<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>ইসলামী চিন্তা &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/thought-and-philosophy/islamic-thought/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Wed, 12 Aug 2026 12:04:35 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>ইসলামী চিন্তা &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>কোরআন কীভাবে পড়বো?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/how-to-read-the-quraan/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/how-to-read-the-quraan/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. জাসের আল আওদাহ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 18 Apr 2026 13:56:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মাকাসিদ আশ শারীয়াহ]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[উসূল ও মেথডোলজি]]></category>
		<category><![CDATA[ফিচারড]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16756</guid>

					<description><![CDATA[بسم الله الرحمن الرحيم আল কোরআন দুনিয়ার সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ। তবে কোরআনকে কীভাবে পড়তে ও বুঝতে হবে, এই প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন পন্থা বা মেথডের আলোচনা সামনে চলে আসে। এক্ষেত্রে মাকাসিদকে কেন্দ্রে রেখে “মাকাসিদভিত্তিক পদ্ধতি” (Maqasid Methodology) ব্যবহার করে কীভাবে পবিত্র]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>بسم الله الرحمن الرحيم</p>
<p>আল কোরআন দুনিয়ার সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ। তবে কোরআনকে কীভাবে পড়তে ও বুঝতে হবে, এই প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন পন্থা বা মেথডের আলোচনা সামনে চলে আসে। এক্ষেত্রে মাকাসিদকে কেন্দ্রে রেখে “মাকাসিদভিত্তিক পদ্ধতি” (Maqasid Methodology) ব্যবহার করে কীভাবে পবিত্র কোরআন পাঠ করতে হবে, এ বিষয়টিই এ প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়।</p>
<p>শুরুতেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্নের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। প্রায়ই আমরা এই প্রশ্নটি করে থাকি যে- “আমি কীভাবে কোরআন পড়ব?” প্রশ্নটি দেখতে হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জন্য এটি ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত জটিল। কেন? কারণ পবিত্র কোরআন বোঝার জন্য এমন কিছু দরজা আছে, যা আল্লাহ নিজেই বান্দার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।</p>
<p>আমাদেরকে সেই দরজায় কড়া নাড়তে হবে, এবং অপেক্ষা করতে হবে কখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আমাদের দোয়া কবুল করে কোরআনের আয়াত সমূহ, নিদর্শন, মিসাল ও অর্থগুলো আমাদের সামনে উন্মুক্ত করবেন। যেটি পাঠক হিসেবে আমাদের জন্য নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটাবে। এরপর আমরা সেই অর্থ ও উপলব্ধির মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক খুঁজে পাবো, বুঝতে শুরু করবো কোরআনের কিছু বক্তব্য কীভাবে আমাদের প্রশ্ন ও উদ্বেগের সাথে সম্পর্কিত।</p>
<p>এজন্য মহাগ্রন্থ আল কোরআনের কাছে আমাদের দ্বারস্থ হতে হবে একদম পরিষ্কার মন নিয়ে, যেন একেবারে নতুন একটি পাতার মতো আমরা সেখানে উপস্থিত হয়েছি। যাতে করে আমাদের উপলব্ধিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চারকারী নিদর্শন সমূহ আমরা লিপিবদ্ধ করে উপকৃত হতে পারি। শুধু তাই নয়, কোরআনের কাছে আমাদের যেতে হবে এমন একটি হৃদয় নিয়ে, যা আল্লাহর কাছে একান্তে হেদায়েত প্রত্যাশা করে। কারণ কোরআন হলো কেবল তাদের জন্যই পথনির্দেশ, যারা আল্লাহভীরু। যদি আমাদের অন্তরে সমস্যা ও রোগাক্রান্ত থাকে, তবে কোরআনের গভীর জ্ঞান, বোঝাপড়া বা ফিকহ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য কখনোই সম্ভব হবেনা। কারণ কোরআন হলো মুমিনদের জন্য হেদায়েত ও রহমত সরূপ, যেমন বলা হয়েছে- <strong>“হুদা ওয়া রহমাতুল্লি কওমিন ইউ’মিনুন।”</strong></p>
<p>আমরা জানি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি আমাদের বিশ্বাস স্থাপনের পরের স্তরে ঈমানের গভীরতা সকলের এক নয় এবং এটি ওঠানামা করে। যেমন, নেক আমল করলে তা বৃদ্ধি পায়, আর গুনাহ করলে তা কমে যায়। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যদি আমাদের নৈতিক বা মানসিক সমস্যা থেকে থাকে, যদি ঈমানের প্রাথমিক স্তরে পরিপূর্ণনা না থেকে থাকে কিংবা যদি সন্দেহ পোষণ করে থাকি; তবে এইভাবে কোরআন পড়ার আগে সেই সমস্যাগুলো দূরীকরণের উপর বিশেষ মনোযোগী হতে হবে ও এজন্য কাজ করতে হবে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে তখন আমরা একেবারে নির্ভুল হয়ে কোরআন পড়তে পারবো। আমরা সবাই মানুষ, আমাদের সবারই ভুল আছে। কিন্তু অন্তত বড় বড় সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে, যাতে আমাদের হৃদয় সমূহ মহান আল্লাহর দেওয়া পবিত্র জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে।</p>
<blockquote><p>মহাগ্রন্থ আল কোরআন একটি শাশ্বত আলো। আমরা যখন তা পড়তে শুরু করি, তখন আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেখানে স্বয়ং নিজেই আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টি এমন নয় যে অন্য কেউ আল্লাহর কথা বর্ণনা করছে; এটি সরাসরি আল্লাহরই বাণী। এ কারণে এই বাণীর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। মানব রচিত যেকোনো বক্তব্য থেকে তার আলোকবর্তিকা ভিন্ন এক ছন্দের মাধ্যমে আমাদের হৃদয় সমূহ বিগলিত করে যায়। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা নিজেই বলছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মতো নয়।</p></blockquote>
<p>ফলে আমরা বলি, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। কিন্তু তাঁর শোনা আমাদের মতো নয়, তাঁর দেখা আমাদের মতো নয়, তাঁর জীবনও আমাদের মতো নয়। আমাদের জীবন দেহ ও আত্মার সমন্বয়, কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এ কারণেই তাঁর বাণীও আমাদের বাণীর মতো নয়। হ্যাঁ, আমরা এটি আরবি ভাষায় পড়ি। কিন্তু এটি তাবৎ জাহানের সকল লেখ্যরূপের চেয়েও ভিন্ন। এর শব্দের নির্বাচন, ধ্বনি, শব্দমূল, বাক্যের বিন্যাস, আয়াতের ক্রম; সবকিছুতেই এক ঐশ্বরিক বিশেষত্ব রয়েছে। ভাবার্থের জায়গা থেকেও কখনো বাক্যের মাঝেই একবচন থেকে বহুবচনে পরিবর্তন হয়, কখনো আখিরাত থেকে দুনিয়া, আবার দুনিয়া থেকে আখিরাতে ফিরে আসে। এটি এক অসাধারণ গ্রন্থ। তাই আমাদেরকে সেই দরজায় কড়া নাড়তেই হবে, যাতে মহান আল্লাহ আমাদের জন্য তা উন্মুক্ত করে দেন এবং আমাদের প্রতি সহায় হোন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য আমাদের যে বিষয়টি করা জরুরী তা হলো একটি পবিত্র হৃদয়কে কোরআনের সামনে নিবেদিত করে কোরআন থেকে জ্ঞান উৎপাদনের চেষ্টা করা। প্রকৃত ফিকহ এটিই। কোরআনের গভীর বোঝাপড়া নির্ণয়ের চেষ্টা করা; <strong>শুধু কিছু ফিকহি বিধানই “ফিকহ” এর মতো গভীর একটি বিষয়কে পরিপূর্ণতা দেয়না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ফিকহ কেবল শরীয়তের বিধান নিয়ে আলোচ্য কোনো বিষয় নয়; এটি আমাদের জ্ঞানের একটি বিস্তৃত ধারণা। যেমন স্থাপত্য, চিকিৎসা, মনোবিজ্ঞান, শিক্ষা, প্রকৌশল, নীতি নির্ধারণ; সব ক্ষেত্রেই ফিকহের প্রয়োগ রয়েছে, পাশাপাশি হাদীস ও দাওয়াহর ক্ষেত্রেও।</strong> এখানে আমরাই গবেষক, আমরাই পাঠক, এবং এক অর্থে আমরাই মুজতাহিদ। আমাদের কাজ হলো- নতুন তত্ত্ব, নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির চেষ্টা করে যাওয়া।</p>
<p>কোরআন পাঠের অর্থবহতা তো কেবল তখনই পরিপূর্ণতা পায় যখন আমরা এখান থেকে কোনো সমস্যার নতুন সমাধান আবিষ্কার করতে চেষ্টা করবো, নতুন কৌশল তৈরি করতে স্বচেষ্ট হবো, অথবা আমাদের নিজস্ব জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুনভাবে কাঠামো নির্মাণ করে তা নিয়ে পুনরায় গবেষণা করবো। এজন্য আমি পরামর্শ দিতে পারি যে, আপনারা যে যেই ক্ষেত্রেই দক্ষ হোন না কেন, বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন লেখকের লেখা তাফসির পাঠ করা অত্যন্ত জরুরী। আমি বলছি না যে আপনি ফকিহদের মতো ফতোয়া দেবেন, বরং আমাদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপট ও নিজস্ব অবস্থানের আলোকেও কোরআনকে বুঝতে চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে এর একটি সামগ্রিকতা আমাদের সামনে নতুন করে হাজির হতে পারে। যেমন, কানাডার একজন ইঞ্জিনিয়ার কোরআনকে একভাবে পড়বে, আবার সামরিক বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী ভিন্নভাবে পড়বে। এর মানে এই নয় যে এইক্ষেত্রে তাফসীর অপ্রাসঙ্গিক, বরং তা আরো ব্যাপকতা পাবে সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আমাদের কোরআনের নিকটবর্তী হওয়া উচিত।</p>
<p>প্রসঙ্গত, জ্ঞানের ইতিহাস এবং নতুন জ্ঞান উৎপাদন; এই দুইয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে। আর আমরা যেন আমাদের সময়ের আলোকে নতুন জ্ঞান তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি, সেই বিষয়ে আমাদের স্বচেষ্ট হওয়া জরুরী। এজন্য আমাদের নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট তাফসীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখাটা কখনোই সমীচীন নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে চিন্তা উৎপাদনের পথ উন্মুক্তকারী জ্ঞান হলো “উসূল”। এর উৎপত্তি ও বিকাশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- ইলমুল উসূল শুধু ফিকহের নিয়ম তৈরির একটি সাধারণ পদ্ধতিই নয়, বরং এটি জ্ঞান উৎপাদনের সীমানা নির্ধারণ করে এবং ইসলামী জ্ঞানকেও একটি দার্শনিক উচ্চতায় উন্নীত করতে সহায়তা করে। বিশেষত আইন ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে মুসলমানদের দার্শনিক জ্ঞান গঠনে উসূল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তাই নয়, এটি কাঠামো নির্ধারণ, নিয়ম প্রণয়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কাজও করে।</p>
<p>এই কারণে উসূলে ফিকহকে স্রেফ ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বিষয়টি সঠিক হবেনা, বরং এটি অন্যান্য জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবেও কাজ করেছে। সংক্ষেপে, দ্বীনের নামে কথা বলার সীমানা নির্ধারণ করেছে এই জ্ঞান। এজন্য উসূল কেবল একটি জ্ঞানের শাখাই নয়; এটি চিন্তারও একটি পদ্ধতি। <strong>কোরআন ও সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে সবসময় উসূলের নীতিমালা ব্যবহার করা হয়েছে।</strong></p>
<p><strong>মাকাসিদ ধারণাটি ক্লাসিক উসূলের “ওয়াসফুল মুনাসিব” থেকে এসেছে। ইমাম গাজালী এটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন; জারুরিয়্যাত, হাজিয়্যাত এবং তাহসিনিয়্যাত। তিনি আবার জারুরিয়্যাতকেও পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন; দ্বীন, জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি ও বংশ রক্ষা।</strong></p>
<p>কিন্তু বর্তমান সময়ের তাবৎ সব জটিল সমস্যার সমাধানে এই সীমিত ধারণা যথেষ্ট কার্যকর নয়। তাই এখন আমাদের মাকাসিদকে সংকীর্ণ অর্থ থেকে বের করে দ্বীনের সামগ্রিক উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্ত করে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।</p>
<p>এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে-<br />
সৃষ্টির উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত তাকবীন), জীবন ও সভ্যতার উদ্দেশ্য (মাকাসিদুল উমরান), ওহী নাযিলের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত তানযীল), কোরআনের উদ্দেশ্য, সুন্নাহর উদ্দেশ্য এবং দায়িত্বের উদ্দেশ্য।</p>
<p>নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর দ্বীনে কোনো অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন বিষয় নেই। কিন্তু আমাদের সংকীর্ণ চিন্তা কখনো কখনো আমাদের ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। মাকাসিদ আমাদেরকে এই অর্থহীনতা থেকে রক্ষা করে থাকে; যদি আমরা সঠিকভাবে এর অর্থ নির্ধারণ করে দ্বীনের রহমত, হিকমত, ন্যায়বিচার ও কল্যাণকে মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে পারি।</p>
<p>এছাড়া আহকামের পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বর্তমান সমস্যার সমাধানের জন্য ফিকহকে গতিশীল করতে তিনটি মূলনীতি খুবই গুরুত্ব বহন করে। সেগুলো হলো-</p>
<p><strong>১. সময় ও স্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে হুকুমের পরিবর্তন অস্বীকার করা যায় না।</strong><br />
<strong>২. কোনো হুকুম যদি তার উদ্দেশ্যের বিপরীত ফল দেয়, তবে তা বাতিল গণ্য হবে।</strong><br />
<strong>৩. নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হলে সেই হুকুমের কার্যকারিতাও শেষ হবে।</strong></p>
<p>এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিলে বর্তমান যুগের সমস্যার উপযোগী কোনো ফিকহ তৈরি করা সম্ভব নয়। এটা এই অর্থে নয় যে তারা ভুল, বা তাদের পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য; বরং আমরা এখানে যে অনুশীলনটি করতে চাইছি, সেটি ভিন্ন। যেমন, যদি আমরা এই অনুশীলনের মধ্যে প্রবেশ করে সরাসরি ইবনে কাসীরের মতো তাফসীর খুলি, তাহলে আমাদের নিজস্ব চিন্তার প্রক্রিয়াটি হয়তো পূর্ণতা পাবেনা।</p>
<p>কারণ <strong>আমরা যদি শিক্ষা বিষয়ে কাজ করি, তাহলে আমাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা নিশ্চয়ই ইবনে কাসীরের মধ্যে যত্রতত্রভাবে খুঁজে পাব না! কারণ এই তাফসীরে তিনি শিক্ষা-দৃষ্টিকোণ থেকে কোরআন ব্যাখ্যা করেননি। তিনি একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করেছেন যেখানে তিনি আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীস, সাহাবা ও তাবেঈদের বর্ণনা সংগ্রহ করেছেন।</strong> তবে এটি অবশ্যই একটি অত্যন্ত সম্মানিত পদ্ধতি, এবং ব্যক্তিগতভাবে আমিও তাঁর থেকে অনেক কিছু শিখেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিষয়টি হলো- আংশিকতা (partialism), অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন করে পড়া। কোরআন পড়ার সময় কখনোই আমাদের বিচ্ছিন্নভাবে পড়া উচিত না। সবসময় সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।</strong> আগের আয়াতের সাথে পরের আয়াতকে যুক্ত করা, শব্দগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করা। সেইসাথে, কেন এমন বলা হলো; এই “কেন” প্রশ্নটি নিজেকে বারবার করা।</p>
<p>আমি মনে করি, ছোটবেলায় যখন আমরা কোরআন মুখস্থ করতাম, তখন শায়খরা আমাদের পরীক্ষা করার জন্য মাঝখান থেকে আয়াত শুরু করতেন, কখনো কখনো শব্দের মাঝখান থেকেও। এর ফলে আমাদের মধ্যে কোরআনকে টুকরো টুকরো করে দেখার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি চাই না আমরা কোরআনকে এভাবে ভেঙে ফেলি। বরং আসুন আমরা কোরআনকে তার অর্থবহতার জায়গা থেকে সমন্বিতভাবে (integrated) পড়তে চেষ্টা করি।</p>
<p>ধরুন, আপনি একজন অর্থনীতিবিদ, এবং আপনি “আল-মাল” (সম্পদ/ধন) শব্দে এসে থামলেন। তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন যে কোরআনের আর কোথায় “আল-মাল” এসেছে? আগের সূরায় কি এ বিষয়ে কিছু পড়েছিলাম? গিয়ে মিলিয়ে দেখুন। সংযোগ তৈরি করুন। আমরা পড়ার সুবিধার জন্য কোরআনকে সাত ভাগে ভাগ করছি, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা এই অংশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ভেঙে ফেলবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয়টি হলো- অ্যাপোলোজেটিক্স (apologism), অর্থাৎ নিজের পূর্বধারণা কোরআনের উপর চাপিয়ে দেওয়া। এই বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বের সাথে আমাদের পরিত্যাগ করা উচিত।</strong> যেমন, আপনি যদি একজন অর্থনীতিবিদ হন, তাহলে কোরআনের মধ্যে পুঁজিবাদ খুঁজবেন না। যদি আপনি মনোবিজ্ঞানী হন, তাহলে ফ্রয়েডকে কোরআনের মধ্যে বসানোর চেষ্টা করবেন না। যদি আপনি সমাজবিজ্ঞানী হন, তাহলে ডুরখাইমের তত্ত্ব দিয়ে কোরআন ব্যাখ্যা করবেন না। উদাহরণ হিসেবে, ডুরখাইম সমাজে মানুষের শ্রেণিবিন্যাসকে তাদের আত্মপরিচয়ের উপর ভিত্তি করে দেখেন। আজকের দিনে যেমন লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কিন্তু কোরআন এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে না।</p>
<p>কোরআনে দল বা গোষ্ঠীর পরিচয় তাদের নিজেদের দাবির উপর নয়, বরং নির্দিষ্ট মানদণ্ডের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। তাই আমাদের পূর্ববর্তী জ্ঞানকে কোরআনের উপর চাপিয়ে দিয়ে সেটিকে “ন্যায়সঙ্গত” প্রমাণ করার চেষ্টা করা ভীষণ কদার্য মানসিকতার পরিচয়। তাহলে কোরআন শুধু উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক চুক্তির বইয়ে পরিণত হয়ে যাবে; যা আসলে কোরআনের মূল আলোচ্য বিষয় নয়। এমনকি “সমতা” (equality) বা “স্বাধীনতা” (freedom) -এই শব্দগুলোও কোরআনে সরাসরি নেই। এর মানে এই নয় যে এসব মূল্যবোধ নেই; বরং এটি একটি গভীরতর আলোচনার বিষয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>চতুর্থ বিষয়টি হলো বিরোধ (contradiction)। আকল (যুক্তি) ও নকল (ওহী/প্রমাণ) এদের মধ্যে বিরোধ খোঁজার চেষ্টা করা যাবেনা। কোরআনকে এদের ঊর্ধ্বে রাখুন।</strong></p>
<p>কোরআন সর্বোচ্চ, এবং এটি সবকিছুকে সমন্বিত করে। এছাড়া “ডিকনস্ট্রাকটিভ” দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোরআন পড়া যাবেনা। যেমন শুরুতেই ক্ষমতার কাঠামো খোঁজা, যেমন পিতৃতন্ত্র (patriarchy)। কোরআন পুরুষের ক্ষমতা বা নারীর ক্ষমতা; কোনোটিরই বই নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা সাধারণ মানুষের ক্ষমতার বইও নয়; এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।</p>
<p>বিশেষ করে যারা সমাজবিজ্ঞান পড়েছেন, তারা এ ধরনের বিশ্লেষণে প্রশিক্ষিত হন, কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবেনা।</p>
<p>এতোক্ষণ যে বিষয় গুলো আমি তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম, এগুলো ছিল “কি করা যাবে না”।</p>
<p>এখন আসুন আলোকপাত করা যাক কোরআন পাঠের ক্ষেত্রে “কি করতে হবে” -এই বিষয় নিয়ে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রথমত, আমরা যে উপাদান সমূহ নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখি।</strong> বিশেষ করে “উদ্দেশ্য” (objectives)। চলুন প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করি, আল্লাহ কেন এটি বলছেন? কেন এভাবে বলা হলো? কেন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়নি? যেমন, কেন কোরআনে “সমতা” শব্দটি নেই? বরং এখানে স্তরভেদ (hierarchy) আছে। “ফাদ্দালাল্লাহু…” (আল্লাহ কিছু মানুষকে অন্যদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন)।</p>
<p>তাহলে এবার প্রশ্ন করি যে সমতার মধ্যে তবে সমস্যা কী? একইভাবে, কেন “ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি” নেই? কেন “গণতন্ত্র” নেই? এই “কেন” প্রশ্নগুলো আমাদেরকে একটি সুসংগঠিত সমালোচনামূলক চিন্তায় নিয়ে যাবে। “কেন” প্রশ্ন ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত, এবং এটি সমন্বিত চিন্তার দরজা খুলে দেয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত বিষয়টি হলো, ধারণা (concepts) বিশ্লেষণ করা। যেমন, বিয়ে (marriage) বনাম যিনা (zina)।</strong> এই দুটি ধারণার ভিত্তিতে সমাজ ও পরিবারকে বুঝার চেষ্টা করি। কোরআনের দৃষ্টিতে “ইলম” (জ্ঞান) আসলে কী? মানুষ (human) কী; এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ বা স্থপতি বা যাই হই না কেন, “মানুষ” ধারণাটি আমাদের জন্য কেন্দ্রীয়।</p>
<p>একজন স্থপতির জন্য যে স্থানে মানুষ বসবাস করবে, সেই স্থানে মানুষের ভূমিকা কী? এই ধারণাগুলো বিশ্লেষণ করে আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব তত্ত্বগুলোকে পুনর্গঠন করতে হবে।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত, মূল্যবোধ (values) নির্ধারণ করা।</strong> এক্ষেত্রে প্রশ্ন করা যে নৈতিকতা কী? সৌন্দর্য কী? উপকার ও ক্ষতি কী? কোরআন আমাদেরকে এই মানদণ্ডগুলো নতুনভাবে গঠন করে দেবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>চতুর্থত, কোরআনের নির্দেশনাগুলো (commands) খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।</strong> কি করতে হবে, আর কি থেকে বিরত থাকতে হবে। আসলে এইভাবেই কোরআন পাঠ একটি গভীর, সমন্বিত এবং সৃজনশীল জ্ঞানচর্চায় পরিণত হবে। মনে রাখা জরুরী যে, কোরআনে “করণীয়” ও “বর্জনীয়” বিষয়গুলো শুধু আহকামের জন্য নয়; শুধু হালাল-হারাম বা ওয়াজিবের বিধানও নয়। বরং এগুলো আরও বহু বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য।</p>
<p>কোরআন আমাদেরকে পৃথিবীতে চলতে, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পরিণতি দেখতে, আগের প্রজন্ম ও সভ্যতাগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে নির্দেশ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এটি এমন একটি নির্দেশ যা সরাসরি বাধ্যতামূলক বিধানের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু, নির্দেশনাগুলোর দিকে তাকান এবং দেখুন কীভাবে আপনি সেগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন। এটা আমাদের জন্য কোআরনের নতুন নতুন দিকগুলো উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।</p>
<p>এরপর রয়েছে সার্বজনীন নিয়মাবলি বা সুন্নাতুল্লাহ। যখন আল্লাহ বলেন যে এগুলো পুনরাবৃত্ত হয় কিংবা এই ধারাবাহিকতা বিদ্যমান; আমরা দেখি:<br />
“وكذلك نجزي المحسنين”<br />
অর্থাৎ, “এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিই।”</p>
<p>এরপর এই নিয়মগুলোর দিকে তাকাই। কী সেই প্যাটার্ন? ইতিহাসের প্যাটার্ন, ভূগোলের প্যাটার্ন, সমাজের প্যাটার্ন; আমরা যে ক্ষেত্র থেকেই আসি না কেন। সুনানুল্লাহ খুঁজুন, এখানে আল্লাহর নিয়ম কী? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ধারা কী? এরপর গোষ্ঠীগুলোর দিকে তাকাই। এবং যখন আমরা গোষ্ঠীগুলো দেখবো, তখন সেগুলোকে আমাদের ধারণার সাথে সংযুক্ত করবো।</p>
<p>কারণ কোরআনে এবং ইসলামে গোষ্ঠীগুলো মানুষের স্বাভাবিক ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।<br />
যেমন—<br />
العلم والعلماء<br />
والتجارة والتجار<br />
والملك والملوك ইত্যাদি।</p>
<p>প্রতিটি গোষ্ঠীর সাথে একটি ধারণা যুক্ত থাকে। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় আমরা এই বিষয়টি ততটা পাই না। আমরা সহজেই কোনো একটি গোষ্ঠীকে “terrorists” বলে লেবেল দিই, কিন্তু “terror” কী তা সংজ্ঞায়িত করি না। অথবা আমরা কাউকে “celebrities” বলি; কিন্তু সেটার অর্থ কী, সেটাও স্পষ্ট করি না। আমরা কীভাবে এগুলো সংজ্ঞায়িত করব? ধারণাটি কী? এবং সেই ধারণার কি কোনো কর্তৃত্ব (سلطان) আছে?</p>
<p>আসলে আমাদের আধুনিক সমাজ ধারণাগত ও গোষ্ঠীগতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গেছে, বিশেষ করে বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে। কী সঠিক, কী ভুল, কী ভালো মূল্যবোধ; এসব নির্ধারণেও আমরা বিভ্রান্ত। এখন মূল্যবোধ মানেই যেন সংখ্যা আর সংখ্যা বেশি মানেই ভালো।</p>
<p>কিন্তু আল্লাহ বলেন:<br />
“قل لا يستوي الخبيث والطيب ولو اعجبك كثرة الخبيث”<br />
অর্থাৎ, “বলুন, অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়, যদিও অপবিত্রের আধিক্য আপনাকে মুগ্ধ করে।”</p>
<p>প্রমাণ (حجج) বিষয়টি নিয়েও ভাবুন। একটি শক্তিশালী প্রমাণ (برهان) ও একটি ভ্রান্ত যুক্তি (fallacy)-এর মধ্যে পার্থক্য কী? কোরআন আমাদের এই বিষয়গুলোও শেখায়।</p>
<p>বিশেষ করে ফিরআউনের দর্শনগুলো দেখুন, <strong>শুধুমাত্র ফিরআউনের দর্শনই আমাদেরকে যুক্তি নির্মাণের অনেক পদ্ধতি দেখাবে। তাই পড়ার সময় এগুলো খুঁজে দেখা জরুরী। এবং মনে রাখতে হবে যে এগুলো আলাদা আলাদা বিষয় নয়।</strong> যেমন, আপনি যেন এক্সেল শিট খুলে না বলেন “এটা একটি concept, এটা একটি objective।” ন্যায় (العدل، القسط) এটি একইসাথে একটি objective এবং একটি concept। আবার মসজিদ একটি গোষ্ঠী। এবং এটিও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার একটি নিয়মের সাথে সম্পর্কিত।</p>
<p>“قائماً بالقسط” তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। অতএব, এটি তাঁর একটি নিয়ম। এবং القسط একটি মূল্যবোধ। এবং القسط একটি নির্দেশ। “وأقسطوا” অতএব, এটি সবকিছু। তাহলে কেন আমরা এগুলোকে এতোগুলো উপাদানে ভাগ করলাম? শুধু আমাদের চিন্তাকে উন্মুক্ত করার জন্য, যাতে আমরা বিভিন্ন দিক থেকে বিষয়গুলো দেখতে ও বিবেচনা করতে পারি।</p>
<p>কারণ আমাদের চিন্তার প্রবণতা ভিন্ন। কেউ ধারণা-কেন্দ্রিক শব্দ ও অর্থ খোঁজে। কেউ উদ্দেশ্য-কেন্দ্রিক; সবসময় জিজ্ঞেস করে “কেন?” এবং “আমি কোথায় যাচ্ছি?”</p>
<p>কেউ নির্দেশনাভিত্তিক; তাদেরকে শুধু বলা হলেই হয় “اعدلوا، اقسطوا” তখনই তারা বুঝে নেয়। কিন্তু তারা “قسط” শব্দটি নিয়ে দার্শনিক বিশ্লেষণ করে না। আবার কেউ গোষ্ঠী বিশ্লেষণে আগ্রহী। এভাবে বিভিন্ন ধরণের প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আমরা মনে রাখিনা যে এই সবকিছুই পরস্পর সংযুক্ত ও আন্তঃসম্পর্কিত। প্রসঙ্গত, এখন মাকাসিদ পদ্ধতি অনুযায়ী এই অনুশীলনে আমরা দুটি ধাপ এক পাশে রেখে পুনরায় কোরআন পাঠের পদ্ধতিকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রথমত রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ। এই অনুশীলনে হাদীস ব্যবহার করব না। এর মানে এই নয় যে হাদীস ভুল, বা আমি সুন্নাহর বিরুদ্ধে; কখনোই না।</p>
<p>আমার কোনো বই-ই এমন নেই যেখানে হাদীস নেই; এক পৃষ্ঠাতেও এক-দুটি বা পাঁচটি হাদীস না থাকে; এমন নয়।</p>
<p>কিন্তু হাদীস একটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়। এইবার কোরআন পড়ার সময় আমরা হাদীস অন্তর্ভুক্ত করবো না। কেন? কারণ হাদীসকে কোরআনের আলোকে প্রাসঙ্গিক করতে হয়-<br />
“عرض الحديث على القرآن”</p>
<p>আমি জানি সুন্নি ও শিয়া ঐতিহ্যের মধ্যে এ বিষয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এটি আপাতত আমাদের বিষয় নয়, এমনকি আমার মতো একজন গবেষকেরও মূল বিষয় নয়।</p>
<p>আমি এই বিতর্কের ঊর্ধ্বে যেতে চাই। বলতে চাই, হাদীস কেন দেখবেন না? কারণ বর্ণনা (narration) অনেক সময় খণ্ডিত হয়, কিন্তু কোরআন সমন্বিত (integrative)। হ্যাঁ, একটি আয়াত কোরআনের একটি অংশ। কিন্তু আপনি একটি আয়াতকে পুরো কোরআন ছাড়া বুঝতে পারবেন না। এটিই বাস্তবতা। কিন্তু মানুষ হাদীসের ক্ষেত্রে প্রায়ই তা করে, একটি হাদীস নিয়ে নেয়, বাকি অংশ বা প্রেক্ষাপট না দেখেই তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করে।</p>
<p><strong>বিশেষ করে জনপ্রিয় হাদীস গ্রন্থগুলোতে অনেক সময় হাদীস কেটে ছোট করা হয়েছে। একজন গবেষক হিসেবে এক্ষেত্রে আমার আপত্তি আছে, বিশেষ করে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের ক্ষেত্রে, তারা অনেক সময় হাদীসকে খুব বেশি সংক্ষিপ্ত করেছে।</strong></p>
<p><strong>হাদীস একটি পূর্ণ অনুচ্ছেদ, কিন্তু আপনি আমাকে পাঁচটি শব্দ দিয়ে বলছেন এটি একটি হাদীস! এমন অনেক উদাহরণ আছে। এছাড়া হাদীসের সাথে সত্যতা (authenticity) বিষয়টি জড়িত এবং সব “সহিহ” সংগ্রহের সবকিছুই সত্য নয়।</strong></p>
<p>হাদীস বর্ণনাকারীর প্রেক্ষাপটের উপরও নির্ভর করে, এমনকি সাহাবির ক্ষেত্রেও। যদি আপনার বিশেষায়ন হাদীসে হয় তাহলে আপনি হাদীস দেখবেন। কারণ আপনাকে দেখতে হবে; কোরআনে সাহাবাদের যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা কি হাদীসে একইভাবে এসেছে? অবশ্যই না। কোরআনে তারা “মুহাজিরীন” ও “আনসার” -এটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট।</p>
<p>তাই যদি আপনি হাদীসের গবেষক হন, তাহলে কোরআনের আলোকে হাদীস বিশ্লেষণ করুন। এটি খুব জরুরী। কিন্তু যদি আপনি চিকিৎসা, ব্যবস্থাপনা, আইন, স্থাপত্য, ভাষা বা সমাজবিজ্ঞান; এই ক্ষেত্রগুলোর কোনো একটিতে থাকেন; তাহলে আজ হাদীসকে পাশে রাখুন।</p>
<p>শুধু কোরআনকে ঘিরে চিন্তা করি চলুন, যাতে আমরা একটি কার্যকর আলোচনার দিকে অগ্রসর হতে পারি। আমি জানি এভাবে পড়তে গিয়ে অবশ্যই আমাদের মনে আসবে “আমি তো একটি হাদীস জানি, যা এর সাথে মেলে না!” ঠিক আছে; এসব নিয়ে আমরা অন্য কোনো প্রবন্ধে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরেকটি বিষয়, এই অনুশীলনে আমরা অন্যান্য জ্ঞান বা সমালোচনামূলক গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করবো না। অর্থাৎ আমরা যা করছি তা হলো: উদ্দেশ্য নির্ধারণ, কোরআনের উপর চিন্তা-ভাবনা, এবং একটি কাঠামো (framework) তৈরি করা; concept, objective ইত্যাদি নিয়ে।</p>
<p>আমরা অন্যান্য জ্ঞানের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আপাতত বাদ দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলো কোরআন থেকে নতুন তত্ত্ব ও নীতি খুঁজে বের করা। যেমন, “কোরআনে সম্পদ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারা রয়েছে, তাই একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি সম্পদের সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে পারি।” অথবা “কোরআনে সৌন্দর্যের একটি বিশেষ ধারণা রয়েছে, তাই একজন শিল্পী হিসেবে আমি সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা দিতে পারি বা এটিকে বিশেষায়িত করতে পারি।” তাই এই পর্যায়ে সুন্নাহ ও অন্যান্য সমালোচনামূলক গবেষণা আমাদের জন্য এক পাশে রাখাটাই শ্রেয়।</p>
<p>আলোচনার এই অংশে এখন আমাদের উদ্দেশ্য কী? চলুন নিজেদেরকে এই চারটি শ্রেণির একটিতে স্থাপন করি:</p>
<p>১. دراسات اصولي(শাস্ত্রভিত্তিক গবেষণা)<br />
২. دراسات فينومينا(ঘটনাভিত্তিক গবেষণা)<br />
৩. دراسات ديسبلنري (শাখাভিত্তিক গবেষণা)<br />
৪. دراسات استراتيجي (কৌশলগত গবেষণা)<br />
যদি আমি ফিকহে বিশেষজ্ঞ হই, তাহলে কোরআনের সাথে আমাদের শেখা ফিকহ তুলনা করি। যেমন, পারিবারিক আইন। আমি নিজে ফতোয়া ও আদালতের কাজে পারিবারিক আইন নিয়ে কাজ করি এবং বড় পার্থক্য দেখি। যেমন বিয়েকে একটি “চুক্তি” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, কিন্তু কোরআনের দৃষ্টিতে এটি কেবল চুক্তি নয়। বা এটি শুধু “লাভ বিনিময়ের চুক্তি” নয়, এভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়।</p>
<p>এমনকি “الاحتباس” নামক একটি তত্ত্ব আছে, যেখানে বলা হয়, স্ত্রী যেন স্বামীর ঘরে বন্দি! সে বাইরে যেতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে, না হলে তার ভরণপোষণ বন্ধ হয়ে যাবে! তালাক হলে ক্ষতিপূরণও পাবে না! এগুলো কী ধরনের ধারণা? তাই যদি আমরা উসূলভিত্তিক গবেষণায় থাকি, তাহলে কোরআনের আলোকে ফিকহ, হাদীস, তাফসীর সবকিছুই চলুন পুনর্বিবেচনা করি।</p>
<p>এবার আমরা যদি নিজেকে কোনো শাখার (discipline) অধীনে রাখি, তাহলে আমরা মানবিক, সমাজবিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বা প্রয়োগমূলক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ইত্যাদি। নিজেকে এই শ্রেণির একটিতে রাখুন এবং সেই অনুযায়ী আমাদের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করি।</p>
<p>শাখাভিত্তিক গবেষণায় মূল কাজ হলো, আমাদের শাস্ত্রের মৌলিক ধারণাগুলো পুনঃসংজ্ঞায়িত করা। যেমন, ভাষা কী? ইতিহাস কীভাবে বোঝা উচিত? কোরআন ইতিহাসকে যেভাবে উপস্থাপন করে তা প্রচলিত ইতিহাস তত্ত্বের মতো নয়। সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি আমরা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা সমস্যা (phenomena) নিয়ে কাজ করি, যেমন দারিদ্র্য; তাহলে যেন পুরো কোরআনের আলোকে সেটি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। শুধু “فقراء” শব্দ খুঁজে বের করলেই হবে না। কোরআন অনেকভাবে দারিদ্র্যের কথা বলে, এমনকি শব্দটি ব্যবহার না করেও।</p>
<p><strong>আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ভাষাগত সীমাবদ্ধতায় আমরা নিজেদেরকে আটকে না ফেলি। গণনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বলে, কোরআনে “শরীয়াহ” শব্দটি মাত্র দুইবার এসেছে, তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি ভুল ধারণা। পুরো কোরআনই শরীয়াহ।</strong></p>
<p>স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ হলো সংগঠনভিত্তিক বিশ্লেষণ, যেমন একটি NGO, রাষ্ট্র বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এখানে কোরআনকে বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে। আপনার সংস্থার লক্ষ্য কোরআনের উদ্দেশ্য থেকে নির্ধারণ করুন, অন্য কোনো মতবাদ থেকে নয়। আপনি গণতন্ত্রকে সমর্থন করতে পারেন, কিন্তু সেটিকে আপনার মূল লক্ষ্য বানাতে পারবেন না, যদি আপনি একটি ইসলামী সংগঠন হন।</p>
<p>আপনার লক্ষ্য আসবে ইসলাম থেকে, তারপর আপনি বিচার করবেন কোন অংশ গ্রহণযোগ্য। কার্যত, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে আমাদের বিশ্বদৃষ্টিও (worldview) অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত নয়। আমরা সমাজকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করবো, তা কোরআনিক কাঠামোর ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আমরা গোষ্ঠীসমূহকেও অন্যের কাঠামো দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে পারি না। আমাদের নিজস্ব কোরআনিক কাঠামো থাকতে হবে, যাতে আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে পারেন।</p>
<p>যেমন, সংস্কারক (reformers) ও দুর্নীতিবাজ (corruptors) এই বিভাজন আমাদেরকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সবশেষে বলতে চাই, আমরা পবিত্র কোরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে যখন নিজেদেরকে এই চারটি ক্ষেত্রের একটিতে স্থাপন করবো, তখন আমাদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেইসাথে, প্রচলিত ধারণার উর্ধ্বে উঠে কোরআনকে আমাদের সময়, যুগ, সভ্যতা, ক্রান্তি ও সংস্কৃতির আলোকে নিজেদের অবস্থান থেকেও নতুন নতুন তত্ব ও আহকাম উন্মোচিত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত পাঠ করা জরুরী।</p>
<p>অনুবাদঃ মুশফিকুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/how-to-read-the-quraan/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16756</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রিথিংকিং আখলাক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/rithinking-akhlaq/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/rithinking-akhlaq/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 06 Apr 2026 10:26:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16731</guid>

					<description><![CDATA[আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্য উপাত্তে, এই তথ্য উপাত্ত আবার বিনোদনের সেক্টরে পরিণত হয়েছে এবং দিন যত গড়াচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব যেন তথ্যের প্রাচুর্যে আচ্ছন্ন এক নতুন মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে আলোচনা অধিক]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্য উপাত্তে, এই তথ্য উপাত্ত আবার বিনোদনের সেক্টরে পরিণত হয়েছে এবং দিন যত গড়াচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব যেন তথ্যের প্রাচুর্যে আচ্ছন্ন এক নতুন মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে আলোচনা অধিক জরুরী হয়ে পড়েছে। <strong>বর্তমান সময়ে অনেক বেশী জ্ঞানী হওয়া মানেই অনেক বেশী আখলাক সম্পন্ন ও মর্যাদাবান হওয়া বুঝায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আকলের মত একটি নিয়ামত খারাপভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।</strong> এর অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিগত শতাব্দীতে যে অগ্রগতি হয়েছে তা শান্তি নয়, যুদ্ধ ও সন্ত্রাস ডেকে এনেছে। এর পাশাপাশি ভোগের প্রবণতা, স্বার্থপরতা এবং লালসতার সীমানা যেন ছাড়িয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে আখলাকবিহীন জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষকে কতটা সুখ ও শান্তি দিতে সক্ষম এটা নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।</p>
<p>সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো, এই সংকট কেবল পাশ্চাত্যের সেকুলার জ্ঞানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; দ্বীনি জ্ঞানের পরিমণ্ডলেও তা সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দ্বীনি জ্ঞানের উদ্দেশ্যই হল আখলাক ও মূল্যবোধ তৈরি করা। অতীতের তুলনায় ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি, ধর্মীয় ধারার প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব কতটুকু পড়ছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। এসব বিষয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও আমাদের সমাজের আখলাকী অবস্থা আজ কেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে? আমরা ভালোভাবেই জানি- অর্থহীন, ফায়দাহীন ও বেহুদা বিতর্ক কোনো সমাজ বা সভ্যতাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষত দ্বীনের শাখা-প্রশাখা নিয়ে অযথা বিতর্ক মানুষের আখলাকী ও নৈতিক মানোন্নয়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।</p>
<p><strong>প্রতিটি দ্বীনি হুকুমেরই একটি ফিকহী দিক এবং একটি আখলাকী দিক রয়েছে। ফিকহী দিকটি মানুষের বাহ্যিক জগত এবং আখলাকী দিক মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতকে বিনির্মাণ করে থাকে। ইলমুল উসূলের ভাষায় ফিকহী দিকটি ইল্লতের উপর আর আখলাকী দিকটি গায়ে ইল্লতের (উদ্দেশ্য) উপর নির্ভর করে থাকে।</strong> এই অর্থে আখলাক হলো উদ্দেশ্য, ফিকহ হলো ওসিলা। ওসিলা ছাড়া উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতে পারে না। তবে উদ্দেশ্য যদি হারিয়ে যায় তাহলে ওসিলা কোন অর্থ বহন করে না।</p>
<p>অপরদিকে আখলাকের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হলো ইখতিলাফের আখলাক। মাকসাদ এক হলেও যদি কোন একটি বিষয়ের সমাধানের জন্য ব্যবহৃত পথ এবং পন্থা ভিন্ন হলে সেটাকে ইখতিলাফ বলা হয়ে থাকে। মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের জন্য ইখতিলাফ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে যে চিন্তা আকলে সালিমের বিপরীত এবং উম্মাহকে মেরুকরণের দিকে নিয়ে যায় সেটাকে খিলাফ বলা হয়ে থাকে। ইখতিলাফ হয়ে থাকে ফিকির বা চিন্তার মধ্যে আর&nbsp; খিলাফ হয়ে থাকে ব্যক্তির মধ্যে। ইখতেলাফ করা হয়ে থাকে দলীল এবং সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর ভিত্তি করে আর খিলাফ হয়ে থাকে ধারণার উপর ভিত্তি করে।</p>
<p><strong>ফলশ্রুতিতে যেকোনো বিষয়ে ইখতিলাফ হতেই পারে এটাকে স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে নিতে হবে। তবে এ ইখতিলাফ যেনো খিলাফে রূপান্তরিত না হয় ও বিভেদ সৃষ্টি না করে সেই দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।</strong> মতামত দেওয়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে আমি ভুল করতে পারি, তাই আমার মতকে যেনো একমাত্র সত্য হিসেবে তুলে না ধরি। আমাদের ব্যক্তিগত তর্ক-বিতর্ককে জ্ঞানগত বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। যাদের সাথে ইখতিলাফ করা হয়, তাদের নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা তা অনুধাবনের চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। <strong>এসব বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিপরীত পক্ষের কাউকে বিদয়াতপন্থী ও ভ্রান্ত বলে দোষারোপ না করা এবং কখনোই তাকফীর করার চেষ্টা না করা।</strong></p>
<p>উপরোল্লিখিত বিষয়সমূহ থেকে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ফিকহকে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন করার ফলে এবং ইখতিলাফের আখলাককে না মানার কারণে বর্তমানে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন হলো আহকাম ও আখলাকের সম্পর্ককে নতুন ভাবে বিশ্লেষণ করা এবং ‘আখলাক হলো আহকামের আকল’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে এই সম্পর্কে নতুন এক মাত্রা যোগ করা। আখলাক ও আহকামের সম্পর্ককে এ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিন্যাস করতে হলে আখলাককে মাকাসিদের একটি মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ফলশ্রুতিতে উসূলে ফিকহের মত আচরণকে আখলাকে রূপান্তরকারী মূল্যবোধের পদ্ধতি ও ক্রমধারাকে নতুন করে বিন্যাস করবে এমন একটি উসূলে আখলাকের বিকাশ সাধন অতীব জরুরী।&nbsp;&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/rithinking-akhlaq/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16731</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রোজার আসল উদ্দেশ্য কী?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-real-purpose-of-fasting/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-real-purpose-of-fasting/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 15 Mar 2026 09:58:22 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16680</guid>

					<description><![CDATA[মানুষের মন-প্রাণ, তার নাফস তো খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাসে গড়ে উঠেছে। সকালে খাবার, রাতে খাবার। জান্নাতেও তো এমনই ব্যবস্থা আছে। আল্লাহ বলেছেন, &#8220;সেখানে তাদের সকাল-সন্ধ্যায় রিযিক দেওয়া হবে।&#8221;&#160; একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, জান্নাতে কি রাত থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হঠাৎ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষের মন-প্রাণ, তার নাফস তো খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাসে গড়ে উঠেছে। সকালে খাবার, রাতে খাবার। জান্নাতেও তো এমনই ব্যবস্থা আছে। আল্লাহ বলেছেন, &#8220;সেখানে তাদের সকাল-সন্ধ্যায় রিযিক দেওয়া হবে।&#8221;&nbsp;</p>
<p>একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, জান্নাতে কি রাত থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? লোকটি বলল, ❝আল্লাহ তো বলেছেন সকাল-সন্ধ্যা রিযিকের কথা।❞</p>
<p>&nbsp;রাসূল ﷺ বললেন, এখানে সকাল-সন্ধ্যা বলতে শুধু সময়ের হিসাব বোঝানো হয়েছে।</p>
<p>আমাদের নাফস তো সারাদিন খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত। তাই আল্লাহ&nbsp; এ অভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখতে বলেছেন। আগের উম্মতদের রোজা রাখা ছিল খুব কঠিন, তাদের সকালের খাবার একদম বন্ধ, রাতের খাবারও আসত না। কিন্তু এই উম্মত মুহাম্মদির&nbsp; প্রতি আল্লাহর দয়া&nbsp; সম্মান দেখুন। তিনি আমাদের রোজায় সকাল-রাতের খাবার আহরণের ব্যবস্থা&nbsp; রেখেছেন। শুধু দিনের নির্ধারিত সময়ে খাওয়া বন্ধ। আর সেহরির সময় খেয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। নবীজি সেহরিকে <strong>❝বরকতময় সকালের খাবার❞</strong> বলেছেন। এই সংযম, এই সময়-নিয়ন্ত্রিত বিরতিই হলো সাওম বা রোজা।</p>
<p>রোজা হলো এমন একটি অভ্যাস থেকে বিরত থাকা, যে অভ্যাসের সঙ্গে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত।(খাওয়া-দাওয়া, শাহওয়াত) যখন নফসকে সেই পরিচিত অভ্যাস থেকে আটকানো হয়, তখন তা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ কষ্টের মধ্য দিয়ে শরীরকে আমরা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করি। কারণ নাফস যখন শাহওয়াতের পেছনে ছোটে, তখন সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ থেকে দূরত্ব যত বাড়ে, বরকত তত কমে যায়। আর যখন কোনো কিছু থেকে বরকত সরে যায়, তখন তা ক্ষীণ হয়, লাঞ্ছিত হয়, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।</p>
<p>কিন্তু যখন নফস তার অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে বিরত রেখে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে ফিরে আসে, তখন তার নৈকট্য বৃদ্ধি পায়। আর আল্লাহর নৈকট্য যত বাড়ে, ততই বরকত নেমে আসে। বরকত নেমে এলে তা পরিশুদ্ধ হয়, বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয়। যাকাত মানে-ই হলো বৃদ্ধি, কল্যাণে পরিপূর্ণতা।&nbsp;</p>
<p>মানুষকে আল্লাহ শুন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। তার শুন্য হৃদয়ে রেখেছেন ঈমান, জ্ঞান, হিকমত, বুদ্ধি, বোঝার ক্ষমতা, শান্তি, গাম্ভীর্য। আর এগুলো হলো&nbsp; কালবের সৈন্য। অন্যদিকে রয়েছে রাগ, ভয়, লোভ, ক্রোধ, ছল-চাতুরি, হিংসা, কাপুরুষতা, কৃপণতা এগুলো নফসের সৈন্য।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16682 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-1024x585.jpg" alt="" width="1024" height="585" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-1024x585.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-300x171.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-768x439.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461.jpg 1500w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>যখন মানুষ নফসের অভ্যাস থেকে বিরত থাকে, তখন সে যেন নিজের সত্তাকেই আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর যখন আল্লাহ সেই আত্মসমর্পণ কবুল করেন, তখন তিনি তাকে ঈমান, বুদ্ধি, সৎকর্ম ও কল্যাণ দিয়ে সমৃদ্ধ করেন। সে পরিশুদ্ধ হয়, পূর্ণতা লাভ করে।</p>
<p>এভাবেই রোজা হয়ে ওঠে দেহের যাকাত।</p>
<p>তুমি কি লক্ষ্য করো না রোজাদাররা ইবাদতের মাঝে কী অপূর্ব স্বাদ অনুভব করেন? কীভাবে তাদের অন্তর প্রশান্ত, নীরব ও স্থির হয়ে ওঠে?</p>
<p>এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:</p>
<blockquote><p>“নিশ্চয় প্রত্যেক কিছুরই যাকাত রয়েছে, আর দেহের যাকাত হলো রোজা।”</p></blockquote>
<p>যখন মানুষ রোজা রাখে, তখন তার উপর বরকত নেমে আসে। তার অন্তরে প্রতিটি কল্যাণের বীজ বিকশিত হতে থাকে, সৎগুণগুলো বেড়ে ওঠে, আর বরকতের ছোঁয়ায় সে মর্যাদায় উন্নত হয়। কিন্তু যদি এই গুণগুলোর উপর থেকে বরকত সরে যায়, তবে সেগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে,&nbsp;কোনো ফল দেয় না, কোনো আলো ছড়ায় না।</p>
<p>আল্লাহ তাআলা এই রোজাকেই বানিয়েছেন বরকত অবতীর্ণ হওয়ার একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে কল্যাণ বাড়ে, অন্তর পবিত্র ও&nbsp; বিকশিত হয়, আর তার নফস কল্যাণে পূর্ণ হয়ে ওঠে।</p>
<p>বান্দা নিজের অভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখার কারণে আমাদের প্রতিপালক বান্দার এই কর্মকে মহিমান্বিত করেছেন।</p>
<p>&nbsp;রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:</p>
<blockquote><p>“আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, তবে রোজা ব্যতীত। নিশ্চয়ই রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দিয়ে থাকি। আমার বান্দা আমারই জন্য তার খাদ্য, পানীয় ও কামনা-বাসনা ত্যাগ করে’।”</p></blockquote>
<p>এই কথা সেই বাণীরই প্রতিধ্বনি যেখানে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে একটি তার ইফতারের সময়, আরেকটি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে।”</p>
<p>“আমার বান্দা যদি এক বিঘত আমার দিকে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই।” বান্দা যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য দিনের বেলায় নিজের অভ্যাস, খাওয়া ও পান করা ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন আল্লাহ তার এ সামান্য ত্যাগকেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা&nbsp;ঘোষণা করেন:</p>
<p>“আমার বান্দা আমার জন্য তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করেছে।” তারপর বলেন: “এটি আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।”</p>
<p>অর্থাৎ এর সওয়াব তিনি অন্য কারও ওপর ন্যস্ত করেন না। অন্যান্য আমল বান্দার জন্য নির্ধারিত হলেও রোজা বিশেষভাবে আল্লাহর জন্য, কারণ এটি বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ নয়; বরং অন্তরের নিয়ত ও আত্মসংযম নিজের অভ্যস্ত প্রবৃত্তিকে দমন করা।</p>
<p>নবী ﷺ বলেছেন:</p>
<p><strong>“রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে একটি ইফতারের সময়।”</strong></p>
<p>এ আনন্দ হলো বরকত নেমে আসার আনন্দ, দেহের যাকাত আদায়ের প্রশান্তি। কারণ তখন নফসের কষ্ট লাঘব হয়, অন্তর হালকা হয়ে আসে।</p>
<p><strong>“অন্য আনন্দটি হবে তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময় যখন সে তার প্রতিদান প্রত্যক্ষ করবে।”</strong></p>
<p>এ কারণেই বান্দাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এক মাস রোজা রাখতে, এরপর শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখতে যেন সে পুরো বছর রোজাদারের সওয়াব পায়। কারণ একটি সৎকর্মের প্রতিদান দশ গুণ। ত্রিশ দিন মানে তিনশ দিনের সমান, আর ছয় দিন মানে ষাট দিনের সমান।</p>
<p>&nbsp;যদি তার সারা জীবনের হিসাব এভাবে সিয়ামের উপর হয়, তাহলে বরকত তার উপর স্থায়ী হয়ে যাবে, সর্বদা কল্যাণ প্রবাহিত হতে থাকবে। যে ব্যক্তি এই সুন্নতের প্রতি আগ্রহী হয়, সে মূলত চায় তার নাফসের জন্য এই বরকত স্থায়ী হোক, যেন তার দেহ ও অন্তর উভয়ই পবিত্র, বিকশিত ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মূলঃ আল-হাকীম আত-তিরমিযী।</strong></p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মু. সাইফুদ্দিন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-real-purpose-of-fasting/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16680</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতায় ইনফাকের সংস্কৃতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. খাদিজা গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 01 Mar 2026 15:03:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16655</guid>

					<description><![CDATA[রমজানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একইসাথে সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ইনফাক। আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি, এইসব সমস্যার মূলে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে ইনফাকের সংস্কৃতি উঠে যাওয়া।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>রমজানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একইসাথে সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ইনফাক। আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি, এইসব সমস্যার মূলে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে ইনফাকের সংস্কৃতি উঠে যাওয়া। এজন্য আজকে আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।</p>
<p>সহজ ভাষায় বললে, <strong>ইনফাক বলতে বুঝায় আল্লাহর পথে ব্যয়। শাব্দিক অর্থে বলতে গেলে, অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য যেই দান বা খরচ করা হয় সেটিই হচ্ছে ইনফাক।</strong> এই সহযোগিতা কেবলমাত্র আর্থিক বিষয় নয়। অপর একজন ভাই/ বোনকে সাহায্য করার জন্য একজন মানুষ তার ধন, সম্পদ, জ্ঞান, সময় এমনকি তার জীবন পর্যন্ত দান করতে পারে। কাজেই, ইনফাক একটি সামাজিক পরিভাষা। যদিও বর্তমানে ইনফাকের কথা এলে শুরুতেই আমাদের মাথায় আসে আর্থিক সাহায্যের বিষয়টি। প্রকৃতপক্ষে, ইনফাকের একইসাথে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক, অর্থাৎ দ্বিমাত্রিক অর্থ আছে। ইনফাকের বিষয়টি একজন ব্যাক্তিকে যেমন বিকশিত করে থাকে, অনুরূপভাবে তা সামাজিক সংহতি ও বিকাশের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ইনফাকের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা, নিজের সময়-সম্পদ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া এবং ত্যাগের মানসিকতা তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ বস্তুগত ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হতে পারে। অতএব, ইনফাকের ক্ষেত্রে আর্থিক দিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ একইসাথে আধ্যাত্মিক দিকটাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে আমি ইনফাকের বিষয়টিকে ৫টি ভাগে ভাগ করে থাকিঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. কথার মাধ্যমে দান।<br />
২. ইলম ও মারেফাতের মাধ্যমে দান।<br />
৩. সময়ের মাধ্যমে দান।<br />
৪. জীবনের মাধ্যমে দান।<br />
৫. সম্পদের মাধ্যমে দান।</p>
<p><strong>১.</strong> <strong>কথার মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে কাউকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে, কাউকে ভালো উপদেশ দেয়ার মাধ্যমে, কাউকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে তার উপকার করা। এগুলো ইনফাকের গুরুত্বপূর্ণ দিক।</p>
<p><strong>২.</strong> <strong>ইলম বা মারেফাতের মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে কোনো উপকারী জ্ঞানকে শিক্ষা করে সে জ্ঞানকে সবার সামনে তুলে ধরা, অন্যকে শিক্ষা দেয়া, বিশেষ করে যুবকদের কাছে তুলে ধরা। একই সাথে সে জ্ঞানটি আমাদের বাস্তব জীবনে কিভাবে কাজে লাগতে পারব সেটিকেও সবার সামনে উপস্থাপন করা।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16657 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d.jpg" alt="" width="735" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d.jpg 735w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d-300x180.jpg 300w" sizes="(max-width: 735px) 100vw, 735px" /></p>
<p><strong>৩.</strong> <strong>সময়ের মাধ্যমে ইনফাক</strong>—এটি হচ্ছে, কেউ যদি আপনার কাছে আসে, এসে সাহায্য-সহযোগিতা চায়; সেটি যেকোন বিষয়ে হতে পারে, যেমনঃ আর্থিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক। এই ব্যাপারে তাকে সময় দেয়া, তার সাথে গিয়ে তার সমস্যার সমাধান করা। এছাড়া সমাজে কোনো বিষয়ে সমস্যা থাকলে সে সমস্যার সমাধানের জন্য সময় বের করা এবং সেগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া হল সময়ের মাধ্যমে ইনফাক।</p>
<p><strong>৪.</strong> <strong>জীবনের মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে প্রয়োজনে জীবনের মায়াকে ত্যাগ করে হলেও অন্যের কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টা চালানো; এমনকি এতে যদি নিজের জীবনও বিপদাপন্ন হয়, তবুও চেষ্টা করা।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোভিড-১৯ এর সময় অনেক ডাক্তার, নার্স এবং হাসপাতালে কর্মরত মানুষজন রোগীদের সেবা দেয়া ও সুস্থ করার জন্য নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হন। শত শত নার্স, ডাক্তার ও চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যাক্তিরা অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেই মৃত্যুবরণ করেন। এটি হচ্ছে জীবন দিয়ে ইনফাকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে আমাদের মায়েরা। তারা তাদের সন্তানকে লালন পালন করার জন্য, তাদের বড় করার জন্য নিজের স্বাস্থ্য, ঘুম থেকে শুরু করে সবধরণের ত্যাগ স্বীকার করেন। বাবারা সন্তানদের হয়তো আর্থিকভাবে লালন পালন করার জন্য, ঘর পরিচালনার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। কিন্তু একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মায়েরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। এক কথায় বলতে গেলে, তারা তাদের জীবন দিয়ে একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।</p>
<blockquote><p><strong>আমাদের সামনে ইনফাকের সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হলো, আমাদের গাজার ভাইবোনেরা। উম্মতের ইজ্জতকে রক্ষা করার জন্য, আমাদের প্রথম ক্বিবলা বায়তুল মাকদিসকে রক্ষা করার জন্য, নিজেদের জন্মভূমিকে রক্ষা করার জন্য, এককথায় বলতে গেলে গোটা উম্মতের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য তারা তাদের জীবন দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন।</strong> <strong>গাজার নারী, শিশু থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ এর মধ্যে শামিল। তাই, আমি মনে করি এটি জীবন দিয়ে ইনফাকের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।</strong></p></blockquote>
<p><strong>৫.</strong> <strong>ধন-সম্পদ বা মালের মাধ্যমে ইনফাক।</strong> এটি হচ্ছে কারো যদি আর্থিক সামর্থ্য থাকে, সে ক্ষেত্রে যারা দরিদ্র, নিপীড়িত; তাদের সাথে নিজের সম্পদ ভাগাভাগি করে নেয়া। এটিকে আবার ৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ</p>
<p>ক) এর প্রথমটি হচ্ছে <strong>তাসাদ্দুক বা সাদাকাহ বা সদকা</strong>। এটি ইনফাকের সামগ্রিক একটি পরিভাষা। এক অর্থে বলতে গেলে এটি ইনফাকের সকল বিষয়কে পরিগ্রহ করে থাকে। এই সদকা সম্পর্কে রাসুল (সা.) এর একটি হাদীস রয়েছে। এ হাদীসে তিনি সদকাকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;প্রতিটি ভালো কাজই সদকা”</p></blockquote>
<p>বর্তমানে আমরা সদকা বলতে বুঝি, কেউ যদি এসে সাহায্য চায় তাকে সাহায্য করা, গরীব লোকদের খাবার দেয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ, আমরা এটিকে খুবই সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু রাসূল (স.) এটিকে সামগ্রিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। কারো সাথে দেখা হলে মুচকি হাসি দেয়া সদকা, কাউকে পথ প্রদর্শন করা সদকা, পশুপাখিকে খাবার দেয়া, অনুবাদ করা, কোনো একটি ভালো কিছু তৈরি করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, শিশু বা বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলানোসহ সকল ভালো কাজই সদকা। এগুলো সবই হাদিসের মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16658 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-1024x720.jpg" alt="" width="1024" height="720" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-1024x720.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-300x211.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-768x540.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c.jpg 1080w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>খ) সদকার আরেকটি রূপ হচ্ছে <strong>সদকায়ে ফিতর বা সদকাতুল ফিতর</strong>। এটি শুধু রমজান মাসের জন্য নির্দিষ্ট। অন্য কোনো সময়ের জন্য নয়। সদকাতুল ফিতর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সদকাতুল ফিতর হচ্ছে এই রমজানে যারা বেঁচে আছে তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহকে দেয়া একটি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহকে খুশি করার জন্য দরিদ্র ব্যাক্তিকে ফিতরা সদকা দেয়া। সদকায় ফিতর এমন একটি জিনিস, যার জন্য ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যাকাতের মতো নিসাব পরিমাণ মাল বা সম্পদের অধিকারী হতে হবে এমন নয়। এটি যে কেউ দিতে পারে। যাকাতের ক্ষেত্রে বাড়ির কর্তা বা যে সম্পদের অধিকারী সে-ই মূলত যাকাত দিয়ে থাকে। অন্যদের পক্ষ থেকে আদায় করা হয় না। কিন্তু সাদাকাতুল ফিতর জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুর জন্য তার পিতা-মাতা দিয়ে থাকে। এটি একটি অসাধারণ বিষয়।</p>
<p>গ) সদকার তৃতীয় রূপ হচ্ছে <strong>যাকাত</strong>। যাকাত হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী ব্যাক্তির সম্পদের একটি অংশকে দান করা। এটি ইসলামের ৫টি স্তম্ভের একটি। সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য যাকাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ বলেনঃ</p>
<blockquote><p>&#8220;خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ&#8221;</p>
<p>অর্থ: (হে নবী!) তুমি তাদের ধন-সম্পদ হতে সাদাকাহ গ্রহণ কর, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করে দিবে, আর তাদের জন্য দু‘আ কর। নিঃসন্দেহে তোমার দু‘আ হচ্ছে তাদের জন্য শান্তির কারণ, আর আল্লাহ খুব শোনেন, খুব জানেন।</p></blockquote>
<p>এখানে রাসুলকে (স.) নির্দেশ করা হয়েছে, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্দেশ করা হয়েছে। <strong>যাকাত দেয়ার মাধ্যমে ধনীদের ধন-সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা এর প্রধান উদ্দেশ্য। এখানে ‘তুতাহহির’ শব্দটির মাধ্যমে সম্পদ কমানো বা নেয়ার জন্য বলা হচ্ছেনা বরং তাদের পরিশুদ্ধ করো বা পবিত্র করো এটি বলা হয়েছে।</strong> যাকাতের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাকাতের মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পদ পরিশুদ্ধ হয়, ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়। এখানে যাকাত ও ‘তুযাক্কি’ একই শব্দমূল থেকে এসেছে।</p>
<p>ঘ) সদকার আরেকটি দিক হচ্ছে <strong>কর্জে হাসানা</strong>। এটি হলো কোন ধরনের বিনিময় প্রত্যাশা না করে কাউকে ঋণ দেয়া। কোন কষ্টে বা সমস্যায় নিপতিত ব্যাক্তিকে কোন সুদ বা দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ ছাড়া ঋণ দেয়াকে ইসলামের অনেক বড় ফজিলত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এটি এমন একটি বিষয়, যেমন কোনো ব্যাক্তি কোনো সমস্যার কারণে ঋণ চাচ্ছে, এমতাবস্থায় আপনি জানেন যে, এটি তার পক্ষে ফেরত দেয়াটা খুবই কঠিন। এমনকি তিনি ফেরত নাও দিতে পারেন—এটি জেনেও তাকে ঋণ দেয়া এবং মনে করা যে আপনি আল্লাহকে ঋণ দিচ্ছেন, এভাবে তাকে ঋণ দেয়া। অর্থাৎ, কোনো ধরণের বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই দিয়ে দেয়া। সে যদি তা ফেরত দেয় তো ভালো, আর যদি দিতে না পারে তাহলে আল্লাহ স্বয়ং নিজে এর বিনিময় দিবেন। কর্জে হাসানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে ঋণ নিবে সে যেনো এর অপব্যবহার না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি নিবে তাকেও অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে, সে যেনো এই নিয়তে না আসে যে, তার কাছে সম্পদ আছে, সেতো দিবেই আমি আর ফেরত দিবোনা, তাহলে এটি আল্লাহর সাথেই প্রতারণা করা হলো। এর হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এজন্য সম্ভব হলে অবশ্যই পরিশোধ করার নিয়্যত থাকতে হবে।</p>
<blockquote><p>مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَهٗ لَهٗۤ اَضۡعَافًا كَثِیۡرَۃً ؕ وَ اللّٰهُ یَقۡبِضُ وَ یَبۡصُۜطُ ۪ وَ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ</p>
<p>অর্থ: এমন ব্যক্তি কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম কর্জ প্রদান করবে? তাহলে তার সেই কর্জকে তার জন্য আল্লাহ বহু গুণ বর্ধিত করে দেবেন এবং আল্লাহই সীমিত ও প্রসারিত ক’রে থাকেন এবং তাঁর দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।</p></blockquote>
<p>কর্জে হাসানার বিষয়টি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটানো উচিত এবং কর্জে হাসানার অপব্যবহার যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। কোরআন আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, ইনফাক হচ্ছে বরকতের একটি উৎস, একইসাথে এটি আমাদের ধন-সম্পদ হ্রাস করেনা, বরং বৃদ্ধি, পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে।<br />
কর্জে হাসানা বা বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়া দান করলে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কখনো সাতগুণ, কখনো একশতগুণ, আবার চাইলে সাতশতগুণ বা অফুরন্ত নিয়ামতে একজন ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ করতে পারেন। তাই আমরা বলে থাকি— দান, সদকা, যাকাত সম্পদকে হ্রাস করেনা, বরং বৃদ্ধি করে। সম্পদের বরকতের বড় একটি উৎস এই দান-সদকা।</p>
<blockquote><p>مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ حَبَّۃٍ اَنۡۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِیۡ كُلِّ سُنۡۢبُلَۃٍ مِّائَۃُ حَبَّۃٍ ؕ وَ اللّٰهُ یُضٰعِفُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ</p>
<p>অর্থ: যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।</p></blockquote>
<p>ঙ) সদকার পঞ্চম যে শ্রেণী, তা হচ্ছে <strong>ফিদিয়া বা কাফফারা</strong>। কেউ রোযা রাখতে অক্ষম হলে তার পরিবর্তে যে দান, বা ওয়াদা রাখতে না পারলে কিংবা এরকম বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দান হলো ফিদিয়া বা কাফফারা। যদি কেউ অসুস্থতার কারণে বা অন্য কোন কারণে রোজা রাখতে না পারে তাহলে সে পরের মাসে কাযা করবে। কিন্তু তার অসুস্থতা যদি এমন হয় যে, তার পক্ষে পরেও কাজা করা সম্ভব না, স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্ভাবনা বা মৃত্যু ঝুঁকি থাকে তাহলে সে ফিদিয়া দিবে। কিন্তু অনেকে এটির অপব্যবহার করে থাকে; ক্লাস, কাজ এসব অজুহাতে রোযা রাখেনা। মনে করে, আমার সামর্থ্য আছে আমি ফিদয়া দিয়ে দিবো। এভাবে এই বিধানের অপব্যবহার করে থাকে। এটি এক অর্থে আল্লাহর সাথে প্রতারণা। আর আল্লাহর সাথে যে প্রতারণা করে, সে নিজেই প্রতারিত হয়।</p>
<p>দান-সদকা এগুলোর জন্য আন্তরিক নিয়্যত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বরকত হওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো, পবিত্র ও হালাল জিনিস দান করতে হবে। নাহলে এটি বরকতের উৎস হবে না।</p>
<blockquote><p>﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِآخِذِيهِ إِلَّا أَن تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ</p>
<p>অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করোনা। কেননা, তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। (সূরা বাকারা, ২৬৭)</p></blockquote>
<p>কোনো একটি পোশাক পুরনো হয়ে গেলে সেটি ফেলে দেয়ার আগে কাউকে দিয়ে দেওয়া বা খাবার খেয়ে কিছু রয়ে গেছে; তা ফেলে দেয়ার আগে দিয়ে দেয়াকে দান বুঝায় না। নতুন কোনো কিছু বা সবচেয়ে সুন্দর কোনো কিছু দান করা হলো উত্তম দান।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16663 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero.jpg" alt="" width="936" height="600" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero.jpg 936w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero-300x192.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero-768x492.jpg 768w" sizes="(max-width: 936px) 100vw, 936px" /></p>
<p>ইনফাক হচ্ছে বান্দাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া ও অপর ভাইয়ের প্রতি ধন্যবাদ।</p>
<p>বান্দার প্রতি ধন্যবাদ তিনভাবে হয়ে থাকেঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১. আমাদের উপর তাদের যে অধিকার সেটি আমরা পূরণ করে দিচ্ছি</strong><br />
<strong>২. তাদের দেয়ার কারণে আমাদের সম্পদ পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হচ্ছে</strong><br />
<strong>৩. যখন সমাজে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষ থাকবেনা, তখন সমাজে বিশৃংখলা ও অপরাধ কমে যাবে এবং শান্তি বিরাজ করবে। কাজেই, সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।</strong></p>
<p>ইনফাকের অন্যতম উদ্দেশ্য সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সংহতি ও সামাজিক আদালত নিশ্চিত করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এটি একটি পন্থা। যে ব্যক্তি দান করে, সে আধ্যাত্মিকভাবে প্রশান্তি লাভ করে; একই সাথে সে কৃপণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে সামাজিকভাবে শ্রদ্ধা অর্জন করে এবং দানের যে সংস্কৃতি সেটিকে বিকশিত করে।<br />
আল্লামা ত্বহা আবদুর রহমান এর ভাষায়, ইনফাক আমাদের আমানতের যে চেতনা সেটিকে জাগ্রত করে থাকে। অর্থাৎ এই পৃথিবীর যা কিছু আছে সবই আমাদের নিকট আমানত এই চেতনা জাগ্রত করে আর আমাদের নিজেদের এর মালিক ভাবার চেতনা হ্রাস করে।</p>
<p>অনেক গবেষণায় আমরা দেখতে পাই যে, যদি পৃথিবীর সব ধনী মুসলমানেরা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করতো, তাহলে পৃথিবীর কোথাও দারিদ্র‍্য ও সামাজিক বৈষম্য থাকতোনা।</p>
<p>ফরাসি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ রজার গারাউডির ভাষায়ঃ</p>
<p>&#8220;যাকাত এমন কোনো বিষয় নয় যা মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এটা আমাদের ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়। <strong>যাকাত হচ্ছে এমন একটা বিষয় যা মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা বা কৃপণতার যে প্রবণতা আছে তাকে পরাভূত বা পরাজিত করতে সাহায্য করে।</strong> মানুষের পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক একটি রূপ হচ্ছে যাকাত। এটিকে বাধ্যতামূলক ও আধ্যাত্মিক একটি কর্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যাকাত একইসাথে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সকল সম্পদের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। <strong>ব্যক্তি চাইলে তার ইচ্ছামতো এর ব্যবহার করতে পারবেনা। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবেই ব্যয় করতে হবে। এটি একটি আমানত।</strong> শুধু তাই নয়। সে যে এই সমাজের সদস্য, অন্য মানুষের সাথে তার একটি সম্পর্ক আছে, সেই সম্পর্কের প্রতি তার একটি দায়বদ্ধতা আছে; এটি তাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় যাকাত।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা যদি কোরআনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, কোরআনে নামাজ এবং যাকাতের কথা একই সাথে উল্লেখিত হয়েছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱرْكَعُوا۟ مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ&#8221;</p>
<p style="padding-left: 40px;">১। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর। (বাকারা, ৪৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">اَلَّذٖينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقٖيمُونَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَۙ</p>
<p style="padding-left: 40px;">২। যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়েম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। (বাকারা, ৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">وَاَقٖيمُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتُوا الزَّكٰوةَؕ وَمَا تُقَدِّمُوا لِاَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللّٰهِؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصٖيرٌ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৩। এবং তোমরা নামায আদায় কর, যাকাত দাও এবং যা কিছু সৎ কার্যাবলী তোমরা স্বীয় আত্মার জন্যে আগে পাঠাবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকট পাবে। তোমরা যা কিছু করছো নিশ্চয়ই আল্লাহ তা দেখছেন। (সূরা বাকারা, ১১০)</p>
<p style="padding-left: 40px;">لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلٰٓئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيّٖنَۚ وَاٰتَى الْمَالَ عَلٰى حُبِّهٖ ذَوِي الْقُرْبٰى وَالْيَتَامٰى وَالْمَسَاكٖينَ وَابْنَ السَّبٖيلِ وَالسَّٓائِلٖينَ وَفِي الرِّقَابِۚ وَاَقَامَ الصَّلٰوةَ وَاٰتَى الزَّكٰوةَۚ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ اِذَا عَاهَدُواۚ وَالصَّابِرٖينَ فِي الْبَأْسَٓاءِ وَالضَّرَّٓاءِ وَحٖينَ الْبَأْسِؕ اُو۬لٰٓئِكَ الَّذٖينَ صَدَقُواؕ وَاُو۬لٰٓئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৪। তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে এতে কোন কল্যাণ নেই বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি এবং আল্লাহর ভালবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাকাত বন্টনকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিস্কৃতি দিতে দান করবে এবং নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিতে থাকবে, ওয়া‘দা করার পর স্বীয় ওয়া‘দা পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে— এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই মুত্তাকী। (সূরা বাকারা, ১৭৭)</p>
<p style="padding-left: 40px;">الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِى ٱلْأَرْضِ أَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُوا۟ بِٱلْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا۟ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلْأُمُورِ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৫। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি যমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে। (হজ্জ, ৪১)</p>
<p style="padding-left: 40px;">رِجَالٌۙ لَا تُلْهٖيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللّٰهِ وَاِقَامِ الصَّلٰوةِ وَاٖيتَٓاءِ الزَّكٰوةِۙ يَخَافُونَ يَوْماً تَتَقَلَّبُ فٖيهِ الْقُلُوبُ وَالْاَبْصَارُ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৬। সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখেনা, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। (সূরা নূর, ৪৯)</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16659 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451.jpg" alt="" width="1000" height="668" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451.jpg 1000w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451-768x513.jpg 768w" sizes="(max-width: 1000px) 100vw, 1000px" /></p>
<p>ইনফাক মানুষকে একই সাথে কিভাবে রূহগত ও সামাজিকভাবে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করে সেই ব্যাপারে হযরত পয়গাম্বর (সঃ) বলেন,</p>
<p style="padding-left: 40px;">اَلْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى<br />
দানকারীর হাত গ্রহণকারীর হাতের চেয়ে উত্তম। (বুখারী, যাকাত, ১৮)</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ&#8221;<br />
যদি কেন কোন মু’মিনের কোন একটি দুনিয়াবী সমস্যাকে দূর করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিন তার একটি সমস্যাকে দূর করে দিবেন। (মুসলিম, বিরর, ৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنًى&#8221;<br />
সর্বোত্তম সাদাকা হলো, প্রয়োজনের অতিরিক্তকে দান করে দেওয়া। (বুখারী, যাকাত, ১৮)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইনফাক বা দানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরিঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. <strong>দান শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা পাওয়ার জন্য করতে হবে।</strong><br />
২. সময়মতো সাহায্য করা। দেখা গেছে যে, কোনো অসুস্থতা বা প্রয়োজনের সময় দান না করে যদি পরে দান করা হয় তাহলে তার খুব বেশি উপকার হবে না। এজন্য সময়মত দান করার চেষ্টা করতে হবে।<br />
৩. <strong>গোপনে দান করা ও প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকে দূরে থাকা।</strong> তবে এটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন ফাউন্ডেশন বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এধরণের কাজকে উৎসাহ দেয়ার জন্য এটিকে দৃশ্যমান করা বা প্রচার করার মধ্যে সমস্যা নেই।<br />
৪. <strong>সম্পদের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস দান করা।</strong> অব্যবহৃত বা মূল্যহীন কিছু দেয়ার চেয়ে ব্যাক্তি যা পছন্দ করে সেখান থেকে দেয়া সবচেয়ে উত্তম।<br />
৫. দেয়ার সময় কোনো ধরনের অপচয় না করা, আবার কৃপণতা থেকেও মুক্ত থাকা। এখানে ব্যক্তি একটি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে।<br />
৬. <strong>যাদের সত্যিকার অর্থে প্রয়োজন তাদের ক্রমাগত সাহায্য করা।</strong><br />
৭. ব্যক্তির উপার্জিত সকল অর্থ দান করা যাবে না। তার পরিবার-পরিজনসহ যাদের প্রতি তার দায়িত্ব আছে তাদের প্রতিপালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রেখে বাকীটা দান করতে হবে।</p>
<p>তাকওয়ায় উপনীত হওয়ার দুটি উপায় আছেঃ</p>
<ul>
<li><strong>১. ইনফাক</strong></li>
<li><strong>২. কল্যাণকর কাজ</strong><br />
ইনফাকও এক ধরণের কল্যাণকর কাজের অংশ।</li>
</ul>
<p>ইসলামী আখলাকের দৃষ্টিকোণ থেকে ইনফাক করার সময় আমাদের দুটি বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবেঃ</p>
<ul>
<li><strong>১. ইসরাফ</strong></li>
<li><strong>২. তাবজির</strong></li>
</ul>
<p>রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;তোমরা ইসরাফ অর্থাৎ অপচয়ের দিকে ধাবিত না হয়ে, অহংকার বা নিজেকে গৌরবান্বিত করার রোগে আক্রান্ত না হয়ে খাও, পান করো ও পরিধান করো এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করো। আল্লাহ তোমাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তা যেনো দৃশ্যমান হয়।&#8221; (বুখারী)</strong></p>
<p>কারো যদি সামর্থ্য থাকে সে ভালো খাবে, ভালো পরিধান করবে, সুন্দর থাকবে এটি আল্লাহ বান্দার কাছ থেকে দেখতে চান।</p>
<p>এ ইনফাক বা ব্যয় করার ক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে একটি পরিভাষা হচ্ছে <strong>তাবজির।</strong> তাবজির হচ্ছে অযথা খরচ বা আল্লাহ যা পছন্দ করেননা, সেখানে খরচ করা। হাদিসে এসেছে, <strong>&#8220;তাবজিরকারী শয়তানের ভাই।&#8221;</strong></p>
<p>এটি ইসরাফের চেয়ে আরেকধাপ এগিয়ে। এই তাবজিরের ব্যাপারে আল্লাহ কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন।</p>
<blockquote><p>وَ اٰتِ ذَاالۡقُرۡبٰی حَقَّهٗ وَ الۡمِسۡكِیۡنَ وَ ابۡنَ السَّبِیۡلِ وَ لَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا<br />
অর্থ: আত্মীয় স্বজনকে দিবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও, এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা।</p></blockquote>
<p>আমরা যদি সম্পদকে আখলাকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে এটি আমাদের জন্য একটি নিয়ামত, আবার একইসাথে এটি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষাও। পবিত্র কোরআনের কিছু কিছু আয়াতে আমরা দেখতে পাই, ধন-সম্পদকে মুমিনদের জন্য ফিতনা ও পরীক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার সম্পদকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যয় করাকে একটি গুনাহের কাজ, একটি দায়িত্বহীন কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানদের অজুতে পানি অপচয় না করা, একেবারে উদরপূর্তি করে না খাওয়া, খাবারের টেবিলকে সাদামাটা রাখা এসব বিষয়ে রাসূলে কারীম (স.) উৎসাহিত করেছেন। আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার, পোশাক ও দামি আসবাবপত্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মুমিনের জীবন হতে হবে সাধারণ ও অনাড়ম্বর।</p>
<p>ইসরাফ ও তাবজিরের পার্থক্যের ক্ষেত্রে আলেমেরদের অনেকের বক্তব্য রয়েছে। এখানে আমি <strong>আল-মাওয়ার্দির</strong> বক্তব্যটি উল্লেখ করছি,</p>
<p>তার মতে, <strong>“ইসরাফ হচ্ছে সঠিক জায়গায় প্রয়োজনের অধিক ব্যয় করা; তাবজির হচ্ছে আল্লাহ পছন্দ করেননা এমন জায়গায় ব্যয় করা, আল্লাহর অবাধ্যতা যেখানে আছে সেখানে ব্যয় করা।”</strong></p>
<p>ইনফাক এর প্রভাব কেবল ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সমাজের ভারসাম্যকে নিশ্চিত করে থাকে। এটি একটি পবিত্র কাজ, এটি আমাদের পারস্পরিক ভাগাভাগি (শেয়ারিং) এর বিষয়টিকে বৃদ্ধি করে থাকে, একই সাথে যে দান করে ও যে দান গ্রহণ করে উভয়কে আত্মিকভাবে প্রশান্তি দিয়ে থাকে। এজন্য ইনফাককে একটি জীবনধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করা আমাদের ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এ বিষয়টি সবসময় জানা থাকতে হবে যে, ধনী হওয়া কিংবা দরিদ্র‍তা—এটি পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিক্রমায় একজন ধনী ব্যক্তিও দরিদ্র হয়ে যেতে পারে, আবার একজন দরিদ্র ব্যক্তিও ধনী হতে পারে। এজন্য ধন-সম্পদ আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হচ্ছে তাকওয়া। একজন ব্যক্তি গরীব হলে গরীব থাকা অবস্থায় যে দায়িত্বগুলো পালন করা সম্ভব, সেগুলো পালন করবে; ধনী হলে ধনী থাকা অবস্থায় যে দায়িত্বগুলো পালন করা প্রয়োজন সেগুলো পালন করবে। তাহলেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রিয় হওয়া যাবে।</p>
<p>আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে এই বিষয়ের আলোকে আমল করার তৌফিক দান করুক। আমাদের সামাজিক সংহতি তৈরি করার তৌফিক দান করুক। ইনফাককে আমাদের জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাওফিক দান করুক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16655</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জুমুয়াতুল বেদা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/jumuatul-wida/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/jumuatul-wida/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 17 Feb 2026 10:34:24 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16571</guid>

					<description><![CDATA[&#8220;আয় মাহে রমজান, আল-বেদা&#8221;-&#8220;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8221;-প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শুনেছি-তবু আজো রমজানের মাসে মাঝে মাঝে কানে বেজে উঠে আয় মাহে রমজান, আলবেদা-আয় মাহে রমজান, আলবেদা! বাড়ীর সংলগ্ন আমবাগ; সেই আমবাগে গাঁয়ের ছোট মছজিদ; রোজার মাসে তারাবীর নামাজে গাঁয়ের মুছল্লীরা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&#8220;আয় মাহে রমজান, আল-বেদা&#8221;-&#8220;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8221;-প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শুনেছি-তবু আজো রমজানের মাসে মাঝে মাঝে কানে বেজে উঠে আয় মাহে রমজান, আলবেদা-আয় মাহে রমজান, আলবেদা!</p>
<p>বাড়ীর সংলগ্ন আমবাগ; সেই আমবাগে গাঁয়ের ছোট মছজিদ; রোজার মাসে তারাবীর নামাজে গাঁয়ের মুছল্লীরা ভেঙ্গে পড়ত। ইমামতী করতেন মুনশী কছিমুদ্দীন সাহেব। অমন বিনয় নম্র ব্যবহার, অমন হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি আর কোথাও দেখি নাই; অমন ভক্তি গদগদ অমৃতবর্ষী কেরায়াত আর কোথাও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। শরীয়তের শাসনের জন্য তিনি কাউকে কখনও জামাতে আটকে দেন নাই, কারো বিবি তালাকের ফতোয়া জারি করেন নাই। কারো পীঠে কখনো দোররা মারার হুকুমের কথা ভাবেন নাই। অথচ গাঁয়ের ছোট-বড় সবাই বিনা প্রতিবাদে তাঁর কথা মেনে চলত।</p>
<p>সে আমবাগানে ছিল বহু-বহুকালের পুরানো গাছ-আম, গাব, বট। আম গাছের গায় সুরুঙ, গাব গাছের গায় গোদ, বটের জটে মছজিদের লাগ বহু স্থান রেখেছিল ছেয়ে। মছজিদের চারপাশে ছিল নতুন-পুরাতন অগণ্য কবর। আর আমার মনে ছিল তখন বাল্যের অপার বিশ্বাস: দুনিয়ার কোন বিস্ময়ই এ বিশ্বাসকে হার মানাতে পারত না। এই মায়াময় পরিবেশে অবস্থিত মছজিদে দাঁড়িয়ে যখন মুনশী সাহেব তাঁর সুন্দর গম্ভীর ছন্দোময়ী কণ্ঠে উচ্চারণ করতেন, &#8216;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8217;, &#8216;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8217;, তখন বুঝতাম না কিছুই, অথচ কি একটি প্রিয় বস্তু হারানোর অজ্ঞাত বেদনায় মন টন টন করে উঠত।</p>
<p><strong>কিন্তু রমজানকে কেন এই বেদনাময়ী সম্ভাষণ? উপবাসের মাস-এই মাস চলে যাচ্ছে, এতো স্বাভাবিক অবস্থায় খুশী হওয়ারই কথা ছিল। সে খুশীর বদলে মুছলমানের কণ্ঠে এ ব্যথার বাণী কেন?</strong></p>
<p>ব্যক্তির জীবনে, প্রাচুর্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রাচুর্য সব সময়ে সম্পদ নয়; প্রাচুর্যে বিপদও আছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচুর্য হতে আসে বিলাস, বিলাস হতে আসে ব্যাসন। সে বিলাস-ব্যাসনে অবশেষে মন ভেঙ্গে পড়ে, আত্মা হাঁপিয়ে উঠে। তাই প্রাচুর্যের আপদকে শাসনে রাখার জন্য প্রয়োজন সংযমের। সাময়িক উপবাস সেই সংযম অনুশীলনের অন্যতম পথ। বেশী খেয়ে পেটের অসুখ ঘটিয়ে বসলে যে চিকিৎসক খানাপিনার ব্যাপারে লঙ্ঘন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই একই শ্রেণীর কারণে এ উপবাসের ব্যবস্থা। এ হিসাবে রমজানের রোজা মানুষের দুর্বল মনে নতুন শক্তির সঞ্চার করে, তার পীড়িত আত্মাকে দেয় শান্তি। ব্রত হিসাবে, সৎ কাজের সহায়ক হিসাবে স্বেচ্ছায় উপবাসকে বরণ করে নিলে মনে যে অপূর্ব শক্তির সৃষ্টি হয়, একথা বহু ধর্মের বহু মনীষী অকুণ্ঠ কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। সেই জন্য রমজান মাসের শেষ শুক্রবারে স্থানীয় মুছলমানেরা জুমা মছজিদে সমবেত হয়ে মাতমের সুরে তাদের বেদনা জ্ঞাপন করে:</p>
<p style="padding-left: 40px;">আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া শাহরাল কোরআন,<br />
আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া আমমারাল কুলুব<br />
আলবেদা-আলবেদা, ইয়া শাহরা রমজান।</p>
<p style="padding-left: 40px;">(হে কোরানের পবিত্র মাস, তোমায় সালাম।<br />
হে হৃদয় শক্তি সঞ্চয়কারী মাস তোমায় সালাম,<br />
বিদায়&#8230; বিদায় হে মাহে রমজান!)</p>
<p>রমজান সংযমের মাস। খাঁটি মুছলমান রমজানের প্রথমেই সংকল্প করে: আমি ষোল আনা রোজা রাখব দেহের রোজা, মনের রোজা, চোখের রোজা, মুখের রোজা। মানুষের দিলকে সাফ করবার জন্য এই যে নিয়ত, এই যে কোশেশ, এ রমজানের মাসকে এক বিরাট মর্যাদা দান করেছে। তাই রছুলুল্লাহ বলেছেন, রমজানের আগমনে বেহেস্তের দুয়ার খুলে যায়, আর দোজখের দুয়ার সব রুদ্ধ। আর এই জন্যই জুমুয়াতুল বেদার দিনে মুছল্লীরা হাজির হয়ে বার বার উচ্চারণ করে:</p>
<p>আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া শাহরাল মাগফেরাতে ওয়াল আতকে মিনান্নিরান। &#8216;হে ক্ষমা ও দোজখ হতে বাঁচার মাস, তোমায় সালাম!&#8217;</p>
<p>মানুষের জীবনে যত বড় দুঃখ ঘটতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে অনশনের দুঃখ। অনশনের জ্বালায় ধার্মিক খোদাকে অভিশাপ দেয়, জননী সন্তানকে বিক্রি করে, সতী নারী পরকে দেহদান করে, কেউ বা গলায় দড়ি দিয়ে এত প্রিয় যে জীবন তাকেও ত্যাগ করে। এত বড় যে দুঃখ তাও প্রতিবেশী ধনীরা নিজ চোখে দেখেও সব সময় বোঝে না; কারণ জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তো তারা কখনো এ দুঃখ অনুভব করে নাই। আব্রাহাম লিঙ্কন গরীবের ঘরে জন্মেছিলেন, গরীবের দুঃখ-বেদনার খবর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই দুস্থ জনগণের কল্যাণে তিনি তাঁর দেশের ধনী ও প্রতিপত্তিশালী অভিজাতদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম ঘোষণা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ধনীর ঘরে যারা জন্মলাভ করে যুগে যুগে দেশে দেশে প্রধানত তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভুত্ব শক্তি পরিচালনা করে আসছে। এরা যদি দুস্থজনগনের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন না হয়, তবে সে দুস্থদের কল্যাণমূলক কাজ এদের দিয়ে সম্যকরূপে সম্পন্ন হওয়ার তো কথা নয়। এ ধনী সন্তানেরা নিজেরা যদি অনশন করে, তবেই অনশন পীড়িতদের প্রতি এদের যথোপযুক্ত সহানুভূতি হওয়ার একটা সঙ্গত সম্ভাবনা ঘটে।</p>
<p>জঠর জ্বালা কি, এ যারা না জানে, রমজানের রোজা তাদেরে সেই শিক্ষা দেয়। জনগণের দুঃখ নিজ জীবন দিয়ে বুঝবার জন্য গান্ধীজী চলতেন রেল-স্টীমারের তৃতীয় শ্রেণীতে, কাপড় পরতেন হাঁটু পর্যন্ত। জনগণের দুঃখ বুঝবার জন্য তাদের সঙ্গে কার্যগত সহানুভূতি সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য মহানবী তাঁর মদীনা জীবনের ঐশ্বর্যের দিনেও অনেক সময়ই তাঁর ক্ষুধার্ত পেটে বেঁধে রাখতেন নিষ্করুণ পাথর। <strong>তিনি বলতেন-রোজ হাসরে আমি এই দুস্থদের সঙ্গেই উত্থান করব। দুস্থ মানবতার জন্য এই যে গভীর মহিমাময় দরদ, রমজান মানুষকে তারই মন্ত্রে দীক্ষা দিতে চেষ্টা করে।</strong></p>
<p>মানুষের দুঃখ বুঝবার জন্য রমজানের সাহায্যে এই যে প্রস্তুতি, আল্লার পথের যারা সত্যিকার পথিক, তারা এই সুযোগকে মনে করে আল্লার তরফ হতে এক পরম নেয়ামত। রমজান শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে, এ নেয়ামতের পথ হয়ে যাবে রুদ্ধ, একথা ভেবে তারা হয়ে পড়ে আকুল। তাই তারা এ মহান সুযোগের সম্ভাবিত অবসানের ব্যথায় অধীর হয়ে মছজিদে সমবেত হয়। কোন জাতীয় বিপদ ঘটলে যেমন সবাই মিলে দুঃখ করে, রোজাদারেরাও তেমনি সবাই সকরুণ স্বরে বলতে থাকে-</p>
<p style="padding-left: 40px;">বিদায়-বিদায়-হে বন্ধু রমজান, বিদায়:<br />
আলবেদা আলবেদা,<br />
আয় মাহে রমজান,<br />
আলবেদা।*</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>[*রেডিও পাকিস্তানের সৌজন্যে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত “ইব্রাহিম খাঁ রচনাবলী-১” থেকে সংগৃহীত।]</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/jumuatul-wida/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16571</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পরিভাষার পরিশুদ্ধিতে সৈয়দ নকিব আল-আত্তাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/syed-naqib-al-attas-on-the-refinement-of-terminology/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/syed-naqib-al-attas-on-the-refinement-of-terminology/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 06 Feb 2026 12:05:15 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16542</guid>

