تُبْصِرُوْنَ</p>
<p>এবং তোমাদের সত্তার মধ্যেও। তোমরা কি দেখ না? (৫১:২০-২১)</p>
<p>اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ جَعَلَ الظُّلُمٰتِ وَ النُّوْرَ۬ؕ ثُمَّ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ یَعْدِلُوْنَ</p>
<p>প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলোর উৎপত্তি ঘটিয়েছেন। (৬:১)</p>
<p>اَوَ لَمْ یَنْظُرُوْا فِیْ مَلَكُوْتِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ مَا خَلَقَ اللّٰهُ مِنْ شَیْءٍۙ-وَّ اَنْ عَسٰۤى اَنْ یَّكُوْنَ قَدِ اقْتَرَبَ اَجَلُهُمْۚ-فَبِاَیِّ حَدِیْثٍۭ بَعْدَهٗ یُؤْمِنُوْنَ</p>
<p>তারা কি কখনো আকাশ ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করেনি এবং আল্লাহর সৃষ্ট কোন জিনিসের দিকে চোখ মেলে তাকায়নি? (৭:১৮৫)</p>
<p>আমরা বস্তুগত দুনিয়া নিয়ে গবেষণা করার জন্য, আল্লাহর সৃষ্ট প্রাকৃতিক নির্দশনগুলোর মাধ্যমে তাঁর আরো নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এবং যে বস্তুগুলো তিনি আমাদের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন সেগুলো ব্যবহারের জন্য আদেশ প্রাপ্ত। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-</p>
<p>قُلِ انْظُرُوْا مَا ذَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِؕ وَ مَا تُغْنِی الْاٰیٰتُ وَ النُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا یُؤْمِنُوْنَ</p>
<p>তাদেরকে বলো, “পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে চোখ মেলে দেখো।” আর যারা ঈমান আনতেই চায় না তাদের জন্য নির্দশন ও উপদেশ তিরস্কার কীইবা উপকারে আসতে পারে। (১০:১০১)</p>
<p>اَللّٰهُ الَّذِیْ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوٰى عَلَى الْعَرْشِ وَ سَخَّرَ الشَّمْسَ وَ الْقَمَرَؕ كُلٌّ یَّجْرِیْ لِاَجَلٍ مُّسَمًّىؕ یُدَبِّرُ الْاَمْرَ یُفَصِّلُ الْاٰیٰتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَآءِ رَبِّكُمْ تُوْقِنُوْنَ</p>
<p>আল্লাহই আকাশসমূহ স্থাপন করেছেন এমন কোন স্তম্ভ ছাড়াই যা তোমরা দেখতে পাও। তারপর তিনি নিজের শাসন কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন। আর তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে একটি আইনের অধীন করেছেন। এ সমগ্র ব্যবস্থার প্রত্যেকটি জিনিস একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলে।&nbsp; আল্লাহই এ সমস্ত কাজের ব্যবস্থাপনা করছেন। তিনি নিদর্শনাবলী খুলে খুলে বর্ণনা করেন,&nbsp; সম্ভবত তোমরা নিজেদের রবের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারটি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করবে। (১৩:২)</p>
<blockquote><p>وَ سَخَّرَ لَكُمُ الَّیْلَ وَ النَّهَارَۙ وَ الشَّمْسَ وَ الْقَمَرَؕ وَ النُّجُوْمُ مُسَخَّرٰتٌۢ بِاَمْرِهٖؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّعْقِلُوْنَۙ وَ مَا ذَرَاَ لَكُمْ فِی الْاَرْضِ مُخْتَلِفًا اَلْوَانُهٗؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیَةً لِّقَوْمٍ یَّذَّكَّرُوْنَ وَ هُوَ الَّذِیْ سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَاْكُلُوْا مِنْهُ لَحْمًا طَرِیًّا وَّ تَسْتَخْرِجُوْا مِنْهُ حِلْیَةً تَلْبَسُوْنَهَاۚ وَ تَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِیْهِ وَ لِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِهٖ وَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ</p>
<p>তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে বশীভূত করে রেখেছেন এবং সমস্ত তারকাও তাঁরই হুকুমে বশীভূত রয়েছে। যারা বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগায় তাদের জন্য রয়েছে এর মধ্যে প্রচুর নিদর্শন। আর এই যে বহু রং বেরংয়ের জিনিস তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করে রেখেছেন এগুলোর মধ্যেও অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা শিক্ষাগ্রহণ করে। তিনিই তোমাদের জন্য সাগরকে করায়ত্ত করে রেখেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তরতাজা গোশত নিয়ে খাও এবং তা থেকে এমন সব সৌন্দর্য সামগ্রী আহরণ করো যা তোমরা অংগের ভূষণরূপে পরিধান করে থাকো। তোমরা দেখছো, সমুদ্রের বুক চিরে নৌযান চলাচল করে। এসব এজন্য, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পারো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো। (১৬:১২-১৪)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>যদি প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা অসম্ভব হত তাহলে কুরআন আমাদেরকে মৌলিক বিষয় এবং বিভিন্ন জীব ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু সমূহ নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করতে উৎসাহিত করতো না। অধিকন্তু কুরআনের কিছু আয়াত সুস্পষ্টরূপে এইদিকে নির্দেশ করে-</p>
<p>سَنُرِیْهِمْ اٰیٰتِنَا فِی الْاٰفَاقِ وَ فِیْۤ اَنْفُسِهِمْ حَتّٰى یَتَبَیَّنَ لَهُمْ اَنَّهُ الْحَقُّؕ اَوَ لَمْ یَكْفِ بِرَبِّكَ اَنَّهٗ عَلٰى كُلِّ شَیْءٍ شَهِیْدٌ</p>
<p>অচিরেই আমি এদেরকে সর্বত্র আমার নিদর্শনসমূহ দেখাবো এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও। যাতে এদের কাছে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ কুরআন যথার্থ সত্য এটাই কি যথেষ্ঠ নয় যে, তোমার রব প্রতিটি জিনিস দেখছেন? (৪১:৫৩)</p>
<p>অন্যদিকে কুরআন হচ্ছে সমগ্র মানব জাতির জন্য পথ নির্দেশনা । আর তাই কুরআনে মানুষের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন কিছুই উপেক্ষা করা হয়নি-</p>
<p>وَ نَزَّلْنَا عَلَیْكَ الْكِتٰبَ تِبْیَانًا لِّكُلِّ شَیْءٍ وَّ هُدًى وَّ رَحْمَةً وَّ بُشْرٰى لِلْمُسْلِمِیْنَ۠</p>
<p>আমি এ কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যা সব জিনিস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে এবং যা সঠিক পথনির্দেশনা, রহমত ও সুসংবাদ বহন করে তাদের জন্য যারা আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে। (১৬:৮৯)</p>
<p>مَا فَرَّطْنَا فِی الْكِتٰبِ مِنْ شَیْءٍ ثُمَّ اِلٰى رَبِّهِمْ یُحْشَرُوْنَ</p>
<p>এই কিতাবে কোন কিছু লিখতে আমি বাদ দেইনি। (৬:৩৮)</p>
<p>অতএব আশা করি যে কেউ গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হবে যে, কুরআন হচ্ছে প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করার পথ উন্মোচনকারী নতুন নতুন পথের সন্ধান দানকারী গ্রন্থ ।</p>
<h3>&nbsp;</h3>
<p><strong>প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করার চেতনা জাগ্রতকারী উপাদান</strong></p>
<p>কুরআনের মতে, প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করার সাধারণ উপায় হচ্ছে আমাদের আক্বল এবং পঞ্চইন্দ্রিয়-</p>
<p>وَ اللّٰهُ اَخْرَجَكُمْ مِّنْۢ بُطُوْنِ اُمَّهٰتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَیْــٴًـاۙ وَّ جَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَ الْاَبْصَارَ وَ الْاَفْـٕدَةَۙ</p>
<p>আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদের বের করেছেন এমন অবস্থায় যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, চিন্তা-ভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন।(১৬:৭৮)</p>
<p>আমরা কোন ঘটনার বারবার পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যম শিখি-</p>
<p>قُلْ سِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَیْفَ بَدَاَ الْخَلْقَ</p>
<p>এদেরকে বলো, পৃথিবীর বুকে চলাফেরা করো এবং দেখো তিনি কিভাবে সৃষ্টির সূচনা করেন। (২৯:২০)</p>
<p>اَفَلَمْ یَسِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَتَكُوْنَ لَهُمْ قُلُوْبٌ یَّعْقِلُوْنَ</p>
<p>তারা কি পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করেনি, যার ফলে তারা উপলব্ধিকারী হৃদয়ের অধিকারী হতো? (২২:৪৬)</p>
<p><strong>এই আয়াতগুলোর প্রথমাংশ পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের দিকে নির্দেশ করে এবং দ্বিতীয়াংশ যুক্তিবিদ্যার দিকে নির্দেশ করে। তাই প্রকৃতিকে বুঝার অপরিহার্য মাধ্যম হচ্ছে পরীক্ষামূলক কার্য সম্পাদন করা। কিন্তু পক্ষান্তরে কিছু ধারার দাবি হচ্ছে প্রকৃতির সকল তথ্য শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা যদি আমাদেরকে শুধুমাত্র পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ করে ফেলি এবং আমদের আক্বলকে যদি ব্যবহার না করি তবে আমাদের এবং পশুদের মাঝে কি পার্থক্য রইল।</strong></p>
<p>وَ لَقَدْ ذَرَاْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِیْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَ الْاِنْسِ ﳲ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا یَفْقَهُوْنَ بِهَا٘-وَ لَهُمْ اَعْیُنٌ لَّا یُبْصِرُوْنَ بِهَا٘-وَ لَهُمْ اٰذَانٌ لَّا یَسْمَعُوْنَ بِهَاؕ-أُولَٰئِكَ كَالْاَنْعَامِ بَلْ هُمْ اَضَلُّؕ-أُولَٰئِكَ هُمُ الْغٰفِلُوْنَ</p>
<p>আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু জ্বীন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি।&nbsp; তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত, বরং তাদের চাইতেও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে। (৭:১৭৯)</p>
<p>উপরন্তু সৃষ্টি জগতে বিদ্যমান নিদর্শনসমূহ বুঝতে প্রয়োজন আক্বল ও গভীর উপলব্ধির । আল &#8211; কুরআনে বারবার এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>اِنَّ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافِ الَّیْلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الْاَلْبَابِۚۙ الَّذِیْنَ یَذْكُرُوْنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوْدًا وَّ عَلٰى جُنُوْبِهِمْ وَ یَتَفَكَّرُوْنَ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِۚ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًاۚ سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ</p>
<p>পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে, যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠনাকৃতি নিয়ে চিন্তা- ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন। (তারা আপনা আপনি বলে ওঠেঃ) “হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে সৃষ্টি করো নি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত। কাজেই হে প্রভু! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করো। (৩:১৯০-১৯১)</p></blockquote>
<p>কুরআন আমাদেরকে এটাও শিখায় যে বস্তুগত দুনিয়ায় এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করতে সক্ষম নই:</p>
<p>فَلَاۤ اُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَۙ وَ مَا لَا تُبْصِرُوْنَۙ</p>
<p>অতএব তা নয়। আমি শপথ করছি ঐ সব জিনিসেরও যা তোমরা দেখতে পাও এবং ঐসব জিনিসের যা তোমরা দেখতে পাওনা। (৬৯:৩৮-৩৯)</p>
<p>خَلَقَ السَّمٰوٰتِ بِغَیْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا</p>
<p>তিনি আকাশসমূহ সৃষ্টি করেছেন স্তম্ভ ছাড়াই, যা তোমরা দেখতে পাও। (৩১:১০)</p>
<p>সর্বশেষ কুরআন এমন লোকদের সমালোচনা করে যারা ভাবে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ই বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার একমাত্র পন্থা:</p>
<p>یَسْــٴَـلُكَ اَهْلُ الْكِتٰبِ اَنْ تُنَزِّلَ عَلَیْهِمْ كِتٰبًا مِّنَ السَّمَآءِ فَقَدْ سَاَلُوْا مُوْسٰۤى اَكْبَرَ مِنْ ذٰلِكَ فَقَالُوْۤا اَرِنَا اللّٰهَ جَهْرَةً فَاَخَذَتْهُمُ الصّٰعِقَةُ بِظُلْمِهِمْۚ</p>
<p>এই আহ্‌লে কিতাবরা যদি আজ তোমার কাছে আকাশ থেকে তাদের জন্য কোন লিখন অবতীর্ণ করার দাবী করে থাকে, তাহলে ইতিপূর্বে তারা এর চাইতেও বড় ধৃষ্ঠতাপূর্ণ দাবী মূসার কাছে করেছিল। তারা তো তাঁকে বলেছিল, আল্লাহকে প্রকাশ্যে আমাদের দেখিয়ে দাও। তাদের এই সীমালঙ্ঘনের কারণে অকস্মাৎ তাদের ওপর বিদ্যুৎ আপতিত হয়েছিল। (৪:১৫৩)</p>
<p>কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক ভাবে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে পজিটিভিজমের হাওয়ায় অনেক মুসলিম স্কলার আক্রান্ত হন এবং অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীও ভাবতে শুরু করেন বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ততটুকুই যতটুকু আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। এই ধরণের চিন্তাকে সামনে রেখে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো :</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১।</strong> আমরা কখনোই কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করি না । আর তাই পরম পরীক্ষামূলক তথ্য বা নিশ্চিত ভাবে সঠিক কোন তথ্য বলতেও কিছু নেই। পরীক্ষামূলক তথ্যের ব্যখ্যা এমনকি এই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও নির্ভর করে পর্যবেক্ষকের পূর্ব ধারণার উপর ভিত্তি। এই বিষয়টাকে প্ল্যাঙ্ক খুব সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেনে এইভাবে:</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;প্রথমত প্রতিটি মাপ-জোপ ততটুকুই অর্থ বহন করে যতটুকু তাৎপর্য জড় বিজ্ঞানের থিওরি তাকে দেয়। সত্যিকারের প্রায়োগিক গবেষণার সাথে পরিচিত এমন যেকেউ এই বিষয়ে একমত হবেন যে সবচেয়ে সুন্দর এবং সরাসরি মাপন যোগ্য যেমন ভর এবং বিদ্যুতের পরিমাপও ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে থাকবে যতক্ষণ না বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে। এটা সত্য যে এই সংশোধনগুলো পরিমাপের পদ্ধতি নিজ থেকে বের হবে না। বরং যে থিওরির উপর এই পরিমাপটা করা হচ্ছে কিংবা এই পরিমাপের সাথে সম্পর্কিত কোন একটা থিওরির মাধ্যমেই সংশোধিত হবে। অর্থ্যাৎ এটা একটা হাইপোথিসিসের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে। (১)&#8221;</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>২।</strong> আইনস্টাইন যথার্থই বলেছেন বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ও স্বীকার্যগুলোকে কখনো আরোহ পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। বরং এগুলো হচ্ছে মানুষের মুক্ত চিন্তার ফলাফল। (২)</p>
<p style="padding-left: 40px;">পদার্থবিজ্ঞান এমন এক যুক্তিনির্ভর সিস্টেম গঠন করেছে যা একেবারে নিখাদ নয়। সময়ের সাথে সাথে যা পরিবর্তিত হচ্ছে। এটাকে বিবর্তনের রাজ্যও বলা যায় । পদার্থ বিজ্ঞানের এই ধারাপূর্ব&nbsp; অভিজ্ঞতার আলোকে আরোহ পদ্ধতিতে চলতে থাকে। এখানে নতুন কোন কিছু আসার উপায় হচ্ছে মুক্ত চিন্তা। পদার্থ বিজ্ঞান যে ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে তার যথার্থতা নির্ভর করে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে সে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি প্রতিপাদন করছে তার উপর; যেখানে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীর বিষয়ের মাঝে সম্পর্ক শুধুমাত্র সংজ্ঞায়নের ভিত্তিতে বোঝা সম্ভব। এখানে বিবর্তন এমন একটি প্রক্রিয়া যা যুক্তির মাধ্যমে ক্রমাগত সরল বিষয়ের দিকে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমাদেরকে একটু করে বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে থিওরির সাথে বাস্তবতার দূরত্ব অনেক। অনুরূপভাবে মৌলিক ভিত্তিগুলোকে শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই ব্যাখ্যা করার যে পথ আমরা গ্রহণ করেছি তাও দিন দিন কঠিন এবং দীর্ঘতর হয়ে পড়ছে। (৩)</p>
<p>এই জন্য এই ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি থিওরি হচ্ছে এক্সপেরিমেন্টের সরাসরি ফলাফল যদি না এই এক্সপিরিমেন্টের অন্য কোন ব্যাখ্যা না থাকে। কিন্তু এক্সপেরিমেন্টের অন্য কোন ব্যাখ্যা থাকবে না এই দাবিও আমরা করতে পারিনা । এই ভুল না করার ব্যাপারে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে বারবার সর্তক করে। থিওরি এবং এক্সপিরেমেন্টের মধ্যকার এই সম্পর্কের দ্বারা এটা বোঝার প্রয়োজন নেই যে এটাই একমাত্র সঠিক পদ্ধতি। যুক্তির বিচারে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটা বিষয়ের উপসংহার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই&nbsp; থেকেই টানা সম্ভব। এই জন্য আমরা এটা বলতে পারি না যে, পরীক্ষামূলক তথ্যের সরাসরি ফলাফলই হচ্ছে থিওরি। বরঞ্চ অনেক থিওরিই দাঁড় করানো হয়েছে এক্সপেরিমেন্টকে ব্যাখ্যা করার জন্য। এজন্য প্রকৃত বিষয়কে জানতে আপনাকে নতুন নতুন অনুমান অথবা তথ্যকে সামনে আনতে হবে। যেমন কেপলার যখন নক্ষত্রগুলোর অবস্থানকে স্থির ধরে মঙ্গলের আপেক্ষিক অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যগুলো নিয়ে পড়ছিলেন তখন এই তথ্যগুলো থেকে সুন্দর একট সূত্র (Good looking law) আবিষ্কারের চেষ্ট করে ব্যর্থ হলো। অতঃপর ভিন্ন একটা কারণে তিনি উপবৃত্ত সম্পর্কিত থিওরি নিয়ে কাজ করছিলেন আর এই সময়ে তিনি ধারণা করেন গ্রহের কক্ষপথও উপবৃত্তাকার হতে পারে। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি কিছু এক্সেপেরিমেন্ট চালিয়ে সফল হলেন। এ থেকে বুঝা যায় মঙ্গলের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়াটা একটা ধারণা ফলাফলা । সরাসরি মঙ্গলের কক্ষপথ দেখে এই সিদ্ধান্তে আসা হয়নি।</p>
<p>অতএব এটা বলা যায় বিজ্ঞানের অগ্রগতি তাত্ত্বিক কল্পনা (Theoretical speculation)এবং পরীক্ষামূলক কাজ (Experimental work) উভয়ের মাধ্যমেই হয়েছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৩।</strong> এমন অনেক কনসেপ্ট আছে যেগুলো ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যেমন দৈব ঘটনার ধারণা ইন্দ্রায়ানুভূতি দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যেসকল বিষয়ে আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্য গ্রহণ করি সেগুলোর উদাহরণ হচ্ছে ‘খ’ এর মত যা ‘ক’এর পরে আসে। আর এটাই হচ্ছে ‘ক’এবং ‘খ’এর মাঝের দৈব সম্পর্ক যা আমরা আমাদের আক্বলের সাহায্যে নিরূপণ করি। এমনকি পদার্থ বিজ্ঞানের সকল ধারণা বাস্তবিক অভিজ্ঞতার ফলাফল নয় বরং এর বেশির ভাগই বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টকে ব্যাখ্যার তাগিদে উদ্ভব হয়েছে। যেমন আমরা এটমের ধারণাকে হাজারো এক্সপেরিমেন্টের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করি কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউই কিন্তু এই এটমকে দেখেনি (এমনকি ইন্দ্রিয় প্রসারিত করে এমন উপকরণ যেমন ইলেকট্রনিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও না।) আমরা এটমকে চিনি অনুমানের উপর নির্ভর করে। অনুরূপভাবে মহাশূন্যের বিস্তৃতি ও সময় নিয়েও আমাদের কাছে কোন সরাসরি তথ্য নেই।</p>
<p>উপসংহারে এই আলোচনা থেকে আমরা এইটা ব্যাখ্যা করতে পারি যে তাত্ত্বিক ভিত্তি ছাড়া শুধুমাত্র এক্সপিরিমেন্ট আমাদেরকে কখনো প্রকৃতি সমন্ধে সঠিক তথ্য দিতে পারে না। এমনকি পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের মাধ্যমে বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে যে ছবি আমাদের মানসপটে তৈরি হয়, যতটুকু জ্ঞান আমরা লাভ করি তার সবটুকুও আমরা ইন্দ্রয়ানুভূতির অভিজ্ঞতা দ্বারা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নই।</p>
<p>বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ছবি অংকন করার এই প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ । আর এই প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণা এবং পরীক্ষামূলক কাজের মাধ্যমে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সঠিক পন্থা অবলম্বনের পথে বাঁধা সমূহ</strong></p>
<p>যেমনটা আমরা পূর্বেই বলেছিলাম কুরআন আমাদেরকে প্রকৃতিকে গভীরভাবে&nbsp; পর্যবেক্ষণ করার এবং এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করার নির্দেশ দেয়। এই গভীর চিন্তা এর সাথে সম্পর্কিত বিদ্যমান তথ্য উপাত্ত আমাদেরকে বিশুদ্ধ জ্ঞানের দিকে নিয়ে যাবে। যাই হোক এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে যদি সঠিক মূলনীতি এবং পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়। এইভাবে আমরা যুক্তির কাছে ফিরে&nbsp; আসি যা মূলনীতি নিয়ে অধ্যায়ন করার সঠিক পন্থা। যাই হোক শুধুমাত্র যুক্তিবিদ্যার নীতি সঠিক ফলাফল নাও দিতে পারে যদি না যেসকল বিষয়ের উপর এই যুক্তি দাঁড় করানো হচ্ছে সেগুলো নির্ভুল হয়। এই কারণে কুরআন আমাদেরকে এমনসব বিষয়ে সর্তক করেছে যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সঠিক ভাবে&nbsp; এগিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করে। এই পর্যায়ে আমরা প্রকৃতিকে সঠিকভাবে চেনার ক্ষেত্রে বাঁধা প্রদানকারী প্রধান প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো:</p>
<p><strong>১। ঈমানের অভাব</strong></p>
<p>কুরআন অনুসারে ঈমানহীন জ্ঞান দিয়ে কেউ প্রকৃতি সম্বন্ধে সঠিক বুঝা পড়া লাভ করে না।</p>
<p>قُلِ انْظُرُوْا مَا ذَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِؕ وَ مَا تُغْنِی الْاٰیٰتُ وَ النُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا یُؤْمِنُوْنَ</p>
<p>তাদেরকে বলো, “পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে চোখ মেলে দেখো।” আর যারা ঈমান আনতেই চায় না তাদের জন্য নির্দশন ও উপদেশ তিরস্কার কীইবা উপকারে আসতে পারে। (১০:১০১)</p>
<p>ঈমানের প্রধান ভূমিকাই হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত রাখা।</p>
<p><strong>২। পক্ষপাতিত্বমূলক বিচার বিশ্লেষণ</strong></p>
<p>কারো খেয়াল খুশির অনুসরণ সেটা হতে পারে কারো প্রতি ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার কারণে&nbsp; সে যাই হোক এধরণের পূর্বানুমানের ভিত্তিতে চলা ইনসাফের নীতি নয় এবং এই নিদারুণ আত্নম্ভরিতাই হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পক্ষপাতহীন এবং নিরপেক্ষক বিচার বিশ্লষণের পথে বাঁধা প্রদানকারী কারণগুলোর অন্যতম।</p>
<p>وَ لَنْ تَرْضٰى عَنْكَ الْیَهُوْدُ وَ لَا النَّصٰرٰى حَتّٰى تَتَّبِـعَ مِلَّتَهُمْؕ قُلْ اِنَّ هُدَى اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰىؕ وَ لَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ بَعْدَ الَّذِیْ جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِۙ مَا لَكَ مِنَ اللّٰهِ مِنْ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیْرٍؔ</p>
<p>ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তোমার প্রতি কখনোই সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের পথে চলতে থাকো। পরিষ্কার বলে দাও, পথ মাত্র একটিই, যা আল্লাহ‌ বাতলে দিয়েছেন। অন্যথায় তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে তারপরও যদি তুমি তাদের ইচ্ছা ও বাসনা অনুযায়ী চলতে থাকো, তাহলে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষাকারী তোমার কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী থাকবে না। (২:১২০)</p>
<p>لَقَدْ جِئْنٰكُمْ بِالْحَقِّ وَ لٰكِنَّ اَكْثَرَكُمْ لِلْحَقِّ كٰرِهُوْنَ</p>
<p>“আমরা তোমাদের কাছে ন্যায় ও সত্য নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের অধিকাংশের কাছে ন্যায় ও সত্য ছিল অপছন্দনীয়।” (৪৩:৭৮)</p>
<p>فَلَمَّا جَآءَتْهُمْ اٰیٰتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوْا هٰذَا سِحْرٌ مُّبِیْنٌۚ جَحَدُوْا بِهَا وَ اسْتَیْقَنَتْهَاۤ اَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَّ عُلُوًّاؕ فَانْظُرْ كَیْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِیْنَ۠</p>
<p>“কিন্তু যখন আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ তাদের সামনে এসে গেলো তখন তারা বলল, এতো সুস্পষ্ট যাদু। তারা একেবারেই অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্যের সাথে সেই নিদর্শনগুলো অস্বীকার করলো অথচ তাদের মন মগজ সেগুলোর সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। এখন এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল দেখে নাও।” (২৭:১৩-১৪)</p>
<p><strong>৩। পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ</strong></p>
<p>وَ قَالُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّاۤ اَطَعْنَا سَادَتَنَا وَ كُبَرَآءَنَا فَاَضَلُّوْنَا السَّبِیْلَا</p>
<p>আরো বলবে, “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের সরদারদের ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে।”&nbsp;(৩৩:৬৭)</p>
<p>وَ اِذَا قِیْلَ لَهُمُ اتَّبِعُوْا مَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ قَالُوْا بَلْ نَتَّبِـعُ مَاۤ اَلْفَیْنَا عَلَیْهِ اٰبَآءَنَاؕ اَوَ لَوْ كَانَ اٰبَآؤُهُمْ لَا یَعْقِلُوْنَ شَیْــٴًـا وَّ لَا یَهْتَدُوْنَ</p>
<p>“তাদের যখন বলা হয়, আল্লাহ‌ যে বিধান নাযিল করেছেন তা মেনে চলো, জবাবে তারা বলে, আমাদের বাপ-দাদাদের যে পথের অনুসারী পেয়েছি আমরা তো সে পথে চলবো। আচ্ছা, তাদের বাপ-দাদারা যদি একটুও বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ না করে থেকে থাকে এবং সত্য-সঠিক পথের সন্ধান না পেয়ে থাকে তাহলেও কি তারা তাদের অনুসরণ করে যেতে থাকবে?” (২:১৭০)</p>
<p><strong>৪। অপ্রসাঙ্গিক আলোচনা এবং অন্ধ সমর্থন</strong></p>
<p>وَ مَا لَهُمْ بِهٖ مِنْ عِلْمٍؕ اِنْ یَّتَّبِعُوْنَ اِلَّا الظَّنَّۚ وَ اِنَّ الظَّنَّ لَا یُغْنِیْ مِنَ الْحَقِّ شَیْــٴًـاۚ</p>
<p>অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞানই নেই। তারা কেবলই বদ্ধমূল ধারণার অনুসরণ করছে। আর ধারণা কখনো জ্ঞানের প্রয়োজন পূরণে কোন কাজে আসতে পারে না। (৫৩:২৮)</p>
<p>সঠিক বিচার বিশ্লেষণের পথে সবেচেয় বড় ভুলগুলোর অন্যতম হচ্ছে জ্ঞানকে আন্দাজ &#8211; অনুমানের ভিত্তিতে প্রতিস্থাপন করা :</p>
<p>وَ لَا تَقْفُ مَا لَیْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌؕ اِنَّ السَّمْعَ وَ الْبَصَرَ وَ الْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْـٴُـوْلًا</p>
<p>এমন কোন জিনিসের পেছনে লেগে যেয়ো না যা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই। নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও রুহ সম্পর্কে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈজ্ঞানিক গবেষণার পূর্বশর্ত</strong></p>
<p>আমরা পর্বেই উল্লেখ করেছি বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে একই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং পরীক্ষামূলক কাজের সংমিশ্রণ। এই কাজকে অর্থবহ করতে এবং যথাযথ ফলাফল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যেকোন বৈজ্ঞানিক কার্যকলাপের পূর্বে একটা মূলনীতিকে অনুমান করে এগিয়ে যেতে হয়। এই সকল মূলনীতির অসংখ্য ব্যাখা বিশ্লেষণ আছে। কুরআনকে নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা করলে আমরা এখান থেকে কিছু মৌলিক যুক্তি ( যেমনঃ দ্বন্দহীনতার মূলনীতি) পাই যেই মূলনীতি যেকোন ধরণের বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রমের পূর্বানুমান হিসেবে কাজ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অদ্বিত্ববাদের মূলনীতি ( আত &#8211; তাওহীদ)</strong></p>
<p>কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কারো ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটানোর জন্য প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করা উচিত নয়। বরং এটা হওয়া উচিত সমগ্র বিশ্বের সর্বজ্ঞানী স্রষ্টাকে জানার চেনার জন্য। প্রকৃতির সকল জীবজন্তু হচ্ছে সৃষ্টির নির্দশন আর এগুলো নিয়ে অধ্যয়ন আমাদেরকে তাঁর দিকেই নিয়ে যায়।</p>
<p>অধিকন্তু বস্তুগত দুনিয়ার এই শৃঙ্খলা ,ঐকতান এবং সৃষ্টির উদ্দ্যেশের সমর্থনে কুরআনের আয়াত রয়েছে:</p>
<p>وَ خَلَقَ كُلَّ شَیْءٍ فَقَدَّرَهٗ تَقْدِیْرًا</p>
<p>যিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন তারপর তার একটি তাকদীর নির্ধারিত করে দিয়েছেন। (২৫:২)</p>
<p>الَّذِیْ خَلَقَ سَبْعَ سَمٰوٰتٍ طِبَاقًاؕ مَا تَرٰى فِیْ خَلْقِ الرَّحْمٰنِ مِنْ تَفٰوُتٍؕ فَارْجِعِ الْبَصَرَۙ هَلْ تَرٰى مِنْ فُطُوْرٍ</p>
<p>তিনিই স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি আসমান তৈরী করেছেন। তুমি রহমানের সৃষ্টকর্মে কোন প্রকার অসঙ্গতি দেখতে পাবে না। আবার চোখ ফিরিয়ে দেখ, কোন ত্রুটি দেখতে পাচ্ছ কি? (৬৭:৩)</p>
<p>وَ مَا خَلَقْنَا السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ مَا بَیْنَهُمَا لٰعِبِیْنَ مَا خَلَقْنٰهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّ وَ لٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا یَعْلَمُوْنَ</p>
<p>আমি এ আসমান ও যমীন এবং এর কাছের সমস্ত জিনিস খেলাচ্ছলে তৈরি করিনি। এসবই আমি যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না। (৪৪:৩৮-৩৯)</p>
<p>তিনি এই মহাজগতের সকল কিছুর মাঝে সমন্বয় ও শৃঙ্খলাবিধানকারী এবং এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পরিচালক :</p>
<p>لَوْ كَانَ فِیْهِمَاۤ اٰلِهَةٌ اِلَّا اللّٰهُ لَفَسَدَتَاۚ</p>
<p>যদি আকাশে ও পৃথিবীতে এক আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোন ইলাহ থাকতো তাহলে (পৃথিবী ও আকাশ) উভয়ের ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেতো। (২১:২২)</p>
<p>صُنْعَ اللّٰهِ الَّذِیْۤ اَتْقَنَ كُلَّ شَیْءٍؕ</p>
<p>এ হচ্ছে আল্লাহর কুদরতের মূর্ত প্রকাশ, যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে বিজ্ঞতা সহকারে সুসংঙ্গবদ্ধ করেছেন।(২৭:৮৮)</p>
<p>اَفَلَا یَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَؕ وَ لَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَیْرِ اللّٰهِ لَوَجَدُوْا فِیْهِ اخْتِلَافًا كَثِیْرًا</p>
<p>তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি এটি আল্লাহ‌ ছাড়া আর কারো পক্ষ থেকে হতো, তাহলে তারা এর মধ্যে বহু বর্ণনাগত অসঙ্গতি খুঁজে পেতো। (৪:৮২)</p>
<p>هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الشَّمْسَ ضِیَآءً وَّ الْقَمَرَ نُوْرًا وَّ قَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِیْنَ وَ الْحِسَابَؕ مَا خَلَقَ اللّٰهُ ذٰلِكَ اِلَّا بِالْحَقِّۚ یُفَصِّلُ الْاٰیٰتِ لِقَوْمٍ یَّعْلَمُوْنَ</p>
<p>তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় ও চন্দ্রকে আলোকময় এবং তার মঞ্জিলও ঠিকমত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যাতে তোমরা তার সাহায্যে বছর গণনা ও তারিখ হিসেব করতে পারো। আল্লাহ‌ এসব কিছু (খেলাচ্ছলে নয় বরং) উদ্দেশ্যমূলকভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিজের নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে পেশ করেছেন যারা জ্ঞানবান তাদের জন্য। (১০:৫)</p>
<p>তাওহীদের উপর দৃঢ় বিশ্বাস একজন গবেষককে প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয় বরং সামগ্রিকভাবে দেখতে&nbsp; শিখায়। এই সামগ্রিক দর্শনের মাধ্যমে গবেষকরা প্রকৃতির একটি বিষয়ের সাথে আরেকটি বিষয়ের যে নিবিড় সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন ।</p>
<p>অন্যদিকে প্রকৃতির এই সুশৃঙ্খল বিন্যাসের উপর যদি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে তাহলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা সার্বজনীন তাৎপর্য বহন করবে না সর্বোচ্চ সাময়িক গুরুত্ব লাভ করতে পারে। তবে কিছু বিজ্ঞানী এমনও আছেন যারা প্রকৃতির মাঝে বিদ্যমান আইন, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার উপস্থিতির উপর বিশ্বাস করলেও তাওহীদে বিশ্বাসী নন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে তাওহীদে বিশ্বাস ব্যতীত মহাজগতিক ব্যবস্থাপনার কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বহিঃজগতের বাস্তবতা</strong></p>
<p>যেমনটা আমরা পূর্বেই বলেছি, কুরআন অনুসারে অনুধাবনকারী বিষয় থেকে স্বতন্ত্র একটি বহিঃজগত রয়েছে:</p>
<p>وَ اللّٰهُ اَخْرَجَكُمْ مِّنْۢ بُطُوْنِ اُمَّهٰتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَیْــٴًـاۙ وَّ جَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَ الْاَبْصَارَ وَ الْاَفْـٕدَةَۙ</p>
<p>আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদের বের করেছেন এমন অবস্থায় যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, চিন্তা-ভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন। (১৬:৭৮)</p>
<p>الَّذِیْ جَعَلَ لَكُمُ الْاَرْضَ مَهْدًا وَّ جَعَلَ لَكُمْ فِیْهَا سُبُلًا لَّعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَۚ وَ الَّذِیْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍۚ فَاَنْشَرْنَا بِهٖ بَلْدَةً مَّیْتًاۚ كَذٰلِكَ تُخْرَجُوْنَ وَ الَّذِیْ خَلَقَ الْاَزْوَاجَ كُلَّهَا وَ جَعَلَ لَكُمْ مِّنَ الْفُلْكِ وَ الْاَنْعَامِ مَا تَرْكَبُوْنَۙ</p>
<p>তিনিই তো সৃষ্টি করেছেন যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য দোলনা বানিয়েছেন এবং সেখানে তোমাদের জন্য রাস্তা তৈরী করে দিয়েছেন। যাতে তোমাদের গন্তব্যস্থলের পথ খুঁজে পাও। যিনি আসমান থেকে একটি বিশেষ পরিমাণে পানি বর্ষণ করেছেন এবং তার সাহায্যে মৃত ভূমিকে জীবিত করে তুলেছেন। তোমাদের এভাবেই একদিন মাটির ভেতর থেকে বের করে আনা হবে। তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি সমস্ত জোড়া সৃষ্টি করেছেন। যিনি তোমাদের জন্য নৌকা-জাহাজ এবং জীব-জন্তুকে সওয়ারি বানিয়েছেন যাতে তোমরা তার পিঠে আরোহণ করো। (৪৩:১০-১২)</p>
<p>বাহ্যিক জগতের&nbsp; উপর বিশ্বাসই হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি। এই বিশ্বাসই যদি না থাকে তবে বৈজ্ঞানিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা বাচ্চাদের অহেতুক কর্মকান্ড বা খেলাধুলার চেয়ে বেশি কিছু না। বৈজ্ঞানিক কর্মকান্ডের জন্য প্রেরণা জোগায় এমন বিষয়গুলোর মাঝে এই বিশ্বাস অন্যতম। প্ল্যাঙ্ক এই বিষয়টিকে খুব সুন্দরভাবে এই ভাবে ব্যক্ত করেন:</p>
<p><em>“সবচেয়ে বাস্তব এবং অসাধারণ মননের অধিকারী ব্যক্তি যেমন কেপলার, নিউটন, লিবনিজ এবং ফেরাডেরা বহিঃজগতের উপস্থিতি এবং এর পিছনে উচ্চতর শাসন বিদ্যমান রয়েছে এমন বিশ্বাস&nbsp; থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।”</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মানব জ্ঞানের সীমবদ্ধতা</strong></p>
<p>আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ:<br />
وَ مَاۤ اُوْتِیْتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ اِلَّا قَلِیْلًا<br />
কিন্তু তোমরা সামান্য জ্ঞানই লাভ করেছো। (১৭:৮৫)</p>
<p>এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় উপলব্ধি করতে পারে না:<br />
فَلَاۤ اُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَۙ وَ مَا لَا تُبْصِرُوْنَۙ<br />
অতএব তা নয়। আমি শপথ করছি ঐ সব জিনিসেরও যা তোমরা দেখতে পাও এবং ঐসব জিনিসের যা তোমরা দেখতে পাওনা। (৬৯:৩৮-৩৯)</p>
<p>اَللّٰهُ الَّذِیْ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا<br />
আল্লাহই আকাশসমূহ স্থাপন করেছেন এমন কোন স্তম্ভ ছাড়াই যা তোমরা দেখতে পাও। (১৩:২)<br />
سُبْحٰنَ الَّذِیْ خَلَقَ الْاَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْۢبِتُ الْاَرْضُ وَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ وَ مِمَّا لَا یَعْلَمُوْنَ</p>
<p>পাক-পবিত্র সে সত্ত্বা যিনি সব রকমের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, তা ভূমিজাত উদ্ভিদের মধ্য থেকে হোক অথবা স্বয়ং এদের নিজেদের প্রজাতির (অর্থাৎ মানব জাতি) মধ্য থেকে হোক কিংবা এমন জিনিসের মধ্য থেকে হোক যাদেরকে এরা জানেও না।(৩৬:৩৬)</p>
<p>এবং এজন্য আমাদেরকে অদেখার উপর বিশ্বাস অর্থ্যাৎ অতিপ্রাকৃতিক সত্যের উপর বিশ্বাস করতে হয়:<br />
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَیْبَ فِیْهِ ۚۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِیْنَۙ الَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِالْغَیْبِ وَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَۙ<br />
এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্য। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামায কায়েম করে এবং যে রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে খরচ করে। (২:২-৩)<br />
মানব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার এবং অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস আমাদের চিন্তাশীলতাকে শুধুমাত্র পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির মাঝে সীমাবদ্ধ না করে ফেলার ব্যাপরে উৎসাহিত করে। একই সাথে আমরা দুনিয়ার সবকিছু জেনে ফেলেছি এমন চিন্তা করার ব্যাপারেও নিরুৎসাহিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কর্ম ও কারণের মূলনীতি</strong></p>
<p>এই মূলনীতির বিবৃতি হচ্ছে প্রতি ঘটনার পিছনে একটি কারণ রয়েছে। এই মূলনীতির দুটি অনুসিদ্ধান্ত রয়েছে:</p>
<p>১।<em> পরিণতিবাদের মূলনীতি: যেকোন ঘটনারই ফলাফল আছে; কারণ ছাড়া কোন ফলাফল নেই এবং কারণ ছাড়া ফলাফল হতেই পারে না।</em></p>
<p>২।<em>&nbsp;প্রকৃতির অভিন্নতার মূলনীতি: অনুরূপ ঘটনার অনুরূপ ফলাফল বিদ্যমান।</em></p>
<p>আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত এযাবৎকালে যত বিজ্ঞানী আছেন তাদের অনেকের দীর্ঘদিনের ধারণা হচ্ছে “বস্তুগত দুনিয়া কিছু নির্দিষ্ট আইন-কানুন দ্বারা পরিচালিত হয়”। কর্ম ও কারণের মূলনীতি হচ্ছে এমন এক স্বীকার্য যা প্রাকৃতিক শক্তির ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত যেকোন সূত্রকে অর্থবহ করে তোলে।</p>
<p>কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এই নীতির উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন আয়াতে এই বিশ্বজগতে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় আইনসমূহের কথা বলা হয়েছে:</p>
<p>فَهَلْ یَنْظُرُوْنَ اِلَّا سُنَّتَ الْاَوَّلِیْنَۚ فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللّٰهِ تَبْدِیْلًا ﳛ وَ لَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللّٰهِ تَحْوِیْلًا</p>
<p>এখন তারা কি পূর্বের জাতিদের সাথে আল্লাহ‌ যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তাদের সাথে অনুরূপ পদ্ধতিরই অপেক্ষা করছে? যদি একথাই হয়ে থাকে তাহলে তুমি আল্লাহর পদ্ধতিতে কখনো কোন পরিবর্তন পাবে না এবং কখনো আল্লাহর বিধানকে তার নির্ধারিত পথ থেকে হটে যেতেও তুমি দেখবে না। (৩৫:৪৩)</p>
<p>فِطْرَتَ اللّٰهِ الَّتِیْ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیْهَاؕ لَا تَبْدِیْلَ لِخَلْقِ اللّٰهِؕ</p>
<p>আল্লাহ মানুষকে যে প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছেন তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। (৩০:৩০)</p>
<p>এমন অনেক আয়াত আছে যেখানে কিছু ঘটনার জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু কর্মকৌশল ব্যক্ত করা হয়েছে:</p>
<p>وَ لَقَدْ خَلَقْنَا الْاِنْسَانَ مِنْ سُلٰلَةٍ مِّنْ طِیْنٍۚ</p>
<p>আমি মানুষকে তৈরী করেছি মাটির উপাদান থেকে। (২৩:১২)</p>
<p>وَّ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخْرَ جَ بِهٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزْقًا لَّكُمْۚ</p>
<p>তিনিই ওপর থেকে পানি বর্ষণ করেছেন এবং তার সাহায্যে সব রকমের ফসলাদি উৎপন্ন করে তোমাদের আহার যুগিয়েছেন। (২:২২)</p>
<p>কুরআনের কিছু আয়াত আছে এমন যেগুলো কিছু ঘটনাকে অন্যকিছু ঘটনার মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে:</p>
<p>وَّ اَرْسَلَ عَلَیْهِمْ طَیْرًا اَبَابِیْلَۙ تَرْمِیْهِمْ بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجِّیْلٍ</p>
<p>আর তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান,যারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করছিল পোড়া মাটির পাথর। (১০৫: ৩-৪)</p>
<p>قَاتِلُوْهُمْ یُعَذِّبْهُمُ اللّٰهُ بِاَیْدِیْكُمْ</p>
<p>তাদের সাথে লড়াই করো, আল্লাহ‌ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি দেবেন। (৯:১৪)</p>
<p>অন্যদিকে কুরআনের কিছু আয়াত আছে যেখানে বলা হচ্ছে আল্লাহই দুনিয়ার সৃষ্টিকারী এবং এর পরিচালকও তিনিই:</p>
<p>قُلِ اللّٰهُ خَالِقُ كُلِّ شَیْءٍ</p>
<p>বলো, প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। (১৩:১৬)।</p>
<p>اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْاَمْرُؕ-</p>
<p>জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই। (৭:৫৪)</p>
<p>এই দুই প্রকারের আয়াতকে সামনে রাখলে যে কেউ শেষ পর্যন্ত এটাই অনুভব করবে যে , সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার অধীন তবে এগুলো বিশেষ মাধ্যমে সংগঠিত হয়। উল্লেখিত আয়াতগুলো একথারই স্বীকৃতি দেয়:</p>
<p>وَ الْبَلَدُ الطَّیِّبُ یَخْرُ جُ نَبَاتُهٗ بِاِذْنِ رَبِّهٖۚ-وَ الَّذِیْ خَبُثَ لَا یَخْرُ جُ اِلَّا نَكِدًاؕ</p>
<p>উৎকৃষ্ট ভুমি নিজের রবের নির্দেশে প্রচুর ফসল উৎপন্ন করে এবং নিকৃষ্ট ভুমি থেকে নিকৃষ্ট ধরনের ফসল ছাড়া আর কিছুই ফলে না। (৭:৫৮)</p>
<p>এই আয়াত যেদিকে নির্দেশ করে তা হচ্ছে, গাছের বৃদ্ধির জন্য জমিনের উর্বরতা জরুরি যদিও আল্লাহর ইচ্ছাও জরুরি। যাই হোক আল্লাহ চাইলে যেকোন গাছ যেকোন ভূমিতে জন্মাতে পারে।</p>
<p>কিছু বিখ্যাত আশয়ারী মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ (যেমন ইমাম গাজালী এবং ইমাম রাজী) বস্তুগত দুনিয়ার ক্ষেত্রে পরিণতিবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । এক্ষেত্রে তাদের মতামত হচ্ছে, প্রাকৃতিক ঘটনা উপলব্ধিতে শারীরিক উপায়গুলির কোন ভূমিকা নেই। যেকোন ঘটনা ঘটে আল্লাহর ইচ্ছায়। বস্তুত এটা আল্লাহর সুন্নাত যে, তিনি আমরা যেটাকে কারণ বলি তা সৃষ্টি করার পর আমরা যেটাকে ফলাফল বলি তা সৃষ্টি করেন, এদের মাঝে এমন কোন সম্পর্ক নেই যা কর্মকে কারণের অনুগামী হতে বাধ্য করে। যদি আল্লাহ না চাইতেন তাহলে এই তথাকথিত “কর্ম” তথাকথিত “কারণের” অনুগামী হতো না। (৪)</p>
<p>যেকারণে এসকল ধর্মতত্ত্ববিদেরা পরিণতিবাদকে অস্বীকার করেছেন তা হচ্ছে কর্মের জন্য কারণ প্রয়োজনীয় এই ধারণা আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করে এবং এখানে মিরাকলের কোন জায়গা থাকে না। যাই হোক এই উপসংহারে আসা সঠিক নয়। কেননা আমরা যেটাকে কারণ বলি তা আসলে প্রকৃত কারণ নয় বরং তা একটি মধ্যবর্তী কিংবা ধরে নেওয়া কারণ। মধ্যস্থতাকারী জিনিগুলোর ভূমিকা হল সমস্ত কিছু তৈরির জন্য ভিত্তি প্রস্তুত করা কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট মধ্যবর্তী এবং তৈরির কারণ সৃষ্টি করেছেন যদিও এগুলো সবই আল্লাহ নিজেই সৃষ্টি করেছেন। এই মধ্যবর্তী বিষয়বস্তুর উপস্থিতির কারণ স্রষ্টা কে তা নিয়ে মতভেদ ঘটানো নয় বরং এটি আল্লাহকে&nbsp; চেনার ক্ষেত্রে বান্দাদের ভাব উচ্ছাসে ভিন্নতা আনয়নের সাথে সম্পর্কিত। (৭)</p>
<p>পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম তত্ত্বের আগমনের এবং হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি প্রদর্শনের পর এই নীতির কিছু প্রতিষ্ঠাতা পরিণতিবাদ এবং এটমিক জগতে প্রকৃতির অভিন্নতা মতবাদকে অস্বীকার করেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে মাইক্রো ফিজিক্সের একটা পরিসংখ্যানমূলক অবস্থা আছে যা অঙ্কিত হয়েছে অসংখ্য একই রকমের পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে এবং একক ঘটনাগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরার মধ্য দিয়ে।</p>
<p>আইনস্টাইন ও প্ল্যাংকের মত ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানী এই নতুন তত্ত্ব ও এর প্রচলিত ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছেন। এই অবস্থা এখনো বিদ্যমান যদিও সময়ের ব্যবধানে বিরোধীদের সংখ্যাও বেড়েছে।</p>
<p>সম্ভবনার সূত্র মহাবিশ্বকে পরিচালনা করছে এইটা আইনস্টাইন, প্ল্যাক এবং আরো প্রমুখ বিজ্ঞানীরা মেনে নিতে পারেননি। তাদের মতে প্রকৃতিতে ঘটমান ঘটনাসমূহ চূড়ান্ত ভাবে পরম সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং আপাতত পরিসংখ্যানমূলক আচরণের ক্ষেত্রে পরিণামবাদী ভিত্তিস্থাপন করা প্রয়োজন। যে কেউ সম্ভাবনার সূত্র ব্যবহার করেন মূলত কোন ঘটনার পিছনের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে না জানা থাকা কারণে অথবা বড় বড় সংখ্যার ঝামেলা এড়াতে।</p>
<p>এই দৃষ্টিকোণ থেকে আইনস্টাইন নিন্মোক্ত মন্তব্য করেন,</p>
<p><strong>আমি বাধ্যগতভাবে স্বীকার করি যে, আমি এই ব্যাখ্যায় শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী গুরুত্ব যোগ করেছি। আমি এখনো বাস্তবতার মডেলের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করি এবং এটা এমন এক তত্ত্ব যা কেবল ঘটনার সম্ভাবনা প্রকাশ করে না বরং বিষয়গুলি যা তাই প্রকাশ করে । (৮)</strong></p>
<p>১৯২৬ সালে ম্যাক্স বর্নকে পাঠানো তার চিঠিতে আইনস্টাইন লিখেন,</p>
<p>কোয়ান্টাম মেকানিক্স চিত্তাকর্ষক বটে। কিন্তু আমার ভিতরের মন বলছে এটা আসলে সত্যিকারের কিছু নয়। এই থিওরি অনেক কিছুই বলে কিন্তু সত্যিকারার্থে আমাদেরকে সেই গোপন রহ্যসের নিকট নিয়ে যায় না। আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি ইশ্বর জুয়া খেলছেন না। (৯)</p>
<p>কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিগত কিছু বছর যাবৎ আমরা লক্ষ্য করছি কিছু মুসলিম স্কলার আশয়ারীদের ফেলে আসা থিওরি গ্রহণ করছেন এবং এর স্বপক্ষে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে দাঁড় করাচ্ছেন। আমরা এই ধরণের দৃষ্টিভিঙ্গিকে প্রত্যাখান করছি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে:</p>
<ul>
<li><strong>ক</strong>. আমরা যদি কর্ম ও কারণ সম্পর্কিত মূলনীতির গুরুত্বকে এটমিক ও সাব-এটমিক পর্যায়ে অস্বীকার করি তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় আমরা সমগ্র দুনিয়ার সাথে এই মূলনীতির যে সম্পর্ক তাই মুছে ফেললাম। কেননা কর্ম ও কারণ একই সাথে দুনিয়ার অনেক কিছুর সাথে সম্পৃক্ত।</li>
<li><strong>খ.</strong> কর্ম ও কারণের মূলনীতি কি সত্য থেকে অসত্য হওয়া প্রয়োজন, আর যদি তাই হয় তাহলে তাহলে পূর্বানুমান এবং উপসংহারের মাঝে কোন সম্পর্ক থাকবে না। কারণ পূর্বানুমানগুলোই একটা উপসংহার বের করে আনে।&nbsp; কর্ম ও কারণের মূলনীতি ব্যাতিরেকে কোন আর্গুমেন্টেরই উপসংহারে পৌঁছানো সম্ভব নয় এবং কেউই যেকোন প্রকারের পূর্বানুমান ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে উপসংহারে পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি তাই হয় তাহলে কোন কিছু প্রমাণ করা আর না করার মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।</li>
</ul>
<p>এই কারণে যারা কর্ম ও কারণের এই মূলনীতিকে অস্বীকার করছেন তারাও পরোক্ষভাবে এই মূলনীতিই ব্যবহার করছেন । কেননা তারা যদি এটা বিশ্বাস না করতেন যে তাদের আর্গুমেন্টের ফলে আমাদের বিশ্বাস পরিবর্তিত হয়ে যাবে তাহলে তারা কখনোই আমাদের সাথে যুক্তি তর্কে লিপ্ত হতেন না। (১০)</p>
<ul>
<li><strong>গ.</strong> যেমনটা শহীদ অধ্যাপক মর্তুজা মোতাহিরি (১১) এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ সাদরি (১২) বলেছেন, এটমিক পর্যায়ে গণনা করার অসম্ভবতার কারণ আমাদের পরিণতিবাদের অভাব নয় বরং এটমিক ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণকারী পরিণতিবাদী জ্ঞানের অভাব এবং এটাও হতে পারে আমাদের অসম্পূর্ণ ব্যবহারিক এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানের ফলে কিংবা গণনার উপর পর্যবেক্ষকের কি প্রভাব পড়ে তা সঠিকভাবে পরিমাপ করতে না পারার ফলে।</li>
</ul>
<p>যেকোন ক্ষেত্রে প্রত্যেককে এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে যে এটমিক পর্যায়ে পরিণতিবাদের আবিষ্কার করতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা এবং এর মাধ্যমে যেন এটা না বুঝি যে এটমিক পর্যায়ে কর্ম ও কারণের প্রয়োজনীয় সম্পর্ক নেই। এটমিক জগত সম্পর্কে আমরা সবকিছু জেনে ফেলেছি এমনটা দাবি করার কোন অধিকার আমাদের নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>১৯৭৯ সালে ডিরেক যা লিখেছিলেন তা উদ্ধৃতি করার এটাই যথাযথ জায়গা</strong></p>
