<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>সাহিত্য &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/society-and-culture/literature/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Thu, 06 Aug 2026 09:56:55 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>সাহিত্য &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>সীরাত সাহিত্যে বাংলা ভাষার অবদান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 05 May 2026 09:40:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16807</guid>

					<description><![CDATA[বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা.]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা. এর যুগেই বাংলা অঞ্চলে ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে সীরাতচর্চারও শুরুয়াত ঘটে। সেইসময় ওমর রা. একদল সাহাবীকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রেরণ করেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আগত সাহাবীগণ রাসূল স. এর তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত জীবনীও বর্ণনা করেন এখানকার জনগোষ্ঠীর মাঝে। এরপর এক শতাব্দীকালের মাঝেই উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে উপকূল অঞ্চল এবং বাংলাতেও পৌঁছে যায় ইসলামের বার্তা।</p>
<p>আরবের সাথে বণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় অন্যান্য মুসলিম বণিকদেরও আগমন ঘটে এখানে। এই সম্পর্ক যে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা হলফ করেই বলা যায়। বণিকরা একইসাথে ইসলামের আখলাক, আধ্যাত্মিকতা ও সুমহান বার্তাও বয়ে নিয়ে আসেন বদ্বীপে। নদী বিধৌত এই বঙ্গভূমিতে রাসূল (স.) এর জীবনী চর্চার অনানুষ্ঠানিক সূত্রপাতও বলা যায় এভাবে।</p>
<p>রাসূল (স.) এর সীরাত নবদীক্ষিত মুসলিমদের বেশ যুগান্তকারী প্রভাব ফেলে। অনেকের ইসলাম গ্রহণের নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এই সীরাত। চৌদ্দ শতকে লিখিত রূপে সীরাতচর্চা শুরুর আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা।</p>
<p>বাংলা ভাষার বিকাশ সাধনে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপক হলেও মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে সাহিত্য জগতে কেবল পদ্য, কবিতা বা ছন্দের হদিস পাওয়া যায়। <strong>লিখিত ভাষায় সীরাত চর্চার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় শাহ মুহাম্মদ সগীরকে (মৃ. ১৪০৯)। ১৪শ শতকে রচিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ <em>“ইউসুফ-জুলেখা”</em>য় উল্লেখযোগ্য একটা অংশ জুড়ে স্থান পেয়েছে রাসূল স. এর জীবনী।</strong> ১৫শ ও ১৬শ শতকে সীরাতচর্চায় অবদান রাখেন দুজন খ্যাতিমান কবি- যয়নুদ্দিন (মৃ. ১৪৮১) ও শাহ বাইরিদ খান (মৃ. ১৫৫০)। <em>“রসূল বিজয়”</em> নামে পৃথক দুটি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয় তাদের হাতে।</p>
<p>অপর একজন কবি সৈয়দ সুলতান (মৃ. ১৬৪৮), যিনি <em>“রসূল চরিত”</em> ও <em>“ওয়াফাত-এ-রসূল”</em> নামে দুটি সাহিত্য রচনা করেন রাসূল স. এর জীবন ও কর্মের উপর। জনশ্রুতিতে প্রচলিত বর্ণনাসমূহ লেখায় রূপদান করতে জুড়ি ছিল না সৈয়দ সুলতানের। ১৭শ শতকে বিখ্যাত কবি আলাওল তাঁর কালজয়ী কাব্য <em>“পদ্মাবতী”</em>র পুরো এক খণ্ড জুড়ে স্থান দেন সীরাতকে। সমসাময়িক আরেকজন সাহিত্যিক সৈয়দ হামজা (মৃ. ১৮১৫) রাসূল স. এর উল্লেখযোগ্য কিছু হাদীস অনুবাদ করেন বাংলা ভাষায়। এভাবে দেখা যায় ক্ল্যাসিকাল যুগ থেকেই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে সীরাত সাহিত্য।&nbsp;</p>
<p>বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে এসে সীরাতচর্চা নতুন একটি মাত্রা পায়। পূর্বতন ধারাবাহিকতায় পদ্য ও কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও শুরু হয় সীরাত সাহিত্য। বহু সংখ্যক কবি, লেখক ও সাহিত্যিকদের শৈল্পিক লেখনীতে সমৃদ্ধ হয় বাংলা ভাষায় সীরাতচর্চার ভাণ্ডার। এই সময়ে যাঁরা অবদান রাখেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন- মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, শেখ জমিরুদ্দিন, শাহাদাত হোসাইন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, বেনজীর আহমেদ, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আল মাহমুদ। রাসূল স. এর শানে তাঁরা রচনা করেন সংগীত, গীতিকাব্য, পদ্য সাহিত্য, প্রবন্ধ ও বই।</p>
<p>বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবুল খায়ের সাইফুদ্দিন <em>“ইসলামী কবিতামালা”</em> &nbsp;নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন, যেখানে বিখ্যাত সব প্রাচীন কবিদের কবিতাকে জড়ো করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বেনজীর আহমেদ সম্পাদিত এমন একটি সংকলন গ্রন্থ <em>“খাতামুন নাবিয়্যিন”</em>। এছাড়াও আরও কিছু সংকলন গ্রন্থ রয়েছে যেমন- ইশরাফ হোসাইনের <em>“রাসূলকে নিবেদিত কবিতা”</em>, মুকুল চৌধুরীর <em>“রাসূলের শানে কবিতা” </em>এবং আসাদ বিন হাফিজের <em>“নির্বাচিত নাতে রাসূল’’</em> ইত্যাদি।&nbsp;</p>
<blockquote><p>কবিতার জগতে সীরাতকে অনন্য একটি অবস্থানে নিয়ে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রাসূল স. এর স্তুতি ও শানে অন্তত শ’খানেক কবিতা ও সংগীত রচনা করেন নজরুল, যেগুলো আজও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এমনকি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছে কালের বিবর্তনে। “মরুভাস্কর” নামে সীরাত গ্রন্থ রচনা করে নবীপ্রেমে নিজেকে উৎসর্গের নজরানা যেন ষোলকলায় পূর্ণ করেন তিনি।</p></blockquote>
<p><strong>উনিশ শতকের শেষের দিকে খ্রিস্টান মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো নবী মুহাম্মদ (স.) এর জীবনীর উপর বই লিখতে শুরু করে এবং লিফলেট ছাপায়, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তাঁর জীবনীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি মুসলিম চিন্তক ও লেখদের ভাবিয়ে তুলে এবং রাসূল (স.) এর জীবনী নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার ভাবনা জাগিয়ে তুলে তাদের মাঝে।</strong> এইক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং সীরাত সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (মৃ. ১৯০৭)। সেইসময় বাংলা মুসলিম সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে সীরাত সাহিত্য। <strong>বাস্তবিকার্থে বাংলা মুসলিম সাহিত্যে গদ্যরীতির সূচনাই হয় সীরাতের মাধ্যমে।</strong> চমকপ্রদ বিষয় হলো, বাংলায় রাসূল (স.) এর সম্পূর্ণ জীবনচরিত রচনা করেন একজন হিন্দু লেখক, গিরিশচন্দ্র সেন, <strong><em>মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবন চরিত</em> (১৮৮৬)</strong> নামে। সর্বপ্রথম মুসলিম লেখক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সীরাত লিখেন শেখ আব্দুর রহীম। তাঁর রচিত সীরাত গ্রন্থের নাম <strong><em>হযরত মোহাম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি</em></strong>। যেটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। সীরাত সাহিত্যে অপর একটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম হচ্ছে <strong><em>মোস্তফা চরিত</em> (১৯২৫)</strong>। মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁ (মৃ. ১৯৬৮) রচনা করেন এটি। কবি গোলাম মোস্তফার সীরাতকর্ম <strong><em>বিশ্বনবী</em></strong>-ও বেশ সমাদৃত হয় বাংলা ভাষায়।&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র বাংলা মৌলিক সাহিত্যের মাধ্যমেই নয়, অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমেও আরবী ও অন্যান্য ভাষায় রচিত ক্ল্যাসিকাল সীরাত গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলার সীরাতচর্চা। সীরাত গ্রন্থের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন আকর গ্রন্থ হিসেবে প্রসিদ্ধ ইবনে ইসহাকের সীরাতে রাসূলুল্লাহ-এর অনুবাদ নিয়ে আসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। এছাড়াও অগণিত প্রকাশনা সংস্থা থেকে সীরাতের অনুবাদকর্মসমূহ প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে অহরহ।</p>
<p>রাসূল স. এর বন্দনায় রচিত ফার্সী ভাষার কতক কবিতা ও সাহিত্যও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। এই পর্যায়ে মওলানা রুমী, মির্জা মাজহার, ওমর খৈয়াম, আব্দুর রহমান জামী, শেখ সাদী, আমীর খসরু, ফতেহ আলী ওয়াসী সহ ফার্সী ভাষার খ্যাতিমান কবিদের সীরাতকর্ম অনূদিত হয় বাংলায়।</p>
<p>উর্দূ ভাষার সীরাত গ্রন্থসমূহও বাংলায় অনুবাদ হওয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় সীরাত সাহিত্য। উর্দূ থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছে- ইদরীস কান্দল্ভীর <strong><em>মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম</em></strong>, আল্লামা শিবলী নোমানীর <strong><em>সীরাতুন্নবী</em></strong>, সোলায়মান নদভীর <strong><em>পয়গামে মোহাম্মদী</em></strong>, আশরাফ আলী থানভীর <em><strong>খাতামুল আম্বিয়া</strong></em>, আবুল কালাম আজাদের <strong><em>বেলাদাতে নববী</em></strong>, মুফতী মোহাম্মদ শফীর <strong><em>সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া</em></strong>, ক্বারী মোহাম্মদ তায়্যিবের <em><strong>আফতাবে নবুয়্যত</strong></em>, এবং সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভীর <strong><em>নবী রহমত</em></strong>। কেবলমাত্র এই সকল গ্রন্থই নয়, পাশাপাশি উর্দূ সাহিত্যের প্রসিদ্ধ অনেক ছোট ছোট প্রবন্ধ, কবিতা ও গীতিও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। বাঙালী স্কলারদের নিকট আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, মির্জা গালিব বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মওদূদীর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম <em><strong>সীরাতে সরওয়ারে আলম</strong>&#8211;</em>এর বাংলা অনুবাদও বেশ পঠিত বাংলা ভাষায়।</p>
<p>এছাড়াও ইংরেজি থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর <em><strong>রণাঙ্গণে রাসূল স.</strong></em> এবং আফজালুর রহমানের <strong><em>মোহাম্মদ: এনসাইক্লোপিডিয়া অফ সীরাত</em></strong> প্রণিধানযোগ্য।&nbsp;</p>
<p>শিশুদের উপযোগী করে সীরাতচর্চাও নেহাত কম হয়নি বাংলা ভাষায়। শিশুদের কোমল মানসে রাসূল স. এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি, আদর্শের দীক্ষা ও সচ্চরিত্রবান করে গড়ে তোলার মহান প্রয়াসকে সামনে রেখে কবি সাহিত্যিকগণ শিশুতোষ সীরাত রচনায় উদ্যত হন। এমনই একটি শিশুতোষ সীরাত হচ্ছে- <strong><em>নূরনবী</em></strong>। ইয়াকুব আলী চৌধুরী রচিত এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। সহজ ও সাবলীল ভাষায় রচিত নূরনবী শিশুসাহিত্য এবং সীরাতসাহিত্যে প্রশংসা কুড়ায় বেশ। নবীকরিম স. কে উপজীব্য করে একজন আদর্শ পুরুষ হয়ে উঠার জন্য দারুণ সহায়ক গ্রন্থটি। সেইসাথে, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর বিনির্মাণেও ভূমিকা রাখে ইয়াকুব আলী চৌধুরীর লেখনী। পরবর্তীতে তোরাব আলী রচিত <em>“</em><strong>ছোটদের মোস্তফা</strong><em>”</em> (১৯৩৬) এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর লেখা <em>“</em><strong>ছোটদের হযরত মোহাম্মদ</strong><em>”</em> (১৯৪১) – এই সকল গ্রন্থও প্রসিদ্ধি লাভ করে বিপুল পঠিত হয় বাংলার মুসলিমদের ঘরে ঘরে।</p>
<p>এভাবে বাংলা ভাষার বেশ শক্তিশালী একটি ধারা গড়ে উঠেছে রাসূল (স.) এর সীরাতকে কেন্দ্র করে। সেই ধারা অব্যহত রয়েছে এখনো। কখনো কখনো সামগ্রিক সীরাত না লিখে সীরাতের বিশেষায়িত কোনো অংশ নিয়ে কেউ লিখছেন সীরাত। আবার অনেকেই রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, দার্শনিক এবং মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তুলে ধরছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবের জীবনাচারকে। আর সেই সাহিত্য প্রভাবও ফেলেছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এবং বাঙ্গালী মুসলিম জাতিসত্তার বিনির্মাণে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হদিসঃ</strong></p>
<p>১। বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব।</p>
<p>২। বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা, মো: আবুল কাসেম ভুঁইয়া।</p>
<p>৩। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, মোহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান।</p>
<p>৪। বাংলা ভাষায় সীরাত বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি, নাসির হেলাল (সম্পাদিত)।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16807</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য চর্চা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Oct 2025 16:38:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16231</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্যের গোড়ার কথা ইসলামের নবী কেবল আরব দেশে আসেননি, দুনিয়ার সব দেশেই এসেছেন। আল্লাহর পাঠানো সবই ছিলেন ইসলামের নবী। সাহিত্যের আলোচনায় প্রথমেই নবী প্রসংগে এলাম কেন? কারণ নবীরাই মানুষের প্রথম শিক্ষক । নবীরাই সমাজ সংগঠক।নবীদের যোগ মানুষের সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকেই।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>সাহিত্যের গোড়ার কথা</strong></h5>
<p>ইসলামের নবী কেবল আরব দেশে আসেননি, দুনিয়ার সব দেশেই এসেছেন। আল্লাহর পাঠানো সবই ছিলেন ইসলামের নবী। সাহিত্যের আলোচনায় প্রথমেই নবী প্রসংগে এলাম কেন? কারণ নবীরাই মানুষের প্রথম শিক্ষক । নবীরাই সমাজ সংগঠক।নবীদের যোগ মানুষের সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকেই। মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতি সাহিত্য নবীদের  ভূমিকা ছাড়া কল্পনাই করা যেতে পারে না। নবীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের সন্ধান এনেছেন এবং সে পথ মানুষকে দেখাননি এমনটি হতে পারে না। সাহিত্য মানুষের জীবনের একটা প্রয়োজনীয় অংশ আর নবীরা এ  অংশে কোনা অবদান রাখেননি একথা কেমন করে ভাবা যেতে পারে? নবীরা যেসব সহিফা ও কিতাব এনেছেন সেগুলোও সাহিত্যরস সমৃদ্ধ। নিছক কাটখোট্টা আলোচনা কোনো কিতাবেই নেই। জীবনকে উপলব্ধি করে আলোচনাগুলো জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে জীবনরস সমৃদ্ধ করে। তবেই তা মানুষের কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে। মানুষ তার সাহায্যে উন্নতি করে উন্নত জীবন সমাজ সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে এবং তার ভিত্তিতে মানুষ করেছে সাহিত্য সাধনা। এটাই হচ্ছে মানুষের সমিতা সাবনার গোড়ার কথা।</p>
<p>আজ যেন সাহিত্য বলতে নবুওয়াতী খাতের ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত একটা স্রোত বুঝায়। এটা মানুষের জীবনের অন্যান্য খাতে ভুলের মতো একটা ভুল। ‘রাধাকৃষ্ণের লীলা’ এই ভুলেরই একটা ফসল।  সাহিত্যকেও নবুওয়াতী ধারায় সম্পৃক্ত হতে হবে। নয়তো তা মানুষের জন্য উপাদেয় ও উপযোগী হতে পারে না। সাহিত্য রস ও সাহিত্যের আস্বাদ মানুষের জীবন গঠনে সাহায়তা না করে যদি ক্ষতি সাধন করে তাহলে কে এমন মানুষ আছে যে তা গ্রহণ করবে? শেষ নবীর কিতাব আল কুরআনে জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘দুনিয়ার জীবনটা তো খেলা-তামাশা, বাহ্যিক চাকচিক্য, তোমাদের পারস্পরিক গৌরব ও অহংকার এবং অর্থ সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে  পরস্পরকে অতিক্রম করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা হলো, বৃষ্টি হয়ে গেলো এবং তার ফলে উৎপন্ন উদ্ভিদরাজি দেখে কৃষক আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তারপর সে ফসল পেকে গেলো এবং তোমরা দেখতে পেলে তা হলুদ বর্ণ ধারণ করছে এবং পরে তা ভূষিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আখেরাত এমন স্থান যেখানে রয়েছে আজাব এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থির জীবন প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।’(আল হাদীদ : ২০)</p>
<p>এ জীবনকে আমরা গ্রহণ করেছি এবং জীবনকে উৎকর্ষিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  কিন্তু জীবনের প্রতারণার জালে জড়িয়ে আমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলতে পারি না। আমাদের সামনে রয়েছে আখেরাতের জীবনের কামিয়াবী। এই আখেরাতের জীবনের জন্য দুনিয়ার জীবন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।দুনিয়াকে বলা হয়েছে আখেরাতের কৃষিক্ষেত (হাদীস)। এখানে যেমন পরিশ্রম করা ও যত্ন নেওয়া হবে তেমনি আখেরাতে তার ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু দুনিয়ার প্রতারণার জালে যদি আমরা ফেঁসে যাই, দুনিয়ার আসল কাজে জড়িত না হয়ে যদি প্রতারণামূলক খেলা-তামাশায় মেতে উঠি এবং দুনিয়ার সম্পদ আহরণ ও ভোগ বিলাসে লিপ্ত হই, তাহলে আমাদের আখেরাতের জীবন বিনষ্ট হয়ে যাবে। দুনিয়া আমাদের সামনে আছে এবং আখেরাত সামনে নেই। তবে আখেরাত আমাদের কল্পনা জগতের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সকল বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। কাজেই তাকে আমার জীবন কর্ম ও জীবন চিন্তা থেকে আলাদা করতে পারি না।</p>
<p><strong>জীবনকে খেলা তামাশা বলা হয়েছে কোন অর্থে? স্বল্পকালীন স্থায়িত্বের অর্থে। একশো বছরের জীবনের বাস্তব কঠিন কর্মক্ষেত্রে খেলা তামাশা মাত্র কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার আনন্দ বিনোদন। এই স্বল্পস্থায়ী ক্ষণটুকুর পর আবার বাস্তব কঠোর কঠীন জীবন শুরু। ঠিক তেমনি এই স্বল্পস্থায়ী জীবনটা খেলা তামাশা এবং আখেরাতটাই বাস্তব ও অনন্তকালীন জীবন। কাজেই আমাদের যা কিছু কাজ চিরস্থায়ী আখেরাতের জন্য। জীবনটা শুধু দুমুঠো খাদ্য গ্রহণ, শরীর ঢাকার জন্য বস্ত্র আহরণ এবং শারীরিক, জৈব ও যৌন চাহিদা পুরণ করার নাম নয়। বরং এই স্বল্পকালীন দুনিয়ার জীবনকে অনন্তকালীন আখেরাতের জীবনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই</strong></p>
<p><strong>জীবনটাকে আমাদের বুঝতে হবে এবং উপলব্ধি করতে হবে।</strong><br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599"
     crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle"
     style="display:block; text-align:center;"
     data-ad-layout="in-article"
     data-ad-format="fluid"
     data-ad-client="ca-pub-9110084365128599"
     data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>জীবনের সাথে সাহিত্য, জীবনকে পরিশীলিত ও বিকশিত করার জন্য সাহিত্য। জীবনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য নয়। জীবনকে বিকৃত করেও সাহিত্য নয়। সাহিত্য আমাদের জীবনেরই নির্যাস।</strong></p>
<p>সাহিত্য আমাদের সুন্দর করবে। আমাদের পরিশীলিত ও পরিশ্রুত করবে। আমাদের জীবনকে ক্লেদমুক্ত অপাপবিদ্ধ করবে। সাহিত্য আমাদের সত্য ও ন্যায়ের  অনুসারী করবে। জীবনের ঘটনাবলী থেকে আমরা সত্য ও ন্যায়ার বাছাই করে নিতে পারবো। জীবন সংগ্রামে সংহিতা কেবলমাত্র একজন দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। বরং একজন দক্ষ পর্যবেক্ষক ও দক্ষ সমালোচকের দৃষ্টি হবে সাহিত্যের দৃষ্টি। এই স্বল্পকালীন পৃথিবীর জীবনে মানুষকে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে অর্থাৎ মানুষ কিভবে যথার্থ মানবতার আধারে পরিণত হতে পারে এবং নিজের নফসের ও জীব-জড়ের কৃত্রিম শক্তির অনুগত না হয়ে  বিশ্ব জাহান ও বিশ্ব প্রাকৃতিত্ব মালিক একমাত্র আল্লাহর অনুগত হতে পারে, তাই হবে সাহিত্যের সাধনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>গাংগেয় বদ্বীপে ইসলামের ভিত</strong></h5>
<p>বাংলাদেশে ইসলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হবার পরই ইসলামী সাহিত্যের সৃষ্টি। ইসলামের নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকালেই খ্রিষ্টীয় সপ্তম ইসলামের দাওয়াত বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রাকৃতিক ও মানসিক উভয় দিক থেকে এখানকার পরিবেশ ছিল অনুকূল। এই অনুকূল পরিবেশে ইসলামের দাওয়ার সহজে বিস্তার লাভ করে। উপমহাদেশের কেন্দ্র দিল্লী থেকে বহু দুরে  থাকায় বিদেশী আক্রমণকারীদের দৃষ্টি কমই এদিকে পড়েছে এবং অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীরাও এখানে কম সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া সবুজ শ্যামল বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত ও প্রাকৃতিক বন জংগলাকীর্ণ সমতলভূমি এমন এক ধরনের নৈসর্গিক গুরু গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করেছিল যা নিরিবিলি নিশ্চিন্তে সত্য দীনের দাওয়াত ছড়াবার পথে সহায়ক হয়েছিল। ফলে স্থানীয় বৌদ্ধ, জৈন ও আর্য ধর্ম প্রভাবিত জনগোষ্ঠী ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করে। এই সংগে আর একটি বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো। কয়েক হাজার বছর থেকে এ এলাকায় বিপুল সেমেটিক জনগোষ্ঠীর সমাবেশ ঘটেছিল। তাদের ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল তৌহীদবাদী। কালের আবর্তনে তাতে মরচে পড়ে গিয়েছিল। আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী বৌদ্ধবাদী ও জৈনবাদী ধর্মীয় সংস্কার যেভাবে এ এলাকায় ব্যাপক বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল ঠিক একই ধারায় ইসলামী তৌহীদবাদ সমগ্র বাংলার অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয়েছিল অতি অল্প সময়েই। যেন এটা ছিল তাদের প্রাণের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ। সকালে হারিয়ে গিয়েছিল আবার সন্ধ্যায় তাকে ফিরে পেয়েছিল, এভাবে তারা এটাকে গ্রহণ করেছিল। তাই হিন্দুস্তানের অতি প্রাচীন মুশরিকী আবাসভূমির মধ্যে গড়ে উঠতে পেরেছিল একটি বিশাল তৌহীদবাদী জনগোষ্ঠী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আলেম উলামা ও কাজীদের জ্ঞানচর্চা</strong></h5>
<p>মুললিম বিজেতাদের পূর্বে সমুদ্র ও নদীপথে আরব বণিকদের সাহায্যে বাংলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করে ইসলামের প্রথম যুগেই। এরপর ইসলাম প্রচারকদের আগমন ঘটতে থাকে। মুসলিম বিজেতাদের ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পর এ ধারা বলিষ্ঠতা অর্জন করে। এ সময় এদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম আইনঙ্গ তথা ফকীহ ও কাজীদের আগমন ঘটতে থাকে। তারা ছিলেন ইসলামি শাস্ত্রে সুদক্ষ ও পারদর্শী। মুসলিম বিশ্বে যে বিপুল জ্ঞান চর্চা হচ্ছিল তার ঢেউ এখানেও এসে পড়ে। ফলে ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকেই এখানে গৌড়, পান্ডুয়া,মাহিসুন (মাহিসন্তোষ), সোনারগাঁও ইত্যাদি এলাকায় বড় বড় ইলমী তথা ইসলামী জ্ঞান চর্চার  কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এখানকার মাদরাসাগুলোতে ইসলামী জ্ঞান আহরণ করার জন্য সমগ্র হিন্দুস্তান থেকে ছাত্রদের আগমন ঘটতো। শায়খ তাকিউদ্দীন আরাবী, শায়খ শরফুউদ্দীন আবু তাওয়ামাহ, শায়খ ইয়াহইয়া মানেরী, শায়খ আলাউল হক, হযরত শায়খ নুর কুতবুল আলম ইত্যাদি বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্ঞানসাধকগণ এসময় এসব জ্ঞানকেন্দ্র আলোকিত করেছিলেন। তাই বলা যায়, ইসলামি শাসনের প্রথম যুগেই বাংলাদেশ ইসলামী জ্ঞানচর্চার  পীঠস্থানে পরিণয় হয়। এখানে এর পরিবেশও ছিল। তখন জ্ঞানচর্চার ভাষা ছিল আরবী ও ফারসী । ফলে বিদেশাগত মুসলমান এবং এদেশীয় শিক্ষিত, জ্ঞানী  ও পণ্ডিতদের মধ্যে মূলত এ জ্ঞানচর্চা সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের মূল কেন্দ্র দিল্লীতে শক্তিশালী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান সাধনার এই কেন্দ্র বাংলা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।</p>