					<description><![CDATA[ভাষার বুননে এক অভিজাত মালয় দার্শনিকের সভ্যতার পুনর্জাগরণের অভিযাত্রা &#160; কুয়ালালামপুরের স্পন্দিত হৃদয়ে এক সবুজ শ্যামল অভিজাত এলাকা হিসেবে নিজের সগর্ব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বুকিত তুনকু। মালয়েশিয়ার আল্ট্রা-এলিট বা অতি-ধনিক শ্রেণির পছন্দের আবাসস্থল এটি। তাদের সুউচ্চ অট্টালিকা ও ভিলাগুলোর ভিড়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4 style="text-align: center;">ভাষার বুননে এক অভিজাত মালয় দার্শনিকের সভ্যতার পুনর্জাগরণের অভিযাত্রা</h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>কুয়ালালামপুরের স্পন্দিত হৃদয়ে এক সবুজ শ্যামল অভিজাত এলাকা হিসেবে নিজের সগর্ব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বুকিত তুনকু। মালয়েশিয়ার আল্ট্রা-এলিট বা অতি-ধনিক শ্রেণির পছন্দের আবাসস্থল এটি। তাদের সুউচ্চ অট্টালিকা ও ভিলাগুলোর ভিড়ে সেখানে হঠাৎ চোখে পড়ে এক আন্দালুসিয় স্থাপত্যের দূর্গ প্রাসাদ। যেন পঞ্চদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়াকে কেউ জাদুবলে তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে মালয় ক্রান্তীয় অঞ্চলের বুকে। এটি হলো &#8216;ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট অ্যান্ড সিভিলাইজেশন&#8217; (ISTAC)। পাহাড়ের চূড়ায় মশালের মত জ্বলতে থাকা এই স্থাপনাটি একজন সাধারণ দর্শকের চোখেও স্থাপত্যশৈলীর এক অপার বিস্ময়।</p>
<figure id="attachment_16546" aria-describedby="caption-attachment-16546" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16546 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16546" class="wp-caption-text">ISTAC এর গ্রাউন্ড, Sohail Nakhooda</figcaption></figure>
<p>১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ISTAC, বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার অবক্ষয়ের বিপরীতে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক জবাবের সূচনা করেছিল। অবাক করা বিষয় হলো এই প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা, নকশা, নান্দনিক ভূ-বিন্যাস এবং প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন একজনই—বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ, সৈয়দ মুহাম্মদ নকিব আল-আত্তাস।</p>
<p>আল-আত্তাস একটি ধ্রুব সত্যে বিশ্বাসী ছিলেন যে, ইসলাম একটি সভ্যতা হিসেবে তখনই বিকশিত হবে, যখন ভাষার মাধ্যমে &#8216;অর্থ&#8217; বা &#8216;মিনিং&#8217;-এর সঠিক বিন্যাস ঘটবে। সেটা বস্তুগত বা অবস্তুগত, সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি সভ্যতার পরিমাপ তো তার জ্ঞান-প্রক্রিয়াকরণ (knowledge-processing) সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের জটিলতার ওপরই নির্ভর করে। আজকের মুসলিম বিশ্বে নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদনের যে দুর্ভিক্ষ চলছে, তার কারণ অনুসন্ধান এবং এর প্রতিকারে নতুন সরঞ্জাম ও সংগঠন তৈরির তাগিদ থেকেই আল-আত্তাসের এই অভিযাত্রা।</p>
<p>এবং বলা বাহুল্য, এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সবচেয়ে গোছানো ও পদ্ধতিগত জবাবটি আল-আত্তাসের মাধ্যমেই এসেছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সৈয়দ মুহাম্মাদ নকিব আল আত্তাসের বেড়ে ওঠা</strong></h5>
<p>১৯৩১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া আল-আত্তাস ছিলেন জন্মগতভাবেই একজন অভিজাত। তার ধমনীতে বা’লাউই বংশধারার রক্ত প্রবহমান, যা ইয়েমেনের হাজরামাউত অঞ্চল থেকে উৎসারিত হয়ে ৩৭তম প্রজন্মে খোদ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। মাতৃকূলে তিনি তুর্কি অভিজাত রুকেয়া হানুমের মাধ্যমে জোহরের রাজপরিবারের সাথে যুক্ত। আবার তার মা, শরীফা রাকয়ান আল-আইদারুস ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার বোগোর অঞ্চলের সুন্দা রাজপরিবারের বংশধর।</p>
<figure id="attachment_16547" aria-describedby="caption-attachment-16547" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16547 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-1024x756.jpg" alt="" width="1024" height="756" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-1024x756.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-768x567.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-1536x1135.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16547" class="wp-caption-text">ISTAC এর স্থাপনাশৈলী পরিকল্পনার সময় নকিব আল-আত্তাস</figcaption></figure>
<p>শৈশবে আল-আত্তাস জাভার মাদ্রাসা এবং জোহরের ইংরেজি স্কুলের দোলাচলে বেড়ে ওঠেন। তার মামারা জোহরের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে মামাদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি দুর্লভ মালয় পাণ্ডুলিপি এবং পশ্চিমা ধ্রুপদী সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন। ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞান, পশ্চিমা ক্লাসিকস এবং মালয় সাহিত্যের এই ত্রিবেণী সম্মিলনই পরবর্তীকালে তার আজীবনের কাজের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।</p>
<p>যুক্তরাজ্যের স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি মালয়েশিয়ায় ফিরে আসেন এবং মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি Some Aspects of Sufism as Understood and Practised Among the Malays নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই কাজটি তাকে কানাডা কাউন্সিল ফেলোশিপ এনে দেয়, যার মাধ্যমে তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পান। সেখানেই তিনি হ্যামিল্টন গিব, এ.জে. আরবেরি, তোশিহিকো ইজুতসু, সাইয়্যেদ হোসেন নাসের এবং ফজলুর রহমানের মতো ইসলামী অধ্যয়নের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন।</p>
<p>পরবর্তীতে তিনি লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)-এ এ.জে. আরবেরি এবং মার্টিন লিংসের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সেসময়ে মালয়েশিয়ার হাতেগোনা কয়েকজন ডক্টরেটধারীর একজন হিসেবে তিনি দ্রুত মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন পদে আসীন হন। ১৯৭০ সালে তিনি মালয়েশিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এর মালয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের রূপরেখা তৈরি করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>গণ্ডির বাইরে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ</strong></h5>
<p>কানাডা ও লন্ডন থেকে ডক্টরেট এবং পাণ্ডিত্য নিয়ে ফিরে আসার পর, মালয়েশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে আল-আত্তাসের প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সেখানে ষাট ও সত্তরের দশকের একাডেমিক পরিবেশ ছিল বিভিন্ন মতবাদের এক রণক্ষেত্র। সদ্য স্বাধীন, দ্রুত শিল্পায়িত এবং জাতিগতভাবে সংবেদনশীল মালয়েশিয়ায় তখন তরুণরা নতুন পথের সন্ধানে ছিল। সেই সময়ে আল-আত্তাস এমন এক ইসলামি ডিসকোর্স বা বয়ান হাজির করলেন, যা একইসাথে অনড় রক্ষণশীলতা এবং আধুনিকতাবাদী সংস্কার—উভয় থেকেই ভিন্ন। আত্তাসের ধাঁচ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঋদ্ধ এবং সভ্যতার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ।</p>
<p>গোটা মুসলিম বিশ্ব তখন আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার সন্ধানে। নুসান্তারা (মালয় দ্বীপপুঞ্জ) অঞ্চলে ধর্মীয় স্রোত প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: ঐতিহ্যবাদী বা &#8216;কাউম তুয়া&#8217; এবং সালাফি বা ইখওয়ানি প্রভাবিত সংস্কারপন্থী বা &#8216;কাউম মুদা&#8217;। তরুণরা যখন ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বদর্শন বা &#8216;ওয়ার্ল্ড ভিউ&#8217; হিসেবে খুঁজছিল, তখন সংস্কারপন্থীদের প্রভাব বাড়ছিল।</p>
<p>এখানেই আল-আত্তাস ভিন্ন এক পথের দিশা দিলেন। তিনি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি, আবার আধুনিকতাকেও অন্ধভাবে আলিঙ্গন করেননি। তিনি ইসলামের সভ্যতার গভীরতাকে নতুন করে আবিষ্কারের ডাক দিলেন। তার কাছে ইসলামি ঐতিহ্য কোনো স্থবির অতীত নয়, বরং এটি এক গতিশীল ধারাবাহিকতা। তিনি তথাকথিত &#8216;সালাফ&#8217; বা পূর্বসূরিদের দোহাই দিয়ে বিগত এক হাজার বছরের জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্জনকে বাতিল করে দেননি। যদিও তার উচ্চমার্গীয় মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা কেবল ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু সামাজিকভাবে তার দর্শন এমন এক আত্মপরিচয় গড়ে তুলেছিল যা নির্দ্বিধায় ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে বিশ্বকে দেখতে শেখায়। যার মূল মালয় সংস্কৃতিতে প্রোথিত থাকলেও শাখা-প্রশাখা ছিল বিশ্বজনীন।</p>
<p>আল-আত্তাসের এই দর্শনের মূলে ছিল একটি গভীর সত্য: &#8220;যেকোনো সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হয় ভাষা এবং তার ধারণাগত স্থাপত্য (Conceptual Architecture) থেকে&#8221;।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ভাষা, চিন্তা ও সভ্যতা</strong></h5>
<p>অনেকেই ইসলামের ইতিহাসকে কেবল আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। কিন্তু আল-আত্তাস এখানে অনন্য। তিনি জোর দিয়েছেন ভাষার ওপর—বিশেষ করে কুরআনি আরবি ভাষার ওপর, যা ইসলামী সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি।</p>
<p>কুরআনি আরবির স্বচ্ছতা এর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। ত্রি-মাত্রিক &#8216;মাদ্দাহ&#8217; বা মূলধাতুর ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই ভাষার একটি সুশৃঙ্খল সেমান্টিক বা অর্থতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে। প্রতিটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট এবং স্থিতিশীল ধারণাগত পরিসীমা আছে। এই কাঠামোর কারণেই মুসলিম অভিধানপ্রণেতারা হাজার বছর ধরে কাজ করে একটি নিখুঁত, বিজ্ঞানসম্মত শব্দকোষ তৈরি করতে পেরেছেন। অর্থের এই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে যে, কুরআনি আরবি অন্যান্য ভাষার মতো নয়। এটা স্থান, কাল বা পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও একটি বস্তুনিষ্ঠ সত্যকে অবিকৃতভাবে বহন করতে পারে।</p>
<p>আল-আত্তাসের মতে, <strong>আরবি ভাষাকে কুরআনের ভাষা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণই হলো এর সহজাত স্বচ্ছতা। সেই সময়ে গ্রিকো-রোমান বা পারসিক ভাষাগুলোর মতো আরবি কোনো পৌরাণিক শব্দভাণ্ডারের ভারে ভারাক্রান্ত ছিল না। আরবী ছিল নির্ভুলভাবে ধারণা প্রকাশ করতে সক্ষম এক বিশুদ্ধ ভাষা।</strong> এই ভাষাগত &#8216;মিতব্যয়িতা&#8217; বা ইকোনমি ইসলামকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। এটি এমন এক বিশ্বদৃষ্টি তৈরি করেছিল যা আরবদের গণ্ডি পেরিয়ে পারসিক, আফ্রিকান, তুর্কি, এমনকি মালয়দেরও আকৃষ্ট করেছিল।</p>
<p>নুসান্তারা অঞ্চলেও এই ভাষাগত ও ধারণাগত স্বচ্ছতা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সেখানে সচেতনভাবে ও কৌশলগতভাবে মালয় ভাষাকে ইসলামের বাহন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। জাভানিজ ভাষার মতো এটি হিন্দু-বৌদ্ধ মহাকাব্যের অলঙ্কৃত শব্দভাণ্ডারে আচ্ছাদিত ছিল না। ইসলামের প্রচারকরা ধীরে ধীরে মালয় ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ আরবি পরিভাষা যুক্ত করেন, যাতে একটি নতুন &#8216;সেমান্টিক ফিল্ড&#8217; বা অর্থবোধক ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাদের গদ্য ব্যবহৃত হতো আকিদা বা বিশ্বাসের স্বচ্ছ বয়ানে, আর কবিতার সাথে থাকত গভীর ব্যাখ্যা। ফলে আরবদের মতো মালয়দের ক্ষেত্রেও ইসলাম এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। তারাও একটি মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে একটি সমৃদ্ধ লিখিত সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সভ্যতার ব্যাকরণ : দ্বীন &#8211; মদিনা &#8211; তামাদ্দুন </strong></h5>
<p>মৌখিক ঐতিহ্য থেকে লিখিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে এই রূপান্তর, একটি গভীর সভ্যতার যুক্তি বা &#8216;লজিক&#8217; উন্মোচন করে। আল-আত্তাস এই যুক্তিকে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত ধারণার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন: দ্বীন (ধর্ম), মদিনা (শহর) এবং তামাদ্দুন (সভ্যতা)।</p>
<p>ইংরেজিতে &#8216;Religion&#8217; শব্দটি এসেছে ল্যাটিন &#8216;religio&#8217; থেকে, যার অর্থ মানুষ ও দেবতার মধ্যকার বন্ধন। কিন্তু এই বন্ধনটি কী বা কীভাবে তা পালন করতে হবে, সে সম্পর্কে এটি স্পষ্ট কিছু বলে না। এই অস্পষ্টতা পশ্চিমা ধর্মীয় ইতিহাসে বহু বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। এর বিপরীতে, কুরআনি &#8216;দ্বীন&#8217; (যা সাধারণত ধর্ম হিসেবে অনূদিত হয়) শব্দটি دِ+ي+ن মূলধাতু থেকে এসেছে, যার সরাসরি সম্পর্ক &#8216;দাইন&#8217; বা ঋণের সাথে। মানুষের জীবনের অস্তিত্বের জন্য খোদার কাছে যে ঋণ, তা পরিশোধের সেরা উপায় হলো একটি সংগঠিত সমাজ—যেখানে আইন ও বিধিনিষেধ আছে।</p>
<p>অন্য কথায়, ঋণ পরিশোধের উপযুক্ত স্থান হলো শহর বা নগর। এই সামাজিক বিন্যাস প্রকাশ পায় &#8216;মদিনা&#8217; শব্দে, যা &#8216;মাদ্দানা&#8217; ক্রিয়া থেকে এসেছে। আর এই মাদ্দানা থেকেই এসেছে &#8216;তামাদ্দুন&#8217; বা সভ্যতা।</p>
<p><strong>নবীজি (সা.) যখন ইয়াসরিবে পৌঁছালেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে &#8216;আল-মদিনা&#8217; (দ্য সিটি) রাখলেন, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এখানেই মুসলিমরা শিখল কীভাবে খোদার প্রতি তাদের অস্তিত্বের ঋণ শোধ করতে হয়। হিজরত কেবল স্থান পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল ইসলামী ক্যালেন্ডার ও সভ্যতার সূচনা।</strong></p>
<p>আল-আত্তাস ফরাসি ইতিহাসবিদ নুমা ডেনিস ফাস্টেল দে কুলঞ্জেসের সূত্র ধরে উল্লেখ করেন, গ্রিক<strong> &#8216;পলিস&#8217; (শহর)</strong> কখনোই সর্বজনীন হতে পারেনি কারণ তাদের কোনো &#8216;ইউনিভার্সাল গড&#8217; বা একচ্ছত্র খোদার ধারণা ছিল না। কিন্তু মদিনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে &#8216;দ্বীন&#8217;-এর ওপর, যার শেকড় সেই আদিম প্রতিশ্রুতিতে (রোজ-এ-আলাস্ত)* প্রোথিত, যেখানে মানবজাতি সমস্বরে খোদার প্রভুত্ব স্বীকার করেছিল—&#8221;হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।&#8221; (আল-আরাফ ৭:১৭২)। তাই দ্বীন ও মদিনার ঐক্যের মধ্যেই একটি &#8216;কসমোপলিস&#8217; বা বিশ্বজনীন নগরের ধারণা নিহিত।</p>
<p>হাজার বছর ধরে মুসলিমদের দ্বীন, মদিনা এবং তামাদ্দুনের এই সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন হয়নি, কারণ এটিই ছিল তাদের যাপিত জীবন। একজন দ্বীনদার ব্যক্তি মানেই ছিলেন একজন সভ্য মানুষ। এমনকি মিরাজের মতো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার পরও নবীজি (সা.) তাঁর শহর মক্কায় ফিরে এসেছিলেন ইসলামের সভ্যতার কাজ চালিয়ে যেতে। একজন মুমিনের ঈমানের দাবিই হলো নিজেকে, নিজের চিন্তাকে এবং নিজের কাজকে সভ্যতার মানদণ্ডে বিচার করা।</p>
<p>আর এই চিন্তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের প্রথম পদক্ষেপ ছিল <strong>ISTAC</strong>।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><em>* ফুটনোট &#8211; <strong>রোজ-</strong><strong>এ-</strong><strong>আলাস্ত (روز الست):</strong> এটি সূফি মহলে বহুল প্রচলিত একটি ফারসি পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ— &#8216;আলাস্তু&#8217;-র সেই দিন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আরাফ-এর ১৭২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সেই মহান দিনকে এটি নির্দেশ করে, যেদিন সৃষ্টির আদিলগ্নে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত রূহকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, &#8220;আলাস্তু বিরাব্বিকুম?&#8221; (আমি কি তোমাদের প্রভু নই?)। উত্তরে সকল রূহ সমস্বরে সাক্ষ্য দিয়েছিল, &#8220;বালা!&#8221; (হ্যাঁ, অবশ্যই)। ইসলামী দর্শন ও সাহিত্যে মানুষের সাথে স্রষ্টার এই চিরন্তন ও আদিম প্রতিশ্রুতিকে &#8216;রোজ-এ-আলাস্ত&#8217; বা &#8216;মিছাক&#8217; (Covenant) হিসেবে অভিহিত করা হয়।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ISTAC: পাহাড়ের চূড়ায় প্রজ্জ্বলিত মশাল</strong></h5>
<blockquote><p><em>&#8220;মনে রেখো, আমরা এমন এক জাতি যারা আশা ও আত্মবিশ্বাস হারাতে অভ্যস্ত নই, এবং তার অনুমতিও আমাদের নেই। নিজেদের মধ্যে কলহ করা, ফাঁকা বুলি আওড়ানো আর নেতিবাচক আন্দোলন করে সময় নষ্ট করা আমাদের সাজে না, যখন যুগের আসল চ্যালেঞ্জ আমাদের গ্রাস করতে আসছে। আসল চ্যালেঞ্জটি বুদ্ধিবৃত্তিক, এবং এর বিরুদ্ধে ইতিবাচক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে—কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার দুর্গ থেকে নয়, বরং সঠিক জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার দুর্গ থেকে।&#8221;</em> — আল-আত্তাস, <em>Islam, Secularism, and the Philosophy of the Future</em> (১৯৭৮)</p></blockquote>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16548 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>দ্বীন ও তামাদ্দুনের এই ধারণাগত স্থাপত্যের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর। আর তখনই তা সমসাময়িক রাজনীতির মুখোমুখি হয়।</p>
<p>প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম অভিজাতদের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেওয়া হয়, যার ফলে জ্ঞান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং উচ্চ সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। এই শূন্যতায় বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনগুলো &#8216;ম্যাস মোবিলাইজেশন&#8217; বা গণজাগরণকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনী ক্ষমতা দখল এবং জাতিরাষ্ট্রের মাধ্যমে শরিয়া কায়েম করা।</p>
<p>আল-আত্তাস এই যুগের হুজুগ বা &#8216;zeitgeist&#8217;-কে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি শরিয়াকে কেবল নিছক আইনশাস্ত্রে (Jurisprudence) নামিয়ে আনার বিরোধী ছিলেন। তার মতে, সত্যিকারের সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হতে হবে জ্ঞানের স্তর থেকে, আর তার কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্ববিদ্যালয়।</p>
<p>ইসলামী স্বর্ণযুগে বায়তুল হিকমাহ, সুফি খানকাহ বা জাওয়িয়া এবং মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। আল-আত্তাসের মতে, এগুলো মসজিদের চারপাশে কেন্দ্র করে জ্ঞানের একটি সঠিক অনুক্রম বা হায়ারার্কি তৈরি করত—যার কেন্দ্রে থাকত &#8216;বিশ্বজনীন জ্ঞান’&#8217; বা চিরন্তন জ্ঞান (যেমন, জ্যোতির্বিদ্যা), এবং তা থেকে ছড়িয়ে পড়ত মানুষের উপকারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জ্ঞান (যেমন, মেডিসিন)। সভ্যতার নবায়নের জন্য সেই &#8216;কেন্দ্র&#8217; এবং তার উদ্দেশ্যকে ফিরিয়ে আনা জরুরি ছিল।</p>
<p>১৯৭৭ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে আল-আত্তাস তার এই যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি ফিলিস্তিনি-আমেরিকান পণ্ডিত ইসমাইল রাজি আল-ফারুকির কাছে তার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাসম্বলিত একটি পাণ্ডুলিপি অর্পণ করেন। এই ঘটনাটি পরবর্তীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।</p>
<figure id="attachment_16549" aria-describedby="caption-attachment-16549" style="width: 392px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16549 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Ismail-Raji.jpg" alt="" width="392" height="493" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Ismail-Raji.jpg 608w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Ismail-Raji-239x300.jpg 239w" sizes="(max-width: 392px) 100vw, 392px" /><figcaption id="caption-attachment-16549" class="wp-caption-text">ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি, IIIT এর প্রতিষ্ঠাতা</figcaption></figure>
<p>আল-আত্তাস এবং আল-ফারুকির বন্ধুত্ব ষাটের দশকের শুরুতেই জমে ওঠে। ১৯৭৪ সালে আল-আত্তাস আল-ফারুকিকে এক বক্তৃতায় অংশ নিতে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে স্থানীয় মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি তখন &#8216;আবীম&#8217; (ABIM) বা মালয়েশীয় ইসলামি যুব আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তীতে আল-ফারুকিও টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে আল-আত্তাসকে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমন্ত্রণ জানান এবং &#8216;অ্যাসোসিয়েশন অফ মুসলিম সোশ্যাল সায়েন্টিস্টস&#8217; (AMSS)-এর একটি বড় সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেন। আল-আত্তাসের সেই বক্তৃতা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। আল-ফারুকি তখন লিখেছিলেন যে, আল-আত্তাসই হয়ে উঠেছেন এই সংগঠনের &#8220;raison d&#8217;être&#8221; বা &#8220;অস্তিত্বের মূল কারণ&#8221;। তিনি বলেছিলেন:</p>
<blockquote><p><em>&#8220;কনভেনশনে আপনার পারফরম্যান্স সম্পর্কে কার্যনির্বাহী বোর্ডের সদস্য এবং অসংখ্য মুসলিম ভাইদের মতামত জানতে চেয়েছিলাম—তারা সবাই আপনাকে নিয়ে গর্বিত&#8230; আপনিই মূলত AMSS। ইসলামী চিন্তাধারাকে আপনার শাণিত করা এবং জ্ঞানের ঐতিহ্যে আপনার অবদানই হলো এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য।&#8221;</em></p></blockquote>
<p>তবে শীঘ্রই তাদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। আল-ফারুকির অনুরোধে আল-আত্তাস &#8220;সেকুলারিজমের সাথে সংলাপ&#8221; (Dialogue with Secularism) শিরোনামে ৪০,০০০ শব্দের একটি পাণ্ডুলিপি লিখে প্রকাশের জন্য তার কাছে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপির ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে আল-আত্তাসের বারংবার জিজ্ঞাসার কোনো জবাব আসেনি। আল-আত্তাস লক্ষ্য করতে শুরু করেন যে, তার ধারণাগুলো কোনো কৃতজ্ঞতা স্বীকার ছাড়াই বিকৃত আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে তিনি নিজেই তার যুগান্তকারী কাজ<strong> <em>&#8216;ইসলাম, সেকুলারিজম অ্যান্ড দ্য ফিলোসফি অফ দ্য ফিউচার&#8217;</em> </strong>বইয়ের অংশ হিসেবে এটি প্রকাশ করেন এবং ভূমিকার মুখবন্ধে <strong>&#8220;বুদ্ধিবৃত্তিক চোর (plagiarists) ও ভণ্ডদের&#8221;</strong> দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এক তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।</p>
<p>এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছেদ ছিল অত্যন্ত মৌলিক। এটি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অবমাননা ছিল না, বরং আল-ফারুকির সাথে তার দর্শনের গভীর ফাটলও স্পষ্ট করে দিয়েছিল। আল-ফারুকির কাছে &#8220;জ্ঞানের ইসলামীকরণ&#8221; ছিল মূলত আধুনিক বিষয়গুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নতুন পাঠ্যবই তৈরি করা। সহজ কথায়, তিনি আধুনিক ডিসিপ্লিনগুলোকে &#8220;ইসলামী&#8221; মোড়কে নতুন করে লিখতে চেয়েছিলেন।</p>
<p><strong>আল-আত্তাস একে অগভীর বা ভাসাভাসা মনে করতেন। তার মতে, জ্ঞান দাঁড়িয়ে থাকে শব্দভাণ্ডার বা পরিভাষার ওপর। মুসলিম বিশ্বদৃষ্টিকে গঠনকারী মূল পরিভাষাগুলোর সংশোধন (Rectification) ছাড়া ইসলামীকরণ প্রজেক্টটি কেবল কিছু কুরআনের আয়াত সংবলিত পাঠ্যবইয়ে পর্যবসিত হবে, যেখানে মূল ধারণাগত সততা বা &#8216;কনসেপচুয়াল ইন্টেগ্রিটি&#8217; থাকবে না। মানুষের পূর্ণাঙ্গ সত্তার প্রতিফলন ঘটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পুনর্গঠন না করলে এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে তাদের সঠিক অনুক্রমে (Hierarchy) ফিরিয়ে না আনলে মুসলিম মানসের বিভ্রান্তি দূর হবে না।</strong></p>
<p>এই বিভাজন শীঘ্রই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১৯৮২ সালে ওআইসি (OIC) সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ &#8216;জ্ঞানের সমন্বয়&#8217; (Integration of knowledge)-এর জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব দেন। মাহাথিরের এই প্রস্তাব ছিল আল-ফারুকির &#8216;ইসলামীকরণ&#8217; ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি—যে পরিভাষাটি আল-আত্তাসের দাবি অনুযায়ী তার মূল কাজ থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। আটটি মুসলিম দেশের সমর্থনে পরের বছর &#8216;ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া&#8217; (IIUM) প্রতিষ্ঠিত হয়। মাহাথিরের সাথে আল-ফারুকির ঘনিষ্ঠতাই IIUM-এর গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আল-আত্তাসের নিজ দেশে হলেও তা শেষ পর্যন্ত ফারুকির চিন্তাধারারই প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>তবে ১৯৮৭ সালে আল-আত্তাস তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এক অভাবনীয় সুযোগ—প্রায় এক &#8216;একচ্ছত্র কর্তৃত্ব&#8217; লাভ করেন। দীর্ঘকাল ধরে তিনি যে ছাত্র ও তরুণ বুদ্ধিজীবীদের গড়ে তুলেছিলেন, তা এক অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে।</p>
<p>ABIM- Malaysian Islamic Youth Movement এর সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং আল-আত্তাসের সম্ভবত সবচেয়ে প্রখ্যাত শিষ্য আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশীয় রাজনীতিতে তখন উল্কার গতিতে উত্থান ঘটিয়েছেন। আনোয়ারের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে আবীম তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে (আনোয়ারের প্রভাবে কৌতুক করে অনেকে ABIM-কে ‘আনোয়ার বিন ইব্রাহিম মুভমেন্ট’ বলেও ডাকত)। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণের ঢেউ এবং মালয়েশিয়ার নতুন মালয় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান—এই দুই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আবীম তখন জনমত গঠনে এক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>১৯৮২ সালে আনোয়ার যখন মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন মালয়েশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক মেলবন্ধনের সূচনা হয়—যার নেপথ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন আল-ফারুকি। শাসনযন্ত্রের ভেতরে ঢুকে আনোয়ার একের পর এক মন্ত্রিত্বের পদ ব্যবহার করে একটি ব্যাপক &#8216;ইসলামীকরণ কর্মসূচি&#8217; এগিয়ে নিতে থাকেন—ইসলামী অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামের প্রতিফলন ঘটানো পর্যন্ত। ১৯৮৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর, তিনি আল-আত্তাসকে প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক করে ISTAC প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেন। যদিও ISTAC কারিগরিভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তবে এটি IIUM-এর অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়।</p>
<p><strong>১৯৯০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা নিবেদন করে পবিত্র মিরাজের রাতে ISTAC-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। আল-আত্তাস নিজে এর প্রতিটি অংশের নকশা করেছিলেন। সিলিং-এর মুকারনাস থেকে শুরু করে উঠোনের ফোয়ারা—সবকিছুতেই ছিল আল-আত্তাসের সেই উচ্চমার্গীয় ইসলামী সংস্কৃতির ছাপ, যা তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন।</strong></p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16551 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16550 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16552 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<figure id="attachment_16553" aria-describedby="caption-attachment-16553" style="width: 768px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16553 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-768x1024.jpg" alt="" width="768" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-768x1024.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-225x300.jpg 225w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-1152x1536.jpg 1152w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5.jpg 1200w" sizes="(max-width: 768px) 100vw, 768px" /><figcaption id="caption-attachment-16553" class="wp-caption-text">ISTAC এর গ্রাউন্ড, Sohail Nakhooda</figcaption></figure>
<p>ISTAC প্রতিষ্ঠার মাত্র এক দশক পর, ১৯৯৭ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমের বরখাস্ত হওয়ার ঘটনায় পুরো মালয়েশিয়া কেঁপে ওঠে। তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী আনোয়ারের এই পতন ছিল আকস্মিক। এশীয় অর্থনৈতিক সংকট (Asian Financial Crisis) মোকাবিলা নিয়ে সরকারের দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব—মাহাথির এবং তার ডেপুটি আনোয়ারের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। আনোয়ার চেয়েছিলেন পুঁজি বাজারকে শান্ত করতে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে; অন্যদিকে মাহাথির চেয়েছিলেন সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের হটিয়ে দিতে শক্তিশালী আর্থিক সহায়তা এবং কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণ। যা ছিল স্রেফ এক যান্ত্রিক বা টেকনোক্র্যাটিক দ্বিমত, তা দ্রুতই ব্যক্তিগত তিক্ততায় রূপ নেয়—এমন এক সংঘাত, যার ছায়া আজও দেশটির রাজনীতির ওপর বিস্তৃত। ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আনোয়ার ইব্রাহিমকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়।</p>
<figure id="attachment_16556" aria-describedby="caption-attachment-16556" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16556 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-1024x681.jpg" alt="" width="1024" height="681" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-1024x681.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-768x511.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1.jpg 1154w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16556" class="wp-caption-text">তরুণ আনোয়ার ইব্রাহিম (বামে) এবং মাহাথির মোহাম্মদ (ডানে), এশিয়া সেন্টিনেল</figcaption></figure>
<p>কিন্তু ১৯৯৭ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমের পতন এবং মাহাথিরের সাথে তার সংঘাতের ফলে আল-আত্তাসও রাজনৈতিক রোষানলে পড়েন। মাহাথির আধুনিকতাবাদী এবং আল-ফারুকির মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন, ফলে তিনি আল-আত্তাসের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখাননি। ২০০২ সালে আল-আত্তাসকে ISTAC থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি তার স্বায়ত্তশাসন হারায়।</p>
<p>অথচ ছাত্র নির্বাচনে কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখা সত্ত্বেও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, <strong>মাত্র এক দশকে ISTAC এমন সব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছিল যারা আজ বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী। তাদের মধ্যে রয়েছেন তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (MIT) বর্তমান পরিচালক ইব্রাহিম কালিন এবং বসনিয়ার সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি মুস্তফা চেরিচ।</strong> ইসলামী সভ্যতার মৌলিক অথচ বিমূর্ত উপাদানগুলো—যেমন শিক্ষার ধারণা, বিজ্ঞানের দর্শন এবং মানব আত্মার মনস্তত্ত্বের ওপর ISTAC অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা গ্রন্থ (Monographs) প্রকাশ করেছিল; যা পরবর্তীতে আরবি, ফারসি, তুর্কি, চীনা, রুশ এবং বসনিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই অ্যানমারি শিমেল, সাইয়্যেদ হোসেন নাসের এবং জাভেদ ইকবালের মতো বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এমনকি তরুণ হামজা ইউসুফও এর অনুরাগী ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে জায়তুনা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>একবিংশ শতাব্দীর জন্য শিক্ষা ও প্রতিফলন</strong></h5>
<p>ISTAC-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুগুণে বিস্তৃত আল-আত্তাসের আজীবনের সাধনা আমাদের সামনে গভীর চিন্তার খোরাক রেখে গেছে। তার <strong>&#8216;দ্বীন-মদিনা-তামাদ্দুন&#8217;</strong> ফ্রেমওয়ার্ক ধর্মের সমসাময়িক সেক্যুলার শ্রেণীবিন্যাস থেকে মুক্তি খোঁজে এবং ইসলামকে একইসাথে একটি ধর্ম ও সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তার মতে, ইসলাম একইসাথে গভীরভাবে ব্যক্তিগত, অধিবিদ্যক (Metaphysical) এবং মনস্তাত্ত্বিক (Psychological); আবার পুরোপুরি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতাগত। ইসলাম যেমন পবিত্রতার (Sacred) কেন্দ্রবিন্দুকে ধারণ করে, তেমনি এর পরিধি পার্থিব জগত (Profane) অবধি বিস্তৃত। একজন মুসলিম নিজেকে গুরুত্বের সাথে &#8216;মুসলিম&#8217; বলে দাবি করতে পারেন না, যদি না তিনি নাগরিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এবং মানবতার সম্মুখভাগে থাকা বিশ্বজনীন সমস্যাগুলো সমাধানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন।</p>
<p>যেহেতু আমাদের &#8216;দ্বীন&#8217;—অর্থাৎ খোদা ও মানুষের মধ্যকার ঋণের বন্ধন—সেই &#8216;রোজ-এ-আলাস্ত&#8217;-এর আদিম প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে (কেউ তা স্বীকার করুক বা না করুক), তাই যারা এই চুক্তিতে বিশ্বাস করেন, সেই মুসলিমদের ওপর এটি আবশ্যিক যে তারা মানবতার বৃহত্তর সমস্যাগুলো সমাধানে অবদান রাখবেন। ফলে মানবতার নৈতিক ও বস্তুগত সংকটগুলো—যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়, জনমিতিক পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্যের মহামারী এবং অভূতপূর্ব প্রাচুর্যের মুখে চরম অসমতা—মুসলিমদের আলোচনার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত।</p>
<p>এটি অর্জন করতে হলে মুসলিমদের কেবল এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বুঝলেই হবে না (যা আল-আত্তাস তার <em>&#8216;ইসলাম অ্যান্ড সেকুলারিজম&#8217;</em> বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন), বরং গত তিন শতাব্দীতে বিশ্বকে আমূল বদলে দেওয়া বস্তুগত বাস্তবতাগুলোকেও বুঝতে হবে। আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে জ্ঞান উৎপাদনের অগ্রভাগে থাকা মুসলিম চিন্তাবিদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত বিশ্বের &#8216;বেস লেয়ার&#8217; বা মূল ভিত্তিগুলো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখা। আর এর জন্য প্রয়োজন কেবল &#8216;ইসলামিক স্টাডিজ&#8217;-এর গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের &#8216;বেস লেয়ার&#8217; বা মূল ভিত্তিগুলো (যেমন: এনার্জি সিস্টেম, ফাইন্যান্স, জিওপলিটিক্স) বোঝা।</p>
<p>অগ্রগামী চিন্তাবিদদের (Frontier thinkers) পক্ষে কেবল &#8216;ইসলামিক স্টাডিজ&#8217;-এর সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা আর সম্ভব নয়। আল-আত্তাসের &#8216;জ্ঞানের ইসলামীকরণ&#8217; প্রকল্পের উদ্দেশ্য মুসলিমদের গোত্রবাদী বা প্রাদেশিক করে তোলা ছিল না। তার ধারণাগুলোকে পর্যাপ্ত প্রেক্ষাপট ছাড়াই কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক বা তুচ্ছ রাজনৈতিক খুটিনাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা মানে তার উত্তরাধিকারের (Legacy) প্রতি চরম অবিচার করা।</p>
<p>বিস্ময় ও আত্ম-সংশয়ের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া মুসলিমদের চালিত করতে আল-আত্তাস আমাদের শব্দভাণ্ডার ও আত্মবিশ্বাসের সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ওহীর ওপর ভিত্তি করে শব্দগুলোর পুনর্ব্যাখ্যা করতে হয়—যাতে আমরা বাইরের জগতের সেরা জিনিসগুলো ছেঁকে নিতে পারি, এবং কৌতূহল ও প্রত্যয়ের সাথে নতুন পথে পা বাড়াতে পারি।</p>
<p>প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আল-আত্তাসের কৌশল একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতা পুনর্জাগরণের যেকোনো প্রচেষ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। যুগের চেয়ে অগ্রবর্তী থেকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন যে জ্ঞান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো সভ্যতা নবায়নের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে তিনি এও স্বীকার করেছিলেন যে, তার পরিকল্পিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি অনিবার্যভাবে পরীক্ষামূলক হবে এবং এতে ভুল সংশোধন ও নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়বে। এই বিশালত্বের সমস্যার সমাধানে আমাদের অবশ্যই সভ্যতার পরিবর্তনের একটি সুদীর্ঘ মেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি (longue durée view) গ্রহণ করতে হবে।</p>
<p>ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আল-আত্তাসের ধারণা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্থায়ী কেন্দ্রটিকে ফিরিয়ে আনা যা ব্যক্তির নিজের প্রতিচ্ছবি—যা জ্ঞানের একতা বজায় রাখবে এবং এর লক্ষ্যের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য স্পষ্ট করবে। এই পরিবেশে অর্জিত প্রতিটি বিশেষায়িত জ্ঞানই এই মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করবে। তবে এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, গত তিন শতাব্দীকে যা আলাদা করেছে তা কেবল জ্ঞানের অগ্রভাগের ছোটখাটো উদ্ভাবন নয়, বরং প্রকৃতি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই উদ্ভাবনগুলোর ‘শিল্প-পর্যায়ে পদ্ধতিগত প্রয়োগ’। এই প্রক্রিয়াই আমাদের ক্রমবর্ধমানভাবে মার্শাল হজসনের ভাষায় একটি &#8216;প্রযুক্তি-নির্ভর&#8217; (technicalistic) সমাজে বন্দি করে ফেলেছে।</p>
<p>এমনকি একটি ইতিবাচক পরিস্থিতিতে যদি আল-আত্তাসের ভিশন অনুযায়ী জ্ঞানের সঠিক অনুক্রম ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিতও হয়, তবুও মুসলিমরা মানবতার স্তরে কার্যকর পরিবর্তন তখনই আনতে পারবে যখন—এই বিশ্বদৃষ্টিকে বৃহত্তর পরিসরে বস্তুগত বা মেটেরিয়াল লেভেলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।</p>
<p>এটি অর্জনের জন্য মুসলিমদের কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা কল্পনা করা উচিত? কীভাবে আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করব, টিকিয়ে রাখব এবং বড় করব? আমরা কি এখনও ISTAC-এর মতো জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর নির্ভর করব? আল-আত্তাসের মতো স্বপ্নদ্রষ্টাদের কি সরকারের ভেতর এমন কোনো উচ্চপদ দেওয়া উচিত—যেমনটি চীনের সরকারে ওয়াং হুনিং-এর অবস্থান—যাতে ভিশনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে? নাকি আমাদের উচিত সেই হারিয়ে যাওয়া অভিজাত মুসলিমদের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা? যদি তাই হয়, তবে একটি সম্মানজনক উচ্চ-সংস্কৃতি (High culture) পুনর্নির্মাণের জন্য কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যাতে মুসলিম অভিজাতরা একত্রিত হতে আগ্রহী হন? এগুলো কঠিন প্রশ্ন যার কোনো সহজ উত্তর নেই, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার পুনর্জাগরণের যেকোনো সিরিয়াস প্রচেষ্টার জন্য এগুলো অত্যন্ত জরুরি।</p>
<figure id="attachment_16554" aria-describedby="caption-attachment-16554" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16554 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-1024x687.jpg" alt="" width="1024" height="687" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-1024x687.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-300x201.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-768x515.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6.jpg 1246w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16554" class="wp-caption-text"><span style="color: #3366ff;"><a style="color: #3366ff;" href="https://humanities.utm.my/casis/" target="_blank" rel="noopener">RZS CASIS</a></span></figcaption></figure>
<p>আল-আত্তাস এখন ৯৪ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। সম্ভবত তার সর্বশেষ বই, <em>&#8216;ইসলাম: দ্য কভেন্যান্টস ফুলফিলড&#8217;</em>, দুই বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের এই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের কোনো একক জাদুকরী সমাধান হয়তো কারোর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়, তবে আল-আত্তাস নিঃসন্দেহে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি প্রশস্ত করে দিয়েছেন।</p>
<blockquote><p>&#8220;তারা হলেন সেই মশাল যা দুর্গম পথে আলো দেখায়; আমাদের হাতে যখন এমন মশাল আছে, তখন মোমবাতির আর কী প্রয়োজন?&#8221;</p></blockquote>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/hisham_al_noman/">হিশাম আল নোমান। </a></p>
<p><strong>লেখক পরিচিতি:</strong> মোহাম্মদ বিন আব্দুল মজিদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কৌশলবিদ (Strategist) হিসেবে যোগদানের আগে তিনি মালয়েশীয় ফেডারেল সরকারে &#8216;পলিসি ইকোনমিস্ট&#8217; বা নীতি-অর্থনীতিবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি কুয়ালালামপুরে বসবাস করছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অধিকতর পাঠের জন্য:</strong></p>
<ul>
<li>Islam, Secularism, and the Philosophy of the Future, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>The Concept of Education, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>Islam: The Covenants Fulfilled, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>Preliminary Statement on a General Theory of the Islamization of the Malay Archipelago, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>ISTAC Illuminated: A Pictorial Tour, Sharifah Shifa Al-Attas</li>
<li>The Origins of Malay Nationalism, William Roff</li>
<li>Islamic Revivalism in Malaysia: Dakwah among the Students, Zainah Anwar</li>
<li>The Educational Philosophy and Practice of Syed Muhammad Naquib Al-Attas: An Exposition of the Original Concept of Islamization, Wan Mohd Nor Wan Daud</li>
<li>Islamization of Knowledge, Ismail Al-Faruqi and Abdul Hamid Abu Sulayman</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/syed-naqib-al-attas-on-the-refinement-of-terminology/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16542</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের ঔদার্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamer-ouudarjo/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamer-ouudarjo/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 28 Jan 2026 13:59:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16501</guid>

					<description><![CDATA[ভাই ভাই মিলি তোমরা সবাই এক মহা পরিবার- নাহি ভেদাভেদ আজমী আরবী এক আদমের সন্তান সবি গরব কিসের তার? (১) -হজরত মুহম্মদ (দঃ) ইসলাম ফেতরতের ধর্ম। ফেতরত মানে স্বভাব প্রকৃতি। অন্য কথায় ইসলাম স্বভাব সঙ্গত ধর্ম। যা অস্বাভাবিক, যা প্রকৃতির]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="padding-left: 80px;">ভাই ভাই মিলি তোমরা সবাই</p>
<p style="padding-left: 160px;">এক মহা পরিবার-</p>
<p style="padding-left: 80px;">নাহি ভেদাভেদ আজমী আরবী</p>
<p style="padding-left: 80px;">এক আদমের সন্তান সবি</p>
<p style="padding-left: 160px;">গরব কিসের তার? (১)</p>
<p style="padding-left: 200px;">-হজরত মুহম্মদ (দঃ)</p>
<p>ইসলাম ফেতরতের ধর্ম। ফেতরত মানে স্বভাব প্রকৃতি। অন্য কথায় ইসলাম স্বভাব সঙ্গত ধর্ম। যা অস্বাভাবিক, যা প্রকৃতির বিরোধী ইসলামে তা ধর্ম নয়। চির-কৌমার্য স্বাভাবিক নয়, না খেয়ে শরীরকে শুকিয়ে ফেলা, চেষ্টা করে বিকলাঙ্গ হওয়া, সংসার-সমাজ সব ছেড়ে নির্জন বাস, জঙ্গল-গুহায় আত্মগোপন-এ সব স্বাভাবিক নয়-কাজেই ইসলামে এতে ধর্ম নাই। &#8220;লা রোহহ্বানিয়াতু ফিল্ ইসলাম&#8221;-&#8216;ইসলামে বৈরাগ্য নাই&#8217;।</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8216;বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি</p>
<p style="padding-left: 80px;">সে আমার নয়-&#8216;</p>
<p>ইসলামেরই মর্মবাণী-বাঙ্গালী কবির কণ্ঠে নবভাষা লাভ করেছে। বিধাতার বিধানের বিরুদ্ধে ইসলাম নব-সাম্রাজ্য স্থাপনের দুশ্চেষ্টা করে নাই বরং বিধাতার বিধানের সহায়ক হিসাবেই ইসলাম বিকাশ লাভ করেছে। যে প্রকৃত মুসলমান, সে দুনিয়ায় আল্লার খলীফা&#8211;বিধাতার প্রতিনিধি। <strong>আল্লা চান তাঁর সৃষ্টির কল্যাণ বিধান-তার ক্রম-বর্ধমান বিকাশ সাধন। আল্লার প্রতিনিধি খাঁটি মুমিনও তা-ই চায়। বন-জঙ্গলের যে বাঘ-সিংহ, স্বাধীন জীবনে তারা যেভাবে দেহে-মনে-শক্তিতে বাড়ে, তা-ই ফেতরত-তা-ই স্বাভাবিক। সার্কাস ওয়ালার পিজরায়-বদ্ধ অর্ধাহারক্লিষ্ট আফিমের অবসাদে ঢুল চুল আঁখি বাঘ সিংহের জীবন স্বাভাবিক নয়। তেমনি ধর্মের নামে যুগে যুগে মানুষের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে যে আফিমের হলাহল পরিবেশন করা হয়েছে, </strong><strong>ইসলা</strong><strong>ম তাকে কখনও ধর্ম বা ধর্মের বিধান বলে স্বীকার করে নাই। </strong>মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বাধীনভাবে তার জীবনের বিকাশ সাধন করবে-এই-ই ইসলাম চায়, ইসলামের মতে এতেই ধর্ম। মানুষ সুস্থদেহে শক্তিমান মন নিয়ে সংসার করবে সৎ রোজগার করে নিজের পেট পুরে খাবে, বাচ্চা কাচ্চাকে খাওয়াবে, ঈদে-উৎসবে নিজে ভালো কাপড় পরবে, পোষ্য দশজনকে পরাবে ইসলামের মতে এতেও পুণ্য। কিন্তু তাই বলে বাকি জনগণ সম্বন্ধে উদাসীন থাকলে চলবে না। ইসলাম বলে &#8216;সে ব্যক্তি কখনই মুসলমান নয়, যে তার প্রতিবেশীকে (তা সে প্রতিবেশী মুসলমান অমুসলমান যে-ই হোক) অভুক্ত রেখে নিজে পেট ভরে খায়।&#8217; ইসলাম আবার বলে-</p>
<p style="padding-left: 40px;">বিচারের দিন সুধাবে বিধাতা-</p>
<p style="padding-left: 120px;">&#8220;আদমের সন্তান,</p>
<p style="padding-left: 40px;">ক্ষুধায়-কাতর অন্ন চেয়েছি</p>
<p style="padding-left: 120px;">অন্ন কর নি দান&#8221;।</p>
<p style="padding-left: 40px;">কহিবে মানব, &#8216;রাজ্জাক&#8217; ওগো,</p>
<p style="padding-left: 120px;">&#8220;তুমি নিখিলের স্বামী,</p>
<p style="padding-left: 40px;">তোমারে কেমনে অন্ন দিতাম</p>
<p style="padding-left: 120px;">নারিনু&#8217; বুঝিতে আমি।&#8221;</p>
<p style="padding-left: 40px;">কহিবেন খোদা, &#8220;বান্দা আমার</p>
<p style="padding-left: 120px;">অন্ন চাহিল দান,</p>
<p style="padding-left: 40px;">তারে দিলে সে-যে আমিই পেতাম,</p>
<p style="padding-left: 120px;">(আজি) পেতে তার প্রতিদান।” <sup>(২)</sup></p>
<p>রসুলুল্লাহ অন্যত্র বলেছেন-<strong>&#8220;মানুষের মধ্যে সেই সবচেয়ে ভালো যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে ভালো।&#8221;</strong></p>
<p>প্রচারকের নাম অনুসারে কোন কোন ধর্মের নামকরণ হয়েছে-Christianity, Judaism, Confucianism ইত্যাদি। কিন্তু ইসলাম কারো নামানুগত ধর্ম নয়; &#8216;Muhamadanism&#8217; নাম দিয়েছেন খৃস্টান লেখকেরা তাঁদের নিজেদের ধর্মের নামানুকরণে। মুসলমান শাস্ত্রকারেরা এ নাম কখনও ব্যবহার করেন নাই। আসল কথা, মহানবী মুহম্মদ (দঃ) ইসলামকে তাঁর বিরচিত ধর্ম বলে দাবী করেন নাই বরং একথাই বার বার বলছেন যে, মানবের সৃষ্টি হতে যে ধর্ম চলে এসেছে, ইসলাম তাই; কালক্রমে সেই ধর্ম স্বার্থবুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষের হাতে কলঙ্কিত হয়েছিল, তিনি তাকে সংশোধিত আকারে প্রচার করেছেন। ইসলাম গোষ্ঠী, জাতি বা দেশ-বিশেষের ধর্ম নয়-ইসলাম মানবীয় ধর্ম। প্রতিটি শিশু ইসলামে জন্ম গ্রহণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জগতের সর্বদেশের সর্বজাতির সর্বমানব ইসলামের জন্মগত অধিকারী: বড় হয়ে তবে তারা নিজ নিজ পিতৃ-সমাজের সংস্কার গ্রহণ করে। তাই, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক-তাই ইসলামের কবি ইকবাল উদাত্ত কণ্ঠে বলেন-</p>
<p style="padding-left: 40px;">চীন ও আরব হামারা, হিন্দুস্তা হামারা</p>
<p style="padding-left: 80px;">মুসলিম হ্যায় হাম, ওতান হ্যায় সারে জাহাঁ হামারা।</p>
<p>এই কথাই কবির কণ্ঠে ফের অন্যভাবে ধ্বনিত হয়েছে-</p>
<p style="padding-left: 40px;">তু উয় ইউছুফ হ্যায় কে হর মেসের হ্যায় কেন&#8217;ন তেরা।</p>
<p>ধনী-গরীব, ধলাকালা, গৃহী-অগ্রহী সবারই জন্য ইসলামের দুয়ার খোলা। কোন পুরোহিত বাহু বিস্তার করে সে রাস্তা রোধ করে দাঁড়ায় নাই-ইসলামে পৌরহিত্যের স্থান নাই। ধর্মাচরণ ব্যাপারে মুসলমান স্বাধীন। কোন বিশেষ বয়স সে দুয়ার পথে কণ্টক সৃষ্টি করে নাই: বালেগ হাওয়ার পর হতেই ইসলামে সবার অধিকার-ইসলামের বিধান পালনে সবার কর্তব্য শুরু হয়। কেবল শেষ বয়স ধর্মের জন্য আলাদা করে রাখা ইসলাম অনুমোদন করে না। মূল কথা-ইসলাম সমগ্র জীবনের ধর্ম-শুধু মৃত্যু-ছায়া-মলিন অবসাদ-গ্রস্ত অকর্মণ্য বার্ধক্যের বা আত্মকেন্দ্রী চিন্তামগ্ন সমাজত্যাগী কর্মহীন গুহাবাসীর ধর্ম নয়। চলাই জীবন-</p>
<p style="padding-left: 40px;">হাস্তাম আগার মীরওয়াম</p>
<p style="padding-left: 80px;">গার নারওয়াম নিস্তাম। <sup>(৩)</sup></p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8216;গতিতেই আমার জীবন-গতিহীনতাতেই আমার মৃত্যু।&#8217;</p>
<p>ইসলাম এই চলমান কর্মময় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলামের যে প্রকৃত অনুসারী, তার কথায়-কাজে, তার অশনে-বসনে, তার চিন্তায়-স্বপনে ফুটে উঠবে তার ধর্মের সত্য-সুন্দর রূপ। কে কোন্ ঘরে জন্মলাভ করেছে, তা নিয়ে মুসলমানের গৌরব নয়। জীবনে ইসলামকে কে কতখানি রূপায়িত করতে পেরেছে, তা-ই দিয়ে তার সত্যিকার পরিচয়:</p>
<p style="padding-left: 40px;">ইউ তু সৈয়দ ভি হো, মীর্জা ভি হো, আফগান ভি হো,</p>
<p style="padding-left: 40px;">তোম সবহি কুছহো, বাতাও তো, মুসলমান ভি হো? <sup>(৪)</sup></p>
<p>ইসলামের যে সত্যিকার আভিজাত্য, তাও সার্বজনীন জন্মস্থান, পিতৃপরিচয়, মস্তিষ্ক শক্তি, ঐশ্বর্য বা প্রভুত্ব ইসলামের আভিজাত্যের মাপকাঠি নয়:</p>
<p style="padding-left: 40px;">নহে আশরাফ যার আছে শুধু</p>
<p style="padding-left: 120px;">বংশের পরিচয়-</p>
<p style="padding-left: 40px;">সেই আশরাফ জীবন যাহার</p>
<p style="padding-left: 120px;">পুণ্য কর্মময়।</p>
<p style="padding-left: 40px;">হাবশীও যদি সত্যের পথে</p>
<p style="padding-left: 40px;">বরণীয় হয়, তবু এ জগতে</p>
<p style="padding-left: 40px;">তারি নির্দেশ নত মস্তকে</p>
<p style="padding-left: 120px;">মানিবে সুনিশ্চয়। <sup>(৫)</sup></p>
<p style="padding-left: 200px;">-হাদীস</p>
<p>ইসলামের এই যে সেবা ও সাধনার আভিজাত্য-এই Aristocracy of Service and Achievement-এ শুধু তার শুভ শাস্ত্রবাক্যে পর্যবসিত রহে নাই: যুগে যুগে প্রাণবন্ত মুসলমানেরা একে বাস্তবে রূপায়িত করেছে। রসুলুল্লার মুয়াজ্জিন ছিলেন গোষ্ঠিতে হাবশী। মহানবী তাঁর একজন জ্ঞাতি-বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তি-পাওয়া দরিদ্র দাসের সঙ্গে। কত ক্রীতদাসকে তাদের সাধনা সাফল্যের অভিনন্দনে বাদশা&#8217;রা দিয়েছেন তাঁদের কন্যা, আমীর, রঈসরা মিলে তুলে দিয়েছেন সিংহাসনে। ভারত-ইতিহাস পাঠকেরা তা ভাল করেই জানেন।</p>
<p>ছোট-বড়, ধলা-কালা, আরবী-আজমী-সর্বপ্রকার বিভেদ নির্বিশেষে সকলের সামনে সাধনার এই যে অবারিত দুয়ার, আর সাধনা সাফল্যের এই যে কার্যগত অকুণ্ঠিত স্বীকৃতি ইসলামের সার্বজনীনতার এ অন্যতম বিকাশ-জগতের আভিজাত্যের ইতিহাসে ইসলামের এ এক অভিনব অবদান।</p>
<p>এরই সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ইসলামের আর একটি স্মরণীয় বৈশিষ্ট্য-<strong>সে তার বিশ্বভ্রাতৃত্ব। বিপ্লবের বিপুল সমুদ্র মন্থন করে ফরাসীরা সাময়িকভাবে লাভ করেছিল যে সাম্যের সুধা, যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের মহিমা গাথা আজকের রুশীয়রা জগতময় গেয়ে ফিরছে এবং যার তরঙ্গ অভিঘাতে আমাদের ধ্যায়ানী যুবক সমাজের বহু জনের চিত্ত আজ উদ্বেলিত, সে উদার সাম্য ভ্রাতৃত্বের আদর্শ </strong><strong>ইসলা</strong><strong>মের শৈশব হতে তার সত্যিকার অনুসারীদের জীবনের সঙ্গে এমন নিবিড়ভাবে মিশে রয়েছে যে, বাইরে তার কোন সরব প্রকাশ নাই-সরব পরিচয়ের কোন প্রয়োজন অনুভূত হয় না।</strong> এই যে রক্তের অনিরুদ্ধ প্রবাহ আমাদের ধমনী বেয়ে অহরহ চলছে, কবে সে তার বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়িয়েছে? বাস্তবিক রক্ত চলাচলে কোন বিঘ্ন না ঘটলে মানুষ টেরই পায় না এ রক্ত-স্রোতের অস্তিত্ব।</p>
<p>এ সম্বন্ধে Captain Mark Sykes-এর &#8216;Darul-Islam&#8217; নামক বই হতে একটু উদ্ধৃত করার লোভ হচ্ছে। তিনি বলেছেন:</p>
<blockquote><p>&#8220;জিজী কুর্দদের প্রতাপান্বিত সর্দার আগা ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে অভ্যর্থনা করার জন্য যে দরবার, তাতে রইলেন আগা স্বয়ং, তাঁর সেনাপতি, একজন অন্ধ ভিক্ষুক, একটি খৃস্টান দোকানদার, টেলিগ্রাফ অফিসের জনৈক কেরানী, দুইজন খানসামা, ইয়াকুব, আমি এবং একজন কসাই-যে চামড়া নিতে এসেছিল, আমরা সবাই এক টেবিলে বসে একসঙ্গে কফী খেলাম।&#8221;</p></blockquote>
<p>এ সাম্যের দরজা পর্যন্তও আমরা পৌঁছতে পারি নাই। কখখনো পারব না। অথচ উদ্ধত মার্কিন মিশনারীরা এদেরকেই শিখাতে আসে সাম্যের মহিমা! আমেরিকার পথে-ঘাটে অহরহ শোনা যায়, &#8216;ওহ। আমরা সবাই সম্পূর্ণ সমান-আমাদের কেউ কারো চেয়ে ছোট নয়।&#8217; কিন্তু এ দেশে সাম্য এমন পূর্ণতালাভ করেছে যে এখানে কেউ এর উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করে না।</p>
<p>কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে সাম্যের গান আনন্দের উন্মত্ততায় এত যে মুখর হয়ে উঠেছে, তার এক বড় কারণ এই যে-ইসলামের অক্ষম অনুসারীদের হাতের বীণায় বহুকাল পর্যন্ত যে সাম্যের ঝঙ্কার কর্মহীন অবসাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, কমিউনিজমের প্রথম আঘাতেই সে ঘুমন্ত ঝঙ্কার ফিরে পেল তার জাগৃতি-বেজে উঠলো সে ঊষার পুলক স্পন্দনের উচ্ছল কলরোলে।</p>
<p>ইসলামের এই বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের মূল উৎস হ&#8217;ল তার তৌহীদ-একেশ্বর-পরায়ণতা। &#8216;আল্লাহু আকবার&#8217;-আল্লাই সবচেয়ে বড়, &#8216;লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ&#8217;-আল্লা ছাড়া আর কেউ উপাস্য নাই। একমাত্র তাঁরই উদ্দেশ্যে নত হবে মানুষের মাথা-কোনও মানুষের সামনে নয়, দুনিয়ার দুর্ধর্ষতম দিগ্বিজয়ী বীরের কাছেও নয়। মুসলমানের এই গভীর বিশ্বাস-তার এই দুর্জয় ঈমান যুগে যুগে তার বুকে জুগিয়েছে বল-দিয়েছে তাকে মৃত্যুর সঙ্গে যুঝবার শক্তি। সেই মহান আল্লার উদ্দেশেই কবি ডেকে বলছেন:</p>
<p style="padding-left: 40px;">উছী-কে গজব-সে ডরো গার ডরো তোম</p>
<p style="padding-left: 40px;">উছী-কে তলব মে মরো যব মরো তোম। <sup>(৬)</sup></p>
<p>এই তৌহিদই মুসলমানের সামাজিক জীবনের সামনে তুলে ধরেছে সাম্যের উজ্জ্বল আদর্শ, তার রাষ্ট্র জীবনে জুগিয়েছে গণতন্ত্রের অনুপ্রেরণা, অন্য ধর্মীদের সঙ্গে ব্যবহারে দিয়েছে উদারতার স্নিগ্ধ ব্যঞ্জনা। আল্লা এক-সবাই তাঁরই সৃষ্টি-সবাই এক আদমের সন্তান-অতএব সবাই সমান-সবাই ভাই ভাই-সবাই সবার সুখ-দুঃখের সাথী, মূলত এই-ই তৌহিদের অন্তর্নিহিত নির্দেশ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নারী সম্বন্ধে ইসলামের বিধান পরম ঔদার্যময়। ইসলামের ধর্ম, ইসলামের নীতি, ইসলামের সমাজ-ইসলামের রাষ্ট্র, ইসলামের শিক্ষা, ইসলামের সংগ্রাম, ইসলামের ব্যক্তিগত সম্পদ-ইসলামের ওয়ারেসী স্বত্ব, ইসলামের বিবাহ-সম্মতি-ইসলামে শান্তিহীন দাম্পত্যজীবনের বিষ বন্ধন হতে মুক্তির অধিকার, এর কোনটিতেই নর একক অধিকার পায় নাই; এর প্রত্যেকটিতে নারীরও বিশিষ্ট অধিকার বর্তমান। রসুলুল্লাহ তাঁর বিদায় হজের বক্তৃতায় সম্মিলিত জন-সংঘকে আকুল কণ্ঠে শেষবার মনে করিয়ে দেন-</p>
<p style="padding-left: 40px;">সাবধান ভাই, সাবধান সব</p>
<p style="padding-left: 120px;">তোমাদের পুরনারী।</p>
<p style="padding-left: 40px;">পুণ্য শপথে বরিয়া লয়েছে</p>
<p style="padding-left: 120px;">মহাদান বিধাতারি।</p>
<p style="padding-left: 40px;">তাহাদের প্রতি তোমা সবাকা</p>
<p style="padding-left: 40px;">দিয়াছে বিধাতা যেই অধিকার</p>
<p style="padding-left: 40px;">তোমাদেরো পরে সেই অধিকারে</p>
<p style="padding-left: 120px;">তাহারাও অধিকারী। <sup>(৭)</sup></p>
<p>প্রাক-ইসলামীয় আরবে কন্যাকে মনে করা হ&#8217;ত বংশের ভাবী কলঙ্কের অঙ্কুর। কাজেই গর্বান্ধ পিতারা অনেক সময়ই তাদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করে ফেলত। পাঁচ বছরের নধর কান্তি কন্যা-মাকে ফাঁকি দিয়ে পিতা তাকে নিয়ে চলেছে কবর দিতে। খেজুর বনের ওপাশে মেয়েকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাপ মাটি খুঁড়ছে-হঠাৎ তার চোখে যায় একটু বালি-কণা-মেয়ে অমনি ব্যস্ত হয়ে তার সেই ছোট্ট স্নেহাঞ্চল দিয়ে মুছতে যায় বাপের চোখ। বাপ বিদ্যুৎ-স্পৃষ্টের মত চমকে ওঠে। থমকে দাঁড়ায়-ভাবে, হায়। কি করছি। কিন্তু না-মায়াবিনী, এ তোমার নতুন ফাঁদ। তারপর সহসা ধাক্কা দিয়ে মেয়েকে ফেলে দেয় সেই অসম্পূর্ণ গর্তে-তাড়াতাড়ি দুই হাত দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে ক্ষ্যাপার মত পালায়-তার দুই কানে আঙ্গুল, শেষে বা তার স্নেহের দুলালীর আর্তকণ্ঠ তথায় পশে।</p>
<p>মহানবী এই কন্যা-হত্যার দুয়ার যে চিরতরে রুদ্ধ করে দিলেন, কেবল তাই নয়-তিনি নিজে কন্যার অভ্যর্থনায় আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে শিক্ষা দিলেন কন্যার স্থান কত মহনীয়।</p>
<p>তারপর সবার উপর স্থান দিলেন তিনি সহধর্মিণীকে বল্লেন, <strong>&#8216;সেই মানুষ ভালো যে তার স্ত্রীর বিবেচনায় ভালো&#8217;</strong>-পীর-পুরোহিত, মৌলবী-মওলানা, ফকীর-দরবেশের বিবেচনায় নয়, স্ত্রীর বিবেচনায়।</p>
<p>সর্বশেষে জননীর হাতে দিলেন তিনি বেহেস্তের দুয়ারের চাবি, বল্লেন-</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8216;আল-জান্নাতু তাহতা আকদামেল উম্মেহাত&#8217;</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8211; মায়ের পায়ের তলে বেহেস্তের স্থান।</p>
<p>জ্ঞান আহরণ ব্যাপারে ইসলাম পরম উদার নীতি অনুসরণ করেছে। রসুলুল্লাহ্ বলেছেন, &#8216;দরকার হলে চীনদেশে গিয়েও জ্ঞান অর্জন কর।&#8217; গোষ্ঠিতে-জাতিতে, ধর্মে-কর্মে, আচারে-অনুষ্ঠানে, ভাষায়-ভঙ্গিতে, অশনে বসনে চীনারা আরব জাতি হতে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেকালে চীনে যাওয়ার পথও ছিল দুর্গম-বিপদ-সঙ্কুল। বিদ্যার খোঁজে এমন স্থানে যেতেও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। <strong>মহানবী আবার বলেছেন, &#8216;জ্ঞান </strong><strong>মুসলমা</strong><strong>নের হারানো মানিক-যেখানে পাও কুড়িয়ে নেও।&#8217;</strong></p>
<p>এসব বাণীই প্রাথমিক মুসলমানগণকে প্রেরণা জুগিয়ছিল জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে জগতের বিভিন্ন সভ্যতা-কেন্দ্র হতে জ্ঞান সংগ্রহ করতে। গ্রীস, রোম, মিসর, পারস্য, ভারত প্রভৃতি দেশ হতে পরম যত্ন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁরা যে বিদ্যা আহরণ করেছিলেন, তারই গবেষণাশুদ্ধ ভিত্তির উপর গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা তাঁদের অভিনব সভ্যতা-যে সভ্যতার শিখা মুসলিম স্পেনের গ্রানাডা ও কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় মারফত মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্রবেশ করে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার স্ফরণে উপকরণ ও উদ্দীপনা জুগিয়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>রাজ্য শাসন সংক্রান্ত ব্যবস্থায় ইসলামের অনুশাসন আজো জগতের সভ্যতম জাতিদেরেও অনেকের আদর্শ হয়ে আছে। বিজিত নাজরান ও পার্শ্ববর্তী খৃস্টান অধিবাসিগণের সম্বন্ধে মহানবী বলেছেন: আল্লা ও তাঁর রছুলের নামে তাঁদের ধন-প্রাণ ও ধর্মের সংরক্ষণ ভার গ্রহণ করছি। তাঁদের আচার অনুষ্ঠানে কোন ক্ষেত্রে কোন বাধা দেওয়া হবে না-কোন বিশপকে তাঁর পদ হতে সরানো হবে না-তাঁরা আগের মত তাঁদের সর্বপ্রকার অধিকার ভোগ করতে থাকবেন। <strong>বাদশা বাবর তাঁর ওছিয়তনামায় পুত্র হুমায়ুনকে বলেছেন-&#8216;এই ভারত সাম্রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম মতের অন্ত নাই। তোমার কর্তব্য&#8211;নিজ মনকে গোঁড়ামির মোহ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত করে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ধর্মমত অনুসারে তাদের প্রতি সুবিচার করা।&#8221;</strong></p>
<p>বাস্তবিক ইসলামের রাজ্যে মুসলমান অমুসলমান সমস্ত নাগরিকের পৌর অধিকার মোটামুটি সমান। মুসলিম শাসকদের এই সমদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে মধ্যযুগীয় খৃস্টান ইউরোপের উপদ্রুত অখৃস্টান প্রজারা দলে দলে এসে স্পেনে আশ্রয় নিয়েছিল। আইভান হো&#8217;র পাঠকেরা জানেন যে, এই একই কারণে ইহুদীনন্দিনী রেবেকা অশ্রুময়ী চোখে ইংলন্ডের মায়া ছেড়ে মুসলিম স্পেনে চলে এ&#8217;ল। ভারতে মুসলিম শাসনের ছায়াতলে হিন্দুবাসিন্দাদেরও যে এমনি শান্ত আশ্রয়লাভ ঘটেছিল, তার প্রমাণ এই যে-মুসলিম প্রভুত্বের কেন্দ্রগুলিতেই ছিল তাদের ভিড়-মুসলমান বাসিন্দারা ছিল সেখানে সংখ্যায় কম। আজ তাই দিল্লী-আগরা, লাক্ষ্ণৌ-এলাহাবাদ হিন্দু ডমিনিয়নের অন্তর্গত-আর সেই কারণেই আজমীরের মত ভারতের বৃহত্তম মুসলিম তীর্থ প্রদেশেও মুসলিম বাসিন্দারা আজো সংখ্যালঘু।</p>
<p>পরধর্মসহিষ্ণুতা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য। ইসলামের প্রথম কথা এই যে, ইসলাম সম্প্রদায় বা জাতি বিশেষের ধর্ম নয়-ইসলাম মানুষের ধর্ম। ইসলামের দ্বিতীয় কথা এই যে, আদি মানব হজরত আদম (আঃ) হতে ইসলাম চলে আসছে। যত নবী-পয়গাম্বর-তাঁরা সবাই ইসলাম প্রচার করে এসেছেন; সুতরাং হজরত মুছা (আঃ), ইছা (আঃ) এঁরা সবাই ইসলামের নবী, এঁরা প্রত্যেকেই মুসলমানের পরম শ্রদ্ধার পাত্র। ইসলামের তৃতীয় কথা এই যে, পৃথিবীর প্রতি দেশে খোদাতা&#8217;লা মানব সমাজের কল্যাণের জন্য পয়গম্বর পাঠিয়েছেন। এই পয়গম্বরেরা সংখ্যায় বিপুল-আমরা তাঁদের সবাইকে চিনি না-সবার নামও জানি না, সুতরাং অন্যধর্মের প্রবর্তকদের নাম নিতে সশ্রদ্ধভাবে সাবধান হওয়া দরকার, কারণ তাঁদের অন্তত কেউ কেউ যে ইসলামেরই পয়গম্বর ছিলেন না, একথা জোর করে বলা কঠিন। ইসলামের চতুর্থ কথা এই যে, অন্য ধর্মের যেসব দেব-দেবীকে ইসলাম মানে না, তাঁদের সম্বন্ধে কোন কটু বলা ইসলামে নিষিদ্ধ। যে মুসলমান কোন অমুসলমানেরও উপাস্য দেব-দেবীকে কটু বলবে, সে বাস্তবিক আল্লাকেই কটু বলবে; কারণ এই কটুর উত্তরে অমুসলমানেরা কার্যত মুসলমানের আল্লাকে কটু বলতে নিমন্ত্রিত হবে।</p>
<p>কিন্তু পরধর্ম সম্বন্ধে ইসলামের অনুশাসন এখানেই শেষ হয় নাই। মন্দির, মছজিদ, গীর্জা প্রভৃতি সর্বপ্রকার ধর্মস্থানকে রক্ষা করা বিষয়ে পবিত্র কোরানে যে তামি তাকিদ আছে, তা থেকে মরহুম খাজা কামাল উদ্দীন সাহেব সিদ্ধান্ত করেন যে, অন্যের ধর্ম মন্দিরকে রক্ষা করে অটুট অবস্থায় রাখা মুসলমানের পক্ষে ফরজ-অবশ্যকরণীয় ধর্ম কাজ। মুসলমানদের দ্বারা জেরুজালেম বিজয়ের পূর্বক্ষণে তথাকার খৃস্টান শাসনকর্তা বলেন, হজরত ওমর (রাঃ) ছাড়া আর কারো হাতে তিনি নগর সমর্পণ করবেন না। সংবাদ পেয়ে খলীফা গেলেন-গীর্জায় দাঁড়িয়ে খৃস্টান শাসনকর্তা ও মুসলিম খলীফা কথাবার্তা বলছেন, এমন সময় নামাজের সময় উপস্থিত হ&#8217;ল। <strong>খৃস্টান শাসনকর্তা বল্লেন, &#8216;তা নামাজ এখানেই পড়ুন।&#8217; হজরত ওমর (রাঃ) বল্লেন, &#8220;না, তা হয় না। আজ আমি এখানে নামাজ পড়লে এই নজীর দেখে ভবিষ্যতে মুসলমানেরা-গীর্জাকে মসজিদে পরিণত করে নিতে পারে।” এই বলে তিনি গীর্জা ছেড়ে বাইরে গিয়ে তাঁর উপাসনা করলেন।</strong></p>
<p>মুসলমান নামাজের শেষ পর্যায়ে যখন সালাম ফিরায়, তখন সে তার ডানে বামে-অর্থাৎ সর্বত্র অবস্থিত সর্বপ্রকার জীবের জন্য বিধাতার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে থাকে। নামাজে বসে দিনের মধ্যে কমপক্ষে চৌদ্দবার যে ব্যক্তি জাতি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে সবার জন্য আল্লার দরবারে কল্যাণ প্রার্থনা করে, তার পক্ষে পরধর্মীর প্রতি ঘৃণার ভাব পোষণ করা স্বাভাবিক, না সঙ্গত? মানব-প্রেম স্নিগ্ধ চিত্ত পারস্য কবি তাই বলেছেন:</p>
<p style="padding-left: 40px;">দিল বদস্থ আর কে হজে আকবরাস্ত</p>
<p style="padding-left: 40px;">আজ হাজারা কা&#8217;বা এক দিল খোশতারাস্ত</p>
<p style="padding-left: 40px;">কা&#8217;বা বুনিয়াদে খলীলে আজরাস্ত</p>
<p style="padding-left: 40px;">দিল গুজার গাহে জলীলে আকরাস্ত</p>
<p>&nbsp;</p>
<p style="padding-left: 40px;">নরের হৃদয় জয় কর, ভাই, শ্রেষ্ঠ হজ-ই তা&#8217;তে</p>
<p style="padding-left: 40px;">হাজার কা&#8217;বার চেয়েও হৃদয় বড় জেনো তুমি,</p>
<p style="padding-left: 40px;">কা&#8217;বা সে ত আজর-তনয় গড়ল আপন হাতে</p>
<p style="padding-left: 40px;">হৃদয় সে যে স্বয়ং বিশ্বপতির বিহারভূমি।</p>
<p>উপরে ইসলামের যে সব উদার বিধানের কথা বলা হ&#8217;ল, তা মুসলিম ইতিহাসের সবযুগে মুসলমানেরা মেনে চলে নাই-একথা সত্য। তবে মুসলিম ইতিহাসের যাঁরা সত্যিকার গৌরব, তাঁরা যে মেনে চলেছেন, এই যথেষ্ট। আর তারা হঠাৎ বড় হয়ে যে ইসলামের বিধান মেনে চলেছেন এমনও নয়-ইসলামের অনুকূল পরিবেশই তাদের আত্মত্মবিকাশের বড় কারণ। একথাও লক্ষণীয় যে, কোন পরকীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি বা প্রগতিপথের ঝলকে, কোন ইন্দ্রজালের ক্ষণিক মায়ায় বা স্বার্থচিন্তার মোহ-বিভ্রমে পড়ে মুসলমানেরা ইসলামের মহান উদার আদর্শ হতে যখন যত দূরে সরে পড়েছে, পরিণামে ঠিক ততখানিই দূরে সরে পড়েছে তারা প্রকৃত কল্যাণ ও উন্নতির পথ হতে। ইসলামের আসল বৈশিষ্ট্য তার অনুপম ঔদার্য-তার সার্বজনীনতা। মুসলমানের এই মহান শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস হল তার কোরান ও হাদীস। বিদায় বেলায় এদের কথাই মহানবী বলেন-আরাফাতে সমবেত সেই সংঘকে:</p>
<p style="padding-left: 40px;">তোমাদের কাছে রেখে গেনু আজি</p>
<p style="padding-left: 120px;">দুটি মহা উপহার</p>
<p style="padding-left: 40px;">কোরানের পূত মঙ্গল-বাণী</p>
<p style="padding-left: 120px;">মম উপদেশ আর।</p>
<p style="padding-left: 40px;">যতদিন সবে পরম আদরে</p>
<p style="padding-left: 40px;">আঁকড়ি রাখিবে ধরি দুই করে</p>
<p style="padding-left: 40px;">হারাবে না পথ ঝঞ্চা ও ঝড়ে</p>
<p style="padding-left: 120px;">সংসার সাহারার। <sup>(৮)</sup></p>
<p><strong>মুসলমা</strong><strong>নকে আবার বড় হতে হলে এঁদের নির্দেশিত উদার পথে চলেই বড় হতে হবে।</strong></p>
<p>[১৯৪৮ সালের ২৩শে জানুয়ারি তারিখে ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের মাঘোৎসব সভায় পঠিত এই প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত “ইব্রাহিম খাঁ রচনাবলী-১” থেকে সংগৃহীত এবং ঈশৎ পরিমার্জিত।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টিকাঃ</strong></p>
<ul>
<li>(১) কথিকা-আবুল হাশেম</li>
<li>(২) কথিকা-আবুল হাশেম</li>
<li>(৩) ইকবাল</li>
<li>(8) ইকবাল</li>
<li>(৫) কথিকা-আবুল হাশেম</li>
<li>(৬) হালী</li>
<li>(৭) কথিকা-আবুল হাশেম</li>
<li>(৮) কথিকা-আবুল হাশেম</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamer-ouudarjo/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16501</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানব সভ্যতার প্রতি ইসলামী সভ্যতার অবদান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 Jan 2026 08:44:09 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16488</guid>

					<description><![CDATA[মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি খুব ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। বিশেষ করে &#8216;শক্তি&#8217;-র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহের নাম আলাদা হলেও তাদের মূলনীতি সমূহ ছিল এক ও অভিন্ন।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি খুব ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। বিশেষ করে &#8216;শক্তি&#8217;-র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহের নাম আলাদা হলেও তাদের মূলনীতি সমূহ ছিল এক ও অভিন্ন। তাদের সভ্যতার মূলে ছিল শোষণ ও জুলুম।।</p>
<p>কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত হল ইসলামী সভ্যতা। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল ইসলামী বিপ্লব, যা সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদ (সঃ) এর নেতৃত্বে হয়েছিল। এই বিপ্লব ছিল এমন এক বিপ্লব যা সকল নিয়ম নীতিকে পাল্টে দিয়ে সংগঠিত হয়েছিল এবং যার প্রভাবে সমগ্র পৃথিবী নতুন করে সেজেছিল।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা মানবতার জন্য কি এনেছে? কি দিয়েছে? আমি এর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করতে চাইঃ</p>
<p><strong>১। মানবাধিকার</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">সত্যিকারের মানবাধিকারের প্রবক্তা হল ইসলামী সভ্যতা। ইসলামী সভ্যতাই প্রথম মানুষকে মানবাধিকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের ধ্বজাধারীরা এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আংশিকভাবে একে গ্রহণ করলেও তাদের পন্থা ও ব্যবস্থা ফেরাউনী ব্যবস্থা তথা জুলুম তান্ত্রিক হওয়ার কারণে এই মানবাধিকারের ধারণার মধ্যকার মৌলিকত্বকে নষ্ট করে দেয় তথা degenerate করে ফেলে। আজকে সকল সমস্যার মূলে রয়েছে তাদের এই degeneration। তারা ইসলামের কাছ থেকে নেয় এবং প্রভাবিত হয় কিন্তু সেটাকে নষ্ট করে জুলুমে রূপান্তর করে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">দেখুন মানবাধিকার রক্ষা করার নামে তারা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছে কিন্তু এই জাতিসংঘে অন্যায় ভাবে &#8216;ভেটো পাওয়ার&#8217; নামে একটা ধারা যুক্ত করে দিয়েছে। আমি এটাকে বলি ফেরাউনী ধারা। এই ফেরাউনী ধারাকে ব্যবহার করে তারা যা ইচ্ছা তাই করে। তারা ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, কিন্তু Degenerate করে ফেলেছে।</p>
<p><strong>২। শোষনের বিলোপ সাধন</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার বিধান এনেছে ইসলামী সভ্যতা। এখানে থেকে ইলহাম নিয়ে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করে। মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করব এই কথার নামে তারা মানুষকে রাজনৈতিক শক্তির দাস বানিয়ে মানুষকে রাজনৈতিক শক্তির শোষণের শিকার বানিয়েছে। কারণ তাদের মূলে রয়েছে &#8216;শক্তি&#8217;। শক্তিকে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড মনে করে থাকে।</p>
<p><strong>৩। মুক্তবাজার অর্থনীতি</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">মুক্তবাজার অর্থনীতির ধরণা দিয়েছে ইসলাম। রাসূল (সঃ) সর্ব প্রথম মদিনার বাজারে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। সকলেই তার ইচ্ছামত ও মর্জিমত ক্রয় বিক্রয় করবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ (ক্যাপিটালিজম) এর প্রবর্তন করে। কিন্তু শক্তির পূজারী হওয়ার কারণে ও শক্তিকে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড মনে করার কারণে মনোপলি (একচেটিয়া), পূঁজিপতিদের শোষণের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে।</p>
<p><strong>৪। চুক্তির স্বাধীনতা</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">ইসলাম মানুষকে ন্যায়ের ভিত্তিতে চুক্তি করার স্বাধীনতা দিয়েছে। পাশ্চাত্য ভূমি আইন, বিয়ে শাদী ইত্যাদিতে কিছু আইন প্রবর্তন করেছে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু আইন প্রবর্তন করেছে। কিন্তু এই স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে মানুষকে সামগ্রিকভাবে দিতে পারেনি। সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানুষের যে স্বাধীনতা রয়েছে সেই স্বাধীনতা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করেছে।</p>
<p>৫। <strong>ইসলামে সামাজিক কাঠামোতে আপোষ রফা রয়েছে। </strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">পাশ্চাত্যের ধারকরা মুসলমানদের প্রভাবে তাদের প্রাচীন Feudalism এর স্থলে কোয়ালিশন গঠন করার পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কর্তৃত্বের অধীনে এবং রাষ্ট্রের সকল শক্তিকে কুক্ষিগতকারী আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসিতে রূপান্তরিত করে পুণরায় ফেরাউনিজমে (জুলুমতন্ত্রে) পরিণত করে।</p>
<p>[মিল্লি গরুশ আন্দোলনের নেতা ও তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকানের <strong>&#8216;ইসলামে জ্ঞানের ধারা ও জ্ঞানপদ্ধতি&#8217;</strong> নামক কনফারেন্স থেকে অনূদিত]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16488</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতা; রাষ্ট্রের সীমা পেরিয়ে এক চিন্তার উত্তরাধিকার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 26 Jan 2026 17:39:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16484</guid>