<p>এই মুহুর্তে এটা পরিষ্কার যে বর্তমান কোয়ান্টাম মেকানিক্স এখনো তার চূড়ান্ত পর্যায়ে আসীন হয়নি । সামনের দিকে আরো কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন বোরের কক্ষপথ ক্রমেই পরিবর্তিত হতে হতে চূড়ান্ত পর্যায়ে আজকের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রূপ লাভ করেছে। কিছুদিন পর হয়ত একটা নতুন আপেক্ষিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আবিষ্কার হবে যেখানে আজকের এই সকল অসম্পূর্ণতা থাকবে না। যতটুকু বোঝা যায় নতুন কোয়ান্টাম মেকানিক্সে পরিণতিবাদ থাকতে পারে যেমনটা আইনস্টাইন চেয়েছিলেন। এই পরিণতিবাদের সাথে পরিচিত হওয়া সম্ভব শুধুমাত্র আজকের পদার্থবিজ্ঞানদের কিছু প্রাক-ধারণা বর্জন করার মধ্য দিয়ে এবং এটি এখনই পাওয়া চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।</p>
<p>সুতরাং এই শর্তে আমার মতে এটা খুব স্বাভাবিক অথবা যে কারোই হোক নিশ্চিতরূপে শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইনই সঠিক বলে প্রমাণিত হবেন, যদিও আপাতত পদার্থবিদেরকে বোরের সম্ভাবনার তত্ত্বকেই মেনে নিতে হবে বিশেষ করে এই মুহূর্তে যদি তাদের সামনে পরীক্ষা থাকে। (১৩)</p>
<p>সংক্ষেপে বললে কর্ম ও কারণের মূলনীতিকে অস্বীকারের মাধ্যমে একটা বিষয় অন্য বিষয়ের জন্য আর প্রয়োজনীয় হবে না এবং যেকোন কিছু থেকেই যেকোন কিছুর ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে। ফলে এখানে বিজ্ঞানের কোন উপস্থিতিই থাকবে না। সুতরাং বিজ্ঞান কর্ম ও কারণের মূলনীতিকে অনুসিদ্ধান্তসহ গ্রহণ করতে বাধ্য যাতে তার অর্থবহ অস্তিত্ব বজায় থাকে।</p>
<p><strong>অনুবাদ : </strong>সায়েম মুহাইমিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রেফারেন্সঃ</strong></p>
<p>১/ Max Planck,The New Science, Greenwich edition(1959);p.51</p>
<p>২/ Einstein,A Centenary Volume, A.P. French ed.,Heinemann(1979). p.312</p>
<p>৩/ Albert Einstein, Idea and Opinions, trans Bergman. New York, Crown Publishers (1954), pp 322-323</p>
<p>৪/ Max Planck, The New Science (1959), p. 250</p>
<p>৭/Sadar al-Din Shirazi, Asfar, vol.6 p.371</p>
<p>৮/Ideas and Opinion by Albert Einstein, p.276</p>
<p>৯/ Enstine, A Centenary Volume, p. 310</p>
<p>১০/ Averroes, Tahafut al Tahafut(The in coherence of the Incoherence) trans.S.Van den Bergh, London &amp; Co., 1954, pp.316-319.</p>
<p>১১/ M.H Tabtabai, Usul Falsafah. vol. 3,p.217(Mutahharis footnote)</p>
<p>১২/M.B Sadr, Falsafatuna, Dar al Taaruf. Beirut, 1980, pp 305-309</p>
<p>১৩/ Some Strangers in the proportion, Woolf ed, Addison-Wesley, p.65.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/philosophy-of-science-views-of-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7682</post-id>	</item>
		<item>
		<title>দর্শন যেভাবে অধ্যয়ন করতে হয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/how-to-study-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/how-to-study-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Feb 2023 09:37:54 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7624</guid>

					<description><![CDATA[প্রথমেই যে জিনিসটা মাথায় আনতে হবে, তা হচ্ছে বিখ্যাত দার্শনিকগণ সবাই কেবলই মানুষ ছিলেন। সুতরাং আপনিও তাদের সাথে দ্বিমত&#160;করে শুরুটা করতে পারেন। যা জানা প্রয়োজন দর্শনের বিষয়টাকে কঠিন মনে হতে পারে। চিন্তাদানব খ্যাত হেগেল, প্লেটো, মার্ক্স, নীটশে, কিয়ার্কেগার্ড এরা আমাদের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রথমেই যে জিনিসটা মাথায় আনতে হবে, তা হচ্ছে বিখ্যাত দার্শনিকগণ সবাই কেবলই মানুষ ছিলেন। সুতরাং আপনিও তাদের সাথে দ্বিমত&nbsp;করে শুরুটা করতে পারেন।</p>
<p><strong>যা জানা প্রয়োজন </strong></p>
<p>দর্শনের বিষয়টাকে কঠিন মনে হতে পারে। চিন্তাদানব খ্যাত হেগেল, প্লেটো, মার্ক্স, নীটশে, কিয়ার্কেগার্ড এরা আমাদের উপর কর্তৃত্বমূলক দৃষ্টি দিয়েছেন এই প্রশ্ন করে যে, আমরা যে মূল্যবান, এ ব্যাপারে আমরা নিজেরা নিশ্চিত কিনা। আমরা হয়তো এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারি যে, তারা যা বলছে তার সবকিছু আমরা বুঝতে পারছি কিনা; এমনকি যদি মনে করি বুঝতেছি, তবুও এই চিন্তাটি ঘুরেফিরে আসবে যে, হয়তো কোনোভাবে আমরা এ ব্যাপারে ভুল বুঝছি এবং বুঝবো।</p>
<p>সুতরাং আমরা যদি দর্শন পড়া শুরু করি, তাহলে এই দানবদেরকে হজম করেই শুরুটা করতে হবে। এই যাত্রায় তাদের প্রত্যেকেই দৌড়িয়েছেন, ঢেকুর তুলেছেন, হাবিজাবি কাজ করেছেন। তাদের কয়েকজন সত্যিকার অর্থেই কাপানো ব্যক্তি ছিলেন। <em>আর্থার শপেনহাওয়ার</em>&nbsp; তার সহকর্মী জার্মান দার্শনিক <em>ফ্রেডরিখ হেগেল </em>এর কাছে ছিলেন একজন “চ্যাপ্টা মাথাওয়ালা, নীরস, বমি বমি ভাব উদ্বেগকারী, নিরক্ষর পণ্ডিত, যিনি একসাথে হিজিবিজি লেখালেখি করতে এবং পাগলাটে রহস্যময় বাজে কথা লেখার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাহসিকতাসম্পন্ন।” তবে শপেনহাওয়ার নাকি হেগেল, কে বেশি কাপানো দার্শনিক ছিলেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।</p>
<p>এখন বিষয়টা হচ্ছে দর্শনের প্রত্যেকটি বিখ্যাত ব্যক্তিই মানুষ ছিলেন। তারা সেসব কাজই করতেন, যা আপনি স্বাভাবিকভাবে করেন। যেমনঃ পড়া, চিন্তা করা, পর্যবেক্ষণ করা, লেখালেখি করা। তাদের বড়বড় কথাবার্তা শুনে আপনি ভয় পাবেন না; আমরা এভাবে বলতে পারি যে, তাদের কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, বা অন্তত এটা বলতে পারি যে তারা আমাদের চক্রান্ত করছে, অথবা আমরা পেছনে রয়ে গেছি। তাদের অবশ্যই উচিত হবে তাদের মূল্যটা আমাদের কাছে প্রমাণ করা।</p>
<p>কিন্তু সেই মূল্যটা কী হতে পারে?</p>
<p>সেটা হচ্ছে, প্রথমেই কেন দর্শন পড়তে হবে ! এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। এই উত্তর দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনার আত্মার উন্নতি সাধন করা। শুধুমাত্র শুনতে ভালো লাগে, অন্যদেরকে ভয় দেখানো যায়, বা বুকসেলফে উঁচুমাপের বই রাখা যায় – এইধরণের খোলা চিন্তায় বুদ হয়ে দর্শন পড়া উচিত নয়। বরং দর্শন পড়া উচিত মানসিক উৎকর্ষতা অর্জনের জন্য, আত্মিক শক্তি পাওয়ার জন্য এবং একটি সুন্দর জীবনের জন্য। (অথবা&nbsp; এসকল বিষয়ের কোনোকিছুই কেন সম্ভব নয় এবং কেন এগুলোর কিছুই আপনার জীবনে তেমন গুরুত্ব বহন করে না এ ব্যাপারে একটি ভালো বুঝাপড়া দাঁড় করানোর জন্য হলেও দর্শন পড়া চাই। কেননা দর্শন কোনো সম্ভাবনাকেই লুকায়িত [Unexplored] রাখে&nbsp; না।)&nbsp; আশার কথা হচ্ছে, এই তথাকথিত চিন্তাদানব খ্যাত ব্যক্তিবর্গ আমাদের জন্য এক্ষেত্রে কিছু সহায়িকা, কিছু&nbsp; প্রস্তাব রেখে গেছেন। আপনি চাইলে এগুলো গ্রহণ করতে পারেন আবার এগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারেন!</p>
<p>এই বিগবসদেরই একজন বার্ট্রান্ড রাসেল তার The Problems of Philosophy (1912) গ্রন্থের শেষ দিকে দর্শন পড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বলেনঃ</p>
<blockquote><p><strong>“দর্শন অধ্যয়নের অর্থ এই নয় যে, কোনো প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর থাকতেই হবে। আর নিয়মানুসারে, যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট উত্তরকেই সত্য হিসেবে জানা যায় না বরং প্রশ্নগুলোর নিজস্ব কারণ নিত্য নতুন প্রশ্ন করতে দার্শনিককে প্রলুব্ধ করে। কেননা এসকল প্রশ্ন ‘কি কি’ সম্ভব, তথা সম্ভাব্যতার ব্যাপারে আমাদের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনাশক্তিকে উন্নত করে। যার ফলাফল আমাদের কাজে গোঁড়ামির সম্ভাবনাকে দূর করার মধ্য দিয়ে চিত্রায়িত হয় ;যা চোখকে অনুমান নির্ভরতা থেকে হেফাজত করে। এজন্য দর্শন সকল জ্ঞানের উপরে। কারণ, মহাবিশ্বের মহত্বকে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে মনও উন্নত হয়, যার ব্যাপারে দর্শন চিন্তা করে এবং যখন তা মহাবিশ্বের সাথে মিলিত হতে সক্ষম হয় তখন এ ব্যাপারে সর্বোত্তম বিষয়টি উপহার দেয়।”</strong></p></blockquote>
<p>দর্শন অধ্যয়ন আমাদের উন্নত উপায়ে ভাবতে পারার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে, গভীর বিস্ময়ে ফেলে দেয় এবং একজন মানুষের কলবে উদয় হতে পারে এমন সকল প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে সাহায্য করে। এটা হচ্ছে&nbsp; দর্শনের একটি দিক এবং এমন একটি দিক যা কেবল কাজের মধ্যে ডুব দিয়েই সম্পন্ন করা যেতে পারে।</p>
<p><strong>তাহলে, মানুষ দর্শন পড়ে কিভাবে?</strong> <strong>এর ভেতর দিয়ে ভাবুন ! </strong><strong>দর্শনের ব্যাপারে আপনার প্রত্যাশার পুনর্বিবেচনা করুন!</strong></p>
<p>লাইব্রেরী বা বুকস্টোরগুলোতে “দর্শন” নামে একটা ক্যাটাগরি থাকে। সেখানে এরকম কিছু বই থাকেঃ The Seven Secrets to a Happier Life অথবা Get Your Sh*t Together অথবা Living With Your Heart Wide Open. এই বইগুলো কেবল নিজের উন্নতি কেন্দ্রিক, এগুলোর কিছু বই জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে একটি সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি দিবে অথবা সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার বিভিন্ন রাস্তা দেখাবে। আপনি হয়তো প্রতিদিন সকালে আপনার বিছানা গুছাতে পারেন, অথবা রান্নার ক্লাস করতে পারেন, অথবা প্রতিটি মানুষকে বিশুদ্ধ মানুষ ভাবতে পারেন। সেটা চমৎকার। তবে প্রতিটি মানুষের প্রতি মুহুর্তেই একটা গতি প্রয়োজন, একটি সাহায্যকারী হাত থাকা প্রয়োজন এবং নিজের উন্নতি কেন্দ্রিক প্রতিটি সাহায্যকারী বই অনেককেই অনেকভাবে সাহায্য করেছে।</p>
<p>কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক বইগুলো সাহায্যকারী হলেও দর্শনের বই নয়। দর্শন সাধারণত ব্যক্তিগত বিষয়ে অল্পই ভাবে, যেমন সময় বাস্তব কিনা, মানুষ প্রকৃতির আইন থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারে কিনা, মানুষের মস্তিষ্ক যা বলে মানুষ সেটাই কিনা, অদ্ভুত মানুষের ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে কিনা ইত্যাদি এবং দর্শন এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট&nbsp;জবাব চায় না, তবে যা চায় তা হচ্ছে, কেন কিছু জবাবে এত সুন্দর আর কেনইবা কেন কিছু জবাব এত গোঁজামিলে ভরপুর।</p>
<p>হ্যা, ভুল। দর্শন এটা বলতে ভয় পায় না।</p>
<p>খুবই সাধারণ পর্যায়ে আত্মকেন্দ্রিক বইগুলো আপনার যেসব সমস্যা থাকা উচিত নয়, সেসবের সমাধান দিবে; আর দর্শন আপনার যেসব সমস্যা থাকা উচিত, সেসবের ব্যাপারে সাহায্য করবে। (অবশ্য কিছু বিষয় আছে যেমনঃ দর্শনের কিছু বই যেগুলোকে আপনার সমস্যা মনে করা উচিত নয়, সেগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে সাহায্য করবে এবং কিছু আত্মকেন্দ্রিক বই আপনার জীবনে যেগুলোকে সমস্যা মনে করা উচিত, সেগুলোর ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষণ করবে।) কিন্তু আরো সাধারণভাবে বললে,<strong><em> দার্শনিক সমস্যা হচ্ছে সেইগুলো, যা সচেতনভাবে আসে এবং এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি আপনি মনে করেন, তাহলে আপনার সমস্যা আছে, আর এজন্যেই দর্শন।</em></strong></p>
<p><em>হাইডেগার</em> এরিস্টটলের ব্যাপারে বলেন, তার শুধু জীবনীকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয় জানা প্রয়োজন ছিল, যে তিনি ছিলেন একজন মানুষ যিনি জন্মগ্রহণ করেন, কাজ করেন এবং মারা যান। অন্য যত বিষয় আছে জীবনের, তার সবই দুর্ঘটনা। তাই দর্শনের বই থেকে ভুলেও কারো কোনো কাউন্সিলিং অথবা উপদেশ প্রত্যাশা করা উচিত নয়, যা গড়পড়তা যেকোনো মানুষের উপর প্রয়োগ করা যাবে না।</p>
<p>কিন্তু তাহলে শুরুটা করবে কিভাবে? কোন বই দিয়ে শুরু করলে ভালো হবে? দর্শন গণিতের মতো নয়, যেখানে মানুষ রাজী হবে যে, আপনাকে একটা জায়গা থেকে শুরু করতে হবে এবং কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হবে, যেগুলো একটা আরেকটার উপর দৃঢ়ভাবে স্থাপিত। দর্শনকে চিত্রায়িত করলে দেখা যাবে একটা রুমে অনেকগুলো সংলাপ চলছে এর চাইতে বেশি কিছু না। একজন নবীন এক্ষেত্রে সূচনা করার জন্য সেই রুমে যাওয়ার ম্যাপটা বুঝার জন্য এবং কথা বলার জন্য সাধারণ ভূমিকামূলক বিষয়গুলোকে উপকারী হিসেবে পেতে পারে। এ ব্যাপারে কিছু নির্দিষ্ট রেফারেন্স দেওয়া আছে লেখাটার শেষ দিকে, কিন্তু সম্ভবত সবচাইতে বড় যে বিষয়টি মাথায় আনতে হবে, তা হচ্ছে শুরু করার সুনির্দষ্ট কিংবা সর্বোত্তম কোনো পন্থা নেই। যেকোনো জায়গা থেকে শুরু করতে পারেন এবং সাধারণ ভাবে বললে আপনার আগ্রহের জায়গাগুলোকে অনুসরণ করুন যেদিক মন চায় সেদিক থেকে শুরু করুন।</p>
<p><strong>দর্শনের জন্য প্রয়োজন সক্রিয়, বিপরীতমুখী অধ্যয়ন</strong></p>
<p>আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত যে, আমরা যখনই কোনো বই পড়ি তখন সেটাতে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি, কারণ পড়ার সময় আমরা ততটা নড়াচড়া করি না। শুধু আমাদের চোখগুলো নড়ে, বাম থেকে ডানে। কখনো পৃষ্ঠা উল্টাই বা নিচের দিকে যাই (স্ক্রলডাউন) সফটকপিতে পড়লে। যখন কোনো শব্দ আমাদের ভেতরে যায় তখন কোথাও থেমে থাকি এবং সেগুলোকে ধারণায় (Idea) রুপ দিই। মূলত, আমরা ভালো লেখা মনে করি সেগুলোকে, যা বুঝতে আমাদের ততবেশি পরিশ্রম করতে হয় না। কিন্তু যেগুলো পড়তে গেলে আমাদের ভ্রু কুচকে যায়, পেছনের পৃষ্ঠায় ফিরে যেতে হয়, অস্থির নিঃশ্বাস ফেলি, চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি, সেগুলোকে বাজে লেখা বলি।</p>
<p>এই দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শনের লেখাগুলোকে খুবই বাজে লেখা বলা যায়। কারণ, এই ধাচের বিষয়গুলোই এখানে দাবীদার হয়ে ওঠে। দর্শনের কোনো বইয়ে কোনো শব্দকে আইডিয়ায় পরিণত করা কঠিন কাজ। আপনাকে অব্যবহারিক পরিভাষা, স্পষ্ট পার্থক্য, মূল উদাহরণ এবং সাধারণ মূলনীতিগুলোর দিকে মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। আপনি যদি এটা ঠিকঠাকভাবে করেন, তাহলে আপনি গুরুত্বপূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর অনুচ্ছেদগুলো দাগিয়ে নিতে, গুরুত্বপূর্ণ দাবীগুলো আন্ডারলাইন করতে এবং বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলির পাশে “???” বা “?” এরকম লিখে রাখতে একটা কলম, পেন্সিল ব্যবহার করবেন, দার্শনিকগণ এরকম বলতে চায় না। (বরং মোহাবিষ্ট না হয়ে আপনার এরকম চিন্তা করা উচিত যে, আপনি আপনার বইয়ের সাথে যুদ্ধরত আছেন)।</p>
<blockquote><p>দর্শনের বইগুলো বারবার অধ্যয়ন করা উচিত। আপনি প্রথমবার দ্রুত পড়ে যেতে পারেন, যাতে ভাসা-ভাসা একটা ধারণা পান। তারপর আবার পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বিস্তারিত পড়বেন, তখন দাঁগিয়ে পড়বেন, নোট নিবেন, যাতে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারেন লেখক কী বলেছে, কেন বলেছে। কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে আপনি হয়তো আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে আপনি এই প্রক্রিয়াটা অব্যাহত রাখবেন; দ্রুত পড়া, তারপর ধীরে ধীরে পড়া, তারপর আবার পড়া।</p></blockquote>
<p><strong>বলা হয়ে থাকে যে, যেকোনো দার্শনিক অভিযোগের ক্ষেত্রে দুই ধরণের জবাব দেওয়া হয়ঃ “ও হ্যাঁ?” এবং “তাহলে কী!” সেটা ঠিক। আপনি যখন দর্শন পড়তে শুরু করবেন তখন থেকে সর্বদাই আপনার মাথায় এই দুটি জবাব থাকতে হবে। সাধারণ অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে আপনার বিপরীতমুখী উদাহরণ দেওয়ার চিন্তা থাকতে হবে, অথবা অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, অথবা জিজ্ঞাসা করা যে দার্শনিকরা একইরকম বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে হ্যান্ডেল করছে কিনা।</strong> আপনার এই প্রশ্নও করা উচিত যে, সেই অভিযোগগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রভাব আছে কিনা, অথবা আপনি কোনো বিষয়ে সম্মতি দিলে আপনার জীবন সম্পূর্ণ বদলে যেতো কিনা। এক্ষেত্রে দার্শনিকরা আপনার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় তৈরি করেন।</p>
<p>এর মানে হচ্ছে দার্শনিক লেখালেখি পাঠের ক্ষেত্রে মানসিকভাবে একটি বিপরীতমুখী অবস্থান নেওয়া জরুরি। অনেকটা এমন যেন কোনো বিতর্কিত বিষয়ে যাকে কিছু অসহায় আইনজীবী যুক্তি দিচ্ছেন তার সামনে আপনি কঠিন মনের অধিকারী হতে চান, সন্দেহমুক্ত বিচার করতে চান। তবে এটাও সত্যি যে, এই কঠিন মনের অধিকারী হওয়াটা অবশ্যই ব্যাখ্যামূলক কিছু পর্যায়ের সাথে মিল থাকতে হবে। সকল সম্ভাবনার ক্ষেত্রে আপনি যে দার্শনিককে পড়ছেন, তিনি বোকা নন; সুতরাং যদি আপনার অধ্যয়ন এরকম বুঝায় যে, দার্শনিক একটি বোকাসোকা যুক্তি দিচ্ছেন, তাহলে সমস্যাটা আপনার অধ্যয়নের হতে পারে। যুক্তি ও অভিযোগগুলোকে সুন্দর উপায়ে ব্যাখ্যা করুন। এরপরও যদি সমস্যা থেকেই যায়, তাহলে আপনি বিচার পেতে পারেন।</p>
<p>খেয়াল করুন অন্যান্য অনেক অধ্যয়ন থেকে এটা কিভাবে ভিন্ন। কোনো উপন্যাস পড়তে গিয়ে মার্জিনে “ও হ্যা?” এবং “তাহলে কী?!” দেখলে সেটাকে বিকৃত মনে হবে। অনেক ননফিকশন বই আপনাকে ইতিহাস, বিজ্ঞান, রাজনীতি, বা অন্যান্য বিষয়ে অনেক কিছু বলবে, কিন্তু সেগুলো আপনাকে ‘সত্য মানে কী’, সে ব্যাপারে কোনো কিছুই বলবে না। অবশ্য আপনি কখনো এই বইগুলোর সন্দেহজনক কোনো দাবীর ব্যাপারে “ও হ্যা?” এরকম প্রশ্ন করবেন। কিন্তু দর্শনের বই পড়ার সময় এই প্রশ্নগুলো মাথায় রাখতে হবে, কারণ স্বাভাবিকভাবেই আপনি সেগুলোকে বুঝবেন না, যতক্ষণ না আপনি এদেরকে সক্রিয় ও বিপরীতমুখী দৃষ্টিতে না দেখবেন। আপনি শক্তিশালী ও মোটা মানুষের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে কখনোই শক্তিশালী হতে পারবেন না। যদি শক্তিশালী হতে চান তবে আপনাকে তাদের মতো প্রশিক্ষণ নিতে হবে। দর্শনের ক্ষেত্রেও বিষয়টা অনেকটা এমনই।</p>
<p>পাশাপাশি এ ধরণের সক্রিয় অধ্যয়ন আপনি যা পড়ছেন তা উপলদ্ধির চাইতে বেশি ধারণ করতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে নিষ্ক্রিয় অধ্যয়নে পাঠ করা বইগুলো মানুষ ক্রমেই ভুলে যায়।</p>
<p><strong>দর্শন হচ্ছে ডায়লগ</strong></p>
<p>কিছু দার্শনিক বই হচ্ছে একে অপরের সাথে সংলাপের মতো। তারা নাটকের মতো পড়ে, যদি আপনার স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয় প্লেটোর থিয়েটাস (জ্ঞান ও বিচার নিয়ে একটি লম্বা আলোচনা) নিয়ে কাজ করে, তাহলে আমি বিদ্যালয়ে না গিয়ে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেব। অন্যান্য বইগুলো সহজবোধ্য, যা সম্পূর্ণ একক কথকের (Monologue) মাধ্যমে কিছু বিষয় কভার করে। কিন্তু সকল প্রকার দার্শনিক কাজ এমনকি মনোলগ-ও (মনোলগ হচ্ছে যে নাটকীয় রচনায় একটি মাত্র লোক কথা বলে)&nbsp; সংলাপ নির্ভর। এই সংলাপগুলো হচ্ছে এমন যে, কেউ একজন দাবী তুলছে, আরেকজন গিয়ে সেটার ব্যাপারে অভিযোগ দিচ্ছে বা গভীর কোনো প্রশ্ন তৈরী উত্থাপন করছে। অবশ্য দার্শনিক বইগুলো খুবই জটিল সংলাপপূর্ণ হতে পারে। কারণ, সেখানে শুধুমাত্র অনেকগুলো কন্ঠস্বরই উপস্থিত হচ্ছে না, আপনিও সেখানে যুক্ত হচ্ছেন, সেই কন্ঠগুলোর সাথে কথা বলছেন। আপনি এবং সেই বই মিলে এখন একটা পার্টিতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>অনেক দর্শনের বইতে বিভিন্ন দার্শনিকদের পারস্পরিক আলোচনা পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরুপ, ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তে তার Meditations (1641) গ্রন্থে প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়ে যান- “আমি অল্প অল্প করে আমার নিজের সম্পর্কে আরো কিছু ঘনিষ্ঠ বিষয় জানার চেষ্টা করবো। আচ্ছা তাহলে আমিও কি জানিনা কোনো বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমার কি কি প্রয়োজন? তবুও আমি অনেককিছুকে নিশ্চিত এবং প্রমাণরুপে গ্রহণ করেছি, যা পরবর্তীতে বুঝতে পারি বিষয়গুলো সন্দেহজনক ছিল। কিন্তু যে বিষয়গুলোকে খুবই সাধাসিধে মনে হয়েছিল, সেগুলোর কী হবে?’’</p>
<p>দেকার্তে নিজের ক্ষেত্রে “ও হ্যা?” কে সমাধান হিসেবে দেখছেন। এক অর্থে, এটি একটি অলংকারমূলক চক্রান্ত, যেহেতু তিনি এরকম মনে করার চেষ্টা করছেন যেন কেউ (যিনি স্বচ্ছ মানসিকতাসম্পন্ন এবং নিজেদের ব্যাপারে সৎ) কার্তেসিয়ান মেটাফিজিক্সের বৃত্তে অনির্দিষ্টভাবে গমন করবে। তবে এটা মনে করবেন না যে, এটা ডায়ালেকটিক্যাল প্রভাবসম্পন্ন গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ।</p>
<p>দেকার্তে যে অভিযোগ করেছেন এবং তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেই অভিযোগের কথা চিন্তা করে পাঠককে এই সংলাপে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু একজন চালাক পাঠক সম্ভবত এমন কিছু প্রশ্ন করবেন যেগুলো দেকার্তে করেন নাই, অথবা আপনি এমন কিছু জবাব দেবেন যেগুলো দেকার্তে চিন্তা করেন নাই। সুতরাং সংলাপে আপনারও একটা অবস্থান আছে। তাই এসবের সব ব্যাপারেই নোট নিন।</p>
<p><strong>দর্শনে ডায়লগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত সকল চিন্তার ক্ষেত্রেই এটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আইডিয়া দাঁড় করাই, প্রশ্ন করি, সমস্যা দেখাই, সেই আইডিয়াগুলোকে পুনরায় কাটাছেড়া করি, নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করি, নতুন আইডিয়া সামনে আনি এবং যতক্ষণ না নতুন কিছু বলার থাকে বা নতুন কিছু সামনে আসে, ততক্ষণ আইডিয়াগুলোকে প্রশ্ন-উত্তর এভাবে পারস্পরিকভাবে মোকাবেলা করতে থাকি। কিন্তু &#8216;দর্শন&#8217;টা বাস করে আইডিয়াগুলোকে আগ-পিছ করার মধ্যে, হারিয়ে ফেলা সম্ভাবনাগুলোকে তুলে আনার মধ্যে, নতুন প্রশ্ন উত্থাপনের মধ্যে, অথবা ভয়ংকর বা ক্ষতিকর সিদ্ধান্তে আসার আগে কিছু বিভাজন সৃষ্টির মধ্যে। সংলাপকে এগিয়ে নেওয়া, পরিবর্তন পরিবর্ধন করা–এটাই হচ্ছে দার্শনিক পদ্ধতি।</strong></p>
<p>যেমন আমি সংজ্ঞায়িত করবো এভাবে, দর্শন হচ্ছে আইডিয়াগুলো নিয়ে বোধগম্যতার সীমান্তে ঝাঁপিয়ে পড়া। যত দ্রুত প্রশ্নগুলো বোধগম্য হয়ে ওঠে, ততই নতুন কোনো ডিসিপ্লিন বের হয়। যেমন ফিজিক্স, বায়োলজি, সাইকোলজি। কিন্তু এখনো যখন আমরা সামনে পেছনে যুদ্ধ করছি কোনটা সত্য মনে হয়, কোনটা অসম্ভব মনে হয় (যা আমরা দেখতে পারিনা) এসব নিয়ে, তখন আমরা দর্শন চর্চা করছি। সেখানে সংলাপের মধ্যে আসলে সামনে-পেছনে পদ্ধতি ছাড়া আর কোনো পথ নেই।</p>
<p>দর্শন অধ্যয়নে, আপনি ডায়লগকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চান। সেই পর্যায়ে, দর্শনের কোনো বইতে কী লেখা আছে, তার ব্যাপারে আপনার চিন্তাগুলো বুঝার জন্য একটি ম্যাগাজিনে আপনার লেখালেখি করা উচিত, যেখান থেকে আপনার চিন্তাগুলো বুঝা যাবে, আপনি সেই লেখককে কী জিগ্যেস করতে চান এবং আপনি তাকে কী বলতে চান (সেটা ভদ্রজনোচিত না হলেও।) যেহেতু আপনি আপনার চিন্তাগুলোকে উন্মুক্ত করছেন, সেহেতু আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে আরো বেশি জানবেন। মাঝেমাঝে আমরা নিজেরাও বুঝিনা আমরা কি চিন্তা করি, যতক্ষণ না নিজেরা সেগুলো বলি বা শেয়ার করি। দার্শনিক সংলাপগুলো পড়ার সময় নোট নেওয়ার মাধ্যমে নতুন কিছু জানা এবং নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া যায়। তারপর যখন আপনি সেই কাটাছেড়া করা বইটি ৩য় বা ৪র্থ বারের মতো পড়বেন, তখন আপনার মনে নতুন প্রশ্ন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উদয় হবে। এর দ্বারা আপনি নতুন এক বইকে আবিষ্কার করবেন।</p>
<blockquote><p>বলা হয়ে থাকে যে, কোনো বিখ্যাত বইকে কখনোই সম্পূর্নরুপে পড়ে ফেলা যায় না। কারণ, যতবারই আপনি এটা পড়বেন, আপনি তখন ভিন্ন একজন পাঠক হয়ে যান। এটাকে অতিরঞ্জিত মনে হলেও এর মাঝে কিছু একটা আছে। মাঝেমাঝে এটাও বলা হয়ে থাকে যে, আপনি যখন বিখ্যাত কোনো বই পড়েন, তখন বইটিও আপনাকে পড়ে। সেটাই হচ্ছে, বইয়ের আইডিয়াগুলোর মাধ্যমে আপনি আপনার জীবনকে নতুনভাবে জানতে শুরু করবেন। এটাই হচ্ছে কোনো খাটি সংলাপের অনিবার্য ফলাফল। তখনই কেবল দর্শন তার সর্বোচ্চ রুপ দেখাতে পারে।</p></blockquote>
<p><strong>আপনাকে ঘিরেই দর্শন</strong></p>
<p>দর্শন আপনার কর্মস্থলের সমস্যাগুলো নিয়ে নয়, অথবা আপনার ফোনের কন্টাক্ট কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন সেগুলো নিয়ে নয়, অথবা সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্থগিত করে দিবেন কিনা এগুলো নিয়ে নয়, যদিও সেগুলো দর্শনের মাধ্যমে বিশেষায়িত করা যেতে পারে। বরং এটা হচ্ছে মানুষ হিসেবে আপনার জীবনকে নিয়ে।</p>
<p>কল্পনা করুন, অনেক যুগ আগে একটা সময়ের ঘুর্ণাবর্তে পড়ে গেলেন এবং কিছু মানুষের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। তখন একবার যদি কোনো একটা ভাষায় তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, তাহলে কি তাদের বন্ধু হতে পারবেন? আপনি কি তাদের সাথে আপনার দুঃখ, আশা, ধারণা, বিশ্বাসকে শেয়ার করতে পারবেন? অবশ্যই পারবেন। তবে আপনার যোগাযোগ বা সংলাপটা অবশ্যই মানুষের সাথে মানুষের হতে হবে, শিল্পবিপ্লব পরবর্তী প্রযুক্তিবিদের সাথে গুহাবাসীর সংলাপ হলে হবে না। আপনি কেবল আপনার শেয়ার করা মানবিক মুল্যবোধের উপর বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারবেন। অবশ্যই এটা হবে আপনার সকল সম্পর্কের চাইতে সেরা বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কারণ, তখন এই খাটি বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো বাজে কথাবার্তা থাকবে না।</p>
<p>সবাই যেভাবে আপনাকে ব্যাখ্যা করেছে তার বিপরীতে গিয়ে (আগে উল্লেখ করা) অনেক বই আপনি আসলে কে, সেটা খুজে বের করার উপর ফোকাস করে। কেউ এটা করতে পারে অভ্যন্তরীন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে অথবা ভিন্ন জীবনধারা সৃষ্টি করে। দর্শন ভিন্নকিছু করতে বলে। “আমরা কে হতে পারি” এই বিষয়ে সংলাপের মাধ্যমে “আমরা আসলে কারা” এটা খুজে পেতে পারি। প্লেটো, এরিস্টটল, ইবনে সিনা সবারই এ ব্যাপারে মতামত ছিল, তেমনি ছিল জিইএম অ্যান্সকোম্ভ, কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডরিখ নীটশে; নগরজুনা, লাও জু এবং কোয়াসি ভীরেদু। অবশেষে, যদি আমরা কারো মতো হতে চাই, তাহলে কোথাও থেকে আসা কিছু ব্যাখ্যার মাধ্যমে আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি। দর্শন বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করার সুযোগ দেয় এবং সেগুলোর মধ্যে আপনাকে খুজে পাওয়ার চেষ্টা করে। এটাই হচ্ছে সকল দার্শনিক পড়াশোনার সমন্বিত কার্যক্রম।</p>
<p><strong>বিভিন্ন উৎসের ব্যবহারঃ </strong></p>
<p>বিষয়টির বাস্তবতা হচ্ছে আমরা দর্শনের সাথে পরিচিত হতে পারার মতো একটি চমৎকার সময়ে বসবাস করছি। ইউটিউবে অসংখ্য দার্শনিক এবং তাদের আইডিয়াগুলো পাওয়া যায় এবং যদিও প্রতিটি ভিডিওতে সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে, তবুও এক্ষেত্রে অনেকে আমাদের প্রসিদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার পথে বিরাট ভূমিকা রাখছে।</p>
<p>ইউটিউবের দর্শনের ভিডিওগুলো আমাদেরকে রসাত্মক ও উত্তেজনাপূর্ণ আবিস্কারের দিকে আহবান করে। অনেক পডকাস্টে উপকারী জিনিস পাওয়া যায়। যেমনঃ The Partially Examined Life, Very Bad Wizards, Philosophy Bites (এটা Aeon+Psyche এর সমন্বয়ে পরিচালিত হয় যেখানে সম্পাদনায় থাকেন Nigel Warburton) এবং Peter Adamson এর সাহসী ও উজ্জ্বল History of Philosophy, যাতে কোনো গ্যাপ ছিলো না। এরকম আরো অনেকেই দর্শনের পথে আকস্মিক প্রবেশ ঘটিয়ে থাকেন।</p>
<p>আসুন বই পাগল না হই। কারণ, <strong>প্লেটো নিজেই মনে করতেন যে, প্রকৃত দর্শন কেবল সরাসরি সংলাপের মধ্যেই হয়ে থাকে, আর লিখিত বিষয়টি প্রকৃত বিষয়ের প্রতিফলন মাত্র।</strong> (ও হ্যা, এটা তিনি একটি পাণ্ডুলিপিতে লিখেছিলেন।)</p>
<p>বিখ্যাত দার্শনিক লেখাগুলোর জটিলতাগুলোকে ফুঁসিয়ে তুলতে আপনার কাছে যে গৌণ উৎসগুলোর (Secondary Sources) একটি বিস্তৃত জগত রয়েছে, সেগুলোকে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করুন। দর্শন পুরনো হলেও এর অন্যতম সুন্দর একটি দিক হলো এটা কখনো পুরনো হয় না এবং কখনো ১৯৭০ সাল থেকে পুরনো ভূমিকামূলক কিছু বই সুন্দর কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে পারে।</p>
<p>আপনি বারবার অধ্যয়ন করতে গিয়ে পুরনো অন্যান্য বইপত্রগুলোর ত্রুটিবিচ্যুতি খুঁজে পাবেন। কিন্তু আপনার এটিকে একটি বিজয় মনে করা উচিত। কারণ এর মাধ্যমে আপনি নিজেকে দর্শনের উন্নত স্তরে নিয়ে যাচ্ছেন।</p>
<p><strong>অবশেষে বলা যায়, অন্যান্য উৎস হিসেবে (কিংবা প্রধান উৎস হিসেবে) কারোরই বন্ধুত্বের মুল্যকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। যদি আপনি একটি পাঠক শ্রেণী তৈরি করতে পারেন এবং আপনার অনুভূতিগুলো তাদেরকে শেয়ার করতে পারেন, তাহলে আপনি শিখবেন কিভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়, যুক্তি উপস্থাপন করতে হয় এবং আপনার মনকে চ্যালেঞ্জ করতে হয় বা কোনো দার্শনিকের সকল প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে (এমনকি যেকোনো মানুষের) কিভাবে চ্যালেঞ্জ করতে হয়।</strong></p>
<p><strong>মূলকথা – দর্শনকে যেভাবে পড়তে হবে </strong></p>
<p><strong>১। দর্শনের ব্যাপারে আপনার প্রত্যাশার পুনর্বিবেচনা করুন। </strong>আপনার ভেতর একটি নিশ্চিত মানসিকতা আছে, যা দর্শন বুঝতে গেলে আপনাকে সাহায্য করবে। এছাড়া এটা উত্তরবিহীন প্রশ্ন এবং সমাধানহীন সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে।</p>
<p><strong>২। দর্শনের জন্য প্রয়োজন এক্টিভ ও বিপরীতমুখী অধ্যয়ন। </strong>অধ্যয়নের সময় সেখান থেকে সর্বোচ্চটা পেতে হাতে একটি পেন্সিল নিন, জরুরী জায়গাগুলো চিহ্নিত করুন এবং সুযোগ পেলেই লেখককে চ্যালেঞ্জ করার সাহস করুন। (এভাবে যে, আপনি লিখলে বিষয়টা কিভাবে লিখতেন।)</p>
<p><strong>৩। দর্শন হচ্ছে ডায়লগঃ যে বিষয়গুলো চমৎকার সেগুলো প্রয়োজনে যোজন বিয়োজন করুন, এর সামনে পেছনে চিন্তা করুন। </strong>আপনি যখন পড়বেন, তখন দর্শনের জায়গাগুলোতে মনোযোগ দিন। এবং সেগুলো ধরতে পারছেন কিনা, নিশ্চিত হউন।</p>
<p><strong>৪। দর্শন মূলত আপনাকে ঘিরেই। </strong>দার্শনিক কথাবার্তা (কোনো বই বা বন্ধুদের আড্ডালাপ) সর্বদাই আপনাকে আপনার নিজের ব্যাপারে আরো নতুন কিছু বলবে। কে আপনি, পৃথিবী নিয়ে আপনি কী ভাবেন; এসব। দর্শন হচ্ছে নিজেকে বিভিন্ন উপায়ে জানার একটা প্রক্রিয়া।</p>
<p><strong>৫। অন্যান্য উৎস ব্যবহার করুন। </strong>দর্শন বুঝতে শুরু করার এটাই উপযুক্ত সময়। কারণ, অসংখ্য উৎস আছে যেগুলোর মাধ্যমে আপনি নতুন জগতে প্রবেশ করতে পারেন।</p>
<p><strong>কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ</strong></p>
<p>আমি এই বিষয়ে আপনাকে এতকিছু বলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু আপনি মরণশীল। যদিও আপনার মৃত্যুর আগে উচিত ঠিকঠাকভাবে খাওয়া দাওয়া করা, প্রতিনিয়ত ব্যায়াম করা, বন্ধু তৈরি করা, সহায়হীনদের সাহায্য করা। আপনি একটু সময় নিয়ে ভাবতে পারেন অস্তিত্ব মানে কী, বাস্তবতা আসলে কী, স্রষ্টা বলতে কেউ আছে কিনা, বা এই মানব জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা। জবাবগুলো নিশ্চিত না, তবে সেগুলোর খোঁজ করা আপনাকে সাহায্য করবে এটা ভাবতে যেন, আপনি এই বিষয়গুলো বুঝতে একটা সুযোগও হাতছাড়া করেন নাই।</p>
<p>এই বড় প্রশ্নগুলো মোকাবেলা করার সবচাইতে সেরা পদ্ধতি হচ্ছে দর্শন পাঠ। আবার, কোনো জবাবই নিশ্চিত নয়, অথবা অনেকগুলো জবাবই নিশ্চিত! কিন্তু বিখ্যাত দার্শনিকদের সাথে করা সংলাপটি আপনাকে সাহায্য করবে এটা আবিষ্কার করতে যে, সেই বড় প্রশ্নগুলো দিয়ে আসলে কী বুঝায়। আপনার যা দরকার তা হচ্ছে সময়, কিছু কৌতুহল এবং একটা লাইব্রেরী কার্ড।</p>
<p><strong>প্লেটো বলেন যে, দর্শন শুরু হয় বিস্ময় থেকে। সে বিস্ময় কিসের? এটা হতে পারে আপনার নিজের সচেতনতাবোধের; বা আপনার কোনো অঙ্গ আপনার মৃত্যুর পর টিকে থাকবে কিনা; সৌন্দর্য বা প্রেমের প্রকৃতি; মানুষ সবসময় একে অপরের সাথে বাজে আচরণ করতে বাধ্য কিনা অথবা আমাদের আচরণ উন্নত করা যায় কিনা; হতে পারে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সম্পর্কে, অথবা সবকিছু বুঝতে পারা সম্ভব কিনা।</strong> মানবিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এরকম বিস্মিত হওয়ার অনেকরকম উপায় দেখে থাকি। যেমনঃ (<a href="https://tinyurl.com/mrxxrhe4" target="_blank" rel="noopener">https://tinyurl.com/mrxxrhe4</a>)</p>
<p>কিন্তু প্রতিদিনকার জীবনে এই ধরণের বিস্ময়কে প্রায়ই নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ, এটা অপ্রায়োগিক হিসেবে দেখা যায়। আমরা মনে করি “এই ধাঁচের প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।” “শুধু জল্পনা, প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব রূপে।”</p>
<p>তাই আমাদের কি আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়? আমাদের কি এই অভিনয় করা উচিত যে, এগুলো কোনো প্রশ্নই না, তার একমাত্র কারণ তার মুল্য অনেক বেশি? অথবা দোলনা থেকে কবরে যাওয়ার পথে বিস্মিত হওয়ার জন্য গভীর যে প্রশ্নগুলো করতে পারি, সেখানে কি আমাদের এই সুযোগটি ব্যবহার করা উচিত?</p>
<p><strong>লিংক ও বইঃ </strong></p>
<p>মানুষ বিভিন্ন কারণে দর্শন পড়তে আগ্রহী হয়। কেউ পছন্দ করে দ্রুত ও রসালো ধাধা, যেমন ট্রলি সমস্যা (<a href="https://tinyurl.com/y4xm8vn4" target="_blank" rel="noopener">https://tinyurl.com/y4xm8vn4</a>) বা পরিবহনকারীদের (<a href="https://tinyurl.com/53hf9f3s" target="_blank" rel="noopener">https://tinyurl.com/53hf9f3s</a>) ব্যাপারে প্রশ্ন। David Chalmers এর সাম্পতিক বই Reality+ (2022)। এটা ভার্চুয়াল বাস্তবতার বাস্তবতা সম্পর্কে উত্তেজনাপূর্ণ প্রশ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গি উত্থাপন করে দুর্দান্ত ধাধার দিকে আহবান করে।</p>
<p>অন্যান্য লোকেরা আইডিয়ার বৃহৎ ইতিহাসে তাদের জ্ঞানের কিছু ফাঁকফোকর পূরণ করতে পছন্দ করে। Durant এর ক্লাসিক গ্রন্থ The Story of Knowledge (1926) যা কতিপয় যাজক শ্রেণির দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। এই বইটা আমি সাজেস্ট করি তাদেরকে যারা দর্শন পড়া শুরু করবে এবং একটা রোডম্যাপ পেতে চায়।</p>
<p>Bryan Magee তার <em>The Story of Philosophy: A Concise Introduction to the World’s Greatest Thinkers and Their Ideas</em>&nbsp;(2nd ed,&nbsp;2016) বইতে Durant এর বইয়ের আপডেট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ চাইলে সহজেই ডুরান্ট বা ম্যাগির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ক্লাসিক দর্শনের ধারণা পেতে পারে এবং নিজেকে এগিয়ে নিতে পারে যেমনটা Steven M Cahn এর <em>Classics of Western Philosophy</em>&nbsp;(8th ed,&nbsp;2011) বইতে পাওয়া যায়।</p>
<p>যদি কেউ সমসাময়িক দার্শনিকেরা কি নিয়ে ভাবে, তা জানার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে থাকে, তাহলে এর সরাসরি ধাঁচের সাক্ষাৎকারটা শুনতে পারেন তার ওয়েবসাইট 3:16 (<a href="https://tinyurl.com/3yxdync5" target="_blank" rel="noopener">https://tinyurl.com/3yxdync5</a>) এ।</p>
<p>আরেকটু জেনারেল লেভেলে একটি ক্লাসিক বই হচ্ছে Mortimer Adler এবং Charles&nbsp;Van Doren এর <em>How to Read a Book</em> (1940)। এর ধাঁচটা প্রাচীন স্কুল লেভেলের, কিন্তু এ জাতীয় স্পষ্ট ও স্বাস্থ্যকর লেখাগুলোতে নস্টালজিক একটা আনন্দ পাওয়া যায়। আর এটা দর্শনের বইপত্র পড়ার জন্য খুবই কার্যকর।</p>
<p>দর্শন পড়ার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ পাওয়া যায় এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ব্লগে (<a href="https://tinyurl.com/yc8feyec" target="_blank" rel="noopener">https://tinyurl.com/yc8feyec</a>)। আবার যদি কেউ ভিডিও দেখে শিখতে চায়, তিনি Christopher Anadale এর How to Read Philosophy in&nbsp;6 Steps’&nbsp;(2016) ভিডিওগুলো দেখতে পারেন। লিংকঃ (<a href="https://tinyurl.com/2p8va9p6" target="_blank" rel="noopener">https://tinyurl.com/2p8va9p6</a>)</p>
<p>অবশেষে, Justin&nbsp;E H Smith এর <em>The Philosopher: A History in Six Types</em>&nbsp;(2016) বইটি দর্শন বলতে কী বুঝায় সেই বুঝাপড়া এবং দর্শন রপ্ত করতে গিয়ে কোন দিকটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারি, সেই ব্যাপারগুলো প্রশস্ত করবে। এটা হচ্ছে যে কারো জন্য একটি উপকারী আত্মসংশোধনমূলক বই তার জন্য, যিনি জ্ঞানের প্রতি আগ্রহটা ধরে রাখতে চান।</p>
<p>অনুবাদক: রিয়াজ আহমেদ</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/how-to-study-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7624</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সেকিউলারিজম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/secularism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/secularism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 21 Jun 2022 08:04:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[Secularism]]></category>
		<category><![CDATA[সেকিউলারিজম]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7203</guid>

					<description><![CDATA[‘সেকিউলারিজম&#8217; ল্যাটিন শব্দ Saecularis থেকে উদ্ভূত। তার অর্থ বৈষয়িক (Worldly), অস্থায়ী (Temporal) এবং প্রাচীন (Old Age)। গীর্জার কোনো পাদ্রী যদি বৈরাগ্যবাদী খানকাহী জীবন পরিহার করে বৈষয়িক জীবন যাপনের অনুমতি লাভ করে তাহলে তাকে &#8216;সেকিউলার&#8217; নামে অভিহিত করা হয়। পারিভাষিক তাৎপর্যের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>‘সেকিউলারিজম&#8217; ল্যাটিন শব্দ Saecularis থেকে উদ্ভূত। তার অর্থ বৈষয়িক (Worldly), অস্থায়ী (Temporal) এবং প্রাচীন (Old Age)। গীর্জার কোনো পাদ্রী যদি বৈরাগ্যবাদী খানকাহী জীবন পরিহার করে বৈষয়িক জীবন যাপনের অনুমতি লাভ করে তাহলে তাকে &#8216;সেকিউলার&#8217; নামে অভিহিত করা হয়।</p>
<p>পারিভাষিক তাৎপর্যের দিক দিয়ে তা একটি মতাদর্শ, একটি বিশেষ ধরনের কার্যক্রম। তাতে যাবতীয় দ্রব্যাদি, বস্তু নিচয় এবং মানুষকে এই পার্থিব জগত পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা হয়। বাংলাভাষায় &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর অনুবাদ করা হয় &#8216;ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ&#8217; অথবা &#8216;বৈষয়িকতাবাদ&#8217; কিংবা &#8216;ধর্মহীনতাবাদ&#8217;। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের ইচ্ছা ও সমর্থনের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে রাষ্ট্র তার সমস্ত বিষয় সম্পত্তিকে নিতান্ত বৈষয়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার লক্ষ্যে করায়ত্ত করে নেয়ার রক্তাক্ত ইতিহাসই তার উৎপত্তি-উৎস। ইতিহাসে এরূপ ঘটনার দৃষ্টান্ত অগণিত। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; এর আরও অধিক বিস্তৃত তাৎপর্য বিশ্লেষণ স্বরূপ বলা যায়- মানব জীবনের বিভিন্ন উপাদান ঝোঁক-প্রবণতা, রসম-রেওয়াজ এবং অন্যান্য সামাজিক রূপ তথা স্বয়ং মানুষের জীবনকে কোনো ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তিশীল না করাকেই বলা হয় &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;। ধর্ম বিবর্জিত জীবনধারা (Adulthood) অবলম্বনই হচ্ছে ‘সেকিউলারিজম&#8217;। এক কথায় তা একটি বিশেষ মতাদর্শ (Ideology) রূপে গড়ে ওঠার জন্য ব্যর্থ চেষ্টায় রত।</p>
<p>‘সেকিউলারিজম&#8217;-এর উৎপত্তি ইউরোপে। ঊনবিংশ শতকে একদল ইংরেজ চিন্তাবিদ &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-কে একটা বিশ্বজনীন আন্দোলনে রূপায়িত করার চেষ্টা চালায়। এরা নিজেদের &#8216;সেকিউলারিস্ট&#8217; &#8216;বৈষয়িকতাবাদী&#8217; বা &#8216;ধর্মবিমুক্ত&#8217; চিন্তাবিদ পরিচিয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান দখল করেছিলেন জি. জে হলিউক (১৮৫৪ খ্রিঃ)। তার মতে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; হচ্ছে জনগণের &#8216;কর্মদর্শন&#8217;। Secularization শব্দটি প্রথমবারে একটি আইনগত পরিভাষারূপে ব্যবহৃত হতে থাকে। <em>যেসব বিশেষ আন্দোলন ১৬৪৬-এর ত্রিশ বর্ষীয় যুদ্ধাবসানকালে সরকারের সাথে আলাপ আলোচনায় আত্মনিয়োগ করেছিল এবং যার ফলে Treaty of west phalia জনগণের সম্মুখে প্রকাশমান হয়েছিল এবং অষ্টদশ শতক থেকে যা Canon-Law রূপে গৃহীত হয়েছিল, তারই ফলে এই পরিভাষাটির উদ্ভব এবং প্রচলন! ঊনবিংশ শতাব্দীতে গীর্জাকে যখন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ওপর বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ও বস্তুগত কল্যাণের ব্যাপারাদির ওপর প্রভাব বিস্তার করা থেকে বঞ্চিত করে দেয়া হলো, তখন Secularization-এর তাৎপর্যে ব্যাপকতা ও গভীরতার সৃষ্টি হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। ফ্রান্সে তখন Secularization-কে একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শনরূপে গ্রহণ করা হয়। আর তার নাম দেয়া হয় Laicism তথা ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি ও নিষ্কৃতি লাভ।</em> কিন্তু ইংল্যান্ডে এই দর্শনের নাম দেয়া হয় &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; (Secularism)। উভয় পরিভাষাই ধর্মের প্রাধান্য ও সার্বভৌমত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থীরূপ পরিগ্রহ করে। অস্তিত্ববাদী, বস্তুবাদী ও অভিন্ন মৌলবাদী (Monism) বা অদ্বৈতবাদে বিশ্বাসীরাও এই পরিভাষাদ্বয়কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।</p>
<p>একালের কিছু সংখ্যক চিন্তাবিদ &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; ও &#8216;সেকিউলারাইজেশন&#8217; এই পরিভাষাদ্বয়ের তাৎপর্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে সচেষ্ট। ‘সেকিউলারিজম&#8217;কে একটা মিথ্যা মতাদর্শরূপে উপস্থাপিত করা হয়েছে। আর ইংরেজি ভাষাভাষী দেশসমূহে &#8216;সেকিউলারাইজেশন&#8217; ষষ্ঠদশ শতকের সেই ঐতিহাসিক স্বৈরতন্ত্র বোঝাবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যার অধীন অষ্টম হেনরী সরকার সমস্ত খানকাহ&#8217; বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল। ইতিহাসের প্রত্যেক অধ্যায়েই কোনো না কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা বিজয়ী ধর্মীয় রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করে ধর্মীয় অনুশাসনকে অগ্রাহ্য করে চলেছে এবং তার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হতে চেষ্টা চালিয়েছে। এ চেষ্টা মূল ধর্মের মতোই প্রাচীন। এ চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও প্রবণতা নিজ নিজ অবস্থা ও পরিবেশ অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীতে মিশরীয় ফেরাউন আখ্-ইন-আতুন (Akn-cn-aton) একটি অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থার খাতিরে স্বীয় সাম্রাজ্যের পরিসীমার মধ্য থেকে ঐতিহ্যবাহী উপাস্য দেবদেবীর ও পূজা-উপাসনার নিয়মাদি নির্মূল করে দিয়েছিল। তাছাড়া জীনোফিনিজ ও এন ইজারাস থেকে শুরু করে সক্রেটিস পর্যন্ত গ্রীক দার্শনিকগণ এবং পরে এপিকিউরিন নিজ সময়ের সব দেবদেবী ও দেবমালা পর্যায়ের ধারণাসমূহের যে তীব্র সমালোচনা করেছে তা-ও সর্বজনবিদিত। ধর্মতত্ত্ব সংক্রান্ত বিদ্যার ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায়, প্রায় প্রত্যেকটি ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস ও আদেশ-উপদেশকে একটি সংকীর্ণ শ্রেণির লোকেরা সবসময়ই সন্দেহ ও সংশয়ের দৃষ্টিতে দেখছে। বাহ্যিকভাবে ও বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার কারণে তারা ধর্মকে হয়ত সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি, কিন্তু একটি প্রশ্নহীন ও সংশয়মুক্ত অন্তর দিয়ে তা তারা কখনোই গ্রহণ করেনি। বাস্তব জীবনের প্রত্যেক পদে তাকে এড়িয়ে চলতেই চেষ্টা করেছে।</p>
<p>মূলত &#8216;সেকিউলারাইজেশন&#8217; (Secularization) এবং সেকিউলারিজম (Secularism)-এর মধ্যে মৌলিক ও তত্ত্বগত কোনো পার্থক্য নেই। উভয়টিকেই ‘নিতান্ত বৈষয়িক আদর্শ&#8217; বললে কিছুমাত্র ভুল বলা হবেনা, &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত একটি বিরল ও অস্থায়ী মতাদর্শরূপেই বিরাজমান।</p>
<p>যে সময়ে এই মতাদর্শটির উৎপত্তি ঘটে, তখন দুনিয়া ও মানুষের ব্যাখ্যা দেয়া হতো অত্যন্ত স্থবির ধরনের দেবমালা সঙ্গাত ভঙ্গিতে। সমস্ত সামজিক রীতিনীতি ও ব্যবস্থা ধর্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এমনকি প্রাকৃতিক শক্তি ও উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যাদুমন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করা হতো। তা-ও ছিল ধর্মের একটা বিকৃত রূপ।</p>
<blockquote><p>সেকিউলারিজম-এর দুটো দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হচ্ছে, তা জনগণের বৈষয়িক জীবনকে উন্নত বানাতে আগ্রহী। আর এটাই তার নৈতিকতার দিক। কেননা নৈতিকতার সম্পর্ক সমাজের মধ্যকার এমন সব কাজের সাথে, যে সবের সাথে লাভ ও লোকসানের কোনো-না-কোনো সম্পর্ক থাকে। কিন্তু সেকিউলারিজমে এই পর্যায়ের কার্যাবলীর ভিত্তি কোনো ধর্ম বা পরকালে বিশ্বাসের ওপর স্থাপিত নয়। ফলে তা ধর্মকে অস্বীকার করেও ধর্মের লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট। অন্যকথায়, ইতিবাচকভাবে তা একটি নৈতিক আন্দোলন বিশেষ। কিন্তু নেতিবাচকভাবে তা একটি &#8216;ধর্মীয় আন্দোলন&#8217;-ও বটে। তার উৎপত্তি লাভে বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা ও দার্শনিক প্রভাব বিশেষ সাহায্যকারী প্রমাণিত হয়েছে।</p></blockquote>
<p><strong>সেকিউলারিজমের বিকাশ</strong></p>
<p><strong> </strong>রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দের সংস্কারমূলক বিল-এর পূর্ব ও পরবর্তীকালীন অস্থিরতা, বিপর্যয় ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে এই মতবাদটির উৎপত্তি ঘটে। তার অন্তঃস্থিত বস্তু অনেকটা রবাট ঊন এবং তার অনুসারীদের অবিন্যস্ত ও সম্পর্কহীন সমাজতন্ত্র এবং ভাগ্যাহত চার্চিস্ট আন্দোলনের ফসল। তা চরমপন্থী চার্চিস্ট ও ইউরোপীয় মহাদেশে সৃষ্ট বিভিন্ন বিপ্লবের দরুন জনমনে জেগে ওঠা বিপ্লবাত্মক আশা-আকাঙ্ক্ষার চরম ব্যর্থতার পর ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে উদ্ভূত হয়েছিল। সেকিউলারিজম সামাজিক ও রাজনৈতিক বিকাশকে সংগঠন ও প্রশিক্ষণ প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ উপায়ের সাহায্যে অগ্রসর করে নেয়ার একটা কার্যক্রম ছিল।</p>
<p>অস্বীকার করার উপায় নেই, অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও তীব্র ধরনের সামজিক বিপর্যয়ের পরিণতি স্বরূপ &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর উদ্ভব ঘটেছিল। ধনশালী ও প্রভাব প্রতিপত্তি সম্পন্ন লোকদের লালসা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পথে অযৌক্তিক ও অসঙ্গত প্রতিবন্ধকতা এবং গীর্জীয় ধর্মতত্ত্বের বন্ধ্যা অহমিকতা প্রভৃতি উপাদান ‘সেকিউলারিজম&#8217; সৃষ্টির নিমিত্ত হয়েছিল। এরই ফলে শ্রমজীবী শ্রেণি যখন অবস্থার চরম অবনতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তখন তাদের মধ্যে শুধু যে চরমবাদী রাজনৈতিক মতবাদই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তাই নয়, ধর্ম বিদ্বেষ ও ধর্মের প্রতি মারাত্মক প্রতিহিংসামূলক প্রবণতাও জন্মলাভ করে, তা কোনো ক্রমেই অস্বীকার করা যায় না।</p>
<p><strong>&#8216;সেকিউলারিজম&#8217; মূলগতভাবে একটি প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মূলক আন্দোলন ছিল। আর সমস্ত বিক্ষোভমূলক আন্দোলনই ভাবাবেগ সৃষ্টিকারী শক্তির সাহায্য নিয়ে বিশেষ ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে থাকে, তা-ই তার প্রকৃতি। এই কারণে তাতে অনিবার্যভাবে বহু প্রকারের দোষত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে যায়। তাতে ভারসাম্যহীনতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। গঠনমূলক ভাবধারার পরিবর্তে বিপর্যয়কর কার্যক্রমের প্রবণতা প্রবল হয়ে থাকে।</strong> দ্বিগুণ অথবা চারগুণ ভাবালুতার বিভ্রান্তিকর প্রয়োগ, দৃষ্টি সংকীর্ণতা ও নেতিবাচক আচরণ প্রভৃতিই এসব আন্দোলনের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। আর প্রচলিত আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তা আত্মপ্রকাশ করে। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; যদিও একটি ইতিবাচক নীতি অনুসরণ ও উপস্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিল; কিন্তু এই &#8216;ইতিবাচক-নীতি-চিন্তা&#8217; একটি বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর দৃষ্টি সংকীর্ণতার মূলে বিশেষ কারণ নিহিত। আর তা হচ্ছে, জীবন ও কর্ম পর্যায়ে বেশিরভাগ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে তা প্রবল ঘৃণা ও বিদ্বেষের অস্ত্র ব্যবহার করেছে। জীবন ও কর্মের গুরুত্ব খুব সামান্যই স্বীকৃত হয়েছে।</p>
