<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/thought-and-philosophy/ethics-and-aesthetics/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Sun, 07 Jun 2026 15:36:06 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>দ্বীন ও আখলাক: জেনেটিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে ইসলামে আখলাকের ধারণা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/religion-and-ethics-the-concept-of-ethics-in-islam-in-the-context-of-genetic-intervention/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/religion-and-ethics-the-concept-of-ethics-in-islam-in-the-context-of-genetic-intervention/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Jun 2026 15:36:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16863</guid>

					<description><![CDATA[১. ভূমিকা আধুনিক সময়ে দ্বীন ও আখলাক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের প্রায়শই এমন এক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে ধর্মকে মনে করা হয় আবেগ ও বিশ্বাসের জগৎ। আর নৈতিকতাকে মনে করা হয় যৌক্তিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যখন আমরা ধর্মতত্ত্বকে একটি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h3 style="font-family: Kalpurush;">১. ভূমিকা</h3>
<p>আধুনিক সময়ে দ্বীন ও আখলাক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের প্রায়শই এমন এক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে ধর্মকে মনে করা হয় আবেগ ও বিশ্বাসের জগৎ। আর নৈতিকতাকে মনে করা হয় যৌক্তিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যখন আমরা ধর্মতত্ত্বকে একটি ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে চাই তখন এই বিভাজন কি আদৌ টিকে থাকে? এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা নৈতিকতা ও ধর্মের মধ্যকার সংযোগকে নতুনভাবে অন্বেষণ করবো। বিশেষত, এই প্রবন্ধ একটি প্রায়োগিক ধর্মতত্ত্বের (practical theology) দৃষ্টিকোণকে উন্মোচিত করবে, যেখানে ধর্ম ও নৈতিকতার সম্পর্ককে একটি দ্বি-স্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> তাত্ত্বিক স্তর; যেখানে মেটা-এথিক্স ও সংশ্লিষ্ট মৌলিক ধারণাগুলোর আলোকে ধর্ম ও নৈতিকতার ধারণাগত কাঠামো বিশ্লেষণ করা হবে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> প্রায়োগিক স্তর; যেখানে নৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং তার সামাজিক প্রভাব কীভাবে একটি বিতর্কের জন্ম দেয়-এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।</p>
<p>এই বিশ্লেষণকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে আমরা সমকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু-জেনেটিকীকরণ (Geneticization)-এর আলোচনাও যুক্ত করবো। কেননা, আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে জিন, দেহ এবং সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা, তার নৈতিক জটিলতা এবং ধর্মীয় মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা একটি সময়োপযোগী দৃষ্টিকোণ তৈরি করবে বলে আশা ব্যক্ত করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3 style="font-family: Kalpurush;">২. ইসলামে নৈতিকতার ধারণা ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো</h3>
<p>ইসলামে দার্শনিক চিন্তাধারায় নৈতিকতা বলতে বোঝায় রূহের এমন একটি দৃঢ় অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য, যা মানুষের কর্মকে পরিচালিত করে। এ ব্যাখ্যার পাশাপাশি, গ্রিক দার্শনিক ধারাতেও নৈতিকতার ধারণা গঠিত হয়েছে-যেখানে আত্মার প্রকৃতি, গুণাবলি এবং ফজিলত (virtue) সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যদিয়ে নৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তি নির্মিত হয় (দ্রাজ ২০০৮, পৃ. ২; ওয়ালজার ১৯৬২, পৃ. ২৩৬-২৫২)।</p>
<p>তবে গ্রিক দর্শনের এ প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি মূলত নীতিশাস্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে আধুনিক চিন্তাচর্চায় এই কাঠামোর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটেছে, যা নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রকে অনেক বিস্তৃত ও বাস্তবমুখীও করে তোলে।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> আধুনিক এই নীতিশাস্ত্র প্রাচীন ভাবনাকে ছাড়িয়ে যুক্তি, জ্ঞানতত্ত্ব এবং অস্তিত্ববাদের মতো প্রমাণভিত্তিক ও প্রায়োগিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রবেশ করে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> জ্ঞানের ক্ষেত্রের বিস্তার, জটিলতা এবং বৈচিত্র্য এতটাই বেড়েছে যে নৈতিক মূল্যায়ন এখন আর স্বতঃসিদ্ধ বিষয় নয়। এর ফলে নৈতিক দর্শনের আরেকটি শাখা তথা &#8220;মেটা-নীতিশাস্ত্র” একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মেটা-নীতিশাস্ত্র মূলত বিভিন্ন নৈতিক কাঠামোকে বাইরের একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে-যাতে তাদের মধ্যে থাকা পার্থক্য, মিল এবং কার্যকরী দিকগুলো স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় (আরকৌন ২০০৭, পৃ. ৮৩-৮৪)।</p>
<p>যদি নৈতিকতাকে দর্শনের একটি শাখা হিসেবে ধরা হয়-যেমন গ্রিক ঐতিহ্যে ফ্রোনেসিস (Phronesis) বা যেটি &#8216;প্রায়োগিক প্রজ্ঞা&#8217; নামে পরিচিত-তবে একে ইসলামী জ্ঞানের প্রাচীন শ্রেণিবিন্যাসে (আল নাদিম, ২০০৯) একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে দেখা কঠিন। এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা উৎসগুলোও তুলনামূলকভাবে সীমিত। কারণ এসব লেখার উৎস প্রধানত দর্শনকেন্দ্রিক রচনাশৈলীর ওপর নির্ভর করে। যা ইসলামের ইতিহাসে পর্যায়ক্রমে বিকাশ লাভ করেছে (মুসা, ১৯৫৩, পৃ. ২২৫; আল জাবিরি, ২০১৪, পৃ. ৯১০)।</p>
<p>তবে যদি গ্রিক দর্শনের প্রভাব বাদ দিয়ে কেবল আরব-ইসলামী ঐতিহ্যকে বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যায় যে নৈতিকতা বিষয়ক গ্রন্থ ও উৎসের পরিমাণ আসলে প্রচুর (ফাখরি, ১৯৯৪; ফাখরি ১৯৭৮, ১:৯১০)। এক্ষেত্রে নৈতিকতা মূলত মানুষের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও &#8216;ভালো জীবন&#8217; যাপনের পথ নিয়ে আলোচনা করে। এ কারণে এটি হালাল বনাম হারাম অথবা ন্যায় বনাম অন্যায়-এই দ্বৈত বিভাজনমূলক ধারণার চেয়েও অনেক বিস্তৃত এবং গভীর। এজন্য নৈতিকতার ধারণাটি জটিল। কারণ মানব আচরণ নিয়ে আলোচনা করে এমন শাস্ত্র বা জ্ঞানের ক্ষেত্র বহু রকম। এ জটিলতাই স্পষ্ট করে-কেন নৈতিকতাকে ইসলামী জ্ঞানের অন্য শাখা থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে দেখা হয়নি। বরং আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিকতা ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেমন-</p>
<ul>
<li>ফিকহ</li>
<li>উসূলে ফিকহ</li>
<li>কালাম</li>
<li>তাসাউফ</li>
<li>আদব তথা সাহিত্য-যেখানে বিশেষ শ্রেণি-পেশার মানুষদের জন্য (যেমন: আলিম, শিক্ষার্থী, মুফতি, ফকীহ, চিকিৎসক প্রমুখ) একটি আদর্শ বা আচরণবিধি ব্যাখ্যা করা হয়।</li>
</ul>
<p>এ অন্তর্বিভাজন ও আন্তঃসম্পর্কের কারণে ইসলামী নৈতিকতাবোধ সবসময়ই একটি বহুমাত্রিক এবং সমন্বিত চিন্তার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সৎকর্ম বা &#8216;পুণ্যকর্ম&#8217;-এর ধারণাটি মূলত দুটি দৃষ্টিকোণে বিভক্ত-অস্তিত্বগত (ontological) ও জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological)। এ বিভাজনের লক্ষ্য হলো দুটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা:</p>
<p>-&#8220;আমরা কে?&#8221;<br />
-&#8220;আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?”</p>
<p>বলা যেতে পারে, ইসলামী ধর্মতত্ত্ব (theology) এই দুটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছে।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো মানবিক আচরণ ও মহান আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের প্রতি মানুষের মনোভাব। এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে:</p>
<ul>
<li>মানবিক কাজ ও ইলাহী কাজের পার্থক্য,</li>
<li>মানবিক স্বাধীন ইচ্ছা (free will) বনাম নিয়তিবাদ,</li>
<li>কর্তব্যবোধ ও দায়বদ্ধতা,</li>
<li>কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক,</li>
<li>এবং মুক্তি (salvation) ও সুখ (happiness)-এর ধারণা।</li>
</ul>
<p><strong>দ্বিতীয়</strong> গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো নৈতিক কর্তব্য (moral obligation) এবং এর উৎস ও ভিত্তি। এখানে প্রশ্ন উঠেছে:</p>
<ul>
<li>কোনো কাজের মূল্যায়ন যুক্তির ভিত্তিতে হবে, নাকি ঐতিহ্য বা ধর্মীয় বর্ণনার ভিত্তিতে?</li>
<li>&#8216;ভালো&#8217; ও &#8216;মন্দ&#8217; কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে?</li>
</ul>
<p>এইসব আলোচনার ভিত্তিতে মুসলিম চিন্তাবিদরা অস্তিত্বগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে একটি ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি করেন। যার মূল প্রশ্ন ছিলো:</p>
<p>আখলাকী মূল্যায়নের বিধান বা নীতিমালা কি কেবল ওহীর (revelation) মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, নাকি ওহী কেবল তা প্রকাশ করে বা ব্যখ্যা দেয়?</p>
<p>ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ইসলামী চিন্তায় গড়ে উঠেছে দুটি মুখ্য ধারা:</p>
<p><strong>১. মুতাযিলা ধারা।</strong> যাদের চিন্তাকে নৈতিক বস্তুনিষ্ঠতাবাদ বলা হয়। (Ethical Objectivism)</p>
<p>মুতাযিলাদের মতে, ভালো ও মন্দ-এই নৈতিক ভিত্তিগুলো আল্লাহর ইচ্ছার (Divine Will) পূর্বেও স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্বশীল। অর্থাৎ,</p>
<ul>
<li>কোনো কাজ ভালো বা মন্দ হওয়ার জন্য আলাদা মানদণ্ড আছে,</li>
<li>আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সেই মানদণ্ড অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে,</li>
<li>ওহীর কাজ এখানে কেবল প্রকাশ করা ও ব্যাখ্যা করা, নতুন করে নির্ধারণ করা নয়।</li>
</ul>
<p>এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আদেশ (command) ভালোকে নির্দেশ করে এবং নিষেধ (prohibition) মন্দকে রোধ করে।</p>
<p><strong>২. আশয়ারী ধারা।</strong> নৈতিক স্বেচ্ছাবাদ (Ethical Voluntarism) বা ইলাহী আদেশ তত্ত্ব (Divine Command Theory)।</p>
<p>আশয়ারী চিন্তাবিদরা বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন:</p>
<ul>
<li>ভালো ও মন্দ কোনো পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ডে নির্ধারিত নয়,</li>
<li>বরং আল্লাহ যা আদেশ করেন তা-ই ভালো এবং যা নিষেধ করেন তা-ই মন্দ,</li>
<li>অর্থাৎ, আদেশই কোনো কাজকে ভালো করে তোলে এবং নিষেধই মন্দ করে তোলে,</li>
<li>ওহী আসার আগ পর্যন্ত ভালো বা মন্দ বলে কিছু নেই।</li>
</ul>
<p>এই চিন্তাধারা ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আশয়ারীদের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত (দ্র. &#8216;আবদুল জব্বার, আল তাফতাযানী, ১৯৯৮, Hourani ১৯৮৫)।</p>
<p>একইসাথে, &#8216;ভালো&#8217; ও &#8216;খারাপ&#8217;-এর ধারণা মূলত তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখার উপর দাঁড়িয়ে আছে-</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>ক.</strong> এমন আচরণ যা মানুষের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা বিরোধপূর্ণ (মুলাইমান লিল তাবিয়ী আও মুনাফফিরান)।<br />
<strong>খ.</strong> কোনো কাজ পরিপূর্ণ বা অপূর্ণ-এই দুটি ব্যাখ্যা যুক্তিসঙ্গত এবং তেমন বিতর্কের সৃষ্টি করে না।<br />
<strong>গ.</strong> কোনো কাজ আল্লাহর নিকট ন্যায়পরায়ণ বা অন্যায় হিসেবে বিবেচিত, যার ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি নির্ধারিত হয়-এই ব্যাখাই মূলত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু (দ্র. আল রাজী, ১৯৯৭, ১:১২৩; আল শাহরিস্তানী ২০০৯, ৩৬৩; আল তাফতাযানী, ১৯৯৮, ৪:২৮২; আল-কারাফী, ১৯৭৩, ৮৮)।</p>
<p>এ বিশ্লেষণ মূলত মেটা-নীতিশাস্ত্র (meta-ethics) এবং নৈতিক বিধানের উৎস (sources of normative provisions) এর আলোকে বোঝা যায়।</p>
<p>ইতিহাসের ধারায় মূলধারার দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো আশয়ারী মতবাদ। তবে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ও মতবাদ বিকাশের ধারায় মাকাসিদ আশ শরীয়াহ এর ধারণা গড়ে ওঠে।</p>
<p>এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো : আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ইচ্ছাধীন (arbitrary) নয়, বরং তা যুক্তিনির্ভর ও কল্যাণমুখী। যেমন-</p>
<ul>
<li>আদেশ এমন কিছুর প্রতি নির্দেশ দেয়, যা কল্যাণ (মাসলাহাত) নিশ্চিত করে।</li>
<li>নিষেধাজ্ঞা এমন কিছুকে নিষেধ করে, যা বড় ধরণের ক্ষতি (মাফসাদাত) আনে (আল কারাফী, ২:১২৬)।</li>
</ul>
<p>অন্যভাবে বলা যায়, যে স্বার্থ বা কল্যাণ (সালাহ) কে কেন্দ্র করে পুরস্কার বা শাস্তির ধারণা গড়ে ওঠে তা পারলৌকিক (আখিরাত) অথবা দুনিয়াবি ও পারলৌকিক উভয়ের মধ্যে যৌথ কল্যাণ, এসব শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ এর মাধ্যমেই জানা যায় (al-&#8216;Izz, 1991, 1:5, 10)।</p>
<p>এ তত্ত্বের ভিত্তি মূলত আশয়ারী চিন্তাবিদরাই তৈরি করেন। তারা ফিকহী বিধানসমূহ বিশ্লেষণ করেন, তার পেছনের উদ্দেশ্য ও যুক্তিগুলো চিহ্নিত করেন এবং সেগুলোকে একটি পরিপূর্ণ ব্যাখ্যামূলক কাঠামোতে সাজান।</p>
<p>এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো মানবীয় আকল একা কোনো কাজের কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণ করতে পারে না। বরং শরীয়তই একমাত্র কর্তৃত্ব, যা আদেশ-নিষেধের উৎস হিসেবে বিবেচিত (আশয়ারীদের মতে)। অন্যদিকে, মুতাযিলাগণ বিশ্বাস করেন যে যুক্তি নিজেই নৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে, যাকে বলা হয় আকলগত দায়িত্ব (আকলী তাকলীফ)।</p>
<p>এ সব বিতর্ক ও চিন্তাভাবনা পরবর্তীতে সুবিন্যস্ত হয়ে উসূলে ফিকহ-এ পরিণত হয়। যা নৈতিক বিধান, তার উৎস এবং তা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতি গড়ে তোলে।</p>
<p>উসূলে ফিকহ একটি এমন শাস্ত্র যা ওহী ও আকল এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত। যদিও বিভিন্ন মাজহাবের উসূলবিদদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তি বা বর্জনের ভিত্তিতে পার্থক্য রয়েছে, তথাপি মাকাসিদ আশ শরীয়াহ একটি সামগ্রিক ও যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে শরীয়তের উদ্দেশ্য এবং আখলাকী বিধানগুলোর আকলী ভিত্তি ব্যাখ্যা করে।</p>
<p>এভাবে দেখা যায়-আখলাক, শরীয়ত, আকল ও ইলাহী জ্ঞানের সম্মিলনে একটি পূর্ণাঙ্গ চিন্তাধারার কাঠামো ইসলামী চিন্তায় গড়ে উঠেছে, যা বিভিন্ন মতবাদ ও ফিকহী ব্যবস্থার পটভূমিতে নির্মিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3 style="font-family: Kalpurush;">৩. জেনেটিকীকরণ ও জেনেটিক হস্তক্ষেপ: আধুনিকতা, নৈতিকতা ও ধর্মতত্ত্ব</h3>
<p>জেনেটিক্স-এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রটি কেবল চিকিৎসা বা বংশগতি নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি ক্ষেত্র নয়, বরং এটি আজ আমাদের নৈতিক অবস্থান, আত্মপরিচয় এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানায়ও প্রবেশ করেছে। পূর্বে আমরা যে ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর আলোচনা করেছি, সেই কাঠামো জেনেটিক্সের মতো বিষয়েও কতটুকু প্রযোজ্য-সে প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এ আলোচনার সূচনা।</p>
<p>কেন &#8216;জিন&#8217; এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আজ জিন বা জেনেটিক উপাদান আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। এটি শুধু বিজ্ঞানই নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা; এমনকি &#8216;ভালো জীবন&#8217; কেমন হবে সে ভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। অন্যদিকে, এটি এমন এক জটিলতাও সৃষ্টি করেছে যেখানে নৈতিকতা, ধর্ম এবং প্রযুক্তির দ্বন্দ্ব এক নতুন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে।</p>
<p>জেনেটিক্স এখন একটি আন্তঃবিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এই একটিমাত্র বিষয় একযোগে যুক্ত হয়ে গেছে নৈতিক দর্শন, জৈব-নৈতিকতা, সমাজবিজ্ঞান এবং ইসলামী আইনের মতো শাস্ত্রের সঙ্গে। ফলে এটি এখন কেবল বিজ্ঞানীদের নয়, বরং দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক এবং আইনজ্ঞদেরও চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।</p>
<p>এ আলোচনা তিনটি মূল ধারণার উপর ভিত্তি করে আগানো হয়েছে: জেনেটিকীকরণ, জেনেটিক হস্তক্ষেপ এবং জেনেটিক উৎকর্ষতা। এদের মধ্যে জেনেটিকীকরণ সবচেয়ে ব্যাপক ও গভীর ধারণা, যেটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তরও।</p>
<p>জেনেটিকীকরণ বলতে বোঝায় এমন এক প্রক্রিয়াশীল অবস্থান, যার মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞান, জেনেটিক্স, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে যায় যে একজন ব্যক্তিকে বোঝার ভাষাই বদলে যায়। মানুষকে তখন আর শুধু সামাজিক বা নৈতিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং জেনেটিক কোড, ব্লুপ্রিন্ট, বৈশিষ্ট্য ও ম্যাপিংয়ের আলোকে দেখতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতিতে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, মানুষকে এখন তার ডিএনএ-র সংজ্ঞা দিয়েই মূল্যায়ন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে (Ten Have 2001, 4:295)। এটি এমন এক পরিবর্তন, যা মানবজীবনের মৌলিক ব্যাখ্যা ও নৈতিক মূল্যবোধকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।</p>
<p>জেনেটিক হস্তক্ষেপ (GI) হলো এই রূপান্তরের বাস্তব প্রয়োগ। এখানে মানুষের জিনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়-কখনো রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময়ের জন্য। আবার কখনো জীবনের মানোন্নয়নের জন্য। এই হস্তক্ষেপ সাধারণত দুটি ধরণের কোষে করা হয়: প্রজনন কোষে (যেমন, ভ্রুণ বা গর্ভস্থ সন্তানের উপর) এবং সোম্যাটিক কোষে (যেখানে হস্তক্ষেপ হয় এমন ব্যক্তির ওপর যিনি সদ্য জন্মগ্রহণ করেছেন)। প্রজনন কোষে হস্তক্ষেপ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হতে পারে, যা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবেও অবক্ষয়ের সূচনাবিন্দু বলা যেতে পারে।</p>
<p>তবে GI-এর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো &#8216;উৎকর্ষতা বৃদ্ধি&#8217;। এটি এমন এক ধারণা, যেখানে মানুষের জৈবিক গঠনে পরিবর্তন এনে তার জীবনে &#8216;ভালো থাকার&#8217; সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। যেমন-স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, উচ্চতা বৃদ্ধি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করা। Sauvlescu, Sandberg, এবং Kahane (২০১১) এটিকে সংজ্ঞায়িত করেন-&#8220;এটি একজন ব্যক্তির জীববিজ্ঞানের এমন পরিবর্তন, যা প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতে তার ভালো জীবনযাপনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।&#8221; প্রশ্ন হলো, এই &#8216;ভালো জীবন&#8217;-এর সংজ্ঞাই বা আসলে কে দেবে? এই পরিবর্তন কি ন্যায্য? আর যদি ধর্ম অনুযায়ী মানুষের গঠন পূর্বনির্ধারিত হয়, তবে এর মধ্যে হস্তক্ষেপ কি ইলাহী নীতির লঙ্ঘন নয়?</p>
<p>এইখানেই ধর্মীয় চিন্তা, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের প্রয়োজন পড়ে। এখানে প্রায়োগিক ধর্মতত্ত্ব এই সংলাপের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে যা প্রযুক্তি, মানবিকতা এবং ইলাহী নির্দেশনার মধ্যকার সম্পর্ককে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3 style="font-family: Kalpurush;">৪. আধুনিককালে জেনেটিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি ফকীহদের নিকট যেভাবে মূল্যায়িত হয়েছে</h3>
<p>এ সময়ের ফিকহবিদগণ জেনেটিক হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে যে বয়ানসমূহ গড়ে তুলেছেন, তা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাথে খাপ খায়িয়ে নেওয়ার বৈধতা কিংবা নিষেধ নিয়েই আলাপ করে না; বরং প্রযুক্তি, ধর্মীয় নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শরীয়াহভিত্তিক চিন্তায় ফতোয়া হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা এবং নৈতিক উপলব্ধিকে ব্যবহারিক বিধানে রূপান্তর করা হয়, যেন মুমিন ব্যক্তির আচরণকে দ্বীন অনুযায়ী পরিচালনা করা যায়।</p>
<p>ফকীহগণ যখন জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেন, তখন তারা সাধারণত দুটি প্রধান বিষয় বিবেচনায় নেন প্রথমত, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিটি কতটুকু কার্যকর এবং নিরাপদ। এবং দ্বিতীয়ত, শরীয়ত প্রণেতা আল্লাহর ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য কী হতে পারে এই বিষয়টি বের করা।</p>
<p>যেহেতু কোরআন বা হাদীসে জেনেটিক্স-এর বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই, তাই এখানে ইজতিহাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফকীহগণ কখনো পূর্ববর্তী ফিকহী নজির বা ধরণকে অনুসরণ করেন, আবার কখনো মাকাসিদ আশ শরীয়াহর আলোকে নতুন সিদ্ধান্ত তৈরি করেন।</p>
<p>এই প্রসঙ্গে তিনটি আন্তর্জাতিক ফিকহী প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে-</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. IOMS (Islamic Organization for Medical Sciences), কুয়েত।<br />
২. IFA (Islamic Fiqh Academy), মক্কা।<br />
৩. IIFA (International Islamic Fiqh Academy), জেদ্দা।</p>
<p>IOMS তাদের বিশ্লেষণে জেনেটিক গবেষণাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে বলেছে, এটি মানুষকে আত্মপরিচয়ের উপলব্ধি দেয় এবং আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন প্রকাশ করে। ফলে, তারা একে ফরজে কিফায়া, অর্থাৎ সমষ্টিগত দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করে। তবে তারা সীমাও নির্ধারণ করেছে: জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈধ এবং প্রজনন কোষে পরীক্ষামূলক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ। কারণ এতে বংশপরিচয়ের অবস্থা ও সামাজিক কাঠামো বিঘ্নিত হতে পারে।</p>
<p>১৯৯৮ সালের এক সিম্পোজিয়ামে IOMS আরও বলেছিলো, জেনেটিক গবেষণা অবশ্যই শরীয়তের বিধান ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। গবেষণা যেন মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদাকে হেয় না করে, সেটাই প্রধান শর্ত।</p>
<p>অন্যদিকে মক্কাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান IFA তুলনামূলকভাবে আরও রক্ষণশীল ভূমিকায় নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। তারা মনে করে, কেবলমাত্র অত্যাবশ্যক পরিস্থিতিতে (জরুরীয়াত) -যেমন জীবন রক্ষা বা গুরুতর রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে যথাযথ ঝুঁকি বিশ্লেষণের পরই গবেষণা, পরীক্ষা বা চিকিৎসা করা যেতে পারে। এখানে ধর্মীয় সম্মতি (religiously accepted consent) ও গোপনীয়তা রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।</p>
<p>পাশাপাশি IIFA তাদের অবস্থানে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ। তারা সোম্যাটিক কোষে নিরাময়মূলক হস্তক্ষেপের অনুমোদন দেয়। তবে স্পষ্টভাবে একথাও বলছে-এর ব্যবহার শুধুমাত্র তখনই বৈধ, যখন তা ব্যথা উপশম কিংবা রোগ নিরাময় পরিস্থিতিতে হয় এবং বড় ধরণের ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকে। তবে বাহ্যিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, এটা সৃষ্টির মৌলিক রূপ (আসলুল খালিকা) বদলে ফেলে এবং এটি ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত প্রয়োজনের (religious necessity) আওতায় পড়ে না।</p>
<p>এ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা কোনটিতে নিহিত? কারণ মুসলিম সমাজে কোনো কিছু হালাল না হারাম; এ বিভাজনই শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।</p>
<p>সমস্যা হলো, জেনেটিক্সের ক্ষেত্রে কোরআন বা হাদীসে সরাসরি উল্লেখ না থাকায় ইজতিহাদ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এক্ষেত্রে, ফকীহগণ পূর্ববর্তী আলেমগণের শরীয়তের ব্যাপারে বোঝাপড়া, নীতিমালা এবং মানুষের উপর আল্লাহর হুকুম-নিষেধের দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নেন।</p>
<p>এজন্য জেনেটিক্স বিষয়ে ফতোয়াগুলোকে দুটি বড় শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১. চিকিৎসামূলক ফতোয়া:</strong> যেখানে মূল শর্ত হলো-প্রয়োগে ভালো ফলাফলের সম্ভাবনা থাকতে হবে এবং তা বড় ধরণের ক্ষতি না ঘটাবে না।<br />
<strong>২. মাসলাহা মুরসালা ভিত্তিক ফতোয়া:</strong> যেখানে সরাসরি দ্বীনি দলীল নেই তবে মাকাসিদ আশ শরীয়াহর আলোকে, মাসলাহাত (কল্যাণ) বিবেচনায় রায় দেওয়া হয়।</p>
<p>এ দুই শ্রেণির ফতোয়া তৈরিতে জেনেটিক্সের &#8216;উপকার&#8217; ও &#8216;ক্ষতি&#8217;-এই দুটি বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয় দুটি স্তরে। <strong>প্রথমত</strong>, ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে, যেখানে জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজে কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলতে পারে তা মূল্যায়ন করা হয়। <strong>দ্বিতীয়ত,</strong> বিধানগত স্তরে, যেখানে এ প্রযুক্তি শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ে কিংবা চিকিৎসা, অধিকার, অভিভাবকত্ব, বংশ ইত্যাদিতে কী প্রভাব ফেলছে তা বিবেচনা করা হয়।</p>
<p>সবশেষে, এই সমস্ত বিশ্লেষণ শরীয়তের দুটি মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথেও জড়িত-</p>
<ul>
<li>মানব জীবন রক্ষা (হিফজুন নাফস)</li>
<li>বংশধারা সংরক্ষণ (হিফজুন নাসল)</li>
</ul>
<p>এই আলোকে তিনটি মূলনীতি কার্যকর থাকে-</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>ক. সবকিছু মূলত বৈধ (আল আসল ফিল আশইয়া আল ইবাহাতুন)</strong><br />
<strong>খ. আত্মা ও বংশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা</strong><br />
<strong>গ. কল্যাণ অর্জন ও ক্ষতি প্রতিরোধ (জালবুল মানাফি ও দাফউল মাফাসিদ)</strong></p>
<p>তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- শুধু উপকারিতা থাকলেই কোনো প্রযুক্তি বৈধ হয় না; যদি সেটি শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করে। কারণ, নৈতিক ক্ষতি উপেক্ষা করে যদি দৈহিক উপকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে তা শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3 style="font-family: Kalpurush;">৫. জিনোম ও নৈতিকতার গভীর অবস্থান (Thick Ethics)</h3>
<p>বর্তমান জেনেটিক্সের যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের শরীর, বংশ এমনকি ভবিষ্যৎ সন্তান জন্মদানের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও এনে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় নৈতিকতা আর কেবল হালাল-হারামের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রয়োজন হয় এমন এক গভীর নৈতিক দৃষ্টিকোণের, যা মানুষকে শুধু শরীরগত নয়-আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও অস্তিত্বগত সত্তা হিসেবেও মূল্যায়ন করে। আর এই মূল্যায়নের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় ইসলামী ঐতিহ্যের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রের আলোকে-ইলমুল কালাম, দর্শন, ফিকহ ও উসূলে ফিকহ।</p>
<p>এ চারটি ক্ষেত্রকে একত্রে চিন্তা করে আমরা গঠন করতে পারি এক ধরনের &#8220;Thick Ethics&#8221; বা &#8216;নৈতিকতা গভীর অবস্থান&#8217;। যা আমাদের আচরণের বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণই নয়, বরং মানুষের পরিচয়, ইচ্ছা, উদ্দেশ্য এবং বৃহত্তর জীবনের উদ্দেশ্যের উপর আলো ফেলতে সক্ষম। এ নৈতিকতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়-</p>
<ul>
<li>আমি কে?</li>
<li>আমি কী চাই?</li>
<li>আমার সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তি ব্যবহার আমার আত্মা, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর কী প্রভাব ফেলবে?</li>
</ul>
<p>প্রসঙ্গে যদি GI-কে শুধু একটি নিরপেক্ষ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হয় তবে এর অজস্র সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দিক উপেক্ষিত। ইসলামে &#8216;নৈতিকতা&#8217; কেবল আচরণনির্দেশকই নয়। বরং এটি মানুষের অন্তর্নিহিত ইচ্ছা, নফস, নিয়ত এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কেরও প্রতিফলন। তাই শরীয়ত বা ফিকহের আলোকে GI-এর মূল্যায়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আখলাকের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। অন্যথায় আমরা কেবল প্রযুক্তির ফলাফলই বিচার করবো, তার অন্তর্নিহিত নৈতিক বোধ নয়।</p>
<p>এজন্য এখানে প্রায়োগিক ধর্মতত্ত্ব (Practical Theology) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, যেখানে শরীয়তের বিধান, আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা ও সামাজিক বাস্তবতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এটি আমাদের শেখায়-একটি প্রযুক্তি ইসলামে আইনত বৈধ হলেও তা সবসময় নৈতিকভাবে ন্যায়সঙ্গত নাও হতে পারে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের শরীর কেবল একটি জৈবিক গঠন নয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং ইলাহী আমানত। আর তাই, জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আমাদের এই সত্তাগুলোর প্রতিও সমান মনোযোগ দিতে হবে।<br />
&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">৫.১ জেনেটিকীকরণ ও ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নৈতিকতা</h4>
<p>জেনেটিক্স বা জিনতত্ত্ব প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি ধারা নয়। এটি মানুষ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কিন্তু এ গভীর রূপান্তরের মুহূর্তে যে ফিকহী আলোচনা প্রায়শই উপেক্ষিত হচ্ছে তা হলো আকীদাগত বা ধর্মতাত্ত্বিক পর্যালোচনা।</p>
<ul>
<li>এখানে মূল বিষয় হলো, মানুষ কি শুধুই একগুচ্ছ অণু-পরমাণুর সমষ্টি নাকি তার মধ্যে রয়েছে এক অতীন্দ্রিয় (transcendent) অস্তিত্ব?</li>
<li>তার আত্মা ও দেহ কি আলাদা নাকি একে অপরের পরিপূরক?</li>
<li>সে কি শুধুই জিন-নির্ধারিত একটি অস্তিত্ব নাকি নৈতিক চেতনা ও সৃজনশীলতার অধিকারী?</li>
<li>জিন কি সত্যিই তার আচরণ নির্ধারণ করে, নাকি এতে রয়েছে অতিরঞ্জন বা তথাকথিত &#8216;gene myth&#8217;?</li>
</ul>
<p>এ প্রশ্নগুলো প্রযুক্তির আলোকে মানুষের স্বাধীনতা এবং আল্লাহর সৃষ্টি এই বিশ্ব-ব্যবস্থাকে নতুন করে ব্যাখ্যার দাবি তোলে (চ্যাপম্যান, ১৯৯৮, ২৯৮-২৯৯; পিটার্স, ১৯৯৭)।</p>
<p>তবে ইসলামী ধর্মতত্ত্বের আলোকে আমরা এই আলোচনাকে দুটি মূল দৃষ্টিকোণে ভাগ করে দেখতে পারি-</p>
<p><strong>এক.</strong> মানুষের ধারণা ও মানব প্রকৃতি: আত্মা, শরীর ও জেনেটিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব।<br />
<strong>দুই.</strong> আল্লাহর সৃষ্টিকর্ম ও মানবিক কর্ম: জেনেটিক হস্তক্ষেপের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ।<br />
&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">৫.১.১ মানুষের ধারণা ও মানব প্রকৃতি: আত্মা, শরীর ও জেনেটিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব</h4>
<p>মানুষ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়। বরং এটি এক গভীর দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও নৈতিক বিবেচনার বিষয়। বিশেষ করে জেনেটিক্সের প্রেক্ষিতে যখন প্রযুক্তি মানুষের শরীর ও ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, সেখানে &#8216;মানুষ আসলে কে&#8217;-এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রে চলে আসে এবং কিছু ধারণাও যৌক্তিক হয়ে উঠে।</p>
<p><strong>এক্ষেত্রে, প্রথম ধারণাটি হলো: আত্মাকেন্দ্রিক গ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি</strong><br />
প্রাচীন গ্রিক দর্শনে মানুষকে বিশ্লেষণ করা হয় মূলত তার আত্মার গঠন ও গুণাবলির মাধ্যমে। এই দৃষ্টিতে আত্মা হলো মানব কর্মের উৎস এবং তিনটি প্রধান শক্তির সমন্বয়ে গঠিত-</p>
<ul>
<li>১. কামনাময় শক্তি (concupiscent)-যা ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং তৃষ্ণা দ্বারা চালিত;</li>
<li>২. রোষাত্মক শক্তি (irascible)-যা প্রতিক্রিয়া, আত্মরক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক আচরণ সৃষ্টি করে;</li>
<li>৩. বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি (rational)-যা বাকি দুই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সংযত রাখে।</li>
</ul>
<p>এ তিনটি শক্তির মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখানে আত্মার পূর্ণতার লক্ষণ, যার ফলে জন্ম নেয় চারটি মূল গুণ সংযম, সাহস, প্রজ্ঞা এবং ন্যায়। গ্রিক নৈতিকতা তাই আত্ম-পরিচিতি ও আত্ম-শৃঙ্খলার ভিত্তিতে গঠিত। এই কাঠামো পরবর্তীতে সুফী ধারায়ও প্রতিফলিত হয়, যেখানে আত্মা পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষ তার আসল অবস্থান তথা আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হয়।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় ধারণাটি হলো: শরীরকেন্দ্রিক জেনেটিক দৃষ্টিভঙ্গি</strong><br />
জেনেটিক গবেষণা ও বিজ্ঞানের প্রসার বৃদ্ধির ফলে মানুষের ধ্যানধারণায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছে। এখানে আত্মার ধারণাকে পাশে সরিয়ে রেখে মানুষকে বিশ্লেষণ করা হয় জিনের যোগফল হিসেবে। এজন্য প্রশ্ন ওঠে- &#8220;মানুষ কি শুধুই জিনসমূহের সমষ্টি?&#8221; (ক্যে, ১৯৯২)</p>
<p>এ ধারণা মানুষের অভ্যন্তরীণ অর্থবোধ ও আত্মিক গঠনকে উপেক্ষা করে কেবল তার জৈবিক গঠনে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এতে মানুষ হয়ে ওঠে পরীক্ষণযোগ্য, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং প্রকৌশলগতভাবে &#8216;উন্নয়নযোগ্য&#8217; এক বস্তু। এই অবস্থান আখলাকী অবস্থানের সঙ্গে এক মৌলিক বিরোধে পড়ে। কারণ এখানে &#8216;মানব মর্যাদা&#8217; নির্ধারিত হয় তার জিনগত গুণাবলির ভিত্তিতে। একইসাথে এই ভিত্তিকে অস্বীকার করে যে সে আল্লাহর প্রতিনিধি।</p>
<p><strong>তৃতীয় ধারণাটি হলো: অন্তঃসম্পর্কিত মানুষ-জিন, পরিবেশ ও নৈতিকতা</strong><br />
তবে হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টের পর এক নতুন ধ্যান-ধারণা সামনে আসে। যেখানে দেখা যায়, মানুষ কেবল জিনের ফল নয়, বরং একটি জৈব-সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সত্তা। সেইসাথে নির্দিষ্ট জিন থাকলেও তা কখন সক্রিয় হবে, কীভাবে প্রকাশ পাবে-তা নির্ধারণ করে।</p>
<p>এটি জিন-নির্ধারণবাদ (genetic determinism)-এর বিরুদ্ধে একটি মৌলিক অবস্থান।এখানে মানুষ হয়ে ওঠে সক্রিয় সত্তা, যিনি নিজের জৈবিক গঠনের বাইরে নৈতিক সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতা ও আত্মিক বিকাশের অধিকারী।</p>
<p><strong>চতুর্থ ধারণাটি হলো ধর্মীয় মূল্যায়ন: আত্মা ও দেহের সমন্বিত স্বরূপ</strong><br />
ইসলামে মানুষ শুধুই শরীর নয়, আবার শুধুই আত্মাও নয়। বরং সে একটি অখণ্ড সত্তা, যার মধ্যে রয়েছে-</p>
<ul>
<li>রূহ (আত্মা), যা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত,</li>
<li>আমানত, যা তাকে দায়িত্ববান করে তোলে,</li>
<li>আখিরাতমুখিতা, যা তার জীবনকে সাময়িক নয়, অনন্তের দিকে পরিচালিত করে।</li>
</ul>
<p>এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসলামী ধর্মতত্ত্ব কেবল আচরণের বিধান দেয় না; বরং মানুষের স্বরূপ, তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে আখলাকের ভিত্তি নির্মাণ করে।</p>
<p>সুতরাং, জেনেটিক হস্তক্ষেপ যদি মানুষকে কেবল উন্নত জাতের জীববৈজ্ঞানিক বস্তুতে পরিণত করে, তবে তা মানব সত্তার ইলাহী বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে। আবার যদি তা শরীরগত কষ্ট লাঘবে, দায়িত্ব পালনে কিংবা মানুষের হেফাজতে সহায়ক হয়, তবে তা আত্মিক দিক বিবেচনায় বৈধতা পেতে পারে। শর্ত হলো তা মাকাসিদ আশ শরীয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।<br />
&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">৫.১.২ আল্লাহর সৃষ্টিকর্ম ও মানবিক কর্ম: জেনেটিক হস্তক্ষেপের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ</h4>
<p>জেনেটিক উৎকর্ষতা নিয়ে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো-মানুষ যেন এখন &#8216;সৃষ্টিকর্তার ভূমিকায়&#8217; অবতীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু ইসলামী চিন্তার কাঠামোতে এ অভিযোগ অনেকক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রযুক্তি ও জ্ঞান মানুষের একমাত্র অর্জন নয়-এগুলোও আল্লাহর ইরাদাতুল খালকের (cosmic will) অংশ। প্রসঙ্গত, ইসলামী আকীদা অনুসারে আল্লাহর ইচ্ছা (ইরাদা) দুই প্রকারে প্রকাশিত হয়-</p>
<p><strong>১. ইরাদাতুল আমর-</strong> আল্লাহর আদেশমূলক ইচ্ছা বা শরীয়তভিত্তিক নির্দেশনা।<br />
<strong>২. ইরাদাতুল খালক-</strong> আল্লাহর সৃষ্টিশীল বা কসমিক ইচ্ছা, যার অধীনে এই জগতে যা কিছু তা সবই ঘটে, এমন ধারণা।</p>
<p>এ পার্থক্য আমাদের শেখায়, যেকোনো কিছু ঘটছে বলেই তা নৈতিকভাবে সঠিক এমন নয়।</p>
<p>এ পৃথিবীতে মানুষের কাজ ইরাদাতুল খালকের অধীনে ঘটলেও তা ইরাদাতুল আমরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা-সে প্রশ্নটিই নৈতিক মূল্যায়নের কেন্দ্র। এর উপর ভিত্তি করেই কোনো কাজের নৈতিক বিচার করা যেতে পারে।</p>
<p>কোরআনে এসেছে: <strong>&#8220;তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করবে&#8221;</strong>&#8211; এ আয়াতকে ঘিরে মুফাসসিরদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কারো মতে, এ পরিবর্তন ক্ষতিকর হলে নিন্দনীয়, আর উপকারী হলে তা বৈধ। এ পরিবর্তন দুইভাবে বোঝা যায়:</p>
<ul>
<li>শারীরিক পরিবর্তন, অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টি করা গঠন বা বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন,</li>
<li>নৈতিক পরিবর্তন, যেমন ঈমান থেকে কুফরে যাওয়া বা সৎ চরিত্র থেকে বিচ্যুতি।</li>
</ul>
<p>মূলত, পরিবর্তনটি যদি কোনো অঙ্গ বা বৈশিষ্ট্যকে তার &#8220;ফিতরাত” বা প্রকৃতিক কাঠামো থেকে বিচ্যুত করে দেয়, সেটিই হয় প্রকৃত &#8220;তাগইর খালকিল্লাহ তথা আল্লাহ প্রদত্ত সৃষ্টিকাঠামোতে পরিবর্তন। তবে, যদি সেই পরিবর্তন রোগ নিরাময়ের জন্য হয়, শরীরকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য হয়, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ&#8221;।</p>
<p>এ ধরণের হস্তক্ষেপ আরও একটি বড় নৈতিক সংকট সৃষ্টি করে, তা হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির স্থিতি ও বৈচিত্র্যে হস্তক্ষেপ। যখন সমাজ &#8216;স্বাভাবিকতা&#8217;কে একটি নির্দিষ্ট বর্ণ, আকৃতি, উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার সাথে সংজ্ঞায়িত করে, তখন এই &#8216;উৎকর্ষতা&#8217;র ধারণা মানুষকে জেনেটিক মানদণ্ডে বিভক্ত করতে শেখায়। এতে করে মানুষের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং একটি সম্ভাব্য জৈবিক শ্রেণিবিভাগের পথ খুলে যায়, যা মানব মর্যাদা ও সাম্যের ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।</p>
<p>কিন্তু এখানে মূল যে প্রশ্ন থেকে যায় তা হলো-এই পরিবর্তন কি শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনছে, নাকি আমাদের উপর এমন কিছু আরোপ করছে যা প্রকৃতি বা আল্লাহ আমাদেরকে দেননি?</p>
<p>এ প্রশ্নগুলোর জবাবেই নির্ধারিত হয় একটি প্রযুক্তির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। পরিবর্তন তখনই ন্যায্য, যখন তা আল্লাহ প্রদত্ত সৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং আত্মসন্তুষ্টি কিংবা সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে আরোপিত হয় না। আর এই পার্থক্য মূলত কোনো কিছু ঘটতে পারা (Cosmic Will) ও কিছু ঘটানো উচিত কিনা (Religious Will) এই দুইয়ের মাঝে নিরূপণ করা হয়। এটাই ইসলামী নৈতিকতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্রে থাকা উচিত।</p>
<p>এ বিবেচনার কাজটি শুধু বিজ্ঞানীদের নয়; বরং ধর্মতাত্ত্বিক, নীতিবিদ ও ফকীহদেরও দায়িত্ব। যারা শরীয়ত ও ঈমানী বোধের আলোকে প্রযুক্তির নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে সক্ষম। কারণ প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হোক, ন্যায়ের প্রশ্নটা থেকে যায় মানুষের ইচ্ছা আর মহান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যের মাঝে।<br />
&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">৫.২ জেনেটিকীকরণ ও ফিকহ এর কাঠামোগত বিশ্লেষণ</h4>
<p>আধুনিক জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে যে আলোচনা চালু আছে, তা অনেক সময় শুধুমাত্র ব্যবহারিক সুবিধা-অসুবিধার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়, যাকে &#8220;thin utilitarian view&#8221; বলা হয়। এটি কেবল উপকারিতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে নৈতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু ইসলামী চিন্তায়, বিশেষ করে ফিকহী ঐতিহ্যে এ ধরনের সরলীকৃত ধারণা যথেষ্ট নয়। বরং এক্ষেত্রে একটি &#8220;thick” বা গভীরতর নৈতিক মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়, যেখানে ফিকহ ও ধর্মতত্ত্ব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করে। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো-ফিকহকে একটি নিছক আইনগত কাঠামো হিসেবে না দেখে নৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।</p>
<p>এই নৈতিকীকরণ (ethicization) ঘটানো সম্ভব দুটি উপায়ে।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> আইনগত বিশ্লেষণ থেকে নৈতিক বিশ্লেষণের দিকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> ফিকহী ঐতিহ্যের বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডারকে নৈতিক চিন্তার ইতিহাস ও সমসাময়িক আলোচনার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ফিকহের পদ্ধতিগত গঠন সাধারণত তিনটি বৈশিষ্ট্যের উপর দাঁড়িয়ে। যেমন-</p>
<ul>
<li>বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার পরস্পর সংযুক্ততা,</li>
<li>নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে অতীতের বিধান খুঁজে পাওয়া</li>
<li>সমস্ত কিছুকে মৌলিক মূলনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা।</li>
</ul>
<p>জেনেটিক হস্তক্ষেপ (GI) এমন একটি বিষয়, যা ফিকহ ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন নৈতিক ইস্যুর আলোকে বিবেচনা করে এসেছে। যেমন জীবন শুরুর পর্যায়, দেহের অখণ্ডতা, আত্মরক্ষা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ। GI প্রয়োগ করা হয় নিষিক্ত ডিম্বাণু, ভ্রুণ ও দেহে এবং প্রত্যেকটি পর্যায়ে একেকটি বিশেষ নৈতিক ও শরয়ী প্রশ্নের জন্ম দিয়ে।</p>
<p>GI যদি শরীরের উপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠে-এই হস্তক্ষেপ কি মানব দেহের মর্যাদাকে অতিক্রম করছে কিনা? এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে: &#8220;আল-আদামিয়্যা&#8221; মানে হচ্ছে মানুষের দেহগত মর্যাদা, যা জীবিত হোক বা মৃত; আলাদা গুরুত্ব রাখে। এই ধারণার ভিত্তিতে ক্লাসিকাল আলেমরা এমনকি মৃতদেহ বিকৃত করাকেও নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ মানব মর্যাদা শরীরের প্রত্যেক পর্যায়ে জারি থাকে।</p>
<p>GI-র বিষয়টি শরীয়তের দুটি মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্তঃ <strong>প্রথমত,</strong> আত্মরক্ষা (হিফজুন নাফস)। এবং <strong>দ্বিতীয়ত,</strong> বংশধারা রক্ষা (হিফজুন নাসল)। আত্মরক্ষা কেবল প্রাণ রক্ষার বিষয় নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে জীবনের ভারসাম্য রক্ষা এবং এমন যেকোনো হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সাবধান থাকা, যা জীবনকে বিকৃত বা বিকল করে দিতে পারে। হোক তা তাৎক্ষণিক কিংবা সম্ভাব্য। এই আত্মরক্ষার ধারণা কেবল বাস্তব আত্মা নয়, সম্ভাব্য আত্মা বা অনাগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।</p>
<p>একইভাবে, বংশধারা রক্ষার দায়িত্বও GI-র আলোচনার সাথে যুক্ত। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, বরং গোটা মানবজাতির বংশগত ও উত্তরাধিকারিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। জেনেটিক হস্তক্ষেপ অনেক সময় এমনভাবে পরিকল্পিত হয়, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর বর্তমানের সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক পক্ষপাত চাপিয়ে দেওয়া হয়-যা একটি নৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে। শরীয়ত এখানে মানুষকে কেবল শারীরিক রূপের হেফাজতকারী হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ মানবসমাজের প্রতি দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবেও দেখে।</p>
<p>অন্যদিকে, সন্তান জন্মের প্রক্রিয়া ইসলামে শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং এটি একটি অধিকার-ভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এখানে রয়েছে ধর্মীয় অধিকার, সামাজিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব, যা কেবল মা-বাবা বা দম্পতির নয়, বরং ভবিষ্যৎ সন্তান ও সমাজের প্রতিও দায়বদ্ধ। GI-র আলোচনায় তাই এই অধিকারের কাঠামোও অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে।<br />
&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">৫.৩ জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রে কর্তৃত্ব</h4>
<p>ফিকহবিদগণ সাধারণত কোনো বিষয়ের শরীয়ত ভিত্তিক বৈধতা নির্ধারণে কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তি) বা মাসলাহা (সমষ্টিগত কল্যাণ) পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এ পদ্ধতির মাধ্যমে তারা আল্লাহর ইচ্ছা বা নির্দেশনা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে। কিন্তু এ পদ্ধতি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট কিংবা বহুবিধ শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সংযুক্ততা পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে সবসময় সক্ষম হয় না।</p>
<p>ফকীহরা সাধারণত প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু সে প্রযুক্তি নিজেই আদতে কী বোঝায় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। প্রযুক্তিকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন এটি &#8216;উন্নয়ন&#8217; ও &#8216;প্রগতি&#8217;র স্বাভাবিক ও অবধারিত রূপ। অথচ সিমন্সের মতো কিছু ধর্মতাত্ত্বিক সতর্ক করে বলেছেন যে প্রযুক্তি হলো একধরনের &#8216;অপ্রাকৃতিক শক্তি&#8217;। এটি কেবল নিরপেক্ষ একটি হাতিয়ার নয়-বরং এর মধ্যে বাজারের চাহিদা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সাংস্কৃতিক চাপ সক্রিয়ভাবে কাজ করে।</p>
<p>হ্যাবারমাস এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে কেবল উপকার বা অপকারের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে একটি গভীর অস্তিত্বগত সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি এমন এক প্রক্রিয়া চালু করে দেয় যেখানে এক সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়। তারপর সেই বাস্তবতা থেকে জন্ম নেয় নতুন সম্ভাবনা এবং এই চক্র অব্যাহত থাকে। এর ফলে মানুষের আত্মপরিচয়, নৈতিক কর্তৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। হেলমুথ প্লেসনারের মতে, এখানে মানুষ কেবল একটি দেহ নয়, বরং আত্মার অধিকারী এক সত্তা। এই ভাবনা থেকে স্পষ্ট হয়-জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরকে বদলে ফেলার প্রবণতা মানুষকে তার নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য ও দায়িত্ববোধ থেকে সরিয়ে নিতে পারে।</p>
<p>আধুনিক জেনেটিক হস্তক্ষেপ এমন এক ক্ষমতা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীর, গঠন এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়ে উঠছে। এর ফলে ভবিষ্যতের মানুষের ওপর বর্তমানের একটি একচ্ছত্র কর্তৃত্ব তৈরি হচ্ছে-যেটিকে হ্যাবারমাস বলেছেন &#8220;বর্তমান জীবিতদের দ্বারা ভবিষ্যতের মানুষকে মৃতদের অনুগত বানিয়ে ফেলা&#8221;।</p>
<p>যদিও ফিকহে এমন কিছু নীতিমালা রয়েছে যেগুলো আগাম ক্ষতির পথ রোধ করতে ব্যবহৃত হয়-যেমন &#8216;সাদ্দুয যারাই&#8217; বা &#8216;ক্ষতির সম্ভাবনামূলক উপায় বন্ধ&#8217; করার পদ্ধতি। তবু এই পদ্ধতি এতটা গভীর নয় যে তা জেনেটিক্সের মতো বহুস্তরীয় প্রযুক্তিগত-নৈতিক সংকটকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারে।</p>
<p>জেনেটিকীকরণ এই প্রেক্ষাপটে তিনটি বড় দার্শনিক সংকট তৈরি করে-</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> এটি ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়। মানুষের সব আচরণ যদি জিন দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবে তার স্বাধীন নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> এটি আত্মপরিচয়ের ধারণাকে প্রভাবিত করে-মানুষকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে যে সেকে।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> এটি ব্যক্তিত্ব অর্জনের আগের জীবন ও মানব মর্যাদার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে-যা মানুষকে আরেকটি পরীক্ষার বস্তুতে রূপ দেয়।</p>
<p>অন্যদিকে, পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান তার গবেষণার সীমা ছুঁয়ে ফেললে আবার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এতে করে একটি বাস্তবতা থেকে আরেকটি সম্ভাবনার দিকে প্রযুক্তির গতি চালু থাকে, যেন কোনো থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই।</p>
<p>ফিকহ মূলত প্রচলিত পদ্ধতির আলোকে এই পরিবর্তনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজনে বিধান নির্ধারণ করে থাকে। তবে দার্শনিক ভিত্তিতে গঠিত গভীর নৈতিকতা বা &#8220;থিক এথিক্স&#8221; প্রযুক্তির আগাম সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন থাকতে সাহায্য করে। এটি বিজ্ঞানকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে, বরং নৈতিক চিন্তার আলোকে প্রযুক্তির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর মাধ্যমে মানুষকে তার প্রকৃতি পরিবর্তন না করে বরং সেই প্রকৃতিকে সম্মান করার শিক্ষা দেয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3 style="font-family: Kalpurush;">শেষকথা</h3>
<p>ব্যবহারিক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ গ্রহণ থেকে দেখলে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি-আধুনিক বাস্তবতা ও ধর্মীয় নির্দেশনার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে গড়ে ওঠে। একদিকে ওহী বা ইলাহী বার্তা, আরেক দিকে সমসাময়িক জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা-এই দু&#8217;য়ের সম্মিলনে গড়ে ওঠে একটি প্রাসঙ্গিক এবং কার্যকরী ধর্মীয় চেতনা।</p>
<p>এ সংলাপের প্রতিফলন দেখা যায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় পটভূমি থেকে আসা আলেম, চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে, যারা আধুনিক বিজ্ঞান বা সামাজিক পরিবর্তনের আলোকে ধর্মীয় প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম আর একপাক্ষিক, নির্দিষ্ট কিংবা অপরিবর্তনীয় কিছু নয়; বরং এটি একটি চলমান, বহুমাত্রিক ধারণা-যেখানে ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা এবং সময়ের জ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে।</p>
<p>এ চলমান ধর্মীয় চেতনার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একত্রে কাজ করে-যেমন ফিকহ, উসূলে ফিকহ ও আকীদা, যেগুলো নৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও শরীয়তের উৎস বিশ্লেষণ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যা আজ আর শুধুমাত্র বাহ্যিক পরিপ্রেক্ষিত নয়, বরং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপায়িত করতেও ভূমিকা রাখে।</p>
<p>এ বিস্তৃত ও বহুস্তরীয় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে &#8220;থিক এথিক্স” বা গভীর নৈতিকতা, যা এখন আর কেবল শাস্ত্রনির্ভর নয়-বরং একটি আন্তঃবিষয়ক পদ্ধতির মাধ্যমে গঠিত। এটি একইসঙ্গে আংশিক বিষয়ের ভেতর সামগ্রিকতা খুঁজে পায়, আবার সামগ্রিক কাঠামোর মাধ্যমে আংশিক সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করে। এভাবে এটি ফিকহী ঐতিহ্যকে বিশ্লেষণ করে এমনভাবে, যাতে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রক্ষা পায় এবং সমসাময়িক সমস্যাও মোকাবিলা করা যায়।</p>
<p>এ দৃষ্টিকোণে মানুষ আর কেবল শরীর নয়, কেবল জিনের সংমিশ্রণও নয়, বরং সে এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা, যার মধ্যে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দুইটি দিকই আছে। সে যেন একটি ছোট জগৎ (microcosm), যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন দেখা যায়।</p>
<p>এ চিন্তা অনুসারে, মানুষ তার দেহের উপর কেবল অধিকারী নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা। তার নৈতিক দায়িত্ব ও জীবনের ছন্দ এই বোঝাপড়ার মধ্যেই প্রকাশ পায়। যেখানে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও প্রয়াস ক্রমাগত ইলাহী ইচ্ছার সন্ধানেই পরিচালিত হয়। এমন একটি পথ ধরে, যেখানে আল্লাহর ইরাদাতুল খালক (যা জগত পরিচালনা করে) এবং ইরাদাতুল আমর (যা মানুষের জন্য বিধান) একত্রে মানুষের কাজ ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ:</strong> মুশফিকুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/religion-and-ethics-the-concept-of-ethics-in-islam-in-the-context-of-genetic-intervention/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16863</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আখলাক ও আদালত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/akhlaq-and-adalat/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/akhlaq-and-adalat/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 10 Apr 2026 17:00:49 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16741</guid>

