<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>ইসলামী দর্শন &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/thought-and-philosophy/islamic-philosophy/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Thu, 16 Jul 2026 15:18:57 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>ইসলামী দর্শন &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>ইসলামী দর্শন কী ও কেন?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/what-is-islamic-philosophy-and-why/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/what-is-islamic-philosophy-and-why/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Mar 2026 14:47:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16692</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতা মানুষকে সত্য, সুন্দর ও আদালতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এটি এমন এক সভ্যতা, যে সভ্যতা সকলের চিন্তার স্বাধীনতা দিতে চায়। সে চায় মানুষ যেন সত্যকে দলীল ও প্রমাণসহ জানতে পারে। এই সভ্যতার মূলভিত্তি- কোরআন এবং সুন্নতেও চিন্তাকে অনেক]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী সভ্যতা মানুষকে সত্য, সুন্দর ও আদালতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এটি এমন এক সভ্যতা, যে সভ্যতা সকলের চিন্তার স্বাধীনতা দিতে চায়। সে চায় মানুষ যেন সত্যকে দলীল ও প্রমাণসহ জানতে পারে।</p>
<p>এই সভ্যতার মূলভিত্তি- কোরআন এবং সুন্নতেও চিন্তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং চিন্তা করাকে ইবাদত বলে গণ্য করা হয়েছে।</p>
<p>মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে, দর্শনের প্রাথমিক অর্থটি সংক্ষেপে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। সকলেই&nbsp; জানেন ফিলোসফি শব্দটি গ্রিক philosophía থেকে এসেছে। এখানে “Philo” – অর্থ হল, ‘ভালোবাসা’ আর “Sophia” অর্থ হল, ‘জ্ঞান/হিকমত&#8217;। এই শব্দদ্বয় থেকে উদ্ভূত শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে প্রথমে আরবিতে, এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে ইংরেজি ভাষায় গিয়ে ‘Philosophy’ নামে রূপলাভ করেছে। যার অর্থ হলো, হিকমতের প্রতি ভালোবাসা (&#8216;love of wisdom&#8217;)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রথম ফিলোসফার বা দার্শনিক হিসেবে পিথাগোরাসকে গণ্য করা হয়। তিনি বলেন, ‘হিকমত হলো স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয় এবং আমরা কেবল সেটাকে ভালোবাসতে পারি”। এর মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন যে, হিকমতের উৎস স্থান&nbsp; ও সময়ের উর্ধ্বে।</p>
<p>হিকমত এমন একটি বিষয়, একে যদি আমরা আকলী ও রূহীভাবে ভালোবাসি তাহলেই কেবল তা আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হবে। ভালোবাসাবিহীন হিকমত অপূর্ণ আবার হিকমতবিহীন ভালোবাসাও খণ্ডিত।</p>
<p>মুসলমানগণও হিকমতকে ভালোবাসার কারণে সমগ্র মানবতার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং যেসকল জ্ঞান, চিন্তা ও হিকমত মানুষের জন্য উপকারী ও মানবসভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সেটাকে অনুবাদ ও ব্যাখা করে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে।</p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<p><strong>ইসলামী দর্শন কখন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কোথায়</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কীভাবে শুরু হয়েছে</strong><strong>? </strong><strong>ইসলামী দর্শন বলে কোনো কিছু সম্ভব কিনা</strong><strong> ? </strong></p>
<p>ইসলামী দর্শন নামক পরিভাষাটি মূলত আধুনিক সময়ে উদ্ভাবিত হয়েছে। যদি এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায় যে, ইসলামী সভ্যতা নবম শতাব্দী থেকে থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে জ্ঞান তৈরি করেছে সে মানসকে ‘ ইসলামী দর্শন’ নামক পরিভাষার মাধ্যমে বুঝানো হয়ে থাকে। এই ইসলামী দর্শন পরিভাষার মধ্যে যে ‘ইসলাম’ – এটা দ্বীন অর্থে নয়, এটা মূলত ইসলামী সভ্যতা যতদিন এই বিশ্বকে শাসন করেছে সেই সময়কালকে বুঝিয়ে থাকে।</p>
<p>কেননা, আমরা মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, একেক সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা এই বিশ্বকে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহকে শাসন করেছে। বর্তমানে যেমন পাশ্চাত্য সভ্যতা বিশ্বকে শাসন করছে, অনুরূপভাবে ইতিপূর্বেও এই বিশ্বকে বিভিন্ন সভ্যতা শাসন করেছে তাঁর মধ্যে অন্যতম হলো, গ্রিক, রোমান, ভারতীয়, চীনা সভ্যতাসহ সহ আরও অনেক সভ্যতা। এ সভ্যতাগুলোর মধ্যে গ্রিক সভ্যতা একটি সময়কাল পর্যন্ত জ্ঞান ও চিন্তাগতভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিলো। গ্রিক সভ্যতার পর হেলেনিস্টিক যুগের সূচনা হয় এবং তারপর ইসলামী সভ্যতার যুগ শুরু হয়। এখানে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যে ইসলাম আসার পর থেকে বিগত ১৪০০ বছরের মধ্যে ১২০০ বছর ইসলামী সভ্যতা সমগ্র বিশ্বে তার প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিলো। যার দরুন, বিগত ১২০০ বছর মানবতার ভাগ্যনিয়ন্তা ছিলো ইসলামী সভ্যতা ও এই সভ্যতার নেতৃত্বদানকারী মুসলমানগণ।</p>
<p>বিশেষ করে সপ্তম শতাব্দীকাল থেকে মুসলমানগণ সভ্য দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং এই সভ্যতা যেন জ্ঞানগত ও চিন্তাগত ভাবে মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে পারে এই জন্য জ্ঞানগত ধারা তৈরি করে। এর মধ্যে যেমন শরয়ী জ্ঞান রয়েছে তেমনি ভাবে অন্যান্য জ্ঞানও রয়েছে। যেমন, হিজরী ২য় শতাব্দীতে (অষ্টম শতাব্দী) বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চলের জ্ঞানগত চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে ‘হিকমাহ’ নাম দিয়ে আরবী ভাষায় অনুবাদ করা শুরু করা হয়। এই অনুবাদ আকলী জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করে দেয়। <strong>এই</strong> <strong>সময়</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নিয়ে</strong> <strong>অষ্টাদশ</strong> <strong>শতাব্দীকাল</strong> <strong>পর্যন্ত</strong> <strong>উৎপাদিত</strong> <strong>আকলী</strong> <strong>জ্ঞানকে</strong> <strong>মূলত</strong> <strong>আমরা</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>দর্শন</strong> <strong>নামে</strong> <strong>অভিহিত</strong> <strong>করে</strong> <strong>থাকি</strong><strong>।</strong></p>
<p>যেমন গ্রিক বা ভারতীয় দর্শন বলতে সেই সভ্যতাগুলোর প্রভাবশালী সময়ে গড়ে ওঠা চিন্তামূলক জ্ঞানকে বোঝায়, তেমনি ইসলামী সভ্যতায় উৎপাদিত ও তৈরিকৃত আকলী জ্ঞানভাণ্ডারকে ইসলামী দর্শন বলা হয়। এখানে ইসলামী দর্শনের মধ্যে যে ‘ইসলাম’ সেটা দ্বীন অর্থে নয় বরং এটা সভ্যতা অর্থে। তবে অনেকেই এটাকে ভিন্নভিন্ন নামে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>যেমন, কেউ কেউ আরব দর্শন বলেছেন, কেউবা আবার আরবী ভাষার দর্শন বলেছেন ইত্যাদি। তবে দ্বীন ইসলাম এই সভ্যতার মূল ভিত্তি হওয়ায় এবং এর অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতাগুলোতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশে অংশগ্রহণ করায়, ইসলামী সভ্যতায় সৃষ্ট জ্ঞানভাণ্ডারকে নির্দেশ করতে মূলত এই পরিভাষাটিই ব্যবহৃত হয়।</p>
<p>আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, আধুনিক সময়ে এসে এই পরিভাষাটির উৎপত্তি হয়। আজ থেকে ৫০০ কিংবা ৬০০ বছর পূর্বে কিংবা ক্ল্যাসিক্যাল যুগে এই পরিভাষাটি আমরা পাই না। শুধুমাত্র শাহরাস্তানি রচিত আল মিলাল ওয়ান নিহাল নামক গ্রন্থে <strong>ফালাসিফাতুল</strong> <strong>ইসলাম</strong> এই পরিভাষাটি পাই। শাহরাস্তানি মূলত মুসলিম চিন্তাবিদগণের দার্শনিক জ্ঞানকে বুঝানোর জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন যার অর্থ হলো, ‘ইসলামের দার্শনিকগণ’। তিনিও ইসলামী সভ্যতার সময়কালে তৈরি হওয়া দার্শনিকদেরকে বুঝিয়েছেন। যেমন ফালাসিফাতুল ইউনান- এর অর্থ হলো, ‘গ্রিক দার্শনিকগণ’। এর দ্বারা গ্রিক সভ্যতার সময়ে জ্ঞান ও চিন্তা উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী দার্শনিকদের বুঝানো হয়ে থাকে।</p>
<p>পারিভাষিক অর্থে দর্শন হলো; কোনো ধরণের অথোরিটির (সেটা দ্বীন কিংবা সংস্কৃতি যাই হোক না কেন) অধীনে না থেকে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা। আর এই কাজ একজন মুসলমানও করতে পারে, বা অন্যান্য ধর্মের যে কেউও করতে পারে। অর্থাৎ মানুষ মাত্রই এ কাজ করতে সক্ষম।</p>
<p>আমরা জানি যে, জ্ঞান এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতায় রূপান্তর হয়ে থাকে। একটি সভ্যতা যখন জ্ঞান ও চিন্তা উৎপাদন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে তখন জ্ঞান ও চিন্তার নেতৃত্বও ঐ সভ্যতার হাতছাড়া হয়ে যায়। এ নেতৃত্ব তখন চলে যায় বিজয়ী সভ্যতার হাতে। যেমন বর্তমানে জ্ঞান ও চিন্তার ঝাণ্ডাকে পাশ্চাত্য বহন করে চলছে। এই কারণে পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যকার সৃষ্ট জ্ঞানকে আমরা পাশ্চাত্য দর্শন বলে অভিহিত করে থাকি। যেমন, ভবিষ্যতে যদি ভিন্ন কোনো সভ্যতা সামনে চলে আসে তাহলে জ্ঞান, গবেষণা ও চিন্তাপদ্ধতি সেই সভ্যতার হাতে চলে যাবে আর তারা এর ঝাণ্ডাবাহী হয়ে কাজ করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী</strong> <strong>দর্শনের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>কোরআন</strong> <strong>ও</strong> <strong>সুন্নতের</strong> <strong>সম্পর্ক</strong></p>
<p>প্রতিটি সভ্যতার মৌলিক কিছু উপাদান করেছে যা ঐ সভ্যতার গঠনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এই মৌলিক উপাদানসমূহ দার্শনিক ও চিন্তাগত কাজকে প্রভাবিত করে থাকে। আর ইসলামী সভ্যতা হলো এমন এক সভ্যতা যা ইসলামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা হলেন স্বয়ং হযরত পয়গাম্বর (স)। ইসলামী সভ্যতা যা কিছু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার সবটাই কোরআন ও সুন্নতকে কেন্দ্র করে। ফলশ্রুতিতে এই সভ্যতার মধ্যে তৈরি হওয়া সকল কিছুর সাথেই কোরআন ও সুন্নতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই অর্থে দার্শনিক কর্মকাণ্ড কিংবা দার্শনিক তাফাক্কুরের সাথে কোরআন ও সুন্নতের সম্পর্ক রয়েছে। আর এই সভ্যতার বড় বড় দার্শনিকগণের বেশির ভাগ-ই হলেন মুসলমান। অনেক অমুসলিম দার্শনিক থাকলেও মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন মুসলমানরাই। রয়েছেন আল কিন্দি, ফারাবী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, আল আল মাওয়ার্দী, রাগিব আল ইসফাহানী, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে খালদুন, শামসুদ্দিন ইসফাহানী, সাদরুশ শরিয়া, দাউদ আল কায়সারী, আদুদ্দিন ইজি, কুতুবুদ্দিন আর রাযি, জামালুদ্দিন ইসনাবী, ইবনে মোকারক শাহ, একমেলুদ্দিন বাবারতী, সাদুদ্দিন তাফতাযানী, বদরুদ্দিন যারকাশী, ইবনে রজব, সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী, বদরুদ্দিন সিমাভী এবং&nbsp; ফিরোজাবাদীসহ আরও অনেক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। আর এরা সকলেই ছিলেন মুসলমান। এসকল মুতাফাক্কিরগণ শুধু দার্শনিক-ই ছিলেন না একই সাথে ঐ সময়ের বড় বড় মুতাকাল্লিমও ছিলেন। এই অর্থে ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও এই দার্শনিক ধারার মৌলিক বিষয়সমূহের ওপর ভিত্তি করে জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে মুসলমান হওয়া কোনো আবশ্যক শর্ত নয়। এখানে কোরআন ও সুন্নতকে একটি মুলনীতি হিসেবে ধরে সেই মূলনীতির আলোকেই গবেষণা করতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। এই কারণে এটা দ্বীন ইসলামের দর্শন নয়। দ্বীন ইসলাম কর্তৃক গঠিত সভ্যজগতে উৎপাদিত ‘দর্শনের ভাণ্ডার’।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বর্তমান সময়ে ইসলামী দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রযোজ্যতা</strong></p>
<p>আমরা জানি যে বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে জ্ঞানের যে ধারা রয়েছে সেটা হল, ইউরোপ কেন্দ্রিক। যেটাকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান হলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। <strong>এই পাশ্চাত্যের যে জ্ঞানগত ধারা এই ধারাটি গড়ে উঠেছে মেটাফিজিক্সকে বাদ দিয়ে। অথচ আমাদের ইসলামী সভ্যতায় যে দর্শনের চর্চা রয়েছে এর মূলে ছিলো মেটাফিজিক্স। আধুনিক সময়ে এসে জ্ঞানের ভিত্তিকে experiment, observation, and verifiability/falsifiability (পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং যাচাইযোগ্যতা) – এর&nbsp; মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। আর মেটাফিজিক্স যেহেতু এসকল ভিত্তির আলোকে নির্ধারিত কোন জ্ঞান নয়, তাই তারা মেটাফিজিক্সকে বিজ্ঞান নয়-এই যুক্তি দেখিয়ে একে জ্ঞানচর্চার পরিসর থেকে বাদ দেয়।</strong></p>
<p>কিন্তু এই সময়ে এসে অনেক চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও গবেষকগণ উপলব্ধি করছেন যে আসলে মেটাফিজিক্স ছাড়া জ্ঞানের যে মৌলিক উদ্দেশ্য সেখানে উপনীত হওয়া সম্ভবপর নয়।</p>
<p>এমতাবস্থায় আমাদের সামনে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা হলো, <strong>‘ আধুনিক সময়ে ইসলামী দর্শন সম্ভব কিনা?’</strong> আমি মনে করি এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ &nbsp;একটি প্রশ্ন। এমন একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে আসার অন্যতম মূল কারণ হলো, ব্রিটিশ উপনিবেশ ও শোষণ, মুসলিম উম্মাহর উপর আধুনিকতার প্রভাব, পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপান্তর ও পরিবর্তনের ক্ষমতা- শুধু ইসলামী দর্শনই নয়, বরং ইসলামী সভ্যতার সমগ্র জ্ঞানগত মিরাসের উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও আমাদের সামনে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। আমাদের বিভিন্ন চিন্তাবিদ এই বিভিন্নভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেসকল উত্তরের মধ্যে আমি কয়েকটিকে উল্লেখ করতে চাই,</p>
<p><strong>১. ইসলামী দর্শনকে আমাদের সভ্যতার জ্ঞানগত একটি মেমোরী হিসেবে বিবেচনা করা। </strong></p>
<p>এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইসলামী দর্শন নানা পরিস্থিতিতেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার চারটি প্রধান ধারার মধ্যে এটি একটি হলো ইসলামী দর্শন। আমাদের সভ্যতায় জ্ঞানের চারটি বড় ধারা রয়েছে, সেগুলো হল, দর্শনিক ধারা, কালামী ধারা, তাসাউফী ও ফিকহী ধারা। আমরা যদি ইসলামী দর্শনকে বিবেচনায় না নেই, ইসলামী দর্শন কী এটা ভালোভাবে না বুঝি তাহলে বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসের ১৪শ বছরকে বুঝতে সক্ষম হবো না। যেমন, আমরা যদি ইসলামকে বাদ দেই, তাহলে মানবসভ্যতার ১৪শত বছরের কোন হদিস পাওয়া যাবেনা। এই ১৪শত বছরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ একটি অংশ হলো ইসলামী দর্শন। এ কারণে ইসলামী দর্শনকে না বুঝলে আমরা মানবসভ্যতার ইতিহাসের ১৪শত বছরকেই বুঝতে পারবো না। এক অর্থে বলতে গেলে, আধুনিক দুনিয়াকে গঠন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একটি ধারাকে আমরা বুঝতেই পারব না। অর্থাৎ, ইসলামী দর্শনকে মানবজাতির ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে।</p>
<p><strong>২</strong><strong>.</strong><strong> নিজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা ও তুলে ধরার জন্য দর্শনকে শক্তিশালী একটি মাধ্যম হিসেবে পাঠ করা। </strong></p>
<p>আমরা মুসলমান হিসেবে ইসলামী সভ্যতার একজন সদস্য। প্রতিটি মানুষ-ই তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত মিরাসের (জ্ঞান, চিন্তা, আচরণ, রীতিনীতি,ভাষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি) আলোকে বসবাস করে। আমরা যদি এই মিরাসকে অস্বীকার করি তবুও আমরা এর আলোকেই বসবাস করি। কারণ এই দুনিয়াকে তৈরি করেছে এই সকল মিরাস। এর বাহিরে যাওয়ার কোন সুযোগ আমাদের নেই।</p>
<p>যেমন, আমরা বাংলায় কথা বলি, বাঙ্গালী সমাজের একজন সদস্য এবং আমরা বাঙ্গালী। আমরা চাই বা না চাই, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বসবাসকারী বাঙ্গালীরা আমাদের পূর্বপুরুষ। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক তাঁদের প্রভাবে ও তাঁদের তৈরিকৃত ধারার আলোকে গঠিত একটি সমাজে আমরা বসবাস করি। আমরা যদি এই সামাজিক হাফিজা বা মেমোরিকে উপেক্ষা করে আমাদের আত্মপরিচয়কে গঠন করি তাহলে আমরা আমাদের মৌলিক গঠনগত উপাদানগুলোকেই উপেক্ষা বা অস্বীকার করে বসবো। এর মানে হলো আমরা আমাদের নিজেদেরকেই চিনতে পারবো না, নিজেকেই ভুলে যাবো। ইতিহাসের গতিধারায় আমাদের যে অবস্থান সেটাকে অর্থাৎ আমাদের নিজেদেরকেই ব্যখ্যা করতে পারবো না। আমাদের চিন্তাশীল যিহিনের প্রেক্ষাপট কী, এখনো অব্যাহত আছে এমন অনেক বিষয়ের এক্সেটেনশনসমূহ কী সেটাও বুঝতে পারবো না।</p>
<p><strong>৩</strong><strong>.</strong><strong> নতুন চিন্তা তৈরি ও বিকাশের জন্য ইসলামী দর্শনের গুরুত্ব</strong></p>
<p>নতুন চিন্তা তৈরি করার জন্য এবং সে চিন্তাকে ধারাবাহিক রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকটে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অতীত মিরাসের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। কেননা অতীত চিন্তা কিংবা নিজেদের তৈরিকৃত জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে যখন কেউ ওয়াকিফহাল না থাকে, তখন সে প্রায়শই অন্যদের চিন্তার প্রভাবে পরিচালিত হয়। একইসাথে চিন্তা করার ও জ্ঞান উৎপাদন করার যোগ্যতাকে হারিয়ে ফেলে। সে কিসের আলোকে চিন্তা তৈরি করবে এটা সে না জানার কারণে গতিশীলতাও হারিয়ে ফেলে।</p>
<p>আমরা যদি এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাই তাহলে আমাদেরকে ইসলামী দর্শনের যে বিশাল ভাণ্ডার এই ভাণ্ডার সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে এবং এখান থেকে উপকৃত হয়ে নতুন করে জ্ঞান ও চিন্তা তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।</p>
<p><strong>৪. মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ইসলামী দর্শন&nbsp; </strong></p>
<p>একজন ব্যক্তি যখন তার অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত থাকে না, তখন তার মানস বা যিহিন ফাঁকা থাকে। এই ফাঁকা যিহিনকে যেকোনো দিকে ধাবিত করা যায় এবং যেভাবে ইচ্ছা তাতে গঠন করা সম্ভব। আমাদের অবস্থাও আজ এমনই। আমরা আমাদের জ্ঞানের অতীত মিরাস সম্পর্কে অপরিচিত থাকায়, শোষক ও সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে আমাদের মানস ও চিন্তাজগতকে নিজেদের ইচ্ছামতো গড়ে তুলছে এবং আমাদের শোষণ করছে। আজ অবস্থা এমন যে তাঁরা শোষণ না করতে চাইলেও হয়ত আমরা তাঁদেরকে ডেকে নিয়ে আসবো শোষণ করার জন্য। আমরা আজ সেলফ-কলোনাইজড হয়ে গিয়েছি। নিজেদের শাসন ও শোষণ করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে যেন নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছি।</p>
<p>এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে ইসলামী দর্শনের চর্চা বাড়াতে হবে, কেননা পাশ্চাত্যের চিন্তা ও দর্শন থেকে কেবল ইসলামী দর্শনই আমাদের যিহিন ও মানসকে মুক্ত করতে পারে। আধুনিক সময়ে এসে আমরা কোন সকল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি ইসলামী দর্শন আমাদের ঐতিহাসিক পরিচয় বা আইডেন্টিটিক সামগ্রিকভাবে বুঝতে সাহায্যকারী মৌলিক একটি উপাদান। যার কারণে আমরা যে দুনিয়ায় বসবাস করছি সেই দুনিয়ার বর্তমান ও পরবর্তী সময়ে চিন্তাগত ও জ্ঞানগত কাজকে সঠিকভাবে করার জন্য আমাদের অতীত মিরাসকে জানতে হবে ও সেই মিরাসের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।</p>
<p><strong>৫</strong><strong>.</strong><strong> কোরআন ও সুন্নতকে বুঝার জন্য ইসলামী দর্শনের গুরুত্ব</strong></p>
<p>কোরআন ও সুন্নত হলো, শাশ্বত ও বিশ্বজনীন। এই মৌলিক উৎস দূটি শুধুমাত্র মুসলমান-ই নয় সমগ্র মানবতার মুক্তির পথনির্দেশক। এখন কথা হলো, আমরা কি আমাদের অতীতকে বাদ দিয়ে এই দুইটি ভাণ্ডারকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবো? আমার মতে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের অতীত চিন্তা ও চিন্তাবিদগণ তাঁদের সময়ে কোরআন ও সুন্নতকে কিভাবে বুঝেছেন এটা যদি আমাদের সামনে থাকে, তাহলে আমরা এই দুইটি মূল উৎসকে আরও সঠিকভাবে বুঝে সমগ্র মানবতার সামনে আরও বোধগম্য ভাবে তুলে ধরতে পারবো।</p>
<p>ইসলামী দর্শন মূলত কোরআন ও সুন্নতকে একটি সভ্যতাগত মিরাসে, সংস্কৃতিতে ও চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে। একইসাথে আমাদের সভ্যতার নাজারী ও তাত্ত্বিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে কালাম ও দর্শন। আমরা যদি এই জ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে বাদ দেই তাহলে বিগত ১০০০ বছরে উৎপাদিত বিশেষত দ্বাদশ শতাব্দী থেকে রচিত তাফসীরগুলোও আমরা বুঝতে পারব না। কেননা এই সময়কালের পর থেকে যত বড় বড় মুফাসসির এসেছেন, তাঁদের অধিকাংশ-ই ছিলেন শক্তিমান দার্শনিক। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী।</p>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের একটি বিশেষ দায়িত্ব দান করেছেন। এই দায়িত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি পবিত্র কোরআনে বলেছেন-</p>
<blockquote><p>كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ</p>
<p>অর্থঃ এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল৷ তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য ৷ তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো৷</p></blockquote>
<p>এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসলমানদের সর্বপ্রথম কাজ হলো তার উপর অর্পিত দায়িত্ব বা তাকলিফকে মানুষের কাছে তুলে ধরা, মানুষকে এই তাকলিফের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এই দায়িত্ব বা তাকলিফকে পরিচয় করানোর মাধ্যমেই মুসলমানদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং একইসাথে এটাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে আল্লাহপ্রদত্ত এই দায়িত্বের সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব করাও আবশ্যক। এ তাকলিফকে মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এর প্রতিনিধিত্ব করা মুসলমানদের মৌলিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ‍</p>
<p>এ দায়িত্বকে যথাযথ ভাবে পালন করতে গিয়ে মুসলমানগণ ইলমুল কালাম ও ইলমুল ফিকহের উদ্ভাবন করেন।</p>
<p>&#8216;ইলমূল কালাম&#8217; আল্লাহ প্রদত্ত তাকলিফ বা দায়িত্বের পরিচয় প্রদান করে আর এই তাকলিফকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার পন্থা তুলে ধরে &#8216;ইলমূল ফিকহ&#8217; । <strong>এক কথায় বলতে গেলে ইলমুল কালাম হলো দ্বীন ইসলামের থিওরীটিক্যাল দিক আর ফিকহ হলো প্র্যাকটিক্যাল দিক</strong>। আর এই নাজারী বা থিওরীটিক্যাল দিকটির ইতিহাসসহ সকল বিষয়কে আমাদের খুব ভালো করে জানতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালাম ও দর্শনের মধ্যকার পার্থক্য </strong></p>
<p>আমাদের অনেকেই কালাম ও ইসলামী দর্শনের মধ্যকার পার্থক্যকে ধরতে পারেন না। যার কারণে কালামকেই ইসলামী দর্শন মনে করে থাকেন। আসলে বিষয়টি তা নয়, এই দুইটি ধারাই স্বতন্ত্র ভাবে গড়ে উঠেছে। এই দুই ধারার মেথডও ভিন্ন ভিন্ন।</p>
<p>প্রখ্যাত মুতাকাল্লিম ইমাম সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী ইলমুল কালামের সংজ্ঞায় বলেন,</p>
<blockquote><p>لْمٌ يُبْحَثُ فِيهِ عَنْ ذَاتِ اللَّهِ تَعَالَى وَصِفَاتِهِ وَأَحْوَالِ الْمُمْكِنَاتِ مِنَ الْمَبْدَإِ وَالْمَعَادِ عَلَى قَانُونِ الْإِسْلَ</p>
<p>অর্থাৎ, ইলমুল কালাম হল এমন একটি জ্ঞান যা আল্লাহ তায়ালার যাত ও সিফাত থেকে নিয়ে মাবদা’ ও মায়াদ (সৃষ্টির সূচনা ও শেষ)- পর্যন্ত সৃষ্টির সকল অবস্থাকে ইসলামের নিয়মনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করে থাকে।</p></blockquote>
<p>উক্ত সংজ্ঞার মধ্যে উল্লেখিত ‘ ইসলাম কানুন তথা নিয়মনীতির আলোকে’ এই বাক্যটি ইলমুল কালামকে দর্শন থেকে আলাদা করে দেয়। কেননা, ইসলামী দর্শন ও মেটাফিজিক্সের মধ্যে আল্লাহ, মাবদা’ ও মায়াদ ( সৃষ্টির সূচনা ও শেষ) এবং সৃষ্টির অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে। তবে দর্শনের ক্ষেত্রে মুভমেন্ট পয়েন্ট বা সূচনা বিন্দু ‘নাকল’ (ওহী) নয়, বরং ‘আকল’ হলো চিন্তার সূচনাবিন্দু।</p>
<p>দর্শন সকল বিষয়কে আকলী মূলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে। অপরদিকে কালামের মুভমেন্ট পয়েন্ট বা সূচনাবিন্দু হলো নাকল তথা ওহী। কালাম তার আলোচিত বিষয়সমূহকে তুলে ধরার সময় আকলকে ব্যবহার করলেও সর্বদা ওহীর সাথে সঙ্গতি রাখে। কিন্তু দর্শন সেটাকে আবশ্যক মনে করে না।</p>
<p>সবশেষে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, কয়েক দশক ধরে পাশ্চাত্যের চিন্তার প্রভাবে মুসলিম বিশ্বে গড়ে উঠে কিছু ধারা দর্শন চর্চার বিরোধিতা করে থাকে। তাঁদের চিন্তার কিছু ভিত্তি থাকলে তাঁরা যেভাবে দর্শন চর্চাকে নিরুৎসাহিত করে তা মোটেও সমীচীন নয়। প্রতিটি জ্ঞান মানুষের সৃষ্ট, তাই সব জ্ঞানই সমালোচনার জন্য উন্মুক্ত। মানুষের তৈরি চিন্তার সমালোচনা করা স্বাভাবিক; তবে এ ক্ষেত্রে কিছু মানদণ্ড মেনে চলা জরুরি। তাই জ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাটিকে নিষিদ্ধ করা বা চর্চাকে হারাম ঘোষণা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। প্রয়োজন হলে আমরা সমালোচনা করবো এবং সংশোধনের প্রয়োজনীয় অংশগুলো সংশোধন করবো। যাই হোক না কেন, আমাদের অতীত মিরাসকে উপেক্ষা করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়।</p>
<p>এ ব্যাপারটি মুসলিম উম্মাহর মহান দার্শনিক, আলেম ও মুতাফাক্কির <a href="https://rowyakbd.com/author/dr-tahsin_gorgun/">প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন</a> তাঁর অনন্য গ্রন্থ ‘জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও মেথডোলজি’তে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন-</p>
<p>“<strong>আমাদের সভ্যতাকে খুব ভালোভাবে চিনতে ও জানতে হবে। এ সভ্যতার মিরাসকে ধারণ করতে হবে। আমরা সভ্যতার মিরাসকে উপেক্ষা ও অস্বীকার করলে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর অন্য কোনো পথ নেই। নিও-সালাফিজমের মূল সমস্যা এটাই।</strong> এ বিষয়ে আমি মনে করি ইসলামী সভ্যতার মিরাসের (ভুল ও ভ্রান্তিসহ) দায়ভার আমাদেরকে নিতে হবে। এটা খুবই জরুরি। ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব নিবো-সে ভুল থেকে শেখার জন্য, পুনরাবৃত্তির জন্য নয়। কিন্তু সেই ভুলগুলোও যে আমরা করেছি, সেটার স্বীকৃতি দিয়েই আমাদেরকে ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করতে হবে। অতীতকে কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে, বুঝার জন্য অতীতকে পাঠ করতে হবে। অতীতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পাঠ করার কারণে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস আজ আমাদের সামনে ইসলামবিচ্যুত ইতিহাস হিসেবে এসেছে। ইতিহাসকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেনো যত সময় গিয়েছে উম্মত হিসেবে আমরা ইসলাম থেকে ততই দূরে সরে গিয়েছি। সাহাবীদের পর থেকে যত সময় গড়িয়েছে, ইসলাম থেকে আমরা ততই দূরে সরে গিয়েছি। আমাদেরকে এ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে”। (পৃ.৩৪-৩৫)</p>
<p>তাই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো নিজেদের অতীত মিরাসকে ধারণ করে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালানো। মহান আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/what-is-islamic-philosophy-and-why/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16692</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রোজার আসল উদ্দেশ্য কী?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-real-purpose-of-fasting/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-real-purpose-of-fasting/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 15 Mar 2026 09:58:22 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16680</guid>

					<description><![CDATA[মানুষের মন-প্রাণ, তার নাফস তো খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাসে গড়ে উঠেছে। সকালে খাবার, রাতে খাবার। জান্নাতেও তো এমনই ব্যবস্থা আছে। আল্লাহ বলেছেন, &#8220;সেখানে তাদের সকাল-সন্ধ্যায় রিযিক দেওয়া হবে।&#8221;&#160; একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, জান্নাতে কি রাত থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হঠাৎ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষের মন-প্রাণ, তার নাফস তো খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাসে গড়ে উঠেছে। সকালে খাবার, রাতে খাবার। জান্নাতেও তো এমনই ব্যবস্থা আছে। আল্লাহ বলেছেন, &#8220;সেখানে তাদের সকাল-সন্ধ্যায় রিযিক দেওয়া হবে।&#8221;&nbsp;</p>
<p>একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, জান্নাতে কি রাত থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? লোকটি বলল, ❝আল্লাহ তো বলেছেন সকাল-সন্ধ্যা রিযিকের কথা।❞</p>
<p>&nbsp;রাসূল ﷺ বললেন, এখানে সকাল-সন্ধ্যা বলতে শুধু সময়ের হিসাব বোঝানো হয়েছে।</p>
<p>আমাদের নাফস তো সারাদিন খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত। তাই আল্লাহ&nbsp; এ অভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখতে বলেছেন। আগের উম্মতদের রোজা রাখা ছিল খুব কঠিন, তাদের সকালের খাবার একদম বন্ধ, রাতের খাবারও আসত না। কিন্তু এই উম্মত মুহাম্মদির&nbsp; প্রতি আল্লাহর দয়া&nbsp; সম্মান দেখুন। তিনি আমাদের রোজায় সকাল-রাতের খাবার আহরণের ব্যবস্থা&nbsp; রেখেছেন। শুধু দিনের নির্ধারিত সময়ে খাওয়া বন্ধ। আর সেহরির সময় খেয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। নবীজি সেহরিকে <strong>❝বরকতময় সকালের খাবার❞</strong> বলেছেন। এই সংযম, এই সময়-নিয়ন্ত্রিত বিরতিই হলো সাওম বা রোজা।</p>
<p>রোজা হলো এমন একটি অভ্যাস থেকে বিরত থাকা, যে অভ্যাসের সঙ্গে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত।(খাওয়া-দাওয়া, শাহওয়াত) যখন নফসকে সেই পরিচিত অভ্যাস থেকে আটকানো হয়, তখন তা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ কষ্টের মধ্য দিয়ে শরীরকে আমরা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করি। কারণ নাফস যখন শাহওয়াতের পেছনে ছোটে, তখন সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ থেকে দূরত্ব যত বাড়ে, বরকত তত কমে যায়। আর যখন কোনো কিছু থেকে বরকত সরে যায়, তখন তা ক্ষীণ হয়, লাঞ্ছিত হয়, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।</p>
<p>কিন্তু যখন নফস তার অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে বিরত রেখে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে ফিরে আসে, তখন তার নৈকট্য বৃদ্ধি পায়। আর আল্লাহর নৈকট্য যত বাড়ে, ততই বরকত নেমে আসে। বরকত নেমে এলে তা পরিশুদ্ধ হয়, বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয়। যাকাত মানে-ই হলো বৃদ্ধি, কল্যাণে পরিপূর্ণতা।&nbsp;</p>
<p>মানুষকে আল্লাহ শুন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। তার শুন্য হৃদয়ে রেখেছেন ঈমান, জ্ঞান, হিকমত, বুদ্ধি, বোঝার ক্ষমতা, শান্তি, গাম্ভীর্য। আর এগুলো হলো&nbsp; কালবের সৈন্য। অন্যদিকে রয়েছে রাগ, ভয়, লোভ, ক্রোধ, ছল-চাতুরি, হিংসা, কাপুরুষতা, কৃপণতা এগুলো নফসের সৈন্য।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16682 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-1024x585.jpg" alt="" width="1024" height="585" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-1024x585.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-300x171.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461-768x439.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2151182461.jpg 1500w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>যখন মানুষ নফসের অভ্যাস থেকে বিরত থাকে, তখন সে যেন নিজের সত্তাকেই আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর যখন আল্লাহ সেই আত্মসমর্পণ কবুল করেন, তখন তিনি তাকে ঈমান, বুদ্ধি, সৎকর্ম ও কল্যাণ দিয়ে সমৃদ্ধ করেন। সে পরিশুদ্ধ হয়, পূর্ণতা লাভ করে।</p>
<p>এভাবেই রোজা হয়ে ওঠে দেহের যাকাত।</p>
<p>তুমি কি লক্ষ্য করো না রোজাদাররা ইবাদতের মাঝে কী অপূর্ব স্বাদ অনুভব করেন? কীভাবে তাদের অন্তর প্রশান্ত, নীরব ও স্থির হয়ে ওঠে?</p>
<p>এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:</p>
<blockquote><p>“নিশ্চয় প্রত্যেক কিছুরই যাকাত রয়েছে, আর দেহের যাকাত হলো রোজা।”</p></blockquote>
<p>যখন মানুষ রোজা রাখে, তখন তার উপর বরকত নেমে আসে। তার অন্তরে প্রতিটি কল্যাণের বীজ বিকশিত হতে থাকে, সৎগুণগুলো বেড়ে ওঠে, আর বরকতের ছোঁয়ায় সে মর্যাদায় উন্নত হয়। কিন্তু যদি এই গুণগুলোর উপর থেকে বরকত সরে যায়, তবে সেগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে,&nbsp;কোনো ফল দেয় না, কোনো আলো ছড়ায় না।</p>
<p>আল্লাহ তাআলা এই রোজাকেই বানিয়েছেন বরকত অবতীর্ণ হওয়ার একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে কল্যাণ বাড়ে, অন্তর পবিত্র ও&nbsp; বিকশিত হয়, আর তার নফস কল্যাণে পূর্ণ হয়ে ওঠে।</p>
<p>বান্দা নিজের অভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখার কারণে আমাদের প্রতিপালক বান্দার এই কর্মকে মহিমান্বিত করেছেন।</p>
<p>&nbsp;রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:</p>
<blockquote><p>“আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, তবে রোজা ব্যতীত। নিশ্চয়ই রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দিয়ে থাকি। আমার বান্দা আমারই জন্য তার খাদ্য, পানীয় ও কামনা-বাসনা ত্যাগ করে’।”</p></blockquote>
<p>এই কথা সেই বাণীরই প্রতিধ্বনি যেখানে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে একটি তার ইফতারের সময়, আরেকটি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে।”</p>
<p>“আমার বান্দা যদি এক বিঘত আমার দিকে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই।” বান্দা যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য দিনের বেলায় নিজের অভ্যাস, খাওয়া ও পান করা ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন আল্লাহ তার এ সামান্য ত্যাগকেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা&nbsp;ঘোষণা করেন:</p>
<p>“আমার বান্দা আমার জন্য তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করেছে।” তারপর বলেন: “এটি আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।”</p>
<p>অর্থাৎ এর সওয়াব তিনি অন্য কারও ওপর ন্যস্ত করেন না। অন্যান্য আমল বান্দার জন্য নির্ধারিত হলেও রোজা বিশেষভাবে আল্লাহর জন্য, কারণ এটি বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ নয়; বরং অন্তরের নিয়ত ও আত্মসংযম নিজের অভ্যস্ত প্রবৃত্তিকে দমন করা।</p>
<p>নবী ﷺ বলেছেন:</p>
<p><strong>“রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে একটি ইফতারের সময়।”</strong></p>
<p>এ আনন্দ হলো বরকত নেমে আসার আনন্দ, দেহের যাকাত আদায়ের প্রশান্তি। কারণ তখন নফসের কষ্ট লাঘব হয়, অন্তর হালকা হয়ে আসে।</p>
<p><strong>“অন্য আনন্দটি হবে তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময় যখন সে তার প্রতিদান প্রত্যক্ষ করবে।”</strong></p>
<p>এ কারণেই বান্দাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এক মাস রোজা রাখতে, এরপর শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখতে যেন সে পুরো বছর রোজাদারের সওয়াব পায়। কারণ একটি সৎকর্মের প্রতিদান দশ গুণ। ত্রিশ দিন মানে তিনশ দিনের সমান, আর ছয় দিন মানে ষাট দিনের সমান।</p>
<p>&nbsp;যদি তার সারা জীবনের হিসাব এভাবে সিয়ামের উপর হয়, তাহলে বরকত তার উপর স্থায়ী হয়ে যাবে, সর্বদা কল্যাণ প্রবাহিত হতে থাকবে। যে ব্যক্তি এই সুন্নতের প্রতি আগ্রহী হয়, সে মূলত চায় তার নাফসের জন্য এই বরকত স্থায়ী হোক, যেন তার দেহ ও অন্তর উভয়ই পবিত্র, বিকশিত ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মূলঃ আল-হাকীম আত-তিরমিযী।</strong></p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মু. সাইফুদ্দিন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-real-purpose-of-fasting/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16680</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পরিভাষার পরিশুদ্ধিতে সৈয়দ নকিব আল-আত্তাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/syed-naqib-al-attas-on-the-refinement-of-terminology/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/syed-naqib-al-attas-on-the-refinement-of-terminology/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 06 Feb 2026 12:05:15 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16542</guid>

					<description><![CDATA[ভাষার বুননে এক অভিজাত মালয় দার্শনিকের সভ্যতার পুনর্জাগরণের অভিযাত্রা &#160; কুয়ালালামপুরের স্পন্দিত হৃদয়ে এক সবুজ শ্যামল অভিজাত এলাকা হিসেবে নিজের সগর্ব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বুকিত তুনকু। মালয়েশিয়ার আল্ট্রা-এলিট বা অতি-ধনিক শ্রেণির পছন্দের আবাসস্থল এটি। তাদের সুউচ্চ অট্টালিকা ও ভিলাগুলোর ভিড়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4 style="text-align: center;">ভাষার বুননে এক অভিজাত মালয় দার্শনিকের সভ্যতার পুনর্জাগরণের অভিযাত্রা</h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>কুয়ালালামপুরের স্পন্দিত হৃদয়ে এক সবুজ শ্যামল অভিজাত এলাকা হিসেবে নিজের সগর্ব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বুকিত তুনকু। মালয়েশিয়ার আল্ট্রা-এলিট বা অতি-ধনিক শ্রেণির পছন্দের আবাসস্থল এটি। তাদের সুউচ্চ অট্টালিকা ও ভিলাগুলোর ভিড়ে সেখানে হঠাৎ চোখে পড়ে এক আন্দালুসিয় স্থাপত্যের দূর্গ প্রাসাদ। যেন পঞ্চদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়াকে কেউ জাদুবলে তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে মালয় ক্রান্তীয় অঞ্চলের বুকে। এটি হলো &#8216;ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট অ্যান্ড সিভিলাইজেশন&#8217; (ISTAC)। পাহাড়ের চূড়ায় মশালের মত জ্বলতে থাকা এই স্থাপনাটি একজন সাধারণ দর্শকের চোখেও স্থাপত্যশৈলীর এক অপার বিস্ময়।</p>
<figure id="attachment_16546" aria-describedby="caption-attachment-16546" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img decoding="async" class="wp-image-16546 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC1.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16546" class="wp-caption-text">ISTAC এর গ্রাউন্ড, Sohail Nakhooda</figcaption></figure>
<p>১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ISTAC, বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার অবক্ষয়ের বিপরীতে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক জবাবের সূচনা করেছিল। অবাক করা বিষয় হলো এই প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা, নকশা, নান্দনিক ভূ-বিন্যাস এবং প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন একজনই—বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ, সৈয়দ মুহাম্মদ নকিব আল-আত্তাস।</p>
<p>আল-আত্তাস একটি ধ্রুব সত্যে বিশ্বাসী ছিলেন যে, ইসলাম একটি সভ্যতা হিসেবে তখনই বিকশিত হবে, যখন ভাষার মাধ্যমে &#8216;অর্থ&#8217; বা &#8216;মিনিং&#8217;-এর সঠিক বিন্যাস ঘটবে। সেটা বস্তুগত বা অবস্তুগত, সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি সভ্যতার পরিমাপ তো তার জ্ঞান-প্রক্রিয়াকরণ (knowledge-processing) সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের জটিলতার ওপরই নির্ভর করে। আজকের মুসলিম বিশ্বে নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদনের যে দুর্ভিক্ষ চলছে, তার কারণ অনুসন্ধান এবং এর প্রতিকারে নতুন সরঞ্জাম ও সংগঠন তৈরির তাগিদ থেকেই আল-আত্তাসের এই অভিযাত্রা।</p>
<p>এবং বলা বাহুল্য, এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সবচেয়ে গোছানো ও পদ্ধতিগত জবাবটি আল-আত্তাসের মাধ্যমেই এসেছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সৈয়দ মুহাম্মাদ নকিব আল আত্তাসের বেড়ে ওঠা</strong></h5>
<p>১৯৩১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া আল-আত্তাস ছিলেন জন্মগতভাবেই একজন অভিজাত। তার ধমনীতে বা’লাউই বংশধারার রক্ত প্রবহমান, যা ইয়েমেনের হাজরামাউত অঞ্চল থেকে উৎসারিত হয়ে ৩৭তম প্রজন্মে খোদ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। মাতৃকূলে তিনি তুর্কি অভিজাত রুকেয়া হানুমের মাধ্যমে জোহরের রাজপরিবারের সাথে যুক্ত। আবার তার মা, শরীফা রাকয়ান আল-আইদারুস ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার বোগোর অঞ্চলের সুন্দা রাজপরিবারের বংশধর।</p>
<figure id="attachment_16547" aria-describedby="caption-attachment-16547" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img decoding="async" class="wp-image-16547 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-1024x756.jpg" alt="" width="1024" height="756" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-1024x756.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-768x567.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas-1536x1135.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Naqib-AL-Attas.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16547" class="wp-caption-text">ISTAC এর স্থাপনাশৈলী পরিকল্পনার সময় নকিব আল-আত্তাস</figcaption></figure>
<p>শৈশবে আল-আত্তাস জাভার মাদ্রাসা এবং জোহরের ইংরেজি স্কুলের দোলাচলে বেড়ে ওঠেন। তার মামারা জোহরের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে মামাদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি দুর্লভ মালয় পাণ্ডুলিপি এবং পশ্চিমা ধ্রুপদী সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন। ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞান, পশ্চিমা ক্লাসিকস এবং মালয় সাহিত্যের এই ত্রিবেণী সম্মিলনই পরবর্তীকালে তার আজীবনের কাজের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।</p>
<p>যুক্তরাজ্যের স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি মালয়েশিয়ায় ফিরে আসেন এবং মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি Some Aspects of Sufism as Understood and Practised Among the Malays নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই কাজটি তাকে কানাডা কাউন্সিল ফেলোশিপ এনে দেয়, যার মাধ্যমে তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পান। সেখানেই তিনি হ্যামিল্টন গিব, এ.জে. আরবেরি, তোশিহিকো ইজুতসু, সাইয়্যেদ হোসেন নাসের এবং ফজলুর রহমানের মতো ইসলামী অধ্যয়নের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন।</p>
<p>পরবর্তীতে তিনি লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)-এ এ.জে. আরবেরি এবং মার্টিন লিংসের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সেসময়ে মালয়েশিয়ার হাতেগোনা কয়েকজন ডক্টরেটধারীর একজন হিসেবে তিনি দ্রুত মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন পদে আসীন হন। ১৯৭০ সালে তিনি মালয়েশিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এর মালয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের রূপরেখা তৈরি করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>গণ্ডির বাইরে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ</strong></h5>
<p>কানাডা ও লন্ডন থেকে ডক্টরেট এবং পাণ্ডিত্য নিয়ে ফিরে আসার পর, মালয়েশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে আল-আত্তাসের প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সেখানে ষাট ও সত্তরের দশকের একাডেমিক পরিবেশ ছিল বিভিন্ন মতবাদের এক রণক্ষেত্র। সদ্য স্বাধীন, দ্রুত শিল্পায়িত এবং জাতিগতভাবে সংবেদনশীল মালয়েশিয়ায় তখন তরুণরা নতুন পথের সন্ধানে ছিল। সেই সময়ে আল-আত্তাস এমন এক ইসলামি ডিসকোর্স বা বয়ান হাজির করলেন, যা একইসাথে অনড় রক্ষণশীলতা এবং আধুনিকতাবাদী সংস্কার—উভয় থেকেই ভিন্ন। আত্তাসের ধাঁচ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঋদ্ধ এবং সভ্যতার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ।</p>
<p>গোটা মুসলিম বিশ্ব তখন আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার সন্ধানে। নুসান্তারা (মালয় দ্বীপপুঞ্জ) অঞ্চলে ধর্মীয় স্রোত প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: ঐতিহ্যবাদী বা &#8216;কাউম তুয়া&#8217; এবং সালাফি বা ইখওয়ানি প্রভাবিত সংস্কারপন্থী বা &#8216;কাউম মুদা&#8217;। তরুণরা যখন ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বদর্শন বা &#8216;ওয়ার্ল্ড ভিউ&#8217; হিসেবে খুঁজছিল, তখন সংস্কারপন্থীদের প্রভাব বাড়ছিল।</p>
<p>এখানেই আল-আত্তাস ভিন্ন এক পথের দিশা দিলেন। তিনি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি, আবার আধুনিকতাকেও অন্ধভাবে আলিঙ্গন করেননি। তিনি ইসলামের সভ্যতার গভীরতাকে নতুন করে আবিষ্কারের ডাক দিলেন। তার কাছে ইসলামি ঐতিহ্য কোনো স্থবির অতীত নয়, বরং এটি এক গতিশীল ধারাবাহিকতা। তিনি তথাকথিত &#8216;সালাফ&#8217; বা পূর্বসূরিদের দোহাই দিয়ে বিগত এক হাজার বছরের জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্জনকে বাতিল করে দেননি। যদিও তার উচ্চমার্গীয় মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা কেবল ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু সামাজিকভাবে তার দর্শন এমন এক আত্মপরিচয় গড়ে তুলেছিল যা নির্দ্বিধায় ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে বিশ্বকে দেখতে শেখায়। যার মূল মালয় সংস্কৃতিতে প্রোথিত থাকলেও শাখা-প্রশাখা ছিল বিশ্বজনীন।</p>
<p>আল-আত্তাসের এই দর্শনের মূলে ছিল একটি গভীর সত্য: &#8220;যেকোনো সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হয় ভাষা এবং তার ধারণাগত স্থাপত্য (Conceptual Architecture) থেকে&#8221;।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ভাষা, চিন্তা ও সভ্যতা</strong></h5>
<p>অনেকেই ইসলামের ইতিহাসকে কেবল আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। কিন্তু আল-আত্তাস এখানে অনন্য। তিনি জোর দিয়েছেন ভাষার ওপর—বিশেষ করে কুরআনি আরবি ভাষার ওপর, যা ইসলামী সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি।</p>
<p>কুরআনি আরবির স্বচ্ছতা এর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। ত্রি-মাত্রিক &#8216;মাদ্দাহ&#8217; বা মূলধাতুর ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই ভাষার একটি সুশৃঙ্খল সেমান্টিক বা অর্থতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে। প্রতিটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট এবং স্থিতিশীল ধারণাগত পরিসীমা আছে। এই কাঠামোর কারণেই মুসলিম অভিধানপ্রণেতারা হাজার বছর ধরে কাজ করে একটি নিখুঁত, বিজ্ঞানসম্মত শব্দকোষ তৈরি করতে পেরেছেন। অর্থের এই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে যে, কুরআনি আরবি অন্যান্য ভাষার মতো নয়। এটা স্থান, কাল বা পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও একটি বস্তুনিষ্ঠ সত্যকে অবিকৃতভাবে বহন করতে পারে।</p>
<p>আল-আত্তাসের মতে, <strong>আরবি ভাষাকে কুরআনের ভাষা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণই হলো এর সহজাত স্বচ্ছতা। সেই সময়ে গ্রিকো-রোমান বা পারসিক ভাষাগুলোর মতো আরবি কোনো পৌরাণিক শব্দভাণ্ডারের ভারে ভারাক্রান্ত ছিল না। আরবী ছিল নির্ভুলভাবে ধারণা প্রকাশ করতে সক্ষম এক বিশুদ্ধ ভাষা।</strong> এই ভাষাগত &#8216;মিতব্যয়িতা&#8217; বা ইকোনমি ইসলামকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। এটি এমন এক বিশ্বদৃষ্টি তৈরি করেছিল যা আরবদের গণ্ডি পেরিয়ে পারসিক, আফ্রিকান, তুর্কি, এমনকি মালয়দেরও আকৃষ্ট করেছিল।</p>
<p>নুসান্তারা অঞ্চলেও এই ভাষাগত ও ধারণাগত স্বচ্ছতা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সেখানে সচেতনভাবে ও কৌশলগতভাবে মালয় ভাষাকে ইসলামের বাহন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। জাভানিজ ভাষার মতো এটি হিন্দু-বৌদ্ধ মহাকাব্যের অলঙ্কৃত শব্দভাণ্ডারে আচ্ছাদিত ছিল না। ইসলামের প্রচারকরা ধীরে ধীরে মালয় ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ আরবি পরিভাষা যুক্ত করেন, যাতে একটি নতুন &#8216;সেমান্টিক ফিল্ড&#8217; বা অর্থবোধক ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাদের গদ্য ব্যবহৃত হতো আকিদা বা বিশ্বাসের স্বচ্ছ বয়ানে, আর কবিতার সাথে থাকত গভীর ব্যাখ্যা। ফলে আরবদের মতো মালয়দের ক্ষেত্রেও ইসলাম এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। তারাও একটি মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে একটি সমৃদ্ধ লিখিত সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সভ্যতার ব্যাকরণ : দ্বীন &#8211; মদিনা &#8211; তামাদ্দুন </strong></h5>
<p>মৌখিক ঐতিহ্য থেকে লিখিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে এই রূপান্তর, একটি গভীর সভ্যতার যুক্তি বা &#8216;লজিক&#8217; উন্মোচন করে। আল-আত্তাস এই যুক্তিকে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত ধারণার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন: দ্বীন (ধর্ম), মদিনা (শহর) এবং তামাদ্দুন (সভ্যতা)।</p>
<p>ইংরেজিতে &#8216;Religion&#8217; শব্দটি এসেছে ল্যাটিন &#8216;religio&#8217; থেকে, যার অর্থ মানুষ ও দেবতার মধ্যকার বন্ধন। কিন্তু এই বন্ধনটি কী বা কীভাবে তা পালন করতে হবে, সে সম্পর্কে এটি স্পষ্ট কিছু বলে না। এই অস্পষ্টতা পশ্চিমা ধর্মীয় ইতিহাসে বহু বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। এর বিপরীতে, কুরআনি &#8216;দ্বীন&#8217; (যা সাধারণত ধর্ম হিসেবে অনূদিত হয়) শব্দটি دِ+ي+ن মূলধাতু থেকে এসেছে, যার সরাসরি সম্পর্ক &#8216;দাইন&#8217; বা ঋণের সাথে। মানুষের জীবনের অস্তিত্বের জন্য খোদার কাছে যে ঋণ, তা পরিশোধের সেরা উপায় হলো একটি সংগঠিত সমাজ—যেখানে আইন ও বিধিনিষেধ আছে।</p>
<p>অন্য কথায়, ঋণ পরিশোধের উপযুক্ত স্থান হলো শহর বা নগর। এই সামাজিক বিন্যাস প্রকাশ পায় &#8216;মদিনা&#8217; শব্দে, যা &#8216;মাদ্দানা&#8217; ক্রিয়া থেকে এসেছে। আর এই মাদ্দানা থেকেই এসেছে &#8216;তামাদ্দুন&#8217; বা সভ্যতা।</p>
<p><strong>নবীজি (সা.) যখন ইয়াসরিবে পৌঁছালেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে &#8216;আল-মদিনা&#8217; (দ্য সিটি) রাখলেন, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এখানেই মুসলিমরা শিখল কীভাবে খোদার প্রতি তাদের অস্তিত্বের ঋণ শোধ করতে হয়। হিজরত কেবল স্থান পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল ইসলামী ক্যালেন্ডার ও সভ্যতার সূচনা।</strong></p>
<p>আল-আত্তাস ফরাসি ইতিহাসবিদ নুমা ডেনিস ফাস্টেল দে কুলঞ্জেসের সূত্র ধরে উল্লেখ করেন, গ্রিক<strong> &#8216;পলিস&#8217; (শহর)</strong> কখনোই সর্বজনীন হতে পারেনি কারণ তাদের কোনো &#8216;ইউনিভার্সাল গড&#8217; বা একচ্ছত্র খোদার ধারণা ছিল না। কিন্তু মদিনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে &#8216;দ্বীন&#8217;-এর ওপর, যার শেকড় সেই আদিম প্রতিশ্রুতিতে (রোজ-এ-আলাস্ত)* প্রোথিত, যেখানে মানবজাতি সমস্বরে খোদার প্রভুত্ব স্বীকার করেছিল—&#8221;হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।&#8221; (আল-আরাফ ৭:১৭২)। তাই দ্বীন ও মদিনার ঐক্যের মধ্যেই একটি &#8216;কসমোপলিস&#8217; বা বিশ্বজনীন নগরের ধারণা নিহিত।</p>
<p>হাজার বছর ধরে মুসলিমদের দ্বীন, মদিনা এবং তামাদ্দুনের এই সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন হয়নি, কারণ এটিই ছিল তাদের যাপিত জীবন। একজন দ্বীনদার ব্যক্তি মানেই ছিলেন একজন সভ্য মানুষ। এমনকি মিরাজের মতো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার পরও নবীজি (সা.) তাঁর শহর মক্কায় ফিরে এসেছিলেন ইসলামের সভ্যতার কাজ চালিয়ে যেতে। একজন মুমিনের ঈমানের দাবিই হলো নিজেকে, নিজের চিন্তাকে এবং নিজের কাজকে সভ্যতার মানদণ্ডে বিচার করা।</p>
<p>আর এই চিন্তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের প্রথম পদক্ষেপ ছিল <strong>ISTAC</strong>।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><em>* ফুটনোট &#8211; <strong>রোজ-</strong><strong>এ-</strong><strong>আলাস্ত (روز الست):</strong> এটি সূফি মহলে বহুল প্রচলিত একটি ফারসি পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ— &#8216;আলাস্তু&#8217;-র সেই দিন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আরাফ-এর ১৭২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সেই মহান দিনকে এটি নির্দেশ করে, যেদিন সৃষ্টির আদিলগ্নে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত রূহকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, &#8220;আলাস্তু বিরাব্বিকুম?&#8221; (আমি কি তোমাদের প্রভু নই?)। উত্তরে সকল রূহ সমস্বরে সাক্ষ্য দিয়েছিল, &#8220;বালা!&#8221; (হ্যাঁ, অবশ্যই)। ইসলামী দর্শন ও সাহিত্যে মানুষের সাথে স্রষ্টার এই চিরন্তন ও আদিম প্রতিশ্রুতিকে &#8216;রোজ-এ-আলাস্ত&#8217; বা &#8216;মিছাক&#8217; (Covenant) হিসেবে অভিহিত করা হয়।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ISTAC: পাহাড়ের চূড়ায় প্রজ্জ্বলিত মশাল</strong></h5>
<blockquote><p><em>&#8220;মনে রেখো, আমরা এমন এক জাতি যারা আশা ও আত্মবিশ্বাস হারাতে অভ্যস্ত নই, এবং তার অনুমতিও আমাদের নেই। নিজেদের মধ্যে কলহ করা, ফাঁকা বুলি আওড়ানো আর নেতিবাচক আন্দোলন করে সময় নষ্ট করা আমাদের সাজে না, যখন যুগের আসল চ্যালেঞ্জ আমাদের গ্রাস করতে আসছে। আসল চ্যালেঞ্জটি বুদ্ধিবৃত্তিক, এবং এর বিরুদ্ধে ইতিবাচক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে—কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার দুর্গ থেকে নয়, বরং সঠিক জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার দুর্গ থেকে।&#8221;</em> — আল-আত্তাস, <em>Islam, Secularism, and the Philosophy of the Future</em> (১৯৭৮)</p></blockquote>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16548 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>দ্বীন ও তামাদ্দুনের এই ধারণাগত স্থাপত্যের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর। আর তখনই তা সমসাময়িক রাজনীতির মুখোমুখি হয়।</p>
<p>প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম অভিজাতদের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেওয়া হয়, যার ফলে জ্ঞান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং উচ্চ সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। এই শূন্যতায় বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনগুলো &#8216;ম্যাস মোবিলাইজেশন&#8217; বা গণজাগরণকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনী ক্ষমতা দখল এবং জাতিরাষ্ট্রের মাধ্যমে শরিয়া কায়েম করা।</p>
<p>আল-আত্তাস এই যুগের হুজুগ বা &#8216;zeitgeist&#8217;-কে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি শরিয়াকে কেবল নিছক আইনশাস্ত্রে (Jurisprudence) নামিয়ে আনার বিরোধী ছিলেন। তার মতে, সত্যিকারের সভ্যতার পুনর্জাগরণ শুরু হতে হবে জ্ঞানের স্তর থেকে, আর তার কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্ববিদ্যালয়।</p>
<p>ইসলামী স্বর্ণযুগে বায়তুল হিকমাহ, সুফি খানকাহ বা জাওয়িয়া এবং মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। আল-আত্তাসের মতে, এগুলো মসজিদের চারপাশে কেন্দ্র করে জ্ঞানের একটি সঠিক অনুক্রম বা হায়ারার্কি তৈরি করত—যার কেন্দ্রে থাকত &#8216;বিশ্বজনীন জ্ঞান’&#8217; বা চিরন্তন জ্ঞান (যেমন, জ্যোতির্বিদ্যা), এবং তা থেকে ছড়িয়ে পড়ত মানুষের উপকারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জ্ঞান (যেমন, মেডিসিন)। সভ্যতার নবায়নের জন্য সেই &#8216;কেন্দ্র&#8217; এবং তার উদ্দেশ্যকে ফিরিয়ে আনা জরুরি ছিল।</p>
<p>১৯৭৭ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে আল-আত্তাস তার এই যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি ফিলিস্তিনি-আমেরিকান পণ্ডিত ইসমাইল রাজি আল-ফারুকির কাছে তার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাসম্বলিত একটি পাণ্ডুলিপি অর্পণ করেন। এই ঘটনাটি পরবর্তীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।</p>
<figure id="attachment_16549" aria-describedby="caption-attachment-16549" style="width: 392px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16549 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Ismail-Raji.jpg" alt="" width="392" height="493" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Ismail-Raji.jpg 608w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Ismail-Raji-239x300.jpg 239w" sizes="(max-width: 392px) 100vw, 392px" /><figcaption id="caption-attachment-16549" class="wp-caption-text">ইসমাইল রাজী আল-ফারুকি, IIIT এর প্রতিষ্ঠাতা</figcaption></figure>
<p>আল-আত্তাস এবং আল-ফারুকির বন্ধুত্ব ষাটের দশকের শুরুতেই জমে ওঠে। ১৯৭৪ সালে আল-আত্তাস আল-ফারুকিকে এক বক্তৃতায় অংশ নিতে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে স্থানীয় মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি তখন &#8216;আবীম&#8217; (ABIM) বা মালয়েশীয় ইসলামি যুব আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তীতে আল-ফারুকিও টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে আল-আত্তাসকে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমন্ত্রণ জানান এবং &#8216;অ্যাসোসিয়েশন অফ মুসলিম সোশ্যাল সায়েন্টিস্টস&#8217; (AMSS)-এর একটি বড় সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেন। আল-আত্তাসের সেই বক্তৃতা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। আল-ফারুকি তখন লিখেছিলেন যে, আল-আত্তাসই হয়ে উঠেছেন এই সংগঠনের &#8220;raison d&#8217;être&#8221; বা &#8220;অস্তিত্বের মূল কারণ&#8221;। তিনি বলেছিলেন:</p>
<blockquote><p><em>&#8220;কনভেনশনে আপনার পারফরম্যান্স সম্পর্কে কার্যনির্বাহী বোর্ডের সদস্য এবং অসংখ্য মুসলিম ভাইদের মতামত জানতে চেয়েছিলাম—তারা সবাই আপনাকে নিয়ে গর্বিত&#8230; আপনিই মূলত AMSS। ইসলামী চিন্তাধারাকে আপনার শাণিত করা এবং জ্ঞানের ঐতিহ্যে আপনার অবদানই হলো এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য।&#8221;</em></p></blockquote>
<p>তবে শীঘ্রই তাদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। আল-ফারুকির অনুরোধে আল-আত্তাস &#8220;সেকুলারিজমের সাথে সংলাপ&#8221; (Dialogue with Secularism) শিরোনামে ৪০,০০০ শব্দের একটি পাণ্ডুলিপি লিখে প্রকাশের জন্য তার কাছে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপির ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে আল-আত্তাসের বারংবার জিজ্ঞাসার কোনো জবাব আসেনি। আল-আত্তাস লক্ষ্য করতে শুরু করেন যে, তার ধারণাগুলো কোনো কৃতজ্ঞতা স্বীকার ছাড়াই বিকৃত আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে তিনি নিজেই তার যুগান্তকারী কাজ<strong> <em>&#8216;ইসলাম, সেকুলারিজম অ্যান্ড দ্য ফিলোসফি অফ দ্য ফিউচার&#8217;</em> </strong>বইয়ের অংশ হিসেবে এটি প্রকাশ করেন এবং ভূমিকার মুখবন্ধে <strong>&#8220;বুদ্ধিবৃত্তিক চোর (plagiarists) ও ভণ্ডদের&#8221;</strong> দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এক তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।</p>
<p>এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছেদ ছিল অত্যন্ত মৌলিক। এটি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অবমাননা ছিল না, বরং আল-ফারুকির সাথে তার দর্শনের গভীর ফাটলও স্পষ্ট করে দিয়েছিল। আল-ফারুকির কাছে &#8220;জ্ঞানের ইসলামীকরণ&#8221; ছিল মূলত আধুনিক বিষয়গুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নতুন পাঠ্যবই তৈরি করা। সহজ কথায়, তিনি আধুনিক ডিসিপ্লিনগুলোকে &#8220;ইসলামী&#8221; মোড়কে নতুন করে লিখতে চেয়েছিলেন।</p>
<p><strong>আল-আত্তাস একে অগভীর বা ভাসাভাসা মনে করতেন। তার মতে, জ্ঞান দাঁড়িয়ে থাকে শব্দভাণ্ডার বা পরিভাষার ওপর। মুসলিম বিশ্বদৃষ্টিকে গঠনকারী মূল পরিভাষাগুলোর সংশোধন (Rectification) ছাড়া ইসলামীকরণ প্রজেক্টটি কেবল কিছু কুরআনের আয়াত সংবলিত পাঠ্যবইয়ে পর্যবসিত হবে, যেখানে মূল ধারণাগত সততা বা &#8216;কনসেপচুয়াল ইন্টেগ্রিটি&#8217; থাকবে না। মানুষের পূর্ণাঙ্গ সত্তার প্রতিফলন ঘটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পুনর্গঠন না করলে এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে তাদের সঠিক অনুক্রমে (Hierarchy) ফিরিয়ে না আনলে মুসলিম মানসের বিভ্রান্তি দূর হবে না।</strong></p>
<p>এই বিভাজন শীঘ্রই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১৯৮২ সালে ওআইসি (OIC) সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ &#8216;জ্ঞানের সমন্বয়&#8217; (Integration of knowledge)-এর জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব দেন। মাহাথিরের এই প্রস্তাব ছিল আল-ফারুকির &#8216;ইসলামীকরণ&#8217; ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি—যে পরিভাষাটি আল-আত্তাসের দাবি অনুযায়ী তার মূল কাজ থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। আটটি মুসলিম দেশের সমর্থনে পরের বছর &#8216;ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া&#8217; (IIUM) প্রতিষ্ঠিত হয়। মাহাথিরের সাথে আল-ফারুকির ঘনিষ্ঠতাই IIUM-এর গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আল-আত্তাসের নিজ দেশে হলেও তা শেষ পর্যন্ত ফারুকির চিন্তাধারারই প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>তবে ১৯৮৭ সালে আল-আত্তাস তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এক অভাবনীয় সুযোগ—প্রায় এক &#8216;একচ্ছত্র কর্তৃত্ব&#8217; লাভ করেন। দীর্ঘকাল ধরে তিনি যে ছাত্র ও তরুণ বুদ্ধিজীবীদের গড়ে তুলেছিলেন, তা এক অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে।</p>
<p>ABIM- Malaysian Islamic Youth Movement এর সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং আল-আত্তাসের সম্ভবত সবচেয়ে প্রখ্যাত শিষ্য আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশীয় রাজনীতিতে তখন উল্কার গতিতে উত্থান ঘটিয়েছেন। আনোয়ারের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে আবীম তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে (আনোয়ারের প্রভাবে কৌতুক করে অনেকে ABIM-কে ‘আনোয়ার বিন ইব্রাহিম মুভমেন্ট’ বলেও ডাকত)। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণের ঢেউ এবং মালয়েশিয়ার নতুন মালয় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান—এই দুই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আবীম তখন জনমত গঠনে এক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>১৯৮২ সালে আনোয়ার যখন মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন মালয়েশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক মেলবন্ধনের সূচনা হয়—যার নেপথ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন আল-ফারুকি। শাসনযন্ত্রের ভেতরে ঢুকে আনোয়ার একের পর এক মন্ত্রিত্বের পদ ব্যবহার করে একটি ব্যাপক &#8216;ইসলামীকরণ কর্মসূচি&#8217; এগিয়ে নিতে থাকেন—ইসলামী অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামের প্রতিফলন ঘটানো পর্যন্ত। ১৯৮৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর, তিনি আল-আত্তাসকে প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক করে ISTAC প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেন। যদিও ISTAC কারিগরিভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তবে এটি IIUM-এর অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়।</p>
<p><strong>১৯৯০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা নিবেদন করে পবিত্র মিরাজের রাতে ISTAC-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। আল-আত্তাস নিজে এর প্রতিটি অংশের নকশা করেছিলেন। সিলিং-এর মুকারনাস থেকে শুরু করে উঠোনের ফোয়ারা—সবকিছুতেই ছিল আল-আত্তাসের সেই উচ্চমার্গীয় ইসলামী সংস্কৃতির ছাপ, যা তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন।</strong></p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16551 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC3.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16550 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC2.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16552 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-1024x684.jpg" alt="" width="1024" height="684" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-1024x684.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-768x513.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4-1536x1025.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC4.jpg 1600w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<figure id="attachment_16553" aria-describedby="caption-attachment-16553" style="width: 768px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16553 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-768x1024.jpg" alt="" width="768" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-768x1024.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-225x300.jpg 225w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5-1152x1536.jpg 1152w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC5.jpg 1200w" sizes="(max-width: 768px) 100vw, 768px" /><figcaption id="caption-attachment-16553" class="wp-caption-text">ISTAC এর গ্রাউন্ড, Sohail Nakhooda</figcaption></figure>
<p>ISTAC প্রতিষ্ঠার মাত্র এক দশক পর, ১৯৯৭ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমের বরখাস্ত হওয়ার ঘটনায় পুরো মালয়েশিয়া কেঁপে ওঠে। তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী আনোয়ারের এই পতন ছিল আকস্মিক। এশীয় অর্থনৈতিক সংকট (Asian Financial Crisis) মোকাবিলা নিয়ে সরকারের দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব—মাহাথির এবং তার ডেপুটি আনোয়ারের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। আনোয়ার চেয়েছিলেন পুঁজি বাজারকে শান্ত করতে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে; অন্যদিকে মাহাথির চেয়েছিলেন সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের হটিয়ে দিতে শক্তিশালী আর্থিক সহায়তা এবং কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণ। যা ছিল স্রেফ এক যান্ত্রিক বা টেকনোক্র্যাটিক দ্বিমত, তা দ্রুতই ব্যক্তিগত তিক্ততায় রূপ নেয়—এমন এক সংঘাত, যার ছায়া আজও দেশটির রাজনীতির ওপর বিস্তৃত। ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আনোয়ার ইব্রাহিমকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়।</p>
<figure id="attachment_16556" aria-describedby="caption-attachment-16556" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16556 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-1024x681.jpg" alt="" width="1024" height="681" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-1024x681.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1-768x511.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/Mahathir-1.jpg 1154w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16556" class="wp-caption-text">তরুণ আনোয়ার ইব্রাহিম (বামে) এবং মাহাথির মোহাম্মদ (ডানে), এশিয়া সেন্টিনেল</figcaption></figure>
<p>কিন্তু ১৯৯৭ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমের পতন এবং মাহাথিরের সাথে তার সংঘাতের ফলে আল-আত্তাসও রাজনৈতিক রোষানলে পড়েন। মাহাথির আধুনিকতাবাদী এবং আল-ফারুকির মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন, ফলে তিনি আল-আত্তাসের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখাননি। ২০০২ সালে আল-আত্তাসকে ISTAC থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি তার স্বায়ত্তশাসন হারায়।</p>
<p>অথচ ছাত্র নির্বাচনে কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখা সত্ত্বেও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, <strong>মাত্র এক দশকে ISTAC এমন সব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছিল যারা আজ বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী। তাদের মধ্যে রয়েছেন তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (MIT) বর্তমান পরিচালক ইব্রাহিম কালিন এবং বসনিয়ার সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি মুস্তফা চেরিচ।</strong> ইসলামী সভ্যতার মৌলিক অথচ বিমূর্ত উপাদানগুলো—যেমন শিক্ষার ধারণা, বিজ্ঞানের দর্শন এবং মানব আত্মার মনস্তত্ত্বের ওপর ISTAC অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা গ্রন্থ (Monographs) প্রকাশ করেছিল; যা পরবর্তীতে আরবি, ফারসি, তুর্কি, চীনা, রুশ এবং বসনিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই অ্যানমারি শিমেল, সাইয়্যেদ হোসেন নাসের এবং জাভেদ ইকবালের মতো বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এমনকি তরুণ হামজা ইউসুফও এর অনুরাগী ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে জায়তুনা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>একবিংশ শতাব্দীর জন্য শিক্ষা ও প্রতিফলন</strong></h5>
<p>ISTAC-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুগুণে বিস্তৃত আল-আত্তাসের আজীবনের সাধনা আমাদের সামনে গভীর চিন্তার খোরাক রেখে গেছে। তার <strong>&#8216;দ্বীন-মদিনা-তামাদ্দুন&#8217;</strong> ফ্রেমওয়ার্ক ধর্মের সমসাময়িক সেক্যুলার শ্রেণীবিন্যাস থেকে মুক্তি খোঁজে এবং ইসলামকে একইসাথে একটি ধর্ম ও সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তার মতে, ইসলাম একইসাথে গভীরভাবে ব্যক্তিগত, অধিবিদ্যক (Metaphysical) এবং মনস্তাত্ত্বিক (Psychological); আবার পুরোপুরি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতাগত। ইসলাম যেমন পবিত্রতার (Sacred) কেন্দ্রবিন্দুকে ধারণ করে, তেমনি এর পরিধি পার্থিব জগত (Profane) অবধি বিস্তৃত। একজন মুসলিম নিজেকে গুরুত্বের সাথে &#8216;মুসলিম&#8217; বলে দাবি করতে পারেন না, যদি না তিনি নাগরিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এবং মানবতার সম্মুখভাগে থাকা বিশ্বজনীন সমস্যাগুলো সমাধানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন।</p>
<p>যেহেতু আমাদের &#8216;দ্বীন&#8217;—অর্থাৎ খোদা ও মানুষের মধ্যকার ঋণের বন্ধন—সেই &#8216;রোজ-এ-আলাস্ত&#8217;-এর আদিম প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে (কেউ তা স্বীকার করুক বা না করুক), তাই যারা এই চুক্তিতে বিশ্বাস করেন, সেই মুসলিমদের ওপর এটি আবশ্যিক যে তারা মানবতার বৃহত্তর সমস্যাগুলো সমাধানে অবদান রাখবেন। ফলে মানবতার নৈতিক ও বস্তুগত সংকটগুলো—যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়, জনমিতিক পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্যের মহামারী এবং অভূতপূর্ব প্রাচুর্যের মুখে চরম অসমতা—মুসলিমদের আলোচনার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত।</p>
<p>এটি অর্জন করতে হলে মুসলিমদের কেবল এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বুঝলেই হবে না (যা আল-আত্তাস তার <em>&#8216;ইসলাম অ্যান্ড সেকুলারিজম&#8217;</em> বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন), বরং গত তিন শতাব্দীতে বিশ্বকে আমূল বদলে দেওয়া বস্তুগত বাস্তবতাগুলোকেও বুঝতে হবে। আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে জ্ঞান উৎপাদনের অগ্রভাগে থাকা মুসলিম চিন্তাবিদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত বিশ্বের &#8216;বেস লেয়ার&#8217; বা মূল ভিত্তিগুলো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখা। আর এর জন্য প্রয়োজন কেবল &#8216;ইসলামিক স্টাডিজ&#8217;-এর গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের &#8216;বেস লেয়ার&#8217; বা মূল ভিত্তিগুলো (যেমন: এনার্জি সিস্টেম, ফাইন্যান্স, জিওপলিটিক্স) বোঝা।</p>
<p>অগ্রগামী চিন্তাবিদদের (Frontier thinkers) পক্ষে কেবল &#8216;ইসলামিক স্টাডিজ&#8217;-এর সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা আর সম্ভব নয়। আল-আত্তাসের &#8216;জ্ঞানের ইসলামীকরণ&#8217; প্রকল্পের উদ্দেশ্য মুসলিমদের গোত্রবাদী বা প্রাদেশিক করে তোলা ছিল না। তার ধারণাগুলোকে পর্যাপ্ত প্রেক্ষাপট ছাড়াই কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক বা তুচ্ছ রাজনৈতিক খুটিনাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা মানে তার উত্তরাধিকারের (Legacy) প্রতি চরম অবিচার করা।</p>
<p>বিস্ময় ও আত্ম-সংশয়ের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া মুসলিমদের চালিত করতে আল-আত্তাস আমাদের শব্দভাণ্ডার ও আত্মবিশ্বাসের সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ওহীর ওপর ভিত্তি করে শব্দগুলোর পুনর্ব্যাখ্যা করতে হয়—যাতে আমরা বাইরের জগতের সেরা জিনিসগুলো ছেঁকে নিতে পারি, এবং কৌতূহল ও প্রত্যয়ের সাথে নতুন পথে পা বাড়াতে পারি।</p>
<p>প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আল-আত্তাসের কৌশল একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতা পুনর্জাগরণের যেকোনো প্রচেষ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। যুগের চেয়ে অগ্রবর্তী থেকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন যে জ্ঞান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো সভ্যতা নবায়নের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে তিনি এও স্বীকার করেছিলেন যে, তার পরিকল্পিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি অনিবার্যভাবে পরীক্ষামূলক হবে এবং এতে ভুল সংশোধন ও নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়বে। এই বিশালত্বের সমস্যার সমাধানে আমাদের অবশ্যই সভ্যতার পরিবর্তনের একটি সুদীর্ঘ মেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি (longue durée view) গ্রহণ করতে হবে।</p>
<p>ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আল-আত্তাসের ধারণা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্থায়ী কেন্দ্রটিকে ফিরিয়ে আনা যা ব্যক্তির নিজের প্রতিচ্ছবি—যা জ্ঞানের একতা বজায় রাখবে এবং এর লক্ষ্যের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য স্পষ্ট করবে। এই পরিবেশে অর্জিত প্রতিটি বিশেষায়িত জ্ঞানই এই মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করবে। তবে এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, গত তিন শতাব্দীকে যা আলাদা করেছে তা কেবল জ্ঞানের অগ্রভাগের ছোটখাটো উদ্ভাবন নয়, বরং প্রকৃতি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই উদ্ভাবনগুলোর ‘শিল্প-পর্যায়ে পদ্ধতিগত প্রয়োগ’। এই প্রক্রিয়াই আমাদের ক্রমবর্ধমানভাবে মার্শাল হজসনের ভাষায় একটি &#8216;প্রযুক্তি-নির্ভর&#8217; (technicalistic) সমাজে বন্দি করে ফেলেছে।</p>
<p>এমনকি একটি ইতিবাচক পরিস্থিতিতে যদি আল-আত্তাসের ভিশন অনুযায়ী জ্ঞানের সঠিক অনুক্রম ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিতও হয়, তবুও মুসলিমরা মানবতার স্তরে কার্যকর পরিবর্তন তখনই আনতে পারবে যখন—এই বিশ্বদৃষ্টিকে বৃহত্তর পরিসরে বস্তুগত বা মেটেরিয়াল লেভেলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।</p>
<p>এটি অর্জনের জন্য মুসলিমদের কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা কল্পনা করা উচিত? কীভাবে আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করব, টিকিয়ে রাখব এবং বড় করব? আমরা কি এখনও ISTAC-এর মতো জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর নির্ভর করব? আল-আত্তাসের মতো স্বপ্নদ্রষ্টাদের কি সরকারের ভেতর এমন কোনো উচ্চপদ দেওয়া উচিত—যেমনটি চীনের সরকারে ওয়াং হুনিং-এর অবস্থান—যাতে ভিশনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে? নাকি আমাদের উচিত সেই হারিয়ে যাওয়া অভিজাত মুসলিমদের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা? যদি তাই হয়, তবে একটি সম্মানজনক উচ্চ-সংস্কৃতি (High culture) পুনর্নির্মাণের জন্য কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যাতে মুসলিম অভিজাতরা একত্রিত হতে আগ্রহী হন? এগুলো কঠিন প্রশ্ন যার কোনো সহজ উত্তর নেই, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার পুনর্জাগরণের যেকোনো সিরিয়াস প্রচেষ্টার জন্য এগুলো অত্যন্ত জরুরি।</p>
<figure id="attachment_16554" aria-describedby="caption-attachment-16554" style="width: 1024px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16554 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-1024x687.jpg" alt="" width="1024" height="687" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-1024x687.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-300x201.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6-768x515.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/ISTAC6.jpg 1246w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /><figcaption id="caption-attachment-16554" class="wp-caption-text"><span style="color: #3366ff;"><a style="color: #3366ff;" href="https://humanities.utm.my/casis/" target="_blank" rel="noopener">RZS CASIS</a></span></figcaption></figure>
<p>আল-আত্তাস এখন ৯৪ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। সম্ভবত তার সর্বশেষ বই, <em>&#8216;ইসলাম: দ্য কভেন্যান্টস ফুলফিলড&#8217;</em>, দুই বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের এই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের কোনো একক জাদুকরী সমাধান হয়তো কারোর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়, তবে আল-আত্তাস নিঃসন্দেহে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি প্রশস্ত করে দিয়েছেন।</p>
<blockquote><p>&#8220;তারা হলেন সেই মশাল যা দুর্গম পথে আলো দেখায়; আমাদের হাতে যখন এমন মশাল আছে, তখন মোমবাতির আর কী প্রয়োজন?&#8221;</p></blockquote>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/hisham_al_noman/">হিশাম আল নোমান। </a></p>
<p><strong>লেখক পরিচিতি:</strong> মোহাম্মদ বিন আব্দুল মজিদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কৌশলবিদ (Strategist) হিসেবে যোগদানের আগে তিনি মালয়েশীয় ফেডারেল সরকারে &#8216;পলিসি ইকোনমিস্ট&#8217; বা নীতি-অর্থনীতিবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি কুয়ালালামপুরে বসবাস করছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অধিকতর পাঠের জন্য:</strong></p>
<ul>
<li>Islam, Secularism, and the Philosophy of the Future, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>The Concept of Education, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>Islam: The Covenants Fulfilled, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>Preliminary Statement on a General Theory of the Islamization of the Malay Archipelago, Syed Muhammad Naquib Al-Attas</li>
<li>ISTAC Illuminated: A Pictorial Tour, Sharifah Shifa Al-Attas</li>
<li>The Origins of Malay Nationalism, William Roff</li>
<li>Islamic Revivalism in Malaysia: Dakwah among the Students, Zainah Anwar</li>
<li>The Educational Philosophy and Practice of Syed Muhammad Naquib Al-Attas: An Exposition of the Original Concept of Islamization, Wan Mohd Nor Wan Daud</li>
<li>Islamization of Knowledge, Ismail Al-Faruqi and Abdul Hamid Abu Sulayman</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/syed-naqib-al-attas-on-the-refinement-of-terminology/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16542</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ফিকহুল মীযান (প্রথম পর্ব)</title>
		<link>https://rowyakbd.com/fiqhul-mizan-part-1/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/fiqhul-mizan-part-1/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. আলী আল কারাদাগী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Sep 2025 17:01:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মাকাসিদ আশ শারীয়াহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16144</guid>

					<description><![CDATA[ফিকহুল মীযান —সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আকীদা ইত্যাদি সমস্ত বিষয় পরিগ্রহ করে আছে। মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য হিসেবে এই সমস্ত বিষয়গুলো আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উম্মাহর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে উম্মাহ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কেননা, যে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ফিকহুল মীযান —সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আকীদা ইত্যাদি সমস্ত বিষয় পরিগ্রহ করে আছে। মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য হিসেবে এই সমস্ত বিষয়গুলো আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উম্মাহর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে উম্মাহ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কেননা, যে ব্যক্তি মুসলমানদের নিয়ে চিন্তা করে না, সে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। ফিকহুল মীযান নিয়ে কলম ধরতে এ বিষয়টিই আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ রব্বুল আলামীন পারস্পরিক বিরোধ দূর করে একে অপরের বন্ধন মজবুত করতে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল করেছেন। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিলের অন্যতম মূল মাকসাদ এটি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ সদস্য এই মাকসাদ থেকে যোজন-যোজন দূরে অবস্থান করছে।</p>
<p>খারেজী, মুতাযিলা, মুরজিয়া, জাবরিয়া, কাদরিয়া, বাতিনিয়্যাহ-সহ হাল আমলের আল-কায়েদা, আইএস, বোকো হারাম এবং এদের থেকে জন্ম নেওয়া নামসর্বস্ব তথাকথিত ইসলামী সংগঠন এবং অন্যান্য ইসলামী সংগঠন যেমন—সালাফী, ইখওয়ান, তাবলীগ—এরা প্রত্যেকেই মানদণ্ড হিসেবে কোরআনকে গ্রহণ করে এবং নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করতে কোরআন থেকে দলীল দেয়। এমনকি আমরা দেখেছি, উগ্র জঙ্গিবাদী সংগঠন আইএসও নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে কোরআন থেকে প্রচুর পরিমাণে উদ্ধৃতি দেয়।</p>
<p>আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে কোনো ধরনের অসঙ্গতি নেই, নেই কোনো ফাঁকফোকরের বালাই। কেননা, এ গ্রন্থ পরাক্রমশালী, হাকীম এবং প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। এ কিতাব মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত এবং সমগ্র মানবতার হেদায়েতের উৎস। এটা যেমন আমার বিশ্বাস, তেমনি প্রত্যেক মুসলমানেরও বিশ্বাস।</p>
<p>কিন্তু তা সত্ত্বেও নসের (Text) অপব্যাখ্যার ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। নস কেন অপব্যাখ্যার স্বীকার হচ্ছে এর কারণটা আমি ঠিকঠাক ধরতে পারছিলাম না। আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে এর কারণ খোঁজা শুরু করি। ফলাফল হিসেবে যা পাই, তা-ই আমাদের এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। আমরা বুঝতে পারি, মীযানে অসঙ্গতির ফলে নস অপব্যাখ্যার স্বীকার হচ্ছে।</p>
<p>সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন—</p>
<p>لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِالۡبَیِّنٰتِ وَاَنۡزَلۡنَا مَعَهُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ</p>
<p>অর্থ : “আমি আমার রসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছি। তাদের সাথে কিতাব ও মীযান নাজিল করেছি যাতে মানুষ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।”</p>
<p>প্রত্যক্ষভাবে কিতাব এবং মীযান উভয়ই বোধ, চিন্তা, আকীদা, ইবাদত, আচার-অনুষ্ঠান, আখলাক, পারস্পরিক আচার-আচরণ এবং লেনদেন ইত্যাদিতে ইনসাফ, আদালত এবং মধ্যমপন্থা নিশ্চিত করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়া’লা কিতাবের সাথে মীযানও নাজিল করেছেন। কারণ মধ্যমপন্থা, আদালত, ফাহ্ম, তাসাউফ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে এবং ইখতিলাফ দূর করতে কিতাবের সাথে মীযানও প্রয়োজন।</p>
<p>আমি প্রায় একশত পঞ্চাশটি তাফসীর গ্রন্থ সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ এই ‘মীযান’ শব্দের ব্যাখ্যা তালাশ করা শুরু করি। অধিকাংশ মুফাসসির মীযানের তাফসীর করেছেন বস্তুগত মীযান অর্থে। মীযান শব্দকে তারা শস্য অথবা সীমা-পরিসীমা ‘নির্ধারক’ হিসেবে তাফসীর করেছেন। তারা আকলের মীযানকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। মীযান বা স্কেল দিয়ে বস্তুর পরিমাপ করা—এটা মানুষের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। তবে মীযান সীরাতে মুস্তাকীমের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের হেদায়াতের সাথে সম্পৃক্ত মীযানই প্রকৃত মীযান। ব্যক্তি যেন সীরাতে মুস্তাকীমের পথে সহজে চলতে পারে, যেন ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থিতিশীল হতে পারে, মীযান তা নিশ্চিত করে।</p>
<p>ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.)-সহ আরও কয়েকজন আলেম মীযানের অর্থ করেছেন আদল। এটিও মীযানের সামগ্রিক অর্থ বহন করে না। কারণ এটি পূর্বের অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করে। وَاَنۡزَلۡنَا مَعَهُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ আমরা তাদের কাছে কিতাব ও মীযান নাজিল করেছি।  لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ -যাতে মানুষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। এখানে قسط মানে ন্যায়বিচার। জুলুম অপসারণ করে ন্যায়বিচার—আদালত নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে সামনে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>ইমাম মাতুরিদীসহ অনেক আলেম মীযানের এর অর্থ করেছেন আকল। এ অর্থটিও মীযান পরিভাষাকে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করে না। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন যখন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তখন তাকে আকলসমেত-ই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আকল একটি বিদ্যমান বিষয়। সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ এর অধিকারী হয়ে থাকে—নাজিল করার প্রয়োজন পড়ে না।</p>
<p>এই পৃথিবীর সবকিছুরই নিজস্ব মীযান রয়েছে। বিদ্যুত পরিমাপের যেমন মীযান বা পরিমাপক রয়েছে, তেমনি পানিরও মীযান বা পরিমাপক রয়েছে। আমি বা আপনি বিদ্যুৎ পরিমাপক অ্যামিটার দিয়ে পানি মাপতে পারবো না, আবার পানি মাপার পরিমাপক—হাইড্রোমিটার দিয়ে বিদ্যুৎ পরিমাপ করতে পারবো না। লোহা পরিমাপ করার যেমন স্কেল রয়েছে, তেমনি স্বর্ণ পরিমাপেরও নিক্তি রয়েছে। লোহা পরিমাপ করার স্কেল অথবা শস্য পরিমাপ করার মিটার দিয়ে কখনোই স্বর্ণ পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এই মহাবিশ্বের সবকিছুরই যেমন ওজন রয়েছে, তেমনি তা পরিমাপেরও ভিন্ন ভিন্ন পরিমাপক রয়েছে। যার ওজন রয়েছে, অবশ্যই তার পরিমাপের যন্ত্রও রয়েছে। সূরা রহমানে একথাটিই বলা হয়েছে—</p>
<blockquote><p>اَلرَّحۡمٰنُ. عَلَّمَ الۡقُرۡاٰنَ. خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ. عَلَّمَه الۡبَیَانَ. اَلشَّمۡسُ وَالۡقَمَرُ بِحُسۡبَانٍ. وَّالنَّجۡمُ وَالشَّجَرُ یَسۡجُدٰنِ. وَالسَّمَآءَ رَفَعَها وَوَضَعَ الۡمِیۡزَانَ. اَلَّا تَطۡغَوۡا فِی الۡمِیۡزَانِ. وَاَقِیۡمُوا الۡوَزۡنَ بِالۡقِسۡطِ وَلَا تُخۡسِرُوا الۡمِیۡزَانَ</p>
<p>অর্থ : “পরম দয়ালু আল্লাহ এ কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা শিখিয়েছেন। সূর্য এবং চন্দ্র একটি হিসাবের অনুসরণ করছে। এবং তারকারাজি ও গাছপালা সব সিজদাবনত। আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মীযান কায়েম করেছেন। এর দাবি হলো তোমরা মীযানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না। ইনসাফের সাথে সঠিকভাবে ওজন করো এবং ওজনে কম দিও না।” <span style="font-size: 16px;">(সূরা রহমান : ১-৯)</span></p></blockquote>
<p>ইসলামী শরীয়ত মীযানের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মীযান শব্দটি ইসমে জিনস। الميزان এর ال টি কেউ বলেছেন জিনসী, কেউ বলেছেন ইসতিগরাকী। কোরআনে নয় বার মীযান শব্দটি এসেছে।</p>
<p><strong>এ মহাবিশ্বে যা কিছু রয়েছে, তার প্রত্যেকের মীযান রয়েছে। ইসলামী শরীয়তেরও মীযান রয়েছে। যখন পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন নির্দিষ্ট মীযান দিয়েই করা হয়েছে। দুনিয়া সম্পর্কিত আয়াতের যেমন মীযান রয়েছে, তেমনি আখেরাত সংক্রান্ত আয়াতেরও মীযান রয়েছে। তবে দুনিয়া এবং আখেরাতের মীযানে বেশকম আছে।</strong></p>
<p>দুনিয়ার প্রজ্জ্বলিত আগুনে কোনো ব্যক্তিকে ফেলে দিলে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই সে জ্বলে-পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। কিন্তু আখেরাতের চিরস্থায়ী আগুন এই নিয়মের ব্যতিক্রম। পরকালে যে মানুষগুলো চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে—</p>
<p>“যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তৎক্ষণাৎ তার স্থলে নতুন চামড়া বদলে দেওয়া হবে, যাতে তারা শাস্তি উপভোগ করতে পারে।” (সূরা নিসা : ৫৬)</p>
<p>দুনিয়াতে খাওয়া-দাওয়ার পরে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের দরকার হয়। কিন্তু আখেরাতে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের ঝামেলা থাকবে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মীযানের ধরনেও আল্লাহ সুনিপুণ একটা পার্থক্য তৈরি করে রেখেছেন।</p>
<p>একটি বিষয় বলে রাখা ভালো। মুতাযিলারা মীযানুশ শাহেদ  এবং মীযানুল গায়েব  এর মধ্যেকার পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে আমরা আমাদের রব আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে দেখতে পাবো। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত এই বিশ্বাস রাখে, হাদীসেও এমনটা বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু মু’তাজিলাদের মতে, আমরা দেখতে পাবো না। কারণ হিসেবে তারা বলে, কোনো কিছু দেখতে চাইলে তাতে আলোর প্রতিবিম্ব পড়তে হবে। আর আলোর প্রতিবিম্ব সেটাতেই পড়ে, যেটা জিসম বা জাওহার।</p>
<p>মুতাযিলারাদের এই যুক্তির জবাবে আমরা বলি, দুনিয়ার চোখ আর পরকালের চোখের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা রয়েছে। এই পৃথিবীর চোখের নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ থাকে। হতে পারে সেটা পঞ্চাশ বা শত বছর। কিন্তু পরকালীন চোখের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ নেই। কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই সে চোখ অমর।</p>
<p>তাহলে দেখা যাচ্ছে অবস্থার পরিবর্তনে মীযানেরও পরিবর্তন হয়। সুতরাং মীযানের সঠিক প্রয়োগ না হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। উদাহরণ হিসাবে আমরা বলতে পারি, কোনো ব্যক্তি লোহা পরিমাপ করার যন্ত্র দিয়ে সোনা পরিমাপ করার চেষ্টা করলে সঠিক পরিমাপ করতে তিনি ব্যর্থ হবেন। কারণ, ঐ যন্ত্র দিয়ে লোহা বিশ/পঞ্চাশ গ্রাম ওজন করা গেলেও এক গ্রামের কম ওজন করা যাবে না। কিন্তু সোনা এক গ্রামের চেয়েও কম পরিমাপ করার প্রয়োজন পড়ে। বিদ্যুৎ, পানি, রাসায়নিক পদার্থ প্রভৃতির বেলায়ও একথা প্রযোজ্য।</p>
<p>আইএস, আল-কায়েদা বা এদের মতো নামসর্বস্ব কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো কিতালের আয়াতগুলোকে মীযানের আলোকে না বুঝার ফলে সারা পৃথিবীব্যাপী বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করছে। ইসলামের তারা ভিন্ন মতাদর্শের উপর কঠোরতা, একগুঁয়েমি এবং শরীয়ত অসমর্থিত জিহাদী কর্মক্রম চালাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি বড় এক ট্র্যাজেডি।</p>
<p>কালামে হাকীমে আমরা দশেরও অধিক আয়াত পাই, যেখানে অনমনীয়তা (غِلْظَة), শক্তি [(شِدَّةٌ) (তোমরা কাফেরদের উপর শক্তি প্রদর্শন করবে-اَشِدَّآءُ عَلَی الۡکُفَّارِ)]  সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কিতাল সম্পর্কেও অনেক আয়াত রয়েছে। বিশেষত সূরা তওবা এবং সূরা আনফালে।</p>
<p>আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো, এই সব আয়াত শত্রুদের সাথে যুদ্ধের মীযান বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। যুদ্ধে শত্রুপক্ষের লক্ষ্য থাকে ভূমি দখল করা। এ লক্ষ্যে সে আপনাকে আক্রমণ করবে। এক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই অনমনীয় এবং শক্তিশালী হতে হবে। প্রয়োজনে কৌশলগত অবস্থানও নিতে হবে। তবে কৌশলের ছলে কখনোই প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। কারণ, প্রতারণা সর্বদাই নিষিদ্ধ।</p>
<p><strong>কোরআনের আয়াতগুলো কেবল একটি মীযানের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং একাধিক মীযানের উপর ভিত্তি করে বুঝতে হবে।</strong></p>
<p>যুদ্ধ-জিহাদ-কঠোরতা সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো সমরনীতি সংক্রান্ত মীযানের আলোকে বুঝতে হবে। নম্রতা-শিথিলতা, অধিকার, ইহসান, এবং অমুসলিমদের সাথে আদালত প্রভৃতি আয়াতগুলো তৎসংশ্লিষ্ট মীযানের আলোকে বুঝতে হবে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এ সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে। যেমন—</p>
<p>فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا</p>
<p>“আপনারা তার সাথে কোমল স্বরে কথা বলবেন।”(সূরা ত্বহা &#8211; ৪৪)</p>
<blockquote><p> لَا یَنۡهىکُمُ اللّٰه عَنِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یُقَاتِلُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَلَمۡ یُخۡرِجُوۡکُمۡ مِّنۡ دِیَارِکُمۡ اَنۡ تَبَرُّوۡهمۡ وَتُقۡسِطُوۡۤا اِلَیۡهمۡ اِنَّ اللّٰه یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ. اِنَّمَا یَنۡهىکُمُ اللّٰه عَنِ الَّذِیۡنَ قٰتَلُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَاَخۡرَجُوۡکُمۡ مِّنۡ دِیَارِکُمۡ وَظٰهرُوۡا عَلٰۤی اِخۡرَاجِکُمۡ اَنۡ تَوَلَّوۡهمۡ</p>
<p>অর্থ : “দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করছেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং বের করে দেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারাই তো জালেম।” (সূরা মুমতাহিনাহ : ৮-৯)</p></blockquote>
<p>উপরের আয়াত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াতে শান্তি ও সহাবস্থান এবং ইসলামী ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকলের অধিকারের মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয় দুই দিক থেকে। একদল কঠোরতা সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর উপর ভিত্তি করে ইসলামকে চরমপন্থী একটি দ্বীন হিসেবে উপস্থাপন করে। আরেক দল কল্যাণ, দয়া এবং ইহসান সংশ্লিষ্ট আয়াতের উপর ভিত্তি করে ইসলামকে শক্তিহীন একটি দ্বীনে পরিণত করে। রহমত এবং শক্তি প্রদর্শন, কঠোরতা এবং শিথিলতার মধ্যে ইসলাম সামঞ্জস্য বিধান করে। যেখানে কঠোরতা প্রয়োজন সেখানে কঠোরতা, যেখানে দয়া ও রহমত প্রয়োজন সেখানে দয়া ও রহমত প্রদর্শন করা। যে যতটুকুর হকদার তাকে ততটুকু প্রদান করাই মীযানের দাবি। অন্যান্য দ্বীনের সাথে ইসলামের পার্থক্যটা এখানেই।</p>
<p>মীযানে তখনই ক্রটি দেখা দেয়, যখন একটি আয়াতকে তৎসংশ্লিষ্ট মীযানে ব্যাখ্যা না করে গড়ে সবগুলো আয়াত একটি মীযানে ব্যাখ্যা করা হয়। বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার শুরুটা এখান থেকেই হয়। এবং এখান থেকেই অতিমাত্রায় সহিংস ও চরমপন্থী গোষ্ঠী বা দলের উদ্ভব হয়; যারা ইসলামের সমস্ত গৌরব এবং শক্তিকে ম্লান করে দেয়।</p>
<p>ফিকহুল মীযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজনের আলোকে শরীয়তের কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি আলেম ও শাসকদের অনুধাবন করানো এবং জনগণকে সে আলোকে পরিচালনা করা। এই সূত্র ধরেই আমরা ফিকহুল মীযান নিয়ে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p><strong>কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, পূর্বে কেন ফিকহুল মীযান নিয়ে আলোচনা ছিলো না। আসলে রাসূল (স.)-এর যুগ থেকেই দৃশ্যত এর প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন ছিলো। রাসূল (স.) যথাযথ এবং ন্যায়সঙ্গত মীযানের আলোকেই সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তিনি তার সুবাসিত জীবনের স্বাভাবিক কিংবা যুদ্ধাবস্থায়, মুসলিম কিংবা অমুসলিমদের সাথে পারস্পরিক আচার-আচরণে যে মীযান প্রয়োগ করেছেন, তা আমরা সামনে আলোচনা করবো।</strong></p>
<p>ফিকহুল মীযান উসূলের একটি ক্ষেত্র তথা শাখা। আমাদের কাছে থাকা উসূলে ফিকহের পরিপূরক হলো ফিকহুল মীযান। উসূলে ফিকহ শরীয়তের হুকুম-আহকামকে ব্যাখ্যা করে। আর ফিকহুল মীযান সাধারণভাবে কোরআন—বিশেষত সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করে। ফিকহুল মীযান দলীলের উপর নির্ভর করে না, বরং মীযান বা মানদণ্ডের উপর নির্ভর করে। দলীল এবং মীযানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দলীল বলতে আমরা বুঝি— কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস, ইসতিহসান , মাসালিহুল মুরসালা  ইত্যাদি।</p>
<p>অপরদিকে মীযান হলো কীভাবে কোরআন থেকে ইজতিহাদ করবো—কোরআনকে কীভাবে বুঝবো? সুন্নত এবং কিয়াসকে কীভাবে বুঝবো? ইজমা কখন হবে? বিভিন্ন প্রকার দলীলের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে—যা নিয়ে মুসলিম উম্মাহ মতানৈক্যে লিপ্ত হয়। ইত্যাকার বিষয়গুলো ফিকহুল মীযানের ভিত্তি এবং উদ্দেশ্য।</p>
<p>ফিকহুল মীযান এমন একটি বাস্তব জ্ঞান, যার মাধ্যমে উসূলে বৈপরীত্য থাকলে তা আমরা দূর করতে পারি। ফুরু&#8217;য়ী বা শাখাগত বিষয়ে মতভেদ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। স্থান-কাল-পাত্রভেদে ফুরু’য়ী বিষয়ে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হতে পারে। তবে উসূল তথা মূলনীতিতে মতপার্থক্যের কোনো সুযোগ নেই।</p>
<p>ফিকহুল মীযান হলো শরীয়তের মানদণ্ড, শরীয়তের স্থিতিস্থাপক। ফকীহ, গবেষক কিংবা মুজতাহিদ ফিকহুল মীযানের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন যে, কৃত ইজতিহাদটি সঠিক অথবা ভুল।</p>
<p>ধরুন একজন বলল, এখানে দশ কেজি শস্যদানা আছে। অন্যজন বলল, না, এখানে পাঁচ কেজি আছে। এই মতানৈক্যে সমাধান দিবে মীযান। ওজন করার পর দশ/পাঁচ যাই পাওয়া যাবে, তাতে উভয় পক্ষের দ্বিমত নিরসন হয়ে এক মতে আসবে। পার্থিব বিষয়ে মীযান এতো গুরুত্বপূর্ণ হলে ঈমান, হেদায়াত, খেলাফত প্রভৃতি বিষয়গুলোতে এর গুরুত্ব কেমন হবে?</p>
<p>আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে কিতাবের সাথে মীযান নাজিল করার বুনিয়াদটা এখানেই। আমাদের বুঝার মানদণ্ড—মীযান। অর্থাৎ এর মাধ্যমে আমরা নসের (Text) সঠিক মর্মার্থে পৌঁছাতে পারি। মুসলিম উম্মাহ আকীদার প্রশ্নে যেখানে মতবিরোধ করছে—ক্ষেত্রবিশেষ একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের করণীয় কী? করণীয় সম্পর্কে কোরআন বলছে—</p>
<blockquote><p>وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ ۖ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَىٰ أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ</p>
<p>অর্থ : “এদের কাছে যখনই কোনো সন্তোষজনক বা ভয়ের খবর পৌঁছে, তখনই তারা তা প্রচার করে বেড়ায়। যদি তারা তা রাসূল এবং তাদের দায়িত্বশীল লোকের নিকট পৌঁছাতো তাহলে তা এমন লোকেরা জানতে পারতো, যারা (এ জাতীয় খবর থেকে) সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।“ (সূরা নিসা: ৮৩)</p></blockquote>
<p>এই দুই অবস্থা (খবরে আমান, খবরে খওফ) বিশ্লেষণ করে আলেমগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো জাতিই এই দুই অবস্থার কোনো একটি থেকে মুক্ত নয়। খবরে আমান  হোক অথবা খবরে খওফ —উভয় অবস্থার জন্যই মারযা (সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবে এমন ব্যক্তি) প্রয়োজন।</p>
<p>মারযা ব্যতীত আল্লাহ আমাদেরকে কীভাবে রাখতে পারেন? যারা ইসতিনবাত  করতে সক্ষম তারাই হচ্ছেন মারযা। কৃত ইসতিনবাতটি যে সঠিক, মীযান ছাড়া এটি কীভাবে প্রমাণিত হবে?</p>
<p>قَٰتِلُوهُمْ—তাদেরকে হত্যা করো—কোরআনের এই আয়াতটি হত্যার মতো কঠিন একটি বিষয়কে নির্দেশ করে। এই নির্দেশটি সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে—এটা মীযানের দাবি হতে পারে না। আমরা এখন যুদ্ধের ময়দানে নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় একই দেশে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান—অন্যান্য ধর্মাবলম্বীগণ একত্রে বসবাস করছি। সুতরাং আয়াতটি মীযানের আলোকে বুঝতে হবে। অন্যথায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।</p>
<p>ফিকহুল মীযানের বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আরেকটি বিষয়ের দিকে আপনাদের নজর আকর্ষণ করতে চাই। আলোচনার শুরুটা করেছিলাম সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াত দিয়ে। কোরআনের ১১৪ টি সূরার মধ্যে সূরা হাদীদের অবস্থান ৫৭ তম। অর্থাৎ সূরা হাদীদ কোরআনের একেবারে মধ্যবর্তী একটি সূরা। মধ্যবর্তী এই সূরার ২৫ নং আয়াতটি লোহা সম্পর্কে। এ নিয়ে বিজ্ঞানীগণ বিস্তারিত গবেষণা করেছেন।</p>
<p>সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াত থেকে ছয়টি মূলনীতি পাওয়া যায়। সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায় এমন প্রত্যেক জাতির জন্য মূলনীতিগুলো অপরিহার্য। হোক তারা মুসলিম কিংবা অমুসলিম।</p>
<p><strong>প্রথম মূলনীতি:</strong> মুতাকায়েদ (Convince) করানোর ক্ষমতা। মুতাকায়েদ করতে হলে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি হতে হবে। শতধা বিভক্ত কিংবা নানাভাবে বিচ্ছিন্ন জাতি কখনোই মুতাকায়েদ (Convince) করতে পারে না। আর মুতাকায়েদ ছাড়া সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।</p>
<p>একটি জাতির পুনর্জাগরণের শুরুটা হবে তার জনগণকে নিজস্ব চিন্তার আলোকে মুতাকায়েদ করা। হোক সেটা ইসলাম, পুঁজিবাদ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার বয়ানে। এটা সর্বজনীন নিয়ম।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় মূলনীতি:</strong> সংবিধান। জাতির অধিকার সংরক্ষণ করবে এমন একটি সংবিধান থাকতে হবে। অধিকার সংরক্ষণকারী এ সংবিধান না থাকলে জনজীবনে ন্যায় এবং আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে না। কালামে হাকীমের ঘোষণা—</p>
<p>لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ</p>
<p>অর্থ : “আমি আমার রাসূলদের সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দিয়ে পাঠিয়েছি এবং তার সাথে দিয়েছি কিতাব।” কিতাব বা কোরআনের সাথে সুন্নতও রয়েছে। কোরআন এবং সুন্নত জাতির সংবিধানের প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>সংবিধান রচনা করতে হবে এমনভাবে যেন ভিন্নমতাবলম্বীদের অধিকারও সমভাবে নিশ্চিত হয়। যেমনটা নবী (স.) মদীনা সনদে নিশ্চিত করেছেন। মুসলিম, ইহুদি এবং পৌত্তলিক—সকলের অধিকার এ সংবিধান নিশ্চিত করে। পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাবিদ এমনকি জঁ-জ্যাঁক রুশোও মদীনার সনদ বা সংবিধানকে তৎকালীন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান বলে অবহিত করেছেন।</p>
<p><strong>তৃতীয় মূলনীতি:</strong> আদালতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। রাষ্ট্রে প্রকৃত অর্থেই আদালত কায়েম থাকতে হবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়াসহ বিজ্ঞ ইমামগণের বক্তব্য হচ্ছে অমুসলিম রাষ্ট্রেও যদি আদালত প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে সে রাষ্ট্র স্থায়ী হবে। অন্যদিকে মুসলিম রাষ্ট্রে যদি জুলুম বহাল থাকলে তার পতন অনিবার্য। পাক কালামের এই আয়াতটি সে কথাই বলছে—</p>
<p>فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِينَ ظَلَمُوا ۚ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ</p>
<p>অর্থ : “ফলে জালিম সম্প্রদায়কে সমূলে উৎখাত করা হলো। আর সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রব আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য।” (সূরা আনআম : ৪৫)</p>
<p>অন্য একটি আয়াত আরেকটু জোরের সাথে বলছে—</p>
<p>هَلْ يُهْلَكُ إِلَّا الْقَوْمُ الظَّالِمُونَ</p>
<p>অর্থ : “জালেম সম্প্রদায় ছাড়া আর কাউকে ধ্বংস করা হবে কি?” (সূরা আনআম : ৪৭)</p>
<p><strong>চতুর্থ মূলনীতি:</strong> সামরিক এবং শিল্পায়নে শক্তিশালী হওয়া।</p>
<p>وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ</p>
<p>আয়াতে <strong>بَأْسٌ شَدِيدٌ দ্বারা সামরিক এবং শিল্পায়ন শক্তি</strong>কে বুঝানো হচ্ছে।</p>
<p><strong>পঞ্চম মূলনীতি :</strong> সফট পাওয়ার, বৈজ্ঞানিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন। এই শক্তিগুলো আসে লৌহদ্রব্য থেকে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে মানুষের উপকারী (مَنَافِعُ لِلنَّاسِ) সবকিছু আসে লৌহ থেকে। সামরিক শক্তি, বৈজ্ঞানিক শক্তি বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা—উৎসগত দিক থেকে এগুলো এক।</p>
<p><strong>ষষ্ঠ মূলনীতি:</strong> রাষ্ট্রশক্তি। উপরের শক্তিগুলোর যথাযথ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রশক্তি।</p>
<p>মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কথা—</p>
<p>وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ</p>
<p>অর্থ : “আল্লাহ রব্বুল আলামীন দেখতে চান, কে গায়েবের প্রতি বিশ্বাস রেখে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ রব্বুল আলামীন শক্তিমান এবং পরাক্রমশালী।” (সূরা হাদীদ : ২৫)</p>
<p>আয়াতের এ অংশটি এও ইঙ্গিত করে যে, মুমিনগণ সামরিক শক্তি এবং নৈতিক শক্তির উপর নির্ভর করার পাশাপাশি, সর্বশক্তিমান আল্লাহ কতৃক প্রেরিত আসমানী সাহায্যের উপরও ভরসা রাখে।</p>
<p><strong>এই ছয়টি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে একটি জাতি গঠিত হয়, ক্ষমতার ভিত তৈরি হয়, সর্বোপরি সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়।</strong></p>
<p>আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই আয়াতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই আয়াতের মধ্যে মীযানের সূক্ষ্ম এবং বিস্তর বর্ণনা রয়েছে। আলেমগণ বিশেষ করে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী কিতাব, মীযান এবং হাদীদ (ধাতব পদার্থ)-কে একত্রে উল্লেখের কারণ হিসেবে উপরোক্ত বিষয়গুলোর দিকেই ইশারা করেছেন।</p>
<p>তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রকমফের আছে। কতক আছেন যারা আল্লাহওয়ালা। তারা একমাত্র আল্লাহর মুখাপেক্ষী। তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রয়োজন বোধ করেন না। তাদের নিকট আল্লাহ এবং তার রাসূলই শেষ কথা। বলা যায় তারা কিতাবের সাথে (কোরআন এবং সুন্নাহ) সম্পর্কযুক্ত।</p>
<p>কতক মানুষ আছেন, যারা ভালো এবং নিষ্ঠাবান মুসলিম। এতদসত্ত্বেও কখনো কখনো তাদেরকে ঝগড়া বিবাদের মুখোমুখি হতে হয় কিংবা পার্থিব জীবন যাত্রায় এমন বিষয়াবলির সম্মুখীন হতে হয় যার ফলে তাদেরকে মীযানের শরণাপন্ন হতে হয়। এ কারণেই কিতাব এবং মীযান একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>উপরের দুই অবস্থার বাইরে এমনও লোক আছে যারা কিতাব, মীযান অথবা আইন-আদালতের তোয়াক্কা করে না। ফলে তাদের উপর শক্তি প্রদর্শন করতে হয়। তাই হাদীদ—লোহার উল্লেখ।</p>
<p>এই আয়াতটিকে ক্ষমতা সংক্রান্ত আয়াতও বলা হয়। কেননা, ক্ষমতা সংক্রান্ত সকল উপদান এই আয়াতে বিদ্যমান। আলোচ্য ছয়টি মূলনীতি বাদ দিয়ে এই আয়াত নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা-পর্যালোচনা করলেও এর সঠিক মর্মার্থে আমরা পৌঁছাতে পারবো না।</p>
<p>দোজাহানের বাদশা নবী (স.) পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কথা আমাদেরকে জানিয়েছেন। নাজিলকৃত কিতাব বুঝার ক্ষেত্রে মীযানের অভাবে তারাও ভারসাম্যহীন অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে।</p>
<p>ইমাম আহমদ (র.) একটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন, <strong>একদিন নবী (স.) দেখলেন সাহাবায়ে কেরামের একদল বলছে, আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? অন্য দল বলছে, আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? নবী (স.) দেখলেন তারা কদর বা ভাগ্য সম্পর্কে বাদানুবাদ করছে।</strong></p>
<p><strong>একপক্ষ কতগুলো আয়াত দিয়ে স্বপক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, অপর পক্ষ ভিন্ন আয়াত দিয়ে তা রদ করে পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে। এই অবস্থা দেখে নবী (স.) রাগ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এমনটা কখনো করতে বলেছি? এগুলো করে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মত ধ্বংস হয়েছে।</strong></p>
<p>তোমাদের পূর্বে যেসব জাতি ছিলো, তাদের ধ্বংস হওয়ার কারণ হলো তারা মীযান প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এরপর তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সুন্নত থেকে কিছু বুনিয়াদি নীতিমালা পেশ করলেন। একজন অপরজনকে সত্যায়ন করার জন্য মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিল করেছেন। অপরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য আল্লাহ কোরআন নাজিল করেননি। বর্তমানে আমরা যেমনটা দেখতে পাচ্ছি, আয়াত উদ্ধৃতির মাধ্যমে একপক্ষ অপর পক্ষকে বাতিল ঘোষণা করছে! এটা কখনোই কাম্য নয়।</p>
<p>এরপর তিনি বলেন, আমি যখন তোমাদেরকে কোনো বিষয়ে আদেশ করি, সেটা সাধ্যমতো করার পালন করার চেষ্টা করো। আর যখন কোনো বিষয় থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি, সেটা থেকে বিরত থাকো। ভারসাম্যহীতার দৃষ্টান্ত পেশ করতে এই হাদীসটি খুবই যুক্তিযুক্ত।</p>
<p>এই হাদীসটির মাধ্যমে দুটি দলকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। একটি জাবরিয়া। অপরটি কাদরিয়া।</p>
<p>জাবরিয়াগণ বলেন, মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত। ভাগ্যে মানুষের কোনো হাত নেই। বাতাসের মাধ্যমে গাছের পাতা যেমন দোলে, তেমনি মানুষও আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী চলাফেরা করে। এখানে তার ইচ্ছার কোনো স্বাধীনতা নাই।</p>
<p>জাবরিয়াগণ আয়াতের জাহেরী অর্থের মাধ্যমে দলীল দেয়। তাদের দলীলগুলোর মধ্যে একটি হলো কোরআনের এই আয়াত—</p>
<p>وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ</p>
<p>অর্থ : “তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।” (সূরা তাকবীর : ২৯)</p>
<p>অন্য একটি আয়াত বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে—</p>
<p>وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ</p>
<p>অর্থ : “আর আপনি যখন নিক্ষেপ করেছিলেন তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি বরং আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করেছিলেন।” (সূরা আনফাল : ১৭)</p>
<p>এসকল আয়াতের মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে এটা বুঝা যায় যে, সবকিছু আল্লাহর প্রত্যক্ষ ইশারাতেই হয়। এমনকি রাসূল নিজ হাতে যেটা নিক্ষেপ করেছেন, আল্লাহ বলেছেন, সেটাও তিনিই নিক্ষেপ করেছেন।</p>
<p>অন্যদিকে কাদরিয়াগণ বলেন, মানুষ তার কর্মে স্বাধীন—যেখানে আল্লাহর কোনো হাত নেই। প্রমাণস্বরূপ তারা কোরআনের এই আয়াত উপস্থাপন করে—যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক, যার ইচ্ছা সে কাফের হোক।  এগুলো তাদের কাজের পুরস্কার। এগুলো সেসব কাজের প্রতিফল—যা তারা করেছে।</p>
<p>এরকম আয়াতগুলো মানুষকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, তোমরা আকল খাটাও, তোমরা চিন্তাভাবনা করো।</p>
<p>আলোচ্য হাদীসটিতে প্রথম পক্ষের বলা—আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বান্দা যা কিছু করে, আল্লাহর ইচ্ছাতেই করে। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া বান্দা কিছুই করতে পারে না। দ্বিতীয় পক্ষের বলা, আল্লাহ কি এমনটা বলেননি? এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষ তার কর্মে স্বাধীন। এখানে আল্লাহর ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন নাই। এই বিতর্কটি তৎকালীন গ্রিক দর্শনের জটিল এবং অস্পষ্ট একটি বিষয় ছিলো।</p>
<p><strong>মীযান আমাদেরকে এই সমস্যার সমাধান দেয়। মীযানের দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় মতই ভ্রান্ত। উভয় দলই মীযানে ভারসাম্য আনতে পারেনি। মীযানের দৃষ্টিকোণ থেকে জাবরিয়াগণ তাদের মতের পক্ষে যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, সেগুলো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আকীদা সংক্রান্ত আয়াত। ঈমান এবং আকীদার মীযান হলো এই আয়াতগুলো</strong>। আল্লাহ রব্বুল আলামীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং পরাক্রমশালী। কোনো বিষয়ে তিনি অক্ষম নন। তিনি সকল বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ বিষয়ে আমরা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস রাখি। আল্লাহ যদি অক্ষম হন, তাহলে তিনি রব হতে পারেন না। এটাই আমাদের বিশ্বাস। এবং এই বিশ্বাসগত অবস্থানের কারণেই আমরা মুমিন।</p>
<p>কিছু আয়াত আছে যেগুলো আল্লাহ স্বয়ং তার নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। সুন্নাতুল্লাহর আলোকে কিছু বিষয় নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছেন। রব্বুল আলামীন মানুষকে তার কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করবেন। এমতাবস্থায় তিনি কীভাবে এমন কিছুর জন্য জবাবদিহি করবেন যা করতে ব্যক্তি বাধ্য হয়!</p>
<p>পৃথিবীতে যা কিছু আছে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তারা আল্লাহর আনুগত্য করে। আল্লাহ তাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এর বাইরে তারা কিছু করতে পারে না। তবে মানুষ এর ব্যতিক্রম; তাকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এটা সুন্নাতুল্লাহ। এটা আমাদের আকীদা।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় পক্ষের বলা, যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক, যার ইচ্ছা সে কুফরি করুক—এটা ইচ্ছার স্বাধীনতা। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদেরকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।</strong></p>
<p>আমি কাউকে বল প্রয়োগে হত্যা করতে চাইলেও আল্লাহ তা চান না। এবং এধরণের হত্যাকে তিনি নিষিদ্ধ করছেন। এখন কেউ যদি বল প্রয়োগে কাউকে হত্যা করতে চায়, আল্লাহ তাতে বাধা দিবেন না। এখান থেকেই আসে দায়িত্বের মীযান, সুন্নাতুল্লাহর মীযান, কর্মের মীযান।</p>
<p>এখানে খিয়ার বা ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রয়োজন। ফিকহের একটি মৌলিক নীতিমালা হলো, অক্ষমের উপর শরীয়তের বিধান প্রয়োগ হবে না। আল্লাহ বলেন—</p>
<blockquote><p>لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا</p>
<p>অর্থ : “আল্লাহ কারও উপর সাধ্যাতীত কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা বাকারা : ২৮৬)</p></blockquote>
<p>আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে ফরজকৃত বিধান বান্দার জন্য পালন করা সহজ।</p>
<p>মীযানে ভারসাম্যহীনতার কথা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে—</p>
<p>আবূ দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে ছিলাম। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, এক সময় মানুষের কাছ থেকে ইলম ছিনিয়ে নেয়া হবে, এমনকি এ সম্পর্কে তাদের কোনো সামর্থ্যই থাকবে না। যিয়াদ ইবনে লাবীদ আল-আনসারী (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের নিকট হতে কীভাবে ইলম ছিনিয়ে নেয়া হবে, আমরা কোরআন তিলাওয়াত করি? আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমরা তা তিলাওয়াত করবো এবং আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকেও তা শিখাবো।</p>
<p>নবীজী বললেন, হে যিয়াদ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। আমি তো তোমাকে মদীনার অন্যতম জ্ঞানী ব্যক্তি বলেই গণ্য করতাম! এই তো ইয়াহুদী-নাসারাদের নিকট তাওরাত ও ইনজীল রয়েছে, তা তাদের কী কাজে লেগেছে? (তিরমীজি : ২৬৫৩)</p>
<p>এটি আমাদেরকে নির্দেশ করে, আমরা যদি মীযানকে গ্রহণ না করি, তাহলে কোরআন আমাদের মাঝে বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তা আমাদের কোনো কাজে আসবে না। কিতাবের সাথে মীযান যুক্ত না হলে, মীযানের প্রয়োগ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ এই কিতাব আমাদের কোনো কল্যাণে আসবে না। উল্টো আমাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে।</p>
<p>কোরআন আমাদেরকে বলে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনো। ঈমানদারদের ঈমান আনতে বলার অর্থ হচ্ছে, তোমরা তোমাদের ঈমানকে মজবুত কর, সক্রিয় কর। জজবা সম্পন্ন ঈমানের অধিকারী হও। ঈমানকে তাকত সম্পন্ন কর। অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসকে বাহ্যিকভাবে প্রতিফলিত কর। নীতিনৈতিকতা এবং পারস্পরিক লেনদেন, ওঠা-বসায় ঈমানের প্রতিফলন ঘাটাও।</p>
<p>মীযানের গুরুত্ব বুঝার জন্য উপরের হাদীসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসটি সহীহ। এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। উল্লিখিত হাদীস এবং আলোচ্য আয়াত “এবং তাদের সাথে দিয়েছি কিতাব এবং মীযান”—মীযানের গুরুত্ব তুলে ধরে।</p>
<p>“জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হবে” নবী (স.) এর এই কথা তখনই ফলবে, যখন দেখা যাবে জ্ঞান তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে—কল্যাণের বাহক হওয়ার পরিবর্তে অকল্যাণের বাহন হচ্ছে।</p>
<p>ইমাম গাযযালীর মতে, আল্লাহর ভয়, শরীয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং প্রবৃত্তির কামনা বাসনা থেকে দূরে থাকার মধ্যেই ইলমের মূল কথা নিহিত।</p>
<p>প্রবৃত্তির কামনা বাসনার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেটের দায় এবং যৌন চাহিদার জন্য হয়ে থাকে। ক্ষমতার দাপট, প্রাধান্য বিস্তার, কর্তৃত্ব খাটানো ইত্যাদিও প্রবৃত্তির তাড়নায় হয়ে থাকে। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এখানে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হতে হয়।</p>
<p>উল্লিখিত হাদীসসহ অন্যান্য হাদীসে কোরআনের শিক্ষার দিকে ফিরে আসার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে কোরআন সম্পর্কে অবশ্যই উন্মুক্ত হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে।</p>
<p>“তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহ তালাবদ্ধ?”  কোরআন বারবার তাদাব্বুর এবং তাফাক্কুরের কথা বলছে। আজ আমরা উম্মতে মোহাম্মদী এই নাজেহাল অবস্থায় কেন বাধ্য হয়ে বসবাস করছি? কারণ আমরা কোরআনের শিক্ষা থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থান করছি।</p>
<p>এই কোরআন কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি এবং শক্তির একমাত্র মাধ্যম। আমাদের সম্মান, মর্যাদা, গৌরব ইত্যাদির বাহক এই কোরআন। আমাদের সভ্যতা ও   সংস্কৃতির একমাত্র সোপানও এই কোরআন। কোরআনের প্রথম আয়াত ইকরা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝে মধ্যে দেখা যায়, আমাদের ভাই-বোনেরা সহীহ-শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে না। আর যারা পারে, তারাও অনেকটা বাধ্য হয়ে তেলাওয়াত করে। দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে করে, ইবাদতের উদ্দেশ্যে না।</p>
<p>অতএব, আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে এই কোরানের কাছে মীযান-সহ প্রত্যাবর্তন করতে হবে। যাতে এই কোরআন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের তাওরাত এবং ইঞ্জিলের মতো না হয়ে যায়।  দুর্ভাগ্যবশত তারা তাদের কিতাব থেকে উপকৃত হতে পারেনি।</p>
<p>সর্বশক্তিমান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমত ও মেহেরবানিতে এই জাতি পূর্ববর্তী জাতির মতো লীন হয়ে যাবে না। এই জাতি অমর হবে, ইনশাআল্লাহ। তারা সংখ্যার বিচারে নয়, বরং যোগ্যতা, আখলাক এবং তাজদীদের মাধ্যমে অমর হবে।</p>
<p>আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এই জাতি তার ক্ষমতা, সততা এবং নতুনত্ব নিয়ে পুনর্জাগরিত হোক। এই জাতি তাদের অন্তর্ভুক্ত হোক, যারা কোরআনুল কারীমের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/fiqhul-mizan-part-1/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16144</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-importance-of-faith-in-human-life/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-importance-of-faith-in-human-life/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 23 Aug 2025 07:17:52 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16092</guid>