<p>&#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর দার্শনিক ভিত্তি জেমস মিল ও জিরামী বেনহাম-এর শরীকানাবাদী চিন্তাপদ্ধতি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। তার একটা নিজস্ব ধর্মবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। পাইন ও রিচার্ড কারলাইল তা-ই লাভ করেছিল উত্তরাধিকারসূত্রে। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এ ইতিবাচকতার প্রভাব ইংরেজদের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছুই নয়। যদিও &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; সে ইতিবাচকতার প্রতি আদৌ কোনো ভ্রূক্ষেপ করেনি, তার প্রতি আরোপ করেনি একবিন্দু গুরুত্ব। মানবতাকে দেবতার আসনে আসীন না করলেও নিজের মধ্যে ইতিবাচক শিক্ষাদর্শনের সংমিশ্রণ করে নিয়েছে। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এ এই প্রভাব জি. এইচ. লিউস. এবং জে. এস. মিল থেকেই আমদানী করেছে। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; যখন মিল্‌-এর সম্মুখে পেশ করা হলো, তখন সে তাকে সত্যতার সনদ দিয়ে ধন্য করে দিলো। অনুরূপভাবে দার্শনিকতার দিক দিয়ে &#8216;বৃটেনিয় সুবিধাবাদ&#8217; তার আধ্যাত্মিক গুরু প্রমাণিত হয়েছে। যেসব তিক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কারণে এ আন্দোলনের মূল হোতাগণ সমসাময়িক সার্বজনীন মতবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, তা-ই ছিল এই &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; আন্দোলনেরও মূল কারণ, কিন্তু তার অন্তঃস্থিত প্রভাব ছিল দার্শনিক ধরণের। আর তা হওয়াও ছিল একান্তই অনিবার্য। কেননা &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; যখন প্রকাশ্যভাবে ধর্মের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দিলো, তখন তা জীবন ও কর্ম পর্যায়ে একটা নতুন দার্শনিক মতাদর্শ গড়ে তুলেছিল। বিশেষভাবে, নৈতিকতার পর্যায়ে এই দর্শন ছিল অত্যন্ত প্রকট। এই মতাদর্শই &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-কে তার কাঙ্ক্ষিত ভিত্তি সংগ্রহ করে দিয়েছিল।</p>
<p><strong>সেকিউলারিজম-এর উদ্ভাবক</strong></p>
<p>&#8216;সেকিউলারিজম&#8217; তার নামকরণ ও সত্তার দিক দিয়ে অনেকটা <strong><em>জর্জ জ্যাকব হলিউক</em></strong>-এর নিকট অনুগ্রহ এবং ঋণের জালে বন্দী। হলিউক ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে বার্মিংহামে জন্মগ্রহণ করেছিল। তার পিতা ছিল কঠোর পরিশ্রমী হস্তশিল্পী। গোঁড়া ধর্মীয় পরিবেশে তাঁর লালন-পালন সম্পন্ন হয়েছিল। তার জন্মভূমির পরিবেশ ও বাল্যকালীন পারিপার্শ্বিকতা তার মধ্যে তীব্র ধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক আকীদার জন্ম দেয়। ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দের সংস্কারমূলক বিল পাশকরণ জলন্ত আগুনে তেল ঢালার কাজ করে। তখন হলিউক ছিল পনেরো বছরের এক সংবেদনশীল কিশোর। ফলে তার মন গীর্জার প্রতি অনাস্থাভাজন হয়ে পড়ে। কেননা গীর্জা সাধারণ মানবিক সংবেদনশীলতা ও অনুকম্পাপরায়ণতা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিল। সে &#8216;ঊন&#8217; -এর সমাজ সংস্কারক ও প্রচারক হিসেবে রাজনৈতিক জীবনে সর্বপ্রথম পদার্পণ করেন।</p>
<p>অতঃপর &#8216;চার্টিজম&#8217; (Chartism) এর সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে চার্টিজম-এর আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে হলিউক চরমপন্থী (Radical) মৌলবাদী চিন্তার ধারকের রূপ পরিগ্রহ করে। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে সে দৃঢ় নিশ্চয়তা সহকারে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে, পরে &#8216;চেশটনহাম&#8217; নামক স্থানে তাকে &#8216;কাফের&#8217; আখ্যায়িত করে গ্রেফতার করা হলে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতি তার ঘৃণা অধিকতর তীব্র, গভীর ও প্রচণ্ড হয়ে ওঠে। কিন্তু হলিউক তার সমসাময়িক বিশ্বাসগত নাস্তিকতাবাদের প্রতিও কোনো সহানুভূতি পোষণ করত না। তার নাস্তিকতা ছিল &#8216;আমি জানিনা&#8217; পর্যায়ের। সে তার স্বতন্ত্র ধরনের চিন্তাধারার প্রকাশ ও প্রচার করেছিল অসংখ্য পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে। The Reasoner পত্রিকায় সে লিখেছিল: &#8220;আমরা কাফের নই যদি এই পরিভাষাটির প্রয়োগ খ্রিষ্টীয় তত্ত্ব অস্বীকৃতির উপর হয়, তাহলে বলব, আমরা সকলে খ্রিষ্টধর্ম সৃষ্ট ভ্রান্তিমূলক রীতিনীতি আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করছি।&#8221;  যেসব খ্রিষ্টান ব্যক্তি রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তায় তার সাথে একমত ছিল হলিউক তাদের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে রেখেছিল। মুরাঈম ও কিংয়ের &#8221;ক্রিশ্চিয়ান স্যোশ্যালিজম&#8221; -এর দিকে তার ঝোঁক তাদের সাথে একত্মতার নিশ্চয়তা বিধান করছিল।</p>
<p>কিন্তু প্রকৃত সমাজতন্ত্রের মতাদর্শগত বিশেষত্বের দরুন সে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই কারণে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে খ্রিষ্টবাদের সংমিশ্রণকে সে অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করতো। হলিউক কয়েক বছর ধরে জনকল্যাণমূলক ও সমবায়ী আন্দোলনের সাথে অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে। মধ্যম বয়স থেকে একজন পুস্তক ব্যবসায়ী হিসাবে লন্ডনের স্থায়ী অধিবাসী হয়ে থাকতে শুরু করে। এই সময়ে ইটালির স্বাধীনতাই হয়েছিল তার অবসরহীন ব্যস্ততা ও গভীর আন্তরিকতার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু। জীরেমী বাল্ডমি ও মীজেনী উভয়ই ছিল তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। যে সব হতভাগ্য ইংরেজ সিপাহীকে ইটালির সাহায্যার্থে প্রেরণ করা হয়েছিল, তাদের প্রশিক্ষণদানে সে তখন সর্বান্তঃকরণে ও সার্বক্ষণিকভাবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতো। জীবনের শেষভাগে সে ব্রাইটনে বসবাস শুরু করে এবং ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে এখানেই তার জীবনের অবসান ঘটে। এই বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের সে ছিল সক্রিয় সমর্থক এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাধীন চিন্তার বিজয়ের সুসংবাদ শ্রবণের জন্য সে হয়েছিল অত্যন্ত ব্যাকুল।</p>
<p>ঊনবিংশ শতাব্দীতে যেসব লোক খ্রিষ্টান বিরোধী প্রচারণাকে প্রচণ্ড ঝটকার ন্যায় পরিচালনা করেছিল, হলিউক তার দীর্ঘ জীবনে তাদের সকলের সাথে গভীর সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সে খ্রিষ্টবাদের প্রখ্যাত প্রচারকবৃন্দের সাথেও সম্পৃক্ত রয়েছে। ডবলিউ. ই. গ্রেডেস্টোন এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে হলিউককে একজন স্বতন্ত্র ধরণের বিশ্বস্ত বিরোধী ব্যক্তি বলে মনে করতো।</p>
<p>চার্লস ব্রেডলাফ (Charles Bradiaugh)-এর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হলিউকের তুলনায় অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি আর কেউ ছিল না। (তার অর্থে, ধর্মের মৌলিকতার বিরুদ্ধে তার ঘৃণা ছিল না। তার ঘৃণা ছিল ধর্মের বন্ধ্যা গীর্জীয় প্রকাশের বিরুদ্ধে) তার দলের বিপুল সংখ্যক সদস্য তার বিরুদ্ধে যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছিল, তা ছিল হলিউকের স্পষ্ট ও দ্বিধামুক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জীবন্ত প্রমাণ।</p>
<p>‘সেকিউলারিজম’-কে প্রতিষ্ঠিত করণ প্রচেষ্টায় হলিউকের সহকর্মীদের মধ্যে চার্লস সাউথ ওয়েল, থমাস কুপার (পরে সে খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছিল), থমাস পিটার্সন ও উইলিয়াম বিল্টন প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। হলিউক এই আন্দোলনকে নাস্তিকতাবাদের &#8216;উত্তম বিকল্প&#8217; বলে অভিহিত করেছিল। ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রেডলাফ এর সাথে হলিউকের সাক্ষাৎ হয় এবং ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে সে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; পরিভাষাটি রচনা করে। সে Netheism Limitatonism -কে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে চলেছে। অথচ নিজেদের বিশেষত্বের দিক দিয়ে এই দুইজন নাস্তিকতাবাদের &#8221;উত্তম বিকল্প&#8221; হওয়ার অধিক অধিকারী ছিল। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; পর্যায়ে তার বক্তব্য ছিল- &#8221;এটি বর্তমান জীবনের আওতাভুক্ত কর্তব্যসমূহ উত্তমভাবে পালনের মতাদর্শ।&#8221;  হলিউক &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর ধর্মবিরোধী মর্যাদাও ব্রেডলাফ-এর নাস্তিকতাবাদী মতাদর্শসমূহের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য প্রকাশ করেছে। যদিও চার্লস ওয়াটস, জি ডাবলিউ ফিট ও অপরাপর ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য এই &#8216;সেকিউলার&#8217; আন্দোলনের ফলেই বহাল রয়েছে। কিন্তু হলিউক সবসময়ে চেষ্টা চালিয়েছে এজন্য যে, সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিকতার লক্ষ্যে নাস্তিকতাবাদী বিশ্বাসকে জরুরী শতরূপে কখনই যেন গণ্য করা না হয়। তাহলেই স্বাধীন মুক্ত চিন্তার ধারক ব্যক্তিবর্গ নিজেদের নাস্তিকতাবাদের প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষী মনোভাব ছাড়াই সে লক্ষ্যসমূহকে সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তার সাথে ঐকান্তিকভাবে শামিল থাকতে পারবে। এই আবরণের ক্ষেত্রে তার বড় ধরনের সাফল্য লাভ না হলেও সে অত্যন্ত কঠোরতা ও অবিচলতা সহকারে এই নীতিকেই সচল রাখতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল।</p>
<p><strong>সেকিউলারিজম-এর মূলনীতি</strong></p>
<p>সেকিউলারিজম-এর মূলনীতি হচ্ছে, মানুষের বৈষয়িক উন্নতির জন্য শুধুমাত্র বৈষয়িক বা পার্থিব উপায় উপকরণের ওপর একান্তভাবে নির্ভর করতে হবে। কেননা বৈষয়িক উপায় উপকরণ মানুষের করায়ত্ত হওয়ার কারণে অন্যান্য সব কিছুর তুলনায় অধিক গুরুত্ব পাওয়ার অধিকারী। তাছাড়া এই উপায় উপকরণসমূহ মানুষের কাঙ্ক্ষিত ও প্রয়োজনীয় সবকিছু অর্জনে অধিক উন্মুক্ততা সহকারে ব্যবহৃত হতে পারে। <strong>&#8216;সেকিউলারিজম&#8217; একটা প্রবল মতাদর্শ হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল সেই সময়ে যখন বিজ্ঞান ও ধর্মের বিচ্ছিন্নতা ও সম্পর্কহীনতার দাবি অত্যন্ত প্রবল আকার ধারণ করেছিল</strong>।</p>
<p>সেকিউলারিজম-এর মত ছিল এই দাবির সাথে পুরামাত্রায় সংগতিপূর্ণ। সে কারণে &#8216;সেকিউলার&#8217; তত্ত্বসমূহকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও নিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। <em>চলমান জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপরই রক্ষিত হয়েছিল &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর ভিত্তি</em>। সেই সাথে দাবি তোলা হয়েছিল যে, তাকে বিবেক বুদ্ধির সাহায্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতার আওতায় নিয়ে আসা যায় অতীব সহজভাবে। মনে করা হয়েছে, অংক ও গণিতবিদ্যা এবং রসায়নশাস্ত্র যেভাবে &#8216;সেকিউলার&#8217; বিদ্যার অন্তর্ভূক্ত, অনুরূপভাবে একটি কল্যাণমূলক জীবন ও মানবীয় কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে &#8216;সেকিউলার&#8217; দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। আর এই পদ্ধতিতেই বৈজ্ঞানিক শিক্ষা-ধারাকেও সচেতন পথ নির্দেশনায় সংযোজিত করা চলে।</p>
<p>এই কারণে ধর্মের সাথে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর সম্পর্ক পারস্পরিক শত্রুতামূলক হওয়ার পরিবর্তে ভিন্নতর ও একক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ধর্মতত্ত্ব অদৃশ্য জগতের ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করে আর &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; অদেখা জগত ও তার ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। বাস্তব অভিজ্ঞতার আওতাভূক্ত জগতের সঙ্গেই সম্পর্ক সেকিউলারিজমের। পরকালীন জীবন পর্যায়ে তার কিছুই বলবার নেই-না তার পক্ষে ইতিবাচকভাবে, না তার বিপক্ষে নেতিবাচকভবে।<em> এক আল্লাহর প্রতি ঈমান কিংবা নাস্তিকতা-এর কোনটি সেকিউলারিজম-এর অংশ নয়। কেননা বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ দুটির প্রমাণ করা যায় না বলে সেকিউলারিজম-এর ধারণা। অবশ্য ধর্মতত্ত্বের নৈতিক শিক্ষার সাথে তার একটা সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সে জন্য বিশ্বাসের বিষয় উপস্থাপিত করে, তা ধর্মীয় বিশ্বাসের আওতাভূক্ত নয়। যেসব লোক বিভিন্ন কারণে ধর্মতত্ত্বের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাস স্থাপনে সক্ষম হচ্ছে না। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; কেবল তাদেরই মহা আকর্ষণের জিনিস।</em></p>
<p>&#8216;সেকিউলারিজম&#8217; এর দাবি হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ নৈতিকতা কেবলমাত্র সেকিউলার চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমেই অর্জন করা যেতে পারে। যেমন- রাজমিস্ত্রী যে সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ কাজ করে নির্মাণ কাজের সামগ্রী সে মিস্ত্রী ছাড়াও অর্জন করা সম্ভব। সেকিউলারিজম-এর ঘোষণা হচ্ছে, এই দুনিয়া ছাড়া &#8216;আলো&#8217; আর কোথাও নেই। আর যদি থেকেও থাকে, তবুও তা মানবীয় লক্ষ্য অর্জনের সহকারী প্রমাণিত হতে পারে না।<strong> ধর্মীয় বিশ্বাস যতক্ষণ পর্যন্ত মানবীয় আনন্দ স্ফূর্তির সম্মুখে বাস্তব প্রতিবন্ধকতা দাঁড় না করাচ্ছে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সে অবস্থায়ই থাকতে দেয়! মরে কিংবা বাঁচে, তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। <em>কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; সব সময়ই নাস্তিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে</em></strong>। যদিও হলিউক সব সময়ই এতদুভয়ের মাঝে পার্থক্য রক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। সে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; নীতিতে ব্রেডলাফ-এর সঙ্গে সানন্দে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। সেকিউলার উপায়-উপকরণের সাহায্যে যে লোকই মানবতার পারস্পরিক গঠন ও উন্নয়নমূলক কাজে অংশ গ্রহণে ইচ্ছুক হতো, তার প্রতিই সে সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করতে প্রস্তুত ছিল। ইসলামে তাওহীদী আকীদা ও নাস্তিকতা এই উভয়কেই সে মাত্রাতরিক্ত বিশ্বাসবাদ মনে করত। ব্রেডলাফ-এর মত ছিল এর বিপরীত। সে মনে করত, ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাস প্রতিহত করাই সেকিউলারিজম-এর কর্তব্য। কেননা এই সব কুসংস্কার মূলক ধারণা-বিশ্বাস যতদিন পর্যন্ত পূর্ণ শক্তিতে প্রকাশিত হতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বস্তুগত উন্নতি লাভ কল্পানাতীত হয়ে থাকবে। সেকিউলারিজম-এর দাবি হচ্ছে, যুক্তি উপস্থাপনের নিয়মে বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবন দিয়ে তার মূলনীতি সমূহের প্রবর্তন ও পরিচ্ছন্নকরণের মাধ্যমে সেগুলোকে সমস্ত মানবতার ওপর অভিন্ন ভঙ্গিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। <strong>সে বলছে, নৈতিকতার ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপনা। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে, ইহাও সংকল্পে তার সম্ভাবনা নেই বললেও অত্যুক্তি হয় না।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>হলিউকের মতে, বস্তুগত অবস্থা এমন করা সম্ভব যেখানে দারিদ্র্য ও বঞ্চনার শিকড় হবে উৎপাটিত। উপযোগবাদীদের (Utilitarian) ন্যায় তারও বিশ্বাস ছিল, চরিত্রই হচ্ছে এমন একটি কার্যক্রম যা মানবতার সম্মিলিত কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম এবং মহাসত্য দিবালোকের মতোই উজ্জ্বল ও অনস্বীকার্য।<em> তার মতে বিজ্ঞান যেমন করে মানুষের সুস্বাস্থ্যের মৌলনীতি নির্দেশ করতে পারে, অনুরূপভাবে মানুষের স্বচ্ছলতার নীতিও উদ্ভাবন করতে সক্ষম</em>। মানবীয় স্বচ্ছলতা অর্জনের জন্য যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে পথ-নির্দেশ লাভ করা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনকালে ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার অনুসরণ করা উচিত নয়। কেননা যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপনের ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা ও ইচ্ছা প্রয়োগ করে আমরা না দৃঢ় প্রত্যয় অর্জন করতে পারি, আর না নিয়ম-শৃঙ্খলা অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। কেবলমাত্র নিরপেক্ষ বিবেক-বুদ্ধিই পারে নির্ভুল প্রত্যয় ও নিয়মতন্ত্র সংরক্ষণ করতে। অতএব বিবেক-বুদ্ধিকে অবশ্যই অনাসক্ত ও স্বাধীন- মুক্ত করে রাখা একান্তভাবে জরুরী। নীতি বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ব পার্যায়ে চিন্তা-গবেষণা বৈজ্ঞানিক চিন্তা-গবেষণার মতোই স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। কোনো প্রকারেরই গবেষণা, সমালোচনা ও প্রচারণা প্রকাশনার কারণে কোনো আইনগত বা আত্মিক শাস্তির ব্যবস্থা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। জীবনের এই বাস্তব মতাদর্শ পেশ করে সেকিউলারিজম এমন একটা লক্ষ্য অর্জনে ব্রতী হয়, যা তার কথায় ধর্ম অর্থাবস্থায় ছেড়ে দেয়। তা সত্যকেই সনদরূপে মানে, সনদকে মতরূপে গ্রহণ করে না। তা কর্তব্যবোধের কল্যাণকে কল্যাণের কর্তব্যবোধের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। It Topes Truth for Authority, not authorially for truth and substitutes. The piety for usefulness for the usefulness of piety.</p>
<p>মানবতার জন্য যা-ই উত্তম কল্যাণকর, পরীক্ষা-নিরীক্ষার উত্তীর্ণ বিবেক-বুদ্ধির সাহায্যেই তা নির্ধারণ করতে হবে এবং মানবতার স্রষ্টা নিশ্চয়ই তাকে স্বীকৃতি দিবে ও তা নিয়ে গৌরব প্রকাশ করবে। আধুনিক কর্তব্যবোধ স্বশক্তিতেই স্বীয় প্রকাশ ঘটাবে। আর &#8216;সর্বজ্ঞানী&#8217; রকমারী আবেদন-নিবেদনে ক্ষুণ্ণ হবে না। কার্যত আমরা সাধারণ রীতি-নীতির অধীন। সেই সাধারণ রীতি-নীতির অনুসন্ধান এবং তদনুযায়ী জীবন যাপন করাই মানুষের কর্তব্য।</p>
<p><strong>সেকিউলারিজম -এর উৎকর্ষ ও বিকাশের পরিবেশ</strong></p>
<p>ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সেকিউলারিজম-এর প্রভাব চতুর্দিকে ব্যাপকভাবে প্রকাশমান হয়ে পড়ে। এই যুগটাই ছিল খ্রিষ্ট ধর্মবিরোধী প্রতিক্রিয়া সেকিউলারিজমের এবং তা তার সহযোগী চিন্তা মতের স্মারক আন্দোলনের রূপ ধারণ করেছিল। <strong>উত্তরকালে তা খুব দ্রুততার সঙ্গে বিলীয়মান হয়ে পড়ে এবং সুসংবদ্ধ বুদ্ধিবাদে লীন হয়ে স্বাধীন সত্তা হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে বুদ্ধিবাদই সেকিউলার প্রাণ-শক্তির নবতর রূপ উপস্থাপিত করছে</strong>। বলা আবশ্যক, সেকিউলারিজম-এর সোনালী যুগ ছিল তখন যখন তা স্বীয় সহযোগীদের ধর্মবিরোধী প্রচারণার সঙ্গে সামগ্রিকভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। ব্রেডলাফ-এর &#8216;সেকিউলার&#8217; আন্দোলনে যোগদান এই পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অথচ হলিউক নাস্তিকতাকে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর অন্তর্ভূক্ত করাকে কখনই জরুরী মনে করেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এ নাস্তিকতা ক্রমশ শামিল হয়ে গেলে তখন প্রাচীন দ্বন্দ্ব নিঃশেষ হয়ে গেল। বিজ্ঞান ও ধর্মের বিচ্ছিন্নতার একটা ভারসাম্যপূর্ণ মতাদর্শ বিজয়ী হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু এসব জিনিসের সাহায্যে সেকিউলারিজম-এর আসল বিশেষত্ব নিঃশেষ হয়ে গেল। ফলে তাকে একটি সুসংগঠিত আন্দোলনরূপে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দেখা দিল। তা স্বীয় মৌল ভাবধারা ও রীতিনীতিসহ নিজের পুনরুজ্জীবন সুসম্পন্ন করতে পারবে কি? এ ব্যাপারে অধুনা সময়ে কঠিন সন্দেহ দেখা দিয়েছে।</p>
<p>সেকিউলারিজম ভূমণ্ডলে মানবীয় জগত-মানবীয় স্বার্থের সীমাবদ্ধতায় বিশ্বাসী। এ মতবাদ সম্ভব এবং কার্যত নিঃসন্দেহে সত্যভিত্তিক। কিন্তু মতাদৰ্শগত দৃষ্টিকোণে তাকে সত্যভিত্তিক প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে, সেকিউলারিজম এই কথা প্রমাণ করার জন্যই ব্যর্থ চেষ্টায় রত রয়েছে। বাস্তব দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে লক্ষ্য করা যাবে, অসংখ্য লোকের স্বার্থ ও সম্পর্ক সম্বন্ধ জীবনের বস্তুগত দিকসমূহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে রয়েছে। দুনিয়ায় এই আচরণই কর্মোপযোগী। কেননা অধিকাংশ লোকই জীবন ও কর্ম সম্পর্ক কোনো সচেতন ও সক্রিয় মতাদর্শের ধারক নয়। কোনো মতাদর্শের প্রয়োজনও হয় না তাদের। অন্য কথায়, মতাদর্শের অনুপস্থিতিতেই বাস্তব সেকিউলারিজম-এর কর্মতৎপরতা নিহিত। সেকিউলারিজম কোনো আদর্শ নয়। তা হচ্ছে আদর্শের অস্বীকৃতি (Negation)। তা মানুষকে এইরূপ অপ্রয়োজনীয় ও অসম্পূর্ণ যুক্তি-প্রমাণ দেখায়, যা না চেয়েও সে সেকিউলারিজম-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পুরণ করছে, আর এটাই হচ্ছে &#8216;সেকিউলারিজম&#8217;-এর দুর্বলতা। এটা সরল মনের স্বাভাবিক বাস্তববাদী মানুষকে দার্শনিক ভিত্তি সংগ্রহ করে দেয়ার চেষ্টা করার মতোই হাস্যকর ব্যাপার। অথচ এই সরলমনা মানুষ বাহ্যিক সত্যের অস্তিত্বের জন্য তার সাক্ষ্যকেই অকাট্য প্রমাণরূপে গণ্য করে নেয়, এ বাহ্যিক সত্য তেমনই, যেমন আমাদের সম্মুখে তা বর্তমান রয়েছে। বাস্তবতার দৃষ্টিতে তার জন্য কোনো দার্শনিক ভিত্তির আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই । মতাদর্শের দৃষ্টিতে এ ভিত্তি সংগ্রহ করা কঠিন, কেননা দর্শন প্রাথমিক পদক্ষেপেই সরল মনের মানুষের প্রতিপাদ্যসমূহকে অসান্ত্বনাদায়ক গণ্য করে। ‘সেকিউলারিজম&#8217;-এর অবস্থাও ঠিক তাই। অসংখ্য লোক বাস্তবভাবে সেকিউলার। কিন্তু জীবন ও কর্ম পর্যায়ের সব মতাদর্শই বিবেচনা সাপেক্ষ। কিন্তু সেকিউলারিজম তাকে কোনই গুরুত্ব দেয় না। হলিউক যদিও দাবি করেছিল যে, সেকিউলারিজম জীবন ও কর্মযোগের মতাদর্শ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা &#8216;আমি জানিনার&#8217; মতোই নিরপেক্ষ। এ দুয়ের মধ্যে পরম মৈত্রী বন্ধন। তা এ দুটির একটাকে নিঃসন্দেহে অস্বীকার করে। তা যেহেতু কর্মকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে, এই কারণে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে গেছে। উদ্দেশ্য লাভের কোনো অবকাশই এখন তার নেই। বাস্তবতার দৃষ্টিতে যে কোনো ব্যক্তি স্বীয় স্বার্থকে &#8216;সীমাবদ্ধতার মতাদর্শ&#8217; ছাড়াই সীমাবদ্ধ করতে পারে এবং ‘নেতিবাচক মত&#8217; ব্যতিরেকেই পারে তাকে অস্বীকার (Negation) করতে। এতদসত্ত্বেও আমরা যখন নিজেদের প্রতিই প্রশ্ন তুলি আমাদের নিজেদের জ্ঞানকে কেন সীমাবদ্ধ করে রাখতে হবে? তখন তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের আচরণ অবলম্বন করা কর্তব্য হয়ে পড়ে। আমরা এ দুটির কোনো একটিও উপেক্ষা করতে পারিনা। পক্ষান্তরে, ধর্ম এমন এক প্রকারের জ্ঞানের সন্ধান দেয়, যা বস্তুগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে অবস্থিত। এই ব্যাপারে ব্রেডলাফ হলিউকের তুলনায় অনেক বেশি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। ধর্মবিরোধী মতাদর্শের সঙ্গে সেকিউলারিজমকে জড়িত করা হলে তা খুবই জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এই সত্য যখন প্রত্যক্ষ করা যায়, তখন উক্ত সত্য অধিকতর শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ধর্মকে অস্বীকার করার পরিবর্তে তাকে উপেক্ষা করে বা এড়িয়ে চলতে চাওয়া অনেকটা অসম্ভব। কেননা ধর্ম বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক উভয় পর্যায়ের সম্পর্ককে পারস্পরিক যুক্ত করে উপস্থাপিত করে। ধর্ম গোটা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা ধর্মের বলিষ্ঠ দাবি। এই দাবি প্রতিরোধ বা খণ্ডন না করা পর্যন্ত সেকিউলার মতাদর্শ প্রতিষ্টা লাভ করতে পারে না। কিন্তু কার্যত তা অসম্ভব। আল্লাহ তো আছেন, কিন্তু তিনি বাস্তবজগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না, এই প্রতিজ্ঞা (Theory) অগ্রহণযোগ্য ও অবাস্তব। যে ব্যক্তিই আল্লাহর প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় রাখে, সে সমস্ত মহাসত্যের তুলনায় এই সত্যকে এক উচ্চতর বিশ্বাসরূপে গ্রহণ করে। তবে এটা অসম্ভব নয় যে, একজন তাওহীদবাদী ব্যক্তি স্বীয় কার্যকলাপে আল্লাহর বিধানকে হয়তো বাস্তবভাবে অনুসরণ করে চলছে না বা সেক্ষেত্রে আল্লাহর আইন-কানুনকে কার্যকর করেনি। আর তা না করে সে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নিজের অ-দৃঢ়তারই পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু এই কর্মপদ্ধতিকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় শান্তনাদায়ক মতাদর্শ গড়ে তোলা খুবই কঠিন ও দুঃসাধ্য। এই কারণেই &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; যদি পূর্ণমাত্রায় ধর্মবিরোধী দৃষ্টিকোণ অবলম্বন না করে, তা হলে তার ব্যর্থতা অবধারিত হয়ে পড়বে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণে-যেমন হলিউক পেশ করেছে সেকিউলারিজম-এর দুর্বলতা অনস্বীকার্য। তা এই সত্যে নিহিত যে, তা সত্য (Reality) মূল্যমান (Value)-এর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ অক্ষম রয়ে গেছে। এই ব্যর্থতা ধর্মপরায়ণতারও রয়েছে, বলা চলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা যখন স্বীয় দাবিসমূহকে বৈজ্ঞানিক রঙ মিশ্রিত করে পেশ করতে চেয়েছিল, তখন তা প্রকট হয়ে উঠেছিল।</p>
<p>সেকিউলারিজম মতাদর্শের আহ্বায়কদের মতে, মহাসত্য বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতা বহির্ভূত। বিজ্ঞানও এই কথা সমর্থন করে। মহাসত্য বিবেক বুদ্ধি পর্যায়ের ব্যাপার বলা চলে। কিন্তু মূল্যমানের গুরুত্ব ও চিরন্তনতা কেবলমাত্র আকীদার কার্যকরতার দরুনই উদ্ভূত হয়। &#8216;সেকিউলারিজম&#8217; গণিতশাস্ত্র ও রসায়নের ওপর অনুমান করে সত্যসমূহের নৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। তার সম্পর্ক কেবলমাত্র জ্ঞানের সঙ্গে, আকীদাহ বিশ্বাসের সঙ্গে নয়। এই ধরনের মৌলিক পার্থক্যের কারণে তা নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্যের মানদণ্ডে তুলনামূলক মূল্যমানের পারস্পরিক ব্যাপারে ফয়সালা করে। সত্য (Truth) ও বিবেকবুদ্ধি (Reason) সম্পর্কে তার বক্তব্য আছে; কিন্তু এইসব পরিভাষা নিহিত নিগূঢ় সত্যতার সঙ্গে কি সম্পর্ক রয়েছে, তা না বুঝেই মত প্রকাশ করে। মনে হয়েছে, এই সব পারিভাষিক শব্দ স্বতঃই মূল্যমানসমূহের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়েছে। তুলনামূলক মূল্যমানের পারস্পরিক পার্থক্যকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে। উপযোগবাদ একটা দার্শনিক মতাদর্শ। তা-ই সেকিউলারিজমের চালিকাশক্তি। এখন পর্যন্ত তা-ই ছিল বিজয়ী। সেকিউলার নৈতিকতা অনুযায়ী কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু উত্তরকালে তারও যখন পরাজয় সূচিত হলো, তখন তা-ই সেকিউলারিজম-এর ভিত্তি ছিল বলে- অনিবার্যভাবে সেকিউলারিজম-এর দার্শনিক ভিত্তিসমূহও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। তাই সব কারণে তা জীবন ও কর্মের দর্শন হিসেবে অবশিষ্ট থাকতে পারেনি। তাই বলতে হয়, অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তারও অনিবার্য অবসান সঙ্ঘটিত হয়। তার নৈতিক লক্ষ্য প্রশংসাযোগ্য হলেও তা কোনো উপযুক্ত ভিত্তি থেকে বঞ্চিত। ফলে মানবীয় চিন্তার কোনো শাশ্বত প্রকল্প দাঁড় করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ঠিক এই কারণেই দর্শনের কোনো গ্রন্থেই সেকিউলারিজম-এর উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না! একটি সুস্পষ্ট শিরোনাম দিয়ে এই বিষয়ে কোনো গ্রন্থেই আলোচনা করা হয়নি। কেননা তা মানব জীবনের জন্য কখনই কোনো আদর্শ বা Ideology হতে পারে না। সম্প্রতি ফেডারিক কমপ্লেসটন&#8217; দর্শনের ইতিহাস পর্যায়ে একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তাতে সকল প্রকারের দার্শনিক মতাদর্শের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু তাতে সেকিউলারিজম-এর কোনই উল্লেখ নেই। বার্ট্রান্ড রাসেল রচিত “পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস&#8221; গ্রন্থেও এই বিষয়টি অনুল্লেখিত রয়ে গেছে। &#8220;দর্শনের বিশ্বকোষ&#8221; এ-ও এই বিষয়ের নাম চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। আরও মজার কথা এই যে, বস্তুবাদের লীলাকেন্দ্র মস্কো &#8216;দর্শনের অভিধান&#8217; প্রকাশ করেছে কিন্তু তাতেও এই বিষয়টি খুঁজে পাওয়া যায়নি।</p>
<p><strong>অ-ধর্মীয় ব্যবস্থা বা Laicism</strong></p>
<p>ফ্রান্সে সেকিউলারিজম-এর পরিবর্তে Laicism পরিভাষাটি সাধারণ্যে প্রচলিত হয়েছে। এটা সেই সময়ের কথা, যখন তৃতীয় রিপাবলিকের অধীনে প্রকৃত মূল্যমানের জন্য গীর্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে এই পরিভাষাটি গীর্জা ও রাষ্ট্রের সমস্যাদির সমাধানের দিকে অধিকতর লক্ষ্য আরোপ করেছিল।</p>
<p>&#8216;লেইসিজম&#8217; এর আধ্যাত্মিক শিকড় হলো &#8216;রেনেসাঁ&#8217; মানবতাবাদ এবং সবচাইতে বেশি করে &#8216;আধুনিকতাবাদ&#8217; পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। এই যুগেই দুনিয়ার স্বাধীন ও প্রকৃতিগত মূল্যমান স্বীকৃত হতে শুরু করেছিল জীবনের সকল বিভাগে। রাষ্ট্র, সমাজ, আইন, অর্থব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও কাল্পনিক সার্বভৌমত্ব কিংবা গীর্জার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এ সময়ে ব্যক্তিকে নিজের ইচ্ছা মতো ধর্ম ও পেশা অবলম্বনের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ অধিকার কেবলমাত্র ব্যক্তি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। ধর্মীয় সংগঠনসমূহে এই চিন্তাধারায় প্রচার তখন পর্যন্ত খুব একটা ফলপ্রসূ প্রমাণিত হতে পারেনি। তবুও ধর্মীয় &#8216;কমিউনিটি&#8217; গুলোকে একান্তভাবে ব্যক্তিগত অধিকারের ভিত্তিতে এক স্বতন্ত্র সংগঠনের মর্যাদা দেয়া হয়েছিল এবং জনগণের প্রতিনিধি বা গণ-জীবনের ওপর প্রভাবশালী হওয়ার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। ধর্ম থেকে নিষ্কৃতি লাভের কার্যক্রমকে যখন শাসনতান্ত্রিক আইন বানানো হলো; তখন তার তাৎক্ষণিক পরিণতির রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হতে লাগল। ১৯০৪ মনে পোপের সঙ্গে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থাপনার যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়া হলো। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় রিপাবলিক-এর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তার সম্পূর্ণতা বিধান করা হলো। ১৮০১ সনের পোপের সঙ্গে কৃত চুক্তি নাকচ করে দেয়া হলো। সাধারণ অর্থভাণ্ডার থেকে গীর্জাকে আর্থিক সাহায্য দান বন্ধ করে দেয়া হলো। গীর্জার সমস্ত দালানকোঠা সরকার বাজেয়াপ্ত করলো ও সরকারী মালিকানাধীন বলে ঘোষণা করা হলো। তবে উপসনা শিক্ষা দানের জন্য নিয়োজিত সরকারী ও সনদধারী জনগোষ্ঠীকে এবং তাদের বাইরের সংগঠনসমূহকে এইসব দালানকোঠা বিনামূল্যে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এসব সরকারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও সরকার কর্তৃকই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিলো। তৃতীয় রিপাবলিকের শিক্ষা ব্যবস্থা এক ধরনের সরকারী ধর্ম ছিল। যাকে বলা হতো &#8216;রাষ্ট্রীয় নাস্তিকতা&#8217;।</p>
<p><em>১৭৯৩-১৭৯৫ এর বিপ্লবের &#8216;খোদা ও মানুষের প্রেম&#8217; (Theophilanthropism)-কে ধর্মের &#8216;উত্তম বিকল্প&#8217; মনে করে নেয়া হলো। ১৮৮২ সনে যখন সরকার চালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে ধর্মীয় পাঠ্য প্রত্যাহার করা হলো ঠিক তখনই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল।</em></p>
<p><strong>তখন ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে সরকারীভাবে বিরচিত নৈতিক শিক্ষা প্রচলিত করা হলো। প্রাথমিক পর্যায়ে আল্লাহ বিশ্বাসকে নৈতিক শিক্ষার প্রাথমিক উৎস রূপে অবশিষ্ট রাখা হয়েছিল বটে, কিন্তু ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত Ligue Delienseignement আল্লাহর সমস্ত বিধান থেকে নৈতিকতাকে সম্পূর্ণরূপে দূর করে রাখার দাবি জানালো। এভাবে রাষ্ট্রীয় গির্জাও ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের পতাকা উন্নত করে ধরলো। ক্রমশ এই মতাদর্শ সার্বজনীন খ্যাতি অর্জন করে বসল। স্বাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষে ধর্মীয় আইন-কানুন ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। এই কারণে আইন প্রণয়নকে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ঘুরিয়ে দেয়া হলো। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টান ধর্মীয় চিন্তা-পদ্ধতিকে বেআইনী ঘোষণা করা হলো</strong>। অন্যান্য গীর্জার জনগোষ্ঠীকে সরকারী সনদ লাভের জন্য সরকারের নিকট দরখাস্ত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। ১৯০১ সনের আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ধর্মীয় স্থান গ্রহণ ও তথায় নতুন ইমারত নির্মাণের জন্য সরকারের নিকট থেকে লাইসেন্স পাওয়াকে জরুরী করে দেয়া হলো। ১৯০৪ সনে নির্বিশেষে সমস্ত ধর্মীয় স্থানগুলোতে সকল প্রকারের ধর্মীয় প্রচারমূলক তৎপরতা নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো। এই বিশেষ সমস্যা ফ্রান্সের ন্যায় ইউরোপের অন্যান্য অংশেও প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ‘সেকিউলার&#8217; রাষ্ট্রের অধীন রাখা হবে, না গীর্জাও কর্তব্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হবে? রাষ্ট্র যখন ধর্মের বন্ধন থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য কঠোর নীতি অবলম্বন করল, তখন ক্যাথলিক পন্থীদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিরক্ষামূলক চেষ্টা-প্রচেষ্টা শুরু করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের Credo-কে শোনা ও দেখা ছাড়া তারা আর কিছুই করতে সক্ষম হলো না। রিপাবলিকান রাষ্ট্র এই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য। অনুমতিপ্রাপ্ত নয়, একথা তারা বুঝতে পেরেছিল। ফরাসী ক্যাথলিক পন্থীদের অধিকাংশই নিজেদের প্রাধান্য বহাল রাখার কাল্পনিক আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল। কেননা ক্যাথলিক গীর্জার বাহ্যিক অবস্থিতির এটাই ছিল একমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ক্যাথলিকদের এই পদক্ষেপ ছিল একান্তভাবে আত্মরক্ষামূলক। এর দরুন রাষ্ট্র অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির হয়ে গেল। ফরাসী ক্যাথলিকদের অধিকাংশ লোক দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সর্বাত্মক বিপর্যয়ের পর বিস্তৃত গহ্বর থেকে মুক্তিলাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। তারা তাদের ধর্মীয় প্রাধান্য পুনরায় অর্জন করার জন্য চেষ্টানুবর্তী হয়ে উঠলো। পোপের ঘোষণাবলী যদিও ছিল আত্মরক্ষামূলক, তবুও তারা নিজেদের আচরণে ভারসাম্য রক্ষার নীতি অবলম্বন করতে শুরু করেছিল। কার্ডিনাল লাভী-জীবী সমঝোতামূলক সতর্কর্তার বাণী উচ্চারণ করতে শুরু করে দিয়েছিল। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে পাইস দশম (PIUS-X) গীর্জার যুক্তিসম্মত ও বৈধ কর্মনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়ার তীব্র নিন্দা করতে শুরু করল স্বীয় বক্তৃতা ও ভাষণসমূহে। গীর্জা ও রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতাকেও সে প্রত্যাখ্যান করলো। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে পাইস একদশ (PIUS-XI) তার পুস্তিকায় Laicism কে গীর্জার নিজস্ব শব্দ সম্ভারের অন্তভূক্ত করে নিল। গীর্জার বৈরাগ্যবাদী সতর্কতা অবশিষ্ট থাকলো এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নবতর সম্পর্কের কারণে তা আরও পরিপক্কতা লাভ করলো। ওদিকে &#8216;রাষ্ট্র&#8217; গীর্জা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সংক্রান্ত আইনসমূহ খুবই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা সহকারে কার্যকর করছিল। গীর্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যকার ব্যবধান একটি চুক্তির সাহায্যে দূর করে দেয়া হলো। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে HOLYSEE ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সম্পর্ক পুনর্বহাল করা হলো। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রধান পাদ্রী সংক্রান্ত ফরাসী ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর গীর্জা চিন্তার আদান-প্রদানের দ্বার উম্মুক্ত রাখার নীতি গ্রহণ করলো। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে Laicism-এর তাৎপর্য প্রকাশ করা হলো এই ভাষায় রাষ্ট্র ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সেই আইনগত অধিকার ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা-যা রাষ্ট্র ও জনগণের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে ব্যবহার ও প্রয়োগ করবে, তার ভিত্তিতে বেসরকারী আইনের অধীন ধর্মীয় সংগঠনসমূহের অস্তিত্ব এবং নাগরিকদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিরাপত্তা দেয়া হবে। শিক্ষা ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহ পর্যায়ে CAMBRAI-এর আর্চ বিশপ ই. এম. গৌরী (E.M.GERRY)-র উদ্ধৃতি দেয়া হচ্ছে : &#8216;রাষ্ট্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ কোনো সাম্প্রদায়িকতার অধীন হবে না। সেগুলোর বিশেষ কোনো নামও রাখা হবে না। বরং সেগুলো হবে নিরপেক্ষ। না ধর্মের পক্ষে কোনো কথা বলবে, না তা ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করবে।&#8217;</p>
<p>আর্চ বিশপের মতে, এটা Laicism-এর বিপরীত দিকে পদক্ষেপ। কেননা এটা একটি দার্শনিক মতাদর্শ। এর ভিত্তি উপযোগবাদ, বস্তুবাদ ও দার্শনিক নাস্তিকতার ওপর রক্ষিত। এরই বলে রাষ্ট্র সমস্ত বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর তা কার্যকর করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও তার অন্তর্ভূক্ত। (১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখ) গীর্জার এই আচরণ ভ্যাটিক্যান-২ -এর সেসব ঘোষণা থেকে সমর্থন লাভ করলো, যাতে বৈষয়িক সত্যসমূহের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। তারই ফলে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের পছন্দসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে গেল। অন্যকথায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উভয় প্রান্তের বাইরে থেকে গীর্জা নিজের প্রাধান্যকে বাঁচিয়ে রাখার দাবি জানাচ্ছিল। অথচ একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিবেচনা করলেই দেখা যায়, গীর্জা বাস্তবভাবে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছিন্নতাকে পূর্ণমাত্রার সমর্থন করে নিয়েছিল। আর সরকারেরও একমাত্র কাম্য ছিল তা-ই।</p>
<p>সেকিউলারিজম-এর এ দীর্ঘ বিস্তারিত ইতিহাস অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে যে, তা একটি বিশেষ ইউরোপীয় পরিস্থিতির উৎপাদন। খ্রিষ্ট রাষ্ট্র যেমন সেকিউলার, খ্রিষ্ট ধর্মও অনুরূপভাবেই সেকিউলার। সেকিউলারিজম-এর সঙ্গে মুসলিম সমাজ তথা দ্বীন-ইসলামের বিন্দুমাত্রও সম্পর্ক নেই। তার সঙ্গে সামান্যতম সামঞ্জস্য-ও নেই। তাই ইসলামে সেকিউলারিজম সমর্থিত নয় যেমন নয় পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। কোনো মুসলমানের পক্ষেই সেকিউলারিজম-এর প্রতি বিশ্বাসী হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সেকিউলারিজম-এর প্রতি বিশ্বাসী হয়ে দ্বীন-ইসলামের প্রতি একবিন্দু ঈমানদার হওয়া বা থাকা</p>
<p>কিন্তু এই সেকিউলারিজম-ই আমাদের দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত ও কলুষিত করে ফেলেছে। সেকিউলার রাজনীতি মুসলমানদের সার্বিকভাবে ইসলামের বাইরে নিয়ে গেছে এবং পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথে তা-ই হয়ে দাঁড়িয়েছে সর্বাপেক্ষা বড় বাধা। আর অর্থনীতির ক্ষেত্রে মুসলমানদের বাধ্য করেছে সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি-শোষণ-প্রভৃতি সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী কার্যক্রমের ধারক ও বাহক হতে। মুসলিম জীবনকে সার্বিকভাবে বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত করে দেয়ার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান সমাজ থেকে আগত এই সেকিউলারিজম। সেকিউলারিজম ইসলামী জীবনধারার প্রধান প্রতিবন্ধক। যে কোনো দিকে সেকিউলারিজমকে গ্রহণ করা হলে ইসলামী জীবন সম্ভব নয়। তাই ইসলামী জীবনাদর্শ গ্রহণ ও পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠার জন্য সেকিউলারিজমকে জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি থেকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করা একান্তই অপরিহার্য।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/secularism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7203</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ক্রমবিকাশ তত্ত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/evolutionary-theory/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/evolutionary-theory/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 11 May 2022 12:06:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ক্রমবিকাশ তত্ত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7117</guid>

					<description><![CDATA[আধুনিক যুগে ক্রমবিকাশবাদ (Evolution Theory) একটি বৈজ্ঞানিক মহাসত্যরূপে বিদ্বজ্জনের সমাজে স্বীকৃত। Science of Life গ্রন্থ প্রণেতাগণ লিখেছেন : আঙ্গিক ক্রমবিকাশকে একটি মহাসত্যরূপে মেনে নিতে এখন কারোরই আপত্তি থাকতে পারে না। কেবল সে সব লোক ছাড়া, যারা মূর্খ বা বিদ্বেষী, কিংবা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আধুনিক যুগে ক্রমবিকাশবাদ (Evolution Theory) একটি বৈজ্ঞানিক মহাসত্যরূপে বিদ্বজ্জনের সমাজে স্বীকৃত। Science of Life গ্রন্থ প্রণেতাগণ লিখেছেন : আঙ্গিক ক্রমবিকাশকে একটি মহাসত্যরূপে মেনে নিতে এখন কারোরই আপত্তি থাকতে পারে না। কেবল সে সব লোক ছাড়া, যারা মূর্খ বা বিদ্বেষী, কিংবা কুসংস্কারে নিমজ্জিত। Modern Packet Library- New York Man and the Universe নামে বইয়ের একটি সিরিজ প্রকাশ করেছে। এই পর্যায়ের পঞ্চম গ্রন্থটিতে ডারউইনের Origin of Speices বই খানিকে ইতিহাস স্রষ্টা আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে: “মানুষ স্বীয় বংশ তালিকা জানবার জন্য দীর্ঘকাল ধরে যে চেষ্টা চালিয়ে আসছে, এপর্যায়ে কোনো মতবাদকে এতটা তীব্র ধর্মীয় বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি, যতটা হতে হয়েছে ডারউইনের লিখিত Natural Selection গ্রন্থটিকে এবং অপর কোনো মতবাদ এতটা বৈজ্ঞানিক সমর্থন (Scientific Affirmation) পায়নি, যতটা এই মতবাদটি পেয়েছে। ১</p>
<p>আমেরিকার প্রখ্যাত ক্রমবিকাশবাদী বিজ্ঞানী G.G. Simpson লিখেছেন :</p>
<p>“ডারউইন ছিলেন ইতিহাসের উচ্চতর লোকদের অন্যতম। তিনি মানবীয় জ্ঞানের বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এই উচ্চতর মর্যাদা তিনি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন এ কারণে যে, তিনি &#8216;ক্রমবিকাশ&#8217; মতবাদ (Theory of Evolution)-কে চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গভাবে একটি মহাসত্যরূপে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, একটা নিছক অনুমান বা বিকল্প প্রকল্পরূপে নয়, যা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বানুসন্ধানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ২</p>
<p>এ.ঈ. মেন্ডর লিখেছেন : “মানুষ ও অন্যান্য প্রাণসম্পন্ন জিনিসসমূহের বর্তমান আকার-আকৃতি পর্যন্ত পৌঁছতে ক্রমবিকাশ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়েছে এই মতটি এত অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, মতটিকে এখন প্রায় নিশ্চিত ও বাস্তব (Approximate Certainity) বলা যেতে পারে।”৩</p>
<p>লাল (RS. Lull) লিখেছেন : &#8220;ডারউইনের পর ক্রমবিকাশ মতবাদটি অধিকতর জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি চিন্তাশীল গবেষকদের নিকট এ ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই যে, এটাই একক যৌক্তিক পদ্ধতি, যার ভিত্তিতে সৃষ্টিকর্মের ব্যাখ্যা দেয়া এবং তা অনুধাবন করা সম্ভব। তিনি আরও লিখেছেন : “সমগ্র বিজ্ঞানী ও অন্যান্য অভিজ্ঞ অধিকাংশ লোকই ক্রমবিকাশতত্ত্বে সত্যতায় (Truthness) সম্পূর্ণ নিশ্চিত, তা প্রস্তর পর্যায়ের হোক কিংবা জীবজন্তু পর্যায়ের। অন্য কথায়, পৃথিবী যখন জীবনের বাসোপযোগী হলো তখন দীর্ঘকালীন কার্যক্রমের ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু জীবনের উন্মেষ হলো। অতঃপর দীর্ঘতম কালের ক্রমাগত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভিদ ও জীব-জন্তুর সেসব বিস্ময়কর প্রজাতিসমূহ অস্তিত্ব লাভ করল যা আজ আমরা প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পাচ্ছি।&#8221;৪</p>
<p>এই মতবাদটির জনপ্রিয়তা সম্পর্কে এটা দেখেও অনুমান করা চলে যে, লাল-এর সাতশ পৃষ্ঠার গ্রন্থে জীবনের সৃষ্টিমূলক ধারণা (Special Creation) পর্যায়ের আলোচনা শুধু একপৃষ্ঠা ও কয়েকটি ছত্রে সন্নিবেশিত হয়েছে। &#8216;ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা&#8217;- (১৯৫৮) গ্রন্থে সৃষ্টি সংক্রান্ত (Creationism) মতবাদের আলোচনার জন্য মাত্র এক চতুর্থাংশ পৃষ্ঠারও কম স্থান বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু তার বিপরীত &#8216;আঙ্গিক অভিব্যক্তি&#8217; (Organic Evolution) শীর্ষক যে রচনাটি সন্নিবেশিত হয়েছে, তা ক্ষুদ্র টাইপে পূর্ণ চৌদ্দটি পৃষ্ঠায় বিস্তৃত হয়ে আছে। এই প্রবন্ধটিতেও জীব-জন্তুর ক্রমবিকাশকে একটি চূড়ান্ত সত্য ঘটনা (Fact) হিসেবে সমর্থন করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ডারউনের পর এই মতবাদটি বিজ্ঞানী ও জনগণকর্তৃক সাধারণভাবে স্বীকৃত (General acceptance) হয়েছে। এখানে প্রশ্ন ওঠে, বিজ্ঞানীরা আংশিক ক্রমবিকাশ মতবাদটিকে সাধারণ সত্যরূপে নিরূপণ করলেন কিভাবে? তাঁরা কি অতীতের অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জীবজন্তু ও মানুষকে আংশিকভাবে ক্রম বিবর্তন লাভ করতে দেখতে পেয়েছেন, যদ্দ্বারা সমগ্র জীবজন্তু ও মানুষ এক সহজ সরল পর্যায়ের প্রাথমিক জীব থেকে আঙ্গিক বিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমবিকাশ লাভের পদ্ধতিতে অস্তিত্ব লাভ করেছে বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে?</p>
<p>এই প্রশ্নের জবাবে বিজ্ঞানবিদেরা বলেছেন, তাদের নিকট নাকি এরূপ দলীল রয়েছে এবং পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণের অকাট্য পদ্ধতিতে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, আঙ্গিক ক্রমবিকাশ লাভের এই মতটি সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সর্বতোভাবে সত্য।</p>
<p>বিজ্ঞানীদের এই জবাব বিশেষভাবে একটি ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল আর তা হচ্ছে, জীবজন্তু বা প্রাণীর অস্বাভাবিকভাবে দৈহিক ও আঙ্গিক সাদৃশ্য থাকা উচ্চতর ও নিম্নতর বহু প্রকারে (Kind) বিভক্ত। এগুলোর পারস্পরিক সাদৃশ্য করে যে, এগুলো সব একই বংশজাত, আর সেগুলোর উচ্চতর ও নিম্নতর প্রকারভেদ থেকে প্রমাণিত হয় যে, এগুলো ক্রমবিকাশ পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতিতে পরিণতি লাভ করেছে।</p>
<p>জীব ও প্রাণীকূলের মধ্যে সর্বপ্রথম যে সব প্রাণী আসে, তারা &#8216;এ্যামীরা&#8217; (Amoeba) নামে পরিচিত। এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্রকায়। এগুলোর গোটা দেহ এককোষ সম্পন্ন মাত্র। খাদ্যগ্রহণ, খাদ্য হজমকরণ, হজম হয়ে যাওয়া খাদ্যের দেহাংশে পরিণতি হওয়া এবং আবর্জনা নিষ্কাশন, শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ এবং প্রজনন ও বংশ সংরক্ষণের ধারাবাহিকতা প্রভৃতি জীবনের অপরিহার্য কার্যাবলী এই এককোষ সম্পন্ন দেহ দিয়েই সুসম্পন্ন করে থাকে। অতঃপর যা লক্ষ্য করা যায়, তা হইড্রা (Hydra) নামে খ্যাত। এর রয়েছে কয়েক সহস্র কোষ। পোকার (Worm)-ও থাকে কয়েক লক্ষ কোষ। আর একটি মানবদেহ</p>
<p>কয়েক হাজার কোটি কোষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। অপরাপর জীব-জন্তু অপেক্ষা মানবদেহের কোষের প্রকারও হয়ে থাকে অনেক বেশি। এ থেকে জানা গেল যে, বিভিন্ন জীব ও প্রাণী স্বীয় দৈহিকতা ও জটিলতায় পরস্পর থেকে যথেষ্ট মাত্রায় ভিন্ন।</p>