					<description><![CDATA[আদালত কী? দ্বীনে মুবীন ইসলামে ‘আদালত’ পরিভাষাটি কেবল মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত একটি পরিভাষাই নয়, আদালত একই সাথে বিশ্বজগৎ ও সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত একটি পরিভাষা। শুধু তাই নয়, এই মহাবিশ্বের মহান সৃষ্টিকর্তার সাথেও এ পরিভাষাটির সম্পর্ক রয়েছে। বিচারক ও]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>আদালত কী?</strong></p>
<p>দ্বীনে মুবীন ইসলামে ‘আদালত’ পরিভাষাটি কেবল মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত একটি পরিভাষাই নয়, আদালত একই সাথে বিশ্বজগৎ ও সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত একটি পরিভাষা। শুধু তাই নয়, এই মহাবিশ্বের মহান সৃষ্টিকর্তার সাথেও এ পরিভাষাটির সম্পর্ক রয়েছে। বিচারক ও আইনজীবীগণ ‘আইন’ ও ‘আদালত’ শব্দ দুটি একসাথে ব্যবহার করেন। আইনের আরবী হলো ‘হুকুক’। حُقُوْق শব্দটি حَقٌّ শব্দ থেকে, আর عَدَالَةٌ শব্দটি عَدْلٌ শব্দ থেকে উৎসারিত। আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দুটি গুণবাচক নাম হলো আল-হক্ব ও আল-আদিল।</p>
<p>ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাওহীদ, ইবাদত, আদালত ও আখলাক। এসকল পরিভাষাকে আমাদের উসূলবিদগণ আসলুল উসূল নামে অভিহিত করেন। এ পরিভাষাগুলোর মধ্য থেকে আদালত ও আখলাক নিয়ে আলোচনা করবো।</p>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আদালতের উপর সৃষ্টি করেছেন। আদালত হলো, প্রত্যেকটি বস্তু বা বিষয়কে তার যথার্থ স্থানে স্থাপন করা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনা করতে গিয়ে فَعَدَلَكَ&nbsp; শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ তিনি মানুষকে সুষম করে গড়েছেন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে হক্ব ও আদালত পরিভাষাদ্বয়কে আমরা একসাথে দেখতে পাই। তিনি এই পরিভাষাদ্বয়কে কোথাও তাঁর সিফাত, আবার কোথাও এ মহাবিশ্বের ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ‘কিতাব’ শব্দের এর সাথে অসাধারণ একটি পরিভাষা ‘মীযান’ ব্যবহার করা হয়েছে। শাব্দিকভাবে ‘মীযান’ শব্দের অর্থ দাঁড়িপাল্লা। যার অর্থ হলো, ভারসাম্য, ব্যালান্স। সূরা রহমানেও মহান আল্লাহ বলেছেন—</p>
<p>وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ</p>
<p>অর্থ : “আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মীযান কায়েম করেছেন।”</p>
<p>অর্থাৎ, ‘আদালত’ আসমান ও যমীন উভয় স্থানেই রয়েছে। পাহাড়, পর্বত, নদী-নালা, খাল-বিলসহ সকল সৃষ্টিতেই আদালত রয়েছে।</p>
<p>এরপরের আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন—</p>
<p>&nbsp;أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ</p>
<p>এর দাবি হলো, “তোমরা মীযানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না।”&nbsp;</p>
<p>আসমানে স্থাপনকৃত মীযানের সাথে সমাজের জন্য পাঠানো মীযানের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একটি সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছেন। এই দুই মীযানের সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার অর্থ হলো, পৃথিবীতে আদালত প্রতিষ্ঠা হওয়া।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কিতাব, মীযান ও হাদীদের মধ্যকার সম্পর্ক</strong></p>
<p>আপনারা সকলেই জানেন যে, পবিত্র কোরআনে হাদীদ নামে একটি সূরা রয়েছে। হাদীদ অর্থ লোহা। সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-</p>
<blockquote><p>لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ</p>
<p>অর্থ : “আমি আমার রাসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত দিয়ে পাঠিয়েছি। তাদের সাথে ‘কিতাব’ ও ‘মীযান’ নাযিল করেছি যাতে মানুষ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর লোহা নাযিল করেছি যার মধ্যে রয়েছে বিরাট শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। এটা করা হয়েছে এজন্য যে, আল্লাহ জেনে নিতে চান, কে তাঁকে না দেখেই তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ অত্যন্ত শক্তিধর ও মহাপরাক্রমশালী।”</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিতাব ও মীযানের সাথে সাথে হাদীদ নাযিলের কথা বলেছেন। যারা কোরআনের বৈজ্ঞানিক তাফসীর করেন, তারা বলেন, আকাশ থেকে বিভিন্ন ধরনের পাথর এসে দুনিয়ায় পড়েছে এর সাথে সাথে লোহাও দুনিয়াতে এসেছে। আমি এ ধরনের তাফসীরকে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করি না।</p>
<p>আমার মতে, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কিতাব বলতে তার অবতীর্ণ আসমানী কিতাবের কথা বুঝিয়েছেন, মীযান বলতে আদালত বুঝিয়েছেন, আর লোহা বলতে শক্তি ও ক্ষমতার কথা বুঝিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে বলেছেন,</p>
<p><strong>কিতাববিহীন মীযান হবে না, আবার লোহাবিহীন মিযান হবে না। কেননা লোহাবিহীন মীযান কিতাবকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এবং কিতাববিহীন লোহা মীযানকে অদৃশ্য করে দেয়। আরও সুস্পষ্টভাবে বললে, কিতাব হলো আদালতের উৎস, মীযান হলো আদালত নিজে আর লোহা হলো শক্তি ও ক্ষমতা। এই তিনটি বিষয় অর্থাৎ- কিতাব, মীযান ও লোহা একসাথে না হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যেখানে কিতাব নেই সেখানে শক্তি ও ক্ষমতা ‘মীযানকে’ (আদালত) নিয়ন্ত্রণ করে। আর এক্ষেত্রে আদালতের শক্তি নয়, শক্তি ও ক্ষমতার আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়।</strong> যদি মীযান না থাকে তাহলে শক্তি ও ক্ষমতা; কিতাবকে তার নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং কিতাবকে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কিতাব যখন শক্তি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণাধীন হয়, তখন সেটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। পূর্বের পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত দ্বীনসমূহ হলো এর জ্বলন্ত উদাহরণ। শক্তি ও ক্ষমতা না থাকলে মীযান শুধুমাত্র থিওরি হিসেবে থেকে যায়, সমাজে ও রাষ্ট্রে যার কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। কিতাবকে মীযানের সাথে এক হয়ে সামাজিক জীবনে প্রভাবশালী হওয়ার জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, একটি শক্তির প্রয়োজন, যে শক্তি কিতাবের আইনসমূহ বাস্তবায়ন করবে।</p>
<p>সূরা হাদীদের এই আয়াতের আলোকে আমরা বলতে পারি যে, কিতাব, মীযান এবং হাদীদ তথা রাষ্ট্রক্ষমতা যখন একসাথে হবে, তখনই কেবল পৃথিবীতে আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>আমি পাঠকদেরকে অনুরোধ করবো, কোরআনকে একবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘আদালত’ এর একটি কিতাব হিসেবে পড়ুন। ‘আদালত’ এর চিন্তাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে যদি সূরা ফাতিহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সমগ্র কোরআন অধ্যয়ন করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, কোরআন একইসাথে ‘আদালত’-এরও একটি গ্রন্থ। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন কেবল আইনের গ্রন্থই নয়; বরং আদালতেরও গ্রন্থ। অর্থাৎ আমরা আইনকে যে অর্থে গ্রহণ করি কোরআন সে অর্থে আইনের কোনো গ্রন্থ নয়।</p>
<p>আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, কোরআন কোনো সংবিধান নয়। আমি যখন এই কথা বলি, তখন অনেকেই আমার উপর রাগ করেন। মুসলিম বিশ্বে বিখ্যাত একটি স্লোগান আছে। আমাদের সংবিধান হলো কোরআন, আমাদের আইন হলো কোরআন। আমি এটা সঠিক মনে করি না।</p>
<p>মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ‘আদালত ও আইন’ এর সবচেয়ে বড় উৎস। একইসাথে তাকবীনের (বিশ্বসৃষ্টি) সাথে তানযীল (অবতীর্ণ)-কে একত্রকারী একটি মহা উৎস। অর্থাৎ মহাবিশ্বের আয়াতসমূহের সাথে মহাগ্রন্থের আয়াতসমূহ একসাথে ‘আদালত’ নামক একটি মৌলিক বিষয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। কিন্তু সেখান থেকে আইন-কানুন বের করার দায়িত্ব মানুষকে দেওয়া হয়েছে। আর মানুষ যখন এই কাজ করবে তখন তা উসূল অনুযায়ী করবে। উসূলুল ফিকহ নামক জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ এই শাখাটি এর উসূল শেখানোর জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে।</p>
<p>কেউ কেউ ইলমুল ফিকহকে, ‘ইসলামী আইন’ নামে অনুবাদ করেন। ‘ইসলামী আইন’ এই পরিভাষাটি ব্যবহার করতে পারেন, তবে ফিকহের অনুবাদ হিসেবে কিংবা ফিকহের সমার্থক হিসেবে নয়। কারণ ফিকহ শুধুমাত্র আইনকে বুঝার জন্য এবং আইন-কানুনকে ব্যাখ্যা করার জন্যই নয়। ফিকহের অর্থ হলো, গভীর উপলব্ধি। ফিকহ এমন একটি ধারণার নাম, যা তাকবীন ও তানযীলকে, আকল ও ওহীকে, কাদীম (পুরাতন) ও জাদীদ (নতুন)-কে একত্রিত করে।</p>
<p>আমরা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনকে যেমন আখলাক ও আইনের গ্রন্থ হিসেবে যেমন পড়ি, তেমনি আদালতেরও একটি গ্রন্থ হিসেবে পড়া উচিত। কোরআনে আদালত সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে। যারা রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত আছেন, আমি মনে করি তাদের সকলের উচিত এই আয়াতটি অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ আত্মস্থ করা। আয়াতটি হলো—</p>
<blockquote><p>يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا</p>
<p>অর্থ : “হে ঈমানদারগণ ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও, তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের ব্যক্তিসত্তার অথবা তোমাদের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও। উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে অনেক বেশি কল্যাণকামী। কাজেই নিজেদের কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে বিরত থেকো না। আর যদি তোমরা বক্র কথা বলো অথবা সত্যকে পাশ কাটিয়ে চলো, তাহলে জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু করছো আল্লাহ তার খবর রাখেন।”</p></blockquote>
<p>আমি মনে করি, এই আয়াতের সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবেন একজন আইনবিশারদ। এই আয়াতে শুধু ‘হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও&#8230;’ এই কথাই বলা হয়নি। এখানে আরও বলা হয়েছে যে, এই কাজ করার সময়, আল্লাহ যে তোমাদেরকে সব সময় দেখছেন এ বিষয়টি ভুলে যেও না। তোমরা হলে আল্লাহর সাক্ষী আর আল্লাহও হলেন তোমাদের সাক্ষী|</p>
<p>মহান আল্লাহর সাথে মানুষের দুটি মীসাক রয়েছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. মীসাকুল আমানাহ।</p>
<p style="padding-left: 40px;">২. মীসাকুশ শাহাদাহ।</p>
<p><strong>মীসাকুশ শাহাদাহ হলো, আল্লাহ সবসময় আমাকে দেখছেন আর আমিও তাঁকে সব সময় দেখছি। আর মীসাকুল আমানাহ হলো, আমার যা কিছু আছে সব কিছুই মহান আল্লাহর।</strong> তিনি সবকিছুই আমাদেরকে আমানত হিসেবে দিয়েছেন। আর আমিও আল্লাহ প্রদত্ত এসকল আমানতকে গ্রহণ করে নিয়েছি। এ বিষয়দুটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য ভিন্ন একটি আলোচনার প্রয়োজন তাই আমি আর সেদিকে যাচ্ছি না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কোরআন ও হাদীসে আদালত</strong></p>
<p>মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আদালতকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার নজীর আর কোথাও নেই। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আদালতকে উচ্চ স্থানে আসীন করেছে। যাবুরেও আদালত সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে। তবে তা কোরআনের মত এত বিস্তৃত ও ব্যাপক নয়।</p>
<p>মহান আল্লাহ সূরা মায়েদার ৮ নং আয়াতে বলেন—</p>
<p>يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ</p>
<p>অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! সত্যের ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হও এবং ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও। কোনো দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেনো এমন উত্তেজিত না করে দেয়, যার ফলে তোমরা ইনসাফ থেকে সরে যাও। ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করো। এটি আল্লাহভীতির সাথে বেশি সামঞ্জস্যশীল। আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন।”</p>
<p>বিচারবিভাগের সাথে সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি কী কী কারণে ন্যায়বিচার করা থেকে দূরে সরে যেতে পারে এটা আল্লাহ তায়ালা জানেন এবং সেই সব বিষয় তিনি এসকল আয়াতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>আমি হাদীসের একজন ছাত্র হিসেবে এই আয়াতগুলোর পাশাপাশি আদালত সম্পর্কিত একটি হাদীস উল্লেখ করতে চাই।</p>
<p>আমরা সকলেই জানি যে, রাসূলে আকরাম (স.) একজন নবী ও রাসূল হওয়ার পাশাপাশি ইমাম (নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান) এবং বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। মদীনার সকল মামলা মোকাদ্দমার মীমাংসা করতেন স্বয়ং রাসূল (স.) নিজে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনও এ আদেশ দিয়েছে। কোরআনে বর্ণিত আছে—</p>
<p>تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ</p>
<p>অর্থ : “যদি তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যাপারে বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তাকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও| যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান এনে থাকো।”</p>
<p>সূরা নিসার ৬৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে—</p>
<p>فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا</p>
<p>অর্থ : “না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্যে কোনো প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।”</p>
<p>আমি যেই হাদীসটি পাঠ করবো সেই হাদীসটি উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির প্রেক্ষাপট হলো, দুপক্ষ একটি মোকাদ্দমা নিয়ে রাসূল (স.)-এর নিকটে আসেন। রাসূল (স.) তাদের দুপক্ষের যুক্তি- তর্কই শোনেন। তবে একপক্ষ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুন্দর ভাষায় তাদের কথা তুলে ধরেন। অপর দিকে অপর পক্ষ ছিলো দুর্বল, নিজের যুক্তি বা অধিকারকে তুলে ধরার ব্যাপারে মোটেই পারঙ্গম ছিলো না। উভয় পক্ষের যুক্তি তর্ক শোনার পর রাসূলে আকরাম (স.) বিশ্বমানবতার বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই কথাটি বলেন—</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>بحُجَّتِهِ مِنْ بَعْضٍ؛ فأَقْضِي لَهُ عَلَى نَحْوِ مَا أَسْمَعُ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ مِنْ حَقِّ أَخِيهِ شَيْئًا فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ</strong></p>
<p><strong>অর্থ : “হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা মুকাদ্দমা নিয়ে আমার কাছে আগমন করো এবং তোমাদের একজন অপরজন অপেক্ষা অধিক বাকপটু হয়ে যুক্তি খাটিয়ে স্বীয় দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করো। আমি কথা শুনে তার অনুকূলে রায় প্রদান করি। সুতরাং এতে যদি তার ভাইয়ের হকের কিছু তাকে প্রদান করি (বাস্তবে হয়তো এতে তার কোনো অধিকারই নেই) তখন তার কর্তব্য হবে তা গ্রহণ না করা। কেননা, এতে যেনো আমি তাকে জাহান্নামের এক খণ্ড আগুন প্রদান করলাম|”</strong></p>
<p>এই হাদীসটির আধুনিক ব্যাখ্যা এরকম, ‘ধরা যাক একজন উকিল (অ্যাডভোকেট) একটি মামলা নিবেন। যে ব্যক্তি তার কাছে আসল তার কাছ থেকে সকল ঘটনা শোনার পর উকিল সাহেব বুঝতে পারলেন, যে লোক এসেছে সে একশত ভাগ দোষী বা অন্যায় কাজ করেছে। এখন এই লোকের এই অন্যায়কে সমর্থন করে তার পক্ষে এই উকিলের লড়া জায়েজ কিনা? এ বিষয় নিয়ে আলেমগণ নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করেছেন।</p>
<p>পাঠকদের মধ্যে অনেক ব্যক্তিবর্গই আইন বিভাগের সাথে জড়িত আছেন। এখন এই একই প্রশ্ন যদি আমি আপনাদেরকে করি, অন্যায়কারী কিংবা জুলুমকারী লোকের পক্ষে আইনী লড়াই করা জায়েজ, নাকি নাজায়েজ?</p>
<p>উত্তরে হয়তো এ কথা আসবে, খুনীরও তো একটি অধিকার রয়েছে। কারণ উকিল বা বিচারকগণ আইনের যে সব বই পড়ে উকিল বা বিচারক হয়েছেন, সেখানে গুরুত্ব দিয়ে এ কথাটি বলা হয়েছে।</p>
<p>তবে হ্যাঁ, খুনীকে কিংবা চোর বা অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য নয়, নির্ধারিত আইনগত শাস্তির বাইরে খুনী যেনো আলাদা কোনো জুলুমের শিকার না হয় এই জন্য তাকে সাহায্য করা যেতে পারে।</p>
<p>এই হাদীস থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, উকিল বা অ্যাডভোকেট যেনো তার মক্কেলকে এমনভাবে সমর্থন না করে যে, তার বাগ্মীতা কিংবা যুক্তির কারণে আদালত প্রভাবিত হয় এবং বিচারক ন্যায়বিচার করতে অপারগ হয়ে যান। আমাদের ফিকহের গ্রন্থসমূহে এই বিষয় নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। সুতরাং আমি সেদিকে যাচ্ছি না এবং কোনো ফতোয়াও দিচ্ছি না।</p>
<p>তবে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এ বিষয়ে একটি আয়াত রয়েছে। আয়াতটি হলো—</p>
<p>وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا</p>
<p>প্রখ্যাত মুফাসসির এলমালি হামদি ইয়াজার এই আয়াতের অনুবাদে বলেন, “হে প্রিয় বন্ধু! তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতি করতে পারবে না।”</p>
<p>উস্তাদ এলমালি হামদি ইয়াজার আরবী خَصِيمً শব্দটির অনুবাদ করেন উকিল বা অ্যাডভোকেট।</p>
<p>এ আয়াতের শানে নুযুল প্রথম যখন পড়ি, তখন আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখনো যখন পড়ি ভীতসন্ত্রস্ত হই। ইলাহী আদালতের সামনে কে না ভীত হয়!</p>
<p>ঘটনার নায়ক হচ্ছে আনসারদের যুফার গোত্রের তা’মাহ বা বশীর ইবনে উবাইরিক নামক এক ব্যক্তি। এই লোক একদিন এক ঘর থেকে আটা ও বর্ম চুরি করে। চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পথে বর্মকে আটার বস্তার ভেতরে রাখে। পথিমধ্যে বস্তায় থাকা বর্মের কারণে বস্তা ছিদ্র হয়ে যায়। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখে, তার বস্তা ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে সে যে পথ দিয়ে যাচ্ছে সে পথে আটা পড়ে পড়ে চিহ্ন হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে চালাকি করে চুরিকৃত আটা এবং বর্মকে নিজের বাসায় না নিয়ে এক ইহুদী প্রতিবেশীর বাসায় যায় এবং চুরিকৃত মাল তার কাছে আমানত রাখে। সকাল বেলা যে সাহাবীর ঘর থেকে বর্ম ও আটা চুরি যায় সে আটা পড়ার পথ অনুসরণ করে সেই ইহুদীর বাড়ি পর্যন্ত যান।</p>
<p>বর্ম ও আটার মালিক সাহাবী রাসূলে আকরাম (স.)-এর কাছে এসে অভিযোগ দায়ের করেন। রাসূলে আকরাম (স.) এ ঘটনা নিষ্পত্তি করার জন্য সেই ইহুদীকে ডেকে পাঠান। রাসূল (স.) ইহুদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায়, এগুলো আমার না। তা’মাহ আমার নিকট আমানত রেখেছে। এই কথা শুনে রাসূল (স.) তা’মাহ কে ডেকে পাঠান। তা’মাহ কে জিজ্ঞাসা করলে সে শপথ করে বলে, আমি এবিষয়ে কিছুই জানি না!&nbsp; তা’মাহ ও তার পক্ষপাতীরা তার সমর্থনে খুব জোড়ালো ভূমিকা রাখে। তারা বলে বেড়ায় : এ শয়তান ইহুদী, সে সত্যকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরি করে। তার কথা কেমন করে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। বরং আমাদের কথা মেনে নেওয়া উচিত, কারণ আমরা মুসলমান। এই মোকাদ্দমার বাহ্যিক ধারা বিবরণীতে প্রভাবিত হয়ে নবী করীম (স.) ইহুদীটির বিরুদ্ধে রায় দিতে প্রায় উদ্যত হয়েছিলেন। এমন সময় সমস্ত ব্যাপারটির প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে মহান আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করে বলেন—</p>
<blockquote><p>إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ۚ وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا</p>
<p>অর্থ : “হে নবী! আমি সত্য সহকারে এই কিতাব আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ আপনাকে যে সঠিক পথ দেখিয়েছেন সে অনুযায়ী আপনি লোকদের মধ্যে ফয়সালা করতে পারেন। আপনি খেয়ানতকারী ও বিশ্বাস ভংগকারীদের পক্ষে বিতর্ককারী হবেন না।”</p></blockquote>
<p>وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا</p>
<p>অর্থ : “আর আল্লাহর কাছে ক্ষমার আবেদন করুন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়।”</p>
<p>চিন্তা করে দেখুন তো, একজন ইহুদী অবিচারের শিকার হবে বলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করেন এবং সেসব মুসলমানদের কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেন, যারা নিছক গোত্র ও অন্ধ স্বজনপ্রীতির কারণে অপরাধীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলো। অন্যদিকে সাধারণ মুসলমানদের এই মর্মে শিক্ষা দান করা হয়েছে যে, ন্যায় ও ইনসাফের প্রশ্নে কোনো প্রকার অন্ধ বিদ্বেষ ও গোত্রপ্রীতির অবকাশ নেই। নিজের দলের লোকেরা বাতিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের অযথা সমর্থন করতে হবে এবং অন্য দলের লোকেরা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করতে হবে-এ নীতি কখনো ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।</p>
<p>আমি জানি আপনারা সকলেই এই সব বিষয় আমার চেয়ে ভালো জানেন। শুধুমাত্র আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এ বিষয়ের অবতারণা করলাম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আখলাক ও আদালতের মধ্যকার সম্পর্ক</strong></p>
<p>এখন আমি আমার মৌলিক আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। আমার বিষয় হলো, আখলাক এবং আদালতের মধ্যে সম্পর্ক।</p>
<p>আমাদের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে আদালতের সাথে চারটি পরিভাষার সম্পর্ককে আলাদা আলাদা গ্রন্থ কিংবা অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো—</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. আদালতের সাথে আখলাকের সম্পর্ক।</p>
<p style="padding-left: 40px;">২. আদালতের সাথে (مَرْحَمَةٌ) মারহামাত বা দয়ার সম্পর্ক।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৩. আদালতের সাথে ইহসানের সম্পর্ক এবং</p>
<p style="padding-left: 40px;">৪. আদালতের সাথে আকলের সম্পর্ক।</p>
<p>ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমায় আদালতের সাথে রহমতের সম্পর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে আগে জুলুমকে বর্ণনা করেছেন। আদালত এবং জুলুম নামক পরিভাষা দুইটি, হক্ব ও বাতিলের মতো বিপরীত অর্থবহনকারী দুটি পরিভাষা হিসেবে কোরআনে কারীমে ও হাদীসে বিবৃত হয়েছে।</p>
<p>ইবনে খালদুন মুকাদ্দিমায় বলেন—</p>
<p>أَنَّ الظُّلْمَ مُؤَذِّنٌ بِخَرَابِ الْعُمْرَان</p>
<p>অর্থ : “জুলুম সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনে।”</p>
<p>এরপর তিনি বলেন, আদালত কেবলমাত্র বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত কোনো বিষয় নয়। বিচার বিভাগ আদালতের খুব সামান্য অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে। আদালতের উপরে যদি জুলুম বিজয় লাভ করে তাহলে মানুষের নিয়তের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়, মুয়ামালাত বিনষ্ট হয়ে যায়, সর্বত্র হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, অবাধ্যতা ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে, জিনিসপত্রের দাম, চুরি ডাকাতি এবং দরিদ্রতা বেড়ে যায়। মানুষ বিভিন্ন ভাগে বিভাজিত হয়ে পড়ে, বিভিন্ন দল ও উপদলের সৃষ্টি হয় এবং তারা একে অপরের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে দেশ ও সমাজ থেকে শান্তি-শৃঙ্খলা বিদায় নেয়। জুলুমের কারণেই মূলত এসব হয়ে থাকে।</p>
<p>মাঝে মধ্যে আমি নিজেই নিজের কাছে অনেক প্রশ্ন করি। এর মধ্যে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি করি সেটি হলো, ‘মুসলিম উম্মাহ কেন আজকের এই অবস্থায়?’ কোরআন আমাদের কাছে, সুন্নত আমাদের কাছে, হাদীস আমাদের কাছে, ইসলাম আমাদের কাছে, ইযযত ও সম্মান আমাদের কাছে, সকল প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের কাছে। এক কথায় বলতে গেলে সবকিছুই আমাদের কাছে। এত কিছু থাকার পরেও মুসলিম উম্মাহ এই অবস্থায় কেনো?</p>
<p>আমার কাছে মনে হয় এর একটি জবাব রয়েছে। আর সেটি হলো, মুসলিম দেশসমূহে ‘আদালত’ নেই। যেখানে আদালত প্রতিষ্ঠিত থাকে না, ইসলাম সেখানে আমানত হিসেবে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে মাত্র। ইসলামের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো সমগ্র দুনিয়াতে আদালত প্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত না থাকলে ইসলামের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থেকে যায়। সে উদ্দেশ্যটি যদি পূর্ণ না হয়, আমরা সকলে হাফেজ হয়ে সারাদিন কোরআন তেলাওয়াত করলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না।</p>
<p>আমাদের প্রাচীন বই-পুস্তকে ও সাহিত্যে খুব সুন্দর একটি ইখতিলাফ রয়েছে, সেটা হলো আদালত বড় নাকি মারহামাত বড়? এটি একইসাথে ভুল আবার সঠিক।</p>
<p>এর সঠিক জবাব হলো শর্তহীন আদালত মারহামাতের চেয়ে বড় নয়, একইভাবে শর্তহীন মারহামাত আদালতের চেয়ে বড় নয়। কিছু কিছু স্থান আছে যেখানে মারহামাত আদালতের চেয়ে বড় বা আদালতের উপর প্রাধান্য পাবে। আবার কিছু কিছু স্থান আছে যেখানে আদালত মারহামাতের চেয়ে বড় এবং এর উপর প্রাধান্য পাবে।</p>
<p>আমরা প্রতি জুমুয়া’র খুতবায় আদালত ও ইহসানের মধ্যকার সম্পর্ক শুনে থাকি। জুমুয়া’র খুতবায় আদালত ও ইহসান সম্পর্কিত একটি আয়াত পড়ার প্রথা চালু করেন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র.)। অর্থাৎ দ্বিতীয় ন্যায়পরায়ণ উমর এই ধারা চালু করেন। তার সময় থেকে আজ পর্যন্ত দুনিয়ার যত স্থানে জুমুয়া’র নামাজ আদায় করা হয় প্রতিটি স্থানে জুমুয়া’র খুতবায় এই আয়াতটি পড়া হয়। আয়াতটি হলো—</p>
<blockquote><p>إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ</p>
<p>অর্থ : “আল্লাহ আদালত ও ইহসানের নির্দেশ দিয়েছেন।”</p></blockquote>
<p>এই আয়াতের তাফসীরে দেখা যায়, এমন অনেক স্থান রয়েছে যেখানে ইহসান আদালতের উপর প্রাধান্য পায় আবার আদালতও ইহসানের উপর প্রাধান্য পেয়ে থাকে।</p>
<p>মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে, ভাই-বোনদের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ আদালতের উপর প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ এসকল ক্ষেত্রে আদালতের চেয়ে ইহসান বড়। কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদালতই হবে মূলভিত্তি। এই সকল ক্ষেত্রে আদালত ইহসানের উপর প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ এখানে ‘আদালত’ দয়ার্দ্রতা ও ইহসানের চেয়ে বড়। এর অর্থ এই নয় যে, এখানে দয়ার্দ্রতা মোটেই থাকবে না।</p>
<p>এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে আদালত প্রতিষ্ঠা জায়েজ নয়, ক্ষেত্রবিশেষ হারামও। আপনারা হয়তো বলবেন আদালত আবার হারাম হয় কী করে? যেমন ধরুন, আপনার মা অথবা বাবা অন্যায় ভাবে আপনাকে থাপ্পড় দিলো, আপনি কি আদালত প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাকে আঘাত করা তো দূরের কথা হাত তোলার কথা কি কল্পনাও করতে পারবেন?</p>
<p>এই জন্য পারিবারিক ব্যাপারে, বন্ধুদের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পারিক আচরণের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ হলো মূল ভিত্তি। এসব ক্ষেত্রে আদালতের চেয়ে ইহসান ও মারহামাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমন, আদালতের প্রয়োগ সম্পর্কিত আয়াতসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি আয়াত হলো—</p>
<p>&nbsp;وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا&nbsp;</p>
<p>অর্থ : “খারাপের প্রতিদান সমপর্যায়ের খারাপ।”</p>
<p>এ আয়াতের দিকে গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, দ্বিতীয় খারাপকে আদালতের স্থানে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ফলাফলের দিক থেকে আদালত প্রতিষ্ঠা হয়, কিন্তু সেই ঘটনাটিকে যদি ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যায় যে, এটিও একটি খারাপ বিষয়। যেমন, কিসাসের কথাই ধরুন। কোনো লোক যদি কাউকে হত্যা করে তাহলে তাকেও হত্যা করা হয়। এটা আদালতের দাবি, কিন্তু ফলাফলের দিক থেকে যার উপর কিসাস প্রয়োগ করা হচ্ছে সেই লোক অন্য একজনকে হত্যা করার কারণে তাকেও হত্যা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফলাফলের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, একজন মানুষকে মারা হচ্ছে। তবে এখানে কিসাস প্রয়োগ জায়েজ হওয়ার কারণ হলো, আরও খারাপ বিষয় তথা অন্যান্য হত্যাকাণ্ডকে প্রতিহত করার জন্য। এই জন্যই আল্লাহ বলেছেন—</p>
<p>&nbsp;وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ</p>
<p>অর্থ : “তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে।”</p>
<p>একইভাবে একজন মানুষের কথা চিন্তা করুন, সে এক জায়গায় চাকরি করে। কিন্তু সে তার উপর অর্পিত দায়িত্বকে সঠিকভাবে পালন করে না। সে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার কারণে এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার কারণে, এই প্রতিষ্ঠান পরিচালকের দায়িত্ব হলো সেই লোককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা। আদালতের দাবিও এটাই। কিন্তু যদি দেখা যায় যে, তাকে যদি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় তাহলে তার সন্তানরা অভুক্ত থাকবে, সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে ইত্যাদি। এমতাবস্থায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যাবে কিনা? এই বিষয় নিয়ে আমাদের ফিকহের কিতাবসমূহে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে এই ক্ষেত্রে ইহসান বা দয়ার্দ্রতাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে সেই অনুযায়ী ফয়সালা করতে হবে। তবে যদি দেখা যায় যে, তাকে চাকরিতে রাখলে তার পরিবারের যতটুকু না ক্ষতি হবে তার চেয়ে সমাজ বা দেশের ক্ষতি বেশি হবে তাহলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এ কাজ করতে পারবোনা। যতক্ষণ সম্ভব তাকে চাকরিতে বহাল রাখার চেষ্টা করবো।</p>
<p>রাসূলে আকরাম (স.) যখন মক্কা বিজয়ের লক্ষ্যে মক্কায় যাচ্ছিলেন, তখন সবার মনেই প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিলো। কারণ এই মক্কাবাসীরাই দশ বছর আগে তাদের সকল সম্পদ দখল করে নিয়ে সম্পূর্ণ খালি হাতে তাদেরকে মক্কা থেকে চলে আসতে বাধ্য করেছিলো। যারা তাদের সাথে এই আচরণ করেছিলো কয়েকদিন পরেই তাদের সাথে দেখা হবে।</p>
<p>রাসূল (স.) ইসলামের ঝাণ্ডাকে সা’দ বিন উবাদা (রা.) এর হাতে তুলে দিলেন। মক্কায় যাওয়ার পথে সা’দ বিন উবাদা তাঁর ঘোড়ার পিঠে বসে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে বলছিলেন—</p>
<p>اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ &#8211; اَلْيَوْمَ يَوْمُ أَذَلّ اللّهُ قُرَيْشًا- اَلْيَوْمَ يَوْمُ اَحَلَّ اللهُ دِمَاءً</p>
<p>অর্থ: “আজ যুদ্ধের দিন, আজকে এমন দিন যেই দিনে আল্লাহ কুরাইশদেরকে অপমানিত করবেন, আজ এমন দিন যে দিন আল্লাহ রক্তপাতকে হালাল করেছেন।”</p>
<p>সা’দ বিন উবাদা (রা.)-এর মুখে একথা শুনে রাসূলে আকরাম (স.) তার হাত থেকে ইসলামের ঝাণ্ডা নিয়ে নেন এবং তা আলী (রা.)-এর হাতে তুলে দিয়ে রাসূল (স.) নিজের উটের পিঠে দাঁড়িয়ে বলেন—</p>
<blockquote><p>اَيُّهَا النَّاسُ اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَرْحَمَةِ &#8211; الْيَوْمَ يَوْمُ اَعَزَّ اللّهُ قُرَيْشًا &#8211; الْيَوْمَ يَوْمُ حَرَّمَ اللهُ دِمَاءً</p>
<p>অর্থ: “হে মানুষ সকল! আজ দয়ার্দ্রতা দেখানোর দিন, আজ এমন দিন যেদিন আল্লাহ কুরাইশদেরকে সম্মানিত করবেন। আজ এমন দিন যেদিন আল্লাহ রক্তপাতকে হারাম করেছেন।”</p></blockquote>
<p>অতঃপর তিনি মক্কা বিজয়ের পর সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি জানো আমি আজ তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করবো?”</p>
<p>এ বাক্যটা শোনার সাথে সাথে সম্ভবত কুরাইশদের চোখের সামনে তাদের কৃত জুলুম নির্যাতন, হিংস্রতা ও বর্বরতার দুই দশকের কালো ইতিহাস একটা সিনেমার ছবির মত ভেসে উঠেছিলো। তাদের বিবেক হয়তো অনুশোচনায় বিদীর্ণ হবার উপক্রম হয়েছিলো। হয়তো চরম অসহায়ত্ব ও অনুতাপের অনুভূতি নিয়েই তারা বলে উঠেছিলো—</p>
<p>“একজন মহানুভব ভাই এবং মহানুভব ভ্রাতুস্পুত্রের মতো।” জবাবে রাসূল (স.) ঘোষণা করলেন—“তোমাদের উপর আজ আর কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।”</p>
<p>আপনারা এই বিষয়ে সকলেই জানেন। সীরাত গ্রন্থসমূহে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।</p>
<p>উল্লিখিত ঘটনা আর বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ঐতিহাসিক একটি ঘটনার সাথে দেশের বিচার বিভাগকে এক করে ফেললে চলবে না। তবে আমাদের সমাজ থেকে দয়ার্দ্রতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা যেনো উঠে যাচ্ছে। যার ফলে রহমতবিহীনতা সমাজের সকল ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে। আমি মনে করি আপনাদের কাছে যে সকল মামলা এসে থাকে তার কারণ যদি অনুসন্ধান করা হয় তাহলে দেখা যাবে, অধিকাংশ মামলার মূলে হলো ইহসান, দয়ার্দ্রতা এবং ভ্রাতৃত্ব না থাকা।</p>
<p>আমাদের প্রখ্যাত দার্শনিক আল ফারাবী, আইন ও বিচারবিভাগকে আখলাকের সর্বনিম্ন স্তর বলে বিবেচনা করে থাকেন। অর্থাৎ, ফজিলত&nbsp; (فضيلة) ও আদালতকে যদি একে অপরের সাথে তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে, ফজিলত (فَضِيلَةٌ)&nbsp; অনেক বেশি বিস্তৃত ও বিশাল। পক্ষান্তরে আদালত হলো ফজিলতের (فَضِيلَةٌ) একটি অংশমাত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আখলাক ও দ্বীনের মধ্যকার সম্পর্ক</strong></p>
<p>আখলাক ও দ্বীনের মধ্যকার সম্পর্ক বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের মুসলমানদের সমস্যা রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্ককে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি না। আমরা আখলাককে আকীদা ও ইবাদতের বাহিরের একটি বিষয় বলে গণ্য করি। আমরা মনে করি, আখলাক হলেও হবে, না হলেও হবে! এটা অনেক বড় একটি ভুল। আখলাক হলো আইনের আকল।</p>
<p>মরক্কোর বিখ্যাত দার্শনিক আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বলেন—</p>
<p>اَلْأَخْلَاقُ عَقْلُ الْأَحْكَامِ</p>
<p>অর্থ : “আখলাক হলো, আহকামের আকল।”</p>
<p>মূলত আদালতেরও মূল উদ্দেশ্য হলো, এই দুনিয়াতে আখলাকের প্রতিষ্ঠা। ‘আদালত’ যেমন শুধু মানুষ ও সমাজ সম্পর্কিত একটি পরিভাষা নয়, তেমনিভাবে আখলাকও কেবলমাত্র মানুষ ও সমাজ সম্পর্কিত একটি পরিভাষা নয়। আখলাক একই সাথে সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত। খালক হলো আমাদের জাগতিক বা ফিজিক্যাল অস্তিত্ব আর খুলক হলো আমাদের আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব। মানুষের ফিজিক্যাল অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা যতটা ক্ষতিকর মানুষের আধ্যাত্মিক অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলাটাও ততটাই ক্ষতিকর।</p>
<p>এজন্য আমাদের দার্শনিকগণ আদালতকে আখলাকের একটি শাখা হিসেবে বিবেচনা করেন।</p>
<p>আপনারা জানেন—</p>
<ul>
<li>ভালো ও মন্দের মধ্যকার পার্থক্য থেকে আখলাকের সৃষ্টি হয়েছে।</li>
<li>সঠিক ও ভুলের মধ্যকার পার্থক্য থেকে আদালতের সৃষ্টি হয়েছে।</li>
<li>সুন্দর ও অসুন্দরের মধ্যকার পার্থক্য থেকে নন্দনতত্ত্ব বা এসথেটিকস এর সৃষ্টি হয়েছে।</li>
</ul>
<p>এসব বিষয় সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা কোনোভাবেই সঠিক হবে না। যেটা সঠিক একই সাথে সেটা সুন্দর, যেটা সঠিক একইসাথে সেটা ভালো। যেটা খারাপ একই সাথে সেট ভুল, যেটা ভুল একই সাথে সেটা কুৎসিত। এই সব বিষয়কে একে অপর থেকে পৃথক করা সম্ভব নয়।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/akhlaq-and-adalat/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16741</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রিথিংকিং আখলাক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/rithinking-akhlaq/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/rithinking-akhlaq/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 06 Apr 2026 10:26:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16731</guid>

					<description><![CDATA[আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্য উপাত্তে, এই তথ্য উপাত্ত আবার বিনোদনের সেক্টরে পরিণত হয়েছে এবং দিন যত গড়াচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব যেন তথ্যের প্রাচুর্যে আচ্ছন্ন এক নতুন মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে আলোচনা অধিক]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্য উপাত্তে, এই তথ্য উপাত্ত আবার বিনোদনের সেক্টরে পরিণত হয়েছে এবং দিন যত গড়াচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব যেন তথ্যের প্রাচুর্যে আচ্ছন্ন এক নতুন মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে আলোচনা অধিক জরুরী হয়ে পড়েছে। <strong>বর্তমান সময়ে অনেক বেশী জ্ঞানী হওয়া মানেই অনেক বেশী আখলাক সম্পন্ন ও মর্যাদাবান হওয়া বুঝায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আকলের মত একটি নিয়ামত খারাপভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।</strong> এর অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিগত শতাব্দীতে যে অগ্রগতি হয়েছে তা শান্তি নয়, যুদ্ধ ও সন্ত্রাস ডেকে এনেছে। এর পাশাপাশি ভোগের প্রবণতা, স্বার্থপরতা এবং লালসতার সীমানা যেন ছাড়িয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে আখলাকবিহীন জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষকে কতটা সুখ ও শান্তি দিতে সক্ষম এটা নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।</p>
<p>সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো, এই সংকট কেবল পাশ্চাত্যের সেকুলার জ্ঞানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; দ্বীনি জ্ঞানের পরিমণ্ডলেও তা সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দ্বীনি জ্ঞানের উদ্দেশ্যই হল আখলাক ও মূল্যবোধ তৈরি করা। অতীতের তুলনায় ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি, ধর্মীয় ধারার প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব কতটুকু পড়ছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। এসব বিষয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও আমাদের সমাজের আখলাকী অবস্থা আজ কেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে? আমরা ভালোভাবেই জানি- অর্থহীন, ফায়দাহীন ও বেহুদা বিতর্ক কোনো সমাজ বা সভ্যতাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষত দ্বীনের শাখা-প্রশাখা নিয়ে অযথা বিতর্ক মানুষের আখলাকী ও নৈতিক মানোন্নয়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।</p>
<p><strong>প্রতিটি দ্বীনি হুকুমেরই একটি ফিকহী দিক এবং একটি আখলাকী দিক রয়েছে। ফিকহী দিকটি মানুষের বাহ্যিক জগত এবং আখলাকী দিক মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতকে বিনির্মাণ করে থাকে। ইলমুল উসূলের ভাষায় ফিকহী দিকটি ইল্লতের উপর আর আখলাকী দিকটি গায়ে ইল্লতের (উদ্দেশ্য) উপর নির্ভর করে থাকে।</strong> এই অর্থে আখলাক হলো উদ্দেশ্য, ফিকহ হলো ওসিলা। ওসিলা ছাড়া উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতে পারে না। তবে উদ্দেশ্য যদি হারিয়ে যায় তাহলে ওসিলা কোন অর্থ বহন করে না।</p>
<p>অপরদিকে আখলাকের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হলো ইখতিলাফের আখলাক। মাকসাদ এক হলেও যদি কোন একটি বিষয়ের সমাধানের জন্য ব্যবহৃত পথ এবং পন্থা ভিন্ন হলে সেটাকে ইখতিলাফ বলা হয়ে থাকে। মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের জন্য ইখতিলাফ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে যে চিন্তা আকলে সালিমের বিপরীত এবং উম্মাহকে মেরুকরণের দিকে নিয়ে যায় সেটাকে খিলাফ বলা হয়ে থাকে। ইখতিলাফ হয়ে থাকে ফিকির বা চিন্তার মধ্যে আর&nbsp; খিলাফ হয়ে থাকে ব্যক্তির মধ্যে। ইখতেলাফ করা হয়ে থাকে দলীল এবং সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর ভিত্তি করে আর খিলাফ হয়ে থাকে ধারণার উপর ভিত্তি করে।</p>
<p><strong>ফলশ্রুতিতে যেকোনো বিষয়ে ইখতিলাফ হতেই পারে এটাকে স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে নিতে হবে। তবে এ ইখতিলাফ যেনো খিলাফে রূপান্তরিত না হয় ও বিভেদ সৃষ্টি না করে সেই দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।</strong> মতামত দেওয়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে আমি ভুল করতে পারি, তাই আমার মতকে যেনো একমাত্র সত্য হিসেবে তুলে না ধরি। আমাদের ব্যক্তিগত তর্ক-বিতর্ককে জ্ঞানগত বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। যাদের সাথে ইখতিলাফ করা হয়, তাদের নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা তা অনুধাবনের চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। <strong>এসব বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিপরীত পক্ষের কাউকে বিদয়াতপন্থী ও ভ্রান্ত বলে দোষারোপ না করা এবং কখনোই তাকফীর করার চেষ্টা না করা।</strong></p>
<p>উপরোল্লিখিত বিষয়সমূহ থেকে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ফিকহকে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন করার ফলে এবং ইখতিলাফের আখলাককে না মানার কারণে বর্তমানে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন হলো আহকাম ও আখলাকের সম্পর্ককে নতুন ভাবে বিশ্লেষণ করা এবং ‘আখলাক হলো আহকামের আকল’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে এই সম্পর্কে নতুন এক মাত্রা যোগ করা। আখলাক ও আহকামের সম্পর্ককে এ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিন্যাস করতে হলে আখলাককে মাকাসিদের একটি মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ফলশ্রুতিতে উসূলে ফিকহের মত আচরণকে আখলাকে রূপান্তরকারী মূল্যবোধের পদ্ধতি ও ক্রমধারাকে নতুন করে বিন্যাস করবে এমন একটি উসূলে আখলাকের বিকাশ সাধন অতীব জরুরী।&nbsp;&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/rithinking-akhlaq/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16731</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাসূলে আকরাম (সঃ) এর ৪০ টি উপদেশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/40-advices-of-prophet-muhammad-pbuh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/40-advices-of-prophet-muhammad-pbuh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 29 Mar 2026 13:57:49 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16697</guid>

					<description><![CDATA[রাসূলে আকরাম (সঃ) এর ৪০ টি উপদেশঃ ১। إِذا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ وَإِذا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ باللهِ، অর্থ, যখন কিছু চাইবে, তখন আল্লার কাছেই চাইবে, যখন সাহায্য চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে। ২। احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ অর্থ, আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাযত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>রাসূলে আকরাম (সঃ) এর ৪০ টি উপদেশঃ</p>
<p>১। إِذا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ وَإِذا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ باللهِ،<br />
অর্থ, যখন কিছু চাইবে, তখন আল্লার কাছেই চাইবে, যখন সাহায্য চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে।</p>
<p>২। احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ<br />
অর্থ, আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাযত করবে, তিনি তোমার হিফাযত করবেন।</p>
<p>৩। اتق الله حيثما كنت.<br />
অর্থ, যেখানেই থাকো না কেন, আল্লাহকে ভয় করবে।</p>
<p>৪। قل: آمنت بالله، ثم استقم.<br />
অর্থ, বল- ’আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি’; তারপর এর উপর দৃঢ় থাক।</p>
<p>৫। اتق المحارم، تكن أعبد الناس.<br />
অর্থ, হারাম থেকে দূরে থাকবে, তাহলেই সর্বাপেক্ষা ইবাদতকারি হিসেবে গণ্য হবে।</p>
<p>৬। ارض بما قسم الله لك، تكن أغنى الناس<br />
অর্থ, আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকো—তাহলেই তুমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ধনী হবে।</p>
<p>৭। دع ما يريبك إلى ما لا يريبك<br />
অর্থ, যা তোমার মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে তা পরিত্যাগ করো, আর যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ করো।</p>
<p>৮। احرص على ما ينفعك<br />
অর্থ, যা তোমার কল্যাণ বয়ে আনে, তার প্রতি মনোযোগী ও সচেষ্ট হও।</p>
<p>৯। استعن بالله، ولا تعجز<br />
অর্থ, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো , হতাশ ও দুর্বল হয়ে পড়ো না।</p>
<p>১০। كن في الدنيا كأنك غريب أو عابر سبيل<br />
অর্থ, পৃথিবীর বস্তু ও ভোগের প্রতি অতিরিক্ত আকৃষ্ট হয়ো না; এ যেন সাময়িক ভ্রমণের মতো, তুমি কেবল পথচারি।</p>
<p>১১। لا يزال لسانك رطبًا من ذكر الله<br />
অর্থ, সবসময় আল্লাহকে স্মরণ কর; যেন তোমার জিহ্বা সর্বদায় যেন তাঁর যিকিরে মশগুল থাকে।</p>
<p>১২। أتبع السيئة الحسنة تمحها<br />
অর্থ, কোনো মন্দ বা খারাপ কাজ করলে যত দ্রুত পারো ভালো কোন কাজ করে সেই খারাপ কাজের প্রভাবকে দূরীভূত করে দাও।</p>
<p>১৩। من رأى منكم منكرًا فليغيره<br />
অর্থ, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অনৈতিক বা খারাপ কাজ দেখো, তবে তাকে সংশোধন করার চেষ্টা কর।</p>
<p>১৪। لا تغضب<br />
অর্থ, রাগ করো না।</p>
<p>১৫। اتق دعوة المظلوم<br />
অর্থ, জুলুমের শিকার হয়েছে এমন ব্যক্তির দোয়াকে ভয় করো।</p>
<p>১৬। خالق الناس بخلق حسن<br />
অর্থ, মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো।</p>
<p>১৭। أحب للناس ما تحب لنفسك<br />
অর্থ, নিজের জন্য যা ভালোবাসো, অন্য মানুষের জন্যও সেটাই কামনা করো।</p>
<p>১৮। أحسن إلى جارك<br />
অর্থ, প্রতিবেশীদের সাথে উত্তম আচরণ করো।</p>
<p>১৯। من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليقل خيرًا أو ليصمت<br />
অর্থ, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাসী সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।</p>
<p>২০। من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليكرم ضيفه<br />
অর্থ, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী সে যেন মেহমানকে সম্মান করে।</p>
<p>২১। لا تحقرن من المعروف شيئًا<br />
অর্থ, কোনো ভালো কাজকেই ছোট করে দেখো না।</p>
<p>২২। يسروا ولا تعسروا<br />
অর্থ, সহজ করো, কঠিন করো না।</p>
<p>২৩। إياك وكثرة الضحك؛ فإن كثرة الضحك تميت القلب<br />
অর্থ, অত্যধিক হাসি থেকে বিরত থাকো; কারণ অতিরিক্ত হাসি হৃদয়কে নিষ্প্রাণ করে দেয়।</p>
<p>২৪। اتقوا النار ولو بشق تمرة، فإن لم تجد فبكلمة طيبة<br />
অর্থ, জাহান্নামের আগুন থেকে সাবধান হও, এমনকি একটি খেজুরের অর্ধেক দিয়ে হলেও (ভালো কাজ) কর; যদি তা পাওয়া না যায়, তবে সুন্দর কথা দিয়ে হলেও।</p>
<p>২৫। أفشوا السلام<br />
অর্থ, বেশি বেশি সালামের প্রচলন করো।</p>
<p>২৬। أطعموا الطعام<br />
অর্থ, মানুষকে বেশি বেশি খাবার খাওয়াও।</p>
<p>২৭। صِلوا الأرحام<br />
অর্থ, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখো।</p>
<p>২৮। صلوا بالليل والناس نيام<br />
অর্থ, রাতের অন্ধকারে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তুমি নামাজ পড়ো।</p>
<p>২৯। بسم الله، وكل بيمينك، وكل مما يليك<br />
অর্থ, খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার সামনের থেকে খাও।</p>
<p>৩০। لا تدعن دبر كل صلاة أن تقول: اللهم أعني على ذكرك، وشكرك، وحسن عبادتك<br />
অর্থ, প্রতি নামাজের পর এই দোয়া পড়বে, হে আল্লাহ! আমাকে সাহায্য কর যেন আমি তোমার স্মরণ করি, তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাই এবং সুন্দরভাবে তোমার ইবাদত করি।</p>
<p>৩১। لا تحاسدوا<br />
অর্থ, হিংসা করো না।</p>
<p>৩২। لا تباغضوا<br />
অর্থ, অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না।</p>
<p>৩৩। لا تجسسوا<br />
অর্থ, মানুষের ব্যক্তিগত ও গোপন বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করো না।</p>
<p>৩৪। كونوا عباد الله إخوانًا<br />
অর্থ, আল্লাহর বান্দা হিসেবে একে অপরের ভাই হয়ে যাও।</p>
<p>৩৫। استوصوا بالنساء خيرًا<br />
অর্থ, নারীদের সাথে উত্তম আঁচরণ করো।</p>
<p>৩৬। أعني على نفسك بكثرة السجود<br />
অর্থ, নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখতে এবং পাপমুক্ত থাকতে বেশি বেশি সিজদা করো (নামাজ আদায় করো)।</p>
<p>৩৭। لا تدعوا على أنفسكم، ولا على أولادكم، ولا على أموالكم<br />
অর্থ, নিজের ব্যাপারে, সন্তানের ব্যাপারে কিংবা তোমার সম্পদের জন্য বদ-দোয়া করবে না।</p>
<p>৩৮। التَّفقُّهِ في القرآنِ<br />
অর্থ, কোরআনকে বুঝে বুঝে পাঠ করো।</p>
<p>৩৯। وأنهاك أن تشتُمَ مسلمًا أو تُصدِّقَ كاذبًا أو تُكذِّبَ صادقًا<br />
অর্থ, কোন মুসলমানকে অপমান ও কটূক্তি করা থেকে এবং সত্যবাদীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা থেকে এবং মিথ্যাবাদীকে সত্য প্রতিপন্ন করা থেকে বিরত থাকো।</p>
<p>৪০। إياكم والظن؛ فإن الظن أكذب الحديث<br />
অর্থ, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কেবল অনুমান বা ধারণার ওপর নির্ভর করো না; কারণ তা প্রায়ই ভুল হয়।</p>
<p>যদি আমরা এই সকল উপদেশকে পালন করতে পারি তাহলে আশা করি আমাদের কলব প্রশান্ত থাকবে, ইবাদত সুন্দর হবে এবং নিজেকে ইস্তিকামাতের পথে পরিচালিত করতে পারব।</p>
<p>মহান আল্লাহ যেন তাঁর প্রিয় রাসূলের এই সকল উপদেশকে আমাদেরকে পালন করার তওফিক দান করেন। আমীন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/40-advices-of-prophet-muhammad-pbuh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16697</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতায় ইনফাকের সংস্কৃতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. খাদিজা গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 01 Mar 2026 15:03:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16655</guid>

					<description><![CDATA[রমজানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একইসাথে সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ইনফাক। আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি, এইসব সমস্যার মূলে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে ইনফাকের সংস্কৃতি উঠে যাওয়া।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>রমজানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একইসাথে সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ইনফাক। আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি, এইসব সমস্যার মূলে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে ইনফাকের সংস্কৃতি উঠে যাওয়া। এজন্য আজকে আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।</p>
<p>সহজ ভাষায় বললে, <strong>ইনফাক বলতে বুঝায় আল্লাহর পথে ব্যয়। শাব্দিক অর্থে বলতে গেলে, অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য যেই দান বা খরচ করা হয় সেটিই হচ্ছে ইনফাক।</strong> এই সহযোগিতা কেবলমাত্র আর্থিক বিষয় নয়। অপর একজন ভাই/ বোনকে সাহায্য করার জন্য একজন মানুষ তার ধন, সম্পদ, জ্ঞান, সময় এমনকি তার জীবন পর্যন্ত দান করতে পারে। কাজেই, ইনফাক একটি সামাজিক পরিভাষা। যদিও বর্তমানে ইনফাকের কথা এলে শুরুতেই আমাদের মাথায় আসে আর্থিক সাহায্যের বিষয়টি। প্রকৃতপক্ষে, ইনফাকের একইসাথে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক, অর্থাৎ দ্বিমাত্রিক অর্থ আছে। ইনফাকের বিষয়টি একজন ব্যাক্তিকে যেমন বিকশিত করে থাকে, অনুরূপভাবে তা সামাজিক সংহতি ও বিকাশের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ইনফাকের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা, নিজের সময়-সম্পদ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া এবং ত্যাগের মানসিকতা তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ বস্তুগত ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হতে পারে। অতএব, ইনফাকের ক্ষেত্রে আর্থিক দিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ একইসাথে আধ্যাত্মিক দিকটাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে আমি ইনফাকের বিষয়টিকে ৫টি ভাগে ভাগ করে থাকিঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. কথার মাধ্যমে দান।<br />
২. ইলম ও মারেফাতের মাধ্যমে দান।<br />
৩. সময়ের মাধ্যমে দান।<br />
৪. জীবনের মাধ্যমে দান।<br />
৫. সম্পদের মাধ্যমে দান।</p>
<p><strong>১.</strong> <strong>কথার মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে কাউকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে, কাউকে ভালো উপদেশ দেয়ার মাধ্যমে, কাউকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে তার উপকার করা। এগুলো ইনফাকের গুরুত্বপূর্ণ দিক।</p>
<p><strong>২.</strong> <strong>ইলম বা মারেফাতের মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে কোনো উপকারী জ্ঞানকে শিক্ষা করে সে জ্ঞানকে সবার সামনে তুলে ধরা, অন্যকে শিক্ষা দেয়া, বিশেষ করে যুবকদের কাছে তুলে ধরা। একই সাথে সে জ্ঞানটি আমাদের বাস্তব জীবনে কিভাবে কাজে লাগতে পারব সেটিকেও সবার সামনে উপস্থাপন করা।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16657 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d.jpg" alt="" width="735" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d.jpg 735w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d-300x180.jpg 300w" sizes="(max-width: 735px) 100vw, 735px" /></p>
<p><strong>৩.</strong> <strong>সময়ের মাধ্যমে ইনফাক</strong>—এটি হচ্ছে, কেউ যদি আপনার কাছে আসে, এসে সাহায্য-সহযোগিতা চায়; সেটি যেকোন বিষয়ে হতে পারে, যেমনঃ আর্থিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক। এই ব্যাপারে তাকে সময় দেয়া, তার সাথে গিয়ে তার সমস্যার সমাধান করা। এছাড়া সমাজে কোনো বিষয়ে সমস্যা থাকলে সে সমস্যার সমাধানের জন্য সময় বের করা এবং সেগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া হল সময়ের মাধ্যমে ইনফাক।</p>
<p><strong>৪.</strong> <strong>জীবনের মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে প্রয়োজনে জীবনের মায়াকে ত্যাগ করে হলেও অন্যের কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টা চালানো; এমনকি এতে যদি নিজের জীবনও বিপদাপন্ন হয়, তবুও চেষ্টা করা।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোভিড-১৯ এর সময় অনেক ডাক্তার, নার্স এবং হাসপাতালে কর্মরত মানুষজন রোগীদের সেবা দেয়া ও সুস্থ করার জন্য নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হন। শত শত নার্স, ডাক্তার ও চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যাক্তিরা অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেই মৃত্যুবরণ করেন। এটি হচ্ছে জীবন দিয়ে ইনফাকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে আমাদের মায়েরা। তারা তাদের সন্তানকে লালন পালন করার জন্য, তাদের বড় করার জন্য নিজের স্বাস্থ্য, ঘুম থেকে শুরু করে সবধরণের ত্যাগ স্বীকার করেন। বাবারা সন্তানদের হয়তো আর্থিকভাবে লালন পালন করার জন্য, ঘর পরিচালনার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। কিন্তু একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মায়েরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। এক কথায় বলতে গেলে, তারা তাদের জীবন দিয়ে একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।</p>
<blockquote><p><strong>আমাদের সামনে ইনফাকের সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হলো, আমাদের গাজার ভাইবোনেরা। উম্মতের ইজ্জতকে রক্ষা করার জন্য, আমাদের প্রথম ক্বিবলা বায়তুল মাকদিসকে রক্ষা করার জন্য, নিজেদের জন্মভূমিকে রক্ষা করার জন্য, এককথায় বলতে গেলে গোটা উম্মতের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য তারা তাদের জীবন দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন।</strong> <strong>গাজার নারী, শিশু থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ এর মধ্যে শামিল। তাই, আমি মনে করি এটি জীবন দিয়ে ইনফাকের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।</strong></p></blockquote>
<p><strong>৫.</strong> <strong>ধন-সম্পদ বা মালের মাধ্যমে ইনফাক।</strong> এটি হচ্ছে কারো যদি আর্থিক সামর্থ্য থাকে, সে ক্ষেত্রে যারা দরিদ্র, নিপীড়িত; তাদের সাথে নিজের সম্পদ ভাগাভাগি করে নেয়া। এটিকে আবার ৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ</p>
<p>ক) এর প্রথমটি হচ্ছে <strong>তাসাদ্দুক বা সাদাকাহ বা সদকা</strong>। এটি ইনফাকের সামগ্রিক একটি পরিভাষা। এক অর্থে বলতে গেলে এটি ইনফাকের সকল বিষয়কে পরিগ্রহ করে থাকে। এই সদকা সম্পর্কে রাসুল (সা.) এর একটি হাদীস রয়েছে। এ হাদীসে তিনি সদকাকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;প্রতিটি ভালো কাজই সদকা”</p></blockquote>
<p>বর্তমানে আমরা সদকা বলতে বুঝি, কেউ যদি এসে সাহায্য চায় তাকে সাহায্য করা, গরীব লোকদের খাবার দেয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ, আমরা এটিকে খুবই সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু রাসূল (স.) এটিকে সামগ্রিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। কারো সাথে দেখা হলে মুচকি হাসি দেয়া সদকা, কাউকে পথ প্রদর্শন করা সদকা, পশুপাখিকে খাবার দেয়া, অনুবাদ করা, কোনো একটি ভালো কিছু তৈরি করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, শিশু বা বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলানোসহ সকল ভালো কাজই সদকা। এগুলো সবই হাদিসের মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16658 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-1024x720.jpg" alt="" width="1024" height="720" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-1024x720.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-300x211.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-768x540.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c.jpg 1080w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>খ) সদকার আরেকটি রূপ হচ্ছে <strong>সদকায়ে ফিতর বা সদকাতুল ফিতর</strong>। এটি শুধু রমজান মাসের জন্য নির্দিষ্ট। অন্য কোনো সময়ের জন্য নয়। সদকাতুল ফিতর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সদকাতুল ফিতর হচ্ছে এই রমজানে যারা বেঁচে আছে তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহকে দেয়া একটি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহকে খুশি করার জন্য দরিদ্র ব্যাক্তিকে ফিতরা সদকা দেয়া। সদকায় ফিতর এমন একটি জিনিস, যার জন্য ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যাকাতের মতো নিসাব পরিমাণ মাল বা সম্পদের অধিকারী হতে হবে এমন নয়। এটি যে কেউ দিতে পারে। যাকাতের ক্ষেত্রে বাড়ির কর্তা বা যে সম্পদের অধিকারী সে-ই মূলত যাকাত দিয়ে থাকে। অন্যদের পক্ষ থেকে আদায় করা হয় না। কিন্তু সাদাকাতুল ফিতর জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুর জন্য তার পিতা-মাতা দিয়ে থাকে। এটি একটি অসাধারণ বিষয়।</p>
<p>গ) সদকার তৃতীয় রূপ হচ্ছে <strong>যাকাত</strong>। যাকাত হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী ব্যাক্তির সম্পদের একটি অংশকে দান করা। এটি ইসলামের ৫টি স্তম্ভের একটি। সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য যাকাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ বলেনঃ</p>
<blockquote><p>&#8220;خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ&#8221;</p>
<p>অর্থ: (হে নবী!) তুমি তাদের ধন-সম্পদ হতে সাদাকাহ গ্রহণ কর, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করে দিবে, আর তাদের জন্য দু‘আ কর। নিঃসন্দেহে তোমার দু‘আ হচ্ছে তাদের জন্য শান্তির কারণ, আর আল্লাহ খুব শোনেন, খুব জানেন।</p></blockquote>
<p>এখানে রাসুলকে (স.) নির্দেশ করা হয়েছে, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্দেশ করা হয়েছে। <strong>যাকাত দেয়ার মাধ্যমে ধনীদের ধন-সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা এর প্রধান উদ্দেশ্য। এখানে ‘তুতাহহির’ শব্দটির মাধ্যমে সম্পদ কমানো বা নেয়ার জন্য বলা হচ্ছেনা বরং তাদের পরিশুদ্ধ করো বা পবিত্র করো এটি বলা হয়েছে।</strong> যাকাতের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাকাতের মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পদ পরিশুদ্ধ হয়, ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়। এখানে যাকাত ও ‘তুযাক্কি’ একই শব্দমূল থেকে এসেছে।</p>
<p>ঘ) সদকার আরেকটি দিক হচ্ছে <strong>কর্জে হাসানা</strong>। এটি হলো কোন ধরনের বিনিময় প্রত্যাশা না করে কাউকে ঋণ দেয়া। কোন কষ্টে বা সমস্যায় নিপতিত ব্যাক্তিকে কোন সুদ বা দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ ছাড়া ঋণ দেয়াকে ইসলামের অনেক বড় ফজিলত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এটি এমন একটি বিষয়, যেমন কোনো ব্যাক্তি কোনো সমস্যার কারণে ঋণ চাচ্ছে, এমতাবস্থায় আপনি জানেন যে, এটি তার পক্ষে ফেরত দেয়াটা খুবই কঠিন। এমনকি তিনি ফেরত নাও দিতে পারেন—এটি জেনেও তাকে ঋণ দেয়া এবং মনে করা যে আপনি আল্লাহকে ঋণ দিচ্ছেন, এভাবে তাকে ঋণ দেয়া। অর্থাৎ, কোনো ধরণের বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই দিয়ে দেয়া। সে যদি তা ফেরত দেয় তো ভালো, আর যদি দিতে না পারে তাহলে আল্লাহ স্বয়ং নিজে এর বিনিময় দিবেন। কর্জে হাসানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে ঋণ নিবে সে যেনো এর অপব্যবহার না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি নিবে তাকেও অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে, সে যেনো এই নিয়তে না আসে যে, তার কাছে সম্পদ আছে, সেতো দিবেই আমি আর ফেরত দিবোনা, তাহলে এটি আল্লাহর সাথেই প্রতারণা করা হলো। এর হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এজন্য সম্ভব হলে অবশ্যই পরিশোধ করার নিয়্যত থাকতে হবে।</p>
<blockquote><p>مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَهٗ لَهٗۤ اَضۡعَافًا كَثِیۡرَۃً ؕ وَ اللّٰهُ یَقۡبِضُ وَ یَبۡصُۜطُ ۪ وَ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ</p>
<p>অর্থ: এমন ব্যক্তি কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম কর্জ প্রদান করবে? তাহলে তার সেই কর্জকে তার জন্য আল্লাহ বহু গুণ বর্ধিত করে দেবেন এবং আল্লাহই সীমিত ও প্রসারিত ক’রে থাকেন এবং তাঁর দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।</p></blockquote>
<p>কর্জে হাসানার বিষয়টি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটানো উচিত এবং কর্জে হাসানার অপব্যবহার যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। কোরআন আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, ইনফাক হচ্ছে বরকতের একটি উৎস, একইসাথে এটি আমাদের ধন-সম্পদ হ্রাস করেনা, বরং বৃদ্ধি, পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে।<br />
কর্জে হাসানা বা বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়া দান করলে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কখনো সাতগুণ, কখনো একশতগুণ, আবার চাইলে সাতশতগুণ বা অফুরন্ত নিয়ামতে একজন ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ করতে পারেন। তাই আমরা বলে থাকি— দান, সদকা, যাকাত সম্পদকে হ্রাস করেনা, বরং বৃদ্ধি করে। সম্পদের বরকতের বড় একটি উৎস এই দান-সদকা।</p>
<blockquote><p>مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ حَبَّۃٍ اَنۡۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِیۡ كُلِّ سُنۡۢبُلَۃٍ مِّائَۃُ حَبَّۃٍ ؕ وَ اللّٰهُ یُضٰعِفُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ</p>
<p>অর্থ: যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।</p></blockquote>
<p>ঙ) সদকার পঞ্চম যে শ্রেণী, তা হচ্ছে <strong>ফিদিয়া বা কাফফারা</strong>। কেউ রোযা রাখতে অক্ষম হলে তার পরিবর্তে যে দান, বা ওয়াদা রাখতে না পারলে কিংবা এরকম বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দান হলো ফিদিয়া বা কাফফারা। যদি কেউ অসুস্থতার কারণে বা অন্য কোন কারণে রোজা রাখতে না পারে তাহলে সে পরের মাসে কাযা করবে। কিন্তু তার অসুস্থতা যদি এমন হয় যে, তার পক্ষে পরেও কাজা করা সম্ভব না, স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্ভাবনা বা মৃত্যু ঝুঁকি থাকে তাহলে সে ফিদিয়া দিবে। কিন্তু অনেকে এটির অপব্যবহার করে থাকে; ক্লাস, কাজ এসব অজুহাতে রোযা রাখেনা। মনে করে, আমার সামর্থ্য আছে আমি ফিদয়া দিয়ে দিবো। এভাবে এই বিধানের অপব্যবহার করে থাকে। এটি এক অর্থে আল্লাহর সাথে প্রতারণা। আর আল্লাহর সাথে যে প্রতারণা করে, সে নিজেই প্রতারিত হয়।</p>
<p>দান-সদকা এগুলোর জন্য আন্তরিক নিয়্যত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বরকত হওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো, পবিত্র ও হালাল জিনিস দান করতে হবে। নাহলে এটি বরকতের উৎস হবে না।</p>
<blockquote><p>﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِآخِذِيهِ إِلَّا أَن تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ</p>
<p>অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করোনা। কেননা, তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। (সূরা বাকারা, ২৬৭)</p></blockquote>
<p>কোনো একটি পোশাক পুরনো হয়ে গেলে সেটি ফেলে দেয়ার আগে কাউকে দিয়ে দেওয়া বা খাবার খেয়ে কিছু রয়ে গেছে; তা ফেলে দেয়ার আগে দিয়ে দেয়াকে দান বুঝায় না। নতুন কোনো কিছু বা সবচেয়ে সুন্দর কোনো কিছু দান করা হলো উত্তম দান।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16663 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero.jpg" alt="" width="936" height="600" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero.jpg 936w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero-300x192.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero-768x492.jpg 768w" sizes="(max-width: 936px) 100vw, 936px" /></p>
<p>ইনফাক হচ্ছে বান্দাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া ও অপর ভাইয়ের প্রতি ধন্যবাদ।</p>
<p>বান্দার প্রতি ধন্যবাদ তিনভাবে হয়ে থাকেঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১. আমাদের উপর তাদের যে অধিকার সেটি আমরা পূরণ করে দিচ্ছি</strong><br />
<strong>২. তাদের দেয়ার কারণে আমাদের সম্পদ পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হচ্ছে</strong><br />
<strong>৩. যখন সমাজে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষ থাকবেনা, তখন সমাজে বিশৃংখলা ও অপরাধ কমে যাবে এবং শান্তি বিরাজ করবে। কাজেই, সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।</strong></p>
<p>ইনফাকের অন্যতম উদ্দেশ্য সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সংহতি ও সামাজিক আদালত নিশ্চিত করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এটি একটি পন্থা। যে ব্যক্তি দান করে, সে আধ্যাত্মিকভাবে প্রশান্তি লাভ করে; একই সাথে সে কৃপণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে সামাজিকভাবে শ্রদ্ধা অর্জন করে এবং দানের যে সংস্কৃতি সেটিকে বিকশিত করে।<br />
আল্লামা ত্বহা আবদুর রহমান এর ভাষায়, ইনফাক আমাদের আমানতের যে চেতনা সেটিকে জাগ্রত করে থাকে। অর্থাৎ এই পৃথিবীর যা কিছু আছে সবই আমাদের নিকট আমানত এই চেতনা জাগ্রত করে আর আমাদের নিজেদের এর মালিক ভাবার চেতনা হ্রাস করে।</p>
<p>অনেক গবেষণায় আমরা দেখতে পাই যে, যদি পৃথিবীর সব ধনী মুসলমানেরা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করতো, তাহলে পৃথিবীর কোথাও দারিদ্র‍্য ও সামাজিক বৈষম্য থাকতোনা।</p>
<p>ফরাসি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ রজার গারাউডির ভাষায়ঃ</p>
<p>&#8220;যাকাত এমন কোনো বিষয় নয় যা মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এটা আমাদের ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়। <strong>যাকাত হচ্ছে এমন একটা বিষয় যা মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা বা কৃপণতার যে প্রবণতা আছে তাকে পরাভূত বা পরাজিত করতে সাহায্য করে।</strong> মানুষের পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক একটি রূপ হচ্ছে যাকাত। এটিকে বাধ্যতামূলক ও আধ্যাত্মিক একটি কর্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যাকাত একইসাথে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সকল সম্পদের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। <strong>ব্যক্তি চাইলে তার ইচ্ছামতো এর ব্যবহার করতে পারবেনা। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবেই ব্যয় করতে হবে। এটি একটি আমানত।</strong> শুধু তাই নয়। সে যে এই সমাজের সদস্য, অন্য মানুষের সাথে তার একটি সম্পর্ক আছে, সেই সম্পর্কের প্রতি তার একটি দায়বদ্ধতা আছে; এটি তাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় যাকাত।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা যদি কোরআনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, কোরআনে নামাজ এবং যাকাতের কথা একই সাথে উল্লেখিত হয়েছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱرْكَعُوا۟ مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ&#8221;</p>
<p style="padding-left: 40px;">১। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর। (বাকারা, ৪৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">اَلَّذٖينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقٖيمُونَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَۙ</p>
<p style="padding-left: 40px;">২। যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়েম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। (বাকারা, ৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">وَاَقٖيمُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتُوا الزَّكٰوةَؕ وَمَا تُقَدِّمُوا لِاَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللّٰهِؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصٖيرٌ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৩। এবং তোমরা নামায আদায় কর, যাকাত দাও এবং যা কিছু সৎ কার্যাবলী তোমরা স্বীয় আত্মার জন্যে আগে পাঠাবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকট পাবে। তোমরা যা কিছু করছো নিশ্চয়ই আল্লাহ তা দেখছেন। (সূরা বাকারা, ১১০)</p>
<p style="padding-left: 40px;">لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلٰٓئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيّٖنَۚ وَاٰتَى الْمَالَ عَلٰى حُبِّهٖ ذَوِي الْقُرْبٰى وَالْيَتَامٰى وَالْمَسَاكٖينَ وَابْنَ السَّبٖيلِ وَالسَّٓائِلٖينَ وَفِي الرِّقَابِۚ وَاَقَامَ الصَّلٰوةَ وَاٰتَى الزَّكٰوةَۚ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ اِذَا عَاهَدُواۚ وَالصَّابِرٖينَ فِي الْبَأْسَٓاءِ وَالضَّرَّٓاءِ وَحٖينَ الْبَأْسِؕ اُو۬لٰٓئِكَ الَّذٖينَ صَدَقُواؕ وَاُو۬لٰٓئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৪। তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে এতে কোন কল্যাণ নেই বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি এবং আল্লাহর ভালবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাকাত বন্টনকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিস্কৃতি দিতে দান করবে এবং নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিতে থাকবে, ওয়া‘দা করার পর স্বীয় ওয়া‘দা পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে— এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই মুত্তাকী। (সূরা বাকারা, ১৭৭)</p>
<p style="padding-left: 40px;">الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِى ٱلْأَرْضِ أَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُوا۟ بِٱلْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا۟ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلْأُمُورِ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৫। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি যমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে। (হজ্জ, ৪১)</p>
<p style="padding-left: 40px;">رِجَالٌۙ لَا تُلْهٖيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللّٰهِ وَاِقَامِ الصَّلٰوةِ وَاٖيتَٓاءِ الزَّكٰوةِۙ يَخَافُونَ يَوْماً تَتَقَلَّبُ فٖيهِ الْقُلُوبُ وَالْاَبْصَارُ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৬। সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখেনা, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। (সূরা নূর, ৪৯)</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16659 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451.jpg" alt="" width="1000" height="668" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451.jpg 1000w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451-768x513.jpg 768w" sizes="(max-width: 1000px) 100vw, 1000px" /></p>
<p>ইনফাক মানুষকে একই সাথে কিভাবে রূহগত ও সামাজিকভাবে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করে সেই ব্যাপারে হযরত পয়গাম্বর (সঃ) বলেন,</p>
<p style="padding-left: 40px;">اَلْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى<br />
দানকারীর হাত গ্রহণকারীর হাতের চেয়ে উত্তম। (বুখারী, যাকাত, ১৮)</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ&#8221;<br />
যদি কেন কোন মু’মিনের কোন একটি দুনিয়াবী সমস্যাকে দূর করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিন তার একটি সমস্যাকে দূর করে দিবেন। (মুসলিম, বিরর, ৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنًى&#8221;<br />
সর্বোত্তম সাদাকা হলো, প্রয়োজনের অতিরিক্তকে দান করে দেওয়া। (বুখারী, যাকাত, ১৮)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইনফাক বা দানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরিঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. <strong>দান শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা পাওয়ার জন্য করতে হবে।</strong><br />
২. সময়মতো সাহায্য করা। দেখা গেছে যে, কোনো অসুস্থতা বা প্রয়োজনের সময় দান না করে যদি পরে দান করা হয় তাহলে তার খুব বেশি উপকার হবে না। এজন্য সময়মত দান করার চেষ্টা করতে হবে।<br />
৩. <strong>গোপনে দান করা ও প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকে দূরে থাকা।</strong> তবে এটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন ফাউন্ডেশন বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এধরণের কাজকে উৎসাহ দেয়ার জন্য এটিকে দৃশ্যমান করা বা প্রচার করার মধ্যে সমস্যা নেই।<br />
৪. <strong>সম্পদের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস দান করা।</strong> অব্যবহৃত বা মূল্যহীন কিছু দেয়ার চেয়ে ব্যাক্তি যা পছন্দ করে সেখান থেকে দেয়া সবচেয়ে উত্তম।<br />
৫. দেয়ার সময় কোনো ধরনের অপচয় না করা, আবার কৃপণতা থেকেও মুক্ত থাকা। এখানে ব্যক্তি একটি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে।<br />
৬. <strong>যাদের সত্যিকার অর্থে প্রয়োজন তাদের ক্রমাগত সাহায্য করা।</strong><br />
৭. ব্যক্তির উপার্জিত সকল অর্থ দান করা যাবে না। তার পরিবার-পরিজনসহ যাদের প্রতি তার দায়িত্ব আছে তাদের প্রতিপালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রেখে বাকীটা দান করতে হবে।</p>
<p>তাকওয়ায় উপনীত হওয়ার দুটি উপায় আছেঃ</p>
<ul>
<li><strong>১. ইনফাক</strong></li>
<li><strong>২. কল্যাণকর কাজ</strong><br />
ইনফাকও এক ধরণের কল্যাণকর কাজের অংশ।</li>
</ul>
<p>ইসলামী আখলাকের দৃষ্টিকোণ থেকে ইনফাক করার সময় আমাদের দুটি বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবেঃ</p>
<ul>
<li><strong>১. ইসরাফ</strong></li>
<li><strong>২. তাবজির</strong></li>
</ul>
<p>রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;তোমরা ইসরাফ অর্থাৎ অপচয়ের দিকে ধাবিত না হয়ে, অহংকার বা নিজেকে গৌরবান্বিত করার রোগে আক্রান্ত না হয়ে খাও, পান করো ও পরিধান করো এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করো। আল্লাহ তোমাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তা যেনো দৃশ্যমান হয়।&#8221; (বুখারী)</strong></p>
<p>কারো যদি সামর্থ্য থাকে সে ভালো খাবে, ভালো পরিধান করবে, সুন্দর থাকবে এটি আল্লাহ বান্দার কাছ থেকে দেখতে চান।</p>
<p>এ ইনফাক বা ব্যয় করার ক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে একটি পরিভাষা হচ্ছে <strong>তাবজির।</strong> তাবজির হচ্ছে অযথা খরচ বা আল্লাহ যা পছন্দ করেননা, সেখানে খরচ করা। হাদিসে এসেছে, <strong>&#8220;তাবজিরকারী শয়তানের ভাই।&#8221;</strong></p>
<p>এটি ইসরাফের চেয়ে আরেকধাপ এগিয়ে। এই তাবজিরের ব্যাপারে আল্লাহ কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন।</p>
<blockquote><p>وَ اٰتِ ذَاالۡقُرۡبٰی حَقَّهٗ وَ الۡمِسۡكِیۡنَ وَ ابۡنَ السَّبِیۡلِ وَ لَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا<br />
অর্থ: আত্মীয় স্বজনকে দিবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও, এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা।</p></blockquote>
<p>আমরা যদি সম্পদকে আখলাকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে এটি আমাদের জন্য একটি নিয়ামত, আবার একইসাথে এটি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষাও। পবিত্র কোরআনের কিছু কিছু আয়াতে আমরা দেখতে পাই, ধন-সম্পদকে মুমিনদের জন্য ফিতনা ও পরীক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার সম্পদকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যয় করাকে একটি গুনাহের কাজ, একটি দায়িত্বহীন কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানদের অজুতে পানি অপচয় না করা, একেবারে উদরপূর্তি করে না খাওয়া, খাবারের টেবিলকে সাদামাটা রাখা এসব বিষয়ে রাসূলে কারীম (স.) উৎসাহিত করেছেন। আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার, পোশাক ও দামি আসবাবপত্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মুমিনের জীবন হতে হবে সাধারণ ও অনাড়ম্বর।</p>
<p>ইসরাফ ও তাবজিরের পার্থক্যের ক্ষেত্রে আলেমেরদের অনেকের বক্তব্য রয়েছে। এখানে আমি <strong>আল-মাওয়ার্দির</strong> বক্তব্যটি উল্লেখ করছি,</p>
<p>তার মতে, <strong>“ইসরাফ হচ্ছে সঠিক জায়গায় প্রয়োজনের অধিক ব্যয় করা; তাবজির হচ্ছে আল্লাহ পছন্দ করেননা এমন জায়গায় ব্যয় করা, আল্লাহর অবাধ্যতা যেখানে আছে সেখানে ব্যয় করা।”</strong></p>
<p>ইনফাক এর প্রভাব কেবল ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সমাজের ভারসাম্যকে নিশ্চিত করে থাকে। এটি একটি পবিত্র কাজ, এটি আমাদের পারস্পরিক ভাগাভাগি (শেয়ারিং) এর বিষয়টিকে বৃদ্ধি করে থাকে, একই সাথে যে দান করে ও যে দান গ্রহণ করে উভয়কে আত্মিকভাবে প্রশান্তি দিয়ে থাকে। এজন্য ইনফাককে একটি জীবনধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করা আমাদের ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এ বিষয়টি সবসময় জানা থাকতে হবে যে, ধনী হওয়া কিংবা দরিদ্র‍তা—এটি পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিক্রমায় একজন ধনী ব্যক্তিও দরিদ্র হয়ে যেতে পারে, আবার একজন দরিদ্র ব্যক্তিও ধনী হতে পারে। এজন্য ধন-সম্পদ আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হচ্ছে তাকওয়া। একজন ব্যক্তি গরীব হলে গরীব থাকা অবস্থায় যে দায়িত্বগুলো পালন করা সম্ভব, সেগুলো পালন করবে; ধনী হলে ধনী থাকা অবস্থায় যে দায়িত্বগুলো পালন করা প্রয়োজন সেগুলো পালন করবে। তাহলেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রিয় হওয়া যাবে।</p>
<p>আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে এই বিষয়ের আলোকে আমল করার তৌফিক দান করুক। আমাদের সামাজিক সংহতি তৈরি করার তৌফিক দান করুক। ইনফাককে আমাদের জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাওফিক দান করুক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16655</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতায় শিল্পকলা ও নান্দনিকতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/art-and-aesthetics-in-islamic-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/art-and-aesthetics-in-islamic-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 24 Feb 2026 13:10:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16588</guid>