					<description><![CDATA[মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্ব নিম্নরূপ, প্রথমত: বিশ্বাস একজন বিশ্বাসী ও আল্লাহর মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই সম্পর্ককে বিকশিত করে যা বিশ্বাসী হৃদয়কে ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং নিশ্চয়তায় পূর্ণ করে। দ্বিতীয়ত: বিশ্বাস মানুষের জীবনযাত্রা ইতর প্রাণি থেকে ভিন্নতর করে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্ব নিম্নরূপ,</p>
<ul>
<li><strong>প্রথমত:</strong> বিশ্বাস একজন বিশ্বাসী ও আল্লাহর মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই সম্পর্ককে বিকশিত করে যা বিশ্বাসী হৃদয়কে ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং নিশ্চয়তায় পূর্ণ করে।</li>
<li><strong>দ্বিতীয়ত:</strong> বিশ্বাস মানুষের জীবনযাত্রা ইতর প্রাণি থেকে ভিন্নতর করে তোলে। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। তাকে সৃষ্টিজগতের সকল কিছুর চেয়ে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সম্মানিত করা হয়েছে, নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। সে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। ফেরেশতারাও ভাবতেন যদি মানুষের মতো তাদেরকেও এত সম্মানিত করা হতো! দ্বীন মানুষকে অনুধাবন করার আহ্বান জানায় যে, তার সত্তার যে অংশে আল্লাহ রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, সে অংশে তার শক্তি নিহিত এবং যে অংশ পোড়া কাদামাটি থেকে তৈরি, সে অংশে তার দুর্বলতা নিহিত। জীবনের তুচ্ছ অসারতার কাছে মানুষের নতিস্বীকার করা উচিত নয় যা তাকে বিপথগামী করে। মানুষের উচিত সর্বদা উচ্চ মূল্যবোধের আকাক্সক্ষী হওয়া।</li>
<li><strong>তৃতীয়ত:</strong> বিশ্বাস এ বিশাল সৃষ্টিজগতের সাথে মানুষের সম্পর্কের পরিধিকে বিস্তৃত করে। মানুষ এ সৃষ্টিজগতে অনুপ্রবেশকারী নয়। আর এ সৃষ্টিজগতও তার শত্রু নয়, বা তাকে তাড়া করে বেড়ানো রহস্য নয়। বরং মানুষের খেদমতের জন্যই এটি সৃষ্টি করা হয়েছে যা আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম নিদর্শন। সব মানুষ তার ভাই-বোন। তার মতো তারাও আল্লাহর বান্দা এবং আদম (আ.)-এর বংশধর।</li>
<li><strong>চতুর্থত:</strong> বিশ্বাস মানুষকে অনন্তকালীন জীবনের নিগূঢ় রহস্য সম্বন্ধে উপলব্ধি করতে শেখায়। মানুষের জীবনের গল্প জন্মের মাধ্যমে শুরু হয়ে মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় না! জীবনের তেমন নয়, যেমনটা বলে থাকে অবিশ্বাসীরা। তারা বলে,</li>
</ul>
<p style="padding-left: 80px;">إِنْ هِىَ إِلَّا حَيَاتُنَا ٱلدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ</p>
<p style="padding-left: 80px;">“একমাত্র দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন। এখানেই আমরা মরি-বাঁচি এবং আমাদের কখনো পুরুজ্জীবিত করা হবে না। (সূরা মুমিনুন : ৩৭)</p>
<p style="padding-left: 80px;">বরং জীবন তেমন, যেমন বলেছেন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রা.)। তিনি বলেছেন,</p>
<blockquote style="padding-left: 40px;">
<p style="padding-left: 80px;">“তোমাকে অনন্তকালের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। মৃত্যু শুধুমাত্র একটি বাহন যা তোমাকে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে নিয়ে যাবে।”</p>
</blockquote>
<p>জীবন আসলে এমনই। এ সকল মূল্যবোধ মানুষকে তার অস্তিত্ব ও সৃষ্টির হাকীকত এবং জীবনের লক্ষ্য সম্বন্ধে উপলব্ধি করায়। আর এ মূল্যবোধগুলো আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান থেকে উদ্ভূত হওয়া এক একটি স্তম্ভ, যেগুলোর উপর ভিত্তি করে খোদায়ী ধর্মগুলো সৃষ্টি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন : একটি প্রয়োজনীয়তা </strong></h4>
<p>বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করা আবশ্যকীয়। মানুষ ও জীবনে এর গঠনমূলক প্রভাব পুনরুদ্ধার করার জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিত।</p>
<p>দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান চিন্তাধারা এবং শিক্ষাব্যবস্থা যে দর্শন বেছে নিয়েছে, তা বস্তুবাদী প্রযুক্তিগত এবং অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের প্রতি অধিক মনোযোগী, সেইসাথে ধর্মকে উপেক্ষাকারী, এমনকি ধর্মের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণকারী।</p>
<p>মূলত বর্তমান চিন্তাধারা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মকে বাতিল ঘোষণাকারী পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং ধর্মের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী যুদ্ধ ঘোষণাকারী মার্কসবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত।</p>
<p>ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণাধীন স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্ম শিক্ষা ক্লাস করানো হয় না, আর যদি করানো হয়, তবে তা গুরুত্বের দিক থেকে একদম শেষে থাকে। ধর্ম শিক্ষা করাকে এখন আর বড় সম্মানের কোনো বিষয় হিসেবে ভাবা হয় না। ধর্ম ক্লাসগুলোকে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অবস্থা এমন যে, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে দিনে বা সপ্তাহে এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ধর্ম ক্লাস করতে বাধ্য করা হয় যেন! উপরন্তু সমালোচকদের সমালোচনা এড়ানোর জন্য এ সময়টাকেই যথেষ্টের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হয়।</p>
<p>অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যায়, বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থার গতি হারানোটা অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। এ শিক্ষাব্যবস্থায় সেই রূহের অভাব রয়েছে, যা মানুষের অনুভূতিকে জাগ্রত করে এবং তাকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে। এ তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে মুসলিম কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল বলেছিলেন, <strong>“এটি চোখকে শেখায় না কীভাবে অশ্রু ঝরাতে হয়, এটি হৃদয়কে শেখায় না কীভাবে আল্লাহর স্মরণে বিনীত হতে হয়।”</strong></p>
<p>বর্তমান গণমাধ্যমও এ অসুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে ভালো অবস্থানে নেই। এটি সত্য যে, গণমাধ্যম এ আধুনিক দুনিয়ায় ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি মাধ্যম এবং জনমত গঠনে সক্ষমতার ফল স্বরূপ এটি সংস্কৃতি অভিমুখী। কিন্তু বর্তমান গণমাধ্যমও স্বচ্ছ নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহ্য, ধারণা বা দল দ্বারা প্রভাবিত যা মানুষকে দুর্নীতির ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।</p>
<p>আর এসব মূলত ধর্মে অবিশ্বাসী দর্শনকে বেছে নেওয়ার ফল।</p>
<p>বিশ্বাস মূলত একটি অভয়ারণ্য বা আশ্রয়স্থল। জান্নাত প্রাপ্তির পথ কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ, অন্যদিকে জাহান্নামের পথ লালসায় পরিপূর্ণ। যদি আমরা আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী না হই, তবে আমাদের পক্ষে সেই কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতাগুলো সহ্য করা, সেইসাথে লালসাকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে না। আর এ আধ্যাত্মিক শক্তি আমাদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত জীবনের যন্ত্রণা সহ্য করতে সক্ষম রাখবে, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহর পথে থাকি। এটি আমাদেরকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণগুলো, অর্থাৎ জীবনের লোভ-লালসা এবং ভোগ-বিলাস পরিত্যাগ করতে সক্ষম করে তোলে। আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দীর্ঘ এ অনিশ্চিত যাত্রায় বিশ্বাস আমাদের জন্য বিধানস্বরূপ।</p>
<p>বিশ্বাসই আধ্যাত্মিক শক্তির সৃষ্টিকারী। বিশ্বাস আমাদেরকে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রেরণা যোগায়। এটি পরম করুণাময় আল্লাহর ইবাদতকে এতটাই পরিপূর্ণ করার প্রেরণা দেয় যে, ইবাদত আমাদের জীবনের প্রশান্তিতে পরিণত হয়। এটি আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে সময়নিষ্ঠ হতে সাহায্য করে, যা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী বোধ করায়। আমরা নফল ইবাদত করি যাতে এই ইবাদতগুলো আমাদেরকে আল্লাহর ভালোবাসার কাছাকাছি নিয়ে আসে। মহামহিম আল্লাহ যদি কাউকে ভালোবাসেন, তাহলে তিনি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যান, যা দিয়ে সে শোনে এবং তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যান, যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যান, যা দিয়ে সে আঁকড়ে ধরে এবং তার পা হয়ে যান, যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি তার কাছে চায়, তবে তিনি তাকে দেন, সে যদি তার কাছে নিরাপত্তা চায়, তবে তিনি তাকে রক্ষা করেন এবং নিরাপত্তা প্রদান করেন।</p>
<p>বলা বাহুল্য, বিশ্বাস শুধু মানুষকে পরকালীন চির সুখের পথেই পরিচালনা করে না, বরং তা ইহকালীন জীবনে সুখের কারণও বটে। সকল মানুষই জীবনে সুখ কামনা করে, কিন্তু খুব কমই তা অনুভব করার সুযোগ পায়। অনেকেই সুখের আশায় কোনো বিষয়ের প্রতি এতটাই মোহ তৈরি করে যে, এটির পেছনে বুনো হাঁসের মতো রুদ্ধশ্বাসে ছুটে বেড়ায়, এই আশায় যে, এটি তাদের সুখ দেবে। অথচ এটি মরুভূমির মরীচিকার মতো, যাকে তৃষ্ণার্তরা পানি মনে করে ছুটে যায়, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে কিছুই খুঁজে পায় না।</p>
<p>একমাত্র বিশ্বাসই মানুষকে মানসিক সুখ এবং শান্তি দিতে পারে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ ٱللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ</p>
<p>“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর যিকিরে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (আর রাদ : ২৮)</p></blockquote>
<p>এটি সত্য যে, টাকা দিয়ে মানুষ অনেক কিছুই কিনতে পারে এবং টাকা হয়তো তার চাহিদার কিছুটা পূর্ণ করতে পারে। কিন্তু মানুষের সমস্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং টাকা কখনোই তাকে সত্যিকার সুখ কিনে দিতে পারে না। সুখ বাজারে বিক্রি করার মতো বিষয় নয়। এটি একটি আত্মিক তৃপ্তির অনুভূতি যার সম্পর্কে আমাদের একজন দরিদ্র এবং ধার্মিক পূর্বপুরুষ বলেছিলেন, “রাজারা যদি আমাদের সুখের পরিমাণ বুঝতেন, তবে তারা এটি নিয়ে আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন।”</p>
<p>বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জন্য জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মানুষ বর্তমানে একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত পৃথিবীতে বসবাস করে। রিমোট কন্ট্রোলে একটি চাপ দেওয়ার মাধ্যমেই সে জীবনের বিলাসিতা উপভোগ করে। বিষয়টা এমন, যেন কয়েক ডজন সিনেট তার সেবায় নিয়োজিত রয়েছে! রিমোট কন্ট্রোল চাপার সাথে সাথে সে দূরত্ব জয় করে নিতে পারে। সে সোফায় আরামে বসে এমনভাবে সবকিছু নড়াচড়া করতে পারেন যেন সে ক্ষমতাশালী কারুন! এমনকি সে তার চারপাশের সকল কিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে কোনো বোতাম চাপার ঝামেলা ছাড়াই! অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিজ্ঞান মানুষকে শারীরিক আয়েশ এনে দিয়েছে, কিন্তু এটি একই সাথে তাকে মানসিক শান্তি থেকেও বঞ্চিত করেছে। বিজ্ঞানের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, জীবনের সমাপ্তির বিষয়টা বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে বিশ্বাসের লক্ষ্যই হলো মানুষের জীবনের সুন্দর সমাপ্তি প্রদান। বিশ্বাস মানে ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা। এটি মানুষকে নিজেকে পবিত্র করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি তাকে তার লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠতে এবং শ্রেষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছাতে যথেষ্ট শক্তি এবং প্রেরণা দেয়। এটি যৌবনের উন্মাতাল কামনা-বাসনাকে দমন করে। এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে প্রলোভনের কাছে হার না মানা দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি অর্জন করতে হয়, যে ইচ্ছাশক্তির বলে সত্যবাদী ইউসুফের (আ.) পাপের প্রলোভন থেকে বাঁচার জন্য কারাগারের অপমানকে শ্রেয় মনে করেছেন। তিনি বলেছিলেন,</p>
<p>قَالَ رَبِّ ٱلسِّجْنُ أَحَبُّ إِلَىَّ مِمَّا يَدْعُونَنِىٓ إِلَيْهِ ۖ</p>
<p>“হে আমার রব! এরা আমাকে দিয়ে যে কাজ করাতে চাচ্ছে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে প্রিয়! (সূরা ইউসুফ : ৩৩)</p>
<p>বিশ্বাস আত্মত্যাগের প্রসঙ্গে মানুষকে ইসমাইলের মতো ধৈর্যশীল হতে শেখায়। তাঁর পিতা ইব্রাহীম (আ.) তাঁকে আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে বলেছিলেন,</p>
<p>تَرَىٰ ۚ قَالَ يَـٰٓأَبَتِ ٱفْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِىٓ إِن شَآءَ ٱللَّهُ مِنَ ٱلصَّـٰبِرِينَ</p>
<p>“এখন তুমি বল তুমি কি মনে করো?’ সে বললো, ‘হে পিতা! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে, তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন।” (সূরা আস সাফফাত : ১০২)</p>
<p>পিতার প্রশ্নের উত্তরে তিনি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।</p>
<p>শুধুমাত্র সত্যিকারের বিশ্বাসই সৎ গুণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি নৈতিক আদর্শ ও আখলাকী মূল্যবোধ প্রদান করতে সক্ষম। ইতিহাস এ সত্যের সাক্ষী যে, কোনো জাতি যখন সৎ কাজ করা ছেড়ে দেয়, তখন তারা বিশৃঙ্খলা, নিষ্ক্রিয়তা এবং সৃজনশীলতার অভাবের মধ্যে নিপতিত হয়। নৈতিক আদর্শবিহীন একটি জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি। প্রখ্যাত কবি আহমদ শাওকির একটি কবিতার লাইন ছিলো এমন, “কোনো জাতি যদি তাদের নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে, তবে তারা মৃতের মতোই ভালো হয়ে যায়, যার কোনো কিছু করার ক্ষমতা থাকে না এবং মৃত দেহের জন্য শেষকৃত্য ও তার দুর্ভাগ্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া আমরা আর কিছুই করতে পারি না।”</p>
<p>বর্তমানে নেতৃস্থানীয়রা প্রায়ই তাদের জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের উপর নীতি-নৈতিকতা সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। সম্ভবত তারা ভুলে গেছেন যে, আইন মানুষের চিন্তা বা অনুভূতির পথকে পরিবর্তন করতে পারে না। একমাত্র যে বিষয়টি মানুষকে পরিবর্তন করতে পারে, পারে তা হলো তার আকল। আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিটি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কোনো আইন এর উপর ক্ষমতা রাখে না। অবশেষে নেতৃস্থানীয়রা শৃঙ্খলা আনয়নের মরিয়া প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পরে সমাজে, রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে এবং ষড়যন্ত্র, স্বার্থপরতা ও লালসা সত্য, ভালো ও দায়িত্ব-কর্তব্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে। ফলশ্রুতিতে অপরাধ, নানাবিধ সংকট ও কেলেঙ্কারি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>ব্রিটিশ বিচারকরা একটি বিখ্যাত মামলার রায় সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আইন, নৈতিক মান এবং বিশ্বাসের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া একটি সমাজের উন্নতি হতে পারে না। এ তিনটিই সমাজের ঐক্যবদ্ধতার জন্য অপরিহার্য।”</p>
<p><strong>বিশ্বাস মুসলমানদের সুপ্ত শক্তির উদ্রেক ঘটায়। মুসলমানদের রক্তে প্রবাহিত আল্লাহ ও পরকালের প্রতি এ অদম্য বিশ্বাস তাকে অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম করে এবং অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশ্বাস হলো মানুষের সহজাত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতিষেধক। এটি তাকে শেখায় যে, দানশীলতা ও পরোপকারের জন্য আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন।</strong> এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন,</p>
<p>“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল : ০৭)</p>
<p>“আর যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে এবং সেইসাথে সে মুমিনও হবে, তার প্রতি কোনো জুলুম বা অধিকার হরণের আশঙ্কা নেই।” (সূরা ত্বাহা : ১১২)</p>
<p>“আল্লাহ কারো ওপর এক অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। যদি কেউ একটি সৎকাজ করে, তাহলে আল্লাহ‌ তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে তাকে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” (সূরা নিসা : ৪০)</p>
<p>বিশ্বাস মানুষকে অনেক বেশি আধ্যত্মিক শক্তি দেয়, যা তাকে আল্লাহর হুকুমের অনিবার্যতার প্রতি আস্থাশীল হতে শেখায়। আল্লাহ তার জন্য যা লিখে রেখেছেন তা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আল্লাহর হুকুম একটি নির্ধারিত বিধান। যদি আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন যে, কারো ভালো বা খারাপ কোনো কিছু ঘটবে, তবে কেউ তা থামাতে পারবে না। এবং যদি আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন যে এটি ঘটবে না, তবে কেউ তার বিপরীত কিছু করতে পারবে না। প্রতিটি প্রাণির রিযিক এবং মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। কোনো মানুষ অন্য মানুষের ভালো করতে চাইলে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা চান, আবার কেউ যদি কারো ক্ষতি করতে চায়, সে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা চান। তাকদীরের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস জিহাদ (আল্লাহর পথে সংগ্রাম) এবং দাওয়াতকে (ইসলামের পথে আহ্বান) মুসলমানদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।</p>
<p>পারস্যের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে রাসূল (স.)-এর একজন সাহাবী পারসিকদের এক নেতার কাছে নিজেদের পরিচয় এভাবে দিয়েছিলেন, “আমরাই তোমাদের ভাগ্য! আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ প্রেরণ করেছেন, যেভাবে তোমরাও আমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। সুতরাং তোমরা যদি মেঘপুঞ্জের উপরেও অবস্থান করো, তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে আকাশে আরোহণ করাবেন, বা তোমাদেরকে নামিয়ে এনে আমাদের সাথে যুদ্ধ করাবেন!”</p>
<p>বিশ্বাস মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব এবং স্নেহের বন্ধনকে শক্তিশালী করে এবং তাদেরকে চির সবুজ, তারুণ্যদীপ্ত ও সাফল্যমণ্ডিত রাখে। বিশ্বাস মুসলমানদের মধ্যে আত্মীয়তার অনুভূতি সৃষ্টি করে, যার ফলে তারা একটি পরিবারের মতো হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।” (সূরা হুজুরাত : ১০)</p>
<p>বিশ্বাসের শক্তি মানুষকে বিভক্তকারী জাতি, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল, শ্রেষ্ঠ, বংশ, ভাগ্য এবং অনুরূপ সকল বাধা অতিক্রম করতে পারে। এ শক্তি পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করে, যা জন্ম ও বিয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট আত্মীয়তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। যখন এ অনন্য সম্পর্কের শিকড় মজবুত হয়, মুসলমানরা তখন তাদের জন্ম এবং রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের চেয়ে বিশ্বাসে তাদের এ ভাইদেরকে বেশি প্রাধান্য দেয়।</p>
<p>এ সুন্দর ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে কেউ কারো বিরুদ্ধে ক্ষোভ পোষণ করতে পারে না; একে-অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিংসায় লিপ্ত হয় না; জীবন নিয়ে অহেতুক গরিমায় ডুবে থেকে একে অপরকে তুচ্ছ করে না। আল্লাহর কাছে জীবন একটি মশার পালকের চেয়ে বেশি কিছু নয়! রাসূল (স.) হিংসাকে জাতির রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং রূপক অর্থে এটিকে চেঁছে ফেলার যন্ত্রের সাথে তুলনা করেছেন, কারণ এটি ধর্মকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দেয়। অন্যদিকে বিশ্বাস পারস্পরিক শত্রুতাকে মুছে দেয়। এটি মানুষের হৃদয়ে তার পথ খুঁজে নেয় এবং হৃদয়কে অন্য সকল বিশ্বাসীর জন্য উৎসারিত ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং উদারতা দিয়ে পূর্ণ করে তোলে। এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন,</p>
<p>“তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার মুসলমান ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ২৮১)</p>
<p>“আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনো, আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পূর্ণ ঈমাদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসো।” (মুসলিম)</p>
<p>পরার্থপরতার এ অসাধারণ উপমা একমাত্র মুসলিম সমাজেই বিদ্যমান যা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। বিশ্বাসই এ পরার্থপরতার উদ্রেক ঘটায়। পরার্থপরতা শুধুমাত্র একটি আভিধানিক শব্দ নয়, এটি একটি মনোভাব এবং আচরণ। এটি একজন মুসলমানের মনে তার অন্য মুসলমান ভাইদের জন্য দায়িত্বানুভূতি জাগিয়ে তোলে, যার ফলে সে নিজের চেয়ে তার মুসলমান ভাইদেরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি তাকে অনেক কষ্টের মধ্যেও টিকে থাকার এবং তার মুসলমান ভাইদের উপকারের জন্য প্রচেষ্টা চালানোর সাহস দেয়। এটি তাকে তার মুসলমান ভাইদের জীবন রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে শেখায়। এটি তাকে তার মুসলমান ভাইদেরকে খাবার দিতে শেখায় এবং তাদের ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করায়, যেমন ছিলেন আনসারদের (সাহায্যকারীদের) সাহাবীরা। আনসাররা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বেই ঈমান এনে দারুল হিজরাতে বসবাস করছিলেন, আর হিজরত করতে আসা মুহাজিরদেরকে অকাতরে সাহায্য করতেন। তারা নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোন না কেন, নিজেদের চেয়ে অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দিতেন।</p>
<p>আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“মূলত যেসব লোককে তার মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (সূরা হাশর : ০৯)</p>
<p>এই অভূতপূর্ব ভ্রাতৃপ্রেম এবং পরার্থপরতার অনুভূতিগুলো মানুষের অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থায় অর্থাৎ সর্বাবস্থায় সহযোগিতা এবং দানশীলতার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।</p>
<p>হাদীসে এসেছে,</p>
<p>“রাসূল (স.) বলেছেন, ‘একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের নিকট একটি দালানের মতো, যার প্রতিটি অংশ একে অপরকে শক্তিশালী করে।” এ কথা বলে তিনি তার হাত আঙ্গুল দিয়ে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেন।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ১৬৭০)</p>
<p><strong>“তুমি মুমিনদেরকে নিজেদের প্রতি ক্ষমাশীল হিসেবে দেখতে পাবে, পরস্পরের মাঝে ভালোবাসাপূর্ণ ও দয়াশীল হিসেবে দেখতে পাবে, যা একটি দেহের সাথে তুলনীয়। যখন শরীরের একটি অংশ অসুস্থ হয়, তখন সমগ্র শরীরই এ কষ্ট (নিদ্রাহীনতা ও জ্বর) ভাগ করে নেয়।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ১৬৭১)</strong></p>
<p>সর্বোপরি, বিশ্বাস হলো মুক্তির চাবিকাঠি। বিশ্বাস বন্যা থেকে রক্ষাকারী নৌকার মতো। আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>وَكَيْفَ تَكْفُرُونَ وَأَنتُمْ تُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ ءَايَـٰتُ ٱللَّهِ وَفِيكُمْ رَسُولُهُۥ ۗ وَمَن يَعْتَصِم بِٱللَّهِ فَقَدْ هُدِىَ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ</p>
<p>“তোমাদের জন্যে কুফরীর দিকে ফিরে যাবার এখন আর কোন সুযোগটি আছে, যখন তোমাদেরকে শুনানো হচ্ছে আল্লাহ‌র আয়াত এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহ‌র রাসূল? যে ব্যক্তি আল্লাহ‌কে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে, সে অবশ্যই সত্য সঠিক পথ লাভ করবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১০১)</p>
<p>&nbsp;</p></blockquote>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মুহসিনা বিনতে মুসলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-importance-of-faith-in-human-life/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16092</post-id>	</item>
		<item>
		<title>দর্শনের গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/importance-of-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/importance-of-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. সাইয়েদ হোসাইন নাসর]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2025 16:02:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ফিচারড]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শনের গুরুত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[পশ্চিমা দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16061</guid>

					<description><![CDATA[দর্শন বলতে আসলে কি বুঝায় ? প্রথমেই  দর্শনের সংজ্ঞাকে পরিষ্কার করা দরকার। অনেক আধুনিক মুসলিম সংস্কারক ও চিন্তাবিদ, যেমন মুহাম্মদ আবদুহু, দর্শন শব্দটি নিয়ে একটু ভয় বা সন্দেহ পোষণ করেন। যদিও এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা জামালউদ্দিন আফগানি তেহরানে বহু বছর ইসলামী]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দর্শন বলতে আসলে কি বুঝায় ? প্রথমেই  দর্শনের সংজ্ঞাকে পরিষ্কার করা দরকার। অনেক আধুনিক মুসলিম সংস্কারক ও চিন্তাবিদ, যেমন মুহাম্মদ আবদুহু, দর্শন শব্দটি নিয়ে একটু ভয় বা সন্দেহ পোষণ করেন। যদিও এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা জামালউদ্দিন আফগানি তেহরানে বহু বছর ইসলামী দর্শন অধ্যয়ন করেছিলেন, যতক্ষণ না তিনি সরকারের চাপে দেশ ছেড়ে আফগানিস্তান, তারপর তুরস্ক ও মিশরে পালিয়ে যান। একটি বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে বিদ্যমান থাকায় ইসলামী প্রেক্ষাপটে দর্শন শব্দটি একটু অস্পষ্ট মনে হয়। তবে পশ্চিমা ও ইসলামী প্রেক্ষাপটে দর্শনের অস্পষ্টতার ধরন একেবারেই আলাদা। <strong>পশ্চিমে দর্শনের অর্থ অনেক রকম—প্লেটো এবং দেরিদার মত সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষকেও দার্শনিকই ডাকা হয়। এখানে একক কোনও বিশ্বদর্শন নাই, এমনকি অধিকাংশ দার্শনিক অনুসরণ করেছেন, এমন গুটিকয়েক বিশ্বদর্শনও আপনি খুঁজে পাবেন না। ফলে এটা এত বিস্তৃত যে তাদেরকে একই ছাতার নিচে ফেলা যায় না।</strong> পশ্চিমে দর্শন এখন আর হাজার বছর ধরে চলে আসা সেই প্রাচীন ধারণা নয়, যা গ্রিক-রোমান যুগে বা ইসলাম ও পশ্চিমের বহুমুখী চিন্তার সম্মিলনের সময়ে ছিল। <strong>আধুনিক পশ্চিমা দর্শন অনেক সময় সফিয়া বা প্রজ্ঞার বিরুদ্ধে গিয়েছে। কোনো কোনো বিজ্ঞজন এটাকে এখন &#8220;মিসোসফি&#8221; বলে ডাকেন, অর্থাৎ ‘প্রজ্ঞার প্রতি ঘৃণা’, যদিও দর্শনের আসল অর্থ ছিল ‘প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসা’।</strong></p>
<p>ইসলামের ক্ষেত্রে অনেকেই ভুলে যান যে কুরআন নিজেই দুইবার <strong>&#8220;হিকমা&#8221;</strong> শব্দটি উল্লেখ করেছে, যাকে আল্লাহর কাছ থেকে মহান উপহার বলা হয়েছে। এই হিকমাকে ইসলামী আলেমরা গ্রিক শব্দ <em>&#8216;ফিলোসফিয়া&#8217;</em> থেকে আরবীকরণ করে তাকে <strong>&#8220;ফালসাফা&#8221;</strong> হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে ইসলামে দর্শনের বিকাশ একটু ভিন্ন পথে গেছে। আমাদের মাঝে ফালসাফা নামে একটি বিদ্যা ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা- যেমন কালাম এবং অন্যান্য বিষয়ও ছিল, যেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শন না হলেও অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিকই ছিল। <strong>ইমাম আশআরী সুন্নি ইসলামের প্রধান কালামী ধারা আশআরি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি ফালসাফার বিরোধিতা করলেও যুক্তি, কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এমনকি তিনি দর্শনের অস্তিত্বই স্বীকার করতেন না, তবে তিনি যে সকল বিষয়ে আলোচনা করেছেন এগুলো মূলত দার্শনিক বিষয়ই ছিল। এমনকি যারা নিজেদের দার্শনিক বলে দাবি করেননি এনারা সহ সব ধরনের ইসলামী চিন্তাবিদদের কাছে ঈমান ও যুক্তির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা নিজেই একটি দার্শনিক বিষয়।</strong></p>
<p>আপনি বলতে পারেন, <em>দর্শন অনেকটা রাজনীতির মতো। রাজনীতি ভালো বা খারাপ হতে পারে, কিন্তু কোনো সমাজ রাজনীতি ছাড়া চলতে পারে না। একইভাবে, দর্শন ছাড়া কেউ চলতে পারে না। সচেতন বা অবচেতন যেভাবেই হোক, নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই—জীবন, কাজ, নীতি, চিন্তা, কী ভালো, কী খারাপ, কী সত্য, কী মিথ্যা, কী সুন্দর, কী কুৎসিত, এসব নিয়ে একটা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। তাই দর্শন ছাড়া চলা অসম্ভব।</em> গত দুই শতাব্দী ধরে, বিশেষ করে ১৭৯৮-১৮০০ সালে নেপোলিয়নের মিশর আক্রমণের পর থেকে পশ্চিমা চিন্তাধারার আগ্রাসনের মুখে ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় ট্র্যাজেডি হলো- আমাদের নিজস্ব দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে বা এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেকের অস্বীকৃতি। অনেক ইসলামী আন্দোলনে একটা দর্শন-বিরোধী মনোভাব আছে, যদিও তারা মৌলিকভাবে দার্শনিক চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়েছে।<br />
<a href=" https://rkmri.co/5NSNee5SeA2M/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Islami-gyane-usuler-dhara-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>পশ্চিমের এই চ্যালেঞ্জ মঙ্গোল আক্রমণের মতো নয়। মঙ্গোলরা লাখো ঘোড়া নিয়ে এসে জমি ধ্বংস করেছে, লাখো মানুষ মেরেছে, কিন্তু তারা ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি। চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকুর নেতৃত্বে তাদের চ্যালেঞ্জ ছিল তীর-ধনুক আর ঘোড়া, কিন্তু<em> ইসলামের প্রতি পশ্চিমের প্রধান চ্যালেঞ্জটা বুদ্ধিবৃত্তিক।</em> এটা শুধু ড্রোন দিয়ে সেই আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে নিরীহ শিশুদের হত্যার ট্র্যাজেডি নয়, যাদের জন্য কেউ কাঁদে না। আমি ওয়াশিংটনে থাকি, এটা আর সহ্য করতে পারি না। কানেকটিকাটে নীল চোখের শিশু মারা গেলে সবাই কাঁদে, আমিও দুঃখিত হই। কিন্তু পেশোয়ারের কাছে কালো চোখের শিশু মারা গেলে কেউ পাত্তা দেয় না। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ এটা নয়। কিংবা এটা শুধু ড্রোন, কিংবা আইএমএফ-এর অর্থনৈতিক চাপ, বা পশ্চিমা শক্তির হাতে বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় বসানো পুতুল সরকার নয়। বরং পশ্চিমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক, চিন্তার জগতের। আমরা আমাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়েছি, কারণ আমরা একটি সভ্যতা হিসেবে যথেষ্ট ভাবা বন্ধ করে দিয়েছি, সঠিকভাবে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি। যেকোনো মাপকাঠিতে আমাদের সভ্যতা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় চিন্তাবিদ তৈরি করেছে। ইসলামে আলহামদুলিল্লাহ ঈমান এখনো শক্তিশালী হলেও, এটা খুবই দুঃখজনক যে অনেক সংস্কারক সঠিক চিন্তার গুরুত্ব; আব্বাসীয় যুগ থেকে আজ অবধি বিস্তৃত ১১০০ বছরের হিকমা ও ফালসাফার ঐতিহ্যের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেননি।</p>
<p><strong>কুরআনের একটি আয়াত বলে, “আমরা কুরআন নাযিল করেছি যাতে মানুষ তাদের বুদ্ধি ব্যবহার করে।</strong>” আমি এখানে <strong>&#8220;যুক্তি&#8221;</strong> শব্দটি ব্যবহার করছি না, বরং পুরনো ইংরেজি ব্যবহারে <em>&#8220;বুদ্ধি&#8221;</em> বা <em>&#8220;ইনটেলেক্ট&#8221;</em> শব্দটি ব্যবহার করছি, যা এখন হারিয়ে গেছে। আরবিতে এটি বিশেষ্য ও ক্রিয়া উভয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বুদ্ধি শুধু যুক্তি নয়, এটা তার চেয়ে গভীর। <em>পশ্চিমের বড় ট্র্যাজেডি হলো বুদ্ধির মৃত্যু, এটিকে শুধু যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, যার ফলে যুক্তি ও ওহীর, ধর্ম ও বিজ্ঞান, ইহজগত ও পরজগতের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।</em> কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় এটা কখনো ছিল না, কারণ আমাদের আকল শুধু যুক্তিবাদী বয়ান ছিল না। আকল দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সারবত্তা যা আমাদের মৌলিক ও অপরিহার্যরূপে জানতে সাহায্য করত। আমরা সেই সভ্যতার উত্তরাধিকারী। আজ আমরা কুরআন পড়ি বটে, কিন্তু আকল খাটাইনা। ফলে স্পষ্টভাবে ভাবতেও পারিনা। এটা কতটা অদ্ভুত যে, এমন একটি সভ্যতা যে সভ্যতা তাজমহলের মতো জ্যামিতিক নিখুঁত স্থাপত্য, ইসফাহানের মসজিদ বা ফেজের মাদ্রাসার ময়দান তৈরি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম গণিত ও জ্যামিতির ওপর ভিত্তি করে, সেই তার চিন্তা আজ এত দুর্বল, পশ্চিমা চিন্তার চ্যালেঞ্জের মুখে এত নড়বড়ে! আমাদের কণ্ঠগুলো বিশ্ব পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, আমাদের ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আছে, কিন্তু মানবজাতির ভবিষ্যৎ ও চিন্তার প্রশ্নে মুসলিম কণ্ঠ কোথায়? এটা আমাদের নিজেদের দোষ, কারণ আমরা এমন এক সভ্যতার উত্তরাধিকারী যারা কুরআনের ভিত্তিতে স্পষ্ট চিন্তার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। আমরা সেটা করিনা, মাথাটাই খাটাইনা।</p>
<p>আজ পশ্চিম থেকে নানা ধরনের <strong>&#8220;ইজম&#8221;</strong> সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একের পর এক আমাদের উপকূলে এসে আছড়ে পড়ছে। আপনারা সবাই এ ব্যাপারে অবগত, আবার কেউ জেনে নাও থাকতে পারেন। যেমন <em>র‍্যাশনালিজম</em>, <em>এম্পিরিসিজম</em>, <em>হিউম্যানিজম</em>, <em>ইভল্যুশনিজম</em> ; সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে <em>লিবারেলিজম</em>, <em>সোশ্যালিজম</em>, <em>ন্যাশনালিজম</em>, জ্ঞানতাত্ত্বিক যায়গায় <em>সায়েন্টিজম</em>। চতুর্দিকে ভেসে বেড়ানো এই ইজমগুলো আমাদের মন ও চিন্তাকে নানা মাত্রায় প্রভাবিত করছে। ইসলামী বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা এমন যে, ইরান এবং দুয়েকটা দেশ ছাড়া বেশিরভাগ দেশে পশ্চিমা শিক্ষাই প্রাধান্য পায়। উপনিবেশিক যুগ থেকে মিশনারি স্কুলের মাধ্যমে এই প্রভাব চলে এসেছে। মিশর বা পাকিস্তানের ধনী পরিবারের প্রায় ৯০% শিশু পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, মুসলিম স্কুলে নয়। পুরনো মাদ্রাসাগুলো এখন শুধু গরিবদের জন্য। দুই শতাব্দী আগে এমন ছিল না। আজ এই ধরণের লোকেরাই দেশ পরিচালনা করে, কিন্তু পশ্চিমা ইজম দিয়ে তাদের মগজধোলাই হয়ে আছে। ধার্মিকদের মধ্যে কেউ কেউ আমরা নামাজ আদায় করি, কিন্তু বাকি সময় এই ইজমের মধ্যে ডুবে থাকি। ইসলাম এখনো এই ইজমগুলোর পূর্ণাঙ্গ জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পূবাল হাওয়ার মত আমরা নতুন ইজমের অপেক্ষায় থাকি, কেউ কেউ এগুলো গোগ্রাসে গিলে, আবার কেউ টেরই পায়না, তবু এগুলো আমাদের প্রভাবিত করেই চলেছে।</p>
<p>তেহরানে ফরাসি দার্শনিক ফুকোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তখন পশ্চিমেও তিনি খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। এক সন্ধ্যায় আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। তিনি খুবই বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন, কিন্তু আফসোসের বিষয় তিনি ইমানদার ছিলেন না। কিন্তু তিনি আলোচনার জন্য যথোপযুক্ত একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, <em>ফ্রান্সে এখন কেউ আমার কথা শোনে না, কিন্তু একদিন শুনবে।</em> আমি কয়েকজন তরুণ পারসিক ছাত্র ও অধ্যাপককে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, <em>ফ্রান্সে আমার ধারণা জনপ্রিয় হলেই এখানেও তা ছড়িয়ে পড়বে।</em> ঠিক তাই হয়েছিল। ফুকো মারা গেলেন, তারপর দেরিদা এলেন, তিনিও চলে গেলেন, এভাবেই চলছে। আমরা শুধু এই ঢেউয়ের শিকার। কিছু ইজম সামাজিক, যেমন জাতীয়তাবাদ বা সমাজতন্ত্র; কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক। কিন্তু আমরা আজ নিষ্ক্রিয়, ফলে এই ইজমগুলো ক্রমাগত আমাদের উপর হামলে পড়েছে।<br />
<a href=" https://rkmri.co/meyepM5TRSee/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/islam-o-sovvota-01-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>এই তাবৎ ইজমগুলো দর্শনের সঙ্গে যুক্ত, চিন্তার ধরন ও বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি &#8211; র‍্যাশনালিজম তো নিজেই এক ফিলসফি। সে বলে যুক্তিই সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ। কত মুসলিম আছেন, যারা নামাজের সময় ধার্মিক, কিন্তু বাকি সময় র‍্যাশনালিস্ট? অনেক আধুনিক মুসলিম লেখক পশ্চিমা চিন্তার প্রভাবে বিভ্রান্ত। পাশ্চাত্য চিন্তার প্রশ্নে তারা কোনো ডান-বাম হদিস করতে পারেননা। তারা আকল ও রিজন বা ইস্তিদলাল (যুক্তি) এর মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। ফলে তারা বলেন, ইসলাম পুরোপুরি র‍্যাশনাল! এই বিভ্রান্তির কারণে কিছু জায়গায় চরম মৌলবাদ ও প্রযুক্তির পূজার অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা যায়। <strong>মুসলিম বিশ্বের কিছু কিছু যায়গায় আপনি এমনও দেখবেন, যেখানে লেটেস্ট প্রযুক্তির পূজা করা হচ্ছে, মুখে বলা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, অথচ তাদের আসল খোদা এই উন্নত প্রযুক্তি। আবার এরাই অন্তঃসার শুণ্যভাবে চলে আসছে ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধকে হেফাজত করতে। এটি ইসলামী বিশ্বের একটি বড় ট্র্যাজেডি।</strong></p>
<p>আমরা প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না, কারণ আমরা আকল খাটাই না। সব প্রশ্নের উত্তর মুষ্টি বা আবেগ দিয়ে দেওয়া যায় না। আগুন লাগলে বেহালা বাজিয়ে তা নেভানো যায় না, পানির প্রয়োজন। হ্যাঁ ভালো বেহালার সুর দিয়ে খারাপটাকে বদলে দেয়া যায়। ঠিক সেভাবেই ভুল চিন্তার জবাব একমাত্র সঠিক চিন্তা দিয়ে দেওয়া যায়। ভুল চিন্তাকে চিৎকার করে সঠিক করা যায়না। আবেগ কখনো ভুল চিন্তাকে শোধরাতে পারেনা, যেটা কেবল সঠিক চিন্তাই পারে। কুরআন বারবার বলে, যারা সঠিকভাবে আকল ব্যবহার করে, তারা যারা করে না, তাদের সমান নয়। যারা আকল খাটায়, তারাই প্রকৃত মুসলিম। এই শিক্ষা আমরা আজ সত্যিই ভুলে গেছি।</p>
<p>আমি পঞ্চাশ বছর ধরে এই বিষয়ে কাজ করছি, কিন্তু আমাদের অগ্রগতি খুব ধীর। ১৯৭৭ সালে মক্কায় প্রথম বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলনে আমি ড. জোব, ড. নাসিফ ও মরহুম বাংলাদেশি চিন্তাবিদ ড. সাইয়েদ আলী আশরাফের সঙ্গে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলাম। আমি এই চার অগ্রপথিকের একজন ছিলাম। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও শিক্ষামন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমরা সফল হইনি, কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু শরিয়া ফ্যাকাল্টিতেই ইসলামী শিক্ষা দেওয়া হয়, বাকি সব পশ্চিমা বিষয়। মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের আকল দিয়ে এই বিষয়গুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবিনি। এটি সহজ কাজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। একটি অনন্য সভ্যতা হিসেবে ইসলামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমরা কতটা ইসলামী কায়দায় ও স্পষ্টভাবে ভাবতে পারি তার উপর।</p>
<p>এজন্য সবার আগে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাকে পুনর্জাগরিত করতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের, প্রতিটি শাখার মধ্যেই একটি দার্শনিক দিক রয়েছে। এমনকি উসুল ; উসূলুদ্দীন উসুলে ফিকাহ, যা আল-আজহারের মতো ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় জ্ঞান, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক দিক রয়েছে, যা পুনর্জাগরিত করা প্রয়োজন। এমনকি আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের একটি শাখা সেমান্টিকসও (শব্দার্থবিজ্ঞান) উসুলের মধ্যে ভিন্ন কারণে আলোচিত হয়। মোটকথা হলো, উসুলের মতো ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যেও দার্শনিক দিক রয়েছে, যা আমাদের পুনরায় জাগিয়ে তুলতে হবে।</p>
<p>কালাম বা ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আধুনিকতাবাদীদের আক্রমণের মুখে পড়েছে, তবু এটি এখনো টিকে আছে। মিশরে নব্য মুতাজিলা এবং নব্য আশআরি মতবাদও দেখা যায়। সালাফি আন্দোলন অবশ্য এই সবকিছুর বিরুদ্ধে, এমনকি সমগ্র ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু শিয়া সুন্নি নির্বিশেষে যারা নিজেদের ঐতিহ্য গভীরভাবে বোঝেন, সেই দরদি মুসলিমরা কালামের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। এটিকে আমাদের সময়ের জন্য উপযুক্ত করে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, এবং এর দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। এছাড়া, <strong>মা‘রিফাহ বা ইরফান</strong>, <em>যাকে আমরা বাস্তবতার চূড়ান্ত জ্ঞান বলি, সেটা হচ্ছে ইসলামী মেটাফিজিক্স</em>। এটি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এটিকেও পুনর্জাগরিত করতে হবে এবং আমাদের সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক করতে হবে। এবং অবশ্যই এর সাথে ইসলামী বিজ্ঞান, ইসলামি দর্শনের পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে।</p>
<p>যদি আমরা এই সমগ্র বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে পারি, তবে তা আমাদের জন্য এমন একটি কাঠামো দেবে, যার মধ্যে আমরা আধুনিক জ্ঞানের শাখাগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব। এই জ্ঞানের শাখাগুলোর জন্য ইসলামী জবাব, ইসলামী সচেতনতা এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ প্রয়োজন, যা ইসলামী সভ্যতার জীবন্ত কাঠামোয় একীভূত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান ও মানববিদ্যার কথা বলি। ১৯৬৪ সালে আমি <strong>&#8220;ইসলামী বিজ্ঞান&#8221;</strong> নিয়ে একটি বই লিখেছিলাম। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে &#8220;ইসলামী বিজ্ঞান&#8221; শব্দটি ব্যবহার করেছি দুটি কারণে। <em>প্রথমত,  আরব জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে  &#8220;আরবি বিজ্ঞান&#8221; বলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। ইসলামী বিজ্ঞান শুধু আরবদের নয়, পারস্য, তুর্কি, মুসলিম ভারতীয়রাও এতে অবদান রেখেছে। ইবনে সিনা, আল বিরুনির মতো মহান বিজ্ঞানীরা আরব ছিলেন না। দ্বিতীয়ত,  এই বিজ্ঞান ইসলামী ওহীর সঙ্গে যুক্ত। সে সময় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। মুসলিম বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী আমার বিরোধিতা করেন, তারা বলেন &#8211; বিজ্ঞান বিজ্ঞানই, ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের এই দাবী সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।</em></p>
<p>বিজ্ঞান একটি বিশ্বদৃষ্টি ও প্যারাডাইমের উপর নির্ভর করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন নাস্তিক সায়েন্টিস্ট ফিলোসফার আপনাকে এটাই বলবে। সুতরাং মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য ইসলামী বিজ্ঞানকে ইসলামী প্যারাডাইমের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে। আমি পঞ্চাশ বছর ধরে সায়েন্টিজমের সমালোচনা করে লড়াই চালিয়ে আসছি। সায়েন্টিজম ইসলামী বিশ্বের একটি বড় রোগ, পূর্ব আফ্রিকার ম্যালেরিয়ার চেয়েও ভয়ানক। <strong>সৌদি আরব, ইরান, মালয়েশিয়া, মিশর—সব সরকার বিজ্ঞানকে সমর্থন করে, কিন্তু এর প্রকৃতি না বুঝেই। তারা ক্ষমতা ও সম্পদ চায় তাই এরকমটা ভাবে বোঝাই যায়। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরাও ভাবেন বিজ্ঞানই যেহেতু ক্ষমতা দেয়, তাই এটি ইসলামী। তারা ভাবে, আল্লাহ জ্ঞান অন্বেষণ করতে বলেছেন, আর জ্ঞান-বিজ্ঞানই শক্তি। তাই ক্ষমতা প্রদানকারী বিজ্ঞানও ইসলামীই। কিন্তু এমন বিজ্ঞান, যেখানে আল্লাহর অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব অপ্রাসঙ্গিক, যেখানে ক্যাথলিক বা নাস্তিক ফিজিসিস্ট হয়েও নোবেল পুরস্কার জেতা যায়, তা ইসলামী সভ্যতায় স্থান পেতে পারে না।</strong> বেশিরভাগ মানুষেরই এই কথাটা বলার সাহস নেই। অথচ আমি ২৫ বছর বয়সে এ কথা বলেছিলাম, এখনো বলছি।</p>
<p>আমাদের বুঝতে হবে, সায়েন্টিজম গ্রহণযোগ্য নয়। বেশিরভাগ মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপাসনা করেন। তারা বলেন, তারা আল্লাহর ইবাদত করেন, কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময় ঠিকই তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপাসনায় মগ্ন। এটি আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোগ। পরিবেশ সংকট একদিন ঠিকই আমাদের উচিত শিক্ষা দেবে। তখন লোকে এই অন্ধ পূজা বন্ধ করবে। এই রোগ  শুধু ইসলামী বিশ্বে নয়, হিন্দু ভারত, কমিউনিস্ট চীনেও দেখা যায়। মাওসেতুং এর সময় থেকে তারা নাস্তিক হয়েও প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে তাদের উপাস্য বানিয়েছে। তাদেরতো আমাদের মত স্বতন্ত্র আদর্শ নেই, ফলে আমাদেরই এই বিজ্ঞানবাদ থেকে খুব খুব সতর্ক থাকতে হবে।</p>
<p>সায়েন্টিজমের মোকাবিলা করতে হলে আমাদের ইসলামী দার্শনিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, কারণ সায়েন্টিজম নিজেই একটি দর্শন। এটি প্রকৃতি ও জ্ঞানের দর্শন, যা আধুনিক বিজ্ঞান ছাড়া প্রকৃতিকে জানার অন্য সব পথ অস্বীকার করে। এর জবাব শুধু দর্শন দিয়েই দেওয়া সম্ভব। সায়েন্টিজমের বিপদের মোকাবিলা আমরা দর্শন ছাড়া করতে পারি না। আমাদের নিজস্ব দার্শনিক ঐতিহ্য থেকে সঠিক দর্শন নিয়ে এটি মোকাবিলা করতে হবে।</p>
<p>মানববিদ্যার কথা যদি বলি, অনেক দিন ধরেই এটাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণে গড়ে তোলার কথা হচ্ছে। আমি বহু বছর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য অনুষদের ডিন ছিলাম, যা ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানববিদ্যার কেন্দ্র। আমি এই আন্দোলনের একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি—পদার্থবিজ্ঞানে না পারলেও, অন্তত ইতিহাস, সাহিত্যের মতো বিষয়গুলো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ানোর চেষ্টা করেছি। <em>আমরা ইতিহাস ফ্রান্সের চোখে দেখব না, মাঝখানে একটু একটু ইসলামী অংশ যোগ করে দিয়ে। সাহিত্য ইংরেজির দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ব না, শেষে উর্দু সাহিত্যের একটা ছোট অংশ যোগ করে।</em> ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম দেখলে লজ্জা লাগে। <strong>কোনো সভ্যতা কি নিজেকে অন্যের চোখে দেখে? আজ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো ইতিহাসের বেশিরভাগ বই পশ্চিমা বিশ্বদৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে। নৃবিজ্ঞান, ভাষা, এমনকি অন্যান্য বিষয়েও একই অবস্থা। আমাদের সেই আন্দোলনের ফলে ইরানে এ নিয়ে সর্বোচ্চ নেতা ফতোয়া দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন এই বিষয়ে কাজ করে। কিন্তু এখন তারা প্রায় নিজেদের পায়েই কুড়াল মারছে। আমি শীঘ্রই তেহরানে এ নিয়ে একটা লেখা প্রকাশ করতে চাই, কারণ এই কাজে আমি সবার সামনে ছিলাম।</strong><a href=" https://rkmri.co/5eomTMRAoSlM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Sunnat-O-hadis-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>কিন্তু আমাদের সন্তানরা পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়ন ছেড়ে নিজেদের সাহিত্য, শিল্প, চিন্তা, সমাজের গঠন, বা বিশ্বদৃষ্টিকে নিজস্ব সভ্যতার চোখে না জানলে এই সভ্যতা কীভাবে টিকবে? এটা একটা বিশাল বড় সংকট; এখানেও এটা একটা দার্শনিক বিষয়ই। এটা শিক্ষাগত সমস্যা অবশ্যই, তবে <em>শিক্ষার দর্শন শুধু ‘কীভাবে পড়ানো হবে’ তা নয়, ‘কী পড়ানো হবে’ তাও ঠিক করে।</em></p>
<p>আলহামদুলিল্লাহ, সবকিছু অন্ধকার নয়। আলোর আভাস রয়েছে। কিছু মানুষ এখন এই বিষয়গুলো বুঝতে শুরু করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। <em>মরুভূমিতে একজন মানুষের চিৎকারও মূল্যবান, কারণ সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। আমি আশা ও দোয়া করি, আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যাদের কেউ কেউ এখানে উপস্থিত, দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে মনোযোগ দেবে। মা-বাবাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আমি অধ্যাপক হিসেবে অনেক মুসলিম ছাত্র দেখেছি, যারা আমার এক-দুটি বক্তৃতা শুনে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিসিন ছেড়ে ইসলামী অধ্যয়ন বা দর্শন পড়তে চেয়েছে।</em> শোনা মাত্রই তাদের বাবা প্রায় হার্ট এটাক করেন, মা প্রায় মাথা ঘুরে রান্নাঘরে পড়ে যান।</p>
<p><strong>যারা ইসলামকে ভালোবাসেন, আল্লাহর কথা ভাবুন, ইসলামের কথা ভাবুন, ইসলামের জন্য কিছু ত্যাগ করুন। আপনার সন্তানের শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া জরুরি নয়। তাদের পাশাপাশি আমাদের এমন মুসলিমও প্রয়োজন, যারা এই বিষয়ে জান কুরবান করবে। হয়তো তারা কম আয় করবে, কিন্তু উম্মতের জন্য এটি অপরিহার্য। আমি প্রায়শই বলি, এটা ফরজে কিফায়া।</strong></p>
<p>বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য উচিত ইহুদি সম্প্রদায়ের মতো কাজ করা, যারা আমেরিকায় মাত্র পঞ্চাশ বছরে ইহুদি অধ্যয়নের প্রায় সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব গ্রহন করেছে। একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, আমেরিকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদি অধ্যয়নের অধ্যাপকরা এখন ইহুদি। তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। আমি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন দুপুরের খাবারের সময় বন্ধুদের সঙ্গে এই বিষয়ে বলছিলাম। তখন শুধু ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইহুদি অধ্যয়নের অধ্যাপক ছিলেন ইহুদি, বাকি সবাই ছিলেন হিব্রু ও তাওরাত জানা খ্রিস্টান। এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি নিউ জার্সির ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় সেটন হলেও ইহুদি অধ্যয়নের অধ্যাপকরা ইহুদি। <em>আমি আশা করি, ইনশাআল্লাহ, আমার মৃত্যুর পর কয়েক দশক পরে আপনারা যখন বক্তৃতা দেবেন, তখন কেউ ইসলামী বিশ্ব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এই কথা বলতে পারবেন। এটি নির্ভর করবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে ঈমানের সঙ্গে মিলিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর। ঈমান ও আকল—এই দুটি আমাদের জান্নাতের পথে নিয়ে যাবে এবং পৃথিবীতে সফল উম্মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার—আকলের সঠিক ব্যবহারই আমাদের পথ। আলহামদুলিল্লাহ।।</em></p>
<p><strong>অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/importance-of-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16061</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল-কুরআনে সুর ও ছন্দ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Jun 2025 08:00:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15891</guid>

					<description><![CDATA[আল-কুরআনের শব্দের মিল ও সাদৃশ্য সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমি তার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষ্টি প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল-কুরআনের শব্দের মিল ও সাদৃশ্য সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমি তার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষ্টি প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর সাথেও সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে আল-কুরআনের উচ্চারণের সাদৃশ্যতা।</p>
<p>আমি এর আগে আভাস দিয়েছি যে, কুরআনে কারীমের মধ্যে সুর ও ছন্দ (শব্দের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা) আছে এবং তার কিছু প্রকার ও ধরন আছে। যা তার বক্তব্য উপস্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সমস্ত কুরআন-ই ছন্দবদ্ধ সেহেতু সর্বত্রই সুর ও তাল বিদ্যমান। দেখা গেছে একই শব্দের বিভিন্ন অক্ষর এবং একই আয়াত ও তার শেষ শব্দ ছান্দিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে। চাই সে আয়াত ছোট হোক কিংবা বড়। বাক্যের শেষ শব্দের মধ্যে সেই মিল কিভাবে হয়, সেসব বাক্য সম্পর্কে আমি আলোচনা করতে চাই। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>وَمَا عَلَّمْنَهُ الشَّعْرَ وَمَا يَنْبَغِى لَهُ ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ</p>
<p>আমি তাঁকে (অর্থাৎ রাসূলকে) কবিতা বা কাব্য শিক্ষা দেইনি। আর তা তাঁর জন্য শোভাও পায় না। এতো একটি স্মারক যা সুস্পষ্ট কুরআন (হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে)। (সূরা ইয়াসীন : ৬৯)</p></blockquote>
<p>একথাটি হচ্ছে কাফিরদের ঐ অভিযোগের জবাব, যা সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে:</p>
<p>بَلِ اقْتَرَهُ بَلْ هُوَ شَاعِرٌ</p>
<p>(তারা বলতো) সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না বরং সে একজন কবি।</p>
<p>(সূরা আল-আম্বিয়া: ৫)</p>
<p>আল-কুরআন ঠিকই বলেছে, এটি কাব্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আরববাসী যারা একে কবিতা বা কাব্য বলতো তারা কি পাগল ছিল, না কবিতা ও কাব্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল? নিশ্চয়ই নয়। যেহেতু তারা একে কাব্য বলেছে কাজেই এর মধ্যে অবশ্যই কবিতা ও কাব্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে যার যাদুকরী আবেশে তারাও মোহবিষ্ট হয়েছিল। কুরআনের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের কান পরিচিত ছিল, ফলে এটি যে একটি কাব্য তা তারা বুঝতে পেরেছিল। আমরা যদি কেবল মাত্রা ও অন্তমিলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তবু বুঝা যায় কাব্য ও কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য সেখানে বিদ্যমান।</p>
<p>তাছাড়া কুরআন গদ্য ও পদ্য উভয়কেই সুন্দরভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে। আল-কুরআন মাত্রা )وزن( ও অন্তমিল )قافیه( থেকে স্বাধীন এবং এতে মিল থাকতেই হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা কুরআনের নেই। তবু সেখানে সুর ও ছন্দ বর্তমান। আয়াতের শেষে মিত্রাক্ষরের প্রয়োজন, সে প্রয়োজনও কুরআন অবশিষ্ট রাখেনি। সেই সাথে আমরা ওপরে কাব্যের যে বৈশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করেছি সেগুলোও সে ধারণ করে নিয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কুরআনে গদ্য ও পদ্য উভয় বেশিষ্ট্য বৈশিষ্ট্যমান।</p>
<p>সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন বাহ্যিক উচ্চারণে সে মাত্রা ও অন্তমিল দেখে, বিশেষ করে এ ব্যাপারটি ছোট ছোট আয়াত সম্বলিত সূরাগুলোতেই দৃষ্টিগোচর হয়। অথবা ঐ সমস্ত জায়গায় যেখানে কোন ঘটনাচিত্র উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য দীর্ঘ আয়াতের সূরাগুলোতেও এটি আছে তবে তা এতোটা স্পষ্ট নয়। নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করুন, যেখানে সুর, ছন্দ ও মাত্রার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে:</p>
<blockquote><p>وَالنَّجْمُ إِذَا هَوَى &#8211; مَاضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى &#8211; وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الهوى &#8211; إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى &#8211; عَلَمَهُ شَدِيدُ القُوى &#8211; ذُو مِرَّةٍ &#8211; فَاسْتَوى &#8211; وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى &#8211; ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى &#8211;</p>
<p>নক্ষত্রের কসম, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট কিংবা বিপথগামী নয় এবং প্রবৃত্তির তাড়নায়ও কথা বলে না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা। সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। (সূরা আল-নজম: ১-৮)</p>
<p>فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوادنى &#8211; فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى &#8211; مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى &#8211; أَفَتُمْرُونَهُ عَلَى مَا يَرَى</p>
<p>অতপর নিকটবর্তী হলো এবং ঝুলে রইলো, তখন ব্যবধান ছিল দুই ধুনক কিংবা তার চেয়ে কম। তখন আল্লাহ্ তার বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? (সূরা নজম: ৯-১২)</p></blockquote>
<p>وَلَقَدْ رَاهُ نَزَلَةً أخرى &#8211; عِنْدَ سِدْرَة المُنْتَهى &#8211; عِنْدَهَا جَنَّةُ الماوى &#8211; إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى &#8211; مَازَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى &#8211; لقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى</p>
<p>নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তা &#8220;দিয়ে আচ্ছন্ন হচ্ছিল। তাঁর দৃষ্টিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয়ই সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।</p>
<p>(সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)</p>
<p>أَفَرَءَ يْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى &#8211;</p>
<p>তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উজ্জা সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?</p>
<p>(সূরা আন-নজম: ১৯-২০)</p>
<p>الكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى.</p>
<p>পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য আর কন্যা সন্তান আল্লাহ্ জন্য?</p>
<p>(সূরা নজম: ২১)</p>
<p>تِلْكَ إِذَا قِسْمَةٌ ضِيزى &#8211;</p>
<p>এ ধরনের বণ্টন তো খুবই অসঙ্গত বণ্টন।</p>
<p>(সূরা আন-নজম: ২২)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতগুলোর শেষাক্ষরে মাত্রার প্রায় মিল আছে। কিন্তু আরবী ছন্দের মাত্রার চেয়ে তা কিছুটা ভিন্ন। সব আয়াতের শেষেই মিত্রাক্ষর এক ধরনের। মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের বদৌলতে প্রশিট আয়াতের সাথে অপর আয়াতের একটি মিল সংঘটিত হয়েছে। ফলে বিচ্ছুরণ ঘটেছে অপূর্ব সুর মূর্ছনার। এই যে মিল ও সাদৃশ্য তার আরেকটি কারণ আছে, অবশ্য তা মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের মতো এতোটা উজ্জ্বল নয়। কেননা তা একক শব্দ, অক্ষরের বিন্যাস এবং বাক্যে শব্দসমূহের বিন্যাসের কারণে সৃষ্টি হয়। তার অনুভূতি ও উপলব্ধির পরিধি, দ্বীনি চেতনা এবং সুর ও সঙ্গীতের উপভোগের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য অন্তরার সুরেলা আওয়াজ এবং বেসুরো আওয়াজের মধ্যে পার্থক্য করা যায়, শুধুমাত্র বাক্যান্তে মিত্রাক্ষর হলেই তাকে সুর বা ছন্দ বলে অভিহিত করা যায় না।</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতগুলো ছোট ছোট বিধায় তা থেকে সৃষ্ট সূর-তরঙ্গের স্থায়িত্বও খুব দীর্ঘ নয়। তবে সব আয়াতের ছন্দ ও মাত্রা এক। তাই সব আয়াতে মিল আছে। এসব আয়াতে শেষ অক্ষর এক রকম হতে হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা নেই।</p>
<p>যেমন আধুনিক সাহিত্যে কোন গল্প-উপন্যাস লিখার সময় এদিকে নজর দেয়া হয় না, কুরআনী সুর ও ছন্দের বেলায় এসব কিছুকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অনেক আয়াত থেকে তো স্পষ্ট বুঝা যায় বাক্যান্তে মিলের জন্য সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে তা করা হয়েছে। যেমন নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করে দেখুন।</p>
<p>أَفَرَءَ يْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى &#8211;</p>
<p>যদি এভাবে বর্ণনা না করে নিচের মতো করে বর্ণনা করা হতো:</p>
<p>أَفَرَيْتُمُ اللَّهَ وَالعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ &#8211;</p>
<p>তাহলে অন্তমিলে পার্থক্য সৃষ্টি হতো এবং ছন্দপতন ঘটতো। তদ্রূপ নিচের আয়াতও:</p>
<p><strong>الكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى &#8211; تِلْكَ اذا قِسْمَةٌ ضيزى .</strong></p>
<p><strong>যদি এভাবে উল্লেখ না করে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হতো:</strong></p>
<p><strong>الكُمُ الذَّكَرُولَهُ الْأُنثى &#8211; تلكَ قِسْمَةُ ضيزى .</strong></p>
<p><strong>তাহলে ছন্দের মিল হতো না। &#8216;ইযান&#8217; শব্দটি দিয়ে সেই মিলকে পুরো করা হয়েছে।</strong></p>
<p>তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, &#8216;আল উখরা&#8217; (أخرى) এবং &#8216;ইযান&#8217;  শব্দ দুটো ছন্দের মিল ছাড়া আর অন্য কোন কারণে নেয়া হয়নি, এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ। আসলে এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ নয় বরং বাক্য বিন্যাসের জন্য সূক্ষ্ম অপরিহার্যতার কারণেই এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আল-কুরআনের আরেকটি শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। একটি বিশেষ অর্থে আল-কুরআনে এ ধরনের শব্দ চয়ন করা হয়েছে এবং সাথে সাথে সেই শব্দটি সুর ও তালের মাত্রাকেও ঠিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।</p>
<p>যেমন আমরা আলোচনা করেছি, আল-কুরআনের এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের উচ্চারণের সময় এক ধরনের ছন্দের মিল লক্ষ্য করা যায় এবং শেষে মিত্রাক্ষর দৃষ্টিগোচর হয়। আবার অনেক জায়গায় শব্দ নির্বাচন এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে একটি শব্দ আগ-পাছ করলেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।</p>
<p>প্রথম অবস্থা: প্রথম অবস্থা হচ্ছে কোন শব্দের স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করার উদাহরণ। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর একথাটি যা কুরআন হুবহু নকল করেছে:</p>
<p>قَالَ أَفَرَءَ يْتُمْ مَّا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ &#8211; أَنْتُمْ وَآبَاؤُ كُمُ الْأَقْدَمُونَ &#8211; فَإِنَّهُمْ عَدُولِي الْأَرَبِّ العَلَمِينَ &#8211; الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ &#8211; وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ &#8211; وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ &#8211; وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينَ &#8211; وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يُغْفِرْ لِي خَطِئَتِي يوم الدين &#8211;</p>
<p>(ইবরাহীম (আ) বললো: তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ, তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা? বিশ্ব প্রতিপালক ব্যতীত তারা সবাই আমার শত্রু। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন। তিনি আমাকে মৃত্যু দেবেন আবার তিনিই পুনুরুজ্জীবিত করবেন। আমি আশা করি তিনিই বিচারের দিনে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন।</p>
<p>(সূরা আশ-শুয়ারা: ৭৫-৮২)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতে &#8216;ইয়াহদিনি&#8217; بهدین &#8216;ইয়াসকিনি&#8217; يسقین &#8216;ইয়াশ ফিনি يشفين এবং &#8216;ইউনি&#8217; يُحين শব্দের শেষ থেকে উত্তম পুরুষের &#8216;ইয়া&#8217;-কে বিলুপ্ত করা হয়েছে। কারণ &#8216;তা&#8217;বুদুনা&#8217; تَعْبُدُونَ &#8216;আল আকদামুনা&#8217; الاقدَمُونَ শব্দদ্বয়ের মতো &#8216;নুন&#8217;-এর মিত্রাক্ষর বহাল রাখার জন্য।</p>
<p>এমনিভাবে নিচের আয়াত ক&#8217;টিতেও &#8216;ইয়া&#8217; কে বিলুপ্ত করা হয়েছে:</p>
<p>والفَجْرِ &#8211; وَلَيَالٍ عَشْرٍ &#8211; والشفْعِ والوَتْرِ &#8211; وَالَّيْلِ إِذَا يَسْرِ &#8211; هَلْ فِي ذَلِكَ قَسَمٌ لِذِي حِجْرٍ &#8211;</p>
<p>শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতে, শপথ তার যা জোড় ও বেজোড় এবং শপথ রাতের যখন তা গত হতে থাকে। এর মধ্যে আছে শপথ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য।</p>
<p>(সূরা আল-ফজর: ১-৫)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতে &#8216;ইয়াসরী&#8217; (يَسرى) শব্দের &#8216;ইয়া&#8217; করা হয়েছে, যেন &#8216;আল-ফাজরি&#8217; (الفجر) &#8216;আশরীন&#8217; (والوتر) ইত্যাদি শব্দসমূহের সাথে মিল থাকে।</p>
<p>নিচের আয়াতগুলোও এখানে উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে।</p>
<p>فَتَوَلَّ عَنْهُمْ يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِ إِلَى شَيْءٍ نُكْرٍ &#8211; خُشِعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَحْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادُ مُنْتَشِرُ &#8211; مُهْطِعِينَ إِلَى الداع ، يَقُولُ الْكَفِرُونَ هَذَا يَوْمٌ عَسِرُ</p>
<p>অতএব তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন।</p>
<p>এ আয়াতে &#8216;আদ দায়ি&#8217; (ভূমি) শব্দের শেষ থেকে যদি &#8216;ইয়া&#8217;-কে বিলুপ্ত করা না হতো তবে মনে হতো এ পংক্তিতে ছন্দপতন ঘটেছে। আর এ ত্রুটি কারো নজর এড়াত না। তেমনিভাবে নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করুন:</p>
<p>ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِ ، فَارْتَدَّ عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا</p>
<p>(মূসা বললেন:) আমরাতো এ জায়গাটিই খুঁজছিলাম। অতপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললো।</p>
<p>(সূরা আল-কাহফঃ ৬৪)</p>
<p>এ আয়াতেও যদি تیغ শব্দটি এভাবে تبغى লিখা হতো তবে মিলের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতো।</p>
<p>তদ্রূপ যদি নিচের আয়াতগুলো থেকে আসল &#8216;ইয়া&#8217; এবং উত্তম পুরুষের &#8216;ইয়া&#8217;- এর শেষ থেকে বিরতিসূচক &#8216;হা&#8217; কে বিলোপ করা হয় তবে অবশ্যই ছন্দ পতন ঘটবে।</p>
<p>وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ &#8211; فَأَمُّ هَاوِيَةٌ &#8211; وَصَا أَدْرَكَ مَاهِيَهِ &#8211; نَارٌ حَامِيَةٌ &#8211;</p>
<p>আর যার পাল্লা হাল্কা হবে, তার ঠিকানা হাবিয়া। তুমি কি জানো তা কি? তা হচ্ছে জ্বলন্ত আগুন।</p>
<p>(সূরা আল ক্বারিয়া: ৮-১১)</p>
<p>নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:</p>
<p>فَامَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَبَاهُ بِيَمِينِهِ ، فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَهُ وَأَكِتَبِيه &#8211; إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيْهِ &#8211; فَهُوَ فِي عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ &#8211;</p>
<p>অতপর যার আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে। অতপর সে সুখ-স্বাছন্দে জীবন যাপন করবে।</p>
<p>(সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১)</p>
<p>দ্বিতীয় অবস্থা: শব্দের সাধারণ অবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন করা হয়নি বটে কিন্তু কৌশলী বিন্যাসে তা হয়ে উঠেছে ছন্দময়। যদি সেই বিন্যাসে সামান্যতম হেরফের করা হয় তবে ছন্দের মিল আর অবশিষ্ট থাকে না। নষ্ট হয়ে যায় সুর ব্যঞ্জনা।</p>
<p>ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيا &#8211; اذْنَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا &#8211; قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا &#8211; وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا</p>
<p>এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তাঁর পালনকর্তাকে নিভৃতে আহ্বান করেছিল এবং বলেছিল: হে আমার রব্ব! আমার অস্থি বয়স ভারাবনত হয়েছে। বার্ধক্যে মাথা সুশুভ্র হয়েছে কিন্তু আপনাকে ডেকে কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৪)</p>
<p>ওপরের আয়াতে যদি শুধুমাত্র &#8216;মিন্নী&#8217; منی শব্দটিকে পরিবর্তন করে &#8216;আল আজমু&#8217; العظم শব্দের পূর্বে এনে এভাবে বলা হয় যে, قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ مِنِّي الْعَظْمُ তবে স্পষ্টতই বুঝা যায় উক্ত বাক্যে ছন্দ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র ছন্দ ও মাত্রা ঠিক রাখার জন্যই &#8216;মিন্নী&#8217; منی শব্দটিকে যথাস্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এবার দেখুন কতো সুন্দর মিল দেয়া হয়েছে। বাক্যের প্রথম দিকে বলা হয়েছে : قَالَ رَبِّ إِنِّي এবং তারপরই বলা হয়েছে :</p>
<p>وَهَنَ الْعَظْمُ مِنّى</p>
<p>এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, আয়াতের ভেতর সুর ও ছন্দ এতো সূক্ষ্ম, শুধু অনুধাবন করা যায় কিন্তু ব্যক্ত করা যায় না। আগেও আমরা এ ব্যাপারে কিছুটা আলোচনা করেছি। এ ধরনের সুর ও তাল একক শব্দ সমষ্টি কিংবা একই বাক্যের বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তা অনুধাবন করতে হলে একমাত্র আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েই সম্ভব, অন্য কোনভাবে নয়।</p>
<p>উপরোক্ত আলোচনা একথারই ইঙ্গিত করে যে, আল-কুরআনের বর্ণনা রীতিতে সুর ও ছন্দের ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে হয়। তা এতো স্পর্শকাতর যে, শাব্দিক সাধারণ বিন্যাসের ব্যতিক্রম হলেই ছন্দপতন ঘটে যায়। অথচ তা কবিতা বা কাব্য নয়। এমনকি তা কাব্যের নিয়ম-নীতি মেনে চলতেও বাধ্য নয়। কিন্তু মানুষ একে এমনভাবে সাজানো ও বিন্যাসিত দেখতে পায়, যে কারণে তারা একে কাব্য না বলে কি যে বলবে তাও ভেবে পায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15891</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 May 2025 07:18:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15855</guid>

					<description><![CDATA[যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা মূল ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা মূল ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না কুরআনের দৃশ্যায়নের পুরো বৈশিষ্ট্যসমূহ সামনে চলে আসে। সত্যি কথা বলতে কি, চিত্রায়ণ, কল্পনা ও রূপায়ণ ছাড়াও কুরআনে বহু আলংকারিক দিক রয়েছে। যতোক্ষণ সে অরণ্যে প্রবেশ করা না যাবে ততোক্ষণ কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের কথা বলা যেতে পারে, যা দৃশ্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>শৈল্পিক বিন্যাসের ধরন</strong></h5>
<p>শৈল্পিক বিন্যাসের কয়েকটি স্তর আছে। বিন্যাসের শৈল্পিক এবং আলংকারিক কতিপয় দিক এমন আছে, যে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ বিশ্লেষণ করেছেন। আবার এমন কিছু দিকও আছে যে সবের মধ্যে তাদের স্পর্শ পর্যন্ত পড়েনি।</p>
<p>১. বিন্যাসের একটি ধরন, যার সম্পর্ক ইবাদতের বিন্যাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- উপযোগী কিছু শব্দচয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিন্যাস করায়। যার বদৌলতে সে বাক্য কথা বা পরিশীলনে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ বিষয়ে এতো বেশি আলোচনা হয়েছে যে, নতুন করে আর কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা নেই।</p>
<p>২. বিন্যাসের আরেকটি সম্পর্ক হচ্ছে, সুর ও ছন্দের সাথে। যা শব্দের সঠিক চয়ন এবং তাকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে বিন্যাসের দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটি আল-কুরআনে পুরো মাত্রায় দৃষ্টিগোচর হয় এবং কুরআনের শৈল্পিক ভিত্তিতে তা একাকার হয়ে আছে। তবু আগের মনীষীগণের দৃষ্টি বাহ্যিক সুর ও ছন্দ ছাড়িয়ে আগে বাড়তে পারেনি। এমনকি তারা এটিও জানতেন না যে সঙ্গীতের সুর, তাল ও মাত্রার সংখ্যা কতো এবং তা কোন ঢংয়ে কোথায় ব্যবহৃত হয়।</p>
<p>৩. অলংকার শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ আল-কুরআনের বিন্যাসের আলংকারিক যেসব দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তার একটি হচ্ছে, আল-কুরআনের আয়াতের শেষ অথবা বক্তব্যের শেষ করা হয়েছে বক্তব্যের সাথে সংগতি রেখে। যেমন- যেসব আয়াতে আল্লাহ তা’আলার যাত ও সিফাতের বর্ণনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْئً قدير বাক্য দ্বারা। আবার যেখানে কোন গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: ان الله عَلَيْمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ বাক্যটি দ্বারা। আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে ইসমে মাওসুল (সংযোজিত পদ) নিয়ে তারপর ছিলাহ বা সংযোজক পদ) ছাড়াই বাক্যকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া। তারপর জাযা বা প্রতিফল বর্ণনা করা। যেমন:</p>
<blockquote><p>إِنَّ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِأَيْتِنَا وَاسْتَكْبَرُوا عَنْهَا لَا تُفَتِّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى بَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ</p>
<p>যারা আমার আয়াতে মিথ্যা বলেছে এবং অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং জান্নাতেও যেতে পারবে না, যতক্ষণ সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করতে না পারবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪০)</p></blockquote>
<p>তেমিনভাবে যেখানে তা’লীম ও তারবিয়াতের আলোচনা এসেছে সেখানে ‘রব্ব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:</p>
<blockquote><p>اقرأ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ &#8211; خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ &#8211; أَقْرَا وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَمَ بِالقَلم &#8211; عَلَّمَ الْإِنْسَنُ مَا لَمْ يَعْلَمْ</p>
<p>পড় তোমার রব্ব-এর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়, তোমার রব্ব অত্যন্ত দয়ালু যিনি কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আল-আলাক: ১-৫)</p></blockquote>
<p>যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সম্মান প্রতিপত্তির আলোচনা এসেছে সেখানে اللَّهَ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:</p>
<p>إِنَّ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ ، وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ، وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ</p>
<p>নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। (সূরা লুকমান: ৩৪)</p>
<p>এমনিভাবে اللَّهَ শব্দটি স্থান ও কালভেদে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো আল্লাহ শব্দটি একবার বলে পরবর্তী আয়াতসমূহে শুধুমাত্র সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও বাক্যের প্রথমে, আবার শেষে, আবার কোথাও আল্লাহ শব্দ এবং তার সর্বনাম যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় প্রশ্নের অবতারণার জন্য আবার অনেক জায়গায় ইতিবাচক বর্ণনার জন্য নেয়া হয়েছে। এটি অনেক অলংকার শাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিকট আলংকারিক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত।</p>
<p>৪. কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যের অর্থগত ধারাবকাহিকতা থাকে। অতপর একটির উদ্দেশ্যকে অন্যটির উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করার ফলে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাও এক ধরনের শৈল্পিক বিন্যাসের নমুনা। অবশ্য অলংকার শাস্ত্রবিদগণ শৈল্পিক বিন্যাস সম্পর্কে যে নীতির কথা বলেন আল-কুরআন তা থেকে মুক্ত।</p>
<p>৫. সম্ভবত শৈল্পিক বিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর যে সম্পর্কে অলংকার শাস্ত্রবিদগণ এ পর্যন্ত পরিচিতি লাভ করেছেন তা হচ্ছে আল-কুরআনের স্বভাবজাত বিন্যাস, যা কাতিপয় আয়াতের বর্ণনা পরম্পরায় পাওয়া যায়। যেমন সূরা আল-ফাতিহা প্রসঙ্গে আমরা আল্লাম যামাখশারীর লেখা থেকে ‘আল-কুরআনের গবেষণা ও তাফসীর’ অধ্যায়ে উদ্ধৃতি দিয়েছি। অলংকার শাস্ত্রবিগদগণ যে বৈশিষ্ট্যসমূহ নিরূপণ করেছেন, কুরআনী বালাগাতের গবেষক আলিমগণ আজ পর্যন্ত তাকে শৈল্পিক বিন্যাসের উত্তম প্রকাশ বলে ঘোষণা দিয়ে আসছেন। আশ্চর্যের কথা এই যে, তারা শৈল্পিক বিন্যাসের অন্য দিকটির নাগালও পাননি। তারা বেশি অগ্রসর হয়ে করার মধ্যে এই করেছেন, আল-কুরআনের সুর ও ছন্দ নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত তাদের নিকট মনে হয়েছে কুরআনের অন্য কোন বৈশিষ্ট্যই আর নেই। প্রকৃতপক্ষে কুরআনী বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য মাত্র। কিন্তু এখানেই তারা পরিতৃপ্ত হয়ে বসে পড়েছেন।</p>
<p>কেননা বালাগাতের আলিমগণ এর মর্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না যে, চিত্রায়ণ ও দৃশ্যাঙ্কনের মাধ্যমে আল-কুরআনে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তা মুল বা ভিত্তির মর্যাদা রাখে। তাই তারা শৈল্পিক বিন্যাসের ব্যাপারটি ভালভাবে আলোকপাত করতে পারেননি। এ বিষয়ে আমরা আমাদের নতুন চিন্তা-গবেষণা পেশ করবো বলেই এ পুস্তকটি লিখা হয়েছে। পুরোনো বিষয় নিয়ে বিবাদ বা তর্ক-বিতর্ক করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাচ্ছি কুরআনের আলংকারিক দিক সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয়েছে তা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার চেষ্টা করা। আমাদের পূর্বসূরীরা যেখানে পৌঁছে থেমে গেছেন তা থেকে আরো সামনে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। কেননা তার প্রচুর অবকাশ আছে। এ বিষয়ে আমরা ঐ সমস্ত উদাহরণকে যথেষ্ট মনে করি, যা আমরা প্রথমদিকে ‘সূরা আল-আলাক’ –এর ব্যাখ্যায় এবং ‘আল কুরআনের সম্মোহনী শক্তির উৎস’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। ঐসব উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল-কুরআনে চিন্তার যোগসূত্রতা এবং বাহ্যিক বিন্যাস প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ ও অবকাশ আছে।</p>
<p>আমরা শুধু একথাটি ইঙ্গিত দিতে চাই, আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী এবং ঐ সমস্ত স্থান, যা ঘটনার সাথে জড়িত এ দু’য়ের মধ্যে এক অদৃশ্য আত্মিক বন্ধন রয়েছে। সেই সাথে কুরআন সেসব ঘটনার দ্বীনি উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং শৈল্পিক দিকের প্রতিও দৃষ্টি রাখে।  এছাড়াও কিয়ামতের দৃশ্য, শান্তি ও শাস্তির দৃশ্য, জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কথপোকথনের দৃশ্যাবলীতেও এ ধরনের মিল পাওয়া যায়, যা আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীতে বিদ্যমান। এ সমস্ত বিষয় বর্ণনার সময় একটি ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্রের প্রতিও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তাই বলে মূল উদ্দেশ্যটাকেও সরাসরি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়নি, যে উদ্দেশ্যে ঐ ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে।</p>
<p>মূল কথা হচ্ছে কুরআনে কারীমের অর্থ ও তাৎপর্য এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং অতি উন্নত। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার নিগুঢ় যে সৌন্দর্য, দৃশ্যায়ন থেকে তার বিস্তৃতি অনেক বেশি। আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় যে, আলোচনার সহজ ও সমতল পথ ছেড়ে অগ্রসর হয়ে এক ঝটকায় কলমের গতি সেই বিষয়বস্তুর সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে উপনীত করবো। এজন্য আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে সেই চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>১</h4>
<p>কুরআনুল কারীমে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে চিত্রায়ণ পদ্ধতে তার বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, সেখানে বক্তব্য এবং অবস্থার মধ্যে পুরোপুরি মিল পাওয়া যায়। যেমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বর্ণনার এ ঢং অথবা আভিধানিক অর্থ ছবির লক্ষণসমূহ পরিপূল্ণ করতে সহায়ক প্রমাণিত হয়্ এটি এমন একটি বাঁক যা বর্ণনার জন্য ব্যাখ্যা এবং ছবির মধ্যে যোগসূত্রের মর্যাদা রাখে। যেখান থকে হাল্কা ঢংয়ের বর্ণা এবং উঁচু মানের নির্মাণ শৈলীর রাস্তা পৃথক হয়ে যায়। যেমন পরবর্তী আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:</p>
<p>إِنْ شَرِّ الدَّوابِ عِنْدَ اللهِ الصُّمُّ البُكُمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ</p>
<p>নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় নিকৃষ্ট সেইসব মুক ও বধির- যারা উপলব্ধি করে না। (সূরা আল-আনফাল: ২২)</p>
<p>الدواب শব্দটি সাধারণ জীবজন্তুর বেলায় ব্যবহৃত হয়। অবশ্য অনেক সময় এ শব্দটি দিয়ে মানুষকে বুঝানো হয়। কেননা دابة শব্দ দিয়ে ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল প্রাণীকেই বুঝায় যেহেতু মানুষও ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করে তাই মানুষের বেলায়ও এ শব্দটি প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু دابة শব্দটি মানুষ অর্থে গ্রহণ করতে বিবেক বাধ্য নয়। এটি স্বাভাবিকতার বিপরীত। এখানে মানুষের জন্য الدواب শব্দটি ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে তাদের চরিত্র ও আচার আচরণে পশু সুলভ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়, যা তাদের হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধক। এ থেকেই তাদের গাফলতি ও পশুত্বের ছবি পরিপূর্ণ হয়ে যায় لَا يَعْقِلُونَ (তারা উপলব্ধি করে না) শব্দ দিয়ে একথাটিকে আরো পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে।</p>
<p>অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:</p>
<p>وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُوْنَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَهُمْ</p>
<p>আর যারা কাফির তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো আহার করে, তাদের বাসস্থান জাহান্নাম। (সূরা মুহাম্মদ : ১২)</p>
<p>এ আয়াতে কাফিরদেরকে জন্তু-জানোয়ারের সাথে তুলনা করে এক চমৎকার চিত্র অংকন করা হয়েছে। কারণ তারা অল্প ক’দিনের দুনিয়ায় খুব আনন্দ ফূর্তি করছে এং বিভিন্নবাবে তারা দুনিয়ার রং-তামাসাকে উপভোগ করার প্রয়াস পাচ্ছে। কিন্তু পরকালের শাস্তি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন যা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যে আচরণ একমাত্র জন্তু-জানোয়ারের দ্বারাই শোভা পায়। সেগুলো খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ ফূর্তিতে মশগুল থাকে কিন্তু একবারও ভেবে দেখে না, কসাইয়ের ছুরি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেগুলোর একমাত্র কাজই যেন শুধু খাওয়া- দাওয়া ও আনন্দ-ফুর্তি করা।</p>
<p>আরো একটি উদাহরণ দেখুন:</p>
<p>نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَكُمْ وَ فَاتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ</p>
<p>তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ। নিজেদের ক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছে যাও। (সূরা আল-বাকারা: ২২৩)</p>
<p>এ আয়অতে কয়েক প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য মিল পাওয়া যায়। এখানে স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শকাতর সম্পর্ককে বড় সূক্ষ্ম ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপমা হচ্ছে স্বামসী-স্ত্রীর সম্পর্কে একজন কৃষক ও তার জমির সাথে তুলনা করা হয়েছে। জমি যেমন ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র তদ্রূপ স্ত্রীও সন্তান উৎপাদনে ক্ষেত্র। জমির ফসল দিয়ে যেমন গোলা পরিপূর্ণ করা হয়, তেমনি স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করে বংশধারাকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে গোটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সঠিক ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>২</h4>
<p>অনেক সময় শুধুমাত্র একটি শব্দ-পুরো বাক্য নয়- ছবির আংশিক পূর্ণতার স্বাক্ষর বহন না করে বরং পুরো ছবিটিকেই উদ্ভাসিত করে তোলে। চিত্রায়ণ পদ্ধতিতে এ মিল পূর্বের চেয়েও জোরালো। এটি পূর্ণতার কাছাকাছি প্রায়। এর গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণ পূর্ণবাক্য ব্যতিরেকে শুধুমাত্র একটি শব্দই একটি চিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। সেই শব্দটি কর্ণগোচর হওয়া মাত্র মনের মুকুরে ভেসে উঠে একটি পরিপূর্ণ চিত্র।</p>
<p>يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَالَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّا قَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ</p>
<p>হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হয়েছে, যখন আল্লহর পথে তোমাদেরকে বের হওয়ার জন্য বলা হয়, তখন তোমরা জমিন আঁকড়ে পড়ে থাক। (সূরা আত-তাওবা: ৩৮)</p>
<p>এ আয়াত পাঠকালে যখন إِنَّا قَلْتُمْ শব্দটি কর্ণগোচর হয় তখনই চিন্তার জগতে একটি ভারী বস্তুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। মনে হয় কোন ব্যক্তি যেন ভারী কোন বস্তুকে উঠানোর জন্য বারবার চেষ্টা করছে কিন্তু তা ভারী হওয়ার কারণে উঠাতে পারছে না। মনে হয় শব্দটি ওজনে কয়েক টন। যদি আয়াতে تثا قلتم বলা হতো (মূলত দুটো শব্দের অর্থ একই) তবে পূর্বের শব্দের মতো এতো ভারী বুঝাত না। উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেত। কিন্তু ব্যবহৃত শব্দটির এতো যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে যে, শ্রোতা শোনামাত্র দুঃসাধ্য এক ভারী বোঝার চিত্র তার কল্পনার চোখে ভেসে উঠে।</p>
<p>এ ধরনের আরেকটি আয়াত হচ্ছে:</p>
<p>وَإِنَّ مِنْكُمْ لَمَنْ لَيُبَطِئَنُ</p>
<p>আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে যারা (ইচ্ছেকৃত) বিলম্ব করবে। (সূরা আন-নিসা: ৭২)</p>
<p>এ আয়াতটি পড়া মাত্র বিলম্বের একটি ধারণা সৃষ্টি হয় বিশেষ করে لِيُبَطِن শব্দটি পাঠ কিংবা শ্রবণ করা মাত্র চোখের সামনে এক চিত্র ভেসে উঠে। তা হচ্ছে সেই কথা বলতে তাদের জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যায়। বহু কষ্টে এবং অনেক বিলম্বৈ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে।</p>
<p>আল-কুরআনে হযরত নূহ (আ)-এর কথাটি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>قَالَ يَقَوْمَ أَرَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةِ مِنْ رَبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ ، أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَرِهُونَ</p>
<p>(নূহ বললেন: ) হে আার জাতি। দেখ তো আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলিলের ওপর থাকি, তিনি যদি তার পক্ষ থেকে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তার পরেও যদি তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তবে আমি কি তা তোমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি, তোমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে? (সূরা হুদ: ২৮)</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে لز مُكْمُومًا শব্দটি পাঠ করা মাত্র অপছন্দ ও পীড়াপীড়ির এক চিত্র ভেসে উঠে মনের মুকুরে। তার সমস্ত চেতনা ও বাকশক্তি পরস্পর এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যেমন كَرَهُونَ বা ঘৃণাকারী সেই জিনিসের সাথে আচরণ করে যা সে ঘৃণা করে। এ আয়াতে শব্দ ও অর্থের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক প্রতিভাত হয় তা বালাগাত ও ফাসাহাতের এক বলিষ্ঠতম প্রয়োগ। যাকে পূর্ব যুগের ও বর্তমান যুগের মুফাসসিরগণ আল-কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে অভিহিত করেছেন।</p>
<p>অন্যত্র বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ ، لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِّنْ عَذَابِهَا ، كَذَالِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ &#8211; وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيْهَا ، رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ</p>
<p>আর যারা কাফির,তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশ দেয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি অকৃতজ্ঞদেরকে এভাবেই শাস্তি প্রদান করি। সেখানে তারা আর্ত চীৎকার করে বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান থেকে বের করে দিন, আমরা সৎকাজ করবো, পূর্বে যা করেছি তেমনটি আর করবো না। (সূরা ফাতির: ৩৬-৩৭)</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে يَصْطَرخُون শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, জাহান্নামীরা চীৎকার করছে, সে আওয়াজ চতুর্দিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেই সাথে আরেকটিচিত্র ভেসে উঠে- তাদের এ মর্মান্তিক চীৎকার কেউ শুনছে আর না এর কোন প্রতিকার করার জন্য কেউ এগিয়ে আসছে সেই প্রাণান্তকর চীৎকারের কারণে। এ চিত্র থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে, শাস্তির তীব্রতা কতো ভয়াবহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন একটি মাত্র শব্দ সমস্ত বাক্যের বক্তব্যকে প্রস্ফুটিত করে তোলে তখন তা হয় تَنَاسُ বা (শৈল্পিক) বিন্যাসের চূড়ান্ত রূপ। যেমন:</p>
<p>عُتُلِ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيْم কঠোর স্বভাব তদুপরি কুখ্যাত। (সূরা ক্বলম: ১৩)</p>
<p>এ আয়াতে عُتُلِ শব্দটি কঠোর স্বভাব ও নির্মমতার পূর্ণ চিত্র অংকন করার জন্য যথেষ্ট।</p>
<p>এ রকম আরেকটি আয়াতে কারীমা :</p>
<p>وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمِّرَ কিন্তু এতো দীর্ঘজীবন তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। (সূরা আল-বাকারা: ৯৬)</p>
<p>এ আয়াতে بِمُزَحْزِحِهِ এর কর্তা হচ্ছে نْ يُعْمَرَ। যা পরিপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত একটি চিত্র অংকন করেছে। কথা ক’টি মুখে উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই চিত্র।</p>
<p>পরবর্তী আয়াতটিও একটি উত্তম উদাহরণ:</p>
<p>فَكُبْكِبُوا فِيهَا هُمْ وَالْغَاوَّنَ &#8211; وَجُنُودُ ابْلِيْسَ اجْمَعُونَ</p>
<p>অতপর তাদেরকে এবং পথভ্রণ্টতের (অর্থাৎ মূর্তি এবং মূর্তিপূজকদের অধোমুকি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং ইবলিস বাহিনীর সকলকেও। ( সূরা আশ-শুআরা: ৯৪-৯৫)</p>
<p>এ আয়াতে فَكُبْكِبُوا শব্দটি জাহান্নামে পতিত হওয়ার যে আওয়াজ তার প্রতিনিধিত্ব করছে।</p>
<p>উল্লেখ্য যে, আয়াত দুটোতে بِمُزَحْزِحِهِ এবং فَكُبْكِبُوا শব্দদ্বয়ের আক্ষরিক অর্থই গোটা ছবিটিকে চোখের সামনে উদ্ভাসিত করে তোলে। কথা এটি নয় যে, কুরআনের বিশেষ ব্যবহারে তার মধ্যে এ ধরনের ধারণা সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মাত্র যে শব্দগুলো স্মরণ করা হলো তা কুরআনের বিশেষ এক প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে এবং একবার মাত্র তা বর্ণিত হয়েছে। অবশ্যই একথা বলা যায় যে, উল্লেখিত শ্বদ্বয় যে স্থানে প্রয়োগ করা হয়েছে নিঃসন্দেহে তা আলংকরিক বর্ণনাসমূহের মধ্যে উৎকৃষ্ট বর্ণনা হিসেবে গণ্য।</p>
<p>কুরআনে কারীমে কিয়ামতের বিশেষণমূলক যে কটি প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার মধ্যে الصاخة (বধিরকারিণী) এবং الظلمة (সকল কিচুর ওপর বিস্তার লাভকারী) শব্দ দুটোও আছে। الصاخة শব্দের মধ্যে এমন পরিমাণে গর্জন ও কাঠিন্য পাওয়া যায়, শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, সে গর্জনে কান ফেটে যাবে। এ শব্দটি বাতাস ভেত করে কর্ণকুহরে গিয়ে আঘাত করে এবং বধির করে দেয়। তেমনিভাবে الطامة শব্দটিও মনে হয় তীব্রবেগে চলমান। এটি ঝড়েরর গতিতে সকল কিছুতে ছেয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলছে। এ রকম আরেকটি আয়াত:</p>
<p>وَالصُّبْحِ إِذَا تَنَفْسَ সকাল বেলার শপথ, যখন সে শ্বাস গ্রহণ করে (অর্থাৎ উদ্ভাসিত হয়) । (সূরা তাকবীর: ১৮)</p>
<p>আমি تَنَفْسَ এর মতো সূক্ষ্ম ও মনোরম শব্দ চয়ন দেখে এবং এর বিকল্প প্রতিশব্দের কথা চিন্তা করে ‘থ’ খেয়ে গেলাম। আপনিও কুরআনের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে অবাক হয়ে যাবেন এবং একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দটি নির্বাচনে আল-কুরআনের সৌন্দর্য ও অলৌকিকত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে:</p>
<p>إِذْ يُغَشَيْكُمُ النُّعَاسَ آمَنَةً مِّنْهُ</p>
<p>যখন তিনি তোমাদের প্রশান্তির জন্য নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর নিদ্রার চাদর বিছিয়ে দিলেন। (সূরা আল-আনফাল: ১১)</p>
<p>এ আয়অতে নিদ্রাকে النُّعَاسَ (তন্দ্রাবেশ) শব্দ দিয়ে প্রচণ্ড প্রভাবের কথা বুঝানো হয়েছে। মনে হয় নিদ্রা এক ধরনের পাতলা ও সূক্ষ্ম চাদর যা খুব আরাম ও মসৃণতার সাথে ঢেকে দেয়। آمَنَةً مِّنْهُ শব্দ থেকে মনে হয় গোটা পৃথিবীব্যাপী প্রশান্তি ও নিরাপত্তা ছেয়ে আছে।</p>
<p>শব্দ ও উচ্চারণ থেকে চিত্রায়ণ আমরা আল-কুরআনের সর্বশেষ সূরা- সূরা আন- নাসেও দেখতে পাই। চিন্তা করে দেখুন:</p>
<p>قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ &#8211; مَلِكِ النَّاسِ &#8211; إِلَهِ النَّاسِ &#8211; مِنْ شَرِّ الوسوَاسِ الْخَنَّاسِ &#8211; الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ – مِنَ الجنة والناس &#8211;</p>
<p>বলে দাও, আমি মানুষের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। (আশ্রয় চাচ্ছি) লোকদের প্রকৃত বাদশাহরে নিকট। মানুষের ইলাহ্‌র নিকট। শয়তানের খারাপ ওয়াসওয়াসা থেকে (যে আল্লাহর নাম শুনে ভেগে যায়), যে লোকদের অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। চাই সে মানুষের থেকে হোক কিংবা জ্বিনদের মধ্য থেকে। (সূরা আন-নাস: ১-৬)</p>
<p>এ সূলাটিকে বার বার পড়ুন এবং দেখুন আপনার আওয়াজ একটি পরিপূরণ ওয়াসওয়াসার সৃষ্টি করবে যা অবিকল সূরায় বর্ণিত ওয়াসওয়াসার মতো। বিশেষ করে নিম্নোক্ত আয়াত পাঠে সৃষ্টি হয়।</p>
<p>مِنْ شَرِّ الْوَسْوَسِ الْخَنَّاسِ &#8211; الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورُ النَّاسِ</p>
<p>আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন। ইরশাদ হচ্ছে:</p>
<p>كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ ، إِنْ يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا</p>
<p>কতো কঠিন তাদের মুখের কথা, তারা যা বলে তাতো সবই মিথ্যে। (সূরা কাহাফ: ৫)</p>
<p>এ আয়াতটিও আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। তবে সামান্য পার্থক্য আছে। এ আয়াতে একটি দোষের কথা বলা হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তান আছে। এ আয়াতে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এ চরম মিথ্যে কথাটিকে খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন প্রথমে كَبُرَتْ কথাটি বলে কর্তকে গোপন রাখা হয়েছে। আবার كَلِمَةً শব্দটি তমীয ও নাকারা (অনির্দিষ্ট) হিসেবে নিয়ে জঘণ্যতার মাত্রাধিক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর مِنْ أَفْوَاهِهِمْ বলে বুঝান হয়েছে, কথাগুলো মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃত এবং অজ্ঞতা প্রসূত বের হয়েছে। أَفْوَاهِهِمْ এর মাধ্যমে যে ঘৃণা ও নীচতা সৃষ্টি হয় তাকে বলবৎ রাখা হয়েছে। এ শব্দটি উচ্চারণের সময় মুখকে সামান্য ফাঁক করা হয় কিন্তু শেষ মীম টি উচ্চারণের সাথে সাথে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তখনও কণ্ঠনালী থেকে বাতাস বেরিয়ে মুখ ভর্তি থাকে।</p>
<p>এক ধরনের শব্দ আছে, যা বিষয়বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে ঠিকই কিন্তু নিজের বক্তব্য ও আওয়াজকে কানে প্রবেশ করিয়ে নয়। তার চিত্রের পরিধি শুধুমাত্র ঐ ছায়ার মতো যা চিন্তার জগতে সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য যে, শব্দ এবং বাকের নিজস্বএক ছায়া বা প্রতিবিম্ব থাকে, যখন মানুষের দৃষ্টি পড়ে তখন তা দৃষ্টিগোচর হয়। এর উদাহরণ হচ্ছে নিচের এ আয়াতটি:</p>
<p>وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَا الَّذِي أَتَيْنُهُ أَيْتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا</p>
<p>তাদেরকে ঐ ব্যক্তির অবস্থা শুনিয়ে দাও যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। (সূরা আরাফ: ১৭৫)</p>
<p>এ আয়াতে ‘ফানসালাখা’ শব্দটি দ্বারা অনুমিত হয়, ঐ ব্যক্তিকে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিল সে তা থেকে কিভাবে বেরিয়ে গেছে। নিচের আয়াতটিও আরেকটি উত্তম উদাহরণ:</p>
<p>فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَيْفًا يَتَرَقُبُ</p>
<p>অতপর তিনি প্রভাতে শঞরে ভীত শংকিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। (সূরা কিসাস: ১৮)</p>
<p>এ আয়াতে يُتَرَ قُتُ শব্দে হযরত মূসা (আ)-এর ভীত ও শংকিত হবার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সামনে রাখতে হবে যে, হযরত মূসা (আ) ভয়ের প্রকাশ স্থল ‘ফিল মাদীনাতি’ অর্থা শহরকে মনে করেছেন যা সাধারণ শান্তি ও নিরাপত্তার হয়ে থাকে। যদিও ‘ইয়াত্তারাক্কাবু’ ঐ সমস্ত জায়গাকেই বলা হয় যেখানে ভয়-ভীতি লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে শান্তি নিরাপত্তার জায়গাকে ভীতিকর চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>আমরা ইতোপূর্বে ‘কল্পনা ও রূপায়ণ’ অধ্যায়ে এ ধরনের উদাহরণ পেশ করেছি, সেগুলোও এর সাথে পূর্ণ সঙ্গতি রাখে।</p>
<p>কখনো কখনো একই শব্দে আওয়াজ এবং প্রভাব একত্রিত হয়ে থাকে। যেমন:</p>
<p>يَوْمَ يُدَعُونَ إِلَى نَارِ جَهَنَّمَ دَعا</p>
<p>যেদিন তাদেরকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ধাক্কিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (সূরা আত-তুর: ১৩)</p>
<p>এ আয়াতে دَعا শব্দটি আওয়াজ ও প্রভাবের সাথে সাথে তার তাৎপর্যের চিত্র সৃষ্টি করে। এখানে চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে دَعا শব্দের অর্থ জোরের সাথে ধাক্কা দেয়া। যখন খুব জোরে কাউকে ধাক্কা দেয়া হয় তখন তার মুখ থেকে তার অজান্তে عُو শব্দটি বেরিয়ে যায়। এ শব্দটি دَعا শব্দের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যশীল। নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:</p>
<p>خَذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ</p>
<p>একে ধরো এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। (সূরা দুখান: ৪৭)</p>
<p>এ আয়াতে فَاعْتِلُوهُ শব্দটির আওয়াজ কানে প্রবেশ করা মাত্র ভাবজগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং একটি জীবন্ত ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে।</p>
<p>এ অধ্যায়ে আমরা সেইসব শব্দের উল্লেখ করতে পারি, যে সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম, আওয়াজটাই তার আক্ষরিক অর্থের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন النُّعَاسَ (তন্দ্রা), التَّنَفْسُ (শ্বাস গ্রহণ করা), الطامة (কিয়ামত)। এসব শব্দ আওয়াজের সাথে সাথে একটি ছায়াও সৃষ্টি করে। কিন্তু এর আওয়াজ ও ছায়ার মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান তার সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। যখন শব্দ তার অর্থ ও ভাবের ছবি অংকন করে তার ধ্বনি ও ভাব একত্রিত হয়ে যায়। তা শুধু অর্থগত দিকে নয় বরং চিন্তা ও চিত্রের দিকেও ধাবিত হয়। আর ঐ জায়গাটিই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্যস্থল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>৩</h4>
<p>আল-কুরআন তার বক্তব্য তুলে ধরার জন্য দৃশ্যায়নের যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তার মধ্যে তাকাবুল বা বৈপরিত্যও একটি। কুরআন যেখানে শব্দের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চিত্র অংকন করতে চায় সেখানে অধিকাংশ সময় তাকাবুল পদ্ধতির অনুসরণ করে থাকে। যেমন :</p>
<p>وَمِنْ أَيْتِهِ خَلْقُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ ، وَهُوَ علَى جَمْعِهِمْ إِذَا يَشَاءُ قَدِيرٌ</p>
<p>তার এক নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব প্রাণী ছড়িযে দিয়েছেন। তিনি তখন ইচ্ছে এগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম। (সূরা আশ শুরা: ২৯)</p>
<p>এ আয়াতে بَثَّ (বিক্ষিপ্ত) এবং جَمْعِهِمْ (একত্রিত করা) শব্দদ্বয় তাকাবুল বা বৈপরিত্যের। বিপরীতমুখী এ শব্দ দুটোকে একই আয়অতে একত্রে প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা হয়েছে। যা চিন্তার জগতে একের পর এক ছবির মতো আবির্ভূত হয়। যদিও শব্দ দুটো বিপরীতার্থক তবু তা সুন্দরভাবে মিলে গেছে।</p>
<p>নিচের আয়াতটিতে জীবন ও মৃত্যু বিপরীতধর্মী দুটো চিত্রকে একত্রিত দেয়া হয়েছে।</p>
<blockquote><p>أَوَلَمْ يَهْدِ لَهُمْ كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْقُرُونِ يَمْشُونَ فِي مَسْكِنِهِمْ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ الْأيْت أَفَلَا يَسْمَعُونَ &#8211; أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَسُوقُ المَاءَ إِلَى الْأَرْضِ الجُرُزِ فُنُخْرِجُ بِهِ زَوْعًا تَأْكُلُ مِنْهُ أَنْعَامُهُمْ وَأَنْفُسُهُمْ ، أَفَلَا يُبْصِرُونَ &#8211;</p>
<p>এতে কি তাদের চোখ খুলেনি, আমি তাদের পূর্বে অনেক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যাদের বাড়ি-ঘরে এরা বিচরণ করে। অবশ্যই এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে। তারা কি শোনে না? তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি উষর ভূমিতে পানি প্রবাহিত করে শস্য উৎপন্ন করি। যা তারা এবং তাদের পশুগুলো খেয়ে থাকে। তারা কেন এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে না? (সূরা সাজদা: ২৬-২৭)</p></blockquote>
<p>দেখুন, এ আয়াতে জীবন মৃত্যুর মধ্যে কতো পার্থক্য। প্রথমে ঐ সমস্ত লোকের কথা বলা হয়েছে যার একদিন জমিনের ওপর চলাফেলা করতো। আজ তারা মৃত, তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তাদের আবাসভূমি বিরাণ। আবর পলকের মধ্যে অন্য রকম এক চিত্রের অবতারণা। মৃত জমিনকে সবুজ-শ্যামল করে সুশোভিত করার চিত্র। এখানে তাকাবুল বা বৈপরিত্ব মূলত এক অবস্থার সাথে আরেক অবস্থার মধ্যে নয় বরং জীবন ও মৃত্যুর সাথে।</p>
<p>এ ধরনের ‘তাকাবুল’ (বৈপরিত্য)-এর চিত্র পরকালীন জীবনের শান্তি ও শাস্তি প্রসঙ্গে যেসব জায়গায় বলা হয়েছে সেখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ধরনের কতিপয় উদাহরণ আমরা নিচে বর্ণনা করলাম।</p>
<p>كَلَّا إِذَا ذُكت الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا &#8211; وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجَايْءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يُتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذكرى &#8211; يَقُولُ يُلَيْتَنِي قَدَّمَتْ لِحَيَاتِي &#8211; فَيَوْمَئِذٍ الْايُعَذِّبُ عَذَابَةٌ أَحَدٌ &#8211; ولا يُؤْثِقُ وثَاقَةٌ أَحَدٌ &#8211; يَايْتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ &#8211; ارْجِعِي إِلى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةٌ &#8211; فَادْخُلِي فِي عِبْدِي &#8211; وَادْخُلِي جَنَّتِي &#8211;</p>
<p>এটি অনুচিত। যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং তোমার প্রতিপালক আবির্ভূত হবেন। ফেরেশতাগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িযে যাবে এবং জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে। কিন্তু এ স্মরণ তার কী কাজে আসবে? সে বলবে : হায় আমিযদি এ জীবনের জন্য আগেই কিছু পাঠিয়ে দিতাম। সেদিন তার শাস্তির মতো শাস্তি কেউ দেবে না এবং সে বাঁধনের মতো বাঁধনও কেউ দেবে না। (সূরা ফজর: ২১-৩০)</p>
<p>চিন্তা করে দেখুন, একদিকে জাহান্নাম ভয়াবহ রূপে উপস্থিত এবং অপরদিকে ফেরেশতাগণ সেনাবাহিনীর মতো ঘিরে দাঁড়ানো। জাহান্নাম অত্যন্ত ভয়াল মূর্তিতে আবির্ভূত। তার শাস্তি এতো ভয়ঙ্কর যার কোন উপমা নেই।</p>
<p>এমন বিপদ এবং বিপর্যয়ের মুহূর্তেও ঈমানদারদেরকে ডেকে বলা হবে:</p>
<blockquote><p>بايْتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مُرْضِيَّةً &#8211; فَادْخُلِي فِي عِبْدِي &#8211; وَادْخُلِي جَنَّتِي</p>
<p>হে প্রশান্ত মন! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরা ফজর: ৩০)</p></blockquote>
<p>এমন বিভিষিকাময় অবস্থায়ও একজন মু’মিনকে দরদ ও স্নেহমাখা বাক্যে আহ্বান করা হবে- ‘হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার রব্ব-এর দিকে ফিরে যাও।’ আর এ ফিরে যাওয়ার মধ্যে ঐ বান্দা এবঙ প্রতিপালকের সাথে গভীর ভালবাসা ও সন্তোষের প্রমাণ পাওয়া যায়। رَاضِيَةً مُرْضِيَّةً অর্থাৎ উভয়ে উভয়ের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন। এসব শব্দে প্রেম-ভালবাসার যে নিদর্শন পাওয়া যায় মনে হয় পুরো পরিবেশটাই প্রীতিডোরে বাধা। তারপর বলা হয়েছে: فَادْخُلِي فِي عِبْدِي আমার বিশেষ বান্দাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং তাদের তাদের সাথে হৃদ্যতা সৃষ্টি করো। وَادْخُلِي جَنَّتِي তারপর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। জাহান্নামের বর্ণনা পুরো পরিবেশটিকে ভয় ও পেরেশানীর এক চিত্রে ঘিরে রেখেছিল। এখানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র পাওয়া যায়। যা প্রেম-প্রীতিতে পরিপূর্ণ।</p>
<p>ওপরের উদাহরণটি ছিল কাফির ও মু’মিনের মধ্যে বিপরীতধর্মী এক চিত্র। একন আমি জাহান্নামীদের আযাব ও জান্নাতীদের নিয়ামতের বিপরীতধর্মী এক চিত্র পেশ করছি।</p>
<blockquote><p>هَلْ أَنَّكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ &#8211; وَجُوهٌ يَوْمَئِذٍ خَاشِعَةٌ &#8211; عَامِلَةٌ ناصِبَةٌ &#8211; تَصْلَى نَاراً حَامِيَة &#8211; تُسْقَى مِنْ عَيْنِ أَنِيَةٍ &#8211; لَيْسَ لَهُمْ طعامُ الْآمِنْ ضَرِيع &#8211; لا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُوعٍ &#8211; وُجُوهٌ يَوْمَئِدْ نَّاعِمَةٌ لِسَعِيْهَا رَاضِيَةٌ &#8211; فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ &#8211; لا تَسْمَعُ فِيهَا لاغية &#8211; فِيهَا عَيْنُ جَارِيَةٌ &#8211; فِيهَا سُرُرُ مُرْفُوعَةٌ &#8211; وَأَكْوَابٌ مُوْ ضُوعَةٌ &#8211; وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ &#8211; وَزَرَبِّي مَبْثُونَةٌ &#8211;</p>
<p>তোমার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? অনেক মুখমণ্ডলণ সেদিন হবে লাঞ্ছিত, ক্লিষ্ট-ক্লান্ত। তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে। তাদেরকে ফুটন্ত নহর থেকে পান করানো হবে, আর কাঁটাযুক্ত ঝাড় ছাড়া তাদের জন্য কোন খাদ্য নেই। এতে তাদের দেহের পুষ্টি সাধন কিংবা ক্ষুধা নিবারণ হবে না। আবার অনেক ‍মুখমণ্ডল সেদিন হবে সজীব। তাদের কর্মের কারণে সন্তুষ্ট। তারা থাকবে সুউচ্চ জান্নাতে। সেখানে কোন অসার কথাবার্তা তারা শুনবে না। সেথায় থাকবে প্রবাহিত ঝর্ণা, উন্নত সুসজ্জিত আসন এবঙ সংরক্ষিত পানপাত্র ও সারি সারি গালিচা এবং বিস্তৃত বিছানো কার্পেট।</p></blockquote>
<p>আযাব ও নিয়ামতের বিপরীতধর্মী একটি সুন্দর চিত্র পূর্বের আয়াত কটি। এ ধরনের উদাহরণ আল-কুরআনে অনেক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>৪</h4>
<p>ওপরের উদাহরণগুলো ছিল দু’টো বিপরীতধর্মী চিত্র। কিন্তু এবার আমরা এমন কিছু উদাহরণ পেশ করবো যা বিপরীতধর্মী বটে কিন্তু তার একটি অতীতের এবং অপরটি বর্তমানকালের। অতীতকে কল্পনায় বর্তমানে নিয়ে এসে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী ছবি আঁকা হয়েছে। যেমন:</p>
<p>خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ</p>
<p>তিনি মানুষকে এক ফোটা বীর্য দিয়ে সৃষ্টি করেচেন। তা সত্ত্বেও সে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। (সূরা আন-নাহল: ৪)</p>
<p>যে অবস্থা বর্তমানে আমাদের সামনে উপস্থিত তা একজন প্রকাশ্য ঝগড়াটে خَصِيمٌ مُّبِينٌ ব্যক্তির, কিন্তু অতীতে সে ছিল সামান্য এক ফোটা বীর্য মাত্র। এ দু’ অবস্থার মধ্যে যে ব্যাপক ব্যবধান তাই এখানে বুঝান উদ্দেশ্য। এজন্র দুটো অবস্থার মধ্যবর্তী অবস্থাকে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন একথা প্রকাশ করা যায় যে, মানুষের শুরু যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে তার ঝগড়া করা সাজে না। অনুরূপ আরেকটি উদাহরণ:</p>
<p>وَذَرْنِي وَالْمُكَذِّبِينَ أُولِي انْعْمَةِ وَمَهْلَهُمْ قَلِيْلًا &#8211; إِنَّ لَدَيْنَا انْكَالًا وَجَحِيمًا &#8211; وطَعَامًا ذَاغُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا</p>
<p>বিত্তবৈভবের অধিকারী মিথ্যারোপকারীদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কিছু অবকাশ দাও। নিশ্চয়ই আমার কাছে আছে শিকল, অগ্নিকুণ্ড, গলগ্রহ হয়ে যায় এমন খাদ্য এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা মুজাম্মিল: ১১-১৩)</p>
<p>এখানেও দুটো অবস্থার মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়। এক অবস্থাতো বর্তমানে উপস্থিত অর্থাৎ বিত্তবৈভবের অহংকার। আরেক অবস্থা বর্তমান অনুপস্থিত ‍শুধু কল্পনার রাজ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। এ উদাহরণ থেকে শৈল্পিক ও দ্বীনি গুরুত্বই প্রকাশ পাচ্ছে। নিচের আয়াতগুলো লক্ষ্য করুন:</p>
<blockquote><p>وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لمَزَةٍ وَ الَّذِي جَمَعَ مَالاً وَعَدَدَهُ &#8211; يَحْسَبُ أَنَّ مَالَةٌ أخْلدَهُ &#8211; كَلَّا لِيُنْتَبَذَنْ فِي الحُطَمَة &#8211; وَمَا أَدْرَاكَ مَالْحُطَمَةُ &#8211; نَارُ</p>
<p>পশ্চাতে ও সম্মুখে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ; যে ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে এবং গুণে গুণে হিসেব রাখে। সে মনে করে, তার সম্পদ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কক্ষণ নয়্ সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে ‘হুতামায়’। তুমি কি জান, ‘হুতামাহ’ কি? তা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছুবে। এতে তাদেরকে বেঁধে দেয়া হবে, লম্বালম্বি খুঁটিতে। (সূরা হুমাজাহ: ১-৯)</p></blockquote>
<p>এ সূরাটিতে বিপরীতধর্মী দুটো অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। একটি দুনিয়ার অবস্থা এবং অপরটি আখিরাতের। কিছু দাম্ভিক ও অহংকারী আছে যারা দুনিয়ার বিত্ত বেসাতে মত্ত হয়ে আখিরাতকে ভুলে গেছে এবং দুনিয়ার রঙ-তামাশায় লিপ্ত আছে। কিন্তু তাদের এ চলার পথের অপর প্রান্তে অপেক্ষা করছে জাহান্নাম। এমন জাহান্নাম যা সবকিছুকে পিষ্ট করে দেয় এবং তার আগুন হৃদয় পর্যন্ত স্পর্শ করে। ঐ হৃদয় যা আজ অহংকার ও দাম্ভিকতায় উন্মাতাল। তাদেরক সেখানে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হবে, যেখান থেকে তারা স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসতে পারবে না ‍কিংবা অন্য কেউ বের করে আনতেও সক্ষম হবে না।</p>
<p>নিচের আয়াতে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>واصحب الشَّمَالِ : مَا أَصْحَبُ الشِّمَالِ &#8211; فِي سَمُومٍ وَحَمِيمٍ &#8211; وظل مِنْ يُحْمُوم &#8211; لا بارد ولا كَرِيم &#8211; إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُشْرِفِينَ .</p>
<p>বামপন্থী লোক, (হায়!) বামপন্থী লোকেরা কী আযাবে থাকবে। তারা থাকবে প্রখর বাষ্প ও উত্তপ্ত পানিতে এবং ধুম্রকুঞ্জের ছায়ায়। যা শীতল নয় এবং আরামদায়কও নয়। তারা ইতোপূর্বে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। (সূরা আল-ওয়াকিয়া: ৪১-৪৫)</p></blockquote>
<p>এখানে দুটো অবস্থাকে মুখোমুখি পেশ করা হয়েছে। এক অবস্থা হচ্ছে জাহান্নামীদের বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ গরম বাষ্প, গরম পানি, ধুয়ার ছায়া যা শুধু নামেমাত্র ছায়া। এ কঠিন অবস্থাকে তাদের পূর্বের অবস্থার (অর্থাৎ সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের) সাথে মুখোমুখি করে পেশ করা হয়েছে।</p>
<p>ওপরে বর্ণিত অবস্থা এবং তার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অবস্থার মধ্যে এক সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যাপার আছে। এ আয়াতে যেসব লোকের কথা বলা হচ্ছে তারা রীতিমতো জীবিত এবং দুনিয়ায় বিচরণত। দুনিয়ার সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের করায়ত্ব্ এ অবস্থাটি বর্তমানে বিদ্যমান। আখিরাতে তাদের জন্য য দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে তা পরের কথা। কিন্তু সেই পরের অবস্থাকে কুরআন বর্তমান অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। পাঠক মনে করেন দুনিয়ার লেনদেন চুকিয়ে ঐ অবস্থায় তারা ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে, যে অবস্থা তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। তাদের পেছনের সমস্ত সুখ-সম্ভোগ শেষ হয়ে গেছে। তারা তীব্র আযাবের সম্মুখীন। এমতাবস্থায় তাদের পেছনের কথা, সেই সুখের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে।</p>
<p>মনে হতে পারে, এটি আশ্চরয ধরনের চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু তাতে কি? কুরআন বহু জায়গায় এ ধরনর স্টাইলে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। কুরআনের এ বর্ণনা শৈল্পিক এবং দ্বীনি দুটোরই আবেদন রাখে। শিল্পের অনুসন্ধানী মনে করে- এ শুধু উপমা উৎক্ষেপণ নয় বরং এটি অনুভব ও বোধের সীমানা ছাড়িযে চোখের সামনেই সংঘটিত একটি ঘটনা, যা ঘটে চলছে।</p>
<p>দ্বীনি অনুসন্ধানীদের অনুভূতি হচ্ছে জাহান্নামে সংঘটিতব্য ঘটনাবলীর ওপর এমন দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন) করা উচিত, যেন তা এখনই সংঘটিত হচ্ছে। তার সম্পর্ক উপলব্ধির সাথে। আর এ দৃঢ় বিশ্বাস মানুষকে ঈমানের দাওয়াত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করে।</p>
<p>নিচের আয়াতটিও ওপরের উদাহরণের সাথে সম্পর্ক রাখে।</p>
<blockquote><p>خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الجَحِيمِ &#8211; ثُمَّ صُبُوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ &#8211; ذُنْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ</p>
<p>একে ধরো এবং টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে যাওদ। (এখন) মজা বুঝ। তুমিতো সম্মানত সম্ভ্রানত। (সূরা আদ-দুখান: ৪৭-৪৯)</p></blockquote>
<p>নিচের আয়াতটিও বিপরীত ধর্মী এক চিত্র পেশ করে:</p>
<blockquote><p>كَلَّا إِذا بلغت الشراقي &#8211; قَبْلَ مَنْ رَاق &#8211; وظنَّ أَنَّهُ الفِراق &#8211; &#8211; التفت الله بالساة &#8211; الى رَبِّكَ يَوْمَندَ الْمَسَاقُ &#8211; فَلَا صَدَقَ</p>
<p>কখনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে ঝাড়-ফুঁক করবে? আর সে মনে করবে, বিদায়ের মুহূর্তটি এসে গেছে এবং পায়ের গোছা অপর গোছার সাথে জড়িয়ে যাবে। সেদিন তোমার রব্ব-এর কাছে সবকিছু উপস্থিত করা হবে। সে বিশ্বাস করেনি এবঙ নামায পড়েনি। পড়ন্তু মিথ্যা মনে করেছে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। তারপর সে দম্ভভরে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গেছে। (সূরা কিয়ামাহ: ২৬-৩৩)</p></blockquote>
<p>উক্ত আয়াতগুলোতে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী চিত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এক, অতীতে যা অতিবাহিত হয়েছে। মন হয় যেন, গোটা সৃষ্টি জগৎ তার সমস্ত সৌন্দর্য হারিয়ে ম্রিয়মান হয়ে গেছে। এমন একটি সময় ছিল- যখন মৃত ব্যক্তি নামায আদায় করেনি, কুরআনের সত্যতা মেনে নেয়নি। এক অবস্থা (অর্থাৎ মৃত্যুর সময়) চোখের সামনে উপস্থিত। আর সে নির্বিকার। মৃত্যুর সময় উপস্থিত, ভয়ে এতোটা বিহ্বল যে, দু’ পা ঠক্‌ঠক করে কাঁপছে। আত্মা গলা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে্ প্রশ্নকারী প্রশ্ন করছে, কোন ঝাড় ফুঁককারী নেই? যে এ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। যেভাবে জ্বিন-প্রেতের আসর থেকে মুক্তির জন্য ঝাড়-ফুঁকের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।</p>
<p>মুমূর্ষ ব্যক্তি মনে করে, আজ আমার পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দিন। বিগত দিনের স্মৃতি তার হৃদয়পটে ভেসে উঠে। নবী করীম (স)-এর দাওয়াত থেকে দাম্ভিকতার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিজের পরিজনের কাছে চলে আসা, তাঁর দাওয়াতকে মিথ্যে মনে করা। দুটো ছবিই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। কিন্তু তাতে কোন কল্যাণ হবে না। কারণ পা তো একটির সাথে আরেকটি পেঁচিয়ে রয়েছে। এখন আর সময় নেই। এখন তো রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য যাত্রা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15855</post-id>	</item>
		<item>
		<title>এক নজরে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তা-দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 16:10:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15839</guid>

					<description><![CDATA[পৃথিবীর অতীত ইতিহাসে নজর বুলালে সুগভীর পর্যবেক্ষণ বা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ব্যতীতই স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও এটাই প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, একটি সভ্যতা তার ধারক-বাহকদের দ্বারা পরিচালিত হবার পূর্বে উক্ত সভ্যতার উত্থান ও বিকাশ হয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন চিন্তাশীল-দার্শনিকের হাতে।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p dir="ltr">পৃথিবীর অতীত ইতিহাসে নজর বুলালে সুগভীর পর্যবেক্ষণ বা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ব্যতীতই স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও এটাই প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, একটি সভ্যতা তার ধারক-বাহকদের দ্বারা পরিচালিত হবার পূর্বে উক্ত সভ্যতার উত্থান ও বিকাশ হয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন চিন্তাশীল-দার্শনিকের হাতে।</p>
<p dir="ltr">আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তেমনি একজন সুমহান ব্যক্তিত্ব, এ-যুগের ইমাম গাজালী। যার হাত ধরে গড়ে উঠেছে আগামীর বিশ্ব দর্শন। যার ক্ষুরধার লেখনীতে পর্যদুস্ত একালের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিসমূহ। গ্রীক থেকে শুরু করে তথাকথিত মধ্যযুগ পেরিয়ে হাল আমলের আধুনিক সব আখলাকবিহীন দর্শনগুলোকে একের পর এক খণ্ডন করে গেছেন তিনি। বিপরীতে উপস্থাপন করে গেছেন আখলাক-সম্পন্ন, আদালাত-সমৃদ্ধ ও মারহামাতপূর্ণ যুগোপযোগী সব বিশ্ব দর্শন। তৈরি করেছেন নিজস্ব এক পরিভাষার ভাণ্ডার, যা দিয়ে বর্ণনা করে গেছেন তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা। তিনি তাঁর চিন্তাধারায় অনন্য। তাঁর প্রতিটি কর্ম বিশ্বব্যাপী সুপ্রসিদ্ধ সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বিষয়বস্তু।</p>
<p dir="ltr">যুগের মহান এই ব্যক্তিত্ব, তাঁর দর্শন, তাঁর চিন্তাধারা ও তাঁর কর্মসমূহ আমাদের সামনে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছেন এই যুগেরই অপর আরেকজন মহান ব্যক্তিত্ব, হাদীস বিশারদ ও মুজতাহিদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ। অসাধারণ ও সাবলীলভাবে অনুবাদান্তে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক ও শিক্ষাবীদ বুরহান উদ্দীন আজাদ। আর, যুগের ইমাম গাজালীকে উম্মাহর সামনে বাংলা ভাষায় পরিচয় করে দিয়েছে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার।</p>
<p dir="ltr">আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তাধারা ও তাঁর দর্শন নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করাটা একেবারেই অসম্ভব। কারণ, যে দার্শনিক একইসাথে দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটি নিয়ে একত্রে কাজ করে গেছেন, ত্রিশেরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং প্রতিটি বিষয়েই যিনি নিজস্ব পরিভাষার অসাধারণ এক সমাহার তৈরি করেছেন, তাঁকে নিয়ে ক্ষুদ্র একটা প্রবন্ধে বিস্তর আলোচনা কখনই সম্ভব না।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔷উম্মাহর সংকট উত্তরণে প্রণীত দর্শন</strong></p>
<p dir="ltr">মহান এই দার্শনিকের চিন্তাধারার মূলভিত্তি প্রোথিত আছে পাঁচটি প্রশ্নের ভেতরে, যে প্রশ্নগুলো তিনি নিজেই নিজেকে করেছেন। প্রশ্ন পাঁচটি এমন,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আমরা কারা?</li>
<li dir="ltr">২. পাশ্চাত্য সভ্যতা কারা?</li>
<li dir="ltr">৩. পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রকৃতি কেমন?</li>
<li dir="ltr">৪. শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের নামে তারা আমাদের কী দিয়েছে?</li>
<li dir="ltr">৫. আমাদের বর্তমান অবস্থান কোথায় এসে পৌছেছে?</li>
</ul>
<p dir="ltr">যেহেতু মহান এই দার্শনিক উম্মাহর স্বার্থে এবং নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ বা ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য সামগ্রিক বিশ্ব দর্শন প্রণয়ন করেছেন, নতুন দুনিয়ার উসূল উপস্থাপন করেছেন, তাই মুসলিমদের সংকট উত্তরণে তাঁর প্রদত্ত দর্শন ও প্রস্তাবনাগুলোর উপর একনজর বুলিয়ে নেওয়া উচিত।</p>
<p dir="ltr">তিনি মনে করেন, পাশ্চাত্যের জুলুমের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে মুসলিমরা দুই ধরনের সংগ্রাম করছে। যথা,</p>
<ul>
<li>১. জুযয়ী তথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আন্দোলন। এখানে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।</li>
<li>২. কুল্লী তথা সামগ্রিক বা বড় আন্দোলন। এখানে তিনি চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলনকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এ-দর্শনের মাধ্যমে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান চিন্তা ও আখলাক-বিহীন রাজনৈতিক আন্দোলনকে অকার্যকর বলে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্যে,</p>
<blockquote>
<p dir="ltr">&#8220;মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে সমাজ পরিবর্তনের জন্য মুসলিমদেরকে রাজনৈতিকভাবেই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো পথ উন্মুক্ত নেই—এই বিষয়টি এখন সবার মাঝে এমন গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, এই পন্থা ব্যতিত আর কোনো পন্থাকেই মুসলিমরা সহজে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু, রাজনৈতিক বিষয়াবলি বাদেও যে সমাজ পরিবর্তন করা যায়, এই বিষয়টা উম্মাহকে বুঝানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার হলেও সবাইকে আখলাকী ও চিন্তাগত পন্থায় সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা উপলব্ধি করাতে হবে। কারণ, মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হয় চিন্তা ও আখলাকী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।&#8221;</p>
</blockquote>
<p dir="ltr">এই বিষয়কে সামনে রেখেই তিনি তাঁর সকল গ্রন্থ-কে সাজিয়ে নিয়েছেন।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের এমন দর্শনের পেছনে অন্যতম যে বিষয়টি মুখ্য হিসেবে কাজ করেছে, সেটি হলো, মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে বিগত বছরগুলোয় মুসলিমদের চালানো প্রচেষ্টাগুলোকে বিশ্লেষণ করে তিনি এগুলোকে পাঁচভাগে বিভক্ত করেছন। যথা,</p>
<ul>
<li>১. প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>২. রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৩. সেক্যুলারিজমের চিন্তাধারাকে কেন্দ্রে রেখে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৪. পাশ্চাত্যের সৃষ্ট মডারেট চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে মডার্ন ধারার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
<li>৫. শক্তির মাধ্যমেই শক্তির জবাব দিতে হবে, এমন ধারণা থেকে চরমপন্থা বা প্রান্তিকতার মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এসকল কারণেই তিনি মনে করেন, আমাদের এখন মৌলিক কাজ হলো, চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলন গড়ে তোলা। তিনি শুধু এটা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি এর উপায়ও বাতলে দিয়ে গেছেন।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, আমরা যেহেতু আমাদের সংকট উত্তরণ করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে প্রথমে এই সংকট নিয়েই পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা আমাদের এই সংকটের বাহ্যিক সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। কিন্তু, অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা তেমন আলোচনা করি না। অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখি, বর্তমানে আমরা বৃহৎ দু&#8217;টি সমস্যার মধ্য দিয়ে আমাদের সময় অতিক্রম করছি। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আল আফাতুল বায়ানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমাদের ভাষাগত সমস্যা।<br />
আমাদের কথ্য, লিখিত, চিন্তাগত ও দার্শনিক ভাষার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। প্রতিটি সেক্টরে আমরা ব্যতিক্রমধর্মী সব ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন করে থাকি। আবার ক্ষেত্রবিশেষে একই ভাষার ব্যবহার বা প্রচলন হলেও তার মধ্যে রয়েছে ভাষার ধরনের ভিন্নতা।</li>
<li dir="ltr">২. আল আফাতুল আমানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমাদের ঈমান, আকল ও চিন্তা একই রেখায় ফাংশন করতে না পারার সমস্যা।</li>
</ul>
<p dir="ltr">যেহেতু আমাদের সমস্যা এখন চিহ্নিত হয়ে গেছে, অতএব এর সমাধানে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। মহান এই দার্শনিক এই সমাধানকল্পে দু&#8217;টি দর্শনকে সামনে নিয়ে আসেন। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. আল ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ। অর্থাৎ, জ্ঞানের সাথে বিশ্বাসের সমন্বিত একটি দর্শন।</li>
<li dir="ltr">২. আল ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ। অর্থাৎ, আমান ও আমানত সম্বলিত একটি দর্শন।</li>
</ul>
<p dir="ltr">এদু&#8217;টোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে তিনি আল ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ নিয়ে একটু বেশি কাজ করে গেছেন। এর উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, এটাকে তিনি শুধু একটা ফিলোসফি হিসেবেই দেখেননি, বরং ফিকহের মতো একটা বিষয়ের সাথেও এটাকে ওতপ্রতভাবে সম্পৃক্ত করেন। পাশাপাশি কালাম ও তাসাওফ—এদু&#8217;টি এবং ফিকহ; জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি শাখাকে তিনি নতুন করে গঠন করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।</p>
<p dir="ltr">ফিকহ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের ফিকহ অনেকটা আমর ও নাহীর উপর ভিত্তি করে রচিত। বর্তমানে, জ্ঞানের এই শাখায় আমান ও আমানতের বিষয়টি বেশ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ইলমুল কালাম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হলো, মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র ইরাদা ও কুদরাতের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। আর, তাসাওফকে তিনি উপরোক্ত দু&#8217;টি শাখার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন। কারণ, ইসতিদলাল, ইসতিমবাত ও ইসতিবসারকে একত্রে বিবেচনা করে থাকেন তিনি। অর্থাৎ, ফিকহ, কালাম ও তাসাওফ—জ্ঞানের এই তিনটি শাখাকে সদা একই রেখায় রেখে কাজ করে যেতে হবে।</p>
<h5 dir="ltr">অন্যান্য দর্শনসমূহ:</h5>
<p dir="ltr"><strong>🔹আল মানহাজ</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর চিন্তাধারা পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে সামনে রেখে তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো আল-মানহাজ, এর অর্থ পদ্ধতি বা পন্থা । তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস-এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক মীরাস পর্যালোচনা করার জন্য নতুন একটা পন্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কীভাবে বুঝবো, সেটার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক সময়ে এসে আমরা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত চিন্তার প্রভাবে সকল কিছুকেই খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি। সকল কিছুকে খণ্ডিত করে দেখা একটি ভুল পন্থা। এই পন্থাটি আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। যার ফলে ইসলামী চিন্তাকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করার সক্ষমতাকেও আজ হারিয়ে ফেলেছি আমরা।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹মডার্নিটি</strong><br />
মডার্নিটি কিংবা আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি রুহুল হাদাসা নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের আধুনিকতা নামে একটি আধুনিকতা রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিকতা একমাত্র কিংবা অনুপম নয়। প্রতিটি চিন্তাই তার মতো করে তাদের নিজস্ব আধুনিকতা তৈরি করতে পারে। পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে, তার কিছু মৌলিক পরিভাষা রয়েছে। যেমন- ধর্মহীন বিশ্বদর্শন (Secular World View), রেশনালিজম, হিউম্যানিজম ইত্যাদি। কিন্তু, আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও পরিভাষার মাধ্যমেই আমাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি আধুনিকতার বিকাশ ঘটাতে পারি। অর্থাৎ আধুনিকতার রূহকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের রূহকে বিনির্মাণ করতে পারলে সেই রূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আধুনিকতার উদ্ভব ঘটবে ।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹আখলাক</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অর্জনকারী বিষয় হলো আখলাক। বিষয়টিতে তিনি অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে দ্বীন ও আখলাকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল ধরণের বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেন। দ্বীনকে আখলাক হিসেবে ও আখলাককে দ্বীন হিসেবে অভিহিত করেন। &#8216;Cogito, ergo sum&#8217; (চিন্তা করি এই জন্যই আছি) চিন্তার বিপরীতে &#8216;আমি আখলাকসম্পন্ন, এই জন্য আমি আছি&#8217;-এই চিন্তার বিকাশ ঘটান।</p>
<p dir="ltr">আখলাকী চিন্তার ক্ষেত্রে মুসলিম আলেমদের চিন্তার সমালোচনা করে বলেন, তাঁদের চিন্তার মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কেননা, আখলাককে তাঁরা পূর্ণতাদানকারী একটা বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু আখলাক পূর্ণতাদানকারী কোনো বিষয় নয়। এটি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। আখলাক ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। আখলাক পূর্ণতার (কামালিয়াত) সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়, এটা অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা দ্বীন ও মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আখলাক ছাড়া দ্বীন হতে পারে না, আখলাক ছাড়া মানুষ হতে পারে না। মানুষের যে সংজ্ঞা, সেই সংজ্ঞার একাংশ জুড়ে আছে আখলাক, বাকি অংশ হলো দ্বীন। তবে উল্লেখ্য বিষয় হলো, এক্ষেত্রে দ্বীন হলো মূল বিষয়।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, রাজনীতি থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ করার চেয়ে দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা আরো বড় ধরণের হুমকি। আর এ বিষয়কে তুলে ধরার জন্য তিনি দাহরানিয়্যাহ নামক একটি পরিভাষা তৈরি করেছেন। দাহরানিয়্যাহ হলো, দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা। আর এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিপদজনক বিষয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹আকল</strong><br />
একজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আকলের উপরেও অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন মহান এই দার্শনিক। এ বিষয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। আকলকে তিনি আকলে মুজাররাদ, আকলে মুয়ায্যাদ ও আকলে মুসাদ্দাদ নামে তিন ভাগে বিভক্ত করেন।</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, আকলে মুজাররাদ হলো বুরহানী আকল। এটি এমন আকল, যা দ্বীনি ক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে। এই ধরণের আকল হলো বিমূর্ত (Abstract) ও যান্ত্রিক। এ ধরণের আকল বিজ্ঞানাগারে, কল কারখানায় ও একাডেমিক গবেষণার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু, মানুষের সাথে তার রবের ও মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক এই আকলের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি আমলের মাধ্যমে সজ্জিত আকলকে আকলে মুসাদ্দাদ নামে নামকরণ করেছেন। আর যে আকল আখলাকী মূল্যবোধের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হয়েছে, সেই আকলকে তিনি &#8216;আকলে মুয়ায়্যাদ&#8217; নামে অভিহিত করেন।</p>
<p dir="ltr">তিনি মনে করেন, আকল শুধুমাত্র একমুখী হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ আকলকেই ছোট করা। কেননা, আকল আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত। এজন্য এই নেয়ামতকে বহুমুখী হিসেবে দেখতে হবে। আকল কোনো জাওহার নয়। আকল হলো একটি কর্ম। এই কারণে তিনি তা&#8217;আক্কুলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹ফিতরাত</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান ফিতরাতের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি তাঁর সকল গ্রন্থেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p dir="ltr">কেননা, তাঁর মতে, মানুষের পূর্বে থেকেই দ্বীন বিরাজমান ছিলো। মানুষের সৃষ্টি হয়েছে দ্বীনের পরে। শুধু তাই নয়, খুলক-ও (আলাক) খালকের (সৃষ্টির) পূর্বে সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের সৃষ্টির পূর্বেই খুলক-এর অস্তিত্ব ছিলো। পরবর্তীতে এটা ফিতরাতরূপে মূল্যবোধের একটি ভাণ্ডার হিসেবে মানুষের ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। দ্বীন মানুষের মধ্যে পরবর্তীতে স্থাপিত কোনো বিষয় নয়। বরং, মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্বপ্রাপ্ত মৌলিক একটি হাফিজার (সংরক্ষণশালা) মধ্যে দ্বীনের অর্থের জগত লুক্কায়িত। আর এই হাফিজা বা সংরক্ষণশালার নাম হলো ফিতরাত।</p>
<p dir="ltr">দ্বীন মানুষকে সঙ্গ দানকারী একটি হাকীকত। মানুষ এ হাকীকত থেকে কখনো পৃথক হতে পারবে না। অপর দিকে পয়গাম্বরদের মাধ্যমে যে দ্বীন এসেছে, সেটা মূলত তাজকীর বা স্মারক। অর্থাৎ, মানুষের ফিতরাতের মধ্যে যা রয়েছে, সেটাই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এ কারণে কোরআনকে যাক্কির (স্মারক) এবং পয়গাম্বরকে মুজাক্কির বলা হয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹পরিভাষা</strong><br />
পরিভাষা তৈরি করার ক্ষেত্রেও তিনি অতুলনীয়। কিছুদিন আগে এ ব্যাপারে কামুসু ত্বহা নামে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ত্বহা আব্দুর রহমানের মতে, মুসলিম উম্মাহ পরিভাষাগত একটি আক্রমণের শিকার। এক্ষেত্রে তিনি &#8216;আল-উদওয়ানুল মাফহুমী&#8217; নামক পরিভাষা ব্যবহার করেন।</p>
<p dir="ltr">তিনি বলেন, পরিভাষা তৈরি করা ও পরিভাষার অধিকারী হওয়ার অর্থ হলো, সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়া। কোনো কিছুকে শক্তি প্রয়োগ করে পরিবর্তন করার চেয়ে পরিভাষার মাধ্যমে পরিবর্তন করা বেশি স্থায়ী হয়ে থাকে। পরিভাষার মধ্য দিয়ে বড় বড় পরিবর্তন করা সম্ভব।<br />
এ কারণেই তিনি পরিভাষার উপর এতো বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন, শত শত পরিভাষা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹দর্শন</strong><br />
দর্শনের বিষয়ে, বিশেষ করে দু&#8217;টি ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন, ক্ষেত্রের উপরে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দর্শন মানে হলো প্রশ্ন করা। আর প্রশ্ন করার পন্থা দু&#8217;টি,<br />
১. অপরপক্ষকে চুপ করানো জন্য প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করার এই পন্থা হলো গ্রীক দার্শনিকদের পন্থা। যেমন- সক্রেটিসের প্রশ্ন করার পন্থা।<br />
২. সমালোচনামূলক প্রশ্ন করা। ইম্যানুয়েল কান্ট এই পন্থা শুরু করেন এবং প্রভাবশালী করে তোলেন।</p>
<p dir="ltr">তবে ই&#8217;তিমানিয়্যাহ দর্শনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সুয়াল বা প্রশ্ন নেই। সুয়াল বা প্রশ্নের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সুয়ালিয়্যাত (প্রশ্ন করা) নয়, এখানে উদ্দেশ্য হলো মাসউলিয়্যাত (দায়িত্ববোধ)। সুয়াল-মাসয়ালা ও মাসউলিয়্যাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি এই বিষয়কে তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, প্রশ্ন যখন দায়িত্ববোধের চেতনা জাগ্রত করবে, কেবল তখনই সেটা সত্যিকারের প্রশ্ন হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরণের প্রশ্নই আমাদের সত্যিকারের দর্শন। এ ক্ষেত্রে তিনি &#8216;আস-সুয়াল মাসউল&#8217; পরিভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹চিন্তাগ্রহণ</strong><br />
চিন্তার আদান প্রদান নিয়ে তিনি বেশ ভালোভাবেই পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অন্যের চিন্তা অনুবাদ করে কোনোদিন সত্যিকারের চিন্তা তৈরি করা যায় না। পাশ্চাত্যের দর্শন বিষয়ক যেসব বই অনুবাদ করে আজ সমগ্র বিশ্বে পড়ানো হচ্ছে, সেটার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন,<br />
لن تكون الفلسفة رافعة إلا اذا كانت مبدعة<br />
অর্থ : &#8220;দর্শন কোনো জাতিকে উচ্চমর্যাদায় আসীন করতে পারে না, যদি না সেটা নিজেদের মূল্যবোধের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়। &#8220;</p>
<p dir="ltr">অর্থাৎ, তাকলীদের মাধ্যমে চর্চিত দর্শন কোনোদিন কোনো জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারে না। যদি কোনো জাতি চিন্তার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে চায়, তাহলে তাকে নিজ মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রেখে চিন্তা ও দর্শন তৈরি করতে হবে।</p>
<p dir="ltr">তবে, অন্যের চিন্তা কতটুকু গ্রহণ করা হবে, এ-বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি &#8216;তাকরীরে তা&#8217;বী&#8217; নামে একটি পন্থার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এর অর্থ এটা নয় যে, আমরা কারোর কাছ থেকে কোনো কিছুই নেবো না। তবে, অন্যদের কোনো চিন্তা ও দর্শন অনুবাদ করার ক্ষেত্রে আমাদের তাদাভুলিয়্যার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যে-সকল চিন্তা অনুবাদ করবো, সেই চিন্তার ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিত্তিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। কেননা আমাদের ভাষা ও ধর্ম উভয়টিই ভিন্ন। যেমন- তিনি হেগেল ও নিটশে-কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, এরা অনেক ধর্মতত্ত্বীয় পরিভাষাকে দার্শনিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে।</p>
<p dir="ltr">এ কারণে অনুবাদের সময় আমাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো হলো তাহসিলিয়্যাহ, তাওসিলিয়্যান ও তা&#8217;সিলিয়্যাহ। তাহসিলিয়্যাহ হলো হুবহু অনুবাদ করা। তাওসিলিয়্যাহ হলো, সতর্কতার সাথে বেছে বেছে অনুবাদ করা। তা&#8217;সিলিয়্যাহ হলো, শুধুমাত্র আমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়সমূহকে অনুবাদ করা। আমাকে সেই বিষয়সমূহই অনুবাদ করতে হবে, যেগুলো আমাদের দ্বীন ও ভাষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔹দর্শন উদ্ভাবন</strong><br />
মুসলমানদের দর্শন তৈরি করার অধিকার নিয়ে তাঁর এই উক্তিটির উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য-<br />
”উম্মতসমূহের ভিন্নতা প্রাকৃতিক একটি বিষয়। যারা নিজের উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছে, তাঁরা ছাড়া অন্য কেউই এই অমোঘ বিধানকে অস্বীকার করতে পারে না। এই কারণে, যে জাতি পরাজিত ও পরাভূত হয়েছে, তাঁদেরও পুনরায় নিজ-পায়ে দাঁড়ানোর অধিকার রয়েছে। তাঁদেরও অধিকার আছে তাঁদের নিজেদের দর্শনকে তৈরি করার।&#8221;</p>
<p dir="ltr">তাঁর মতে, যে সভ্যতা তাঁর যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব নিজের মূল্যবোধের মাধ্যমে দিতে সক্ষম নয়, সেই সভ্যতার পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যে সভ্যতা যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব অন্য সভ্যতা কর্তৃক সৃষ্ট মূল্যবোধ ও জবাবের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেই সভ্যতা আরও বেশি অধঃপতনের শিকার হয়।</p>
<p dir="ltr">তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, যুগের জবাবদানের ক্ষেত্রে অন্যদের তৈরি করা জবাবের মাধ্যমে জবাব দেওয়া। আর এই বিষয়টিই আমাদের পথকে রোধ করে দিয়েছে।</p>
<p dir="ltr">আমরা মুসলিম হিসেবে যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব কীভাবে দিবো এবং আমাদেরকে কীভাবে কাজ করতে হবে, এ বিষয়ে তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় তাঁর অভিমত তুলে ধরেছেন।</p>
<p dir="ltr"><strong>🔷গ্রন্থপঞ্জির দর্শন</strong><br />
আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের গ্রন্থগুলোকে দু&#8217;টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li dir="ltr">১. উসূল ও মেথডোলজি</li>
<li dir="ltr">২. উসূলের প্রয়োগপদ্ধতি</li>
</ul>
<p dir="ltr">উসূল ও মেথডোলজি সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>১. ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ।</li>
<li>২. ফালসাফাতুল ই&#8217;তিমানিয়্যাহ।</li>
</ul>
<p dir="ltr">পরিশেষে জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য তুলে ধরতে হয়। তিনি বলেন,</p>
<blockquote>
<p dir="ltr"><strong>“এমন কোনো জ্ঞান ও আমল নেই, যা দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান ও আমলের চেয়ে উত্তম হতে পারে। দ্বীনি কার্যক্রমের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো চিন্তাকে স্থবির করে ফেলা।”</strong></p>
</blockquote>
<p dir="ltr">অর্থাৎ, যারা জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করবে, তাঁদেরকে সবসময় জ্ঞানগত ও আমলগত দিক থেকে গতিশীল থাকতে হবে। কোনো আন্দোলন যখন তাঁর চিন্তাগত গতিশীলতাকে হারিয়ে ফেলে, তখনই তা কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahmans-philosophy-at-a-glance/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15839</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম; আকাঙ্ক্ষিত সভ্যতার মূর্ত প্রতীক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 15:31:02 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15835</guid>