<p>যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতার দিক দিয়েও এগুলোর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। &#8216;এ্যামীবা&#8217; ও &#8216;হাইড্ৰা&#8217; প্লাবন, স্রোত ও শুষ্কতার দয়ার ওপর নির্ভরশীল। একটি পোকা মাটির খুব ক্ষুদ্র স্থানের সাথে সম্পর্কিত। মাছের পরিধি অধিক বিস্তীর্ণ। প্রতিকূল অবস্থায় স্বীয় অবস্থিতির পরিবর্তন তার সাধ্যায়ত্ব। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাছ পানিতেই থাকে। পানির অভ্যন্তর ছাড়া মাছের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। কুকুর পানিতে সাঁতার কাটে; আর স্থলভাগে দৌড়ায়। কিন্তু মানুষ জল ও স্থলভাগ ছাড়াও শূন্যলোকের উপরও কর্তৃত্ব করে।</p>
<p>পরিবেশের যে অবস্থা এই সবের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তাও বিস্ময়করভাবে বিভিন্ন। এ্যামীবা&#8217;র প্রভাবিত হওয়ার ঘটনাবলী এক মিটারের কয়েক হাজার ভাগের একভাগের মধ্যে সঙ্ঘটিত হয়, যখন আলো ও কম্পন তাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু এই আলো ও কম্পনের উৎস কোথায় এবং তার দূরত্ব কতটা, তা জানবার কোনো উপায় তার আয়ত্তে নেই। তা খুবই সাদাসিধাভাবে আলো ও কম্পনের প্রভাব গ্রহণ করে থাকে। হাইড্রা সাপের মতো এক প্রকারের সামুদ্রিক পোকা কয়েক শত মিটার দূরত্বের পরিবেশ থেকে প্রভাব গ্রহণ করে। পোকা আকারে কিছুটা বড় হয়। তা কোনো অতিরিক্ত অনুভূতিশীল অঙ্গ ব্যতিরেকেই আলো ও অন্ধকার অনুভব করতে পারে। কিন্তু তা কোনো জিনিসের সংগঠন, তার বর্ণ বা দূরত্ব দেখতে পারে না। সে জানতে পারে কেবল তখন, যখন পৃথিবীতে কম্পন শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তা শুনতে পায় না। কেননা বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো সাধ্য তার নাই। মানুষের ন্যায় পরিবেশকে আয়ত্তাধীন ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো চেষ্টা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা পরিবেশের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তা বাইরের সব কিছু থেকে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক হয়ে একটা বন্ধ জগতে জীবন যাপন করে। আমাদের অনুভূতি-যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও তা প্রায় দুর্বোধ্য।</p>
<p>মাছ প্রতিবিম্ব দেখতে পারে। কিন্তু পানির বাইরের কোনো জিনিস দেখা তার পক্ষে কঠিন। পানির মধ্যেই তার সবকিছু প্রায় সীমাবদ্ধ। কয়েক ফুটের একটি গর্তই তার জগত । কুকুর দেখে ও শুনে, আর ঘ্রাণের শক্তিও তীব্র। পৃথিবীর বুকে দৌড়ানোও তার পক্ষে সম্ভব। ইন্দ্রিয় নিচয় দ্বারা তার অনুভবকৃত পরিবেশ মানুষের পরিবেশের মতোই বিস্তীর্ণ। কিন্তু পরিবেশকে অনুধাবন করা মানুষের পক্ষে যতটা সম্ভব তার পক্ষে ততটা নয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, মেঘ, চন্দ্র, সূর্য বা তারকা-নক্ষত্রসমূহের মধ্যকার দূরত্ব অনুধাবন করা কুকুরের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়, যা মানুষের পক্ষে সহজ। অনুরূপভাবে কুকুরের মন ইন্দ্রিয়ানুভূত জিনিসসমূহের মধ্যে বুদ্ধিগত সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম নয়, যা মানুষ পারে। কুকুরও জানতে পারে; কিন্তু সে জানাটা অ-বুদ্ধি বিবেকসঞ্জাত।</p>
<p>সাপ তার ডিমসমূহ মাটির উপর ছেড়ে দেয়। তা থেকে আপনা আপনি বাচ্চা বের হয়ে আসে। পাখি ডিম পেড়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত &#8216;তা&#8217; দিতে থাকে। এই সময়ে পুরুষ পাখি তার অন্ন জোগায়। অনেক সময় পুরুষ পাখি ও স্ত্রী পাখি উভয়ই পর পর ডিমে তা দেয়। দুগ্ধ দানকারী জন্তুগুলোর অবস্থা এদের থেকে উন্নত ও অগ্রসর। স্ত্রী-পশু বাচ্চা প্রসব করে স্বীয় দেহের &#8216;রক্ত&#8217; সৃষ্ট দুগ্ধ পান করিয়ে করিয়ে বাচ্চাকে পালে ও বড় করে।</p>
<p>এভাবেই বিভিন্ন জীব ও জন্তুর মধ্যে স্তর ভেদ বিদ্যমান। স্তর ভেদের এই রূপ অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এগুলোর মধ্যে একটা বিকাশমান বিন্যাস পরম্পরা রয়েছে। নিম্নতার পর্যায়ের জীব জৈবিক ক্রমবিকাশের অতীত স্তরসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করে। আর উচ্চতর বা উন্নততর জীব জৈবিক ক্রমবিকাশের পরবর্তী স্তরসমূহ তুলে ধরে। বিজ্ঞানীদের মতে এ নিছক অনুমান বা কল্পনা নয়। এ হচ্ছে জীবনের সেই অকথিত কাহিনী, যা মাটির স্তরসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আর তা এই মতবাদটিকে পর্যবেক্ষণিক যুক্তি পর্যায়ে সর্বতোভাবে সঠিক ও নির্ভুল প্রমাণ করে।</p>
<p><strong>ভারতের শিমলা ও চণ্ডীগড়ের মাঝখানে সিওয়ালিক (Siwalik) নামে পরিচিত একটি পর্বতমালা অবস্থিত। এখানকার ভূপৃষ্ঠের উপর নানাস্থানে দাঁত, মাথার খুলি ও অস্থিখণ্ড প্রস্তর খন্ডের ন্যায় যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। কেবল এখানেই নয়, দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে এ রকম পাওয়া গেছে। আসলে এগুলো কোটি কোটি বছর পূর্বে দুনিয়ায় বসবাসকারী জন্তু-জানোয়ারের দেহ কাঠামোর ধ্বংসাবশিষ্ট মাত্র। তা মাটির তলায় পড়ে গেছে এবং দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের ফলে তা প্রস্তরে রূপান্তরিত হয়েছে। উদ্ভিদ ও জীব-জন্তুর এই প্রস্তরায়িত রূপকে ফসিল (Fossile) বলা হয়। ভূমিকম্প ইত্যাদির ফলে এগুলো মাটির তলদেশ থেকে উপরে উঠে এসেছে। অথবা মাটি খোদাই কাজের দরুনও এগুলো আবিষ্কৃত হয়ে থাকবে। বর্তমানে এই ফসিল বিপুল পরিমাণে পাওয়া গেছে এবং বড় বড় যাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। এই প্রস্তরায়িত দেহাবয়বের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো কোথাও পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় খণ্ড খণ্ড টুকরা টুকরা রূপে। অবশ্য বিশেষজ্ঞগণ এই খণ্ড টুকরাসমূহ একত্রিত সংযোজিত করে প্রাচীন জীব-জন্তুর আকৃতি বানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন</strong>।</p>
<p>এইসব প্রস্তর খণ্ড ভূ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে মিলিত ও পরস্পর সংযোজিত করার ফলে এক মহাসত্যের উদ্ঘাটন সম্ভবপর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে যে কোনো প্রস্তর খণ্ডকে দেখে তার বয়স এবং কতকাল ধরে তা পৃথিবী পৃষ্টে অবস্থান করছে তা অতি সহজেই বলে দেয়া যেতে পারে। প্রস্তরসমূহের স্তর দেখে পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরের বয়স জানতে পারা আজকের দিনে কঠিন কিছু নয়। এই বিজ্ঞানের আলোকে প্রস্তবায়িত খণ্ডসমূহকে দেখে জানা গেছে যে, সকল প্রকার জীব-জন্তুই প্রথম দিন থেকেই আর পৃথিবীতে অবস্থান করছে না। এগুলোর মধ্যে কালের একটি স্তর বিন্যাস রয়েছে। পৃথিবীর প্রাচীনতম স্তরগুলো হালকা ও প্রাথমিক পর্যায়ের জীবগুলোর সন্ধান দেয়। অতঃপর পাওয়া যায় পর্যায়ক্রমিক জটিল ও উন্নত মানের জীবের সন্ধান। আর সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থিত এই মানুষ। এই উদ্ভাবনের ভিত্তিতে বিবর্তন তত্ত্বের সমর্থনে অসংখ্য গ্রন্থাবলী রচিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, অতঃপর ক্রমবিকাশবাদ একটা পর্যবেক্ষিত পর্যায়ে প্রমাণিত তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>প্রখ্যাত প্রাণীবিদ জুলিয়াস হাক্সলি ও জে বি এম হাল্ডেস-এর যৌথভাবে লিখিত Animal Biology গ্রন্থে লিখেছেন: “প্রাণী প্রজাতিসমূহের সাধারণ ও উচ্চ বিন্যাস থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, উচ্চতর জীবসমূহ বিবর্তিত হয়ে পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে। এইগুলোকে আমরা যেন ঠিক অস্তিত্ব লাভ করতে দেখতে পাচ্ছি, যখন আমরা পিছনের দিকে ফিরে ফসিলের সাহায্যে ইতিহাস অধ্যয়ন করি। এটা অনুমান বা ধারণা পর্যায়ের হলেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে আছে। পৃথিবীর যে প্রাথমিক ইতিহাস প্রস্তর খণ্ড ও প্রস্তরায়িত কাঠামোসমূহে অঙ্কিত হয়ে আছে, তা এখন পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় লিপিবদ্ধ হয়নি। তা সত্ত্বেও এ এক প্রমাণিত সত্য যে, জীবন সাধারণ ও নিম্ন পর্যায়ের প্রাণীকূলের রূপে উন্মেষ লাভ করেছিল।”৫</p>
<p>এই ঘটনার সঙ্গে জৈব-জীবনের অপরাপর ঘটনাবলী মিলিয়ে নিলে অনুমান পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। আর তা হচ্ছে, জীবগুলো পারস্পরিক বহু বৈষম্য ও পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অসাধারণভাবে পরস্পর সাদৃশ্য সম্পন্ন। মানবীয় কাঠামোর এক একটি &#8216;অস্থির&#8217; সঙ্গে ঘোড়া, বানর বা চামচিকার ‘অস্থি’র তুলনা করা চলে। জীব-জন্তুসমূহের দৈহিক গঠন এবং এগুলোর হাড়, রগ ও স্নায়ুগুলো সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হলে স্পষ্টভবে জানা যাবে যে, সব জীবই পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। আর এগুলো গোড়ায় ছিল একটি জীব। সহস্র কোটি বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ার পরিণতিতে এগুলো বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে।</p>
<p>বিভিন্ন প্রাণীর ভ্রূণ প্রাথমিক পর্যায়ে পরস্পর সদৃশ। আমাদের প্রত্যেকটি ব্যক্তিসত্তাই এককোষ নিয়ে জীবনের সূচনা করেছে। অন্যান্য দুগ্ধপায়ী জীবকূলের প্রাথমিক কোষের তুলনায় শুধু পরিমাণ ও গঠন প্রকৃতির কতিপয় সূক্ষ্ম দিকে (Fine details) বিভিন্ন হয়ে থাকে। এই কোষ একটি থেকে দুটি ও দুটি থেকে চারটিতে পরিণত হয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করে। জন্মের পূর্বে মানব শিশু মাছ, ব্যাঙ, সাপ ও প্রাথমিক পর্যায়ে দুগ্ধদায়ী প্রাণীকূল এবং বন মানুষ সদৃশ আকৃতি অবলম্বন করে।</p>
<p>এক পর্যায়ে তার পাখা গজায় এবং পরবর্তী এক পর্যায়ে তার লেজ বের হয়। জন্মের তিন মাস পূর্বে তার সমগ্র দেহ কালো মসৃণ পশমে আচ্ছাদিত হয়ে যায়। ক্রম বৃদ্ধির পর্যায়ে বানর ও মানবশিশু পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ থাকে। কেবল মাত্র শেষ পর্যায়ে এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য করা সম্ভবপর হয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও মানব শিশু ঠিক তেমনি লালন-পালন পায়, জীব বিজ্ঞানীদের মতে ঠিক যেভাবে মানব বংশের ক্রমবিকাশ সম্ভব হয়েছিল। তা যখনই স্বীয় হাত-পা ব্যবহার করার যোগ্য হয়ে যায়, তখনই হাটুর উপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে শুরু করে। অর্থাৎ ঠিক চতুষ্পদ জন্তুর মতোই শুরু হয় তাঁর জৈবজীবন। কেবল মাত্র একটি ক্ষেত্রেই নয়, অসংখ্য প্রকারের সাদৃশ্য রয়েছে জীবগুলোর পরস্পরের মধ্যে। এর ভিত্তিতে জীব-বিজ্ঞানীরা এই মতবাদ রচনা করেছে যে, প্রত্যেকটি প্রাণীই তার জীবনের সামান্য সময়ের মধ্যে সেই সমস্ত পরিবর্তনগুলোরই পুনরাবৃত্তি করে, যা এর পূর্বে তার পূর্ববংশের লক্ষ কোটি বছরের পরিসরে সঙ্ঘটিত হয়েছে। মানুষ ও জীবের ভ্রূণ ও তার ক্রমবৃদ্ধির ক্ষেত্রের সাদৃশ্যের উল্লেখ করার পর বিজ্ঞানী লাল লিখেছেন : “গর্ভের অন্ধ প্রকোষ্ঠ উপরোক্তভাবে যে বিস্ময়কর পরিবর্তনসমূহ সঙ্ঘটিত হয়, তা খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সেই সমস্ত পরিবর্তনেরই পুনরাবৃত্তি, যা পৃথিবীর উপরিভাগে দীর্ঘকাল ধরে ইতিপূর্বে সঙ্ঘটিত হয়েছে।&#8221;৬</p>
<p>অন্যান্য জীব-জন্তু অপেক্ষা মানুষ ও বনমানুষের মধ্যকার সাদৃশ্য অধিকতর ঘনিষ্ঠ। এই কারণে মনে করা হয়েছে যে, মানুষ সম্ভবত বন মানুষেরই পরবর্তী ক্রমবিকাশপ্রাপ্ত বংশ। এই দুই শ্রেণির জীবের আকৃতির মধ্যে বর্তমান সাদৃশ্যসমূহ স্যার আর্থার কিইথের (Keith) গণনানুযায়ী এটি ধরা পড়েছে, যা অপরাপর লেজুড় সম্পন্ন বানরের মধ্যে পাওয়া যায় না। ডারউইন তার গ্রন্থে মানুষের বংশধারার প্রথম অধ্যায়ে মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তুর মধ্যে বহু সংখ্যক সাদৃশ্যের উল্লেখ করে শেষে লিখেছেন : “আমাদের বিদ্বেষ ও অহংকারই আমাদের পিতৃ-পুরুষদের মুখে একথা বলিয়েছে যে, তারা দেবতার সন্তান। আর এই অনুভূতিই মানুষকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয়নি যে, (তারা স্বতন্ত্র কোনো সৃষ্টি নয়, আসলে তারা অন্যান্য জীব-জন্তুর ক্রমবিকাশ প্রাপ্ত বংশধর মাত্র)। কিন্তু সে সময় অবশ্যই আসবে, যখন বিশ্বকরভাবে তারা জানবে। প্রকৃতি-বিজ্ঞানীরা এটা ভালভাবেই জানতেন যে, মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী জীব-জন্তুর দেহ কাঠামোতে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে, তাদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে সৃষ্টি করা হয়নি।&#8221;৭</p>
<p>মিষ্ট পানিতে সতেরো প্রকারের শামুক পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে পর্যায় বিন্যাস পরম্পরা নির্ধারণ করে প্রাণীবিদরা দাবি করেছেন যে, এগুলো আসলে একই শামুকের আগের পরের অভিব্যক্তি পর্যায় সমূহ মাত্র। এখানে তিনটি শামুকের ছবি দেয়া হয়েছে। অভিব্যক্তিবাদী বিজ্ঞানীদের দাবি অনুযায়ী তাদের মতবাদের দুটি ভিত্তি এগুলোর মধ্যে প্রকটভাবে বিদ্যমান তার একটি হচ্ছে এগুলোর পারস্পরিক সাদৃশ্য আর দ্বিতীয়, এগুলোর মধ্যকার ক্রমিক নিয়মের অভিব্যক্তি।</p>
<p>এছাড়াও বহু সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো বিজ্ঞানীদের এই মতবাদ রচনায় বাধ্য করেছে পথ দেখিয়েছে। যেমন-উচ্চতর জীব জন্তুর দেহে অনেক অপ্রয়োজনীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, অথচ, এগুলোই নিম্নস্তরের প্রাণীকূলের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। মানব দেহে প্রায় দুশো তন্ত্র ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যা বর্তমান অবস্থায় আমাদের কোনো কাজে আসে না। অথচ নিম্নস্তরের প্রাণীকূলের জন্য সেগুলো অনেক জরুরী কাজ সুসম্পন্ন করে। কান দোলানো ও লোম খাড়া করার তন্ত্রগুলো এ পর্যায়ে গণ্য। এগুলো মানব দেহে রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এগুলোর তেমন কোনো কাজ নেই। Vermiform appendix ঘাষাশী জন্তুগুলোর জন্য অত্যন্ত জরুরী অঙ্গ; মানুষের জন্য তা অপ্রয়োজনীয়ই শুধু নয়, অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত মারাত্মক হয়েও দেখা দেয়। এজন্য অনেকে আগভাগেই তার অপারেশন করিয়ে নেয়। জীব বিজ্ঞানীদের মতে, এই কাঁটাকার অন্ত্র সেই সময়কার স্মারক, যখন মানুষের পূর্ববংশ ঘাষ খেত। কেননা এই অন্ত্র ঘাষ চিবানোর জন্য খুবই জরুরী। এমনকি মানুষের ঝরে যাওয়া লেজের চিহ্ন স্বরূপ মেদণ্ডের নিম্নাগ্রে কয়েকটি অস্থি বর্তমান রয়েছে, যা বুঝাতে চায় যে, মানুষ এক সময় লেজযুক্ত জীব ছিল। মানুষ এককালে যেসব পর্যায়ে ছিল, সেসব পর্যায়ের মধ্য দিয়েই বর্তমানে অন্যান্য জীব-জন্তু অগ্রসর হচ্ছে এবং এগুলোই তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাস্তব প্রমাণ সহকারে। মানবদেহের এসব অপ্রয়োজনীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উল্লেখ করে লাল তার গ্রন্থের ৩৯ তম অধ্যায় লিখেছেন : “আসলে এক ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবেই এগুলোর প্রত্যেকটিকে মানুষের দেহে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এগুলো তার দীর্ঘ অতীতকে প্রকট ও প্রকাশ করে। এদের এ ছাড়া অন্য কোনো তাৎপর্য থাকতে পারে বলে মনে করা যায় না।&#8221;৮</p>
<blockquote><p>ডারউইন লিখেছেন : “সমগ্র উচ্চতর গুণপনা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ এখন পর্যন্ত নিজের দেহের মধ্যে সেকালের অমোচনীয় চিহ্নসমূহ বহন করে চলছে; যখন সে নিম্নমানের জীবের আকৃতিতে ছিল।&#8221;৯</p></blockquote>
<p><strong>এই মতবাদটি সম্পর্কে একটা প্রশ্ন ওঠে। তাহলো ক্রমবিবর্তনের এই কার্যটি কিভাবে সাধিত হয়েছে? এর কার্যকলাপ ও অনুপ্রেরক কি ছিল? এই প্রশ্নের জবাবে অনেকগুলো মতবাদ উপস্থাপন করা হয়েছে। লাল তাঁর লিখিত Organic Evolution গ্রন্থে ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন। যার সারনির্যাস হলো, প্রত্যেকটি প্রজাতির কতিপয় ব্যক্তিসত্তার মধ্যে কিছু পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়ে যায়। যেমন-কিছু সংখ্যক অন্যান্যদের অপেক্ষা অনেক বড় হয়ে যায়। কতকগুলো অধিকতর তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী হয়। এগুলোর এ পার্থক্যধর্মী বিশেষত্ব প্রজনন ও বংশানুক্রমিকতার মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। আর পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় এবং নৈসর্গিক ঘটনা-দুর্ঘটনাসমূহে পার্থক্যকারী বিশেষত্ব সম্পন্ন এই স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তাগুলোই রক্ষা পায় এবং বেঁচে যায়। এই কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলতে থাকে এবং প্রত্যেক পরবর্তী বংশে পূর্ববর্তী বংশের পার্থক্যধর্মী বিশেষত্বসমূহ বারবার সংরক্ষিত হতে থাকে এবং এভাবেই সম্মুখের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘকাল পরে সে বিশেষত্বগুলো এত বিপুল পরিমাণে সঞ্চিত হয়ে যায় যে, পূর্ববর্তী প্রজাতির ব্যক্তিসত্তা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর প্রজাতীয় রূপ পরিগ্রহ করে নেয়।</strong></p>
<p>এই পার্থক্যধর্মী বিশেষত্বসমূহ কেমন করে উন্মোচিত হয়। এ পর্যায়ে প্রথমে এই ধারণা উপস্থাপিত করা হয়েছিল যে, অঙ্গ-প্রতঙ্গের ব্যবহার ও অপব্যবহার কিংবা বাহ্যিক পারিপার্শ্বিকতাই এগুলোর স্রষ্টা। পরে অপর একটি মতবাদ দাঁড় করানো হয়েছে, তা হচ্ছে, এই পার্থক্যটা ক্রমাগতভাবে কোনো প্রজাতির কতিপয় ব্যক্তিসত্তা লাভ করে বসে। কিন্তু আধুনিকতম মতবাদ এই দুটিকে একত্রিত করে দিয়েছে। সিম্পসন তাঁর Meaning of Evolution গ্রন্থে লিখেছেন : “বিবর্তন সংক্রান্ত মতবাদ পর্যায়ে দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার পর কথাবার্তা এখানে এসে ঠেকেছে যে, ক্রমবিকাশমূলক পরিবর্তনসমূহ জন্মগতভাবে স্বতঃই প্রকাশমান হয়ে পড়ে। অথবা পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে কোনো বংশের কতিপয় ব্যক্তিসত্তা তা লাভ করে বসে। অর্থাৎ জীবনের অভিব্যক্তিমূলক ইতিহাসে যে সব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী কার্যকারণ সক্রিয় হয়ে রয়েছে তা অভ্যন্তরীণ ছিল, অথবা ছিল বাহ্যিক। এক্ষণে একথা অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এই বিরোধের আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থহীন। এ দুটি দৃষ্টিকোণের কোনো একটিতেও প্রকৃত সত্য নিহিত নেই। বরং তা তৃতীয় দৃষ্টিকোণে নিহিত রয়েছে। আর তা হচ্ছে, অভিব্যক্তির কার্যক্রমে উভয় ধরণের প্রভাব কার্যকর রয়েছে।&#8221;১০</p>
<h2>পর্যালোচনা</h2>
<p>উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে অত্যন্ত সহজ সরল ও সাধাসিধা ভঙ্গিতে বিবর্তন বা অভিব্যক্তিবাদ পর্যায়ে বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছি। বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা বা সমালোচনা এখানে সম্ভব নয় বলে মাত্র কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করছি।</p>
<p><strong>১</strong>. বিভিন্ন প্রাণীর উচ্চ নিম্নস্তরের বিন্যাস সর্বপ্রথম আলোচ্য, এই ধরনের বিন্যাস ও পরম্পরা দাঁড় করানো সামষ্টিক অর্থে ঠিক কিনা, সে প্রশ্ন না তুলে আমরা এই প্রশ্ন তুলতে চাই যে, নিছক এই বিন্যাস বা পরম্পরা এ কথা কি করে প্রমাণিত করতে পারে যে, <strong>প্রত্যেকটি পরবর্তী প্রজাতি পূর্ববর্তী প্রজাতি থেকে নির্গত হয়েছে</strong>? এই মতবাদকে বাদ দিয়ে যদি দাবি করা হয় যে, প্রত্যেকটি প্রজাতি কালগত বিন্যাস বা পরম্পরা অনুযায়ী আলাদা আলাদাভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে, তাহলে পূর্বোক্ত প্রকল্পটির অগ্রাধিকার পাওয়ার এবং একটির তুলনায় সেটিকেই সত্য ও সঠিক মেনে নেয়ার কি কারণ থাকতে পারে? এই শেষোক্ত প্রকল্পটিকে ভুলই বা বলা হবে কোন যুক্তিতে? এহেন অবস্থার একটা ব্যাখ্যা এরূপও তো দেয়া যেতে পারে যে, নিম্নতর ও উচ্চতর সৃষ্টির মধ্যকার পার্থক্যটা আসলে প্রজাতীয় পার্থক্য, কলগত বিন্যাস ও পরম্পরাই এগুলোর সৃষ্টিগত পরম্পরা প্রকাশ করেছে।</p>
<p>জীবনের সূচনাকালীন প্রাণী যদি সর্বপ্রথম অস্তিত্ব লাভ করতে পারে, তাহলে জীবনের অন্যান্য প্রকার ও প্রজাতিসমূহ প্রথমবারেই অস্তিত্ব লাভ করতে পারেনি কেন? সেরূপ অস্তিত্ব লাভ করা যে অসম্ভব বা অবৈজ্ঞানিক, তা মনে করা হবে কোন যুক্তির বলে?</p>
<p><strong><em>মাটির স্তর সংক্রান্ত তত্ত্ব ও তথ্যাদি থেকে জানা যায়, ভূপৃষ্ঠে সর্বপ্রথম নিম্ন শ্রেণির জীবের অস্তিত্ব ছিল। উচ্চশ্রেণি জীবের আগমন ঘটেছে তৎপরবর্তীকালে। কিন্তু এ থেকে একথা কি করে প্রমাণিত হয় যে, শেষের দিকে আগত প্রাণী প্রথমে আগত প্রাণীকূল থেকে বংশানুক্রমিক ভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে?</em></strong> এ থেকে পর্যায়ক্রমিক আগমন বা অস্তিত্ব লাভের কথা তো প্রমাণিত হয়, কিন্তু তা অভিব্যক্তিমূলক জন্মলাভের প্রমাণ হয় কিভাবে? সামুদ্রিক ভ্রমণের ইতিহাস বলে, প্রথম দিকে হালবৈঠাধারী নৌকা চালানো হয়েছে, পরে পালতোলা নৌকা ব্যবহৃত হয়েছে। এরপরে পাম্প শক্তির বলে বড় বড় জাহাজ চালিয়েছে। এক্ষণে কি করে বলা যেতে পারে যে, এসব নৌকা জাহাজের প্রতি পরবর্তী বাহনটি পূর্ববর্তী বাহনটির গর্ভজাত? তা কিছুতেই বলা যায় না। বরং সত্যি কথা হচ্ছে, প্রত্যেকটি বাহনই স্বতন্ত্রভাবে নির্মিত ও ব্যবহৃত হয়েছে, পার্থক্য হচ্ছে আগে ও পরের মাত্র।</p>
<p>জীবাশ্ম (Fossile) অধ্যয়ন থেকে জানা গেছে, প্রাচীনতম কালে ভূপৃষ্ঠে এমন এমন অসংখ্য প্রজাতি বসবাস করত, যার অস্তিত্ব বর্তমানে কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে সব সম্পর্কে এক্ষণে মনে করা হয় যে, তা বর্তমানের জীব-প্রাণীসমূহের অভিব্যক্তি পূর্ব আকৃতি ছিল। একটি যাদুঘরে হরিণ প্রজাতির জন্তুর তিনটি প্রস্তরায়িত মাথার খুলি পড়ে ছিল। তিনটি খুলিই সুবিন্যস্তভাবে একটির পর অন্যটি একই কাতারে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। এই খুলিগুলো বাহ্যত একই ধরনের ছিল। অবশ্য এই তিনটি খুলির মধ্যে</p>
<p>একটা বিশেষ পার্থক্য ছিল। প্রথম খুলিটির শিং ও পার্শ কপালের মধ্যকার দূরত্ব দুই ইঞ্চি পরিমাণ ছিল, দ্বিতীয়টিতে এই দূরত্ব দেড় ইঞ্চি পরিমাণ এবং তৃতীয়টিতে ছিল এক ইঞ্চি পরিমাণে। প্রাণী বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এটাই অভিব্যক্তির অকাট্য প্রমাণ, একটি বংশজাত কিভাবে অভিব্যক্তির ধারা অবলম্বন করে সম্মুখে অগ্রসর হয়েছে, তা এ থেকেই জানা যায় বলে তাদের দাবি। কয়েক টুকরা অস্থি বিভিন্ন স্থান থেকে কুড়িয়ে এনে একত্রিত করে মনে মনে সেগুলোর পরস্পরিক বিন্যাস ও পরম্পরা সাজানো সহজ হলেও বাস্তবতার সাথে তার দূরতম সম্পর্কও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন ও স্বতন্ত্র প্রজাতি নয়, তার কি কোনো প্রমাণ আছে? এগুলোকে ক্রমবিবর্তনমুখী একটি প্রজাতির আগের পরের ব্যক্তি সত্তা ধরে নেয়ার পক্ষে কোন অকাট্য যুক্তিটি পেশ করা যেতে পারে? আসলে এই অস্থিগুলোকে মিলিয়ে একটা মানসিক ‘প্রকল্প&#8217;-কে মনে করানোর চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। অথচ এর অপর একটি ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে তদ্দ্বারা প্রকৃত সত্য অনুধাবন অধিকতর সহজসাধ্য।</p>
<p><strong>২.</strong> জীব ও প্রাণীসমূহের দৈহিক যোগ্যতা ক্ষমতা পর্যায়ের পারস্পরিক সাদৃশ্যকে অভিব্যক্তিবাদের প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হয়েছে। আমেরিকার যাদুঘরে প্রাকৃতিক ইতিহাস পর্যায়ের যেসব জিনিস সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে তন্মধ্যে মানুষ ও ঘোড়ার দুটি কংকালও রয়েছে। একটা বিশেষ ভঙ্গিতে পরস্পর মিলিয়ে ও সাজিয়ে দুটিকে রাখা হয়েছে। দেখা যায়, ঘোড়াটি তার সম্মুখ ভাগের পা দুটিকে ঊর্ধ্বে তুলে পিছন দিকের দুটি পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর মানুষটির হাত দুখানি যথারীতি ঝুলিয়ে দেয়ার পরিবর্তে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে। এরূপ কংকাল বাহ্যত পরস্পর সৌসাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়। এতদ্বারা মানুষকে অন্যান্য স্তন্যপায়ী জন্তুর বংশধর বুঝানোই এর আসল উদ্দেশ্য। মানুষ দাঁড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে সোজা খাড়া হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। উভয়ই একই বংশজাত না হলে এতটা সৌসাদৃশ্যপূর্ণ হলো কি করে, তা বোঝানোই এর মূলে নিহিত একমাত্র ইচ্ছা।</p>
<p>কিন্তু মানুষ ও জন্তুর মধ্যে নিছক দৈহিক ও আকৃতিক সৌসাদৃশ্য উভয়ের অভিন্ন বংশজাত হওয়ার কথা প্রমাণ করতে পারে না। কেননা মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক বিশেষত্বে অন্যান্য সমস্ত প্রকারের জীব-জন্তুর ওপর এতটা প্রাধান্য ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যে, এদুটিকে কোনো প্রকারে ও কোনো উপায়েই পরস্পরের বংশধর প্রমাণ করা সম্ভবপর নয়। প্লাস্টিক নির্মিত একটা মানবদেহ বাহ্যিক আকৃতির দিক দিয়ে প্রকৃত মানব দেহের সঙ্গে শতকরা একশ ভাগ সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও প্রথমটিকে একটা প্রকৃত মানব দেহ প্রমাণ করার কি কোনো উপায় থাকতে পারে? উপরন্তু মানুষ ও জীব-জন্তুর দেহ পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ হলে; কিংবা বিশেষত্বের দিক দিয়ে উভয়ের মধ্যে কোনরূপ নৈকট্য পাওয়া গেলেও মানুষ অন্যান্য জীব-জন্তুর ঔরসজাত সন্তান, তা প্রমাণিত হয়েছে বলে কি করে দাবি করা যেতে পারে? লক্ষ লক্ষ কাঁচা ইট স্তুপীকৃত করে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়। ইটগুলো দেখতে প্রায় একই রকম মনে হয়। তাই বলে এই ইটগুলোর প্রত্যেকটি অপরগুলোর গর্ভজাত-তা মনে করা যেতে পারে কি? এগুলোর মধ্যে বংশানুক্রমিকতা ও প্রজনন প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে বলে আজ পর্যন্ত কি কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে? সৌসাদৃশ্যের এরূপ অর্থ গ্রহণ বিজ্ঞানের কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্যের ওপর ভিত্তিশীল বলে দাবি করা যেতে পারে?</p>
<p>এরূপ অবস্থায় একটা ব্যাখ্যা এতদপেক্ষাও সুন্দর ও অধিকতর যুক্তিসঙ্গতভাবে দেয়া যেতে পারে। তা হচ্ছে, জীব-জন্তুর স্রষ্টা ভালো করেই জানতেন যে, মানুষ ও জীব-জন্তুকে একই প্রকারের পরিবেশগত অবস্থার মধ্যে জীবন-যাপন করতে হবে, এই কারণে তিনি অতি স্বাভাবিকভাবেই এসবের দেহ কাঠামোর মধ্যে বহুদিকের এককতা, অভিন্নতা, সৌসাদৃশ্য রেখে দিয়েছেন। জীবনের যদি বিভিন্ন ধরনের পার্থক্যপূর্ণ পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে জীবন-যাপন করতে হতো, তা হলে নিশ্চিয়ই এই সৌসাদৃশ্য রক্ষা করা হতো না, প্রত্যেকটির কাঠামোগত বিশেষত্ব সম্পূর্ণরূপে বিভিন্ন হতো। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে, তাদের সবাইকে একই ধরনের ভৌগোলিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে বংশানুক্রমে যুগের পর যুগ ধরে। এটাই তাদের নিয়তি, প্রাকৃতিক বিধান। এই কারণেই তাদের সকলের দেহ কাঠামোকে অভিন্ন মৌলিকতার অধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ভ্রূণের সৌসাদৃশ্য আছে বলে তার ভিত্তিতে এসবের একই বংশজাত হওয়ার কথা প্রমাণ করতে যাওয়া কোনক্রমেই যুক্তিসঙ্গত বলে মেনে নেয়া যায় না। তা থেকে বড় জোর শুধু এতটুকুই প্রমাণিত হতে পারে যে, বিভিন্ন প্রজাতি ক্রমবৃদ্ধি লাভের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে পারস্পরিক অভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। (অথবা বলা যায়, ভ্রূণের এই অভিন্নতা চোখে দেখা গেলেও তা প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়)। পরে ক্রমবৃদ্ধি লাভের শেষ পর্যায়ে তাদের মধ্যকার পার্থক্য ভিন্নতা স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তাতে তারা সব একই বংশজাত এমন কথা তো কিছুতেই প্রমাণিত হতে পারে না। আসলে এই যুক্তি দেখিয়ে একটা প্রকৃত ব্যাপারকে ভিত্তি করে একটা সম্পূর্ণ ভুল ও অসত্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।</p>
<p><strong>৩.</strong> বিবর্তন বা অভিব্যক্তি কার্যকারণ অনুপ্রেরক পর্যায়ে যা কিছু বলা হয়েছে, তা এর চেয়েও অধিকতর হাস্যকর। এ দর্শনের প্রাণ হচ্ছে বিবর্তন ও পরিবর্তনের পার্থক্যধর্মী বিশেষত্বসমূহ। এ পর্যায়ে লাল লিখেছেন, কতিপয় ব্যক্তিসত্তার মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হওয়াই বিবর্তন অভিব্যক্তির প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ তার বক্তব্য এই : <strong>‘পরিবর্তন (Variation) স্বতঃই বিবর্তন কার্যক্রমের কারণ হতে পারে।&#8217;</strong> ১১</p>
<p>&#8216;Animal Biolgy&#8217; গ্রন্থের লেখক হল্ডেন ও হাক্সালির ভাষায় &#8216;প্রাকৃতিক নির্বাচন&#8217; আসলে ‘পরিবর্তনসমূহের নির্বাচন (Selection of Mutations) এর নাম১২ তারা আরও লিখেছেন, যন্ত্র নির্মাণের ইতিহাসে আমরা যেমন একটি বিকাশ মাত্র ও ক্রমউৎকর্ষমূলক কার্যক্রম লক্ষ্য করছি, মানুষ ও জীব-জন্তুর ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে বিবর্তন সঙ্ঘটিত হয়েছে। অতঃপর লিখেছেন: “জীব-জন্তু ও যন্ত্রের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। যন্ত্রের নীল নকশা সরাসরি মানুষ নিজে তৈরি করে। অথচ জৈবিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে নকশা প্রস্তুতকারীর (Designer) স্থান নিয়েছে পরিবর্তন (Variation) যা প্রাণীলের মধ্যে সামগ্রিকভাবে কার্যকর। এই পরিবর্তনই প্রাথমিক পার্থক্য সৃষ্টি করে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের চালুনি তার ওপরই কাজ করে।&#8221;১৩ এখানে একটা সত্য তত্ত্বকে ভিত্তি করে একটা ভুল যুক্তি অবতারণ করা হয়েছে। একই দম্পতির চারটি সন্তান সর্বদিক দিয়ে এক ও অভিন্ন হয়না, একথা সত্য। এদের মধ্যে কিছু না কিছু বৈসাদৃশ্য অবশ্যই থেকে যায়। এই কথাটি যতখানি সত্য, তার চাইতে অনেক বেশি ভুল হচ্ছে এই কথা যে, ছাগলের দেহকাঠামো বৃদ্ধি পেতে পেতে জিরাফের কাঠামো হয়ে যেতে পারে। উপরের প্রত্যেকটি কথা স্বীয় পরিমন্ডলে সত্য। কিন্তু তার পরিধির বাইরে সেই সত্যই সুস্পষ্ট মিথ্যা ও অসত্যে পরিণত হয়।</p>
<p>এছাড়া যে সব পরিবর্তন উপার্জিত হয় বলে ধরে নেয়া হয়েছে তারও কোনো তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়না। মনস্তাত্ত্বিক অধ্যয়ন বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ব্যক্তিসত্তার মধ্যে জন্মগতভাবে পূর্ব থেকেই যেসব বিশেষত্ব বর্তমান নেই তা কেউই পরবর্তীকালে নিজের মধ্যে অর্জন করতে পারেনা। তাহলে প্রাচীন জীবসত্তাসূহ একটি প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হওয়ার অভিনব ও বিস্ময়কর বিশেষত্বসমূহ নিজেদের মধ্যে কি করে সৃষ্টি করে নিতে সক্ষম হতে পারলো? প্রকৃতির অধ্যয়ন যে সম্ভাব্যতাকে আজ প্রমাণ করতে পারেনা, অতীতে সেই সম্ভাব্যতা বাস্তবায়িত হয়েছিল বলে আজ কোন দলিলের ভিত্তিতে দাবি করা যেতে পারে?</p>
<p>প্রখ্যাত দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ব্যবহার অব্যবহারের বংশানুক্রমিক স্থানান্তরে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলতেন, &#8216;আমার হাত এতোটা খাটো এই কারণে যে, আমার পিতা-মাতা তাদের হাত দ্বারা কোনরূপ শ্রমের কাজ করতেন না।&#8217; বস্তুত পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা অভিব্যক্তিকে বাস্তব সত্য প্রমাণ করার জন্য কত যে হাস্যকর কথাবর্তা বলতে পারেন, তা উপরোক্ত উক্তি থেকে নিঃসন্দেহে বোঝা যায়। স্পেন্সারের খাটো হাত যদি তাঁর পিতা মাতা থেকে সত্যই উত্তরাধিকার সূত্রে হয়ে থাকে, তাহলে এই উত্তরাধিকার তার নিজের বংশধরদের মধ্যেও সংক্রমিত ও স্থানান্তরিত হওয়া অবধারিত ছিল। শুধু তা-ই নয়, প্রত্যেকটি বংশেই এই ঘটনা সঙ্ঘটিত হওয়া উচিৎ ছিল। এমনকি, যাদের কোনো অঙ্গ কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে, তাদের বংশ অনুরূপ অঙ্গহীন মানুষের নতুন একটা প্রজাতি গড়ে ওঠা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু তা যখন হয়নি, তখন এই প্রকল্পও ভিত্তিহীন হয়ে গেছে।**</p>
<p>বিবর্তনবাদীদের বক্তব্য হচ্ছে, একটি প্রজাতির অস্তিত্ব লাভের জন্য একটা &#8216;কারণ&#8217; থাকা অবশ্যক। বিবর্তনবাদ এমনিই একটি &#8216;কারণ&#8217; চিহ্নিত করছে, কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে প্রজাতি সৃষ্টির মতবাদ কোনো অনুভবযোগ্য ও জ্ঞানগত কারণ নির্ধারণ করছে না।</p>
<p>এর জবাবে বলতে চাই, এটাই যদি বিবর্তনবাদের বিশেষত্ব হয়ে থাকে, তাহলে কথাটি ঠিক এই পর্যায়ের মনে হবে, যেমন- কেউ জীব সত্তার ব্যাখ্যায় বলে দিলো, সমস্ত জিনিসই স্বীয় মাতৃগর্ভে জন্ম গ্রহণ করেছে। আর এই কথা বলে যেমন-মনে অহংকার বোধ করবে যে, সেতো জীবত্বের ব্যাখ্যা দিয়েই ফেলেছে। আসলে এই ব্যাখ্যাটি যেমন—একটা মধ্যবর্তী কথা, পূর্বোক্তটিও তেমনি মধ্যবর্তী অবস্থার বিশ্লেষণ মাত্র। কিন্তু মধ্যবর্তী ব্যাখ্যা কখনোই কোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত জবাব হতে পারেনা। বিবর্তনবাদীরা তাদের এই কথাকে আসল প্রশ্নের জবাব বলে অভিহিত করতে পারেন, যদি প্রথম জীবের অস্তিত্ব লাভের কারণসমূহ তাদের করায়ত্ত হয়ে থাকে। জিরাফ অন্যান্য ক্ষুরধারী চতুষ্পদ জন্তু থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করেছে। আর ক্ষুরধারী চতুষ্পদ জন্তুগুলি হামাগুড়ি দিয়ে চলা জীবগুলো থেকে বের হয়ে এসেছে। এভাবে প্রতিটি প্রাণীর পশ্চাতে অপর একটি প্রাণী রয়েছে, তা-ই এর স্রষ্টা। বিবর্তনবাদীদের এই তত্ত্ব বিশ্লেষণে প্রশ্ন জাগে, এই ধারাবাহিকতার পিছনের দিক এসে যে প্রাণীটি পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে তার স্রষ্টা কে?</p>
<p>Pasteur একথা পূর্ণমাত্রায় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, যে কোনো প্রাণী-ই- এমনকি অনুবীক্ষণী পোকাও শুধুমাত্র জীবনের সাহায্যেই জন্ম লাভ করতে পারে। তাহলে যে প্রাথমিক রূপ থেকে জীবনের সূচনা হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে তাঁকে অস্তিত্বদান করলো কে? বিবর্তনবাদের দাবি অনুযায়ী জীবনের সমস্ত অতীত স্তর বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে বিরাজমান রয়েছে। তাহলে জড় যে জীবনটার সহসা আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিল, এক্ষণে সেটি আমরা দেখতে পাচ্ছিনা কেন?</p>
<p>বিজ্ঞানের নিকট এই প্রশ্নের কোনো জবাব নাই। সিম্পসন যেমন- বলেছেন, সর্বশেষ ও চূড়ান্ত মহাসত্য সম্পর্কে কিছু জানতে পারা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তত্ত্বানুসন্ধানের আওতার বাইরে অবস্থিত। বরং সম্ভবত মানুষের কল্পনা শক্তিও সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। ১৪</p>
<blockquote><p>তিনি লিখেছেন : “জীবন কী করে সৃষ্টি হলো? এই প্রশ্নের সততানিষ্ঠ জবাব হচ্ছে, এই প্রশ্নের জবাব আমাদের জানা নেই। অবশ্য তার কিছু লক্ষণ প্রতীকের কথা আমরা বলতে পারি।&#8221; ১৫</p></blockquote>
<p><strong>‘লক্ষণ আর প্রতীক&#8217; বলে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন? সম্ভবত তা এই যে, পানির মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিশেষ কার্যক্রম চলার ফলে এই ঘটনাটি স্বতঃই সঙ্ঘটিত হয়েছে। সিম্পসন লিখেছেন: &#8216;জীবনের একেবারে সেই প্রাথমিক রূপ যে কি ছিল বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত তা জানতে পারেনি। বর্তমান অবস্থায় তা কখনও জানা যাবে, তারও কোনো আশা নেই। তবে আমাদের অধ্যয়ন এই সম্ভাব্যতার সাক্ষ্য দেয়-বরং এই শক্ত অনুমান পর্যন্ত পৌঁছে দেয় যে, জীবন অবৃদ্ধি প্রবণ উপাদান থেকে স্বতঃই (Spontaneously) অস্তিত্ব লাভ করেছিল। আর কোনরূপ অতি প্রাকৃতিক শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিছক বস্তুগত কার্যক্রমের সাহায্যে এই ঘটনা সঙ্ঘটিত হয়েছিল। এই অজানা সূচনা থেকে রূপান্তরিত হয়ে অন্যান্য সমস্ত জীব প্রজাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে।&#8221;</strong> ১৬</p>
<p>(**বিবর্তনবাদ জীবন ও তার বাহ্য প্রকাশসমূহের যে ব্যখ্যা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপিত করেছে, তাতে সুস্পষ্টরূপে দুটি শূণ্যতা বিরাজ করে। একটি এই যে, এই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ আদিম নয়, বরং মধ্যবর্তী ব্যাখ্যা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, স্বরূপের বিচারের এই ব্যাখ্যা ধর্মীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে ভিন্নতর কিছু নয়।)</p>
<p>বস্তুবাদী বিজ্ঞানীদের এরূপ কথা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। ধর্ম যদি বলে যে, জীবন কোনরূপ পূর্ববর্তী অস্তিত্ব ছাড়াই একটা বিশেষ সময়ে প্রথমবারের মতো অস্তিত্বলাভ করেছিল, তাহলে বিজ্ঞানীরা তা শুনে নাক সিটকাতে শুরু করেন। কিন্তু বিজ্ঞানী বলে পরিচিত ও খ্যাতিপ্রাপ্ত লোকদের উত্তরূপ কথা সহজেই বোধগম্য হয়ে যায় এবং তারা &#8216;মহাবিজ্ঞানী&#8217; বলে অভিনন্দিত হন। বস্তুত সিম্পসনের উপরোক্ত স্বীকারোক্তি এবং ধর্মের বক্তব্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। আসল কথা হচ্ছে ব্যাপারটিকে মাঝখান থেকে না দেখে সামগ্রিকভাবে বিচার বিবেচনা করা হলে স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে জানা যাবে যে, ধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ই ‘বিশেষ সৃষ্টিকর্ম’ (Special creation) স্বীকার করে। তবে পার্থক্য শুধু এটুকুই হয় যে, বিজ্ঞান শুধু প্রথম প্রাণী সম্পর্কে এই কথা স্বীকার করে, আর ধর্ম এই আকীদা বিশ্বাস করে জীব-জন্তুর সময় প্রজাতি সম্পর্কে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিজ্ঞান জীবের প্রথম উন্মেষ বা প্রকাশের বিশ্লেষণ যে ভিত্তিটিকে মেনে নিচ্ছে, জীবনের বাড়তি প্রকাশের বিশ্লেষণেও সেই ভিত্তিটিকে মেনে নিচ্ছে না কেন? এ পর্যায়ে সময়ের প্রশ্নটি সম্পূর্ণ অবান্তর ব্যাপার। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি প্রজাতি স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের সৃষ্টি কর্মে কতটা সময় লেগেছে, তা এক আপেক্ষিক প্রশ্ন। মূল বিষয়ের ওপর তার কোনই প্রভাব নেই বা তার সাথে এর কোনো সম্পর্কও নেই।</p>
<p>প্রজাতিসমূহের অস্তিত্বের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাও স্বীয় স্বরূপে ধর্মে দেয়া ব্যাখ্যা থেকে ভিন্নতর কিছু নয়। বিবেচনা করা যেতে পারে, ‘প্রজাতি&#8217; কাকে বলে? ভূপৃষ্ঠে প্রায় পাঁচ লক্ষ প্রকারের জীব পাওয়া যায়। এই সংখ্যার প্রত্যেকটি প্রাণী অন্যান্য প্রাণী থেকে কি সম্পূর্ণ ভাবে ভিন্নতর?&#8230;&#8230; না নিশ্চয়ই নয়। এগুলো অসংখ্য দিক দিয়ে পারস্পরিক সৌসাদৃশ্য সম্পন্ন। মাত্র কতিপয় দিকের পার্থক্যই তাদের আলাদা প্রজাতি বানিয়ে দিয়েছে। এই প্রজাতীর পার্থক্য কি করে হলো? আমরা বলব, প্রত্যেকটি প্রজাতি স্বীয় বর্তমান পার্থক্যপূর্ণ বিশেষত্বসহ প্রথম দিনই সৃষ্টি করা হয়েছে। বিজ্ঞানের দাবি হচ্ছে, শুরুতে একই প্রকারের জীবন ছিল, তার বংশধরদের মধ্যে কোনো কোনো কার্যকারণ হেতু পূর্ব পুরুষদের থেকে সামান্য সামান্য পার্থক্য&#8217; হতে থাকে। এই পার্থক্যই সুদীর্ঘকালের পরিক্রমায় কোনো কোনো ব্যক্তিসত্তায় প্রকট মাত্রায় একীভূত হয়ে গেল। আর তখনই তা স্বতন্ত্র একটা প্রজাতিরূপ পেয়ে গেল।</p>
<p>এ দুটি ব্যাখ্যার মাঝে পরিমাণগত পার্থক্য অবশ্য আছে, কিন্তু স্বরূপতার দিক দিয়েও কি কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়? কোনো বংশের কতিপয় ব্যক্তিসত্তায় স্বীয় অপরাপর স্বজাতীয়দের তুলনায় যে পরিবর্তনটার কথা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে কারণে তা সে বংশের অপরাপর ব্যক্তিসত্তা&#8217; থেকে স্বতন্ত্র বিশিষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, সে স্থলে যদি প্রজাতি শব্দটি বসিয়ে দেয়া যায়, তাহলে সহজেই জানা যাবে যে, প্রকৃত ব্যপারের দিক দিয়ে ধর্ম ও বিজ্ঞানের বক্তব্য কোনো পার্থক্য নেই। ধর্ম &#8216;প্রজাতি সৃষ্ট&#8217; বলে যে জিনিসটিকে বোঝাচ্ছে &#8211; ভিন্নতর শব্দের আবরণে।</p>
<p>নিষ্প্রাণ জগতে জীবনের প্রথম সৃষ্টি সাধনের কার্যকারণ যদি পৃথিবী ও আকাশ মণ্ডলে কার্যকর থাকে, তা হলে সেই কার্যকারণ অন্যান্য প্রকারের জীবন সৃষ্টিকর্মে অক্ষম প্রমাণিত হবে কেন? অনুরূপভাবে এ বিশ্বলোককে যখন সৃষ্টি করা হয়েছিল, নির্মাণ সামগ্রীসমূহ কোথেকে সংগৃহীত হয়েছিল, প্রস্তরখণ্ডসমূহ একটির ওপর অপরটি এমন সুন্দরভাবে রক্ষিত হলো কিভাবে, ঠিক প্রয়োজন ও পরিমাণ অনুযায়ী কিভাবে তৈরি হয়ে গেল? তাহলে এ রকম আরও অসংখ্য ইমারত নির্মিত হতে থাকল না কেন এ যাবৎ পর্যন্ত? &#8230;&#8230;. ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি যদি এইসব এবং এ ধরনের অন্যান্য প্রশ্নাবলীর সান্ত্বনাদায়ক জবাব দিতে সক্ষম হন তাহলে তাজমহলের নির্মিত হওয়ার দাবি মেনে নেয়া হবে। কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাব দেয়া যদি তার পক্ষে সম্ভব না হয় &#8211; সম্ভব যে নয় তো সুস্পষ্ট &#8211; তাহলে উক্ত কথাটি একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উক্তি হয়েই থাকবে, তার যথার্থতা কেউ মেনে নেবে না। উল্লেখিত প্রশ্নগুলো নিছক ব্যাখ্যামূলক নয়, এ হচ্ছে প্রদত্ত ব্যাখ্যার জবাবে দলীল প্রমাণের দাবি।</p>
<p>বিবর্তনবাদ সংক্রান্ত বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যার জবাবেও বহু সংখ্যক প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। প্রশ্ন ওঠে, তা কি করে ঘটলো, কল্পিত পরিবর্তনসমূহের মূলে কার্যকরণ ও অনুপ্রেরক কি ছিল? অতীতে ঘটেছে বলে যে বিবর্তনমূলক কার্যক্রমকে মেনে নেয়া হচ্ছে, তাকে আজও এক্ষণে আমরা দেখতে পাচ্ছিনা কেন? এ প্রশ্নগুলোর কোনো যথার্থ জবাব দেয়া বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীদের পক্ষে সম্ভবপর নয়, জবাব দিতে তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কথার সত্যতায় একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই। এ পর্যায়ে যতগুলো ব্যাখ্যা ও কারণ উপস্থাপিত করা হয়েছে সে সম্পর্কে স্বয়ং বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে প্রচন্ড সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কোনো একটি ব্যাখ্যায়ও সম্পূর্ণ একমত হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। তার অর্থ হচ্ছে, বিবর্তনবাদী মতবাদ যুক্তির কষ্টিপাথরে সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বস্তুবাদী বিজ্ঞানীদের নিকট এই মতবাদটি এতই প্রিয় যে, তাদের কামনা হচ্ছে, কোনো যুক্তি বা প্রমাণ ছাড়াই তাকে সত্য বলে মেনে নেয়া হোক। এই উদ্দেশ্যে একটি চাকচিক্যপূর্ণ ও প্রতারণামূলক ধারণাও রচনা করা হয়েছে। এই পর্যায়ে এ. ঈ. মেন্ডারের বক্তব্য তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন : &#8216;আঙ্গিক বিবর্তন&#8217; বাদের দুটি দিক। একটি হচ্ছে-সমগ্র জীবন্ত সত্তা বিবর্তিত হয়ে বর্তমান আকার-আকৃতি ধারণ করেছে। বিবর্তনের দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, বিবর্তন কি করে সঙ্ঘটিত হলো, তার কার্যকারণ ও অবস্থা কি ছিল? জীবন্ত সত্তাসমূহের মধ্যে বিবর্তন কার্যক্রম চলেছে, এটা কোনো নতুন প্রকল্প নয়। দুই হাজার বছর পূর্বে কোনো কোনো গ্রীক চিন্তাবিদ এই মতবাদ পেশ করেছিলেন। অতীতের দুই তিনটি বংশধরের জীবন কালে নবতর ঘটনা ও বাস্তবতা বিপুল পরিমাণ ধরা পড়েছে। সেই অনুযায়ী পরীক্ষণ কার্যক্রম চালানও হয়েছে। এক্ষণে এই মতবাদটি সর্বতোভাবে সত্যায়িত ও যথার্থ মতবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সমর্থনে লক্ষ লক্ষ ঘটনার (Facts) সমাবেশ হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের হাজার হাজার বিশেষজ্ঞের অভিমত-ও এর পক্ষে পাওয়া গেছে। এহেন ‘আঙ্গিক বিবর্তন&#8217; মতবাদটির বক্তব্য হচ্ছে, সমস্ত জীবন্ত প্রজাতি উদ্ভিদ ও জীবজন্তু-উভয়ই আজকের দৃশ্যমান আকার-আকৃতিতে চিরকাল বর্তমান ছিল না। বরং দীর্ঘ পরিক্রমায় ওরা অসংখ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে সাদাসিধা ও নিম্নমানের প্রাণী থেকে ধীরে ধীরে অস্তিত্ব লাভ করে এসেছে। বিবর্তনের অপর অংশ ডারউইনবাদ বা &#8216;নিউ ডারউইনিজম&#8217; প্রভৃতি নামে পরিচিত। বিবর্তন সংক্রান্ত এই দ্বিতীয় ধরনের মতবাদসমূহ জীবজন্তুর ক্ষেত্রে বিবর্তন কার্যক্রম চলেছে একথা বলার জন্য আসেনি, বরং এগুলো এই মতবাদের ব্যাখ্যা করে মাত্র যে, পরিবর্তনসমূহ এভাবে সাধিত হয়েছে। এই দ্বিতীয় দিকটির কোনো কিছুই চূড়ান্ত ও অকাট্য বলে দাবি করার কোনো জিনিস আমাদের হাতে নেই। আসলে এ ধরনের সব মতবাদ পরীক্ষাধীন রয়েছে, তাতে অনেক পরিবর্তনও সাধিত হয়েছে। সর্বশেষ চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ মতবাদ পর্যন্ত পৌঁছবার জন্য চেষ্টা অব্যাহতভাবে চলছে।১৭</p>
<p>এখানে &#8216;বিবর্তন&#8217; ও &#8216;বিবর্তনের কারণ প্রদর্শন&#8217; এই দুটি শব্দে যে বিভক্তি করা হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর। তার পরিবর্তে &#8216;বিবর্তন’ ও ‘বিবর্তনের প্রমাণ’ এরূপ বলা হলে বিভক্তিটা উত্তমভাবে করা যায়। এক ব্যক্তি যখন বলে, জীবনের সমস্ত বহিঃপ্রকাশ (Phenomenon) বিবর্তনের ফসল, তখন সাথে সাথেই প্রশ্ন ওঠে, এই বিবর্তনটা কী এবং তা কীভাবে প্রাণীকূলের ওপর কল্পিত কার্যক্রম পরিচালিত করে? এসব প্রশ্নের সান্ত্বনাদায়ক জবাব দিয়ে দিলে কথাটি মেনে নেয়া হবে। কিন্তু এসব প্রশ্নের যথার্থ জবাব দিতে না পারলে কার্যত আপনি এটাই প্রদর্শন করেন যে, আপনার দাবির স্বপক্ষে পেশ করার মতো কোনো দলীলই আপনার নিকট নেই।</p>
<p>বস্তুত বিবর্তনের কার্যকারণ সুপরিজ্ঞাত ও সুনির্দিষ্ট না হলে স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, বিবর্তনবাদ এখন পর্যন্ত প্রমাণের মুখাপেক্ষী। মনে হয়, বিবর্তনের এমন কোনো রূপ এখন পর্যন্ত ধরা পড়েনি যা প্রকৃতপক্ষে এসব ঘটনা সঙ্ঘটিত করাতে সক্ষম, যা এই মতবাদটিতে দাবি করা হয়েছে। এরূপ অবস্থায় বিবর্তনবাদকে একটা প্রমাণিত সত্য বলে দাবি করা এবং বিবর্তনের কার্যকারণসমূহ এখন পর্যন্ত বিবেচনাধীন বলা মূলত একটা প্রমাণহীন দাবি মেনে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেউ যদি বলে, এই যে লক্ষ লক্ষ রেল ইঞ্জিন দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে, আসলে এগুলো বড় বড় লৌহপিন্ড অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে তা স্বতঃই সক্রিয় ও গতিশীল হয়ে তীব্রগতিতে দৌড়াতে শুরু করে দিল। পূর্বোদ্ধৃত কথাটি ঠিক এই শেষোক্ত কথাটির মতোই। এই বিস্ময়কর ব্যাপারটি কী করে ঘটল, লোকটিকে এই প্রশ্ন করা হলে সে বলে, &#8216;আমি এই &#8216;কী করে&#8217;র ব্যাখ্যা দিতে পারব না। তবে এ রকমটা যে হয়েছে, তা আমি নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করি।&#8221; এইরূপ কথা বিজ্ঞানীদের নিকট কি মর্যাদা পেতে পারে?**</p>
<blockquote><p>সত্যকথা এই যে, এরূপ অবস্থায় বিবর্তনবাদকে জীবনের প্রকাশমানতার একটা দিক &#8216;মনে করে নেয়া&#8217; বিশ্লেষণই বলা যেতে পারে, &#8216;চূড়ান্তভাবে&#8217; প্রমাণিত ও স্বীকৃত সত্য রূপে মেনে নেয়া কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, বিজ্ঞানীরা উপরোক্ত ধরনের বিভক্তি সৃষ্টি করে যেন একথাই বলেছেন যে, &#8216;বিবর্তন মতবাদের পক্ষে আমাদের নিকট অকাট্য কোনো প্রমাণ না থাকলেও আমরা বিশ্বাস করি যে, সমস্ত জীবজন্তু বিবর্তনেরই উৎপাদন।&#8217; জীবন সংক্রান্ত বিষয়াদিতে এ-ই যদি হয় বিজ্ঞানের ভূমিকা, তাহলে শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক সত্যে &#8211; ধর্ম ও বিজ্ঞানের পার্থক্যটা কী থাকলো? বিজ্ঞানও তো সৃষ্টিলোকের ব্যাখ্যাদানের জন্য একটা &#8216;বিশ্বাস&#8217; কেই দাঁড় করিয়েছে, যার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ উপস্থাপনই তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অথচ এরূপ অভিযোগ আজ পর্যন্ত কেবল ধর্মের বিরুদ্ধেই তোলা হতো যে, &#8220;ধর্ম কেবল বিশ্বাস করতে বলে, বিশ্বাসের স্বপক্ষে কোন অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপিত করে না।&#8221; এ<strong>ই অবস্থা বলতে বাধ্য হচ্ছি সমগ্র সৃষ্টি লোকের স্রষ্টার অস্তিত্ব ও একত্বকে মানুষ এই কারণেই হয়ত কোনরূপ প্রমাণ ছাড়াই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে, কেননা, &#8216;বিশ্বাস&#8217; সাধারণত এভাবেই দানা বেঁধে ওঠে। যদিও ইসলাম উপস্থাপিত বিশ্বাসসমূহ সম্পর্কে সেকথা আদৌ প্রযোজ্য নয়।</strong></p></blockquote>
<p>(**এই ধরনের কথাদ্বারা কোন ‘বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণ করতে চাইলে তা যে কতটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায় তা বলে শেষ করা যায় না। ঠিক এই হাস্যকর অবস্থার মধ্যেই পড়ে আছে বিবর্তনবাদ যা চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সত্য বলে একালের একশ্রেণীর বিদগ্ধ লোকেরা স্বীকার করে গিয়েছেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক স্যার আর্থার কিইথ এ সম্পর্কে বলেছেন: Evolution is unproved and unprovable. We belive it because the only altemative is special creation and that unthinkable. অর্থাৎ বিবর্তন ধারায় গোটা সৃষ্টিলোক স্বতঃই গড়ে উঠেছে, একথা প্রমাণিত নয়, প্রমাণিত হতেও পারে না, এর পক্ষে কোন প্রমাণ দেয়াই যেতে পারে না। তা সত্ত্বেও আমরা তা মেনে নিয়েছি এজন্য যে, তা যদি মেনে না নেই তা হলে কেউ বিশেষ ক্ষমতায় সৃষ্টি করেছে বলে মানতে হয়। কিন্তু আল্লাহকে তো এর মানতে প্রস্তুতই নয়, সেই কারণেই না এই চরম অসত্য কথাটিকে পরম বৈজ্ঞানিক সত্য বলে মেনে নিতে হচ্ছে নিরূপায়ের উপায় হিসেবে।&#8230;.. চমৎকার বিজ্ঞান বটে।)</p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<ol>