					<description><![CDATA[মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর &#8211; “আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন”[1] – এই কথার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের যে আকল সেই আকল]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর &#8211; <strong>“আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন”</strong><a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a> – এই কথার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের যে আকল সেই আকল কর্তৃক আল্লাহ তায়ালার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা সম্ভবপর নয়। তবে তাঁর যে সৌন্দর্য সেটা তাঁর জামাল সিফাতের মাধ্যমে তার সৃষ্টিতে যে অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে সেটার মাধ্যমে একটু হলেও উপলব্ধি করা যেতে পারে।</p>
<p>কেননা মহান প্রভু যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন সেটাকেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে&nbsp; তৈরি করেছেন।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a> এই মহাবিশ্ব হলো, <strong>&#8216;আহসানুল খালিকীন&#8217;</strong> মহান প্রভুর এক অপরূপ শিল্পকর্ম। এই ভাবে বিন্দু থেকে সিন্ধু পর্যন্ত সমগ্র মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সৌন্দর্য, সুর, শৃঙ্খলা, পরিমিতি, রুচি, কোমলতা ও স্বকীয়তা বিদ্যমান।</p>
<div class="image-container">
  <img loading="lazy" decoding="async" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/1.jpg" alt="" width="500" height="650"><br />
  <img loading="lazy" decoding="async" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/2.jpg" alt="" width="500" height="650">
</div>
<style>
.image-container {
  display: flex;
  gap: 20px;
  justify-content: center;
  align-items: center;
  flex-wrap: wrap;
}</p>
<p>.image-container img {
  max-width: 100%;
  height: auto;
}</p>
<p>@media (max-width: 768px) {
  .image-container {
    flex-direction: column;
    gap: 20px;
  }
}
</style>
<p>মানুষকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সৃষ্টিকারী আমাদের মহান রব, দ্বীনের প্রতি যেরূপ আবেগ দিয়েছেন&nbsp; অনুরূপভাবে নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যবোধকেও মানুষের ফিতরাতের মধ্যে বপন করে দিয়েছেন। এ কারণে মানুষ তাঁর সৃষ্টির সূচনাকাল থেকেই সঠিক, সুন্দর ও ভালোর মতই নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যের দিকেও ছুটে চলেছে। সকল পয়গাম্বর-ই মানুষকে তাওহীদের পাশাপাশি সুন্দর ও নান্দনিকতাকেও শিখিয়েছেন। এই বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হযরত পয়গাম্বর (স) – এর জীবনও সৌন্দর্য, লাবণ্য, সুষমা ও নান্দনিকতার উপমায় ভরপুর। <strong>রাসূলে আকরাম (স)- এর নেতৃত্বে প্রথম মুসলিম প্রজন্ম তথা সাহাবীগণ মদীনায় তাঁদের মসজিদ, তাঁদের কিবলা, তাঁদের আজান, তাঁদের স্থাপত্য, তাঁদের হস্তশিল্পে এবং শহরকে গড়ে তুলেছিলেন। এভাবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁরা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রথম দৃষ্টান্ত রেখে যান। &nbsp;ফলশ্রুতিতে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার প্রথম বীজ মদীনার সমাজেই রোপিত হয়েছিলো। সমগ্র ইতিহাকাল ধরে মুসলমানদের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণাকে গঠনের ক্ষেত্রে তাওহীদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং সদকায়ে জারিয়া, আমলে সালেহ করার নিয়ত ও চিন্তা, শিল্প ও চারুকলার বিভিন্ন শাখার বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।</strong> ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার উৎস হলো, কোরআন ও সুন্নত। মূলত ‘ইহসান’ নামক মূলনীতি (সবকিছুকেই সুন্দরভাবে করা ও সর্বদা সর্বোত্তম আচরণ করার নীতি)–ই হলো এই শিল্পকলা ও নান্দনিকতার মূলভিত্তি। ইহসান যেমন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে, একইভাবে তা আত্মিক ও শারীরিক নান্দনিকতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। সাদামাটা হওয়া, যথার্থ উপযোগিতা, প্রশান্তিজ্ঞাপক হওয়া, ব্যবহারযোগ্যতা, সাশ্রয়ী হওয়া, বিনয়ভাব প্রকাশ করা, স্বাভাবিকতা এবং ইহসানের আখলাক এগুলো হলো ইসলামে শিল্পভাবনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।</p>
<div class="image-container"><img loading="lazy" decoding="async" class="" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/3.jpg" alt="" width="500" height="650"></div>
<p>&nbsp;ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা শিল্প ও নান্দনিকতার অসংখ্য সব মহাকীর্তি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইট ও পাথরে জ্ঞান ও হিকমতকে নকশা করে নান্দনিকতার মূর্তপ্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা মসজিদসমূহ, সুর থেকে হৃদয়ে বয়ে যাওয়া সঙ্গীত, সচেতন দ্বীনদারীর মধ্য দিয়ে জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগের ফল হিসেবে গড়ে উঠা শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এবং যতটা সম্ভব সূক্ষ্ম দ্বীনদারীর ছাপ বহনকারী অসংখ্য স্থাপত্যকর্মের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প শুধু পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে শুধুমাত্র একটি শৈল্পিক অলঙ্করণের মতো সূক্ষ্মভাবে গাঁথাই হয়নি, একইসাথে তা পরকালের অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আত্মা ও হৃদয়ের আধ্যাত্মিক আবহতেও গভীর ছাপ রেখেছে।</p>
<p>এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পাথরখণ্ডগুলো মেহমেদ আগা ও খোজা সিনানের মত বিখ্যাত সব স্থাপত্যবিদের হাতে মসজিদ, ইমারত, সরাইখানা, ফোয়ারা ও সেতুতে রূপান্তরিত হয়ে একটি সৌন্দর্য ও অর্থবহতা তৈরি করেছে। সুলতান আহমেদ, সুলেইমানিয়া, সেলিমিয়া ও অন্যান্য মসজিদসমূহ লাভী, লামী ও দেদে এফেন্দি ও ইত্রি বেয়- এর রঙ, ছন্দ ও সঙ্গীতের স্পর্শে অনুরণিত হয়েছে। সুলেয়মান চেলেবি, ফুজুলী, ইউনুস এমরে ও রুমির বালাগাত ও ফাসাহাতে ভাষা ও সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা ক্যালিওগ্রাফি, জলরঙ ও মনোরম টাইলসের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প ও নান্দনিকতার শ্রেষ্ঠ উপমাকে প্রদর্শন করেছে। ইসলামী শিল্পের এই অমূল্য নান্দনিক কর্মসমূহের সামনে মানুষ তার বিস্ময় ও মুগ্ধতা লুকাতে পারে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলামী সভ্যতা কেবলমাত্র জ্ঞান, চিন্তা ও ইরফানের সভ্যতাই নয়, একই সাথে তা নান্দনিকতা ও শিল্পের সভ্যতাও বটে।&nbsp;</p>
<div class="image-container"><img loading="lazy" decoding="async" class="" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/image_2026-02-24_15-28-45.jpg" alt="" width="500" height="650"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignleft" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/image_2026-02-24_15-31-50.jpg" alt="" width="443" height="667"></div>
<p>&nbsp;আধুনিক যুগে এসে ইসলামী সভ্যতা তাঁর নান্দনিকতা ও শিল্পমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীরতাকে হারানো শুরু করেছে। <strong>ইসলামের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণা আমাদের শহর, মেট্রোপলিস, মেগাপলিসগুলোতে তো নয়ই, আমাদের মসজিদ স্থাপত্য ও শিক্ষাকেন্দ্রসমূহেও প্রতিফলিত হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য ইসলামী শিল্পকলার অনেক দিক শুধুমাত্র চর্চার অভাবে আজ বিলুপ্তির পথে!</strong> এক্ষেত্রে মুসলিম&nbsp; উম্মাহ বিগত কয়েক শতক ধরে যে কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছে ইসলামী শিল্পকলা বিলুপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এর প্রভাব রয়েছে। মুসলমানগণ অতীতে শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে অসাধারণ সব উপমা সৃষ্টি করলেও, সেই উপমাসমূহের উপর ভিত্তি করে আধুনিক যুগের নান্দনিকতা ও শিল্পের দৃষ্টিকোণকে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মৌলিক ছাপ ও কাজ তৈরিতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।</p>
<p>শিল্প হলো এমন একটি বিষয়, যেখানে নির্দিষ্ট কোন একটি কাজের নান্দনিক অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেটাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবে শুধুমাত্র কিছু ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। শিল্পের অনেক মৌলিক শাখাকে উপেক্ষা করে সেটাকে শুধুমাত্র সঙ্গীত, নাটক, সিনেমার মতো ভিজুয়্যাল কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ মনে করা এবং এই ক্ষেত্রগুলোর ছায়াতলে আটকে পড়া অনেক বড় একটি সমস্যা।</p>
<div class="image-container"><img loading="lazy" decoding="async" class="" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/the-nasir-al-mulk-mosque-royalty-free-image-1580500453.jpg" alt="" width="760" height="508"></div>
<p>একইভাবে, শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে মুসলমানরা শতাব্দীকাল ধরে যে শিল্পকর্মগুলো সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর মাধ্যমে তাঁরা শিল্প, সৌন্দর্য ও পরিশীলিত রুচিবোধকে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে মেটাফিজিক্স ও অতীন্দ্রিয়তাকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়ার যে মনোভাব, এর প্রভাবে ইসলাম ও শিল্পকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা রীতিমত ভুল একটি চিন্তা।</p>
<p>পরিশেষে বলতে হয়, শুধুমাত্র অতীতের শিল্পকর্মসমূহকে প্রদর্শন করে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতাকে তুলে ধরা ও পরিচিত করানো সম্ভবপর নয়। ইসলামী শিল্পকলার ধারণাকে আধুনিক যুগে আবারও সকল বৈচিত্র্যসহ মৌলিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করা এবং সমগ্র মানবজাতির প্রশংসার জন্য উপস্থাপন করা, সৌকর্যময়তার প্রতীক হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আল্লাহর সৌন্দর্যে সম্মানিত হতে ইচ্ছুক সকল মুমিনদের উপর একটি &nbsp;আবশ্যকীয় দায়িত্ব।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong>&nbsp;<a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> মুসলিম, ঈমান, ৪।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> আস-সাজদা, ৭৭।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/art-and-aesthetics-in-islamic-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16588</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করে</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-society-islam-establishes/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-society-islam-establishes/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 08 Aug 2025 07:47:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16026</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম মানবজাতিকে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি এবং ধর্মপরায়ণ পরিবারের পাশাপাশি ধর্মপরায়ণ সমাজের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সমাজ ঈমান ও পুণ্যের সমাজ, এ সমাজ পরিপূর্ণ ঈমানদারদের সমাজ, যারা বস্তুবাদের বলয় থেকে মুক্ত থাকে, প্রভুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে, একে অপরের সাথে সদাচরণ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম মানবজাতিকে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি এবং ধর্মপরায়ণ পরিবারের পাশাপাশি ধর্মপরায়ণ সমাজের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সমাজ ঈমান ও পুণ্যের সমাজ, এ সমাজ পরিপূর্ণ ঈমানদারদের সমাজ, যারা বস্তুবাদের বলয় থেকে মুক্ত থাকে, প্রভুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে, একে অপরের সাথে সদাচরণ করে এবং আদালত ও পারস্পরিক পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে একে অপরকে উপদেশ দেয়, যেভাবে তাদের পালনকর্তা কোরআনে বর্ণনা করেছেন,</p>
<blockquote><p>فَمَآ أُوتِيتُم مِّن شَىْءٍۢ فَمَتَـٰعُ ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا ۖ وَمَا عِندَ ٱللَّهِ خَيْرٌۭ وَأَبْقَىٰ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ. وَٱلَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَـٰٓئِرَ ٱلْإِثْمِ وَٱلْفَوَٰحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا۟ هُمْ يَغْفِرُونَ. وَٱلَّذِينَ ٱسْتَجَابُوا۟ لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَـٰهُمْ يُنفِقُونَ</p>
<p>“যা-ই তোমাদের দেয়া হয়েছে, তা কেবল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের উপকরণ মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা যেমন উত্তম, তেমনি চিরস্থায়ী। তা সেই সব লোকের জন্য, যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের রবের উপর নির্ভর করে, যারা বড় বড় গুনাহ এবং লজ্জাহীনতার কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ক্রোধ উৎপত্তি হলে ক্ষমা করে, যারা তাদের রবের নির্দেশ মেনে চলে, নামাজ কায়েম করে এবং নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে চালায়, আমি তাদের যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।” (সূরা শুরা : ৩৬-৩৮)</p></blockquote>
<p><strong>ঈমান ও ইবাদতের পরে এ ইসলামী সমাজ যে স্তম্ভগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত, তা হলো,</strong></p>
<p><strong>১. ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা :</strong></p>
<p>ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা মূলত ঈমান বা বিশ্বাসের স্বাভাবিক ফল, যা বিশ্বাসীদেরকে দৃঢ় বিশ্বাসবোধের সাথে পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং ফলশ্রুতিতে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। আল্লাহ বলেন,</p>
<p>إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌۭ</p>
<p>“মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই।” (সূরা হুজুরাত : ১০)</p>
<p>ইতিহাস ও বাস্তবতা উভয়ই প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীতে দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে উঠা ঐক্য বা বন্ধনের মতো সুদৃঢ় কোনো ঐক্যের অস্তিত্ব নেই এবং এক্ষেত্রে ইসলামের মতো কার্যকর কোনো ধর্মবিশ্বাস নেই।</p>
<p>ভ্রাতৃত্বের সবচেয়ে নিচের স্তর হলো নিজের হৃদয়কে হিংসা ও ঘৃণা থেকে মুক্ত রাখা, যে হিংসা ও ঘৃণাকে ‘জাতির রোগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্য কথায় হিংসা ও ঘৃণা হলো চাঁছার যন্ত্র, তবে তা চুলের নয়, বরং ধর্মের! বিশ্বাসের শিকড় যত গভীর হবে, সত্তা, জীবন ও ভ্রাতৃত্বের পাতা, ছায়া ও ফল তত বেশি হবে এবং হৃদয়ও তত বেশি অহংকার থেকে মুক্ত হবে, কারণ এর ফলে মানুষ নেওয়ার চেয়ে দেওয়া এবং অর্জন করার চেয়ে ত্যাগ করতে বেশি আগ্রহী হবে।</p>
<p>হাদীসে এসেছে,<strong>“</strong>তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার মুসলমান ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ২৮১)<br />
<a href=" https://rkmri.co/yTyNMMMpTAey//"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Muslim-zubokder-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত বিকশিত হয়, যতক্ষণ না এটি ব্যক্তিকে পরোপকারের স্তরে উন্নীত করে। সাহাবীদের সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি ছিলো ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা। আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন,</p>
<blockquote><p>وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلْإِيمَـٰنَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِى صُدُورِهِمْ حَاجَةًۭ مِّمَّآ أُوتُوا۟ وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌۭ ۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِۦ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ</p>
<p>“তারা (আনসারগণ) ভালোবাসে সেই সব লোকদের, যারা হিজরত করে তাদের কাছে এসেছে। যা কিছুই তাদের দেয়া হোক না কেন এরা নিজেদের মনে তার কোনো প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করে না এবং যত অভাবগ্রস্তই হোক না কেন নিজেদের চেয়ে অন্যদের অগ্রাধিকার দান করে। মূলত যেসব লোককে তার মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম।” (সূরা হাশর : ০৯)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-size: 1.2em; font-weight: bold;">২. সহানুভূতি এবং অনুগ্রহ :</span></p>
<p>প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের অন্যতম ফলাফল হলো সহানুভূতি এবং অনুগ্রহ। রাসূল (স.) বলেছেন,</p>
<p>“পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ জ্বর ও নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয়।” (বুখারী : ৬০১১)</p>
<p>অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে,</p>
<p>“দয়াশীল ব্যতীত কেউই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ দয়া পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, বরং সকল ক্ষেত্রেই।” (বায়হাকী, জামি আস সাগীর : ৯৯৬১)</p>
<p>দুর্বল, এতিম, অভাবী ও মুসাফিরদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যক। আল কোরআনে এ ধরনের মানুষদের প্রতি রূঢ় আচরণকে অবিশ্বাসী বা ঈমানহীন এবং ধর্মত্যাগীদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>أَرَءَيْتَ ٱلَّذِى يُكَذِّبُ بِٱلدِّينِ. فَذَٰلِكَ ٱلَّذِى يَدُعُّ ٱلْيَتِيمَ. وَلَا يَحُضُّ عَلَىٰ طَعَامِ ٱلْمِسْكِينِ</p>
<p>“তুমি কি তাকে দেখেছো, যে আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তিকে মিথ্যা বলছে? সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয়, এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না।” (সূরা মাউন : ১-৩)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-size: 1.2em; font-weight: bold;">৩. সমর্থন এবং সহযোগিতা :</span></p>
<p>সমর্থন এবং সহযোগিতা হলো ভ্রাতৃত্ব এবং সহানুভূতি ও অনুগ্রহের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। ইসলামী সহযোগিতার মানে হলো উদারতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা; অপুণ্য ও শত্রুতা নয়।</p>
<p>আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْبِرِّ وَٱلتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَٰنِ</p>
<p>“নেকী ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদাহ : ০২)</p></blockquote>
<p>এরই ধারাবাহিকতায় ইসলাম সুদ ও একাধিপত্যকে নিষিদ্ধ করেছে, কারণ এসবের মাধ্যমে শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে শোষণ করে।</p>
<p>অধিকন্তু নবী (স.) এ সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরেছেন এই বলে যে,</p>
<p>একজন মুমিন ব্যক্তি অপর মুমিনের জন্য একটি অট্টালিকা সদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে। (আল লুলু ওয়াল মারজান : ১৬৭)</p>
<p>এছাড়াও সমাজের ব্যক্তিদের পারস্পরিক সহযোগিতা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মধ্যকার সহযোগিতা, শাসক ও প্রজাদের মধ্যকার সহযোগিতাও ইসলামী সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে যুলকারনাইন এবং ইয়াজুজ-মাজুজ কর্তৃক হুমকিগ্রস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>قَالُوا۟ يَـٰذَا ٱلْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِى ٱلْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَىٰٓ أَن تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّۭا. قَالَ مَا مَكَّنِّى فِيهِ رَبِّى خَيْرٌۭ فَأَعِينُونِى بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا</p>
<p>“তারা বললো, ‘হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। আমরা কি তোমাকে এ কাজের জন্য কোনো কর দেবো, তুমি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবে?’ সে বললো, ‘আমার রব আমাকে যা কিছু দিয়ে রেখেছেন তাই যথেষ্ট। তোমরা শুধু শ্রম দিয়ে আমাকে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে প্রাচীর নির্মাণ করে দিচ্ছি’।” (সূরা কাহফ : ৯৪-৯৫)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৪. পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সংহতি :</strong></p>
<p>পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং পারস্পরিক সংহতি সে সমাজেই বিদ্যমান, যে সমাজে সামর্থ্যবানরা দুর্বলদেরকে, ধনীরা গরীবদেরকে সাহায্য করে, যে সমাজে অক্ষম ও অভাবীরা অসহায় বোধ করে না। এ সংহতির নূন্যতম মাত্রা হলো ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ যাকাত। যাকাতের তত্ত্বাবধানে আছে বিশ্বাস, মুসলিম জনমত এবং আইন ও সার্বভৌমত্ব। বিশ্বাসের উৎপত্তি হয় একজন মুসলিম ব্যক্তির বিবেক থেকে, মুসলিম জনমতের উৎপত্তি হয় সমাজ থেকে, আইন এবং সার্বভৌমত্বের উৎপত্তি হয় রাষ্ট্র থেকে।</p>
<blockquote><p>خُذْ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ صَدَقَةًۭ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَوٰتَكَ سَكَنٌۭ لَّهُمْ ۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ</p>
<p>“হে নবী! তাদের ধন-সম্পদ থেকে সদকা নিয়ে তাদেরকে পাক পবিত্র করো, (নেকীর পথে) তাদেরকে এগিয়ে দাও এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করো। তোমার দোয়া তাদের সান্ত্বনার কারণ হবে। আল্লাহ‌ সবকিছু শুনেন ও জানেন।” (সূরা তাওবা : ১০৩)</p></blockquote>
<p>যাকাত ছাড়াও একের সম্পত্তির উপর অন্যের আরও কিছু অধিকার রয়েছে, বিশেষ করে প্রতিবেশীর অধিকার। কারণ সমাজের কোনো এক সদস্যের সুসময় ও দুঃসময় উভয় ক্ষেত্রেই গোটা সমাজকে পাশে থাকতে হয়। রাসূল (স.) বলেছেন,</p>
<p>“সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট ভরে খায় আর পাশেই তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।” (আদাবুল মুফরাদ)</p>
<p>ইসলামী সংহতি জীবনের সকল দিককে অন্তর্ভুক্ত করে, হোক তা বস্তুগত বা নৈতিক। অন্য কথায়, এটি একটি জীবন্ত, বৈজ্ঞানিক, পুঁথিগত এবং সামরিক সংহতি। এটি অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যেগুলো সম্পর্কে ড. মুস্তফা আস সিবায়ী এর Socialism of Islam বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৫. পারস্পরিক আলোচনা এবং পরামর্শ :</strong></p>
<p>পারস্পরিক আলোচনা এবং পরামর্শ হলো আক্ষরিক অর্থে সংহতির বৈশিষ্ট্য। এটি প্রত্যেক মুসলমানকে দায়িত্বশীল করে তোলে। মুসলমানরা একে অপরের সাথে পরামর্শ করে, একে অন্যকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয় এবং নিজেরাও অন্যের উপদেশ গ্রহণ করে। আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ সম্পাদনকারী মুসলমানরা কখনোই অন্যায়ভাবে নিজের মতো প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। এটি ইসলামের অন্যতম নীতি, নাজাতের শর্ত।</p>
<p>কোরআনে বলা হয়েছে,</p>
<p>وَٱلْعَصْرِ. إِنَّ ٱلْإِنسَـٰنَ لَفِى خُسْرٍ. إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلْحَقِّ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلصَّبْرِ</p>
<p>“সময়ের কসম। মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে।” (সূরা আসর : ১-৩)</p>
<blockquote><p>وَٱلْمُؤْمِنُونَ وَٱلْمُؤْمِنَـٰتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍۢ ۚ يَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ</p>
<p>“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। এরা ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা তাওবা : ৭১)</p></blockquote>
<p>হাদিসে বলা হয়েছে,</p>
<p>&#8220;কল্যাণ কামনা করাই ধর্ম।&#8221; (মুসলিম)</p>
<p>অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে,</p>
<p>“মুমিনরা পরস্পরের আয়না স্বরূপ।” (জামিউস সগীর)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৬. ইসলাহ এবং উন্নয়ন :</strong></p>
<p>মুসলিম সমাজ একটি মুসলিহ সমাজ যা তার ব্যক্তিদেরকে সংস্কার, শালীনতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যতা, পবিত্রতা সম্পর্কে শিক্ষা দেয় এবং গোপন বা প্রকাশ্য সকল প্রকার জঘন্য কাজকে নিষিদ্ধ করে। এটি মদ এবং জুয়াকে শয়তানের কাজ এবং নিষিদ্ধ হিসেবে অভিহিত করে। ইসলাম আরও নির্দেশ দেয় যে, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং গোপনাঙ্গের হেফাজত করে। ইসলাম কথা বলার ক্ষেত্রে, হাঁটা বা চলাফেরায় ক্ষেত্রে নগ্নতা পরিহার করার নির্দেশ দেয়।</p>
<p>যাই হোক, মুসলিম সমাজ ফেরেশতাদের সমাজ নয়, মানুষের সমাজ। আর মানুষের ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ইসলাম বলে, কেউ যদি পাপ করে, তবে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে, প্রদর্শন না করে বা তা নিয়ে অহংকার না করে। এটি করলে তার পাপের প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে এবং অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে যাবে না। অতঃপর সে যেন তাওবা করে।</p>
<p>إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلْمُتَطَهِّرِينَ</p>
<p>“আল্লাহ‌ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে ও পবিত্রতা অবলম্বন করে।” (সূরা বাকারা : ২২২)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৭. আদালত :</strong></p>
<p>আদালত তথা ন্যায়বিচার মানুষের জীবনের সকল বিষয়ের সাথে জড়িত, তাই আদালত বাধ্যতামূলক এবং অন্যায় নিষিদ্ধ।<br />
<a href="https://rkmri.co/Ayo3AM0NemMe/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Agami-diner-sovvota-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>হাদীসে এসেছে,</p>
<p>“হে আমার বান্দাগণ, আমি নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের উপরেও হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না।” (মুসলিম)</p>
<p>আদালত এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারও অন্তর্ভুক্ত, যা সেসব প্রভাবশালীদের বিরোধিতা করে, যারা গরীবের রক্ত চুষে খায়। আদালত ধনীদের অন্যায় আধিপত্যের অবসান ঘটায় এবং যাকাতের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তিতে দরিদ্রদের অধিকার প্রদান করে দরিদ্রদের মান বৃদ্ধি করে। এটি আইন ও বিচারকার্যের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে, এমনকি খলিফা বা তার সন্তানরা অন্যায় করলে তাদেরকেও সমানভাবে শাস্তি দেওয়া হয়।</p>
<p>রাসূল (স.) বলেছেন,</p>
<p><strong>“আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করতো, আমি তাঁর হাত কেটে দিতাম!” (মুসলিম)</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৮. প্রগতিশীল সমাজ :</strong></p>
<p>ইসলাম যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি প্রগতিশীল সমাজ এবং কোনো অনুন্নত সমাজ নয়। এ বিষয়টির কিছু ব্যাখ্যা প্রয়োজন, কারণ ‘প্রগতি’ শব্দটি অনেক ব্যাখ্যার দাবিদার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে দাবি করে। তারা আরও অভিযোগ করে যে, মুসলিম সমাজ, যেটিকে তারা ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে অভিহিত করে, তা অনুন্নত। তদুপরি, চাটুকারিতার ছলে তারা মুসলিম দেশগুলোকে ‘অনুন্নত’ না বলে ‘উন্নয়নশীল’ হিসেবে অভিহিত করে। সত্যি বলতে, আমাদের প্রগতিশীলতার ব্যাপারে আমাদের মনোভাব, অন্য কথায়, এ ব্যাপারে ইসলামের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত। এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদেরকে প্রথমে প্রগতির ধারণাটি সংজ্ঞায়িত করতে হবে, কারণ কেউ কখনো কোনো বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দিতে পারে না, যদি না সে এটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা রাখে। সহজ কথায়, প্রগতি বা অগ্রগতি মানে অন্যের আগে বা সামনে থাকা। এটির বিপরীত হলো অনগ্রসরতা বা অনুন্নয়ন, যার অর্থ অন্যদের থেকে পিছিয়ে থাকা। অগ্রগতি বা পশ্চাৎপদতা আপেক্ষিক, কারণ পিছিয়ে থাকা বা বিপরীতে থাকা ব্যক্তির প্রেক্ষিতেই আপনাকে এগিয়ে হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> কাজী সালমা বিনতে সলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-society-islam-establishes/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16026</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল-কুরআনে সুর ও ছন্দ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Jun 2025 08:00:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15891</guid>

					<description><![CDATA[আল-কুরআনের শব্দের মিল ও সাদৃশ্য সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমি তার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষ্টি প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল-কুরআনের শব্দের মিল ও সাদৃশ্য সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমি তার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষ্টি প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর সাথেও সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে আল-কুরআনের উচ্চারণের সাদৃশ্যতা।</p>
<p>আমি এর আগে আভাস দিয়েছি যে, কুরআনে কারীমের মধ্যে সুর ও ছন্দ (শব্দের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা) আছে এবং তার কিছু প্রকার ও ধরন আছে। যা তার বক্তব্য উপস্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সমস্ত কুরআন-ই ছন্দবদ্ধ সেহেতু সর্বত্রই সুর ও তাল বিদ্যমান। দেখা গেছে একই শব্দের বিভিন্ন অক্ষর এবং একই আয়াত ও তার শেষ শব্দ ছান্দিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে। চাই সে আয়াত ছোট হোক কিংবা বড়। বাক্যের শেষ শব্দের মধ্যে সেই মিল কিভাবে হয়, সেসব বাক্য সম্পর্কে আমি আলোচনা করতে চাই। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>وَمَا عَلَّمْنَهُ الشَّعْرَ وَمَا يَنْبَغِى لَهُ ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ</p>
<p>আমি তাঁকে (অর্থাৎ রাসূলকে) কবিতা বা কাব্য শিক্ষা দেইনি। আর তা তাঁর জন্য শোভাও পায় না। এতো একটি স্মারক যা সুস্পষ্ট কুরআন (হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে)। (সূরা ইয়াসীন : ৬৯)</p></blockquote>
<p>একথাটি হচ্ছে কাফিরদের ঐ অভিযোগের জবাব, যা সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে:</p>
<p>بَلِ اقْتَرَهُ بَلْ هُوَ شَاعِرٌ</p>
<p>(তারা বলতো) সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না বরং সে একজন কবি।</p>
<p>(সূরা আল-আম্বিয়া: ৫)</p>
<p>আল-কুরআন ঠিকই বলেছে, এটি কাব্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আরববাসী যারা একে কবিতা বা কাব্য বলতো তারা কি পাগল ছিল, না কবিতা ও কাব্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল? নিশ্চয়ই নয়। যেহেতু তারা একে কাব্য বলেছে কাজেই এর মধ্যে অবশ্যই কবিতা ও কাব্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে যার যাদুকরী আবেশে তারাও মোহবিষ্ট হয়েছিল। কুরআনের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের কান পরিচিত ছিল, ফলে এটি যে একটি কাব্য তা তারা বুঝতে পেরেছিল। আমরা যদি কেবল মাত্রা ও অন্তমিলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তবু বুঝা যায় কাব্য ও কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য সেখানে বিদ্যমান।</p>
<p>তাছাড়া কুরআন গদ্য ও পদ্য উভয়কেই সুন্দরভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে। আল-কুরআন মাত্রা )وزن( ও অন্তমিল )قافیه( থেকে স্বাধীন এবং এতে মিল থাকতেই হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা কুরআনের নেই। তবু সেখানে সুর ও ছন্দ বর্তমান। আয়াতের শেষে মিত্রাক্ষরের প্রয়োজন, সে প্রয়োজনও কুরআন অবশিষ্ট রাখেনি। সেই সাথে আমরা ওপরে কাব্যের যে বৈশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করেছি সেগুলোও সে ধারণ করে নিয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কুরআনে গদ্য ও পদ্য উভয় বেশিষ্ট্য বৈশিষ্ট্যমান।</p>
<p>সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন বাহ্যিক উচ্চারণে সে মাত্রা ও অন্তমিল দেখে, বিশেষ করে এ ব্যাপারটি ছোট ছোট আয়াত সম্বলিত সূরাগুলোতেই দৃষ্টিগোচর হয়। অথবা ঐ সমস্ত জায়গায় যেখানে কোন ঘটনাচিত্র উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য দীর্ঘ আয়াতের সূরাগুলোতেও এটি আছে তবে তা এতোটা স্পষ্ট নয়। নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করুন, যেখানে সুর, ছন্দ ও মাত্রার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে:</p>
<blockquote><p>وَالنَّجْمُ إِذَا هَوَى &#8211; مَاضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى &#8211; وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الهوى &#8211; إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى &#8211; عَلَمَهُ شَدِيدُ القُوى &#8211; ذُو مِرَّةٍ &#8211; فَاسْتَوى &#8211; وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى &#8211; ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى &#8211;</p>
<p>নক্ষত্রের কসম, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট কিংবা বিপথগামী নয় এবং প্রবৃত্তির তাড়নায়ও কথা বলে না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা। সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। (সূরা আল-নজম: ১-৮)</p>
<p>فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوادنى &#8211; فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى &#8211; مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى &#8211; أَفَتُمْرُونَهُ عَلَى مَا يَرَى</p>
<p>অতপর নিকটবর্তী হলো এবং ঝুলে রইলো, তখন ব্যবধান ছিল দুই ধুনক কিংবা তার চেয়ে কম। তখন আল্লাহ্ তার বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? (সূরা নজম: ৯-১২)</p></blockquote>
<p>وَلَقَدْ رَاهُ نَزَلَةً أخرى &#8211; عِنْدَ سِدْرَة المُنْتَهى &#8211; عِنْدَهَا جَنَّةُ الماوى &#8211; إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى &#8211; مَازَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى &#8211; لقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى</p>
<p>নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তা &#8220;দিয়ে আচ্ছন্ন হচ্ছিল। তাঁর দৃষ্টিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয়ই সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।</p>
<p>(সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)</p>
<p>أَفَرَءَ يْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى &#8211;</p>
<p>তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উজ্জা সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?</p>
<p>(সূরা আন-নজম: ১৯-২০)</p>
<p>الكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى.</p>
<p>পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য আর কন্যা সন্তান আল্লাহ্ জন্য?</p>
<p>(সূরা নজম: ২১)</p>
<p>تِلْكَ إِذَا قِسْمَةٌ ضِيزى &#8211;</p>
<p>এ ধরনের বণ্টন তো খুবই অসঙ্গত বণ্টন।</p>
<p>(সূরা আন-নজম: ২২)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতগুলোর শেষাক্ষরে মাত্রার প্রায় মিল আছে। কিন্তু আরবী ছন্দের মাত্রার চেয়ে তা কিছুটা ভিন্ন। সব আয়াতের শেষেই মিত্রাক্ষর এক ধরনের। মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের বদৌলতে প্রশিট আয়াতের সাথে অপর আয়াতের একটি মিল সংঘটিত হয়েছে। ফলে বিচ্ছুরণ ঘটেছে অপূর্ব সুর মূর্ছনার। এই যে মিল ও সাদৃশ্য তার আরেকটি কারণ আছে, অবশ্য তা মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের মতো এতোটা উজ্জ্বল নয়। কেননা তা একক শব্দ, অক্ষরের বিন্যাস এবং বাক্যে শব্দসমূহের বিন্যাসের কারণে সৃষ্টি হয়। তার অনুভূতি ও উপলব্ধির পরিধি, দ্বীনি চেতনা এবং সুর ও সঙ্গীতের উপভোগের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য অন্তরার সুরেলা আওয়াজ এবং বেসুরো আওয়াজের মধ্যে পার্থক্য করা যায়, শুধুমাত্র বাক্যান্তে মিত্রাক্ষর হলেই তাকে সুর বা ছন্দ বলে অভিহিত করা যায় না।</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতগুলো ছোট ছোট বিধায় তা থেকে সৃষ্ট সূর-তরঙ্গের স্থায়িত্বও খুব দীর্ঘ নয়। তবে সব আয়াতের ছন্দ ও মাত্রা এক। তাই সব আয়াতে মিল আছে। এসব আয়াতে শেষ অক্ষর এক রকম হতে হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা নেই।</p>
<p>যেমন আধুনিক সাহিত্যে কোন গল্প-উপন্যাস লিখার সময় এদিকে নজর দেয়া হয় না, কুরআনী সুর ও ছন্দের বেলায় এসব কিছুকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অনেক আয়াত থেকে তো স্পষ্ট বুঝা যায় বাক্যান্তে মিলের জন্য সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে তা করা হয়েছে। যেমন নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করে দেখুন।</p>
<p>أَفَرَءَ يْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى &#8211;</p>
<p>যদি এভাবে বর্ণনা না করে নিচের মতো করে বর্ণনা করা হতো:</p>
<p>أَفَرَيْتُمُ اللَّهَ وَالعُزَّى &#8211; وَمَنْوةَ الثَّالِثَةَ &#8211;</p>
<p>তাহলে অন্তমিলে পার্থক্য সৃষ্টি হতো এবং ছন্দপতন ঘটতো। তদ্রূপ নিচের আয়াতও:</p>
<p><strong>الكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى &#8211; تِلْكَ اذا قِسْمَةٌ ضيزى .</strong></p>
<p><strong>যদি এভাবে উল্লেখ না করে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হতো:</strong></p>
<p><strong>الكُمُ الذَّكَرُولَهُ الْأُنثى &#8211; تلكَ قِسْمَةُ ضيزى .</strong></p>
<p><strong>তাহলে ছন্দের মিল হতো না। &#8216;ইযান&#8217; শব্দটি দিয়ে সেই মিলকে পুরো করা হয়েছে।</strong></p>
<p>তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, &#8216;আল উখরা&#8217; (أخرى) এবং &#8216;ইযান&#8217;  শব্দ দুটো ছন্দের মিল ছাড়া আর অন্য কোন কারণে নেয়া হয়নি, এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ। আসলে এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ নয় বরং বাক্য বিন্যাসের জন্য সূক্ষ্ম অপরিহার্যতার কারণেই এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আল-কুরআনের আরেকটি শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। একটি বিশেষ অর্থে আল-কুরআনে এ ধরনের শব্দ চয়ন করা হয়েছে এবং সাথে সাথে সেই শব্দটি সুর ও তালের মাত্রাকেও ঠিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।</p>
<p>যেমন আমরা আলোচনা করেছি, আল-কুরআনের এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের উচ্চারণের সময় এক ধরনের ছন্দের মিল লক্ষ্য করা যায় এবং শেষে মিত্রাক্ষর দৃষ্টিগোচর হয়। আবার অনেক জায়গায় শব্দ নির্বাচন এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে একটি শব্দ আগ-পাছ করলেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।</p>
<p>প্রথম অবস্থা: প্রথম অবস্থা হচ্ছে কোন শব্দের স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করার উদাহরণ। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর একথাটি যা কুরআন হুবহু নকল করেছে:</p>
<p>قَالَ أَفَرَءَ يْتُمْ مَّا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ &#8211; أَنْتُمْ وَآبَاؤُ كُمُ الْأَقْدَمُونَ &#8211; فَإِنَّهُمْ عَدُولِي الْأَرَبِّ العَلَمِينَ &#8211; الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ &#8211; وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ &#8211; وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ &#8211; وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينَ &#8211; وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يُغْفِرْ لِي خَطِئَتِي يوم الدين &#8211;</p>
<p>(ইবরাহীম (আ) বললো: তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ, তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা? বিশ্ব প্রতিপালক ব্যতীত তারা সবাই আমার শত্রু। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন। তিনি আমাকে মৃত্যু দেবেন আবার তিনিই পুনুরুজ্জীবিত করবেন। আমি আশা করি তিনিই বিচারের দিনে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন।</p>
<p>(সূরা আশ-শুয়ারা: ৭৫-৮২)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতে &#8216;ইয়াহদিনি&#8217; بهدین &#8216;ইয়াসকিনি&#8217; يسقین &#8216;ইয়াশ ফিনি يشفين এবং &#8216;ইউনি&#8217; يُحين শব্দের শেষ থেকে উত্তম পুরুষের &#8216;ইয়া&#8217;-কে বিলুপ্ত করা হয়েছে। কারণ &#8216;তা&#8217;বুদুনা&#8217; تَعْبُدُونَ &#8216;আল আকদামুনা&#8217; الاقدَمُونَ শব্দদ্বয়ের মতো &#8216;নুন&#8217;-এর মিত্রাক্ষর বহাল রাখার জন্য।</p>
<p>এমনিভাবে নিচের আয়াত ক&#8217;টিতেও &#8216;ইয়া&#8217; কে বিলুপ্ত করা হয়েছে:</p>
<p>والفَجْرِ &#8211; وَلَيَالٍ عَشْرٍ &#8211; والشفْعِ والوَتْرِ &#8211; وَالَّيْلِ إِذَا يَسْرِ &#8211; هَلْ فِي ذَلِكَ قَسَمٌ لِذِي حِجْرٍ &#8211;</p>
<p>শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতে, শপথ তার যা জোড় ও বেজোড় এবং শপথ রাতের যখন তা গত হতে থাকে। এর মধ্যে আছে শপথ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য।</p>
<p>(সূরা আল-ফজর: ১-৫)</p>
<p>উল্লেখিত আয়াতে &#8216;ইয়াসরী&#8217; (يَسرى) শব্দের &#8216;ইয়া&#8217; করা হয়েছে, যেন &#8216;আল-ফাজরি&#8217; (الفجر) &#8216;আশরীন&#8217; (والوتر) ইত্যাদি শব্দসমূহের সাথে মিল থাকে।</p>
<p>নিচের আয়াতগুলোও এখানে উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে।</p>
<p>فَتَوَلَّ عَنْهُمْ يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِ إِلَى شَيْءٍ نُكْرٍ &#8211; خُشِعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَحْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادُ مُنْتَشِرُ &#8211; مُهْطِعِينَ إِلَى الداع ، يَقُولُ الْكَفِرُونَ هَذَا يَوْمٌ عَسِرُ</p>
<p>অতএব তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন।</p>
<p>এ আয়াতে &#8216;আদ দায়ি&#8217; (ভূমি) শব্দের শেষ থেকে যদি &#8216;ইয়া&#8217;-কে বিলুপ্ত করা না হতো তবে মনে হতো এ পংক্তিতে ছন্দপতন ঘটেছে। আর এ ত্রুটি কারো নজর এড়াত না। তেমনিভাবে নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করুন:</p>
<p>ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِ ، فَارْتَدَّ عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا</p>
<p>(মূসা বললেন:) আমরাতো এ জায়গাটিই খুঁজছিলাম। অতপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললো।</p>
<p>(সূরা আল-কাহফঃ ৬৪)</p>
<p>এ আয়াতেও যদি تیغ শব্দটি এভাবে تبغى লিখা হতো তবে মিলের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতো।</p>
<p>তদ্রূপ যদি নিচের আয়াতগুলো থেকে আসল &#8216;ইয়া&#8217; এবং উত্তম পুরুষের &#8216;ইয়া&#8217;- এর শেষ থেকে বিরতিসূচক &#8216;হা&#8217; কে বিলোপ করা হয় তবে অবশ্যই ছন্দ পতন ঘটবে।</p>
<p>وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ &#8211; فَأَمُّ هَاوِيَةٌ &#8211; وَصَا أَدْرَكَ مَاهِيَهِ &#8211; نَارٌ حَامِيَةٌ &#8211;</p>
<p>আর যার পাল্লা হাল্কা হবে, তার ঠিকানা হাবিয়া। তুমি কি জানো তা কি? তা হচ্ছে জ্বলন্ত আগুন।</p>
<p>(সূরা আল ক্বারিয়া: ৮-১১)</p>
<p>নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:</p>
<p>فَامَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَبَاهُ بِيَمِينِهِ ، فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَهُ وَأَكِتَبِيه &#8211; إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيْهِ &#8211; فَهُوَ فِي عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ &#8211;</p>
<p>অতপর যার আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে। অতপর সে সুখ-স্বাছন্দে জীবন যাপন করবে।</p>
<p>(সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১)</p>
<p>দ্বিতীয় অবস্থা: শব্দের সাধারণ অবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন করা হয়নি বটে কিন্তু কৌশলী বিন্যাসে তা হয়ে উঠেছে ছন্দময়। যদি সেই বিন্যাসে সামান্যতম হেরফের করা হয় তবে ছন্দের মিল আর অবশিষ্ট থাকে না। নষ্ট হয়ে যায় সুর ব্যঞ্জনা।</p>
<p>ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيا &#8211; اذْنَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا &#8211; قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا &#8211; وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا</p>
<p>এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তাঁর পালনকর্তাকে নিভৃতে আহ্বান করেছিল এবং বলেছিল: হে আমার রব্ব! আমার অস্থি বয়স ভারাবনত হয়েছে। বার্ধক্যে মাথা সুশুভ্র হয়েছে কিন্তু আপনাকে ডেকে কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৪)</p>
<p>ওপরের আয়াতে যদি শুধুমাত্র &#8216;মিন্নী&#8217; منی শব্দটিকে পরিবর্তন করে &#8216;আল আজমু&#8217; العظم শব্দের পূর্বে এনে এভাবে বলা হয় যে, قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ مِنِّي الْعَظْمُ তবে স্পষ্টতই বুঝা যায় উক্ত বাক্যে ছন্দ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র ছন্দ ও মাত্রা ঠিক রাখার জন্যই &#8216;মিন্নী&#8217; منی শব্দটিকে যথাস্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এবার দেখুন কতো সুন্দর মিল দেয়া হয়েছে। বাক্যের প্রথম দিকে বলা হয়েছে : قَالَ رَبِّ إِنِّي এবং তারপরই বলা হয়েছে :</p>
<p>وَهَنَ الْعَظْمُ مِنّى</p>
<p>এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, আয়াতের ভেতর সুর ও ছন্দ এতো সূক্ষ্ম, শুধু অনুধাবন করা যায় কিন্তু ব্যক্ত করা যায় না। আগেও আমরা এ ব্যাপারে কিছুটা আলোচনা করেছি। এ ধরনের সুর ও তাল একক শব্দ সমষ্টি কিংবা একই বাক্যের বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তা অনুধাবন করতে হলে একমাত্র আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েই সম্ভব, অন্য কোনভাবে নয়।</p>
<p>উপরোক্ত আলোচনা একথারই ইঙ্গিত করে যে, আল-কুরআনের বর্ণনা রীতিতে সুর ও ছন্দের ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে হয়। তা এতো স্পর্শকাতর যে, শাব্দিক সাধারণ বিন্যাসের ব্যতিক্রম হলেই ছন্দপতন ঘটে যায়। অথচ তা কবিতা বা কাব্য নয়। এমনকি তা কাব্যের নিয়ম-নীতি মেনে চলতেও বাধ্য নয়। কিন্তু মানুষ একে এমনভাবে সাজানো ও বিন্যাসিত দেখতে পায়, যে কারণে তারা একে কাব্য না বলে কি যে বলবে তাও ভেবে পায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/melody-and-rhythm-in-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15891</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে পর্দার দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 12 Mar 2025 13:29:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[উসূল ও মেথডোলজি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15602</guid>