					<description><![CDATA[বর্তমানে মানবতার এমন একটি নতুন সভ্যতা খুব বেশি প্রয়োজন, যে সভ্যতার পাশ্চ্যত্য সভ্যতার থেকে ভিন্ন দর্শন এবং বার্তা রয়েছে। পাশ্চ্যত্য সভ্যতার বলতে আমরা এ সভ্যতার কমিউনিস্ট এবং বস্তুবাদী দিক উভয়টিকেই বুঝাচ্ছি। উভয়টিই কোরআন, তাওরাত এবং যাবুরে বর্ণিত সেই অভিশপ্ত গাছের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বর্তমানে মানবতার এমন একটি নতুন সভ্যতা খুব বেশি প্রয়োজন, যে সভ্যতার পাশ্চ্যত্য সভ্যতার থেকে ভিন্ন দর্শন এবং বার্তা রয়েছে। পাশ্চ্যত্য সভ্যতার বলতে আমরা এ সভ্যতার কমিউনিস্ট এবং বস্তুবাদী দিক উভয়টিকেই বুঝাচ্ছি। উভয়টিই কোরআন, তাওরাত এবং যাবুরে বর্ণিত সেই অভিশপ্ত গাছের দুটি শাখা। আর গাছটি হলো বস্তুবাদ।</p>
<p>মানবতার এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যে সভ্যতা আল্লাহ, কোরআন, হাশর, মিজানে বিশ্বাসী; সেইসাথে মানুষের মহৎ মূল্যবোধে বিশ্বাসী। যা ছাড়া মানুষ তার মানবিকতাবোধ হারায় এবং জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলে।</p>
<p>মানবতার এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যে সভ্যতা ধর্ম, বিজ্ঞান, বিশ্বাস, আকল, চেতনাসহ মানুষের আকাঙ্ক্ষিত সবকিছুকে বেষ্টন করে রাখে। এ সভ্যতা যেমন পরকালে মানুষের জান্নাত প্রাপ্তির পথকে সুগম করতে পারে, তেমনি ইহকালে মানুষের জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ্য করে তুলতে পারে। এটি মানুষকে সত্য, শক্তি, নীতি-নৈতিকতা এবং স্বাধীনতার সন্ধান দেয়।</p>
<p>মানুষের এমন একটি সভ্যতা প্রয়োজন, যা পৃথিবী ও জান্নাতের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এ সভ্যতায় বিশ্বাসী হৃদয়ের সাথে যুক্তিরও ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকে। এ সভ্যতায় মানুষ হাকীকত এবং আকলের দ্বারা পরিচালিত হয়, যা তার উপর আল্লাহর দয়া এবং অনুগ্রহের প্রমাণ।</p>
<p>আমরা এতক্ষণ যে সভ্যতার কথা ভাবছি, তা মূলত ইসলাম ছাড়া অন্য কোনোটিই নয় এবং সেই প্রভু হলেন আল্লাহ, যিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্বজ্ঞানী, যিনি সবকিছু জানেন। জান্নাত ও পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো কিছুই তার জানার বাইরে নয় এবং তিনি ভারসাম্য ও সুসমন্বয়ের অবিশ্বাস্য ও বাস্তবসম্মত উদাহরণ তৈরি করতে সক্ষম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ভারসাম্য এবং সমন্বয়ের সভ্যতা :</strong></p>
<p>ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা মানবতাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থা উপহার দেয়।</p>
<p>ভারসাম্য বলতে আমরা বুঝি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা, অর্থাৎ দুটি প্রান্তিকতার মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করাকে। মানব রচিত কোনো ব্যবস্থা অথবা মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থাই চরমপন্থা বা প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত নয়। একমাত্র ইসলামেই এটি উপস্থিত।</p>
<p>আল কোরআনের মধ্যমপন্থাকে সরল-সঠিক পথ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন যে সূরা দিয়ে শুরু হয়েছে, সে সূরা ফাতিহার একটি আয়াতে এ কথা বলা হয়েছে। একজন মুসলমান প্রতিদিনের নামাজে কমপক্ষে সতেরো বার আল্লাহর কাছে এ আর্জি জানায়,</p>
<p>“হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করো।” (সূরা ফাতিহা : ০৬)</p>
<p>এ সরল-সঠিক পথ আল্লাহর আযাবের ফলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাতিগুলোর পথের সম্পূর্ণ বিপরীত। মধ্যম পন্থাকে ‘মিজান’ বা দাঁড়িপাল্লা হিসেবেও অভিহিত করা হয় যা, যা সীমালঙ্ঘন না করা এবং ওজনে কম না দেওয়া বোঝায়। আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মিজান কায়েম করেছেন। এর দাবি হলো, তোমরা মিজানে সীমালঙ্ঘন করো না। ইনসাফের সাথে সঠিকভাবে ওজন করো এবং ওজনে কম দিও না।” (সূরা আর রাহমান : ৬-৯)</p>
<p>এখানে সীমালঙ্ঘন করা বলতে চরমপন্থা বা প্রান্তিকতা অবলম্বনের প্রবণতা এবং ওজনে কম দেওয়া বলতে সঠিকভাবে ওজন করার ক্ষেত্রে গাফিলতির প্রবণতাকে বোঝায়। আর উভয়টিই নিন্দনীয়।</p>
<p>ইসলামের ভারসাম্যের এই চমৎকার ব্যবস্থা এমন সব পরস্পর বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করেছে, যাদের পারস্পরিক সমঝোতাকে মানুষ কার্যত অসম্ভব মনে করতো। আর এ সমঝোতা এতটাই সুন্দর যে, উভয় পক্ষ কোনো ধরনের সীমালঙ্ঘন ও পারস্পরিক সংঘর্ষ ছাড়াই নিজেদের সীমার মধ্যে অবস্থান নিয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ ইলাহী ও মানবিক বিষয়াবলি, ওহী ও আকল, আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত বিষয়, পরকাল ও ইহকাল, একক ব্যক্তি ও ব্যক্তিসমষ্টি, ধারণাগত ও বাস্তববাদী বিষয়, অতীত ও ভবিষ্যত এবং দায়িত্ববোধ ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্যের মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। এ ভারসাম্য সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও নতুন আবিষ্কার, দায়িত্ব ও অধিকার, স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তন, প্রতিশ্রুতি ও ধৈর্যের মাঝে পুনর্মিলন ঘটায়।</p>
<p>এসবের কারণে মুসলিম উম্মাহ অন্য সব জাতির তুলনায় বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,</p>
<p>“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যমপন্থী’ উম্মতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীদের উপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের উপর সাক্ষী।” (সূরা আল-বাকারা : ১৪৩)</p>
<p>আর সমন্বয় বলতে বোঝায় দুটি ধারণা বা মতাদর্শকে এমনভাবে মিলিত করা, যেন একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় এবং একটি অন্যটিকে ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। এটি মানুষের জমিনে বিনির্মাণ, পৃথিবীতে খেলাফতের দায়িত্ব পালন এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদাত করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। ইসলাম বিজ্ঞান ও বিশ্বাস, সত্য ও শক্তি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ক্রিয়াকলাপ, ধর্ম ও রাষ্ট্র, নির্দেশনা ও আইন, ধর্মীয় বিড়ম্বনা ও শাসকদের দায়িত্ব, বস্তুগত সৃজনশীলতা ও নৈতিক উন্নতি এবং সামরিক শক্তি ও মনোবল এর মাঝে সমন্বয় সাধন করে।</p>
<p>ইসলাম এবং বাস্তবতা অনুসারে, বিজ্ঞান বিশ্বাসের সাথে এবং ক্ষমতা সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তারা একে অপরের সাথে সেভাবে সমন্বিত, যেভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস ক্রিয়াকলাপ বা কার্যাবলির সাথে এবং নির্দেশনাসমূহ আইনের সাথে সমন্বিত। ইসলাম যে জীবনের কথা বলে তা মূলত এ সমন্বয়ের উপর ভিত্তি করে গঠিত।</p>
<p>মানবরচিত ব্যবস্থা কিছু মূল্যবোধ এবং বিষয়ের উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করে এবং অন্য বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে এটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এসব ব্যবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চেয়ে উদরপূর্তিকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যা মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। এ ব্যবস্থাগুলো বস্তুবাদী বিজ্ঞানকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়, কিন্তু বিশ্বাসের গুরুত্বকে উপেক্ষা করে। এ ব্যবস্থাগুলো যোগাযোগের সুবিধার প্রতি আগ্রহ দেখায়, কিন্তু জনগণের মধ্যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ গড়ে তোলার গুরুত্বকে উপেক্ষা করে।</p>
<p>আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ মানুষকে তার প্রয়োজনীয় সব কিছুই দেয়। এটি মানুষের শরীর, মন এবং আত্মার ভারসাম্য বিধান করে। এটি মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে যেমন গুরুত্ব প্রদান করে, তেমনি গুরুত্ব প্রদান করে একটি পরিবার এবং একটি সমাজের সদস্য হিসেবেও। এটি মানুষকে তার জীবনের বিভিন্ন ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি সম্বলিত আইনসমূহ সরবরাহ করে। এটি শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, শাসক এবং শাসিতদের সকল চাহিদা পূরণ করে। এটি শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, ধনী-দরিদ্র, আকাশচুম্বী ভবনে বসবাসকারী-গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে গুরুত্ব প্রদান করে।</p>
<p><a href="https://rkmri.co/Ayo3AM0NemMe/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Agami-diner-sovvota-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>ইসলামে বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের সমন্বয় :</strong></p>
<p>বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যকার সমন্বয় সুসমন্বিত ইসলামী ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। অন্যান্য ব্যবস্থায় এটি অনুপস্থিত, উপরন্তু অন্যান্য ব্যবস্থায় সর্বদা বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। ইসলামী ব্যবস্থায় বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানকে এমনভাবে সমন্বিত করা হয়েছে যে, উভয়েই সমান তালে দাঁড়িয়ে থাকে।</p>
<p>মধ্যযুগের ইউরোপ অবিচার এবং হাজার হাজার নিরীহ বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, পণ্ডিত ও তাদের সমর্থকদের উপর পরিচালিত রক্তাক্ত গণহত্যার ইতিহাসে পূর্ণ। ÒIslam and Christianity: Side by Side With Science and UrbanismÓ বইয়ে মুহাম্মদ আবদুহু এ রোমহর্ষক ঘটনাগুলোর কিছু বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আমাদের বোঝা উচিত, মুসলমান হওয়ার কারণে আমরা কতটা ভাগ্যবান, কারণ ইসলাম কখনোই বিজ্ঞান ও উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। যারা বলে যে, ইসলাম বিজ্ঞান ও উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টিকারী, তারা মূলত ইসলাম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ এবং তারা চায় ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো পরিণতি বরণ করুক।</p>
<p>আমরা বৈজ্ঞানিক উন্নতিকে (প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা মানুষের কাজকে সহজ করে তোলে এবং তার সময় ও শ্রম বাঁচায়) একজন মুসলমানের ইবাদত হিসেবেই মানি। বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে তার অংশগ্রহণ এবং উৎকর্ষ সাধন তাকে তার নামাজ-রোজার মতো করেই আল্লাহর নিকটবর্তী করে তোলে। বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ একটি সমষ্টিগত ইবাদত, যা অবশ্যই পালন করতে হবে। বেসামরিক ও সামরিক পর্যায়ে এটির দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য সমগ্র মুসলিম সমাজকেই দায়বদ্ধ থাকত হবে।</p>
<p>বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং চিন্তার প্রতি উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদা। ইসলাম মানুষকে জ্ঞানার্জনের জন্য আহ্বান জানায়, আল কোরআনের প্রথম সাতটি আয়াত যার সাক্ষ্য প্রদান করে। ইসলাম বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের প্রশংসা করে এবং পশ্চাদপদতা ও অজ্ঞতার নিরলস বিরোধিতা করে।</p>
<p>অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলাম কখনো এ ধরনের মিথ্যাচার করেনি যে, “আপনাকে প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে এবং তারপর জানতে হবে আপনি কী বিশ্বাস করেছেন! আপনাকে অবশ্যই অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে! এই না জেনে অনুসরণ করাই তাকওয়ার উৎস!” এসব বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিপরীতে বিশিষ্ট মুসলিম আলেমরা বলেছেন, “আল্লাহ সেসব বিশ্বাসীর আমল কবুল করবেন না, যারা না জেনে, না বুঝে অন্ধ আনুগত্য করে।” তারা বলেন, ওহীতে বিশ্বাসের মূল ভিত্তিই হলো আকল। আকল প্রমাণ করে যে, আল্লাহ আছেন এবং নবুয়তও সংঘটিত হয়েছে। নবুয়তের সীলমোহর এবং কোরআনের মুজিযাগুলোতে অবিশ্বাসীদেরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>“তাদেরকে বলে দাও, তোমাদের প্রমাণ আনো, যদি নিজেদের দাবির ব্যাপারে তোমরা সত্যবাদী হও।” (সূরা আল-বাকারা : ১১১)</p></blockquote>
<p>“আসলে তাদের বেশিরভাগ লোকই নিছক আন্দাজ-অনুমানের পেছনে চলছে। অথচ আন্দাজ-অনুমান দ্বারা সত্যের প্রয়োজন কিছুমাত্র মেটে না। তারা যা কিছু করছে তা আল্লাহ‌ ভালোভাবেই জানেন।” (সূরা ইউনুস : ৩৬)</p>
<p>মধ্যযুগের মানুষেরা পশ্চিমা গির্জাগুলোর প্রচারিত শিক্ষা এই মর্মে ধারণ করতো যে, আকল, যুক্তি, বিজ্ঞান, চিন্তা এবং আইন ওহী বা আসমানী কিতাব, ধর্ম, বিশ্বাস এবং প্রজ্ঞার চরম শত্রু। ইসলামে এই সমস্যা নেই, কারণ এটি আকল এবং ওহী উভয়টিকেই আল্লাহর কুদরতের দুটি চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করে। উভয়টিই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমজাতীয়, উপরন্তু ওহী আকলকে সমর্থন করে এবং মুসলমানদেরকে আকল বোঝা এবং আকলের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য আহ্বান জানায়। মুসলিম আলেমদের মতে, প্রকাশ্য (যাহের) এবং ব্যখ্যাযোগ্য (মুফাসসার) এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। যদি কেউ এর বিপরীত দাবি করে, তবে তা প্রকাশ্য এবং আকল সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির ব্যাপারে যথাসম্ভব চরম অবিচার এবং অপব্যাখ্যার ফলাফল।</p>
<p>এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো,</p>
<p>১. চৌদ্দ শতাব্দী আগে কোরআন নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময়ে অনেক মতাদর্শ এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোরআনের কোনো আয়াতকেই বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত করা সম্ভব হয়নি। এটি কোরআনের অশেষ মুজিযার প্রমাণ।</p>
<p>২. কোরআনকে যদিও শুধুমাত্র বিজ্ঞানের গ্রন্থ বলা হয় না, কিন্তু কোরআন প্রায় সময়ই এমন সব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়, যা কোরআন নাযিলের পূর্বে ভাবাই যেতো না বা কোরআন নাযিলের বহু শতাব্দী পরেও শোনা যায়নি। বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হিসেবে পরিচিত কোরআনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক বৈজ্ঞানিক বই লেখা হয়েছে, একে কেন্দ্র করে অনেক দেশে অনেক সভা-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মক্কার Muslim World League-এর সাথে সম্পৃক্ত একটি স্বতন্ত্র সংস্থা রয়েছে, যা শুধু এ বিষয়টি নিয়েই কাজ করে।</p>
<p>৩. কোরআনের শিক্ষা অবশ্যই সর্বোত্তম আখলাক ও উন্নত চরিত্র গঠনকারী। এ শিক্ষা মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা সৃষ্টি করে যা কুসংস্কার, অনুমান এবং লালসাকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি অন্ধ অনুকরণ এবং নির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী নয়, বরং এটি বৈজ্ঞানিক এবং পরীক্ষামূলক প্রমাণে বিশ্বাসী। এটি কোরআন, হাদীস এবং রাসূল (স.)-এর সীরাতে বিশ্বাসী। এটি বিশ্বাস করে যে মানুষের মন তার জন্য একটি নেয়ামত, যার মাধ্যমে সে সৃষ্টিজগতে যা কিছু আছে, তার সর্বোত্তম ব্যবহারের সর্বোত্তম উপায়গুলো প্রতিফলিত করতে পারে। এর মাধ্যমে সে ইতিহাসের ধারণারও বিকাশ ঘটাতে পারে এবং কীভাবে অতীতকে ব্যবহার করতে হয় তা শিখতে পারে, যে অতীত রবের হুকুমের অপরিবর্তনীয়তার সাক্ষ্য দেয়। নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে উল্লিখিত উপমাগুলো এ আহ্বানেরই পরিচায়ক।</p>
<p>“&#8230;যাদের বুদ্ধি ও বিবেক রয়েছে।” (সূরা আল-বাকারা : ১৬৪)</p>
<p>“&#8230;যারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (সূরা ইউনুস : ২৪)</p>
<p>“&#8230;তাদের জন্য, যাদের জ্ঞান আছে।” (সূরা আল-বাকারা : ২৩)</p>
<p>“&#8230;তাদের জন্য, যারা বোধসম্পন্ন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)</p>
<p>“তাদের জন্য যারা আকলসম্পন্ন।” (সূরা ত্বাহা : ৫৪)</p>
<p>৪. আল কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে আলেমদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-</p>
<p>“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা আয যুমার : ০৯)</p>
<p>“তুমি কি দেখো না আল্লাহ‌ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তারপর তার মাধ্যমে আমি নানা ধরনের বিচিত্র বর্ণের ফল বের করে আনি? পাহাড়ের মধ্যেও রয়েছে বিচিত্র বর্ণের সাদা, লাল ও নিকষকালো রেখা। আর এভাবে মানুষ, জীব-জনোয়ার ও গৃহপালিত জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের রয়েছে। আসল ব্যাপার হলো আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাঁকে ভয় করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ‌ পরাক্রমশালী এবং ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির : ২৮)</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ আকাশ, বৃক্ষ, জীবজন্তু এবং মানব জাতির পরেই আলেমদের কথা বলেছেন, যা নির্দেশ করে যে আলেমরাই তারা, যারা মহাজাগতিক এবং জীববৈজ্ঞানিক বিষয়াবলি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, গভীর জ্ঞান রাখে। তাদের জ্ঞানই তাদেরকে মহান আল্লাহর পরম শক্তি, দয়া, রহমত, ক্ষমা এবং জ্ঞান অনুভব করায়।</p>
<p>৫. নবী-রাসূলগণ এবং সৎকর্মশীলগণের সীরাত আমাদেরকে জ্ঞানের মূল্য এবং গুরুত্ব শিক্ষা দেয় যেন আমরা পৃথিবীতে মানুষকে আল্লাহর খলিফা হিসেবে তার দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো পূরণে সহায়তা করতে পারি। এ জ্ঞানের কারণেই হযরত আদম (আ.) ফেরেশতাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন, এ জ্ঞান হযরত ইউসুফ (আ.)-কে মিশরকে দুর্ভিক্ষের কবল থেকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছিলো, এ জ্ঞানের মাধ্যমে হযরত সোলায়মান (আ.) চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে নিয়ে এসেছিলেন, অন্যান্য নবী এবং বিশ্বাসীগণও এ জ্ঞানের মাধ্যমেই সফলতা লাভ করেছিলেন। এটিই জ্ঞানের উপযোগিতা। ইসলামী সভ্যতার সেরা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এসব মূল্যবোধ ও নীতির বাস্তব প্রয়োগের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিলো।</p>
<p>মুসলমানগণ অনুবাদেও ছিলেন সর্বোচ্চ অবস্থানে, ইতিহাস তাদের অনুবাদ প্রতিভার এ উৎকর্ষের সাক্ষী। তারা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সকলের আগেই এ উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। তারা বিজ্ঞান, গণিত, মেটাফিজিক্সসহ জ্ঞানের সকল শাখায় সংশোধন, বিস্তৃতকরণ, গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে জ্ঞান ভাণ্ডারের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। তারা বীজগণিতের মতো জ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র উদ্ভব করেছেন। তারা যৌক্তিক এবং পরীক্ষামূলক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে পশ্চিমারা তা গ্রহণ করে নেয় এবং আধুনিক পশ্চিমা রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণে তা ব্যবহার করে। নিরপেক্ষ মানসিকতার পশ্চিমারা এ ইতিহাসের সাক্ষী। নিঃসন্দেহে ইসলামী সভ্যতা বহু শতাব্দী ধরেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার পথিকৃৎ ছিলো, আর তখন ইউরোপ অজ্ঞতা, অনগ্রসরতা বা পশ্চাৎপদতায় আবৃত ছিলো। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুসলিম অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যেমন: বাগদাদ, কায়রো, দামেস্ক, কর্ডোভা, আন্দালুসিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ। সারা বিশ্বের ছাত্ররা সঠিক শিক্ষা গ্রহণ এবং নিজেদের দেশকে উন্নয়নের পদ্ধতি শেখার জন্য এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতো।</p>
<p>চিকিৎসা, ফার্মাকোলজি, জ্যোতিষশাস্ত্র, অপটিকস, রসায়ন, গণিত, ভূগোল এবং জ্ঞানের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রে ইসলামী তথ্যসূত্রগুলো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ছিলো। ইসলামী এবং আরব তথ্যসূত্রগুলো বহু শতাব্দী ধরেই চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রধান তথ্যসূত্র ছিলো। আল রাজীর “আল-হাওয়ি”, ইবনে সিনার “আল-কানুন”, ইবনে রুশদের “আল-কুলিয়াত”, আল জাহরাওয়ীর “আল-তাসরিফ লিমান আগাজ আন আল-তালিফ” এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলো ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানের রত্ন ভাণ্ডারের অংশ ছিলো। সে সময়ে মুসলিম পণ্ডিত বা আলেমরা ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতের তারকা; আল-খাওয়ারিজমি, আল-বেরুনি, ইবনে আল-হাইশাম, ইবনে নাফিস, ইবনে আল-বিত্তার এবং আরও অনেকেই যার উদাহরণ। মানবিকের ক্ষেত্রে আল-ফারাবি, আল-গাজ্জালী, ইবনে তোফায়েল, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে খালদুন এবং আরও অনেকেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।</p>
<p>তখন আরবী ছিলো বিশ্বের প্রধান ভাষা, কারণ এটি জ্ঞানের অনূদিত এবং মূল শাখা উভয়টিকেই মূলধারার ইসলামী সভ্যতার সাথে একীভূত করেছিলো। আরবী ভাষার এ ক্ষমতা ও নিপুণতা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং সমাদৃত হয়েছিলো।</p>
<p>মুসলমানদের এই দুর্দান্ত উত্থান সে সময় মুসলিম শহরগুলোর মসজিদ, স্কুল, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল এবং জীবনের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ছাপ রেখে গিয়েছিলো। এটি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনে একটি শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিলো, যে প্রভাব আল্লাহর সাথে তাদের অনন্য সম্পর্ক, তাদের নামাজ, রোজা, যাকাত, সাদকা এবং দাতব্য কাজগুলোতে ফুটে উঠেছিলো। গুস্তাভ লে বন মুসলমানদের এ স্বকীয়, মানবিক ও বিবেকপূর্ণ আচরণ, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও তাদের ভালো আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “আরবদের (মুসলমান) মতো এত বেশি ন্যায়পরায়ণ (আদিল) এবং দয়ালু বিজেতার উদাহরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে নেই।”</p>
<p>প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তার কাছে আত্মসমর্পণ, তার ইবাদত এবং তার স্মরণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো এ সভ্যতা। এ সভ্যতার মুসলমানগণ বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিলো একটি আদিল (ন্যায়ভিত্তিক) সভ্যতা, যেখানে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং যুদ্ধ একে অপরের সাথে মিলেমিশে ছিলো।</p>
<p><a href=" https://rkmri.co/3yyeyyNMEATM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Zubo-jiggasa-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>বিজ্ঞান এবং বিশ্বাস : অবিচ্ছেদ্য</strong></p>
<p>আমরা জ্ঞান এবং যুক্তির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাসী, তবে আমরা এটিও বিশ্বাস করি যে, শুধুমাত্র জ্ঞান এবং যুক্তি মানুষের সকল চাহিদাই পূরণ করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ জ্ঞান এবং যুক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলো আমাদের কিছু চাহিদা পূরণ করে, আবার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে না। নিজেদের ক্ষমতার বাইরের বিষয়গুলোর সামনে উভয়েই অসহায়। উভয়েই অস্তিত্ব, জীবন, মহাবিশ্ব, মৃত্যু এবং অন্যান্য সকল প্রাসঙ্গিক বিষয়ের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম নয়। উভয়ের ক্ষমতাই বস্তুবাদী এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। সুতরাং বোঝা যায়, জ্ঞানের অন্য একটি উৎস অবশ্যই থাকতে হবে যা মানুষকে তার দায়িত্ব-কর্তব্য, পৃথিবীতে তার ভূমিকা এবং সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত অন্তহীন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক্ষেত্রে ওহী-ই একমাত্র উৎস যা মানুষের সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদানের সক্ষমতা রাখে, আর বিশ্বাসই এটির মূল চাবিকাঠি। চিন্তাবিদরা জ্ঞান এবং যুক্তির মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের রহস্য সমাধানের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। উল্টো পরস্পরবিরোধী এবং অযৌক্তিক ফলাফলের কারণে তারা গভীর বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছেন। তাই কোরআনের অকাট্য আয়াত দ্বারা পরিচালিত বিশ্বাসই একমাত্র সমাধান।</p>
<p>ইসলামের মতে মানুষকে বিভ্রান্তকারী প্রধান সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা ঈমান বা বিশ্বাসের রয়েছে, যেমন, মানুষের অস্তিত্ব এবং তার মৃত্যু পরবর্তী অনন্তকালের জীবন। তাছাড়াও বিশ্বাস মানুষকে তার জীবনের অর্থ বুঝতে এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম করে তোলে। সেইসাথে জ্ঞান অর্জনের নামে সীমালঙ্ঘন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লাগাম টানতেও এ শক্তি ব্যবহৃত হয়। আমাদের কাছে এ নিয়ন্ত্রণের অনেক উদাহরণ রয়েছে। চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে নিয়ে আসার পর আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী হযরত সুলায়মান (আ.) বলেছিলেন,</p>
<p>“এ আমার রবের অনুগ্রহ, আমি শোকরগুযারী করি না নাশোকরী করি, তা তিনি পরীক্ষা করতে চান। আর যে ব্যক্তি শোকরগুযারী করে, তার শোকর তার নিজের জন্যই উপকারী। অন্যথায় কেউ অকৃতজ্ঞ হলে, আমার রব কারো ধার ধারেন না এবং আপন সত্তায় আপনি মহীয়ান।” (সূরা নামল : ৪০)</p>
<p>সুলায়মান যখন তার সামনে রানী বিলকিসের সিংহাসন পড়ে থাকতে দেখেন, তখন তিনি আনন্দ বা অহংকারে মত্ত হয়ে একটা মুহূর্তও নষ্ট করেননি, বরং আল্লাহর প্রশংসা করেন।</p>
<p>প্রাচীর নির্মাণ শেষে যুলকারনাইন (আ.) বিনীতভাবে বলেছিলেন,</p>
<p>“এ আমার রবের অনুগ্রহ। কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতির নির্দিষ্ট সময় আসবে, তখন তিনি একে ধূলিস্মাৎ করে দেবেন, আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।” (সূরা কাহফ: ৯৮)</p>
<p>যদি আমরা ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণালী দিনগুলোতে ফিরে যাই, তাহলে আমরা বিশ্বাসের দ্বারা পরিচালিত জ্ঞান কীভাবে গঠনমূলকভাবে মানুষের সেবা, উপকার এবং সুখে থাকার কাজে আসে তার অনেক উদাহরণ দেখতে পাবো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে আমরা পশ্চিমাদের উদাহরণগুলো খুঁজে নেই, যারা জ্ঞানকে কলুষিত করেছে, আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে, গণবিধ্বংসী অস্ত্র আবিষ্কার করে এটির অপব্যবহার করেছে, যা আমাদের জীবনকে একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্নে  পরিণত করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মুহসিনা বিনতে মুসলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islam-the-embodiment-of-desired-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15835</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পাশ্চাত্য চিন্তার ভিত্তি ও তার সমালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 27 Apr 2025 15:38:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15793</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিজের অস্তিত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছে। আর এ বিষয়টি মানুষের স্বভাবতাড়িত। সে অপর জনগোষ্ঠীর আচরণকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তবে এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় নিষ্কলুষ কিংবা নিষ্পাপ ছিলো না। যার কারণে এ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিজের অস্তিত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছে। আর এ বিষয়টি মানুষের স্বভাবতাড়িত। সে অপর জনগোষ্ঠীর আচরণকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তবে এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় নিষ্কলুষ কিংবা নিষ্পাপ ছিলো না। যার কারণে এ জানাশোনার সূত্রেই বিভিন্ন চিন্তার বিনির্মাণ ও উৎপত্তি ঘটেছে। চিন্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান দুনিয়া দুটি ভাগে বিভক্ত; আর তা হলো- প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য। তবে এই আলোচনায় মূল বিষয়বস্তু হলো <strong>‘</strong><strong>পাশ্চাত্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>তার</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>ভিত্তি</strong><strong>’</strong><strong>।</strong> আধুনিক যুগে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা হলো পাশ্চাত্য চিন্তাধারা। যা আমাদের অস্তিত্ব এবং চিন্তার মাঝে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, যার দরুন আমাদের দ্বীন, সমাজ-সংস্কৃতি এবং জীবনাদর্শের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে নড়বড় করে দিয়েছে। যা কেবল মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানবতার জন্য চরম অধঃপতন, জুলুম এবং শোষণের দিকে ধাবিত করছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা কিংবা ধর্মহীন যে পাশ্চাত্য তা নিয়ে আলোচনার শুরুতেই কয়েকটি প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির হয়। সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>পাশ্চাত্য বলতে আসলে কী বুঝায়?</li>
<li>পাশ্চাত্য চিন্তার অভিন্ন বা কমন বিষয়সমূহ কি কি?</li>
<li>পাশ্চাত্য চিন্তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ (Hypothesis)।</li>
</ul>
<p>যে সকল বিষয়সমূহের উপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য চিন্তা গড়ে উঠে-</p>
<ul>
<li>মানুষ হলো পরিত্যক্ত একটি সৃষ্টি, যা ইলাহী সমর্থন ও সাহায্য থেকে মাহরুম/বঞ্চিত।</li>
<li>মানুষকে একাকী ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তার কাজে হস্তক্ষেপ করার মতো কেউ নাই।</li>
<li>সকল কিছুই সময় তথা নির্দিষ্ট কিছু শর্তের আলোকে নির্ধারিত হয়ে থাকে।</li>
<li>সকল কিছুই মানুষ তৈরি করে, এমনকি দ্বীনও মানুষ তৈরি করে থাকে।</li>
<li>সকল কিছুই সম্ভব। যা কিছু মওজুদ (বিদ্যমান) আছে সকল কিছুই মুমকিন মওজুদ<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a> থেকে সৃষ্টি হয়।</li>
<li>মুমকিন মওজুদের বাইরে অন্য কোনো সৃষ্টি নেই।</li>
<li>মানুষ তার নিজের জন্য নিজেই যথেষ্ট।</li>
</ul>
<p>পাশ্চাত্য বলতে মূলত পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান ধর্মকে বুঝিয়ে থাকে। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ক্যাথলিক ধর্ম পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, পরবর্তীতে ১৭ শতাব্দীতে এসে (মার্টিন লুথার কিং এঁর মাধ্যমে) প্রটেস্ট্যান্টরা যুক্ত হয়। পাশ্চাত্যের একটি সংজ্ঞা আছে; তা হচ্ছে- we and the rest অর্থাৎ, আমরা এবং অন্যরা। এখানে “আমরা” বলতে বুঝায় মূলত পাশ্চাত্য বসবাসকারী খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে। তবে ল্যাটিন অ্যামেরিকা বা ব্রাজিল কিংবা উরুগুয়ের খ্রিস্টানরা পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত নয়; পাশাপাশি অর্থডক্স খ্রিস্টান অর্থাৎ রাশিয়ান খ্রিস্টানরাও পাশ্চাত্যের অর্ন্তভুক্ত নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্পেনের ক্যাথলিকরা পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত কিনা, সেটা নিয়েও তাঁদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যার ফলে পাশ্চাত্য চিন্তার প্রতিনিধিত্বকারী মূলত ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, হল্যান্ড এবং আংশিকভাবে ইতালির চিন্তাকে বুঝানো হয়ে থাকে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে এসে অ্যামেরিকা ও কানাডার চিন্তাও এর সাথে (we বা আমরা) যুক্ত হয়।</p>
<p>সপ্তদশ শতাব্দীর পরে এসে আধুনিক পাশ্চাত্য গঠিত হয়। আমাদের সামনে যে পাশ্চাত্য বিদ্যমান তা মূলত ষোড়শ শতাব্দী পরবর্তী পাশ্চাত্য। এ সময়ে ইউরোপে জ্ঞানের যে বিভিন্ন ধারা তৈরি হয়, সেটাই পরবর্তীতে সুগঠিত হয়ে নতুন পাশ্চাত্য গঠন করা হয়। আর সপ্তদশ শতাব্দীতে গঠিত পাশ্চাত্য যে মূলনীতিকে তার movement point হিসেবে গ্রহণ করে &#8211;</p>
<blockquote><p>من عرف نفسه فقد عرف ربه<strong>&#8211;</strong></p>
<p>অর্থাৎ, “যে নিজেকে চিনে সে তাঁর রবকেও চিনতে পারে।”</p></blockquote>
<p>কারণ, এ মূলনীতি ক্যাথলিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, যদি আমরা মানুষ ও প্রকৃতিকে জানতে পারি তাহলে স্রষ্টাকেও চিনতে পারবো। মারেফাতুল্লাহ (স্রষ্টাকে চিনা)-ই উপনীত হওয়ার জন্য ক্যাথলিক চার্চের প্রয়োজন নেই। মুসলমানদের মতো আমরাও প্রকৃতি এবং মানুষকে বিশ্লেষণ করে মারেফাতুল্লাহ-ই উপনীত হতে পারবো। আর এক্ষেত্রে সঠিক পন্থা হলো, মানব সত্ত্বা ও প্রকৃতিকে আকলের মাধ্যমে গবেষণা করা। আকলের মাধ্যমে গবেষণা করার বিষয়টা ক্যাথলিক চিন্তাধারায় ছিলো না। তাই ঐ সময়ের প্রভাবশালী চিন্তা ইসলামী সভ্যতার চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রভাবিত ছিলো। তাদের এ চিন্তা ঊনবিংশ শতাব্দী অর্থাৎ ২০০ বছর পর্যন্ত জারি ছিলো। পরবর্তীতে তারা এটাকে পরিত্যাগ করে।</p>
<p>আর এটা পরিবর্তন করার কারণ হলো- ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তারা একটি চিন্তায় পৌঁছায় সেটা হলো, আকলের মাধ্যমে রবকে জানা সম্ভব নয়। এখানে জ্ঞানের বিষয়বস্তু পরিবর্তন হয়ে যায় এবং মারেফাতুল্লাহকে জ্ঞানের বিষয় থেকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ষোড়শ শতাব্দী পরবর্তী সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য চিন্তায় মূল বিষয়সমূহ ছিলো-</p>
<ul>
<li>প্রাকৃতিক দ্বীন (Natural religion)</li>
<li>প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব (Natural theology)</li>
<li>প্রাকৃতিক আইন (Natural law)</li>
<li>তাবিয়াত দর্শন বা প্রাকৃতিক দর্শন (Natural philosophy)</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক দ্বীন হলো,</strong> মানুষের ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বীন। তারা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দ্বীনের অনুসন্ধান করতো। কারণ তাঁরা ক্যাথলিক চিন্তার মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি কিংবা তাঁদের চিন্তাকে সমাজে প্রভাবশালী করতে পারছিলো না। তারা যে পিছিয়ে ছিলো বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো, তা থেকে বের হওয়ার জন্য একটি প্রাকৃতিক দ্বীনের অনুসন্ধান করছিলো। পরবর্তীতে তারা পরিকল্পনা করে, যেহেতু এই দ্বীনের মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব নয় এবং এর মধ্য থেকে আমরা নতুন কিছু তৈরি করতে পারবো না, এজন্য আমাদের এমন একটা দ্বীন প্রয়োজন যেটা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা প্রাকৃতিক দ্বীন। ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যতা খোঁজার পেছনে অন্যতম কারণ হল, ইসলামী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব হলো,</strong> প্রকৃতির মধ্যকার বিধান নিয়ে গবেষণা করে তথা “আসার’ (পৃথিবীতে যা কিছু আছে বা সৃষ্টি) থেকে “মুয়াসসির” তথা স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সিফাতসমূহকে নির্ণয় করার প্রচেষ্টা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের খালক বা মহান সৃষ্টির মধ্যে যে বিধি-বিধান আছে সেটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। তারই প্রকৃতির মধ্যে যে বিধান দিয়ে দিয়েছেন সেটা গবেষণা করে আল্লাহর অস্তিত্ব এবং সিফাতসমুহকে নির্ণয় করা। এজন্য তারা একটি থিওলজি দাঁড় করায়। তবে সৃষ্টি যার আইন তার, এই বিধান অর্থে না। এমনকি নিউটনের ‘Principia mathematica physics’ বইয়ে এরকম একটা লাইন হুবহু আছে, “সৃষ্টিকে দেখে স্রষ্টাকে খুঁজে বের করা তথা ‘আসার’ দেখে ‘মুয়াসসির’কে খুঁজে বের করা।” এটা ছিলো তাদের ন্যাচারাল থিওলজি। নিউটনের এ বইটি ফিজিক্স, একই সাথে কালামের সাথে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব মূলত ইলমুল কালাম দ্বারা প্রভাবিত, বিশেষ করে ইবনে সিনার থিওরী/তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক আইন হলো,</strong> মানুষের প্রকৃতির মধ্যে মওজুদ (বিদ্যমান) এবং আকলের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব, এমন মূলনীতিসমূহকে খুঁজে বের করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিধানকে মওজুদিয়্যাত ও আকলের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া বিধানের উপর প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ যে ব্যবস্থাপনা হবে সেটা আকল কর্তৃক নির্ধারিত হবে এবং মানুষের প্রকৃতির মধ্যে যে সকল বিষয় আছে সে সকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। প্রত্যেকটা বিষয়েই তারা ব্যাপকভাবে ইসলামী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।</p>
<p>&#8211; <strong>ন্যাচারাল ফিলোসফি বা প্রাকৃতিক দর্শন হলো,</strong> এস্ট্রোনমি, ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি ও বায়োলজির মতো জ্ঞানসমূহ। ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলমানগণ এ সকল বিষয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিলো। পাশ্চাত্য চিন্তার গঠনগত পর্যায়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা ইসলামী চিন্তা থেকে অনেক বেশী প্রভাবিত এবং উপকৃত হয়েছে। এমনকি ইসলামী সভ্যতার অসংখ্য বই পাশ্চাত্য নিজেদের মতো ভাবার্থ করে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছে। সে সময়ের বইগুলোতে এক পাশে ইংরেজি আর অন্যপাশে আরবী, এভাবে অনুবাদ করা হতো।</p>
<p>যেমন &#8211; জন লক ও গ্রটিউস আরবী ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। <strong>Hugo Grotius </strong><strong>এর</strong><strong> On the law of War and Peace </strong><strong>গ্রন্থটি</strong> <strong>ইমাম</strong> <strong>সারাখসীর</strong> <strong>শারহু</strong> <strong>সিয়ারুল</strong> <strong>কাবির</strong> <strong>গ্রন্থের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>অনেক</strong> <strong>মিল</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>এই</strong> <strong>বই</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নকল</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong></p>
<p>তবে এক্ষেত্রে একটা বিষয়ে ঘাটতি আছে। সেটা হল- তারা এসব বিষয় আমাদের কাছ থেকে নিলেও, আমাদের কাছ থেকে যেটা গ্রহণ করেনি তা হলো- নবুয়ত। তারা যা কিছু নিয়েছে, সুন্নতকে একপাশ রেখে, বাইরে রেখে যেভাবে নেওয়া যায়; সেভাবে নিয়েছে। তাই, আমরা এখন তাদের কাছ থেকে যে চিন্তাই গ্রহণ করি না কেন, তা সুন্নতের বাইরে যায়, আমাদের সমাজ বা মন-মানসের সাথে মিলে না। যা আমাদের জন্য মোটেই উপযোগী নয়।</p>
<p>সপ্তাদশ শতাব্দীতে উসমানী খেলাফতের (শুধু উসমানী না, সাফাভী, মুঘল এবং উসমানী)  প্রভাবের কারণে তারা আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করে, মানুষ তার প্রতিষ্ঠিত দুনিয়াতে বসবাস করে। অর্থাৎ আমরা যে শহরে বাস করি সেটা আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমাদের তৈরি করা। এটাকে ইমাম মাওয়ার্দী বা ইসলামী সভ্যতার ভাষায় বলে العقل المكتسب বা মুকতাসাব আকল, যা এক অর্থে সমগ্র মানবতার আর্কাইভ [এখানে মানুষের সকল কিছু রয়েছে]। এটা তারা মুসলমানদের চিন্তাধারা থেকে জানতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইবনে</strong> <strong>খালদুনের</strong> <strong>শ্রেণিবিন্যাস</strong> <strong>অনুযায়ী</strong> <strong>মওজুদাতকে</strong> <strong>দুইভাগে</strong> <strong>বিভক্ত</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়</strong><strong> &#8211; </strong></p>
<ul>
<li>তাবিয়াত বা প্রকৃতি (যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই)।</li>
<li>সংস্কৃতি বা সভ্যতা বা উমরান অথবা কাসবি (যা মানুষের নিজের তৈরি)। এটাকে দুনিয়া বা দুনিয়ার জীবন বলা হয়ে থাকে।</li>
</ul>
<p>ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে &#8216;কাসব&#8217; পরিভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আমরা আমাদের অর্জিত বা কাসবী দুনিয়ায় বসবাস করি। এসব চিন্তা দ্বারা তারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।</p>
<p>সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে যখন তারা ক্যাথলিক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো, তাদের মধ্যে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল সেটা হলো- এ দুনিয়ায় মানুষের খুব বেশী কিছু করা সম্ভব নয়। এই দুনিয়া রুহুল কুদস বা পবিত্র আত্মা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আর এই পবিত্র আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে গির্জা বা গির্জা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুনিয়া। এখানে যা কিছু ঘটছে তা আমাদের চিন্তার বাইরে। ফলে মানুষের কিছু করার নেই বা মানুষ সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এটাই ছিলো তাদের প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু দুনিয়া, সভ্যতা বা সংস্কৃতি বিনির্মাণ করার ক্ষেত্রে ‘ইমারত’ সম্পূর্ণভাবে মানুষের উপর নির্ভরশীল৷ মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা দায়িত্বের অংশ হিসেবে কিংবা আখেরাতে সে যে পরিণতি পাবে, দুনিয়াতে ইমারতের দাবি হিসেবে আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন। “তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা পৃথিবীকে বিনির্মাণ করো।” বিনির্মাণের এই চিন্তা পরবর্তীতে ইলমুল উমরান হিসেবে আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো। এই মূলনীতির কারণে এর উপর ভিত্তি করে আমরা সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি।</p>
<p>কিন্তু, ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাদের চিন্তার মূল বিষয়সমূহ পরিবর্তন হয়ে যায়। এই সময়ে তাদের কিছু নতুন চিন্তা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>ইমানুয়েল কান্ট (Critique of pure reason নামক গ্রন্থে) এর মতে, মানুষ শুধুমাত্র তার আকল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে-ই জানতে পারে।</li>
<li>সংজ্ঞাগত কারণেই মানুষের পক্ষে তার আকল দ্বারা স্রষ্টাকে (ইনশা ও ইহাতা) বুঝতে পারা সম্ভব না। অর্থাৎ, রবকে আকলের মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়; মারেফাতুল্লাহ জ্ঞানের বিষয় নয়; এই বিষয়ে কান্ট সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন।</li>
<li>স্রষ্টা জ্ঞানের কোনো বিষয় নয়। অর্থাৎ, মারেফাতুল্লাহ সম্ভব নয়।</li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে কান্টের সিস্টেমের মধ্যে দ্বৈত একটি বিভাজন রয়েছে–</p>
<ul>
<li>Numen (নুমেন)- ইলাহী বিষয় এবং যা মানুষ জানতে পারবে না।</li>
<li>Phenomen- মানুষের মস্তিস্ক কর্তৃক তৈরিকৃত বিষয়কে জানতে পারবে; অর্থাৎ মানুষের মস্তিস্ক কর্তৃক তৈরিকৃত বিষয়কে জানতে পারবে। সকল ধরনের বিষয়কে মানুষ তৈরি করে; যেমন- পাথর, গাছপালা, সূর্য, মহাকাশ, নিহারিকা, খাবার-দাবার ইত্যাদি।</li>
</ul>
<p>কান্টের চিন্তাধারা Will and Representation (ইরাদা এবং তাসাউর) এবং ফরাসি বিপ্লব- সকল কিছুকে পরিবর্তন করে নতুন একটা বিশ্বব্যবস্থার পথে যাত্রা শুরু করে। এ বিষয়ের ক্ষেত্রে কান্টের পাশাপাশি ফরাসি বিপ্লবও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি বিপ্লবের মূল কথা হলো- <strong>মানুষ</strong> <strong>তার</strong> <strong>পছন্দনীয়</strong> <strong>ও</strong> <strong>ইচ্ছাকৃত</strong> <strong>ব্যবস্থাকে</strong> <strong>নিজের</strong> <strong>মতো</strong> <strong>প্রতিষ্ঠা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>; </strong><strong>একইসাথে</strong> <strong>তা</strong> <strong>ব্যক্তিগত</strong> <strong>ও</strong> <strong>সামাজিক</strong> <strong>ক্ষেত্রেও</strong><strong>।</strong> পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সব-ই মানুষ তৈরি করছে, একই সাথে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তাও মানুষ তৈরি করেছে। কান্টের চিন্তার ভিত্তি হলো, যে নিজেকে চিনতে পারবে, সে নিজেকে চিনতে পারবে। জগতে যা কিছু আছে, তা মানুষ তার নিজের আকলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাই রব এখানে Out of subject অর্থাৎ এ সকল কিছুর বাইরে। তারা আকলের মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা (خلق) পরিবর্তন করে দিলো। আরেকটা হলো امر (পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা &#8211; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিজামে আলাম)-কে পরিবর্তন করলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীতে আরেকটি চিন্তা ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে উঠে, তা হলো- <strong>কান্টের</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>অটনমি</strong> <strong>চিন্তা</strong><strong>।</strong></p>
<p>অটনমি শব্দটি এসেছে, nomos- অর্থ হলো বিধান। Autonomy অর্থ হলো, যে নিজের আইন নিজেই প্রণয়ন করতে পারে। সুতরাং আখলাকী অটনমি হলো, নিজের আখলাককে নিজেই তৈরি করার যোগ্যতা। অর্থাৎ মানুষ তার নিজের আখলাকী বিধানকে নিজেই প্রণয়ন করে। এই ক্ষেত্রে নিজের বিবেক-ই মূল। বিবেক সম্মতি দিলে সে যা ইচ্ছা করতে পারবে। ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে ভালো ও খারাপ নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে। এটাকে তিনি এই বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন- Volenti non fit injura, অর্থাৎ মানুষ তার নিজের ব্যাপারে নিজের ইচ্ছায় যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাকে জুলুম বলা যাবে না। এতে সে আত্মহত্যা বা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। তার সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানুষ তার নিজের উপর জুলুম করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে মানুষ তার নিজের সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাকে আখলাকী দিক থেকে ভুল বলে অভিহিত করা যাবে না।</p>
<p>কিন্তু কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষ নিজের উপর জুলুম করতে পারে, এবং তার নিজের সম্পর্কে অজ্ঞও হতে পারে। যার পরবর্তী ধাপ-ই হলো ইস্তিগনার চিন্তা অর্থাৎ মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করে। মানুষ যখনই তার নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করবে তখনই সে ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে।</p>
<blockquote><p>إن الإنسان ليطغى أن رآه استغنى</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অপর একটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়, রোমান্টিক তথা কল্পনাপ্রবণ আন্দোলন (Romantic Movement)। যার মূল কথা,</p>
<ul>
<li>মানুষ সকল কিছুকে তার নিজের মত বিনির্মাণ করতে পারে; আর এক্ষেত্রে কোন সীমারেখা নাই।</li>
<li>এ বিষয়ে হেগেলের একটি মৌলিক চিন্তা হলো, ‘স্রষ্টা আছে’। এখানে স্রষ্টা আছে এর অর্থ, মওজুদ আছে।</li>
</ul>
<p>আর যেহেতু মওজুদ (বিদ্যমান বিষয়) তাদের হাতে আছে, এজন্য আল্লাহ বা স্রষ্টার প্রয়োজন নাই। স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শুধু মওজুদের উপর ভিত্তি করে তারা সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। পরবর্তীতে হেগেল এই অন্টোলজির মাধ্যমে বা মওজুদিয়াতের উপর ভিত্তি করে সবকিছুকে দাঁড় করায়।</p>
<ul>
<li>স্রষ্টা নামক শব্দকে ব্যবহার না করেও “মওজুদ” নামক পরিভাষা উপর ভিত্তি করে সকল কিছুকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।</li>
<li>হেগেলের পরবর্তী সময়ে এমন একটি ধারণা প্রভাবশালী হয়ে উঠে, স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সমগ্র মওজুদাতকে বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা ও জ্ঞান উৎপাদন করা সম্ভব। [এরই মাধ্যমে হিস্টোরিক্যাল ম্যাটেরিয়ালিজমের বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের জন্ম হয়।]</li>
</ul>
<p>রোমান্টিক আন্দোলন (Romantic Movement)-এর অন্যতম একজন দার্শনিক শিলায়েমাখার (Schleiermacher) নামে একজন জার্মান দার্শনিক (মৃত্যুঃ ১৮৩৪ ) ছিলেন। যিনি একইসাথে একজন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ। তার মতে, মানুষ পরিপূর্ণভাবে তার রবকে ইহাতা বা পরিগ্রহ করতে পারবে না। তবে এর সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে মানুষ স্রষ্টা (মুতলাক বা absolute) সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে। পরবর্তীতে এই সকল অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে দ্বীনকে (ইনশা) বিনির্মাণ করতে পারে। এক্ষেত্রে এ দার্শনিক দু’টি বিষয় উল্লেখ করেন-</p>
<ul>
<li>অনুরূপভাবে স্রষ্টা সম্পর্কে তাসাউর (ধারণা), এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।</li>
<li>যেহেতু স্রষ্টাকে ইহাতা বা পরিগ্রহ করা যাবে না, এজন্য দ্বীনের ভিত্তি হলো ইর‍্যাশনাল বা অযৌক্তিক।</li>
</ul>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা মুসলমানদের দ্বীনকে হক্ব দ্বীন হিসেবে বিবেচনা করে না, কারণ এই দ্বীন আকলের সাথে অনেক বেশী সঙ্গতিপূর্ণ। যেহেতু এই দ্বীন আকল কর্তৃক গঠন করা সম্ভব। তাই এটা হক দ্বীন হতে পারে না। কারণ ইলাহ বা স্রষ্টাকে ইহাতা করা সম্ভব নয়। এজন্য সে পরবর্তীতে সেই মানুষ কর্তৃক একটি দ্বীন এবং ধর্মীয় ভাষা প্রবর্তিত হবে। শিলায়েমাখার এটাকে মানুষের তৈরি বলেন, যার ভিত্তি হলো যুক্তিহীন। এটা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এবং এ অভিজ্ঞতা যেহেতু একজন মানুষ করে, এটা কোন ভাষায় কীভাবে করেছে সেটা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না; একইসাথে এটাকে অবশ্যই যুক্তিহীন হতে হবে। এই সময় একটা বিষয় পরিলক্ষিত হয়, যে দ্বীন যত বেশি অযৌক্তিক হবে, সে দ্বীন তত বেশি হক দ্বীন বলে বিবেচিত হবে। যেমন- খ্রিস্টান ধর্মের যত অযৌক্তিক বিষয় আছে সকল অযৌক্তিক বিষয়কে সে এমন ভাবে সামনে নিয়ে আসছে যেন সেটাই একমাত্র হক্ব দ্বীন। এভাবে শিলায়েমাখার এর এই চিন্তার উপর ভিত্তি করে দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞানকে বিকশিত করা হয়।</p>
<p>এই শতাব্দীতে প্রভাবশালী আরেকটি বিষয় হলো, তারা ইসলামী জ্ঞান ও সভ্যতার দ্বারা উপকৃত হলেও নবুয়তকে গ্রহণ না করার কারণে ধীরে ধীরে নববী হিকমত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এতে তারা শুধু নিজেরাই নয় সমগ্র মানবতাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আধুনিক</strong> <strong>পাশ্চাত্যের</strong> <strong>মূলনীতিসমূহ</strong><strong>&#8211;</strong></p>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা বলতে শুধুমাত্র একটি বিষয় নয়; একইসাথে positivism, historicism, idealism, empiricism, rationalism, existentialism, constructivism, marxisim এই সবগুলো বিষয়ই পাশ্চাত্য চিন্তা। এ সকল বিষয়ের অভিন্ন বিষয়সমূহ আলোচনা করা যাক! এই সকল চিন্তাধারার অভিন্ন কিছু দিক রয়েছে।</p>
<ul>
<li><strong>প্রথম</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong><strong> (</strong><strong>স্রষ্টার</strong> <strong>পক্ষ</strong> <strong>থেকে</strong><strong>) </strong><strong>পরিত্যক্ত</strong> <strong>একটি</strong> <strong>জীব</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে পরিত্যাগের বিষয়টি দুইভাবে হতে পারে- একটি <strong>আধ্যাত্মিক</strong> এবং অপরটি <strong>জাগতিক</strong> দৃষ্টিকোণ থেকে। এখানে পরিত্যক্ত বিষয়টা হচ্ছে passive তথা নিষ্ক্রিয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; যাতে কর্তা নির্দিষ্ট না। তবে খ্রিস্টান ধর্ম অনুযায়ী মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক পরিত্যক্ত। খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীদের মতে, স্রষ্টা মানুষকে পরিত্যাগ করেছে। <em>জন</em> <em>পল</em> <em>সার্ত্রে</em> বলেন, মানুষকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই সে নিজের মত করে জীবন গঠন করতে বাধ্য অর্থাৎ সে আকলের ওপর নির্ভরশীল।</p>
<p>তবে খ্রিস্টান থিওলজিস্টদের মতে,</p>
<ul>
<li>মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক পরিত্যক্ত একটি জীব।</li>
<li>মানুষের একার পক্ষে তার আমল দ্বারা মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। Original sin বা আদিপাপের কারণে আধ্যাত্মিক বা জাগতিকভাবে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। এই জন্য স্বয়ং স্রষ্টাকে এসে এই অরিজিনাল সিন বা আদি পাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করার প্রয়োজন।</li>
<li>এক্ষেত্রে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুলুম, তারা একজন পয়গম্বরকে স্রষ্টা বানিয়েছে আবার ইলাহকে তার মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ত্রিত্ববাদ তথা পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।</li>
</ul>
<p>আবার, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর সময়কালে ডেইস্টরা (যারা নবুয়তকে অস্বীকার করে) বলে থাকে যে, আল্লাহ (স্রষ্টা) দুনিয়াকে সৃষ্টি করেছেন এবং এটাকে পরিচালনা করছেন। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ মানুষকে জাগতিক ভাবে পরিত্যাগ করেননি, একই ভাবে আধ্যাত্মিকভাবেও পরিত্যাগ করেননি। তিনি মানুষকে আকল দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে তারা জাগতিক বা ফিজিক্যাল দুনিয়াকে এবং মানুষের আধ্যাত্মিক জগতকে বিশ্লেষণ করে স্রষ্টা সন্তুষ্ট হবেন এমন একটি জীবন ধারা তৈরি করতে পারবে। এটা ইসলামী সভ্যতার প্রভাবে করলেও তারা এটা কখনো স্বীকার না করার কারণে মনে হত, তারা আকলের মাধ্যমে এটাকে খুঁজে পেয়েছে।</p>
<p>[তবে, এখানে মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহ যদি আধ্যাত্মিক বা জাগতিকভাবে পরিত্যাগ করেন তাহলে কি মানুষের টিকে থাকা সম্ভব? মোটেও সম্ভব না। বরং মহান আল্লাহ মানুষকে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রত্যেক যুগে যুগে নবী প্রেরণ করেছেন। শুধু তাই নয়, হযরত পয়গম্বর (স) এর মাধ্যমে বিশ্বজনীন সুন্নত তথা আল্লাহর রাসূলের ওফাত বা মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর সুন্নত বা সুন্নতের মাধ্যমে তিনি সবসময় আমাদের সাথে আছেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুন্নত ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ জাগতিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে পরিত্যাগ করেছেন এ কথাটা মোটেও ইসলামী চিন্তাধারার আলোকে সঠিক নয়। আমরা যদি পয়গম্বরদের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে পড়ি তাহলে আমরা বুঝতে পারবো এটা একটা বানোয়াট চিন্তাধারা। তবে উনবিংশ শতাব্দীর পরে এরকম কোন চিন্তা আর পরিলক্ষিত হয়নি।]</p>
<ul>
<li><strong>তাদের</strong> <strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষকে</strong> <strong>একাকী</strong> <strong>ছেড়ে</strong> <strong>দেয়া</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>যেমন ফিটশের মতে, কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হচ্ছে, সেই কাজ করার সক্ষমতা। আর সক্ষম হলে সেটা গ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়।মানুষকে যেহেতু একাকী ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাই তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।</p>
<p>লাগামহীন ভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তাঁদের সীমারেখা কে নির্ধারণ করবে? মানুষের সীমারেখা নির্ধারণ করবে অন্যরা। মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে তাহলে এই সমঝোতা সকল কিছুর মূলভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে। মূলত থমাস হবস, জন লক এবং জ্ জ্যাক রুশোর সোসাল কনট্রাক্টের ভিত্তি মাধ্যমেই এই মূলনীতির উৎপত্তি।</p>
<p>তাদের মতে, মানুষের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত-ই সঠিক। এ ক্ষেত্রে মুতলাক হাকীকত বা প্রকৃত সত্য বলতে কোনো বিষয় নেই। কারণ তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন, উদাহরণস্বরূপ সমকামিতা এবং মদকে বৈধকরণের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করতে পারি। [এ সকল কিছু তাদের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সঠিক। আজকে এটা সঠিক, কালকে এটা ভুলও হতে পারে। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধ্রুব সত্য বলতে কিছু নেই।] তাই তাদের নীতি &#8211; by the people, of the people, for the people. সার্বভৌমত্ব জনগণের, কথাটার উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এভাবেই তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার উৎপত্তি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ফলশ্রুতিতে আল্লাহ কিংবা কোন শক্তির সামনে তারা কোনো ধরণের জবাবদিহিতা করতে বাধ্য নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>পাশ্চাত্যের</strong> <strong>তৃতীয়</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>সময়</strong><strong>।</strong> <strong>সকল</strong> <strong>কিছুই</strong> <strong>সময়</strong> <strong>কর্তৃক</strong> <strong>নির্ধারিত</strong><strong>।</strong> এই ক্ষেত্রে কোরআনের এই আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য &#8211;</li>
</ul>
<blockquote><p>وَ قَالُوْا مَا هِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنْیَا نَمُوْتُ و نَحْیَا وَ مَا یُهْلِكُنَاۤ اِلَّا الدَّهْرُ-</p>
<p>অর্থাৎ, আমাদেরকে কোনো কিছুই ধ্বংস বা বিনাশ করতে পারবে না একমাত্র দাহর বা সময় ছাড়া।</p></blockquote>
<p>এখানে সময় বা যামান হলো, প্রদত্ত অবস্থা ও শর্তসমূহ। ফলশ্রুতিতে সত্য হলো, শর্তভিত্তিক বা অবস্থাভিত্তিক। অবস্থা ও শর্তের দাবী যা, সেটাই সঠিক। ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। মূলত Historicism তথা ঐতিহাসিকতাবাদ এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।</p>
<p>সময়ের সাথে এবং শর্তের সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি বিষয় হলো, মানুষের চাওয়া এবং দাবি। তাদের মতে, এটাও সঠিক। যেহেতু এটা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। যাকে নিহিলিজম (Nihilism) বলা হয়ে থাকে।</p>
<p>নিহিলিজম হলো- Universal law of ethics বা বিশ্বজনীন আখলাকী বিধান বলতে কিছু নেই। মূলত মানুষ তার চিন্তার আলোকে সকল কিছুর অর্থবহতা দান করে। অর্থাৎ বিশ্বজনীন কিছু নেই, যা আছে তা টার্ম (শর্ত) এবং কন্ডিশনের (অবস্থা) আলোকে পরিবর্তিত হতে পারে।</p>
<p>[হক এবং সঠিক এর মধ্যে পার্থক্য কী? হক হচ্ছে অপরিবর্তনীয়, ধ্রুব এবং কনস্ট্যান্ট। আর হকের পারিভাষিক অর্থ হলো, সকল অবস্থায় এবং সকল পরিবেশে যা সঠিক। তাদের মতে সঠিক হলো, টার্মস (শর্ত) এবং কন্ডিশন (অবস্থা)। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মতে, মানুষের আকল যখন যে অবস্থায় থাকুক না কেনো, যেভাবে চিন্তা করুক না কেনো যে সময় এবং শর্ত যাই থাকুক না কেনো, সর্বাবস্থায় যা চিরন্তন বলে দাবি করে সেটা হক এবং হাকিকত। যা হক এবং সঠিকের মাঝে মৌলিক পার্থক্য।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>চতুর্থ</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>দ্বীন</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>তৈরি</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>শিলায়েমাখেরের মতে, মানুষ মুতলাককে ইহাতা করতে পারবে না। আর ক্ষেত্রে তিনি কান্টের চিন্তার সাথে সমন্বয় করে বিকশিত করেছেন।</p>
<p>তার মতে মানুষ মহাজগত ও প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করতে করতে এমন এক পর্যায়ে এসে উপনীত হয়, যেখানে সে সৃষ্টির সীমারেখাকে খুঁজে পায়। এটা আকলের সর্বোচ্চ চূড়া। আকল তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সে এমন এক সীমানায় এসে উপনীত হয় যেটা সে অতিক্রম করতে পারে না। এই অবস্থায় সে মুতলাকের মুখোমুখি হয়, আর যখন যে এই মুতলাকের অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন তার জীবনধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তবে মুতলাককে আকলের মাধ্যমে ইহাতা করে, পাশাপাশি তাকে বুঝে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না সে কারণে শুধুমাত্র সে নিজে সেই অভিজ্ঞতাকে লাভ করে৷ সেই বিষয়কেও ভাষায় প্রকার করার মত কোন ভাষা না থাকায় সে সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন একটি ভাষাকে তৈরি করে।</p>
<p>আর এটাকে দ্বীনি অভিজ্ঞতা (Religious Experience) এবং দ্বীনি ভাষা (Religious Language) বলা হয় । এটা মানুষের তৈরি, যা সে গবেষণা করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে আকল আর ইহাতা করতে পারে না। সে যা অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং সেটা মানুষের মাঝে প্রকাশ করে। যেহেতু এটা সে মানুষের সামনে তাদের ভাষায় তুলে ধরতে পারবে না, সে এটাকে অযৌক্তিকভাবে তুলে ধরবে।</p>
<p>আর এই সকল অভিজ্ঞতা ও ভাষা মানুষ কর্তৃক বর্ণিত হওয়ায় সেখান থেকে দ্বীন তৈরি হয়।ফলে দ্বীন হলো মানুষের তৈরি।</p>
<p>তাদের মতে, সবচেয়ে হাকীকী দ্বীন হলো এমন দ্বীন যেটা আকল কর্তৃক সাব্যস্ত নয়। যে দ্বীন আকল থেকে যতবেশী দূরে, সেটা ততবেশী হক। এই জন্য খ্রিস্টান ধর্ম হল হাকিকি দ্বীন।</p>
<p>তাদের এই চিন্তা মতে, বাতিল দ্বীন হলো, যে দ্বীনের সাথে আকলের কোনো সমস্যা নেই; অর্থাৎ, ইসলাম। এজন্য পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরা ইসলামকে মুতলাকের সাথে সম্পর্কিত দ্বীন হিসেবে দেখে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>পঞ্চম</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>সকল</strong> <strong>কিছুই</strong> <strong>সম্ভব</strong><strong>।</strong> এটাকে তারা Contingency বলে থাকে।</li>
</ul>
<p>Contingency এর অর্থ হলো, বর্তমানে যা কিছু মওজুদ (বিদ্যমান) আছে, সেগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে জীবন ধারাকে পরিচালনা করা। আমাদের কালামী ধারায় যে শ্রেণীবিন্যাস তথা <strong>ওয়াজিবুল</strong> <strong>উজুদ</strong> ও <strong>মুমকিনুল</strong> <strong>উজুদ</strong> আছে। <strong>ওয়াজিবুল</strong> <strong>উজুদ</strong> হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি হওয়া আমরা কল্পনা করতে পারি না। আর আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে সবকিছু <strong>মুমকিনুল</strong> <strong>উজুদ</strong>। তারা ওয়াজিবুল উজুদকে অস্বীকার করে। তাদের মতে গ্রহনযোগ্য হলো, মুমকিনুল উজুদ। যেমন &#8211; ঢাকা, আগে ছিলো না, এখন আছে। এর অর্থ এটার অস্তিত্ব বা উজুদ সম্ভবপর। যেমন &#8211; সংখ্যা, যা মানুষের যিহিনে থাকে। যদি যিহিন না থাকে, তাহলেও সংখ্যা হবে। সুতরাং যিহিনও মুমকিনুল উজুদ।</p>
<p>তাদের মতে, ওয়াজিবুল উজুদ<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a> আমাদেরকে মেটাফিজিক্সের দিকে ধাবিত করবে। তাই আমরা এই মওজুদকে পরিত্যাগ করেছি। এটা পাশ্চাত্য চিন্তার মৌলিক একটি বিষয়। ওয়াজিবুল উজুদ ইলাহী জ্ঞান হওয়ার কারণে এর প্রয়োজন নেই। পাশ্চাত্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেটাফিজিক্স পড়ানো হয় না।</p>
<p>তাদের মতে, ওয়াজিবুল উজুদ বা যারুরী, এটা মানতিকের (চিন্তা) সাথে সম্পর্কিত একটি ক্যাটাগরি, উজুদের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়। যা চিন্তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়। এর উপর ভিত্তি করে কোনো জ্ঞান দাঁড় করানো যাবে না। এজন্য তারা এটা গ্রহণ করে না। যেগুলো উজুদের সাথে সম্পর্কিত, অস্তিত্বের (ম্যাটেরিয়ালস্টিক) সাথে সম্পর্কিত সেগুলোর সাথে যারুরিয়্যাত বা আবশ্যিকতাকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। যেমন &#8211; ঢাকা আগে ছিলো না, এখন আছে।</p>
<p>কোনো কিছুর যারুরিয়্যাত আমরা শুধুমাত্র চিন্তা করতে পারি। অন্যথায় যেগুলো মওজুদ আছে, সেগুলার সাথে যারুরিয়্যাতকে সম্পৃক্ত করা যাবে না।</p>
<p>ফলে যা কিছু বাস্তবে আছে, সেগুলা থেকে নতুন নতুন জিনিশ তৈরি করা। আমাদের দুনিয়াতে মুমকিন উজুদ বা সম্ভাব্য সৃষ্টিগুলো সেগুলোকে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করে একটি জীবন ধারা পরিচালিত করতে পারি।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে আমাদের জন্য স্থায়ী অপরিবর্তনীয় কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। যাকে দার্শনিক ভাষায় বলা হয় post truth (হাকীকত পরবর্তী অবস্থা)। ফলে অপরিবর্তনীয় বা সাবিত বলতে কোনো মূলনীতিকে তারা গ্রহণ করে না।</p>
<p>[কন্টেনজেন্সি আজকে আছে, কালকে নাও থাকতে পারে। এই যে বিভিন্ন নতুন নতুন আবিষ্কার, সকল বিষয়ে পরিবর্তনশীলতা এবং এর উপর ভিত্তি করে যা ইচ্ছা তা করতে পারা; এ চিন্তা থেকে তারা আমাদের যে পতনের দিকে ধাবিত করছে, মানুষ বলতে যে জিনস, ইনসান বলতে যে প্রজাতি এই পৃথিবীতে আছে, তা মুমকিন উজুদ বা সম্ভাব্য সৃষ্টি৷ অর্থাৎ, মানুষ না থাকলেও কোনো সমস্যা নাই। তারা রোবটিক টেকনোলজির মাধ্যমে অথবা বায়োলজিকাল টেকনলোজির মাধ্যমে নারী-পুরুষ বা জিনস থাকবে না, এ ধরনের বা আরও উন্নত সৃষ্টি তৈরি করতে পারে। তাদের এখানে কন্টেনজেন্সি মূল বিষয়।</p>
<p>যে সভ্যতা পৃথিবী থেকে আশরাফুল মাখলুকাতের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে চায়; তাঁরাই মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু। যা তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রমাণিত। তারা মানুষকে হোমো-সেপিয়েন্স বা একটি প্রজাতি হিসেবে দেখে। যেমন – মানুষ বানর থেকে বিবর্তিত হয়েছে। মানুষ হলো বিবর্তনের সর্বোচ্চ চূড়া। তার নিচের সকল সৃষ্টি সেকেন্ডারি বা গৌণ সৃষ্টি। যা থাকা বা না থাকায় কিছু যায় আসে না। তাদের মতে, মানুষের চেয়ে উন্নত সৃষ্টি তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষের অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই। এই পৃথিবীতে মানুষ টিকে থাকবে কিনা এ দায়িত্ব মুসলমানদের। আমাদের আন্দোলন মানুষ রক্ষার আন্দোলন। মানুষ রক্ষা হলে ঈমান রক্ষা হবে। এই কারণে এটা বলা যায় যে পাশ্চাত্য সভ্যতা সমগ্র মানবতার শত্রু। কেননা সে মানুষকে তার অবস্থা থেকে সরানোর জন্য সকল প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>ষষ্ঠ</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong> <strong>নিজে</strong> <strong>নিজেই</strong> <strong>স্বয়ংসম্পূর্ণ</strong><strong>।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>মুসতাগনি</strong><strong>।</strong> সূরা আলাক্ব-এ বলা হয়েছে &#8211;</li>
</ul>
<blockquote><p>كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ-  أَن رَّآهُ اسْتَغْنَىٰ-</p></blockquote>
<p>মানুষ নিজেকে যখন মুসতাগনি হিসেবে দেখে, তখন সে তুগইয়ান তথা ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। সীমানাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। যখন এই অবস্থায় উপনীত হয় তখন কি হয়? ইন্না ইলা রাব্বিকা রুজয়া। মানুষ যখন নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে তখন সে ফাসাদ সৃষ্টি করে বা সীমালঙ্ঘন করে। তাই মানুষকে এই চিন্তা থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আগেই মুক্তির উপায় দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, রবের কাছে ফিরে আসতে হবে যেহেতু সীমালঙ্ঘন করেছে।</p>
<ul>
<li>মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন যেহেতু সে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারবে না। এই জন্য তাকে তার রবের কাছে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে।</li>
<li>মানুষ কেন মুসতাগনি নয়? মানুষ মানুষের মুখাপেক্ষী, প্রকৃতির মুখাপেক্ষী, একই ভাবে পয়গম্বর ও আল্লাহর প্রতিও মুখাপেক্ষী। যা আমাদের ভ্রাতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা মুসতাগনি নই। তখন নিজে মুসতাগনির চিন্তায় নিপতিত হবো না।</li>
<li>ইবাদত আমাদের ইহসানের এর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই ক্ষেত্রে যে উবুদিয়্যাত এটা হল মূলত মানুষ যে অমুখাপেক্ষী নয় এটার সর্বোচ্চ চূড়া এবং প্রতিটি ইবাদত বার বার আমাদেরকে এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমি মুসতাগনি নই।</li>
</ul>
<p>এর উপর ভিত্তি করে রিসালাত, আমানত এবং শাহাদাতের মিসাক এ বিষয়গুলোকে পরিপূর্ণভাবে পড়তে পারলে মুসতাগনি বা স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তাধারা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।</p>
<p><strong>আর</strong> <strong>সকল</strong> <strong>পরিবর্তন</strong> <strong>এবং</strong> <strong>পরিবর্ধনের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>একটা</strong> <strong>বিষয়</strong><strong>ই</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>রক্ষা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>;</strong> <strong>তা</strong> <strong>হলো</strong> <strong>ইসলাম</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>মূল্যবোধ</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ ও সংকলনঃ </strong><a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> এই পরিভাষাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ইবনে সিনা। মহান আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টিজগতের সকল কিছুকে বুঝানোর জন্য এই পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> ওয়াজিবুল উজুদ ইসলামী দর্শন ও কালামে বহুল পরিচিত একটি পরিভাষা। এই পরিভাষার উদ্ভাবন করেন ইবনে সিনা। কালাম ও ইসলামী দর্শনে ওয়াজিবুল উজুদ বলতে আল্লাহ রাবুল আলামিনকে বুঝানো হয়ে থাকে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15793</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে পর্দার দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 12 Mar 2025 13:29:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[উসূল ও মেথডোলজি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15602</guid>

					<description><![CDATA[সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি ছাড়া সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে, সকল সংস্কৃতিতে, সকল সভ্যতায় এবং সকল আখলাকী ব্যবস্থায় মানুষের জন্য মূল বিষয় হল নিজেকে আবৃত করে রাখা। মানুষ, তাঁর শরীরকে আবহওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকে কিংবা ঠাণ্ডা ও গরম থেকে রক্ষা করার জন্যই নয় একই সাথে আধ্যাত্মিক একটি মূল্যবোধকে সামনে রেখে নিজেকে আবৃত করে থাকে।</p>
<p>সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ পোশাক পরিচ্ছদের দিকে আরও বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। সকলেই জানেন যে, আজ থেকে একশত বছর পূর্বেও নারীরা খ্রিষ্টান কিংবা ইয়াহুদী, যে ধর্মেরই হোক না কেন মুসলমান নারীদের মত তারাও পর্দা করত। কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে সকল ক্ষেত্রের মত এই ক্ষেত্রেও মানবতা অনেক বড় একটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আধুনিক সময়ে পর্দাকে এতটা প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে, যা জীবনের সাথে সম্পর্কহীন একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একদিকে পর্দাকে তুচ্ছ ও প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখানো হয়েছে আর অপর দিকে শরীর প্রদর্শনকে আকর্ষণীয় ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিক সময়ে শোষণের একটি ক্ষেত্রে হিসেবে মানুষের শরীরকে বেঁছে নেওয়া হয়েছে। নারী, পুরুষ কিংবা শিশু সকলের শরীরকেই যথেচ্ছাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের দিকে শুরু হওয়া যৌন বিপ্লবের মাধ্যমে শরীরকে মালিকানাধীন একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। যা পরবর্তীতে শরীরকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করে এবং শরীর প্রদর্শন ফ্যাশনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ‘ফ্যাশন’, ‘স্বাধীনতা’ কিংবা সর্বজনীনতার নামে বিভিন্ন পন্থায় মানুষের সামনে এই যৌনতাকে তুলে ধরার ফলে সমগ্র দুনিয়াজুড়ে মানবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমস্যার সম্মুখীন।</p>
<p>ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে নতুন <strong>ভার্চুয়াল স্ক্রিন সভ্যতা </strong>প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই সভ্যতায় বিনোদন কেন্দ্রিক একটি <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাক</strong> প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এই সভ্যতায় মানুষ; তাঁর নিজের সাথে, অন্যদের সাথে এবং মহাবিশ্বের সাথে সম্পর্ককে হাকীকতের উপর ভিত্তি করে নয় বরং চিত্র ও ছবির উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে। এই সভ্যতায় আকলের বদলে চোখ-ই হয়ে উঠেছে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। একই এই সভ্যতার বড় কাজ হল, চিন্তা করার বদলে দেখা। অর্থাৎ এই <em>ভার্চুয়াল</em> <em>স্ক্রিন</em> <em>সভ্যতা</em>  আকলের উপর চোখকে এবং চিন্তা করার বদলে দেখাকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর এই সভ্যতায় ‘চোখ’ নাজার ও মুশাহাদা (অবলোকন) &#8211; এর উপাদান হওয়ার পরিবর্তে কামনা-বাসনা ও শাহওয়াতের উপাদানে পরিণত হয়েছে। আর এই বিষয়টি পর্দার ফিতরাতী, দ্বীনী, আধ্যাত্মিক ও মেটাফিজিক্যাল অর্থকে হারিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে এবং ইলাহী উদ্দেশ্যকে বিলীন হওয়ার ক্ষেত্রে এমনকি আখলাকী ভিত্তি থেকেও সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। ভিজুয়াল ইদরাকের আধিপত্য এমন অনেক গায়রে আখলাকী বিষয়কে দৃশ্যায়িত করেছে যা আমাদের কল্পনারও অতীত। <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য মানুষকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করে তার গোপনীয়তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এমন অনেক ক্ষেত্র তৈরি করেছে যা মানুষকে সাময়িক কিছু আনন্দ দেয়, এবং তাকানোকে শাহাওয়াতে এবং দেখাকে কামনায় পরিণত করেছে। ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য আকলের ইদরাককে দুর্বল করেছে, এবং কলবের ইদরাককে মৃত্যুঝুকিতে ফেলে দিয়েছে। </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র ইসলামের অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত নীতিমালাসমূহ মানুষকে আবৃত হওয়ার দিকে আহবান জানিয়ে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন ও ডিজিটালাইজশন কর্তৃক ছুড়ে এই সকল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় মহাপর্বতের ন্যায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের এই মূলনীতিগুলো চাচ্ছে মানুষকে হায়া ও সতীত্বের দিকে ফিরিয়ে আনতে। তবে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন এবং ডিজিটালাইজেশন কর্তৃক সৃষ্ট চাপের পাশাপাশি নিম্নোক্ত কারণসমূহও এই একই সমস্যাকে আরও বেশী ঘনীভূত করেছে।</p>
<ul>
<li>১। আধুনিক সময়ে এসে নারী ও পর্দার বিষয়কে ইসলামের মূলনীতির আলোকে সঠিকভাবে বিনির্মাণ করতে ব্যর্থ হওয়া।</li>
<li>২। মুসলমানদের নিকটে পর্দার হিকমত ও দর্শনকে ভালোভাবে তুলে ধরতে না পারা এবং এই ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করা।</li>
<li>৩। পর্দাকে যেন শুধুমাত্র নারীদের জন্যই আবশ্যক এই ধারণার ব্যাপক প্রসার।</li>
<li>৪। পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি।</li>
<li>৫। কখনো কখনো পর্দাকে নারীদের সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের একটি বিষয় হিসেবে না নিয়ে বরং সেটাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৬। নারীদের পর্দার পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হিজাবকে পরিত্যাগ করা এবং হিজাব ত্যাগ করাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৭। হিজাব পরিধানকারী নারীদেরকে ইসলামের প্রতিনিধি রূপে তুলে ধরে তাঁদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।</li>
</ul>
<p>উপর যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, এই সকল বিষয়সমূহ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পর্দার বিষয়টিকে আরও কঠিন করে ফেলেছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঘটে যাওয়া এই সকল সমস্যাসমূহ আসলে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, একই সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ধর্ম এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছে। আর এই বিষয়টি হিজাবের বিষয়টির রূহ ও মাকসাদকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোন থেকে প্রভাবিত করেছে এবং পর্দার আধ্যাত্মিক, রূহী এবং মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।</p>
<p>এই সকল বিষয়কে সামনে রেখে আমি <strong><em>ইসলামের</em> <em>পর্দা</em> <em>দর্শন</em> <em>এবং</em> <em>নতুন</em> <em>একটি</em> </strong><em><strong>দৃষ্টিভঙ্গি</strong>  </em>এই বিষয়ে কিছু চিন্তা আপনাদের নিকটে পেশ করতে চাই।</p>
<p>ইসলামের সকল বিষয়কে নারীদেরকে কেন্দ্র করে আলোচিত হওয়ার ফলে আল্লাহর নারী বান্দাদের উপর যে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এই বিষয় সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। এই কারণে পর্দার বিষয়টিকে নারী কিংবা পুরুষকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এই বিষয়টিকে আমি ‘মানুষ’ এর উপর ভিত্তি করে আলোচনা করতে চাই এবং আমি সুস্পষ্ট করতে চাই যে এই বিষয়টি শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। একই সাথে আমি এই বিষয়টিও তুলে ধরতে চাই যে পর্দার বিষয়টি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক অর্থবোধক।</p>
<p>পর্দার বিষয়টিকে পাঁচটি দিক থেকে বিবেচনা করে পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করানোর চেষ্টা করব। সেগুলো হলোঃ</p>
<ul>
<li>১. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>ফিতরাতী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em>  অর্থাৎ পর্দার স্বয়ং মানুষের সাথে সম্পর্কিত দিক।</li>
<li>২. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>কালামী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> অর্থাৎ মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা।</li>
<li>৩. পর্দার ব্যাপারে ফিকহী দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা ।</li>
<li>৪. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>আখলাকী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> , অর্থাৎ পর্দার নৈতিক দিক।</li>
<li>৫. পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ পর্দার সৌন্দর্যগত, শোভাগত এবং চারিত্রিক দিক।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>১</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিতরাতী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>পর্দার বিষয়টি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ফিতরাতী একটি বিষয়। ফিতরাত হলো, সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে দেওয়া মূল্যবোধের এক রত্নভাণ্ডারের নাম। অন্য কথায়, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে আপলোডকৃত ইলাহী এক সফটওয়্যারের নাম হলো ফিতরাত। আবৃত করে রাখা, আদব, হায়া ও সতীত্বের মত অনুভূতিসমূহ মূলত এই মেমোরির মধ্যে তথা ইলাহী সফটওয়্যারের মধ্যে রক্ষিত মূল্যবোধ থেকেই উৎসারিত হয়ে থাকে। নিজের গোপনীয়তাকে রক্ষা করে যে ভালো, সঠিক ও সুন্দর এবং শরীর প্রদর্শন করা যে খারাপ, কুৎসিত ও ভুল,  এই সকল বিষয়সমূহ মানুষের এই মূল্যবোধের ভাণ্ডারের মধ্যে মওজুদ রয়েছে।</p>
<p>পর্দার ফিতরাতী দৃষ্টিকোণের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাকে আমরা কোরআনে কারীমে বর্ণিত হযরত আদম ও হযরত হাওয়ার কিসসার মধ্যে দেখতে পাই।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1"><sup>[1]</sup></a>  এই কিসসা অনুসারে হযরত আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে সকল ধরণের নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে রাখেন এবং  তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন; ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ কিন্তু শয়তান তাঁদেরকে প্রতারিত করে এবং তাঁদের গোপনাঙ্গকে একে অপরের নিকটে উন্মুক্ত করার জন্য তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে, “তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”। শয়তান কসম খেয়ে তাঁদেরকে বলে যে, “ আমি নিঃসন্দেহে তোমাদের কল্যাণকামী”। এই ভাবে আদম ও হাওয়া উভয়কেই প্রতারিত করতে সক্ষম হয় এবং নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার সাথে সাথে লজ্জাস্থান পরস্পরের সামনে খুলে যায়। অতপর তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থানকে আবৃত করার জন্য জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জাস্থানকে ঢাকার চেষ্টা চালায়। এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে ,শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?  তাঁরাও বলে উঠে, “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি৷ এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো, এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো ৷” কোরআনে কারীম এই কিসসাকে এই নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে শেষ করেছে,</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ</p>
<p>অর্থাৎ, হে বনী আদম! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশ-ভূষার জন্য। আর তাকওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোত্তম। এটা আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2"><sup>[2]</sup></a></p></blockquote>
<p>এ কিসসা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে বাশারিয়্যাত থেকে আদামিয়্যাতের দিকে এবং আদামিয়্যাত থেকে ইনসানিয়্যাতের দিকে যাত্রাকালে মানুষ সর্বপ্রথম যে বিষয়টিকে উপলব্ধি করে সেটা হল মানুষের ফিতরাতের মধ্যকার আবৃত করার বিষয়টি। আর বিষয়টি না শুধু নারীর জন্য আর না শুধু পুরুষের জন্য। আবৃত করার বিষয়টি নারী ও পুরষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই প্রযোজ্য একটি বিষয়।</p>
<p>আর আলোকে এই কথা বলা যায় যে, পর্দার বিষয়টি আসমানী একটি নিয়ামত। আবৃত করার বিষয়টি মানুষের জন্য একটি তাকওয়া অর্থাৎ রক্ষা করা, পরিশুদ্ধ করা, সুন্দর করা ও ইজ্জত সম্পন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অন্যতম একটি নিয়ামত। এ নিয়ামতটি আমাদেরকে ইহসানের চেতনা দান করে এবং যেন আমরা সর্বদায় আল্লাহকে দেখছি এমন ভাবে আচরণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। আর এটা কেবলমাত্র তাকওয়ার পোশাক পরিধান করার মাধ্যমেই সম্ভব।</p>
<p>আর তাকওয়ার পোশাক কেবলমাত্র বাহ্যিক একটি পোশাক-ই নয়। তাকওয়ার পোশাক হল, মানুষকে স্বয়ং তার নিজের প্রতি, সৃষ্টিজগত ও রবের প্রতি দায়িত্ববান করে তোলা। আর এই দায়িত্ববোধ বাহ্যিক পোশাককে অর্থবহতা দান করে, পর্দার মধ্যে রূহ প্রদান করে এবং সকল প্রকার পর্দার চূড়া হলো এ দায়িত্ববোধ। তাকওয়ার পোশাক বিহীন শরীর রসকষবিহীন একটি অবয়ব ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>২</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>কালামী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>অনেকেই ধারণা করেন যে, পর্দা শুধুমাত্র মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি বিষয়। আসলে ব্যাপারটি এমন নয়। পর্দার একই সাথে আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি দিকও রয়েছে। কেননা মানুষ  ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ক শুধুমাত্র খালেক-মাখলুক কিংবা রুবুবিয়্যাত-উলুহিয়্যাত- এর সম্পর্কই নয়। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার এই সম্পর্ক একই সাথে শাহিদ-মাশহুদেরও সম্পর্ক। এ সম্পর্কের দাবি অনুযায়ী মানুষ সর্বদা আল্লাহকে স্মরণে রেখে পথ চলে। কোরআনে কারিমে এই সম্পর্ককে নিম্নোক্তভাবে  তুলে ধরা হয়েছেঃ</p>
<blockquote><p>اَیَحۡسَبُ اَنۡ لَّمۡ یَرَهٗۤ اَحَدٌ</p>
<p>অর্থাৎ, সে কি ধারণা করে যে, তাকে কেহই দেখছেনা?<a href="#_ftn3" name="_ftnref3"><sup>[3]</sup></a></p>
<p>وَ هُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ</p>
<p>তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। <a href="#_ftn4" name="_ftnref4"><sup>[4]</sup></a></p>
<p>فَاَیۡنَمَا تُوَلُّوۡا فَثَمَّ وَجۡهُ اللّٰهِ</p>
<p>তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও সেই দিকেই আল্লাহকে পাবে।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5"><sup>[5]</sup></a></p></blockquote>
<p>শুধু তাই নয় শাহিদ ও মাশহুদের এই সম্পর্ক একটি মিসাক (শাহাদাতের মিসাক) এর উপর নির্ভর করে। এই মিসাকের আলোকে মানুষ তার সৃষ্টির পূর্বেও আলমে আরওয়াহ/রূহের জগতে তাঁর রবের একত্বে ও মহত্বে স্বাক্ষ্য প্রদান করেছে। কোরআনের ভাষ্যমতে,</p>
<blockquote><p>وَ اَشۡهَدَهُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ ۚ اَلَسۡتُ بِرَبِّکُمۡ ؕ قَالُوۡا بَلٰی ۚۛ شَهِدۡنَا</p>
<p>অর্থাৎ, আর তাদেরকেই সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ; এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’<a href="#_ftn6" name="_ftnref6"><sup>[6]</sup></a></p></blockquote>
<p>আর সৃষ্টির পরে দুনিয়াতে এসেও মানুষ তাঁর মহান প্রভুর নাম, আয়াত, সিফাত ও নিয়ামতসমূহকে অবলোকন করছে। আল্লাহ তায়ালাও তাঁর বান্দার সকল অবস্থা, কাজ, নিয়ত ও গোপন বিষয়ের সাক্ষী। <strong>“ وَ اللّٰهُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَهِیۡدٌ /আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী”।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7"><sup>[7]</sup></a></strong> যার কারণে পর্দা শুধুমাত্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘আমার চোখে’ কিংবা বাহিরের ‘অন্যদের চোখে’ কেমন লাগলো এর সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, আমার রব আমাকে কেমন দেখছেন এর সাথেও এই বিষয়টি সম্পর্কিত। কেননা কোন দৃষ্টি-ই মহান প্রভুর দৃষ্টির চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়। <strong>কলবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা হলো চোখ। এ চোখকে যারা রক্ষা করতে পারবে তাঁরা আল্লাহর নজরগাহ হিসেবে আখ্যায়িত কলবকেও রক্ষা করতে পারবে। হাদীসে যেমনটা বর্ণিত হয়েছে; “إِنَّ اللهَ تعالى لَا ينظرُ إلى صُوَرِكُمْ وَأمْوالِكُمْ ، ولكنْ إِنَّما ينظرُ إلى قلوبِكم وأعمالِكم / নিশ্চয় আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না তোমাদের শরীর এবং তোমাদের আকৃতির দিকে, বরং দৃষ্টি দিবেন তোমাদের অন্তর ও তোমাদের কর্মসমূহের দিকে”।</strong></p>
<p>এখানে আমাদের মনে এমন একটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারেঃ “ অগণিত গ্যালাক্সির স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা আমার পোশাক-আশাক কিংবা চুলের স্টাইলের দিকে কেনই বা নজর দিবেন?” এখানে মূল বিষয়টি আসলে পোশাক-আশাক কিংবা চুল দাঁড়ির সাথে সম্পর্কিত নয়। এখানে মূল বিষয়টি আসলে মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমতের সাথে সম্পর্কিত। কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমত সম্পর্কে অবহিত করেছেন এবং তাঁদের ফিতরাতের মধ্যে যে মূল্যবোধ দিয়েছেন সেই মূল্যবোধের দাবির আলোকে বসবাস করতে বলেছেন। তাঁরা তাঁদের রবের উপর ঈমান আনবে কি আনবে না এটা তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। পর্দা ও শরীরকে আবৃত করে রাখার বিষয়টিও মহান প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষের নিকট চাওয়া সেই সকল মূল্যবোধসমূহের মধ্যকার একটি । মূলত, পর্দার বিষয়টিকে শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ একটি বিষয় বলে ধারণা করার কারণে অনেকেই এই ধরণের প্রশ্ন করে থাকেন। অনেকেই আবার আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে পর্দাকে শুধুমাত্র নারীদের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখে থাকেন। বিশেষ করে <strong>আধুনিক সময়ে পর্দাকে বাহ্যিক একটি বিষয় হিসেবে উত্থাপন করে একে আদর্শিক একটি  সংঘর্ষের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যা খুবই বিপদজনক একটি দৃষ্টিভঙ্গী। অথচ পর্দা আদর্শিক (Ideological) কোন প্রতীক নয়; পর্দা হল বিশ্বাস, ইজ্জত-আব্রু ও সম্মানের প্রতীক। ফিতরাত, ইজ্জত, সতীত্ব, ব্যক্তিত্ব ও ইস্তিকামাতের বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশের নাম হল পর্দা।</strong> এর আলোকে পর্দা আদবকে সজ্জিত করে এবং মানুষকে পরিশুদ্ধ একটি রূহের মাধ্যমে বসবাস করতে সাহায্য করে। পর্দা নিভপ্ল একটি আলামত কিংবা কোন প্রতীক নয়, পর্দা হল একটি আয়াত। প্রতীক হল জাগতিক ও শারীরিক একটি বিষয় অপরদিকে আয়াত হলো আধ্যাত্মিক ও রূহী একটি বিষয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিকহী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong><strong>  </strong></h5>
<p>আমাদের অধিকাংশ আলেম-ই পর্দার প্রকৃতি ও সীমানাকে, শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে আওরাত ও ফিতনার উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোরআন ও সুন্নতের নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করে আঞ্চলিক ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়কে দ্বীনি বিধানের সাথে সম্পর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের অসামঞ্জস্যতাকে বৈধতাদানকারী, পুরুষদেরকে কেন্দ্রে রেখে পর্দার ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি  দাঁড় করানো হয়েছে সেটা ধর্মীয় নয় বরং সাংস্কৃতিক। পর্দাকে যদি শুধুমাত্র আওরাত<a href="#_ftn8" name="_ftnref8"><sup>[8]</sup></a> ও ফিতনা নামক পরিভাষাদ্বয় এর উপর ভিত্তি করে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে,</p>
<ul>
<li>১। পর্দাকে কেবলমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিন্যস্তকারী একটি বিষয় হিসেবে দেখা হবে।</li>
<li>২। পুরুষরা যেন ফেতনায় পতিত না হয় এই কারণে নারীদেরকে পর্দা করার আদেশ করা হয়েছে, এমন একটি ধারণা তৈরি হবে। অথচ এরকম চিন্তা ইলাহী হিকমতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।</li>
<li>৩। পর্দার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাহ্যিক বিষয় সমূহকেই আবশ্যকীয় বলে পালন করা হবে এবং পর্দার রূহকে উপেক্ষা করা হবে।</li>
</ul>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে প্রথমে পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,</p>
<blockquote><p>قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ</p>
<p>অর্থাৎ, মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করবে। <a href="#_ftn9" name="_ftnref9"><sup>[9]</sup></a></p></blockquote>
<p>পুরুষদের পরে নারীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,</p>
<blockquote><p>وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ</p>
<p>অর্থাৎ, আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করে।<a href="#_ftn10" name="_ftnref10"><sup>[10]</sup></a></p></blockquote>
<p>এই সকল আয়াতকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পর্দার বিষয়টি শুধুমাত্র নারীদের জন্যই নয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা নারী ও পুরুষ একে অপরকে পরস্পরের জন্য পর্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মহান প্রভুর ভাষায়, <strong>“ هُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّهُنَّ / তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ”। <a href="#_ftn11" name="_ftnref11"><sup>[11]</sup></a></strong></p>
<p>খাজানের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ তাঁর <em>“</em><em>কোরআনে</em> <em>কারীমের</em> <em>আয়াতের</em> <em>নূরের</em> <em>আলোকে</em> <em>খাতুন</em><em>”</em>  নামক গ্রন্থে বলেন, “<strong>“আমাদের আলেমগণ পর্দা সংক্রান্ত সকল বিধানসমূহকে ‘ফিতনার ভয়’- এর মত ধারণামূলক একটি হিকমতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার কারণে এ বিধানসমূহ কখনো কখনো এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে নারীগণ সূর্যের নূর থেকে জ্ঞানের আলো পর্যন্ত অনেক বিষয় থেকেই বঞ্চিত হয়েছে। অথচ, জ্ঞান ও ঈমানের আলো কখনো ফিতনা হতে পারেনা। যদি ফিতনা থেকেই থাকে তা থাকার সম্ভাবনা পুরুষদের চোখে, অন্তরে ও ভাষায়। তাই ফিতনা থেকে যদি নিষ্কৃতি পেতেই হয়, তবে পুরুষদের চোখে নিকাব, কলবে আদব এবং মুখে লাগাম লাগানোই হবে মোক্ষম তদবীর। </strong></p>
<p>এ কারণে সকল আসমানী দ্বীন কর্তৃক গৃহীত পর্দাকে কেবল ফিতনার সাথে সম্পর্কিত করার অধিকার কারোর-ই নেই। কেননা ইসলাম আনীত পর্দার বিধানটি শুধুমাত্র নারীদের মুখমণ্ডল ও শরীরের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, একই সাথে তা তাঁদের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকারের সাথেও সম্পর্কিত। পর্দাকে কখনোই “ আওরাতের পর্দা” হিসেবে আদেশ করা হয়নি। পর্দাকে সম্মানের প্রতীক, ইসমাতের চাদর এবং সম্মানের ইহরাম হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। ঘরের মধ্যে নারীরা যে অংশে অবস্থান করেন সেই অংশকে হেরেম বলার কারণ হল হুরমাত বা  সম্মানের কারণে। কাবাকে যে উদ্দেশ্যে হারাম বলা হয়ে থাকে, নারীরা যে ঘরে অবস্থান করে সেই ঘরকেও এজন্যই হারাম বা হারেম বলা হয়ে থাকে”।</p>
<p>সংক্ষেপে বলতে গেলে উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ মতে ইসলামের পর্দার বিষয়টি সকলের জন্যই আবশ্যকীয়। যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই পরিগ্রহ করে থাকে। হায়া ও সতীত্বকে রক্ষা করা এবং এ চেতনাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব শুধুমাত্র নারীদের-ই নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপরেই এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য সেটা পর্দার সীমা ও পরিসীমার সাথে সম্পর্কিত। যেমনটা আয়াতের ধারাবাহিকতায় এসেছে, “  وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِهِنَّ / তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে”।<a href="#_ftn12" name="_ftnref12"><sup>[12]</sup></a> এ আদেশের মাধ্যমে হিজাবকে নারীদের জন্য পর্দার একটি পরিপূরক বিষয় হিসেবে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>পর্দার ব্যাপারে যে ফিকহী দৃষ্টিকোণ রয়েছে তাঁর মধ্যে অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার সম্পর্ক। প্রথমত আমি বলতে চাই যে, মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার যে সম্পর্ক, তা মালিকানার কোন সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্ক হল আমানতের সম্পর্ক। আধুনিক সময়ে আমরা একটি কথা অনেক বেশী শুনে থাকি, সে কথাটি হলো, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”। এটাকে অনেক সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে  ব্যক্তি স্বাধীনতা হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সাথে তাঁর রবের যে মিসাক (চুক্তি) তাঁর মধ্যে অন্যতম একটি হলো আমানতের চুক্তি (মিসাক)। এ মিসাক বা চুক্তি অনুযায়ী সকল কিছুকেই মানুষের নিকটে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজগতের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্ক প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা মালিকানার সম্পর্ক নয়। মানুষের সাথে মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক সে সম্পর্ক হলো আমানতের সম্পর্ক। ফলশ্রুতিতে শরীর আমাদের মালিকানাধীন কোন বিষয় নয়, আমাদের নিকট আমানত।</p>
<p>এ মিসাকের  (চুক্তি) মাধ্যমে আমরা সাক্ষ্য দিয়ে থাকি যে আমরা আমাদের শরীরের উপর আধিপত্য ও প্রভুত্ব কায়েম করব না। আমরা বুঝতে পারব যে, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”, এ কথা বলার অধিকার আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি উপলব্ধি করতে পারব যে, আমি আমাকে অন্যের সামনে একটি পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারি না। এই মিসাক আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমার শরীর হল আমার নিকট রাখা একটি আমানত এবং কোন অবস্থাতেই আমি এই আমানতের খেয়ানত করতে পারি না। যেমনটা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন,</p>
<blockquote><p> “ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَخُوۡنُوا اللّٰهَ وَ الرَّسُوۡلَ وَ تَخُوۡنُوۡۤا اَمٰنٰتِکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ</p>
<p>তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, আর যে বিষয়ে তোমরা আমানাত প্রাপ্ত হয়েছ তাতেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না”। <a href="#_ftn13" name="_ftnref13"><sup>[13]</sup></a></p></blockquote>
<p>পর্দার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অপর একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পর্দাকে এমনভাবে তুলে ধরা যা নারীদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই ক্ষেত্রে “ নারীদের আওয়াজ হলো আওরাত, তাঁদের মুখমণ্ডল ও হাত-পা হলো আওরাত” এ ধরণের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবের বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। <strong>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে , “وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا / তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে” এই কথা বলার পরেও, এবং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবু বকরের (রা) কন্যা, হযরত আসমার (রা) উপর ভিত্তি করে নারীদের পর্দার সীমানাকে উম্মতের সামনে সুস্পষ্ট করে দেওয়ার পরেও<a href="#_ftn14" name="_ftnref14"><sup>[14]</sup></a> বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে কিছু কিছু আঞ্চলিক পোশাকের উপর ভিত্তি করে জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার মত প্রান্তিক চিন্তাকে মেনে নেওয়া হয়েছে।</strong> অথচ নারীদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী রেখে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা পর্দার উদ্দেশ্য নয়। পর্দার উদ্দেশ্য হলো নারীগণ যেন নিরাপত্তা ও শালীনতার সাথে সমাজের সকল স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং নর ও নারী উভয়ের জন্যই এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে তাঁরা মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালো কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করা এবং দ্বীনের রহমত ও হিকমতকে প্রচারের দায়িত্ব নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উভয়কেই দিয়েছেন। মহান প্রভুর ভাষায়ঃ</p>
<blockquote><p>وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ یُطِیۡعُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ</p>
<p>অর্থাৎ “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা নামাজ আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।আল্লাহ শীঘ্রই এদের উপর দয়া (মারহামাত) করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।</p></blockquote>
<h5><strong>৪</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>দৃষ্টিভঙ্গী</strong></h5>
<p>প্রথমত এই বিষয়টি সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, দ্বীন ইসলামে আখলাক ফিতরাতের থেকে, কালাম কিংবা ফিকহ থেকে আলাদা বিভাগে অবস্থানকারী কোন বিষয় নয়। জোর দিয়ে বলতে চাই যে, “ কোন কিছু  আখলাকী” এর অর্থ মোটেই এই নয় যে তা ঐচ্ছিক একটি বিষয়”। কোন কিছু আখলাকী এর অর্থ হলো, তা আবশ্যক একটি বিষয়। যারা আখলাককে ‘হলেও চলবে না হলেও চলবে’ এমন একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন তাঁরা মূলত দ্বীনের মধ্যে আখলাকের অবস্থানকে নির্ণয় করতে পারেন না। কেননা ইসলামে আখলাক পরিপূর্ণতাদানকারী কোন বিষয় নয়, আখলাকের বিষয়টি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। অনুরূপভাবে একথা বলাও সম্ভবপর নয় যে, দ্বীন ও আখলাক আলাদা আলাদা বিষয়। দ্বীন থেকে আখলাককে আলাদা করে ফেলার অর্থ হল, স্বয়ং দ্বীনকেই আলাদা করে ফেলা। দ্বীন ও আখলাক যেমন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ অনুরূপভাবে দ্বীনের আহকাম কেও আখলাক থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা যায় না। কেননা, <strong>“ الاخلاق عقل الأحكام / আখলাক হলো, আহকামের আকল”। </strong> পর্দার আখলাকী ভিত্তি হলো হায়া। আমরা অনেকেই মনে করে থাকি যে, হায়া মানে হল লজ্জাশীলতা, আসলে তা নয়। হায়ার অর্থ আরও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। হায়া ও হায়াত একই উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে। হায়ার অপর নাম হল হায়াত। হায়া অনেকটা তাকওয়ার মত আল্লাহর প্রতি দায়িত্বানুভূতির চেতনা। হায়া স্বয়ং কল্যাণ।<a href="#_ftn15" name="_ftnref15"><sup>[15]</sup></a> হায়া হল কুল্লি একটি আখলাক। কুৎসিত, অসুন্দর ও  বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং ভাল, সুন্দর ও সঠিককে মেনে চলার নাম হল হায়া। হায়া হল এমন এক চেতনার নাম, যে চেতনা আমাদেরকে খারাপের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহ যে আমাদের সব কিছুই দেখছেন এ বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দিবে। অপরদিকে পর্দা ও হিজাব মানুষের হায়াকে লালিত করে। আর রূহ এখান থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। রূহ হল পানির মত। যে পাত্রে যায় এই পাত্রের-ই আকার ধারণ করে।</p>
<p>রাসূলে আকরাম  (স) একটি হাদীসে হায়াকে, ইসলামের মূল আখলাক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, <strong>“ إنَّ لِكُلِّ دينٍ خُلُقًا، وإنَّ خُلُقَ الإسلامِ الحياءُ / প্রতিটি দ্বীনের-ই মৌলিক একটি আখলাক রয়েছে। ইসলামের মূল আখলাক হল হায়া”।<a href="#_ftn16" name="_ftnref16"><sup>[16]</sup></a></strong> এর আলোকে হায়া শুধুমাত্র একটি মূল্যবোধের নাম নয়। হায়া হল মূল্যবোধ উৎপাদনকারী কুল্লি একটি আখলাকের নাম।</p>
<p>রাসূল (স) হায়া ও ঈমানকে একে অপরের থেকে আলাদা কোন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি বলেন,</p>
<blockquote><p>الحياء شعبة من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের একটি শাখা।<a href="#_ftn17" name="_ftnref17"><sup>[17]</sup></a></p>
<p>الحياء من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের অংশ।<a href="#_ftn18" name="_ftnref18"><sup>[18]</sup></a></p>
<p>الحياءُ والإيمانُ قرناءُ جميعًا فإذا رُفِع أحدُهما رُفِع الآخرُ</p>
<p>অর্থঃ ঈমান ও হায়া হলো ভাইয়ের মত। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।<a href="#_ftn19" name="_ftnref19"><sup>[19]</sup></a></p></blockquote>
<p>রাসূলে করীম (সঃ) হায়াকে অন্য একটি হাদীসে সকল পয়গাম্বর কর্তৃক আনীত অভিন্ন একটি মূল্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<blockquote><p>إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحى فاصنعْ مَا شئْتَ</p>
<p>অর্থাৎ, সমগ্র মানবতা, প্রথম দিন থেকে এমন একটি কথা জানেন যে কথার ব্যাপারে সকল পয়গাম্বর ঐকমত্য পোষণ করেছেন সেটা হলো, যদি হায়া না থাকে তাহলে যা ইচ্ছা তাই করতে পার।<a href="#_ftn20" name="_ftnref20"><sup>[20]</sup></a></p></blockquote>
<h5>৫। <strong>পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>দ্বীনের প্রতিটি হুকুমের-ই নান্দনিক বা সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। ইসলামের প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রেই আল্লাহর জামাল নামের একটি প্রতিফলন দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন শাহাদাতের চেতনার অধিকারী হয় তখন সে এমন এক অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনে যা তাঁকে প্রতিমুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছে। আখলাকী মূল্যবোধ ও দ্বীনের বিধানসমূহকে শুধুমাত্র কামাল (পরিপূরক) হিসেবেই নয়; জামাল হিসেবেও দেখে থাকে এবং এই জামাল মানুষের মধ্যে জ্ঞান, হিকমত, মারেফত ও মুহাব্বতে রূপান্তরিত হয়।</p>
<p>পর্দার দায়িত্ব শুধুমাত্র শরীরকে ঢেকে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার একই সাথে নান্দনিক ও সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, <strong>“ قَدۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکُمۡ لِبَاسًا یُّوَارِیۡ سَوۡاٰتِکُمۡ وَ رِیۡشًا / আমি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার ও শোভা বর্ধনের জন্য তোমাদের পোশাক পরিচ্ছদের উপকরণ অবতীর্ণ করেছি”।</strong> এই আয়াতের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষের জন্য পর্দার একই সাথে  সৌন্দর্যগত একটি দিকও রয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত رِیۡشً/রিশ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল পাখির পালক। <strong>কোরআনের ভাষায় রিশ দ্বারা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার সর্বোচ্চ চূড়া বুঝানো হয়ে থাকে।</strong> ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর ভাষায়, رِیۡشً/রিশ হল পর্দার সৌন্দর্যগত দিক। অর্থাৎ رِیۡشً/রিশ যিনাতেরও উপরের একটি সৌন্দর্যকে বুঝিয়ে থাকে। তবে কোরআনে রিশ শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই নয়, আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকেও ব্যক্ত করে থাকে। অপর একটি আয়াতে মহান রব কাবা ঘরকে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকারী জাহেলী সমাজকে এই অবস্থা থেকে বিরত রাখার জন্য বলেছেন, <strong>“یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ / হে আদম সন্তান! মসজিদে যাওয়ার সময় সাজসজ্জা করো”। <a href="#_ftn21" name="_ftnref21"><sup>[21]</sup></a></strong> এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে লঙ্ঘন না করা। তাছাড়া এখানে নির্দিষ্ট কোন অবয়ব কিংবা পোশাকের কথা বলা হয়নি। অন্যথায় আবহাওয়া ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে পোশাক আশাকে ভিন্নতা একটি রহমত স্বরূপ। ইসলাম পোশাকে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন পোশাক বা ধরণ চাপিয়ে দেয়নি। ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে মেনে চলার পরও যদি কেউ কারোর উপর পোশাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ধরণকে চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেটা হবে এই রহমতকে লঙ্ঘন করার শামিল।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের ভাষায় দুই ধরণের সৌন্দর্য রয়েছে। একটি হল <strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong> অপরটি হলো <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>।</p>
<p><strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>, তার নামকে তিনি রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে ( Roman Mythology)<a href="#_ftn22" name="_ftnref22"><sup>[22]</sup></a> আলোচিত প্রেম, সৌন্দর্য ও কামনার দেবী ভেনাস থেকে নিয়েছেন। আর সেটা গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে (Greek Mythology) আলোচিত আফ্রোদিতি থেকে এসেছে। এটার দ্বারা শুধুমাত্র শারীরিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর এর উৎস হলো জাগতিক আবেগ ও অনুভূতি। এটা শুধুমাত্র আবেগকে উদ্বেলিত করে থাকে, প্রভাবিত করে, কিন্তু প্রতারণামূলক। <strong>মানুষকে</strong> <strong>বস্তুগত জগৎ</strong> <strong>ও</strong> <strong>বাহ্যিকতার</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বন্দী</strong> <strong>করে</strong> <strong>ফেলে</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>অপরটি</strong> <strong>হল</strong> <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong><strong>।</strong> এই সৌন্দর্যের নামকে তিনি হযরত ইউসুফ (আ) থেকে নিয়েছেন। ইউসুফী সৌন্দর্যের ভিত্তি হল, শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রূহী সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দের চেয়ে চোখের নূর ও কালবের প্রশান্তি রয়েছে। এই সৌন্দর্য শুধুমাত্র বাসারকেই (দৃষ্টিকেই) নয়, বাসিরাতকেও (দূরদৃষ্টি) উদ্দেশ্য করে কথা বলে। প্রভাবিত করে কিন্তু প্রতারিত করে না। মানুষকে সুন্দর ও নান্দনিকতার দিকে পরিচালিত করে। হাদীসের ভাষ্য মতে, <strong>“إنَّ اللهَ جميلٌ يُحبُّ الجمالَ / আল্লাহ তায়ালা সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন”।<a href="#_ftn23" name="_ftnref23"><sup>[23]</sup></a></strong></p>
<p>সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ব্যাখ্যানুসারে হযরত ইউসুফের তিনটি পোশাক পর্দার তিনটি ধরণ ও তিন বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে।</p>
<p>প্রথমটি হল মিথ্যাবাদী পোশাক। ‘ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে’ এই কথা বলার জন্য ইউসুফ (আ) এর ভাইয়েরা তাঁদের বাবার নিকট রক্তমাখা যে পোশাক নিয়ে যায় এই পোশাক। “ وَ جَآءُوۡ عَلٰی قَمِیۡصِهٖ بِدَمٍ کَذِبٍ ؕ / আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল”।<a href="#_ftn24" name="_ftnref24"><sup>[24]</sup></a></p>
<p>দ্বিতীয় পোশাক হলো, ছেঁড়া পোশাক কিন্তু সেই শার্ট সামনে থেকে নয়, বরং পেছন থেকে ছেঁড়া ছিলো। সে পোশাক ছিলো এমন পোশাক যা তাঁর পরিধানকারীকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে হায়া’র দিকে ধাবিত করেছিলো। “وَ اِنۡ کَانَ قَمِیۡصُهٗ قُدَّ مِنۡ دُبُرٍ فَکَذَبَتۡ وَ هُوَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ  / আর তার জামা যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয় তাহলে সে (মহিলা) মিথ্যা বলেছে এবং সে (পুরুষ) হচ্ছে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত”।<a href="#_ftn25" name="_ftnref25"><sup>[25]</sup></a></p>
<p>তৃতীয় পোশাক হলো, অন্ধ চোখকে উন্মীলিতকারী পোশাক। এ পোশাকের আধ্যাত্মিক একটি ঘ্রাণ ও সুন্দর একটি দিক রয়েছে। যা চোখকে খুলে দেয় এবং বাসিরাতকে (দূরদৃষ্টি) বৃদ্ধি করে। এর ঘ্রাণ এমনকি হযরত ইয়াকুবের অন্ধ হয়ে যাওয়া চক্ষুকে খোলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিলো। আর এটা হল এমন জামা যা চক্ষুকে উম্মুক্ত করে দেয় এবং বাসিরাতকে লালিত করে। <strong>“اِذۡهَبُوۡا بِقَمِیۡصِیۡ هٰذَا فَاَلۡقُوۡهُ عَلٰی وَجۡهِ اَبِیۡ یَاۡتِ بَصِیۡرًا / তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও, অতঃপর সেটি আমার পিতার চেহারায় স্পর্শ করাও। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন”। <a href="#_ftn26" name="_ftnref26"><sup>[26]</sup></a></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি জানি যে সকল বিষয়ের মত পর্দা নিয়েও তোমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আর এর পেছনে অনেক অভ্যন্তরীণ ও বহির্গত কারণ রয়েছে সেটাও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে নয়। আমাদের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনাসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের এই সকল জেরা ও জিজ্ঞাসাসমূহ যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং আমাদেরকে আমাদের রবের দিকে ধাবিত করে। অন্যথায় এসকল জিজ্ঞাসা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর অন্য কোনকিছু বয়ে আনবে না। যেসকল আত্মজিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণ আমাদের মূল্যবোধকে বিনাশ করে দেয় তা সঠিক কোন জিজ্ঞাসা বা বিশ্লেষণ হতে পারে না।</p>
<p>হিজাব কিংবা পর্দাকে ছেড়ে দেওয়া শুধুমাত্র হিজাব ও পর্দাকে ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। কেননা পর্দা হলো মহান প্রভুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার একটি বহিঃপ্রকাশ। পর্দা মানুষকে তার অবস্থান সম্পর্কে  সচেতন করে তুলে এবং মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ একটি জীবনধারা অর্জনে সাহায্য করে। আর এ ক্ষেত্রে শুধু পর্দা করলে কিংবা হিজাব পরিধান করলেই হবে না, আমি কেন পর্দা করি, কেন হিজাব পড়ি এই বিষয়কে কোরআনের আলোকে জানতে হবে এবং আল্লাহর আখলাককে আখলাকাসম্পন্ন হতে হবে। আমরা যদি এই চেতনাকে ধারণ পর্দা করতে পারি তখন-ই কেবলমাত্র আমাদের নিজেদেরকে ইস্তেকামাতের পথে দৃঢ় রাখতে পারবো।</p>
<p>সমাজবিজ্ঞানে হাবিটাস (Habitus) নামে একটি পরিভাষা রয়েছে। হাবিটাস (Habitus)  ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিতকারী এবং আমরা যে সমাজে বসবাসকরী সেই সামাজিক জীবন। বিগত শতাব্দী পর্যন্ত  হাবিটাস (Habitus) ছিল পর্দার প্রভাবাধীন, অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ-ই পর্দা করত। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে এই হাবিটাস (Habitus)- এ পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষ পর্দাকে পরিত্যাগ করে শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমি জানি আমাদের তরুণ-তরুণীরা স্বাধীনতাকে অনেক বেশী পছন্দ করে। তবে নফসের নিকট আত্মসমর্পণ করার নাম স্বাধীনতা নয়। অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনুসরণ করে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোকে মেনে  জীবন পরিচালনা করাকেও স্বাধীনতা বলে না। সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো, আমাদের উপর বৈশ্বিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই সকল হাবিটাস (Habitus)- এর নিকটে আত্মসমর্পণ না করা</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> সূরা আরাফ, ১৯-২৩।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> আরাফ, ২৬।</p>
<p><a href="#_ftnref3" name="_ftn3">[3]</a> বালাদ, ৭</p>
<p><a href="#_ftnref4" name="_ftn4">[4]</a> হাদিদ, ৪</p>
<p><a href="#_ftnref5" name="_ftn5">[5]</a> বাকারা, ১১৫।</p>
<p><a href="#_ftnref6" name="_ftn6">[6]</a> আরাফ, ১৭২।</p>
<p><a href="#_ftnref7" name="_ftn7">[7]</a> বুরুজ, ৭।</p>
<p><a href="#_ftnref8" name="_ftn8">[8]</a> আওরাত বলতে আমাদের ভাষায় মেয়েলোক বা নারী জাতি বুঝায়। কিন্ত আরবী ভাষায় এর মানে হয় বাধা ও বিপদের জায়গা এবং যে জিনিসের খুলে য়াওয়া মানুষের জন্য লজ্জার ব্যাপার এবং যার প্রকাশ হয়ে পড়া তার জন্য অস্বস্তিকর হয় এমন জিনিসের জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া কোন জিনিসের অসংরক্ষিত হওয়া অর্থেও এর ব্যবহার হয়। (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref9" name="_ftn9">[9]</a> নূর, ৩০।</p>
<p><a href="#_ftnref10" name="_ftn10">[10]</a> নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref11" name="_ftn11">[11]</a> বাকারা, ১৮৭।</p>
<p><a href="#_ftnref12" name="_ftn12">[12]</a> সূরা নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref13" name="_ftn13">[13]</a> আনফাল, ২৭।</p>
<p><a href="#_ftnref14" name="_ftn14">[14]</a> আবু দাউদ, লিবাস, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref15" name="_ftn15">[15]</a> মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ৩৭।</p>
<p><a href="#_ftnref16" name="_ftn16">[16]</a> ইবনে মাজা, যুহুদ, ১৭।</p>
<p><a href="#_ftnref17" name="_ftn17">[17]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৮; নাসাঈ, ঈমান, ১৬।</p>
<p><a href="#_ftnref18" name="_ftn18">[18]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৯।</p>
<p><a href="#_ftnref19" name="_ftn19">[19]</a> হাকিম, <em>মুসতাদরাক</em><em>,</em> ৫৮।</p>
<p><a href="#_ftnref20" name="_ftn20">[20]</a> বুখারী, আদব, ৭৮।</p>
<p><a href="#_ftnref21" name="_ftn21">[21]</a> আরাফ, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref22" name="_ftn22">[22]</a> Venus is a Roman goddess, whose functions encompass love, beauty, desire, sex, fertility, prosperity, and victory. In Roman mythology, she was the ancestor of the Roman people through her son, Aeneas, who survived the fall of Troy and fled to Italy. Julius Caesar claimed her as his ancestor. Venus was central to many religious festivals and was revered in Roman religion under numerous cult titles. (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref23" name="_ftn23">[23]</a> মুসলিম, ঈমান, ১৪৭।</p>
<p><a href="#_ftnref24" name="_ftn24">[24]</a> ইউসুফ, ১৮।</p>
<p><a href="#_ftnref25" name="_ftn25">[25]</a> ইউসুফ,২৭ ।</p>
<p><a href="#_ftnref26" name="_ftn26">[26]</a> ইউসুফ,৯৩ ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15602</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের পর্যালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 06 Feb 2025 16:37:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15526</guid>