<p><em>সাধারণ মুসলমানের ভাষা ছিল বাংলা। ইতিপূর্বে পাল যুগে বৌদ্ধ শাসনামলে সাহিত্যের ও রাজভাষা সংস্কৃত থাকলেও সাহিত্য ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার চর্চা যা একটু আধটু হয়েছিল সেনযুগে হিন্দু শাসনামলে এসে তা সম্পূর্ণরণে রহিত হয়ে যায়। সংস্কৃতের মাধ্যমে সাহিত্য চর্চা ও রাজকার্য চলতে থাকে। এজন্য একটা দরবারী জগাখিচুড়ি মার্কা সংস্কৃত ভাষাও গড়ে ওঠে। মুসলিম সুলতানদের শাসনামলে মূলত বাংলা ভাষার পুনরজন্ম হয়। মুসলিম শাসকগণ তাঁদের দরবারী ও রাজভাষা ফারসী এবং ইলমী ভাষা আরবী রাখলেও মুসলিম এবং এদেশটার জনসাধারণের ভাষা বাংলার ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার জন্য রাজকোষ অর্থ বরাদ্দ করেন। ফলে ধীরে ধীরে বাংলা ইলমী ভাষায় রুপান্তরিত হবার পথ প্রশস্ত হতে থাকে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সুফী সাধকদের ইসলাম প্রচার</strong></h5>
<p>মুসলমানদের মধ্যে দিনরাত আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন এবং তাঁর ইবাদতে মশগুল একটি দল গড়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন সুফী নামে খ্যাত। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের য্যোগী, সন্ন্যাসী ও রাহেবদের মতো তাঁরা সংসার বিরাগী ছিলেন না। তাঁরা সংসার,ধর্ম, জ্ঞানচর্চা এবং এমনকি জিহাদ চর্চাও করেছেন। এই সংগে আল্লাহর ইবাদত ও মানবতার সেবাই ছিল তাঁদের ব্রত। বাংলায় ইসলাম প্রচারে এই সুফিদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশী। তাই বাংলার মুসলিম সমাজে সুফীদের জীবন চর্চার  প্রভাব বেশী অনুভুত হয়েছে। কিন্তুু সুফীগণ ইসলামী শরীয়তের বাইরে কোনো অভিনব ও কৃত্রিম জীবন যাপন করতেন না।তারা ছিলেন আদর্শ মুসলিম এবং আদর্শ ইসলামী চরিত্রের অধিকারী। তাঁরা ছিলেন কুরআনের সুরা আল কাসাসের ৭৭ নং আয়াতে ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তার মাধ্যমে আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কারা,তবে সেই সংগে দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলো না।’ মর্মবাণীর যথার্থ আধার। তাঁরা সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেছেন। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করেছেন এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করেননি।খিলাফয়ে রাশেদার চার পাঁচশো বছর পরে সৈরতান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক শাসকদের সাথে কোথাও  তাঁরা কোনো আপোশ করেন নি। বরং কবি ও দার্শনিল ইকবালের ভাষায় অনেক জায়গায় ‘সিকান্দাররা কালিন্দরদের কথায় ওঠাবসা করতেন। দিল্লীর খাজা কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী র., হযরত বু আলী কলন্দর র. আজমীরের হযরত খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতী র. এবং গৌড়ের হযরত শাহ নূর কুতুবুল আলম র. এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই সুফীরা কখনো কোনো অন্যায়, জুলুম ও শোষণের সাথে আপোশ করেননি। তাঁরা ব্যাপক হারে জনগণকে ইসলামের তালিম ও তরবীয়ত দিয়েছেন এবং তাদের ইসলামী জীবন যাপানে সাহায্য করেছেন।</p>
<p><em>এই সুফীদের হাতে এক সাথে এত বেশী সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে যে, তাদের ইসলামী তালিম ও তরবিয়ত দেয়া এবং তাদের ইসলামী চরিত্র গঠন করা এই সীমিত সংখ্যক সুফীর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। যদি পনের শতকের জৌনপুরের বিখ্যাত সুফী হযরত মীর সাইয়েদ আশরাফ জাঁহাগীর সিমনানীর একটি পত্র থেকে জানা যায় ‘মোটকথা বাংলার বড় শহরের কথা বাদ দিলেও এমন কোনো ছোট শহর বা গ্রাম নেই যেখানে খোদাভীরু সুফীগণ আগমন ও বসতি স্থাপন করেননি’। তারপরও বলা যায় কুরআন ও সুন্নাহ চর্চার অবর্তমানে বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী ইসলামের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারেনি। যার ফলে মুশরিকী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বেড়া টপকে তারা ইসলামী মিল্লাতের আওতাভুক্ত হলেও ওদিক থেকে আসার সময় নিজেদের বহিরংগে মুশরিকী সভ্যতা সংস্কৃতির অনেক কিছু সাথে করে নিয়ে আসে। কালক্রমে এগুলো মুসলিম জীবন ধারায় জেঁকে বসে।</em></p>
<p>মুলত ইসলাম এমন একটা জীবন ব্যবস্থা ও জীবনাদর্শ যা মোটেই অনুষ্ঠান নির্ভর নয়। বরং কতিপয় বিশ্বাস ও বিশ্বাসভিত্তিক কর্মের ওপরই তা নির্ভরশীল। ইসলামের উৎস হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল। তৃতীয় কোনো সত্তার সাথে ইসলাম সরাসরি জড়িত নয়। তাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রথম পর্যায়ে সুফী দরবেশ বা উলামায়ে কেরামের যারাই জড়িত থাক না কেন সেক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন ও  সুন্নাহ চর্চার যতটুকুন কমতি থেকে গেছে তা ইসলামী ভিত্তির দুর্বলতা হিসাবেই চিহ্নিত হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>স্থানীয় কুফরী উপাদান</strong></h5>
<p>বাংলায় মুসলমানদের আগমন এবং ইসলামী আদর্শবাদের প্রসারের পূর্বে যেসব ধর্মমত বিস্তার লাভ  করেছিল সেগুলির পেছনে কোনো পরিচিত ও পরীক্ষিত আসমানী কিতাবের সমর্থন ছিল না। বৌদ্ধবাদ, জৈনবাদ ও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদেরই এখানে প্রচলন ছিল বেশী। এই তিন বৃহৎ ধর্মমতের বাইরে কাল্পনিক দেবদেবীর পূজারও একটা ধারা প্রচলিত ছিল। মূলত সবগুলো ধর্মমতই ঈশ্বর আরাধনার নামে প্রকৃতি পূজা ও পুতুল পুজায় পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মমত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ, ত্রিপিটক ইত্যাদিকে অভ্রান্ত মনে করতো। কিন্তু এর পেছনে কোনো শক্তিশালী ভিত্তি উপস্থাপন করতে পারতো না। ফলে সেগুলো প্রায় গালগল্প, পুরাতন কাহিনী, নিছক নীতিকথা এবং দার্শনিক আলোচনার কচকচি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল্লাহর অস্তিত্বে বিভিন্ন জীব ও জড়কে শরীক করা এবং এতদসংক্রান্ত ব্যাপক কুসংস্কারই ছিল ধর্ম। ফলে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে নানান বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্যের সমাবেশ ঘটেছিল। প্রকৃত সত্যকে মেনে নেবার মতো মানসিকতা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।</p>
<p>আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী রীতি বর্ণবাদের ভিত্তিতে সমাজকে বিভক্ত করে ফেলেছিল। মানুষ সরাসরি মানুষের দাসে পরিণত হয়েছিল। বরং একদল মানুষ সমাজে অন্ত্যজ ও মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। বিরোধী ধর্ম মত জৈন ও বৌদ্ধবাদও ধীরে ধীরে বর্ণভেদ প্রথার হাতে নিজেদের সোপর্দ করে দিয়েছিল। অথবা কোথাও আত্মরক্ষার্থে আত্মগোপন করে সহজিয়া ও তান্ত্রিক ইত্যাদি মতবাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়েছিল। অর্থাৎ ধর্মের নামে সমগ্র বাংলাদেশে ধর্মীয় অনাচার কুসংস্কার ও চারিত্রিক নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। এই ছিল তখনকার বাংলা সাহিত্য চর্চার পটভূমি বা পরিবেশ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলমানদের সাহিত্য সাধনা<br />
</strong></h5>
<p>বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কয়েকশো বছর পূর্ব থেকে ইসলাম প্রচারকদের এদেশে আগমন শুরু হয়। ইসলামের খালেস তৌহিদবাদ ও সামাজিক সাম্য বাংলার পৌত্তলিক সমাজে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক অবিচার, জুলুম, নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী পরিবেশ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি নিরাকার সর্বশক্তিমান একক স্রষ্টার আরাধনার ধারণা সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাকালে চতুরদিকে যখন ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা বেড়ে চলছিল তখনকার সমাজে ইসলামের শক্তির একটা অস্পষ্ট প্রভাব সমসাময়িক একটি কবিতায় ফুটে উঠেছে। অজ্ঞতাবশত কদি রামাই পণ্ডিত তের শতকের শেষের দিকে লিখিত তাঁর এ কবিতায় ইসলামী আদর্শ ও সদ্যগঠিত মুসলিম সমাজের চিত্র সঠিক রূপে আঁকতে না পারলেও ইসলামের অসাধারণ ও যাদুকরী প্রভাব এর মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর কবিতাটির নাম নিরঞ্জনের রুষ্মা । এ কবিতায় মধ্যযুগীয় ইউরোপের পোপ ও যাজকদের ক্ষমতার মতো ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু পুরোহিতদের ক্ষমতার কিছু আভাস পাওয়া যায়। জাজপুর তথা ওড়িষার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সদ্ধর্মীদের নিকট কর আদায় করতে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যগোষ্ঠী গলার পৈতা কানে বেড় দিয়ে বৌদ্ধ জনসাধারণকে শাপ শাপান্ত করে তাদের বাড়ি-ঘর আগুন জালিয়ে ছারখার করে দেয়। তাদের এ জুলুম উৎপীড়ন দেখে ধর্মদেবতা বৈকুন্ঠে বসে এর প্রতিবিধানে মনোনিবেশ করলেন। ধর্মরূপী মুসলমানরা জাজপুরে প্রবেশ করলো এবং ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীরা রাতারাতি ধর্মান্তর গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলো। তারা দেউল ও দেব বিগ্রহ ভেঙে পুতুল পুজার অবসান ঘটিয়ে ব্রাহ্মণদের বিনাশ করলো। কবির কল্পনায় বিষয়টা এভাবে ধরা দিয়েছে:</p>
<p>ধর্ম হইল জবন রূপী<br />
মাথায়েত কাল টুপি<br />
হাতে শোভে ত্রিকচ কামান।<br />
চাপিয়া উত্তম হত্র<br />
ত্রিভুবনে লাগে ভ-এ<br />
খোদায়ে বলিআ এক নাম।।<br />
(নিরঞ্জন নিরাকার<br />
হৈলা ভেস্ত অবতার<br />
মুখেত বলএ দম্বদার।।<br />
জথেক দেবতাগণ<br />
সভে হৈয়‍্যা একমুন<br />
আনন্দেতে পরিলা ইজার।।)<br />
ব্রহ্মা হৈল্যা মহামদ<br />
বিষ্ণু হৈল্যা পেকাম্বর<br />
আদম্ফ হইল শূলপানি।<br />
গনেশ হইলা গাজী<br />
কার্তিক হইলা কাজী<br />
ফকির হইলা জথ মুনি।।<br />
তেজিয়া আপন ভেক,<br />
নারদ হইলা শেক,<br />
পুরন্দর হইলা মলনা।<br />
চন্দ্র, সূর্য আদি দেবে<br />
পদাতিক হয়্যা সেবে,<br />
সভে মিলে বাজাএ বাজনী।।<br />
আপনি চণ্ডিকা দেবী,<br />
তিঁহ হৈল্যা হায়া বিবি<br />
পদ্মাবতী হৈল্যা বিবি নূর।<br />
জথেক দেবতাগণ,<br />
সভে হয়া একমন,<br />
প্রবেশ করিল জাজপুর।।<br />
দেউল দেহারা ভাঙ্গে,<br />
ক্যাড়্যা ফিড়্যা খাএ রঙ্গে,<br />
পাখড় পাখড় বোলে বোল।<br />
ধরিয়া ধর্মের পাএ,<br />
রামাঞি পণ্ডিত গাএ,<br />
ই বড় বিসম গণ্ডগোল।।</p>
<p>(শব্দার্থ: দম্বদার – দম-ই-মাদার, বদরুদ্দীন মওলানা শাহ-ই মাদার, পনের শতকের লোক, এ অংশটি পরবর্তীকালে প্রক্ষিপ্ত। আদম্ফ – আদম।  পাখাড়-পাকড়াও।)</p>
<p>কবির বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে: ধর্মদেবতা মাথায় কালো টুপি পরে ত্রিকচ অর্থাৎ তীরকাশ তথা তীরধারী কামান নিয়ে উন্নত জাতের অশ্বে আরোহন করে ত্রিভূবনে ভীতি সঞ্চারকারী ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে জবন তথা মুসলিম রুপ ধারণ করলেন। (নিরঞ্জন নিরাকার বেহেশতের অবতার হয়ে মুখে দম-ই-মাদার বলতে লাগলেন। সমস্ত দেবতা একমত হয়ে আনন্দে ইজার পরে নিলেন অর্থাৎ সবাই মুসলমান রূপ ধারণ করলেন।) ব্রহ্ম মুহাম্মাদ হলেন, বিষ্ণু হলেন পয়গম্বর এবং মহাদেব হলেন আদম। পনেশ গাজী, কার্তিক কাজী এবং যত মুনি ঋষি ফকির দরবেশ সাজলেন। আপন বেশভূষা পরিত্যাগ করে নারদ শেখ ও পুরন্দর মওলানা সাজলেন। চন্দ্র সূর্য প্রভৃতি আদি দেব পদাতিক হয়ে বাজনা বাজিয়ে তাদের সেবা করতে লাগলেন। চণ্ডিকা দেবী স্বয়ং হাওয়া বিবি হলেন আর পদ্মাবতী হলেন বিবি নূর, যত দেবতা ছিলেন সবাই এভাবে মুসলমান সেজে এক সাথে জাজপুরে প্রবেশ করলেন। তারা দেবালয় ও দেবগৃহ ভাঙলেন, মনের আনন্দে লুটতরাজ করে খেতে লাগলেন এবং সংগে সংগে অপরাধীদের ‘পাকড়াও পাকড়াও’ ধধ্বনি তুললেন। এই দারুণ গণ্ডগোল দেখে রামাই পণ্ডিত ধর্মের পায়ে লুটিয়ে পড়লো এবং গান গাইলো। এতে বুঝা যাচ্ছে দেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে এবং ইসলামের ন্যায়ের দন্ড তথাকথিত বর্ণবাদী সমাজের জুলুম, অবিচার ও উৎপীড়ন নির্মূল করে সমাজে শান্তি, সমতা ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনছে। মানুষ ইসলামের হক ও সাম্যের আহবান গ্রহণ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে।</p>
<p><strong>বাংলায় তুর্কীদের হাতে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। তুর্কীরা পাঠান ও মোগলদের তুলনায় বেশি ইসলামী ভাবাপন্ন ছিলেন। ফলে বাংলায় আরব দেশের মতো না হলেও তাদের সাথে সামঞ্চস্যশীল একটা ন্যায় ইনসাফ ও সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত বাংলায় মুসলমানদের সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। সমাজে একটা ইসলামী পরিবেশ ও ইসলামী দৃষ্টিভংগী সৃষ্টি হচ্ছিল। সেটা ছিল : মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই এক আদমের সন্তান। এক আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক। একমাত্র তাঁরই ইবাদত ও আরাধনা করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই। সবাই তাঁর অনুগত। বাংলার বিশাল ভূখন্ডে (অর্থাৎ বাংলা বিহার, ওড়িষা ও বৃহত্তর আসাম) এই তৌহিদী পরিবেশ দানা বেঁধে উঠছিল। কিন্তু যেহেতু বাংলা ভাষা তখনো স্থিতিশীলতা লাভ করেনি, তখনো সৃজ্যমান ছিল  (কয়েকশো বছর আগের চর্যাপদের ভাষা দেখলে তা বোঝা যাবে) আর সৃজ্যমান ভাষায় বড় ও সৃষ্টিশীল কোনো কিছুর আশা করা যায় না, তাই এসময়কার সাহিত্যের বিক্ষিপ্ত নিদর্শন থাকলেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য মুসলিম কবির রচনার সাক্ষাত পাওয়া যায় না। পনের শতক থেকে আমরা মুসলিম কবিদের একটা ‘ধারাবাহিকতা লক্ষ করি। শাহ মুহাম্মদ সগীর, জৈনুদ্দীন, মুজাম্মিল তাদের অন্যতম। শাহ মুহাম্মদ সগীর তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘য়ুসুফ-জলিখা’ রচনা করেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের আমলে (১৩৮৯-১৪১০)। কবি জৈনুদ্দীন ছিলেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের আমলে (১৪৭৪-১৪৮১) সভাকবি। কবি মুজাম্মিল পনের শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পনের শতক থেকে উনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত যে অসংখ্য মুসলিম কবির সন্ধান পাই তাদের অন্যতম হচ্ছেন : সৈয়দ সুলতান, (১৫৫০-১৬৪৮) শেখ ফয়জুল্লাহ, শুকুর মাহমুদ, (১৬৮০-১৭৫০) সাবিরিদ খান, দোনাগাজী, বাহরাম খান, আফজাল আলী, মুহম্মদ কবীর, মুহম্মদ খান, (১৫৮০-১৬৫০) দৌলত কাজী, (১৬০০-১৬৩৮) আলাওল, (১৬০৭-১৬৮০) শেখ পরান (১৫৫০-১৬১৫) আবদুল হাকীম (১৬২০-১৬৯০) শাহ গরীবুল্লাহ, মুহম্মদ ইয়াকুব, হায়াত মাহমুদ, মুহম্মদ মুকীম (১৭০০-১৭৭৫), সায়্যিদ হামজা (১৭৫৫-১৮১৫) প্রমুখ।</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনের অবসানের পর বিশেষ করে এদেশের অমুসলিম সমাজের সহযোগিতায় বিদেশী খৃস্টান বণিক ইংরেজরা দেশের শাসন যন্ত্র দখল করে। ফলে উনিশ শতকের শুরু থেকে ইংরেজ ও হিন্দুর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বসে বাংলা ভাষার নিত্য ব্যবহৃত আরবী ফারসী শব্দগুলো দুই হাতে বাদ দিয়ে মৃত সংস্কৃত ভাষার অপ্রচলিত ও অপরিচিত কঠিন শব্দসম্ভারে ভারাক্রান্ত করে একটা নতুন বাংলা গদ্য তৈরি করা হয়। অতপর এ ভাষায় গদ্য ও পদ্য লেখার কাজ চলে। ইংরেজের সাথে সংঘাতে লিপ্ত থাকার কারণে মুসলমানরা প্রথমে এ বিষয়ে উদাসীন থাকে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পরাজয়ের পর ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাদের এক ধাপ পিছিয়ে আসতে হয়। ইংরেজের সহযোগিতা ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় উদ্দীপিত হিন্দু মনীষার কারণে হিন্দু ঐতিহ্য এই সাহিত্যে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। তবুও এই উনিশ শতকে যেসকল মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের জন্ম হয়েছে তারা এর মধ্যে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী স্বতন্ত্র পথটি তৈরি করার প্রচেষ্টা চালান। এদের মধ্য থেকে কয়েকজন শ্রেষ্ট কবি সাহিত্যিকের নাম এখানে উল্লেখ করছি – এরা হচ্ছে ঔপন্যাসিক প্রবন্ধকার মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২), মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২) প্রবন্ধকার শেখ আবদুর  রহীম (১৮৫৯-১৯৩১), কবি মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩), প্রবন্ধকার ও সংবাদিক মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), কবি প্রবন্ধকার ও ঔপন্যাসিক সৈয়্যদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী  (১৮৮০-১৯৩১), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), প্রবন্ধকার ডা. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৯৯-১৯৩৬), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), কথাশিল্পী এস, ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), ঔপন্যাসিক নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৭৮-১৯২৩), কবি শেখ ফজলুল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), কবি কথাশিল্পী ও প্রবন্ধকার বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কবি শাহাদৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), কবি ও ঔপন্যাসিক শেখ মুহম্মদ ইদরিস আলী (১৮৯৫-১৯৪৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম সাহিত্যের উপাদান</strong></h5>
<p>মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা যখনই সাহিত্য ময়দানে পদার্পণ করেছেন তাদের মধ্যে একটা স্বাতন্ত্র ও সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। তাদের একটা বিশিষ্ট অংশ নিজেদেরকে নিছক কবি সাহিত্যিক মনে করেননি। তাঁরা মনে করেছেন বাংলার এই কুফরী সমাজে যেমন তাদের একক তৌহিদবাদী হিসাবে টিকে থাকতে হবে তেমনি এখানে কুফরীর গলদ চিহ্নিত করাও তাদের দায়িত্ব। এজন্য তারা একই সংগে ভাষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। যে ভাষায় ইসলামী আদর্শ ও আচরণ প্রকাশ এবং তার বিকাশ সাধন করা যায় সে ভাষা প্রয়োগ করার কথা তারা চিন্তা করেছেন। যেমন :</p>
<p>দেশেত আলিম থাকি যদি ন জানায়।<br />
সে আলিম নরকেত যাইব সর্বথায়।।<br />
নর সবে পাপ কৈলে আলিমের ধরি।<br />
আল্লাহর সাক্ষাতে মারিবেস্ত দণ্ড বেড়ি।।<br />
তোম্মারা সবের মেলে মোর উৎপন।<br />
তেকারনে কহি আমি শাস্ত্রের বচন।।<br />
আল্লায় বলিব তোরা আলিম আছিলা।<br />
মনুষ্যে করিতে পাপ নিষেধ ন কৈলা।।<br />
আছুক আপনা পাপ আলিমে খণ্ডাইব।<br />
পরের পাপের লাগি লাঘব পাইব।।<br />
(শব-ই-মিরাজ: সৈয়্যদ সুলতান)</p>
<p>কবি সৈয়্যদ সুলতান যেমন হিন্দু ধর্ম কাহিনী ও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ইসলামী কাহিনী ও প্রস্তাব বাংলায় লিখে প্রচার করেছিলেন ঠিক তেমনি তাঁর শাগরিদ কবি মুহম্মদ খান পরবর্তীকালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘মকতুল হুসৈন’ এও এ উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। এ গ্রন্থটি রচিত হয় ১৬৪৫ খৃস্টাব্দে। এতে বলা হয়:</p>
<p>হিন্দুস্থানে লোকে সবে ন বুঝে কিতাব।<br />
ন বুঝি শুনি নিত্যি করে মহাপাপ।।<br />
তেকাজে সংক্ষেপ করি পঞ্চালী রচিলুং।<br />
ভাল মন্দ পাপ পূণ্য কিছু ন জানিলুং।।<br />
পঞ্চালী পড়িতে সবে মনে ভয় পাই।<br />
অবশ্য কিতাব কথা শুনিবেক যাই।।<br />
কিতাবে আল্লার আজ্ঞা শুনিবেন্ত যবে।<br />
দান ধর্ম পূণ্য কর্ম করিবেন্ত তবে।।<br />
অবশ্য মোহোরে সবে দিবে আশীর্বাদ।<br />
মহাজন আশীর্বাদ খণ্ডিবে প্রমাদ ॥<br />
বিশেষ পীরের আজ্ঞা ন যায় লঙ্ঘন<br />
রচিলুং পাঞ্চালিকা তাহার কারম।।</p>
<p>শেখ মুত্তালিব (১৫৯৫-১৬৬০) লিখছেন:<br />
আরবীতে সকলে ন বুঝে ভাল মন্দ।<br />
তেকারনে দেশী ভাষে রচিলু প্রবন্ধ।।<br />
মুছলমানী শাস্ত্র কথা বাঙ্গালা করলু।<br />
বহু পাপ হৈল মোর নিশ্চয় জানিলু।।<br />
কিন্তু মাত্র ভরসা আছয়া মনান্তরে।<br />
বুঝিয়া মুমিন দোয়া করিব আমারে।।<br />
মুমীনের আশীর্বাদে পূণ্য হইবেক।<br />
অবশ্য গফুর আল্লা পাপ খেমিবেক।।<br />
এসব জানিয়া যদি করয়ে রক্ষণ<br />
তবে সে মোহোরে পাপ হইবে মোচন ॥<br />
(কিফায়িতুল মুসল্লীন)</p>
<p>মধ্যযুগের মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা তাদের জীবন ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা তাদের সাহিত্যে ইহকাল ও পরকাল উভয় কালকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের কাব্যের বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত ব্যপক। কেবলমাত্র মানব মানবীর প্রেমোপাখ্যান লিখেই তারা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেননি। এইসংগে তারা ইসলামী শরীয়ত, হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনীর মোকাবিলায় মুসলিম পৌরাণিক কাহিনী, হিন্দুদের পৌরাণিক ও আজগুবি সৃষ্টিতত্ত্বের তুলনায় সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ  ইসলামী সৃষ্টিতত্ব, ইসলামী দর্শন ও সুফীতত্ব, মুসলিম ঐতিহাসিক কাব্য, রূপক সাহিত্য তথা একপ্রকার রূপকের মাধ্যমে হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরা, মর্সিয়া সাহিত্য, মারফতী ইত্যাদি ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন গান রচনা করেন। তাদের এতদসম্পর্কিত কিছু গ্রন্থের নামোল্লেখ করলে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা আরো একটু সুস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে মনে হয়। যেমন:</p>
<ul>
<li>শরীয়ত নামা-নসরুল্লাহ খান</li>
<li>নসীহত নামা-শেখ পরান</li>
<li>কিফায়িতু-ল-মুসল্লীন-শেখ মুত্তলিব</li>
<li>হিদায়িতু-ল-ইসলাম-নজরুল্লাহ খান</li>
<li>নামাজ মাহাত্ম্য- মুহাম্মদ জান</li>
<li>শিহাবুদ্দীন নামা-আবদুল হাকীম</li>
<li>হিতজ্ঞান বাণী- হায়াত মাহমুদ</li>
<li>নবী বংশ-সৈয়্যদ সুলতান</li>
<li>রসূল বিজয়-ঐ</li>
<li>শব-ই-মিরাজ- ঐ</li>
<li>ওফাৎ-ই-রসূল- ঐ</li>
<li>ইবলিস নামা ঐ</li>
<li>আম্বিয়া বাণী- হায়াত মাহমুদ</li>
<li>কিয়ামত নামা -মুহম্মদ খান</li>
<li>নূর নামা (সৃষ্টিতত্ব)- শেখ পরান</li>
<li>নূর নামা (সৃষ্টিতত্ব)- আবদুল হাকীম</li>
<li>জ্ঞান প্রদীপ (সূফীতত্ব) সৈয়্যদ সুলতান</li>
<li>কারবালা (মর্সিয়া সাহিত্য)-আবদুল হাকীম</li>
<li>জঙ্গনামা- গরীবুল্লাহ ও ইয়াকুব</li>
<li>সায়াৎনামা -(জ্যোতিষ শাস্ত্র) মীর মুহাম্মদ শফী</li>
</ul>
<p>এ ধরনের ইসলামী জ্ঞান ও মুসলিম জীবন সম্পর্কে অসংখ্য গ্রন্থ তারা রচনা করেন। তাদের লেখনীর সাহায্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চার একটা সাগর সৃষ্টি হয়।</p>
<p><strong>তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, মুসলিম কবিদের এই ইসলাম চর্চার সাথে খালেস তৌহীদের সম্পর্ক যতটুকু তার চেয়ে অনেক বেশী সম্পর্ক সুফীতাত্বিক মরমীবাদের। বাংলার কবিদের কাব্যচর্চার ওপর ইরানের প্রভাব ব্যাপকতর। সে তুলনায় আরবীয় প্রভাব অতি সামান্যই। আর ইরানী প্রভাব মানেই হচ্ছে ইরানী সাহিত্যে যে মাশশায়ী, ইশরাকী ও ইরফানী ইত্যাদি এরিস্টটলীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবাদী দর্শন এবং তাসাউফের গৃঢ় রহস্যভিত্তিক মরমীবাদের প্রসার ঘটে তারই প্রভাব বাংলার কবিদের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে।</strong></p>