					<description><![CDATA[সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে নিয়ে তাঁর শরীর আবৃত করে রাখার বিষয়টিকে মৌলিক একটি ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ কারণে কিছু কিছু আদিম উপজাতি ছাড়া সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে, সকল সংস্কৃতিতে, সকল সভ্যতায় এবং সকল আখলাকী ব্যবস্থায় মানুষের জন্য মূল বিষয় হল নিজেকে আবৃত করে রাখা। মানুষ, তাঁর শরীরকে আবহওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকে কিংবা ঠাণ্ডা ও গরম থেকে রক্ষা করার জন্যই নয় একই সাথে আধ্যাত্মিক একটি মূল্যবোধকে সামনে রেখে নিজেকে আবৃত করে থাকে।</p>
<p>সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ পোশাক পরিচ্ছদের দিকে আরও বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। সকলেই জানেন যে, আজ থেকে একশত বছর পূর্বেও নারীরা খ্রিষ্টান কিংবা ইয়াহুদী, যে ধর্মেরই হোক না কেন মুসলমান নারীদের মত তারাও পর্দা করত। কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে সকল ক্ষেত্রের মত এই ক্ষেত্রেও মানবতা অনেক বড় একটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আধুনিক সময়ে পর্দাকে এতটা প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে, যা জীবনের সাথে সম্পর্কহীন একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একদিকে পর্দাকে তুচ্ছ ও প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখানো হয়েছে আর অপর দিকে শরীর প্রদর্শনকে আকর্ষণীয় ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিক সময়ে শোষণের একটি ক্ষেত্রে হিসেবে মানুষের শরীরকে বেঁছে নেওয়া হয়েছে। নারী, পুরুষ কিংবা শিশু সকলের শরীরকেই যথেচ্ছাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের দিকে শুরু হওয়া যৌন বিপ্লবের মাধ্যমে শরীরকে মালিকানাধীন একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। যা পরবর্তীতে শরীরকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করে এবং শরীর প্রদর্শন ফ্যাশনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ‘ফ্যাশন’, ‘স্বাধীনতা’ কিংবা সর্বজনীনতার নামে বিভিন্ন পন্থায় মানুষের সামনে এই যৌনতাকে তুলে ধরার ফলে সমগ্র দুনিয়াজুড়ে মানবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমস্যার সম্মুখীন।</p>
<p>ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে নতুন <strong>ভার্চুয়াল স্ক্রিন সভ্যতা </strong>প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই সভ্যতায় বিনোদন কেন্দ্রিক একটি <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাক</strong> প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এই সভ্যতায় মানুষ; তাঁর নিজের সাথে, অন্যদের সাথে এবং মহাবিশ্বের সাথে সম্পর্ককে হাকীকতের উপর ভিত্তি করে নয় বরং চিত্র ও ছবির উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে। এই সভ্যতায় আকলের বদলে চোখ-ই হয়ে উঠেছে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। একই এই সভ্যতার বড় কাজ হল, চিন্তা করার বদলে দেখা। অর্থাৎ এই <em>ভার্চুয়াল</em> <em>স্ক্রিন</em> <em>সভ্যতা</em>  আকলের উপর চোখকে এবং চিন্তা করার বদলে দেখাকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর এই সভ্যতায় ‘চোখ’ নাজার ও মুশাহাদা (অবলোকন) &#8211; এর উপাদান হওয়ার পরিবর্তে কামনা-বাসনা ও শাহওয়াতের উপাদানে পরিণত হয়েছে। আর এই বিষয়টি পর্দার ফিতরাতী, দ্বীনী, আধ্যাত্মিক ও মেটাফিজিক্যাল অর্থকে হারিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে এবং ইলাহী উদ্দেশ্যকে বিলীন হওয়ার ক্ষেত্রে এমনকি আখলাকী ভিত্তি থেকেও সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। ভিজুয়াল ইদরাকের আধিপত্য এমন অনেক গায়রে আখলাকী বিষয়কে দৃশ্যায়িত করেছে যা আমাদের কল্পনারও অতীত। <strong>ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য মানুষকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করে তার গোপনীয়তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এমন অনেক ক্ষেত্র তৈরি করেছে যা মানুষকে সাময়িক কিছু আনন্দ দেয়, এবং তাকানোকে শাহাওয়াতে এবং দেখাকে কামনায় পরিণত করেছে। ভিজ্যুয়াল ইদরাকের আধিপত্য আকলের ইদরাককে দুর্বল করেছে, এবং কলবের ইদরাককে মৃত্যুঝুকিতে ফেলে দিয়েছে। </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র ইসলামের অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত নীতিমালাসমূহ মানুষকে আবৃত হওয়ার দিকে আহবান জানিয়ে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন ও ডিজিটালাইজশন কর্তৃক ছুড়ে এই সকল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় মহাপর্বতের ন্যায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের এই মূলনীতিগুলো চাচ্ছে মানুষকে হায়া ও সতীত্বের দিকে ফিরিয়ে আনতে। তবে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন এবং ডিজিটালাইজেশন কর্তৃক সৃষ্ট চাপের পাশাপাশি নিম্নোক্ত কারণসমূহও এই একই সমস্যাকে আরও বেশী ঘনীভূত করেছে।</p>
<ul>
<li>১। আধুনিক সময়ে এসে নারী ও পর্দার বিষয়কে ইসলামের মূলনীতির আলোকে সঠিকভাবে বিনির্মাণ করতে ব্যর্থ হওয়া।</li>
<li>২। মুসলমানদের নিকটে পর্দার হিকমত ও দর্শনকে ভালোভাবে তুলে ধরতে না পারা এবং এই ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করা।</li>
<li>৩। পর্দাকে যেন শুধুমাত্র নারীদের জন্যই আবশ্যক এই ধারণার ব্যাপক প্রসার।</li>
<li>৪। পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি।</li>
<li>৫। কখনো কখনো পর্দাকে নারীদের সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের একটি বিষয় হিসেবে না নিয়ে বরং সেটাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৬। নারীদের পর্দার পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হিজাবকে পরিত্যাগ করা এবং হিজাব ত্যাগ করাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করা।</li>
<li>৭। হিজাব পরিধানকারী নারীদেরকে ইসলামের প্রতিনিধি রূপে তুলে ধরে তাঁদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।</li>
</ul>
<p>উপর যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, এই সকল বিষয়সমূহ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পর্দার বিষয়টিকে আরও কঠিন করে ফেলেছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঘটে যাওয়া এই সকল সমস্যাসমূহ আসলে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, একই সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ধর্ম এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছে। আর এই বিষয়টি হিজাবের বিষয়টির রূহ ও মাকসাদকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোন থেকে প্রভাবিত করেছে এবং পর্দার আধ্যাত্মিক, রূহী এবং মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।</p>
<p>এই সকল বিষয়কে সামনে রেখে আমি <strong><em>ইসলামের</em> <em>পর্দা</em> <em>দর্শন</em> <em>এবং</em> <em>নতুন</em> <em>একটি</em> </strong><em><strong>দৃষ্টিভঙ্গি</strong>  </em>এই বিষয়ে কিছু চিন্তা আপনাদের নিকটে পেশ করতে চাই।</p>
<p>ইসলামের সকল বিষয়কে নারীদেরকে কেন্দ্র করে আলোচিত হওয়ার ফলে আল্লাহর নারী বান্দাদের উপর যে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এই বিষয় সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। এই কারণে পর্দার বিষয়টিকে নারী কিংবা পুরুষকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এই বিষয়টিকে আমি ‘মানুষ’ এর উপর ভিত্তি করে আলোচনা করতে চাই এবং আমি সুস্পষ্ট করতে চাই যে এই বিষয়টি শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। একই সাথে আমি এই বিষয়টিও তুলে ধরতে চাই যে পর্দার বিষয়টি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক অর্থবোধক।</p>
<p>পর্দার বিষয়টিকে পাঁচটি দিক থেকে বিবেচনা করে পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করানোর চেষ্টা করব। সেগুলো হলোঃ</p>
<ul>
<li>১. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>ফিতরাতী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em>  অর্থাৎ পর্দার স্বয়ং মানুষের সাথে সম্পর্কিত দিক।</li>
<li>২. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>কালামী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> অর্থাৎ মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা।</li>
<li>৩. পর্দার ব্যাপারে ফিকহী দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা ।</li>
<li>৪. <em>পর্দার</em> <em>ব্যাপারে</em> <em>আখলাকী</em> <em>দৃষ্টিকোণ</em> , অর্থাৎ পর্দার নৈতিক দিক।</li>
<li>৫. পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ পর্দার সৌন্দর্যগত, শোভাগত এবং চারিত্রিক দিক।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>১</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিতরাতী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>পর্দার বিষয়টি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ফিতরাতী একটি বিষয়। ফিতরাত হলো, সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে দেওয়া মূল্যবোধের এক রত্নভাণ্ডারের নাম। অন্য কথায়, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে আপলোডকৃত ইলাহী এক সফটওয়্যারের নাম হলো ফিতরাত। আবৃত করে রাখা, আদব, হায়া ও সতীত্বের মত অনুভূতিসমূহ মূলত এই মেমোরির মধ্যে তথা ইলাহী সফটওয়্যারের মধ্যে রক্ষিত মূল্যবোধ থেকেই উৎসারিত হয়ে থাকে। নিজের গোপনীয়তাকে রক্ষা করে যে ভালো, সঠিক ও সুন্দর এবং শরীর প্রদর্শন করা যে খারাপ, কুৎসিত ও ভুল,  এই সকল বিষয়সমূহ মানুষের এই মূল্যবোধের ভাণ্ডারের মধ্যে মওজুদ রয়েছে।</p>
<p>পর্দার ফিতরাতী দৃষ্টিকোণের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাকে আমরা কোরআনে কারীমে বর্ণিত হযরত আদম ও হযরত হাওয়ার কিসসার মধ্যে দেখতে পাই।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1"><sup>[1]</sup></a>  এই কিসসা অনুসারে হযরত আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে সকল ধরণের নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে রাখেন এবং  তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন; ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ কিন্তু শয়তান তাঁদেরকে প্রতারিত করে এবং তাঁদের গোপনাঙ্গকে একে অপরের নিকটে উন্মুক্ত করার জন্য তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে, “তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো”। শয়তান কসম খেয়ে তাঁদেরকে বলে যে, “ আমি নিঃসন্দেহে তোমাদের কল্যাণকামী”। এই ভাবে আদম ও হাওয়া উভয়কেই প্রতারিত করতে সক্ষম হয় এবং নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার সাথে সাথে লজ্জাস্থান পরস্পরের সামনে খুলে যায়। অতপর তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থানকে আবৃত করার জন্য জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জাস্থানকে ঢাকার চেষ্টা চালায়। এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে ,শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”?  তাঁরাও বলে উঠে, “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি৷ এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো, এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো ৷” কোরআনে কারীম এই কিসসাকে এই নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে শেষ করেছে,</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ</p>
<p>অর্থাৎ, হে বনী আদম! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশ-ভূষার জন্য। আর তাকওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোত্তম। এটা আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2"><sup>[2]</sup></a></p></blockquote>
<p>এ কিসসা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে বাশারিয়্যাত থেকে আদামিয়্যাতের দিকে এবং আদামিয়্যাত থেকে ইনসানিয়্যাতের দিকে যাত্রাকালে মানুষ সর্বপ্রথম যে বিষয়টিকে উপলব্ধি করে সেটা হল মানুষের ফিতরাতের মধ্যকার আবৃত করার বিষয়টি। আর বিষয়টি না শুধু নারীর জন্য আর না শুধু পুরুষের জন্য। আবৃত করার বিষয়টি নারী ও পুরষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই প্রযোজ্য একটি বিষয়।</p>
<p>আর আলোকে এই কথা বলা যায় যে, পর্দার বিষয়টি আসমানী একটি নিয়ামত। আবৃত করার বিষয়টি মানুষের জন্য একটি তাকওয়া অর্থাৎ রক্ষা করা, পরিশুদ্ধ করা, সুন্দর করা ও ইজ্জত সম্পন্ন করার একটি বিষয় হিসেবে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অন্যতম একটি নিয়ামত। এ নিয়ামতটি আমাদেরকে ইহসানের চেতনা দান করে এবং যেন আমরা সর্বদায় আল্লাহকে দেখছি এমন ভাবে আচরণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। আর এটা কেবলমাত্র তাকওয়ার পোশাক পরিধান করার মাধ্যমেই সম্ভব।</p>
<p>আর তাকওয়ার পোশাক কেবলমাত্র বাহ্যিক একটি পোশাক-ই নয়। তাকওয়ার পোশাক হল, মানুষকে স্বয়ং তার নিজের প্রতি, সৃষ্টিজগত ও রবের প্রতি দায়িত্ববান করে তোলা। আর এই দায়িত্ববোধ বাহ্যিক পোশাককে অর্থবহতা দান করে, পর্দার মধ্যে রূহ প্রদান করে এবং সকল প্রকার পর্দার চূড়া হলো এ দায়িত্ববোধ। তাকওয়ার পোশাক বিহীন শরীর রসকষবিহীন একটি অবয়ব ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>২</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>কালামী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>অনেকেই ধারণা করেন যে, পর্দা শুধুমাত্র মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি বিষয়। আসলে ব্যাপারটি এমন নয়। পর্দার একই সাথে আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে নিরূপণকারী একটি দিকও রয়েছে। কেননা মানুষ  ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ক শুধুমাত্র খালেক-মাখলুক কিংবা রুবুবিয়্যাত-উলুহিয়্যাত- এর সম্পর্কই নয়। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার এই সম্পর্ক একই সাথে শাহিদ-মাশহুদেরও সম্পর্ক। এ সম্পর্কের দাবি অনুযায়ী মানুষ সর্বদা আল্লাহকে স্মরণে রেখে পথ চলে। কোরআনে কারিমে এই সম্পর্ককে নিম্নোক্তভাবে  তুলে ধরা হয়েছেঃ</p>
<blockquote><p>اَیَحۡسَبُ اَنۡ لَّمۡ یَرَهٗۤ اَحَدٌ</p>
<p>অর্থাৎ, সে কি ধারণা করে যে, তাকে কেহই দেখছেনা?<a href="#_ftn3" name="_ftnref3"><sup>[3]</sup></a></p>
<p>وَ هُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ</p>
<p>তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। <a href="#_ftn4" name="_ftnref4"><sup>[4]</sup></a></p>
<p>فَاَیۡنَمَا تُوَلُّوۡا فَثَمَّ وَجۡهُ اللّٰهِ</p>
<p>তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও সেই দিকেই আল্লাহকে পাবে।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5"><sup>[5]</sup></a></p></blockquote>
<p>শুধু তাই নয় শাহিদ ও মাশহুদের এই সম্পর্ক একটি মিসাক (শাহাদাতের মিসাক) এর উপর নির্ভর করে। এই মিসাকের আলোকে মানুষ তার সৃষ্টির পূর্বেও আলমে আরওয়াহ/রূহের জগতে তাঁর রবের একত্বে ও মহত্বে স্বাক্ষ্য প্রদান করেছে। কোরআনের ভাষ্যমতে,</p>
<blockquote><p>وَ اَشۡهَدَهُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ ۚ اَلَسۡتُ بِرَبِّکُمۡ ؕ قَالُوۡا بَلٰی ۚۛ شَهِدۡنَا</p>
<p>অর্থাৎ, আর তাদেরকেই সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ; এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’<a href="#_ftn6" name="_ftnref6"><sup>[6]</sup></a></p></blockquote>
<p>আর সৃষ্টির পরে দুনিয়াতে এসেও মানুষ তাঁর মহান প্রভুর নাম, আয়াত, সিফাত ও নিয়ামতসমূহকে অবলোকন করছে। আল্লাহ তায়ালাও তাঁর বান্দার সকল অবস্থা, কাজ, নিয়ত ও গোপন বিষয়ের সাক্ষী। <strong>“ وَ اللّٰهُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَهِیۡدٌ /আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী”।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7"><sup>[7]</sup></a></strong> যার কারণে পর্দা শুধুমাত্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘আমার চোখে’ কিংবা বাহিরের ‘অন্যদের চোখে’ কেমন লাগলো এর সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, আমার রব আমাকে কেমন দেখছেন এর সাথেও এই বিষয়টি সম্পর্কিত। কেননা কোন দৃষ্টি-ই মহান প্রভুর দৃষ্টির চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়। <strong>কলবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা হলো চোখ। এ চোখকে যারা রক্ষা করতে পারবে তাঁরা আল্লাহর নজরগাহ হিসেবে আখ্যায়িত কলবকেও রক্ষা করতে পারবে। হাদীসে যেমনটা বর্ণিত হয়েছে; “إِنَّ اللهَ تعالى لَا ينظرُ إلى صُوَرِكُمْ وَأمْوالِكُمْ ، ولكنْ إِنَّما ينظرُ إلى قلوبِكم وأعمالِكم / নিশ্চয় আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না তোমাদের শরীর এবং তোমাদের আকৃতির দিকে, বরং দৃষ্টি দিবেন তোমাদের অন্তর ও তোমাদের কর্মসমূহের দিকে”।</strong></p>
<p>এখানে আমাদের মনে এমন একটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারেঃ “ অগণিত গ্যালাক্সির স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা আমার পোশাক-আশাক কিংবা চুলের স্টাইলের দিকে কেনই বা নজর দিবেন?” এখানে মূল বিষয়টি আসলে পোশাক-আশাক কিংবা চুল দাঁড়ির সাথে সম্পর্কিত নয়। এখানে মূল বিষয়টি আসলে মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমতের সাথে সম্পর্কিত। কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও হিকমত সম্পর্কে অবহিত করেছেন এবং তাঁদের ফিতরাতের মধ্যে যে মূল্যবোধ দিয়েছেন সেই মূল্যবোধের দাবির আলোকে বসবাস করতে বলেছেন। তাঁরা তাঁদের রবের উপর ঈমান আনবে কি আনবে না এটা তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। পর্দা ও শরীরকে আবৃত করে রাখার বিষয়টিও মহান প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষের নিকট চাওয়া সেই সকল মূল্যবোধসমূহের মধ্যকার একটি । মূলত, পর্দার বিষয়টিকে শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ একটি বিষয় বলে ধারণা করার কারণে অনেকেই এই ধরণের প্রশ্ন করে থাকেন। অনেকেই আবার আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে পর্দাকে শুধুমাত্র নারীদের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখে থাকেন। বিশেষ করে <strong>আধুনিক সময়ে পর্দাকে বাহ্যিক একটি বিষয় হিসেবে উত্থাপন করে একে আদর্শিক একটি  সংঘর্ষের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যা খুবই বিপদজনক একটি দৃষ্টিভঙ্গী। অথচ পর্দা আদর্শিক (Ideological) কোন প্রতীক নয়; পর্দা হল বিশ্বাস, ইজ্জত-আব্রু ও সম্মানের প্রতীক। ফিতরাত, ইজ্জত, সতীত্ব, ব্যক্তিত্ব ও ইস্তিকামাতের বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশের নাম হল পর্দা।</strong> এর আলোকে পর্দা আদবকে সজ্জিত করে এবং মানুষকে পরিশুদ্ধ একটি রূহের মাধ্যমে বসবাস করতে সাহায্য করে। পর্দা নিভপ্ল একটি আলামত কিংবা কোন প্রতীক নয়, পর্দা হল একটি আয়াত। প্রতীক হল জাগতিক ও শারীরিক একটি বিষয় অপরদিকে আয়াত হলো আধ্যাত্মিক ও রূহী একটি বিষয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>ফিকহী</strong> <strong>দৃষ্টিকোণ</strong><strong>  </strong></h5>
<p>আমাদের অধিকাংশ আলেম-ই পর্দার প্রকৃতি ও সীমানাকে, শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে আওরাত ও ফিতনার উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোরআন ও সুন্নতের নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করে আঞ্চলিক ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়কে দ্বীনি বিধানের সাথে সম্পর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পর্দার ব্যাপারে পুরুষদের অসামঞ্জস্যতাকে বৈধতাদানকারী, পুরুষদেরকে কেন্দ্রে রেখে পর্দার ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি  দাঁড় করানো হয়েছে সেটা ধর্মীয় নয় বরং সাংস্কৃতিক। পর্দাকে যদি শুধুমাত্র আওরাত<a href="#_ftn8" name="_ftnref8"><sup>[8]</sup></a> ও ফিতনা নামক পরিভাষাদ্বয় এর উপর ভিত্তি করে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে,</p>
<ul>
<li>১। পর্দাকে কেবলমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে বিন্যস্তকারী একটি বিষয় হিসেবে দেখা হবে।</li>
<li>২। পুরুষরা যেন ফেতনায় পতিত না হয় এই কারণে নারীদেরকে পর্দা করার আদেশ করা হয়েছে, এমন একটি ধারণা তৈরি হবে। অথচ এরকম চিন্তা ইলাহী হিকমতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।</li>
<li>৩। পর্দার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাহ্যিক বিষয় সমূহকেই আবশ্যকীয় বলে পালন করা হবে এবং পর্দার রূহকে উপেক্ষা করা হবে।</li>
</ul>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে প্রথমে পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,</p>
<blockquote><p>قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ</p>
<p>অর্থাৎ, মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করবে। <a href="#_ftn9" name="_ftnref9"><sup>[9]</sup></a></p></blockquote>
<p>পুরুষদের পরে নারীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,</p>
<blockquote><p>وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ</p>
<p>অর্থাৎ, আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের সতীত্বের হেফাযত করে।<a href="#_ftn10" name="_ftnref10"><sup>[10]</sup></a></p></blockquote>
<p>এই সকল আয়াতকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পর্দার বিষয়টি শুধুমাত্র নারীদের জন্যই নয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা নারী ও পুরুষ একে অপরকে পরস্পরের জন্য পর্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মহান প্রভুর ভাষায়, <strong>“ هُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّهُنَّ / তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ”। <a href="#_ftn11" name="_ftnref11"><sup>[11]</sup></a></strong></p>
<p>খাজানের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ তাঁর <em>“</em><em>কোরআনে</em> <em>কারীমের</em> <em>আয়াতের</em> <em>নূরের</em> <em>আলোকে</em> <em>খাতুন</em><em>”</em>  নামক গ্রন্থে বলেন, “<strong>“আমাদের আলেমগণ পর্দা সংক্রান্ত সকল বিধানসমূহকে ‘ফিতনার ভয়’- এর মত ধারণামূলক একটি হিকমতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার কারণে এ বিধানসমূহ কখনো কখনো এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে নারীগণ সূর্যের নূর থেকে জ্ঞানের আলো পর্যন্ত অনেক বিষয় থেকেই বঞ্চিত হয়েছে। অথচ, জ্ঞান ও ঈমানের আলো কখনো ফিতনা হতে পারেনা। যদি ফিতনা থেকেই থাকে তা থাকার সম্ভাবনা পুরুষদের চোখে, অন্তরে ও ভাষায়। তাই ফিতনা থেকে যদি নিষ্কৃতি পেতেই হয়, তবে পুরুষদের চোখে নিকাব, কলবে আদব এবং মুখে লাগাম লাগানোই হবে মোক্ষম তদবীর। </strong></p>
<p>এ কারণে সকল আসমানী দ্বীন কর্তৃক গৃহীত পর্দাকে কেবল ফিতনার সাথে সম্পর্কিত করার অধিকার কারোর-ই নেই। কেননা ইসলাম আনীত পর্দার বিধানটি শুধুমাত্র নারীদের মুখমণ্ডল ও শরীরের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়-ই নয়, একই সাথে তা তাঁদের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকারের সাথেও সম্পর্কিত। পর্দাকে কখনোই “ আওরাতের পর্দা” হিসেবে আদেশ করা হয়নি। পর্দাকে সম্মানের প্রতীক, ইসমাতের চাদর এবং সম্মানের ইহরাম হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। ঘরের মধ্যে নারীরা যে অংশে অবস্থান করেন সেই অংশকে হেরেম বলার কারণ হল হুরমাত বা  সম্মানের কারণে। কাবাকে যে উদ্দেশ্যে হারাম বলা হয়ে থাকে, নারীরা যে ঘরে অবস্থান করে সেই ঘরকেও এজন্যই হারাম বা হারেম বলা হয়ে থাকে”।</p>
<p>সংক্ষেপে বলতে গেলে উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ মতে ইসলামের পর্দার বিষয়টি সকলের জন্যই আবশ্যকীয়। যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই পরিগ্রহ করে থাকে। হায়া ও সতীত্বকে রক্ষা করা এবং এ চেতনাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব শুধুমাত্র নারীদের-ই নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপরেই এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য সেটা পর্দার সীমা ও পরিসীমার সাথে সম্পর্কিত। যেমনটা আয়াতের ধারাবাহিকতায় এসেছে, “  وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِهِنَّ / তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে”।<a href="#_ftn12" name="_ftnref12"><sup>[12]</sup></a> এ আদেশের মাধ্যমে হিজাবকে নারীদের জন্য পর্দার একটি পরিপূরক বিষয় হিসেবে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>পর্দার ব্যাপারে যে ফিকহী দৃষ্টিকোণ রয়েছে তাঁর মধ্যে অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার সম্পর্ক। প্রথমত আমি বলতে চাই যে, মানুষ ও তাঁর শরীরের মধ্যকার যে সম্পর্ক, তা মালিকানার কোন সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্ক হল আমানতের সম্পর্ক। আধুনিক সময়ে আমরা একটি কথা অনেক বেশী শুনে থাকি, সে কথাটি হলো, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”। এটাকে অনেক সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে  ব্যক্তি স্বাধীনতা হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সাথে তাঁর রবের যে মিসাক (চুক্তি) তাঁর মধ্যে অন্যতম একটি হলো আমানতের চুক্তি (মিসাক)। এ মিসাক বা চুক্তি অনুযায়ী সকল কিছুকেই মানুষের নিকটে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজগতের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্ক প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা মালিকানার সম্পর্ক নয়। মানুষের সাথে মহাবিশ্বের যে সম্পর্ক সে সম্পর্ক হলো আমানতের সম্পর্ক। ফলশ্রুতিতে শরীর আমাদের মালিকানাধীন কোন বিষয় নয়, আমাদের নিকট আমানত।</p>
<p>এ মিসাকের  (চুক্তি) মাধ্যমে আমরা সাক্ষ্য দিয়ে থাকি যে আমরা আমাদের শরীরের উপর আধিপত্য ও প্রভুত্ব কায়েম করব না। আমরা বুঝতে পারব যে, “ শরীর আমার এটাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারও আমার”, এ কথা বলার অধিকার আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি উপলব্ধি করতে পারব যে, আমি আমাকে অন্যের সামনে একটি পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারি না। এই মিসাক আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমার শরীর হল আমার নিকট রাখা একটি আমানত এবং কোন অবস্থাতেই আমি এই আমানতের খেয়ানত করতে পারি না। যেমনটা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন,</p>
<blockquote><p> “ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَخُوۡنُوا اللّٰهَ وَ الرَّسُوۡلَ وَ تَخُوۡنُوۡۤا اَمٰنٰتِکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ</p>
<p>তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, আর যে বিষয়ে তোমরা আমানাত প্রাপ্ত হয়েছ তাতেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না”। <a href="#_ftn13" name="_ftnref13"><sup>[13]</sup></a></p></blockquote>
<p>পর্দার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অপর একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পর্দাকে এমনভাবে তুলে ধরা যা নারীদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই ক্ষেত্রে “ নারীদের আওয়াজ হলো আওরাত, তাঁদের মুখমণ্ডল ও হাত-পা হলো আওরাত” এ ধরণের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবের বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। <strong>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে , “وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا / তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে” এই কথা বলার পরেও, এবং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবু বকরের (রা) কন্যা, হযরত আসমার (রা) উপর ভিত্তি করে নারীদের পর্দার সীমানাকে উম্মতের সামনে সুস্পষ্ট করে দেওয়ার পরেও<a href="#_ftn14" name="_ftnref14"><sup>[14]</sup></a> বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে কিছু কিছু আঞ্চলিক পোশাকের উপর ভিত্তি করে জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার মত প্রান্তিক চিন্তাকে মেনে নেওয়া হয়েছে।</strong> অথচ নারীদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী রেখে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা পর্দার উদ্দেশ্য নয়। পর্দার উদ্দেশ্য হলো নারীগণ যেন নিরাপত্তা ও শালীনতার সাথে সমাজের সকল স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং নর ও নারী উভয়ের জন্যই এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে তাঁরা মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালো কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করা এবং দ্বীনের রহমত ও হিকমতকে প্রচারের দায়িত্ব নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উভয়কেই দিয়েছেন। মহান প্রভুর ভাষায়ঃ</p>
<blockquote><p>وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ یُطِیۡعُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ</p>
<p>অর্থাৎ “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা নামাজ আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।আল্লাহ শীঘ্রই এদের উপর দয়া (মারহামাত) করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।</p></blockquote>
<h5><strong>৪</strong><strong>।</strong> <strong>পর্দার</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>দৃষ্টিভঙ্গী</strong></h5>
<p>প্রথমত এই বিষয়টি সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, দ্বীন ইসলামে আখলাক ফিতরাতের থেকে, কালাম কিংবা ফিকহ থেকে আলাদা বিভাগে অবস্থানকারী কোন বিষয় নয়। জোর দিয়ে বলতে চাই যে, “ কোন কিছু  আখলাকী” এর অর্থ মোটেই এই নয় যে তা ঐচ্ছিক একটি বিষয়”। কোন কিছু আখলাকী এর অর্থ হলো, তা আবশ্যক একটি বিষয়। যারা আখলাককে ‘হলেও চলবে না হলেও চলবে’ এমন একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন তাঁরা মূলত দ্বীনের মধ্যে আখলাকের অবস্থানকে নির্ণয় করতে পারেন না। কেননা ইসলামে আখলাক পরিপূর্ণতাদানকারী কোন বিষয় নয়, আখলাকের বিষয়টি অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। অনুরূপভাবে একথা বলাও সম্ভবপর নয় যে, দ্বীন ও আখলাক আলাদা আলাদা বিষয়। দ্বীন থেকে আখলাককে আলাদা করে ফেলার অর্থ হল, স্বয়ং দ্বীনকেই আলাদা করে ফেলা। দ্বীন ও আখলাক যেমন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ অনুরূপভাবে দ্বীনের আহকাম কেও আখলাক থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা যায় না। কেননা, <strong>“ الاخلاق عقل الأحكام / আখলাক হলো, আহকামের আকল”। </strong> পর্দার আখলাকী ভিত্তি হলো হায়া। আমরা অনেকেই মনে করে থাকি যে, হায়া মানে হল লজ্জাশীলতা, আসলে তা নয়। হায়ার অর্থ আরও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। হায়া ও হায়াত একই উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে। হায়ার অপর নাম হল হায়াত। হায়া অনেকটা তাকওয়ার মত আল্লাহর প্রতি দায়িত্বানুভূতির চেতনা। হায়া স্বয়ং কল্যাণ।<a href="#_ftn15" name="_ftnref15"><sup>[15]</sup></a> হায়া হল কুল্লি একটি আখলাক। কুৎসিত, অসুন্দর ও  বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং ভাল, সুন্দর ও সঠিককে মেনে চলার নাম হল হায়া। হায়া হল এমন এক চেতনার নাম, যে চেতনা আমাদেরকে খারাপের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহ যে আমাদের সব কিছুই দেখছেন এ বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দিবে। অপরদিকে পর্দা ও হিজাব মানুষের হায়াকে লালিত করে। আর রূহ এখান থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। রূহ হল পানির মত। যে পাত্রে যায় এই পাত্রের-ই আকার ধারণ করে।</p>
<p>রাসূলে আকরাম  (স) একটি হাদীসে হায়াকে, ইসলামের মূল আখলাক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, <strong>“ إنَّ لِكُلِّ دينٍ خُلُقًا، وإنَّ خُلُقَ الإسلامِ الحياءُ / প্রতিটি দ্বীনের-ই মৌলিক একটি আখলাক রয়েছে। ইসলামের মূল আখলাক হল হায়া”।<a href="#_ftn16" name="_ftnref16"><sup>[16]</sup></a></strong> এর আলোকে হায়া শুধুমাত্র একটি মূল্যবোধের নাম নয়। হায়া হল মূল্যবোধ উৎপাদনকারী কুল্লি একটি আখলাকের নাম।</p>
<p>রাসূল (স) হায়া ও ঈমানকে একে অপরের থেকে আলাদা কোন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি বলেন,</p>
<blockquote><p>الحياء شعبة من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের একটি শাখা।<a href="#_ftn17" name="_ftnref17"><sup>[17]</sup></a></p>
<p>الحياء من الإيمان</p>
<p>অর্থঃ হায়া হলো ঈমানের অংশ।<a href="#_ftn18" name="_ftnref18"><sup>[18]</sup></a></p>
<p>الحياءُ والإيمانُ قرناءُ جميعًا فإذا رُفِع أحدُهما رُفِع الآخرُ</p>
<p>অর্থঃ ঈমান ও হায়া হলো ভাইয়ের মত। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।<a href="#_ftn19" name="_ftnref19"><sup>[19]</sup></a></p></blockquote>
<p>রাসূলে করীম (সঃ) হায়াকে অন্য একটি হাদীসে সকল পয়গাম্বর কর্তৃক আনীত অভিন্ন একটি মূল্যবোধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<blockquote><p>إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحى فاصنعْ مَا شئْتَ</p>
<p>অর্থাৎ, সমগ্র মানবতা, প্রথম দিন থেকে এমন একটি কথা জানেন যে কথার ব্যাপারে সকল পয়গাম্বর ঐকমত্য পোষণ করেছেন সেটা হলো, যদি হায়া না থাকে তাহলে যা ইচ্ছা তাই করতে পার।<a href="#_ftn20" name="_ftnref20"><sup>[20]</sup></a></p></blockquote>
<h5>৫। <strong>পর্দার ব্যাপারে নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ</strong></h5>
<p>দ্বীনের প্রতিটি হুকুমের-ই নান্দনিক বা সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। ইসলামের প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রেই আল্লাহর জামাল নামের একটি প্রতিফলন দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন শাহাদাতের চেতনার অধিকারী হয় তখন সে এমন এক অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনে যা তাঁকে প্রতিমুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছে। আখলাকী মূল্যবোধ ও দ্বীনের বিধানসমূহকে শুধুমাত্র কামাল (পরিপূরক) হিসেবেই নয়; জামাল হিসেবেও দেখে থাকে এবং এই জামাল মানুষের মধ্যে জ্ঞান, হিকমত, মারেফত ও মুহাব্বতে রূপান্তরিত হয়।</p>
<p>পর্দার দায়িত্ব শুধুমাত্র শরীরকে ঢেকে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার একই সাথে নান্দনিক ও সৌন্দর্যগত একটি দিক রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, <strong>“ قَدۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکُمۡ لِبَاسًا یُّوَارِیۡ سَوۡاٰتِکُمۡ وَ رِیۡشًا / আমি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার ও শোভা বর্ধনের জন্য তোমাদের পোশাক পরিচ্ছদের উপকরণ অবতীর্ণ করেছি”।</strong> এই আয়াতের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষের জন্য পর্দার একই সাথে  সৌন্দর্যগত একটি দিকও রয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত رِیۡشً/রিশ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল পাখির পালক। <strong>কোরআনের ভাষায় রিশ দ্বারা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার সর্বোচ্চ চূড়া বুঝানো হয়ে থাকে।</strong> ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর ভাষায়, رِیۡشً/রিশ হল পর্দার সৌন্দর্যগত দিক। অর্থাৎ رِیۡشً/রিশ যিনাতেরও উপরের একটি সৌন্দর্যকে বুঝিয়ে থাকে। তবে কোরআনে রিশ শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই নয়, আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকেও ব্যক্ত করে থাকে। অপর একটি আয়াতে মহান রব কাবা ঘরকে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকারী জাহেলী সমাজকে এই অবস্থা থেকে বিরত রাখার জন্য বলেছেন, <strong>“یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ / হে আদম সন্তান! মসজিদে যাওয়ার সময় সাজসজ্জা করো”। <a href="#_ftn21" name="_ftnref21"><sup>[21]</sup></a></strong> এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে লঙ্ঘন না করা। তাছাড়া এখানে নির্দিষ্ট কোন অবয়ব কিংবা পোশাকের কথা বলা হয়নি। অন্যথায় আবহাওয়া ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে পোশাক আশাকে ভিন্নতা একটি রহমত স্বরূপ। ইসলাম পোশাকে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন পোশাক বা ধরণ চাপিয়ে দেয়নি। ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে মেনে চলার পরও যদি কেউ কারোর উপর পোশাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ধরণকে চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেটা হবে এই রহমতকে লঙ্ঘন করার শামিল।</p>
<p>আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের ভাষায় দুই ধরণের সৌন্দর্য রয়েছে। একটি হল <strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong> অপরটি হলো <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>।</p>
<p><strong>ভেনাসী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong>, তার নামকে তিনি রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে ( Roman Mythology)<a href="#_ftn22" name="_ftnref22"><sup>[22]</sup></a> আলোচিত প্রেম, সৌন্দর্য ও কামনার দেবী ভেনাস থেকে নিয়েছেন। আর সেটা গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে (Greek Mythology) আলোচিত আফ্রোদিতি থেকে এসেছে। এটার দ্বারা শুধুমাত্র শারীরিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর এর উৎস হলো জাগতিক আবেগ ও অনুভূতি। এটা শুধুমাত্র আবেগকে উদ্বেলিত করে থাকে, প্রভাবিত করে, কিন্তু প্রতারণামূলক। <strong>মানুষকে</strong> <strong>বস্তুগত জগৎ</strong> <strong>ও</strong> <strong>বাহ্যিকতার</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বন্দী</strong> <strong>করে</strong> <strong>ফেলে</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>অপরটি</strong> <strong>হল</strong> <strong>ইউসুফী</strong> <strong>সৌন্দর্য</strong><strong>।</strong> এই সৌন্দর্যের নামকে তিনি হযরত ইউসুফ (আ) থেকে নিয়েছেন। ইউসুফী সৌন্দর্যের ভিত্তি হল, শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রূহী সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দের চেয়ে চোখের নূর ও কালবের প্রশান্তি রয়েছে। এই সৌন্দর্য শুধুমাত্র বাসারকেই (দৃষ্টিকেই) নয়, বাসিরাতকেও (দূরদৃষ্টি) উদ্দেশ্য করে কথা বলে। প্রভাবিত করে কিন্তু প্রতারিত করে না। মানুষকে সুন্দর ও নান্দনিকতার দিকে পরিচালিত করে। হাদীসের ভাষ্য মতে, <strong>“إنَّ اللهَ جميلٌ يُحبُّ الجمالَ / আল্লাহ তায়ালা সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন”।<a href="#_ftn23" name="_ftnref23"><sup>[23]</sup></a></strong></p>
<p>সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ব্যাখ্যানুসারে হযরত ইউসুফের তিনটি পোশাক পর্দার তিনটি ধরণ ও তিন বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে।</p>
<p>প্রথমটি হল মিথ্যাবাদী পোশাক। ‘ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে’ এই কথা বলার জন্য ইউসুফ (আ) এর ভাইয়েরা তাঁদের বাবার নিকট রক্তমাখা যে পোশাক নিয়ে যায় এই পোশাক। “ وَ جَآءُوۡ عَلٰی قَمِیۡصِهٖ بِدَمٍ کَذِبٍ ؕ / আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল”।<a href="#_ftn24" name="_ftnref24"><sup>[24]</sup></a></p>
<p>দ্বিতীয় পোশাক হলো, ছেঁড়া পোশাক কিন্তু সেই শার্ট সামনে থেকে নয়, বরং পেছন থেকে ছেঁড়া ছিলো। সে পোশাক ছিলো এমন পোশাক যা তাঁর পরিধানকারীকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে হায়া’র দিকে ধাবিত করেছিলো। “وَ اِنۡ کَانَ قَمِیۡصُهٗ قُدَّ مِنۡ دُبُرٍ فَکَذَبَتۡ وَ هُوَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ  / আর তার জামা যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয় তাহলে সে (মহিলা) মিথ্যা বলেছে এবং সে (পুরুষ) হচ্ছে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত”।<a href="#_ftn25" name="_ftnref25"><sup>[25]</sup></a></p>
<p>তৃতীয় পোশাক হলো, অন্ধ চোখকে উন্মীলিতকারী পোশাক। এ পোশাকের আধ্যাত্মিক একটি ঘ্রাণ ও সুন্দর একটি দিক রয়েছে। যা চোখকে খুলে দেয় এবং বাসিরাতকে (দূরদৃষ্টি) বৃদ্ধি করে। এর ঘ্রাণ এমনকি হযরত ইয়াকুবের অন্ধ হয়ে যাওয়া চক্ষুকে খোলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিলো। আর এটা হল এমন জামা যা চক্ষুকে উম্মুক্ত করে দেয় এবং বাসিরাতকে লালিত করে। <strong>“اِذۡهَبُوۡا بِقَمِیۡصِیۡ هٰذَا فَاَلۡقُوۡهُ عَلٰی وَجۡهِ اَبِیۡ یَاۡتِ بَصِیۡرًا / তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও, অতঃপর সেটি আমার পিতার চেহারায় স্পর্শ করাও। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন”। <a href="#_ftn26" name="_ftnref26"><sup>[26]</sup></a></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি জানি যে সকল বিষয়ের মত পর্দা নিয়েও তোমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আর এর পেছনে অনেক অভ্যন্তরীণ ও বহির্গত কারণ রয়েছে সেটাও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে নয়। আমাদের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনাসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের এই সকল জেরা ও জিজ্ঞাসাসমূহ যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং আমাদেরকে আমাদের রবের দিকে ধাবিত করে। অন্যথায় এসকল জিজ্ঞাসা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর অন্য কোনকিছু বয়ে আনবে না। যেসকল আত্মজিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণ আমাদের মূল্যবোধকে বিনাশ করে দেয় তা সঠিক কোন জিজ্ঞাসা বা বিশ্লেষণ হতে পারে না।</p>
<p>হিজাব কিংবা পর্দাকে ছেড়ে দেওয়া শুধুমাত্র হিজাব ও পর্দাকে ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। কেননা পর্দা হলো মহান প্রভুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার একটি বহিঃপ্রকাশ। পর্দা মানুষকে তার অবস্থান সম্পর্কে  সচেতন করে তুলে এবং মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ একটি জীবনধারা অর্জনে সাহায্য করে। আর এ ক্ষেত্রে শুধু পর্দা করলে কিংবা হিজাব পরিধান করলেই হবে না, আমি কেন পর্দা করি, কেন হিজাব পড়ি এই বিষয়কে কোরআনের আলোকে জানতে হবে এবং আল্লাহর আখলাককে আখলাকাসম্পন্ন হতে হবে। আমরা যদি এই চেতনাকে ধারণ পর্দা করতে পারি তখন-ই কেবলমাত্র আমাদের নিজেদেরকে ইস্তেকামাতের পথে দৃঢ় রাখতে পারবো।</p>
<p>সমাজবিজ্ঞানে হাবিটাস (Habitus) নামে একটি পরিভাষা রয়েছে। হাবিটাস (Habitus)  ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিতকারী এবং আমরা যে সমাজে বসবাসকরী সেই সামাজিক জীবন। বিগত শতাব্দী পর্যন্ত  হাবিটাস (Habitus) ছিল পর্দার প্রভাবাধীন, অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ-ই পর্দা করত। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে এই হাবিটাস (Habitus)- এ পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষ পর্দাকে পরিত্যাগ করে শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমি জানি আমাদের তরুণ-তরুণীরা স্বাধীনতাকে অনেক বেশী পছন্দ করে। তবে নফসের নিকট আত্মসমর্পণ করার নাম স্বাধীনতা নয়। অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনুসরণ করে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোকে মেনে  জীবন পরিচালনা করাকেও স্বাধীনতা বলে না। সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো, আমাদের উপর বৈশ্বিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই সকল হাবিটাস (Habitus)- এর নিকটে আত্মসমর্পণ না করা</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> সূরা আরাফ, ১৯-২৩।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> আরাফ, ২৬।</p>
<p><a href="#_ftnref3" name="_ftn3">[3]</a> বালাদ, ৭</p>
<p><a href="#_ftnref4" name="_ftn4">[4]</a> হাদিদ, ৪</p>
<p><a href="#_ftnref5" name="_ftn5">[5]</a> বাকারা, ১১৫।</p>
<p><a href="#_ftnref6" name="_ftn6">[6]</a> আরাফ, ১৭২।</p>
<p><a href="#_ftnref7" name="_ftn7">[7]</a> বুরুজ, ৭।</p>
<p><a href="#_ftnref8" name="_ftn8">[8]</a> আওরাত বলতে আমাদের ভাষায় মেয়েলোক বা নারী জাতি বুঝায়। কিন্ত আরবী ভাষায় এর মানে হয় বাধা ও বিপদের জায়গা এবং যে জিনিসের খুলে য়াওয়া মানুষের জন্য লজ্জার ব্যাপার এবং যার প্রকাশ হয়ে পড়া তার জন্য অস্বস্তিকর হয় এমন জিনিসের জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া কোন জিনিসের অসংরক্ষিত হওয়া অর্থেও এর ব্যবহার হয়। (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref9" name="_ftn9">[9]</a> নূর, ৩০।</p>
<p><a href="#_ftnref10" name="_ftn10">[10]</a> নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref11" name="_ftn11">[11]</a> বাকারা, ১৮৭।</p>
<p><a href="#_ftnref12" name="_ftn12">[12]</a> সূরা নূর, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref13" name="_ftn13">[13]</a> আনফাল, ২৭।</p>
<p><a href="#_ftnref14" name="_ftn14">[14]</a> আবু দাউদ, লিবাস, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref15" name="_ftn15">[15]</a> মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ৩৭।</p>
<p><a href="#_ftnref16" name="_ftn16">[16]</a> ইবনে মাজা, যুহুদ, ১৭।</p>
<p><a href="#_ftnref17" name="_ftn17">[17]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৮; নাসাঈ, ঈমান, ১৬।</p>
<p><a href="#_ftnref18" name="_ftn18">[18]</a> মুসলিম, ঈমান, ৫৯।</p>
<p><a href="#_ftnref19" name="_ftn19">[19]</a> হাকিম, <em>মুসতাদরাক</em><em>,</em> ৫৮।</p>
<p><a href="#_ftnref20" name="_ftn20">[20]</a> বুখারী, আদব, ৭৮।</p>
<p><a href="#_ftnref21" name="_ftn21">[21]</a> আরাফ, ৩১।</p>
<p><a href="#_ftnref22" name="_ftn22">[22]</a> Venus is a Roman goddess, whose functions encompass love, beauty, desire, sex, fertility, prosperity, and victory. In Roman mythology, she was the ancestor of the Roman people through her son, Aeneas, who survived the fall of Troy and fled to Italy. Julius Caesar claimed her as his ancestor. Venus was central to many religious festivals and was revered in Roman religion under numerous cult titles. (অনুবাদক)</p>
<p><a href="#_ftnref23" name="_ftn23">[23]</a> মুসলিম, ঈমান, ১৪৭।</p>
<p><a href="#_ftnref24" name="_ftn24">[24]</a> ইউসুফ, ১৮।</p>
<p><a href="#_ftnref25" name="_ftn25">[25]</a> ইউসুফ,২৭ ।</p>
<p><a href="#_ftnref26" name="_ftn26">[26]</a> ইউসুফ,৯৩ ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-veil-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15602</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইমাম আযম আবু হানীফার (রহঃ) তাঁর ছাত্রের উদ্দেশ্যে উপদেশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/imam-abu-hanifas-advice-to-his-student/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/imam-abu-hanifas-advice-to-his-student/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 15 Nov 2024 11:22:22 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15220</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম [ইমাম আবু হানীফা তাঁর একজন ছাত্র ‘ইউসুফ বিন খালিদ আস-সামতি’ কে বসরায় পাঠানোর সময় এই উপদেশ প্রদান করেন] সামতি, জেনে রাখো, তুমি যখন মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে, ভালো সম্পর্ক না রাখবে, তখন তারা শত্রুতে রুপান্তরিত হবে।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;"><strong>বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম</strong><br />
[ইমাম আবু হানীফা তাঁর একজন ছাত্র ‘ইউসুফ বিন খালিদ আস-সামতি’ কে বসরায় পাঠানোর সময় এই উপদেশ প্রদান করেন]</p>
<p style="text-align: left;"><em>সামতি, জেনে রাখো, তুমি যখন মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে, ভালো সম্পর্ক না রাখবে, তখন তারা শত্রুতে রুপান্তরিত হবে। তারা তোমার বাবা মা হলেও। আর যদি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করো, তাহলে তারা তোমার আত্মীয়তে পরিণত হবে, তোমার আত্মীয় না হলেও।</em></p>
<p style="text-align: left;">ধরে নিচ্ছি, তুমি বসরায় গিয়েছো। এবং সেখানকার মানুষের সাথে বিরুদ্ধাচারণ শুরু করেছো। তারা যেসব চিন্তা করে, তার বিরুদ্ধে তুমি বলা শুরু করেছো। তুমি তাদের উপর তোমার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা শুরু করেছো। এবং তুমি তোমার জ্ঞান দিয়ে তাদেরকে পরাভূত করার চেষ্টা করতেছো। যদি এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়,</p>
<ul>
<li style="text-align: left;"> তাহলে তুমি তাদেরকে যতটুকু দূরে ঠেলে দিবে, তারাও তোমার থেকে ততটুকুই দূরত্ব বজায় রেখে চলবে।</li>
<li style="text-align: left;"> যদি তুমি তাদের নিন্দা করো, তারাও তোমার নিন্দা করবে।</li>
<li style="text-align: left;">যদি তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলো, তারাও তোমাকে অনুরুপ অভিযোগ আরোপ করবে।</li>
<li style="text-align: left;">তাদেরকে বিদয়াতী বললে তারাও তোমাকে বিদয়াতী বলবে।</li>
<li style="text-align: left;">যদি তুমি এরকম করতে থাকো, তাহলে এটা আমাদের জন্য এবং তোমার জন্য একটা দুঃখের বিষয়।</li>
</ul>
<p style="text-align: left;">আমি চাইনা পরবর্তীতে তাদের থেকে তুমি পালিয়ে চলে আসো। এ<strong>টা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ না যে, তুমি তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে পারছো না।</strong> এই অবস্থায় যদি আল্লাহ তোমার জন্য কোনো পথ উন্মুক্ত করে না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি সমস্যায় পড়ে থাকবে।</p>
<p style="text-align: left;">এসব শুনে সামতি চিন্তায় পড়ে গেলেন এবং করণীয় সম্পর্কে ভাবতে লাগলেন।</p>
<p style="text-align: left;">তারপর আবু হানিফা তাকে বলেন, যখন তুমি বসরাতে যাবে, লোকেরা তোমাকে স্বাগত জানাবে, তোমার সাথে সাক্ষাত করতে আসবে, যখন তাদের মর্যাদা বুঝতে পারবে, তখন তাদের প্রত্যেকের অবস্থান অনুযায়ী তাদেরকে সম্মান করবে।</p>
<ul>
<li>সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শন করো।</li>
<li>যারা জ্ঞানের অধিকারী, তাদের প্রশংসা করো।</li>
<li>আর যারা বয়সে বড়, তাদেরকে সম্মান করো।</li>
<li>যারা যুবক, তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করো, তাদেরকে হাসাও।</li>
<li>সাধারণ মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করো, তাদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করো।</li>
<li>যারা পাপী, তাদের থেকে দূরে থাকো।</li>
<li>ভালো মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করো।</li>
<li>যেখানে যাবে, সেখানের সুলতানকে অবহেলা করো না, তাকেও বিবেচনায় নিও।</li>
<li>কাউকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিচু মনে করো না।</li>
<li>মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কখনোই কার্পণ্য করো না।</li>
<li>কারো কাছে নিজের গোপন বিষয় প্রকাশ করো না।</li>
<li>কাউকে যাচাই বাছাই না করে গভীর বন্ধুত্ব করতে যেও না। নিম্নশ্রেণীর মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তাদের কারো সাথে এমনভাবে কথা বলো না, যার ফলে তারা সরাসরি তোমার বিরোধিতা করতে আসে৷</li>
</ul>
<blockquote>
<p style="text-align: left;">সাবধান! মুর্খদের সাথে উঠাবসা করবে না। এদের দাওয়াত গ্রহণ করো না, হাদিয়া গ্রহণ করো না, তুমি এমতাবস্থায় ধৈর্য্য ধারণ করবে। উত্তম চরিত্র প্রদর্শন করবে এবং তোমার বক্ষকে উন্মুক্ত রাখবে। সুন্দর পরিস্কার ও নতুন কাপড় পরিধান করবে, বেশি বেশি সুগন্ধি ব্যবহার করবে, এবং এটার প্রসার ঘটাবে।</p>
</blockquote>
<ul>
<li style="text-align: left;">তোমার মজলিসকে গুরুত্ব দিও, যাতে সবাই দেখা সাক্ষাৎ করতে পারে, সহজেই তোমার কাছে আসতে পারে।</li>
<li style="text-align: left;">নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করো, যাতে সবাই তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য তোমার কাছে আসে।</li>
<li style="text-align: left;">মানুষের খোজ খবর নিও।</li>
<li style="text-align: left;">নামাজের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।</li>
<li style="text-align: left;">প্রচুর পরিমাণ খাবার খাওয়াবে। কারণ কৃপন ব্যক্তি কখনো মানুষের নেতৃত্ব দিতে পারে না।</li>
</ul>
<p style="text-align: left;">এমন কিছু মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখো, যাদের মাধ্যমে সব ধরনের খবর নিতে পারো। যদি কোথাও ফাসাদ বা পাপাচার দেখতে পাও, সেটাকে বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করবে। কোথাও সংশোধনমূলক কাজ দেখলে সেখানে ভূমিকা রাখবে। যারা তোমার কাছে আসে, আর যারা আসে না, সবার কাছেই সফর করো। যারা ভালো ব্যবহার করে আর যারা করেনা, সবার সাথেই ভালো ব্যবহার করো। ক্ষমা এবং সৎকাজের আদেশ দাও, অর্থাৎ নিজের আমল দিয়ে সৎকাজের প্রসার ঘটাও। যেসব বিষয় তোমার সাথে সম্পৃক্ত নয়, সেসব থেকে দূরে থাকো। যা তোমাকে কষ্ট দেয়, তা থেকে দূরে থাকো। তোমার উপর অর্পিত দায়িত্বকে সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করো।</p>
<ul>
<li>যদি তোমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়, তাহলে তুমি নিজে তাদের খোজ নাও।</li>
<li>যদি যেতে না পারো, তাহলে অন্তত তাদের কাছে তোমার বার্তা প্রেরণ করো।</li>
<li>কেউ হারিয়ে গেলে তার খোজ নেওয়ার চেষ্টা করো।</li>
<li>মানুষ যতক্ষণ তোমার কাছে আসতে চায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি সেখান থেকে চলে যেও না।</li>
</ul>
<p style="text-align: left;">প্রতিবেশির সাথে ভালো সম্পর্ক রাখো। যারা তোমার কাছে আসে, তাদের সম্মান করো। যারা কষ্ট দেয়, তাদেরকে ক্ষমা করো। কেউ তোমার সাথে মন্দ ভাষায় কথা বললে, তুমি তাদের সাথে উত্তম ভাষায় জবাব দাও। সে মৃত্যুবরণ করলে তার অধিকার পূরণ করো। বেশি বেশি সালাম দাও, সে যেকোনো নিম্ন শ্রেণীর হলেও। কোনো মজলিসে বা আলোচনায় কেউ তোমার সাথে দ্বিমত করলে তুমি সাথেসাথেই তাদের বিরুদ্ধে বলতে যেও না। তারা প্রশ্ন করলে তাদের লেভেল অনুযায়ী জবাব দাও। তবে আরেকটি বিষয় এখানে খেয়াল রেখো, সেটা হচ্ছে,</p>
<ul>
<li>জবাব দিতে গিয়ে এটাও বলবে যে, এ বিষয়ে মতামত আছে এবং সেটার দলিল হচ্ছে এই। তাহলে তারা তোমার অবস্থান, তোমার কতটুকু যোগ্যতা, এটাও বুঝতে পারবে। এটা শুনে যদি তারা জিজ্ঞেস করে, এটা কার কথা, তাহলে তাদেরকে বলো কতিপয় ফকিহদের মতামত। (নিজেকে প্রকাশ করতে যেও না।) তাহলে তারা তোমার অবস্থান বুঝতে পারবে, তোমাকে মর্যাদা দিবে।</li>
<li>যাদের সাথেই তর্কবিতর্ক বা আলোচনা করো, তাদেরকেই তোমার জ্ঞান থেকে একটু দেওয়ার চেষ্টা করো, যাতে তারা তোমার জ্ঞানের গভীরতা বুঝতে পারে। আর এটা এমনভাবে উপস্থাপন করো, যাতে তারা একটু হলেও গ্রহণ করতে পারে।</li>
<li>কেবল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলোই তাদেরকে উপস্থাপন করবে, অপ্রয়োজনীয় জিনিস সামনে আনবে না। তাদের কাছে যাও, মাঝেমধ্যে ঠাট্টা মস্করা করো, খোশগল্প করো। এটা ভালোবাসার সৃষ্টি করে। এটা জ্ঞানের সম্পর্ককে ধারাবাহিকতাকে দান করে।</li>
<li>মাঝেমধ্যে তাদেরকে খাবার খাওয়াও। তাদের প্রয়োজন পূরণ করো। তাদের অবস্থা জানার চেষ্টা করো।</li>
<li>তাদের যেকোনো গোপন বিষয় উপেক্ষা করো, জানার চেষ্টা করো না। তাদেরকে কাছে টানার চেষ্টা করো, এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দাও।<br />
নিজেকে কখনোই সংকীর্ণ মানসিকতা ও ক্লান্ত হিসেবে উপস্থাপন করো না। সবসময় নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করো, যাতে মানুষ মনে করে তুমি তাদেরই একজন। মানুষ তাকেই নেতা হিসেবে গ্রহণ করে, যে তাদের মতো।</li>
<li>তাদের উপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে দিও না, যা তারা করতে সক্ষম নয়।</li>
<li>তুমি যা পছন্দ করো, তাদের জন্য তাই পছন্দ করো। সবসময় ভালো ধারণা করো। সততার পথ অবলম্বন করো। তাকওয়াকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরো।</li>
<li>যদি কেউ পরামর্শ করার মতো থাকে, তাহলে তার সাথে পরামর্শ করো।</li>
</ul>
<p>তুমি যদি এই উপদেশ মেনে চলতে পারো, তাহলে আবার আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে। এমনকি তুমি সেখানে ভালোভাবেই নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে পারবে।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 214px; top: 2725.09px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/imam-abu-hanifas-advice-to-his-student/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15220</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নন্দনতত্ত্বের অতীন্দ্রিয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 15 Sep 2024 13:08:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14806</guid>