					<description><![CDATA[পূর্ণ মানব (আদর্শ মানব) কে, তা জানা একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যক্তির প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রতিটি মতাদর্শেই আদর্শ মানবের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়। যেহেতু আমরা ইসলামের পূর্ণ ও আদর্শ মানবের প্রতিকৃতি ও স্বরূপ জানতে চাই, সেহেতু প্রচলিত অন্য সব]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পূর্ণ মানব (আদর্শ মানব) কে, তা জানা একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যক্তির প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রতিটি মতাদর্শেই আদর্শ মানবের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়। যেহেতু আমরা ইসলামের পূর্ণ ও আদর্শ মানবের প্রতিকৃতি ও স্বরূপ জানতে চাই, সেহেতু প্রচলিত অন্য সব মতবাদের আদর্শ মানবের প্রকৃতির পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব। গত দিনের আলোচনায় বিভিন্ন মতবাদ সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি। আজকে আমাদের আলোচনা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ দিয়ে শুরু করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক</strong> <strong>মতবাদের</strong> <strong>সার</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সংক্ষেপ</strong></h4>
<p>প্রাচীন দার্শনিক ভাবনায় মানুষের অস্তিত্বের মূল বিষয় ছিল তার বুদ্ধিবৃত্তি। তাদের মতে, মানুষের আমিত্ব হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি বা আকল। যেমনভাবে মানবদেহ তার ব্যক্তিত্বের অংশ নয় তেমনিভাবে তার আত্মিক ও মানসিক শক্তি ও ক্ষমতা তার ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সত্তা নয়। মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল হলো তার চিন্তা করার শক্তি ও ক্ষমতা, মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো যা দ্বারা সে চিন্তা করে।</p>
<p>মানুষ যা দ্বারা চোখে দেখে তা চিন্তার একটি উপকরণ মাত্র, তেমনি যা দ্বারা কল্পনা করে, যা দ্বারা চায়, যা দ্বারা ভালোবাসে বা মানুষ যে সত্তার কারণে জৈবিক চাহিদার অধিকারী, এ সবই চিন্তা সত্তার একেকটি উপকরণ। মানব সত্তার মৌল উপাদান তার চিন্তাশক্তি। তাই পূর্ণ মানব তিনিই, যিনি চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌছেছেন। চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌছার অর্থ বিশ্ব ও অস্তিত্বজগতকে ঠিক যে রূপে আছে সে রূপেই উদঘাটন করা ও জানা।</p>
<p>এ মতবাদ বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলকে মানব সত্তার মৌল উপাদান বলে জানে। এ ছাড়াও বিশ্বাস করে যে, বুদ্ধিবৃত্তি বা চিন্তা-শক্তির দ্বারা বিশ্বকে তার প্রকৃত রূপে উদঘাটন করা সম্ভব। আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি অস্তিত্বজগতকে তার আসল রূপে নিজের মধ্যে প্রতিফলিত করার ক্ষেত্রে সক্ষম। ঠিক আয়নার মত বিশ্বজগৎ তার প্রকৃত রূপ নিয়ে এতে প্রতিফলিত হয়।</p>
<p>ইসলামের দার্শনিক সমাজে যারা এ ধারণাকে গ্রহণ করেছেন তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ও কোরআনের আলোকে ঈমান বলতে বিশ্বকে ঠিক যেমনভাবে আছে তেমনভাবে জানার কথাই বোঝানো হয়েছে। ঈমান অর্থ বিশ্বজগতের স্রষ্টা, বিশ্বে বিরাজমান শৃঙ্খলা, প্রচলিত বিধান, বিশ্বের গতি ও লক্ষ্য এগুলোকে জানা। তাঁরা বলেন, কোরআনে যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, বিশ্বজগৎ আল্লাহর সৃষ্টি এ বিষয়ে বিশ্বাস, আল্লাহ্ বিশ্বজগতকে লক্ষ্যহীন ছেড়ে দেননি, বরং একে হেদায়েত ও পরিচালনা করছেন, যেমন নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত করছেন তা জানা, সবকিছু আল্লাহ্ থেকে এসেছে এবং তাঁর প্রতিই প্রত্যাবর্তনকারী প্রভৃতি- এ বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো বিশ্বজগতকে তার প্রকৃতরূপে জানা। তাঁরা ঈমানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ঈমান জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ব্যতীত কিছু নয়। অবশ্য তাঁদের এ প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের অর্থ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা আংশিক জ্ঞান নয়, বরং এ জ্ঞান দার্শনিক ও প্রজ্ঞাগত। দার্শনিক জ্ঞানের অর্থ বিশ্বের উৎপত্তি ও পরিসমাপ্তি, অস্তিত্বের ধারা ও পর্যায়কে সামগ্রিকভাবে জানা ও উদঘাটন করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>এ</strong> <strong>মতাদর্শের</strong> <strong>বিপরীত</strong> <strong>মতবাদ</strong></h4>
<p>এ মতাদর্শ যা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ বলে আমরা উল্লেখ করেছি এর বিপরীতে বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে যেগুলো এ মতবাদের বিরোধী ও সমালোচক। মুসলিম বিশ্বে প্রথম যে মতবাদটি এ মতবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সেটা হলো ইশরাকী-সূফী-খোদাপ্রেমী মতবাদ। এরপর রয়েছে আহলে হাদীসের অনুসারীরা। শিয়াদের মধ্যে আখবারী এবং সুন্নীদের মধ্যে হাম্বলী ও আহলে হাদীসগণ আকলের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের অস্বীকার করেছে। তাঁরা বলছেন, দার্শনিকরা আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপারে যত বেশি গুরুত্ব দেয় আকলের গুরুত্ব এত অধিক নয়।</p>
<p>এদের থেকেও ইন্দ্রিয়বাদীরা বর্তমান সময়ে বুদ্ধিবৃত্তির চরম সমালোচক। বিগত তিন-চার শতক ধরে ইন্দ্রিয়বাদীদের জয়-জয়কার। তাদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিকে যতটা মূল্য দেয়া হচ্ছে, তা এতটা মূল্যের অধিকারী নয়। আকলের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই, বরং আকল ইন্দ্রিয়ের অনুগত। মানবের মূল তার ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতিসমূহ। আকল খুব বেশি হলে যা করতে পারে তা হলো ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের উপর কাজ করা। যেমন কোনো কারখানার কথা যদি আমরা চিন্তা করি, সেখানে কাঁচামাল প্রবেশ করে, তারপর কারখানার মেশিনের মধ্যে তা মিশ্রিত হয়ে বিভিন্ন রুপ ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ কাপড় বুনন কারখানায় প্রথমে তুলা থেকে সুতা বের করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে বুননের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাপড়ের আকৃতি দেয়া হয়। তেমনি আকল মেশিনের মতো শুধু ইন্দ্রিয়লব্ধ কাঁচামালকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট আকৃতি দেয়। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ তার নিজের স্থানে এখনও অটল। এখানে আমরা অবশ্য সে বিষয়ে আলোচনা করব না, বরং এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করার চেষ্টা করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইসলামে</strong> <strong>বুদ্ধিবৃত্তির</strong> <strong>মৌলিকত্ব</strong></h4>
<p>বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদে কয়েকটি বিষয় আছে যার প্রতিটিকে যাচাই করে দেখব যে, সেগুলো ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা। প্রথম বিষয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও জ্ঞানের মৌলিকত্ব। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও জ্ঞানের অর্থ হলো আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি বিশ্বের বাস্তবতাকে আবিষ্কার করার ক্ষমতা রাখে এবং এ জ্ঞান মৌলিক, নির্ভরযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ।</p>
<p>অনেক মতবাদই বুদ্ধিবৃত্তির এরূপ ক্ষমতা ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী নয়। এখন আমরা দেখব ইসলামী উৎসগুলো থেকে আমাদের নিকট এ ধরনের দলিল-প্রমাণ রয়েছে কিনা যে, বুদ্ধিবৃত্তির এরূপ ক্ষমতায় আমরা বিশ্বাসী হতে পারি। ঘটনাক্রমে আমাদের হাতে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত দলিল রয়েছে যাতে আমরা বলতে পারি, ইসলামের মতো কোনো মতাদর্শেই আকলকে এত অধিক পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়নি বা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আকলকে অন্য কোন ধর্মেই ইসলামের মতো গুরুত্ব দেয়া হয়নি।</p>
<p>আপনি খ্রিষ্টধর্মকে ইসলামের সঙ্গে তুলনা করে দেখুন, খ্রিষ্টধর্ম ঈমানের দৃষ্টিতে আকলে প্রবেশের বিরোধী। তাদের মতে, মানুষ যখন কোনো কিছুর উপর ঈমান আনবে তখন এর উপর চিন্তা করার অধিকার তার নেই। চিন্তা যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তির কাজ তাই বিশ্বাসগত বিষয়ে চিন্তার অবকাশ নেই। যে বিষয়ে ঈমান রাখতে হবে সে বিষয়ে চিন্তা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আকলকে &#8216;কি&#8217; ও &#8216;কেন&#8217; এ ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া যাবে না। একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি, বিশেষত চার্চের অধিপতির দায়িত্ব হলো ঈমানের গণ্ডিতে যুক্তি, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রবেশকে প্রতিহত করা। মূলত খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।</p>
<p>ইসলামের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক এর বিপরীত অবস্থা দেখি। ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়ে (উসূল) বুদ্ধিবৃত্তি ব্যতীত অন্য কিছুর প্রবেশ নিষিদ্ধ। যেমন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় আপনার ধর্মের একটি মৌলিক বিষয় বলুন। আপনি হয়তো বললেন, তাওহীদ (একত্ববাদ)। এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, কেন আপনি এক আল্লাহতে ঈমান এনেছেন? আপনাকে অবশ্যই এজন্য যুক্তি পেশ করতে হবে যেহেতু ইসলাম আকল ব্যতীত আপনার নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে না। যদি বলেন, &#8220;আমি এক আল্লাহয় বিশ্বাস করি, কিন্তু এর পেছনে কোন যুক্তি পেশ করতে পারব না। আমার দাদীমার থেকে শুনে আমি বিশ্বাস করেছি। অবশেষে এক সত্যে পৌঁছেছি যেভাবেই হোক দাদীমার কাছে শুনে অথবা স্বপ্ন দেখে।&#8221; ইসলাম বলে, &#8220;না, যদিও এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হও, কিন্তু এ বিশ্বাসের ভিত্তি স্বপ্ন বা পিতা- মাতার অন্ধ অনুকরণ অথবা পরিবেশের প্রভাবে হয়ে থাকে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।&#8221; কেবল চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর যুক্তির ভিত্তিতে যদি আপনি ঈমান আনয়ন করেন তবেই তা গ্রহণ করা হবে নতুবা নয়।</p>
<p>খ্রিষ্টবাদে ঈমানের গণ্ডিতে আকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটাই খ্রিষ্টবাদের ভিত্তি। একজন খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তির দায়িত্ব হলো এই গণ্ডিতে আকল ও চিন্তার প্রবেশকে রোধ করা। ইসলামে ঈমানের গণ্ডিতে আকলের স্থান সংরক্ষিত। আকল ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর এ গণ্ডিতে প্রবেশাধিকার নেই।</p>
<p>ইসলামের উৎসসমূহে অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহতে আকলকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন দেখা যায়। প্রথমত কোরআন সব সময়ই বুদ্ধিবৃত্তির প্রশংসা করেছে। তদুপরি আমাদের হাদীস গ্রন্থসমূহেও বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব ও মৌলিকত্ব এতটা প্রকট যে, এ গ্রন্থসমূহ খুললেই দেখা যায়, তাতে প্রথম অধ্যায় হিসেবে কিতাবুল আকল এসেছে এবং এ অধ্যায়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তির পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে।</p>
<p>ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) আকল সম্পর্কিত একটা আশ্চর্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, &#8220;আল্লাহপাকের দু&#8217;টি হুজ্জাত (দলিল) রয়েছে। এ দু&#8217;টি হুজ্জাত হচ্ছে দু&#8217;টি নবী। একটি অভ্যন্তরীণ নবী বা আকল, দ্বিতীয়টি বাহ্যিক নবী অর্থাৎ আল্লাহ্র প্রেরিত পুরুষগণ যাঁরা নিজেরা মানুষ এবং অন্য মানুষদের দীনের দিকে দাওয়াত করেন। আল্লাহপাকের এ দু&#8217;টি হুজ্জাত একে অপরের পরিপূরক অর্থাৎ যদি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি থাকে, কিন্তু পৃথিবীতে কোনো নবী প্রেরিত না হয়, তবে মানুষের পক্ষে সফলতার পথ অতিক্রম করা সম্ভব হবে না। তেমনি যদি নবী থাকেন, কিন্তু মানুষ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী না হয় তাহলেও সে সাফল্য লাভ করতে পারবে না। আকল ও নবী একসঙ্গে একই দায়িত্ব পালন করে।&#8221; এর চেয়ে উত্তমরূপে আকলকে সম্মানিত করা ও পৃষ্ঠপোষকতা দান আর কোনভাবে সম্ভব কি?</p>
<p>এ ধরনের বর্ণনা ও রেওয়ায়েত সম্ভবত আরো শুনে থাকবেন। যেমনঃ</p>
<blockquote><p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>নিদ্রা</em> <em>অজ্ঞের</em> <em>ইবাদত</em> <em>হতে</em> <em>উত্তম</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>খাদ্যগ্রহণ</em> <em>মূর্খের</em> <em>রোযা</em> <em>অপেক্ষা</em> <em>উত্তম</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>জ্ঞানীর</em> <em>নিরবতা</em> <em>অজ্ঞের</em> <em>কথা</em> <em>হতে</em> <em>শ্রেয়</em><em>&#8216;, </em></p>
<p><em>&#8216;</em><em>আল্লাহ্</em> <em>কোনো</em> <em>নবীকেই</em> <em>তাঁর</em> <em>আকল</em> <em>পূর্ণতায়</em> <em>পৌছা</em> <em>ও</em> <em>সমগ্র</em> <em>উম্মত</em> <em>থেকে</em> <em>তাঁর</em> <em>বুদ্ধিবৃত্তি</em> <em>উচ্চতর</em> <em>হওয়ার পূর্বে প্রেরণ</em> <em>করেননি</em><em>।’ </em><em> </em></p></blockquote>
<p>আমরা রাসূল (সা.)-কে বুদ্ধিবৃত্তির সমগ্র রূপ বলে জানি। আমাদের এ ধারণা খ্রিষ্টবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যশীল। যেহেতু তারা বুদ্ধিবৃত্তি থেকে দীনকে পৃথক বলে জানে। কিন্তু আমরা আমাদের নবীকে আকলের পরিপূর্ণ রূপ মনে করি।</p>
<p>সুতরাং জ্ঞান ও প্রামাণ্যের ক্ষেত্রে আমরা আকলকে দলিল বলে জানি এ অর্থে যে, বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে বাস্তব জ্ঞান ও পরিচয় লাভ সম্ভব। দার্শনিকদের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম সমর্থন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক</strong> <strong>মতবাদের</strong> <strong>দু</strong><strong>&#8216;</strong><strong>টি</strong> <strong>ত্রুটি</strong></h4>
<p>দার্শনিক মতে মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি। এ ছাড়া বাকী যা আছে সেগুলো অপ্রধান এবং এগুলো মাধ্যম বৈ কিছু নয়। শরীর আকলের জন্য যেমনি একটি মাধ্যম, তেমনি চোখ, কান, ধারণক্ষমতা, কল্পনাশক্তি ও অন্য যে সকল যোগ্যতা আমাদের মধ্যে বর্তমান সেগুলোও আমাদের মূল সত্তা ‘আকল’র একেকটি মাধ্যম।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো দলিল ইসলামে রয়েছে কি? না, এ ধরনের বক্তব্য যে, আমাদের মূল সত্তা শুধু আকল- এর সপক্ষে কোনো দলিল বা প্রমাণ ইসলামে নেই। ইসলাম এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে যে, আকল মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের একটি অংশ, তার সমগ্র অস্তিত্ব নয়।</p>
<p>দ্বিতীয় বিষয় হলো আমাদের অধিকাংশ দর্শনের গ্রন্থে ঈমানকে শুধু জ্ঞান বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, ইসলামে ঈমানের অর্থ বাস্তব পরিচিতি বা জ্ঞান। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ আল্লাহকে জানা, তদ্রূপ রাসূল (সা.)-কে জানা। ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের অর্থ ফেরেশতাদের পরিচয় লাভ, আখেরাতের প্রতি ঈমানের অর্থ আখেরাতের পরিচয় জানা। কোরআনে যেখানেই ঈমান এসেছে এর অর্থ বাস্তব জ্ঞান ও পরিচিতি ছাড়া আর কিছু নয়। এ বিষয়টি কোনক্রমেই ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। ইসলামে ঈমানের অর্থ শুধু পরিচিতি নয়, বরং এর চেয়ে বেশি কিছু। পরিচিতি অর্থ হলো জানা। যিনি পানিবিজ্ঞানী তিনি পানিকে চেনেন। যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী তিনি জ্যোতিষ্ক সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তদ্রূপ যিনি সমাজবিজ্ঞানী তিনি জানেন সমাজকে, যিনি মনোবিজ্ঞানী তিনি মনকে বোঝেন, যিনি প্রাণীবিজ্ঞানী তিনি প্রাণীদের সম্পর্কে জানেন অর্থাৎ এঁরা সবাই নিজেদের সম্পৃক্ত বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন। ঈমানও কি কোরআনে এরূপ জানা অর্থেই এসেছে? আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ কি শুধুই তাঁকে বোঝা ও অনুভব করা? না, এমন নয়। এটা ঠিক যে, পরিচয় লাভ ঈমানের শর্ত ও অংশ। পরিচিতি ব্যতীত ঈমান অর্থহীন, এটা সত্য, কিন্তু শুধু জানাও ঈমান নয়।</p>
<p>ঈমান এক প্রবণতা যার মধ্যে আনুগত্যের প্রবণতা রয়েছে, প্রেম ও ভালবাসার প্রবণতা রয়েছে, স্রষ্টার প্রতি আত্মনিবেদনের প্রবণতা রযেছে, কিন্তু জ্ঞানের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা অনুপস্থিত। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যোতিষ্কমণ্ডলী সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন- এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি জ্যোতিষ্কসমূহের প্রতি অনুরক্ত। তদ্রূপ একজন খনিজবিজ্ঞানী বা পানিবিজ্ঞানী- এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি খনিজ বা পানির প্রতি আসক্ত। বরং এ ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে যে, মানুষ কোনো বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, কিন্তু তা থেকে বিতৃষ্ণ। বিশেষত রাজনীতিতে শত্রুকে মানুষ নিজের থেকেও ভালোভাবে চেনে। উদাহরণস্বরূপ কোন ইসরাইলী হয়তো আরব ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ; হয়তো ইসলাম সম্পর্কেও তার জ্ঞান অত্যন্ত গভীর। ইসরাইলে মিশর, সিরিয়া, আলজেরিয়া বা ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুসলমানদের মধ্যকার এরূপ বিশেষজ্ঞ অপেক্ষা অনেক বেশি এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রশ্ন হলো এরূপ মিশর বিষয়ক ইসরাইলী বিশেষজ্ঞ কি মিশরের প্রতি আনুগত্যশীল? কখনই নয়। তদ্রূপ মিশরে কোন ইসরাইল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তো তিনি ইসরাইলের প্রতি অনুরক্ত নন, বরং তিনি হয়তো ইসরাইলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। (যেহেতু ইসরাইল আরবদের প্রতি শত্রুপরায়ণ সেহেতু আরবরাও তাদের প্রতি সন্দেহ পরায়ণ।)</p>
<p>আলেম সমাজ যে বলেন, “ঈমান অর্থ শুধু জ্ঞান অর্জন নয় (যা দর্শন দাবি করে)” এর সপক্ষে সর্বোত্তম প্রমাণ খোদ কোরআন। যেহেতু কোরআন ঐ সকল ব্যক্তিকে আমাদের নিকট পরিচিত করিয়েছে যারা আল্লাহ পাককে সবচেয়ে উত্তমরূপে চেনে, সে সকল নবী ও আউলিয়াকেও উত্তমরূপে চেনে, কিয়ামতকেও ভালোভাবে জানে, কিন্তু ঈমানদার নয় বরং কাফের। যেমন শয়তান। শয়তান কি আল্লাহকে চেনে না? শয়তান তো বস্তুবাদীদের মতো নয় যে, আল্লাহকে চেনে না, বরং সে আল্লাহকে চেনে, কিন্তু আল্লাহপাকের বিরোধী। শয়তান আমার বা আপনার থেকে অনেক ভালোভাবে আল্লাহকে চেনে। কয়েক হাজার বছর সে আল্লাহর ইবাদত করেছে। কোরআন আমাদের বলছে, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনো এবং আমরাও ঈমান এনেছি।</p>
<p>কিন্তু শয়তান কি ফেরেশতাদের চেনে না? না বরং সে ফেরেশতাদের চেনে, তাদের সঙ্গে সহস্র বছর এক সঙ্গে ছিল, আমাদের তুলনায় হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে সে উত্তমরূপে জানে। নবীদেরও তদ্রূপ খুব ভালোভাবে চেনে ও জানে। কিয়ামত সম্পর্কে আরো উত্তমরূপে জানে (এ কারণেই আল্লাহর নিকট কিয়ামত পর্যন্ত সময় চেয়েছে)। কিন্তু এত কিছু জানার পরেও কেন কোরআন তাকে কাফের বলে সম্বোধন করছে? কেন বলছে, &#8220;সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত&#8221;? (সূরা সোয়াদ: ৭৪)</p>
<p>যদি ঈমানের অর্থ শুধু &#8216;জানা&#8217; হতো (যেরূপ দর্শন বলছে), তাহলে শয়তান প্রথম মুমিন বলে পরিচিত হতো। কিন্তু জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সে মুমিন নয়। কারণ সে অস্বীকারকারী জ্ঞানী অর্থাৎ যদিও সে সত্যকে জানে তদুপরি তার বিরোধীতা করে এবং সেটার প্রতি আনুগত্যশীল নয়। সে এ সত্যের প্রতি রুজু করে না বা তার প্রতি ভালোবাসাও অনুভব করে না। ফলশ্রুতিতে সে দিকে সে ধাবিতও হয় না।</p>
<p>সুতরাং ঈমান কেবল &#8216;পরিচয়&#8217; নয়। এ জন্যই অনেক প্রজ্ঞাবান দার্শনিক সূরা ত্বীন-এর</p>
<blockquote><p>لَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ فِيٓ أَحۡسَنِ تَقۡوِيمٖ</p>
<p>ثُمَّ رَدَدۡنَٰهُ أَسۡفَلَ سَٰفِلِينَ</p>
<p>إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ</p></blockquote>
<p><strong>এ আয়াতের তাফসীর এভাবে করেছেন যে, إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ অর্থাৎ তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা ও وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ অর্থাৎ ব্যবহারিক প্রজ্ঞা। এটা ঠিক নয়। إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ -এর মধ্যে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা অপেক্ষা উচ্চতর অর্থ নিহিত রয়েছে। তবে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা তার অংশ ও ভিত্তি হলেও প্রজ্ঞা, অনুধাবন, জ্ঞান, পরিচয় ও জানাই পূর্ণ ঈমান নয়, বরং ঈমান জ্ঞান ও জানা-বুঝা থেকে বড় অন্য কিছু।</strong></p>
<p>এখানে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি বিষয় তুলে ধরেছি। <strong>প্রথমত</strong>, আকল প্রামাণ্য দলিল, আকল দ্বারা গৃহীত বিষয় বিশ্বাসযোগ্য এবং আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে সঠিক পরিচয় লাভ সম্ভব- এ বিষয়গুলো সত্য এবং ইসলাম তা গ্রহণ করে। <strong>দ্বিতীয়ত</strong> আকল মানুষের একক মূলসত্তা- ইসলাম এটাকে গ্রহণ করে না। <strong>তৃতীয়ত</strong> ঈমানের অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুধাবন, জানা ও পরিচয় লাভ ব্যতীত অন্যকিছু নয়- ইসলামের দৃষ্টিতে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ঈমানের</strong> <strong>মৌলিকত্ব</strong></h4>
<p>ঈমান ও পরিচয়কে একই জানি অথবা পরিচয়কে ঈমানের একাংশ জানি, এখন যে বিষয়টি আমাদের নিকট লক্ষণীয় তা হলো ঈমান ও পরিচিতির মৌলিকত্ব রয়েছে কি? নাকি মৌলিকত্ব নেই বরং এ দু&#8217;টি আমলের (কার্যের) পূর্বশর্ত মাত্র। এ ক্ষেত্রেও দু&#8217;টি বড় মতাদর্শের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>ঈমানের মৌলিকত্বের অর্থ কি? এর অর্থ ইসলাম যেভাবে ঈমানকে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছে তা এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে, ঈমান মানুষের আমলের বিশ্বাসগত ভিত্তি। অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীতে অবশ্যই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবে এবং কাজ করবে এবং এ চেষ্টা ও কার্যক্রম এক বিশেষ পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি অনুযায়ী হতে হবে যার ভিত্তি বিশেষ চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। অন্যভাবে বর্ণনা করলে যেহেতু মানুষ চায় বা না চায় তার সকল কর্মকাণ্ড চিন্তাগত এবং যদি সে তার ব্যবহারিক জীবনে নিজের উদ্দেশ্যে পৌঁছতে সঠিক একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে চায় তবে তা চিন্তা ও বিশ্বাসের বিশেষ ভিত্তি ব্যতীত সম্ভব নয়। এ কারণেই তাকে চিন্তা ও বিশ্বাসের একটি ভিত্তি দিতে হবে যাতে তার উপর ভিত্তি করে সে তার চিন্তার কাঠামো নির্মাণ করতে পারে। যেমন কোন ব্যক্তি যদি একটি দালান নির্মাণ করতে চায় তাহলে তার লক্ষ্য চার দেয়াল, ছাদ, দরজা-জানালা বিশিষ্ট ঘর নির্মাণ করা, কিন্তু সে এগুলো নির্মাণের পূর্বে ভিত্তি বা স্তম্ভ তৈরি করে যার বেশ কিছু অংশ মাটির নীচে গ্রোথিত করে যদিও এটি তার লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু সে এটা করে যাতে করে দালানের ভিত্তি মজবুত হয় এবং তা ভেঙ্গে না পড়ে। এজন্যই ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ কমিউনিজম কতগুলো চিন্তা ও বিশ্বাসের সমষ্টি যার ভিত্তি বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নৈতিকতা সম্পর্কিত মৌলিক কাঠামোটি বস্তুবাদের মৌলিক চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তির উপর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু একজন কমিউনিস্টের এটা লক্ষ্য নয় অর্থাৎ বস্তুবাদ তার লক্ষ্যও নয় এবং তার নিকট এর মৌলিকত্বেরও মূল্য নেই। (প্রকৃতপক্ষে যাঁরা বস্তুবাদের ফাঁদে পা দিয়েছেন তা গীর্জাসমূহের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাসমূহ, বিশেষত স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে যুক্তিহীন দ্বন্দ্বের কারণে। যার ফলে ইউরোপে এ চিন্তার উদ্ভব ঘটেছিল যে, হয় মানুষ স্বাধীন হয়ে সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ঈশ্বরকে দূরে ছুঁড়ে ফেলুক নতুবা নিজেকে অধিকারহীন ও বন্দি বলে জানুক। এর জন্য সর্বোত্তম পথ হিসেবে ধর্মের মূলোৎপাটনকে গ্রহণ করেছিল।)</p>
<p>কিন্তু সে চিন্তা করে (ভুল চিন্তা করে) বস্তুবাদ ব্যতীত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মৌল চিন্তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আর তা ব্যাখ্যা করার জন্যই বস্তুবাদের মৌলিক চিন্তাকে গ্রহণ করে। সম্প্রতি পৃথিবীতে কয়েকজন কমিউনিস্ট ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে যাঁরা বস্তুবাদকে কমিউনিজম থেকে পৃথক মনে করেন। তাঁরা বলেন, &#8220;আমাদের জন্য বস্তুবাদ কোন মৌলিকত্ব তো রাখেই না, বরং বস্তুবাদকে এক অখণ্ডনীয় মৌলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার কোন প্রয়োজনই নেই। আমরা কমিউনিজম চাই যদিও তাতে বস্তুবাদের অস্তিত্ব না থাকে।&#8221; বর্তমানে পৃথিবীর আনাচে কানাচে অনেক কমিউনিস্ট নেতাই ধর্মের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি পরিহার করার কথা বলছেন।</p>
<p>এটা এ কারণে যে, তাঁদের জন্য এ মৌল চিন্তার প্রতি বিশ্বাসের কোন মৌলিকত্ব নেই। এটা শুধু চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি ব্যতীত কিছু নয়। যেহেতু জীবনাদর্শ বিশ্বদৃষ্টি ব্যতীত সম্ভব নয় সেহেতু এ বিশ্বদৃষ্টিকে (বস্তুবাদ) দালানের নীচে স্থাপন করা হয় যাতে করে জীবনাদর্শ স্থাপিত ও অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো জীবনাদর্শ।</p>
<p>কিন্তু ইসলামে কিরূপ? ইসলাম কি ইসলামী বিশ্বাস, যেমন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস, নবী ও ওলীদের প্রতি বিশ্বাস, কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস এগুলোকে শুধু এজন্য বর্ণনা করেছে যে, চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে? ইসলাম কি এজন্য এ মৌল চিন্তাসমূহকে উপস্থাপন করেছে যাতে করে জীবনাদর্শকে এ মৌল চিন্তার উপর ভিত্তি করে স্থাপন করতে পারে এবং এটাই (জীবনাদর্শই) তার উদ্দেশ্য? যদি তা-ই হয় তবে এ মৌল চিন্তার (ঈমান) কোন মৌলিকত্ব নেই। না, এমনটি নয়। এ মৌল চিন্তা ইসলামী জীবনাদর্শিক চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি বটে, তবে তার মূল্য শুধু ভিত্তি হিসেবে নয়। ঈমান চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি এবং ইসলামী জীবনাদর্শ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ঈমান ভিত্তি হিসেবে মূল্য ছাড়াও মৌলিকত্বের অধিকারী ও লক্ষ্য হিসেবেও পরিগণিত।</p>
<p>সুতরাং এ ক্ষেত্রে দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক যে, ঈমান শুধু আমলের পূর্বশর্ত হিসেবে নয় বরং এর মৌলিকত্বের কারণে মূল্যের অধিকারী। এ রকম নয় যে, শুধু কর্ম ও প্রচেষ্টাই সব কিছু। বরং যদি আমল থেকে ঈমানকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, একটি ভিত্তিকে নষ্ট করা হলো। তেমনিভাবে যদি আমলকে ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় অন্য স্তম্ভটি ধ্বংস করা হলো। এজন্যই কোরআন সব সময় বলেছে, ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَٰتِ &#8220;যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে।&#8221; যদি আমলহীন ঈমান হয়, তবে সেখানে সাফল্যের একটি স্তম্ভ আছে, অন্যটি অনুপস্থিত। অপর দিকে ঈমানহীন আমলও তদ্রূপ।</p>
<p>সাফল্যের তাঁবু একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানের সত্তাগত মূল্য ও মৌলিকত্ব রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের পূর্ণতা এ পৃথিবীতে এবং বিশেষত আখেরাতে এটাই যে, সে ঈমানের অধিকারী। কারণ ইসলামে আত্মা স্বাধীন এবং পূর্ণতার অধিকারী, তার মৃত্যু নেই। যদি আত্মা (ঈমানের মাধ্যমে) পূর্ণতায় না পৌঁছায়, অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত হয় তাহলে কখনই সফলতায় পৌছতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কোরআন</strong> <strong>ও</strong> <strong>নাহজুল</strong> <strong>বালাগাহ্</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>এর</strong> <strong>সপক্ষে</strong> <strong>দলিল</strong></h4>
<p>কোরআন এ বিষয়ে বলছে,</p>
<blockquote><p>وَمَن كَانَ فِي هَٰذِهِۦٓ أَعۡمَىٰ فَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ أَعۡمَىٰ وَأَضَلُّ سَبِيلٗا</p>
<p>&#8220;যে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে অন্ধ, আখেরাতেও সে অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।” (সূরা ইসরা: ৭২)</p></blockquote>
<p>ইমামগণ এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এর তাফসীরে বলেছেন, এর অর্থ এমন নয় যে, কারো বাহ্যিক এ চক্ষু পৃথিবীতে অন্ধ হলে আখেরাতেও সে অন্ধ থাকবে। যদি এরূপ হতো, তবে আবু বাসির যিনি ইমাম সাদিক (আ.)-এর একজন অন্ধ সাহাবী ছিলেন তিনি পরকালীন দুনিয়াতেও শোচনীয় অবস্থায় পড়বেন। না, বরং এর অর্থ হলো যে, কারো অন্তর্চক্ষু যদি সত্যকে, তার স্রষ্টাকে, মহান আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং অন্যান্য যে সব বিষয়ে ঈমান বা বিশ্বাস থাকা উচিত তা থেকে অন্ধ হয়, তবে সে আখেরাতে অন্ধ হিসেবে পুনরুত্থিত হবে, এর অন্যথা সম্ভব নয়। যদি ধরে নিই, এ পৃথিবীতে একজন মানুষ যত প্রকার ভালো কাজ করা সম্ভব তা করে, সৎকর্মের আদেশ ও অসৎকর্মের নিষেধের দায়িত্ব পালন করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দুনিয়াবিরাগী ব্যক্তির ন্যায় জীবন যাপন করে, সে সাথে নিজের জীবনকে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য নিবেদিত করে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না, পরকাল ও ইহকালকে চেনে না- এরূপ ব্যক্তি অন্ধ, তাই পরকালীন দুনিয়াতেও সে অন্ধ।</p>
<p>সুতরাং এটা ঠিক নয় যে, ঈমান শুধু চেষ্টা-প্রচেষ্টার পূর্ব প্রস্তুতি এবং ব্যক্তির আমল ঠিক হলেই চলবে, ঈমানের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের কথা অর্থহীন। ফখরে রাজী বলেন,</p>
<p>&#8220;আশংকা আমার,</p>
<p>চলে যাব বিশ্বের প্রাণ না দেখে,</p>
<p>চলে যাব বিশ্ব ছেড়ে বিশ্বকে না দেখে,</p>
<p>দেহের বিশ্ব ছেড়ে যাব মনের বিশ্বে ও প্রাণে,</p>
<p>দেহের বিশ্বে মনের বিশ্ব না দেখেই তাঁর পানে।&#8221;</p>
<p>অর্থাৎ আমার আশংকা এটি যে, এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, অথচ তা এ বিশ্বকে না দেখেই। তাঁর এ কথার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, বিশ্ব বলতে পৃথিবীর মাটি, পাহাড়, সমুদ্র, তারকারাজি আর ঘরবাড়ি বোঝাচ্ছেন এবং এ সব না দেখেই চলে যাওয়ার জন্য চিন্তিত, বরং তাঁর আশংকা হলো এখানে যে, তাঁর অন্তর্চক্ষু উন্মোচিত যদি না হয় তবে বিশ্বের প্রাণ, এর উৎস ও সৃষ্টিকর্তাকে অনুধাবন- যাকে ইসলাম ঈমান বলেছে তা না করেই এ বিশ্ব ছেড়ে চলে যাবেন। তিনি বলছেন, যদি এ দেহের বিশ্বে মনের বিশ্বকে অনুভব না করি, তবে যখন দেহের বিশ্ব ছেড়ে প্রাণ ও মনের বিশ্বে গমন করব তা কিরূপে অনুভব করব? যেখানে সম্ভব ছিল সেখানেই পারিনি, তাই আফসোস। এ দু&#8217;টি পঙতিতে কোরআনের উপরোক্ত এ আয়াতেরই অর্থ করেছেন।</p>
<p>কোরআন অন্য একটি আয়াতে বলছে,</p>
<blockquote><p>قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِيٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرٗا</p>
<p>قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ</p>
<p>(সূরা ত্বাহা: ১২৫-১২৬)</p></blockquote>
<p><strong><em>কিয়ামতের</em></strong> <strong><em>দিন</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>বান্দাকে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>হিসেবে</em></strong> <strong><em>পুনরুত্থিত</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>হবে</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>প্রতিবাদ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>বলবে</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>প্রভু</em></strong><strong><em>! </em></strong><strong><em>কেন</em></strong> <strong><em>আমাকে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>পুনরুত্থিত</em></strong> <strong><em>করেছেন</em></strong><strong><em>? </em></strong><strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>পৃথিবীতে</em></strong> <strong><em>চক্ষুষ্মান</em></strong> <strong><em>ছিলাম</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>কেন</em></strong> <strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong><strong><em>? </em></strong><strong><em>তার</em></strong> <strong><em>প্রতি</em></strong> <strong><em>বলা</em></strong> <strong><em>হবে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>পৃথিবীতে</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>চক্ষুর</em></strong> <strong><em>অধিকারী</em></strong> <strong><em>ছিলে</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>এখানের</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>প্রযোজ্য</em></strong> <strong><em>নয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্য</em></strong> <strong><em>রকম</em></strong> <strong><em>চক্ষুর</em></strong> <strong><em>প্রয়োজন</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তোমার</em></strong> <strong><em>যে</em></strong> <strong><em>চক্ষু</em></strong> <strong><em>ছিল</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>নিজেই</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong> <strong><em>করেছ</em></strong> <strong><em>তাই</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>এখানে</em></strong> <strong><em>অন্ধ</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8220;</em></strong> أنك آيائنا আমাদের নিদর্শনসমূহ এ পৃথিবীতে ছিল, তুমি এ নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে আমাদের দেখা, অনুধাবন এবং সত্যকে উদ্ঘাটনের পরিবর্তে সেখানে নিজেকে অন্ধ করে রেখেছিলে। সেজন্যই প্রকৃত বিশ্বে এসে অন্ধ হিসেবে পুনরুত্থিত হয়েছ।</p>
<p>সূরা মুতাফফিফীন বলছে,</p>
<blockquote><p>كَلَّآ إِنَّهُمۡ عَن رَّبِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ لَّمَحۡجُوبُونَ</p>
<p>&#8220;কখনই নয়, নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালক হতে সেদিন পর্দাবৃত থাকবে।&#8221; (সূরা মুতাফফিফীন : ১৫)</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ এদের পরিত্যাগ কর। এদের উচিত ছিল পৃথিবীতে তাদের চক্ষুর সম্মুখ হতে গাফিলতির পর্দা উন্মোচন করা ও দেখা। ঈমানের অর্থ এটাই- হে মানুষ! তুমি এ পৃথিবীতে আগমন করেছ যাতে এ পৃথিবীতেই চক্ষুর মাধ্যমে ঐ পৃথিবীকে দেখতে ও কর্ণের মাধ্যমে ঐ পৃথিবীকে শ্রবণ কর।</p>
<p>আমি সব সময়ই এজন্য আনন্দিত যে, আমাদের যুবকরা বিশেষ করে নাহজুল বালাগার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দান করছে। নাহজুল বালাগার বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। দেখবে নাহজুল বালাগাহ্ এরূপ চক্ষু ও কর্ণ সম্পর্কে কি বলে।</p>
<p>নাহজুল বালাগাহ্ ঈমানের ক্ষেত্রে মৌলিকত্বে বিশ্বাসী। ঈমানের মূল্য শুধু চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং চিন্তা ও ভিত্তি ছাড়াও মৌলিক হিসেবে নাহজুল বালাগাহ্ ঈমানকে উল্লেখ করেছে।</p>
<p>আলী (আ.) নাহজুল বালাগায় আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের (আহলুল্লাহ্) সম্পর্কে বলেন,</p>
<blockquote><p>يَتَنَسَّمُونَ بِدُعَائِه روح التجاوز</p>
<p>&#8220;এরা এমন বান্দা যে, যখন তারা দোয়া করে ও তওবায় নিমজ্জিত হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্তির সমীরণ নিজেদের মধ্যে অনুভব করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>আলী (আ.) আরো বলেন,</p>
<blockquote><p>إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَعَلَ الذِّكْرَ حِلاءً لِلْقُلُوْبِ تَسْمَعُ بِهِ بَعدَ الوقرة وَ تُبْصِرُ بِهِ بَعْدَ الْعَشْوَةِ وَ تَنقَادُ بِهِ بَعْدَ الْمَعَائِدَةِ وَ مَا بَرِحَ اللَّه عَزَّتْ الأَؤُهُ فِي الْبُرْهَةِ بَعْدَ الْبُرْهَةِ وَ فِي أَزْمَانَ الفَتَرَتِ عِبَادٌ نَاجَاهُمْ فِي فِكْرِهِمْ وَ كَلَّمَهُمْ فِي ذَاتِ عُقُولِهِمْ</p></blockquote>
<p><strong>&#8220;নিশ্চয় মহান আল্লাহ্ তাঁর স্মরণকে মানুষের আত্মার উজ্জ্বলতার কারণস্বরূপ করেছেন, যে কারণে (আত্মার স্বচ্ছতার কারণে) সে বধিরতার পর শ্রবণশক্তি, অন্ধত্বের পর দৃষ্টিশক্তি লাভ করে এবং নাফরমানীর পর আনুগত্যের পথ গ্রহণ করে, সকল অবস্থায় অফুরন্ত নেয়ামত দানকারী আল্লাহর জন্য নিজেকে নিবেদিত করে। সকল কালেই একদল ব্যক্তি রয়েছে যাদের চিন্তার মাধ্যমে আল্লাহ্ গোপন রহস্যের ভেদ উন্মোচন করেন। আর আকলের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলেন।” (নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ২২২)</strong></p>
<p>সুতরাং আমি এখানে যে বিষয়টি বলতে চাই তা হলো আল্লাহর পরিচয় জানা, তাঁর ফেরেশতাদের পরিচয় জানা (যাঁরা অস্তিত্বজগতের জন্য মাধ্যম), তাঁর প্রেরিত নবী ও আউলিয়াগণের পরিচয় জানা (যাঁরা অন্য একভাবে আল্লাহর নেয়ামত সৃষ্টির নিকট পৌছানোর মাধ্যম), আমাদের এ পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্যকে জানা, আখেরাত ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনকে জানা এ সবই মৌলিক। সত্যের প্রতি ঈমান যেমন মৌলিক তেমনি তা চিন্তা, বিশ্বাস ও ইসলামী জীবনাদর্শের ভিত্তিও বটে। কেবল একশ&#8217; ভাগ মৌলিক এরূপ কোন ঈমানই পারে একটি জীবনাদর্শের জন্য সর্বোত্তম চিন্তা ও বিশ্বাসগত ভিত্তি হতে। সুতরাং কখনই আমলের জন্য যেমন ঈমানকে বিসর্জন দেয়া যুক্তিযুক্ত নয় তেমনি ঈমানের জন্য আমলকে বিসর্জন দেয়াও অযৌক্তিক। এদের কোনটিকেই অন্যটির জন্য বিসর্জন দেয়া যাবে না।</p>
<p>সুতরাং দর্শনের পূর্ণ মানব, পূর্ণ মানব নয় বরং অপূর্ণ মানব। অপূর্ণ মানবের অর্থ কি? অপূর্ণ মানব সে, যে পূর্ণতার অংশবিশেষ ধারণ করে। দর্শন বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতার ক্ষেত্রে মৌলিকত্বে বিশ্বাসী তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু দর্শনের পূর্ণ মানব মানবের পূর্ণতার অন্যান্য দিকগুলোকে উপেক্ষা করে শুধু আকলের পূর্ণতার মধ্যে তার পূর্ণতাকে খোঁজে। তাই এ মানব অপূর্ণ অথবা অর্ধপূর্ণ যা জ্ঞানের এক প্রতিমূর্তি বৈ কিছু নয়, জ্ঞান ব্যতীত সকল কিছু তার নিকট অনুপস্থিত। এরূপ মানব এমন এক অস্তিত্ব যে শুধু জানে, কিন্তু আবেগ, উত্তাপ ও গতিহীন এবং সৌন্দর্য বিমুখ। যে অস্তিত্বের সমগ্র শিল্প শুধু জ্ঞানের মধ্যে নিহিত সে অস্তিত্ব এক বিচ্ছিন্ন বিশ্বের মত পরিত্যক্ত। এটি ইসলামের পূর্ণ মানব নয় বরং ইসলামের অর্ধ মানব।</p>
<p>আকল ও বুদ্ধিবৃত্তির মূল্যের ক্ষেত্রে ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর হাদীসটি আপনাদের জন্য ব্যাখ্যা করার সময় হলো না। এ প্রসঙ্গে প্রচুর কথা রয়েছে। যদি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই তাহলে আরো দু&#8217;টি বৈঠক প্রয়োজন। সে সময় হাতে নেই বলে বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ সম্পর্কিত আলোচনা এখানেই শেষ করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/discussion-of-intellectual-doctrine/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15526</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/insan-al-kamil-from-the-point-of-view-of-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/insan-al-kamil-from-the-point-of-view-of-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 28 Jan 2025 06:26:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15456</guid>

					<description><![CDATA[و إذ ابتلى إبراهيم ربه بكلمات فأتمهن قال إني جاعلك للناس إماماً قال و من ذريتي قال لا ينال عهدي الظالمين আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল বা পূর্ণ মানব। ইনসানে কামেল অর্থ আদর্শ মানুষ, সর্বোত্তম মানুষ বা সর্বশ্রেষ্ঠ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<blockquote><p><strong>و إذ ابتلى إبراهيم ربه بكلمات فأتمهن قال إني جاعلك للناس إماماً قال و من ذريتي قال لا ينال عهدي الظالمين</strong></p></blockquote>
<p>আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল বা পূর্ণ মানব। ইনসানে কামেল অর্থ আদর্শ মানুষ, সর্বোত্তম মানুষ বা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। অন্যান্য বস্তু বা জিনিসের মত মানুষেরও পূর্ণতা ও অপূর্ণতা রয়েছে, এমনকি ত্রুটিযুক্ত ও ত্রুটিহীন হওয়ার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। ত্রুটিমুক্ত মানুষ আবার দু&#8217;ধরনের পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মানুষ এবং অপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মানুষ। পূর্ণ বা আদর্শ মানুষকে চেনা ইসলামের দৃষ্টিতে আমাদের প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ যদি আমরা পূর্ণ মুসলমান হতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের জানতে হবে পূর্ণ মানবের রুপ কী। যেহেতু ইসলাম চায় পূর্ণ মানব তৈরি করতে এবং ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূর্ণ মানব গড়ে তুলতে, সুতরাং আদর্শ মানুষের নমুনা আমাদের সামনে থাকতে হবে। এখানে আমরা পূর্ণ মানবের প্রকৃতি, তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করছি। সে কেমন প্রকৃতির, তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতি কেমন, একজন পরিপূর্ণ মানুষের চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যসমূহ কী? যদি আমরা তা জানতে পারি তবেই নিজেকে ও সমাজকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারব। যদি আমরা পরিপূর্ণ মানুষকে চিনতে না পারি তাহলে কোনক্রমেই পূর্ণ মুসলমান হতে পারব না। অন্যভাবে বলা যায় যে, আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে একজন অপূর্ণ মানুষে পরিণত হব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইসলামের</strong> <strong>দৃষ্টিতে</strong> <strong>পূর্ণ</strong> <strong>মানব</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেলকে</strong> <strong>চেনার</strong> <strong>উপায়</strong></h4>
<p>ইসলামের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ মানুষকে চেনার জন্য দু&#8217;টি পথ রয়েছে। <strong>একটি</strong> <strong>পথ</strong> <strong>হচ্ছে</strong>, প্রথমত আমরা দেখব ‘কোরআন’ ও দ্বিতীয়ত ‘সুন্নাত’ ইনসানে কামেলকে কিভাবে বর্ণনা করেছে। যদিও কোরআন ও সুন্নাতে এভাবে ইনসানে কামেলের ব্যাখ্যা করা হয়নি, বরং পরিপূর্ণ মুসলমান ও পূর্ণ মুমিনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে এটা স্পষ্ট যে, পরিপূর্ণ মুসলমান অর্থ- যে মানব ইসলামের মধ্যে দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছেছে এবং পরিপূর্ণ মুমিন সে-ই যে ঈমানের ছায়ায় পরিপূর্ণতায় পৌছেছে। আমাদের অবশ্যই দেখতে হবে কোরআন ও সুন্নাত পরিপূর্ণ মানুষকে কিভাবে বর্ণনা করেছে। কুরাআনে পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিকৃতির বিষয়ে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে।</p>
<p><strong>পরিপূর্ণ</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>চেনার</strong> <strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>পদ্ধতি</strong>&#8211; এ পদ্ধতিতে কোরআন ও সুন্নাতে পরিপূর্ণ মানুষ সম্পর্কে কিরূপ বর্ণনা এসেছে তা থেকে নয়, বরং ঐ সকল ব্যক্তিকে তাঁদের জীবনী থেকে চিনব যাঁদের উপর আমরা আস্থা লাভ করেছি যে, ইসলাম ও কোরআন যেভাবে চায় তাঁরা সেভাবে গড়ে উঠেছেন। ইসলামের পূর্ণ মানুষের হুবহু প্রতিকৃতি হলেন তাঁরা। যেহেতু ইসলামের পরিপূর্ণ মানুষ শুধু আদর্শিক, কল্পনা ও চিন্তাগত কোন বিষয় নয় যে, বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকবে না। পরিপূর্ণ মানুষ সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন উভয় পর্যায়েই বাস্তবে অস্তিত্ব লাভ করেছে।</p>
<p>মহানবী (সা.) নিজেই পূর্ণ মানবের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। হযরত আলী (আ.) অন্য এক পূর্ণ মানবের নমুনা। আলী (আ.)-কে চেনার অর্থ পরিপূর্ণ মানুষেকে চেনা। কিন্তু <strong>হযরত</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>চেনা</strong> <strong>এটা</strong> <strong>নয়</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>তাঁর</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>পত্র</strong> <strong>জানা</strong><strong>।</strong> কখনো মানুষ হযরত আলীকে পরিচয় পত্র থেকে চিনে যে, তাঁর নাম আলী, আবু তালিবের পুত্র, আবু তালিব আবদুল মুত্তালিবের পুত্র, মাতা ফাতেমা যে আসাদ ইবনে আবদুল ওজ্জার কন্যা, হযরত আলী মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমার সহধর্মী, হাসান ও হুসাইনের পিতা, অমুক বছর জন্মগ্রহণ করেছেন, অমুক বছর শাহাদাত বরণ করেছেন, অমুক অমুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন- এগুলো আলীর পরিচয় জানা। অর্থাৎ যদি চাই আলীর জন্য একটি পরিচয় পত্র তৈরি করব ও পরিচয় পত্র সম্পর্কে জানব তবে তা এরূপই হবে। কিন্তু <strong>হযরত</strong> <strong>আলীর</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>পত্র</strong> <strong>জানা</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>জানা</strong> <strong>নয়</strong> <strong>বা</strong> <strong>একজন</strong> <strong>পরিপূর্ণ</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>চেনাও</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>জানা</strong> <strong>তাঁর</strong> <strong>ব্যক্তিত্বকে</strong> <strong>জানা</strong><strong>, </strong><strong>ব্যক্তি</strong> <strong>আলীকে</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong></p>
<p>আলীর সম্মিলিত ব্যক্তিত্বের যতটুকু আমরা জানব, ইসলামের পরিপূর্ণ মানুষকে ততটুকু চিনব। আর শুধু নাম ও শাব্দিক অর্থে নয়, বরং কার্যক্ষেত্রে পূর্ণ মানুষকে যতটুকু অনুসরণ করেছি তাঁকে সে পরিমাণ ইমাম বা নেতা হিসেবে মেনেছি ও তাঁর পথে চলেছি; তাঁর অনুসারী ও অনুগামী হয়েছি ও যতটুকু চেষ্টা করছি নিজেকে সেই আদর্শ অনুযায়ী তৈরি করতে ঠিক সেই পরিমাণ এ কামেল পুরুষের অনুসারী হয়েছি। যেহেতু শহীদ (একজন ব্যক্তি) লোমআ গ্রন্থে الشيعة من شايع علياً -এ বাক্যের অর্থ করতে গিয়ে বলেন, &#8220;শিয়া ঐ ব্যক্তি যে আলীর সহযাত্রী হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বলার মাধ্যমে শিয়া হবে না (যে আমি শিয়া), নাম ধারণ করলেই শিয়া হবে না, শুধু ভালবাসা ও পছন্দের দাবিতে শিয়া হবে না। তাহলে কিভাবে শিয়া হবে? সহযাত্রী হয়ে অর্থাৎ পদানুসরণের মাধ্যমে। যখন কেউ একজন যে পথে চলে আপনি তার পেছনে পেছনে বা সঙ্গে যাবেন আপনাকে তার সহযাত্রী বা পদাঙ্কনুসারী বলা হবে। আলীর শিয়া অর্থ আলীর কর্মের পদাঙ্কনুসারী।</p>
<p>তাহলে পূর্ণ মানবকে চেনার দু&#8217;টি পথ ও সেইসাথে এ সম্পর্কে আলোচনার উপকারিতাও জানতে পারলাম। সুতরাং ইনসানে কামেল বিষয়টি শুধু একটি দার্শনিক ও জ্ঞানগত বিষয় নয়। যদি ইসলামের পূর্ণ মানবকে কোরআন ও সুন্নাতের বর্ণনা থেকে ও কোরআন দ্বারা পরিবর্ধিত রূপে না জানি তাহলে ইসলাম নির্দেশিত পথে চলতে পারব না এবং প্রকৃত ও সত্যিকারের মুসলমান হতে পারব না। অনুরূপ আমাদের সমাজও একটি ইসলামী সমাজ হতে পারবে না। সুতরাং ইসলামের পূর্ণ, শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যের মানুষকে চেনা জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কামেল</strong> <strong>ও</strong> <strong>তামামের</strong> <strong>পার্থক্য</strong></h4>
<p>এখন প্রশ্ন হলো &#8216;কামেল&#8217; (کامل ) এর প্রকৃত অর্থ কি? &#8216;ইনসানে কামেল&#8217;-এর অর্থই বা কি?</p>
<p>আরবী ভাষায় এ দু&#8217; শব্দের অর্থ কাছাকাছি হলেও এক নয়; যদিও দু&#8217;টিরই বিপরীত শব্দ এক অর্থাৎ শব্দটি কখনো প্রথমটির বিপরীত শব্দ হিসেবে আবার কখনো দ্বিতীয়টির বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এমনকি ফার্সীতে ঐ দু&#8217;টি শব্দের পরিবর্তে একটি শব্দই রয়েছে। ঐ দু&#8217;টি শব্দ আরবীতে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলেও কামেল এবং তামাম দু&#8217;টিরই বিপরীত শব্দ ناقص (অসম্পূর্ণ)। যেমন ফার্সীতে বলা হয়: এটা کامل বা সম্পূর্ণ এবং ওটা ناقص বা অসম্পূর্ণ; তেমনি বলা হয়, এটা تمام ওটা ناقص।</p>
<p>আল কোরআনের একটি আয়াতে এ দু&#8217;টি শব্দই এসেছে-</p>
<p>اليوم أكملت لكم دينكم و أتممت عليكم نعمتي</p>
<p>&#8220;আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামতকে তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করলাম।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৩)</p>
<p>এখানে এটা বলা হয়নি যে,  أكملت لكم نعمتي له أتممت عليكم دينكم,যদি তা বলা হতো, তবে আরবী ব্যাকরণে ভুল বলে গণ্য হতো। এখন এ দু&#8217;শব্দের পার্থক্য কি? যদি আমরা এ দু&#8217;য়ের পার্থক্যকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ না করি তাহলে আমাদের আলোচনা শুরু করতে পারব না। অর্থাৎ আমাদের আলোচনার শুরু হবে এ দু&#8217;শব্দের অর্থ জানার মাধ্যমে।</p>
<p>&#8216;تمام&#8217; কোন বস্তুর জন্য তখনই বলা হবে যখন ঐ বস্তুর বাস্তব অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছুই অস্তিত্বে এসে থাকে। অর্থাৎ যদি তা থেকে কিছু জিনিস অনুপস্থিত থাকে, তবে বস্তুটি ঐ বস্তু হওয়ার ক্ষেত্রে অপূর্ণ অথবা বলা যায় বস্তুটি তার অস্তিত্বের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ। যেমন অর্ধেক অস্তিত্ব লাভ করেছে, এক-তৃতীয়াংশ অস্তিত্ব লাভ করেছে বা দুই-তৃতীয়াংশ অস্তিত্ব লাভ করেছে ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ একটি পরিকল্পিত মসজিদের বিল্ডিংয়ের জন্য হলরুম দরকার। রুমের জন্য দেয়াল, ছাদ, দরজা, জানালা ও অন্যান্য জিনিস প্রয়োজন। যদি ঐ বিল্ডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় এ সকল অংশ বিদ্যমান না থাকে তবে ঐ বিল্ডিং ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। যখন প্রয়োজনীয় সব কিছু বিদ্যমান থাকবে তখন বলা যাবে বিল্ডিং সম্পূর্ণ (তামাম) হয়েছে। এ শব্দের বিপরীত স্থানকে নির্দেশ করতে অসম্পূর্ণ বা নাকিস ব্যবহার করা হয়। কোন বস্তু সম্পূর্ণতা লাভ করলেই তা পূর্ণতা লাভ করেছে বলা যায় না, বরং বস্তুটি হয়তো কখনো এর থেকে এক স্তর উপরের পর্যায়ের, কখনো কয়েক স্তর উপরের পর্যায়ের পূর্ণতা লাভ করে, এভাবে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। যদি এই کمال বা পূর্ণতা ঐ বস্তুর না থাকে তবুও তা ঐ বস্তুরই। কিন্তু পূর্ণতা লাভ করার অর্থ তা থেকে এক স্তর উপরে উঠা।</p>
<p>কামাল বা পূর্ণতাকে আড়াআড়ি বা সমান্তরালভাবে বর্ণনা করা হয়। যখন বস্তু সমান্তরালভাবে শেষ প্রান্তে বা পরিসীমায় পৌঁছায় তখন বলা হয় সম্পূর্ণ হয়েছে এবং বস্তু যখন লম্বিকভাবে উপরের দিকে বাড়তে থাকে বা উন্নতি লাভ করে তখন বলা হয় &#8216;পূর্ণতা&#8217; লাভ করেছে। যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির বুদ্ধি (আকল) পূর্ণতা লাভ করেছে, এর অর্থ পূর্বেও তার বুদ্ধি ছিল, কিন্তু তার বুদ্ধি পূর্বের চেয়ে উপরের পর্যায়ে পৌঁছেছে বা পরিপক্ক হয়েছে। অথবা যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করেছে তাহলে এর অর্থ পূর্বেও তার জ্ঞান ছিল ও সে তা ব্যবহার করত, কিন্তু এখন তার জ্ঞান পূর্ণতার এক স্তর অতিক্রম করেছে। সুতরাং আমরা দেখছি, একজন সম্পূর্ণ মানুষ আছে যার বিপরীতে সমান্তরালভাবে চিন্তা করে অসম্পূর্ণ মানুষও আছে অর্থাৎ অর্ধেক মানুষ বা মানুষের ভগ্নাংশ। উদাহরণস্বরূপ এক-তৃতীয়াংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ সম্পূর্ণ মানুষ নয়। অন্য এক প্রকার মানুষও আছে যে মানুষ সম্পূর্ণ ও এই সম্পূর্ণ মানুষ পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হতে পারে- এভাবে সর্বোচ্চ পরিসীমা পর্যন্ত যার উপর কোন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারে না যাকে পরিপূর্ণতম বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষ বলা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেলের</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong></h4>
<p><strong>সপ্তম</strong> <strong>হিজরী</strong> <strong>শতাব্দী</strong> <strong>পর্যন্ত</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>সাহিত্যে</strong> <strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেলের</strong> <strong>কোন</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>ছিল</strong> <strong>না</strong><strong>।</strong> <strong>বর্তমানে</strong> <strong>ইউরোপেও</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>সর্ম্পকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>প্রচলিত</strong> <strong>থাকলেও</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>বিশ্বে</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>সর্ম্পকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>ভাষা</strong> <strong>সপ্তম</strong> <strong>হিজরীতে</strong> <strong>ব্যবহৃত</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong> <strong>যিনি</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>সর্ম্পকে</strong> <strong>প্রথম</strong><strong> &#8216;</strong><strong>ইনসানে</strong> <strong>কামেল</strong><strong>&#8216; </strong><strong>শব্দটি</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করেছেন</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>হলেন</strong> <strong>বিখ্যাত</strong> <strong>আরেফ</strong> <strong>মহিউদ্দিন</strong> <strong>ইবনে</strong> <strong>আরাবী</strong><strong>।</strong> <strong>ইবনে আরাবী</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>ইরফানের</strong><strong> (</strong><strong>আধ্যাত্মিকতার</strong><strong>) </strong><strong>জনক</strong><strong>।</strong> <strong>সপ্তম</strong> <strong>হিজরীর</strong> <strong>পর</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>যত</strong> <strong>আরেফ</strong> <strong>এসেছেন</strong><strong>, </strong><strong>প্রায় সকলেই তার ছাত্র ছিলেন।</strong> যেমনঃ ইরানী ও ফার্সী ভাষার আরেফগণ সকলেই ইবনে আরাবীর ছাত্র। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী ইবনে আরাবীর মক্তবের ছাত্র। রুমী তাঁর সকল মর্যাদাসহ ইরফানের দৃষ্টিতে ইবনে আরাবীর তুলনায় কিছুই নন। ইবনে আরাবী আরব জাতিভুক্ত ও হাতেম তায়ীর বংশধর এবং আন্দালুসের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর সকল ভ্রমণ ইসলামী দেশসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি সিরিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর দামেস্কে। সিরিয়ায় (পূর্বনাম শাম) মৃত্যুবরণ করা ও সেখানে দাফন হওয়ায় তাঁকে শামী বলা হয়।</p>
<p>তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সদরুদ্দিন কৌনাভী তাঁর পরে সবচেয়ে বড় আরেফ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে ইরফান যে একটি জ্ঞানের রূপে এসেছে তা শুধু মহিউদ্দিন আরাবী ও সদরুদ্দীন কৌনাভীর কর্মপ্রচেষ্টার ফলেই। সদরুদ্দিন কৌনাভী তুরস্কের কৌনীর বাসিন্দা ও ইবনে আরাবীর স্ত্রীর পূর্ববতী স্বামীর ঔরসজাত পুত্র ছিলেন। অর্থাৎ মহিউদ্দীন তাঁর শিক্ষকও ছিলেন আবার সৎ পিতাও। জালালুদ্দিন রুমী সদরুদ্দিন কৌনাভীর সমসাময়িক ছিলেন। সদরুদ্দিন একটি মসজিদের জামায়াতের ইমাম ছিলেন। রুমী সেখানে যেতেন ও তাঁর পেছনে নামাজ পড়তেন। ইবনে আরাবীর চিন্তা সদরুদ্দিনের মাধ্যমে মৌলভীর কাছে স্থানান্তরিত হয়েছিল।</p>
<p>অন্যতম যে বিষয়টি তিনি উপস্থাপন করেন তা ইনসানে কামেল সম্পর্কিত। তবে তিনি বিষয়টি ইরফানের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে &#8216;সাহেবে মানজুমে&#8217; খ্যাত মাহমুদ সাব্যস্তকারীর সবচেয়ে উন্নত ও মূল্যবান সাহিত্যমান সম্পন্ন বই &#8216;গুলশানে রজ&#8217;-এ যে প্রশ্নগুলো ইনসানে কামেলের ব্যাপারে এসেছে, সদরুদ্দিন ইরফানের দৃষ্টিতে সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। সুতরাং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ বিষয়টি &#8216;ইনসানে কামেল&#8217; শিরোনামে উপস্থাপন করেছেন ও ইরফানের আলোকে বর্ণনা করেছেন। অন্যরাও ইনসানে কামেলকে নিজস্ব রূপে বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আমরা দেখতে চাই ইনসানে কামেল কোরআনের দৃষ্টিতে কেমন মানুষ। আলোচনাকে &#8216;সম্পূর্ণ মানুষ&#8217; ও &#8216;অসম্পূর্ণ মানুষ&#8217; দিয়ে শুরু করছি যেন এ বিষয়ের উপর পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>শারিরীক</strong> <strong>ও</strong> <strong>মানসিক</strong> <strong>ত্রুটি</strong></h4>
<p>আমাদের মধ্যে কি ত্রুটিহীন এবং ত্রুটিযুক্ত মানুষও রয়েছে? সুস্থতা ও অসুস্থতা কখনো কখনো মানুষের দেহের সাথে সম্পর্কিত। সন্দেহ নেই যে, কিছু মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত এবং কিছু মানুষ ত্রুটিযুক্ত ও অসুস্থ। উদাহরণস্বরূপ শারীরিক ত্রুটি, যেমন দৃষ্টিহীনতা ও অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ব ও পক্ষাঘাতগ্রস্থতা প্রভৃতি। কিন্তু এগুলো ব্যক্তি-মানুষের সাথে সম্পর্কিত, মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নয়। কোন ব্যক্তি যদি অন্ধ, বধির, পঙ্গু, খাটো বা কুৎসিত চেহারার হন, এ ত্রুটিগুলোকে আপনি তার মর্যাদা, ব্যক্তিত্ব ও মনুষত্বের ক্ষেত্রে ত্রুটি হিসেবে দেখেন না। যেমন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস যাঁকে নবীদের পরবর্তী পর্যায়ের জ্ঞানী বলে ধরা হয় তিনি পৃথিবীর এক কদাকার মানুষ ছিলেন। কিন্তু কেউই তাঁর এ কদাকৃতিকে একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ত্রুটি বলে মনে করেন না। অথবা আবুল আলা মাযারি (আরব কবি) এবং ত্বাহা হোসেইন (মিশরীয় সাহিত্যিক) যাঁরা উভয়ই অন্ধ ছিলেন, তাঁদের এ শারীরিক ত্রুটি ব্যক্তিগত ত্রুটি হিসেবে পরিগণিত হলেও তাঁদের ব্যক্তিত্বের জন্য ত্রুটি বলে গণ্য হবে কি? অবশ্যই নয়। সুতরাং মানুষের ব্যক্তি দিক তার ব্যক্তিত্বের দিক হতে যে ভিন্ন তা প্রমাণিত সত্য। একটি তার দেহের সাথে, অন্যটি তার রূহের সাথে সম্পর্কিত। মনের বিষয় তার দেহ থেকে ভিন্ন। যাঁরা মনে করেন মানুষের মন একশ&#8217; ভাগ দেহের অনুগত তাদের ভুল এখানেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষের দেহ পুরোপুরি সুস্থ থাকলেও তার অন্তর কি অসুস্থ হতে পারে? এটা একটা প্রশ্ন। সুতরাং যাঁরা রূহ বা আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চান এবং রূহের সকল বৈশিষ্ট্যকে মানুষের স্নায়ুর সরাসরি প্রতিক্রিয়া বলে মনে করেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে বলতে চান যে, মন কিছুই নয়, সবই দেহের অনুগামী। তাঁদের মতে, মন অসুস্থ হওয়ার অর্থ তার দেহ অসুস্থ। অর্থাৎ মানসিক অসুস্থতা এবং দৈহিক অসুস্থতা একই।</p>
<p>এটা আনন্দের বিষয় যে, বর্তমানে এটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে একজন মানুষ শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে (যেমন শরীরে লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ দেহে ভিটামিনের পরিমাণ, পরিপাকতন্ত্রের মেটাবলিক কার্যক্রম, এমনকি নিউরোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে) সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারে। কিভাবে তা সম্ভব? আধুনিক পরিভাষায় একে &#8216;মানসিক জটিলতা&#8217; বলা হয়। আধুনিক বিজ্ঞান মানসিক জটিলতাসম্পন্ন মানুষকে অসুস্থ বলে মনে করে। এমন ব্যক্তির দেহে শারীরিক কোন জটিলতা সৃষ্টি না হয়েই মানসিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসা শারীরিকভাবে না করে মানসিকভাবে করতে হয়। যেমন অহংকার যা মানসিক জটিলতা থেকে উদ্ভুত, একটি রোগ বলে বর্তমানে প্রমাণিত তা প্রকৃতপক্ষেই একটি আত্মিক ও মানসিক রোগ। কিন্তু কোনো ঔষধের দোকানে অহংকার রোগের ঔষধ পাওয়া যাবে কি? কিংবা বাস্তবে এটা কি সম্ভব যে, অহংকারী ব্যক্তি একটি ট্যাবলেট খাবে আর সাথে সাথে তার অহংকার বিলুপ্ত হয়ে সে এক নিরহংকার ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যাবে? না, এটা কখনোই সম্ভব নয় যে, জল্লাদ ও পাষাণ হৃদয়ের মত কাউকে একটা ইনজেকশন পুশ করা হবে বা একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়া হবে আর সে রাতারাতি একজন দয়ালু, হৃদয়বান ও প্রশস্ত অন্তরের মানুষে পরিণত হয়ে যাবে। তবে এ ব্যাধিগুলোর চিকিৎসার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে যা এভাবে নয়।</p>
<p>এমনকি শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসাও কখনো কখনো মানসিকভাবে করা সম্ভব। যেমনভাবে কখনো কখনো মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা শারীরিকভাবে করা হয়ে থাকে। যেমন কোন রোগ হয়তো শারীরিক, কিন্তু মানসিক উদ্দীপনা ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়। এ বিষয়ে আলোচনা বেশ ব্যাপক এবং বিষয়টি আশ্চর্য হওয়ার মতোও বটে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মানুষ দেহ ও মনের সমন্বয়ে এক সৃষ্টি এবং মানুষের মন তার দেহ হতে স্বাধীন ও সম্পূর্ণরূপে দেহের অনুগামী নয়। তেমনিভাবে দেহও পুরোপুরি মনের অনুগামী নয়। তবে এরা একে অপরকে প্রভাবিত করে। জ্ঞানীদের ভাষায় দেহ ও মন একে অপরের উপর গঠনমূলক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ যেমনভাবে দেহ মনের উপর প্রভাব ফেলে তেমনভাবে মনও দেহের উপর প্রভাব ফেলে। সেই সাথে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবেও কাজ করে। তাই মানুষের মনোজগৎ একটি স্বাধীন জগতের অধিকারী।</p>
<p>আমরা পূর্ণ মানবের আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে ত্রুটিহীন ও ত্রুটিযুক্ত মানুষের বিষয়টি এনেছি এজন্য যে, আমাদের নিকট এটা পরিষ্কার হওয়া যে, আমাদের উদ্দেশ্য এখানে শারীরিক সুস্থতা বা ত্রুটি নয় এবং আমাদের উদ্দেশ্য এটাও নয় যে, মানব দেহ কতটা সুস্থ তা নিরীক্ষা করা। প্রকৃতপক্ষে তা দিয়ে আমাদের কাজও নেই। আমাদের লক্ষ্য হলো বাস্তবে এটা প্রমাণ করা যে, মানুষ যেমনভাবে মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারে তেমনিভাবে ত্রুটিযুক্ত ও অসুস্থও হতে পারে। কোরআন এ সত্যকে স্বীকৃতি দিয়ে বলছে, قلوهم مرض فزادهم الله مرضا  &#8220;তাদের অন্তরে অসুস্থতা রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ্ তাদের এ অসুস্থতাকে বৃদ্ধি করে দেন।&#8221; (সূরা বাকারাহ: ১০)</p>
<p>এখানে আল্লাহ্ বলছেন তাদের অন্তর রোগাক্রান্ত ও রূহ অসুস্থ, এটা বলেননি যে, তাদের চক্ষু অসুস্থ। এখানে লক্ষণীয় কোরআন হৃদয় বা অন্তর বলতে যা বুঝিয়েছে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড নয় যে, এর আরোগ্যের জন্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। কোরআনের বর্ণিত হৃদয় হলো মানুষের আত্মা ও মানস। যেমন কোরআন অন্যত্র বলছে,</p>
<p>نترل من القرآن ما هو شفاء ورحمة للمؤمنين</p>
<p>&#8220;আমরা কোরআনে যা কিছু অবতীর্ণ করেছি তা মুমিনদের জন্য আরোগ্য লাভের উপায় ও রহমতস্বরূপ।&#8221; (সূরা বনি ইসরাইল: ৮২)</p>
<p>সুতরাং কোরআন মুমিনদের জন্য আরোগ্য লাভের উপায়।</p>
<p>আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেন, الا وان من البلاء الفاقة  &#8220;জেনে রাখ, নিশ্চয়ই দারিদ্র্য একটি বড় বিপদ اشد من الفاقة مرض البدن এবং দারিদ্র্য হতে মন্দ শারীরিক অসুস্থতা اشد من مرض البدن مرض القلب  এবং শারীরিক অসুস্থতা হতে মন্দ ও কঠিন হলো অন্তরের অসুস্থতা।</p>
<p>কোরআনের অন্যতম পরিকল্পনা হলো সুস্থ মানুষ তৈরি। তাই আমাদের পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পূর্বে সুস্থ ও ত্রুটিহীন মানুষ হতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মানবাত্মার</strong> <strong>ব্যাধি</strong></h4>
<p>প্রথমে আমরা যে সকল বস্তু মানবাত্মাকে ব্যাধিগ্রস্ত করে তা সংক্ষেপে আলোচনা করব। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বঞ্চনা আত্মিক রোগের অন্যতম উৎস। অধিকাংশ মানসিক রোগের কারণ হলো বঞ্চনা। আপনারা জানেন ফ্রয়েড বাড়াবাড়িমূলকভাবে এ তত্ত্বের উপর নির্ভর করেছেন, বিশেষত যৌনতার বিষয়ে। যা হোক বঞ্চনা মানসিক ব্যাধির প্রধান কারণ। বঞ্চনা মানুষের মনে বিদ্বেষের সৃষ্টি করে। যখন মানুষ অন্তরে কারো প্রতি বিদ্বেষ অনুভব করে তখন তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চায় এবং যতক্ষণ না তাকে হত্যা বা লাঞ্ছিত করতে পারে ততক্ষণ শান্তি লাভ করতে পারে না। এ প্রতিশোধ স্পৃহাটি কি?</p>
<p><strong><em>হিংসুক</em></strong> <strong><em>ব্যক্তি</em></strong> <strong><em>যখন</em></strong> <strong><em>কারো</em></strong> <strong><em>ভালো</em></strong> <strong><em>বা</em></strong> <strong><em>কল্যাণ</em></strong> <strong><em>দেখে</em></strong> <strong><em>তখন</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>সমগ্র</em></strong> <strong><em>কামনা</em></strong> <strong><em>হয়ে</em></strong> <strong><em>ওঠে</em></strong> <strong><em>এটা</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>ব্যক্তি</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>এ</em></strong> <strong><em>কল্যাণ</em></strong> <strong><em>যেন</em></strong> <strong><em>দ্রুত</em></strong> <strong><em>অপসারিত</em></strong> <strong><em>হয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>নিজের</em></strong> <strong><em>বিষয়ে</em></strong> <strong><em>তখন</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>আর</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>না</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>বরং</em></strong> <strong><em>ঐ</em></strong> <strong><em>ব্যক্তির</em></strong> <strong><em>অমঙ্গলের</em></strong> <strong><em>চিন্তায়</em></strong> <strong><em>মগ্ন</em></strong> <strong><em>হয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>সুস্থ</em></strong> <strong><em>চিন্তার</em></strong> <strong><em>মানুষ</em></strong> <strong><em>প্রতিযোগিতা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>হিংসা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong> <strong><em>না</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>সুস্থ</em></strong> <strong><em>মানুষ</em></strong> <strong><em>সামনে</em></strong> <strong><em>এগিয়ে</em></strong> <strong><em>যাওয়ার</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>সব</em></strong> <strong><em>সময়</em></strong> <strong><em>নিজেকে</em></strong> <strong><em>নিয়ে</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>সব</em></strong> <strong><em>সময়</em></strong> <strong><em>এগিয়ে</em></strong> <strong><em>থাকার</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>সুস্থতার</em></strong> <strong><em>পরিচয়</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>এটা</em></strong> <strong><em>দোষের</em></strong> <strong><em>কিছু</em></strong> <strong><em>নয়</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>অন্যেরা</em></strong> <strong><em>সব</em></strong> <strong><em>সময়</em></strong> <strong><em>পিছে</em></strong> <strong><em>পড়ে</em></strong> <strong><em>থাক</em></strong><strong><em>&#8211; </em></strong><strong><em>এ</em></strong> <strong><em>চিন্তা</em></strong> <strong><em>অসুস্থতার</em></strong> <strong><em>পরিচায়ক</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>হিংসুক</em></strong> <strong><em>ব্যক্তির</em></strong> <strong><em>অসুস্থতা</em></strong> <strong><em>কখনো</em></strong> <strong><em>কখনো</em></strong> <strong><em>এতটা</em></strong> <strong><em>অধিক</em></strong> <strong><em>হয়</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>নিজের</em></strong> <strong><em>একশ</em></strong><strong><em>&#8216; </em></strong><strong><em>ভাগ</em></strong> <strong><em>ক্ষতি</em></strong> <strong><em>করেও</em></strong> <strong><em>যদি</em></strong> <strong><em>অপরের</em></strong> <strong><em>পাঁচ</em></strong> <strong><em>ভাগ</em></strong> <strong><em>ক্ষতি</em></strong> <strong><em>করা</em></strong> <strong><em>যায়</em></strong> <strong><em>তাতে</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>খুশী</em></strong><strong><em>।</em></strong></p>
<p><strong><em> </em></strong></p>
<h4><strong>&#8216;</strong><strong>হিংসা</strong><strong>&#8216; </strong><strong>রোগের</strong> <strong>নমুনা</strong></h4>
<p>একটি প্রসিদ্ধ কাহিনী ইতিহাসের বইয়ে এসেছে। কোন এক খলিফার সময় একজন ব্যক্তি এক দাস কিনে এনেছিল। প্রথম দিন থেকেই সে তার সঙ্গে দাসের মতো আচরণ না করে বরং সম্মানিত ব্যক্তির মতো আচরণ করত। সব সময় ভাল খাবার দিত, তার জন্য ভাল পোষাক কিনত, বিশ্রামের জন্য উত্তম উপকরণ এনে দিত। মোট কথা, তার সঙ্গে নিজের সন্তানের মত আচরণ করত। মনে হতো লালন-পালনের জন্যই তাকে আনা হয়েছে। দাসটি লক্ষ্য করত তার মনিব সব সময়ই বিষন্ন ও চিন্তিত। কিন্তু তার কারণ সে জানত না। একদিন মনিব তাকে ডেকে বলল, &#8220;আমি তোমাকে মুক্ত করে দিতে চাই, সে সাথে প্রচুর অর্থও দিতে চাই। কিন্তু তুমি কি জান কেন তোমাকে এত আদর ও স্নেহ করেছি? এজন্য যে, তুমি যেন আমার একটি অনুরোধ রক্ষা কর। তুমি যদি তা রক্ষা কর তবে আমার আদর-স্নেহের প্রতিদান দিলে এবং এর জন্য আরো অধিক কিছু তোমাকে আমি দেব। কিন্তু যদি তা না কর তবে আমি তোমার উপর অসন্তুষ্ট।&#8221; দাস বলল, &#8220;যেহেতু আপনি আমার মনিব এবং আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন, আপনি যা বলবেন আমি তা-ই করব।&#8221; মনিব বলল, &#8220;না, তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আমার ভয় হয় যদি রাজি না হও।&#8221; দাস বলল, &#8220;যে কোনো প্রস্তাব দিন আমি রাজী হব।&#8221; যখন দাস প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো তখন মনিব বলল, &#8220;আমার অনুরোধ হলো একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে নির্দেশ দেব। তুমি আমার মাথা গোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।&#8221; দাস বলল, &#8220;আমি তা করতে পারব না।&#8221; মনিব বলল, &#8220;না, অবশ্যই তোমাকে তা করতে হবে। কারণ তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।&#8221; মাঝ রাতে মনিব দাসকে ঘুম থেকে জাগিয়ে একটি ধারালো ছুরি হাতে দিয়ে তাকে নিয়ে এক প্রতিবেশীর বাড়ীর ছাদে গেল আর বলল, &#8220;এখানেই আমার মস্তক বিচ্ছিন্ন কর, তারপর যেখানে ইচ্ছা চলে যাও।&#8221; দাস বলল, &#8220;কেন এটা করব?&#8221; সে বলল, &#8220;যেহেতু এই প্রতিবেশীকে আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না। মৃত্যু আমার কাছে বেঁচে থাকার চেয়ে উত্তম। সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সে আমার থেকে অগ্রগামী। সব কিছুতেই সে আমার থেকে উত্তম অবস্থায় রয়েছে। আমি হিংসার আগুনে জ্বলে মরছি। আমি চাই সে খুনী বলে পরিচিত হোক ও শাস্তি ভোগ করুক। যদি এমন হয় তবেই আমি শান্তি পাব। আমার শান্তি এখানেই যে, যদি আমাকে এখানে হত্যা কর, কালকে সবাই বলবে (যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বীর লাশ তার বাড়ির ছাদে পাওয়া গেছে) সে-ই আমাকে হত্যা করেছে। অতঃপর তাকে বন্দী করা হবে ও পরে প্রাণদণ্ড দেয়া হবে। আমার ইচ্ছাও পূর্ণ হবে।&#8221; দাস বলল, &#8220;যেহেতু তুমি এমন বোকা লোক সেহেতু আমি এটা কেন করব না। তুমি এটার জন্যই উপযুক্ত।&#8221; অতঃপর সে মনিবের মাথা বিচ্ছিন্ন করল এবং টাকাগুলো নিয়ে চলে গেল। পরের দিন সবখানে খবর ছড়িয়ে পড়ল। ঐ বাড়ির মালিককে গ্রেফতার করা হলো। কিন্তু সবাই বলাবলি করতে লাগল যদি সে খুনীই হতো তবে নিজের বাড়ির ছাদে খুন করতে যাবে কেন? সম্ভবত কিছু একটা আছে। ব্যাপারটা রহস্যময়। দাসের বিবেক তাকে চিন্তায় ফেলল। অবশেষে বিচারকের কাছে গিয়ে সত্য ঘটনা বর্ণনা করে সে বলল, &#8220;আমি তার ইচ্ছাতেই তাকে হত্যা করেছি। সে প্রতিহিংসায় এতটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, মৃত্যুকে জীবনের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। যখন প্রমাণিত হলো ঘটনা এ রকম তখন দাস এবং ঐ বাড়ির মালিক দু&#8217;জনকেই মুক্তি দেয়া হলো।</p>
<p>সুতরাং এটা বাস্তব যে, মানুষ প্রকৃতই হিংসা রোগে অসুস্থ হয়। কোরআন বলছে,</p>
<p>قد افلح من زكيها و قد خاب من د سيها</p>
<p>&#8220;সে-ই সফলকাম হলো যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং সে-ই অকৃতকার্য হলো যে নিজেকে কলুষিত করল। কোরআনের প্রথম কর্মসূচী আত্মার পরিশুদ্ধি ও উন্নয়ন এবং হৃদয়কে মানসিক রোগ, সমস্যা, অশান্তি, অন্ধকার ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>রূপান্তরিত</strong> <strong>মানুষ</strong></h4>
<p>রূপান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপান্তর অর্থ কি? নিশ্চয় শুনেছেন পূর্বকালে এক উম্মত ছিল যারা প্রচুর গুনাহের কারণে তৎকালীন নবীর দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ অন্য এক পশুতে পরিণত হয়েছিল। যেমন বানর, শূকর, নেকড়ে বা অন্য কোন প্রাণীতে। এটাকেই রূপান্তর বলা হচ্ছে। এই রূপান্তর প্রকৃতপক্ষে কিরূপ ছিল? মানুষ কি প্রকৃতই পশুতে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। এখন এর ব্যাখ্যা করব।</p>
<p>এটি অনস্বীকার্য যে, মানুষ দৈহিকভাবে রূপান্তরিত বা পশুতে পরিণত না হলেও মানসিক ও আত্মিকভাবে রূপান্তরিত বা পশুতে পরিণত হয়, এমনকি কখনো কখনো এত নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হয় যে, যার নজীর পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া বিরল। কোরআন বলছে- بل هم أضل  অর্থাৎ চতুষ্পদ জন্তু হতেও নিকৃষ্ট। এখন প্রশ্ন হলো মানুষ কি প্রকৃতই মানসিক ও আত্মিকতার দিক থেকে পশুতে পরিণত হতে পারে? উত্তর হলো, হ্যাঁ। কারণ মানুষের ব্যক্তিত্ব তার চারিত্রিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। যদি কোন মানুষের চারিত্রিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্য কোন হিংস্র প্রাণীর বা চতুস্পদ পশুর মত হয় তবে সে প্রকৃতই রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ তার আত্মা প্রকৃতই রূপান্তরিত ও পরিবর্তিত হয়ে এক পশুতে পরিণত হয়েছে। শূকরের দেহ তার আত্মার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু মানুষ দৈহিকভাবে শূকরের মত না হয়েও শূকরের সকল স্বভাব ধারণ করতে পারে। যদি কোন মানুষ এরূপ হয় তবে সে রূপান্তরিত হয়েছে। বাস্তব ও অন্তর্দৃষ্টিতে সে প্রকৃতই একটি শূকর বৈ কিছু নয়। তাই ত্রুটিযুক্ত মানুষ কখনো কখনো রূপান্তরিত মানুষে পরিণত হয়। আমরা এ সব কথা কম শুনি এবং অনেকেই মনে করেন এগুলো metaphoric বা allegory (রূপক) এবং এগুলো বিশ্বাস করতে চান না। কিন্তু এটা খুবই সত্য।</p>
<p>এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে, &#8220;ইমাম যয়নুল আবেদীন -এর সাথে আরাফাতের ময়দানে ছিলাম। উপর থেকে লক্ষ্য করলাম ময়দান হাজীতে পূর্ণ। ইমামকে উদ্দেশ্য করে বললাম, কি পরিমাণ হাজী এ বছর এসেছে আলহামদুলিল্লাহ্। ইমাম বললেন চিৎকার এত বেশি, কিন্তু হাজী খুবই কম।&#8221; ঐ ব্যক্তি বলেছে, &#8220;তারপর জানি না ইমাম এমন দৃষ্টি শক্তি দান করলেন আমাকে এবং বললেন লক্ষ্য কর। আমি লক্ষ্য করলাম সম্পূর্ণ ময়দান যেন পশুতে পূর্ণ- যেন চিড়িয়াখানার মধ্যে সামান্য কিছু মানুষ চলাচল করছে। ইমাম বললেন এখন দেখ বাতেন (অপ্রকাশ্য) কিরূপ! যারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী তাঁদের নিকট এ বিষয়টি প্রদীপের মতই উজ্জ্বল। এখন যদি আধুনিক চিন্তাধারার কেউ তা অস্বীকার করতে চায় তাহলে ভুল করবে। আমাদের এখনকার সময়ও ব্যক্তি-বিশেষ ছিলেন এবং আছেন যাঁরা মানুষের সত্তাকে অনুভব করেন এবং দেখেন।</p>
<p>যে মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর মত শুধু খাওয়া, ঘুমানো, যৌন চাহিদা পূরণ ছাড়া (প্রাণীর) অন্য কোনো চিন্তা করে না, তার চিন্তা শুধু এটাই যে, খাবে, ঘুমাবে আর দৈহিক আনন্দ অনুভব করবে, প্রকৃতপক্ষে তার আত্মা একটা চতুষ্পদ জন্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। তার অন্তর একটি রূপান্তরিত মানুষে পরিণত হয়েছে। যার স্বভাব রূপান্তরিত, তার মানবিক বৈশিষ্ট্য রূপান্তরিত- কিভাবে তা ব্যাখ্যা দেব। অর্থাৎ তার মনুষ্যত্ব তার নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, ঐ স্থানে সে নিজের জন্য চতুষ্পদ ও হিংস্র পশুর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।</p>
<p>সূরা নাবায় আমরা পড়ি &#8220;সে দিন যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তোমরা দলে দলে আসবে। এবং আকাশকে উন্মুক্ত করা হবে ফলে তা বহু দ্বারে বিভক্ত হয়ে পড়বে। পর্বতকে বিচলিত করা হবে ফলে তা মরীচিকায় পরিণত হবে।&#8221; (সূরা নাবা: ১৮-২০) কিয়ামতের দিন মানুষ দলে দলে পুনরুত্থিত ও সমবেত হবে। রাসূলগণ সব সময়ই বলেছেন, শুধু মানুষের একটি দল মানুষের চেহারায় পুনরুত্থিত হবে। কোন কোন দল পিপীলিকার মত, কোন দল সাপের মত, কোন দল নেকড়ের মত চেহারা নিয়ে হাশরের ময়দানে আবির্ভূত হবে। কেন? এটা কি সম্ভব কোন কারণ ছাড়াই মহান আল্লাহ্ মানুষকে এ রকম আকৃতিতে পুনরুত্থিত করবেন? যে ব্যক্তির পৃথিবীতে মানুষকে ক্ষত বিক্ষত করা ছাড়া কোন কাজ ছিল না, যার সকল আনন্দ অন্যদের কষ্ট দেয়ার মধ্যে নিহিত ছিল সে প্রকৃতই একটি বিষাক্ত বিচ্ছু। তাই সে সেভাবেই পুনরুত্থিত হবে। যে ব্যক্তির বাঁদরামী করাই একমাত্র স্বভাব ছিল, কিয়ামতে প্রকৃতই সে বাঁদরের চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হবে। এমনিভাবে যার স্বভাব কুকুরের মতো সে কুকুর হিসেবে পুনরুত্থিত হবে। &#8220;মানুষ তার নিয়্যতের (কাজের) উপর ভিত্তি করেই পুনরুত্থিত হবে।&#8221; (মুসনাদে আহমদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৯২)</p>
<p>কিয়ামতে মানুষ তার নিয়্যত, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, তার স্বভাব ও তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে পুনরুত্থিত হবে। আপনি এ পৃথিবীতে কী চেহারাতে আছেন? কী হতে চান? কী বস্তু চান? আপনার ইচ্ছাগুলো কী মানুষের চাওয়া নাকি কোনো হিংস্র পশুর চাওয়া? নাকি এক তৃণভোজীর মতো চাওয়া? যা আপনি চান আপনি তা-ই এবং সে চেহারাতেই আপনি পুনরুত্থিত হবেন যে রকম আছেন।</p>
<p>এটাই আমাদের আল্লাহ্ ব্যতীত সকল কিছুর উপাসনা থেকে বিরত করে। আমরা যা কিছুর উপাসনা করব তার মতোই হব। যদি টাকার উপাসনা করি, যদি অর্থ আমাদের অস্তিত্ব ও অস্তিত্বের অংশে পরিণত হয়, এর অর্থ কিয়ামতে সে-ই উত্তপ্ত ধাতব পদার্থে পরিণত হবে। এ পৃথিবীতে যাদের অস্তিত্ব এই ধাতব পদার্থের অস্তিত্বের সাথে মিশে গিয়েছে এবং এই ধাতুর উপাসনা ছাড়া যার কোন কাজ নেই, কোরআন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছে, &#8220;এবং যারা সোনা-রূপা মজুদ করে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও। সে দিন তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বদেশে ও তাদের পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। এবং বলা হবে এটা সেই বস্তু যা তোমরা নিজেদের জন্য প্রস্তত করতে।&#8221; (সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫)</p>
<p>এ অর্থই সে দিন উত্তপ্ত করা হবে- তার জন্য জাহান্নামের আগুনে পরিণত হবে। এটা অন্যতম উপাদান যা মানুষকে রূপান্তরিত করে।</p>
<p>আমি এ বৈঠকে ত্রুটিযুক্ত ও ত্রুটিহীন মানুষের বিষয়টি সংক্ষেপে বর্ণনা করতে চাচ্ছিলাম। সমস্যাগ্রস্ত (মানসিক) মানুষ একজন ত্রুটিপূর্ণ মানুষ। যে মানুষ পৃথিবীর কোন বস্তুকে উপাসনা করে- তার দৈনন্দিন কাজে বস্তু ব্যবহারকারী নয়, বরং এর উপাসনাকারী সে মানুষ ত্রুটিযুক্ত এবং একজন রূপান্তরিত মানুষ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পবিত্র</strong> <strong>রমযান</strong> <strong>মাসের</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>গঠনের</strong> <strong>পরিকল্পনা</strong></h4>
<p>আসলেই পবিত্র রমযান মাসের কর্মসূচী মানুষ গঠনের পরিকল্পনার। অর্থাৎ কর্মসূচীর উদ্দেশ্য এটাই যে, এ মাসে ত্রুটিযুক্ত মানুষ নিজেকে ত্রুটিহীন মানুষে এবং ত্রুটিহীন মানুষ নিজেকে পূর্ণ মানুষে পরিণত করবে। এ পবিত্র মাসের পরিকল্পনা নাফস বা প্রবৃত্তির পরিশুদ্ধি, মানবীয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার সংশোধন, প্রবৃত্তির জৈবিক তাড়নার উপর বুদ্ধিবৃত্তি, ঈমান ও ইচ্ছাশক্তির বিজয় ও নিয়ন্ত্রণ।</p>
<blockquote><p><em>এর</em> <em>জন্য</em> <em>দোয়ার</em> <em>কর্মসূচী</em><em>, </em><em>সত্যের</em> <em>পথে</em> <em>ইবাদতের</em> <em>মাধ্যমে</em> <em>আল্লাহর</em> <em>দিকে</em> <em>যাত্রা</em><em>, </em><em>আত্মার</em> <em>উন্নয়নের</em> <em>জন্য</em> <em>কর্মসূচী</em><em>, </em><em>আত্মাকে</em> <em>বিকাশমান</em> <em>ও</em> <em>গতিশীল</em> <em>করার</em> <em>পরিকল্পনা</em> <em>দেয়া</em> <em>হয়েছে</em><em>।</em> <em>যদি</em> <em>এমন</em> <em>হয়</em> <em>যে</em><em>, </em><em>পবিত্র</em> <em>রমযান</em> <em>মাস</em> <em>এল</em><em>, </em><em>মানুষ</em> <em>ত্রিশ</em> <em>দিন</em> <em>ক্ষুধার্ত</em><em>, </em><em>তৃষ্ণার্ত</em> <em>ও</em> <em>নিদ্রাহীন</em> <em>থাকল</em><em>, </em><em>উদাহরণস্বরূপ</em> <em>রাত্রিগুলোতে</em> <em>অনেক</em> <em>সময়</em> <em>জেগে</em> <em>থাকল</em><em>, </em><em>এখানে</em> <em>ওখানে</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>অনুষ্ঠানে</em> <em>অংশগ্রহণ</em> <em>করল</em><em>, </em><em>তারপর</em> <em>ঈদ</em> <em>আসলো</em><em>, </em><em>কিন্তু</em> <em>রমযানের</em> <em>পূর্বের</em> <em>দিন</em> <em>থেকে</em> <em>তার</em> <em>বিন্দুমাত্র</em> <em>পরিবর্তন</em> <em>হয়নি</em><em>, </em><em>তাহলে</em> <em>ঐ</em> <em>রোযা</em> <em>তার</em> <em>জন্য</em> <em>কোন</em> <em>উপকারই</em> <em>বয়ে</em> <em>আনেনি</em><em>।</em> <em>ইসলাম</em> <em>তো</em> <em>এটা</em> <em>চায়</em> <em>না</em> <em>যে</em><em>, </em><em>মানুষ</em> <em>এমনিই</em> <em>মুখ</em> <em>বন্ধ</em> <em>করে</em> <em>রাখবে</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>মানুষ মুখ বন্ধ করুক আর না করুক ইসলামের তাতে কোনোকিছু যায় আসেনা, বরং রোযা রাখার উদ্দেশ্য হলো এটা যে, মানুষ সংশোধিত হবে। কেন হাদীসসমূহে এমন এসেছে, প্রচুর রোযাদার আছে যারা রোযা থেকে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই লাভ করে না, তাদের রোযা শুধু ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকা ছাড়া কিছুই নয়। হালাল খাদ্য থেকে মুখ বন্ধ করার অর্থ মানুষ এ ত্রিশ দিন একনাগাড়ে অনুশীলন করবে হারাম কথা থেকে জিহ্বাকে বিরত রাখার, গীবত না করার, মিথ্যা না বলার ও গালি না দেয়ার।</p>
<p>রোযা যে বাতেনী, আধ্যাত্মিক ও আত্মিক তার প্রমাণস্বরুপ একটি ঘটনা বর্ণনা করছি।</p>
<blockquote><p><strong><em>একদিন</em></strong> <strong><em>এক</em></strong> <strong><em>রোযাদার</em></strong> <strong><em>মহিলা</em></strong> <strong><em>রাসূল</em></strong><strong><em> (</em></strong><strong><em>সা</em></strong><strong><em>.)-</em></strong><strong><em>এর</em></strong> <strong><em>নিকট</em></strong> <strong><em>আসল</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>রাসূল</em></strong> <strong><em>দুধ</em></strong> <strong><em>অথবা</em></strong> <strong><em>অন্য</em></strong> <strong><em>কিছু</em></strong> <strong><em>খাওয়ার</em></strong> <strong><em>জন্য</em></strong> <strong><em>তাকে</em></strong> <strong><em>অনুরোধ</em></strong> <strong><em>করলেন</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>দিকে</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>এগিয়ে</em></strong> <strong><em>দিয়ে</em></strong> <strong><em>বললেন</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>নাও</em></strong> <strong><em>পান</em></strong> <strong><em>কর</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>সে</em></strong> <strong><em>বলল</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>ইয়া</em></strong> <strong><em>রাসূলাল্লাহ</em></strong><strong><em>! </em></strong><strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আছি</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>রাসূল</em></strong> <strong><em>বললেন</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>রাখনি</em></strong> <strong><em>এবং</em></strong> <strong><em>এ</em></strong> <strong><em>বলে</em></strong> <strong><em>পুনরায়</em></strong> <strong><em>তাকে</em></strong> <strong><em>খেতে</em></strong> <strong><em>নির্দেশ</em></strong> <strong><em>দিলেন</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>মহিলা</em></strong> <strong><em>বলল</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>আসলেই</em></strong> <strong><em>আমি</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আছি</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; (</em></strong><strong><em>যেহেতু</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>বিবেচনায়</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আছে</em></strong> <strong><em>বলে</em></strong> <strong><em>মনে</em></strong> <strong><em>করল</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>যেমন</em></strong> <strong><em>বাহ্যিক</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>আমার</em></strong> <strong><em>রাখি</em></strong><strong><em>)</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>রাসূল</em></strong> <strong><em>বললেন</em></strong><strong><em>, &#8220;</em></strong><strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>কেমন</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>রেখেছ</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিছুক্ষণ</em></strong> <strong><em>পূর্বেই</em></strong> <strong><em>তোমার</em></strong> <strong><em>মুমিন</em></strong> <strong><em>ভাই</em></strong> <strong><em>বা</em></strong> <strong><em>বোনের</em></strong> <strong><em>মাংস</em></strong> <strong><em>খেয়েছ</em></strong><strong><em> (</em></strong><strong><em>অর্থাৎ</em></strong> <strong><em>গীবত</em></strong> <strong><em>করেছ</em></strong><strong><em>)</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>তুমি</em></strong> <strong><em>কি</em></strong> <strong><em>দেখতে</em></strong> <strong><em>চাও</em></strong> <strong><em>যে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>মাংস</em></strong> <strong><em>খেয়েছ</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>ভেতর</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>এখনই</em></strong> <strong><em>তা</em></strong> <strong><em>উল্টিয়ে</em></strong> <strong><em>ফেল</em></strong><strong><em>।</em></strong><strong><em>&#8221; </em></strong><strong><em>তখনই</em></strong> <strong><em>সে</em></strong> <strong><em>বমি</em></strong> <strong><em>করল</em></strong> <strong><em>ও</em></strong> <strong><em>এক</em></strong> <strong><em>টুকরা</em></strong> <strong><em>মাংস</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>মুখ</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>বেরিয়ে</em></strong> <strong><em>পড়ল</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>মানুষ</em></strong> <strong><em>রোযা</em></strong> <strong><em>রেখে</em></strong> <strong><em>গীবত</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>ফলে</em></strong> <strong><em>যদিও</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>মুখকে</em></strong> <strong><em>হালাল</em></strong> <strong><em>খাদ্য</em></strong> <strong><em>থেকে</em></strong> <strong><em>বঞ্চিত</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>কিন্তু</em></strong> <strong><em>তার</em></strong> <strong><em>আত্মার</em></strong> <strong><em>মুখকে</em></strong> <strong><em>হারাম</em></strong> <strong><em>খাদ্য</em></strong> <strong><em>দ্বারা</em></strong> <strong><em>পূর্ণ</em></strong> <strong><em>করে</em></strong><strong><em>।</em></strong></p></blockquote>
<p>কেন আমাদের উদ্দেশ্যে এটা বলা হয়েছে যে, যদি মানুষ একটা মিথ্যা বলে তবে তার মুখের দুর্গন্ধে সপ্ত আসমান পর্যন্ত ফেরেশতারা কষ্ট পান। যেমন বলা হয় যখন মানুষ জাহান্নামে থাকবে তখন জাহান্নাম প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াবে। এ দুর্গন্ধ প্রকৃতপক্ষে এ দুনিয়াতেই আমরা সৃষ্টি করেছি মিথ্যা কথা বলা, গালি দেয়া, অপবাদ ও পরনিন্দা চর্চার মাধ্যমে।</p>
<p>পরনিন্দা ও মিথ্যা অপবাদ আরোপ গীবত থেকেও খারাপ, যেহেতু পরনিন্দার মাধ্যমে যেমন মিথ্যাও বলা হয় তেমন গীবতও করা হয়। কিন্তু যে মিথ্যা বলে সে শুধু মিথ্যাই বলে, গীবত করে না। তাই পরনিন্দায় দু&#8217;টি কবীরা গুনাহ এক সঙ্গে আঞ্জাম দেয়া হয়।</p>
<p>এটা কি উচিত, রমযান মাস শেষ হয়ে যায়, অথচ এ মাসে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে নিন্দা ও অপবাদ আরোপ করতে থাকি? রমযান মাস এজন্য যে, মুসলমানরা বেশি বেশি সমবেত হবে, সম্মিলিতভাবে ইবাদত করবে, মসজিদে একত্র হবে। এজন্য নয় যে, একে অপরকে দূরে সরানোর জন্য এ মাসকে ব্যবহার করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> এ. কে. এম. আনোয়ারুল কবীর।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/insan-al-kamil-from-the-point-of-view-of-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15456</post-id>	</item>
		<item>
		<title>হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার দর্পণে ইসলামী শরীয়ত ও আল ইরতিফাকাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-shariah-and-al-irtifaqat-in-the-mirror-of-hujjatullahil-baliga/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-shariah-and-al-irtifaqat-in-the-mirror-of-hujjatullahil-baliga/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Jan 2025 04:50:27 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15359</guid>

					<description><![CDATA[হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার বৈশিষ্ট্য শাহ সাহেবের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ও জ্ঞানগত কৃতিত্ব &#8216;হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা&#8217;। যার মধ্যে ইসলামী শরীয়তের এমন এক মজবুত, সামগ্রিক ও প্রামাণ্য চিত্র পেশ করা হয়েছে, যেখানে আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, লেনদেন, আচার-অনুষ্ঠান, আখলাক-চরিত্র, সামাজিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ইহসান (অনুগ্রহ-দান)]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>হুজ্জাতুল্লাহিল</strong> <strong>বালিগার</strong> <strong>বৈশিষ্ট্য</strong></h4>
<p>শাহ সাহেবের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ও জ্ঞানগত কৃতিত্ব &#8216;হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা&#8217;। যার মধ্যে ইসলামী শরীয়তের এমন এক মজবুত, সামগ্রিক ও প্রামাণ্য চিত্র পেশ করা হয়েছে, যেখানে আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, লেনদেন, আচার-অনুষ্ঠান, আখলাক-চরিত্র, সামাজিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ইহসান (অনুগ্রহ-দান) কে এমন এক যোগসূত্র ও সঠিক সামঞ্জস্যের সঙ্গে পেশ করা হয়েছে, মনে হয় যেন তা একই মালার মুক্তা ও একই শিকলের অসংখ্য কড়া। তাতে আসল ও শাখা-প্রশাখা, লক্ষ্য- উদ্দেশ্য ও উপায়-উপকরণ এবং সার্বক্ষণিক ও সাময়িকের পার্থক্য দৃষ্টির আড়াল হতে পারে না। এ তো সেসব রচনাবলি ও গবেষণাকর্মের পুরোনো দুর্বলতা, যা কোনও বাড়াবাড়ি ও অন্যায়, বে-ইনসাফী প্রত্যাখ্যান কিংবা কোনও আবেগ-আগ্রহ নিয়ে রচিত হয়েছে। এই যোগসূত্রতা ও সামঞ্জস্যের কারণ (শাহ সাহেবের জন্মগত মানসিক ও চিন্তাগত সুস্থতা ও মিতাচার ব্যতিত) তার হাদীস শাস্ত্রের গভীর ও ব্যাপক অধ্যয়ন এবং সেই বিশেষ মানসিকতা ও আকর্ষণ, যা হাদীস ও সীরাতের নিমগ্নতা কিংবা নববী মেজায ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল কোনও &#8216;আলেমে রব্বানী&#8217; (বুযুর্গ আলেম)- এর সংস্পর্শ ও তরবিয়ত-তত্ত্বাবধানে সৃষ্টি হয়। ইসলামের এই মজবুত ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা, যা হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পরিলক্ষিত হয়, তা খুব কম ধর্মীয় বই-পুস্তক ও রচনাবলিতেই দৃষ্টিগোচর হবে। এভাবে হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা সেই যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন শাস্ত্রের যুগে এক নতুন ইলমে কালাম হয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে হকপন্থী ও সুস্থ মনের মানুষের জন্য (যার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্তদৃষ্টিও কিছুটা আছে) প্রশান্তি ও স্বস্তির পর্যাপ্ত খোরাক। আমার জানামতে কোনও মাযহাবের সমর্থনে এবং তার প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে (আমাদের পরিজ্ঞাত ভাষায়) এই মানের গ্রন্থ রচনা করা হয়নি। আর রচিত হয়ে থাকলেও বর্তমান সময়ে তা শিক্ষাজগতের সামনে নেই। বারো হিজরী শতকের সামান্য পরেই ভারতবর্ষ এবং গোটা মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও জ্ঞান-গবেষণামূলক নানা কারণে এক বিশেষ ধরনের &#8216;দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা&#8217; -এর যে যুগ শুরু হতে যাচ্ছিল এবং শরীয়তের আহকামের তত্ত্বাবলি ও উপকারিতা অনুসন্ধানের যে গণজোয়ার সৃষ্টি হচ্ছিল, সে কারণে অনেক মেধা-মনন বিভ্রান্ত হওয়া এবং বহু কলম বিপথে চালিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। বিশেষতঃ হাদীস ও সুন্নাহ (বিশেষ কারণে) নানা আপত্তি-অভিযোগ ও সংশয়-সন্দেহের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যস্থলে পরিণত হচ্ছিল। এসব নতুন চাহিদার কারণে সঠিকভাবে সে ব্যক্তিই কর্তব্য পালন করতে পারত, যিনি কুরআন-সুন্নাহ, দর্শন ও হিকমত শাস্ত্র, কালাম শাস্ত্র, চারিত্রিক জ্ঞান, জীববিদ্যা, (সমকালীন গণ্ডিতে) ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জ্ঞাত। সেই সাথে ইহসান ও আত্মশুদ্ধির রত্ন ও বাস্তবতা সম্পর্কে শুধু জ্ঞাতই নয় বরং এক্ষেত্রে ইজতিহাদের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেন। চাহিদা ছিল, সে যুগ শুরু হওয়ার পূর্বে হিজরী বারো শতকের ইমামের কলমে এমন গ্রন্থ রচিত হয়ে যাবে, যা এই প্রয়োজনীয়তা এমন পর্যাপ্তভাবে পূর্ণ করবে, যা এরূপ কোনও মানুষের কলম দ্বারাই সম্ভব, যিনি একজন মানুষ মাত্র। না তিনি নিষ্পাপ; না তার জ্ঞান প্রত্যেক যুগ, স্থান ও শাস্ত্রসমূহের উপর পরিব্যাপ্ত। তার উপর সমকালের (ন্যূনতম পর্যায়ে) স্পর্শ এবং সেই শিক্ষাব্যবস্থা ও তরবিয়তের প্রভাবও আছে, যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন। অধিকন্তু তাকে মূলতঃ কুরআনিক শিক্ষাকেন্দ্র, হাদীস ও সুন্নাহর বিদ্যাপীঠের বরকত ও সংশ্রবপ্রাপ্ত এবং মুখপাত্র বলেই পরিলক্ষিত হয়।</p>
<p>শাহ সাহেব উক্ত গ্রন্থ রচনার উৎসাহ-প্রেরণার কারণ সম্পর্কে লিখেন, <strong>‘</strong><strong>উলূমে</strong> <strong>হাদীসের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>জটিল</strong><strong>, </strong><strong>সূক্ষ্ম</strong> <strong>ও</strong> <strong>গভীর</strong><strong>, </strong><strong>উঁচু</strong> <strong>ও</strong> <strong>নতুন</strong> <strong>শাস্ত্র</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>দীনের</strong> <strong>তত্ত্ব</strong><strong>&#8211;</strong><strong>রহস্যের</strong> <strong>সেই</strong> <strong>জ্ঞান</strong><strong>, </strong><strong>যাতে</strong> <strong>আহকাম</strong> <strong>ও</strong> <strong>বিধি</strong><strong>&#8211;</strong><strong>নিষেধের</strong> <strong>হিকমত</strong><strong>, </strong><strong>তার</strong> <strong>শ্রেষ্ঠত্ব</strong> <strong>ও</strong> <strong>বিশেষ</strong> <strong>বিশেষ</strong> <strong>আমলগুলোর</strong> <strong>সূক্ষ্মতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>তত্ত্ব</strong> <strong>বর্ণনা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হবে।</strong> <strong>যার</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>শরীয়তের</strong> <strong>আনীত</strong> <strong>বিষয়গুলোর</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>অন্ত</strong> <strong>দৃষ্টি</strong> <strong>সম্পন্ন</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যায়</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ভুল</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ভ্রান্তি</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নিরাপদ</strong> <strong>থাকে</strong><strong>’</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিষয়বস্তুর</strong> <strong>কমনীয়তা</strong></h4>
<p>ধর্মীয় গভীরতা ও শরয়ী আহকামের রহস্য, উপকারিতাসমূহ, কারণ ও ইল্লতগুলো বর্ণনা করার বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। সামান্য অসতর্কতা-পক্ষপাতিত্ব, বিশেষ কোনও দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য কিংবা যুগের প্রভাবে পাঠকবর্গের মেধা-মনন আসমানী শরীয়ত ও নববী শিক্ষার সেই ফলক- যেখানে মূল লক্ষ্য বলা হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও পারলৌকিক মুক্তি, সেখান থেকে নেমে এসে বস্তুবাদী জীবনোপকরণগুলোর সুব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক কল্যাণ কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ফাঁদে পড়ে যায়। আর চেষ্টা-সংগ্রামের পূর্ণ ক্রমধারা থেকে ঈমান ও হিসাব প্রস্তুতির প্রাণ হয়ত সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে যায় অথবা অত্যন্ত দুর্বল ও আহত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ নামাযের রহস্য ও উপকারিতা প্রসঙ্গে বলা যায়, তা এক ধরনের সামরিক প্যারেড। এর দ্বারা শৃঙ্খলা, আমীরের আনুগত্য ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য পাওয়া যায়। রোযা সুস্থতার জন্য ফলপ্রসূ পদ্ধতি। যাকাত ধনাঢ্যদের উপর গরীব-অসহায়দের প্রাপ্য ট্যাক্স। হজ্জ একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী কনফারেন্স। যেখানে জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শ করা হয়।</p>
<p>সেসব সমস্যা-সংকটে অবস্থার প্রেক্ষিতে (যেগুলো সম্ভাবনা ও আশঙ্কা থেকে অগ্রসর হয়ে ঘটনাবলি ও বাস্তব দৃষ্টান্তের স্থান দখল করে নিয়েছে) এ বিষয়ে সঠিকভাবে সে আলেমই দায়িত্ব পালন করতে পারেন, যার হাতে থাকবে দীন ও শরীয়তের আসল সংবিধান, যিনি আল্লাহর শরীয়ত অবতরণ এবং নবী-রাসূল (স) প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হবেন সম্যক অবগত। যার শিরা-উপশিরায় বিস্তৃত থাকবে ঈমান ও হিসাব প্রস্তুতির প্রাণ। যার চিন্তাধারা ও জ্ঞানগত উন্নতি হবে কুরআন-সুন্নাহ, ঈমান ও হিসাব প্রস্তুতির পরিবেশে এবং তার ছায়াতলে। আর শাহ সাহেব (র) ছিলেন (যেমনটি তার জীবনকর্ম থেকে জানা যায়) এই স্পর্শকাতর জটিল বিষয়ে কলম ধরার জন্য উচ্চ মাপের ব্যক্তিত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পৃথক</strong> <strong>সংকলনের</strong> <strong>প্রয়োজনীয়তা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>প্রবীণ</strong> <strong>আলেমদের</strong> <strong>প্রাথমিক</strong> <strong>চেষ্টা</strong></h4>
<p>শাহ সাহেব (র) এ বিষয়ে প্রবীণদের সংক্ষিপ্ত চেষ্টা-সাধনার বর্ণনা দিয়ে লিখেন- &#8216;পূর্বসূরীগণ সেসব উপকারিতার পর্দা উন্মোচন করেছেন, শরয়ী অধ্যায়গুলোতে যার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পরবর্তী গবেষকগণ কতিপয় অতি মূল্যবান তত্ত্বও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার পরিমাণ এতটুকু যে, আজ এ বিষয়ের সমালোচনা ঐক্য বিনষ্টকারী হয়নি। কেউ এ বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেনি। এর মূলনীতি ও শাখামূলক বিষয়গুলো কেউ পুরোপুরি বিন্যাস করেননি।&#8217; এ প্রসঙ্গে শাহ সাহেব (র) ইমাম গাযালী (র), আল্লামা খাত্তাবী ও শায়খুল ইসলাম ইযযুদ্দীন ইবনে আবদুস সালাম (র)-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যাদের গ্রন্থাবলি ও রচনাবলিতে অল্প অল্প এমন সব বিষয়বস্তু ও ইংগিত পাওয়া যায়, শাহ সাহেব (র) &#8220;শরয়ী আহকাম উপকারিতা নির্ভর নয় এবং আসল ও প্রতিদানের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা তেমন একটা জরুরী নয়।&#8221; এই দাবী প্রত্যাখ্যান প্রসঙ্গে সেসব আয়াতে কারীমা ও হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন, যেগুলোর মধ্যে বিভিন্ন আমল এবং তার পরিণতির মাঝে সম্পৃক্ততার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও বিধি-বিধানের ইল্লত এবং উপকারিতাও বর্ণনা করা হয়েছে। আবার সেসব হাদীসও উল্লেখ করেছেন, যেগুলো কোনও ইবাদত-বন্দেগী অথবা কোনও আমল শরীয়ত-নির্দেশিত হওয়ার কারণ এবং নিরূপণের রহস্য বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কোনও কোনও নিষেধাজ্ঞার সেসব কারণ ও রহস্যের বিভিন্ন উদাহরণও দিয়েছেন, যা হযরত উমর (রা) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম থেকে বর্ণিত আছে।</p>
<p>আর প্রত্যাখ্যান করেছেন সেসব চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেসবের জবাবও দিয়েছেন, যারা এই জটিল বিষয়ের সংকলনকে অসম্ভব কিংবা নিরর্থক বা অভিনব কাজ বলতেন। তাছাড়া এ বিষয়ে সে সময় পূর্ণ মনোযোগিতা না থাকার কী কারণ ছিল, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।</p>
<p>এ শাস্ত্র সংকলনের প্রয়োজনীয়তা ও রহস্য বর্ণনা করতঃ শাহ সাহেব লিখেন, “এমন কিছু হাদীস বাহ্যতঃ যেগুলোকে পুরোপুরি কিয়াসবিরোধী মনে হত, কোনও কোনও ফকীহ সেগুলোকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করাকে বৈধ জ্ঞান করতেন। এ কারণেও হাদীসসমূহের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।“ <strong>উম্মতের</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>শ্রেণীর</strong> <strong>বিরোধপূর্ণ</strong> <strong>কর্মপদ্ধতি</strong><strong>, </strong><strong>কারও</strong> <strong>কারও</strong> <strong>যুক্তি</strong> <strong>ও</strong> <strong>বিবেক</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>একেবারে</strong> <strong>চোখ</strong> <strong>বন্ধ</strong> <strong>করে</strong> <strong>নেওয়া</strong><strong>, </strong><strong>কারও</strong> <strong>কারও</strong> <strong>অলীক</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>দান</strong> <strong>এবং</strong> <strong>এহেন</strong> <strong>অবস্থায়</strong><strong> &#8216;صرف عن الظاهر&#8217; (</strong><strong>বাহ্যিকতা</strong> <strong>বিমুখ</strong> <strong>হওয়া</strong><strong>)-</strong><strong>এর</strong> <strong>উপর</strong> <strong>নির্দ্বিধায়</strong> <strong>আমল</strong> <strong>করা</strong><strong>, </strong><strong>যেখানে</strong> <strong>হাদীসসমূহ</strong> <strong>যৌক্তিক</strong> <strong>নীতিমালার</strong> <strong>পরিপন্থী</strong> <strong>দেখা</strong> <strong>যায়</strong> <strong>এবং</strong> <strong>এ</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>অসংখ্য</strong> <strong>দলের</strong> <strong>সীমালঙ্ঘন</strong> <strong>শাহ</strong> <strong>সাহেবের</strong> <strong>নিকট</strong> <strong>এ</strong> <strong>শাস্ত্রের</strong> <strong>নতুন</strong> <strong>সংকলনকে</strong> <strong>না</strong> <strong>কেবল</strong> <strong>বৈধ</strong> <strong>ও</strong> <strong>উপকারী</strong> <strong>সাব্যস্ত</strong> <strong>করে</strong> <strong>বরং</strong> <strong>একে</strong> <strong>দীনের</strong> <strong>বিরাট</strong> <strong>বড়</strong> <strong>খেদমত</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সময়ের</strong> <strong>অতি</strong> <strong>গুরুত্বপূর্ণ</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>বলেই</strong> <strong>প্রমাণ</strong> <strong>করে।</strong></p>
<p>প্রয়োজনীয়তার এই অনুভূতি, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সময়ের চাহিদাগুলো ছাড়া শাহ সাহেব এই মহান কাজের পূর্ণতা দানের জন্য কিছু গাইবী (অদৃশ্য) সুসংবাদ এবং নবুওয়াতের দরবার থেকে এমন একটি ইংগিতও পেয়েছেন- যাতে অনুমিত হয়, দীনের নতুন একটি বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা উদ্দেশ্য। শাহ সাহেব (র) বলেন, &#8216;আমি অন্তরে এমন একটি আলোকবর্তিকা পেলাম, যা বরাবরই বৃদ্ধি পেতে থাকে। মক্কা শরীফে অবস্থানকালে আমি একবার ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রা) কে স্বপ্নে দেখলাম। তারা আমাকে কলম দান করলেন আর বললেন, এটা আমাদের নানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কলম।&#8217; শাহ সাহেবের শিষ্য ও সঙ্গীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্নেহের ছাত্র তার মামাতো ভাই, শ্যালক, ঘর-বাইরের বন্ধু শায়খ মুহাম্মদ আশেক ফুলতী (র)- এর সবচেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষা ও পীড়াপীড়ি ছিল এ কাজের পূর্ণতা দানের পেছনে। যিনি শাহ সাহেবের মন-মানস সম্পর্কে সবচেয়ে অভিজ্ঞ, তার জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা সম্পর্কে সর্বাধিক ওয়াকিফহাল ছিলেন। মোটকথা, আল্লাহ তা&#8217;আলা শাহ সাহেবকে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ সুসম্পন্ন করার তাওফীক দান করেন আর তার কলম দ্বারা এই অমূল্য গ্রন্থ রচিত হয়ে জ্ঞানী মহলের হাতে পৌঁছে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ভূমিকা</strong><strong>, </strong><strong>মৌলিক</strong> <strong>বিষয়সমূহ</strong><strong>, </strong><strong>আদেশ</strong> <strong>দান</strong><strong>, </strong><strong>পুরস্কার</strong> <strong>ও</strong> <strong>শাস্তি</strong></h4>
<p>কিতাবের প্রথমভাগে শাহ সাহেব ভূমিকাস্বরূপ সেসব আলোচনা সন্নিবেশিত করেছেন, যার দ্বারা সৃষ্টিকর্তার হেদায়াত, আসমানী শিক্ষা, নবী- রাসূল প্রেরণ ও তাদের শিক্ষা-দীক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রতীয়মান হয়। তাতে অত্যন্ত মৌলিক ও ভিত্তিমূলক আলোচনাটি তিনি باب سر التكليف শিরোনামের অধীনে বর্ণনা করেছেন। যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন, <strong>&#8216;</strong><strong>তাকলীফ</strong> <strong>বা</strong> <strong>আদেশ</strong> <strong>দান</strong><strong>&#8216; </strong><strong>মানবজাতির</strong> <strong>জন্মগত</strong> <strong>চাহিদাগুলোর</strong> <strong>একটি।</strong> মানুষ তার যোগ্যতার ভাষায় আবেদন করে- আল্লাহ তা&#8217;আলা যেন তার উপর এমন জিনিস ওয়াজিব করেন, যা ফিরিশতাসুলভ শক্তিতুল্য। এরপর তার বিনিময়ে যেন সওয়াব দেন। আর তার উপর (তার মধ্যে সুপ্ত) পশুবৃত্তি বা পাশবিকতায় নিমজ্জিত হওয়াকে হারাম করেন এবং তাকে শাস্তি দেন। এ ব্যাপারে শাহ সাহেবের প্রাণী জগৎ, উদ্ভিদ এবং মানব জাতির উপর ব্যাপক ও গভীর জ্ঞান-গবেষণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সাথে সাথে মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসা ও বনাজী সম্পর্কে অবগতিও প্রকাশ পায়। শাহ সাহেব যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করেছেন, মানুষের প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিৎজগতের সাথে যে বিশেষ পার্থক্য রয়েছে এবং তার ভেতর যেসব যোগ্যতা ও জন্মগত প্রত্যাশা-চাহিদা সুপ্ত রাখা হয়েছে, তা বস্তুতঃ শরয়ী তাকলীফ (আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে সম্বোধন করে কোনও বিধি-নিষেধ পালনের আদেশ দান) এবং মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা&#8217;আলার হেদায়াত প্রত্যাশা করে। শাহ সাহেব একে &#8216;التكفف الحالى&#8221; প্রকৃতির ভাষায় ভিক্ষে চাওয়া ও হাত পাতা) -এর মত উচ্চাঙ্গের শব্দে ব্যক্ত করেছেন। সেসঙ্গে &#8216; التكففا لعلمى&#8217; (জ্ঞানের ভিক্ষাবৃত্তি) শব্দ বৃদ্ধি করেন।</p>
<p>তাঁর মতে মানুষের মধ্যে (বিবেক-বুদ্ধি ও বাকশক্তি ছাড়াও) আরও দুটি বিষয় রয়েছে। براعة القوة العملية وزيادة القوة العقلية এতে মানুষের মধ্যে কেবল বিবেকবুদ্ধি ও কর্মশক্তির অস্তিত্বই নয় বরং সেসবের উন্নতি, সাহসিকতা, পূর্ণতা কামনা, অতৃপ্তিও তার জন্মগত স্বভাব। শাহ সাহেবের মতে ফিরিশতাগণের সৃষ্টি, বড় বড় ঘটনাবলি ও নবী-রাসূল প্রেরণ এরই ফলাফল। প্রকারান্তরে ঐ অনুগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বিস্ময়-কমনীয়তা, যা গোটা মানবজাতির মাঝে ব্যাপৃত। এসব খোদায়িত্ব ও আল্লাহর রহমতের ঝলক। <strong>তার</strong> <strong>মতে</strong> <strong>ইবাদত</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বন্দেগী</strong> <strong>ও</strong> <strong>শরীয়ত</strong> <strong>পরিপালন</strong> <strong>মানব</strong> <strong>জাতির</strong> <strong>এমন</strong> <strong>এক</strong> <strong>জাতিগত</strong> <strong>চাহিদা</strong><strong>, </strong><strong>যেমন</strong><strong>&#8211; </strong><strong>হিংস্র</strong> <strong>প্রাণীর</strong> <strong>গোশত</strong> <strong>ভক্ষণ</strong><strong>, </strong><strong>চতুষ্পদ</strong> <strong>জন্তুর</strong> <strong>ঘাসে</strong> <strong>বিচরণ</strong><strong>, </strong><strong>মৌমাছির</strong> <strong>স্বীয়</strong> <strong>নেতা</strong><strong> (</strong><strong>রাণী</strong><strong>) &#8211;</strong><strong>এর</strong> <strong>প্রতি</strong> <strong>আনুগত্য</strong> <strong>প্রদর্শন।</strong> <strong>তবে</strong> <strong>প্রাণীজগতের</strong> <strong>জ্ঞান</strong> <strong>প্রাকৃতিক</strong> <strong>প্রত্যাদেশের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সম্পৃক্ত</strong><strong>, </strong><strong>আর</strong> <strong>মানবীয়</strong> <strong>জ্ঞান</strong><strong>, </strong><strong>কাজকর্ম</strong> <strong>ও</strong> <strong>জীবিকার্জন</strong> <strong>দেখা</strong> <strong>বা</strong> <strong>অহী</strong> <strong>কিংবা</strong> <strong>অনুসরণ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>অনুকরণের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সম্পৃক্ত।</strong></p>
<p>এরপর শাহ সাহেব মাজাযাত (প্রতিদান ও শান্তি) কে শরয়ী তাকলীফের কুদরতী চাহিদা বলেন। তার নিকট এর কারণ চারটিঃ</p>
<p>১. শ্রেণীগত চাহিদা।</p>
<p>২. উর্ধ্বজগতের প্রভাব।</p>
<p>৩. শরীয়তের চাহিদা।</p>
<p>৪. নবী প্রেরণের ফল ও চাহিদা।</p>
<p>আল্লাহ তা&#8217;আলার কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও সাহায্যের ফায়সালার আবশ্যকীয়তা। তারপর মানুষের মধ্যে নিজের স্বভাব-প্রকৃতিতে পার্থক্যের কারণে চরিত্র, কাজকর্ম ও যোগ্যতার স্তরেও পার্থক্য হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে শাহ সাহেব মালাকিয়্যাত ও রাহীমিয়্যাত (ফিরিশতাসুলভ ও পশুসুলভ অবস্থা-গুণ)-এর সহাবস্থান, এগুলোর প্রবলতা ও দুর্বলতার সাদৃশ্য আর এগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের প্রকারভেদের (যেগুলোকে তিনি &#8216;আকর্ষণ&#8217; ও &#8216;পরিভাষা&#8217; শব্দে ব্যক্ত করেন) আটটি রূপ এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্যাবলি বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে যেগুলো প্রাধান্যপ্রাপ্ত, সেগুলো উল্লেখ করেছেন। এই আলোচনা ও বিশ্লেষণ শাহ সাহেবের ধীশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন এবং কিতাবেরই একটি বৈশিষ্ট্য। এতে মানুষের অবস্থা ও স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান-গবেষণা জানা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আমলের গুরুত্ব ও তার প্রভাব</strong></h4>
<p>শাহ সাহেব আমলের গুরুত্ব, মানবীয় বৈশিষ্ট্য-গুণের উপর তার প্রভাব এবং দুনিয়া-আখেরাতে তার প্রতিক্রিয়ার রূপরেখা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একটি সময় এমন আসে, যখন আমলসমূহে (উর্ধ্বজগতের পছন্দ- অপছন্দের কারণে) এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যা হয়ে থাকে সেসব তাবীয ও নকশায়, যেগুলো সবিশেষ গঠন-বৈশিষ্ট্যসহ প্রবীণদের থেকে বর্ণিত।</p>
<p><strong>এভাবে</strong> <strong>বইটির</strong> <strong>এ</strong> <strong>প্রারম্ভিক</strong> <strong>আলোচনা</strong> <strong>অধ্যয়নকারীদের</strong> <strong>মেধা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>মননকে</strong> <strong>সামনের</strong> <strong>সেসব</strong> <strong>আলোচনার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>প্রস্তুত</strong> <strong>করে</strong> <strong>দেয়</strong><strong>, </strong><strong>যার</strong> <strong>ভিত্তিই</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>মানুষের</strong> <strong>শ্রেণীগত</strong> <strong>চাহিদাসমূহ</strong> <strong>উপলব্ধি</strong> <strong>করা</strong><strong>, </strong><strong>শরয়ী</strong> <strong>তাকলীফের</strong> <strong>কারণগুলো</strong> <strong>ও</strong> <strong>তার</strong> <strong>উপর</strong> <strong>আরোপিত</strong> <strong>সাজা</strong> <strong>ও</strong> <strong>পুরস্কার</strong><strong>, </strong><strong>খোদায়িত্ব</strong> <strong>ও</strong> <strong>রহমতের</strong> <strong>দাবীসমূহ</strong><strong>, </strong><strong>আমলসমূহের</strong> <strong>রূপরেখা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সেগুলোর</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>সামাজিক</strong> <strong>পদ্ধতি</strong><strong>, </strong><strong>মানবজীবনের</strong> <strong>সঙ্গে</strong> <strong>সম্পৃক্ততা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সেসব</strong> <strong>অদৃশ্য</strong> <strong>আলামত</strong> <strong>ও</strong> <strong>জিনিসগুলোর</strong> <strong>অস্তিত্ব</strong> <strong>স্বীকার</strong> <strong>করে</strong> <strong>নেওয়ার</strong> <strong>উপর</strong> <strong>সীমাবদ্ধ।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইরতিফাকাত বা আশ্রয় গ্রহণ</strong></h4>
<p>হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা পাঠ করলে মনে হয়, শাহ সাহেবের দূরদৃষ্টি ও পরিবর্তনশীল অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোর গভীর ও বাস্তবদর্শী পর্যবেক্ষণ (আল্লাহর সমর্থনের সাহায্যে) বুঝে নিয়েছিল যে, শীঘ্রই এমন যুগ আসবে, যাতে একদিকে মানুষ শরীয়তের আহকামে বিশেষতঃ হাদীস ও সুন্নাহর শিক্ষা আর নবীজীর পবিত্র বাণীসমূহের রহস্যভেদগুলো বুঝার জন্য সচেষ্ট হবে। এসবের সভ্যতা-সাংস্কৃতিক, সম্মিলিত, সামাজিক ও বাস্তবিক উপকারিতাগুলো জানতে চাইবে। অপরদিকে সে দীন-ধর্ম ও জীবনের মধ্যকার সম্পর্ক উপলব্ধি করবে। ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষা ও আসমানী হেদায়াতকে জীবনের বিস্তৃত পরিমণ্ডল এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, উপকরণ ও ফলাফলের মধ্যকার সম্পর্কের নিরিখে বুঝা এবং এসবের উপকারিতা উপলব্ধির চেষ্টা করবে।</p>
<p>এজন্য শাহ সাহেব যে &#8216;হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা&#8217; কে মূলতঃ শরীয়তের রহস্যভেদ এবং হাদীস ও সুন্নাহর যৌক্তিক ব্যাখ্যাস্বরূপ লেখা হয়েছে, সে গ্রন্থখানা &#8216;শরীয়া ব্যবস্থা&#8217; থেকে শুরু করার কারণে- যার শুরুভাগে সেসব আদেশ-নিষেধ বর্ণিত হয়েছে, যার মৌলিক সম্পর্ক প্রতিদান ও শাস্তি, পরলৌকিক মুক্তি আর শাহ সাহেবের পরিভাষা  محبث البر والاثم ( পাপ-পুণ্য অধ্যায়) এর সাথে, প্রথমে সেসব আলোচনা দ্বারা শুরু করেছেন, যার সম্পর্ক বিশ্ব চরাচরের সৃষ্টিগত ব্যবস্থা ও মানব জীবনের সাথে। যার অনুসরণে একটি সুস্থ সামাজিক রূপরেখা ও একটি সুস্থ সভ্যতা অস্তিত্ব লাভ করে। শাহ সাহেব এক্ষেত্রে &#8216;ইরতিফাকাত&#8217; পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। যা আমাদের জানামতে ইতোপূর্বে মুসলমান দার্শনিক-মুতাকাল্লিম, প্রজ্ঞাবান চিন্তাবিদ ও আলেম শ্রেণী (অন্তত এতটুকু সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে) ব্যবহার করেননি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইরতিফাকাতের গুরুত্ব</strong></h4>
<p><strong>ইরতিফাকাত</strong> <strong>বলে</strong> <strong>শাহ</strong> <strong>সাহেবের</strong> <strong>উদ্দেশ্য</strong><strong>, </strong><strong>মানুষের</strong> <strong>পারস্পরিক</strong> <strong>বৈধ</strong> <strong>হিতাকাঙ্ক্ষা</strong><strong>, </strong><strong>সাহায্য</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সহযোগিতা</strong><strong>, </strong><strong>সামাজিক</strong> <strong>সম্মিলিত</strong> <strong>কর্মকাণ্ড</strong><strong>, </strong><strong>ন্যায়ানুগ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ভারসাম্যপূর্ণ</strong> <strong>নাগরিক</strong> <strong>জীবন</strong> <strong>প্রতিষ্ঠার</strong> <strong>জন্য</strong><strong> &#8216;</strong><strong>হিতকর</strong> <strong>ব্যবস্থাপনা</strong><strong>&#8216;</strong><strong>।</strong> এভাবে শাহ সাহেব মানবীয় উৎকর্ষতার ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় দিক এবং ইহ ও পারলৌকিক উভয় জীবন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। শাহ সাহেবের মতে এই ‘নেযামে তাকবীনী’ তথা সৃজনশীল ব্যবস্থাপনা কেবল নবীগণের আনীত শরয়ী ব্যবস্থাপনার অনুকূল হওয়াই যথেষ্ট নয় বরং তার জন্য সাহায্য-সহযোগিতাকারী ও তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের খাদেম হয়ে থাকা উচিৎ। তিনি সভ্যতার আলেম ও অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের মাঝে প্রথমবার চারিত্রিক জ্ঞানের সাথে অর্থনীতি ও জীবিকা নির্বাহ জ্ঞানের গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। <strong>শাহ</strong> <strong>সাহেবের</strong> <strong>মতে</strong> <strong>যখন</strong> <strong>এই</strong> <strong>সম্পর্ক</strong> <strong>ছিন্ন</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>তখন</strong> <strong>অর্থনীতি</strong> <strong>ও</strong> <strong>চরিত্র</strong><strong>&#8211;</strong><strong>নৈতিকতা</strong> <strong>দুটিই</strong> <strong>চরম</strong> <strong>মুমূর্ষু</strong> <strong>অবস্থায়</strong> <strong>পতিত</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>যার</strong> <strong>প্রভাব</strong> <strong>ধর্ম</strong><strong>, </strong><strong>চরিত্র</strong><strong>, </strong><strong>স্থিতিশীল</strong> <strong>শান্তিপূর্ণ</strong> <strong>জীবন</strong><strong>, </strong><strong>মানুষের</strong> <strong>পারস্পরিক</strong> <strong>সম্পর্ক</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সভ্যতা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সংস্কৃতির</strong> <strong>উপর</strong> <strong>পতিত</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>তার</strong> <strong>মতে</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>সামাজিক</strong> <strong>অবকাঠামো</strong> <strong>তখনই</strong> <strong>একেবারে</strong> <strong>ধ্বংস</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>যখন</strong> <strong>কোনও</strong> <strong>কঠোরতা</strong> <strong>আরোপের</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>তাদেরকে</strong> <strong>অর্থনৈতিক</strong> <strong>সংকটে</strong> <strong>বাধ্য</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>সে</strong> <strong>সময়</strong> <strong>এই</strong> <strong>মানুষ</strong><strong> (</strong><strong>যাদের</strong> <strong>ভেতর</strong> <strong>আল্লাহ</strong> <strong>তা</strong><strong>&#8216;</strong><strong>আলা</strong> <strong>উচ্চস্তরের</strong> <strong>আত্মিক</strong> <strong>যোগ্যতা</strong><strong>, </strong><strong>আধ্যাত্মিক</strong> <strong>শক্তি</strong> <strong>ও</strong> <strong>উন্নতির</strong> <strong>অপার</strong> <strong>সম্ভাবনা</strong> <strong>সুপ্ত</strong> <strong>রেখেছেন</strong><strong>, </strong><strong>তারা</strong><strong>) </strong><strong>এক</strong> <strong>টুকরো</strong> <strong>রুটির</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>গাধা</strong> <strong>ও</strong> <strong>বলদের</strong> <strong>মত</strong> <strong>বাধ্যগত</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>থাকে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সব</strong> <strong>ধরনের</strong> <strong>উন্নতি</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সমৃদ্ধি</strong> <strong>ও</strong> <strong>সৌভাগ্য</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যায়</strong> <strong>বঞ্চিত।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>নাগরিক ও সামাজিক জীবনের গুরুত্ব ও তার রূপরেখা</strong></h4>
<p>শাহ সাহেব নাগরিক ও সামাজিক জীবনের পরিচয় (যার কেন্দ্রস্থলকে المدينة -রাজধানী শব্দে ব্যক্ত করে) এমন জ্ঞানগর্ভ ভাষায় পেশ করেন, যার চেয়ে উৎকৃষ্ট ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত (লেখক-দার্শনিকদের মাঝে) করা হয়নি। তিনি (باب سياسية المدنية )শহরের রাজনীতি অনুচ্ছেদ শিরোনামে লিখেছেন- &#8216;শহর বলে আমার উদ্দেশ্য মানুষের সে দল, যাতে কোনও শ্রেণীর ঘনিষ্ঠতা থাকবে এবং তাদের মধ্যে লেনদেন ও আচার- অনুষ্ঠানে থাকবে অংশীদারিত্ব। অবশ্য তারা বসবাস করবে বিভিন্ন স্থানে।</p>
<p>তিনি নগর ব্যবস্থা-এর সংজ্ঞায় বলেন, <strong>&#8216;</strong><strong>নগর</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong><strong>&#8216; </strong><strong>দ্বারা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>উদ্ধেশ্য</strong> <strong>হল</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কৌশল</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>এই</strong> <strong>নাগরিক</strong> <strong>জীবনের</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>মধ্যকার</strong> <strong>পারস্পরিক</strong> <strong>সম্পর্ক</strong> <strong>সংরক্ষণের</strong> <strong>পদ্ধতি</strong> <strong>সম্পর্কে</strong> <strong>আলোচনা</strong> <strong>করে।</strong></p>
<p>অনন্তর তিনি এই সভ্যজীবন বা শহরের সংজ্ঞায় আরেকটু অগ্রসর হয়ে বলেন, &#8216;শহরকে তার অধিবাসী বা নাগরিকদের মাঝে বিদ্যমান পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে একক ব্যক্তি মনে করা উচিৎ, যা বিভিন্ন অঞ্চল ও সামাজিক রূপরেখায় গঠিত হয়েছে।&#8217; তার মতে &#8220;ইরতিফাক&#8221; (মৌলিক অধিকার) দুই প্রকার। ১. প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয়। যা গ্রাম্যলোকদেরও আছে।</p>
<p>২. সামাজিক বা উন্নত, যা শহরবাসীর (শহুরে ও সভ্য লোকজনের) রয়েছে।</p>
<p><strong>এছাড়া</strong> <strong>তৃতীয়</strong> <strong>আরেকটি</strong> <strong>প্রকারও</strong> <strong>আছে।</strong> <strong>সেটি</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>রাজনীতি</strong> <strong>ও</strong> <strong>ব্যবস্থাপনা।</strong> <strong>অধিকন্তু</strong> <strong>এর</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>চতুর্থ</strong> <strong>আরেক</strong> <strong>প্রকার</strong> <strong>বেরিয়েছে</strong><strong>&#8211; </strong><strong>গণপ্রতিনিধিত্ব।</strong> <strong>শাহ</strong> <strong>সাহেব</strong> <strong>চতুর্থ</strong> <strong>ইরতিফাকে</strong> <strong>দেশবাসী</strong><strong> (</strong><strong>বিভিন্ন</strong> <strong>রাষ্ট্র</strong> <strong>ও</strong> <strong>দূরাঞ্চলগুলো</strong><strong>) &#8211;</strong><strong>এর</strong> <strong>পারস্পরিক</strong> <strong>সম্পর্ক</strong> <strong>রক্ষার</strong> <strong>উপর</strong> <strong>জোর</strong> <strong>দেন।</strong> <strong>এই</strong> <strong>সম্পর্ক</strong><strong> (</strong><strong>বিভিন্ন</strong> <strong>অঞ্চলের</strong> <strong>মাঝে</strong><strong>) </strong><strong>এতই</strong> <strong>জরুরী</strong><strong>, </strong><strong>যেমন</strong> <strong>ছিল</strong> <strong>একই</strong> <strong>শহরের</strong> <strong>নাগরিকদের</strong> <strong>মাঝে</strong> <strong>প্রাথমিক</strong> <strong>ও</strong> <strong>নির্দিষ্ট</strong> <strong>অবস্থায়।</strong><strong>&#8216;</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কর্মক্ষেত্র ও জীবিকা নির্বাহের প্রশংসিত ও ঘৃণিত রূপরেখা</strong></h4>
<p>ইরতিফাকাত প্রসঙ্গে জীবিকা নির্বাহের উপায় বর্ণনা করতে গিয়ে শাহ সাহেব অস্বাভাবিক ও অনৈতিক জীবনোপকরণ বা জীবিকা নির্বাহের পথগুলো উল্লেখ করতে ভুলেননি। তিনি বলেন, &#8216;অনেকের মন-মানসিকতা এমন হয়ে থাকে, যাদের বৈধ পন্থায় জীবিকা নির্বাহ কঠিন মনে হয়। তখন তারা জীবিকা নির্বাহের এমন সব পথে অগ্রসর হয়, যা নাগরিক ও সামাজিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। যেমন- চুরি, জুয়া, লুটতরাজ, ভিক্ষাবৃত্তি এবং বেআইনী ও অনৈতিক কাজ-কারবার।&#8217;</p>
<p>এই &#8216;ইরতিফাকাত&#8217; সম্পর্কিত আলোচনায় শাহ সাহেবের কলম থেকে এমন কিছু তত্ত্বকণিকা বেরিয়ে এসেছে, যার দ্বারা সভ্যতা, সমাজ ও মানবতার উত্থান-পতনের ইতিহাস সম্পর্কে তার গভীর-জ্ঞান-প্রজ্ঞাই প্রমাণ করে। তিনি বলেন, &#8216;যখন মন-মানসে অস্বাভাবিক স্পর্শকাতরতা, ভারসাম্যহীনতা, সীমাতিরিক্ত স্বাদ-আহলাদ, বাড়াবাড়ি পর্যায়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শঙ্কামুক্ত নিরাপত্তা এসে যায়, তখন জীবিকা নির্বাহের স্পর্শকাতর-মসৃণ ও জঘন্য নীচু পথ সৃষ্টি হয় আর প্রত্যেক ব্যক্তি একটি বিশেষ জীবনোপকরণ বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার ঠিকাদার হয়ে যায়।&#8217;</p>
<p>শাহ সাহেব নাগরিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোর মধ্যে আরও উল্লেখ করেছেন, সকল নাগরিকের একই আয়ের পথ বেছে নেয়া। যেমন, সকলেই ব্যবসা শুরু করল, কৃষিকাজ ছেড়ে দিল অথবা যুদ্ধের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পথ অবলম্বন করল। <strong>তাঁর</strong> <strong>মতে</strong> <strong>কৃষি</strong> <strong>খাদ্যের</strong> <strong>পর্যায়ে</strong> <strong>আর</strong> <strong>কারিগরি</strong><strong>, </strong><strong>শিল্প</strong><strong>, </strong><strong>ব্যবসা</strong> <strong>ও</strong> <strong>আইন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>শৃঙ্খলা</strong> <strong>লবণের</strong> <strong>পর্যায়ে।</strong> <strong>এ</strong> <strong>প্রসঙ্গেই</strong> <strong>শাহ</strong> <strong>সাহেব</strong> <strong>বিরাট</strong> <strong>এক</strong> <strong>তাত্ত্বিক</strong> <strong>কথা</strong> <strong>লিখেছেন।</strong> বলেছেন, &#8216;এ যুগে দেশ ধ্বংসের বড় দুটি কারণ রয়েছে।</p>
<p>১. বিনা পরিশ্রমে সরকারী তহবিলের উপর বোঝা হওয়া।</p>
<p>২. কৃষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও বিভিন্ন কর্মজীবীদের উপর ভারী ভারী ট্যাক্স চাপিয়ে দেওয়া। শেষাংশে বলেন- আমাদের যুগের লোকদের এই তাত্ত্বিক বাস্তবতা বুঝে নেওয়া এবং সচেতন হয়ে যাওয়া উচিত।&#8217;</p>
<p>সভ্যতা ও সামাজিক বিপর্যয় ও অবক্ষয় সৃষ্টিকারী কারণগুলোর মধ্যে শাহ সাহেব অতিরিক্ত আনন্দ-বিনোদনকেও গণ্য করেন। এতে জীবনোপকরণ ও পরকাল উভয়ই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তন্মধ্যে দাবা খেলায় বিভোর-মত্ততা, শিকারের ব্যাপকতা ও কবুতর পালনকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এভাবে চারিত্রিক অপরাধসমূহ ও এমন সব কাজকর্মকে মেনে নেওয়া, সাধারণতঃ যেগুলোকে কোনও সুস্থ-বিবেকবান মানুষ নিজের সত্ত্বার জন্য মেনে নিতে পারে না। সেগুলোকে সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর মনে করে। তার মতে এসব কারণে রাজত্বের পতন দেখা দেয়।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>সৌভাগ্য ও তার চার উৎস</strong></h4>
<p>কিতাবের চতুর্থ অনুচ্ছেদ مبحث السعادة (বা সৌভাগ্যের সোপান) প্রসঙ্গে। তাতে বলা হয়েছে, <strong>সৌভাগ্য</strong> <strong>অর্জন</strong> <strong>করা</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>গুরুত্বপূর্ণ</strong> <strong>বিষয়।</strong> <strong>আর</strong> <strong>তা</strong> <strong>আত্মশুদ্ধি</strong> <strong>এবং</strong> <strong>পশুবৃত্তিকে</strong> <strong>ফিরিশতাসুলভ</strong> <strong>শক্তির</strong> <strong>অনুগত</strong> <strong>বানানোর</strong> <strong>দ্বারা</strong> <strong>অর্জিত</strong> <strong>হয়।</strong></p>
<p>শাহ সাহেবের মতে সৌভাগ্য লাভের মূল উৎস চারটি। যার জন্য নবী- রাসূল প্রেরিত হয়েছেন। আর এর ব্যাখ্যা আসমানী শরীয়ত। এটা বস্তুতঃ ধর্ম ও শরীয়তসমূহের মৌলিক শাখাগুলোর সামগ্রিক শিরোনাম এবং নবী-রাসূল (স) প্রেরণের উদ্দেশ্যসমূহ পূর্ণতা দানের কার্যকরী মাধ্যম।</p>
<p>১. পবিত্রতা (তথা শারীরিক পবিত্রতা, যা মানুষকে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করে)।</p>
<p>২. আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা (তথা তাওবা ও অক্ষমতা প্রকাশ, অনুতাপ-অনুশোচনা, আল্লাহর প্রতি মনযোগিতা এবং বিনয়-নম্রতা)।</p>
<p>৩. সততা, উন্নত চরিত্র ও উঁচু স্তরের কাজকর্ম।</p>
<p>৪. দীনদারী ও ন্যায়নিষ্ঠা (তথা এমন আত্মিক যোগ্যতা, যার প্রতিক্রিয়ায় দেশ ও জাতির শৃঙ্খলা সহজেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়)।</p>
<p>এভাবে শাহ সাহেব মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং একটি সুস্থ ও পরস্পর সহমর্মী সমাজ বিনির্মাণের মূলনীতিগুলো তুলে ধরেছেন, যা আসমানী শরীয়ত ও নবী-রাসূল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য।</p>
<p>এরপর উক্ত চারটি গুণ অর্জনের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। অনন্তর সেসব প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো স্বভাবজাত আদর্শ বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায়। তন্মধ্যে তিন প্রকার গ্রহণ করেছেনঃ</p>
<p>১. হিজাবুত তবা (তথা মানবিক ও মানসিক চাহিদাগুলোর প্রাধান্য)।</p>
<p>২. হিজাবুর রুসম (বাইরের অবস্থা ও পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব)।</p>
<p>৩. হিজাবু সূইল মা&#8217;রিফা (তথা ভ্রান্ত শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রচলিত ভ্রান্ত আকীদাসমূহের প্রভাব)।</p>
<p>এরপর তিনি এসবের প্রতিকার বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আকীদা ও ইবাদত</strong></h4>
<p>কিতাবের মূখ্য বিষয় শুরু হয়েছে পঞ্চম অধ্যায় مبحث البر والاثم থা পাপ-পুণ্য অনুচ্ছেদ থেকে। বস্তুতঃ কিতাবের আলোচ্য বিষয় ও উদ্দেশ্য এটিই। <strong>&#8216;بر&#8217; </strong><strong>বা</strong> <strong>পুণ্যের</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হিসেবে</strong> <strong>শাহ</strong> <strong>সাহেব</strong> <strong>সর্বপ্রথম</strong> <strong>তাওহীদ</strong> <strong>সম্পর্কে</strong> <strong>আলোচনা</strong> <strong>করেছেন।</strong> কারণ, এর উপরই মুখাপেক্ষিতা, অক্ষমতা, অনুতাপ-অনুযোগ প্রকাশ সীমাবদ্ধ, যা সৌভাগ্য লাভের সবচেয়ে বড় উপায়। এক্ষেত্রে শাহ সাহেব তাওহীদের চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন। সাথে সাথে আরবের মুশরিকদের শিরকের বাস্তবতা উন্মোচন করেছেন। তাওহীদের পর আল্লাহ পাকের গুণাবলির উপর ঈমান আনয়ন, ভাগ্যলিপির উপর ঈমান আনয়ন এবং আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন (যেমন- শাহ সাহেবের মতে কুরআন, কা&#8217;বা, নবী এবং নামায সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন)। এর আলোচনা করতঃ শাহ সাহেব ইবাদত-আনুগত্য ও ফরযসমূহের প্রসঙ্গ শুরু করেছেন এবং সংক্ষেপে অযু-গোসলের রহস্য, নামাযের রহস্য, যাকাতের রহস্য, রোযার রহস্য ও হজ্জের রহস্য সম্পর্কে বিবরণ দিয়েছেন। এসব আলোচনা যদিও মৌলিক ও সংক্ষিপ্ত, তথাপি তাতে এমন এমন তত্ত্ব ও তথ্য রয়েছে, যা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন।</p>
<p>যেমন &#8216;নামাযের রহস্য&#8217; অনুচ্ছেদে শাহ সাহেব লিখেন, ইবাদতের এই পদ্ধতি তিনটি শারীরিক অবস্থা তথা কিয়াম (দণ্ডায়মান হওয়া), রুকু (মাথা অর্ধনমিত করে ঝুঁকে থাকার অবস্থা) ও সিজদা (কপাল মাটিতে মিলানো অবস্থা) এর সমন্বয়। এখানে বড় থেকে ছোট দিকে অবনমিত হওয়ার স্থলে নিচ থেকে বড় দিকে (কিয়াম থেকে রুকু; রুকু থেকে সিজদার দিকে) উন্নীত হওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছে। আর এটাই যুক্তি ও স্বভাবসম্মত। এরপর শাহ সাহেব ইবাদত প্রসঙ্গে আল্লাহ পাকের শ্রেষ্ঠত্ব-মাহাত্ম্য চিন্তাভাবনা, ধ্যান-মগ্নতা ও অব্যাহত যিকির-এর উপর আলোচনা সংক্ষিপ্ত না করার (যা ছিল প্রাচ্যবিদ, দার্শনিক ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের রীতি আবার কোনও কোনও লাগামহীন সূফী দরবেশও এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল) কারণ বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, এই চিন্তা-গবেষণা ও ধ্যান-তন্ময়তা সেসব লোকদের জন্য সম্ভব ও উপকারী ছিল, যাদের মন-মানস সেসবের সাথে সামঞ্জস্য রাখত। তারা এর মাধ্যমে উন্নতি করতে পারত। <strong>নামায</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>চিন্তা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>গবেষণা</strong> <strong>ও</strong> <strong>কাজ</strong><strong>, </strong><strong>মানসিক</strong> <strong>আকর্ষণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>শারীরিক</strong> <strong>কর্মব্যস্ততার</strong> <strong>অবলেহ</strong> <strong>সমন্বয়।</strong> <strong>নামায</strong> <strong>সর্বশ্রেণীর</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>উপকারী</strong> <strong>ও</strong> <strong>বিরাট</strong> <strong>প্রতিক্রিয়াশীল</strong> <strong>প্রতিষেধক।</strong> <strong>কুসংস্কারের</strong> <strong>বিষবাষ্প</strong><strong> (</strong><strong>পরিবেশের</strong> <strong>বিরূপ</strong> <strong>প্রভাব</strong><strong>) </strong><strong>থেকে</strong> <strong>পরিত্রাণ</strong> <strong>লাভ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>মন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>মানস</strong> <strong>বিবেকের</strong> <strong>অনুগত</strong> <strong>হওয়ার</strong> <strong>প্রশিক্ষণের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>নামায</strong> <strong>অপেক্ষা</strong> <strong>বড়</strong> <strong>কোনও</strong> <strong>ফলপ্রসূ</strong> <strong>ও</strong> <strong>কার্যকরী</strong> <strong>পদ্ধতি</strong> <strong>নেই।</strong></p>
<p>রোযা ও হজ্জের সম্পর্ক যতদূর, সে সম্পর্কেও এ আলোচনায় কিছুটা ইংগিত প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডে এসবের উদ্দেশ্য, রহস্য ও তত্ত্বাবলি সম্পর্কে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার উপমা ইতোপূর্বে কোনও গ্রন্থে দৃষ্টিগোচর হয়নি। তার বিবরণ সামনে যথাস্থানে দেওয়া হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>জাতীয় রাজনীতি ও নবী-রাসূলের প্রয়োজনীয়তা</strong><strong> </strong></h4>
<p>ষষ্ঠ অধ্যায়ের শিরোনাম مبحث السياسات الملية বা জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গ। এটি কিতাবের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এর প্রথম অনুচ্ছেদে শাহ সাহেব অত্যন্ত বিচক্ষণতা, দূরদর্শীতা ও বাস্তবধর্মীতার সাথে বলেছেন, মানবজাতির জন্য সত্যের পথপ্রদর্শক ও জাতির সংস্কারক-সংগঠক (তথা নবী- রাসূল)-এর প্রয়োজন কেন হয়েছে? এর জন্য তাদের সুস্থ স্বভাবজাত জ্ঞান ও সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি কেন যথেষ্ট ছিল না? এরপর তিনি এ দলের গুণাবলি ও প্রয়োজনীয় শর্তাবলী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আরও লিখেছেন, তিনি কখন, কিভাবে আপন উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে পারেন এবং তাতে সাফল্য লাভ করতে পারেন। এ অনুচ্ছেদটি কালাম শাস্ত্রের কিতাবাদিতে বর্ণিত, &#8216;নবুওয়াত প্রমাণের সাধারণ আলোচনা&#8217; থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম মনে হয়। এতে সুস্থ জ্ঞান-বিবেককে আশ্বস্ত করার মত এমন উপাদান রয়েছে, যা কালাম শাস্ত্র ও আকাঈদের কিতাবাদিতে সাধারণতঃ পাওয়া যায় না। এ আলোচনায় নবুওয়াতের পদমর্যাদা ও এর বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে যে অনুচ্ছেদ রয়েছে, তা শাহ সাহেবের শরীয়তের প্রাণ ও নবুওয়াতের মেজাযের বাস্তবতা সম্পর্কে বিজ্ঞতা, মানবাত্মা সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন এবং চরিত্রের আভ্যন্তরীণ উৎস সম্পর্কে সচেতনতার প্রতি ইংগিত করে। এ অধ্যায়ে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণসমূহের ব্যাপারে স্ববিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সমসাময়িক দূতপ্রেরণ</strong></h4>
<p>শাহ সাহেব লিখেন, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ নবুওয়াত বা রিসালাত সেই নবী- রাসূলেরই হয়ে থাকে, যার প্রেরণ &#8216;মাকরূন&#8217; (বা যৌথ) হয় অর্থাৎ তার নবুওয়াতের সাথে গোটা এক জাতি তাবলীগ ও দাওয়াতের জন্য আদিষ্ট এবং তার সংস্পর্শের বরকতে তৈরী হয়ে অন্যান্য মানুষের শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যম হয়। <strong>নবীর</strong> <strong>আবির্ভাব</strong> <strong>হয়</strong> <strong>মৌলিকভাবে</strong><strong> (</strong><strong>আর</strong> <strong>একে</strong> <strong>নবুওয়াত</strong> <strong>বলা</strong> <strong>হয়</strong><strong>); </strong><strong>উম্মতের</strong> <strong>স্থলাভিষিক্ততা</strong> <strong>ও</strong> <strong>খেদমতের</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>অর্পণ</strong> <strong>হয়</strong> <strong>মধ্যস্থতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>প্রতিনিধিত্ব</strong> <strong>হিসেবে।</strong> রাসূলে কারীম (স) -এর আবির্ভাব এমনই পূর্ণাঙ্গ ছিল, যার সাথে পুরো এক উম্মতকে তাঁর নবুওয়াতের পদমর্যাদার খেদমত ও প্রসারের জন্য হাতিয়ার ও অস্ত্র বানানো হয়েছে। আর এর জন্য দূতপ্রেরণ ও সমার্থক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-</p>
<p>کنتم خير امة اخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون</p>
<p>عن المنكر.</p>
<p>&#8216;যত উম্মত সৃষ্টি হয়েছে, তন্মধ্যে তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত। তোমাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে, যাতে তোমরা লোকদেরকে সৎকাজের আদেশ কর আর নিষেধ কর অসৎকাজ থেকে। (সূরা আলে ইমরান : ১১০)</p>
<p>হাদীস শরীফে (বা&#8217;ছাত) &#8216;দূত প্রেরণ&#8217; শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করে বলেন,</p>
<p>فانما بعثتم ميسرين ولم تعثوا معسرين</p>
<p>&#8216;তোমাদেরকে সহজতার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; কঠিনতার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি।&#8217;</p>
<p>এ অনুচ্ছেদের বিশেষ প্রতিপাদ্য হচ্ছে সেটি, যাতে নবী-রাসূলগণের সীরাত (জীবন চরিত), তাদের আগ্রহ-চেতনা, মন-মানসিকতা, তাদের দাওয়াত-তাবলীগের পদ্ধতি, তাদের সম্বোধন ভঙ্গি ও শিক্ষাধারা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে শাহ সাহেবের দূরদর্শীতা, বিচক্ষণতা, নবুওয়াত ও আম্বিয়ায়ে কিরামের বৈশিষ্ট্যাবলির গভীর অধ্যয়ন এবং কুরআনে কারীমের অগাধ ব্যুৎপত্তি অনুমান করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইরান ও রোম সভ্যতায় চারিত্রিক ও ঈমানী মূল্যবোধের বিভৎসতা এবং মানবতার দুরাবস্থা</strong></h4>
<p>বর্বরতার যুগ যদিও আরবের সাথে সুনির্দিষ্ট ছিল না। তা ছিল বিশ্বময় বিস্তৃত আকীদাগত, চারিত্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এক বিপর্যয়, যা গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করে নিয়েছিল। কিন্তু ইরানী ও রোমীরা ছিল এর নেতা ও আসল কর্ণধার। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিকেই সে সময় পৃথিবীতে মানদণ্ড মনে করা হত। তারই (অন্ধ) অনুকরণ করা হত সর্বত্র। তাদের দেশগুলো, কেন্দ্রীয় শহর ও সমাজ সবচেয়ে বেশি এর আক্রমণে ছিল। এই অবস্থা-পরিস্থিতির যে চিত্র শাহ সাহেব অংকণ করেছেন এবং এর যেসব কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন, এর উত্তম চিত্র প্রাচীন জীবনচরিত ও ইতিহাসের কোনও কিতাবে এবং ইতিহাসে-দর্শন ও সামাজিক জ্ঞানের কোনও পণ্ডিতের কলমে রচিত হতে দেখা যায়নি। এখানে এসে শাহ সাহেবের কলম তার পূর্ণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে। তার লিখনী শক্তি ও রচনাশৈলী আপন উৎকর্ষতায় দেখা যায়। এর দ্বারা সাহেবের ইতিহাসের গভীর জ্ঞান, বাস্তবতা পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা ও প্রকৃত অবস্থাচিত্র পর্যবেক্ষণের আল্লাহর প্রদত্ত যোগ্যতা উপলব্ধি করা যায়। শাহ সাহেব লিখেন,</p>
<p><em>&#8216;</em><em>শত</em> <em>শত</em> <em>বছর</em> <em>ধরে</em> <em>স্বাধীন</em> <em>রাজত্ব</em> <em>করতে</em> <em>করতে</em> <em>আর</em> <em>দুনিয়ার</em> <em>নানা</em> <em>স্বাদ</em> <em>আস্বাদনে</em> <em>নিমজ্জিত</em> <em>থেকে</em><em>, </em><em>পরকালকে</em> <em>একেবারে</em> <em>ভুলে</em> <em>যাওয়া</em> <em>ও</em> <em>শয়তানের</em> <em>পূর্ণ</em> <em>নিয়ন্ত্রণাধীন</em> <em>হয়ে</em> <em>যাওয়ার</em> <em>কারণে</em> <em>ইরানী</em> <em>ও</em> <em>রোমীরা</em> <em>জীবনের</em> <em>সহজতা</em><em>&#8211;</em><em>অনাড়ম্বরতা</em> <em>ও</em> <em>সুখ</em><em>&#8211;</em><em>শান্তির</em> <em>উপকরণে</em> <em>বিরাট</em> <em>জটিলতা</em> <em>ও</em> <em>স্পর্শকাতর</em> <em>চিন্তাধারা</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করে</em> <em>নিয়েছিল।</em> <em>এতে</em> <em>সর্বপ্রকার</em> <em>উন্নতি</em> <em>ও</em> <em>উৎকৃষ্টতায়</em> <em>একে</em> <em>অন্যের</em> <em>থেকে</em> <em>অগ্রগামী</em> <em>হওয়া</em> <em>এবং</em> <em>গর্ব</em> <em>করার</em> <em>চেষ্টা</em> <em>চালাত।</em> <em>পৃথিবীর</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>অঞ্চল</em> <em>থেকে</em> <em>এসব</em> <em>কেন্দ্রস্থলে</em> <em>বড়</em> <em>বড়</em> <em>শিল্পী</em><em>&#8211;</em><em>কারিগর</em><em>, </em><em>পেশাজীবী</em> <em>ও</em> <em>দক্ষ</em> <em>লোকজন</em> <em>এসে</em> <em>জড়ো</em> <em>হয়েছিল।</em> <em>যারা</em> <em>আরাম</em><em>&#8211;</em><em>আয়েশ</em> <em>ও</em> <em>সুখ</em><em>&#8211;</em><em>শান্তির</em> <em>উপকরণে</em> <em>জটিলতা</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করত।</em> <em>নতুন</em> <em>নতুন</em> <em>সাজগোজ</em><em>&#8211;</em><em>প্রসাধন</em> <em>বের</em> <em>করত।</em> <em>তার</em> <em>উপর</em> <em>তাৎক্ষণিক</em> <em>আমল</em> <em>শুরু</em> <em>হয়ে</em> <em>যেত।</em> <em>তাতে</em> <em>যথারীতি</em> <em>পরিবর্ধন</em> <em>ও</em> <em>চমক</em> <em>থাকত।</em> <em>এসব</em> <em>নিয়ে</em> <em>গর্বও</em> <em>করা</em> <em>হত।</em> <em>জীবনযাত্রা</em> <em>এত</em> <em>উঁচু</em> <em>হয়ে</em> <em>গিয়েছিল</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আমীরদের</em> <em>কারও</em> <em>জন্য</em> <em>এক</em> <em>লাখ</em> <em>দিরহামের</em> <em>কমমূল্যের</em> <em>পাগড়ী</em> <em>বাঁধা</em> <em>ও</em> <em>মুকুট</em> <em>পরা</em> <em>ছিল</em> <em>চরম</em> <em>দোষণীয়।</em> <em>কারও</em> <em>নিকট</em> <em>যদি</em> <em>বিলাসবহুল</em> <em>প্রাসাদ</em><em>, </em><em>ফোয়ারা</em><em>, </em><em>গোসলখানা</em><em>, </em><em>বাগ</em><em>&#8211;</em><em>বাগিচা</em><em>, </em><em>আয়েশী</em> <em>খাবার</em><em>, </em><em>প্রশিক্ষিত</em> <em>জীবজন্তু</em><em>, </em><em>সুদর্শন</em> <em>যুবক</em> <em>ও</em> <em>গোলাম</em> <em>না</em> <em>থাকত</em><em>, </em><em>খাবারে</em> <em>বিলাসিতা</em> <em>ও</em> <em>আড়ম্বরতা</em> <em>আর</em> <em>পোশাক</em><em>&#8211;</em><em>পরিচ্ছদে</em> <em>বৈচিত্র্য</em> <em>না</em> <em>হত</em><em>, </em><em>তাহলে</em> <em>সম</em><em>&#8211;</em><em>সাময়িকদের</em> <em>মাঝে</em> <em>তার</em> <em>কোনও</em> <em>সম্মান</em> <em>থাকত</em> <em>না।</em> <em>এ</em> <em>বিবরণ</em> <em>অনেক</em> <em>দীর্ঘ।</em> <em>স্বদেশের</em> <em>রাজা</em><em>&#8211;</em><em>বাদশাদের</em> <em>যে</em> <em>অবস্থা</em> <em>দেখছেন</em><em>, </em><em>তা</em> <em>এর</em> <em>সঙ্গে</em> <em>অনুমান</em> <em>করতে</em> <em>পারেন।</em></p>
<p><em>এসব</em> <em>বিলাসিতা</em> <em>তাদের</em> <em>জীবন</em> <em>ও</em> <em>সমাজের</em><em> (</em><em>অবিচ্ছেদ্য</em><em>) </em><em>অংশ</em> <em>হয়ে</em> <em>গিয়েছিল।</em> <em>তাদের</em> <em>মনের</em> <em>ভেতর</em> <em>এমনভাবে</em> <em>বদ্ধমূল</em> <em>হয়ে</em> <em>গিয়েছিল</em> <em>যে</em><em>, </em><em>কোনভাবেই</em> <em>বের</em> <em>করা</em> <em>যেত</em> <em>না।</em> <em>এ</em> <em>কারণে</em> <em>এমন</em> <em>এক</em> <em>দূরারোগ্য</em> <em>ব্যাধি</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>হয়ে</em> <em>গিয়েছিল</em><em>, </em><em>যা</em> <em>তাদের</em> <em>সভ্যতায়</em> <em>ছড়িয়ে</em> <em>পড়েছিল।</em> <em>এ</em> <em>ছিল</em> <em>এক</em> <em>মহাবিপদ।</em> <em>যার</em> <em>থেকে</em> <em>সাধারণ</em><em>&#8211;</em><em>অসাধারণ</em><em>, </em><em>ধনী</em><em>&#8211;</em><em>দরিদ্র</em> <em>কেউই</em> <em>নিরাপদ</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em> <em>প্রত্যেক</em> <em>নাগরিকের</em> <em>উপর</em> <em>এই</em> <em>বিলাসিতা</em> <em>ও</em> <em>আমীরানা</em> <em>জীবনধারা</em> <em>এমনভাবে</em> <em>চেপে</em> <em>বসেছিল</em><em>, </em><em>যা</em> <em>তাদেরকে</em><em> (</em><em>সহজ</em><em>) </em><em>জীবন</em> <em>থেকে</em> <em>অক্ষম</em> <em>করে</em> <em>দিয়েছিল।</em> <em>তাদের</em> <em>মাথার</em> <em>উপর</em> <em>প্রতিনিয়ত</em> <em>উদ্বেগ</em><em>&#8211;</em><em>উৎকণ্ঠার</em> <em>এক</em> <em>পাহাড়</em> <em>পড়ে</em> <em>থাকত।</em></p>
<p><em>কথা</em> <em>হল</em><em>, </em><em>এই</em> <em>বিলাসিতা</em> <em>বিপুল</em> <em>পরিমাণ</em> <em>অর্থ</em> <em>ব্যয়</em> <em>করা</em> <em>ছাড়া</em> <em>লাভ</em> <em>করা</em> <em>যেত</em> <em>না</em> <em>আর</em> <em>এই</em> <em>অর্থ</em> <em>ও</em> <em>অঢেল</em> <em>ধন</em><em>&#8211;</em><em>সম্পদ</em> <em>কৃষক</em><em>, </em><em>ব্যবসায়ী</em> <em>ও</em> <em>অন্যান্য</em> <em>পেশাজীবীদের</em> <em>উপর</em> <em>কর</em> <em>ও</em> <em>ট্যাক্স</em> <em>বাড়ানো</em> <em>এবং</em> <em>তাদের</em> <em>উপর</em> <em>শোষণ</em> <em>চালানো</em> <em>ছাড়া</em> <em>হস্তগত</em> <em>হত</em> <em>না।</em> <em>তারা</em> <em>যদি</em> <em>এসব</em> <em>দাবী</em> <em>পূরণ</em> <em>করতে</em> <em>অস্বীকৃতি</em> <em>জানাত</em><em>, </em><em>তবে</em> <em>তাদের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>যুদ্ধ</em> <em>করা</em> <em>হত।</em> <em>তাদেরকে</em> <em>নানা</em> <em>ধরনের</em> <em>শাস্তি</em> <em>দেওয়া</em> <em>হত।</em> <em>আর</em> <em>তারা</em> <em>যদি</em> <em>মেনে</em> <em>নিত</em><em>, </em><em>তবে</em> <em>তাদেরকে</em> <em>খাটানো</em> <em>হত</em> <em>গাধা</em> <em>ও</em> <em>বলদের</em> <em>মত।</em> <em>যাদের</em> <em>দ্বারা</em> <em>পানি</em> <em>উত্তোলন</em> <em>ও</em> <em>কৃষিকাজে</em> <em>সাহায্য</em> <em>নেওয়া</em> <em>হত।</em> <em>কেবল</em> <em>সেবার</em> <em>জন্যই</em> <em>তাদের</em> <em>লালন</em><em>&#8211;</em><em>পালন</em> <em>করা</em> <em>হত।</em> <em>তারা</em> <em>কখনও</em> <em>কষ্ট</em><em>&#8211;</em><em>পরিশ্রম</em> <em>থেকে</em> <em>নিষ্কৃতি</em> <em>পেত</em> <em>না।</em></p>
<p><em>এই</em> <em>কষ্টপূর্ণ</em> <em>ও</em> <em>পশুসুলভ</em><em> (</em><em>মানবেতর</em><em>) </em><em>জীবনের</em> <em>পরিণামে</em> <em>কখনও</em> <em>তাদের</em> <em>মাথা</em> <em>উঠানো</em> <em>এবং</em> <em>পরকালীন</em> <em>সৌভাগ্য</em> <em>লাভের</em> <em>কল্পনা</em> <em>করারও</em> <em>সময়</em><em>&#8211;</em><em>সুযোগ</em> <em>হত</em> <em>না।</em> <em>অনেক</em> <em>সময়</em> <em>গোটা</em> <em>দেশেও</em> <em>এমন</em> <em>কোনও</em> <em>মানব</em> <em>সন্তান</em> <em>পাওয়া</em> <em>যেত</em> <em>না</em><em>, </em><em>যার</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিজ</em> <em>ধর্মের</em> <em>চিন্তা</em><em>&#8211;</em><em>ভাবনা</em> <em>ও</em> <em>গুরুত্ব</em> <em>রয়েছে।</em><em>&#8216;</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আরও কিছু উপকারী কথা</strong></h4>
<p>এর পরের বিষয়বস্তু &#8216;ধর্মের আসল/উৎস একটি।&#8217; আর শরীয়তের রাস্তায় বিশেষ কোনও যুগ ও জাতির পক্ষাবলম্বনের কারণে মতবিরোধ হয়। তারপর এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, দীন-ধর্মের একটি উৎস হওয়া সত্ত্বেও সেসব পথে কেন জবাবদিহি করা হয়?</p>
<p>সহজিকরণ, উৎসাহ প্রদান ও ভীতি প্রদর্শনের তত্ত্ব ইত্যাদির অধীন বিষয়গুলো আলোচনার পর শাহ সাহেব এমন ধর্মের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছেন, যা সকল ধর্ম বিলুপ্তকারী হবে। তাছাড়া ধর্মকে কিভাবে বিকৃতির ছোবল থেকে রক্ষা করা যায়, বিকৃতি-পরিবর্তন কোন কোন পথে ও ছিদ্র দিয়ে ধর্মে অনুপ্রবেশ করে, কী কী রূপে তা বিকশিত হয়? আর কী কী রঙ-রূপ ধারণ করে? শরীয়ত সেসবের প্রতিকার হিসেবে কী পন্থা অবলম্বন করেছে এবং কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এরপর বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, নবুওয়াতের যুগে জাহেলী যুগের কী অবস্থা ছিল, রাসূলে কারীম (স) যার সংস্কার করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>হাদীস ও সুন্নাহর মর্যাদা এবং এ ব্যাপারে উম্মতের কর্মপদ্ধতি</strong></h4>
<p>সপ্তম অধ্যায়ের শিরোনামمبحث الشرائع من حديث النبى صلى الله ، عليه وسلم  তথা হাদীসে নববী সম্পর্কে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি। এতে সেসব আলোচনা স্থান পেয়েছে, যেগুলো সরাসরি হাদীস ও সুন্নাহর জ্ঞান, তা থেকে মাসায়েল উৎসারণ, উলুমে নববী (স)-এর শ্রেণীবিভাগ, নবী (স) থেকে শরীয়ত আহরণের অবস্থা-পদ্ধতি, হাদীস গ্রন্থাবলির শ্রেণীবিন্যাস, কুরআন- সুন্নাহর আলোকে শরয়ী উদ্দেশ্যসমূহ উদঘাটনের পদ্ধতি ও বিভিন্ন হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধন কিংবা প্রাধান্য দানের বিষয়। এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও সূক্ষ্মদর্শিতার সাথে শাহ সাহেব শাখামূলক আলোচনায় সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈদের মতানৈক্যের কারণগুলো বর্ণনা করেন। সেসবের উদাহরণ উদ্ধৃত করার পর ফকীহগণের মতাদর্শে মতবিরোধ এবং হাদীস বিশারদ ও চিন্তাবিদগণের মতানৈক্যের পার্থক্য বর্ণনা করেন। চতুর্থ হিজরী শতকের পূর্বাপর মানুষের মাসআলা জিজ্ঞাসা ও এর উপর আমল করা এবং এক্ষেত্রে বিশেষ-অবিশেষ মহলের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল? এসবের সবিস্তর ব্যাখ্যা দেন, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর আলোচনা সমৃদ্ধ এবং যা কালাম কিংবা উসূলে ফিকহ শাস্ত্রের কোনও কিতাবে পাওয়া দুষ্কর।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ফরযসমূহ ও রুকনগুলোর তত্ত্ব-রহস্য</strong></h4>
<p>শাহ সাহেব আকাঈদ থেকে নিয়ে ইবাদত-আনুগত্য, লেনদেন, আচার-অনুষ্ঠান, ইহসান-অনুগ্রহ; আত্মশুদ্ধি, আইন-শৃঙ্খলা, অবস্থা-পরিস্থিতি, জীবনোপকরণ বা জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতি, দান ও সাহায্য-সহযোগিতা, পরিবার ব্যবস্থা, খেলাফত ও শাসন ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধ-জিহাদ, পানাহারের শিষ্ঠাচার, বন্ধুত্ব নীতি, সামাজিকতা আর সবশেষে ফিতান, পরকালীন ঘটনাপ্রবাহ ও কিয়ামতের আলামত পর্যন্ত হাদীসের আলোকে আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে সীরাতে নববী (স)-এর সারমর্মও পেশ করেছেন। সেসব অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য-রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, এসব বিষয়ের সম্পর্ক জীবন, সভ্যতা, চরিত্র-নৈতিকতা থেকে কখনও বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বস্তুতঃ এটিই কিতাবের কেন্দ্রীয় বা মূল প্রতিপাদ্য। শাহ সাহেবের ইচ্ছা ছিল, হাদীস শিক্ষাদান যেন সেসব তত্ত্ব-রহস্যের আলোকে আমল ও চরিত্র-নৈতিকতা, সভ্যতা-সামাজিকতা, মানবীয় সাফল্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে হয়। যেন সেসবের পূর্ণ প্রভাব পড়ে জীবন, আমল-আখলাক, সভ্যতা ও সামাজিকতার ওপর। সামঞ্জস্য বিধান হয় ঐতিহ্যগত ও যৌক্তিক দলীল-প্রমাণের মাঝে, বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষে এসবের উপর আপত্তি উত্থাপন, হাদীস ও সুন্নাতের মূল্য, উপকারিতা এবং তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করা (যাকে শাহ সাহেবের দূরদর্শী ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দেখে নিয়েছিল) ও মানসিক বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টির সুযোগ না হয়। আমলী আরকান ও চার ফরয সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন, তা এরই অংশ এবং &#8216;হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা&#8217; -এর একটি বৈশিষ্ট্য। এখানে উদাহরণস্বরূপ কেবল রোযা ও হজ্জের উদ্দেশ্যভেদ এবং এগুলোর ইসলামী ও শরয়ী রূপরেখার সূক্ষ্মতার উপর শাহ সাহেব যা কিছু লিখেছেন, তা উল্লেখ করা হচ্ছে। রোযা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তার পরিমাণ ও রোযার সংখ্যা নির্ধারণের রহস্য (যা ইসলামী শরীয়তের সাথে নির্দিষ্ট) এবং এর শরয়ী বিধানের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি লিখেন, <strong>&#8216;</strong><strong>রোযার</strong> <strong>মধ্যে</strong><strong> (</strong><strong>সময়</strong><strong>, </strong><strong>সংখ্যা</strong> <strong>ও</strong> <strong>পরিমাণের</strong><strong>) </strong><strong>স্বেচ্ছাধিকার</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হলে</strong> <strong>অপব্যাখ্যা</strong> <strong>ও</strong> <strong>পলায়নের</strong> <strong>পথ</strong> <strong>উন্মুক্ত</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যাবে।</strong> <strong>রুদ্ধ</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যাবে</strong> <strong>সৎকাজের</strong> <strong>আদেশ</strong> <strong>ও</strong> <strong>অসৎকাজের</strong> <strong>নিষেধ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>এর</strong> <strong>পথ।</strong> <strong>বিরাট</strong> <strong>উদাসীনতার</strong> <strong>শিকার</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যাবে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>এই</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>বড়</strong> <strong>আনুগত্য</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ইবাদত।</strong></p>
<p>এরপর রোযার পরিমাণ ও সংখ্যা প্রসঙ্গে লিখেন, এর (সময়) নির্ধারণেরও প্রয়োজন ছিল। যেন তাতে বাড়াবাড়ি ও উদাসীনতার অবকাশ না থাকে। নতুবা কেউ কেউ এর উপর এতটুকু আমল করত, যার দ্বারা তার কোনও কল্যাণ হত না আর না কোন প্রভাব পড়ত। আবার কেউ কেউ এত বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করত যে, তারা অক্ষমতা ও দুর্বলতার সীমায় পৌঁছে যেত। আর সে হয়ে যেত মৃতপ্রায়/অর্ধমৃত। মূলতঃ রোযা একটি প্রতিষেধক। প্রবৃত্তির বিষ নামানোর জন্য যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাজেই এতে প্রয়োজনীয়তার প্রতি লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়।</p>
<p>তারপর রোযার উভয় শ্রেণীর (তথা প্রথমতঃ সেই রোযা, যাতে পানাহারসহ রোযার পরিপন্থী সকল প্রকার কাজকর্ম থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকতে হয়। দ্বিতীয়তঃ সেই রোযা যাতে কতিপয় বিষয় থেকে বাঁচতে হয়। আর কতিপয় বিষয় থেকে বাঁচতে হয় না -এর মাঝে তুলনা করে প্রথমোক্ত রোযাকে প্রাধান্য দেন।) সাথে অভিজ্ঞতা, জ্ঞানের গভীরতা ও আধ্যাত্মিকতার আলোকে এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতঃ লিখেন, &#8216;আহার কমানোর দুটি পদ্ধতি। এক. খাবারের পরিমাণ হ্রাস করে দেওয়া। দুই. আহারের মধ্যে এত দীর্ঘ বিলম্ব রাখা, যাতে উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায়। শরীয়তে এই দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। কেননা এতে ক্ষুৎ-পিপাসার সঠিক ধারণা জন্মে। পাশবিক কামনায় আঘাত লাগে। বাস্তবেই এতে হ্রাস পেতে দেখা যায়। পক্ষান্তরে প্রথম পদ্ধতিতে মানুষের উপর বিশেষ কোনও প্রভাব পড়ার পূর্বে তা সৃষ্টি হয় না। কেননা যথারীতি পানাহার চালিয়ে যাওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ প্রথম পদ্ধতির জন্য কোনও সাধারণ নীতিমালা প্রণয়ন করা কঠিন। কারণ, মানুষের অবস্থা বিভিন্ন ধরনের। কেউ এক পোয়া খায় আবার কেউ খায় আধা সের। সুতরাং এ পদ্ধতি নির্ধারণের ফলে যদি একজনের কল্যাণ হয়, তবে অন্যজনের ক্ষতি হবে।&#8217;</p>
<p>তিনি আরও বলেন, এই সুনির্দিষ্টতা ও সময়ের বাধ্যবাধকতায় ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। তিনি লিখেন, &#8216;এটাও জরুরী ছিল যে, এ সময় যেন অসাধ্য সাধন বা সাধ্যাতীত হুকুম পালনে আক্রান্তকারী না হয়। যেমন, তিনদিন তিনরাত। কেননা এটা শরীয়তের আলোচ্য বিষয়ের বাইরে এবং তার উদ্দেশ্য পরিপন্থী। সাধারণতঃ এর উপর আমল করাও অসম্ভব।&#8217;</p>
<p>হজ্জ প্রসঙ্গে তার আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তিনি সেখানে লিখেন-</p>
<p>&#8216;(হজ্জের উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে) সেই উত্তরাধিকার সত্ত্ব সংরক্ষণও আছে, যা আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম (আ) ও আমাদের নেতা ইসমাইল (আ) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। কারণ, এ দুজনই মিল্লাতে হানীফার (পবিত্র উম্মাহর) ইমাম এবং আরবে তার প্রতিষ্ঠাতা ও স্থপতি বলা যেতে পারে। রাসূলে কারীম (স)-এর শুভাগমনও এজন্য হয়েছিল, যেন মিল্লাতে হানীফা তার মাধ্যমে পৃথিবীতে জয়লাভ করে এবং তার ঝাণ্ডা সমুন্নত হয়।&#8217;</p>
<p>আল্লাহ তা&#8217;আলা বলেন,</p>
<p>ملة أبيكم ابراهيم</p>
<p>তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ) এর ধর্ম।</p>
<p>কাজেই এই ধর্মের ইমামের (দিশারীর) পক্ষ থেকে যেসব বিষয় আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, যেমন- স্বভাবজাত গুণাবলি, হজ্জব্রত পালন ইত্যাদি আমাদের সংরক্ষণ করা জরুরী। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন-</p>
<p>قفوا على مشاعركم فانكم على أرث من إرث أبيكم.</p>
<p>&#8216;আপন নিদর্শন/স্থানসমূহে অবস্থান করো। কেননা তোমরা আপন পিতার একই উত্তরাধিকার সত্ত্বের উত্তরাধিকারী।&#8217;</p>
<p>এছাড়া তিনি আরেকটি তত্ত্ব-দর্শন বর্ণনা করে লিখেন- <strong>&#8216;</strong><strong>যেভাবে</strong> <strong>সরকারের</strong> <strong>কিছুদিন</strong> <strong>পরপর</strong> <strong>একটি</strong> <strong>গণজরিপ</strong> <strong>ও</strong> <strong>পরিদর্শনের</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>যেন</strong> <strong>সে</strong> <strong>জানাতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>&#8211; </strong><strong>কে</strong> <strong>কৃতজ্ঞ</strong><strong>? </strong><strong>কে</strong> <strong>বিদ্রোহী</strong><strong>? </strong><strong>কে</strong> <strong>কর্তব্য</strong> <strong>পরায়ণ</strong><strong>, </strong><strong>দায়িত্বশীল</strong> <strong>আর</strong> <strong>কে</strong> <strong>কামচোরা</strong> <strong>প্রতারক</strong><strong>? </strong><strong>সাথে</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>এর</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>তার</strong> <strong>সততা</strong><strong>, </strong><strong>বিশ্বস্ততার</strong> <strong>সুখ্যাতি</strong> <strong>ও</strong> <strong>সুনাম</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>তার</strong> <strong>শ্রমিক</strong><strong>, </strong><strong>কর্মচারী</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কর্মকর্তা</strong> <strong>ও</strong> <strong>নাগরিকগণ</strong> <strong>একে</strong> <strong>অন্যের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>পরিচিত</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>অনুরূপভাবে</strong> <strong>জাতির</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>হজ্জ</strong> <strong>প্রয়োজন।</strong> <strong>যাতে</strong> <strong>মুনাফিক</strong><strong>&#8211;</strong><strong>অমুনাফিক</strong><strong> (</strong><strong>কপট</strong><strong>&#8211;</strong><strong>অকপট</strong><strong>)-</strong><strong>এর</strong> <strong>মাঝে</strong> <strong>পার্থক্য</strong> <strong>নির্ণয়</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>আল্লাহ</strong> <strong>পাকের</strong> <strong>নির্দিষ্ট</strong> <strong>দিনে</strong> <strong>আল্লাহ</strong> <strong>পাকের</strong> <strong>দরবারে</strong> <strong>আবেগ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>উচ্ছাস</strong> <strong>নিয়ে</strong> <strong>দলে</strong> <strong>দলে</strong> <strong>লোকজন</strong> <strong>হাজির</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>মানুষ</strong> <strong>পরস্পর</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>লাভ</strong> <strong>করে।</strong> <strong>প্রত্যেক</strong> <strong>ব্যক্তি</strong> <strong>যা</strong> <strong>তার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>নেই</strong><strong>, </strong><strong>সে</strong> <strong>বিষয়ে</strong> <strong>অন্যের</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>উপকার</strong> <strong>লাভ</strong> <strong>করে।</strong> <strong>কেননা</strong> <strong>উত্তমতর</strong> <strong>ও</strong> <strong>সুন্দর</strong> <strong>আনন্দদায়ক</strong> <strong>বিষয়গুলো</strong> <strong>সাধারণতঃ</strong> <strong>সংস্পর্শ</strong> <strong>ও</strong> <strong>বন্ধুত্বের</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>একে</strong> <strong>অপরকে</strong> <strong>দেখে</strong><strong>&#8211;</strong><strong>শুনেই</strong> <strong>অর্জিত</strong> <strong>হয়।</strong><strong>&#8216;</strong></p>
<p>তিনি আরও লিখেন, &#8216;হজ্জ যেহেতু এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে সকলেই সমবেত হয়, তাই এটি বিভ্রান্তিকর রুসম-রেওয়াজ থেকে নিরাপত্তা লাভের জন্য খুবই ফলপ্রসূ। জাতির মধ্যে তাঁদের ইমাম ও দিশারীদের স্মৃতিচারণ এবং মনের মণিকোঠায় তাদের আনুগত্য ও অনুকরণের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য কোনও কিছু এ পর্যায়ের নেই, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।&#8217;</p>
<p>অন্যত্র লিখেন, &#8216;হজ্জের উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে আরেকটি বিষয় হল, যার জন্য সরকার-প্রশাসন কোনও প্রদর্শনী কিংবা সরকারী উৎসবের আয়োজন করে। আর তা দেখার জন্য কাছে-দূরের সকল স্থান থেকে মানুষ এসে সমবেত হয়। মিলিত হয় একে অন্যের সাথে। নিজের শাসন ব্যবস্থা ও জাতির শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে অবগতি লাভ করে। তার পবিত্র ও পুণ্যময় স্থানগুলোর সম্মান রক্ষা করে। অনুরূপভাবে হজ্জ মুসলমানদের একটি জাতীয় প্রদর্শনী কিংবা রাজকীয় অনুষ্ঠান। যেখানে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রকাশ পায়। তাদের শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়। তাদের জাতির নাম উজ্জল হয়।&#8217; আল্লাহ তা&#8217;আলা ইরশাদ করেন-&#8216;</p>
<p>. وإذ جعلنا البيت مثابة للناس وأمنا</p>
<p>&#8216;আর (স্মরণ করো সে সময়ের কথা) আমি কাবাকে করেছি মানুষের জন্য প্রত্যাবর্তনস্থল ও নিরাপদ শান্তির স্থান।&#8217;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>কিতাবের স্বয়ংসম্পূর্ণতা</strong></h4>
<p>এ গ্রন্থের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, ফিকহ, হাদীস, আকাঈদ, ইবাদত, লেনদেন ও আচার-অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত অধ্যায় ও অনুচ্ছেদগুলো ব্যতীত এতে পরিবারব্যবস্থা, পারিবারিক শৃঙ্খলা বিধান, খেলাফত (গণপ্রতিনিধিত্ব) ও বিচারব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অধ্যায় এবং সাহচর্যের শিষ্টাচারসমূহের আলোচনাও রয়েছে। যা চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিকতা, সভ্যতা ও জীবনোপায়ের সাথে সম্পৃক্ত। সাধারণতঃ কোনও ফিকহী কিংবা দর্শন শাস্ত্রের বই-পুস্তকে এসবের আশা করা যায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>অনুগ্রহ ও আত্মশুদ্ধি</strong></h4>
<p>অধিকন্তু এ গ্রন্থে শাহ সাহেব হাদীস ও জীবন-চরিতের আলোকে বিন্যস্ত অনুগ্রহ ও আত্মশুদ্ধির এমন নীতিমালা উপস্থাপন করেছেন, যার উপর চলে মানুষ আল্লাহর নৈকট্যের উঁচু থেকে উঁচু সিঁড়িগুলো, বেলায়েতের স্তরসমূহ, মর্যাদার আসন ও অবস্থাসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ইহসান সম্পর্কিত এই অনুচ্ছেদটি কিতাবের ৬৬-১০১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অনুচ্ছেদে শাহ সাহেব সেসব উপাদানসমূহ নিয়ে আলোকপাত করেছেন, যেগুলো বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র হাজির করা, ইচ্ছা-সংকল্প এবং শারীরিক ও বাতেনী অবস্থাসমূহের সঙ্গে আত্মার প্রতি মনোনিবেশ করার উপর জোর দিয়েছেন। সেসঙ্গে ক্রমাগত দুঃখ-ব্যথা ও রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা, ঐ শরীয়তসম্মত পন্থা, ফরয, ইবাদত ও যিকির-আযকারের মাধ্যমে নির্বাচন করেছেন। সাথে সাথে বদঅভ্যাস ও নীচুতার প্রতিষেধক চিকিৎসা এবং উত্তম-উন্নত স্বভাব-চরিত্র অর্জনের পন্থাও শরীয়ত ও সুন্নাতের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>এ অধ্যায়ে তিনি বর্ণিত যিকিরসমূহ, শরীয়তসম্মত দু&#8217;আসমূহ এবং ইস্তিগফার-তাওবার গুরুত্বপূর্ণ শব্দাবলীও সন্নিবেশিত করেছেন। কার্যকরী মাকবুল দু&#8217;আর পদ্ধতি এবং তার শর্তাবলীও বর্ণনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে মানবিক চাহিদা, জীবনের প্রয়োজনাদি ও ধর্মীয় আমলগুলো নিয়তের পরিচ্ছন্নতার সাথে আদায় করার প্রতি তাগিদ করেছেন। এসবের প্রভাব- ক্রিয়া ও অবস্থাবলি ব্যতিক্রম হওয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন<strong>, &#8216;</strong><strong>ভালোভাবে</strong> <strong>হৃদয়াঙ্গম</strong> <strong>করে</strong> <strong>নিন</strong><strong>, </strong><strong>নিয়ত</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong> (</strong><strong>সবকিছুর</strong><strong>) </strong><strong>প্রাণ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>আত্মা।</strong> <strong>আর</strong> <strong>ইবাদত</strong> <strong>হল</strong> <strong>দেহ।</strong> <strong>আত্মা</strong> <strong>ছাড়া</strong> <strong>শরীর</strong><strong>/</strong><strong>দেহ</strong> <strong>বেঁচে</strong> <strong>থাকা</strong> <strong>সম্ভব</strong> <strong>নয়।</strong> <strong>আত্মা</strong> <strong>দেহ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>পৃথক</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যাওয়ার</strong> <strong>পরও</strong> <strong>জীবিত</strong> <strong>থাকে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>জীবন</strong><strong>/</strong><strong>বেঁচে</strong> <strong>থাকার</strong> <strong>প্রতিক্রিয়া</strong> <strong>দেহ</strong> <strong>ছাড়া</strong> <strong>পুরোপুরিভাবে</strong> <strong>প্রকাশ</strong> <strong>পায়</strong> <strong>না।</strong> কাজেই আল্লাহ তা&#8217;আলা বলেন,</p>
<p>لن ينال الله لحمها ولا دماؤها ولكن يناله التقوى منكم</p>
<p>&#8216;আল্লাহ পাকের এসব কুরবানীর (পশুর) গোশত ও রক্ত পৌঁছে না। সেখানে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীরুতা। (সূরা হজ্জ ৩৭)</p>
<p>আর রাসূলে কারীম (স) ইরশাদ করেছেন,</p>
<p>إنما الاعمال بالنيات</p>
<p>&#8216;সকল আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের উপর নির্ভরশীল।&#8217;</p>
<p>অনন্তর শাহ সাহেব নিম্নোক্ত ভাষায় &#8216;নিয়ত&#8217;-এর সংজ্ঞা পেশ করেন। &#8216;নিয়ত বলে আমাদের উদ্দেশ্য তাসদীক তথা সত্যায়ন ও বিশ্বাসের সেই মানসিক অবস্থা, যা তাকে সে কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। অর্থাৎ আল্লাহ তা&#8217;আলা স্বীয় নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে আনুগত্যকারীদের প্রতিদান আর অবাধ্যদেরকে শাস্তি দেওয়ার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তা এই হুকুম পালন এবং এই পাপাচার থেকে বেঁচে থাকার কারণ -এ বিশ্বাস করা।&#8217;</p>
<p>আলোচ্য অনুচ্ছেদের শেষে শাহ সাহেব উন্নত চরিত্র গঠন, সৃষ্টিজীবের অধিকার সংরক্ষণ ও উত্তম আচার-ব্যবহার সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস বাছাই করে লিখে দিয়েছেন। যার উপর আমল করলে মানুষ কল্যাণ ও পবিত্রতার উচ্চস্তরে পৌঁছে যেতে পারে। এরপর সেসব মর্যাদা ও অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, যেগুলো উপকার ও পবিত্রতার সুফলে অর্জিত হয়; যা বাতেনী নূর, অন্তরের সচেতনতা, আত্মার পরিচ্ছন্নতা, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ঊর্ধ্বজগতের সাহায্য-সমর্থনের সুফল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>জিহাদ</strong></h4>
<p>উক্ত গ্রন্থে জিহাদ সম্পর্কেও একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে। আর তা শাহ সাহেব এক তথ্যবহুল ও বিস্ময়কর শব্দমালা দিয়ে শুরু করেছেন। যা সকল ধর্ম ও জাতির পুরো ইতিহাস, মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যসমূহ ও সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টার উদ্দিষ্ট ব্যবস্থার উপর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কোনও জ্ঞানী পণ্ডিতই লিখতে পারেন। শাহ সাহেব লিখেন, <strong>&#8216;</strong><strong>স্মরণ</strong> <strong>রাখুন</strong><strong>! </strong><strong>সার্বিকভাবে</strong> <strong>পূর্ণাঙ্গ</strong> <strong>শরীয়ত</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তার</strong> <strong>স্বয়ংসম্পূর্ণ</strong> <strong>সংবিধান</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>সেই</strong> <strong>শরীয়ত</strong><strong>, </strong><strong>যাতে</strong> <strong>জিহাদের</strong> <strong>নির্দেশ</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়েছে।</strong><strong>&#8216;</strong></p>
<p>মোটকথা, এই গ্রন্থখানা তার স্বয়ংসম্পূর্ণতা, তাত্ত্বিকতা, দীন ও শরীয়তের ব্যাপক-প্রশস্ত, মজবুত নিবিড় ব্যাখ্যা এবং কিতাবের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ছড়ানো ছিটানো শত-সহস্র অমূল্য তথ্য-কণিকা ও সূক্ষ্ম গবেষণার ভিত্তিতে ইসলামী গ্রন্থশালায় বহুদিক থেকে সম্পূর্ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এক কথায় ،كم ترك الأول للآخر&#8217; &#8216;কত কী রেখে গেলেন প্রবীণগণ পরবর্তীদের জন্য&#8217;-এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাওলানা শিবলী (র) তার বিখ্যাত &#8216;ইলমুল কালাম&#8217; গ্রন্থে লিখেছেন- &#8216;আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র) ও ইবনে রুশদ -এর পরে বরং স্বয়ং তাদের যুগেই মুসলমানদের মধ্যে চিন্তাধারার যে অধঃপতন শুরু হয়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ আশা ছিল না যে, ফের কোনও (মুসলিম) চিন্তাবিদ, সূক্ষ্মদর্শী ও গবেষক জন্ম নিবেন। কিন্তু মহান কুদরতের আপন যাদুর শক্তি দেখানোর ইচ্ছা ছিল। শেষ যুগে যখন ইসলামের প্রাণ ওষ্ঠাগত, ঠিক তখন শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র)-এর মত ব্যক্তিত্বের শুভজন্ম হয়, যার বিচক্ষণতার সামনে ইমাম গাযালী (র), রাযী (র) ইবনে রূশদ (প্রমুখ ব্যক্তিত্ব) -এর কৃতিত্বও ম্লান হয়ে যায়।&#8217;</p>
<p>আরেকটু সামনে লিখেন- &#8216;শাহ সাহেব ইলমে কালাম বা দর্শন শাস্ত্রের শিরোনামে কোনও রচনা লিখেননি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে দার্শনিকদের কাতারে শামিল করা বাহ্যতঃ উচিত নয়। কিন্তু তার রচিত &#8216;হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা&#8217;, যাতে তিনি শরীয়তের তত্ত্বভেদ বর্ণনা করেছেন, বস্তুতঃ কালাম শাস্ত্রের উজ্জ্বল প্রাণ।&#8217;</p>
<p>সমকালীন চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (তাফসীরে হাক্কানী ও আকাঈদুল ইসলাম রচয়িতা) হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা -এর অনুবাদ গ্রন্থ ‘নি&#8217;মাতুল্লাহিস সাবিগাহ’ -এর ভূমিকায় লিখেন- &#8216;যে শাস্ত্রে এই গ্রন্থনা, তাঁর (শাহ সাহেব) পূর্বে একত্রে কেউ তা সন্নিবেশিত করেনি। এ শাস্ত্রের বিষয়বস্তু শরীয়তে মুহাম্মদী (স)-এর ব্যবস্থাপনা من حيث المصلحة و المفيدة (উপকারী সংস্কারের দৃষ্টিকোণে)। আর তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেন স্পষ্ট জেনে নেয়- আল্লাহ ও তার রাসূল (স)-এর হুকুম-আহকামের মধ্যে কোন সংকীর্ণতা নেই; আর না তা সুস্থ স্বভাবরীতির পরিপন্থী। যেন সেগুলোর উপর মানুষের পরিপূর্ণ আস্থা জন্মে। সেগুলোকে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল জ্ঞান করে মন সেদিকে আকৃষ্ট হয়। কোনও সন্দিগ্ধতার অজুহাতে মনের মধ্যে সংশয় না জাগে। এর সংজ্ঞা হচ্ছে- এটি সেই ইলম, যাতে ধর্মীয় আইন-কানুন ও শরয়ী আহকামের সূক্ষ্মতা-প্রজ্ঞা জানা যায় আর এর উৎস তার সকল ইলম।&#8217;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> আবু সাঈদ মুহাম্মদ উমর।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -9px; top: 14928.3px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-shariah-and-al-irtifaqat-in-the-mirror-of-hujjatullahil-baliga/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15359</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) ও তাঁর চিন্তাধারা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/imam-ghazali-and-his-method-of-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/imam-ghazali-and-his-method-of-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 22 Nov 2024 05:14:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইলমুল কালাম]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15231</guid>