<p>আব্বাসীয় আমলে হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে গ্রীক দর্শনের আলোচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালী ও ফখরুদ্দীন রাযীর আক্রমণাত্মক ভূমিকার ফলে মাশশায়ী দর্শন ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে ফেললে ইশরাকী ও ইরফান তাসাউফ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইশরাকী তাসাউফের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খ শিহাবদ্দীন ইয়াহইয়া ইবনে হাবস ইবনে আমীরাক সোহরাওয়দী (৫৪৯হি:- ৫৮৭হি:)। রেই, হামেদান, কাযভীন ইত্যাদি ইরানের বিভিন্ন শহরে তাসাউফের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা গড়ে ওঠে। ফারসী সাহিত্য মূলত তাসাউফের এই ভাবধারাগুলির মধ্যেই বিকশিত হয়। পনের শতকের কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে উনিশ শতকের বাংলার কবিদের মধ্যে এর সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। ইরানী কবিদের সাথে তারা গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন ‘ইউসুফ জুলিখা’সহ ইরানী কবিদের অনেকগুলি কাব্য তারা বাংলায় অনুবাদ করেন। এমনকি অনেকে তাদের আদলে কাব্য ও কবিতা চর্চা করেন। এখানে পীরের নির্দেশে গ্রন্থরচনার কথা অনেক কবিই বলেছেন। পনের শতকের কবি লিখেছেন:</p>
<p>শাহা বদরুদ্দীন পীর কৃপাকুল হরি।<br />
শতমুখে সে বাখান কহিতে ন পারি।।<br />
তাহান আদেশ-মালা শিরেতে ধরিয়া।<br />
রচিলেন্ত মুজাম্মিলে মনে আকলিয়া।।<br />
(সায়াৎনামা)</p>
<p>পীর শাহ দৌলার আদেশে কবি শেখ চান্দ লিখছেন:<br />
ফতে মোহাম্মদ সুত শেখ চান্দ নাম।<br />
গুরুর আজ্ঞায় পঞ্চালী রচে অনুপাম।।<br />
কাছাছুল আম্বিয়া এক বিতাবেত শুনি।<br />
পঞ্চালী বাঁধিয়া তাকে পুস্তকেত ভনি।।</p>
<p><em>মূলত মধ্যযুগের বাংলা কবিতা তাসাউফের চত্বরে ঘোরাফেরা করে। ইউরোপ ও আমেরিকায় খৃষ্টান কবিরা যখন বাইবেলের মধ্যে ডুব দেয়, বাইবেল চর্চা করে এবং বাইবেল থেকে পথ নির্দেশনা নেবার চেষ্টা করে তখন এশিয়ার মুসলিম কবিরা ডুব দেয় তাসাউফের মধ্যে। তাসাউফের মধ্যে জীবন দর্শনের চিত্র অংকন করে। তাসাউফকে কুরআনের নির্যাস বিবেচনা করে। ফলে কুরআন থেকে পথ নির্দেশনা দেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। বাংলা মধ্যযুগের কবিরা কুরআন ও ইসলামের নামে যা কিছু বলেছেন তা সরাসরি কুরআন ও হাদীসের চিন্তা থেকে নয়। বরং ইরানী সাহিত্যের মধ্যস্থতায় তাসাউফের জারক রসে সিঞ্চিত করে বলেছেন।</em> এই প্রসংগে বলা যায় মওলানা রুমীর মসনবীকে বলা হয়েছে-</p>
<p>‘হত কুরআ দর যবানে পাহলভী’<br />
মসনবী-ই-মানবী-ই মৌলভী</p>
<p>অর্থাৎ ‘পাহলবী তথা ফারসী ভাষায় মওলানা রুমীর মসনবীই হচ্ছে কুরআন মজীদ।’</p>
<p>অথচ অন্যদিকে ইমাম গাজ্জালী র. মওলানা রুমীর এই মসনবীর চিন্তা উদ্বৃত (সামা) গান ও নাচের প্রবল বিরোধিতা করেছেন। অর্থাৎ কোনো গ্রন্থই কুরআনের সমান্তরাল হতে পারে না।</p>
<p>তাসাউফের চিন্তার জটিলতার কারণে পনের ষোল শতকের বাংলার কিছু মুসলিম কবি শ্রীচৈতন্যের ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে বৈষ্ণব পদাবলীও রচনা করেন। তারা এটাকে শির্ক মিশ্রিত এবং মুসলিম জীবন ধারা থেকে বিভিন্ন মনে করতে পারেননি। আল্লাহ যে খালেস তৌহীদের কথা কুরআনে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, শিরক ছাড়া অন্য সমস্ত গুনাহ তিনি মাফ করে দেবেন, সেই শিরক থেকে আমাদের জীবনকে যেমন মুক্ত রাখতে হবে তেমনি সাহিত্যও হবে তা থেকে মুক্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আধুনিক পরিবেশ ও আধুনিক সাহিত্য</strong></h5>
<p>উনিশ শতক থেকে এদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। এ আধুনিকতার সম্পর্ক ইংরেজী সভ্যতা সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় চিন্তার সাথে কবিতার আংগিকে কাঠামোয় এবং চিন্তায় যেমন পরিবর্তন আসে তেমনি নতুন গদ্যভংগী রচিত হয়। উপন্যাস, প্রহসন, নাটক ইত্যাদি কথাসাহিত্যের একটি ধারা সৃষ্টি হয়। সমগ্র সাহিত্য জগতে যেন নতুন জোয়ার আসে। মুসলিম সমাজ ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত থাকায় মুসলিম সাহিত্যিকরা প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা ভাষার ওপর থেকে মুসলিম ঐতিহ্যের প্রভাব ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়ে তাদের নিজেদের পৌরাণিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত করে। তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ন্যায় বড় বড় প্রতিভার জন্ম হয়। যথার্থই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উন্নতির উচ্চ সোপান অতিক্রম করতে থাকে।</p>
<p>এসময় মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে এগিয়ে আসেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। তিনি নতুন ভাষার ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর পরে শক্তিশালী লেখক হিসাবে এগিয়ে আসেন মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২), শেখ আবদুর রহীম (১৮৫৯ – ১৯৩১), আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৬৯-১৯৫৩), মওলানা মনিরুজ্জামান  ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার সৈয়্যদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), প্রবন্ধকার ও ঔপন্যাসিক এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), ঔপন্যাসিক নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ব (১৮৭৮-১৯২৩), প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), কবি শাহাদত হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), কবি ও প্রবন্ধকার গোলাম মোস্তাফা (১৮৯৭-১৯৬৪), ইত্যাদি অসংখ্য শক্তিশী সাহিত্যিকবৃন্দ। তাঁরা সবাই নিজেদের সময় ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল স্বাভাবিকভাবে প্রবল। তাই সাহিত্য জগতে তাঁরা প্রতিবেশীদের তুলনামূলক উন্নতমানের সাথে সহাবস্থান করেও মুসলমানদের জন্য একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।</p>
<p>এই সময় আগমন হয় বাংলার সাহিত্যাকাশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবি নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬)। ভাষার ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক প্লাটফর্মের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি মুসলিম ঐতিহ্যে ফিরে যাবার সকল প্রচেষ্টা শুরু করেন। তাঁর প্রতিভা প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীদের হৃদয়ও স্পর্শ করে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় বিচরণ করে তিনি ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের ঝাণ্ডা সমুন্নত করেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংগীত তাঁর অমর কীর্তি। নজরুলের পরে কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৩) তাঁর সাহিত্যধারাকে আরো পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ফররুখ ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যকে পূর্ণরূপে বিকাশিত করেন।</p>
<p><strong>১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লব হবার পর এর প্রভাব সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকের জার্মান চিন্তাবিদ কার্লমার্কস ও ফেড্রারিক এঙ্গেলস ছিলেন এই বিপ্লবী চিন্তাধারার উদগাতা। তাঁরা অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে এই বিপ্লবের ডাক দেন। আসলে কমিউনিস্ট ভাবধারা একটা অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম। একে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত করেন। একদল সাহিত্যিকের মাথায় শ্রেণীসংগ্রামের চিন্তা এবং এই সংগে নিরীশ্বরবাদিতা ও ধর্ম আফিমের ন্যায় এই ধারণা বন্ধমূল করে দেন। এরই ভিত্তিতে তারা দুনিয়াব্যাপী একটি সাহিত্যের আবহ তৈরিতে মেতে ওঠেন। মাত্র সত্তর বছরের মধ্যে তারা বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও ব্যর্থ হয়ে যান। মার্কসবাদ একটা অলীক কল্পনায় পরিণত হয়। কিন্তু বিশ্ব সাহিত্যকে তারা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এখন কয়েক প্রজন্ম ধরে। তারা সাহিত্য থেকে আল্লাহকে বিদায় দিয়েছেন। সাহিত্যের পরতে পরতে শ্রেণী সংগ্রাম প্রবেশ করিয়ে একটা হিংসাত্মক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। তারা মানবতাবাদের কথা বলেন। কিন্তু তাদের সাহিত্যের মাধ্যমে সবচেয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে মানবতা। তারা মানুষকে কোনো এক পর্যায়ে নিয়ে স্থিতিশীল করতে পারেননি। মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে কার কাছে আশ্রয় নেবে? এক আল্লাহকে ত্যাগ করলে অসংখ্য আল্লাহ এসে যায়। দেশ এক আল্লাহ, পাটি এক আল্লাহ, প্রেসিডিয়াম এক আল্লাহ- এভাবে ক্ষমতাধর প্রত্যেকেই এক এক আল্লাহ। এই স্বৈরাচারী আল্লাহদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষমতা মার্কসবাদী সাহিত্যের নেই।</strong></p>
<p>বিগত শতকের শেষার্ধব্যাপী এই মার্কসবাদী সাহিত্যের দাপাদাপি বাংলার মুসলিম সাহিত্য অংগণে অশনি সম্পাতের মতো অনুভুত হচ্ছিল। মুসলিম ঘরানার বহু সাহিত্যিক ইসলামী আদর্শবাদ ত্যাগ করে এদিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। মার্কসবাদের পতনের পর তাদের পালে আর হাওয়া বইছে না। তবুও তারা মার্কসবাদের মূল ভিত্তি সেক্যুলাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। অনেকে ইসলামী আদর্শবাদের আওতায় ফিরে আসছেন।</p>
<p>তবে ইসলামী আদর্শবাদও বিশ্বাসের নতুন বলয় সৃষ্টি করে ময়দানে নতুন করে জেগে উঠছে। আমাদের পূর্বসূরীদের বিগত ছ’সাতশো বছরের প্রচেষ্টা ও কর্মপ্রবাহ এ বলয়কে শক্তিশালী ভিত্তিদান করেছে। কুরআন ও হাদীস অবিকৃত থাকার এবং তাদের সাথে আমাদের আবেগগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ গড়ে ওঠার কারণে আজ সেখান থেকে পথনির্দেশ লাভ করা আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। ইসলামী সমাজ চিন্তা যেমন নতুন করে নব উদ্যমে বলীয়ান হচ্ছে তেমনি ইসলামী সাহিত্য চিন্তাও তার সাথে সমান তালে এগিয়ে যাবে।</p>
<div id="wpdevar_comment_1"></div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16231</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বড়র পিরীতি বালির বাঁধ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী নজরুল ইসলাম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Jul 2025 12:16:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15968</guid>

					<description><![CDATA[তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদী। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।… এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন- আবার কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদী। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।… এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন- আবার কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করেছেন।</p>
<p>আমার পাশেই দাঁড়য়েছিলেন আরো দু’একটি কাব্য-বাতিকগ্রস্ত রাজ-কয়েদী। আমার চেয়েও বেশী হেঁসেছিলেন সেদিন তাঁরা। আনন্দে নয়, যা নয় তাই শুনে।</p>
<p>কিন্তু ঐ আজগুবী গল্পও সত্য হয়ে গেল। বিশ্বকবি সত্যি সত্যিই আমার ললাটে ‘অলক্ষণের তিলক-রেখা’ এঁকে দিলেন।</p>
<p>অলক্ষণের তিলক-রেখাই বটে! কারণ এর পর থেকে আমার অতি অন্তরঙ্গ রাজবন্দী বন্ধুরাও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন। যাঁরা এতদিন আমার এক লেখাকে দশবার করে প্রশংসা করেছেন, তারাই পরে সেই লেখার পনের বার করে নিন্দা করলেন। আমার হয়ে গেল বরে শাপ!</p>
<p>জেলের ভিতর থেকেই শুনতে পেলাম, বাইরেও একটা বিপুল ঈর্ষা-সিন্ধু ফেনায়িত হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস হ’ল না। বিশেষ করে যখন শুনলাম, আমারি অগ্রজপ্রতিম কোন কবিবন্ধু সেই সিন্ধু-মন্থনের অসুর-পক্ষ লীড্‌ করছেন। আমার প্রতি তাঁর অফুরন্ত স্নেহ, অপরিসীম ভালবাসার কথা শুধু যে আমরা দুজনেই জানতাম তা নয়, দেশের সকলেই জানত তাঁর গদ্যে-পদ্যে কীর্তিত আমার মহিমা-গানের ঘটা দেখে।</p>
<p>সত্য-সুন্দরের পূজারী বলে যাঁরা হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে বেড়ান, তাঁদের মনও ঈর্ষায় কালো হয়ে ওঠে, শুনলে আর দুঃখ রাখবার জায়গা থাকে না।</p>
<p>এ খবর শুনে চোখের জল আমার চোখেই শুকিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম শুধু আমি- বাইরের এই লাভে অন্তরের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার। মনে মনে কেঁদে বল্‌লাম, হায় গুরুদেব! কেন আমার এত বড় ক্ষতিটা করলে!</p>
<p>বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন ক’রে ভক্ত তার ইষ্টদেবকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধুপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্রা-বিদ্রুপ করেছেন।</p>
<p>এমন কি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্র-বিদ্বেষী কোন একজনের মাথার চাঁদিতে আজও অক্ষয় হয়ে লেখা আছে এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।</p>
<p>আমার পরম শ্রদ্ধেয় কবি ও কথাশিল্পী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন কবির সামনেই এ কথা ফাঁস করে দিলেন। কবি হেঁসে বললেন, যাক, আমার আর ভয় নেই তাহলে।</p>
<p>তারপর কতদিন দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে। নিজের লেখা দু’চারটে কবিতা গানও শুনিয়েছি, অবশ্য কবির অনুরোধেই এবং আমার অতি সৌভাগ্যবশত তাঁর অতি প্রশসংসা লাভও করেছি কবির কাছ থেকে। সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় কোনদিন এতটুকু প্রাণের দৈন্য বা মন-রাখা ভাল-বলবার চেষ্টা দেখিনি।</p>
<p>সষ্কোচে দূরে গিয়ে বসলে সস্নেহে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। মনে হয়েছে, আমার পূজা সার্থক হ’ল, আমি বর পেয়ে গেলাম।</p>
<p><strong>অনেক দিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে গিয়ে থাকবার কথা বলেছেন। হতভাগা আমি, তাঁর পায়ের তলায় বসে মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না। বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।</strong></p>
<p><strong>এই নিয়ে কতদিন তিনি আমায় কতভাবে অনুযোগ করেছেন, তুমি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচ্‌ছ- তোমাকে জন-সাধারণ একবারে খানায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে- ইত্যাদি।</strong></p>
<p>আমি দেখেছি, এ গৌরবে আমার মুখ যত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কোনো কোনো নাম-করা কবির মুখে কে যেন তত কালি ঢেলে দিয়েছেন। ক্রমে ক্রমে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু শুভানুধ্যায়ীরাই এমনি করে শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন। আজ তিন চার বছর ধরে এই শুভানুধ্যায়ীরা গালি-গালাজ করেছেন আমায়, তবু তাঁদের মনের ঝাল বা প্রাণের খেদ্‌ মিটল না। বাপ রে বাপ! মানুষের গা’ল দেবার ভাষা ও তার এত কস্‌রতও থাকতে পারে, এ আমার জানা ছিল না।</p>
<p>ফি শনিবারে চিঠি! এবং তাতে সে কী গাড়োয়ানী রসিকতা, আর মেছোহাটা থেকে টুকে-আনা গালি! এই গালির গালিচাতে বোধ হয় আমি এ-কালের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ শাহানশাহ্‌।</p>
<p>বাংলায় রেকর্ড হয়ে রইল আমায় দেওয়া এই গালির স্তূপ। কোথায় লাগে ধাপার মাঠ! ফি হপ্তায় মেল (ধাপা-মেল) বোঝাই। কিন্তু এত নিন্দাও সয়েছিল। এতদিন তবু সান্ত্বনা ছিল যে, এ হচ্ছে তন্তুবায়ের বলীবর্দ ক্রয়ের অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া। বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া-রোগ-এ স্বদেশ-প্রেমের বাই উঠল। কোথায় তুই হাঁ করে খাবি গুলবদনীর গুলিস্তানে মলয় হাওয়া, দেখবি ফুলের হাই-তোলা, গাইবি ‘আয় লো অলি কুসুম-কলি’ গান, -তা না ক’রে দিতে গেলি রাজার পেছনে খোঁচা! গেলি জেলে, টানলি ঘানি, করলি প্রয়োপবেশন, পরলি শিকল-বেড়ী, ডান্ডাবেড়ী, বইগুলোকে একধার থেকে করাতে লাগলি বাজেয়াপ্ত, এ কোন্‌ রকম রসিকতা তোর? কেনই বা এ হ্যাঙ্গাম-হুজ্জুৎ!</p>
<p>হঠাৎ একদিন দেখি ঝড় উঠেছে সাহিত্যের বেণু-বনে এবং দেখতে দেখতে সুরের বাঁশী অসুরের কোঁৎকা হয়ে উঠেছে! ছুট ছুট! যত মোলায়েম ক’রেই বেণু-বন বলি না কেন, তাতে ঝড় উঠলে যে তা চিরন্তন বাঁশ-বনই হয়ে ওঠে, তা কোন্‌ পাষণ্ড অবিশ্বাস করবে!</p>
<p>বেচারী তরুণ সাহিত্য! যেন বালক অভিমন্যুকে মারতে সপ্ত মহারথীর সমাবেশ! বাইরে ছেলেমেয়ের ভিড় জমে গেল! ঘন ঘন হাততালি! বলে, ‘এই! বাঁশ-বাজি দেখতে যাবি, দৌড়ে আয়।’ কিন্তু, শুধুই কি সপ্ত মহারথীর মার! তাঁদের পেছনের পদাতিকগুলি যে আরো ভীষণ। ধূলো কাদা গোবর মাটি- কোনো রুচির বাছ-বিচার নাই, বেপরোয়া ছুঁড়ে চলেছে।</p>
<p>মহারথীদের মারে অমর্যাদা নেই, কিন্তু বাইরে থেকে আনা ঐ ভাড়াটে গুণ্ডাগুলোর নোংরামীতে সাহিত্যের বেনুবন যে পুকুর-পাড়ের বাঁশবাগান হয়ে উঠল!</p>
<p><strong>পুলিশের জুলুম আমার গা-সওয়া হয়ে গেছে। ওদের জুলুমের তবু একটা সীমারেখা আছে। কিন্তু সাহিত্যিক যদি জুলুম করতে শুরু করে, তার আর পারাপার নেই। এরা তখন হয়ে ওঠে টিক্‌টিকি পুলিশের চেয়েও ক্রূর, অভদ্র। যেন চাক-ভাঙ্গা ভীমরুল। জলে ডুবেও নিষ্কৃতি নেই, সেখানে গিয়েও দংশন করবে।</strong></p>
<p>পলিটিক্সের পাঁকের ভয়ে পালিয়ে গেলাম নাগালের বাইরে। মনে করলাম, যাক, এতদিনে একবার প্রাণ ভ’রে সাহিত্যের নির্মল বায়ু সেবন ক’রে অতীতের গ্লানি কাটিয়ে উঠব। ও বাবা! সাহিত্যের আসর যে পলিটিক্যাল আখড়ার চেয়েও নোংরা তা কে জানত!</p>
<p>কপাল, কপাল! পালিয়েও কি পার আছে? হঠাৎ একদিন সপ্ত-রথীর সপ্ত প্রহরণে চকিত হয়ে উঠলাম। ব্যাপার কি!</p>
<p>জানতে পালাম, আমার অপরাধ, আমি তরুণ! তরুণেরা নাকি আমায় ভালবাসে, তা’রা আমার লেখার ভক্ত। সভয়ে প্রশ্ন করলাম, আজ্ঞে, এতে আমার অপরাধটা কিসের হ’ল?</p>
<p>বহু কণ্ঠের হুঙ্কার উঠলো, ঐটেই তোমার অপরাধ, তুমি তরুণ এবং তরুণেরা তোমায় নিয়ে নাচে।</p>
<p>বললাম, আপাততঃ আপনাদের ভয়ে আজই তো বুড়ো হয়ে যেতে পারছিনে। ওর জন্য দু-দশ বছর মার খেয়েই অপেক্ষা করতে হবে। আর, যারা আমায় নিয়ে নাচে, আপনারাও তাদের নাচিয়ে ছেড়ে দিন। গোল চুকে যাবে। আমায় নিয়ে কেন টানাটানি!</p>
<p>আবার নেপথ্যে শোনা গেল, তুমি এই জ্যাঠা অভিমন্যুর পৃষ্ঠরক্ষী। তোমাকে মারতে পারলেই একে কতল করতে দেরী লাগবে না।</p>
<p>দেখাই যাক।…</p>
<p>এতদিন আমি উপেক্ষাবশতঃই এ ধোঁওয়া ছাড়িনি- না উনুনের, না সিগারেটের, ভেবেছিলাম, সম্রাটে সম্রাটে যুদ্ধ, দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেই ভাল। কিন্তু হাতিতে হাতিতে লড়াই হলেও নলখাগড়ার নিস্তার নাই দেখছি। কাজেই, আমাদেরও এবার আত্মরক্ষা করতে হবে। প’ড়ে প’ড়ে মার খাওয়ায় কোন পৌরুষ নেই।</p>
<p>পলিটিক্সের পাঁককে যাঁরা এতদিন ঘৃণা ক’রে এসেছেন, বেণু-বনের বাঁশের প্রতি তাঁদের এই আকস্মিক আসক্তি দেখে আমারই লজ্জা করছে- বাইরের লোক কি বলছে তা না-ই বললাম।</p>
<p>এ-বাঁশ ছোঁড়ারও তারিফ করতে হবে। কোনো বিশেষ একজনের শির লক্ষ্য করে না ছু’ড়ে এঁরা ছুঁড়ছেন একেবারে দল লক্ষ্য করে। কারণ, তাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার লজ্জা নেই। বীর বটে! এতদিন তাই পরাস্ত মেনেই চুপ ক’রে ছিলাম। কিন্তু ঐ চুপ করে থাকি বলেই ও-পক্ষ মনে করেন, আমরা জিতে গেলাম। তাই এবার মাথা বেছে বেছেই বাঁশ ছোড়া হচ্ছে- বাণ নয়।</p>
<p>অবশ্য, সে বাঁশে বাঁশীর মত গোটাকতক ফুটো ক’রে সুর ফোটাবার আয়াসেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তবু তার খোঁচা আর স্থলত্বই বলে, ও বাঁশী নয়- বাঁশ।</p>
<p>বীণাই শোভা পায় যাঁর হাতে, তাঁকেও লাঠি ঘুরাতে দেখলে দুঃখও হয়, হাঁসিও পায়। পালোয়ানী মাতামাতিতে কে যে কম যান, তা ত বলা দুষ্কর।…</p>
<p>আজকের ‘বাঙ্গলার কথা’য় দেখলাম- যিনি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের পক্ষ হয়ে পঞ্চ পাণ্ডবকে লাঞ্ছিত করবার সৈনাপত্য গ্রহণ করেছেন, আমাদের উভয় পক্ষের পূজ্য পিতামহ ভীষ্ম-সম সেই মহারথী কবি-গুরু এই অভিমন্যুবধে সায় দিয়েছেন। মহাভারতের ভীষ্ম এই অন্যায় যুদ্ধে সায় দেননি, বৃহত্তর ভারতের ভীষ্ম সায় দিয়েছেন- এইটেই এ যুগের পক্ষে সবচেয়ে পীড়াদায়ক।</p>
<p>এই অভিমন্যুর রক্ষী মনে ক’রে কবিগুরু আমায়ও বাণ নিক্ষেপ করতে ছাড়েন নি। তিনি বলেছেন, আমি কথায় কথায় ‘রক্ত’কে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি।</p>
<p>কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপী-পায়জামা পরেন, অথচ আমরা পরলেই তাঁর এত আক্রোশের কারণ হয়ে উঠি কেন, বুঝতে পারিনে।</p>
<p>এই আরবী-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।</p>
<p><strong>আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ ক’</strong><strong>রে আসছি। সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানী-টুপী ব্যবহার করেন, এমন কি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ওরিয়েন্টাল। কিন্তু ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তাঁরা হ’</strong><strong>য়ে যায় ‘</strong><strong>মিঞা সাহেব’</strong><strong>।</strong> মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুস্কিল- তবু ও নিয়ে ঠাট্রা বিদ্রূপের আর অন্ত নেই।</p>
<p>আমি ত টুপী পায়জামা শেরওয়ানী দাড়িকে বর্জন ক’রে চলেছি শুধু ঐ &#8216;মিঞা সাহেব’ বিদ্রূপের ভয়ে- তবুও নিস্তার নেই।</p>
<p>এইবার থেকে আদালতকে না হয় বিচারালয় বলব, কিন্তু নাজির পেশ্‌কার উকিল মোক্তারকে কী বলব?</p>
<p>কবি-গুরুর চিরন্তনের দোহাই নিতান্ত অচল। তিনি ইটালীকে উদ্দেশ ক’রে এক কবিতা লিখেছেন। তাতে- ‘উতারো ঘোম্‌টা’ তাঁকেও ব্যবহার করতে দেখেছি। ঘোম্‌টা-খোলা শোনাই আমাদের চিরন্তন অভ্যাস। ‘উতারো ঘোম্‌টা’ আমি লিখলে হয়ত সাহিত্যিকদের কাছে অপরাধীই হতাম। কিন্তু ‘উতারো’ কথাটা যে জাতেরই হোক, ওতে এক অপূর্ব সঙ্গীত ও শ্রীর উদ্বোধন হয়েছে ও-জায়গাটায়, তা ত কেউ অস্বীকার করবে না। ঐ একটু ভালো-শোনাবার লোভেই, ঐ একটি ভিন দেশী কথার প্রয়োগে অপূর্ব রূপ ও গতি দেওয়ার আনন্দেই আমিও আরবী-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করি। কবি-গুরুও কতদিন আলাপ-আলোচনায় এর সার্থকতার প্রশংসা করেছেন।</p>
<p><strong>আজ আমাদেরও মনে হচ্ছে, আজকের রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই চির-চেনা রবীন্দ্রনাথ নন। তাঁর পেছনের বৈয়াকরণ পণ্ডিত এসব বলাচ্ছে তাঁকে দিয়ে।</strong></p>
<p><strong>খুন্‌’ আমি ব্যবহার করি আমার কবিতায়, মুসলমানী বা বলশেভিকী রং দেওয়ার জন্য নয়। হয়ত কবি ও-দুটোর একটারও রং আজকাল পছন্দ করছেন না, তাই এত আক্ষেপ তাঁর।</strong></p>
<p>আমি শুধু ‘খুন্‌’ নয়- বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবী-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায়। আমার দিক থেকে ওর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীরও একটা মুসলমানী ঢং আছে। ও-সাজে তাঁর শ্রীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। স্বার্গীয় অজিত চক্রবর্তীও এ-ঢংএর ভূয়সী প্রশংসা ক’রে গেছেন। বাঙলা কাব্য-লক্ষ্মীকে দুটো ইরানী ‘জেওর’ পরালে তাঁর জাত যায় না, বরং তাঁকে আরও ‘খুবসুরত’ই দেখায়।</p>
<p>আজকের করা-রক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই ত মুসলমানী ঢং-এর। বাইরের এ ফর্মের প্রয়োজন ও সৌকুমার্য সকল শিল্পীই স্বীকার করেন। পণ্ডিত মালবিয়া স্বীকার করতে না পারেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথ স্বীকার করবেন।</p>
<p>তা ছাড়া যে ‘খুনে’র জন্য কবি-গুরু রাগ করেছেন, তা দিনরাত ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের কথায়, কালার বক্সে (colour box-এ) এবং তা খুন-করা, খুন-হওয়া ইত্যাদি খুনোখুনি ব্যাপারেই নয়। হৃদয়েরও ‘খুন-খারাবী’ হ’তে দেখি আজো এবং তা শুধু মুসলমান-পাড়া লেনেই হয় না। আমার একটা গানে আছে-</p>
<p><strong>‘উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’</strong></p>