					<description><![CDATA[তৌহীদ দ্বারা বুঝায় আল্লাহতত্ত্বকে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে প্রকৃতি সমগ্র রাজ্য থেকে আলাদাকরণ, যা কিছু সৃষ্টিতে বিদ্যমান, সৃষ্টি থেকে আগত, তাই সৃষ্টি, অতীন্দ্রিয় নয় এবং দেশকালের বিধানের অধীন, কোন অর্থে এর কোন কিছু খোদা বা খোদা-সদৃশ হতে পারেনা, বিশেষ করে তত্ত্ববিজ্ঞানের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তৌহীদ দ্বারা বুঝায় আল্লাহতত্ত্বকে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে প্রকৃতি সমগ্র রাজ্য থেকে আলাদাকরণ, যা কিছু সৃষ্টিতে বিদ্যমান, সৃষ্টি থেকে আগত, তাই সৃষ্টি, অতীন্দ্রিয় নয় এবং দেশকালের বিধানের অধীন, কোন অর্থে এর কোন কিছু খোদা বা খোদা-সদৃশ হতে পারেনা, বিশেষ করে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে, যা একেশ্বরবাদের সারমর্ম হিসেবে তৌহীদ অস্বীকার করে। আল্লাহ সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র, সমগ্রভাবেই প্রকৃতি থেকে পৃথক এবং সে কারণেই ইন্দ্রিয়াতীত তিনি, একমাত্র ইন্দ্রিয়াতীত সত্ত্বা। তৌহীদ আরো দাবী করে, কোন কিছু তার মত নয়<sup>১</sup>। এবং সে কারণে সৃষ্টিতে কোন কিছু তার সদৃশ বা প্রতীক হতে পারেনা, কোন কিছুই তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে সংজ্ঞার দিক দিয়ে আল্লাহর কোন প্রতীক অসম্ভব। আল্লাহ হচ্ছেন তিনি, যার সম্পর্কে কোন নন্দনতাত্ত্বিক ইন্দ্রয়গত কোন দিব্যজ্ঞানই সম্ভব নয়।</p>
<p>নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝায় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধির সাহায্যে একটি প্রাক-সিদ্ধ এবং সে কারণে, অতীন্দ্রিয় প্রকৃতি-অতিক্রান্ত উপলব্ধি, যার সারনির্যাস দৃষ্টি-বিষয়ের নমুনা নীতি হিসেবে কাজ করে- এ হচ্ছে যা হওয়া উচিত তারই বিষয়। দৃষ্ট বস্তুটি তার সার নির্যাসের যতই নিকটবর্তী হবে ততই হবে অধিকতর সুন্দর।</p>
<p>তৃণলতা, জীবজন্তু এবং বিশেষ করে মানুষের প্রাণময় প্রকৃতির ক্ষেত্রে তাই হচ্ছে সুন্দর, যা প্রাকসিদ্ধ সারসত্ত্বার সম্ভাব্য অনুরূপ হয়, যাতে করে বিচারক্ষম প্রত্যেকেরই এ দাবীর অধিকার থাকবে যে, নান্দনিক বিষয় বা বস্তুটিতে প্রকৃতি নিজেকে ব্যক্ত করেছে তেজস্বিতার সঙ্গে, পরিষ্কারভাবে। <strong>সুন্দর</strong> <strong>বস্তু</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>তাই</strong><strong>, </strong><strong>প্রকৃতি</strong> <strong>যা</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>চায়</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>সে</strong> <strong>বলে</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>কদাচিৎ</strong> <strong>কখনো</strong> <strong>তার</strong> <strong>হাজারো</strong> <strong>এক</strong> <strong>ত্রুটির</strong> <strong>মধ্যে</strong><strong>।</strong> <strong>শিল্পকলা</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>প্রকৃতির</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>প্রকৃতিকে</strong> <strong>ছাড়িয়ে</strong> <strong>যাওয়া</strong><strong>, </strong><strong>সেই</strong> <strong>সারসত্ত্বাকে</strong> <strong>আবিস্কার</strong> <strong>করার</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>দৃশ্যরূপে</strong> <strong>প্রকাশ</strong> <strong>করার</strong> <strong>প্রক্রিয়া</strong><strong>।</strong> স্পষ্টতই, শিল্প সৃষ্ট- প্রকৃতির অনুকরণ নয়, যে সব বস্তুর প্রাকৃতিক-বাস্তবতা সম্পূর্ণ সেগুলোর ইন্দ্রিয়নির্ভর রূপ সৃষ্টি শিল্প নয়। পরিচয় প্রমাণ করবার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন ও ডকুমেন্টেশনের জন্য ফটোগ্রাফিক চিত্ররূপ, যা বিষয়টি যেভাবে বিদ্যমান সেভাবেই তার ছবি তোলে, তা মূল্যবান হতে পারে। শিল্প হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সেই সারসত্ত্বার পঠন, যা প্রকৃতির অতীত এবং সারসত্ত্বাটিকে তার যথাযথ একটি দৃশ্যরূপ দান করা<sup>২</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ পর্যন্ত যেভাবে সংজ্ঞা দান করা হয়েছে এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে শিল্প হচ্ছে অপরিহার্যভাবেই প্রকৃতির মধ্যে তারই ধারণা করা যা প্রকৃতির অন্তগর্ত নয়। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে যা সম্পর্কিত নয়, তা ইন্দ্রিয়াতীত এবং যা দিব্য, কেবল তাই এই মর্যাদা লাভের যোগ্য। অধিকন্ত প্রাকসিদ্ধ সারসত্ত্বা, যা নন্দনতাত্ত্বিক উপলব্ধির বিষয়, তা যেহেতু আদর্শসূলভ এবং সুন্দর, সে কারণে মানুষের আবেগ অনুভূতি এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। এ কারণেই মানুষ সুন্দরকে ভালবাসে এবং সুন্দরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যখন তারা মানুষের প্রকৃতিতে সুন্দরকে প্রত্যক্ষ করে, তখন প্রাকসিদ্ধ প্রকৃতির অতীত সারসত্ত্বা হয়ে ওঠে মানবিকতা, যা ইন্দ্রিয়াতীত, মাত্রায় আদর্শরূপ পরিগ্রহণ করে। একেই গ্রীকরা বলতো apotheosis অর্থাৎ ঐশী সত্তার মধ্যে মানবিকতার প্রতিস্থাপন। মানুষ এ ধরনের রূপান্তরিত মানুষের বিশেষ করে মান্য করে এবং তাদেরকে দেব দেবী বলে গণ্য করে। <em>আধুনিক</em> <em>পাশ্চাত্যের</em> <em>লোকেরা</em> <em>মেটাফিজিক্স</em> <em>বা</em> <em>তত্ত্বশাস্ত্রের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>সম্পর্কিত</em> <em>কোন</em> <em>উপাস্যের</em> <em>প্রতি</em> <em>অতি</em> <em>সামান্যই</em> <em>সহনশীল</em><em>।</em> <em>কিন্তু</em> <em>নীতিশাস্ত্র</em> <em>এবং</em> <em>আচরণের</em> <em>ক্ষেত্রে</em> <em>পাশ্চাত্যের</em> <em>লোকেরা</em> <em>মানুষের</em> <em>প্রবৃত্তি</em> <em>ও</em> <em>প্রবণতাগুলোকে</em> <em>আদর্শের</em> <em>রূপ</em> <em>দিতে</em> <em>গিয়ে</em> <em>যে</em> <em>সব</em> <em>দেব</em><em>&#8211;</em><em>দেবী</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করে</em> <em>সেগুলোই</em> <em>প্রকৃতপক্ষে</em> <em>তার</em> <em>কর্মকান্ড</em> <em>নিয়ন্ত্রণ</em> <em>করে<sup>৩</sup></em><em>।</em></p>
<p>এই হচ্ছে ব্যাখ্যা, কেন দৃশ্যরূপে ভাস্কর্যে এবং কল্পনায়, তার কারো ও নাটকে প্রাচীন গ্রীকরা মানবিক উপকরণসমূহ তার গুণাবলী অথবা তার প্রবৃত্তিগুলোর প্রতীক প্রাচীন গ্রীসের শিল্পকর্মে সর্বোচ্চ নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াস হিসেবে গৃহীত হয়েছিলো। তারা যে সব বিষয়ের, যেমন ঈশ্বরের প্রতিরূপ সৃষ্টি করেছিল, সেগুলো সুন্দর ছিলো একারণে যে মানব প্রকৃতি যা হওয়া উচিত, সেগুলো ছিলো তারই আদর্শরূপ। তাদের সৌন্দর্য অন্য দেবতাদের সঙ্গে তাদের অন্তর্গত বিরোধ গোপন করতোনা, সত্যিকার অর্থে এ কারণে যে, প্রত্যেকেই ছিলো প্রকৃতির একটি প্রকৃত বিষয়, যাকে তারা ঐশীরূপে তথা অতিপ্রাকৃত স্তরে চূড়ান্তরূপ দিয়েছিলো<sup>৪</sup>।</p>
<p>রোমেই কেবল গ্রীক অবক্ষয়ের নাট্যমঞ্চ, গ্রীক ভাস্কর্য শিল্পের অবনতি ঘটে রাজা বাদশাদের বাস্তববাদী অভিজ্ঞতামূলক, বাস্তভিত্তিক প্রতিকৃতিতে। অবশ্য তখনো তা সম্ভব হতোনা সম্রাটকে দেবতায় পরিণত না করে। গ্রীকে যেখানে শত শত বছর ধরে এই থিওরীটি তার বিশুদ্ধরূপে বিদ্যমান ছিল- যেখানে ভাস্কর্য শিল্পের পাশাপাশি নাট্যশিল্প বিকশিত হয় প্রকৃতপক্ষে দেবতাদের মধ্যকার শাশ্বত পারস্পরিক দ্বন্দ্ব প্রতিফলিত করার জন্য, একসারি ঘটনা উপস্থাপনের মাধ্যমে, যাতে চরিত্রগুলো ছিলা জড়িত। সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল- তাদের ব্যক্তি চরিত্রগুলো উন্মোচিত করা, দর্শকরা যাদেরকে মানবিক, অতিমাত্রায় মানুষ্যজনোচিত জানতো- অবশ্য তা ছিলো বিপুল আনন্দের উৎস। তাদের চোখের সামনে উৎঘাটিত নাটকের ঘটনাগুলো পরিণতি যদি ঘটতো ট্রাজিক সমাপ্তিতে, তা অপরিহার্য এবং তাদের চরিত্রের অন্তর্গত বলে গণ্য হত। এর অনিবার্যতায় ফুলের একটি দংশন দূর হয় এবং কেতারসিসের মাধ্যমে তারা অনৈতিক কাজকর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য তারা যে অপরাধবোধ করতো তার অবসান ঘটাতে সাহায্য করতো। এজন্যই, গ্রীকে উদ্ভাসিত পূর্ণতা-সাধিত্ব ট্রাজেডিশিল্প ছিলো সাহিত্যশিল্পের শীর্ষ বিন্দু এবং সকল মানববিদ্যারও। এক বিরল সত্যভাষণের মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ ফনগ্রুনেবোম্ বলেছেন, ইসলামে প্রতিমাধর্মী শিল্পকলা ভাস্কর্য চিত্র এবং নাটক নেই, কারণ ইসলামে প্রকৃতিতে কোন দেবদেবীর অবতারের অবকাশ নেই, অথবা প্রকৃতিতে অন্তবর্তী কোন দেবদেবীর ধারণা থেকে মুক্ত ইসলাম। যে সব দেবদেবী পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত অথবা মন্দের সঙ্গে দ্বন্দ্বেজড়িত<sup>৫</sup>, ফনগুনোবোম এটিকে ইসলামের একটি নিন্দাবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও আসলে ইহা ইসলামের একটি পরম বৈশিষ্ট্য। এ হচ্ছে ইসলামের একটি একক গৌরব যে ইসলাম পৌত্তলিকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, অর্থাৎ সৃষ্টিকে স্রষ্টারূপে গণ্য করার প্রমাণ থেকে ইসলাম মুক্ত।</p>
<p><strong>তাওহীদ</strong> <strong>শৈল্পিক</strong> <strong>সৃজনশীলতার</strong> <strong>বিরোধী</strong> <strong>নয়</strong><strong>; </strong><strong>সৌন্দর্য</strong> <strong>উপভোগেরও</strong> <strong>বিরোধী</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong> <strong>পক্ষান্তরে</strong> <strong>তাওহীদ</strong> <strong>সৌন্দর্যকে</strong> <strong>পবিত্র</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>করে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তার</strong> <strong>পৃষ্ঠপোষকতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>উৎকর্ষ</strong> <strong>সাধন</strong> <strong>করে</strong><strong>।</strong> তাওহীদ কেবলমাত্র আল্লাহতে এবং ওহীর বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রকাশিত তার অভিপ্রায় বা তার শব্দের মধ্যে পরম সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই দৃষ্টিভঙ্গির উপযোগী নতুন সৃষ্টিতে তাওহীদ উম্মুখ। <em>আল্লাহ</em> <em>ছাড়া</em> <em>কোন</em> <em>ইলাহ</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>এই</em> <em>আশ্রয়বাক্য</em> <em>থেকে</em> <em>শুরু</em> <em>করে</em> <em>মুসলিম</em> <em>শিল্পী</em> <em>এ</em> <em>বিষয়ে</em> <em>প্রত্যয়দৃপ্ত</em> <em>যে</em><em>, </em><em>প্রকৃতির</em> <em>যা</em> <em>কিছুই</em> <em>রূপায়িত</em> <em>করেছে</em><em>, </em><em>তাকেই</em> <em>শৈলীবদ্ধ</em> <em>করেছে</em><em>।</em> অর্থাৎ শৈলীবদ্ধ করার মাধ্যমে তাকে সে যথাসম্ভব নিসর্গ বা প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত করেছে। বলতে কি, প্রকৃতির বিষয় বা বস্তু প্রকৃতি থেকে এতদূর বিচ্ছিন্ন করা হল যে, তা প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে উঠলো। শিল্পীর হাতে শৈলীবদ্ধতা ছিল একটি নৈতিবাচক যন্ত্র, যার মাধ্যমে সে প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক বস্তু এমনকি খোদ সৃষ্টির প্রতি ব্যক্ত করেছে তার &#8216;না&#8217; বা অস্বীকৃতি। প্রাকৃতিকতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করে মুসলিম শিল্পী দৃশ্যরূপে প্রকাশ করে শাহাদার নেতিবাচক দিকটি, অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। <strong>মুসলিম</strong> <strong>শিল্পীর</strong> <strong>এই</strong> <strong>শাহাদাই</strong> <strong>আসলে</strong> <strong>তার</strong> <strong>প্রকৃতিতে</strong> <strong>ইন্দ্রিয়াতীততার</strong> <strong>অস্বীকৃতির</strong> <strong>সমার্থক<sup>৬</sup></strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম শিল্পী এখানেই থেমে গেলেন না। তার সৃজনশীলতার মুক্তি তখনই ঘটলো, যখন তাঁর এই চৈতন্য হল যে আল্লাহকে প্রকৃতির কোন মুর্তিতে প্রকাশ করা এককথা এবং এ ধরনের মূর্তিতে তা প্রকাশ অসম্ভব, তা বলা ভিন্ন কথা। আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালাকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি হচ্ছে মানুষের জন্য মহত্তম নান্দনিক লক্ষ্য, আল্লাহ তায়ালা নিঃশর্ত চরম পরম ও মহিমাময়। সৃষ্টির কোন কিছুর দ্বারা যে তাকে প্রকাশ করা যায় না এই সিদ্ধান্তের অর্থই আল্লাহর পরমত্ব ও মহিমাময়তাকে অতিশয় গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। কল্পনায় তাকে সৃষ্টির সমস্ত কিছু থেকে পৃথকরূপে দেখার অর্থই হচ্ছে তাকে সুন্দররূপে দেখা, সুন্দর অন্য যে কোন বিষয় বা বস্তু থেকে স্বতন্ত্ররূপে দেখা। ঐশী অনির্বচনীয়তা হচ্ছে, একটি ঐশীগুণ যার অর্থ হচ্ছে অন্তহীনতা, পরমতা, চূড়ান্ততা বা নিঃশর্ততা, অপরিমেয়তা, অসীম বা অনন্ত- সকল অর্থেই অনির্বচনীয়<sup>৭</sup>।</p>
<p>ইসলামী চিন্তাধারায়, চিন্তার এই ধারা অনুসারে মুসলিমশিল্পী আবিস্কার করেছে অলংকরণ শিল্প এবং তাকে রূপান্তরিত করেছে লতাপাতা, ডালপালা, সর্পিল কারুকার্যময় নক্সায়, আর এটি এমন একটি non-devolopmental নক্সা যা সম্প্রসারিত হয়েছে সকল দিকে অনন্ত অভিমুখে। এই শিল্প যাকে বলা হয় এরাবেক্স যা টেক্সটাইল, ধাতু, পুষ্পাধার, প্রাচীন, সিলিং, স্তম্ভ, জানালা, বা বইয়ের একটি পৃষ্ঠা ইত্যাদি-প্রকৃতির যেকোন বস্তুকেই তা অলংকৃত করে, তাকেই রূপান্তরিত করে নির্ভর, স্বচ্ছ, ভাসমান প্যাটার্নে, যা অন্তহীনতার অভিমুখে সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির বিষয় প্রকৃতি নিজে নয়-বরং তা হচ্ছে &#8220;transubstantiated&#8221;, এতে কেবল একটি দৃষ্টিক্ষেত্র হয়ে উঠে। নান্দনিকতার দিক দিয়ে এরাবেক্স শিল্পরূপের মাধ্যমে নিঃসর্গের বস্তু হয়ে উঠে অনন্তের দিকে একটি জানাল। একে যখন অনন্তের ইশারা হিসেবে দেখা হয় তখন ইন্দ্রিয়াতীততার একটি মানে স্পষ্ট হয়ে উঠে- নেতিবাচকভাবে প্রদত্ত হলেও একমাত্র মানেই, যা ইন্দ্রিয়গত রূপায়ণ এবং ইনটুইশনের পক্ষে অর্জন সম্ভব<sup>৮</sup>।</p>
<p><strong><em>এতেই</em> <em>আমরা</em> <em>ব্যাখ্যা</em> <em>পাই</em> <em>কেন</em> <em>মুসলমানরা</em> <em>যে</em> <em>শিল্প</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করেছেন</em> <em>তার</em> <em>প্রায়</em> <em>সবটাই</em> <em>বিমূর্ত</em><em>, </em><em>এমনকি</em><em>, </em><em>যেখানে</em> <em>লতাপাতা</em><em>, </em><em>জীবজন্তু</em> <em>এবং</em> <em>মানুষের</em> <em>প্রতিকৃতি</em> <em>ব্যবহার</em> <em>করা</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেখানেও</em> <em>আর্টিষ্ট</em> <em>এগুলোকে</em> <em>যথেষ্ঠভাবে</em> <em>শৈলী</em> <em>রূপ</em> <em>দিয়েছে</em><em>, </em><em>এরা</em> <em>যে</em> <em>প্রকৃত</em> <em>কোন</em> <em>সৃষ্ট</em> <em>বস্তু</em> <em>নয়</em><em>, </em><em>তা</em> <em>প্রকাশ</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>&#8211; </em><em>একথা</em> <em>অস্বীকার</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>মধ্যে</em> <em>কোন</em> <em>অতীন্দ্রিয়</em> <em>সারসত্ত্বা</em> <em>বাস</em> <em>করছে</em><em>।</em> </strong>এই প্রয়াসে মুসলিম শিল্পী সাহায্য পেয়েছে, তার ভাষাগত এবং সাহিত্যিক উত্তরাধিকার থেকে। একই উদ্দেশ্যে সে আরবী বর্ণমালা এভাবে বিকাশ সাধন করেছে যাতে করে তা হয়ে ওঠে একটি অন্তহীন এরাবেক্স শিল্পকলা, যার প্রসার ঘটেছে ক্যালিগ্রাফারের পছন্দমত যে কোন দিকে, অপরিবর্তনীয়ভাবে; মুসলিম স্থপতিদের বেলায় একই কথা সত্য, যার ইমারত হচ্ছে তার সম্মুখভাগ, এলিভেশন, স্কাইলাইন এবং মেঝে পরিকল্পনার দিক দিয়ে একটি এরাবেক্স শিল্পকলা। ভূগোল বা নৃতত্ত্বের দিক দিয়ে মুসলিম আর্টিষ্টরা যত পৃথকই হোক, যাদের বিশ্বদৃষ্টি ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি, সেই সকল শিল্পীরই একটি সাধারণ বিভাজক হচ্ছে তাওহীদ<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>নন্দনতত্ত্বে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>বন্ধন</strong> <strong>মুক্তি</strong></h4>
<p>কোন কিছুই, যা প্রাকৃতিক বস্তু নয়, তা ঐশী সত্ত্বাকে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হতে পারে না, এর দ্বারা সাধারণত এ সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হয়না যে, প্রকৃতির একটি বস্তু সেই সত্যকে প্রকাশের একটি বাহন হতে পারে- অর্থাৎ এই সত্যটিকে যে ঐশী সত্ত্বা আসলেই অসীম এবং অনির্বচনীয়। ঐশী সত্ত্বা অনির্বচনীয় বলেই তাকে প্রকাশ না করা এক কথা এবং এই সূত্রের অন্তর্গত সত্যকে প্রকাশ করা আরেক কথা। স্বীকৃতভাবেই, আল্লাহ যে ইন্দ্রিয়ের দিক দিয়ে অনির্বচনীয় এই সত্য প্রকাশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তা যে কোন শিল্পীর কল্পনাকে বিহ্বল করে দেয়। কিন্তু ইহা অসম্ভব নয়। বস্তুত এখানেই ইসলামের শৈল্পিক প্রতিভা বিজয়ী বন্ধন- মুক্তি অর্জন করে। আমরা দেখেছি, প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য যে ষ্টাইলাইজেশন সুপরিচিত ছিলো এবং যার অনুশীলন হতো, তাকে আলেকজান্ডার এবং তাঁর উত্তরসূরীগণ কর্তৃক আরোপিত হেলেনিয় প্রকৃতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ণতার একটি নতুন স্তরে উন্নীত করে। এখন, খ্রীষ্টান ছদ্মাবরণ স্বরূপ হেলিনিজমের মোকাবেলা করতে গিয়ে ইসলামে নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াসের ক্ষেত্রে সেমেটিক প্রক্রিয়া হল একই রকম প্রবল, যেমন প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা গেল ধর্মতাত্ত্বিক প্রয়াসের ক্ষেত্রে। হযরত ঈসার ঐশ্বরিকতা ইসলাম যে প্রবলতার সঙ্গে প্রত্যাখান করে তার তুল্য প্রত্যাখান হচ্ছে প্রকৃতির সৌন্দর্যতাত্ত্বিক রূপায়ণে প্রকৃতিবাদের অস্বীকৃতি এবং ইসলাম তা সমাধা করেছে ষ্টাইলাইজেশনকে উৎসাহিত করে। একটি শৈল্পিক লতা পাতা বা ফুল প্রকৃতির একটি বাস্তব বস্তুর বর্গের কেচার মাত্র, যাকে বলা যায় অপ্রকৃত। মনে হয় শিল্পী তা অংকন করতে গিয়ে প্রকৃতিকে অস্বীকার করে, অ-প্রকৃতিত্ব অর্থাৎ প্রকৃতিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রত্যাখান প্রকাশের এটি একটি উপযুক্ত হাতিয়ার হতে পারেনা। অবশ্য এককভাবে বিচার করলে শৈলীরূপ লতাপাতা বা ফুল প্রকৃতির বহির্ভূতকেই প্রকাশ করে। কিন্তু স্বতন্ত্ররূপে এতে এই ইঙ্গিতই মিলে যে, বস্তুটির মধ্যে প্রকৃতির মৃত্যুই একটি স্বাতন্ত্রিক রূপ পেয়েছে। প্রাকৃতিক বিষয়কে প্রকৃতিমুক্ত রূপ দিতে গিয়ে এ উচ্চাঙ্গের প্রকৃতিবাদকেও প্রকাশ করতে পারে, যা ইসলামের লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তেমনটি আমরা প্রায়ই দেখতে পাই রূগ্নতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের এবং মৃত্যুর মাধ্যমে জীবন প্রতিফলিত হয়। <em>তাই</em> <em>জুদাইজম</em> <em>যেখানে</em> <em>ব্যর্থ</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেখানে</em> <em>সফল</em> <em>হতে</em> <em>হলে</em> <em>ইসলামের</em> <em>ঐশী</em> <em>সত্ত্বার</em> <em>অনির্বচনীয়তা</em> <em>সংরক্ষণের</em> <em>জন্য</em> <em>ভিন্ন</em> <em>কিছু</em> <em>আবশ্যক</em> <em>ছিল<sup>১০</sup></em><em>।</em></p>
<p>এখন এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম শিল্পী দন্ডায়মান হলেন। তার অনন্য সৃজনশীল এবং মৌলিক সমাধান হচ্ছে, যেন, যে কোন বা সকল স্বাতন্ত্রিকরণকে অস্বীকার করার জন্য এবং পরিণামে চৈতন্য থেকে প্রকৃতিবাদকে চিরতরে নির্বাসন দেওয়ার জন্য শিল্পগত তরুলতা ও ফুলকে অন্তহীন পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা। প্রকৃতি বহির্ভূত কোন বিষয় একইভাবে বার বার প্রকাশ করলে তা অ-প্রকৃতিত্বকেই প্রকাশ করে। এর উপরে যদি শিল্পী অ-প্রকৃত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সুন্দর তাত্ত্বিকভাবে অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তেমন অবস্থায় পরিণামে তা হয়ে উঠতে পারে এই সাক্ষ্যের সমার্থক লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, যা উচ্চারিত হয় শাব্দিক এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে। কারণ যে অনির্বচনীয়তা এবং অসীমতা শৈল্পিক প্রতিফলনের উপকরণ, তাতে এগুলো যে অ-প্রকৃতির গুণাবলী তার ইঙ্গিত মেলে। তাই ইসলামী মন এই অনুধাবন করে যে, সেমেটিক চৈতন্যের আদি প্রেরণার সঙ্গে, দৃশ্যশিল্পের সাযুজ্যের একটি পন্থা রয়েছে। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হচ্ছে, প্রকৃতির কোন বস্তু যতো শৈল্পিক রূপই তাকে দেওয়া হউক, কি করে তা অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রকাশের বাহন হতে পারে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>আরব</strong> <strong>চৈতন্য</strong><strong>: </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>ঐতিহাসিক</strong> <strong>ভিত্তিমূল</strong></h4>
<p>একটি সমাধান লাভের জন্য ইসলামী চেতনাকারণ নেয় তার নিজের ঐতিহাসিক ভিত্তিমূল, তথা আরব চৈতন্যের উপর। ইহাই সেই ঐতিহাসিক বিষয় যা ঐশী প্রত্যাদেশ অবহিত করে এবং তার সংঘটনের জন্য Sitz-im-Leben রূপে ব্যবহার করেছে। ঐশী সত্য প্রকাশের মাধ্যম ও বাহনরূপে এই চেতনাই মূর্তরূপ লাভ করে হযরত মোহাম্মদের (সা.) মধ্যে, যিনি এই প্রত্যাদেশ লাভ করেন এবং দেশকালের মানবজাতির কাছে তা প্রচার করেন নবুয়্যতের মাধ্যমে। ইসলামের পূর্বে ভাষা এবং লেখন শিল্পে এর অর্জন ছিলো প্রকৃতই একটি অলৌকিক ব্যাপার এবং এ বিষয়টিই নতুন প্রত্যাদেশের ধরন বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে তা হবে সাহিত্যের পূর্ণতা, কারণ এই প্রত্যাদেশের জন্য তা ছিলো প্রস্তুত এবং তা বহনের ক্ষতাসম্পন্ন।</p>
<p>আরব চৈতন্যের প্রথম হাতিয়ার এবং তার সকল ক্যাটেগরির অবয়ব হচ্ছে আরবী ভাষা। মূলত আরবী ভাষা হচ্ছে তিনটি মূল ব্যঞ্জন ধাতুমূল নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটি তিনশতেরও অধিক রূপে ধাতুরূপ সম্ভাব্য বাচ্যে পরিবর্তন করে উপসর্গ, অনুসর্গ বা মধ্যসর্গ যোগ করে। যে শব্দরূপই গঠন করা হউক না কেন, যে সকল শব্দের একই ধাতুরূপ রয়েছে সে সকলের একই প্রকারত্ব অর্থ রয়েছে, ধাতুমূলের ভিন্নতা সত্বেও, ধাতুর অর্থ একই থেকে যায়, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয় অন্য একটি প্রকারাত্বক অর্থ, ধাতুরূপের মাধ্যমে তা যে অর্থটি লাভ করে এবং সকল সময়, সর্বত্র যা একই থাকে<sup>১১</sup>। তখন ভাষার একটি যৌক্তিক কাঠামো গঠিত হয় যা প্রথমেই  সুস্পষ্ট, সম্পূর্ণ এবং বোধগম্য। এই কাঠামোটি বুঝতে পারলেই যে কোন ব্যক্তি ভাষাপণ্ডিত হয়ে ওঠে, যখন ধাতুমূলের অর্থ সম্পর্কে জ্ঞান হয়ে উঠে গৌণও গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য-শিল্প নিহিত রয়েছে বিভিন্ন ধারণার একটি পদ্ধতি নির্মাণে, যে ধারণাগুলো এভাবে পরস্পর সম্পর্কিত যে তাতে করে ধাতুগুলোর কনজুগেশনের মাধ্যমে সাদৃশ্য ও বৈপরীত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। <em>যখন</em> <em>বোধ</em> <em>শক্তির</em> <em>পক্ষে</em> <em>সম্ভব</em> <em>হয়</em> <em>জটিলতার</em> <em>মধ্য</em> <em>দিয়ে</em> <em>নিরবচ্ছিন্ন</em> <em>অভঙ্গুর</em> <em>রেখায়</em> <em>অগ্রসর</em> <em>হওয়া</em> <em>একটি</em> <em>এরাবেক্স</em> <em>শিল্পে</em><em>, </em><em>যার</em> <em>মধ্যে</em> <em>ত্রিভুজ</em><em>, </em><em>বর্গক্ষেত্র</em><em>, </em><em>বৃত্ত</em><em>, </em><em>পঞ্চভুজ</em><em>, </em><em>অষ্টভুজ</em> <em>ইত্যাদি</em> <em>হাজারো</em> <em>রূপ</em> <em>সবই</em> <em>ভিন্ন</em> <em>বর্ণে</em> <em>বিচিত্র</em> <em>এবং</em> <em>একে</em> <em>অপরের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>বাড়াবাড়ি</em> <em>করে</em> <em>অবস্থান</em> <em>করে</em> <em>তা</em> <em>চোখকে</em> <em>ঝলসে</em> <em>দেয়</em><em>, </em><em>কিন্তু</em> <em>মনকে</em> <em>নয়</em><em>&#8211; </em><em>প্রত্যেকটি</em> <em>ফিগারকে</em> <em>তার</em> <em>স্বরূপে</em> <em>চিনতে</em> <em>পেরে</em> <em>বর্ণ</em> <em>বিচরণ</em> <em>করতে</em> <em>পারে</em> <em>একটি</em> <em>পঞ্চভুজ</em> <em>থেকে</em> <em>অন্য</em> <em>একটি</em> <em>পঞ্চভুজে</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>বর্ণের</em> <em>বৈচিত্র্য</em> <em>সত্ত্বেও</em> <em>এবং</em> <em>শিল্পকর্মটির</em> <em>এক</em> <em>প্রান্ত</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>প্রান্ত</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>এগোতে</em> <em>পারে</em><em>&#8211; </em><em>প্রত্যেক</em> <em>বিরতির</em> <em>স্থানেই</em> <em>কিছু</em> <em>আনন্দের</em> <em>অভিজ্ঞতা</em> <em>নিয়ে</em><em>, </em><em>একইরূপ</em> <em>আকুতিজাত</em> <em>সাদৃশ্য</em> <em>ও</em> <em>সামঞ্জস্য</em> <em>প্রত্যক্ষ</em> <em>করে</em><em>&#8211; </em><em>অর্থাৎ</em> <em>ধাতুমূলের</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>অর্থ</em> <em>প্রকাশের</em> <em>একইরূপ</em> <em>ধরন</em> <em>এবং</em> <em>খোদ</em> <em>শব্দমূলগুলো</em> <em>কর্তৃক</em> <em>সৃষ্ট</em> <em>বৈপরীত্ব</em> <em>অনুধাবন</em> <em>করে</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী ভাষার গঠনমূলক প্রকৃতি তার কবিতাকেও গঠন করে। আরবী কবিতা স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ এবং স্বাধীন শ্লোক নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটি একই এবং অভিন্ন ছন্দরূপের অভিন্ন রূপায়ণ। আরবী কাব্য ঐতিহ্যে সুপরিচিত ত্রিশটি প্যাটার্নের মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নেবার স্বাধীনতা কবির আছে। কিন্তু একবার নির্বাচনের পর গোটা কবিতাটির প্রত্যেকটি অংশই এই প্যাটার্নের সঙ্গে সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আরবী কবিতা শ্রবণ এবং উপভোগের তাৎপর্যই হচ্ছে এই প্যাটার্নের সঙ্গে উপলব্ধি; কবিতা আবৃতির সঙ্গে সঙ্গে কবিতার শ্রোতা ও সমজদার এর ছন্দ প্রবাহের সঙ্গে অগ্রসর হয় এবং এই প্যাটার্ন যা প্রত্যাশা করেছে তা প্রত্যাশা ও গ্রহণ করে। অবশ্য প্রত্যেক শ্লোকে শব্দ ধারণা এবং অনুভূতি নির্মাণ পৃথক পৃথক। এতে করেই রংয়ের বৈচিত্র ফুটে ওঠে, কিন্তু তার কাঠামোগত রূপ আগাগোড়ায় এক।</p>
<p>আরবী ভাষা ও আরবী কবিতার এই বুনিয়াদি জ্যামিতির বদৌলতে আরব চৈতন্য দ্বিরায়তনের পর্যায়ে অনন্তের ধারণা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ধাতু মূলগুলো বহু, বলা যায় অনন্ত, কেননা তিনটি স্বরবর্ণের যে কোন নতুন সম্মেলনের প্রতি প্রথাগতভাবে যে কোন অর্থ আরোপ করা যেতে পারে। আরবীয় চৈতন্য বিদেশী ধাতুমূলকে অবিচলিত স্থৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং এজন্য বিদেশী শব্দমূলটিকে আরবীয় রূপদানের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার নিজস্ব ধাতুরূপের কারখানার উপর। তাদের সংখ্যার অনন্ত তার মতই তাদের ধাতুমূলও অনন্ত, ধাতুমূলের পরিচিত, প্যাটার্ন রয়েছে সীমিত সংখ্যক শব্দমূলেরই ধাতুরূপ করা হয়েছে এবং তাদের ধাতুরূপগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ওয়েবষ্টার কিংবা অক্সফোর্ডের মত আরবী ভাষার একটি অভিধান, যাতে সকল শব্দ সংকলিত এবং তালিকাবদ্ধ হবে তা একেবারেই অসম্ভব, কারণ কাল পরম পরাক্রমে পরিচিত সকল শব্দমূলের ধাতুরূপ করা হয়নি। ধাতুমূলের তালিকা কখনো বন্ধ করা হয়নি। ধাতুরূপের সব কয়টি ধরন বা রূপ ব্যবহৃত হয়নি এবং ধরনের তালিকাও সমাপ্ত হয়নি। ঐতিহ্য সচেতনবোধ দ্বারা নতুন ধরনের সম্ভাবনা অস্বীকার করেনা। তবে তারা সেই প্রতিভার অপেক্ষায় থাকেন যে যৌক্তিকতা প্রমাণ এবং নিজের সুবিধার খাতিরে ব্যবহার করা যায়। তাই আরবী ভাষা অস্তিত্বের আরবীয় প্রবাহের মতই এমন একটি পদ্ধতি যা কেন্দ্রস্থলে উজ্জ্বল (ঐতিহ্য হেতু), কিন্তু কিনারের দিকে অস্পষ্ট, যা সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে অনিশ্চিতভাবে<sup>১২</sup>।</p>
<p>এবার কবিতার কথায় আসা যাক। শ্লোকগুলোর ছন্দরূপ কবিতার অবয়র গঠন করে বলে কোনো কবিতার শ্লোকগুলোর জন্য জরুরী নয়- কবি যে ধারণায় সেগুলো রচনা করেছেন সেই ক্রম অনুসারে সেগুলো পাঠ করা, বা অন্য কোন নিয়ম অনুসারে। কবিতাটি শুরু থেকেই সমাপ্তির দিকে পাঠ করা হোক কিংবা সমাপ্তি থেকে শুরুর দিকে আবৃত্তি করা হোক, কবিতাটি বরাবরই একই রকম মাধুর্য বজায় রাখে, কারণ কবি প্রত্যেকটি শ্লোকের সঙ্গে তার প্যাটার্নের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেছেন। পুনরাবৃত্তিতে আমরা আনন্দিত হই, কারণ তাতে করে আমাদের ইনটুইটিভ ক্ষমতা স্বীকৃত হয়, অর্থ এবং বোধ কাঠামোর বাস্তবতার বৈচিত্র থেকে আমরা যা প্রত্যাশা করেছিলাম তা প্রত্যাশা ও উপলব্ধি করতে পারি। তাই সংজ্ঞা অনুসারে কোনো আরবী কবিতাই সম্পূর্ণ এবং বন্দী নয় এবং কোন অর্থেই পরিপূর্ণ নয়, যাতে করে মনে করা যেতে পারে কবিতার সঙ্গে কোন কিছু যোগ বা নিরবচ্ছিন্নতা ব্যাহত হতে বা এমন কিছু ধারণা করা যেতে পারে। বলতে কি, আরবী কবিতাকে উভয় দিকে টেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব, তার শুরুতে এবং তার অন্তে। তার সৌন্দর্যকে বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন না করে কোন মানুষ কর্তৃক, ব্যক্তিগত রচনাশৈলীর দ্বারা না হলেও কবিতাটির রচয়িতার দ্বারা তো বটেই। বস্তুত আমরা যদি উত্তম শ্রোতা হই, তাহলে একথা ধরে নেয়া হবে যে, আমরা কবির সঙ্গে তার কবিতা সৃষ্টিতে সূচনাতে অংশগ্রহণ করবো। যেমনটি করা হয় একটি জীবন্ত অভিনয়, এবং দ্বিতীয়ত আমরা তার কবিতা অনুসরণ করবো আমাদের নিজেদেরই হিতার্থে, কেননা তার আবৃত্তি যে গতি সঞ্চার করেছে তার দ্বারা আমাদেরকে বন্দী করেছে এবং আমাদেরকে এর নিজস্ব অসীম কাব্যিক পরিমন্ডলে নিক্ষেপ করেছে। আরব জগতে একজন কবির জন্য এ কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, যখন কবি মহৎ শ্রোতাদের উপস্থিতিতে সেই শ্রোতাদের মৌখিক সাহায্য লাভ করেন, তার কবিতার আবৃত্তিতে, যে কবিতা ইতিপূর্বে কখনো তিনি শোনেননি অথবা তার কবিতার সঙ্গে একই কবিতার আরো অংশ যোগ করে, তার প্রতি মন্তব্য প্রকাশ করে থাকেন<sup>১৩</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>ইসলাম</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>শিল্পকর্ম</strong><strong>: </strong><strong>আল</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কুরআনুল</strong> <strong>করীম</strong></h4>
<p>এই আরব চৈতন্যই ইসলামের ছাঁচ এবং বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করে। ইসলামী প্রত্যাদেশ আল-কুরআনুল করীম নাযিল হয় মহত্তম শিল্পকর্ম হিসেবে। সেই চৈতন্যের সকল আদর্শ লক্ষ্য একই মুহূর্তে চূড়ান্ত পরিপূরণের জন্য এই অনুভূতি আসে।</p>
<blockquote><p><em>কোন</em> <em>কিছু</em> <em>যদি</em> <em>শিল্পের</em> <em>দাবী</em> <em>রাখে</em><em>, </em><em>কুরআন</em> <em>নিশ্চয়ই</em> <em>শিল্প</em><em>।</em> <em>কোন</em> <em>কিছুর</em> <em>দ্বারা</em> <em>মুসলিম</em> <em>মন</em> <em>যদি</em> <em>আন্দোলিত</em> <em>ও</em> <em>প্রভাবিত</em> <em>হয়ে</em> <em>থাকে</em><em>, </em><em>নিশ্চয়ই</em> <em>কুরআন</em> <em>কর্তৃক</em> <em>প্রভাবিত</em> <em>হয়েছে</em><em>।</em> <em>এই</em> <em>প্রভাব</em> <em>যদি</em> <em>কোথাও</em> <em>ভিত্তিমূলক</em> <em>উপাদানে</em> <em>পরিণত</em> <em>হবার</em> <em>মত</em> <em>যথেষ্ট</em> <em>গভীরতা</em> <em>অর্জন</em> <em>করে</em> <em>থাকে</em><em>, </em><em>তা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>নন্দনতাত্ত্বিকতা</em><em>।</em> <em>এমন</em> <em>কোন</em> <em>মুসলমান</em> <em>নেই</em> <em>কুরআনের</em> <em>সুর</em> <em>মুর্ছনা</em><em>, </em><em>ছন্দ</em> <em>এবং</em> <em>তার</em> <em>প্রাঞ্জলতার</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>স্তর</em><em>, </em><em>যার</em> <em>অস্তিত্বের</em> <em>গভীরতম</em> <em>মর্মমূল</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>নাড়িয়ে</em> <em>দেয়নি</em><em>।</em> <em>এমন</em> <em>কোনো</em> <em>মুসলমান</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>যার</em> <em>আদর্শ</em> <em>ও</em> <em>সৌন্দর্যের</em> <em>মান</em> <em>কুরআন</em> <em>নতুন</em> <em>করে</em> <em>গড়েনি</em> <em>এবং</em> <em>তার</em> <em>নিজের</em> <em>আলোকে</em> <em>নির্মাণ</em> <em>করেনি</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>মুসলমানরা কুরআনের এই দিকটিকে ই&#8217;জাজ বলে উল্লেখ করেছে, যার অর্থ হচ্ছে স্তব্ধ করে দেওয়া। &#8220;ই&#8217;জাজ পাঠককে একটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় স্থাপন করে, যা মোকাবেলা করার জন্য সে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু কখনো মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়না।&#8221; বস্তুত কুরআন নিজেই সর্বোচ্চ সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী আরব শ্রোতাগণকে আহ্বান করেছে কুরআনের মত কিছু সৃষ্টি করতে (২: ২৩) এবং তাদের ব্যর্থতার জন্য তাদের তিরস্কার করেছে (১০: ৩৮), (১১: ১৩), (১৭: ১৮)। রাসূলুল্লাহর সমসাময়িকদের মধ্যে ইসলামের কতিপয় শত্রু এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলার জন্য দাঁড়িয়েছিল, তারা তাদের বিরোধী এবং তাদের আপন বন্ধুদের বিচারে অপমানিত হয়েছিল<sup>১৪</sup>। মোহাম্মদকে (সা.) বলা হল &#8220;একজন ভূতাবিষ্ট মানুষ (১৮: ২২) এবং কুরআন একটি যাদুর কিতাব&#8221; (২১: ৫৩), (২৫: ৪), কেবল মাত্র শ্রোতাদের চেতনার উপর এর ক্রিয়ার কারণে।</p>
<p>প্রত্যেকেই এ সত্যটি বুঝতে পারে যে, যদিও কুরআনের আয়াতগুলো কবিতার কোন জ্ঞাত প্যাটার্নের সঙ্গে খাপ খায়না, তবু কবিতার মত একই প্রভাব বিস্তার করে এই সব আয়াত। <em>বলতে</em> <em>কি</em> <em>চূড়ান্ত</em> <em>মাত্রায়</em><em>, </em><strong><em>প্রত্যেকটি</em> <em>আয়াতই</em> <em>সম্পূর্ণ</em> <em>এবং</em> <em>নিজস্ব</em> <em>গুণেই</em> <em>নিখুঁত</em><em>, </em><em>প্রায়ই</em> <em>তা</em> <em>পূববর্তী</em> <em>আয়াত</em> <em>বা</em> <em>আয়াতসমূহের</em> <em>সঙ্গ</em> <em>ছন্দে</em> <em>মিলে</em> <em>যায়</em> <em>এবং</em> <em>তা</em> <em>পরম</em> <em>সৌন্দর্যের</em> <em>উচ্চারণ</em> <em>বা</em> <em>সাহিত্যিক</em> <em>অভিব্যক্তির</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিহিত</em> <em>এক</em> <em>বা</em> <em>একাধিক</em> <em>ধর্মীয়</em> <em>বা</em> <em>নৈতিক</em> <em>তাৎপর্য</em> <em>বহন</em> <em>করে</em><em>।</em></strong> এর আবৃত্তি এত প্রবল গতিসঞ্চার করে যে, শ্রোতারা অনিবার্যভাবেই এ আবৃত্তির সঙ্গে অগ্রসর হতে পরবর্তী আয়াতটি আশা করতে এবং তা শ্রবণের পর গভীরতম স্বীকৃতিতে পৌছাতে বাধ্য হয়। এর পর প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হয় পরবর্তী একটি, দুটি অথবা তিনটি বা তিনের অধিক একটি গুচ্ছ আয়াতের সঙ্গে<sup>১৫</sup>।</p>
<p>মুসলিম আরবরা কি সপ্তম শতকে কোনো শিল্প নিয়ে আর্বিভূত হয়েছিলো? তারা কি বিজিত জাতিগুলোর পরবর্তীকালে বিকশিত শিল্পকলায় প্রাসঙ্গিক কোন অবদান রেখেছিলো? অজ্ঞতা বা বিদ্বেষ বশে এবং প্রায়ই এতদ উভয়ের দুঃখজনক সংমিলনে, ইসলামী শিল্পের প্রত্যেকটি পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদ জবাব দিয়েছেন, &#8216;না&#8217;। এই শাস্ত্রের পিতামহ ঘোষণা করেছেন, &#8220;প্রথম যেসব লোক নিয়ে এই সব সেনাবাহিনী গঠিত হয় (ইসলামের প্রথম আরবীয় সেনাবাহিনী) তারা ছিলো মুখ্যত বেদুইন, এমনকি যারা স্থায়ী বসতি থেকে আসে, যেমন মক্কা ও মদীনা থেকে আগত লোকেরাও স্থাপত্য শিল্পের কিছুই জানতোনা<sup>১৬</sup>।&#8221; তরুণতর প্রজন্ম অন্তহীনভাবে বার বার একথাই বলে, &#8220;মুসলিম শিল্পকলা তার আরব অতীত থেকে বলতে গেলে কিছুই অর্জন করেনি<sup>১৭</sup>।&#8221;</p>
<p>সত্য তাদের এই সব অভিযোগের কত বিপরীত। গোটা ইসলামী শিল্পকলাই অর্জিত হয় আরব অতীত থেকে- যা কিছু গঠনমূলক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ সে সবের মর্মবাণী, নিয়মকানুন এবং পদ্ধতি, এ সবের লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের পন্থা, সমস্ত কিছুই নিশ্চয়ই দৃশ্য ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামী শিল্পকলার প্রয়াসের জন্য আবশ্যক ছিলো উপকরণের এবং বিষয়বস্তুর এবং যেখানে এগুলো পেয়েছে ইসলামী শিল্পকলা সেখান থেকে এগুলো নিয়েছে। কিন্তু শিল্পের অর্থ ও তাৎপর্য, তার ইতিহাস ও তথ্যের যে কোন আলোচনায় এগুলোকে ঋণ বলে উল্লেখ করা রচিবিরুদ্ধভাবে অগভীর। একটি শিল্পকর্ম শিল্প হয়ে উঠে তার শৈলী, তার উপাদান এবং তা প্রকাশের মাধ্যমে- সে যে সব উপকরণ ব্যবহার করে, যা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভৌগোলিক অথবা সামাজিক আকস্মিকতা থেকে অর্জিত। আরব চেতনায় ইসলামের মাধ্যমে এই ভিত্তির কারণে ইসলামী শিল্পকলা একটি ঐক্য। আরব চৈতন্যের রীতিপ্রণালীগুলোর দ্বারাই সকল মুসলমানের শিল্পসৃষ্টি নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে<sup>১৮</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>দৃশ্যশিল্পের</strong> <strong>নন্দনতাত্ত্বিক</strong> <strong>রূপ</strong></h4>
<p>পাশ্চাত্য দৃষ্টিনির্ভর শিল্পকলা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করে মানব প্রকৃতির উপর- মানুষের প্রতিকৃতি, ভূ-চিত্র, স্থির জীবন, এমনকি বিমূঢ়ত্ব, নক্সা বা নক্সাহীনতার মাধ্যমে, যেভাবেই প্রকাশিত হউক। ইসলামী দৃশ্যশিল্পের আগ্রহ ছিলনা মানব প্রকৃতিতে, বরং তার আগ্রহ ছিল ঐশী প্রকৃতিতে। যেহেতু মানব প্রকৃতির নতুন নতুন দিক প্রকাশ করা এর লক্ষ্য ছিলোনা, এজন্য এ শিল্প নন্দনতাত্ত্বিকভাবে ফিগার বা প্রতিকৃতির আলোচনা করেনি, অর্থাৎ মানব প্রকৃতির যে অসংখ্য বৈচিত্রপূর্ণ রূপায়ণ ঘটে তা চিত্রিত করেনি। মানব চরিত্র যা মানুষের প্রাকসিদ্ধ এমন একটি ধারণা, যে ধারণায় মানুষকে লক্ষ লক্ষ খুঁটিনাটিরূপে বিশ্লেষণ করা যায় বলে ধরে নেয়া হয়, যে সব খুঁটিনাটিতে মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্য একটি গভীরতা বা উচ্চতা উদ্‌ঘাটিত হয়, এসবই কিন্তু মুসলিম শিল্পীর লক্ষ্যবস্তু ছিলনা। ঐশী সত্ত্বা হচ্ছে তার প্রথম প্রেম এবং তার শেষ আবিষ্টতার বিষয়। তার জন্য ঐশী সত্ত্বার সম্মুখে দাঁড়ানো হচ্ছে অস্তিত্বের এবং সমস্ত মহত্ব সৌন্দর্যের শীর্ষবিন্দু। এই লক্ষ্যে মুসলমানরা নিজেদের চারপাশে জড় করে প্রত্যেকটি অবলম্বন এবং প্রত্যেকটি উদ্দীপক যা সেই ঐশী অস্তিত্বের উপস্থিতির সম্পর্কে ইতিহাসে সহায়তা করে।</p>
<p>প্রথমে, শৈলীকরণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে যেহেতু তার প্রকৃতিত্ব থেকে মুক্ত করা হয়, সেজন্য প্রথম দিকের আরব মুসলমানরা সেই উপায়টিকে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে যান। অধিকন্তু শৈলীকরণের অর্থ হচ্ছে বৈচিত্র বা পরিবর্তনকে অস্বীকার করা- কাণ্ড থেকে শাখা প্রশাখা পত্রপল্লব পর্যন্ত বিকাশ সাধন, যেমনটি ঘটে থাকে উদ্ভিদ জগতে, অংকন শিল্পের আগাগোড়া কাণ্ড এবং শাখার গাঢ়ত্ব হয়ে উঠে এক, অভিন্ন এবং আকার অথবা রূপ হয়ে উঠে একই। পরিবর্তনের অনুপস্থিতির কারণেও ক্রমবিকাশ বাতিল হয়ে যায়। একই চিত্রের মধ্যে সকল পত্র পল্লব এবং ফুল পায় একই রূপ। পরিশেষে প্রকৃতিবাদের প্রতি মৃত্যু আঘাত হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। বৃন্ত, এবং ফুল বার বার অংকন করে এবং সেগুলো একটি অপরটি থেকে অন্তহীন পর্যায়ে এমনভবে নির্গত দেখিয়ে যা প্রকৃতিতে অসম্ভব, প্রকৃতি সম্পর্কে সকল ধারাণাকেই মুছে দেওয়া হয়। পুনরাবৃত্তি এত নিশ্চিতভাবে এবং অভ্রান্তভাবে এই পরিণতি ঘটায় যে, তা আপন শত্রুকেও পর্যন্ত সয়ে যায়- অর্থাৎ বিকাশরূপ তার আপন শত্রুকেও সে বরদাস্ত করে- অবশ্য যদি একটি শিল্প কর্মের অংশে তার বিকাশ ঘটে ও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে সমগ্র শিল্পকর্মটির মধ্যে। এভাবে চৈতন্য থেকে প্রকৃতিকে নির্মূল করা হয় এবং তা প্রকৃতিকে চিত্রিত করা হয়। যদি দর্শকের চৈতন্যে বৃন্ত পত্রপল্লব এবং ফুল তখনো প্রকৃতির কোনো চিহ্ন বা অবশেষ রেখে দেয়, সে অবস্থায় সকল ভগ্ন, বৃত্তাকার ফোয়ারার মত উৎসারিত বা বংকিম রেখা যা ফ্রীলান্স, নক্সা বা জ্যামিতিক ফিগারে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এ কাজটি সম্পন্ন হবে সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্টতররূপে। এটিকে বৃত্ত, পাতা, ফুল উপকরণের সঙ্গে যুক্ত করে দর্শককে উদ্দিষ্ট (জ্যামিতিকতা এবং তার প্রাকৃতিকতার) দিকটি তুলে ধরে পরিশেষে পুনরাবৃত্তিকে যদি সিমেট্রির নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যাতে করে তা একই দূরত্ব বজায় রেখে সকল দিকে অগ্রসর হতে পারে, সে অবস্থায় শিল্পকর্মটি মর্মের দিক দিয়ে হয় একটি অনন্ত দৃষ্টিক্ষেত্র। ঘটনাক্রমে এই অনন্তক্ষেত্রের একটি অংশই মাত্র শিল্পী নিজের খেয়াল মত বেছে নেয় এবং পৃষ্ঠা, প্রাচীর, প্যানেল অথবা ক্যানভাসের বাস্তব ফ্রেমে তাকে সীমিত করে, যেখানে মানুষের ফিগারের জান্তব দিকটি ব্যবহৃত হয়, যেমন দেখা যায় ইরানের মিনিয়েচারে; সেখানে প্রকৃতিমুক্ত অবস্থা অর্জিত হয় প্রাণীটির শৈলীরূপ সৃষ্টি করে, <em>এবং</em> <em>মানুষের</em> <em>মুখমন্ডল</em> <em>এবং</em> <em>শরীরকে</em> <em>কোন</em> <em>বিশিষ্ট</em> <em>রূপ</em><em>, </em><em>চরিত্র</em> <em>এবং</em> <em>ব্যক্তিত্ব</em> <em>অর্পণ</em> <em>না</em> <em>করে</em><em>।</em> একটি ফুলেরবমতই একজন মানুষ অ- প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করতে পারে শৈলীকরণের মাধ্যমে কিন্তু আসলে ইহাইতো ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের বিমোচন। একারণেই, পারস্যের মহত্তম মিনিয়েচারগুলোতে সব থাকে একাধিক মানুষের ফিগার। তাদের একজনকে অপরজন থেকে স্পষ্টরূপে চিহ্নিত করা যায় না<sup>১৯</sup>। আরবী কবিতার মতই মিনিয়েচারগুলো চিত্রিত হয় অনেকগুলো অংশ নিয়ে, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন, যাদের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব একটি স্বাধীন কেন্দ্রবিন্দু রয়েছে। দর্শক যেমন কবিতার নক্সা বা ছকে স্থাপিত সাহিত্যিক মনিমুক্তাগুলো নিজ চৈতন্যে প্রত্যক্ষ করে, আনন্দের স্বাদ উপভোগ করে, একইভাবে দর্শক গালিচায়, দরজা, প্রাচীর, ঘোড়ার জিন, মানুষের পাগড়ি বা পোশাক ইত্যাদিতে মিনিয়েচারের একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লতাপাতার বৃন্তে শিল্পগুলো সম্পর্কে চিন্তা করে এবং তখন তাদের মনে এই প্রত্যাশ্যাও থাকে যে, আরও সব অনন্ত কেন্দ্র রয়েছে যার দিকে সে অগ্রসর হতে পারে<sup>২০</sup>।</p>
<p>ইসলামী শিল্পকর্মের সকল অংকন এবং অলংকরণে প্রশ্নাতীতভাবে রয়েছে গতি- প্রকৃতিপক্ষে যে গতি অনিবার্য একটি নক্সার এক ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটের দিকে এবং পরে এক নক্সা থেকে অন্য নক্সায় এবং আসলে, একটি দৃষ্টিক্ষেত্র থেকে অন্য একটি দৃষ্টিক্ষেত্রের দিকে, যেমনটি আমরা দেখতে পাই বড় বড় প্রাসাদের বিশাল তোরণে, সম্মুখ ভাগে অথবা প্রাচীরগুলোতে। কিন্তু এমন কোন ইসলামী শিল্প কর্মই নেই যেখানে গতি চূড়ান্ত। দর্শকের দৃষ্টি যে চলমান থাকে তাই মূল কথা। দর্শকের মন গতিশীল হয়ে উঠে অনন্তকে প্রত্যক্ষ করার সন্ধানে। ভর, আয়তন, স্থান, বেষ্টনি, সৌন্দর্য, সামঞ্জস্য, টেনশন এসবই হচ্ছে প্রকৃতির বাস্তবতা, যেগুলোকে অস্বীকার করতে হবে যদি অ-প্রকৃতির উপলব্ধি অর্জন করতে হয় স্বজ্ঞার সাহায্যে। কেবলমাত্র তেমন একটি নক্সাই, তেমন একটি মোমেন্টাম-স্রষ্টা প্যাটার্নই মুসলিম সৌন্দর্য- প্রেমিককে ঘিরে থাকে- সকল দিকে অনন্ত পৃথিবীতে ছাড়িয়ে হয়। এতে করে তার মধ্যে সৃষ্টি হয় একটি ধ্যানী মেজাজ যা ঐশী সত্ত্বার ইনটুইশনের জন্য আবশ্যক। কেবল একটি বইয়ের প্রচ্ছদের ডিজাইন নয়, যে আলোকিত পৃষ্ঠাটি সে পড়ছে তার পায়ের নিচের গালিচা, তার বাড়ীর সিলিং এর সম্মুখ ভাগ, ভিতর ও বাইরের প্রাচীরগুলোই কেবল নয়, বাড়ীটির মেঝের পরিকল্পনাও এমন একটি এরাবেক্স তৈরী করে, যেখানে বাগিচা, বাড়ীর উঠান, প্রবেশ কক্ষ এবং প্রতিটি কক্ষই একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র, লতাপাতার নিজস্ব শিল্পরূপ সমেত যা তার নিজস্ব গতি সৃষ্টি করে।</p>
<p>কিন্তু এরাবেক্স কি? আমরা উপরে এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছি একথা ধরে নিয়ে যে পাঠক এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। যথার্থভাবেই এধারণা করেছি, কারণ অন্য যে কোন শিল্পকর্ম থেকে এরাবেক্সকে মুহূর্তে পৃথক করে চেনা যায়। সকল মুসলিম দেশে এই শিল্পরূপটি সর্বব্যাপী, এটি সকল ইসলামী শিল্পকর্মের একটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা উপাদান। যথাযথই একে বলা হয় এরাবেক্স, কেননা আরবী কাব্য এবং আরবী কুরআনের মতই এটি আরবীয়, তার নান্দনিকতার দিক দিয়ে। এর অস্তিত্ব যে কোন পরিবেশকে রূপান্তরিত করে ইসলামী আবহে, এই বৈশিষ্ট্যটিই চূড়ান্ত রকমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্পকর্মে দান করে একটি ঐক্য। এটি সঙ্গে সঙ্গে চেনা যায় এবং আসলে এতে ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। মূলত এটি অনেকগুলো ইউনিট বা ফিগারের সমন্বয়ে রচিত যা একত্রে মিলিত হয় এবং এমনি ধারা পরস্পর জড়াজড়ি করে, যার ফলে একটি ফিগার বা ইউনিট থেকে অন্য একটি ইউনিটের অভিমুখে অগ্রসর হয় সকল দিকে, যতক্ষণ না শিল্পকর্মটিকে তার বাস্তব কিনার থেকে কিনার পর্যন্ত অতিক্রম করে গেছে দৃষ্টি। ফিগার বা ইউনিটটি অবশ্যই সম্পূর্ণ এবং স্বতন্ত্র, কিন্তু তা পরবর্তী ফিগার বা ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত, দৃষ্টি বাধ্য হয় অগ্রসর হতে একটি ফিগারের আউটলাইন এবং নক্সা অনুসরণ করে পরবর্তী ফিগারটির রূপরেখা এবং নক্সার অনুসন্ধানে। এতেই সৃষ্টি হয় ছন্দ। এই গতিটি মন্থর হতে পারে যতই ফিগারগুলো পরস্পর থেকে হবে অধিকতর বিচ্ছিন্ন। যাই হোক, ফিগারগুলো যতই অধিকতর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হবে যার ফলে গতি, যতি এবং ছন্দ সৃষ্টি হয় এবং রেখাগুলোর ঘূর্ণায়মানতা এবং ভগ্নতার দ্বারা যতই গতি বাধাগ্রস্থ হয় ততই বেশী শক্তি সঞ্চারিত হয় এরাবেক্স এর গতিবেগে। গতিবেগ যত বাড়বে ততই মনের জন্য সহজ হবে যুক্তিচিন্তার জন্ম দিতে, যাতে করে শিল্পকর্মের সীমা ছাড়িয়ে কল্পনায় ঝাপ দিতে পারে, মন যা চায় তা সৃষ্টির প্রয়াসে। এই প্রক্রিয়ার জন্য পুনরাবৃত্তি আবশ্যক। একারণে যেকোন শিল্পকর্মে ভিন্ন ভিন্ন রকম অনেকগুলো এরাবেক্স এর কাজ থাকে যার প্রত্যেকটি ঢেকে দেয় একটি কাঠামোগত অংশ। উদ্দেশ্যটি সুস্পষ্টঃ এর উদ্দিষ্ট উড্ডয়নের উপর কল্পনার উৎক্ষেপণ। এটি ঘটতে পারে দ্বিতীয়, তৃতীয় অথবা দশম এরাবেক্স-এ, যদি তা না আসে প্রথমটির সঙ্গে।</p>
<p>এরাবেক্সগুলো হয়ে থাকে লতাপাতা ফুলময় বা জ্যামিতিক, শিল্প মাধ্যম হিসেবে সেগুলো যে বৃন্ত, পত্র, ফুল ব্যবহার করলো (আল-তাওরিক) অথবা যে জ্যামিতিক বসম (ফিগার) ব্যবহার করলো, তার উপর ভিত্তি করে। জ্যামিতিক ফিগারটি হতে পারে খাত (রৈখিক) সৎ, যদি তা সরল এবং ভগ্ন রেখা ব্যবহার করে অথবা তা হতে পারে বংকিম (রামী) যদি তা ব্যবহার করে বহুকেন্দ্রিক বক্ররেখা। এ সমস্তরই সম্মেলন ঘটতে পারে এবং তখন তাকে বলা হর বাড়ী। এরাবেক্সগুলো হবে প্লানার বা সমতলিক, যদি সেগুলোর থাকে দুই আয়তন, যেমনটি আমরা দেখতে পাই প্রাচীর, দরজা, সিলিং, আসবাবপত্র কাপড়, গালিচা, পুস্তকের মলাট এবং পৃষ্ঠার সকল অলংকরণের মধ্যে। এগুলো স্থান বিষয়ক অথবা ত্রিমাত্রিক হতে পারে যা নির্মিত হয় স্ব স্ব, তোরণ এবং গম্বুজের পাঁজরের সাহায্যে। এই রূপটি হচ্ছে মাগরিব এবং আন্দালুসিয়ার স্থাপত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য যার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই কর্ডোভার মহান মসজিদে এবং গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদে। আলহামরাতে দৃশ্যমান তোরণের উপর স্থাপিত পরস্পর জড়াজড়ি করা বহু তোরণ দ্বারা নির্মিত হয়েছে একটি  সম্পূর্ণ গম্বুজ যা কেবলমাত্র উদ্দীপ্ত কল্পনাই প্রত্যক্ষ করতে এবং তাদের গতিপথ অনুসরণ করতে পারে। এখানে গতিবেগটি এমনই প্রচন্ড যে ছন্দের সঙ্গে অগ্রসর হতে ইচ্ছুক যে কোন ব্যক্তিকে তা পরিচালিত ও নিক্ষেপ করতে পারে অনন্তের সরাসরি উপলব্ধির দিকে। একটি প্রকাণ্ড মসজিদের মহৎ সম্মুখভাগ, একটা বিশাল প্রাচীরে প্রবেশ কক্ষের প্যানেল, দরজার যে হাতলের উপর দৃষ্টি হুমড়ি খেয়ে পড়ে, একটি পুস্ত কের পৃষ্ঠায় একটি মিনিয়েচার, একটি গালিচার নক্সা অথবা আপন কাপড় চোপড় বা বেল্ট কিংবা বেল্টের বাকল সবই মুসলিমের কাছে ঘোষণা করে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, কেননা সে অ-প্রকৃত বা সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যাওয়া অলৌকিক জগতের অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রত্যক্ষ করে এসবের মাধ্যমে<sup>২১</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>আরবী</strong> <strong>ক্যালিগ্রাফি</strong><strong>: </strong><strong>অতিন্দ্রীয়</strong> <strong>উপলব্ধি</strong> <strong>বা</strong> <strong>চৈতন্য</strong></h4>
<p>মুসলিম চৈতন্য ইন্দ্রিয়াতীত ঐশী সত্ত্বা নিয়ে এতটাই আবিষ্ট যে, মুসলিম উপলব্ধি চেয়েছে সর্বত্রই তার প্রকাশ দেখতে এবং ঐশী উপস্থিতি ঘোষণা করার পন্থা ও উপায় খুঁজে বার করার জন্য এই চৈতন্য এতটাই ব্যগ্র ছিল যে, এই করে পরম ভাব উচ্ছাসের সঙ্গে এমন একটি প্যাটার্ন নির্মাণ যা মানবজাতির অভিজ্ঞতায় আগে কখনো ঘটেনি। এমন কি দৃশ্য শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে এর প্রতিভার জন্য এরাবেক্স-এর অনন্ত বৈচিত্রও যথেষ্ট ছিলোনা। এ প্রতিভা প্রত্যেকটি চিন্তনীয় শিল্প প্রয়াসের বিষয়কে ব্যবহার করেছে, এমন একটি দর্পণে রূপান্তরিত করেছে যাতে এর মর্ম প্রতিবিম্বিত হয়। এটি তখন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো আরো একটি অধিকতর চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রাক-ইসলামী ইতিহাস, সাহিত্যিক গদ্য এবং কবিতায় শব্দের সৌন্দর্য বা নান্দনিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। যদিও এর ধারণা ইসলামের আবির্ভাবকালে, আরবদের অনুরূপ অন্য কারো হাতে ততটুকু বিকশিত ছিলনা, তবু মেসোপটেমিয় এবং হিব্রুগণ, গ্রীক এবং রোমানগণ এবং হিন্দুরা শব্দের নান্দনিকতার সীমান্তকে যতদুর প্রসারিত করেছিল, তা সামান্য বিষয় ছিল না। লিখন শিল্প ছিল অপরিপক্ক, স্থূল এবং সারা পৃথিবীতে সৌন্দর্যের বিচারে অনাকর্ষণীয় এবং এখনো প্রায় সর্বক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান। ভারত, বাইজানটিয়ান এবং খৃষ্টান প্রতীচ্যে লেখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে এর যথোচিত ক্যাপাসিটি অনুযায়ী, অর্থাৎ যৌক্তিক প্রতীক হিসেবে। খৃষ্টান ও হিন্দুধর্মের দৃশ্য (প্রতিকৃতি মূলক) শিল্পের প্রকাশ কল্পিত হয়েছে লিখনের মাধ্যমে, অর্থাৎ বাঞ্ছিত খণ্ড খণ্ড ধারণাকে প্রকাশ করার জন্য শব্দের যৌক্তিক প্রতীকতার সাহায্যে তা ব্যক্ত হয়েছে। দৃশ্যশিল্পকে উদ্ধার করার জন্য অসংলগ্ন বিষয়ান্তরগামী চিন্তার সাহায্যের প্রয়োজন নেই, যদি না সেই শিল্প বাঞ্ছিত প্রাকসিদ্ধ ধারণাটিকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে প্রকাশ করার জন্য অক্ষম হয়। এপোলো এবং এফ্রোদিতের জন্য এধরনের কোন অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলোনা দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপে, কেবল দৃষ্টহিসেবেই ওরা দর্শকের কাছে ঐশীত্ব প্রকাশ করেছে, কারণ মানব প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকেই এবং ইন্দ্রিয়কে প্রদত্ত চরিত্র থেকেই প্রত্যক্ষভাবে ঐশীত্ব বা প্রাকসিদ্ধ ধারণা উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাইজানটাইন বা হিন্দুশিল্পের ব্যাপারে তা ছিলোনা, কারণ এই শিল্পের ফিগারগুলো ইঙ্গিতময় কোনো সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত ছিল, যেখানে এগুলোকে কেবল শৈলীরূপ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে লেখার আশ্রয় নেওয়া হয়, প্রতিচ্যে এবং ভারতীয় শিল্পে এর ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, এর প্রতীকতা ছিল সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং কেবল বুদ্ধিগ্রাহ্য, আরবী অথবা রোমান সংখ্যার থেকে যা ভিন্ন নয়। ইসলামের পূর্বে আরবী ভাষা যে লিপিতেই লেখা হউক না কেন প্রকৃত ব্যাপার ছিল এই ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এবং দৃশ্য শিল্পকর্মে ইন্দ্রিয়াতীততা অর্জনের জন্য বলিষ্ঠ উদ্যোগের ফলে, লিখন শিল্পে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবার প্রতীক্ষায় ছিলো, ইসলামী প্রতিভা সাফল্যের সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী &#8216;আল্লাহ&#8217; শব্দটি নাবাতি বর্ণমালা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নসখ রীতিতে (গোটা গোটা হাতের লেখায়) লিখিত হয় অথবা সিরীয় হরফের মাধ্যমে প্রাপ্ত আরামাইক, কুফী হরফে (কৌণিক)। অন্য যে কোন ভাষার মতই আগাগোড়াই এর তাৎপর্য ছিলো বলা যায়, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরগামী সম্ভবত আরো বেশী, এ কারণে যে, নিকটপ্রাচ্যের মানুষগুলো ক্যালিগ্রাফি বলতে যা বুঝায় তেমন কিছুর সঙ্গে পরিচিতই ছিলনা। রোমানরা ক্যালিগ্রাফিতে কিছুটা সামর্থ অর্জন করলেও হরফগুলোর তাৎপর্য আগের মত উজ্জ্বল, যৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক রয়ে গেল। আয়ারল্যান্ডের কেলটিক সন্যাসীরা Book of Kells এর মতো অল্প ক&#8217;টি উদ্ভাসিত পান্ডুলিপি তৈরি করেছিলো। কিন্তু তাদের ক্যালিগ্রাফি রোমান স্তরকে অতিক্রম করেনি। তাদের অক্ষরগুলো ছিল গোল গোল এবং অলংকরণের মাধ্যমে, সৌন্দর্যমন্ডিত, কিন্তু তার পূর্ণ তাৎপর্যটি যৌক্তিকই থেকে যায়। <em>অলংকরণ</em> <em>ছিল</em> <em>একটি</em> <em>অতিরিক্ত</em> <em>ব্যাপার</em><em>।</em> <em>কারণ</em> <em>এতে</em> <em>করে</em> <em>হরফগুলোর</em> <em>চরিত্র</em> <em>পরিবর্তিত</em> <em>হয়নি</em> <em>এবং</em> <em>প্রত্যেকটি</em> <em>হরফই</em> <em>একাকী</em> <em>অবস্থান</em> <em>করে</em><em>।</em> <em>দৃষ্টি</em> <em>এক</em> <em>হরফ</em> <em>থেকে</em> <em>আরেক</em> <em>হরফে</em> <em>পৌঁছায়</em> <em>লাফ</em> <em>দিয়ে</em> <em>এবং</em> <em>বোধশক্তিকে</em> <em>একাজে</em> <em>মধ্যস্থতা</em> <em>করতে</em> <em>হত</em><em>, </em><em>যুক্তি</em> <em>এবং</em> <em>স্মৃতি</em> <em>মিলিত</em> <em>হত</em> <em>গ্রাফিক</em> <em>অক্ষরগুলোকে</em> <em>শব্দ</em> <em>বা</em> <em>মনের</em> <em>ধারণায়</em> <em>রূপান্তরিত</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>।</em> <em>লিখিত</em> <em>হরফ</em><em>, </em><em>শব্দ</em><em>, </em><em>ছত্র</em> <em>বা</em> <em>বাক্যের</em> <em>কোনো</em> <em>নান্দনিক</em> <em>ইনটুইশন</em> <em>হতনা</em><em>।</em> ক্রমে ক্রমে দুই জেনারেশনের ব্যবধানের মধ্যেই ইসলামী শিল্প আরবী শব্দকে রূপান্তরিত করলো একটি দৃশ্য শিল্পকর্মে এবং তাতে সংবেদনাত্বক ইনটুইশনকে এমন একটি নান্দনিক অর্থ দান করে যা অসংলগ্ন কর্ম ক্ষমতা ও বোধকে যে অসংলগ্ন অর্থ দান করে তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্যান্য শিল্পকলার মতই এই নতুন শিল্প ছিলো ইসলামী চৈতন্যের সামগ্রিক লক্ষের অধীন। এরদৃশ্য সামর্থগুলোর বিকাশ ঘটানো হয় একটি এরাবেক্স নির্মাণ করার জন্য গ্রীক এবং ল্যাটিন বর্ণমালার মতই নাবাতি এবং সিরীয় বর্ণমালার হরফগুলো ছিল একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং স্বতন্ত্র। আরব শিল্পী এগুলোকে একত্রে যুক্ত করে দেয়, যাতে করে একটি অক্ষর প্রত্যক্ষ না করে দর্শকের চোখ একটি মাত্র দৃষ্টিপাতে এবং একটি সংবেদনাত্মক ইনটুইশনের সাহায্যে দেখতে পেতো পুরো শব্দটিকে এবং কার্যত গোটা বাকধারা বা ছত্রটিকে। দ্বিতীয়ত আরব শিল্পী অক্ষরগুলোকে করে নমনীয় যাতে করে সে অক্ষরগুলোকে প্রসারিত, প্রলম্বিত, সংকুচিত, নমিত, বিস্তৃত, সোজা, বাঁকানো, বিভাজন, গাঢ়করণ ক্রমে সংকীর্ণ করে আনয়ন, অংশত বা পূর্ণত বর্ধিতকরণ, যা খুশী তাই করতে পারে। হরফ হয়ে উঠে বংশবদ শিল্প উপকরণ, ক্যালিগ্রাফারের যে কোন নান্দনিক পরিকল্পনা বা ধারণাকে ধারণ ও কার্যকর করার জন্য যা থাকে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, এরাবেক্স শিল্পকর্মে এপর্যন্ত যা কিছু জ্ঞানলাভ হয়েছে শিল্পী তার সমস্ত কিছুকেই কাজে লাগায় ফুল ও লতাপাতার শিল্প রূপায়ণ এবং জ্যামিতিক চিত্রণ, কেবলমাত্র লেখন শিল্পের উৎকৃষ্টতর অলংকরণের জন্যই নয়, বরং লিখনকেই তার আপন অধিকারে একটি এরাবেক্স-এ রূপদানের জন্য আরবী লিখন এভাবে হয়ে উঠে একটি মুক্ত তরঙ্গিত রেখা যা এখানে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং নিজে নিজেই সম্পূর্ণ হতে পারে। মিল রেখে বিন্যাস করেই হউক বা বৃহৎ পরিবারে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়েই হউক অক্ষর বা বর্ণের নতুন করে অর্জিত নমনীয়তার ফলে ক্যালিগ্রাফারকে লিখনের ক্ষমতা দান করে দুটির একটি পন্থায় বা উভয় পন্থায়। সে যে নান্দনিক পরিকল্পনাটির বিকাশ ঘটাতে চায়, তার অনুসরণে। পরিশেষে সে অক্ষর বা হরফের এই মুক্তি সাধন করে, কেবলমাত্র এরাবেক্স অলংকরণগুলোকে গ্রহণ করার জন্যই নয়, বরং একটি বৃহৎ এরাবেক্স নির্মান করার জন্য তার সঙ্গে হরফকে মিশিয়ে দেয়। শিল্পী এটি সম্ভব করে তোলে- লিখন থেকে যাতে অন্য এরাবেক্সটি বিকাশ লাভ করে, অথবা সেসবের মধ্য থেকে লিখনের বিকাশ ঘটে। অক্ষরের যে মৌলিক প্রকৃতি অক্ষরকে বোধগম্যতা দান করে তা রক্ষিত হয়, এবং কাব্যে ছন্দের প্যাটার্ন এবং সমতল এরাবেক্সগুলোতে গঠিত যে সব জ্যামিতিক ও লতাপাতা ফুলের রূপ ও আকৃতি, বোধগম্য আকারে সেগুলোকে প্রকাশ করার মধ্যেই সৃষ্টি হতো তাদের গতিশীলতা। এরাবেক্স হিসেবে আরবী লিখন অসংলগ্ন রোধের চূড়ান্ত বাহনস্বরূপ অক্ষর বা যৌক্তিক প্রতীকগুলোকে রূপান্তরিত করে একটি সংবেদনাত্মক শিল্প উপকরণে এবং একটি নান্দনিক মাধ্যমে, যা জন্ম দেয় একটি অনন্য নান্দনিক ইনটুইশনের। মানবিক শিল্প হিসেবেই এ ছিল তার এক বিজয়, যার সাহায্যে অসংলগ্ন যুক্তির সর্বশেষ এলাকা অতিক্রম করে মানবিক শিল্পকে সংবদনাত্মক নান্দনিকতার জগতের সঙ্গে মুক্ত ও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এটি ছিল ইসলামের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত শৈল্পিক বিজয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলাম দাবী করে, আল্লাহর বাণী বা কালাম হচ্ছে চিন্তার দিক দিয়ে তার নিকটতম ধারণা? তাঁর ইচ্ছার আশুতম প্রকাশ; যেহেতু ইন্দ্রিয়াতীত হওয়ার কারণে তিনি অনন্ত কালই অজ্ঞেয় এবং অব্যক্ত মানবের গোচরে। সে কারণে তাঁর কালাম বা শব্দের মাধ্যমে প্রত্যাদেশের আকারে তাঁর ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে। তাহলে কুরআনের শব্দ হচ্ছে God-in-Percipi বুদ্ধিগ্রাহ্য আল্লাহ এবং একারণে সম্মানের দিক দিয়ে ও সৌন্দের্যের দিক দিয়ে তাকে দেওয়া উচিত চূড়ান্ত মর্যাদা। এজন্য ইসলামে এর লিখন হচ্ছে নান্দনিকতার চরম ও পরম। একারণে আরো যুক্তিসঙ্গত যে, আরবী ক্যালিগ্রাফির বিকাশ সাধন করতে হবে ঐশী সত্ত্বার সংবেদনাত্মক ইনটুইশন বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ঘটানোর জন্য- আল্লাহকে যে প্রকাশ করা যায় না, চেতনায় ব্যক্ত করা এবং প্রতিফলিত করা যায়না, তারই পূর্ণ উপলব্ধির মাধ্যমে। যেহেতু আরবী লিখন একটি এরাবেক্স হয়ে উঠেছে, সে কারণে তা যে কোন লিপিকর্মে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখানে আইনত অবস্থান নিতে পারে তার চিন্তামূলক উপাদান যাই হোক। যে কোন শিল্পকর্মের উপরে তা চড়াও হতে পারে, এবং এর নান্দনিক গতিবেগ বা মূল্যের পরিপূরক হিসেবে, আর সেই শিল্পকে করতে পারে মহিমান্বিত, শিল্প কর্মটির সংঘা লিখন সমন্বত বা অঙ্গীভূত হোক বা না হোক, সকল মুসলমান পবিত্র কিতাবের প্রতি যে শ্রদ্ধা পোষণ করে থাকে, <em>পরে</em> <em>লিখন</em> <em>শিল্প</em> <em>দ্রুত</em> <em>বিস্তৃতি</em> <em>লাভ</em> <em>করে</em> <em>এবং</em> <em>সর্বাধিক</em> <em>সংখ্যক</em> <em>মেধাকে</em> <em>সংহত</em> <em>করে</em> <em>ও</em> <em>প্রবেশ</em> <em>করে</em> <em>মুসলিম</em> <em>জীবনের</em> <em>প্রতিটি</em> <em>মুহূর্তে</em><em>।</em> <em>প্রস্তরে</em><em>, </em><em>কাঠে</em><em>, </em><em>কাগজে</em><em>, </em><em>চর্ম</em> <em>কিংবা</em> <em>বস্ত্রে</em><em>, </em><em>গৃহে</em><em>, </em><em>অফিসে</em><em>, </em><em>দোকানে</em><em>, </em><em>মসজিদে</em> <em>প্রত্যেকটি</em> <em>প্রাচীর</em> <em>এবং</em> <em>সিলিং</em><em>&#8211;</em><em>এ</em> <em>আরবী</em> <em>লিখন</em> <em>হয়ে</em> <em>উঠলো</em> <em>ইসলামের</em> <em>সাধারণ</em> <em>শিল্পকর্ম</em><em>।</em> এর প্রভাব এবং উপস্থিতি এত ব্যাপকতা লাভ করে যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোন নগরী বা গ্রাম এই শিল্পকর্মের ডজন ডজন মহৎ স্রষ্টা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়নি। <strong>এমনকি</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>শত্রুরাও</strong> <strong>এই</strong> <strong>প্রভাব</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>মুক্ত</strong> <strong>ছিলনা</strong><strong>।</strong> <strong>খ্রীষ্টান</strong> <strong>স্পেন</strong><strong>, </strong><strong>ফ্রান্স</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইটালীতে</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>অজ্ঞতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>অযোগ্যতার</strong> <strong>বশে</strong> <strong>আনাড়ীর</strong> <strong>মত</strong> <strong>আরব</strong> <strong>লিখন</strong> <strong>শিল্প</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করেছে</strong><strong>, </strong><strong>তবু</strong> <strong>সেই</strong> <strong>ব্যবহারের</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>নান্দনিকতার</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>প্রভূত</strong> <strong>লাভবান</strong> <strong>হয়েছে<sup>২২</sup></strong><strong>।</strong> ইহা যে নান্দনিক সংবেদনাত্মক ইনটুইশনের জন্ম দেয় তা যে কোন এরাবেক্স শিল্পকর্মের মতই কল্পনা উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম, যে কোন যুক্তি অভিমুখে তার উর্ধ অভিসারী উড্ডয়নে, হয়তোবা তার চাইতেও বেশী, কারণ একই সময়ে এর অসংলগ্ন উপাদানগুলো পাঠ করতে সক্ষম দর্শকের জন্য আরবী লিখন বুদ্ধির সক্রিয়তার মাধ্যমে জন্মাবে কল্পনার লক্ষ্যের আরো বিশিষ্ট একটি রূপ, এর গতিবেগে সে লক্ষ্যের অভিমুখে আরো অগ্রসরতা। তাহলে, এ কোন বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে, কুরআন কপি করতে গিয়ে আরবী ক্যালিগ্রাফি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পকর্ম। রাজা বাদশা এবং প্রাকৃতজন প্রত্যেকই তাদের সমগ্র জীবনের জন্য একটি পরম আশা পোষণ করতেন: একখণ্ড সমগ্র কুরআন কপি করা এবং তা সমাপনের পর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ<sup>২৩</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জামাখসারির (তাঁর আছাদ আল বালাগা, দ্রঃ &#8216;কালাম&#8217;) বিবৃতি মতে উজির মোহাম্মদ আবু আলী মুকলা লিখনকে তুলনা করেছিলেন কাজের সঙ্গে এবং দুটি শিল্পকর্মের পরিকল্পনায় ও রচনায় অর্পণ করেছিলেন একই নান্দনিক দায়িত্ব। তিনি লিখন শিল্পের মৌল গুণ পাঁচটি বলে বর্ণনা করেছিলেন; আত্ তাওফিয়া (শব্দটি যেসব অক্ষর দিয়ে নির্মিত তার প্রত্যেকটিকে তার পূর্ণ অংশ প্রদান যাতে করে সমগ্র ও অংশের মধ্যে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসামঞ্জস্য হতে পারে), আল ইলমান (প্রত্যকটি অক্ষরকে তার জন্য প্রয়োজনীয় স্থান, ক্ষমতা ও গুরুত্ব প্রদান), আল ইকমাল (প্রত্যেকটি অক্ষরকে তার দৃশ্য ব্যক্তিত্ব প্রদান, যা প্রকাশিত তার ভঙ্গিতে, সোজা, দন্ডয়মান অবস্থায়, ফ্ল্যাট অবস্থায়, শুয়ে পড়ায়, দৃঢ় ন্যূজতায়, আত্মসমর্পণ, অভিজ্ঞতালব্ধ বক্রতায়); আল্ ইশবা (প্রত্যেকটি বর্ণকে তার অন্তর্গত দৃশ্য ব্যক্তিত্ব যার প্রকাশ ঘটে সূক্ষ্মতার মাধ্যমে প্রত্যেকটি অক্ষরের যা দাবী তা দান করা); আল ইরসাল (মুক্ত গতিতে রেখার উৎসারণ যা ইতস্ততা বা কোন অন্তর্গত প্রতিনিবৃত্তির দ্বারা বাধ্যগ্রন্থ নয়, যা উচ্চ গতির বেগ সৃষ্টি করে<sup>২৪</sup>)। আবু হাইয়ান আত্ তাওহীদী তার ইলমুল কিতাবাতে বলেনঃ &#8220;সাধারণভাবে লিখন হচ্ছে জাগতিক উপকরণ দিয়ে আধ্যাত্মিক চিত্রণ<sup>২৫</sup>।&#8221; <em>যুগ</em> <em>যুগ</em> <em>ধরে</em> <em>মুসলমানরা</em> <em>অজ্ঞাতনামা</em> <em>সাধু</em> <em>দরবেশদের</em> <em>উক্তির</em> <em>আবৃত্তি</em> <em>করেছেন</em><em>, </em><em>যেমন</em><em>: </em></p>
<blockquote><p><em>&#8216;</em><em>মানুষের</em> <em>মনের</em> <em>অবস্থান</em> <em>তাদের</em> <em>কলমের</em> <em>দাঁতের</em> <em>নীচে</em><em>,&#8217; &#8220;</em><em>লিখন</em> <em>হচ্ছে</em> <em>চিন্তার</em> <em>পানি</em> <em>সেচন</em><em>,&#8221; &#8220;</em><em>সুন্দর</em> <em>লিখা</em> <em>দুর্বল</em> <em>চিন্তার</em> <em>অভাব</em> <em>পূরণ</em> <em>করে</em><em>, </em><em>আর</em> <em>ধ্বনিকে</em> <em>তা</em> <em>দান</em> <em>করে</em> <em>জীবনীশক্তি<sup>২৬</sup></em><em>।</em><em>&#8220;</em></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>মধ্যযুগের বহু পণ্ডিত মানবিক বিষয়ে মহৎ খ্যাতি অর্জন করেছেন, যেমন ইবন আবদ রাব্বী, মোহাম্মদ আমীন, ইবনুন আছীর, ইবনুল নাদী, আল কালকাসান্দী প্রমুখ। এঁরা সকলেই লিখন ক্ষেত্রে সহগামী মুসলমানের কৃতিত্বকে স্বীকার করেছেন। তাঁরা এতে গর্বিত ছিলেন যে, অন্য যে কোন লেখনী শিল্পের চেয়ে আরবী লিখন অনেক বেশী বিকশিত হয়েছে। তারা গর্বিত যে, আরবী লিখন-সৌন্দর্য শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছে, এবং এমন অভিব্যাপ্তি ও গৌরব অর্জন করেছে যা সম্পূর্ণভাবে তুলনাবিহীন, এবং পরিশেষে এতে অর্পিত হয়েছে পরমমূল্য অর্থাৎ ধর্মীয় মূল্য, ঐশী প্রজ্ঞা প্রকাশের বাহন এবং মাধ্যম হিসেবে। কুরআনুল করীম তাদের মূল্য নির্ণয়ের অভ্রান্ততার চূড়ান্ত প্রত্যয় ও সন্তোষের সঙ্গে দাবী করে যে, লিখনকে অপার্থিব মর্যাদা দান করেছে একটি আয়াতে যার সূচনা কলম এবং লেখনীর তাকিদ দিয়ে<sup>২৭</sup>।</p>
<p>যেখানে, সমস্ত শিল্পকলাই সমজদারদের উপর চিং-প্রকর্ষ ও মানবিকতা-সৃজনকারী প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে গ্রীক এবং রেনেসাঁর শিল্পকলা মানুষের কাছে মানুষের নিজের মূল্য বৃদ্ধি করে এবং তার কল্পনা এবং ইচ্ছাকে আত্মউপলব্ধির বৃহত্তর উচ্চতায় উন্নীত করার জন্য তাকে অনুপ্রাণিত করে। গ্রীক এবং রেনেসাঁ শিল্প তা সম্পাদন করে মানুষকে একটা মহত্তর ও গভীরতর মানবিকতায় শিক্ষিত করে, এমন মহৎ এক মানবিকতা যে, তার চেতনায় তা লোপ পায় ঐশ্বরিকতার মধ্যে যা কিনা আশা ও সর্চোচ্চ জীবন মানের শীর্ষবিন্দু। ইসলামে শিল্পকর্ম উৎকর্ষ মানবিকতা ও আত্মউপলব্ধিকর একই প্রয়াস দেখা যায়। কিন্তু ইসলাম তা সম্পাদন করে মানুষকে প্রতিটি মুহূর্তে ঐশী উপস্থিতির সম্মুখে স্থাপন করে। ঐশীসত্ত্বা অপৌরুষেয় এবং ইন্দ্রিয়াতীত হওয়ায় ইসলামী শিল্পকলা যে আদর্শবাদের জন্ম দেয় তা কখনো দাম্ভিক অথবা অবাধ্য প্রমিথিউসের মত ছিলনা। যেহেতু তা ছিল মানবীয়, একারণে ইসলামী শিল্পকলার আদর্শবাদ নিজেকে নিয়ম-শৃংখলার অধীনে স্থাপন করে, তার নিজের ইন্দ্রিয়াতীত চেতনার মাধ্যমে। এটি কি সীমাবদ্ধতা? নিশ্চয়ই। এই সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয় ইন্দ্রিয়াতীত মূল্যমান দ্বারা সংজ্ঞা মতে যার সূচনা অনন্ত থেকে; এই সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সেই সব মূল্যের কারণে যেগুলো, সেসব বিষয়ে &#8216;বিভ্রান্তির&#8217; মাধ্যমে নয় বরং সোজাসুজি তার সামনে দাঁড়িয়ে, উৎকৃষ্টতরভাবে নিরীক্ষণ ও উপলব্ধি করা যায়। যেহেতু মূল্যের উভয় জগতই প্রাকসিদ্ধ, সে কারণে ধারণার দিক দিয়ে সে সব বিষয়ে মানুষের বিভ্রান্তি অসম্ভব এবং প্রমিথিউস হামেশাই একজন আত্মতুষ্ট ব্যক্তি। ইসলামী শিল্পকর্মের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে খোদ ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের অনুসন্ধান এবং সর্বদা পরম ট্রান্সেন্ডেন্ট বাস্তবতা থেকে পার্থক্যের দূরত্ব বজায় রাখা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা:</p>
<p>১. (আল্লাহ) আসমান এবং জমিনের স্রষ্টা। কোন কিছুই তাঁর মতো নয়। তিনি সমস্ত কিছু শোনেন এবং দেখেন (৪২: ১১)।</p>
<p>২. Arthur Schopenhaser. The World as Will and Idea. tr. R.B. Haldane and J. Kemp London: Routledge and Kegan Paul Limited) vol i. Third Book. p. 217.</p>
<p>৩. Friedrich Nietzsche. Works. tr. and ed Walter Kaufmaan (New York The Viking Press. 1954) পৃ. 459. Walter Kaufmann. Nietzsche. Philospher. Psychologist. Antichrist (Princeton: Princeton Press. Meridian Books. 1956) পৃ.102.</p>
<p>৪. Murray, Five Stages পৃ. 57,60,63.</p>
<p>৫. দ্র: এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221;.</p>
<p>৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬।</p>
<p>৭. দেখুন এই গ্রন্থারের &#8230; &#8220;Divine Transcendence&#8221; pp. 11-19.</p>
<p>৮. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; P. 78.</p>
<p>৯. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;Divine Transcedence&#8221;&#8230;&#8230;.p. 22.</p>
<p>১০. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221;.</p>
<p>১১. যে কোন ব্যাকরণমূলক পাঠ অনুসারে এই ভূমিকা প্রায় সকল সেমেটিক ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ধাতৃমূল্যের ত্রি-ব্যঞ্জনমূলক কাঠামো সেমেটিক ভাষাতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>১২. দ্রঃ এই গ্রন্থারের প্রবন্ধ, &#8220;Islam and Art.&#8221; Studia Islamica fasciculi xxxvii (1973) পৃ. 93।</p>
<p>১৩. শ্রোতা এবং আবৃত্তিকার বা পরিবেশকের মধ্যে একই ধরনের সহযোগিতামূলক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হচ্ছে গোটা মুসলিম বিশ্বের মধ্যযুগের সঙ্গীত ও কবিতার মোসায়েরাগুলোর বৈশিষ্ট্য, যা দেখা যাবে ঐ আমলের সাহিত্যের প্রয়াস (যেমন: Kitab al Aghani by al Isfahani)।</p>
<p>১৪. Abd al qaidir al Jurjani, Dalail al l&#8217;jaz: (Cairo: Al Matba&#8217;ah al Arabiyah 1351 H).</p>
<p>১৫. Abu al Faraj al Isfahani. Kitab al Aghani (Beirut: Dar al Thaqafah. 1374/1955) witnesses to a countless number of such instances.</p>
<p>১৬. K.A.C. Creswell. Early Muslim Architecture (Oxford: Clarendon Press. 1932- 1940) vol. পৃ. 40.</p>
<p>১৭. দ্র: Richard Ethinghusen. &#8220;The Character of Islamic Art &#8220;The Arab Heritage ed. N.A. Fais (Princeton: Princeton University Press 1944) পৃ. 251-67.</p>
<p>১৮. দ্র: Al Faruqi &#8220;Urubah and Religion&#8221; p. 211.</p>
<p>১৯. T.W. Arnold, Painting in Islam (Oxford: the Clarendon Press, 1928) c,. t. 133.</p>
<p>২০. Sturt Cary Welch, A Kings: The Shah-Nameh of Shah Tahmasp (New York: Metropoliton Museam of Art, 1972), পৃ. 30.</p>
<p>২১. কোনো দৃষ্টি তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না, কিন্তু তিনি সমস্ত কিছু দেখেন। তিনি দয়াময় (৬: ১০৩)।</p>
<p>২২. ইতিহাসবিদরা &#8216;মোজারাবিক&#8217; শব্দটি সৃষ্টি করেছেন, খ্রিষ্টিয়ান, ইতালী ও স্পেনিস অলংকরণের সমুদয় ঐতিহ্যটি বুজানোর জন্য, যেগুলোর সঙ্গে আরবী Motive (মুলভাব) এবং নক্সা সংশ্লিষ্ট।</p>
<p>২৩. তা বুঝা যায়, কুরআনের পাঠের কপির অনন্ত বিপুলতায়, যা বাজনাবর্গ অভিজাতগণ এবং সাধারণরা, সকল স্তরের মানুষের কপি করেছিলেন, বা যা রয়েছে সকল স্তরের মানুষের অধিকারে।</p>
<p>২৪. Naji Zayn al Din. Musawwer al Khan al Arabi. Baghdad: Al Mujam al Ilmi al Iraqi, 1288/1968). p. 372.</p>
<p>২৫. ঐ, পৃষ্ঠা ৩৯৬, যাতে জইনুদ্দিন আত তৌহীদের রিসালা ফি ইলমূল কিতাবাত একটি অংশ উদ্ধৃত করেছে। এটি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি।</p>
<p>২৬. ঐ।</p>
<p>২৭. নুন। কলমের সাক্ষ্য এবং যা, তা লিপিবদ্ধ করে তার সাক্ষ্য (৬৮: ১-২) পাঠকের&#8230;. তোমার রাব্বের নামে, যিনি দয়াময়, যিনি কলম ব্যবহার শিখিয়েছেন, মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানতো না (৯৬: ৩-৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -14px; top: 15394px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14806</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নন্দনতত্ত্ব : ইসলামী শিল্পে নান্দনিকতার অন্বেষণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/aesthetics-an-exploration-of-aesthetics-in-islamic-art/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/aesthetics-an-exploration-of-aesthetics-in-islamic-art/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 03 Jul 2024 13:23:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14517</guid>