					<description><![CDATA[সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ আবু হামিদ মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল গাজ্জালী সমগ্র দুনিয়াতে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ নামে অর্থাৎ ইসলামের নিশ্চিত দলীল নামে পরিচিত। তিনি ফিকহ, কালাম, দর্শন ও তাসাউফের মত বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার সাথে সমালোচনামূলক একটি সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং এই সকল]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4>সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ</h4>
<p>আবু হামিদ মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল গাজ্জালী সমগ্র দুনিয়াতে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ নামে অর্থাৎ ইসলামের নিশ্চিত দলীল নামে পরিচিত। তিনি ফিকহ, কালাম, দর্শন ও তাসাউফের মত বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার সাথে সমালোচনামূলক একটি সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং এই সকল ধারায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছেন। তিনি ১০৫৬ সালে বর্তমানের দক্ষিনপূর্ব ইরানের তুস শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তুস, নিশাপুর, ইস্পাহান, বাগদাদ, শাম, হিজাজ ও কুদুস শহরে তিনি তার জীবনকাল অতিক্রম করেন। সমগ্র মানব সভ্যতার চিন্তার ইতিহাসকে প্রভাবিতকারী এই মহান ইমাম ১১১১ সালে তাঁর জন্মস্থান তুসে মৃত্যুবরণ করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>ইমাম গাজ্জালীর গুরুত্বঃ</h4>
<p>ইমাম গাজ্জালীর গুরুত্বকে কয়েকটি পয়েন্টে একত্রিত করে তুলে ধরা সম্ভব।<br class="html-br" /><strong>প্রথমত,</strong> আমরা জানি যে, দর্শন বা ফিলোসফি ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের শক্তিকে শানীত করে। মূলত ইবনে সিনার মাধ্যমে এই দার্শনিক ধারা মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আর ইমাম গাজ্জালী প্রথমবারের মত এই দার্শনিক ধারাকে কালামী দৃষ্টিকোণ থেকে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করেন।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> ফালাসিফা বা দার্শনিকগণের চিন্তাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণকারী গাজ্জালী যে সকল চিন্তা ক্ষতিকর নয়, সে সকল চিন্তাকে ধারণ করেন। তাঁর এই পন্থা কালামী ও তাসাউফী ধারায় অনেক বড় একটি পরিবর্তন নিয়ে আসে।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> ইমাম গাজ্জালী নাকলী (ওহী ভিত্তিক) জ্ঞানের ইতিহাসকেও সমালোচনামূলক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। এই সকল জ্ঞানকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করার পর তিনি দাবী করেন যে, এই সকল জ্ঞান তার উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গিয়েছে এবং সময়ের পরিক্রমায় রূহ বিহীন হয়ে শুধুমাত্র জ্ঞানের একটি ফরমাল শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই সমালোচনা ইমাম গাজ্জালীকে তাসাউফ থেকে প্রাপ্ত ইলহামের মাধ্যমে নাকলী জ্ঞানকে নতুন করে গঠন করার দিকে ধাবিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>ইমাম গাজ্জালীর রচনাবলিঃ</h4>
<p>জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে ইমাম গাজ্জালীর যে সম্পর্ক, সে সম্পর্ক তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে। আমরা যদি তাঁর শিক্ষাজীবনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, তিনি মূলত শাফেয়ী মাজহাবের একজন ফকিহ ছিলেন এবং তিনি শাফেয়ী মাজহাবের ফুরু’ ফিকহ সম্পর্কে “আল-বাসিত”, “আল ওয়াসিত” ও “আল ওয়াজিজ” এর মত গ্রন্থ রচনা করেন। এর পাশাপাশি শাফেয়ী মাজহাবের মূলনীতির আলোকে “আল-মানখুল” নামক গ্রন্থ রচনা করেন, যে গ্রন্থটিকে তাঁর জীবনের প্রথম গ্রন্থ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একইভাবে <strong>উসূলে ফিকহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”ও তিনি রচনা করেছেন তাঁর জীবনের শেষ ভাগে</strong>।<br class="html-br" /><br class="html-br" /><strong>ইলমুল উসূল নিয়ে তাঁর লেখা গ্রন্থ মুসতাসফার শুরুতেই তিনি ইবনে সিনার ধারার মানতিককে যুক্ত করে দেন। মানতিককে ইলমুল উসূলের সাথে এভাবে যুক্ত করে দেওয়ার কারণে তা নাকলী জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন একটি মাত্রা এনে দেয়।</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />অপরদিকে ইমাম গাজ্জালী তাঁর যুগের বাতিনি ফিতনার বিরুদ্ধেও কলম ধরেন এবং রাজনৈতিক ও ই’তিকাদী দিক থেকে হুমকি সৃষ্টিকারী এই ধারার অসারতা প্রমাণ করার জন্য সিরিজ আকারে গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হল আব্বাসী খলিফা আল-মুস্তাজহির বিল্লাহর জন্য রচিত গ্রন্থ “ফাদায়িহুল বাতিনিয়্যা” ও “ফাযাইলুল মুস্তাজহিরিয়্যা”।<br class="html-br" /><br class="html-br" />দর্শনের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। দর্শনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে তিনি মানতিক সম্পর্কিত “মি’য়ারুল ইলম” ও “মিহাক্কুন নাজার” নামক দুইটি গ্রন্থ রচনা করেন। বিশেষ করে ফকিহদের নিকটে মানতিককে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য এই সকল গ্রন্থে তিনি অনেক প্রচেষ্টা চালান। এছাড়াও দার্শনিকগণের চিন্তাধারাকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরার জন্য “মাকাসিদুল ফালাসিফা” অর্থাৎ দার্শনিকগণের উদ্দেশ্য নামক গ্রন্থ রচনা করেন। একইভাবে দার্শনিকগণের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে ফাটল ধরানোর জন্য “তাহাফাতুল ফালাসিফা” অর্থাৎ দার্শনিকগণের অসঙ্গতিসমূহ নামক গ্রন্থও রচনা করেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />তবে <strong>যে গ্রন্থটি ইমাম গাজ্জালীকে মুসলিম উম্মাহর কাছে মর্যাদার আসনে আসীন করেছে, সেটি হল “ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন”</strong>। এই গ্রন্থের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি তাসাউফ ও ফিকহকে স্থান দিলেও এখানে অনেক দার্শনিক কথাবার্তাও রয়েছে। এই গ্রন্থে তিনি আখেরাতের পথের জ্ঞান নামে নামকরণকৃত জ্ঞান ইলমুল মুয়ামালাতকে নতুন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />তবে ইসলামী চিন্তাধারার আধুনিক সময়ে এসে তাঁর এত বেশি গ্রহনযোগ্যতার অন্যতম কারণ হল তাঁর রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “আল মুনকিজু মিনাদ-দালাল ওয়া মুসলিহ বিল আহওয়াল”। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তিনি কালাম, দর্শন, তাসাউফ ও বাতিনিয়্যাতের মধ্যে আবর্তিত হওয়া তাঁর হাকিকতের অনুসন্ধানকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>ইমাম গাজ্জালীর মৌলিক চিন্তাসমূহঃ</h4>
<p>ইমাম গাজ্জালী ইসলামী চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন দর্শনের প্রতি তাঁর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। তাঁর “তাহাফাতুল ফালাসিফা” নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত। তাঁর এই গ্রন্থটিকে মানব সভ্যতার চিন্তার ইতিহাসে রচিত দর্শনের প্রথম সামগ্রিক সমালোচনামূলক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই গ্রন্থে ইমাম গাজ্জালী দেখিয়েছেন যে, এরিস্টটল নিজেই তাঁর পূর্বের দার্শনিকদের প্রযোজ্যতা অকার্যকর করে দিয়েছেন। আর এটিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে তিনি এরিস্টটলের দার্শনিক চিন্তা ও মুসলিম চিন্তাধারার মধ্যে তাঁর (এরিস্টটল) চিন্তার সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ফারাবী ও ইবনে সিনার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তাঁদের সমালোচনা করেছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />তাঁর চিন্তাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,<strong> তিনি কখনো কখনো সামগ্রিকভাবে সকল দার্শনিক চিন্তাকে সমালোচনা করেছেন। তবে দার্শনিকগণের প্রতি তাঁর যে সমালোচনা, সেটি আংশিক। তিনি দর্শনকে সামগ্রিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেননি। গাজ্জালীর মতে দর্শন হল জ্ঞানের সামগ্রিক একটি ধারা।</strong> এই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের সাথে গণিত, মানতিক, ফিজিক্স, মেটাফিজিক্স, আখলাক ও রাজনীতির যে সম্পর্ক, সে সম্পর্ককে তিনি স্বতন্ত্রভাবে পর্যালোচনা করেছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />জ্ঞানের এই সকল শাখার মধ্যে মানতিক ও গণিত সম্পূর্ণভাবে আকল কর্তৃক উদ্ভাবিত হওয়ায় এবং চিন্তা করার ক্ষেত্রে অবজেক্টিভ নিয়মনীতিসমূহও দেওয়ায় গাজ্জালীর মতে এই সকল জ্ঞান দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তিনি আরও মনে করেন যে, এই সকল জ্ঞানের নির্ভুলতায় প্রতারিত হয়ে দার্শনিকগণের সকল চিন্তাকেই গ্রহণ করাটা যেমন ভুল, একইভাবে দার্শনিকগণের সমালোচনা করার নামে তাঁদের সকল চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করাটাও একটি ভুল।<br class="html-br" /><br class="html-br" />আখলাক ও রাজনীতি জ্ঞানের ব্যাপারেও গাজ্জালীর অবস্থান ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, দার্শনিকগণের রাজনৈতিক চিন্তার মূলে পয়গাম্বরগণ ও তাঁদের আনীত গ্রন্থের প্রভাব রয়েছে এবং আখলাকী চিন্তার ক্ষেত্রে সুফীদের চিন্তার প্রভাব রয়েছে। উৎসগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই সকল জ্ঞান গ্রহণযোগ্য হলেও দার্শনিকগণের ভুল তত্ত্ব ও চিন্তাকে পৃথক করার জন্য বিশেষ একটি যোগ্যতার প্রয়োজন। এই ধরনের বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ যখন রাজনীতি ও আখলাকের জ্ঞানকে দার্শনিকগণের ভুল চিন্তা ও তত্ত্ব থেকে মুক্ত করবেন, তখন দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে এই সকল জ্ঞানের মধ্যে কোন ধরনের সমস্যা থাকবে না।<br class="html-br" /><br class="html-br" /><strong>তাহাফাতুল ফালাসিফা</strong>র মূল আলোচ্য বিষয় হল ফিজিক্স ও মেটাফিজিক্স। এই দুইটি বিষয়কে তিনি ২০ টি মূল পয়েন্টে আলোচনা করেছেন। এ<strong>ই ২০ টি পয়েন্টের মধ্যে ১৬ টি মেটাফিজিক্স নিয়ে আর ৪ টি ফিজিক্স নিয়ে। এই গ্রন্থের ১৭ নম্বর পয়েন্টটি (মাসায়েল) পড়লে বুঝা যায় ফিজিক্স তথা পদার্থ বিজ্ঞানে ইমাম গাজ্জালীর গভীরতা কত বেশি ছিল।</strong> এই মাসায়েল বা পয়েন্টটির অসাধারণ উপস্থাপনা ও আলোচনা তাঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দিয়েছে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />ইমাম গাজ্জালীর মতে কারণ ও কার্য তথা Cause and Effect এর মধ্যে মৌলিকত্বের দিক থেকে আবশ্যিক সম্পর্ক থাকার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই ব্যাপারে তাঁর একটি উদাহরণ রয়েছে, তা হল আগুন ও তুলার উদাহরণ। তাঁর মতে, আগুন ও তুলা পাশাপাশি আসলেই যে আগুনের পোড়াতে হবে আর তুলার পুড়তেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আগুন ছাড়াও তুলা পুড়তে পারে, আবার আগুন দিলেও তুলা নাও পুড়তে পারে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />মূলত মু’জিজার বিষয়টিকে একটি ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সব সময় এই দুনিয়ার নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে চলছেন এই বিষয়কে বুঝার জন্য তিনি এ রকম একটি ব্যখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। এখান থেকে কেউ যেন আবার এমন কথা বের না করে যে, পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে, তার সবকিছুই কাকতালীয়।<br class="html-br" />এক্ষেত্রে তিনি আদাতুল্লাহ (আল্লাহর নীতি) ও সুন্নাতুল্লাহ (আল্লাহর রীতি) এই দুইটি পরিভাষাকে সামনে রেখে এই কাকতালীয়তার যে সন্দেহ, সেটির অবসান ঘটিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন যে, এই জগতে যা কিছুই হচ্ছে, সেটির ক্ষেত্রে মহান স্রষ্টার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />তাহাফাতুল ফালাসিফা নামক গ্রন্থে ইমাম গাজ্জালী সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছেন মেটাফিজিক্স নিয়ে। তাঁর মতে দার্শনিকগণ যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল ও ভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছেন, সেই বিষয়টি হল মেটাফিজিক্স। গাজ্জালী বলেন, দার্শনিকগণ কোন একটি বিষয়কে প্রমাণ করার জন্য মানতিক বা যুক্তিবিদ্যায় যে সকল শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, মেটাফিজিক্সের ক্ষেত্রে তারা সকল শর্ত মেনে চলেননি।<br class="html-br" /><br class="html-br" />মেটাফিজিক্সকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করার পর তিনি বলেন, যদি দার্শনিকগণ নিমোক্ত তিনটি চিন্তা ধারণ করেন, তাহলে তাঁদেরকে তাকফির করা যাবেঃ</p>
<ul>
<li>১। যদি তারা জগতকে চিরস্থায়ী মনে করেন।</li>
<li>২। তারা যদি মনে করেন যে আল্লাহ জুযয়ী বা আংশিক বিষয়সমূহ জানেন না।</li>
<li>৩। যদি তারা আখেরাতের জীবনকে জিসমানী বা শারীরিক মনে না করে রূহানী মনে করেন।</li>
</ul>
<p>এই বিষয় তিনটি গাজ্জালী পরবর্তী সময়েও দার্শনিকগণকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইটেরিয়া হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।<br class="html-br" />দর্শনের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাসাউফের সাথে সম্পৃক্ততার ফলে ইমাম গাজ্জালী আরও একটি বিষয়ের অবতারণা করেন, আর সেটি হল আকলের সীমাবদ্ধতা।<br class="html-br" /><br class="html-br" /><strong>তাঁর মতে ইন্দ্রিয়ের উপর যেমন আকল রয়েছে, অনুরূপভাবে আকলেরও বাহিরে উপলব্ধি (ইদরাক)-র জন্য আরও একটি ক্ষেত্র রয়েছে, আর সেটি হল কালব। এই কালব মানুষকে ইদরাকী শক্তি দান করে থাকে। ইমাম গাজ্জালী জোর দিয়ে বলেন যে, পয়গাম্বরগণ হলেন মানুষের কালবের চিকিৎসক। তারা হলেন শাফিউল কুলুব।</strong> আর এক্ষেত্রে আকলের কাজ হল পয়গাম্বরগণের সত্যতাকে স্বীকার করা ও যারা কালবের রোগ থেকে মুক্তি পেতে চায়, তাদেরকে পয়গাম্বরের নিকটে নিয়ে যাওয়া। এই অর্থে পয়গাম্বরদের মিশনকে সত্যিকারার্থে তারাই ধারাবাহিক রাখতে পারবেন, যারা পয়গাম্বরগণের সকল অবস্থা অনুভব করতে পারবেন। অন্য কথায় তাসাউফের উচ্চ শিখরে আরোহনকারী আলেমগণের পক্ষেই কেবল পয়গাম্বরগণের রেখে যাওয়া কাজের আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>ইমাম গাজ্জালী যেভাবে ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করেছেনঃ</h4>
<p>এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইমাম গাজ্জালী যেমন বহুমুখী চিন্তার অধিকারী ছিলেন, তেমনি তাঁর প্রভাবও ছিল বহুমুখী। দর্শনের প্রতি, বিশেষ করে দার্শনিকগণের মেটাফিজিক্যাল চিন্তার প্রতি গাজ্জালীর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের মধ্যে দার্শনিক চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বাধা সৃষ্টি করেনি, বরং সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে তিনি দর্শনকে সহজভাবে তুলে ধরার কারণে দর্শন মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মানতিকের প্রতি তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানতিক শুধুমাত্র দর্শনের জন্য নয়, সকল প্রকার তাত্ত্বিক তথা থিওরিটিক্যাল জ্ঞানের জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু হয়।<br class="html-br" /><br class="html-br" />ইবনে সিনা -পন্থী মনস্তত্ত্ব (সাইকোলজি) ও জ্ঞানতত্ত্ব (এপিস্টেমোলজি)–কে গ্রহণ করার ফলে একই সাথে তা কালাম ও তাসাউফের উপর গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে কালাম ও তাসাউফের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রূহ ও শরীর, আকল ও আখলাকের চিন্তার ক্ষেত্রে নতুন একটি মাত্রা দান করে। “নূর” পরিভাষাকে কেন্দ্রে স্থাপন করে তিনি যে অন্টোলজিক্যাল একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন, সে তত্ত্বটি তাসাউফের মত ইশরাকী ধারাতেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />এই মহান চিন্তাবিদ শুধুমাত্র মুসলিম চিন্তাবিদগণ-ই নয়, পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদদেরকেও প্রভাবিত করেছেন ব্যাপকভাবে। এই কারণে রেনে দেকার্তে ও তাঁর অনুসারীদের সন্দেহবাদ বা স্কেপটিসিজমের মধ্যে, হিউমের ক্যাজুয়ালিটি (causality)-র মধ্যে এবং ইমান্যুয়েল কান্টের ফিজিক্সের সমালোচনার মধ্যে ইমাম গাজ্জালীর চিন্তার ছাপ পাওয়া<br class="html-br" />যায়।<br class="html-br" /><br class="html-br" />অনুবাদঃ <span class="html-span xdj266r x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r xexx8yu x4uap5 x18d9i69 xkhd6sd x1hl2dhg x16tdsg8 x1vvkbs"><a class="x1i10hfl xjbqb8w x1ejq31n xd10rxx x1sy0etr x17r0tee x972fbf xcfux6l x1qhh985 xm0m39n x9f619 x1ypdohk xt0psk2 xe8uvvx xdj266r x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r xexx8yu x4uap5 x18d9i69 xkhd6sd x16tdsg8 x1hl2dhg xggy1nq x1a2a7pz x1sur9pj xkrqix3 xzsf02u x1s688f" tabindex="0" role="link" href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/"><span class="xt0psk2">বুরহান উদ্দিন আজাদ</span></a></span></p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 96px; top: 468.969px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/imam-ghazali-and-his-method-of-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15231</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল্লামা ত্বহা আবদুর রহমান ও তাঁর চিন্তাদর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahman-and-his-philosophical-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahman-and-his-philosophical-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 26 Oct 2024 15:20:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইলমুল কালাম]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15152</guid>

					<description><![CDATA[আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বহুমাত্রিক একজন আলেম ও চিন্তাবিদ। তাঁর মতো চিন্তাবিদের চিন্তাধারা একটি প্রবন্ধের মধ্যে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। বিগত পঞ্চাশ বছরের চিন্তাগত জীবনে তিনি দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটির মতো বিভিন্ন বিষয়ে ত্রিশের অধিক গ্রন্থ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বহুমাত্রিক একজন আলেম ও চিন্তাবিদ। তাঁর মতো চিন্তাবিদের চিন্তাধারা একটি প্রবন্ধের মধ্যে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। বিগত পঞ্চাশ বছরের চিন্তাগত জীবনে তিনি দ্বীন, রাজনীতি, আখলাক, দর্শন, ফিকহ ও মডার্নিটির মতো বিভিন্ন বিষয়ে ত্রিশের অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই সকল গ্রন্থে স্বতন্ত্র একটি ভাষার মাধ্যমে তিনি শত শত পরিভাষা তৈরি করেছেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান বিভিন্ন সময়ে আমাদের সামনে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময়ে তাঁর বয়স ২৩-২৪ বছর। সে সময়ের একজন যুবক হিসেবে তাঁর মানসপট কীভাবে পরিবর্তন হয়েছিল সেটা তিনি আমাদেরকে অবহিত করেছেন। এ সময়ে তিনি সাহিত্য ও কবিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রাক্কালে নিজেকে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো করেন-</p>
<ul>
<li>১. ما كنه العقل الذي هزم العقل المسلم অর্থাৎ, দৃশ্যমানভাবে হলেও মুসলমানদের আকলকে বিপর্যস্ত করে এমন আকলের প্রকৃতি কী?</li>
<li>এখানে তিনি পাশ্চাত্যের আকলের প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।</li>
<li>২. ماذا صنع الاستعمار بنا অর্থাৎ, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আমাদের জন্য কী বইয়ে এনেছে?</li>
<li>আপনারা জানেন মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া ফ্রান্সের শোষণাধীন ছিল। ত্বহা আব্দুর রহমান যখন ছোট ছিলেন তখনও মরক্কো-সহ ঐ অঞ্চলে ফ্রান্সের শোষণ ও শাসন অব্যাহত ছিল।</li>
<li>৩. من نحن بعد الإستعمار অর্থাৎ শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের পর আমরা কোন অবস্থায় এসে উপনীত হলাম?</li>
</ul>
<p>তিনি বলেন, এই তিনটি প্রশ্ন আমি নিজেকে করি এবং এর সাথে আরও দু’টি প্রশ্নকে যুক্ত করি।</p>
<ul>
<li>ক. من نحن অর্থাৎ, আমরা কারা?</li>
<li>খ. من هذا الاخر অর্থাৎ, অন্যরা কারা?</li>
</ul>
<p>তাঁর ভাষ্যমতে, এই পাঁচটি প্রশ্নকে সামনে রেখে তিনি তাঁর চিন্তাজগতকে নতুন করে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। আমরা তাঁর সকল গ্রন্থ সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই যে, তিনি কোনো গ্রন্থই পরিকল্পনাহীনভাবে রচনা করেননি।</p>
<p>তিনি তাঁর মানসপটে অঙ্কিত প্রজেক্টকে (কর্ম-পরিকল্পনা) শক্তিশালী চিন্তা ও লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে শোষণ ও পাশ্চাত্যায়ন (Westernization)-কে العباد البنيوية (কাঠামোগত একটি গণহত্যা) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা শোষণ, পাশ্চাত্যায়ন মুসলিম উম্মাহর সকল প্রতিষ্ঠান ও চিন্তাকে ধ্বংস করে দেয়। এই অবস্থা থেকে মুসলিম উম্মাহ কীভাবে উদ্ধার হতে পারে এই বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো, ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তা ও প্রজেক্টসমূহকে (কর্ম-পরিকল্পনা) বিশেষ করে আধুনিক সময়ে এসে মুসলিম উম্মাহর সৃষ্ট আন্দোলনসমূহের মধ্যে কোথায় স্থান দেবো? ক্ল্যাসিক ইসলামী চিন্তার মধ্যে তাঁর স্থান কোথায়?</p>
<p>শুরুতেই আমরা প্রথম প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। তাঁর মতে, শোষণ ও পাশ্চাত্যায়নের বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর দু’ধরণের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে একটি ছোট বা (জুযয়ি) আর অপরটি সামগ্রিক/বড় (কুল্লি)। ছোট (জুযয়ি) আন্দোলনগুলো হলো রাজনৈতিক আন্দোলন। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যতগুলো রাজনৈতিক আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করেছে সবগুলোই হলো ছোট বা জুযয়ি আন্দোলন। আর বড় বড় আন্দোলনসমূহ হলো চিন্তা ও আখলাকী আন্দোলন। এ ক্ষেত্রে তাঁর এই বাণীটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ :</p>
<blockquote><p>يكاد يكون مستحيلاً اقتناعنا بوجود أداة تغيير غير سياسة في الواقع المعاصر</p>
<p>অর্থাৎ : আধুনিক দুনিয়াতে সমাজ পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি ছাড়াও যে অন্য পন্থা রয়েছে এই বিষয়টির ব্যপারে কনভিন্স করা এক প্রকারের অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।</p></blockquote>
<p><strong>অর্থাৎ, যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয় তাহলে রাজনৈতিকভাবেই আনতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। এ বিষয়টি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যেন এর বাহিরে অন্য কোনো পন্থাতেই সমাজ পরিবর্তন করা যেতে পারে না।</strong></p>
<blockquote><p>ولكن ما من سبيل الا ان نقلب هذا المستحيل</p>
<p>কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই।</p></blockquote>
<p><strong>অর্থাৎ রাজনীতি ছাড়াও যে সমাজ পরিবর্তন করা যায় এই বিষয়টি আমাদেরকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং তাঁদেরকে এই ব্যপারে কনভিন্স করতে হবে। বিষয়টি অনেক কঠিন হলেও এই কাজে আমাদেরকে সফল হতে হবে।</strong></p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান বলতে চেয়েছেন, মৌলিক পরিবর্তন চিন্তা ও আখলাকী পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়। বিষয়টিতে তিনি ব্যাপক জোর দেন এবং তাঁর সবগুলো গ্রন্থ এই চিন্তার আলোকে সুসজ্জিত করেন।</p>
<p>এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মুসলিম উম্মাহ শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে সকল তাজদীদ ও ইহইয়া আন্দোলন শুরু করেছিল সেগুলোকে আমরা পাঁচভাবে বিভক্ত করতে পারি :</p>
<ul>
<li>১. সমস্যাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনাকারী এবং নতুন করে ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টাকারী আন্দোলনসমূহ।</li>
<li>২. মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে (সেকুলারিজম) ধারণ করে সেটার আলোকে চলতে হবে এমন আন্দোলনসমূহ।</li>
<li>৩. রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশকারী ইসলামপন্থী দলসমূহ। তাঁদের স্লোগান হলো, الاسلام هو الحل অর্থাৎ ইসলামই হলো একমাত্র সমাধান।</li>
<li>৪. পাশ্চাত্যে সৃষ্ট চিন্তাধারা ইসলামী চিন্তার মধ্যে প্রয়োগকারী মডার্ন ধারাসমূহ। তাঁদেরকে তিনি “তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস” নামক গ্রন্থের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন।</li>
<li>৫. শক্তিকে শক্তির মাধ্যমে জবাব দিতে হবে। এই গ্রুপের দ্বারা তিনি বিভিন্ন চরমপন্থী গ্রুপকে বুঝিয়েছেন এবং তাঁদেরকে নিয়ে سؤال العنف নামক একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।</li>
</ul>
<p>আচ্ছা! তাহলে এখন মূল কাজ কী? আমাদেরকে কী করতে হবে? এখানে মৌলিক কাজ হলো চিন্তাগত ও আখলাকী একটি চিন্তা গড়ে তোলা। এটা কীভাবে শুরু করতে হবে?</p>
<p>এক্ষেত্রে তিনি বলেন, আমাদেরকে দুটি আপদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। তাঁর মতে, সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে পরিগ্রহকারী দুটি আপদ রয়েছে।<strong> প্রথমটি ‘আল-আফাতুল বায়ানিয়্যাহ’, দ্বিতীয়টি ‘আল-আফাতুল ইমানিয়্যাহ’।</strong></p>
<p>প্রথম আপদ তথা <strong>আল-আফাতুল বায়ানিয়্যায়</strong> শুরুতে যে বিষয়টি আসে তা হলো আমাদের ভাষাগত সমস্যা। অর্থাৎ, আমরা সমগ্র উম্মাহ যে ভাষায় কথা বলি সে ভাষায় চিন্তা করি না। আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেই ভাষায় দর্শন তৈরি করি না। কিংবা আমাদের চিন্তায় আমরা কথা বলি না। আমরা যে দার্শনিক চিন্তার অধিকারী সেই চিন্তাকে তুলে ধরি না। এ কারণে তিনি এটাকে ‘আল-আফাতুল বায়ানিয়্যাহ’ বলেন।</p>
<p>আমরা দেখি, ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর জীবনে শুরুর দিকের বড় একটি অংশ ভাষা, মানতিক ও দর্শন শিক্ষায় ব্যয় করেন। ভাষা ও মানতিক নিয়ে তাঁর গবেষণাসমূহ আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, স্বতন্ত্র একটি ইসলামী দর্শনের জন্য এ দুটি বিষয়ের বিকল্প নেই।</p>
<p>তাঁর মতে, সর্বশেষ ইলাহী দ্বীন ইসলামকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবতার মুক্তির জন্য প্রেরণ করেছেন। আর এই দ্বীনের মূল গ্রন্থকে তিনি একটি ভাষার মাধ্যমে সমগ্র মানবতার নিকট পৌঁছে  দিয়েছেন। যদি এই ভাষার মাধ্যমে চিন্তা ও দর্শনকে তৈরি করা না যায় তাহলে আর কোন ভাষায় করা সম্ভবপর হবে? এই কারণে তিনি এ বিষয়ে ব্যাপক জোর দেন এবং এ সমস্যাকে সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালান।</p>
<p>তাঁর মতে, কোনো চিন্তা ‘ফিলোসফি’ নামে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য প্রাচীন গ্রীসে কিংবা পাশ্চাত্যে তৈরি হওয়া শর্ত নয়। সকল জায়গার সকল সংস্কৃতির মানুষই দর্শন ও চিন্তা তৈরি করতে পারে। শুধু তাই নয়, চাইলে তারা বিশ্বজনীন ফিলোসফিও সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রসর ভাষা হলো আরবী। এ ভাষার মাধ্যমে এমন বড় বড় বিশ্বজনীন চিন্তা তৈরি করা যেতে পারে। আর এ কাজ সবচেয়ে ভালো ও উত্তমভাবে করতে পারে মুসলিম উম্মাহ। এ বিষয়ে তিনি অনেক বেশি জোর দেন।</p>
<p>দ্বিতীয় আপদ হলো, <strong>‘আল-আফাতুল ঈমানিয়্যাহ’</strong>। এর মাধ্যমে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন? তাঁর উদ্দেশ্য হলো, আমরা আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে এখনো জীবনের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি। অর্থাৎ আমাদের ঈমান চিন্তা তৈরি করতে পারছে না। কেননা ঈমান একইসাথে চিন্তাকারী একটি আকল। কিন্তু আমরা ঈমানের মাধ্যমে চিন্তা করি না। একারণে তিনি দ্বিতীয় বড় আপদকে ‘আল-আফাতুল ঈমানিয়্যাহ’ নামে নামকরণ করেন।</p>
<p>এ বিষয়ে তিনি সমাধান হিসেবে কী পেশ করেন?</p>
<p><strong>এই দুটি বিষয়কে অতিক্রম করার জন্য সমাধান হিসেবে তিনি দুটি ফিলোসফি (দর্শন) সম্পর্কে আলোকপাত করেন। প্রথমটি ‘আল-ফালসাফাতুদ তাদাভুলিয়্যাহ’। দ্বিতীয়টি ‘আল-ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’।</strong></p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানকে বুঝতে চাইলে এই পরিভাষাসমূহকে এভাবেই ব্যবহার করতে হবে। এসকল পরিভাষা অনুবাদ করে বুঝা সম্ভব নয়। তাদাভুলিয়্যা’র দ্বারা উদ্দেশ্য, জ্ঞান ও বিশ্বাসকে একত্রিত করে দর্শন তৈরি করা। আমাদের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র একটি ফিলোসফির প্রয়োজন যেটাকে তিনি এই নামে অভিহিত করেন। এ বিষয়গুলো তিনি তাঁর গ্রন্থসমূহে অসাধারণভাবে তুলে ধরেন। এই দর্শনের কেন্দ্রে রাখেন ভাষাকে।</p>
<p>অপরদিকে ‘আল-ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ পরিভাষাটি তিনি আমান ও আমানত নামক পরিভাষাদ্বয়কে একত্রিত করে তৈরি করেন। এক্ষেত্রে তিনি ঈমান (বিশ্বাস)-কে কেন্দ্রে স্থাপন করেন এবং এটাকে তিনি মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানকে বুঝার জন্য এই পরিভাষা দু’টি (তাদাভুলিয়্যাহ, ই’তিমানিয়্যাহ) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভাষাতত্ত্ব, মানতিক ও দর্শনে পারদর্শী বিশেষজ্ঞদের এই বিষয়ে আলোচনা করা উচিত।</p>
<p>তবে আমাকে যে বিষয়টি বেশি আগ্রহী করে সেটা হলো, তাঁর আল-ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ। আমি এ বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করার চেষ্টা করবো। কেননা বিষয়টি তিনি শুধুমাত্র একটি ফিলোসফি হিসেবে বিবেচনা করেননি। যেমন, ফিকহকেও তিনি এই পরিভাষার উপর ভিত্তি করে দাঁড় করাতে চান। এজন্য তিনি ফিকহুল ইতিমানিয়্যাহ নিয়েও কাজ করেছেন। বিশেষ করে জ্ঞানের তিনটি শাখা তিনি নতুন করে গঠন করার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেন। সেগুলো হলো, ফিকহ, কালাম ও তাসাউফ।</p>
<p>তাঁর মতে, আমাদের ফিকহ অনেকাংশে আদেশ ও নিষেধের উপর ভিত্তি করে গঠিত। একারণে তিনি আমাদের ক্ল্যাসিক ফিকহের নাম দিয়েছেন ‘ফিকহুল ই’তিমান’। এই ফিকহে ই’তিমান তথা আমান ও আমানতের বিষয়টি দুর্বল অবস্থায় রয়ে গেছে। একারণে তিনি তাঁর দ্বীনুল হায়া নামক গ্রন্থের প্রথম খন্ডে ফিকহুল ই’তিমানের উসূলকে তুলে ধরেছেন।</p>
<p>ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তাবনা হলো, মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র ইরাদা ও কুদরাতের উপর ভিত্তি করে নয়; বরং মিসাকের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। তাজদীদু ইলমুল কালাম নামক গ্রন্থে তিনি এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে ই’তিমানী দর্শন সামনে রেখে নতুন করে তৈরি করার প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।</p>
<p>অপরদিকে তাসাউফকে তিনি এই দুই জ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তাঁর মতে, ইসতিদলাল, ইসতিমবাত এবং ইসতিবসারকে একত্রে বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ, ফিকহ, কালাম ও তাসাউফকে একত্রে বিবেচনা করতে হবে। তবে এখানে তিনি তাসাউফ বলতে বর্তমান সময়ের জ্ঞানহীন তাসাউফের কথা উল্লেখ করেননি। তাসাউফকে তিনি জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে নতুন করে বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেও একজন তাসাউফপন্থী আলেম ও একটি তরিকতের সদস্য। তবে তাসাউফকে জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি অনেক বেশি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।</p>
<p>এসকল দৃষ্টিকোণ সামনে রেখে আমরা ত্বহা আব্দুর রহমানের গ্রন্থগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করতে চাই। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের অর্ধেক উসূল ও মেথডোলজি নিয়ে আর বাকি অর্ধেক এই সকল উসূলের প্রয়োগ নিয়ে। অর্থাৎ, তিনি তাঁর রচিত উসূলকে তাঁর নিজের গ্রন্থসমূহেই প্রয়োগ করেছেন। যেমন, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভকারী গায়রে আখলাকী বিষয়টিকে তিনি বিশ্লেষণ করার সময় তাঁর ই’তিমানিয়্যাহ দর্শনকে সামনে রাখেন এবং এর আলোকে সমাধান পেশ করার চেষ্টা করেন। কিংবা আকলের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার সময় তাদাভুলিয়্যাহ দর্শনকে সামনে রাখেন এবং এর আলোকে উত্তোরণের পথ বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।</p>
<p>সুবরু মুরাবিতা নামে তাঁর একটি গ্রন্থ রয়েছে। এখানে তিনি সৌদি আরব ও ইরান নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেন। মূলত রুহুদ্বীন (দ্বীনের রূহ) নামক গ্রন্থকে এই দুই দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সামনে রেখে রচনা করেন এবং এই বইয়ে তিনি দ্বীন ও রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সমাধানমূলক তত্ত্ব তুলে ধরেন। একইভাবে আমরা যখন তাঁর সুয়ালুল উনফ নামক গ্রন্থটি পাঠ করি তখন দেখতে পাই, মুসলিম উম্মাহকে পরিগ্রহকারী বিশৃঙ্খলা, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।</p>
<p>পূর্বে আমি যেমনটা উল্লেখ করেছি আমরা তাঁর গ্রন্থসমূহকে দু’ভাগে বিভক্ত করতে পারি। একভাগ হলো উসূল ও মেথডোলজি সংক্রান্ত আর অপর ভাগ হলো জীবনের বিভিন্ন প্রায়োগিক দিক নিয়ে।</p>
<p>উসূল ও মেথডোলজি সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহ আবার দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর মধ্যে এক ভাগ হলো ‘ফালসাফাতুল তাদাভুলিয়্যাহ’ সম্পর্কে আর অপরভাগ হলো ‘ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ সম্পর্কে।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান তাঁর চিন্তা পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে সামনে রেখে তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো আল-মানহাজ। অর্থাৎ পদ্ধতি বা পন্থা। <strong>তাজদীদুল মানহাজ ফি তাকবিমুত তুরাস</strong> &#8211; এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক মিরাস (ঐতিহ্য) পর্যালোচনা করার জন্য নতুন একটি পন্থার প্রস্তাবনা দিয়েছেন। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য (মিরাস)-কে কীভাবে বুঝবো? যদিও অনেকেই বলেন যে, এই গ্রন্থটি তিনি মুহাম্মাদ আবিল আল-জাবিরিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন এবং তাঁর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আসলে বিষয়টি এমন নয়। অর্থাৎ ত্বহা আব্দুর রহমান অন্যকে খণ্ডন করার পন্থা অবলম্বন করেন না। তিনি একজন বিনির্মাণকারী। তিনি কাউকে বিরোধী হিসেবে গণ্য করে তাকে খণ্ডন করেন না; বরং যেটা হাকীকত ও সত্য সেটাকেই তিনি সর্বোচ্চ যুক্তি ও দলীল দিয়ে তুলে ধরেন। এ কারণে তিনি একজন অসাধারণ নির্মাতা। তবে তিনি জাবিরি’র বয়ান, বুরহান ও ইরফান নামক ত্রয়াত্মক শ্রেণিবিন্যাস এবং এর উপর ভিত্তি করে ইসলামী চিন্তাধারাকে সরলীকরণের কঠোর সমালোচনা করেন। এই ক্ষেত্রে তিনি তাকামুলী তথা উৎকর্ষতার পন্থাকে প্রস্তাব করেন। এই তিনটিকে তাদাখুলিয়া তথা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।</p>
<p>তাঁর মতে, আধুনিক সময়ে এসে আমরা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত চিন্তার প্রভাবে সকল কিছুকেই খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি। সকল কিছুকে খণ্ডিত করে দেখা ভুল একটি পন্থা। এই পন্থাটি আমাদের মঝে প্রভাব বিস্তার করার কারণে ইসলামী চিন্তা সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করার সক্ষমতাকেও আজ হারিয়ে ফেলেছি। এই পন্থা বা মেথডকে তিনি মানহাজের অংশে ভাষা, মানতিক ও দর্শনের পাশাপাশি উসূলুল ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করেন।</p>
<p><strong>তিনি অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও ৫৮০ পৃষ্ঠার বিশাল একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম হলো, আত-তা’সিসুল ই’তিমানি লি ইলমিল মাকাসিদ। অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ইলমুল মাকাসিদের ই’তিমানি ভিত্তিসমূহ। আমার মতে, এই গ্রন্থটি মাকাসিদ নিয়ে লেখা বিগত ২০ বছরের সবচেয়ে সেরা গ্রন্থ।</strong> আর এই গ্রন্থের পর এই বিষয়ে যারা লেখালেখি করেছেন তাঁরা তাঁদের চিন্তাকে পুনর্বিবেচনা করবেন বলে আমার বিশ্বাস। কেননা তিনি মাকাসিদের শরয়ী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ যেটা শরয়ী সেটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য?  আর যেটা গ্রহণযোগ্য সেটা কতটুকু শরয়ী? আমরা ইলাহী মাকসাদ বা উদ্দেশ্যকে এত সু-স্পষ্টভাবে কীভাবে উল্লেখ করতে পারি? এই শক্তি আমরা কোথায় পাই? এই বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এসকল দৃষ্টিকোণ থেকে এ গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ।</p>
<p>আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, <strong>ত্বহা আব্দুর রহমানের অন্যতম একটি গ্রন্থ হলো রুহুদ দ্বীন</strong>। এ গ্রন্থে তিনি দ্বীন ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ককে শুধুমাত্র সেকুলারিজমের দৃষ্টিকোণ থেকেই অর্থাৎ দ্বীনের রাজনীতিকরণ কিংবা রাজনীতির দ্বীনিকরণ নিয়েই আলোচনা করেননি। এ গ্রন্থে একইসাথে তিনি তাদবীর ও তায়াব্বুদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নতুন একটি উসূল দাঁড় করিয়েছেন। তায়ায়্যুশী আমলের সাথে তায়াব্বুদী আমলকে কীভাবে একত্রিত করতে পারি এবং ইসলাম এই বিষয়টি কীভাবে তুলে ধরেছে সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তিনি বিভিন্ন পরিভাষার পাশাপাশি যে পরিভাষার ব্যপারে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন সেটি হলো ‘তুরাস’। যে চিন্তা তাঁর অতীতকে অস্বীকার করে সেই চিন্তার পক্ষে নতুন কোনো প্রস্তাবনা দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, তাঁর পক্ষে নতুন কোনো চিন্তাও দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তিনি তাকদীস ও তাহকীর তথা তুরাসকে পবিত্র বলে গণ্য করা থেকেও বিরত থাকেন আবার সেটাকে হেয় প্রতিপন্ন করা থেকেও বিরত থেকে অতীত থেকে  শিক্ষা নেওয়ার পন্থা তথা তাকদীরের পন্থাকে বেছে নেওয়ার পক্ষে মত দেন।</p>
<p>মডার্নিটি কিংবা আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি রুহুল হাদাসা নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের আধুনিকতা নামে একটি আধুনিকতা রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিকতা একমাত্র কিংবা অনুপম নয়। প্রতিটি চিন্তায় তাঁর মতো করে তাঁদের নিজস্ব আধুনিকতা তৈরি করতে পারে। পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর কিছু মৌলিক পরিভাষা আছে। যেমন, ধর্মহীন বিশ্বদর্শন (Secular World View), রেশনালিজম, হিউম্যানিজম ইত্যাদি। কিন্তু আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও পরিভাষার মাধ্যমে আমাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি আধুনিকতার বিকাশ ঘটাতে পারি। অর্থাৎ আধুনিকতার রূহকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের রূহকে বিনির্মাণ করতে পারলে সেই রূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আধুনিকতার উদ্ভব ঘটবে।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তায় অপর আরেকটি বিষয় হলো আখলাক। এই বিষয়েও তিনি অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে দ্বীন ও আখলাকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল ধরণের বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দ্বীনকে আখলাক হিসেবে ও আখলাককে দ্বীন হিসেবে অভিহিত করেন। ‘Cogito, ergo sum’ (চিন্তা করি এই জন্যই আছি) চিন্তার বিপরীতে ‘আমি আখলাকসম্পন্ন, এই জন্য আমি আছি&#8221; এই চিন্তার বিকাশ ঘটান। আখলাকী চিন্তার ক্ষেত্রে মুসলিম আলেমদের চিন্তার সমালোচনা করে বলেন, তাদের চিন্তার মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কেননা তাঁরা আখলাককে পূর্ণতা  হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু আখলাক পূর্ণতাদানকারী কোনো বিষয় নয়। এটি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। আখলাক ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। আখলাক পূর্ণতার (কামালিয়াত) সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়, এটা অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা দ্বীন ও মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আখলাক ছাড়া দ্বীন হতে পারে না, আখলাক ছাড়া মানুষ হতে পারে না। মানুষের যে সংজ্ঞা সেই সংজ্ঞার একাংশ জুড়ে আছে আখলাক আর বাকি অংশ হলো দ্বীন। তবে এক্ষেত্রে দ্বীন হলো মূল।</p>
<p>তাঁর মতে, রাজনীতি থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ করার চেয়ে দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা আর বড় ধরণের হুমকি। আর এ বিষয়কে তুলে ধরার জন্য তিনি দাহরানিয়্যাহ নামক একটি পরিভাষা তৈরি করেন। দাহরানিয়্যাহ হলো, দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা। আর এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিপদজনক বিষয়।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান ফিতরাতের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি তাঁর সকল গ্রন্থেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। কেননা তাঁর মতে, দ্বীন মানুষের পূর্বে ছিল। মানুষের সৃষ্টি হয়েছে দ্বীনের পরে। শুধু তাই নয়, খুলক-ও (আখলাক) খালকের (সৃষ্টির) পূর্বে। মানুষের সৃষ্টির পূর্বেই খুলক ছিল আর এটা ফিতরাতরূপে মূল্যবোধের একটি ভাণ্ডার হিসেবে মানুষকে দেওয়া হয়েছে। দ্বীন মানুষের মধ্যে পরবর্তীতে স্থাপিত কোনো বিষয় নয়। দ্বীনের অর্থের জগত মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্বপ্রাপ্ত মৌলিক একটি হাফিজার (সংরক্ষণশালা) মধ্যে লুক্কায়িত। আর এই হাফিজা বা সংরক্ষণশালার নাম হলো ফিতরাত। দ্বীন মানুষকে সঙ্গ দানকারী একটি হাকীকত এবং মানুষ এ হাকীকত থেকে কখনো পৃথক হতে পারবে না। অপর দিকে পয়গাম্বরদের মাধ্যমে যে দ্বীন এসেছে সেটা মূলত তাজকীর বা স্মারক। অর্থাৎ, মানুষের ফিতরাতের মধ্যে যা রয়েছে, সেটাই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এ কারণে কোরআন যাক্কির (স্মারক), পয়গাম্বর মুজাক্কির। মিসাকুর রিসালার সাথে মিসাকুশ শাহাদাকে ত্বহা আব্দুর রহমান সূরা আরাফের ১৭২ নং আয়াতের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<blockquote><p>(وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَا)</p>
<p>অর্থ : “আর হে নবী! লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা, যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন : ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলেছিল, নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব, আমরা এর সাক্ষ্য দিচ্ছি।”</p></blockquote>
<p>এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে তিনি বলেন, আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক হলো শাহাদাতের উপর ভিত্তি করে।</p>
<p>আর দ্বিতীয় মিসাক হলো, মিসাকুল আমানা। এটাকে তিনি সূরা আহযাবের ৭২ নং আয়াতের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<blockquote><p>إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ ۖ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا</p>
<p>অর্থ :  “আমি এ আমানতকে আকাশসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতরাজির ওপর পেশ করি। তারা একে বহন করতে রাজি হয়নি এবং তা থেকে ভীত হয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ একে বহন করেছে, নিঃসন্দেহে সে বড় জালেম ও অজ্ঞ।”</p></blockquote>
<p>আর তৃতীয়টি তথা মিসাকুর রিসালাকে তিনি দাঁড় করিয়েছেন সূরা বাকারার ১৫১ নং আয়াতের উপর ভিত্তি করে।</p>
<blockquote><p>كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِّنكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ</p>
<p>অর্থ : “যেমনিভাবে (তোমরা এই জিনিসটি থেকেও সাফল্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছো যে) আমি তোমাদের মধ্যে স্বয়ং তোমাদের থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শুনায়, তোমাদের জীবন পরিশুদ্ধ করে সুসজ্জিত করে, তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় এবং এমন জ্ঞান তোমাদের শেখায়, যা তোমরা জানতে না।”</p></blockquote>
<p>মিসাকুশ শাহাদা ফিতরাত হিসেবে মানুষের সাথে একত্রে অস্তিত্ব লাভ করেছে, মিসাকুল আমানা মূলত মূল্যবোধ হিসেবে এসেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে উভয়টি মূলত মূল্যবোধ। একটি হলো ঈমান অপরটি হলো আখলাক। এগুলো মানুষের মধ্যে একটি সফটওয়্যার হিসেবে মানুষের অস্তিত্ব লাভের সাথে সাথে অস্তিত্ব লাভ করেছে কিন্তু তা আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। আর মিসাকুর রিসালা হলো এটাকে পূর্ণতাদানকারী একটি বিষয়। এ দু’টি বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই মহান আল্লাহ পয়গাম্বর পাঠিয়েছেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানের অপর একটি গ্রন্থ হলো, <strong>আল-মানতিক ওয়ান নাহও’স সূরী</strong>। এই গ্রন্থে তিনি সূরী মানতিক ও নাহু’র মাধ্যমে ইসলামের মূল্যবোধসমূহকে অপর মানুষের নিকট উত্থাপনকারী একটি ভাষা হিসেবে আরবী ভাষা নিয়ে বিশ্লেষণ করেন।</p>
<p><strong>দর্শনের বিষয়ে বিশেষ করে দু’টি ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন এবং এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দর্শন মানে হলো প্রশ্ন করা। আর প্রশ্ন করার পন্থা দু’টি :</strong></p>
<ul>
<li><strong>১. অপরপক্ষকে চুপ করানো জন্য প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করার এই পন্থা হলো গ্রীক দার্শনিকদের পন্থা। যেমন, সক্রেটিসের প্রশ্ন করার পন্থা।</strong></li>
<li><strong>২. সমালোচনামূলক প্রশ্ন করা। ইম্যানুয়েল কান্ট এই পন্থা শুরু করেন এবং প্রভাবশালী করে তুলেন।</strong></li>
</ul>
<p><strong>তবে ই’তিমানিয়্যাহ দর্শনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সুয়াল বা প্রশ্ন নেই। সুয়াল বা প্রশ্নের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সুয়ালিয়্যাত (প্রশ্ন করা) নয়, এখানে উদ্দেশ্য হলো মাসউলিয়্যাত (দায়িত্ববোধ)। সুয়াল-মাসয়ালা ও মাসউলিয়্যাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি এই বিষয়কে তুলে ধরেন এবং মনে করেন, প্রশ্ন যখন দায়িত্ববোধের চেতনা জাগ্রত করবে কেবল তখনই সেটা সত্যিকারের প্রশ্ন হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরণের প্রশ্নই আমাদের সত্যিকারের দর্শন। এ ক্ষেত্রে তিনি ‘আস-সুয়ালুল মাসউল’ পরিভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।</strong></p>
<p>পরিভাষা তৈরি করার ক্ষেত্রেও তিনি অতুলনীয়। কিছুদিন আগে এ ব্যপারে কামুসু ত্বহা নামে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমানের মতে, মুসলিম উম্মাহ পরিভাষাগত একটি আক্রমণের শিকার। এ ক্ষেত্রে তিনি <strong>‘আল-উদওয়ানুল মাফহুমী’</strong> নামক পরিভাষা ব্যাবহার করেন।</p>
<p>তিনি বলেন, <strong>“পরিভাষা তৈরি করা ও পরিভাষার অধিকারী হওয়ার অর্থ হলো সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়া। কোনো কিছুকে পরিভাষার মাধ্যমে পরিবর্তন করা শক্তি প্রয়োগ করে পরিবর্তন করার চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়ে থাকে। পরিভাষার মধ্য দিয়ে বড় বড় পরিবর্তন করা সম্ভব”।</strong></p>
<p>এ কারণেই তিনি পরিভাষার উপর এত বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন  এবং শত শত পরিভাষা তৈরি করেছেন।</p>
<blockquote><p>অনুরূপভাবে তিনি আকলের বিষয়েও অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। আকলকে <strong>তিনি আকলে মুজাররাদ, আকলে মুয়ায়্যাদ ও আকলে মুসাদ্দাদ নামে তিন ভাগে বিভক্ত করেন।</strong> <strong>তাঁর মতে, আকলে মুজাররাদ হলো বুরহানী আকল।</strong> এটি এমন আকল যা দ্বীনি ক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে। এই ধরণের আকল হলো বিমূর্ত (Abstract) ও যান্ত্রিক। এ ধরণের আকল বিজ্ঞানাগারে, কল কারখানায় ও একাডেমিক গবেষণার কাজে লাগতে পারে কিন্তু  মানুষের সাথে তাঁর রবের ও মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক এই আকলের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি আমলের মাধ্যমে সজ্জিত আকলকে ‘আকলে মুসাদ্দাদ’ নামে নামকরণ করেছেন। <strong>আর</strong> <strong>যে আকল আখলাকী মূল্যবোধের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হয়েছে সেই আকলকে তিনি ‘আকলে মুয়ায়্যাদ’ নামে অভিহিত করেন।</strong> তিনি মনে করেন, আকল শুধুমাত্র একমুখী হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ আকলকেই ছোট করা। কেননা আকল আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত। এজন্য এই নেয়ামতকে বহুমুখী হিসেবে দেখতে হবে। আকল কোনো জাওহার নয়। আকল হলো একটি কর্ম। এই কারণে তিনি তায়া’ক্কুলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p></blockquote>
<p>এখন আমি তাঁর গ্রন্থসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরতে চাই।</p>
<p>প্রথমত, মেথডোলজি সংক্রান্ত গ্রন্থ। এ সম্পর্কে রচিত তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ফিকহুল ফালসাফা। চার খণ্ডে বিভক্ত করে তিনি এ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তা দুই খণ্ড প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে তিনি বলেন, অন্যের চিন্তা অনুবাদ করে কোনোদিন সত্যিকারের চিন্তা তৈরি করা যায় না। পাশ্চাত্যের দর্শন বিষয়ক যে সব বইকে অনুবাদ করে আজকে সমগ্র বিশ্বে পড়ানো হচ্ছে, সেটার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন,</p>
<p><strong>لن تكون الفلسفة رافعة إلا اذا كانت مبدعة</strong></p>
<p><strong>অর্থ : “দর্শন কোনো জাতিকে উচ্চমর্যাদায় আসীন করতে পারে না, যদি না সেটা নিজেদের মূল্যবোধের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়।”</strong></p>
<p>অর্থাৎ, তাকলীদের মাধ্যমে চর্চিত দর্শন কোনোদিন কোনো জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারে না। যদি কোনো জাতি চিন্তার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে চায়, তাহলে তাকে নিজ মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রেখে চিন্তা ও দর্শন তৈরি করতে হবে। নাসক মাসক নিয়ে আসে। নাসক হলো কোনো কিছুকে ফটোকপি করা। আর ফটোকপি মাসক’কে নিয়ে আসে। মাসক কী? মাসক হলো, ফটোকপির মাধ্যমে অন্যদের অনুবাদ করে তাদের চিন্তাকে নিয়ে আসলে সেটা একটি জাতিকে বিশেষভাবে মুসলিম উম্মাহকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করে দিবে।</p>
<p>তিনি ‘তাকরীবে তা’বী’ নামে একটি পন্থার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এর অর্থ এটা নয় যে, আমরা কারোর কাছ থেকে কোনো কিছুই নেবো না। তবে আমরা অন্যদের কোনো চিন্তা ও দর্শন অনুবাদ করার ক্ষেত্রে তাদাভুলিয়্যার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যে সকল চিন্তা অনুবাদ করবো, সেই চিন্তার ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিত্তিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। কেননা আমাদের ভাষা ও ধর্ম উভয়টিই ভিন্ন। যেমনঃ তিনি হেগেল ও নিটশে-কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, এরা অনেক ধর্মতত্ত্বীয় পরিভাষাকে দার্শনিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে। এ কারণে আমরা যখন অনুবাদ করবো তখন আমাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো হলো তাহসিলিয়্যা, তাওসিলিয়্যা ও তা’সিলিয়্যা। তাহসিলিয়্যা হলো হুবহু অনুবাদ করা। তাওসিলিয়্যা হলো, সতর্কতার সাথে বেছে বেছে অনুবাদ করা। তা’সিলিয়্যা হলো, শুধুমাত্র আমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়সমূহকে অনুবাদ করা। আমাকে সেই বিষয়সমূহই অনুবাদ করতে হবে, যেগুলো আমাদের দ্বীন ও ভাষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।</p>
<p>ফিকহুল ফালসাফার দ্বিতীয় খণ্ড হলো আল-কাওলুল ফালসাফিয়্যু অর্থাৎ দার্শনিক কথন কী? এ গ্রন্থে তিনি পরিভাষা ও এটিমলজি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি বলেন,</p>
<p>فالقول الذي لا يتصل بترثه لا يمكن ان يكون إبداعا</p>
<p>অর্থাৎ, “ইতিহাস ও ঐতিহ্যের (তুরাস) সাথে যে কথার সম্পর্ক নেই, সেই কথার পক্ষে নতুন কোনো প্রস্তাবনা পেশ করা সম্ভব নয়।”</p>
<p>এ ক্ষেত্রে তিনি আল আকলানিয়্যাতুল ইবারিয়্যার সাথে আল আকলানিয়্যাতুল ইশারিয়্যার মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপন করার পাশাপাশি কালাম ও তাসাউফের মধ্যেও সম্পর্ক স্থাপন করেন। আল আকলানিয়্যাতুল ইবারিয়্যা ও ইশারিয়্যা নিয়ে আলোচনা করার সময় প্লেটো, দেকার্ত ও হাইডেগারকে উদ্দেশ্য করে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।</p>
<p>তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ হলো আল-লিসান ওয়াল মিযান ওয়া’ত-তাকাওসুরুল আকল। এ গ্রন্থে তিনি মানতিক ও আকলের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বইয়ে তিনি বলেন,</p>
<p>ان الاتصال الإنسان باللامتناهي الكامل من جهة ما يدفعه الي دوام طلب الزيادة في التعقل بدرجات تعلو علي واقع تعلقه</p>
<p>অর্থাৎ, “অসীমের (ইনফিনিটি) সাথে মানুষের যে সম্পর্ক, সেটা সর্বদা তার তা’য়াক্কুলী (চিন্তা করার) শক্তিকে বিকশিত করে থাকে এবং চিন্তা করার ক্ষেত্রে সে যে অবস্থায় আছে তাকে সেই অবস্থা থেকে তাঁর অবস্থানকে সর্বদা উচ্চ পর্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।”</p>
<p>এ গ্রন্থে তিনি তিনটি ধারার তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন। গাজালিয়্যা, রুশদিয়্যা ও খালদুনিয়্যা নামে গাজ্জালী, ইবনে রুশদ ও ইবনে খালদুনের তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন।</p>
<p>একইসাথে তিনি আল-খিতাবিয়্যা, আল-হিজাজিয়্যা ও আল-মাজাজিয়্যার পন্থাকেও বিশ্লেষণ করেছেন।</p>
<p>মেথডোলজি সম্পর্কে তাঁর চতুর্থ গ্রন্থ হলো আল হাক্কুল আরাবী ফি’ল ইখতিলাফিল ফালসাফিয়্যা। এ গ্রন্থে তিনি মুসলমানদের দর্শন তৈরি করার অধিকার নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর এই উক্তিটি প্রণিধানযোগ্যঃ</p>
<p>ان الاختلاف الأمم ظاهرة طبيعية لا ينكرها إلا من يري في الاختلاف زوال سلطانه</p>
<p>অর্থাৎ, “উম্মতসমূহের ভিন্নতা প্রাকৃতিক একটি বিষয়। যারা নিজের উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছে, তাঁরা ছাড়া অন্য কেহই এই অমোঘ বিধানকে অস্বীকার করতে পারে না।”</p>
<p>لذالك لا بد من اثبات هذا الحق للأمم المهزومة كما المنتصرة</p>
<p>অর্থাৎ, “আর এই কারণে যে জাতি পরাজিত ও পরাভূত হয়েছে, তাঁদেরও পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অধিকার রয়েছে। তাঁদেরও অধিকার আছে তাঁদের নিজেদের দর্শনকে তৈরি করার।”</p>
<p>এই গ্রন্থের শুরুতেই তিনি বলেন, যে সভ্যতা তাঁর যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব নিজের মূল্যবোধের মাধ্যমে দিতে সক্ষম নয়, সেই সভ্যতার পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যে সভ্যতা যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব অন্য সভ্যতা কর্তৃক সৃষ্ট মূল্যবোধ ও জবাবের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেই সভ্যতা আরও বেশি অধঃপতনের শিকার হয়।</p>
<p>আমরা মুসলিম হিসেবে যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব কীভাবে দিবো এবং আমাদেরকে কীভাবে কাজ করতে হবে, এ বিষয়ে তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় তাঁর অভিমত তুলে ধরেছেন।</p>
<p>মেথডোলজি সম্পর্কে তাঁর পঞ্চম গ্রন্থ হলো আল-হাক্কুল ইসলামী ফিল ইখতিলাফিল ফিকরি। এ গ্রন্থে তিনি চিন্তাগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন এবং ইসলামী চিন্তাকে কীভাবে নবায়ন করে তুলে ধরা যায় এ বিষয় নিয়েও আলোকপাত করেছেন। এ গ্রন্থেই তিনি বলেছেনঃ</p>
<p>ان من العجز ان نرضي باجوبة غيرنا</p>
<p>“আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো যুগের জবাবদানের ক্ষেত্রে অন্যদের তৈরি করা জবাবের মাধ্যমে জবাব দেওয়া।</p>
<p>التي انتهت بهم طريق مسدود</p>
<p>আর এই বিষয়টিই আমাদের পথ রোধ করে দিয়েছে।</p>
<p>بل طريق يقلب الوسائل والمقاصد الي اضدادها</p>
<p>শুধু তাই নয়, এটা মাকসাদ ও ওসিলার স্থানকে পরিবর্তন করে দিতে পারে, যা আমাদের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হয়ে যেতে পারে।”</p>
<p>অর্থাৎ মাকসাদের স্থান ওসিলা আর ওসিলার স্থান মাকসাদ দখল করে নিতে পারে। যার ফলে আমাদের উদ্দেশ্যই পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।</p>
<p>আত-তাওয়াসুল ওয়াল হিজাজ নামে ভাষাতত্ত্বের উপরে তাঁর আরেকটি গ্রন্থ রয়েছে। এ গ্রন্থে তিনি ভাষাগত যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>আমি মনে করি, ত্বহা আব্দুর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো সুয়ালুল আখলাক। একটু পূর্বেই আমি যেমনটা উল্লেখ করেছি, তিনি আখলাককে কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) দানকারী কোনো বিষয় নয়; বরং অস্তিত্বদানকারী একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি আখলাককে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আখলাককে দ্বীন থেকে এবং দ্বীনকে আখলাক থেকে পৃথক করা সম্ভব নয়। যদি পৃথক করা হয়, তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে -এই সকল বিষয় নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।</p>
<p><strong>বুয়ুসুদ দাহরানিয়া</strong> তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এ গ্রন্থটিতেও তিনি আখলাক নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দ্বীন থেকে আখলাককে পৃথক করে ফেললে কোন ধরণের সমস্যা তৈরি হতে পারে -এই বিষয়টি তিনি ই’তিমানি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন। ই’তিমানি দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এ গ্রন্থটি সুয়ালুল আখলাকের ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য করা যায়।</p>
<p>এ গ্রন্থের সাথে সম্পর্কিত আরও একটি গ্রন্থ রয়েছে, সেটি হলো <strong>শুরুদু মা বা’দাদ দাহরানিয়্যা</strong>। এ গ্রন্থে তিনি সমগ্র মানবতার আখলাক নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশ্চাত্য চিন্তা সমগ্র মানবতাকে কীভাবে আখলাকের বাহিরে ঠেলে দিয়েছে- এ বিষয় নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এ গ্রন্থে বিশেষভাবে তিনি মনোবিশ্লেষকদের নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড,  ফ্রিডরিখ নিটশে, লুইস দি লসাদে, লাকান-সহ আরও অন্যান্য মনোবিশ্লেষকদের চিন্তাকে খণ্ডন করেছেন। কেননা এ সকল চিন্তাবিদরা মানুষকে কামুক একটি জীব হিসেবে অভিহিত করে ইনসানকে শুধুমাত্র চাহিদার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। আবার বুঝতেও খুব কঠিন। অর্থাৎ বুয়ুসুদ দাহরানিয়া নামক গ্রন্থে তিনি আলোচনা করেছেন, মানুষ যদি দ্বীন থেকে আখলাককে আলাদা করে ফেলে, তাহলে একদিন সে তাঁর নিজেকেও আখলাক থেকে আলাদা করে ফেলবে। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি শুরুদু মা বা’দাদ দাহরানিয়্যা নামক গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, মানুষ কীভাবে আখলাক থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং এর পর্যায়সমূহ কি হতে পারে।</p>
<p>আল-আমালু’দ দিনিয়্যু ওয়া তাজদিদুল আকল নামেও তাঁর একটি গ্রন্থ রয়েছে। এ গ্রন্থে তিনি আমল ও আকলের পুনর্জাগরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থ থেকে আমি দু’একটি লাইন পাঠকদের উদ্দেশ্য উল্লেখ করতে চাই-</p>
<p>ليس هناك من علم ولا عمل فائقين مثل المتعلقين بالدين</p>
<p>“এমন কোনো জ্ঞান ও আমল নেই, যা দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান ও আমলের চেয়ে উত্তম হতে পারে।”</p>
<p>لذالك كان الجمود هو العدو الأساسي لفاعلية الدين</p>
<p>“দ্বীনি কার্যক্রমের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো চিন্তাকে স্থবির করে ফেলা।”</p>
<p>অর্থাৎ যারা জ্ঞান ও আকলের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করবে, তাঁদেরকে সবসময় জ্ঞানগত ও আমলগত দিক থেকে গতিশীল থাকতে হবে। কোনো আন্দোলন যখন তাঁর চিন্তাগত গতিশীলতাকে হারিয়ে ফেলে, তখনই তা কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।</p>
<p>তাঁর অপর একটি গ্রন্থ হলো <strong>উসূলিল হিওয়ার ওয়া তাজদিদু ইলমিল কালাম</strong>। তাঁর এ গ্রন্থটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থে তিনি আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে তিনি এই গ্রন্থে ইলমূল মানতিকের মধ্যকার যে ডায়ালগ রয়েছে, সেই ডায়ালগকে নিয়েও আলোচনা করেছেন এবং এটাকে মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন।</p>
<p>ত্বহা আব্দুর রহমান শুধু থিওরীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। আমলী দিকের প্রতিও তিনি তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। এই বিষয়ে লেখা তাঁর অন্যতম গ্রন্থ হলো <strong>সুয়ালুল আমল</strong>। সেখানে তিনি বলেন,</p>
<p>كل علم ليس تحته عمل فغير معتبر</p>
<p>অর্থাৎ, “যে জ্ঞান আমল দ্বারা সজ্জিত নয়, সেই জ্ঞান খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়।”</p>
<p><strong>তাঁর অপর একটি গ্রন্থ হলো মিনাল ইনসানিল আবতার ইলা ইনসানিল কাউসার। অর্থাৎ একমুখী ইনসান থেকে বহুমুখী ইনসানের দিকে। আবতার ইনসান হলো একমুখী ইনসান। সে শুধুমাত্র বস্তুজগত নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু কাউসার ইনসান বস্তুজগত (মুলক) ও আধ্যাত্মিক (মালাকুত) জগতকে একসাথে বিবেচনা করে।</strong> এ গ্রন্থটি দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে শিক্ষা দর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে আর দ্বিতীয় ভাগে দার্শনিক ধারণা নিয়ে আলোকপাত করা  করা হয়েছে। তবে উভয় অধ্যায়েই ইনসানকে তিনি কেন্দ্রে রেখেছেন।</p>
<p>তাঁর অন্যতম আরেকটি গ্রন্থ হলো <strong>দ্বীনুল হায়া</strong>। এ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে তিনি ই’তিমানি আখলাকের দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং আখলাককে আসমাউল হুসনার উপর ভিত্তি করে বিশ্লেষণ করেছেন। এ খণ্ডে তিনি হুদুদুল্লাহ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন।</p>
<p>দ্বীনুল হায়ার দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সৃষ্ট গায়রে আখলাকী চ্যালেঞ্জকে কীভাবে মোকাবেলা করা যায় এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে হায়ার আখলাকের মাধ্যমে এই সঙ্কটকে আমরা কীভাবে মোকাবেলা করবো সে বিষয়টি দার্শনিক যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন।</p>
<blockquote><p><strong>দ্বীনুল হায়ার তৃতীয় খণ্ড হলো রুহুল হিজাব</strong>।  এই গ্রন্থটি অসাধারণ একটি গ্রন্থ। হিজাবের ফিতরী ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র শরীর ঢাকার নামই হিজাব নয়। শরীরকে আবৃত করার পাশাপাশি হিজাব একইসাথে রবের নিকটবর্তী কীভাবে হবো,সেই বিষয়টিও শিক্ষা দেয়। তাঁর ভাষায়ঃ</p>
<p>ان الحجاب لباس معنوى يكشف عن اداب التقرب الي الله</p>
<p>অর্থাৎ, “হিজাব হলো আধ্যাত্মিক একটি পোশাক। আমরা কীভাবে আল্লাহর নিকটবর্তী হবো, হিজাব আমাদেরকে সেই শিক্ষা দিয়ে থাকে।”</p></blockquote>
<p>আল মাফাহিমুল আখলাকিয়্যা নামে দুই খণ্ডের আরও একটি গ্রন্থ রয়েছে।</p>
<p>যুগের গাজ্জালী খ্যাত মহান এই মনীষীর চিন্তা ও দর্শনকে বুঝে আল্লাহ আমাদের কাজ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 758px; top: 1160.45px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/allama-taha-abdur-rahman-and-his-philosophical-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15152</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জ্ঞানের হাকিকত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-haqiqat-of-knowledge/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-haqiqat-of-knowledge/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 08 Oct 2024 14:48:42 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[জ্ঞানের আখলাক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14958</guid>

					<description><![CDATA[আমরা এমন একটি গ্রন্থের প্রতি ঈমান এনে মু’মিন হয়েছি যে কিতাবের প্রথম আদেশ হল, পড়! প্রথমেই বলা হয়নি যে নামাজ আদায় কর ও রোজা রাখ। জ্ঞান, অস্তিত্বের পূর্বে আসে। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার জন্য জ্ঞানের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। আর অস্তিত্বগত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা এমন একটি গ্রন্থের প্রতি ঈমান এনে মু’মিন হয়েছি যে কিতাবের প্রথম আদেশ হল, পড়! প্রথমেই বলা হয়নি যে নামাজ আদায় কর ও রোজা রাখ। জ্ঞান, অস্তিত্বের পূর্বে আসে। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার জন্য জ্ঞানের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। আর অস্তিত্বগত জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার জন্য এই তিনটি গ্রন্থকে একে অপরের থেকে পৃথক করা সমীচীন নয়;<br class="html-br"><br class="html-br">১। ছোট বিশ্ব তথা মানুষ (হাকিকাতুল ইনসান)<br class="html-br">২। বড় বিশ্ব (হাকিকাতুল কাওন)<br class="html-br">৩। কোরআন (হাকিকাতুল কিতাব)<br class="html-br"><br class="html-br">এই তিনটি গ্রন্থকে যদি আমরা একত্রে পাঠ করি কেবলমাত্র তখন-ই আমরা হাকিকতে উপনীত হতে পারব। ফলশ্রুতিতে প্রতিটি মুসলমানের উচিত হল এই তিনটি গ্রন্থকেই পাঠ করা এবং এগুলোর হাকিকত নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা।<br class="html-br"><br class="html-br">ইমাম মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবীর মতে, হাকিকতের তাজাল্লী (প্রতিফলন) দুইভাবে হয়ে থাকে। একটি হল; জ্ঞানের মাধ্যমে আর অপরটি হল উজুদ তথা সৃষ্টির মাধ্যমে। আমাদেরকে হাকিকতের দিকে ধাবিতকারী সবচেয়ে বড় উৎস হল উজুদ বা সৃষ্টি স্বয়ং নিজে। হাকিকতকে হয় আয়ান তথা চোখের মাধ্যমে দেখা যায় কিংবা বয়ানের মাধ্যমে শেখা ও শেখানো যায়। যদি আয়ান বা দৃষ্টিশক্তি না থাকে তাহলে বয়ানের মাধ্যমে হাকিকতে উপনীত হওয়া সম্ভবপর নয়। যদি কেবলমাত্র আয়ান (চোখে দেখা)- এর মাধ্যমে হাকিকতে উপনীত হওয়া সম্ভব হত তাহলে পয়গাম্বর পাঠানোর কোন প্রয়োজন হত না। এই জন্য ওহী প্রয়োজন।<br class="html-br"><br class="html-br">শুধুমাত্র কিছু তথ্যের নাম-ই জ্ঞান নয়। জ্ঞান একই সাথে কোন কিছুর যথার্থতা, সত্যতা ও মূল্যকে জানার নাম। একইভাবে কোন বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে শুধুমাত্র ওয়াকিফহাল হওয়ার নাম-ই জ্ঞান নয়। জ্ঞান একই সাথে আমাদেরকে ঐ বিষয় বা বস্তুর হাকিকতের দিকে ধাবিতকারী একটি পথ। কোন কিছুর যথার্থতা, সত্যতা ও মূল্যকে নিরূপণ করে থাকে ‘হক্ব’। আর হক্ব এসে থাকে আসমাউল হুসনা থেকে। হক্ব নামক শব্দটি আমাদের জন্য একই সাথে একটি মিকইয়াস (পরিমাপক) ও মি’য়ার (মানদণ্ড)। আমাদের সভ্যতার সকল কিছুই তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে মহান প্রভু থেকে নিয়ে থাকে। তিনি যেটাকে হক্ব বলেছেন সেই হক্ব। হক্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন কোন বিষয়-ই আমাদের সভ্যতায় হাকিকত নামে অভিহিত হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি হাদীসে বলেছেন;</p>
<blockquote><p>“إنَّ اللهَ قد أعْطى كلَّ ذي حقٍّ حقَّه</p>
<p>নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রতিটি হকদারকে তার হক্ব দিয়েছেন”।</p></blockquote>
<p>এর আলোকে ইসলাম সকল কিছুর হক্বকে আদায় করে থাকে; প্রতিটি হক্বদারকে তাঁর হক্বকে দিয়ে দেওয়া হল ইসলাম। এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ মানুষকে এই যোগ্যতা দেননি। এই ক্ষেত্রে মানুষের উচিত হবে মি’য়ার ও মিকইয়াস হিসেবে হক্ব কর্তৃক নির্ধারিত হাকিকতের মানদণ্ডকে উপেক্ষা না করা।</p>
<p><br class="html-br">জ্ঞানের উদ্দেশ্য হল পৃথিবীতে হাকিকতকে ছড়িয়ে দেওয়া; হাকিকতের অধিকারী বানানো নয়। হিকমতের উদ্দেশ্য হল, হাকিকতে উপনীত হওয়ার পথের সন্ধান দেওয়া। আর মারেফতের উদ্দেশ্য হল, হাকিকতে উপনীত হওয়ার পথকে দেখিয়ে দেওয়া। ইসলামে জ্ঞানের যে দৃষ্টিভঙ্গী (তাসাউউর) সেখানে ইলম, হিকমত ও মারেফতকে একে অপরের থেকে পৃথক করা হয় না। এগুলোর একটিকে আহলে তাসাউফের নিকট রেখে, অপরটিকে আহলে হিকমতের নিকট রেখে এবং অন্য একটিকে ফকীহদের নিকট রেখে দিয়ে হাকিকতের পথে থাকা সম্ভবপর নয়।<br class="html-br">আজকে আমাদের মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সঙ্কটের একটি হল, কিছু কিছু ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর নিজেদেরকে হাকিকতের অনুসারী দাবি করার পরিবর্তে হাকিকতের অধিকারী দাবী করে বসা। শুধু তাই নয় কেউ কেউ আবার হাকিকত আমার কাছে এই দাবী করে হাকিকতকে নিজের অধিনস্ত করে রাখতে চায়। আজকে আমাদের মধ্যে যে ইখতিলাফ ও বিভাজন এর অন্যতম একটি কারণ হল নিজেদেরকে হাকিকতের অধিকারী বলে দাবি করা। অথচ হাকিকত এমন কোন বিষয় নয় যে, যেটার অধিকারী হওয়া যায়। বরঞ্চ হাকিকত হল এমন একটি বিষয় যেটার পথে থাকা যায়। ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞানের যে দৃষ্টিভঙ্গী সেটার আলোকে মু’মিন হল হাকিকতের পথের একজন যাত্রী। সে যেন সর্বদায় হাকিকতের পথে থাকে এই জন্য তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কোন একজন ব্যক্তি, কোন একটি গোষ্ঠী কিংবা দল কেহই নিজেকে হাকিকতের অধিকারী বলে দাবি করতে পারে না। ইসলাম এই ক্ষমতা কাউকেই দেয়নি। এই কারণে একজন ব্যক্তির উচিত হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পড়াশুনা থেকে দূরে থাকা।<br class="html-br"><br class="html-br">কেননা স্থায়ী হাকিকতকে ক্ষণস্থায়ী কোন ব্যক্তি, দল কিংবা আইডিওলজির উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা যায় না। ব্যক্তি, দল কিংবা আইডিওলজি কেন্দ্রিক পড়াশুনার বদলে আমাদের সভ্যতার সকল ধারা ও বড় বড় ব্যক্তিদের নিকট থেকে উপকৃত হতে হবে। কেননা আমাদের সভ্যতায় একজন বড় ব্যক্তি নন, অনেক বড় বড় ব্যক্তিগণ রয়েছেন।<br class="html-br">আপনারা জানেন কোরআনে কারীমে ইব্রাহীমের কিসসা রয়েছে। যেটা আমরা সাধারণত এই ভাবে পড়ে থাকি, “রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক। কিন্তু যখন তা অস্তমিত হল, সে বলল, যা অস্তমিত হয়ে যায় তার প্রতি আমার কোন অনুরাগ নেই। অতঃপর সে যখন চন্দ্রকে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখল তখন বলল, এটা হচ্ছে আমার প্রতিপালক। কিন্তু যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, আমার প্রতিপালক যদি আমাকে সঠিক পথের দিশা না দেন তাহলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। অতঃপর যখন সে সূর্যকে অতি উজ্জ্বল হয়ে উদিত হতে দেখল তখন বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক, এটাই হচ্ছে সব থেকে বড়। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা যেগুলোকে (আল্লাহর) অংশীদার স্থির কর সেগুলোর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই”। কিসসাটি ভাবেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।<br class="html-br"><br class="html-br">কোন পয়গাম্বর-ই এক মুহূর্তের জন্যও যে ঈমানের প্রতি দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন না এই বিষয়কে মনে প্রাণে বিশ্বাসকারী একজন মু’মিন হিসেবে শুধু মাত্র বলতে চাই যে এই কিসসাকে এই ভাবে বুঝা প্রয়োজন। কিসসার পূর্বোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে যে,</p>
<blockquote><p>وَ کَذٰلِکَ نُرِیۡۤ اِبۡرٰهِیۡمَ مَلَکُوۡتَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ لِیَکُوۡنَ مِنَ الۡمُوۡقِنِیۡنَ</p>
<p>&#8220;ইব্রাহীম যেন হাকিকতের ব্যাপারে ইয়াকিন, নিশ্চিত ও সত্যিকারের জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে এই জন্য আমি তাঁকে আকাশ ও যমীনের মালাকুতকে (মূলক/দৃশ্যমান জগতের সাথে মালাকুত/অদৃশ্য জগতের অর্থকে) অবলোকন করিয়েছি।&#8221;</p></blockquote>
<p>এই আয়াতকে বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী আয়াতকে বুঝলে আরও বেশী সঠিক হবে। মূলত আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হাকিকতের জ্ঞানে উপনীত হওয়ার জন্য ইব্রাহীমের (আঃ) অনুসৃত পন্থাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে যদি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মত হাকিকতের অধকারী হতে চাও তাহলে তাঁর মত হিকমতের তাঁরকা, জ্ঞানের চাঁদ ও মারেফতের সূর্যকে একত্রে বুঝতে হবে। শুধু তাই নয় এই কিসসা আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, হাকিকতে উপনীত হওয়ার জন্য শুধুমাত্র চন্দ্র, সূর্য ও তারকার আলো নয় একই সাথে ইলম, হিকমত ও মারেফতকেও আয়ত্ব করতে হবে। অর্থাৎ জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় জগত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। ফলশ্রুতিতে জ্ঞানকে; বিশ্বসৃষ্টি, মানুষ ও ওহীকে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণকারী একটি দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ:</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-haqiqat-of-knowledge/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14958</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নন্দনতত্ত্বের অতীন্দ্রিয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 15 Sep 2024 13:08:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14806</guid>