					<description><![CDATA[আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে আমরা ইতিহাসের যে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছি, তাতে অনেক সময় ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের সীমাবদ্ধ ও সংকুচিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু এগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো মোটেও ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি বা অবসানের তারিখ নয়।</p>
<p>কারণ ইসলামী সভ্যতা কখনোই কোনো একটি রাষ্ট্রনির্ভর, নিছক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড়ায়নি। রাষ্ট্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল বটে, কিন্তু তা কখনোই একমাত্র ভিত্তি ছিল না। ইসলামী সভ্যতা কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বা ক্ষমতাকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা নয়। হ্যাঁ, ক্ষমতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা ছিল বৃহত্তর এক সভ্যতাগত ব্যবস্থার অংশমাত্র। ইসলামী সভ্যতা মূলত একটি সামগ্রিক সভ্যতা; যার কেন্দ্রে ছিল এক সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি, একটি চিন্তাধারা, একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনদর্শন। সেই দর্শনের আলোকে গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চা, শহর-স্থাপত্য, শিল্পকলা, সাহিত্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক কাঠামো।</p>
<p>এ কারণেই বলা হয়, হক ও শক্তিশালী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সভ্যতার যাত্রা কখনো বিলীন হয় না। ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, সেসব অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোথাও উপনিবেশিক শোষণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা ছিল ভয়াবহ; কোথাও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এতকিছুর মধ্য দিয়েও সেই সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন, শহরচিন্তা ও জ্ঞানগত উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।</p>
<p>সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্ঞান। বইয়ের পাতায়, আলেম ও চিন্তকদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের সিলসিলার মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা আজও জীবিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যগুলি, মসজিদ, মাদরাসা, সেতু, নগর পরিকল্পনার নিদর্শন, নিজেদের নীরব ভাষায় সেই সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। পাথরে খোদাই করা হাকিকতের রূহ, কারুকার্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা দর্শন আজও আমাদের সামনে উপস্থিত।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতায় শহর পরিকল্পনা ছিল গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল। পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব নগর; যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ‘শহরের রূহ’ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই রূহ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে। এক বিন্দু পরিমাণও সে রূহ থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি।</strong></p>
<p>শিল্পকলার প্রতিটি শাখায়; গান, কাব্য, ক্যালিওগ্রাফির রেখায় রেখায় আমরা দেখি সভ্যতার রূহানি ও আধ্যাত্মিক দিক। সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্বকে বোঝার যে চিন্তা সিলসিলা, তা আজও বিদ্যমান। মানবিক মূল্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব, ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য; সবই ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।</p>
<p>রমজান থেকে ঈদ, জিয়াফত থেকে সামাজিক উৎসব সবকিছু আজও আমাদের জীবনে এক গভীর রূহানি আবেশ নিয়ে উপস্থিত।</p>
<p>রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে, কিন্তু সভ্যতা তখনই ধ্বংস হয়, যখন মানুষের চিন্তাগত, নৈতিক, জ্ঞানগত, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক স্তর থেকে সেই সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ মুছে যায়। ইসলামী সভ্যতা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজও নানা রূপে, নানা মাত্রায় আমাদের মাঝে বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা ও রাষ্ট্র: সম্পর্ক ও বুঝাপড়া</strong></p>
<p>এখানে একটি মৌলিক সভ্যতাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি, সভ্যতা ও রাষ্ট্র কখনোই একার্থক নয়। সভ্যতা মূলত মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, আখলাক, জ্ঞান, রুচিবোধ, নান্দনিকতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সমষ্টিগত রূপ; আর রাষ্ট্র হলো, সেই সভ্যতাগত জীবনের শাসন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি সাময়িক কাঠামো। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের পেছনে থাকা সভ্যতাগত চিন্তা ও মূল্যবোধ যুগের পর যুগ ধরে বহমান থেকেছে। ইসলামী সভ্যতা এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছে।</p>
<blockquote><p>ইসলামি সভ্যতায় রাষ্ট্র কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না; রাষ্ট্র ছিল একটি উসিলা বা মাধ্যম। রাজনীতি এখানে গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র পথ নয়; বরং রাজনীতি ছিল আখলাক সমৃদ্ধ সমাজ, নৈতিক নগর, সাংস্কৃতিক ভারসাম্য এবং জ্ঞানচর্চার সহায়ক শক্তি। এই কারণেই ইসলামি সভ্যতায় রাজনীতিকে কখনোই সর্বগ্রাসী করা হয়নি; বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা ও জ্ঞান সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।</p></blockquote>
<p>ইসলামী সভ্যতা আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র একটি মাধ্যম, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রাজনীতি এখানে কখনোই গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র উপায় ছিল না; বরং রাজনীতি ছিল একটি উসিলা। রাষ্ট্র ও রাজনীতি নৈতিক সমাজ, আখলাক সমৃদ্ধ নগর, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন এবং জ্ঞান ও রুচিবোধের সেবক হিসেবে কাজ করত।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আলেমদের জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব দৃঢ় হয়, মানুষ তার আত্মিক শান্তি খুঁজে পায়, রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল এসবের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা। এখানে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ ছিল ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অবকাঠামো, যা রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়েও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, মুসাফিরখানা, খাদ্য ব্যবস্থা, পানি ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছিল। আধুনিক রাষ্ট্র যে সামাজিক সেবাগুলোকে আজ ‘ওয়েলফেয়ার’ বলে চিহ্নিত করে, তার বড় অংশই ইসলামী সভ্যতায় ওয়াকফের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হলেও সমাজ ভেঙে পড়েনি; সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ রাজনীতি, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা, নগর বিনির্মাণ, সবকিছুই ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।</p>
<p>এই ইবাদতসম রূপেই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়েছিল। <strong>নগরগুলো মানুষের জন্য গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়। এমনকি কোথাও ক্ষমতার প্রকাশ থাকলেও, এক পর্যায়ে তা মানুষের কল্যাণের দিকেই নিবেদিত হতে বাধ্য হতো। কারণ সমাজ, জ্ঞান ও আলেমদের ভূমিকা ছিল আখলাক বিনির্মাণে কেন্দ্রীভূত।</strong> ফলশ্রুতিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ইসলামি সভ্যতা মানবতাকে দিয়ে গিয়েছে। কারণ ইসলামি সভ্যতার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না রাষ্ট্রকে, সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রকে বা নির্দিষ্ট কিছু দ্বারা দখল করা। একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সকলের কল্যাণ।</p>
<p>ব্রিটিশ জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করতে শিখেছি যে রাষ্ট্র দখল করলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়, বা কোনো কিছুকে দখল করে নিলেই সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এটিও আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মিরাস নয়। আমাদের পূর্বপুরুষগণ একটি সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিলেন, যেখানে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, জ্ঞান ও চিন্তা, শহর, স্থাপত্য, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি থেকে পরিবেশ সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি সিভিলাইজেশনাল বা সভ্যতাগত ক্ষেত্র, রাষ্ট্র বা দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</p>
<p>এখানে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ হল, এই সভ্যতা বিনির্মাণের কাজটি সকল মানুষ করতে পারত। এই কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো সমাজ, এবং সমাজ শক্তিশালী হতো। সমাজ শক্তিশালী হলে সেখান থেকে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসত। অর্থাৎ এই চিন্তাধারা মূলত মানুষকে কনভেন্স করত, মানুষের উপর প্রভাব সৃষ্টি করত। মানুষ নিজের আকল খাটিয়ে তার সঠিক কাজের ক্ষেত্র, অবদানের জায়গা, নিজের উপকারের ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারত এবং সে অনুযায়ী অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমরা সেই জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছি।</p>
<p>পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের উপর একচ্ছত্রভাবে রাজনীতি করেছে, কিন্তু সেই রাজনীতি বহুক্ষেত্রেই আমাদের স্বাধীনতা দেয়নি। তারা চাপিয়ে দেওয়া শিখিয়েছে, জোরপূর্বক দখল, ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনীতি চাপিয়ে দেওয়া, ঋণ চাপিয়ে দেওয়া। কৃষি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে শোষণ এবং শোষণ নিয়ে কিছু বলা যাবে না, এই ধরনের চিন্তা চাপিয়ে দেওয়া; সবই তারা করেছে। অথচ ইসলামি সভ্যতার মূল পন্থা ছিল ইক্বনা অর্থাৎ কনভেন্স করা। কনভেন্স করেই এগিয়ে যাওয়া।</p>
<p>এই কনভেন্সের সবচেয়ে বড় নমুনা আমরা পাই প্রতিটি স্থাপত্যে। স্থাপত্য যখন চিন্তার ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেটিও ছিল কনভেন্সের একটি অংশ। মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিশীলতা, সর্বোচ্চ চিন্তা এবং সর্বোচ্চ হাকিকতের দিকে ধাবিত করার একটি মাধ্যম ছিল এটি। তাই ইসলামী সভ্যতায় ইস্তাম্বুল থেকে আন্দালুস, ইস্পাহান থেকে কুতুব মিনার- কোনো স্থাপত্যই শুধু ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়। এগুলো ছিল একেকটি চিন্তা ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>স্থাপত্য: চিন্তা ও আখলাকের দৃশ্যমান ভাষা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় স্থাপত্য ছিল এক ধরনের নীরব দাওয়াত। এটি কেবল ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়; বরং চিন্তা, দর্শন ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েই মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিবোধ, সর্বোচ্চ শালীনতা এবং তাওহিদের চিন্তার দিকে আহ্বান জানানো হতো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার স্থাপত্য কখনোই ইট-পাথরের সমষ্টি ছিল না। কর্ডোভার মসজিদের অসংখ্য খিলান বহুত্বের ভেতর ঐক্যের- ‘ওয়াহদাত’-এর ঘোষণা দেয়। আল-হামরার দেয়ালে খোদাই করা “লা গালিবা ইল্লাল্লাহু” কোনো সামরিক বিজয়ের ঘোষণা নয়; বরং ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের স্থায়ী স্মারক। একইভাবে ঝিনাইদহের মোহাম্মাদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানা, দারসবাড়ি (ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও কিছুটা হলেও টিকে আছে), খুলনার খান-জাহানের মসজিদও একইভাবে ওয়াহদাতের ঐক্যের দর্শন ফুটিয়ে তোলে।</p>
<p>অর্থাৎ প্রতিটি জায়গায়; এই সভ্যতা ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একই সাথে হক্ব ও হাকিকতের চিন্তা, যার প্রস্ফুটিত রূপ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সকল অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেটি পেরেছিল বলেই সেই চিন্তার ভাষা আজও আমাদের আন্দোলিত করে। এর ছোট্ট নমুনা হলো- প্রতিটি মসজিদের পাথর, যা এখনও যেন ধ্যানে মগ্ন। সৌন্দর্য যেন জিকিররত, জ্ঞান যেন এখনও নূর ছড়াচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বাংলার ইসলামী সভ্যতা: আখলাক ও মূল্যবোধের সভ্যতা&#8217;</strong></p>
<p>বাংলার ইসলামী সভ্যতা এবং বাংলায় ইসলামের আগমন ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ৩০০ বছর ধরে আলেমগণ, সুফি ও ব্যবসায়ীগণ আখলাকের দাওয়াত ও বাস্তব উপমা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এর ফলে সমাজ ও ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানসহ নানাবিধ উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এর ফলেই বিনা রক্তপাতে এখানে একটি বিজয় সাধিত হয়েছিল। এই বিজয়ের মূল ধারক ও বাহক ছিলেন সুফি দরবেশ, আলেম ও আখলাকসম্পন্ন ব্যবসায়ীগণ। তাঁরা এখানে সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে এই সুফি আলেমদের প্রভাবে ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের আখলাক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার ফলে যুগ যুগ ধরে সকল ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে একটি শক্তিশালী, আস্থাশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। দুনিয়ার চার ভাগের একভাগ অর্থনীতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। কৃষি, সমুদ্রাঞ্চল স্থাপনা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও শহর, নদীমাতৃক অঞ্চলে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সবকিছুই শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছিল।</p>
<p>ব্রিটিশ উপনিবেশের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও প্রায় ২০০ বছরের নিকৃষ্ট শোষণ চালানো হয়। আমরা হারিয়েছি আমাদের হাফেজা, স্থাপনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনি কাঠামো, সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক নীতি, বিশাল ওয়াক্‌ফ জমি, বনাঞ্চল ও প্রাণ প্রকৃতি। তবু এই ক্ষতির মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, পারিবারিক মূল্যবোধ আজও টিকে আছে।</p>
<p><strong>ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ষাট গম্বুজ মসজিদ আমাদের দেখায়, তাঁরা শুধু জিকিরের মজলিশে নিমজ্জিত ছিলেন না; পানির নহর, অর্থনীতি, কৃষি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কত ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন।</strong> প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা এমন সিলসিলা তৈরি করেছিলেন, যেখানে নদী, বাতাস ও আলোকে উপেক্ষা করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।</p>
<p><strong>চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানায় আজও মানুষের খাবারের ব্যবস্থার নিদর্শন দেখা যায়।</strong> অর্থাৎ একত্রে বসা ও মানুষের সাথে মেশার সংস্কৃতি আজও রমজান, ঈদ, শবে বরাত, মিলাদ ও মিরাজের মাধ্যমে বিদ্যমান।</p>
<p>শরফুদ্দিন আবু দাওয়ামার রেখে যাওয়া ফিকহি সিলসিলা, হাদিসের দারস, দারসবাড়ির জ্ঞান; সবই আজও সুফি আলেমদের মাদরাসা ও মসজিদের মাধ্যমে নানাভাবে বিদ্যমান। মক্তব সংস্কৃতি, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, একত্রে ইফতার, সহযোগিতা, গোশত বণ্টন, একজনের দ্বারা বহু মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার সংস্কৃতি আজও জীবিত।</p>
<p>সব সংকটের মধ্য দিয়েও আমরা একদিনের জন্যও আজান বন্ধ হতে দেইনি। নবী(সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো পরাস্ত হয়নি। কারণ বাংলার ইসলামী সভ্যতা কোনো স্থান দখল করেনি, স্থানকে আপন করে নিয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকাশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকল্প, অর্থনীতি ও কৃষির পুনরুত্থান সবই তাঁদের অবদান।</p>
<p>এত শোষণের পরও যদি এত কিছু টিকে থাকে, তবে এটুকুই বলা যায়, আমরা এমন একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক, যার রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পতন হলেও চিন্তা ও আখলাকি সিলসিলা শক্তভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি সভ্যতায় প্রতিটি শহর নিরাপদ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানরা শাসন করলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করেছে।</p>
<p>এই সভ্যতা কোনো ধর্ম, জ্ঞান বা ভাষাকে নষ্ট করেনি, বরং বিকশিত করেছে। এর বড় প্রমাণ বাংলা ভাষা। মুঘলদের চারবাগ সংস্কৃতি, পানির ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনায় জান্নাতের ধারণাকে দুনিয়ার নৈতিক ও শালীন রূপে প্রকাশ করা হয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা আজও একসাথে বসবাসের অবস্থান ধরে রাখতে পারছি, এটাই ইসলামী সভ্যতার অবদান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা কেন বিলিন হয়নি?</strong></p>
<p>সভ্যতা তখনই বিলুপ্ত হয়, যখন মানুষের চিন্তা থেকে নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও হাকিকতের অন্বেষণ মুছে যায়। যে সভ্যতা আখলাককে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, সে সভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের ভিত নিজেই ক্ষয় করে। ইসলামী সভ্যতা কখনোই আখলাককে প্রান্তে ঠেলে দেয়নি; বরং সভ্যতা ও আখলাককে সমার্থক করে তুলেছিল। এই কারণেই রাজনৈতিক পতন, উপনিবেশিক শোষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসলামী সভ্যতা সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতা কখনোই শুধু ক্ষমতা বা রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়নি। এটি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত, হাকিকত অন্বেষী এবং মানবতার কল্যাণমুখী এক সভ্যতা। মানুষকে সে দেখেছে সভ্যতা বিনির্মাণের কারিগর হিসেবে, আয়াত হিসেবে। ফলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লেও চিন্তা, আখলাক, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের সিলসিলা আজও বহমান।</strong> আন্দালুস থেকে আনাতোলিয়া, মদিনা থেকে বাগদাদ, শাম থেকে দিল্লি, ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকা; রাষ্ট্রীয় পতন সত্ত্বেও এই নগরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় জাগরণসহ নানা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের জন্য ছায়ার ভূমিকা পালন করেছে। ইবনে সিনা, ফারাবী, ফখরুদ্দিন রাজী, ইবনে খালদুনের মতো চিন্তকরা এমন জ্ঞান রেখে গেছেন, যার ওপর আজকের দুনিয়া এখনও দাঁড়িয়ে আছে।</p>
<p>এই সভ্যতা ইতিহাসকে জাদুঘরের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। আন্দালুস, বাংলা, মুঘল বা ইস্তাম্বুল; সবখানেই সুর এক, বাদ্যযন্ত্র আলাদা। রূহানি আবেশ ও আখলাকি পরশ একই। এ কারণেই ইসলামী সভ্যতা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের গভীরে প্রথিত হয়েছে, আজও যা প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক।।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16484</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বায়তুল মাকদিস মুক্তির শপথগ্রহণের রজনী হোক শবে মেরাজ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/may-shab-e-meraj-be-the-night-of-taking-the-oath-of-liberating-baitul-maqdis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/may-shab-e-meraj-be-the-night-of-taking-the-oath-of-liberating-baitul-maqdis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 16 Jan 2026 12:07:43 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16461</guid>

					<description><![CDATA[শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে যেমন গুরুত্বপুর্ণ একটি ঘটনা, তেমনি বাঙ্গালী মুসলমানের সংস্কৃতিতে এটি হয়ে আছে তাৎপর্যপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। এই অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের পর থেকেই ঘটা করে পালন হয়ে আসছে এই দিবসটি। দরবার ও খানকাগুলোতে হেদায়াতি তা’লিম, জিকিরের মজলিস শেষে একসাথে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে যেমন গুরুত্বপুর্ণ একটি ঘটনা, তেমনি বাঙ্গালী মুসলমানের সংস্কৃতিতে এটি হয়ে আছে তাৎপর্যপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। এই অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের পর থেকেই ঘটা করে পালন হয়ে আসছে এই দিবসটি। দরবার ও খানকাগুলোতে হেদায়াতি তা’লিম, জিকিরের মজলিস শেষে একসাথে তবারক গ্রহণ, ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি তৈরির মাধ্যমে উদযাপনের এক নান্দনিক সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে এই শবে মেরাজের।</p>
<p>শবে মেরাজের জলসাতে এসে এই রজনীতে কী ঘটেছিল, কীভাবে রাসূল নিজ ঘর থেকে ইসরা (রাত্রিকালীন ভ্রমণ) করে মসজিদে আকসায় গেলেন, সেখান থেকে উর্ধ্ব গগণে আরোহনের মাধ্যমে কীভাবে মেরাজ সংঘটিত হয় – এসব কাহিনী শুনেন নি এমন ব্যক্তি বোধহয় বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।</p>
<p>তবু, মুসলিম উম্মাহর এই চরম ক্রান্তিলগ্নে এসে – যখন তাবৎ দুনিয়া মুসলিমদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, জ্ঞান-গরিমা-চিন্তায় মুসলিমদের নিদারুণ দৈন্যদশা লক্ষণীয়, প্রথম কেবলা বায়তুল মাকদিস ইতিহাসের মুতলাক শার ইসরায়েলীদের দ্বারা লুন্ঠিত – তখন শবে মেরাজের প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহ, মাকসাদ ও এর তাৎপর্য নতুন করে চিন্তা করার দাবি নিশ্চয় অমূলক নয়। সেই গরজেই শবে মেরাজকে নিয়ে আমাদের ভাবনাকে আরেকটু শাণিত করার এই চেষ্টা-</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আশা ও নিরাপত্তার ভূমি রূপে বায়তুল মাকদিস </strong></p>
<p>ইসরা ও মেরাজের সময়টা একটু মানস্পটে অঙ্কিত করা যাক। নবুয়তপ্রাপ্তির পর থেকে বটবৃক্ষের মতো ছায়া প্রদানকারী রাসূল ﷺ এর চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর ক্ষণ গড়াতে না গড়াতেই জীবনসঙ্গিনী খাদিজার-ও (রা.) জীবনাবসান ঘটলো। ছায়াপ্রদানকারী চাচা কিংবা সুখ-দুঃখের নিত্যকার সঙ্গী আপনজন আর কেউ রইলো না। সেই সময়ে রাসূলের ﷺ দুর্বিসহ অবস্থার কথা কল্পনা করুন তো! সীরাতের পাতায় তাইতো এই সময়টাকে <strong>&#8220;আমুল হুযুন&#8221; তথা দুঃখের বছর</strong> বলে অভিহিত করা হয়েছে।</p>
<p>আর ঠিক সেই সময়েই আসমানী পয়গাম এলো ইসরার। শত দুঃখ ঝঞ্ঝাট অতিক্রান্ত করে মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পথিকের দিশা পাওয়া একফোঁটা বারির মতো আশার ঝিলিক হয়ে আসে ইসরার রজনী। বায়তুল মাকদিসে ভ্রমণ করালেন রব তার প্রিয় হাবিবকে ﷺ। আর এটি পরিণত হলো আশা ও নিরাপত্তার ভূমিতে।</p>
<p>যেমনটা হয়েছিল ঠিক মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহীম (আ.) এর জন্যও। নবুয়তী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বজাতির নিকট নির্মম জুলুমের স্বীকার হয়ে হিজরত করতে বাধ্য হন বায়তুল মাকদিসে। কুরআনে সেই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এভাবে-</p>
<blockquote><p>﴿قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ﴾﴿وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْنَاهُمُ الْأَخْسَرِينَ﴾﴿وَنَجَّيْنَاهُ وَلُوطًا إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا لِلْعَالَمِينَ﴾</p>
<p>অর্থাৎ, “আমি বললাম, ‘হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা তার সাথে চক্রান্ত করার ইচ্ছা করেছিল; কিন্ত আমি তাদেরকে করে দিলাম সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তাঁকে ও লূতকে উদ্ধার করে এমন এক ভূমিতে পৌঁছিয়ে দিলাম, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য বরকতময় করে রেখেছি।“ (সূরা আম্বিয়া: ৬৯-৭১)</p></blockquote>
<p>এভাবে ইবরাহীম (আ) এর জন্য আশা-ভরসার স্থলে পরিণত হয় বায়তুল মাকদিস। আর যা পুনরায় এসে প্রতিষ্ঠিত হয় রাসূলের ﷺ ইসরার মাধ্যমে। ইসরা রাসূল কে যেমন একটি আশা ও নিরাপত্তার সঞ্চার করে, তেমনি মুসলমানদের মনোজগতেও এর প্রভাব বিস্তার করে প্রবল।</p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<p><strong>মেরাজে রাসূল </strong></p>
<p>বায়তুল মাকদিস থেকে উর্ধ্বারোহণ করিয়ে রাসূলকে ﷺ নিয়ে যাওয়া হয় বায়তুল মা’মুরে। যেখানে সাক্ষাৎ হয় আদম (আ.), ঈসা (আ.), ইয়াহইয়া (আ.), ইউসুফ (আ.), ইদরীস (আ.), হারুন (আ.), মুসা (আ.) ও ইবরাহীম (আ.) এর সাথে।</p>
<p>নবীগণের সাথে এই মোলাকাত কী তাৎপর্য বহন করে? এর মাধ্যমে মূলত রাসূলে আকরাম ﷺ এর সাথে পুর্ববর্তী নবীদের সম্পর্ক আরও দৃঢ়তর হয়। আরেকটি দিক থেকে, জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহুর্তে এসে – যখন ব্যক্তিগত জীবন ভয়াবহ পর্যদুস্ত, দাওয়াতি কাজে ন্যুন্যতম আশার আলো নেই, একে একে সকল জাতি অস্বীকার করছে তাওহীদ-রেসালাত-আখেরাতের আহবানকে – তখন নবীদের সাথে এই সাক্ষাৎ নতুন করে আশার সঞ্চার করে মানুষ মুহাম্মদ ﷺ এর মনোজগতে। কেননা, এই সকল নবী-রাসূলগণও তাদের নবুয়তী জিন্দেগীতে এমন ক্রান্তিকাল অতিক্রাম করেছেন। স্বজাতির নিকট অপদস্ত এমনকি হত্যার স্বীকারও হয়েছিলেন অনেকেই। তারা একেকজন সংগ্রাম করেছিলেন একেক প্রকার জুলুমের বিরুদ্ধে। কেউ মানুষকে রক্ষার বদলে তার উপর প্রভুত্ব কায়েমের বিরোধিতা করে, কেউ অর্থনৈতিক জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, কেউ তার যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পার করেছেন সারাটি জীবন। আর রাসূলে আকরাম যেহেতু একইসাথে সকল প্রকার জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলেন, তাই পুর্বসুরীদের সাথে এই সাক্ষাৎ তার দাওয়াতি কাজে নতুন উদ্দীপনা জোগায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বরকতময় ভূমি রূপে বায়তুল মাকদিস </strong></p>
<p>আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী এটি কেবল ইবরাহীম (আ) কিংবা তার জাতির জন্যই নয়, বরং পুরো বিশ্ববাসীর জন্য বরকতময় ভূমি। পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ৭১ নং আয়াতে বায়তুল মাকদিসকে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের বরকতের ভূমি হিসেবে সম্বোধিত করা হলেও উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য বরকতময় ভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় সূরা ইসরার ১ম আয়াতে। রাব্বে কারীম ইরশাদ করেন,</p>
<blockquote><p>سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ&nbsp; اَسۡرٰی بِعَبۡدِہٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ&nbsp; اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَہٗ&nbsp; لِنُرِیَہٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّہٗ&nbsp; ہُوَ&nbsp; السَّمِیۡعُ&nbsp; الۡبَصِیۡرُ &#8211;</p>
<p>“পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি। (ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল) যেন আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি। তিনিই (আল্লাহ) সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শবে মেরাজ ও বায়তুল মাকদিসের আধ্যাত্মিক ও ঈমানী গুরুত্ব</strong></p>
<p>রাসূলে পাকের ﷺ &nbsp;ইসরা ও মেরাজের কারণে বায়তুল মাকদিসের সাথে মুসলিমদের এক রুহানী বন্ধনের উন্মেষ ঘটে। নবীর পদধুলীতে ধন্য যে ভূমি, আম্বিয়ায়ে কেরামগণের ইমাম হলেন নবী যেই স্থানে, সেই স্থানের প্রতি তো অবশ্যই এক অকৃত্রিম আধ্যাত্মিক আবেশ কাজ করবেই!</p>
<p>সাহাবীগণ সেই সময় থেকে বায়তুল মাকদিস যিয়ারতের ইরাদা পোষণ করতেন হৃদয়ের গভীরে। আলাপ-আলোচনার বিষয়বস্তুতেও বায়তুল মাকদিস দখল করে নেয় অনভিপ্রেত এক স্থান। আর <strong>কাফেররা যখন খায়েশের পূজোয় নিমজ্জিত হয়ে ইসরা ও মেরাজকে অস্বীকার করলো</strong><strong>, </strong><strong>তখন ঈমানিয়্যাতের দাবিতে বলীয়ান মুমিন সাহাবীগণ অকপটে বিশ্বাস করে নিলেন ইহা। এভাবেই বায়তুল মাকদিস রুহানিয়্যাত ও ঈমানিয়্যাতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিগণিত হয়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শবে মেরাজ ও বায়তুল মাকদিসের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব </strong></p>
<p>গোটা দুনিয়ার এত এত স্থান থাকতেও কেন আল্লাহ তা&#8217;য়ালা তাঁর রাসূলকে ﷺ বায়তুল মাকদিসেই ভ্রমণ করালেন?</p>
<p>এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অনেক রকম ব্যাখ্যা হাজির হবে। এসবের মাঝে যদি শুধুমাত্র বিশ্বমানচিত্রে বায়তুল মাকদিসের অবস্থানের দিকেও লক্ষ্য করা যায় তাহলে পরিলক্ষিত হবে যে, এই স্থানের ভ্রমণের কারণটা কী ছিল আর বায়তুল মাকদিসের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব কতটা বেশি।</p>
<p>এর ভৌগোলিক গুরুত্বের বিবেচনায় বলা হয়ে থাকে যে,</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>&#8211;</strong><strong>যারাই এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করবে</strong><strong>, </strong><strong>তারাই গোটা দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করবে।</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>&#8211;</strong><strong>এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার মানে হলো পুরো পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>&#8211;</strong><strong>বায়তুল মাকদিস হচ্ছে মুসলমানদের জাতিগত অবস্থার আয়নাস্বরুপ।</strong></p>
<p>বাস্তবেও তাই। ইতিহাসের ধুসর পাতাগুলোতে নজর বুলালে এটাই দেখা যাবে যে, যখনই বায়তুল মাকদিস মুসলিমদের ছাড়া অন্য কারও হস্তগত হয়েছে, তখনই রক্তাক্ত ইতিহাসের উপাখ্যান রচিত হয়েছে। কলঙ্কিত হয়েছে বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস। আর মুসলিমরাও বিশ্বদরবারে উচ্চশীরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলো ততদিন, যতদিন বায়তুল মাকদিস মুসলিমদের আমানতে ছিলো।</p>
<p>মূলত, বায়তুল মাকদিস মুসলিমদের জন্য এই রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ হয়ে উঠে মূলত শবে মেরাজের ইসরার মাধ্যমেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>উম্মাহ ধারণার প্রতিচ্ছবির পরিস্ফুটন</strong></p>
<p>ইসরা ও মেরাজ যখন সংঘটিত হয়, তখনও তো ইসলামের কোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাজিরাতুল আরব বা তার পার্শ্ববর্তী কিছু অঞ্চলের ঈমানগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গই তখন মুসলমানদের অঘোষিত সমাজের অংশ।</p>
<p>কিন্তু বায়তুল মাকদিসে সংঘটিত ইসরা মুসলিমদের মনে নতুন এক আশার দুয়ার খুলে দেয়। নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরেও যে এই অঘোষিত সমাজের বিস্তৃতি হতে পারে বা সম্পর্ক থাকতে পারে, তা হৃদয়ে গেঁথে যায় ইসরার মাধ্যমে। মুসলিমরা তখন থেকেই বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এক উম্মাহ হওয়ার স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করে হৃদ-মাজারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>নবজাগরণের ভূমি বায়তুল মাকদিস </strong></p>
<p>আর এক পর্যায়ে এই প্রোথিত স্বপ্নের বীজই অঙ্কুরিত হয়ে মহীরুহ ধারণ করে খুলে দেয় নবজাগরণের দুয়ার। তখন থেকেই বায়তুল মাকদিসকে গভীরভাবে হৃদয়ে লালন করতে শুরু করে মুসলিমরা। এমনকি ড. আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসীর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ওমর (রা.) এর মাকদিস বিজয়ের পূর্ব সময় পর্যন্ত সংঘটিত সকল সামরিক কিংবা কুটনৈতিক পদক্ষেপের মাকসাদ ছিলো বায়তুল মাকদিস অভিমূখী। <strong>তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে</strong><strong>, </strong><strong>রাসূল (স.) এর জীবদ্দশায়ও যেসকল গাজওয়া কিংবা সারিয়্যাহ সংঘটিত হয়</strong><strong>, </strong><strong>এক অর্থে বলা যায় যে প্রায় সবকটিই ছিলো বায়তুল মাকদিস মুক্তকরণের প্রাথমিক পদক্ষেপস্বরুপ।</strong> রাসূলের ﷺ নির্দেশে উসামা বিন যায়েদের নেতৃত্বে প্রেরিত সর্বশেষ অভিযানও তাই প্রমাণ করে।</p>
<p>একপর্যায়ে সেই স্বপ্ন, কার্যকলাপ ও সকল প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয় ওমর (রা.) এর বায়তুল মাকদিস বিজয়ের মাধ্যমে। তখন থেকে মুসলিমরা বিশ্বদরবারে এক অনন্য অবস্থানে পৌঁছাতে শুরু করে। বায়তুল মাকদিসকে বিশ্বমানবতার সকলের জন্য নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করে। বিশ্বশান্তির সূতিকাগারে পরিণত হয় বায়তুল মাকদিস।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাল আমলের তাবৎ মানবতার মুক্তি ও বায়তুল মাকদিস </strong></p>
<p>কিন্তু আজ সেই বরকতময় ভূমি, আশা ও নিরাপত্তার স্থান দখলদারদের হাতে লুন্ঠিত। তাই তো মানবতাও আজ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে মুক্তির ক্ষণ গুণতে গুণতে। কিন্তু কোথায় সেই মুক্তি! কোথায় সেই আশার প্রদীপ!</p>
<p>রাসূলের ﷺ দুর্বিসহ দিনগুলোতে ইসরার মাধ্যমে আলোকবর্তিকারুপে যেমন আবির্ভূত হয়েছিল বায়তুল মাকদিস, আজও কি তা সেই অবস্থানে পুনরাবর্তিত হতে পারবে না! আবারও কি বিশ্বমানবতার মুক্তির মারকাজ হয়ে উঠবে না এই পবিত্র ভূমি! বরকতের সেই পেয়ালা থেকে অমীয় সুধা পান করে তৃষিত মানবতা কি পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠবে না!</p>
<p><strong>আমাদের ইয়াক্বীন</strong><strong>, </strong><strong>অবশ্যই তা হবে। আবার চিরসজীব হয়ে উঠবে এই ভূমির জয়তুন গাছ। মসজিদে কেবলার ইট-সুরকীগুলো নিঃশ্বাস ফেলবে মুক্ত বাতাসে। গম্বুজে হাদরা আবার মুক্তির পায়রার একটুখানি বিশ্রামের জন্য উন্মুক্ত করে দিবে নিজেকে। </strong></p>
<p><strong>সেই মুক্তির স্বাদ আস্বাদনের শপথ নেয়ার রজনী হোক তবে এই শবে মেরাজ!</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্য ও চিন্তাঋ</strong><strong>ণঃ</strong></p>
<p>১। মসজিদে আকসাকে মুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা, প্রফেসর ড. আব্দুল ফাত্তাহ আল ওয়াইসী।</p>
<p>২। <a href="https://rowyakbd.com/baitul-maqdis-from-the-perspective-of-diin-and-civilization/">দ্বীন ও সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে বায়তুল মাকদিস, প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ।</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/may-shab-e-meraj-be-the-night-of-taking-the-oath-of-liberating-baitul-maqdis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16461</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ফিকহুল মীযান (প্রথম পর্ব)</title>
		<link>https://rowyakbd.com/fiqhul-mizan-part-1/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/fiqhul-mizan-part-1/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. আলী আল কারাদাগী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Sep 2025 17:01:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মাকাসিদ আশ শারীয়াহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16144</guid>

					<description><![CDATA[ফিকহুল মীযান —সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আকীদা ইত্যাদি সমস্ত বিষয় পরিগ্রহ করে আছে। মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য হিসেবে এই সমস্ত বিষয়গুলো আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উম্মাহর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে উম্মাহ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কেননা, যে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ফিকহুল মীযান —সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আকীদা ইত্যাদি সমস্ত বিষয় পরিগ্রহ করে আছে। মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য হিসেবে এই সমস্ত বিষয়গুলো আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উম্মাহর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে উম্মাহ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কেননা, যে ব্যক্তি মুসলমানদের নিয়ে চিন্তা করে না, সে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। ফিকহুল মীযান নিয়ে কলম ধরতে এ বিষয়টিই আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ রব্বুল আলামীন পারস্পরিক বিরোধ দূর করে একে অপরের বন্ধন মজবুত করতে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল করেছেন। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিলের অন্যতম মূল মাকসাদ এটি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ সদস্য এই মাকসাদ থেকে যোজন-যোজন দূরে অবস্থান করছে।</p>
<p>খারেজী, মুতাযিলা, মুরজিয়া, জাবরিয়া, কাদরিয়া, বাতিনিয়্যাহ-সহ হাল আমলের আল-কায়েদা, আইএস, বোকো হারাম এবং এদের থেকে জন্ম নেওয়া নামসর্বস্ব তথাকথিত ইসলামী সংগঠন এবং অন্যান্য ইসলামী সংগঠন যেমন—সালাফী, ইখওয়ান, তাবলীগ—এরা প্রত্যেকেই মানদণ্ড হিসেবে কোরআনকে গ্রহণ করে এবং নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করতে কোরআন থেকে দলীল দেয়। এমনকি আমরা দেখেছি, উগ্র জঙ্গিবাদী সংগঠন আইএসও নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে কোরআন থেকে প্রচুর পরিমাণে উদ্ধৃতি দেয়।</p>
<p>আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে কোনো ধরনের অসঙ্গতি নেই, নেই কোনো ফাঁকফোকরের বালাই। কেননা, এ গ্রন্থ পরাক্রমশালী, হাকীম এবং প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। এ কিতাব মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত এবং সমগ্র মানবতার হেদায়েতের উৎস। এটা যেমন আমার বিশ্বাস, তেমনি প্রত্যেক মুসলমানেরও বিশ্বাস।</p>
<p>কিন্তু তা সত্ত্বেও নসের (Text) অপব্যাখ্যার ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। নস কেন অপব্যাখ্যার স্বীকার হচ্ছে এর কারণটা আমি ঠিকঠাক ধরতে পারছিলাম না। আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে এর কারণ খোঁজা শুরু করি। ফলাফল হিসেবে যা পাই, তা-ই আমাদের এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। আমরা বুঝতে পারি, মীযানে অসঙ্গতির ফলে নস অপব্যাখ্যার স্বীকার হচ্ছে।</p>
<p>সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন—</p>
<p>لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِالۡبَیِّنٰتِ وَاَنۡزَلۡنَا مَعَهُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ</p>
<p>অর্থ : “আমি আমার রসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছি। তাদের সাথে কিতাব ও মীযান নাজিল করেছি যাতে মানুষ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।”</p>
<p>প্রত্যক্ষভাবে কিতাব এবং মীযান উভয়ই বোধ, চিন্তা, আকীদা, ইবাদত, আচার-অনুষ্ঠান, আখলাক, পারস্পরিক আচার-আচরণ এবং লেনদেন ইত্যাদিতে ইনসাফ, আদালত এবং মধ্যমপন্থা নিশ্চিত করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়া’লা কিতাবের সাথে মীযানও নাজিল করেছেন। কারণ মধ্যমপন্থা, আদালত, ফাহ্ম, তাসাউফ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে এবং ইখতিলাফ দূর করতে কিতাবের সাথে মীযানও প্রয়োজন।</p>
<p>আমি প্রায় একশত পঞ্চাশটি তাফসীর গ্রন্থ সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ এই ‘মীযান’ শব্দের ব্যাখ্যা তালাশ করা শুরু করি। অধিকাংশ মুফাসসির মীযানের তাফসীর করেছেন বস্তুগত মীযান অর্থে। মীযান শব্দকে তারা শস্য অথবা সীমা-পরিসীমা ‘নির্ধারক’ হিসেবে তাফসীর করেছেন। তারা আকলের মীযানকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। মীযান বা স্কেল দিয়ে বস্তুর পরিমাপ করা—এটা মানুষের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। তবে মীযান সীরাতে মুস্তাকীমের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের হেদায়াতের সাথে সম্পৃক্ত মীযানই প্রকৃত মীযান। ব্যক্তি যেন সীরাতে মুস্তাকীমের পথে সহজে চলতে পারে, যেন ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থিতিশীল হতে পারে, মীযান তা নিশ্চিত করে।</p>
<p>ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.)-সহ আরও কয়েকজন আলেম মীযানের অর্থ করেছেন আদল। এটিও মীযানের সামগ্রিক অর্থ বহন করে না। কারণ এটি পূর্বের অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করে। وَاَنۡزَلۡنَا مَعَهُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ আমরা তাদের কাছে কিতাব ও মীযান নাজিল করেছি।  لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ -যাতে মানুষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। এখানে قسط মানে ন্যায়বিচার। জুলুম অপসারণ করে ন্যায়বিচার—আদালত নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে সামনে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>ইমাম মাতুরিদীসহ অনেক আলেম মীযানের এর অর্থ করেছেন আকল। এ অর্থটিও মীযান পরিভাষাকে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করে না। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন যখন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তখন তাকে আকলসমেত-ই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আকল একটি বিদ্যমান বিষয়। সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ এর অধিকারী হয়ে থাকে—নাজিল করার প্রয়োজন পড়ে না।</p>
<p>এই পৃথিবীর সবকিছুরই নিজস্ব মীযান রয়েছে। বিদ্যুত পরিমাপের যেমন মীযান বা পরিমাপক রয়েছে, তেমনি পানিরও মীযান বা পরিমাপক রয়েছে। আমি বা আপনি বিদ্যুৎ পরিমাপক অ্যামিটার দিয়ে পানি মাপতে পারবো না, আবার পানি মাপার পরিমাপক—হাইড্রোমিটার দিয়ে বিদ্যুৎ পরিমাপ করতে পারবো না। লোহা পরিমাপ করার যেমন স্কেল রয়েছে, তেমনি স্বর্ণ পরিমাপেরও নিক্তি রয়েছে। লোহা পরিমাপ করার স্কেল অথবা শস্য পরিমাপ করার মিটার দিয়ে কখনোই স্বর্ণ পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এই মহাবিশ্বের সবকিছুরই যেমন ওজন রয়েছে, তেমনি তা পরিমাপেরও ভিন্ন ভিন্ন পরিমাপক রয়েছে। যার ওজন রয়েছে, অবশ্যই তার পরিমাপের যন্ত্রও রয়েছে। সূরা রহমানে একথাটিই বলা হয়েছে—</p>
<blockquote><p>اَلرَّحۡمٰنُ. عَلَّمَ الۡقُرۡاٰنَ. خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ. عَلَّمَه الۡبَیَانَ. اَلشَّمۡسُ وَالۡقَمَرُ بِحُسۡبَانٍ. وَّالنَّجۡمُ وَالشَّجَرُ یَسۡجُدٰنِ. وَالسَّمَآءَ رَفَعَها وَوَضَعَ الۡمِیۡزَانَ. اَلَّا تَطۡغَوۡا فِی الۡمِیۡزَانِ. وَاَقِیۡمُوا الۡوَزۡنَ بِالۡقِسۡطِ وَلَا تُخۡسِرُوا الۡمِیۡزَانَ</p>
<p>অর্থ : “পরম দয়ালু আল্লাহ এ কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা শিখিয়েছেন। সূর্য এবং চন্দ্র একটি হিসাবের অনুসরণ করছে। এবং তারকারাজি ও গাছপালা সব সিজদাবনত। আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মীযান কায়েম করেছেন। এর দাবি হলো তোমরা মীযানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না। ইনসাফের সাথে সঠিকভাবে ওজন করো এবং ওজনে কম দিও না।” <span style="font-size: 16px;">(সূরা রহমান : ১-৯)</span></p></blockquote>
<p>ইসলামী শরীয়ত মীযানের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মীযান শব্দটি ইসমে জিনস। الميزان এর ال টি কেউ বলেছেন জিনসী, কেউ বলেছেন ইসতিগরাকী। কোরআনে নয় বার মীযান শব্দটি এসেছে।</p>
<p><strong>এ মহাবিশ্বে যা কিছু রয়েছে, তার প্রত্যেকের মীযান রয়েছে। ইসলামী শরীয়তেরও মীযান রয়েছে। যখন পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন নির্দিষ্ট মীযান দিয়েই করা হয়েছে। দুনিয়া সম্পর্কিত আয়াতের যেমন মীযান রয়েছে, তেমনি আখেরাত সংক্রান্ত আয়াতেরও মীযান রয়েছে। তবে দুনিয়া এবং আখেরাতের মীযানে বেশকম আছে।</strong></p>
<p>দুনিয়ার প্রজ্জ্বলিত আগুনে কোনো ব্যক্তিকে ফেলে দিলে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই সে জ্বলে-পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। কিন্তু আখেরাতের চিরস্থায়ী আগুন এই নিয়মের ব্যতিক্রম। পরকালে যে মানুষগুলো চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে—</p>
<p>“যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তৎক্ষণাৎ তার স্থলে নতুন চামড়া বদলে দেওয়া হবে, যাতে তারা শাস্তি উপভোগ করতে পারে।” (সূরা নিসা : ৫৬)</p>
<p>দুনিয়াতে খাওয়া-দাওয়ার পরে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের দরকার হয়। কিন্তু আখেরাতে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের ঝামেলা থাকবে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মীযানের ধরনেও আল্লাহ সুনিপুণ একটা পার্থক্য তৈরি করে রেখেছেন।</p>
<p>একটি বিষয় বলে রাখা ভালো। মুতাযিলারা মীযানুশ শাহেদ  এবং মীযানুল গায়েব  এর মধ্যেকার পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে আমরা আমাদের রব আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে দেখতে পাবো। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত এই বিশ্বাস রাখে, হাদীসেও এমনটা বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু মু’তাজিলাদের মতে, আমরা দেখতে পাবো না। কারণ হিসেবে তারা বলে, কোনো কিছু দেখতে চাইলে তাতে আলোর প্রতিবিম্ব পড়তে হবে। আর আলোর প্রতিবিম্ব সেটাতেই পড়ে, যেটা জিসম বা জাওহার।</p>
<p>মুতাযিলারাদের এই যুক্তির জবাবে আমরা বলি, দুনিয়ার চোখ আর পরকালের চোখের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা রয়েছে। এই পৃথিবীর চোখের নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ থাকে। হতে পারে সেটা পঞ্চাশ বা শত বছর। কিন্তু পরকালীন চোখের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ নেই। কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই সে চোখ অমর।</p>
<p>তাহলে দেখা যাচ্ছে অবস্থার পরিবর্তনে মীযানেরও পরিবর্তন হয়। সুতরাং মীযানের সঠিক প্রয়োগ না হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। উদাহরণ হিসাবে আমরা বলতে পারি, কোনো ব্যক্তি লোহা পরিমাপ করার যন্ত্র দিয়ে সোনা পরিমাপ করার চেষ্টা করলে সঠিক পরিমাপ করতে তিনি ব্যর্থ হবেন। কারণ, ঐ যন্ত্র দিয়ে লোহা বিশ/পঞ্চাশ গ্রাম ওজন করা গেলেও এক গ্রামের কম ওজন করা যাবে না। কিন্তু সোনা এক গ্রামের চেয়েও কম পরিমাপ করার প্রয়োজন পড়ে। বিদ্যুৎ, পানি, রাসায়নিক পদার্থ প্রভৃতির বেলায়ও একথা প্রযোজ্য।</p>
<p>আইএস, আল-কায়েদা বা এদের মতো নামসর্বস্ব কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো কিতালের আয়াতগুলোকে মীযানের আলোকে না বুঝার ফলে সারা পৃথিবীব্যাপী বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করছে। ইসলামের তারা ভিন্ন মতাদর্শের উপর কঠোরতা, একগুঁয়েমি এবং শরীয়ত অসমর্থিত জিহাদী কর্মক্রম চালাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি বড় এক ট্র্যাজেডি।</p>
<p>কালামে হাকীমে আমরা দশেরও অধিক আয়াত পাই, যেখানে অনমনীয়তা (غِلْظَة), শক্তি [(شِدَّةٌ) (তোমরা কাফেরদের উপর শক্তি প্রদর্শন করবে-اَشِدَّآءُ عَلَی الۡکُفَّارِ)]  সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কিতাল সম্পর্কেও অনেক আয়াত রয়েছে। বিশেষত সূরা তওবা এবং সূরা আনফালে।</p>
<p>আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো, এই সব আয়াত শত্রুদের সাথে যুদ্ধের মীযান বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। যুদ্ধে শত্রুপক্ষের লক্ষ্য থাকে ভূমি দখল করা। এ লক্ষ্যে সে আপনাকে আক্রমণ করবে। এক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই অনমনীয় এবং শক্তিশালী হতে হবে। প্রয়োজনে কৌশলগত অবস্থানও নিতে হবে। তবে কৌশলের ছলে কখনোই প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। কারণ, প্রতারণা সর্বদাই নিষিদ্ধ।</p>
<p><strong>কোরআনের আয়াতগুলো কেবল একটি মীযানের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং একাধিক মীযানের উপর ভিত্তি করে বুঝতে হবে।</strong></p>
<p>যুদ্ধ-জিহাদ-কঠোরতা সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো সমরনীতি সংক্রান্ত মীযানের আলোকে বুঝতে হবে। নম্রতা-শিথিলতা, অধিকার, ইহসান, এবং অমুসলিমদের সাথে আদালত প্রভৃতি আয়াতগুলো তৎসংশ্লিষ্ট মীযানের আলোকে বুঝতে হবে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এ সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে। যেমন—</p>
<p>فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا</p>
<p>“আপনারা তার সাথে কোমল স্বরে কথা বলবেন।”(সূরা ত্বহা &#8211; ৪৪)</p>
<blockquote><p> لَا یَنۡهىکُمُ اللّٰه عَنِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یُقَاتِلُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَلَمۡ یُخۡرِجُوۡکُمۡ مِّنۡ دِیَارِکُمۡ اَنۡ تَبَرُّوۡهمۡ وَتُقۡسِطُوۡۤا اِلَیۡهمۡ اِنَّ اللّٰه یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ. اِنَّمَا یَنۡهىکُمُ اللّٰه عَنِ الَّذِیۡنَ قٰتَلُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَاَخۡرَجُوۡکُمۡ مِّنۡ دِیَارِکُمۡ وَظٰهرُوۡا عَلٰۤی اِخۡرَاجِکُمۡ اَنۡ تَوَلَّوۡهمۡ</p>
<p>অর্থ : “দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করছেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং বের করে দেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারাই তো জালেম।” (সূরা মুমতাহিনাহ : ৮-৯)</p></blockquote>
<p>উপরের আয়াত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াতে শান্তি ও সহাবস্থান এবং ইসলামী ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকলের অধিকারের মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয় দুই দিক থেকে। একদল কঠোরতা সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর উপর ভিত্তি করে ইসলামকে চরমপন্থী একটি দ্বীন হিসেবে উপস্থাপন করে। আরেক দল কল্যাণ, দয়া এবং ইহসান সংশ্লিষ্ট আয়াতের উপর ভিত্তি করে ইসলামকে শক্তিহীন একটি দ্বীনে পরিণত করে। রহমত এবং শক্তি প্রদর্শন, কঠোরতা এবং শিথিলতার মধ্যে ইসলাম সামঞ্জস্য বিধান করে। যেখানে কঠোরতা প্রয়োজন সেখানে কঠোরতা, যেখানে দয়া ও রহমত প্রয়োজন সেখানে দয়া ও রহমত প্রদর্শন করা। যে যতটুকুর হকদার তাকে ততটুকু প্রদান করাই মীযানের দাবি। অন্যান্য দ্বীনের সাথে ইসলামের পার্থক্যটা এখানেই।</p>
<p>মীযানে তখনই ক্রটি দেখা দেয়, যখন একটি আয়াতকে তৎসংশ্লিষ্ট মীযানে ব্যাখ্যা না করে গড়ে সবগুলো আয়াত একটি মীযানে ব্যাখ্যা করা হয়। বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার শুরুটা এখান থেকেই হয়। এবং এখান থেকেই অতিমাত্রায় সহিংস ও চরমপন্থী গোষ্ঠী বা দলের উদ্ভব হয়; যারা ইসলামের সমস্ত গৌরব এবং শক্তিকে ম্লান করে দেয়।</p>
<p>ফিকহুল মীযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজনের আলোকে শরীয়তের কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি আলেম ও শাসকদের অনুধাবন করানো এবং জনগণকে সে আলোকে পরিচালনা করা। এই সূত্র ধরেই আমরা ফিকহুল মীযান নিয়ে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p><strong>কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, পূর্বে কেন ফিকহুল মীযান নিয়ে আলোচনা ছিলো না। আসলে রাসূল (স.)-এর যুগ থেকেই দৃশ্যত এর প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন ছিলো। রাসূল (স.) যথাযথ এবং ন্যায়সঙ্গত মীযানের আলোকেই সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তিনি তার সুবাসিত জীবনের স্বাভাবিক কিংবা যুদ্ধাবস্থায়, মুসলিম কিংবা অমুসলিমদের সাথে পারস্পরিক আচার-আচরণে যে মীযান প্রয়োগ করেছেন, তা আমরা সামনে আলোচনা করবো।</strong></p>
<p>ফিকহুল মীযান উসূলের একটি ক্ষেত্র তথা শাখা। আমাদের কাছে থাকা উসূলে ফিকহের পরিপূরক হলো ফিকহুল মীযান। উসূলে ফিকহ শরীয়তের হুকুম-আহকামকে ব্যাখ্যা করে। আর ফিকহুল মীযান সাধারণভাবে কোরআন—বিশেষত সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করে। ফিকহুল মীযান দলীলের উপর নির্ভর করে না, বরং মীযান বা মানদণ্ডের উপর নির্ভর করে। দলীল এবং মীযানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দলীল বলতে আমরা বুঝি— কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস, ইসতিহসান , মাসালিহুল মুরসালা  ইত্যাদি।</p>
<p>অপরদিকে মীযান হলো কীভাবে কোরআন থেকে ইজতিহাদ করবো—কোরআনকে কীভাবে বুঝবো? সুন্নত এবং কিয়াসকে কীভাবে বুঝবো? ইজমা কখন হবে? বিভিন্ন প্রকার দলীলের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে—যা নিয়ে মুসলিম উম্মাহ মতানৈক্যে লিপ্ত হয়। ইত্যাকার বিষয়গুলো ফিকহুল মীযানের ভিত্তি এবং উদ্দেশ্য।</p>
<p>ফিকহুল মীযান এমন একটি বাস্তব জ্ঞান, যার মাধ্যমে উসূলে বৈপরীত্য থাকলে তা আমরা দূর করতে পারি। ফুরু&#8217;য়ী বা শাখাগত বিষয়ে মতভেদ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। স্থান-কাল-পাত্রভেদে ফুরু’য়ী বিষয়ে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হতে পারে। তবে উসূল তথা মূলনীতিতে মতপার্থক্যের কোনো সুযোগ নেই।</p>
<p>ফিকহুল মীযান হলো শরীয়তের মানদণ্ড, শরীয়তের স্থিতিস্থাপক। ফকীহ, গবেষক কিংবা মুজতাহিদ ফিকহুল মীযানের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন যে, কৃত ইজতিহাদটি সঠিক অথবা ভুল।</p>
<p>ধরুন একজন বলল, এখানে দশ কেজি শস্যদানা আছে। অন্যজন বলল, না, এখানে পাঁচ কেজি আছে। এই মতানৈক্যে সমাধান দিবে মীযান। ওজন করার পর দশ/পাঁচ যাই পাওয়া যাবে, তাতে উভয় পক্ষের দ্বিমত নিরসন হয়ে এক মতে আসবে। পার্থিব বিষয়ে মীযান এতো গুরুত্বপূর্ণ হলে ঈমান, হেদায়াত, খেলাফত প্রভৃতি বিষয়গুলোতে এর গুরুত্ব কেমন হবে?</p>
<p>আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে কিতাবের সাথে মীযান নাজিল করার বুনিয়াদটা এখানেই। আমাদের বুঝার মানদণ্ড—মীযান। অর্থাৎ এর মাধ্যমে আমরা নসের (Text) সঠিক মর্মার্থে পৌঁছাতে পারি। মুসলিম উম্মাহ আকীদার প্রশ্নে যেখানে মতবিরোধ করছে—ক্ষেত্রবিশেষ একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের করণীয় কী? করণীয় সম্পর্কে কোরআন বলছে—</p>
<blockquote><p>وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ ۖ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَىٰ أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ</p>
<p>অর্থ : “এদের কাছে যখনই কোনো সন্তোষজনক বা ভয়ের খবর পৌঁছে, তখনই তারা তা প্রচার করে বেড়ায়। যদি তারা তা রাসূল এবং তাদের দায়িত্বশীল লোকের নিকট পৌঁছাতো তাহলে তা এমন লোকেরা জানতে পারতো, যারা (এ জাতীয় খবর থেকে) সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।“ (সূরা নিসা: ৮৩)</p></blockquote>
<p>এই দুই অবস্থা (খবরে আমান, খবরে খওফ) বিশ্লেষণ করে আলেমগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো জাতিই এই দুই অবস্থার কোনো একটি থেকে মুক্ত নয়। খবরে আমান  হোক অথবা খবরে খওফ —উভয় অবস্থার জন্যই মারযা (সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবে এমন ব্যক্তি) প্রয়োজন।</p>
<p>মারযা ব্যতীত আল্লাহ আমাদেরকে কীভাবে রাখতে পারেন? যারা ইসতিনবাত  করতে সক্ষম তারাই হচ্ছেন মারযা। কৃত ইসতিনবাতটি যে সঠিক, মীযান ছাড়া এটি কীভাবে প্রমাণিত হবে?</p>
<p>قَٰتِلُوهُمْ—তাদেরকে হত্যা করো—কোরআনের এই আয়াতটি হত্যার মতো কঠিন একটি বিষয়কে নির্দেশ করে। এই নির্দেশটি সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে—এটা মীযানের দাবি হতে পারে না। আমরা এখন যুদ্ধের ময়দানে নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় একই দেশে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান—অন্যান্য ধর্মাবলম্বীগণ একত্রে বসবাস করছি। সুতরাং আয়াতটি মীযানের আলোকে বুঝতে হবে। অন্যথায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।</p>
<p>ফিকহুল মীযানের বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আরেকটি বিষয়ের দিকে আপনাদের নজর আকর্ষণ করতে চাই। আলোচনার শুরুটা করেছিলাম সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াত দিয়ে। কোরআনের ১১৪ টি সূরার মধ্যে সূরা হাদীদের অবস্থান ৫৭ তম। অর্থাৎ সূরা হাদীদ কোরআনের একেবারে মধ্যবর্তী একটি সূরা। মধ্যবর্তী এই সূরার ২৫ নং আয়াতটি লোহা সম্পর্কে। এ নিয়ে বিজ্ঞানীগণ বিস্তারিত গবেষণা করেছেন।</p>
<p>সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াত থেকে ছয়টি মূলনীতি পাওয়া যায়। সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায় এমন প্রত্যেক জাতির জন্য মূলনীতিগুলো অপরিহার্য। হোক তারা মুসলিম কিংবা অমুসলিম।</p>
<p><strong>প্রথম মূলনীতি:</strong> মুতাকায়েদ (Convince) করানোর ক্ষমতা। মুতাকায়েদ করতে হলে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি হতে হবে। শতধা বিভক্ত কিংবা নানাভাবে বিচ্ছিন্ন জাতি কখনোই মুতাকায়েদ (Convince) করতে পারে না। আর মুতাকায়েদ ছাড়া সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।</p>
<p>একটি জাতির পুনর্জাগরণের শুরুটা হবে তার জনগণকে নিজস্ব চিন্তার আলোকে মুতাকায়েদ করা। হোক সেটা ইসলাম, পুঁজিবাদ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার বয়ানে। এটা সর্বজনীন নিয়ম।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় মূলনীতি:</strong> সংবিধান। জাতির অধিকার সংরক্ষণ করবে এমন একটি সংবিধান থাকতে হবে। অধিকার সংরক্ষণকারী এ সংবিধান না থাকলে জনজীবনে ন্যায় এবং আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে না। কালামে হাকীমের ঘোষণা—</p>
<p>لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ</p>
<p>অর্থ : “আমি আমার রাসূলদের সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দিয়ে পাঠিয়েছি এবং তার সাথে দিয়েছি কিতাব।” কিতাব বা কোরআনের সাথে সুন্নতও রয়েছে। কোরআন এবং সুন্নত জাতির সংবিধানের প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>সংবিধান রচনা করতে হবে এমনভাবে যেন ভিন্নমতাবলম্বীদের অধিকারও সমভাবে নিশ্চিত হয়। যেমনটা নবী (স.) মদীনা সনদে নিশ্চিত করেছেন। মুসলিম, ইহুদি এবং পৌত্তলিক—সকলের অধিকার এ সংবিধান নিশ্চিত করে। পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাবিদ এমনকি জঁ-জ্যাঁক রুশোও মদীনার সনদ বা সংবিধানকে তৎকালীন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান বলে অবহিত করেছেন।</p>
<p><strong>তৃতীয় মূলনীতি:</strong> আদালতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। রাষ্ট্রে প্রকৃত অর্থেই আদালত কায়েম থাকতে হবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়াসহ বিজ্ঞ ইমামগণের বক্তব্য হচ্ছে অমুসলিম রাষ্ট্রেও যদি আদালত প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে সে রাষ্ট্র স্থায়ী হবে। অন্যদিকে মুসলিম রাষ্ট্রে যদি জুলুম বহাল থাকলে তার পতন অনিবার্য। পাক কালামের এই আয়াতটি সে কথাই বলছে—</p>
<p>فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِينَ ظَلَمُوا ۚ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ</p>
<p>অর্থ : “ফলে জালিম সম্প্রদায়কে সমূলে উৎখাত করা হলো। আর সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রব আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য।” (সূরা আনআম : ৪৫)</p>
<p>অন্য একটি আয়াত আরেকটু জোরের সাথে বলছে—</p>
<p>هَلْ يُهْلَكُ إِلَّا الْقَوْمُ الظَّالِمُونَ</p>
<p>অর্থ : “জালেম সম্প্রদায় ছাড়া আর কাউকে ধ্বংস করা হবে কি?” (সূরা আনআম : ৪৭)</p>
<p><strong>চতুর্থ মূলনীতি:</strong> সামরিক এবং শিল্পায়নে শক্তিশালী হওয়া।</p>
<p>وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ</p>
<p>আয়াতে <strong>بَأْسٌ شَدِيدٌ দ্বারা সামরিক এবং শিল্পায়ন শক্তি</strong>কে বুঝানো হচ্ছে।</p>
<p><strong>পঞ্চম মূলনীতি :</strong> সফট পাওয়ার, বৈজ্ঞানিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন। এই শক্তিগুলো আসে লৌহদ্রব্য থেকে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে মানুষের উপকারী (مَنَافِعُ لِلنَّاسِ) সবকিছু আসে লৌহ থেকে। সামরিক শক্তি, বৈজ্ঞানিক শক্তি বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা—উৎসগত দিক থেকে এগুলো এক।</p>
<p><strong>ষষ্ঠ মূলনীতি:</strong> রাষ্ট্রশক্তি। উপরের শক্তিগুলোর যথাযথ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রশক্তি।</p>
<p>মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কথা—</p>
<p>وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ</p>
<p>অর্থ : “আল্লাহ রব্বুল আলামীন দেখতে চান, কে গায়েবের প্রতি বিশ্বাস রেখে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ রব্বুল আলামীন শক্তিমান এবং পরাক্রমশালী।” (সূরা হাদীদ : ২৫)</p>
<p>আয়াতের এ অংশটি এও ইঙ্গিত করে যে, মুমিনগণ সামরিক শক্তি এবং নৈতিক শক্তির উপর নির্ভর করার পাশাপাশি, সর্বশক্তিমান আল্লাহ কতৃক প্রেরিত আসমানী সাহায্যের উপরও ভরসা রাখে।</p>
<p><strong>এই ছয়টি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে একটি জাতি গঠিত হয়, ক্ষমতার ভিত তৈরি হয়, সর্বোপরি সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়।</strong></p>
<p>আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই আয়াতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই আয়াতের মধ্যে মীযানের সূক্ষ্ম এবং বিস্তর বর্ণনা রয়েছে। আলেমগণ বিশেষ করে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী কিতাব, মীযান এবং হাদীদ (ধাতব পদার্থ)-কে একত্রে উল্লেখের কারণ হিসেবে উপরোক্ত বিষয়গুলোর দিকেই ইশারা করেছেন।</p>
<p>তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রকমফের আছে। কতক আছেন যারা আল্লাহওয়ালা। তারা একমাত্র আল্লাহর মুখাপেক্ষী। তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রয়োজন বোধ করেন না। তাদের নিকট আল্লাহ এবং তার রাসূলই শেষ কথা। বলা যায় তারা কিতাবের সাথে (কোরআন এবং সুন্নাহ) সম্পর্কযুক্ত।</p>
<p>কতক মানুষ আছেন, যারা ভালো এবং নিষ্ঠাবান মুসলিম। এতদসত্ত্বেও কখনো কখনো তাদেরকে ঝগড়া বিবাদের মুখোমুখি হতে হয় কিংবা পার্থিব জীবন যাত্রায় এমন বিষয়াবলির সম্মুখীন হতে হয় যার ফলে তাদেরকে মীযানের শরণাপন্ন হতে হয়। এ কারণেই কিতাব এবং মীযান একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>উপরের দুই অবস্থার বাইরে এমনও লোক আছে যারা কিতাব, মীযান অথবা আইন-আদালতের তোয়াক্কা করে না। ফলে তাদের উপর শক্তি প্রদর্শন করতে হয়। তাই হাদীদ—লোহার উল্লেখ।</p>
<p>এই আয়াতটিকে ক্ষমতা সংক্রান্ত আয়াতও বলা হয়। কেননা, ক্ষমতা সংক্রান্ত সকল উপদান এই আয়াতে বিদ্যমান। আলোচ্য ছয়টি মূলনীতি বাদ দিয়ে এই আয়াত নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা-পর্যালোচনা করলেও এর সঠিক মর্মার্থে আমরা পৌঁছাতে পারবো না।</p>
<p>দোজাহানের বাদশা নবী (স.) পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কথা আমাদেরকে জানিয়েছেন। নাজিলকৃত কিতাব বুঝার ক্ষেত্রে মীযানের অভাবে তারাও ভারসাম্যহীন অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে।</p>
<p>ইমাম আহমদ (র.) একটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন, <strong>একদিন নবী (স.) দেখলেন সাহাবায়ে কেরামের একদল বলছে, আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? অন্য দল বলছে, আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? নবী (স.) দেখলেন তারা কদর বা ভাগ্য সম্পর্কে বাদানুবাদ করছে।</strong></p>
<p><strong>একপক্ষ কতগুলো আয়াত দিয়ে স্বপক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, অপর পক্ষ ভিন্ন আয়াত দিয়ে তা রদ করে পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে। এই অবস্থা দেখে নবী (স.) রাগ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এমনটা কখনো করতে বলেছি? এগুলো করে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মত ধ্বংস হয়েছে।</strong></p>
<p>তোমাদের পূর্বে যেসব জাতি ছিলো, তাদের ধ্বংস হওয়ার কারণ হলো তারা মীযান প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এরপর তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সুন্নত থেকে কিছু বুনিয়াদি নীতিমালা পেশ করলেন। একজন অপরজনকে সত্যায়ন করার জন্য মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিল করেছেন। অপরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য আল্লাহ কোরআন নাজিল করেননি। বর্তমানে আমরা যেমনটা দেখতে পাচ্ছি, আয়াত উদ্ধৃতির মাধ্যমে একপক্ষ অপর পক্ষকে বাতিল ঘোষণা করছে! এটা কখনোই কাম্য নয়।</p>
<p>এরপর তিনি বলেন, আমি যখন তোমাদেরকে কোনো বিষয়ে আদেশ করি, সেটা সাধ্যমতো করার পালন করার চেষ্টা করো। আর যখন কোনো বিষয় থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি, সেটা থেকে বিরত থাকো। ভারসাম্যহীতার দৃষ্টান্ত পেশ করতে এই হাদীসটি খুবই যুক্তিযুক্ত।</p>
<p>এই হাদীসটির মাধ্যমে দুটি দলকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। একটি জাবরিয়া। অপরটি কাদরিয়া।</p>
<p>জাবরিয়াগণ বলেন, মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত। ভাগ্যে মানুষের কোনো হাত নেই। বাতাসের মাধ্যমে গাছের পাতা যেমন দোলে, তেমনি মানুষও আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী চলাফেরা করে। এখানে তার ইচ্ছার কোনো স্বাধীনতা নাই।</p>
<p>জাবরিয়াগণ আয়াতের জাহেরী অর্থের মাধ্যমে দলীল দেয়। তাদের দলীলগুলোর মধ্যে একটি হলো কোরআনের এই আয়াত—</p>
<p>وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ</p>
<p>অর্থ : “তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।” (সূরা তাকবীর : ২৯)</p>
<p>অন্য একটি আয়াত বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে—</p>
<p>وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ</p>
<p>অর্থ : “আর আপনি যখন নিক্ষেপ করেছিলেন তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি বরং আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করেছিলেন।” (সূরা আনফাল : ১৭)</p>
<p>এসকল আয়াতের মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে এটা বুঝা যায় যে, সবকিছু আল্লাহর প্রত্যক্ষ ইশারাতেই হয়। এমনকি রাসূল নিজ হাতে যেটা নিক্ষেপ করেছেন, আল্লাহ বলেছেন, সেটাও তিনিই নিক্ষেপ করেছেন।</p>
<p>অন্যদিকে কাদরিয়াগণ বলেন, মানুষ তার কর্মে স্বাধীন—যেখানে আল্লাহর কোনো হাত নেই। প্রমাণস্বরূপ তারা কোরআনের এই আয়াত উপস্থাপন করে—যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক, যার ইচ্ছা সে কাফের হোক।  এগুলো তাদের কাজের পুরস্কার। এগুলো সেসব কাজের প্রতিফল—যা তারা করেছে।</p>
<p>এরকম আয়াতগুলো মানুষকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, তোমরা আকল খাটাও, তোমরা চিন্তাভাবনা করো।</p>
<p>আলোচ্য হাদীসটিতে প্রথম পক্ষের বলা—আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বান্দা যা কিছু করে, আল্লাহর ইচ্ছাতেই করে। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া বান্দা কিছুই করতে পারে না। দ্বিতীয় পক্ষের বলা, আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষ তার কর্মে স্বাধীন। এখানে আল্লাহর ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন নাই। এই বিতর্কটি তৎকালীন গ্রিক দর্শনের জটিল এবং অস্পষ্ট একটি বিষয় ছিলো।</p>
<p><strong>মীযান আমাদেরকে এই সমস্যার সমাধান দেয়। মীযানের দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় মতই ভ্রান্ত। উভয় দলই মীযানে ভারসাম্য আনতে পারেনি। মীযানের দৃষ্টিকোণ থেকে জাবরিয়াগণ তাদের মতের পক্ষে যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, সেগুলো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আকীদা সংক্রান্ত আয়াত। ঈমান এবং আকীদার মীযান হলো এই আয়াতগুলো</strong>। আল্লাহ রব্বুল আলামীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং পরাক্রমশালী। কোনো বিষয়ে তিনি অক্ষম নন। তিনি সকল বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ বিষয়ে আমরা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস রাখি। আল্লাহ যদি অক্ষম হন, তাহলে তিনি রব হতে পারেন না। এটাই আমাদের বিশ্বাস। এবং এই বিশ্বাসগত অবস্থানের কারণেই আমরা মুমিন।</p>
<p>কিছু আয়াত আছে যেগুলো আল্লাহ স্বয়ং তার নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। সুন্নাতুল্লাহর আলোকে কিছু বিষয় নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছেন। রব্বুল আলামীন মানুষকে তার কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করবেন। এমতাবস্থায় তিনি কীভাবে এমন কিছুর জন্য জবাবদিহি করবেন যা করতে ব্যক্তি বাধ্য হয়!</p>
<p>পৃথিবীতে যা কিছু আছে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তারা আল্লাহর আনুগত্য করে। আল্লাহ তাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এর বাইরে তারা কিছু করতে পারে না। তবে মানুষ এর ব্যতিক্রম; তাকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এটা সুন্নাতুল্লাহ। এটা আমাদের আকীদা।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় পক্ষের বলা, যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক, যার ইচ্ছা সে কুফরি করুক—এটা ইচ্ছার স্বাধীনতা। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদেরকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।</strong></p>
<p>আমি কাউকে বল প্রয়োগে হত্যা করতে চাইলেও আল্লাহ তা চান না। এবং এধরণের হত্যাকে তিনি নিষিদ্ধ করছেন। এখন কেউ যদি বল প্রয়োগে কাউকে হত্যা করতে চায়, আল্লাহ তাতে বাধা দিবেন না। এখান থেকেই আসে দায়িত্বের মীযান, সুন্নাতুল্লাহর মীযান, কর্মের মীযান।</p>
<p>এখানে খিয়ার বা ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রয়োজন। ফিকহের একটি মৌলিক নীতিমালা হলো, অক্ষমের উপর শরীয়তের বিধান প্রয়োগ হবে না। আল্লাহ বলেন—</p>
<blockquote><p>لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا</p>
<p>অর্থ : “আল্লাহ কারও উপর সাধ্যাতীত কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা বাকারা : ২৮৬)</p></blockquote>
<p>আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে ফরজকৃত বিধান বান্দার জন্য পালন করা সহজ।</p>
<p>মীযানে ভারসাম্যহীনতার কথা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে—</p>
<p>আবূ দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে ছিলাম। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, এক সময় মানুষের কাছ থেকে ইলম ছিনিয়ে নেয়া হবে, এমনকি এ সম্পর্কে তাদের কোনো সামর্থ্যই থাকবে না। যিয়াদ ইবনে লাবীদ আল-আনসারী (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের নিকট হতে কীভাবে ইলম ছিনিয়ে নেয়া হবে, আমরা কোরআন তিলাওয়াত করি? আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমরা তা তিলাওয়াত করবো এবং আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকেও তা শিখাবো।</p>
<p>নবীজী বললেন, হে যিয়াদ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। আমি তো তোমাকে মদীনার অন্যতম জ্ঞানী ব্যক্তি বলেই গণ্য করতাম! এই তো ইয়াহুদী-নাসারাদের নিকট তাওরাত ও ইনজীল রয়েছে, তা তাদের কী কাজে লেগেছে? (তিরমীজি : ২৬৫৩)</p>
<p>এটি আমাদেরকে নির্দেশ করে, আমরা যদি মীযানকে গ্রহণ না করি, তাহলে কোরআন আমাদের মাঝে বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তা আমাদের কোনো কাজে আসবে না। কিতাবের সাথে মীযান যুক্ত না হলে, মীযানের প্রয়োগ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ এই কিতাব আমাদের কোনো কল্যাণে আসবে না। উল্টো আমাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে।</p>
<p>কোরআন আমাদেরকে বলে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনো। ঈমানদারদের ঈমান আনতে বলার অর্থ হচ্ছে, তোমরা তোমাদের ঈমানকে মজবুত কর, সক্রিয় কর। জজবা সম্পন্ন ঈমানের অধিকারী হও। ঈমানকে তাকত সম্পন্ন কর। অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসকে বাহ্যিকভাবে প্রতিফলিত কর। নীতিনৈতিকতা এবং পারস্পরিক লেনদেন, ওঠা-বসায় ঈমানের প্রতিফলন ঘাটাও।</p>
<p>মীযানের গুরুত্ব বুঝার জন্য উপরের হাদীসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসটি সহীহ। এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। উল্লিখিত হাদীস এবং আলোচ্য আয়াত “এবং তাদের সাথে দিয়েছি কিতাব এবং মীযান”—মীযানের গুরুত্ব তুলে ধরে।</p>
<p>“জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হবে” নবী (স.) এর এই কথা তখনই ফলবে, যখন দেখা যাবে জ্ঞান তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে—কল্যাণের বাহক হওয়ার পরিবর্তে অকল্যাণের বাহন হচ্ছে।</p>
<p>ইমাম গাযযালীর মতে, আল্লাহর ভয়, শরীয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং প্রবৃত্তির কামনা বাসনা থেকে দূরে থাকার মধ্যেই ইলমের মূল কথা নিহিত।</p>
<p>প্রবৃত্তির কামনা বাসনার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেটের দায় এবং যৌন চাহিদার জন্য হয়ে থাকে। ক্ষমতার দাপট, প্রাধান্য বিস্তার, কর্তৃত্ব খাটানো ইত্যাদিও প্রবৃত্তির তাড়নায় হয়ে থাকে। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এখানে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হতে হয়।</p>
<p>উল্লিখিত হাদীসসহ অন্যান্য হাদীসে কোরআনের শিক্ষার দিকে ফিরে আসার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে কোরআন সম্পর্কে অবশ্যই উন্মুক্ত হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে।</p>
<p>“তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহ তালাবদ্ধ?”  কোরআন বারবার তাদাব্বুর এবং তাফাক্কুরের কথা বলছে। আজ আমরা উম্মতে মোহাম্মদী এই নাজেহাল অবস্থায় কেন বাধ্য হয়ে বসবাস করছি? কারণ আমরা কোরআনের শিক্ষা থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থান করছি।</p>
<p>এই কোরআন কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি এবং শক্তির একমাত্র মাধ্যম। আমাদের সম্মান, মর্যাদা, গৌরব ইত্যাদির বাহক এই কোরআন। আমাদের সভ্যতা ও   সংস্কৃতির একমাত্র সোপানও এই কোরআন। কোরআনের প্রথম আয়াত ইকরা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝে মধ্যে দেখা যায়, আমাদের ভাই-বোনেরা সহীহ-শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে না। আর যারা পারে, তারাও অনেকটা বাধ্য হয়ে তেলাওয়াত করে। দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে করে, ইবাদতের উদ্দেশ্যে না।</p>
<p>অতএব, আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে এই কোরানের কাছে মীযান-সহ প্রত্যাবর্তন করতে হবে। যাতে এই কোরআন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের তাওরাত এবং ইঞ্জিলের মতো না হয়ে যায়।  দুর্ভাগ্যবশত তারা তাদের কিতাব থেকে উপকৃত হতে পারেনি।</p>
<p>সর্বশক্তিমান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমত ও মেহেরবানিতে এই জাতি পূর্ববর্তী জাতির মতো লীন হয়ে যাবে না। এই জাতি অমর হবে, ইনশাআল্লাহ। তারা সংখ্যার বিচারে নয়, বরং যোগ্যতা, আখলাক এবং তাজদীদের মাধ্যমে অমর হবে।</p>
<p>আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এই জাতি তার ক্ষমতা, সততা এবং নতুনত্ব নিয়ে পুনর্জাগরিত হোক। এই জাতি তাদের অন্তর্ভুক্ত হোক, যারা কোরআনুল কারীমের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/fiqhul-mizan-part-1/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16144</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-importance-of-faith-in-human-life/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-importance-of-faith-in-human-life/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 23 Aug 2025 07:17:52 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16092</guid>