					<description><![CDATA[ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে নিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত ছিলো, উসমানীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধ্রুপদী কাব্য “দিওয়ান” চর্চার স্বর্ণযুগ। এই লম্বা সময়ের ঐতিহ্যগত ভিত্তি এর স্বতন্ত্র ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কবিদের সাহিত্যচর্চার চিরচারিত উপায় উপকরণের মধ্যে ছিল মাজমুন (দিওয়ান), মানুষের আবেগ-অনুভূতি,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে নিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত ছিলো, উসমানীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধ্রুপদী কাব্য “দিওয়ান” চর্চার স্বর্ণযুগ। এই লম্বা সময়ের ঐতিহ্যগত ভিত্তি এর স্বতন্ত্র ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কবিদের সাহিত্যচর্চার চিরচারিত উপায় উপকরণের মধ্যে ছিল মাজমুন (দিওয়ান), মানুষের আবেগ-অনুভূতি, অপরিবর্তনীয় শব্দসমূহ, আর আরবী ছন্দশাস্ত্র। এই সমস্ত উপকরণসমূহ কবিদের পূর্ববর্তী সাহিত্যসমূহের অনুকরণ ও পুনরাবৃত্তি করার পরিবর্তে তাদের দিয়েছিল, স্বতন্ত্র রচনাশৈলীতে গভীর অনুভূতি প্রকাশের সক্ষমতা। এছাড়াও এগুলো কবিতার গঠনে যোগ করেছিল নান্দনিকতার ভিন্ন এক মাত্রা। ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই উপকরণগুলো কাব্যশাস্ত্রের নান্দনিক মূলনীতিসমূহ মেনে চলতো। এই মূলনীতিসমূহ নন্দনতত্ত্বের অন্যান্য শাখাগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।</p>
<p>তাহলে উসমানী সালতানাতে কিংবা সামগ্রিকভাবে ইসলামী সভ্যতায় নন্দনতত্ত্বের মানদন্ড কী ছিল?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3><strong>নান্দনিকতার ধারণা</strong></h3>
<p>“নান্দনিকতা”র ইংরেজি প্রতিশব্দ “Aesthetics” (অ্যাসথেটিকস) শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ “Aesthesis” থেকে; যার অর্থ অনুভব বা উপলব্ধি। পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে “Aesthetics” শব্দের ব্যবহার বেশ পুরাতন। পারিভাষিকভাবে এটি এথেনিয়ান দার্শনিক প্লেটোর সময়কাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসলেও অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত অন্যান্য সাধারণ শব্দগুলোর মতোই এর বহুল ব্যবহার ছিলো। জার্মান দার্শনিক Gottfried Wilhelm Leibniz এর ছাত্র Alexander Gottlieb Baumgarten (১৭১৪-১৭৬২) তার বিখ্যাত গ্রন্থ “Aesthetica” এর মাধ্যমে “Aesthetics” শব্দটিকে একটি পরিভাষায় রূপদান করেন। পরবর্তীতে ঊনিশ শতকের শেষের দিকে উসমানীয়দের ওয়েস্টার্নাইজেশনের সময় এ পরিভাষাটি তুর্কি ভাষার অন্তর্ভূক্ত হয়।</p>
<figure id="attachment_14518" aria-describedby="caption-attachment-14518" style="width: 369px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14518 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture1.jpg" alt="A miniature of Al-Masjid an-Nabawi." width="369" height="246" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture1.jpg 369w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture1-300x200.jpg 300w" sizes="(max-width: 369px) 100vw, 369px" /><figcaption id="caption-attachment-14518" class="wp-caption-text">মসজিদে নববীর এক ক্ষুদ্র চিত্রকর্ম।</figcaption></figure>
<p><strong>গ্রিকো-ল্যাটিন সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত বিশ্বদর্শন থেকে আগত শব্দ “Aesthetics” পশ্চিমা সংস্কৃতির শিল্প-সৌন্দর্যের ব্যখ্যা করতে পারলেও অন্যান্য সংস্কৃতির শিল্প ও সৌন্দর্যের ব্যখ্যায় ছিল একেবারেই অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে এই শব্দের দ্বারা ইসলামী শিল্প ও নান্দনিকতাকে তো সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিলোইনা, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামী শিল্পকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে উপস্থাপন করেছিলো। </strong></p>
<p>উসমানী সভ্যতায় নান্দনিকতা বোঝাতে “Aesthetics” এর সমার্থক শব্দ হিসেবে আরবি শব্দ জামাল, অর্থাৎ সৌন্দর্য ব্যবহৃত হলেও এর দ্বারা “Aesthetics” এর পারিভাষিক অর্থ বোঝানো হতো না। এর দ্বারা সাধারণত বস্তুর এমন সব বৈশিষ্ট্যকে বোঝানো হয়, যা মানুষের অন্তরে ভালো লাগার অনুভূতি, ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করে।</p>
<p>“علم الجمال” (ইলমুল জামাল) এর অর্থ “সৌন্দর্য সংক্রান্ত জ্ঞান”। এটি “Aesthetics” শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা সৌন্দর্যের প্রকৃতি ও মূলনীতি, শৈল্পিক মূল্যমানের ধারা এবং সৌন্দর্য তত্ত্বের মতো বিষয়গুলোকে পরিগ্রহ করে।</p>
<figure id="attachment_14519" aria-describedby="caption-attachment-14519" style="width: 408px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14519" style="font-weight: inherit;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture2.png" alt="Ceramic Aesthetics at Museum of Turkish and Islamic art." width="408" height="250" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture2.png 342w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture2-300x184.png 300w" sizes="(max-width: 408px) 100vw, 408px" /><figcaption id="caption-attachment-14519" class="wp-caption-text">ইস্তানবুলের &#8220;মিউজিয়াম অব টার্কিশ অ্যান্ড ইসলামিক আর্ট&#8221; জাদুঘরে সিরামিক শিল্প, ফেব্রুয়ারী ২০২০ (Shutterstock Photo)</figcaption></figure>
<p>উসমানীয়দের পশ্চিমাকরণকালের (ওয়েস্টার্নাইজেশনের সময়কালীন) বুদ্ধিজীবীগণ “Aesthetics” এর নামকরণ করেন “علم الحسن” (ইলমুল হুসন) বা “সৌন্দর্য সম্বন্ধীয় জ্ঞান” (science of beauty)। তারা তখন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে “Aesthetics” হলো “চারুকলার দর্শন” এবং এই দর্শনকে “হিকমত-ই-বেদায়ী” হিসেবে নামকরণ করেন। ১৯১২ সালের পর “হিকমত-ই-বেদায়ী” এর পরিবর্তে কোরআনের “بداء”  থেকে উদ্ভুত “بداية“ (বিদায়াত) শব্দের ব্যবহার শুরু হয় যার দ্বারা আল্লাহর সৃষ্টির অনন্যতাকে বুঝানো হতো। অবশ্য পরবর্তীতে “Aesthetics” শব্দটিও তুর্কি ভাষার অন্তর্ভূক্ত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3><strong>শিল্পকলায় ইমাম গাজ্জালীর প্রদত্ত রূপরেখা</strong></h3>
<p>বিখ্যাত ইসলামী দার্শনিক আল ফারাবীর মতে, “পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ, আর সৌন্দর্য আল্লাহর সিফাতের অন্তর্গত, সে তুলনায় অন্যান্য সবকিছুর সৌন্দর্য কেবল তারই বিভিন্ন প্রতিফলিত রূপ”। মহান চিন্তাবিদ ইবনে সিনা বলেন, “সমস্ত সৌন্দর্যের অধিকারী আল্লাহ, আর সমগ্র মহাবিশ্বের সৌন্দর্য এসেছে তার কাছ থেকেই”।</p>
<p>বিভিন্ন মৌলিক বিষয়গুলোর বিবেচনায় দেখা যায় ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে অন্যান্য দর্শন সম্পর্কিত বিষয়াবলির মতো নন্দনতত্ত্বকে আলাদা শাস্ত্র হিসেবে এতো বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়নি। <strong>এই বিষয়কে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে সামনে নিয়ে আসেন ইমাম গাজ্জালী। তিনি তার “ইহইয়াউ উলুমুদ্দ্বীন” (ইসলামী জ্ঞানের পূণর্জাগরণ) গ্রন্থের “ভালোবাসা, আকাঙ্খা, দয়া ও তৃপ্তি” অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা করেন। </strong></p>
<p>তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো সৌন্দর্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে সে অবশ্যই তাকে ভালোবাসে। আর সৌন্দর্য তৃপ্তি দান করে যা মানুষ উপভোগ করে।” তার মতে, সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহ বস্তুগত কিংবা জৈবিক কোনো আনন্দ থেকে আসে না, বরং সৌন্দর্য থেকে পাওয়া আনন্দানুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌন্দর্য তার সত্ত্বাগতভাবেই ভালোবাসায় পূর্ণ; এক্ষেত্রে তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা পানির ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে থাকার আনন্দানুভূতির উদাহরণ দেন। আল গাজ্জালী সৌন্দর্যকে ঐকতান (harmony) ও অনুপাতের (proportion) ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন।</p>
<figure id="attachment_14520" aria-describedby="caption-attachment-14520" style="width: 474px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14520 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/OIP.jpeg" alt="Taj Mahal" width="474" height="296" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/OIP.jpeg 474w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/OIP-300x187.jpeg 300w" sizes="(max-width: 474px) 100vw, 474px" /><figcaption id="caption-attachment-14520" class="wp-caption-text">ভারতের আগ্রায় অবস্থিত তাজমহল, ইসলামী সভ্যতার এক অনন্য স্থাপনা।</figcaption></figure>
<p>তার ব্যখ্যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে সুফী ধারায় সৌন্দর্যের আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা যুক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, তার চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করে ইবনে আরাবী ও মাওলানা জালালউদ্দীন রুমি সৌন্দর্যের আরো বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এই সমস্ত ব্যাখ্যাগুলো ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির অন্তর্গত হলেও মৌলিকভাবে ইসলামী চিন্তা, বিশ্বাস ও বিশ্বদর্শনকেই তুলে ধরে। এইভাবে ইমাম গাজ্জালীর মাধ্যমেই ইসলামী শিল্পকলায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নন্দনতত্ত্বের বিকাশ ঘটে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3><strong>শিল্প কোনো কর্ম নয় বরং শিল্প হলো আবিষ্কার</strong></h3>
<p>আঞ্চলিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব ধরণের ইসলামী শিল্পেই বিভিন্ন আঙ্গিকে ইসলামের মূলনীতিসমূহের প্রয়োগ ছিলো। আর পশ্চিমাদের মতো ইসলামী শিল্পে নন্দনতত্ত্বের জ্ঞানসমূহ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উদ্ভূত না হওয়াটি মূলত মুসলিম শিল্পী এবং চিন্তাবিদদের অনুসৃত পন্থার ফলাফল।</p>
<p>বাস্তবতাকে শুধুমাত্র বস্তুজগতের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াবলীর দ্বারা ব্যাখ্যা করার ধারণাটি যে সঠিক নয়, সেটিও প্রাচীনকালে উদ্ভাবিত নন্দনতত্ত্বের সরল উপলব্ধির ফলাফল। খ্রিষ্টান ধর্মেও এই ধারণাটি সবসময় অপরিবর্তিত ছিলো।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, কোনো ধর্মই বাস্তবতাকে শুধুমাত্র বস্তুজগতের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে, শিল্পকলার অনেক ক্ষেত্রই শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াবলির দ্বারা বাস্তবতাকে বর্ণনা করার ধারণায় সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে।</p>
<p>মুসলিম শিল্পীগণ মৌলিকভাবে মনস্তাত্ত্বিক কোনো ধারণার অনুসরণ না করার ফলে বহির্বিশ্বের চিত্রায়নও তাদের শিল্পসমূহে ফুটে উঠেছে। তারা সবসময়ই এমন এক চিন্তাধারার আলোকে কাজ করতেন যা তাদেরকে যেকোনো বস্তু বা বিষয়ের রূহী সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করতো। <strong>লুই ম্যাসাইননের মতো চিন্তাবিদদের মতে, মুসলিম শিল্পীগণ তাদের চিত্রকর্মকে মেটাফিজিক্সের দিকে নিয়ে যেতেন। ইসলামী নন্দনতত্ত্বে, শিল্পকলা মানে নতুন করে কোনো কিছুর সৃষ্টি নয় বরং শিল্প হচ্ছে ইতোমধ্যে বিদ্যমান রূপ ও সৌন্দর্যের অন্বেষণ এবং প্রকাশ। অর্থাৎ, শিল্পী সৌন্দর্যের সৃষ্টিকর্তা নন বরং আবিষ্কারক। সর্বোপরি, সবকিছুই আল্লাহর রঙে রঙিন। “…আর কেইবা আছে আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ঠ রঞ্জনকারী?” (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৩৮)</strong></p>
<figure id="attachment_14521" aria-describedby="caption-attachment-14521" style="width: 243px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14521 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture3.png" alt="" width="243" height="355" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture3.png 243w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/07/Picture3-205x300.png 205w" sizes="(max-width: 243px) 100vw, 243px" /><figcaption id="caption-attachment-14521" class="wp-caption-text">অটোমান ক্যালিগ্রাফার শেখ হামদুল্লার থুলুথ এবং নাসখ লিপিতে একটি ক্যালিগ্রাফিক অ্যালবাম।(কার্টেসিঃ Sakıp Sabancı Museum)</figcaption></figure>
<p>ইসলামী জিওগ্রাফিতে শিল্পের কাঠামোগত ধারণাকে “ফাইন আর্ট” হিসেবে সংজ্ঞায়ন খুবই সাম্প্রতিক। সাম্প্রতিক সময়ের আগ পর্যন্ত শিল্পকলার শাখাগুলোকে পৃথক পৃথক হিসেবে বিবেচনা করা হতো; যেমন: সংগীত বিজ্ঞান, সাহিত্য বিজ্ঞান ইত্যাদি। বস্তুত, শিল্প এবং কারুশিল্পসমূহকে ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায় না। ফলশ্রুতিতে যখন ইসলামী শিল্প বা ইসলামী নন্দনতত্ত্বের কথা আসে, তখন এর দ্বারা শিল্পের বিস্তৃত এক জগৎকে বোঝানো হয়।</p>
<p>শিল্পক্ষেত্রে বিমূর্তন (Abstraction) বলতে মূলত এমন শিল্প বোঝায় যা বাস্তবতা থেকে দূরবর্তী। বিমূর্তনে বস্তুর ভৌত অবস্থা বা কোনো অবস্থানের চিত্রায়ন করা হয়না; বরং রঙ, রেখা কিংবা জ্যামিতিক প্যাটার্নের মাধ্যমে একটি ভাব বা ম্যাসেজ প্রকাশ করা হয়। মুসলিম শিল্পীদের মধ্যে যারা বিমূর্তন নিয়ে কাজ করেছেন তারাও “ওয়াহদাত আল-উজুদ” (অস্তিত্বের ঐক্য)-এর থেকে তাদের কাজের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। সর্বোপরি, <strong>ইসলামী শিল্পকলার গূঢ় লক্ষ্য হচ্ছে, “দৃশ্যমান জিনিসের পেছনের অদৃশ্য (ঐশী) শক্তির কাছে পৌছানো”, আর বাহ্যিক লক্ষ্য হচ্ছে, “পৃথিবীকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা”।</strong> বিভিন্ন মেটাফিজিক্যাল প্রেক্ষাপট থাকার পরেও ইসলামী শিল্প সর্বদাই মানুষের জীবনধারার সাথে জড়িত ছিলো। ইসলামে নান্দনিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে, দেখা নয় বরং অভিজ্ঞতা অর্জনই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> নাজমুস সাকিব নাঈম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/aesthetics-an-exploration-of-aesthetics-in-islamic-art/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14517</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শিক্ষা (জ্ঞান ও আখলাক) আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণে শাহীদ ইনসান হিসেবে আমাদের করণীয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/shiksha-andoloner-vitti-nirmane-shahid-insan-hisebe-amader-koronio/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/shiksha-andoloner-vitti-nirmane-shahid-insan-hisebe-amader-koronio/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 04 Nov 2022 07:30:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7525</guid>

					<description><![CDATA[প্রতিটি সৃষ্টিকেই মহান আল্লাহ কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা ফিতরাত দিয়েছেন। এ অনুসারে মানুষেরও ফিতরাত রয়েছে। যেমন– মানুষ ক্ষুধা লাগলে খাবার খায়, ঘুম পেলে ঘুমায়, আবার জাগ্রত হয় ৷ একইভাবে মানুষের ফিতরাত হলো সে জানতে চায়, সে অন্বেষী হয়ে জানে ও]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">প্রতিটি সৃষ্টিকেই মহান আল্লাহ কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা ফিতরাত দিয়েছেন। এ অনুসারে মানুষেরও ফিতরাত রয়েছে। যেমন– মানুষ ক্ষুধা লাগলে খাবার খায়, ঘুম পেলে ঘুমায়, আবার জাগ্রত হয় ৷ একইভাবে মানুষের ফিতরাত হলো সে জানতে চায়, সে অন্বেষী হয়ে জানে ও শুনে। এটি মানুষের খুব সাধারণ একটি ফিতরাত। কিন্তু গত কয়েকশো বছরে সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাব্যবস্থার আগ্রাসন এবং মুসলমানদের ব্যর্থতার দরুণ আমরা জ্ঞানকে সেভাবে তুলে ধরতে পারছি না। ফলশ্রুতিতে মানুষ জানার সুযোগও পাচ্ছে না। এই আগ্রাসন জ্ঞানকে পুজিঁর স্বার্থে বা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করায় জ্ঞান তার সত্যিকারের রূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছে না।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">একইভাবে বর্তমান শিক্ষা কাঠামো আমাদেরকে কোম্পানির দাস বা তাদের সিস্টেমের গোলাম হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। সেই লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে দিয়ে কিছু তথ্য বা অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে জ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে, ফলে জ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়। আর এ কারণে ফিতরাত থাকা সত্ত্বেও মানুষ এ বৈশিষ্ট্যকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছে না।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে যে বিষয়টি আমাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে, তা হলো পৃথিবীর ইতিহাসে ইসলামী সভ্যতাই একমাত্র সভ্যতা যা জ্ঞানার্জনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এবং জ্ঞানার্জনের পরেই মানুষের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা তথা খাদ্য, বাসস্থান এবং অর্থনৈতিক মুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ সকল বিষয়ে এত গুরুত্বারোপ করার কারণে প্রতিটি যুগেই মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলো।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">ইসলামী সভ্যতাই জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করেছে। ফলে শুধু মুসলমানরাই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বা জাতিগোষ্ঠীও এর দ্বারা উপকৃত হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহ ইসলামী সভ্যতাকে জ্ঞানভিত্তিক একটি সভ্যতা হিসেবে মানুষের সামনে হাজির করতে পেরেছে।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<div dir="auto">আমরা যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিকালের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো যে, বর্তমানে দুইটি সভ্যতা বিদ্যমান।</div>
<div dir="auto">&#8211; পাশ্চাত্য সভ্যতা</div>
<div dir="auto">&#8211; ইসলামী সভ্যতা।</div>
</blockquote>
<div dir="auto">পাশ্চাত্য সভ্যতা তার শক্তি বলয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং পরিচালনাকারী শক্তি হিসেবে তারা তাদের চিন্তাধারাকে সকল স্তরে প্রয়োগ করছে। ফলশ্রুতিতে তাদের আইডিওলজি বর্তমানের ক্ষমতাসীন আইডিওলজি এবং এটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী আইডিওলজি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আর এ আইডিওলজি জ্ঞানকে ব্যবহার করে শোষণ ও ক্ষমতার জন্য, এ জ্ঞান দর্শনের ডায়লগই হলো knowledge is power, অর্থাৎ জ্ঞানের মধ্য দিয়ে তারা শক্তি অর্জন করবে ও মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে। অপরদিকে মুসলমানদের জ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো হাকীকত অন্বেষণ, আমানতের সংরক্ষণ এবং মানব সভ্যতার কল্যাণ। সুতরাং স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে, ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজস্ব জ্ঞান দর্শনকে নিজেদের স্বার্থ বা পুজিঁবাদী আগ্রাসন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে৷ ফলশ্রুতিতে মানুষ পাশ্চাত্যের শিক্ষা কাঠামো থেকে কথিত জ্ঞানার্জন করলেও তাদের তৈরিকৃত সিস্টেমের গোলাম হিসেবে বা কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে নিজেদের তৈরি করা ব্যতীত ভিন্ন কিছু অর্জন করতে পারে না। তাদের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যই যেন মুখলেস ও আন্তরিক দাস হয়ে, আধুনিক কোম্পানির কর্মচারী হয়ে সুন্দর ফ্ল্যাটে বসবাস করা। এর ফলাফল স্বরূপ মুসলমানরা ভুলেই গিয়েছে যে, জ্ঞান দিয়েই আসমানী কিতাব কোরআনের যাত্রা শুরু হয়েছে, আল্লাহর রাসূল (স) জ্ঞান দিয়েই মানবতার মুক্তি সংগ্রামের সূচনা করেছেন, আল্লাহ পাক আমাদের শিখিয়েছেন কোরআনের সবচেয়ে ওজনদার দোয়া “রাব্বি যিদনি ইলমা”। এ সবকিছুর মর্মার্থ আমরা মুসলমানরা ভুলে গিয়েছি। সব মানুষ তার স্বাভাবিক ফিতরাত হিসেবেই, জ্ঞান অর্জন করতে চাইছে তথা জানতে চাইছে, মুসলমানদের আবেগ সেই জ্ঞানের দিকেই বারবার ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু এ আবেগকে আমরা বাস্তবে রূপ দান করতে পারছি না। এটি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">একইসাথে যদি লক্ষ্য করি, মুসলিম উম্মাহর সদস্য প্রায় ২০০ কোটি, যা পৃথিবীর জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে, যে ৩০ শতাংশ সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন না করলে গোটা মানব সভ্যতা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, ৪০০ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকালেই যা বুঝা যায়। এজন্য সর্বপ্রথম আমাদের দায়িত্ব ছিলো মুসলমান হিসেবে, শাহীদ ইনসান হিসেবে ইসলামকে, সত্যিকারের জ্ঞান দর্শনকে বিশ্ববাসীর সামনে, মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরা। কারণ মুসলমানদের অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই হলো শাহীদ উম্মাহ হিসেবে মানুষের সামনে এই সত্যকে তুলে ধরবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto" style="text-align: center;"><em>প্রশ্ন আসে, “কেন আমরা পারছি না?” বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি যুবকদের অধিকাংশের মধ্যেই যে সংশয়টি বিরাজ করছে, তা হলো এ চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, জ্ঞানচর্চা কি আদৌ মানুষ গ্রহণ করবে? আদৌ কি মানুষের কাছে তা পৌঁছাবে? কী হবে এসব চর্চা আর প্রচেষ্টা দিয়ে?</em></div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এর মানে হলো আমরা ভুলেই গিয়েছি যে, এটি মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাত। ভুলে যাওয়ার কারণ কী? কারণ আমাদের কাছে জ্ঞানার্জনকে চাপিয়ে দেওয়া বস্তুবাদী গাধার বোঝার মতো মনে হয়, আর সার্টিফিকেট অর্জনকেই জ্ঞানের সফলতা, জীবনের স্বার্থকতা মনে হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মুসলিম উম্মাহর সদস্য হিসেবে আমাদের মনে রাখা আবশ্যক যে, এ সকল চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, জ্ঞান চর্চা সরাসরি মানুষের ফিতরাতের সাথে সম্পৃক্ত। আমরা যদি এটিকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মানুষ তা গ্রহণ করবেই। এছাড়া ভিন্ন কোনো পথ মানুষের সামনে খোলা নেই।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">দ্বিতীয়ত, জ্ঞান ও চিন্তার নিজস্ব ডানা রয়েছে। এ ডানা মূলত মানুষকে মুক্তির দিকে ধাবিত করে। বর্তমান মানবসভ্যতা একটুখানি মুক্তির জন্য হাহাকার করছে। সুতরাং আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে আমাদের চিন্তা-বিশ্বাসকে আমলী ও নাজারী দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে পারি, তাহলে অবশ্যই মানুষ তা গ্রহণ করবে। আর এটি তুলে ধরা মুসলমানদের দায়িত্ব। এ সময়ে শাহীদ ইনসান হিসেবে এ দায়িত্ব আমাদেরই। কারণ আজকের বাংলাদেশের দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাই, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অস্থিরতা, কর্তৃত্ববাদীতা, শোষণ, জুলুম, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংঘাত, মানবাধিকার লংঘন, নারীদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা, পাশ্চাত্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীলতা– এভাবে প্রতিটি মানবিক সমস্যার সারনির্যাস আমাদের সামনে বিদ্যমান। এ সকল সমস্যা থেকে মুক্তির অন্যতম ওসিলা হলো জ্ঞানতাত্ত্বিক সচেতনতা। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সচেতনতাই আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার দিকে ধাবিত করবে। আমরা যদি জ্ঞানকে সেই অর্থে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মানুষও তা গ্রহণ করবেই।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এরপর যে আলোচনাটি আমাদের সামনে আসে, তা হলো আমাকেই কেন করতে হবে? এর সবচেয়ে বড় জবাব হলো একজন মুসলমান হিসেবে এ যুগে খেলাফতের দায়িত্ব পালনের কাজ আমাকেও শুরু করতে হবে, মুক্তির আওয়াজ আমাকেও তুলতে হবে। কেননা প্রতিটি যুগেই কেউ না কেউ এই আওয়াজ তুলে ধরেন, আযান দিয়ে যান। কোনো না কোনো গ্ৰুপ এজন্য সংগ্ৰাম করে যায়। আমরাও যদি বর্তমান যুগের প্রেক্ষিতে ব্যক্তি হিসেবে কিংবা জনগোষ্ঠীর সন্তান হিসেবে নিজেদের সে অর্থে তুলে ধরতে পারি, তাহলে এটিই আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। এজন্য আল্লামা রাগেব ইস্পাহানি বলেছেন, “আমরা যদি দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী হতে চাই এবং পৃথিবী বিনির্মাণ করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে এ দায়িত্বটি পালন করতেই হবে। এবং মুসলমান হওয়ার কারণে আমরাই এ দায়িত্ব পালন করবো, পালন করে যাচ্ছি।” তাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেকে এ সংগ্ৰামের দিকে ধাবিত করা আমাদের আবশ্যকীয় কর্তব্য।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এরপর প্রশ্ন আসবে, এত বিশাল সংকট, দারিদ্র<span class="xxymvpz xgzva0m xat24cr xhhsvwb xdj266r x1fcty0u x1j61x8r x3nfvp2">‍</span>্য, বঞ্চনা, জুলুম-শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে উত্তরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়ে এক সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন করার জন্য আসলেই আমাদের অবস্থান থেকে কী কী করা প্রয়োজন? এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর জবাব হলো–</div>
<div dir="auto"><em>&#8211; ইসলামী সভ্যতার চৌদ্দশো বছরের ইতিহাসকে ধারণ করে, সে মুকতাসাব আকলকে সামনে রেখে এ সকল সংকটের চ্যালেঞ্জ গ্ৰহণ করতে হবে।</em></div>
<div dir="auto"><em>&#8211; শত্রুর সাজে সজ্জিত হতে হবে (অর্থাৎ শত্রুর সকল কর্মপরিকল্পনা বুঝে তার আক্রমণ মোকাবেলা করার ও বিজয়ী হওয়ার শক্তি অর্জন করতে হবে), তাদের বিপরীতে সবোর্চ্চ কার্যকরী শক্তি অর্জন করে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নতুন এক জাতিসত্ত্বার বিকাশ ঘটাতে হবে।</em></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><em>তাই চিন্তাগত দিক থেকে আমাদেরকে যে বিষয়টি সব সময় স্মরণ রাখতে হবে, তা হলো আমাদের আইডিওলজিক্যাল দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের মদদপুষ্ট বিভিন্ন চিন্তাধারা ইসলামের দুটি বিষয়ের উপর চরমভাবে আক্রমণ করেছে। বিষয়গুলো হলো–</em></div>
<div dir="auto"><em>&#8212; তরিকত বা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা</em></div>
<div dir="auto"><em>– ফিকহ</em></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এই দুটি বিষয়ে আক্রমণ করার ফলে আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক রূহকে যেমন হারিয়ে ফেলেছি, তেমনি আমাদের ব্যবস্থাগত সংকট মোকাবেলা করার অস্ত্রও হারিয়ে ফেলেছি।</div>
<div dir="auto">সেটি‌ কীভাবে?</div>
<div dir="auto"><strong>প্রথমত তরিকত বা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা-</strong></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">প্রথমত তরিকত বা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গে আসা যাক। আমরা যদি আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাই, যেমন– আলজেরিয়া, সেখানে ফ্রান্সের শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ কারা গড়ে তুলেছিলো? সূফীগণ, খানকাভিত্তিক আন্দোলনসমূহ। রাষ্ট্রব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে চলে যাওয়ার পরে সংগঠিত শক্তি হিসেবে এ আধ্যাত্মিক আন্দোলনগুলো, তরিকতপন্থী সূফী ও আলেমগণ মুক্তির সংগ্ৰামের নেতৃত্ব দিয়েছেন, এ সংগ্রামের বার্তা তুলে ধরেছেন।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এভাবে প্রতিটি অঞ্চলেই এর নজির দেখতে পাওয়া যায়। তাই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এ আধ্যাত্মিক খানকা, দরগাহগুলোর বিরুদ্ধে নিউ সালাফিজমের মাধ্যমে, ওহাবিজমের মাধ্যমে সর্বপ্রথম ফতোয়া দেয় এবং এটিকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করে। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে তারা খুব ভালোভাবেই এক্ষেত্রে সফলতা পেয়েছে। নানাবিধ প্রচারণার মাধ্যমে তরিকতের ব্যাপারগুলোকে সব সময়ই নেতিবাচক, হারাম, কুসংস্কার ও বিদআতের অর্থে যুবশ্রেণির সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। হ্যাঁ! বর্তমানে হাকীকতপন্থী তরিকত, দরগা, খানকার খুব অভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এ জাতীয় নেতিবাচক প্রোপাগান্ডার কারণে আমরা আধ্যাত্মিকতা, হাকীকতপন্থী তরিকত, খানকা ও দরগাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি রূহবিহীন কাঠখোট্টা ধর্ম চর্চার দিকে ধাবিত হয়েছি।‌</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় হলো ফিকহ-</strong></div>
<div dir="auto">ফিকহের উপর এত আক্রমণ কেন হলো? কারণ আমাদের সভ্যতার সবকিছু ফিকহ নির্ভর। আমাদের কাছে যদি জীবন্ত একটি ফিকহ থাকে, তবে ব্রিটিশরা, ফরাসিরা কিংবা সাম্রাজ্যবাদী কোনো শক্তিই তাদের জুলুম, শোষণ দীর্ঘস্থায়ী করতে পারবে না। ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি যদি সচল থাকে, তারা কখনোই পূঁজিবাদী আগ্রাসনকে মানবতার সামনে নিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের অর্থনীতির সাথে সমাজতত্ত্বকে যদি আমরা ভালোভাবে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে তাদের চাপিয়ে দেওয়া সোশিওলজি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য হতে পারবে না, রাজনীতির মাইলফলক হতে পারবে না, এটি অসম্ভব। তাই তারা ফিকহকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রসহ সকল ক্ষেত্রে ফিকহকে অপ্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। এক্ষেত্রেও সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে তাদেরই মদদপুষ্ট নিউ সালাফিজম। তারা বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি উম্মাহর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে পর্যন্ত তারা অস্বীকার করেছে। যেমন– ইলমুল কালাম তো ভ্রান্ত জ্ঞান! দর্শন বলতে ইসলামে কিছু নেই! হাদীস থাকতে ফিকহের কেন প্রয়োজন! এভাবেই তারা ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মিরাসগুলোকে অস্বীকার করে, নব্য বিতর্কের জন্ম দিয়ে মুসলমানদেরকে ভিন্ন ব্যস্ততার দিকে ধাবিত করছে। যার ফলে পাশ্চাত্যের কঠিন চ্যালেঞ্জ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ মোকাবেলার পরিবর্তে আমাদের অভ্যন্তরীণ ধর্ম ও জ্ঞান চর্চাকেই আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এ প্রেক্ষাপট কি শুধু পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে বিরাজমান? না, এ প্রেক্ষাপট আমাদের বাংলাদেশেও বিদ্যমান। অধিকাংশ তরুণ কিংবা বিভিন্ন জ্ঞানের ধারা, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্দোলনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো, তারা তাসাউফ, আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রগুলো জানে না, ফিকহকে ভালোভাবে উপলব্ধি করে এর সামগ্ৰীকতা নিয়ে চর্চা করে না, এমনকি বড় অংশ তাসাউফ ও ফিকহকে শত্রু মনে করে, অপ্রয়োজনীয় মনে করে। তারা ফিকহের কিছু খন্ডিত অংশ পাঠ করে ফিকহকে জটিল একটি দূর্বোধ্য জ্ঞানতত্ত্ব হিসেবে লাইব্রেরীতে তুলে রাখে। এসবের মাধ্যমে যে আমরা ভয়াবহ অপরাজনীতির শিকার হচ্ছি, তা আমরা আজও উপলব্ধি করতে পারছি না।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এ দুটি বিষয়ের সাথে আরেকটি তৃতীয় বিষয় ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যখন আধ্যাত্মিকতা এবং ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মিরাস ও সম্পদ ফিকহকে আমরা দূরে ঠেলে দিচ্ছি, তখন খুব সহজেই ওরিয়েন্টালিস্টদের মদদপুষ্ট ইতিহাসবিদরা আমাদেরকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে। অন্যসব অঞ্চলের মতো বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরাও ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে। আমাদের লেখকগণ, পাশ্চাত্যপন্থী শিক্ষাবিদগণ রাষ্ট্রব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জাতিকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে উপস্থাপন করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আমাদের বারোশো বছরের সোনালী সভ্যতাকে, বাংলা অঞ্চলের পাঁচশো বছরের সালতানাতকে সাধারণ একটি ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা রাষ্ট্রীয় কিছু দ্বন্দ্ব নির্ভর একটি গতানুগতিক সাধারণ ইতিহাসে রূপান্তরিত করেছে, বয়ান সৃষ্টি করেছে। এগুলোর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে আত্মবিশ্বাসী করতে তো পারছিই না, বরং হীনম্মন্যতায় ডুবে যাচ্ছি। অথচ এ সভ্যতা আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এ প্রতীক যদি সামনে না রাখি, সেভাবে যদি ইতিহাসের মেলবন্ধন তৈরি করতে না পারি, তাহলে কখনোই বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">উপরোক্ত পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মূলত যে বিষয়টি আমরা আলোচনা করতে চাই, তা হলো- এ সকল সংকট আমাদের সবচেয়ে ভয়াবহ একটি সংকটের দিকে ধাবিত করেছে। এ সংকট হলো আমাদের সভ্যতার অন্তর্দ্বন্দ্ব। সভ্যতার অন্তর্দ্বন্দ্ব এ মুহূর্তে আমাদের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">• বিশ্বব্যাপী যে ইসলামী আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিলো, বর্তমানে সেগুলো এক ভয়াবহ পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। তাদের দেখানো ভিশনকে যুব সমাজের কাছে আস্থাহীন করে রাখা হয়েছে। নানাবিধ মতভেদ, ভাঙ্গন, ইসলামপন্থীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইসলামী ধারাসমূহের একে অপরকে ঘায়েল করে দেওয়ার মানসিকতা ইত্যাদি যুব সমাজের সামনে ইসলামের ভিশনকে আস্থাহীন করে তুলেছে।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ফলশ্রুতিতে, এ প্রতিটি ধারাই আজ মৃত দেহের মতো পড়ে আছে। দেহের সবই আছে কিন্তু রূহ নেই। এ ভয়াবহ পরিস্থিতে আমরা ভালোভাবেই উপলব্ধি পারছি যে, মুসলমানদেরকে যদি এ রূপ বিভাজন থেকে বের করে নিয়ে এসে জ্ঞানগত বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করা না যায়, তাহলে কখনোই মুক্তি সম্ভব নয়। ঠিক একইভাবে এ সভ্যতার অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে আসতে পারে দুটি মাত্র উপায় রয়েছে।</div>
<div dir="auto">&#8211; আমাদের বিশ্বাস</div>
<div dir="auto">&#8211; আমাদের জ্ঞানগত সম্পদসমূহ</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আমাদের বিশ্বাস তথা ঈমানী ঐক্য সকলের মধ্যে রয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। তাই জ্ঞানগত বিষয়সমূহ নিয়ে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, অন্য কোনো বিষয় দ্বারা ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। এটি ছাড়া আমরা সর্বোচ্চ একে অন্যকে শত্রু বানিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে পারবো, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি কোনো বন্ধন সৃষ্টি করতে পারবো না। আর দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধন সৃষ্টি করতে হলে হাকীকত অন্বেষী জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই তা দাঁড় করাতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, এ জ্ঞান কোন জ্ঞান? এ জ্ঞান হলো ইসলামের জ্ঞানের শাখাসমূহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উসূল এবং মাকাসিদ। প্রশ্ন আসতে পারে উসূল কেন প্রয়োজন? এর জবাব হলো উসূলের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহীর আলোকে আল্লাহ ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সাথে পৃথিবী ও প্রকৃতির সম্পর্ক ইত্যাদিসহ সমাজের সকল সমস্যা, কর্মসূচি এবং প্রত্যেকটি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি ও ব্যাখ্যা। সে আলোকে যদি আমরা মূল মিহওয়ারে ফিরে আসতে পারি, তাহলে অবশ্যই এ জ্ঞান আমাদেরকে ঐক্যের দিকে, মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ফিকহকে নতুন করে বিনির্মাণ। কেননা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এ কাঠামো মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে এ বিশ্বব্যবস্থা অন্টোলজিক্যালি, এপিস্টোমোলজিক্যালি ইসলামের সাথে ফাংশনাল নয়। তাই আমরা যদি ফিকহকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করতে পারি, ফিকহকে উসূল এবং মাকাসিদের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে ইসলামী সভ্যতা ইতিহাসের নানা সংকটের মধ্যেও যেভাবে পুনর্জাগরিত হয়েছিলো, একইভাবে বর্তমান সময়েও আমাদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে আমরা রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে আবার নতুন প্রস্তাবনা হাজির করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এরপর গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো আমরা, বর্তমান সময়ের মুসলমানরা নানাবিধ অভিযোগ ও বিতর্কের উপর ভিত্তি করে ইসলামকে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, اعتراض বা অভিযোগের উপর ভিত্তি করে কখনো নিজেদের অস্তিত্ব দাঁড় করানো যায় না। নিজেদের অস্তিত্ব যদি দাঁড় করাতে চাই, তাহলে অবশ্যই তাকলিফ তথা প্রস্তাবনা নিয়ে আসতে হবে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">কিন্তু আমরা কীভাবে ইসলাম চর্চা করছি? পাশ্চাত্যের নারীবাদ যখন আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন আমরা আমাদের ইসলামের নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলছি। পুঁজিবাদী সভ্যতা যখন নানাভাবে আমাদের শোষণ করছে, তখন ইসলামী অর্থব্যবস্থার কিছুদিক নিয়ে আমরা ডিফেন্স করছি। অথচ আমাদের ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির স্বতন্ত্র প্রস্তাবনা রয়েছে, নারীদের ব্যাপারে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা রয়েছে, রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিজীবন সর্বস্তরে আদালতের প্রস্তাবনা রয়েছে, সমাজ সংস্কৃতির ব্যাপারে ইসলামের প্রস্তাবনাও সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু সেগুলোকে আমরা বর্তমান সময়ের আলোকে তুলে ধরতে পারছি না। অথচ এ সকল প্রস্তাবনা ব্যতিত কখনোই মুক্তি আনয়ন সম্ভব নয়, যার নজির রয়েছে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সেই বাদশা নাজ্জাশির সামনে জাফর বিন আবু তালিবের প্রস্তাবনা, পারস্য সম্রাটের সামনে মুসলিম সেনাপতির প্রস্তাবনা, এভাবে প্রতিটি প্রস্তাবনার শিক্ষাকে হাজির করার মধ্য দিয়ে জাতির রূহকে উপলব্ধি করে এবং কারো বিরোধিতা কিংবা বিতর্কের জন্য নয়, বরং হক্ব বা হাকীকত হিসেবে জ্ঞানকে তুলে ধরার জন্য আমরা তাকলিফ করবো। তখন অবশ্যই সে জ্ঞান মানুষের গ্ৰহণ উপযোগী হিসেবেই জাতির সামনে উপস্থাপিত হবে‌। মানুষ তখন তার ফিতরাতের আলোকেই এ বিষয়গুলোকে গ্ৰহণ করতে থাকবে। এটিই প্রাকৃতিক ব্যাপার।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তাই আমাদের অন্যতম ইশতেহার হলো- দ্বীনে মুবিন ইসলামের মৌলিক চিন্তাসমূহকে কীভাবে যুবসমাজের চিন্তায় রূপ দেওয়া যায়, কীভাবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাকাঠামো, শিক্ষাপদ্ধতি ও বিভিন্ন ধারার শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামী চিন্তা-দর্শনকে, ১৪০০ বছরের মূল চিন্তাধারাকে জাতির মূল চিন্তায় পরিণত করা যায়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আর এ ইশতেহারকে বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে যে বিষয়গুলো সামনে রাখতে হবে–</div>
<div dir="auto">১. ব্যক্তির অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জন ও ত্যাগের অন্যতম উপমা হিসেবে জাতির সামনে, পরবর্তী প্রজন্মের সামনে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হলেন প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও আখলাকবিদ নুরুদ্দিন তুপচে, যিনি ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আখলাকের উপর পিএইচডি করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার প্রস্তাবনা ফিরিয়ে দিয়ে নিজ দেশে গিয়ে সাধারণ কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। অতঃপর তিনি চিন্তাকে প্রসারিত করাসহ জাতি গঠনের জন্য প্রতি মূহুর্তে কাজ করেছেন, আমৃত্যু এর উপর নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন। ফলশ্রুতিতে জাতির বিকাশে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাকে আখ্যা করা হয়। আমরাও যদি এভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম সেভাবেই গড়ে উঠবে। আর কাজ করলে আল্লাহ বরকত দেন, বরকত দিবেন, ইনশাআল্লাহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">২. জ্ঞান ও আখলাকের আন্দোলনকে খুব ভালোভাবে ধরণ করা এবং সে আলোকেই সকলের সামনে উপস্থাপন করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইমাম আবু হানিফার জ্ঞানের আন্দোলন। সেটি অনেক বড় পরিসরে হয়েছিলো, যা বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে গত কয়েকশো বছরে ভারতীয় উপমহাদেশে বড় বড় অনেক শিক্ষা আন্দোলন এখানেও গড়ে উঠেছে। যেমন– দেওবন্দি আন্দোলন (দেওবন্দি শিক্ষা কাঠামোর মডেল)। একইভাবে আলিগড় শিক্ষা আন্দোলন (যা তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম মডেল ছিলো)। এ শিক্ষা আন্দোলনগুলো শুধুমাত্র শিক্ষা আন্দোলনের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো, কিন্তু এ আন্দোলনগুলো থেকে বের হয়েছেন বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আলেম কিংবা বড় বড় আন্দোলনের কর্ণধার। বর্তমানেও জাতির সামনে তারা তারকার ন্যায় অমলিন হয়ে আছেন। এ ধরনের বহু শিক্ষা মডেল আমাদের সামনে রয়েছে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">আবার একইভাবে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে বড় বড় মক্তব গড়ে উঠেছে, যেমন– ইমাম গাজ্জালী, ইমাম রাযী নিজেই একটি মক্তব। এ সকল ব্যক্তি নিজেরাই একেকটি ধারায় পরিণত হয়েছেন, শিক্ষা আন্দোলনে পরিণত হয়েছেন। যেহেতু একজন ব্যক্তি একটি ধারায় পরিণত হয়েছেন, তাহলে আমরা কেন সম্মিলিতভাবে একটি শিক্ষা আন্দোলন দাঁড় করাতে পারবো না? চেষ্টা করলে আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকেও দিবেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৩. তালকিহুল ফুহুল, অর্থাৎ জ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্রিক যে আন্দোলন আমরা দাড়ঁ করাবো, তার অন্যতম দাবী হলো নিজেরা যোগ্য চিন্তাবিদ হয়ে চিন্তা তৈরি করতে হবে, অর্থাৎ চিন্তা সৃষ্টি করা এবং চিন্তাগুলোকে জাতির মনে গেঁথে দেওয়া, মানুষকে প্রভাবিত করা, সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করা। আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠিত করতে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে ও স্থায়ীত্ব দান করতে এটি অন্যতম দাবি।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৪. দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে ইস্তেকামাতের উপর টিকে থাকা। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের দিবেন এ বিশ্বাস নিয়ে টিকে থাকলে বরকত আসবেই। কখনোই তাড়াহুড়ো করা যাবে না।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৫. আন্দোলনকে জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করা, আর জ্ঞান ও আখলাককে আন্দোলনের কেন্দ্রে স্থাপন করা। এ জ্ঞান হতে হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ বা আটকে থাকা যাবে না, সামগ্রিক ও বৈপরীত্য মুক্ত হতে হবে। হবেও, ইনশাআল্লাহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৬. চ্যালেঞ্জ গ্ৰহন করা। উপমহাদেশে গত কয়েকশো বছরে বহু আন্দোলন, শিক্ষা কাঠামো, ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং এগুলোর অধিকাংশই ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাস যদি বার বার আমরা সামনে রাখি, তাহলে হতাশ হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমি ব্যর্থ হবো কি সফল হবো তা এ মুহূর্তের আলোচ্য বিষয় নয়। আমি মুক্তির জন্য পথ চলছি, টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে সংগ্ৰাম করে যাচ্ছি, এটিই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অর্থবহ।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">অনেক প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে অন্যের সহযোগিতা নিয়ে কিংবা পাশ্চাত্যের আদলে, এর কোনোটিই আমরা গ্ৰহন করছি না। আমরা নিজেরাই দাঁড়াবো। এক্ষেত্রে শত্রুর সাজে সজ্জিত হয়ে, জামানার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে যোগ্য সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব হয়ে তাদেরকে মোকাবেলা করে মুক্তির ইশতেহারের কাব্যগাঁথা রচনা করবো– এটিই আমাদের ডায়ালগ হওয়া উচিত।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৭. নানাবিধ ব্যর্থতা, নানাবিধ সামাজিক দৈন্যতা আমাদের সামনে রয়েছে। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা যে, বাংলা অঞ্চলে পূর্বের কাজসমূহে চিন্তাগত যে অপরিপক্কতা ছিলো, যে মানবীয় দূর্বলতা ছিলো, সেগুলোকে পূর্ববর্তীদের দোষ হিসেবে না দেখে সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, সে আলোকে সামনে অগ্ৰসর হওয়াই আমাদের প্রধান কর্তব্য।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">আমরা বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিগত কারণে, নানাবিধ বিষয়ের বদৌলতে বহু নেয়ামত পেয়েছি, এর মধ্যে প্রধান হলো আমরা সময়ের সবচেয়ে উন্নত চিন্তা, চৌদ্দশো বছরের মুকতাসাব জ্ঞানসহ শিক্ষক ও উম্মাহর ভাইদের পাশে পেয়েছি। এ নেয়ামত আল্লাহ সবাইকে দেন না। যেহেতু আল্লাহ আমাদের এ নেয়ামত দিয়েছেন, অতএব আল্লাহ অবশ্যই সহযোগিতা করবেন। আল্লামা ইকবাল, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভিরা যেভাবে ব্যক্তি হিসেবে সারা দুনিয়াকে আন্দোলিত করেছেন, আমরা তাদের সন্তান হিসেবে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ক্ষুদ্র আন্দোলন হিসেবে কেন নূন্যতম অবদান রাখতে পারবো না? আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকেও দিবেন। এক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া নজরনা হলো উমরের (রা.) এর রাষ্ট্র পরিচালনা। তার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বেশি দিনের ছিলো না, কিন্তু দ্বীনের রূহ, মূলনীতি, আখলাক ও রবের রহমতের বদৌলতে সেই উমর (রা.) মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে বিশাল পারস্য অঞ্চল পরিচালনা করছেন, মানবসভ্যতার সামনে এ সভ্যতাকে সবচেয়ে সফল একটি সভ্যতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৮. আমরা কাজ করে যাবো। তবে সবাই সামগ্ৰীকভাবে উঠে আসবে এ রকম উচ্চাশাও করা যাবে না। আমাদের চেষ্টা, আমাদের সংগ্ৰাম, আমাদের ইখলাস ও দোয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহ কাউকে না কাউকে উঠিয়ে আনবেন। এটিই স্বাভাবিক। যদি আমরা পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রেও দেখি, তারা ছয়শো বছর যাবৎ ইউরোপের দর্শন চর্চা করছে, এত কাজ করছে, তাদের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আলাদা ডিপার্টমেন্ট রয়েছে, হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক গড়ে তোলার জন্য তারা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গত কয়েকশো বছরে তাদের কতজন দার্শনিক উঠে এসেছে? হাতে গোনা বিশ-ত্রিশ জন দার্শনিক আমরা দেখতে পাই।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সুতরাং এত কাজের মধ্যে দিয়ে যদি তাদের মাত্র বিশ-ত্রিশ জন দার্শনিক উঠে আসে, তাহলে আমরা অল্প কাজ করে বেশি ফলাফল আশা করাটা আমাদের নিজেদের প্রতিই অবিচার করা হবে। এজন্য আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো, কখনো হাল ছেড়ে দিবো না। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের মধ্য থেকে বড় বড় ব্যক্তিত্ব, রাসেখ আলেমদের উঠিয়ে আনবেন। তারাই মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতকে কাজে লাগিয়ে মুক্তির ইশতেহার রচনা করে নতুন এক সভ্যতার সূর্যোদয় ঘটাবেন, ইনশাআল্লাহ।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/shiksha-andoloner-vitti-nirmane-shahid-insan-hisebe-amader-koronio/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7525</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জ্ঞানের আখলাক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/akhlakh-of-knowledge/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/akhlakh-of-knowledge/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 28 Oct 2022 13:34:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7505</guid>