<li>Philosophers of Science, p-244</li>
<li>Meaning of Evolution-G.G. Simpson (H.Xi 951) P-127</li>
<li>Organic Evolution-R.S. Lull, p-15</li>
<li>Ibid, p-83</li>
<li>Modern Scientific Thought, p-293</li>
<li>Organic Evolution-R.S. Lull, p-666</li>
<li>Descent of Man-Charles Darwin (London-1946) p-26</li>
<li>Organic Evolution-R.S. Lull, P-663</li>
<li>Decent of Man-Charles Darwin, P-244</li>
<li>Meaning of Evolution-G.G. Simpson, p-87</li>
<li>Organic Evolution-R.S. Lull, P-85</li>
<li>Modern Scientific Thought, P-26</li>
<li>Ibid, P-130</li>
<li>Meaning of Evolution-G.G. Simpson, p.134-35</li>
<li>Ibid, P-13</li>
<li>Ibid, P-176</li>
<li>Clear Thinking-A. E. Mendor, P.112-13</li>
</ol>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/evolutionary-theory/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7117</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মার্কসীয় দর্শন </title>
		<link>https://rowyakbd.com/marx-and-marxist-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/marx-and-marxist-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 28 Apr 2022 11:48:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[কার্ল মার্কস]]></category>
		<category><![CDATA[মার্কসীয় দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7091</guid>

					<description><![CDATA[কার্লমার্কস ঊনবিংশ শতকের (১৮১৮-১৮৮৩) একজন মস্তবড় দার্শনিক চিন্তানায়ক। বর্তমান দুনিয়ার চিন্তাদর্শন, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রদর্শনের ওপর তাঁর চিন্তাধারার প্রভাব অত্যন্ত বেশি। কিছুটা সচেতনভাবে আর কিছুটা অচেতনভাবে আজকের মানুষ তার চিন্তাদর্শন দ্বারা প্রভাবান্বিত। মার্কস মানব জীবনের প্রায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">কার্লমার্কস ঊনবিংশ শতকের (১৮১৮-১৮৮৩) একজন মস্তবড় দার্শনিক চিন্তানায়ক। বর্তমান দুনিয়ার চিন্তাদর্শন, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রদর্শনের ওপর তাঁর চিন্তাধারার প্রভাব অত্যন্ত বেশি। কিছুটা সচেতনভাবে আর কিছুটা অচেতনভাবে আজকের মানুষ তার চিন্তাদর্শন দ্বারা প্রভাবান্বিত। মার্কস মানব জীবনের প্রায় সর্ব দিক সম্পর্কে দার্শনিক তত্ত্বমূলক ও বাস্তুব কর্ম সম্পর্কিত চিন্তাধারা পেশ করেছেন। তার এই চিন্তাধারার সমষ্টিরই নাম হলো মার্কসবাদ এবং তার দর্শনকেই বলা হয় মার্কসীয় দর্শন। কার্লমার্কস তার সমস্ত দার্শনিক মতবাদ গড়ে তুলেছেন- তার পূর্ববর্তী দার্শনিক চিন্তাবিদদের চিন্তাধারা ও মতবাদকে ভিত্তি করে। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবান্বিত হয়েছেন উপাদান গ্রহণ করেছেন G WE Hegel এর চিন্তা ও মতবাদ থেকে। এক কথায় বলা চলে, হেগেলের কাছ থেকে মূল প্রেরণা নিয়েই মার্কস তার নিজের দর্শন গড়ে তুলেছেন। মার্কসের ওপর অপর কোনো দার্শনিকের কোনো প্রভাব পড়েনি, একথা বলা হচ্ছে না। তার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে হেগেলীয় দর্শনের এটাই বক্তব্য, অতএব মার্কসীয় দর্শনের আগে হেগেলীয় দর্শনের আলোচনা আবশ্যক। </span></p>
<h2></h2>
<h4><strong>ডায়ালেকটিক বাদ</strong></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">হেগেলের দর্শনকে এক কথায় বলা যায় Philosophy of Opposites বিপরীত জিনিসমূহের দর্শন&#8217;। মানবীয় চিন্তা-গবেষণার শুরু থেকেই একথা সর্ববাদী সমর্থিত যে, প্রতিটি জিনিসই তার বিপরীত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক অস্তিত্বের জন্য অস্তিত্বহীনতা, স্থিতির জন্য ধ্বংস অবধারিত দুঃখ কষ্টই যদি না হলো তবে আনন্দ ও সন্তোষের ফুল কখনো প্রস্ফুটিত হতে পারে না। ক্লান্তি না আসলে বিশ্রাম কিসের? যেখানের ফুল ফুটেছে, তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে কাটা। এই সবই স্বাভাবিক ব্যাপার, সকলেরই জানা কথা এবং সকলেই এর সত্যতা অনুভব করতে পারে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এর ভিত্তিতে স্বতন্ত্র ও সম্পূর্ণ এক চিন্তা পদ্ধতি গড়ে তোলা, সে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। দার্শনিক হেগেল এ সত্যকেই এক ব্যাপক ও পরিপূর্ণ দর্শন হিসেবে পেশ করেছেন। এর ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছেন এক নবতর দার্শনিক মত। ফলে ধারণা ও চিন্তা কল্পনার ক্ষেত্রে এক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের কর্মজীবনের চিন্তাধারার ক্ষেত্রে এর এক সিদ্ধান্তমূলক প্রভাব পড়েছে। হেগেল বলেছেন, </span><b><i>“প্রতিটি জিনিস তার বিপরীত জিনিসের দ্বারা কেবল কায়েমই নয়, দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত যা কিছু উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, ইতিহাসের ক্ষেত্রে মানবতা যতটুকু অগ্রসর হতে পেয়েছে, তার সব কিছুরই মূল কারণ হচ্ছে পরস্পর বিপরীত জিনিসগুলোর দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ।”</i></b><span style="font-weight: 400;"> প্রত্যেকটি ধারণা বা বিশ্বাস যখন একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত এগিয়ে যায়, তখনি তার মাঝ থেকে তার বিপরীত ধারণার সৃষ্টি হয় এবং দুটোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলে এক নবতর ধারণা বা বিশ্বাস অস্তিত্ব লাভ করে। অন্য কথায় বলা যায়, মানুষ যখন কোনো ধারণা সম্পর্কে পূর্ণ চিন্তা ও গবেষণা করে এবং &#8216;লজিকের’ দিক দিয়ে তাকে পূর্ণ পরিণত করে নেয়, তখনি এমন এক অবস্থা সম্মুখে আসে, যখন সে অনুভব করে যে, যে ধারণা থেকে সে যাত্রা শুরু করেছিল তা এখন আর বর্তমান নেই। সেখানে এমন এক নতুন ধারণা এসে স্থান দখল করেছে, যা পূর্বের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। হেগেল এর দৃষ্টান্ত নিয়েছেন এই ভাবে যে, গরীবদের সাহায্য করা, দান-খয়রাত করা সকল সামর্থ্যবান ব্যক্তিরই কর্তব্য। একথাটি সাধারণ নৈতিক শিক্ষা হিসেবে সব ধর্মেই স্বীকৃত। এখন যদি এ কথানুযায়ী সকলেই দান-খয়রাত উদার হস্তে করতে থাকে, তাহলে সেখানে গরীব থাকবে না। এতে করে গরীবকে সাহায্য দেয়া কর্তব্য- এ ধারণাটি নিজেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে বাতিল হয়ে যাবে।কেননা যখন গরীবই কেউ থাকবে না, তখন আর তাদের সাহায্য করার কোনো কাজই থাকতে পারে না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মায়ের স্নেহ সন্তানের জন্য অপরিহার্য। তা নাহলে সন্তানের ব্যক্তিত্ব ও জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু মা যদি সন্তানকে স্নেহ করতে গিয়ে তার যে কোনো আবদার মেনে নেয়, তাহলে সন্তানের চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে। ফলে মায়ের স্নেহ এক সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ভয়ের উদ্রেক হতে থাকে। অর্থাৎ নিজেই চরম পর্যায়ে পৌঁছে তার বিপরীত ভয় সৃষ্টি করবে। হেগেলের মতে এর কারণ হচ্ছে এই যে, প্রতিটি ধারণাই সীমাবদ্ধ অসম্পূর্ণ। এ কারণেই তা থেকে তার বিপরীত জিনিসের সৃষ্টি হয়। তার ফলে প্রথমটির অস্তিত্ব মুছে যায়। এর পরে নতুন ধারণার সৃষ্টি; তা পূর্বতন ধারণার সবগুলো দিককেই বাতিল করে না, বাতিল করে দুর্বল ও অসম্পূর্ণ দিকগুলোকে। তারপরে যেহেতু বাতিলকৃত ধারণার সম্পর্কেই পরবর্তী ধারণা নির্দিষ্ট হয়, এই জন্য তাতে পরবর্তী ধারণার স্মৃতি জামা থেকে যায়। আর এটি হয় পূর্বতন ধারণার তুলনায় অধিক প্রশস্ত। এই কারণে বিপরীতধর্মী ধারণাসমূহের সংযোজনায় এক নবতর Unit সৃষ্টি হয়, যা পূর্বের ধারণা দুটো অপেক্ষা অনেকখানি প্রশস্ত হয়ে থাকে। কিন্তু এই নতুন প্রশস্ততর ধারণাও বাতিল হওয়ার সময় আসে, এই প্রশস্ততর ধারণারও বিপরীত ধারণার জন্ম হয়। আর এরূপ অব্যাহত ভাবেই চলতে থাকে ধারণার পর ধারণা সৃষ্টির কাজ। ক্রমবিকাশের এই কর্মধারাকে হেগেল নাম দিয়েছেন Dialectical Process বা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি। তার মতে যুগ ও সময়ের ময়দানে এরূপ ভাঙাগড়া অব্যাহত ভাবে চলছে। প্রথমে একটি দাবি সামনে আসে, একে বলা হয় Thesis। তার পরেই তার বিপরীত দাবি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে. একে বলা হয় Antitshesis। তারপরে এক দীর্ঘকালীন দ্বন্দ্বের পর এ দুইয়ের মাঝখানে এক সমঝোতার সৃষ্টির হয় অর্থাৎ প্রথম দাবিরও কিছু কথা মেনে নেয়া হয়, পরবর্তী বিপরীত দাবিরও কিছু কথা তার সঙ্গে স্বীকৃত হয়। এই দুইয়ের সংযোজনায় সৃষ্টি হয় তৃতীয় এক দাবি, যাকে বলে Synthesis; পরে এই সিনথিসিই একটি দাবি হয়ে দাঁড়ায়। তারপরে তার বিপরীত দাবিও উঠতে থাকে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হেগেলের মতে এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হচ্ছে এক সর্বাত্মক সামগ্রিক সামাজিক কর্মধারা। ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের গোটা মানবীয় সভ্যতা যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ মানব দেহ-এক জীবন্ত সত্তা। ব্যক্তি ও দলসমূহ যেন এই দেহের অংশ ও অঙ্গ, হেগেলের মতে এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি থেকে দুনিয়ার কোনো কিছুই কোনো নাম করা ব্যক্তিই নিষ্কৃিতি পেতে পারে না। এবং এরা যেন সব দাবার গুটি। মানব সভ্যতা ও সমাজের আসল জিনিস হচ্ছে World reason, World spirit, Absolute Spirit.</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও ডায়ালেকটিকবাদ</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় দর্শনের মূল কথা হচ্ছে এই ডায়ালেকটিক পদ্ধতি Dialectic Principles. ডায়ালেকটিক কথাটি গ্রীক দর্শন থেকে গৃহীত, গ্রীক ভাষায় শুরুতে এ শব্দের অর্থ ছিল কথাবার্তা-পরবর্তীকালে বিতর্ক ও আলোচনার এক বিশেষ টেকনিকরূপে পরিচিত হয় ডায়ালেকটিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতি চিন্তার দুটো অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। তার একটিকেও বাদ দিলে এই গোটা পদ্ধতিই অর্থহীন হয়ে যায়। অংশ দুটোর অর্থ হচ্ছে এই যে, সৃষ্টি জগতের মৌলিক ও প্রকৃত সত্য বাইরের জিনিস নয়; বরং চিন্তা ও বিশ্বাসই হচ্ছে মূল। আর দ্বিতীয় এই যে, এই ধারণা বিশ্বাসগুলো স্থবির ও নিশ্চল নয়, বরং প্রবাহমান, গতিশীল, অব্যাহত ধারায় তা বয়ে চলে এবং প্রবাহিত হয়েই ক্রমবিকাশের বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ে অতিক্রম করে অগ্রসর হয়ে যায়। প্লেটোও এ কথা স্বীকার করতেন। তবে পার্থক্য এই যে, প্লেটো চিন্তা ও বিশ্বাসগুলোকে অপরিবর্তনশীল ও নিস্পন্দ বলে মনে করেছেন। এবং বলেছেন যে, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতেই এগুলো লাভ করা যেতে পারে অর্থাৎ এমন উপায়ে, যাতে বিপরীত চিন্তাকে প্রথমে মেনে নেয়া হবে, তারপরে তার প্রতিবাদ করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত তার মাঝে সামঞ্জস্য ও ঐক্য সৃষ্টি করা হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হেগেল এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি বলেছেন যে, ধারণা বিশ্বাসগুলো নিজেরাই এই তিন পর্যায়ের কাজ অর্থাৎ প্রমাণ, প্রতিবাদ ও সামঞ্জস্য বিধান সম্পন্ন করেছে। অন্য কথায়, নিখিল সৃষ্টিলোকের সমগ্র সত্য মূলত এক ঐকিক ধারণার স্বল্পমূলক বিতর্কের প্রতিচ্ছায়া। যাতে এই ধারণা তার বিভিন্ন ও বিপরীত দিকসমূহকে প্রকাশ করে এবং কেবল বিশেষ কোনো সত্যই নয়, সমগ্র সৃষ্টিলোক এক ব্যাপক ধারণা বিশেষ যা তার বিপরীতগুলোর প্রমাণ করে আর করে তার প্রতিবাদ। এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোর মাঝে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে এক উচ্চতর ইউনিট কায়েম করে। এভাবে এই ধারণা ক্রমশঃ স্বীয় অভ্যন্তরকে বিকশিত করে তোলে। বিশ্ব জগতে সে খোদায়ী মন&#8217; (Divine mind) Logical Necessity অনুযায়ী ক্রমবিকাশের স্তর অতিক্রম করে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে স্বীয় পূর্ণতা বিধান করছে। হেগেলের আবিষ্কৃত চিন্তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি যেন চিরন্তন জিনিস-অনন্তকাল থেকেই তা কায়েম রয়েছে। আর কাল ও স্থানের বুকে বস্তুজগত হচ্ছে এই চিন্তা পদ্ধতির বাহ্যিক অভিব্যক্তি-বহির্বিকাশ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ফয়েরবাখ্, মার্কস ও এঞ্জেলস-এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেন। তার মতে প্রাকৃতিক জগতে এই নীতি ও পদ্ধতি পূর্ব থেকেই কার্যকর হয়ে আছে, চিন্তা জগতে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে পরে। মার্কস একথাও বলেছেন যে, মানবীয় চিন্তা মূলত বস্তু জগতেই প্রতিবিম্বিত এবং তা-ই মানব মনের দর্পণে প্রতিফলিত হয় এবং তার হাড়ের সঙ্গে মিলে-মিশে যায়। এজ্ঞেলসতো হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সম্পর্কে এ মত প্রকাশ করেছেন যে, মূলতঃ তা থেকে বস্তুর বৈশিষ্ট্য বিশেষত্ব এবং তার গতির নিয়ম-কানুন প্রকাশিত হয়, চিন্তার নিয়ম-পদ্ধতি তা থেকে উদ্ভাবিত হয় গৌণতঃ। তার দাবি হচ্ছে হেগেল চিন্তা জগতের জন্য যে পদ্ধতি রচনা করেছেন, তা বস্তুর অবস্থা ও বাস্তব ঘটনাবলীর ওপরও প্রযোজ্য হতে পারে। তা সমাজ বিজ্ঞানই হোক আর সামাজিক জীবনযাপন সম্পর্কিত জ্ঞানই হোক। অথবা তা জীব বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞানই হোক কিংবা তা প্রকৃতি বিজ্ঞান আর ভূগোল বিজ্ঞানই ভূগোল-বিজ্ঞানই হোকনা কেন।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও বস্তুবাদ</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসবাদের দাবি হচ্ছে এই যে, মানবীয় মন (Human Mind) বস্তুর উদ্ভাবিত &#8211; এর বিপরীত নয়। হেগেলীয় দর্শনে ধারণা, চিন্তা ও বিশ্বাসকে বিশ্ব জাহানের মৌলিক সত্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। এর সম্পূর্ণ বিপরীত মার্কসীয় মতবাদ হচ্ছে প্রকৃত ও মৌলিক সত্তা কেবল বস্তুরই রয়েছে। মানুষের মন, তার চেতনা, তার ধারণা-বিশ্বাস সব কিছুই প্রকৃত পক্ষে বস্তুর উদ্ভাবন মাত্র। Engeles বলেছেন: &#8220;Matter is not aproduct of mind but itself is merely the highest product of matter.&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">লেনিন লিখেছেন : &#8220;Natural science positively asserts that the earth once existed in a state in which woman or any other living creative existed or could have existed&#8230; Hence matters primery and mind, consciousness, sensation are product of a very high development.&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসবাদের দৃষ্টিতে প্রকৃতি বা বস্তু চিরন্তন, মন ও চেতনা গৌণ। বস্তই জীবনের রূপ পরিগ্রহ করছে। জীবন থেকেই চেতনা জেগেছে এবং এ চেতনা থেকেই মনের সভা গড়ে উঠেছে। মার্কস এজন্য প্রমাণ হিসেবে ভূ-বিজ্ঞানের Goology নবতর আবিষ্কারের কথা পেশ করেছেন। বলেছেন এ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, গোটা ভূমণ্ডল মানুষের পূর্বেই অস্তিত্ব লাভ করেছে। (ফসিল সম্পর্কিত গবেষণা ও আধুনিক আবিষ্কারসমূহ তারা পেশ করেন এর প্রমাণ হিসেবে)</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও ক্রমবিকাশবাদ (Theory of Evolution)</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসবাদ ডারউইন এবং তাঁর অনুসারীদের রচিত ক্রমবিকাশ থিওরীকে সমর্থন করেছে, সত্য বলে মেনে নিয়েছে। দুনিয়ার ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের জন্য এই থিওরীকে ব্যবহার করেছে। তবে এতদুভয়ের একটি জায়গায় কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে ডারউইন এবং তাঁর মতাবলম্বী বিজ্ঞানীদের দাবি হচ্ছে :  প্রকৃতির বুকে ক্রমবিকাশমান পরিবর্তন সূচিত হয় এবং প্রকৃতির ধারাবাহিকতা কোথাও ব্যাহত হচ্ছে না। প্রকৃতির বুকে কখনও কোনো আকস্মিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় না। মার্কসবাদ একথা স্বীকার করেনি। তার মতে, প্রকৃতির ধারাবাহিকতা কখনও ব্যাহত হতে পারে। কখনও কখনও প্রকৃতির ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা পরিহার করে লাফ দিয়ে বহুদূরে এগিয়ে যায় এবং পূর্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপের একটি জিনিসকে সৃষ্টি করে। অর্থাৎ মার্কসীয় দর্শনে ক্রমবিকাশ (Theory of Evolution) Envergence Theory এর অনুরূপ। অর্থাৎ মানবজগৎ ও প্রাকৃতিক জগতে এখন নতুন নতুন গুণ বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হয়ে পড়ে, যা সম্পূর্ণ অভাবিতপূর্ব। পূর্ববর্তী অবস্থার সঙ্গে এ গুণ বৈশিষ্ট্যগুলোর কি বাহ্যতঃ কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না? যেমন-দুরকমের রঙ মিলে এক নবতর রঙ সৃষ্টি করে। এ রঙ মৌলিক উপাদানের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ধরণের। অথবা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মাত্রানুজনিক সংমিশ্রণে পানির সৃষ্টি হয়। এই পানিতে তার মৌলিক উপাদান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্য ও গুণ থাকে। হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন সম্পর্কে গবেষণা করে একথা কেউ বলতে পারে না যে, এ থেকে পানির মত কোনো জিনিস তৈরি হতে পারে। কেননা পানির বৈশিষ্ট্যের সাথে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের বৈশিষ্ট্যের কোনো মিল নেই। মার্কসবাদে মানবীয় মন ও চেতনার বিশ্লেষণ ঠিক এমনিভাবে হয়ে থাকে। অর্থাৎ দেহের অংশসমূহের সংযোজক এক উন্নততর জিনিস অস্তিত্ব লাভ করল, যা সম্পূর্ণতঃ নতুন অভিনযব এবং এর মৌলিক উপাদানগুলো সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে এ সম্পর্কে কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><b>মার্কসীয় দর্শনে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক নিয়ম (Nature and Natural Laws)</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">চিন্তা এবং চেতনা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এঞ্জেলস তাঁর Anti During গ্রন্থে লিখেছেন &#8220;But if the further question is rise. What then are thought and consciousness and whence they come it becomes apparent that they are products of the human brain and that man himself is the product of nature: Which has been developed in and along with environment whence it is self evident that the products of the human brain being in the last analysis also products of nature do not contradict the rest of nature but are in correspondence with it.&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এখানে এঞ্জেলস স্বীকার করেছেন যে, মানুষের চিন্তা ও চেতনা সবকিছুই মানুষের মস্তিষ্কের কাজ, আর মানুষ তার গোটা দেহসত্তা ও মস্তিষ্ক সহ স্বয়ং প্রকৃতির উৎপাদন। এবং মানুষের পরিবেশের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তা অস্তিত্বলাভ করেছে। এখানে প্রকৃতিকে বস্তু ও বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতির সমান পর্যায়ে দাঁড় করানো হয়েছে। মার্কসবাদ কোনো উচ্চতর ইচ্ছাশক্তি বা উদ্দেশ্য সম্পন্ন কোনো বুদ্ধি বছর উর্ধ্বে থাকতে পারে বলে স্বীকার করে না। Historical Materialism গ্রন্থে লেখা রয়েছে &#8220;The entire natural world is governed by law absolutely excludes the intervention of action from outside. আর এক জায়গায়  &#8220;But now a days in our evolutionary conception of the universe there is absolutely no room for either a creator or ruler and to take of a supreme being shut us from the whole existing world implies a contradiction in terms.</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">লেনিন তাঁর এক চিঠিতে লিখেছেন &#8216;খোদার সত্তা অত্যন্ত দুরূহ ও জটিল চিন্তা কল্পনার ফল, প্রাকৃতিক নিয়ম বিধান সম্পর্কে অনবহিতই তা সৃষ্টি হয়েছে। মোট কথা, মার্কসবাদ একটি Purposive Regulating Intelligence স্বীকার করে বটে; কিন্তু বস্তুজগতের বাইরে তার অবস্থানকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। অর্থাৎ মার্কসবাদ খোলা-বিশ্বাসের কথাটিকে অতটা অস্বীকার করছেনা, যতটা অস্বীকার করছে খোদার সৃষ্টিলোক বহির্ভূত এক সত্তা হওয়ার কথাটিকে। অন্যথায় মার্কসবাদ বস্তুর অন্তর্নিহিত শক্তিকেই সর্ব শক্তিমান সত্তারূপে মেনে নিচ্ছে। মার্কসবাদের খোদা বস্তুর বা জুড়ে অন্তর্নিহিত জিনিস, তার বাইরের নয়।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও নৈতিকতা (Theory of Morality) </b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">কাল মার্কস লিখেছেন:</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;The mode of production in material life determines the social political and intellectual life process in general.</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> অর্থাৎ মার্কসের মতে মানবীয় নৈতিকতা উৎপাদনের ধরণ ও পদ্ধতির দ্বারা নির্ণিত ও বিধিবন্ধ হয়। অন্যকথায় নৈতিকতার ব্যাপারে মানুষের ইচ্ছার কোনো দখল নেই। কেননা মানুষ এ সব কিছুই পূর্ব থেকে তৈরিকৃত হিসেবে লাভ করেছে। মার্কসের এই নৈতিকতা থিওরির সমর্থনে এঞ্জেলসও কথা</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বলেছেন। তিনি তার Anti during লিখেছেন</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> &#8220;We maintain on the contrary that all former moral theories are the products in the last analaysiss of the economic stage which society had reached at that particular eproch, and as society has hither to moved in class antagonistic morality it has either justified the domination and interests of the ruling class or as soon as oppressed class has become powerful enough it has represented the revolt against this domination and the future interests of oppressed.</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও ধর্ম</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">এঞ্জেলস তার Anti during গ্রন্থে লিখেছেন All religion however is nothing but the fanatic reflection in men&#8217;s minds of these external forces which control their daily life, a reflection in which the terrestrial forces assume the form of supernatural forces অর্থাৎ ধর্মকে মনে করা হচ্ছে শুধুমাত্র বাহ্যিক প্রতিকূল অবস্থা সমূহের প্রতিবিম্ব। এর নিজস্ব কোনো যৌক্তিকতা বা মৌলিকতা যেমন নেই, তেমনি নেই এর কোনো স্থায়িত্ব। মার্কসের ভাষায় ধর্ম হচ্ছে &#8216;Oplain of the people-Lenin on religion&#8217; গ্রন্থের ২১ পৃষ্ঠায় লেখা আছে &#8216;মার্কসবাদের অপর নাম হচ্ছে বস্তুবাদী। এজন্য তা ধর্মের তেমনি দুশমন যতখানি দুশমন অষ্টাদশ শতকের সাধারণ বস্তুবাদ বা ফয়েরবাখের বক্তবাদ। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলসের ডায়ালেকটিক বস্তুবাদ ফয়েরবাখ ও অষ্টাদশ শতকের অপরাপর বস্তুবাদীদের থেকেও অগ্রসর। এতে বস্তুবাদী দর্শনকে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও চিরস্থায়ী সত্য (Eternal Truths)</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসবাদ কোন চিরস্থায়ী সত্য বিশ্বাস করে না। কেননা মার্কসবাদের দৃষ্টিতে ইতিহাস প্রকৃতির পরিবর্তন বিবর্তন, ক্রমবিকাশ ও ক্রয় উন্নতির অসংখ্য নিদর্শন ও পর্যবেক্ষণে ভরপুর। এই কারণে এক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী সত্য স্থান লাভ করতে পারে না। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে বলা হয়েছে। Communism repudiates eternal truth and morality instead of refashioning them. এঞ্জেলস লেখেছেন: মানবীয় চিন্তার নেতৃত্ব ও নিরংকুশতা স্বতন্ত্র ব্যক্তিসমূহের সীমাবদ্ধ ও অনিরংকুশ চিন্তার ভিত্তিতে স্থাপিত হয়। যে জ্ঞান শর্তহীন অর্থাৎ নিরংকুশ সত্যের ধারক, ভুল-ভ্রান্তি ও পদস্খলনের এক সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতার পরই তা ভাল করা যেতে পারে। কিন্তু তা লাভ করার জন্য মানুষের জীবন সীমাহীন ও অশেষ হওয়া দরকার। অন্যথায় মানুষ তার এই সীমাবদ্ধ জীবন দ্বারা সীমাহীন সময়ব্যাপী সুদীর্ঘ সাধনা ও ভুল-ভ্রান্তির অভিজ্ঞতার পর সত্য জ্ঞান-চিরস্থায়ী সত্য লাভ করতে পারে না, তখন আর এখানে চিরস্থায়ী সত্য বলতে কিছু থাকতে পারে না।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসবাদ ও ওহী</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসবাদের সকল প্রকার জ্ঞানভিত্তিক ধারণা বিশ্বাস লাভের একমাত্র উৎস রূপে গৃহীত হয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতা, যা মানুষ লাভ করে বাহ্য জগত থেকে। তাই মানবীয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান ব্যতীত অপর কোনো জ্ঞান বা ঊর্ধ্বজগতের কোনো প্রকৃত জ্ঞানকে সমর্থন করে না। অধ্যাপক দাসগুপ্ত তাঁর Materialism. Determinism and Dialectics নামক গ্রন্থে লিখেছেন: “জ্ঞানের সমস্ত তথ্য বস্তু জগতের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই আমরা লাভ করে থাকি। বিভিন্ন অভিজ্ঞতার পারস্পরিক কার্যক্রমের সাহায্যে নবতর চিন্তা ও ধারণা লাভ করতে পারি। আমাদের বাহ্য জগত থেকে শত জ্ঞানের সাথে তার সম্পর্ক আমরা না-ও জানতে পারি। কিন্তু এই চিন্তা ও ধারণা সমূহের গভীর তলদেশে যদি পৌঁছাতে চেষ্টা করা হয় তাহলে জানা যাবে যে, আমাদের পূর্বতন অভিজ্ঞতাসমূহের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতাই সে অভিজ্ঞতার উৎস। খোদায়ী ওহী খালেস চিন্তা ও জ্ঞান লাভ করার মাধ্যম হতে পারেনা। কেননা এ নিছক কল্পনা ও কিংবদন্তি ছাড়া আর কিছু নয়।&#8221;</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>ইতিহাসের মার্কসীয় দর্শন</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">কার্ল মার্কস তাঁর ইতিহাস দর্শন হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে গড়েছেন। হেগেল বলেন, ইতিহাসের ক্রমবিকাশ, ক্রম উন্নতির গতিধারা এবং মানব জীবনের বিপ্লনসমূহ বিপরীত জিনিসমমূহের দ্বন্দের প্রত্যক্ষ ফল। জীবনের কোনো একটি ব্যবস্থা যখন উন্নতি-উৎকর্ষের চরমতম পর্যায়ে উন্নীত হয়, তখন তারই গর্ভ থেকে কতক বিরোধী শক্তি জন্ম নেয় এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সাথে দ্বন্ধ করতে শুরু করে দেয়। শেষ পর্যন্ত এই নবতর শক্তি ও পূর্বতন ব্যবস্থার সংমিশ্রণে এক নতুনতম ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করে, যাতে পুরানো ব্যবস্থার উত্তম অংশগুলো অবশিষ্ট থেকে যায়-যদিও তাকে অপরাপর অংশ থেকে আলাদা করে দেয়া যায় না। তারপর এই নবতর ব্যবস্থাও যখন একটি পর্যায় বা স্তর পর্যন্ত পৌছে যায় তখন তারই মধ্য থেকে তার বিপরীত জিনিসের উদ্ভব হয় ও তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এই দ্বন্দ্বের ফলে আবার এক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা গড়ে ওঠে পূর্ববর্তী ব্যবস্থা ও তার বিপরীতের সংযোজনায়। পুরোনো ব্যবস্থা নির্মূল হয়ে যায়, সেখানে নবতর ব্যবস্থার পর্যায় শুরু হয়। এ ব্যবস্থায় পূর্বতন ব্যবস্থার সারাংশ থেকে যায়। এ ব্যবস্থা পূর্ব ব্যবস্থার তুলনায় অধিকতর প্রশস্ত ও অতিশয় ব্যাপক হয়ে থাকে। এভাবে জীবন হচ্ছে এক নিরবচ্ছিন্ন উন্নতি ও ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতা। তার প্রত্যেকটি নবতর পর্যায় পূর্ববর্তী পর্যায়ের তুলনায় উন্নত হয় এ দৃষ্টিতে যে, তাতে পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহের উচ্চতর বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ব, তার উত্তম অংশগুলো-যা তার যার নির্যাস-যথারীতি সুরক্ষিত থাকে। মানবীয় ক্রমবিকাশের ধারায় Conservation of values মূল্যমানের সংরক্ষণ মার্কা স্বীকার করেন। এ পর্যন্ত মার্কস হেগেলের সাথে একমত। কিন্তু এর পর উভয়ের পথ চিন্তাধারা আলাদা হয়ে যায়। মার্কস হেগেলীয় &#8220;ডায়ালেকটিকেল প্রসেসের মূল তরুটুকু তো লুফে নিয়েছেন; কিন্তু তাকে জীবনের ঘটনাবলীর ওপর এমনভাবে প্রযুক্ত করেছেন যে, হেগেলের সময় দর্শন প্রাসাদ ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। তাই হেগেলীয় ডায়ালেকটিকস ও মার্কসীয় ডায়ালেকটিকস-এ তফাত অনেক। কারণ মার্কস শুধু ডায়ালেকটিসিয়ানই নন, তিনি ডায়ালেকটিভ মেটারিয়ালিস্ট জড়বাদী, বস্তুবাদী ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হেগেলের দৃষ্টিতে বিপরীত জিনিস সমূহের পারস্পরিক দ্বন্ধ সংগ্রামের ক্ষেত্র ছিল Realm of ideas &#8216;চিন্তার জগত। জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই থাকলেও শুধু এতটুকু যে, দ্বন্দ্বের ফলে যে পক্ষ জয়ী হয়, বাইরের গোটা পরিবেশ তারই অধীন হয়ে যায়। ফলে মানুষের সমাজ সভ্যতা, জীবন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের আসল কারণ হচ্ছে চিন্তাজগতের বিপ্লব, যা সৃষ্টি হয় ডায়ালেকটিবাদ থেকে। এক কথায় হেগেলের মতে মানবেতিহাসের আসল প্রভাবশালী শক্তি হচ্ছে চিন্তা ও বিশ্বাসের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি, স্বয়ং মানুষের নয়। তার জীবন ও তামাদ্দুনের বহিঃপ্রকাশও নয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কস হেগেলের এ দর্শনকে উল্টিয়ে দিয়েছেন, তাঁর মতে ইতিহাসের গতিধারায় উত্থান-পতন ও ভাঙ্গা-গড়ায় আসল জিনিস মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস নয়, আসল হচ্ছে মানুষের বাস্তব ও বাহ্যিক জীবন-Actual world of human affairs, তাঁর মতে মানবীয় ধারণা-বিশ্বাস হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিবেশের ফল, এদের নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সত্তা নেই। বিপরীতসমূহের দ্বন্দ্ব চিন্তার জগতে বাস করে না, মানুষের প্রকৃত জীবন ক্ষেত্রেই তা দিনরাত ঘটছে এবং সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমে Through change in the economic structure of society কেননা মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস জগতের পরিবর্তন আর তো কিছুই নয়, তা হচ্ছে শুধু Reflection of social and economic changes.</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কস তার Contribution to the Critique of political Economy&#8217; গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন: The mode of production in material life determine the social political and intellectual life-process- in general- it is not the consciousness of men that determines their beings. but, on the contrary, their social being that determines their consciousness.</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসের মতে ইতিহাসের ভিত্তি হচ্ছে বাস্তব। কোনো অলৌকিক শক্তির ইঙ্গিত ইতিহাসের গতি নির্দেশ করে না। ইতিহাসের গতি নির্দেশ করে সমাজের Mode of production. তাই তিনি বলেছেন: The conditions goveming the relation among men are dependent upon the means of production. মানুষে মানুষে যে পরস্পর সম্বন্ধ তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে যুগের উৎপাদন প্রধা বা ব্যবস্থার ওপর। তাই When the letter changes, there comes about </span><span style="font-weight: 400;">also a change in the relation among the producers. এ ভাবেই সমাজে উৎপাদকদের মাঝের সম্পর্কও পরিবর্তিত হয় এবং পরিবর্তনের ভিত্তিতেই বিভিন্ন রকমের সমাজ গড়ে ওঠে, সমাজিক জীবন ও সভ্যতার চেহারা রীতিমত বদলে যায়। আরও পরিষ্কার করে বললেন, মানুষ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সম্পদ উৎপাদনের সামাজিক প্রচেষ্টায় কর্ম বন্টনের নীতিতে শরীক হয়, সমাজের লোক </span><span style="font-weight: 400;">বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে সমাজে Class divisions গড়ে ওঠে। প্রত্যেক শ্রেণির স্বার্থ অপর শ্রেণির স্বার্থ থেকে ভিন্নতর হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক উৎপাদনের বণ্টন ব্যবস্থাও কার্যকর হয় বেশি স্বার্থের ভিত্তিতে। এর ফলে সৃষ্টি হয় Property system এবং জনগণের মধ্যে Property relation নির্দিষ্ট হয়। সমাজের আইন, মালিকানা ও শ্রেণি পার্থক্যের সংরক্ষক হয়ে পড়ে। এই সমস্ত আইনগত ও সামাজিক গঠন, এই শ্রেণি পার্থক্য ও মালিকানা ব্যবস্থাকে মার্কসের ভাষায় বলা হয়েছে-Condition of production মার্কস বলেন এই উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদক শক্তির মাঝে এক স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রচলিত উৎপাদক শক্তি হয় যে স্তরের উৎপাদন ব্যবস্থাও সে পর্যন্ত উন্নীত হয়। কিন্তু কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজের আয়ু পর্যন্ত পূর্ণ করে নিলেই তার মধ্য থেকে নতুন উৎপানক শক্তির আবির্ভাব ঘটে, যার সাথে উৎপাদন ব্যবস্থা নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে উৎপাদক অবস্থা ও নতুন উৎপাদক শক্তির মাঝে সৃষ্টি হয় সংঘর্ষের। যেমনঃ</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;">১. ভারবহন ও চাষকার্যে যন্ত্রের ব্যবহার, পূর্বে তা ছিল না পরে জানা গেছে। এতে করে প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন সূচিত হলো। আইনও তাকে মেনে নিলো।</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;">২. পাম্প ব্যবহার: পূর্বে মানুষ জানতো না, পরে জানতে পেরেছে। এতে এক নতুন উৎপাদক শক্তির আবিষ্কার হলো। এ ভাবে নতুন উৎপাদন যন্ত্র Instruments of production হাতে পাওয়ার দরুন অর্থনৈতিক সংস্থারও পরিবর্তন সাধিত হয়। অর্থাৎ Form and methods of modes of production বদলে যাওয়ার কারণে পূর্ব থেকে প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন প্রথার মাঝে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং এই ডায়ালেকটিক পন্থায় পুরানো অর্থব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় ও নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অন্য কথায় পুরাতন সমাজ ভেঙ্গে যায়, নতুন সমাজ গড়ে ওঠে। সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা-বিশ্বাস, ধারণা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ পূর্ণ হয়ে যায়। সংক্ষেপে ও মোটামুটিভাবে এই হচ্ছে মার্কসের অর্থনৈতিক দর্শন। একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যায় যে, এতে একই সঙ্গে তিনটি জিনিস রয়েছে। যেমন:</span>
<ul>
<li style="list-style-type: none;">
<ul>
<li>১. ইতিহাস দর্শন, যাকে বলা হয় Material conception of history অথবা Historical materialism</li>
<li>২.শ্রেণী সংগ্রাম এবং</li>
<li>৩. চিন্তা-বিশ্বাস সম্পর্কে মার্কসের মত।</li>
</ul>
</li>
</ul>
</li>
</ul>
<p><b>১.ইতিহাস দর্শন </b></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কস ইতিহাসের ব্যাখ্যা</span> <span style="font-weight: 400;">করেছেন বস্তুবাদী দৃষ্টিতে। তাঁর মতে সামাজিক তথ্য ঐতিহাসিক অংগতির Determining Factor বা কার্যকারণ সম্বন্ধের যথার্থ বা অনিবার্য কারণ হচ্ছে Economics (অর্থনীতি) </span><span style="font-weight: 400;">এন্ডোস এ কথার প্রতিধ্বনি করে তার বই inti During-এ খোলাখুলি বলেছেন যে, ইতিহাসের বাস্তব ব্যাখ্যা তখনি সম্ভব যখন আমরা মেনে নেবো , The production and together with production the change of the finished products form the foundation of social order. অর্থাৎ মার্কসীয় দৃষ্টিতে ইতিহাসের ব্যাখ্যা করতে হলে Productive force গুলোর মাঝে কি পরিবর্তন হলো আর সঙ্গে সঙ্গে পণ্য দ্রব্যের Social utilities এর বিনিময় ব্যবস্থাতেই বা কি পরিবর্তন হলো তা দেখতে হবে। সহজ কথনঃ The underlying cause of all social phenomena are to be found not in the pilosophy but in the economics of every generation, অর্থাৎ অর্থনীতিই হচ্ছে সমাজের মূল দর্শন। মার্কস তাই বলেছেন। &#8220;I am convinced that the relation among men under the existing laws and the present forms industrial life. Express themselves neither in their own nature or in the development of the human spirit, but that they are deeply rooted in the material conditions of life (that productive forces).</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">২.</span><b> শ্রেণী সংগ্রাম (Class struggle)</b></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসের মতে প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন প্রথা ও উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন উৎপাদক শক্তির আবির্ভাব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। মালিক পক্ষ চিরন্তন নিয়মে বঞ্চিতদের শোষণ করতে ও তাদের বঞ্চিতই রাখতে চায়। ফলে পরস্পরের মধ্যে সমর অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই শ্রেণি সংগ্রামের মৃল সূত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে Communist Manifesto-তে মার্কা এঞ্জেলস লিখেছেন </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;Since the establishment of private property society has been divided into two hostile economic classes. Just as in the ancient world the interest of slave owners was opposed it that of the slaves and in medieval Europe, the interest of the feudal lords was opposed to that of the serfs. So in our times the interest of the capitalist class, which drives its income mainly from the ownership of property. antagonistic to the interest of the proletariat class, depends for its livelihood chiefly upon the sale of its labour power.&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাই মার্কস অন্যত্র বলেছেন:</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;All social changes has been determined chiefly but the economic class struggles that have pervaded history since the break up of tribal community organization.&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এবং কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শুরুতেই লিখেছেন :</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;The history of hitherto existing society is the history of class struggles&#8221; মার্কসের মতে এই শ্রেণি সংগ্রামই হচ্ছে সমাজ বিবর্তনের এক অমোঘ হাতিয়ার। সব সময়ই সকল সমাজেই এ সংগ্রাম চলতে থাকবে। অতএব Socialism must come. Because historical necessity. The objective of human history, the forces of production are bringing us everyday and closer to it.</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই শ্রেণি সংগ্রামের মূলে যে জিনিসটি কাজ করছে, তা হলো Theory of surplus value বাড়তি মূল্য থিওরী। মার্কসীয় দর্শনের দৃষ্টিতে একটি জিনিসের আসল মূল্য হচ্ছে শ্রম, যে শ্রম দিয়ে তা তৈরি করা হয়েছে, তা তৈরির ব্যাপারে যে শ্রম বিনিয়োগ করা হয়েছে। মার্কসের পূর্বে অ্যাডাম স্মীথ এবং রিকার্ডো এই নীতি রচনা করেছিলেন যে, পণ্যের বিনিময়ে মূল্যের আসল মানদণ্ড হচ্ছে শ্রমিক-মজুরদের দাম। &#8216;লোক&#8217; &#8216;লেবার ক্যান মেইক ভ্যালু কথাটিকে অমোঘ সত্য মনে করে ব্যাক্তিগত মালিকানা অধিকারের প্রবল সমর্থন দিয়েছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কস তার &#8216;থিওরী অফ ভ্যালু এদের কাছ থেকেই ধার করেছেন। কিন্তু তিনি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মতলব হাসিল করতে চেয়েছেন। তিনি যখন দেখলেন যে, দুনিয়ায় অসমর্থ ও অসহায় মজুররা পুঁজিবাদীদের নিরবচ্ছিন্ন জুলুম-শোষণের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ হয়ে রয়েছে, কেবল প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না, তখন মার্কস এই তত্ত্ব আবিষ্কার করে তাদের সামনে তুলে ধরলেন যে, </span><b><i>পণ্যের উৎপাদন কেবলমাত্র তাদের শ্রমেরই ফল, পুঁজিদার কেবল তার সামাজিক মর্যাদা ও জোরের বলে শ্রমিকদের ন্যায্য, সংগত অংশ লুটে নিচ্ছে। অতএব তাদের অধিকার ও ন্যায্য অংশ লাভের জন্য মালিক পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।</i></b><span style="font-weight: 400;"> মার্কস তার থিওরীকে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, মনে কর, একজন মজুর দৈনিক একটাকা মজুরির বিনিময়ে কারখানায় কাজ করছে দৈনিক আট ঘন্টা করে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে আট ঘন্টা কাজ করে মাত্র এক টাকা মূল্যে পণ্য উৎপাদন করে, না তার চেয়ে বেশি করে? আসলে মজুরীর এ হার এ জন্য নির্দিষ্ট করা হয়নি যে, সে আট ঘন্টা কাজ করে এক টাকা মূল্যের পণ্যই উৎপাদন করে। বরং এ জন্য যে, সে তার শ্রমের মূল্য আদায় করে নিতে পারে না, কেননা সে দুর্বল ক্ষুধায় কাতর অসহায়। আসলে সে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করে-এক টাকার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যের পণ্য উৎপাদন করে থাকে, কিন্তু তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে দেয়া হয় মাত্র এক টাকা, আর বাকী সবটাই লুটে নেয় পুঁজিদার, কারখানা মালিক, আর এটাই হচ্ছে Surplus value.</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">৩. </span><b>চিন্তা, বিশ্বাস, ধারণার পদ্ধতি (Thought process) </b></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পূর্বতন জার্মান দার্শনিকদের মত ছিল যে, মানুষের সামাজিক ও তামাদ্দুনিক বিবর্তনে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী শক্তি হচ্ছে স্বয়ং মানুষের চিন্তা ও ধারণা-বিশ্বাসের শক্তি। আর এ শক্তি তার বাইরের জীবন ও বৈষয়িক প্রয়োজন বাসনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থেকেই কাজ করে। অর্থাৎ ইতিহাসের অগ্রগতির ধারা নির্দিষ্ট হয় নিছক চিন্তা ও ধারণা-বিশ্বাসের শক্তির সাহয্যে মার্কস এ থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তার মতে এই ধারণা, চিন্তা বিশ্বাসেরও জন্য হয় মানুষের বাস্তব জীবনের পটভূমিতে ও সমসাময়িক বাহ্যিক পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবেও। আর তা হচ্ছে তদানীন্তন অর্থব্যবস্থা।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসীয় দর্শনে রাষ্ট্র (Theory of state)</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">রাষ্ট্র সম্বন্ধে মার্কসীয় দর্শনের দৃষ্টি হচ্ছে এই যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি (Private property) থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি। সমাজে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রচলন শুরু হলো, তখন সমাজের শক্তিশালী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হাতেই প্রায় সমস্ত সম্পত্তি চলে গেল। তারাই হলো সম্পত্তির মালিক। ফলে অবশিষ্ট সকল লোকই হলো বিত্তহীন। এখন এই দু’দলের সম্পত্তির মালিকদল সম্পত্তি নিরাপদে ভোগ করার জন্য রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির উদ্ভাবন করলো। সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থা বজায় রাখাই হলো রাষ্ট্রের কাজ। এজন্য জুলুম নির্যাতন যা কিছুই করা প্রয়োজন বোধহয়, তা সবকিছুই করা হয় দ্বিধাহীনভাবে। মার্কস ও এন্ডেলস বিরচিত কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে রাষ্ট্র সম্পর্কে বলা হয়েছে-</span><b> &#8216;রাষ্ট্র হচ্ছে একটি শ্রেণিকে ধ্বংস করার বাহনাস্ত্র।</b><span style="font-weight: 400;"> ইহা একটি দলকে বিনাশ ও তার ওপর জুলুম-নির্যাতনের স্রোত চালানোর জন্য একটি সংগঠন তবে সমাজতান্ত্রিক যুগের সমাজ হবে Classless society- শ্রেণিহীন সমাজ সেখানে Domination class এরও অবসান হবে। ফলে রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না। সেখানে মার্কসের ভাষায়, State will wither away- রাষ্ট্র আপনার থেকেই লোপ পেয়ে যাবে। অবশ্য তার আগে শ্রেণি সংগ্রাম সাফল্যের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠিত হবে।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসীয় দর্শনে পরিবার</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় দর্শনে রাষ্ট্রের মতো বিবাহ ও পরিবার প্রদত্ত Private property system-এরই পরিণতি। স্ত্রী সেখানে অন্যান্য সম্পত্তির মতোই পুরুষের সম্পতি, মার্কসের ভাষায় Instrument of production এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রথা বন্ধ হয়ে গেলেই শ্রেণিহীন সমাজে পরিবার বিলুপ্ত হবে। সংক্ষেপে মার্কসীয় চিন্তাধারার পরিচয় পেশ করা হলো। এ চিন্তাধারাই হচ্ছে কমিউনিজমের দার্শনিক ভিত্তি। বর্তমান সময় বিশেষ করে পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রাপ্ত ও পাশ্চাত্য ধরণের মন মগজের লোকদের চিন্তায় দৃষ্টিভঙ্গিতে এর প্রভাব তীব্রভাবে বিদ্যমান। কাজেই যতদিন এ চিন্তাধারা সমাজ মনে বদ্ধমূল হয়ে থাকবে ততদিন সেখানে ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের স্থান লাভ করতে পারে না। তাই এর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সমালোচনা করে এর অন্তঃসারশূন্যতা সমাজ সম্মুখে উজ্জ্বল করে ধরতে হবে। মানবমনকে মুক্ত করতে হবে মার্কসবাদের কুজ্বটিকা থেকে।</span></p>
<h1></h1>
<h4><b>সমালোচনা</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় দর্শনের প্রায় সবকটি দিকই আমি সংক্ষেপে পেশ করলাম। এ সবের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে মার্কসবাদ। মার্কসীয় দর্শনের গোড়ার কথাই এই। এ দিকগুলোকে সামনে রেখে চিন্তা করলেই স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়, মার্কসীয় দর্শনানুসারী জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র কিরূপ হতে পারে। কিন্তু তবু এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। তাই এবারে আমি এর সমালোচনা শুরু করবো।</span></p>
<h3></h3>
<h4><b>সমালোচনার লক্ষ্য</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মূল সমালোচনা শুরু করার পূর্বে দুটো কথা বলা দরকার। পয়লা কথা এই যে, এ সমালোচনার মূলে আমার মনে কোনো অন্ধবিদ্বেষ নেই, নিতান্ত সত্যানুসন্ধিত্সা ও সত্য লাভের ঐকান্তিক অগ্রহই আমাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করছে। একেতো জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্ধবিদ্বেষ মূলতঃই অবাঞ্ছনীয়, দ্বিতীয়ত প্রকৃত সত্যকে পেতে হলে অন্ধবিশ্বাসকে পরিহার করতে হবে। এ ব্যাপারে একান্ত প্রয়োজন মার্কসের শুধু মার্কসেরই নয়, সম্ভব মতো সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানকেই যুক্তির মানদণ্ডে যাচাই করে, বাস্তবতার নিক্তিতে ওজন করে প্রত্যেকটি কথাই গ্রহণ করা কিংবা বর্জন করা। ঠিক এই দৃষ্টিতেই আমি মার্কসের দার্শনিক মতবাসসমূহের বিচার ও যাচাই করবো।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>মার্কসের পরিবেশ</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, মার্কসের চিন্তাধারার সঠিক বিচার তখনি হতে পারে, যদি তাকে তার পরিবেশ-পরিস্থিতিকে সম্মুখে রেখে যাচাই করা হয়। </span><span style="font-weight: 400;">অন্যথায় না তার চিন্তাধারাকে সঠিকরূপে উপলব্ধি করা যাবে আর না হবে তার প্রতি সুবিচার। এ জন্য আমি মার্কসের পরিবেশ এবং তার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা প্রথমেই পেশ করবো। মার্কস বাহনল্যান্ড-এর এক ইয়াহুদা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াহুদী বংশজাত হওয়ার কারণে খৃস্টান ধর্মের প্রতি অন্ধবিদ্বেষ ছিল তার বংশানুক্রমিক ও মজ্জাগত। এই কারণেই মার্কস শুরু থেকেই ধর্মকে বাদ দিয়ে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে চিন্তা-গবেষণা শুরু করেছিলেন। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি শিক্ষা দীক্ষার বিপুল সুযোগ পেয়েছিলেন। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়েই তার চিন্তার বীজ উপ্ত হয়। তখন হেগেলের দার্শনিক চিন্তাই ছিল একমাত্র প্রভাবশালী চিন্তা মত মার্কস তার চিন্তাধারা আকণ্ঠ পান করেছিলেন। পরে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। এ সময়েই সেকালের অপরাপর দার্শনিকদের দার্শনিক অবস্থাবলী গভীরভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ পান। শুধু অধ্যয়নই নয়, তিনি তাদের চিন্তাধারা থেকে রীতিমত মাল-মশলা গ্রহণ করে নিজস্ব দার্শনিক মত রচনা করেন। জাতীয় রাষ্ট্রীয় মালিকানা মাত্র গ্রহণ করেন Mamly &amp; Hazani থেকে। ইতিহাসের বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যা ফয়েরবাখ্, Feuer Spinor-এর কাছ থেকে গ্রহণ করেন। শ্রেণি সংগ্রাম সম্পর্কিত ধারণা তিনি লাভ করেন St.simon, Thierry &amp; Mignet-এর গ্রন্থাবলী থেকে। শ্রমিকদের ডিকটেটরশিপ এর ধারণা গ্রহণ করেন অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগের চিন্তাবিদ Babeue থেকে। সমাজের অর্থনৈতিক শোষণ এবং তা দূর করার জন্য সমগ্র উপায় উৎপাদন রাষ্ট্রায়ত করণের পরিকল্পনা মার্কসের পূর্বে পেশ করেছিলেন Fouier, Bary এবং Thompson প্রমুখ চিন্তাবিদগণ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ঠিক এ কারণেই মার্কসের চিন্তাধারায় রয়েছে গোজামিল। এক কথায় তার চিন্তাধারা হচ্ছে অর্থদর্শন ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ। তার রচিত জীবন পন্থায়  ডারউইনের ক্রম-বিকাশবাদ, মেকিয়াভেলীর রাষ্ট্রদর্শন, রবার্ট উয়েন-এর তীব্রতিক্ত সমূহবাদ ও বক্তৃতান্ত্রিকতার গভীর চাপ রয়েছে বলে স্পষ্ট মনে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে একথাও আমাদের মনে রাখা বোধহয় আবশ্যক যে, মার্কসীয় দর্শনে স্রষ্টা সম্পর্কিত মনস্তত্ত্বই ছিল অত্যন্ত হিংস, জিঘাংসু ও প্রতিশোধ আক্রোশে উচ্ছ্বসিত। কাজেই তার রচিত চিন্তাধারায়ও যে ঠিক সে ভাবধারাই হবে, তাতে আর সন্দেহ কি এসব বলার মূলে উদ্দেশ্য এই যে, মার্কসের মতবাদ অনুধাবন ও সত্যাসত্য বিচারের সময় এসব কথা সকলেরই স্মৃতিপটে জাগরুক থাকা আমি দরকার বলে মনে করি। এবারে একটি একটি করে মার্কসের মতবাদ সম্পর্কে আমার বক্তব্য পেশ করছি।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>১. ডায়ালেকটিকবাদ</b></h4>