					<description><![CDATA[মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্ব নিম্নরূপ, প্রথমত: বিশ্বাস একজন বিশ্বাসী ও আল্লাহর মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই সম্পর্ককে বিকশিত করে যা বিশ্বাসী হৃদয়কে ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং নিশ্চয়তায় পূর্ণ করে। দ্বিতীয়ত: বিশ্বাস মানুষের জীবনযাত্রা ইতর প্রাণি থেকে ভিন্নতর করে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্ব নিম্নরূপ,</p>
<ul>
<li><strong>প্রথমত:</strong> বিশ্বাস একজন বিশ্বাসী ও আল্লাহর মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই সম্পর্ককে বিকশিত করে যা বিশ্বাসী হৃদয়কে ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং নিশ্চয়তায় পূর্ণ করে।</li>
<li><strong>দ্বিতীয়ত:</strong> বিশ্বাস মানুষের জীবনযাত্রা ইতর প্রাণি থেকে ভিন্নতর করে তোলে। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। তাকে সৃষ্টিজগতের সকল কিছুর চেয়ে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সম্মানিত করা হয়েছে, নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। সে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। ফেরেশতারাও ভাবতেন যদি মানুষের মতো তাদেরকেও এত সম্মানিত করা হতো! দ্বীন মানুষকে অনুধাবন করার আহ্বান জানায় যে, তার সত্তার যে অংশে আল্লাহ রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, সে অংশে তার শক্তি নিহিত এবং যে অংশ পোড়া কাদামাটি থেকে তৈরি, সে অংশে তার দুর্বলতা নিহিত। জীবনের তুচ্ছ অসারতার কাছে মানুষের নতিস্বীকার করা উচিত নয় যা তাকে বিপথগামী করে। মানুষের উচিত সর্বদা উচ্চ মূল্যবোধের আকাক্সক্ষী হওয়া।</li>
<li><strong>তৃতীয়ত:</strong> বিশ্বাস এ বিশাল সৃষ্টিজগতের সাথে মানুষের সম্পর্কের পরিধিকে বিস্তৃত করে। মানুষ এ সৃষ্টিজগতে অনুপ্রবেশকারী নয়। আর এ সৃষ্টিজগতও তার শত্রু নয়, বা তাকে তাড়া করে বেড়ানো রহস্য নয়। বরং মানুষের খেদমতের জন্যই এটি সৃষ্টি করা হয়েছে যা আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম নিদর্শন। সব মানুষ তার ভাই-বোন। তার মতো তারাও আল্লাহর বান্দা এবং আদম (আ.)-এর বংশধর।</li>
<li><strong>চতুর্থত:</strong> বিশ্বাস মানুষকে অনন্তকালীন জীবনের নিগূঢ় রহস্য সম্বন্ধে উপলব্ধি করতে শেখায়। মানুষের জীবনের গল্প জন্মের মাধ্যমে শুরু হয়ে মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় না! জীবনের তেমন নয়, যেমনটা বলে থাকে অবিশ্বাসীরা। তারা বলে,</li>
</ul>
<p style="padding-left: 80px;">إِنْ هِىَ إِلَّا حَيَاتُنَا ٱلدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ</p>
<p style="padding-left: 80px;">“একমাত্র দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন। এখানেই আমরা মরি-বাঁচি এবং আমাদের কখনো পুরুজ্জীবিত করা হবে না। (সূরা মুমিনুন : ৩৭)</p>
<p style="padding-left: 80px;">বরং জীবন তেমন, যেমন বলেছেন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রা.)। তিনি বলেছেন,</p>
<blockquote style="padding-left: 40px;">
<p style="padding-left: 80px;">“তোমাকে অনন্তকালের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। মৃত্যু শুধুমাত্র একটি বাহন যা তোমাকে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে নিয়ে যাবে।”</p>
</blockquote>
<p>জীবন আসলে এমনই। এ সকল মূল্যবোধ মানুষকে তার অস্তিত্ব ও সৃষ্টির হাকীকত এবং জীবনের লক্ষ্য সম্বন্ধে উপলব্ধি করায়। আর এ মূল্যবোধগুলো আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান থেকে উদ্ভূত হওয়া এক একটি স্তম্ভ, যেগুলোর উপর ভিত্তি করে খোদায়ী ধর্মগুলো সৃষ্টি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন : একটি প্রয়োজনীয়তা </strong></h4>
<p>বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করা আবশ্যকীয়। মানুষ ও জীবনে এর গঠনমূলক প্রভাব পুনরুদ্ধার করার জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিত।</p>
<p>দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান চিন্তাধারা এবং শিক্ষাব্যবস্থা যে দর্শন বেছে নিয়েছে, তা বস্তুবাদী প্রযুক্তিগত এবং অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের প্রতি অধিক মনোযোগী, সেইসাথে ধর্মকে উপেক্ষাকারী, এমনকি ধর্মের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণকারী।</p>
<p>মূলত বর্তমান চিন্তাধারা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মকে বাতিল ঘোষণাকারী পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং ধর্মের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী যুদ্ধ ঘোষণাকারী মার্কসবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত।</p>
<p>ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণাধীন স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্ম শিক্ষা ক্লাস করানো হয় না, আর যদি করানো হয়, তবে তা গুরুত্বের দিক থেকে একদম শেষে থাকে। ধর্ম শিক্ষা করাকে এখন আর বড় সম্মানের কোনো বিষয় হিসেবে ভাবা হয় না। ধর্ম ক্লাসগুলোকে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অবস্থা এমন যে, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে দিনে বা সপ্তাহে এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ধর্ম ক্লাস করতে বাধ্য করা হয় যেন! উপরন্তু সমালোচকদের সমালোচনা এড়ানোর জন্য এ সময়টাকেই যথেষ্টের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হয়।</p>
<p>অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যায়, বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থার গতি হারানোটা অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। এ শিক্ষাব্যবস্থায় সেই রূহের অভাব রয়েছে, যা মানুষের অনুভূতিকে জাগ্রত করে এবং তাকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে। এ তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে মুসলিম কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল বলেছিলেন, <strong>“এটি চোখকে শেখায় না কীভাবে অশ্রু ঝরাতে হয়, এটি হৃদয়কে শেখায় না কীভাবে আল্লাহর স্মরণে বিনীত হতে হয়।”</strong></p>
<p>বর্তমান গণমাধ্যমও এ অসুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে ভালো অবস্থানে নেই। এটি সত্য যে, গণমাধ্যম এ আধুনিক দুনিয়ায় ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি মাধ্যম এবং জনমত গঠনে সক্ষমতার ফল স্বরূপ এটি সংস্কৃতি অভিমুখী। কিন্তু বর্তমান গণমাধ্যমও স্বচ্ছ নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহ্য, ধারণা বা দল দ্বারা প্রভাবিত যা মানুষকে দুর্নীতির ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।</p>
<p>আর এসব মূলত ধর্মে অবিশ্বাসী দর্শনকে বেছে নেওয়ার ফল।</p>
<p>বিশ্বাস মূলত একটি অভয়ারণ্য বা আশ্রয়স্থল। জান্নাত প্রাপ্তির পথ কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ, অন্যদিকে জাহান্নামের পথ লালসায় পরিপূর্ণ। যদি আমরা আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী না হই, তবে আমাদের পক্ষে সেই কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতাগুলো সহ্য করা, সেইসাথে লালসাকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে না। আর এ আধ্যাত্মিক শক্তি আমাদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত জীবনের যন্ত্রণা সহ্য করতে সক্ষম রাখবে, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহর পথে থাকি। এটি আমাদেরকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণগুলো, অর্থাৎ জীবনের লোভ-লালসা এবং ভোগ-বিলাস পরিত্যাগ করতে সক্ষম করে তোলে। আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দীর্ঘ এ অনিশ্চিত যাত্রায় বিশ্বাস আমাদের জন্য বিধানস্বরূপ।</p>
<p>বিশ্বাসই আধ্যাত্মিক শক্তির সৃষ্টিকারী। বিশ্বাস আমাদেরকে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রেরণা যোগায়। এটি পরম করুণাময় আল্লাহর ইবাদতকে এতটাই পরিপূর্ণ করার প্রেরণা দেয় যে, ইবাদত আমাদের জীবনের প্রশান্তিতে পরিণত হয়। এটি আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে সময়নিষ্ঠ হতে সাহায্য করে, যা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী বোধ করায়। আমরা নফল ইবাদত করি যাতে এই ইবাদতগুলো আমাদেরকে আল্লাহর ভালোবাসার কাছাকাছি নিয়ে আসে। মহামহিম আল্লাহ যদি কাউকে ভালোবাসেন, তাহলে তিনি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যান, যা দিয়ে সে শোনে এবং তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যান, যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যান, যা দিয়ে সে আঁকড়ে ধরে এবং তার পা হয়ে যান, যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি তার কাছে চায়, তবে তিনি তাকে দেন, সে যদি তার কাছে নিরাপত্তা চায়, তবে তিনি তাকে রক্ষা করেন এবং নিরাপত্তা প্রদান করেন।</p>
<p>বলা বাহুল্য, বিশ্বাস শুধু মানুষকে পরকালীন চির সুখের পথেই পরিচালনা করে না, বরং তা ইহকালীন জীবনে সুখের কারণও বটে। সকল মানুষই জীবনে সুখ কামনা করে, কিন্তু খুব কমই তা অনুভব করার সুযোগ পায়। অনেকেই সুখের আশায় কোনো বিষয়ের প্রতি এতটাই মোহ তৈরি করে যে, এটির পেছনে বুনো হাঁসের মতো রুদ্ধশ্বাসে ছুটে বেড়ায়, এই আশায় যে, এটি তাদের সুখ দেবে। অথচ এটি মরুভূমির মরীচিকার মতো, যাকে তৃষ্ণার্তরা পানি মনে করে ছুটে যায়, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে কিছুই খুঁজে পায় না।</p>
<p>একমাত্র বিশ্বাসই মানুষকে মানসিক সুখ এবং শান্তি দিতে পারে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ ٱللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ</p>
<p>“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর যিকিরে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (আর রাদ : ২৮)</p></blockquote>
<p>এটি সত্য যে, টাকা দিয়ে মানুষ অনেক কিছুই কিনতে পারে এবং টাকা হয়তো তার চাহিদার কিছুটা পূর্ণ করতে পারে। কিন্তু মানুষের সমস্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং টাকা কখনোই তাকে সত্যিকার সুখ কিনে দিতে পারে না। সুখ বাজারে বিক্রি করার মতো বিষয় নয়। এটি একটি আত্মিক তৃপ্তির অনুভূতি যার সম্পর্কে আমাদের একজন দরিদ্র এবং ধার্মিক পূর্বপুরুষ বলেছিলেন, “রাজারা যদি আমাদের সুখের পরিমাণ বুঝতেন, তবে তারা এটি নিয়ে আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন।”</p>
<p>বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জন্য জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মানুষ বর্তমানে একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত পৃথিবীতে বসবাস করে। রিমোট কন্ট্রোলে একটি চাপ দেওয়ার মাধ্যমেই সে জীবনের বিলাসিতা উপভোগ করে। বিষয়টা এমন, যেন কয়েক ডজন সিনেট তার সেবায় নিয়োজিত রয়েছে! রিমোট কন্ট্রোল চাপার সাথে সাথে সে দূরত্ব জয় করে নিতে পারে। সে সোফায় আরামে বসে এমনভাবে সবকিছু নড়াচড়া করতে পারেন যেন সে ক্ষমতাশালী কারুন! এমনকি সে তার চারপাশের সকল কিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে কোনো বোতাম চাপার ঝামেলা ছাড়াই! অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিজ্ঞান মানুষকে শারীরিক আয়েশ এনে দিয়েছে, কিন্তু এটি একই সাথে তাকে মানসিক শান্তি থেকেও বঞ্চিত করেছে। বিজ্ঞানের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, জীবনের সমাপ্তির বিষয়টা বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে বিশ্বাসের লক্ষ্যই হলো মানুষের জীবনের সুন্দর সমাপ্তি প্রদান। বিশ্বাস মানে ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা। এটি মানুষকে নিজেকে পবিত্র করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি তাকে তার লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠতে এবং শ্রেষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছাতে যথেষ্ট শক্তি এবং প্রেরণা দেয়। এটি যৌবনের উন্মাতাল কামনা-বাসনাকে দমন করে। এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে প্রলোভনের কাছে হার না মানা দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি অর্জন করতে হয়, যে ইচ্ছাশক্তির বলে সত্যবাদী ইউসুফের (আ.) পাপের প্রলোভন থেকে বাঁচার জন্য কারাগারের অপমানকে শ্রেয় মনে করেছেন। তিনি বলেছিলেন,</p>
<p>قَالَ رَبِّ ٱلسِّجْنُ أَحَبُّ إِلَىَّ مِمَّا يَدْعُونَنِىٓ إِلَيْهِ ۖ</p>
<p>“হে আমার রব! এরা আমাকে দিয়ে যে কাজ করাতে চাচ্ছে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে প্রিয়! (সূরা ইউসুফ : ৩৩)</p>
<p>বিশ্বাস আত্মত্যাগের প্রসঙ্গে মানুষকে ইসমাইলের মতো ধৈর্যশীল হতে শেখায়। তাঁর পিতা ইব্রাহীম (আ.) তাঁকে আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে বলেছিলেন,</p>
<p>تَرَىٰ ۚ قَالَ يَـٰٓأَبَتِ ٱفْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِىٓ إِن شَآءَ ٱللَّهُ مِنَ ٱلصَّـٰبِرِينَ</p>
<p>“এখন তুমি বল তুমি কি মনে করো?’ সে বললো, ‘হে পিতা! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে, তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন।” (সূরা আস সাফফাত : ১০২)</p>
<p>পিতার প্রশ্নের উত্তরে তিনি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।</p>
<p>শুধুমাত্র সত্যিকারের বিশ্বাসই সৎ গুণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি নৈতিক আদর্শ ও আখলাকী মূল্যবোধ প্রদান করতে সক্ষম। ইতিহাস এ সত্যের সাক্ষী যে, কোনো জাতি যখন সৎ কাজ করা ছেড়ে দেয়, তখন তারা বিশৃঙ্খলা, নিষ্ক্রিয়তা এবং সৃজনশীলতার অভাবের মধ্যে নিপতিত হয়। নৈতিক আদর্শবিহীন একটি জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি। প্রখ্যাত কবি আহমদ শাওকির একটি কবিতার লাইন ছিলো এমন, “কোনো জাতি যদি তাদের নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে, তবে তারা মৃতের মতোই ভালো হয়ে যায়, যার কোনো কিছু করার ক্ষমতা থাকে না এবং মৃত দেহের জন্য শেষকৃত্য ও তার দুর্ভাগ্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া আমরা আর কিছুই করতে পারি না।”</p>
<p>বর্তমানে নেতৃস্থানীয়রা প্রায়ই তাদের জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের উপর নীতি-নৈতিকতা সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। সম্ভবত তারা ভুলে গেছেন যে, আইন মানুষের চিন্তা বা অনুভূতির পথকে পরিবর্তন করতে পারে না। একমাত্র যে বিষয়টি মানুষকে পরিবর্তন করতে পারে, পারে তা হলো তার আকল। আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিটি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কোনো আইন এর উপর ক্ষমতা রাখে না। অবশেষে নেতৃস্থানীয়রা শৃঙ্খলা আনয়নের মরিয়া প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পরে সমাজে, রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে এবং ষড়যন্ত্র, স্বার্থপরতা ও লালসা সত্য, ভালো ও দায়িত্ব-কর্তব্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে। ফলশ্রুতিতে অপরাধ, নানাবিধ সংকট ও কেলেঙ্কারি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>ব্রিটিশ বিচারকরা একটি বিখ্যাত মামলার রায় সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আইন, নৈতিক মান এবং বিশ্বাসের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া একটি সমাজের উন্নতি হতে পারে না। এ তিনটিই সমাজের ঐক্যবদ্ধতার জন্য অপরিহার্য।”</p>
<p><strong>বিশ্বাস মুসলমানদের সুপ্ত শক্তির উদ্রেক ঘটায়। মুসলমানদের রক্তে প্রবাহিত আল্লাহ ও পরকালের প্রতি এ অদম্য বিশ্বাস তাকে অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম করে এবং অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশ্বাস হলো মানুষের সহজাত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতিষেধক। এটি তাকে শেখায় যে, দানশীলতা ও পরোপকারের জন্য আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন।</strong> এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন,</p>
<p>“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল : ০৭)</p>
<p>“আর যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে এবং সেইসাথে সে মুমিনও হবে, তার প্রতি কোনো জুলুম বা অধিকার হরণের আশঙ্কা নেই।” (সূরা ত্বাহা : ১১২)</p>
<p>“আল্লাহ কারো ওপর এক অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। যদি কেউ একটি সৎকাজ করে, তাহলে আল্লাহ‌ তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে তাকে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” (সূরা নিসা : ৪০)</p>
<p>বিশ্বাস মানুষকে অনেক বেশি আধ্যত্মিক শক্তি দেয়, যা তাকে আল্লাহর হুকুমের অনিবার্যতার প্রতি আস্থাশীল হতে শেখায়। আল্লাহ তার জন্য যা লিখে রেখেছেন তা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আল্লাহর হুকুম একটি নির্ধারিত বিধান। যদি আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন যে, কারো ভালো বা খারাপ কোনো কিছু ঘটবে, তবে কেউ তা থামাতে পারবে না। এবং যদি আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন যে এটি ঘটবে না, তবে কেউ তার বিপরীত কিছু করতে পারবে না। প্রতিটি প্রাণির রিযিক এবং মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। কোনো মানুষ অন্য মানুষের ভালো করতে চাইলে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা চান, আবার কেউ যদি কারো ক্ষতি করতে চায়, সে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা চান। তাকদীরের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস জিহাদ (আল্লাহর পথে সংগ্রাম) এবং দাওয়াতকে (ইসলামের পথে আহ্বান) মুসলমানদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।</p>
<p>পারস্যের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে রাসূল (স.)-এর একজন সাহাবী পারসিকদের এক নেতার কাছে নিজেদের পরিচয় এভাবে দিয়েছিলেন, “আমরাই তোমাদের ভাগ্য! আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ প্রেরণ করেছেন, যেভাবে তোমরাও আমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। সুতরাং তোমরা যদি মেঘপুঞ্জের উপরেও অবস্থান করো, তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে আকাশে আরোহণ করাবেন, বা তোমাদেরকে নামিয়ে এনে আমাদের সাথে যুদ্ধ করাবেন!”</p>
<p>বিশ্বাস মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব এবং স্নেহের বন্ধনকে শক্তিশালী করে এবং তাদেরকে চির সবুজ, তারুণ্যদীপ্ত ও সাফল্যমণ্ডিত রাখে। বিশ্বাস মুসলমানদের মধ্যে আত্মীয়তার অনুভূতি সৃষ্টি করে, যার ফলে তারা একটি পরিবারের মতো হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।” (সূরা হুজুরাত : ১০)</p>
<p>বিশ্বাসের শক্তি মানুষকে বিভক্তকারী জাতি, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল, শ্রেষ্ঠ, বংশ, ভাগ্য এবং অনুরূপ সকল বাধা অতিক্রম করতে পারে। এ শক্তি পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করে, যা জন্ম ও বিয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট আত্মীয়তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। যখন এ অনন্য সম্পর্কের শিকড় মজবুত হয়, মুসলমানরা তখন তাদের জন্ম এবং রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের চেয়ে বিশ্বাসে তাদের এ ভাইদেরকে বেশি প্রাধান্য দেয়।</p>
<p>এ সুন্দর ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে কেউ কারো বিরুদ্ধে ক্ষোভ পোষণ করতে পারে না; একে-অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিংসায় লিপ্ত হয় না; জীবন নিয়ে অহেতুক গরিমায় ডুবে থেকে একে অপরকে তুচ্ছ করে না। আল্লাহর কাছে জীবন একটি মশার পালকের চেয়ে বেশি কিছু নয়! রাসূল (স.) হিংসাকে জাতির রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং রূপক অর্থে এটিকে চেঁছে ফেলার যন্ত্রের সাথে তুলনা করেছেন, কারণ এটি ধর্মকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দেয়। অন্যদিকে বিশ্বাস পারস্পরিক শত্রুতাকে মুছে দেয়। এটি মানুষের হৃদয়ে তার পথ খুঁজে নেয় এবং হৃদয়কে অন্য সকল বিশ্বাসীর জন্য উৎসারিত ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং উদারতা দিয়ে পূর্ণ করে তোলে। এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন,</p>
<p>“তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার মুসলমান ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ২৮১)</p>
<p>“আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনো, আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পূর্ণ ঈমাদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসো।” (মুসলিম)</p>
<p>পরার্থপরতার এ অসাধারণ উপমা একমাত্র মুসলিম সমাজেই বিদ্যমান যা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। বিশ্বাসই এ পরার্থপরতার উদ্রেক ঘটায়। পরার্থপরতা শুধুমাত্র একটি আভিধানিক শব্দ নয়, এটি একটি মনোভাব এবং আচরণ। এটি একজন মুসলমানের মনে তার অন্য মুসলমান ভাইদের জন্য দায়িত্বানুভূতি জাগিয়ে তোলে, যার ফলে সে নিজের চেয়ে তার মুসলমান ভাইদেরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি তাকে অনেক কষ্টের মধ্যেও টিকে থাকার এবং তার মুসলমান ভাইদের উপকারের জন্য প্রচেষ্টা চালানোর সাহস দেয়। এটি তাকে তার মুসলমান ভাইদের জীবন রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে শেখায়। এটি তাকে তার মুসলমান ভাইদেরকে খাবার দিতে শেখায় এবং তাদের ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করায়, যেমন ছিলেন আনসারদের (সাহায্যকারীদের) সাহাবীরা। আনসাররা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বেই ঈমান এনে দারুল হিজরাতে বসবাস করছিলেন, আর হিজরত করতে আসা মুহাজিরদেরকে অকাতরে সাহায্য করতেন। তারা নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোন না কেন, নিজেদের চেয়ে অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দিতেন।</p>
<p>আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“মূলত যেসব লোককে তার মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (সূরা হাশর : ০৯)</p>
<p>এই অভূতপূর্ব ভ্রাতৃপ্রেম এবং পরার্থপরতার অনুভূতিগুলো মানুষের অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থায় অর্থাৎ সর্বাবস্থায় সহযোগিতা এবং দানশীলতার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।</p>
<p>হাদীসে এসেছে,</p>
<p>“রাসূল (স.) বলেছেন, ‘একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের নিকট একটি দালানের মতো, যার প্রতিটি অংশ একে অপরকে শক্তিশালী করে।” এ কথা বলে তিনি তার হাত আঙ্গুল দিয়ে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেন।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ১৬৭০)</p>
<p><strong>“তুমি মুমিনদেরকে নিজেদের প্রতি ক্ষমাশীল হিসেবে দেখতে পাবে, পরস্পরের মাঝে ভালোবাসাপূর্ণ ও দয়াশীল হিসেবে দেখতে পাবে, যা একটি দেহের সাথে তুলনীয়। যখন শরীরের একটি অংশ অসুস্থ হয়, তখন সমগ্র শরীরই এ কষ্ট (নিদ্রাহীনতা ও জ্বর) ভাগ করে নেয়।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ১৬৭১)</strong></p>
<p>সর্বোপরি, বিশ্বাস হলো মুক্তির চাবিকাঠি। বিশ্বাস বন্যা থেকে রক্ষাকারী নৌকার মতো। আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>وَكَيْفَ تَكْفُرُونَ وَأَنتُمْ تُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ ءَايَـٰتُ ٱللَّهِ وَفِيكُمْ رَسُولُهُۥ ۗ وَمَن يَعْتَصِم بِٱللَّهِ فَقَدْ هُدِىَ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ</p>
<p>“তোমাদের জন্যে কুফরীর দিকে ফিরে যাবার এখন আর কোন সুযোগটি আছে, যখন তোমাদেরকে শুনানো হচ্ছে আল্লাহ‌র আয়াত এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহ‌র রাসূল? যে ব্যক্তি আল্লাহ‌কে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে, সে অবশ্যই সত্য সঠিক পথ লাভ করবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১০১)</p>
<p>&nbsp;</p></blockquote>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মুহসিনা বিনতে মুসলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-importance-of-faith-in-human-life/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16092</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে অর্থনৈতিক বিধানের উদ্দেশ্যসমূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. উমর চাপরা]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 19 Aug 2025 15:53:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16080</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম জীবনবিমুখ কোনো ধর্ম নয় (১) এবং এটি কখনো মানুষকে &#8220;আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ” (কোরআন, ৭:৩২) থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে না। বরং ইসলাম মানুষের প্রতি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এভাবে, &#8220;মানুষ জন্মগতভাবে গুনাহগার নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম জীবনবিমুখ কোনো ধর্ম নয় (১) এবং এটি কখনো মানুষকে &#8220;আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ” (কোরআন, ৭:৩২) থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে না। বরং ইসলাম মানুষের প্রতি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এভাবে, &#8220;মানুষ জন্মগতভাবে গুনাহগার নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি বা খলীফা এবং সে শুধুমাত্র নিজের কৃত গুনাহসমূহের জন্যই দায়ী থাকবে।&#8221; (আল কোরআন, ২:৩০) এমনকি &#8220;মানুষের জন্যই এই পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে।&#8221; (২:২৯)। সুতরাং আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহকে ত্যাগ করার মধ্যে নয়, বরং তার দেওয়া সীমারেখায় থেকে সেগুলোকে ভোগ করার মাঝেই কল্যাণ নিহিত।</p>
<p>যাবতীয় মানবীয় কার্যাবলি ইসলামের ধর্মীয় মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে জাগতিক কাজ বলে আলাদা করে কোনো বিভাজন নেই। অর্থনীতিসহ মানব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরণের কাজই আধ্যাত্মিক, যদি সেটি শান্তির জন্য হয় এবং ইসলামের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের সীমার মধ্যে হয়। এই লক্ষ্য এবং মূল্যবোধগুলোই ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণ করে। তাই, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আরো ভালো দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এই বিষয়গুলোর সঠিক বোঝাপড়া থাকা দরকার। এই মূল্যবোধ এবং লক্ষ্যগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>১. ইসলামের নৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।</li>
<li>২. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও আদালত।</li>
<li>৩. আয়ের ন্যায়সংগত বণ্টন।</li>
<li>৪. সামাজিক অগ্রগতির প্রেক্ষিতে ব্যক্তির স্বাধীনতা।</li>
</ul>
<p>এই লক্ষ্যগুলো ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আলোচনা এবং ব্যাখ্যা করার জন্য সম্পূর্ণ নয়, তবে পর্যাপ্ত ফ্রেমওয়ার্ক (কাঠামো) সরবরাহ করার পাশাপাশি সেসব বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে যা ইসলামী ব্যবস্থার সাথে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের পার্থক্য নিরূপণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ইসলামের নৈতিক মূল্যমান:</h5>
<p>&#8220;তোমরা আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহ থেকে খাও এবং পান করো, এবং দুনিয়াতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।&#8221; (আল-কোরআন, ২:৬০)</p>
<p>&#8220;হে মানবজাতি! এই পৃথিবীতে যা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, তা তোমরা খাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না।&#8221; (আল-কোরআন, ২: ১৬৮)</p>
<p>&#8220;হে ইমানদারগণ! আল্লাহ যা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন, তাকে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। এবং হালাল খাবার গ্রহণ করো, আর যে আল্লাহর উপর তোমরা ঈমান এনেছো আর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকো।&#8221; (আল-কোরআন, ৫: ৮৭-৮৮)</p>
<p>কোরআনে এরকম অসংখ্য আয়াত আছে (২), যেগুলো অর্থনীতিতে কোরআনী মূলনীতি তুলে ধরে। ইসলাম আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহসমূহকে ভোগ করার জন্য মুসলমানদের তাগিদ দিয়ে থাকে এবং মুসলিম সমাজে বস্তুগত উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে কোনো সংখ্যাগত সীমারেখ বেঁধে দেয় না। বরং এটি বস্তুগত উন্নতিকেও একটি সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করে।</p>
<p>&#8220;যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।&#8221; (আল কোরআন, ৬২: ১০)</p>
<p>আল্লাহ যদি তোমাদের সামনে জীবিকা উপার্জনের কোনো সুযোগ করে দেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এটিকে কাজে লাগাও যতক্ষণ না সেটি নিঃশেষ হয়ে যায়।(৩)</p>
<p>কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষরোপণ করে, অথবা জমি চাষাবাদ করে এবং সেখান থেকে যদি একটি পাখিও রিযিক আহরণ করে থাকে, তবে তা তার জন্য সাদকাহ হিসেবে আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে।(৪)</p>
<p>যারা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য এবং ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত থাকার জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে জমিনে রিযিক অন্বেষণ করে এবং প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হয়, তারা তাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে তাদের চেহারাগুলো পূর্ণ চাঁদের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে।(৫)</p>
<p>এমনকি ইসলাম আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে মানুষকে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের তাগিদ দিয়েছে (৬) এবং রাসূল (স.) বলেছেন যে, <strong>পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ নেই, যার জন্য আল্লাহ একটি প্রতিকার নির্ধারণ করে রাখেননি।</strong>(৭) সুতরাং, এটি সহজেই অনুমেয় যে মুসলিম সমাজে অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশ অন্যতম। কেননা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহকে মানবতার সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নতির স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা করার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে মানুষ তার আগমনের উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ করতে পারে।</p>
<p>ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করেছে, এবং মানুষকে জীবিকা অন্বেষণের তাগিদ দিয়েছে।(৮) এটি থেকে ধরে নেওয়া যায় যে, মুসলিম সমাজে আরেকটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা যেন কাজ করতে আগ্রহী মানুষ বা যারা কাজ খুঁজছে এরকম সকলেই তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী জীবিকা উপার্জনের উপায় খুঁজে পায়। যদি এটি সম্পন্ন না হয়, তবে মুসলিম সমাজ তার আধ্যাত্মিক ক্ষুধা নিবারণেও সক্ষম হবে না। কেননা, বেকার মানুষগুলো জীবনে অমানুষিক কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হবে যদি না সে অন্যের দয়া বা দানের উপর নির্ভর করে অথবা ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে কিংবা কোনো অসদুপায় অবলম্বন করে। আর এসবগুলো পন্থাই; বিশেষ করে প্রথম দুটি ইসলামের প্রাণসত্তার সাথে বেমানান।</p>
<p>অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে জোর দেবার বিষয়টি মূলত ইসলামের মৌল বার্তা থেকেই উদ্ভূত। ইসলাম এসেছেই মানবতার জন্য আর্শীবাদস্বরূপ, মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য, দারিদ্র্য এবং কষ্টের মধ্যে নিপতিত করার জন্য নয়। কোরআন এ ব্যাপারে বলেছে-</p>
<p>&#8220;আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সমগ্র মানবতার জন্য রহমত হিসেবে।&#8221; (আল-কোরআন, ২১: ১০৭)</p>
<p>&#8220;হে মানুষ! তোমাদের জন্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসিহত এসে গেছে, এটি সে জিনিস যা অন্তরের সমস্ত রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও নিয়ামত।&#8221; (আল-কোরআন, ১০:৫৭)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা-ই চান, যা কঠিন তা চান না।&#8221; (আল-কোরআন, ২: ১৮৫)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের বোঝাকে লাঘব করতে চান। কেননা, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।&#8221; (আল-কোরআন, ৪: ২৮)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো বোঝা চাপিয়ে দিতে চান না, বরং তিনি চান তোমাদের পরিশুদ্ধ করতে এবং তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহকে পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো।&#8221; (আল-কোরআন, ৫:৬)</p>
<p>এ আয়াতগুলোর উপর ভিত্তি করে মুসলিম ফকীহগণ সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মানুষের স্বার্থে উৎপাদন এবং মানুষের কষ্ট লাঘব করাই ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি।(৯) ইমাম গাযযালীর মতে, শরীয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ সাধন যা নির্ভর করে তাদের বিশ্বাসের নিরাপত্তা, জীবনের নিরাপত্তা, আকলের নিরাপত্তা, বংশের ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং এই পাঁচটি জিনিসের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় জনগণের স্বার্থরক্ষার কবচ এবং অনুমোদনযোগ্য।(১০) ইমাম ইবনে কাইয়ুম জোর দিয়ে বলেন, <strong>&#8220;শরীয়তের ভিত্তি হচ্ছে হিকমত এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের কল্যাণ সাধন। এই কল্যাণ নির্ভর করে পরিপূর্ণ আদালত, মারহামাত, মাসলাহাত এবং হিকমতের উপর। যা কিছু আদালত থেকে জুলুমের দিকে মারহামাত থেকে রূঢ়তার দিকে, মাসলাহাত থেকে দুর্দশার দিকে এবং হিকমত থেকে মূর্খতা/ নির্বুদ্ধিতার দিকে নিয়ে যায়, শরীয়তে তার কোনো স্থান নেই। &#8220;</strong>(১১)</p>
<p>কিন্তু এই অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে একজন মুসলিম যদি তার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে, অন্যের ক্ষতি করে, আদালত থেকে দূরে সরে গিয়ে এবং কল্যাণের বিষয়কে মাথায় না রেখে সম্পদ উপার্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তবে সে চরমপন্থায় চলে যায় এবং জাগতিক উন্নতির মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ইসলাম যেহেতু মানব জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, তাই কোরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে, &#8220;নামাজ শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করতে থাকো যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো।&#8221; (আল কোরআন, ৫৭ঃ ৭) অধিকাংশ আলেমদের মতে, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা বলতে বেশি বেশি ইবাদত করা বুঝায়নি, বরং এর মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে আখলাকী জীবন যাপনঃ(১২) হালাল উপার্জন, সবধরনের হারাম পন্থাকে বর্জন এবং সম্পদকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে, যার হিসাব কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে।(১৩) এই প্রেক্ষিতে হয়তো পৃথিবীর এবং এর কর্তৃত্বের অসারতা বিষয়ক কোরআনের আয়াত ও হাদীসগুলো বোঝা সহজ হবে।(১৪) সূক্ষ্ম এ কথাটি আক্ষরিক অর্থে বলা হয়নি, বরং এটি আধ্যাত্মিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট। যদি আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে বিসর্জন না দিয়ে সমস্ত পৃথিবীর কর্তৃত্বও অধিকার করা যায়, তাহলে তা ত্যাগ করার মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। রাসূল (স.) বলেন, &#8220;যে আল্লাহকে ভয় করে তার সম্পদ উপার্জনে কোনো দোষ নেই।&#8221;(১৫) কিন্তু সেখানে যদি কোনো বিবাদ ঘটে থাকে, তাহলে মানুষের উচিত ততটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা, যতটুকু সভাবে উপার্জন করা যায় সেটা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। কোরআন বলছে, &#8220;তাদের বলে দিন, ভালো এবং মন্দ কখনোই সমান নয়। যদিও মন্দের প্রাচুর্য তোমাদের মোহিত করে। হে বোধসম্পন্ন লোকেরা। তোমরা আল্লাহর নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো।&#8221; (আল কোরআন, ৫: ১০০) যে ব্যক্তি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সন্তুষ্টির উপর ইসলামের চিরন্তন মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়, সে খুব সহজেই দুনিয়াবী সম্পদকে বিসর্জন দিতে পারে। কেননা, তার সামনে আছে রাসূলের বাণী, &#8220;এই পৃথিবীর মোহ তো কেবল শয়তানের কারসাজি&#8221;(১৬) এবং &#8220;যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে সে আখেরাতকে হারিয়ে ফেলে আর যে ব্যক্তি আখিরাতকে ভালোবাসে সে দুনিয়াতেও এর প্রতিদান লাভ করে। সুতরাং তোমরা ক্ষণস্থায়ী জিনিসের তুলনায় চিরস্থায়ী জিনিসকে বেছে নাও।&#8221;(১৭)</p>
<p><strong>এভাবেই একদিকে বস্তুগত উন্নতির জন্য চেষ্টা করার তাগিদ দেয়া আবার একইসাথে এই জাগতিক প্রচেষ্টাকে একটি আখলাকী পাটাতনের উপর স্থাপন করার মাধ্যমে ইসলাম জাগতিক এবং নৈতিক বিষয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে যা জাগতিক চেষ্টাকে আধ্যাত্মিকতার অলংকারে সজ্জিত করে।</strong></p>
<p>وَٱبْتَغِ فِيمَآ ءَاتَىٰكَ ٱللَّهُ ٱلدَّارَ ٱلْـَٔاخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَآ أَحْسَنَ ٱللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ ٱلْفَسَادَ فِى ٱلْأَرْضِ ۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلْمُفْسِدِينَ</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে তোমার আখিরাতের ঘর নির্মাণের চেষ্টা করো, কিন্তু দুনিয়াতেও তোমার অংশের কথা ভুলে যেও না। আর আল্লাহ তোমার উপর যেমন দয়া করেছেন, তুমিও মানুষের প্রতি তেমনি দয়া করো। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।&#8221; (আল-কোরআন, ২৮: ৭৭)</p>
<p>সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম তারাই যারা তাদের দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় বিষয়ে সচেতন।(১৮)</p>
<p>&#8220;তোমাদের মধ্যে সে শ্রেষ্ঠ নয়, যে আখিরাতের জন্য দুনিয়াকে অস্বীকার করে, আবার সেও শ্রেষ্ঠ নয় যে দুনিয়ার জন্য আখিরাতকে অবহেলা করে। বরং তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়কেই প্রাধান্য দেয়।&#8221; (১৯)</p>
<p>এভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় দিকের উপর জোর দেওয়ার বিষয়টি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে, এ দুটো একত্রে পারস্পরিক শক্তির আধার হয়ে প্রকৃত মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে। জীবনে এদুটো দিকের কোনো একটিকে অবহেলা করেই প্রকৃত মানবকল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভব নয়। যদি শুধু জাগতিক বিষয়গুলোকে লালন করা হয় এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়হীনতা বিরাজমান থাকে তাহলে সমাজে হতাশা, অপরাধ, মাদকাসক্তি, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, ডিভোর্স, মানসিক অসুস্থতা, আত্মহত্যার মতো অসংগতিগুলো প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে যার সবগুলোই ব্যক্তিজীবনে মানসিক প্রশান্তির ঘাটতির কারণে হয়ে থাকে। আবার যদি শুধু আধ্যাত্মিক বিকাশকেই লালন করা হয়, তাহলে অনেকের কাছেই তা অবাস্তব এবং অকার্যকর হয়ে পড়বে। এভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের মধ্যে দ্বি-বিভাজন এবং দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে যা সমাজের যাবতীয় মূল্যবোধকেই হুমকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।</p>
<p>অন্য দুটি ব্যবস্থা, সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদে আধ্যাত্মিক এবং বস্তুগত জীবনের এই মেলবন্ধন অনুপস্থিত। কেননা, এ দুটি মতবাদই মূলত সেকুলার এবং অনৈতিক বা নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। উৎপাদনশীল প্রযুক্তি এবং জীবনমানের উন্নতির ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের অবদানকে যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের ভূমিকাকেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই দুটি ব্যবস্থাই মানবজীবনে আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>২. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং আদালত:</h5>
<p>&#8220;হে মানবজাতি। আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে মুত্তাকীগণই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৪৯:১৩)</p>
<p>&#8220;তোমাদের রব একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে এসেছো, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। শ্রেষ্ঠত কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে হয়। অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কালোর উপরও সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। (২০)</p>
<p>&#8220;মানবজাতির সূচনা হয়েছে আদম এবং হাওয়ার মাধ্যমে, আর তোমরা সবাই তাদের বংশধর। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ কারও কাছে তার বংশ বা গোত্র পরিচয় জানতে চাইবেন না। বরং সেদিন আল্লাহর সামনে সেই সবচেয়ে সম্মানিত হবে যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।</p>
<p>ইসলাম এমন এক সমাজ বিনির্মাণের কথা বলে যেখানে সকল মানুষ একই স্রষ্টার দ্বারা আবদ্ধ থাকে। সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, এটি কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে আবদ্ধ নয়, আর এক দম্পতি থেকে সৃষ্ট একই পরিবারের সদস্যের মতো ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসার বন্ধনে না কোনো জাতি, গোত্র বা বর্ণে, বরং যাবতীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এই ভ্রাতৃত্ব সমগ্র মানব জাতিকে এক করে। কোরআনের ভাষ্যমতে, &#8220;বলুন, হে মানুষ। আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।&#8221; (আল কোরআন, ৭:১৫৮) আর রাসূলুল্লাহ (স.) জোর দিয়ে বলেন, &#8220;আমি তোমাদের মধ্যে সাদা-কালো সবার জন্যই সমানভাবে প্রেরিত হয়েছি।&#8221;</p>
<p>আর স্বাভাবিকভাবেই এই সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের পূর্বশর্ত হলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে, যারা একই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্টি হওয়া ছাড়াও একই বিশ্বাসের বন্ধনেও আবদ্ধ যাকে কোরআন &#8216;দ্বীনি ভাই&#8217; (আল কোরআন, ৯:১১) (২৩) এবং &#8216;পরস্পরের প্রতি রহমশীল&#8217; (আল কোরআন, ৪৮:২৯) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাসূল (স.) বলেন,</p>
<p>&#8220;সমগ্র মানবজাতি আল্লাহর পরিবারভুক্ত আর তার কাছে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেই বেশি প্রিয় যে সর্বশ্রেষ্ঠ।&#8221;(২৪)</p>
<p>&#8220;জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি রহমশীল হও, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি রহমশীল হবেন।&#8221;(২৫)</p>
<p>&#8220;পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির ক্ষেত্রে আপনি মুসলমানদের একটি দেহের মতো পাবেন। এর এক অংশ আঘাত পেলে সারা দেহে সে ব্যথা অনুভূত হয়। &#8220;(২৬)</p>
<p>&#8220;এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে কখনো তার প্রতি অন্যায় আচরণ করে না, কখনো বিপদে তাকে একাকী ছেড়ে দেয় না কিংবা তাকে তাচ্ছিল্য করে না। (২৭)</p>
<p>&#8220;ইসলামের এই ভ্রাতৃত্বের ধারণা থেকেই ইসলাম আদালতের উপর এত গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি কোরআনে বলা হয়েছে, নবীগণের শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো দুনিয়ার বুকে আদালত প্রতিষ্ঠা।&#8221; (আল-কোরআন, ৫৭: ২৫)</p>
<p>আদালতবিহীন ঈমান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে কোরআন ঘোষণা করেছে- &#8220;তাদের জন্যই জন্যই রহমত এবং হেদায়াত যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জলুমের সাথে মিশ্রিত করে ফেলেনি।&#8221; (আল-কোরআন, ৬:৮২)</p>
<p><strong>সুতরাং ইসলাম মুসলমানদের আদালতের ব্যাপারে নিছক উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে তাগিদ দিয়ে গেছে, &#8220;আল্লাহ তোমাদের সৎকাজের এবং আদালত কায়েমের আদেশ দিচ্ছেন&#8221; (আল কোরআন, ১৬:৯০) এবং &#8220;যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, ইনসাফের ভিত্তিতে করো।&#8221; (আল কোরআন, ৩:৫৮)</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামে ইনসাফ এবং আদালতের গুরুত্ব এত বেশি যে, ন্যায়পরায়ণ হওয়াকে মুত্তাকী এবং মুমিন হবার শর্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে-</p>
<p>&#8220;হে ঈমানদারগণ। আল্লাহর জন্য তোমরা সত্যের উপর কায়েম থাকো এবং ইনসাফের সাক্ষী হও। কারও প্রতি দুশমনি যেন তোমাদেরকে ইনসাফ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। ইনসাফ করো। এটিই তাকওয়ার কাছাকাছি। আল্লাহকে ভয় করো। নিশচয়ই তোমরা যা কিছু করো, সে বিষয়ে আল্লাহ পুরোপুরি খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৫:৮)</p>
<p>এমনকি ইনসাফের ক্ষেত্রে যদি কারও নিজের বা তার কাছের মানুষদের ক্ষতি হয়ে যায়, তবুও তা কায়েম করতে বলা হয়েছে-</p>
<p>&#8220;এবং যখন তোমরা কথা বলো, ইনসাফের সহিত বলো, যদি তা তোমাদের নিকটাত্মীয়দের বিপক্ষেও যায়।&#8221; (আল কোরআন, ৬: ১৫২)</p>
<p>&#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে বা তোমাদের পিতামাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়, সে ধনী হোক বা দরিদ্র হোক। আল্লাহ সবার উত্তম হেফাজতকারী। কাজেই নফসের প্রতারণায় ইনসাফ থেকে দূরে সরে যেও না। যদি তোমরা (সত্য থেকে) বিচ্যুত হও বা ইনসাফ থেকে দূরে সরে যাও তাহলে মনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সকল তৎপরতার খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৪: ১৩৫)</p>
<p>এ বিষয়টি আরো বিস্তারিত অনুধাবনের জন্য আমরা ইসলামের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সামাজিক সুবিচার:</strong></p>
<p>ইসলাম যেহেতু সমগ্র মানবতাকে একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করে তাই আল্লাহর আইনে সকল মানুষই সমান। এখানে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। গোত্র-বর্ণ বা সামাজিক পদমর্যাদার জন্য মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন করা হয় না। এখানে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হলো আখলাক, যোগ্যতা, এবং মানবতার কল্যাণে ভূমিকা। পয়গাম্বর (স) বলেন-</p>
<p>&#8220;নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং ধন-সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের কাজ।&#8221;(২৮)</p>
<p>&#8220;তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যার আখলাক সর্বোত্তম।&#8221;(২৯)</p>
<p>আল্লাহর রাসূল (স.) সেসব মানুষ এবং জাতির জন্য ধ্বংসের সতর্কবাণী করেছেন, যারা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভেদেভেদ এবং অসাম্যের সৃষ্টি করে।</p>
<p><strong>“তোমাদের পূর্বের অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছিলো, কারণ যখন তাদের মধ্যে উচ্চবিত্তরা চুরি করতো, তাদের কোনো শাস্তি দেয়া হতো না। বিপরীতে নিম্নবিত্তের উপর শাস্তি কার্যকর হতো। খোদার কসম। যদি আমার আদরের দুলালী ফাতিমাও চুরি করতো আমি তার হাত কেটে দিতে দ্বিধা করতাম না।”(৩০)</strong></p>
<p>&#8220;যদি কেউ কোনো মুসলিম নারী অথবা পুরুষকে তার দারিদ্য বা অনটনের জন্য তাচ্ছিল্য বা উপহাস করে কেয়ামতের মাঠে আল্লাহ তাকে অপমানিত করবেন। &#8220;(৩১)</p>
<p>ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) তার গভর্ণর আবু মুসা আল আশয়ারী (রা.)-এর কাছে চিঠি লেখেন এই মর্মে-</p>
<p><strong>“সকল মানুষকে সমানভাবে দেখবে যেন দরিদ্ররা তোমার আদালত থেকে নিরাশ না হয়, আবার ধনীরা তোমার কাছে কোনো বাড়তি সুবিধা আশা না করে।&#8221;(৩২)</strong></p>
<p>ইসলামের প্রথম চার খলীফার শাসনামলেই আদালতের এই রূহ সর্বত্র বিদ্যমান ছিলো। কিছুটা শিথিল হলেও পরবর্তী শাসকরাও এটির অনুসরণ করেছেন, বিভিন্ন ঘটনায় যার নজির পাওয়া যায়। খলীফা হারুন উর রশিদের সময়কার বিখ্যাত ইমাম কাজী আবু ইউসুফের খলীফাকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠির বক্তব্য থেকে আমরা যেমনটি দেখতে পাই, &#8220;সকলের প্রতি সমান আচরণ করুন, হোক সে আপনার নিকটবর্তী অথবা দূরবর্তী&#8221; এবং &#8220;আপনার রাষ্ট্রের উন্নতি নির্ভর করবে কোরআনের আইন কায়েম করা এবং অন্যায় ও জুলুম নিরসন করার মধ্যে। &#8220;(৩৩)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অর্থনৈতিক সুবিচার:</strong></p>
<p>সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং সামাজিক সুবিচারের ধারণাটি অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি না এর সাথে অর্থনৈতিক সুবিচারের মেলবন্ধন ঘটে; যদি না সমাজে প্রত্যেকেই তার অবদানের মূল্য পেয়ে থাকে এবং একে অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কোরআন মুসলমানদের বলে, &#8220;কখনো অন্যের পাওনা আটকে রেখো না।&#8221; (আল কোরআন, ২৬: ১৮৩)।(৩৪)  ফলে প্রত্যেকে তার ন্যায্য পাওনা পেয়ে যাবে এবং কেউ অন্যের অংশ হস্তগত করে কাউকে বঞ্চিত করবে না। রাসূল (স.) উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন, &#8220;তোমরা জুলুমের ব্যাপারে সচেতন হও। কেননা, জুলুম কেয়ামতের মাঠে ঘোর অন্ধকারের মতো হবে।&#8221;(৩৫) শোষণ এবং জুলুমের ব্যাপারে এরূপ সতর্কবার্তার কারণ হলো সমাজে প্রতিটি মানুষের জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়ন যা ইসলামের মূল লক্ষ্য। হোক সে ভোক্তা, উদ্যোক্তা, বণ্টনকারী কর্মচারী অথবা মালিক) অধিকার সংরক্ষণ এবং এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, শ্রমিক বা কর্মচারী এবং মালিকের সম্পর্কের ব্যাপারে আদালতের ভিত্তিতে ইসলাম সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। একজন শ্রমিক মালিকের জন্য তার কর্মচারীকে বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত নয়। রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, দ্রব্য উৎপাদনে তার অবদানের জন্য ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকারী এবং একজন মুসলিম &#8220;ঠিন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিরাগভাজন হবে; যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি তার কৃত ওয়াদা পূর্ণ না করেই মৃত্যুবরণ করেছে, যে ব্যক্তি কোনো মুক্ত মানুষকে বিক্রি করে এবং মূল্য ভোগ করে, আর যে একজন শ্রমিক নিয়োগ করে তার উৎপাদিত পণ্য ভোগ করে, কিন্তু তার মজুরি শোধ করে না।&#8221;(৩৬) এই হাদীসে একজন মুক্ত মানুষকে ক্রীতদাসে পরিণত করা এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি আদায় না করাকে পাশাপাশি রাখার মাধ্যমে ইসলাম এ বিষয়ে কতটা কঠোর তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।</p>
<p><strong>এখানে শ্রমিকের &#8216;ন্যায্য মজুরি&#8217; এবং &#8216;শ্রমিক শোষণ&#8217; বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিকে আমাদের কোরআন এবং সুন্নতের আলোকে বুঝতে হবে। মার্কসের মতো ইসলাম শ্রম ব্যাতীত অন্য কোনো ফ্যাক্টর দ্বারা উৎপাদনের স্বীকৃতি দেয় না। তাই স্বাভাবিকভাবেই ইসলামে শ্রমিকের মজুরি এবং শ্রমিক শোষণের ধারণাটিও মার্কসের প্রস্তাবিত উদ্বৃত্ত মূল্যের (suplus value) ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।</strong> তাত্ত্বিকভাবে এরূপ বক্তব্য আসতে পারে যে, শ্রমিক কর্তৃক উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের সমপরিমাণ মূল্যই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি। কিন্তু বাস্তবে এভাবে মূল্য নির্ধারণ করা খুবই কষ্টসাধ্য তাই এই তত্ত্বের কার্যকরীতাও যৎসামান্য। কিন্তু বিভিন্ন হাদীস থেকে সর্বনিম্ন এবং আদর্শ মজুরি সম্পর্কে একটা গুণগত ধারণা পাওয়া যায়, যা অনেক বেশি বাস্তবিক। রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;একজন শ্রমিকের (নারী অথবা পুরুষ) ন্যূনতম মজুরি এমন হবে, যা দিয়ে সে পরিমিতভাবে তার খাদ্য ও বস্ত্রের চাহিদা পূরণ করতে পারবে এবং তাকে দিয়ে কখনো তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কাজ করানো যাবে না।&#8221;</strong>(৩৮) সুতরাং এই হাদীস থেকে এটা স্পষ্ট যে, একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এমন হওয়া চাই যা তার এবং তার পরিবারের মানসম্মতভাবে ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত হয় এবং এজন্য তাকে সাধ্যের অতিরিক্ত চাপ নিতে না হয়। মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক মান রক্ষার্থে সাহাবীরা এভাবেই শ্রমিকের মজুরি দিয়েছিলেন। ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রা) বলেন, &#8220;অদক্ষ নারী শ্রমিকদের তার বৃত্তিমূলক কাজে অতিরিক্ত চাপ দিওনা, তাতে করে সে হয়তো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। তোমার অধীন পুরুষদেরও অতিরিক্ত কাজের চাপ দিও না। তাহলে সে হয়তো চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারে। তোমার অধীনস্থদের প্রতি সহানুভূতিশীল হও, তাহলে তোমার রব তোমার প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। আর মনে রাখবে, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমার উপর ন্যস্ত।&#8221;(৩৯)</p>
<p>আরেকটি হাদীস থেকে আদর্শ মজুরি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। আদর্শ মজুরি এমন হবে যাতে কর্মচারী তার মালিকের সমমানের খাদ্য এবং বস্ত্রের আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়।</p>
<p><strong>“তোমাদের কর্মচারীগণ তোমাদের ভাই। যদিও আল্লাহ তাদের তোমাদের অধিনস্ত করেছেন। সুতরাং যে তার ভাইকে অধীন হিসেবে পায় সে যেন তাকে তাই খেতে দেয় যা &#8220;তোমাদের কর্মচারীগণ তোমাদের ভাই। যদিও আল্লাহ তাদের তোমাদের অধিনস্ত সে নিজে খায়, এবং তাই পরতে দেয়, যা সে নিজে পরিধান করে।&#8221;(৪০)</strong></p>
<p>সুতরাং ন্যায্য মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হতে পারবে না এবং এর কাক্সিক্ষত মান আদর্শ মজুরির যথাসম্ভব কাছাকাছি হবে যাতে করে আয়ের বৈষম্য যতটা সম্ভব কমানো সুতরাং ন্যায্য মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হতে পারবে না এবং এর কাঙ্ক্ষিত মান যায়। এর ফলে শ্রমিক ও মালিকের জীবনমানের মধ্যেকার যে ব্যবধান, যা সমাজে দুটি ভিন্ন শ্রেণির সৃষ্টি করে এবং ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা নষ্ট হয়ে যায়, যা মুসলিম সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি তাতেও একটা সেতুবন্ধন রচিত হয়। উপর্যুক্ত আলোচনার সারমর্ম হলো &#8216;ন্যূনতম&#8217; এবং &#8216;আদর্শ&#8217; এদুটি সীমারেখার মধ্যে চাহিদা (demand) এবং যোগানের (supply) এর মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা, মসলিম সমাজের আখলাকী অবস্থান, এবং রাষ্ট্রের বৈধ আইনের ভিত্তিতে শ্রমিক/কর্মচারীর প্রকৃত মজুরি নির্ধারিত হবে।</p>
<p>ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং আদর্শ মজুরিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ইসলাম এ বিষয়েও জোর দিয়েছে যে, শ্রমিকদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো যাবে না, যাতে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ে বা সে তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে না পারে।(৪১) যদি তাদেরকে সাধ্যের চেয়ে বেশি কোনো কাজ করতে হয় তাহলে অবশ্যই পর্যাপ্ত সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সে অতিরিক্ত চাপ না নিয়েই কাজটি করতে পারে। ইতোপূর্বে শ্রমিকদের ভাই হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে রাসূল (স.) আরও বলেছেন, &#8220;&#8230;এবং তাদের উপর তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিও না। যদি সেটা দিয়ে থাকো, তাহলে তাদের সাহায্য করো। &#8220;(৪২)</p>
<p>এই হাদীস থেকে ইসলামী মূলনীতি অনুযায়ী সর্বাধিক শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্প ঝুঁকির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন এর প্রত্যেকটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নির্ধারণ করা সম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মালিকের কাছ থেকে এসব আচরণ নির্ধারণের করার পাশাপাশি আদালতের স্বার্থে ইসলাম কর্মচারীর উপরও কিছু নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করেছে। প্রথম কর্তব্য হলো, নিজের সর্বোচ্চ যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এবং যথাযথ গুরুত্ব ও সচেতনতার সাথে যত্ন দিয়ে কাজ করা। রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, &#8220;আল্লাহ তোমাদের উপর কর্তব্যপরায়ণতাকে ফরয করেছেন&#8221;(৪৩) এবং &#8220;এবং তিনি চান যে তোমরা যখন কোনো কাজ করো, সেটি যথাযথভাবে সম্পাদন করো।&#8221;(৪৪)</p>
<p>সুতরাং সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্য যার উপর ইসলাম এতটা জোর দিয়েছে সেটি নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই কর্মচারীদেরও কর্মদক্ষ হতে হবে। অন্য একটি ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূল (স.) বলেন, <strong>“যে কর্মচারী একনিষ্ঠভাবে আল্লাহমুখী হবার পাশাপাশি, তার মালিকের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ দায়িত্ব এবং আনুগত্যের সাথে সম্পন্ন করে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। &#8220;</strong>(৪৫)</p>
<p>কর্মচারীদের দ্বিতীয় কর্তব্য হলো, বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন হওয়া। কোরআনের ভাষ্যমতে, শ্রেষ্ঠ কর্মচারী সে যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সৎ। (আল কোরআন, ২৮ : ২৬)। এবং রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;যখন কাউকে কোনো কাজের জন্য নিযুক্ত করা হয় এবং তার বিনিময়ে তার জীবিকা সরবরাহ করা হয়, তখন এর চেয়ে বাড়তি যা কিছু সে অর্জন করে তাই তার জন্য অন্যায়/হারাম।&#8221;</strong>(৪৬)</p>
<p>অতএব, মালিকের উপর অনেকগুলো দায়িত্ব অর্পণ করার পাশাপাশি ইসলাম শ্রমিকের কাছেও তার কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং বিশ্বস্ততা প্রত্যাশা করে। এবং এর লক্ষ্য হলো যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলিতে শ্রমিক এবং মালিক উভয়ের জন্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩. সম্পদের ইনসাফপূর্ণ বণ্টন:</strong></h5>
<p>ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুবিচারের ক্ষেত্রে ইসলামের অনন্য এবং প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও প্রাণসত্তার সাথে আয় ও সম্পদের অন্যায় বণ্টন খাপ খায় না। বরং ইসলাম সারা পৃথিবীতে যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ধন-সম্পদের অন্যায় বণ্টনের ফলে তা কেবল ধ্বংসই হয়। এছাড়াও, কোরআনের বর্ণনামতে যেহেতু পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ &#8220;আল্লাহর পক্ষ থেকে সমগ্র মানবতার জন্য উপহারস্বরূপ।&#8221; (আল কোরআন, ২: ২৯)। তাই এ সম্পদ কিছু ব্যক্তির মধ্যে পুঞ্জিভূত থাকার কোনো মানে হয় না। তাই ইসলাম ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের উপর জোর দেয় এবং ইসলামী ব্যবস্থার অধীনে আয় ও সম্পদের একটি পুনঃবণ্টননীতি প্রণয়ন করে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মানবিক এবং সম্মানজনক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত হয়। মূলত এর মাধ্যমে ইসলাম &#8220;পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা হিসেবে&#8221; (আল কোরআন, ২: ৩০) মানুষের মর্যাদাকে সবকিছুর উপরে সমুন্নত করতে চায়। কোনো মুসলিম সমাজ যদি এই রকম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি তার ধারণ করা নামের অযোগ্য বলে গণ্য হবে। <strong>যেমনটা রাসূল (স.) বলেছেন, &#8220;সে প্রকৃত মুসলিম নয়, যে পেট পুরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।&#8221;(৪৭)</strong></p>
<p>ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) এক জনসভায় ইসলামের আদালতপূর্ণ পুনঃবণ্টন নীতির ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, &#8220;সমাজের সম্পদে প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার রয়েছে। এমনকি আমি নিজেও এর চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারবো না। আল্লাহ যদি আমাদেরকে হায়াত দান করেন, তাহলে আমরা শীঘ্রই দেখতে পাবো যে, এমনকি সান&#8217;আ পর্বতের পাদদেশে একজন রাখালও তার ন্যায্য অংশ লাভ করবে। &#8220;(৪৮)</p>
<p>খলীফা আলী (রা.) এই বিষয়ে জোর দিতেন যে, &#8220;আল্লাহ ধনীর জন্য এটা বাধ্যতামূলক করেছেন যে সে দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ করবে। যদি দরিদ্ররা ক্ষুধার্ত অথবা পোশাকহীন বা দুর্দশার মধ্যে থাকে, তার মানে হলো ধনীরা গরীবকে তার অংশ থেকে বঞ্চিত করেছে। অতএব, আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং শান্তি দিবেন।&#8221;(৪৯) ফিকহবিদগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দরিদ্রদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের দায়িত্ব, এবং বিশেষ করে এ দায়িত্ব ধনীদের উপর ন্যস্ত। যদি স্বচ্ছল ব্যক্তিরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে রাষ্ট্র তাদের এটি করতে বাধ্য করতে পারবে।(৫০)</p>
<p>ইসলামের পুনঃবণ্টন ব্যবস্থা তিন ধাপে বিভক্ত। প্রথমত, ইসলামী ব্যবস্থায় বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তার ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, যাকাতের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ গরীবের (যারা কাজ করতে অক্ষম অথবা দাস) মধ্যে পুনঃবণ্টন করা। যাতে কোরআনের এ আয়াতের সত্যতা কায়েম হয়, &#8220;সম্পদ তোমাদের ধনীদের মধ্যেই পুঞ্জিভূত না থাকে।&#8221; (আল কোরআন, ৫৯ঃ ৭)। তৃতীয়ত, মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মিরাসের সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন যা সমাজে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনকে শক্তিশালী ভিত এর উপর স্থাপন করে।</p>
<p><strong>ইসলামের এই ইনসাফপূর্ণ বণ্টননীতি এবং অর্থনৈতিক সুবিচারের অর্থ এই নয় যে, সমাজে যার অবদান যাই হোক না কেন প্রত্যেকে সম্পদের সমান অংশ লাভ করবে। কেননা, সমাজে সকল মানুষের চরিত্র, সক্ষমতা এবং সমাজের প্রতি অবদান সবার সমান নয়। তাই ইসলাম যাকাতের মাধ্যমে সকল মানুষের জন্য জীবনযাত্রার সুষম মান নিশ্চিত করার পর প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও সমাজে তার অবদান অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়াকে সমর্থন করে।</strong> ইসলাম এই ইনসাফপূর্ণ বণ্টননীতিতে এতটাই জোর দিয়েছে যে, কোনো কোনো মুসলমান মনে করে যে, ইসলাম সম্পদের সমবণ্টনের কথা বলেছে। রাসূলের অন্যতম সাহাবী আবু যর (রা.) এই মত পোষণ করতেন যে, একজন মুসলিমের জন্য তার পরিবারের ভরণপোষণের অতিরিক্ত সম্পদ রাখা জায়েয নয়। কিন্ত রাসূল (স.)-এর অধিকাংশ সাহাবীই তার এই চরমপন্থার সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।(৫২) তবে, আবু যর (রা.) ও আয়ের সমবন্টনের পক্ষে ছিলেন না, বরং তিনি জমাকৃত সম্পদের সমবণ্টনের পক্ষে ছিলেন। অর্থাৎ, তার মতে ব্যক্তির নিজের প্রকৃত ব্যায়ের পর উদ্বৃত্ত সম্পদ সে তার দারিদ্র্য-পীড়িত ভাইদের কল্যাণে ব্যয় করবে। ইনসাফপূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থার পক্ষাবলম্বন সত্ত্বেও, আলেমগণ সকলে এ বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, একজন মুসলিম ন্যায়সংগত উপায়ে উপার্জন করে, এবং তার আয় ও সম্পদ থেকে যাকাত আদায় ও অন্যান্য ভূমিকার মাধ্যমে সমাজের প্রতি তার ফরয দায়িত্ব পালন করার পরও তার ভাইয়ের কল্যাণে আরো সম্পদ ব্যয় করার মধ্যে কোনো বাধা নেই। (৫৩) প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী ব্যবস্থার আলোকে যদি উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম মেনে চলা হয়, শ্রমিক এবং মজুরের মধ্যে আদালতপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়, সম্পদ ও আয় বণ্টনের ইনসাফপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় এবং ইসলামের মিরাস ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তাহলে মুসলিম সমাজে আয় ও সম্পদের স্কুল অসাম্য বিদ্যমান থাকা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>৪. সামাজিক অগ্রগতির সাপেক্ষে ব্যক্তি স্বাধীনতা:</h5>
<p>ইসলামী মূল্যবোধের অন্যতম স্তম্ভ হলো এই বিশ্বাস যে, মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি এবং সে আল্লাহ ছাড়া আর কারও মুখাপেক্ষী নয়। (আল কোরআন, ১৩: ৩৬, ৩১: ২২) এটি ইসলামে মানুষকে সব ধরণের জিঞ্জির থেকে মুক্তির অনন্য দলীল। কোরআন রাসূলের (স.) নবুয়তী মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে &#8220;মানুষের গলা থেকে সকল প্রকার দাসত্বের শৃঙ্খল খুলে ফেলা&#8221;-কে। (আল কোরআন, ৭: ১৫৭) এটি ইসলামের সেই রূহ যা খলীফা উমরকে (রা.) এই কথা বলতে প্রবৃত্ত করেছে যে, &#8220;তোমরা মানুষকে দাস বানাচ্ছো, অথচ তার মা তাকে স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন।&#8221;(৫৪) শাফেয়ী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্যেও এই একই প্রাণসত্তার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় যখন তিনি বলেন, &#8220;আল্লাহ তোমাকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন, তাই কখনো পরাধীন হয়ো না।&#8221;(৫৫)</p>
<p>যেহেতু মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাই কারও, এমনকি রাষ্ট্রেরও তার গলায় পরাধীনতার জিঞ্জির পরাবার অধিকার নেই। ফিকহবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, এবং মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির উপর কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করা যাবে না। <strong>হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে বলেন, &#8220;একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক এবং মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির উপর কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করা যাবে না, এমনকি যদি সে ব্যক্তিগত ক্ষতি, যেমন- সে কোনো লাভ ছাড়া বেহিসাবে অর্থ ব্যয় করতে থাকে।&#8221;</strong> এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার মানে হলো তার মনুষ্যত্বের অবমাননা করে তাকে পশু জ্ঞান করা। এর মাধ্যমে যে ক্ষতি হয়, তার ঐ সম্পদের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি। এবং একটা ছোট ক্ষতির মোকাবেলায় বড় ক্ষতিকে সমর্থন করা যায় না।(৫৬)</p>
<p>এই মতদ্বৈধতা তখনি কার্যকর হয়, যখন কোনো ব্যক্তি ইসলামের সীমারেখার মধ্যে থেকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের ক্ষতি সাধন করে থাকে। কিন্তু যদি কেউ অন্যের কোনো ক্ষতি করে থাকে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে বাধা দিতে হবে এবং এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে কোনো ভিন্নমত নেই। ইমাম আবু হানিফার ভাষায়, &#8220;একজন অদক্ষ চিকিৎসক, একজন দায়িত্বহীন বিচারক, অথবা একজন দেউলিয়া নিয়োগকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করো, কেননা, এর মাধ্যমে ছোট ক্ষতির বিপরীতে বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারবে।&#8221;(৫৭) ইসলামে সামাজিক উন্নতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রাথমিক গুরুত্ব সত্ত্বেও এটি সামাজিক দায়বদ্ধতামুক্ত নয়।</p>
<p>অপরাপর ব্যক্তি এবং সমাজের সাথে ব্যক্তির অধিকারকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দাঁড় করানোর জন্য ফকীহগণ নিম্নোক্ত মূলনীতিগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন(৫৮):</p>
<ul>
<li>ব্যক্তিস্বার্থের উপর সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।</li>
<li>যদিও &#8216;দুর্দশা লাঘব করা&#8217; এবং &#8216;কল্যাণের প্রসার&#8217; দুটিই শরীয়তের উদ্দেশ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত, প্রথমটির উপর দ্বিতীয়টি প্রাধান্য পাবে।</li>
<li>ছোট ক্ষতির মোকাবেলায় বড় ক্ষতিকে সমর্থন দেয়া যাবে না। অথবা ক্ষুদ্রতর কল্যাণের জন্য বৃহত্তর কল্যাণ ত্যাগ করা যাবে না। বিপরীতে, বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে ছোট ক্ষতি অথবা বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে ক্ষুদ্রতর কল্যাণ ত্যাগ করা অনুমোদনযোগ্য।</li>
</ul>
<p>কাজেই, ইসলামের নৈতিক সীমার মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতা ততক্ষণ প্রযোজ্য হবে যতক্ষণ এটি সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী না হয় এবং অন্যের অধিকার হরণ করা না হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:</strong></p>
<p>ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্য নিয়ে উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের দৃঢ় ভিত্তির উপর বস্তুগত উন্নতিকে স্থাপন করার মধ্য দিয়ে ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের পাটাতন নির্মিত হয়েছে। আধ্যাত্মিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র থেকে ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায়, এর মৌলিক কাঠামোও এই দুটি ব্যবস্থা থেকে আলাদা। তাই ইসলামের সাথে এই দুটি মতবাদ এবং ব্যবস্থার সাদৃশ্য খুঁজতে গেলে তা কেবল তিনটি ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণায়-ই পর্যবসিত করবে। তাছাড়া, ইসলামী ব্যবস্থা নিরন্তর মানবীয় ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, আয়ের ন্যায্য বণ্টন এবং সামজিক অগ্রগতির সাথে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি নিবেদিত। এই নিবেদন অবশ্যই আধাত্মিকতা কেন্দ্রিক এবং ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কারুকার্যে চমৎকারভাবে সজ্জিত। অন্যদিকে আধুনিক পুঁজিবাদের ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে এককেন্দ্রিক দর্শন। এর সামগ্রিক দর্শন সামজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয়ের ন্যায়সংগত বন্টনের লক্ষ্যে নির্মিত হয়নি এবং সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আধ্যাত্মিক প্রাণসত্তার বদলে এটি দলীয় স্বার্থচিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত হয়। আবার সমাজতন্ত্র যদিও দাবি করে যে, এটি একটি মৌলিক দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু, একদিকে মানবীয় ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতি উদাসীনতা এবং আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর স্থাপিত আদালত, নিরপেক্ষ বিচার ও ন্যায়পরায়ণতার অভাব, অন্যদিকে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অস্বীকারের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা এবং আত্মপরিচয়ের প্রতি অবমাননার ফলে তাদের এই দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।</p>
<p>ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি ইসলামের অঙ্গীকার এটিকে পরিষ্কারভাবে সমাজতন্ত্র অথবা অন্য যেকোনো মতবাদ ও ব্যবস্থা থেকে পৃথক করে তোলে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক সম্মতি, যা ব্যবসায়িক লেনদেনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত, তা মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান সকল ধারায় অবিসংবাদিতভাবে স্বীকৃত।(৫৯)<strong> “হে ঈমানদারগণ! কখনো একে অন্যের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। ব্যবসায়িক লেনদেন করো পারস্পরিক সম্পত্তির ভিত্তিতে” (আল কোরআন, ৪: ২৯)।</strong> কোরআনের এ আয়াত থেকেই মূলত এই মূলনীতিটি এসেছে। রাসূলুল্লাহ (স.) এরও এরকম একটি হাদীস আছে, &#8220;মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দাও। কেননা, আল্লাহ মানুষকে একে অন্যের মাধ্যমে রিযিক দিয়ে থাকেন।&#8221;(৬০) জীবন এবং স্বাধীনতার এই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে গ্রুপের অধীনে থাকে যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে কেউ পারে যদি উৎপাদন ও বণ্টনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যক্তি মালিকানা অথবা স্বেচ্ছাসেবী কেনাকাটা করতে পারে। ইসলাম এন্টারপ্রাইজের পাশাপাশি উদ্যোক্তা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকে সামনে এনেছে যা সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক সম্পত্তি অর্জন ও হস্তান্তর, পণ্যদ্রব্য বিক্রয় ও ব্যবহার, এবং যাকাত ব্যবস্থা ও মিরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট মূলনীতিগুলো কোরআন, সুন্নত ও ফিকহের কিতাবাদীতে বিস্তৃত আলোচিত হয়েছে।</p>
<p>দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ইসলামের ইতিহাসে বরাবরই এই মূলনীতিগুলো সার্বজনীনভাবে সমুন্নত ছিলো এবং ব্যতিক্রমগুলোকে ইসলামের মূলধারার সাথে কখনোই মেলানো যাবে না এবং এগুলো ইসলামী ব্যবস্থার নীতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।</p>
<p>সুসংগঠিত বাজার ব্যবস্থা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি স্বতন্ত্র দিক। কেননা, একদিকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এটি ছাড়া অকার্যকর হয়ে পড়বে, অন্যদিকে এটি ভোক্তাদের চাহিদা ও পছন্দের পণ্য ও দাম সম্পর্কে মত প্রকাশের এবং উদ্যোক্তাদের স্বাধীনভাবে নিজস্ব পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ করে করে দেয়।</p>
<p>ইসলাম মুনাফা লাভের প্রেরণাকে সমর্থন করে, যেটি যেকোনো ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে কোনো এন্টারপ্রাইজ পরিচালনার পূর্বশর্ত। চার মাযহাবের উপর ফিকহী গবেষণার জন্য বিখ্যাত আলেম আল-জাযিরী বলেন, &#8220;ইসলাম ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে পরস্পরের লাভবান হওয়াকে অনুমোদন করে।&#8221; যদি ফকীহগণ ক্রেতা এবং বিক্রেতার মুনাফা অর্জনকে নিষিদ্ধ করে দেয় কিংবা একেবারেই কোনো সীমা বেঁধে না দেয়-দুটোই ইনসাফহীনতায় পর্যবসিত হতে পারে। তাই তিনি এর মধ্যে সীমারেখা আরোপ করেন। এছাড়াও তিনি প্রতারণা, ভণ্ডামী এবং কোনো পণ্য অন্যায়ভাবে ভোগ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। (৬১)</p>
<p>এই বিধানের কারণ হলো, মুনাফা লাভের আগ্রহ আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার প্রেরণা যোগায়। সম্পদের কার্যকর বণ্টন যেকোনো সতেজ-সুস্থ সমাজের চালিকাশক্তি। কিন্তু, মুনাফাকে একটি উপকরণের পরিবর্তে মৌলিক উদ্দেশ্য প্রতিপন্ন করার চিন্তা থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধির সৃষ্টি হয়। তাই ইসলাম এক্ষেত্রে কিছু নৈতিক সীমা বেঁধে দিয়েছে যেন মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের বাসনা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী না হয় এবং ইসলামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত না করে।</p>
<p><strong>এন্টারপ্রাইজ ও ব্যক্তিগত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং মুনাফা লাভকে অনুমোদন দেবার মধ্য দিয়ে ইসলামী অর্থনীতি এন্টারপ্রাইজের স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদের সদৃশ হয়ে যায় না। দুটোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান দুটো প্রধান কারণে। প্রথমত, ইসলামী ব্যবস্থায় যদিও সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত, তবু এটি বান্দার কাছে আল্লাহপ্রদত্ত আমানত। কারণ আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছে এগুলো আমানত। </strong></p>
<p>কোরআনের ভাষ্যমতে-</p>
<p>&#8220;আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর অধীন।&#8221; (২: ২৮৪)</p>
<p>&#8220;(হে নবী।) এদের জিজ্ঞেস করো, এ যমীন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কার (মালিকানাধীন)? তারা বলবে, এ সবকিছুই আল্লাহর।&#8221; (২৩:৮৪-৮৫)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে দান করো।&#8221; (২৪:৩৩)</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, মানুষ যেহেতু পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা এবং সে যে সম্পত্তির মালিক তা তার কাছে আল্লাহর দেওয়া আমানত, তাই সে আমানতের শর্তাবলি মানতে বাধ্য।</strong> আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে সে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধের সীমারেখা, বিশেষ করে হালাল-হারাম, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, সামগ্রিক কল্যাণকামিতার মধ্যে আবদ্ধ। তাই সে যে সম্পদ উপার্জন করবে তা হালাল উপায়ে করতে হবে এবং এটিকে সে উদ্দেশ্যে ব্যয় করতে হবে, যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন। রাসূল (স.) ইরশাদ করেন, &#8220;এই সম্পদ নিঃসন্দেহে তাজা এবং সুমিষ্ট। কিন্তু যে এটিকে ন্যায়সংগতভাবে অর্জন করে, তার জন্য। আর যে এটিকে অন্যায় পন্থায় অর্জন করে, তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতো যে খেতেই থাকে, কিন্তু কখনো তৃপ্ত হয় না। (৬২)</p>
<p>এখন, এই দুটো বিষয় কী পার্থক্যের সৃষ্টি করে? এটি পরিষ্কার হবে যদি পুঁজিবাদী অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থা নিয়ে একটু আলোচনা করা যায়।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থাকে গণভোটের সাথে তুলনা করা যায় যেখানে একজন ব্যক্তি কর্তৃক ব্যয়কৃত প্রতিটি মুদ্রা একেকটি ব্যালট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং সকলের সব ব্যালটের ভিত্তিতে মোট জাতীয় সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় হবে। যদি দুধের পরিবর্তে লিকারের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তার কারণ হলো, লিকারের চাহিদা জনগণের মধ্যে বেশি। তাই জাতীয় সম্পদ থেকে লিকার উৎপাদনে ব্যয়ের অংশ বেশি। এভাবে মূল্য ব্যবস্থায়, প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম (optimum) বণ্টন নিশ্চিত হয়। বাজার ব্যবস্থা এখানে নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে আসীন হয় এবং কেবলমাত্র ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখনো নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে না। ইসলামে সম্পদের বরাদ্দ তখনই সর্বোত্তম হিসেবে গণ্য হয়, যদি তা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী না হয় এবং ভোক্তার পছন্দ অনুযায়ী হয়। প্রকৃত ইসলামী সমাজে এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা নেই এবং রাষ্ট্র সেখানে নিষ্ক্রিয় দর্শক হতে পারে না। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র তার জনগণকে ইসলামী মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে থাকে, ফলে তাদের পছন্দও সে আদলে হয়ে থাকে এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যের আলোকে পরিচালনা করে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে সম্পদের বণ্টন ইসলামী আদর্শের আলোকে হচ্ছে কিনা এ রায় কে দিবে? এটি কোনো গীর্জার হায়ারার্কির কর্তৃত্বে হবে না, কেননা ইসলাম এরকম কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। তাই ইসলামের আবহমান রাজনৈতিক আদর্শ অনুসারে গণতান্ত্রিক পন্থায় যেকোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> যেহেতু প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় মুদ্রাকে ব্যালটের সাথে তুলনা করা হয়, তাই ব্যক্তিভেদে সবার চাহিদা এবং জরুরতকে মুদ্রার মূল্যে বিবেচনা করা হয়। যদি দুজন ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবার জন্য সমান অর্থব্যয়ে প্রস্তুত থাকে, তবে ধরে নেওয়া হয় তাদের দুজনের কাছে এই জিনিসটির চাহিদা বা জরুরত একই। এমনকি এ ধরণের তুলনা যদি সম্ভবপর হয়ও, তাহলে মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় সম্পদের কাঙ্ক্ষিত বণ্টনের জন্য আয়ের সমবণ্টন বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। যদি তা না থাকে, তাহলে এধরণের বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদিত সম্পদের বণ্টন অধিকাংশ ভোক্তার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। এর ফলে একটি পুঁজিপতি উচ্চবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হবে যারা সংখ্যায় কম হওয়া সত্তেও তাদের হাতে জাতীয় সম্পদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুঞ্জিভূত থাকবে। এবং তথাকথিত ভোটের ওয়েট (weight) দিয়ে তারা দুর্লভ জাতীয় সম্পদগুলোকে সামাজিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরবে। ফলশ্রুতিতে জাতীয় সম্পদের যে বণ্টন হবে তাও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। অন্যদিকে ইসলামী অর্থনীতিতে মুদ্রাব্যবস্থা ব্যক্তিগত ভোটের মূল্যমানে নির্ধারিত হওয়ার পরিবর্তে কোনো একটি পণ্য বা সেবার জন্য সর্বমোট কতটি ভোট বিদ্যমান তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সুতরাং, এখানে সম্পদের প্রত্যাশিত বণ্টন নির্ধারণ করার পূর্বশর্ত হলো, আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, যা ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> একচেটিয়া (monopoly) ও মনোপসনি (monopsony) বাজার ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে, বা এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যাতে পণ্যের দামে (price) এর সঠিক খরচ (cost) ও উপকারিতা প্রতিফলিত হয় না। পণ্যের দাম তার সুযোগ ব্যয় থেকে কম-বেশি হওয়ার কারণ শুধু এই নয় যে, উদ্যোক্তার পারিশ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় কম বেশি হতে পারে। তার কাজের সামাজিক মূল্যমান ও উপকারিতাকে অবজ্ঞা করার কারণেও এটি ঘটতে পারে। অন্যদিকে ইসলামে সামাজিক অগ্রগতির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। যদিও মূল্য ব্যবস্থার আত্ম-সংশোধনের প্রবণতা বিদ্যমান যার ফলে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক স্বার্থের দূরত্ব দূর হওয়া সম্ভব, কিন্তু কার্যকারিতার (operational) ত্রুটি এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সীমিত স্বাধীনতার জন্য এটি অসহনীয় দীর্ঘ সময় নেয়। এই পরিস্থিতিতে কোনো একটি উন্নয়নমূলক সরকারব্যবস্থার নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনা ব্যতীত এই বাজার ব্যবস্থাটি কখনো সম্পদের সর্বোত্তম বণ্টন (optimum allocation) নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না।</p>
<p><strong>চতুর্থত,</strong> পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তি তার পণ্যের প্রাথমিক মালিক, তাই এগুলো দিয়ে সে যা খুশি তাই করতে পারে। নৈতিক কোনো সীমারেখা না থাকায়, সে চাইলে মূল্যবৃদ্ধির জন্য পণ্যকে পুড়িয়ে ফেলা বা সমুদ্রে নিক্ষেপ করার মতো জঘন্য কাজও করতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থায় যেহেতু সব সম্পদ আল্লাহর দেয়া আমানতস্বরূপ, তাই এটি একটি মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। জান-মালের ক্ষতি সাধনকে কোরআনে দুর্নীতি ও পাপের সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। (২ : ২০৫) এটি সে আয়াত, যা হযরত আবু বকরকে (রা.) তার সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে যুদ্ধে প্রেরণের সময় অন্যায়ভাবে কাউকে হত্য না করতে এবং এমনকি শত্রুপক্ষের ভূমিতেও কোনো শস্যক্ষেত ও পশুপাখির ক্ষতি না করার নসিহত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।(৬৩) যদি যুদ্ধক্ষেত্রেই এটি অনুমোদিত না হয়, তবে স্বাভাবিক সময়ে বা মূল্যবৃদ্ধির জন্য এধরণের কাজ গ্রহণযোগ্য হবার তো প্রশ্নই আসে না।</p>
<p><strong>পঞ্চমত,</strong> এমনকি বাজার পরিচালনায় সুস্থ প্রতিযোগিতার শর্তেও এটি বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা অচলাবস্থা মোকাবেলার জন্য কিংবা পণ্যদ্রব্যের ন্যায্য বণ্টনের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। তাই, এর জন্য সুনির্দিষ্ট আদর্শিক লক্ষ্য ভিত্তিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।</p>
<p><strong>ষষ্ঠ বিষয় হলো,</strong> এরকম প্রতিযোগিতা নির্ভর বাজারে সফলতার রাস্তাগুলো অনেক সময় নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয়ের ন্যায্য বন্টনের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকারের তত্ত্বাবধানে না থাকলে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অযোগ্যরা জায়গা পেয়ে যেতে পারে, আবার বিপরীতে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজগুলো পেছনে পড়ে থাকতে পারে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।</p>
<p>অতএব, ইসলাম যদিও একটি বাজার ব্যবস্থার রূপরেখা আমাদের দিয়ে দিয়েছে, তথাপি এটি অপরিবর্তনীয় চিরস্থায়ী কোনো কিছু নয়। মূলত এটি হলো একটি ব্যবস্থা যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা, বিশেষ করে ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটি। সেজন্য ইসলামী আদর্শের আলোকে প্রয়োজন ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বাজারব্যবস্থাকে সাজিয়ে নিতে হবে। ইসলাম এক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে সরকার এককভাবে কখনো অর্থনৈতিক সুবিচার ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তিতে একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে না, হয়তো কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করতে সক্ষম হবে। অন্যান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দূর করতে হলে আখলাকী দর্শনকে সমাজের গভীরে প্রোথিত হতে হবে। যাকে সজ্জিত হতে হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, সামাজিক উন্নয়ন এবং আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের আদর্শে। সুতরাং, পুঁজিবাদ যদিও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে এটিকে আলাদা করেছে সেকুলারিজম; এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার ও জনকল্যাণের স্বার্থে একটি সুস্পষ্ট আখলাকী দর্শনের অনুপস্থিতি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> নাজিয়া তাসনীম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা-</p>
<p>১. দ্রষ্টব্য: সূরা মায়েদার তাফসীর (০৫:৮৭), কাশশাফ, বৈরুত ১৯৪৭, খণ্ড ১. পৃ. ৬৭। ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, কায়রো, খণ্ড ২. পৃষ্ঠা. ৮৭-৮৮। আরও দেখুন, বুখারী, কায়রো, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৯-৫০; মুসলিম, কায়রো ১৯৫৫, খণ্ড ২, পৃ. ৮১২-১৮: দারেমী, দামেশক ১৩৪৯ হিজরী, খণ্ড ২. পৃ. ১৩৩।</p>
<p>২. কোরআন ২:১৭২, ৬:১৪২, ৭:৩১ এবং ১৬০, ১৬:১১৪, ২০:৮১, ২৩:৫১, ৩৪:১৫, ৬৭:১৫</p>
<p>৩. ইবনে মাজাহ, কায়রো, ১৯৫২. খণ্ড ২, পৃ. ৭২৭:২১৪৮</p>
<p>৪. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃঃ ১২৮; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১১৮৯:১২, এবং তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃ. ৬৬৬:১৩৮-২</p>
<p>৫. বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত, দামেশক, ১৩৮১ হিজরী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫৮:৫২০৭</p>
<p>৬. দ্রঃ &#8220;তোমরা কি দেখো না, নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন? আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ কোনো জ্ঞান, কোনো পথনির্দেশ বা কোনো দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে&#8221;। সূরা লোকমান, (৩১:২০); এছাড়া, কোরআনে অনুরূপ আরো বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, দ্রঃ ১৪:৩২-৩৩, ১৬:১২-১৪; ২২; ৬৫ এবং ৪৫:১২</p>
<p>৭. বুখারী, খণ্ড ৭, পৃ. ১৫৮; ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১১৩৮:৩৪৩৯</p>
<p>৮. &#8220;কারো নিকট ভিক্ষা করো না&#8221;, আবু দাউদ, কায়রো ১৯৫২, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮২; উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে অধিকতর উত্তম, বুখারী, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৩; নাসায়ী, খণ্ড ৫, পৃ. ৪৫-৪৬। এছাড়া দ্রঃ ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৩:২১৩৮; নাসায়ী, কায়রো ১৯৬৪, খণ্ড ৭, পৃ. ২১২</p>
<p>১. দ্র: আবু যাহরাহ, উসূল আল ফিকহ, দামেশক ১৯৫৭, পৃ. ৩৫৫</p>
<p>১০. আবু হামিদ আল গাজালী, আল মুসতাসফা, কায়রো ১৯৩৭, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯-৪০</p>
<p>১১. ইবনুল কাইয়্যিম, ই&#8217;লামুল মুয়াক্কিইয়ীন, কায়রো ১৯৫৫</p>
<p>১২. ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৬৭</p>
<p>১৩. ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৫, ২১৪৪</p>
<p>১৪. দ্রঃ কোরআন (৪:৭৭, ২৯:৬৪, ৫৭:২০-২১); ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৭৮:৪১১৪</p>
<p>১৫. বুখারী, পৃ. ১১৩:৩০১</p>
<p>১৬. বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত, দামেশক, ১৩৮১ হিজরী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫৯:৫২১৩</p>
<p>১৭. মুসনাদে আহমাদ, মিশকাতে উদ্ধৃত, খণ্ড ২, পৃ. ৬৩:১:৫১৭৯</p>
<p>১৮. ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৫:২১৪৩</p>
<p>১৯. ইবনে আসাকিরের বরাতে উদ্ধৃত, সামান্য শব্দভেদে একই রেওয়ায়েত উল্লেখ হয়েছে, সুয়ুতীর জামি আস সাগীর, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৫</p>
<p>২০. তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৮, পৃ. ৮৪</p>
<p>২১. ইবনে কাসীর, তাফসীর, খণ্ড ৪, পৃ. ২১৮, দেখুন-সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতের তাফসীর।</p>
<p>২২. শাতিবী, আল মুওয়াফিকাত ফি উসূল আশ শারীয়াহ, কায়রো, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৪: বুখারী, মুসলিম এবং নাসায়ীর বরাতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>২৩. আল কোরআন, ৩৩:৫, এবং ৪৯:১০</p>
<p>২৪. মিশকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৬১৩:৪৯৯৮, বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত।</p>
<p>২৫. প্রাগুক্ত, ৬০৮:৪৯৬৯, আবু দাউদ ও তিরমিযীর বরাতে উল্লিখিত।</p>
<p>২৬. বুখারী, খণ্ড ৮, পৃ. ১২; মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৯৯, একইসাথে দেখুন ৬৫ এবং ৬৭নং হাদীস।</p>
<p>২৭. মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৮৬:৩২</p>
<p>২৮. মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৮৭:৩৪</p>
<p>২৯. বুখারী, খণ্ড ৮, পৃ. ১৫</p>
<p>৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৯ এবং নাসায়ী, খণ্ড ৮, পৃ.৬৫</p>
<p>৩১. মুসনাদ ইমাম আলী আল রিদা, বৈরুত ১৯৬৬, পৃ. ৪৭৪</p>
<p>৩২. আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, কায়রো ১৩৬৭ হিজরী।</p>
<p>৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪ এবং ৬</p>
<p>৩৪. দেখুন, কোরআন ৮৩:১-৩</p>
<p>৩৫. মুসনাদ এবং বায়হাকীর শুআবুল ঈমানের বরাতে সুয়ূতী উদ্ধৃত করেছেন, খণ্ড ১, পৃ. ৮</p>
<p>৩৬. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ. ১১২</p>
<p>৩৭. কিছু উদ্ধৃতিতে (হাদীস অথবা অন্যান্য) &#8216;দাস&#8217;দের সাথে সম্পর্কিত হলেও অনুবাদে কর্মচারী ব্যবহার করা হয়েছে। একজন দাসের সাথেও যখন আদিল ও মানবিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সে তুলনায় একজন কর্মচারীর সাথেও অবশ্যই তার চেয়েও অধিক ভালো আচরণ করতে হবে।</p>
<p>৩৮. মালিক, মুয়াত্তা, কায়রো ১৯৫১, খণ্ড ২, পৃ. ৯৮০:৪০</p>
<p>৩৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৮১:৪২</p>
<p>৪০. বুখারী, পৃ. ১৫ এবং খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৫; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৮৩:৩৮</p>
<p>৪১. &#8220;আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তুমি ইনশাআল্লাহ আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত পাবে: (সূরা ত্বহা, ২৮:২৭), হযরত শুয়াইব (আ.) যখন মুসা (আ.) কে কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তখন এমনটা বলেছিলেন। যা যেকোনো কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি অনন্য কোরআনী উপদেশ।</p>
<p>৪২. বুখারী, খণ্ড ১. পৃ. ১৬ এবং খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৫; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৮৩:৩৮ এবং 80</p>
<p>৪৩. মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১৫৪৮:৫৭</p>
<p>৪৪. বায়হাকীর শুআবুল ঈমানের বরাতে সুয়তী উল্লেখ করেছেন, খণ্ড ১, পৃ. ৭৫</p>
<p>৪৫. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৬</p>
<p>৪৬. আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃ. ১২১</p>
<p>৪৭. বুখারী, পৃ. ৫২৪১১২</p>
<p>৪৮. হোসাইন হায়কল, উমার আল ফারুক, কায়রো ১৯৬৪, খণ্ড ২, পৃ. ২৩৩</p>
<p>৪৯. আবু উবাইদ, কিতাবুল আমওয়াল, কায়রো ১৩৫৩ হিজরী, পৃ. ৫৯৫:১৯০৯, সামান্য শব্দভেদে উল্লিখিত হয়েছে, নাহজুল বালাগা, কায়রো, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩১</p>
<p>৫০. প্রাসঙ্গিক বর্ণনার জন্য দেখুন, সিদ্দিকী, ইসলাম কা নাযারিয়ায়ে মিলকিয়াত, লাহোর ১৯৬৮, পৃ. ২৭২-৭৯</p>
<p>৫১. রাসূল (স.) যখন মুয়ায (রা.)-কে ইয়েমেনের গভর্ণর হিসেবে নিযুক্ত করেন, তখন তাকে দায়িত্বের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিলো, &#8216;মানুষকে এ কথা বোঝানো যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরজ করেছেন, যা সম্পদশালীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে, এবং দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা হবে&#8217;। দেখুন-বুখারী, খণ্ড ২, পৃ. ১২৪; তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃ. ২১:৬২৫; এবং নাসায়ী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩ এবং ৪১</p>
<p>৫২. সূরা তাওবার ৩৪ নং আয়াতের তাফসীর দেখুন, ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫২; এবং জাসসাস, আহকামুল কুরআন, কায়রো ১৯৫৭, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩০</p>
<p>৫৩.দ্র: তাফসীর ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫০-৫৩</p>
<p>৫৪. আলী আল তানতাবী ও নাজী আল তানতাবী, আখবারু উমার, দামেশক ১৯৫৯, পৃ. ২৬৮</p>
<p>৫৫. উদ্ধৃত, ইউসুফউদ্দীন, ইসলাম কি মাশি নাজরিয়াত, হায়দারাবাদ, ভারত, খণ্ড ১, পৃ. ১৪০</p>
<p>৫৬. আল হিদায়াহ, কায়রো ১৯৬৫, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮১, আরো দেখুন, জাযিরী, কিতাবুল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবাআ, কায়রো ১৯৩৮, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৯</p>
<p>৫৭. আল হিদায়াহ, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮১ এবং জাযিরী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৯</p>
<p>৫৮. এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার জন্য, দেখুন-শাতিবী, খণ্ড ২, পৃ.৩৪৮-৬৪; আবু যাহরাহ, পৃ. ৩৫০-৬৪; দাওয়ালিবী, আল মাদখাল ইলা ইলমিল উসূল আল ফিকহ, বৈরুত ১৯৬৫, পৃ. ৪৪৭-৪৯</p>
<p>৫৯. জাফিরী, খণ্ড ২, পৃ. ১৫৩-১৬৮</p>
<p>৬০. উদ্ধৃত, ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, কায়রো ১৯৬০, খণ্ড ২, পৃ. ১৬৭</p>
<p>৬১. জাফিরী, খণ্ড ২, পৃ. ২৮৩-২৮৪</p>
<p>৬২. মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৮:১২২</p>
<p>৬৩. মালিক, মুয়াত্তা, খণ্ড ২, পৃ. ৪৪৮:১০; আরও দেখুন, মাওয়ারদী, আহকামুস সুলতানিয়া, কায়রো, ১৯৬০, পৃ. ৩৪</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16080</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বই পড়ার ব্যাপারে আলেমগণের পরামর্শ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/advice-from-alims-on-reading-books/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/advice-from-alims-on-reading-books/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2025 14:33:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16050</guid>

					<description><![CDATA[জ্ঞান অর্জন করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বই পড়া। বই পড়ার ব্যাপারে আমাদের আলেমগণ বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনাসমূহ প্রদান করেছেন, যা আমাদেরকে আল্লাহর সন্তোষভাজন একজন বান্দা এবং মর্যাদাপূর্ণ ও হিকমত সম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। &#160; ১.]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>জ্ঞান অর্জন করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বই পড়া। বই পড়ার ব্যাপারে আমাদের আলেমগণ বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনাসমূহ প্রদান করেছেন, যা আমাদেরকে আল্লাহর সন্তোষভাজন একজন বান্দা এবং মর্যাদাপূর্ণ ও হিকমত সম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১. পড়া শুরু করার পূর্বে নিয়ত করো। ইমাম শাফেয়ী বলেন, <strong>“যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করতে চায়, সে জ্ঞানের বরকতে উপনীত হয়।”</strong> জ্ঞানকে শুধুমাত্র তথ্য হিসেবে নয়—জ্ঞান যেন তোমার রূপান্তর ঘটায়, বিকশিত করে এবং হাকীকতের নিকটবর্তী করে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২. অল্প করে হলেও প্রতিদিন পড়ো। ইবনে খালদুন বলেন, “জ্ঞানকে যদি ছোট ছোট অংশে গ্রহণ করা হয়, তবে সে জ্ঞান স্থায়ী হয়।” একসাথে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরে হাল ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পড়ার জন্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এটি মানস (যিহিন) ও কলবকে জাগ্রত রাখে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩. পড়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করো। ইমাম গাজ্জালী বলেন, “<strong>জ্ঞান অর্জনের জন্য সর্বাধিক উপযুক্ত সময় হলো, যখন যিহিন বা মানস সবচেয়ে শাণিত থাকে।”</strong> সে সময়টি হলো ফজরের পর ও রাতের নিরবতা।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৪. পড়ার পূর্বে নিজেকে প্রস্তুত করো। বই হাতে নেওয়ার আগে নিজের অন্তরকে ফাঁকা করো। দৈনন্দিন সমস্যা, মোবাইল ও ব্যস্ততা থেকে নিজেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত রাখো। বইয়ের দিকে রূহানী দৃষ্টিতে অগ্রসর হও—তাহলেই বইও নিজেকে তোমার সামনে মেলে ধরবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৫. মোবাইলকে এক পাশে রেখে দাও। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ভার্চুয়াল জগৎ। ইবনুল জাওযী বলেন, <strong>“মানসকে মশগুল করে রাখে এমন সব বিষয়ই অন্তরে পর্দা সৃষ্টি করে।”</strong> পড়ার সময় পুরো মনোযোগ বইয়ের দিকে রাখো।<br class="html-br" /><a href=" https://rkmri.co/5NSNee5SeA2M/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Islami-gyane-usuler-dhara-01.jpg" height="133" /></a>৬. বই পড়ার সময় হাতে কলম রাখো। বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি বলেন, <strong>“মুতালাআ মূলত লেখার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।”</strong> পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দাগ দিয়ে চিহ্নিত করো। কলম যিহিনকে গভীর করে তোলে, চিন্তাকে স্থায়িত্ব দেয়।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৭. যে অংশ বোঝা যায় না, তা পাশ কাটিয়ে যেও না। বরং সেখানে থেমে চিন্তা করো ও অনুধাবনের চেষ্টা করো। ইমাম ইবনে রুশদ বলেন, “যিহিন মূলত কষ্টের মাধ্যমে পরিপক্ব হয়।” সহজে পাওয়া জ্ঞান নয়, কষ্ট করে অর্জিত জ্ঞানই পরিবর্তন আনে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৮. একসাথে অনেকগুলো বই পড়ার পরিবর্তে একটি বই মনোযোগ দিয়ে পড়ো। অনেক বিষয়ে একসাথে পড়া যিহিনের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। যে বই হৃদয়ে গেঁথে যায়, তা শত বইয়ের চেয়েও উত্তম।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৯. বই পড়াকে রুটিনে পরিণত করো। <strong>নীরব, সুন্দর ও আলোকোজ্জ্বল একটি স্থানে পড়ার সময়কে যেন ইবাদতের মতো মনে হয়—হাকীকত এমন পরিবেশেই উদ্ভাসিত হয়।</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />১০. পড়ার সময় বইয়ের প্রতি সম্মান দেখাও। ইমাম মালেক যখন জ্ঞানের মজলিসে যেতেন, তখন সর্বোৎকৃষ্ট পোশাক পড়তেন। তুমি জ্ঞানের প্রতি যত সম্মান দেখাবে, ততই জ্ঞান তোমার প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করবে। বই রহস্যে পূর্ণ এক বন্ধু, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করো।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১১. বিষয়ভিত্তিক বই নির্বাচন করো। শুধুমাত্র জনপ্রিয় বা প্রস্তাবিত বই নয়; যে বিষয়ে তোমার জানা প্রয়োজন, সেই বিষয়ে লেখা বই পড়ো। যে বই তোমার রূহের তৃষ্ণা মেটাবে, সেই বই-ই তোমার জন্য উপযুক্ত।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১২. যিহিন ক্লান্ত বা ব্যস্ত থাকলে পড়ো না। কারণ ক্লান্ত মানসিকতা নিয়ে বইয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না। ইবনে হাযম বলেন, <strong>“জ্ঞান অর্জনকারীর প্রথম দায়িত্ব নিজের মননকে পরিশুদ্ধ করা, এরপর হাকিকতের দিকে ধাবিত হওয়া।”</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />১৩. বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করো—ফিকশন, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য ও জীবনীমূলক বই পড়ো। এতে দুনিয়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে শিখবে। জ্ঞানকে এক চোখে নয়, অনেক চোখে দেখার চেষ্টা করো।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১৪. যা পড়বে, তা অন্যকে বোঝানোর চেষ্টা করো। বুঝানোর কেউ না থাকলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বোঝাও, অথবা নিজের ডায়েরিতে লিখে রাখো। এতে স্মরণশক্তি বাড়বে ও অর্থ স্থায়িত্ব পাবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১৫. যা শিখবে তা জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করো। কেবল জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না। ইমাম আযম আবু হানিফা বলেন, <strong>“জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কাজে রূপান্তরিত হয়।”</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />১৬. তোমার নোটগুলো সংরক্ষণ করো। ভুলে যাওয়া জ্ঞানকে স্মরণে রাখার জন্য ডায়েরি রাখো। প্রতিটি লাইন হলো অতীতের ‘তুমি’র বর্তমান ‘তুমি’কে পাঠানো এক শুভেচ্ছা।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১৭. বইয়ের সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক তৈরি করো—এটি যিহিনকে গভীরতা দান করে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১৮. নিজে পড়ার জন্য মাসিক ও বাৎসরিক লক্ষ্য নির্ধারণ করো। লক্ষ্যহীনতা মানে পথ হারানো, আর পরিকল্পনা হলো বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করার চাবিকাঠি।<br class="html-br" /><br class="html-br" />১৯. প্রভাবিত করা লাইনগুলো লিখে রাখার জন্য নির্দিষ্ট ডায়েরি রাখো। একদিন সেই লাইনগুলোই তোমাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২০. লাইব্রেরি পর্যবেক্ষণ করো। যে বই আকর্ষণ করে না, তা এক পাশে রাখো—প্রতিটি বইয়ের নিজস্ব সময় আছে। সময় এলে সেই বই-ই নিজে থেকেই তোমাকে ডাক দেবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২১. পঠিত বিষয়কে আত্মস্থ করার জন্য সময়ের প্রয়োজন। <strong>ধৈর্য ধরো। জ্ঞান যিহিনে স্থান পাওয়ার পূর্বে তা হৃদয়ের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যেতে হয়।</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />২২. যেসব বই পড়তে কষ্ট হয়, সেগুলোকে ভয় পেয়ো না। কঠিন বই যিহিনকে উন্মুক্ত করে এবং রূহে গভীরতা নিয়ে আসে। সহজে পাওয়া তথ্য নয়—যে জ্ঞান কষ্ট করে অর্জিত হয়, সেটাই তোমাকে সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী করে তোলে।<br class="html-br" /><a href=" https://rkmri.co/5eomTMRAoSlM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Sunnat-O-hadis-01.jpg" height="133" /></a>২৩. পড়ার সময়কে পবিত্র মনে করো। যেমন নামাজ নির্ধারিত সময়ে আদায় করো, তেমনি পড়াশোনাও নির্ধারিত সময়ে করো। কারণ এটিও আত্মশুদ্ধির একটি পথ।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২৪. পড়াশোনার অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করো—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা বই পাঠের গ্রুপে। এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করা অন্যদেরকেও উৎসাহিত করবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২৫. বইয়ের সঙ্গে গল্প করো। বইকে কেবল জ্ঞানের উৎস হিসেবে নয়, এক বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো দেখো। তারা তো সারাক্ষণ তোমার সঙ্গেই থাকে—তাদের কথাও শুনে দেখো।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২৬. লেখকের জীবনী জানার চেষ্টা করো। এতে লেখকের উদ্দেশ্য বুঝতে পারবে এবং বইটি তোমার সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২৭. বইয়ের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করো। একসাথে পড়া, আলোচনা করা তোমাকে প্রাণবন্ত রাখবে। ইমাম শাফেয়ী বলেন, <strong>“একজন ভালো বন্ধু—জ্ঞানের অর্ধেক।”</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />২৮. নিজের জন্য একটি &#8216;বুক কর্নার&#8217; তৈরি করো। এমন একটি স্থান, যা হবে তোমার চিন্তা, ধ্যান ও তাফাক্কুরের কেন্দ্র।<br class="html-br" /><br class="html-br" />২৯. অল্প সময়ের জন্য নয়—সারাজীবন পড়ো। পড়া যেন একটি সাময়িক শখ না হয়ে ওঠে, বরং একটি জীবনধারা হয়। প্রতিটি বয়স ও অবস্থার জন্য উপযুক্ত বই আলাদা হয়ে থাকে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩০. বইয়ের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলো। যে বিষয়গুলো পড়ো, তা-ই ধীরে ধীরে তোমার চিন্তা, কথা ও আখলাক গঠন করে। তুমি যা পড়ো, তা-ই একদিন হয়ে উঠবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩১. পড়ার সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করো:<br class="html-br" /><strong>“হে আল্লাহ! এই জ্ঞানের মাধ্যমে আমার অন্তরকে আলোকিত করে দাও।”</strong><br class="html-br" />জ্ঞান এক ধরনের নূর—দোয়ার মাধ্যমে তা অন্তরে সহজে প্রবেশ করে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩২. এমন মনোযোগ সহকারে পড়ো যেন পৃথিবী থেমে যায়। যখন কেউ মনপ্রাণ দিয়ে পড়ে, তখন দুনিয়ার অন্য সবকিছু গৌণ হয়ে যায়। সেই মুহূর্তেই সত্যিকারের শেখা শুরু হয়।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৩. ভালোভাবে বুঝার জন্য মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে পড়ো। শ্রবণ তথ্যকে দ্রুত যিহিনে স্থান দিতে সাহায্য করে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৪. চোখ বুলিয়ে পড়া আর গভীর পাঠ এক নয়। ধীরে পড়ো, প্রতিটি বাক্য চিন্তা করে পড়ো। প্রতিটি শব্দ যেন মুক্তার মতো—তাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করো। ইমাম গাজ্জালী বলেন, <strong>“প্রত্যেকটি হরফ হিকমত ধারণ করে।”</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৫. কোনো কোনো বই কেবল একটি লাইনের জন্য পড়া হয়। সেই একটি লাইনই পুরো জীবনধারাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৬. যা শিখবে, কেবল নিজের মধ্যেই রাখো না—লিখে ফেলো, আলাপ- আলোচনা করো। জ্ঞান যত বেশি ভাগ করা যায়, তা তত বেশি বরকতময় হয়ে ওঠে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৭. পড়া যেন তোমাকে অহংকারী না করে তোলে। জ্ঞান বাড়লে বিনয়ও বাড়া উচিত। যে নিজেকে জানে, সে কখনোই নিজের জ্ঞানের ভারে ভেঙে পড়ে না।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৮. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পড়াকে শুধু একটি কাজ মনে না করে আত্মশুদ্ধির একটি উপায় হিসেবে দেখো। যদি তোমার নিয়ত খালেস হয় এবং দিক সঠিক হয়, তবে বই তোমাকে তোমার সীমা ছাড়িয়ে উচ্চতর মর্যাদায় নিয়ে যাবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />৩৯. প্রখ্যাত দার্শনিক মোল্লা সাদরা বলেন, “<strong>বই পড়ার উদ্দেশ্য হলো নিজেকে বইয়ের মাঝে ডুবিয়ে রাখা নয়; বরং রূহকে জাগ্রত করা। বাহ্যিক আকার থেকে অর্থের জগতে প্রবেশ করলেই আত্মা আলোকিত হয়।”</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />৪০. ইমাম গাজ্জালী বলেন, <strong>“নিঃসন্দেহে জ্ঞান একটি নূর। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করা ইবাদত; জ্ঞানের অনুসন্ধান করা জিহাদ; আর অজ্ঞকে শিক্ষা দেওয়া সদকা।”</strong><br />
<a href=" https://rkmri.co/3yyeyyNMEATM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Zubo-jiggasa-01.jpg" height="133" /></a><br />
<strong>অনুবাদ ও সংকলন:</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ।</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/advice-from-alims-on-reading-books/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16050</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইবনে খালদুন ও ইলমুল উমরান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 31 Jul 2025 15:05:38 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15971</guid>