<p><strong>এই গানটি সেদিন কবি-গুরুকে দুর্ভাগ্যক্রমে শুনিয়ে ফেলেছিলাম এবং এতেই হয়তো তাঁর ও কথার উল্লেখ। তিনি রক্তের পক্ষপাতী। অর্থাৎ ও লাইনটাকে ‘উদিবে সে রবি মোদেরি রক্তে রাঙিয়া পূর্নবার&#8217;ও করা চল্‌ত।</strong> চল্‌ত, কিন্তু ওতে ওর অর্ধেক ফোর্স কমে যেত। আমি যেখানে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহার করেছি, সে ঐরকম ন্যাশনাল সঙ্গীতে বা রুদ্ররসের কবিতায়। যেখানে ‘রক্তধারা’ লিখবার, সেখানে জোর করে খুনধারা লিখি নাই। তাই বলে রক্ত-খারাবীও লিখি নাই, হয় রক্তারক্তি, না হয় খুন-খারাবী লিখেছি।</p>
<p>কবিগুরু মনে করেন, রক্তের মানেটা আরো ব্যাপক। ওটা প্রেমের কবিতাতেও চলে। চলে, কিন্তু তখন ওতে রাগ মেশাতে হয়। প্রিয়ার গালে যেমন ‘খুন’ ফোটে না, তেমনি রক্তও ফোটে না- নেহাৎ দাঁত না ফুটালে। প্রিয়ার সাথে খুনা-খুনি খেলি না, কিন্তু খুন-সুড়ি হয়ত করি।</p>
<p>কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর আচকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে, ফুল-বনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুল্‌বুলির সুর।</p>
<p>এতেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল যাঁরা মনে করেন, তাঁরা সাহিত্য সভায় ভিড় না ক’রে হিন্দু-সভারই মেম্বার হন গিয়ে।</p>
<p>যে কবিগুরু অভিধান ছাড়া নূতন নূতন শব্দ সৃষ্টি করে ভাবীকালের জন্য আরো তিনটে অভিধানের সঞ্চয় রেখে গেলেন, তাঁর এই নূতন শব্দ-ভীতি দেখে আমরা বিস্মিত হই। মনে হয়, তাঁর আক্রোশের পেছনে অনেক কেহ এবং অনেক কিছু আছে। আরো মনে হয়, আমার শত্রু সাহিত্যকগণের অনেক দিনের অনেক মিথ্যা অভিযোগ জমে জমে ওঁর মনকে বিষিয়ে তুলেছে। নৈলে আরবী-ফার্সি শব্দের মোহ ত আমার আজকের নয়; এবং কবি-গুরুর সাথে আমার বা আমার কবিতার পরিচয়ও আজকের নয়। কই, এতদিন ত কোনো কথা উঠল না এ নিয়ে।</p>
<p>সবচেয়ে দুঃখ হয়, যখন দেখি কতকগুলো জোনাকিপোকা রবিলোকের বহু নিম্নে থেকেও কবিত্বের আস্ফালন করে। ভক্ত কি শুধু ঐ নোংরা লোকগুলোই, যারা রাত-দিন তাঁর কানের কাছে অন্যের কুৎসা গেয়ে তাঁর শান্ত সুন্দর মনকে নিরন্তন বিক্ষুব্ধ ক’রে তুলছে? আর, আমরা তাঁর কাছে ঘন ঘন যাইনে বলেই হয়ে গেলাম তাঁর শত্রু।</p>
<p>কবি-গুরুর কাছে প্রার্থনা, ঐ দৃতরাষ্ট্রের সেনাপতিত্ব তিনি করুন, দুঃখ নাই। কিন্তু ওদের প্ররোচনায় আমাদের প্রতি অহেতুক সন্দেহ পোষণ ক’রে যেন তাঁর মহিমাকে খর্ব না করেন।</p>
<p>সবচেয়ে কাছে যারা থাকে, দেব-মন্দিরের সেই পাণ্ডারাই দেবতার সবচেয়ে বড় ভক্ত নয়।</p>
<p>আরো একটা কথা। যেটা সম্বন্ধে কবি-গুরুর একটা খোলা কথা শুনতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য ক’রে ওঁর আজকালকার লেখাগুলোর সুর শুনে মনে হয়, আমাদের অভিশপ্ত জীবনের দারিদ্র্য নিয়েও যেন তিনি বিদ্রূপ করতে শুরু করেছেন।</p>
<p>আমাদের এই দুঃখকে কৃত্রিম বলে সন্দেহ করবার প্রচুর ঐশ্বর্য তাঁর আছে, জানি এবং এও জানি, তিনি জগতের সবচেয়ে বড় দুঃখ ঐ দারিদ্র ব্যতীত হয়ত আর সব দুঃখের সাথেই অল্প-বিস্তর পরিচিত। তাই এতে ব্যথা পেলেও রাগ করিনে।</p>
<p><strong>কি ভীষণ দারিদ্রর সঙ্গে সংগ্রাম করে অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটিয়ে আমাদের নতুন লেখকদের বেঁচে থাকতে হয়- লক্ষ্মীর কৃপায় কবি-গুরু কোনদিন আমাদের মত সাহিত্যিকের কুটীরে পদার্পণ করেন নি- হয়ত তাঁর মহিমা ক্ষুণ্ন হ’ত না তাতে- নৈলে দেখতে পেতেন, আমাদের জীবন-যাত্রার দৈন্য কত ভীষণ। এই দীন মলিন বেশ নিয়ে আমরা আছি দেশের একটেরে আত্মগোপন ক’রে। দেশে দেশে প্রোপাগাণ্ডা করা ত দূরের কথা, বাড়ী ছেড়ে পতে দাঁড়াতেও লজ্জা করে।</strong> কিছুতেই ছেঁড়া জামার তালিগুলোকে লুকাতে পারিনে। ভদ্র শিক্ষিতদের মাঝে ব’সে সর্বদাই মন খুঁত খুঁত করে, যেন কত বড় অপরাধ ক’রে ফেলেছি! বাইরের দৈন্য অভাব যত ভিতরে ভিতরে চাবকাতে থাকে, তত মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে।</p>
<p>কবি-গুরুর কাছেও শুধু ঐ দীনতার লজ্জাতেই যেতে পারিনে। ভয় হয়, এ লক্ষ্ণীছাড়া মূর্তি দেখে তাঁর দারোয়ানেরাই ঐ সুর-সভায় প্রবেশ করতে দেবে না। দীন ভক্ত তীর্থ যাত্রা করতে পারল না বলে দেবতা যদি অভিশাপ দেন, তা হ’লে এই পোড়া কপালকে দোষ দেওয়া ছাড়া কীই বা বলবার আছে!</p>
<p>তাঁর কাছে নিবেদন, তিনি যত ইচ্ছা বাণ নিক্ষেপ করুন, তা হয়ত সইবে, কিন্তু আমাদের একান্ত-আপনার এই দারিদ্র্য-যন্ত্রণাকে উপহাস করে যেন আর কাটাঘায়ে নুনের ছিটে না দেন। শুধু ঐ নির্মমতাটাই সইবে না।</p>
<p>কবি-গুরুর চরণে ভক্তের আর একটি সশ্রদ্ধ আবেদন- যদি আমাদের দোষত্রুটি হয়েই থাকে, গুরুর অধিকারে সস্নেহে তা দেখিয়ে দিন, আমরা শ্রদ্ধাবনত শিরে তাকে মেনে নিব। কিন্তু যারা শুধু কুৎসিৎ বিদ্রূপ আর গালিগালাজই করতে শিখেছে, তাঁকে তাদেরি বাহন হ’তে দেখলে আমাদের মাথা লজ্জায় বেদনায় আপনি হেঁট হয়ে যায়। বিশ্বকবি-সম্রাটের আসন-রবিলোক- কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির বহু ঊর্ধ্বে।</p>
<p>কথাসাহিত্য-সম্রাট শরৎচন্দ্র শনিবারের চিঠিওয়ালাদের কাছে আমায় গালিই দেন আর যাই করুন, (জানি না, এ সংবাদ সত্য কিনা) ঐ দারিদ্র্রটুকুর অসম্মান তিনি করতে পারেন নি। অসহায় মানুষের দুঃখ-বেদনাকে তিনি এত বড় কঁরে দেখেছেন বলেই আজ তাঁর আসন রবি-লোকের কাছাকাছি গিয়ে উঠেছে।</p>
<p>একদিন কথাশিল্পী সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম যে, শরৎচন্দ্র তাঁর বই-এর সমস্ত আয় দিয়ে পথের কুকুর’দের জন্য একটা মঠ তেরী ক’রে যাবেন। খেতে না পেয়ে পথে পথে ঘু’রে বেড়ায় যে সব হন্যে কুকুর, তারা আহার ও বাসস্থান পাবে ঐ মঠে- ফ্রি অব্ চার্জ। শরৎচন্দ্র নাকি জানতে পেরেছেন, ঐ সমস্ত পথের কুকুর পূর্বজন্মে সাহিত্যিক ছিল, ম’রে কুকুর হয়েছে। শুনলাম, ঐ মর্মে নাকি উইলও হয়ে গেছে।</p>
<p>ঐ গল্প শুনে আমি বারংবার শরৎচন্দ্রের উদ্দেশে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম ক’রে বলেছিলাম, ‘শরৎদা সত্যিই একজন মহাপুরুষ সত্যিই আমরা- সাহিত্যিকরা কুকুরের জাত। কুকুরের মতই আমরা না খেয়ে এবং কামড়া-কামড়ি ক’রে মরি। তাঁর সত্যিকার অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি আছে, তিনি সাহিত্যিকদের অবতার-রূপ দেখতে পেয়েছেন।’</p>
<p>আজ তাই একটি মাত্র প্রার্থনা, যদি পরজন্ম থাকেই, তবে আর যেন এদেশে কবি হয়ে না জন্মাই। যদি আসি, বরং শরৎচন্দ্রের মাঠের কুকুর হয়েই আসি যেন। নিশ্চিন্তে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচব।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15968</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নজরুল সাহিত্যে বিশ্ব-মানস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/world-spirit-in-nazrul-s-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/world-spirit-in-nazrul-s-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 Aug 2024 09:50:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14708</guid>

					<description><![CDATA[বিশ্ব-সাহিত্য বলতে বিদগ্ধ মহল এ বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্যকেই মনে করেন। হোমার, বাল্মিকী, ব্যাস, তোবাহ বা ওলড টেস্টামেন্ট, রাজা আর্থারের রাউন্ড টেবিলের গল্প (King Aurthur and his round table), আরব্য উপন্যাস, শেকসপীয়র, গ্যেটে, তলস্তয় ও রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীকে বিশ্ব-সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ অবদান বলে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিশ্ব-সাহিত্য বলতে বিদগ্ধ মহল এ বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্যকেই মনে করেন। হোমার, বাল্মিকী, ব্যাস, তোবাহ বা ওলড টেস্টামেন্ট, রাজা আর্থারের রাউন্ড টেবিলের গল্প (King Aurthur and his round table), আরব্য উপন্যাস, শেকসপীয়র, গ্যেটে, তলস্তয় ও রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীকে বিশ্ব-সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ অবদান বলে গণ্য করেন। এ তালিকাকে নিখুঁত বলে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই। যেহেতু মানব-জীবনের কোনো শেষ সীমা আজও নির্ধারিত হয়নি এবং ভবিষ্যতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরও উন্নততর অবদানের সম্ভাবনা রয়েছে- এজন্য গোঁড়া ভক্তের মতো পণ্ডিতজনের এ সংখ্যাকে সর্বশেষ বলে গ্রহণ করা যায় না। তবে এ নির্দিষ্ট সংখ্যা থেকে তাঁদের বিচারের মানদণ্ড আবিষ্কার করা যায় কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়।</p>
<p>কেন এগুলোকে বিশ্বের সেরা সাহিত্য বলে তাঁরা গ্রহণ করেছেন এবং কালের অমোঘ প্রবাহ অতিক্রম করে কেন এগুলো এখনও মানব-জীবনে টিকে রয়েছে- তার অনুসন্ধান করলে, দেখা যায়, তাতে মানব-জীবনেরই চিরন্তন রূপ প্রতিফলিত হয়েছে- এবং তাতে সে জীবনের সমালোচনা রয়েছে- এ জন্যে তারা আজও টিকে রয়েছে। হোমার বা বাল্মিকী অংকিত চরিত্রের প্রত্যেকটিই এক একটা প্রতীক (type) এবং তারা মানব- জীবনের এক একটা বিশিষ্ট দিকের প্রতিনিধি। হোমারের অংকিত ট্রয়ের রাজকুমার প্রায়াম দস্যু প্রকৃতির অদম্য দুঃসাহসী যুবক। তার বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে হেলেনকে জোর-জবরদস্তি করে অপহরণ করেছে। এ অপহরণ করার যে প্রবৃত্তি মানব-মানসে রয়েছে- সেই প্রবৃত্তি তাকে এ অপকর্ম করার প্রেরণা যুগিয়েছে। এজন্য তাকে মানব- মানসে ক্রিয়াশীল দুষ্প্রবৃত্তির প্রতিনিধি বলা যায়। রামায়ণে চিত্রিত রাজা রামচন্দ্রকে তেমনি মানব-জীবনের অপর এক বৃত্তির প্রতিনিধি বলা যায়। তিনি পিতৃসত্য পালনের জন্য চতুর্দশ বৎসর বনবাস ক্লেশ সহ্য করতেও প্রস্তুত ছিলেন, এবং প্রায়মের মতো পাপাচারী রাজা রাবণের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য তাকে বধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে তিনি ম্যাকিয়াভ্যালীর সেই নিন্দিত নীতি- The end justifies the means লক্ষ্যের যথার্থ দ্বারাই মাধ্যম গ্রহণের সার্থকতা স্বীকৃতি লাভ করে&#8217;- গ্রহণ করেছেন। এ নীতির আলোকে রাম ভ্রাতৃ-যুদ্ধে লিপ্ত বালিকে বধ করেছেন। ভ্রাতৃ-বিরোধ বিচ্ছিন্ন বিভীষণের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তেমনি গণ-মানসের সন্তোষের জন্য পতিব্রতা সীতাকেও ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি। এজন্য তাকে মানব-জীবনের একটা টাইপ বা প্রতীক বলা যায়। শেকসপীয়রের অংকিত চরিত্রগুলোতে সেরূপ প্রতীকী চরিত্র রয়েছে। হ্যামলেট নাটকের নায়ক রাজকুমার হ্যামলেট আপনার চাচা কর্তৃক নিহত পিতার সংস্রবে আসার কোনো সুবিধা পাননি। পিতৃহন্তা ও বিপিতা চাচার আশ্রয়ে প্রতিপালিত এ কুমার একাধারে প্রেমিক ও দার্শনিক। ছেলে-বেলা থেকেই সন্দেহের বীজ তার মানসে ক্রিয়াশীল। তাই মানব-জীবনের সবগুলো উত্থান পতনকে তিনি যেমন আপাতদৃষ্ট রূপে গ্রহণ করতে পারেননি, তেমনি এ বিশ্বচরাচরের রূপকে তার প্রকৃত রূপ বলে গ্রহণ করতেও তিনি সম্মত হননি। শেকসপিয়রের অপরাপর নাটকগুলোতে তেমনি মানব চরিত্রের এক একটা বিশিষ্ট প্রতীক বিশেষভাবেই ফুটে উঠেছে। অদম্য সাহসের অধিকারী অথচ উচ্চাকাঙ্ক্ষার দ্বারা সকল সময়ই পরিচালিত ম্যাকবেথ তেমনি মানব-মানসের এক অতি উজ্জ্বল প্রতীক। আরব্য উপন্যাসের নায়ক নায়িকারাও তেমনি মানব-জীবনের এক একটা বৃত্তি বা প্রবৃত্তির প্রতীক। অত্যাচারী তথাকথিত খলিফা হারুন-আল্-রশীদের শাসনকালে রচিত এ গ্রন্থখানাতে যে সব চরিত্র বর্ণনা করা হয়েছে, তারা সকলেই-প্রতীকী জীবনের পুরুষ ও নারী। সিন্দাবাদ নাবিকের জীবনে যেমন ধন-লিপ্সার বাসনা প্রকাশ পেয়েছে, এবং তা লাভ করার জন্য তিনি সাত সাগরে পাড়ি জমাচ্ছেন, তেমনি সে ধনকে অতি সহজে লাভ করার প্রতীক হিশাবে দেখা দিয়েছে- আলীবাবা। অর্থাৎ তাঁর প্রত্যেকটি চরিত্রই সে ধর্ম পালন করছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আধুনিককালে যারা বিশ্বের ক্লাসিক হিসাবে গণ্য হয়েছেন, তাদের মধ্যেও এক প্রতীক চিত্রণের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। মহাকবি গ্যেটে তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য ফাউস্টের মধ্যে একদিকে ফাউস্ট অপরদিকে মেফিস্টোফেলিসের চিত্র অংকিত করে মানব-জীবনের সে আদর্শিক দ্বন্দ্বের সত্যই প্রচার করেছেন। ফাউস্টের জীবনে অবিরাম সে মেফিস্টোফেলিসের সঙ্গে সংগ্রামে পর্যবসিত হয়েছে।</p>
<p>লেভ তলস্তয়ের উপন্যাসগুলোতে তেমনি কতকগুলো প্রতীকী চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর &#8220;আনা কারেনিনা&#8221; এক হতভাগ্য মহিলার জীবনের করুণ কাহিনী। তিনি তাঁর এক প্রেমিকের দ্বারা প্রলুব্ধা হয়ে গর্ভবতী হয়েছেন- অথচ সে অবস্থায়ও তাঁর উদার হৃদয় স্বামীকে তাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত। তবে সামাজিক জীবনে তাঁর স্থান অবশ্যিই অত্যন্ত নীচ পর্যায়ে, &#8216;অধঃগ্রামী&#8217; হবে বলে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। &#8220;রেজারেকশন” নামক উপন্যাসে মহামতি তলস্তয় তাঁর নায়িকার ক্যটুলা ম্যাসলভাকে অতিশয় পতিত জীবনের মধ্যেও মানবতার এক প্রতীক হিশাবে চিত্রিত করেছেন। মানবতার এ অভূতপূর্ব প্রতীক ম্যাসলভা তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কাব্যেই সে প্রতীকী ধর্মের রয়েছে অভিব্যক্তি। সেখানে ব্যক্তি-জীবনের যেমন প্রতিক্রিয়ার ফল রয়েছে তেমনি সমষ্টি জীবনেরও প্রতিক্রিয়ার ফল সন্নিবেশিত হয়েছে। জীবনে বিশ্ব-চরাচরের নানাবিধ বিষয়ের ক্রিয়াকলাপের যে প্রতিক্রিয়া তাঁর জীবনে দেখা দিয়েছে তার অভিব্যক্তি, রয়েছে- তাঁর বিভিন্ন রচনায়। এ রচনার প্রেক্ষাপটে যে-সৃষ্টিশীল প্রতিজ্ঞা কার্যকরী তিনি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ নন, তিনি বিশ্ব-মানবের প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ। &#8220;গীতাঞ্জলী&#8221;, &#8220;নীতিমাল্য&#8221; প্রভৃতি পর্যায়ে তিনি বিশ্ব-মানব-জীবনকে সমর্পণ করতে চেয়েছেন পরম মঙ্গলময় এবং পরম সুন্দর এক অতীন্দ্রিয় সত্তার নিকট। এ সত্তার নিকট নতি স্বীকার এবং তার সত্তায় ব্যক্তি-জীবনের অহংকার ও স্বাতন্ত্র্যের বিলোপ মানব জীবনে এক আকাঙ্খিত বিষয়। সেরূপ মানব- জীবনের আশা-ভরসা নানা আদর্শিক বিষয়ের কামনা তাঁর বিরাট রচনার মধ্যে বর্তমান। তাঁ রচিত নাটকগুলো যে প্রতীকধর্মী সে সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই। &#8220;রক্ত-করবী&#8217;র প্রধান চরিত্র নন্দিনী মানব-মানসেরই একটা সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষার রূপ নিয়ে অপ্রাকৃত জীবনের ধনমদ্রমত্তের বাসনায় অন্ধ সোনার পুরীতে অবস্থিত জাল ছিঁড়ে তাদের প্রকৃতিস্থ করতে চায়। এতে যে বলিষ্ঠ প্রতীক সৃষ্টির বাসনা প্রকাশ পেয়েছে তা বিশ্ব- সাহিত্য অনন্য।</p>
<p>এ প্রতীক যেমন সর্বসাধারণের জীবনের নানাবিধ আশা-আকাঙ্ক্ষার হতে পারে- তেমনি মানব-সমাজের মধ্যে উদ্ভুত নানা শ্রেণী, নানান জাতি, নানা কর্মে লিপ্ত মানুষের হতে পারে। যাঁরা মানব-জীবনকে তাঁদের রচনায় এভাবে প্রকাশ করেছেন তাঁদের রচনার মধ্যে আবার মূল্যবোধও প্রকাশ পেয়েছে। যদিও ধর্মগুরুদের আদেশ-নির্দেশের মতো তা প্রকাশ পায়নি তবুও মানব-চেতনার নানাবিধ বৃত্তি-প্রবৃত্তির প্রতীকগুলোর মধ্যে কোনটার পক্ষে তাদের সহানুভূতি রয়েছে তা অতিশয় কুশলী তুলির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। গভীর রাত্রিতে সমুদ্রের পারে আবির্ভূত রাজা ডানকানের প্রতি, না উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিভূ ম্যাকবেথের প্রতি শেকসপিয়রের সহানুভূতি রয়েছে তা অতি সহজেই বুঝতে পারা যায়। ম্যাকবেথের স্বগত উক্তিতে তার জীবনের গভীর তলদেশ থেকে উত্থিত নৈতিক চেতনা তাকে যখন ভীষণভাবে আক্রমণ করে পীড়িত করতে থাকে, তখন তার উক্তিতে শেকসপীয়রের মূল্যবোধেরও পরিচয় স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। এজন্য বিশ্বসাহিত্যে প্রতীকধর্মী রূপের প্রেক্ষাপটে সৃষ্টিকুশলী সাহিত্যিকেরা কবির যে মূল্যবোধ রয়েছে- তাকে অনস্বীকার্য বলা যায়। মূল্যেরও আবার তারতম্য রয়েছে। <strong>এ দুনিয়ার সমাজে মানবতাবাদ ক্রমশই বিকশিত হচ্ছে। কাজেই এককালে যা মানব-জীবনের অবশ্যম্ভাবী রূপে গ্রহণীয় ও সহনীয় ছিলো- বর্তমান কালে তা নেই। অনাগত ভবিষ্যতে আরও উচ্চ- পর্যায়ের মূল্যমান এ দুনিয়ায় অভ্যুত্থিত হ&#8217;লে-মানব-জীবনের কার্যকরী নানাবিধ মূল্যমান স্নান হয়ে যেতে পারে। অনাগত যুগের সাহিত্যে তাই ভালো-মন্দের বিচার আজকের দিনের মতোই হবে-তা বলা যায় না। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় মানবতাবাদের বিস্তৃতির ফলে যে পরিবেশে বর্তমান মানব-সমাজ রয়েছে, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে সে সমাজের অধঃপতন হবে না, হবে আরোহণ।</strong> এজন্য অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো মূল্যমানের অভ্যুদয় হবে না তার পূর্ববর্তী মূল্যমানকে বিচ্যুত করে মানব-সভ্যতার ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে। মানব-জীবনে এমন সব চিরস্তন বৃত্তি ও প্রবৃত্তি রয়েছে যে- গুলোর সন্তোষ বিধানের জন্য মানুষ চিরকালই চেষ্টা করবে এবং তাদের মধ্যে মানব- জীবনের পক্ষে অনুকূল দলের সঙ্গে প্রতিকূল দলের সংঘর্ষ অনিবার্যভাবে দেখা যাবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বিশ্ব-সাহিত্যের অপর লক্ষণের মধ্যে পাওয়া যায় স্থান-কাল-জাত-পরিবেশের প্রভাব। হোমারের মহাকাব্যে গ্রীস ও ট্রয়ের যুদ্ধে দেবদেবীগণও যোগদান করেছেন। তেমনি রামায়ণ ও মহাভারতে যেসব যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে-তাতে মানব-বংশ বহির্ভূত বীরগণ অংশগ্রহণ করেছেন। ধর্মের অংশে যুধিষ্ঠিরের এবং পবনের অংশে ভীমের জন্ম হলেও ইন্দের অংশে অর্জুনের জন্য। তেমনি অশ্বিনীকুমার দ্বয়ের অংশে নকুল ও মহাদেবের জন্ম। এরা সম্পূর্ণভাবে দেব বংশ সম্ভূত না হলেও দেব ও মানবের মধ্যবর্তী অতি-মানবিক বংশ সম্ভূত ছিলেন। রামচন্দ্র সীতা উদ্ধার কল্পে যে-সেনাবাহিনীকে গঠন করেছিলেন- তাতে বানর বংশীয় সৈন্যও যোগদান করেছিলেন। সে-যুগে দেব-দানব ও মানুষে অথবা মানুষ ও পশুতে তেমন পার্থক্য দেখা দেয়নি বলে এরূপ চরিত্র সৃষ্টিতে ব্যাস অথবা বাল্মিকী কোনো দ্বিধাবোধ করেননি।</p>
<p>তাহলে ক্লাসিক্যাল সাহিত্যে আমরা কতকগুলো লক্ষণ পাচ্ছি। তাতে মানব-মানসের কতকগুলো বৃত্তি ও প্রবৃত্তির প্রতীককে কাব্যের বা নাটকের নায়ক-নায়িকারূপে প্রদর্শন করা হয়েছে। তাতে নানা ব্যবসায় বা কর্মজীবনের পার্থক্য রয়েছে। তাতে যেমন রাজা- মহারাজা রয়েছেন, তেমনি অতিশয় দীন দুঃখী মানুষও রয়েছে। তাতে ব্যক্তি-জীবনের এক বৃত্তির সঙ্গে অপর বৃত্তির যেমন সংগ্রাম রয়েছে, তেমনি এক শ্রেণীর লোকের সঙ্গে অপর শ্রেণীর লোকেরও সংগ্রাম রয়েছে। তাতে পরিবেশের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে এবং তার মধ্যে মূল্যবোধের প্রকাশও রয়েছে।</p>
<p>এ মানদণ্ডের আলোকে নজরুল ইসলামের রচনাকে বিচার করলে তাঁকে বিশ্ব- সাহিত্যিকদের আসনে স্থান দান করা যায় কি না-তা-ই বিশেষভাবে বিচার্য। তবে তার পূর্বে নজরুলের জীবনে যে পরিবেশ কার্যকরী ছিল তাও ভেবে দেখতে হয়। কারণ আমরা পূর্বেই দেখেছি- পরিবেশের ছাপ সকল বিশ্ব-কাব্যেই বর্তমান। নজরুলের জন্ম হয়েছে অত্যন্ত দরিদ্র কিন্তু অভিজাত পরিবারে-পরিবারের মধ্যে তাঁর ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি-চর্চা থাকলেও, দারিদ্র্যের কঠোর নিষ্পেষণে তাঁকে লেটো দলে বা রুটির দোকানের চাকুরি গ্রহণ করতে হয়েছে। যে-সমাজে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন সে-সমাজের মুসলিমের অবস্থাও তখন অত্যন্ত শোচনীয়। বঙ্গদেশবাসী মুসলিম সমাজ তখন ইংরেজ সরকারের অত্যাচারে অত্যন্ত দুরবস্থায় অধঃপতিত হয়ে, উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাবে নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, মুনশী মেহেরুল্লাহ প্রমুখ নেতাদের দ্বারা পুনর্বার আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তবে জীবনের অধিক সংখ্যক ক্ষেত্রেই তারা অপর সমাজের লোকদের দ্বারা নানাভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। কেবল বঙ্গদেশে নয়, ভারতের সর্বত্রই মুসলিম সমাজের এই একই দশা। গুটিকতক করদ মিত্র রাজ্যের নওয়াব এবং বঙ্গদেশে গুটিকতক জমিদারের সৃষ্টি করে ইংরেজ সরকার বিজিত মুসলিম সমাজকে পদানত করে রেখেছে। কেবল এ উপ-মহাদেশে নয়- সারা বিশ্বেই মুসলিমদের অত্যন্ত হীন অবস্থা। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিরাট ভূখণ্ডের মালিক এবং মক্কা মদীনা তথা জাজিরাত-উল আরবের সংরক্ষণকারী তুর্কির সুলতান বলকান যুদ্ধের পরে হৃতসর্বস্ব। পরবর্তীকালে প্রথম মহাসমরের পরে একেবারে নিঃস্ব।</p>
<p>দেশের সর্বত্রই রয়েছে অনাচার অত্যাচারের প্রবাহ। ধনী কর্তৃক নির্ধনকে শোষণ সামাজিক জীবনে নির্বিবাদে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আশরাফ আতরাফের ভেদ ধর্মের বিধান বলে গৃহীত হয়েছে। হিন্দু অথবা ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সতত বিবাদ বিসংবাদ দেখা দিচ্ছে। কথাকথিত পুরোহিত বা মোল্লা সমাজের লোকেরা এই বিবাদকে ধর্মীয় প্রেরণাজাত বলে প্রচার করছেন। সত্যিকার দেশপ্রেমিক লোকেরা সমাজে কোন স্থান পাচ্ছে না। বাংলা অগ্নিযুগের বিপ্লববাদীদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে। মানবতাবাদের আলোকে তৎকালীন ভারতীয় শিক্ষালয়গুলোতে কোনো শিক্ষাদান করা হচ্ছে না। এরূপ পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে মানুষ মানবিক জীবন যাপন করতে পারে না। তার বিরুদ্ধে একমাত্র বিদ্রোহ ব্যতীত অপর কোনো পন্থা নেই। তাই নজরুল তাঁর কাব্য-জীবনের সূচনায়ই এক প্রচণ্ড বিদ্রোহের গর্জন করেছেন। সে গর্জনের পূর্ণ অভিব্যক্তি &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে দেখা দিয়েছে বটে, তবে তার অভ্যুদয় হয়েছে &#8216;শাতিল-আরব&#8217;, &#8216;মুহররম&#8217; প্রভৃতি কবিতায়। এ বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে যে আদর্শ রয়েছে বিদ্রোহের গর্জনের মধ্যেও তার আভাস ও ইঙ্গিত রয়েছে এবং পরবর্তীকালে তা &#8220;নতুন চাঁদ&#8221; প্রভৃতি কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে &#8216;বিদ্রোহী&#8217;ই নজরুল মানস-ভাণ্ডারের চাবিকাঠি। তাতে যে বিভিন্ন চিন্তার স্রোত রয়েছে সে স্রোতগুলো তাঁর পরবর্তী রচনার মধ্যে নিজের স্বকীয় রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p>এ পরিদৃশ্যমান বিশ্বভুবনে এবং মানব-জীবনে যত সব বিষয়আশয় রয়েছে এবং তার মধ্যে দ্বন্দ্ব-কোলাহল রয়েছে তাকে জয় করে তা থেকে উত্তরণ ছিলো &#8216;বিদ্রোহী&#8217;র লক্ষ্য। এজন্য। তাঁর এ রচনার মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে কোনো কোনো সমালোচক মন্তব্য করেছেন। যিনি &#8216;খোদার আসন আরশ ছেদিয়া&#8217; বিশ্ব বিধাতৃর বিস্ময় রূপে দেখা দিয়েছেন- তিনিই আবার &#8216;ষোড়শীর হৃদি সরসিজ প্রেম উদ্দাম&#8217; রূপে কিভাবে দেখা দিতে পারেন? অথবা তিনি বিষ্ণু বক্ষ হতে যুগল কন্যা কেন ছিনিয়ে আনবেন? তিনি &#8216;জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি&#8217;ই বা ধরবেন কেন? বা &#8216;অর্ফিয়াসের বাঁশের বাঁশরী&#8217;ই হবেন কেন? এ সকল চরিত্রের মধ্যে অধিকাংশ প্রতীক। মানব-মানসে ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ উদ্দাম প্রেমের যে স্থান রয়েছে, তেমনি লক্ষ্মী সরস্বতী নামক যুগল কন্যার অধিকারী বিষ্ণুর প্রতিও হিংসা রয়েছে। তেমনি বিরাট ও বিপুল অগ্নিপাখার অধিকারী জিব্রাইলের প্রতিও রয়েছে। এজন্য তাঁর এসব উক্তিতে অসংগতি দেখা দেয়। এ প্রতিভাসিত জগতের মধ্যে যাতে কোনো অসংগতি বা ভেদাভেদ থাকে না তার জন্যই বিদ্রোহীর এ হুংকার। তবে &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তেই নজরুল ইসলামের কার্য জীবনের নানাবিধ সংকেত থাকলেও এখানেই তাঁর কাব্য-জীবনের ইতি হয়নি। &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে প্রকাশিত এক একটা প্রতীক পরবর্তীকালে তাঁর স্বকীয় পরিধির মধ্যে &#8216;চমৎকার রূপ লাভ করেছে। &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে প্রকৃতি-প্রীতি Paganism- এর যে সুর উঠেছে এবং এ বিশ্বের স্থিতি ও ধ্বংসের মধ্যেও তাঁর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অবকাশ পেয়েছে তার পরিচয় আমরা পাই:</p>