<p><i><span style="font-weight: 400;">&#8220;ডায়ালেকটিক্যাল প্রসেস</span></i><span style="font-weight: 400;">&#8220;-এর নিগূঢ় তত্ত্ব অনুধাবন করার ব্যাপারে হেগেল মার্কস দু&#8217;জনই ধোঁকা খেয়ে গেছেন। &#8220;Conflict of opposins ‘বিপরীতসমূহের দ্বন্দ্ব’ সম্পর্কে হোসেলের মূল কথাটির সত্যতা অবশ্য অস্বীকার করা হচ্ছে না। সেই সঙ্গে একথাও অস্বীকার করা হচ্ছে না যে, প্রত্যেকটি ব্যবস্থা যখন এক বিশেষ স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন তারই মাঝ থেকে বিপরীত শক্তি বের হয়ে এক নবতর ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এ ব্যবস্থা পূর্ববর্তী ব্যবস্থার বিপরীত হয় এবং পূর্ব ব্যবস্থার ওপর জয়ী হয় এ পর্যন্ত হেগেলের দাবি ঠিকই আছে। কিন্তু পরবর্তী কথা- এই দাবি যে, প্রত্যেক নবতর ধারণা বাতিলকৃত ধারণার সাথে মিলে এক নবতর Unit রচনা করে এবং নতুন Unit বাতিলকৃত ধারণার তুলনায় এই হিসেবে প্রশস্ততর হয় যে, শেষেরটিতে পূর্বটির অংশ ও মুক্তি অবশিষ্ট থাকে-এ দাবি স্বীকার করা যায় না। কেননা এই দাবিটি Logical contradiction ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রথমে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত ধারণার মাঝ থেকে তার বিপরীত আত্মপ্রকাশ করে। পরে বলা হয়েছে যে, এই বিপরীতটি পূর্ববর্তীর সাথে মিলে মিশে এক নবতর Unit সৃষ্টি করে। এখানে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে। পরবর্তী জিনিসকে প্রথমের ‘বিপরীত&#8217; বলা হবে কেন? কেবল এই জন্যই কি যে, তা পূর্ববর্তী ধারণাকে বাতিল করে? কেননা তাকে বিপরীত বলার অর্থ হবে যে, মূল ধারণা এবং তার বিপরীতের মাঝে ঐক্য ও সাদৃশ্য মিলনের কোনো সূত্রই পাওয়া যায় না। তাহলে এ দুয়ের মিলনে এক তৃতীয় নবতর Unit-এর উদ্ভব কি করে হতে পারে? আরা যদি স্বীকার করা হয় যে, উভয়ের মাঝে কোনো প্রচ্ছন্ন সাদৃশ্য ও মিলন সূত্র বর্তমান রয়েছে, তাহলে শেষেরটিকে প্রথমটির &#8216;বিপরীত&#8217; ধরে নেয়া কি করে সম্ভব? &#8230;..তাতো সুস্পষ্ট রূপে ভুল হবে। কেননা এ ‘বিপরীতের&#8221; মাঝে বিরোধ ও পূর্ণমাত্রার বৈপরিত্য থাকাই স্বাভাবিক। তা হলে কোনো স্তরেই উত্তরের সংমিশ্রণে কোনো Unit গড়ে উঠতে পারে না। আর যদি গড়ে ওঠে বলেই ধরা হয়, তাহলে মনে করতে হবে যে, উভয়ের মাঝে কোনো বিরোধ বা বৈপরিত্য নেই, আছে গভীর বন্ধুতৃতা, সামঞ্জশ্য, ঐক্য ও সাদৃশ্য। তাহলে এদের পরস্পর বিপরীত&#8217; বলা সুস্পষ্টরূপে ভুল।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হেগেলের দৃষ্টান্ত বীজ ও গাছ এ ব্যাপারে মোটেই খাপ খায় না। আর যদি বলা হয় যে, শেষের বিপরীতটি প্রথমের সর্বদিক ও সব অংশের সাথে দ্বন্দ্ব করে না, করে কোনো কোনটির সাথে, তাহলে মানতে হবে যে, বিপরীতসমূহের দ্বন্দ লজিকের ভিত্তিতে চলে-চিন্তা-ধারণা ব্যবস্থা সমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ খুব বুঝে শুনে বিজ্ঞতা ও সতর্কতা সহ চলে। এ কথার না আছে কোনো যৌক্তিকতা, না আছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক : ক ধারণাঃ এর বিপরীত হচ্ছে খ, হেগেলের শেষ জবাবের দৃষ্টিতে ক-এর কয়েকটি দিক রয়েছে মনে করা যেতে পারে, তাদের ক(১),ক (২), ক (৩), ক (৪) ক(৫)। এর মধ্যে প্রথম তিনটি দুর্বল, খ তার Negation(বিপরীত) করে, কিন্তু &#8216;ক&#8217;র শেষ দুটি দিক দুর্বল নয়, তাই &#8216;খ&#8217; তার Negation করে না কিছু দিন দ্বন্দ্ব করার পর &#8216;খ&#8217; এদেরকে নিজের মধ্যে হজম করে নেয়। এ হিসেবে ক-এর প্রথম তিন দিক যার Negation(বিপরীত) করে। আর ক (৪) ও.ক (৫) কে নিজের মধ্যে Absorb করে নেয় তবে হজম করে নেয়, কাজেই খ-এর সাথে ক(৪) ও ক(৫)-এর কোনো দ্বন্দ্ব নেই বরং কিছু বন্ধুতা আছে। এখন হেগেলের মতে বিষয়টা এরকম দাঁড়ায় যে খ&#8230;&#8230;ক এর বিপরীত। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু যুক্তির মানদন্ডে খ- ক(১),ক(২),ক(৩) &#8211; এর বিপরীত, কেননা খ এদের Negation করে কিন্তু &#8216;খ&#8217;- ক(8), ও ক(৫)-এর বিপরীত নয়, কেননা &#8216;খ&#8217; এদের Negation করে না। ফলে &#8216;ক (১)’ ‘ক (২)&#8217; ও &#8216;ক(৩)&#8217; &#8211; &#8216;ক(৪)&#8217;  ও &#8216;ক(৫)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত ও উল্টা হবে। তাহলে দেখ যাচ্ছে ক-ই হবে ক-এর বিপরীত। আর তাহলে মেনে নিতে হয় যে, দুই পরস্পর বিপরীত বা বিরোধী অংশ একই ধারণার Unit-এ একত্রিত হতে পারে। অথচ দুই বিপরীতের সমন্বয় তো চিরকালই অসম্ভব বলে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে চূড়ান্তরূপে স্বীকৃত হয়ে আসছে। কাজেই হেগেলের এ Philosophy of opposits যুক্তির মানদন্ডে ভুল বলে প্রতীয়মান হয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্যদিকে মার্কস হেগেলেরই Dialectical process গ্রহণ করে সেই ভুলেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ ভুল ডায়ালেকটিক পদ্ধতির ওপরই স্থাপিত হয়েছে কার্ল মার্কসের ডায়ালেকটিক বস্তুবাদের স্বপ্ন প্রাসাদ। মার্কস প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাঝ থেকে যেমন বিপরীত শক্তি আত্মপ্রকাশ করে তা কিছু দিনের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের পর এক নবতর অর্থব্যবস্থা গঠন করে, যা পূর্বতন ব্যবস্থার ওপর জন্ম হয়, তাকে নির্মূল করে- নিঃশেষ করে দেয়। কিন্তু তার উত্তম ও উৎকৃষ্ট অংশগুলো নিজের মধ্যে শুষে নেয়। কাজেই এই নবতর অর্থব্যবস্থা পূর্ববর্তী ব্যবস্থা থেকে এই হিসেবে উন্নত যে, পূর্ববর্তী উচ্চ বৈশিষ্ট্যগুলো এই শেষেরটির মধ্যে বর্তমান থেকে যায়। Russell এই দর্শনের সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন। সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, হেগেলের মতে জীবন &#8216;লজিকের&#8217; অধীন। কিন্তু বাস্তবিকই কি জীবন ও লজিকের মাঝে কোনো অনিবার্য সম্পর্ক রয়েছে?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল স্বরূপ কোনো উন্নত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া কি সকল সময়ই জরুরী ? &#8230;. রোমান সাম্রাজ্যের উপর বর্বর উপজাতিদের আক্রমণে কোনো কল্যাণময় অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, আন্দালুসিয়া থেকে মুসলিমদের বহিষ্কারের ফলে কোনো উন্নত ব্যবস্থা সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ ইতিহাস মার্কসের পক্ষে নয়-ইতিহাসের ভিত্তিতেই জিজ্ঞেস করা যায়, জায়গীরদারী (Fcudal) ব্যবস্থার পর যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন তাতে জায়গীরদারী ব্যবস্থার কোনো উচ্চতর বৈশিষ্ট্য সুরক্ষিত থাকলো কিছু কিংবা গোলামী ব্যবস্থার অবসানের পর যখন জায়গীরদারী ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, তাতেই বা গোলামী যুগের কোনো বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট ছিল? চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে এর কোনো পরবর্তী ব্যবস্থাই তার পূর্ববর্তী ব্যবস্থার কোনো বৈশিষ্ট্যই বাকী থাকে নি। কেননা কোনো চিন্তা বা কর্মমুখর আন্দোলনের লজিক্যাল পূর্ণতার পর তার বিপরীত ভাবধারা যখন ফুটে বের হয়, তখন নতুন ভাবধারা পূর্বতন আন্দোলনের সাথে মিলে কোনো উন্নততর ও নবতর সংযোজন সৃষ্টি করে না। বরং প্রায়শই দেখা যায়, পরবর্তীটি পূর্ববর্তীর মূলোৎপাটন করে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে, সেখানে পূর্ববর্তী আন্দোলনের সকল দিকই নিঃশেষ হয়ে যায়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসের ডায়ালেকটিক্যাল ম্যাটেরিয়ালিজম সম্পর্কে আরও প্রশ্ন ওঠে। মার্কসের মতে ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ ও অগ্রতির মূলে প্রকৃত কারণ ও উদ্গাতা (Factor) হচ্ছে অর্থনৈতিক শ্রেণিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামে। শ্রেণি সংগ্রাম না হলে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিও কোনো কাজ করে না।</span><b> অথচ সকল প্রকার গতি ও উন্নতিমূলক ভিত্তি স্থাপিত হচ্ছে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির ওপর। মার্কস সেকথা বলেন নি। শ্রেণি সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে এই ঘাদিক পদ্ধতির পরিণাম কি হবে?</b><span style="font-weight: 400;"> কেননা মার্কসের মতে কমিউনিস্ট সমাজে শ্রেণি পার্থক্য বলতে কিছুই থাকবে না এটা Classless society হবে, অতএব Class war বলতেও সেখানে কিছু থাকবে না। তা হলে কমিউনিস্ট সমাজে যে উন্নতি ও অগ্রগতি সম্পূর্ণরূপে স্থগিত হয়ে যাবে সে কথা কি মার্কসবাদীরা একবারও ভেবে দেখছেন? আসলে এর কোনো জবাব মার্কসের নিকট নেই। যা তিনি বলতে চেয়েছেন, তা গোজামিল ছাড়া কিছুই নয়, কোনো চিন্তাশীল মানুষই তাতে প্রভাবিত হতে পারে না।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>২. অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় দর্শনে সকল প্রকার সামাজিক পরিবর্তন বিবর্তনের মূল কারণ হচ্ছে অর্থনীতি- Economic Factor: আর একেই বলে Economics Determinisum; কিন্তু মুশকিল এই যে; Economic Factor বলতে মার্কস কি বোঝাতে চান, যে সম্পর্কে সব মার্কসবাদীই একমত নন। সে যাই হোক এ ব্যাপারে যত মতভেদহ হোক না কেন এবং মার্কসবাদীদের এ ব্যাপারে যত অজুহাত থাক না কেন, সবকিছুই পরিবর্তন বিবর্তনের মূলে অর্থনীতিহ যে মূল, এতে তাদের মাঝে কোনো মতভেদ নেই। অথচ সমাজ-বিপ্লবের ইতিহাস যারা অধ্যয়ন করেছেন তাদের এ কথায় কোনো দ্বিমত নেই যে, সামাজিক পরিবর্তন বিবর্তনের বিবিধ কারণ থাকতে পারে এবং থাকেও। তন্মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বা ব্যবস্থাও যে একটা কারণ অনেক সময় অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। তাই মার্কসের এই আর্থিক ব্যাখ্যাও সম্পূর্ণ সত্যি নয়- আংশিক সত্য, তাও মেনে নিতে কোনো দ্বিধা নেই। অর্থাৎ সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে অর্থনীতিও The factor &#8211; Out of the factors মাত্র। অতএব মার্কসের ইতিহাস ব্যাখ্যা একদেশদর্শী, বহুবিধ শক্তির পারস্পরিক গাত-প্রতিঘাতেই সামাজিক পরিবর্তন সূচিত হয়। তাই মার্কসের Monistic Interpretation of History রীতিমত ভুল Pluralistic Interpretation of History-ই অধিকতর বিজ্ঞান সম্মত।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায়। অর্থনীতি সবকিছুর মূলে এবং অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটলে তবেই অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে, এ কথা না হয় কিছু সময়ের জন্য ধরে নেয়া গেল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থনীতিতেই কেন অন্যান্য সব কিছুর আগে পরিবর্তন ঘটে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তরই মার্কসবাদীরা দিতে পারেন নি। অর্থনীতিকে যদি স্বয়ংক্রিয়াশীল-Self-starter-ও ধরে নেয়া হয়, তবুও অর্থনীতির সে অজেয় রহস্যময় রূপ, রহস্যই থেকে যায়। Sorokin-এর ভাষায় বলতে হয়, </span><b>The hypothesis of the self-starter amounts to the worst kind of mysticisen where the economic factor economics a kind of god.</b><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<h2></h2>
<h4><b>৩. সমাজ বিপ্লব ও শ্রেণি সংগ্রাম</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসের মতে কেবল শ্রেণি সংগ্রাম হচ্ছে সমাজ বিবর্তনের একমাত্র নিয়ামক। তিনি ইতিহাসে কেবল শ্রেণি সংগ্রামই দেখতে পেয়েছেন। তাই সংগ্রাম এবং সংঘর্ষ ছাড়াও যে সমাজে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে তা মার্কসের চোখে ধরা পড়েনি। তাই এ হচ্ছে An inadequate explanation । কিন্তু বাস্তবিক সংঘর্ষই একমাত্র শক্তি নয়। সমাজে সদিচ্ছা ও সহযোগিতাও বিবর্তনের জন্য বহু কাজ করে। কোপার্টিন-এর মতে &#8220;The law of organic evolution is primarily a law of mutual aid, not of conflict.&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কেবল সহযোগিতা ও বিবর্তনের পারস্পরিক সদিচ্ছার ফলেই সমাজে পরিবর্তন এসেছে এ কথা বলাও যেমন অভিরঞ্জন, তেমনি কেবল সংঘর্ষই হচ্ছে পরিবর্তনের একমাত্র নিয়ামক, একথা বলাও আরো একটি অতি বড় অতিরঞ্জন। তবে শেষের অতিরঞ্জণ অপেক্ষা প্রথমোল্লেখিত অতিরঞ্জণই যুক্তিসঙ্গত। অতএব শুধু Conflict বা সংঘর্ষের চশমায় মার্কসবাদ রীতিমত একপেশী হয়ে দাঁড়িয়েছে।</span></p>
<p><b>Sorokin-এর ভাষায় : &#8220;They have taken only one side of the coin and forgetten the other&#8221;</b><span style="font-weight: 400;">. তারপর এ Conflict-কে মার্কস কেবল অর্থনীতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ করতে চান। তার মানে, সমাজে যত সংঘর্ষ হচ্ছে তা কেবল অর্থনীতির জন্যই, অন্য কিছুর কারণে নয়। কিন্তু একথা রীতিমত স্থূল। সামাজিক সংঘর্ষের ইতিহাসে অর্থনীতিই একমাত্র কারণ নয়, তার মাঝে আদর্শবাদও যে একটা প্রধান কারণ, তা ইতিহাসবিদ মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য। ফরাসী বিপ্লবই তার বড় দৃষ্টান্ত। মার্কসের মতে এ বিপ্লব হয়েছিল কেবলমাত্র অর্থনৈতিক কারণে। কিন্তু আমরা দেখছি তার বিপরীত। ফ্রান্সের তদানীন্তন সরকারের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম যারা আওয়াজ তুলেছিলেন তাঁরা ছিলেন সে দেশের চিন্তাশীল শিক্ষিত সমাজ- সমাজের Intelligentsia, তারা কোনো অর্থনৈতিক শ্রেণির মধ্যেই গণ্য হতে পারেন না এবং সে কারণও ছিল না সেখানে। সংগ্রামীদের মধ্যে যেমন ছিল গরীব লোক, তেমনি ছিল বিপুল সংখ্যক স্বঞ্চল অর্থশালী লোকও। ইউরোপের ধর্মীয় যুদ্ধসমূহও এইরূপ। কাজেই সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস কেবল Economic Determinism- বলতে সমাজ বিপ্লবের ইতিহাসের কোনো জিনিসই নেই।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>৪. জড়বাদ বা বস্তুবাদ</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় দর্শনের মূলকথা হচ্ছে জড়বাদ। এ দুনিয়ায় &#8216;হাড়ই&#8217; হলো আদি ও অকৃত্রিম ।  ক্রমঅভিব্যক্তির পথে এ &#8216;জুড়&#8217; থেকেই প্রাণ, চেতনা বা মনের সৃষ্টি। অর্থাৎ মার্কসীয় মতে বস্তুই জীবনের রূপে পরিগ্রহ করেছে, সে জীবন থেকেই চেতনা এবং সেই চেতনা থেকেই মনের সত্তা গড়ে উঠেছে। খোদা বলতে তাদের মনে কোনো কিছু নেই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">(* এই পর্যায়ে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে আধুনিক ইরানে যে সর্বাত্মক ইসলামী বিপ্লব সাধিত হয়েছে, মার্কসীয় দর্শনের ভ্রান্তি প্রমাণের জন্য তা অকাট্য সাক্ষ্য। বিপ্লবীরা মার্কসকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিল তোমার মত কেবল অর্থনৈতিক কারণেই বিপ্লব হয়। তুমি কবর থেকে বের হয়ে এসে দেখে যাও আমরা কোনো অর্থনৈতিক কারণে বিপ্লব করিনি, বিপ্লব করেছি কেবলমাত্র ঈমান ও ইসলামের জন্য।)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এ মতের পিছনে যথার্থ কোনো বৈজ্ঞানিক সমর্থন আছে কি? আঠারো শতকের বিজ্ঞান নয়, ঊনবিংশ অথবা বিংশ শতকের বিজ্ঞান-আধুনিক বিজ্ঞান এ বস্তুবাদ স্বীকার করে কি? তা এ জন্য বলছি যে, আঠারো শতকের বিজ্ঞান ছিল নেহাতেই যান্ত্রিক, হস্তবিজ্ঞানের যুগ, জড় বিজ্ঞানের যুগ। সে যুগে &#8216;জড়&#8217; নিয়েই ছিল বিজ্ঞানের কারবার। উদ্ভিদ থেকে মানুষ-সবই ছিল যন্ত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ। মন বা প্রাণকে যে দিন বলা হতো &#8216;ও কিছু নয়, ও শুধু কতগুলো জড়কোষের সমবায়ের ফল মাত্র। দৃষ্টান্ত হিসেবে গলিত মাংসের মাঝে নিজ থেকেই অসংখ্য জীবকণা সৃষ্টি হওয়ার কথা উল্লেখ করা হতো। কিন্তু পরের যুগে-লুই পাস্তর-এর জীবাণু বা  </span><span style="font-weight: 400;">Bacteria</span><span style="font-weight: 400;">  আবিষ্কারের পর এ ধারণা তাদের বদলাতে হয়েছে। এখন প্রমাণিত হয়েছে যে, জীৰ তথা জীবন থেকেই জীবনের সৃষ্টি, আপনা থেকে এ হতে পারে না। কিন্তু যে জীব তথা জীবন থেকে সৃষ্টিধারা শুরু হলো তার মূল কোথায়? প্রথম জীব কণাটির স্রষ্টা কে? আর এই জড় পৃথিবীতেই বা জীবনের উদ্গম হলো কী করে? জড়বাদীরা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম। &#8230;..অন্ততঃ সত্যিকার বিজ্ঞানসম্মত কোনো উত্তরই আজ পর্যন্ত দেয়া সম্ভব হয় নি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্থূল দেহতে আশ্রয় না করলে প্রাণ কখনো আত্মপ্রকাশ করে না। তাই যদি বলি প্রাণশক্তি চিরকালই ছিল, শুধু যোগ্য আধার পাওয়ার অপেক্ষায় বসেছিল। যখন প্রাণ সে পাত্র পেল তখনই সে প্রাণ আত্মপ্রকাশ করলো। এই প্রাণেরই স্রষ্টা হচ্ছে আল্লাহ-দেহেরও যেমন তেমনিভাবে জড়েরও স্রষ্টা তিনি। তাহলে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একথাটা অযৌক্তিক হবে কিন্তু বস্তুবাদ বা জড়বাদ যে আজ বাতিল হয়ে আছে, তা আমরা আরেক দিক থেকেও দেখতে পাচ্ছি। বস্তু কী, বস্তুর শেষ কোথায়?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ঊনবিংশ শতকেও এর শেষ কথা ছিল Atom অণু। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে একথা মিথ্যা হয়ে গেছে। এখন ইলেক্ট্রন ও প্রোটন আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে যে, জড়বস্তু আর জড় নয় বরং নেহাতই সূক্ষ্ম শক্তির পুঞ্জীভূত বাহারূপ মাত্র। তাই বলতে হয়, জড়বাদীদের জড়ই আজ জড়ত্ব হারিছে ফেলেছে-Matter বা বস্তু নয়।</span><b> বস্তুর এই অবস্থা দেখে Russell বলেছিলেন, &#8220;জড়বাদ বেঁচে নেই, তার মৃত্যু ঘটেছে&#8221;</b><span style="font-weight: 400;"> Matter এবং Mind-54 ব্যাখ্যায় তাই বলতে হবে : বিশ্বসংসারের সব কিছুর আড়ালে সর্বব্যাপী এমন এক মহান মন-রয়েছেন, যাঁর ইচ্ছাশক্তিই কাজ করেছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বর্তমান প্রকৃতি ও পদার্থ বিজ্ঞান তার বস্তুভিত্তি ত্যাগ করেছে মোড় ঘুরিয়ে নিয়েছে। জিগ-এর ভাষায় Modern physics moving in the direction of philosophical idealism. অতএব জড়বাদ বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে কোনো জীবন দর্শন দাঁড় করানো একেবারেই অর্থহীন। এজন্য যে Scientific materialism is may more scientific today. তাই রুশ বিপ্লব যেমন যুক্তিহীন, তেমনি ভিত্তিহীন রাশিয়ান রাষ্ট্রের অবস্থিতি। এখনো আরও দুটো কথা রয়ে যায়। দ্বন্ধ যে চিরন্তন চিরকাল থেকেই এর অস্তিত্ব, একথার প্রমাণ কোথায়? &#8216;দ্বন্ধ&#8217; কে তো মানুষই অনুভব করতে পেরেছে। মানুষের চেতনা ও মন সৃষ্টির পূর্বে এ দুনিয়ায় কী ছিল, আর কী ছিল না, সে জ্ঞান লাভ করার জন্য তখন কে উপস্থিত ছিল? জড়বাদ বা বস্তুবিজ্ঞান তা কী করে জানতে পারে?</span></p>
<blockquote><p><b>এর জবাবে মার্কসবাদীরা Fossils-কে নিদর্শন স্বরূপ পেশ করেন। কিন্তু তাতে বরং একথাই প্রমাণিত হয় যে, সরাসরি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে জ্ঞান অর্জনই মানুষের পক্ষে জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায় না। বরং কোনো জিনিসের নিদর্শন-Sign-দেখেও অপর কোনো জিনিসের অস্তিত্বের সন্ধান মেলে এবং তা নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করা যায়। আধুনিক দর্শনের ভাষায় তাকে বলা হবে Inference,</b><span style="font-weight: 400;"> তাহলে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করার যৌক্তিকতা কি হতে পারে, যখন তার অস্তিত্বের প্রমাণ করছে আকাশ বাতাস পৃথিবী-গোটা দৃশ্যমান জগৎ এবং প্রতিটি অণু-পরমাণু?</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">দ্বিতীয়ত &#8216;বস্তু&#8217; নিজে নিজেই কি করে অস্তিত্ব লাভ করলো? মার্কসবাদীরা কি প্রমাণ করতে পারেন যে, “বস্তু সৃষ্টির আদিকাল থেকেই বর্তমান ছিল। নিজে নিজেই কি তা অস্তিত্বমান হয়েছিল? তা দাবি করা হলে বলতে হয়, কেবল মাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান ছাড়া আর কোনো জ্ঞানকেই যারা কোনো জ্ঞান বলে বিশ্বাস করে না, তাদের পক্ষে এটা নিতান্ত গোঁড়ামী ছাড়া আর কিছু নয়। আর &#8216;বস্তুতেই যদি এভাবে স্বীকার করা যেতে পারে, তাহলে আল্লাহকে স্বীকার করতে বাধে কোথায়? &#8216;দ্বন্ধ&#8217; যদি Self existent হতে পারে, তবে আল্লাহ তা হতে পারবেন না কেন? প্রশ্ন হতে পারে যে, আল্লাহই যদি বিশ্ব নিখিলের স্রষ্টা হবেন, তাহলে আমরা তাঁকে দেখতে পারছি না কেন? এর উত্তর খুবই সহজ এবং সোজা। আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেখে যে, যে জিনিসের অস্তিত্ব যত স্থূল, তা তত সহজেই দেখা যায়, অনুভব করা যায়। আর যে জিনিসের সত্তা যত সূক্ষ্ম, তা দেখা ও অনুভব করা ততই কঠিন। তাছাড়া অস্তিত্বের মর্যাদা ও স্তর বা পর্যায়ের দৃষ্টিতে যে জিনিস যত বেশী উচ্চ ও উন্নত, সে জিনিস সে হিসেবেই ততো সূক্ষ্ম-ইন্দ্রিয় ও অনুভূতির নাগালের তত বাইরে। মানুষের বাহ্যদেহ আকার আকৃতি রূপ স্থূল তা সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য। কিন্তু গুণ ও মেধা তা কি একজনকে দেখলেই বুঝতে পারা যায়- বা অনুভব করা যায়?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আরও দেখুন। মানুষের বাহ্য দেহের তুলনায় তার ভিতরকার প্রাণ-রূহ কত সুক্ষ্ম। তাই মানুষের স্থূল দেহ অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গ ধরা-ছোঁয়া গেলেও তার রূহকে </span><span style="font-weight: 400;">না ধরা যায় না দেখা যায়। শুধু মাত্র তার ক্রিয়াকাণ্ডের সাহায্যে তার অস্তিত্বই অনুভব করা যায় মাত্র। পৃথিবীতে সদা প্রবাহমান বাড়াসও কি সেরূপ </span><span style="font-weight: 400;">তাই আল্লাহ কোনো স্থূল জিনিসের নাম নয়। সূক্ষ্মতায় তিনি তুলনাহীন। এ কারণে ইন্দ্রিয় শক্তির সাহায্যে তাঁকে দেখা সম্ভব নয়। আর অস্তিত্ব ও সত্তার মর্যাদা এবং মাত্রার বিচারেও তিনি সর্বোচ্চ, তাই তাঁকে অনুভব করা ততই কঠিন। আরও একটি বলা আছে। মানুষের দেহের অস্তিত্ব অনুভবের জন্য স্থূলবর আবশ্যক, যেমন-চোষ, হাত ইত্যাদি; কিন্তু এই স্কুল ইন্দ্রিয় শক্তি দ্বারা মানুষের মেধা ও প্রতিভাকে ধরা যায় না, বোঝা যায় না। আল্লাহকে দেখার জন্য যে দৃষ্টিশক্তির দরকার, তা এই বস্তুজগতে সম্ভব নয়। বস্তুজগত শেষ হয়ে গেলে আল্লাহকেও দেখা যাবে বৈকি।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>৫. জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে সূত্র এবং চিরস্থায়ী সত্য</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">External Experiment বাহ্যিক অভিজ্ঞতা ছাড়া মানবীয় দর্শনে জ্ঞান লাভের আর কোনো উৎসই স্বীকৃত নয়। তাই ওহী, ইলহাম বা চিরস্থায়ী সত্যকে মার্কসীয় দর্শন স্বীকার করে না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ সম্পর্কে প্রশ্ন দাঁড়ায়, মানুষ তার যাবতীয় চিন্তা ও জ্ঞানসম্পদ বাহ্যজগত থেকে গ্রহণ করে, একথা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু যে মানবীয় মন এই জ্ঞান আহরণ করে, সেই জ্ঞানের রূপায়ণে ও সুসংবদ্ধকরণে তার নিজের অর্থাৎ মনের কী ভূমিকা থাকে? তাতে স্বয়ং মনের কি কোনো অংশই থাকে না? &#8230;..এমন কী জ্ঞান আহরণ করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে? মন নিজ থেকে তাতে কোনরূপ রদবদল না করেই কি তা গ্রহণ করে? অন্যথায়, বাহ্যজগত থেকে জ্ঞান আহরণে মনের ভূমিকা কি নিছক একটি ক্যামরার মতো Rocciving-এর কাজ করার; নাকি অন্য কিছুর? তা-ই যদি হবে তাহলে তো একই সময়ে লালিত-পালিত সকল লোকের চিন্তা ও মতবাদ সর্বতোভাবে একই রকমের হওয়া আবশ্যক। কেননা সকলের অভিজ্ঞতাই সমানভাবে এক ও অভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে তা সত্য মনে হয় না। মন এক স্বাধীন ও স্বয়ং সম্পূর্ণ রূপায়ণ শক্তি, জ্ঞানের সম্পদ ও তথ্য বাহির থেকে গ্রহণ করলেও মন তাকে হবহু গ্রহণ করেন না, যেমন-ক্যামেরা গ্রহণ করে। বরং মন তাতে নিজের ইচ্ছামত ঢেলে দেয়। এ কারণেই মানুষের চিন্তা ও মতাদর্শ রচনাকারী শক্তি হচ্ছে মানুষের মন। নিছক বাহা অভিজ্ঞতাই শুধু নয়, এই মন বিভিন্ন-এই মনের শক্তিও বিভিন্ন নবী রাসূলগণের মন ও দার্শনিক বিজ্ঞানীদের মনের মাঝে আসমান জমিনের শুরুতে রয়েছে। সকলেই বাহাজগত থেকে জ্ঞান আহরণ করে। তবে বাহাজগত সকলের এক নয়। চিন্তাবিদ দার্শনিকগণ যেখানে এই দুনিয়ার চলচলন গতিধারা ও অবস্থার মধ্যে থেকে জ্ঞান আহরণ করেন, নবী রাসূলগণ জ্ঞান গ্রহণ করেন আল্লাহর নিকট থেকে। চিন্তাশীল দার্শনিক বৈজ্ঞানিকদের আহরিত জ্ঞান যদি মানুষের জৈর জীবনের জন্যে প্রয়োজন, তাহলে মানুষের মানবিক তথা নৈতিক জীবনের জন্য প্রয়োজন নবী রাসুলগণ কর্তৃক আহরিত জ্ঞান। মার্কসীয় দর্শনে কোনো চিরস্থায়ী সত্যও স্বীকৃত নয়। সম্পর্কে আমার বক্তব্য শুধু এতটুকু যে, সত্য যদি কেবল সময়, কাল ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা-ভিত্তিকই হয়- হয় আপেক্ষিক, এবং সময় কল ও অবস্থায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সে সত্যও যদি বদলে যায়, আর সত্যের এই পরিবর্তন যদি হয় এই করণে যে, যে নিয়মকে ভিত্তি করে এ সত্য দাঁড়িয়েছিল, সে আইন ও নিয়মেরই পরিবর্তন হয়ে গেছে, তা হলে বলতে হয় এ বিশ্বজগতই এক দুফো রহস্য ছাড়া আর কিছু নয়। আর বিজ্ঞানীগণ যত মত, চিন্তা ও আদর্শের কথা বলেছেন, পেশ করেছেন যত তত্ত্ব ও তথ্য, তা সবই ভুলে ভরা, বিশ্বাসের অযোগ্য। কেননা বিশ্ব-নিখিলকে আমরা কেবল সাধারণ আইন (General laws)-এর দ্বারাই বুঝতে পারি। কিন্তু এই আইন যদি পরিবর্তনশীলই হয়, তাহলে দুনিয়ার ঘটনাবলীর নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করা কখনোই সম্ভব হতে পারে না। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ ধরুন, বর্তমানে এ এক সর্বসম্মত মত। কিন্তু প্রাকৃতিক আইনকে যতি নিত্য পরিবর্তশীলই ধরে নেয়া হয়, তাহলে এই আপেক্ষিকতাবাদ কেই বা আমরা কীভাবে নির্ভরযোগ্য মনে করতে পারি? আইনস্টাইনের এ মত রচনার পর বর্তমানে প্রকৃতি কোনো নতুন নিয়মে চলতে শুরু করেনি, তা কি নিশ্চিতভাবে বলা যায়? আর আপেক্ষিকতাবাদ-Law of Relativity-র স্থানে নতুন যে নিয়মে এসে দাঁড়িয়েছে, তাকে ভিত্তি করে আজ গবেষণা শুরু করলে সেই গবেষণা শেষ হবার পূর্বেই হয়তো সে নিয়ম বদলে গেছে এবং আবার এক নতুন নিয়ম এসে সেখানে জায়গা দখল করে বসেছে। আর প্রকৃতির অবস্থা যদি এরূপ হয়, তা হলে বাহ্য জগত থেকে কোনো জ্ঞান আহরণ এবং সে জ্ঞানকে &#8216;জ্ঞান&#8217; বলে মনে করে তার ওপর নির্ভর করা কিছুতেই এবং কখনই মুক্তিসংগত বা বুদ্ধিমানের হতে পারেনা। আর তা হচ্ছে এক চরম অনিশ্চিত অবস্থাও। কিন্তু মানুষ এই অনিশ্চিত অবস্থায় কিছুতেই স্থিতি ও স্বস্তি পেতে পারে না। মানুষের জন্য চাই স্থির নিশ্চিত জ্ঞান- চাই চিরস্থায়ী অপরিবর্তনীয় সত্য। আর প্রকৃতি যে সেরূপ জ্ঞানই দেয়-দিতে পারে, তাতে কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক লোকেরই সন্দেহ থাকতে পারে না।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>৬. রাষ্ট্র</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় মতে রাষ্ট্র সব সময়ই জুলুম শোষণের সাহায্যকারী হয়েছে। কেননা এর উৎপত্তিই হয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানা রক্ষার জন্য নিতান্ত অর্থনীতির কারণে। কাজেই এ ধরনের রাষ্ট্রে যে শ্রেণী সংগ্রামের উদ্ভব হবে তা-ই Leads to the dictatorship of the proletariat এবং This dictatorship itself only constitutes The ransition of all classless society এবং সেখানে কোনো রাষ্ট্রের প্রয়োজন হবে না। রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসীয় মত স্বীকার্য কিনা, তার বিচার করার জন্য আমাদের একটু ভাবতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাষ্ট্র মানুষের জীবনে ঠিক কখন কীভাবে উদ্ভূত হয়েছিল সে চিন্তা অবান্তর। তবে রাষ্ট্র যে মানুষের জীবনে অপরিহার্য তাতে কারো সন্দেহ থাকতে পারে না। কেননা, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব, দলবদ্ধ হয়ে থাকার চেষ্টা মানুষের জন্মগতই। তাই রাষ্ট্র যে বিভিন্ন দিক দিয়ে Common interest-কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল, সে সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দ্বিমত নেই। আর সে সমস্বার্থ যে অর্থনীতিভিত্তিক ছিল তা কিছুতেই বলা যেতে পারে না। রাষ্ট্র গঠনের মূলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে-Force of state building হিসেবে কাজ করে রক্ত (Kinship), জাতিত্ব, ধর্ম-Religion industry ও যুদ্ধ। আর এ সব কিছুর মূলে রয়েছে The focling of unity and solidarity এ কারণে রাষ্ট্র শুধু গঠিতই হচ্ছে না, দিন দিন তার শ্রী বৃদ্ধিও হচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে শান্তি, শৃংখলা স্থাপন ও অত্যাচার-অনাচারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশ্রয়ের প্রয়োজনেই বহুরকমের শক্তি ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে রাষ্ট্রের উদ্ভব- R. C. Gottell তার Polotical Science-এ লিখেছেন। came into existence gradually as the natural result of many and diverse forces resulting from the need of men for order and protection.&#8221;রাষ্ট্রের উদ্ভব যেভাবেই হোক না কেন, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রশক্তির ব্যবহার Sate and Government এক নয়-এ দুটো জিনিস আলাদা এবং আলাদাভাবেই তার যাচাই ও বিচার হওয়া উচিত। তাই রাষ্ট্র ঠিক থাকলেও হতে পারে যে, গভর্নমেন্ট খারাপ লোকের হাতে গড়ে তার অপব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রটি তো আর খারাপ হয়ে যায়নি। ইতিহাসে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রশক্তি অত্যাচার ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যেমন, তেমনি Human consolidation and wellbeing-এর কাজেও তার অবদান কোনো অংশে কম নয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাজেই সমাজ জীবনে ব্যক্তিগত মালিকানা কখনো যদি লোপ পায় , যদিও পাওয়া সম্ভব নয় অবশ্য তা হলেও রাষ্ট্রের প্রয়োজন কখনো ফুরাবে না, ফুরাতে পারে না। কেননা রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তিগত মালিকানার কারণে ও তাকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠেনি। আমরা দেখছি, মার্কসবাদ Proletariat-দের ডিকটেটরশিপের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে Fascist রূপে একান্ত অপরিহার্য হিসেবে মেনে নিচ্ছে; কিন্তু তাদের দ্বারা বুর্জোয়া নিধন কার্য সম্পন্ন হবার পর যখন Social unit- Levelling বা সমতাবিধানের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে, তখনি হবে মার্কসবাদী রাষ্ট্র বিলুপ্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু মানুষ রাষ্ট্রের প্রয়োজন থেকে কখনো নিষ্কৃতি পেতে পারে না।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের জীবন কেবল শ্রেণি স্বার্থেই সীমাবদ্ধ নয়, তাদের জীবনের আরও অনেক দিক আছে, আছে অনেক দায়-দায়িত্ব। সেগুলোকে নিয়ন্ত্রিত ও সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকবে ততদিন, যতদিন ধরিত্রীর বুকে মানুষ নামক জীব বাস করতে থাকবে। অধ্যাপক লাঙ্কির ভাষায়: &#8220;To live with others is the condition of rational existence. There is in implied the necessity of government, Since the activities of a civilized community are too numerous and too complex to be left unregulated.&#8221; তাই মানুষের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত State-এর প্রয়োজন আছে এবং থাকবে। তার থাকার উদ্দেশ্য হবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায় Only to enable the mass of men to realize social and on the largest possible scale. শেষ কথা, শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থের খাতিরেই যে রাষ্ট্রের উৎপত্তি এবং স্বার্থের অবসান হলেই যে রাষ্ট্রের অবসান হবে, মার্কসবাদীদের এ বিশ্বাস একান্তই অন্ধবিশ্বাস, এক অলীক কল্পনাবিলাস। কারণ রাষ্ট্রের উদ্ভব শুধু একটি কারণেই </span><span style="font-weight: 400;">ঘটেনি, বহু কারণই তার রয়েছে। আর মানুষের  জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে কারণগুলো কোনো না কোনো রূপে (Form) এ অবশ্যই বর্তমান থকবে।</span></p>
<h2></h2>
<h4><b>৭. মানুষ ও ধর্ম</b></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">ধর্মের প্রয়োজন আছে কি? এ প্রশ্নের জবাব মার্কসীয় দর্শনে নির্ভুল জবাব মিলতে পারে না। কেননা Man is a spiritual being&#8217; বলতে মানুষের যে দিকের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তার কোনো চর্চা বা গবেষণা করেনি সে বিজ্ঞান-যার ওপর মার্কসীয় দর্শনের ভিত্তি। বিজ্ঞানের এত দিনকার যা কিছু শিক্ষা তাতে যান্ত্রিক বিবর্তনের নেহাৎই একটি যান্ত্রিক উৎপাদন হিসেবেই মানুষের বিচার, মানুষের পরিচয়। একদিকে অন্ধ ডারউইনীয় জীবন-সংগ্রাম আর অপরদিকে ওয়াটসনের আচরণবাদ Behaviourism-এদুয়ের মাঝে জড়জগতের ফর্মুলা ছাড়া আর কিছুর জায়গা নেই সেখানে। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ এ ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। এখনকার বিজ্ঞান বলে &#8220;Science cannot deny that man recognize and acclaims truth goodness and beauty in all their forms, means higher activities are promoted and sustained by spiritual ideas by his aspirations towards truth Goodness and beauty&#8221; (Religion and the science of lift by M.C, Dougali)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বস্তুত জড়বিজ্ঞানের ফর্মুলা যে জীববিজ্ঞানে চলে না, একথা আজ বিজ্ঞান জগতেই স্বীকৃত। স্বয়ং J. H. Halane এ বিষয়ে বলেছেন &#8220;Physical science cannot express or describe biological phenomena so that its claim to represent objective reality cannot be admitted. আর ধর্মকে নিছক কু-সংস্কার বলে জড়িয়ে দেয়াও কোনো যুক্তিসংগত কাজ নয়। প্রকৃতির ভয় আতংক থেকে রক্ষা পাওয়ার ইচ্ছা এবং বুর্জোয়াদের শোষণ পীড়নের যথার্থতা প্রমাণই যে ধর্মের উদ্ভবের কারণ, একথা কেবল গায়ের জোরেই বলা যেতে পারে। ধর্মের মূলত যে কাজ, তা মানুষের সহস্রাত ধারারই অভিব্যক্তি। মানুষ এই বিশ্বপ্রকৃতি দেখে কেবল ভয়ই পায় না, অসংখ্য ও অফুরন্ত নিয়ামত পেয়ে মানুষ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণও করে তাই মানুষের জীবনের Higher values ধর্মকে মানা আল্লাহর সমীপে নিজেকে সোপর্দ করে দেয়া যে তার একটি বিশেষ অঙ্গ, একথা অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ধর্ম যদি শাসক শ্রেণির শোষণ ও নিষ্পেষণের হাতিয়ার হয়েও থাকে, তবে তা খৃষ্টানধর্ম, হিন্দু ধর্ম &#8230; ইসলাম নয়। কেননা ইসলাম সে রকম কোনো ধর্মই নয়, যা মানুষের হাতের শোষণ পীড়নের হাতিয়ার হয়ে থাকে, ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন পদ্ধতি, যা শাসক ও শাসিত নির্বিশেষে সকলেই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে পালন করে চলতে বাধ্য। মূলত রাষ্ট্র ও সরকারকেই গঠিত হতে হয় চলতে হয়-দায়িত্ব পালন করতে হয় ইসলামের বিধান অনুযায়ী। তাই তা কারোর হাতিয়ার হয় না।</span></p>
<h2></h2>
<h4><strong>৮. পারিবারিক জীবন</strong></h4>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কসীয় দর্শন মতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রথার কারণেই পরিবার গড়ে উঠেছে এবং এই প্রথার বিলোপ হলেই পরিবার খতম হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পরিবার প্রথারও বিলুপ্তি কি সম্ভব? পরিবার ব্যবস্থা কি এতটাই ঠুনকো? এ সম্পর্কে যত চিন্তা করা হবে প্রমাণিত হবে যে, পরিবার প্রথার উৎপত্তি সম্পর্কে মার্কসীয় দর্শন সম্পূর্ণ ভুল মত পোষণ করে। অতএব তার ভবিষ্যদ্বাণীও ভিত্তিহীন। কেননা কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তির কারণেই পরিবার হয়নি। মানুষের যৌনবৃত্তি, যৌবনের তাগিদ, তার সঙ্গীর সক্রিয় অনুভূতিপ্রবণ মন এগুলোও মানুষের পারিবারিক জীবনের ভিত্তিভূমি। ভাই&#8221;Being the result of plural forces the family will not get abolished by the abolition of private property&#8221; তবু জোর করেই যদি পরিবার প্রথা খতম করা হয়, তাহলে তার বিনিময়ে আমরা কী পাব? মানুষের প্রকৃতিতে তার ব্যক্তি জীবনে সে এমন একটা জায়গা চায়, যেখানে নিজের খুশীমত হাত পা ছড়িয়ে সে বলতে পারবে &#8216;এটা আমার পরিবারই হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্ববোধ তথা তার স্বাধীন বিচরণের ক্ষেত্র। এখানে সে তার মায়ের ছেলে, স্ত্রীর-স্বামী, বোনের ভাই, সন্তানের পিতা। এরা তার সম্পত্তি নয়, এদের মায়ার বন্ধনে সে বাঁধা এবং এতেই তার পরম তৃপ্তি। এখানেই তার নিজস্ব সঞ্চরণ সম্ভব হতে পারে। কিন্তু পরিবারকে লুপ্ত করে দিলে ব্যক্তির এ বিকাশের ক্ষেত্রটাকেই একেবারে শিকড় ধরে টান দিয়ে উপড়ে ফেলা হবে। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষের ব্যক্তিত্বটাই দমবন্ধ হয়ে মারা পড়বে। কেননা ব্যক্তির জন্যই পরিবার প্রয়োজন একথা ঠিক নয়। মানুষের সামাজিক জীবনেও প্রেম, প্রীতি ও ভালোবাসায় আবদ্ধ এ সুখনীড় একান্তই জরুরী।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সহজ কথায়, মানুষের মিলিত জীবনের সৌন্দর্য সমন্বয় ও কল্যাণের সাধনায় পারিবারিক জীবনের সেই প্রীতি ভালোবাসার শিক্ষাই হয় তার প্রধানতম ভিত্তিভূমি। তাই পরিবারকে বিচার করতে হবে মানুষের সমাজ জীবনের প্রথম Unit হিসেবে। পারিবারিক জীবনের ছোট্ট গণ্ডিতেই মানুষ শিখতে পারে পরার্থে নিজের সুখ-সুবিধা কী করে বিসর্জন দিতে হয়। কেননা The highest developments of altruism have owed muone to the family and the home than to any other influence The home and the family have fostered and developed love in the human race গত মহাযুদ্ধের সময়ে ও পরে অসংখ্য মা-বাপহাৱা শিশুর পালন কেন্দ্র খোলা হয়। এতে লালিত-পালিত শিশুদের পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যেসব শিশুকে বহু ধাত্রী লালন করেছে তাদের ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। বড় অস্থির, চঞ্চল, চরিত্রহীন হয়ে উঠেছে তারা। তাদের মধ্যে সহ ভালোবাসার কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। অবৈধ সন্তানদের মাঝেও দেখা গেছে হীনমন্যতা। পরিবারহীন সমাজের লক্ষ কোটি শিশু সঠিকভাবে মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে না।</span></p>
<h1></h1>
<h3><strong>শেষ কথা</strong></h3>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">আমার এই দীর্ঘ আলোচনা এখানেই শেষ করছি। আলোচনাটি দীর্ঘ হলেও মার্কসীয় দর্শনের ভ্রান্তি আমাকে খুব সংক্ষেপেই দেখাতে হয়েছে। কেননা এর ভ্রান্তি এত বেশি, এত বহুমুখী যে, তার সর্বদিক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দু&#8217;চারদিনের প্রয়োজন। তবে মোটামুটি ভাবে যা কিছু আলোচনা করা হলো, তার ভিত্তিতে এ কথা জোর করে বলা চলে যে, মার্কসীয় দর্শন একটা সুস্পষ্ট প্রতারণা মাত্র। মানুষকে তার মনুষ্যত্বের মহান মর্যাদা থেকে বিচ্যুত ও মানবীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য থেকে চিরতরে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এ দর্শন রচিত হয়েছে। যারা এ আলোচনা গভীর দৃষ্টিতে পাঠ করবেন, আমি আশা করি, মার্কসীয় দর্শনের বিভ্রান্তি থেকে তাঁরা নিশ্চয়ই মুক্তিলাভ করবেন। একজন লোকও যদি এ থেকে সে কল্যাণ লাভ করতে পারেন, তবে আমি বুঝবো, আমার আলোচনা স্বার্থক হয়েছে।</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">(“প্রবন্ধটি মূলতঃ ১৯৬১ সনে তদানীন্তন ঢাকাস্থ তা&#8217;মীরে মিল্লাত সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত ১০ দিন ব্যাপী ইসলামী সেমিনারে প্রদত্ত একটি ভাষণ। পরে &#8216;চিন্তাধারা&#8217; নামক সেমিনার সংকলনে এটি প্রকাশিত হয়। ১৯৭৬ সনে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রবন্ধ সংকলনেও তা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল।)</span></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/marx-and-marxist-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7091</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ডেভিড হিউম যেভাবে দার্শনিক হলেন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/how-daviid-hume-became-aa-philosopher/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/how-daviid-hume-became-aa-philosopher/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 06 May 2021 16:36:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ডেভিড হিউম]]></category>
		<category><![CDATA[ডেভিড হিউম যেভাবে দার্শনিক হলেন]]></category>
		<category><![CDATA[যেভাবে দার্শনিক হলেন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=5262</guid>

					<description><![CDATA[ডেভিড হিউম খুব ইন্টারেস্টিং একজন মানুষ। তিনি নিজেকে দার্শনিক হিসেবে উপাস্থাপন করার জন্য দর্শন বিষয়ক একটি বই রচনা করেন। কিন্তু এই বই বিক্রি হয় ৫ থেকে ৬ কপি। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য বইয়ের অধ্যায় সমূহকে আলাদা আলাদা করে পুনরায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ডেভিড হিউম খুব ইন্টারেস্টিং একজন মানুষ। তিনি নিজেকে দার্শনিক হিসেবে উপাস্থাপন করার জন্য দর্শন বিষয়ক একটি বই রচনা করেন। কিন্তু এই বই বিক্রি হয় ৫ থেকে ৬ কপি। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য বইয়ের অধ্যায় সমূহকে আলাদা আলাদা করে পুনরায় লিখে প্রকাশ করেন কিন্তু একই অবস্থা, বই আর বিক্রি হয় না।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই অবস্থা দেখে তিনি দার্শনিকগীরি বাদ দিয়ে ব্রিটেনের ইতিহাস লেখার সিন্ধান্ত নেন এবং ইংল্যান্ডের প্রথম ঐতিহাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">জানজাক রুশো এবং তার মধ্যকার বিতর্ক নিয়ে একটি বই রয়েছে। বইয়ের শিরোনাম হল, “ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ডেভিড হিউমের সাথে ফরাসী দার্শনিক রুশোর মধ্যকার বিতর্ক,”&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">Causality নিয়ে ডেভিড হিউমের ৩/৪ পৃষ্ঠার একটা লেখা আছে। খুবই ছোট একটা লেখা। পরবর্তীতে ইমানুয়েল কান্ট তার Synthetic A Priori র চিন্তাকে আরো উন্নত করার জন্য ডেভিড হিউমের ঐ ৩/৪ পৃষ্ঠার লেখাকে নিয়ে আসেন এবং সেটাকে আরও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় উন্নত করেন। এরপর থেকেই ডেভিড হিউম ও তার চিন্তাকে নিয়ে বই লেখা শুরু করেন। এভাবে ব্রিটিশরাও বিশ্ববিখ্যাত একজন দার্শনিক অর্জন করেন।</span></p>
<p><strong>ডেভিড হিউমকে দার্শনিক বানান মূলত কান্ট। কান্ট তাকে উল্লেখ না করলে হয়তবা সে কোনদিনও দার্শনিক হওয়ার মর্যাদা পেতেন না।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই কাহিনীর মাধ্যমে মূলত একটি বিষয়কে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। সেটা হল, আমাদের মুসলমানদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের ইতিহাসে এরকম এত পরিমাণে লোক ও তথ্য রয়েছে যে যা প্রকাশ করতে কয়কেটা বই লাগবে। যেমন এখন আমাদের জন্য যেটা সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন সেটা হল আমাদের সমাজ বিজ্ঞানের থিওরীকে উন্নত করা। যেভাবেই এটা আমাদের করতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সমাজ বিজ্ঞানের থিওরী সমূহ মূলত হল ইউটোপিয়া। জুরগেন হাবেরমাস, দুরখায়েমের থিওরীও ইউটোপিয়া। কারোর থিওরীই সমাজকে সত্যিকারভাবে রুপায়ন করতে পারে না। <strong>এটা ভুলে যাবেন না মার্ক্স, হেগেল সহ সকলের থিওরীই ইউটোপিয়া।</strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এখানে আমাদের করনীয় সম্পর্কে আমাদের ইতিহাস থেকে কয়েকটি উপমা তুলে ধরতে চাই। যেমন, প্রখ্যাত আলেম আদুদুদ্দিন আল ইজী তার লেখায় বলেন, <strong>সমাজের মূল হল মুহাব্বাত (ভালোবাসা) এবং এটাকে তিনি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরে ব্যাখা করেন</strong>। এখন আমরা যদি আদুদুদ্দিন আল ইজীর কাছ থেকে এর উপর ভিত্তি করে আধুনিক একটি থিওরীর জন্য অপেক্ষা করি তাহলে আরও অনেক অপেক্ষা করতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের কাজ হল তার এই থিওরির উপর ভিত্তি করে এই থিওরীকে আধুনিক যুগের আলোকে তুলে ধরা। আমাদের কাজ হল ইজীর এই সকল কথা থেকে সমাজ বিজ্ঞানের একটি থিওরি দাঁড় করানো। এটা আমাদের করতে হবে এটা আমাদের দায়িত্ব।যদি আমরা হাবেরমাসের থিওরির আলোকে না চলতে চাই, তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে না চাই তাহলে আমাদেরকে কেমন একটি সমাজ চাই তার উপর ভিত্তি করে একটি থিওরি দাঁড় করাতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যেমনঃ&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল-ফারাবির আল মাদিনাতুল ফাদিলা রয়েছে। ফজিলত পূর্ণ একটি সমাজ, এটা আসলে কি? এটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। </span></p>
<p><strong>ফারাবি এটা করছে, ওইটা করছে, এরিস্টটল, প্লেটো অমুক তমুকের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে এগুলা নিয়ে মশুগুল না থেকে আসল কাজ করা দরকার। ফারাবীর ভুল ধরে প্লেটো বা এরিস্টটলের চিন্তাকে নকল করেছেন ইত্যাদি বলে তাকে অতীতে রেখে দেওয়া মানে হল তাকে বা তার চিন্তাকে শেষ করে দেওয়া।</strong></p>
<p><strong> ওরিয়েন্টালিস্টরা মূলত এই কাজই করে থাকে।&nbsp;</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এভাবে তারা তাদের প্রতিপক্ষ সভ্যতাকে বিলীন করে দেয়। আজকের প্রেক্ষাপটে মাদিনাতুল ফাদিলা কিভাবে হতে পারে? কি কি প্রয়োজন এই চিন্তা করতে হবে। আমাদের কাজ হল ফারাবীর মৌলিক চিন্তা গুলাকে উন্নত করা। যেমন, ফজিলতপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র কি?&nbsp;&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি উদাহরণ হল,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাফতাযানির সমাজ চিন্তা। তাফতাযানির লেখা আল-মুতাওয়ায়ালে অনেক সুন্দর একটি প্যারাগ্রাফ রয়েছে। তিনি সেখানে বলেন, <strong>সমাজের মূলভিত্তি তৈরি করে &#8216;বয়ান&#8217; বা যোগাযোগ, কথাবার্তা।&nbsp;</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যোগাযোগ বা বয়ানের উপর ভিত্তি করে</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> একটি সমাজ কিভাবে গড়ে উঠতে পারে? </span></li>