					<description><![CDATA[&#160; এ প্রবন্ধে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, শুরুতেই তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই, ১. ইবনে খালদুনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। ২. ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরান কী? ৩. সমাজবিজ্ঞান বা Sociology কী? ৪. ইলমুল উমরান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&nbsp;</p>
<p style="text-align: left;"><strong>এ প্রবন্ধে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, শুরুতেই তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই,</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>১. ইবনে খালদুনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>২. ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরান কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৩. সমাজবিজ্ঞান বা Sociology কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৪. ইলমুল উমরান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে পারে?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৫. ইবনে খালদুন বর্তমান দুনিয়ার প্রেক্ষিতে কতটা প্রাসঙ্গিক এবং আমরা তাঁর নিকট থেকে কীভাবে উপকৃত হতে পারি?</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের সামনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, তা হলো ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় যে থিওরিগুলো দিয়েছেন, সেগুলোকে আমরা সমাজবিজ্ঞান বা Sociology নামে অভিহিত করতে পারি কিনা? এ প্রশ্নটিকে আগে সুস্পষ্ট করার জন্য বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান (Sociology) বিভাগের পাঠ্য বই হিসেবে পঠিত এন্থনি গিডেন্সের লেখা Sociology নামক বইটি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই।</p>
<p>আগে দেখা যাক এন্থনি গিডেন্স সমাজবিজ্ঞানকে (Sociology) কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে,</p>
<p>&#8220;Sociology is the scientific study of human social life, groups and societies. It is a dazzling and compelling enterprise, as its subject matter is our own behavior as social beings. The scope of sociology is extremely wide, ranging from the analysis of passing encounters between individuals on the street to the investigation of crime, international relations and global forms of terrorism.&#8221;</p>
<p><em>অর্থাৎ,  সমাজ এবং সমাজের প্রতিষ্ঠানাদির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান। সমাজের মৌলিক উপাদান এবং সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের আচরণকে বিশ্লেষণ করাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের কাজ। যার দরুণ এটি বেশ সমৃদ্ধ এবং প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। সমাজবিজ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত। যেমন, দুজন পথচারীর সাময়িক বিবাদের বিশ্লেষণ থেকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মানুষের জীবনাচরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী সময়োপযোগী আলাপন উপস্থাপন করাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের নিত্যদিনের কাজ।</em></p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর নিজের তৈরিকৃত ডিসিপ্লি­ন ইলমুল উমরানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;انه لما كانت حقيقة التاريخ انه خبر عن الإجتماع الإنساني الذي هو عمران العالم ، وما يعرض لطبيعة ذالك العمران من الأحوال&#8221;</p>
<p>&#8220;ইলমুল উমরান হলো এমন জ্ঞান যা বিশ্বজগতের উমরানের সাথে সম্পর্কিত মানুষের সমাজ এবং প্রকৃতির দাবি অনুসারে তার মধ্যে সৃষ্ট অবস্থাসমূহ এবং সে সকল অবস্থার আবশ্যিক ফলাফল হিসেবে ইতিহাস এবং ইতিহাসের হাকীকতকে বিষয়বস্তু হিসেবে গণ্য করে থাকে।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এন্থনি গিডেন্সের প্রদত্ত সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা এবং ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরানের সংজ্ঞার মধ্যে কতগুলো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।</p>
<p><strong>প্রথমত</strong><strong>, </strong>ইলমুল উমরানের মধ্যে ইতিহাস বড় একটি ফ্যাক্টর।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত</strong><strong>,</strong> ইবনে খালদুনের মতে, সমাজ বলতে মানবসমাজ বুঝানো হয়, সে ক্ষেত্রে মানুষের একত্রে বসবাসের বিষয়টি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। ইবনে খালদুন মানুষের সামাজিক জীবনকে স্বীয় ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়, বরং অত্যাবশ্যকীয় (Imperative) একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। মানবসমাজকে অত্যাবশ্যকীয় (Imperative) একটি বিষয় হিসেবে দেখার অর্থ হলো এ বিষয়টিকে একটি মেটাফিজিক্যাল বিষয় হিসেবে দেখা কিংবা অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা। তাহলে আমরা এ কথা বলতে পারি, সমাজকে অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা ইলমুল উমরানের মূল বিষয়।</p>
<p>অপরদিকে সমাজবিজ্ঞান (Sociology) সমাজকে একটি মওজুদ বা বিদ্যমান বিষয় হিসেবে দেখে। বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞান এ মওজুদ বা বিদ্যমান সমাজের বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থাকে বিশ্লেষণ করে।</p>
<blockquote><p><strong>এখানে আমরা যে মৌলিক পার্থক্যটি দেখতে পাই, তা হলো, সমাজবিজ্ঞানের (Sociology) ক্ষেত্রে ইতিহাস কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। এটি শুধুমাত্র মওজুদ বা বিদ্যমান সমাজকে ব্যাখ্যা করে।</strong></p></blockquote>
<p>অপরদিকে ইলমুল উমরান মানুষকে ও সমাজকে ঐতিহাসিক একটি অস্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করে। ঐতিহাসিক একটি অস্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করার কারণে সে অস্তিত্বটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে তার অস্তিত্বকে ধারাবাহিক রাখে সে বিষয়কে বিশ্লেষণ করে থাকে। এজন্য ইলমুল উমরানের ক্ষেত্রে ‘সময়’ এর ব্যপারটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>যেমন, এ বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য আমাদেরকে মুকাদ্দিমার সূচিপত্র ও এন্থনি গিডেন্সের Sociology বইয়ের সূচিপত্রকে তুলনামূলকভাবে নিরীক্ষণ করতে হবে। এ তুলনামূলক নিরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট একটি ধারণা পাব।</p>
<p>প্রথমেই যদি এন্থনি গিডেন্সের Sociology বইয়ের সূচিপত্রের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, তিনি প্রথমেই ‘সমাজবিজ্ঞান (Sociology) কী’ এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি বিশ্বায়ন (Globalization) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারপরের অধ্যায়সমূহে তিনি সমাজবিদ্যাগত প্রশ্ন ও উত্তর (Asking and Answering Sociological Questions), সমাজবিজ্ঞানে তাত্ত্বিক চিন্তা (Theoretical Thinking in Sociology), সামাজিক যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন (Social Interaction and Everyday Life), সামাজিকীকরণ, জীবনযাত্রা ও বার্ধক্য (Socialization, Life-Course and Ageing), পরিবার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কসমূহ (Families and Intimate Relationships), স্বাস্থ্য, অসুস্থতা ও অক্ষমতা (Health, Illness and Disability), স্তরবিন্যাস ও শ্রেণি (Stratification and Class) দরিদ্রতা, সামাজিক বাধা ও সমাজ কল্যাণ (Poverty, Social Exclusion and Welfare), বৈশ্বিক বৈষম্য (Global Inequality), লিঙ্গ ও যৌনতা (Sexuality and Gender), বর্ণ, জাতিভুক্ত ও অভিবাসন (Race, Ethnicity and Migration), আধুনিক সমাজে ধর্ম (Religion in Modern Society), গণমাধ্যম (The Media), প্রতিষ্ঠান/সংগঠন ও বিস্তৃতি/নেটওয়ার্ক (Organization and Networks), শিক্ষা (Education), অর্থনৈতিক জীবন ও কর্ম (Work and Economic Life) অপরাধ ও বিচ্যুতি (Crime and Deviance) রাজনীতি, সরকার ও সন্ত্রাসবাদ (Politics, Government and Terrorism), নগর ও নাগরিক অবস্থান (Cities and Urban Spaces), পরিবেশ ও ঝুঁকি (The Environment and Risk) নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে সাধারণত এ সকল বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়।</p>
<p>কিন্তু ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমার দিকে যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো, এর প্রথম অধ্যায়ে তিনি যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হলো একটি জীবসত্তা হিসেবে মানুষ কীভাবে অন্য মানুষের সাথে বসবাস করছে, মানুষের মৌলিকত্বের সাথে এ বিষয়টির সম্পর্ক কী এবং মূলগত দিক থেকে মানুষের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত না হয়েও কীভাবে এটি সমাজে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এবং মানুষ কর্তৃক বসবাসকৃত সমাজের এ ব্যবস্থাপনাটি কার্য ও কারণের সম্বন্ধের (Causality Order) মাধ্যমে তুলে ধরার অর্থ হলো এ বিষয়টিকে অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা। সমাজকে অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে সমাজ কীভাবে অস্তিত্ব ও বিকাশ লাভ করে, সে বিষয়টিকেও তিনি উপস্থাপন করেছেন।</p>
<p>পরবর্তীতে তিনি সমাজ মূলগতভাবে যেমন, ঠিক সেভাবেই বিকশিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দুটি ভিন্ন উপাদানকে উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে <strong>প্রথমটি হলো;</strong> ‘মানুষ যদি এমন একটি আচরণের মধ্যে থাকে যে, আমি যদি আমার নিকটবর্তীজনকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমি নিজেও আমার নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবো না’। সমাজের মানুষ যদি এ ধরনের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে আলোকে তাদের সমাজকে গড়ে না তুলে, তাহলে তারা একত্রে বসবাস করতে পারবে না। যেমন, মানবশিশু খুবই দুর্বল ও অসহায় হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। সমাজ যদি তাকে বড় হওয়ার জন্য ও বেঁচে/টিকে থাকার জন্য সাহায্য না করে, তাহলে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। এক অর্থে ইবনে খালদুন এ বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন, আল্লাহ মানুষকে একটি প্রজাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ যেন এভাবে টিকে থাকতে পারে এজন্য তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে আল্লাহ তায়ালা একটি ‘অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নীতি’ দান করেছেন। সে নীতিটি হলো মানুষজন মুসলিম হোক বা না হোক, তারা যেন একটি প্রজাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, সেভাবেই একে অপরকে রক্ষা করে থাকে। এ বিষয়টি হলো মানুষের সমাজজীবনের পর্যায়, এটি পরবর্তীতে পর্যায় থেকে পর্যায়ক্রমে অতিবাহিত হতে থাকে। অর্থাৎ, <strong>আসাবিয়্যাত হলো মানুষের জীবনকে সমাজবদ্ধভাবে পরিচালনা করার প্রথম ধাপ।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়টি হলো,</strong> একটি সমাজ হিসেবে মানুষের টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশকেও মানুষের বাসোপযোগী হতে হবে। পরিবেশ যদি মানুষের বসবাসের উপযোগী না হয়, তাহলে মানুষের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। যার কারণে মরুভূমিতেও উমরান গড়ে উঠবে না, আবার বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলেও উমরান গড়ে উঠবে না।</p>
<p>এ দুটি মূলনীতি উমরানের জন্য অপরিহার্য।</p>
<p>মানুষের একসাথে বসবাস করার জন্য এ দুটি মূলনীতির সাথে ইবনে খালদুন তৃতীয় একটি মূলনীতি যুক্ত করেন। তিনি বলেন, <strong>যদি কোনো কওম বা গোত্রের নিকট কোনো পয়গাম্বর আসে</strong><strong>, </strong><strong>তাহলে সে পয়গাম্বরের উম্মতের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী চেতনা থাকতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যে চেতনার বলে তারা উম্মতের সকলকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে। আর সে প্রচেষ্টা হতে হবে এমন</strong><strong>, </strong><strong>যেমনটা একজন মা তার সন্তানকে রক্ষা করার জন্য করে থাকেন।</strong></p>
<p>ফলশ্রুতিতে সামাজিক অস্তিত্বের তৃতীয় মেটাফিজিক্যাল মূলনীতিটি হলো ‘নবুওয়ত’। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইবনে খালদুনকে নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা জ্ঞাতসারে হোক কিংবা অজ্ঞাতসারে হোক এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করে থাকেন। এ ‘নবুওয়ত’ এর মাধ্যমে সৃষ্ট আসাবিয়্যাত রক্ত সম্পর্কীয় আসাবিয়্যাতকে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত করে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তাঁর এ সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে একইসাথে একজন পয়গাম্বরকে ইত্তিবা বা অনুসরণকারীদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার প্রথম অধ্যায়ে সাধারণভাবে আল-উমরানুল বাশারীর মধ্যে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর রচিত গ্রন্থ <strong>“আল-মাবাহিসুল মাশরিকিয়্যা”</strong> এর মেটাফজিক্যাল পদ্ধতিকে সমাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। এ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থাকা অতীব জরুরী।</p>
<p>এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ ও ‘উমরান আল বাদাবী’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ অধ্যায়ে তিনি মানুষের জীবনপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দুটি মৌলিক ক্যাটাগরিকে পরস্পর থেকে পৃথকভাবে তুলে ধরেছেন। সে মৌলিক ক্যাটাগরির মধ্যে একটি হলো সে সময়ে মানুষ যাযাবর হিসেবে বসবাস করত। বিশেষত যারা গ্রামীণ জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলো। তাদের যাযাবর হিসেবে বসবাস করার অর্থ আবার এ নয় যে, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা ছিল না। তাদেরও একটি ব্যবস্থাপনা ছিল, ইবনে খালদুন যেটিকে ‘উমরান আল বাদাবী’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। অপরদিকে শহরে বসবাসকারীগণ, যেটিকে তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সত্যিকারের উমরান অবশ্যই শহরের মধ্যে বিকশিত উমরান। এরপর তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ নিয়ে আলোচনা করেন এবং এর পূর্বশর্তসমূহ কী কী সেগুলো নিয়েও আলোচনা করেন।</p>
<p>এক অর্থে বলতে গেলে এন্থনি গিডেন্স তাঁর Sociology নামক গ্রন্থে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার প্রায় সকল বিষয় নিয়েই ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার এ অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ আংশিকভাবে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তবে এন্থনি গিডেন্স সমাজবিজ্ঞান (Sociology) হিসেবে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, সে বিষয়গুলোকে ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমার ইলমুল উমরানের মধ্যকার একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>এখন পর্যন্ত আমরা যে আলোচনা করলাম, তা থেকে বুঝতে পারি যে, বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান বলতে যা বুঝায়, তা ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বের নিকটে খুবই সামান্য। ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞানের যে তত্ত্ব দিয়েছেন তা অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক। বর্তমান সময়ে যে বিষয়কে সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয়, সেটিকে ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরানের মধ্যে একটি অধ্যায়ের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>এরপর ইবনে খালদুন আরেকটু অগ্রসর হয়ে পরবর্তী ধাপে মানুষের একত্রে বসবাস করার ফলে সৃষ্ট ব্যবস্থাপনাসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। <strong>মানুষের তৈরি রাষ্ট্রকে ইবনে খালদুন দুভাগে বিভক্ত করেছেন। একটি হলো ‘মুলক’ অপরটি হলো ‘খেলাফত’।</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের মতে, মুলক (Kingdom) হলো এমন জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, যাদের নিকটে কোনো পয়গাম্বর আসেনি।</p>
<p>আর খেলাফত হলো সে রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা একজন পয়গাম্বরের অনুসারীগণ যখন সে পয়গাম্বরের সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে কোনো আইনী ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলে।</p>
<p>এ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে, মূলকের ক্ষেত্রে আকলী ও আমলী (প্রায়গিক) হিকমত প্রযোজ্য, আর খেলাফতের ক্ষেত্রে শরয়ী হিকমত প্রযোজ্য।</p>
<p>এক স্থানে ইবনে খালদুন বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর আদেশকে ‘মুলক’ এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ করেন, তবে এটি এমন সমাজের জন্য প্রযোজ্য, যে সমাজে পয়গাম্বর আসেননি কিংবা যে সমাজ পয়গাম্বরের সাথে কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি কিংবা সম্পর্ককে বিছিন্ন করে ফেলেছে।”</p>
<p>চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি শহর ও শহরের জীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন। শহরের জীবনের বিষয়টি আসলে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, শহরের জীবন ধারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p><strong>আল ফারাবীর ভাষায়, “মানুষ আখলাকী কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) মূলত শহরের মাধ্যমে লাভ করে থাকে।”</strong></p>
<p>কেননা, একজন মানুষ যত বেশি ও যত ধরনের মানুষের সাথে মিশে, সে নিজেকে তত বেশি বিকশিত করতে পারে। এজন্য যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ইনসানে কামিল কোথায় খুঁজে পাব, তাহলে আমি জবাবে বলব সবচেয়ে বড় ইনসানে কামিল বড় বড় শহরের মধ্যে পাওয়া যায়, গ্রামগঞ্জে কিংবা গুহার ভেতরে ইনসানে কামিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।</p>
<p>যে ব্যক্তি সমাজ থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে গুহার মধ্যে বসবাস করে, তার আখলাকী শ্রেষ্ঠত্ব তো কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে গ্রামে বসবাসকারী মানুষের সুযোগও সীমাবদ্ধ।</p>
<p>অপরদিকে এমন এক ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যার অঢেল সম্পদ রয়েছে এবং সে রাজনৈতিকভাবে অনেক বড় শক্তির নিয়ন্ত্রক কিংবা এমন একজন সেনাপতির কথাই ধরুন, যে অনেক বড় একটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। এ ধরনের মানুষেরা যখন তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাজ করে থাকে, তখন এমন অনেক সময় তাদের সামনে আসে, যখন তাদের পক্ষে আদালত ও আখলাকের মূলনীতিসমূহ মেনে চলা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি তারা সে কঠিন অবস্থাতেও আখলাক ও আদালতের নীতিকে বিসর্জন না দেয়, তবে তখন সে অনুপাতে তাদের আখলাকী পূর্ণতা ফুটে উঠবে।</p>
<p>অনেক হাদীসেও আদিল বাদশাহ ও সৎ ব্যবসায়ীদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে যদি ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই, যদি কোনো ব্যক্তি এ কথা বলে, আমার ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে এজন্য আমি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদীর সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে শুধু নিজেকে রক্ষা করার জন্য একাকী বসবাস করে সেখানে আমার আখলাকী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবো, এমন ব্যক্তির এ আখলাকী সন্ধানের খুব বেশি মূল্য নেই।</p>
<p>সত্যিকার মারেফত হলো অনেক বড় বড় পদে থেকেও নিজেকে আখলাক ও আদালতের মূলনীতির আলোকে পরিচালিত করা।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার চতুর্থ অধ্যায়ে শহর সম্পর্কে অনেক ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে এখানে বিষয়টি শুধুমাত্র শহরের সোশিওলজির সাথে সম্পর্কিত নয়, শহরের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত আরও অনেক বিষয় তিনি এখানে আলোকপাত করেছেন।</p>
<p>মুকাদ্দিমার পঞ্চম অধ্যায় হলো জীবিকা সংক্রান্ত অধ্যায়। এ অধ্যায়ে তিনি জীবিকা অর্জনের উপায়, শিল্প-কৌশল এবং তৎসমুদয়ে ক্রিয়াশীল বিচিত্র অবস্থা ও সমস্যাবলি নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর এ সকল বিষয় সরাসরি অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত। এ অধ্যায়ে তিনি অর্থনীতি সংক্রান্ত এত অসাধারণ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন, যার কারণে শুধুমাত্র মুসলমানগণই নন, অনেক অমুসলিম অর্থনীতিবিদও ইবনে খালদুনকে অর্থনীতির জনক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। পাশ্চাত্যের যে সকল অর্থনীতিবিদগণ ইবনে খালদুনকে অর্থনীতির জনক হিসেবে বিবেচনা করেন, তাঁরা ছোটখাট কোনো অর্থনীতিবিদ নন। তাদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত অর্থনীতিবিদগণও রয়েছেন।</p>
<p><strong>ইবনে খালদুন অর্থনীতিকে ইলমুল উমরানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে দেখে থাকেন এবং স্থায়ী মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে যে বিষয়সমূহ পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়সমূহকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।</strong></p>
<p>এখানে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্য হলো সমাজবিজ্ঞানে শুধুমাত্র পদ্ধতিগত ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় বিষয়সমূহকে অনুসন্ধান করা হয়ে থাকে। কেননা, সমাজবিজ্ঞান সমাজের উৎপত্তির ফলে সৃষ্ট একেবারে মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় বিষয়সমূহ নিয়ে গবেষণা করে না । এর মূল কারণ হলো সমাজবিজ্ঞান স্থায়ী কিংবা অপরিবর্তনীয় কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বর্তমানে বিদ্যমান সমাজসমূহের জীবনধারার মধ্যে তুলনামূলকভাবে পরিবর্তনীয় ও অপেক্ষাকৃত কম পরিবর্তনীয় বিষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত করে এদের লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করে থাকেন।</p>
<p>অপরদিকে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে স্বতন্ত্র পর্যায়সমূহ রয়েছে।</p>
<p><strong>প্রথমটি হলো,</strong> সমগ্র মানবতা ও সমাজের অস্তিত্বের মূলকে গঠনকারী মূলনীতিসমূহকে ইবনে খালদুন অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলশ্রুতিতে এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান ও সাধারণভাবে সমাজবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত যত বিষয় রয়েছে, সকল বিষয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গি স্বতন্ত্র।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়টি হলো,</strong> তিনি চিরন্তন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অপেক্ষাকৃত কম পরিবর্তনীয় ও অধিক পরিবর্তনীয় বিষয়কে পরস্পর থেকে পৃথক করেন। এগুলোকে পৃথক করার পর এদেরকে একটিকে অপরটির সাথে সম্পৃক্ত করে বিশ্লেষণ করেন।</p>
<p><strong>মুকাদ্দিমার সর্বশেষ অধ্যায় হলো জ্ঞান সম্পর্কিত। এ অধ্যায়টি একইসাথে জ্ঞানের ইতিহাস ও জ্ঞানের দর্শন সম্পর্কিত একটি অধ্যায়। শুধু তাই নয়, একদিক থেকে দেখলে এ অধ্যায়কে জ্ঞানের এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়।</strong> ইবনে খালদুন এ অধ্যায়ে সমগ্র মানবতার উদ্ভাবিত জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে তিনি এ অধ্যায়ে জ্ঞান অর্জনের পন্থা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন এবং এ সম্পর্কে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ অধ্যায়কে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, এখানে ইবনে খালদুন চার পর্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<ol>
<li>মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করার কারণে যেখানেই মানুষ রয়েছে সেখানেই সমাজ রয়েছে। সেটি বাদাবী (গ্রাম্য) কিংবা হাদারী (শহুরে) যে কোনোটি হতে পারে। এর অর্থ হলো এটি একটি মুভমেন্ট পয়েন্ট।</li>
<li> তাদের অস্তিত্ব কীভাবে সম্ভবপর হলো এটিকে বুঝার জন্য সহায়ক মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়।</li>
<li> এ সকল বিষয়কে কীভাবে জানা যাবে এ সংক্রান্ত প্রশ্ন।</li>
<li>আমরা এ সকল বিষয় সম্পর্কে কীভাবে জানি সে পন্থাকে নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি অনেক বড় একটি দৃষ্টিকোণ। এ সকল দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার সর্বশেষ অধ্যায়কে দাঁড় করিয়েছেন।</li>
</ol>
<p>এ সকল বিষয়কে সামনে রাখলে দেখতে পাই, বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞানে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে, ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় সে সকল বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় স্বাভাবিকভাবেই তিনি যে সমাজে বসবাস করেছেন সে সমাজের অবস্থা তুলে ধরেছেন। সে সময়ে যেহেতু তিনি অনেক বড় বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালন করেছেন, সেজন্য সে সকল রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়কেও তিনি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি যেটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরেছেন, সেটি হলো ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মেটাফিজিক্স। তিনি রাযীর মেটাফিজিক্যাল তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন, শ্রেণিবিন্যাস করেছেন এবং লিপিবদ্ধ করেছেন।</p>
<p>অপরদিক থেকে দুটি বিষয়কে তিনি পৃথকভাবে তুলে ধরেন,</p>
<ul>
<li><em>চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয়।</em></li>
<li><em>ঐতিহাসিক কারণে অপেক্ষাকৃত কম বা বেশি পরিবর্তনীয়।</em></li>
</ul>
<p>যদিও আমি আমার এ আলোচনায় এন্থনি গিডেন্সের রচিত বইকে কেন্দ্র করে আলোচনা করেছি, তবে বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান একটি নয়। অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞান বা Sociology রয়েছে। যেমন জার্মান সোশিওলজি রয়েছে। যেমন, ম্যাক্স ওয়েবার জার্মান সোশিওলজিকে যেভাবে তুলে ধরেছেন, সেটির ধারণা ব্রিটিশদের সোশিওলজি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অপরদিক থেকে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিলে দ্যুর্খায়েমের সমাজবিজ্ঞান যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাই, জার্মান ও ব্রিটিশ সোশিওলজি থেকে ফ্রান্সের সোশিওলজি সম্পূর্ণ ভিন্ন। Marcel Mauss, Levi Strauss-সহ আরও অনেক ফরাসি সমাজবিজ্ঞানীর দিকে যদি তাকাই, তাহলেও দেখতে পাই, তাঁদের সমাজচিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।</p>
<p>অনুরূপভাবে, Social Theory-র নামে কিংবা সিস্টেম থিওরি হিসেবে গৃহীত অনেক তত্ত্ব রয়েছে, সেগুলোও আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। এছাড়াও মার্কসবাদীদের তৈরি করা সমাজতত্ত্বগুলোও সম্পূর্ণ ভিন্ন। <strong>এ কারণে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞান বুঝালে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটি সমাজবিজ্ঞান নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞানকে বুঝানো হয়। এগুলোর মধ্যে শুধু যে বিষয়টি অভিন্ন সেটি হলো এদের নাম একই, কিন্তু এদের মধ্যে খুব বেশি মিল নেই।</strong></p>
<p>এর কারণ হলো ফ্রান্সের সোশিওলজি ফ্রান্সের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে গবেষণা করেছে এবং সমাজ সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের উত্তর ফরাসি সমাজের উপর ভিত্তি করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।</p>
<p>জার্মান সোশিওলজি জার্মান সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেটির আলোকে তাদের সমাজবিজ্ঞান গঠন করে থাকে। ব্রিটিশরা ইংল্যান্ডের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে ও আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানীরা আমেরিকার সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে সে আলোকে তাদের সমাজবিজ্ঞানকে গড়ে তুলেছেন।</p>
<p>এখানেই ইবনে খালদুন থেকে আমাদের যে বিষয়টি শিখতে হবে সেটি আমরা খুঁজে পাই। ইবনে খালদুন আরব, তুর্কি, বারবার (আফ্রিকান) ও ফ্রাঙ্কদের সমাজবিজ্ঞানকে পরস্পরের চেয়ে ভিন্ন বলে অভিহিত করেন না। তাঁর মতে, সকল মানুষের জন্য ও সমাজের জন্যই প্রযোজ্য, এমন একটি বিষয় রয়েছে। সে বিষয়টি হলো সকল মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে, আর এ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করার মধ্যে একটি সংহতি বা আসাবিয়্যাত রয়েছে। আসাবিয়্যাত বা সংহতি ছাড়া সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা সম্ভব নয়।</p>
<p>এখানে লক্ষ্য করুন, সকল সমাজের জন্য প্রযোজ্য এমন একটি মূলনীতির কথা তিনি এখানে আলোচনা করছেন, সেটি হলো ‘আসাবিয়্যাত’।</p>
<p>ইবনে খালদুন <strong>দ্বিতীয় যে বিষয়টির </strong>প্রতি গুরুত্বারোপ করেন, তা হলো একটি সমাজের বৈশিষ্ট্য সে সমাজের ভৌগলিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে এটি পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত। ফলশ্রুতিতে সে পরিবেশকেও বিবেচনায় নিলে আমরা দেখতে পাই, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধারার সমাজ গড়ে উঠে।</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয় হলো</strong>, যদি মানুষগণ কোনো একজন পয়গাম্বরের অনুসরণ করে, তাহলে রক্তের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিকতার সম্পর্কও ছিন্ন করে সে পয়গাম্বরের অনুসারীদের মধ্যে একটি ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে ও সে পয়গাম্বরের দেখানো পন্থার আলোকে একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠে। আর সে সময়ে ইন্দোনেশিয়াতে বসবাসকারী মুসলমানদের সাথে মরক্কো, সাইবেরিয়া, আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়াতে বসবাসকারী মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তারা একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি সভ্যতা বিনির্মাণের জন্য চেষ্টা করে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ও অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও একজন পয়গাম্বরের অনুসরণের ফলে তাদের মধ্যে খুব শক্তিশালী একটি আসাবিয়াত (সংহতি) গড়ে উঠতে পারে।</p>
<blockquote><p><em>এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বর্তমান সময়ে যদি আমরা সমাজ নিয়ে গবেষণা করতে চাই তাহলে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে সেটি হলো পয়গাম্বররের অনুসরণকারী উম্মাহকে তথা মুসলিম উম্মাহকে একটি অভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এরপর এর নিচে উপবিভাগ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যে ভিন্নতা রয়েছে সেটি তুলে ধরতে হবে। আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী মুসলমানদের ভিন্নতা, উত্তর আফ্রিকাতে বসবাসকারী মুসলমানদের ভিন্নতা, মধ্য এশিয়া ও বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের ভিন্নতাকে তুলে ধরতে হবে। এগুলা একইসাথে এক, আবার একইসাথে এদের মধ্যে ভিন্নতাও রয়েছে। এটিকে আমরা ওয়াহদাতের মধ্যে কাসরাত (একের মাঝে বহুত্ব) বলে অভিহিত করতে পারি।</em></p></blockquote>
<p>এখন যদি রাশিয়ার কথা চিন্তা করি, রাশিয়ার সমাজ কোন মূলনীতিগুলোর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ প্রশ্নও আমাদেরকে করতে হবে। যেমন রাশিয়া যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে ছিল, তখন তারা নিজেদেরকে কম্যুনিস্ট হিসেবে দাবি করত। তবে এর পেছনে রাশিয়ার জাতীয়তাবাদ খুবই শক্তিশালী একটি ফ্যাক্টর ছিলো এবং তারা অন্যান্য অঞ্চলকে রাশিয়ার মধ্যে আত্মীকরণ করার জন্য চেষ্টা চালিয়েছে, তবে এক্ষেত্রে তারা সফল হতে পারেনি। কিন্তু এখন তারা রাশিয়ান জাতীয়তাবাদের সাথে অর্থোডক্সিয়া ধর্মবিশ্বাসকে একত্রিত করে নতুন করে একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p>অনুরূপভাবে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, সেখানে অর্থোডক্স, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা রয়েছে। এরা কেউ কাউকেই পছন্দ করে না। দেশ হিসেবে দেখলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও জার্মানি রয়েছে। ব্রিটেনও ছিল ইতিপূর্বে। কিন্তু এদের মধ্যে অভিন্ন কোনো কিছু না থাকা সত্ত্বেও, পঞ্চাশ বছর আগেও এরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণে একক একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং একটি অভিন্ন সমাজ গঠনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।</p>
<p>আমরা যখন বাইরে থেকে দেখি, তখন আমাদের মনে একটি প্রশ্ন আসে, সেটি হলো এরা কি আদৌ সফল হতে পারবে? আমরা এটি চাই যে তারা সফল হোক, দুনিয়ার সকল মানুষ তাদের মানবিক মর্যাদা নিয়ে আদালত ও শান্তির মধ্যে বসবাস করুক, কেউ কারোর উপর অত্যাচারের স্টীমরোলার পরিচালনা না করুক।</p>
<p>কিন্তু যদি বাস্ততার নিরিখে বিবেচনা করি, তাহলে কী দেখি? তাহলে দেখতে পাই যে, সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ কঠিন সংকটের সম্মুখীন। কেন? কারণ তাদের মধ্যে আসাবিয়্যাত নেই।</p>
<p>এখন বর্তমান সময়ে আমরা ইলমুল উমরানকে কীভাবে ব্যবহার করবো? আমি মনে করি এ নামে ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। তবুও যদি এটিকে আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট সহজভাবে তুলে ধরতে চাই, তাহলে আমরা একে ‘ইলমুল মাদানী’ (সভ্যতা সংক্রান্ত জ্ঞান) হিসেবে অভিহিত করতে পারি।</p>
<p>আমরা দেখতে পাই যে, ইলমুল উমরান বা ইলমুল মাদানী’র মধ্যে একইসাথে বিশ্বাস রয়েছে, আখলাক রয়েছে, রাজনীতি রয়েছে, আইন রয়েছে, একইসাথে সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান রয়েছে, একইসাথে সামাজিক মনস্তত্ত্ব, সাইকোলজি, মেটাফিজিক্স রয়েছে, এক অর্থে বলতে গেলে এর মধ্যে সকল কিছুই রয়েছে। এ বিষয়টিকে যদি বিবেচনায় নেই, তাহলে দেখতে পাই, ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমা আমাদেরকে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে সাহায্য করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইবনে খালদুন ও ইলমুল উমরান নিয়ে আলোচনা করার পর এ কথা অনায়াসেই বলা যায় যে, ইবনে খালদুনকে শুধুমাত্র একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করা একজন মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর কোনো একটি অঙ্গের নামে নামকরণ করার শামিল। যেমন মানুষের চোখ আছে, এখন তাকে শুধুমাত্র চোখ বলে ডাকা কি সমীচীন হবে? মানুষের কান আছে, এখন যদি কেউ তাকে কান বলে ডাকে, তাহলে কেমন হবে? এটি মোটেই ঠিক হবে না।</p>
<p>&#8211; একইভাবে ইবনে খালদুনকে অর্থনীতিবিদ বললেও ইবনে খালদুনের পরিচয়কে অসম্পূর্ণ করে রাখা হবে।</p>
<p>&#8211; ইবনে খালদুনকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলার অর্থ হলো তাঁকে অসম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা।</p>
<p>&#8211; ইবনে খালদুনকে শুধুমাত্র দার্শনিক বলে আখ্যায়িত করাও তাঁর প্রতি অবিচার করার শামিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><em>তাহলে আমরা ইবনে খালদুনকে কী নামে ডাকব? তাঁকে আমরা তাঁর রাখা নামেই ডাকব। সে নামটি কী? সেটি হলো, তিনি হলেন ‘ইলমুল উমরানের প্রতিষ্ঠাতা’।</em></p></blockquote>
<p>আর ‘ইলমুল উমরান’কে বর্তমান ভাষায় আমরা ‘ইলমুল মাদানী’ বা ‘সভ্যতা সংক্রান্ত জ্ঞান’ বলে অভিহিত করতে পারি। ইবনে খালদুন একইসাথে একটি সভ্যতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, কীভাবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, একটি সভ্যতা কোন ধরণের সংকটে নিপতিত হতে পারে এ সকল বিষয়কেও অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। আর সভ্যতা সংক্রান্ত সকল বিষয়কে এভাবে বর্ণনা করার কারণে ইবনে খালদুন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। কেননা আমরা ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ চাই। আমরা যেহেতু ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ চাই, তাই আমাদের অবশ্যই ইবনে খালদুনের মুখাপেক্ষী হতে হবে।</p>
<p>তবে একটি বিষয় না বললেই নয়, ইবনে খালদুনকে বুঝার ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট রয়েছে, অনেকেই তাঁকে না বুঝেই তাঁর ব্যাপারে অপবাদ দিয়ে থাকে। তাঁর কথার উদ্দেশ্য এবং মর্মকে বুঝার পরিবর্তে যদি তাঁকে শাব্দিকভাবে বুঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তাঁকে বুঝার জন্য বর্তমান সময়ে তাঁর শব্দসমূহই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে আক্ষরিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যদি ইবনে খালদুনকে বুঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে মুকাদ্দিমার লাইনসমূহই ইবনে খালদুনকে বুঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p>তাহলে কী করতে হবে?</p>
<p>ইবনে খালদুনের লেখাকে পড়তে হবে, তবে তাকে শুধু আক্ষরিকভাবেই নয় বরং বর্তমান সময় ও তাঁর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে এবং এক্ষেত্রে আমাদেরকে সফল হতে হবে।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার মাধ্যমে যে কাজটি করেছেন সেটিকে আমরা সোশ্যাল অন্টোলজি নামে অভিহিত করতে পারি। আর ইবনে খালদুনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এ সোশ্যাল অন্টোলজি সৃষ্টি করতে পারা। সোশ্যাল অন্টোলজি সৃষ্টি করার দৃষ্টিকোণ থেকেও সত্যিকারার্থেই জ্ঞানের ইতিহাসে এর কোনো তুলনা নেই। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাশ্চাত্যের কিছু চিন্তাবিদ কিছু কিছু কাজ করেছেন যেগুলোকে সোশ্যাল অন্টোলজি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অনুরূপভাবে বিংশ শতাব্দীতেও কিছু দার্শনিক এরকম কিছু করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁদের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। তবে এদের কেউই ইবনে খালদুনের মত এক্ষেত্রে এত গভীর ও সামগ্রিক কোনো কিছু করতে পারেননি। যার কারণে ইবনে খালদুনের সাথে তাঁদের কোনো তুলনাই চলে না।</p>
<p>ইবনে খালদুনের এ সোশ্যাল অন্টোলজির মূল কাঠামোটি কী?</p>
<p>এ বিষয় সম্পর্কে ইবনে খালদুন <strong>প্রথম যে বিষয়টি উল্লেখ করেন সেটি হলো</strong> মানুষ মূলসত্তাগত দিক থেকে দুর্বল একটি সৃষ্টি এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল এক সৃষ্টজীব। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সকলেই এমন। আর সবচেয়ে নির্ভরশীল ব্যক্তি হলো সে, যার অবস্থান সমাজে সবচেয়ে উপরে।</p>
<p>যেমন ধরুন, আপনি এমন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট, যে দেশের জনসংখ্যা ১০ কোটি। এর অর্থ হলো আপনি একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সে দেশের ১০ কোটি মানুষের উপর নির্ভরশীল। তারা আপনাকে তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই আপনি শক্তিশালী। কিন্তু যদি তারা আপনার প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, পরের দিন আপনি সাধারণ একজন নাগরিক ছাড়া আর কিছু নন। মানুষের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ মূলসত্তাগত দিক থেকে দুর্বল এবং অন্যের মুখাপেক্ষী।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় যে বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন,</strong> তা হলো মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য মানুষের সাথে কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগিতার চুক্তি করতে বাধ্য।</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয়টি হলো,</strong> যারা কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগিতার চুক্তি করে, তারা সুযোগ ও সম্ভাবনার আলোকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে। একটি নিজাম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়। সকল মানুষই এমন।</p>
<p><strong>চতুর্থ বিষয়টি হলো,</strong> কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার যে চুক্তি, সে চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠা প্রতিটি ব্যবস্থা (প্রতিষ্ঠান) একটি শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং একটি সমাজের মূল সে সমাজকে গঠনকারী মানুষগণের একে অপরকে সাহায্য ও সমর্থনের ক্ষেত্রে যে শক্তি, সে শক্তির সাথে সম্পর্কিত। পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থনের দিক থেকে মানুষ যত বেশি শক্তিশালী, তাদের বসবাসকৃত সে সমাজও তত বেশি শক্তিশালী।</p>
<p><strong>পঞ্চম বিষয়টি হলো,</strong> হাতে যে শক্তি আছে, তা যত বেশি ব্যবহার করা হবে, তত বেশি বৃদ্ধি পাবে ও বড় হবে। এ বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>সর্বশেষ বিষয় হলো প্রতিটি শক্তিরই একটি সীমা ও শেষ রয়েছে। সীমায় উপনীত হওয়া কিংবা উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া প্রতিটি শক্তিই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার স্থান অন্য শক্তির নিকট ছেড়ে দেয়।</p>
<p>ইবনে খালদুনের এ সোশ্যাল অন্টোলজির মূল ফ্রেমটির তৃতীয় বিষয়টির অর্থাৎ যারা কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার চুক্তি করে, তারা সুযোগ ও সম্ভাবনার আলোকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে এ প্রশ্নের জবাব সমাজবিজ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করে। সমাজবিজ্ঞান শুধু এ কাজটিই করে থাকে।</p>
<p>কিন্তু ইবনে খালদুনের সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এটি শুধুমাত্র একটি বিষয়, এছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>এখন বর্তমান সময়ে আসা যাক। ইবনে খালদুন আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য কী বলেন? বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অনুষদে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হয়। সে সকল অনুষদের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দিকে যদি তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন, সেখানে ঐ সমাজের কোনো কিছু নিয়ে গবেষণা করা হয় না। যেমন, পাকিস্তান বলেন, তুরস্ক বলেন, মিসর বলেন কিংবা বাংলাদেশ বলেন, এ সকল দেশের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে নিজেদের দেশের সমাজ নিয়ে গবেষণা হয় না। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ইউরোপের যে সকল ধারা অনুসরণ করেন, সাধারণত সে সকল ধারার থিওরিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। যেমন, যদি কেউ জার্মান ভাষা জেনে থাকেন, তাহলে তিনি জার্মান চিন্তাবিদগণ জার্মান সমাজকে সামনে রেখে যে সকল থিওরি দিয়েছেন, সে সকল থিওরীকেই শিক্ষার্থীদেরকে শিখান।</p>
<p>আর যারা ইংরেজি জানেন, তারা আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানের থিওরিকে শিক্ষার্থীদেরকে শিখিয়ে থাকেন এবং আমেরিকার সমাজকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে তুলে ধরেন। একইভাবে যারা ফ্রেঞ্চ জানেন, তারাও ফ্রান্সের সমাজকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।</p>
<p>এখন কথা হলো বাংলাদেশের সমাজে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশী যুবকগণ কি সমাজবিজ্ঞান বিভাগসমূহে তাদের নিজেদের সমাজ ও দেশ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়?</p>
<p>এর জবাব হলো, না, পায় না!</p>
<p>একবার চিন্তা করে দেখুন তো, এটি কত মারাত্মক একটি বিষয়!</p>
<p>শুধুমাত্র সমাজবিজ্ঞানই নয়, সকল বিভাগের ক্ষেত্রে এ একই কথা প্রযোজ্য। যারা অর্থনীতি পড়ে, তারা তাদের নিজেদের অর্থনীতি সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিবহাল?</p>
<p>তাহলে ইবনে খালদুন আমাদেরকে মূল যে বিষয়টি শিক্ষা দিয়ে থাকেন, সে বিষয়টি হলো <strong>আমরা যদি সমাজবিজ্ঞান তৈরি করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সমাজবিজ্ঞান তৈরি করতে হবে।</strong> সমাজবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজকে একইসাথে জ্ঞানের বিষয় ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে তৈরি করতে হবে। যদি আমরা আমাদের সমাজকে একইসাথে জ্ঞানের বিষয় ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে তৈরি করতে পারি, তাহলে হয়তোবা আমরা আমাদের সমাজের উপর ভিত্তি করে এমন এমন সব থিওরী সৃষ্টি করতে সক্ষম হব, যেগুলো দেখে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা তাদের সমাজকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ পাবে। পরবর্তীতে তারা নিজেদেরকে পুনর্গঠন করতে পারবে। এটি হয়তো অনেকের কাছে কল্পনাপ্রসূত হতে পারে, কিন্তু এটি মোটেই অসম্ভব নয়। অতীতে তারা মূলত আমাদের সমাজ থেকেই শিখেছে, এখনো যদি আমরা এক্ষেত্রে সফল হতে পারি, তাহলে তারা আমাদের নিকট থেকেই শিখবে। কারণ আমরাই হলাম বিশ্ববিবেক।</p>
<p>এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে সমাজবিজ্ঞান সংক্রান্ত যত বিষয় রয়েছে সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজকে সামনে রেখে তত্ত্ব (থিওরী) ও মডেল দাঁড় করাতে হবে।</p>
<p style="text-align: left;"><strong>আর আমাদের সমাজ কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>আমাদের সমাজ হলো মুসলিম সমাজ। আমাদের সমাজ ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ। এখন যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরেকটু বিস্তৃত করি, তাহলে আমাদের যারা সমাজবিজ্ঞান পড়ে, তাদের মৌলিক দায়িত্ব হলো মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার ঐক্যকে কীভাবে সুদৃঢ় করা যায়, কীভাবে মুসলমানদের মধ্যকার কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায় এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করা।</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>ইনশাআল্লাহ, আমরা ধীরে ধীরে ইবনে খালদুন যেদিকে ইঙ্গিত করেছেন, সে দিক বিবেচনায় রেখে আমাদের সমাজবিজ্ঞানকে নতুন করে গড়ে তুলব। নতুন করে সমগ্র মানবতা আমাদেরকে দেখে নিজেদের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে নিবে। আর আমি বিশ্বাস করি, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ :</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15971</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল-কুরআনে সুর ও ছন্দ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Jun 2025 08:00:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15891</guid>

					<description><![CDATA[আল-কুরআনের শব্দের মিল ও সাদৃশ্য সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমি তার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষ্টি প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল-কুরআনের শব্দের মিল ও সাদৃশ্য সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমি তার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষ্টি প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর সাথেও সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে আল-কুরআনের উচ্চারণের সাদৃশ্যতা।</p>
<p>আমি এর আগে আভাস দিয়েছি যে, কুরআনে কারীমের মধ্যে সুর ও ছন্দ (শব্দের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা) আছে এবং তার কিছু প্রকার ও ধরন আছে। যা তার বক্তব্য উপস্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সমস্ত কুরআন-ই ছন্দবদ্ধ সেহেতু সর্বত্রই সুর ও তাল বিদ্যমান। দেখা গেছে একই শব্দের বিভিন্ন অক্ষর এবং একই আয়াত ও তার শেষ শব্দ ছান্দিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে। চাই সে আয়াত ছোট হোক কিংবা বড়। বাক্যের শেষ শব্দের মধ্যে সেই মিল কিভাবে হয়, সেসব বাক্য সম্পর্কে আমি আলোচনা করতে চাই। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>وَمَا عَلَّمْنَهُ الشَّعْرَ وَمَا يَنْبَغِى لَهُ ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ</p>
<p>আমি তাঁকে (অর্থাৎ রাসূলকে) কবিতা বা কাব্য শিক্ষা দেইনি। আর তা তাঁর জন্য শোভাও পায় না। এতো একটি স্মারক যা সুস্পষ্ট কুরআন (হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে)। (সূরা ইয়াসীন : ৬৯)</p></blockquote>
<p>একথাটি হচ্ছে কাফিরদের ঐ অভিযোগের জবাব, যা সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে:</p>
<p>بَلِ اقْتَرَهُ بَلْ هُوَ شَاعِرٌ</p>
<p>(তারা বলতো) সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না বরং সে একজন কবি।</p>
<p>(সূরা আল-আম্বিয়া: ৫)</p>
<p>আল-কুরআন ঠিকই বলেছে, এটি কাব্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আরববাসী যারা একে কবিতা বা কাব্য বলতো তারা কি পাগল ছিল, না কবিতা ও কাব্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল? নিশ্চয়ই নয়। যেহেতু তারা একে কাব্য বলেছে কাজেই এর মধ্যে অবশ্যই কবিতা ও কাব্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে যার যাদুকরী আবেশে তারাও মোহবিষ্ট হয়েছিল। কুরআনের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের কান পরিচিত ছিল, ফলে এটি যে একটি কাব্য তা তারা বুঝতে পেরেছিল। আমরা যদি কেবল মাত্রা ও অন্তমিলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তবু বুঝা যায় কাব্য ও কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য সেখানে বিদ্যমান।</p>
<p>তাছাড়া কুরআন গদ্য ও পদ্য উভয়কেই সুন্দরভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে। আল-কুরআন মাত্রা )وزن( ও অন্তমিল )قافیه( থেকে স্বাধীন এবং এতে মিল থাকতেই হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা কুরআনের নেই। তবু সেখানে সুর ও ছন্দ বর্তমান। আয়াতের শেষে মিত্রাক্ষরের প্রয়োজন, সে প্রয়োজনও কুরআন অবশিষ্ট রাখেনি। সেই সাথে আমরা ওপরে কাব্যের যে বৈশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করেছি সেগুলোও সে ধারণ করে নিয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কুরআনে গদ্য ও পদ্য উভয় বেশিষ্ট্য বৈশিষ্ট্যমান।</p>
<p>সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন বাহ্যিক উচ্চারণে সে মাত্রা ও অন্তমিল দেখে, বিশেষ করে এ ব্যাপারটি ছোট ছোট আয়াত সম্বলিত সূরাগুলোতেই দৃষ্টিগোচর হয়। অথবা ঐ সমস্ত জায়গায় যেখানে কোন ঘটনাচিত্র উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য দীর্ঘ আয়াতের সূরাগুলোতেও এটি আছে তবে তা এতোটা স্পষ্ট নয়। নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করুন, যেখানে সুর, ছন্দ ও মাত্রার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে:</p>
<blockquote><p>وَالنَّجْمُ إِذَا هَوَى &#8211; مَاضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى &#8211; وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الهوى &#8211; إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى &#8211; عَلَمَهُ شَدِيدُ القُوى &#8211; ذُو مِرَّةٍ &#8211; فَاسْتَوى &#8211; وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى &#8211; ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى &#8211;</p>
<p>নক্ষত্রের কসম, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট কিংবা বিপথগামী নয় এবং প্রবৃত্তির তাড়নায়ও কথা বলে না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা। সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। (সূরা আল-নজম: ১-৮)</p>
<p>فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوادنى &#8211; فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى &#8211; مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى &#8211; أَفَتُمْرُونَهُ عَلَى مَا يَرَى</p>
<p>অতপর নিকটবর্তী হলো এবং ঝুলে রইলো, তখন ব্যবধান ছিল দুই ধুনক কিংবা তার চেয়ে কম। তখন আল্লাহ্ তার বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? (সূরা নজম: ৯-১২)</p></blockquote>
<p>وَلَقَدْ رَاهُ نَزَلَةً أخرى &#8211; عِنْدَ سِدْرَة المُنْتَهى &#8211; عِنْدَهَا جَنَّةُ الماوى &#8211; إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى &#8211; مَازَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى &#8211; لقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى</p>
<p>নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তা &#8220;দিয়ে আচ্ছন্ন হচ্ছিল। তাঁর দৃষ্টিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয়ই সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।</p>
<p>(সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)</p>
<p>أَفَرَءَ يْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى &#8211;</p>
<p>তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উজ্জা সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?</p>
<p>(সূরা আন-নজম: ১৯-২০)</p>
<p>الكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى.</p>
<p>পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য আর কন্যা সন্তান আল্লাহ্ জন্য?</p>
<p>(সূরা নজম: ২১)</p>
<p>تِلْكَ إِذَا قِسْمَةٌ ضِيزى &#8211;</p>
<p>এ ধরনের বণ্টন তো খুবই অসঙ্গত বণ্টন।</p>
<p>(সূরা আন-নজম: ২২)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতগুলোর শেষাক্ষরে মাত্রার প্রায় মিল আছে। কিন্তু আরবী ছন্দের মাত্রার চেয়ে তা কিছুটা ভিন্ন। সব আয়াতের শেষেই মিত্রাক্ষর এক ধরনের। মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের বদৌলতে প্রশিট আয়াতের সাথে অপর আয়াতের একটি মিল সংঘটিত হয়েছে। ফলে বিচ্ছুরণ ঘটেছে অপূর্ব সুর মূর্ছনার। এই যে মিল ও সাদৃশ্য তার আরেকটি কারণ আছে, অবশ্য তা মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের মতো এতোটা উজ্জ্বল নয়। কেননা তা একক শব্দ, অক্ষরের বিন্যাস এবং বাক্যে শব্দসমূহের বিন্যাসের কারণে সৃষ্টি হয়। তার অনুভূতি ও উপলব্ধির পরিধি, দ্বীনি চেতনা এবং সুর ও সঙ্গীতের উপভোগের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য অন্তরার সুরেলা আওয়াজ এবং বেসুরো আওয়াজের মধ্যে পার্থক্য করা যায়, শুধুমাত্র বাক্যান্তে মিত্রাক্ষর হলেই তাকে সুর বা ছন্দ বলে অভিহিত করা যায় না।</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতগুলো ছোট ছোট বিধায় তা থেকে সৃষ্ট সূর-তরঙ্গের স্থায়িত্বও খুব দীর্ঘ নয়। তবে সব আয়াতের ছন্দ ও মাত্রা এক। তাই সব আয়াতে মিল আছে। এসব আয়াতে শেষ অক্ষর এক রকম হতে হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা নেই।</p>
<p>যেমন আধুনিক সাহিত্যে কোন গল্প-উপন্যাস লিখার সময় এদিকে নজর দেয়া হয় না, কুরআনী সুর ও ছন্দের বেলায় এসব কিছুকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অনেক আয়াত থেকে তো স্পষ্ট বুঝা যায় বাক্যান্তে মিলের জন্য সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে তা করা হয়েছে। যেমন নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করে দেখুন।</p>
<p>أَفَرَءَ يْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى &#8211;</p>
<p>যদি এভাবে বর্ণনা না করে নিচের মতো করে বর্ণনা করা হতো:</p>
<p>أَفَرَيْتُمُ اللَّهَ وَالعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ &#8211;</p>
<p>তাহলে অন্তমিলে পার্থক্য সৃষ্টি হতো এবং ছন্দপতন ঘটতো। তদ্রূপ নিচের আয়াতও:</p>
<p><strong>الكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى &#8211; تِلْكَ اذا قِسْمَةٌ ضيزى .</strong></p>
<p><strong>যদি এভাবে উল্লেখ না করে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হতো:</strong></p>
<p><strong>الكُمُ الذَّكَرُولَهُ الْأُنثى &#8211; تلكَ قِسْمَةُ ضيزى .</strong></p>
<p><strong>তাহলে ছন্দের মিল হতো না। &#8216;ইযান&#8217; শব্দটি দিয়ে সেই মিলকে পুরো করা হয়েছে।</strong></p>
<p>তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, &#8216;আল উখরা&#8217; (أخرى) এবং &#8216;ইযান&#8217;  শব্দ দুটো ছন্দের মিল ছাড়া আর অন্য কোন কারণে নেয়া হয়নি, এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ। আসলে এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ নয় বরং বাক্য বিন্যাসের জন্য সূক্ষ্ম অপরিহার্যতার কারণেই এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আল-কুরআনের আরেকটি শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। একটি বিশেষ অর্থে আল-কুরআনে এ ধরনের শব্দ চয়ন করা হয়েছে এবং সাথে সাথে সেই শব্দটি সুর ও তালের মাত্রাকেও ঠিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।</p>
<p>যেমন আমরা আলোচনা করেছি, আল-কুরআনের এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের উচ্চারণের সময় এক ধরনের ছন্দের মিল লক্ষ্য করা যায় এবং শেষে মিত্রাক্ষর দৃষ্টিগোচর হয়। আবার অনেক জায়গায় শব্দ নির্বাচন এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে একটি শব্দ আগ-পাছ করলেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।</p>
<p>প্রথম অবস্থা: প্রথম অবস্থা হচ্ছে কোন শব্দের স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করার উদাহরণ। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর একথাটি যা কুরআন হুবহু নকল করেছে:</p>
<p>قَالَ أَفَرَءَ يْتُمْ مَّا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ &#8211; أَنْتُمْ وَآبَاؤُ كُمُ الْأَقْدَمُونَ &#8211; فَإِنَّهُمْ عَدُولِي الْأَرَبِّ العَلَمِينَ &#8211; الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ &#8211; وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ &#8211; وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ &#8211; وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينَ &#8211; وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يُغْفِرْ لِي خَطِئَتِي يوم الدين &#8211;</p>
<p>(ইবরাহীম (আ) বললো: তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ, তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা? বিশ্ব প্রতিপালক ব্যতীত তারা সবাই আমার শত্রু। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন। তিনি আমাকে মৃত্যু দেবেন আবার তিনিই পুনুরুজ্জীবিত করবেন। আমি আশা করি তিনিই বিচারের দিনে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন।</p>
<p>(সূরা আশ-শুয়ারা: ৭৫-৮২)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতে &#8216;ইয়াহদিনি&#8217; بهدین &#8216;ইয়াসকিনি&#8217; يسقین &#8216;ইয়াশ ফিনি يشفين এবং &#8216;ইউনি&#8217; يُحين শব্দের শেষ থেকে উত্তম পুরুষের &#8216;ইয়া&#8217;-কে বিলুপ্ত করা হয়েছে। কারণ &#8216;তা&#8217;বুদুনা&#8217; تَعْبُدُونَ &#8216;আল আকদামুনা&#8217; الاقدَمُونَ শব্দদ্বয়ের মতো &#8216;নুন&#8217;-এর মিত্রাক্ষর বহাল রাখার জন্য।</p>
<p>এমনিভাবে নিচের আয়াত ক&#8217;টিতেও &#8216;ইয়া&#8217; কে বিলুপ্ত করা হয়েছে:</p>
<p>والفَجْرِ &#8211; وَلَيَالٍ عَشْرٍ &#8211; والشفْعِ والوَتْرِ &#8211; وَالَّيْلِ إِذَا يَسْرِ &#8211; هَلْ فِي ذَلِكَ قَسَمٌ لِذِي حِجْرٍ &#8211;</p>
<p>শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতে, শপথ তার যা জোড় ও বেজোড় এবং শপথ রাতের যখন তা গত হতে থাকে। এর মধ্যে আছে শপথ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য।</p>
<p>(সূরা আল-ফজর: ১-৫)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতে &#8216;ইয়াসরী&#8217; (يَسرى) শব্দের &#8216;ইয়া&#8217; করা হয়েছে, যেন &#8216;আল-ফাজরি&#8217; (الفجر) &#8216;আশরীন&#8217; (والوتر) ইত্যাদি শব্দসমূহের সাথে মিল থাকে।</p>
<p>নিচের আয়াতগুলোও এখানে উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে।</p>
<p>فَتَوَلَّ عَنْهُمْ يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِ إِلَى شَيْءٍ نُكْرٍ &#8211; خُشِعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَحْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادُ مُنْتَشِرُ &#8211; مُهْطِعِينَ إِلَى الداع ، يَقُولُ الْكَفِرُونَ هَذَا يَوْمٌ عَسِرُ</p>
<p>অতএব তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন।</p>
<p>এ আয়াতে &#8216;আদ দায়ি&#8217; (ভূমি) শব্দের শেষ থেকে যদি &#8216;ইয়া&#8217;-কে বিলুপ্ত করা না হতো তবে মনে হতো এ পংক্তিতে ছন্দপতন ঘটেছে। আর এ ত্রুটি কারো নজর এড়াত না। তেমনিভাবে নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করুন:</p>
<p>ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِ ، فَارْتَدَّ عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا</p>
<p>(মূসা বললেন:) আমরাতো এ জায়গাটিই খুঁজছিলাম। অতপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললো।</p>
<p>(সূরা আল-কাহফঃ ৬৪)</p>
<p>এ আয়াতেও যদি تیغ শব্দটি এভাবে تبغى লিখা হতো তবে মিলের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতো।</p>
<p>তদ্রূপ যদি নিচের আয়াতগুলো থেকে আসল &#8216;ইয়া&#8217; এবং উত্তম পুরুষের &#8216;ইয়া&#8217;- এর শেষ থেকে বিরতিসূচক &#8216;হা&#8217; কে বিলোপ করা হয় তবে অবশ্যই ছন্দ পতন ঘটবে।</p>
<p>وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ &#8211; فَأَمُّ هَاوِيَةٌ &#8211; وَصَا أَدْرَكَ مَاهِيَهِ &#8211; نَارٌ حَامِيَةٌ &#8211;</p>
<p>আর যার পাল্লা হাল্কা হবে, তার ঠিকানা হাবিয়া। তুমি কি জানো তা কি? তা হচ্ছে জ্বলন্ত আগুন।</p>
<p>(সূরা আল ক্বারিয়া: ৮-১১)</p>
<p>নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:</p>
<p>فَامَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَبَاهُ بِيَمِينِهِ ، فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَهُ وَأَكِتَبِيه &#8211; إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيْهِ &#8211; فَهُوَ فِي عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ &#8211;</p>
<p>অতপর যার আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে। অতপর সে সুখ-স্বাছন্দে জীবন যাপন করবে।</p>
<p>(সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১)</p>
<p>দ্বিতীয় অবস্থা: শব্দের সাধারণ অবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন করা হয়নি বটে কিন্তু কৌশলী বিন্যাসে তা হয়ে উঠেছে ছন্দময়। যদি সেই বিন্যাসে সামান্যতম হেরফের করা হয় তবে ছন্দের মিল আর অবশিষ্ট থাকে না। নষ্ট হয়ে যায় সুর ব্যঞ্জনা।</p>
<p>ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيا &#8211; اذْنَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا &#8211; قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا &#8211; وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا</p>
<p>এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তাঁর পালনকর্তাকে নিভৃতে আহ্বান করেছিল এবং বলেছিল: হে আমার রব্ব! আমার অস্থি বয়স ভারাবনত হয়েছে। বার্ধক্যে মাথা সুশুভ্র হয়েছে কিন্তু আপনাকে ডেকে কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৪)</p>
<p>ওপরের আয়াতে যদি শুধুমাত্র &#8216;মিন্নী&#8217; منی শব্দটিকে পরিবর্তন করে &#8216;আল আজমু&#8217; العظم শব্দের পূর্বে এনে এভাবে বলা হয় যে, قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ مِنِّي الْعَظْمُ তবে স্পষ্টতই বুঝা যায় উক্ত বাক্যে ছন্দ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র ছন্দ ও মাত্রা ঠিক রাখার জন্যই &#8216;মিন্নী&#8217; منی শব্দটিকে যথাস্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এবার দেখুন কতো সুন্দর মিল দেয়া হয়েছে। বাক্যের প্রথম দিকে বলা হয়েছে : قَالَ رَبِّ إِنِّي এবং তারপরই বলা হয়েছে :</p>
<p>وَهَنَ الْعَظْمُ مِنّى</p>
<p>এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, আয়াতের ভেতর সুর ও ছন্দ এতো সূক্ষ্ম, শুধু অনুধাবন করা যায় কিন্তু ব্যক্ত করা যায় না। আগেও আমরা এ ব্যাপারে কিছুটা আলোচনা করেছি। এ ধরনের সুর ও তাল একক শব্দ সমষ্টি কিংবা একই বাক্যের বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তা অনুধাবন করতে হলে একমাত্র আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েই সম্ভব, অন্য কোনভাবে নয়।</p>
<p>উপরোক্ত আলোচনা একথারই ইঙ্গিত করে যে, আল-কুরআনের বর্ণনা রীতিতে সুর ও ছন্দের ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে হয়। তা এতো স্পর্শকাতর যে, শাব্দিক সাধারণ বিন্যাসের ব্যতিক্রম হলেই ছন্দপতন ঘটে যায়। অথচ তা কবিতা বা কাব্য নয়। এমনকি তা কাব্যের নিয়ম-নীতি মেনে চলতেও বাধ্য নয়। কিন্তু মানুষ একে এমনভাবে সাজানো ও বিন্যাসিত দেখতে পায়, যে কারণে তারা একে কাব্য না বলে কি যে বলবে তাও ভেবে পায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15891</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্বায়নের যুগে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠায় মুসলিম স্কলারদের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-scholars-in-establishing-maslahah-in-the-era-of-globalization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-scholars-in-establishing-maslahah-in-the-era-of-globalization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 20 Jun 2025 14:37:24 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15871</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে। দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক আমানাতদার সৎ বান্দার উপর, যাকে বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবে এবং হেদায়েত অনুসন্ধানীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরে থাকা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।</p>
<p>সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে। দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক আমানাতদার সৎ বান্দার উপর, যাকে বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবে এবং হেদায়েত অনুসন্ধানীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরে থাকা সত্যিকারের ক্বলব, আকল ও রূহের দর্শন পেয়েছে। যাকে প্রেরণ করা হয়েছে জুলুমপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আদালত ও হেদায়েতের পথে নিয়ে আসার জন্য।</p>
<p>সম্মানিত সুধী, বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম এবং কর্তব্যপরায়ণ ও ন্যয়ানুরাগ ব্যক্তিবর্গ, শুরুতেই সবাইকে ইসলামের সম্ভাষণ জানাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।</p>
<p>ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মুসলিম স্কলার কর্তৃক ইস্তাম্বুলে আয়োজিত এই ৫ম সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পেরে সত্যিই আমি আনন্দিত বোধ করছি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং মিথ্যাচার সত্ত্বেও ইস্তাম্বুলে আপনাদের এই আগমন সত্যি শহরটির জন্য সুফল বয়ে আনবে। এছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মুসলিম উম্মাহর জন্য আশীর্বাদ হয়ে থাকবে। তবে, নিজেদের ভেতরের একতা ব্যতীত প্রখ্যাত স্কলার এবং তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন চিন্তাশীলগণও মুসলিম উম্মাহর কোনো ভবিষ্যত বিনির্মাণ করতে পারবে না। আমি খুব আনন্দিত যে, আপনাদের মতো ধীসম্পন্ন স্কলার এবং চিন্তাশীলদের একত্রিত হবার মতো একটা পরিবেশ ইস্তাম্বুলে তৈরি হয়েছে।</p>
<p>সুপ্রিয় ভাই এবং বোনেরা,<br />
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বৈশ্বিক শান্তি বিনির্মাণ এবং বিশ্বকে পুনর্গঠন করার জন্য ইসলামকে সংবিধান হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এছাড়াও আপনারা জানেন যে, মানুষের সাথে তার নিজ সত্তা, অন্যান্য মানুষ এবং মহাবিশ্বের মাঝে সম্পর্ক তৈরি করার জন্যও ইসলাম এসেছে।  ইসলামের দৃষ্টিতে এই সমগ্র বিশ্বজাহান মহান আল্লাহর সৃষ্টি; এবং আমরাও, তবে তার বান্দা হিসেবে। অতএব, এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বিশ্বজাহান এবং আমরা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।</p>
<p>পক্ষান্তরে, তথাকথিত আধুনিক দার্শনিকরা এই বন্ধনকে বস্তুবাদী সম্পর্কে পরিণত করেছে। অথচ, ইসলাম বলেছে, মানুষরা হলো বিশ্বজাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অর্থাৎ আশরাফুল মাখলুকাত। আর আমাদের মানুষদেরকে এই লক্ষ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে যে, আমরা আরব-অনারব ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র বিশ্বে আদালত প্রতিষ্ঠা করবো। আমাদের সকলকে সমতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তাকওয়া ব্যতিত আর কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের মাঝে কোনোরূপ ভেদাভেদ থাকবে না। আর আমরাই হচ্ছে সকল জালিম এবং আগ্রাসন পরিচালনাকারীদের প্রধান শত্রু। কুরআনের ভাষ্যে, “একমাত্র জালেম ছাড়া আর কেউ শত্রু হতে পারে না।”</p>
<p>সম্মানিত সুধীমণ্ডলী,<br />
সুলহ, ইসলাহ, মাসলাহাত, ফাসাদ, ইফসাদ ও মাফসাদাত ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব এবং ইসলামী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিভাষা। কারণ, ফিকহে ইসলামী বা ইসলামী সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম একটি মূলনীতি হলো, আদালত প্রতিষ্ঠা করা এবং জুলুম প্রতিহত করা। বিষয়টির অন্যতম দলিল হলো একটি সার্বজনীন মূলনীতি,<br />
<strong>“দুনিয়াতে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা হলেই আল্লাহর ওয়াদা পূরণ হয়ে যায়।”</strong></p>
<p>কিন্তু, বর্তমান বিশ্বে মাসলাহাতকে পুঁজি করে অসংখ্য বিধ্বংসী সব কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। বিষয়টা যেন এই আয়াতটিরই প্রতিচ্ছবি,<br />
<strong>“যখন তাদের বলা হয়, তোমরা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না। তখন তারা বলে, আমরা মাসলাহাত প্রতিষ্ঠাকারী।”</strong><br />
আর বর্তমান বিশ্বে যা ঘটছে, এটা জুলুম ও নৃশংসতা ছাড়া আর কিছুই না। আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>“যখন সে কর্তৃত্ব লাভ করে, পৃথিবীতে তার সমস্ত প্রচেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত ও মানব বংশ ধ্বংস করার কাজে। অথচ আল্লাহ‌ (যাকে সে সাক্ষী মেনেছিল) বিপর্যয় মোটেই পছন্দ করেন না।”</p></blockquote>
<p>আর তাই আমাদেরকে এখন পৃথিবী থেকে মাফসাদাত প্রতিহত করে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মূলত, এখানেই আসে নবীর ওয়ারিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একজন আলেমের দায়িত্ব পালনের বিষয়। একজন আলেম শুধু জ্ঞানের দিক থেকেই নবীর ওয়ারিশ নয়, অথবা সুনির্দিষ্ট কিছু নস মুখস্থকরণ ও মিম্বারে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেই ওয়ারিশ নয়, বরং ওয়ারিশ হিসেবে তার দায়িত্ব হচ্ছে, দুনিয়াতে ইসলাহ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করা এবং বর্তমান জুলুমপূর্ণ ব্যবস্থা থেকে আদালতপূর্ণ সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করা। বর্তমান বিশ্বের জনসাধারণ এখন সাধারণ স্কলারের বিপরীতে মুসলিহ আলেম বা ভবিষ্যত বিনির্মানকারী স্কলারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। আল্লাহর ভাষায়,<br />
“তোমার রব এমন নন যে, তিনি জনবসতিসমূহ অন্যায়ভাবে ধ্বংস করবেন, অথচ তার অধিবাসীরা ভবিষ্যত বিনির্মানকারী।”</p>
<p>মাফসাদাত প্রতিহত করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলোর মধ্য থেকে একটি। আর মাফসাদাত উত্তরোত্তর বৃদ্ধির সময় কাজটার আবশ্যকতা আরো বৃদ্ধি পায়। বর্তমান মুসলিম উম্মাহ আজ মাফসাদাতের নিকৃষ্ট বেড়াজালে বন্দী। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলই আজ মাফসাদাতের বিষাক্ত থাবায় পর্যদুস্ত। এমন একটি সময়ে একমাত্র ইত্তিহাদ ও মাসলাহাতকে কেন্দ্র করে জ্ঞানার্জন করা ওলামায়ে কেরামই এই অবস্থা থেকে উম্মাহকে উত্তোরণের পথ বাতলে দিতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এখন এপর্যায়ে এসে আমরা দু&#8217;টি বার্তা দিয়ে যেতে চাই।<br />
প্রথম বার্তাটি মুসলিমদের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের প্রতি।</strong></p>
<p>বর্তমানে এমন অরাজকতার সময়ে মহান আল্লাহ আপনাদেরকে ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। আপনাদের এই সক্ষমতা রয়েছে যে, আপনারা যেকোনো বিষয়ের আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। এই ক্ষমতার মাধ্যমে আপনি আপনার দেশ ও জাতিকে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারেন অথবা অজ্ঞতা ও জুলুমের মধ্যে নিপতিত করে রাখতে পারেন।</p>
<p>মাসলাহাতকে পুঁজি করে দেশের উন্নতির পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘন বা কোনো ফাসাদ সৃষ্টি করা অনেক প্রাচীন একটা রীতি। এ&#8217;সব ক্ষমতাবানদের বলতে ইচ্ছে হয়, আল্লাহর সৃষ্টির উপর ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে কোন প্রশান্তিটা পেয়ে থাকেন আপনারা? মাসলাহাতের নামে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ভেতরে কোন উপকার নিহিত আছে?</p>
<p>আমাদের প্রথম বার্তাটা আপনাদেরই প্রতি, নিজেদের মহান এই দায়িত্বকে সঠিকভাবে পালন করে আপনারা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিষয়াদির সাক্ষী হতে পারেন! কারণ, ন্যায়পরায়ণ শাসক হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্যতম একটা নেয়ামত। পাথর এবং গাছেরা পর্যন্ত তাদের জন্য দোয়া করে।</p>
<p>অতএব, আপনাদের প্রতি অনুরোধ রইলো, আলমদেরকে তটস্থ করে না রেখে তাদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করুন। তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিবেন না। কারণ, সভ্যতা পুনর্গঠনে আপনার কাজে তাদের মতো সহযোগী আর কাউকে পাবেন না। এই বিষয় আলোচনাকালে সৌদি আরবের সম্মানিত শাসকদের নাম উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য।</p>
<p>তাঁদের উদ্দেশ্যে আমাদের বার্তা হলো, প্রতিটি দেশ ও তার অধিবাসীদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব রয়েছে। একমাত্র শোষক ব্যতিত আর কেউ এটাকে অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু, উম্মাহ এখন মুসলিহ আলেমের দিকে চেয়ে রয়েছে। আলেমগণ নিজেদের দেশের অধিবাসী হলেও তাদের প্রভাব সীমানা পেরিয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই, আলেমগণ শুধু তার জন্মভূমির সম্পদ নন, তাঁরা সমগ্র বিশ্বের সম্পদ।</p>
<p>সমগ্র বিশ্বের ওলামায়ে কেরামের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সৌদি শাসকের নিকট থেকে তাঁর দেশের স্কলারদের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাই। তারা তো কোনো অপরাধ করেননি। মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, তাঁরা দেশ ও জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সেবক। কিন্তু, ন্যয়পরায়ণ শাসকের নিকট থেকে যেমন উত্তর পাওয়া যায়, সেভাবে কি আমরা আমাদের প্রশ্নের উত্তরগুলো পাবো সৌদি শাসকের নিকট থেকে? সুবিশাল আশা নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে রইলাম।</p>
<p>আজ আমরা ইলম, হিকমত ও দাওয়াহ সমৃদ্ধ এই অধিবেশন থেকে জামাল খাসোগি (রহ.)&#8217;র পরিবারকে সমবেদনা জানাচ্ছি। বলতে দ্বিধা নেই, তুরস্কের মাটিতে তাঁর মৃত্যুবরণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। এই ক্ষতি এতোটাই অপূরণীয় যে, এই শোকে মর্মর সাগরের পানিও কৃষ্ণ সাগরের পানির মতো কালো হয়ে যাতে পারে। যেহেতু আমরা এখনও তাঁর জানাযা আদায় করতে পারিনি, তাই সৌদি শাসকের নিকট তাঁর মরদেহ প্রকাশ করে ইস্তাম্বুলে পাঠানোর অনুরোধ করছি, যেন আমরা ওলামায়ে কেরাম জনসাধারণকে সাথে নিয়ে তাঁর জানাযা পড়তে পারি। আমরা সকলেই একসাথে তাঁর জানাযা আদায় করতে চাই। তবে, সেটা গায়েবানা জানাযা নয়। কারণ, কবরে রাখার পূর্বে এই জানাযার মাধ্যমে সম্মানিত হওয়াটা তাঁর অধিকার। জান্নাতে তাঁর সর্বোচ্চ মাকামের জন্য আমরা মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি এবং হত্যাকারীদের জন্য ধ্বংস কামনা করি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমার দ্বিতীয় বার্তাটি মুসলিম উম্মাহর বিশিষ্ট স্কলার, চিন্তাবিদ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি।</strong></p>
<p>উম্মাহর পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের সিস্টেম্যাটিক উন্নয়ন প্রয়োজন। যেনো আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে সমাজের নিকট রোল-মডেলে পরিণত হতে পারি।আমাদের যে ইন্সটিটিউটসমূহ হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সূতিকাগার ছিলো, সেগুলো আজ সাধারণ সমাজ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ—উভয় স্থানেই তার গতিময়তা ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, ইন্সটিটিউটগুলোর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলে যাওয়া।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে, ইন্সটিটিউটগুলো পরবর্তীতে তার নেতৃত্ব হারিয়ে শুধু প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং জনসাধারণও এদের ব্যাপারে  সবাই সন্দিহান হয়ে পড়েছে। আবার কোনো কোনো ইন্সটিটিউট বৈশ্বিকতা হারিয়ে নিজেদেরকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক স্কলারগণও এই পথে হেঁটেছেন। ফলে, উম্মাহর পুনর্গঠনের বিপরীতে উম্মাহ আরো ধ্বংসের পথে এগিয়ে গেছে।</p>
<p>আমরা তাঁদেরকে এই ঐক্যবদ্ধতার অধিবেশন থেকে বার্তা দিতে চাই,<br />
আল আযহার ও আয-যায়তুন বিশ্ববিদ্যালয়, সমগ্র বিশ্বের ফতওয়া ও দাওয়াহ ইন্সটিটিউট, বিশেষ করে, মুসলিম বিশ্বের সকল স্কলারদেকে বলতে চাই, আসুন, ভ্রাতৃত্ব ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে আবার নতুন করে সাজাই। যেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে ছাপিয়ে ক্ষমার প্রবণতাটা সমুন্নত হবে। যার মাধ্যমে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী এক অরাজকতার পর উম্মাহ আবার স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। আসুন, আমরা চিন্তার মতপার্থক্য ও মাযহাবকেন্দ্রীক বিতর্ককে তদস্থলে রেখে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই। আসুন, আমাদের সকলের ঐশীশক্তিকে কাজে লাগাই উম্মাহর উত্তরণের জন্য। যে উম্মাহর প্রত্যেকেরই স্রষ্টা, নবী ও জীবনধারণের উদ্দেশ্য একই। যেন আমরা সমগ্র বিশ্বে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সমুন্নত করতে পারি, যে রাষ্ট্রগুলো নিয়ে কেয়ামতের দিনে নবী (সা.) গর্ব করতে পারবেন। কাব্যিক ভাষায়,<br />
“দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর হে ওলামায়ে কেরাম, তোমরাই যদি বাতিকগ্রস্ত হয়ে থাকো, তাহলে জাতির কাণ্ডারি কে হবে?”</p>
<p>শ্রদ্ধেয় সুধী এবং বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম,<br />
যখন সবার আখলাকী উন্নয়ন সম্ভব হবে, তখন সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পুনর্গঠিত হতে শুরু করবে। আমাদের সমাজ দীর্ঘ একটা সময় ধরে আখলাকী সমস্যায় জর্জরিত। এ সমস্যার অসংখ্য কারণ রয়েছে। তবে, এখন সবগুলো উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কিন্তু, সমস্যাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটা হচ্ছে, আখলাকের সাথে সম্পর্কহীনতা। অথচ, এই আখলাকের মাধ্যমেই আমরা সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে শিখি। আর এই আখলাকহীনতাই আজ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। মূলত, এই আখলাকহীনতা ও বস্তুবাদী মানসিকতার জন্যই আজ আমরা পর্যদুস্ত।</p>
<p>বিজ্ঞানভিত্তিক ইন্সটিটিউট এবং মুসলিহ ওলামায়ে কেরামের মাঝে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরিই হবে উম্মাহর পুনর্গঠনের মূল পদক্ষেপ। নচেৎ, এই পুনর্গঠন কীভাবে সম্ভব হবে, যখন সমাজ দেখবে এদের সমাজ চালানোর ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে!? কারণ, বস্তুবাদী দর্শনে প্রভাবিত বিজ্ঞানের বহু ব্যাখ্যা আজ ওলামায়ে কেরামকে বিজ্ঞানের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে। যদিও এখানে, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উপকারিতা-ও অন্যতম একটা কারণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সত্যিকারার্থে, আমাদের সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলো আসলে কিছুই না। সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে মূলত কলোনাইজেশন, দাসত্ব, জুলুম ও অজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে, বা এগুলোর ছত্রছায়ায়।</p>
<p>কিন্তু, অনেক মুসলিম জনগোষ্ঠী আবার এই সমস্যা সমাধানকল্পে ইতিহাস পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে প্রতিশোধের আশ্রয় নিচ্ছে। এখন মূলত আমাদের নিজেদেরকে দায়ী করে প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কী ছিলাম আর কোন ভুলে আমরা এই অবস্থানে পৌঁছলাম? এবং আমরা তখন কী করেছিলাম, যখন এই সমস্যাগুলো আমাদের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করেছিলো?</p>
<p>এমন পরিস্থিতিতে যখন মুসলিম বিশ্বের কোথাও থেকে গোলাবারুদের ঘ্রাণ আসে, তখন আমাদের একটাই চাওয়া এবং একটাই দায়িত্ব-কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়; তা হলো, যেকোনো পন্থায় আমাদের মুসলিমদের রক্ত ঝড়ানো বন্ধ করা। এই সমস্যা সমাধানকল্পে অনেকে আবার আমাদেরকে উম্মাতান-ওয়াসাতান থেকেও সরিয়ে নিয়ে আসছে।</p>
<p>সম্মানিত বিজ্ঞ স্কলারগণ,<br />
আজকের এই অধিবেশনের মূল লক্ষ্য হলো, আমাদের আলেমগণেরই মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা। ভ্রাতৃত্ব, মাসলাহাত, ন্যায়, সত্য ও আদালত প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে যাওয়া। আমাদের এমন আলেম হওয়ার শপথ নেওয়া যে, যারা হজ্জের বিশাল সমাগমের সময়েও ছোট্ট একটা পিঁপড়ার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলবে। কারণ, নিরপরাধ মানুষ হত্যার ব্যাপারটা নিয়েও আমরা আজ ভয়ে জোরালো বিরোধিতা করতে পারি না।</p>
<p>আমার এখন প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়,<br />
আমাদের বিবেক ফিরিয়ে আনার জন্য এই ঝরানো রক্তগুলো কি যথেষ্ট নয়?<br />
অত্যাচার, ঔদ্ধত্য, অপমান, অসম্মান করে কি এখনও আত্মতৃপ্তি হয়নি?<br />
আসুন, আমরা গতানুগতিক সবকিছু থেকে বেরিয়ে আমাদের জ্ঞান, মন এবং কলমগুলোকে আবারো কাজে লাগাই। আসুন, সকল ধরনের ফিতনা দূরীকরণে আমাদের কণ্ঠকে আবারো সমুন্নত করি। আজকের এই অধিবেশন যেন আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করার অধিবেশনে পরিণত হয়।</p>
<p>যুগশ্রেষ্ঠ সম্মানিত স্কলারগণ,<br />
ইসলাম দু&#8217;টি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত—একত্ববাদ এবং একতা। অর্থাৎ, আল্লাহর একত্ববাদ এবং উম্মাহর অভ্যন্তরীণ একতা। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা যেন এই আয়াতটাকে প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছি,<br />
“যারা নিজেদের আলাদা আলাদা দ্বীন তৈরি করে নিয়েছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলের কাছে যা আছে তাতেই তারা মশগুল হয়ে আছে।”</p>
<p>এটা সত্য যে, পশ্চিমা ও ওরিয়েন্টালিস্টরা তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মুসলিমদের মাঝে বিভক্ত করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু, এরচেয়েও মারাত্মক যে বিষয়টা আমাদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, তা হলো আমাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কারণ, নিকটবর্তীদের নিকট থেকে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি গভীর।</p>
<p>পরিশেষে বলতে চাই,<br />
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, আমাদের মাঝে মতপার্থক্য থাকার পরেও উম্মাহর পুনর্গঠন এবং উম্মাহর মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদেরকে আত্মত্যাগ করা। ওয়াল্লাহি, শান্তি প্রতিষ্ঠাই হবে আমাদের সকল সমস্যা সমাধানের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। ওয়াল্লাহি, উম্মাহর মধ্যকার একতাই আমাদের বন্ধনকে আরো শক্তিশালী করবে।</p>
<p>কিন্তু, শয়তান তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই থাকবে। তবে, একমাত্র উলামায়ে কেরামই সে প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করতে পারে। এবং এই আয়াতকে আমরা আমাদের স্লোগান বানাতে চাই,</p>
<blockquote><p>“আমি তো আমার সাধ্য অনুযায়ী সংশোধন (পুনর্গঠন) করতে চাই। যা কিছু আমি করতে চাই তা সবই আল্লাহর তাওফীকের ওপর নির্ভর করে। তাঁরই ওপর আমি ভরসা করেছি এবং সব ব্যাপারে তাঁরই দিকে রুজু করি।”</p></blockquote>
<p>দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক সকল নবীদের সর্দার মুহাম্মাদ (সা.), তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবীদের উপর। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে (শেষ করছি)। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ মিফতাহুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-scholars-in-establishing-maslahah-in-the-era-of-globalization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15871</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 May 2025 07:18:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15855</guid>