<blockquote><p>আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা</p>
<p>কভু ধরণীরে করি বরণীয়া কভু বিপুল ধ্বংস ধন্যা</p></blockquote>
<p>তার একক পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে:</p>
<blockquote><p>আজ কাশ বনে কে শ্বাস ফেলে যায়</p>
<p>মরা নদীর কূলে</p>
<p>ও তার হলদে আঁচল চলতে জড়ায়</p>
<p>অড়হরের ফুলে।</p></blockquote>
<p>মানব-মানসে স্বাশ্রয়ী হওয়ার যে-আদিম প্রবৃত্তি রয়েছে এবং যার প্রকাশ &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে জাজ্বল্যমান তারই অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে:</p>
<blockquote><p>তোমার দত্ত হস্তেরে বাঁধে কার নিপীড়ন চেড়ী</p>
<p>আমার স্বাধীন বিচরণ কার আইনের বেড়ী</p>
<p>ক্ষুধা তৃষ্ণা আছে আছে মোর প্রাণ</p>
<p>আমিও মানুষ আমিও মহান</p>
<p>আমার অধীন এ মোর রসনা এই খাড়া গর্দান</p>
<p>মনের শিকল ছিঁড়েছি পড়েছে হাতের শিকলে টান</p>
<p>এতদিনে ভগবান-</p>
<p>(ফরিয়াদ।)</p></blockquote>
<p>আত্ম-সংরক্ষণের উপবৃত্তি হচ্ছে আত্ম-প্রতিষ্ঠা। সে আত্ম-প্রতিষ্ঠারই এক রূপ যৌন- বাসনা। এ যৌন-বাসনার প্রকাশ কবির ভাষায় অনুপম রূপ লাভ করেছে:</p>
<blockquote><p>সখি পাতিসনে শিলাতলে পদ্ম-পাতা</p>
<p>সখি দিসনে গোলাপ ছিটে খাস লো মাথা</p>
<p>যার অন্তরে ক্রন্দন</p>
<p>করে হৃদি মন্থন</p>
<p>তারে হরি চন্দন</p>
<p>কমলী মালা</p>
<p>সখি দিস নে লো, দিস নে লো বড় সে জ্বালা!</p></blockquote>
<p>আত্ম-প্রতিষ্ঠার উপ-প্রবৃত্তির মধ্যে যুথচারী প্রবৃত্তি অত্যন্ত প্রকটমান। এ প্রকৃতিই মানুষকে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে আত্ম-প্রতিষ্ঠা লাভে উদ্বুদ্ধ করে। নজরুলের ভাষায় এ প্রবৃত্তিরই দান সাম্যবাদের প্রকাশ অনন্য:</p>
<blockquote><p>গাহি সাম্যের গান</p>
<p>যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান</p>
<p>যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রীষ্টান।</p>
<p>(সাম্যবাদী।)</p></blockquote>
<p>ঐতিহ্য-চেতনা থেকেই স্বদেশপ্রেমের সৃষ্টি, সে স্বদেশপ্রেমের মূলমন্ত্র হচ্ছে আপনার দেশ থেকে অপর জাতির শাসন ও শোষণের অবসান। নজরুল স্বদেশপ্রেমের প্রতিনিধি হয়ে বলেছেন:</p>
<blockquote><p><strong>কান্ডারী তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর</strong></p>
<p><strong>বাঙ্গালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর।</strong></p></blockquote>
<p>যে ঐতিহ্যচেতনার মধ্যে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধও রয়েছে:</p>
<blockquote><p>জুলফিকার, হায়দরী হাঁক আজও হজরত আলীর</p>
<p>শাতিল আরব, শাতিল আরব জিন্দা রেখেছে তোমার তীর</p>
<p>(শাত-ইল-আরব)</p></blockquote>
<p><strong>তাঁকে প্রায়ই অপবাদ দেওয়া হয়, তাঁর কাব্যে বা জীবনে কোনো দার্শনিক মতবাদ নেই; সে অপবাদের জ্বলন্ত প্রতিবাদ হিসাবে বলা যায়:</strong></p>
<blockquote><p><strong>আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন</strong></p>
<p><strong>খুঁজি তারে আমি আপনায়</strong></p>
<p><strong>আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি</strong></p>
<p><strong>আমারি তিয়াসী বাসনায়-</strong></p>
<p><strong>&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;</strong></p>
<p><strong>আমারই রচিত কাননে বসিয়া</strong></p>
<p><strong>পরানু পিয়ারে মালিকা রচিয়া</strong></p>
<p><strong>যে মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া</strong></p>
<p><strong>আপনারই গলে দুলে হায়।</strong></p>
<p><strong>(আপনি-পিয়াসী, ছায়ানট)</strong></p></blockquote>
<p>আমার সঙ্গে পরমাত্মার একটা মধুর সম্পর্ক সম্বন্ধে তার বর্ণনা বিশ্ব-সাহিত্যে বিরল। পরমাত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন:</p>
<blockquote><p>আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল আমার দেউল-</p>
<p>আমারই আপন দেহ</p>
<p>আমার এ প্রাণের ঠাকুর নহে সুদূর</p>
<p>অন্তরে মন্দির সেহ।</p>
<p>(বন-গীতি)</p></blockquote>
<p>এ দেহেরই মধ্যে যে প্রাণের ঠাকুর নিত্য তার লীলায় মত্ত রয়েছেন-সে সম্বন্ধে কবি নি:সন্দেহে:</p>
<blockquote><p>এ দেহেরই রঙ মহলায়</p>
<p>খেলিছে লীলা-বিহারী</p>
<p>মিথ্যা মায়া, এ কায়া</p>
<p>কায়ায় হেরি ছায়া তারি।</p>
<p>(গুল-বাগিচা)</p></blockquote>
<p>এতে স্পষ্টই বোঝা যায় মানব-মানসের এমন কোনো বৃত্তি বা প্রবৃত্তি নেই যার সন্তোষ বিধানের জন্য তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে ত্রুটি করেননি।</p>
<p>এজন্যেই তাঁকে বিশ্ব-সাহিত্যের কবি-সভায় স্থান পাওয়ার যোগ্য বলে দাবী করা যায়। তবে এখানে একটা বিঘ্ন রয়েছে। যাঁরা ক্লাসিক হিসাবে বিশ্ব-সাহিত্যে স্থান পেয়েছেন তাঁদের রচনা নানাভাবে ছড়িয়ে পড়েছে- রামায়ণ, মহা-ভারত বা ইলিয়ড ওডিসি সমৃদ্ধভাবে গ্রন্থাকারে দেখা দিয়ে আজও রসগ্রাহী মহলে রস পরিবেশন করছে। তেমনি শেকসপীয়রের নাটকগুলোও এখনও মঞ্চে পরিবেশিত হয়ে মানব-চিত্তে নানা সমস্যার সাড়া জাগাতে সক্ষম হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীর মধ্যে নাটকগুলো এখনও অভিনীত হচ্ছে। নজরুল ইসলামের রচনাবলীতে বেশির ভাগ রয়েছে কবিতা ও গান। এগুলো পাঠ ব্যতীত অন্যভাবে পরিবেশিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই অল্প। এজন্য তার প্রচার অত্যন্ত সীমিত। তাঁর রচনাকে নাট্যাকারে প্রকাশ করে তার ভাবধারা বিশ্ববাসীর নিকট পেশ করা যায় কিনা- আজকের দিনে এ পরীক্ষা হবে আমাদের কর্তব্য। <strong>আমরা দেখতে পেয়েছি জীবনের এমন কোনো স্তর নেই যার সম্বন্ধে তিনি বিশ্বজনের প্রতিনিধি হয়ে সে সম্বন্ধে আলোকপাত করেননি। তাঁর প্রতিটি কবিতায় মানব-জীবনের কোনো- না কোনো বৃত্তির প্রতীকী রূপ দেখতে পাওয়া যায়।</strong> যে-অপূর্ব প্রতিভার অধিকারী হয়ে নজরুল এ দুনিয়ায় এসেছিলেন এবং যে প্রতিভার অপূর্ব ছটায় একদা বাংলা তথা ভারতের কাব্য-গগন আলোকিত হয়েছিলো- তার সম্যক বিকাশ হয়নি। নিদারুণ দারিদ্র্য স্বীয় সমাজের হেনস্থা ও অবহেলা তাতে মহাপ্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। চল্লিশ বৎসর পার হতে না হতে তিনি মানসিক স্তব্ধতা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। যদি তিনি দীর্ঘায়ু হতেন, তা&#8217;হলে তাঁর কাছ থেকে এ বিশ্ব আরও অনেক কিছু আশা করতে পারতো। তবুও যা কিছু তিনি দান করেছেন- তাকে বিশ্ব-সাহিত্যের পর্যায়ে অল্প আয়াসেই উত্তোলন করা যায়।<sup>*</sup></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>*অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-কানাইলাল গঙ্গোপাধ্যায়কৃত গ্যোটের তরজমা পুস্তকের ভূমিকা দ্রষ্টব্য।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/world-spirit-in-nazrul-s-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14708</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মহাকবি ইকবাল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/famous-poet-iqbal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/famous-poet-iqbal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 08 May 2024 09:43:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14149</guid>

					<description><![CDATA[(১) মহাকালকে আত্মিক বা তাত্ত্বিক সত্তা যেভাবেই ভাবা যাক না কেনো, তার প্রবহমানতা বা গতিকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে-কালের গতি অবিচ্ছিন্ন, তার আদি অন্ত আজ মানুষের জ্ঞানের বহির্ভূত। তবু আমাদের সুবিধার জন্য আমরা তাতে রেখা টেনে ভাগ করি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h2 style="text-align: center;">(১)</h2>
<p>মহাকালকে আত্মিক বা তাত্ত্বিক সত্তা যেভাবেই ভাবা যাক না কেনো, তার প্রবহমানতা বা গতিকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে-কালের গতি অবিচ্ছিন্ন, তার আদি অন্ত আজ মানুষের জ্ঞানের বহির্ভূত। তবু আমাদের সুবিধার জন্য আমরা তাতে রেখা টেনে ভাগ করি এবং পুরাতন, মধ্য ও আধুনিক যুগ বলে তাতে তিনটে পর্যায়ের সৃষ্টি করি। আধুনিক যুগের বর্ণনা প্রসঙ্গে দর্শনের ইতিহাসবিদ মিলি বলেন,</p>
<p>&#8220;বর্তমান কালের ইতিহাসের মধ্যে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে চিন্তার পুনর্জাগরণ, সমালোচনা করার মনোবৃত্তির জন্মলাভ, গুরুবাদের ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, নির্বিশেষবাদ (Absolution) ও সংঘবাদের (Collectivum) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং চিন্তায়, অনুভূতিতে ও কার্যে স্বাধীনতার দাবী। রেনেসাঁ ও রিফরমেশনের ক্রান্তিকাল থেকে যে প্রভাব কার্যকরী ছিল, তাই পরবর্তী শতাব্দীতে রয়েছে ক্রিয়াশীল এবং এখন পর্যন্ত তা শান্ত হয়নি।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ মতবাদের পোষকতায় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ করে বলা হয়, দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাচীনকালের গ্রীক মনীষার সঙ্গে বর্তমানকালের সাদৃশ্য রয়েছে। অপরদিকে মধ্যযুগ ছিল বর্তমান কালের সম্পূর্ণ বিপরীত—ধর্মী। গ্রীকদের চিন্তারাজ্যে কোন আপ্তবাক্য (Authority) বা কোন সংঘবদ্ধ চিন্তার শাসন ছিল না। ছোট ছোট নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক মনীষীরই আপনার স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার অধিকার ছিল। এ জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে তাদের ধারণার ফল কোনো ধর্ম সংক্রান্ত প্রত্যয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়নি। সক্রেটিস, প্লেটো বা এরিস্টটলের চিন্তাধারায় তাই স্বাধীন মানসের পরিচয় পাওয়া যায়। তেমনি কাব্যে ও নাটকে সেই সাশ্রয়ী মানসের স্বাক্ষর রয়েছে। হোমার, সকোক্লিস, এসকাইলাস প্রভৃতি মহাকবি ও নাট্যকারগণের অমর অবদানে এ সত্যই বার বার প্রমাণিত হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মতামত ব্যক্ত করার প্রবৃত্তি প্রাচীনকালে ছিল—এ থিওরী সত্য হলেও প্রচলিত প্রত্যয় বা রীতি-নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা সে-যুগেও বিস্তৃতি লাভ করেছে। সক্রেটিসের জীবন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আবার মধ্যযুগেও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার উদাহরণ রয়েছে। সেলজুক বাদশাহ মালিক শাহের আমলে, তাঁর উজির নিজাম-উল-মূলক প্রতিষ্ঠিত নিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ওমর খৈয়াম তার &#8216;রুবাই&#8217;তে যে-সব আদিম ও সার্বজনীন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, তার সঙ্গে তুলনা করলে অতি আধুনিক তত্ত্ব-জিজ্ঞাসাও ম্লান হয়ে পড়ে। আবার এ বিংশ শতাব্দীতেই টি.এস. এলিয়ট তাঁর কাব্যে ধর্মাশ্রিত দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করবার প্রয়াস পেয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ বিভাজনকে তাই সাধারণ নীতি হিসাবে গ্রহণ করলেও তার মধ্যে ব্যতিক্রমের অবকাশ রয়েছে বলে স্বীকার করতেই হবে, এ বিভাজন করার মূলে রয়েছে যে মানদণ্ড, তাকে স্বাধীন বা ধর্মসংক্রান্ত প্রত্যয়শীলতা বলেও গ্রহণ করা যায় না। স্বাধীন চিন্তার মূলেও রয়েছে জীবন-দর্শনসম্ভূত প্রত্যয়শীলতা। আর ধর্মকেন্দ্রিক প্রত্যয়শীলতায় যে এক প্রচন্ড জীবনবোধ রয়েছে তা অনস্বীকার্য। কোনো জীবন-বেদ ব্যতীত যে সত্যিকার কাব্য-সৃষ্টি সম্ভব নয়, তা যে কোনো মহাকাব্যের বিশ্লেষণেই প্রমাণিত হয়। হোমার বা বাল্মীকির কাব্যে আমরা সে প্রত্যয়শীলতারই নিদর্শন পাই—ইলিয়ড ওডিসির যে প্রত্যয়শীলতা—‘সত্যের জয় এবং অসত্যের ক্ষয়’ নামক নীতির স্বীকৃতিতে তা প্রমাণিত হয়। রামায়ণেও সে নীতিরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তবে পার্থক্য এই  যে, রামায়নের সর্বত্রই প্রকৃতির মধ্যেও নীতির কার্যকারিতা দেখা যায়। সক্রেটিসের নাটকাদিতে নিয়তির অমোঘ বিধানের উপর নাট্যকারের অগাধ বিশ্বাসের পরিচর পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মধ্যযুগের বিশেষত্ব হচ্ছে ধর্মীয় প্রত্যয়শীলতার পটভূমিতে জীবনের সমালোচনা করার প্রবৃত্তি। এজন্যই সে যুগের কাব্যকে ধর্মীয় বাণী থেকে পৃথক করা কষ্টসাধ্য। জালাল-উদ্দীন রুমীর মসনভীতে একাধারে ধর্মতত্ত্ব ও কাব্য-রসের সন্ধান পাওয়া যায়। মরমী তত্ত্ববা</strong><strong>ণী </strong><strong>যেমন এ কাব্য থেকে তাঁর সাধনার অনুকূল প্রেরণার উৎসের সন্ধান পান, তেমনি কাব্যরস পিপাসু রসিকজন তাতে উৎকৃষ্ট কাব্যের লক্ষণ আবিষ্কার করে অভিভূত হন।</strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p>এ ধারা মধ্যযুগে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও এখনও তার ইতি হয়নি। বাঙলা  কাব্যের বৈষ্ণব পদাবলীতে সে ধারারই অনুসরণ দেখা যায়। মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির কাব্যের পটভূমিকায় এবং মীরার ভজনে সে মানসিকতাই বর্তমান। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বাউলদের গানে সে ধারার অনুবর্তন লক্ষিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এভাবে কাব্যের মধ্যে ধর্মীয় প্রত্যয়ও ও ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত থাকায় তাকে দু&#8217;দিক থেকেও বিচার করার সম্ভাবনা রয়েছে। তার কারণস্বরূপ বলা যায়‚ বর্তমান কালের সূচনায় জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে যেভাবে পৃথক করা হয়েছে— মধ্যযুগে সে পার্থক্য এত উৎকট হয়ে দেখা দেয়নি বলে একই মানসে তা’ কোথাও ধর্মের আবেগরূপে আবার কোথাও কাব্যের অনুরাগরূপে অপরূপ ভঙ্গিমায় প্রকাশ লাভ করেছে। সম্ভবতঃ এজন্যই মধ্যযুগীয় কাব্যসাধনা তথা ধর্মীয় প্রত্যয়শীলতার ফল Cult-এ পরিণত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইকবাল আমার সঙ্গে কথা বললেন একজন পরামর্শদাতার মতো করে। তাঁর কবিতার মধ্যে বিপুল চিন্তাশক্তি আর ভাবপ্রবণতার আভাষে আমি স্তম্ভিত হলাম। কখনও তিনি বিশ্বস্ত সংলাপী, কখনও আবার অগ্নিময়ী বিচারকের মতো &#8216;মানুষের&#8217; জয়গান গেয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>&#8216;তুমি গড়িয়াছ রাত্রি,</p>
<p>আমি এনেছি আলোর দিশা,</p>
<p>তুমি আমারে দিয়েছ মৃত্তিকা</p>
<p>আমি গড়িয়া তুলেছি পাত্র।</p>
<p>মরু প্রান্তর, পর্বত</p>
<p>সবি তোমারি দান,</p>
<p>উদ্যান প্রভু রচেছি যে আমি—</p>
<p>বিরাম স্থান।</p>
<p>বালুকার রাশি রূপ পেয়ে</p>
<p>হোলো স্বচ্ছ কাঁচ</p>
<p>বিষ নাশি বিষে মধু আনি দিনু</p>
<p>নতুন ধাঁচ।&#8221;</p>
<p>(&#8216;মানুষে ও স্রষ্টার মধ্যে কথোপকথন&#8217;)</p></blockquote>
<p>একথা বলেছেন তিনি সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে। এখানে তাঁর সতর্কীস্বর মানুষের ক্ষমতাবোধকে জাগিয়ে তুলেছে।</p>
<blockquote><p>“&#8230;..দিনভর শুধু ঘুমায় যে জন</p>
<p>প্রকৃতি চাহেনা তারে</p>
<p>যে মানুষ খাটে দিনটি ভরিয়া</p>
<p>সব প্রেম তার ভরে।&#8221;</p>
<p>(&#8216;দুর্দশার দৃশ্য&#8217; কবিতা থেকে)</p></blockquote>
<p>ইকবাল ডাক দিয়েছেন তাঁর দেশবাসীকে ঘুমভেঙে জেগে উঠতে, স্বাধীনতা আর ন্যায়-বিচারের জন্যে সংগ্রামে আগুয়ান হতে। অন্যায়, নিষ্ঠুরতা আর দমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তিনি তাঁর দেশের মানুষদের উপনিবেশ স্থাপনকারীদের অত্যাচার থেকে দেশকে মুক্ত করতে আহ্বান জানিয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যতই আমি ইকবালের কবিতা পড়ি, তাঁর দেশের মানুষের জীবনধারাকে আরো পরিষ্কাররূপে দেখতে পাই, অনুধাবন করি তার মাতৃভূমির মহিমান্বিত রূপ আর সেই দেশের জন্যে কবির অপরিসীম ভালবাসা।</p>
<p>তার বইগুলো আমার চোখের সামনে প্রাচ্যের মানুষদের মহিমাভরা অপূর্ব জীবনধারা আর সে জীবনের দুঃখভরা দৃশ্যাবলী রূপায়িত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><em>ইকবালের কাব্যধারা সোভিয়েত পাঠকদেরও বিশেষ করে কাযাখরা, যারা কাস্পিয়ান সাগর আর উরাল পর্বতমালা থেকে অন্যদিকে আলতাই পর্বতমালা আর জুনগর দরওয়াজা পর্যন্ত এশিয়ার এক সুবিশাল বৃক্ষপত্রহীন প্রান্তরে বসবাস করে, তাদের কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাযাখদের যুগযুগের পুরাতন একটা ইতিহাস রয়েছে; ওদের সমৃদ্ধ কৃষ্টিধারা আছে তাই ওরা কাব্যজগতের মূল্য উপলব্ধি করে। কাযাখদের নিজেদের আছে মহাকাব্যের ধনাগার। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের প্রখ্যাত কবি যোদ্ধা কবি মঘোম্বেত (১৮০৪-১৮৪৬), নীতিগর্ভ উপদেশ আর প্রবাদবাক্যে ভরা কাব্যের বিখ্যাত দার্শনিক কবি আবাই (১৮৪৫-১৯০৪), এবং নামকরা মানবতার কবি মুখতার অডিএজোভের (১৮৯৭-১৯৮১) বইগুলো যদি উর্দুতে অনুদিত হতো তাহলে সেগুলো ইকবালের কাযাখ ভাষায় অনুবাদ করা কবিতাগুলির মতোই হৃদয়গ্রাহী হতো। ইকবালের মতো এদের কাব্যলিতেও আছে গভীর একটি ভাবাবেগ; মানুষের প্রতি ভালবাসা, মহৎ একটি আকাঙ্ক্ষা, মানুষের স্বাধীনতা, বিচারশক্তি এবং আলোর পথে ডাক দেওয়া।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>আমাদের আধুনিক মানস স্বভাবতঃই স্বাশ্রয়ী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী। সেজন্য ধর্মাশ্রিত কাব্যকে সত্যিকার কবিমনের প্রকাশ বলে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। কাব্যের বয়েছে এ সার্বজনীন আবেগ। এ দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেখানেই মানুষ থাক না কেন—সেখানেই কাব্যের আদর হয় বলে তাকে সাম্প্রদায়িকতার স্পর্শ থেকে দূরে রাখা বাঞ্ছনীয় মনে করা হয়। ধর্মের বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য ও বিভিন্নতা থাকা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী ভাবধারা থাকায় কোনো বিশিষ্ট ধর্মের অনুসারীর মর্মবা</em><em>ণী </em><em>অপর ধর্মের মানুষের মনে আবেগের সৃষ্টিতে সক্ষম কি না—সে সম্বন্ধে তর্কের অবকাশ রয়েছে। আবেগের বিষয়বস্তুর উপর গুরুত্ব আরোপ করলে এবং বিধ সিদ্ধান্ত অপরিহার্য বলে প্রতিভাত হয়। </em></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে মানব-মানসের দিক থেকে (From the subjective standpoint) বিচার করলে বুঝতে পারা যায়, ধর্মের মধ্যে বিভিন্নতা থাকলেও ধর্মের মধ্যে রয়েছে এক মহান ঐক্য। মানবমন স্বভাবতই বহির্মুখীন এবং তার স্বাভাবিক প্রবণতার দরুনই এ বিশ্বের পশ্চাদপটে বিরাজমান আদিসত্তাকে সে জানতে চায়। জ্ঞানের এ প্রেরণাই তাকে তার সীমাবদ্ধ জীবনের পরিস্থিতি থেকে  সীমাহীন সত্তার অন্বেষণে ধাবিত করে। জীবনের এ জোরালো চাহিদার তৃপ্তি সাধনে তৎপর রয়েছে বলেই মানব-মানস ধর্মমুখী। সে তৃপ্তির জন্য যে-সব পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় অথবা যে-সব ধারণার আশ্রয় লওয়া হয়, সেগুলো ধর্মের রাজ্যে মুখ্য বিষয় নয়; মুখ্য বিষয় হচ্ছে, মনের যে আদিম চাহিদা এবং তার তৃপ্তির জন্য মানব-মানসের বহির্গমন। ধর্মীয় আবেগের পরিতৃপ্তির জন্য যে সব ধারণা গ্রহণ করা হয়, সেগুলো মানব-জীবনেরই সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। কোথাও আদর্শকে প্রেমিক হিসাবে, কোথাও পিতারূণে কোথাও বা প্রেমিকারূপে গ্রহণ করে ধর্মীয় মানস স্বস্তি পায়। এসব আদর্শে উপলব্ধির পথ বিভিন্ন হতে পারে, তবে মানব-জীবনে যে আবেগের ফলে তাদের উৎপত্তি, তা&#8217; এক ও অবিভাজ্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে আদর্শের সংঘর্ষের ফল এবং সে-সব আদর্শের রূপায়ণের মাধ্যমের বিভিন্নতার দরুণ অনেক সময় ধর্মীয় অনুষঙ্গ সার্বজনীনতা লাভ করতে পারে না। এজন্যই বোধ হয় কোনো কোনো মধ্যযুগীয় কবি তাদের ধর্মীয় আবেগকে মানবিকরূপ দান করেছেন, ইরানি কবি হাফিজের কাব্য-প্রতিভার বৈশিষ্ট্য এই খানেই। তিনি অতি গুঢ় আধ্যাত্মিক ভাবধারাকে অতি সহজভাবে মানব-প্রেমের প্রকাশ ভঙ্গিমায় মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। তার &#8216;দিওয়ানের&#8217; সর্বত্রই আপাতঃদৃষ্টিতে মানব-প্রেমেরই এক লালসাপূর্ণ অধ্যায়ের প্রকাশ পাওয়া যায়,</p>
<p>“প্রিয়ারে ছাড়িয়া থেকো না হাফিজ, ছেড়ো না পেয়েলা লাল  এ যে গোলাপের চামেলীর দিন, এ যে উৎসব কাল&#8230;”</p>
<p>(তরজমাঃ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এবংবিধ উক্তির মর্মমূলে আধ্যাত্মিক সাধনার গূঢ় অর্থ থাকলেও আপাতঃশ্রুতিতে তাতে কামনাময় শারীরিক সম্বন্ধজাত আবেগের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ধরনের সৃষ্টির উদাহরণ রয়েছে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির কাব্যে। তাঁর ধারণাতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিকরূপ পরিত্যাগ করে কবি-জীবনের চরম সখারূপে দেখা দিয়েছেন,</p>
<p>“তিমির দিক ভরি ঘোর যামিনী অথির বিজুরিত পাতিয়া বিদ্যাপতি কহে ক্যায়সে গোয়াইব হরি বিনে দিন রাতিয়া।“</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে কাব্যের বিষয়বস্তু ধর্মীয় রূপ গ্রহণ করুক অথবা মানবীয় রূপেই তা প্রকাশিত হোক, তার পশ্চাদপটে বিশিষ্ট জীবন-দর্শন থাকা অবশ্যম্ভাবী। সে জীবন-দর্শনেও পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। নানাবিধ পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও মহাকাব্যে কতকগুলো লক্ষণ ফুটে ওঠে। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ লক্ষণ হচ্ছে তার অন্তর্গত নানাবিধ ভাবধারার সমাবেশ। তাতে এমন কতকগুলো ভাবধারা বর্তমান থাকে যার ফলে তার জাতি নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানব-জীবনকে সামগ্রিকভাবে দেখার ফলে তার মধ্যে নানাবিধ ভাবধারা থাকে বর্তমান, যার ফলে তত্ত্বানুসন্ধানী দার্শনিক তার মধ্যে খুজে পান দর্শনের জটিল তত্ত্বের সমাধানের প্রয়াস, মানব-প্রেমিক তার মধ্যে আবিষ্কার করেন মানব-প্রেমের বা মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>রামায়ণে বর্ণিত রাজা রামচন্দ্রের চরিত্রে যেমন আদর্শ নরপতির উদাহরণ পাওয়া যায়, তেমনি প্রজাগণের মনোরঞ্জনার্থে সীতাকে বনবাসে প্রেরণের মধ্যে প্রজাতন্ত্রের (Democracy) আদি বীজেরও সন্ধান পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ধর্মের সঙ্গে রয়েছে মহাকাব্যের সাদৃশ্য। ধর্মের মধ্যে যেমন মানব-জীবনের নানাবিধ দিকের সন্তোষ বিধানের রয়েছে উপাদান। এ দুনিয়ার সকল ধর্মের মধ্যে সমাজ-নীতি ও রাজনীতির মৌলিকসূত্র বর্তমান। এ সব নীতিকে ধর্ম- প্রবর্তকগণ কেবল প্রচার করেই ক্ষান্ত হননি, বাস্তব জীবনেও তার রূপায়ণের জন্যও চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বৌদ্ধ ধর্মকে সাধারণতঃ অহিংসার ধর্ম বলেই গ্রহণ করা হয়, অথচ বুদ্ধদেব স্বম্বন্ধে কাহিনী প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি ব্রাহ্মণ বৈশ্যদের ষড়ন্ত্রের ফলে ব্যবসায় ও বাণিজ্যে যে কর্ডনিং প্রথার সৃষ্টি হয়েছিল এবং যে জঘন্য প্রথার ফলে সর্বসাধারণের মানুষের জীবনে সংকট দেখা দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে তিনি দলবলসহ যুদ্ধ করেছেন। যীশুখৃষ্ট দাসের দল নিয়ে ইহুদিদের সুদ লেনদেনের প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করেছেন এবং হযরত মুহাম্মদ (দঃ) দাসকে মুক্ত করা তাঁর জীবনের ব্রত হিসাবেই গ্রহণ করেছিলেন। কাজেই এ সব ধর্মে জনগণের কল্যাণকে শ্রেষ্ঠ সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে অম্লান বদনে স্বীকার করা যায়। তাই দেখা যায় পারলৌকিক মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ইহলোকিক কল্যাণও এ-সব ধর্মের লক্ষ্যের বিষয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানেই মহাকাব্যের স্রষ্টাগণ অপরাপর সৃষ্টিধর্মী মানুষ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বহুধা বিস্তৃত জীবনের নানাবিধ ভূয়োদর্শনের ফলে এদের মানস এত গভীর ও সমৃদ্ধ হয় যে, মহাসমুদ্রের মত তাতে হাঙ্গর, কুমীর, তিমি থেকে শুরু করে অতি নিরীহ ঝিনুকানিও  স্থান পায়। বিচিত্র জীবনের বৈচিত্র্য প্রকাশে কৃতী বলেই তারা এ জগতে অমর হয়ে বিরাজমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে স্মরণ করা কর্তব্য যে, মহাকাব্য রচনায় সফল হওয়ার পূর্বে এসব অপূর্ব প্রতিভা ও মণীষার অধিকারী শিল্পীগণ নানা স্তর পার হয়ে সেই চরমস্তরে উপনীত হন। স্বজন ধর্ম স্বভাবজাত হলেও তাকে সার্থক করে তুলতে হলে সাধনার সোপান উত্তীর্ণ হতে হয়। ইকবালকে মহাকবি বলার অর্থ এই যে, তাঁর মধ্যেও মানব-জীবনের নানাদিকের নানা প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা রয়েছে। সাধনার সর্বশেষ স্তরে উপনীত হওয়ার আগে তাঁকে নানা স্তর পার হতে হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h2 style="text-align: center;"><strong>(২)</strong></h2>