<li><span style="font-weight: 400;">কিভাবে কাজ করতে পারে?&nbsp;</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এটা নিয়ে আমাদের কাজ করা দরকার। এটাকে আধুনিক সমাজের আলোকে চিন্তা করা দরকার। এটাকে আমাদের থিওরীতে রূপান্তরিত করা দরকার।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল মাওয়ারদি থেকে অন্য একটি উদাহরণঃ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তার একটি বিখ্যাত বই রয়েছে। বইটির নাম আদাবুত দ্বীন ওয়াদ দুনিয়া। এখানে তিনি আদবের উপর ভিত্তি করে একটি সমাজের কথা বলেছেন। এই থিওরীটি নিজেই একটি অতুলনীয় থিওরি। সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে আজ&nbsp; পর্যন্ত এর সমকক্ষ কোন থিওরী আমি পাই নাই। অসাধারন একটি থিওরি এটা। এই আদব থিওরি নিয়ে আমাদের কাজ করা দরকার। এখন যদি আমরা মূল কথাকে বাদ দিয়ে, তার বইয়ের ইবারত, কবিতা ইত্যাদি নিয়ে পড়ে থাকি তাহলে কিছুই করা যাবে না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>আমরা অনেক সময় গোলাপ ফুলকে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখি। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে গোলাপ ফুল দেখা যায় না। অন্য কিছু দেখা যায়। গোলাপ ফুল দেখতে হলে সামগ্রিক ভাবে দেখতে হবে। মাইক্রোস্কোপ আমাদেরকে গোলাপের মধ্যকার ভাইরাস দেখাবে।</strong>&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি উদাহরণঃ&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাবুস নামা। কাবুসনামাতে &#8216;যোগ্যতা&#8217; র উপর ভিত্তি করে একটি সমাজের কথা বলা হয়েছে। <strong>যোগ্যতা ভিত্তিক সমাজ। যোগ্যতা ভিত্তিক সমাজ কি এটা নিয়ে থিওরি তৈরি করা প্রয়োজন।</strong> আমরা যদি এই সব চিন্তাকে বর্তমান সময়কে বিবেচনায় নিয়ে আরও উন্নত করতে পারি তাহলে পাশ্চাত্যের সমাজ বিজ্ঞানের কোন দরকারই আমাদের পড়বে না। দুরখায়েম, হাবেরমাস সহ কোন সমাজ বিজ্ঞানীরই আমাদের দরকার পড়বে না। আমরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান থেকে অবশ্যই উপকৃত হব কিন্তু তাদের উপর নির্ভর করব না।&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কেন প্রশ্ন আসতে পারে, কেন আমরা তাদের দ্বারা উপকৃত হব?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কারণ আমাদের প্রিয় রাসূল বলেছেন আমরা হলাম&nbsp; ‘<strong>মানবতার হিকমতের উত্তরসূরী’</strong>।&nbsp; তারাও আমাদের জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হয়েছে। হয়তবা আমাদের কাছ থেকে নেওয়া জ্ঞানকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছে। তারা যে জ্ঞানকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে সেই জ্ঞানকে পুনরায় মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও আমাদেরই। তাই আমাদের উচিত হল আধুনিক চিন্তাকে পড়া ও সংশোধন করা এবং আমাদের ক্লাসিক ইসলামী চিন্তা ধারাকেও প্রভাবশালী করা।&nbsp;</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">আমরা অনেক সময় মনে করি যে, ইমাম গাজ্জালির ইহইয়া ভালো করে পড়লে হয়ত আমাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজে পাব। একই ভাবে আমরা ইমাম সারাখসি, ইবনে সিনা, ইমাম শাফেয়ী, ফখরুদ্দিন রাযি, ইমাম আবু হানিফা উনাদের কাছ থেকে সমাধানের আশা করে থাকি। বর্তমান সময়ের সমস্যা সমাধান করার জন্য না আছে তাদের কোন দায়িত্ব, এটা না তাদের কোন কাজ। </span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">তা</span>রা তাদের সময়ের সমস্যার ও চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেছে এবং সমসাধান করেছে। তারা তাদের সময়ের পরীক্ষা দিয়েছে, আমাদের পরীক্ষা তারা কেন দিবে? আজকে আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে আমাদের পরীক্ষা আমাদেরই দিতে হবে।।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/how-daviid-hume-became-aa-philosopher/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">5262</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইতিহাসে মধ্যযুগের আবিষ্কার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/invention-of-the-term-medieval-in-history/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/invention-of-the-term-medieval-in-history/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 02 May 2021 10:12:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাসে মধ্যযুগের আবিষ্কার]]></category>
		<category><![CDATA[মধ্যযুগ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4983</guid>

					<description><![CDATA[পাশ্চাত্যের লেখকরা শুধুমাত্র সভ্যতার ইতিহাসই নয় একইসাথে সমগ্র দুনিয়ার ইতিহাসের লেখার ধারাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সুস্পষ্ট আলামত হল ‘মধ্য যুগ’ বা Middle Age নামে একটি পরিভাষার আবিষ্কার। অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত দুনিয়ার ইতিহাসকে দুইভাগে ভাগ করা হত,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পাশ্চাত্যের লেখকরা শুধুমাত্র সভ্যতার ইতিহাসই নয় একইসাথে সমগ্র দুনিয়ার ইতিহাসের লেখার ধারাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সুস্পষ্ট আলামত হল ‘মধ্য যুগ’ বা Middle Age নামে একটি পরিভাষার আবিষ্কার।</p>
<p>অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত দুনিয়ার ইতিহাসকে দুইভাগে ভাগ করা হত,</p>
<ul>
<li>প্রাচীন যুগ</li>
<li>আধুনিক যুগ।</li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">আর আধুনিক যুগ শুরু হত ইসলামের উন্মেষের মধ্য দিয়ে। উনবিংশ শতাব্দীর পরে এসে </span><span style="font-weight: 400;">&#8216;</span><span style="font-weight: 400;">মধ্য যুগ</span><span style="font-weight: 400;">&#8216; </span><span style="font-weight: 400;">বা </span><span style="font-weight: 400;">Middle Age </span><span style="font-weight: 400;">নামে একটি পরিভাষার আবিষ্কার করা হয় এবং এই মধ্য যুগকে রোমান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হয়। রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যযুগ শুরু হয় এবং পূর্ব রোম তথা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ফাতিহ সুলতান মেহমেদ কর্তৃক বিজিত হলে</span> <span style="font-weight: 400;">রোমান সাম্রাজ্যের পরিপূর্ণ পতন ঘটে। ফলশ্রুতিতে  রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের শুরু হয়। পাশ্চাত্যের লেখকগণ এমন একটি ফিকশন তৈরি করে। </span></p>
<p><strong>যদি ভালো করে খেয়াল করা হয় তাহলে দেখা যায় যে, রোমান সাম্রাজ্যকে মূল ভিত্তি হিসেবে নিলে দুনিয়ার ইতিহাস লেখার সময় বা বুঝানোর সময় মুসলমানদের ইতিহাসকে লেখার কিংবা বুঝানোর কোন প্রয়োজন পড়ে না। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">গ্রীক থেকে শুরু করে কিংবা তারও আগে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহকে যেভাবে</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">যে পর্যন্ত ইচ্ছা লেখার সেভাবে লেখার/বুঝানোর পরে রোমান সাম্রাজ্য এবং রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের ঘটনা প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে ষষ্ঠাদশ শতকে ইউরোপের ঘটনা প্রবাহ সমূহকে বুঝানো যায়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আর বুঝানোর সময় মাঝেমধ্যে  উসমানী খিলাফত ও মুসলমানদের সম্পর্কে সত্য মিথ্যা মিলিয়ে কিছু কাহিনী বর্ণনা করে থাকে। এইভাবে ইসলামের ইতিহাসকে খুব সহজেই ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারার বাহিরে বের করে দেওয়া খুবই সহজ হয়ে যায়। এইভাবে মুসলমানদেরকে ইতিহাসের পাতায় কোনভাবেই স্থান না দিয়েই মানব সভ্যতার ইতিহাসকে পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাস বলে লেখার/বুঝানোর সম্ভব হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগবে এমন একটি কাজ তারা কিভাবে করতে পারে বা চিন্তা করতে পারে</span><span style="font-weight: 400;">? </span><span style="font-weight: 400;">এর মূলে রয়েছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি </span><span style="font-weight: 400;">Philosophical  Transformation ( </span><span style="font-weight: 400;">দার্শনিক রূপান্তর) রয়েছে। আর এই </span><span style="font-weight: 400;">Philosophical  Transformation</span><span style="font-weight: 400;"> ঘটিয়েছেন দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। কান্টের মতে, সকল </span><span style="font-weight: 400;">objects </span><span style="font-weight: 400;">বা উপাদানের যামান (সময়) এবং মাকান (স্থান) মানুষের যিহীন বা (মানসিকতা) র সাথে সম্পৃক্ত। ফলশ্রুতিতে তার ধারণা মতে সময়</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">স্থান এবং উপাদান সমূহ মানুষের আকল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাহলে</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">সময়কে যদি আমরা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে অতীতকেও আমাদের ইচ্ছামত প্রতিষ্ঠা করতে পারি। বর্তমান সময়ে মানুষের জীবন প্রণালীকে যদি আমরাই নির্ধারণ করে দিয়ে থাকি</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">তাহলে সেটাকে আমরা আমাদের নিজেদের ইচ্ছামত নির্ধারণ/প্রতিষ্ঠা করতে পারি। একইসাথে আমরা এর সাথে সম্পৃক্ততা রেখে আমাদের ভবিষ্যতকেও আমাদের ইচ্ছামত/চাহিদামত করে আকৃতি দান করতে পারি এবং অন্য দিক থেকে এর এক ধাপ পরে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহ সমূহকে সামনে এনে এমন একটি বিষয়ের সৃষ্টি করা</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">যেখানে বিষয়টি এমনভাবে ফুটে উঠবে যে</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">হাকিকত মূলত আমাদের লেখা ও বলার মধ্যেই নিহিত</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">এর বাহিরে নয়।</span></p>
<p><strong> এমন একটি বিষয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তখন হাকিকতকে বাদ দিয়ে তার স্থলে নিজেদের তৈরি করা ঘটনা প্রবাহের উপর ভিত্তি করে একটি অতীত রচনা করার সম্ভাবনা সামনে আসে। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা আজ যে ইতিহাস পড়ে থাকি কিংবা পড়িয়ে থাকি এই বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই তা লেখা হয়েছে কিংবা তৈরি করা হয়েছে।</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/invention-of-the-term-medieval-in-history/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4983</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী চিন্তার ইতিহাসের পর্যায়কাল সমূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/periods-in-the-history-of-islamic-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/periods-in-the-history-of-islamic-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 22 Apr 2021 13:44:48 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4806</guid>

					<description><![CDATA[পাশ্চাত্য চিন্তা ও দর্শনের ঐতিহাসিক পর্যায়কাল সমূহ রয়েছে। এক এক দেশের দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ তাদের মত করে এই পর্যায়কালকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়েছেন। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সমধিক পরিচিত পর্যায়কাল সমূহ হল, ১। প্রাচীন (Ancient) এই প্রাচীনকালকে আবার]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পাশ্চাত্য চিন্তা ও দর্শনের ঐতিহাসিক পর্যায়কাল সমূহ রয়েছে। এক এক দেশের দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ তাদের মত করে এই পর্যায়কালকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়েছেন। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সমধিক পরিচিত পর্যায়কাল সমূহ হল,</p>
<p><strong>১। প্রাচীন (Ancient)</strong></p>
<p>এই প্রাচীনকালকে আবার চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হল,<br />
ক) প্রি-সক্রেটিস (খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী &#8211; পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত)<br />
খ) সক্রেটিক (খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী &#8211; চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত)<br />
গ) হেলেনিস্টিক (খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী &#8211; তৃতীয় শতাব্দী (খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত)<br />
ঘ) রোমান (প্রথম শতাব্দী &#8211; পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত)</p>
<p><strong>২। মেডিভাল ( Medieval)</strong></p>
<p>এই মেডিভাল যুগকে আবার ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, সেগুলো হল,<br />
ক) মেডিভাল ( ষষ্ঠ শতাব্দী &#8211; চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত)<br />
খ) রেনেসাঁ ( পঞ্চদশ শতাব্দী &#8211; ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত)</p>
<p><strong>৩। আধুনিক</strong></p>
<p>একে আবার ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হল,<br />
ক) এইজ অফ রিজন (Age of Reason), সপ্তদশ শতাব্দী।<br />
খ) এইজ অফ এনলাইটেনমেন্ট ( Age of Enlightenment) অষ্টাদশ শতাব্দী।<br />
খ) আধুনিক সময়কাল, ( Modern Era) উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী।</p>
<p>আর একবিংশ শতাব্দীকে এখন অনেক চিন্তা ও দার্শনিক পোস্ট-ট্রুথ, পোস্ট হিউম্যান ইত্যাদি নামে অভিহিত করছেন।</p>
<p>পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস এই ভাবে বিভাজিত করার কারণে এর ধারাবাহিকতা দেখাও যেমন সহজ তেমনিভাবে পাশ্চাত্য চিন্তা ও দর্শন কোন কোন পর্যায়কাল অতিক্রম করেছে এবং এখন কোন পর্যায়ে আছে সেটাও বুঝা যায় অতি সহজেই। যার ফলে পাশ্চাত্যে বেড়ে উঠা একজন যুবক বা শিক্ষার্থী সে কোন যুগে আছে তার কাজ কি হবে এটা সে খুব সহজেই নিরূপণ করতে পারে।</p>
<p>এখন আসা যাক ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসের দিকে। আমাদের চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে এইভাবে সাজানো হয়নি। আমরা এখনো ওরিয়েন্টালিস্টদের সাজিয়ে দেওয়া পর্যায়ের আলোকে আমাদের চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে অধ্যয়ন করে থাকি। যেমন তারা আমাদের চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে &#8216;গাজালী পূর্ব ইসলামী চিন্তা ও দর্শন&#8217; এবং &#8216;গাজালী পরবর্তী চিন্তা ও দর্শন&#8217; এই ভাবে সাজিয়ে দিয়েছে আমরাও এখনো এই বিভাজনের আলোকেই লিখছি ও পড়ছি!!</p>
<p>আর ওরিয়েন্টালিস্টরা খুব সূক্ষ্ম ভাবে গাজালী পরবর্তী সময়কালকে ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের পতন যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন! এই প্রশ্নেরও জবাব আমরা দিতে পারিনি।</p>
<p>অনেক ইসলামী স্কলার ও চিন্তাবিদই এই বিষয় নিয়ে এখনো আলোচনা করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন যে, ইসলামী উসমানী খিলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত তথা উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের চর্চা মুসলিম বিশ্বের অনেক জায়গাতেই জারী ছিল। যেমন উসমানী খিলাফতের রাজধানী ইস্তানবুলে তখনো আলেমগণ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, মরক্কোতে আন্দালুসিয়ার ধারা অনেক শক্তিশালীভাবে জারী ছিল, মিশরের আল-আযহারে ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ধারা জারী ছিল। যার ফলে মুসলমানগণ আলাদা করে কোন পর্যায় কালে বিভক্ত করার প্রয়োজন বোধ করেননি।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter wp-image-13136 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-scaled.jpg" alt="" width="2560" height="1123" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-scaled.jpg 1920w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-300x132.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-1024x449.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-768x337.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-1536x674.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/04/272995741_502656437947740_2067456665738256957_n-2048x898.jpg 2048w" sizes="(max-width: 2560px) 100vw, 2560px" /></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কিন্তু উসমানী খিলাফতের পতন ও সমগ্র বিশ্বে পাশ্চাত্য চিন্তা-দর্শন মুসলমানদের সকল অঙ্গনকে গ্রাস করে ফেললে মুসলিম যুবকগণ পাশ্চাত্য শিক্ষার কারণে নিজেদের অতীত ইতিহাসকে ভুলে যেতে থাকে এবং সত্যিকার অর্থে ইসলামী চিন্তা ও দর্শন বলতে কিছু ছিল কিনা এই বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তুলতে থাকে। কারণ যে সকল মুসলমানগণ ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাস লিখেছেন তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে আংশিক ভাবে এনেছেন। কেউ আবার নিজেদের দেশের চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে হাইলাইট করতে গিয়ে অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম চিন্তাবিদদের ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃত ভাবে গোপন করেছেন।</p>
<p>আর পাশ্চাত্যের ওরিয়েন্টালিস্ট ও লেখকগণ তো রীতিমত ইসলামী চিন্তা ও দর্শনকে অস্বীকারই করেছেন। কোন কোন লেখক তাদের লেখায় স্থান দিলেও এই এক হাজার বছরের চিন্তা দর্শনের ইতিহাসকে ৫০ পৃষ্ঠা বা তার চেয়েও কম স্থান দিয়েছেন।</p>
<p>অবস্থা যখন এমন, সেই সময়ে ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে পূর্ণাংগভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল। পাশ্চাত্যের জবাব দেওয়ার জন্য নয় কিংবা পাশ্চাত্যের তৈরি করে দেওয়া বৃত্তের মধ্যে থেকে নয়, যুবকগণ যেন ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে সামগ্রিক ভাবে অধ্যয়ন করে ইসলামী সভ্যতাকে সামনে নিয়ে যেতে পারে এই জন্য প্রয়োজন ছিল ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে পর্যায়ক্রমিক ভাবে তুলে ধরার । আর এই কাজে এগিয়ে আসেন তুরস্কের ইসলামী স্কলারগণ। প্রায় ২০০ র বেশী গবেষক দীর্ঘ ৩ বছর গবেষণা করে ২০১৭ সালে &#8216;ইসলামী চিন্তার এটলাস &#8216; নামে ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের সামগ্রিক একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। আর ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরার জন্য ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসকে ৪ টি পর্যায়কালে বিভক্ত করেছেন। সেগুলো হল,</p>
<p><strong>১। ক্ল্যাসিক পর্যায় (Classical Period) </strong></p>
<p>( সপ্তম শতাব্দী / প্রথম হিজরী – একাদশ শতাব্দী / পঞ্চম হিজরী পর্যন্ত),</p>
<p>এই সময়কালকে আবার ২ ভাগে ভাগ করেছেন,</p>
<p>ক) উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশকাল (সপ্তম শতাব্দী / প্রথম হিজরী – অষ্টম শতাব্দী / দ্বিতীয় হিজরী পর্যন্ত)<br />
খ) শ্রেণীবিন্যাস ও সুবিন্যস্ত করণ ( নবম শতাব্দী / তৃতীয় হিজরী- একাদশ শতাব্দী / পঞ্চম হিজরী পর্যন্ত)</p>
<p><strong>২। নবায়ন পর্যায় (Renewal Period)</strong></p>
<p>( দ্বাদশ শতাব্দী / ষষ্ঠ হিজরী – ষোড়শ শতাব্দী / দশম হিজরী পর্যন্ত)</p>
<p>এই নবায়নের (Renewal Period) পর্যায়কে আবার ২ ভাগে ভাগ করেছেন,</p>
<p>ক) নবায়ন পর্যায়কাল (I) ( Early Renwal Period) (দ্বাদশ শতাব্দী / ষষ্ঠ হিজরী – চতুর্দশ শতাব্দী/ অষ্টম হিজরী পর্যন্ত)</p>
<p>খ) নবায়ন পর্যায়কাল (II) ( Late Renewal Period) ( পঞ্চদশ শতাব্দী/ নবম হিজরী – ষোড়শ শতাব্দী/ দশম হিজরী পর্যন্ত)</p>
<p><strong>৩। পুনঃমূল্যায়নের পর্যায়কাল ( Evaluation Period)</strong></p>
<p>( সপ্তদশ শতাব্দী / একাদশ হিজরী – অষ্টাদশ শতাব্দী / দ্বাদশ হিজরী পর্যন্ত)</p>
<p>এই পুনঃমূল্যায়নের পর্যায়কালকে আবার দুইভাবে ভাগ করেন।</p>
<p>ক) কাদীম বা প্রাচীনের বিবেচনায় পুনঃমূল্যায়ন (সপ্তদশ শতাব্দী / একাদশ হিজরী)</p>
<p>খ) জাদিদ বা নতুনের বিবেচনায় পুনঃমূল্যায়ন (অষ্টাদশ শতাব্দী / দ্বাদশ হিজরী পর্যন্ত)</p>
<p>৪। অন্বেষনের পর্যায়কাল (Period of Questing) (উনবিংশ শতাব্দী / ত্রয়োদশ হিজরী – বিংশ শতাব্দী / চতুর্দশ হিজরী)</p>
<p>ইসলামী চিন্তা দর্শনের ইতিহাসকে এইভাবে বিভক্ত করে এই সময়কে মুসলমানগণ জ্ঞানের কোন কোন শাখায় কি কি করেছেন? কোন কোন চিন্তাবিদ, আলেম, স্কলার ও দার্শনিক কি কি অবদান রেখেছেন তা তুলে ধরেছেন।</p>
<blockquote><p><em>এই ভাবে তুলে ধরার ফলে আজ আমাদের মত মুসলিম যুবকদের কাছে এটা স্পষ্ট যে, আমরা এখন কোন সময়ে আছি ? আমরা এখন অনুসন্ধান বা অন্বেষণের যুগে আছি? কিসের অন্বেষণ করব? কিসের অনুসন্ধান করব ?</em></p></blockquote>
<p>আমরা সকলেই জানি আজ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ পাশ্চাত্য চিন্তা, দর্শন, সংস্কৃতি ও সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত। আজ আমরা মুসলিম জাতি হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। মুসলিম উম্মাহকে অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গোলামী থেকে মুক্ত করার জন্য আমাদেরকে ইসলামের মূলনীতির আলোকে নতুন সমাধান দাঁড় করাতে হবে। ইসলামী সভ্যতা যেন পুনরায় ইতিহাসের অণুঘটকে ভূমিকা পালন করে সমগ্র মানবতাকে পাশ্চাত্য সভ্যতার কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে এই জন্য আমাদেরকে অনুসন্ধানী হতে হবে।।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/periods-in-the-history-of-islamic-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4806</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইউরোপে চিন্তা বিপ্লব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/revolution-of-thought-in-europe/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/revolution-of-thought-in-europe/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 05 Mar 2021 06:59:52 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইউরোপে]]></category>
		<category><![CDATA[ইউরোপে চিন্তা বিপ্লব]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা বিপ্লব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4207</guid>

					<description><![CDATA[মুসলমানরা যেকালে বাগদাদ, মিশর ও স্পেনে  জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিগন্তপ্লাবী আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, সেকালে সমগ্র ইউরোপ অজ্ঞতার সূচিভেদ্য অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। ইউরোপীয় ইতিহাসে এই যুগটি অন্ধকার যুগ (Dark Age) নামে অভিহিত। এ সময়ে স্পেনের মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অংকশাস্ত্র,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মুসলমানরা যেকালে বাগদাদ, মিশর ও স্পেনে  জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিগন্তপ্লাবী আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, সেকালে সমগ্র ইউরোপ অজ্ঞতার সূচিভেদ্য অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। ইউরোপীয় ইতিহাসে এই যুগটি অন্ধকার যুগ (Dark Age) নামে অভিহিত। এ সময়ে স্পেনের মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অংকশাস্ত্র, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ও রসায়ন,  দর্শন, ভাষাতত্ত্ব ও  সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার উচ্চ পর্যায়ের জ্ঞান শিক্ষাদানের ব্যাপক ব্যবস্থা বর্তমান ছিলো এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীরা এসে এখানে ভিড় জমিয়েছিলো। তারা গ্রানাডা ও কর্ডোভার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী হিসেবে যোগদান করে নিজেদের ধন্য ও গৌরবান্বিত মনে করতো। প্রতিবেশী দেশ ফ্রান্স ও ইটালী থেকেও বহুসংখ্যক জ্ঞানপিপাসু এ শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে এসে জমায়েত হতো এবং মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত এ বিশাল জ্ঞানকেন্দ্র-সমূহে মুসলিম মনীষীদের নিকট শিক্ষালাভ করে ও উচ্চতর ডিগ্রী গ্রহণ করে নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তন করে লব্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রচারে আত্মনিয়োগ করতো। এরই ফলে ইউরোপ ধীরে ধীরে অজ্ঞতা ও মূর্খতার তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে জাগ্রত হতে শুরু করে এবং তার পরিণতি স্বরূপ সমগ্র ইউরোপে নবজাগরণের জোয়ার প্রবাহিত হয়, আসে রেনেসাঁর যুগ। খ্রিষ্টীয় ষোল ও সতের শতকে এই জাগরণ অধিক ব্যাপকতা ও সমৃদ্ধি লাভ করে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী ও রোমে এ সময়েই বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেসব স্থানে জ্ঞান শিক্ষাদানের ব্যাপক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। অপরদিকে এ সময়েই ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সাধিত হয়। নিত্য-নতুন যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হতে শুরু করে এবং সূচিত হয় এক নতুন শিল্পযুগ। এ শিল্পযুগে ইউরোপ, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভূ-খন্ডে ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করার ও বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ গড়ে তোলার বিরাট সুযোগ লাভ করে। এভাবে শিল্প-উৎপাদন, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধন-ঐশ্বর্যের বিপুল প্রাচুর্যের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চায়ও ইউরোপ সমধিক অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও তখন পর্যন্ত ইউরোপীয়দের জীবনদর্শনে চিন্তা ও মতবাদে বিশেষ কোন বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সূচিত হয়নি। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা খ্রিষ্টীয় অস্তিত্ব ও পরিস্থিতি, পরকালীন পুরষ্কার ও শাস্তি, নৈতিক মূল্যমান ও খ্রিস্টীয় প্রেম-ভালোবাসার চর্চা প্রভৃতি ধর্মীয় ভাবধারা ঊনবিংশ শতকের সূচনাকাল পর্যন্ত বর্তমান থাকে।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এই ঊনবিংশ শতকেই ইউরোপবাসীদের চিন্তাধারায় মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়। শিল্প-বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও অগ্রগতির ফলে ইউরোপ সকল ক্ষেত্রে নতুনত্ব সৃষ্টির লীলাকেন্দ্রে পরিণত হয়। ধন-ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য তাদের সাহস, কর্মোদ্যম ও কর্মচাঞ্চল্য বিপুলভাবে বৃদ্ধি করে দেয়, যন্ত্রপাতির নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনীর ফলে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রায় সবকটি বিভাগে যান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ প্রবল ও প্রকট হয়ে ওঠে। সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। অর্থনীতির ক্ষেত্রে পুজিঁবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিশ্বলোককে একটা বিরাট ‘যন্ত্র’ মনে করতে শুরু করা হয়। পূর্ববর্তী ধর্মতাত্ত্বিক মতাদর্শ (Metaphysical Ideas) সন্দেহপূর্ণ ও অবিশ^াস্য বলে ধরে নেয়া হয় এবং এ পর্যায়ের সব চিন্তা ও মতাদর্শকে যান্ত্রিক নীতিতে (Mechanical Principles) পুনর্বিবেচনা করার</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> চেষ্টা শুরু হয়ে যায়। গোটা সমাজ ও সংস্কৃতিতে বৈষয়িকতাবাদী-বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল হয়ে ওঠে। আদর্শ ও নৈতিকতার গুরুত্ব লঘু হয়ে যায় এবং সুবিধাবাদ ও স্বার্থবাদের ভিত্তিতে নতুন নীতিদর্শন (Ethics) বিরচিত হয়। এমনকি মানুষকে একটা ‘জীবন্ত চলমান যন্ত্র বিশেষ’ প্রমাণ করার প্রবণতা সর্বত্র পরিলক্ষিত হয় এবং বর্তমান ও সাম্প্রতিক সংক্ষিপ্ত</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> জীবনটুকু ছাড়া তার কোন অতীত বা ভবিষ্যত আছে বলে বিশ্বাস করতেও অনিচ্ছা প্রকাশ করা হয়। এই সময় সার্বিকভাবে ইউরোপীয় জনগণের মধ্যে যে চিন্তা-বিশ্বাস ও মনোভাব-মানসিকতা দানা বেঁধে উঠতে থাকে, তারই পারিভাষিক নাম হচ্ছে ‘সেকিউলারিজম’।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইউরোপীয় সমাজের তদানীন্তন পরিবেশ পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে জনগণের এ যান্ত্রিক মনোভাবের জন্যে বিশেষ কোন ব্যক্তিকে দায়ী করা চলে না, কারূর কোন বিশেষ ইচ্ছাগত সিদ্ধান্ত বা চেষ্টা সাধনার ফলে এরূপ হয়েছিল বলেও দাবি করার কোন অবকাশ নেই। ইউরোপীয় সমাজে তখনকার সমগ্র সমাজের গতি এদিকেই নিবদ্ধ ছিল, একটা তীব্র ও বিদ্বেষমূলক বৈষয়িকতাবাদী (Secularist) বস্তুবাদী ভাবাবেগই যেন গোটা ইউরোপীয় সমাজকে সর্বাত্মকভাবে গ্রাস করে বসেছিলো। এরূপ অবস্থায় মানুষ নিতান্ত বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণে চিন্তা ও গবেষণা পরিচালনা করতে যেন একান্তভাবে বাধ্য হয়ে পড়েছিল। তখনকার সমাজে যান্ত্রিকতা ও বৈষয়িকতার নীতিতে যে তত্ত্বেরই ব্যাখ্যা পেশ করা হতো তা মন ও মানসকে পরিতৃপ্ত করতে না পারলেও সঙ্গে সঙ্গেই তা সর্বজন গৃহীত হয়ে যেতো। প্রকৃতিবিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার (Physical Science) যান্ত্রিক নীতিসমূহ তখন জ্ঞান গবেষণায় এমন উজ্জ্বল প্রদীপ বলে মেনে নেয়া হয়েছিল যে, তার চোখ ঝলসানো চাকচিক্য ও আলোকচ্ছটায় প্রত্যেক চিন্তাবিদ ও গবেষক গভীরভাবে প্রভাবিত হতে বাধ্য হয়েছিলো।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিশ্বলোক (Universe) ও মানুষকে বৈষয়িক ও যান্ত্রিক দৃষ্টিকোণে বিচার করার একটা তীব্র প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এসব কারণে খ্রিস্টান ধর্মীয় পণ্ডিতেরা তাঁদের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> খ্রিষ্ট ধর্মকে এক মহাবিপদের সম্মুখীন দেখতে পেয়ে রীতিমতো কেঁপে উঠেছিলেন এবং খ্রিস্ট ধর্মকে জ্ঞান ও চিন্তার নতুন আলোর আঘাত থেকে রক্ষা করার চিন্তায় অস্থির</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> হয়ে পড়েছিলেন। অধ্যাপক উইলিয়ামস বেক এ সময়কার অবস্থা বিশ্লেষেণ করতে গিয়ে লিখেছেন ঃ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">“হাক্সলি (Huxley) যখন মানুষের আদি পুরুষ সম্পর্কে নিজের মতবাদ প্রচার করলেন, তখন মানুষের পরিকল্পিত অপমানের জন্যে লোকেরা শত বছর পর্যন্ত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে থাকলো। আর পবিত্রতা ও নৈতিকতার প্রবক্তরা বলতে শুরু করল যে, বিজ্ঞান তার সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। ফ্রয়েডের বৈজ্ঞানিক চিন্তার ফলাফল ঘোষণা করলেও অনুরূপ চিৎকার উঠেছিলো। তা সত্ত্বেও কালের অগ্রগতির সাথে সাথে ক্রমবিকাশ ও বিবর্তন এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মতাদর্শ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বস্তুত এ দু’টি মতাদর্শ সমগ্র মানব সমাজের সংস্কৃতি, ধর্ম, কৃষ্টি ও চিরন্তন কালের চিন্তা-বিশ্বাসের ওপর অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করলো।”</span></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ সময় ইউরোপে বর্ষাকালীন পোকামাকড়ের মতো অসংখ্য মতবাদ গড়ে ওঠে। তন্মধ্যে সেকিউলারিজম ভিত্তিগত মতাদর্শ বা অসংখ্য মতবাদের উৎস হওয়ার মর্যাদা লাভ করে। এ মতবাদটিকে ভিত্তি করেই চিন্তাবিদগণ তাদের চিন্তা ও মতবাদ রচনার কাজ চালিয়ে গেছেন। এই পর্যায়ের চিন্তাবিদের মধ্যে তিনজন বিশেষ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং এ তিনজনই চিন্তার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। এ তিনজনের একজন হলো চার্লস ডারউইন। তিনি বিবর্তনবাদী মতবাদের উদ্গাতা। দ্বিতীয়জন সিগমুণ্ড ফ্রয়েড। আধুনিক মনস্তত্ত্ব তারই অবদান। আর তৃতীয়জন কার্ল মার্কস। বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ তার কল্পনার ফসল। এক কথায় এ তিনজন চিন্তাবিদ পাশ্চাত্যের আধুনিক সভ্যতার স্রষ্টা বা নির্মাতা বলে অভিহিত। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিভূমি এই তিনজনের চিন্তাধারাই সম্মিলিতভাবে রচনা করেছে। এদের উপস্থাপিত মতাদর্শ পাশ্চাত্যের লোকদের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, প্রভাবিত করেছে এবং তাতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। এ কালের চিন্তাবিদদের মতে এদের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> চিন্তাধারাকে বাদ দিয়ে একালের পাশ্চাত্য জীবন-দর্শন সম্পর্কে কোন আলোচনাই পূর্ণতা লাভ করতে পারে</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রসঙ্গত বলা যায়, এই চিন্তাবিদ ত্রয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয়জন সর্বজন জ্ঞাতভাবেই ইসলাম ও মুসলমানদের চির দুশমন ইয়াহুদী বংশজাত।</span><span style="font-weight: 400;">১</span><span style="font-weight: 400;"> আর প্রথমজন নিজে ইয়াহুদী না হলেও তার সমস্ত চিন্তা ও মত ইয়াহুদীদের দ্বারাই ব্যাপক প্রচারিত ও তাদের উদ্দেশ্য সাধনের কাজে সর্বাত্মকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) দীর্ঘ কয়েক বছরকাল ধরে গাছপালা, বৃক্ষলতা ও জীব-জন্তুর গভীর জীবতাত্ত্বিক অধ্যয়ন করেন এবং দীর্ঘদিনের অধ্যয়ন ও গবেষণার পর </span><b>Origin of Species</b><span style="font-weight: 400;">   নামে একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থেই তিনি তার চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী মতবাদটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেশ করেন। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে তিনি শুরু থেকেই অস্বীকার করে এসেছেন। তার দৃষ্টিতে তা একটা ধাঁধাঁ বা ‘নিছক কল্পনা’ ছাড়া আর কোন মর্যাদারই অধিকারী হয়নি। কিন্তু মানুষের দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যক্রমের কোন ব্যাখ্যা দান তখনকার বিজ্ঞানের পক্ষে সম্ভব হয়নি। উত্তরকালে ডারউইনী বিবর্তনবাদ যখন দৈহিক কার্যক্রমের একটা বস্তুবাদী ব্যাখ্যা পেশ করেছিল, তখন ইয়াহুদী চিকিৎসাবিদ ফ্রয়েড কর্তৃক উপস্থাপিত হলো মনস্তাত্ত্বিক (কার্যক্রমের জড়বাদী বা যৌনবাদী) ব্যাখ্যা। ফ্রয়েড উনিশ শতকের শেষ দশকে ভিয়েনায় মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক ছিলেন। এই ক্ষেত্রে তিনি এক অভিনব পন্থার সাহায্য গ্রহণ করেন। এ পন্থর নাম হলো ‘মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ (Psycho Analysis) এই প্রসঙ্গে তিনি যেসব মনস্তাত্ত্বিক দার্শনিক মতবাদ ও চিন্তাধারা উপস্থাপিত করেন, অধ্যাপক উইলিয়ামস বেক সেগুলোকে বিজ্ঞান-চিন্তার ফসল আখ্যায়িত করেছেন এবং তার প্রতিবাদ, সমালোচনা বা বিপরীত চিন্তাকে ‘চিৎকার’ বলে অভিহিত করেছেন। এই মতাদর্শ ও চিন্তাধারা ডারউইনের ক্রমবিকাশ দর্শনের সাথে মিলিত হয়ে সেকিউলার বা ধর্মহীন বরং ধর্মবিরোধী জড়বাদী এবং নাস্তিক্যবাদী প্রবণতাকে খুবই বলিষ্ঠ করে তুলেছে। ধর্মীয় আকীদা বিশ্বাসকে তো কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন বলে তার প্রতি উৎকট ঘৃণা প্রকাশ করেছেই। মানুষের যে কোন উচ্চ মর্যাদা ও মহান জীবন-লক্ষ্যে থাকতে পারে, প্রেরিত হয়ে থাকতে পারে কোন মহান দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে-কিংবা তা হওয়াই বাঞ্ছনীয়, এরূপ মনোভাবকে অপরিপক্ক চিন্তা ও নিতান্তই খোশ-খেয়াল বলে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অতঃপর এই চিন্তা ও মন-মানসিকতা আল্লাহ অস্বীকৃতির দিকে আরও অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">ডারউইনের মতবাদ মানুষের মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যমানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। আর ফ্রয়েড মানুষের উন্নতমানের মহান পবিত্র চরিত্র গুণের উপর তীর চালিয়ে তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। অতঃপর কার্ল মার্কস এসে সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তনের মূলে অর্থনৈতিক কার্যকারণের অনিবার্যিক কার্যকরতা প্রমাণ করে মানুষকে নিতান্তই অর্থনৈতিক জীব প্রমাণ করতে বলিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক যুক্তি উপস্থাপিত করেছেন।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">মার্কস ১৮৬৭ সালে </span><b>‘Das Capital’</b><span style="font-weight: 400;"> নামে একখানি বিরাট গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন। তাতে অর্থনীতি পর্যায়ে বহু বিপ্লবী চিন্তাধারার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দিয়েছেন। এই গ্রন্থটিই হলো ‘কমিউনিজম’ ধর্মের ‘বাইবেল’।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ গ্রন্থের মূল বক্তব্য হলো, বিশ্বলোকের নৈসর্গিক সম্পদ ও উপায়-উপাদান এবং শ্রমিকের শ্রম দিয়েই সমস্ত ব্যবহার্য দ্রব্য ও পণ্য উৎপন্ন হয়-প্রাকৃতিক সম্পদ উপায়-উপকরণের উপর সকলেরই সমান অধিকার।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অতএব উৎপন্ন ব্যবহার্য পণ্য সবই শ্রমিকদের শ্রমের ফসল। মালিকের ব্যবস্থাপনা (Management) শ্রমিকদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। তাদের ব্যক্তিগত শ্রম অপেক্ষা অনেক বেশি লাভ করার লোভে সমস্ত বিবর্তনবাদী মতাদর্শ (theory of Evolution) পেশ করেন।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই ক্রমবিকাশ তত্ত্বের দৃষ্টিতে মূল জীবনটাই যেন ক্রমবিকাশমূলক কার্যক্রম। তা একটি অতি নগণ্য সূক্ষ্ম কীট থেকে শুরু হয়ে বিবর্তনের ধারা অবলম্বন করে এই মানুষ পর্যন্ত হয়েছে। এ ক্রমবিকাশ কার্যক্রমের কার্যকরণ (Cause) একান্তভাবে জৈবিক, রাসায়নিক ও যান্ত্রিক।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">মৌল উপাদানের কোন প্রাথমিক আকস্মিক সংঘাত কেবল একটিমাত্র সূক্ষ্ম জীবকোষ (Life Cell) সৃষ্টি করেছে। পরে তাতে বিপুল জীবন সংগতি ও বেঁচে থাকার যোগ্যতার উদ্ভব হয়। কালের ঘাত-প্রতিঘাতের সাথে শক্তি পরীক্ষা এবং কোটি কোটি বছরের ক্রমাগত প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection) ও ক্রম অভিব্যক্তি প্রবণতা (Evolutionary Trend) এ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জীবকোষ (Germplasm)-কে বিকাশ দান ও রূপান্তর সাধন করে এখনকার মানুষের আকৃতি বাস্তবায়িত করেছে। ক্রম-বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরে জীবসমূহের বিভিন্ন আকার-আকৃতির উদ্ভব হয়েছে। দূরে অতীতের সেসব জীব-জন্তুর অবশিষ্ট এখনও কিছু বেঁচে আছে। আর অনেক-ই নিশ্চিহ্ন হয়ে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিশ্বলোকে জীবনের উন্মেষ এবং বিভিন্ন প্রজাতীয় অভিব্যক্তির ডারউইনীয় ব্যাখ্যা মানব জীবন সংক্রান্ত যুগ যুগ থেকে চলে আশা ধারণা, বিশ্বাস (Conception) ও মূল্যমানকে আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির খোলাহাটে নির্মমভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও অপদস্ত করেছে। শাশ্বত মূল্যমানের এ অপমানে নীতিবাদীর চিৎকার করে উঠেছে বটে; কিন্তু আধুনিকতাবাদীদের মন ও মানস সেই ব্যাখ্যাকেই পরম সত্য রূপে গ্রহণ করেছে এবং তাতেই লাভ করেছে মন ও মানসের গভীর তৃপ্তি ও স্বস্তি। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রকৃতি প্রবণতা অনুযায়ী বিশ্বলোকে জীবনের ও জীবের উন্মেষ ও অস্তিত্বের রাসায়নিক এবং যান্ত্রিক ব্যাখ্যা লাভ করেছে। লাভ করেছে বৈজ্ঞানিক যুক্তিপ্রমাণের আচ্ছাদনে, তাতে যত ফাঁক ও ফাঁকিই থাকুক না কেন, সেদিকে এতটুকু ভ্রুক্ষেপ করারও প্রয়োজন তারা বোধ করেনি; বরং তাকে উপেক্ষা করাই শ্রেয় মনে করেছে।</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সেকিউলারিজম মতাদর্শভিত্তিক এ ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ বর্তমান</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;">সভ্যতাগর্বী পাশ্চাত্য সমাজ ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ কারণে আজকের মানুষের নিকট আবহমানকালের মানবতা, মনুষ্যত্ব এবং নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা নিতান্ত মূল্যহীন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মানুষ জীব মাত্রে-উন্নত আকৃতিসম্পদ পশুতে-পরিণত হয়েছে।</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই পরিপ্রেক্ষিতেই আত্মপ্রকাশ করেছে সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের চিন্তাধারা। সে চিন্তা ও মত অনুযায়ী মানুষ মূলত একটি ‘বস্তুগত যন্ত্র’ মাত্র। এখানে দেহ ও প্রাণশক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বলতে কিছুই থাকলো না। কেননা উক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘প্রাণ’ কোন স্বতন্ত্র সত্তারূপে গণ্য নয়, তা বস্তুরই বিবর্তনের একটি পর্যায় মাত্র। পাশ্চাত্যেও ‘সেকিউলার’ বিজ্ঞান-আল্লাহ অস্বীকারকারী জড়বাদী বিজ্ঞান ‘রূহ’ বা প্রাণশক্তিকে এড়িয়ে এবং তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে আস্বীকার করেই সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে। আর পুঁজিবাদের ব্যাখ্যায় কার্ল মার্কস বলেছেন যে, পুঁজিপতিরা শিল্পের আমল ও মৌলিক মুনাফা নিজেরাই কুক্ষিগত করে। তাই বঞ্চিত শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে এ উৎপাদন ব্যবস্থাকে খতম করে, পুঁজিপতি ও পুঁজিবাদকে উৎখাত করে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে বলে এক ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ডারউইন, ফ্রয়েড ও মার্কসের পূর্বোদ্ধৃত চিন্তাধারাই বর্তমানে পাশ্চাত্য জীবন-দর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর। পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি এই চিন্তাধারার আঘাতে সদা কম্পমান। মার্কসের কমিউনিজম তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র পাশ্চাত্যের কোন কোন দেশে প্রতিষ্ঠিত না হলেও পুঁজিবাদী অর্থনীতি তার আসল রূপ হারিয়ে ফেলে সমাজতন্ত্রের অনেকখানি কাছে এসে গেছে। আর রাজনৈতিক গণতান্ত্রিকতা অনেকখানি সমাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেকিউলারিজম-এর মতাদর্শ এসব দেশেই সমাজের ভিত্তি হিসেবে অভিন্নভাবেই স্বীকৃতি পেয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বস্তুত মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যে জিনিসকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করে, বাস্তব জীবনে তাকেই সত্য করে তোলে। এটাই হলো মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব দুর্বলের ধ্বংস ও বিলয় এবং সবল ও শক্তিমানের উর্দ্বতন অনিবার্য করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ এবং তার ফলাফলকে অতীব স্বাভাবিক পরিণতি রূপে গণ্য করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতেই মানুষের বাস্তব জীবনের বিশাল ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তি, শ্রেণী ও জাতির মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামকে অত্যন্ত স্বাভাবিক, যথার্থ ও কাম্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে। আর এর পরিণামে শাক্তিমানের বিজয় ও উর্দ্বতন এবং দুর্বল-শক্তিহীনের পরাজয় ও অবলুপ্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত বলে বিশ্বাস করাতে চেয়েছে। এর কোন একটি ক্ষেত্রে একবিন্দু অস্বাভাবিকতা অনুভূত নয় পাশ্চাত্য সামাজের নিকট। এক কথায় ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি শাশ্বত ও চরম সত্য বিধানরূপে পাশ্চাত্য সমাজের নিকট চূড়ান্তভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু আবহমান কালের পরম সত্য ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজের দৃষ্টিতে তা নিতান্তই অন্যায়, জুলুম ও স্বভাব পরিপন্থী কার্যকলাপ রূপে প্রমানিত। সে দৃষ্টিকোণে সব মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি, সকলেই সমান মর্যাদা ও অধিকার সম্পন্ন। শক্তিমানের হস্তে দুর্বলের স্বার্থহানি অবৈধ ও অতি বড় অপরাধ। মূল্যমানের দিক দিয়ে তা অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং কার্যত অবশ্য পরিত্যাজ্য।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">ডারউইনের ক্রমবিকাশতত্ত্বের আলোকে মানুষ তার পাশবিক পূর্ব পুরুষদের স্বভাব গ্রহণ করেছে। চারদিকে পশুসুলভ রীতিনীতির আইন-কানুন চালু হওয়া তারই অনিবার্য পরিণতি। বর্তমানের পাশ্চাত্য জাতিসমূহ জাতিসংঘের সমস্ত আন্তর্জাতিক ব্যাপারে এসব আইনের অধীনেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। ন্যায় বা অন্যায়, শোভন বা অশোভন, জুলুম বা ইনসাফ প্রভৃতির প্রশ্ন তাদের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> নিকট কোন গুরুত্বই পাচ্ছে না। বঞ্চিত, নিপীড়িত ও দুর্বল জাতিগুলোর ফরিয়াদ আকাশ-বাতাসকে মথিত করে তুলেছে। কিন্তু সেদিকে কর্ণপাত করার কেউ নেই। প্রবল ও পরাশক্তিগুলো ‘খায়ও এবং হুংকারও ছাড়ে’ আর ভোটদানের সময় নিপীড়িত জাতিগুলোকে বড় বড় অত্যাচারী জাতিগুলোর পক্ষে রায় দিতেও বাধ্য করছে। তা না দিলে তাদের পরিণামও অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়বে। প্রত্যেকটি বৃহৎ শক্তি অপর বৃহৎ শক্তির পক্ষেই কাজ করে। বাহ্যিকভাবে বক্তৃতা-ভাষণে যত বিরোধই দেখানো হোক, আসল কাজে তাদের সকলেরই ভূমিকা সম্পূর্ণরূপেই অভিন্ন । কোন বৃহৎ শক্তি অপর কোন দুর্বল শক্তির পক্ষে কাজ করলেও তা করে তাকে সমূলে ধ্বংস করার তাকে চূড়ান্তভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে । তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগদানের লক্ষ্যে নিশ্চয়ই নয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এদিক দিয়ে খুবই তিক্ত।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক মতাদর্শে তো স্পষ্ট ভাষায় মানুষকে এক ‘যৌন আবেগসর্বস্ব জন্তু’ বানিয়ে দেখানো হয়েছে। যৌন</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> উচ্ছৃঙ্খলতা ও যথেচ্ছাচারকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও একান্তই সাধারণ ব্যাপাররূপে পেশ করে নৈতিক বিধিনিষেধ, বাধা-বন্ধন ও নিয়ন্ত্রণকে নিতান্তই অনভিপ্রেত এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। এটাই ছিল ধন-ঐশ্বর্যে মদমত্ত পুঁজিবাদীদের কাম্য। ফলে চারদিকে যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা ও নির্বিশেষে নারী-পুরুষের দৈহিক মিলনজনিত ব্যভিচারের প্লাবন বয়ে গেল। এর পূর্বে পাশ্চাত্য দেশসমূহের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন প্রাচ্য দেশীয় পরিবার ও দাম্পত্য জীবনের মতোই সুস্থ ও পবিত্র ছিল। ভিন পুরুষের সাথে ভিন নারীরা গোপনে মিলিত হওয়া প্রাচ্য দেশের মতোই দূষণীয় ও অবাঞ্ছিত ছিল। সেখানে যুবতী মেয়েরা কোন আত্মীয় পুরুষ বা নারীরা সঙ্গ ছাড়া ঘরের বাইরে যাতায়াত করতে পারতো না। কিন্তু ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক মতাদর্শ পাশ্চাত্যের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> নারী-পুরুষকে বাঁধাভাঙ্গা জলস্রোতের মতোই উদ্দাম ও উত্তাল করে দিয়েছে, অবিবাহিত নারী-পুরুষের পারস্পরিক প্রেম বিনিময় একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। মেয়েরা এখন আর ঘরের রাণী হয়ে থাকতে প্রস্তুত নয়, তারা এখন সভা-সম্মেলনের প্রদীপ শিখা, মঞ্চের গায়িকা, নৃত্যরতা শিল্পী আর অফিসের রিশিপসনিস্ট, বড় সাহেবের ব্যক্তিগত সেক্রেটারী, কর্মচারীদের সহকর্মিণী, টাইপিস্ট, স্টেনো এবং দোকানের বিক্রয়কারিণী (Sales Girls)</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ত্রী এখন স্বামীর একক শয্যা-সঙ্গিনী নয়, বন্ধু ও প্রিয়জনকে আপ্যায়নের সামগ্রী বিশেষ। স্বামীদের পক্ষে এটা যেমন একটা গৌরবের ব্যাপার, তেমনি স্ত্রীদের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> জন্যেও বহু ভোগ্য হওয়া কম গৌরবের ব্যাপার নয়। কুমারীরা মা হতে এবং মা রূপে সমাজে পরিচিতা হতে এখন আর কোন লজ্জা বা সংকোচ বোধ করে না, সামাজিকভাবে নয় তারা ঘৃণিতা বা লাঞ্ছিতা। বরং বৈধ মা’দের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> অপেক্ষা তারা কিছুমাত্র কম সম্মানিতা নয়। কেননা ফ্রয়েডের দর্শন সব দ্বিধা, সংকোচ, লজ্জা বা অন্যায়বোধের অবসান ঘটিয়েছে। অবৈধ সন্তানের উৎপাদন বর্তমানে খাদ্য উৎপাদনের চাইতেও অধিক উন্নতির পথে। ফ্রয়েডীয় দর্শনের এটাই বড় অবদান।