					<description><![CDATA[তৌহীদ দ্বারা বুঝায় আল্লাহতত্ত্বকে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে প্রকৃতি সমগ্র রাজ্য থেকে আলাদাকরণ, যা কিছু সৃষ্টিতে বিদ্যমান, সৃষ্টি থেকে আগত, তাই সৃষ্টি, অতীন্দ্রিয় নয় এবং দেশকালের বিধানের অধীন, কোন অর্থে এর কোন কিছু খোদা বা খোদা-সদৃশ হতে পারেনা, বিশেষ করে তত্ত্ববিজ্ঞানের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তৌহীদ দ্বারা বুঝায় আল্লাহতত্ত্বকে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে প্রকৃতি সমগ্র রাজ্য থেকে আলাদাকরণ, যা কিছু সৃষ্টিতে বিদ্যমান, সৃষ্টি থেকে আগত, তাই সৃষ্টি, অতীন্দ্রিয় নয় এবং দেশকালের বিধানের অধীন, কোন অর্থে এর কোন কিছু খোদা বা খোদা-সদৃশ হতে পারেনা, বিশেষ করে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে, যা একেশ্বরবাদের সারমর্ম হিসেবে তৌহীদ অস্বীকার করে। আল্লাহ সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র, সমগ্রভাবেই প্রকৃতি থেকে পৃথক এবং সে কারণেই ইন্দ্রিয়াতীত তিনি, একমাত্র ইন্দ্রিয়াতীত সত্ত্বা। তৌহীদ আরো দাবী করে, কোন কিছু তার মত নয়<sup>১</sup>। এবং সে কারণে সৃষ্টিতে কোন কিছু তার সদৃশ বা প্রতীক হতে পারেনা, কোন কিছুই তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে সংজ্ঞার দিক দিয়ে আল্লাহর কোন প্রতীক অসম্ভব। আল্লাহ হচ্ছেন তিনি, যার সম্পর্কে কোন নন্দনতাত্ত্বিক ইন্দ্রয়গত কোন দিব্যজ্ঞানই সম্ভব নয়।</p>
<p>নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝায় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধির সাহায্যে একটি প্রাক-সিদ্ধ এবং সে কারণে, অতীন্দ্রিয় প্রকৃতি-অতিক্রান্ত উপলব্ধি, যার সারনির্যাস দৃষ্টি-বিষয়ের নমুনা নীতি হিসেবে কাজ করে- এ হচ্ছে যা হওয়া উচিত তারই বিষয়। দৃষ্ট বস্তুটি তার সার নির্যাসের যতই নিকটবর্তী হবে ততই হবে অধিকতর সুন্দর।</p>
<p>তৃণলতা, জীবজন্তু এবং বিশেষ করে মানুষের প্রাণময় প্রকৃতির ক্ষেত্রে তাই হচ্ছে সুন্দর, যা প্রাকসিদ্ধ সারসত্ত্বার সম্ভাব্য অনুরূপ হয়, যাতে করে বিচারক্ষম প্রত্যেকেরই এ দাবীর অধিকার থাকবে যে, নান্দনিক বিষয় বা বস্তুটিতে প্রকৃতি নিজেকে ব্যক্ত করেছে তেজস্বিতার সঙ্গে, পরিষ্কারভাবে। <strong>সুন্দর</strong> <strong>বস্তু</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>তাই</strong><strong>, </strong><strong>প্রকৃতি</strong> <strong>যা</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>চায়</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>সে</strong> <strong>বলে</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>কদাচিৎ</strong> <strong>কখনো</strong> <strong>তার</strong> <strong>হাজারো</strong> <strong>এক</strong> <strong>ত্রুটির</strong> <strong>মধ্যে</strong><strong>।</strong> <strong>শিল্পকলা</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>প্রকৃতির</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>প্রকৃতিকে</strong> <strong>ছাড়িয়ে</strong> <strong>যাওয়া</strong><strong>, </strong><strong>সেই</strong> <strong>সারসত্ত্বাকে</strong> <strong>আবিস্কার</strong> <strong>করার</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>দৃশ্যরূপে</strong> <strong>প্রকাশ</strong> <strong>করার</strong> <strong>প্রক্রিয়া</strong><strong>।</strong> স্পষ্টতই, শিল্প সৃষ্ট- প্রকৃতির অনুকরণ নয়, যে সব বস্তুর প্রাকৃতিক-বাস্তবতা সম্পূর্ণ সেগুলোর ইন্দ্রিয়নির্ভর রূপ সৃষ্টি শিল্প নয়। পরিচয় প্রমাণ করবার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন ও ডকুমেন্টেশনের জন্য ফটোগ্রাফিক চিত্ররূপ, যা বিষয়টি যেভাবে বিদ্যমান সেভাবেই তার ছবি তোলে, তা মূল্যবান হতে পারে। শিল্প হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সেই সারসত্ত্বার পঠন, যা প্রকৃতির অতীত এবং সারসত্ত্বাটিকে তার যথাযথ একটি দৃশ্যরূপ দান করা<sup>২</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ পর্যন্ত যেভাবে সংজ্ঞা দান করা হয়েছে এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে শিল্প হচ্ছে অপরিহার্যভাবেই প্রকৃতির মধ্যে তারই ধারণা করা যা প্রকৃতির অন্তগর্ত নয়। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে যা সম্পর্কিত নয়, তা ইন্দ্রিয়াতীত এবং যা দিব্য, কেবল তাই এই মর্যাদা লাভের যোগ্য। অধিকন্ত প্রাকসিদ্ধ সারসত্ত্বা, যা নন্দনতাত্ত্বিক উপলব্ধির বিষয়, তা যেহেতু আদর্শসূলভ এবং সুন্দর, সে কারণে মানুষের আবেগ অনুভূতি এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। এ কারণেই মানুষ সুন্দরকে ভালবাসে এবং সুন্দরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যখন তারা মানুষের প্রকৃতিতে সুন্দরকে প্রত্যক্ষ করে, তখন প্রাকসিদ্ধ প্রকৃতির অতীত সারসত্ত্বা হয়ে ওঠে মানবিকতা, যা ইন্দ্রিয়াতীত, মাত্রায় আদর্শরূপ পরিগ্রহণ করে। একেই গ্রীকরা বলতো apotheosis অর্থাৎ ঐশী সত্তার মধ্যে মানবিকতার প্রতিস্থাপন। মানুষ এ ধরনের রূপান্তরিত মানুষের বিশেষ করে মান্য করে এবং তাদেরকে দেব দেবী বলে গণ্য করে। <em>আধুনিক</em> <em>পাশ্চাত্যের</em> <em>লোকেরা</em> <em>মেটাফিজিক্স</em> <em>বা</em> <em>তত্ত্বশাস্ত্রের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>সম্পর্কিত</em> <em>কোন</em> <em>উপাস্যের</em> <em>প্রতি</em> <em>অতি</em> <em>সামান্যই</em> <em>সহনশীল</em><em>।</em> <em>কিন্তু</em> <em>নীতিশাস্ত্র</em> <em>এবং</em> <em>আচরণের</em> <em>ক্ষেত্রে</em> <em>পাশ্চাত্যের</em> <em>লোকেরা</em> <em>মানুষের</em> <em>প্রবৃত্তি</em> <em>ও</em> <em>প্রবণতাগুলোকে</em> <em>আদর্শের</em> <em>রূপ</em> <em>দিতে</em> <em>গিয়ে</em> <em>যে</em> <em>সব</em> <em>দেব</em><em>&#8211;</em><em>দেবী</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করে</em> <em>সেগুলোই</em> <em>প্রকৃতপক্ষে</em> <em>তার</em> <em>কর্মকান্ড</em> <em>নিয়ন্ত্রণ</em> <em>করে<sup>৩</sup></em><em>।</em></p>
<p>এই হচ্ছে ব্যাখ্যা, কেন দৃশ্যরূপে ভাস্কর্যে এবং কল্পনায়, তার কারো ও নাটকে প্রাচীন গ্রীকরা মানবিক উপকরণসমূহ তার গুণাবলী অথবা তার প্রবৃত্তিগুলোর প্রতীক প্রাচীন গ্রীসের শিল্পকর্মে সর্বোচ্চ নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াস হিসেবে গৃহীত হয়েছিলো। তারা যে সব বিষয়ের, যেমন ঈশ্বরের প্রতিরূপ সৃষ্টি করেছিল, সেগুলো সুন্দর ছিলো একারণে যে মানব প্রকৃতি যা হওয়া উচিত, সেগুলো ছিলো তারই আদর্শরূপ। তাদের সৌন্দর্য অন্য দেবতাদের সঙ্গে তাদের অন্তর্গত বিরোধ গোপন করতোনা, সত্যিকার অর্থে এ কারণে যে, প্রত্যেকেই ছিলো প্রকৃতির একটি প্রকৃত বিষয়, যাকে তারা ঐশীরূপে তথা অতিপ্রাকৃত স্তরে চূড়ান্তরূপ দিয়েছিলো<sup>৪</sup>।</p>
<p>রোমেই কেবল গ্রীক অবক্ষয়ের নাট্যমঞ্চ, গ্রীক ভাস্কর্য শিল্পের অবনতি ঘটে রাজা বাদশাদের বাস্তববাদী অভিজ্ঞতামূলক, বাস্তভিত্তিক প্রতিকৃতিতে। অবশ্য তখনো তা সম্ভব হতোনা সম্রাটকে দেবতায় পরিণত না করে। গ্রীকে যেখানে শত শত বছর ধরে এই থিওরীটি তার বিশুদ্ধরূপে বিদ্যমান ছিল- যেখানে ভাস্কর্য শিল্পের পাশাপাশি নাট্যশিল্প বিকশিত হয় প্রকৃতপক্ষে দেবতাদের মধ্যকার শাশ্বত পারস্পরিক দ্বন্দ্ব প্রতিফলিত করার জন্য, একসারি ঘটনা উপস্থাপনের মাধ্যমে, যাতে চরিত্রগুলো ছিলা জড়িত। সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল- তাদের ব্যক্তি চরিত্রগুলো উন্মোচিত করা, দর্শকরা যাদেরকে মানবিক, অতিমাত্রায় মানুষ্যজনোচিত জানতো- অবশ্য তা ছিলো বিপুল আনন্দের উৎস। তাদের চোখের সামনে উৎঘাটিত নাটকের ঘটনাগুলো পরিণতি যদি ঘটতো ট্রাজিক সমাপ্তিতে, তা অপরিহার্য এবং তাদের চরিত্রের অন্তর্গত বলে গণ্য হত। এর অনিবার্যতায় ফুলের একটি দংশন দূর হয় এবং কেতারসিসের মাধ্যমে তারা অনৈতিক কাজকর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য তারা যে অপরাধবোধ করতো তার অবসান ঘটাতে সাহায্য করতো। এজন্যই, গ্রীকে উদ্ভাসিত পূর্ণতা-সাধিত্ব ট্রাজেডিশিল্প ছিলো সাহিত্যশিল্পের শীর্ষ বিন্দু এবং সকল মানববিদ্যারও। এক বিরল সত্যভাষণের মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ ফনগ্রুনেবোম্ বলেছেন, ইসলামে প্রতিমাধর্মী শিল্পকলা ভাস্কর্য চিত্র এবং নাটক নেই, কারণ ইসলামে প্রকৃতিতে কোন দেবদেবীর অবতারের অবকাশ নেই, অথবা প্রকৃতিতে অন্তবর্তী কোন দেবদেবীর ধারণা থেকে মুক্ত ইসলাম। যে সব দেবদেবী পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত অথবা মন্দের সঙ্গে দ্বন্দ্বেজড়িত<sup>৫</sup>, ফনগুনোবোম এটিকে ইসলামের একটি নিন্দাবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও আসলে ইহা ইসলামের একটি পরম বৈশিষ্ট্য। এ হচ্ছে ইসলামের একটি একক গৌরব যে ইসলাম পৌত্তলিকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, অর্থাৎ সৃষ্টিকে স্রষ্টারূপে গণ্য করার প্রমাণ থেকে ইসলাম মুক্ত।</p>
<p><strong>তাওহীদ</strong> <strong>শৈল্পিক</strong> <strong>সৃজনশীলতার</strong> <strong>বিরোধী</strong> <strong>নয়</strong><strong>; </strong><strong>সৌন্দর্য</strong> <strong>উপভোগেরও</strong> <strong>বিরোধী</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong> <strong>পক্ষান্তরে</strong> <strong>তাওহীদ</strong> <strong>সৌন্দর্যকে</strong> <strong>পবিত্র</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>করে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তার</strong> <strong>পৃষ্ঠপোষকতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>উৎকর্ষ</strong> <strong>সাধন</strong> <strong>করে</strong><strong>।</strong> তাওহীদ কেবলমাত্র আল্লাহতে এবং ওহীর বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রকাশিত তার অভিপ্রায় বা তার শব্দের মধ্যে পরম সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই দৃষ্টিভঙ্গির উপযোগী নতুন সৃষ্টিতে তাওহীদ উম্মুখ। <em>আল্লাহ</em> <em>ছাড়া</em> <em>কোন</em> <em>ইলাহ</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>এই</em> <em>আশ্রয়বাক্য</em> <em>থেকে</em> <em>শুরু</em> <em>করে</em> <em>মুসলিম</em> <em>শিল্পী</em> <em>এ</em> <em>বিষয়ে</em> <em>প্রত্যয়দৃপ্ত</em> <em>যে</em><em>, </em><em>প্রকৃতির</em> <em>যা</em> <em>কিছুই</em> <em>রূপায়িত</em> <em>করেছে</em><em>, </em><em>তাকেই</em> <em>শৈলীবদ্ধ</em> <em>করেছে</em><em>।</em> অর্থাৎ শৈলীবদ্ধ করার মাধ্যমে তাকে সে যথাসম্ভব নিসর্গ বা প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত করেছে। বলতে কি, প্রকৃতির বিষয় বা বস্তু প্রকৃতি থেকে এতদূর বিচ্ছিন্ন করা হল যে, তা প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে উঠলো। শিল্পীর হাতে শৈলীবদ্ধতা ছিল একটি নৈতিবাচক যন্ত্র, যার মাধ্যমে সে প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক বস্তু এমনকি খোদ সৃষ্টির প্রতি ব্যক্ত করেছে তার &#8216;না&#8217; বা অস্বীকৃতি। প্রাকৃতিকতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করে মুসলিম শিল্পী দৃশ্যরূপে প্রকাশ করে শাহাদার নেতিবাচক দিকটি, অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। <strong>মুসলিম</strong> <strong>শিল্পীর</strong> <strong>এই</strong> <strong>শাহাদাই</strong> <strong>আসলে</strong> <strong>তার</strong> <strong>প্রকৃতিতে</strong> <strong>ইন্দ্রিয়াতীততার</strong> <strong>অস্বীকৃতির</strong> <strong>সমার্থক<sup>৬</sup></strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম শিল্পী এখানেই থেমে গেলেন না। তার সৃজনশীলতার মুক্তি তখনই ঘটলো, যখন তাঁর এই চৈতন্য হল যে আল্লাহকে প্রকৃতির কোন মুর্তিতে প্রকাশ করা এককথা এবং এ ধরনের মূর্তিতে তা প্রকাশ অসম্ভব, তা বলা ভিন্ন কথা। আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালাকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি হচ্ছে মানুষের জন্য মহত্তম নান্দনিক লক্ষ্য, আল্লাহ তায়ালা নিঃশর্ত চরম পরম ও মহিমাময়। সৃষ্টির কোন কিছুর দ্বারা যে তাকে প্রকাশ করা যায় না এই সিদ্ধান্তের অর্থই আল্লাহর পরমত্ব ও মহিমাময়তাকে অতিশয় গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। কল্পনায় তাকে সৃষ্টির সমস্ত কিছু থেকে পৃথকরূপে দেখার অর্থই হচ্ছে তাকে সুন্দররূপে দেখা, সুন্দর অন্য যে কোন বিষয় বা বস্তু থেকে স্বতন্ত্ররূপে দেখা। ঐশী অনির্বচনীয়তা হচ্ছে, একটি ঐশীগুণ যার অর্থ হচ্ছে অন্তহীনতা, পরমতা, চূড়ান্ততা বা নিঃশর্ততা, অপরিমেয়তা, অসীম বা অনন্ত- সকল অর্থেই অনির্বচনীয়<sup>৭</sup>।</p>
<p>ইসলামী চিন্তাধারায়, চিন্তার এই ধারা অনুসারে মুসলিমশিল্পী আবিস্কার করেছে অলংকরণ শিল্প এবং তাকে রূপান্তরিত করেছে লতাপাতা, ডালপালা, সর্পিল কারুকার্যময় নক্সায়, আর এটি এমন একটি non-devolopmental নক্সা যা সম্প্রসারিত হয়েছে সকল দিকে অনন্ত অভিমুখে। এই শিল্প যাকে বলা হয় এরাবেক্স যা টেক্সটাইল, ধাতু, পুষ্পাধার, প্রাচীন, সিলিং, স্তম্ভ, জানালা, বা বইয়ের একটি পৃষ্ঠা ইত্যাদি-প্রকৃতির যেকোন বস্তুকেই তা অলংকৃত করে, তাকেই রূপান্তরিত করে নির্ভর, স্বচ্ছ, ভাসমান প্যাটার্নে, যা অন্তহীনতার অভিমুখে সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির বিষয় প্রকৃতি নিজে নয়-বরং তা হচ্ছে &#8220;transubstantiated&#8221;, এতে কেবল একটি দৃষ্টিক্ষেত্র হয়ে উঠে। নান্দনিকতার দিক দিয়ে এরাবেক্স শিল্পরূপের মাধ্যমে নিঃসর্গের বস্তু হয়ে উঠে অনন্তের দিকে একটি জানাল। একে যখন অনন্তের ইশারা হিসেবে দেখা হয় তখন ইন্দ্রিয়াতীততার একটি মানে স্পষ্ট হয়ে উঠে- নেতিবাচকভাবে প্রদত্ত হলেও একমাত্র মানেই, যা ইন্দ্রিয়গত রূপায়ণ এবং ইনটুইশনের পক্ষে অর্জন সম্ভব<sup>৮</sup>।</p>
<p><strong><em>এতেই</em> <em>আমরা</em> <em>ব্যাখ্যা</em> <em>পাই</em> <em>কেন</em> <em>মুসলমানরা</em> <em>যে</em> <em>শিল্প</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করেছেন</em> <em>তার</em> <em>প্রায়</em> <em>সবটাই</em> <em>বিমূর্ত</em><em>, </em><em>এমনকি</em><em>, </em><em>যেখানে</em> <em>লতাপাতা</em><em>, </em><em>জীবজন্তু</em> <em>এবং</em> <em>মানুষের</em> <em>প্রতিকৃতি</em> <em>ব্যবহার</em> <em>করা</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেখানেও</em> <em>আর্টিষ্ট</em> <em>এগুলোকে</em> <em>যথেষ্ঠভাবে</em> <em>শৈলী</em> <em>রূপ</em> <em>দিয়েছে</em><em>, </em><em>এরা</em> <em>যে</em> <em>প্রকৃত</em> <em>কোন</em> <em>সৃষ্ট</em> <em>বস্তু</em> <em>নয়</em><em>, </em><em>তা</em> <em>প্রকাশ</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>&#8211; </em><em>একথা</em> <em>অস্বীকার</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>মধ্যে</em> <em>কোন</em> <em>অতীন্দ্রিয়</em> <em>সারসত্ত্বা</em> <em>বাস</em> <em>করছে</em><em>।</em> </strong>এই প্রয়াসে মুসলিম শিল্পী সাহায্য পেয়েছে, তার ভাষাগত এবং সাহিত্যিক উত্তরাধিকার থেকে। একই উদ্দেশ্যে সে আরবী বর্ণমালা এভাবে বিকাশ সাধন করেছে যাতে করে তা হয়ে ওঠে একটি অন্তহীন এরাবেক্স শিল্পকলা, যার প্রসার ঘটেছে ক্যালিগ্রাফারের পছন্দমত যে কোন দিকে, অপরিবর্তনীয়ভাবে; মুসলিম স্থপতিদের বেলায় একই কথা সত্য, যার ইমারত হচ্ছে তার সম্মুখভাগ, এলিভেশন, স্কাইলাইন এবং মেঝে পরিকল্পনার দিক দিয়ে একটি এরাবেক্স শিল্পকলা। ভূগোল বা নৃতত্ত্বের দিক দিয়ে মুসলিম আর্টিষ্টরা যত পৃথকই হোক, যাদের বিশ্বদৃষ্টি ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি, সেই সকল শিল্পীরই একটি সাধারণ বিভাজক হচ্ছে তাওহীদ<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>নন্দনতত্ত্বে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>বন্ধন</strong> <strong>মুক্তি</strong></h4>
<p>কোন কিছুই, যা প্রাকৃতিক বস্তু নয়, তা ঐশী সত্ত্বাকে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হতে পারে না, এর দ্বারা সাধারণত এ সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হয়না যে, প্রকৃতির একটি বস্তু সেই সত্যকে প্রকাশের একটি বাহন হতে পারে- অর্থাৎ এই সত্যটিকে যে ঐশী সত্ত্বা আসলেই অসীম এবং অনির্বচনীয়। ঐশী সত্ত্বা অনির্বচনীয় বলেই তাকে প্রকাশ না করা এক কথা এবং এই সূত্রের অন্তর্গত সত্যকে প্রকাশ করা আরেক কথা। স্বীকৃতভাবেই, আল্লাহ যে ইন্দ্রিয়ের দিক দিয়ে অনির্বচনীয় এই সত্য প্রকাশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তা যে কোন শিল্পীর কল্পনাকে বিহ্বল করে দেয়। কিন্তু ইহা অসম্ভব নয়। বস্তুত এখানেই ইসলামের শৈল্পিক প্রতিভা বিজয়ী বন্ধন- মুক্তি অর্জন করে। আমরা দেখেছি, প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য যে ষ্টাইলাইজেশন সুপরিচিত ছিলো এবং যার অনুশীলন হতো, তাকে আলেকজান্ডার এবং তাঁর উত্তরসূরীগণ কর্তৃক আরোপিত হেলেনিয় প্রকৃতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ণতার একটি নতুন স্তরে উন্নীত করে। এখন, খ্রীষ্টান ছদ্মাবরণ স্বরূপ হেলিনিজমের মোকাবেলা করতে গিয়ে ইসলামে নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াসের ক্ষেত্রে সেমেটিক প্রক্রিয়া হল একই রকম প্রবল, যেমন প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা গেল ধর্মতাত্ত্বিক প্রয়াসের ক্ষেত্রে। হযরত ঈসার ঐশ্বরিকতা ইসলাম যে প্রবলতার সঙ্গে প্রত্যাখান করে তার তুল্য প্রত্যাখান হচ্ছে প্রকৃতির সৌন্দর্যতাত্ত্বিক রূপায়ণে প্রকৃতিবাদের অস্বীকৃতি এবং ইসলাম তা সমাধা করেছে ষ্টাইলাইজেশনকে উৎসাহিত করে। একটি শৈল্পিক লতা পাতা বা ফুল প্রকৃতির একটি বাস্তব বস্তুর বর্গের কেচার মাত্র, যাকে বলা যায় অপ্রকৃত। মনে হয় শিল্পী তা অংকন করতে গিয়ে প্রকৃতিকে অস্বীকার করে, অ-প্রকৃতিত্ব অর্থাৎ প্রকৃতিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রত্যাখান প্রকাশের এটি একটি উপযুক্ত হাতিয়ার হতে পারেনা। অবশ্য এককভাবে বিচার করলে শৈলীরূপ লতাপাতা বা ফুল প্রকৃতির বহির্ভূতকেই প্রকাশ করে। কিন্তু স্বতন্ত্ররূপে এতে এই ইঙ্গিতই মিলে যে, বস্তুটির মধ্যে প্রকৃতির মৃত্যুই একটি স্বাতন্ত্রিক রূপ পেয়েছে। প্রাকৃতিক বিষয়কে প্রকৃতিমুক্ত রূপ দিতে গিয়ে এ উচ্চাঙ্গের প্রকৃতিবাদকেও প্রকাশ করতে পারে, যা ইসলামের লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তেমনটি আমরা প্রায়ই দেখতে পাই রূগ্নতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের এবং মৃত্যুর মাধ্যমে জীবন প্রতিফলিত হয়। <em>তাই</em> <em>জুদাইজম</em> <em>যেখানে</em> <em>ব্যর্থ</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেখানে</em> <em>সফল</em> <em>হতে</em> <em>হলে</em> <em>ইসলামের</em> <em>ঐশী</em> <em>সত্ত্বার</em> <em>অনির্বচনীয়তা</em> <em>সংরক্ষণের</em> <em>জন্য</em> <em>ভিন্ন</em> <em>কিছু</em> <em>আবশ্যক</em> <em>ছিল<sup>১০</sup></em><em>।</em></p>
<p>এখন এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম শিল্পী দন্ডায়মান হলেন। তার অনন্য সৃজনশীল এবং মৌলিক সমাধান হচ্ছে, যেন, যে কোন বা সকল স্বাতন্ত্রিকরণকে অস্বীকার করার জন্য এবং পরিণামে চৈতন্য থেকে প্রকৃতিবাদকে চিরতরে নির্বাসন দেওয়ার জন্য শিল্পগত তরুলতা ও ফুলকে অন্তহীন পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা। প্রকৃতি বহির্ভূত কোন বিষয় একইভাবে বার বার প্রকাশ করলে তা অ-প্রকৃতিত্বকেই প্রকাশ করে। এর উপরে যদি শিল্পী অ-প্রকৃত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সুন্দর তাত্ত্বিকভাবে অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তেমন অবস্থায় পরিণামে তা হয়ে উঠতে পারে এই সাক্ষ্যের সমার্থক লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, যা উচ্চারিত হয় শাব্দিক এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে। কারণ যে অনির্বচনীয়তা এবং অসীমতা শৈল্পিক প্রতিফলনের উপকরণ, তাতে এগুলো যে অ-প্রকৃতির গুণাবলী তার ইঙ্গিত মেলে। তাই ইসলামী মন এই অনুধাবন করে যে, সেমেটিক চৈতন্যের আদি প্রেরণার সঙ্গে, দৃশ্যশিল্পের সাযুজ্যের একটি পন্থা রয়েছে। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হচ্ছে, প্রকৃতির কোন বস্তু যতো শৈল্পিক রূপই তাকে দেওয়া হউক, কি করে তা অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রকাশের বাহন হতে পারে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>আরব</strong> <strong>চৈতন্য</strong><strong>: </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>ঐতিহাসিক</strong> <strong>ভিত্তিমূল</strong></h4>
<p>একটি সমাধান লাভের জন্য ইসলামী চেতনাকারণ নেয় তার নিজের ঐতিহাসিক ভিত্তিমূল, তথা আরব চৈতন্যের উপর। ইহাই সেই ঐতিহাসিক বিষয় যা ঐশী প্রত্যাদেশ অবহিত করে এবং তার সংঘটনের জন্য Sitz-im-Leben রূপে ব্যবহার করেছে। ঐশী সত্য প্রকাশের মাধ্যম ও বাহনরূপে এই চেতনাই মূর্তরূপ লাভ করে হযরত মোহাম্মদের (সা.) মধ্যে, যিনি এই প্রত্যাদেশ লাভ করেন এবং দেশকালের মানবজাতির কাছে তা প্রচার করেন নবুয়্যতের মাধ্যমে। ইসলামের পূর্বে ভাষা এবং লেখন শিল্পে এর অর্জন ছিলো প্রকৃতই একটি অলৌকিক ব্যাপার এবং এ বিষয়টিই নতুন প্রত্যাদেশের ধরন বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে তা হবে সাহিত্যের পূর্ণতা, কারণ এই প্রত্যাদেশের জন্য তা ছিলো প্রস্তুত এবং তা বহনের ক্ষতাসম্পন্ন।</p>
<p>আরব চৈতন্যের প্রথম হাতিয়ার এবং তার সকল ক্যাটেগরির অবয়ব হচ্ছে আরবী ভাষা। মূলত আরবী ভাষা হচ্ছে তিনটি মূল ব্যঞ্জন ধাতুমূল নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটি তিনশতেরও অধিক রূপে ধাতুরূপ সম্ভাব্য বাচ্যে পরিবর্তন করে উপসর্গ, অনুসর্গ বা মধ্যসর্গ যোগ করে। যে শব্দরূপই গঠন করা হউক না কেন, যে সকল শব্দের একই ধাতুরূপ রয়েছে সে সকলের একই প্রকারত্ব অর্থ রয়েছে, ধাতুমূলের ভিন্নতা সত্বেও, ধাতুর অর্থ একই থেকে যায়, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয় অন্য একটি প্রকারাত্বক অর্থ, ধাতুরূপের মাধ্যমে তা যে অর্থটি লাভ করে এবং সকল সময়, সর্বত্র যা একই থাকে<sup>১১</sup>। তখন ভাষার একটি যৌক্তিক কাঠামো গঠিত হয় যা প্রথমেই  সুস্পষ্ট, সম্পূর্ণ এবং বোধগম্য। এই কাঠামোটি বুঝতে পারলেই যে কোন ব্যক্তি ভাষাপণ্ডিত হয়ে ওঠে, যখন ধাতুমূলের অর্থ সম্পর্কে জ্ঞান হয়ে উঠে গৌণও গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য-শিল্প নিহিত রয়েছে বিভিন্ন ধারণার একটি পদ্ধতি নির্মাণে, যে ধারণাগুলো এভাবে পরস্পর সম্পর্কিত যে তাতে করে ধাতুগুলোর কনজুগেশনের মাধ্যমে সাদৃশ্য ও বৈপরীত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। <em>যখন</em> <em>বোধ</em> <em>শক্তির</em> <em>পক্ষে</em> <em>সম্ভব</em> <em>হয়</em> <em>জটিলতার</em> <em>মধ্য</em> <em>দিয়ে</em> <em>নিরবচ্ছিন্ন</em> <em>অভঙ্গুর</em> <em>রেখায়</em> <em>অগ্রসর</em> <em>হওয়া</em> <em>একটি</em> <em>এরাবেক্স</em> <em>শিল্পে</em><em>, </em><em>যার</em> <em>মধ্যে</em> <em>ত্রিভুজ</em><em>, </em><em>বর্গক্ষেত্র</em><em>, </em><em>বৃত্ত</em><em>, </em><em>পঞ্চভুজ</em><em>, </em><em>অষ্টভুজ</em> <em>ইত্যাদি</em> <em>হাজারো</em> <em>রূপ</em> <em>সবই</em> <em>ভিন্ন</em> <em>বর্ণে</em> <em>বিচিত্র</em> <em>এবং</em> <em>একে</em> <em>অপরের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>বাড়াবাড়ি</em> <em>করে</em> <em>অবস্থান</em> <em>করে</em> <em>তা</em> <em>চোখকে</em> <em>ঝলসে</em> <em>দেয়</em><em>, </em><em>কিন্তু</em> <em>মনকে</em> <em>নয়</em><em>&#8211; </em><em>প্রত্যেকটি</em> <em>ফিগারকে</em> <em>তার</em> <em>স্বরূপে</em> <em>চিনতে</em> <em>পেরে</em> <em>বর্ণ</em> <em>বিচরণ</em> <em>করতে</em> <em>পারে</em> <em>একটি</em> <em>পঞ্চভুজ</em> <em>থেকে</em> <em>অন্য</em> <em>একটি</em> <em>পঞ্চভুজে</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>বর্ণের</em> <em>বৈচিত্র্য</em> <em>সত্ত্বেও</em> <em>এবং</em> <em>শিল্পকর্মটির</em> <em>এক</em> <em>প্রান্ত</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>প্রান্ত</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>এগোতে</em> <em>পারে</em><em>&#8211; </em><em>প্রত্যেক</em> <em>বিরতির</em> <em>স্থানেই</em> <em>কিছু</em> <em>আনন্দের</em> <em>অভিজ্ঞতা</em> <em>নিয়ে</em><em>, </em><em>একইরূপ</em> <em>আকুতিজাত</em> <em>সাদৃশ্য</em> <em>ও</em> <em>সামঞ্জস্য</em> <em>প্রত্যক্ষ</em> <em>করে</em><em>&#8211; </em><em>অর্থাৎ</em> <em>ধাতুমূলের</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>অর্থ</em> <em>প্রকাশের</em> <em>একইরূপ</em> <em>ধরন</em> <em>এবং</em> <em>খোদ</em> <em>শব্দমূলগুলো</em> <em>কর্তৃক</em> <em>সৃষ্ট</em> <em>বৈপরীত্ব</em> <em>অনুধাবন</em> <em>করে</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী ভাষার গঠনমূলক প্রকৃতি তার কবিতাকেও গঠন করে। আরবী কবিতা স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ এবং স্বাধীন শ্লোক নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটি একই এবং অভিন্ন ছন্দরূপের অভিন্ন রূপায়ণ। আরবী কাব্য ঐতিহ্যে সুপরিচিত ত্রিশটি প্যাটার্নের মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নেবার স্বাধীনতা কবির আছে। কিন্তু একবার নির্বাচনের পর গোটা কবিতাটির প্রত্যেকটি অংশই এই প্যাটার্নের সঙ্গে সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আরবী কবিতা শ্রবণ এবং উপভোগের তাৎপর্যই হচ্ছে এই প্যাটার্নের সঙ্গে উপলব্ধি; কবিতা আবৃতির সঙ্গে সঙ্গে কবিতার শ্রোতা ও সমজদার এর ছন্দ প্রবাহের সঙ্গে অগ্রসর হয় এবং এই প্যাটার্ন যা প্রত্যাশা করেছে তা প্রত্যাশা ও গ্রহণ করে। অবশ্য প্রত্যেক শ্লোকে শব্দ ধারণা এবং অনুভূতি নির্মাণ পৃথক পৃথক। এতে করেই রংয়ের বৈচিত্র ফুটে ওঠে, কিন্তু তার কাঠামোগত রূপ আগাগোড়ায় এক।</p>
<p>আরবী ভাষা ও আরবী কবিতার এই বুনিয়াদি জ্যামিতির বদৌলতে আরব চৈতন্য দ্বিরায়তনের পর্যায়ে অনন্তের ধারণা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ধাতু মূলগুলো বহু, বলা যায় অনন্ত, কেননা তিনটি স্বরবর্ণের যে কোন নতুন সম্মেলনের প্রতি প্রথাগতভাবে যে কোন অর্থ আরোপ করা যেতে পারে। আরবীয় চৈতন্য বিদেশী ধাতুমূলকে অবিচলিত স্থৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং এজন্য বিদেশী শব্দমূলটিকে আরবীয় রূপদানের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার নিজস্ব ধাতুরূপের কারখানার উপর। তাদের সংখ্যার অনন্ত তার মতই তাদের ধাতুমূলও অনন্ত, ধাতুমূলের পরিচিত, প্যাটার্ন রয়েছে সীমিত সংখ্যক শব্দমূলেরই ধাতুরূপ করা হয়েছে এবং তাদের ধাতুরূপগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ওয়েবষ্টার কিংবা অক্সফোর্ডের মত আরবী ভাষার একটি অভিধান, যাতে সকল শব্দ সংকলিত এবং তালিকাবদ্ধ হবে তা একেবারেই অসম্ভব, কারণ কাল পরম পরাক্রমে পরিচিত সকল শব্দমূলের ধাতুরূপ করা হয়নি। ধাতুমূলের তালিকা কখনো বন্ধ করা হয়নি। ধাতুরূপের সব কয়টি ধরন বা রূপ ব্যবহৃত হয়নি এবং ধরনের তালিকাও সমাপ্ত হয়নি। ঐতিহ্য সচেতনবোধ দ্বারা নতুন ধরনের সম্ভাবনা অস্বীকার করেনা। তবে তারা সেই প্রতিভার অপেক্ষায় থাকেন যে যৌক্তিকতা প্রমাণ এবং নিজের সুবিধার খাতিরে ব্যবহার করা যায়। তাই আরবী ভাষা অস্তিত্বের আরবীয় প্রবাহের মতই এমন একটি পদ্ধতি যা কেন্দ্রস্থলে উজ্জ্বল (ঐতিহ্য হেতু), কিন্তু কিনারের দিকে অস্পষ্ট, যা সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে অনিশ্চিতভাবে<sup>১২</sup>।</p>
<p>এবার কবিতার কথায় আসা যাক। শ্লোকগুলোর ছন্দরূপ কবিতার অবয়র গঠন করে বলে কোনো কবিতার শ্লোকগুলোর জন্য জরুরী নয়- কবি যে ধারণায় সেগুলো রচনা করেছেন সেই ক্রম অনুসারে সেগুলো পাঠ করা, বা অন্য কোন নিয়ম অনুসারে। কবিতাটি শুরু থেকেই সমাপ্তির দিকে পাঠ করা হোক কিংবা সমাপ্তি থেকে শুরুর দিকে আবৃত্তি করা হোক, কবিতাটি বরাবরই একই রকম মাধুর্য বজায় রাখে, কারণ কবি প্রত্যেকটি শ্লোকের সঙ্গে তার প্যাটার্নের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেছেন। পুনরাবৃত্তিতে আমরা আনন্দিত হই, কারণ তাতে করে আমাদের ইনটুইটিভ ক্ষমতা স্বীকৃত হয়, অর্থ এবং বোধ কাঠামোর বাস্তবতার বৈচিত্র থেকে আমরা যা প্রত্যাশা করেছিলাম তা প্রত্যাশা ও উপলব্ধি করতে পারি। তাই সংজ্ঞা অনুসারে কোনো আরবী কবিতাই সম্পূর্ণ এবং বন্দী নয় এবং কোন অর্থেই পরিপূর্ণ নয়, যাতে করে মনে করা যেতে পারে কবিতার সঙ্গে কোন কিছু যোগ বা নিরবচ্ছিন্নতা ব্যাহত হতে বা এমন কিছু ধারণা করা যেতে পারে। বলতে কি, আরবী কবিতাকে উভয় দিকে টেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব, তার শুরুতে এবং তার অন্তে। তার সৌন্দর্যকে বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন না করে কোন মানুষ কর্তৃক, ব্যক্তিগত রচনাশৈলীর দ্বারা না হলেও কবিতাটির রচয়িতার দ্বারা তো বটেই। বস্তুত আমরা যদি উত্তম শ্রোতা হই, তাহলে একথা ধরে নেয়া হবে যে, আমরা কবির সঙ্গে তার কবিতা সৃষ্টিতে সূচনাতে অংশগ্রহণ করবো। যেমনটি করা হয় একটি জীবন্ত অভিনয়, এবং দ্বিতীয়ত আমরা তার কবিতা অনুসরণ করবো আমাদের নিজেদেরই হিতার্থে, কেননা তার আবৃত্তি যে গতি সঞ্চার করেছে তার দ্বারা আমাদেরকে বন্দী করেছে এবং আমাদেরকে এর নিজস্ব অসীম কাব্যিক পরিমন্ডলে নিক্ষেপ করেছে। আরব জগতে একজন কবির জন্য এ কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, যখন কবি মহৎ শ্রোতাদের উপস্থিতিতে সেই শ্রোতাদের মৌখিক সাহায্য লাভ করেন, তার কবিতার আবৃত্তিতে, যে কবিতা ইতিপূর্বে কখনো তিনি শোনেননি অথবা তার কবিতার সঙ্গে একই কবিতার আরো অংশ যোগ করে, তার প্রতি মন্তব্য প্রকাশ করে থাকেন<sup>১৩</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>ইসলাম</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>শিল্পকর্ম</strong><strong>: </strong><strong>আল</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কুরআনুল</strong> <strong>করীম</strong></h4>
<p>এই আরব চৈতন্যই ইসলামের ছাঁচ এবং বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করে। ইসলামী প্রত্যাদেশ আল-কুরআনুল করীম নাযিল হয় মহত্তম শিল্পকর্ম হিসেবে। সেই চৈতন্যের সকল আদর্শ লক্ষ্য একই মুহূর্তে চূড়ান্ত পরিপূরণের জন্য এই অনুভূতি আসে।</p>
<blockquote><p><em>কোন</em> <em>কিছু</em> <em>যদি</em> <em>শিল্পের</em> <em>দাবী</em> <em>রাখে</em><em>, </em><em>কুরআন</em> <em>নিশ্চয়ই</em> <em>শিল্প</em><em>।</em> <em>কোন</em> <em>কিছুর</em> <em>দ্বারা</em> <em>মুসলিম</em> <em>মন</em> <em>যদি</em> <em>আন্দোলিত</em> <em>ও</em> <em>প্রভাবিত</em> <em>হয়ে</em> <em>থাকে</em><em>, </em><em>নিশ্চয়ই</em> <em>কুরআন</em> <em>কর্তৃক</em> <em>প্রভাবিত</em> <em>হয়েছে</em><em>।</em> <em>এই</em> <em>প্রভাব</em> <em>যদি</em> <em>কোথাও</em> <em>ভিত্তিমূলক</em> <em>উপাদানে</em> <em>পরিণত</em> <em>হবার</em> <em>মত</em> <em>যথেষ্ট</em> <em>গভীরতা</em> <em>অর্জন</em> <em>করে</em> <em>থাকে</em><em>, </em><em>তা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>নন্দনতাত্ত্বিকতা</em><em>।</em> <em>এমন</em> <em>কোন</em> <em>মুসলমান</em> <em>নেই</em> <em>কুরআনের</em> <em>সুর</em> <em>মুর্ছনা</em><em>, </em><em>ছন্দ</em> <em>এবং</em> <em>তার</em> <em>প্রাঞ্জলতার</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>স্তর</em><em>, </em><em>যার</em> <em>অস্তিত্বের</em> <em>গভীরতম</em> <em>মর্মমূল</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>নাড়িয়ে</em> <em>দেয়নি</em><em>।</em> <em>এমন</em> <em>কোনো</em> <em>মুসলমান</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>যার</em> <em>আদর্শ</em> <em>ও</em> <em>সৌন্দর্যের</em> <em>মান</em> <em>কুরআন</em> <em>নতুন</em> <em>করে</em> <em>গড়েনি</em> <em>এবং</em> <em>তার</em> <em>নিজের</em> <em>আলোকে</em> <em>নির্মাণ</em> <em>করেনি</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>মুসলমানরা কুরআনের এই দিকটিকে ই&#8217;জাজ বলে উল্লেখ করেছে, যার অর্থ হচ্ছে স্তব্ধ করে দেওয়া। &#8220;ই&#8217;জাজ পাঠককে একটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় স্থাপন করে, যা মোকাবেলা করার জন্য সে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু কখনো মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়না।&#8221; বস্তুত কুরআন নিজেই সর্বোচ্চ সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী আরব শ্রোতাগণকে আহ্বান করেছে কুরআনের মত কিছু সৃষ্টি করতে (২: ২৩) এবং তাদের ব্যর্থতার জন্য তাদের তিরস্কার করেছে (১০: ৩৮), (১১: ১৩), (১৭: ১৮)। রাসূলুল্লাহর সমসাময়িকদের মধ্যে ইসলামের কতিপয় শত্রু এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলার জন্য দাঁড়িয়েছিল, তারা তাদের বিরোধী এবং তাদের আপন বন্ধুদের বিচারে অপমানিত হয়েছিল<sup>১৪</sup>। মোহাম্মদকে (সা.) বলা হল &#8220;একজন ভূতাবিষ্ট মানুষ (১৮: ২২) এবং কুরআন একটি যাদুর কিতাব&#8221; (২১: ৫৩), (২৫: ৪), কেবল মাত্র শ্রোতাদের চেতনার উপর এর ক্রিয়ার কারণে।</p>
<p>প্রত্যেকেই এ সত্যটি বুঝতে পারে যে, যদিও কুরআনের আয়াতগুলো কবিতার কোন জ্ঞাত প্যাটার্নের সঙ্গে খাপ খায়না, তবু কবিতার মত একই প্রভাব বিস্তার করে এই সব আয়াত। <em>বলতে</em> <em>কি</em> <em>চূড়ান্ত</em> <em>মাত্রায়</em><em>, </em><strong><em>প্রত্যেকটি</em> <em>আয়াতই</em> <em>সম্পূর্ণ</em> <em>এবং</em> <em>নিজস্ব</em> <em>গুণেই</em> <em>নিখুঁত</em><em>, </em><em>প্রায়ই</em> <em>তা</em> <em>পূববর্তী</em> <em>আয়াত</em> <em>বা</em> <em>আয়াতসমূহের</em> <em>সঙ্গ</em> <em>ছন্দে</em> <em>মিলে</em> <em>যায়</em> <em>এবং</em> <em>তা</em> <em>পরম</em> <em>সৌন্দর্যের</em> <em>উচ্চারণ</em> <em>বা</em> <em>সাহিত্যিক</em> <em>অভিব্যক্তির</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিহিত</em> <em>এক</em> <em>বা</em> <em>একাধিক</em> <em>ধর্মীয়</em> <em>বা</em> <em>নৈতিক</em> <em>তাৎপর্য</em> <em>বহন</em> <em>করে</em><em>।</em></strong> এর আবৃত্তি এত প্রবল গতিসঞ্চার করে যে, শ্রোতারা অনিবার্যভাবেই এ আবৃত্তির সঙ্গে অগ্রসর হতে পরবর্তী আয়াতটি আশা করতে এবং তা শ্রবণের পর গভীরতম স্বীকৃতিতে পৌছাতে বাধ্য হয়। এর পর প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হয় পরবর্তী একটি, দুটি অথবা তিনটি বা তিনের অধিক একটি গুচ্ছ আয়াতের সঙ্গে<sup>১৫</sup>।</p>
<p>মুসলিম আরবরা কি সপ্তম শতকে কোনো শিল্প নিয়ে আর্বিভূত হয়েছিলো? তারা কি বিজিত জাতিগুলোর পরবর্তীকালে বিকশিত শিল্পকলায় প্রাসঙ্গিক কোন অবদান রেখেছিলো? অজ্ঞতা বা বিদ্বেষ বশে এবং প্রায়ই এতদ উভয়ের দুঃখজনক সংমিলনে, ইসলামী শিল্পের প্রত্যেকটি পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদ জবাব দিয়েছেন, &#8216;না&#8217;। এই শাস্ত্রের পিতামহ ঘোষণা করেছেন, &#8220;প্রথম যেসব লোক নিয়ে এই সব সেনাবাহিনী গঠিত হয় (ইসলামের প্রথম আরবীয় সেনাবাহিনী) তারা ছিলো মুখ্যত বেদুইন, এমনকি যারা স্থায়ী বসতি থেকে আসে, যেমন মক্কা ও মদীনা থেকে আগত লোকেরাও স্থাপত্য শিল্পের কিছুই জানতোনা<sup>১৬</sup>।&#8221; তরুণতর প্রজন্ম অন্তহীনভাবে বার বার একথাই বলে, &#8220;মুসলিম শিল্পকলা তার আরব অতীত থেকে বলতে গেলে কিছুই অর্জন করেনি<sup>১৭</sup>।&#8221;</p>
<p>সত্য তাদের এই সব অভিযোগের কত বিপরীত। গোটা ইসলামী শিল্পকলাই অর্জিত হয় আরব অতীত থেকে- যা কিছু গঠনমূলক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ সে সবের মর্মবাণী, নিয়মকানুন এবং পদ্ধতি, এ সবের লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের পন্থা, সমস্ত কিছুই নিশ্চয়ই দৃশ্য ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামী শিল্পকলার প্রয়াসের জন্য আবশ্যক ছিলো উপকরণের এবং বিষয়বস্তুর এবং যেখানে এগুলো পেয়েছে ইসলামী শিল্পকলা সেখান থেকে এগুলো নিয়েছে। কিন্তু শিল্পের অর্থ ও তাৎপর্য, তার ইতিহাস ও তথ্যের যে কোন আলোচনায় এগুলোকে ঋণ বলে উল্লেখ করা রচিবিরুদ্ধভাবে অগভীর। একটি শিল্পকর্ম শিল্প হয়ে উঠে তার শৈলী, তার উপাদান এবং তা প্রকাশের মাধ্যমে- সে যে সব উপকরণ ব্যবহার করে, যা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভৌগোলিক অথবা সামাজিক আকস্মিকতা থেকে অর্জিত। আরব চেতনায় ইসলামের মাধ্যমে এই ভিত্তির কারণে ইসলামী শিল্পকলা একটি ঐক্য। আরব চৈতন্যের রীতিপ্রণালীগুলোর দ্বারাই সকল মুসলমানের শিল্পসৃষ্টি নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে<sup>১৮</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>দৃশ্যশিল্পের</strong> <strong>নন্দনতাত্ত্বিক</strong> <strong>রূপ</strong></h4>
<p>পাশ্চাত্য দৃষ্টিনির্ভর শিল্পকলা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করে মানব প্রকৃতির উপর- মানুষের প্রতিকৃতি, ভূ-চিত্র, স্থির জীবন, এমনকি বিমূঢ়ত্ব, নক্সা বা নক্সাহীনতার মাধ্যমে, যেভাবেই প্রকাশিত হউক। ইসলামী দৃশ্যশিল্পের আগ্রহ ছিলনা মানব প্রকৃতিতে, বরং তার আগ্রহ ছিল ঐশী প্রকৃতিতে। যেহেতু মানব প্রকৃতির নতুন নতুন দিক প্রকাশ করা এর লক্ষ্য ছিলোনা, এজন্য এ শিল্প নন্দনতাত্ত্বিকভাবে ফিগার বা প্রতিকৃতির আলোচনা করেনি, অর্থাৎ মানব প্রকৃতির যে অসংখ্য বৈচিত্রপূর্ণ রূপায়ণ ঘটে তা চিত্রিত করেনি। মানব চরিত্র যা মানুষের প্রাকসিদ্ধ এমন একটি ধারণা, যে ধারণায় মানুষকে লক্ষ লক্ষ খুঁটিনাটিরূপে বিশ্লেষণ করা যায় বলে ধরে নেয়া হয়, যে সব খুঁটিনাটিতে মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্য একটি গভীরতা বা উচ্চতা উদ্‌ঘাটিত হয়, এসবই কিন্তু মুসলিম শিল্পীর লক্ষ্যবস্তু ছিলনা। ঐশী সত্ত্বা হচ্ছে তার প্রথম প্রেম এবং তার শেষ আবিষ্টতার বিষয়। তার জন্য ঐশী সত্ত্বার সম্মুখে দাঁড়ানো হচ্ছে অস্তিত্বের এবং সমস্ত মহত্ব সৌন্দর্যের শীর্ষবিন্দু। এই লক্ষ্যে মুসলমানরা নিজেদের চারপাশে জড় করে প্রত্যেকটি অবলম্বন এবং প্রত্যেকটি উদ্দীপক যা সেই ঐশী অস্তিত্বের উপস্থিতির সম্পর্কে ইতিহাসে সহায়তা করে।</p>
<p>প্রথমে, শৈলীকরণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে যেহেতু তার প্রকৃতিত্ব থেকে মুক্ত করা হয়, সেজন্য প্রথম দিকের আরব মুসলমানরা সেই উপায়টিকে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে যান। অধিকন্তু শৈলীকরণের অর্থ হচ্ছে বৈচিত্র বা পরিবর্তনকে অস্বীকার করা- কাণ্ড থেকে শাখা প্রশাখা পত্রপল্লব পর্যন্ত বিকাশ সাধন, যেমনটি ঘটে থাকে উদ্ভিদ জগতে, অংকন শিল্পের আগাগোড়া কাণ্ড এবং শাখার গাঢ়ত্ব হয়ে উঠে এক, অভিন্ন এবং আকার অথবা রূপ হয়ে উঠে একই। পরিবর্তনের অনুপস্থিতির কারণেও ক্রমবিকাশ বাতিল হয়ে যায়। একই চিত্রের মধ্যে সকল পত্র পল্লব এবং ফুল পায় একই রূপ। পরিশেষে প্রকৃতিবাদের প্রতি মৃত্যু আঘাত হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। বৃন্ত, এবং ফুল বার বার অংকন করে এবং সেগুলো একটি অপরটি থেকে অন্তহীন পর্যায়ে এমনভবে নির্গত দেখিয়ে যা প্রকৃতিতে অসম্ভব, প্রকৃতি সম্পর্কে সকল ধারাণাকেই মুছে দেওয়া হয়। পুনরাবৃত্তি এত নিশ্চিতভাবে এবং অভ্রান্তভাবে এই পরিণতি ঘটায় যে, তা আপন শত্রুকেও পর্যন্ত সয়ে যায়- অর্থাৎ বিকাশরূপ তার আপন শত্রুকেও সে বরদাস্ত করে- অবশ্য যদি একটি শিল্প কর্মের অংশে তার বিকাশ ঘটে ও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে সমগ্র শিল্পকর্মটির মধ্যে। এভাবে চৈতন্য থেকে প্রকৃতিকে নির্মূল করা হয় এবং তা প্রকৃতিকে চিত্রিত করা হয়। যদি দর্শকের চৈতন্যে বৃন্ত পত্রপল্লব এবং ফুল তখনো প্রকৃতির কোনো চিহ্ন বা অবশেষ রেখে দেয়, সে অবস্থায় সকল ভগ্ন, বৃত্তাকার ফোয়ারার মত উৎসারিত বা বংকিম রেখা যা ফ্রীলান্স, নক্সা বা জ্যামিতিক ফিগারে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এ কাজটি সম্পন্ন হবে সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্টতররূপে। এটিকে বৃত্ত, পাতা, ফুল উপকরণের সঙ্গে যুক্ত করে দর্শককে উদ্দিষ্ট (জ্যামিতিকতা এবং তার প্রাকৃতিকতার) দিকটি তুলে ধরে পরিশেষে পুনরাবৃত্তিকে যদি সিমেট্রির নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যাতে করে তা একই দূরত্ব বজায় রেখে সকল দিকে অগ্রসর হতে পারে, সে অবস্থায় শিল্পকর্মটি মর্মের দিক দিয়ে হয় একটি অনন্ত দৃষ্টিক্ষেত্র। ঘটনাক্রমে এই অনন্তক্ষেত্রের একটি অংশই মাত্র শিল্পী নিজের খেয়াল মত বেছে নেয় এবং পৃষ্ঠা, প্রাচীর, প্যানেল অথবা ক্যানভাসের বাস্তব ফ্রেমে তাকে সীমিত করে, যেখানে মানুষের ফিগারের জান্তব দিকটি ব্যবহৃত হয়, যেমন দেখা যায় ইরানের মিনিয়েচারে; সেখানে প্রকৃতিমুক্ত অবস্থা অর্জিত হয় প্রাণীটির শৈলীরূপ সৃষ্টি করে, <em>এবং</em> <em>মানুষের</em> <em>মুখমন্ডল</em> <em>এবং</em> <em>শরীরকে</em> <em>কোন</em> <em>বিশিষ্ট</em> <em>রূপ</em><em>, </em><em>চরিত্র</em> <em>এবং</em> <em>ব্যক্তিত্ব</em> <em>অর্পণ</em> <em>না</em> <em>করে</em><em>।</em> একটি ফুলেরবমতই একজন মানুষ অ- প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করতে পারে শৈলীকরণের মাধ্যমে কিন্তু আসলে ইহাইতো ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের বিমোচন। একারণেই, পারস্যের মহত্তম মিনিয়েচারগুলোতে সব থাকে একাধিক মানুষের ফিগার। তাদের একজনকে অপরজন থেকে স্পষ্টরূপে চিহ্নিত করা যায় না<sup>১৯</sup>। আরবী কবিতার মতই মিনিয়েচারগুলো চিত্রিত হয় অনেকগুলো অংশ নিয়ে, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন, যাদের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব একটি স্বাধীন কেন্দ্রবিন্দু রয়েছে। দর্শক যেমন কবিতার নক্সা বা ছকে স্থাপিত সাহিত্যিক মনিমুক্তাগুলো নিজ চৈতন্যে প্রত্যক্ষ করে, আনন্দের স্বাদ উপভোগ করে, একইভাবে দর্শক গালিচায়, দরজা, প্রাচীর, ঘোড়ার জিন, মানুষের পাগড়ি বা পোশাক ইত্যাদিতে মিনিয়েচারের একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লতাপাতার বৃন্তে শিল্পগুলো সম্পর্কে চিন্তা করে এবং তখন তাদের মনে এই প্রত্যাশ্যাও থাকে যে, আরও সব অনন্ত কেন্দ্র রয়েছে যার দিকে সে অগ্রসর হতে পারে<sup>২০</sup>।</p>
<p>ইসলামী শিল্পকর্মের সকল অংকন এবং অলংকরণে প্রশ্নাতীতভাবে রয়েছে গতি- প্রকৃতিপক্ষে যে গতি অনিবার্য একটি নক্সার এক ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটের দিকে এবং পরে এক নক্সা থেকে অন্য নক্সায় এবং আসলে, একটি দৃষ্টিক্ষেত্র থেকে অন্য একটি দৃষ্টিক্ষেত্রের দিকে, যেমনটি আমরা দেখতে পাই বড় বড় প্রাসাদের বিশাল তোরণে, সম্মুখ ভাগে অথবা প্রাচীরগুলোতে। কিন্তু এমন কোন ইসলামী শিল্প কর্মই নেই যেখানে গতি চূড়ান্ত। দর্শকের দৃষ্টি যে চলমান থাকে তাই মূল কথা। দর্শকের মন গতিশীল হয়ে উঠে অনন্তকে প্রত্যক্ষ করার সন্ধানে। ভর, আয়তন, স্থান, বেষ্টনি, সৌন্দর্য, সামঞ্জস্য, টেনশন এসবই হচ্ছে প্রকৃতির বাস্তবতা, যেগুলোকে অস্বীকার করতে হবে যদি অ-প্রকৃতির উপলব্ধি অর্জন করতে হয় স্বজ্ঞার সাহায্যে। কেবলমাত্র তেমন একটি নক্সাই, তেমন একটি মোমেন্টাম-স্রষ্টা প্যাটার্নই মুসলিম সৌন্দর্য- প্রেমিককে ঘিরে থাকে- সকল দিকে অনন্ত পৃথিবীতে ছাড়িয়ে হয়। এতে করে তার মধ্যে সৃষ্টি হয় একটি ধ্যানী মেজাজ যা ঐশী সত্ত্বার ইনটুইশনের জন্য আবশ্যক। কেবল একটি বইয়ের প্রচ্ছদের ডিজাইন নয়, যে আলোকিত পৃষ্ঠাটি সে পড়ছে তার পায়ের নিচের গালিচা, তার বাড়ীর সিলিং এর সম্মুখ ভাগ, ভিতর ও বাইরের প্রাচীরগুলোই কেবল নয়, বাড়ীটির মেঝের পরিকল্পনাও এমন একটি এরাবেক্স তৈরী করে, যেখানে বাগিচা, বাড়ীর উঠান, প্রবেশ কক্ষ এবং প্রতিটি কক্ষই একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র, লতাপাতার নিজস্ব শিল্পরূপ সমেত যা তার নিজস্ব গতি সৃষ্টি করে।</p>
<p>কিন্তু এরাবেক্স কি? আমরা উপরে এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছি একথা ধরে নিয়ে যে পাঠক এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। যথার্থভাবেই এধারণা করেছি, কারণ অন্য যে কোন শিল্পকর্ম থেকে এরাবেক্সকে মুহূর্তে পৃথক করে চেনা যায়। সকল মুসলিম দেশে এই শিল্পরূপটি সর্বব্যাপী, এটি সকল ইসলামী শিল্পকর্মের একটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা উপাদান। যথাযথই একে বলা হয় এরাবেক্স, কেননা আরবী কাব্য এবং আরবী কুরআনের মতই এটি আরবীয়, তার নান্দনিকতার দিক দিয়ে। এর অস্তিত্ব যে কোন পরিবেশকে রূপান্তরিত করে ইসলামী আবহে, এই বৈশিষ্ট্যটিই চূড়ান্ত রকমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্পকর্মে দান করে একটি ঐক্য। এটি সঙ্গে সঙ্গে চেনা যায় এবং আসলে এতে ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। মূলত এটি অনেকগুলো ইউনিট বা ফিগারের সমন্বয়ে রচিত যা একত্রে মিলিত হয় এবং এমনি ধারা পরস্পর জড়াজড়ি করে, যার ফলে একটি ফিগার বা ইউনিট থেকে অন্য একটি ইউনিটের অভিমুখে অগ্রসর হয় সকল দিকে, যতক্ষণ না শিল্পকর্মটিকে তার বাস্তব কিনার থেকে কিনার পর্যন্ত অতিক্রম করে গেছে দৃষ্টি। ফিগার বা ইউনিটটি অবশ্যই সম্পূর্ণ এবং স্বতন্ত্র, কিন্তু তা পরবর্তী ফিগার বা ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত, দৃষ্টি বাধ্য হয় অগ্রসর হতে একটি ফিগারের আউটলাইন এবং নক্সা অনুসরণ করে পরবর্তী ফিগারটির রূপরেখা এবং নক্সার অনুসন্ধানে। এতেই সৃষ্টি হয় ছন্দ। এই গতিটি মন্থর হতে পারে যতই ফিগারগুলো পরস্পর থেকে হবে অধিকতর বিচ্ছিন্ন। যাই হোক, ফিগারগুলো যতই অধিকতর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হবে যার ফলে গতি, যতি এবং ছন্দ সৃষ্টি হয় এবং রেখাগুলোর ঘূর্ণায়মানতা এবং ভগ্নতার দ্বারা যতই গতি বাধাগ্রস্থ হয় ততই বেশী শক্তি সঞ্চারিত হয় এরাবেক্স এর গতিবেগে। গতিবেগ যত বাড়বে ততই মনের জন্য সহজ হবে যুক্তিচিন্তার জন্ম দিতে, যাতে করে শিল্পকর্মের সীমা ছাড়িয়ে কল্পনায় ঝাপ দিতে পারে, মন যা চায় তা সৃষ্টির প্রয়াসে। এই প্রক্রিয়ার জন্য পুনরাবৃত্তি আবশ্যক। একারণে যেকোন শিল্পকর্মে ভিন্ন ভিন্ন রকম অনেকগুলো এরাবেক্স এর কাজ থাকে যার প্রত্যেকটি ঢেকে দেয় একটি কাঠামোগত অংশ। উদ্দেশ্যটি সুস্পষ্টঃ এর উদ্দিষ্ট উড্ডয়নের উপর কল্পনার উৎক্ষেপণ। এটি ঘটতে পারে দ্বিতীয়, তৃতীয় অথবা দশম এরাবেক্স-এ, যদি তা না আসে প্রথমটির সঙ্গে।</p>
<p>এরাবেক্সগুলো হয়ে থাকে লতাপাতা ফুলময় বা জ্যামিতিক, শিল্প মাধ্যম হিসেবে সেগুলো যে বৃন্ত, পত্র, ফুল ব্যবহার করলো (আল-তাওরিক) অথবা যে জ্যামিতিক বসম (ফিগার) ব্যবহার করলো, তার উপর ভিত্তি করে। জ্যামিতিক ফিগারটি হতে পারে খাত (রৈখিক) সৎ, যদি তা সরল এবং ভগ্ন রেখা ব্যবহার করে অথবা তা হতে পারে বংকিম (রামী) যদি তা ব্যবহার করে বহুকেন্দ্রিক বক্ররেখা। এ সমস্তরই সম্মেলন ঘটতে পারে এবং তখন তাকে বলা হর বাড়ী। এরাবেক্সগুলো হবে প্লানার বা সমতলিক, যদি সেগুলোর থাকে দুই আয়তন, যেমনটি আমরা দেখতে পাই প্রাচীর, দরজা, সিলিং, আসবাবপত্র কাপড়, গালিচা, পুস্তকের মলাট এবং পৃষ্ঠার সকল অলংকরণের মধ্যে। এগুলো স্থান বিষয়ক অথবা ত্রিমাত্রিক হতে পারে যা নির্মিত হয় স্ব স্ব, তোরণ এবং গম্বুজের পাঁজরের সাহায্যে। এই রূপটি হচ্ছে মাগরিব এবং আন্দালুসিয়ার স্থাপত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য যার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই কর্ডোভার মহান মসজিদে এবং গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদে। আলহামরাতে দৃশ্যমান তোরণের উপর স্থাপিত পরস্পর জড়াজড়ি করা বহু তোরণ দ্বারা নির্মিত হয়েছে একটি  সম্পূর্ণ গম্বুজ যা কেবলমাত্র উদ্দীপ্ত কল্পনাই প্রত্যক্ষ করতে এবং তাদের গতিপথ অনুসরণ করতে পারে। এখানে গতিবেগটি এমনই প্রচন্ড যে ছন্দের সঙ্গে অগ্রসর হতে ইচ্ছুক যে কোন ব্যক্তিকে তা পরিচালিত ও নিক্ষেপ করতে পারে অনন্তের সরাসরি উপলব্ধির দিকে। একটি প্রকাণ্ড মসজিদের মহৎ সম্মুখভাগ, একটা বিশাল প্রাচীরে প্রবেশ কক্ষের প্যানেল, দরজার যে হাতলের উপর দৃষ্টি হুমড়ি খেয়ে পড়ে, একটি পুস্ত কের পৃষ্ঠায় একটি মিনিয়েচার, একটি গালিচার নক্সা অথবা আপন কাপড় চোপড় বা বেল্ট কিংবা বেল্টের বাকল সবই মুসলিমের কাছে ঘোষণা করে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, কেননা সে অ-প্রকৃত বা সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যাওয়া অলৌকিক জগতের অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রত্যক্ষ করে এসবের মাধ্যমে<sup>২১</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>আরবী</strong> <strong>ক্যালিগ্রাফি</strong><strong>: </strong><strong>অতিন্দ্রীয়</strong> <strong>উপলব্ধি</strong> <strong>বা</strong> <strong>চৈতন্য</strong></h4>
<p>মুসলিম চৈতন্য ইন্দ্রিয়াতীত ঐশী সত্ত্বা নিয়ে এতটাই আবিষ্ট যে, মুসলিম উপলব্ধি চেয়েছে সর্বত্রই তার প্রকাশ দেখতে এবং ঐশী উপস্থিতি ঘোষণা করার পন্থা ও উপায় খুঁজে বার করার জন্য এই চৈতন্য এতটাই ব্যগ্র ছিল যে, এই করে পরম ভাব উচ্ছাসের সঙ্গে এমন একটি প্যাটার্ন নির্মাণ যা মানবজাতির অভিজ্ঞতায় আগে কখনো ঘটেনি। এমন কি দৃশ্য শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে এর প্রতিভার জন্য এরাবেক্স-এর অনন্ত বৈচিত্রও যথেষ্ট ছিলোনা। এ প্রতিভা প্রত্যেকটি চিন্তনীয় শিল্প প্রয়াসের বিষয়কে ব্যবহার করেছে, এমন একটি দর্পণে রূপান্তরিত করেছে যাতে এর মর্ম প্রতিবিম্বিত হয়। এটি তখন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো আরো একটি অধিকতর চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রাক-ইসলামী ইতিহাস, সাহিত্যিক গদ্য এবং কবিতায় শব্দের সৌন্দর্য বা নান্দনিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। যদিও এর ধারণা ইসলামের আবির্ভাবকালে, আরবদের অনুরূপ অন্য কারো হাতে ততটুকু বিকশিত ছিলনা, তবু মেসোপটেমিয় এবং হিব্রুগণ, গ্রীক এবং রোমানগণ এবং হিন্দুরা শব্দের নান্দনিকতার সীমান্তকে যতদুর প্রসারিত করেছিল, তা সামান্য বিষয় ছিল না। লিখন শিল্প ছিল অপরিপক্ক, স্থূল এবং সারা পৃথিবীতে সৌন্দর্যের বিচারে অনাকর্ষণীয় এবং এখনো প্রায় সর্বক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান। ভারত, বাইজানটিয়ান এবং খৃষ্টান প্রতীচ্যে লেখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে এর যথোচিত ক্যাপাসিটি অনুযায়ী, অর্থাৎ যৌক্তিক প্রতীক হিসেবে। খৃষ্টান ও হিন্দুধর্মের দৃশ্য (প্রতিকৃতি মূলক) শিল্পের প্রকাশ কল্পিত হয়েছে লিখনের মাধ্যমে, অর্থাৎ বাঞ্ছিত খণ্ড খণ্ড ধারণাকে প্রকাশ করার জন্য শব্দের যৌক্তিক প্রতীকতার সাহায্যে তা ব্যক্ত হয়েছে। দৃশ্যশিল্পকে উদ্ধার করার জন্য অসংলগ্ন বিষয়ান্তরগামী চিন্তার সাহায্যের প্রয়োজন নেই, যদি না সেই শিল্প বাঞ্ছিত প্রাকসিদ্ধ ধারণাটিকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে প্রকাশ করার জন্য অক্ষম হয়। এপোলো এবং এফ্রোদিতের জন্য এধরনের কোন অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলোনা দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপে, কেবল দৃষ্টহিসেবেই ওরা দর্শকের কাছে ঐশীত্ব প্রকাশ করেছে, কারণ মানব প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকেই এবং ইন্দ্রিয়কে প্রদত্ত চরিত্র থেকেই প্রত্যক্ষভাবে ঐশীত্ব বা প্রাকসিদ্ধ ধারণা উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাইজানটাইন বা হিন্দুশিল্পের ব্যাপারে তা ছিলোনা, কারণ এই শিল্পের ফিগারগুলো ইঙ্গিতময় কোনো সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত ছিল, যেখানে এগুলোকে কেবল শৈলীরূপ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে লেখার আশ্রয় নেওয়া হয়, প্রতিচ্যে এবং ভারতীয় শিল্পে এর ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, এর প্রতীকতা ছিল সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং কেবল বুদ্ধিগ্রাহ্য, আরবী অথবা রোমান সংখ্যার থেকে যা ভিন্ন নয়। ইসলামের পূর্বে আরবী ভাষা যে লিপিতেই লেখা হউক না কেন প্রকৃত ব্যাপার ছিল এই ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এবং দৃশ্য শিল্পকর্মে ইন্দ্রিয়াতীততা অর্জনের জন্য বলিষ্ঠ উদ্যোগের ফলে, লিখন শিল্পে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবার প্রতীক্ষায় ছিলো, ইসলামী প্রতিভা সাফল্যের সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী &#8216;আল্লাহ&#8217; শব্দটি নাবাতি বর্ণমালা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নসখ রীতিতে (গোটা গোটা হাতের লেখায়) লিখিত হয় অথবা সিরীয় হরফের মাধ্যমে প্রাপ্ত আরামাইক, কুফী হরফে (কৌণিক)। অন্য যে কোন ভাষার মতই আগাগোড়াই এর তাৎপর্য ছিলো বলা যায়, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরগামী সম্ভবত আরো বেশী, এ কারণে যে, নিকটপ্রাচ্যের মানুষগুলো ক্যালিগ্রাফি বলতে যা বুঝায় তেমন কিছুর সঙ্গে পরিচিতই ছিলনা। রোমানরা ক্যালিগ্রাফিতে কিছুটা সামর্থ অর্জন করলেও হরফগুলোর তাৎপর্য আগের মত উজ্জ্বল, যৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক রয়ে গেল। আয়ারল্যান্ডের কেলটিক সন্যাসীরা Book of Kells এর মতো অল্প ক&#8217;টি উদ্ভাসিত পান্ডুলিপি তৈরি করেছিলো। কিন্তু তাদের ক্যালিগ্রাফি রোমান স্তরকে অতিক্রম করেনি। তাদের অক্ষরগুলো ছিল গোল গোল এবং অলংকরণের মাধ্যমে, সৌন্দর্যমন্ডিত, কিন্তু তার পূর্ণ তাৎপর্যটি যৌক্তিকই থেকে যায়। <em>অলংকরণ</em> <em>ছিল</em> <em>একটি</em> <em>অতিরিক্ত</em> <em>ব্যাপার</em><em>।</em> <em>কারণ</em> <em>এতে</em> <em>করে</em> <em>হরফগুলোর</em> <em>চরিত্র</em> <em>পরিবর্তিত</em> <em>হয়নি</em> <em>এবং</em> <em>প্রত্যেকটি</em> <em>হরফই</em> <em>একাকী</em> <em>অবস্থান</em> <em>করে</em><em>।</em> <em>দৃষ্টি</em> <em>এক</em> <em>হরফ</em> <em>থেকে</em> <em>আরেক</em> <em>হরফে</em> <em>পৌঁছায়</em> <em>লাফ</em> <em>দিয়ে</em> <em>এবং</em> <em>বোধশক্তিকে</em> <em>একাজে</em> <em>মধ্যস্থতা</em> <em>করতে</em> <em>হত</em><em>, </em><em>যুক্তি</em> <em>এবং</em> <em>স্মৃতি</em> <em>মিলিত</em> <em>হত</em> <em>গ্রাফিক</em> <em>অক্ষরগুলোকে</em> <em>শব্দ</em> <em>বা</em> <em>মনের</em> <em>ধারণায়</em> <em>রূপান্তরিত</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>।</em> <em>লিখিত</em> <em>হরফ</em><em>, </em><em>শব্দ</em><em>, </em><em>ছত্র</em> <em>বা</em> <em>বাক্যের</em> <em>কোনো</em> <em>নান্দনিক</em> <em>ইনটুইশন</em> <em>হতনা</em><em>।</em> ক্রমে ক্রমে দুই জেনারেশনের ব্যবধানের মধ্যেই ইসলামী শিল্প আরবী শব্দকে রূপান্তরিত করলো একটি দৃশ্য শিল্পকর্মে এবং তাতে সংবেদনাত্বক ইনটুইশনকে এমন একটি নান্দনিক অর্থ দান করে যা অসংলগ্ন কর্ম ক্ষমতা ও বোধকে যে অসংলগ্ন অর্থ দান করে তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্যান্য শিল্পকলার মতই এই নতুন শিল্প ছিলো ইসলামী চৈতন্যের সামগ্রিক লক্ষের অধীন। এরদৃশ্য সামর্থগুলোর বিকাশ ঘটানো হয় একটি এরাবেক্স নির্মাণ করার জন্য গ্রীক এবং ল্যাটিন বর্ণমালার মতই নাবাতি এবং সিরীয় বর্ণমালার হরফগুলো ছিল একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং স্বতন্ত্র। আরব শিল্পী এগুলোকে একত্রে যুক্ত করে দেয়, যাতে করে একটি অক্ষর প্রত্যক্ষ না করে দর্শকের চোখ একটি মাত্র দৃষ্টিপাতে এবং একটি সংবেদনাত্মক ইনটুইশনের সাহায্যে দেখতে পেতো পুরো শব্দটিকে এবং কার্যত গোটা বাকধারা বা ছত্রটিকে। দ্বিতীয়ত আরব শিল্পী অক্ষরগুলোকে করে নমনীয় যাতে করে সে অক্ষরগুলোকে প্রসারিত, প্রলম্বিত, সংকুচিত, নমিত, বিস্তৃত, সোজা, বাঁকানো, বিভাজন, গাঢ়করণ ক্রমে সংকীর্ণ করে আনয়ন, অংশত বা পূর্ণত বর্ধিতকরণ, যা খুশী তাই করতে পারে। হরফ হয়ে উঠে বংশবদ শিল্প উপকরণ, ক্যালিগ্রাফারের যে কোন নান্দনিক পরিকল্পনা বা ধারণাকে ধারণ ও কার্যকর করার জন্য যা থাকে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, এরাবেক্স শিল্পকর্মে এপর্যন্ত যা কিছু জ্ঞানলাভ হয়েছে শিল্পী তার সমস্ত কিছুকেই কাজে লাগায় ফুল ও লতাপাতার শিল্প রূপায়ণ এবং জ্যামিতিক চিত্রণ, কেবলমাত্র লেখন শিল্পের উৎকৃষ্টতর অলংকরণের জন্যই নয়, বরং লিখনকেই তার আপন অধিকারে একটি এরাবেক্স-এ রূপদানের জন্য আরবী লিখন এভাবে হয়ে উঠে একটি মুক্ত তরঙ্গিত রেখা যা এখানে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং নিজে নিজেই সম্পূর্ণ হতে পারে। মিল রেখে বিন্যাস করেই হউক বা বৃহৎ পরিবারে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়েই হউক অক্ষর বা বর্ণের নতুন করে অর্জিত নমনীয়তার ফলে ক্যালিগ্রাফারকে লিখনের ক্ষমতা দান করে দুটির একটি পন্থায় বা উভয় পন্থায়। সে যে নান্দনিক পরিকল্পনাটির বিকাশ ঘটাতে চায়, তার অনুসরণে। পরিশেষে সে অক্ষর বা হরফের এই মুক্তি সাধন করে, কেবলমাত্র এরাবেক্স অলংকরণগুলোকে গ্রহণ করার জন্যই নয়, বরং একটি বৃহৎ এরাবেক্স নির্মান করার জন্য তার সঙ্গে হরফকে মিশিয়ে দেয়। শিল্পী এটি সম্ভব করে তোলে- লিখন থেকে যাতে অন্য এরাবেক্সটি বিকাশ লাভ করে, অথবা সেসবের মধ্য থেকে লিখনের বিকাশ ঘটে। অক্ষরের যে মৌলিক প্রকৃতি অক্ষরকে বোধগম্যতা দান করে তা রক্ষিত হয়, এবং কাব্যে ছন্দের প্যাটার্ন এবং সমতল এরাবেক্সগুলোতে গঠিত যে সব জ্যামিতিক ও লতাপাতা ফুলের রূপ ও আকৃতি, বোধগম্য আকারে সেগুলোকে প্রকাশ করার মধ্যেই সৃষ্টি হতো তাদের গতিশীলতা। এরাবেক্স হিসেবে আরবী লিখন অসংলগ্ন রোধের চূড়ান্ত বাহনস্বরূপ অক্ষর বা যৌক্তিক প্রতীকগুলোকে রূপান্তরিত করে একটি সংবেদনাত্মক শিল্প উপকরণে এবং একটি নান্দনিক মাধ্যমে, যা জন্ম দেয় একটি অনন্য নান্দনিক ইনটুইশনের। মানবিক শিল্প হিসেবেই এ ছিল তার এক বিজয়, যার সাহায্যে অসংলগ্ন যুক্তির সর্বশেষ এলাকা অতিক্রম করে মানবিক শিল্পকে সংবদনাত্মক নান্দনিকতার জগতের সঙ্গে মুক্ত ও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এটি ছিল ইসলামের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত শৈল্পিক বিজয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলাম দাবী করে, আল্লাহর বাণী বা কালাম হচ্ছে চিন্তার দিক দিয়ে তার নিকটতম ধারণা? তাঁর ইচ্ছার আশুতম প্রকাশ; যেহেতু ইন্দ্রিয়াতীত হওয়ার কারণে তিনি অনন্ত কালই অজ্ঞেয় এবং অব্যক্ত মানবের গোচরে। সে কারণে তাঁর কালাম বা শব্দের মাধ্যমে প্রত্যাদেশের আকারে তাঁর ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে। তাহলে কুরআনের শব্দ হচ্ছে God-in-Percipi বুদ্ধিগ্রাহ্য আল্লাহ এবং একারণে সম্মানের দিক দিয়ে ও সৌন্দের্যের দিক দিয়ে তাকে দেওয়া উচিত চূড়ান্ত মর্যাদা। এজন্য ইসলামে এর লিখন হচ্ছে নান্দনিকতার চরম ও পরম। একারণে আরো যুক্তিসঙ্গত যে, আরবী ক্যালিগ্রাফির বিকাশ সাধন করতে হবে ঐশী সত্ত্বার সংবেদনাত্মক ইনটুইশন বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ঘটানোর জন্য- আল্লাহকে যে প্রকাশ করা যায় না, চেতনায় ব্যক্ত করা এবং প্রতিফলিত করা যায়না, তারই পূর্ণ উপলব্ধির মাধ্যমে। যেহেতু আরবী লিখন একটি এরাবেক্স হয়ে উঠেছে, সে কারণে তা যে কোন লিপিকর্মে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখানে আইনত অবস্থান নিতে পারে তার চিন্তামূলক উপাদান যাই হোক। যে কোন শিল্পকর্মের উপরে তা চড়াও হতে পারে, এবং এর নান্দনিক গতিবেগ বা মূল্যের পরিপূরক হিসেবে, আর সেই শিল্পকে করতে পারে মহিমান্বিত, শিল্প কর্মটির সংঘা লিখন সমন্বত বা অঙ্গীভূত হোক বা না হোক, সকল মুসলমান পবিত্র কিতাবের প্রতি যে শ্রদ্ধা পোষণ করে থাকে, <em>পরে</em> <em>লিখন</em> <em>শিল্প</em> <em>দ্রুত</em> <em>বিস্তৃতি</em> <em>লাভ</em> <em>করে</em> <em>এবং</em> <em>সর্বাধিক</em> <em>সংখ্যক</em> <em>মেধাকে</em> <em>সংহত</em> <em>করে</em> <em>ও</em> <em>প্রবেশ</em> <em>করে</em> <em>মুসলিম</em> <em>জীবনের</em> <em>প্রতিটি</em> <em>মুহূর্তে</em><em>।</em> <em>প্রস্তরে</em><em>, </em><em>কাঠে</em><em>, </em><em>কাগজে</em><em>, </em><em>চর্ম</em> <em>কিংবা</em> <em>বস্ত্রে</em><em>, </em><em>গৃহে</em><em>, </em><em>অফিসে</em><em>, </em><em>দোকানে</em><em>, </em><em>মসজিদে</em> <em>প্রত্যেকটি</em> <em>প্রাচীর</em> <em>এবং</em> <em>সিলিং</em><em>&#8211;</em><em>এ</em> <em>আরবী</em> <em>লিখন</em> <em>হয়ে</em> <em>উঠলো</em> <em>ইসলামের</em> <em>সাধারণ</em> <em>শিল্পকর্ম</em><em>।</em> এর প্রভাব এবং উপস্থিতি এত ব্যাপকতা লাভ করে যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোন নগরী বা গ্রাম এই শিল্পকর্মের ডজন ডজন মহৎ স্রষ্টা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়নি। <strong>এমনকি</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>শত্রুরাও</strong> <strong>এই</strong> <strong>প্রভাব</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>মুক্ত</strong> <strong>ছিলনা</strong><strong>।</strong> <strong>খ্রীষ্টান</strong> <strong>স্পেন</strong><strong>, </strong><strong>ফ্রান্স</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইটালীতে</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>অজ্ঞতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>অযোগ্যতার</strong> <strong>বশে</strong> <strong>আনাড়ীর</strong> <strong>মত</strong> <strong>আরব</strong> <strong>লিখন</strong> <strong>শিল্প</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করেছে</strong><strong>, </strong><strong>তবু</strong> <strong>সেই</strong> <strong>ব্যবহারের</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>নান্দনিকতার</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>প্রভূত</strong> <strong>লাভবান</strong> <strong>হয়েছে<sup>২২</sup></strong><strong>।</strong> ইহা যে নান্দনিক সংবেদনাত্মক ইনটুইশনের জন্ম দেয় তা যে কোন এরাবেক্স শিল্পকর্মের মতই কল্পনা উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম, যে কোন যুক্তি অভিমুখে তার উর্ধ অভিসারী উড্ডয়নে, হয়তোবা তার চাইতেও বেশী, কারণ একই সময়ে এর অসংলগ্ন উপাদানগুলো পাঠ করতে সক্ষম দর্শকের জন্য আরবী লিখন বুদ্ধির সক্রিয়তার মাধ্যমে জন্মাবে কল্পনার লক্ষ্যের আরো বিশিষ্ট একটি রূপ, এর গতিবেগে সে লক্ষ্যের অভিমুখে আরো অগ্রসরতা। তাহলে, এ কোন বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে, কুরআন কপি করতে গিয়ে আরবী ক্যালিগ্রাফি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পকর্ম। রাজা বাদশা এবং প্রাকৃতজন প্রত্যেকই তাদের সমগ্র জীবনের জন্য একটি পরম আশা পোষণ করতেন: একখণ্ড সমগ্র কুরআন কপি করা এবং তা সমাপনের পর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ<sup>২৩</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জামাখসারির (তাঁর আছাদ আল বালাগা, দ্রঃ &#8216;কালাম&#8217;) বিবৃতি মতে উজির মোহাম্মদ আবু আলী মুকলা লিখনকে তুলনা করেছিলেন কাজের সঙ্গে এবং দুটি শিল্পকর্মের পরিকল্পনায় ও রচনায় অর্পণ করেছিলেন একই নান্দনিক দায়িত্ব। তিনি লিখন শিল্পের মৌল গুণ পাঁচটি বলে বর্ণনা করেছিলেন; আত্ তাওফিয়া (শব্দটি যেসব অক্ষর দিয়ে নির্মিত তার প্রত্যেকটিকে তার পূর্ণ অংশ প্রদান যাতে করে সমগ্র ও অংশের মধ্যে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসামঞ্জস্য হতে পারে), আল ইলমান (প্রত্যকটি অক্ষরকে তার জন্য প্রয়োজনীয় স্থান, ক্ষমতা ও গুরুত্ব প্রদান), আল ইকমাল (প্রত্যেকটি অক্ষরকে তার দৃশ্য ব্যক্তিত্ব প্রদান, যা প্রকাশিত তার ভঙ্গিতে, সোজা, দন্ডয়মান অবস্থায়, ফ্ল্যাট অবস্থায়, শুয়ে পড়ায়, দৃঢ় ন্যূজতায়, আত্মসমর্পণ, অভিজ্ঞতালব্ধ বক্রতায়); আল্ ইশবা (প্রত্যেকটি বর্ণকে তার অন্তর্গত দৃশ্য ব্যক্তিত্ব যার প্রকাশ ঘটে সূক্ষ্মতার মাধ্যমে প্রত্যেকটি অক্ষরের যা দাবী তা দান করা); আল ইরসাল (মুক্ত গতিতে রেখার উৎসারণ যা ইতস্ততা বা কোন অন্তর্গত প্রতিনিবৃত্তির দ্বারা বাধ্যগ্রন্থ নয়, যা উচ্চ গতির বেগ সৃষ্টি করে<sup>২৪</sup>)। আবু হাইয়ান আত্ তাওহীদী তার ইলমুল কিতাবাতে বলেনঃ &#8220;সাধারণভাবে লিখন হচ্ছে জাগতিক উপকরণ দিয়ে আধ্যাত্মিক চিত্রণ<sup>২৫</sup>।&#8221; <em>যুগ</em> <em>যুগ</em> <em>ধরে</em> <em>মুসলমানরা</em> <em>অজ্ঞাতনামা</em> <em>সাধু</em> <em>দরবেশদের</em> <em>উক্তির</em> <em>আবৃত্তি</em> <em>করেছেন</em><em>, </em><em>যেমন</em><em>: </em></p>
<blockquote><p><em>&#8216;</em><em>মানুষের</em> <em>মনের</em> <em>অবস্থান</em> <em>তাদের</em> <em>কলমের</em> <em>দাঁতের</em> <em>নীচে</em><em>,&#8217; &#8220;</em><em>লিখন</em> <em>হচ্ছে</em> <em>চিন্তার</em> <em>পানি</em> <em>সেচন</em><em>,&#8221; &#8220;</em><em>সুন্দর</em> <em>লিখা</em> <em>দুর্বল</em> <em>চিন্তার</em> <em>অভাব</em> <em>পূরণ</em> <em>করে</em><em>, </em><em>আর</em> <em>ধ্বনিকে</em> <em>তা</em> <em>দান</em> <em>করে</em> <em>জীবনীশক্তি<sup>২৬</sup></em><em>।</em><em>&#8220;</em></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>মধ্যযুগের বহু পণ্ডিত মানবিক বিষয়ে মহৎ খ্যাতি অর্জন করেছেন, যেমন ইবন আবদ রাব্বী, মোহাম্মদ আমীন, ইবনুন আছীর, ইবনুল নাদী, আল কালকাসান্দী প্রমুখ। এঁরা সকলেই লিখন ক্ষেত্রে সহগামী মুসলমানের কৃতিত্বকে স্বীকার করেছেন। তাঁরা এতে গর্বিত ছিলেন যে, অন্য যে কোন লেখনী শিল্পের চেয়ে আরবী লিখন অনেক বেশী বিকশিত হয়েছে। তারা গর্বিত যে, আরবী লিখন-সৌন্দর্য শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছে, এবং এমন অভিব্যাপ্তি ও গৌরব অর্জন করেছে যা সম্পূর্ণভাবে তুলনাবিহীন, এবং পরিশেষে এতে অর্পিত হয়েছে পরমমূল্য অর্থাৎ ধর্মীয় মূল্য, ঐশী প্রজ্ঞা প্রকাশের বাহন এবং মাধ্যম হিসেবে। কুরআনুল করীম তাদের মূল্য নির্ণয়ের অভ্রান্ততার চূড়ান্ত প্রত্যয় ও সন্তোষের সঙ্গে দাবী করে যে, লিখনকে অপার্থিব মর্যাদা দান করেছে একটি আয়াতে যার সূচনা কলম এবং লেখনীর তাকিদ দিয়ে<sup>২৭</sup>।</p>
<p>যেখানে, সমস্ত শিল্পকলাই সমজদারদের উপর চিং-প্রকর্ষ ও মানবিকতা-সৃজনকারী প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে গ্রীক এবং রেনেসাঁর শিল্পকলা মানুষের কাছে মানুষের নিজের মূল্য বৃদ্ধি করে এবং তার কল্পনা এবং ইচ্ছাকে আত্মউপলব্ধির বৃহত্তর উচ্চতায় উন্নীত করার জন্য তাকে অনুপ্রাণিত করে। গ্রীক এবং রেনেসাঁ শিল্প তা সম্পাদন করে মানুষকে একটা মহত্তর ও গভীরতর মানবিকতায় শিক্ষিত করে, এমন মহৎ এক মানবিকতা যে, তার চেতনায় তা লোপ পায় ঐশ্বরিকতার মধ্যে যা কিনা আশা ও সর্চোচ্চ জীবন মানের শীর্ষবিন্দু। ইসলামে শিল্পকর্ম উৎকর্ষ মানবিকতা ও আত্মউপলব্ধিকর একই প্রয়াস দেখা যায়। কিন্তু ইসলাম তা সম্পাদন করে মানুষকে প্রতিটি মুহূর্তে ঐশী উপস্থিতির সম্মুখে স্থাপন করে। ঐশীসত্ত্বা অপৌরুষেয় এবং ইন্দ্রিয়াতীত হওয়ায় ইসলামী শিল্পকলা যে আদর্শবাদের জন্ম দেয় তা কখনো দাম্ভিক অথবা অবাধ্য প্রমিথিউসের মত ছিলনা। যেহেতু তা ছিল মানবীয়, একারণে ইসলামী শিল্পকলার আদর্শবাদ নিজেকে নিয়ম-শৃংখলার অধীনে স্থাপন করে, তার নিজের ইন্দ্রিয়াতীত চেতনার মাধ্যমে। এটি কি সীমাবদ্ধতা? নিশ্চয়ই। এই সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয় ইন্দ্রিয়াতীত মূল্যমান দ্বারা সংজ্ঞা মতে যার সূচনা অনন্ত থেকে; এই সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সেই সব মূল্যের কারণে যেগুলো, সেসব বিষয়ে &#8216;বিভ্রান্তির&#8217; মাধ্যমে নয় বরং সোজাসুজি তার সামনে দাঁড়িয়ে, উৎকৃষ্টতরভাবে নিরীক্ষণ ও উপলব্ধি করা যায়। যেহেতু মূল্যের উভয় জগতই প্রাকসিদ্ধ, সে কারণে ধারণার দিক দিয়ে সে সব বিষয়ে মানুষের বিভ্রান্তি অসম্ভব এবং প্রমিথিউস হামেশাই একজন আত্মতুষ্ট ব্যক্তি। ইসলামী শিল্পকর্মের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে খোদ ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের অনুসন্ধান এবং সর্বদা পরম ট্রান্সেন্ডেন্ট বাস্তবতা থেকে পার্থক্যের দূরত্ব বজায় রাখা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা:</p>
<p>১. (আল্লাহ) আসমান এবং জমিনের স্রষ্টা। কোন কিছুই তাঁর মতো নয়। তিনি সমস্ত কিছু শোনেন এবং দেখেন (৪২: ১১)।</p>
<p>২. Arthur Schopenhaser. The World as Will and Idea. tr. R.B. Haldane and J. Kemp London: Routledge and Kegan Paul Limited) vol i. Third Book. p. 217.</p>
<p>৩. Friedrich Nietzsche. Works. tr. and ed Walter Kaufmaan (New York The Viking Press. 1954) পৃ. 459. Walter Kaufmann. Nietzsche. Philospher. Psychologist. Antichrist (Princeton: Princeton Press. Meridian Books. 1956) পৃ.102.</p>
<p>৪. Murray, Five Stages পৃ. 57,60,63.</p>
<p>৫. দ্র: এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221;.</p>
<p>৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬।</p>
<p>৭. দেখুন এই গ্রন্থারের &#8230; &#8220;Divine Transcendence&#8221; pp. 11-19.</p>
<p>৮. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; P. 78.</p>
<p>৯. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;Divine Transcedence&#8221;&#8230;&#8230;.p. 22.</p>
<p>১০. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221;.</p>
<p>১১. যে কোন ব্যাকরণমূলক পাঠ অনুসারে এই ভূমিকা প্রায় সকল সেমেটিক ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ধাতৃমূল্যের ত্রি-ব্যঞ্জনমূলক কাঠামো সেমেটিক ভাষাতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>১২. দ্রঃ এই গ্রন্থারের প্রবন্ধ, &#8220;Islam and Art.&#8221; Studia Islamica fasciculi xxxvii (1973) পৃ. 93।</p>
<p>১৩. শ্রোতা এবং আবৃত্তিকার বা পরিবেশকের মধ্যে একই ধরনের সহযোগিতামূলক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হচ্ছে গোটা মুসলিম বিশ্বের মধ্যযুগের সঙ্গীত ও কবিতার মোসায়েরাগুলোর বৈশিষ্ট্য, যা দেখা যাবে ঐ আমলের সাহিত্যের প্রয়াস (যেমন: Kitab al Aghani by al Isfahani)।</p>
<p>১৪. Abd al qaidir al Jurjani, Dalail al l&#8217;jaz: (Cairo: Al Matba&#8217;ah al Arabiyah 1351 H).</p>
<p>১৫. Abu al Faraj al Isfahani. Kitab al Aghani (Beirut: Dar al Thaqafah. 1374/1955) witnesses to a countless number of such instances.</p>
<p>১৬. K.A.C. Creswell. Early Muslim Architecture (Oxford: Clarendon Press. 1932- 1940) vol. পৃ. 40.</p>
<p>১৭. দ্র: Richard Ethinghusen. &#8220;The Character of Islamic Art &#8220;The Arab Heritage ed. N.A. Fais (Princeton: Princeton University Press 1944) পৃ. 251-67.</p>
<p>১৮. দ্র: Al Faruqi &#8220;Urubah and Religion&#8221; p. 211.</p>
<p>১৯. T.W. Arnold, Painting in Islam (Oxford: the Clarendon Press, 1928) c,. t. 133.</p>
<p>২০. Sturt Cary Welch, A Kings: The Shah-Nameh of Shah Tahmasp (New York: Metropoliton Museam of Art, 1972), পৃ. 30.</p>
<p>২১. কোনো দৃষ্টি তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না, কিন্তু তিনি সমস্ত কিছু দেখেন। তিনি দয়াময় (৬: ১০৩)।</p>
<p>২২. ইতিহাসবিদরা &#8216;মোজারাবিক&#8217; শব্দটি সৃষ্টি করেছেন, খ্রিষ্টিয়ান, ইতালী ও স্পেনিস অলংকরণের সমুদয় ঐতিহ্যটি বুজানোর জন্য, যেগুলোর সঙ্গে আরবী Motive (মুলভাব) এবং নক্সা সংশ্লিষ্ট।</p>
<p>২৩. তা বুঝা যায়, কুরআনের পাঠের কপির অনন্ত বিপুলতায়, যা বাজনাবর্গ অভিজাতগণ এবং সাধারণরা, সকল স্তরের মানুষের কপি করেছিলেন, বা যা রয়েছে সকল স্তরের মানুষের অধিকারে।</p>
<p>২৪. Naji Zayn al Din. Musawwer al Khan al Arabi. Baghdad: Al Mujam al Ilmi al Iraqi, 1288/1968). p. 372.</p>
<p>২৫. ঐ, পৃষ্ঠা ৩৯৬, যাতে জইনুদ্দিন আত তৌহীদের রিসালা ফি ইলমূল কিতাবাত একটি অংশ উদ্ধৃত করেছে। এটি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি।</p>
<p>২৬. ঐ।</p>
<p>২৭. নুন। কলমের সাক্ষ্য এবং যা, তা লিপিবদ্ধ করে তার সাক্ষ্য (৬৮: ১-২) পাঠকের&#8230;. তোমার রাব্বের নামে, যিনি দয়াময়, যিনি কলম ব্যবহার শিখিয়েছেন, মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানতো না (৯৬: ৩-৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -14px; top: 15394px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14806</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উম্মাহর অন্তর্গত প্রাণশক্তি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-vitality-of-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-vitality-of-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 03 Sep 2024 13:51:21 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14782</guid>

					<description><![CDATA[ ক. উম্মাহকে বাদ দিয়ে ইসলামের অস্তিত্ব নেই আল্লাহ তায়ালা আদেশ করছেন &#8220;তোমাদের মধ্যে এক উম্মাহ্ হোক যে আহ্বান করবে কল্যাণের দিকে, পুণ্যকর্মের নির্দেশ দেবে এবং মন্দকর্ম নিষেধ করবে। যারা তা করে তারাই সফলকাম&#8221; (পবিত্র কুরআন ৩: ১০৪)। স্পষ্টতই মুসলমানরা আদিষ্ট]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong> </strong><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>উম্মাহকে</strong> <strong>বাদ</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>অস্তিত্ব</strong> <strong>নেই</strong></h4>
<p>আল্লাহ তায়ালা আদেশ করছেন &#8220;তোমাদের মধ্যে এক উম্মাহ্ হোক যে আহ্বান করবে কল্যাণের দিকে, পুণ্যকর্মের নির্দেশ দেবে এবং মন্দকর্ম নিষেধ করবে। যারা তা করে তারাই সফলকাম&#8221; (পবিত্র কুরআন ৩: ১০৪)। স্পষ্টতই মুসলমানরা আদিষ্ট হয়েছে নিজেদেরকে উম্মাহক্তে পরিণত করতে অর্থাৎ একটি সামাজিক সংস্থারূপে গঠিত হতে- একটি বিশেষ পন্থায়। আল কোরআনের পাঠ আমাদের দেয় এমন আদেশ নির্দেশের &#8216;ইল্লাহ&#8217; বা ইল্লাত (প্রয়োজনীয় যুক্তি), অর্থাৎ &#8216;কল্যাণের দিকে আহ্বান এবং পুণ্যকর্মের তাকিদ দিতে ও মন্দকর্ম বারণ করতে।&#8221; অবশ্য এই ইল্লাহ হচ্ছে একমাত্র চূড়ান্ত কারণ বা পরম লক্ষ্য, উম্মাহ্ যা সাধন করবে। এর চাইতে একটি নিম্নতরো চূড়ান্ত কারণ বা যুক্তি (এবং সে কারণে নিমিত্তস্বরূপ কারণ) হচ্ছে এই সত্য বা বাস্ত বতা যে, উম্মাহ্ই কল্যাণের দিকে আহ্বান এবং পুণ্যকর্মের নির্দেশ ও মন্দ কর্মের নিষেধ সম্ভব করে তোলে। উম্মাহ্ হচ্ছে মুসলিমের অধিকার ও কর্তব্যের উৎস এবং এ সংস্থার বা সংগঠনের মধ্যেই এসব অধিকার অর্জন ও কর্তব্য সম্ভব হতে পারে।</p>
<p>মহানবী (সা.) এই বিধান দিয়েছেন, &#8220;কোনো দেশে বা স্থানে তিনজন মুসলমান থাকতে পারেনা, তাদের মধ্যে একজনকে ইমাম বা নেতা নির্বাচন না করে। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে অধিকারসমূহ সংরক্ষণ, আল্লাহর নির্দেশাবলী কার্যকরকরণ, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, হুদুদ বা আইনের সীমা বাস্তবায়ন এবং এ পৃথিবীতে এ অন্যজগতের সুখ শান্তি পরিপূরণ, তাই তাদের জন্য নিজেদেরকে একটি উম্মাহ্ বা একটি সুসংবদ্ধ সমাজে সংগঠিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই- যে উম্মাহর থাকবে নিজস্ব সরকার<sup>১</sup>।</p>
<p>কেউ কেউ আপত্তি উত্থাপন করে বলতে পারেন, ব্যক্তিগত মূল্যসমূহের বাস্তবায়নের জন্য উম্মাহ্ আবশ্যক নয়। পক্ষান্তরে তারা এ দাবী প্রবলভাবে করতে পারে যে, মূল্য যেহেতু তখনই সর্বোচ্চ যখন তা গোপণ থাকে, তাই সমাজ এ ধরনের রূপায়ণকে নষ্ট করে দেয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের জবাব এই যে, এ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে একটি খৃষ্টান দৃষ্টিভঙ্গি। নিশ্চয়ই ইসলাম বক্তিগত মূল্যসমূহের তাগিদ দেয়, সমষ্টিগতভাবে যে মূল্যগুলোকে বলা হয় ইখলাস, (নিয়্যত, সিদক, ইবতিগা, ওয়াজহু আল্লাহ, তুহুর, আমানত ইত্যাদি), কিন্তু সমভাবেই ইসলাম সন্যাসব্রতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে (কুরআন ৫৬: ২৭)। এর অনন্যতা এখানেই যে, ইসলাম দাবী করে, কোনো ইখলাসই বিশ্বাসযোগ্য নয়, যদি না দেশ ও কালের মধ্যে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য কর্মরূপে প্রতিভাত হয় এবং সেই সঙ্গে সমগ্র সমাজের উপর তা ইসলামের তাগিদে রূপান্তরিত হয়। খ্রীষ্টান ধর্মে সমাজ ও রাষ্ট্র হচ্ছে সীজারের এলাকা (মসিহ ২২: ২৭, মার্ক ১২: ১৭, লুক ২০: ২৫), লিখিত সুসমাচারের শ্লোকের উপর ভিত্তি করে খৃষ্টান ধর্ম ঐতিহ্যগতভাবে এই বিশ্বাস করে এসেছে। সমাজের ক্ষেত্রে যাতে প্রাসঙ্গিক এবং ব্যবহার্য হতে পারে এজন্য খৃষ্টান নীতি-দর্শনের পরিসর বৃদ্ধির জন্য জোরে শোরে চেষ্টা শুরু হয় রিফর্মেশনের পরে থেকে এবং ক্যালভিনের মতবাদকে ধরে নেওয়া হয় আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে। কিন্তু এসবই সংখ্যাগুরু লোকজনের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং কখনো তা বিশ্বাসের অংশ হতে পারেনি, কেবলমাত্র তাদের নিজস্ব দলীয় মতবাদের অনুসারীদের দৃষ্টিতে ছাড়া। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের পর যখন মানুষের উপর শোষণ, নির্মমতা ও অধঃপতনের চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হলো, কেবল তখনি খৃষ্টান বিবেক জাগ্রত হয়, সামাজিক সম্পর্কে ও জন আইনের রূপায়ণের সঙ্গে খৃষ্টের প্রাসঙ্গিকতা সম্প্রসারিত করার জন্য। কেবলমাত্র গত বিশ, ত্রিশ বছরের মধ্যেই এবং প্রধানত রেসিজম, কম্যুনিজম এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ার ফলেই এই উদ্যোগ তখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠে। তা সত্বেও খৃষ্টান মন-মানসিকতা সরাসরি উম্মাহ্-সদৃশ একটি খৃষ্টান নীতি শাস্ত্রকে স্বীকার করে নেয়নি। যেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে খৃষ্টের আবশ্যিকতা অনুভূত হয় সেখানেও খৃষ্টের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে এ দাবী দ্ব্যর্থবোধক, কেননা, এ দাবী মতে, খৃষ্ট হচ্ছেন, পৃথিবীতে সিজারগণ যা করেন তার বিপরীত। এ কখনো সিজারগণের কি করা উচিত<sup>২</sup> সে বিষয়ে খৃষ্টকে কিছুই বলতে দেখেনা।</p>
<blockquote><p>ইসলামের সমস্ত কিছুই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং সবকিছুই ধর্মীয় নির্দেশের পরিসরের মধ্যে পড়ে। বস্তুত: উম্মাহ্ হচ্ছে সকল পুণ্যকর্ম ও নৈতিকতার অপরিহার্য শর্ত। এজন্যই আল্লাহ মুমিনদের বর্ণনা করেছেন <strong>&#8220;সেই সব নারী ও পুরুষরূপে যারা একে অন্যের রক্ষক- যারা একে অন্যকে সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দকর্মে নিষেধ করে&#8221; (পবিত্র কুরআন ৯:৭১)</strong>। আরো সরাসরি তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সৎকাজে এবং পুণ্য অর্জনে একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে (পবিত্র কুরআন ৫:৩)। অপরপক্ষে আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দেন মন্দকর্মে একমত না হতে এবং পরস্পরের বিরোধীতা করতে, অপরাধ বর্জন ও আগ্রাসন বন্ধের জন্য (পবিত্র কুরআন ৫:৩)। শিক্ষামূলকভাবে তিনি সেই সব লোককে, অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন, যারা তাদের মধ্যে, যে সব মন্দকর্ম চলছিলো একে অপরকে তা নিষেধ করেনি (কুরআন ৫:৭৯)। এজন্যই মহানবী (সা.) বলেছেন, <strong>&#8220;যেখানে মানুষ, যারা একটি মন্দকর্ম অনুষ্ঠিত হতে দেখে এবং তা পরিবর্তনের জন্য কোনো চেষ্টা করেনা- আল্লাহ তাদের উপর শাস্তি নাযিল করবেন।&#8221;</strong> এবং তিনি এ যুক্তিতে তার বিচারের ব্যাখ্যা করেছেন যে, পাপ বা মন্দ কর্ম যখন গোপনে করা হয়, তা যে মন্দকর্ম করে, কেবল তারই ক্ষতি করে, কিন্তু যখন তা প্রকাশ্যে করে এবং কেউ তা নিষেধ করে না, তখন তা সকলেরই ক্ষতি করে<sup>৩</sup>।</p></blockquote>
<p>উম্মাহর আরো যৌক্তিকতা পাওয়া যেতে পারে, নীতিশাস্ত্রীয় চেতনা এবং ব্যক্তিগত নীতিদর্শনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে। প্রথমটি থেকে এ তথ্য উদঘাটিত হয় যে, নৈতিক নির্দেশ হচ্ছে এমন একটি জিনিস যা কেবলমাত্র নৈতিকতার অধিকারী কারক বা কর্তা, প্রকৃতি ও অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের আওতার মধ্যে অবস্থান করে এবং তার নিজের জীবন যাপন করে, কেবলমাত্র তার থেকেই তা পাওয়া যেতে পারে, তার মধ্যেই ব্যবহৃত হতে পারে এবং কেবলমাত্র তার পটভূমিকাতেই তার মানে হতে পারে। আল্লাহর খেদমত হচ্ছে তাঁর ইচ্ছার বাস্তবাস্তবায়ন এবং ঐশী অভিপ্রায় যেহেতু সেই সব মূল্য বা মৌলনীতি, যা সবকিছুকে মূল্যবান করে তোলে, তাই এ থেকে এ সিদ্ধান্ত সূচিত হয় যে, মানুষকে যদি আল্লাহর বন্দেগী করতে হয় তাকে অবশ্যই আন্তঃমানবিক সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, যার মাধ্যমেই কেবল নৈতিক মূল্যগুলোর বাস্তব রূপদান সম্ভব। ঠিক যেমন উপযোগী কিছুই মূল্যসমূহের বাস্তব রূপদানের জন্য দেশকালে চৌহদ্দিভুক্ত পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি দেহ বিমুক্ত আত্মার আবশ্যকতা-অর্থহীন, ঠিক তেমনি নৈতিকতার বাস্তবায়ন মানুষের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য, বন্ধুত্ব, বিবাহ, পড়শী, জাগতিক দ্রব্যাদির উৎপাদন ও ভোগ, যুদ্ধ ও শান্তি, বিচার ও রায়, মিশন ও শিক্ষা, অবকাশ ও নান্দনিক উপভোগ ভ্রাতৃসম্পর্কের ব্যাপারে অন্য মানুষের সাথে সম্পর্কহীন একজন গৃহত্যাগী, সাধু সন্যাসীর কাছে প্রত্যশা করা যায় না। নৈতিক মূল্যগুলো হচ্ছে একটি অতিক্রমী-দিব্য অবস্থায় কতগুলো আদর্শ সার নির্যাস মাত্র, যদিনা সেগুলো এধরনের আন্তঃমানবিক সম্পর্কের মধ্যে বাস্তবে রূপায়িত হয়। নৈতিকতার পূর্বেই এসব সম্পর্ক স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং এগুলোকে বাদ দিয়ে নৈতিকতা অসম্ভব। এই সব সম্পর্কের প্রত্যেকটি অস্বীকৃতি বা প্রত্যাহারের মানে হচ্ছে এর প্রাসঙ্গিক মূল্যটি, অর্থাৎ যে মূল্যের সঙ্গে ঐ সম্পর্ক হচ্ছে ভিত্তিমূল বা বাহক, তাতেই অবাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ। একজন ব্যক্তি, সন্যাসী বা সাধু, যে নির্জন জীবন যাপন করে, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তার ভিত্তি হচ্ছে মূল্যের এলাকার অবচ্ছেদনের উপর। কেননা এ জীবন পরিচালিত হয় এ নীতির দ্বারা যে, সচেতনতা বা কর্তার খোদ-আত্মা যে মূল্যগুলোর বাহন, দৃষ্টান্তস্বরূপ তার অনন্যতা ও নির্জনতা, কেবল এগুলো নিয়েই মূল্যের জগতে গঠিত, অথবা এসবই হচ্ছে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, যার স্বার্থে অন্য সব মূল্য লংঘন করা যায়। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে অন্যান্য মূল্যের অস্তিত্ব বিষয়ে সুস্পষ্ট অন্ধতা, একটা জবরদস্তি মূল্যগত ও দ্বৈতবাদ বা বর্জনকর মতবাদ। শেষোক্তটি হচ্ছে অন্যান্য মূল্যের প্রকৃত চালিকা শক্তি সম্পর্কে সংবেদনশীলতা, তাদের স্তরবিন্যাস সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত, প্রকৃতপক্ষে যা মূল্যতাত্ত্বিক চূড়ান্ততারই অস্বীকৃতি। এতে বিষয়ের কিছু নেই যে, নিঃসঙ্গ প্রতিটি মানুষ, বিখ্যাত সাধু সন্যাসীগণ এবং ইতিহাস বিশ্রুত সন্যাসীগণ সকলেই কঠোর, অসংযমী এবং প্রায়শঃ নির্দয় জীবন যাপন করেছেন<sup>৪</sup>।</p>
<p>যখনই ব্যক্তিক অর্থে নৈতিক পরিসরের সংজ্ঞা দেওয়া হয়, এর অনিবার্য পরিণতি ঘটে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদে, যার যৌক্তিক সমাপ্তি ঘটে আত্মপ্রচারে। কারণ চূড়ান্ত বিশ্লেষণে অবশ্যই তা নির্ভর করবে নৈতিক কর্তার অভ্যন্তরীণ নির্ধারণসমূহ বা উপাদানগুলোর উপর, যার বিচারক কেবল তার নিজের বিবেকই হতে পারে। নৈতিক ব্যক্তি বা এজেন্ট কামনা করতে পারে সর্বোচ্চ এবং মহত্তম পরার্থবাদী আদর্শ। ইচ্ছা যে কারণে নৈতিক হয়ে উঠে তা ধারণার দিক দিয়ে ইচ্ছাকৃত উপাদানটির মহত্ব বা পরার্থপরতা নয়, বরং ইচ্ছা করতে গিয়ে তার নিজের বৃত্তি যেভাবে ব্যক্ত হয়েছে তার উপরই তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিগত যে অভ্যন্তরীণ প্রতিজ্ঞা নৈতিকতা গঠন করে, তার এই অগ্রাধিকার বা সংকীর্ণ বৈশিষ্ট্যই তাকে করে তোলে আত্মপ্রচারশীল, সর্বক্ষণ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। যদি এ দাবী করা হয় যে, নিজেকে নিয়ে আবিষ্টতার মূলেও রয়েছে পরার্থপরতার প্রবর্তনা, যেমন দেখা যায় আত্মঈপ্সিত দৃষ্টান্তের মধ্যে, একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, যেহেতু নৈতিক এজেন্টের আচরণ যতই প্রকৃতি এবং অন্য মানুষের সঙ্গে বেশী করে সংশ্লিষ্ট হবে, ততই তার নিজের কিংবা মানবজাতির আচরণ সম্পর্কে, যে দৃষ্টান্তের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, জড়িত না হয়ে সেই দৃষ্টান্ত অর্জনের প্রবণতা দেখা যাবে। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে সকল যুগের এবং জাতির দরবেশ এবং সংসারবিরাগী সাধুসন্তদের নৈতিক অভ্যন্তরীণ প্রতিজ্ঞার দৃষ্টিান্ত হচ্ছে এই সব দরবেশ ও সাধুসন্ত, যাদের মধ্যে দেখা যায় পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নৈতিকতার দ্বারা জগৎ বিমুখতা, জগৎ বর্জন ও দেহকে নিগ্রহর। এটি সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, ইসলাম একটি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের ধর্ম, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ধর্ম, প্রাত্যহিক এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জালের মধ্যে অবস্থান করে, একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং পরস্পর প্রভাবিত হয়, অন্য মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং অন্যেরাও তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে বাদ দিয়ে ইসলাম সম্ভব নয়। বস্তুতপক্ষে মহানবীর (সা.) মশহুর উক্তি, &#8220;ধর্ম হচ্ছে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যবহারের বিষয়&#8221;, হচ্ছে এ পৃথিবীতে অন্য মানুষদের বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবার ইসলামী প্রবণতার প্রকাশক<sup>৫</sup>। আমরা ইতিপূর্বে যেরূপ উল্লেখ করেছি, সমাজের জন্য &#8216;হাই ইবনে ইয়াকজানের&#8217; এই আকুতি প্রকাশিত হয়েছে, সত্য আবিষ্কারের পর এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে, সম্ভাব্য তার সকল সুখ ও আনন্দ লাভের পর<sup>৬</sup>।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>এক</strong> <strong>এবং</strong> <strong>একমাত্র</strong> <strong>উম্মাহ্</strong></h4>
<p>আল্লাহ বলেছেন, <strong>&#8220;তোমাদের এই উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ্&#8221; (কুরআনুল করিম ২১: ২৯, ২৩: ৫৩)</strong>। এই ঘোষণার দ্বারা আল্লাহ বলতে চেয়েছেন, মুমিনদের থাকবে একটি মাত্র উদ্দেশ্য, একটি ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ মূল্যমান যা, তাদের সমস্ত কর্মপ্রায়াসকে স্থাপন করে একটি সর্বপরিবৃত তাৎপর্যের অধীনে, যা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত। উম্মাহ্- এক এবং সবসময়ই তা একই থাকবে, কেননা আল্লাহ এক এবং তার ইবাদত এক ও অবিভাজ্য। কুরআন এবং মহানবীর সুন্নায় লিপিবদ্ধ এবং শরীয়ায় বাস্তবরূপে প্রতিফলিত, মানব জাতির জন্য আল্লাহর অভিপ্রায় সকল স্থানে এবং সকল সময়ে এক এবং অভিন্ন। তার অভিপ্রায় হচ্ছে সকল মানুষের জন্য এবং তার দৃষ্টিতে সকল মানুষ হচ্ছে সম্পূর্ণ সমান। তিনি বিশেষ কোন ব্যক্তি বা জাতির কাছ থেকে কম বা বেশী প্রত্যাশা করেন না, যা তিনি প্রত্যাশা করেন অন্য সকলের কাছে থেকে। তাই উম্মাহর এই একত্ব হচ্ছে ধর্মীয় এবং নৈতিক; জৈবিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক নয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহুদীদেরকে একটি উম্মাহ্ বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও তারা মুসলমানদের সঙ্গে একই অঞ্চলে বসবাস করতো এবং একই রাজনৈতিক, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক গ্রুপের অন্তর্গত ছিলো। যেহেতু তাদের আদর্শ ধর্মীয় এবং নৈতিক উভয়েই পৃথক, সে কারণে তিনি তাদেরকে একটি উম্মাহ্ বলে গণ্য করতেন। ইসলাম জীববিদ্যা, ভূগোল, রাজনীতি, ভাষা অথবা সংস্কৃতির ভিত্তিতে কোন উম্মাহ্ স্বীকার করেনা, কেবল ধর্মের ভিত্তিতে উম্মাহ্ স্বীকার করে। এজন্য আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সুপরিচিত ন্যাশান, জাতিগোষ্ঠী (race) রাষ্ট্র, মহাদেশ- এই স্তরবিন্যাসগুলো ইসলামে স্বীকৃত নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একথা বলার তাৎপর্য এ নয় যে, উম্মাত্র ধর্মীয় ঐক্য এধরনের ভিন্নতর ঐক্যগুলোর দ্বারা কার্যকর করা যায় না বা এগুলো পরিপূরক হিসেবে কাজ করেনা। স্থান ও ভূগোলের ঐক্য, ভাষা এবং সংস্কৃতির ঐক্য, জৈবিক জন্ম এবং জনগোষ্ঠীর ঐক্য, ধর্মীয় ঐক্যের সহায়তা করতে পারে এবং কার্যত করেও থাকে। <strong>&#8220;ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি হচ্ছে ঘনিষ্ঠতর আত্মীয় স্বজনেরা, মানুষের সৎকর্মে অধিকতর হকদার<sup>৭</sup>।&#8221;</strong> ইসলাম বলতে চায় যে, ধর্মীয় এবং নৈতিক উপাদানকে ডিঙিয়ে ব্যক্তি মুসলমান বা মুসলিম গ্রুপের আচরণ কিছুতেই দৈহিক নৈকট্যের দ্বারা নির্ধারিত হতে দেওয়া হবেনা। আল্লাহ বলেছেন, &#8220;আমি সকলকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ এবং এক রমণী থেকে এবং তোমাদেরকে ভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে ভাই-ভাই হিসেবে মেলামেশা করতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই হবে মহত্তম যে সবচেয়ে পুণ্যবান (কুরআনুল করীম ৪০: ১৩)। স্পষ্টতই দৈহিক নৈকট্যের স্থান, সৎগুণ ও নেক কর্মের নীচে, নৈতিক যোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত মেধার তুলনায় এর স্থান গৌণ, মূখ্য নয়।</p>
<p>তাই উম্মাহ্ জন্ম, ভূগোল এবং ভাষার বিষয় নয়। এগুলো হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা- নিরপেক্ষ এবং তজ্জন্য অপরিহার্য। একটি ধর্মীয় এবং ভ্রাতৃসমাজ হিসেবে উম্মাহ্ হচ্ছে ব্যক্তিবর্গের একটি স্বাধীন জামাত, যার লক্ষ্য, তাদের নিজেদের জন্য এবং মানব জাতির মধ্যে সকল মূল্যের জগত বাস্তবায়ন, যা ঐতিহ্যিক ইসলামী পরিভাষায়, &#8220;উভয় বাসস্থানে সুখ ও শান্তি, এ জীবনে এবং পরজীবনে।&#8221; মানুষ একটি অন্ধ সুযোগে উম্মাহর মধ্যে জন্মগ্রহণ করেনা, বরং একটি বুদ্ধিমান যুক্তিবাদী সত্ত্বা হিসেবে তার উম্মাহকে সে বেছে নেয় এবং তাতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। উম্মাহ্ একটি সম্প্রদায় নয়, একটি সমাজ; প্রকৃতিগতভাবে ইহা একটি সম্প্রদায় নয়, বরং স্বেচ্ছায় গঠিত একটি সম্প্রদায়, একটি সমাজ।</p>
<p>ঠিক প্রথম হিজরার পরে ইসলামী আন্দোলন যখন শুরু হল, সে সময়ে সম্প্রদায়ের সহজ রূপ, গোত্র এবং সাম্রাজ্য, যা জাতিগোষ্ঠী, ভাষা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপর স্থাপিত একটি রাজনৈতিক সমাজ, তার অস্তিত্ব ছিল এবং এগুলোর তরক্কি হচ্ছিল, ইসলাম উভয়কেই ধাক্কা দিয়ে ধূলিসাৎ করে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করে একটি বিশুদ্ধ সমাজ, ধর্মীয় ও নৈতিক বিধানের অধীনে একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং তাতে যোগদানের জন্য গোটা মানবজাতিকে আহ্বান করে। মানুষের সামাজিক ইতিহাসে এটি ছিল, এখনো রয়েছে মহত্তম নবধারা। <strong>এটা সত্য যে, সম্পূর্ণভাবে ধর্ম এবং নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে খৃষ্টান ধর্ম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে খৃষ্টানত্বের জন্য অপরিহার্য ধর্মীয় এবং নৈতিক উপাদানকে পর্যবসিত করা হয়েছে ন্যূনতম বিন্দুতে; অর্থাৎ ধর্মের অনির্বচনীয় পরীক্ষামূলক সাধনা এবং ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ের বিশুদ্ধতম নৈতিকতায়। এ উভয়ই ব্যক্তিগত, গোপন বা অভ্যন্তরীণ এবং এর সম্পাদন, বিচার ও মূল্যায়নের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ব্যক্তির বিবেক বুদ্ধির উপর এবং যে মুহূর্তে একে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ্য, সার্বজনিক বা সমাজভিত্তিক উপাদান অর্পণ করা হল, সে মুহূর্তেই রাজত্ব ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো এবং অংশত তা ফিরে গেল, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে স্থাপিত প্রাচীনতর সামাজরূপে।</strong> খৃষ্টান ধর্মের প্রথম দিকের বিভাগগুলো, যা ঘটেছিল নাইসিয়া এবং কেলসিডনে, প্রধানতই তা সংশ্লিষ্ট ছিল উচ্চতর মাত্রায়, এক দিকে সেমেটিক অন্যদিকে সাধারণ মানুষের গ্রীক, দল উপদলবাজীর মধ্যে। একইরূপে, ১০৫৮ খ্রীষ্টিয় শতকের মহামতবিভেদ ছিল প্রাচ্য বনাম প্রতীচ্যের মধ্যে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ষোল শতকের সংস্কার আন্দোলনে জার্মান, ইংরেজ, ফরাসী, ইতালীয়, ও ডাচদের জাতিগত প্রবণতাগুলোই, ব্যক্তিগতভাবে মনস্ত ত্বের দিক দিয়ে বিব্রত ক্যাথলিক সন্যাসী লুথার তাঁর আশ্রম গুরুদের কাছে যে ৯৫টি থিসিস উপস্থাপন করেছিলেন, সেগুলোর ফল নির্ধারণ করেছিল<sup>৮</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তাই ইসলামে উম্মাহর অভ্যন্তরে কোনো ধর্মীয় বিভেদ এবং কোনো নৈতিক স্বাধীনতা বা বিভাগ বৈধ নয়। উম্মাহর ধর্ম থেকে বিছিন্নতাও বেদাআত, কারণ ধর্মীয় ও নৈতিক অর্থে উম্মাহ্ হচ্ছে সন্দেহাতীত ভাবেই একটি এক শিলায় তৈরী স্তম্ভের মত ব্যবস্থা। এর বিপরীত কিছুতে বিশ্বাসের মানেই হচ্ছে এমন সব ধর্ম পালন ও এমন সব নৈতিক নীতি অনুসরণ যা ইসলাম থেকে ভিন্ন, স্পষ্টতঃই তা অযৌক্তিক এবং হাস্যকর। অধিকন্তু ইসলামের অভ্যন্তরে ধর্মীয় নৈতিক বিভিন্নতা অনুমোদন করার মানেই হচ্ছে তাওহীদকে পরিত্যাগ করা, যে তাওহীদ হচ্ছে সকল সত্য জ্ঞানের একত্বের মূলনীতি। এ হবে সত্যের প্রতি দুটি ভিন্ন দাবীর সহাবস্থান অনুমোদন করার নামান্তর। এই বিচার মোটেই যৌক্তিক নয়, কেননা এখানে যে সমস্যাটি বিরাজ করছে তা দাবী এবং প্রতিদাবীর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেতুবন্ধের মত বুদ্ধির সাহায্যে সত্যের অধিগম্যতার সম্ভাব্যতা মেনে নেওয়া, যার অর্থে দাবী এবং প্রতিদাবীর মধ্যে বিরোধের সমাধান হতে পারে এবং বিভিন্নতা দূর করা যেতে পারে। নিশ্চিতভাবে ইসলাম পরমসত্যের বহুত্বের বিরোধী, সত্য সম্পর্কে মতের বিভিন্নতার বিরোধী নয়। ইসলামের দাবী অনুসারে মতামত হতে হবে দায়িত্বশীল। ইসলাম নিজের পথ নির্ধারণে এ দায়িত্ব পালনের জন্য ইজমার ব্যবস্থা করেছে (ঐক্যমতের ব্যবস্থা করেছে)। ইসলামী আইন শাস্ত্রে উম্মাহর প্রত্যেকটি ঐক্যমতকে সৃজনশীল উদ্ভাবনশীল ব্যাখ্যাতা কর্তৃক লংঘন করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তৎসঙ্গে ইসলাম এ বিধানও দিয়েছে যে, ব্যাখ্যাকারকে এর জন্য উম্মাহর ঐকমত্য চাইতে হবে, অন্যথায় তা বেদাআত হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবে।</p>
<p>যাহোক, ধর্মীয় নৈতিক দিক দিয়ে উম্মাহ্ এক, একথা বলার তাৎপর্য এ নয় যে, উম্মাহ্ কোনো প্রশাসনিক বিভাগ স্বীকার করেনা। বস্তুত দক্ষতার প্রয়োজনে ও স্বার্থে, উম্মাহর মধ্যে যতগুলো প্রশাসনিক বিভাগ প্রয়োজন উম্মাহর অভ্যন্তরে ততগুলো বিভাগই  সম্ভব। শাফেয়ী মাযহাব রমাজানের প্রথম দিন নির্ধারণের জন্য ঈদুল ফিতর এর দিন নির্ণয়ের জন্য, এবং যাকাত তহবিলের বিতরণের জন্য ২৪ ফার্সাখ এর ইউনিট (১৯২ কিলোমিটার) স্বীকার করে<sup>৯</sup>। আজ সংগতভাবেই এ যুক্তি উত্থাপন করা যেতে পারে যে, যোগাযোগ টেকনোলোজিতে অসাধারণ উন্নতির ফলে সারা পৃথিবী একটি মাত্র প্রদেশ হয়ে উঠেছে। যাহোক জনপ্রশাসন কেবলমাত্র যোগাযোগের একটি বিষয় নয়। বলা যেতে পারে দক্ষতা ও সেবার দাবী অনুসারে উম্মাহ্ অবশ্যই বিভাজ্য।</p>
<p>এটা লক্ষ্য করতে হবে যে, উম্মাহর একটি বিভাগের মধ্যে প্রশাসনিক স্বায়ত্বশাসন সেই বিভাগকে আইন প্রণয়নের স্বায়ত্বশাসন দান করেনা। ইসলামে আইন প্রণয়ন একটি পূর্ণাঙ্গ ফিকাহ বা শরীয়ত দ্বারা শাসিত। এই পদ্ধতিতে সাধারণ নীতিমালাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের প্রয়োগ থেকে। সাধারণ নীতিমালার মধ্যে কোন পরিবর্তন স্বীকার করা হয়না, কারণ এ নীতিমালা আল্লাহ কর্তৃক জারীকৃত এবং যুক্তিগ্রাহ্য। মানুষের সৃজনশীলতার প্রয়োজন সেখানেই হয় যেখানে একটি নীতি বা মূল্যকে আচরণের নির্দিষ্ট মূর্ত নির্দেশে রূপদানের প্রয়োজন হয়। যাকে বলা যায় আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা দানের প্রয়োজন হয়, এবং প্রয়োজন হয় সেই সব নির্দেশনা পালন ও কার্যকর করণের। কেবলমাত্র মহানবীর (সা.) প্রদত্ত নির্দেশই আদর্শ, অবশ্য পালনীয়। ঐশী নির্দেশ অনুসারে তা ঘোষিত হয়েছে, &#8220;নবীর সুন্নাহর মধ্যে যে কেউ আল্লাহর সাহায্য চায়, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর আদর্শ (৩৩: ২১)।&#8221; অন্য সকলের জন্য প্রদত্ত ব্যবস্থা নির্দেশই হচ্ছে একটি মানবিক প্রয়াস, যাকে কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ হতে হবে এবং উম্মাহর ঐক্যমতের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।</p>
<p>উম্মাহর যে কোন প্রশাসনিক বিভাগের সৃজনধর্মী প্রয়াস, তার নির্দেশনার ক্ষেত্রেই হোক অথবা কার্যকারণের বেলায়ই হোক তা ইসলামিক আইনে একটি তর্কের বিষয়; এই আইনের বৈধতা সম্পর্কে পৃথিবীর মুসলমানদের প্রত্যয়ী করে অথবা মুসলিম বিশ্বের জনমত যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে, এবং বিতর্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন তা বর্জন বা পরিবর্তন করে এই প্রয়াসকে সার্বজনীনতা দান হচ্ছে প্রশাসনিক বিভাগের দায়িত্ব<sup>১০</sup>।</p>
<p>আমাদের কালকে বাদ দিলে, উম্মাহ্ তো সমগ্র ইতিহাসকালে ছিল একটি মাত্র শিলার দ্বারা তৈরী স্তম্ভের মত একটি ঐক্য; কেননা সব সময়ই তা এক বা অভিন্ন ইসলামী আইন দ্বারা শাসিত হয়েছে। রাজনৈতিক দিক দিয়ে কেবলমাত্র খোলাফায়ে রাশেদীন এবং উমাইয়া আমলে (১০-১৩১ হিজরা/৬৩২-৭৪৯ খ্রীষ্টিয় সন) উম্মাহ্ ঐক্যবদ্ধ ছিল, একটি অধি-রাজত্বের অধীনে, এর ইতিহাসের বাকি সময়টুকুতে ১২০০ বছরেরও অধিক কালের মধ্যে উম্মাহ্ বিভক্ত হয়ে পড়েছে বহু রাজনৈতিক বিভাগে; কিন্তু আইনের একত্ব ছিল তার চেয়ে দৃঢ়তর। এই আইন মুসলিম বিশ্বকে দিয়েছে তার বিভিন্ন অনুষ্ঠান, তার নৈতিক, ভিত্তি, এর জীবনে, এবং সংস্কৃতির রীতি ও ভঙ্গি, সকল জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মুসলমানদেরকে এই আইন এক এবং অভিন্ন আদর্শে শিক্ষাদান করেছে এবং একই আদর্শে নিবেদিত একটি ভ্রাতৃ সমাজের মধ্যে তাদেরকে সংহত করেছে। ইসলামী আইনের অভিন্নতা ও একত্ব, ইসলামের ইতিহাসের চৌদ্দশ&#8217; বছরের খণ্ডন ও বিচ্ছিনতার আশংকা মোকাবেলা করেছে সাফল্যের সঙ্গে, তৎসঙ্গে বৈদেশিক শক্তির বিজয়কেও ঠেকিয়েছে। যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যেতে পারে, বিশ্বব্যাপী মুসলিম ঐক্যের সর্বাগ্রবর্তী শক্তি এবং মেরুদন্ড উভয়ই হচ্ছে শরীয়ত, এই সত্য ও বাস্তবতাই উম্মাহকে করে তুলে একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃসমাজ, যেখানে সকল মানুষই হচ্ছে তার সদস্য, মূলত জন্মগতভাবে এবং কার্যত এই আইন বিশ্ব ভ্রাতৃসমাজে প্রবেশ করার স্বাধীন ব্যক্তিগত নৈতিক সিদ্ধান্তের বদৌলতে<sup>১১</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>উম্মাহগত</strong> <strong>ঐক্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>সংহতির</strong> <strong>প্রকৃতি</strong></h4>
<p><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>সর্বব্যাপকত্ব</strong></p>
<p>এটা আশা করা যায় যে, ইসলাম যে জীবনের একটি সামগ্রিক সর্বব্যাপক ব্যবস্থা ও পদ্ধতি তা প্রমাণের কোন আবশ্যকতা নেই। ইসলাম পৃথিবীকে পবিত্র-অপবিত্র, পাক-নাপাক এই দুই ভাগে ভাগ করেনা, জীবনকে ধর্মীয় এবং ধর্ম নিরপেক্ষ বলে স্বতন্ত্র গণ্য করেনা। মানুষকে পৌরোহিত্য ও পৌরোহিত্য-বহির্ভূত শ্রেণীতে পৃথক গন্ডীভূক্ত করেনা। ইসলাম এ সকল বিভাগকে কৃত্রিম, অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক গণ্য করে। ইতিহাসের বিচারে এ সমস্তই অমুসলিম ট্রাডিসনের আওতাভুক্ত, খৃষ্টান ট্রাডিসনের অংশ ইস্পেরিয়াল রোমের সর্বশ্রেষ্ঠ সেবাদাস খৃষ্টান ধর্মের ট্রাডিশন। আর এই ইম্পেরিয়াল রোমেই খৃষ্টান ধর্মের জন্ম হয় ও তার অবয়ব নির্মিত হয়।</p>
<blockquote><p>বস্তুতঃ ধর্ম দর্শনের সঙ্গে ইসলাম প্রাসঙ্গিক অর্থাৎ পরাবিদ্যার সর্বোচ্চ নীতিমালার সঙ্গে যেমন ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা বিদ্যমান, তেমনি তা ব্যক্তিগত প্রাত্যহিক জীবনের ছোটখাট খুটিনাটির ক্ষেত্রেও তা প্রাসঙ্গিক। পবিত্র কুরআনেই আমরা সত্ত্বার দ্বৈতরূপের স্বীকৃতি পাঠ করি: বাস্তব সৃষ্টি এবং সীমাতিক্রমী স্রষ্টা, প্রকৃতি এবং মানবভাগ্য, মানুষের স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব সকল সৃষ্টির কারকত্ব, নিমিত্তত্ব এবং নমনীয়তা, বিশ্বজগতের নিয়ম শৃংখলাবদ্ধতা, সত্য ও মূল্যের একত্ব, এবং একই ভাবে আমরা পাঠ করি, অভিবাদনের জবাবে উৎকৃষ্টতর অভিবাদনের আদেশ (কুরআন ৪: ৮৫), কোন গৃহে প্রবেশের আগে, প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনার (কুরআন ২৪: ২৬-২৮), অন্যদের চিৎকার না করে মোলায়েম ভাষায় সম্বোধনের, (কুরআন ৩১: ১৯)।</p></blockquote>
<p>কুরআন এবং সুন্নাহ মিলিতভাবে আচার-আচরণ, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিক নীতিমালা এবং সমাজপদ্ধতির একটি পরিপূর্ণ ব্যবস্থা আমাদেরকে দিয়েছে। এটা সত্য যে, কুরআন আমাদেরকে সকল খুঁটিনাটি দেয়নি, কিন্তু দিয়েছে সকল মৌলনীতি এবং দৃষ্টান্ত হিসেবে কিছু খুঁটিনাটি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোন একটি বিষয়ে মর্মকে সুষ্পষ্ট করে তোলার জন্য, অন্য ব্যাপারের চাইতে বেশী খুঁটিনাটি দেওয়া হয়েছে এবং সুন্নাহও তাই করেছে। কিন্তু ইসলামের পবিত্র গ্রন্থের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আল্লাহ তায়ালা কিংবা তার নবী (সা.) যে সব খুঁটিনাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি, সেগুলোর বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও বিশেষ রূপদানের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মুসলমানদের উপর। নিশ্চয়ই মুসলমানরা যোগ্যতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেছে এবং সামগ্রিক আইন ব্যবস্থা বিশদরূপ তৈরী করেছে মানুষের ইতিহাসে, তেমনটি যা আর কোথাও হয়নি<sup>১২</sup>। এই সামগ্রিক ব্যাপকত্বের তাত্ত্বিক ভিত্তি এই স্বতঃসিদ্ধ যে, মানুষের প্রত্যেকটি কর্মের মধ্যেই নিহিত রয়েছে, কোন না কোন মূল্যের সম্ভাবনা, যেহেতু উম্মাহর লক্ষ্য হচ্ছে এই মূল্যের বাস্তবায়ন, তা থেকে এই সিদ্ধান্ত সূচিত হয় যে, যেখানেই এই বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে, সেখানেই উম্মাহ্ তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টিত হবে। এর তাৎপর্য এই যে, মানুষের প্রত্যেকটি কর্মকান্ডের ব্যাপারে উম্মাহর কিছু না কিছু বক্তব্য থাকবেই। যেহেতু ইসলামী আইন এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, তাই উম্মাহর কোন প্রশাসনিক বা বিচার বিষয়ক পরিসরের বাইরে কোন কার্যই পড়েনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>বৈষয়িকতা</strong> <strong>বা</strong> <strong>অন্তঃস্থিত</strong> <strong>বিষয়াদি</strong></p>
<p>যে কোন একত্বের সামগ্রিক প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিক বা বিমূর্ত হতে পারে। বস্তুত, ব্যাপকতা যত বেশী হবে, একত্ব ততই বেশী শরীরী হয়ে থাকে। এবং একটি সমগ্র ধর্ম বা বিশ্বদৃষ্টি কিংবা নীতিমালাকে কয়েকটি বিমূর্ত শব্দের মধ্যে পুরে দেওয়া যেতে পারে-যা সবকিছু বোঝাতে গিয়ে কিছুই বুঝায় না। ইসলামের সামগ্রিক ব্যাপকত্ব বৈষয়িকতা বা উপাদানকে বর্জন করে অর্জিত হয়নি। পক্ষান্তরে, এর মোকাবেলায় দাঁড় করিয়েছে নিরেট উপাদান অর্থাৎ নীতিসম্মত প্রতিটি বাঞ্ছিত বিষয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনগত ব্যবস্থা ও নির্দেশ এবং যেখানে বিষয়টি আইনের বহির্ভূত সেখানে দিয়েছে মানুষের কর্মকান্ডের প্রত্যেকটি এলাকা ও কর্মের দিশারী হিসেবে বিশেষ মূলনীতি (dicta)।</p>
<p>উপাদান বা আধেয় বর্জিত সামগ্রিকত্বের দৃষ্টান্ত বহু। হিন্দু অনুধ্যানী চিন্তাবিদ সূর্য্যের নীচে এবং সূর্য্যকে ছাড়িয়ে সমস্ত কিছুই বোঝান &#8216;ওম&#8217; শব্দ দ্বারা; আমাদের সুফী অনুধ্যানী অনুরূপভাবে &#8216;হু&#8217; শব্দ দ্বারা তা ব্যক্ত করেন। দার্শনিকদের জন্য সমস্ত কিছু বোঝায় এমন একটি ফর্মুলার দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া একটি আকর্ষণীয় ব্যাপার। অবশ্য দুঃখজনক সত্য এই যে, এ রকম এক স্বর বা ধ্বনি বিশিষ্ট মূল পরিভাষার প্রভাবে মানুষ, পুণ্যময় আধ্যাত্মিকতা থেকে শুরু করে সকল প্রকার পাপকর্ম এবং পৌত্তলিকতার পথে বিচরণ করেছে। হিন্দু এবং সুফী উভয়ই জানে এই পরিভাষা এধরনের বিচ্যুতি থামাবার শক্তি রাখে না। একইভাবে, যেখানে হযরত ঈসার প্রাথমিক লক্ষ্যই ছিল শিলীভূত নিষ্প্রাণ আইন সর্বস্বতা ভেঙ্গে ফেলা, অর্থাৎ ইহুদীদের আক্ষরিকতার উৎসাদন, সেখানে তাঁর শিষ্যরা যা স্থির করল তা মূলত নৈতিক এবং ঐশিক অন্তর্দৃষ্টিকে একটি পরম পদ্ধতিতে সঞ্চারিত করার প্রয়াস, যেখানে সমস্ত নৈতিকতাই অন্তর্গত মানসিক বিষয়। হিন্দুর পরাতাত্ত্বিক একমাত্র বুলি &#8216;ওম&#8217; স্থলে খৃষ্টানরা প্রতিষ্ঠিত করল লাভ বা প্রেম, যে নৈতিক শ্রেণীতে পড়ে সমস্ত কিছুই। অগাষ্টিনের &#8220;আল্লাহকে ভালবাস এবং তোমরা যা ইচ্ছা কর&#8221; হয়ে দাঁড়াল সকলের জন্য এক হিতোপদেশ, যা যে কোন ব্যক্তি, যে কোন উদ্দেশ্যের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য ব্যবহার করতে পারে।</p>
<p><strong>আমাদের অবশ্যই এ বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ হচ্ছেন ধর্মের একজন চমৎকার ইতিহাসবিদ, যিনি ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো জানেন এবং ধর্মের ত্রুটিগুলো প্রত্যক্ষ করেন। যার প্রমাণ মেলে কুরআনুল করিমের বহু আয়াতে। এজন্য এটা খুবই স্বাভাবিক যে, ইসলাম, যার আবির্ভাব হয়েছে ঐতিহাসিক ধর্মগুলোর সংস্কাররূপে, তাতে আল্লাহ আমাদেরকে কেবল এক বা একাধিক সাধারণ নীতি দান করেন নাই, বরং দিয়েছেন নৈতিকতার নির্দিষ্ট বিষয়স্বরূপ উপাদান বা আধেয় এবং বিশেষ আদেশ ও নিষেধ, যেখানে বিশেষ উপাদান বা আধেয় অনুপস্থিত সেখানে ইসলামের বিধান হচ্ছে অনুসন্ধান করে তা বের করা এবং প্রতিষ্ঠিত করা মানুষের কর্তব্য।</strong></p>
<p>স্পষ্টতই ইসলাম যেহেতু সামগ্রিক, এবং উপাদান বা আধেয়ের ধারক, তাই ইসলাম হচ্ছে এক শিলায় নির্মিত বিশাল স্তম্ভের মতই একক। এর লক্ষ্য হচ্ছে খুঁটিনাটি প্রত্যেকটি বিষয়ে সম্পূর্ণ একটি পদ্ধতি গড়ে তোলা, যাতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবন হবে নিয়ন্ত্রিত। অমুসলমানরা শরীয়ার সমালোচনা করেন, কারণ শরীয়াহ হচ্ছে সম্পূর্ণ (অর্থাৎ সামগ্রিক)<sup>১৩</sup>। তাঁরা ঠিকই বলে থাকেন, ইসলামের সামগ্রিকত্ব এবং আধেয়ত্ব এক সন্দেহাতীত বাস্তবতা, কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে ইসলাম ধর্মের বৈশিষ্ট্য, এর অনন্যতা ও মূল্যও।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৩</strong><strong>. </strong><strong>গতিশীলতা</strong></p>
<p>সংজ্ঞার দিক দিয়ে মনোলিথিক ব্যবস্থা হচ্ছে বর্জনধর্মী একটা ব্যবস্থা, যা চার দিক থেকে আবদ্ধ এবং বিদেশী অপরিচিত বা নতুন সকল উপাদানের ক্ষেত্রে রুদ্ধদ্বার, কোন কিছুকেই গ্রহণ করতে বা বুকে স্থান দিতে রাজী নয়। এই হচ্ছে প্রাচ্যবিদের শরীয়ার সামগ্রিকত্ব ও উপাদানের যে সমালোচনা করে থাকেন তার সারমর্ম। তারা বলে থাকেন, শরীয়াহ তার ইতিহাসের একটি একমাত্র প্রকৃত মহৎ মুহূর্তেই, অর্থাৎ যখন তা তার পূর্ণতায় পৌছেছিল তখনই, একটি পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে, তার লক্ষ্যে উপনীত হয়েছিল। যখন এই শীর্ষ বিন্দুতে সে পৌছল তখনই শুরু হয় অবক্ষয়, তার নিম্নগতি, কারণ এর মধ্যে নিজেকে বার বার পুনর্জীবিত করার যে শাশ্বত চরিত্র রয়েছে তাকে তা অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হবে। কিন্তু মনোলিথিক পদ্ধতি নতুন নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বদলাতে পারেনা এবং এজন্য তা অবশ্যই নতুন প্রবর্তনার বিরোধিতা করতে বাধ্য হবে এবং প্রত্যেকটি পরিবর্তনাই হচ্ছে &#8216;বেদায়াত&#8217;, এটিও একটি বৈধ সমালোচনা; কিন্তু সে সমালোচনা শরীয়ার সমালোচনা নয়, মুসলিম ফকীহ ও তাদের অনুসরণকারীদের সমালোচনা; যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই শরীয়ার বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। আসলে আমাদের মধ্যযুগের পূর্বপুরুষগণই ইসলামকে এই পথে তুলে দিয়েছিলেন। তারা ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দেন, এবং ঘোষণা করেন, প্রথম ইজমা হবে সালাফের ইজমা, (সালাফ মানে আদি প্রজন্ম), অর্থাৎ সাহাবাদের ইজমা, নবীর সহচরদের ইজমা, যাতে করে কোন বেদায়াত প্রবর্তিত হতে না পারে। আজ আমরা তাদের সময়ের প্রয়োজন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পারি এবং তাদেরকে ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু আজকের মুসলমানদের জন্য তাদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ হাস্যকর।</p>
<blockquote><p>ফিকাহ্-উসুলের যে সব পন্ডিত মধ্যযুগে শরীয়াহ-এর স্পষ্ট রূপদান করেছিলেন এবং তাকে উন্নীত করেছিলেন পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে তারা এর মধ্যে আইনের স্বয়ংক্রিয় নবরূপ অর্জনের সূক্ষ্মতম যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করতে যত্নবান ছিলেন<sup>১৪</sup>। তারা মুসলমানদের দিয়েছিলেন সহীহ আইন এবং তার সঙ্গে দিয়েছিলেন তাকে নতুন রূপদানের প্রতিষ্ঠান ও উপায়সমূহ, এবং তা যতোটা সহীহ ছিল তার চাইতে তাকে আরো নিখুঁত করতে অথবা সকল সময় ও সকল কালের জন্য আইনের এই সম্পূর্ণতা প্রাসঙ্গিকভাবে যাতে কার্যকর হতে পারে তা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছেন। আধুনিক কালে স্বল্প কয়েকটি প্রয়াস ছাড়া মুসলমানরা শরীয়াহ-এর নবায়নের এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটির কোন ব্যবহারই করেনি (অর্থাৎ ইজতিহাদ, কিয়াস, ইজমা, ইসতিহসান, আল মাসালিহ, আল মুরসালাহ ইত্যাদি)। সেই যন্ত্রটির বিশ্লেষণের স্থান এটি নয়, তবে যে তত্ত্বগত বুনিয়াদের উপর তা দাঁড়িয়ে আছে তা অবশ্যই বিচার করে দেখতে হবে।</p></blockquote>
<p>ইসলাম হচ্ছে সোনালী মধ্যপন্থার ধর্ম: &#8220;এবং এভাবে আমি তোমাদেরকে (মুসলমানদেরকে) করেছি উত্তম মধ্যপন্থী উম্মাহ যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য হতে পার প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের জন্য প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত&#8221; (কুরআন ২: ১৪৩)। এই নীতি বিশেষ এবং নির্বিশেষ, বিশ্বজনীন এবং নির্দিষ্ট বিশেষিতেক ও উপাদানপূর্ণ, মনোলিথিক, এবং বহুমুখী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং বিশেষাত্মক উভয়ই, এবং ইহাই এর শক্তি। ইসলাম আমাদেরকে দিয়েছে সাধারণ আইন এবং তার সঙ্গে আমাদেরকে অনুমতি দিয়েছে যেখানে প্রয়োজন সেখানে তা ভঙ্গ করতে। অর্থাৎ যখন সাধারণ আইনে বিধৃত একটি মূল্যকে অনুসরণের ফলে, একটি উচ্চতর মূল্য লংঘিত হয়, চুরি, নরহত্যা, শূকর মাংস ভক্ষণের বিরুদ্ধে কুরআনের নির্দেশমালা, সালাত, রোজা, পিতামাতার জন্য সম্মান, এমনকি হজ্জ সম্পর্কে কুরআনের বিধানসমূহ এসবই এবং আরো বেশী ক্ষেত্রে লংঘন করা যেতে পারে, যখন এই আদেশ নির্দেশের পালন একটি উচ্চতর ইসলামী মূল্যকে লংঘন করে অথবা এধরনের মূল্যের বাস্তবায়নকে বিঘ্নিত করে। <strong>কেবলমাত্র যে নীতিটির ক্ষেত্রে ইসলামে কোন ব্যতিক্রম নেই, তা হচ্ছে তাওহীদ। &#8220;আল্লাহ শিরকের অপরাধ কখনো ক্ষমা করেননা, কিন্তু যাকে ইচ্ছা তিনি এর চাইতে কম গুরুতর যে কোন পাপ ক্ষমা করে দেন&#8221; (কুরআন ৪: ৪৭)। ইসলামের আদেশ- নির্দেশের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের অবকাশের মধ্যেই রয়েছে ইসলামের গতিশীলতা। যদি বিগত শতকগুলোতে মুসলমানরা এই চাবিগুলো ব্যবহার না করে নিজেদেরকে বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করে রেখে থাকে, এ জন্য কেবল মুসলমানদেরকেই অপরাধী সাব্যস্ত করতে হবে, আর কাউকে নয়। এছাড়া আর কোনো নীতিই চূড়ান্ত ও অলংঘনীয় নয়, ইসলাম হচ্ছে ভারসাম্যের ধর্ম।</strong> যেমন তা শিল্পের ক্ষেত্রে, সাহিত্যসহ এর সকল শিল্পের বেলায় যা গড়ে উঠেছে তাওয়াজুন (ভারসাম্য) এর এই নীতির উপর, তার খোদ মূল্যতত্বই হচ্ছে পরস্পরবিরোধী দুটি মূল্যের সূক্ষ্ম মিশ্রণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য স্থাপন। ইবনে তাইমিয়া কি সুন্দর করেইনা তাঁর আল সিয়াসা আল শরীয়াতে বলেছেন &#8220;ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম, যে বেশী করে এবং যে কম করে, তাদের মধ্য স্থলে যার অবস্থান।&#8221; এই গুণটিই নিজেকে দ্বীনিউল ফিতরাত (আল্লাহর দ্বীন, স্বভাব ও যুক্তির দ্বীন, ভারসাম্যের দ্বীন এবং সোনালী মধ্যপন্থা) বলে দাবী করার যোগ্যতা দান করে ইসলামকে। ইসলামের এই তাওয়াজুন তথা ভারসাম্য সোনালী মধ্যপন্থা এবং গতিশীলতার একটি অতুলনীয় অভিব্যক্তি।</p>
<p>আমরা দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহর (সা.) জবাবে যখন, ইসলামের একটি উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কিছু সংখ্যক লোক তাঁকে বলেছিলো, &#8220;এখন থেকে আমরা আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি দিন রোজা রাখবো, সরারাত বন্দেগী করবো এবং আমরা কখনো আমাদের স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করবোনা&#8221; মহানবী তখন বললেন, &#8220;কিন্তু আমিতো বছরের কিছু সংখ্যক দিনে রোজা রাখবো, বাকি দিনগুলোতে খাওয়া দাওয়া করবো। আমি ইবাদত করবো এবং নিদ্রাও যাব, এবং আমি স্ত্রীলোকদের বিবাহ করবো, যারা আমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে চাইবে না তারা আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য হবেনা।” তালিকা করা যায়না এমন বহুসংখ্যক আয়াতে কুরআন আমাদেরকে বলেছে, সেই সব মূল্যগত উপাদানের মোকাবেলায় যুক্তিগ্রাহ্য কান্ডজ্ঞান হিসেবে ইসলামের সারমর্ম- যে উপাদানগুলোর মধ্যে কল্যাণ এবং অকল্যাণ উভয়েরই সমান সম্ভাবনা, পৃথিবীর সকল শুভ বস্তুই এর মধ্যে পড়ে<sup>১৫</sup>। কুরআন এরমাত্র কয়েকটি উল্লেখ করেছে &#8220;যেমন রমণী, শিশু, স্বর্ণ-রৌপ্য, অশ্বরাজি, গৃহপালিত জীবজন্তু এবং ক্ষেত খামার।&#8221; এবং এভাবে মানবমনে পৃথিবীর সঙ্গে যে সবের সম্পর্ক তখন ছিলো এবং এখনো সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট রয়েছে, সেগুলোকে একত্রিত করেছে (৩: ১৪)। বহু সংখ্যক আয়াতে এগুলো অমঙ্গলকর বলে ঘোষিত হয়েছে এবং মুসলমানদেরকে এসব সম্পর্কে হুশিয়ার করে দিয়েছে। অথচ (৭: ৩১) আয়াতে এগুলো ঘোষিত হয়েছে কল্যাণকররূপে এবং এসব অর্জনের জন্য মুসলামনদের প্রয়াসকে সমর্থন করা হয়েছে। মূল নিয়ামক নীতিটি দেওয়া হয়েছে (৯:২৫) আয়াতে, যেখানে তিরস্কার করা হয়েছে ভ্রান্ত শ্রেণীবিভাগকে, আল্লাহ ও তাঁর নবীর উপর এ শ্রেণীবিভাগকে, মানুষ কর্তৃক প্রাধান্য দানে আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মনিয়োগের উপরে। স্পষ্টতই সোনালী মধ্যপন্থার মানে হচ্ছে দুটি অ-মূল্যের মধ্যবর্তী পন্থা; কিন্তু তা এক এবং অভিন্ন মূল্যের অনুসরণের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্য যার মধ্যে সমন্বয় ঘটে, অন্য সকল মূল্যের নয়, যা প্রত্যেকটিকে দেয় তার যথোচিত প্রাপ্য<sup>১৬</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৪</strong><strong>. </strong><strong>আঙ্গিকতা</strong></p>
<p>উম্মাহর ঐক্য হচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় একটি জীবদেহের ঐক্যের মত; অর্থাৎ উম্মাহ্ হচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় একটি দেহের মত যার প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে অন্যের সঙ্গে এবং সমগ্রের উপর পরস্পর ও আলাদা আলাদাভাবে নির্ভরশীল। একটি অঙ্গ যখন নিজের কাজ করে, তখন তা যেমন অন্যান্য অঙ্গের জন্যও কাজ করে, তেমনি তা নিজের প্রয়োজনে সমগ্রের জন্যও কাজ করে। উহা যখন নিজের কাজ করে, তখন ইহা বিভিন্ন অঙ্গের প্রত্যেকের জন্য কাজ করে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সফলকাম বলে বর্ণনা করেছেন,<strong> &#8220;যাদের সম্পদে তারা অভাবগ্রস্থ ও বঞ্চিতের অধিকার স্বীকার করে&#8221; (৫:১৯)</strong>। এবং মহানবীর উম্মতদের বর্ণনা করেন এভাবে যে <strong>&#8220;তারা অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে কঠোর, কিন্তু নিজেদের বেলায় একে অন্যের প্রতি কোমল ও দয়ালু; এ এমন একটি ভ্রাতৃসমাজ যাতে আল্লাহকে কেন্দ্র করে একে অন্যের প্রতি পারস্পরিক ভালবাসার দ্বারা তাদের হৃদয় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে&#8221; (৪৮:২৯)</strong>। মহানবী (সা.) মোক্ষম কথা বলেছিলেন, যখন তিনি উম্মাহকে বর্ণনা করেন <strong>&#8220;একটি সুস্থিত সংহত ইমারতরূপে, মজবুত ইমারতরূপে, যার প্রত্যেকটি অংশ অন্য সকল অংশকে ধরে রাখে, মজবুত করে এবং তাকে তুলনা করেন একটি দেহের সঙ্গে যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে সমস্ত দেহই নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে কাতর হয়।&#8221;</strong> উম্মাহকে একটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় জীবন্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, এই শেষ হাদীসটিতে, যা সম্ভবত ইসলামী সমাজের সবচেয়ে যথোচিত বর্ণনা। অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় দেহ হচ্ছে জীবন্ত এবং বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ নিয়ে এর অস্তিত্ব হচ্ছে এর সত্যিকার জীবন। অর্থাৎ সমগ্র দেহকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যেঙ্গের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সমগ্র কর্তৃক অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোর নিরবচ্ছিন্ন লালন পালনের মধ্যেই এই জীবন্ত দেহের জীবন নিহিত। অঙ্গময়তা বা আঙ্গিকতা জীবনের কেবল একটি গুণমাত্র নয়, বরং এটিই জীবন। উম্মাহ্ যদি এই বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে অন্যকিছু হতে চায়, তাহলে তা আবার ফিরে যাবে মরুভূমির ইসলাম-পূর্ব গোত্রবাদে। এমনকি সেই ব্যবস্থাও গোত্রের অঙ্গময়তার ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত, কারণ এই অঙ্গময়তা বাদ দিয়ে এর অস্তিত্ব সম্ভব ছিলনা; গোত্রের এ ধারণাকে কেবলমাত্র সম্প্রসারিত করা হয়েছে যাতে সমগ্র মানবজাতি তার আওতায় আসতে পারে। তাই এই অঙ্গময়তাকে বা উম্মাহর প্রয়োজনকে অস্বীকার করার মানেই হচ্ছে ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বকে শুভ মনে করা। এমনভাবে তাদের পরস্পর বিচ্ছিন্ন বলে মনে করা, যার ফলে, কেবল যে ইসলামই অসম্ভব হয়ে পড়ে তা নয়, বরং সমভাবে সভ্যতা, প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষের জীবনই অসম্ভব এবং অচিন্ত্যনীয় হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে নিয়ে অতি বাড়াবাড়ি করা যেতে পারে, কারণ এই নির্ভরশীলতাকে বাড়িয়ে এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছুনো যেতে পারে, যেখানে একটি বৃহত্তর অঙ্গ বা যন্ত্রের চাকার কেবল একটি খাঁজ বা দাঁতে পরিণত করা যেতে পারে মানব ব্যক্তিকে, যাতে সেই খাঁজে, তথা ব্যক্তির নিজের বিকাশে আত্মপূর্ণতা এবং সুখের কোন অবকাশই থাকেনা। গোত্র প্রাধান্যের মানেই হউক কিংবা নগর, জাতি অথবা বিশ্বসম্প্রদায়ের জমানাই হউক, রেজিমেন্টেশন এবং যৌথখামার ও মালিকানা প্রথার অভিশাপ সব সময়ই মানুষের চেতনায় একটি দুর্বহ পাষাণ ভারের মত চেপে বসেছে। এখানেও আবার ইসলাম তাওয়াজুন অর্থাৎ সোনালী মধ্যপন্থার ব্যবস্থা দিয়েছে এবং তা ব্যক্তি ও গ্রুপ উভয়েরই সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য বলে ঘোষিত হয়েছে। খ্রীষ্টান ধর্মের চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ এবং ইহুদী ধর্ম ও ইসলাম-পূর্ব চূড়ান্ত গোত্রবাদের মধ্যে ইসলাম প্রকৃত প্রস্তাবে একটি মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সুবিস্তৃত পরিসরের মধ্যে, মধ্যবর্তী স্থলে উভয় মূল্যের অবস্থিতি ঘোষণা করে এবং সেই পরিসরের শেষ প্রান্তের অ-মূল্যকে অস্বীকার করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঘ</strong><strong>. </strong><strong>সম্ভাবনা</strong></p>
<p>উপরে বর্ণিত এধরনের একটি উম্মাহ্ যে কেবলই সম্ভব তা নয়, বলতে গেলে এই হচ্ছে ইতিহাসের সফলতার একমাত্র শর্ত। এই উম্মাহর নীতির কোন না কোনটিকে বাস্তবায়িত না করে কোন সমাজ এবং কোন ধর্মই, কোন গোত্র এবং কোন রাষ্ট্রই, কোন সাম্রাজ্য এবং কোন ইতিহাসই কখনো সৃষ্টি হয়নি, বা সফল হয়নি। উম্মাহর মৌলনীতি যত বেশী অনুসৃত হয়েছে তত বেশী এবং তত স্থায়ী হয়েছে এই বাস্তবায়ন। উম্মাহর আদর্শ যত কম অনুসৃত হয়েছে, সাফল্য হয়েছে তত বেশী সাময়িক বা ব্যর্থতা হয়েছে তত বেশী বৃহৎ। এমনকি খোদ শয়তানের সাফল্যের জন্য উম্মাহর নীতিমালা একটি নিশ্চয়তা, যদিও তা সাময়িক। যদি শয়তান এবং তার বাহিনী উম্মাহর আদর্শের প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করে সে এবং তার বাহিনী অবশ্যই সফল হবে, যদিও মানবজাতির ইতিহাসে তাদের সাফল্য চূড়ান্ত বা সিদ্ধান্তমূলক হতে পারেনা। জায়নবাদীরা যেমন সফল, ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলা, যাদের অধীনে স্পেনীয়রা আমাদেরকে বহিষ্কার করেছিল তারাও সফল, স্পেন থেকে তারা এবং ব্রিটিশ, ফরাসী, ইতালীয়, ডাচ ইত্যাদি যারা আমাদের দেশকে আমাদের ভূমিকে কলোনী বানিয়েছিল, এমনকি হিংস্র তাতাররা যারা লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল এবং আমাদের মহত্তম এবং বৃহত্তম নগরীগুলোকে ভষ্মীভূত করেছিল, তারা সকলেই সফল হয়েছিল, কারণ, তারা ছিল বা রয়েছে অধিকতর উম্মাহপন্থী, অতীতের কিংবা বর্তমান কালের মুসলমানদের থেকে অনেক বেশী। এখানেই আমাদের দুর্বলতা, আধুনিক সাহিত্যে বারবার এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, &#8220;এর কারণ কি? যখন কোন মুসলমান &#8216;ওয়া ইসলামা&#8217; বলে চিৎকার করে, কেউই সাড়া দেয়না?&#8221; এর জবাব হচ্ছে আমাদের মধ্যে উম্মাহর অনুপস্থিতি, উম্মাহ্ ব্যবস্থার ধারা এবং মৌলনীতিগুলোকে পূরণ করার ব্যাপারে আমাদের ব্যর্থতা।</p>
<p>কাজেই, অনিবার্য প্রশ্নটি হচ্ছে এই, কি করে আমরা মুসলমানদের মধ্যে উম্মাহর আদর্শ সৃষ্টি করবো? উম্মাহ্ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ধরে নিয়ে এবং উম্মাহর শিক্ষা তথা ইসলামী আদর্শ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান রয়েছে একথা স্বীকার করে নিয়ে আমরা বাস্তব প্রশ্নটির মোকাবেলা করতে পারি। উম্মাহর লক্ষ্যকে ক্রমান্বয়ে কি করে আমরা কার্যকর ও প্রসারিত করতে পারি, প্রশ্নটি যতই বাস্তব হউক, এই প্রশ্নের উপরই সুফীগণ তাদের সমস্ত প্রতিভাকে নিঃশেষ করেছিলেন চূড়ান্ত লক্ষ্য বিস্মৃত হয়ে। ইবনে বা&#8217;জা এদের এই ভুল ধরতে পেরে লিখেছিলেন গবেষণা-মূলক গ্রন্থ &#8216;রিসালাত তাদবির আল মোতাওয়াহদ&#8217; যার জন্য, চিন্তাধারার ইতিহাসবিদ হিসেবে আমরা উদ্ভাবন করতে পারি একটি পরিভাষার &#8220;সমাজভিত্তিক সুফীবাদ&#8221;। আধুনিক কালে সেনুসিয়াহ আন্দোলন এই ধরনের উম্মাহভিত্তিক সুফীবাদের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছিল।</p>
<p>দুই, মুসলমানের মধ্যে উম্মাহর সামগ্রিক একাত্মতাবোধ, কী করে আমি সৃষ্টি করতে পারি, সে প্রশ্ন তো আসলে দু&#8217;জনের মধ্যে কী করে আমি একটি রাসায়নিক মিলন সৃষ্টি করতে পারি, তা জিজ্ঞাসা করা। এধরনের রাসায়নিক সম্পর্কের ফলই হচ্ছে &#8216;তাহাবুব&#8217; (পারস্পরিক ভালবাসা) &#8216;আত্ তাওয়াসী&#8217; ওয়া আততানাহী&#8217; (পরামর্শদান) &#8216;আততায়াখী&#8217; (ভ্রাতৃসম্পর্ক স্থাপন) আততাওয়াউন (সহযোগিতা) আততায়ালুমস (শিক্ষাদান) আততাজাউয (মেলামেশা), আত্ তাওয়াসী (শান্তনাদান), আত্ তাসাদুক ওয়া তাত্তানউস (বন্ধুকরণ), কী ধরনের ক্রিয়া এবং নিষ্ক্রীয়তা, বাস্তবতা অথবা অবাস্তবতা, কর্মতৎপরতা অথবা নিষ্কর্মতা, উম্মতের এই বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে, যা একবার অস্তিত্বে এলেই, এই মূল্যগুলো সূচিত হবে এবং এভাবে উম্মাহর জন্ম হবে। সংক্ষেপে দুই বা ততোদিক ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিভাবে এই পারস্পরিক ভালবাসা সৃষ্টি করা যেতে পারে, ইহাই প্রশ্ন। মানুষের মধ্যে এ রূপান্তর সৃষ্টি করা মানুষের কাজ নয়, বরং আল্লাহর দায়িত্ব, কুরআনের শতাধিক আয়াতে যা ঘোষিত হয়েছে<sup>১৭</sup>, কারণ শ্রেয়র দিকে যে কোন রূপান্তর ও উম্মতের ধারণার দিকে যে কোন উন্মুখতার তিনিই হচ্ছেন গ্রন্থকার। এক্ষেত্রে মানুষ যা করতে পারে, তা হচ্ছে তার প্রস্তাবনার সামর্থ্য অর্থাৎ বাস্তব ও বৈষয়িক প্রেক্ষিত সৃষ্টি করা, যার মধ্যে ঐশী উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। ইহা নিশ্চয়ই সম্ভব যে, ঐশী কর্মের জন্য এধরনের মানসিক প্রস্তুতি কখনো কোন ফল উৎপাদন নাও করতে পারে। কিন্তু একথা সেক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যেখানে মানবিক উদ্যোগ হচ্ছে স্পর্ধিত, অবজ্ঞাপূর্ণ এবং নিজের সমৃন্ধে অযথাই অতি আস্থাবান, কিন্তু যখন এই উদ্যোগ মিশ্রিত হয় ঐশী ক্ষমতার বিনীত স্বীকৃতির সঙ্গে, তখন তা সফল না হয়ে পারেনা। অন্যথায় যে কোন মানবিক ক্রিয়ার জন্য ঐশী আদেশ অসার হয়ে পড়ে এবং একইভাবে তা হয়ে দাঁড়ায় অহংকৃত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা তাহলে আমাদের প্রশ্নটিকে নতুন করে গঠন করতে পারি। ঐশী উদ্যোগের জন্য কি বিশেষ কর্ম বা পরিস্থিতি, বস্তুগত প্রেক্ষিত বা পটভূমিকা হতে পারে? এখানে একমাত্র সম্ভাব্য জবাব এই যে, এই মানুষগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হবে- আল্লাহকে স্বীকার করবে এবং একত্রে তার ইবাদত করবে, যুগ্মভাবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সন্ধান করবে, একত্রে স্পর্শগ্রাহ্য সুনির্দিষ্ট ফলের জন্য কাজ করা ও তা অর্জন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে খাওয়া দাওয়া উৎসব করা, উপভোগ করা এবং নিজেদের মধ্যে বিয়ে-শাদী করা। যদি এই কাজগুলো সম্পাদিত হয় অকপটে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যতাড়িত না হয়ে, তাহলে এ বিশ্বাস নিশ্চয়ই করা যায় যে, এগুলো সৃষ্টি করবে উম্মাহর বন্ধন। অন্য কোন পন্থায়ই এ বন্ধন সৃষ্টি করবেনা। অনুমেয় যে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ে ইসলামী সমাজের বৈঠক ও জলসাগুলোর পদক্ষেপ এই লক্ষ্যেই; বিশ্বব্যাপী ইসলামী সংঘ, সমিতি ও কেন্দ্রগুলোর জুমার জামাতগুলোও তা-ই। অবশ্য এখন পর্যন্ত এসবই খন্ডিত, অনিয়মিত, বিরল, অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং অসম্পূর্ণ। আমরা এখন পর্যন্ত যা করতে পেরেছি তার চাইতে অনেক বেশী করা আমাদের জন্য আবশ্যক অর্থাৎ উম্মাহর জলসা ও জামাতগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান।</p>
<p>এই উদ্দেশ্যে এই পরামর্শ দেওয়া যাচ্ছে যে, যে কোনো মুসলিম যে নিজেকে নেতৃত্বের জন্য সম্ভাবনাপূর্ণ মনে করে, যে ইসলামের প্রতি এমন একটি অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে গণ্য করে, যা তার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক স্বার্থকে অতিক্রম করে যায়, সে একজন আমিল হবে। (একজন প্রতিষ্ঠাতা, একজন সংগঠক urwah wuhqa এর নেতা [১০ জন বয়স্ক মুসলমানের একটি জামাত, যাতে তার পরিবারের লোকজনও থাকবে।] একটি urwah wuhqa এর একটি উদ্দেশ্য এবং একটি শর্তই হচ্ছে ইসলাম। আমেল ১০ জন সদস্যকে চিহ্নিত ও আহ্বান করে, সে এই ১০ জনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একে অন্যের মধ্যে যোগাযোগের এবং নিজেদের ও উম্মাহর বৃহত্তর সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আমিল তার নিজের উরুয়াতে শুক্রবারের মাগরিবের জামাতের ব্যবস্থা করে যেখানে তিন থেকে চার ঘন্টা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের প্রশিক্ষণ চলে। অপরিহার্যভাবেই এই সান্ধ্যজামাতের অন্তর্ভুক্ত থাকে এশার সালাতের জামাত, কুরআনের কিছু অংশের পঠন, ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিষয় আলোচিত হয় এবং শেষ পর্যায়ে কিছু খাবার ব্যবস্থা করা হয় ও সামাজিক আদান প্রদান হয়। এই চারটি আইটেমই সম্পূর্ণ আবশ্যক। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে তার মধ্যে যেন কোন কাঠিন্য এবং একঘেঁয়েমী না থাকে। কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামী জ্ঞানের অনুশীলন, খাদ্য এবং সামাজিক আদান-প্রদান এই শেষোক্ত তিনটি আইটেম আনুষ্ঠানিক সালাত বাদ দিলে, হতে পারে অসংখ্য রকমে বৈচিত্র্যপূর্ণ। যত শীঘ্র সুবিধাজনক এবং সম্ভব সান্ধ্যজামাত অনুষ্ঠিত হবে অপর একজন সদস্যের গৃহে। এভাবে প্রত্যেক সদস্যের বাড়ীতে সান্ধ্যজামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় যখন একটি নির্দিষ্ট উরুয়ার প্রত্যেক সদস্যের বাড়ীতে পর্যায়ক্রমে সান্ধ্যজামাত অনুষ্ঠিত হয়।</p>
<p>উরুয়ার সদস্য নির্বাচন করতে গিয়ে আমিলকে অবশ্যই তার নিজের বাড়ী থেকে সদস্যের বাড়ীর দূরত্ব বিবেচনা করতে হবে। ইসলামে ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক মিল জাতীয় ও গোত্রগত পটভূমিকা এবং সংস্কৃতির স্তর বৈষম্যের কোন ভিত্তি হতে পারেনা। ইসলামী সমাজের একটি শক্তি ছিল এবং সবসময় শক্তি হবে এই বৈশিষ্ট্য যে, এ সমাজ একটি উন্মুক্ত সমাজ, বহুগোষ্ঠীর সমাজ, সংস্কৃতিগতভাবে বৈচিত্রমুখী, রং-কানা, এবং প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত। সান্ধ্য জামাতে বয়স্ক সদস্যদের মতই শিশুগণ এবং পিতামহ ও পিতামহীরা হবে আবশ্যিক অংশ। যেখানে অনীহা, আলস্য, অবাধ্যতা, মতবিরোধ বা বিরুদ্ধতা দেখা দেয়, তা সান্ধ্যজামাত সম্পর্কেই হউক বা নগরী, রাষ্ট্র অথবা জাতীয় পর্যায়ে মুসলিম কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে হউক, সেখানে আমিলের আপন ন্যায়বোধ, তার উৎসাহ, সান্তনা, উদ্যোগ, নেতৃত্ব ব্যক্তিগত দায়িত্বের উপরই একমাত্র নির্ভর করে।</p>
<p>উরুয়া-ভ্রাতৃসমাজগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি প্রাপ্তির সঙ্গে প্রয়োজন হবে সেগুলোকে সংগঠিত করা, তাদের প্রয়োজনগুলোর পরিকল্পনা তৈরী করা এবং সেই সব প্রয়োজন পূরণ করা। একের অভিজ্ঞতায় শরীক হবে অন্যেরা এবং মেধা, তথ্য, প্রভাব, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের সাধারণ মুসলিম ভাণ্ডারে কমবেশী সময়ের ব্যবধানে অবশ্যই গঠন করবে সমগ্রভাবে ইসলামী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। এখানে পৌছেই আন্দোলন গ্রহণ করতে পারে নেতৃত্বের বিশাল বোঝা, আমিলদের জন্য বিভিন্ন সময়ে সেমিনার সংগঠন করতে হবে যাতে করে তারা একে অন্যের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতায় শরীক হতে এবং অধিকতর সফলভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য তারা প্রশিক্ষিত হতে পারে। একটি ভৌগোলিক ইউনিটের অন্তর্গত ইসলামী নেতৃত্ব উরুয়ার জন্য দিতে পারে একটি &#8220;সপ্তাহের জন্য মুদ্রিত পাঠ&#8221;, যাতে কুরআনের অংশ থাকবে নির্দিষ্ট-যাতে করে নির্বাচিত আয়াতগুলোর মাধ্যমে ইসলামের একটি পদ্ধতিবদ্ধ রূপ প্রতিফলিত হবে এবং তৎসঙ্গে সর্বত্র মুসলমানদের জীবন যে সব ঘটনায় আক্রান্ত তার মোবাবেলার ইঙ্গিত থাকবে।</p>
<p>উরুয়ার সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে এবং আন্দোলন যতই বিস্তৃত হতে থাকে ততই নতুনতর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে। দশটি &#8216;উরুয়া&#8217; মিলে হবে একটি &#8216;উমরা&#8217;, দশটি উমরা নিয়ে গঠিত হবে একটি &#8216;জারিয়া&#8217; এবং দশটি জাবিয়া নিয়ে একটি &#8216;জামাত&#8217;। সংগঠনের এই প্রত্যেকটি পর্যায়ে একটি প্রশাসনিক অঙ্গসংগঠন প্রতিষ্ঠিত হবে সংশ্লিষ্ট উরুয়াগুলোর আঞ্চলিক প্রয়োজনসমূহ পূরণের জন্য। যা সংগঠন করতে হবে তা অস্তিত্বে আসার পরই সংগঠন এবং কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। আমাদের অলসভাবে ব্লাকবোর্ডের উপর কাঠামো তৈরি করলে চলবেনা বরং লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে করে কাঠামোগুলো গড়ে উঠে ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা থেকে। সর্বত্রই আমাদেরকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, কি করে এ বাস্ত বতাগুলো সৃষ্টি করা যায়। পুনরাবৃত্তিস্বরূপ উত্তর এই যে, প্রত্যেক মুসলমানকে তার সহযাত্রী মুসলমানদের সঙ্গে নির্দোষ কাজগুলো করতে হবে- সকলের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইবাদতের ক্রিয়াকলাপে, নিরবচ্ছিন্নভাবে ইসলামী শিক্ষার অনুশীলনে এবং কল্যাণের বিস্তারে ও মন্দের প্রতিরোধে (আল আমর বিল মারুফ ওয়া আল নাহি আন আল মুনকার)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকা:</strong></p>
<p>১. আমরা আমাদের রসূলগণকে পাঠিয়েছি, প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ। আমরা তাদের প্রতি নাযিল করেছি কিতাব এবং দিয়েছি মিজান (ন্যায় বিচারের তৌলদন্ড) যাতে করে মানুষ পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আমরা তাদেরকে দিয়েছি লৌহ যা বিশাল বিশ ক্ষমতার একটি হাতিয়ার, যাতে করে তার দ্বারা মানুষের প্রতি তার ফায়দা কার্যকর হতে পারে এবং যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সহায়তা করতে ইচ্ছুক এবং তারা রসূলগণকে তা করতে পারে। আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী (৫৭: ২৫)। হে মোহাম্মদ, আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি কিতাব, সত্য সহকারে যাতে তুমি তার প্রত্যাদিষ্ট-ন্যায়দন্ড অনুসারে মানুষের প্রতি ন্যায় বিচার করতে পার (৪৫: ১০) &#8230; এবং তাদের মধ্যে বিচার কর, যে মোহাম্মদ, তোমার প্রতি আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার সাহায্যে এবং তাদের কুসংস্কার অনুসরণ করনা (৫: ৪৯)।</p>
<p>২. Barth, Against the Stream pp. 29-31.</p>
<p>৩. Ismail ibn Kathir Tafsir al Quran al Azim (Beirut: Dar al Ma &#8216;rifah, 1388/1969) s.v Quran 5: 79, vol. 2, pp 83-84</p>
<p>৪. William James. The Variety of Religious Experience (New York: Mentor Books, New American Library, 1953) pp. 269 ff pp 276 ff.</p>
<p>৫. অথবা বরং &#8216;ধর্ম হচ্ছে অন্যকে ভাল কাজ করার পরামর্শ দান।&#8221; N. Atiyah in A Source Book in Medeval</p>
<p>৬. Ibn Tufayl, Havy ibn Yaqzan tr. Goorge Political Philosophy, ed Ralph Lerner and Muhsin Mahdi (Glenceo II: The Free Press 1936).</p>
<p>৭. Al aqrabun awla bt al ma&#8217;ruf, এটি হচ্ছে আইন প্রণয়নের একটি সাধারণ নীতি।</p>
<p>৮. Henry Bettenson -এর ডকুমেন্টস গ্রন্থটি চার্চের আইডিয়েশনাল ইতিহাসের খুটিনাটির জন্য পড়তে পারেন।</p>
<p>৯. Abd al Rahman al jaziri: Al Fiqh ala al Mahab al Arba&#8217; ah (Cairo: Al Matalaah al Tijariah al Kubra, n.v) Beginning of Remadan And Shawwal vol. 1 pp 584-85.</p>
<p>১০. ইহাই একমাত্র পথ বলে মনে হয়, যাতে করে গতিশীল এবং সৃজনধর্মীয় ইসতিহাদের সমন্বয় সাধিত হতে পারে একই রকম বাঞ্চনীয় একমত ও ঐক্যমতের লক্ষ্যের সঙ্গে। এ দুটি মূল্যমানই ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির এবং এর আদর্শ পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।</p>
<p>১১. এখানে শরীয়াহ-এর অখ ভূমিকা এবং সোলোনের আইনের মধ্যে একটি সমান্তরাল রেখা টানা যেতে পারে। সোলোনের এই আইন ঈজিয়ান সাগরের চারদিকে বসবাসকারী ছড়ানো ছিটানো গ্রীকদেরকে একই সাংস্কৃতিক ঐক্যের মধ্যে আনয়ন করেছিল।</p>
<p>১২. ইসলামী আইনের দুটি চূড়ান্ত উৎস হচ্ছে কুরআন এবং সুন্নাহ। বিশাল সুপরিসর শরীয়াহ এর বিধি ব্যবস্থার অবয়বের মধ্যে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক নৈতিকতার সকল অঞ্চলই পড়ে। স্পষ্টতই দুটি মূল উৎসের কোনটির সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ইসলামের কোন বিধি ব্যবস্থাই বৈধ বলে গণ্য হবেনা</p>
<p>১৩. William Mac Neil. The Rise of the West (Chicago University Press. 1964) s.v &#8220;The Shariah&#8221;</p>
<p>১৪. Self-renewal যন্ত্রটি খুঁটিনাটির জন্য পড়া যেতে পারে উসুল আল ফিকাহর উপর যে কোন পাঠ্য পুস্তকে, আল ইসতিহাদ, আল কিয়াস, আল ইসতিহসান, আল মাসালিহ, আল মুরসালাহ লাহ, শিরোনামের অধীনে তোমরা কৃপণ হয়োনা, বদ্ধমুষ্টি হয়োনা এবং অমিতব্যয়ী হয়োনা, যেন তোমরা তোমাদের সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে তোমরা নিজেরাই না সর্বহারা হয়ে পড় (১৭: ২৯)।</p>
<p>১৫. কৃপণতা ও অতি বদান্যতা বা আতিশৈয্যের মধ্যবর্তী সোনালী পন্থার উপর ইসলামের উচ্চকণ্ঠ গুরুত্বের ঘোষণা মেলে আল কুরআনে (১৭: ২৯)।</p>
<p>১৬. See the Phenomental nalysis of Contradictory Values in Nicolary Hartaman. Ethics Abyev Stanton Coin (New York Macxmillan 1932) vol. 2. section 2</p>
<p>১৭. উপরে উল্লেখিত শব্দগুলো যে সব আয়াতের অন্তর্গত তার জন্য পড়ুন মোহাম্মদ বারাকাত রচিত Al Murshid ila Ayat al Quran al Karim (Cairo Al Malataba al Hashimyah 1957)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ <strong>অধ্যাপক শাহেদ আলী</strong>।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -5px; top: 11463.5px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-vitality-of-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14782</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 01 Sep 2024 11:25:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইলমুল কালাম]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14770</guid>