<p>মহাকবি ইকবালে কাব্য-পাঠে সর্বপ্রথমেই ভেসে উঠে তার প্রতি জোরালো প্রত্যয়শীলতা। সে প্রত্যয়শীলতা প্রথমদিকে আধুনিক ভাবধারা দ্বারা বিকশিত হয়েছে এবং বিকাশের ধারায় পরবর্তীকালে ধর্মীয় ধারণার দ্বারা পুষ্ট হয়ে পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। প্রথমদিকে তাঁর ভাব প্রকাশের বাহন হিসাবে তিনি বিজাতীয় ধারণা বা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করলেও পরবর্তীকাল তিনি সম্পূর্ণ ইসলামী সংস্কৃতির ধারণার মাধ্যমে তাঁর পরিণত বয়সের চিন্তার ফল প্রকাশ করেছেন। অবশ্য উভয় পর্যায়েই তিনি আধুনিক চিন্তাধারার সমালোচনা করে তাঁর জীবনদর্শন প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মহাকাব্যের উপজীব্য বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রধান বিষয়গুলো ছিলো, সৃষ্টিশীল আল্লাহ সম্বন্ধে তাঁর ধারণা, মানব জীবনের গতিশীলতা, খুদী, তকদীর ও অমরতা। এসব ধারণায় তিনি অকস্মাৎ এসে উপনীত হননি। ক্রমবিকাশের ধারায় সর্বশেষ স্তরে তাঁর মানস এ-সব ধারণার মর্ম গ্রহণে সমর্থ হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তাঁর মহাকাব্যের বিকাশের ধারার অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাই, প্রথমে তিনি জীর্ণ-শীর্ণ এ ঘুনে ধরা সমাজের নানাবিধ গ্লানিতে অতিষ্ঠ হয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতি অধ্যুষিত এই বিশাল দেশে কোথাও প্রাণের স্পন্দন তিনি পাননি। গতানুগতিক আচার পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ সেই পুরাতনেরই আরাধনা করছে। তাতে বাইরের খোলাটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, অন্তরের কোনো সাড়া তাতে প্রকাশ পাচ্ছে না। সে যুগের ইকবাল মানসের পরিচয় হিসাবে নিম্নে উদ্ধৃত কবিতাকে শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলা যায়,</p>
<blockquote><p>শূন্য পড়িয়া আছে বহু যুগ হতে হৃদয়ের লোকালয়</p>
<p>এসো এক নূতন শিবালয় এই দেশে বসাইয়া দেই,</p>
<p>পৃথিবীর তীর্থ হইতে উচ্চ হউক আপন তীর্থ</p>
<p>আকাশের বস্ত্রাঞ্চলের সঙ্গে তাহার চূড়ায় কলস মিলাইয়া দেই।</p>
<p>(অনুবাদ: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p></blockquote>
<p>এ যুগেরই অপর এক কবিতায় তাঁর এ মনোভাবের আরও স্পষ্ট হয়ে প্রকাশিত হয়েছে—</p>
<p>ওগো ব্রাহ্মণ!</p>
<p>মন্দিরের দেবতা তোর পুরানো হয়ে গেছে</p>
<p>নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ—</p>
<p>এতো তুই তার কাছেই শিখেছিস</p>
<p>খোদাই শিখিয়েছেন ওয়াইজকে ঝগড়া বিবাদ করতে—</p>
<p>মসজিদ মন্দির কোনটাতেই আমার ভক্তি নেই—</p>
<p>ব্রাহ্মণ মোল্লা দুই-ই ছেড়েছি আমি</p>
<p>তুই ভেবেছিস পাথরের মন্দিরে দেবতা আছে</p>
<p>জন্মভূমির প্রতি ধূলিকণা কিন্তু আমার দেবতা—</p>
<p>নুতন শিবালয় তৈরি করব প্রাণের বশত ভূমিতে</p>
<p>উদার আকাশে মেলে দেবে এ চূড়ার পাখা</p>
<p>সকল তীর্থের সেরা তীর্ঘ হবে এই—</p>
<p>মানুষের মুক্তি আনবে প্রেমের ভিতর দিয়ে—</p>
<p>(নয়া শিবালয়, অনুবাদ- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এক্ষেত্রে স্পষ্টই বুঝতে পারা যায় তথাকথিত হিন্দু বা মুসলিম কোনো সংস্কৃতিতেই তাঁর আস্থা ছিল না। তিনি ছিলেন জীবনের অন্বেষণে ধাবমান। সত্যিকার জীবন কোথায়—কিভাবে তাকে আবার ফিরে পাওয়া যায়—এ-ই ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু। এ যুগের অপর একটি কবিতায় এ ভাবটি সুপরিস্ফুট। &#8216;চাঁদ&#8217; নামক কবিতায় তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়ের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়—</p>
<blockquote><p>কাহারে খুঁজিছ তুমি, কোন সে সুন্দর</p>
<p>ফিরিছ তালাশ করি আমারি মতন?</p>
<p>অনন্ত আলোকে যার মানব-অন্তর</p>
<p>আলোকিত প্রভাসিত প্রদীপ যেমন।&#8217;</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা— বাঙ-ই-দারা; তরজমা- মীজানুর রহমান)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ পর্যায়েই তাঁর মানসে স্বদেশ-প্রেম ছিল অগ্নি-শিখার মত জ্বলন্ত। অতি আধুনিক যুগে স্বদেশ-প্রেমকে অনেক মনীষীই মানব জীবনের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মহা প্রতিবন্ধকরূপে গণ্য করছেন। বার্ট্রান্ড রাসেল স্বদেশ-প্রেমের জন্ম ইতিহাস বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, তার বয়স খুব বেশী নয়। জোয়ান-অব-আর্ক কর্তৃক তা সর্বপ্রথমে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়। নেপোলিয়ন তা জার্মানীতে আমদানী করেন। মেটারনিক তাঁর বীজ ইটালীতে বপন করেন এবং শেক্সপীয়রের মতল এমন মধুর ভাষায় আর কেউই এ বিষ পরিবেশন করেননি। স্বদেশ-প্রেমের প্রথমদিকে থাকে আত্মরক্ষামূলক মনোবৃত্তি এবং পরিশেষে তাতে দেখা দেয় আত্ম-প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শোষণের প্রবৃত্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ভৌগলিক পরিবেশ, রক্ত, ভাষা, অর্থনৈতিক সংস্থা প্রভৃতি থেকে মানুষের মনে জাতীয়তাবোধের প্রতিষ্ঠা হয়। এ জাতীয়তার সর্বপ্রধান লক্ষ্য অপর জাতির অধিকার থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা। আবার এভাবে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হলে পরবর্তীকালে তাকে মানুষের শ্রেষ্ঠ সমাজ মনে করে এবং অপরাপর জাতির রক্ত মোক্ষণ করে আনন্দ পাওয়াটা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। এঙ্গেলস সেকসনস, ব্রিটন প্রভতি জাতির সমবায়ে যে বিটিশ জাতি বা ন্যাশন গড়ে ওঠে, তার মূল কারণ ছিলো নরম্যানসদের সাগরের অপরপারের অপরাপর জাতি থেকে নিরাপদ হওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন বোধ। আবার সংঘবদ্ধ হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করার পর এ </strong><strong>ব্রি</strong><strong>টিশ জাতিই এ দুনিয়ার সুদূর প্রান্তে কত শত জাতিকে অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করে শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষণ করে নিঃশেষিত করে ফেলেছে, তার ইয়ত্তা নেই। </strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>ইকবালের জন্ম ইংরেজ শাসনের চূড়ান্ত পর্যায়ে। এদেশবাসীকে ইংরেজরা কি অমানুষিকভাবে শাসন ও শোষণ করতো, তা তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন। কাজেই স্বদেশ-প্রেমের প্রাথমিক পর্যায়ের অনুপ্রেরণা তিনি লাভ করেছিলেন। বর্তমানকালের স্বদেশ-প্রেমের যে বিষময় ফল এ দুনিয়ার সর্বত্র দেখা দিচ্ছে তা&#8217;ও তিনি পরিণত বয়সে উপলব্ধি করেছিলেন এবং সে পর্যায়ে তাঁর কাব্যে যে বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছে, এবং তা বিশ্ব-সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য। আলোচিত পর্যায়ে তাঁর মনে স্বদেশ তথা ভারতীয় প্রেম তাঁকে কীভাবে উজ্জীবিত করছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় তারানা</strong><strong>য়ে </strong><strong> হিন্দ, মেরা ওয়তান ওহি হ্যায়, হিন্দুস্থান হামারা প্রভৃতি কবিতায়। তারানায়ে হিন্দতে তিনি গেয়েছেন—</strong></p>
<p>ধর্ম কখনও শিখায় না শত্রুতা করিতে</p>
<p>হিন্দি আমি, হিন্দুস্তান স্বদেশ আমার—</p>
<p>(তরজমা: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অথবা হিন্দুস্তান হামারাতে গর্ব করেছেন—</p>
<p>সারা জাহাঁসে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে স্বদেশ-প্রেম ইকবাল কাব্যের চূড়ান্ত নয়। এ স্তর তিনি অনায়াসে পার হয়েছেন তার অন্তর্নিহিত আশাবাদের উজ্জ্বল আলোকে। যে চিরন্তন সত্যের জন্য তাঁর এ যাত্রা এবং যে সন্ধানের আভাস আমরা পূর্বে পেয়েছি তাতে সফলতার আশাবাদ তিনি সর্বদাই পোষণ করতেন—</p>
<p>কিন্তু তবু, ভ্রাম্যমাণ চিরকাল জীবনের জাহাজ</p>
<p>মানবের দৃষ্টির আড়ালে—</p>
<p>কখনো হারিয়ে যায়, হয়ত বা যেতে পারে তবু</p>
<p>ধ্বংস তার নেই কোনো কালে—</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা—রাভীতীরে; তরজমা— মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পরবর্তীকালে যে অমরতার বাণী তিনি মানবকে শুনিয়েছেন তার সূত্রও এখানে পাওয়া যায়—</p>
<p>জীবন জাহাজ চিরকাল ভ্রাম্যমাণ। সে কখনও বা হারিয়ে যায়, কখনও বা দৃষ্টির বাইরে চলে যায়, তবে তার ধ্বংস নেই কোনোকালে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতার মধ্যে বিশেষভাবে তাঁর তত্ত্বজ্ঞানের প্রবণতার নিদর্শন পাওয়া যায়। অবিনশ্বর জীবনের যে ধারণা পূর্বতন পর্যায়ে পাওয়া যায়, তাই আরও পাকা দানা বেঁধেছে তার মানসে। এ পর্যায়েই বিশেষভাবে স্থিতির নিন্দা ও গতির উচ্চ প্রশংসা তাঁর কাব্যে পরিলক্ষিত হয়–</p>
<p>গতি হইতে জগতের জীবন</p>
<p>ইহাই ইহার প্রাচীন রীতি</p>
<p>এই পথে অবস্থিতি লুক্কায়িত</p>
<p>চলনশীল নিষ্কৃতি পাইয়াছে,</p>
<p>যে একটু থামিয়াছে বিধ্বস্ত হইয়াছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ গতিবাদ বা DYNAMISM জগতের চিন্তাধারার ইতিহাসে নতুন নয়। গ্রীক দর্শনে হিরাক্লাইটাস এ-গতিবাদ প্রথমে প্রচার করেন। তাঁর চিন্তাধারাকে ইলিয়াটিক (ELEATIC) চিন্তাধারার ব্যত্যয় বলা যায়। ইলিয়াটিক চিন্তার মর্ম কথা হচ্ছে, গতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এ দুনিয়ায় অপরিবর্তনশীল সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করা। মননশীলতার দিক থেকে বিচার করলে গতিশীলতাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের ভ্রান্তি বলেই ধরে নিতে হয়। এ চিন্তাধারার প্রতিনিধি পারমিনাইডিসের (Parmenides) প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল—চিন্তা ও স্থিতির ঐক্য। জিনো (Zeno) গতির অবাস্তবতা প্রমাণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কোনো গতিশীল তীরকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যেতে হলে তার মধ্যবর্তী অনন্ত বিন্দুর ভিতর দিয়েই যেতে হবে। অনন্ত বিন্দুর মধ্যে দিয়ে তার পক্ষে যাওয়া সম্ভবপর নয়। হিরাক্লাইটাস এ চিন্তার প্রতিপক্ষীয় মতবাদ প্রচার করেন। পরস্পর বিরোধী বস্তুর দ্বন্দ্বই সকল বস্তুর প্রকৃত সত্তা এবং তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পাচ্ছে অগ্নিতে। তবে এ গতির কোনো লক্ষ্য নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অতি আধুনিক দর্শনে এ গতিবাদ প্রচার করেছেন ফরাসী দার্শনিক বের্গসোঁ (Bergsou)। ডারউইন বা লেমার্ক বর্ণিত জীব-জগতের বিবর্তনের ব্যাখ্যার সমালোচনা প্রসঙ্গে বের্গসোঁ মন্তব্য করেন, ওঁরা বাইরের দিক থেকে ক্রমবিকাশের ধারাকে বর্ণনা করেছেন। ওঁরা দেখিয়েছেন কিভাবে জীব-জগতে বিবর্তন হচ্ছে—তবে কেন এ বিবর্তন হচ্ছে এ প্রশ্নটা ওঁরা তোলেননি। তাঁর মতে, এ বিবর্তনের কারণ হচ্ছে তার পশ্চাতে রয়েছে এমন একটি শক্তি যা নিত্যনূতন নব নব সৃষ্টি করেই চলে। এ শক্তির ধাতুই হচ্ছে নব নব সৃষ্টিতে পর্যবসিত হওয়া। এজন্যই কালকে বের্গসোঁ বলেছেন বিশ্বসত্তা। কালে যেভাবে কোন স্থিতি নেই—গতিই একমাত্র সত্য—তেমনি এ বিশ্বে স্থিতিশীল বলে কোনো কিছুই নেই। কালের বা বিশ্বসত্তার স্বাভাবিক ধর্ম গতিশীলতা হলেও—তাতে কোন লক্ষ্য নেই। অর্থাৎ কোনো আদর্শের বাস্তবায়নে বা কোনো লক্ষ্যের পানে পৌঁছার জন্য সে গতিরও কেউ নিয়ন্ত্রণ করেনি। গতির ফলেই ক্রমবিকাশের ধারায় নিত্য নতুন নানা মূল্যমানের সৃষ্টি হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইকবাল গতিবাদকে স্বীকার করে তাকে সংশোধিত আকারে প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতবাদ অনুসারে ক্রমবিকাশের ধারার লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টি এবং তার মাধ্যমে প্রকৃত জীবনের সন্ধান। বিশ্ব প্রকৃতিতে মানুষের উৎপত্তি এক মহান ব্যাপার। মানুষকে হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে আল্লার প্রতিনিধি বা খলিফা। সে খলিফার প্রকৃত কর্তব্য হচ্ছে এ দুনিয়ায় আল্লার রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করা। কাজেই সেই আল্লার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকল্পেই বিবর্তনের ধারা ছুটে চলেছে এবং মানুষের মাধ্যমেই তা এ দুনিয়ার বুকে বাস্তবায়িত হবে। এই ভাবধারাকেই ইকবাল প্রকাশ করেছেন তাঁর অনবদ্য ভাষায়—</p>
<p>ঝরণা চায় নদীতে মিশতে</p>
<p>নদী চায় সমুদ্রে মিশে যেতে</p>
<p>সমুদ্রের ঢেউ কামনা করে চাঁদের জ্যোৎস্নাকে</p>
<p>জীবন রহস্যের সন্ধান নাও খিজিরের কাছে থেকে</p>
<p>দুনিয়ায় কারোর আশাই তো পূর্ণ হলো না।</p>
<p>(কোশেশ-ই-না তামাম; অনুবাদঃ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, যদিও ইসলামী ভাবধারায় খিজির আলায়-হিস-সাল্লাম এখনও জীবিত এবং তাঁর কাছে থেকেই জীবন-রহস্যের সন্ধানের ইকবাল তাগিদ করছেন, তবু শেষ পংক্তিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে কারোর আশাই তো পূর্ণ হলো না। এখানে স্পষ্টই বুঝতে পারা যায় খিজিরের কাছে জীবনরহস্যের সন্ধান পেলেও কারো আশাই পূর্ণ হবে না। সারাটা জীবনব্যাপী তাকে উপলব্ধি করার জন্য অন্বেষণ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তৃতীয় পর্যায়ে কবি-মানস আরও সমৃদ্ধতর হয়ে দেখা দিয়েছে। এ পর্যায়ে তিনি তার বিখ্যাত অভিযোগমূলক কাব্য শেকোয়া ও তার জওয়াব প্রকাশ করে। মানবাত্মা সম্বন্ধে তাঁর ধারণাও আসরারে খুদীর মধ্যে ব্যক্ত রয়েছে। শেকোয়া বা অভিযোগমূলক কাব্যের প্রবর্তন এ-দুনিয়ার ইতিহাসে নতুন নয়। ইকবালের বহু পূর্বে ওমর খৈয়াম তার অপূর্ব বচনভঙ্গিমায় মানুষের পক্ষ থেকে অভিযোগ করেছেন। সাধারণভাবে মানুষকে তাঁর পাপের জন্য দায়ী করা হয়, কিন্তু পাপের সৃষ্টি তো খোদা আল্লাহর দ্বারাই হয়েছে। কাজেই মানুষ সর্বতোভাবে ক্ষমার যোগ্য—</p>
<p>পাপের কালো মূর্তি নিয়ে জীব জগতে ঘুরছ হায়,</p>
<p>মানুষ তোমায় করছে ক্ষমা তুমিও দেব ক্ষমিয় তার।</p>
<p>(রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম, তরজমা: কান্তি চন্দ্র ঘোষ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ অভিযোগ করেছেন-</p>
<p>এ দুনিয়ার সৃষ্টির উপাদান শুধু মৃত্তিকা। একে নন্দনকানন করে গড়ে তোলেননি ভগবান। সে গড়ার সম্পূর্ণ ভার দেওয়া হয়েছে মানুষকে, অথচ মানুষের হাতে স্বাভাবিক কোনো যন্ত্র নেই যে, তার মাধ্যমে সে এ মাটির পৃথিবীকে সুন্দর ও শোভন করে তুলে। তবু সে ভার মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে—</p>
<p>তুমি তো গড়েছো শুধু এ মাটির ধরণী</p>
<p>তোমার মিলাইয়া আলোকে আঁধার</p>
<p>শুন্য হাতে সেখা মোরে রেখে</p>
<p>হাসিছ আপনি সেই শুন্যের আড়ালে</p>
<p>গুপ্ত থেকে দিয়াছ আমার পরে ভার</p>
<p>তোমার স্বর্গটা রচিবার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ-সব অভিযোগকে সার্বজনীন অভিযোগ বলা হয়। এ দুনিয়ার সকল মানুষের প্রতিনিধি হয়েই ওমর খৈয়াম বা রবীন্দ্রনাথ এ-সব অভিযোগ করেছেন। ইকবাল অভিযোগ করেছেন এ দুনিয়ার এ বিশিষ্ট মতবাদে বিশ্বাসী এক মানব গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। তবে এ ক্ষেত্রে ভাববার বিষয় এই, মুসলিমদেরকে একটি আদর্শবাদে প্রত্যয়শীল দল বলেই তিনি গ্রহণ করেছেন। ইসলামের ঐতিহ্যের আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যায়, আদি যুগ থেকেই মুসলিমেরা এ দুনিয়ায় আল্লার ওহদানীয়ত বা ঐক্য এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিরুদ্ধমতবাদী লোকের সঙ্গে সংগ্রাম করেছে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে ও আল কুরআনে সে সংগ্রামের কাহিনী লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইব্রাহিম খলিল থেকে এ দুনিয়ায় আল্লাহর ওহদানীয়ত ও সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সূচনায় কাফের বাদশা নমরুদের শত্রুতা থেকে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিলো এবং যে সংগ্রাম এখনও চলেছে অত্যাচারী রাজা বাদশাহ বা তথাকথিত জননেতার বিরুদ্ধে, সে সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী একটি বিশিষ্ট মানব গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়েই তিনি এ অভিযোগ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ মানবগোষ্ঠীর জীবনে কোনো বংশের বা গোত্রের প্রতিষ্ঠা বা স্বার্থ আদায় করার প্রবৃত্তি ছিলো না। এরা ছিলো এক বলিষ্ঠ জীবন-বোধে অনুপ্রাণিত। এ দুনিয়ায় কোনো বক্তির নয়, কোনো জাতির নয়, কোনো অধিপতির নয়— খোদ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠায় এরা ছিল উন্মুখ। ওরা চেয়েছিল আল্লার সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা করে এ দুনিয়ার সম্পদ সমানভাবে ভোগ করার নীতি প্রতিষ্ঠা করতে। এজন্যেই পরবর্তী-কালে ওরা কেবল বিধর্মীর সঙ্গেই যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি, বরং তথাকথিত মুসলিম নামধারী শাসক ও শোসকদের বিরুদ্ধেও সংগ্রামে জান কোরবান করেছে। কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেনের (রাঃ) জেহাদ বা জাহাঙ্গীরের ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিরোধকল্পে মুজাদ্দিদে আলফে সানী শেখ আহমদ সিরহিন্দের বিদ্রোহও সেই মানসিকতার পরিচায়ক। কাজেই এ স্থলে মুসলিম শব্দ ব্যাপক বা সাধারণ অর্থে ইকবাল ব্যবহার করেননি। এক বিশিষ্ট জীবনদর্শনে প্রত্যয়শীল আদর্শবাদী এক মানুষ গোষ্ঠী সম্বন্ধে তিনি এ শব্দ প্রয়োগ করেছেন। তার ব্যাখ্যার কারণ স্বরূপ বলা যায়, যে জাতি সারাজীবন ভরে আল্লার আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে অবিরাম বিরুদ্ধবাদী প্রতিপক্ষীয় শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করেই গেলো, তার পতন বাস্তবিকই ইনসাফের দিক থেকে সহনীয় নয়—</p>
<blockquote><p>কেহ কি তোমার মহিমার লাগি করেছিল তেগ উত্তোলন</p>
<p>বিকল তোমার সৃষ্টি যন্ত্রে বাঁধিল নিয়মে কোন সে জন?</p>
<p>তব নাম লয়ে বুজিয়াছি একা আমি মুসলিম অমিত বল</p>
<p>কখানা ভুলতে মেতেছি সমরে, আলোড়িয়া কভু সিন্ধু জল।</p>
<p>(মোহাম্মদ সুলতান; শোকোয়ার তরজমা থেকে)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>তার প্রতিদানে আল্লাহ মুসলিমদের কি দান করেছেন? আপাতদৃষ্টিতে কিছু নয়। বরং যারা তাঁর নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে না তাদের তরেই বর্ধিত আল্লার যত নিয়ামত কণা—</p>
<blockquote><p>নহে অভিযোগ দিয়াছ বলিয়া ধনাগার করি পূর্ণ তার</p>
<p>তব সনে যার কহিতেও কথা নাহিক চিহ্ন ভদ্রতার</p>
<p>আফসোস হায় হুরীসহ তারা করিছে রম্য হর্ম্যে বাস</p>
<p>মুসলিম তরে রাখিয়াহ বাকী কেবল হুরীর প্রাপ্তি আশ।</p>
<p>(তরজমাঃ মোহাম্মদ সুলতান)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম জীবনের এতো সব দৈন্যের মধ্যেও কবি তাঁর আশ্যবাদ বর্জন করেননি। জওয়াবে শেকোয়াতে মুসলিম জীবনের এ অধঃপতনের জন্য আল্লাহ খোদ মুসলিমদেরই দায়ী করেছেন এবং কোন পদ্ধতিতে তারা আবার তাদের লুপ্ত গৌরব ফিরে পেতে পারে তার পথও দেখিয়েছেন—</p>
<p>ধর্মযাজক বিশ্বাসহীন ধর্মে নাহিক আস্থা হায়</p>
<p>বিদ্যুৎ সম নাহি সে স্বভাব নাহি উষ্ণতা বক্তৃতায়,</p>
<p>বেঁচে আছে শুধু আজানের প্রথা কোথা সে বেলাল ভক্তিমান</p>
<p>দর্শন আজি পুঁথির বিধান গাজ্জালীর নাই শিক্ষাদান। (পূর্বোক্ত)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তব মুসলিম জীবনে নিরাশাবাদের কোন স্থান নাই—</p>
<p>জ্ঞানের বর্মে শোভিত অঙ্গ প্রেম-তরবারি হস্তে ঝলে</p>
<p>হে মোর বিরাগী তব খেলাফত রহিবে অটুট বিশ্বতলে</p>
<p>বহ্নিতুল্য তকবীর উজলিবে সারা সৃষ্টি খান</p>
<p>তদবীর হতে তকদীর তব হওগো সাচ্চা মুসলমান। (পূর্বোক্ত)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানেও লক্ষণীয় বিষয়, এই পরবর্তীকালে তকদীর সম্বন্ধে যে মতবাদ তিনি প্রকাশ করেছেন তার ইঙ্গিত এ কবিতায় রয়েছে। মানুষ নিয়তির হাতের ক্রীড়নক নয়—সে তার ভাগ্য আপনি সৃষ্টি করে। বিকাশের ধারায় তার চেষ্টাই তাকে সফল করে। এ পর্যায়েই কবি-জীবনে খুদি তত্ত্ব পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। খুদি তত্ত্বের একটি বিশিষ্ট পংক্তি এখন পাকিস্তানের সর্বত্রই উচ্চরিত হয়—</p>
<p>“খুদি কো কর বুলন্দ কে হর তকদীর সে পহেলে খুদ খোদা বান্দা সে পুছে কে বাতা তেরি রিজা কিয়া হ্যায়&#8230;”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ কোন জাতীয় খুদি?</p>