					<description><![CDATA[যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা মূল ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা মূল ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না কুরআনের দৃশ্যায়নের পুরো বৈশিষ্ট্যসমূহ সামনে চলে আসে। সত্যি কথা বলতে কি, চিত্রায়ণ, কল্পনা ও রূপায়ণ ছাড়াও কুরআনে বহু আলংকারিক দিক রয়েছে। যতোক্ষণ সে অরণ্যে প্রবেশ করা না যাবে ততোক্ষণ কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের কথা বলা যেতে পারে, যা দৃশ্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>শৈল্পিক বিন্যাসের ধরন</strong></h5>
<p>শৈল্পিক বিন্যাসের কয়েকটি স্তর আছে। বিন্যাসের শৈল্পিক এবং আলংকারিক কতিপয় দিক এমন আছে, যে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ বিশ্লেষণ করেছেন। আবার এমন কিছু দিকও আছে যে সবের মধ্যে তাদের স্পর্শ পর্যন্ত পড়েনি।</p>
<p>১. বিন্যাসের একটি ধরন, যার সম্পর্ক ইবাদতের বিন্যাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- উপযোগী কিছু শব্দচয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিন্যাস করায়। যার বদৌলতে সে বাক্য কথা বা পরিশীলনে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ বিষয়ে এতো বেশি আলোচনা হয়েছে যে, নতুন করে আর কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা নেই।</p>
<p>২. বিন্যাসের আরেকটি সম্পর্ক হচ্ছে, সুর ও ছন্দের সাথে। যা শব্দের সঠিক চয়ন এবং তাকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে বিন্যাসের দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটি আল-কুরআনে পুরো মাত্রায় দৃষ্টিগোচর হয় এবং কুরআনের শৈল্পিক ভিত্তিতে তা একাকার হয়ে আছে। তবু আগের মনীষীগণের দৃষ্টি বাহ্যিক সুর ও ছন্দ ছাড়িয়ে আগে বাড়তে পারেনি। এমনকি তারা এটিও জানতেন না যে সঙ্গীতের সুর, তাল ও মাত্রার সংখ্যা কতো এবং তা কোন ঢংয়ে কোথায় ব্যবহৃত হয়।</p>
<p>৩. অলংকার শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ আল-কুরআনের বিন্যাসের আলংকারিক যেসব দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তার একটি হচ্ছে, আল-কুরআনের আয়াতের শেষ অথবা বক্তব্যের শেষ করা হয়েছে বক্তব্যের সাথে সংগতি রেখে। যেমন- যেসব আয়াতে আল্লাহ তা’আলার যাত ও সিফাতের বর্ণনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْئً قدير বাক্য দ্বারা। আবার যেখানে কোন গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: ان الله عَلَيْمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ বাক্যটি দ্বারা। আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে ইসমে মাওসুল (সংযোজিত পদ) নিয়ে তারপর ছিলাহ বা সংযোজক পদ) ছাড়াই বাক্যকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া। তারপর জাযা বা প্রতিফল বর্ণনা করা। যেমন:</p>
<blockquote><p>إِنَّ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِأَيْتِنَا وَاسْتَكْبَرُوا عَنْهَا لَا تُفَتِّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى بَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ</p>
<p>যারা আমার আয়াতে মিথ্যা বলেছে এবং অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং জান্নাতেও যেতে পারবে না, যতক্ষণ সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করতে না পারবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪০)</p></blockquote>
<p>তেমিনভাবে যেখানে তা’লীম ও তারবিয়াতের আলোচনা এসেছে সেখানে ‘রব্ব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:</p>
<blockquote><p>اقرأ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ &#8211; خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ &#8211; أَقْرَا وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَمَ بِالقَلم &#8211; عَلَّمَ الْإِنْسَنُ مَا لَمْ يَعْلَمْ</p>
<p>পড় তোমার রব্ব-এর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়, তোমার রব্ব অত্যন্ত দয়ালু যিনি কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আল-আলাক: ১-৫)</p></blockquote>
<p>যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সম্মান প্রতিপত্তির আলোচনা এসেছে সেখানে اللَّهَ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:</p>
<p>إِنَّ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ ، وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ، وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ</p>
<p>নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। (সূরা লুকমান: ৩৪)</p>
<p>এমনিভাবে اللَّهَ শব্দটি স্থান ও কালভেদে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো আল্লাহ শব্দটি একবার বলে পরবর্তী আয়াতসমূহে শুধুমাত্র সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও বাক্যের প্রথমে, আবার শেষে, আবার কোথাও আল্লাহ শব্দ এবং তার সর্বনাম যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় প্রশ্নের অবতারণার জন্য আবার অনেক জায়গায় ইতিবাচক বর্ণনার জন্য নেয়া হয়েছে। এটি অনেক অলংকার শাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিকট আলংকারিক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত।</p>
<p>৪. কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যের অর্থগত ধারাবকাহিকতা থাকে। অতপর একটির উদ্দেশ্যকে অন্যটির উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করার ফলে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাও এক ধরনের শৈল্পিক বিন্যাসের নমুনা। অবশ্য অলংকার শাস্ত্রবিদগণ শৈল্পিক বিন্যাস সম্পর্কে যে নীতির কথা বলেন আল-কুরআন তা থেকে মুক্ত।</p>
<p>৫. সম্ভবত শৈল্পিক বিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর যে সম্পর্কে অলংকার শাস্ত্রবিদগণ এ পর্যন্ত পরিচিতি লাভ করেছেন তা হচ্ছে আল-কুরআনের স্বভাবজাত বিন্যাস, যা কাতিপয় আয়াতের বর্ণনা পরম্পরায় পাওয়া যায়। যেমন সূরা আল-ফাতিহা প্রসঙ্গে আমরা আল্লাম যামাখশারীর লেখা থেকে ‘আল-কুরআনের গবেষণা ও তাফসীর’ অধ্যায়ে উদ্ধৃতি দিয়েছি। অলংকার শাস্ত্রবিগদগণ যে বৈশিষ্ট্যসমূহ নিরূপণ করেছেন, কুরআনী বালাগাতের গবেষক আলিমগণ আজ পর্যন্ত তাকে শৈল্পিক বিন্যাসের উত্তম প্রকাশ বলে ঘোষণা দিয়ে আসছেন। আশ্চর্যের কথা এই যে, তারা শৈল্পিক বিন্যাসের অন্য দিকটির নাগালও পাননি। তারা বেশি অগ্রসর হয়ে করার মধ্যে এই করেছেন, আল-কুরআনের সুর ও ছন্দ নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত তাদের নিকট মনে হয়েছে কুরআনের অন্য কোন বৈশিষ্ট্যই আর নেই। প্রকৃতপক্ষে কুরআনী বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য মাত্র। কিন্তু এখানেই তারা পরিতৃপ্ত হয়ে বসে পড়েছেন।</p>
<p>কেননা বালাগাতের আলিমগণ এর মর্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না যে, চিত্রায়ণ ও দৃশ্যাঙ্কনের মাধ্যমে আল-কুরআনে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তা মুল বা ভিত্তির মর্যাদা রাখে। তাই তারা শৈল্পিক বিন্যাসের ব্যাপারটি ভালভাবে আলোকপাত করতে পারেননি। এ বিষয়ে আমরা আমাদের নতুন চিন্তা-গবেষণা পেশ করবো বলেই এ পুস্তকটি লিখা হয়েছে। পুরোনো বিষয় নিয়ে বিবাদ বা তর্ক-বিতর্ক করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাচ্ছি কুরআনের আলংকারিক দিক সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয়েছে তা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার চেষ্টা করা। আমাদের পূর্বসূরীরা যেখানে পৌঁছে থেমে গেছেন তা থেকে আরো সামনে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। কেননা তার প্রচুর অবকাশ আছে। এ বিষয়ে আমরা ঐ সমস্ত উদাহরণকে যথেষ্ট মনে করি, যা আমরা প্রথমদিকে ‘সূরা আল-আলাক’ –এর ব্যাখ্যায় এবং ‘আল কুরআনের সম্মোহনী শক্তির উৎস’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। ঐসব উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল-কুরআনে চিন্তার যোগসূত্রতা এবং বাহ্যিক বিন্যাস প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ ও অবকাশ আছে।</p>
<p>আমরা শুধু একথাটি ইঙ্গিত দিতে চাই, আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী এবং ঐ সমস্ত স্থান, যা ঘটনার সাথে জড়িত এ দু’য়ের মধ্যে এক অদৃশ্য আত্মিক বন্ধন রয়েছে। সেই সাথে কুরআন সেসব ঘটনার দ্বীনি উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং শৈল্পিক দিকের প্রতিও দৃষ্টি রাখে।  এছাড়াও কিয়ামতের দৃশ্য, শান্তি ও শাস্তির দৃশ্য, জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কথপোকথনের দৃশ্যাবলীতেও এ ধরনের মিল পাওয়া যায়, যা আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীতে বিদ্যমান। এ সমস্ত বিষয় বর্ণনার সময় একটি ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্রের প্রতিও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তাই বলে মূল উদ্দেশ্যটাকেও সরাসরি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়নি, যে উদ্দেশ্যে ঐ ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে।</p>
<p>মূল কথা হচ্ছে কুরআনে কারীমের অর্থ ও তাৎপর্য এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং অতি উন্নত। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার নিগুঢ় যে সৌন্দর্য, দৃশ্যায়ন থেকে তার বিস্তৃতি অনেক বেশি। আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় যে, আলোচনার সহজ ও সমতল পথ ছেড়ে অগ্রসর হয়ে এক ঝটকায় কলমের গতি সেই বিষয়বস্তুর সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে উপনীত করবো। এজন্য আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে সেই চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>১</h4>
<p>কুরআনুল কারীমে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে চিত্রায়ণ পদ্ধতে তার বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, সেখানে বক্তব্য এবং অবস্থার মধ্যে পুরোপুরি মিল পাওয়া যায়। যেমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বর্ণনার এ ঢং অথবা আভিধানিক অর্থ ছবির লক্ষণসমূহ পরিপূল্ণ করতে সহায়ক প্রমাণিত হয়্ এটি এমন একটি বাঁক যা বর্ণনার জন্য ব্যাখ্যা এবং ছবির মধ্যে যোগসূত্রের মর্যাদা রাখে। যেখান থকে হাল্কা ঢংয়ের বর্ণা এবং উঁচু মানের নির্মাণ শৈলীর রাস্তা পৃথক হয়ে যায়। যেমন পরবর্তী আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:</p>
<p>إِنْ شَرِّ الدَّوابِ عِنْدَ اللهِ الصُّمُّ البُكُمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ</p>
<p>নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় নিকৃষ্ট সেইসব মুক ও বধির- যারা উপলব্ধি করে না। (সূরা আল-আনফাল: ২২)</p>
<p>الدواب শব্দটি সাধারণ জীবজন্তুর বেলায় ব্যবহৃত হয়। অবশ্য অনেক সময় এ শব্দটি দিয়ে মানুষকে বুঝানো হয়। কেননা دابة শব্দ দিয়ে ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল প্রাণীকেই বুঝায় যেহেতু মানুষও ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করে তাই মানুষের বেলায়ও এ শব্দটি প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু دابة শব্দটি মানুষ অর্থে গ্রহণ করতে বিবেক বাধ্য নয়। এটি স্বাভাবিকতার বিপরীত। এখানে মানুষের জন্য الدواب শব্দটি ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে তাদের চরিত্র ও আচার আচরণে পশু সুলভ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়, যা তাদের হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধক। এ থেকেই তাদের গাফলতি ও পশুত্বের ছবি পরিপূর্ণ হয়ে যায় لَا يَعْقِلُونَ (তারা উপলব্ধি করে না) শব্দ দিয়ে একথাটিকে আরো পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে।</p>
<p>অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:</p>
<p>وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُوْنَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَهُمْ</p>
<p>আর যারা কাফির তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো আহার করে, তাদের বাসস্থান জাহান্নাম। (সূরা মুহাম্মদ : ১২)</p>
<p>এ আয়াতে কাফিরদেরকে জন্তু-জানোয়ারের সাথে তুলনা করে এক চমৎকার চিত্র অংকন করা হয়েছে। কারণ তারা অল্প ক’দিনের দুনিয়ায় খুব আনন্দ ফূর্তি করছে এং বিভিন্নবাবে তারা দুনিয়ার রং-তামাসাকে উপভোগ করার প্রয়াস পাচ্ছে। কিন্তু পরকালের শাস্তি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন যা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যে আচরণ একমাত্র জন্তু-জানোয়ারের দ্বারাই শোভা পায়। সেগুলো খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ ফূর্তিতে মশগুল থাকে কিন্তু একবারও ভেবে দেখে না, কসাইয়ের ছুরি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেগুলোর একমাত্র কাজই যেন শুধু খাওয়া- দাওয়া ও আনন্দ-ফুর্তি করা।</p>
<p>আরো একটি উদাহরণ দেখুন:</p>
<p>نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَكُمْ وَ فَاتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ</p>
<p>তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ। নিজেদের ক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছে যাও। (সূরা আল-বাকারা: ২২৩)</p>
<p>এ আয়অতে কয়েক প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য মিল পাওয়া যায়। এখানে স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শকাতর সম্পর্ককে বড় সূক্ষ্ম ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপমা হচ্ছে স্বামসী-স্ত্রীর সম্পর্কে একজন কৃষক ও তার জমির সাথে তুলনা করা হয়েছে। জমি যেমন ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র তদ্রূপ স্ত্রীও সন্তান উৎপাদনে ক্ষেত্র। জমির ফসল দিয়ে যেমন গোলা পরিপূর্ণ করা হয়, তেমনি স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করে বংশধারাকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে গোটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সঠিক ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>২</h4>
<p>অনেক সময় শুধুমাত্র একটি শব্দ-পুরো বাক্য নয়- ছবির আংশিক পূর্ণতার স্বাক্ষর বহন না করে বরং পুরো ছবিটিকেই উদ্ভাসিত করে তোলে। চিত্রায়ণ পদ্ধতিতে এ মিল পূর্বের চেয়েও জোরালো। এটি পূর্ণতার কাছাকাছি প্রায়। এর গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণ পূর্ণবাক্য ব্যতিরেকে শুধুমাত্র একটি শব্দই একটি চিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। সেই শব্দটি কর্ণগোচর হওয়া মাত্র মনের মুকুরে ভেসে উঠে একটি পরিপূর্ণ চিত্র।</p>
<p>يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَالَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّا قَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ</p>
<p>হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হয়েছে, যখন আল্লহর পথে তোমাদেরকে বের হওয়ার জন্য বলা হয়, তখন তোমরা জমিন আঁকড়ে পড়ে থাক। (সূরা আত-তাওবা: ৩৮)</p>
<p>এ আয়াত পাঠকালে যখন إِنَّا قَلْتُمْ শব্দটি কর্ণগোচর হয় তখনই চিন্তার জগতে একটি ভারী বস্তুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। মনে হয় কোন ব্যক্তি যেন ভারী কোন বস্তুকে উঠানোর জন্য বারবার চেষ্টা করছে কিন্তু তা ভারী হওয়ার কারণে উঠাতে পারছে না। মনে হয় শব্দটি ওজনে কয়েক টন। যদি আয়াতে تثا قلتم বলা হতো (মূলত দুটো শব্দের অর্থ একই) তবে পূর্বের শব্দের মতো এতো ভারী বুঝাত না। উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেত। কিন্তু ব্যবহৃত শব্দটির এতো যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে যে, শ্রোতা শোনামাত্র দুঃসাধ্য এক ভারী বোঝার চিত্র তার কল্পনার চোখে ভেসে উঠে।</p>
<p>এ ধরনের আরেকটি আয়াত হচ্ছে:</p>
<p>وَإِنَّ مِنْكُمْ لَمَنْ لَيُبَطِئَنُ</p>
<p>আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে যারা (ইচ্ছেকৃত) বিলম্ব করবে। (সূরা আন-নিসা: ৭২)</p>
<p>এ আয়াতটি পড়া মাত্র বিলম্বের একটি ধারণা সৃষ্টি হয় বিশেষ করে لِيُبَطِن শব্দটি পাঠ কিংবা শ্রবণ করা মাত্র চোখের সামনে এক চিত্র ভেসে উঠে। তা হচ্ছে সেই কথা বলতে তাদের জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যায়। বহু কষ্টে এবং অনেক বিলম্বৈ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে।</p>
<p>আল-কুরআনে হযরত নূহ (আ)-এর কথাটি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>قَالَ يَقَوْمَ أَرَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةِ مِنْ رَبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ ، أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَرِهُونَ</p>
<p>(নূহ বললেন: ) হে আার জাতি। দেখ তো আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলিলের ওপর থাকি, তিনি যদি তার পক্ষ থেকে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তার পরেও যদি তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তবে আমি কি তা তোমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি, তোমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে? (সূরা হুদ: ২৮)</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে لز مُكْمُومًا শব্দটি পাঠ করা মাত্র অপছন্দ ও পীড়াপীড়ির এক চিত্র ভেসে উঠে মনের মুকুরে। তার সমস্ত চেতনা ও বাকশক্তি পরস্পর এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যেমন كَرَهُونَ বা ঘৃণাকারী সেই জিনিসের সাথে আচরণ করে যা সে ঘৃণা করে। এ আয়াতে শব্দ ও অর্থের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক প্রতিভাত হয় তা বালাগাত ও ফাসাহাতের এক বলিষ্ঠতম প্রয়োগ। যাকে পূর্ব যুগের ও বর্তমান যুগের মুফাসসিরগণ আল-কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে অভিহিত করেছেন।</p>
<p>অন্যত্র বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ ، لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِّنْ عَذَابِهَا ، كَذَالِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ &#8211; وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيْهَا ، رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ</p>
<p>আর যারা কাফির,তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশ দেয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি অকৃতজ্ঞদেরকে এভাবেই শাস্তি প্রদান করি। সেখানে তারা আর্ত চীৎকার করে বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান থেকে বের করে দিন, আমরা সৎকাজ করবো, পূর্বে যা করেছি তেমনটি আর করবো না। (সূরা ফাতির: ৩৬-৩৭)</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে يَصْطَرخُون শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, জাহান্নামীরা চীৎকার করছে, সে আওয়াজ চতুর্দিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেই সাথে আরেকটিচিত্র ভেসে উঠে- তাদের এ মর্মান্তিক চীৎকার কেউ শুনছে আর না এর কোন প্রতিকার করার জন্য কেউ এগিয়ে আসছে সেই প্রাণান্তকর চীৎকারের কারণে। এ চিত্র থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে, শাস্তির তীব্রতা কতো ভয়াবহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন একটি মাত্র শব্দ সমস্ত বাক্যের বক্তব্যকে প্রস্ফুটিত করে তোলে তখন তা হয় تَنَاسُ বা (শৈল্পিক) বিন্যাসের চূড়ান্ত রূপ। যেমন:</p>
<p>عُتُلِ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيْم কঠোর স্বভাব তদুপরি কুখ্যাত। (সূরা ক্বলম: ১৩)</p>
<p>এ আয়াতে عُتُلِ শব্দটি কঠোর স্বভাব ও নির্মমতার পূর্ণ চিত্র অংকন করার জন্য যথেষ্ট।</p>
<p>এ রকম আরেকটি আয়াতে কারীমা :</p>
<p>وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمِّرَ কিন্তু এতো দীর্ঘজীবন তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। (সূরা আল-বাকারা: ৯৬)</p>
<p>এ আয়াতে بِمُزَحْزِحِهِ এর কর্তা হচ্ছে نْ يُعْمَرَ। যা পরিপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত একটি চিত্র অংকন করেছে। কথা ক’টি মুখে উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই চিত্র।</p>
<p>পরবর্তী আয়াতটিও একটি উত্তম উদাহরণ:</p>
<p>فَكُبْكِبُوا فِيهَا هُمْ وَالْغَاوَّنَ &#8211; وَجُنُودُ ابْلِيْسَ اجْمَعُونَ</p>
<p>অতপর তাদেরকে এবং পথভ্রণ্টতের (অর্থাৎ মূর্তি এবং মূর্তিপূজকদের অধোমুকি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং ইবলিস বাহিনীর সকলকেও। ( সূরা আশ-শুআরা: ৯৪-৯৫)</p>
<p>এ আয়াতে فَكُبْكِبُوا শব্দটি জাহান্নামে পতিত হওয়ার যে আওয়াজ তার প্রতিনিধিত্ব করছে।</p>
<p>উল্লেখ্য যে, আয়াত দুটোতে بِمُزَحْزِحِهِ এবং فَكُبْكِبُوا শব্দদ্বয়ের আক্ষরিক অর্থই গোটা ছবিটিকে চোখের সামনে উদ্ভাসিত করে তোলে। কথা এটি নয় যে, কুরআনের বিশেষ ব্যবহারে তার মধ্যে এ ধরনের ধারণা সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মাত্র যে শব্দগুলো স্মরণ করা হলো তা কুরআনের বিশেষ এক প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে এবং একবার মাত্র তা বর্ণিত হয়েছে। অবশ্যই একথা বলা যায় যে, উল্লেখিত শ্বদ্বয় যে স্থানে প্রয়োগ করা হয়েছে নিঃসন্দেহে তা আলংকরিক বর্ণনাসমূহের মধ্যে উৎকৃষ্ট বর্ণনা হিসেবে গণ্য।</p>
<p>কুরআনে কারীমে কিয়ামতের বিশেষণমূলক যে কটি প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার মধ্যে الصاخة (বধিরকারিণী) এবং الظلمة (সকল কিচুর ওপর বিস্তার লাভকারী) শব্দ দুটোও আছে। الصاخة শব্দের মধ্যে এমন পরিমাণে গর্জন ও কাঠিন্য পাওয়া যায়, শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, সে গর্জনে কান ফেটে যাবে। এ শব্দটি বাতাস ভেত করে কর্ণকুহরে গিয়ে আঘাত করে এবং বধির করে দেয়। তেমনিভাবে الطامة শব্দটিও মনে হয় তীব্রবেগে চলমান। এটি ঝড়েরর গতিতে সকল কিছুতে ছেয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলছে। এ রকম আরেকটি আয়াত:</p>
<p>وَالصُّبْحِ إِذَا تَنَفْسَ সকাল বেলার শপথ, যখন সে শ্বাস গ্রহণ করে (অর্থাৎ উদ্ভাসিত হয়) । (সূরা তাকবীর: ১৮)</p>
<p>আমি تَنَفْسَ এর মতো সূক্ষ্ম ও মনোরম শব্দ চয়ন দেখে এবং এর বিকল্প প্রতিশব্দের কথা চিন্তা করে ‘থ’ খেয়ে গেলাম। আপনিও কুরআনের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে অবাক হয়ে যাবেন এবং একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দটি নির্বাচনে আল-কুরআনের সৌন্দর্য ও অলৌকিকত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে:</p>
<p>إِذْ يُغَشَيْكُمُ النُّعَاسَ آمَنَةً مِّنْهُ</p>
<p>যখন তিনি তোমাদের প্রশান্তির জন্য নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর নিদ্রার চাদর বিছিয়ে দিলেন। (সূরা আল-আনফাল: ১১)</p>
<p>এ আয়অতে নিদ্রাকে النُّعَاسَ (তন্দ্রাবেশ) শব্দ দিয়ে প্রচণ্ড প্রভাবের কথা বুঝানো হয়েছে। মনে হয় নিদ্রা এক ধরনের পাতলা ও সূক্ষ্ম চাদর যা খুব আরাম ও মসৃণতার সাথে ঢেকে দেয়। آمَنَةً مِّنْهُ শব্দ থেকে মনে হয় গোটা পৃথিবীব্যাপী প্রশান্তি ও নিরাপত্তা ছেয়ে আছে।</p>
<p>শব্দ ও উচ্চারণ থেকে চিত্রায়ণ আমরা আল-কুরআনের সর্বশেষ সূরা- সূরা আন- নাসেও দেখতে পাই। চিন্তা করে দেখুন:</p>
<p>قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ &#8211; مَلِكِ النَّاسِ &#8211; إِلَهِ النَّاسِ &#8211; مِنْ شَرِّ الوسوَاسِ الْخَنَّاسِ &#8211; الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ – مِنَ الجنة والناس &#8211;</p>
<p>বলে দাও, আমি মানুষের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। (আশ্রয় চাচ্ছি) লোকদের প্রকৃত বাদশাহরে নিকট। মানুষের ইলাহ্‌র নিকট। শয়তানের খারাপ ওয়াসওয়াসা থেকে (যে আল্লাহর নাম শুনে ভেগে যায়), যে লোকদের অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। চাই সে মানুষের থেকে হোক কিংবা জ্বিনদের মধ্য থেকে। (সূরা আন-নাস: ১-৬)</p>
<p>এ সূলাটিকে বার বার পড়ুন এবং দেখুন আপনার আওয়াজ একটি পরিপূরণ ওয়াসওয়াসার সৃষ্টি করবে যা অবিকল সূরায় বর্ণিত ওয়াসওয়াসার মতো। বিশেষ করে নিম্নোক্ত আয়াত পাঠে সৃষ্টি হয়।</p>
<p>مِنْ شَرِّ الْوَسْوَسِ الْخَنَّاسِ &#8211; الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورُ النَّاسِ</p>
<p>আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন। ইরশাদ হচ্ছে:</p>
<p>كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ ، إِنْ يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا</p>
<p>কতো কঠিন তাদের মুখের কথা, তারা যা বলে তাতো সবই মিথ্যে। (সূরা কাহাফ: ৫)</p>
<p>এ আয়াতটিও আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। তবে সামান্য পার্থক্য আছে। এ আয়াতে একটি দোষের কথা বলা হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তান আছে। এ আয়াতে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এ চরম মিথ্যে কথাটিকে খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন প্রথমে كَبُرَتْ কথাটি বলে কর্তকে গোপন রাখা হয়েছে। আবার كَلِمَةً শব্দটি তমীয ও নাকারা (অনির্দিষ্ট) হিসেবে নিয়ে জঘণ্যতার মাত্রাধিক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর مِنْ أَفْوَاهِهِمْ বলে বুঝান হয়েছে, কথাগুলো মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃত এবং অজ্ঞতা প্রসূত বের হয়েছে। أَفْوَاهِهِمْ এর মাধ্যমে যে ঘৃণা ও নীচতা সৃষ্টি হয় তাকে বলবৎ রাখা হয়েছে। এ শব্দটি উচ্চারণের সময় মুখকে সামান্য ফাঁক করা হয় কিন্তু শেষ মীম টি উচ্চারণের সাথে সাথে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তখনও কণ্ঠনালী থেকে বাতাস বেরিয়ে মুখ ভর্তি থাকে।</p>
<p>এক ধরনের শব্দ আছে, যা বিষয়বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে ঠিকই কিন্তু নিজের বক্তব্য ও আওয়াজকে কানে প্রবেশ করিয়ে নয়। তার চিত্রের পরিধি শুধুমাত্র ঐ ছায়ার মতো যা চিন্তার জগতে সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য যে, শব্দ এবং বাকের নিজস্বএক ছায়া বা প্রতিবিম্ব থাকে, যখন মানুষের দৃষ্টি পড়ে তখন তা দৃষ্টিগোচর হয়। এর উদাহরণ হচ্ছে নিচের এ আয়াতটি:</p>
<p>وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَا الَّذِي أَتَيْنُهُ أَيْتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا</p>
<p>তাদেরকে ঐ ব্যক্তির অবস্থা শুনিয়ে দাও যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। (সূরা আরাফ: ১৭৫)</p>
<p>এ আয়াতে ‘ফানসালাখা’ শব্দটি দ্বারা অনুমিত হয়, ঐ ব্যক্তিকে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিল সে তা থেকে কিভাবে বেরিয়ে গেছে। নিচের আয়াতটিও আরেকটি উত্তম উদাহরণ:</p>
<p>فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَيْفًا يَتَرَقُبُ</p>
<p>অতপর তিনি প্রভাতে শঞরে ভীত শংকিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। (সূরা কিসাস: ১৮)</p>
<p>এ আয়াতে يُتَرَ قُتُ শব্দে হযরত মূসা (আ)-এর ভীত ও শংকিত হবার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সামনে রাখতে হবে যে, হযরত মূসা (আ) ভয়ের প্রকাশ স্থল ‘ফিল মাদীনাতি’ অর্থা শহরকে মনে করেছেন যা সাধারণ শান্তি ও নিরাপত্তার হয়ে থাকে। যদিও ‘ইয়াত্তারাক্কাবু’ ঐ সমস্ত জায়গাকেই বলা হয় যেখানে ভয়-ভীতি লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে শান্তি নিরাপত্তার জায়গাকে ভীতিকর চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>আমরা ইতোপূর্বে ‘কল্পনা ও রূপায়ণ’ অধ্যায়ে এ ধরনের উদাহরণ পেশ করেছি, সেগুলোও এর সাথে পূর্ণ সঙ্গতি রাখে।</p>
<p>কখনো কখনো একই শব্দে আওয়াজ এবং প্রভাব একত্রিত হয়ে থাকে। যেমন:</p>
<p>يَوْمَ يُدَعُونَ إِلَى نَارِ جَهَنَّمَ دَعا</p>
<p>যেদিন তাদেরকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ধাক্কিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (সূরা আত-তুর: ১৩)</p>
<p>এ আয়াতে دَعا শব্দটি আওয়াজ ও প্রভাবের সাথে সাথে তার তাৎপর্যের চিত্র সৃষ্টি করে। এখানে চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে دَعا শব্দের অর্থ জোরের সাথে ধাক্কা দেয়া। যখন খুব জোরে কাউকে ধাক্কা দেয়া হয় তখন তার মুখ থেকে তার অজান্তে عُو শব্দটি বেরিয়ে যায়। এ শব্দটি دَعا শব্দের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যশীল। নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:</p>
<p>خَذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ</p>
<p>একে ধরো এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। (সূরা দুখান: ৪৭)</p>
<p>এ আয়াতে فَاعْتِلُوهُ শব্দটির আওয়াজ কানে প্রবেশ করা মাত্র ভাবজগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং একটি জীবন্ত ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে।</p>
<p>এ অধ্যায়ে আমরা সেইসব শব্দের উল্লেখ করতে পারি, যে সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম, আওয়াজটাই তার আক্ষরিক অর্থের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন النُّعَاسَ (তন্দ্রা), التَّنَفْسُ (শ্বাস গ্রহণ করা), الطامة (কিয়ামত)। এসব শব্দ আওয়াজের সাথে সাথে একটি ছায়াও সৃষ্টি করে। কিন্তু এর আওয়াজ ও ছায়ার মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান তার সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। যখন শব্দ তার অর্থ ও ভাবের ছবি অংকন করে তার ধ্বনি ও ভাব একত্রিত হয়ে যায়। তা শুধু অর্থগত দিকে নয় বরং চিন্তা ও চিত্রের দিকেও ধাবিত হয়। আর ঐ জায়গাটিই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্যস্থল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>৩</h4>
<p>আল-কুরআন তার বক্তব্য তুলে ধরার জন্য দৃশ্যায়নের যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তার মধ্যে তাকাবুল বা বৈপরিত্যও একটি। কুরআন যেখানে শব্দের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চিত্র অংকন করতে চায় সেখানে অধিকাংশ সময় তাকাবুল পদ্ধতির অনুসরণ করে থাকে। যেমন :</p>
<p>وَمِنْ أَيْتِهِ خَلْقُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ ، وَهُوَ علَى جَمْعِهِمْ إِذَا يَشَاءُ قَدِيرٌ</p>
<p>তার এক নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব প্রাণী ছড়িযে দিয়েছেন। তিনি তখন ইচ্ছে এগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম। (সূরা আশ শুরা: ২৯)</p>
<p>এ আয়াতে بَثَّ (বিক্ষিপ্ত) এবং جَمْعِهِمْ (একত্রিত করা) শব্দদ্বয় তাকাবুল বা বৈপরিত্যের। বিপরীতমুখী এ শব্দ দুটোকে একই আয়অতে একত্রে প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা হয়েছে। যা চিন্তার জগতে একের পর এক ছবির মতো আবির্ভূত হয়। যদিও শব্দ দুটো বিপরীতার্থক তবু তা সুন্দরভাবে মিলে গেছে।</p>
<p>নিচের আয়াতটিতে জীবন ও মৃত্যু বিপরীতধর্মী দুটো চিত্রকে একত্রিত দেয়া হয়েছে।</p>
<blockquote><p>أَوَلَمْ يَهْدِ لَهُمْ كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْقُرُونِ يَمْشُونَ فِي مَسْكِنِهِمْ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ الْأيْت أَفَلَا يَسْمَعُونَ &#8211; أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَسُوقُ المَاءَ إِلَى الْأَرْضِ الجُرُزِ فُنُخْرِجُ بِهِ زَوْعًا تَأْكُلُ مِنْهُ أَنْعَامُهُمْ وَأَنْفُسُهُمْ ، أَفَلَا يُبْصِرُونَ &#8211;</p>
<p>এতে কি তাদের চোখ খুলেনি, আমি তাদের পূর্বে অনেক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যাদের বাড়ি-ঘরে এরা বিচরণ করে। অবশ্যই এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে। তারা কি শোনে না? তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি উষর ভূমিতে পানি প্রবাহিত করে শস্য উৎপন্ন করি। যা তারা এবং তাদের পশুগুলো খেয়ে থাকে। তারা কেন এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে না? (সূরা সাজদা: ২৬-২৭)</p></blockquote>
<p>দেখুন, এ আয়াতে জীবন মৃত্যুর মধ্যে কতো পার্থক্য। প্রথমে ঐ সমস্ত লোকের কথা বলা হয়েছে যার একদিন জমিনের ওপর চলাফেলা করতো। আজ তারা মৃত, তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তাদের আবাসভূমি বিরাণ। আবর পলকের মধ্যে অন্য রকম এক চিত্রের অবতারণা। মৃত জমিনকে সবুজ-শ্যামল করে সুশোভিত করার চিত্র। এখানে তাকাবুল বা বৈপরিত্ব মূলত এক অবস্থার সাথে আরেক অবস্থার মধ্যে নয় বরং জীবন ও মৃত্যুর সাথে।</p>
<p>এ ধরনের ‘তাকাবুল’ (বৈপরিত্য)-এর চিত্র পরকালীন জীবনের শান্তি ও শাস্তি প্রসঙ্গে যেসব জায়গায় বলা হয়েছে সেখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ধরনের কতিপয় উদাহরণ আমরা নিচে বর্ণনা করলাম।</p>
<p>كَلَّا إِذَا ذُكت الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا &#8211; وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجَايْءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يُتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذكرى &#8211; يَقُولُ يُلَيْتَنِي قَدَّمَتْ لِحَيَاتِي &#8211; فَيَوْمَئِذٍ الْايُعَذِّبُ عَذَابَةٌ أَحَدٌ &#8211; ولا يُؤْثِقُ وثَاقَةٌ أَحَدٌ &#8211; يَايْتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ &#8211; ارْجِعِي إِلى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةٌ &#8211; فَادْخُلِي فِي عِبْدِي &#8211; وَادْخُلِي جَنَّتِي &#8211;</p>
<p>এটি অনুচিত। যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং তোমার প্রতিপালক আবির্ভূত হবেন। ফেরেশতাগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িযে যাবে এবং জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে। কিন্তু এ স্মরণ তার কী কাজে আসবে? সে বলবে : হায় আমিযদি এ জীবনের জন্য আগেই কিছু পাঠিয়ে দিতাম। সেদিন তার শাস্তির মতো শাস্তি কেউ দেবে না এবং সে বাঁধনের মতো বাঁধনও কেউ দেবে না। (সূরা ফজর: ২১-৩০)</p>
<p>চিন্তা করে দেখুন, একদিকে জাহান্নাম ভয়াবহ রূপে উপস্থিত এবং অপরদিকে ফেরেশতাগণ সেনাবাহিনীর মতো ঘিরে দাঁড়ানো। জাহান্নাম অত্যন্ত ভয়াল মূর্তিতে আবির্ভূত। তার শাস্তি এতো ভয়ঙ্কর যার কোন উপমা নেই।</p>
<p>এমন বিপদ এবং বিপর্যয়ের মুহূর্তেও ঈমানদারদেরকে ডেকে বলা হবে:</p>
<blockquote><p>بايْتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مُرْضِيَّةً &#8211; فَادْخُلِي فِي عِبْدِي &#8211; وَادْخُلِي جَنَّتِي</p>
<p>হে প্রশান্ত মন! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরা ফজর: ৩০)</p></blockquote>
<p>এমন বিভিষিকাময় অবস্থায়ও একজন মু’মিনকে দরদ ও স্নেহমাখা বাক্যে আহ্বান করা হবে- ‘হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার রব্ব-এর দিকে ফিরে যাও।’ আর এ ফিরে যাওয়ার মধ্যে ঐ বান্দা এবঙ প্রতিপালকের সাথে গভীর ভালবাসা ও সন্তোষের প্রমাণ পাওয়া যায়। رَاضِيَةً مُرْضِيَّةً অর্থাৎ উভয়ে উভয়ের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন। এসব শব্দে প্রেম-ভালবাসার যে নিদর্শন পাওয়া যায় মনে হয় পুরো পরিবেশটাই প্রীতিডোরে বাধা। তারপর বলা হয়েছে: فَادْخُلِي فِي عِبْدِي আমার বিশেষ বান্দাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং তাদের তাদের সাথে হৃদ্যতা সৃষ্টি করো। وَادْخُلِي جَنَّتِي তারপর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। জাহান্নামের বর্ণনা পুরো পরিবেশটিকে ভয় ও পেরেশানীর এক চিত্রে ঘিরে রেখেছিল। এখানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র পাওয়া যায়। যা প্রেম-প্রীতিতে পরিপূর্ণ।</p>
<p>ওপরের উদাহরণটি ছিল কাফির ও মু’মিনের মধ্যে বিপরীতধর্মী এক চিত্র। একন আমি জাহান্নামীদের আযাব ও জান্নাতীদের নিয়ামতের বিপরীতধর্মী এক চিত্র পেশ করছি।</p>
<blockquote><p>هَلْ أَنَّكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ &#8211; وَجُوهٌ يَوْمَئِذٍ خَاشِعَةٌ &#8211; عَامِلَةٌ ناصِبَةٌ &#8211; تَصْلَى نَاراً حَامِيَة &#8211; تُسْقَى مِنْ عَيْنِ أَنِيَةٍ &#8211; لَيْسَ لَهُمْ طعامُ الْآمِنْ ضَرِيع &#8211; لا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُوعٍ &#8211; وُجُوهٌ يَوْمَئِدْ نَّاعِمَةٌ لِسَعِيْهَا رَاضِيَةٌ &#8211; فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ &#8211; لا تَسْمَعُ فِيهَا لاغية &#8211; فِيهَا عَيْنُ جَارِيَةٌ &#8211; فِيهَا سُرُرُ مُرْفُوعَةٌ &#8211; وَأَكْوَابٌ مُوْ ضُوعَةٌ &#8211; وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ &#8211; وَزَرَبِّي مَبْثُونَةٌ &#8211;</p>
<p>তোমার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? অনেক মুখমণ্ডলণ সেদিন হবে লাঞ্ছিত, ক্লিষ্ট-ক্লান্ত। তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে। তাদেরকে ফুটন্ত নহর থেকে পান করানো হবে, আর কাঁটাযুক্ত ঝাড় ছাড়া তাদের জন্য কোন খাদ্য নেই। এতে তাদের দেহের পুষ্টি সাধন কিংবা ক্ষুধা নিবারণ হবে না। আবার অনেক ‍মুখমণ্ডল সেদিন হবে সজীব। তাদের কর্মের কারণে সন্তুষ্ট। তারা থাকবে সুউচ্চ জান্নাতে। সেখানে কোন অসার কথাবার্তা তারা শুনবে না। সেথায় থাকবে প্রবাহিত ঝর্ণা, উন্নত সুসজ্জিত আসন এবঙ সংরক্ষিত পানপাত্র ও সারি সারি গালিচা এবং বিস্তৃত বিছানো কার্পেট।</p></blockquote>
<p>আযাব ও নিয়ামতের বিপরীতধর্মী একটি সুন্দর চিত্র পূর্বের আয়াত কটি। এ ধরনের উদাহরণ আল-কুরআনে অনেক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>৪</h4>
<p>ওপরের উদাহরণগুলো ছিল দু’টো বিপরীতধর্মী চিত্র। কিন্তু এবার আমরা এমন কিছু উদাহরণ পেশ করবো যা বিপরীতধর্মী বটে কিন্তু তার একটি অতীতের এবং অপরটি বর্তমানকালের। অতীতকে কল্পনায় বর্তমানে নিয়ে এসে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী ছবি আঁকা হয়েছে। যেমন:</p>
<p>خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ</p>
<p>তিনি মানুষকে এক ফোটা বীর্য দিয়ে সৃষ্টি করেচেন। তা সত্ত্বেও সে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। (সূরা আন-নাহল: ৪)</p>
<p>যে অবস্থা বর্তমানে আমাদের সামনে উপস্থিত তা একজন প্রকাশ্য ঝগড়াটে خَصِيمٌ مُّبِينٌ ব্যক্তির, কিন্তু অতীতে সে ছিল সামান্য এক ফোটা বীর্য মাত্র। এ দু’ অবস্থার মধ্যে যে ব্যাপক ব্যবধান তাই এখানে বুঝান উদ্দেশ্য। এজন্র দুটো অবস্থার মধ্যবর্তী অবস্থাকে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন একথা প্রকাশ করা যায় যে, মানুষের শুরু যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে তার ঝগড়া করা সাজে না। অনুরূপ আরেকটি উদাহরণ:</p>
<p>وَذَرْنِي وَالْمُكَذِّبِينَ أُولِي انْعْمَةِ وَمَهْلَهُمْ قَلِيْلًا &#8211; إِنَّ لَدَيْنَا انْكَالًا وَجَحِيمًا &#8211; وطَعَامًا ذَاغُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا</p>
<p>বিত্তবৈভবের অধিকারী মিথ্যারোপকারীদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কিছু অবকাশ দাও। নিশ্চয়ই আমার কাছে আছে শিকল, অগ্নিকুণ্ড, গলগ্রহ হয়ে যায় এমন খাদ্য এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা মুজাম্মিল: ১১-১৩)</p>
<p>এখানেও দুটো অবস্থার মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়। এক অবস্থাতো বর্তমানে উপস্থিত অর্থাৎ বিত্তবৈভবের অহংকার। আরেক অবস্থা বর্তমান অনুপস্থিত ‍শুধু কল্পনার রাজ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। এ উদাহরণ থেকে শৈল্পিক ও দ্বীনি গুরুত্বই প্রকাশ পাচ্ছে। নিচের আয়াতগুলো লক্ষ্য করুন:</p>
<blockquote><p>وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لمَزَةٍ وَ الَّذِي جَمَعَ مَالاً وَعَدَدَهُ &#8211; يَحْسَبُ أَنَّ مَالَةٌ أخْلدَهُ &#8211; كَلَّا لِيُنْتَبَذَنْ فِي الحُطَمَة &#8211; وَمَا أَدْرَاكَ مَالْحُطَمَةُ &#8211; نَارُ</p>
<p>পশ্চাতে ও সম্মুখে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ; যে ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে এবং গুণে গুণে হিসেব রাখে। সে মনে করে, তার সম্পদ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কক্ষণ নয়্ সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে ‘হুতামায়’। তুমি কি জান, ‘হুতামাহ’ কি? তা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছুবে। এতে তাদেরকে বেঁধে দেয়া হবে, লম্বালম্বি খুঁটিতে। (সূরা হুমাজাহ: ১-৯)</p></blockquote>
<p>এ সূরাটিতে বিপরীতধর্মী দুটো অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। একটি দুনিয়ার অবস্থা এবং অপরটি আখিরাতের। কিছু দাম্ভিক ও অহংকারী আছে যারা দুনিয়ার বিত্ত বেসাতে মত্ত হয়ে আখিরাতকে ভুলে গেছে এবং দুনিয়ার রঙ-তামাশায় লিপ্ত আছে। কিন্তু তাদের এ চলার পথের অপর প্রান্তে অপেক্ষা করছে জাহান্নাম। এমন জাহান্নাম যা সবকিছুকে পিষ্ট করে দেয় এবং তার আগুন হৃদয় পর্যন্ত স্পর্শ করে। ঐ হৃদয় যা আজ অহংকার ও দাম্ভিকতায় উন্মাতাল। তাদেরক সেখানে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হবে, যেখান থেকে তারা স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসতে পারবে না ‍কিংবা অন্য কেউ বের করে আনতেও সক্ষম হবে না।</p>
<p>নিচের আয়াতে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>واصحب الشَّمَالِ : مَا أَصْحَبُ الشِّمَالِ &#8211; فِي سَمُومٍ وَحَمِيمٍ &#8211; وظل مِنْ يُحْمُوم &#8211; لا بارد ولا كَرِيم &#8211; إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُشْرِفِينَ .</p>
<p>বামপন্থী লোক, (হায়!) বামপন্থী লোকেরা কী আযাবে থাকবে। তারা থাকবে প্রখর বাষ্প ও উত্তপ্ত পানিতে এবং ধুম্রকুঞ্জের ছায়ায়। যা শীতল নয় এবং আরামদায়কও নয়। তারা ইতোপূর্বে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। (সূরা আল-ওয়াকিয়া: ৪১-৪৫)</p></blockquote>
<p>এখানে দুটো অবস্থাকে মুখোমুখি পেশ করা হয়েছে। এক অবস্থা হচ্ছে জাহান্নামীদের বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ গরম বাষ্প, গরম পানি, ধুয়ার ছায়া যা শুধু নামেমাত্র ছায়া। এ কঠিন অবস্থাকে তাদের পূর্বের অবস্থার (অর্থাৎ সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের) সাথে মুখোমুখি করে পেশ করা হয়েছে।</p>
<p>ওপরে বর্ণিত অবস্থা এবং তার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অবস্থার মধ্যে এক সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যাপার আছে। এ আয়াতে যেসব লোকের কথা বলা হচ্ছে তারা রীতিমতো জীবিত এবং দুনিয়ায় বিচরণত। দুনিয়ার সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের করায়ত্ব্ এ অবস্থাটি বর্তমানে বিদ্যমান। আখিরাতে তাদের জন্য য দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে তা পরের কথা। কিন্তু সেই পরের অবস্থাকে কুরআন বর্তমান অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। পাঠক মনে করেন দুনিয়ার লেনদেন চুকিয়ে ঐ অবস্থায় তারা ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে, যে অবস্থা তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। তাদের পেছনের সমস্ত সুখ-সম্ভোগ শেষ হয়ে গেছে। তারা তীব্র আযাবের সম্মুখীন। এমতাবস্থায় তাদের পেছনের কথা, সেই সুখের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে।</p>
<p>মনে হতে পারে, এটি আশ্চরয ধরনের চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু তাতে কি? কুরআন বহু জায়গায় এ ধরনর স্টাইলে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। কুরআনের এ বর্ণনা শৈল্পিক এবং দ্বীনি দুটোরই আবেদন রাখে। শিল্পের অনুসন্ধানী মনে করে- এ শুধু উপমা উৎক্ষেপণ নয় বরং এটি অনুভব ও বোধের সীমানা ছাড়িযে চোখের সামনেই সংঘটিত একটি ঘটনা, যা ঘটে চলছে।</p>
<p>দ্বীনি অনুসন্ধানীদের অনুভূতি হচ্ছে জাহান্নামে সংঘটিতব্য ঘটনাবলীর ওপর এমন দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন) করা উচিত, যেন তা এখনই সংঘটিত হচ্ছে। তার সম্পর্ক উপলব্ধির সাথে। আর এ দৃঢ় বিশ্বাস মানুষকে ঈমানের দাওয়াত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করে।</p>
<p>নিচের আয়াতটিও ওপরের উদাহরণের সাথে সম্পর্ক রাখে।</p>
<blockquote><p>خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الجَحِيمِ &#8211; ثُمَّ صُبُوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ &#8211; ذُنْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ</p>
<p>একে ধরো এবং টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে যাওদ। (এখন) মজা বুঝ। তুমিতো সম্মানত সম্ভ্রানত। (সূরা আদ-দুখান: ৪৭-৪৯)</p></blockquote>
<p>নিচের আয়াতটিও বিপরীত ধর্মী এক চিত্র পেশ করে:</p>
<blockquote><p>كَلَّا إِذا بلغت الشراقي &#8211; قَبْلَ مَنْ رَاق &#8211; وظنَّ أَنَّهُ الفِراق &#8211; &#8211; التفت الله بالساة &#8211; الى رَبِّكَ يَوْمَندَ الْمَسَاقُ &#8211; فَلَا صَدَقَ</p>
<p>কখনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে ঝাড়-ফুঁক করবে? আর সে মনে করবে, বিদায়ের মুহূর্তটি এসে গেছে এবং পায়ের গোছা অপর গোছার সাথে জড়িয়ে যাবে। সেদিন তোমার রব্ব-এর কাছে সবকিছু উপস্থিত করা হবে। সে বিশ্বাস করেনি এবঙ নামায পড়েনি। পড়ন্তু মিথ্যা মনে করেছে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। তারপর সে দম্ভভরে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গেছে। (সূরা কিয়ামাহ: ২৬-৩৩)</p></blockquote>
<p>উক্ত আয়াতগুলোতে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী চিত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এক, অতীতে যা অতিবাহিত হয়েছে। মন হয় যেন, গোটা সৃষ্টি জগৎ তার সমস্ত সৌন্দর্য হারিয়ে ম্রিয়মান হয়ে গেছে। এমন একটি সময় ছিল- যখন মৃত ব্যক্তি নামায আদায় করেনি, কুরআনের সত্যতা মেনে নেয়নি। এক অবস্থা (অর্থাৎ মৃত্যুর সময়) চোখের সামনে উপস্থিত। আর সে নির্বিকার। মৃত্যুর সময় উপস্থিত, ভয়ে এতোটা বিহ্বল যে, দু’ পা ঠক্‌ঠক করে কাঁপছে। আত্মা গলা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে্ প্রশ্নকারী প্রশ্ন করছে, কোন ঝাড় ফুঁককারী নেই? যে এ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। যেভাবে জ্বিন-প্রেতের আসর থেকে মুক্তির জন্য ঝাড়-ফুঁকের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।</p>
<p>মুমূর্ষ ব্যক্তি মনে করে, আজ আমার পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দিন। বিগত দিনের স্মৃতি তার হৃদয়পটে ভেসে উঠে। নবী করীম (স)-এর দাওয়াত থেকে দাম্ভিকতার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিজের পরিজনের কাছে চলে আসা, তাঁর দাওয়াতকে মিথ্যে মনে করা। দুটো ছবিই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। কিন্তু তাতে কোন কল্যাণ হবে না। কারণ পা তো একটির সাথে আরেকটি পেঁচিয়ে রয়েছে। এখন আর সময় নেই। এখন তো রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য যাত্রা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15855</post-id>	</item>
		<item>
		<title>এক নজরে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তা-দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 16:10:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15839</guid>

					<description><![CDATA[পৃথিবীর অতীত ইতিহাসে নজর বুলালে সুগভীর পর্যবেক্ষণ বা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ব্যতীতই স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও এটাই প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, একটি সভ্যতা তার ধারক-বাহকদের দ্বারা পরিচালিত হবার পূর্বে উক্ত সভ্যতার উত্থান ও বিকাশ হয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন চিন্তাশীল-দার্শনিকের হাতে।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p dir="ltr">পৃথিবীর অতীত ইতিহাসে নজর বুলালে সুগভীর পর্যবেক্ষণ বা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ব্যতীতই স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও এটাই প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, একটি সভ্যতা তার ধারক-বাহকদের দ্বারা পরিচালিত হবার পূর্বে উক্ত সভ্যতার উত্থান ও বিকাশ হয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন চিন্তাশীল-দার্শনিকের হাতে।</p>
<p dir="ltr">আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তেমনি একজন সুমহান ব্যক্তিত্ব, এ-যুগের ইমাম গাজালী। যার হাত ধরে গড়ে উঠেছে আগামীর বিশ্ব দর্শন। যার ক্ষুরধার লেখনীতে পর্যদুস্ত একালের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিসমূহ। গ্রীক থেকে শুরু করে তথাকথিত মধ্যযুগ পেরিয়ে হাল আমলের আধুনিক সব আখলাকবিহীন দর্শনগুলোকে একের পর এক খণ্ডন করে গেছেন তিনি। বিপরীতে উপস্থাপন করে গেছেন আখলাক-সম্পন্ন, আদালাত-সমৃদ্ধ ও মারহামাতপূর্ণ যুগোপযোগী সব বিশ্ব দর্শন। তৈরি করেছেন নিজস্ব এক পরিভাষার ভাণ্ডার, যা দিয়ে বর্ণনা করে গেছেন তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা। তিনি তাঁর চিন্তাধারায় অনন্য। তাঁর প্রতিটি কর্ম বিশ্বব্যাপী সুপ্রসিদ্ধ সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বিষয়বস্তু।</p>
<p dir="ltr">যুগের মহান এই ব্যক্তিত্ব, তাঁর দর্শন, তাঁর চিন্তাধারা ও তাঁর কর্মসমূহ আমাদের সামনে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছেন এই যুগেরই অপর আরেকজন মহান ব্যক্তিত্ব, হাদীস বিশারদ ও মুজতাহিদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ। অসাধারণ ও সাবলীলভাবে অনুবাদান্তে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক ও শিক্ষাবীদ বুরহান উদ্দীন আজাদ। আর, যুগের ইমাম গাজালীকে উম্মাহর সামনে বাংলা ভাষায় পরিচয় করে দিয়েছে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার।</p>
<p dir="ltr">আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তাধারা ও তাঁর দর্শন নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করাটা একেবারেই অসম্ভব। কারণ, যে দার্শনিক একইসাথে দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটি নিয়ে একত্রে কাজ করে গেছেন, ত্রিশেরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং প্রতিটি বিষয়েই যিনি নিজস্ব পরিভাষার অসাধারণ এক সমাহার তৈরি করেছেন, তাঁকে নিয়ে ক্ষুদ্র একটা প্রবন্ধে বিস্তর আলোচনা কখনই সম্ভব না।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔷উম্মাহর সংকট উত্তরণে প্রণীত দর্শন</strong></p>
<p dir="ltr">মহান এই দার্শনিকের চিন্তাধারার মূলভিত্তি প্রোথিত আছে পাঁচটি প্রশ্নের ভেতরে, যে প্রশ্নগুলো তিনি নিজেই নিজেকে করেছেন। প্রশ্ন পাঁচটি এমন,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আমরা কারা?</li>
<li dir="ltr">২. পাশ্চাত্য সভ্যতা কারা?</li>
<li dir="ltr">৩. পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রকৃতি কেমন?</li>
<li dir="ltr">৪. শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের নামে তারা আমাদের কী দিয়েছে?</li>
<li dir="ltr">৫. আমাদের বর্তমান অবস্থান কোথায় এসে পৌছেছে?</li>
</ul>
<p dir="ltr">যেহেতু মহান এই দার্শনিক উম্মাহর স্বার্থে এবং নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ বা ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য সামগ্রিক বিশ্ব দর্শন প্রণয়ন করেছেন, নতুন দুনিয়ার উসূল উপস্থাপন করেছেন, তাই মুসলিমদের সংকট উত্তরণে তাঁর প্রদত্ত দর্শন ও প্রস্তাবনাগুলোর উপর একনজর বুলিয়ে নেওয়া উচিত।</p>
<p dir="ltr">তিনি মনে করেন, পাশ্চাত্যের জুলুমের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে মুসলিমরা দুই ধরনের সংগ্রাম করছে। যথা,</p>
<ul>
<li>১. জুযয়ী তথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আন্দোলন। এখানে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।</li>
<li>২. কুল্লী তথা সামগ্রিক বা বড় আন্দোলন। এখানে তিনি চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলনকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এ-দর্শনের মাধ্যমে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান চিন্তা ও আখলাক-বিহীন রাজনৈতিক আন্দোলনকে অকার্যকর বলে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্যে,</p>
<blockquote>
<p dir="ltr">&#8220;মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে সমাজ পরিবর্তনের জন্য মুসলিমদেরকে রাজনৈতিকভাবেই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো পথ উন্মুক্ত নেই—এই বিষয়টি এখন সবার মাঝে এমন গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, এই পন্থা ব্যতিত আর কোনো পন্থাকেই মুসলিমরা সহজে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু, রাজনৈতিক বিষয়াবলি বাদেও যে সমাজ পরিবর্তন করা যায়, এই বিষয়টা উম্মাহকে বুঝানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার হলেও সবাইকে আখলাকী ও চিন্তাগত পন্থায় সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা উপলব্ধি করাতে হবে। কারণ, মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হয় চিন্তা ও আখলাকী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।&#8221;</p>
</blockquote>
<p dir="ltr">এই বিষয়কে সামনে রেখেই তিনি তাঁর সকল গ্রন্থ-কে সাজিয়ে নিয়েছেন।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের এমন দর্শনের পেছনে অন্যতম যে বিষয়টি মুখ্য হিসেবে কাজ করেছে, সেটি হলো, মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে বিগত বছরগুলোয় মুসলিমদের চালানো প্রচেষ্টাগুলোকে বিশ্লেষণ করে তিনি এগুলোকে পাঁচভাগে বিভক্ত করেছন। যথা,</p>
<ul>
<li>১. প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>২. রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৩. সেক্যুলারিজমের চিন্তাধারাকে কেন্দ্রে রেখে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৪. পাশ্চাত্যের সৃষ্ট মডারেট চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে মডার্ন ধারার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৫. শক্তির মাধ্যমেই শক্তির জবাব দিতে হবে, এমন ধারণা থেকে চরমপন্থা বা প্রান্তিকতার মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এসকল কারণেই তিনি মনে করেন, আমাদের এখন মৌলিক কাজ হলো, চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলন গড়ে তোলা। তিনি শুধু এটা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি এর উপায়ও বাতলে দিয়ে গেছেন।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, আমরা যেহেতু আমাদের সংকট উত্তরণ করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে প্রথমে এই সংকট নিয়েই পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা আমাদের এই সংকটের বাহ্যিক সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। কিন্তু, অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা তেমন আলোচনা করি না। অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখি, বর্তমানে আমরা বৃহৎ দু&#8217;টি সমস্যার মধ্য দিয়ে আমাদের সময় অতিক্রম করছি। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আল আফাতুল বায়ানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমাদের ভাষাগত সমস্যা।<br />
আমাদের কথ্য, লিখিত, চিন্তাগত ও দার্শনিক ভাষার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। প্রতিটি সেক্টরে আমরা ব্যতিক্রমধর্মী সব ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন করে থাকি। আবার ক্ষেত্রবিশেষে একই ভাষার ব্যবহার বা প্রচলন হলেও তার মধ্যে রয়েছে ভাষার ধরনের ভিন্নতা।</li>
<li dir="ltr">২. আল আফাতুল আমানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমাদের ঈমান, আকল ও চিন্তা একই রেখায় ফাংশন করতে না পারার সমস্যা।</li>
</ul>
<p dir="ltr">যেহেতু আমাদের সমস্যা এখন চিহ্নিত হয়ে গেছে, অতএব এর সমাধানে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। মহান এই দার্শনিক এই সমাধানকল্পে দু&#8217;টি দর্শনকে সামনে নিয়ে আসেন। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আল ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ। অর্থাৎ, জ্ঞানের সাথে বিশ্বাসের সমন্বিত একটি দর্শন।</li>
<li dir="ltr">২. আল ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমান ও আমানত সম্বলিত একটি দর্শন।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এদু&#8217;টোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে তিনি আল ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ নিয়ে একটু বেশি কাজ করে গেছেন। এর উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, এটাকে তিনি শুধু একটা ফিলোসফি হিসেবেই দেখেননি, বরং ফিকহের মতো একটা বিষয়ের সাথেও এটাকে ওতপ্রতভাবে সম্পৃক্ত করেন। পাশাপাশি কালাম ও তাসাওফ—এদু&#8217;টি এবং ফিকহ; জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি শাখাকে তিনি নতুন করে গঠন করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।</p>
<p dir="ltr">ফিকহ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের ফিকহ অনেকটা আমর ও নাহীর উপর ভিত্তি করে রচিত। বর্তমানে, জ্ঞানের এই শাখায় আমান ও আমানতের বিষয়টি বেশ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ইলমুল কালাম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হলো, মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র ইরাদা ও কুদরাতের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। আর, তাসাওফকে তিনি উপরোক্ত দু&#8217;টি শাখার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন। কারণ, ইসতিদলাল, ইসতিমবাত ও ইসতিবসারকে একত্রে বিবেচনা করে থাকেন তিনি। অর্থাৎ, ফিকহ, কালাম ও তাসাওফ—জ্ঞানের এই তিনটি শাখাকে সদা একই রেখায় রেখে কাজ করে যেতে হবে।</p>
<h5 dir="ltr">অন্যান্য দর্শনসমূহ:</h5>
<p dir="ltr"><strong>🔹আল মানহাজ</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর চিন্তাধারা পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে সামনে রেখে তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো আল-মানহাজ, এর অর্থ পদ্ধতি বা পন্থা । তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস-এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক মীরাস পর্যালোচনা করার জন্য নতুন একটা পন্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কীভাবে বুঝবো, সেটার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক সময়ে এসে আমরা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত চিন্তার প্রভাবে সকল কিছুকেই খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি। সকল কিছুকে খণ্ডিত করে দেখা একটি ভুল পন্থা। এই পন্থাটি আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। যার ফলে ইসলামী চিন্তাকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করার সক্ষমতাকেও আজ হারিয়ে ফেলেছি আমরা।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹মডার্নিটি</strong><br />
মডার্নিটি কিংবা আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি রুহুল হাদাসা নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের আধুনিকতা নামে একটি আধুনিকতা রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিকতা একমাত্র কিংবা অনুপম নয়। প্রতিটি চিন্তাই তার মতো করে তাদের নিজস্ব আধুনিকতা তৈরি করতে পারে। পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে, তার কিছু মৌলিক পরিভাষা রয়েছে। যেমন- ধর্মহীন বিশ্বদর্শন (Secular World View), রেশনালিজম, হিউম্যানিজম ইত্যাদি। কিন্তু, আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও পরিভাষার মাধ্যমেই আমাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি আধুনিকতার বিকাশ ঘটাতে পারি। অর্থাৎ আধুনিকতার রূহকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের রূহকে বিনির্মাণ করতে পারলে সেই রূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আধুনিকতার উদ্ভব ঘটবে ।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹আখলাক</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অর্জনকারী বিষয় হলো আখলাক। বিষয়টিতে তিনি অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে দ্বীন ও আখলাকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল ধরণের বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেন। দ্বীনকে আখলাক হিসেবে ও আখলাককে দ্বীন হিসেবে অভিহিত করেন। &#8216;Cogito, ergo sum&#8217; (চিন্তা করি এই জন্যই আছি) চিন্তার বিপরীতে &#8216;আমি আখলাকসম্পন্ন, এই জন্য আমি আছি&#8217;-এই চিন্তার বিকাশ ঘটান।</p>
<p dir="ltr">আখলাকী চিন্তার ক্ষেত্রে মুসলিম আলেমদের চিন্তার সমালোচনা করে বলেন, তাঁদের চিন্তার মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কেননা, আখলাককে তাঁরা পূর্ণতাদানকারী একটা বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু আখলাক পূর্ণতাদানকারী কোনো বিষয় নয়। এটি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। আখলাক ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। আখলাক পূর্ণতার (কামালিয়াত) সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়, এটা অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা দ্বীন ও মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আখলাক ছাড়া দ্বীন হতে পারে না, আখলাক ছাড়া মানুষ হতে পারে না। মানুষের যে সংজ্ঞা, সেই সংজ্ঞার একাংশ জুড়ে আছে আখলাক, বাকি অংশ হলো দ্বীন। তবে উল্লেখ্য বিষয় হলো, এক্ষেত্রে দ্বীন হলো মূল বিষয়।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, রাজনীতি থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ করার চেয়ে দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা আরো বড় ধরণের হুমকি। আর এ বিষয়কে তুলে ধরার জন্য তিনি দাহরানিয়্যাহ নামক একটি পরিভাষা তৈরি করেছেন। দাহরানিয়্যাহ হলো, দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা। আর এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিপদজনক বিষয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹আকল</strong><br />
একজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আকলের উপরেও অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন মহান এই দার্শনিক। এ বিষয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। আকলকে তিনি আকলে মুজাররাদ, আকলে মুয়ায্যাদ ও আকলে মুসাদ্দাদ নামে তিন ভাগে বিভক্ত করেন।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, আকলে মুজাররাদ হলো বুরহানী আকল। এটি এমন আকল, যা দ্বীনি ক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে। এই ধরণের আকল হলো বিমূর্ত (Abstract) ও যান্ত্রিক। এ ধরণের আকল বিজ্ঞানাগারে, কল কারখানায় ও একাডেমিক গবেষণার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু, মানুষের সাথে তার রবের ও মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক এই আকলের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি আমলের মাধ্যমে সজ্জিত আকলকে আকলে মুসাদ্দাদ নামে নামকরণ করেছেন। আর যে আকল আখলাকী মূল্যবোধের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হয়েছে, সেই আকলকে তিনি &#8216;আকলে মুয়ায়্যাদ&#8217; নামে অভিহিত করেন।</p>
<p dir="ltr">তিনি মনে করেন, আকল শুধুমাত্র একমুখী হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ আকলকেই ছোট করা। কেননা, আকল আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত। এজন্য এই নেয়ামতকে বহুমুখী হিসেবে দেখতে হবে। আকল কোনো জাওহার নয়। আকল হলো একটি কর্ম। এই কারণে তিনি তা&#8217;আক্কুলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹ফিতরাত</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান ফিতরাতের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি তাঁর সকল গ্রন্থেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p dir="ltr">কেননা, তাঁর মতে, মানুষের পূর্বে থেকেই দ্বীন বিরাজমান ছিলো। মানুষের সৃষ্টি হয়েছে দ্বীনের পরে। শুধু তাই নয়, খুলক-ও (আলাক) খালকের (সৃষ্টির) পূর্বে সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের সৃষ্টির পূর্বেই খুলক-এর অস্তিত্ব ছিলো। পরবর্তীতে এটা ফিতরাতরূপে মূল্যবোধের একটি ভাণ্ডার হিসেবে মানুষের ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। দ্বীন মানুষের মধ্যে পরবর্তীতে স্থাপিত কোনো বিষয় নয়। বরং, মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্বপ্রাপ্ত মৌলিক একটি হাফিজার (সংরক্ষণশালা) মধ্যে দ্বীনের অর্থের জগত লুক্কায়িত। আর এই হাফিজা বা সংরক্ষণশালার নাম হলো ফিতরাত।</p>
<p dir="ltr">দ্বীন মানুষকে সঙ্গ দানকারী একটি হাকীকত। মানুষ এ হাকীকত থেকে কখনো পৃথক হতে পারবে না। অপর দিকে পয়গাম্বরদের মাধ্যমে যে দ্বীন এসেছে, সেটা মূলত তাজকীর বা স্মারক। অর্থাৎ, মানুষের ফিতরাতের মধ্যে যা রয়েছে, সেটাই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এ কারণে কোরআনকে যাক্কির (স্মারক) এবং পয়গাম্বরকে মুজাক্কির বলা হয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹পরিভাষা</strong><br />
পরিভাষা তৈরি করার ক্ষেত্রেও তিনি অতুলনীয়। কিছুদিন আগে এ ব্যাপারে কামুসু ত্বহা নামে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ত্বহা আব্দুর রহমানের মতে, মুসলিম উম্মাহ পরিভাষাগত একটি আক্রমণের শিকার। এক্ষেত্রে তিনি &#8216;আল-উদওয়ানুল মাফহুমী&#8217; নামক পরিভাষা ব্যবহার করেন।</p>
<p dir="ltr">তিনি বলেন, পরিভাষা তৈরি করা ও পরিভাষার অধিকারী হওয়ার অর্থ হলো, সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়া। কোনো কিছুকে শক্তি প্রয়োগ করে পরিবর্তন করার চেয়ে পরিভাষার মাধ্যমে পরিবর্তন করা বেশি স্থায়ী হয়ে থাকে। পরিভাষার মধ্য দিয়ে বড় বড় পরিবর্তন করা সম্ভব।<br />
এ কারণেই তিনি পরিভাষার উপর এতো বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন, শত শত পরিভাষা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹দর্শন</strong><br />
দর্শনের বিষয়ে, বিশেষ করে দু&#8217;টি ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন, ক্ষেত্রের উপরে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দর্শন মানে হলো প্রশ্ন করা। আর প্রশ্ন করার পন্থা দু&#8217;টি,<br />
১. অপরপক্ষকে চুপ করানো জন্য প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করার এই পন্থা হলো গ্রীক দার্শনিকদের পন্থা। যেমন- সক্রেটিসের প্রশ্ন করার পন্থা।<br />
২. সমালোচনামূলক প্রশ্ন করা। ইম্যানুয়েল কান্ট এই পন্থা শুরু করেন এবং প্রভাবশালী করে তোলেন।</p>
<p dir="ltr">তবে ই&#8217;তিমানিয়্যাহ দর্শনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সুয়াল বা প্রশ্ন নেই। সুয়াল বা প্রশ্নের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সুয়ালিয়্যাত (প্রশ্ন করা) নয়, এখানে উদ্দেশ্য হলো মাসউলিয়্যাত (দায়িত্ববোধ)। সুয়াল-মাসয়ালা ও মাসউলিয়্যাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি এই বিষয়কে তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, প্রশ্ন যখন দায়িত্ববোধের চেতনা জাগ্রত করবে, কেবল তখনই সেটা সত্যিকারের প্রশ্ন হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরণের প্রশ্নই আমাদের সত্যিকারের দর্শন। এ ক্ষেত্রে তিনি &#8216;আস-সুয়াল মাসউল&#8217; পরিভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹চিন্তাগ্রহণ</strong><br />
চিন্তার আদান প্রদান নিয়ে তিনি বেশ ভালোভাবেই পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অন্যের চিন্তা অনুবাদ করে কোনোদিন সত্যিকারের চিন্তা তৈরি করা যায় না। পাশ্চাত্যের দর্শন বিষয়ক যেসব বই অনুবাদ করে আজ সমগ্র বিশ্বে পড়ানো হচ্ছে, সেটার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন,<br />
لن تكون الفلسفة رافعة إلا اذا كانت مبدعة<br />
অর্থ : &#8220;দর্শন কোনো জাতিকে উচ্চমর্যাদায় আসীন করতে পারে না, যদি না সেটা নিজেদের মূল্যবোধের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়। &#8220;</p>
<p dir="ltr">অর্থাৎ, তাকলীদের মাধ্যমে চর্চিত দর্শন কোনোদিন কোনো জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারে না। যদি কোনো জাতি চিন্তার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে চায়, তাহলে তাকে নিজ মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রেখে চিন্তা ও দর্শন তৈরি করতে হবে।</p>
<p dir="ltr">তবে, অন্যের চিন্তা কতটুকু গ্রহণ করা হবে, এ-বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি &#8216;তাকরীরে তা&#8217;বী&#8217; নামে একটি পন্থার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এর অর্থ এটা নয় যে, আমরা কারোর কাছ থেকে কোনো কিছুই নেবো না। তবে, অন্যদের কোনো চিন্তা ও দর্শন অনুবাদ করার ক্ষেত্রে আমাদের তাদাভুলিয়্যার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যে-সকল চিন্তা অনুবাদ করবো, সেই চিন্তার ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিত্তিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। কেননা আমাদের ভাষা ও ধর্ম উভয়টিই ভিন্ন। যেমন- তিনি হেগেল ও নিটশে-কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, এরা অনেক ধর্মতত্ত্বীয় পরিভাষাকে দার্শনিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে।</p>
<p dir="ltr">এ কারণে অনুবাদের সময় আমাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো হলো তাহসিলিয়্যাহ, তাওসিলিয়্যান ও তা&#8217;সিলিয়্যাহ। তাহসিলিয়্যাহ হলো হুবহু অনুবাদ করা। তাওসিলিয়্যাহ হলো, সতর্কতার সাথে বেছে বেছে অনুবাদ করা। তা&#8217;সিলিয়্যাহ হলো, শুধুমাত্র আমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়সমূহকে অনুবাদ করা। আমাকে সেই বিষয়সমূহই অনুবাদ করতে হবে, যেগুলো আমাদের দ্বীন ও ভাষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹দর্শন উদ্ভাবন</strong><br />
মুসলমানদের দর্শন তৈরি করার অধিকার নিয়ে তাঁর এই উক্তিটির উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য-<br />
”উম্মতসমূহের ভিন্নতা প্রাকৃতিক একটি বিষয়। যারা নিজের উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছে, তাঁরা ছাড়া অন্য কেউই এই অমোঘ বিধানকে অস্বীকার করতে পারে না। এই কারণে, যে জাতি পরাজিত ও পরাভূত হয়েছে, তাঁদেরও পুনরায় নিজ-পায়ে দাঁড়ানোর অধিকার রয়েছে। তাঁদেরও অধিকার আছে তাঁদের নিজেদের দর্শনকে তৈরি করার।&#8221;</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, যে সভ্যতা তাঁর যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব নিজের মূল্যবোধের মাধ্যমে দিতে সক্ষম নয়, সেই সভ্যতার পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যে সভ্যতা যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব অন্য সভ্যতা কর্তৃক সৃষ্ট মূল্যবোধ ও জবাবের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেই সভ্যতা আরও বেশি অধঃপতনের শিকার হয়।</p>
<p dir="ltr">তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, যুগের জবাবদানের ক্ষেত্রে অন্যদের তৈরি করা জবাবের মাধ্যমে জবাব দেওয়া। আর এই বিষয়টিই আমাদের পথকে রোধ করে দিয়েছে।</p>
<p dir="ltr">আমরা মুসলিম হিসেবে যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব কীভাবে দিবো এবং আমাদেরকে কীভাবে কাজ করতে হবে, এ বিষয়ে তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় তাঁর অভিমত তুলে ধরেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔷গ্রন্থপঞ্জির দর্শন</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের গ্রন্থগুলোকে দু&#8217;টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. উসূল ও মেথডোলজি</li>
<li dir="ltr">২. উসূলের প্রয়োগপদ্ধতি</li>
</ul>
<p dir="ltr">উসূল ও মেথডোলজি সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>১. ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ।</li>
<li>২. ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ।</li>
</ul>
<p dir="ltr">পরিশেষে জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য তুলে ধরতে হয়। তিনি বলেন,</p>
<blockquote>
<p dir="ltr"><strong>“এমন কোনো জ্ঞান ও আমল নেই, যা দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান ও আমলের চেয়ে উত্তম হতে পারে। দ্বীনি কার্যক্রমের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো চিন্তাকে স্থবির করে ফেলা।”</strong></p>
</blockquote>
<p dir="ltr">অর্থাৎ, যারা জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করবে, তাঁদেরকে সবসময় জ্ঞানগত ও আমলগত দিক থেকে গতিশীল থাকতে হবে। কোনো আন্দোলন যখন তাঁর চিন্তাগত গতিশীলতাকে হারিয়ে ফেলে, তখনই তা কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15839</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম; আকাঙ্ক্ষিত সভ্যতার মূর্ত প্রতীক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 15:31:02 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15835</guid>

					<description><![CDATA[বর্তমানে মানবতার এমন একটি নতুন সভ্যতা খুব বেশি প্রয়োজন, যে সভ্যতার পাশ্চ্যত্য সভ্যতার থেকে ভিন্ন দর্শন এবং বার্তা রয়েছে। পাশ্চ্যত্য সভ্যতার বলতে আমরা এ সভ্যতার কমিউনিস্ট এবং বস্তুবাদী দিক উভয়টিকেই বুঝাচ্ছি। উভয়টিই কোরআন, তাওরাত এবং যাবুরে বর্ণিত সেই অভিশপ্ত গাছের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বর্তমানে মানবতার এমন একটি নতুন সভ্যতা খুব বেশি প্রয়োজন, যে সভ্যতার পাশ্চ্যত্য সভ্যতার থেকে ভিন্ন দর্শন এবং বার্তা রয়েছে। পাশ্চ্যত্য সভ্যতার বলতে আমরা এ সভ্যতার কমিউনিস্ট এবং বস্তুবাদী দিক উভয়টিকেই বুঝাচ্ছি। উভয়টিই কোরআন, তাওরাত এবং যাবুরে বর্ণিত সেই অভিশপ্ত গাছের দুটি শাখা। আর গাছটি হলো বস্তুবাদ।</p>
<p>মানবতার এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যে সভ্যতা আল্লাহ, কোরআন, হাশর, মিজানে বিশ্বাসী; সেইসাথে মানুষের মহৎ মূল্যবোধে বিশ্বাসী। যা ছাড়া মানুষ তার মানবিকতাবোধ হারায় এবং জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলে।</p>
<p>মানবতার এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যে সভ্যতা ধর্ম, বিজ্ঞান, বিশ্বাস, আকল, চেতনাসহ মানুষের আকাঙ্ক্ষিত সবকিছুকে বেষ্টন করে রাখে। এ সভ্যতা যেমন পরকালে মানুষের জান্নাত প্রাপ্তির পথকে সুগম করতে পারে, তেমনি ইহকালে মানুষের জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ্য করে তুলতে পারে। এটি মানুষকে সত্য, শক্তি, নীতি-নৈতিকতা এবং স্বাধীনতার সন্ধান দেয়।</p>
<p>মানুষের এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যা পৃথিবী ও জান্নাতের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এ সভ্যতায় বিশ্বাসী হৃদয়ের সাথে যুক্তিরও ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকে। এ সভ্যতায় মানুষ হাকীকত এবং আকলের দ্বারা পরিচালিত হয়, যা তার উপর আল্লাহর দয়া এবং অনুগ্রহের প্রমাণ।</p>
<p>আমরা এতক্ষণ যে সভ্যতার কথা ভাবছি, তা মূলত ইসলাম ছাড়া অন্য কোনোটিই নয় এবং সেই প্রভু হলেন আল্লাহ, যিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্বজ্ঞানী, যিনি সবকিছু জানেন। জান্নাত ও পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো কিছুই তার জানার বাইরে নয় এবং তিনি ভারসাম্য ও সুসমন্বয়ের অবিশ্বাস্য ও বাস্তবসম্মত উদাহরণ তৈরি করতে সক্ষম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ভারসাম্য এবং সমন্বয়ের সভ্যতা :</strong></p>
<p>ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা মানবতাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থা উপহার দেয়।</p>
<p>ভারসাম্য বলতে আমরা বুঝি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা, অর্থাৎ দুটি প্রান্তিকতার মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করাকে। মানব রচিত কোনো ব্যবস্থা অথবা মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থাই চরমপন্থা বা প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত নয়। একমাত্র ইসলামেই এটি উপস্থিত।</p>
<p>আল কোরআনের মধ্যমপন্থাকে সরল-সঠিক পথ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন যে সূরা দিয়ে শুরু হয়েছে, সে সূরা ফাতিহার একটি আয়াতে এ কথা বলা হয়েছে। একজন মুসলমান প্রতিদিনের নামাজে কমপক্ষে সতেরো বার আল্লাহর কাছে এ আর্জি জানায়,</p>
<p>“হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করো।” (সূরা ফাতিহা : ০৬)</p>
<p>এ সরল-সঠিক পথ আল্লাহর আযাবের ফলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাতিগুলোর পথের সম্পূর্ণ বিপরীত। মধ্যম পন্থাকে ‘মিজান’ বা দাঁড়িপাল্লা হিসেবেও অভিহিত করা হয় যা, যা সীমালঙ্ঘন না করা এবং ওজনে কম না দেওয়া বোঝায়। আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মিজান কায়েম করেছেন। এর দাবি হলো, তোমরা মিজানে সীমালঙ্ঘন করো না। ইনসাফের সাথে সঠিকভাবে ওজন করো এবং ওজনে কম দিও না।” (সূরা আর রাহমান : ৬-৯)</p>
<p>এখানে সীমালঙ্ঘন করা বলতে চরমপন্থা বা প্রান্তিকতা অবলম্বনের প্রবণতা এবং ওজনে কম দেওয়া বলতে সঠিকভাবে ওজন করার ক্ষেত্রে গাফিলতির প্রবণতাকে বোঝায়। আর উভয়টিই নিন্দনীয়।</p>
<p>ইসলামের ভারসাম্যের এই চমৎকার ব্যবস্থা এমন সব পরস্পর বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করেছে, যাদের পারস্পরিক সমঝোতাকে মানুষ কার্যত অসম্ভব মনে করতো। আর এ সমঝোতা এতটাই সুন্দর যে, উভয় পক্ষ কোনো ধরনের সীমালঙ্ঘন ও পারস্পরিক সংঘর্ষ ছাড়াই নিজেদের সীমার মধ্যে অবস্থান নিয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ ইলাহী ও মানবিক বিষয়াবলি, ওহী ও আকল, আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত বিষয়, পরকাল ও ইহকাল, একক ব্যক্তি ও ব্যক্তিসমষ্টি, ধারণাগত ও বাস্তববাদী বিষয়, অতীত ও ভবিষ্যত এবং দায়িত্ববোধ ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্যের মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। এ ভারসাম্য সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও নতুন আবিষ্কার, দায়িত্ব ও অধিকার, স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তন, প্রতিশ্রুতি ও ধৈর্যের মাঝে পুনর্মিলন ঘটায়।</p>
<p>এসবের কারণে মুসলিম উম্মাহ অন্য সব জাতির তুলনায় বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যমপন্থী’ উম্মতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীদের উপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের উপর সাক্ষী।” (সূরা আল-বাকারা : ১৪৩)</p>
<p>আর সমন্বয় বলতে বোঝায় দুটি ধারণা বা মতাদর্শকে এমনভাবে মিলিত করা, যেন একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় এবং একটি অন্যটিকে ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। এটি মানুষের জমিনে বিনির্মাণ, পৃথিবীতে খেলাফতের দায়িত্ব পালন এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদাত করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। ইসলাম বিজ্ঞান ও বিশ্বাস, সত্য ও শক্তি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ক্রিয়াকলাপ, ধর্ম ও রাষ্ট্র, নির্দেশনা ও আইন, ধর্মীয় বিড়ম্বনা ও শাসকদের দায়িত্ব, বস্তুগত সৃজনশীলতা ও নৈতিক উন্নতি এবং সামরিক শক্তি ও মনোবল এর মাঝে সমন্বয় সাধন করে।</p>
<p>ইসলাম এবং বাস্তবতা অনুসারে, বিজ্ঞান বিশ্বাসের সাথে এবং ক্ষমতা সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তারা একে অপরের সাথে সেভাবে সমন্বিত, যেভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস ক্রিয়াকলাপ বা কার্যাবলির সাথে এবং নির্দেশনাসমূহ আইনের সাথে সমন্বিত। ইসলাম যে জীবনের কথা বলে তা মূলত এ সমন্বয়ের উপর ভিত্তি করে গঠিত।</p>
<p>মানবরচিত ব্যবস্থা কিছু মূল্যবোধ এবং বিষয়ের উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করে এবং অন্য বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে এটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এসব ব্যবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চেয়ে উদরপূর্তিকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যা মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। এ ব্যবস্থাগুলো বস্তুবাদী বিজ্ঞানকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়, কিন্তু বিশ্বাসের গুরুত্বকে উপেক্ষা করে। এ ব্যবস্থাগুলো যোগাযোগের সুবিধার প্রতি আগ্রহ দেখায়, কিন্তু জনগণের মধ্যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ গড়ে তোলার গুরুত্বকে উপেক্ষা করে।</p>
<p>আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ মানুষকে তার প্রয়োজনীয় সব কিছুই দেয়। এটি মানুষের শরীর, মন এবং আত্মার ভারসাম্য বিধান করে। এটি মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে যেমন গুরুত্ব প্রদান করে, তেমনি গুরুত্ব প্রদান করে একটি পরিবার এবং একটি সমাজের সদস্য হিসেবেও। এটি মানুষকে তার জীবনের বিভিন্ন ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি সম্বলিত আইনসমূহ সরবরাহ করে। এটি শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, শাসক এবং শাসিতদের সকল চাহিদা পূরণ করে। এটি শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, ধনী-দরিদ্র, আকাশচুম্বী ভবনে বসবাসকারী-গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে গুরুত্ব প্রদান করে।</p>
<p><a href="https://rkmri.co/Ayo3AM0NemMe/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Agami-diner-sovvota-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>ইসলামে বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের সমন্বয় :</strong></p>
<p>বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যকার সমন্বয় সুসমন্বিত ইসলামী ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। অন্যান্য ব্যবস্থায় এটি অনুপস্থিত, উপরন্তু অন্যান্য ব্যবস্থায় সর্বদা বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। ইসলামী ব্যবস্থায় বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানকে এমনভাবে সমন্বিত করা হয়েছে যে, উভয়েই সমান তালে দাঁড়িয়ে থাকে।</p>
<p>মধ্যযুগের ইউরোপ অবিচার এবং হাজার হাজার নিরীহ বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, পণ্ডিত ও তাদের সমর্থকদের উপর পরিচালিত রক্তাক্ত গণহত্যার ইতিহাসে পূর্ণ। ÒIslam and Christianity: Side by Side With Science and UrbanismÓ বইয়ে মুহাম্মদ আবদুহু এ রোমহর্ষক ঘটনাগুলোর কিছু বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আমাদের বোঝা উচিত, মুসলমান হওয়ার কারণে আমরা কতটা ভাগ্যবান, কারণ ইসলাম কখনোই বিজ্ঞান ও উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। যারা বলে যে, ইসলাম বিজ্ঞান ও উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টিকারী, তারা মূলত ইসলাম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ এবং তারা চায় ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো পরিণতি বরণ করুক।</p>
<p>আমরা বৈজ্ঞানিক উন্নতিকে (প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা মানুষের কাজকে সহজ করে তোলে এবং তার সময় ও শ্রম বাঁচায়) একজন মুসলমানের ইবাদত হিসেবেই মানি। বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে তার অংশগ্রহণ এবং উৎকর্ষ সাধন তাকে তার নামাজ-রোজার মতো করেই আল্লাহর নিকটবর্তী করে তোলে। বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ একটি সমষ্টিগত ইবাদত, যা অবশ্যই পালন করতে হবে। বেসামরিক ও সামরিক পর্যায়ে এটির দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য সমগ্র মুসলিম সমাজকেই দায়বদ্ধ থাকত হবে।</p>
<p>বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং চিন্তার প্রতি উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদা। ইসলাম মানুষকে জ্ঞানার্জনের জন্য আহ্বান জানায়, আল কোরআনের প্রথম সাতটি আয়াত যার সাক্ষ্য প্রদান করে। ইসলাম বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের প্রশংসা করে এবং পশ্চাদপদতা ও অজ্ঞতার নিরলস বিরোধিতা করে।</p>
<p>অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলাম কখনো এ ধরনের মিথ্যাচার করেনি যে, “আপনাকে প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে এবং তারপর জানতে হবে আপনি কী বিশ্বাস করেছেন! আপনাকে অবশ্যই অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে! এই না জেনে অনুসরণ করাই তাকওয়ার উৎস!” এসব বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিপরীতে বিশিষ্ট মুসলিম আলেমরা বলেছেন, “আল্লাহ সেসব বিশ্বাসীর আমল কবুল করবেন না, যারা না জেনে, না বুঝে অন্ধ আনুগত্য করে।” তারা বলেন, ওহীতে বিশ্বাসের মূল ভিত্তিই হলো আকল। আকল প্রমাণ করে যে, আল্লাহ আছেন এবং নবুয়তও সংঘটিত হয়েছে। নবুয়তের সীলমোহর এবং কোরআনের মুজিযাগুলোতে অবিশ্বাসীদেরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>“তাদেরকে বলে দাও, তোমাদের প্রমাণ আনো, যদি নিজেদের দাবির ব্যাপারে তোমরা সত্যবাদী হও।” (সূরা আল-বাকারা : ১১১)</p></blockquote>
<p>“আসলে তাদের বেশিরভাগ লোকই নিছক আন্দাজ-অনুমানের পেছনে চলছে। অথচ আন্দাজ-অনুমান দ্বারা সত্যের প্রয়োজন কিছুমাত্র মেটে না। তারা যা কিছু করছে তা আল্লাহ‌ ভালোভাবেই জানেন।” (সূরা ইউনুস : ৩৬)</p>
<p>মধ্যযুগের মানুষেরা পশ্চিমা গির্জাগুলোর প্রচারিত শিক্ষা এই মর্মে ধারণ করতো যে, আকল, যুক্তি, বিজ্ঞান, চিন্তা এবং আইন ওহী বা আসমানী কিতাব, ধর্ম, বিশ্বাস এবং প্রজ্ঞার চরম শত্রু। ইসলামে এই সমস্যা নেই, কারণ এটি আকল এবং ওহী উভয়টিকেই আল্লাহর কুদরতের দুটি চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করে। উভয়টিই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমজাতীয়, উপরন্তু ওহী আকলকে সমর্থন করে এবং মুসলমানদেরকে আকল বোঝা এবং আকলের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য আহ্বান জানায়। মুসলিম আলেমদের মতে, প্রকাশ্য (যাহের) এবং ব্যখ্যাযোগ্য (মুফাসসার) এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। যদি কেউ এর বিপরীত দাবি করে, তবে তা প্রকাশ্য এবং আকল সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির ব্যাপারে যথাসম্ভব চরম অবিচার এবং অপব্যাখ্যার ফলাফল।</p>
<p>এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো,</p>
<p>১. চৌদ্দ শতাব্দী আগে কোরআন নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময়ে অনেক মতাদর্শ এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোরআনের কোনো আয়াতকেই বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত করা সম্ভব হয়নি। এটি কোরআনের অশেষ মুজিযার প্রমাণ।</p>
<p>২. কোরআনকে যদিও শুধুমাত্র বিজ্ঞানের গ্রন্থ বলা হয় না, কিন্তু কোরআন প্রায় সময়ই এমন সব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়, যা কোরআন নাযিলের পূর্বে ভাবাই যেতো না বা কোরআন নাযিলের বহু শতাব্দী পরেও শোনা যায়নি। বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হিসেবে পরিচিত কোরআনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক বৈজ্ঞানিক বই লেখা হয়েছে, একে কেন্দ্র করে অনেক দেশে অনেক সভা-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মক্কার Muslim World League-এর সাথে সম্পৃক্ত একটি স্বতন্ত্র সংস্থা রয়েছে, যা শুধু এ বিষয়টি নিয়েই কাজ করে।</p>
<p>৩. কোরআনের শিক্ষা অবশ্যই সর্বোত্তম আখলাক ও উন্নত চরিত্র গঠনকারী। এ শিক্ষা মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা সৃষ্টি করে যা কুসংস্কার, অনুমান এবং লালসাকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি অন্ধ অনুকরণ এবং নির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী নয়, বরং এটি বৈজ্ঞানিক এবং পরীক্ষামূলক প্রমাণে বিশ্বাসী। এটি কোরআন, হাদীস এবং রাসূল (স.)-এর সীরাতে বিশ্বাসী। এটি বিশ্বাস করে যে মানুষের মন তার জন্য একটি নেয়ামত, যার মাধ্যমে সে সৃষ্টিজগতে যা কিছু আছে, তার সর্বোত্তম ব্যবহারের সর্বোত্তম উপায়গুলো প্রতিফলিত করতে পারে। এর মাধ্যমে সে ইতিহাসের ধারণারও বিকাশ ঘটাতে পারে এবং কীভাবে অতীতকে ব্যবহার করতে হয় তা শিখতে পারে, যে অতীত রবের হুকুমের অপরিবর্তনীয়তার সাক্ষ্য দেয়। নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে উল্লিখিত উপমাগুলো এ আহ্বানেরই পরিচায়ক।</p>
<p>“&#8230;যাদের বুদ্ধি ও বিবেক রয়েছে।” (সূরা আল-বাকারা : ১৬৪)</p>
<p>“&#8230;যারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (সূরা ইউনুস : ২৪)</p>
<p>“&#8230;তাদের জন্য, যাদের জ্ঞান আছে।” (সূরা আল-বাকারা : ২৩)</p>
<p>“&#8230;তাদের জন্য, যারা বোধসম্পন্ন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)</p>
<p>“তাদের জন্য যারা আকলসম্পন্ন।” (সূরা ত্বাহা : ৫৪)</p>
<p>৪. আল কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে আলেমদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-</p>
<p>“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা আয যুমার : ০৯)</p>
<p>“তুমি কি দেখো না আল্লাহ‌ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তারপর তার মাধ্যমে আমি নানা ধরনের বিচিত্র বর্ণের ফল বের করে আনি? পাহাড়ের মধ্যেও রয়েছে বিচিত্র বর্ণের সাদা, লাল ও নিকষকালো রেখা। আর এভাবে মানুষ, জীব-জনোয়ার ও গৃহপালিত জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের রয়েছে। আসল ব্যাপার হলো আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাঁকে ভয় করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ‌ পরাক্রমশালী এবং ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির : ২৮)</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ আকাশ, বৃক্ষ, জীবজন্তু এবং মানব জাতির পরেই আলেমদের কথা বলেছেন, যা নির্দেশ করে যে আলেমরাই তারা, যারা মহাজাগতিক এবং জীববৈজ্ঞানিক বিষয়াবলি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, গভীর জ্ঞান রাখে। তাদের জ্ঞানই তাদেরকে মহান আল্লাহর পরম শক্তি, দয়া, রহমত, ক্ষমা এবং জ্ঞান অনুভব করায়।</p>
<p>৫. নবী-রাসূলগণ এবং সৎকর্মশীলগণের সীরাত আমাদেরকে জ্ঞানের মূল্য এবং গুরুত্ব শিক্ষা দেয় যেন আমরা পৃথিবীতে মানুষকে আল্লাহর খলিফা হিসেবে তার দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো পূরণে সহায়তা করতে পারি। এ জ্ঞানের কারণেই হযরত আদম (আ.) ফেরেশতাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন, এ জ্ঞান হযরত ইউসুফ (আ.)-কে মিশরকে দুর্ভিক্ষের কবল থেকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছিলো, এ জ্ঞানের মাধ্যমে হযরত সোলায়মান (আ.) চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে নিয়ে এসেছিলেন, অন্যান্য নবী এবং বিশ্বাসীগণও এ জ্ঞানের মাধ্যমেই সফলতা লাভ করেছিলেন। এটিই জ্ঞানের উপযোগিতা। ইসলামী সভ্যতার সেরা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এসব মূল্যবোধ ও নীতির বাস্তব প্রয়োগের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিলো।</p>
<p>মুসলমানগণ অনুবাদেও ছিলেন সর্বোচ্চ অবস্থানে, ইতিহাস তাদের অনুবাদ প্রতিভার এ উৎকর্ষের সাক্ষী। তারা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সকলের আগেই এ উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। তারা বিজ্ঞান, গণিত, মেটাফিজিক্সসহ জ্ঞানের সকল শাখায় সংশোধন, বিস্তৃতকরণ, গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে জ্ঞান ভাণ্ডারের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। তারা বীজগণিতের মতো জ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র উদ্ভব করেছেন। তারা যৌক্তিক এবং পরীক্ষামূলক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে পশ্চিমারা তা গ্রহণ করে নেয় এবং আধুনিক পশ্চিমা রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণে তা ব্যবহার করে। নিরপেক্ষ মানসিকতার পশ্চিমারা এ ইতিহাসের সাক্ষী। নিঃসন্দেহে ইসলামী সভ্যতা বহু শতাব্দী ধরেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার পথিকৃৎ ছিলো, আর তখন ইউরোপ অজ্ঞতা, অনগ্রসরতা বা পশ্চাৎপদতায় আবৃত ছিলো। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুসলিম অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যেমন: বাগদাদ, কায়রো, দামেস্ক, কর্ডোভা, আন্দালুসিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ। সারা বিশ্বের ছাত্ররা সঠিক শিক্ষা গ্রহণ এবং নিজেদের দেশকে উন্নয়নের পদ্ধতি শেখার জন্য এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতো।</p>
<p>চিকিৎসা, ফার্মাকোলজি, জ্যোতিষশাস্ত্র, অপটিকস, রসায়ন, গণিত, ভূগোল এবং জ্ঞানের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রে ইসলামী তথ্যসূত্রগুলো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ছিলো। ইসলামী এবং আরব তথ্যসূত্রগুলো বহু শতাব্দী ধরেই চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রধান তথ্যসূত্র ছিলো। আল রাজীর “আল-হাওয়ি”, ইবনে সিনার “আল-কানুন”, ইবনে রুশদের “আল-কুলিয়াত”, আল জাহরাওয়ীর “আল-তাসরিফ লিমান আগাজ আন আল-তালিফ” এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলো ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানের রত্ন ভাণ্ডারের অংশ ছিলো। সে সময়ে মুসলিম পণ্ডিত বা আলেমরা ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতের তারকা; আল-খাওয়ারিজমি, আল-বেরুনি, ইবনে আল-হাইশাম, ইবনে নাফিস, ইবনে আল-বিত্তার এবং আরও অনেকেই যার উদাহরণ। মানবিকের ক্ষেত্রে আল-ফারাবি, আল-গাজ্জালী, ইবনে তোফায়েল, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে খালদুন এবং আরও অনেকেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।</p>
<p>তখন আরবী ছিলো বিশ্বের প্রধান ভাষা, কারণ এটি জ্ঞানের অনূদিত এবং মূল শাখা উভয়টিকেই মূলধারার ইসলামী সভ্যতার সাথে একীভূত করেছিলো। আরবী ভাষার এ ক্ষমতা ও নিপুণতা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং সমাদৃত হয়েছিলো।</p>
<p>মুসলমানদের এই দুর্দান্ত উত্থান সে সময় মুসলিম শহরগুলোর মসজিদ, স্কুল, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল এবং জীবনের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ছাপ রেখে গিয়েছিলো। এটি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনে একটি শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিলো, যে প্রভাব আল্লাহর সাথে তাদের অনন্য সম্পর্ক, তাদের নামাজ, রোজা, যাকাত, সাদকা এবং দাতব্য কাজগুলোতে ফুটে উঠেছিলো। গুস্তাভ লে বন মুসলমানদের এ স্বকীয়, মানবিক ও বিবেকপূর্ণ আচরণ, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও তাদের ভালো আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “আরবদের (মুসলমান) মতো এত বেশি ন্যায়পরায়ণ (আদিল) এবং দয়ালু বিজেতার উদাহরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে নেই।”</p>
<p>প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তার কাছে আত্মসমর্পণ, তার ইবাদত এবং তার স্মরণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো এ সভ্যতা। এ সভ্যতার মুসলমানগণ বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিলো একটি আদিল (ন্যায়ভিত্তিক) সভ্যতা, যেখানে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং যুদ্ধ একে অপরের সাথে মিলেমিশে ছিলো।</p>
<p><a href=" https://rkmri.co/3yyeyyNMEATM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Zubo-jiggasa-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>বিজ্ঞান এবং বিশ্বাস : অবিচ্ছেদ্য</strong></p>
<p>আমরা জ্ঞান এবং যুক্তির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাসী, তবে আমরা এটিও বিশ্বাস করি যে, শুধুমাত্র জ্ঞান এবং যুক্তি মানুষের সকল চাহিদাই পূরণ করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ জ্ঞান এবং যুক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলো আমাদের কিছু চাহিদা পূরণ করে, আবার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে না। নিজেদের ক্ষমতার বাইরের বিষয়গুলোর সামনে উভয়েই অসহায়। উভয়েই অস্তিত্ব, জীবন, মহাবিশ্ব, মৃত্যু এবং অন্যান্য সকল প্রাসঙ্গিক বিষয়ের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম নয়। উভয়ের ক্ষমতাই বস্তুবাদী এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। সুতরাং বোঝা যায়, জ্ঞানের অন্য একটি উৎস অবশ্যই থাকতে হবে যা মানুষকে তার দায়িত্ব-কর্তব্য, পৃথিবীতে তার ভূমিকা এবং সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত অন্তহীন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক্ষেত্রে ওহী-ই একমাত্র উৎস যা মানুষের সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদানের সক্ষমতা রাখে, আর বিশ্বাসই এটির মূল চাবিকাঠি। চিন্তাবিদরা জ্ঞান এবং যুক্তির মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের রহস্য সমাধানের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। উল্টো পরস্পরবিরোধী এবং অযৌক্তিক ফলাফলের কারণে তারা গভীর বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছেন। তাই কোরআনের অকাট্য আয়াত দ্বারা পরিচালিত বিশ্বাসই একমাত্র সমাধান।</p>
<p>ইসলামের মতে মানুষকে বিভ্রান্তকারী প্রধান সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা ঈমান বা বিশ্বাসের রয়েছে, যেমন, মানুষের অস্তিত্ব এবং তার মৃত্যু পরবর্তী অনন্তকালের জীবন। তাছাড়াও বিশ্বাস মানুষকে তার জীবনের অর্থ বুঝতে এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম করে তোলে। সেইসাথে জ্ঞান অর্জনের নামে সীমালঙ্ঘন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লাগাম টানতেও এ শক্তি ব্যবহৃত হয়। আমাদের কাছে এ নিয়ন্ত্রণের অনেক উদাহরণ রয়েছে। চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে নিয়ে আসার পর আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী হযরত সুলায়মান (আ.) বলেছিলেন,</p>
<p>“এ আমার রবের অনুগ্রহ, আমি শোকরগুযারী করি না নাশোকরী করি, তা তিনি পরীক্ষা করতে চান। আর যে ব্যক্তি শোকরগুযারী করে, তার শোকর তার নিজের জন্যই উপকারী। অন্যথায় কেউ অকৃতজ্ঞ হলে, আমার রব কারো ধার ধারেন না এবং আপন সত্তায় আপনি মহীয়ান।” (সূরা নামল : ৪০)</p>
<p>সুলায়মান যখন তার সামনে রানী বিলকিসের সিংহাসন পড়ে থাকতে দেখেন, তখন তিনি আনন্দ বা অহংকারে মত্ত হয়ে একটা মুহূর্তও নষ্ট করেননি, বরং আল্লাহর প্রশংসা করেন।</p>
<p>প্রাচীর নির্মাণ শেষে যুলকারনাইন (আ.) বিনীতভাবে বলেছিলেন,</p>
<p>“এ আমার রবের অনুগ্রহ। কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতির নির্দিষ্ট সময় আসবে, তখন তিনি একে ধূলিস্মাৎ করে দেবেন, আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।” (সূরা কাহফ: ৯৮)</p>
<p>যদি আমরা ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণালী দিনগুলোতে ফিরে যাই, তাহলে আমরা বিশ্বাসের দ্বারা পরিচালিত জ্ঞান কীভাবে গঠনমূলকভাবে মানুষের সেবা, উপকার এবং সুখে থাকার কাজে আসে তার অনেক উদাহরণ দেখতে পাবো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে আমরা পশ্চিমাদের উদাহরণগুলো খুঁজে নেই, যারা জ্ঞানকে কলুষিত করেছে, আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে, গণবিধ্বংসী অস্ত্র আবিষ্কার করে এটির অপব্যবহার করেছে, যা আমাদের জীবনকে একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্নে  পরিণত করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মুহসিনা বিনতে মুসলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15835</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম দার্শনিকদের দৃষ্টিতে ইতিহাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/history-from-the-pov-of-muslim-philosophers/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/history-from-the-pov-of-muslim-philosophers/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 04 Apr 2025 15:26:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15688</guid>