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">ধন-সম্পদেও অসম বণ্টন, পুঁজিপতিদের অমানুষিক শোষণ, বিলাস-ব্যসন, লালসা চরিতার্থতা ও বিলাসী জীবন-যাপন, সুখ-সম্ভোগ গরীবদের অনশন ও দুঃখ-দারিদ্র এবং নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের প্রচণ্ড অভাব কার্লমার্কসের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের জন্যে সহায়ক ও অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। শ্রমিক শ্রেণীর অসহায় অবস্থা যখন চরমে,তখন তারা ক্রুদ্ধ-বিক্ষুদ্ধ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল এবং সব রকমের বাধা-বন্ধনকে চূর্ণ করে বন্য হিংস্র পশুর মতো এমনভাবে হুংকার দিলো যে, পুঁজি ও পুঁজিদারদের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতা ও ধর্মের সব নিয়ম-কানুন ও মূল্যবোধকে নিশ্চিহ্ন করে দিলো। রাশিয়ার রক্তাক্ত বিপ্লব কত নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও কত ঝরাবে, তার কোন ইয়ত্তা নেই। ১৯১৭ থেকে যে নির্মম রক্তপাতের ধারা শুরু হয়েছে, বর্তমানে দুনিয়ার অন্য বহু সংখ্যক দেশে সে ধারাই চলছে অব্যাহতভাবে। যে হিংসা,আক্রোশ ও শত্র</span><span style="font-weight: 400;">æ</span><span style="font-weight: 400;">তা-জিঘাংসা দিয়ে সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা দুনিয়ার দেশে দেশে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের রক্তের বন্যা প্রবাহিত করে চলেছে। তবু মার্কসীয় দর্শনের রক্ত পিপাসা এখনও নিবৃত্ত হয়নি।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমান দুনিয়া এমন একটি একটি কারখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মালিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক শ্রেণী মুখোমুখী হয়ে নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার কঠিন দ্বন্দ্ব সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে রয়েছে। কোন পক্ষই অপর পক্ষের নিকট একবিন্দু নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়, কোন পক্ষই উন্নত নৈতিকতা, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যমানের প্রতি একবিন্দু শ্রদ্ধা জানাতেও আগ্রহী নয়।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">ডারউইন ও ফ্রয়েডীয় দর্শন তাদের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> এসব বন্ধন ও বাধ্যবাধকাতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিয়েছে। আর কার্ল মার্কসের শ্রেণী সংগ্রামের দর্শন ‘বিশ্ব কারখানায় বিশ্ব ধর্মঘট’ করার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকটি দেশের জনগণ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক ভাগের লোকদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে রাশিয়া। আর অপর ভাগের আসল প্রভু বা মন্ত্রণাদাতা হচ্ছে আমেরিকা। আর তারই অনিবার্য পরিণতিতে প্রায় প্রত্যেকটি দেশ ‘রুশপন্থী’ আর ‘মার্কিনপন্থী’ পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সাধারণ মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘি</span><span style="font-weight: 400;">œ</span><span style="font-weight: 400;">ত করছে এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরে যে দলাদলি ও সংঘর্ষ চলছে, তার পেছনে এই পরাশক্তিগুলোর হাত রয়েছে নিশ্চিতভাবে। এসবের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ও</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;">ধন-সম্পদের</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;">ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। একথা নিঃসন্দেহে বুঝতে হবে যে, স্থানীয় সংঘর্ষ ও সংঘাত মূলত স্থানীয় নয়, তা দুনিয়ার পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বৃহৎ শক্তিবর্গেরই কারসাজি। দুনিয়ার বহু ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতি বৃহৎ শক্তিবর্গের মানবতা বিধ্বংসী চাল ও চক্রান্তে পড়ে পয়মাল হয়ে যাচ্ছে।</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু মানুষের রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে দেখে- না স্থানীয় মানুষের কাণ্ডজ্ঞান ফিরে আসছে, না বৃহৎ শক্তিবর্গের অন্তরে কোনরূপ দয়া-মায়ার উদ্রেক হচ্ছে। তারা নিত্যনতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও নির্মাণ করে, তার ভয়ে ভীত করে প্রাচ্যের লোকদের ওপর তাদের নিজস্ব মতাদর্শ ও সভ্যতা-সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চাইছে। বিশ্ব মানবতার প্রতি পাশ্চাত্য সভ্যতার এটাই হচ্ছে বড় অবদান। আর এ সভ্যতার ভিত্তি রচিত হয়েছে এ সমস্ত আলোচিত চিন্তা ও দার্শনিক মতবাদসমূহের ওপর। </span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">টীকাঃ</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">১. ইয়াহুদী জাতি জাতীয় ভাবেই খোদাদ্রোহী। সকল প্রকারের অনিষ্ট সাধনে সিদ্ধ হস্ত। হিংসা-বিদ্বেষ ও ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা এবং মহাজনী পুঁজিদারী এই জাতির রক্তে</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> মাংসে মিশ্রিত। দুনিয়ার যেখানেই কোন গণ্ডগোল হয়েছে বুঝতে হবে তার পিছনে</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;"> অবশ্যই ইয়াহুদীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হাত রয়েছে। অতীতের কথা বাদ দিলেও বর্তমান দুনিয়ার উদ্ভাবিত অকল্যাণ সৃষ্টিকারী প্রধান মতবাদ সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম এদেরই অবদান। সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম সুসংগঠিত ও সুসংবদ্ধ পুঁজিবাদেরই একটি আকর্ষণীয় রূপ মাত্র। ইয়াহুদীরা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সহকারে এই মতাদর্শের বিশ্বব্যাপী প্রচারণা</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;">চালিয়েছে। এই মতবাদের রচয়িতারও বড় বড় নেতা; সকলেই দৃঢ় প্রত্যয় সম্পন্ন ইয়াহুদী। ১৯৭১ সনের রুশ বিপ্লব মূলত ইয়াহুদীদেরই চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফসল। এ বিপ্লবের হীরো লেনিন ইয়াহুদী মত প্রচারে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন। ইয়াহুদী লোকেরাই এ বিপ্লবকে সমর্থন ও তার কল্যাণের ব্যাখ্যা করে সব চাইতে বেশি গ্রন্থ রচনা করেছে। ইয়াহুদী মহাজনী কাজে ও জাতীয় উন্নয়নে সব চাইতে বড় অবদান রয়েছে রাশিয়ার। আজকের দুনিয়ায়ও ইয়াহুদীদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাশিয়া। আমেরিকা ও রাশিয়া বাহ্যত দুটি প্রতপক্ষ হলেও ইয়াহুদী স্বার্থে উভয়ের নীতি অভিন্ন। তাই বলা যায়, পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রের সাথে ইয়াহুদীবাদ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আর বর্তমানে দুনিয়ার পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক’ উভয় ধরণের রাষ্ট্র ও সমাজ আলোচ্য তিনজন চিন্তাবিদের দার্শনিক চিন্তাধারার বড় সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক, ধারক ও অনুসারী। আজকের দুনিয়ার এই দুই পরাশক্তির চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচার-আচরণ সম্যকভাবে জানতে ও বুঝতে হলে এই তিনজন চিন্তাবিদের দার্শনিক চিন্তাধারাকে গভীরভাবে বুঝতে হবে। এঁদের প্রত্যেকেরই চিন্তা-গবেষণার মূলে নিহিত রয়েছে ‘সেকিউলারিজম’ মতবাদটি। প্রথমে তারা ধর্মবিশ্বাসকে অস্বীকার করে, ধর্মবিশ্বাসের প্রভাব থেকে নিজেদের মন-মগজকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেই নিজ নিজ বিষয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা চালিয়েছেন। এই কারণে ‘সেকিউলারিজম’ মতাদর্শটিকে সর্বপ্রথম গভীরভাবে অনুধাবন করা আবশ্যক। তার পরই উক্ত প্রধান তিনজন চিন্তাবিদের উপলদ্ধি করা সম্ভব হতে পারে।</span><span style="font-weight: 400;">                </span></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/revolution-of-thought-in-europe/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4207</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পশ্চিমা বস্তুবাদের দার্শনিক সূত্র</title>
		<link>https://rowyakbd.com/poshcima-bostubader-darshonik-sutro/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/poshcima-bostubader-darshonik-sutro/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 18:49:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4169</guid>

					<description><![CDATA[প্রাচীন গ্রীক সমাজই ইতিহাসের গোড়ার দিকে তার নিয়ম-প্রণালী: প্রথা, শিল্পকলা ও বিজ্ঞান থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করেছে। প্রাচীন গ্রিসই ছিল প্রথম সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ। তার দর্শনের ভিত্তি ছিল ‘সৌন্দর্য ও ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ অখণ্ড সমাজ বুদ্ধি ও মানব মনীষা প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">প্রাচীন গ্রীক সমাজই ইতিহাসের গোড়ার দিকে তার নিয়ম-প্রণালী: প্রথা, শিল্পকলা ও বিজ্ঞান থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করেছে। প্রাচীন গ্রিসই ছিল প্রথম সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ। তার দর্শনের ভিত্তি ছিল ‘সৌন্দর্য ও ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ অখণ্ড সমাজ বুদ্ধি ও মানব মনীষা প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এতে অতি প্রাকৃতিক কোন সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আজ পর্যন্ত এই ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাই পশ্চিমা সভ্যতার মূল চাবিকাঠি হয়ে আছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রাচীন গ্রীকদের মতে মানুষের নগ্ন শরীরে সৌন্দর্য চরম উৎকর্ষতা লাভ করেছে। নর-নারীর নগ্ন দেহই গ্রীক শিল্পকলার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ভাস্কর্যশিল্প এবং চিত্রকররা বিরামহীনভাবে এ চিত্র অঙ্কন করে চলেছে। শরীরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য খেলাধুলাকে খুবই উৎসাহ দেয় হয়। ছোট খাট বা কোন অখ্যাত শহর নেই যেখানে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের জন্যে সরকারী ব্যায়ামাগার নেই। ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করা অভিপ্রায়ে উন্মুক্ত স্টেডিয়ামে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। হাজার হাজার লোক এসব খেলা উপভোগ করে। অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দেরকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করা একটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। অলিম্পিক খেলাই এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে খুব প্রসিদ্ধ। এই প্রতিযোগিতা এখনও চলছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্লেটোর ( ৪২৭-৩৪৭ খৃঃ পূঃ) রিপাবলিকের একটি উদ্ধৃতি। তিনি তার গুরু সক্রেটিসের (৪৬৯-৩১৯ খুঃ পূঃ) মুখ দিয়ে কল্পিত সুখ রাজ্য তথা একটি আদর্শ রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছেন এইভাবে-</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">গ্লুকন সক্রেটিসকে প্রশ্ন করলঃ </span></p>
<p><em><span style="font-weight: 400;">তুমি কি মনে কর, প্রহরারত কুকুরদের মধ্যে পুরুষ কুকুর যে কাজ করে মাদি কুকুরদেরও তা করা উচিত। অথবা পুরুষ কুকুরদের</span> <span style="font-weight: 400;">সঙ্গে কি মাদি কুকুরদেরও শিকার করা উচিত, অথবা বাচ্চা জন্ম এবং লালনের জন্যে তাদের কুকুরশালায় রাখা উচিত এবং পুরুষ কুকুরদের কি শক্ত কাজের সঙ্গে দলের রক্ষণাবেক্ষণও করা উচিত?</span></em></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সক্রেটিস বললেন-তাদেরকে সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে। পুরুষ শক্তিশালী এবং মাদি দুর্বল কেবলমাত্র এই ধারণা ছাড়া।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> কিন্তু একই প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান না দিয়ে তুমি কি পশুদেরকে একই কাজে ব্যবহার করতে পারবে?</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;"> </span><span style="font-weight: 400;">অসম্ভব।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;এখন পুরুষদেরকে গান এবং শরীরচর্চা শিখানো হয়। সুতরাং মহিলাদেরকে এ দুটি শিল্প শিখাতে হবে এবং একইভাবে তাদের কাজে লাগাতে হবে। কুস্তির স্কুলে পুরুষদের সঙ্গে আমরা মহিলাদেরকেও নগ্ন অবস্থায় ব্যায়াম করতে দেখতে চাই। শুধু যুবতী না—বৃদ্ধাদেরকেও। ব্যায়ামাগারে বৃদ্ধের সঙ্গে বৃদ্ধাদেরকেও আমরা এবড়ো থেবড়ো অবস্থায় দেখতে চাই। যারা খেলায় এখনো সুন্দর তাদের দেখতে ভাল লাগেনা।”</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;কিন্তু আমরা অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে পেয়েছি এ সব জিনিস লুকিয়ে রাখার চাইতে বিবস্ত্র করা ভাল। চোখের ভালোর চাইতে যুক্তিতে যা ভাল তাই শ্রেষ্ঠ। এই সব মহিলাদেরকে পুরুষদের সাধারণ সম্পত্তি হতে হবে । কোন ব্যক্তিই নিজস্ব ব্যক্তিগত স্ত্রী থাকা উচিত নয়, সন্তানরাও হবে সাধারণ সম্পত্তি। পিতামাতা তার সন্তান চিনবে না এবং সন্তানরাও পিতামাতা চিনবেনা।&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8216;আমি তোমার বাড়ীতে শিকারী কুকুর এবং খেলার পাখী দেখছি। তুমি কি কোনদিন তাদের মিলন অথবা প্রজননের দিকে নজর দিয়েছো?</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;এর পর আমাদের সিদ্ধান্ত  শ্রেষ্ঠ পুরুষদের শ্রেষ্ঠ মহিলাদের সঙ্গে মেশা উচিত, এবং কেবলমাত্র শ্রেষ্ঠ লোকদের লালন করা উচিত। যদি দলকে ছিমছাম থাকতে হয় তাহলে অন্যের লালন করা অনুচিত । শাসকরা ছাড়া এই শিশু হত্যার কথা অন্যদের জানতে দেয়া উচিত নয়। শাসকদেরকে শাসিতের কল্যাণের জন্যে মিথ্যা এবং প্রতারণার আশ্রয় নিতে হবে। আমরা আগেই বলেছি চিকিৎসা হিসেবে এসবই প্রয়োজন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">…………ত্রুটিপূর্ণ সন্তান জন্মালে তার জন্যে খাদ্য এবং লালন পালন ব্যবস্থা নেই এই যুক্তিতে তাকে সরিয়ে দিতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রোমের ইহুদী ও খৃষ্টানরা গ্রীসের এই ধর্মনিরপেক্ষ উত্তরাধিকারকে গ্রহণ, লালন এবং বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করেছে। অবশ্য সবকিছুর উর্দ্ধে রোমানরা ছিল সামরিকমনা। ফলে সৌন্দর্য পূজার পরিবর্তে শীগগীরই শক্তি পূজা শুরু হয়েছে। গ্রীকদের আদর্শবাদ ক্রমবর্ধমান বৈরাগ্যবাদ, পলায়নবাদের রূপ নিয়েছে। এই কারণে রোমান দার্শনিক Tyre-এর maximus নাস্তিক্যবাদের পক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তি দিয়েছেন ।</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">“অবিনশ্বরের সকল কিছুর অবিনশ্বর থাকার ইচ্ছা রয়েছে। তার অপরিবর্তিত ইচ্ছায় যদি প্রার্থনা করা হয়, তিনি কি করতে বলেছেন তা তাকে জিজ্ঞেস করা অর্থহীন। যদি কেউ তার নির্ধারিত কাজের বিপরীত করার জন্যে তার কাছে প্রার্থনা করে, প্রার্থনাকারী চায় সে দুর্বল, নগণ্য, অসঙ্গত হোক। তিনি দুর্বল, নগণ্য এবং অসঙ্গত বিশ্বাস করার অর্থ তাকে নিয়ে তামাশা করা। তোমার কোন ভালো কাজের ইচ্ছা জাগলে তোমার প্রার্থনা ছাড়াই তিনি তা করবেন । তার কাছে অনুনয় করার অর্থ তাকে অবিশ্বাস করা, অথবা বিষয়টি এমন অন্যায়। যার দ্বারা তুমি তাকে অপমান করো। তুমি উপযুক্ত হও অথবা অনুপযুক্ত হও, করুণা তুমি পাবে, যদি তুমি উপযুক্ত হও সে তোমার চাইতে ভাল জানে, যদি অনুপযুক্ত হও, যা পাওয়ার যোগ্য নও তার চেয়ে তুমি আরেকটি পাপ করো। এক কথায় আমরা স্রষ্টার কাছে এজন্য প্রার্থনা করি যে তাকে আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধতায় চিন্তা করি। (&#8220;The Portable Voltaire Viking Press, New York, 1949)</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">রোম সাম্রাজ্যের পতন এবং রেনেসাঁর উদ্ভব পর্যন্ত হাজার বছরে রোমান ক্যাথলিক গীর্জাই প্রাধান্য পেয়েছে। মধ্যযুগ নামে পরিচিত এই সময়ে প্রাচীন গ্রীস ও রোমের সঙ্গে ইউরোপের ঐতিহাসিক পারম্পর্য বিচ্ছিন্ন হয়েছে। <strong>বস্তুতঃ মধ্যযুগ তার নিজস্ব সুস্পষ্ট ও একক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রাচীন গ্রীস, রোমান সমাজ বা আজকের ইউরোপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন বৈশিষ্ট্যই তার নেই। বস্তুতঃ মধ্যযুগের সভ্যতাকে</strong></span><strong> কেবলমাত্র ভৌগলিক অবস্থানের কারণে পশ্চিমা বলা যেতে পারে।</strong></p>
<p>মধ্যযুগীয় সভ্যতা সকল দিক থেকে আধুনিক সভ্যতার বিরোধী এবং বিপরীতধর্মী ছিল । এ কারণে ইউরোপের ইতিহাসের কোন অধ্যায় সম্পর্কে অপবাদ দেয়া হয়নি। একই কারণে ইংরেজী ভাষায় ‘মধ্যযুগীয়’ শব্দের চাইতে নিকৃষ্ট ভাষা ব্যবহৃত হয়নি। যখনি কোন আমেরিকান বা ইউরোপীয় এই বিশেষণের সম্মুখীন হয়েছেন তার মনে বর্বর, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ‘কালোযুগ’ ভেসে উঠেছে। কোন পশ্চিমা লোক বিশ্বের কোন এলাকা, বিশেষ করে তাদের মতে অনগ্রসর এলাকার বর্ণনা দিতে ইচ্ছুক হালে তাকে ‘মধাযুগীয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<p>ইউরোপের নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা প্রাচীন গ্রীস ও রোমের সমালোচনামুক্ত ভক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে খৃষ্টান ধর্ম পরিহারকে রেনেসাঁসের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। রেনেসাঁ সত্যিকারভাবে বুঝিয়েছে খৃষ্টান ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নবায়ন। এইভাবে পশ্চিমা সভ্যতা তার আদি বক্তব্যে ফিরে গেছে। এখন পর্যন্তও সেভাবেই চলছে।</p>
<p>রেনেসাঁর মূল প্রেরণার সংক্ষিপ্তসার যারা দিয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন Niccolo Machiavelli (১৪৬১-১৫৩২)। ইতালীর ফ্লোরেন্সের অধিবাসী মেকিয়াভেলি তার সরকারের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আসন লাভ করেন। তার তের বছরের কর্মজীবনে পার্শ্ববর্তী স্পেন এবং ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির তুলনায় ইতালীর অসহায়ত্ব তাকে হীনমন্য করে রেখেছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের পর মেকিয়াভেলি পদচ্যুত এবং দেশান্তরিত হন। প্রবাসী জীবনে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন, সংহতকরণ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারে সব চাইতে প্রভাবশালী বক্তব্য সম্বলিত The Prince পুস্তক রচনা করেন। সবকিছুর উর্দ্ধে মেকিয়াভেলি ছিলেন গোড়া জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক। তার স্বপ্ন ছিল আধিপত্যশালী বিশ্বশক্তি হিসেবে অখণ্ড ইতালীর আত্মপ্রকাশ। মেকিয়াভেলি ছিলেন আধুনিক একদলীয় শাসনের জনক। তিনি ক্ষমতাকে তার চূড়ান্ত শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।</p>
<p>“আমি জানি কোন প্রিন্সের মধ্যে সকল সদগুণ সকলের প্রশংসার। তবে সেগুলো কারো পক্ষে অর্জন, ধারণ বা পালন সম্ভব নয়, একজন মানুষের পক্ষে তা সম্ভবও নয়। সে যদি মনে করে থাকে তাকে সকল অন্যায় পরিহার করার মত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হতে হবে, দেখা যাবে গুণ বলে বিবেচিত এমন কিছু জিনিসও কারো ধ্বংসের কারণ হতে পারে এবং এমন কিছু জিনিস যা দোষ বলে মনে হয় তা কারো বৃহত্তর নিরাপত্তা এবং কল্যাণে আসতে পারে।</p>
<p>প্রত্যেকেই জানেন ধূর্ততা ছাড়া কোন প্রিন্স যদি সকলের বিশ্বাস নিয়ে নির্বিঘ্ন জীবন যাপন করে তা কতই প্রশংসনীয়। তবুও আমাদের যুগের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, যে সব প্রিন্স মহৎ কাজ করেছেন, সৎ বিশ্বাসের প্রতি তাদের সামান্য শ্রদ্ধাই আছে, তারা ধূর্ততার সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্ক বিগড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সৎ লোকদের ওপর জয়ী হয়েছেন।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই ধরনের একজন প্রিন্সকে পশুর মত কাজ করার জন্যে শৃগাল এবং সিংহের অনুকরণ করতে হবে। কারণ সিংহ নিজেকে যদি থেকে রক্ষা করতে পারে না এবং শৃগাল নিজেকে নেকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না। অতএব একজন প্রিন্সকে ফাদ চেনার জন্যে শৃগাল এবং নেকড়েদের ভীত করার জন্যে সিংহ হতে হবে। যারা কেবল সিংহ হতে চান তারা এটা বোঝেন না। সুতরাং বুদ্ধিমান শাসককে কখনো শাসিতকে বিশ্বাস করা উচিত নয়, এটা তার স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে। যখন তিনি যুক্তি দিয়ে তা বুঝবেন, তখন ক্ষমতা তার নাগালের বাইরে চলে যাবে। যদি নকল মানুষ ভাল হতো, তাহলে এই উপদেশ সঠিক হতো না, কিন্তু যেহেতু তারা খারাপ এবং তোমার সঙ্গে বিশ্বাস রক্ষায় বাধ্য নয়, সুতরাং তুমিও তাদের সঙ্গে বিশ্বাস রক্ষায় বাধ্য নও। অনেকে প্রিন্সের বিশ্বাস ভঙ্গের ফলে কত প্রতিশ্রুতি মূল্যহীন হয়েছে এবং কত অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে তার ভুরি ভুরি আধুনিক নজির তুলে ধরবেন এবং যারা শৃগালকে অনুকরণ করেছে তারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে বলে প্রমাণ দেবেন। তবে এই চরিত্র গোপন রাখা প্রয়োজন এবং ভান করা, কপটতা দেখানো খুবই ভাল। মানুষ এতই সরল এবং বর্তমান প্রয়োজনকে মেনে নিতে এই প্রস্তুত যে যিনি প্রতারণা</span> <span style="font-weight: 400;">করেন তিনি দেখবেন যে, প্রতারিতরাই প্রতারণার সুযোগ দিয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> একজন প্রিন্সকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে যে, তার মুখ থেকে যেন</span> <span style="font-weight: 400;">ক্ষমা, বিশ্বাস, মানবতা, আন্তরিকতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধী কোন কথা যেন না বেরোয়। এই গুণ ছাড়া আর বিশেষ কিছুর প্রয়োজন নেই, কারণ মানুষ সাধারণত হাতের চাইতে চোখ দিয়েই বিচার করে। কেননা প্রত্যেকেই দেখতে পায়, কিন্তু অল্প লোকই অনুধাবন করতে পারে। প্রত্যেকেই দেখে তুমি দেখতে কেমন, খুব কম লোকই অনুধাবন করে তুমি কি এবং এই স্বল্প সংখ্যকরা বহু লোকের যুক্তির কাছে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশে সাহসী হবে না। মানুষের কাজ বিশেষ করে প্রিন্সের কাজের বিরুদ্ধে তাদের কোন অভিযোগ থাকেনা। &#8220;উদ্দেশ্যই উপায়ের স্বার্থ নির্ধারণ করে”।</span></p>
<p>প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন খৃষ্টান ধর্মের ওপর এমন আঘাত হেনেছে যে, পরবর্তীকালে কখনো খৃষ্টানধর্ম তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। গীর্জার ক্ষমতা, দুর্নীতি ও অপকর্মের সংশোধনের কোন পথ না পেয়ে মার্টিন লুথার তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন এবং নিজে একটি ধর্মমত প্রচারের সিদ্ধান্ত দেন। পোপের কর্তৃত্ব ও ল্যাটিন ভাষা প্রটেস্ট্যান্টদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাব খুবই শক্তিশালী হয়েছে। শক্তিশালী খৃষ্টান সাম্রাজ্যের স্থলে বহু ক্ষুদ্র, দুর্বল গোত্রের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকেই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অপরের বিরোধিতা করেছে। প্রটেস্ট্যান্ট দেশসমূহে সরকারী নিয়ন্ত্রণে জাতীয় গীর্জা স্থাপন করা হয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য জায়গার মত ধর্মের আধ্যাত্মিক শক্তি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শাসকদের সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংক্ষেপে প্রটেস্ট্যান্টদের সংস্কার আন্দোলনের পর রেনেসাঁর পণ্ডিতরা গীর্জার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকেই সবচাইতে শক্তিশালী হাতিয়ার বানিয়েছে। ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬১৫) ‘The New Atlantis’ গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক প্রেরণার সার সংক্ষিপ্ত করেছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাল্পনিক দ্বীপে একটি ইংলিশ জাহাজ অবতরণ করবে। তার প্রধান</span> <span style="font-weight: 400;">কাজ হবে বিজ্ঞান গবেষণার জন্যে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। শাসক যাত্রীদেরকে এই বলে পরিচালিত করেছেন জ্ঞানানুসন্ধান ও জিনিসের রহস্য উদ্ধার করে সম্ভবপর সকল জিনিসের পরিচয় উদঘাটনের মাধ্যমে মানব সামাজের সীমা বাড়ানোর ওপর আমাদের ভিত্তি স্থাপন সমাপ্ত হবে”।</span></p>
<p>Descartes পরীক্ষামূলক পদ্ধতির উন্নয়নের ওপর গবেষণা চালান। অপরদিকে জ্ঞাত জিনিসের প্রমাণের পরিবর্তে নতুন সত্য আবিষ্কারের জন্যে Francis Bacon এরিষ্টটল ও মধ্যযুগীয় পণ্ডিত দার্শনিকদের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করে গবেষণা শুরু করেন। Descartes এর মত পশ্চিমা দার্শনিকদের কাছে প্রকৃতি আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যবিহীন যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ সহ সকল জীবন্ত প্রাণী স্বয়ংক্রিয় রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফলশ্রুতি। Descartes দম্ভপূর্ণ উক্তি করে বলেছেন, “আমাকে উপাদান দাও, আমি বিশ্ব সৃষ্টি করব।”</p>
<p>অপরিবর্তনীয় গাণিতিক আইনে সমগ্র সৌরজগৎ পরিচালিত হয়, নিউটনের (১৬৪৩-১৭২৭) এই মতবাদে আত্মহারা হয়ে তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত যুগের প্রবক্তারা প্রচার করেছেন মানুষের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের বিপরীত সকল বিশ্বাস পরিহার করতে হবে। ভাগ্য, ওহীসহ সকল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে কুসংস্কার বলে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হয়েছে। Voltaire ( ১৬৯৪-১৭৭৮) বলেছেন- “পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোন চিন্তা না করেই ঘড়ি সংযোজনকারীর মত ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন”। Hume (১৭১১-১৭৭৬) সকল ধর্মীয় বিশ্বাস এই বলে বাতিল করেছেন যে, এগুলো বিজ্ঞান বা মানবীয় প্রজ্ঞার দ্বারা প্রমাণ করা যায় না। তিনি ভলতেয়ারের প্রত্যাদেশ (ওহী) ক্ষমতাহীন ঈশ্বরকে আক্রমণ করে বলেছেন- “আমরা ঘড়ি বানাতে দেখেছি কিন্তু পৃথিবী বানাতে দেখিনি&#8221;।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">যদি পৃথিবীর কোন মালিক থাকেন তিনি অনুপযুক্ত কর্মী অথবা কাজ সমাপ্ত করে তিনি অনেক আগে মারা গেছেন বা তিনি পুরুষ অথবা মহিলা ঈশ্বর বা অনেক সংখ্যক ঈশ্বর আছে। তিনি সম্পূর্ণই ভালো, সম্পূর্ণই খারাপ, অথবা দুই বা কোনটাই নয়। সম্ভবতঃ তিনি খারাপ। পরকালের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হিউমের যুক্তি হচ্ছেঃ “কোন জীবন সম্পর্কে আমাদের এই সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন যুক্তি নেই যে, যেখানে মানুষের ফেলে যাওয়া জীবনের জন্যে পুরস্কার কিংবা শাস্তি দেয়া হবে। গণিত যেমন ধমতত্ত্ব ও মানব জ্ঞানের অন্যান্য শাখা থেকে স্বাধীন, ঠিক তেমনি নৈতিকতাও একটি বিজ্ঞান। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">দিদেরো এবং রুশোর মত দার্শনিকেরা সম্মত হয়েছেন যে, ব্যবহার এবং সুখই নৈতিকতার একমাত্র মান নির্ণায়ক। সঙ্গীদের ন্যায্য অংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত না করে মানুষের উচিত যতবেশী সম্ভব আনন্দ ও সুখ প্রত্যাশা করা। কোন সম্পর্কই সকলকে আনন্দ দিতে পারে না, তবে উপকার করতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে তারা লক্ষ্য করেন যে, পুরুষ ও নারীর চিরাচরিত সততার দাবির মধ্যে কোন কল্যাণ নেই ।</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">অতীতের সকল বিশ্বাসকে ভ্রান্ত গণ্য করে ও ধ্বংস করে ‘আলোকপ্রাপ্ত’রা বিশ্বাস করলেন যে, সার্বজনীন গণশিক্ষা যে বুদ্ধিবৃত্তি ও বিজ্ঞান প্রচার করেছে তাতে বিশ্বে একটি সত্যিকার স্বর্গ প্রতিষ্ঠিত হবে। নিজের ভাগ্য রূপ দেয়ার বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা এখন মানুষের করায়ত্ত রয়েছে। সমগ্র বিশ্বে স্বাধীনতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য এবং সার্বজনীন শান্তি বিরাজ করবে। ক্রমবর্ধমান জ্ঞান মানবজীবনকে দীর্ঘায়িত করবে এবং সকল রোগ ও কষ্ট নিঃশেষ করে দেবে। পরবর্তী শতকের প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এই নতুন বিশ্বাসকে বদ্ধমূল করেছে যে, কোন অলৌকিক সাহায্য ছাড়াই বিশ্বে মানব জীবনের পরিপূর্ণতা অর্জন করে।</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">নিম্নস্তরের প্রাণী থেকে বিবর্তনবাদের মাধ্যমে মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কিত ডারউইনের (১৮০১-১৮৮২) মতবাদ নৈতিক মূল্যবোধকে নতুন খাতে প্রবাহিত করেছে। দার্শনিকরা এখন চিন্তা শুরু করলেন যে, অবিরাম পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানবসমাজ অনিবার্যভাবে আরে উচ্চ এবং জটিল অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে। মানব সমাজে জৈবিক বিবর্তনবাদ প্রয়োগ হওয়ার ফলে এই সমাজ অত্যাধুনিক অগ্রসরমান এবং প্রগতিশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">ঐতিহাসিকরা মানুষকে প্রকৃতির সন্তান এবং অংশ হিসেবে দেখতে থাকলো। খুবই নিম্ন পর্যায় থেকে বিরূপ পরিবেশের সঙ্গে মর্মন্তুদ সংগ্রাম করে মানুষ বর্তমান অবস্থায় পৌছেছে বলে ধরে নিলেন। ডারউইন পশ্চিমা দার্শনিকদের বুঝালেন যে, মানুষ অন্যান্য পশুর মতই একটি সাধারণ প্রজাতি। William James (১৮৪২-১১১০) বিবেক অথবা মনের অস্পষ্ট ধারণার মূল্য সম্পর্কে ও প্রশ্ন তুললেন। তার মতে এটি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফল এবং ‘স্নায়ুর ওপর বাইরের চাপের ফলে সব কিছুর সৃষ্টি।’ মনস্তত্ত্ববিদ Pavlov (১৮৪১-১৯৩৬) কুকুর, বানর ও গেরিলার ওপর গবেষণা চালিয়ে মানুষের ব্যবহারের কার্যকারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন।</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>Freud (১৮৫১-১৯৩৯) মানুষের অসঙ্গত ব্যবহারের মূলে আবিষ্কার করলেন শৈশব অবস্থায় অপরিণত মস্তিষ্কের ওপর চাপ। আধুনিক দার্শনিকেরা ধর্মের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে আরেকটি হাতিয়ার পেলেন। ফ্রয়েড বললেন, ছোট শিশু তার মা বাবার অনুসরণ করল। কারণ তারা তার জীবন দিয়েছেন, কষ্ট থেকে রক্ষা করেছেন, সুশৃঙ্খল থাকতে বাধ্য করেছেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরপর ধর্মীয় আচার-আচরণের জন্যে পুরস্কার ও শাস্তির ভয় দেখালেন। ‘ধর্ম মানুষের তৈরী এবং নৈতিকতা অবিসংবাদিত নয় বরং আপেক্ষিক’ এই ধারণা ইতিহাস, সমাজবিদ্যা ও নৃতত্ত্বের ছাত্রদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হল।</strong> এই ভাবে বিশিষ্ট মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ</span><span style="font-weight: 400;"> Ralph Linton </span><span style="font-weight: 400;">তার The Tree of Culture (১১৫৩) নামক পুস্তকে বললেন: “ইহুদী ধর্ম ও ইসলামের আপোষহীন একত্ববাদ আরবের যাযাবর উপজাতির পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের ধারণা থেকে উদ্ভূত।&#8221; তিনি লিখলেনঃ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">‘সর্বশক্তিমান দেবতার ধারণা প্রাচীন আরব জাতির পারিবারিক জীবন থেকে সরাসরি এসেছে। এই দেবতা ন্যায়-অন্যায় করুক পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করা যায়। প্রতিটি কাজের ব্যাপারে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল সৃষ্টিকারী অতি স্বাতন্ত্র্যবাদও মূসার (আঃ) আইন-কানুনের সারসংক্ষেপ। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার এই বেড়াজালে বিশ্বাসী লোকেরা এমন শিশুর মত হয়েছে যে শিশু তার</span> <span style="font-weight: 400;">বাবার যে আদেশ নিষেধই মনে রাখতে সক্ষম। ঈশ্বর আরবীয় পরিবারের পিতার প্রতিমূর্তি যার পিতৃতান্ত্রিক একনায়কত্বের গুণের অতিশয়োক্তি রয়েছে’। </span></p>
<p>ফ্রয়েড ধর্মের ঐশ্বরিক উৎপত্তির কথা অস্বীকার করেই সন্তষ্ট হননি বরং ধর্মীয় বিশ্বাস যে কোন দিক থেকে ন্যায়সঙ্গত হতে পারে এই ধারণাও বাতিল করেছেন।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">&#8220;এটা সত্য নয় যে, বিশ্বে এমন একটি শক্তি আছে যে, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত কল্যাণ দেখা শুনা করে এবং তাদেরকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে নেয়। আদতে মানুষের ভাগ্য সার্বজনীন ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ভূকম্পন, বন্যা এবং আগুন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ এবং পাপী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে পার্থক্য করে না। এমনকি সমস্ত খারাপ লোক ও ভাল লোকগুলো পৃথক থাকলেও আমরা কোন অবস্থায় দুষ্টদের শাস্তি পেতে এবং গুণীদের পুরস্কৃত হতে দেখিনা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় খারাপ ও অসৎ লোকেরা যা চায় তাই পায়, কিন্তু ধার্মিকেরা শূণ্য হাতে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। মায়া-মমতাহীন দাম্ভিক শক্তিই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। ধর্ম যে ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের শাসনের কথা বলে তার কোন অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। বিজ্ঞানের প্রাধান্য যতই অস্বীকার করা হোক তাতে প্রকৃতি ও বহিঃবিশ্বে উপর আমাদের নির্ভরশীলতা পরিবর্তিত হবে না। অপরদিকে ধর্ম একটি বালক সুলভ মায়া-বিভ্রম। আমাদের সহজাত আকাঙ্ক্ষাতেই তার শক্তি নিহিত।&#8221; (Freud : Great Thinkers of the Western World, Encyclopedia Britanica )</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কার্ল মার্কসের হাতে বস্তুবাদী দর্শন চূড়ান্ত রূপ পেলো। মার্কসের মতে মানব ইতিহাসে সমাজ এবং সংস্কৃতির সবদিক-ই অর্থনৈতিক কার্যকারণের ফলশ্রুতি। ব্যক্তিবিশেষ তার চারিদিকের ঘটনাবলীর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। বস্তুগত পরিবেশের গতিশীল উন্নয়নের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা সৃষ্টি হওয়া অনিবার্য। আজকের পশ্চিমা সভ্যতার পিছনে মার্কসের মতবাদের বিরাট অবদান রয়েছে। মার্কসীয় মতবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত সোভিয়েত ইউনিয়নেও আগ্রহের সঙ্গে গৃহীত হয় ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন লক্ষ্য সম্পর্কে সৎ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিমুখী এবং কপটাচারী।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><br />
</span><span style="font-weight: 400;">বার্ট্রাণ্ড রাসেল বস্তুবাদী দর্শনকে তুঙ্গে পৌঁছিয়ে দেন। তিনি লিখেনঃ “মানুষ কার্যকারণের সৃষ্টি, তার প্রাপ্তির শেষ নেই, তার জন্ম, বৃদ্ধি, আশা , ভয়, ভালোবাসা, বিশ্বাস অণুর বিন্যাসের ফলশ্রুতি। কোন প্রকার বীরত্বঃ  চিন্তার গভীরতা এবং আবেগ ব্যক্তি বিশেষকে কবর থেকে দূরে রাখতে পারেনা। অর্থাৎ যুগের সকল পরিশ্রম, সকল নিষ্ঠা মানব মনীষার সকল প্রেরণা সৌরজগতের বিশালাকার সত্যের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে বাধ্য। মানুষের সাফল্যের সমগ্র মন্দির বিশ্বের ধ্বংসাবশেষের নিচে অবশ্যই সমাধিস্থ হবে। এসব জিনিস এতই নিশ্চিত সে, তাদেরকে অস্বীকারকারী কোন দর্শনই টিকে থাকতে পারে না। এ সত্যের মঞ্চে কেবলমাত্র অনমনীয় হতাশার দৃঢ় ভিত্তির দ্বারাই নিরাপদ মানববসতি গড়ে তোলা সম্ভব”। (Makers of Modern Mind, Randall, Columbia University Press, Newyork 1930)</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">Schopen Hauer বস্তুবাদী দর্শনের যৌক্তিক সমাধান টানলেন। তার কাছে জীবনের অস্তিত্ব লক্ষ্যহীন, চঞ্চল তৎপরতা সম্পূর্ণ অতিশয়োক্তি। &#8220;সকল আকাঙ্ক্ষার মূলে রয়েছে প্রয়োজন, ঘাটতি এবং তাই কষ্টকর। মানুষের প্রকৃতি মূলত : নিষ্ঠুর এবং তার অস্তিত্ব তাই কষ্টকর হতে বাধ্য। অপরদিকে সে যদি সহজ সন্তুষ্টির সঙ্গে সকল কাঙ্ক্ষিত জিনিস লাভ করে এ ধরনের অসার ক্লান্তিতে তার হৃদয় ভরে গেলে সে হৃদয় তার কাছে অসহনীয় বোঝা হয়ে পড়ে। এই ভাবে জীবন গোলকের মত কষ্ট থেকে ক্লান্তিতে এবং ক্লান্তি থেকে কষ্টে দোল খেতে থাকে। জীবন, শিলা ও আবর্তে পরিপূর্ণ সমুদ্রের মত, মানুষ যা সতর্কতার সঙ্গে পরিহার করে যদিও সে জানে যে সকল প্রচেষ্টা এবং দক্ষতার সঙ্গে প্রবেশ করতে পারলেও সে জাহাজডুবি তথা মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছায়। প্রতিটি মানুষ এবং তার জীবনে গতিপ্রকৃতির সীমাহীন প্রেরণায় আরেকটি ক্ষণিকের স্বপ্ন মাত্র। বেঁচে থাকার অবিরাম প্রচেষ্টায় মানুষ প্রকৃতির সীমাহীন প্রান্তরে এসে ঠাই নের। প্রকৃতিও ক্ষণিকের জন্য আশ্রয় দিয়ে আবার সীমাহীন অতলান্তে বিলীন করে দেয়।&#8221; (Makers of the Modern Mind)</span><span style="font-weight: 400;"><br />
</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ধর্ম বিশ্বাসের বাস্তব মূল্য অস্বীকার করে ফ্রয়েডকে স্বীকার করতে হয়েছে যে, ‘বিজ্ঞান বিকল্প নয়’। “বাস্তব জগতের উপর গুরুত্ব ছাড়া বিজ্ঞান অবশ্যই নেতিবাচক বক্তব্য দেয়। তার সীমা স্পর্শনীয় বস্তুগত সত্য এবং মায়াকে সে অস্বীকার করে। আমাদের অনুসারীদের যারা এধরনের কার্যাবলীতে অসন্তুষ্ট এবং ক্ষণিক শাস্তির জন্য আরো অধিক আকাঙ্ক্ষা করেন তারা যেখানে তা পাবেন সেখানে খোঁজ করতে পারেন, কিন্তু আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি না”। ( Encyclopedia Britanica) </span></p>
<p>“বর্তমান জীবনের কষ্ট, ক্ষুধা, যন্ত্রণা, বার্ধক্য, মৃত্যু এবং ক্ষত স্পষ্ট হয়েছে অথবা সম্ভবতঃ আগের চাইতে একটু বেশী করে অনুভূত হয়েছে দু’টি বিশ্বযুদ্ধের দ্বারা। কবি ও উপন্যাসিক সহ বস্তুবাদী চিন্তাবিদদের খোদার বিরুদ্ধে বাদানুবাদের মূল বিষয়ও এটি। তারা তার করুণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং ধর্মতত্ত্ববিদদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রতি ফোটা অশ্রুর জন্যে পুরস্কারের অঙ্গীকার করে মানব মনীষার সঙ্গে তামাসা না করতে। কারণ কাগজের নোটের নগদ বিনিময় মূল্যের নিশ্চয়তা না থাকলে তা স্রেফ ধোকা। এই উচ্চবাচ্যের মূল হচ্ছে জীবনের অমরত্বে অবিশ্বাস। আমরা যদি এখন ব্যর্থ হই, আমরা চিরদিন ব্যর্থ হবো কারণ কোন অতীতই ফিরে আসে না। যদি আমরা এ জীবন হারাই আমরা সব কিছুই হারালাম কারণ এটাই প্রথম এবং শেষ সুযোগ। মৃত্যু আসার সঙ্গে সঙ্গেই আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিপদ-ভয়, পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা হঠাৎ থেমে যায়। জীবনের এই সীমিত ধারণা নিয়ে এটাই স্বাভাবিক যে, আমাদের দুঃখ কষ্টের হিসাব করবো এবং অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার কামনা করুন। এবং ভাববো আমরা যে সব অন্যায় আচরণের শিকার সবই আমাদের নিজেদের তৈরী”।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্যায় আচরণ সম্ভবতঃ কোনদিন সম্পূর্ণ শেষ হবে না। এসব স্থায়ীভাবে থাকতে এসেছে। খোদা সবাইকে মোহাম্মদ আলীর (মুষ্টিযোদ্ধা) মত স্বাস্থ্য, রকেফেলারের মত ধন এবং বার্ট্রাণ্ড রাসেলের মত বুদ্ধিমত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি অভাব, দারিদ্র্য, রোগ এবং বার্ধক্যের জন্যে সার্বজনীন বীমা পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেননি। বিজ্ঞানীরা আমাদের ওয়াদা দিতে পারেন যে, এই শতক শেষ হওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ী এবং গাড়ী থাকবে। তপ্ত সূর্যের নিচে কি ভাবে ঘামতে হয় অথবা শীতের রাতে কি ভাবে কাপতে হয় আমরা তা জানবো না। আমাদের ক্ষুদ্রতম ব্যক্তিও আরামদায়ক কাজ পাবে, মনোমুগ্ধকর ও প্রচুর বেতন পাবে এবং একই সঙ্গে যুগের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি উপভোগ করার মত অখণ্ড অবসর পাবে। এধরনের স্বপ্ন যদি সত্যি হয় তাহলে মানবতার জন্যে সেটি দুর্ভাগ্যের দিন হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা পৃথিবীতে এসেছি কাজ করতে, সংগ্রাম করতে, আমাদের দুঃখ ও উৎকণ্ঠার শরীক হতে এবং পৃথিবীর কল্যাণে অবদান রাখতে, আধ্যাত্মিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে, অত্যাচার এবং অবিচার, হিংসা, ঘৃণা লাঘব বা নির্মূল করতে। এটি একটি বিরাট কাজ সম্ভবতঃ আমরা তা শেষ করতে পারবোনা। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনা। আমাদের চেষ্টার দ্বারা আমরা ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণীয় হলাম সেটাই আমাদের দেখার বিষয়। বাকিটুকু দেখা আল্লাহর নিজের দায়িত্ব। কেবলমাত্র এই ধরনের আশা ও প্রচেষ্টার দ্বারা পৃথিবীতে আমাদের জীবন, কাজ এবং মৃত্যু কামনা করা উচিৎ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">(S. Ahmed, Back to God v. Yaqeen International, Karachi</span><span style="font-weight: 400;">, </span><span style="font-weight: 400;">April 22.1967)</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/poshcima-bostubader-darshonik-sutro/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4169</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের ইতিহাস দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamer-itihas-dorshon/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamer-itihas-dorshon/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 09:54:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4083</guid>

					<description><![CDATA[মানুষের অতীত কার্যাবলির সমষ্টি ইতিহাস বলে পরিচিত হয়েছে। ইতিহাস সর্ম্পকে দুটি প্রশ্ন রয়েছে, যা সবসময় আমাদের ভাবিয়ে তুলে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে &#8211; যা কিছু ইতিহাসে ঘটেছে তা কেন ঘটেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে &#8211; যা ঘটেছে তা কিভাবে ঘটল। ইতিহাস ব্যাখার]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>মানুষের অতীত কার্যাবলির সমষ্টি ইতিহাস বলে পরিচিত হয়েছে। ইতিহাস সর্ম্পকে দুটি প্রশ্ন রয়েছে, যা সবসময় আমাদের ভাবিয়ে তুলে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে &#8211; যা কিছু ইতিহাসে ঘটেছে তা কেন ঘটেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে &#8211; যা ঘটেছে তা কিভাবে ঘটল।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইতিহাস ব্যাখার প্রয়োজন রয়েছে। এতে করে আমরা আমাদের অতীত ভুলের কথা জানতে পারি। এর ফলে আমরা সামনের ভুল থেকে বাঁচতে পারি। সাবধান ও সর্তক হতে পারি। এখন আমি কয়েকটি ইতিহাস দর্শন নিয়ে আলোচনা করব। তারপর ইসলামের ইতিহাস দর্শন বলব। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিখ্যাত দার্শনিক <strong>পলিবিয়াস</strong>, যিনি ঈসা (আঃ) এর পূর্বে জন্ম নিয়েছেন, তিনি ইতিহাস দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন &#8211; প্রথমে কোনো দেশে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। রাজতন্ত্র বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অত্যাচারী নয়, এমন এক শাসকের শাসন। এর পরে আসে স্বৈরতন্ত্র। স্বৈরতন্ত্র বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অত্যাচারী নয়, এমন এক শাসকের শাসন। এরপর স্বৈরতন্ত্রের পতন হয় এবং আসে সম্মিলিত শাসন। এভাবে ইতিহাসে রাজনীতির চাকা ঘুরতে থাকে। তিনি তার বইতে অনেক উদাহরণ দিয়েছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এরপর আসে <strong>স্পেংগলারের</strong> ইতিহাস দর্শন। তিনি বলেছেন প্রত্যেক সংস্কৃতি নিজ সময়ে রাজত্ব করে গিয়েছে। তারপর তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর সংস্কৃতির পুনর্জীবন সম্ভব নয়। এই মতের কোনো সত্যিকার ভিত্তি নাই। এই মত গ্রহণ করলে ইসলামের পুনর্জীবন আর সম্ভব নয়। সুতরাং এ মত গ্রহণ করা যায় না। সংস্কৃতি ও সভ্যতার পুনর্জীবন হয় কিছুটা ভিন্নভাবে। ইতোমধ্যে আমরা দেখছি যে ইসলামের পুনর্জীবন হচ্ছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এরপর <strong>হেগেলের</strong> ইতিহাস দর্শন আসছি। হেগেলের মতকে বিপরীতের সমন্বয় বলা যেতে পারে। ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে সভ্যতা ও সংস্কৃতির গোটা রূপটি মিলে একটি সভ্যতার যোগ হয়। এরপরে বিপরীত ধ্যান ধারণার জন্ম নেয়। প্রথমটিকে তিনি থিসিস বলেছেন। এবং দ্বিতীয়টিকে তিনি এন্টি-থিসিস বলেছেন। পরবর্তীতে এ দুটির সংঘাতে সমন্বয় বা সিনথেসিস হয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হেগেলের মতে মানুষের কর্মের কোনো স্বাধীনতা নেই। মানুষের উচিত নয় নিজেকে স্বাধীন মনে করা। সবকিছু ইতিহাসের গতিতে ঘটছে। এটা ইসলামের তকদিরের চেয়ে অনেক ভিন্ন। ইসলামের তকদিরের একটি অংশ হচ্ছে তদবির বা চেষ্টা। কিন্তু হেগেলের মতে কোনো তদবিরের স্থান নাই। সুতরাং এই মতকে গ্রহণ করা যায় না। এই মত গ্রহণ করলে অতীতের দিকে ফিরে তাকাবার কোন প্রশ্ন উঠে না। অতীত তার যা কিছুু দেয়ার তা দিয়ে দিয়েছে। এই মত গ্রহণ করলে চিরন্তন বলে কিছু থাকে না। কিন্তু সত্য ও মিথ্যা চিরন্তন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এখন আমি <strong>মার্কসীয়</strong> ইতিহাস আলোচনা করব। মার্কসীয় দর্শনের মূলকথা সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি সমাজের কাঠামো রচনা করে। উৎপাদন ব্যবস্থায় সে বস্তুভিত্তি যার উপর আইন ও রাজনীতি ব্যবস্থা দাঁড়ায়। মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন নয়। সবকিছু নির্ভর করে উৎপাদন ব্যবস্থার উপরে। মার্কসের এ মতামত গ্রহণ করা যায় না। মার্কসের মতে সামাজিক পরির্বতনের একমাত্র কারণ উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন। এটা সঠিক নয়। সামাজিক পরির্বতনের অনেক কারণ আছে। উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন ও অন্য কোনো বিষয়ের প্রভাবে হয়ে থাকে। মার্কস মনে করেন যে নৈতিকতাও উৎপাদন পদ্ধতির মতো হয়ে থাকে। একথা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। নৈতিকতার মূল দিকগুলো সবসময়ই এক।</span></p>
<blockquote><p><strong><em>এখন আমি ইসলামের দর্শন ইতিহাস আলোচন করব। ইসলামের দৃষ্টিতে সকল শক্তি মূলত আল্লাহ পাকের। অন্যদের যা শক্তি তা আল্লাহর দেয়া। সব পরির্বতনের কারণ বস্তুশক্তি। এটা ইসলাম স্বীকার করে না। ইসলাম বস্তুশক্তি ও জাগতিক শক্তিকে চূড়ান্ত মনে করে না। বদরের যুদ্ধই তার প্রমাণ। যেখানে তিন শতাধিক মুসলিম দুর্বল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মক্কার মোশরেকদের বিপুল সংখ্যার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। </em></strong></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">ইতিহাস দর্শনের অন্যতম দিক হচ্ছে মানুষের উন্নতি অবনতির আভ্যন্তরীণ তাৎপর্য পেশ করা। সবকিছু বস্তুশক্তিতে হয় না। যেমন রোম নগর রাষ্ট্র ছিল। তাদের লোকবল অস্ত্রবল তেমন কিছু ছিল না। তা সত্ত্বেও তারা বিশ্বরাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল। তেমনিভাবে মদিনার ছোট নগর রাষ্ট্রটি এক বিশাল এবং উন্নত রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল। আল্লাহ প্রয়োজনমত ইতিহাসে হস্তক্ষেপ করেন। যেমন বদর যুদ্ধে করেছিলেন। এবং মদিনা রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে করেছিলেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন যে তিনি শান্তি সৃষ্টি করার জন্য এক জাতি দ্বারা অন্য জাতিকে প্রতিহত করেন (সূরা হজ্জ) কিন্তু সাধারণভাবে আল্লাহ তা&#8217;য়ালা হস্তক্ষেপ করেন না। মানুষকে আল্লাহ তা&#8217;য়ালা স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন। খেলাফতের মর্যাদা এটাই  এবং তাকদিরের মূল তাৎপর্য এটাই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইসলামের ইতিহাস দর্শনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চারিত্রিক গুণাবলির উপর অধিক গুরুত্বারোপ দেয়া। মানব ইতিহাসে বিভিন্ন জাতির উন্নতি অবনতির জন্য আল্লাহ তা&#8217;য়ালা সূরা আল আছরে নৈতিক গুণাবলির কথা বলেছেন। </span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">‘‘ সময়ের কসম মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। যদি তারা বিশ্বাসী না হয়। যদি তারা নেক কাজ না করে। সত্যের ব্যাপারে এবং সবর করার ব্যাপারে একে অপরকে উৎসাহ না দেয়।”</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">ইতিহাসের গতিধারায় মানুষ কোনো কালের পুতল নয় &#8211; যা মার্কসবাদ ও হেগেলের দর্শনে দেখা যায়। মানুষের ভূমিকা সক্রিয় এ কথা ইসলাম স্বীকার করেছে। মানুষকে খলীফা স্বীকারের প্রকৃত তাৎপর্য এটাই। মানুষের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা সন্দেহ নাই। কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার সীমাও অত্যন্ত ব্যাপক। এই ব্যাপক সীমায় মানুষ সক্রিয়ভাবে দায়িত্বপালন করে,করতে হয়,ইহাই ইসলামের মত।</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamer-itihas-dorshon/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4083</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