<p>সাধারণতঃ ইউরোপী ধারণায় Indivdualism বা ব্যাষ্টিবাদ বলে যে মতবাদ প্রচলিত রয়েছে, এ খুদিকে তারই অপর এক নাম বলে ভুল ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ নামেও এ মতবাদ পরিচিত। ফরাসী দার্শনিক রুশো ও ইংরেজ দার্শনিক জন লক এ-মতবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছেন। এ মতবাদকে সমষ্টিবাদ বা Collectivism-এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বলা যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে, আধুনিক যুগের বিশেষত্ব হচ্ছে নির্বিশেষবাদ (Absolution) ও সংঘবাদের (Collectivism) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাতে। পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রাচীনকালে গ্রীকদের ছোটো ছোটো রাষ্ট্রে সংঘবদ্ধ বলে বিশেষ কিছুই ছিলো না। ব্যাষ্টিকে স্বাধীনভাবে তার মতামত প্রকাশ করার অধিকার দেওয়া হতো। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতনেরও নজির পাওয়া যায়, তবু মোটামুটিভাবে মানুষের চিন্তার ও বাক্যের স্বাধীনতা ছিল বলতেই হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রেনেসাঁর পর থেকেই ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতি স্বীকৃতি লাভ করে এবং মধ্যযুগীয় ধর্ম রাজ্যের পোপের আধিপত্য বা চার্চের শাসন থেকে মানুষ মুক্তি লাভ করে, আপনাদের স্বাধীন চিন্তাপ্রসূত মতামত প্রকাশ করার বাসনা পোষণ করে। এ মতবাদের পোষকতায় বলা হয় মানুষ তার স্বকীয় ভুয়োদর্শনের ফলে যে-মতবাদ গঠন করতে সমর্থ হয় তাই তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানের উপাদান বাইরের পৃথিবী থেকে আহরিত হয় এবং সে-সব উপকরণের ভিত্তির উপর আমাদের মানস একটা সৌধ গঠন করে। সে সৌধের মধ্যে গুরু বাক্য বা আ</strong><strong>প্ত</strong><strong>বাক্যের (Authority) কোন স্থান নাই। প্রাকৃতিক রাজনীতিকে স্বীকার করতে বাধ্য হলেও মানুষ অপর মানুষের দ্বারা প্রতারিত হতে বা প্রচলিত কোনো নীতি মানতে বাধ্য নয়। সে তার নিজের সুখ- সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখে আপন মতবাদ গঠন করতে পারে। </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানকে মানব-জ্ঞানের মূল উপকরণ বলে স্বীকার করলে মানুষের পক্ষে আপনার সুখ-শান্তির আকাঙ্খা ছাড়া আর কোনো কিছুই কাম্য হতে পারে না। কাজেই ব্যাষ্টিবাদ তার পরিণতিতে সুখবাদ বা Hedonism-এ পরিণত হয়। জন লক যে ধারণা প্রচার করেছিলেন, তার পরিণতিতেই ইংল্যান্ডে সুখবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং জন স্টুয়ার্ট মিল ও বেনথাম তাকে একটু পরিবর্তিত আকারে প্রচার করে তাঁদের দেশের তথা তৎকালীন সভ্যজগতের প্রশংসা লাভ করেন। প্রাচীন কালে গ্রীকদের মধ্যে যে সুখবাদ প্রচলিত ছিলো, তাতে ব্যাষ্টির পক্ষে সর্বতোভাবে তার নিজের সুখস্বাচ্ছন্দ্যই কামনা করার নীতি গৃহিত হয়েছিলো। মিল ব্যাষ্টির নিজস্ব সুখের স্থলে নীতি হিসাবে প্রচুরতম লোকের প্রভুততম উপকার (Greatest good of the greatest number)-কে মানব জীবনের লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। এতে ন্যায়শাস্ত্রের সুস্পষ্ট নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে। তা দর্শনের ছাত্র মাত্রই অবগত আছেন। প্রত্যেকে তার সুখ চায়, কাজেই সকলেই সকলের সুখ চায়, একটা মস্ত বড় তর্ক শাস্ত্রীয় ফাটলের উপর প্রতিষ্ঠিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জন লকের ধারণা ছিলো মানুষ একক হিসাবেই জন্মগ্রহণ করে। একা তার পক্ষে এ জীবনে টিকে থাকা সম্ভবপর নয়, তাকে বাধ্য হয়ে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজ গঠন করতে হয়। এক্ষেত্রে তার মননশীলতার দ্বারা চালিত হয়েই সে সমাজ গঠনে অগ্রসর হয়। রুশো তার বিখ্যাত বাণীতে বলেছিলেন- Man is born free but everywhere he is in chains. মানুষ স্বাধীন হয়েই জন্মগ্রহণ করে তবে সবখানেই সে বন্দী। তার ধারণা ছিলো লকের ধারণারই অনুরূপ। মানুষ এক জন্মায় এবং ব্যাষ্টি সমাজের আদি সংখ্যা, তবে তার নানাবিধ প্রক্ষোভ (emotion) অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য করে। বাধ্য হয়েই সে তার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতি গঠন করে বটে, তবে যতই সে এসব সংস্থা গঠনে অগ্রসর হয়, ততোই সে তার জন্মগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। জন লক ও রুশোর মতবাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এইখানেই। লক মানুষকে বৃদ্ধি-প্রধান আর রুশো প্রক্ষোভ-প্রাণ বলেছেন। মানুষ স্বভাবতই আত্মকেন্দ্রিক হলে তার পক্ষে নিজের সুখ-সুবিধার আদায় করা বা সে-সবের জন্য প্রাণপণ করেও চেষ্টা করা মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক বৃত্তি ছাড়া কিছুই নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাক্তি স্বাতন্ত্রবাদের অপর এক উদাহরণ পাওয়া যায় জার্মান মনীষী নীটশের চিন্তাধারায়। তার ধারণা ছিলো জ্ঞান অর্জন মানুষের জীবনের লক্ষ্য নয়, উপমা মাত্র। জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ জীবন-আহবে (Struggle for existence) টিকে থাকরে পারে। জ্ঞান মানুষের পক্ষে জীবন-যুদ্ধে টিকে থাকার অস্ত্রবিশেষ। এজগতে কেবল শক্তিশালীই টিকে থাকে। যারা পঙ্গু, যারা বিকলাঙ্গ তারা অচিরেই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। কাজেই, মানুষের শক্তি আহরণ করা উচিত এবং এমন সব গুণের অধিকার হওয়া উচিত যাতে সে মহামানবে পরিণত হতে পারে। শক্তির অধিকারী হতে হলে আমাদের নৈতিক ধারণার পরিবর্তন করতে হবে। ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে খৃষ্টান-জগৎ প্রেম, দয়া, মমতা প্রভৃতিকে শ্রেষ্ঠ গুণাবলী বলে স্বীকার করেছে। প্রকৃতপক্ষে এগুলো দাস জাতির গুণাবলী। বীরের গুণাবলী হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে উর্ধ্বে আরোহণ করার শক্তিমত্তা। সর্বসাধারণ মানুষ অতি মানুষের কাছে যন্ত্র সদৃশ। ক্রমবিকাশের ধারায় অনিবার্যভাবে অতিমানুষের সৃষ্টি হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নীটশের ভাষ্য থকে বুঝা যায়, তিনি হিটলার বা মুসোলিনীর মত নাৎসী ধারাকেই অতিমানব বলে ধারণা করেছিলেন এবং ক্রমবিকাশের গতি যে ঐরূপ মানুষের সৃষ্টিতে তা তিনি তাঁর দিব্যচক্ষুতে দেখেছিলেন। ইকবাল খুদির বিকাশ বলতে লকের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদকে বা রুশোর ব্যাষ্টিবাদকে ধারণা করেননি। নীটশের মত অতি পাষণ্ড অতি মানুষ তৈরির কোন পরিকল্পনাও করেননি। তাঁর খুদির অর্থ ছিল মানব-জীবনে আল্লাহর যে-সব গুণাবলী রয়েছে সে-সব রহমানী গুণাবলীর বিকাশ শয়তানী গুণাবলীর বিকাশ নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ সম্বন্ধে তাঁর চিন্তার অনুসরণ করতে হলে তাঁর পূর্ববর্তী চিন্তানায়ক অপর মহাকবি জালালউদ্দিনের অহমবাদের আলোচনা করতে হয়। জালালউদ্দিনের চিন্তাকে গ্রীক বা ভারতীয় চিন্তার তীব্র প্রতিবাদ বলা হয়। থেলিস (Thales) থেকে গ্রিক চিন্তাধারার সূচনা হয় এবং তার পূর্ণ পরিণাম প্লেটোর দর্শন। এরিস্টটল প্লেটোর নানাবিধ ভাবধারার সামঞ্জস্য বিধান করেছেন। এ চিন্তায় নির্বিশেষই চূড়ান্ত স্থান লাভ করেছে প্লেটোর কাছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরিস্টটল নির্বিশেষকে বিশেষের মধ্যে রূপায়িত করার চেষ্টা করেছেন, তবু মর্যাদার দিক থেকে নির্বিশেষই উচ্চ স্থানের অধিকারী বলে পরিগণিত হয়েছে। প্লেটো মানবাত্মার অমরত্ব স্বীকার করেছেন এবং নির্বিশেষের সঙ্গে তার যোগসূত্রের জন্য এ জীবনে কীভাবে মানবাত্মা অধীর আগ্রহ প্রকাশ করে তাও চমৎকার ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে গরজটা মানবাত্মার দিক থেকেই প্রকাশ পায়, নির্বিশেষ এসে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানবাত্মার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয় না। ভারতীয় দর্শনেও তেমনি দেখা যায়, শংকরাচার্য-কৃত বেদান্ত ভাষ্যে ব্রহ্মকেই চরম স্থিতি বলে গণ্য করা হয়েছে। জ্ঞানের মাধ্যমে মানবাত্মা সে ব্রহ্মেই আপনার চরম স্থিতি খুঁজে পায় এবং এতে তার মোক্ষ লাভ হয়। কাজেই গ্রীক দর্শনের মত ভারতীয় দর্শনেও ঐক্য চেতনা মানব-আত্মা থেকেই আসে এবং ব্রহ্ম-জীবনে স্থান লাভ মানব-জীবনের চরম ও পরম কার্য। এ সব চিন্তার প্রতিবাদ হিসাবে রুমী ঘোষণা করেন মানবাত্মা এক ও অবিভাজ্য। এ সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর মানব জীবনেরই বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকাশ। তার এ অহমবোধকে তাই দার্শনিক জগতের এক অভিনব অবদান বলা যায়। কি উদাত্ত স্বরে রুমী তা এ আত্মচেতনা প্রকাশ করেছেন—</p>
<blockquote><p>মৃত্তিকার অন্ধকার তলে</p>
<p>আমার সত্তা ছিল মিশে</p>
<p>প্রস্তর আর লৌহ পিণ্ড সাথে</p>
<p>স্তব্ধবাক বর্ণ, গন্ধ হীন,</p>
<p>তার পর একদা প্রভাতে</p>
<p>প্রাণের স্পন্দন এলো</p>
<p>মাটির আধারে</p>
<p>আমার সত্তা পেল রূপ রস প্রাণ</p>
<p>বিচিত্র রঙের ফুলে হেসে উঠিলাম</p>
<p>প্রাণ পেল গতি আর</p>
<p>মাটির বাঁধন গেল টুটে</p>
<p>শুরু হল ভ্রাম্যমান জীবনের</p>
<p>পথ পরিক্রমা</p>
<p>সন্তরণ, উড্ডয়ন</p>
<p>হামাগুড়ি আর পায়ে চলা</p>
<p>শেষ হলো</p>
<p>শুরু হলো আরেক জীবন</p>
<p>আমার সত্তা পেল নবতর রূপ</p>
<p>দৃষ্টি পেল—যে দৃষ্টিতে এসে</p>
<p>বিশ্বের রহস্য দিল ধরা;</p>
<p>এই দৃষ্টি মানুষের</p>
<p>&#8230;..এই দূর আকাশের পারে মৃত্যুহীন</p>
<p>ফেরেশতার লোকে আরো দূরে রাত্রিদিন</p>
<p>জন্ম আর মরণের বাহিরে</p>
<p>দৃশ্য অদৃশ্য আর সকল অস্তিত্ব যেখানে</p>
<p>একাকার লীন হয়ে গেছে</p>
<p>আমার গন্তব্য সেই মৃত্যুহীন অমৃতের পানে।</p></blockquote>
<p>এই দর্শনের ভিত্তিতেই ইকবাল তার খুদি-তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। যে সত্তার সর্ব প্রথম প্রকাশ মৃত্তিকার অন্ধকার তলে এবং বিবর্তনের ধারায় যে সত্তার কাছে বিশ্বের রহস্য ধরা দিয়েছে- সে সত্তার অধিকারেই সব। রুমীর অনুসরণ করে ইকবাল সে সত্তাকে মানব জীবন থেকে পৃথক কোনো সত্তা বলে স্বীকার করেননি। সেই সত্তাকে উপলব্ধি করার জন্য সাধনা করবার জন্যও তিনি কাউকে উপদেশ দেননি। তার বিকাশের জন্য ইসলামের বিধানকেই তিনি চরম পন্থা বলে জ্ঞান করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ চিন্তাকে অহমবাদী চিন্তা বললেও একে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মূলক চিন্তাধারা বা অতিমানব সম্বন্ধীয় চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ পৃথকরূপে পরিচয় করা যায়। কারণ এখানে ব্যাক্তি তার স্বীয় বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করতে বা তার আনুষঙ্গিক সুখ-সুবিধা ভোগ করতে লালায়িত নয়, তেমনই অতিমানব রূপে বিকশিত হয়ে সে অপরাপর মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায় না। এ অহমবাদের মর্ম কথা হচ্ছে আত্মপরিচয় লাভ এবং তারই মাধ্যমে এ বিশ্ব-চৈতন্যে আপনার প্রকৃত স্বরূপের উপলব্ধি। এ অহমবাদের পরিচয় পাওয়া যায় আসরারই খুদির ছত্রে ছত্রে। এ ধারণা ছিল এ পাক-ভারত মানুষকে নির্জীব-করণে ক্রিয়াশীল, মানুষের জানকে যেখানে মনে করা হতো মায়াময় মরীচিকা ভ্রম বৈ আর কিছুই নয়, ব্রহ্মজ্ঞান লাভে যে জানের ভ্রান্তি সহজেই ধরা পড়ে, জীবাত্মাকে অসহায় ও ভাগ্যের ক্রীড়নক হিসাবে যেখানে করা হয়েছে অথর্ব ও পঙ্গু; ইকবাল তারই প্রতিবাদ করে জ্বালাময়ী ভাষায় ঘোষণা করেছেন-</p>
<blockquote><p>পানি আর কাদা বলে</p>
<p>নিজেকে ভাবছো কেন</p>
<p>কেন ছোট করে ফেল মন?</p>
<p>এই হীনমন্যতায় কতকাল কাটাবে জীবন;</p>
<p>তোমার কর্দম হতে সৃষ্টি কর জ্বালাময় নতুন সিনাই।</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা- আসরার-ই-খুদী); তরজমা, আ.ক.শ. নূর মোহাম্মদ)</p></blockquote>
<p>সক্রিয়, জীবন্ত, চঞ্চল ও গতিশীল আভার উদ্বোধনের জন্য তিনি আবেগময়ী ভাষায় &#8216;রমুজে বেখুদী&#8217;তেও মানব সমাজকে আহ্বান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর চোখে আমাদের সমাজের সুফীদের ধারণা অত্যন্ত গর্হিত বলে প্রতিভাত হয়েছিলো। তারা মানবাত্মার অসহায় অবস্থা ও তার পরিণতি সাহিত্যে ও কাব্যে প্রচার করেছিলেন। তাতে রুজ-ই-আলন্তে মানুষের ভাগ্যলিপির নির্ণয় ও তার ফলে পুতুলের মতো জীবন-নদের স্রোতে তাদের ভাসমান অবস্থার জন্য বিলাপ করেছিলেন। মহাকবি হাফিজ তাঁর অনবদ্য ভাষায় মানুষের এ করুণ চিত্র এঁকেছিলেন। ইকবাল তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ঘোষণা করে বলেছিলেন ফার্সি ভাষায়-</p>
<p>মানবগণ যাহারা আফিমের নেশায়</p>
<p>বিভোর হয়ে এ জগৎকে নীচ বলে ঘৃণা করছ</p>
<p>উঠো জাগো, চোখ খোলো, এ জগতের দুঃখ দর্দশার</p>
<p>নিন্দা করো না-</p>
<p>এ দুঃখ-দর্দশা মুসলিমদের সমাজ জীবনকে</p>
<p>গঠন করার জন্য ও</p>
<p>তাদের অন্তর্নিহিত শক্তির</p>
<p>স্ফুরণের জন্য নির্দিষ্ট হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>রমুজ-ই-বেখুদীর অন্যত্রও তিনি বলেছেন-</p>
<p>বিচিত্র ছন্দে ও তালে সঙ্গীত তাহার</p>
<p>মৃত পৃথিবীতে করে প্রাণের সঞ্চার</p>
<p>তাহার নিকট থেকে আলোর আস্বাদ</p>
<p>পৃথিবী ভ্রমণ করে নূতনের সাধ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই তো সে আদর্শ, যার প্রতীক্ষায় আকাশ বাতাস জল স্থল অন্তরীক্ষ সবই অপেক্ষা করছে। সবল সরল মেরুদণ্ডের অধিকারী উন্নত শীর্ষ মহামানবের অপেক্ষায় সতত সৃষ্টিশীল কর্মচঞ্চল বিশ্বসত্তা আজও অপেক্ষা করছে। তার এ উন্নত অবস্থার পটভূমিতে রয়েছে তাওহীদে তার শিক্ষা। তাওহীদের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই সে উন্নত শীর্ষ মহামানব এ জগতের বুকে করে আদর্শ পূণ্য ভূমির প্রতিষ্ঠা-</p>
<blockquote><p>তওহীদের মূল-সূত্র তাহার শিক্ষায়</p>
<p>তাহার নিয়ম পূর্ণ শৃঙ্খলা প্রথায়-</p>
<p>অমিতাচারী উচ্ছৃঙ্খল মানুষ সে নয়-</p>
<p>তার প্রত্যেক কথায় ও কাজে রয়েছে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা।</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>পরবর্তী বা শেষ স্তরে ইকবাল-মানস তত্ত্বজ্ঞানের দিকে বিশেষ করে ঝুঁকে পড়ে। &#8216;পয়ামে মশরিক&#8217; বা প্রাচ্যের বাণী ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয়। তথসীয়ে ফিত্রৎ বা সৃষ্টির অধিকার নামক খণ্ডকাব্য এর অন্তর্ভুক্ত। এ কাব্য জার্মান দেশীয় দার্শনিক কবি গ্যেটের DEST WESTERLICHE DIWAN-এর উত্তরে রচিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কড়া যাহার খাদ্য যোগায় ভাই,</p>
<p>জানি একদিন উঠবে আকাশ-পথে</p>
<p>হয়া-আবর্ষ ছেড়ে পাবে রোশনাই।</p>
<p>কেন জিজ্ঞাসা করছো আমার কথা?</p>
<p>মানুষের কথা ভাবো, আর দেখো চেয়ে।</p>
<p>এ হৃদয় আরো উন্নীত,</p>
<p>হলে পর হবে যে মহান স্বর্ণ-ধারায় নেয়ে।</p>
<p>সময় মতন মামুলি চিন্তাধারা</p>
<p>যদি বিকাশের মহান সুযোগ পায়</p>
<p>তবে তার স্থান আনন্দ উচ্ছাসে হবে</p>
<p>নিশ্চয় খোদার মনের ছায়।</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমা: আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষের সকল আশা ও আকাঙ্খা, প্রেম-ভালবাসা সব কিছুরই মূল্য রয়েছে বিশ্বে। এর কণামাত্রও নিরর্থক নয়, বিকশিত হলে এ সবের প্রত্যেকটিরই রয়েছে স্বতন্ত্র ভাব। মানবতার বিকাশের পথে কিন্তু চাই সত্যিকার ঈমান। মাটির খুলির গড়া ও কায়াকে স্বর্গীয়ভাবে দীপ্তিমান করে তুলতে হলে তাকে ঈমানের রশ্মিতেই উজ্জ্বল করতে হবে-</p>
<p>জীবন্ত এই আত্মাখানির</p>
<p>ঈমানটুকু বাজে স্বপ্ন নয়-</p>
<p>ছড়ানো এ ধুলো দিয়েই</p>
<p>নকসা গড়া অধিক শক্তিময়-</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমা: আবদূর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ঈমানের রোশনীতে উদ্দীপিত আত্মার পক্ষে তাই এগিয়ে চলাই হচ্ছে সারতত্ত্ব। ধূলিময় এ পৃথিবীতে অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা তার পক্ষে উচিত নয়। মানুষকে কান পেতে শুনতে হবে পৃথিবীর অদম্য চলার গান। মানুষকে ভাবতে হবে অতীতের কথা— শুধুমাত্র নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগসূত্র রাখার জন্য। তাকে প্রস্তুত হতে হবে ভবিষ্যতের জন্য, আগ্রহভরে অপেক্ষা করতে হবে অনাগত দিনগুলোর জন্য, তাই তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলছেন-</p>
<p>পৃথিবীর জনপদে আমিও তো</p>
<p>ধুলির মতন কাহার কোমল গান</p>
<p>তারপর শুনেছি এ বুকে:</p>
<p>সময় নদীর উৎস খুঁজে পাবে আমার ঝর্ণায়</p>
<p>অতীত কেবল মোর শৌর্যবীর্য হারানো দিনের</p>
<p>এখন আগ্রহভরে ভবিষ্যতের প্রতীক্ষা আমার।</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমাঃ আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষের ধুলি তার কর্ম-জীবনের দ্বারাই উজ্জ্বল হয়ে লোক থেকে লোকান্তরে নিম্নতর পর্যায় থেকে অধিষ্ঠিত হয়, যাতে ফেরেশতারাও ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে—</p>
<p>সবচেয়ে উঁচু মণ্ডল পরে</p>
<p>এমনি গতি যে মোর ফেরেশতাগণ</p>
<p>তা দেখে আমায় ধরিতে লাগায় সোর</p>
<p>মানুষের ধুলি নিত্য নূতন কর্মে উজ্জ্বল হয়</p>
<p>পুরানো দিনের মত চাঁদ তার, এখনো আলোকময়</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমাঃ আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষ তার তেজদীপ্ত বাহুকে বাজুবন্ধ পরে শক্তিহীন করেছে, তাই তাকে আবার প্রাণময় করার জন্য খুদির প্রদীপ জেলে আপনার প্রকৃত সত্তার পরিচয় লাভ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে খুদির বিকাশের পথে তাকে রসুল নির্দেশিত পথেই হতে হবে অগ্রসর-</p>
<p>বাজুবন্ধের আড়ালে যেহেতু মানুষ লুকালো</p>
<p>আনি মুসার হাতকে, তাই জ্বালি মোর প্রদীপখানি</p>
<p>এসো গো নামাজে, শাহজাদা দ্বারা দিও না ধর্না</p>
<p>আর তাই ছিল মোর পূর্ব পুরুষ পুরাকালে এ-ধারার</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমাঃ আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h1 style="text-align: center;">(৩)</h1>
<p>প্রকৃতপক্ষে ইকবালের কায়া সত্তাকে আর তুলনা করা যায় না। নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টি বা সৌন্দর্য পুজার সাধনা তিনি করেননি। শিল্পের জন্যই শিল্পের সৃষ্টি (Art for at sake) করার চেষ্টা তিনি কোনোকালেই করেননি। অস্কার ওয়াইলডের এবং বিশ্ব ভাবধারা দ্বারা তিনি কোনোকালেই প্রভাবান্বিত At in Calydon-এ নিসর্গ পূজার যে অতি স্পন্দনয়ায় নিদর্শন পাওয়া যায়, তার কোনো প্রভাবই ইকবালের কাব্যে পড়েনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাঙলা কাব্যে রবীন্দ্রনাথ বা বিশেষ করে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নানাবিধ কবিতায় নিসর্গবাদের যে চমৎকার নিদর্শনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎলাভ হয়, ইকবালের কাব্যে তার কোন উদাহরণই নেই। তার ভাষা ও ছন্দের একত্র সমাবেশে বাঙলা কাব্যে উর্বশী যে অপূর্ব স্থানের অধিকারী, সেরূপ প্রতিমধুর বা মায়াময় রূপ সৃষ্টিধর্মী কবিতাও ইকবাল সাহিত্যে বিরল। মহাকাব্যের বিরাট পটভূমিতে যেভাবে নানা মানুষ ও নানা চরিত্রের সমাবেশ রয়েছে ইকবাল কাব্যে, তার কোনো আভাষই নেই; খণ্ড কবিতার স্বল্পপরিসর আলোর মাঝে জীবনের কোনোমবিশিষ্ট দিক বা ভাবও তাতে মূর্ত হয়ে উঠেনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কাব্যের গোড়াতেই রয়েছে এক তীব্র প্রতিবাদ। সে প্রতিবাদ সবপ্রথমে দেখা দিয়েছে প্রচলিত সংস্কারের বিরদ্ধেএবং ক্রমবিকাশের ধারায় তা পূর্ণ পরিণতি লাভ করেছে মানব-জীবন সম্বন্ধে দীর্ঘকাল শোষিত নিরাশাবাদের বিরুদ্ধে। এ প্রতিবাদ বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করেছেন তাঁর নিজস্ব অভিমত প্রচার করার উদ্দেশ্যে এবং তাতে তিনি সফল হয়েছেন অপ্রত্যাশিতভাবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যদিও নজরুল ইসলামের মত তিনি মানবিকত্বকে সার্বিক ও পরম শান্তিময় রূপদানে কুন্ঠিত ছিলেন; জগদীশ্বর, ঈদ, পুরষোত্তর সত্য বলে তিনি দাবি করেননি, তবু তাঁর সীমিত ভাষায় মানব-জীবনের পূর্ণ পরিণতির যে আশ্বাস দিয়েছেন, বিশ্ব-সাহিত্যে তা অনবদ্য। তার দার্শনিক মতবাদের বৈশিষ্ট্য হিসাবে বলা যায় ব্রহ্ম-কেন্দ্রিক বা পরমাত্মা কেন্দ্রিক; মানব-সৃষ্টির স্থলে তিনি মানব-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠায় ছিলেন দৃঢ়-সংকল্প।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্যই এই মাটির মানুষকে তিনি জ্যোতির্ময় ফেরেশতাদের উপরেও স্থান দিতে একটু ইতঃস্তত করেননি। এ ক্ষেত্রে তাঁর এ বৈপ্লবিক পদক্ষেপ রবীন্দ্রনাথের পদক্ষেপের পরিপূরক বলা যায়। ব্রহ্মবাদের অতল তলায় তলিয়ে যাওয়া মাটির পৃথিবীতেই রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন ব্রহ্মাস্থান—&#8217;এ মাটির বেড়ার প্রান্ত হতে অমূর্তের পেয়েছি সন্ধান&#8217;—খেয়ালী কবির কল্পনা-বিলাস নয়। এ বক্তব্য মহাধ্যানীর জীবন-সাধনার সিদ্ধিজাত ফল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মাটির পৃথিবীতে স্বর্গের সব উপাদান বিরাজমান বলে ধারণা করা রবীন্দ্র-দর্শনের পরিণত ফল। সেই মাটির মানুষের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার বিভিন্ন রূপ তিনি সাধ্যমত তুলিকা-স্পর্শে অমর করে তুলেছেন। শ্রেণী-সংগ্রামের পর্যুদস্ত অসহায় নির্বিত্তের করুণ চিত্রও তিনি দূর থেকে দেখেছেন। আফসোসও করেছেন। তবে মানুষকে এ-সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে কোনো অনুপ্রেরণা দান করেননি। ইকবাল এক্ষেত্রে আরও অগ্রসর হয়েছেন এবং মাটির ধারার অধিবাসী আপাতঃদৃষ্টিতে নানাবিধ দুর্যোগে সম্পূর্ণ অসহায় পঙ্গু ও অশক্ত মানব নামধারী একদল জীবকে তাদের &#8216;খুদী&#8217; তার প্রকৃত সত্তার পরিচয় লাভ করার জন্য উদাত্ত স্বরে আহ্বান জানিয়েছেন। এখানেই তাঁর কাব্যের বিশেষত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধু মাত্র আনন্দ পরিবেশনই তাঁর কাব্যের লক্ষ্য নয়, মানুষকে এক বিশিষ্ট জীবনাদর্শে উদ্বোধিত করে তোলা এবং তার মধ্যে আত্মপ্রত্যয়ের প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল আদর্শ। তাকে মহাকবি এজন্যই বলা যায়। নতুনভাবে জগৎ ও জীবনকে দেখার প্রেরণা ও পদ্ধতি উভয়ই তার কাব্যে পাওয়া যায়। মুসলিম জীবনের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগের জন্য নিকলসন (Nickolson) প্রমুখ সমঝদারেরা তাঁকে মুসলিমদের কবি বলে একটি বিশিষ্ট জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ওঁরা ভুলে গেছেন ইসলাম ও মুসলিম জাতি এক নয়।<strong> ইকবাল বার বার বলেছেন এ দুনিয়ার নানাবিধ সংকটের সময় মুসলিমরা ইসলামকে রক্ষা করেনি বরং ঠিক উল্টোভাবে ইসলামই মুসলিমদের রক্ষা করেছে। ইকবাল ইসলামকে শুধুমাত্র প্রত্যয় হিসাবে গ্রহণ করেননি বরং এক অভিনব পূর্ণাঙ্গ জীবন-দর্শন ও জীবন-পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। সে পূর্ণাঙ্গ জীবন-দর্শনের অনুশীলনের ফলে মানুষ &#8216;ইনসানে কামিল&#8217; বা পূর্ণ বিকশিত মানুষে পরিণত হতে পারে। সে জীবন-দর্শনে প্রত্যয়শীল মানুষ গোষ্ঠীকেই তিনি সত্যিকার মুসলিম বলে ধরে নিয়েছিলেন এবং শেকোয়াতে সেই আদর্শবাদী মানুষ গোষ্ঠীর তরফ থেকেই তিনি আল্লার দরবারে অভিযোগ পেশ করেছেন। বর্তমানকালের নাম-সর্বস্ব মুসলিমদের জন্য তিনি আল্লার কাছে আহাজারি করেননি।</strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p><em><strong>-ঋণ স্বীকার: মাহে নও, এপ্রিল ১৯৬৯।</strong></em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/famous-poet-iqbal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14149</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শিল্পী-সাহিত্যিকের দায়িত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-responsibility-of-artists-and-writers/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-responsibility-of-artists-and-writers/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 15 Apr 2024 07:21:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[art]]></category>
		<category><![CDATA[civilization]]></category>
		<category><![CDATA[literature]]></category>
		<category><![CDATA[religion]]></category>
		<category><![CDATA[আর্ট]]></category>
		<category><![CDATA[কালচার]]></category>
		<category><![CDATA[ধর্ম]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13978</guid>

					<description><![CDATA[গোটা জাতীয় কালচারের ইমারত সাহিত্য। অতএব সাহিত্যিকরা সে কালচারের আর্কিটেক্ট। উপরে বর্ণিত জাতীয় কৃষ্টির বিভিন্ন রূপকে যুগোপযোগী করিয়া পুনর্জীবিত করিতে হইলে সাধক চিন্তা-নায়ক সাহিত্যিকদেরই তা করিতে হইবে। এই আসল কাজেই কিন্তু আমরা আজও আত্ম-অচেতন পরানুকারী রহিয়া গিয়াছি। চরম দুর্ভাগ্য এই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[