					<description><![CDATA[মহাগ্রন্থ আল-কোরআন যে সকল মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে, ইতিহাস তার মধ্যে অন্যতম। এই অর্থে কোরআনের মৌলিক বিষয় সমূহের একটি হল ‘ইতিহাস’।মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ইতিহাসের কোন বই না হওয়া সত্ত্বেও এর দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ শুরু]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহাগ্রন্থ আল-কোরআন যে সকল মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে, ইতিহাস তার মধ্যে অন্যতম। এই অর্থে কোরআনের মৌলিক বিষয় সমূহের একটি হল ‘ইতিহাস’।<br class="html-br" /><br class="html-br" />মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ইতিহাসের কোন বই না হওয়া সত্ত্বেও এর দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ শুরু থেকেই ইতিহাসের ব্যাপারে জোর দিয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে মুসলিমগণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে পাঠ করেছেন ও বিশ্লেষণ করেছেন। আর সেটা হল, তারা ইতিহাসকে দেখেছেন &#8216;ইবরাত&#8217; হিসেবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />এই কারণে মুসলিম চিন্তাবিদগণ &#8216;তারিখ (ইতিহাস)&#8217; ও &#8216;ইবরাত&#8217; নামক পরিভাষাদ্বয় একত্রে ব্যবহার করেছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />যেমন ইবনে খালদুন তাঁর লেখা ইতিহাস গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, &#8216; কিতাবুল ইবার&#8217; তথা ইবরাতের গ্রন্থ। কেননা, ইবরাত (عبرة) হল; মহাবিশ্ব নিয়ে এবং একই সাথে আল্লাহ তার এই সৃষ্টির উপর যে বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো নিয়ে এবং সর্বোপরি সুন্নাতুল্লাহ নিয়ে চিন্তা করা। কঠিন অভিজ্ঞতা সমূহকে আকল দিয়ে চিন্তা (তাফাক্কুর) করে দূরদৃষ্টি দিয়ে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ খুঁজে বের করা।<br class="html-br" /><br class="html-br" />ইবরাত (عبرة) এর শাব্দিক অর্থ, ঘটনা সমূহের কারণ এবং ফলাফলের উপরে দূরদৃষ্টি দেওয়া, গভীর ভাবে চিন্তা করা এবং দেখা থেকে শিক্ষা খুঁজে বের করা। মূলত ইবরাত (عبرة) হল; শব্দবিহীন এবং উচ্চারণবিহীন ইলাহী একটি ওয়াজ।<br class="html-br" /><br class="html-br" />একই ভাবে ধর্মের ইতিহাসবিদ নামে খ্যাতি অর্জনকারী প্রখ্যাত শাহরাস্তানী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ , &#8216; মিলাল ওয়ান নিহাল&#8217; কেও একই দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন ধর্ম, মাজহাব ও চিন্তাগত ধারাসমূহকে নিয়ে আলোচনা করেছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />এই সকল বিষয়কে নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, &#8216;যারা চিন্তা করতে পারে তাঁদের জন্য শিক্ষা (ইবরাত) আর যারা শিক্ষা নিতে পারে তাঁদের জন্য চিন্তার উসিলা হয়&#8217;।<br class="html-br" /><br class="html-br" />অনুরূপভাবে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর সময়কালের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উসামা ইবনে মুনকিযও তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, &#8216;কিতাবুল ই&#8217;তিবার&#8217;। এই গ্রন্থেও ইতিহাসকে তিনি ইতিবারের সিলসিলা হিসেবে দেখেছেন ও দেখিয়েছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" /><strong>ইতিহাসকে পাঠ করার ক্ষেত্রে মুসলিম ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদগণের &#8216;ইতিবারমূলক&#8217; এই দৃষ্টিভঙ্গীকে যদি সামনে রাখি তাহলে দেখতে পাই যে, ইতিহাসকে তারা অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহের বিস্তারিত বিবরণকে তুলে ধরার জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি। কিংবা তারা অতীত বিতর্ককে উস্কে দেওয়ার জন্যও ইতিহাস রচনা করেননি।</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />বরঞ্চ তারা ইতিহাস রচনা করেছেন,</p>
<ul>
<li>১। এমন একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যা আমাদেরকে এমন এক চেতনার প্রদীপ দান করবে যেটার উপর ভিত্তি করে আমরা সঠিকভাবে আমাদের দুনিয়াবী অভিযাত্রাকে পরিসমাপ্ত করতে পারব।</li>
<li>২। ইতিহাস শুধুমাত্র অতীত ঘটনা প্রবাহের সমষ্টি নয় বরং ইতিহাস হল এমন একটি গতিশীল প্রক্রিয়ার নাম যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গীর (তাসাউউর) &#8211; সাথে প্রতি মুহূর্তে জীবন্ত থাকে।</li>
<li>৩। ইতিহাস সময়ের কোলে অবস্থান করলেও সময়ের উর্দ্ধে উঠে শাশ্বত একটি বিশ্বাস, মূলনীতি ও মূলবোধের প্রতিফলন করে থাকে।</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/history-from-the-pov-of-muslim-philosophers/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15688</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মক্কা বিজয়; হাল আমলের প্রেক্ষিতে রাসূলের (সা.) বিজয়ী ভাষণের গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-conquest-of-mecca-the-importance-of-the-prophets-victory-speech-in-the-context-of-modern-times/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-conquest-of-mecca-the-importance-of-the-prophets-victory-speech-in-the-context-of-modern-times/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 22 Mar 2025 14:18:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15676</guid>

					<description><![CDATA[০১. সারাটা জীবন রাসূলের সীরাত পড়ার পরেও আমরা রাসূল (সা.)-কে কতটুকু চিনতে পেরেছি, সেটা বিরাট একটা প্রশ্ন আমাদের সামনে। বেশ আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিবেচনার বিষয়ও বটে। তারচেয়েও বড় কথা, রাসূলের জীবনীকে আমরা কেনো যেনো সেই ১৪০০ বছর পূর্বের ঘটনাবলি হিসেবে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4>০১.</h4>
<p>সারাটা জীবন রাসূলের সীরাত পড়ার পরেও আমরা রাসূল (সা.)-কে কতটুকু চিনতে পেরেছি, সেটা বিরাট একটা প্রশ্ন আমাদের সামনে। বেশ আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিবেচনার বিষয়ও বটে।</p>
<p>তারচেয়েও বড় কথা, রাসূলের জীবনীকে আমরা কেনো যেনো সেই ১৪০০ বছর পূর্বের ঘটনাবলি হিসেবে বিবেচনা করেই ক্ষান্ত হই। দুঃখের বিষয় হলো, রাসূলের সীরাত বর্তমান সময়ের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত আর সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়টা নিয়ে আমাদের মাঝে কোনোপ্রকার আলাপ হয় না বললেই চলে।</p>
<p>আমাদের দেশের একটা রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশই রাসূলের সীরাত পড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে। তাই, রাসূলের সীরাতটা পড়া থাকলেও রাসূলের জীবনকে সেই সময়ের আলোকেই বুঝি আমরা; বর্তমানের সাথে খুব একটা সম্পৃক্ত করতে পারি না।</p>
<p>রাসূলের মাক্কী জীবন, মাদানী জীবন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক মূলনীতি, কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক ব্যবস্থাপনা বা দৈনন্দিন জীবনাচরণ—এসব বিষয় যে সামগ্রিক, এগুলো যে আমাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত একেকটা বিষয় আর এই বিষয়গুলো যে কেয়ামতাব্দি উসূল হিসেবে আমাদের সামনে সংরক্ষিত থাকবে, এই বুঝটা যেনো আমাদের মাঝে পয়দাই হয় না।</p>
<p>রাসূলের জীবনকে শুধু নস্টালজিক ইতিহাসের পাতাতেই রাখতে পছন্দ করি আমরা। রাসূলের দুঃখী সময়কে স্মরণ করে ওয়াজের ময়দানে বেদনা-বিধুর সেসব বয়ান শুনে কান্নাকাটি করি। কিন্তু, শিক্ষা নেওয়ার সময় আমাদের উপলব্ধির আকলটা কেনো যেনো অকার্যকর হয়ে যায় তখন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>০২.</strong></h4>
<p>কথাগুলো বলার কারণ হলো, আজ ২০ রমজান, মক্কা বিজয় দিবস।<br />
তবে ইংরেজি তারিখ নিয়ে একটু মতভেদ আছে। হয় ৩১ ডিসেম্বর রাসূল (সা.) মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্য মদীনা হতে রওয়ানা দিয়ে ১১ জানুয়ারি মক্কায় বিজয় করেছিলেন। অথবা, সে তারিখেরও ১১দিন পূর্বে রওয়ানা দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর রাসূল (সা.) মক্কায় পৌঁছেছিলেন।</p>
<p>সে যাই হোক, রাসূলের (সা.) মক্কা বিজয়টা রাসূলের (সা.) জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটা বিজয় বললেও ভুল হবে না। রক্তপাতহীন সুমহান সেই বিজয়টা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য এক স্থান দখল করে আছে। শুধু অনন্য নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে এমন রক্তপাতহীন বিজয় আর দ্বিতীয়টি নেই।</p>
<p>আজকের কথিত এই আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার বর্তমান শাসনপদ্ধতিতে ট্রিটি অব ওয়েস্টফেলিয়াকে আধুনিক শান্তি ও নিরাপত্তার ম্যাগনাম ওপাস হিসেবে অভিহিত করা হয়। অথচ, মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.) যে শান্তি ও নিরাপত্তার বিধান ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং যে মডেল উপস্থাপন করেছিলেন, তা সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এবং এক ও অদ্বিতীয়।</p>
<p>যে ভূমি থেকেই রাসূল (সা.)-কে বিতাড়িত করা হয়েছিলো, সেই অঞ্চলটাই তিনি বিজয় করলেন—মাত্র এক দশকের মাথায়; তাও আবার কোনো প্রকার যু্দ্ধ ও রক্তপাত ছাড়াই, একেবারে নির্বিঘ্নে।</p>
<p>হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সাহাবীরা মক্কা গমনের যে সুযোগটা পেয়েছিলেন, সেই সুযোগেই পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়েছিলো মুসলিমদের আখলাকী সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক নান্দনিকতা। নচেৎ মাত্র কয়েক বছরের মাথায় হু-হু করে বহু-সংখ্যক আরব ও অনারব ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতো না।</p>
<p>এখানে সংস্কৃতির বিষয়টা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।<br />
মক্কা বিজয়ের পেছনে যে সাংস্কৃতিক একটা প্রভাবও বিদ্যমান ছিলো, এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু, এই বিষয়টা বরাবরই আমাদের পর্যালোচনার আড়ালে থেকে যায়। এর পেছনে হয়তো সংস্কৃতির সংজ্ঞায়নটাই বড় একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সংস্কৃতিকে আমরা শুধুমাত্র বিনোদন আর নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।</p>
<p>সান জু-র আর্ট অব ওয়ার থেকে শুরু করে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হয়ে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা, যে সময়ই হোক না কেনো, কোনো অঞ্চল বিজয়ের ক্ষেত্রে একটা সুপ্রসিদ্ধ দর্শন হচ্ছে, কেউ যদি কোনো অঞ্চলকে বিনা যুদ্ধে জয় করতে চায়, তাহলে সেই অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির চেয়ে সেই বিজেতাদের সংস্কৃতিকে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। ফলাফলস্বরূপ, মাত্র কয়েকবছরের মাথায় সেই অঞ্চলের অধীবাসীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবেই পরাজিত হয়ে পড়বে; এবং তখন অতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের উপর করায়ত্ত করা সম্ভব হবে।</p>
<p>কারণ, সাংস্কৃতিক দিক থেকে কেউ অনুগত হলে তাকে জয় করা খুবই সহজ হয়ে পড়ে। আর সংস্কৃতি আমাদের জীবনাচরণে কতোটা প্রভাব ফেলে, তা একজন আকলবান ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে পারবেন। তাহলে মনে হয়, এটা বললে খুব একটা ভুল হবে না যে, সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে যেকোনো রাজনৈতিক বিপ্লবের পূর্বশর্ত বলা যায়।</p>
<p>এসব দিক বিবেচনায় মাত্র চার বছরের মাথায় মক্কার মতো একটি অঞ্চলকে বিজয় করা, তাও আবার বিনা যুদ্ধে ও বিনা রক্তপাতে, এখানে আসলে আখলাকী আর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণকে কখনই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>০৩.</strong></h4>
<p>মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে রাসূলের দেওয়া সেই ভাষণের কয়েকটা পয়েন্ট তুলে ধরা যাক,</p>
<ul>
<li>ক. নিজ ঘরে থাকলে নিরাপদ;</li>
<li>খ. আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকলে নিরাপদ:</li>
<li>গ. অস্ত্র ত্যাগ করলে নিরাপদ;</li>
<li>ঘ. পশু হত্যা করা যাবে না;</li>
<li>ঙ. গাছপালা, ঘাস কাটা যাবে না;</li>
<li>চ. সকল জাত্যাভিমান বাতিল করা হলো;</li>
<li>ছ. মক্কাকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হলো;</li>
<li>জ. মক্কার সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো।</li>
</ul>
<p>এখান থেকে কয়েকটা নির্দেশ নিয়ে বর্তমানের আলোকে পর্যালোচনা করা যাক।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong><br />
দীর্ঘ তেরোটা বছরের অত্যাচার, নির্যাতন, বন্দিত্ব; আবার বদর, উহুদ, খন্দক-এর পরেও রাসূল (সা.) একেবারে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন; শুধু হাতেগোনা কয়েকজন বাদ দিয়ে। ইসলামের বিশেষত্বটা ঠিক এখানেই।</p>
<p>বিষয়গুলোকে এখন একটু আধুনিক সময়ে কনভার্ট করা যাক!<br />
আমাদের প্রযুক্তির এই সময়ে সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বুঝি!? তার কতটুকু আমাদের মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে? আমরা যদি কোথাও পাশ্চাত্যের বিপরীতে ইসলামকে দাঁড় করাইতে চাই, তাহলে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা কতটুকু আছে আমাদের!?<br />
এরপর না-হয় আমরা সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবো বা ক্ষমা করার সেই বিষয়টা আমাদের সামনে আসবে। পুরো দুনিয়ায় এতোগুলো মুসলিম দেশ থাকার পরেও গাজায় এক বোতল পানি পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারি না আমরা, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিকভাবে সবাইকে নিরাপদ ঘোষণাই করবোই বা কখন?</p>
<p>তবে আবার, সে যুগের সাধারণ ক্ষমা আর বর্তমানের সাধারণ ক্ষমার ধরন কস্মিনকালেও যে এক হবে না, এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। সবার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, ট্যাক্স নিয়ন্ত্রণ, মারহামাতপূর্ণ বিচারব্যবস্থা, আদালতপূর্ণ অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ ইত্যাদির মাঝেই রাসূলের সাধারণ ক্ষমার মর্মার্থ বিদ্যমান। অন্তত উপরের আটটা পয়েন্টের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যথার্থ ব্যাখ্যা এমনটা না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।</p>
<p>তাই, মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে এতোবছরের নির্যাতন, নিপীড়ন ও অত্যাচার সহ্য করেও রাসূলের ক্ষমা করার বিষয়টা আমাদের স্বতন্ত্র গবেষণার দাবি রাখে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong><br />
মানুষের জানের নিরাপত্তা দেওয়ার পর, রাসূল দিলেন মানুষের মালের নিরাপত্তা। আবার নির্দেশ দিলেন রবের দেওয়া প্রাকৃতিক নেয়ামতগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্বের ঘোষণা; অর্থাৎ, রাসূল দিলেন গাছপালা ও পশুপাখির নিরাপত্তা।</p>
<p>এই বিষয়গুলোকেও এবার বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দেখা যাক।<br />
আমরা মুসলিমরাই কতটুকু স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চায়ন করতে পারছি? আবার পরিবেশবাদী আন্দোলন যেগুলো রয়েছে বর্তমান বিশ্বে, তার কতগুলো সংস্থাই বা মূলত পরিবেশ সংরক্ষণের জন্যই কাজ করে যাচ্ছে?</p>
<p>আবার খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়টাও আমাদের বিবেচনা করা প্রয়োজন!<br />
আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা কতটুকু নিরাপদ? মধ্যস্বত্বভোগী লোকদের জন্য কৃষক তার ন্যায্য মূল্য পায় না, দরিদ্ররা খাবার ক্রয় করতে পারে না আর বর্গাচাষীরা একবেলা পেটপুরে খাবারের চিন্তায় দিনাতিপাত করে। বিষয়গুলোকে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা আর সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে পড়ে না!?</p>
<p>এবার একটু বীজ ব্যবস্থাপনার দিকে খেয়াল করেন তো!<br />
কয়েক বছর আগেও তো খাদ্যে এতো বিষ আর ভেজাল ছিলো না। ক্ষেতে ক্ষেতে এতোটা পোকা মাকড়ের উপদ্রব ছিলো না। শুধু এক জৈবসার ব্যবহার করেই যে পরিমাণ নিরাপদ খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হতো, তা দিয়ে মানুষের সময়টা এমনেই পার হয়ে যেতো।</p>
<p>কিন্তু, প্রশ্ন হলো, তার কতটুকু এখন হয়? মানুষ কেন আজ ৫০-এ পা রাখলেই বুড়িয়ে যেতে থাকে? ৪০-এ পা দিতেই কেন মানুষের হাড়-গোড়ে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে? যুবকদের শারীরিক অবস্থার আজ এতো অবনতি কেন? একজন যুবককে কেন লো-প্রেশার নিয়ে চলাফেরা করতে হয়? এগুলোর পেছনে কি খাদ্য ব্যবস্থাপনা দায়ী নয়?<br />
এগুলো কি রাসূলের বলা প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ সময়োপযোগী আধুনিক বিষয় নয়?</p>
<p>চোখের উপর থেকে অদৃশ্য পর্দাটা একটু সরালেই দেখা যায়, যারাই বীজ উৎপাদন করছে, তারাই আবার বীজের প্রতিষেধক তৈরি করছে। অতএব, এতোটুকু বুঝতে আর দেরি হয় না যে, বীজে বিষ মেশানোটা পরিকল্পিত একটা প্রজেক্ট। হেনরি কিসিঞ্জারের কথাটাই না-হয় তুলে ধরি,<br />
❝তেল নিয়ন্ত্রণ করলে আপনি দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আপনাকে বীজ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।❞</p>
<p>আরেকটু গভীরে গেলে আমাদের এটাও বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, এসব কিছুর মূল হোতা হাতেগোনা কয়েকজনই। আমেরিকার রকফেলার পরিবার, ইংল্যান্ডের রথাচাইল্ড পরিবার আর ইতালির এগনেল্লি পরিবার। রাজনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি আর হলিউডি নোংরা সংস্কৃতির পেছনে তাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong><br />
রাসূল (সা.) শস্যের পাশাপাশি দিলেন পশুপাখির নিরাপত্তা।<br />
কিন্তু আজকের ডেইরি ফার্মগুলোর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। গাভীর দুধগুলো মেশিনের সাহায্যে একপ্রকার জোর করে দুধ দোহন করা হয়। বাছুরগুলো তাদের প্রধান খাদ্য মায়ের দুধ পর্যাপ্তভাবে পায় না। অথচ, রাসূলের সুস্পষ্ট বিধান আছে যে, মা পশুকে কষ্ট দিয়ে এবং বাচ্চাকে ক্ষুধার্ত রেখে দুধ দোহন করা যাবে না। মুরগির ফার্মগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।</p>
<p>আবার, প্রাণীদেরকে নিয়ে নিষ্ঠুর আর অমানবিক সব এক্সপেরিমেন্ট থেকে শুরু করে মানুষকে পর্যন্ত গিনিপিগ বানিয়েছে পশ্চিমারা। শিল্পায়নের নাম করে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে প্রকৃতির অবস্থাটা দুরবস্থা করতে এমন কোনো উপায় বাকী নেই, যেটার ব্যবহার তারা করেনি। প্রতি বছর শয়ে শয়ে পাখি মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিল্ডিংয়ের থাই গ্লাস বা কাচের জানালার সাথে ধাক্কা খেয়ে। ইনকা, মায়া, এযটেক সভ্যতাকে ধ্বংস করে সেসব জায়গায় ইট-পাথরের বস্তি বানিয়ে রেখেছে এখন তারা।</p>
<p>অথচ, নেটফ্লিক্সের বিখ্যাত ডকু সিরিজ Our Planet-এর দ্বিতীয় সিজনের সম্ভবত প্রথম এপিসোডেই বিখ্যাত ন্যারেটর David Attenborough বলেন,<br />
&#8220;Across the island, chicks are dying. There is now so much plastic in our oceans, that it reaches even the most remote islands on Earth, carried here by the currents. And only now are we beginning to understand that all life on Earth depends on the freedom to move.&#8221;</p>
<p>প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে প্রাণীদের উদ্বাস্তু করে এখন এসে তারা প্রকৃতির উপর দরদ দেখাচ্ছে। তারা বলছে, মানুষ নাকি কেবল বুঝতে শুরু করেছে প্রাণীদেরকে তাদের মতো করেই রেখে দিতে হয়। কিন্তু কোথায়? উন্নতির নাম করে শিল্পায়নের আগে তো কখনও প্রাণীরা তাদের জীবন নিয়ে এতোটা বিপাকে পড়েনি!</p>
<p>উন্নতি কি আগে হয়নি? উসমানীয়দের সময়ে বরং প্রতিটি দালানেই নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকতো, যেখান থেকে পাখিরা বিশ্রাম নিতো আর খাবার খেতো। এমনকি, কোনো অঞ্চলে পাখিদের সুবিধার জন্য উঁচু উঁচু দালান নির্মাণ করা নিষিদ্ধ ছিলো। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, পশ্চিমাদের এতোসব কাজ-কারবার যতোটা না আশ্চর্যজনক, তারচেয়েও বেশি আশ্চর্যজনক হলো, মানুষরা এসব আবার বিনা দ্বিধায় বিশ্বাসও করে থাকে।</p>
<p><strong>চতুর্থত,</strong><br />
কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.) চিরতরে নিষিদ্ধ করলেন জাতপ্রথা, জাত্যাভিমান ও জাতিগগ শ্রেষ্ঠত্বকে; এবং মক্কাকে সকল দিক থেকে বালাদুল আমীন বা নিরাপদ শহর হিসেবে ঘোষণা করলেন।</p>
<p>কিন্তু আজকে? বর্তমান সভ্যতার কথিত স্বাধীন পৃথিবীতে?<br />
কোথাও কি শান্তি ও নিরাপত্তার নামে কোনোকিছু আছে? নাকি সমগ্র দুনিয়ায় আজকে যুদ্ধাবস্থা আর অস্থিতীশীলতা বিরাজ করছে? পৃথিবীর কোন প্রান্তে আজ মুসলিমরা প্রশান্ত মনে রাতের নিদ্রায় আচ্ছন্ন হতে পারছে? বিষয়টা কি সম্পূর্ণ বিপরীত না?</p>
<p>অথচ, আজকের পৃথিবীতে শান্তি বিনষ্টকারী হিসেবেই তুলে ধরা হয় ইসলামকে। সমগ্র দুনিয়াজুড়েই আজকে মুসলিম দেশগুলোকে যুদ্ধবিধ্বস্ত, জঙ্গী আর শান্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিচিত করানো হয়েছে। এক্ষেত্রে গত শতকে দেওয়া মার্গারেট থ্যাচারের সেই বক্তব্যকে তুলে না ধরলেই নয়। তিনি বলেন,<br />
“আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে। তাই ন্যাটোর সামনে কোনো শত্রু নেই। কিন্তু, কোনো মতাদর্শ এবং কোনো আন্দোলন শত্রু ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না। আর বর্তমান দুনিয়ায় ইসলামই একমাত্র সকল সমস্যার মূল। তাই আজ থেকে ন্যাটোর প্রধান শত্রু হচ্ছে ইসলাম।”</p>
<p>যে শান্তি ও নিরাপত্তার কথা বলে তারা, যে শান্তি ও নিরাপত্তার মডেল উপস্থাপন করে তারা আর যার উপর ভিত্তি করে সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি রক্ষাকারী বনে গিয়েছে তারা, তার বয়স মাত্র কয়েকশ বছর; আর সেটি হলো ট্রিটি অব ওয়েস্টফেলিয়া। অথচ, সেই চোদ্দোশো বছর আগেই রাসূল (সা.) শান্তি ও নিরাপত্তার যে বিধান দিয়েছিলেন, তা আজও পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এবং এক ও অনন্য।</p>
<p>আর আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার ধ্বজাধারীরা, যারা শান্তি ও নিরাপত্তার বুলি আওড়িয়ে ভুবন ভোলানো বক্তব্য দেয়, তারা কি আদৌ পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করতে পেরেছে? নাকি আজকের এই শান্তি ও নিরাপত্তার বিধান ও কথিত ডেমোক্রেসি শুধু তাদের স্বার্থের জন্যই ব্যবহৃত হয়?</p>
<p>তাদের ডেমোক্রেসি ততক্ষণ পর্যন্ত ডেমোক্রেসি থাকে, যতক্ষণ না আপনার আমার মন্তব্য তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার মডেল ততক্ষণ পর্যন্ত বজায় থাকে, যতক্ষণ না আপনার আমার নিরাপত্তা ইস্যু তাদের নিরাপত্তার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>যার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের অবস্থান এবং অপারেশন আকসা তুফানের পর গাজাবাসী নিয়ে তাদের অবস্থানের দিকে খেয়াল করলে। এটাই হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রেসক্রিপশনে তৈরি আজকের সভ্য দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার আসল চরিত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>০৪.</strong></h4>
<p>তাই, পরিশেষে মনে হয় এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে,<br />
আমাদের এখন আত্মসমালোচনা করা খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে! কেননা, আমরা আজকে বর্তমান বিশ্বের এনাটমিটা বুঝি না আর এর ব্যবস্থাপনাটা বুঝার চেষ্টাও করি না।</p>
<p>অথচ, দুনিয়াব্যাপী ইসলামের ঝাণ্ডা উড়ানোর ব্যাপারে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ! তাহলে কোথায় গেলো সূরা আনফাল আর সূরা নিসায় বলা কাফেরদের বিরুদ্ধে সর্বদিক থেকে নেওয়া আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির বিষয়টা? তাহলে কোথায় গেলো সূরা নাহলে বলা সেই হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে ইসলাম ছড়িয়ে দেওয়ার কথা?</p>
<p>বর্তমান বিশ্বকে না বুঝা, আমাদের পর্যাপ্ত সামর্থ অর্জন না করা, বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতি, সংস্কৃতি না বুঝাই কি তাহলে আমাদের আল্লাহর বলা সেই হিকমত ও প্রজ্ঞা অর্জন করা? কোনো কিছুর প্রস্তুতি না নেওয়া বা কোনো সেক্টরেই সম্পূর্ণরূপে দক্ষতা অর্জন না করাই কি তাহলে কাফেরদের বিরুদ্ধে নেওয়া আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির নমুনা?</p>
<p>প্রশ্নগুলো তাদের নিকট রইলো, যারা ইসলাম নিয়ে চিন্তা করেন, ভাবেন, ইসলাম নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।</p>
<p>মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে রাসূলের সেই ভাষণটি আমাদের আকল ও বিবেকের জন্য চক্ষু উন্মোচনকারী হোক এবং আগামীর নতুন দুনিয়া বিনির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের সকলকেই একেকজন মুজাহিদ হিসেবে মহান রব কবুল করে নিক, এই দোয়া ও কামনা করি। আল্লাহুম্মা আমীন।</p>
<p>প্রচেষ্টা ও জিহাদ আমাদের, সফলতা দেবার দায়িত্ব মহান রবের।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-conquest-of-mecca-the-importance-of-the-prophets-victory-speech-in-the-context-of-modern-times/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15676</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে পর্দার দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 12 Mar 2025 13:29:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[উসূল ও মেথডোলজি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15602</guid>

					<description><![CDATA[সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি ছাড়া সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে, সকল সংস্কৃতিতে, সকল সভ্যতায় এবং সকল আখলাকী ব্যবস্থায় মানুষের জন্য মূল বিষয় হল নিজেকে আবৃত করে রাখা। মানুষ, তাঁর শরীরকে আবহওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকে কিংবা ঠাণ্ডা ও গরম থেকে রক্ষা করার জন্যই নয় একই সাথে আধ্যাত্মিক একটি মূল্যবোধকে সামনে রেখে নিজেকে আবৃত করে থাকে।</p>
<p>সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ পোশাক পরিচ্ছদের দিকে আরও বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। সকলেই জানেন যে, আজ থেকে একশত বছর পূর্বেও নারীরা খ্রিষ্টান কিংবা ইয়াহুদী, যে ধর্মেরই হোক না কেন মুসলমান নারীদের মত তারাও পর্দা করত। কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে সকল ক্ষেত্রের মত এই ক্ষেত্রেও মানবতা অনেক বড় একটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আধুনিক সময়ে পর্দাকে এতটা প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে, যা জীবনের সাথে সম্পর্কহীন একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একদিকে পর্দাকে তুচ্ছ ও প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখানো হয়েছে আর অপর দিকে শরীর প্রদর্শনকে আকর্ষণীয় ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিক সময়ে শোষণের একটি ক্ষেত্রে হিসেবে মানুষের শরীরকে বেঁছে নেওয়া হয়েছে। নারী, পুরুষ কিংবা শিশু সকলের শরীরকেই যথেচ্ছাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের দিকে শুরু হওয়া যৌন বিপ্লবের মাধ্যমে শরীরকে মালিকানাধীন একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। যা পরবর্তীতে শরীরকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করে এবং শরীর প্রদর্শন ফ্যাশনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ‘ফ্যাশন’, ‘স্বাধীনতা’ কিংবা সর্বজনীনতার নামে বিভিন্ন পন্থায় মানুষের সামনে এই যৌনতাকে তুলে ধরার ফলে সমগ্র দুনিয়াজুড়ে মানবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমস্যার সম্মুখীন।</p>
<p>ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে নতুন <strong>ভার্চুয়াল স্ক্রিন সভ্যতা </strong>প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই সভ্যতায় বিনোদন কেন্দ্রিক একটি <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাক</strong> প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এই সভ্যতায় মানুষ; তাঁর নিজের সাথে, অন্যদের সাথে এবং মহাবিশ্বের সাথে সম্পর্ককে হাকীকতের উপর ভিত্তি করে নয় বরং চিত্র ও ছবির উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে। এই সভ্যতায় আকলের বদলে চোখ-ই হয়ে উঠেছে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। একই এই সভ্যতার বড় কাজ হল, চিন্তা করার বদলে দেখা। অর্থাৎ এই <em>ভার্চুয়াল</em> <em>স্ক্রিন</em> <em>সভ্যতা</em>  আকলের উপর চোখকে এবং চিন্তা করার বদলে দেখাকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর এই সভ্যতায় ‘চোখ’ নাজার ও মুশাহাদা (অবলোকন) &#8211; এর উপাদান হওয়ার পরিবর্তে কামনা-বাসনা ও শাহওয়াতের উপাদানে পরিণত হয়েছে। আর এই বিষয়টি পর্দার ফিতরাতী, দ্বীনী, আধ্যাত্মিক ও মেটাফিজিক্যাল অর্থকে হারিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে এবং ইলাহী উদ্দেশ্যকে বিলীন হওয়ার ক্ষেত্রে এমনকি আখলাকী ভিত্তি থেকেও সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। ভিজুয়াল ইদরাকের আধিপত্য এমন অনেক গায়রে আখলাকী বিষয়কে দৃশ্যায়িত করেছে যা আমাদের কল্পনারও অতীত। <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য মানুষকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করে তার গোপনীয়তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এমন অনেক ক্ষেত্র তৈরি করেছে যা মানুষকে সাময়িক কিছু আনন্দ দেয়, এবং তাকানোকে শাহাওয়াতে এবং দেখাকে কামনায় পরিণত করেছে। ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য আকলের ইদরাককে দুর্বল করেছে, এবং কলবের ইদরাককে মৃত্যুঝুকিতে ফেলে দিয়েছে। </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র ইসলামের অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত নীতিমালাসমূহ মানুষকে আবৃত হওয়ার দিকে আহবান জানিয়ে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন ও ডিজিটালাইজশন কর্তৃক ছুড়ে এই সকল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় মহাপর্বতের ন্যায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের এই মূলনীতিগুলো চাচ্ছে মানুষকে হায়া ও সতীত্বের দিকে ফিরিয়ে আনতে। তবে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন এবং ডিজিটালাইজেশন কর্তৃক সৃষ্ট চাপের পাশাপাশি নিম্নোক্ত কারণসমূহও এই একই সমস্যাকে আরও বেশী ঘনীভূত করেছে।</p>
<ul>
<li>১। আধুনিক সময়ে এসে নারী ও পর্দার বিষয়কে ইসলামের মূলনীতির আলোকে সঠিকভাবে বিনির্মাণ করতে ব্যর্থ হওয়া।</li>
<li>২। মুসলমানদের নিকটে পর্দার হিকমত ও দর্শনকে ভালোভাবে তুলে ধরতে না পারা এবং এই ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করা।</li>
<li>৩। পর্দাকে যেন শুধুমাত্র নারীদের জন্যই আবশ্যক এই ধারণার ব্যাপক প্রসার।</li>
<li>৪। পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি।</li>
<li>৫। কখনো কখনো পর্দাকে নারীদের সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের একটি বিষয় হিসেবে না নিয়ে বরং সেটাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৬। নারীদের পর্দার পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হিজাবকে পরিত্যাগ করা এবং হিজাব ত্যাগ করাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৭। হিজাব পরিধানকারী নারীদেরকে ইসলামের প্রতিনিধি রূপে তুলে ধরে তাঁদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।</li>
</ul>
<p>উপর যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, এই সকল বিষয়সমূহ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পর্দার বিষয়টিকে আরও কঠিন করে ফেলেছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঘটে যাওয়া এই সকল সমস্যাসমূহ আসলে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, একই সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ধর্ম এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছে। আর এই বিষয়টি হিজাবের বিষয়টির রূহ ও মাকসাদকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোন থেকে প্রভাবিত করেছে এবং পর্দার আধ্যাত্মিক, রূহী এবং মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।</p>
<p>এই সকল বিষয়কে সামনে রেখে আমি <strong><em>ইসলামের</em> <em>পর্দা</em> <em>দর্শন</em> <em>এবং</em> <em>নতুন</em> <em>একটি</em> </strong><em><strong>দৃষ্টিভঙ্গি</strong>  </em>এই বিষয়ে কিছু চিন্তা আপনাদের নিকটে পেশ করতে চাই।</p>
<p>ইসলামের সকল বিষয়কে নারীদেরকে কেন্দ্র করে আলোচিত হওয়ার ফলে আল্লাহর নারী বান্দাদের উপর যে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এই বিষয় সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। এই কারণে পর্দার বিষয়টিকে নারী কিংবা পুরুষকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এই বিষয়টিকে আমি ‘মানুষ’ এর উপর ভিত্তি করে আলোচনা করতে চাই এবং আমি সুস্পষ্ট করতে চাই যে এই বিষয়টি শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। একই সাথে আমি এই বিষয়টিও তুলে ধরতে চাই যে পর্দার বিষয়টি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক অর্থবোধক।</p>
<p>পর্দার বিষয়টিকে পাঁচটি দিক থেকে বিবেচনা করে পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করানোর চেষ্টা করব। সেগুলো হলোঃ</p>
<ul>
<li>১. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>ফিতরাতী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em>  অর্থাৎ পর্দার স্বয়ং মানুষের সাথে সম্পর্কিত দিক।</li>
<li>২. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>কালামী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> অর্থাৎ মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা।</li>
<li>৩. পর্দার ব্যাপারে ফিকহী দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা ।</li>
<li>৪. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>আখলাকী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> , অর্থাৎ পর্দার নৈতিক দিক।</li>
<li>৫. পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ পর্দার সৌন্দর্যগত, শোভাগত এবং চারিত্রিক দিক।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>১</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিতরাতী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>পর্দার বিষয়টি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ফিতরাতী একটি বিষয়। ফিতরাত হলো, সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে দেওয়া মূল্যবোধের এক রত্নভাণ্ডারের নাম। অন্য কথায়, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে আপলোডকৃত ইলাহী এক সফটওয়্যারের নাম হলো ফিতরাত। আবৃত করে রাখা, আদব, হায়া ও সতীত্বের মত অনুভূতিসমূহ মূলত এই মেমোরির মধ্যে তথা ইলাহী সফটওয়্যারের মধ্যে রক্ষিত মূল্যবোধ থেকেই উৎসারিত হয়ে থাকে। নিজের গোপনীয়তাকে রক্ষা করে যে ভালো, সঠিক ও সুন্দর এবং শরীর প্রদর্শন করা যে খারাপ, কুৎসিত ও ভুল,  এই সকল বিষয়সমূহ মানুষের এই মূল্যবোধের ভাণ্ডারের মধ্যে মওজুদ রয়েছে।</p>
<p>পর্দার ফিতরাতী দৃষ্টিকোণের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাকে আমরা কোরআনে কারীমে বর্ণিত হযরত আদম ও হযরত হাওয়ার কিসসার মধ্যে দেখতে পাই।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1"><sup>[1]</sup></a>  এই কিসসা অনুসারে হযরত আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে সকল ধরণের নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে রাখেন এবং  তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন; ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ কিন্তু শয়তান তাঁদেরকে প্রতারিত করে এবং তাঁদের গোপনাঙ্গকে একে অপরের নিকটে উন্মুক্ত করার জন্য তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে, “তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”। শয়তান কসম খেয়ে তাঁদেরকে বলে যে, “ আমি নিঃসন্দেহে তোমাদের কল্যাণকামী”। এই ভাবে আদম ও হাওয়া উভয়কেই প্রতারিত করতে সক্ষম হয় এবং নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার সাথে সাথে লজ্জাস্থান পরস্পরের সামনে খুলে যায়। অতপর তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থানকে আবৃত করার জন্য জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জাস্থানকে ঢাকার চেষ্টা চালায়। এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে ,শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?  তাঁরাও বলে উঠে, “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি৷ এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো, এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো ৷” কোরআনে কারীম এই কিসসাকে এই নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে শেষ করেছে,</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ</p>
<p>অর্থাৎ, হে বনী আদম! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশ-ভূষার জন্য। আর তাকওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোত্তম। এটা আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2"><sup>[2]</sup></a></p></blockquote>
<p>এ কিসসা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে বাশারিয়্যাত থেকে আদামিয়্যাতের দিকে এবং আদামিয়্যাত থেকে ইনসানিয়্যাতের দিকে যাত্রাকালে মানুষ সর্বপ্রথম যে বিষয়টিকে উপলব্ধি করে সেটা হল মানুষের ফিতরাতের মধ্যকার আবৃত করার বিষয়টি। আর বিষয়টি না শুধু নারীর জন্য আর না শুধু পুরুষের জন্য। আবৃত করার বিষয়টি নারী ও পুরষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই প্রযোজ্য একটি বিষয়।</p>
<p>আর আলোকে এই কথা বলা যায় যে, পর্দার বিষয়টি আসমানী একটি নিয়ামত। আবৃত করার বিষয়টি মানুষের জন্য একটি তাকওয়া অর্থাৎ রক্ষা করা, পরিশুদ্ধ করা, সুন্দর করা ও ইজ্জত সম্পন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অন্যতম একটি নিয়ামত। এ নিয়ামতটি আমাদেরকে ইহসানের চেতনা দান করে এবং যেন আমরা সর্বদায় আল্লাহকে দেখছি এমন ভাবে আচরণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। আর এটা কেবলমাত্র তাকওয়ার পোশাক পরিধান করার মাধ্যমেই সম্ভব।</p>
<p>আর তাকওয়ার পোশাক কেবলমাত্র বাহ্যিক একটি পোশাক-ই নয়। তাকওয়ার পোশাক হল, মানুষকে স্বয়ং তার নিজের প্রতি, সৃষ্টিজগত ও রবের প্রতি দায়িত্ববান করে তোলা। আর এই দায়িত্ববোধ বাহ্যিক পোশাককে অর্থবহতা দান করে, পর্দার মধ্যে রূহ প্রদান করে এবং সকল প্রকার পর্দার চূড়া হলো এ দায়িত্ববোধ। তাকওয়ার পোশাক বিহীন শরীর রসকষবিহীন একটি অবয়ব ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>২</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>কালামী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>অনেকেই ধারণা করেন যে, পর্দা শুধুমাত্র মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি বিষয়। আসলে ব্যাপারটি এমন নয়। পর্দার একই সাথে আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি দিকও রয়েছে। কেননা মানুষ  ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ক শুধুমাত্র খালেক-মাখলুক কিংবা রুবুবিয়্যাত-উলুহিয়্যাত- এর সম্পর্কই নয়। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার এই সম্পর্ক একই সাথে শাহিদ-মাশহুদেরও সম্পর্ক। এ সম্পর্কের দাবি অনুযায়ী মানুষ সর্বদা আল্লাহকে স্মরণে রেখে পথ চলে। কোরআনে কারিমে এই সম্পর্ককে নিম্নোক্তভাবে  তুলে ধরা হয়েছেঃ</p>
<blockquote><p>اَیَحۡسَبُ اَنۡ لَّمۡ یَرَهٗۤ اَحَدٌ</p>
<p>অর্থাৎ, সে কি ধারণা করে যে, তাকে কেহই দেখছেনা?<a href="#_ftn3" name="_ftnref3"><sup>[3]</sup></a></p>
<p>وَ هُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ</p>
<p>তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। <a href="#_ftn4" name="_ftnref4"><sup>[4]</sup></a></p>
<p>فَاَیۡنَمَا تُوَلُّوۡا فَثَمَّ وَجۡهُ اللّٰهِ</p>
<p>তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও সেই দিকেই আল্লাহকে পাবে।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5"><sup>[5]</sup></a></p></blockquote>
<p>শুধু তাই নয় শাহিদ ও মাশহুদের এই সম্পর্ক একটি মিসাক (শাহাদাতের মিসাক) এর উপর নির্ভর করে। এই মিসাকের আলোকে মানুষ তার সৃষ্টির পূর্বেও আলমে আরওয়াহ/রূহের জগতে তাঁর রবের একত্বে ও মহত্বে স্বাক্ষ্য প্রদান করেছে। কোরআনের ভাষ্যমতে,</p>
<blockquote><p>وَ اَشۡهَدَهُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ ۚ اَلَسۡتُ بِرَبِّکُمۡ ؕ قَالُوۡا بَلٰی ۚۛ شَهِدۡنَا</p>
<p>অর্থাৎ, আর তাদেরকেই সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ; এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’<a href="#_ftn6" name="_ftnref6"><sup>[6]</sup></a></p></blockquote>
<p>আর সৃষ্টির পরে দুনিয়াতে এসেও মানুষ তাঁর মহান প্রভুর নাম, আয়াত, সিফাত ও নিয়ামতসমূহকে অবলোকন করছে। আল্লাহ তায়ালাও তাঁর বান্দার সকল অবস্থা, কাজ, নিয়ত ও গোপন বিষয়ের সাক্ষী। <strong>“ وَ اللّٰهُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَهِیۡدٌ /আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী”।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7"><sup>[7]</sup></a></strong> যার কারণে পর্দা শুধুমাত্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘আমার চোখে’ কিংবা বাহিরের ‘অন্যদের চোখে’ কেমন লাগলো এর সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, আমার রব আমাকে কেমন দেখছেন এর সাথেও এই বিষয়টি সম্পর্কিত। কেননা কোন দৃষ্টি-ই মহান প্রভুর দৃষ্টির চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়। <strong>কলবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা হলো চোখ। এ চোখকে যারা রক্ষা করতে পারবে তাঁরা আল্লাহর নজরগাহ হিসেবে আখ্যায়িত কলবকেও রক্ষা করতে পারবে। হাদীসে যেমনটা বর্ণিত হয়েছে; “إِنَّ اللهَ تعالى لَا ينظرُ إلى صُوَرِكُمْ وَأمْوالِكُمْ ، ولكنْ إِنَّما ينظرُ إلى قلوبِكم وأعمالِكم / নিশ্চয় আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না তোমাদের শরীর এবং তোমাদের আকৃতির দিকে, বরং দৃষ্টি দিবেন তোমাদের অন্তর ও তোমাদের কর্মসমূহের দিকে”।</strong></p>
<p>এখানে আমাদের মনে এমন একটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারেঃ “ অগণিত গ্যালাক্সির স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা আমার পোশাক-আশাক কিংবা চুলের স্টাইলের দিকে কেনই বা নজর দিবেন?” এখানে মূল বিষয়টি আসলে পোশাক-আশাক কিংবা চুল দাঁড়ির সাথে সম্পর্কিত নয়। এখানে মূল বিষয়টি আসলে মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমতের সাথে সম্পর্কিত। কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমত সম্পর্কে অবহিত করেছেন এবং তাঁদের ফিতরাতের মধ্যে যে মূল্যবোধ দিয়েছেন সেই মূল্যবোধের দাবির আলোকে বসবাস করতে বলেছেন। তাঁরা তাঁদের রবের উপর ঈমান আনবে কি আনবে না এটা তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। পর্দা ও শরীরকে আবৃত করে রাখার বিষয়টিও মহান প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষের নিকট চাওয়া সেই সকল মূল্যবোধসমূহের মধ্যকার একটি । মূলত, পর্দার বিষয়টিকে শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ একটি বিষয় বলে ধারণা করার কারণে অনেকেই এই ধরণের প্রশ্ন করে থাকেন। অনেকেই আবার আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে পর্দাকে শুধুমাত্র নারীদের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখে থাকেন। বিশেষ করে <strong>আধুনিক সময়ে পর্দাকে বাহ্যিক একটি বিষয় হিসেবে উত্থাপন করে একে আদর্শিক একটি  সংঘর্ষের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যা খুবই বিপদজনক একটি দৃষ্টিভঙ্গী। অথচ পর্দা আদর্শিক (Ideological) কোন প্রতীক নয়; পর্দা হল বিশ্বাস, ইজ্জত-আব্রু ও সম্মানের প্রতীক। ফিতরাত, ইজ্জত, সতীত্ব, ব্যক্তিত্ব ও ইস্তিকামাতের বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশের নাম হল পর্দা।</strong> এর আলোকে পর্দা আদবকে সজ্জিত করে এবং মানুষকে পরিশুদ্ধ একটি রূহের মাধ্যমে বসবাস করতে সাহায্য করে। পর্দা নিভপ্ল একটি আলামত কিংবা কোন প্রতীক নয়, পর্দা হল একটি আয়াত। প্রতীক হল জাগতিক ও শারীরিক একটি বিষয় অপরদিকে আয়াত হলো আধ্যাত্মিক ও রূহী একটি বিষয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিকহী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong><strong>  </strong></h5>
<p>আমাদের অধিকাংশ আলেম-ই পর্দার প্রকৃতি ও সীমানাকে, শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে আওরাত ও ফিতনার উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোরআন ও সুন্নতের নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করে আঞ্চলিক ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়কে দ্বীনি বিধানের সাথে সম্পর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের অসামঞ্জস্যতাকে বৈধতাদানকারী, পুরুষদেরকে কেন্দ্রে রেখে পর্দার ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি  দাঁড় করানো হয়েছে সেটা ধর্মীয় নয় বরং সাংস্কৃতিক। পর্দাকে যদি শুধুমাত্র আওরাত<a href="#_ftn8" name="_ftnref8"><sup>[8]</sup></a> ও ফিতনা নামক পরিভাষাদ্বয় এর উপর ভিত্তি করে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে,</p>
<ul>
<li>১। পর্দাকে কেবলমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিন্যস্তকারী একটি বিষয় হিসেবে দেখা হবে।</li>
<li>২। পুরুষরা যেন ফেতনায় পতিত না হয় এই কারণে নারীদেরকে পর্দা করার আদেশ করা হয়েছে, এমন একটি ধারণা তৈরি হবে। অথচ এরকম চিন্তা ইলাহী হিকমতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।</li>
<li>৩। পর্দার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাহ্যিক বিষয় সমূহকেই আবশ্যকীয় বলে পালন করা হবে এবং পর্দার রূহকে উপেক্ষা করা হবে।</li>
</ul>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে প্রথমে পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,</p>
<blockquote><p>قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ</p>
<p>অর্থাৎ, মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করবে। <a href="#_ftn9" name="_ftnref9"><sup>[9]</sup></a></p></blockquote>
<p>পুরুষদের পরে নারীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,</p>
<blockquote><p>وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ</p>
<p>অর্থাৎ, আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করে।<a href="#_ftn10" name="_ftnref10"><sup>[10]</sup></a></p></blockquote>
<p>এই সকল আয়াতকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পর্দার বিষয়টি শুধুমাত্র নারীদের জন্যই নয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা নারী ও পুরুষ একে অপরকে পরস্পরের জন্য পর্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মহান প্রভুর ভাষায়, <strong>“ هُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّهُنَّ / তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ”। <a href="#_ftn11" name="_ftnref11"><sup>[11]</sup></a></strong></p>
<p>খাজানের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ তাঁর <em>“</em><em>কোরআনে</em> <em>কারীমের</em> <em>আয়াতের</em> <em>নূরের</em> <em>আলোকে</em> <em>খাতুন</em><em>”</em>  নামক গ্রন্থে বলেন, “<strong>“আমাদের আলেমগণ পর্দা সংক্রান্ত সকল বিধানসমূহকে ‘ফিতনার ভয়’- এর মত ধারণামূলক একটি হিকমতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার কারণে এ বিধানসমূহ কখনো কখনো এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে নারীগণ সূর্যের নূর থেকে জ্ঞানের আলো পর্যন্ত অনেক বিষয় থেকেই বঞ্চিত হয়েছে। অথচ, জ্ঞান ও ঈমানের আলো কখনো ফিতনা হতে পারেনা। যদি ফিতনা থেকেই থাকে তা থাকার সম্ভাবনা পুরুষদের চোখে, অন্তরে ও ভাষায়। তাই ফিতনা থেকে যদি নিষ্কৃতি পেতেই হয়, তবে পুরুষদের চোখে নিকাব, কলবে আদব এবং মুখে লাগাম লাগানোই হবে মোক্ষম তদবীর। </strong></p>
<p>এ কারণে সকল আসমানী দ্বীন কর্তৃক গৃহীত পর্দাকে কেবল ফিতনার সাথে সম্পর্কিত করার অধিকার কারোর-ই নেই। কেননা ইসলাম আনীত পর্দার বিধানটি শুধুমাত্র নারীদের মুখমণ্ডল ও শরীরের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, একই সাথে তা তাঁদের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকারের সাথেও সম্পর্কিত। পর্দাকে কখনোই “ আওরাতের পর্দা” হিসেবে আদেশ করা হয়নি। পর্দাকে সম্মানের প্রতীক, ইসমাতের চাদর এবং সম্মানের ইহরাম হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। ঘরের মধ্যে নারীরা যে অংশে অবস্থান করেন সেই অংশকে হেরেম বলার কারণ হল হুরমাত বা  সম্মানের কারণে। কাবাকে যে উদ্দেশ্যে হারাম বলা হয়ে থাকে, নারীরা যে ঘরে অবস্থান করে সেই ঘরকেও এজন্যই হারাম বা হারেম বলা হয়ে থাকে”।</p>
<p>সংক্ষেপে বলতে গেলে উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ মতে ইসলামের পর্দার বিষয়টি সকলের জন্যই আবশ্যকীয়। যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই পরিগ্রহ করে থাকে। হায়া ও সতীত্বকে রক্ষা করা এবং এ চেতনাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব শুধুমাত্র নারীদের-ই নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপরেই এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য সেটা পর্দার সীমা ও পরিসীমার সাথে সম্পর্কিত। যেমনটা আয়াতের ধারাবাহিকতায় এসেছে, “  وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِهِنَّ / তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে”।<a href="#_ftn12" name="_ftnref12"><sup>[12]</sup></a> এ আদেশের মাধ্যমে হিজাবকে নারীদের জন্য পর্দার একটি পরিপূরক বিষয় হিসেবে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>পর্দার ব্যাপারে যে ফিকহী দৃষ্টিকোণ রয়েছে তাঁর মধ্যে অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার সম্পর্ক। প্রথমত আমি বলতে চাই যে, মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার যে সম্পর্ক, তা মালিকানার কোন সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্ক হল আমানতের সম্পর্ক। আধুনিক সময়ে আমরা একটি কথা অনেক বেশী শুনে থাকি, সে কথাটি হলো, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”। এটাকে অনেক সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে  ব্যক্তি স্বাধীনতা হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সাথে তাঁর রবের যে মিসাক (চুক্তি) তাঁর মধ্যে অন্যতম একটি হলো আমানতের চুক্তি (মিসাক)। এ মিসাক বা চুক্তি অনুযায়ী সকল কিছুকেই মানুষের নিকটে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজগতের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্ক প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা মালিকানার সম্পর্ক নয়। মানুষের সাথে মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক সে সম্পর্ক হলো আমানতের সম্পর্ক। ফলশ্রুতিতে শরীর আমাদের মালিকানাধীন কোন বিষয় নয়, আমাদের নিকট আমানত।</p>
<p>এ মিসাকের  (চুক্তি) মাধ্যমে আমরা সাক্ষ্য দিয়ে থাকি যে আমরা আমাদের শরীরের উপর আধিপত্য ও প্রভুত্ব কায়েম করব না। আমরা বুঝতে পারব যে, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”, এ কথা বলার অধিকার আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি উপলব্ধি করতে পারব যে, আমি আমাকে অন্যের সামনে একটি পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারি না। এই মিসাক আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমার শরীর হল আমার নিকট রাখা একটি আমানত এবং কোন অবস্থাতেই আমি এই আমানতের খেয়ানত করতে পারি না। যেমনটা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন,</p>
<blockquote><p> “ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَخُوۡنُوا اللّٰهَ وَ الرَّسُوۡلَ وَ تَخُوۡنُوۡۤا اَمٰنٰتِکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ</p>
<p>তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, আর যে বিষয়ে তোমরা আমানাত প্রাপ্ত হয়েছ তাতেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না”। <a href="#_ftn13" name="_ftnref13"><sup>[13]</sup></a></p></blockquote>
<p>পর্দার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অপর একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পর্দাকে এমনভাবে তুলে ধরা যা নারীদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই ক্ষেত্রে “ নারীদের আওয়াজ হলো আওরাত, তাঁদের মুখমণ্ডল ও হাত-পা হলো আওরাত” এ ধরণের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবের বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। <strong>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে , “وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا / তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে” এই কথা বলার পরেও, এবং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবু বকরের (রা) কন্যা, হযরত আসমার (রা) উপর ভিত্তি করে নারীদের পর্দার সীমানাকে উম্মতের সামনে সুস্পষ্ট করে দেওয়ার পরেও<a href="#_ftn14" name="_ftnref14"><sup>[14]</sup></a> বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে কিছু কিছু আঞ্চলিক পোশাকের উপর ভিত্তি করে জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার মত প্রান্তিক চিন্তাকে মেনে নেওয়া হয়েছে।</strong> অথচ নারীদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী রেখে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা পর্দার উদ্দেশ্য নয়। পর্দার উদ্দেশ্য হলো নারীগণ যেন নিরাপত্তা ও শালীনতার সাথে সমাজের সকল স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং নর ও নারী উভয়ের জন্যই এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে তাঁরা মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালো কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করা এবং দ্বীনের রহমত ও হিকমতকে প্রচারের দায়িত্ব নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উভয়কেই দিয়েছেন। মহান প্রভুর ভাষায়ঃ</p>
<blockquote><p>وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ یُطِیۡعُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ</p>
<p>অর্থাৎ “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা নামাজ আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।আল্লাহ শীঘ্রই এদের উপর দয়া (মারহামাত) করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।</p></blockquote>
<h5><strong>৪</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>দৃষ্টিভঙ্গী</strong></h5>
<p>প্রথমত এই বিষয়টি সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, দ্বীন ইসলামে আখলাক ফিতরাতের থেকে, কালাম কিংবা ফিকহ থেকে আলাদা বিভাগে অবস্থানকারী কোন বিষয় নয়। জোর দিয়ে বলতে চাই যে, “ কোন কিছু  আখলাকী” এর অর্থ মোটেই এই নয় যে তা ঐচ্ছিক একটি বিষয়”। কোন কিছু আখলাকী এর অর্থ হলো, তা আবশ্যক একটি বিষয়। যারা আখলাককে ‘হলেও চলবে না হলেও চলবে’ এমন একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন তাঁরা মূলত দ্বীনের মধ্যে আখলাকের অবস্থানকে নির্ণয় করতে পারেন না। কেননা ইসলামে আখলাক পরিপূর্ণতাদানকারী কোন বিষয় নয়, আখলাকের বিষয়টি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। অনুরূপভাবে একথা বলাও সম্ভবপর নয় যে, দ্বীন ও আখলাক আলাদা আলাদা বিষয়। দ্বীন থেকে আখলাককে আলাদা করে ফেলার অর্থ হল, স্বয়ং দ্বীনকেই আলাদা করে ফেলা। দ্বীন ও আখলাক যেমন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ অনুরূপভাবে দ্বীনের আহকাম কেও আখলাক থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা যায় না। কেননা, <strong>“ الاخلاق عقل الأحكام / আখলাক হলো, আহকামের আকল”। </strong> পর্দার আখলাকী ভিত্তি হলো হায়া। আমরা অনেকেই মনে করে থাকি যে, হায়া মানে হল লজ্জাশীলতা, আসলে তা নয়। হায়ার অর্থ আরও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। হায়া ও হায়াত একই উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে। হায়ার অপর নাম হল হায়াত। হায়া অনেকটা তাকওয়ার মত আল্লাহর প্রতি দায়িত্বানুভূতির চেতনা। হায়া স্বয়ং কল্যাণ।<a href="#_ftn15" name="_ftnref15"><sup>[15]</sup></a> হায়া হল কুল্লি একটি আখলাক। কুৎসিত, অসুন্দর ও  বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং ভাল, সুন্দর ও সঠিককে মেনে চলার নাম হল হায়া। হায়া হল এমন এক চেতনার নাম, যে চেতনা আমাদেরকে খারাপের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহ যে আমাদের সব কিছুই দেখছেন এ বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দিবে। অপরদিকে পর্দা ও হিজাব মানুষের হায়াকে লালিত করে। আর রূহ এখান থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। রূহ হল পানির মত। যে পাত্রে যায় এই পাত্রের-ই আকার ধারণ করে।</p>
<p>রাসূলে আকরাম  (স) একটি হাদীসে হায়াকে, ইসলামের মূল আখলাক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, <strong>“ إنَّ لِكُلِّ دينٍ خُلُقًا، وإنَّ خُلُقَ الإسلامِ الحياءُ / প্রতিটি দ্বীনের-ই মৌলিক একটি আখলাক রয়েছে। ইসলামের মূল আখলাক হল হায়া”।<a href="#_ftn16" name="_ftnref16"><sup>[16]</sup></a></strong> এর আলোকে হায়া শুধুমাত্র একটি মূল্যবোধের নাম নয়। হায়া হল মূল্যবোধ উৎপাদনকারী কুল্লি একটি আখলাকের নাম।</p>
<p>রাসূল (স) হায়া ও ঈমানকে একে অপরের থেকে আলাদা কোন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি বলেন,</p>
<blockquote><p>الحياء شعبة من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের একটি শাখা।<a href="#_ftn17" name="_ftnref17"><sup>[17]</sup></a></p>
<p>الحياء من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের অংশ।<a href="#_ftn18" name="_ftnref18"><sup>[18]</sup></a></p>
<p>الحياءُ والإيمانُ قرناءُ جميعًا فإذا رُفِع أحدُهما رُفِع الآخرُ</p>
<p>অর্থঃ ঈমান ও হায়া হলো ভাইয়ের মত। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।<a href="#_ftn19" name="_ftnref19"><sup>[19]</sup></a></p></blockquote>
<p>রাসূলে করীম (সঃ) হায়াকে অন্য একটি হাদীসে সকল পয়গাম্বর কর্তৃক আনীত অভিন্ন একটি মূল্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<blockquote><p>إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحى فاصنعْ مَا شئْتَ</p>
<p>অর্থাৎ, সমগ্র মানবতা, প্রথম দিন থেকে এমন একটি কথা জানেন যে কথার ব্যাপারে সকল পয়গাম্বর ঐকমত্য পোষণ করেছেন সেটা হলো, যদি হায়া না থাকে তাহলে যা ইচ্ছা তাই করতে পার।<a href="#_ftn20" name="_ftnref20"><sup>[20]</sup></a></p></blockquote>
<h5>৫। <strong>পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>দ্বীনের প্রতিটি হুকুমের-ই নান্দনিক বা সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। ইসলামের প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রেই আল্লাহর জামাল নামের একটি প্রতিফলন দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন শাহাদাতের চেতনার অধিকারী হয় তখন সে এমন এক অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনে যা তাঁকে প্রতিমুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছে। আখলাকী মূল্যবোধ ও দ্বীনের বিধানসমূহকে শুধুমাত্র কামাল (পরিপূরক) হিসেবেই নয়; জামাল হিসেবেও দেখে থাকে এবং এই জামাল মানুষের মধ্যে জ্ঞান, হিকমত, মারেফত ও মুহাব্বতে রূপান্তরিত হয়।</p>
<p>পর্দার দায়িত্ব শুধুমাত্র শরীরকে ঢেকে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার একই সাথে নান্দনিক ও সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, <strong>“ قَدۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکُمۡ لِبَاسًا یُّوَارِیۡ سَوۡاٰتِکُمۡ وَ رِیۡشًا / আমি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার ও শোভা বর্ধনের জন্য তোমাদের পোশাক পরিচ্ছদের উপকরণ অবতীর্ণ করেছি”।</strong> এই আয়াতের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষের জন্য পর্দার একই সাথে  সৌন্দর্যগত একটি দিকও রয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত رِیۡشً/রিশ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল পাখির পালক। <strong>কোরআনের ভাষায় রিশ দ্বারা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার সর্বোচ্চ চূড়া বুঝানো হয়ে থাকে।</strong> ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর ভাষায়, رِیۡشً/রিশ হল পর্দার সৌন্দর্যগত দিক। অর্থাৎ رِیۡشً/রিশ যিনাতেরও উপরের একটি সৌন্দর্যকে বুঝিয়ে থাকে। তবে কোরআনে রিশ শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই নয়, আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকেও ব্যক্ত করে থাকে। অপর একটি আয়াতে মহান রব কাবা ঘরকে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকারী জাহেলী সমাজকে এই অবস্থা থেকে বিরত রাখার জন্য বলেছেন, <strong>“یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ / হে আদম সন্তান! মসজিদে যাওয়ার সময় সাজসজ্জা করো”। <a href="#_ftn21" name="_ftnref21"><sup>[21]</sup></a></strong> এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে লঙ্ঘন না করা। তাছাড়া এখানে নির্দিষ্ট কোন অবয়ব কিংবা পোশাকের কথা বলা হয়নি। অন্যথায় আবহাওয়া ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে পোশাক আশাকে ভিন্নতা একটি রহমত স্বরূপ। ইসলাম পোশাকে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন পোশাক বা ধরণ চাপিয়ে দেয়নি। ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে মেনে চলার পরও যদি কেউ কারোর উপর পোশাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ধরণকে চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেটা হবে এই রহমতকে লঙ্ঘন করার শামিল।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের ভাষায় দুই ধরণের সৌন্দর্য রয়েছে। একটি হল <strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong> অপরটি হলো <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>।</p>
<p><strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>, তার নামকে তিনি রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে ( Roman Mythology)<a href="#_ftn22" name="_ftnref22"><sup>[22]</sup></a> আলোচিত প্রেম, সৌন্দর্য ও কামনার দেবী ভেনাস থেকে নিয়েছেন। আর সেটা গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে (Greek Mythology) আলোচিত আফ্রোদিতি থেকে এসেছে। এটার দ্বারা শুধুমাত্র শারীরিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর এর উৎস হলো জাগতিক আবেগ ও অনুভূতি। এটা শুধুমাত্র আবেগকে উদ্বেলিত করে থাকে, প্রভাবিত করে, কিন্তু প্রতারণামূলক। <strong>মানুষকে</strong> <strong>বস্তুগত জগৎ</strong> <strong>ও</strong> <strong>বাহ্যিকতার</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বন্দী</strong> <strong>করে</strong> <strong>ফেলে</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>অপরটি</strong> <strong>হল</strong> <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong><strong>।</strong> এই সৌন্দর্যের নামকে তিনি হযরত ইউসুফ (আ) থেকে নিয়েছেন। ইউসুফী সৌন্দর্যের ভিত্তি হল, শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রূহী সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দের চেয়ে চোখের নূর ও কালবের প্রশান্তি রয়েছে। এই সৌন্দর্য শুধুমাত্র বাসারকেই (দৃষ্টিকেই) নয়, বাসিরাতকেও (দূরদৃষ্টি) উদ্দেশ্য করে কথা বলে। প্রভাবিত করে কিন্তু প্রতারিত করে না। মানুষকে সুন্দর ও নান্দনিকতার দিকে পরিচালিত করে। হাদীসের ভাষ্য মতে, <strong>“إنَّ اللهَ جميلٌ يُحبُّ الجمالَ / আল্লাহ তায়ালা সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন”।<a href="#_ftn23" name="_ftnref23"><sup>[23]</sup></a></strong></p>
<p>সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ব্যাখ্যানুসারে হযরত ইউসুফের তিনটি পোশাক পর্দার তিনটি ধরণ ও তিন বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে।</p>
<p>প্রথমটি হল মিথ্যাবাদী পোশাক। ‘ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে’ এই কথা বলার জন্য ইউসুফ (আ) এর ভাইয়েরা তাঁদের বাবার নিকট রক্তমাখা যে পোশাক নিয়ে যায় এই পোশাক। “ وَ جَآءُوۡ عَلٰی قَمِیۡصِهٖ بِدَمٍ کَذِبٍ ؕ / আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল”।<a href="#_ftn24" name="_ftnref24"><sup>[24]</sup></a></p>
<p>দ্বিতীয় পোশাক হলো, ছেঁড়া পোশাক কিন্তু সেই শার্ট সামনে থেকে নয়, বরং পেছন থেকে ছেঁড়া ছিলো। সে পোশাক ছিলো এমন পোশাক যা তাঁর পরিধানকারীকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে হায়া’র দিকে ধাবিত করেছিলো। “وَ اِنۡ کَانَ قَمِیۡصُهٗ قُدَّ مِنۡ دُبُرٍ فَکَذَبَتۡ وَ هُوَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ  / আর তার জামা যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয় তাহলে সে (মহিলা) মিথ্যা বলেছে এবং সে (পুরুষ) হচ্ছে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত”।<a href="#_ftn25" name="_ftnref25"><sup>[25]</sup></a></p>
<p>তৃতীয় পোশাক হলো, অন্ধ চোখকে উন্মীলিতকারী পোশাক। এ পোশাকের আধ্যাত্মিক একটি ঘ্রাণ ও সুন্দর একটি দিক রয়েছে। যা চোখকে খুলে দেয় এবং বাসিরাতকে (দূরদৃষ্টি) বৃদ্ধি করে। এর ঘ্রাণ এমনকি হযরত ইয়াকুবের অন্ধ হয়ে যাওয়া চক্ষুকে খোলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিলো। আর এটা হল এমন জামা যা চক্ষুকে উম্মুক্ত করে দেয় এবং বাসিরাতকে লালিত করে। <strong>“اِذۡهَبُوۡا بِقَمِیۡصِیۡ هٰذَا فَاَلۡقُوۡهُ عَلٰی وَجۡهِ اَبِیۡ یَاۡتِ بَصِیۡرًا / তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও, অতঃপর সেটি আমার পিতার চেহারায় স্পর্শ করাও। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন”। <a href="#_ftn26" name="_ftnref26"><sup>[26]</sup></a></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি জানি যে সকল বিষয়ের মত পর্দা নিয়েও তোমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আর এর পেছনে অনেক অভ্যন্তরীণ ও বহির্গত কারণ রয়েছে সেটাও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে নয়। আমাদের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনাসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের এই সকল জেরা ও জিজ্ঞাসাসমূহ যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং আমাদেরকে আমাদের রবের দিকে ধাবিত করে। অন্যথায় এসকল জিজ্ঞাসা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর অন্য কোনকিছু বয়ে আনবে না। যেসকল আত্মজিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণ আমাদের মূল্যবোধকে বিনাশ করে দেয় তা সঠিক কোন জিজ্ঞাসা বা বিশ্লেষণ হতে পারে না।</p>
<p>হিজাব কিংবা পর্দাকে ছেড়ে দেওয়া শুধুমাত্র হিজাব ও পর্দাকে ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। কেননা পর্দা হলো মহান প্রভুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার একটি বহিঃপ্রকাশ। পর্দা মানুষকে তার অবস্থান সম্পর্কে  সচেতন করে তুলে এবং মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ একটি জীবনধারা অর্জনে সাহায্য করে। আর এ ক্ষেত্রে শুধু পর্দা করলে কিংবা হিজাব পরিধান করলেই হবে না, আমি কেন পর্দা করি, কেন হিজাব পড়ি এই বিষয়কে কোরআনের আলোকে জানতে হবে এবং আল্লাহর আখলাককে আখলাকাসম্পন্ন হতে হবে। আমরা যদি এই চেতনাকে ধারণ পর্দা করতে পারি তখন-ই কেবলমাত্র আমাদের নিজেদেরকে ইস্তেকামাতের পথে দৃঢ় রাখতে পারবো।</p>
<p>সমাজবিজ্ঞানে হাবিটাস (Habitus) নামে একটি পরিভাষা রয়েছে। হাবিটাস (Habitus)  ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিতকারী এবং আমরা যে সমাজে বসবাসকরী সেই সামাজিক জীবন। বিগত শতাব্দী পর্যন্ত  হাবিটাস (Habitus) ছিল পর্দার প্রভাবাধীন, অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ-ই পর্দা করত। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে এই হাবিটাস (Habitus)- এ পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষ পর্দাকে পরিত্যাগ করে শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমি জানি আমাদের তরুণ-তরুণীরা স্বাধীনতাকে অনেক বেশী পছন্দ করে। তবে নফসের নিকট আত্মসমর্পণ করার নাম স্বাধীনতা নয়। অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনুসরণ করে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোকে মেনে  জীবন পরিচালনা করাকেও স্বাধীনতা বলে না। সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো, আমাদের উপর বৈশ্বিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই সকল হাবিটাস (Habitus)- এর নিকটে আত্মসমর্পণ না করা</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> সূরা আরাফ, ১৯-২৩।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> আরাফ, ২৬।</p>
<p><a href="#_ftnref3" name="_ftn3">[3]</a> বালাদ, ৭</p>
<p><a href="#_ftnref4" name="_ftn4">[4]</a> হাদিদ, ৪</p>
<p><a href="#_ftnref5" name="_ftn5">[5]</a> বাকারা, ১১৫।</p>
<p><a href="#_ftnref6" name="_ftn6">[6]</a> আরাফ, ১৭২।</p>
<p><a href="#_ftnref7" name="_ftn7">[7]</a> বুরুজ, ৭।</p>
<p><a href="#_ftnref8" name="_ftn8">[8]</a> আওরাত বলতে আমাদের ভাষায় মেয়েলোক বা নারী জাতি বুঝায়। কিন্ত আরবী ভাষায় এর মানে হয় বাধা ও বিপদের জায়গা এবং যে জিনিসের খুলে য়াওয়া মানুষের জন্য লজ্জার ব্যাপার এবং যার প্রকাশ হয়ে পড়া তার জন্য অস্বস্তিকর হয় এমন জিনিসের জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া কোন জিনিসের অসংরক্ষিত হওয়া অর্থেও এর ব্যবহার হয়। (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref9" name="_ftn9">[9]</a> নূর, ৩০।</p>
<p><a href="#_ftnref10" name="_ftn10">[10]</a> নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref11" name="_ftn11">[11]</a> বাকারা, ১৮৭।</p>
<p><a href="#_ftnref12" name="_ftn12">[12]</a> সূরা নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref13" name="_ftn13">[13]</a> আনফাল, ২৭।</p>
<p><a href="#_ftnref14" name="_ftn14">[14]</a> আবু দাউদ, লিবাস, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref15" name="_ftn15">[15]</a> মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ৩৭।</p>
<p><a href="#_ftnref16" name="_ftn16">[16]</a> ইবনে মাজা, যুহুদ, ১৭।</p>
<p><a href="#_ftnref17" name="_ftn17">[17]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৮; নাসাঈ, ঈমান, ১৬।</p>
<p><a href="#_ftnref18" name="_ftn18">[18]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৯।</p>
<p><a href="#_ftnref19" name="_ftn19">[19]</a> হাকিম, <em>মুসতাদরাক</em><em>,</em> ৫৮।</p>
<p><a href="#_ftnref20" name="_ftn20">[20]</a> বুখারী, আদব, ৭৮।</p>
<p><a href="#_ftnref21" name="_ftn21">[21]</a> আরাফ, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref22" name="_ftn22">[22]</a> Venus is a Roman goddess, whose functions encompass love, beauty, desire, sex, fertility, prosperity, and victory. In Roman mythology, she was the ancestor of the Roman people through her son, Aeneas, who survived the fall of Troy and fled to Italy. Julius Caesar claimed her as his ancestor. Venus was central to many religious festivals and was revered in Roman religion under numerous cult titles. (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref23" name="_ftn23">[23]</a> মুসলিম, ঈমান, ১৪৭।</p>
<p><a href="#_ftnref24" name="_ftn24">[24]</a> ইউসুফ, ১৮।</p>
<p><a href="#_ftnref25" name="_ftn25">[25]</a> ইউসুফ,২৭ ।</p>
<p><a href="#_ftnref26" name="_ftn26">[26]</a> ইউসুফ,৯৩ ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15602</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের পর্যালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 06 Feb 2025 16:37:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15526</guid>