					<description><![CDATA[মানব সভ্যতায় জ্ঞানের গুরুত্ব যে কত বেশী এটা সর্বজনবিদিত। ইসলাম জ্ঞানের প্রতি কত বেশী গুরুত্ত্বারোপ করেছে এবং মুসলিম ব্যক্তি ও সমাজের জ্ঞান ও হিকমতের মাধ্যমে সজ্জিত হওয়া কত বেশী প্রয়োজন এই বিষয়টিও সকলের নিকট স্পষ্ট। আমরা এমন একটি সভ্যতার সদস্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="xdj266r x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs x126k92a">
<div dir="auto"><strong>মানব সভ্যতায় জ্ঞানের গুরুত্ব যে কত বেশী এটা সর্বজনবিদিত। ইসলাম জ্ঞানের প্রতি কত বেশী গুরুত্ত্বারোপ করেছে এবং মুসলিম ব্যক্তি ও সমাজের জ্ঞান ও হিকমতের মাধ্যমে সজ্জিত হওয়া কত বেশী প্রয়োজন এই বিষয়টিও সকলের নিকট স্পষ্ট। আমরা এমন একটি সভ্যতার সদস্য যে সভ্যতায় জ্ঞান হিকমতের সাথে মিলিত হয়েছে, ইরফানের মাধ্যমে সজ্জিত হয়েছে এবং আলেমগণ হয়েছেন আখলাকের মাধ্যমে অলঙ্কৃত। অনুরূপভাবে আমরা এমন এক ধারার সন্তান যে ধারায় জ্ঞান, শুধুমাত্র জ্ঞানই নয় একই সাথে জ্ঞানের মধ্যে আখলাক ও দায়িত্ত্বকে অনুসন্ধান করা হয়ে থাকে এবং জ্ঞানকে আখলাক ও হিকমতের সমানুপাতিক হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।</strong></div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির কারণে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্যে, এই তথ্য আবার শুধুমাত্র বিনোদনের সেক্টরে রূপান্তরিত হয়েছে এবং যত দিন যাচ্ছে তথ্যভিত্তিক এক মূর্খতা ও দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান দুনিয়ার অবস্থা যখন এই তখন জ্ঞানের চেয়ে ‘জ্ঞানের আখলাক’ এবং জ্ঞান ও মানুষের মধ্যকার যে সম্পর্ক সেই সম্পর্কের আখলাকী মাত্রাকেও নিয়ে চিন্তা করা আমাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে। অনেক বেশী জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই ব্যক্তি অনেক বেশী আখলাক ও মর্যাদা সম্পন্ন। খুবই আশ্চর্যজনক যে, যে যুগে এত এত আবিষ্কার মানুষকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে সেই যুগেও মানুষ দেখতে পাচ্ছে যে আকলকে কত খারাপভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে! মানব সভ্যতার জন্য শান্তি আনয়ন করার পরিবর্তে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসকে নিয়ে আসা হয়েছে। বিগত শতাব্দী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যে উন্নতি ও অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো যেন শান্তি নয় বরং যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের সেবা করেছে। মানুষে ভোগ করার লোভ, স্বার্থপরতা এবং লোভ-লালসা সীমাহীন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আখলাক থেকে দূরে থেকে উৎপাদিত জ্ঞান, নৈতিকতা শূন্য একটি বিজ্ঞান মানুষকে কততুকুই বা শান্তি ও আশার ওয়াদা দিতে পারে?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<div dir="auto"><em>এগুলো শুধুমাত্র পাশ্চাত্যের/সেক্যুলার জ্ঞানের জন্যই নয়, একই সাথে যে জ্ঞানের উদ্দেশ্যই হল আখলাক সেই দ্বীনী জ্ঞানের ক্ষেত্রেও বহুলাংশে প্রযোজ্য। সাম্প্রতিক সময়ে দ্বীনী জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে উন্নতি-অগ্রগতি সাধিত হয়েছে অতীতের তুলনায় তা অনেক বেশী। দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, প্রকাশনা ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক বিকাশ সাধিত হলেও জ্ঞানের ক্ষেত্রে এই উন্নতি ও অগ্রগতি ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে কি পরিমানে আখলাক ও দায়িত্ত্ববোধে রূপান্তরিত হয়েছে সেটা নিয়ে বিতর্কের দাবী রাখে। <a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></em></div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>‎ </strong><strong>আখলাকের ক্ষেত্র হিসেবে জ্ঞানের আখলাক</strong></div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আধুনিক যুগে আখলাকের দর্শনসহ (Philosophy of Ethics) বৈজ্ঞানিক অর্থেও আখলাক সম্পর্কিত গবেষণা ও কাজ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ একটি সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। সমগ্র মানবতাকে সম্পৃক্তকারী আখলাকের বিশ্বজনীন মূলনীতি সমূহ নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি প্রতিটি পেশার জন্যও নির্দিষ্ট আখলাকের আলাদা আলাদা ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা করা হচ্ছে। আখলাকের সাথে ডাক্তার, বিচারক, কিংবা প্রশাসকদের কি সম্পর্ক এটা নিয়ে গবেষণা করার করার সময় ‘ জ্ঞানের আখলাক’ নিয়েও বিশেষভাবে গবেষণা করা হচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র ‘ জ্ঞানের আখলাক’ নিয়েই আলোচনা করা হচ্ছে না। মুসলমানগণ- জ্ঞান, আখলাক ও দায়িত্ত্বকে একটি ধারণা হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার কারণে আমরা ‘ জ্ঞানের আখলাক’ নামক পরিভাষাটি ব্যবহার করে থাকি। কেননা উপাধি, পেশা ও কাজের ক্ষেত্র যাই হোকা না কেন আমাদের দৃষ্টিতে একজন জ্ঞানী মানুষ হলেন দায়িত্ত্ববান মানুষ এবং তাঁর এই জ্ঞানের মাধ্যমে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই আখলাকী হওয়া অতীব জরুরী।</div>
</div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও আখলাক</strong></div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করাটা শুধুমাত্র এই যুগের জন্যই নির্দিষ্ট কোন বিষয় নয়। তবে আধুনিক সময়ে এসে জ্ঞান আইডিওলজিক্যাল একটি চেহরা অর্জন করার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। আর এই অবস্থার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে স্বয়ং প্রতিষ্ঠানকে ও তার দেওয়া পদমর্যাদা সমূহের ও ডিপ্লোম্যাসির। এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহ সরাসরিভাবে শক্তি ও ক্ষমতার সাথে যে সম্পর্ক স্থাপন করে সেই সম্পর্ক সত্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে জ্ঞানের সামনে বড় একটি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কোন একজন ব্যক্তির একটি একাডেমির ছায়াতলে কাজ করা এবং সেই একাডেমি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কিছু পদবীকে বহন করলেই যে সে একজন আলেম এই কথা বুঝায় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই ধরণের পদবীর অধিকারীরা, শক্তি ও ক্ষমতার দ্বারা জ্ঞানী হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে এবং তাঁদেরকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। কেননা যদি আমরা জনগণের উপর প্রভাবের দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে সাধারণ একটি চিন্তা যদি পদপদবীহীন সাধারণ একজন মানুষ বলে থাকে তাহলে সেটার প্রভাব এবং সেই একই কথা বা চিন্তা যদি পদ-পদবীধারী কেউ বলে থাকে তাহলে সেটার প্রভাবের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ফলশ্রুতিতে ‘জ্ঞানের আখলাক’ নিয়ে চিন্তা করার সময়, জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক ধারা আখলাককে কতটুকু প্রভাবিত করেছে সেই বিষয়টি নিয়েও চিন্তা ভাবনা করতে হবে।</div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>সমালোচনামূলক জ্ঞান ও আখলাক</strong></div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">সমগ্র ইতিহাসকাল ধরে প্রায়োগিক দিক থেকে জ্ঞান সাধারণত দুইটি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে-</div>
<div dir="auto"><span style="font-size: 16px;">ㅤ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ </span></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><em><strong>প্রথমটি হল,</strong> মওজুদ অবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অবদান রাখা। </em></div>
<div dir="auto"><em><strong>দ্বিতীয়টি হল,</strong> যা আছে সেটাকে যথেষ্ট হিসেবে না দেখে সেটাকে আরও বেশী ভালো ও সঠিকতার দিকে ধাবিত করা।</em></div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">জ্ঞানের আখলাক অনুসারে প্রথমটি সঠিক নয়। কেননা যা মওজুদ আছে সেটা তাঁর অস্তিত্ব যেন বিলীন না হয়ে যায় এই উদ্বেগের কারণে তার মধ্যকার সকল ভুল-ভ্রান্তিকে ধরে রাখে, এবং সেই সকল ভুলের কারণে সৃষ্ট হওয়া জুলুম ও অবিচারকে জারি রাখে। হাকিকত ও সত্য উদ্ভাসিত হোক প্রতিষ্ঠিত শক্তি ও ব্যবস্থা সব সময় এটা নাও চাইতে পারে। কেননা হাকিকত ও সত্য উদ্ভাসিত ও প্রকাশিত হলে তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। অবস্থা যখন এরূপ হয় জ্ঞান তখন তার সমালোচনার যোগ্যতাকে হারিয়ে ফেলে এবং যে জ্ঞানকে সমালোচনা করা যায় না সেই জ্ঞান আখলাক থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। অথচ যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রয়োজন সেটা হল জ্ঞানকে তার মওজুদ সীমারেখার মধ্যে বন্দী করে না রেখে তাকে আরও বেশী বিকশিত করা ও তার সীমানাকে বৃদ্ধি করা। মানুষ এবং সমাজ জীবনকে আরও ভালো ও কল্যাণের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় বাহন হল জ্ঞান। আর জ্ঞান তার এই দায়িত্ত্বকে তখনই পালন করতে সক্ষম হবে যখন সেটা সঠিক সমালোচনার ফিল্টার সমূহকে অতিক্রম করবে। তবে সেই সমালোচনা অবশ্যই গঠনমূলক হতে হবে। কেননা একজন আলেম (জ্ঞানী ব্যক্তি) যদি সমালোচনার ক্ষেত্রে আদালতের মূলনীতিকে উপেক্ষা করে তাহলে তার প্রতি যেমন আস্থা উঠে যায় একই সাথে সে জ্ঞানের আখলাককেও আহত করে।</div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>জ্ঞানের আখলাক ও নিরপেক্ষতা</strong></div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আধুনিক সময়ে জ্ঞানের আখলাকের কথা আসলে যে বিষয়টি সবচেয়ে সামনে চলে আসে সেটি হল ‘নিরপেক্ষতার নীতি’। প্রথম দর্শনে এই মূলনীতিটি আখলাকের গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতির মত দেখা যেতে পারে। তবে এই ‘নিরপেক্ষতার নীতি’ দ্বারা আসলে কি বুঝানো হচ্ছে সেই বিষয়টিও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কার মতে কেমন একটি নিরপেক্ষতা? প্রথমত, একজন আলেম/জ্ঞানী ব্যক্তি কি কখনো সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে? একজন জ্ঞানী মানুষের কতটুকু নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব বা তাঁর নিরপেক্ষ হওয়াটা কতটুকু আখলাকী? হাকিকতের সন্ধানি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি কি হাকিকতের পক্ষাবলম্বনকারী নয়? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে একজন জ্ঞানী ব্যক্তির নিরপেক্ষ হওয়াটা জ্ঞানের আখলাকের মূলনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করা অতীব জরুরী।<span style="font-size: 16px;">ㅤ</span></div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>আমাদের সভ্যতায় জ্ঞানের আখলাক ও আদব</strong></div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">জ্ঞান ও আখলাকের সম্পর্কের দৃষ্টিকোন থেকে কেন্দ্রবিন্দু হল, জ্ঞানকে বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্যের সাথে সাযুজ্য রেখে তাঁর ব্যবহার। এই বিষয়টিকে ভালোভাবে বুঝার জন্য এই হাদীসটি আমাদেরকে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে। রাসূলে আকরাম (সঃ) বলেছেন, <strong>“ আলেমদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য, অথবা নির্বোধদের সাথে ঝগড়া করার জন্য অথবা সাধারণ মানুষের মনোযোগ তোমাদের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য জ্ঞানার্জন করো না। যে তা করবে সে জাহান্নামী”।</strong></div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আমাদের হাদীস গ্রন্থ সমূহের ‘ কিতাবু’ল-ইলম’ নামক অধ্যায় সমূহে যে বিষয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ত্বারোপ করা হয়েছে সেটি হল জ্ঞান ও আমলের মধ্যকার সামগ্রিকতা। জ্ঞান স্বয়ং নিজেই ফায়দার দিকে ইশারাকারী একটি অর্থবহতাকে ধারণ করে থাকে। তবে আমল হিসেবে বাস্তব জীবনে যদি সেটা প্রতিফলিত না হয় তাহলে সেই জ্ঞানকে আমাদের দ্বীনে ফায়দাহীন জ্ঞান হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং এই বিষয়টি হয়রত পয়গাম্বরের (সঃ) দোয়ার মধ্যে এই ভাবে স্থান পেয়েছেঃ “ হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট পানাহ চাই উপকারহীন জ্ঞান থেকে, সম্মান প্রদর্শন করে না এমন কালব থেকে, পূর্ণ হয় না এমন নফস থেকে, অশ্রুপাত করে না এমন চোখ থেকে এবং বিবেচনায় নেওয়া হয় না এমন দোয়া থেকে”।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<div dir="auto" style="text-align: left;"><em><strong style="font-size: 16px;">একজন আলেমের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হল তাঁর নিয়ত এবং সর্বজ্ঞাত মহান প্রভুর সামনে তাঁর অবস্থা কেমন? এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর সব সময় চিন্তা করা প্রয়োজন। জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত হক্বকে ভালোভাবে বুঝে রবের নিকট নিকটবর্তী হওয়া। আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর ভাষায় “ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য কোন জ্ঞানকে যদি কেহ শুধুমাত্র দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য অর্জন করে কিয়ামতের দিন তাহলে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না”।</strong></em></div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অপরদিকে আমাদের বিভিন্ন গ্রন্থ সমূহে ‘জ্ঞানের আদব’ শিরোনামে উল্লেখিত রেওয়ায়েত সমূহ বিনম্রতা, সাহসিকতা ও ভদ্রতার মত গুনাবলীকে জ্ঞানের সাথে একত্রিত করার প্রয়োজনের দিকে ইঙ্গিত করেছে। রাসূলে করীম (সঃ) আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে একজন শিক্ষার্থীকে বিনম্র, ভদ্র ও হিম্মত সম্পন্ন হতে হবে।</div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">“ হে আল্লাহ তুমি আমার জ্ঞানকে বৃদ্ধি করে দাও, আমার দৃঢ়তা সাহসিকতাকে বৃদ্ধি করে দাও”।</div>
<div dir="auto">আল্লাহর রাসূল (সঃ) এইভাবে দোয়া করেছেন।</div>
<div dir="auto">ㅤㅤㅤㅤㅤㅤㅤ</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তাকওয়ার সাথে জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা দরকার। এই বিষয়টিও অতীব জরুরী একটি বিষয়। ইলমের সাথে হিলম &#8211; এর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অনেক গ্রন্থেই আলোচনা করা হয়েছে। ইমাম গাজালী, বিনম্রতা, খুশু-খুজু, তাকওয়া, যুহুদ এবং হিলমকে একজন আলেমের গুনাবলী বলে উল্লেখ করেছেন। মূর্খতা ও বোকামীর বিপরীত হল; &#8216;হিলম&#8217;। আমাদের ভাষায় হিলকে নম্রতা ও সহিষ্ণুতা বলে অনুবাদ করা হয়ে থাকে এটা সঠিক নয়। <strong><em>একজন ব্যক্তি যদি জ্ঞান ও হিকমতের দ্বারা সজ্জিত হয়, তাঁর সেই জ্ঞান ও হিকমতকে যদি একটি দায়িত্ত্ব ও আখলাক হিসেবে তার জীবনে বাস্তবায়িত করতে পারে তাহলে সেই ব্যক্তির প্রতিটি আখলাকী আচরণের নামই হিলম হিসেবে অভিহিত হবে।</em></strong> যদি সে এরূপ করতে পারে তাহলে সে ইলম ও হিলমকে একত্রিতকারী বলে গণ্য হবে। বলা হয়েছে :</div>
<div dir="auto">‎ ‎ ‎ ‎ ‎</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">“ হিলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোন কিছুই নেই যা ইলমকে এত বেশী শোভামন্ডিত করতে পারে” হিলমের অধিকারী একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যখন কথা বলে জ্ঞানের মাধ্যমে কথা বলে আর যখন চুপ থাকে তখন হিলমের মাধ্যমে চুপ থাকে।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অবশেষে আমরা এই কথা বলতে পারি যে, জ্ঞান এমন একটি বিষয় বহন করে যা, জ্ঞানের অধিকারীর প্রতি, সমাজের প্রতি , প্রকৃতির প্রতি এবং আল্লাহর প্রতি একটি দায়িত্ত্ব বোধ জাগ্রত করে দেয়। আজ জ্ঞানের ব্যাপারে দায়িত্ত্বহীনতা এবং জ্ঞানের অপব্যবহার সমগ্র দুনিয়া যে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক বিপর্যয় ডেকে নিয়ে এসেছে তা আমাদেরকে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে সোচ্চার হওয়ার দিকে আহবান জানাচ্ছে। আজ আমাদেরকে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে অনেক বেশী চিন্তা করা প্রয়োজন। মানুষের কল্যাণ ও উপকারের জন্য উৎপাদিত জ্ঞান যখন আখলাকের সাথে তাঁর সম্পর্ককে ছিন্ন করে ফেলে তখন দুনিয়াতে কি ভয়াবহতা সৃষ্টি হতে পারে আমরা সকলেই আজ সেটার স্বাক্ষী। আজ এই সঙ্কট নিয়ে চিন্তা করা দরকার। জ্ঞান ও আখলাকের মধ্যকার এই সম্পর্ককে আমাদের পুনঃস্থাপন করতে হবে এবং জ্ঞান, দায়িত্ত্ববোধ ও আখলাককে একত্রে বাঁচিয়ে রাখার যে মহান দায়িত্ত্ব সেটা ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের উপর অর্পিত হয়েছে।</div>
</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/akhlakh-of-knowledge/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7505</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শহরের রূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/spirit-of-city/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/spirit-of-city/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 12 Jun 2022 19:15:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[শহর ও স্থাপত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7176</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতার অনন্য সামগ্রিকতা, বিশালতা ও অনন্যতার প্রকাশক তার বাহ্যিকতা নয়, বরং তার রূহ। তাই কোনো কিছুর বাহ্যিক কাঠামোর চেয়েও তার রূহ কতটা ইসলামী, সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু ইসলামী সভ্যতার অংশ কিনা বা ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী সভ্যতার অনন্য সামগ্রিকতা, বিশালতা ও অনন্যতার প্রকাশক তার বাহ্যিকতা নয়, বরং তার রূহ। তাই কোনো কিছুর বাহ্যিক কাঠামোর চেয়েও তার রূহ কতটা ইসলামী, সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু ইসলামী সভ্যতার অংশ কিনা বা ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করে কিনা তা তার রূহ কতটা ইসলামী তার সমানুপাতিক। কারণ ইসলামী সভ্যতা হলো নববী হিকমতকে ধারণকারী একটি বিশ্বব্যবস্থা, যা গোটা মানবসভ্যতাকে আদালতপূর্ণভাবে পরিচালিত করেছে। সুতরাং, কোনো কিছু ইসলামী সভ্যতার অংশ কিনা বা তা ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করে কিনা তা নিরুপণের অন্যতম মাপকাঠি হলো তার রূহ। রূহ যতটা ইসলামী, কোনো কিছু ঠিক ততটাই ইসলামী সভ্যতার নিকটবর্তী, ঠিক ততটাই ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করে।</p>
<p>আর ইসলামের এ রূহানী প্রভাব ও সামগ্রিকতা জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ব্যাপ্ত। ইসলামী সভ্যতাকে ধারণকারী যেকোনো কিছুর  ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বৃহৎ ক্ষেত্র পর্যন্ত ইসলাম বিদ্যমান। এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামী সভ্যতায় শহরেরও রূহ আছে, কলব আছে। কোনো শহর কতটা ইসলামী তা শুধুমাত্র সে শহরের অধিবাসীদের ব্যক্তিগত ইবাদত কিংবা পোশাকের উপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে সে শহরের রূহ ইসলামকে কতটা ধারণ করে তার উপর।</p>
<p><strong>শহরের রূহ নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে শুরুতেই আমাদের নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে–</strong></p>
<p><strong>• শহর কী? </strong><br />
<strong>• রূহ কী?</strong><br />
<strong>• শহরের রূহ কী?</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের ভাষায়,“নগর এমন একটি আবাসস্থল যা মানুষ বসবাস ও প্রয়োজন পূরণের জন্য অবলম্বন করে থাকে। শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই তারা নগর নির্মাণ করে। এক্ষেত্রে অকল্যাণ (ফাসাদ) প্রতিরোধের ব্যবস্থা এবং কল্যাণ ও উপযোগিতার বন্দোবস্ত থাকা প্রয়োজন। নগরকে অবশ্যই সুরক্ষিত হতে হবে এবং তা নির্মাণের ক্ষেত্রে সুরক্ষিত স্থানকে প্রাধান্য দিতে হবে। একইসাথে আবহাওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, তা যেন মানুষের বাসোপযোগী হয়, রোগ কম ছড়ায় এবং মানুষের স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে।”</p>
<p>ইবনে খালদুনের সংজ্ঞার আলোকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই, ইসলামী সভ্যতার চিন্তার আলোকে তিনি যে নগর প্রস্তাবনা দিয়েছেন, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য চারটি। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো–</p>
<p>• শান্তি ও নিরাপত্তা<br />
• মাফসাদাত প্রতিরোধ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা<br />
• সুরক্ষিত অবস্থান<br />
• বসবাসযোগ্য পরিবেশ</p>
<p>উপরোক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য যে স্থানে পাওয়া যাবে, সে স্থানই ইসলামী সভ্যতায় শহর হিসেবে গণ্য হবে।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি শহরে কি মানুষের পক্ষে ভালোভাবে দ্বীন পালন করা সম্ভব? নাকি যে শহরে শান্তি ও নিরাপত্তা নেই, শৃঙ্খলা নেই, সুরক্ষা নেই, বসবাসযোগ্য পরিবেশ নেই, সেখানেই একজন মানুষের পক্ষে ভালোভাবে দ্বীন পালন করা সম্ভব?</p>
<p>এমন একটি যুক্তি আমরা সব সময় শুনি যে, ভালোভাবে দ্বীন পালন না করাই মানুষের সকল বিপদের উৎস। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমাদের শহরগুলোতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কারণ হিসেবেও আমরা এটাই মনে করি। একইভাবে বৈরাগ্যবাদী বয়ানে প্রভাবিত হয়ে এ বিষয়টিও আমরা অনেক শুনি যে, শহরের জীবনে চাকচিক্য বেশি, তাই শহর ত্যাগ করে নির্জন এলাকায় বসবাস করা উচিত, যাতে ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা যায়। কিংবা শহরে থাকার কারণে মানুষের মন দুনিয়াবী জাঁকজমকের ফিতনায় পড়ে যায়। অথচ মানুষের দ্বীন পালন করার পরিবেশও ভালভাবে এসব শহরেই তৈরি হওয়া সম্ভব!<br />
কামালিয়াতপূর্ণ শহর, অর্থাৎ পরিপূর্ণ শহরের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো:</p>
<ul>
<li>সম্পদের সহজলভ্যতা থাকা, বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা থাকা।</li>
<li>দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপত্তা থাকা।</li>
<li>তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় ও চিন্তাগত স্বাধীনতা থাকা।</li>
</ul>
<p>এসব বৈশিষ্ট্য আছে যে শহরে, সে শহরে ইবাদত পালন করা বেশি সহজ নাকি যে শহরে এসব বৈশিষ্ট্য নেই, সে শহরে ইবাদত পালন করা বেশি সহজ? অবশ্যই যে শহরে এসব বৈশিষ্ট্য আছে, সে শহরেই। ইসলামী সভ্যতার মহান দার্শনিক আলেম আল ফারাবীর ভাষায়, “মানুষ তার আখলাকী কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) শহরের মাধ্যমেই লাভ করে।” আর এ ধরনের শহর অবশ্যই ইসলামী সভ্যতার শহর। কেননা, উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ছাড়া কখনোই আখলাকী পরিপূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয়।</p>
<p>এ পর্যায়ে প্রশ্ন হলো, শহরের রূহ কী? রূহ (روح) শব্দটি কোরআন এবং হাদীসের অনেক স্থানেই বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পারিভাষিক সংজ্ঞা অনুযায়ী রূহ মূলত একটি ‘ইলাহী প্রেরণা’ বা ‘জীবনীশক্তি’। জীবন আর মৃত্যু সংজ্ঞায়িত হয় রূহের ধারণার উপর ভিত্তি করে। কোনো কিছুর ভেতরে রূহ না থাকলে তাকে মৃত বলা হয়। রূহসম্পন্ন সকল কিছুকেই জীবিত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।<br />
কোরআনের এ আয়াতের “و نفخ من روحه” (তিনি তাঁর রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন) আলোকে অনেক চিন্তক মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে রূহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।<br />
অনেক দার্শনিক শহরকে মানুষের উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন: আল ফারাবী তাঁর নগরের ধারণায় শহরের কেন্দ্রকে কলবের সাথে, এর পথ এবং রাস্তাগুলোকে শিরার সাথে, এর শাসককে মস্তিষ্কের সাথে তুলনা করে তুলে ধরেছেন। এবং এ সকল নগরতত্ত্বীয় ধারণাগুলোতে শহরের যে একটি চালিকা শক্তি, অর্থাৎ মানুষের ন্যায় একটি রূহ রয়েছে, এ বিষয়টি বারংবার উঠে এসেছে।</p>
<p><strong>এক্ষেত্রে শহরের রূহ মূলত কী?</strong></p>
<p>একটি সভ্যতার শহরের প্রতিটি ক্ষেত্র, যথা:<br />
&#8211; শহরের ইতিহাস,<br />
&#8211; পরিকল্পনা ও পরিছন্নতা,<br />
&#8211; সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ,<br />
&#8211; স্থাপত্য ও প্রতিষ্ঠান<br />
&#8211; মিউজিক,<br />
&#8211; সাহিত্য ও ভাষা<br />
&#8211; শিল্প ও চারুকলা<br />
&#8211; লোককাহিনী,<br />
&#8211; বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সম্পদ<br />
&#8211; এবং শহরের অধিবাসীরা হলো শহরের রূহ।</p>
<p>এ সকল বিষয় যে চিন্তার আলোকে তৈরি হবে, সে রূহ শহরের প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। এগুলো বিহীন নগরকাঠামো চিন্তা করলে আমরা পাথরের স্তুপ আর বিরাট অট্টালিকা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না। অর্থাৎ রূহহীন শহর শুধুমাত্র ইট-পাথরের স্তুপ ব্যতীত কিছুই নয়। এক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় হলো একটি শহরকে রূহসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে মানুষের তৈরিকৃত। অর্থাৎ, একটি শহরের রূহ তৈরি করে সে শহরের অধিবাসীরা।<br />
মানুষ শহর তৈরি করে এবং এর রূহও মানুষের মাধ্যমেই তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ তথা শহরের অধিবাসীদের পরিবর্তনের অর্থ হলো শহরের রূহ পরিবর্তিত হওয়া। পরিবর্তিত শহরের মানুষ মুসলমান হলে শহরের রূহ হয় ইসলামী, খ্রিস্টান হলে শহরের রূহ খ্রিস্টান ধর্মের চিন্তার আলোকে তৈরি হয়, বৌদ্ধ হলে শহরের রূহ তৈরি হয় বৌদ্ধ ধর্মের চিন্তার আলোকে।</p>
<p>একটি শহরকে দূর থেকে অবলোকন করলে যদি সেখানে মিনার দেখা যায়, তবে তা ইসলামী শহর; যদি সেখানে চার্চের টাওয়ারগুলোকে বিদ্রোহীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তবে তা খ্রিস্টানদের শহর; যদি তা প্যাগোডা দিয়ে সজ্জিত দেখা যায়, তবে তা বৌদ্ধদের শহর; আর যদি তা মূর্তি, মন্দির দিয়ে সজ্জিত দেখা যায়, তবে তা হিন্দুদের শহর। অর্থাৎ, একটি শহরের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মধ্যকার রূহ সে শহরের রূহের প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো শহরের আজান, চার্চের ঘন্টা, মন্দিরের শাঁখের আওয়াজ কিংবা মঠের স্থাপত্যশৈলী সে শহরের রূহের প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>শহর একটি ক্রমাগত অগ্রসরমান এবং পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে। এই পার্থক্য আমরা বহির্কাঠামোর পরিবর্তন থেকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি। রাসূল (স.) এর ফাতহে মক্কা, মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত বিজয়, তারিক বিন যিয়াদের স্পেন বিজয়, ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বঙ্গবিজয়, আল্প আরসালানের মালাজগিরতের যুদ্ধ, সুলতান ফাতিহ কর্তৃক বিজিত ইস্তাম্বুল কীভাবে একটি শহরের রূহ পরিবর্তিত হয় তাঁর উজ্জ্বল নিদর্শন। রাসূল (স.) কেন মক্কা বিজয়ের সাথে সাথেই কাবা প্রাঙ্গনের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন কিংবা সুলতান ফাতিহ ইস্তাম্বুল বিজয়ের সাথে সাথেই কেন আয়া সোফিয়ার কাঠামো বদলে দিয়েছিলেন তা আমাদের সামনে স্পষ্ট। কিংবা, মুসলমানগণ বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে সাথে সাথেই মসজিদ নির্মাণ করার সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো সে শহরের রূহকে পরিবর্তন করা।</p>
<p>কিছু শহরে এমন জায়গা বা ব্যক্তিত্ব রয়েছে যা শহরের রূহকে জাগ্রত রাখে।<br />
মদীনায় পয়গম্বর (স.), বায়তুল মাকদিসে বহু পয়গম্বরের কবর, কুফায় আলী (রা.), ইরাকে হযরত হোসাইন (রা.), মাওয়ারাউন নাহারে ইমাম মাতুরিদী (র.), আদিয়ামানে বায়েজিদ বোস্তামী (র.), ইস্তাম্বুলে আবু আইয়ুব আল আনসারী (রা.), সাইপ্রাসে উম্মে হালা থেকে শুরু করে বঙ্গভূমির সিলেটে শাহজালাল (র.), শাহ পরাণ (র.), ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে শাহ আলী (র.) এভাবে ইসলামী সভ্যতার শহরগুলোতে মহান পয়গম্বরগণ, সুফী, আলেম, মুজাহিদ, দরবেশদের কবরগুলোও সে শহরগুলোর প্রাণকেন্দ্র, আধ্যাত্মিকতা ও রূহকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<blockquote><p><strong>তাই ইসলামী সভ্যতাকে ধারণকারী শহর আর পাশ্চাত্য সভ্যতাকে ধারণকারী শহরগুলোর মাঝে আকাশপাতাল তফাত বিদ্যমান। কেননা, যে শহরের প্রতিবেশী অভুক্ত আছে কিনা, কেউ কোনো সমস্যায় আছে কিনা সে চিন্তা না করেই উদ্দাম বিলাসিতার আয়োজন করা হয়, যে শহরে মানুষ বিশুদ্ধ পানি পায় না, অপরদিকে হাজারো লিটার পানির অপচয় হয়, যে শহরে হাজারখানেক মানুষের চেয়েও একজন মানুষের ব্যক্তিগত প্রসাধনীর ব্যয় বেশি হয়, সে শহর কখনোই ইসলামী হতে পারে না, ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করতে পারে না।</strong></p></blockquote>
<p>আমির ইবরাহীমের মতে, কোনো শহরকে রূহসম্পন্ন হতে হলে নিম্নলিখিত চারটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে।</p>
<p>• <strong>ব্যবস্থা এবং সামঞ্জস্য:</strong> এমন শর্ত প্রদান করা যাকে আমরা সংগঠন এবং সাদৃশ্য বলতে পারি। এ আইনগুলো বেশিরভাগ দ্বীন কর্তৃক নির্ধারিত হয়। মানুষ এবং মানুষের মধ্যে সিস্টেমের সমন্বয়ে, অথবা মানুষ এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্যের মধ্যকার সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরে।</p>
<p>• <strong>পরিচ্ছন্নতা:</strong> এটি আধ্যাত্মিক এবং বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা উভয়কেই বোঝায়।</p>
<p>• <strong>ব্যবহারযোগ্যতা:</strong> শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যা শহরের কার্যকারিতা নিশ্চিত করে পারস্পরিক দায়িত্বের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে।</p>
<p>• <strong>সৌন্দর্য, অর্থাৎ সৌজন্য:</strong> এটি সেই অভিক্ষেপ যা শহর থেকে মানুষের রূহের উপর পড়ে। মানুষের রূহের সাথে শহরের রূহের সামঞ্জস্য, মানুষের পরিচয়ের মাধ্যমে শহরের পরিচিতি তৈরি হওয়া এক্ষেত্রে বিবেচ্য।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতাকে ধারণকারী রূহসম্পন্ন একটি শহরই প্রকৃত রূহসম্পন্ন শহর। এ শহরে মানুষের দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায় মানুষকে গোপনে উপকার, সহযোগিতা করার মাধ্যমে। এ দায়িত্ববোধ শহরের মধ্যকার ইখওয়ান (ভ্রাতৃত্ব) এর প্রতিনিধিত্ব করে। এ শহরে কোনো মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায় না, কোনো বোন পেটের দায়ে তাঁর সম্মান বিক্রি করতে বাধ্য হয় না; এ শহরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিদ্যমান; এ শহরের প্রতিটি স্থাপত্য হয় চোখের প্রশান্তি, যা তার প্রতিবেশীর হক নষ্ট করে তৈরি হয় না; এ শহরের প্রতিটি অধিবাসী অপর অধিবাসীর প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও রহমপূর্ণ আচরণ চর্চা করে, রহমানী আখলাকের অধিকারী হয়। এজন্যই সময়ের মুতাফাক্কিরগণ বলেন, “সভ্যতার পুনর্জাগরণে সর্বপ্রথম প্রয়োজন ব্যক্তির জাগরণ বা জাগ্রত ব্যক্তিত্বের। কেননা ঘুমন্ত ব্যক্তির মাধ্যমে কখনো জাগ্রত সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দরকার হলো রূহের জাগরণ। অতঃপর চিন্তা ও বিশ্বাসের জাগরণ। কেননা, রূহ জাগ্রত না হলে ব্যক্তি জাগ্রত হবে না, আর চিন্তা ও বিশ্বাসের জাগরণ না হলে অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি কোনো ক্ষেত্রেই পুনর্জাগরণ আসবে না।”</p>
<p>আর এ ধরনের রূহসম্পন্ন শহর কেবলমাত্র একদল রূহসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের হাত ধরেই গড়ে উঠতে পারে।<br />
বাংলা অঞ্চলের সাতশো বছরব্যাপী মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে তাই রূহসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তৈরির আন্দোলনের ইশতেহার ঘোষণা আমাদেরকেই করতে হবে, নতুনভাবে সমগ্র বাংলাদেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে হবে।</p>
<p>আমরা আমাদের শহর ও স্থাপত্যসমূহের হারিয়ে যাওয়া রূহের পুনর্জাগরণের প্রত্যাশায়…</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/spirit-of-city/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7176</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কোরআনের নীতি (আখলাক) দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-the-quran-ethics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-the-quran-ethics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 04 Apr 2022 15:17:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক]]></category>
		<category><![CDATA[কোরআনের নীতি]]></category>
		<category><![CDATA[কোরআনের নীতি (আখলাক) দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6986</guid>

					<description><![CDATA[খোদাহীন-ধর্মহীন নীতিদর্শনের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আমরা বলে এসেছি যে, প্রাচীন গ্রীসের নীতিদার্শনিক কিংবা বর্তমান ইউরোপ-আমেরিকার নীতিবিজ্ঞানী—যাঁরাই হোন, তাঁদের জন্যে সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য এই যে, তাঁরা বিশ্বস্রষ্টার জারী করা বিশ্ব-প্রকৃতিতে বিরাজিত ও সদা কার্যরত নিয়মের অধ্যয়ন ও গবেষণায় যতই ব্যতিব্যস্ত হোন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>খোদাহীন-ধর্মহীন নীতিদর্শনের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আমরা বলে এসেছি যে, প্রাচীন গ্রীসের নীতিদার্শনিক কিংবা বর্তমান ইউরোপ-আমেরিকার নীতিবিজ্ঞানী—যাঁরাই হোন, তাঁদের জন্যে সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য এই যে, তাঁরা বিশ্বস্রষ্টার জারী করা বিশ্ব-প্রকৃতিতে বিরাজিত ও সদা কার্যরত নিয়মের অধ্যয়ন ও গবেষণায় যতই ব্যতিব্যস্ত হোন না কেন, মানুষের জন্য বিশ্বস্রষ্টার নাযিল করা আইন-বিধান অধ্যয়ন ও অনুধাবনে তাঁরা কিছুমাত্র আগ্রহী নন। এ কারণে যে সব জটিল ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে বিবেক-বুদ্ধি সম্পূর্ণ অকেজো প্রমাণিত, সেই সব ক্ষেত্রেও তাঁরা অনুরূপতা (Analogy) ও তত্ত্বানুসন্ধানের (Investigation, searching) তীর অন্ধভাবে নিক্ষেপ করে প্রকৃত সত্য পথের সন্ধান করতে সচেষ্ট। এরই ফলে মানুষের নৈতিকতার (Ethics) গোটা ব্যাপারটিই অর্থহীন ও নিষ্ফল তর্ক-বিতর্কে পরিণত হয়েছে। তার দ্বারা মৌলিক প্রশ্নের জবার পাওয়া বা আসল সমস্যার সমাধান হওয়া একেবারেই সম্ভব হয়নি। মানবতার ইতিহাস অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা নিঃসন্দেহে জানতে পারি যে, আল্লাহর নাযিল করা ওহী ও বিধান ছাড়া বিশ্ব-মানবতার নৈতিক সমস্যার কোন সমাধান কোন কালেই পাওয়া যায়নি, নৈতিকতা সংক্রান্ত কোন প্রশ্নের নির্ভুল জবাব দেয়া আর কারোর পক্ষেই সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মানবতা যে পরিমণ্ডলে জীবন অতিবাহিত করছে, তার পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনাও আমাদেরকে বলে দিচ্ছে, এই সমস্যাটির সমাধানে এই প্রশ্নটির জবাব পেতে মানুষের কোন চেষ্টাই সফলতা লাভ করতে পারছে না। এ দুনিয়া বস্তুগত দিক দিয়ে যত উন্নতিই লাভ করছে, নৈতিকতার দিক দিয়ে ততই ভাঙন ও বিপর্যয়ের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বস্তুগত উন্নতি ও নৈতিক অধঃপতন, দৈহিক বিবর্তন ও অধঃপতন বর্তমান আণবিক যুগের একটা বিশেষত্ব – একটা নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, একালের ইউরোপ-আমেরিকার চিন্তাবিদ দার্শনিকগণ সর্বাত্মক নৈতিক বিপর্যয় লক্ষ্য করে কেঁপে উঠেছেন, নৈতিক মহাধ্বংস নামতে দেখে উচ্চ কণ্ঠে সাবধান বাণী উচ্চারণ করছেন। কিন্তু নৈতিক পুনর্জাগরণে অপরিহার্য আল্লাহর নাযিল-করা বিধান পর্যন্ত তাঁরা এখনো পৌঁছতে পারেননি। ইদানিং বহু ইউরোপীয় মনীষী-চিন্তাবিদ ও বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক কুরআনের বহু সূক্ষ্ম তত্ত্বের সাথে পরিচিত হতে পেরে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখে স্তম্ভিত হচ্ছেন এবং অকৃত্রিম বিশ্বাস নিয়ে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করছেন, একথায় কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটি এখনও ব্যাপক ও সাধারণ রূপ পরিগ্রহ করেনি; হয়ত-বা সেদিন খুব একটা দূরেও নয়।</p>
<p>আজ একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বিশ্ব-মানবতার উচ্চতর ও মহত্তর লক্ষ্য যে নতুন সভ্যতার প্রতিষ্ঠা, তা একমাত্র কুরআন উপস্থাপিত নীতিদর্শনে (Ethical view of the Quran)-এর ভিত্তিতেই সম্ভব। কিন্তু বর্তমান দুনিয়ার নেতৃত্ব কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ যদি এই জীবন-উৎসের সাথে পরিচিত না হয়ে থাকেন, কিংবা সেদিকে লক্ষ্য নিবন্ধ না করে থাকেন, তাহলে তার জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী তারাই যারা এখানে সেই মহান জীবন-উৎসের বড় ‘আমানতদার&#8217;। কেননা তারাই সে উৎসের প্রতি ঈমানদার হওয়ার ও তাকে সকল মানবীয় সমস্যার একমাত্র সমাধান বলে মৌখিকভাবে দাবি করছে। কুরআনের প্রতি ঈমানদার হওয়ার দাবিদার এই জনগোষ্ঠী যদি দুনিয়ার কোন একটি ক্ষুদ্র ভু-খণ্ডে ও কুরআনী নীতিদর্শনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তব রূপ দেখিয়ে দিতে সমর্থ হয়, তা হলে সমগ্র বিশ্ব মেনে নিতে বাধ্য হবে যে, মানুষের সকল প্রকার নৈতিক রোগ-ব্যাধি ও বিপর্যয়ের প্রকৃত প্রতিষেধক এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জটিলতার প্রতিবিধান কেবলমাত্র তা-ই হতে পারে, যা কুরআন মজীদ পেশ করেছে। তারা এও অকপটে স্বীকার করত যে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ পবিত্র মানব সমাজ কেবল কুরআনের ওপর ভিত্তি করেই রচিত হতে পারে এবং নৈতিক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া কেবল তখনই সম্ভবপর। আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে চাই, কোন মেধা-সম্পন্ন ব্যক্তি যদি কেবলমাত্র জ্ঞানগত তত্ত্ব হিসেবেও (Theoritically) কুরআন উপস্থাপিত নীতিদর্শনকে বুঝে নেন, তাহলেও তিনি তাকেই এতৎসংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার একমাত্র ও চূড়ান্ত সমাধান মেনে নিতে বাধ্য হবেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা এখানে কুরআনের নীতিদর্শন পেশ করতে চাচ্ছি।</p>
<p><strong>নীতিদর্শনের প্রাথমিক সূত্র:</strong></p>
<pre>আমরা সর্বপ্রথম দেখতে চাই, কুরআন বিষয়টির সূচনা কোনখান থেকে করেছে এবং তার দৃষ্টিতে নীতিদর্শনের প্রথম সূত্র কি?</pre>
<p>বস্তুত যে কোন সমস্যার প্রাথমিক সূত্র না পাওয়া পর্যন্ত নির্ভুলভাবে তার সমাধান বের করা কখনই সম্ভব হতে পারে না। দার্শনিকগণ কেবলমাত্র বিবেক-বুদ্ধির কুঞ্চিকা দিয়ে নৈতিক সমস্যার সমাধান করতে চেষ্টা করেছেন; এটা যে মস্ত বড় ভুল, তা আমরা আগেই দেখিয়েছি। তাদের আর একটি বড় ভুল হল, সমস্যার মৌল উৎসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে মধ্যখান থেকে তার সমাধান বের করতে চেষ্টানুবর্তী হওয়া। সমস্যার মৌল উৎসের সন্ধান করাকে হয়ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি কিংবা তার সন্ধান করাই তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। কিন্তু কুরআন মজীদ মানুষের শুধু নৈতিকতাই নয়, তার যাবতীয় সমস্যার মৌল উৎসের সন্ধান দিয়েছে এবং সেই দৃষ্টিতেই তার প্রতিটির নির্ভুল সমাধান একের পর এক উপস্থাপন করেছে।</p>
<p>মানুষের জীবনটা কি, তার জন্মের উদ্দেশ্য কি, তার জীবনের লক্ষ্য কি, এই দুনিয়ায় তার অবস্থান কোথায় মানুষের সম্মুখে এগুলিই সর্বপ্রথম উপস্থিত প্রশ্ন এবং এই প্রশ্ন সমূহের নির্ভুল জবাবই হচ্ছে যাবতীয় জটিলতার প্রাথমিক সূত্র। এই জবাব সম্বলিত জ্ঞানই মানুষের জানার প্রাথমিক এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত মানব জীবনের কোন সমস্যা অনুধাবন করা সম্ভব নয় – সম্ভব নয় তার সমাধান জানতে পারা। কেবলমাত্র মানবীয় বিবেক-বুদ্ধির দ্বারা উল্লেখিত প্রশ্নাবলির জবাব নির্ধারণ করা কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। অথচ দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকগণ কেবলমাত্র এ উপায়ই ঐসব প্রশ্নের জবাব পেতে চেষ্টা করেছেন। আর এ কারণেই মানব জীবনের অন্যান্য সমস্যার ন্যায় নৈতিকতার সমস্যাটিও সম্পূর্ণ অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।</p>
<p>আল্লাহর নাযিল করা কুরআন মজীদ এসব প্রশ্নের সঠিক-নির্ভুল ও সুস্পষ্ট জবাব পেশ করেছে। সে জবাবের দ্বারা সকল সমস্যার –নৈতিক সমস্যারও সমাধান এমনভাবে হয়ে যায় যে, তাতে মন ও মগজ পূর্ণ স্বস্তি পরম সান্ত্বনা লাভ করে।</p>
<p>কুরআন প্রদত্ত জবাবে মন ও মগজ পরম সান্ত্বনা ও স্বস্তি লাভ করে প্রধানত দুটি কারণে। একটি এই যে, এ জবাব কোন মানুষের মনগড়া আজগুবী বা ভিত্তিহীন কথা নয়। এটা স্বয়ং সেই মহান সত্তার, যিনি সমগ্র বিশ্বলোক ও মানুষের একমাত্র স্রষ্টা। শুধু স্রষ্টাই নন, তাঁর অলৌকিক বুদ্ধিমত্তা ও অতুলনীয় জ্ঞান দ্বারাই এই বিশ্ব-ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বলোকের একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে যারাই আল্লাহকে বিশ্বাস করে ও মানে, তাঁর আপন সৃষ্টিকুল সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান যে কেবল তাঁরই থাকতে পারে-রয়েছেও, তা মেনে নিতে তাদের কোন দ্বিধা-সংকোচ থাকার কথা নয়। তিনি তাঁর সৃষ্ট প্রজাতিসমূহের অবস্থান ও সে সবের সৃষ্টি-উদ্দেশ্য বলে দেয়ার সবচাইতে বেশী অধিকারী, এটা অস্বীকার করা তাদের পক্ষে কি করে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে? কোন যন্ত্রের নির্মাতা তার নির্মাণ-কৌশল, তার নির্মাণ-উদ্দেশ্য এবং তার অংশগুলির যথার্থ অবস্থান নির্ধারণ করবে ও সকলকে তা জানিয়ে দিবে, এ-ই তো স্বাভাবিক এবং তা কিছুমাত্র দুর্বোধ্য নয়। আল্লাহ্-ই এই বিশ্বলোকের স্রষ্টা ও নির্মাতা। এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব তিনি ছাড়া আর কে দিতে পারে ?</p>
<p>মহান আল্লাহর জানিয়ে দেয়া জবাব আমরা কুরআন মজীদের মাধ্যমেই জানতে পারি। সে জবাব হল :</p>
<p>মানুষের এই জীবনটা কেবল আল্লাহর দান। তিনি মানুষকে এই জীবন দিয়েছেন আমানত স্বরূপ। এ দান চিরদিনের জন্য নয়, সাময়িক – একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্তকার জন্যে মাত্র। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি তা ফিরিয়ে নিবেন। এই জীবনদানের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষ এই গোটা পরিসরে কেবল আল্লাহ্‌কে নিজের একমাত্র মা&#8217;বুদ মালিক ও সার্বভৌম মানবে এবং সকল কাজে, নিজেকে কেবল তাঁরই বান্দাহ, অনুসারী ও আনুগত্যকারী প্রমাণ করবে।</p>
<blockquote><p>এই জগতে তার অবস্থান- সে আল্লাহর বান্দাহ, আল্লাহর খলীফা। সে এখানকার কোন কিছুরই মালিক নয়, তার নিজের জীবন ও সত্তা এবং শক্তি-সামর্থ্যেরও নয়। অতএব সে তার হৃদয়-মন-মগজ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা শুধু তা-ই করবে যা করতে তার আসল মালিক, মনিব ও সার্বভৌম বলেছেন। যা করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন, যা করতে তিনি নিষেধ করেছেন। অথবা যা করলে তার বান্দাহ ও অনুগত হওয়ার মর্যাদা বিনষ্ট হয়, তা সে কখনই করবে না।</p></blockquote>
<p>এই দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা কি, তার অবস্থান কোথায় মানুষের নৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য তার জীবন-লক্ষ্য নির্ধারণ সহ এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি একান্তই অপরিহার্য। কেননা জীবন লক্ষ্য ও অবস্থানে পার্থক্য ঘটলে নৈতিকতার ব্যাপারে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি অনিবার্য হয়ে পড়ে। এমন কি মানবীয় কাজের &#8216;ভালো&#8217; বা &#8216;মন্দ&#8217; হওয়া, &#8216;নেক&#8217; বা &#8216;বদ&#8217; হওয়া সম্পূর্ণরূপে এরই ওপর নির্ভর করে। একটা রূপক কথার দ্বারা দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। আমার নিকট দশটি টাকা রয়েছে। এই টাকার ব্যাপারে আমার অবস্থ কি, অবস্থান কোথায়, তা নির্ধারণ করতে হবে সর্বপ্রথম। এক্ষেত্রে আমার মাত্র দুটি অবস্থা হতে পারে।</p>
<p>প্রথমত, আমি তার স্বাধীন ও ইচ্ছাধিকারী মালিক। সেজন্য আমাকে কারোর নিকট হিসেব দেয়ার বা জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা নেই।</p>
<p>আর দ্বিতীয়ত, তার প্রকৃত মালিক আমি নই, অন্য কেউ। সে আমাকে এই টাকা কতিপয় শর্তের ভিত্তিতে দিয়েছে ব্যয় ও ব্যবহার করার জন্যে। শেষ পর্যন্ত এ টাকার ব্যয় ব্যবহার সম্পর্কে তার নিকট আমাকে হিসেবেও দিতে হবে, জবাবদিহিও করতে হবে।</p>
<p>প্রথমোক্ত অবস্থায় দশ টাকা দিয়ে আমি যা-ই করি না কেন, তার পূর্ণ স্বাধীনতা আমার রয়েছে। আমি তার হিসাব কারোর নিকট দিতে বাধ্য নই; যেভাবে ও যে কাজে ইচ্ছা আমি ব্যয় করব, সে ব্যাপারে কারোরই কিছু বলবার নেই।</p>
<p>আর দ্বিতীয় অবস্থা টাকার আসল মালিকের আরোপিত শর্তসমূহের কোন একটি শর্তও যদি আমি লংঘন করি, তাহলে আমাকে চুক্তি ভংগকারী ও বিশ্বাস লংঘনকারী সাব্যস্ত করা হবে, লোকের নিকট আমি খারাপভাবে চিত্রিত হব এবং আমাকে মন্দ বলা হবে। সেজন্য আমাকে কোন শাস্তি দিলেও আমার কিছুই বলবার থাকবে না। তখন আমি হব খিয়ানতকারী।</p>
<p>দুটি অবস্থার যে বিশ্লেষণ দেয়া হল, যে রূপ পরিণতির কথা বলা হল তা অকাট্য—এটা নিঃসন্দেহ। এই উপমাটি মানুষের গোটা জীবনের কার্যাবলীর ওপর প্রয়োগ করলেই &#8216;ভালো&#8217; ও &#8216;মন্দ&#8217;, &#8216;নেক’ ও ‘বদ&#8217;, চরিত্র ও চরিত্রহীনতা — এর তত্ত্ব উদঘাটিত হতে পারে। মানুষের বৈষয়িক জীবনের নিগূঢ় রহস্য ও জীবন উদ্দেশ্য ও অবস্থান সম্পর্কে—এই যা কিছু বলা হল, কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে তা-ই সুস্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে সেদিকে ইংগিত করা হচ্ছে।</p>
<p><strong>খিলাফত:</strong></p>
<p>কুরআনের সূরা আল-বাকারার ৪র্থ রুকূর আয়াতসমূহে এই দুনিয়ায় মানুষকে &#8216;খলীফা&#8217; বানানোর কথা বলা হয়েছে। কয়েকটি আয়াতের অনুবাদ নিম্নরূপ :</p>
<p>&#8216;অতঃপর সেই সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন তোমার রব্ব ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বললেনঃ আমি পৃথিবীতে একজন খলীফা নিয়োগকারী। তারা বললঃ আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করবেন, যে সেখানকার শৃংখলা-ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করবে ও রক্তপাত ঘটাবে? আপনার তা’রীফ-প্রশংসা সহকারে তস্বীহ্ এবং আপনার পবিত্রতা মহানত্ব তো আমরাই প্রকাশ করছি। (আল্লাহ) বললেনঃ তোমরা যা জানো না, আমি তা জানি।</p>
<p>এর পর আল্লাহ্ আদমকে সমস্ত জিনিসের পুরোপুরি নাম শিক্ষা দিলেন। পরে সেগুলিকে ফেরেশতাদের সম্মুখে পেশ করলেন এবং বললেনঃ</p>
<p>তোমাদের ভাবনাটাই যদি সত্য হয় (যে, খলীফা নিয়োগে শৃংখলা-ব্যবস্থা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে) তা হলে তোমরা এই জিনিসগুলির নাম আমাকে জানাও। তারা বললে : অসম্পূর্ণতা ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত তো আপনার সত্তা। আমরা তো শুধু ততটুকুই জানি, যতটুকু আপনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর জ্ঞান ও বুঝ-এর অধিকারী আপনি ছাড়া কেউ নয়। পরে আল্লাহ্ আদমকে বললেনঃ তুমি ওদের এসবের নাম জানিয়ে দাও। সে যখন তাদেরকে সমস্ত নাম বলে দিল, তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সমস্ত নিগুঢ় তত্ত্ব জানি যা তোমাদের নিকট প্রচ্ছন্ন। তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর তা-ও আমি জানি আর তা-ও যা তোমরা গোপন রাখ।</p>
<p>পরে আমরা যখন ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমের জন্য অবনত হও, তখন সকলেই অবনত হল; কিন্তু ইবলীস, সে অমান্য করল। স্বীয় বড়ত্বের অহংকারে পড়ে গেল ও কাফিরদের দলে শামিল হল।</p>
<p>উদ্ধৃত আয়াতসমূহ থেকে কয়েকটি বিষয় আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, মানব প্রজাতি সৃষ্ট হয়েছে এই পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা হিসেবে। (খলীফা বানানোর ঘোষণা দেয়ার পর তিনি আদমকে সৃষ্টি করেছেন, সমস্ত মানুষ এই আদমেরই বংশধর।) ক্ষুদ্র গ্রহ এই পৃথিবীকে আবাদকরণ ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালনের উদ্দেশ্যে তাকে এখানে পাঠানো হয়েছে। এই লক্ষ্যে আল্লাহ্ খিলাফত তথা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব দিয়ে মানুষকে অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, এবং এ কারণে তিনি অপর কোন সৃষ্টিকেই এ মর্যাদা দান করেন নি; বরং তাঁর সর্বাধিক নিকটবর্তী সৃষ্টি ফেরেশতাদেরকেও মানুষের সম্মুখে সিজদাবনত হতে বাধ্য করেছেন। বস্তুত সমগ্র সৃষ্টিলোককে তিনি এই মানুষের জন্যই নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছেন। কেননা তারা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বশীল সত্তা। অপর দিকে তিনি মানুষকে একথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তোমরা এখানকার বাদশাহ বা সম্রাট কিংবা রাজাধিরাজ নও, বরং তোমরা বিশ্বলোক সম্রাটের কর্মচারী মাত্র। তোমরা এখানকার সার্বভৌম নও, সার্বভৌমের অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী।</p>
<p>দ্বিতীয়ত আয়াতের কথাগুলি থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ্ মানুষকে যে &#8216;ইলম&#8217; (জ্ঞান) দিয়েছেন তার স্বরূপ ফেরেশতাদের দেয়া &#8216;ইলম&#8217;-এর মতো নয়। স্পষ্টত মনে হয় ফেরেশতাদেরকে তিনি প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র ও কর্মের স্বরূপ পর্যায়ের আংশিক ইলম দিয়েছেন আর তাদের বিপরীত মানুষকে দেয়া হয়েছে ব্যাপক ও সমষ্টিগত জ্ঞান। মানুষকে যেখানে আল্লাহর প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছে, সেখানকার সমস্ত বিভাগ সংক্রান্ত কিছু-না-কিছু জ্ঞান তাকে দেয়া হয়েছে। ঠিক এ কারণেই পরীক্ষায় আদম ফেরেশতাদের ওপর উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন এবং ফেরেশতাদেরকে বাধ্য হতে হল নিজেদের অজ্ঞানতার কথা অকপটে স্বীকার করে নিতে। প্রসংগত এখানে একটি প্রশ্নের জবাব দেয়া আবশ্যক মনে হয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, আদম (আ)-কে যে &#8216;ইলম&#8217; দেয়া হয়েছিল, ফেরেশতাদের সম্মুখে তার প্রদর্শনীর কি প্রয়োজন ছিল?</p>
<p>এর জবাবে বলা যেতে পারে, যেহেতু একটু পরেই আল্লাহ্ তা&#8217;আলা আদম (আ)-এর উদ্দেশ্যে সিজদা করার নির্দেশ দিতে যাচ্ছিলেন, এ কারণে এই নির্দেশ দানের প্রাক্কালে আদম (আ)-এর বিশেষত্ব ও মর্যাদাশীলতা কার্যত প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল বলেই তা করানো হয়েছে, যেন ফেরেশতাগণ সর্বান্তঃকরণে বুঝে-শুনে আদম (আ)-এর সম্মুখে অবনত হতে পারেন। সেই সঙ্গে যার উদ্দেশ্যে তারা নতি স্বীকার করছে তাঁর জ্ঞান-বিদ্যা যে তাদের তুলনায় বেশী এবং মর্যাদার দিক দিয়েও তিনি অনেক ঊর্ধ্বে এটা তাঁরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।</p>
<p>বস্তুত দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালনে আদম (আ)-কে ফেরেশতাদের সহায়তা সহযোগিতা করতে হবে এবং তাতে আদম (আ)-এর অধীনতা করা একান্তই জরুরী হয়ে পড়বে। আর আদম (আ) ফেরেশতাদের নিকট থেকে এই অধীনতা ও আনুগত্য পাওয়ার যোগ্যও বটে।</p>
<p>বনী আদম সম্পর্কে ফেরেশতাদের এই কথোপকথনের একটা বিবরণ নবী করীম (স)-এর নিকট থেকে ও পাওয়া গেছে। তা থেকেও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ তা&#8217;আলা মানুষকে ফেরেশতাদের ওপর অধিক মর্যাদা দিয়েছেন। হাদীসটি এই :</p>
<p>হযরত জাবির (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ্ তা&#8217;আলা যখন আদম ও আদম বংশকে সৃষ্টি করলেন, তখন ফেরেশতাগণ বললেন : হে রব্ব! আপনি ওদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, ওরা পানাহার করে, বিয়ে শাদী করে, জন্তুর পিঠে সওয়ার হয়। অতএব আপনি ওদের জন্য দুনিয়াকে নির্দিষ্ট করে দিন এবং আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিন পরকালকে। জবাবে আল্লাহ তা&#8217;আলা বললেনঃ আমি যাকে নিজ হস্তে বানিয়েছি এবং তাতে নিজের রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছি তার মান-মর্যাদা আমি তার সমান করব না যার অবস্থা এই যে, আমি বললাম হয়ে যা, আর অমনি হয়ে গেল। (মিশকাত-বায়হাকী)</p>
<p>&#8216;হাদীসটির তাৎপর্য হচ্ছে, ফেরেশতারা মানুষ সম্পর্কে আল্লাহর নিকট বললেনঃ তারা যখন দুনিয়ার সুখ-শান্তি ভোগ করছে, আর আমরা দুনিয়া থেকে কোন সুখই গ্রহণ করছি না, তখন দুনিয়াটা ওদের জন্য হওয়া উচিত আর পরকালটা কেবল আমাদের জন্যে।</p>
<p>কিন্তু জবাবে আল্লাহ্ মানুষ ও ফেরেশতাদের সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় নিহিত পার্থক্যকে সুস্পষ্ট করে দিলেন। ফলে উভয়ের মধ্যকার মর্যাদাগত পার্থক্যটা স্পষ্টত প্রকাশিত হল। &#8220;নিজ হস্তে নির্মাণ ও তাতে রূহ ফুঁকে দেয়া শুধু সৃষ্টিকর্মের বিশেষ ব্যবস্থাপনা এবং সৃষ্টিটির মান-মর্যাদা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যেই বলা। সৃষ্টিকর্মের বিশেষ ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে যে, মানুষ কোন সাধারণ বা নগণ্য সৃষ্টি নয়। তাকে যে গুণাবলী দেয়া হয়েছে তা খোদায়ী গুণাবলীর প্রতিবিম্ব। আর আকৃতিগত ও ভাবগত এবং ইন্দ্রিয়গত ও বিবেক-বুদ্ধিগত পূর্ণত্বের যে ব্যাপকতা মানুষকে দান করা হয়েছে, তা ফেরেশতাদের দেয়া হয়নি। এ দ্বারা সম্ভবত একে বুঝানো হয়েছে যে, এই সত্তা যদি আল্লাহর আনুগত্য করে তা হলে ইহকাল-পরকাল উভয়ই তার জন্যে হবে। আর এই সত্তার মাথায় খিলাফতের মুকুট পরিয়ে তার পরীক্ষা সুসম্পন্ন করার জন্যেই এই সমগ্র বিশ্বলোক ও বস্তুজগতের সমস্ত তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে। এই পরীক্ষার ফলাফল যথার্থভাবে প্রকাশের জন্যেই পরকালের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।</p>
<p>ফেরেশতাদের ওপর আদমের সর্বমুখী মর্যাদা এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এর ফলেই ফেরেশতাগণ সানন্দে আদমের সম্মুখে অবনত হয়ে গেলেন। উদ্ধৃত আয়াতসমূহ থেকে এও সুস্পষ্ট হয় যে, খিলাফত তথা প্রতিনিধিত্বের পরীক্ষায় একটি চিরন্তন দুশমনও মানুষের সাথে নিরন্তরভাবে লেগে আছে। মানুষকে আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও খিলাফতের দায়িত্ব পালনে প্রবলভাবে বাধাদান ও মানুষকে আল্লাহদ্রোহী বানানোর চেষ্টায় সে পূর্ণ শক্তিতে আত্মনিয়োগ করে আছে। এ এক অকারণ শত্রুতা, মানুষ কোনদিনই তার সাথে শত্রুতামূলক কোন আচরণ কখনই করেনি। এতৎসত্ত্বেও ইবলীস-শয়তান আত্ম-অহংকারে স্ফীত ও মানুষের সাথে হিংসার আগুনে প্রতি মুহূর্ত দগ্ধ হচ্ছে। মানুষকেও তারই মত খোদাদ্রোহী ও অভিশপ্ত বানানোর জন্যই তার এই অব্যাহত চেষ্টা ও প্রচেষ্টা। কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও এই সব তত্ত্ব ইশারা-ইংগিতে পেশ করা হয়েছে।</p>
<p>এ আলোচনা থেকে এই বিশ্বলোক ও পৃথিবীতে মানুষের মর্যাদা ও দায়িত্বের ব্যাপারটি স্পষ্টত প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। এক্ষণে মানুষের বৈষয়িক জীবনের নিগূঢ় তত্ত্ব এবং তার জীবন-উদ্দেশ্য বুঝতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবু এই প্রসঙ্গটি কুরআনের আলোকে অধ্যয়ন করাই বাঞ্ছনীয়। আমরা সেই আলোচনা এখানে পেশ করছি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-philosophy-of-the-quran-ethics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6986</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কঠিন সময়ের শিক্ষাঃ করোনা ভাইরাস ফ্যাক্ট </title>
		<link>https://rowyakbd.com/teachings-of-hard-time/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/teachings-of-hard-time/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 24 Jul 2021 06:37:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[কঠিন সময়ের শিক্ষাঃ করোনা ভাইরাস ফ্যাক্ট]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=5671</guid>