					<description><![CDATA[তৌহীদ ঘোষণা করে যে, &#8220;তোমাদের উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ, যার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। তাই তাঁর উপাসনা এবং ইবাদাত কর১।&#8221; মুমিনগণ যে একটি মাত্র ভ্রাতৃসমাজ, যার সদস্যরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে পরস্পরকে ভালবাসবে, যারা একে অপরকে ন্যায়বিচার করতে ও ধৈর্য্যশীল হতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তৌহীদ ঘোষণা করে যে, &#8220;তোমাদের উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ, যার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। তাই তাঁর উপাসনা এবং ইবাদাত কর<sup>১</sup>।&#8221; মুমিনগণ যে একটি মাত্র ভ্রাতৃসমাজ, যার সদস্যরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে পরস্পরকে ভালবাসবে, যারা একে অপরকে ন্যায়বিচার করতে ও ধৈর্য্যশীল হতে পরামর্শ দেয়<sup>২</sup>, যারা ব্যতিক্রমহীনভাবে সকলে একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়না<sup>৩</sup>। যারা একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে, সৎকাজে উৎসাহ দেয় এবং মন্দকার্য নিষেধ করে<sup>৪</sup> যার পরিণতিতে আল্লাহ এবং তার রাসুলকে মেনে চলে<sup>৫</sup>-এ সমুদয়ই হচ্ছে সমাজের বিষয়ে তৌহীদের প্রাসঙ্গিকতা।</p>
<p>উম্মাহর স্বপ্ন এক, তেমনি এক হচ্ছে অনুভূতি অথবা ইচ্ছা এবং কর্ম, উম্মাহর সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মনোভঙ্গিতে, তাদের চরিত্রে ও তাদের বাহুতে, চিন্তার একটা ঐক্যমত রয়েছে। উম্মাহ হচ্ছে এমন একটি মানবিক ব্যবস্থা যা মন, হৃদয় এবং বাহু, এই তিনের ঐক্যমতে ঘটিত। এ একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃসমাজ, যা বর্ণ যেমন স্বীকার করেনা তেমনি স্বীকার করেনা নৃতাত্বিক পরিচয়। এর দৃষ্টিতে সকল মানুষই এক, কেবলমাত্র সদাচারণ ও ধার্মিকতার মানদন্ড দ্বারা যার পরিমাপ হবে<sup>৬</sup>। এর কোন সদস্য যদি জ্ঞান, ক্ষমতা, খাদ্য বা আরাম আয়েশ অর্জন করে, তার কর্তব্য হচ্ছে অন্য সবাইকে তাতে শরীক করা, যদি কোন সদস্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, সাফল্য বা সমৃদ্ধি অর্জন করে, সে অবস্থায় তার কর্তব্য হবে, অন্যেরাও যাতে প্রতিষ্ঠিত, সফল ও সমৃদ্ধশালী হতে পারে, সেজন্য সাহায্য করা<sup>৭</sup>। এটি এমন একটি মানবিক ব্যবস্থা, যার সদস্যরা উম্মাহর মূল্যায়ন ও নীতিমালা দ্বারা নিজের জীবন শাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এবং অন্য সকল মানুষের জীবন যাতে অনুরূপ নীতিমালার দ্বারা শাসিত হয় তার জন্য চেষ্টা করে। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা হতে পারে, এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সদস্য হতে পারে; তারা উম্মাহর সদস্য বলে এই সদস্যপদ সমস্ত বৈষম্য ও পার্থক্যের উপর শরীয়াকে দেয় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। উম্মাহর ভিত্তি প্রজাতির (race) উপর নয়, অঞ্চল বা ভাষার উপর নয়, রাজনীতিক এবং সামরিক সার্বভৌমত্বের উপর নয়। অতীত ইতিহাসের উপরও নয়, এর বুনিয়াদ হচ্ছে ইসলামের উপর। নর-নারী নির্বিশেষে যে কেউ ইসলামকে তার ধর্ম বলে গণ্য করে এবং চায় যে, এর আইন কানুন দ্বারা তার জীবন শাসিত হবে, সে বাস্তবে এবং কার্যত উম্মাহর একজন সদস্য, দ্বারা শাহাদার আইনগত চাহিদার এই হচ্ছে অর্থ। তাছাড়া অন্য কোন প্রয়োজনটা আবশ্যক নয়। এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে কোন ব্যক্তিই শরীয়াহ কর্তৃক স্বীকৃত সকল অধিকার সকল সুযোগ সুবিধা ভোগের অধিকারী হয়ে উঠে এবং নিজেকে শরীয়াহর সমস্ত দায়িত্বের অধীনে স্থাপন করে।</p>
<p>ব্যক্তি মুসলমান, পৃথিবীর যে কোন স্থানে বাস করতে পারে এবং সেই দেশের আইনের প্রতি আনুগত্যশীল হতে পারে, যতক্ষণ না সে সব আইন জীবনের সেই সব ক্ষেত্রে শরীয়ার বিরোধিতা করে, যার দ্বারা তার নিজের জীবন প্রভাবিত হয়। যখন যে অঞ্চলে সে বাস করে, তার আইন কানুন যদি ইসলামের বিপরীতে তার জীবনকে প্রভাবিত করে, তখন একটি ইসলামিক অঞ্চলে হিযরত করার বিকল্প তার থাকে। অথবা ইসলামিক কিংবা ভিন্নতর কোন বাহ্য উদ্দেশ্য পূরণের আশায় সে তার নিজের জীবনে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সহ্য করে যেতে পারে। তার পক্ষে উম্মাহ হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য নয়। অবশ্য প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে অন্য সকলকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত করা, নিজের অঞ্চলে উম্মাহকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। দেশের আইন হিসাবে শরীয়াহর প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে তার কর্তব্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>তৌহীদ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>খিলাফত</strong></h4>
<p>উপরে যে উম্মাহর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সে উম্মাহ হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা পূরণের জন্য বিশ্ব পুনর্গঠন বা বিশ্ব সংস্কারের বাহন। এ হচ্ছে সৃষ্টিতে আল্লাহর খিলাফত, কেননা মানুষের বিষয়ে সৃষ্টির সূচনা লগ্নে প্রদত্ত এই ভবিষ্যত বাণী অবশ্যই সম্প্রসারিত হবে উম্মাহ পর্যন্ত এবং তার যুক্তি হচ্ছে পূর্ববর্তী অংশে উল্লেখিত যুক্তিসমূহ। সমভাবে উম্মাহ একটি রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্বের অর্থে এবং সার্বভৌম শক্তির জন্য যে সব অঙ্গ ও ক্ষমতা সার্বভৌমত্বকে বলবৎ করার জন্য প্রয়োজন সে সমুদয়ের অর্থে। রাষ্ট্র হিসাবে উম্মাহর উল্লেখ করতে হবে খিলাফত হিসাবে, দাওলাত হিসাবে নয়। ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য খিলাফত হচ্ছে নিকটতর এবং তৌহীদের ঘনিষ্ঠতর, যে তৌহীদ একটি সরাসরি এবং কুরআনি সিদ্ধান্ত<sup>৮</sup>। দ্বিতীয়টি হচ্ছে &#8216;দাওলাত&#8217; একটি আধুনিক ধারণা যার অবস্থান কুরআনের প্রতিনিধিত্ব বা খিলাফতের ধারণা থেকে সবচাইতে দূরতম ব্যবধানে। আর খিলাফতের এই ধারণাটি হচ্ছে উম্মাহর মূল শর্ত। আমরা যখন খিলাফত উল্লেখ করতে রাষ্ট্রকে বুঝাই তখন উম্মাহ এবং পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্য আমাদের মনে রাখতে হবে। তাই উম্মাহর সার্বভৌমত্ব বলবৎ করার ক্ষেত্রে খিলাফতই হচ্ছে উম্মাহ। এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে না হলেও উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব এর দ্বারাই গঠিত। খিলাফতের বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা রাষ্ট্রতত্বের ক্ষেত্রে তৌহীদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে চাইছি। খিলাফত হচ্ছে ত্রিমুখী ঐক্মত্য দৃষ্টির ঐকমত্য, ক্ষমতার ঐকমত্য এবং উৎপাদনের ঐকমত্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>ইজমা</strong> <strong>আর</strong><strong>&#8211;</strong><strong>রুইয়াহ্</strong> <strong>বা</strong> <strong>দৃষ্টির</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>ইজমা আর-রুইয়াহ্ বা দৃষ্টির ঐকমত্য হচ্ছে মানসিক ঐক্য বা চৈতন্য এবং এর রয়েছে তিনটি উপাদান। প্রথম হচ্ছে, যে সব মূল্যায়ন নিয়ে আল্লাহর ইচ্ছা ঘটিত সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান এবং তাদের বাস্তব রূপায়ণ ইতিহাসে যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে জ্ঞান। স্পষ্টতই ইহা পদ্ধতিবদ্ধ এবং ঐতিহাসিক, দৃষ্টির উপাদানগুলো প্রকৃতিগতভাবেই অপরিসীম, অন্তহীন। তাই সমস্ত কিছু সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টির প্রয়োজন নেই, কেবলমাত্র তার সার নির্যাসেরই প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রয়োজন হওয়া উচিত। এটি হচ্ছে একটি কাঠামো, একটি পদ্ধতি, স্তরে স্তরে বিন্যাস এবং সিদ্ধান্তের জন্য আবশ্যক যার পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন, যা একবার আয়ত্ব হলে এক জনের পক্ষে সমন্বিততার মধ্যে যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা আবিস্কার করা এবং প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়। মূল্যমানের পদ্ধতিবদ্ধ জ্ঞান সম্পর্কে এ হচ্ছে বিশেষ করে সত্য। আর এই জ্ঞানের উৎস হচ্ছে প্রত্যাদেশ অর্থাৎ কুরআন এবং সুন্নাহ এবং যুক্তি, বুদ্ধি এর নিজস্ব প্রক্রিয়ার উপলদ্ধির মাধ্যমে, ন্যায়শাস্ত্র ও জ্ঞানতত্ত্ব এবং সাধারণভাবে সত্য সম্পর্কে উপলব্ধি (পরাতত্ত্ব) নিসর্গ সম্পর্কে উপলব্ধি (প্রকৃতি বিজ্ঞান), মানুষের সম্পর্কে জ্ঞান (নৃতত্ব, মনস্তত্ব এবং নীতিশাস্ত্র), এবং সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান (সমাজ বিজ্ঞানসমূহ)। প্রত্যাদেশের ক্ষেত্রে যেমন নয়, তেমনি বুদ্ধির ক্ষেত্রেও দৃষ্টির একাডেমিক ফল আবশ্যক নয়, যা উপাদানের পদ্ধতিগত ধারণা নিয়ে গঠিত, বরং তা হতে হবে ইনটুইটি স্বজ্ঞালব্ধ, অর্থাৎ এমন একটি উপলব্ধির আলোর অভিজ্ঞতা হতে হবে যা, যে কোন অঞ্চলকে আলোকিত করতে পারে, দৃষ্টির জন্য ইসলামের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এমন একটি ছবি প্রতিষ্ঠিত ক&#8217;রে<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একদিকে ইতিহাসে ইসলামী মূল্যমানসমুহ যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল, সেই আন্দোলন এবং ইসলামী মূল্যমানগুলোর বাস্তবায়ন সম্পর্কে জ্ঞান মূখ্যত একটি অভিজ্ঞতার বস্তু<sup>১০</sup>। এই জন্যই প্রথম দিকের মুসলমানরা মহানবী সম্পর্কে সকল বিবরণ এবং তাঁর সাহাবাদের জীবন থেকে আহরিত ঘটনাবলী জানার জন্য অবিরাম চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই এধরনের চাহিদা দেখা যায়, কারণ অনুসারীদের জন্য তাদের বিশ্বাসের অনুযায়ী ধারণা কি করে একটি কংক্রীট রূপে প্রকাশ পায় তার জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যমান বাস্তবায়নের বিশেষ উপাদানগুলো তাদের ছাত্রদের উপর একটি সার্থক এবং বাঞ্চনীয় শিক্ষকীয় প্রভাব বিস্তার করে। এগুলো তাদের পদ্ধতিগত অধ্যয়নের উপাদানগুলো থেকে সহজে বোঝা এবং স্মরণ রাখা যায়। যাই হোক খিলাফতের জন্য যে দৃষ্টিভঙ্গির উৎপাদন আবশ্যক তার জন্য উভয়টিই সমরূপে আবশ্যক।</p>
<p>মূল্যমানের পদ্ধতিগত উপলব্ধি এবং ইতিহাসে সেগুলোর রূপায়ণ, এ দুটি বিষয় নিয়ে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানের জ্ঞানের অভাবে এবং বর্তমান কি করে সেগুলোকে নতুন করে বাস্তবায়িত করতে পারে, সেই জ্ঞান ছাড়া প্রায় এখন অসম্পূর্ণ। <strong>যেহেতু খিলাফত পশ্চাৎমুখী হতে পারে এবং বর্তমানের মধ্যে বাস করতে পারে এবং ভবিষ্যতেও কার্যকর হবে, সেজন্য বর্তমানের সঙ্গে মূল্যমানকে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক। স্থির করতে হবে বাস্তবে অস্তিত্বশীল কোন উপাদান কোন মূল্যমানকে বাস্তবায়িত করবে, সেগুলো রূপায়ণের বেলায় কেমন করে বর্তমান অবস্থাগুলো মূল্যমানসমুহের শ্রেণীর উপর প্রভাব বিস্তার করে।</strong></p>
<p>এখানে যে ইজমা আর-রুইয়াহর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে ধর্মীয় জ্ঞানের একটি উৎস বলে ধরা হয়েছে। রাসুল্লাহর এই হাদিস, &#8220;আমার উম্মাহ অসত্য বা মিথ্যার ব্যাপারে একমত হবেনা&#8221;, উম্মাহর জনমতের উপর প্রায় একটি পবিত্রতা আরোপ করেছে। তা সত্ত্বেও এ কোন অনড় মত নয় বরং সব সময়ই উন্মুক্ত<sup>১১</sup>। এই উম্মুক্ততাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে ইজতিহাদে, যা কেবল সামর্থ নয়, বরং প্রত্যেক বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন মুসলমানের কর্তব্য, ইসলামী সত্য ও মূল্যমানের সমগ্র পরিসর বা তার কোন অংশকে নতুন করে আত্মসাৎ করে। প্রকৃতিগতভাবেই ইজতিহাদ গতিশীল এবং সৃজনধর্মী এবং তার স্বগুণেই উপলব্ধিক্ষম মনের কাছে খুবই আবেদনশীল। ইজতিহাদকেও রাসুলুল্লাহ এই হাদীসে অভিনন্দনের যোগ্য বলে গণ্য করেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;যে কেউ ইজতিহাদ করে একটি ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সেও একটা সৎ কাজ করলো। যে কেউ ইজতিহাদ করে সত্যে উপনীত হয়, সে দ্বিগুণ পূণ্য লাভ করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>ইজতিহাদ এবং ইজমা সম্মিলিতভাবে সৃষ্টি করে একটি দ্বান্দিক গতি, যা চিন্তার রাজ্যে ইসলামী গতিশীলতা গঠন করে। কারণ ইজমা যেখানে উপলব্ধি লাভের প্রয়াসে চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় সেখানে তা ক্রমাগতই লংঘিত হয় ইজতিহাদের সৃজনধর্মী শক্তির বলে। অন্যপক্ষে, যেখানে ইজতিহাদ উপলব্ধির সর্বোচ্চ বাঞ্ছিত লক্ষ্য বলে পবিত্র বলে গণ্য হয় সেখানে তা সকল মুসলমানকে এর বৈধতা সম্পর্কে বিশ্বাসী করার প্রয়োজনে তা হয় নিয়ন্ত্রিত, সংশোধিত এবং সমালোচনা অর্থাৎ সকলের দ্বারা তা (ইজমা) তা সমর্থিত হবার প্রয়োজনে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>ইজমা</strong> <strong>আল্</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ইরাদা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইচ্ছার</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>ক্ষমতার ঐকমত্য হচ্ছে ইচ্ছার মিল বা ঐক্য এবং এর দুটি উপাদান আছে আল্ আসাবিয়া (সামাজিক সংহতি) যার বলে মুসলমানরা বিভিন্ন ঘটনা এবং পরিস্থিতিতে একইভাবে আল্লাহর আহবানের প্রতি সম্মিলিত আনুগত্যে সাড়া দেবার জন্য নিজেরা অঙ্গীকার করে এবং আন্- নিজাম, সিদ্ধান্তের বাস্তব রূপদানে সামর্থবান, মুসলিমদের কাছে পৌছাতে এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ করতে এবং সাংগঠনিক এবং যৌক্তিক কাঠামো মূল্যমানের ঔচিত্যকে ব্যক্তির গ্রুপ ও তাদের নেতাদের কর্তব্যের রূপদানে পারঙ্গম।</p>
<p>আল আসাবিয়া দৃষ্টিগত ঐক্যের সমান বা ফল নয়। এই ধরনের ঐকমত্যের দ্বারা আসাবিয়াকে সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ করা যেতে পারে। <strong>আসলে এই ধরনের ঐকমত্য ছাড়া আসাবিয়ার অস্তিত্ব অসম্ভব, কেননা যেখানে কোনো ব্যাপারে ঐকমত্য নেই, সেখানে কখনো সংহতি অর্জিত হতে পারে না। দৃষ্টিগত ঐকমত্যের চাইতেও আসাবিয়ার চাহিদা আরো বেশী, এর অভিব্যক্তি ঘটে আন্দোলনের সঙ্গে নিজের অভিন্নতা ঘোষণার সিদ্ধান্তে।</strong> বলতে গেলে উম্মাহর অর্ণবজানে নিজের ভাগ্য সমর্পণ করতে এবং পরে আহবানে সাড়া দিতে- অর্থাৎ আহবান বা দাওয়াতে ইতিবাচক &#8220;হ্যাঁ&#8221; বলতে এবং দাওয়াতে যা কিছু চায় তা ইতিবাচকভাবে সম্পাদন করতে।</p>
<p>খোদ্‌ এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি নির্মিত হয় একটি দীর্ঘ মনস্তাত্বিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ার উপর, যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি নিজেকে উম্মাহর সঙ্গে অভিন্ন রূপে দেখতে পায়, যার পরিশেষে তার চৈতন্য হয়ে উঠে বাস্তবায়নমুখী এবং মানুষ নিজেকে উম্মাহর ঐতিহাসিক ঘূর্ণাবর্ত ও সূচীমুখ হিসাবে খিলাফতের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই মনস্তাত্বিক প্রক্রিয়া শিক্ষা এবং অনুশীলনের বিষয়বস্তু হতে পারে। যেখানে তা হয় সেখানে এই প্রক্রিয়া হয়ে উঠে মার্জিত এবং সমৃদ্ধ। তবে জন্মের মাধ্যমেও প্রকৃতিগতভাবে এর আবির্ভাব হতে পারে এবং গোত্র বা গোষ্ঠীর বদ্ধ পরিবেশে তা লালিত পালিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে বিচার বুদ্ধিহীন। অন্ধ আরেক নিজেকে গোত্র বা জাতের সঙ্গে একাত্ম পণ্য করার এই অর্থে ইবনে খলদুন আসাবিয়াকে সমাজ সংহতির ভিত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন<sup>১২</sup>। যেহেতু ইসলামে এই বাস্তব উপাদানগুলো অতিক্রান্ত হয়েছে তৌহীদের আদর্শের দ্বারা সে কারণে ইসলামের আসাবিয়া হবে একটি নতুন প্রক্রিয়ার, একটি নতুন সংস্কৃতির ফল (আল্লাহর অভিপ্রেত আদলে  সক্রিয় ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের চেহারা বদল করা)। তাই আসাবিয়া হবে ইচ্ছাকৃত লালিত পালিত বিকশিত এবং পরিণত। কেবলমাত্র প্রকৃতিগতভাবে একটি অনৈচ্ছিক বিকাশ নাও হতে পরে, ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের জাতীয়তাবাদী অনুভূতির সঙ্গেও একে এক করে দেখা যাবেনা যা প্রায় বর্ণিত হয় অচেতন, অনৈচ্ছিক, অবর্ণনীয়রূপে অন্তর্গত এবং গূঢ় বলে, প্রকৃতপক্ষে যা গোত্র গোষ্ঠীতন্ত্রের আসাবিয়া। ইসলামী আসাবিয়া ইচ্ছাকৃত, পরিস্কারভাবে বিশ্লেষণযোগ্য একটি নৈতিক ও দায়িত্বপূর্ণ কর্ম। এ আসাবিয়া হচ্ছে তৌহীদের স্বচ্ছ আলোকে, তৌহীদের সকল তাৎপর্যের পূর্ণ প্রভায় উম্মাহর ভাগ্যের সঙ্গে, নিজেকে অভিন্ন গণ্য করার অঙ্গীকার এবং তাতে অংশগ্রহণ। এ দৃষ্টান্ত পাই আমরা এর বিশুদ্ধতমরূপে মক্কায় হজ্জ যাত্রীদের সম্মিলিত ধ্বনিতে যখন তারা কাবা ঘর তাওয়াফ করে অথবা যখন আরাফার দিকে ধাবিত হয়; &#8220;লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক&#8221;- (তোমার আহ্বানে হে প্রভু এখানে আমরা হাজির, তোমার আহবানে)। আর এ হচ্ছে বহু শতাব্দী ধরে যে ভৌগোলিক বা গোত্র গোষ্ঠী ধর্মী বা সংস্কৃতিগত বৈশেষিকতা খাস পাশ্চাত্য জাতীয়তার চরিত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী ধ&#8217;রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত<sup>১৩</sup>।</p>
<p>যেহেতু আসাবিয়া ভূমন্ডলের একটি বিস্তৃত অঞ্চলে বিস্তৃত বিশ্বজনীন উম্মাহ্-গঠনকারী একটি উপাদান সে কারণে আল আসাবিয়া মুসলমানের ব্যক্তিগত মূহুর্তের একটি সত্য মাত্র হতে পারেনা। পরিস্থিতি এবং ঘটনায় সাড়া দিতে গিয়ে মুসলমান যখনি সক্রিয় হতে ইচ্ছা করে বা বাধ্য হয় তখন তা একটি অবাধ তরঙ্গোচ্ছাস হিসাবে কাজ করতে পারেনা; এরূপ কাজ হবে জগৎব্যাপী বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির জনক। আসাবিয়া ইসলাম সম্মত এবং সে কারণে দায়িত্বশীল হতে হলে শৃংখলার অধীন, অবশ্যই হবে নিয়ম গভীরতা ও দিশার দিক দিয়ে এবং অন্য সকল মুসলমানের সঙ্গে সমবায়মূলক ক্রিয়াকান্ডের সঙ্গে নিজেকে অভিন্নভাবে যুক্ত করার জন্য শৃংখলার অধীন। এটাই হচ্ছে আন্-নিজামের রূপ, যে বিষয়ে তৌহীদের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে ইজমা-প্রথা মুসলমানদের তৈরি করেছে। এই নিজামের দিকে লক্ষ্য করে, আমাদের পিতৃপুরুষেরা ভালভাবেই জানতেন যে প্রত্যেক মুসলমানকে হতে হবে অক্ষরজ্ঞান এবং সাহিত্যের রুচীসম্পন্ন তাকে কুরআনের বৃহৎ অংশ সম্পর্কে অবশ্যই জ্ঞান রাখতে হবে, নবী চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে এবং সাহাবাদের জীবনী জানতে হবে, তার গৃহের নিকটবর্তী জামাতে এবং ইবাদতে অংশগ্রহণ করতে হবে- (অর্থাৎ অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ইবাদত করতে হবে- আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি নিকটবর্তী মসজিদে সালাতের সময় যে মুসলমানদের কাঁধ পরস্পর স্পর্শ করা উচিত, এই তাগিদের মানে এই যে, এতে করে, একের কাছে অপরের অস্তিত্ব জীবন্ত হয়ে উঠবে, একের সঙ্গে অপরের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিচয় এবং শব্দটির আক্ষরিক অর্থে বৃহত্তর উম্মাহর সঙ্গে সহযোগিতার উপলব্ধি. বাস্তব হয়ে উঠবে, যাতে করে আল্লাহ যে সকলের প্রভু এবং মালিক ইবাদতকারীর চেতনায় তা মুদ্রিত হয়ে যায়। এ সমস্তই পরিকল্পিত হয়েছে খিলাফতের আনুষ্ঠানিক সংগঠনের প্রস্তুতি হিসাবে। সেকালে মসজিদ ছিলো এবং একালেও তা হওয়া উচিত সকল ইসলামী কর্মতৎপরতার কেন্দ্র, ইসলামের আবশ্যিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু, কারণ মসজিদে মুসলমানরা দৈনিক মিলিত হত, তৌহীদের বন্ধনে তার সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে একটি জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করতো এবং লাভ করতো আধ্যাত্মিক, নৈতিক, রাজনৈতিক জীবনীশক্তির দৈনিক বরাদ্দ। এই খোরাক সরবরাহ করা যায় এবং প্রকৃতই তা সরবরাহ করা হতো যে কোন মুসলিম কর্তৃক, যার অধিকতর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছিলো তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার, যাতে খোদ খলিফাকেও বাদ দেওয়া হতোনা। আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালার দিকে আহবান কর মানুষকে প্রজ্ঞা এবং অধিকতর সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে<sup>১৪</sup>। এবং রাসুলুল্লাহর (সঃ) নসিহত প্রদানের আদর্শে স্বাধীনভাবে প্রদত্ত পরামর্শ, যে নসিহতের আদর্শকে ইজতিহাদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে<sup>১৫</sup>। সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে এই সম্পর্ক ও সংসর্গ রূপ নেবে জুম্মার সালাতে যেখানে ঈমামের খুৎবা হচ্ছে একটি গঠনমূলক স্তম্ভসদৃশ। খুৎবার বিষয়বস্তু হবে বর্তমান পরিস্থিতি, মুসলামান সমাজকে যে সব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে সেসবের উপরই খুৎবা দেবেন ইমাম। খুৎবাতে যে কুরআন এবং হাদিসের কিছু উল্লেখ থাকে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামী প্রজ্ঞার বক্তব্য পেশ করা এবং এভাবে তার প্রাসঙ্গিকতা ঘোষণা করা। আমির (শাসক) নিজেই যে জুম্মার সালাতের ইমাম হবেন, এই প্রথার উদ্দেশ্য ছিলো কার্যকর করার জন্য সপ্তাহের আলাপ আলোচনা থেকে যে ঐক্যমতের সৃষ্টি হয় তার সুস্পষ্ট রূপদান কিংবা ঐকমত্য অর্জিত না হলে নেতৃত্বকে ঘিরে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং উপস্থিত প্রশ্নের আবশ্যক বিচার ও প্রতিবাদের ব্যবস্থা করা। ইসলামের এ সমস্ত ইবাদত পৃথিবী এবং মানুষের বাস্তব রূপান্তর, যে উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে খোদ কুরআন<sup>১৬</sup>, পৃথিবীস্বরূপ আল্লাহর জমিদারীতে রায়ত এবং কৃষকের বাস্তব খিদমত, মরুভূমিকে খুটি করে উপনিষদীয় গুরুর, তথা সন্যাসীর, শারীরিক কসরত, তথা যোগ সাধন নয়, কোন ধর্মীয় ঐতিহ্যের আত্মনিঃগ্রহ, বিশ্বের অস্বীকৃতি এবং ইতিহাস প্রত্যাখ্যান নয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>আমলের</strong> <strong>ইজমা</strong> <strong>বা</strong> <strong>কার্যের</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>কার্যক্ষেত্রে পূর্বে উল্লেখিত সমস্ত প্রস্তুতির চূড়ান্ত শীর্ষ হচ্ছে ইজমা আল-আমাল। এ হচ্ছে ইজমা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠা ঔচিত্যের রূপ। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা ইজমা-ইজতিহাদ দ্বন্দের চিরন্তন গতিশীলতার মতই কখনো নিঃশেষ হতে পারেনা। মানুষকে তার বেহেস্তের অধিকার অর্জনের প্রয়াসে, দেশকালের মধ্যে আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তাবায়িত করা এমন একটি প্রয়াস কেবল বিচার দিবসই যাতে যতি টানতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উম্মাহর বৈষয়িক চাহিদাগুলো পুরণের ব্যবস্থা, এর প্রত্যেক সদস্যকে এমন একটি শিক্ষাদান যাতে করে তার পূর্ণ আত্মপরিচয় সম্ভব হবে; আরো রয়েছে উম্মাহর সফল প্রতিরক্ষার জন্য বৈদেশিক শত্রুর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার বৈষয়িক ও নৈতিক উপায়ের ব্যবস্থা করা এবং তৎসহ সারা পৃথিবীতে আল্লাহর অভিপ্রায় রূপায়ণের জন্য নৈতিক ও বৈষয়িক উপায়ের ব্যবস্থা।</p>
<p>আল্লাহর অভিপ্রায়ের সার নির্যাস হচ্ছে, উম্মাহর বৈষয়িক চাহিদা পুরণ এবং সে কারণে তা ধর্মেরও মর্মকথা। যেহেতু তার খিদমত করার জন্য আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন<sup>১৭</sup> এবং আল্লাহর জমিনে রায়ত-কৃষকের মত এই দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন<sup>১৮</sup>&#8211; তাতে করে ইহা অনিবার্য হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ চান মানুষ জমি চাষ করবে, প্রকৃতির উপাদান এবং শক্তিগুলোকে ব্যবহার করবে এবং তার খুশীমত সভ্যতার বিকাশ ঘটাবে<sup>১৯</sup>। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করতে গিয়ে কুরআন দারিদ্রকে শয়তানের অঙ্গীকার বলে বর্ণনা করেছে<sup>২০</sup>। এবং ধর্মের সঙ্গে ক্ষুধার্তের খাদ্য দান এবং দুর্বলের রক্ষণকে অভিন্ন গণ্য করেছে<sup>২১</sup>। বিশেষ করে মানুষ যখন আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন করে<sup>২২</sup>, তখন মানুষের খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের স্বাভাবিক প্রতিফল এই যে, সে সৃষ্টির মাধুর্য এবং আনন্দ উপভোগ করবে। মেসোপটেমীয় দৃষ্টিতে মানুষের সৃজনের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আল্লাহর জমিনে স্থাপন করা হয়েছে, তাঁর ভৃত্য হিসাবে। কিন্তু মানুষের এই সৃজন কর্মই হচ্ছে সংঘবদ্ধ কৃষিকর্ম, বাঁধ তৈরী, সেচ এবং পানি নিষ্কাশন, খাল খনন, শষ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য, পিরামিড, মন্দির নির্মাণ, লিখন ও হিসাব রক্ষণ পদ্ধতি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রাম-সরকার, নগরী, প্রদেশ, জাতি এবং বিশ্ব পর্যায়ে সরকার প্রতিষ্ঠার সূচনা। সংক্ষেপে আল্লাহর এই সৃজন কর্মই হচ্ছে বিশৃংখলা থেকে সৃষ্টিকে শৃংখলার অধীনে আনয়ন এবং শৃংখলাবদ্ধ জগতের সৃষ্টি<sup>২৩</sup>।</p>
<p>সেমিটিক মন কখনো সংসারত্যাগীর সংসার বর্জন বা আত্মনিগ্রহের অর্থ বুঝতে সক্ষম নয়, ইহা কখনো কাম ও প্রজনন, খাদ্য ও আরাম আয়েশকে স্বাভাবিক পাপ বলে গণ্য করেনা। এর দৃষ্টিতে পাপ হচ্ছে এসবের অপব্যবহার, কখনো প্রকৃতির বিষয় হিসাবে এগুলো পাপ নয়। খ্রীষ্টান ধর্ম বস্তুর সকল ভীতিসহ যে গ্নষ্টিক (gnostic) ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকারস্বরূপ গ্রহণ করে, তাই খ্রীষ্টান আন্দোলনে সংসার বর্জন ও আত্মনিগ্রহরে বীজ বপন করে। ইসলাম অবশ্যই শ্রম বা উপবাসের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটিঃ আত্মসংযমের অনুশীলন এবং অভাবগ্রন্থের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি। একই আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর খাদ্য, পানীয় এবং আনন্দের মাধ্যমে অবশ্যই ভাঙতে হবে রোজা।</p>
<p>খলিফাকে যদি মানুষের বৈষয়িক চাহিদা অবশ্যই পূরণ করতে হয় যা প্রত্যাশা করা হয় খলিফার কাছ থেকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে মানুষের এই বৈষয়িক চাহিদা কি পরিমাণ হলে যথেষ্ট হবে। ন্যূনতম চাহিদা সহজেই নির্ণয় করা যায়; সে চাহিদা হচ্ছে সকল মানুষের জন্য দুর্ভিক্ষ, ব্যাধি এবং শিশু মৃত্যুর প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন তাই হচ্ছে ন্যূনতম চাহিদা, কিন্তু সর্বোচ্চ চাহিদা নির্ণয় করা অসম্ভব, কেননা প্রকৃতির ব্যবহারের সীমা অথবা প্রকৃতির খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা নির্ণয় করা যায়না। এদুটিই হচ্ছে মানুষের কল্যাণের জন্য, আল্লাহ তায়ালা প্রকৃতি বা তার পদ্ধতির মধ্যে যে নিয়ম প্রবর্তন করেছেন সেগুলোর উপর মানুষের কর্ম প্রসারণশীল কর্তৃত্বের বিষয়<sup>২৪</sup>। কুরআন আমাদেরকে জানাচ্ছে আসমানে এবং জমিনে যা কিছু আছে সমস্তই আমাদের কল্যাণের জন্য। রাসুল্লাহ (সঃ) বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;যে কেউ রাত্রে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে যখন তার একদিনের পথে কোথাও একটি মাত্র মানুষও ক্ষুধার্ত থাকে, সে আল্লাহকে কষ্ট দিয়েছে।&#8221;</p></blockquote>
<p>এবং দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রাঃ) ঘোষণা করেছিলেন</p>
<blockquote><p>&#8220;আমি ভয় করি যে, বিচার দিবসে নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে দায়ী করবেন, প্রত্যেকটি খচ্ছরের জন্য যা হোচট খায় বা পড়ে যায়, খিলাফতের সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মেরামতহীন ভাঙ্গাচুড়া রাস্তায়<sup>২৫</sup>।&#8221;</p></blockquote>
<p>নিশ্চয়ই ইসলাম অন্য সকল ধর্মের মতই দান খয়রাতের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম দান খয়রাতকে বলে সাদাকা (শাব্দিক ভাবে যার অর্থ হচ্ছে সত্যপরায়ণতার একটি খন্ড) যার দ্বারা ইসলাম একে একজনের ঈমানের সত্যতার অভিব্যক্তি এবং সূচক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু সকল ধর্মের চাইতে স্বতন্ত্রভাবে ইসলাম ব্যবস্থা করেছে যাকাতের, যা বার্ষিক শতকরা আড়াই ভাগ হিসাবে একটি সম্পদ কর এবং তা আদায় করা হয় রাষ্ট্রীয় আইনের অনুমোদনক্রমে। ইসলাম যে একে যাকাত বলে (মাধুর্য বা মিষ্টতা) এর দ্বারা ইসলাম বোঝাতে চায় যে, আমরা যদি আমাদের সম্পদে আমাদের সঙ্গী সাথীদের অংশীদার না করি, তাহলে বছরে সে সম্পদ হয়ে উঠে তেতো। অধিকন্তু ইসলাম বঞ্চিতদেরকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে, তাদের জন্য ভিক্ষা, দান বা অপমানজনকভাবে ছুঁড়ে মারা কোনো রুটীর টুকরো নয়, বরং এ হচ্ছে বিত্তবানের সম্পদ তাদের হক, তাদের অধিকার<sup>২৬</sup>। ইসলাম একচেটিয়া ব্যবসা যেমন নিষিদ্ধ করেছে, তেমনি নিষিদ্ধ করেছে মজুতদারী এবং মানুষের উপর মানুষের শোষণের প্রধান হাতিয়ারস্বরূপ সুদকে উচ্ছেদ করেছে<sup>২৭</sup>। পক্ষান্তরে যেখানে ইচ্ছা এবং সর্বত্র আল্লাহের অনুগ্রহ সন্ধানের জন্য মানুষকে নির্দেশ দিয়েছে<sup>২৮</sup>। এদেরকে সেই প্রকৃতপক্ষে অনুগ্রহ প্রাচুর্যের সন্ধানে দেশ দেশান্তরে যেতে বলেছে, তলে আল্লাহর নৈতিক বিধানের আওতায়- বিশ্বাসঘাতকতা, প্রবঞ্চনা, চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন বা লুটপাট না করে এবং এভাবে একবার প্রাচুর্য অর্জনের পর সেই বিপুল সম্পদের কোন অংশ কিংবা তার বহুগুণ বৃদ্ধিতে যাকাত প্রদান করে তিক্ততা দূর ক&#8217;রে মধুর করে তুলতে হবে। এবং এভাবে সাদাকাত দ্বারা এই বৃত্তির অধিকারীর সত্যবাদিতা প্রমাণ করতে হবে<sup>২৯</sup>।</p>
<p>উম্মাহর প্রত্যেকটি সদস্য যাতে পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়ামত অর্জন ও ভোগ করতে পারে তার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করাই অবশ্য খিলাফতের দায়িত্ব। কিন্তু এই লক্ষ্য, মহৎ এবং আবশ্যক হলেও যে মুহুর্তে একে মানব জীবনের একমাত্র বা চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে গণ্য করা হয় তখনই তা পর্যবসিত হয় তাহা পাশবিকতায় এবং অধঃপতনে, যাতে মানুষের ব্যক্তিত্বের ঘটে বিকৃতি এবং গোটা ঐশী অভিপ্রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা<sup>৩০</sup>। মানুষের বৈষয়িক প্রয়োজনগুলো নির্দোষ এবং বস্তুতই উত্তম; সম্ভাব্য উচ্চতম মাত্রায় এগুলোর পরিপূরণ আবশ্যক। কিন্তু জীবনের গোটা বৈষয়িক দিকটি যেগুলো রক্ষা করবে, সেগুলো ব্যক্তি বা সমগ্রভাবে উম্মাহর আধ্যাত্মিক মর্মের উপায় বা বাহন মাত্র। বৈষয়িক অর্জনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে গণ্য করার মানে হচ্ছে আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।</p>
<p>এ হচ্ছে এরূপ দাবীরই নামান্তর যে, আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে একটি শূন্য বিষয়, আচার অনুষ্ঠান ও মনস্তাত্বিক আত্মরূপান্তরের দেহ বিযুক্ত জীবন, যা বস্তুগত জীবন অনুসন্ধানের বিকল্প ইসলামে আধ্যাত্মিক জীবন হচ্ছে তিনটি পর্যায়ের, যা একই সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে। এর প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, উম্মাহর সাধারণ বৈষয়িক কাজকর্মে ব্যক্তির অংশগ্রহণ। এর মাধ্যমে মানুষের নিজের বৈষয়িক প্রয়োজনকে উম্মাহর কাজকর্মের প্রয়োজনের অধীনে স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে দুটি পর্যায়ে নিজের এবং অন্যদের শিক্ষার জন্য প্রয়াস; যেমন প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব মানুষের জন্য প্রকৃতির ব্যবহারকে অধিকতর সম্ভব এবং সহজসাধ্য করে তোলে; এবং ইজমা ইজতিহাদের দ্বান্দ্বিকতা হয়ে উঠতে পারে গতিশীল, সৃজনধর্মী এবং ঐশী অভিপ্রায়ের আরো উঁচু হতে উঁচুতর ক্ষমতার স্তর পর্যন্ত পৌছুতে পারে। তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে নন্দনতাত্বিক সৃষ্টি, যাতে উম্মাহর আকুতি এবং জীবনরূপ পায়- কারণ উম্মাহ মূল্যবান বা ঐশী অভিপ্রায়কে বাস্তব এবং রূপায়িত করে তুলে ইতিহাসের পরিক্রমায়।</p>
<p>ইজমা ইজতিহাদের (উৎপাদনের মতৈক্য) দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যের জন্য এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করা যার বদৌলতে পূর্ণ আত্মপরিচয় অর্জন সম্ভব হয়<sup>৩১</sup>। আল্লাহর বান্দা হিসাবে কোনো ব্যক্তি তার পেশাকে উপলদ্ধি করেনা, যদিনা তার ব্যক্তিগত সম্ভাবনা ও ক্ষমতার চূড়ান্ত বিকাশ ও সম্ভাব্য পূর্ণতম ব্যবহার হয়। এধরনের ব্যক্তি নিজেকে অসুখী বলে মনে করবেনা এবং এধরনের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি ব্যর্থ সমাজ হবেনা, কিন্তু মেধার পূর্ণ ব্যবহার না হলে, শক্তি অব্যবহৃত থাকলে এবং উৎসাহ উদ্দীপনা অপূর্ণ থাকলে, উম্মাহর গন্ডীর বাইরে আত্মউপলব্ধির প্রলোভন অথবা খিলাফতকে ক্ষতিগ্রস্থ এবং ব্যর্থ করার প্রবণতা থেকেই যাবে। খিলাফতকে দুটিই করতে হবে: &#8220;প্রয়োজন সৃষ্টি করা অর্থাৎ সদস্যদের মধ্যে সত্য সম্ভাবনা জাগ্রত করা এবং সেগুলোর পরিপূরণের উপায়ের ব্যবস্থা করা।&#8221; যদি পূর্বোক্ত ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হয় সে পাবে এমন একটি উম্মাহ যা অজ্ঞ এবং অজাগ্রত ও অর্বাচীন লোকদের নিয়ে গঠিত, যদি দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দেশ ত্যাগের মাধ্যমে নিজেকে শূন্য ও ধ্বংস করার পথ উম্মুক্ত করে দেবে, অথবা অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক কাজের মাধ্যমে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং বিদেশীদের শোষণের মাধ্যমে আত্মবিনাসের পথ উন্মুক্ত করে দেবে।</p>
<p>উৎপাদনের ঐকমত্য চরিতার্থ করার জন্য খেলাফত অবশ্যই উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করবে, শত্রুর আক্রমণ থেকে উম্মাহর কার্যকর প্রতিরক্ষার জন্য, প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করবে<sup>৩২</sup>। কোনো সদস্যই স্বেচ্ছাসেবী নয়। বরং সকলেই বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাবদ্ধ সৈনিক, যখন উম্মাহর মূল অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে, অথবা যখন পৃথিবীতে আল্লাহর বাণীকে সবার উপরে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য তাদের সার্ভিস প্রয়োজন।</p>
<p>চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ইজমা আল-আমালের এই দিকটির দ্বারাই উম্মাহর সর্বোচ্চ সাফল্য স্থিরীকৃত হয়, অর্থাৎ পৃথিবীকে ইসলামের জীবন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করায় এর অবদান নির্ণিত হয়। পেশা বা বৃত্তির এই দিকটি উম্মাহকে সেই স্তরে উন্নীত করে যেখানে পৌঁছানোর পর সে মানুষের ইতিহাসের এবং বিশ্ব ইতিহাসের মোকাবেলা করতে পারে। এই পর্যায়ে উম্মাহর সাফল্য হচ্ছে আল্লাহর দৃষ্টিতে উম্মাহর চূড়ান্ত যৌক্তিকতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>তৌহীদ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>ক্ষমতা</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>ইসলাম</strong> <strong>ও</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>বিশ্ব</strong><strong>: </strong><strong>দুঃখজনক</strong> <strong>কতগুলো</strong> <strong>বাস্তবতা</strong></p>
<p>মুসলিম বিশ্ব আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর কালামকে সবার উপরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি মহাসম্ভাবনাপূর্ণ শক্তি, কেননা এই মুহুর্তে মুসলিম বিশ্বে বাস করছে আটলান্টিক থেকে পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে, একশত কোটির বেশী মানুষ এবং তা এখন ইউরোপ এবং আমেরিকাতে শিকড় গাড়তে ও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। তার নিজের জন্য এবং পৃথিবীর জন্য এটি একটি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আল্লাহর অভিপ্রেত লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্ব এখনো তার ক্ষমতার বিকাশ ও ব্যবহার থেকে দূরে। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিশ্ব তার নিজের ক্ষমতা, নিজের বিকাশের জন্য প্রয়োগ, স্বদেশে তার ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যর্থ প্রয়াস ও অমুসলমানদের স্বার্থে গঠনমূলক প্রচেষ্টায় সেই সব শক্তির অপচয়ের মধ্যে একটি অনিশ্চিত ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।</p>
<p>মুসলিম দেশগুলোর সংবিধানের অধিকসংখ্যকই ঘোষণা করে যে, রাষ্ট্রের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। কেবলমাত্র একটি দেশই, সৌদি আরব, এই ঘোষণাকে গুরুত্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছে, যার লক্ষণ হচ্ছে রাষ্ট্রে শরীয়াহর কার্যকরণ। অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো কিছু সংখ্যকের, যেমন- পাকিস্তান ও কুয়েতের স্থান এর পরেই, কারণ এই সব দেশের সংবিধান ঘোষণা করেছে, ইসলাম হচ্ছে রাষ্ট্রের এবং উম্মাহর মূল শর্ত, তবে এর সঙ্গে তারা যোগ করেছে পাশ্চাত্য বর্ণনামূলক এসব ধারণা যে, তারা যে জাতি বা রাষ্ট্র এর কারণ তারা একটি জাতি গোষ্ঠী, একটি অঞ্চল এবং সার্বভৌমত্ব সমবায়ে তাদের জাতি বা রাষ্ট্র গঠিত, এটি এমন একটি বিবেচনা যাতে অপরিহার্য শর্ত হিসাবে ইসলাম অসম্পূর্ণ বলে গণ্য। তৃতীয় শ্রেণীর রাষ্ট্রগুলো যেমন মিশর, মরক্কো এবং সুদান ইত্যাদি। যারা ইসলামকে কেকের উপর বরফের একটি আবশ্যক আস্তর বলে গণ্য করে, যে কেকটির অন্তর্গত কাঠামো এবং বিন্যাস গঠিত পাশ্চাত্যের ধ্যান ধারণার দ্বারা, ইসলামী ধ্যান ধারণার দ্বারা নয়। জাতীয়তাবাদ নামক এক নতুন শুউবীয়া বা গোত্রবাদ পাশ্চাত্য ধরনের (রক্ত এবং মাংসের) রোমান্টিসিজম দ্বারা নির্ধারিত হয় অভিবাসন, এবং ন্যাচারালাইজেসনের আইন কানুন, নেতাদের সক্রিয় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও অন্যান্য শিক্ষিত শ্রেণীর জীবন আচরণের রূপ এবং নিজেদের সামাজিক প্রতিকৃতি যা জনগণের শিক্ষা এবং প্রেরণার জন্য পরিকল্পিত ও প্রচারিত হচ্ছে। এমন কোন মুসলমান দেশই নেই যা মদীনায় রাসুল্লাহর সমগ্র সময়ে মহানবীর সমাজ যে নিরবিচ্ছিন্ন মবিলাইজেশন ও সতর্ক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে সেই মবিলাইজেশন ও সর্তকতার মধ্যে নিজেকে পরিচালিত করেছে। এবং সম্ভবত মুসলিম বিশ্বের সবচাইতে নিকৃষ্ট দিক হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে তার দেউলিয়াপনা। এমন কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব কোথাও নেই যা পাঁচ বছর বয়স্ক মুসলিম শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তার সম্ভাবনাপূর্ণ বিকাশে তাকে উম্মাহর নিকট প্রত্যর্পণ করে। পৃথিবীকে রূপান্তরিত করার জন্য মুসলিমদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণের কোন সুযোগ সুবিধা আমাদের নেই- সে সুযোগ সুবিধা নেই ঐশী নক্সার আদলে উপাদান উপকরণকে রূপ দেওয়ার এই চেতনায় যে, সেই ঐশী নক্সাই হচ্ছে তার ব্যক্তিগত জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। পি. এইচ. ডি অথবা এম. ডি. গ্রাজুয়েটদের মোট সংখ্যার অনুপাতে শিক্ষিত ইমিগ্রান্ট এবং হতাশ বসবাসকারীদের হার ভয়ংকরভাবে অনেক উচ্চে, এর পরিসরের অন্যপ্রান্তে শিক্ষিতদের সঙ্গে অশিক্ষিতদের সর্বোচ্চ হার আতংকজনক।</p>
<p>মুসলমানরা যে দীর্ঘদিনের নিদ্রা থেকে জেগে উঠতে শুরু করেছে তাতে বিচলিত হবার কিছু নেই, তাদের সমাজগুলো আর্থিক সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে যে দুর্বল অথবা তাদের রাষ্ট্রগুলো যে নিষ্ক্রীয়তা ও আলস্য থেকে পৃথক ধ্বনি তুলে এলোমোলোভাবে পা ফেলে দাঁড়াচ্ছে তাতেও বিচলিত হবার কিছু নেই। বিচলিত হবার বিষয় হচ্ছে উম্মাহর এই মুহূর্তে বর্তমান ও ভবিষ্যতের এই সন্ধিকালে মুসলিম নেতাদের উম্মাহ সম্পর্কে দূরদৃষ্টির অভাব। আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হচ্ছে এই দূরদৃষ্টির অভাবের ফল এবং ইসলামী নাগরিকদের গড়ে তোলার চেষ্টার সম্পূর্ণ অভাব, যে নাগরিকেরা ইসলামী আদর্শের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কারণ সে একবিংশ শতাব্দীতে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সজাগ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>ক্ষমতার</strong> <strong>প্রতিশ্রুতি</strong></p>
<p>কোনো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মুসলিমই এই শতাব্দীতে উম্মাহর দুঃখজনক ব্যর্থতাগুলো সম্পর্কে মুসলিম রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত যে সব কৈফিয়ত দিয়ে থাকেন, সেগুলো বোঝেনা বা গ্রহণ করেনা এবং কেউ এ যুক্তি গ্রহণ করেনা যে, খিলাফতের নেতাদের উদ্যোগ গ্রহণের পূর্বেই জনতার মধ্যে থেকেই আসতে হবে। যে এলিট শ্রেণীর এ বিষয়ে উৎকৃষ্টতর জ্ঞান আছে নিশ্চয়ই তাদের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তারা সংখ্যায় প্রচুর। ইতিহাসের এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন মুসলিম উম্মায় ইচ্ছা-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তাকে গতিশীল করে তোলা। এবং কেবল তখনই তা সম্ভবপর হতে পারে, যখন নেতারা প্রস্ততি গ্রহণ করবেন, কর্তা হিসাবে ইতিহাসের গতিধারায় হস্তক্ষেপের বিপজ্জনক ভূমিকায়, এর বোগী বা কর্ম (object) হিসাবে নয়<sup>৩৩</sup>।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহ কর্তৃক ইতিহাসে হস্তক্ষেপের সূচনা হয় গৃহেই, খিলাফতকে নির্মাণ করার ধৈর্য্যপূর্ণ অবিচলিত প্রয়াসের মাধ্যমে যা বর্তমান কোন মুসলিম রাষ্ট্রেই বিদ্যমান রয়েছে বলে মনে হয়না। যেখানে নোঙ্গর ফেলতে হবে তার একটি সাময়িক বুনিয়াদ সম্পর্কে নিশ্চিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই খিলাফতকে অবশ্যই সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে মবিলাইজ করার জন্য চেষ্টিত হতে হবে, এবং মার্চ করে অগ্রসর হবার জন্য ডাক দিতে হবে। এই উদ্দেশ্য পুরণের জন্য খোদ খিলাফতের বিলুপ্তি ছাড়া আর কোন প্রয়াসই বাহুল্য বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। খিলাফতের কর্মচারী ও পরিচালকদেরকে কোরবান করা যেতে পারে বা কোরবানী করা উচিত, যদি কোরবানী ছাড়া অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রগতি সম্ভব না হয়। যে মুহূর্তে উম্মাহ প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াবে সেই মুহূর্তে আবু বকরের খিলাফত আবার আয়ত্বে এসে যাবে আর তা হবে সর্বকালের মহত্তম মুহূর্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকা:</strong></p>
<p>১. তোমাদের এই উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য এবং আমি তোমাদের রাব্ব, তোমরা আমার বন্দেগী কর (২১: ৯২)।</p>
<p>২. (মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্থ) তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, একে অপরকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং ধৈর্য্যশীল হতে আদেশ করেছে (১০৩: ৩)- যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং ধৈর্য্য ও দয়া দাক্ষিণ্যের নির্দেশ দেয় (৯০: ১৭)।</p>
<p>৩. আল্লাহ রজ্জু দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়োনা, স্মরণ কর তার অনুগ্রহের কথা, তোমাদের মিলনের কথা, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু এবং তোমরা হয়ে উঠলে পরস্পরের ভাই এবং যখন তোমরা ধ্বংসের অতল গহ্বরে কিনারে উপনীত হয়েছিলে এবং তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছিলেন, এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে দেখান তার নির্দশন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার (৩: ১০৩)।</p>
<p>৪. তোমাদের মধ্য থেকে একটি উম্মাহ্ হউক, যে সৎকাজের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে, মন্দ কাজ নিষেধ করবে। প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>৫. আল্লাহ এবং তাঁর নবীকে মেনে চল, যদি তোমরা প্রকৃতই মুমিন হও (৮: ১)।</p>
<p>৬. আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই মহত্তম তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে পুণ্যব্রতী, সবচেয়ে সদাচারী (৪৯: ১৩)।</p>
<p>৭. তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর সৎকর্মে ও পুণ্যকাজে, মন্দকর্মে ও সীমা লংঘনে নয় (৫: ২)।</p>
<p>৮. খিলাফাহ, খুলাফাহ, খালায়েফ, ইয়াস্তাখলিফুকুম প্রভৃতি শব্দগুলোর দ্বারা কুরআনের আয়াতে এর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>৯. তোমাদের মধ্য থেকে একটি উম্মাহ্ হউক যে সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কর্ম বারণ করে, প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>১০. ইসলামী আইন-কানুনের কংক্রীট রূপদান ও বাস্তবায়নের এই ত্যাগীদের ইসলামে এবং ইউটোপিয়াবাদী ধর্মগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীতে, একটি বাস্তব ধর্ম হিসেবে ইসলাম খ্যাতি অর্জন করে।</p>
<p>১১. ইসলামে জনকণ্ঠ বা জনমতকে কখনো আল্লার কণ্ঠের সমান গণ্য করা হয়নি, বরং জনকণ্ঠ বা জনমত সবসময়ই আল্লাহর নির্দেশের অনুবর্তি ও অধীনে রয়েছে, জনমত যখন আল্লাহর আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তখনই তা বাধ্যতামূলক এবং যখন আল্লাহর বাণী থেকে ভিন্নপথ অবলম্বন করে তখনই তা নিন্দনীয় হয়।</p>
<p>১২. Abd al Rahman ibn Khaldun. Al Muqaddimah (Cairo: Matbaut Mustafa. Muhammad n.) pp. 127 if.</p>
<p>১৩. দেখুন এই গ্রন্থকারের (Christion Ethics Chap 1 VII Urubah and Religion pp. ff</p>
<p>১৪. তোমরা রবের পথের দিকে আহ্বান কর, প্রজ্ঞা ও শোভন প্রচারের মাধ্যমে, অবিশ্বাসীদের সঙ্গে সংলাপে সবসময় শ্রেষ্ঠতর এবং শোভনতর যুক্তি উত্থাপন কর (১৬: ১২৫)।</p>
<p>১৫. শাসকের বৈধ সমালোচনাকে উৎসাহিত করার জন্য মহানবী বলেছেন, &#8220;যে কেউ শাসকের জবাবদিহি বাধ্য করার প্রয়াসে মারা যায়, সে শহীদের মৃত্যুবরণ করে&#8221; এবং কোন জাতি যখন দেখে একটি শাসক জবরদাস্ত স্বৈরশাসন চালাচ্ছে এবং তাকে থামাবার জন্য চেষ্টা করছেনা তখন সে জাতি এমন একটি অপরাধ করে যার জন্য সে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়ে।</p>
<p>১৬. আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা করে (১৩: ১১), তারাই সদাচারী যারা পৃথিবীতে তাদেরকে ক্ষমতা দেওয়া হলে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দকর্ম নিষেধ করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে সমস্ত কিছুর প্রত্যাবর্তন আল্লাহর নিকট (১২: ৪১)।</p>
<p>১৭. আমি জ্বীন এবং মানবজাতিকে আমার ইবাদত ছাড়া জন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি (৫১: (৫১:৫৬)। ৫৬)।</p>
<p>১৮. হে জনগোষ্ঠী, আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে তোমাদেরকে স্থাপন করেছেন যাতে তোরা পৃথিবীতে বাস করতে পার। অতএব তার ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁর নিকট অনতাপ কর, তিনি হচ্ছেন প্রভু, তিনি নিকটেই আছেন এবং তিনি দয়ালু (১১: ৬১)।</p>
<p>১৯. যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে রাজত্ব দান করবেন যেমন তিনি দিয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে তিনি তাদের নিকট থেকে যা গ্রহণ করেছিলেন তাদের সেই ধর্মকে শক্তিশালী করবার জন্য তিনি কথা দিয়েছিলেন এবং তাদের আতংক ও নিরাপত্তহীনতাকে আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তায় পরিণত করতে। তদের কাজ হচ্ছে তাঁর ইবাদত করা এবং কোনো কিছুতেই তাঁর শরীক না করা, যারা ঈমান আনেনা তারা অন্যায়চারী (২৪: ৫৫)।</p>
<p>২০. দারিদ্র হচ্ছে শয়তানের প্রতিশ্রুতি, শয়তান তোমাদেরকে অশ্লীল ও পাপকর্ম করতে নির্দেশ দেয়, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন, তার দয়া ক্ষমা ও অনুগ্রহের, তিনি সবকিছু জানেন। তিনি প্রাচুর্যময় (২: ২৬৮)।</p>
<p>২১. তুমি কি দ্বীনের অস্বীকারকারীেেদর দেখেছো, সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি সে এতিমকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়, যে মিসকিনকে খাদ্য দানে নির্দেশ দেয়না (১০৭: ১-৩)।</p>
<p>২২. বল হে মোহাম্মদ, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যে সব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা দিয়েছেন, কে তা নিষিদ্ধ করেছে? বল, এই পৃথিবীতে এগুলো মুমিনদেরই জন্য এবং পরকালে তারা এগুলো উপভোগ করবে। এরূপে আল্লাহ জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন (৭: ৩২)।</p>
<p>২৩. Pritchard. Ancient Near Eastern. Tests 60.</p>
<p>২৪. আসমানে এবং জমিনে যা কিছু আছে সমস্ত কিছুই তোমাদের অধীন করেছেন। যারা চিন্তা করে এবং বিচার করে, তাদের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন (৪৫: ১৩) আল্লাহই তোমাদের জন্য ধরিত্রীকে করেছেন বশীভূত, তোমাদের উদ্দেশ্য সাধন ও কর্মের জন্য তাই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে ভক্ষণ কর এবং স্মরণ রাখ যে তার কাছেই তোমাদের ফিরতে হবে (৬৭:১৫)।</p>
<p>২৫. Mohammad Husayn Haykal-Al Faruq Umar (Cairo Matbaat Misr 1364) Vol. 2 p. 200.</p>
<p>২৬. এবং তারা তাদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতের অধিকার স্বীকার করে (৫১: ১৬)।</p>
<p>২৭. (দুর্ভাগ্য তাদের) যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে এবং মনে করে যে, তাদের সম্পদ অমরতা দান করবে (১০৪: ২-৩) আল্লাহ ক্রয় বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন (২০২: ২৭৫) ২৮. যখন সালাত সম্পন্ন হয়, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান কর এবং</p>
<p>আল্লাহকে বার বার স্মরণ কর যাতে তোমরা প্রকৃতই সফলকাম হতে পার (৬২: ১০)। (হে মোহাম্মদ) তাদের থেকে একটি অংশ গ্রহণ কর অভাবগ্রস্থকে দেবার জন্য। এবং তাতে তাদের অন্তরের সৎকর্মশীলতা দৃঢ় হবে। তাদের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা কর, তাদের জন্য তোমার প্রার্থনা, তাদের জন্য সৃষ্টি করবে আত্মবিশ্বাস, কারণ আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৯: ১০৩)।</p>
<p>২৯. যাকাতের আদেশ বিষয়ক কুরআনের আয়াত অসংখ্য। দেখুন Barakat. Al Murshid&#8230; Zakah. বিশেষ করে কুরআন ৯: ১০৩)।</p>
<p>৩০. প্রকৃতপক্ষে অন্য মূল্যগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো একটি মূল্যের অনুসরণ হচ্ছে সেই মূল্যের উপর একটি জুলুম। একচ্ছত্র শাসন এই ধরনের কোনো একটি মূল্যের অনুসরণে বাড়াবাড়ি যা মূল্য অনুসরণের প্রয়াস এবং তার উদ্দেশ্য দুটিকেই দুষিত করে এবং সেগুলোকে মূল্যহীন করে তোলে।</p>
<p>৩১. পাঠ কর তোমার রবের নামে যিনি স্রষ্টা (৯৬: ১)&#8230; পাঠ কর তোমার প্রভু মহিমান্বিত, তিনি লিখতে শিখিয়েছেন, তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে আগে কখনো জানতনা (৯৬: ৩-৫)। মুমিনগণের একসঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়, তাদের কিছু সংখ্যকের উচিত ধর্মের অনুসরণের জন্য এবং এর নিয়ম কানুন আদেশ নিষেধের চর্চার জন্য গৃহে অবস্থান করা কারণ তাদের সাথীরা যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তাদেরকে শিক্ষাদানের জন্য তদের প্রয়োজন হবে, যেন তারা পাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে (ধর্মের নির্দেশ মত) (১: ১২২)।</p>
<p>৩২. তোমাদের সর্বশক্তি নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবার জন্য তৈরী হও। তোমাদের অশ্বারোহী যোদ্ধাগণকে এভাবে বিন্যস্ত কর, যাতে আল্লাহর শত্রুগণ এবং তোমাদের শত্রুগণ ভীত হয় এবং অন্যেরাও ভীত হ্যা, যাদের তোমরা হয়তো জাননা, কিন্তু আল্লাহ জানেন। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে যা কিছু ব্যয় কর, সমস্ত কিছুই তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তোমাদের পুরস্কারসহ এবং তোমাদের প্রতি অবিচার করা হবেনা (৮:৬০)।</p>
<p>৩৩. (হে বিশ্বাসীগণ) আল্লাহ যা ইতিহাসেই নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া আর কিছুই তোমাদের উপর আপতিত হবেনা, তিনি আমাদের রব, আমরা মুমিনগণ সবসময়ই তার উপর নির্ভর করবো। বল তোমরা কি আমাদের জন্য দুটি মঙ্গলের একটির প্রতীক্ষা করছো (শাহাদাত এবং জান্নাত, অথবা যুদ্ধে বেঁচে থাকা এবং শত্রুর উপর বিজয়) এবং আমরা প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদের শান্তি দিবেন সরাসরি নিজ পক্ষ হতে অথবা আমাদের হস্তের দ্বারা (৯: ৫১-৫২)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14770</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের অনন্যতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/uniqueness-of-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/uniqueness-of-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 10 Jun 2024 14:37:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14401</guid>

					<description><![CDATA[সামাজিক আয়তন ও পরিসরের দিক দিয়ে, পৃথিবীতে যত ধর্ম ও সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে ইসলাম সে সবের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে একক ও অনন্য। ইসলাম দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদাভাবে দ্বীনকে জীবনের মূল বিষয় বলে গণ্য করে। দেশকালের মূল বিষয়বস্তু ইতিহাসের মূল প্রক্রিয়া]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সামাজিক আয়তন ও পরিসরের দিক দিয়ে, পৃথিবীতে যত ধর্ম ও সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে ইসলাম সে সবের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে একক ও অনন্য। ইসলাম দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদাভাবে দ্বীনকে জীবনের মূল বিষয় বলে গণ্য করে। দেশকালের মূল বিষয়বস্তু ইতিহাসের মূল প্রক্রিয়া বলে গণ্য করে ইসলাম তাকে নির্দোষ, কল্যাণকর এবং নিজ গুণেই বাঞ্ছনীয় ঘোষণা করে- যদি তা সুন্দর ও উৎকৃষ্টভাবে করা হয়, তবে এসবই হচ্ছে নেক কাজ ও সৎকর্মপরায়ণতা; এবং এসবই অপবিত্র, অন্যায়, অসদাচরণ, যদি তা করা হয় বিপরীতভাবে। এ কারণে ইসলাম নিজেকে দেশকালের সমস্ত কিছুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক মনে করে এবং সমগ্র মানবজাতিসহ গোটা ইতিহাসকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। প্রকৃতি থেকে আগত বা তার সঙ্গে যা সম্পর্কিত তা নির্দোষ, কল্যাণকর এবং আপনাতে বাঞ্ছনীয়। প্রকৃতি বা জগতের নিন্দার উপর নেককাজ বা নৈতিকতার ভিত্তি হতে পারে না।</p>
<p>ইসলাম চায় প্রকৃতি থেকে লভ্য সমস্ত কিছুই মানুষ অর্জনের চেষ্টা করবে, সে খাবে, পান করবে, সে গৃহবাস করবে, আরাম-আয়েশ ভোগ করবে, পৃথিবীকে একটা উদ্যানে পরিণত করবে, দাম্পত্য মিলন উপভোগ করবে। জীবনের সমস্ত উত্তম জিনিস উপভোগ করবে। বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাবে। শিখবে, জ্ঞান অর্জন করবে, প্রকৃতিকে ব্যবহার করবে, পরস্পর সহযোগিতা করবে। সংক্ষেপে এই সমস্ত কাজই সে করবে, কিন্তু করবে ন্যায়সঙ্গতভাবে, মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় না নিয়ে, চুরি ও অন্যকে শোষণ না করে; নিজের প্রতি, প্রতিবেশীর প্রতি, প্রকৃতির প্রতি এবং ইতিহাসের প্রতি অবিচার না করে। প্রকৃতপক্ষে এ কারণেই ইসলাম মানুষকে খলিফা বলে। এ সমস্ত কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায়ের পরিপূরণ ও রূপায়ণ।</p>
<p>এর পরিণাম স্বরূপ আমরা দেখতে পাব ইসলাম উপরে উল্লেখিত লক্ষ্যগুলোকে সকল মানুষের সাধারণ লক্ষ্য, তাদের মৌলিক মানবাধিকার বলে গণ্য করে এবং এগুলোর নিশ্চয়তা বিধান করতে চায়। এই লক্ষ্যের উপর ইসলাম তার সমাজতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে। কেবল এই লক্ষ্য, আদৌ বাস্তবায়িত হলেই, ইসলামের মত সমাজব্যবস্থা আবশ্যক। যদি স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, মানুষের সংঘ বা সমাজ হচ্ছে প্রকৃতিগত, ইসলাম তার সঙ্গে যুক্ত করে আবশ্যকতার গুণ। দেশকালের পরিসরে ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থা এবং তার পরিতৃপ্তি, উম্মাহ বা দারুস সালাম (শান্তিনিকেতন) এর সঙ্গে দ্বীন ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা কেবল অতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, চূড়ান্তও বটে। ইসলামী আইনের একটি ক্ষুদ্র অংশই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং উপাসনা ও নেহাত ব্যক্তিগত নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।&#8217; ইসলামী আইনের বৃহত্তর অংশের সম্পর্ক হচ্ছে সমাজব্যবস্থার সঙ্গে। এমন কি, আইনের ব্যক্তিগত দিকগুলো, যার বিষয়বস্তু উপাসনার আচার অনুষ্ঠান এবং খোদ আচার অনুষ্ঠানসমূহ ইসলামে এতটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আয়তন অর্জন করে যে, সেই পরিসরের অস্বীকৃতি বা দুর্বলতা সেগুলোকেই কার্যত অসিদ্ধ করে দেয়। <strong>যাকাত এবং হজ্জের মত কোন কোন রীতি বা আচার-অনুষ্ঠান তাদের প্রকৃতি এবং পরিণামের দিক দিয়ে স্পষ্টতই সামাজিক ধরনের। সালাত এবং সাওমের মত অন্য প্রথাগুলোর সমাজমুখীতা এর চেয়ে সামান্য কম। কিন্তু সকল মুসলমান একথা স্বীকার করেন, যে প্রার্থনার দ্বারা উপাসকের &#8216;মন্দ প্রবণতার নিবৃত্তি&#8217; বুঝায়না, তা অসিদ্ধ। এবং হজ্জযাত্রীর জন্য, যে হজ্জ সামাজিক কল্যাণ বহন করেনা, তা অসম্পূর্ণ।</strong> <strong>ইসলামের হৃদপিন্ড হচ্ছে সমাজব্যবস্থা এবং তার স্থান, ব্যক্তিগত জীবনের পূর্বে বা অগ্রে। আসলে ইসলাম ব্যক্তিগত অবস্থানকে সামাজিক অবস্থানের প্রাক শর্ত মনে করে এবং মনে করে মানব চরিত্র অবগুন্ঠিতই থেকে যায়, যদি তা সীমিত থাকে ব্যক্তিগতের উপর এবং ব্যক্তিত্বের গন্ডি অতিক্রম করে, সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ না হয়।</strong> যে সকল ধর্ম ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুণাবলি কর্ষণ করে, ইসলাম সেগুলোর সঙ্গে একমত এবং মনে করে, এ সব গুণাবলি (আল্লাহর ভীতি, ঈমান, হৃদয়ের পবিত্রতা, নম্রতা, কল্যাণ বদান্যতার প্রকাশ করে, প্রেম ও অঙ্গীকার) সম্পূর্ণই আবশ্যক; আসলে ইসলাম এ সকল সৎগুণ ও ন্যায়নিষ্ঠ সৎকর্মকে ধর্মপরায়ণতার অপরিহার্য শর্ত বলে গণ্য করে, কিন্তু এ সমস্তকে এবং এগুলোর অনুসরণকে শূন্য গর্ব বলে জ্ঞান করে, যদি না এ সবের চর্চা যারা করে তারা সমাজের অন্য মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণ বৃদ্ধি করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক. ভারতীয় ধর্মগুলো থেকে স্বতন্ত্র</strong><br />
কতকগুলো ধর্মে, বিশেষ করে, উপনষিদীয় হিন্দু ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম জগতকে পাপ গণ্য করে এবং জগতের অস্বীকৃতিকেই পরিত্রাণ বা পরম সুখ বলে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ জগত থেকে মুক্ত হতে পারলেই পরিত্রাণ লাভ ও মহাসুখ ঘটে। অধিকন্তু এই ধর্মগুলো পরিত্রাণকে একটি ব্যক্তিক বা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে দাবি করে। কারণ তারা পরিত্রাণের সংজ্ঞা দেয়, চৈতন্যের বা উপলব্ধির পরিভাষায়, যা কেবল ব্যক্তিগতভাবেই অর্জিত হতে পারে। জগতের উন্নয়ন এবং সে কারণে তার সম্প্রসারণ, জগতে অন্তর্নিহিত বস্তুকেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকে গভীরতর করার জন্য জগতের সঙ্গে নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়া হচ্ছে পাপ। উদ্দেশ্য যখন এর সম্পূর্ণ বিপরীত, কেবল তখনই<br />
জগতের সঙ্গে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ককে স্বীকার করা হয়, অর্থাৎ পৃথিবীর কবল থেকে এবং এর &#8216;কর্ম&#8217; থেকে পূর্ণ মুক্তি অর্জন ঘটে, তাই (নিজেকে বিলুপ্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখার আইন বা বিধান) হিন্দু ধর্মে কেবল মাত্র কর্তার ক্ষেত্রে, অথবা বৌদ্ধ মতবাদে কর্তা ও অন্যদের জন্য এবং সে কারণে মিশনারী কর্মতৎপর ব্যক্তিদের বেলায়-উভয় ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আয়তনটি কেবল আদি ব্যাপারই নয়, বরং নৈতিকতা ও পরিত্রাণের সমগ্র প্রক্রিয়াটি এ নিয়েই গঠিত। পক্ষান্তরে, মানুষের সামাজিক কর্মকান্ড একটা রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই হউক, মূলত পাপ বা মন্দ, কেননা প্রকৃতিগতভাবে তা জগতের স্থায়িত্ব বা সমৃদ্ধি চায়। অর্থাৎ জৈবতাত্ত্বিক, বৈষয়িক,<br />
অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবন- সংক্ষেপে জগতের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধি তার লক্ষ্য। হিন্দুরা যদি একটা সমাজব্যবস্থার বিকাশ সাধন করে থাকে, একটা রাষ্ট্র, একটা সাম্রাজ্য, একটা সভ্যতা এবং এখন পর্যন্ত বিদ্যমান একটা বিশিষ্ট মানবসম্প্রদায় সৃষ্টি করে থাকে, তা তারা করেছে উপনিষদীয় দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করে। যদি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে তাদের সমাজব্যবস্থা স্বীকৃতি পেয়ে থাকে, তা পেয়েছে যা অনিবার্যতার সঙ্গে আপোস করে। ইহা এমন একটি স্বীকৃতি যা না মানা বা গ্রহণ না করাই বরং ব্রাহ্মণের পক্ষে শ্রেয়।</p>
<p>পক্ষান্তরে, দৃষ্টান্তস্বরূপ বৌদ্ধরা অশোকের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও প্রয়াস মেনে নিতে ও তার প্রতি ইতিবাচক সমর্থন দিতে পেরেছে। পৃথিবী থেকে বাঞ্ছিত সুখ অর্জনে অন্যদের সাহায্য করার জন্য এক্ষেত্রে বুদ্ধসংঘ নামে একটা সমাজব্যবস্থা গঠন করেছে, যা হচ্ছে পরিত্রাণকামী সন্ন্যাসী বা<br />
ব্যক্তিদের প্রথম সম্প্রদায়।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ. ইহুদী মতবাদ থেকে ভিন্নতা</strong><br />
এই দৃশ্য বা পরিসরের অন্য প্রান্তে, যা ভারতীয় ধর্মবোধ থেকে সম্পূর্ণ বৈপরীত্যের দিক থেকে কম নয়, রয়েছে হিব্রুদের বিষয়টি, তারা নিজেদেরকে যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছে এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে তাদের স্বপ্ন যেভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে তাতে করে, মানবজাতি থেকে তারা হচ্ছে একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠী। <strong>তারা হচ্ছে খোদার &#8216;পুত্র এবং কন্যা&#8217;, স্রষ্টার সঙ্গে তাদের বিশেষ সম্পর্কের কারণে বাকি সকলের থেকে তারা স্বতন্ত্র। ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত আইন কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্যদের নয়; এই বিধান আদেশ নিষেধের মাধ্যমে যে সমাজব্যবস্থাকে তুলে ধরে, তার অধিকারী কেবল ইহুদীরাই।</strong> তাদের ধর্ম ছিল একটি ট্রাইব (Tribe) কেন্দ্রিক ধর্ম, যাতে ভাল-মন্দ পাপ-পুণ্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে একটি ট্রাইব বা জনগোষ্ঠীর হিত এবং ক্ষতির পরিভাষায়। তাদের সমাজব্যবস্থার ছিল একটি জৈবতাত্বিক ভিত্তি।</p>
<p>কেবল জন্মগত ইহুদীরাই ইহুদী এবং ইহুদী ধর্মে ধর্মান্তর গ্রহণ কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং তা রাখতে হবে একটি ন্যূনতম পর্যায়ে। এ হচ্ছে জাহিলিয়ার রেসিজম, বংশ বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ, যার মধ্যে মূল্যের কোন চর্চা নেই, মুরুয়াহ (সাহস, বীরত্ব, মহানুভবতা) নেই, যা এর মূলগত মন্দ প্রকৃতি বা পাপকে লাঘব করতে পারে। কারণ হিব্রু ইতিহাস, যা তাওরাত কর্তৃক আদর্শায়িত বা সহজ কথায় পবিত্রিকৃত, প্রত্যাদেশ দ্বারা এবং অন্যান্য সেসব সাহিত্য যা নিয়ে ওল্ড টেস্টামেন্ট গঠিত, এবং যেভাবে তা সাধারণভাবে জ্ঞাত, তা হচ্ছে ঐসব মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত মূল্যবোধে পরিপূর্ণ। এক্ষেত্রে হিব্রু এবং তাদের বংশধর ইহুদীদের বেলায়, সম্মান অথবা ন্যায়বিচারের যে কোন মূল্যে, ট্রাইবের উর্ধ্বতন বা অব্যাহত অস্তিত্বই হচ্ছে লক্ষ্য। <strong>নেক কর্ম বা নৈতিকতার যে কোন মূল্যে রেস বা বংশের উর্ধ্বতন বা অব্যাহত অস্তিত্বই হচ্ছে বাঞ্ছনীয়। এমনকি, ইসরাইলের নিজ সামাজিক আইনের মধ্যে তা পবিত্রতম, যেমন অগত্যা নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে যৌন সংসর্গ এবং ব্যভিচারও অলংঘনীয় নয়, যখন <em>&#8216;ইব্রাহীমের বংশধারার নিরবচ্ছিন্নতা বিপন্ন হওয়ার প্রশ্ন উঠে।&#8217;</em></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ. খ্রিষ্টানধর্ম থেকে পার্থক্য </strong></p>
<p>খ্রীষ্টধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে এই মারাত্মক নৃতত্ত্বকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যা হযরত ঈসার সময়ে নিষ্প্রাণ আইনসর্বস্বতায় ফসিলিকৃত হয়ে উঠেছিল। অপরিহার্যভাবেই হযরত ঈসার আহ্বান ছিল বিশ্বমুখী এবং ব্যক্তি অভিমুখী বা অন্তমুখী। ইহুদীদের জাতিগত কুল-গৌরবের মন্দ পরিণাম সম্পর্কে ঈসা এতটাই সচেতন ছিলেন যে, তাঁর আত্মীয়রা, ‘যেহেতু তাঁরই আত্মীয়, এজন্য অধিক পাবার দাবিদার’ এমন ইঙ্গিত মাত্রেই তিনি ক্রুদ্ধ হতেন। ঈসার এই আহ্বান যা সারবত্তার দিক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে নৈতিকতাভিত্তিক (কেননা তার খোদা এবং কিতাব আর ইহুদীদের খোদা এবং কিতাব মূলতই অভিন্ন); তা পরিণত হতে পারতো একটি স্থায়ী আন্দোলনে যাতে ইহুদীদের বাড়াবাড়িগুলো সংশোধন হতে পারতো, যদি এর অনুসারীরা সেমিটিক অর্থাৎ ফিলিস্তিনী এবং তাদের পড়শীদের মধ্যে সীমিত থাকতো। কিন্তু গ্রীকদের দ্বারা গৃহীত হবার ফলে ঈসার এই দাওয়াত নতুন একটি &#8216;রহস্য ধর্মে রূপান্তরিত হয়। সেমাইটদের লোকোত্তর খোদা হয়ে উঠলেন ত্রিত্ববাদের মধ্যে এক &#8216;পিতা&#8217;, যে ত্রয়ীর দ্বিতীয় জনকে নির্মাণ করা হয়েছে মিত্র এবং এডোনিসের প্রতিকৃতিতে, যে মৃত্যুবরণ করে আবার বেঁচে উঠে, আবেগ মুক্তি বা মোক্ষণের মাধ্যমে পরিত্রাণ এনে দেবার জন্য।</p>
<p>যীশুর অন্তর্মুখীনতার পরিণয় বন্ধন ছিল বস্তুর প্রতি অসুস্থ ঘৃণার সঙ্গে যা বুদ্ধিসর্বস্ব জ্ঞানতত্ত্বের একটি বৈশিষ্ট্য, পরিণয় বন্ধন ছিল সমগ্র রাজনৈতিক জীবন তথা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সামগ্রিক নিন্দাবাদে ইহুদী ট্রাইবেলিস্ট রাজনীতির প্রতি তার সংশয়ী দৃষ্টিভঙ্গির সহিত। মুক্ত নাগরিকদের দাস সমাজ থেকে পৃথকীকরণ এবং মুক্ত নাগরিকদের সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক নপুংসকতা ছিল চর্চা বা ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের সূচনা। খ্রিষ্টান চার্চ বা ধর্ম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে, এবং এক সময়ে দুই তরবারীর তত্ত্ব সাধারণভাবে গৃহীত হয় একটি রাজনৈতিক থিওরী হিসেবে, কিন্তু তা ছিল আদি খ্রিষ্টানবিবেকের পরিপন্থী। এই বিবেকের বিদ্রোহ ঘটে লুথারের মাধ্যমে এবং চার্চকে আবার নিয়ে বন্দী করা হয় সেই খাঁচার মধ্যে, যা চার্চের প্রথম দিকের মতবাদ নির্মাণ করেছিল তার চারপাশে। আজ কদাচিৎই কোন খ্রিষ্টানধর্মানুসারী মধ্যযুগের থিওরিকে গ্রহণ করে। কদাচিৎ কোন খ্রিষ্টানরাজী হবে রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মকে একটি অংশ দিতে, দূর থেকে সমালোচনা করার অধিকার দেওয়া ছাড়া।<br />
বর্তমানে খ্রিষ্টানধর্মের কোন সমাজ বিষয়ক থিওরী নেই। দেশকাল এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নিন্দা, প্রত্যেকটি জাগতিক কর্মকান্ড, এমনকি খোদ সমাজ ব্যবস্থাকে অসার এবং পরিত্রাণ লাভের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক গণ্য করায় খ্রিষ্টানধর্মে কোন থিওরীর অবকাশ নেই। সমাজব্যবস্থাকে অপরিহার্য পাপ বলে গণ্য করা ছাড়া, কল্যাণ-বিধানের বাইরে দাঁড়িয়ে, এমনকি তার জাগতিক অস্তিত্বে খ্রিষ্টানধর্ম যতটুকু সংশ্লিষ্ট (ঈসার শরীর হিসেবে এর বাহ্য অস্তিত্ব যা এই পৃথিবীর নয়, কিংবা এ পৃথিবীতে নেই) তাতে করে খ্রিষ্টানধর্ম হচ্ছে একটি অস্থায়ী প্রতিষেধক, যেখানে দান- দক্ষিণা এবং বিশ্বাস হচ্ছে দৈনন্দিন বিধান। কিন্তু এতে প্রোগ্রাম ভিত্তিক কর্মকান্ড অথবা আইন কানুনের জন্য প্রয়াসের কোন মূল্য নেই, যেখানে ইতিহাস নিজেই অপ্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বহীন। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, শিল্প বিল্পবের সময় থেকে ইউরোপে এবং উত্তর আমেরিকায় খ্রিষ্টানচিন্তাবিদরা খ্রিষ্টানধর্মের নামে ক্রমবর্ধমান হারে সামাজিক ন্যায়বিচারের উচ্চতর ব্যবস্থার জন্য পরিকল্পনা আহ্বান করেছেন এবং তা কার্যকর করেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের এ সমস্ত কর্ম,  জগতবিমুখতা থেকে খ্রিষ্টানধর্মকে নড়াতে পারেনি। দারিদ্র বিমোচনের জন্য আবশ্যক এবং অত্যন্ত হিতকর হলেও, কিংবা বুদ্ধিভিত্তিক দিক দিয়ে একটি নৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতাবোধ সঞ্চারিত করার প্রয়াস সত্বেও তাদের কর্মকান্ড অসার প্রমাণিত হয়েছে। যা বিশ্বাসে মৌলিক সূত্রগুলোর সংস্কারের জন্য প্রয়োজন, তা সাধনের জন্য আজ পর্যন্ত কদাচিৎ কেউ দুঃসাহস করেছে- যেমন আল্লাহর প্রকৃতি, সৃষ্টির লক্ষ্য, মানুষের প্রকৃতি ও গন্তব্য। যত দিন না তা করা হয়েছে ততদিন খ্রিষ্টান চিন্তাধারা স্ববিরোধীই থেকে যাবে, সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নীলনকশা নিয়ে তারা যতই অগ্রসর হোক-না-কেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঘ. আধুনিক সেক্যুলারিজম থেকে ভিন্নতা</strong><br />
স্পষ্টতই ইসলামী সমাজব্যবস্থা হচ্ছে আধুনিক সেক্যুলারিজমের (ধর্মহীন নিরপেক্ষতা) সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান ধর্ম নিরপেক্ষতা চায় ধর্মের সম্ভাব্য সকল নিয়ন্ত্রণ থেকে সমাজের পাবলিক বা রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকান্ডকে দূরে রাখতে। পাশ্চাত্য জগতে সেক্যুলারিজমের ইতিহাসে যা দেখা যায়, তার প্রধান যুক্তি হচ্ছে ধর্ম অন্য সকলের উপর সমাজের একটি অংশ বা চার্চের একটি কায়েমী স্বার্থ, যেহেতু চার্চের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কর্তৃত্ববাদী, যাতে ব্যক্তিস্বাধীনতা উপেক্ষিত, এবং যেহেতু তাতে সমগ্র সমাজের প্রতিনিধিত্ব নেই, তাই চার্চ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ অত্যাচারের সামিল, একটি গ্রুপ বা দল কর্তৃক জাতির শোষণ এবং দমনের একটি প্রকার। পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে যুক্তিটি নিশ্চয়ই সত্য, যেখানে প্রাথমিক চার্চ জনসংখ্যার কেবল একটি অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে, সেখানে ক্যাথলিক খ্রিষ্টান মতবাদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিরোধী কর্তৃত্ববাদী শক্তিরূপে এবং জনগণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় গড়ে তুলে কায়েমী স্বার্থ। বহু শতাব্দী ধরে ক্যাথলিক চার্চ যেহেতু ইউরোপে সবচেয়ে বেশী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী ছিল সেকারণে সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির যে কোন আন্দোলন স্বভাবতই চার্চের বিরুদ্ধে একটি সংগ্রামের রূপ নেয়।</p>
<p>অধিকতর সাম্প্রতিককালে, সেক্যুলারিজম বলছে, ধর্ম থেকে উদ্ভূত মূল্যবোধসমূহের দ্বারা রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের বিরোধীতা তার লক্ষ্য। কেননা, উৎস হিসেবে পাশ্চাত্য ধর্মকে বিশ্বাসের অযোগ্য বলে গণ্য করে।&#8221; দাবি করা হয়, এই উৎস হচ্ছে অযৌক্তিক কৃসংস্কারপূর্ণ এবং নির্বিচারী। বলাবাহুল্য, এই সব অভিযোগের প্রতি মানুষ সহানুভূতিশীল তখনই হতে পারে, যখন অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয় খ্রিষ্টানধর্ম এবং সেই সব ধর্মের বিরুদ্ধে যেসব মতবাদের ভিত্তি হচ্ছে অন্ধবিশ্বাস অথবা সেই সব ধর্মের বিরুদ্ধে ইতিহাসের নির্দিষ্ট কোন কোন যুগে যাদের অবক্ষয় ঘটেছে। কিন্তু এসব অভিযোগ সেই সব ধর্মের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক, যেগুলো স্বভাবসংগত অর্থাৎ যৌক্তিক ধর্ম, তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার অধিকারী যা যুক্তি বিচারের মানদন্ডের সার্বজনীন বৈধতা স্বীকার করে। অথবা সেই সব ধর্মের ক্ষেত্রেও তা অপ্রসাঙ্গিক যেগুলো তাদের স্থবিরতা ও অবক্ষয়ের যুগ অতিক্রম করার প্রয়াস পায় সব প্রস্তাবনাবাক্যের প্রতি সমালোচনার আলোকে যৌক্তিক আবেদন জানিয়ে, সকল প্রকৃত মানবিক মূল্যবোধ যে সব প্রেমিসের অন্তর্গত। অবশ্য বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেক্যুলারিজমের অনুসরণ করা হয় অগভীর যুক্তিতে। তাদের যুক্তি এই যে, বিজ্ঞানের যুগ সেক্যুলারিজমের বাস্তবতাবাদ ও প্রগতির সঙ্গে অভিন্ন মনে করে। অথচ ধর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ এই যে, ধর্ম সেক্যুলারিজমের বিপরীত মূল্যবোধসমূহ জারি করে, আর এটি এমন একটা দাবী যার অবস্থান সত্য থেকে চূড়ান্ত দূরত্বে। প্রকৃতপক্ষে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এই দাবীটি হচ্ছে কপটতামূলক, কেননা কোন সমাজ দাবী করতে পারেনা যে, কোন মূল্যবোধের সাহায্য ছাড়াই তার ক্রিয়াকান্ড নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়, বা এমন সব মূল্যবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যা তার নিজ ধর্মের উত্তরাধিকার থেকে মোটেই অর্জিত নয়।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ অধ্যাপক শাহেদ আলী। </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/uniqueness-of-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14401</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কোরআনের ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাফাক্কুর</title>
		<link>https://rowyakbd.com/tafaqqur-on-the-occasion-of-1400-years-of-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/tafaqqur-on-the-occasion-of-1400-years-of-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আলীয়া ইজ্জেতবেগোভিচ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 29 Dec 2023 14:18:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[কোরআনের ১৪০০ বছর]]></category>
		<category><![CDATA[কোরআনের ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাফাক্কুর]]></category>
		<category><![CDATA[তাফাক্কুর]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13036</guid>