					<description><![CDATA[পূর্ণ মানব (আদর্শ মানব) কে, তা জানা একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যক্তির প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রতিটি মতাদর্শেই আদর্শ মানবের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়। যেহেতু আমরা ইসলামের পূর্ণ ও আদর্শ মানবের প্রতিকৃতি ও স্বরূপ জানতে চাই, সেহেতু প্রচলিত অন্য সব]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পূর্ণ মানব (আদর্শ মানব) কে, তা জানা একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যক্তির প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রতিটি মতাদর্শেই আদর্শ মানবের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়। যেহেতু আমরা ইসলামের পূর্ণ ও আদর্শ মানবের প্রতিকৃতি ও স্বরূপ জানতে চাই, সেহেতু প্রচলিত অন্য সব মতবাদের আদর্শ মানবের প্রকৃতির পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব। গত দিনের আলোচনায় বিভিন্ন মতবাদ সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি। আজকে আমাদের আলোচনা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ দিয়ে শুরু করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক</strong> <strong>মতবাদের</strong> <strong>সার</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সংক্ষেপ</strong></h4>
<p>প্রাচীন দার্শনিক ভাবনায় মানুষের অস্তিত্বের মূল বিষয় ছিল তার বুদ্ধিবৃত্তি। তাদের মতে, মানুষের আমিত্ব হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি বা আকল। যেমনভাবে মানবদেহ তার ব্যক্তিত্বের অংশ নয় তেমনিভাবে তার আত্মিক ও মানসিক শক্তি ও ক্ষমতা তার ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সত্তা নয়। মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল হলো তার চিন্তা করার শক্তি ও ক্ষমতা, মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো যা দ্বারা সে চিন্তা করে।</p>
<p>মানুষ যা দ্বারা চোখে দেখে তা চিন্তার একটি উপকরণ মাত্র, তেমনি যা দ্বারা কল্পনা করে, যা দ্বারা চায়, যা দ্বারা ভালোবাসে বা মানুষ যে সত্তার কারণে জৈবিক চাহিদার অধিকারী, এ সবই চিন্তা সত্তার একেকটি উপকরণ। মানব সত্তার মৌল উপাদান তার চিন্তাশক্তি। তাই পূর্ণ মানব তিনিই, যিনি চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌছেছেন। চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌছার অর্থ বিশ্ব ও অস্তিত্বজগতকে ঠিক যে রূপে আছে সে রূপেই উদঘাটন করা ও জানা।</p>
<p>এ মতবাদ বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলকে মানব সত্তার মৌল উপাদান বলে জানে। এ ছাড়াও বিশ্বাস করে যে, বুদ্ধিবৃত্তি বা চিন্তা-শক্তির দ্বারা বিশ্বকে তার প্রকৃত রূপে উদঘাটন করা সম্ভব। আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি অস্তিত্বজগতকে তার আসল রূপে নিজের মধ্যে প্রতিফলিত করার ক্ষেত্রে সক্ষম। ঠিক আয়নার মত বিশ্বজগৎ তার প্রকৃত রূপ নিয়ে এতে প্রতিফলিত হয়।</p>
<p>ইসলামের দার্শনিক সমাজে যারা এ ধারণাকে গ্রহণ করেছেন তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ও কোরআনের আলোকে ঈমান বলতে বিশ্বকে ঠিক যেমনভাবে আছে তেমনভাবে জানার কথাই বোঝানো হয়েছে। ঈমান অর্থ বিশ্বজগতের স্রষ্টা, বিশ্বে বিরাজমান শৃঙ্খলা, প্রচলিত বিধান, বিশ্বের গতি ও লক্ষ্য এগুলোকে জানা। তাঁরা বলেন, কোরআনে যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, বিশ্বজগৎ আল্লাহর সৃষ্টি এ বিষয়ে বিশ্বাস, আল্লাহ্ বিশ্বজগতকে লক্ষ্যহীন ছেড়ে দেননি, বরং একে হেদায়েত ও পরিচালনা করছেন, যেমন নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত করছেন তা জানা, সবকিছু আল্লাহ্ থেকে এসেছে এবং তাঁর প্রতিই প্রত্যাবর্তনকারী প্রভৃতি- এ বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো বিশ্বজগতকে তার প্রকৃতরূপে জানা। তাঁরা ঈমানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ঈমান জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ব্যতীত কিছু নয়। অবশ্য তাঁদের এ প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের অর্থ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা আংশিক জ্ঞান নয়, বরং এ জ্ঞান দার্শনিক ও প্রজ্ঞাগত। দার্শনিক জ্ঞানের অর্থ বিশ্বের উৎপত্তি ও পরিসমাপ্তি, অস্তিত্বের ধারা ও পর্যায়কে সামগ্রিকভাবে জানা ও উদঘাটন করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>এ</strong> <strong>মতাদর্শের</strong> <strong>বিপরীত</strong> <strong>মতবাদ</strong></h4>
<p>এ মতাদর্শ যা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ বলে আমরা উল্লেখ করেছি এর বিপরীতে বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে যেগুলো এ মতবাদের বিরোধী ও সমালোচক। মুসলিম বিশ্বে প্রথম যে মতবাদটি এ মতবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সেটা হলো ইশরাকী-সূফী-খোদাপ্রেমী মতবাদ। এরপর রয়েছে আহলে হাদীসের অনুসারীরা। শিয়াদের মধ্যে আখবারী এবং সুন্নীদের মধ্যে হাম্বলী ও আহলে হাদীসগণ আকলের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের অস্বীকার করেছে। তাঁরা বলছেন, দার্শনিকরা আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপারে যত বেশি গুরুত্ব দেয় আকলের গুরুত্ব এত অধিক নয়।</p>
<p>এদের থেকেও ইন্দ্রিয়বাদীরা বর্তমান সময়ে বুদ্ধিবৃত্তির চরম সমালোচক। বিগত তিন-চার শতক ধরে ইন্দ্রিয়বাদীদের জয়-জয়কার। তাদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিকে যতটা মূল্য দেয়া হচ্ছে, তা এতটা মূল্যের অধিকারী নয়। আকলের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই, বরং আকল ইন্দ্রিয়ের অনুগত। মানবের মূল তার ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতিসমূহ। আকল খুব বেশি হলে যা করতে পারে তা হলো ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের উপর কাজ করা। যেমন কোনো কারখানার কথা যদি আমরা চিন্তা করি, সেখানে কাঁচামাল প্রবেশ করে, তারপর কারখানার মেশিনের মধ্যে তা মিশ্রিত হয়ে বিভিন্ন রুপ ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ কাপড় বুনন কারখানায় প্রথমে তুলা থেকে সুতা বের করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে বুননের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাপড়ের আকৃতি দেয়া হয়। তেমনি আকল মেশিনের মতো শুধু ইন্দ্রিয়লব্ধ কাঁচামালকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট আকৃতি দেয়। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ তার নিজের স্থানে এখনও অটল। এখানে আমরা অবশ্য সে বিষয়ে আলোচনা করব না, বরং এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করার চেষ্টা করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইসলামে</strong> <strong>বুদ্ধিবৃত্তির</strong> <strong>মৌলিকত্ব</strong></h4>
<p>বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদে কয়েকটি বিষয় আছে যার প্রতিটিকে যাচাই করে দেখব যে, সেগুলো ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা। প্রথম বিষয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও জ্ঞানের মৌলিকত্ব। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও জ্ঞানের অর্থ হলো আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি বিশ্বের বাস্তবতাকে আবিষ্কার করার ক্ষমতা রাখে এবং এ জ্ঞান মৌলিক, নির্ভরযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ।</p>
<p>অনেক মতবাদই বুদ্ধিবৃত্তির এরূপ ক্ষমতা ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী নয়। এখন আমরা দেখব ইসলামী উৎসগুলো থেকে আমাদের নিকট এ ধরনের দলিল-প্রমাণ রয়েছে কিনা যে, বুদ্ধিবৃত্তির এরূপ ক্ষমতায় আমরা বিশ্বাসী হতে পারি। ঘটনাক্রমে আমাদের হাতে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত দলিল রয়েছে যাতে আমরা বলতে পারি, ইসলামের মতো কোনো মতাদর্শেই আকলকে এত অধিক পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়নি বা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আকলকে অন্য কোন ধর্মেই ইসলামের মতো গুরুত্ব দেয়া হয়নি।</p>
<p>আপনি খ্রিষ্টধর্মকে ইসলামের সঙ্গে তুলনা করে দেখুন, খ্রিষ্টধর্ম ঈমানের দৃষ্টিতে আকলে প্রবেশের বিরোধী। তাদের মতে, মানুষ যখন কোনো কিছুর উপর ঈমান আনবে তখন এর উপর চিন্তা করার অধিকার তার নেই। চিন্তা যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তির কাজ তাই বিশ্বাসগত বিষয়ে চিন্তার অবকাশ নেই। যে বিষয়ে ঈমান রাখতে হবে সে বিষয়ে চিন্তা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আকলকে &#8216;কি&#8217; ও &#8216;কেন&#8217; এ ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া যাবে না। একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি, বিশেষত চার্চের অধিপতির দায়িত্ব হলো ঈমানের গণ্ডিতে যুক্তি, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রবেশকে প্রতিহত করা। মূলত খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।</p>
<p>ইসলামের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক এর বিপরীত অবস্থা দেখি। ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়ে (উসূল) বুদ্ধিবৃত্তি ব্যতীত অন্য কিছুর প্রবেশ নিষিদ্ধ। যেমন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় আপনার ধর্মের একটি মৌলিক বিষয় বলুন। আপনি হয়তো বললেন, তাওহীদ (একত্ববাদ)। এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, কেন আপনি এক আল্লাহতে ঈমান এনেছেন? আপনাকে অবশ্যই এজন্য যুক্তি পেশ করতে হবে যেহেতু ইসলাম আকল ব্যতীত আপনার নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে না। যদি বলেন, &#8220;আমি এক আল্লাহয় বিশ্বাস করি, কিন্তু এর পেছনে কোন যুক্তি পেশ করতে পারব না। আমার দাদীমার থেকে শুনে আমি বিশ্বাস করেছি। অবশেষে এক সত্যে পৌঁছেছি যেভাবেই হোক দাদীমার কাছে শুনে অথবা স্বপ্ন দেখে।&#8221; ইসলাম বলে, &#8220;না, যদিও এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হও, কিন্তু এ বিশ্বাসের ভিত্তি স্বপ্ন বা পিতা- মাতার অন্ধ অনুকরণ অথবা পরিবেশের প্রভাবে হয়ে থাকে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।&#8221; কেবল চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর যুক্তির ভিত্তিতে যদি আপনি ঈমান আনয়ন করেন তবেই তা গ্রহণ করা হবে নতুবা নয়।</p>
<p>খ্রিষ্টবাদে ঈমানের গণ্ডিতে আকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটাই খ্রিষ্টবাদের ভিত্তি। একজন খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তির দায়িত্ব হলো এই গণ্ডিতে আকল ও চিন্তার প্রবেশকে রোধ করা। ইসলামে ঈমানের গণ্ডিতে আকলের স্থান সংরক্ষিত। আকল ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর এ গণ্ডিতে প্রবেশাধিকার নেই।</p>
<p>ইসলামের উৎসসমূহে অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহতে আকলকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন দেখা যায়। প্রথমত কোরআন সব সময়ই বুদ্ধিবৃত্তির প্রশংসা করেছে। তদুপরি আমাদের হাদীস গ্রন্থসমূহেও বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব ও মৌলিকত্ব এতটা প্রকট যে, এ গ্রন্থসমূহ খুললেই দেখা যায়, তাতে প্রথম অধ্যায় হিসেবে কিতাবুল আকল এসেছে এবং এ অধ্যায়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তির পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে।</p>
<p>ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) আকল সম্পর্কিত একটা আশ্চর্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, &#8220;আল্লাহপাকের দু&#8217;টি হুজ্জাত (দলিল) রয়েছে। এ দু&#8217;টি হুজ্জাত হচ্ছে দু&#8217;টি নবী। একটি অভ্যন্তরীণ নবী বা আকল, দ্বিতীয়টি বাহ্যিক নবী অর্থাৎ আল্লাহ্র প্রেরিত পুরুষগণ যাঁরা নিজেরা মানুষ এবং অন্য মানুষদের দীনের দিকে দাওয়াত করেন। আল্লাহপাকের এ দু&#8217;টি হুজ্জাত একে অপরের পরিপূরক অর্থাৎ যদি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি থাকে, কিন্তু পৃথিবীতে কোনো নবী প্রেরিত না হয়, তবে মানুষের পক্ষে সফলতার পথ অতিক্রম করা সম্ভব হবে না। তেমনি যদি নবী থাকেন, কিন্তু মানুষ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী না হয় তাহলেও সে সাফল্য লাভ করতে পারবে না। আকল ও নবী একসঙ্গে একই দায়িত্ব পালন করে।&#8221; এর চেয়ে উত্তমরূপে আকলকে সম্মানিত করা ও পৃষ্ঠপোষকতা দান আর কোনভাবে সম্ভব কি?</p>
<p>এ ধরনের বর্ণনা ও রেওয়ায়েত সম্ভবত আরো শুনে থাকবেন। যেমনঃ</p>
<blockquote><p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>নিদ্রা</em> <em>অজ্ঞের</em> <em>ইবাদত</em> <em>হতে</em> <em>উত্তম</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>খাদ্যগ্রহণ</em> <em>মূর্খের</em> <em>রোযা</em> <em>অপেক্ষা</em> <em>উত্তম</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>নিরবতা</em> <em>অজ্ঞের</em> <em>কথা</em> <em>হতে</em> <em>শ্রেয়</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>আল্লাহ্</em> <em>কোনো</em> <em>নবীকেই</em> <em>তাঁর</em> <em>আকল</em> <em>পূর্ণতায়</em> <em>পৌছা</em> <em>ও</em> <em>সমগ্র</em> <em>উম্মত</em> <em>থেকে</em> <em>তাঁর</em> <em>বুদ্ধিবৃত্তি</em> <em>উচ্চতর</em> <em>হওয়ার পূর্বে প্রেরণ</em> <em>করেননি</em><em>।’ </em><em> </em></p></blockquote>
<p>আমরা রাসূল (সা.)-কে বুদ্ধিবৃত্তির সমগ্র রূপ বলে জানি। আমাদের এ ধারণা খ্রিষ্টবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যশীল। যেহেতু তারা বুদ্ধিবৃত্তি থেকে দীনকে পৃথক বলে জানে। কিন্তু আমরা আমাদের নবীকে আকলের পরিপূর্ণ রূপ মনে করি।</p>
<p>সুতরাং জ্ঞান ও প্রামাণ্যের ক্ষেত্রে আমরা আকলকে দলিল বলে জানি এ অর্থে যে, বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে বাস্তব জ্ঞান ও পরিচয় লাভ সম্ভব। দার্শনিকদের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম সমর্থন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক</strong> <strong>মতবাদের</strong> <strong>দু</strong><strong>&#8216;</strong><strong>টি</strong> <strong>ত্রুটি</strong></h4>
<p>দার্শনিক মতে মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি। এ ছাড়া বাকী যা আছে সেগুলো অপ্রধান এবং এগুলো মাধ্যম বৈ কিছু নয়। শরীর আকলের জন্য যেমনি একটি মাধ্যম, তেমনি চোখ, কান, ধারণক্ষমতা, কল্পনাশক্তি ও অন্য যে সকল যোগ্যতা আমাদের মধ্যে বর্তমান সেগুলোও আমাদের মূল সত্তা ‘আকল’র একেকটি মাধ্যম।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো দলিল ইসলামে রয়েছে কি? না, এ ধরনের বক্তব্য যে, আমাদের মূল সত্তা শুধু আকল- এর সপক্ষে কোনো দলিল বা প্রমাণ ইসলামে নেই। ইসলাম এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে যে, আকল মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের একটি অংশ, তার সমগ্র অস্তিত্ব নয়।</p>
<p>দ্বিতীয় বিষয় হলো আমাদের অধিকাংশ দর্শনের গ্রন্থে ঈমানকে শুধু জ্ঞান বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, ইসলামে ঈমানের অর্থ বাস্তব পরিচিতি বা জ্ঞান। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ আল্লাহকে জানা, তদ্রূপ রাসূল (সা.)-কে জানা। ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের অর্থ ফেরেশতাদের পরিচয় লাভ, আখেরাতের প্রতি ঈমানের অর্থ আখেরাতের পরিচয় জানা। কোরআনে যেখানেই ঈমান এসেছে এর অর্থ বাস্তব জ্ঞান ও পরিচিতি ছাড়া আর কিছু নয়। এ বিষয়টি কোনক্রমেই ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। ইসলামে ঈমানের অর্থ শুধু পরিচিতি নয়, বরং এর চেয়ে বেশি কিছু। পরিচিতি অর্থ হলো জানা। যিনি পানিবিজ্ঞানী তিনি পানিকে চেনেন। যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী তিনি জ্যোতিষ্ক সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তদ্রূপ যিনি সমাজবিজ্ঞানী তিনি জানেন সমাজকে, যিনি মনোবিজ্ঞানী তিনি মনকে বোঝেন, যিনি প্রাণীবিজ্ঞানী তিনি প্রাণীদের সম্পর্কে জানেন অর্থাৎ এঁরা সবাই নিজেদের সম্পৃক্ত বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন। ঈমানও কি কোরআনে এরূপ জানা অর্থেই এসেছে? আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ কি শুধুই তাঁকে বোঝা ও অনুভব করা? না, এমন নয়। এটা ঠিক যে, পরিচয় লাভ ঈমানের শর্ত ও অংশ। পরিচিতি ব্যতীত ঈমান অর্থহীন, এটা সত্য, কিন্তু শুধু জানাও ঈমান নয়।</p>
<p>ঈমান এক প্রবণতা যার মধ্যে আনুগত্যের প্রবণতা রয়েছে, প্রেম ও ভালবাসার প্রবণতা রয়েছে, স্রষ্টার প্রতি আত্মনিবেদনের প্রবণতা রযেছে, কিন্তু জ্ঞানের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা অনুপস্থিত। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যোতিষ্কমণ্ডলী সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন- এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি জ্যোতিষ্কসমূহের প্রতি অনুরক্ত। তদ্রূপ একজন খনিজবিজ্ঞানী বা পানিবিজ্ঞানী- এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি খনিজ বা পানির প্রতি আসক্ত। বরং এ ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে যে, মানুষ কোনো বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, কিন্তু তা থেকে বিতৃষ্ণ। বিশেষত রাজনীতিতে শত্রুকে মানুষ নিজের থেকেও ভালোভাবে চেনে। উদাহরণস্বরূপ কোন ইসরাইলী হয়তো আরব ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ; হয়তো ইসলাম সম্পর্কেও তার জ্ঞান অত্যন্ত গভীর। ইসরাইলে মিশর, সিরিয়া, আলজেরিয়া বা ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুসলমানদের মধ্যকার এরূপ বিশেষজ্ঞ অপেক্ষা অনেক বেশি এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রশ্ন হলো এরূপ মিশর বিষয়ক ইসরাইলী বিশেষজ্ঞ কি মিশরের প্রতি আনুগত্যশীল? কখনই নয়। তদ্রূপ মিশরে কোন ইসরাইল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তো তিনি ইসরাইলের প্রতি অনুরক্ত নন, বরং তিনি হয়তো ইসরাইলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। (যেহেতু ইসরাইল আরবদের প্রতি শত্রুপরায়ণ সেহেতু আরবরাও তাদের প্রতি সন্দেহ পরায়ণ।)</p>
<p>আলেম সমাজ যে বলেন, “ঈমান অর্থ শুধু জ্ঞান অর্জন নয় (যা দর্শন দাবি করে)” এর সপক্ষে সর্বোত্তম প্রমাণ খোদ কোরআন। যেহেতু কোরআন ঐ সকল ব্যক্তিকে আমাদের নিকট পরিচিত করিয়েছে যারা আল্লাহ পাককে সবচেয়ে উত্তমরূপে চেনে, সে সকল নবী ও আউলিয়াকেও উত্তমরূপে চেনে, কিয়ামতকেও ভালোভাবে জানে, কিন্তু ঈমানদার নয় বরং কাফের। যেমন শয়তান। শয়তান কি আল্লাহকে চেনে না? শয়তান তো বস্তুবাদীদের মতো নয় যে, আল্লাহকে চেনে না, বরং সে আল্লাহকে চেনে, কিন্তু আল্লাহপাকের বিরোধী। শয়তান আমার বা আপনার থেকে অনেক ভালোভাবে আল্লাহকে চেনে। কয়েক হাজার বছর সে আল্লাহর ইবাদত করেছে। কোরআন আমাদের বলছে, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনো এবং আমরাও ঈমান এনেছি।</p>
<p>কিন্তু শয়তান কি ফেরেশতাদের চেনে না? না বরং সে ফেরেশতাদের চেনে, তাদের সঙ্গে সহস্র বছর এক সঙ্গে ছিল, আমাদের তুলনায় হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে সে উত্তমরূপে জানে। নবীদেরও তদ্রূপ খুব ভালোভাবে চেনে ও জানে। কিয়ামত সম্পর্কে আরো উত্তমরূপে জানে (এ কারণেই আল্লাহর নিকট কিয়ামত পর্যন্ত সময় চেয়েছে)। কিন্তু এত কিছু জানার পরেও কেন কোরআন তাকে কাফের বলে সম্বোধন করছে? কেন বলছে, &#8220;সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত&#8221;? (সূরা সোয়াদ: ৭৪)</p>
<p>যদি ঈমানের অর্থ শুধু &#8216;জানা&#8217; হতো (যেরূপ দর্শন বলছে), তাহলে শয়তান প্রথম মুমিন বলে পরিচিত হতো। কিন্তু জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সে মুমিন নয়। কারণ সে অস্বীকারকারী জ্ঞানী অর্থাৎ যদিও সে সত্যকে জানে তদুপরি তার বিরোধীতা করে এবং সেটার প্রতি আনুগত্যশীল নয়। সে এ সত্যের প্রতি রুজু করে না বা তার প্রতি ভালোবাসাও অনুভব করে না। ফলশ্রুতিতে সে দিকে সে ধাবিতও হয় না।</p>
<p>সুতরাং ঈমান কেবল &#8216;পরিচয়&#8217; নয়। এ জন্যই অনেক প্রজ্ঞাবান দার্শনিক সূরা ত্বীন-এর</p>
<blockquote><p>لَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ فِيٓ أَحۡسَنِ تَقۡوِيمٖ</p>
<p>ثُمَّ رَدَدۡنَٰهُ أَسۡفَلَ سَٰفِلِينَ</p>
<p>إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ</p></blockquote>
<p><strong>এ আয়াতের তাফসীর এভাবে করেছেন যে, إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ অর্থাৎ তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা ও وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ অর্থাৎ ব্যবহারিক প্রজ্ঞা। এটা ঠিক নয়। إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ -এর মধ্যে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা অপেক্ষা উচ্চতর অর্থ নিহিত রয়েছে। তবে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা তার অংশ ও ভিত্তি হলেও প্রজ্ঞা, অনুধাবন, জ্ঞান, পরিচয় ও জানাই পূর্ণ ঈমান নয়, বরং ঈমান জ্ঞান ও জানা-বুঝা থেকে বড় অন্য কিছু।</strong></p>
<p>এখানে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি বিষয় তুলে ধরেছি। <strong>প্রথমত</strong>, আকল প্রামাণ্য দলিল, আকল দ্বারা গৃহীত বিষয় বিশ্বাসযোগ্য এবং আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে সঠিক পরিচয় লাভ সম্ভব- এ বিষয়গুলো সত্য এবং ইসলাম তা গ্রহণ করে। <strong>দ্বিতীয়ত</strong> আকল মানুষের একক মূলসত্তা- ইসলাম এটাকে গ্রহণ করে না। <strong>তৃতীয়ত</strong> ঈমানের অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুধাবন, জানা ও পরিচয় লাভ ব্যতীত অন্যকিছু নয়- ইসলামের দৃষ্টিতে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ঈমানের</strong> <strong>মৌলিকত্ব</strong></h4>
<p>ঈমান ও পরিচয়কে একই জানি অথবা পরিচয়কে ঈমানের একাংশ জানি, এখন যে বিষয়টি আমাদের নিকট লক্ষণীয় তা হলো ঈমান ও পরিচিতির মৌলিকত্ব রয়েছে কি? নাকি মৌলিকত্ব নেই বরং এ দু&#8217;টি আমলের (কার্যের) পূর্বশর্ত মাত্র। এ ক্ষেত্রেও দু&#8217;টি বড় মতাদর্শের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>ঈমানের মৌলিকত্বের অর্থ কি? এর অর্থ ইসলাম যেভাবে ঈমানকে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছে তা এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে, ঈমান মানুষের আমলের বিশ্বাসগত ভিত্তি। অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীতে অবশ্যই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবে এবং কাজ করবে এবং এ চেষ্টা ও কার্যক্রম এক বিশেষ পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি অনুযায়ী হতে হবে যার ভিত্তি বিশেষ চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। অন্যভাবে বর্ণনা করলে যেহেতু মানুষ চায় বা না চায় তার সকল কর্মকাণ্ড চিন্তাগত এবং যদি সে তার ব্যবহারিক জীবনে নিজের উদ্দেশ্যে পৌঁছতে সঠিক একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে চায় তবে তা চিন্তা ও বিশ্বাসের বিশেষ ভিত্তি ব্যতীত সম্ভব নয়। এ কারণেই তাকে চিন্তা ও বিশ্বাসের একটি ভিত্তি দিতে হবে যাতে তার উপর ভিত্তি করে সে তার চিন্তার কাঠামো নির্মাণ করতে পারে। যেমন কোন ব্যক্তি যদি একটি দালান নির্মাণ করতে চায় তাহলে তার লক্ষ্য চার দেয়াল, ছাদ, দরজা-জানালা বিশিষ্ট ঘর নির্মাণ করা, কিন্তু সে এগুলো নির্মাণের পূর্বে ভিত্তি বা স্তম্ভ তৈরি করে যার বেশ কিছু অংশ মাটির নীচে গ্রোথিত করে যদিও এটি তার লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু সে এটা করে যাতে করে দালানের ভিত্তি মজবুত হয় এবং তা ভেঙ্গে না পড়ে। এজন্যই ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ কমিউনিজম কতগুলো চিন্তা ও বিশ্বাসের সমষ্টি যার ভিত্তি বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নৈতিকতা সম্পর্কিত মৌলিক কাঠামোটি বস্তুবাদের মৌলিক চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তির উপর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু একজন কমিউনিস্টের এটা লক্ষ্য নয় অর্থাৎ বস্তুবাদ তার লক্ষ্যও নয় এবং তার নিকট এর মৌলিকত্বেরও মূল্য নেই। (প্রকৃতপক্ষে যাঁরা বস্তুবাদের ফাঁদে পা দিয়েছেন তা গীর্জাসমূহের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাসমূহ, বিশেষত স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে যুক্তিহীন দ্বন্দ্বের কারণে। যার ফলে ইউরোপে এ চিন্তার উদ্ভব ঘটেছিল যে, হয় মানুষ স্বাধীন হয়ে সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ঈশ্বরকে দূরে ছুঁড়ে ফেলুক নতুবা নিজেকে অধিকারহীন ও বন্দি বলে জানুক। এর জন্য সর্বোত্তম পথ হিসেবে ধর্মের মূলোৎপাটনকে গ্রহণ করেছিল।)</p>
<p>কিন্তু সে চিন্তা করে (ভুল চিন্তা করে) বস্তুবাদ ব্যতীত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মৌল চিন্তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আর তা ব্যাখ্যা করার জন্যই বস্তুবাদের মৌলিক চিন্তাকে গ্রহণ করে। সম্প্রতি পৃথিবীতে কয়েকজন কমিউনিস্ট ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে যাঁরা বস্তুবাদকে কমিউনিজম থেকে পৃথক মনে করেন। তাঁরা বলেন, &#8220;আমাদের জন্য বস্তুবাদ কোন মৌলিকত্ব তো রাখেই না, বরং বস্তুবাদকে এক অখণ্ডনীয় মৌলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার কোন প্রয়োজনই নেই। আমরা কমিউনিজম চাই যদিও তাতে বস্তুবাদের অস্তিত্ব না থাকে।&#8221; বর্তমানে পৃথিবীর আনাচে কানাচে অনেক কমিউনিস্ট নেতাই ধর্মের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি পরিহার করার কথা বলছেন।</p>
<p>এটা এ কারণে যে, তাঁদের জন্য এ মৌল চিন্তার প্রতি বিশ্বাসের কোন মৌলিকত্ব নেই। এটা শুধু চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি ব্যতীত কিছু নয়। যেহেতু জীবনাদর্শ বিশ্বদৃষ্টি ব্যতীত সম্ভব নয় সেহেতু এ বিশ্বদৃষ্টিকে (বস্তুবাদ) দালানের নীচে স্থাপন করা হয় যাতে করে জীবনাদর্শ স্থাপিত ও অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো জীবনাদর্শ।</p>
<p>কিন্তু ইসলামে কিরূপ? ইসলাম কি ইসলামী বিশ্বাস, যেমন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস, নবী ও ওলীদের প্রতি বিশ্বাস, কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস এগুলোকে শুধু এজন্য বর্ণনা করেছে যে, চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে? ইসলাম কি এজন্য এ মৌল চিন্তাসমূহকে উপস্থাপন করেছে যাতে করে জীবনাদর্শকে এ মৌল চিন্তার উপর ভিত্তি করে স্থাপন করতে পারে এবং এটাই (জীবনাদর্শই) তার উদ্দেশ্য? যদি তা-ই হয় তবে এ মৌল চিন্তার (ঈমান) কোন মৌলিকত্ব নেই। না, এমনটি নয়। এ মৌল চিন্তা ইসলামী জীবনাদর্শিক চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি বটে, তবে তার মূল্য শুধু ভিত্তি হিসেবে নয়। ঈমান চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি এবং ইসলামী জীবনাদর্শ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ঈমান ভিত্তি হিসেবে মূল্য ছাড়াও মৌলিকত্বের অধিকারী ও লক্ষ্য হিসেবেও পরিগণিত।</p>
<p>সুতরাং এ ক্ষেত্রে দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক যে, ঈমান শুধু আমলের পূর্বশর্ত হিসেবে নয় বরং এর মৌলিকত্বের কারণে মূল্যের অধিকারী। এ রকম নয় যে, শুধু কর্ম ও প্রচেষ্টাই সব কিছু। বরং যদি আমল থেকে ঈমানকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, একটি ভিত্তিকে নষ্ট করা হলো। তেমনিভাবে যদি আমলকে ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় অন্য স্তম্ভটি ধ্বংস করা হলো। এজন্যই কোরআন সব সময় বলেছে, ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ &#8220;যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে।&#8221; যদি আমলহীন ঈমান হয়, তবে সেখানে সাফল্যের একটি স্তম্ভ আছে, অন্যটি অনুপস্থিত। অপর দিকে ঈমানহীন আমলও তদ্রূপ।</p>
<p>সাফল্যের তাঁবু একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানের সত্তাগত মূল্য ও মৌলিকত্ব রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের পূর্ণতা এ পৃথিবীতে এবং বিশেষত আখেরাতে এটাই যে, সে ঈমানের অধিকারী। কারণ ইসলামে আত্মা স্বাধীন এবং পূর্ণতার অধিকারী, তার মৃত্যু নেই। যদি আত্মা (ঈমানের মাধ্যমে) পূর্ণতায় না পৌঁছায়, অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত হয় তাহলে কখনই সফলতায় পৌছতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কোরআন</strong> <strong>ও</strong> <strong>নাহজুল</strong> <strong>বালাগাহ্</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>এর</strong> <strong>সপক্ষে</strong> <strong>দলিল</strong></h4>
<p>কোরআন এ বিষয়ে বলছে,</p>
<blockquote><p>وَمَن كَانَ فِي هَٰذِهِۦٓ أَعۡمَىٰ فَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ أَعۡمَىٰ وَأَضَلُّ سَبِيلٗا</p>
<p>&#8220;যে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে অন্ধ, আখেরাতেও সে অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।” (সূরা ইসরা: ৭২)</p></blockquote>
<p>ইমামগণ এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এর তাফসীরে বলেছেন, এর অর্থ এমন নয় যে, কারো বাহ্যিক এ চক্ষু পৃথিবীতে অন্ধ হলে আখেরাতেও সে অন্ধ থাকবে। যদি এরূপ হতো, তবে আবু বাসির যিনি ইমাম সাদিক (আ.)-এর একজন অন্ধ সাহাবী ছিলেন তিনি পরকালীন দুনিয়াতেও শোচনীয় অবস্থায় পড়বেন। না, বরং এর অর্থ হলো যে, কারো অন্তর্চক্ষু যদি সত্যকে, তার স্রষ্টাকে, মহান আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং অন্যান্য যে সব বিষয়ে ঈমান বা বিশ্বাস থাকা উচিত তা থেকে অন্ধ হয়, তবে সে আখেরাতে অন্ধ হিসেবে পুনরুত্থিত হবে, এর অন্যথা সম্ভব নয়। যদি ধরে নিই, এ পৃথিবীতে একজন মানুষ যত প্রকার ভালো কাজ করা সম্ভব তা করে, সৎকর্মের আদেশ ও অসৎকর্মের নিষেধের দায়িত্ব পালন করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দুনিয়াবিরাগী ব্যক্তির ন্যায় জীবন যাপন করে, সে সাথে নিজের জীবনকে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য নিবেদিত করে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না, পরকাল ও ইহকালকে চেনে না- এরূপ ব্যক্তি অন্ধ, তাই পরকালীন দুনিয়াতেও সে অন্ধ।</p>
<p>সুতরাং এটা ঠিক নয় যে, ঈমান শুধু চেষ্টা-প্রচেষ্টার পূর্ব প্রস্তুতি এবং ব্যক্তির আমল ঠিক হলেই চলবে, ঈমানের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের কথা অর্থহীন। ফখরে রাজী বলেন,</p>
<p>&#8220;আশংকা আমার,</p>
<p>চলে যাব বিশ্বের প্রাণ না দেখে,</p>
<p>চলে যাব বিশ্ব ছেড়ে বিশ্বকে না দেখে,</p>
<p>দেহের বিশ্ব ছেড়ে যাব মনের বিশ্বে ও প্রাণে,</p>
<p>দেহের বিশ্বে মনের বিশ্ব না দেখেই তাঁর পানে।&#8221;</p>
<p>অর্থাৎ আমার আশংকা এটি যে, এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, অথচ তা এ বিশ্বকে না দেখেই। তাঁর এ কথার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, বিশ্ব বলতে পৃথিবীর মাটি, পাহাড়, সমুদ্র, তারকারাজি আর ঘরবাড়ি বোঝাচ্ছেন এবং এ সব না দেখেই চলে যাওয়ার জন্য চিন্তিত, বরং তাঁর আশংকা হলো এখানে যে, তাঁর অন্তর্চক্ষু উন্মোচিত যদি না হয় তবে বিশ্বের প্রাণ, এর উৎস ও সৃষ্টিকর্তাকে অনুধাবন- যাকে ইসলাম ঈমান বলেছে তা না করেই এ বিশ্ব ছেড়ে চলে যাবেন। তিনি বলছেন, যদি এ দেহের বিশ্বে মনের বিশ্বকে অনুভব না করি, তবে যখন দেহের বিশ্ব ছেড়ে প্রাণ ও মনের বিশ্বে গমন করব তা কিরূপে অনুভব করব? যেখানে সম্ভব ছিল সেখানেই পারিনি, তাই আফসোস। এ দু&#8217;টি পঙতিতে কোরআনের উপরোক্ত এ আয়াতেরই অর্থ করেছেন।</p>
<p>কোরআন অন্য একটি আয়াতে বলছে,</p>
<blockquote><p>قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِيٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرٗا</p>
<p>قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ</p>
<p>(সূরা ত্বাহা: ১২৫-১২৬)</p></blockquote>
<p><strong><em>কিয়ামতের</em></strong> <strong><em>দিন</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>বান্দাকে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>হিসেবে</em></strong> <strong><em>পুনরুত্থিত</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>হবে</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>প্রতিবাদ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>বলবে</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>প্রভু</em></strong><strong><em>! </em></strong><strong><em>কেন</em></strong> <strong><em>আমাকে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>পুনরুত্থিত</em></strong> <strong><em>করেছেন</em></strong><strong><em>? </em></strong><strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>পৃথিবীতে</em></strong> <strong><em>চক্ষুষ্মান</em></strong> <strong><em>ছিলাম</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>কেন</em></strong> <strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong><strong><em>? </em></strong><strong><em>তার</em></strong> <strong><em>প্রতি</em></strong> <strong><em>বলা</em></strong> <strong><em>হবে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>পৃথিবীতে</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>চক্ষুর</em></strong> <strong><em>অধিকারী</em></strong> <strong><em>ছিলে</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>এখানের</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>প্রযোজ্য</em></strong> <strong><em>নয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্য</em></strong> <strong><em>রকম</em></strong> <strong><em>চক্ষুর</em></strong> <strong><em>প্রয়োজন</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তোমার</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>চক্ষু</em></strong> <strong><em>ছিল</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>নিজেই</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>করেছ</em></strong> <strong><em>তাই</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8220;</em></strong> أنك آيائنا আমাদের নিদর্শনসমূহ এ পৃথিবীতে ছিল, তুমি এ নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে আমাদের দেখা, অনুধাবন এবং সত্যকে উদ্ঘাটনের পরিবর্তে সেখানে নিজেকে অন্ধ করে রেখেছিলে। সেজন্যই প্রকৃত বিশ্বে এসে অন্ধ হিসেবে পুনরুত্থিত হয়েছ।</p>
<p>সূরা মুতাফফিফীন বলছে,</p>
<blockquote><p>كَلَّآ إِنَّهُمۡ عَن رَّبِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ لَّمَحۡجُوبُونَ</p>
<p>&#8220;কখনই নয়, নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালক হতে সেদিন পর্দাবৃত থাকবে।&#8221; (সূরা মুতাফফিফীন : ১৫)</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ এদের পরিত্যাগ কর। এদের উচিত ছিল পৃথিবীতে তাদের চক্ষুর সম্মুখ হতে গাফিলতির পর্দা উন্মোচন করা ও দেখা। ঈমানের অর্থ এটাই- হে মানুষ! তুমি এ পৃথিবীতে আগমন করেছ যাতে এ পৃথিবীতেই চক্ষুর মাধ্যমে ঐ পৃথিবীকে দেখতে ও কর্ণের মাধ্যমে ঐ পৃথিবীকে শ্রবণ কর।</p>
<p>আমি সব সময়ই এজন্য আনন্দিত যে, আমাদের যুবকরা বিশেষ করে নাহজুল বালাগার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দান করছে। নাহজুল বালাগার বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। দেখবে নাহজুল বালাগাহ্ এরূপ চক্ষু ও কর্ণ সম্পর্কে কি বলে।</p>
<p>নাহজুল বালাগাহ্ ঈমানের ক্ষেত্রে মৌলিকত্বে বিশ্বাসী। ঈমানের মূল্য শুধু চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং চিন্তা ও ভিত্তি ছাড়াও মৌলিক হিসেবে নাহজুল বালাগাহ্ ঈমানকে উল্লেখ করেছে।</p>
<p>আলী (আ.) নাহজুল বালাগায় আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের (আহলুল্লাহ্) সম্পর্কে বলেন,</p>
<blockquote><p>يَتَنَسَّمُونَ بِدُعَائِه روح التجاوز</p>
<p>&#8220;এরা এমন বান্দা যে, যখন তারা দোয়া করে ও তওবায় নিমজ্জিত হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্তির সমীরণ নিজেদের মধ্যে অনুভব করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>আলী (আ.) আরো বলেন,</p>
<blockquote><p>إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَعَلَ الذِّكْرَ حِلاءً لِلْقُلُوْبِ تَسْمَعُ بِهِ بَعدَ الوقرة وَ تُبْصِرُ بِهِ بَعْدَ الْعَشْوَةِ وَ تَنقَادُ بِهِ بَعْدَ الْمَعَائِدَةِ وَ مَا بَرِحَ اللَّه عَزَّتْ الأَؤُهُ فِي الْبُرْهَةِ بَعْدَ الْبُرْهَةِ وَ فِي أَزْمَانَ الفَتَرَتِ عِبَادٌ نَاجَاهُمْ فِي فِكْرِهِمْ وَ كَلَّمَهُمْ فِي ذَاتِ عُقُولِهِمْ</p></blockquote>
<p><strong>&#8220;নিশ্চয় মহান আল্লাহ্ তাঁর স্মরণকে মানুষের আত্মার উজ্জ্বলতার কারণস্বরূপ করেছেন, যে কারণে (আত্মার স্বচ্ছতার কারণে) সে বধিরতার পর শ্রবণশক্তি, অন্ধত্বের পর দৃষ্টিশক্তি লাভ করে এবং নাফরমানীর পর আনুগত্যের পথ গ্রহণ করে, সকল অবস্থায় অফুরন্ত নেয়ামত দানকারী আল্লাহর জন্য নিজেকে নিবেদিত করে। সকল কালেই একদল ব্যক্তি রয়েছে যাদের চিন্তার মাধ্যমে আল্লাহ্ গোপন রহস্যের ভেদ উন্মোচন করেন। আর আকলের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলেন।” (নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ২২২)</strong></p>
<p>সুতরাং আমি এখানে যে বিষয়টি বলতে চাই তা হলো আল্লাহর পরিচয় জানা, তাঁর ফেরেশতাদের পরিচয় জানা (যাঁরা অস্তিত্বজগতের জন্য মাধ্যম), তাঁর প্রেরিত নবী ও আউলিয়াগণের পরিচয় জানা (যাঁরা অন্য একভাবে আল্লাহর নেয়ামত সৃষ্টির নিকট পৌছানোর মাধ্যম), আমাদের এ পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্যকে জানা, আখেরাত ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনকে জানা এ সবই মৌলিক। সত্যের প্রতি ঈমান যেমন মৌলিক তেমনি তা চিন্তা, বিশ্বাস ও ইসলামী জীবনাদর্শের ভিত্তিও বটে। কেবল একশ&#8217; ভাগ মৌলিক এরূপ কোন ঈমানই পারে একটি জীবনাদর্শের জন্য সর্বোত্তম চিন্তা ও বিশ্বাসগত ভিত্তি হতে। সুতরাং কখনই আমলের জন্য যেমন ঈমানকে বিসর্জন দেয়া যুক্তিযুক্ত নয় তেমনি ঈমানের জন্য আমলকে বিসর্জন দেয়াও অযৌক্তিক। এদের কোনটিকেই অন্যটির জন্য বিসর্জন দেয়া যাবে না।</p>
<p>সুতরাং দর্শনের পূর্ণ মানব, পূর্ণ মানব নয় বরং অপূর্ণ মানব। অপূর্ণ মানবের অর্থ কি? অপূর্ণ মানব সে, যে পূর্ণতার অংশবিশেষ ধারণ করে। দর্শন বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতার ক্ষেত্রে মৌলিকত্বে বিশ্বাসী তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু দর্শনের পূর্ণ মানব মানবের পূর্ণতার অন্যান্য দিকগুলোকে উপেক্ষা করে শুধু আকলের পূর্ণতার মধ্যে তার পূর্ণতাকে খোঁজে। তাই এ মানব অপূর্ণ অথবা অর্ধপূর্ণ যা জ্ঞানের এক প্রতিমূর্তি বৈ কিছু নয়, জ্ঞান ব্যতীত সকল কিছু তার নিকট অনুপস্থিত। এরূপ মানব এমন এক অস্তিত্ব যে শুধু জানে, কিন্তু আবেগ, উত্তাপ ও গতিহীন এবং সৌন্দর্য বিমুখ। যে অস্তিত্বের সমগ্র শিল্প শুধু জ্ঞানের মধ্যে নিহিত সে অস্তিত্ব এক বিচ্ছিন্ন বিশ্বের মত পরিত্যক্ত। এটি ইসলামের পূর্ণ মানব নয় বরং ইসলামের অর্ধ মানব।</p>
<p>আকল ও বুদ্ধিবৃত্তির মূল্যের ক্ষেত্রে ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর হাদীসটি আপনাদের জন্য ব্যাখ্যা করার সময় হলো না। এ প্রসঙ্গে প্রচুর কথা রয়েছে। যদি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই তাহলে আরো দু&#8217;টি বৈঠক প্রয়োজন। সে সময় হাতে নেই বলে বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ সম্পর্কিত আলোচনা এখানেই শেষ করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15526</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/insan-al-kamil-from-the-point-of-view-of-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/insan-al-kamil-from-the-point-of-view-of-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 28 Jan 2025 06:26:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15456</guid>

					<description><![CDATA[و إذ ابتلى إبراهيم ربه بكلمات فأتمهن قال إني جاعلك للناس إماماً قال و من ذريتي قال لا ينال عهدي الظالمين আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল বা পূর্ণ মানব। ইনসানে কামেল অর্থ আদর্শ মানুষ, সর্বোত্তম মানুষ বা সর্বশ্রেষ্ঠ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<blockquote><p><strong>و إذ ابتلى إبراهيم ربه بكلمات فأتمهن قال إني جاعلك للناس إماماً قال و من ذريتي قال لا ينال عهدي الظالمين</strong></p></blockquote>
<p>আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল বা পূর্ণ মানব। ইনসানে কামেল অর্থ আদর্শ মানুষ, সর্বোত্তম মানুষ বা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। অন্যান্য বস্তু বা জিনিসের মত মানুষেরও পূর্ণতা ও অপূর্ণতা রয়েছে, এমনকি ত্রুটিযুক্ত ও ত্রুটিহীন হওয়ার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। ত্রুটিমুক্ত মানুষ আবার দু&#8217;ধরনের পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মানুষ এবং অপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মানুষ। পূর্ণ বা আদর্শ মানুষকে চেনা ইসলামের দৃষ্টিতে আমাদের প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ যদি আমরা পূর্ণ মুসলমান হতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের জানতে হবে পূর্ণ মানবের রুপ কী। যেহেতু ইসলাম চায় পূর্ণ মানব তৈরি করতে এবং ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূর্ণ মানব গড়ে তুলতে, সুতরাং আদর্শ মানুষের নমুনা আমাদের সামনে থাকতে হবে। এখানে আমরা পূর্ণ মানবের প্রকৃতি, তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করছি। সে কেমন প্রকৃতির, তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতি কেমন, একজন পরিপূর্ণ মানুষের চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যসমূহ কী? যদি আমরা তা জানতে পারি তবেই নিজেকে ও সমাজকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারব। যদি আমরা পরিপূর্ণ মানুষকে চিনতে না পারি তাহলে কোনক্রমেই পূর্ণ মুসলমান হতে পারব না। অন্যভাবে বলা যায় যে, আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে একজন অপূর্ণ মানুষে পরিণত হব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইসলামের</strong> <strong>দৃষ্টিতে</strong> <strong>পূর্ণ</strong> <strong>মানব</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেলকে</strong> <strong>চেনার</strong> <strong>উপায়</strong></h4>
<p>ইসলামের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ মানুষকে চেনার জন্য দু&#8217;টি পথ রয়েছে। <strong>একটি</strong> <strong>পথ</strong> <strong>হচ্ছে</strong>, প্রথমত আমরা দেখব ‘কোরআন’ ও দ্বিতীয়ত ‘সুন্নাত’ ইনসানে কামেলকে কিভাবে বর্ণনা করেছে। যদিও কোরআন ও সুন্নাতে এভাবে ইনসানে কামেলের ব্যাখ্যা করা হয়নি, বরং পরিপূর্ণ মুসলমান ও পূর্ণ মুমিনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে এটা স্পষ্ট যে, পরিপূর্ণ মুসলমান অর্থ- যে মানব ইসলামের মধ্যে দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছেছে এবং পরিপূর্ণ মুমিন সে-ই যে ঈমানের ছায়ায় পরিপূর্ণতায় পৌছেছে। আমাদের অবশ্যই দেখতে হবে কোরআন ও সুন্নাত পরিপূর্ণ মানুষকে কিভাবে বর্ণনা করেছে। কুরাআনে পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিকৃতির বিষয়ে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে।</p>
<p><strong>পরিপূর্ণ</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>চেনার</strong> <strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>পদ্ধতি</strong>&#8211; এ পদ্ধতিতে কোরআন ও সুন্নাতে পরিপূর্ণ মানুষ সম্পর্কে কিরূপ বর্ণনা এসেছে তা থেকে নয়, বরং ঐ সকল ব্যক্তিকে তাঁদের জীবনী থেকে চিনব যাঁদের উপর আমরা আস্থা লাভ করেছি যে, ইসলাম ও কোরআন যেভাবে চায় তাঁরা সেভাবে গড়ে উঠেছেন। ইসলামের পূর্ণ মানুষের হুবহু প্রতিকৃতি হলেন তাঁরা। যেহেতু ইসলামের পরিপূর্ণ মানুষ শুধু আদর্শিক, কল্পনা ও চিন্তাগত কোন বিষয় নয় যে, বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকবে না। পরিপূর্ণ মানুষ সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন উভয় পর্যায়েই বাস্তবে অস্তিত্ব লাভ করেছে।</p>
<p>মহানবী (সা.) নিজেই পূর্ণ মানবের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। হযরত আলী (আ.) অন্য এক পূর্ণ মানবের নমুনা। আলী (আ.)-কে চেনার অর্থ পরিপূর্ণ মানুষেকে চেনা। কিন্তু <strong>হযরত</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>চেনা</strong> <strong>এটা</strong> <strong>নয়</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>তাঁর</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>পত্র</strong> <strong>জানা</strong><strong>।</strong> কখনো মানুষ হযরত আলীকে পরিচয় পত্র থেকে চিনে যে, তাঁর নাম আলী, আবু তালিবের পুত্র, আবু তালিব আবদুল মুত্তালিবের পুত্র, মাতা ফাতেমা যে আসাদ ইবনে আবদুল ওজ্জার কন্যা, হযরত আলী মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমার সহধর্মী, হাসান ও হুসাইনের পিতা, অমুক বছর জন্মগ্রহণ করেছেন, অমুক বছর শাহাদাত বরণ করেছেন, অমুক অমুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন- এগুলো আলীর পরিচয় জানা। অর্থাৎ যদি চাই আলীর জন্য একটি পরিচয় পত্র তৈরি করব ও পরিচয় পত্র সম্পর্কে জানব তবে তা এরূপই হবে। কিন্তু <strong>হযরত</strong> <strong>আলীর</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>পত্র</strong> <strong>জানা</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>জানা</strong> <strong>নয়</strong> <strong>বা</strong> <strong>একজন</strong> <strong>পরিপূর্ণ</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>চেনাও</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>জানা</strong> <strong>তাঁর</strong> <strong>ব্যক্তিত্বকে</strong> <strong>জানা</strong><strong>, </strong><strong>ব্যক্তি</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong></p>
<p>আলীর সম্মিলিত ব্যক্তিত্বের যতটুকু আমরা জানব, ইসলামের পরিপূর্ণ মানুষকে ততটুকু চিনব। আর শুধু নাম ও শাব্দিক অর্থে নয়, বরং কার্যক্ষেত্রে পূর্ণ মানুষকে যতটুকু অনুসরণ করেছি তাঁকে সে পরিমাণ ইমাম বা নেতা হিসেবে মেনেছি ও তাঁর পথে চলেছি; তাঁর অনুসারী ও অনুগামী হয়েছি ও যতটুকু চেষ্টা করছি নিজেকে সেই আদর্শ অনুযায়ী তৈরি করতে ঠিক সেই পরিমাণ এ কামেল পুরুষের অনুসারী হয়েছি। যেহেতু শহীদ (একজন ব্যক্তি) লোমআ গ্রন্থে الشيعة من شايع علياً -এ বাক্যের অর্থ করতে গিয়ে বলেন, &#8220;শিয়া ঐ ব্যক্তি যে আলীর সহযাত্রী হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বলার মাধ্যমে শিয়া হবে না (যে আমি শিয়া), নাম ধারণ করলেই শিয়া হবে না, শুধু ভালবাসা ও পছন্দের দাবিতে শিয়া হবে না। তাহলে কিভাবে শিয়া হবে? সহযাত্রী হয়ে অর্থাৎ পদানুসরণের মাধ্যমে। যখন কেউ একজন যে পথে চলে আপনি তার পেছনে পেছনে বা সঙ্গে যাবেন আপনাকে তার সহযাত্রী বা পদাঙ্কনুসারী বলা হবে। আলীর শিয়া অর্থ আলীর কর্মের পদাঙ্কনুসারী।</p>
<p>তাহলে পূর্ণ মানবকে চেনার দু&#8217;টি পথ ও সেইসাথে এ সম্পর্কে আলোচনার উপকারিতাও জানতে পারলাম। সুতরাং ইনসানে কামেল বিষয়টি শুধু একটি দার্শনিক ও জ্ঞানগত বিষয় নয়। যদি ইসলামের পূর্ণ মানবকে কোরআন ও সুন্নাতের বর্ণনা থেকে ও কোরআন দ্বারা পরিবর্ধিত রূপে না জানি তাহলে ইসলাম নির্দেশিত পথে চলতে পারব না এবং প্রকৃত ও সত্যিকারের মুসলমান হতে পারব না। অনুরূপ আমাদের সমাজও একটি ইসলামী সমাজ হতে পারবে না। সুতরাং ইসলামের পূর্ণ, শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যের মানুষকে চেনা জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কামেল</strong> <strong>ও</strong> <strong>তামামের</strong> <strong>পার্থক্য</strong></h4>
<p>এখন প্রশ্ন হলো &#8216;কামেল&#8217; (کامل ) এর প্রকৃত অর্থ কি? &#8216;ইনসানে কামেল&#8217;-এর অর্থই বা কি?</p>
<p>আরবী ভাষায় এ দু&#8217; শব্দের অর্থ কাছাকাছি হলেও এক নয়; যদিও দু&#8217;টিরই বিপরীত শব্দ এক অর্থাৎ শব্দটি কখনো প্রথমটির বিপরীত শব্দ হিসেবে আবার কখনো দ্বিতীয়টির বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এমনকি ফার্সীতে ঐ দু&#8217;টি শব্দের পরিবর্তে একটি শব্দই রয়েছে। ঐ দু&#8217;টি শব্দ আরবীতে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলেও কামেল এবং তামাম দু&#8217;টিরই বিপরীত শব্দ ناقص (অসম্পূর্ণ)। যেমন ফার্সীতে বলা হয়: এটা کامل বা সম্পূর্ণ এবং ওটা ناقص বা অসম্পূর্ণ; তেমনি বলা হয়, এটা تمام ওটা ناقص।</p>
<p>আল কোরআনের একটি আয়াতে এ দু&#8217;টি শব্দই এসেছে-</p>
<p>اليوم أكملت لكم دينكم و أتممت عليكم نعمتي</p>
<p>&#8220;আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামতকে তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করলাম।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৩)</p>
<p>এখানে এটা বলা হয়নি যে,  أكملت لكم نعمتي له أتممت عليكم دينكم,যদি তা বলা হতো, তবে আরবী ব্যাকরণে ভুল বলে গণ্য হতো। এখন এ দু&#8217;শব্দের পার্থক্য কি? যদি আমরা এ দু&#8217;য়ের পার্থক্যকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ না করি তাহলে আমাদের আলোচনা শুরু করতে পারব না। অর্থাৎ আমাদের আলোচনার শুরু হবে এ দু&#8217;শব্দের অর্থ জানার মাধ্যমে।</p>
<p>&#8216;تمام&#8217; কোন বস্তুর জন্য তখনই বলা হবে যখন ঐ বস্তুর বাস্তব অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছুই অস্তিত্বে এসে থাকে। অর্থাৎ যদি তা থেকে কিছু জিনিস অনুপস্থিত থাকে, তবে বস্তুটি ঐ বস্তু হওয়ার ক্ষেত্রে অপূর্ণ অথবা বলা যায় বস্তুটি তার অস্তিত্বের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ। যেমন অর্ধেক অস্তিত্ব লাভ করেছে, এক-তৃতীয়াংশ অস্তিত্ব লাভ করেছে বা দুই-তৃতীয়াংশ অস্তিত্ব লাভ করেছে ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ একটি পরিকল্পিত মসজিদের বিল্ডিংয়ের জন্য হলরুম দরকার। রুমের জন্য দেয়াল, ছাদ, দরজা, জানালা ও অন্যান্য জিনিস প্রয়োজন। যদি ঐ বিল্ডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় এ সকল অংশ বিদ্যমান না থাকে তবে ঐ বিল্ডিং ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। যখন প্রয়োজনীয় সব কিছু বিদ্যমান থাকবে তখন বলা যাবে বিল্ডিং সম্পূর্ণ (তামাম) হয়েছে। এ শব্দের বিপরীত স্থানকে নির্দেশ করতে অসম্পূর্ণ বা নাকিস ব্যবহার করা হয়। কোন বস্তু সম্পূর্ণতা লাভ করলেই তা পূর্ণতা লাভ করেছে বলা যায় না, বরং বস্তুটি হয়তো কখনো এর থেকে এক স্তর উপরের পর্যায়ের, কখনো কয়েক স্তর উপরের পর্যায়ের পূর্ণতা লাভ করে, এভাবে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। যদি এই کمال বা পূর্ণতা ঐ বস্তুর না থাকে তবুও তা ঐ বস্তুরই। কিন্তু পূর্ণতা লাভ করার অর্থ তা থেকে এক স্তর উপরে উঠা।</p>
<p>কামাল বা পূর্ণতাকে আড়াআড়ি বা সমান্তরালভাবে বর্ণনা করা হয়। যখন বস্তু সমান্তরালভাবে শেষ প্রান্তে বা পরিসীমায় পৌঁছায় তখন বলা হয় সম্পূর্ণ হয়েছে এবং বস্তু যখন লম্বিকভাবে উপরের দিকে বাড়তে থাকে বা উন্নতি লাভ করে তখন বলা হয় &#8216;পূর্ণতা&#8217; লাভ করেছে। যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির বুদ্ধি (আকল) পূর্ণতা লাভ করেছে, এর অর্থ পূর্বেও তার বুদ্ধি ছিল, কিন্তু তার বুদ্ধি পূর্বের চেয়ে উপরের পর্যায়ে পৌঁছেছে বা পরিপক্ক হয়েছে। অথবা যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করেছে তাহলে এর অর্থ পূর্বেও তার জ্ঞান ছিল ও সে তা ব্যবহার করত, কিন্তু এখন তার জ্ঞান পূর্ণতার এক স্তর অতিক্রম করেছে। সুতরাং আমরা দেখছি, একজন সম্পূর্ণ মানুষ আছে যার বিপরীতে সমান্তরালভাবে চিন্তা করে অসম্পূর্ণ মানুষও আছে অর্থাৎ অর্ধেক মানুষ বা মানুষের ভগ্নাংশ। উদাহরণস্বরূপ এক-তৃতীয়াংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ সম্পূর্ণ মানুষ নয়। অন্য এক প্রকার মানুষও আছে যে মানুষ সম্পূর্ণ ও এই সম্পূর্ণ মানুষ পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হতে পারে- এভাবে সর্বোচ্চ পরিসীমা পর্যন্ত যার উপর কোন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারে না যাকে পরিপূর্ণতম বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষ বলা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেলের</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong></h4>
<p><strong>সপ্তম</strong> <strong>হিজরী</strong> <strong>শতাব্দী</strong> <strong>পর্যন্ত</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>সাহিত্যে</strong> <strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেলের</strong> <strong>কোন</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>ছিল</strong> <strong>না</strong><strong>।</strong> <strong>বর্তমানে</strong> <strong>ইউরোপেও</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>সর্ম্পকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>প্রচলিত</strong> <strong>থাকলেও</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>বিশ্বে</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>সর্ম্পকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>ভাষা</strong> <strong>সপ্তম</strong> <strong>হিজরীতে</strong> <strong>ব্যবহৃত</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong> <strong>যিনি</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>সর্ম্পকে</strong> <strong>প্রথম</strong><strong> &#8216;</strong><strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেল</strong><strong>&#8216; </strong><strong>শব্দটি</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করেছেন</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>হলেন</strong> <strong>বিখ্যাত</strong> <strong>আরেফ</strong> <strong>মহিউদ্দিন</strong> <strong>ইবনে</strong> <strong>আরাবী</strong><strong>।</strong> <strong>ইবনে আরাবী</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>ইরফানের</strong><strong> (</strong><strong>আধ্যাত্মিকতার</strong><strong>) </strong><strong>জনক</strong><strong>।</strong> <strong>সপ্তম</strong> <strong>হিজরীর</strong> <strong>পর</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>যত</strong> <strong>আরেফ</strong> <strong>এসেছেন</strong><strong>, </strong><strong>প্রায় সকলেই তার ছাত্র ছিলেন।</strong> যেমনঃ ইরানী ও ফার্সী ভাষার আরেফগণ সকলেই ইবনে আরাবীর ছাত্র। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী ইবনে আরাবীর মক্তবের ছাত্র। রুমী তাঁর সকল মর্যাদাসহ ইরফানের দৃষ্টিতে ইবনে আরাবীর তুলনায় কিছুই নন। ইবনে আরাবী আরব জাতিভুক্ত ও হাতেম তায়ীর বংশধর এবং আন্দালুসের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর সকল ভ্রমণ ইসলামী দেশসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি সিরিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর দামেস্কে। সিরিয়ায় (পূর্বনাম শাম) মৃত্যুবরণ করা ও সেখানে দাফন হওয়ায় তাঁকে শামী বলা হয়।</p>
<p>তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সদরুদ্দিন কৌনাভী তাঁর পরে সবচেয়ে বড় আরেফ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে ইরফান যে একটি জ্ঞানের রূপে এসেছে তা শুধু মহিউদ্দিন আরাবী ও সদরুদ্দীন কৌনাভীর কর্মপ্রচেষ্টার ফলেই। সদরুদ্দিন কৌনাভী তুরস্কের কৌনীর বাসিন্দা ও ইবনে আরাবীর স্ত্রীর পূর্ববতী স্বামীর ঔরসজাত পুত্র ছিলেন। অর্থাৎ মহিউদ্দীন তাঁর শিক্ষকও ছিলেন আবার সৎ পিতাও। জালালুদ্দিন রুমী সদরুদ্দিন কৌনাভীর সমসাময়িক ছিলেন। সদরুদ্দিন একটি মসজিদের জামায়াতের ইমাম ছিলেন। রুমী সেখানে যেতেন ও তাঁর পেছনে নামাজ পড়তেন। ইবনে আরাবীর চিন্তা সদরুদ্দিনের মাধ্যমে মৌলভীর কাছে স্থানান্তরিত হয়েছিল।</p>
<p>অন্যতম যে বিষয়টি তিনি উপস্থাপন করেন তা ইনসানে কামেল সম্পর্কিত। তবে তিনি বিষয়টি ইরফানের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে &#8216;সাহেবে মানজুমে&#8217; খ্যাত মাহমুদ সাব্যস্তকারীর সবচেয়ে উন্নত ও মূল্যবান সাহিত্যমান সম্পন্ন বই &#8216;গুলশানে রজ&#8217;-এ যে প্রশ্নগুলো ইনসানে কামেলের ব্যাপারে এসেছে, সদরুদ্দিন ইরফানের দৃষ্টিতে সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। সুতরাং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ বিষয়টি &#8216;ইনসানে কামেল&#8217; শিরোনামে উপস্থাপন করেছেন ও ইরফানের আলোকে বর্ণনা করেছেন। অন্যরাও ইনসানে কামেলকে নিজস্ব রূপে বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আমরা দেখতে চাই ইনসানে কামেল কোরআনের দৃষ্টিতে কেমন মানুষ। আলোচনাকে &#8216;সম্পূর্ণ মানুষ&#8217; ও &#8216;অসম্পূর্ণ মানুষ&#8217; দিয়ে শুরু করছি যেন এ বিষয়ের উপর পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>শারিরীক</strong> <strong>ও</strong> <strong>মানসিক</strong> <strong>ত্রুটি</strong></h4>
<p>আমাদের মধ্যে কি ত্রুটিহীন এবং ত্রুটিযুক্ত মানুষও রয়েছে? সুস্থতা ও অসুস্থতা কখনো কখনো মানুষের দেহের সাথে সম্পর্কিত। সন্দেহ নেই যে, কিছু মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত এবং কিছু মানুষ ত্রুটিযুক্ত ও অসুস্থ। উদাহরণস্বরূপ শারীরিক ত্রুটি, যেমন দৃষ্টিহীনতা ও অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ব ও পক্ষাঘাতগ্রস্থতা প্রভৃতি। কিন্তু এগুলো ব্যক্তি-মানুষের সাথে সম্পর্কিত, মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নয়। কোন ব্যক্তি যদি অন্ধ, বধির, পঙ্গু, খাটো বা কুৎসিত চেহারার হন, এ ত্রুটিগুলোকে আপনি তার মর্যাদা, ব্যক্তিত্ব ও মনুষত্বের ক্ষেত্রে ত্রুটি হিসেবে দেখেন না। যেমন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস যাঁকে নবীদের পরবর্তী পর্যায়ের জ্ঞানী বলে ধরা হয় তিনি পৃথিবীর এক কদাকার মানুষ ছিলেন। কিন্তু কেউই তাঁর এ কদাকৃতিকে একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ত্রুটি বলে মনে করেন না। অথবা আবুল আলা মাযারি (আরব কবি) এবং ত্বাহা হোসেইন (মিশরীয় সাহিত্যিক) যাঁরা উভয়ই অন্ধ ছিলেন, তাঁদের এ শারীরিক ত্রুটি ব্যক্তিগত ত্রুটি হিসেবে পরিগণিত হলেও তাঁদের ব্যক্তিত্বের জন্য ত্রুটি বলে গণ্য হবে কি? অবশ্যই নয়। সুতরাং মানুষের ব্যক্তি দিক তার ব্যক্তিত্বের দিক হতে যে ভিন্ন তা প্রমাণিত সত্য। একটি তার দেহের সাথে, অন্যটি তার রূহের সাথে সম্পর্কিত। মনের বিষয় তার দেহ থেকে ভিন্ন। যাঁরা মনে করেন মানুষের মন একশ&#8217; ভাগ দেহের অনুগত তাদের ভুল এখানেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষের দেহ পুরোপুরি সুস্থ থাকলেও তার অন্তর কি অসুস্থ হতে পারে? এটা একটা প্রশ্ন। সুতরাং যাঁরা রূহ বা আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চান এবং রূহের সকল বৈশিষ্ট্যকে মানুষের স্নায়ুর সরাসরি প্রতিক্রিয়া বলে মনে করেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে বলতে চান যে, মন কিছুই নয়, সবই দেহের অনুগামী। তাঁদের মতে, মন অসুস্থ হওয়ার অর্থ তার দেহ অসুস্থ। অর্থাৎ মানসিক অসুস্থতা এবং দৈহিক অসুস্থতা একই।</p>
<p>এটা আনন্দের বিষয় যে, বর্তমানে এটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে একজন মানুষ শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে (যেমন শরীরে লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ দেহে ভিটামিনের পরিমাণ, পরিপাকতন্ত্রের মেটাবলিক কার্যক্রম, এমনকি নিউরোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে) সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারে। কিভাবে তা সম্ভব? আধুনিক পরিভাষায় একে &#8216;মানসিক জটিলতা&#8217; বলা হয়। আধুনিক বিজ্ঞান মানসিক জটিলতাসম্পন্ন মানুষকে অসুস্থ বলে মনে করে। এমন ব্যক্তির দেহে শারীরিক কোন জটিলতা সৃষ্টি না হয়েই মানসিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসা শারীরিকভাবে না করে মানসিকভাবে করতে হয়। যেমন অহংকার যা মানসিক জটিলতা থেকে উদ্ভুত, একটি রোগ বলে বর্তমানে প্রমাণিত তা প্রকৃতপক্ষেই একটি আত্মিক ও মানসিক রোগ। কিন্তু কোনো ঔষধের দোকানে অহংকার রোগের ঔষধ পাওয়া যাবে কি? কিংবা বাস্তবে এটা কি সম্ভব যে, অহংকারী ব্যক্তি একটি ট্যাবলেট খাবে আর সাথে সাথে তার অহংকার বিলুপ্ত হয়ে সে এক নিরহংকার ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যাবে? না, এটা কখনোই সম্ভব নয় যে, জল্লাদ ও পাষাণ হৃদয়ের মত কাউকে একটা ইনজেকশন পুশ করা হবে বা একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়া হবে আর সে রাতারাতি একজন দয়ালু, হৃদয়বান ও প্রশস্ত অন্তরের মানুষে পরিণত হয়ে যাবে। তবে এ ব্যাধিগুলোর চিকিৎসার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে যা এভাবে নয়।</p>
<p>এমনকি শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসাও কখনো কখনো মানসিকভাবে করা সম্ভব। যেমনভাবে কখনো কখনো মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা শারীরিকভাবে করা হয়ে থাকে। যেমন কোন রোগ হয়তো শারীরিক, কিন্তু মানসিক উদ্দীপনা ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়। এ বিষয়ে আলোচনা বেশ ব্যাপক এবং বিষয়টি আশ্চর্য হওয়ার মতোও বটে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মানুষ দেহ ও মনের সমন্বয়ে এক সৃষ্টি এবং মানুষের মন তার দেহ হতে স্বাধীন ও সম্পূর্ণরূপে দেহের অনুগামী নয়। তেমনিভাবে দেহও পুরোপুরি মনের অনুগামী নয়। তবে এরা একে অপরকে প্রভাবিত করে। জ্ঞানীদের ভাষায় দেহ ও মন একে অপরের উপর গঠনমূলক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ যেমনভাবে দেহ মনের উপর প্রভাব ফেলে তেমনভাবে মনও দেহের উপর প্রভাব ফেলে। সেই সাথে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবেও কাজ করে। তাই মানুষের মনোজগৎ একটি স্বাধীন জগতের অধিকারী।</p>
<p>আমরা পূর্ণ মানবের আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে ত্রুটিহীন ও ত্রুটিযুক্ত মানুষের বিষয়টি এনেছি এজন্য যে, আমাদের নিকট এটা পরিষ্কার হওয়া যে, আমাদের উদ্দেশ্য এখানে শারীরিক সুস্থতা বা ত্রুটি নয় এবং আমাদের উদ্দেশ্য এটাও নয় যে, মানব দেহ কতটা সুস্থ তা নিরীক্ষা করা। প্রকৃতপক্ষে তা দিয়ে আমাদের কাজও নেই। আমাদের লক্ষ্য হলো বাস্তবে এটা প্রমাণ করা যে, মানুষ যেমনভাবে মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারে তেমনিভাবে ত্রুটিযুক্ত ও অসুস্থও হতে পারে। কোরআন এ সত্যকে স্বীকৃতি দিয়ে বলছে, قلوهم مرض فزادهم الله مرضا  &#8220;তাদের অন্তরে অসুস্থতা রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ্ তাদের এ অসুস্থতাকে বৃদ্ধি করে দেন।&#8221; (সূরা বাকারাহ: ১০)</p>
<p>এখানে আল্লাহ্ বলছেন তাদের অন্তর রোগাক্রান্ত ও রূহ অসুস্থ, এটা বলেননি যে, তাদের চক্ষু অসুস্থ। এখানে লক্ষণীয় কোরআন হৃদয় বা অন্তর বলতে যা বুঝিয়েছে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড নয় যে, এর আরোগ্যের জন্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। কোরআনের বর্ণিত হৃদয় হলো মানুষের আত্মা ও মানস। যেমন কোরআন অন্যত্র বলছে,</p>
<p>نترل من القرآن ما هو شفاء ورحمة للمؤمنين</p>
<p>&#8220;আমরা কোরআনে যা কিছু অবতীর্ণ করেছি তা মুমিনদের জন্য আরোগ্য লাভের উপায় ও রহমতস্বরূপ।&#8221; (সূরা বনি ইসরাইল: ৮২)</p>
<p>সুতরাং কোরআন মুমিনদের জন্য আরোগ্য লাভের উপায়।</p>
<p>আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেন, الا وان من البلاء الفاقة  &#8220;জেনে রাখ, নিশ্চয়ই দারিদ্র্য একটি বড় বিপদ اشد من الفاقة مرض البدن এবং দারিদ্র্য হতে মন্দ শারীরিক অসুস্থতা اشد من مرض البدن مرض القلب  এবং শারীরিক অসুস্থতা হতে মন্দ ও কঠিন হলো অন্তরের অসুস্থতা।</p>
<p>কোরআনের অন্যতম পরিকল্পনা হলো সুস্থ মানুষ তৈরি। তাই আমাদের পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পূর্বে সুস্থ ও ত্রুটিহীন মানুষ হতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মানবাত্মার</strong> <strong>ব্যাধি</strong></h4>
<p>প্রথমে আমরা যে সকল বস্তু মানবাত্মাকে ব্যাধিগ্রস্ত করে তা সংক্ষেপে আলোচনা করব। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বঞ্চনা আত্মিক রোগের অন্যতম উৎস। অধিকাংশ মানসিক রোগের কারণ হলো বঞ্চনা। আপনারা জানেন ফ্রয়েড বাড়াবাড়িমূলকভাবে এ তত্ত্বের উপর নির্ভর করেছেন, বিশেষত যৌনতার বিষয়ে। যা হোক বঞ্চনা মানসিক ব্যাধির প্রধান কারণ। বঞ্চনা মানুষের মনে বিদ্বেষের সৃষ্টি করে। যখন মানুষ অন্তরে কারো প্রতি বিদ্বেষ অনুভব করে তখন তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চায় এবং যতক্ষণ না তাকে হত্যা বা লাঞ্ছিত করতে পারে ততক্ষণ শান্তি লাভ করতে পারে না। এ প্রতিশোধ স্পৃহাটি কি?</p>
<p><strong><em>হিংসুক</em></strong> <strong><em>ব্যক্তি</em></strong> <strong><em>যখন</em></strong> <strong><em>কারো</em></strong> <strong><em>ভালো</em></strong> <strong><em>বা</em></strong> <strong><em>কল্যাণ</em></strong> <strong><em>দেখে</em></strong> <strong><em>তখন</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>সমগ্র</em></strong> <strong><em>কামনা</em></strong> <strong><em>হয়ে</em></strong> <strong><em>ওঠে</em></strong> <strong><em>এটা</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>ব্যক্তি</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>এ</em></strong> <strong><em>কল্যাণ</em></strong> <strong><em>যেন</em></strong> <strong><em>দ্রুত</em></strong> <strong><em>অপসারিত</em></strong> <strong><em>হয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>নিজের</em></strong> <strong><em>বিষয়ে</em></strong> <strong><em>তখন</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>আর</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>না</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>বরং</em></strong> <strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>ব্যক্তির</em></strong> <strong><em>অমঙ্গলের</em></strong> <strong><em>চিন্তায়</em></strong> <strong><em>মগ্ন</em></strong> <strong><em>হয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>সুস্থ</em></strong> <strong><em>চিন্তার</em></strong> <strong><em>মানুষ</em></strong> <strong><em>প্রতিযোগিতা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>হিংসা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>না</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>সুস্থ</em></strong> <strong><em>মানুষ</em></strong> <strong><em>সামনে</em></strong> <strong><em>এগিয়ে</em></strong> <strong><em>যাওয়ার</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>সব</em></strong> <strong><em>সময়</em></strong> <strong><em>নিজেকে</em></strong> <strong><em>নিয়ে</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>সব</em></strong> <strong><em>সময়</em></strong> <strong><em>এগিয়ে</em></strong> <strong><em>থাকার</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>সুস্থতার</em></strong> <strong><em>পরিচয়</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>এটা</em></strong> <strong><em>দোষের</em></strong> <strong><em>কিছু</em></strong> <strong><em>নয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>অন্যেরা</em></strong> <strong><em>সব</em></strong> <strong><em>সময়</em></strong> <strong><em>পিছে</em></strong> <strong><em>পড়ে</em></strong> <strong><em>থাক</em></strong><strong><em>&#8211; </em></strong><strong><em>এ</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>অসুস্থতার</em></strong> <strong><em>পরিচায়ক</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>হিংসুক</em></strong> <strong><em>ব্যক্তির</em></strong> <strong><em>অসুস্থতা</em></strong> <strong><em>কখনো</em></strong> <strong><em>কখনো</em></strong> <strong><em>এতটা</em></strong> <strong><em>অধিক</em></strong> <strong><em>হয়</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>নিজের</em></strong> <strong><em>একশ</em></strong><strong><em>&#8216; </em></strong><strong><em>ভাগ</em></strong> <strong><em>ক্ষতি</em></strong> <strong><em>করেও</em></strong> <strong><em>যদি</em></strong> <strong><em>অপরের</em></strong> <strong><em>পাঁচ</em></strong> <strong><em>ভাগ</em></strong> <strong><em>ক্ষতি</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>যায়</em></strong> <strong><em>তাতে</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>খুশী</em></strong><strong><em>।</em></strong></p>
<p><strong><em> </em></strong></p>
<h4><strong>&#8216;</strong><strong>হিংসা</strong><strong>&#8216; </strong><strong>রোগের</strong> <strong>নমুনা</strong></h4>
<p>একটি প্রসিদ্ধ কাহিনী ইতিহাসের বইয়ে এসেছে। কোন এক খলিফার সময় একজন ব্যক্তি এক দাস কিনে এনেছিল। প্রথম দিন থেকেই সে তার সঙ্গে দাসের মতো আচরণ না করে বরং সম্মানিত ব্যক্তির মতো আচরণ করত। সব সময় ভাল খাবার দিত, তার জন্য ভাল পোষাক কিনত, বিশ্রামের জন্য উত্তম উপকরণ এনে দিত। মোট কথা, তার সঙ্গে নিজের সন্তানের মত আচরণ করত। মনে হতো লালন-পালনের জন্যই তাকে আনা হয়েছে। দাসটি লক্ষ্য করত তার মনিব সব সময়ই বিষন্ন ও চিন্তিত। কিন্তু তার কারণ সে জানত না। একদিন মনিব তাকে ডেকে বলল, &#8220;আমি তোমাকে মুক্ত করে দিতে চাই, সে সাথে প্রচুর অর্থও দিতে চাই। কিন্তু তুমি কি জান কেন তোমাকে এত আদর ও স্নেহ করেছি? এজন্য যে, তুমি যেন আমার একটি অনুরোধ রক্ষা কর। তুমি যদি তা রক্ষা কর তবে আমার আদর-স্নেহের প্রতিদান দিলে এবং এর জন্য আরো অধিক কিছু তোমাকে আমি দেব। কিন্তু যদি তা না কর তবে আমি তোমার উপর অসন্তুষ্ট।&#8221; দাস বলল, &#8220;যেহেতু আপনি আমার মনিব এবং আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন, আপনি যা বলবেন আমি তা-ই করব।&#8221; মনিব বলল, &#8220;না, তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আমার ভয় হয় যদি রাজি না হও।&#8221; দাস বলল, &#8220;যে কোনো প্রস্তাব দিন আমি রাজী হব।&#8221; যখন দাস প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো তখন মনিব বলল, &#8220;আমার অনুরোধ হলো একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে নির্দেশ দেব। তুমি আমার মাথা গোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।&#8221; দাস বলল, &#8220;আমি তা করতে পারব না।&#8221; মনিব বলল, &#8220;না, অবশ্যই তোমাকে তা করতে হবে। কারণ তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।&#8221; মাঝ রাতে মনিব দাসকে ঘুম থেকে জাগিয়ে একটি ধারালো ছুরি হাতে দিয়ে তাকে নিয়ে এক প্রতিবেশীর বাড়ীর ছাদে গেল আর বলল, &#8220;এখানেই আমার মস্তক বিচ্ছিন্ন কর, তারপর যেখানে ইচ্ছা চলে যাও।&#8221; দাস বলল, &#8220;কেন এটা করব?&#8221; সে বলল, &#8220;যেহেতু এই প্রতিবেশীকে আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না। মৃত্যু আমার কাছে বেঁচে থাকার চেয়ে উত্তম। সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সে আমার থেকে অগ্রগামী। সব কিছুতেই সে আমার থেকে উত্তম অবস্থায় রয়েছে। আমি হিংসার আগুনে জ্বলে মরছি। আমি চাই সে খুনী বলে পরিচিত হোক ও শাস্তি ভোগ করুক। যদি এমন হয় তবেই আমি শান্তি পাব। আমার শান্তি এখানেই যে, যদি আমাকে এখানে হত্যা কর, কালকে সবাই বলবে (যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বীর লাশ তার বাড়ির ছাদে পাওয়া গেছে) সে-ই আমাকে হত্যা করেছে। অতঃপর তাকে বন্দী করা হবে ও পরে প্রাণদণ্ড দেয়া হবে। আমার ইচ্ছাও পূর্ণ হবে।&#8221; দাস বলল, &#8220;যেহেতু তুমি এমন বোকা লোক সেহেতু আমি এটা কেন করব না। তুমি এটার জন্যই উপযুক্ত।&#8221; অতঃপর সে মনিবের মাথা বিচ্ছিন্ন করল এবং টাকাগুলো নিয়ে চলে গেল। পরের দিন সবখানে খবর ছড়িয়ে পড়ল। ঐ বাড়ির মালিককে গ্রেফতার করা হলো। কিন্তু সবাই বলাবলি করতে লাগল যদি সে খুনীই হতো তবে নিজের বাড়ির ছাদে খুন করতে যাবে কেন? সম্ভবত কিছু একটা আছে। ব্যাপারটা রহস্যময়। দাসের বিবেক তাকে চিন্তায় ফেলল। অবশেষে বিচারকের কাছে গিয়ে সত্য ঘটনা বর্ণনা করে সে বলল, &#8220;আমি তার ইচ্ছাতেই তাকে হত্যা করেছি। সে প্রতিহিংসায় এতটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, মৃত্যুকে জীবনের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। যখন প্রমাণিত হলো ঘটনা এ রকম তখন দাস এবং ঐ বাড়ির মালিক দু&#8217;জনকেই মুক্তি দেয়া হলো।</p>
<p>সুতরাং এটা বাস্তব যে, মানুষ প্রকৃতই হিংসা রোগে অসুস্থ হয়। কোরআন বলছে,</p>
<p>قد افلح من زكيها و قد خاب من د سيها</p>
<p>&#8220;সে-ই সফলকাম হলো যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং সে-ই অকৃতকার্য হলো যে নিজেকে কলুষিত করল। কোরআনের প্রথম কর্মসূচী আত্মার পরিশুদ্ধি ও উন্নয়ন এবং হৃদয়কে মানসিক রোগ, সমস্যা, অশান্তি, অন্ধকার ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>রূপান্তরিত</strong> <strong>মানুষ</strong></h4>
<p>রূপান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপান্তর অর্থ কি? নিশ্চয় শুনেছেন পূর্বকালে এক উম্মত ছিল যারা প্রচুর গুনাহের কারণে তৎকালীন নবীর দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ অন্য এক পশুতে পরিণত হয়েছিল। যেমন বানর, শূকর, নেকড়ে বা অন্য কোন প্রাণীতে। এটাকেই রূপান্তর বলা হচ্ছে। এই রূপান্তর প্রকৃতপক্ষে কিরূপ ছিল? মানুষ কি প্রকৃতই পশুতে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। এখন এর ব্যাখ্যা করব।</p>
<p>এটি অনস্বীকার্য যে, মানুষ দৈহিকভাবে রূপান্তরিত বা পশুতে পরিণত না হলেও মানসিক ও আত্মিকভাবে রূপান্তরিত বা পশুতে পরিণত হয়, এমনকি কখনো কখনো এত নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হয় যে, যার নজীর পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া বিরল। কোরআন বলছে- بل هم أضل  অর্থাৎ চতুষ্পদ জন্তু হতেও নিকৃষ্ট। এখন প্রশ্ন হলো মানুষ কি প্রকৃতই মানসিক ও আত্মিকতার দিক থেকে পশুতে পরিণত হতে পারে? উত্তর হলো, হ্যাঁ। কারণ মানুষের ব্যক্তিত্ব তার চারিত্রিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। যদি কোন মানুষের চারিত্রিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্য কোন হিংস্র প্রাণীর বা চতুস্পদ পশুর মত হয় তবে সে প্রকৃতই রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ তার আত্মা প্রকৃতই রূপান্তরিত ও পরিবর্তিত হয়ে এক পশুতে পরিণত হয়েছে। শূকরের দেহ তার আত্মার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু মানুষ দৈহিকভাবে শূকরের মত না হয়েও শূকরের সকল স্বভাব ধারণ করতে পারে। যদি কোন মানুষ এরূপ হয় তবে সে রূপান্তরিত হয়েছে। বাস্তব ও অন্তর্দৃষ্টিতে সে প্রকৃতই একটি শূকর বৈ কিছু নয়। তাই ত্রুটিযুক্ত মানুষ কখনো কখনো রূপান্তরিত মানুষে পরিণত হয়। আমরা এ সব কথা কম শুনি এবং অনেকেই মনে করেন এগুলো metaphoric বা allegory (রূপক) এবং এগুলো বিশ্বাস করতে চান না। কিন্তু এটা খুবই সত্য।</p>
<p>এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে, &#8220;ইমাম যয়নুল আবেদীন -এর সাথে আরাফাতের ময়দানে ছিলাম। উপর থেকে লক্ষ্য করলাম ময়দান হাজীতে পূর্ণ। ইমামকে উদ্দেশ্য করে বললাম, কি পরিমাণ হাজী এ বছর এসেছে আলহামদুলিল্লাহ্। ইমাম বললেন চিৎকার এত বেশি, কিন্তু হাজী খুবই কম।&#8221; ঐ ব্যক্তি বলেছে, &#8220;তারপর জানি না ইমাম এমন দৃষ্টি শক্তি দান করলেন আমাকে এবং বললেন লক্ষ্য কর। আমি লক্ষ্য করলাম সম্পূর্ণ ময়দান যেন পশুতে পূর্ণ- যেন চিড়িয়াখানার মধ্যে সামান্য কিছু মানুষ চলাচল করছে। ইমাম বললেন এখন দেখ বাতেন (অপ্রকাশ্য) কিরূপ! যারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী তাঁদের নিকট এ বিষয়টি প্রদীপের মতই উজ্জ্বল। এখন যদি আধুনিক চিন্তাধারার কেউ তা অস্বীকার করতে চায় তাহলে ভুল করবে। আমাদের এখনকার সময়ও ব্যক্তি-বিশেষ ছিলেন এবং আছেন যাঁরা মানুষের সত্তাকে অনুভব করেন এবং দেখেন।</p>
<p>যে মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর মত শুধু খাওয়া, ঘুমানো, যৌন চাহিদা পূরণ ছাড়া (প্রাণীর) অন্য কোনো চিন্তা করে না, তার চিন্তা শুধু এটাই যে, খাবে, ঘুমাবে আর দৈহিক আনন্দ অনুভব করবে, প্রকৃতপক্ষে তার আত্মা একটা চতুষ্পদ জন্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। তার অন্তর একটি রূপান্তরিত মানুষে পরিণত হয়েছে। যার স্বভাব রূপান্তরিত, তার মানবিক বৈশিষ্ট্য রূপান্তরিত- কিভাবে তা ব্যাখ্যা দেব। অর্থাৎ তার মনুষ্যত্ব তার নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, ঐ স্থানে সে নিজের জন্য চতুষ্পদ ও হিংস্র পশুর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।</p>
<p>সূরা নাবায় আমরা পড়ি &#8220;সে দিন যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তোমরা দলে দলে আসবে। এবং আকাশকে উন্মুক্ত করা হবে ফলে তা বহু দ্বারে বিভক্ত হয়ে পড়বে। পর্বতকে বিচলিত করা হবে ফলে তা মরীচিকায় পরিণত হবে।&#8221; (সূরা নাবা: ১৮-২০) কিয়ামতের দিন মানুষ দলে দলে পুনরুত্থিত ও সমবেত হবে। রাসূলগণ সব সময়ই বলেছেন, শুধু মানুষের একটি দল মানুষের চেহারায় পুনরুত্থিত হবে। কোন কোন দল পিপীলিকার মত, কোন দল সাপের মত, কোন দল নেকড়ের মত চেহারা নিয়ে হাশরের ময়দানে আবির্ভূত হবে। কেন? এটা কি সম্ভব কোন কারণ ছাড়াই মহান আল্লাহ্ মানুষকে এ রকম আকৃতিতে পুনরুত্থিত করবেন? যে ব্যক্তির পৃথিবীতে মানুষকে ক্ষত বিক্ষত করা ছাড়া কোন কাজ ছিল না, যার সকল আনন্দ অন্যদের কষ্ট দেয়ার মধ্যে নিহিত ছিল সে প্রকৃতই একটি বিষাক্ত বিচ্ছু। তাই সে সেভাবেই পুনরুত্থিত হবে। যে ব্যক্তির বাঁদরামী করাই একমাত্র স্বভাব ছিল, কিয়ামতে প্রকৃতই সে বাঁদরের চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হবে। এমনিভাবে যার স্বভাব কুকুরের মতো সে কুকুর হিসেবে পুনরুত্থিত হবে। &#8220;মানুষ তার নিয়্যতের (কাজের) উপর ভিত্তি করেই পুনরুত্থিত হবে।&#8221; (মুসনাদে আহমদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৯২)</p>
<p>কিয়ামতে মানুষ তার নিয়্যত, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, তার স্বভাব ও তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে পুনরুত্থিত হবে। আপনি এ পৃথিবীতে কী চেহারাতে আছেন? কী হতে চান? কী বস্তু চান? আপনার ইচ্ছাগুলো কী মানুষের চাওয়া নাকি কোনো হিংস্র পশুর চাওয়া? নাকি এক তৃণভোজীর মতো চাওয়া? যা আপনি চান আপনি তা-ই এবং সে চেহারাতেই আপনি পুনরুত্থিত হবেন যে রকম আছেন।</p>
<p>এটাই আমাদের আল্লাহ্ ব্যতীত সকল কিছুর উপাসনা থেকে বিরত করে। আমরা যা কিছুর উপাসনা করব তার মতোই হব। যদি টাকার উপাসনা করি, যদি অর্থ আমাদের অস্তিত্ব ও অস্তিত্বের অংশে পরিণত হয়, এর অর্থ কিয়ামতে সে-ই উত্তপ্ত ধাতব পদার্থে পরিণত হবে। এ পৃথিবীতে যাদের অস্তিত্ব এই ধাতব পদার্থের অস্তিত্বের সাথে মিশে গিয়েছে এবং এই ধাতুর উপাসনা ছাড়া যার কোন কাজ নেই, কোরআন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছে, &#8220;এবং যারা সোনা-রূপা মজুদ করে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও। সে দিন তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বদেশে ও তাদের পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। এবং বলা হবে এটা সেই বস্তু যা তোমরা নিজেদের জন্য প্রস্তত করতে।&#8221; (সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫)</p>
<p>এ অর্থই সে দিন উত্তপ্ত করা হবে- তার জন্য জাহান্নামের আগুনে পরিণত হবে। এটা অন্যতম উপাদান যা মানুষকে রূপান্তরিত করে।</p>
<p>আমি এ বৈঠকে ত্রুটিযুক্ত ও ত্রুটিহীন মানুষের বিষয়টি সংক্ষেপে বর্ণনা করতে চাচ্ছিলাম। সমস্যাগ্রস্ত (মানসিক) মানুষ একজন ত্রুটিপূর্ণ মানুষ। যে মানুষ পৃথিবীর কোন বস্তুকে উপাসনা করে- তার দৈনন্দিন কাজে বস্তু ব্যবহারকারী নয়, বরং এর উপাসনাকারী সে মানুষ ত্রুটিযুক্ত এবং একজন রূপান্তরিত মানুষ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পবিত্র</strong> <strong>রমযান</strong> <strong>মাসের</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>গঠনের</strong> <strong>পরিকল্পনা</strong></h4>
<p>আসলেই পবিত্র রমযান মাসের কর্মসূচী মানুষ গঠনের পরিকল্পনার। অর্থাৎ কর্মসূচীর উদ্দেশ্য এটাই যে, এ মাসে ত্রুটিযুক্ত মানুষ নিজেকে ত্রুটিহীন মানুষে এবং ত্রুটিহীন মানুষ নিজেকে পূর্ণ মানুষে পরিণত করবে। এ পবিত্র মাসের পরিকল্পনা নাফস বা প্রবৃত্তির পরিশুদ্ধি, মানবীয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার সংশোধন, প্রবৃত্তির জৈবিক তাড়নার উপর বুদ্ধিবৃত্তি, ঈমান ও ইচ্ছাশক্তির বিজয় ও নিয়ন্ত্রণ।</p>
<blockquote><p><em>এর</em> <em>জন্য</em> <em>দোয়ার</em> <em>কর্মসূচী</em><em>, </em><em>সত্যের</em> <em>পথে</em> <em>ইবাদতের</em> <em>মাধ্যমে</em> <em>আল্লাহর</em> <em>দিকে</em> <em>যাত্রা</em><em>, </em><em>আত্মার</em> <em>উন্নয়নের</em> <em>জন্য</em> <em>কর্মসূচী</em><em>, </em><em>আত্মাকে</em> <em>বিকাশমান</em> <em>ও</em> <em>গতিশীল</em> <em>করার</em> <em>পরিকল্পনা</em> <em>দেয়া</em> <em>হয়েছে</em><em>।</em> <em>যদি</em> <em>এমন</em> <em>হয়</em> <em>যে</em><em>, </em><em>পবিত্র</em> <em>রমযান</em> <em>মাস</em> <em>এল</em><em>, </em><em>মানুষ</em> <em>ত্রিশ</em> <em>দিন</em> <em>ক্ষুধার্ত</em><em>, </em><em>তৃষ্ণার্ত</em> <em>ও</em> <em>নিদ্রাহীন</em> <em>থাকল</em><em>, </em><em>উদাহরণস্বরূপ</em> <em>রাত্রিগুলোতে</em> <em>অনেক</em> <em>সময়</em> <em>জেগে</em> <em>থাকল</em><em>, </em><em>এখানে</em> <em>ওখানে</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>অনুষ্ঠানে</em> <em>অংশগ্রহণ</em> <em>করল</em><em>, </em><em>তারপর</em> <em>ঈদ</em> <em>আসলো</em><em>, </em><em>কিন্তু</em> <em>রমযানের</em> <em>পূর্বের</em> <em>দিন</em> <em>থেকে</em> <em>তার</em> <em>বিন্দুমাত্র</em> <em>পরিবর্তন</em> <em>হয়নি</em><em>, </em><em>তাহলে</em> <em>ঐ</em> <em>রোযা</em> <em>তার</em> <em>জন্য</em> <em>কোন</em> <em>উপকারই</em> <em>বয়ে</em> <em>আনেনি</em><em>।</em> <em>ইসলাম</em> <em>তো</em> <em>এটা</em> <em>চায়</em> <em>না</em> <em>যে</em><em>, </em><em>মানুষ</em> <em>এমনিই</em> <em>মুখ</em> <em>বন্ধ</em> <em>করে</em> <em>রাখবে</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>মানুষ মুখ বন্ধ করুক আর না করুক ইসলামের তাতে কোনোকিছু যায় আসেনা, বরং রোযা রাখার উদ্দেশ্য হলো এটা যে, মানুষ সংশোধিত হবে। কেন হাদীসসমূহে এমন এসেছে, প্রচুর রোযাদার আছে যারা রোযা থেকে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই লাভ করে না, তাদের রোযা শুধু ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকা ছাড়া কিছুই নয়। হালাল খাদ্য থেকে মুখ বন্ধ করার অর্থ মানুষ এ ত্রিশ দিন একনাগাড়ে অনুশীলন করবে হারাম কথা থেকে জিহ্বাকে বিরত রাখার, গীবত না করার, মিথ্যা না বলার ও গালি না দেয়ার।</p>
<p>রোযা যে বাতেনী, আধ্যাত্মিক ও আত্মিক তার প্রমাণস্বরুপ একটি ঘটনা বর্ণনা করছি।</p>
<blockquote><p><strong><em>একদিন</em></strong> <strong><em>এক</em></strong> <strong><em>রোযাদার</em></strong> <strong><em>মহিলা</em></strong> <strong><em>রাসূল</em></strong><strong><em> (</em></strong><strong><em>সা</em></strong><strong><em>.)-</em></strong><strong><em>এর</em></strong> <strong><em>নিকট</em></strong> <strong><em>আসল</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>রাসূল</em></strong> <strong><em>দুধ</em></strong> <strong><em>অথবা</em></strong> <strong><em>অন্য</em></strong> <strong><em>কিছু</em></strong> <strong><em>খাওয়ার</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>তাকে</em></strong> <strong><em>অনুরোধ</em></strong> <strong><em>করলেন</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>দিকে</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>এগিয়ে</em></strong> <strong><em>দিয়ে</em></strong> <strong><em>বললেন</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>নাও</em></strong> <strong><em>পান</em></strong> <strong><em>কর</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>সে</em></strong> <strong><em>বলল</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>ইয়া</em></strong> <strong><em>রাসূলাল্লাহ</em></strong><strong><em>! </em></strong><strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আছি</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>রাসূল</em></strong> <strong><em>বললেন</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>রাখনি</em></strong> <strong><em>এবং</em></strong> <strong><em>এ</em></strong> <strong><em>বলে</em></strong> <strong><em>পুনরায়</em></strong> <strong><em>তাকে</em></strong> <strong><em>খেতে</em></strong> <strong><em>নির্দেশ</em></strong> <strong><em>দিলেন</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>মহিলা</em></strong> <strong><em>বলল</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>আসলেই</em></strong> <strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আছি</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; (</em></strong><strong><em>যেহেতু</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>বিবেচনায়</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আছে</em></strong> <strong><em>বলে</em></strong> <strong><em>মনে</em></strong> <strong><em>করল</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>যেমন</em></strong> <strong><em>বাহ্যিক</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আমার</em></strong> <strong><em>রাখি</em></strong><strong><em>)</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>রাসূল</em></strong> <strong><em>বললেন</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>কেমন</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>রেখেছ</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিছুক্ষণ</em></strong> <strong><em>পূর্বেই</em></strong> <strong><em>তোমার</em></strong> <strong><em>মুমিন</em></strong> <strong><em>ভাই</em></strong> <strong><em>বা</em></strong> <strong><em>বোনের</em></strong> <strong><em>মাংস</em></strong> <strong><em>খেয়েছ</em></strong><strong><em> (</em></strong><strong><em>অর্থাৎ</em></strong> <strong><em>গীবত</em></strong> <strong><em>করেছ</em></strong><strong><em>)</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>কি</em></strong> <strong><em>দেখতে</em></strong> <strong><em>চাও</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>মাংস</em></strong> <strong><em>খেয়েছ</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>ভেতর</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>এখনই</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>উল্টিয়ে</em></strong> <strong><em>ফেল</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>তখনই</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>বমি</em></strong> <strong><em>করল</em></strong> <strong><em>ও</em></strong> <strong><em>এক</em></strong> <strong><em>টুকরা</em></strong> <strong><em>মাংস</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>মুখ</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>বেরিয়ে</em></strong> <strong><em>পড়ল</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>মানুষ</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>রেখে</em></strong> <strong><em>গীবত</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>ফলে</em></strong> <strong><em>যদিও</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>মুখকে</em></strong> <strong><em>হালাল</em></strong> <strong><em>খাদ্য</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>বঞ্চিত</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>আত্মার</em></strong> <strong><em>মুখকে</em></strong> <strong><em>হারাম</em></strong> <strong><em>খাদ্য</em></strong> <strong><em>দ্বারা</em></strong> <strong><em>পূর্ণ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>।</em></strong></p></blockquote>
<p>কেন আমাদের উদ্দেশ্যে এটা বলা হয়েছে যে, যদি মানুষ একটা মিথ্যা বলে তবে তার মুখের দুর্গন্ধে সপ্ত আসমান পর্যন্ত ফেরেশতারা কষ্ট পান। যেমন বলা হয় যখন মানুষ জাহান্নামে থাকবে তখন জাহান্নাম প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াবে। এ দুর্গন্ধ প্রকৃতপক্ষে এ দুনিয়াতেই আমরা সৃষ্টি করেছি মিথ্যা কথা বলা, গালি দেয়া, অপবাদ ও পরনিন্দা চর্চার মাধ্যমে।</p>
<p>পরনিন্দা ও মিথ্যা অপবাদ আরোপ গীবত থেকেও খারাপ, যেহেতু পরনিন্দার মাধ্যমে যেমন মিথ্যাও বলা হয় তেমন গীবতও করা হয়। কিন্তু যে মিথ্যা বলে সে শুধু মিথ্যাই বলে, গীবত করে না। তাই পরনিন্দায় দু&#8217;টি কবীরা গুনাহ এক সঙ্গে আঞ্জাম দেয়া হয়।</p>
<p>এটা কি উচিত, রমযান মাস শেষ হয়ে যায়, অথচ এ মাসে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে নিন্দা ও অপবাদ আরোপ করতে থাকি? রমযান মাস এজন্য যে, মুসলমানরা বেশি বেশি সমবেত হবে, সম্মিলিতভাবে ইবাদত করবে, মসজিদে একত্র হবে। এজন্য নয় যে, একে অপরকে দূরে সরানোর জন্য এ মাসকে ব্যবহার করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> এ. কে. এম. আনোয়ারুল কবীর।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/insan-al-kamil-from-the-point-of-view-of-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15456</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