					<description><![CDATA[আমরা আজ যে কঠিন সময় পার করছি এই সময়ে আমাদের আজকের এই চতুর্থ ক্লাসে আমাদের ইবাদতের জিন্দেগী নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আপনারা জানেন এক সপ্তাহ পরে রমজান মোবারক আসছে। আমরা যে মুসাফিরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি সেই মুসাফির আমাদের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা আজ যে কঠিন সময় পার করছি এই সময়ে আমাদের আজকের এই চতুর্থ ক্লাসে আমাদের ইবাদতের জিন্দেগী নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আপনারা জানেন এক সপ্তাহ পরে রমজান মোবারক আসছে। আমরা যে মুসাফিরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি সেই মুসাফির আমাদের মাঝে আগমন করবে। ইনশাল্লাহ এই বছরও এই পবিত্র রমজান আমাদের জন্য নিয়ামতের ফল্গুধারা এবং রহমত বয়ে আনবে। কিন্তু এই বছর মাহে রমজান ভিন্ন একটি দুনিয়ার সাক্ষাৎ পাবে। দুনিয়ার সকল মসজিদ সমূহ বন্ধ পাবে। উৎসব মুখর পরিবেশে আদায়কৃত শুধুমাত্র তারাবিহ নামাজসমূহই নয়, ওয়াক্ত নামাজসমূহও মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে আদায় করতে পারব না। আমাদের সাপ্তাহিক ঈদ এবং ইসলামের বড় একটি শায়া’য়ির জুমু’য়া নামাজসমূহকে আদায় করতে পারবো না। কা’বাতুল্লাহ বন্ধ। যেমনটা প্রতি বছরই হয়ে থাকে তেমনি ভাবে এই বছর আমাদের কেউ তাদের অন্তরের প্রশান্তির জন্য উমরাহ করতে যেতে পারবে না এবং তাওয়াফ করতে পারবে না। এই বছর হজ্জ বাতিল করা হয়েছে। হয়তোবা এই বছর কেউ ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আরাফাতে অবস্থান করবে না। এই অবস্থা শুধুমাত্র আমাদের জন্য নয়, সমগ্র দুনিয়ার অবস্থা আজ একই রকম। একজন মুসলিম হিসেবে এটা যে আমাদের জন্য কত দুঃখের এবং উদ্বিগ্নের তা নিজের জীবন থেকে অনুভব করছি। কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইবাদতের পন্থা, ইসলামের বিশ্বজনীন ইবাদতের মূলনীতিসমূহ এবং ইসলামের মসজিদ ও ইবাদতগাহের ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গী সেটাকে সামনে রেখে যখন চিন্তা করি তখন মানসিকভাবে প্রশান্তি পাই।</p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আজকে আমাদের এই আলোচনায় এই সকল বিশ্বজনীন মূলনীতি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>প্রথমতঃ</strong> আমরা বিশ্বাস করি যে সমগ্র দুনিয়াই আমাদের জন্য মসজিদ। রাসূলে আকরাম (সঃ) বলেছেন, جُعِلَتْ لِىَ الأَرْضُ مَسْجِدًا , </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ পৃথিবীকে আমাদের জন্য মসজিদ বানানো হয়েছে। (বুখারী, কিতাবুস সালাত-৫৬)।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই বিষয়টি যেন আমরা ভুলে না যাই। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>দ্বিতীয়তঃ</strong> আমাদের ইবাদতসমূহের মধ্যে কোনো ধরণের ওসিলার (মাধ্যম) প্রয়োজন নেই। আমাদের নামাজ, তসবিহ, তিলাওয়াত ও জিকিরের জন্য কোনো ধরণের ওসিলার দরকার নেই। আজ পৃথিবীতে যত ধর্ম রয়েছে তার মধ্যে আমাদের দ্বীন ইসলামই কেবলমাত্র এই বিশেষত্বের অধিকারী। যে দ্বীনে ইবাদত সমূহ কবুল হওয়ার জন্য কোন ধরণের ওসিলার প্রয়োজন নেই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>তৃতীয়তঃ</strong> আমাদের ইবাদতের ধারণা শুধুমাত্র জানা ইবাদতসমূহ কিংবা আমাদের ফিকহের গ্রন্থসমূহে ইবাদাতে মারসুমা বা আনুষ্ঠানিক ইবাদত যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্জ এবং উমরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>চতুর্থতঃ</strong> আমাদের ইবাদতগাহ সম্পর্কে ভিন্ন একটি চিন্তা রয়েছে। সেটি হল, আমাদের ইবাদতগাহসমূহ ইবাদতের জন্য কোনো পূর্বশর্ত নয়। অন্যান্য ধর্মের পূজারস্থান সমূহের মত আমাদের ইবাদতগাহসমূহ মূর্তি কিংবা ছবিতে পূর্ণ কোন স্থান নয়। আমাদের ইবাদতগাসমূহ, রূহসমূহ এবং অন্তর সমূহকে একত্রিতকারী জায়গা, তাওহীদের একটি স্থান। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>পঞ্চমতঃ</strong> কঠিন সময়ে কিংবা প্রয়োজনে আমরা কিভাবে ইবাদত করবো সেই বিষয় সমূহকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনাকারী আমাদের বিশ্বজনীন একটি ইবাদতের ফিকহ রয়েছে এবং ফিকহের একটি উসূল ও মেথডোলজি রয়েছে।  </span></p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সকল মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে আমি বলতে চাই যে, মসজিদসমূহ বন্ধ থাকা, জুমুয়া’র নামাজ আদায় করতে না পারা, হজ্জ এবং উমরা করতে না পারা আমাদের রবের প্রতি আমাদের যে ইবাদতের দায়িত্ব রয়েছে সেই দায়িত্ব থেকে বিরত রাখবে না। আমাদের সকল অবস্থাকেই আমরা আরও অনেক বড় একটি ইবাদত ও রহমতে রূপান্তরিত করতে পারি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">নামাজ অবশ্যই দ্বীনের মূলস্তম্ভ। এর মাধ্যমে মানুষ তার রবের সাথে দিনে পাঁচবার সাক্ষাৎ করে থাকে। বিশেষ করে যুবক ভাইয়েরা যেন আমাদের রবের সাথে দিনে পাঁচবার সাক্ষাৎ করা থেকে মাহরুম না হয়। কিন্তু আমাদের ইবাদতসমূহ কেবলমাত্র নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের ইবাদতের ধারণায় আমাদের সমগ্র জীবনটাই ইবাদত। আমাদের জীবন, আমাদের প্রজন্ম, আমাদের সন্তান-সন্ততি এবং সমাজকে রক্ষা করার জন্য আমাদের ঘরে অবস্থানকে ইবাদতে রূপান্তরিত করতে পারি। এই সামর্থ্য আমাদের রয়েছে। </span></p>
<blockquote><p><strong>সকল ধরণের আমলে সালেহই ইবাদত। সকল ধরণের ভালো কাজ ইবাদত। জ্ঞান অর্জন করা ও প্রচার করা ইবাদত। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া ইবাদত। মানুষকে সাহায্য করা ও তাদেরকে সু-সংবাদ দেয়া ইবাদত। সকল ধরণের খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা, অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ইবাদত। মা লা ইয়া’নিয়ি  (مالا يعنيه)  তথা সকল প্রকার অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে পরিত্যাগ করা, নিরর্থক, ফায়দাবিহীন এবং উদ্দেশ্যবিহীন কাজসমূহ থেকে দূরে থাকা ইবাদত। যে সকল বিষয় মানুষকে কষ্ট দেয় সে সকল বিষয়কে দূর করে দেওয়া ইবাদত। রাসূল (সঃ) ঈমানের পরিচয় পেশ করার সময় এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। মানুষের অভাব দূর করে দেওয়া, মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করা ইবাদত। ধৈর্য ধারণ করা এবং তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ইবাদত। যে কোন মানুষের সাথে হাসি মুখে কথা বলা, উত্তম কথা বলা ইবাদত। ইবাদতের ব্যপারে ইসলামের অনেক বিস্তৃত একটি ধারণা রয়েছে। তবে হ্যা, মৌলিক ইবাদসমূহকে বাদ দিয়ে নয়। </strong></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">মসজিদে জামায়াতের সাথে নামাজ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। কিন্তু আমাদের জীবন রক্ষা করা ফরজ। জেনেশুনে অন্যের রোগাক্রান্ত হওয়ার জন্য কারণ হওয়া  হারাম। ফলশ্রুতিতে একটি সুন্নতকে পালন করতে গিয়ে অবশ্যই আমরা ফরজকে পরিত্যাগ করতে পারি না। সুন্নতকে পালন করতে গিয়ে আমরা যেন হারাম কাজ না করি। এই ওসিলায় আমরা আমাদের ঘরকে ইবাদতগাহে পরিণত করতে পারি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">জুমুয়া’র নামাজ অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সামাজিক একটি ইবাদত এবং ইসলামের অনেক বড় একটি শিয়া’র (নিশানা)। কিন্তু এখানে মূল বিষয় হল সময়। নামাজ এখানে মূল বিষয় নয়। মূল বিষয়, জুমুয়ার দিন। দুই রাকায়াত জুমুয়া’র নামাজ যোহরের নামাজের পরিবর্তে বা পরিপূরক হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। যখন এই পরিপূরক বা পরিবর্তিত বিষয়টিকে আদায় করতে না পারবে তখন মূলে ফিরে যাবে এবং যোহরের নামাজ আদায় করবে। আমাদের ফিকহ এটাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। </span></p>
<p><strong>যে সকল ভাইয়েরা উমরা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কিন্তু যেতে পারছেন না তারা উমরার জন্য জমাকৃত টাকাকে এই কঠিন সময়ে গরীব, দুঃখী ও অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কার পেতে পারেন। কাবার চতুর্দিকে যে তাওয়াফ করতেন সেই তাওয়াফ তারা আল্লাহর গরীব-দুঃখী বান্দা, এতিম ও মিসকিনদের অন্তরের চতুর্দিকে করতে পারেন। তবে হ্যা। যখন কাবা খোলা থাকবে এবং যেতে কোন বাঁধা থাকবে না তখন এগুলো একটি অপরটির পরিপূরক নয়। কেউ আবার আমার কথাকে ভূল বুঝবেন না। কিন্তু এখন যেহেতু রাস্তা ও কাবা উভয় বন্ধ তাই এই সকল বিষয়কে অনায়াসেই বেছে নেওয়া যেতে পারে। রাসূলে আকরাম (সঃ) একদিন কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় কাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন,  ما أَطْيَبَكِ , তুমি কতই না সুন্দর, ما أَطْيَبَ رِيحَكِ , তোমার গন্ধ কতই না পবিত্র, ما أعظمَكَ , তুমি কতই না মহান, ما أَعْظَمَ حُرْمَتَكِ তোমার সম্মান কতই না সু-উচ্চে, والذي نَفْسُ محمدٍ بيدِهِ لَحُرْمَةُ المُؤْمِنِ أعظمُ عِنْدِ اللهِ حُرْمَةً مِنْكِ , সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, নিঃসন্দেহে একজন মু’মিনের সম্মান আল্লাহর কাছে তোমার সম্মানের চেয়ে বেশী, অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, একজন মু’মিনের কালব তোমার চেয়ে অনেক বেশী মহান। ( ইবনে মাজা, ফিতান-২, আলবানী, সাহিহুত- তারগিব, ২৪৪১)। রাসূল (সঃ) কাবাকে উদ্দেশ্য করে এমন কথা বলেছেন। আমি মনে করি, এই বছর আমাদের ঐ সকল জাঁকজমক পূর্ণ ইফতার মাহফিলসমূহ একটি সুযোগে পরিণত হবে। আমাদের খাবার টেবিলের ঐ সকল বাহারি ইফতারসমূহের টাকা যদি আমরা গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেই তাহলে তা আমাদেরকে তাদের দস্তরখানায় আমাদেরকে আরও ভালোভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রিয় ভাইয়েরা, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এখন আমি উসূলের দৃষ্টি কোন থেকে আমাদের বর্তমান অবস্থাকে সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরতে চাই। ইসলামের সকল হুকুম সমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>জারুরিয়্যাতঃ</strong> যা না হলেই নয়, খুবই জরুরী। এমন জরুরী হুকুম যা কোনো ক্রমেই বাদ দেওয়া যাবে না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>হাজিয়্যাতঃ</strong> জীবনকে সহজকারী বিষয়সমূহ। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>তাহসিনিয়্যাতঃ</strong> প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য। বিশেষ করে সৌন্দর্য ও রুচিশীলতা। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>জারুরিয়্যাতঃ</strong> যা না হলেই নয়, খুবই জরুরী। না হলেই নয় এই মূলনীতির আওতায় পাঁচটি মৌলিক বিষয় রয়েছে, এগুলো যেন আমরা কক্ষনোই ভূলে না যাই। যেগুলো হলঃ <strong>জান, মাল, আকল, নাসল (বংশ) এবং দ্বীনকে রক্ষা করা</strong>। তবে, মাল, আকল, নাসল এবং দ্বীনের রক্ষা সব সময় জান রক্ষার পরে আসে। কারণ দ্বীনসহ সকল <strong>মুকাল্লিফিয়্যাত</strong> (দায়িত্ব) মানুষের জীবন রক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন মানুষ মহাপ্রলয় (কিয়ামত) পর্যন্ত নিজেদের জীবনকে রক্ষা করতে পারে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এর আলোকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে সুস্পষ্ট ভাবে মূলনীতিসমূহ পেশ করেছেন। সেই মূলনীতিসমূহ হল, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدّ۪ينِ مِنْ حَرَجٍۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠিন বিষয় আরোপ করেননি, তিনি তোমাদের কাছ থেকে কঠিন কোন কিছু চান না। (সূরা হজ্জ-৭৮) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">يُر۪يدُ اللّٰهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُر۪يدُ بِكُمُ الْعُسْرَ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> অর্থঃ আল্লাহ তোমাদের সাথে নরম নীতি অবলম্বন করতে চান, কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না ৷ (সূরা বাকারা-১৮৫)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْساً اِلَّا وُسْعَهَاۜ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ আল্লাহ কারোর ওপর তার সামর্থের অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপান না ৷ (সূরা বাকারা-২৮৬)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাসূলে আকরাম (সঃ) বলেছেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">নিঃসন্দেহে, দ্বীন হল সহজ বিষয়। (বুখারী, কিতাবুল ঈমান-২৯)</span></p>
<p>আমরা যে এক কঠিন সময় পার করছি এই সময়ে আমাদের সকল ব্যক্তিগত ইবাদতের সাথে সাথে এই সময়ে আমাদেরকে নিয়ে এবং সমগ্র মানবতাকে নিয়ে চিন্তার করার একটি সময়। আমাদের এই সকল ইবাদতসমূহ তাফাক্কুরে রূপান্তরিত করতে পারি।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">পবিত্র কোরআনে <strong>‘ইবরাত’</strong> নামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষা রয়েছে। নয় জায়গায় উল্লেখিত ‘ইবরাত’ শুধুমাত্র একটি শব্দ নয়, আমার মতে শুধু একটি পরিভাষাও নয়। আমি মনে করি এটি একটি বুঝার পন্থা (Method of Understanding)। বুঝা এবং বিশ্লেষণের উসূল। <strong>বিশ্ব মানবতা হিসেবে যে সকল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হয় সেই সকল চ্যালেঞ্জকে আকল, ইদরাক (উপলব্ধি) এবং বাসিরাত (দূরদৃষ্টি) দিয়ে মূল্যায়ন করার পন্থা হল ‘ইবরাত’</strong>। ইবরাত হল, বস্তু (মেটারিয়াল) থেকে অর্থ (মিনিং) র দিকে, স্বপ্নের জগত থেকে হাকিকতের দুনিয়ায় পদার্পণ করার নাম। এক অর্থে, ডাইমেশন (মাত্রা) পরিবর্তন করা। ইবরাত (عبرة ) হল; মহাবিশ্ব নিয়ে এবং একই সাথে আল্লাহ তার এই সৃষ্টির উপর যে বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো নিয়ে  এবং সর্বোপরি সুন্নাহতুল্লাহ নিয়ে চিন্তা করা। কঠিন অভিজ্ঞতাসমূহকে আকল দিয়ে চিন্তা (তাফাক্কুর) করে দূরদৃষ্টি দিয়ে শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ খুঁজে বের করা। ইবরাত (عبرة ) এর শাব্দিক কোন অর্থ নয়। ঘটনাসমূহের কারণ এবং ফলাফলের উপরে দূরদৃষ্টি দেওয়া, গভীর ভাবে চিন্তা করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা খুঁজে বের করা। মূলত ইবরাত (عبرة ), শব্দবিহীন এবং উচ্চারণবিহীন ইলাহী একটি আওয়াজ। আমাদের অন্তরের আবেগ, অনুভূতি এবং চিন্তার গোপন একটি বহিঃপ্রকাশ হওয়ার কারণে, আরবীতে চোখের পানির অপর নাম হল ইবরাত (عبرة )। অনেক আয়াতে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীসমূহ, ঐতিহাসিক কাহিনীসমূহ আমাদের উদ্দেশ্য বিবৃত করার পর কোরআনে কারীম বলে থাকে যে,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِي الْأَبْصَارِ﴾)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ এখানে বাসিরাত (দূরদৃষ্টি) সম্পন্ন লোকদের জন্য ইবরেত (শিক্ষা) রয়েছে। (সূরা নূর-৪৪)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَاعْتَبِرُوا يَٓا اُو۬لِي الْاَبْصَارِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ শিক্ষা (ইবরাত) গ্রহণ করো হে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লোকেরা। (সূরা হাশর- ৫৯)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাফাক্কুর (গভীর চিন্তা) এবং বাসিরাত (দূরদৃষ্টি) ছাড়া ইবরাড (শিক্ষা) গ্রহণ করা সম্ভব নয়।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রিয় ভাইয়েরা,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিশ্ব মানবতা হিসেবে আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি যে সময়ে আমরা অনেক বড় বড় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে, আমাদের নফসকে নিয়ে, সৃষ্টিকে নিয়ে, সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে নিয়ে, সৃষ্টির হিকমতকে নিয়ে, দুনিয়া এবং সমগ্র মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার সময়। সবচেয়ে বড় শিক্ষা (ইবরাত) এটাই। আজকে আমরা যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেই অবস্থাকে যদি শুধুমাত্র চীনে প্রকাশিত হওয়া এবং পরবর্তীতে সমগ্র দুনিয়াকে গ্রাসকারী একটি মহামারী রোগ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে সঠিক শিক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা যদি এই অবস্থাকে ইবরাত এর সঠিক অর্থের আলোকে পাঠ করি তাহলে এই অবস্থা আমাদেরকে এবং সমগ্র মানবতাকে চিৎকার করে বলেছেঃ</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">হে মানব জাতি! এই দুনিয়ার প্রতি ও প্রকৃতির প্রতি মালিকের মত আচরণ করো না। এই দুনিয়ার প্রতি ও প্রকৃতির প্রতি মালিকের মত আচরণ করা থেকে এবং এই দুনিয়ায় যথেচ্ছা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাক। তোমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছ সেখান থেকে বিরত থাকো। পৃথিবীকে বিনির্মাণ করার জন্য প্রতিযোগিতা করো।</span></p>
<p>মহান আল্লাহ কি তার মহাগ্রন্থে বলেন নিঃ</p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">هُوَ اَنْشَاَكُمْ مِنَ الْاَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ ف۪يهَا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যেন এই পৃথিবীকে বিনির্মাণ করো, এটা তিনি চান। (হুদ-৬১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আসুন, পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা থেকে আমরা বিরত থাকি। ইসলাহর নামে এই দুনিয়াকে ধ্বংস করবেন না। এই মহাবিশ্ব সকল নিয়ামতসমূহ আপনাদের নিকট আমানত। দয়া করে এই আমানতের খিয়ানত করবেন না। আমরা যে সময় অতিক্রম করছি এই সময় আমাদেরকে চিৎকার করে এই আহবান জানাচ্ছে। আপনারা একই মাটির একই পানির সন্তান। একই বাতাস থেকে আপনারা নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আল্লাহ আপনাদেরকে যে নিয়ামত দিয়েছেন সেই নিয়ামত গুনে শেষ করতে পারবেন না। কোনো কিছুর পরওয়া না করে এই বাতাসকে যেভাবে দূষিত করছেন তা থেকে বিরত থাকুন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মানুষগণ, মাটিকে ধ্বংস করো না! হে মানুষগণ পানিকে দূষিত করো না। হে মানুষগণ হালাল ও পবিত্র জিনিস ভক্ষণ করো। হে মানুষগণ নিকৃষ্ট ও খারাপ বিষয় সমূহ থেকে দূরে থাকো। হে মানুষগণ এই প্রকৃতি হলো মুসলিম। কারণ তারা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। আর যে বা যারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে তারাই মুসলিম।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَلَهُٓ اَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمٰوَاتِ وَالْاَرْضِ ,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ আকাশে ও জমিনে যা কিছু আছে সকল কিছুই আল্লাহর নিকট সমর্পণ করেছে। (আলে ইমরান-৮৩)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই জন্য প্রকৃতির ধারা ও বিন্যাসকে নষ্ট করবেন না, তাদের আত্মসমর্পণে হস্তক্ষেপ করবেন না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মানব জাতি, আল্লাহ যে মানব জাতিকে সম্মানিত করেছেন সেই মানুষদেরকে সম্মান করুন, তাদেরকে মূল্যায়ন করুন। তবে সাবধান! আল্লাহর চেয়ে মানুষকে বেশী মূল্য দিবেন না। সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুবরণ করেছে (নাউযুবিল্লাহ) এই ধরণের বানোয়াট দার্শনিক চিন্তা থেকে দূরে থাকুন। আপনাদের দুর্বলতার কথা ভুলে যাবেন না। নিজেদের দুর্বলতাকে ঢেকে রাখার জন্য যে অহংকারের পোশাক পরিধান করেছন, এই পোশাককে খুলে ফেলুন। হে মানুষ সকল! সকল কিছুকে বস্তুবাদী চোখে দেখা থেকে ফিরে আসুন। মানুষকে শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করবেন না। রূহের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকুন। এই বস্তু জগত ছাড়াও যে মেটাফিজিক্যাল এবং আধ্যাত্মিক একটি জগত রয়েছে সেটাকে ভুলে যাবেন না। মহাকাশ নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা বন্ধ করুন, এই লক্ষ্যে মানুষকে যে গোলামী জিঞ্জিরে আবদ্ধ করছেন সেখান থেকে ফিরে আসুন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মানব জাতি! জ্ঞানের পেছনে ছুটে চলুন। জ্ঞান থেকে বিরত থাকবেন না। জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নতুন আবিষ্কার অব্যাহত রাখুন। কিন্তু জ্ঞানকে শুধুমাত্র আকলের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় বলে মনে করবেন না। বিজ্ঞানকে পবিত্র একটি ডগমায় রূপান্তর করবেন না। বিজ্ঞানকে মানুষ এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন না। রাসায়নিক অস্ত্রের প্রস্তুতি ও ব্যবহার থেকে ফিরে আসুন।</span></p>
<p><strong>হে মানুষগণ! রাজনীতিকে অহংকার এবং আত্মম্ভরিতা, শক্তি ও ক্ষমতার নেশায় সাম্রাজ্য পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। বরং রাজনীতিকে, আখলাক, আদালত এবং রহমতের মাধ্যমে মানুষকে সেবার মাধ্যমে রূপান্তরিত করুন। সুন্দর একটি দুনিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করুন। বিশ্বায়নের নামে সমগ্র দুনিয়াকে শাসন করার আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত থাকুন।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা আজ যে সময় অতিক্রম করছি এই সময় আজ আমাদেরকে এই সকল কথাই বলছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মানব জাতি! এই দুনিয়াকে সব সময় পূর্ব ও পশ্চিম দিয়ে ভাগ করবে না। পূর্বও আল্লাহর, পশ্চিমও আল্লাহর।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">لِلّٰهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُۜ,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর ৷</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ আল্লাহ পূর্বেরও রব, পশ্চিমেরও রব।</span></p>
<blockquote><p><strong>হে প্রাচ্য, সব সময় পশ্চিমকে অভিশাপ না দিয়ে পাশ্চাত্যের আকাশে উদিত সূর্য হও। হে পাশ্চাত্য, প্রাচ্যকে সবসময় ছোট না ভেবে প্রাচ্যের আকাশে উদিত হওয়া সূর্য থেকে উপকৃত হও।</strong></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমান অবস্থা আমাদেরকে আরও একটি বার্তা দিচ্ছে সেটা হলো, দুনিয়াকে মূল্য দিন। কিন্তু মানব জীবন যে শুধু দুনিয়ার জীবনের সাথেই সম্পৃক্ত নয় এর উপরে ঈমান আনুন। চিরস্থায়ী বিষয়কে অস্থায়ী একটি জিনিসের বিনিময়ে উৎসর্গ করবেন না। আমাদের এই দুনিয়ার জীবন, চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবনের প্রথম দরজা মাত্র। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, দুনিয়ার জীবন চিরন্তন জীবনের প্রথম প্রহর। জান্নাতের বীজ আমরা এই দুনিয়া নামক বাগানেই বপন করি। জাহান্নামের আগুনকেও আমরা এই দুনিয়া নামক জায়গা থেকেই নিয়ে যাবো।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُۚ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। (সূরা আল বাকারা-২৪)</span></p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আজকে আমরা যে সময় অতিক্রম করছি, এই সময়টি আমাদের মুসলমানদেরকেও ‘ইবরাত’ এর ভাষায় অনেক কিছু বলছে। মুসলমানদের প্রাচীন ভূমিসমূহ, সভ্যতার প্রানকেন্দ্রসমূহকে ধ্বংস স্তুপে পরিণতকারী যুদ্ধ থেকে কি এখনো বিরত হবেন না? আল্লাহর দ্বীনকে সঠিক ভাবে বুঝুন। নিজেদের ধারণার উপর ভিত্তি করে দ্বীনের নামে যে ভুল চিন্তাধারার সৃষ্টি করেছেন সেগুলোকে পরিত্যাগ করুন। আখেরাতের চিরন্তনতা ও চিরস্থায়ীত্বতা বুঝাতে গিয়ে আপনাকে যে দুনিয়া বিনির্মাণ করার কথা বলা হয়েছে সেই দুনিয়াকে অচ্ছুৎ ও নিচু করে দেখানো দেখে বিরত থাকুন। যারা মানুষকে আল্লাহর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়, মানুষকে আল্লাহর উপর স্থান দেয় আমরা অবশ্যই সেই চিন্তার বিরোধিতা করব, তাদের সমালোচনা করব। কিন্তু এটা করার জন্য যেন আমরা মানুষকে নিচু না বানিয়ে দেই, ইনসানী ও ইসলামী বিষয়কে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে না দেই। যে আইডিওলজি বিজ্ঞানকে ডগমায় পরিণত করে সেই আইডিওলজিসমূহকে আমরা অবশ্যই সমালোচনা করবো। এই সমালোচনা করার সময় আল্লাহ তার সৃষ্টি জগতে যে আইন কানুন নির্ধারণ করেছেন সেই সকল আইন কানুনের তাফসীর বিজ্ঞানকে পরিত্যাগ করা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং আমাদের মানব কল্যাণের জন্য বিজ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। আসুন, আমরা সমগ্র মানব জাতিকে এই মহামারী থেকে উদ্ধার করি। ঔষধ, টিকা এবং শিফা আমরা এবার খুঁজে বের করি। ঔষধ আবিষ্কার করে আমরা এই সওয়াবের ভাগিদার হই। আমাদের মহাগ্রন্থ আল কোরআন কি একজন মানুষের জীবন বাঁচানোকে সমগ্র মানবতার জীবন বাঁচানো সমান হিসেবে দেখে না?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَمَنْ اَحْيَاهَا فَكَاَنَّمَٓا اَحْيَا النَّاسَ جَم۪يعاًۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থঃ আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করলো সে যেন দুনিয়ার সমস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করলো ৷ (মায়েদা-৩২)</span></p>
<p><strong>এবার সমগ্র মানবতাকে বাঁচানোর জন্য একজন মুসলমান এগিয়ে আসুক। নাকি একই ভাবে আগের মত অন্যকেউ যখন এর ঔষধ খুঁজে বের করবে তখন, আমরা তার আখেরাতের অবস্থা কী হবে সেটা নিয়ে বিতর্ক শুরু করব? আমাদের কাজ কি শুধু এটাই, যে সমগ্র মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য একটি ঔষধ বা টিকা আবিষ্কার করল আখেরাতে তার অবস্থা কি হবে সেটা নিয়ে ফতওয়া দেওয়া?</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রিয় ভাইয়েরা,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই অবস্থা আমাদেরকে সমগ্র মানবতাকে নিয়ে নতুন একটি রহমতের চুক্তি করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। সমগ্র মানবতা যেই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হবে, কেউ এই চুক্তির বাহিরে থাকবে না। হ্যা, একটি রহমতের চুক্তির মাধ্যমে আমাদের নতুন একটি জীবন শুরু করা দরকার। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন এর ওসিলায় আমাদেরকে মহামারি থেকে উদ্ধার করেন। আমাদেরকে যেন এই কঠিন পরিক্ষা থেকে মুক্তি দেন। যে ভাইরাস ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ ছাড়া দেখা যায় না, সেই ভাইরাস সমগ্র মানবতাকে কত বড় শিক্ষাই না দিচ্ছে। যার সাক্ষী আমরা সকলেই। মহান আল্লাহ যেন মাহে রমজানের ওসিলায় আমাদেরকে এই মহাবিপদ থেকে মুক্তি দান করেন। আমীন।</span></p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/teachings-of-hard-time/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">5671</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কঠিন সময়ের আখলাকঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/akhlaq-in-hard-times/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/akhlaq-in-hard-times/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 06 May 2021 16:51:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[কঠিন সময়ের আখলাকঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=5283</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু আমি আমার আলোচনার শুরুতেই সমগ্র মুসলিম উম্মাহ, বিশ্বমানবতা যে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দোয়া করছি। এই কঠিন সময়েও জীবন দিয়ে যারা এই মহামারীকে প্রতিহত করার]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম</p>
<p>আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু</p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমি আমার আলোচনার শুরুতেই সমগ্র মুসলিম উম্মাহ, বিশ্বমানবতা যে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দোয়া করছি। এই কঠিন সময়েও জীবন দিয়ে যারা এই মহামারীকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেই সকল ডাক্তার ভাই-বোনদেরকে, নার্সদেরকে এবং তাদের পাশাপাশি মানুষের জরুরী প্রয়োজন সমূহকে পূর্ণ করার জন্য সকল ধরণের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে যারা সেবাকে ইবাদত মনে করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে এবং যারা এই সময়ে বাসায় থেকে বাসার সকল মুরুব্বীকে  সাহায্য করছেন, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সময়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কথাকে মেনে চলা প্রয়োজন। এখন তাদের উপদেশ শুনে সেই অনুযায়ী চলাই মূলত আমাদের পবিত্র দ্বীনেরও আদেশ। কারণ মহান আল্লাহ প্রদত্ত আমানত <strong>‘নিজকে’</strong> রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এখন নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য এবং অন্যকে সংক্রমিত হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য আমাদের ঘরে অবস্থান করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এক অর্থে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাচীরের মত দাঁড়ানোর মত, মানুষকে রক্ষায় পাহারাদারের ভূমিকা পালন করার মত।মহান আল্লাহ আমাদের সকলের জন্য এবং সমগ্র মানবতার জন্য যেন সব কিছুকে সহজ করে দেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আজকের আলোচনায় আমি তিনটি প্রশ্নের জবাব আমার সাধ্যমত অল্প সময়ের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করবো। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>প্রথম প্রশ্ন হলো,</strong> এই কঠিন সময়ে, কঠিন সময়ের ঈমান  এবং কঠিন সময়ের আখলাক বলতে কি বুঝায়? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো,</strong> এই সময়ে আমরা আমাদের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক (Immune) ইমিউন সিস্টেমকে কিভাবে শক্তিশালী করবো?</span></p>
<p><strong>তৃতীয় প্রশ্ন হল</strong>, মানব সভ্যতা হিসেবে আমরা এই সময়কে কিভাবে রহমতে রূপান্তরিত করতে পারি?</p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমি জানি, আজ দারস (শিক্ষা) দেওয়ার সময় নয়, আজ দারস (শিক্ষা) নেওয়ার সময়। আজ হাহাকার করার সময় নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমস্যাকে দূরীভূত করার সময়। আজকে আমি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো আশা করি সামান্য হলেও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এবং সমস্যা সমূহকে দূরীভূত করার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। এই আশা নিয়ে আমি আপনাদের সাথে কিছু বিষয় শেয়ার করতে চাই। </span></p>
<p><strong>আমাদের সকলের উপর অর্পিত দায়িত্ব কি? </strong></p>
<p>রাষ্ট্র-প্রশাসন, ব্যক্তি, পরিবার, যুবক সকলের উপর অর্পিত দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে এই সকল বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করতে চাই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের জীবনে অনেক কঠিন সময় আসে। জাতীয় জীবনেও অনেক কঠিন সময় আসে।সামাজিক জীবনেও অনেক কঠিন সময় আসে। কিন্তু বর্তমান সময়েই হয়তোবা প্রথমবারের মত পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ধনী, দরিদ্র কোন কিছুর মধ্যে ভেদাভেদ না করে কঠিন সময় চলে এসেছে। সমগ্র মানবতা আজ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। মহা-গ্রন্থ আল কোরআন, মানুষকে নিয়ে আলোচনা করা সময় তাদের এই কঠিন সময়কে দুইটি পরিভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">      <strong>  الْبَأْسَٓاءِ</strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">  <strong>     وَالضَّرَّٓاء</strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থাৎ, সমস্যা ও কঠিন সময়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মহামারী, খরা, বালা-মুসিবত, অসুস্থতা এই সকল কিছুর জন্য এই পরিভাষা। যে সকল আয়াতে এই সকল পরিভাষা সমূহ উল্লেখিত হয়েছে সে সকল আয়াতে আমাদেরকে কঠিন সময়ের ঈমান এবং কঠিন সময়ের আখলাকের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। কঠিন সময়ের ঈমান হলো অনেক আশা ভরসা নিয়ে মহান প্রভুর কাছে দোয়া করা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষকে আশার বাণী দেওয়া, তাদের হৃদয়ে ভালোবাসার সৃষ্টি করা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো- কখনোই হতাশ না হওয়া। কঠিন সময়ে যে বিষয়টি মু&#8217;মিনের সাথে একেবারেই যায় না সেটা হলো হতাশ হয়ে পড়া।</span></p>
<p><strong>মহাগ্রন্থ আল-কোরআন মানুষের দুইটি ভুলকে তুলনামূলক ভাবে উল্লেখ করে থাকে </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সেটা হলো, যখন অবস্থা ভালো থাকে তখন অকৃতজ্ঞের মত আচরণ করে, আর যখন অভাব-অনটন কিংবা কোন সমস্যায় পড়ে তখন আশাহত হয়ে পড়ে। এই উভয় বিষয়টিকে কোরআন একই ধরণের ভুল হিসেবে গণ্য করে থাকে এবং মানুষের এই আচরণ কিংবা বৈশিষ্ট্যকে নিয়ে কোরআনের অনেক স্থানে সমালোচনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা ইসরায় মু’মিনের এই বিষয়কে এইভাবে উল্লেখ করেছেন-</span></p>
<p><strong>  وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنسَانِ أَعْرَضَ وَنَأَىٰ بِجَانِبِهِ ۖ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَئُوسًا</strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ, মানুষের অবস্থা হচ্ছে এই যে, যখন আমি তাকে নিয়ামত দান করি, তখন সে গর্ব করে ও পিঠ ফিরিয়ে নেয় এবং যখন সামান্য বিপদের মুখোমুখি হয় তখন হতাশ হয়ে যেতে থাকে ৷ (সূরা বনী ইসরাইল-৮৩)</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই একই বিষয় দেখুন সূরা রুমে মহান আল্লাহ কিভাবে উল্লেখ করেছেন,</span></p>
<p><strong>  وَإِذَا أَذَقْنَا النَّاسَ رَحْمَةً فَرِحُوا بِهَا</strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ, যখন লোকদের দয়ার স্বাদ আস্বাদন করাই তখন তারা তাতে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।</strong></p>
<p><strong> وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ إِذَا هُمْ يَقْنَطُونَ</strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ,  যখন তাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফলে তাদের ওপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন সহসা তারা হতাশ হয়ে যেতে থাকে ৷</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের আচরণ ও অবস্থাকে মহান আল্লাহ সমালোচনা করেছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই একই বিষয়কে মহান আল্লাহ সূরা ফুসসিলাতে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন,</span></p>
<p><strong>  لَا يَسْأَمُ الْإِنْسَانُ مِنْ دُعَاءِ الْخَيْرِ</strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ, কল্যাণ চেয়ে দোয়া করতে মানুষ কখনো ক্লান্ত হয় না ৷</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> <strong>  وَإِنْ مَسَّهُ الشَّرُّ فَيَئُوسٌ قَنُوطٌ</strong></span></p>
<p><strong>অর্থাৎ, আর যখন কোন অকল্যাণ তাকে স্পর্শ করে, তখন সে হতাশ ও মনভাঙ্গা হয়ে যায় ৷</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কঠিন সময়ের ঈমান বলতে আমি এই সকল বিষয়ের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। মু&#8217;মিন যতই কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হোক না কেন, কখনোই আশাহত হবে না এবং মহান রবের উপর ভরসা করে অনেক আশা নিয়ে এই সকল অবস্থাকে পরিবর্তন করার জন্য চেষ্টা করবে।  একই আয়াত সমূহে একই সাথে কঠিন সময়ের আখলাক সমূহও রয়েছে। কঠিন সময়ের আখলাক হলো <em>ইহসানের</em>  আখলাক, কঠিন সময়ের আখলাক হলো<em>পরার্থপরতার</em>  আখলাক, <em>ইনফাকের </em> আখলাক, <em>ক্ষমার</em>  আখলাক, <em>ধৈর্যের</em>  আখলাক। এই সকল বিষয় একই আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে। মুলতঃ কঠিন সময়ের আখলাক হলো ইহসান।</span></p>
<p><strong>ইহসান হলো, সকল ধরণের খারাপ বিষয়কে ভালোর দ্বারা প্রতিহত করা, কাজকে সহজভাবে তুলে ধরা। এই কঠিন সময়ে কোন ভাইয়ের জীবনই যেন বিপন্ন না হয় এজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>কঠিন সময়ের আখলাক হলো ‘ইসার’।</strong> ইসার কাকে বলে?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সর্বাবস্থায় অন্যকে, অপর ভাইকে নিজের উপর প্রাধান্য দেয়া, প্রতিবেশীকে নিজের উপর প্রাধান্য দেয়া। </span></p>
<p>কঠিন সময়ের আখলাক হলো ইনফাকের আখলাক। নিজের যা কিছু আছে সব কিছুকে অপর ভাইয়ের সাথে শেয়ার করা। কঠিন সময়ের আখলাক হলো ক্ষমার আখলাক। সব সময় ক্ষমাশীল হওয়া, দয়াশীল হওয়া এবং গঠনকারী হওয়া। কঠিন সময়ের আখলাক হলো ধৈর্যের আখলাক।</p>
<p><strong>প্রিয় ভাই  ও বোনেরা </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><em>কোরআনে যে ধৈর্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার অর্থ সহ্য করা কিংবা কোন ভাবে পার করে দেয়া নয়। কোরআনে যে ধৈর্যের কথা বলা হয়েছে তার অর্থ হলো, প্রতিরোধী হওয়া; অন্যায় এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রেরণাকে কখনোই হারিয়ে না ফেলা। </em>এই সকল বিষয়কে কোরআনে এই ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">     <strong>الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ </strong></span><strong>وَاللّٰهُ يُحِبُّ الْمُحْسِن۪ينَۚ  </strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ–ত্রুটি মাফ করে দেয় ৷ আর এ ধরনের সৎলোকদের আল্লাহ অত্যন্ত ভালোবাসেন ৷</strong></p>
<p><strong>প্রিয় ভাই  ও বোনেরা </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই সেটা হলো, </span><strong>আমাদের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক ইমিউন সিস্টেম নিয়ে । </strong><span style="font-weight: 400;">ইনশাল্লাহ মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে এই কঠিন সময় পার হয়ে যাবে। কিন্তু এই সময়ে আমরা যে মর্যাদা ও আখলাকী আচরণ অর্জন করব তা আমাদের কাছে থেকে যাবে। এই সময়ে একটি ভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়ার জন্য আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে (শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) শক্তিশালী রাখা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একই সাথে জাতি হিসেবে ও উম্মাহ হিসেবে আমাদের রুহী, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করা আরও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ।</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">এই কঠিন সময়ে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন নামক আমানতকে রক্ষা করা, তাঁর সবচেয়ে বড় আদেশ সমূহের একটি। আমি আমার আলোচনার শুরুতেও এই কথা বলেছি। কিন্তু; একদিক দিয়ে আমাদের শরীরকে রক্ষা করার সময় অপর দিকে আমাদের ঐক্য, একতা এবং ভ্রাতৃত্ব যেন বিনষ্ট না হয় এই জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এক দিক থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি। সকলেই আমাদেরকে এই উপদেশ দিচ্ছে। কিন্তু অপরদিক থেকে আমরা যেন আমাদের মধ্যকার বন্ধনকে শক্তিশালী করার কথা ভুলে না যাই। একদিক থেকে শারীরিকভাবে একত্রিত হওয়া থেকে মাহরুম হচ্ছি, মুসাফাহা পর্যন্ত করতে পারছি না।</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এই সময়ে আমাদের মধ্যকার আন্তরিক সম্পর্ককে বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। একদিক থেকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখছি এবং আমাদেরকে বারংবার এই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা আমরা অবশ্যই করব। অপর দিক থেকে সামাজিক ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বকে রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। </span></p>
<p><strong><em>যে সকল ভাষা আমাদেরকে মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে ও দূরত্ব বাড়ায় সেই সকল ভাষা থেকে দূরে থাকবো। সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্ত্বা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশী সতর্ক থাকবো। আমরা নিকট অতীতে আমাদের জাতিকে যে বিভাজন করেছি ও নিজেরা বিভাজিত হয়েছি সেটাকে ভুলে যেতে হবে। </em></strong></p>
<p><strong>প্রিয় ভাই  ও বোনেরা </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই মুসিবত আজ হোক কিংবা কাল হোক পার হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু এই সময়ে যদি আমরা কারও মনে কষ্ট দেই তাহলে কিন্তু সেটা থেকে যাবে, খুব সহজেই সেই ক্ষত দূর হবে না। </span></p>
<p><em><span style="font-weight: 400;">সাবধান ! আসুন কারও মনে কষ্ট না দেই। মানবতা এই ধরণের কঠিন সময় পাড়ি দেয়ার সময় সকল প্রতিষ্ঠানের সকলের উপরে আলাদা আলাদা দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পিত হয়ে থাকে। </span></em></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমি পুনরায় একথা বলতে চাই যে, &#8220;আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ ভাবে এই কঠিন সময়কে পাড়ি দিতে পারব ইনশাআল্লাহ। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আজকে আমরা সকলেই ঘরের মধ্যে থাকলেও আমাদের মানবিক, ইসলামী ও আখলাকী দায়িত্ব সমূহ চলমান রয়েছে। বিশেষ করে, এই কঠিন সময়ে বিত্তশালী ভাইদের উপর অনেক বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। </span></p>
<p><strong>প্রিয় ভাই  ও বোনেরা </strong></p>
<p><strong>এমন অনেক ভাই আছেন যারা দিন আনেন দিন খান। তারা আজ বাধ্য হয়ে ঘরের মধ্যে অবস্থান করছেন। এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদের সমাজে রয়েছে যা আমরা সকলেই জানি। আজ জমা করার দিন নয়, দান করার দিন, সকলে মিলে এক সাথে খাওয়ার দিন। আসুন আজকের এই দিনে কোরআনের এই আয়াতের উপর আমল করি</strong></p>
<p><strong>  وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَۚ</strong></p>
<p><strong>‘আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি সেখান থেকে তারা অন্যকে দান করে ।’</strong></p>
<p><strong> আসুন সকলেই যার যার অবস্থান থেকে দান করি। আমরা নিজের জন্য যা চাই, অপরের জন্যও তা চাওয়ার সময় আজ।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আজ আমরা এমন দিন অতিক্রম করছি যখন আমার নিজেকে নিয়ে যতটুকু চিন্তা করছি অপরকে নিয়ে ততটুকু চিন্তা করার দিন। ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহর মেহেরবানীতে এই কঠিন সময় চলে যাবে। কিন্তু এই সময়ে যে সকল ভালো বিষয় সমূহ আমরা অর্জন করব তা আমাদের কাছে থেকে যাবে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিত্তশালী ভাইদের প্রতি অনুরোধ; যা আমি আমার পূর্বের দারসেও বলেছি, দয়া করা বাস্তব দোয়াকে বৃদ্ধি করুন। তারা কি করতে পারেন? </span></p>
<p><strong><em>ভাড়াটিয়াকে বাড়ি ভাড়া মওকুফ করে দিতে পারেন, এই কথা বলেছিলাম। তার অধীনে যারা কাজ করেন যতদূর সম্ভব তাদের বেতন দেওয়া অব্যাহত রাখুন। </em></strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অতীতে যে সকল যাকাতকে দিতে পারি নাই, সে সকল যাকাত দেয়ার উপযুক্ত সময় এটা। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এমনকি সামনের বছর আমরা যে যাকাত দিব তা আমরা এই বছরই দিয়ে দিতে পারি। যাকাত দেওয়ার জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত কিন্তু আগেও হিসাব করে দেওয়া সম্ভব বলে আমি মনে মনে করি। এই সময়ে আমাদের পারিবারিক জীবন আরও অনেক বেশী গুরুত্বের দাবিদার। বাধ্য হয়ে আমরা  আজ আলাদা অবস্থান করছি  এবং কোরআনে কারীমেও উল্লেখিত</span><span style="font-weight: 400;"> রমজানের শেষ দশ দিনে আমরা যে ই&#8217;তিকাফ করি সেই ই&#8217;তিকাফের চেতনাকে ধারণ করে আমাদের এই একাকিত্বকে ই’তিকাফের মত বরকতময় করে তুলতে পারি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্যাসিভ কোন আইসোলেশন নয়, একটিভ আইসোলেশনে রূপান্তর করি। এই মুসিবত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদেরকে প্রত্যেকের উপর অর্পিত দায়িত্বকে আমরা</span> যেখানেই থাকি না কেন সেখান থেকেই পালন করার চেষ্টা করি।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সময়ে আমরা আমাদের ঘর-বাড়ি ও বাসাকে দু-জাহানের কামিয়াবের স্থানে রূপান্তরিত করতে পারি। এই সময়ে সব জায়গায় সুন্দর একটি শ্লোগান ভাইরাল হয়েছে, সবাই বলেছেন যে, বাসা জীবনকে ধারণ করতে পারে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হ্যাঁ, বাসা শুধু মাত্র দুনিয়াবী জীবনকেই নয়,  মূলত আখেরাতের জীবনকেও  ধারণ করতে পারে। উভয় জীবন যেন আমাদের বাসা ধারণ করতে পারে, আসুন এই চিন্তা করি।  ইন্টারনেট ও আরও অন্যান্য বৈষয়িক মাধ্যম সমূহকে ব্যবহার করে আমাদের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, দূরে অবস্থানকারী ভাই-বোনদের খোঁজ-খবর নিয়ে এই সময়কে বরকতময় করতে পারি। আধুনিক যুগের প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আমাদের বাসা-বাড়িকে ইলম ও ইরফানের মক্তবে পরিণত করতে পারি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহান আল্লাহ মুসা (আঃ) ও তাঁর ভাইকে উদ্দেশ্য করে একটি বিষয় বলেছিলেন- </span></p>
<p><strong>وَاجْعَلُو بُيُوتَكُمْ قِبْلَةً</strong></p>
<p><strong>তোমরা তোমাদের ঘরকে কিবলায় পরিণত করো তথা ইবাদতগাহে পরিণত করো।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আপনাদের ঘরকে নামাজগাহে পরিণত করুন। এখন এ সকল বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সময়ে আমার প্রিয় যুবক বন্ধুদেরকে কিছু কথা বলতে চাই। </span></p>
<p><strong>প্রিয় যুবকেরা, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সময়ে তোমাদের উপরেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এই সময় নিজেদেরকে রক্ষা করার সময়, পাশাপাশি মুরুব্বীদের প্রতিও খেয়াল রাখবে, তাদের সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। বিশেষ করে এই দিন সমূহে যে সকল মুরুব্বীগণকে তাদের নিজেদের সু-স্বাস্থ্যের জন্য বাহিরে বের হতে হয়, তাদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তার দিকে বিশেষভাবে নজর দিবে।এছাড়াও তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য পড়াশুনা চালিয়ে যাবে। নিজেদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য বড়দের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>প্রিয় যুবকেরা,</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমরা কি জানো, আমাদের সংস্কৃতিতে বয়স্ক পরিভাষাটি খুব বেশী ব্যবহার করা হয় না। ইখতিয়ার শব্দটিকে বেশী ব্যবহার করা হয়।এই শব্দটি খাইর থেকে আসে। যার অর্থ হলো সমাজের মুল ব্যক্তিগণ। এর অর্থ হলো সমাজের কল্যাণ।</span></p>
<p><strong>যেখানে মুরুব্বীগণ থাকেন সেখানে কল্যাণ থাকে। যেখানে মুরুব্বীগণ থাকেন সেখানে বরকত থাকে এবং শান্তি থাকে।</strong></p>
<p><strong>প্রিয় যুবকেরা,</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">শারীরিক দূরত্বকে বজায় রাখলেও মুরুব্বীদের সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চেষ্টা করো। </span><span style="font-weight: 400;">কঠিন সময়ে সমাজকে হেদায়াতের প্রতি আহবানকারী সম্মানিত আলেমদের প্রতি আবেদন, আপনাদের একজন ভাই হিসেবে ও একই পেশার মানুষ হিসেবে কয়েকটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।</span></p>
<p><strong>প্রিয় আলেমগণ, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্যান্য সকল বিষয়ে আমরা যেমন ভুল করে থাকি আসুন, দয়া করে এই বিষয়ে একই ভুল আর না করি। যদিও এই কথা বলার অধিকার </span>আমার নেই, তবুও আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই মুসিবতকে মূল্যায়ন করার সময় তাড়াহুড়া করে যেন আমাদের কেউ এটাকে কিয়ামত, কেউ আবার দাব্বাতুল আরদ, কেউ আবার ইয়াজুজ মাজুজ, কেউ আবার ইলাহী আযাব-গজব, কেউ আবার ধ্বংস এই ধরণের মন্তব্য না করি।  দয়া করে ইলম ও হিকমাহ থেকে পৃথক হয়ে </span></p>
<p><strong> رَجْماً بِالْغَيْبِۚ</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কোরআনের ভাষায়, গায়েবে পাথর নিক্ষেপ না করি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সম্মানিত আলেমগণ, এই ধরণের বড় বড় অসুস্থতার সময়ে আমাদের দ্বীনদারদেরকে রোগের বাহন হতে যেন না দেই। খণ্ডিত একটি দুনিয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ জ্ঞান নিয়ে আমরা যা তা যেন না বলে ফেলি। আসুন কোন বিষয়কে মূল্যায়ন করার সময় সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করি। </span></p>
<p><strong>আয়াতে তাকভীনির (মহাবিশ্বের) সাথে কোরআনকে, সুন্নতকে, মানুষকে এবং আকলকে এক সাথে মূল্যায়ন করি। এই রকম সময় সমূহ, থিওরিক থিওলজি করার জন্য মোটেই উপযুক্ত সময় নয়।ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, বড় বড় বিপদের সময়ে একই সাথে ই’তিকাদকে বিনষ্টকারী বাতিল বিশ্বাস সমূহের জন্ম হয়ে থাকে। অনেকদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাঝে মধ্যেই এমন বিষয় সমূহ দেখি যার সাথে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই। আসুন সেই সকল বিষয়কে পরিত্যাগ করি। আজকে কথার মুয়াল্লিম নয়, আশার মুয়াল্লিম হওয়ার সময়।</strong></p>
<p><strong>মুহতারাম হুজুরগণ, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা সকলেই পরীক্ষার এই দুনিয়ায় শিক্ষায় পরিপূর্ণ এক বিশ্বব্যাপী সংক্রামক ব্যাধির মুখোমুখী। আমরা আলেমগণ যদি এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে মানুষের হেদায়াতের ওসিলা হতে চাই তাহলে মানুষকে ভীতিমূলক একটি স্রষ্টার দিকে ধাবিত না করি। কেউ যেন রাহমান ও রাহীম রবকে আকাশ থেকে ক্রোধ বর্ষণকারী, আযাব প্রেরণকারী একজন ইলাহ হিসেবে তুলে না ধরি। এই অধিকার কারও নেই। এটা আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এটা যে সুন্নাতুল্লাহ এবং এর মধ্যে যে অনেক শিক্ষা রয়েছে সেই শিক্ষাকে অর্থহীন করে তুলবে, এমনিভাবে  আখেরী যামান বলে বলে মূল শিক্ষা থেকে উপকৃত হওয়া থেকে কাউকে </span>যেন আমরা বঞ্চিত না করি। আমাদের মহান রব এই মহা বিশ্বকে তার রহমান সিফাতের মাধ্যমে পরিচালনা করে থাকেন-</p>
<p><span style="font-weight: 400;">  <strong>كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلٰى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَۙ</strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তিনি নিজের জন্য রহমতকে লিপিবদ্ধ করে নিয়েছেন। মহান রব একথা বলেছেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তিনি শুধুমাত্র তার নামাজ আদায়কারী এবং তাঁর অনুগত বান্দাদেরকেই রিজিক দেন না। যারা তাঁর অবাধ্যতা করে তাদেরকেও তিনি রিজিক দেন, লালন পালন করেন। যারা তাঁর অবাধ্যতা করে তাদেরকে তিনি মাঝে মধ্যে আরও বেশী করে দেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সকল বিষয়কে বিশ্লেষণ কিংবা মূল্যায়ন করার সময় এই সামগ্রিক বিষয়কে বিবেচনায় রাখতে হবে।</span></p>
<p><strong>আজ যুবকদের মনে অনেক প্রশ্ন, আজ মুসলমান আলেমদের উচিত হলো, যুবকদের সেই সকল প্রশ্নের জবাব তৈরি করা। খারাপ এবং অকল্যাণের সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত অনেক বড় বড় প্রশ্ন তাদের মনে। তাদের জন্য আমাদের জ্ঞানগর্ব মূলক জবাব প্রস্তুত করতে হবে।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আজকে আমাদেরকে পরিবেষ্টনকারী এই সকল অকল্যাণকে ইলাহী রহমত ও ইলাহী আদালতের সাথে সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করে পড়তে হবে, আর সেই আলোকেই যুবকদের সামনে তুলে ধরতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইনশাআল্লাহ সামনের কোন এক দারসে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। </span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;">আমার যুবক বন্ধুদের পাশাপাশি মুসলমান আলেমদের উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা হলো, এই করোনা পরবর্তী সময়ের দুনিয়া দ্বীনে মুবিন ইসলামকে কিভাবে প্রভাবিত করবে? </span></li>
<li><span style="font-weight: 400;">মানুষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবন এই সময়ের দ্বারা কিভাবে প্রভাবিত হবে? </span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এই ধরণের বিষয় সমূহ নিয়ে এখন থেকেই জ্ঞানগত সংলাপের আয়োজন করতে হবে। সকলেই মিলে এই সকল প্রশ্নের সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। </span><span style="font-weight: 400;"> সবশেষে, মানব জাতি হিসেবে আমরা এই সময়কে কিভাবে রহমতে পরিণত করতে পারি? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা বাকারার ২১৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন- </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> <strong>  وَعَسٰٓى اَنْ تَكْرَهُوا شَيْـٔاً وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ</strong></span></p>
<p><strong>“হতে পারে কোন জিনিস তোমরা অপছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক।” </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">  <strong>  وَعَسٰٓى اَنْ تُحِبُّوا شَيْـٔاً وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْۜ</strong></span></p>
<p><strong>“হতে পারে এমন অনেক জিনিস রয়েছে তোমরা পছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য খারাপ।” </strong></p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হতে পারে আমরা এই দুনিয়াকে খুব বেশী ক্লান্ত করে ফেলেছি তাই তার একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন ছিলো। </span></p>
<blockquote><p>সত্যি আমরা প্রকৃতিকে অনেক ক্লান্ত করে ফেলেছি, দুনিয়াকে যথেচ্ছা ব্যবহার করেছি। হয়ত প্রকৃতির দিকে আমাদেরকে নতুন করে নজর দিতে হবে। আমরা প্রকৃতির অধিকারকে কতটা নষ্ট করেছি এটা আমাদের পুনর্বিবেচনা করা দরকার ছিলো।</p></blockquote>
<p><strong> কারণ আমাদের রব সেখানেও একটি মিযান স্থাপন করেছেন-</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">   <strong>وَالسَّمَٓاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْم۪يزَانَۙ</strong></span></p>
<p>আল্লাহর স্থাপিত মিযান যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মানুষ অসুস্থ হয়ে যায় এবং পানি দূষিত হয়ে পড়ে।</p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">খাদ্য মানুষকে অসুস্থ বানায় এবং ঔষধ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আমাদের সকলেরই সাক্ষী হতে পারে এই মুসিবত ,মানুষের মূল্য ও মর্যাদা, সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং হিকমাহকে নতুন করে আবিষ্কার করতে সাহায্য করবে। যেই সময় শক্তির প্রতিযোগিতা জীবনের মৌলিক একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে, সেই সময়ে আজ এটা সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে ,মানুষ কত সামান্য এবং তার অহংকার করা বড় একটি বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।</span></p></blockquote>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা, </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের জন্য এই বিশ্বজগত একই সাথে নিয়ামত ও কষ্টের জায়গা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই প্রতিকূলতাকে নিয়ামতে রূপান্তরিত করার জন্য  মানুষকে  শক্তি এবং সম্ভাবনা দান করেছেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইতিহাসের গতিধারাকে পরিবর্তন করে দেয়ার মত শক্তি ও সম্ভাবনা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানবতা ইতিহাসের অনেক মুসিবতকে আল্লাহর সাহায্যে নিয়ামতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই।ইনশাআল্লাহ আমরা জ্ঞানের মাধ্যমে, ঈমানের মাধ্যমে, দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে, তাদবিরের মাধ্যমে এবং তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে আজকের এই বৈশ্বিক সংকটকে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো। কেউ কেউ বলে থাকে মানুষ মানুষের শত্রু, আমি এটা সঠিক মনে করি না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষ মানুষের বন্ধু, এই ঘটনা আমাদেরকে তা প্রমান করবে। মানুষ মানুষের জন্য শিফা। </span><span style="font-weight: 400;">এই ওসিলায় মানুষ যে মানুষের বন্ধু এবং শিফা এটা নতুন করে দেখতে পাবো ইনশাআল্লাহ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের প্রত্যাশা হলো, মানবতা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠার পরে এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে যেন অভিন্ন শত্রুর মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হয়, এখন আমাদের সকলের অভিন্ন শত্রু হলো ভাইরাস।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এমন এক ভাইরাস যা মাইক্রোস্কোপ যন্ত্র দিয়েও দেখা যায় না। কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, মূলত মানুষের অনেক অভিন্ন বা কমন শত্রু রয়েছে। আমরা আজ যে অবস্থায় পতিত হয়েছি, হয়তোবা সেই অভিন্ন শত্রুকে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করতে পারিনি বলে। </span></p>
<p><strong>ঐ সকল শত্রু কি? </strong></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;">যেমন- শক্তি ও ক্ষমতার প্রতি আকাংখা। </span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>ওইগুলো কি?</strong> </span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;">স্বার্থপরতা।</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>সেই অভিন্ন শত্রু কি?</strong> </span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;">শোষণ, জুলুম, মূর্খতা, হিংসা ও বিদ্বেষ। </span></li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মহান আল্লাহ ! সমগ্র মানবতার এই সংকটকে রহমতে পরিণত করার তওফিক দান করুন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমি আমার আলোচনাকে মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) ও আদি মাতা হযরত হওয়া (আঃ) এর কোরআনের মাধ্যমে চিরন্তনতা প্রাপ্ত দোয়ার মাধ্যমে শেষ করতে চাই ,</span></p>
<p><strong> رَبَّـنَا ظَلَمْنَٓا اَنْفُسَ<span style="font-weight: 400;">نَا</span></strong></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">হে প্রভু আমরা নিজেদের উপরে জুলুম করেছি </span></p></blockquote>
<p><strong>وَاِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا</strong></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">তুমি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করো, আমাদের উপর রহম না করো </span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِر۪ينَ</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত করো না।</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, এই দিন গুলো থেকে আমাদের পরিত্রান দান করে, সমগ্র মানবতার অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে </span><span style="font-weight: 400;">আমাদেরকে যেন নতুন এক দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করার তাওফিক দান করেন। (আমিন)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সকলকে  জানাই </span>সালাম।</p>
<p><strong>আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আল্লাহ হাফেজ।।</strong></p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/akhlaq-in-hard-times/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">5283</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল কোরআনের আলোকে কথা বলার আখলাক </title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-manners-of-speaking-in-the-light-of-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-manners-of-speaking-in-the-light-of-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 23 Apr 2021 12:22:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আল কোরআনের আলোকে কথা বলার আখলাক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4836</guid>

					<description><![CDATA[মহাগ্রন্থ আল কোরআন আমাদেরকে কথা বলার আখলাক, কথার মাধুর্যতা সম্পর্কে খুব সুন্দর একটি ফ্রেম এঁকে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সেটাকে ভুলে গিয়ে ডিজিটাল দুর্গ বানিয়েছি এবং সেটা নিজেদের জন্য আত্মরক্ষার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে, সোস্যাল মিডিয়ার একাউন্ট সমূহ থেকে আমাদের কি-বোর্ডের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহাগ্রন্থ আল কোরআন আমাদেরকে কথা বলার আখলাক, কথার মাধুর্যতা সম্পর্কে খুব সুন্দর একটি ফ্রেম এঁকে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সেটাকে ভুলে গিয়ে ডিজিটাল দুর্গ বানিয়েছি এবং সেটা নিজেদের জন্য আত্মরক্ষার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে, সোস্যাল মিডিয়ার একাউন্ট সমূহ থেকে আমাদের কি-বোর্ডের বাটন সমূহকে একে অপরের কালবে গুলি ছোঁড়ার মত করে ব্যবহার করছি।</p>
<p><strong>আমরা আমদের কালবকে এবং পেটকে হয়ত রোজা রাখাতে পেরেছি, কিন্তু আমাদের মুখকে এবং হাতের নখকে রোজা রাখাতে পারিনি। এই বিষয়কে সামনে রেখে আজকে আমি কথা বলার আদব বা আখলাক নিয়ে আলোচনা করতে চাই। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কোরআনে মূলত কথা বলার আখলাক আমাদেরকে বুঝানোর জন্য; &#8216;আখলাক&#8217; নামক একটি সূরা রয়েছে, যার নাম সূরা-হুজুরাত । সূরা-হুজুরাত, আমাদের প্রিয় নবীর সামনে, বিখ্যাত আরব গোত্র বনী তামিমের সাথে সাহাবাদের মধ্য থেকে কয়েকজন কবি ও বক্তা সাহাবীর মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি বিতর্ককে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছিল। রাসূলে করীমের সেই বিখ্যাত বাণী,  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কোন কোন কথা কতই না যাদুকরী। ( বুখারী, নিকাহ, ৪৭; তিব্ব, ৫১; তিরমিজি, বিরর, ৮১; আবু দাউদ, আদব, ৯৬) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই কথা বলে যে আশ্চর্যতা প্রকাশ করেছিলেন, সেটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই সূরা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> সূরা হুজুরাত, আমাদেরকে কথা বলার আখলাককে শেখানোর জন্য নাযিল হয়েছে। এই সূরা একই সাথে সকল মানুষের একই মূল থেকে, একই মাটি থেকে, একই মা-বাবা, একই সৃষ্টি থেকে আসা সকলের জন্য বিশ্বজনীন এক ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দেয়। আবার একই সাথে ঈমানী ভ্রাতৃত্বের কথাও ঘোষণা দেয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সূরার ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি৷ তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো৷ একে অপরের অধিকারকে যেন চিনতে পারো। একে অপরের সাথে যেন মারেফত এবং জ্ঞানের আদান প্রদান করতে পারো এই জন্য। ( সূরা হুজুরাত, ১৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সুরায় বর্ণিত অপর একটি ভ্রাতৃত্ব হল, ঈমানের ভ্রাতৃত্ব।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">اِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ اِخْوَةٌ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মু&#8217;মিনগণ হল পরস্পর ভাই ভাই। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَاَصْلِحُوا بَيْنَ اَخَوَيْكُمْ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যদি তাই হয়, তাহলে তোমাদের সকলের কর্তব্য হল, মু&#8217;মিনদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বকে ঠিক করে দেওয়া, মু&#8217;মিনদের মধ্যকার সম্পর্ককে জোড়া লাগিয়ে দেওয়া। (সূরা হুজুরাত, ১০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই আয়াতটিও এই একই সুরার।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এই সূরা একই সাথে সৃষ্টিগত দিক থেকে সৃষ্ট হওয়া ভ্রাতৃত্ব এবং একই সাথে আমাদেরকে ভাইয়ে পরিণতকারী ঈমানী ভ্রাতৃত্বকে বিনষ্টকারী সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি  সেই মূল বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে। এই কারণে এই সূরাকে সূরাতুল আখলাক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই অর্থে এই অধিকারকে বিনষ্টকারী ৭ টি  জঘন্য খারাপ  বিষয়কে কোরআন খুবই গুরুত্বের সাথে এই সূরায় উল্লেখ করেছে। সেগুলো হল, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong> ১।</strong> لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ  তথা একে অপরকে বিদ্রুপ করো না, সাবধান এক গোষ্ঠী যেন অপর কোন গোষ্ঠীকে বিদ্রুপ না করে। (হুজুরাত, ১১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম৷ </span></p>
<p><strong>২। </strong><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">تَلْمِزُٓوا</span> <span style="font-weight: 400;">اَنْفُسَكُمْ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একে অপরকে অপমানিত করবে না। ( হুজুরাত, ১১)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একে অপরকে ছোট করে দেখবে না। একে অপরকে নিচু করে দেখবে না। </span></p>
<p><strong>৩। </strong><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">تَنَابَزُوا</span> <span style="font-weight: 400;">بِالْاَلْقَابِۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পরস্পরকে খারাপ উপাধি ধরে ডেকো না। (হুজুরাত, ১১) পছন্দ করবে না এমন নামে ডেকো না। </span></p>
<p><strong>৪। </strong><span style="font-weight: 400;">اجْتَنِبُوا</span> <span style="font-weight: 400;">كَث۪يراً مِنَ الظَّنِّۘ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে খারাপ ধারণা করো না, খারাপ ধারণা থেকে বিরত থাকো। (হুজুরাত, ১২) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>৫।</strong> </span><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">تَجَسَّسُوا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একজন আরেক জনের দোষ অন্বেষণ করো না। একে অপরের বিরুদ্ধে  গোয়েন্দাগিরি করো না। (হুজুরাত, ১২) </span></p>
<p><strong>৬। </strong><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضاً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একে অপরের গীবত করো না। (হুজুরাত, ১২) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এবং গীবতের আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মত খারাপ একটি বিষয়ের সাথে তুলনা করেছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>৭।</strong> </span><span style="font-weight: 400;">اِنْ جَٓاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُٓوا</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে সেটাকে ভালোভাবে যাচাই না করে গ্রহণ করো না। তা না করলে; পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে৷ এই কথা বলা হয়েছে। (হুজুরাত, ৬) </span></p>
<p><strong>কোরআনে কথা বলার আখলাক সম্পর্কিত আয়াত সমূহ শুধুমাত্র সূরা হুজুরাতেই আলোচিত হয়নি। সমগ্র কোরআনেই উল্লেখিত রয়েছে এবং কোরআনে কথার আখলাক সম্পর্কিত  আয়াত সমূহকে যদি একত্রিত করি তাহলে অসাধারণ একটি চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠে। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>১। &#8220;কাওলুল হাসান&#8221; তথা সুন্দর কথা।</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মু&#8217;মিন সুন্দর কথার অধিকারী। যখন কথা বলবে উত্তম কথা বলবে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলো। (সূরা বাকারা, ৮৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এমনকি এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন বনী ইসরাইলের নিকট থেকে অঙ্গীকার নেওয়ার সময় ঈমানের, ইবাদতের এবং আখলাকের মূলনীতির সাথে একত্রে উল্লেখ করেছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলবে। (বাকারা, ৮৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি আয়াতে খারাপ কথা বা &#8216;কাওল-উ সু&#8217; উল্লেখ বলা হয়েছে। কাওল-উ হাসানার বিপরীত হল কাওলু সু&#8217;উ বা খারাপ কথা যা আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় কথা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">لَا يُحِبُّ اللّٰهُ الْجَهْرَ بِالسُّٓوءِ مِنَ الْقَوْلِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বলা হয়েছে, আল্লাহ খারাপ কথাকে পছন্দ করেন না। </span></p>
<p><strong>২। &#8220;কাওলু আদল&#8221; তথা আদালত পূর্ণ কথা। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَاِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যখন কথা বলবে তখন আদালতপূর্ণ তথা ন্যায্য কথা বলো। (আনআম, ১৫২) </span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">যখন কথা বলবে তখন তোমাদের কথা যেন আদালত পূর্ণ হয়। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, <em>কথার আদালত হল, ভারসাম্যপূর্ণ কথা। সকল ধরণের চরমপন্থা থেকে বিরত থাকা।</em> আদালত পূর্ণ কথার বিপরীতে পরিত্যাজ্য এক প্রকারের কথা রয়েছে; আর সেটাই হলঃ &#8220;কাওলু যুর&#8221;। কাওলু যুর হল, হাকিকত-বিহীন কথা বার্তা। গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বলা সকল কথার অপর নাম হল কাওলু যুর। </span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِۙ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এমনকি তাগুত থেকে, মূর্তি থেকে বিরত থাকার মত গুজব ও মিথ্যা থেকে কাওলু যুর থেকে দূরে থাকো। আল্লাহ আমাদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা হজ্জ, ৩০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>৩। &#8220;কাওলু সাদিদ&#8221; ভারসাম্যপূর্ণ, সঠিক কথা বলা।</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا قَوْلاً سَد۪يداًۙ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমরা সঠিক কথা বলো (আহযাব, ৭০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমাদের কথা যেন হক্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। তোমাদের কথা যেন সঠিক হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ভারসাম্যপূর্ণ, সত্য এবং ইনসাফপূর্ণ কথা বলার নাম হল কাওলু সাদিদ। অন্যদের সম্পর্কে সকল প্রকারের ইশারাপূর্ণ এবং গোপন অর্থ থেকে, সন্দেহ থেকে মুক্ত ভাবে কথা বলা হল কাওলু সাদিদের অধিকারী হওয়া। সত্যকে অতিরঞ্চিত না করে আবার কোন ধরণের কমতি না রেখে যে রকম আছে সেভাবেই পৌঁছে দেওয়া। এর বিপরীতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন অন্য আয়াত সমূহে, বক্রতাপূর্ণ কথা থেকে দূরে থাকার জন্য আদেশ দিয়েছেন এবং সেটাকে কাওলু লাহন বলা হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আর <strong>কাওলু লাহন</strong> হল, নিফাকের মধ্যে নিমজ্জিত মানুষদের কথা বার্তা সমূহ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ ف۪ي لَحْنِ الْقَوْلِۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হয়েছে, তুমি তাদের বক্রতা পূর্ণ কথা থেকেই বুঝতে পারবে। (মুহাম্মদ, ৩০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য এক প্রকারের কথার ধরণ হল, কাওলু যুখরুফ, অন্যদেরকে শুধুমাত্র প্রভাবিত করার জন্য বলা চমকপ্রদ কথা-বার্তাকে কাওলু যুখরুফ বলা হয়েছে। কাওলু যুখরুফ এবং কাওলু লাহন বলতে বক্রতাপূর্ণ কথা বার্তা এবং চমকপ্রদ কথা সমূহ থেকে দূরে থেকে বিশেষ করে কাওলু সাদিদ এবং সঠিক কথা বলার নির্দেশ দেয়, মহাগ্রন্থ আল কোরআন। </span></p>
<p><strong>৪। &#8220;কাওলু লায়্যিন&#8221; তথা কোমল কথা। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> কাওলু লায়্যিনের আয়াত, বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে আল্লাহর দ্বীনের মালিকের (নাউযুবিল্লাহ) মত আচরন করেন এবং এই সকল পয়েন্টে চরমপন্থায় নিপতিত হয়ে থাকেন এই ধরণের মানুষদেরকে আশ্চর্যাবস্থায় ফেলে দেওয়ার মত একটি আয়াত। কারণ এই আয়াত দুইজন বড় নবী, হযরত মুসা এবং হযরত হারুন (আঃ) কে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জালেম ফেরাউনের নিকটে পাঠানোর সময় আমাদের রব তাদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَقُولَا لَهُ قَوْلاً لَيِّناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হচ্ছে, তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো। (তাহা, ৪৪)</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">বিখ্যাত জালেম শাসক, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ একদিন খুতবা দেয়। সে খুতবা দেওয়ার সময় এক আলেম উঠে দাঁড়ান এবং তাকে খুব কঠিন ভাষায় সমালোচনা করেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সে যে কত বড় জালেম এই কথা বলতে গিয়ে ঐ আলেম একটু গালি দেওয়ার মত করে কথা বলেন। বর্ণিত হয়েছে, জালিম হাজ্জাজ সেই আলেমকে লক্ষ্য করে বলেনঃ এই ভাই! আমি তো আর ফেরাউনের চেয়ে বেশী খারাপ না। আর তুমিও মুসা এবং হারুনের চেয়েও বড় না। আল্লাহ মুসা এবং হারুনকে পর্যন্ত ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় বলে দেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَقُولَا لَهُ قَوْلاً لَيِّناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমরা তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো </span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">তাই, কোমল কথা, এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। </span></p>
<p><strong>৫। &#8220;</strong><span style="font-weight: 400;"><strong>কাওলু কারিম&#8221; হল মন জয় করার মত করে কথা বলা। সম্মানজনক কথা। বীরত্বপূর্ণ কথা।</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাওলু কারিম হল, সন্তানগণ যখন তাদের পিতা-মাতার সাথে কথা বলবে তখন কিভাবে কথা বলবে সেটার পন্থা সম্পর্কিত। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَر۪يماً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পিতা-মাতার সাথে কথা বলার সময় মর্যাদা সহকারে কথা বলো। তাদের মন জয় করার মত করে কথা বলো, সম্মান জনক ভাবে কথা বলো। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَلَا تَقُلْ لَهُمَٓا اُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাহলে তাদেরকে “উহ্‌” পর্যন্তও বলো না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না। </span></p>
<p><strong>৬। &#8220;কাওলু মারুফ&#8221; হল জ্ঞান ভিত্তিক, ইতিবাচক, উপকারী, গঠনমূলক, মাকবুল এবং যথোপযুক্ত কথার নাম। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَعْرُوفاً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, তাদের সাথে উত্তমভাবে কথা বলো। (সূরা নিসা, ৫)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এর বিপরীতে অন্যান্য আয়াতেও মারুফ কথার বিপরীত মুনকার কথা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অশ্রাব্য, খারাপ কথা বুঝানোর জন্য কাওলু মুনকার ব্যবহার করা হয়েছে । আর সেটা হল হাকিকতের পাল্লায় যার কোন মূল্য নেই এমন খারাপ কথা এবং বিশেষ করে যারা নিফাকির মধ্যে রয়েছে তাদের কথা বলা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে আমি একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কাওলু মারুফ বিশেষ করে পরিবারের ব্যাপারে স্বামীগণ তাদের স্ত্রী গণের প্রতি এবং স্ত্রীগণ তাদের স্বামীদের প্রতি ব্যবহার করবেন। এটার নাম হল কাওলু মারুফ এবং কথা বলার সময় মুনকার থেকে দূরে থাকবে। কারণ, এই আয়াত সমূহ জাহেলি যুগে মহিলাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কথা ও আচরণ সমূহকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য আমাদেরকে পথ প্রদর্শনকারী আয়াত সমূহে এই সকল কথা উল্লেখ করা হয়েছে। </span></p>
<p><strong>৭। কাওলু মাইসুর; </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাওলু মাইসুর হল, নরম সুরে বলা স্বস্তিদায়ক কথাকে কাওলু মাইসুর বলা হয়। বিশেষ করে কাওলু মাইসুর, ধনী ও বিত্তশালী লোকদের দরিদ্র মানুষের প্রতি, ঋণ গ্রহীতার সাথে ঋণ দাতা যেভাবে কথা বলবেন তার নাম হল কাওলু মাইসুরা। তারা যদি কোন আবেদন নিয়ে আসে তাহলে তাদের সাথে নরমভাবে কথা বলবে। তাদের উপর জোর জবরদস্তি করবে না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">قُلْ لَهُمْ قَوْلاً مَيْسُور</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হয়েছে, অন্তত তাদের সাথে নরম সুরে কিছু বলো। (সূরা বনী ইসরাইল ২৮) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই আয়াতটি, সূরা বাকারায়ও মহান আল্লাহ বলেনঃ হে ইমানদারগণ! দরিদ্রদেরকে কষ্ট দিয়ে ও খোঁটা দিয়ে তোমাদের সাদাকাকে নষ্ট করো না। (বাকারা, ২৬৪) এই কথা বলার পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন কাওলু মারুফকে এখানেও ব্যবহার করেছেন, কাওলু মাইসুরের সাথে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হয়েছে, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">قَوْلٌ مَعْرُوفٌ وَمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِنْ صَدَقَةٍ يَتْبَعُهَٓا اَذًىۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মারুফ, মন জয়কারী একটি কথা এবং কোন অপ্রীতিকর ব্যাপারে সামান্য উদারতা ও ক্ষমা প্রদর্শন এমনি দানের চেয়ে ভালো, যার পেছনে আসে দুঃখ ও মর্মজ্বালা ৷ (সূরা বাকারা, ২৬৩) </span></p>
<p><strong>৮। কাওলু তায়্যিবঃ পবিত্র কথা । </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কালিমায়ে তায়্যিবা, যদিও কালেমায়ে তাওহীদের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবুও এই আয়াতের অর্থ অনেক ব্যাপক। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আয়াতেও উত্তম কথা বলাকে এমন একটি গাছের সাথে তুলনা করেছেন যার মূল মাটির গভীরে প্রোথিত, এবং শাখা প্রশাখা সমূহ আকাশে পৌঁছে গেছে, এবং যার ফল সমূহ সব সময় ভক্ষণ করা যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ &#8211; تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا ۗ  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">(সূরা ইব্রাহিম ২৪-২৫) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু খারাপ কথার উদাহরণও এমন যার কোন ফল নেই, কোন উপকার নেই, পাতা এমন কি কোন মূলও নেই, গন্ধহীন এবং মাটির উপরে নিক্ষিপ্ত একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَب۪يثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَب۪يثَةٍۨ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْاَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَار</span></p>
<p><strong>অন্যদিকে মন্দ কথার উপমা হচ্ছে, একটি মন্দ গাছ, যাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে দূরে নিক্ষেপ করা হয়, যার কোন স্থায়িত্ব নেই৷ (সূরা ইব্রাহিম- ২৬)</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এরকম একটি পয়েন্টে, বিশেষ করে যারা মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের রহমতের দিকে আহবান করেন, আল্লাহর দ্বীনকে মানুষের নিকট প্রচারকারী, নিজেদেরকে মুরশিদ হিসেবে পরিচয় দানকারী, নিজেকে উস্তাদ হিসেবে উপস্থাপনকারী ভাইদের কাছে, আমি নিজেকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বিশেষ করে যারা আমর বিল মারুফের দায়িত্ব পালন করেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের নিকটে এবং যুবকদেরকে কাছে যারা দ্বীনকে তুলে ধরে থাকেন তারা যেন সবচেয়ে সুন্দর ভাষা ব্যবহার করেন, সবচেয়ে সুন্দর পন্থা যেন অবলম্বন করেন। সবচেয়ে সুন্দর কথা হল, সবচেয়ে ন্যায্য কথা, সবচেয়ে নরম কথা, কাওলু লায়্যিন, কাওলু আদল, কাওলু সাদিদ। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ভাষা, সম্মানজনক কথা, মন জয়কারী কথা, জ্ঞানভিত্তিক বাণী, মারুফ কথা, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কথা, সহজবোধ্য কথা এবং সবচেয়ে দয়াদ্রপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা মানুষকে শুধুমাত্র হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দান করতে বাধ্য। মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন কতই না সুন্দর করে বলেছেন,  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَمَنْ اَحْسَنُ قَوْلاً مِمَّنْ دَعَٓا اِلَى اللّٰهِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করে তার কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে? (সূরা ফুসসিলাত, ৩৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ, দাওয়াত এবং তাবলীগ কখনো দাম্ভিকতা পূর্ণ কথা দিয়ে হয় না। চিল্লা-পাল্লা করে মানুষকে কখনো দ্বীনের পথে ডাকা যায় না। মানুষকে ছোট করে ও নিচু করে দেখে তো মোটেই না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞাপন ও প্রোপাগান্ডার ভাষা, ইরশাদের (দাওয়াতের) ভাষা এক হতে পারে না। দাওয়াতের ভাষা হল দয়ার ভাষা, মারহামাতের ভাষা, ভালোবাসার ভাষা। আজ কোন আলেম উলামা যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় কথা না বলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বন্দপূর্ণ ভাষা দিয়ে মানুষকে কিভাবে আল্লাহর দিকে আহবান করা যেতে পারে? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ভাইয়েরা, আমর বিল মারুফের ভাষা কেবল মারুফই। মুনকার ভাষা দিয়ে কাওলু মুনকার কখনো আমর বিল মারুফ হতে পারে না। কাওলু লায়্যিনের অধিকারী হওয়া আবশ্যকীয়, যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুঝিয়ে থাকেন। মাটিতে পর্যন্ত আমাদেরকে আস্তে আস্তে পা রাখতে বলা হয়েছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَلَا تَمْشِ فِي الْاَرْضِ مَرَحاًۚ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একই ভাবে সুন্দর এবং সঠিক কথার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করতে আমরা বাধ্য। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">দৃঢ় চিত্তে হাঁটা, নরম ও ভদ্র ভাষায় কথা বলা বীরত্ব। নম্রতা কোন দুর্বলতা নয়, কোন খারাপ বিষয় নয় বরং গর্ব অহংকার মানুষকে নীচে নামিয়ে দেয়, নম্রতা মানুষকে মর্যাদাবান করে তুলে। মু&#8217;মিন তার মারহামাতপূর্ণ হৃদয়কে সকলের জন্য উম্মুক্ত করে দিতে বাধ্য। এটা আমাদের রবের আদেশ তার প্রিয় রাসূলের প্রতি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যে কোরআনে কারীম কথা বলার আদবের দিকে এত গুরুত্ব দিয়েছে তা কি শুধুমাত্র মানুষের সাধারণ কোন আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে? </span></p>
<p><em><span style="font-weight: 400;">মূলত এগুলো হল মানুষের ব্যক্তিত্ত্বের বহিঃপ্রকাশের জন্য। কারণ কথা বলার পূর্বে নিয়ত রয়েছে। নিয়ত হল আমলের বীজ। কথার পূর্বে ইচ্ছা রয়েছে। কথার পূর্বে একটি চিন্তা রয়েছে। এরপরে রয়েছে কাজ, আমল এবং আচরণ। কথা একই সাথে নিয়ত এবং কাজের বহিঃপ্রকাশ। </span></em></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাসূল সঃ বলেছেনঃ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রত্যেক কাজের ফলাফল তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল। ( বুখারী, বাদাউল ওহী, ১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মূলত এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে, কথা নিজেই একটি আমল। যে সকল মানুষের কথার মধ্যে কোন মাধুর্যতা নেই তাদের কাজের মধ্যেও আখলাক এবং এসথেটিকস খুঁজে বেড়ানো বেহুদা কাজ। আল্লাহ যে সকল কালেমা ও নাম শিক্ষা দিয়েছে সেগুলো তার শিক্ষা দেওয়া বয়ানের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَعَلَّمَ اٰدَمَ الْاَسْمَٓاءَ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল্লাহ আদমকে সকল নাম শিখিয়েছেন। (বাকারা, ৩১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">اَلرَّحْمٰنُۙ ﴿١﴾ عَلَّمَ الْقُرْاٰنَۜ ﴿٢﴾ خَلَقَ الْاِنْسَانَۙ ﴿٣﴾ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ ﴿٤﴾</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বায়ানও তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন। ( রাহমান, ১-৫) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষ এমন ভাবে কথা বলবে তা যেন তার রবের শিক্ষা দেওয়া নামের তাজাল্লি গাহে পরিণত হয়। সুন্দর কথা হল; সুন্দর আচরণের ফলাফল।  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমি একটু আগে যে আয়াত পাঠ করেছি সেই আয়াতের ধারাবাহিকতায় তা রয়েছেঃ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا قَوْلاً سَد۪يداًۙ يُصْلِحْ لَكُمْ اَعْمَالَكُمْ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সঠিক কথা বলো। আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ ঠিকঠাক করে দিবেন। (আহযাব, ৭০-৭১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এগুলো একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। সুন্দর করে কথা বলুন, যেন আপনাদের আমল সালিহ হয়। আপনাদের আমল যেন সুন্দর হয় তাহলে কথাও সুন্দর হবে। শুধুমাত্র আমাদের হাত এবং পায়ের কাজ কর্ম সমূহকেই আমাদের আমলনামা সমূহে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে না। আমাদের মুখ যে কাজ করছে সেটাও কিন্তু একটা আমল। আমাদের আঙ্গুল সমূহ আমাদের কি-বোর্ডের উপর যা করে সেটাও কিন্তু একটি আমল। আমাদের মুখ থেকে নিঃসৃত প্রতিটি কথাকেই হাকিকতের পাল্লায় অবশ্যই মাপা হবে এবং ইলাহী রেকর্ডে রেকর্ড করে রাখা হচ্ছে। আমাদের মহান প্রভু বলেনঃ  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَق۪يبٌ عَت۪يدٌ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ এবং কালেমা, আল্লাহর পাহারাদার ফেরেশতাদের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে ঐ সকল লিপিবদ্ধকৃত বিষয় সমূহকে আমল হিসেবে আমল নামায় লিপিবদ্ধ করা হয়। (ক্বাফ, ১৮) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা একই বিশ্বাসের উত্তরাধিকারী, একই কিতাবে বিশ্বাসী মু&#8217;মিন, একই পয়গাম্বরের উম্মত, একই জাতি এবং একই ইতিহাসের সন্তান। তাই আসুন সকল ধরণের বিভাজনকে এক পাশে রেখে দিয়ে কথার আখলাককে সুন্দর করে নতুন একটি জীবন শুরু করি। এমন একটি বিপদপূর্ণ সময়ে অন্যান্য সময়ের মত এই সময়কেও রহমতে পরিণত করি। আমি বলেছিলাম যে, আসুন আমরা দুঃখকে আনন্দে, বঞ্চনাকে রহমতে পরিণত করি, মুহাসারাকে মুহাসাবাতে রূপান্তরিত করি। </span></p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-manners-of-speaking-in-the-light-of-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4836</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