					<description><![CDATA[এ বছর মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন নাজিলের ১৪০০ বছর পূর্ণ হলো। কোরআনের এই ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সমগ্র দুনিয়াতেই বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি নিজেও কোরআনকে পুনরায় অধ্যয়ন করে অনেক নতুন কিছু উপলব্ধি করেছি। এইবার কোরআন অধ্যয়ন করতে গিয়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এ বছর মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন নাজিলের ১৪০০ বছর পূর্ণ হলো। কোরআনের এই ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সমগ্র দুনিয়াতেই বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি নিজেও কোরআনকে পুনরায় অধ্যয়ন করে অনেক নতুন কিছু উপলব্ধি করেছি। এইবার কোরআন অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমি নতুন করে কী শিখলাম, এবং বিশেষ করে এইবার কোন কোন বিষয়গুলো আমার নজর কেড়েছে, সেই বিষয়সমূহ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই।</p>
<p>ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো &#8211; <strong>“ইসলাম শুধু একটি বিশ্বাসের নাম নয়, ইসলাম এর চেয়েও আরও অনেক বিস্তৃত বিষয়। ইসলাম কেবলমাত্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনধারাই নয়, একইসাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকেও পরিগ্রহকারী একটি দ্বীন”</strong>। মৌলিকভাবে সঠিক এই চিন্তাটি কাদের দ্বারা সৃষ্টি হলো, কেমন একটি জ্ঞান এবং যা সত্যের অধিকারী, এবং সর্বজনবিদিত এ দাবিকে কেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এসকল বিষয় সম্পর্কে অনেক বই পুস্তক লেখা হয়েছে। এখানে আমাদের জন্য যেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল, ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম বিশ্বাসের নাম নয়, ইসলাম মানুষের জীবনকে সামগ্রিকভাবে পরিগ্রহকারী একটি ব্যবস্থা।</p>
<p>সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী পুনর্জাগরণ নিয়ে অনেক বেশী আলোচনা হওয়ায় এই বিষয়টি সকলের মধ্যে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছে এবং একটি সংগ্রামী ধারায় রূপান্তরিত হয়েছে। শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক ও ব্যক্তিগত বিষয় সমূহ নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলির সমাধানও ইসলামেই রয়েছে (ভিনদেশি আইডিওলজি সমূহে নয়)।</p>
<p>ইসলাম মানুষের জীবনের সকল কিছুকেই সামগ্রিকভাবে পরিগ্রহ করে, এই আশ্চর্যজনক দাবিকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করে আমার নিজেকে এই প্রশ্ন করলাম, <strong>ইসলাম; বিশেষ করে তার প্রথম ও মৌলিক উৎস হিসেবে কোরআন কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বজনীন?</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন যুবক ছিলাম তখন এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করার সময় কোরআনকে অধ্যয়ন করে শুধুমাত্র দ্বীনী বিষয়সমূহ নয়, তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক &#8211; এমন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করতাম। কোরআনের মধ্যে আমি বৈজ্ঞানিক সত্য সমূহ, রাজনৈতিক, সামাজিক, এমনকি অর্থনৈতিক সিস্টেম সম্পর্কে নির্দেশনা খুঁজে পাব, এ ব্যাপারে আমার বিশ্বাস ছিলো অতান্ত শক্তিশালী। আমার এ শক্তিশালী বিশ্বাস &#8211; কোরআনের মধ্যে সরাসরি পাওয়া যাবে না, এমন বিষয়সমূহও কোরআনের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার নেশায় আকুল করে তুলতো। পরবর্তীতে যখন আস্তে-আস্তে চিন্তাগত দিক থেকে পরিপক্ব হওয়া শুরু করলাম, তখন আমার নিজস্ব জীবনবোধ আমার কিছু কিছু বিষয়কে সংশোধন করে দিতো এবং আমি উপলব্ধি করতে শুরু করি যে, মানুষের জীবন ও তাকদীরগত দিক থেকে দ্বীনি ও আখলাকী বিষয়সমূহই মূলত একমাত্র সত্য। কেননা আমি সেভাবেই চিন্তা করতাম যে, নিকট ভবিষ্যতে আমরা সবাই প্রতিষ্ঠিত হবো এবং হয়তোবা অনেক কম কাজ করে অনেক কিছুর মালিক হওয়ার পরেও সুখ এবং আত্মতৃপ্তি পাবো না &#8211; এটা দেখতে পেতাম। শুধুমাত্র নিজের জন্য বেঁচে থেকে এবং নিজের জন্য ব্যস্ত হয়ে পরস্পর একত্রে বসবাস করার দ্বীনি চিন্তাকে পরিত্যাগ করার কারণে ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক, জযবার স্থানটি দখল করে নিবে আবেগহীনতা এবং জীবনসঙ্কট। আর ইবাদতের সাথে গভীর চিন্তার পরিবর্তে দখল করে নিবে অর্থহীন এক মৃত্যু এবং তৈরি হবে এমন এক দুনিয়া: যেথায় পরবর্তীতে বসবাসকারীরা আমাদের উপর দিবে অভিশাপ।</p>
<p>মানুষের শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বৈষয়িক উন্নতি যে এককভাবে সুখ-শান্তি বয়ে আনতে পারে না, এটা প্রাচীনকাল থেকেই বড় বড় দ্বীনের প্রতিষ্ঠাতাগণ এবং আখলাকবিদগণ বলে আসছেন। তবে শুধুমাত্র বৈষয়িক উন্নতি ও অগ্রগতিই যে মানুষের জীবনে শান্তি বইয়ে আনতে পারে না, এটা আজ সবচেয়ে বেশী সুস্পষ্টভাবে মানুষের সামনে এসে ধরা দিয়েছে। আজকের এই যুগে ইউরোপ ও আমেরিকা এর বাস্তব সাক্ষী। একজন মানুষের সাথে অপর একজন মানুষের মধ্যকার পার্থক্য তাদের পরিচয়কে কীভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে নয়, বরং সত্যিকার অর্থেই তারা কী &#8211; এই ব্যাপারটার মাঝে নিহিত রয়েছে। একইভাবে দুইটি সমাজের মধ্যকার সত্যিকার পার্থক্য, তাদেরকে কীভাবে পরিচালিত করা হয়েছে তার মধ্যে নয়; বরং সেই সমাজের মানুষকে গঠনকারী মূল্যবোধসমূহের মাঝে নিহিত থাকে। মানুষকে সত্যিকার অর্থেই মানুষ করে তুলে তাদের মধ্যকার আখলাক, মানবতাবোধ, ব্যক্তিত্ব ও তাদের বিবেকবোধ। যে সমাজের মানুষ তাদের আখলাক ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলেছে, তাদের দ্বারা আদর্শ সমাজ গঠন করা অসম্ভব। এই ধরনের সমাজের মানুষ সামান্য স্বার্থ পেলেই তাদের আখলাকহীনতাকে প্রকাশ করে দেয়।</p>
<p>যদি একটি সমাজকে আখলাকী মূল্যবোধের উপর গড়ে তুলতে হয়, তাহলে সেই সমাজের শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। কারণ সমাজ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে মানুষের শিক্ষা-দীক্ষার উপর নির্ভর করে থাকে। কোরআনের ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই চিন্তা ভাবনাকে সামনে রেখে আমি কোরআন অধ্যয়ন করেছিলাম।</p>
<p>যৌবনকালে আমি সবসময় চিন্তা করতাম যে, সকল ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যাবলি মানুষকে ‘শিক্ষা দেওয়া’র মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। আমার রুহের মধ্যকার এই গোপন রহস্যটি একটি সমাধানে উপনীত হয়েছে। কোরআন কীভাবে মানুষের জীবনের সকল সমস্যার জবাব দিতে সক্ষম হয়েছিল? কোরআনকে ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম যে, মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান কোরআনে রয়েছে, তবে আমরা যেভাবে ধারণা করি সেভাবে নয়। মূলত কোরআন মানুষের এই দুনিয়ার জীবনকে ব্যাখ্যা করেছে এবং তাদের অবস্থাকে তুলে ধরে, মৌলিক হাকীকতসমূহকে তুলে ধরে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদেরকে মূলনীতি দিয়েছে। এই হাকীকতসমূহও দ্বীন ও আখলাকের বিষয়। আর মানুষের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এগুলোই হলো প্রতিটি মানুষের মৌলিক বিষয়। মানবজীবনকে পরিগ্রহকারী অন্যান্য বিষয়াবলির তুলনায় এই বিষয় দুটি আরও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাই, এই বিষয় দুইটি (দ্বীন ও আখলাক) ব্যতীত মানব জীবনের অগ্রগতি ও উন্নতি অসম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এখন, আমরা দেখতে পাই যে, কোরআনের মৌলিক হাকীকত সমূহ হচ্ছে- </strong></p>
<p>সকল কিছুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এই দুনিয়ার শক্তির সাথে, আইন ও কানুনের সাথে মানুষের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, সকল মানুষ তার কাজের হিসাব প্রদান করবে। সকল মানুষের জন্য দুইটি পথ সব সময় উন্মুক্ত রয়েছে &#8211; সে চাইলে খারাপ পথ কিংবা ভালো পথ বেছে নিতে পারে। মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সকল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।</p>
<p>এ সকল মৌলিক বিষয়ে এবং দ্বীন ও আখলাকের গুরুত্বের ব্যাপারে কারোর কোনো দ্বিমত করার ক্ষমতা নেই। একইসাথে একমাত্র ওহীভিত্তিক দুনিয়া-দর্শন ছাড়া অন্য কোন জীবন দর্শন নেই, এটিও যুক্তিসংগত ও বাস্তবভিত্তিক।</p>
<p>হুমকি এবং কষ্টের বিনিময়ে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা, নাকি মান সম্মান ও ইজ্জতকে বিকিয়ে দিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট ও আয়েশি জীবন যাপন করা &#8211; এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি বেছে নিব? এই প্রশ্নটি সকল মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। দুনিয়ার কোনো গবেষণাই এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। বিশ্বাস করবে কি করবে না, এই প্রশ্ন কিংবা এই ধরনের অন্যান্য প্রশ্নের মুখোমুখি হলে প্রতিটি মানুষই নিঃসঙ্গতায় পড়ে যায়। কেবলমাত্র এবং শুধুমাত্র ওহীই এই নিঃসঙ্গতাকে দূরীভূত করে দিতে পারে। এই সকল প্রশ্নের জবাব কেবলমাত্র ওহীর মধ্যেই রয়েছে। এ কারণে ওহী শুধুমাত্র মূল্যবান একটি বিষয়ই নয়, ওহী একইসাথে এমন এক জ্ঞান যার শুন্যতাকে পূর্ণ করা অসম্ভব।</p>
<p>মানুষের এ সকল বড় বড় প্রশ্নের জবাবে কোরআন কী বলে? কোরআন কোন ধরনের জবাব দেয়? পূর্বে উল্লিখিত এ সকল বড় বড় বিষয়ে কোরআনের অবস্থান কী? এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্যই হলো কোরআনকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার ক্ষেত্রে সাহায্য করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> কোরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রতি ঈমানকে মানুষের মনে বদ্ধমূল করে দেওয়া এবং একক, মহান ও ন্যায়পরায়ণ এক স্রষ্টার ব্যাপারে মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করে বিকাশ করা। এই অর্থে কোরআন সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং সবচেয়ে মহান একত্ববাদের উপমা।</strong></p>
<p>১. “পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর। যেদিকে তোমরা মুখ ফিরাবে, সেদিকেই আল্লাহর সত্তা বিরাজমান। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশালতার অধিকারী এবং সর্ব বিষয়ে অবহিত।” (সূরা আল-বাকারা: ১১৫)</p>
<p>২. “বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন আল্লাহর কথা মানতে অস্বীকার করছো? তোমরা যেসব কাজকর্ম করছো, তা সবই আল্লাহ প্রত্যক্ষ করছেন”। (সূরা আলে-ইমরান: ৯৮)</p>
<p>৩. “আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাজিল করেছেন এবং তোমাকে এমন বিষয় জানিয়ে দিয়েছেন, যা তোমার জানা ছিলো না। বস্তুত তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অসীম।” (সূরা আন-নিসা: ১১৩)</p>
<p>৪. “অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলগণের প্রতি ঈমান আনো এবং বলো না, তিন জন আছে। বিরত হও; এ তোমাদেরই পক্ষে কল্যাণকর। আল্লাহই অভিভাবক হিসেবে যথেষ্ট।” (সূরা আন-নিসা: ১৭১)</p>
<p>৫. “আল্লাহ কি তাঁর শোকর আদায়কারী বান্দাদেরকে এদের নিজেদের অপেক্ষাও বেশি জানেন না? আমার আয়াতের প্রতি যারা ঈমান আনে তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন তাদেরকে বলো, “তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” তোমাদের রব দয়া ও অনুগ্রহের নীতি নিজের জন্য অপরিহার্য করে নিয়েছেন। তোমাদের কেউ যদি অজ্ঞতাবশত কোনো খারাপ কাজ করে বসে, তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তাহলে তিনি তাকে মাফ করে দেন এবং নরম নীতি অবলম্বন করেন, এটি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহেরই প্রকাশ।&#8221; (সূরা আল-আনয়াম: ৫৩-৫৪)</p>
<p>৬. “ইবরাহীমের ঘটনা স্মরণ করো, যখন সে আপন পিতা আজরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছ? আমি তো তোমাকে ও তোমার দলের লোকজনকে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত দেখতে পাচ্ছি’। ইবরাহীমকে এভাবেই আমি জমিন ও আসমানের রাজ্য পরিচালন-ব্যবস্থা দেখাচ্ছিলাম। আর এজন্য যে, সে যেন নিঃসন্দেহে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অতঃপর যখন তার উপর রাত আচ্ছন্ন হয়ে এলো তখন সে একটি তারকা দেখতে পেলো। বললো, এ আমার রব। কিন্তু পরে তা যখন অস্তমিত হয়ে গেলো, তখন বললো, অস্ত হয়ে যাওয়া জিনিসের প্রতি আমি কিছুমাত্র অনুরাগী নই। পরে যখন উজ্জ্বল চন্দ্র দেখতে পেল তখন বললো, এ আমার রব। কিন্তু তাও যখন অস্তগমন করল, তখন বললো, আমার রব যদি আমাকে পথ না দেখান তাবে আমিও গোমরাহ লোকদের মধ্যে শামিল হয়ে পড়ব। এরপর যখন সূর্যকে উজ্জ্বল-উদ্ভাসিত দেখতে পেলো, তখন বলল, এ-ই হচ্ছে আমার রব। এটি সর্বাপেক্ষা বড়। কিন্তু পরে এটাও যখন ডুবে গেলো, তখন ইবরাহীম চিৎকার করে বলে উঠল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক বানাচ্ছ, আমি সেই সব থেকে মুক্ত। আমি তো একনিষ্ঠভাবে নিজের লক্ষ্য সেই মহান সত্তার দিকে কেন্দ্রীভূত করেছি, যিনি যমীন ও আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আল-আনয়াম: ৭৪-৭৯)</p>
<p>৭. “আল্লাহই শস্যবীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী। তিনিই জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং তিনিই বের করেন মৃতকে জীবিত থেকে। এ সমস্ত কাজ তো আল্লাহই করেন, তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে ছুটে চলছো? তিনিই রাতের আবরণ বিদীর্ণ করে রঙিন প্রভাতের উন্মেষ করেন। তিনিই রাতকে করেছেন প্রশান্তিকাল। তিনিই চন্দ্র ও সূর্যের উদয়াস্তের হিসেব নির্দিষ্ট করেছেন। বস্তুত এসবই সেই মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানীর নির্ধারিত পরিমাপ। আর তিনিই তোমাদের জন্য তারকাসমূহকে মরু-সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে পথ জানার উপায় বানিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ করো, আমি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি তাদের জন্য যারা জ্ঞান রাখে। আর তিনিই এক প্রাণসত্তা থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর প্রত্যেকের জন্য রয়েছে একটি অবস্থান স্থল এবং তাকে সোপর্দ করার একটি জায়গা। এ নিদর্শনগুলো সুস্পষ্ট করে দিয়েছি তাদের জন্য যার জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারী। আর তিনিই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন। তারপর তার সাহায্য সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপাদন করেছেন এবং তার দ্বারা শস্য-শ্যামল ক্ষেত-খামার ও গাছ-পালার সৃষ্টি করেছেন। তারপর তা থেকে বিভিন্ন কোষসম্পন্ন শস্যদানা উৎপাদন করেছেন, খেজুরের মোচা থেকে ফলের থোকা থোকা বানিয়েছেন, যা বোঝার ভারে নুয়ে পড়ে। আর সজ্জিত করেছেন আঙুর, যয়তুন ও ডালিমের বাগান, সাজিয়ে দিয়েছেন সেখানে ফলসমূহ পরস্পর সদৃশ, অথচ প্রত্যেকটি পৃথক বৈশিষ্ট্যেরও অধিকারী। এ গাছগুলো যখন ফলধারণ করে তখন তাদের ফল বের হওয়া ও তা পেকে যাওয়ার অবস্থাটি একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করো। এসব জিনিসেই সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিহিত রয়েছে তাদের জন্য, যারা ঈমান আনে।” (সূরা আল-আনয়াম: ৯৫-৯৯)</p>
<p>৮. “বলো, আমার নামাজ, আমার সর্বপ্রকার ইবাদত অনুষ্ঠানসমূহ, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই সারে জাহানের রব আল্লাহরই জন্য।” (সূরা আল-আনয়াম: ১৬২)</p>
<p>৯. “মূলত একথা তারা শুধু এ জন্যই বলবে যে, যে সত্যকে তারা পূর্বে আবৃত ও গোপন করে রেখেছিল, এক্ষণে তা উন্মুক্ত হয়ে তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে; নতুবা, তাদেরকে পূর্ববর্তী জীবনের দিকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তা হলেও তারা সেইসব কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। তারা তো বড়ই মিথ্যাবাদী। (তাই নিজেদের মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও তারা মিথ্যারই আশ্রয় নেবে)। আজ তারা বলে, জীবন বলতে যা কিছু আছে, তা শুধু এ দুনিয়ার জীবনটুকুই এবং মৃত্যুর পর আমরা কখনই পুনরুত্থান লাভ করব না।” (সূরা আল-আনয়াম: ২৮- ২৯)</p>
<p>১০. “বলুন, ‘আমার রব নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায়বিচারের।’ আর তোমরা প্রত্যেক সাজদাহ বা ইবাদতে তোমাদের লক্ষ্য একমাত্র আল্লাহকেই নির্ধারণ কর এবং তাঁরই আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁকে ডাক। তিনি যেভাবে তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টি করেছেন তোমরা সেভাবে ফিরে আসবে। একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে। কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি।” (সূরা আল-আ’রাফ: ২৯-৩০)</p>
<p>১১. “আমার সাহায্যকারী ও রক্ষাকর্তা হচ্ছেন সেই আল্লাহ, যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনি তার সালিহ বান্দাদেরকে সাহায্য করে থাকেন। পক্ষান্তরে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা না তোমাদের কোনো সাহায্য করতে পারে আর না তারা নিজেদের সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে।&#8221; (সূরা আ’রাফ: ১৯৬-১৯৭)</p>
<p>১২. “আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদের বের করেছেন এমন অবস্থায় যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, চিন্তা-ভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। এই লোকেরা কি কখনও পাখিদের দেখেনি যে, আকাশের শূন্যলোকে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে? আল্লাহ ছাড়া কে তাদেরকে ধরে রেখেছে? নিশ্চয়ই এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সেই লোকদের জন্য যারা ঈমান আনে।” (সূরা নাহল: ৭৮-৭৯)</p>
<p>১৩. “আল্লাহ তায়া’লা ন্যায়বিচার (ইনসাফ), অনুগ্রহ ও সিলায়ে রেহমীর নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অন্যায়, পাপাচার, নির্লজ্জতা ও জুলুম পীড়ন করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে নসিহত করেছেন, যেন তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো। তোমরা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ওয়াদা করার পর তা পূরণ করো এবং নিজেদের কসম পাকা-পোক্তভাবে করার পর তা ভঙ্গ করো না, যখন তোমরা আল্লাহকে নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে নিয়েছো। আল্লাহ তোমাদের সব কাজকর্ম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল রয়েছেন।&#8221; (সূরা নাহল: ৯০-৯১)</p>
<p>১৪. &#8220;আল্লাহর ওয়াদা-প্রতিশ্রুতিকে সামান্য ও নগণ্য ফায়দার বিনিময়ে বিক্রি করে দিও না। যা কিছু আল্লাহর কাছে রয়েছে, তা তোমাদের জন্য অধিক উত্তম-যদি তোমরা জানতে ও বুঝতে পারো। তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে আর যা আল্লাহর কাছে রয়েছে, তাই চিরদিন অবশিষ্ট থাকবে। আমরা অবশ্যই ধৈর্য ধারণকারীদেরকে তাদের উত্তম কাজ অনুপাতে প্রতিফল দান করব।&#8221; (সূরা নাহল: ৯৫-৯৬)</p>
<p>১৫. &#8220;আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে এ রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ। সূর্য ও চাঁদকে সেজদা করো না; সেজদা করো সেই আল্লাহকে যিনি এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, যদি বাস্তবিকই তোমরা তাঁরই ইবাদতকারী হয়ে থাকো।&#8221; (সূরা হা-মীম আস সাজদাহ: ৩৭)</p>
<p>১৬. &#8220;আর আল্লাহর নিদর্শনের মধ্যে একটি এই যে, তোমরা দেখতে পাচ্ছ, জমিন শুকনো জীর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে। অতঃপর যখনই আমরা তার ওপর পানি বর্ষণ করি, সহসা তা উথলে ওঠে-অঙ্কুরোদগমে স্ফীত হয়। যে আল্লাহ এ মৃত জমিনকে জীবন্ত করে দেন, তিনি মৃত লোকদেরকেও নিশ্চিতভাবে জীবন দান করবেন। নিঃসন্দেহে তিনি প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর ক্ষমতাবান।&#8221; (সূরা হা-মীম আস সাজদাহ: ৩৯)</p>
<p>১৭. &#8220;এরপর সে সেগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর ডান হাতে খুব করে আঘাত হানলো। সেই লোকেরা (ফিরে এসে) দ্রুতবেগে তার কাছে উপস্থিত হলো। সে বললঃ “তোমরা কি নিজেদেরই নির্মিত জিনিসের পূজা-উপাসনা করো? অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন আর তোমরা যে জিনিসগুলো বানিয়ে রাখো সেগুলোকেও।” (সূরা সাফফাত: ৯৩-৯৬)</p>
<p>১৮. &#8220;অতীব মহান ও শ্রেষ্ঠ সেই সত্তা, যার মুষ্ঠির মধ্যে রয়েছে সমগ্র সৃষ্টিলোকের কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্ব। প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর-ই তাঁর কর্তৃত্ব সংস্থাপিত। তিনিই মৃত্যু ও জীবন উদ্ভাবন করেছেন, যেন তোমাদেরকে পরখ করে দেখতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি যেমন সর্বজয়ী শক্তিমান, তেমনি ক্ষমাশীলও।&#8221; (সূরা মূলক: ১-২)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> একক, কাদিরে মুতলাক এবং সর্বোত্তম এক স্রষ্টার ধারণা সম্পর্কে এমন সুস্পষ্ট পরিভাষা সমূহের উপর নির্ভরশীল দ্বীন এবং ঈমানও সাধারণ মানুষের আকল এবং কালবের জন্য উন্মুক্ত। এবং স্রষ্টা সম্পর্কে এত সহজ ধারণা সকলের দ্বারাই অনুধাবনযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য। আর মানুষের এই ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো মহান আল্লাহর ইচ্ছাকে গ্রহণ করা এবং উত্তম কাজ করা।</strong></p>
<p>১. &#8220;নিশ্চয় জানো শেষ নবীর প্রতি বিশ্বাসী হোক, কি ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা সাবীই-যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনবে ও নেক কাজ করবে, তার পুরস্কার তার রব-এর কাছে রয়েছে এবং তার জন্য কোনো প্রকার ভয় ও চিন্তার কারণ নেই।&#8221; (সূরা বাকারা: ৬২)</p>
<p>২. &#8220;স্মরণ করো, ইসরাইল-সন্তানদের কাছ থেকে আমরা এ পাকাপোক্ত প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। পিতামাতার সাথে, আত্মীয়-স্বজনের সাথে, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। লোকদের সাথে ভালো কথাবার্তা বলবে, নামাজ কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। কিন্তু মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া তোমরা সকলেই এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ এবং এখন পর্যন্ত সেই অবস্থায়ই রয়েছে।&#8221; (সূরা বাকারা: ৮৩)</p>
<p>৩. &#8220;প্রত্যেকের জন্য একটি দিক রয়েছে, যেদিকে সে মুখ করে দাঁড়ায়। কাজেই তোমরা প্রতিযোগিতার সাথে কল্যাণের দিকে অগ্রসর হও। তোমরা যেখানেই থাকবে, আল্লাহ তোমাদেরকে নিশ্চয়ই পাবেন। কোনো জিনিসই তার শক্তিবহির্ভূত নয়।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৪৮)</p>
<p>৪. &#8220;হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ও নামাজের সাহায্যে প্রার্থনা করো, আল্লাহ ধৈর্যশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৫৩)</p>
<p>৫. &#8220;তোমাদের মুখ পূর্ব দিকে বা পশ্চিম দিকে ফিরাবার মধ্যে কোন পুণ্য নেই। বরং কাজ হচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ‌, কিয়ামতের দিন, ফেরেশতা আল্লাহ‌র অবতীর্ণ কিতাব ও নবীদেরকে মনে প্রাণে মেনে নেবে এবং আল্লাহ‌র প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্য প্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে। আর নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দান করবে। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে এবং বিপদে-অনটনে ও হক–বাতিলের সংগ্রামে সবর করবে তারাই সৎ ও সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৭৭)</p>
<p>৬. &#8220;হে ঈমানদারগণ! যা কিছু অর্থ-সম্পদ আমরা তোমাদেরকে দান করেছি, তা থেকে ব্যয় করো, সেই দিনটি উপস্থিত হওয়ার পূর্বে যে দিন না ক্রয়-বিক্রয় হবে, না বন্ধুত্ব কোনো কাজে আসবে আর না চলবে কোনো সুপারিশ। প্রকৃত জালিম তারাই, যারা কুফরির নীতি অবলম্বন করে।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৫৪)</p>
<p>৭. &#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের দান-খয়রাতের কথা বলে (অনুগ্রহের দোহাই দিয়ে) এবং কষ্ট দিয়ে তাকে সেই ব্যক্তির ন্যায় নষ্ট করো না, যে ব্যক্তি শুধু লোকদের দেখাবার উদ্দেশ্যেই নিজের ধন-মাল ব্যয় করে আর না আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, না পরকালের প্রতি। তার খরচের দৃষ্টান্ত এইরূপ : যেমন একটি পাথুরে চাতাল, যার ওপর মাটির আস্তর পড়ে ছিল-এর ওপর যখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ল, তখন সমস্ত মাটি ধুয়ে ভেসে গেল এবং গোটা চাতালটি নির্মল ও পরিষ্কার হয়ে পরে রইল। এই সব লোক দান-সদকা করে যে পুণ্য অর্জন করে, তার কিছুই তাদের হাতে আসে না। আর কাফেরদেরকে সঠিক পথ নির্দেশ করা আল্লাহর রীতি নয়।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৬৪)</p>
<p>৮. &#8220;পক্ষান্তরে যারা নিজেদের ধন-মাল খালেসভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য মনের ঐকান্তিক স্থিরতা ও দৃঢ়তা সহকারে খরচ করে, তাদের এই ব্যয়ের দৃষ্টান্ত এইরূপ। যেমন কোনো উচ্চ ভূমিতে একটি বাগান রয়েছে, প্রবল বেগে বৃষ্টি হলে দ্বিগুণ ফল ধরে, আর জোরে বৃষ্টি না হলেও বৃষ্টির রেণুই তার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়। বস্তুত তোমরা যা করো, সবই আল্লাহর গোচরীভূত রয়েছে।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৬৫)</p>
<p>৯. &#8220;তোমরা কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারো না, যতক্ষণ না তোমরা (আল্লাহর পথে) সেই সব জিনিস ব্যয় ও নিয়োগ করবে, যা তোমাদের প্রিয় ও পছন্দনীয়। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহ সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবহিত রয়েছেন। (সূরা আলে-ইমরান: ৯২)</p>
<p>১০. &#8220;হে ঈমানদারগণ! অঙ্গীকারসমূহ পুরোপুরি মেনে চলো। তোমাদের জন্য গৃহপালিত ধরনের সমস্ত জন্তুকে হালাল করা হয়েছে, সে সব বাদে, যা একটু পরই তোমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ইহরামের অবস্থায় শিকার কার্যকে নিজেদের জন্য হালাল করে নিও না। বস্তুত আল্লাহ যা-ই চান, তারই আদেশ দান করেন।&#8221; (সূরা মায়েদা: ১)</p>
<p>১১. &#8220;হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর আনুগত্য ও ভক্তির নিদর্শনসমূহের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করো না। হারাম মাসসমূহের কোনো মাসকে হালাল করে নিও না। কুরবানির জন্তু-জানোয়ারগুলোর ওপর হস্তক্ষেপ করো না; সে সব জন্তুর ওপরও হস্তক্ষেপ করো না, যে সবের গলদেশে খোদায়ী মানতের চিহ্নস্বরূপ পট্টি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেই সব লোককেও কোনো কষ্ট দিয়ো না, যারা নিজেদের পরোয়ারদেগারের অনুগ্রহ এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের সন্ধানে পবিত্র ও সম্মানিত ঘরে (কা’বায় যাচ্ছে। ইহরামের অবস্থা শেষ হয়ে গেলে অবশ্য তোমরা শিকার করতে পারো। আর দেখো, একদল লোক যে তোমাদের জন্য মসজিদে হারামের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, সেজন্য তোমাদের ক্রোধ যেন তোমাদেরকে এতদূর উত্তেজিত করে না তোলে যে, তোমরাও তাদের মোকাবিলায় অবৈধ বাড়াবাড়ি করতে শুরু করবে। যে সব কাজ পুণ্যময় ও আল্লাহর ভয়মূলক, তাতে সকলের সঙ্গে সহযোগিতা করো; আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজ, তাতে কারো একবিন্দু সাহায্য ও সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো, কেননা, তাঁর শান্তি অত্যন্ত কঠিন।&#8221; (সূরা মায়েদা: ২)</p>
<p>১২. &#8220;হে ঈমানদার লোকেরা! এই মদ, জুয়া, আস্তানা ও পাশা এ সবই নাপাক শয়তানি কাজ। তোমরা এটা পরিহার করো। আশা করা যায় যে, তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৯০)</p>
<p>১৩. &#8220;হে মুহাম্মাদ! এই লোকদেরকে বলো যে, তোমরা এসো, আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দেবো তোমাদের রব তোমাদের ওপর কি কি বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন। তা এই যে, তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরিক করবে না, ব্যবহার করবে, পিতামাতার সঙ্গে ভালো নিজেদের সন্তানদের দারিদ্রের ভয়ে হত্যা করবে না, কেননা আমিই তোমাদেরকে রিযিক দেই, এবং তাদেরকেও দেবো। নির্লজ্জতার বিষয় ও। প্রসঙ্গের কাছেও যাবেনা, তা প্রকাশ্যেই হোক, কি গোপনে। কোনো প্রাণ আল্লাহ্ যাকে সম্মানীয় করেছেন ধ্বংস করবে না, অবশ্য সত্য ও ন্যায় সহকারে (করা যাবে)। এসব কথা পালন করার জন্য তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভবত তোমরা বুঝে-শুনে কাজ করবে।&#8221; (সূরা আনয়াম: ১৫১)</p>
<p>১৪. &#8220;আরো এই যে, তোমরা ইয়াতীমের মাল-সম্পদের নিকটেও যাবে না, অবশ্য এমন নিয়ম ও পন্থায় (যেতে পারো) যা সর্বাপেক্ষা ভালো, যতদিন না সে জ্ঞানবুদ্ধি লাভের বয়স পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর মাপে এবং ওজনে পুরোপুরি ইনসাফ করো। আমরা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর দায়িত্বের বোঝা ততখানিই চাপাই, যতখানির সাধ্য তার রয়েছে। আর যখন কথা বলো, ইনসাফের কথা বলো: ব্যাপারটি নিজের আত্মীয়েরই হোক না কেন এবং আল্লাহর ওয়াদা পূরণ করো। এসব বিষয়ের হেদায়েত আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে দিয়েছেন; হয়ত তোমরা নসীহত কবুল করবে।&#8221; (সূরা আনয়াম: ১৫২)</p>
<p>১৫. &#8220;আমি কি তাকে দুটি চোখ, একটি জিহ্বা এবং দুটি ওষ্ঠ দেই নাই? আর আমি কি তাকে দুটি স্পষ্ট পথ দেখাই না? কিন্তু সে দুর্গম বন্ধুর পথ অতিক্রম করার সাহস করেনি। তুমি কি জানো সেই দুর্গম বন্ধুর পথটি কি? কোনো গলাকে দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা কিংবা উপবাসের দিনে কোনো নিকটবর্তী ইয়াতীম বা ধূলি মলিন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো। সেই সঙ্গে শামিল হওয়া সেই লোকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যারা পরস্পরকে ধৈর্য ধারণের ও (সৃষ্টিকুলের প্রতি) দয়া প্রদর্শনের উপদেশ দেয়। এ লোকেরাই দক্ষিণপন্থি। আর যারা আমার আয়াতসমূহ মেনে নিতে অস্বীকার করেছে তারা বামপন্থী। তাদের ওপর আগুন। একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।&#8221; (সূরা বালাদ: ৮-১৬)</p>
<p>১৬. সূর্য ও তার রৌদ্রের শপথ। চাঁদের শপথ যখন তা সূর্যের পিছনে পিছনে আসে। দিনের শপথ যখন তা (সূর্যকে) প্রকট করে তোলে। এবং রাতের শপথ যখন তা (সূর্যকে) আচ্ছাদিত করে নেয়। আকাশসমূহের এবং সেই সত্তার শপথ যিনি তা সংস্থাপিত করেছেন। আর পৃথিবীর ও সেই সত্তার শপথ, যিনি তাকে বিছিয়ে দিয়েছেন। মানব-প্রকৃতির এবং সেই সত্তার শপথ, যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তার পাপ ও তার তাকওয়া (সতর্কতা) তার প্রতি ইলহাম করেছেন। নিঃসন্দেহে কল্যাণ পেল সে, যে নিজের নফসের পবিত্রতা বিধান করল। এবং ব্যর্থ হলো সে, যে তাকে খর্ব ও গুপ্ত করল। (সূরা শামস: ১-১০)</p>
<p>১৭. &#8220;(লোকেরা) জিজ্ঞেস করছে মদ ও জুয়া সম্পর্কে কী নির্দেশ? বলে দাও এ দুটি জিনিসেই বড় পাপ রয়েছে, যদিও এতেই লোকদের জন্য কিছুটা উপকারিতাও আছে; কিন্তু উভয় কাজের পাপ উপকারিতা থেকে অনেক বেশি জিজ্ঞেস করছে? আমরা আল্লাহর পথে কি খরচ করব? বলো, যা কিছু তোমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত। বস্তুত, আল্লাহ তোমাদের জন্য এভাবে বিধানসমূহ স্পষ্টরূপে বিবৃত করেন।&#8221; (সূরা বাকারা: ২১৯)</p>
<p>১৮. &#8220;একটু মিষ্টি কথা এবং কোনো অপ্রিয় ব্যাপারে সামান্য উদারতা দেখানো সে দান অপেক্ষা ভালো যার পিছনে আসে দুঃখ ও তিক্ততা। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা গুণে ভূষিত।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৬৩)</p>
<p>১৯. &#8220;সেই পথে তীব্র গতিতে চলো, যা তােমাদের রব্ব-এর ক্ষমা এবং আকাশ ও পৃথিবীর সমান প্রশন্ত বেহেশতের দিকে চলে গেছে এবং যা সেই মুত্তাকী লোকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা সব সময়ই নিজেদের ধন-মাল খরচ করে, দুরবস্থায়ই হোক আর সচ্ছল অবস্থায়ই হোক, যারা ক্রোধকে হজম করে এবং অন্যান্য লোকদের অপরাধ মাফ করে দেয়। এই সব নেককার লোককেই আল্লাহ খুব ভালোবাসেন।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৩-১৩৪)</p>
<p>২০. &#8220;হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য অবলম্বন করো, বাতিলপন্থীদের মুকাবিলায় দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা প্রদর্শন করো, সত্যের খেদমতের জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ২০০)</p>
<p>২১. &#8220;ইয়াতিমদের ধন-সম্পত্তি তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। ভালো সম্পদ খারাপ সম্পদের সাথে বদল করো না এবং তাদের সম্পদ তোমাদের সম্পদের সাথে মিলিয়ে হজম করে ফেলো না। এটি অত্যন্ত বড় গুনাহ।&#8221; (সূরা নিসা: ২)</p>
<p>২২. &#8220;যারা ইয়াতিমদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে আগুন দ্বারা নিজেদের পেট বোঝাই করে এবং তারা নিশ্চয়ই জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।&#8221; (সূরা নিসা: ১০)</p>
<p>২৩. &#8220;সেই সব লোককেও আল্লাহ পছন্দ করেন না, যারা কার্পণ্য করে এবং অন্য লোককেও কার্পণ্য করার উপদেশ দেয় এবং আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দান করেছেন, তা লুকিয়ে রাখে এরূপ অকৃতজ্ঞ-নেয়ামত অস্বীকারকারী লোকদের জন্য আমরা অপমানকর আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছি।&#8221; (সূরা নিসা: ৩৭)</p>
<p>২৪. &#8220;নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের সব ক্রিয়াকার্য জানেন গোপন ও অদৃশ্য বিষয়ও এবং প্রকাশ্য ব্যাপারগুলোও। তিনি সে লোকদেরকে আদৌ পছন্দ করেন না যারা আত্ম-অহংকারে নিমজ্জিত।&#8221; (সূরা নাহল: ২৩)</p>
<p>২৫. &#8220;হে নবী! তোমার রব-এর পথের দিকে আহ্বান জানাও হেকমত ও উত্তম নসিহতের সাহায্যে। আর লোকদের সঙ্গে পরস্পর বিতর্ক করো এমন পন্থায়, যা অতি উত্তম। তোমার রবই বেশি ভালো জানেন, কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে আর কে সঠিক পথে আছে।&#8221; (সূরা নাহল: ১২৫)</p>
<p>২৬. &#8220;(হে নবী!) তিলাওয়াত করো এই কিতাব, যা ওহীর মাধ্যমে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে আর নামাজ আদায় করো: নিঃসন্দেহে নামাজ অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর যিকির তা থেকেও অধিক বড় জিনিস। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কিছু করো।&#8221; (সূরা আনকাবুত: ৪৫)</p>
<p>২৭. &#8220;ধ্বংস, হীন ঠকবাজদের জন্য (যারা মাপে বা ওজনে কম দেয়)। তাদের অবস্থা এই যে, লোকদের কাছ থেকে গ্রহণের সময় পুরোমাত্রায় গ্রহণ করে; কিন্তু তাদেরকে ওজন বা পরিমাপ করে দেওয়ার সময় তাদের ক্ষতিসাধন করে। এ লোকেরা কি চিন্তা করে না যে, একটা মহাদিবসে তাদেরকে উঠিয়ে আনা হবে? এটি সেই দিন, যেদিন সমস্ত মানুষ রাব্বুল আ’লামীনের সামনে দাঁড়াবে।&#8221; (সূরা মুতাফফিফীন, ১-৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> দ্বীন আকলের কোন ফসল নয়, তবে আকলের সাথে দ্বীনের কোনো সংঘর্ষও নেই। জ্ঞান ও বিজ্ঞান যদিও দ্বীনকে বিচার করার ও তাকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা রাখে না, তবুও জ্ঞান ও বিজ্ঞান তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে এবং আমাদের জযবার মাধ্যমে আমাদের গভীর চিন্তার গোপন রহস্য সমূহকে অনেক বেশী সম্প্রসারিত করতে পারে।</strong></p>
<p>১. &#8220;পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠণাকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন। তারা আপনা আপনি বলে ওঠে, হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সৃষ্টি করোনি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৯০-১৯১)</p>
<p>২. &#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না। নামাজ সেই সময় পড়া উচিত যখন তোমরা যা বলছো তা জানতে পারো। অনুরূপভাবে অপবিত্র অবস্থায়ও গোসল না করা পর্যন্ত নামাযের কাছে যেয়ো না। তবে যদি পথ অতিক্রমকারী হও, তাহলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। আর যদি কখনো তোমরা অসুস্থ হয়ে পড়ো, সফরে থাকো বা তোমাদের কেউ মলমূত্র ত্যাগ করে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ করে থাকো এবং এরপর পানি না পাও, তাহলে পাক পবিত্র মাটির সাহায্য গ্রহণ করো এবং তা নিজেদের চেহারা ও হাতের ওপর বোলাও। নিঃসন্দেহে আল্লাহ কোমলতা অবলম্বনকারী ও ক্ষমাশীল।&#8221; (সূরা নিসা: ৪৩)</p>
<p>৩. &#8220;তাদের মতো হয়ে যেয়ো না, যারা বললো, আমরা শুনেছি অথচ তারা শোনে না। অবশ্য আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার হচ্ছে সেই সব বধির ও বোবা লোক যারা-বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগায় না।&#8221; (সূরা আনফাল: ২১- ২২)</p>
<p>৪. &#8220;এদেরকে জিজ্ঞেস করো, আকাশ ও পৃথিবীর রব কে? বলো আল্লাহ! তারপর এদেরকে জিজ্ঞেস করো, আসল ব্যাপার যখন এই তখন তোমরা কি তাঁকে বাদ দিয়ে এমন মাবুদদেরকে নিজেদের কার্যসম্পাদনকারী বানিয়ে নিয়েছো যারা তাদের নিজেদের জন্যও কোন লাভ ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না? বলো অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হয়ে থাকে? আলো ও আঁধার কি এক রকম হয়? যদি এমন না হয়, তাহলে তাদের বানানো শরীকরাও কি আল্লাহর মতো কিছু সৃষ্টি করেছে, যে কারণে তারাও সৃষ্টি ক্ষমতার অধিকারী বলে সন্দেহ হয়েছে? বলো, প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। তিনি একক ও সবার ওপর পরাক্রমশালী।&#8221; (সূরা রা’দ: ১৬)</p>
<p>৫. &#8220;একমাত্র আল্লাহই সেই সময়ের জ্ঞান রাখেন। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে কি লালিত হচ্ছে। কোন প্রাণসত্তা জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কোন ব্যক্তির জানা নেই তার মৃত্যু হবে কোন যমিনে। আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন।&#8221; (সূরা লোকমান: ৩৪)</p>
<p>৬. &#8220;(এরা মানছে না) তাহলে কি এরা উটগুলো দেখছে না, কীভাবে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশ দেখছে না, কীভাবে তাকে উঠানো হয়েছে? পাহাড়গুলো দেখছে না, কীভাবে তাদেরকে শক্তভাবে বসানো হয়েছে? আর যমীনকে দেখছে না, কীভাবে তাকে বিছানো হয়েছে? বেশ (হে নবি) তাহলে তুমি উপদেশ দিয়ে যেতে থাকো। তুমি তো শুধুমাত্র একজন উপদেশক, এদের উপর বল প্রয়োগকারী নও।&#8221; (সূরা গাশিয়া: ১৭-২২)</p>
<p>৭. &#8220;(এই সত্যটি চিহ্নিত করার জন্য যদি কোন নিদর্শন বা আলামতের প্রয়োজন হয় তাহলে) যারা বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার করে তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর ঘটনাকৃতিতে, রাত্রদিনের অনবরত আবর্তনে, মানুষের প্রয়োজনীয় ও উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগর দরিয়ার চলমান জলযানসমূহে, বৃষ্টিধারার মধ্যে, যা আল্লাহ বর্ষণ করেন ওপর থেকে তারপর তার মাধ্যমে মৃত ভূমিকে জীবন দান করেন এবং নিজের এই ব্যবস্থাপনার বদৌলতে পৃথিবীতে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন, আর বায়ু প্রবাহে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৬৪)</p>
<p>৮. &#8220;হে নবী! তোমার কাছে অহীর মাধ্যমে যে হেদায়াত পাঠানো হচ্ছে তুমি তার অনুসরণ করো। আর আল্লাহ ফায়সালা দান করা পর্যন্ত সবর করো এবং তিনিই সবচেয়ে ভালো ফয়সালাকারী।&#8221; (সূরা ইউসুফ: ১০৯)</p>
<p>৯. &#8220;আর তিনিই এ ভূ-তলকে বিছিয়ে রেখেছেন, এর মধ্যে পাহাড়ের খুঁটি গেড়ে দিয়েছেন এবং নদী প্রবাহিত করেছেন। তিনিই সব রকম ফল সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায় এবং তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে ফেলেন। এ সমস্ত জিনিসের মধ্যে বহুতর নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা-ভাবনা করে।&#8221; (সূরা রা’দ: ৩)</p>
<p>১০. &#8220;আর দেখো, পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন আলাদা আলাদা ভূখণ্ড, রয়েছে আঙুর বাগান, শস্যক্ষেত, খেজুর গাছ- কিছু একাধিক কান্ডবিশিষ্ট আবার কিছু এক কাণ্ড বিশিষ্ট, সবাই সিঞ্চিত একই পানিতে কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে আমি করে দেই তাদের কোনোটাকে বেশী ভালো এবং কোনোটাকে কম ভালো। এসব জিনিসের মধ্যে যারা বুদ্ধিকে কাজে লাগায় তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন।&#8221; (সূরা রা’দ: ৪)</p>
<p>১১. &#8220;পাক-পবিত্র সে সত্তা যিনি সব রকমের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, তা ভূমিজাত উদ্ভিদের মধ্য থেকে হোক অথবা স্বয়ং এদের নিজেদের প্রজাতির অর্থাৎ মানব জাতি মধ্য থেকে হোক কিংবা এমন জিনিসের মধ্য থেকে হোক যাদেরকে এরা জানেও না। এদের জন্য রাত হচ্ছে আর একটি নিদর্শন। আমি তার উপর থেকে দিনকে সরিয়ে দেই তখন এদের ওপর অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর সূর্য, সে তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলছে। এটি প্রবল পরাক্রমশালী জ্ঞানী সত্তার নিয়ন্ত্রিত হিসেবে আর চাঁদ, তার জন্য আমি মনযিল নির্দিষ্ট করে দিয়েছি, সেগুলো অতিক্রম করে সে শেষ পর্যন্ত আবার খেজুরের শুকনো ডালের মতো হয়ে যায়। না সূর্যের ক্ষমতা আছে চাঁদকে ধরে ফেলে এবং না রাত দিনের ওপর অগ্রবর্তী হতে পারে, সবাই এক একটি কক্ষপথে সন্তরণ করছে।&#8221; (সূরা ইয়াসিন: ৩৬-৪০)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> এখন যে আয়াত সমূহকে আমি উল্লেখ করেছি, সেই সকল আয়াতে আমরা দেখতে পাই যে, প্রকৃতির সাথে ইসলামের সম্পর্ক এবং বহিঃজগতের সাথে তার সম্পৃক্ততা আমাদের নজর কেড়ে নেয়। মহাগ্রন্থ আল কোরআন আল্লাহর প্রতি ঈমান সম্পর্কে, মানুষের দায়িত্ব ও আদালত সম্পর্কে যেমন বলে থাকে, একইভাবে আমাদেরকে পশু-পাখি, নদী-পাহাড়, তারকাপুঞ্জ, চন্দ্র-সূর্য, পিঁপড়া, মৌমাছি, খেজুর এবং উট সম্পর্কেও বলে থাকে। এই সকল সৃষ্ট বিষয় সমূহের অভ্যন্তরীণ এবং প্রাকৃতিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। </strong>এই দুনিয়ার ব্যাপারে ইসলাম আমাদের সামনে অনুপম এক দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে। হয়তোবা এটি ইসলামের আখলাকের ক্ষেত্রে ভালোবাসা ও মারহামাতের পরিবর্তে হক এবং আদালতকে বেশী প্রাধান্য দেওয়ার একটি জবাবও।</p>
<p>১. &#8220;হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও, তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের ব্যক্তিসত্তার অথবা তোমাদের বাপ-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও। উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে অনেক বেশী কল্যাণকামী। কাজেই নিজেদের কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে বিরত থেকো না। আর যদি তোমরা প্যাঁচালো কথা বলো অথবা সত্যতাকে পাশ কাটিয়ে চলো, তাহলে জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু করছো আল্লাহ তার খবর রাখেন।&#8221; (সূরা নিসা: ১৩৫)</p>
<p>২. &#8220;লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করেছে, তাদের জন্য কি হালাল করা হয়েছে? বলে দাও, তোমাদের জন্য সমস্ত পাক- পবিত্র জিনিস হালাল করা হয়েছে। আর যে-সব শিকারি প্রাণীকে তোমরা শিক্ষিত করে তুলেছ, যাদেরকে আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে তোমরা শিকার করা শিখিয়েছো, তারা তোমাদের জন্য যে-সব প্রাণী ধরে রাখে, তাও তোমরা খেতে পারো। তবে তার ওপর আল্লাহর নাম নিতে হবে। আর আল্লাহর আইন ভাঙার ব্যাপারে সাবধান। অবশ্য হিসাব নিতে আল্লাহর মোটেই দেরি হয় না।&#8221; (সূর মায়েদা: ৮)</p>
<p>৩. &#8220;এরা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম আহারকারী। কাজেই এরা যদি তোমাদের কাছে (নিজেদের মামলা নিয়ে) আসে তাহলে তোমরা চাইলে তাদের মীমাংসা করে দিতে অথবা অস্বীকার করে দিতে পারো। অস্বীকার করে দিলে এর তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর মীমাংসা করে দিলে যথার্থ ইনসাফ সহকারে মীমাংসা করো। কারণ আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৪২)</p>
<p>৪. &#8220;আর যদি তোমরা প্রতিশোধ নাও, তাহলে ঠিক ততটুকু নাও যতটুকু তোমাদের ওপর বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। কিন্তু যদি তোমরা সবর করো তাহলে নিশ্চিতভাবেই এটা সবরকারীদের পক্ষে উত্তম।&#8221; (সূরা নাহল: ১২৬)</p>
<p>৫. &#8220;(আমি তাকে বললাম) হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করবে। যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শান্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।” (সূরা সোয়াদ: ২৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> আদালত, সামাজিক আদালত এবং ইনসাফ সম্পন্ন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামের যে প্রচেষ্টা, সেটার মূল ভিত্তি হচ্ছে আখলাক। আমি এখন যে সকল আয়াতকে উল্লেখ করব, সেই সকল আয়াতসমূহ অতীতের মুসলমানদের ভুবনজয়ী ঐতিহাসিক বিজয় সমূহের সাথে বর্তমান মুসলিম সমাজের পরাজয়ের কারণ সমূহকে বুঝার জন্য সাহায্য করবে।</strong> যদি কোরআনের ব্যবস্থাকে অপচয়হীন এবং দুর্দশাহীন একটি ব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে আমাদেরকে আজকে একথা স্বীকার করতে হবে যে, কোরআনের ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ব্যবস্থা আমাদের সমাজে বিদ্যমান। যার ফলে আজকের মুসলিম সমাজে এত অপচয় ও দুর্দশা বিরাজ করছে।</p>
<p>১. &#8220;আর তোমরা জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু গনিমতের মাল লাভ করেছো তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আল্লাহ, তাঁর রসূল, আত্মীয়স্বজন, এতিম মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর প্রতি এবং ফায়সালার দিন অর্থাৎ উভয় সেনাবাহিনীর সামনা সামানি মোকাবিলার দিন আমি নিজের বান্দার ওপর যা নাফিল করেছিলাম তার প্রতি, (অতএব সানন্দে এ অংশ আদায় করো) আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর শক্তিশালী।&#8221; (সূরা আনফাল: ৪১)</p>
<p>২. &#8220;এ সদকাগুলো তো আসলে ফকীর মিসকীনদের জন্য। আর যারা সাদকা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত এবং যাদের জন্য মন জয় করা প্রয়োজন তাদের জন্য। তাছাড়া দাস মুক্ত করার, ঋণগ্রস্তের সাহায্য করার, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের উপকারে ব্যয় করার জন্য। এটা আল্লাহর পক্ষে থেকে একটি বিধান এবং আল্লাহর সবকিছু জানেন, তিনি বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ।&#8221; (সূরা তওবা: ৬০)</p>
<p>৩. &#8220;আর দেখো, আল্লাহ তোমাদের একজনকে আর একজনের ওপর রিযিকের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তারপর যাদেরকে এ শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে তারা এমন নয় যে নিজেদের রিযিক নিজেদের গোলামদের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে থাকে, যাতে উভয় এ রিযিকে সমান অংশীদার হয়ে যায়। তাহলে কি এরা শুধু আল্লাহরই অনুগ্রহ মেনে নিতে অস্বীকার করে?&#8221; (সূরা নাহল: ৭১)</p>
<p>৪. &#8220;তোমাদের মধ্য থেকে যারা প্রাচুর্য ও সামর্থ্যের অধিকারী তারা যেন এ মর্মে কসম খেয়ে না বসে যে, তারা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, গরিব-মিসকিন ও আল্লাহর পথে গৃহত্যাগকারীদেরকে সাহায্য করবে না। তাদেরকে ক্ষমা করা ও তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীলতা ও দয়া গুণে গুণান্বিত।&#8221; (সূরা নূর: ২২)</p>
<p>৫. &#8220;এবং যখন এদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দান করেছেন তার মধ্য থেকে কিছু আল্লাহর পথে খরচ করো তখন এসব কুফরিতে লিপ্ত লোক মু’মিনদেরকে জবাব দেয় “আমরা কি তাদেরকে খাওয়াবো, যাদেরকে আল্লাহ চাইলে নিজেই খাওয়াতেন? তোমরা তো পরিষ্কার বিভ্রান্তির শিকার হয়েছো।&#8221; (সূরা ইয়াসিন: ৪৭)</p>
<p>৬. &#8220;(এ সবই এজন্য) যাতে যে ক্ষতিই তোমাদের হয়ে থাকুক তাতে তোমরা মনক্ষুণ্ন না হও। আর আল্লাহ তোমাদের যা দান করেছেন। সেজন্য গর্বিত না হও। যারা নিজেরা নিজেদের বড় মনে করে এবং অহংকার করে, নিজেরাও কৃপণতা করে এবং মানুষকেও কৃপণতা করতে উৎসাহ দেয় আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। এরপর ও যদি কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আল্লাহ অভাবশূন্য ও অতি প্রশংসিত।&#8221; (সূরা হাদীদ: ২৩-২৪)</p>
<p>৭. &#8220;তুমি কি তাকে দেখেছো যে আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্ত্রিকে মিথ্যা বলছে? সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না।&#8221; (সূরা মাউন: ১-৩)</p>
<p>৮. &#8220;কাজেই (হে মুমিন!) আত্মীয়দেরকে তাদের অধিকার দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকে (দাও তাদের অধিকার)। এ পদ্ধতি এমন লোকদের জন্য ভালো যারা চায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তারাই সফলকাম হবে।&#8221; (সূরা রুম: ৩৮)</p>
<p>এই আয়াতের মাধ্যমে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা সম্পর্কিত এই হুকুম সমূহ, সমাজের দুর্বলদের অধিকারের সাথে শক্তিশালীদের দায়িত্ব সমূহকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সকল মানুষ যে সমান এই মূলনীতির মাধ্যমে অনুপম এক সাদৃশ্য রয়েছে। কোরআনে আলোকে নির্বাচিত কোনো সমাজ কিংবা উচ্চ বর্ণের কোনো জাতি নেই।</p>
<p>৯. &#8220;প্রথমে সব মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। (তারপর এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকেনি, তাদের মধ্যে মতভেদের সূচনা হয়) তখন আল্লাহ নবী পাঠান। তারা ছিলেন সত্য সঠিক পথের অনুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং অসত্য ও বেঠিক পথ অবলমম্বনের পরিণতির ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনকারী। আর তাদের সাথে সত্য কিতাব পাঠান, যাতে সত্য সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল তার মীমাংসা করা যায়। এবং প্রথমে তাদেরকে সত্য সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া হয়নি বলে এ মতভেদগুলো সৃষ্টি হয়েছিল, তা নয়। মতভেদ তারাই করেছিল যাদেরকে সত্যের জ্ঞান দান করা হয়েছিল। তারা সুস্পষ্ট পথনির্দেশ লাভ করার পরও কেবলমাত্র পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিল বলেই সত্য পরিহার করে বিভিন্ন পথ উদ্ভাবন করে। কাজেই যারা নবীদের ওপর ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ নিজের ইচ্ছাক্রমে সেই সত্যের পথ দিয়েছেন, যে ব্যাপারে লোকেরা মতবিরোধ করেছিল। আল্লাহ যাকে চান সত্য সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। (সূরা বাকারা: ২১৩)</p>
<p>১০. &#8220;হে মানব জাতি! তোমাদের রবকে ভয় করো। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে। আর সেই একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া। তারপর তাদের দুজনার থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। সেই আল্লাহকে ভয় করো যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে নিজেদের হক আদায় করে থাকো এবং আত্মীয়তা ও নিকট সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছেন।&#8221; (সূরা নিসা: ১)</p>
<p>১১. হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। (সূরা হুজুরাত: ১৩)</p>
<p>১২. তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই থাকতে হবে, যারা নেকী ও সৎকর্মশীলতার দিকে আহ্বান জানাবে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে তারাই সফলকাম হবে। (সূরা আলে-ইমরান: ১০৪)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> মানুষের মধ্যকার সমতা ও সমমর্যাদার বিষয়টি নারীদের সাথেও অনেক বেশী সংগতিপূর্ণ। এই বিষয়টির গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম নয়। সকলেই অবগত যে সমগ্র মানবতার অর্ধেকই হলো নারী। এই ক্ষেত্রে ইসলাম ইউরোপিয়ানদের তথাকথিত নারী অধিকার ও সমতা নয়, ইসলাম কোরআনের আলোকে মানুষের মর্যাদাকে নিরূপণ করে এবং নারীর সমতা ও মর্যাদা নিয়ে অনুপম একটি ধারণা পেশ করে থাকে। আর সমতার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম বিষয় হলো &#8211; নারী একজন মানুষ হিসেবে একই মূল্য ও মর্যাদার অধিকারী। নারী ও পুরুষের মূল্য ও মর্যাদা একই, তবে তারা একে অপরের চেয়ে ভিন্ন।</strong> কোরআন নারী পুরুষের মধ্যকার এই ভিন্নতাকে উঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এই সকল ভিন্নতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। নারীর ক্ষেত্রে ইসলাম ও পাশ্চাত্যের পার্থক্য এখানেই। ইসলাম চায় নারীর ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্যকে রক্ষা করে তাদেরকে সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে। আর পাশ্চাত্য চায় নারী ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্যকে তুলে দিয়ে তাদেরকে সমান মর্যাদা দিতে চায়। তবে সমতার প্রশ্নে কোরআন শুধুমাত্র এই বিষয়টিকে স্বীকৃতিই দেয় না, একইসাথে কেউ যেন ভুল অর্থ বের করতে না পারে, এমন বাক্য ব্যবহার করেছে।</p>
<p>১. &#8220;জবাবে তাদের রব বললেন, আমি তোমাদের কারো কর্মকাণ্ড নষ্ট করবো না। পুরুষ হও বা নারী, তোমরা সবাই একই জাতির অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যারা আমার জন্য নিজেদের স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করেছে এবং আমার পথে যাদেরকে নিজেদের ঘর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া ও কষ্ট দেয়া হয়েছে এবং যারা আমার জন্য লড়েছে ও মারা গেছে, তাদের সমস্ত গোনাহ আমি মাফ করে দেবো এবং তাদেরকে এমন সব বাগানে প্রবেশ করাবো যার নিচে দিয়ে ঝর্ণাধারা বয়ে চলবে। এসব হচ্ছে আল্লাহর কাছে তাদের প্রতিদান এবং সবচেয়ে ভালো প্রতিদান আল্লাহর কাছেই আছে।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৯৫)</p>
<p>২. &#8220;আর যা কিছু আল্লাহ তোমাদের কাউকে অন্যদের মোকাবিলায় বেশি দিয়েছেন তার আকাঙ্ক্ষা করো না। যা কিছু পুরুষেরা উপার্জন করেছে তাদের অংশ হবে সেই অনুযায়ী। আর যা কিছু মেয়েরা উপার্জন করেছে তাদের অংশ হবে সেই অনুযায়ী। হাঁ, আল্লাহর কাছে তাঁর ফজল ও মেহেরবানীর জন্য দোয়া করতে থাকো। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ সমস্ত জিনিসের জ্ঞান রাখেন।&#8221; (সূরা নিসা: ৩২)</p>
<p>৩. &#8220;মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। এরা ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে। এরা এমন লোক যাদের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হবেই। অবশ্যই আল্লাহ সবার ওপর পরাক্রমশালী এবং জ্ঞানী ও বিজ্ঞ। এ মুমিন পুরুষ ও নারীকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদেরকে তিনি এমন বাগান দান করবেন যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান হবে এবং তারা তার মধ্যে চিরকাল বাস করবে। এসব চির সবুজ বাগানে তাদের জন্য থাকবে বাসগৃহ এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।&#8221; (সূরা তওবা: ৭১-৭২)</p>
<p>৪. &#8220;পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবো এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে।&#8221; (সূরা নাহল: ৯৭)</p>
<p>৫. &#8220;যারা সতী সাধ্বী, সরলমনা মু’মিন মহিলাদের প্রতি অপবাদ দেয় তারা দুনিয়ায় ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশান্তি।&#8221; (সূরা নূর: ২৩)</p>
<p>৬. &#8221; হে নবী! মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্র পদ্ধতি। যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন। আর হে নবী! মু’মিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে। তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া স্বামী, বাপ, স্বামীর বাপ, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের, নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোনোরকম উদ্দেশ্য নেই এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ। তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।&#8221; (সূরা নূর: ৩০-৩১)</p>
<p>৭. &#8220;একথা সুনিশ্চিত যে, যে পুরুষ ও নারী মুসলিম, মুমিন, হুকুমের অনুগত, সত্যবাদী, সবরকারী, আল্লাহর সামনে বিনত, সাদকাদানকারী, রোযা পালনকারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী আল্লাহ তাদের জন্য মাগফিরাত এবং প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।&#8221; (সূরা আহযাব: ৭৩)</p>
<p>৮. &#8220;সেই দিন তাদের বলা হবে, হে আমার বান্দারা, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং কোনো দুঃখও আজ তোমাদের স্পর্শ করবে না। তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীরা জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমাদের খুশী করা হবে।&#8221; (সূরা যুখরুফ: ৬৯-৭০)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অর্থাৎ একটি নারীদের জন্য অপরটি পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট এরকম দুই ধরনের আখলাকের স্থান নেই। কোরআন এই অনুপম আখলাকের ধারণার আলোকে সকল মানুষের কাছ থেকে যা কিছু চেয়ে থাকে সেগুলো হলো: </strong></p>
<p>১. &#8220;তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন: তোমরা কারোর ইবাদাত করো না, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো। পিতামাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করো। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হয়, তাহলে তাদেরকে “উহ্” পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিও না। আর তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বলো। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো এবং দোয়া করতে থাকো এই বলেঃ হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।&#8221; (সূরা ইসরা: ২৩-২৪)</p>
<p>২. &#8220;এতীমের সম্পত্তির ধারে কাছে যেও না, তবে হ্যাঁ সুদপায়ে, যে পর্যন্ত না সে বয়োপ্রাপ্ত হয়ে যায়। প্রতিশ্রুতি পালন করো, অবশ্যই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে। মেপে দেবার সময় পরিমাপ পাত্র ভরে দাও এবং ওজন করে দেবার সময় সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো। এটিই ভালো পদ্ধতি এবং পরিণামের দিক দিয়েও এটিই উত্তম। এমন কোনো জিনিসের পেছনে লেগে যেও না, যে সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই। নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও দিল সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যমীনে দম্ভভরে চলো না। তুমি না যমীনকে চিরে ফেলতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে। এ বিষয়গুলোর মধ্য থেকে প্রত্যেকটির খারাপ দিক তোমার রবের কাছে অপছন্দনীয়।&#8221; (সূরা ইসরা: ৩৪-৩৮)</p>
<p>৩. &#8220;হে ঈমানদারগণ! নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তার অধিবাসীদেরকে সালাম করো। এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে। তারপর যদি সেখানে কাউকে না পাও, তাহলে তাতে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি না দেয়া হয়। আর যদি তোমাদের বলা হয়, ফিরে যাও তাহলে ফিরে যাবে, এটিই তোমাদের জন্য বেশী শালীন ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি এবং যা কিছু তোমরা করো আল্লাহ তা খুব ভালোভাবেই জানেন।&#8221; (সূরা নূর: ২৭-২৮)</p>
<p>৪. &#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাসদাসী এবং তোমাদের এমন সব সন্তান যারা এখনো বুদ্ধির সীমানায় পৌঁছেনি, তাদের অবশ্যই তিনটি সময়ে অনুমতি নিয়ে তোমাদের কাছে আসা উচিত: ফজরের নামাযের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক ছেড়ে রেখে দাও এবং এশার নামাযের পর। এ তিনটি তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এরপরে তারা বিনা অনুমতিতে এলে তোমাদের কোন গুনাহ নেই এবং তাদেরও না। তোমাদের পরস্পরের কাছে বারবার আসতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিজের বাণী সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন এবং তিনি সবকিছু জানেন ও বিজ্ঞ।&#8221; (সূরা নূর: ৫৮)</p>
<p>৫. &#8220;হে নবী, সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়। তুমি অসৎ কাজকে সেই নেকী দ্বারা নিবৃত্ত করো যা সবচেয়ে ভাল। তাহলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গিয়েছে। ধৈর্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারো ভাগ্যে জোটে না। এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না।&#8221; (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪-৩৫)</p>
<p>৬. &#8220;এটাই সেই জিনিস যার সুসংবাদ আল্লাহ তার সেই সব বান্দাদের দেন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে। হে নবী, এসব লোককে বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে আত্মীয়তার ভালবাসা অবশ্যই চাই। যে কল্যাণ উপার্জন করবে আমি তার জন্য তার সেই কল্যাণের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দিব। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড় ক্ষমাশীল ও নেক কাজের মর্যাদাদাতা।&#8221; (সূরা শুরা: ২৩)</p>
<p>৭. &#8220;আমি মানুষ এই মর্মে নির্দেশনা দিয়েছি যে, তারা যেন পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলো এবং কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছিলো। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান করাতে ত্রিশ মাস লেগেছে। এমন কি যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছেছে এবং তারপর চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয়েছে তখন বলেছেঃ “হে আমার রব, তুমি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে যে-সব নিয়ামত দান করেছো আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর এমন সৎ কাজ করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ করো। আমার সন্তানদেরকে সৎ বানিয়ে আমাকে সুখ দাও। আমি তোমার কাছে তওবা করছি। আমি নির্দেশের অনুগত (মুসলিম) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।&#8221; (সূরা আহকাফ: ১৫)</p>
<p>৮. &#8220;হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোনো গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।&#8221; (সূরা হুজুরাত: ৬)</p>
<p>৯. &#8220;ঈমানদারদের মধ্যকার দু’টি দল যদি পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। তারপরও যদি দু’টি দলের কোন একটি অপরটির বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে তবে যে দল বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করো। যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। এরপর যদি তারা ফিরে আসে তাহলে তাদের মাঝে ন্যায় বিচারের সাথে মীমাংসা করিয়ে দাও এবং ইনসাফ করো। আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবানী করা হবে।&#8221; (সূরা হুজুরাত: ৯-১০)</p>
<p>১০. &#8220;হে ঈমানদাগণ, বেশী ধারণা ও অনুমান করা থেকে বিরত থাকো কারণ কোনো কোনো ধারণা ও অনুমান গোনাহ। দোষ অন্বেষণ করো না। আর তোমাদের কেউ যেন কারো গিবত না করে। এমন কেউ কি তোমাদের মধ্যে আছে, যে তার নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? দেখো, তা খেতে তোমাদের ঘৃণা হয়। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ অধিক পরিমাণে তওবা কবুলকারী এবং দয়ালু।&#8221; (সূরা হুজুরাত: ১২)</p>
<p>১১. &#8220;মনমরা হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৯)</p>
<p>১২. &#8220;হে পুত্র! নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের হুকুম দাও, খারাপ কাজে নিষেধ করো এবং যা কিছু বিপদই আসুক সে জন্য সবর করো। একথাগুলোর জন্য বড়ই তাকিদ করা হয়েছে। আর মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কথা বলো না, পৃথিবীর বুকে চলো না উদ্ধত ভঙ্গিতে, আল্লাহ পছন্দ করেন না আত্মম্ভরি ও অহংকারীকে। নিজের চলনে ভারসাম্য আনো এবং নিজের আওয়াজ নীচু করো। সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে গাধার আওয়াজ।&#8221; (সূরা লোকমান: ১৭-১৯)</p>
<p>১৩. &#8220;আমি তাওরাত নাযিল করেছি। তাতে ছিল পথনির্দেশ ও আলো। সমস্ত নবী, যারা মুসলিম ছিল, সে অনুযায়ী এ ইহুদী হয়ে যাওয়া লোকদের যাবতীয় বিষয়ের ফায়সালা করতো। আর এভাবে রব্বানী ও আহবারও (এরই ওপর তাদের ফায়সালার ভিত্তি স্থাপন করতো)। কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এবং তারা ছিল এর ওপর সাক্ষী। কাজেই (হে ইহুদী গোষ্ঠী।) তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো। আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৪৪)</p>
<p>১৪. &#8220;তোমরা অন্যদের সৎকর্মশীলতার পথ অবলম্বন করতে বলো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে যাও। অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করে থাকো। তোমরা কি জ্ঞান বুদ্ধি একটুও কাজে লাগাও না?&#8221; (সূরা বাকারা: ৪৪)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> মহাগ্রন্থ আল কোরআন সুদ এবং যারা সুদি কারবার করে তাদেরকে এমনভাবে নিন্দা জানায় যার দৃষ্টান্ত অন্য কোনো কিতাবে কিংবা কোরআনের আগে পরে রচিত কোনো আইনের গ্রন্থে দেখা যায় না। কোরআন এমন এক সমাজের ধারণা তুলে ধরে, যে সমাজের মূল ভিত্তি হবে আখলাক ও ইহসান, এই জন্য এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোরআন উচ্চকণ্ঠ হতে বাধ্য হয়। কোরআন সুদকে এবং সকল ধরণের সুদি কারবারকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং যারা বৈধ পথে উপার্জন করে তাদের পক্ষাবলম্বন করে থাকে।</strong> কোরআন শুধুমাত্র এর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে নি, একইসাথে সকল ধরনের শোষণ, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অন্যায়ভাবে উপার্জন করে যারা জীবন নির্বাহ করে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করে।</p>
<p>১. &#8220;কিন্তু যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এই অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে: ব্যবসা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। কাজেই যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌঁছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুদখোরি থেকে সে বিরত হয়, সে ক্ষেত্রে যা কিছু সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই এবং এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে। আর এই নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত ও বিকশিত করেন। আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞ দুষ্কৃতিকারীকে পছন্দ করেন না। অবশ্যই যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, নামাজ কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের প্রতিদান নিঃসন্দেহে তাদের রবের কাছে আছে এবং তাদের কোন ভয় ও মর্মজ্বালাও নেই। হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং লোকদের কাছে তোমাদের যে সুদ বাকি রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও, যদি যথার্থই তোমরা ঈমান এনে থাকো। কিন্তু যদি তোমরা এমনটি না করো তাহলে জেনে রাখো, এটা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এখনো তওবা করে নাও (এবং সুদ ছেড়ে দাও) তাহলে তোমরা আসল মূলধনের অধিকারী হবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপর জুলুম করাও হবে না।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৭৫-২৭৯)</p>
<p>২. &#8220;যে সুদ তোমরা দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের সম্পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তা বাড়ে না। আর যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকো, তা প্রদানকারী আসলে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করে।&#8221; (সূরা রূম: ৩৯)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> সবশেষে, কেউ কেউ বিভিন্ন দলিলের উপর ভিত্তি করে জিহাদকে ইসলামের ষষ্ঠ রুকন বলে উল্লেখ করেছেন। আমিও তাদের এই মতকে সমর্থন করি। কারণ জিহাদবিহীন ইবাদত ও তাবলীগ রিয়া ছাড়া অন্যকিছু নয়। জিহাদ এবং শুধুমাত্র জিহাদের জযবাই পারে আমাদেরকে সত্যিকারের মুসলিম বানাতে।</strong></p>
<p>১. “আর তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না। কারণ যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা: ১৯০)</p>
<p>২. “আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না। অনুগ্রহ প্রদর্শনের পথ অবলম্বন করো, কেননা আল্লাহ অনুগ্রহ প্রদর্শনকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)</p>
<p>৩. তোমাদের যুদ্ধ করার হুকুম দেয়া হয়েছে এবং তা তোমাদের কাছে অপ্রীতিকর। হতে পারে কোনো জিনিস তোমরা পছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য খারাপ। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। (সূরা বাকারা: ২১৬)</p>
<p>৪. “তারপর তালুত যখন সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললো, সে বললোঃ “আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নদীতে তোমাদের পরীক্ষা হবে। যে তার পানি পান করবে সে আমার সহযোগী নয়। একমাত্র সে-ই আমার সহযোগী যে তার পানি থেকে নিজের পিপাসা নিবৃত্ত করবে না। তবে এক আধ আঁজলা কেউ পান করতে চাইলে করতে পারে। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ছাড়া বাকি সবাই সেই নদীর পানি আকণ্ঠ পান করলো। অতঃপর তালুত ও তার সাথী মুসলমানরা যখন নদী পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো তখন তারা তালুতকে বলে দিল, আজ জালুত ও তার সেনাদলের মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু যারা একথা মনে করছিল যে, তাদের একদিন আল্লাহর সাথে মোলাকাত হবে, তারা বললোঃ “অনেকবারই দেখা গেছে, স্বল্প সংখ্যক লোকের একটি দল আল্লাহর হুকুমে একটি বিরাট দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে। আল্লাহ সবরকারীদের সাথী।” (সূরা বাকারা: ২৪৯)</p>
<p>৫. “অবশেষে আল্লাহর হুকুমে তারা কাফেরদের পরাজিত করলো। আর দাউদ জালুতকে হত্যা করলো এবং আল্লাহ তাকে রাজ্য ও প্রজ্ঞা দান করলেন আর এই সাথে যা যা তিনি চাইলেন তাকে শিখিয়ে দিলেন। এভাবে আল্লাহ যদি মানুষদের একটি দলের সাহায্যে আর একটি দলকে দমন না করতে থাকতেন, তাহলে পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হতো। কিন্তু দুনিয়াবাসীদের ওপর আল্লাহর অপার করুণা (যে, তিনি এভাবে বিপর্যয় রোধের ব্যবস্থা করতেন)।” (সূরা বাকারা: ২৫১)</p>
<p>৬. “হে ঈমানদারগণ! এ আহলে কিতাবদের অধিকাংশ আলেম ও দরবেশের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা মানুষের ধন- সম্পদ অন্যায় পদ্ধতিতে খায়, এবং তাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে। যারা সোনা রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যন্ত্রণাময় আযাবের সুখবর দাও।” (সূরা তওবা: ৩৪)</p>
<p>৭. “তোমাদের ওপর যখন বিপদ এসে পড়লো তোমরা বলতে লাগলে, এ আবার কোথায় থেকে এলো? তোমাদের এ অবস্থা কেন? অথচ (বদরের যুদ্ধে) এর দ্বিগুণ বিপদ তোমাদের মাধ্যমে তোমাদের বিরোধী পক্ষের ওপর পড়েছিল। হে নবী! ওদের বলে দাও, তোমরা নিজেরাই এ বিপদ এনেছো। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের ওপর শক্তিমান।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৬৫)</p>
<p>৮. “হে ঈমানদানগণ! সবরের পথ অবলম্বন করো, বাতিলপন্থীদের মোকাবলায় দৃঢ়তা দেখাও, হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে।” (সূরা আলে-ইমরান: ২০০)</p>
<p>৯. “হে ঈমানদারগণ! মোকাবিলা করার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো। তারপর সুযোগ পেলে পৃথক পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বের হয়ে পড়ো অথবা একসাথে।” (সূরা নিসা: ৭১)</p>
<p>১০. “যে-সব মুসলমান কোন প্রকার অক্ষমতা ছাড়াই ঘরে বসে থাকে আর যারা ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তাদের উভয়ের মর্যাদা সমান নয়। যারা ঘরে বসে থাকে তাদের তুলনায় জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বুলন্দ করেছেন। যদিও সবার জন্য আল্লাহ কল্যাণ ও নেকীর ওয়াদা করেছেন তবুও তাঁর কাছে মুজাহিদদের কাজের বিনেময়ে বসে থাকা লোকেদের তুলনায় অনেক বেশী।” (সূরা নিসা: ৯৫)</p>
<p>এখন আমি বিশেষ একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেই বিষয়টি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান। দ্বীনের বিষয় আসলে আমরা সাধারণত মানুষকে দুইভাগে বিভক্ত করে থাকি: মু’মিন (বিশ্বাসী) ও কাফির (অবিশ্বাসী)। যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব যে, এই ধরনের বিভাজন করলে খুবই সরলীকরণ হয়ে যায়। এই দুই ধরনের মানুষ ছাড়াও সমাজে তৃতীয় একটি দল রয়েছে, আমরা অনেক সময় তাদেরকে উল্লেখ করতে ভুলে যাই। এই তৃতীয় দলটি হলো এমন দল যারা নিজেদেরকে বিশ্বাসী (মুমিন) দাবি করে এবং বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা এমন নয়। এরা কম হোক কিংবা বেশি হোক আল্লাহর ইবাদত করে, ঈদ উদযাপন করে, দ্বীনের নির্দিষ্ট কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করে। কিন্তু তারা ভয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করে, ব্যবসার ক্ষেত্রে মানুষকে প্রতারিত করে, অন্যের উপর ভর করে নিজের জীবন পরিচালনা করে, মদ পান করে, হারামভাবে জীবনকে উপভোগ করে এবং যেন এক হাজার বছর বেঁচে থাকবে এমনভাবে জীবন, সম্পদ ও পদপদবীকে ভয়ের সাথে রক্ষা করে অথবা শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানদের চাটুকারী করে। এই ধরণের মানুষদের অভিন্ন ও সুস্পষ্ট একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে &#8211; ‘ভয়’। আর এই ভয় তাদের জীবনের জন্য, তাদের সম্পদের জন্য এবং তাদের পদ-পদবীর জন্য। তাদের জীবন যেন ভয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে থাকে। তাদের সকল প্রচেষ্টা হয়ে থাকে শক্তিশালী গোষ্ঠীর কিংবা সরকারের সমর্থন অর্জন করার জন্য।</p>
<p>আর তাদের এত সকল ভয়ের মধ্যে একটি ভয়ের ঘাটতি রয়েছে আর সেটি হলো &#8211; “আল্লাহর ভয়”। তারা তাদের এই রুহ এবং অনির্ধারিত দ্বিমুখী একটি পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলে থাকে। তবে আমরা যদি এই তৃতীয় দলটির অস্তিত্বকে বিবেচনায় ধরি তাহলে দুনিয়ার অনেক কিছুকে অনেক সহজভাবে বুঝতে পারব। ‘কী হচ্ছে’, এর সাথে ‘কেন হচ্ছে’ সেটাও আমরা বুঝতে পারব।</p>
<p>বর্তমান মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দ্বীনের সত্যিকারের অনুসারীর সংখ্যা খুবই কম, তবে মৌখিকভাবে দ্বীনের স্বীকৃতিদানকারীদের সংখ্যা অনেক। দ্বীনের জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গকারীদের সংখ্যা খুবই কম, তবে দ্বীনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারকারীদের সংখ্যা অনেক। এরা দ্বীনকে শর্তহীনভাবে সামনে নিয়ে আসে, তবে ঐ একই দ্বীনের চাওয়াকে ব্যক্তিগত জীবনে খুব কমই বাস্তবায়ন করে। এই প্যারাডক্স এবং বাহ্যিকতা ও অভ্যন্তরের মধ্যকার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য খুবই সহায়ক।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোরআনের যে অবস্থান, তা আজকের অবস্থাকে খুব করুণভাবে তুলে ধরেছে। আজ মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের ঘরে গিয়ে দেখবেন কোরআনকে সবচেয়ে উঁচু স্থানে তুলে রাখা হয়েছে। কোরআনকে সবচেয়ে ভালো উপহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কোরআন ছাপার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মানুষ এখনো কোরআনের আয়াত দিয়ে সুন্দর সুন্দর ক্যালিগ্রাফি অঙ্কন করে এবং এর পৃষ্ঠা সমূহকে চাকচিক্য করে তুলে ধরার জন্য প্রতিযোগিতা করে।</p>
<p>শিশুরাও সর্বপ্রথম যে বইটি পড়তে শেখে সেটি হলো কোরআন। কিন্তু তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ এর মধ্যে আসলেই কী লেখা আছে, সেটা না জেনে এবং সেটার গুরুত্ব না বুঝেই বড় হবে ও জীবন যাপন করবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কোরআন হলো অনেক বড় একটি شعائر (সিম্বল)। কিন্তু বর্তমানে কুরআনকে এই শায়ায়ীর বা নিদর্শনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখে জীবন পাথেয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।</p>
<p>একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, কোরআন বুঝে পড়ার চেয়ে সুন্দর সুরে কোরআন পড়াকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আবার সুর দেওয়ার ক্ষেত্রেও আরব হোক কিংবা অনারব হোক, কেহই কোরআনের মৌলিক অর্থে উপনীত হতে পারছে না। এছাড়াও কোরআনের রয়েছে অনুপম এক সুরের দ্যোতনা। কখনো আদেশ দানকারী ও নিশ্চিত অর্থবোধক, আবার কখনো মিষ্টিভাবে সতর্ককারী ও দাওয়াতদানকারী এবং উচ্চস্বরে সতর্ককারী। কিন্তু যারা সুন্দর সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত করেন, তারা কি এসব বিষয় খেয়াল রাখেন?</p>
<p><strong>দ্বীন আরাম আয়েশের জন্য নয়। দ্বীন হলো একটি আহ্বান, একটি দায়িত্ব, একটি আবেদন। সত্যিকারের ঈমানদ্বার ও জযবাধারী একটি প্রজন্ম, জযবা ও চেতনাহীনভাবে দ্বীনকে ধারণাকারী একটি প্রজন্ম থেকে অনেক কিছু করতে সক্ষম। বিগত ১৪০০ বছর ধরে ইসলামের মধ্যে যে সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং যে আখলাক দেখতে পাচ্ছি, এটা শুরুর দিকের ৩ টি মুসলিম প্রজন্ম কর্তৃক তৈরিকৃত। ১৪০০ বছর আগে সেই তিনটি প্রজন্ম যা কিছু করেছেন মুসলিম উম্মাহ আজও সেটার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরবর্তীতে যারাই এসেছে তারা সকলেই এই তিন প্রজন্মকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তাদের নিকট থেকে প্রেরণা নিয়েছেন।</strong></p>
<blockquote><p>এই কারণে মুসলিম দেশসমূহে ভবিষ্যতে যে সকল বিপ্লব হবে তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম হবে দ্বীনি বিপ্লব। মানুষের রুহ এবং কলবের মধ্যে সংগঠিত হওয়া এই বিপ্লব অনেক মুজিযার জন্ম দিবে। আজকে যে সকল বিষয়কে অসম্ভব ও অকল্পনীয় মনে হচ্ছে সেই সকল কিছু অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে এই অদৃশ্য বিপ্লবের বদৌলতে। রুহ ও কালবের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই বিপ্লবের বদৌলতে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে, শোষক ও দখলদারদেরকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করবে, অভাব, কুসংস্কার, আদালতহীনতা, জুলুম ও মূর্খতা বিদায় নিবে। আমাদের শহর ও গ্রামগুলো হবে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি &#8211; এমন অনেক ক্ষেত্রে এমন এমন কাজ হবে, যেটার বদৌলতে মানুষ দেখতে পাবে এক নব সংস্কৃতি ও নব দিগন্ত।</p>
<p><span style="font-size: 16px;">হে আল্লাহ, তুমি সকল মুসমানদেরকে এবং সকল মানুষকে ঈমান দান করো। আমিন।</span></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>(সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/mamunmuzahid123/"><strong>বুরহান উদ্দিন আজাদ</strong></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/tafaqqur-on-the-occasion-of-1400-years-of-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13036</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইবনে খালদুন ও তাঁর চিন্তাধারা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-his-thinkings/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-his-thinkings/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 20 Nov 2023 13:35:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[ibn khaldun]]></category>
		<category><![CDATA[ibnkhhaldun]]></category>
		<category><![CDATA[islamic thought]]></category>
		<category><![CDATA[muslim]]></category>
		<category><![CDATA[tahsin gorgun]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=12914</guid>

					<description><![CDATA[ইবনে খালদুনের পরিচয় ইবনে খালদুনের পূর্ণ নাম হল, আবু যায়েদ ওয়ালীউদ্দিন আব্দুর রহমান। তিনি ৭৩২ হিজরি সালের পহেলা রমজান, ১৩৩২ সালে তিউনিশিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের বড় একটি অংশ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবাহিত করেন।এর পর তিনি আন্দালুসিয়াতে যান এবং সেখানে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto"><strong>ইবনে খালদুনের পরিচয়</strong></p>
<p dir="auto">ইবনে খালদুনের পূর্ণ নাম হল, আবু যায়েদ ওয়ালীউদ্দিন আব্দুর রহমান। তিনি ৭৩২ হিজরি সালের পহেলা রমজান, ১৩৩২ সালে তিউনিশিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের বড় একটি অংশ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবাহিত করেন।এর পর তিনি আন্দালুসিয়াতে যান এবং সেখানে একটি সময়কাল ধরে অবস্থান করেন। সেখান থেকে আবার তিনি তিলিমসানে আসেন সেখান বসবাস করেন। তাঁর নিজের জীবন অনেক ঘটনাবহুল এবং তিনি যে সময়ে বসবাস করেন সেই সময়ে ঐ সকল অঞ্চল ছিল রাজনৈতিকভাবে খুবই অস্থিতিশীল। ক্ষমতার পালাবদল খুব দ্রুত হচ্ছিল। এই অস্থিতিশীলতার সময়ে ইবনে খালদুনও বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হন। ইবনে খালদুনের অন্যতম একটি একটি বিষয় হল তিনি তাঁর জীবনীকে অসাধারন ভাবে লিপিবদ্ধ করেন। যা আমাদের মুসলিম আলেমদের মধ্যে খুবই বিরল।</p>
<p dir="auto">
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto"><strong>ইবনে খালদুন আমাদের জন্য কেন গুরুত্ত্বপূর্ণ?</strong></p>
<p dir="auto">ইবনে খালদুনের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, তিনি ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মেটাফিজিক্সকে ঐতিহাসিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন এবং ইতিহাস ও সামাজিক ক্ষেত্রকে এক ধরণের সামাজিক মেটাফিজিক্স হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ইবনে খালদুনের কাজকে আমরা সামাজিক মেটাফিজিক্স বলে থাকি তবে অনেকেই সেটাকে সামাজিক বা সোসাল অন্টলজি নামেও অভিহিত করে থাকেন। বর্তমান সময়ে যদিও সোসাল অন্টলজি-নামক পরিভাষাটি বেশী প্রসিদ্ধ।</p>
<p dir="auto">
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto"><strong>তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ</strong></p>
<p dir="auto">ইবনে খালদুন কর্তৃক রচিত গ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশী নয়। তাঁর সবচয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হল <strong>কিতাবুল ইবার।</strong> একথা বলা যায় যে কিতাবুল ইবার তিনটি অধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত। তবে এটাকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায় যে এটি চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। একটি হল গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় যেটাকে তিনি মুকাদ্দিমা হিসেবে রচনা করেছেন। পরবর্তীতে যা আলাদা গ্রন্থ হিসেবে রচিত হয় এবং মুকাদ্দিমা নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে। অপর দুই অধ্যায়ে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তিনি দুনিয়ার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। চতুর্থ অধ্যায় নামে অভিহিত করতে পারি সেটা হল তাঁর নিজের আত্মজিবনী এটাকে তিনি বিশ্বের ইতিহাসের সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে যুক্ত করেন। কেউ যদি তাঁর জিবনী সংক্রান্ত এই গ্রন্থটি হাতে নিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন তাহলে তাঁর কাছে মনে হবে যে তিনি যেন সমগ্র দুনিয়ার ইতিহাসকে তিনি যে সময়ে বসবাস করেছেন সেই সময় ও তাঁর জীবনকালকে ব্যাখ্যা করার জন্য রচনা করেছেন।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">তবে এটা যদি ইতিহাসকে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গী হয়ে থাকে তাহলে দেখা যায় যে ইতিহাস তাঁর নিজের জন্য অর্থবহ হওয়ার চেয়ে বর্তমানকে বুঝার জন্য। অর্থাৎ ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের গুরুত্ব অবশ্যই আছে তবে সেটার দ্বারা যদি বর্তমানকে বুঝা যায় তাহলে সেটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p dir="auto">
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto"><strong>ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা</strong></p>
<p dir="auto">ইবনে খালদুনকে যে বিষয়টি অমরত্ব দান করেছে বা বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাসংগিক করে তুলেছে সেটা হল জ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম বারের মত সোসাল অন্টলজির প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ, <em><strong>সমাজকে স্বতন্ত্র একটি সত্ত্বা হিসেবে গ্রহণ করে, সে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটার মূল ক্যাটাগরি সমূহকে বিবেচনায় নিয়ে সিস্টেম্যাটিকভাবে বিশ্লেষণ করা। </strong></em>ইবনে খালদুন এই তত্ত্বকে দাঁড় করানো সময় তাঁর পূর্বের বড় বড় চিন্তাবিদগণের নিকট থেকে উপকৃত হয়েছেন। তিনি তাঁর পূর্বের মাসউদী, তাবারী, মাতুরিদি সহ অনেক চিন্তাবিদগণের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন তবে তাঁর এই সমাজ চিন্তার ক্ষেত্রে যিনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করেছেন তিনি হলেন ইমাম মাওয়ারদী। তবে অন্যান্য চিন্তাবিদগণ থেকে ইবনে খালদুনকে যে বিষয়টি স্বাতন্ত্রতা দান করেছে সেই বিষয়টি হল, তাঁর ব্যবহৃত আসাবিয়াত নামক পরিভাষা ও এই আসাবিয়াত নামক পরিভাষাকে বিবেচনায় নিয়ে সমাজের অস্তিত্বকে বায়োলজিক্যাল (জীবতাত্ত্বিক) দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করেন এবং এর সাথে ধাপে ধাপে আবেগ, চিন্তা ও ইরাদা (ইচ্ছা) কেও এর মধ্যে সম্পৃক্ত করে আরও মিশ্র একটি পদ্ধতি দাঁড় করান। এই দৃষ্টিকোন থেকে তিনি ইমাম মাওয়ার্দীর দ্বারা প্রভাবিত হলেও মাওয়ার্দী এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করে জ্ঞানগত দিক থেকে বিশ্লেষণ করায় ইবনে খালদুন ও মাওয়ার্দীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আমরা দেখতে পাই।</p>
<p>ইবনে খালদুন ও মাওয়ার্দীর সম্পর্কের আরেকটি দিক হল উমরান নামক পরিভাষা। ইবনে খালদুন এই পরিভাষাটিকে মাওয়ার্দী থেকে নিয়েছেন তবে আকল ও জ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়কে নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি ইমাম গাজ্জালী, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি এবং মাওয়ার্দী সহ আরও অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ চিন্তাবিদগণের নিকট থেকে সাহায্য নিয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ভবিষ্যৎকে তিনি যেভাবে প্রভাবিত করেছেন</strong></p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর পরবর্তী সময়ের চিন্তা ও চিন্তাবিদের অনেককেই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন। বিশেষ করে তাঁর পরে আসা চিন্তাবিদগণ ইবনে খালদুন থেকে অনেক বেশী উপকৃত হয়েছেন। উসমানী খেলাফতের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী আলেমগণ সহ সমগ্র দুনিয়ার চিন্তাবিদগণ ব্যাপকভাবে উপকৃত হন। ইবনে খালদুন কর্তৃক শুধুমাত্র মুসলমানগণ কিংবা ইসলামী চিন্তাধারাই প্রভাবিত হয়নি, একই সাথে পাশ্চাত্য চিন্তাদর্শনও অনেক বেশী উপকৃত হয়েছে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদগণ কর্তৃক রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লিখিত চিন্তা সমূহকে যদি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে ইবনে খালদুনের সাথে তাদের চিন্তার মধ্যে অনেক সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।</p>
<p>তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা হুবুহু তাঁকে কপি করেছে, আমরা বুঝাতে চাচ্ছি যে ইবনে খালদুনের চিন্তার সাথে অনেক সাদৃশ্যতা রয়েছে। সাধারণভাবে যদি আমরা ইবনে খালদুনের গুরুত্বকে তুলে ধরতে চাই, তাহলে আমরা এই কথা বলতে পারি যে, ইবনে খালদুন ইতিহাস দর্শন এবং একই সাথে সমাজ দর্শনের ক্ষেত্রে বড়দের চেয়েও বড় চিন্তাবিদ। মাওয়ার্দীর সাথে তুলনা করে দেখলে মাওয়ারদীর চিন্তা অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক হলেও ইবনে খালদুন তাত্ত্বিক (থিওরিক) দিক থেকে অনেক বড় একজন দার্শনিক হওয়ার কারণে এবং রাজনীতি ও সমাজিক মেটাফিজিক্সের আলোকে বিশ্লেষণ করলে তিনি অনেক বেশী সামনে চলে আসেন।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto"><em><strong>ইবনে খালদুনকে যদি আমরা বর্তমানে খুব ভালোভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে আমরা যে সকল সমস্যার সম্মুখীন সে সকল সমস্যার সমাধানকল্পে একই সাথে থিওরী তৈরি করার ক্ষেত্রে আবার একই সাথে সমাধান তৈরি করার ক্ষেত্রে এবং অতীতের ঘটনা বুঝার ক্ষেত্রে এই বিশ্লেষণ অনেক সহায়ক হবে। অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বুঝার দৃষ্টিকোন থেকে ইবনে খালদুন আমাদের জন্য অনেক বড় একটি ইলহামের উৎস হতে পারেন।</strong></em></p>
<p><strong>অনুবাদ: <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></strong></p>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-his-thinkings/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">12914</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ফিলোসফি অফ সায়েন্স: কুরআনী দৃষ্টিকোণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/philosophy-of-science-views-of-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/philosophy-of-science-views-of-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 24 Mar 2023 12:09:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7682</guid>

					<description><![CDATA[বিজ্ঞানের দ্বারা জ্ঞানের এমন একটি শাখাকে বুঝানো হয় যা বস্তুগত দুনিয়া নিয়ে আলোচনা করে। ফিলোসফি অফ সায়েন্স বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত এমন দার্শনিক সমস্যার সমাধান করে। এগুলোর মাঝে ২ টি সমস্যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ &#8211; ১/ বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কিভাবে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিজ্ঞানের দ্বারা জ্ঞানের এমন একটি শাখাকে বুঝানো হয় যা বস্তুগত দুনিয়া নিয়ে আলোচনা করে। ফিলোসফি অফ সায়েন্স বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত এমন দার্শনিক সমস্যার সমাধান করে। এগুলোর মাঝে ২ টি সমস্যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ &#8211;</p>
<ul>
<li>১/ বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কিভাবে বিকশিত হলো ?</li>
<li>২/ বৈজ্ঞানিক গবেষণার চিরন্তন মূলনীতিগুলো কি ?</li>
</ul>
<p>এখানে আমরা কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইটা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞানতত্ত্বীয় সমস্যা</strong></p>
<p>কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবিক অর্থেই আমাদের অন্তরের বিশাল স্বাধীনতা রয়েছে। এ সঙ্ক্রান্ত কিছু আয়াত হলো-</p>
<p>وَ فِی الْاَرْضِ اٰیٰتٌ لِّلْمُوْقِنِیْنَۙ</p>
<p>দৃঢ় প্রত্যয় পোষণকারীদের জন্য পৃথিবীতে বহু নিদর্শন রয়েছে।</p>
<p>وَ فِیْۤ اَنْفُسِكُمْؕ اَفَلَا تُبْصِرُوْنَ</p>
<p>এবং তোমাদের সত্তার মধ্যেও। তোমরা কি দেখ না? (৫১:২০-২১)</p>
<p>اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ جَعَلَ الظُّلُمٰتِ وَ النُّوْرَ۬ؕ ثُمَّ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ یَعْدِلُوْنَ</p>
<p>প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলোর উৎপত্তি ঘটিয়েছেন। (৬:১)</p>
<p>اَوَ لَمْ یَنْظُرُوْا فِیْ مَلَكُوْتِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ مَا خَلَقَ اللّٰهُ مِنْ شَیْءٍۙ-وَّ اَنْ عَسٰۤى اَنْ یَّكُوْنَ قَدِ اقْتَرَبَ اَجَلُهُمْۚ-فَبِاَیِّ حَدِیْثٍۭ بَعْدَهٗ یُؤْمِنُوْنَ</p>
<p>তারা কি কখনো আকাশ ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করেনি এবং আল্লাহর সৃষ্ট কোন জিনিসের দিকে চোখ মেলে তাকায়নি? (৭:১৮৫)</p>
<p>আমরা বস্তুগত দুনিয়া নিয়ে গবেষণা করার জন্য, আল্লাহর সৃষ্ট প্রাকৃতিক নির্দশনগুলোর মাধ্যমে তাঁর আরো নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এবং যে বস্তুগুলো তিনি আমাদের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন সেগুলো ব্যবহারের জন্য আদেশ প্রাপ্ত। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-</p>
<p>قُلِ انْظُرُوْا مَا ذَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِؕ وَ مَا تُغْنِی الْاٰیٰتُ وَ النُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا یُؤْمِنُوْنَ</p>
<p>তাদেরকে বলো, “পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে চোখ মেলে দেখো।” আর যারা ঈমান আনতেই চায় না তাদের জন্য নির্দশন ও উপদেশ তিরস্কার কীইবা উপকারে আসতে পারে। (১০:১০১)</p>
<p>اَللّٰهُ الَّذِیْ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوٰى عَلَى الْعَرْشِ وَ سَخَّرَ الشَّمْسَ وَ الْقَمَرَؕ كُلٌّ یَّجْرِیْ لِاَجَلٍ مُّسَمًّىؕ یُدَبِّرُ الْاَمْرَ یُفَصِّلُ الْاٰیٰتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَآءِ رَبِّكُمْ تُوْقِنُوْنَ</p>
<p>আল্লাহই আকাশসমূহ স্থাপন করেছেন এমন কোন স্তম্ভ ছাড়াই যা তোমরা দেখতে পাও। তারপর তিনি নিজের শাসন কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন। আর তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে একটি আইনের অধীন করেছেন। এ সমগ্র ব্যবস্থার প্রত্যেকটি জিনিস একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলে।&nbsp; আল্লাহই এ সমস্ত কাজের ব্যবস্থাপনা করছেন। তিনি নিদর্শনাবলী খুলে খুলে বর্ণনা করেন,&nbsp; সম্ভবত তোমরা নিজেদের রবের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারটি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করবে। (১৩:২)</p>
<blockquote><p>وَ سَخَّرَ لَكُمُ الَّیْلَ وَ النَّهَارَۙ وَ الشَّمْسَ وَ الْقَمَرَؕ وَ النُّجُوْمُ مُسَخَّرٰتٌۢ بِاَمْرِهٖؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّعْقِلُوْنَۙ وَ مَا ذَرَاَ لَكُمْ فِی الْاَرْضِ مُخْتَلِفًا اَلْوَانُهٗؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیَةً لِّقَوْمٍ یَّذَّكَّرُوْنَ وَ هُوَ الَّذِیْ سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَاْكُلُوْا مِنْهُ لَحْمًا طَرِیًّا وَّ تَسْتَخْرِجُوْا مِنْهُ حِلْیَةً تَلْبَسُوْنَهَاۚ وَ تَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِیْهِ وَ لِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِهٖ وَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ</p>
<p>তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে বশীভূত করে রেখেছেন এবং সমস্ত তারকাও তাঁরই হুকুমে বশীভূত রয়েছে। যারা বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগায় তাদের জন্য রয়েছে এর মধ্যে প্রচুর নিদর্শন। আর এই যে বহু রং বেরংয়ের জিনিস তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করে রেখেছেন এগুলোর মধ্যেও অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা শিক্ষাগ্রহণ করে। তিনিই তোমাদের জন্য সাগরকে করায়ত্ত করে রেখেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তরতাজা গোশত নিয়ে খাও এবং তা থেকে এমন সব সৌন্দর্য সামগ্রী আহরণ করো যা তোমরা অংগের ভূষণরূপে পরিধান করে থাকো। তোমরা দেখছো, সমুদ্রের বুক চিরে নৌযান চলাচল করে। এসব এজন্য, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পারো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো। (১৬:১২-১৪)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>যদি প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা অসম্ভব হত তাহলে কুরআন আমাদেরকে মৌলিক বিষয় এবং বিভিন্ন জীব ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু সমূহ নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করতে উৎসাহিত করতো না। অধিকন্তু কুরআনের কিছু আয়াত সুস্পষ্টরূপে এইদিকে নির্দেশ করে-</p>
<p>سَنُرِیْهِمْ اٰیٰتِنَا فِی الْاٰفَاقِ وَ فِیْۤ اَنْفُسِهِمْ حَتّٰى یَتَبَیَّنَ لَهُمْ اَنَّهُ الْحَقُّؕ اَوَ لَمْ یَكْفِ بِرَبِّكَ اَنَّهٗ عَلٰى كُلِّ شَیْءٍ شَهِیْدٌ</p>
<p>অচিরেই আমি এদেরকে সর্বত্র আমার নিদর্শনসমূহ দেখাবো এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও। যাতে এদের কাছে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ কুরআন যথার্থ সত্য এটাই কি যথেষ্ঠ নয় যে, তোমার রব প্রতিটি জিনিস দেখছেন? (৪১:৫৩)</p>
<p>অন্যদিকে কুরআন হচ্ছে সমগ্র মানব জাতির জন্য পথ নির্দেশনা । আর তাই কুরআনে মানুষের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন কিছুই উপেক্ষা করা হয়নি-</p>
<p>وَ نَزَّلْنَا عَلَیْكَ الْكِتٰبَ تِبْیَانًا لِّكُلِّ شَیْءٍ وَّ هُدًى وَّ رَحْمَةً وَّ بُشْرٰى لِلْمُسْلِمِیْنَ۠</p>
<p>আমি এ কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যা সব জিনিস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে এবং যা সঠিক পথনির্দেশনা, রহমত ও সুসংবাদ বহন করে তাদের জন্য যারা আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে। (১৬:৮৯)</p>
<p>مَا فَرَّطْنَا فِی الْكِتٰبِ مِنْ شَیْءٍ ثُمَّ اِلٰى رَبِّهِمْ یُحْشَرُوْنَ</p>
<p>এই কিতাবে কোন কিছু লিখতে আমি বাদ দেইনি। (৬:৩৮)</p>
<p>অতএব আশা করি যে কেউ গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হবে যে, কুরআন হচ্ছে প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করার পথ উন্মোচনকারী নতুন নতুন পথের সন্ধান দানকারী গ্রন্থ ।</p>
<h3>&nbsp;</h3>
<p><strong>প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করার চেতনা জাগ্রতকারী উপাদান</strong></p>
<p>কুরআনের মতে, প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করার সাধারণ উপায় হচ্ছে আমাদের আক্বল এবং পঞ্চইন্দ্রিয়-</p>
<p>وَ اللّٰهُ اَخْرَجَكُمْ مِّنْۢ بُطُوْنِ اُمَّهٰتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَیْــٴًـاۙ وَّ جَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَ الْاَبْصَارَ وَ الْاَفْـٕدَةَۙ</p>
<p>আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদের বের করেছেন এমন অবস্থায় যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, চিন্তা-ভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন।(১৬:৭৮)</p>
<p>আমরা কোন ঘটনার বারবার পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যম শিখি-</p>
<p>قُلْ سِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَیْفَ بَدَاَ الْخَلْقَ</p>
<p>এদেরকে বলো, পৃথিবীর বুকে চলাফেরা করো এবং দেখো তিনি কিভাবে সৃষ্টির সূচনা করেন। (২৯:২০)</p>
<p>اَفَلَمْ یَسِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَتَكُوْنَ لَهُمْ قُلُوْبٌ یَّعْقِلُوْنَ</p>
<p>তারা কি পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করেনি, যার ফলে তারা উপলব্ধিকারী হৃদয়ের অধিকারী হতো? (২২:৪৬)</p>
<p><strong>এই আয়াতগুলোর প্রথমাংশ পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের দিকে নির্দেশ করে এবং দ্বিতীয়াংশ যুক্তিবিদ্যার দিকে নির্দেশ করে। তাই প্রকৃতিকে বুঝার অপরিহার্য মাধ্যম হচ্ছে পরীক্ষামূলক কার্য সম্পাদন করা। কিন্তু পক্ষান্তরে কিছু ধারার দাবি হচ্ছে প্রকৃতির সকল তথ্য শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা যদি আমাদেরকে শুধুমাত্র পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ করে ফেলি এবং আমদের আক্বলকে যদি ব্যবহার না করি তবে আমাদের এবং পশুদের মাঝে কি পার্থক্য রইল।</strong></p>
<p>وَ لَقَدْ ذَرَاْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِیْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَ الْاِنْسِ ﳲ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا یَفْقَهُوْنَ بِهَا٘-وَ لَهُمْ اَعْیُنٌ لَّا یُبْصِرُوْنَ بِهَا٘-وَ لَهُمْ اٰذَانٌ لَّا یَسْمَعُوْنَ بِهَاؕ-أُولَٰئِكَ كَالْاَنْعَامِ بَلْ هُمْ اَضَلُّؕ-أُولَٰئِكَ هُمُ الْغٰفِلُوْنَ</p>
<p>আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু জ্বীন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি।&nbsp; তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত, বরং তাদের চাইতেও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে। (৭:১৭৯)</p>
<p>উপরন্তু সৃষ্টি জগতে বিদ্যমান নিদর্শনসমূহ বুঝতে প্রয়োজন আক্বল ও গভীর উপলব্ধির । আল &#8211; কুরআনে বারবার এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>اِنَّ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافِ الَّیْلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الْاَلْبَابِۚۙ الَّذِیْنَ یَذْكُرُوْنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوْدًا وَّ عَلٰى جُنُوْبِهِمْ وَ یَتَفَكَّرُوْنَ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِۚ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًاۚ سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ</p>
<p>পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে, যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠনাকৃতি নিয়ে চিন্তা- ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন। (তারা আপনা আপনি বলে ওঠেঃ) “হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে সৃষ্টি করো নি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত। কাজেই হে প্রভু! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করো। (৩:১৯০-১৯১)</p></blockquote>
<p>কুরআন আমাদেরকে এটাও শিখায় যে বস্তুগত দুনিয়ায় এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করতে সক্ষম নই:</p>
<p>فَلَاۤ اُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَۙ وَ مَا لَا تُبْصِرُوْنَۙ</p>
<p>অতএব তা নয়। আমি শপথ করছি ঐ সব জিনিসেরও যা তোমরা দেখতে পাও এবং ঐসব জিনিসের যা তোমরা দেখতে পাওনা। (৬৯:৩৮-৩৯)</p>
<p>خَلَقَ السَّمٰوٰتِ بِغَیْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا</p>
<p>তিনি আকাশসমূহ সৃষ্টি করেছেন স্তম্ভ ছাড়াই, যা তোমরা দেখতে পাও। (৩১:১০)</p>
<p>সর্বশেষ কুরআন এমন লোকদের সমালোচনা করে যারা ভাবে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ই বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার একমাত্র পন্থা:</p>
<p>یَسْــٴَـلُكَ اَهْلُ الْكِتٰبِ اَنْ تُنَزِّلَ عَلَیْهِمْ كِتٰبًا مِّنَ السَّمَآءِ فَقَدْ سَاَلُوْا مُوْسٰۤى اَكْبَرَ مِنْ ذٰلِكَ فَقَالُوْۤا اَرِنَا اللّٰهَ جَهْرَةً فَاَخَذَتْهُمُ الصّٰعِقَةُ بِظُلْمِهِمْۚ</p>
<p>এই আহ্‌লে কিতাবরা যদি আজ তোমার কাছে আকাশ থেকে তাদের জন্য কোন লিখন অবতীর্ণ করার দাবী করে থাকে, তাহলে ইতিপূর্বে তারা এর চাইতেও বড় ধৃষ্ঠতাপূর্ণ দাবী মূসার কাছে করেছিল। তারা তো তাঁকে বলেছিল, আল্লাহকে প্রকাশ্যে আমাদের দেখিয়ে দাও। তাদের এই সীমালঙ্ঘনের কারণে অকস্মাৎ তাদের ওপর বিদ্যুৎ আপতিত হয়েছিল। (৪:১৫৩)</p>
<p>কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক ভাবে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে পজিটিভিজমের হাওয়ায় অনেক মুসলিম স্কলার আক্রান্ত হন এবং অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীও ভাবতে শুরু করেন বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ততটুকুই যতটুকু আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। এই ধরণের চিন্তাকে সামনে রেখে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো :</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১।</strong> আমরা কখনোই কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করি না । আর তাই পরম পরীক্ষামূলক তথ্য বা নিশ্চিত ভাবে সঠিক কোন তথ্য বলতেও কিছু নেই। পরীক্ষামূলক তথ্যের ব্যখ্যা এমনকি এই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও নির্ভর করে পর্যবেক্ষকের পূর্ব ধারণার উপর ভিত্তি। এই বিষয়টাকে প্ল্যাঙ্ক খুব সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেনে এইভাবে:</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;প্রথমত প্রতিটি মাপ-জোপ ততটুকুই অর্থ বহন করে যতটুকু তাৎপর্য জড় বিজ্ঞানের থিওরি তাকে দেয়। সত্যিকারের প্রায়োগিক গবেষণার সাথে পরিচিত এমন যেকেউ এই বিষয়ে একমত হবেন যে সবচেয়ে সুন্দর এবং সরাসরি মাপন যোগ্য যেমন ভর এবং বিদ্যুতের পরিমাপও ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে থাকবে যতক্ষণ না বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে। এটা সত্য যে এই সংশোধনগুলো পরিমাপের পদ্ধতি নিজ থেকে বের হবে না। বরং যে থিওরির উপর এই পরিমাপটা করা হচ্ছে কিংবা এই পরিমাপের সাথে সম্পর্কিত কোন একটা থিওরির মাধ্যমেই সংশোধিত হবে। অর্থ্যাৎ এটা একটা হাইপোথিসিসের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে। (১)&#8221;</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>২।</strong> আইনস্টাইন যথার্থই বলেছেন বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ও স্বীকার্যগুলোকে কখনো আরোহ পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। বরং এগুলো হচ্ছে মানুষের মুক্ত চিন্তার ফলাফল। (২)</p>
<p style="padding-left: 40px;">পদার্থবিজ্ঞান এমন এক যুক্তিনির্ভর সিস্টেম গঠন করেছে যা একেবারে নিখাদ নয়। সময়ের সাথে সাথে যা পরিবর্তিত হচ্ছে। এটাকে বিবর্তনের রাজ্যও বলা যায় । পদার্থ বিজ্ঞানের এই ধারাপূর্ব&nbsp; অভিজ্ঞতার আলোকে আরোহ পদ্ধতিতে চলতে থাকে। এখানে নতুন কোন কিছু আসার উপায় হচ্ছে মুক্ত চিন্তা। পদার্থ বিজ্ঞান যে ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে তার যথার্থতা নির্ভর করে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে সে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি প্রতিপাদন করছে তার উপর; যেখানে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীর বিষয়ের মাঝে সম্পর্ক শুধুমাত্র সংজ্ঞায়নের ভিত্তিতে বোঝা সম্ভব। এখানে বিবর্তন এমন একটি প্রক্রিয়া যা যুক্তির মাধ্যমে ক্রমাগত সরল বিষয়ের দিকে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমাদেরকে একটু করে বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে থিওরির সাথে বাস্তবতার দূরত্ব অনেক। অনুরূপভাবে মৌলিক ভিত্তিগুলোকে শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই ব্যাখ্যা করার যে পথ আমরা গ্রহণ করেছি তাও দিন দিন কঠিন এবং দীর্ঘতর হয়ে পড়ছে। (৩)</p>
<p>এই জন্য এই ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি থিওরি হচ্ছে এক্সপেরিমেন্টের সরাসরি ফলাফল যদি না এই এক্সপিরিমেন্টের অন্য কোন ব্যাখ্যা না থাকে। কিন্তু এক্সপেরিমেন্টের অন্য কোন ব্যাখ্যা থাকবে না এই দাবিও আমরা করতে পারিনা । এই ভুল না করার ব্যাপারে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে বারবার সর্তক করে। থিওরি এবং এক্সপিরেমেন্টের মধ্যকার এই সম্পর্কের দ্বারা এটা বোঝার প্রয়োজন নেই যে এটাই একমাত্র সঠিক পদ্ধতি। যুক্তির বিচারে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটা বিষয়ের উপসংহার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই&nbsp; থেকেই টানা সম্ভব। এই জন্য আমরা এটা বলতে পারি না যে, পরীক্ষামূলক তথ্যের সরাসরি ফলাফলই হচ্ছে থিওরি। বরঞ্চ অনেক থিওরিই দাঁড় করানো হয়েছে এক্সপেরিমেন্টকে ব্যাখ্যা করার জন্য। এজন্য প্রকৃত বিষয়কে জানতে আপনাকে নতুন নতুন অনুমান অথবা তথ্যকে সামনে আনতে হবে। যেমন কেপলার যখন নক্ষত্রগুলোর অবস্থানকে স্থির ধরে মঙ্গলের আপেক্ষিক অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যগুলো নিয়ে পড়ছিলেন তখন এই তথ্যগুলো থেকে সুন্দর একট সূত্র (Good looking law) আবিষ্কারের চেষ্ট করে ব্যর্থ হলো। অতঃপর ভিন্ন একটা কারণে তিনি উপবৃত্ত সম্পর্কিত থিওরি নিয়ে কাজ করছিলেন আর এই সময়ে তিনি ধারণা করেন গ্রহের কক্ষপথও উপবৃত্তাকার হতে পারে। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি কিছু এক্সেপেরিমেন্ট চালিয়ে সফল হলেন। এ থেকে বুঝা যায় মঙ্গলের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়াটা একটা ধারণা ফলাফলা । সরাসরি মঙ্গলের কক্ষপথ দেখে এই সিদ্ধান্তে আসা হয়নি।</p>
<p>অতএব এটা বলা যায় বিজ্ঞানের অগ্রগতি তাত্ত্বিক কল্পনা (Theoretical speculation)এবং পরীক্ষামূলক কাজ (Experimental work) উভয়ের মাধ্যমেই হয়েছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৩।</strong> এমন অনেক কনসেপ্ট আছে যেগুলো ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যেমন দৈব ঘটনার ধারণা ইন্দ্রায়ানুভূতি দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যেসকল বিষয়ে আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্য গ্রহণ করি সেগুলোর উদাহরণ হচ্ছে ‘খ’ এর মত যা ‘ক’এর পরে আসে। আর এটাই হচ্ছে ‘ক’এবং ‘খ’এর মাঝের দৈব সম্পর্ক যা আমরা আমাদের আক্বলের সাহায্যে নিরূপণ করি। এমনকি পদার্থ বিজ্ঞানের সকল ধারণা বাস্তবিক অভিজ্ঞতার ফলাফল নয় বরং এর বেশির ভাগই বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টকে ব্যাখ্যার তাগিদে উদ্ভব হয়েছে। যেমন আমরা এটমের ধারণাকে হাজারো এক্সপেরিমেন্টের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করি কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউই কিন্তু এই এটমকে দেখেনি (এমনকি ইন্দ্রিয় প্রসারিত করে এমন উপকরণ যেমন ইলেকট্রনিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও না।) আমরা এটমকে চিনি অনুমানের উপর নির্ভর করে। অনুরূপভাবে মহাশূন্যের বিস্তৃতি ও সময় নিয়েও আমাদের কাছে কোন সরাসরি তথ্য নেই।</p>
<p>উপসংহারে এই আলোচনা থেকে আমরা এইটা ব্যাখ্যা করতে পারি যে তাত্ত্বিক ভিত্তি ছাড়া শুধুমাত্র এক্সপিরিমেন্ট আমাদেরকে কখনো প্রকৃতি সমন্ধে সঠিক তথ্য দিতে পারে না। এমনকি পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের মাধ্যমে বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে যে ছবি আমাদের মানসপটে তৈরি হয়, যতটুকু জ্ঞান আমরা লাভ করি তার সবটুকুও আমরা ইন্দ্রয়ানুভূতির অভিজ্ঞতা দ্বারা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নই।</p>
<p>বস্তুগত দুনিয়া সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ছবি অংকন করার এই প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ । আর এই প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণা এবং পরীক্ষামূলক কাজের মাধ্যমে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সঠিক পন্থা অবলম্বনের পথে বাঁধা সমূহ</strong></p>
<p>যেমনটা আমরা পূর্বেই বলেছিলাম কুরআন আমাদেরকে প্রকৃতিকে গভীরভাবে&nbsp; পর্যবেক্ষণ করার এবং এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করার নির্দেশ দেয়। এই গভীর চিন্তা এর সাথে সম্পর্কিত বিদ্যমান তথ্য উপাত্ত আমাদেরকে বিশুদ্ধ জ্ঞানের দিকে নিয়ে যাবে। যাই হোক এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে যদি সঠিক মূলনীতি এবং পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়। এইভাবে আমরা যুক্তির কাছে ফিরে&nbsp; আসি যা মূলনীতি নিয়ে অধ্যায়ন করার সঠিক পন্থা। যাই হোক শুধুমাত্র যুক্তিবিদ্যার নীতি সঠিক ফলাফল নাও দিতে পারে যদি না যেসকল বিষয়ের উপর এই যুক্তি দাঁড় করানো হচ্ছে সেগুলো নির্ভুল হয়। এই কারণে কুরআন আমাদেরকে এমনসব বিষয়ে সর্তক করেছে যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সঠিক ভাবে&nbsp; এগিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করে। এই পর্যায়ে আমরা প্রকৃতিকে সঠিকভাবে চেনার ক্ষেত্রে বাঁধা প্রদানকারী প্রধান প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো:</p>
<p><strong>১। ঈমানের অভাব</strong></p>
<p>কুরআন অনুসারে ঈমানহীন জ্ঞান দিয়ে কেউ প্রকৃতি সম্বন্ধে সঠিক বুঝা পড়া লাভ করে না।</p>
<p>قُلِ انْظُرُوْا مَا ذَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِؕ وَ مَا تُغْنِی الْاٰیٰتُ وَ النُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا یُؤْمِنُوْنَ</p>
<p>তাদেরকে বলো, “পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে চোখ মেলে দেখো।” আর যারা ঈমান আনতেই চায় না তাদের জন্য নির্দশন ও উপদেশ তিরস্কার কীইবা উপকারে আসতে পারে। (১০:১০১)</p>
<p>ঈমানের প্রধান ভূমিকাই হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত রাখা।</p>
<p><strong>২। পক্ষপাতিত্বমূলক বিচার বিশ্লেষণ</strong></p>
<p>কারো খেয়াল খুশির অনুসরণ সেটা হতে পারে কারো প্রতি ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার কারণে&nbsp; সে যাই হোক এধরণের পূর্বানুমানের ভিত্তিতে চলা ইনসাফের নীতি নয় এবং এই নিদারুণ আত্নম্ভরিতাই হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পক্ষপাতহীন এবং নিরপেক্ষক বিচার বিশ্লষণের পথে বাঁধা প্রদানকারী কারণগুলোর অন্যতম।</p>
<p>وَ لَنْ تَرْضٰى عَنْكَ الْیَهُوْدُ وَ لَا النَّصٰرٰى حَتّٰى تَتَّبِـعَ مِلَّتَهُمْؕ قُلْ اِنَّ هُدَى اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰىؕ وَ لَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ بَعْدَ الَّذِیْ جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِۙ مَا لَكَ مِنَ اللّٰهِ مِنْ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیْرٍؔ</p>
<p>ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তোমার প্রতি কখনোই সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের পথে চলতে থাকো। পরিষ্কার বলে দাও, পথ মাত্র একটিই, যা আল্লাহ‌ বাতলে দিয়েছেন। অন্যথায় তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে তারপরও যদি তুমি তাদের ইচ্ছা ও বাসনা অনুযায়ী চলতে থাকো, তাহলে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষাকারী তোমার কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী থাকবে না। (২:১২০)</p>
<p>لَقَدْ جِئْنٰكُمْ بِالْحَقِّ وَ لٰكِنَّ اَكْثَرَكُمْ لِلْحَقِّ كٰرِهُوْنَ</p>
<p>“আমরা তোমাদের কাছে ন্যায় ও সত্য নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের অধিকাংশের কাছে ন্যায় ও সত্য ছিল অপছন্দনীয়।” (৪৩:৭৮)</p>
<p>فَلَمَّا جَآءَتْهُمْ اٰیٰتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوْا هٰذَا سِحْرٌ مُّبِیْنٌۚ جَحَدُوْا بِهَا وَ اسْتَیْقَنَتْهَاۤ اَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَّ عُلُوًّاؕ فَانْظُرْ كَیْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِیْنَ۠</p>
<p>“কিন্তু যখন আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ তাদের সামনে এসে গেলো তখন তারা বলল, এতো সুস্পষ্ট যাদু। তারা একেবারেই অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্যের সাথে সেই নিদর্শনগুলো অস্বীকার করলো অথচ তাদের মন মগজ সেগুলোর সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। এখন এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল দেখে নাও।” (২৭:১৩-১৪)</p>
<p><strong>৩। পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ</strong></p>
<p>وَ قَالُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّاۤ اَطَعْنَا سَادَتَنَا وَ كُبَرَآءَنَا فَاَضَلُّوْنَا السَّبِیْلَا</p>
<p>আরো বলবে, “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের সরদারদের ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে।”&nbsp;(৩৩:৬৭)</p>
<p>وَ اِذَا قِیْلَ لَهُمُ اتَّبِعُوْا مَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ قَالُوْا بَلْ نَتَّبِـعُ مَاۤ اَلْفَیْنَا عَلَیْهِ اٰبَآءَنَاؕ اَوَ لَوْ كَانَ اٰبَآؤُهُمْ لَا یَعْقِلُوْنَ شَیْــٴًـا وَّ لَا یَهْتَدُوْنَ</p>
<p>“তাদের যখন বলা হয়, আল্লাহ‌ যে বিধান নাযিল করেছেন তা মেনে চলো, জবাবে তারা বলে, আমাদের বাপ-দাদাদের যে পথের অনুসারী পেয়েছি আমরা তো সে পথে চলবো। আচ্ছা, তাদের বাপ-দাদারা যদি একটুও বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ না করে থেকে থাকে এবং সত্য-সঠিক পথের সন্ধান না পেয়ে থাকে তাহলেও কি তারা তাদের অনুসরণ করে যেতে থাকবে?” (২:১৭০)</p>
<p><strong>৪। অপ্রসাঙ্গিক আলোচনা এবং অন্ধ সমর্থন</strong></p>
<p>وَ مَا لَهُمْ بِهٖ مِنْ عِلْمٍؕ اِنْ یَّتَّبِعُوْنَ اِلَّا الظَّنَّۚ وَ اِنَّ الظَّنَّ لَا یُغْنِیْ مِنَ الْحَقِّ شَیْــٴًـاۚ</p>
<p>অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞানই নেই। তারা কেবলই বদ্ধমূল ধারণার অনুসরণ করছে। আর ধারণা কখনো জ্ঞানের প্রয়োজন পূরণে কোন কাজে আসতে পারে না। (৫৩:২৮)</p>
<p>সঠিক বিচার বিশ্লেষণের পথে সবেচেয় বড় ভুলগুলোর অন্যতম হচ্ছে জ্ঞানকে আন্দাজ &#8211; অনুমানের ভিত্তিতে প্রতিস্থাপন করা :</p>
<p>وَ لَا تَقْفُ مَا لَیْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌؕ اِنَّ السَّمْعَ وَ الْبَصَرَ وَ الْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْـٴُـوْلًا</p>
<p>এমন কোন জিনিসের পেছনে লেগে যেয়ো না যা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই। নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও রুহ সম্পর্কে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈজ্ঞানিক গবেষণার পূর্বশর্ত</strong></p>
<p>আমরা পর্বেই উল্লেখ করেছি বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে একই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং পরীক্ষামূলক কাজের সংমিশ্রণ। এই কাজকে অর্থবহ করতে এবং যথাযথ ফলাফল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যেকোন বৈজ্ঞানিক কার্যকলাপের পূর্বে একটা মূলনীতিকে অনুমান করে এগিয়ে যেতে হয়। এই সকল মূলনীতির অসংখ্য ব্যাখা বিশ্লেষণ আছে। কুরআনকে নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা করলে আমরা এখান থেকে কিছু মৌলিক যুক্তি ( যেমনঃ দ্বন্দহীনতার মূলনীতি) পাই যেই মূলনীতি যেকোন ধরণের বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রমের পূর্বানুমান হিসেবে কাজ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অদ্বিত্ববাদের মূলনীতি ( আত &#8211; তাওহীদ)</strong></p>
<p>কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কারো ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটানোর জন্য প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করা উচিত নয়। বরং এটা হওয়া উচিত সমগ্র বিশ্বের সর্বজ্ঞানী স্রষ্টাকে জানার চেনার জন্য। প্রকৃতির সকল জীবজন্তু হচ্ছে সৃষ্টির নির্দশন আর এগুলো নিয়ে অধ্যয়ন আমাদেরকে তাঁর দিকেই নিয়ে যায়।</p>
<p>অধিকন্তু বস্তুগত দুনিয়ার এই শৃঙ্খলা ,ঐকতান এবং সৃষ্টির উদ্দ্যেশের সমর্থনে কুরআনের আয়াত রয়েছে:</p>
<p>وَ خَلَقَ كُلَّ شَیْءٍ فَقَدَّرَهٗ تَقْدِیْرًا</p>
<p>যিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন তারপর তার একটি তাকদীর নির্ধারিত করে দিয়েছেন। (২৫:২)</p>
<p>الَّذِیْ خَلَقَ سَبْعَ سَمٰوٰتٍ طِبَاقًاؕ مَا تَرٰى فِیْ خَلْقِ الرَّحْمٰنِ مِنْ تَفٰوُتٍؕ فَارْجِعِ الْبَصَرَۙ هَلْ تَرٰى مِنْ فُطُوْرٍ</p>
<p>তিনিই স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি আসমান তৈরী করেছেন। তুমি রহমানের সৃষ্টকর্মে কোন প্রকার অসঙ্গতি দেখতে পাবে না। আবার চোখ ফিরিয়ে দেখ, কোন ত্রুটি দেখতে পাচ্ছ কি? (৬৭:৩)</p>
<p>وَ مَا خَلَقْنَا السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ مَا بَیْنَهُمَا لٰعِبِیْنَ مَا خَلَقْنٰهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّ وَ لٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا یَعْلَمُوْنَ</p>
<p>আমি এ আসমান ও যমীন এবং এর কাছের সমস্ত জিনিস খেলাচ্ছলে তৈরি করিনি। এসবই আমি যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না। (৪৪:৩৮-৩৯)</p>
<p>তিনি এই মহাজগতের সকল কিছুর মাঝে সমন্বয় ও শৃঙ্খলাবিধানকারী এবং এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পরিচালক :</p>
<p>لَوْ كَانَ فِیْهِمَاۤ اٰلِهَةٌ اِلَّا اللّٰهُ لَفَسَدَتَاۚ</p>
<p>যদি আকাশে ও পৃথিবীতে এক আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোন ইলাহ থাকতো তাহলে (পৃথিবী ও আকাশ) উভয়ের ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেতো। (২১:২২)</p>
<p>صُنْعَ اللّٰهِ الَّذِیْۤ اَتْقَنَ كُلَّ شَیْءٍؕ</p>
<p>এ হচ্ছে আল্লাহর কুদরতের মূর্ত প্রকাশ, যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে বিজ্ঞতা সহকারে সুসংঙ্গবদ্ধ করেছেন।(২৭:৮৮)</p>
<p>اَفَلَا یَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَؕ وَ لَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَیْرِ اللّٰهِ لَوَجَدُوْا فِیْهِ اخْتِلَافًا كَثِیْرًا</p>
<p>তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি এটি আল্লাহ‌ ছাড়া আর কারো পক্ষ থেকে হতো, তাহলে তারা এর মধ্যে বহু বর্ণনাগত অসঙ্গতি খুঁজে পেতো। (৪:৮২)</p>
<p>هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الشَّمْسَ ضِیَآءً وَّ الْقَمَرَ نُوْرًا وَّ قَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِیْنَ وَ الْحِسَابَؕ مَا خَلَقَ اللّٰهُ ذٰلِكَ اِلَّا بِالْحَقِّۚ یُفَصِّلُ الْاٰیٰتِ لِقَوْمٍ یَّعْلَمُوْنَ</p>
<p>তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় ও চন্দ্রকে আলোকময় এবং তার মঞ্জিলও ঠিকমত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যাতে তোমরা তার সাহায্যে বছর গণনা ও তারিখ হিসেব করতে পারো। আল্লাহ‌ এসব কিছু (খেলাচ্ছলে নয় বরং) উদ্দেশ্যমূলকভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিজের নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে পেশ করেছেন যারা জ্ঞানবান তাদের জন্য। (১০:৫)</p>
<p>তাওহীদের উপর দৃঢ় বিশ্বাস একজন গবেষককে প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয় বরং সামগ্রিকভাবে দেখতে&nbsp; শিখায়। এই সামগ্রিক দর্শনের মাধ্যমে গবেষকরা প্রকৃতির একটি বিষয়ের সাথে আরেকটি বিষয়ের যে নিবিড় সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন ।</p>
<p>অন্যদিকে প্রকৃতির এই সুশৃঙ্খল বিন্যাসের উপর যদি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে তাহলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা সার্বজনীন তাৎপর্য বহন করবে না সর্বোচ্চ সাময়িক গুরুত্ব লাভ করতে পারে। তবে কিছু বিজ্ঞানী এমনও আছেন যারা প্রকৃতির মাঝে বিদ্যমান আইন, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার উপস্থিতির উপর বিশ্বাস করলেও তাওহীদে বিশ্বাসী নন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে তাওহীদে বিশ্বাস ব্যতীত মহাজগতিক ব্যবস্থাপনার কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বহিঃজগতের বাস্তবতা</strong></p>
<p>যেমনটা আমরা পূর্বেই বলেছি, কুরআন অনুসারে অনুধাবনকারী বিষয় থেকে স্বতন্ত্র একটি বহিঃজগত রয়েছে:</p>
<p>وَ اللّٰهُ اَخْرَجَكُمْ مِّنْۢ بُطُوْنِ اُمَّهٰتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَیْــٴًـاۙ وَّ جَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَ الْاَبْصَارَ وَ الْاَفْـٕدَةَۙ</p>
<p>আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদের বের করেছেন এমন অবস্থায় যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, চিন্তা-ভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন। (১৬:৭৮)</p>
<p>الَّذِیْ جَعَلَ لَكُمُ الْاَرْضَ مَهْدًا وَّ جَعَلَ لَكُمْ فِیْهَا سُبُلًا لَّعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَۚ وَ الَّذِیْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍۚ فَاَنْشَرْنَا بِهٖ بَلْدَةً مَّیْتًاۚ كَذٰلِكَ تُخْرَجُوْنَ وَ الَّذِیْ خَلَقَ الْاَزْوَاجَ كُلَّهَا وَ جَعَلَ لَكُمْ مِّنَ الْفُلْكِ وَ الْاَنْعَامِ مَا تَرْكَبُوْنَۙ</p>
<p>তিনিই তো সৃষ্টি করেছেন যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য দোলনা বানিয়েছেন এবং সেখানে তোমাদের জন্য রাস্তা তৈরী করে দিয়েছেন। যাতে তোমাদের গন্তব্যস্থলের পথ খুঁজে পাও। যিনি আসমান থেকে একটি বিশেষ পরিমাণে পানি বর্ষণ করেছেন এবং তার সাহায্যে মৃত ভূমিকে জীবিত করে তুলেছেন। তোমাদের এভাবেই একদিন মাটির ভেতর থেকে বের করে আনা হবে। তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি সমস্ত জোড়া সৃষ্টি করেছেন। যিনি তোমাদের জন্য নৌকা-জাহাজ এবং জীব-জন্তুকে সওয়ারি বানিয়েছেন যাতে তোমরা তার পিঠে আরোহণ করো। (৪৩:১০-১২)</p>
<p>বাহ্যিক জগতের&nbsp; উপর বিশ্বাসই হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি। এই বিশ্বাসই যদি না থাকে তবে বৈজ্ঞানিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা বাচ্চাদের অহেতুক কর্মকান্ড বা খেলাধুলার চেয়ে বেশি কিছু না। বৈজ্ঞানিক কর্মকান্ডের জন্য প্রেরণা জোগায় এমন বিষয়গুলোর মাঝে এই বিশ্বাস অন্যতম। প্ল্যাঙ্ক এই বিষয়টিকে খুব সুন্দরভাবে এই ভাবে ব্যক্ত করেন:</p>
<p><em>“সবচেয়ে বাস্তব এবং অসাধারণ মননের অধিকারী ব্যক্তি যেমন কেপলার, নিউটন, লিবনিজ এবং ফেরাডেরা বহিঃজগতের উপস্থিতি এবং এর পিছনে উচ্চতর শাসন বিদ্যমান রয়েছে এমন বিশ্বাস&nbsp; থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।”</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মানব জ্ঞানের সীমবদ্ধতা</strong></p>
<p>আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ:<br />
وَ مَاۤ اُوْتِیْتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ اِلَّا قَلِیْلًا<br />
কিন্তু তোমরা সামান্য জ্ঞানই লাভ করেছো। (১৭:৮৫)</p>
<p>এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় উপলব্ধি করতে পারে না:<br />
فَلَاۤ اُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَۙ وَ مَا لَا تُبْصِرُوْنَۙ<br />
অতএব তা নয়। আমি শপথ করছি ঐ সব জিনিসেরও যা তোমরা দেখতে পাও এবং ঐসব জিনিসের যা তোমরা দেখতে পাওনা। (৬৯:৩৮-৩৯)</p>
<p>اَللّٰهُ الَّذِیْ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا<br />
আল্লাহই আকাশসমূহ স্থাপন করেছেন এমন কোন স্তম্ভ ছাড়াই যা তোমরা দেখতে পাও। (১৩:২)<br />
سُبْحٰنَ الَّذِیْ خَلَقَ الْاَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْۢبِتُ الْاَرْضُ وَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ وَ مِمَّا لَا یَعْلَمُوْنَ</p>
<p>পাক-পবিত্র সে সত্ত্বা যিনি সব রকমের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, তা ভূমিজাত উদ্ভিদের মধ্য থেকে হোক অথবা স্বয়ং এদের নিজেদের প্রজাতির (অর্থাৎ মানব জাতি) মধ্য থেকে হোক কিংবা এমন জিনিসের মধ্য থেকে হোক যাদেরকে এরা জানেও না।(৩৬:৩৬)</p>
<p>এবং এজন্য আমাদেরকে অদেখার উপর বিশ্বাস অর্থ্যাৎ অতিপ্রাকৃতিক সত্যের উপর বিশ্বাস করতে হয়:<br />
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَیْبَ فِیْهِ ۚۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِیْنَۙ الَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِالْغَیْبِ وَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَۙ<br />
এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্য। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামায কায়েম করে এবং যে রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে খরচ করে। (২:২-৩)<br />
মানব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার এবং অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস আমাদের চিন্তাশীলতাকে শুধুমাত্র পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির মাঝে সীমাবদ্ধ না করে ফেলার ব্যাপরে উৎসাহিত করে। একই সাথে আমরা দুনিয়ার সবকিছু জেনে ফেলেছি এমন চিন্তা করার ব্যাপারেও নিরুৎসাহিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কর্ম ও কারণের মূলনীতি</strong></p>
<p>এই মূলনীতির বিবৃতি হচ্ছে প্রতি ঘটনার পিছনে একটি কারণ রয়েছে। এই মূলনীতির দুটি অনুসিদ্ধান্ত রয়েছে:</p>
<p>১।<em> পরিণতিবাদের মূলনীতি: যেকোন ঘটনারই ফলাফল আছে; কারণ ছাড়া কোন ফলাফল নেই এবং কারণ ছাড়া ফলাফল হতেই পারে না।</em></p>
<p>২।<em>&nbsp;প্রকৃতির অভিন্নতার মূলনীতি: অনুরূপ ঘটনার অনুরূপ ফলাফল বিদ্যমান।</em></p>
<p>আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত এযাবৎকালে যত বিজ্ঞানী আছেন তাদের অনেকের দীর্ঘদিনের ধারণা হচ্ছে “বস্তুগত দুনিয়া কিছু নির্দিষ্ট আইন-কানুন দ্বারা পরিচালিত হয়”। কর্ম ও কারণের মূলনীতি হচ্ছে এমন এক স্বীকার্য যা প্রাকৃতিক শক্তির ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত যেকোন সূত্রকে অর্থবহ করে তোলে।</p>
<p>কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এই নীতির উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন আয়াতে এই বিশ্বজগতে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় আইনসমূহের কথা বলা হয়েছে:</p>
<p>فَهَلْ یَنْظُرُوْنَ اِلَّا سُنَّتَ الْاَوَّلِیْنَۚ فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللّٰهِ تَبْدِیْلًا ﳛ وَ لَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللّٰهِ تَحْوِیْلًا</p>
<p>এখন তারা কি পূর্বের জাতিদের সাথে আল্লাহ‌ যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তাদের সাথে অনুরূপ পদ্ধতিরই অপেক্ষা করছে? যদি একথাই হয়ে থাকে তাহলে তুমি আল্লাহর পদ্ধতিতে কখনো কোন পরিবর্তন পাবে না এবং কখনো আল্লাহর বিধানকে তার নির্ধারিত পথ থেকে হটে যেতেও তুমি দেখবে না। (৩৫:৪৩)</p>
<p>فِطْرَتَ اللّٰهِ الَّتِیْ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیْهَاؕ لَا تَبْدِیْلَ لِخَلْقِ اللّٰهِؕ</p>
<p>আল্লাহ মানুষকে যে প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছেন তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। (৩০:৩০)</p>
<p>এমন অনেক আয়াত আছে যেখানে কিছু ঘটনার জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু কর্মকৌশল ব্যক্ত করা হয়েছে:</p>
<p>وَ لَقَدْ خَلَقْنَا الْاِنْسَانَ مِنْ سُلٰلَةٍ مِّنْ طِیْنٍۚ</p>
<p>আমি মানুষকে তৈরী করেছি মাটির উপাদান থেকে। (২৩:১২)</p>
<p>وَّ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخْرَ جَ بِهٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزْقًا لَّكُمْۚ</p>
<p>তিনিই ওপর থেকে পানি বর্ষণ করেছেন এবং তার সাহায্যে সব রকমের ফসলাদি উৎপন্ন করে তোমাদের আহার যুগিয়েছেন। (২:২২)</p>
<p>কুরআনের কিছু আয়াত আছে এমন যেগুলো কিছু ঘটনাকে অন্যকিছু ঘটনার মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে:</p>
<p>وَّ اَرْسَلَ عَلَیْهِمْ طَیْرًا اَبَابِیْلَۙ تَرْمِیْهِمْ بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجِّیْلٍ</p>
<p>আর তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান,যারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করছিল পোড়া মাটির পাথর। (১০৫: ৩-৪)</p>
<p>قَاتِلُوْهُمْ یُعَذِّبْهُمُ اللّٰهُ بِاَیْدِیْكُمْ</p>
<p>তাদের সাথে লড়াই করো, আল্লাহ‌ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি দেবেন। (৯:১৪)</p>
<p>অন্যদিকে কুরআনের কিছু আয়াত আছে যেখানে বলা হচ্ছে আল্লাহই দুনিয়ার সৃষ্টিকারী এবং এর পরিচালকও তিনিই:</p>
<p>قُلِ اللّٰهُ خَالِقُ كُلِّ شَیْءٍ</p>
<p>বলো, প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। (১৩:১৬)।</p>
<p>اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْاَمْرُؕ-</p>
<p>জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই। (৭:৫৪)</p>
<p>এই দুই প্রকারের আয়াতকে সামনে রাখলে যে কেউ শেষ পর্যন্ত এটাই অনুভব করবে যে , সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার অধীন তবে এগুলো বিশেষ মাধ্যমে সংগঠিত হয়। উল্লেখিত আয়াতগুলো একথারই স্বীকৃতি দেয়:</p>
<p>وَ الْبَلَدُ الطَّیِّبُ یَخْرُ جُ نَبَاتُهٗ بِاِذْنِ رَبِّهٖۚ-وَ الَّذِیْ خَبُثَ لَا یَخْرُ جُ اِلَّا نَكِدًاؕ</p>
<p>উৎকৃষ্ট ভুমি নিজের রবের নির্দেশে প্রচুর ফসল উৎপন্ন করে এবং নিকৃষ্ট ভুমি থেকে নিকৃষ্ট ধরনের ফসল ছাড়া আর কিছুই ফলে না। (৭:৫৮)</p>
<p>এই আয়াত যেদিকে নির্দেশ করে তা হচ্ছে, গাছের বৃদ্ধির জন্য জমিনের উর্বরতা জরুরি যদিও আল্লাহর ইচ্ছাও জরুরি। যাই হোক আল্লাহ চাইলে যেকোন গাছ যেকোন ভূমিতে জন্মাতে পারে।</p>
<p>কিছু বিখ্যাত আশয়ারী মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ (যেমন ইমাম গাজালী এবং ইমাম রাজী) বস্তুগত দুনিয়ার ক্ষেত্রে পরিণতিবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । এক্ষেত্রে তাদের মতামত হচ্ছে, প্রাকৃতিক ঘটনা উপলব্ধিতে শারীরিক উপায়গুলির কোন ভূমিকা নেই। যেকোন ঘটনা ঘটে আল্লাহর ইচ্ছায়। বস্তুত এটা আল্লাহর সুন্নাত যে, তিনি আমরা যেটাকে কারণ বলি তা সৃষ্টি করার পর আমরা যেটাকে ফলাফল বলি তা সৃষ্টি করেন, এদের মাঝে এমন কোন সম্পর্ক নেই যা কর্মকে কারণের অনুগামী হতে বাধ্য করে। যদি আল্লাহ না চাইতেন তাহলে এই তথাকথিত “কর্ম” তথাকথিত “কারণের” অনুগামী হতো না। (৪)</p>
<p>যেকারণে এসকল ধর্মতত্ত্ববিদেরা পরিণতিবাদকে অস্বীকার করেছেন তা হচ্ছে কর্মের জন্য কারণ প্রয়োজনীয় এই ধারণা আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করে এবং এখানে মিরাকলের কোন জায়গা থাকে না। যাই হোক এই উপসংহারে আসা সঠিক নয়। কেননা আমরা যেটাকে কারণ বলি তা আসলে প্রকৃত কারণ নয় বরং তা একটি মধ্যবর্তী কিংবা ধরে নেওয়া কারণ। মধ্যস্থতাকারী জিনিগুলোর ভূমিকা হল সমস্ত কিছু তৈরির জন্য ভিত্তি প্রস্তুত করা কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট মধ্যবর্তী এবং তৈরির কারণ সৃষ্টি করেছেন যদিও এগুলো সবই আল্লাহ নিজেই সৃষ্টি করেছেন। এই মধ্যবর্তী বিষয়বস্তুর উপস্থিতির কারণ স্রষ্টা কে তা নিয়ে মতভেদ ঘটানো নয় বরং এটি আল্লাহকে&nbsp; চেনার ক্ষেত্রে বান্দাদের ভাব উচ্ছাসে ভিন্নতা আনয়নের সাথে সম্পর্কিত। (৭)</p>
<p>পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম তত্ত্বের আগমনের এবং হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি প্রদর্শনের পর এই নীতির কিছু প্রতিষ্ঠাতা পরিণতিবাদ এবং এটমিক জগতে প্রকৃতির অভিন্নতা মতবাদকে অস্বীকার করেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে মাইক্রো ফিজিক্সের একটা পরিসংখ্যানমূলক অবস্থা আছে যা অঙ্কিত হয়েছে অসংখ্য একই রকমের পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে এবং একক ঘটনাগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরার মধ্য দিয়ে।</p>
<p>আইনস্টাইন ও প্ল্যাংকের মত ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানী এই নতুন তত্ত্ব ও এর প্রচলিত ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছেন। এই অবস্থা এখনো বিদ্যমান যদিও সময়ের ব্যবধানে বিরোধীদের সংখ্যাও বেড়েছে।</p>
<p>সম্ভবনার সূত্র মহাবিশ্বকে পরিচালনা করছে এইটা আইনস্টাইন, প্ল্যাক এবং আরো প্রমুখ বিজ্ঞানীরা মেনে নিতে পারেননি। তাদের মতে প্রকৃতিতে ঘটমান ঘটনাসমূহ চূড়ান্ত ভাবে পরম সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং আপাতত পরিসংখ্যানমূলক আচরণের ক্ষেত্রে পরিণামবাদী ভিত্তিস্থাপন করা প্রয়োজন। যে কেউ সম্ভাবনার সূত্র ব্যবহার করেন মূলত কোন ঘটনার পিছনের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে না জানা থাকা কারণে অথবা বড় বড় সংখ্যার ঝামেলা এড়াতে।</p>
<p>এই দৃষ্টিকোণ থেকে আইনস্টাইন নিন্মোক্ত মন্তব্য করেন,</p>
<p><strong>আমি বাধ্যগতভাবে স্বীকার করি যে, আমি এই ব্যাখ্যায় শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী গুরুত্ব যোগ করেছি। আমি এখনো বাস্তবতার মডেলের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করি এবং এটা এমন এক তত্ত্ব যা কেবল ঘটনার সম্ভাবনা প্রকাশ করে না বরং বিষয়গুলি যা তাই প্রকাশ করে । (৮)</strong></p>
<p>১৯২৬ সালে ম্যাক্স বর্নকে পাঠানো তার চিঠিতে আইনস্টাইন লিখেন,</p>
<p>কোয়ান্টাম মেকানিক্স চিত্তাকর্ষক বটে। কিন্তু আমার ভিতরের মন বলছে এটা আসলে সত্যিকারের কিছু নয়। এই থিওরি অনেক কিছুই বলে কিন্তু সত্যিকারার্থে আমাদেরকে সেই গোপন রহ্যসের নিকট নিয়ে যায় না। আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি ইশ্বর জুয়া খেলছেন না। (৯)</p>
<p>কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিগত কিছু বছর যাবৎ আমরা লক্ষ্য করছি কিছু মুসলিম স্কলার আশয়ারীদের ফেলে আসা থিওরি গ্রহণ করছেন এবং এর স্বপক্ষে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে দাঁড় করাচ্ছেন। আমরা এই ধরণের দৃষ্টিভিঙ্গিকে প্রত্যাখান করছি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে:</p>
<ul>
<li><strong>ক</strong>. আমরা যদি কর্ম ও কারণ সম্পর্কিত মূলনীতির গুরুত্বকে এটমিক ও সাব-এটমিক পর্যায়ে অস্বীকার করি তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় আমরা সমগ্র দুনিয়ার সাথে এই মূলনীতির যে সম্পর্ক তাই মুছে ফেললাম। কেননা কর্ম ও কারণ একই সাথে দুনিয়ার অনেক কিছুর সাথে সম্পৃক্ত।</li>
<li><strong>খ.</strong> কর্ম ও কারণের মূলনীতি কি সত্য থেকে অসত্য হওয়া প্রয়োজন, আর যদি তাই হয় তাহলে তাহলে পূর্বানুমান এবং উপসংহারের মাঝে কোন সম্পর্ক থাকবে না। কারণ পূর্বানুমানগুলোই একটা উপসংহার বের করে আনে।&nbsp; কর্ম ও কারণের মূলনীতি ব্যাতিরেকে কোন আর্গুমেন্টেরই উপসংহারে পৌঁছানো সম্ভব নয় এবং কেউই যেকোন প্রকারের পূর্বানুমান ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে উপসংহারে পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি তাই হয় তাহলে কোন কিছু প্রমাণ করা আর না করার মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।</li>
</ul>
<p>এই কারণে যারা কর্ম ও কারণের এই মূলনীতিকে অস্বীকার করছেন তারাও পরোক্ষভাবে এই মূলনীতিই ব্যবহার করছেন । কেননা তারা যদি এটা বিশ্বাস না করতেন যে তাদের আর্গুমেন্টের ফলে আমাদের বিশ্বাস পরিবর্তিত হয়ে যাবে তাহলে তারা কখনোই আমাদের সাথে যুক্তি তর্কে লিপ্ত হতেন না। (১০)</p>
<ul>
<li><strong>গ.</strong> যেমনটা শহীদ অধ্যাপক মর্তুজা মোতাহিরি (১১) এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ সাদরি (১২) বলেছেন, এটমিক পর্যায়ে গণনা করার অসম্ভবতার কারণ আমাদের পরিণতিবাদের অভাব নয় বরং এটমিক ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণকারী পরিণতিবাদী জ্ঞানের অভাব এবং এটাও হতে পারে আমাদের অসম্পূর্ণ ব্যবহারিক এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানের ফলে কিংবা গণনার উপর পর্যবেক্ষকের কি প্রভাব পড়ে তা সঠিকভাবে পরিমাপ করতে না পারার ফলে।</li>
</ul>
<p>যেকোন ক্ষেত্রে প্রত্যেককে এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে যে এটমিক পর্যায়ে পরিণতিবাদের আবিষ্কার করতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা এবং এর মাধ্যমে যেন এটা না বুঝি যে এটমিক পর্যায়ে কর্ম ও কারণের প্রয়োজনীয় সম্পর্ক নেই। এটমিক জগত সম্পর্কে আমরা সবকিছু জেনে ফেলেছি এমনটা দাবি করার কোন অধিকার আমাদের নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>১৯৭৯ সালে ডিরেক যা লিখেছিলেন তা উদ্ধৃতি করার এটাই যথাযথ জায়গা</strong></p>
<p>এই মুহুর্তে এটা পরিষ্কার যে বর্তমান কোয়ান্টাম মেকানিক্স এখনো তার চূড়ান্ত পর্যায়ে আসীন হয়নি । সামনের দিকে আরো কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন বোরের কক্ষপথ ক্রমেই পরিবর্তিত হতে হতে চূড়ান্ত পর্যায়ে আজকের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রূপ লাভ করেছে। কিছুদিন পর হয়ত একটা নতুন আপেক্ষিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আবিষ্কার হবে যেখানে আজকের এই সকল অসম্পূর্ণতা থাকবে না। যতটুকু বোঝা যায় নতুন কোয়ান্টাম মেকানিক্সে পরিণতিবাদ থাকতে পারে যেমনটা আইনস্টাইন চেয়েছিলেন। এই পরিণতিবাদের সাথে পরিচিত হওয়া সম্ভব শুধুমাত্র আজকের পদার্থবিজ্ঞানদের কিছু প্রাক-ধারণা বর্জন করার মধ্য দিয়ে এবং এটি এখনই পাওয়া চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।</p>
<p>সুতরাং এই শর্তে আমার মতে এটা খুব স্বাভাবিক অথবা যে কারোই হোক নিশ্চিতরূপে শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইনই সঠিক বলে প্রমাণিত হবেন, যদিও আপাতত পদার্থবিদেরকে বোরের সম্ভাবনার তত্ত্বকেই মেনে নিতে হবে বিশেষ করে এই মুহূর্তে যদি তাদের সামনে পরীক্ষা থাকে। (১৩)</p>
<p>সংক্ষেপে বললে কর্ম ও কারণের মূলনীতিকে অস্বীকারের মাধ্যমে একটা বিষয় অন্য বিষয়ের জন্য আর প্রয়োজনীয় হবে না এবং যেকোন কিছু থেকেই যেকোন কিছুর ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে। ফলে এখানে বিজ্ঞানের কোন উপস্থিতিই থাকবে না। সুতরাং বিজ্ঞান কর্ম ও কারণের মূলনীতিকে অনুসিদ্ধান্তসহ গ্রহণ করতে বাধ্য যাতে তার অর্থবহ অস্তিত্ব বজায় থাকে।</p>
<p><strong>অনুবাদ : </strong>সায়েম মুহাইমিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রেফারেন্সঃ</strong></p>
<p>১/ Max Planck,The New Science, Greenwich edition(1959);p.51</p>
<p>২/ Einstein,A Centenary Volume, A.P. French ed.,Heinemann(1979). p.312</p>
<p>৩/ Albert Einstein, Idea and Opinions, trans Bergman. New York, Crown Publishers (1954), pp 322-323</p>
<p>৪/ Max Planck, The New Science (1959), p. 250</p>
<p>৭/Sadar al-Din Shirazi, Asfar, vol.6 p.371</p>
<p>৮/Ideas and Opinion by Albert Einstein, p.276</p>
<p>৯/ Enstine, A Centenary Volume, p. 310</p>
<p>১০/ Averroes, Tahafut al Tahafut(The in coherence of the Incoherence) trans.S.Van den Bergh, London &amp; Co., 1954, pp.316-319.</p>
<p>১১/ M.H Tabtabai, Usul Falsafah. vol. 3,p.217(Mutahharis footnote)</p>
<p>১২/M.B Sadr, Falsafatuna, Dar al Taaruf. Beirut, 1980, pp 305-309</p>
<p>১৩/ Some Strangers in the proportion, Woolf ed, Addison-Wesley, p.65.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/philosophy-of-science-views-of-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7682</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