<p class="wp-block-paragraph"><br />গোটা জাতীয় কালচারের ইমারত সাহিত্য। অতএব সাহিত্যিকরা সে কালচারের আর্কিটেক্ট। <a href="https://rowyakbd.com/what-is-culture/">উপরে বর্ণিত</a> জাতীয় কৃষ্টির বিভিন্ন রূপকে যুগোপযোগী করিয়া পুনর্জীবিত করিতে হইলে সাধক চিন্তা-নায়ক সাহিত্যিকদেরই তা করিতে হইবে।<br /><br />এই আসল কাজেই কিন্তু আমরা আজও আত্ম-অচেতন পরানুকারী রহিয়া গিয়াছি। চরম দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা যে পরানুকারী তা বুঝিতে পারিতেছি না। মনের এই গোলামিকে আমরা উদার প্রগতিশীলতা ও বিশ্বজনীনতা ধরিয়া নিয়া গর্ববোধ করিতেছি। এই মানসিক দাসত্বের মোহ আমাদিগকে কাটাইয়া উঠিতে হইবে। স্বকীয়তা ও গুণগ্রাহিতার, আত্ম-সম্মান ও গুণীর সম্মানের, উদারতা ও হীনমন্যতার পার্থক্য বুঝিতে ও তাদের সীমারেখা চিনিতে হইবে।<br /><br />মানুষের আত্মমর্যাদাবোধই তার কালচারের প্রাণ। তার আত্মবিশ্বাসই ওর শক্তি। এই দুইটা যাদের নাই, কালচারের ব্যাপারে তারা পরগাছা মাত্র। কালচার-প্রীতি দেশাত্মবোধ ও বাপ-মা ভক্তির মতই ইমোশনের বস্তু, যুক্তিবাদ ও দর্শন-বিজ্ঞানের ব্যাপার নয়। কিন্তু কালচার-প্রীতির এ ইমোশন সহজাত নয়, অর্জিত। বেহালার তারে আঘাত করিয়া যেমন সুর আনিতে হয়, তেমনি হৃদয়ের তারে আঘাত করিয়া এই ইমোশন আনিতে হয়। কবি-সাহিত্যিকরাই সে সুর-শিল্পী।<br /><br />নিজের মর্যাদা মানে যে পরের অমর্যাদা নয়, অপরের অমর্যাদা করিয়া কেউ যে মর্যাদাবান হয় না, পরকে অভদ্র বলা যে ভদ্রলোকের খাসিয়ত নয়, পরকে তাচ্ছিল্য করার মানে যে আত্মবিশ্বাস নয়, জাতির অন্তরে এই সূক্ষ্ম শালীনতাবোধ সৃষ্টির দায়িত্বও কবি-সাহিত্যিকের। এটা তারাই পারে। আর কেউ না।<br /><br />এই সুর-শিল্পীরা যদি নেশা খাইয়া আত্মভোলা হয়, তবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ চাবুক মারিয়া তাদেরে আত্মস্থ করে। সম্প্রতি পাক-ভারত যুদ্ধ আমাদের কৃষ্টি জীবনে তাই করিয়াছে। আমরা শুধু নিজের কালচারই ভুলিয়া থাকি নাই, নিজের দেশকে পর্যন্ত ভুলিয়া ছিলাম। দেশের মাটি ও তার নদ-নদী, তার সবুজ মাঠ, পাখির গান, মাতৃভূমির সন্তান ও তাদের মুখের বুলি, তাদের সুখ-দুঃখ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের কবি-প্রাণে স্পন্দন জাগাইতে এবং লেখকের কলমে গতি যোগাইতে পারে নাই।<br /><br />আমরা কলিকাতার কৃষ্টি পশ্চিম-বাংলার পরিবেশ ও শান্তি-নিকেতনের রচনাভংগি নকল করিয়া সুখী ও বিদগ্ধ হইতেছিলাম। রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জাতীয় কবি আখ্যা দিয়া রবীন্দ্র-সংগীতের সাগরে ডুব পাড়িতেছিলাম।<br /><br />কাজেই আমাদের প্রকাশকরা পশ্চিম-বাংলার পুস্তক রিপ্রিন্ট করিয়া, বিক্রেতারা তা বেচিয়া এবং পাঠকরা তা গো-গ্রাসে গিলিয়া পাক-বাংলাকে পশ্চিম-বাংলার কৃষ্টিক উপনিবেশ, তার্ষিক সীমান্ত প্রদেশ ও সাহিত্যিক বজায় করিয়া রাখিয়াছেন। আর আমাদের কবি সাহিত্যিকরা রাস্তার পাশে দাঁড়াইয়া অসহায় দর্শকের মতই এই বেচা-কেনা দেখিতেছিলেন।</p>



<p class="wp-block-paragraph"><br /><br /><strong>ঘুম-ভাংগা দামামা</strong><br /><br />এমন সময় যুদ্ধের দামামা বাজিয়া উঠিল। আমাদের তন্দ্রা-টুটিল সরকার কয়েক শ্রেণীর রবীন্দ্র-সংগীত বন্ধ ও পশ্চিম-বাংলার বই-পুস্তক ও ছায়াছবি নিষিদ্ধ করিলেন। তবেই আমাদের জ্ঞান হইল। আমাদের রেডিও-টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে গানে- কবিতায় ছায়াছবিতে দেশাত্মবোধ ও কৃষ্টিক স্বকীয়তা ঝংকৃত হইতে লাগিল।<br /><br />দেশের জাগরণের পক্ষে এটা নবযুগ, কালচারের দিক হতে এটা সুবেহসাদেক, কিন্তু কবি-সাহিত্যিকদের জন্য এটা গৌরবের কথা নয়। এই গুণে আমরা সরকারী হস্তক্ষেপকে সাহিত্যিক রেজিমেন্টেশন বলিতে পারি না। যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো বিপর্যয় দরকার হয় জনগণের সমবেত চেতনা উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য। কবি-সাহিত্যিকদের জন্য তার দরকার হইবে কেন? তাঁরা যে চিন্তা-নায়ক। দূরে দেখা যে তাঁদের পবিত্র দায়িত্ব। পশ্চিম-বাংলা যে আমাদের দেশ নয়, কলিকাতার কৃষ্টির সাহিত্য যে আমাদের কৃষ্টি-সাহিত্য নয়, শান্তিনিকেতনী ভাষা যে আমার ভাষা নয়, এই সূক্ষ্ম তত্ত্ব হৃদয়ংগম করিতে জনগণের সময় লাগিতে পারে, কিন্তু চিন্তানায়কদের লাগিবে কেন?<br /><br />রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হইয়াও পাক-বাংলার জাতীয় কবি নন? বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার পর এটা রাষ্ট্রীয় সত্য হইয়াছে নিশ্চয়ই। কিন্তু বিভাগ-পূর্ব বাংলাতেও এটা সাহিত্যিক সত্য ছিল। <strong>পাকিস্তান হওয়ার তিন বছর আগে ১৯৪৪ সালে কলিকাতার বুকে দাঁড়াইয়া এক সভাপতির ভাষণে আমি বলিয়াছিলাম &#8220;বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব ভারতীয় বিশ্বে কতবার শারদীয়া পূজায় &#8216;আনন্দময়ী মা&#8217; এসেছে গিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে ঈদ মোহররমের চাঁদ উঠেনি।&#8221;</strong></p>



<p class="wp-block-paragraph"><br /><br /><strong>বিশ্ব-কবি বনাম জাতীয় কবি</strong><br /><br />এটা-বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশ্রদ্ধা-অসম্মানের কথা নয়। সত্য কথা। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি হইয়াও বাংলার জাতীয় কবি নন। বাংলার জাতীয় কবি নন তিনি এই সহজ কারণে যে বাংলায় কোনও &#8216;জাতি&#8217; নাই। আছে শুধু হিন্দু-মুসলমান দুইটা সম্প্রদায়। তিনি বাংলার জাতীয় কৃষ্টির প্রতীক নন এই সহজ কারণে, যে এখানে কোনও জাতীয় কৃষ্টিই নাই। এখানে আছে দুইটা কৃষ্টি: একটা বাংগালী হিন্দু-কৃষ্টি অপরটি বাংগালী মুসলিম-কৃষ্টি। সমগ্র বাংলায় মেজরিটি ছিল মুসলমান। মেজরিটি দেশবাসীর সাথে নাড়ীর যোগ না থাকিলে কেউ জাতীয় কবি হইতে পারেন না। বিশ্বের কাছে তিনি যত বড়ই হউন। এটা পশ্চিম-বাংলার কৃষ্টি- সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞাও নয়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব-কবি হিসাবে আমাদের নমস্য। সর্ব অবস্থায় তা থাকিবেন। যুদ্ধেও থাকিবেন, শান্তিতেও থাকিবেন। এই খানেই সীমা-রেখার সূক্ষ্ম জ্ঞানের প্রয়োজন। ভারতের সংগে যুদ্ধ বাধিলেই রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা নিষিদ্ধ হইবে এটাও যেমন দূষণীয়; শান্তি হইলেই রবীন্দ্র-পূজা শুরু হইবে এটাও তেমনি দূষণীয়। <br /><br />পশ্চিম-বাংলার সাহিত্য উন্নত সাহিত্য হিসাবে নিশ্চই আমাদের অনুকরণীয়; কিন্তু তা আমাদের নিজের সাহিত্য নয়। অমন মোহ যদি থাকে তবে তা ঝাড়িয়া ফেলিতে হইবে। আমাদিগকে অবিলম্বে আমাদের নিজস্ব জাতীয় ঐতিহ্য ও কৃষ্টির রিডিস্কভারি করিতে হইবে আমাদের নিজের দেশে। পাক-বাংলার গত সাতশ&#8217; বছরের ইতিহাস আবার পড়িতে হইবে নতুন জাতির মন লইয়া। সে রিডিসকভারির রূপায়ণেই আমাদের জাতীয় সাহিত্য রচিত হইবে নয়া যিন্দিগির বাণী বহন করিয়া। বাংগালী হিন্দুর রেনেসাঁ যুগের মতো আমাদের মধ্যেও বাংগালী মুসলিম রেনেসাঁর বংকিম- রবীন্দ্র ও রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের জন্ম হইতে হইবে।</p>



<p class="wp-block-paragraph"><br /><br /><strong>রিভাইভ্যাল নয়, রেনেসাঁ</strong><br /><br />তরুণরা ভুল বুঝিবেন না। এটা পিছন ডাক নয়। এটা সামনে চলার আহ্বান। রিভাইভ্যাল নয়, রেনেসাঁ। &#8211; এটা বাদশাহি আমলে বা খিলাফত যুগে ফিরিয়া যাওয়ার পরামর্শ নয়। ওটা হইবে অবাস্তব। ভ্রান্ত মরীচিকা। দুনিয়া আজ প্রগতি ও সাধনার পথে অনেক-অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছে। আমাদেরও সে প্রগতির নাগাল ধরিতে হইবে। তার শরিক হইতে হইবে। কাজেই গতি হইবে আমাদের অতিদ্রুত। আমাদের কালচারকেও আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক হইতে হইবে। এটা ফিউডাল যুগ নয়, গণতন্ত্রের যুগ। আমাদের কালচারকেও তাই গণ-ভিত্তিক হইতে হইবে। এটা কৃষি-যুগ নয়, এটা শিল্প-যুগ। কাজেই জনগণও আজ আর শুধু কৃষক নয়, তারা মিল-মজুরও বটে। শিল্পও আর শুধু আর্বান ইন্ডাস্ট্রী নয়, রুরাল ইণ্ডাস্ত্রীও তার শক্তিশালী শরিক। কালচারের ধারক যে পল্লীগ্রাম, তাও আর আগের পল্লী নাই। শহর ও পল্লীর ব্যবধান দ্রুত সংকীর্ণ হইতেছে। কালচার ও সিভিলিয়েশনের মধ্যে তাই নতুন করিয়া সমঝোতা হইতেছে। পাক-বাংলার কৃষ্টিক রেনেসাঁ হইবে এই পরিবেশে। সে কৃষ্টি-সাহিত্যের ইমারত গড়িয়া উঠিবে আধুনিক মাল-মসলাতেই। তার বুনিয়াদ হইবে পাক-বাংলার মাটিতে। রূপ-রস-গন্ধে হইবে তা অপূর্ব। সে কৃষ্টি-সাহিত্য রূপে হইবে বাংগালী, রসে হইবে তা মুসলিম, আর গন্ধে হইবে তা বিশ্বজনীন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-responsibility-of-artists-and-writers/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13978</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী দৃষ্টিতে সাহিত্য বিচার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/literary-judgment-from-islamic-point-of-view/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/literary-judgment-from-islamic-point-of-view/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 06 Apr 2024 09:57:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13961</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্য ভাষানির্ভর। হেজাজে ইসলাম-পূর্ব যুগেই আরবি একটা শক্তিশালী লিখিত ভাষায় পরিণত হয়েছিল। হেজাজের আরবদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আরবিতে পড়তে, লিখতে ও গুনতে পারতেন। তাই সেই সময়েই হেজাজের আরবদের একটা নিরক্ষর জাতি বলা যেত না। মক্কার কাছে, ওকাজ নামে একটি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সাহিত্য ভাষানির্ভর। হেজাজে ইসলাম-পূর্ব যুগেই আরবি একটা শক্তিশালী লিখিত ভাষায় পরিণত হয়েছিল। হেজাজের আরবদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আরবিতে পড়তে, লিখতে ও গুনতে পারতেন। তাই সেই সময়েই হেজাজের আরবদের একটা নিরক্ষর জাতি বলা যেত না। মক্কার কাছে, ওকাজ নামে একটি জায়গা ছিল। যেখানে প্রতি বছর বসত একটা বিরাট মেলা। মেলাতে থাকত নানা আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। হতো দৌড়-ঝাঁপের প্রতিযোগিতা। এই মেলায় আসতেন অনেক কবি। এসব কবি তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনাতেন মেলায় উপস্থিত কবিতার শ্রোতাদের। যাদের কবিতা ভালো লাগত, মেলায় উপস্থিত শ্রোতারা করতেন তাদের পুরস্কৃত। যাদের কবিতা খুবই ভালো বলে বিবেচিত হতো, তাদের কবিতা সমাদর করে লেখা হতো কাবাগৃহের প্রাচীরে। যার কিছু নিদর্শন এখনো বিদ্যমান আছে। <strong>সে যুগের কিছু কবির নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন : ইমরুল কায়েস, তারাফা, জোয়াহির, আন্তারা প্রমুখ।</strong> কবিতার মাধ্যমে গল্পও বলা হতো। যার নিদর্শন এখনো টিকে আছে। যেমন হাতেম তাই। কাহিনীটি ইসলামী না হলেও মুসলিম সমাজে তা হয়ে আছে শ্রদ্ধার। কেননা, হাতেম ছিলেন দানবীর। যা কিছু মানুষের কল্যাণ করে, তাই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হলো শ্রেয়।</p>
<p>কুরআন শব্দটি এসেছে আরবি ইকরা শব্দ থেকে। ইকরা বলতে বোঝায় পড়া অথবা আবৃত্তি করা। ইসলাম একটি লিখিত ধর্ম। তাই অনেক সুনির্দিষ্ট। কুরআনে প্রথম নাজিল হওয়া সূরা হলো আলাক। যদিও সূরাটির ক্রমিক সংখ্যা হলো ৯৬। যাতে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>পাঠ করো তোমার মহা প্রভুর নাম উচ্চারণ করে।<br />
যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেন রক্ত জমাট করে।<br />
তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন লেখনীর ব্যবহার।<br />
যার মাধ্যমে তিনি তাকে দিয়েছেন জ্ঞান, নানা অজানার।</p></blockquote>
<p>আল কুরআনের একটা নাম ফুরকান। ফুরকান শব্দের অর্থ আলো। অর্থাৎ কুরআন মানুষকে অজানাকে জানতে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করতে উৎসাহ জুগিয়েছে। কুরআনের এই অনুপ্রেরণা মুসলমানদের সভ্যতার স্বর্ণযুগে দিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ।</p>
<p>গ্রিক দার্শনিক প্লাতো (আফলাতুন) তার আদর্শ রাষ্ট্রে কবিকে স্থান দিতে চাননি। কেননা, কবিরা কল্পনাবিলাসী। তাই তারা হলেন শেষ পর্যন্ত সত্যবিদ্বেষী। আদর্শ রাষ্ট্রে সত্যবিদ্বেষীদের স্থান হতে পারে না। <strong>কুরআন শরিফে কবিদের সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তি-বুদ্ধিকে বাদ দিয়ে কবিদের কথার কুহকে না পড়তে (সূরা ২৬: ২২৪)।</strong> <strong>অন্য দিকে আল কুরআনে লোকমান হাকিমকে খুব উচ্চস্থান দেয়া হয়েছে। কারণ, যদিও তিনি নিছক গল্প বলেছেন, কিন্তু তিনি তা বলেছেন মানুষকে নীতিশিক্ষা দেয়ার জন্য। যা কিছু মানুষকে নৈতিক করে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তাই হলো শ্রেয় (সূরা ৩১ : ১২)।</strong> এই সূরায় আরো বলা হয়েছে, গাধার মতো চিৎকার না করতে। মূল্য দেয়া হয়েছে সুকণ্ঠের। বলা হয়েছে গর্বিত না হতে। যা থেকে মনে হয় কুরআনের শিক্ষা হলো, লেখক হিসেবে অহঙ্কারী না হতে।</p>
<p><strong>ইসলাম ও সাহিত্য প্রসঙ্গে যথেষ্ট বিশদভাবে আলোচনা করেছেন কবি দার্শনিক ইকবাল (১৮৭৩-১৯৩৮), যা আমার মনে হয় এখনো আমাদের জন্য হয়ে আছে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে দু’টি সম্প্রদায়ের উদ্ভব হতে পারে। যার একটিকে বলে ‘জাবরিয়া’। আর অপরটিকে বলা হয় ‘কাদরিয়া’। জাবরিয়ারা বলেন, যেহেতু কোনো কিছুই অকারণে ঘটে না, তাই সব কিছুই ঘটে পূর্বাবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে। এখানে মানুষের কিছু করণীয় নেই। অর্থাৎ এরা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাস করেন না। শেষ পর্যন্ত এরা হয়ে উঠতে চান ভাগ্যবাদী (তকদির)। অন্য দিকে কাদরিয়ারা বলেন, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা না থাকলে কোনো অপরাধের জন্য তাকে দায়ী করা চলে না। দেয়া যেতে পারে না কোনো শাস্তি।</p>
<p>ফলে সমাজে দণ্ড-ভয়ের অভাবে বেড়ে যেতে পারে অপরাধপ্রবণতা। সমাজ হয়ে উঠতে পারে বাসের অযোগ্য। তাই অপরাধীকে দিতে হবে শাস্তি। বলতে হবে, সে ইচ্ছা করেই করেছে অপরাধ। সে অপরাধ না করলেও পারতো। এই দুই মতকে সমন্বিত করবার একটা চেষ্টাও হয়েছে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে। এদের বক্তব্য, বন্যা হয় প্রাকৃতিক কারণে। কিন্তু মানুষ নদীতে বাঁধ বাঁধে বন্যা নিবারণের জন্য। মানুষ তার বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। এখানেই আছে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার মূল্য। স্বাধীন ইচ্ছা প্রাকৃতিক নিয়মকে অস্বীকার করে না। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা প্রাকৃতিক নিয়মকে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আর কুরআনে সূরা হিজর-এ বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ হজরত আদম আঃ-কে সৃষ্টি করেছিলেন কাদামাটি দিয়ে। কিন্তু পরে তিনি তার মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেন নিজের নিঃশ্বাস। একে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে যে, আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টি-শক্তির অংশ।</p>
<p>মানুষ কালের পুতুল নয়। সে তার জীবনকে নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলতে চায় এবং বেশ কিছু পরিমাণে পারেও। সেই সাহিত্যই শ্রেয়, যে সাহিত্য মানুষকে তার নিজের জীবনকে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। তাকে করে তোলে না বিষণ্ন আর নিরাশাবাদী। এ হলো ইসলামের সাহিত্য বিচারের আরেকটি দিক। ইসলামে মানুষকে ভাবা হয়েছে সৃষ্টি-শক্তিসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে। এখানেই ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে ইসলামের বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব। অবশ্য অন্য ধর্মেও যে অনুরূপ কথা একেবারেই বলা হয়নি, তা নয়।</p>
<p>কবি দার্শনিক ইকবালের মতে, যেহেতু আল কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মর্তের খলিফা হিসেবে (সূরা ২ : ৩০)। তাই ধরা চলে আল্লাহ মানুষকে মর্ত্যের ঘটনাবলিকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিয়েছেন। আমাদের কর্তব্য হবে এই শক্তিকে যথাযথভাবে প্রয়োগ। ভাগ্যবাদী হয়ে চুপ করে বসে থাকা নয়। তিনি তাঁর ‘বাঙ্গেদ্বারা’ (ঘণ্টার আওয়াজ) কাব্যগ্রন্থে বলেছেন :</p>
<blockquote><p>খুদহি কো কর বুলন্দ ইতনা কি হর তকদীর সে পহেলে<br />
খুদা বান্দা সে খুদ পুছে বান্দা তেরী রজা কেয়া হ্যায়?</p></blockquote>
<p>নিজেকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তোলো। যেন বিধাতা তোমার ভাগ্যলিপি রচনার আগে তোমাকে জিজ্ঞাসা করেন, বলো তুমি কী চাও, কী তোমার সত্তার অভিপ্রায়।</p>
<p>কবি ইকবাল চেয়েছেন মানুষকে সক্রিয় করে তুলতে। তিনি ছিলেন শক্তিবাদের কবি। মুসলিম জনসমাজে তিনি চেয়েছিলেন আবার শক্তিবাদে প্রত্যয়ী করতে। কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) ইন্তেকাল করলেন। তিনি ছিলেন আমার একজন আন্তরিক বন্ধু। তার সাথে আমার বহু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যার মধ্যে সাহিত্যে ইসলামের প্রভাব কেমন হওয়া উচিত, সেটিও ছিল উপজীব্য। কিন্তু আমি তার সাথে এ ক্ষেত্রে একমত হতে পারিনি। কেননা আমার মনে হয়েছে তিনি পারলৌকিক ইসলামের ওপর যে পরিমাণ আকৃষ্ট, ইহজাগতিক ইসলামের ওপর তা নন। তার চিন্তা থেকে ইসলামের ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি হতে চলেছে অপসৃত। মনে হয়েছে তার বয়োবৃদ্ধি এর একটি কারণ। কেননা বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে মানব মনে ভিড় করে মৃত্যুচিন্তা; আর পারলৌকিক চিন্তা-ভাবনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ক’দিন আগে ভারতের খ্যাতনামা লেখিকা অরুন্ধতী রায় (জন্ম ২৪ নভেম্বর ১৯৬১) ঢাকায় এসেছিলেন। তার নামটি খাঁটি বাঙালি হিন্দু। কারণ তার পিতামহ ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশের বরিশাল জেলার অধিবাসী। কিন্তু তার মাতা হলেন ভারতের কেরেলা (কেরল) প্রদেশের লোক। কেরেলা প্রদেশ গঠিত হয়েছে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫৬ সালে। কেরেলা গঠিত হয়েছে কোচিন ও ত্রিবেন্দম নামক দু’টি দেশীয় রাজ্য এবং মালাবার নামক ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলকে একত্র করে। <strong>ব্রিটিশ শাসনামলে মালাবার ছিল তখনকার মাদ্রাজ প্রদেশের সাথে যুক্ত। মালাবার অঞ্চল ছিল মুসলিমপ্রধান। মালাবারের মুসলমানদের বলা হয় মোফলা।</strong></p>
<p><strong>এখানে ইসলাম প্রচারিত হয় আরব মুসলমান বণিকদের দিয়ে, প্রথম হিজরিতে।</strong> অর্থাৎ প্রথম ইসলাম প্রচারিত হয়, মালাবারে দক্ষিণ এশিয়ায়। মালাবারের কাছেই হলো লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীরাও হলেন মোফলা মুসলমান। লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ ভারত সরকার কর্তৃক কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল হিসেবে শাসিত হয়; কোনো প্রদেশ হিসেবে নয়। কেরেলায় অবস্থিত কালিকট (কজিকোট)। এখানে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কোদাগামা এসে অবতরণ করেছিলেন ১৪৯৮ সালে। যার আগমন পথ অনুসরণ করে এই উপমহাদেশে সমুদ্রপথে আগমন শুরু হয় ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজদের। যাদের আগমনে বদলে যায় আমাদের ইতিহাসের ধারা। <strong>কেরেলার ভাষা হলো মালয়লাম। মালয়লাম দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষা। ভাষাটি তামিল ভাষার খুবই নিকট সম্পর্কীয়। কিন্তু কেরেলায় বহু মানুষের ভাষা এখন হয়ে উঠছে কার্যত ইংরেজি। এর একটা কারণ সমুদ্রপথে এরা যান নানা দেশে জীবিকার অন্বেষণে। অরুন্ধতী রায় সাহিত্য চর্চা করেছেন মালয়লাম ভাষায় নয়; ইংরেজি ভাষায়। এর কারণ ইংরেজি হলো তার মাতৃভাষারই মতো।</strong></p>
<p>অরুন্ধতী রায়ের বয়স যখন ২ বছর, তখন তার মাতার সাথে তার পিতার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তার মাতা তাকে নিয়ে যান কেরেলায়। সেখানেই তিনি মানুষ হন। তিনি বাংলার বিন্দু-বিসর্গও জানেন না। পড়েও বুঝতে পারেন না। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন তার প্রপিতামহর দেশকে খোলামেলাভাবে দেখতে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তার বাদ সাধলেন। কেন তার সাথে এ রকম রূঢ় ব্যবহার করা হলো, আমরা জানি না। হতে পারে এর একটা কারণ হলো, তিনি কাশ্মিরিদের স্বাধীনতার পক্ষে।</p>
<p>অরুন্ধতীর সাহিত্যের মূল্য নিয়ে আলোচনা করা এখানে বান্তর হবে না। তবে তার ‘দি গড অব স্মল থিংস’ বইটির মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে একটা সর্বজনীন বিষন্নতাবোধ। কেরেলা একটি বামপন্থী আন্দোলনের জায়গা। সারা ভারতের মধ্যে কেরেলায় কমিউনিস্টরা প্রাদেশিক পরিষদে প্রথম ক্ষমতায় আসেন ১৯৫৭ সালে, ভোটের মাধ্যমে। যা সে সময় সারা বিশ্বে হয়ে উঠেছিল বিশেষ আলোচ্য। অরুন্ধতীর ওপর কোনো বাম চিন্তার প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয় না। অরুন্ধতী তার বই ‘দি গড অব স্মল থিংস’-এর জন্য বুকার পুরস্কার পান ১৯৯৭ সালে। বুকার পুরস্কার দেয়া হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ ট্রাস্টি থেকে, যার প্রতিষ্ঠা করে যান বুকার ভ্রাতারা। বুকার প্রাইজের সম্মান বিশ্বজুড়ে। যদিও ঠিক নোবেল প্রাইজের মতো নয়। আমরা আশা করব, অরুন্ধতী রায় ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশে আসবেন এবং খোলামেলাভাবে দেখতে পারবেন তার প্রপিতামহের দেশকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা বাংলাদেশে তার বিষন্নতাবাদকে অনুসরণ করব না। আমরা অনুসরণ করব ইকবালের শক্তিবাদের দর্শনকে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এই দেশ ইসলামী ঐতিহ্যকে অনুসরণ করবে, সেটাই স্বাভাবিক।</p>
<p><strong> </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/literary-judgment-from-islamic-point-of-view/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13961</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সাহিত্য ও সমাজ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/literature-and-society/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/literature-and-society/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 29 Mar 2024 10:24:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[আর্ট]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13927</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্যের সঙ্গে যে মানব-জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে সে সম্বন্ধের রূপ নিয়ে। নানাভাবে এ সম্বন্ধের নির্ণয় হতে পারে। মানব-জীবন যেমন ব্যাপক তেমনি সাহিত্যের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপকতা। কাজেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এদের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সাহিত্যের সঙ্গে যে মানব-জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে সে সম্বন্ধের রূপ নিয়ে। নানাভাবে এ সম্বন্ধের নির্ণয় হতে পারে। মানব-জীবন যেমন ব্যাপক তেমনি সাহিত্যের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপকতা। কাজেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এদের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা হতে পারে। সাধারণত বলা হয়, সাহিত্য হচ্ছে মানব-জীবনের অভিব্যক্তি। মানব-জীবনে যেসব সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্না দেখা দেয়, তারই শিল্পসম্মত অভিব্যক্তি হলো সাহিত্য।</p>
<p>সাহিত্যের মাঝে সমাজ তার নিজের ছবি দেখতে পায়। সে ছবি সুখেরও হতে পারে, ব্যথা-বেদনারও হতে পারে। তবে এতেও একটি ত্রুটি থেকে যায়। কেননা, তখন আবার সাহিত্যকে মনে করা হয় নিছক Recreational বা অবসর-বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে। মানুষের হাতে যখন কোনো কাজ থাকে না তখন মানুষ একখানা নাটক, উপন্যাস বা কবিতার বই নিয়ে বসে এবং চিত্তবিনোদনের জন্য তা পাঠ করে। একথাটিও সত্যি। তবে চিত্তবিনোদন ব্যতীত সাহিত্যের অপর একটি রূপ রয়েছে-তাকে বলা হয় Recreative বা পুনঃসৃষ্টিকারী। পাঠক-পাঠিকার মনে নতুন একটা ভাব বা নতুন একটা চিন্তা গেঁথে দেওয়াও প্রকৃত সাহিত্যের কাজ। শুধু শুধু মানস-বিনোদনই যদি সাহিত্যের লক্ষ্য হতো, তাহলে এ জাতীয় পুস্তক-পুস্তিকাতেই সাহিত্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তো। বাস্তবে কিন্তু সাহিত্যের অমোঘ কার্যকারিতা দেখা যায়। একখান ডিটেকটিভ উপন্যাস ও একখানা যুগান্তকারী উপন্যাস পাশাপাশি পাঠ করলেই তাদের তারতম্য স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়।</p>
<p>রোমাঞ্চকর কাহিনী কল্পনার দুয়ার খুলে দিয়ে মনকে অত্যাশ্চর্য জগতে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু পুস্তকখানা পাঠ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক অবাস্তবতা হাসির উদ্রেক করে। অপর পক্ষে প্রকৃত সাহিত্য মনের সামনে এমন এক জগতের সন্ধান দেয়, যাকে বাস্তবায়িত করা অবশ্য কর্তব্য বলেই মনে হয়। স্যার আর্থার কেনান ডয়েলের &#8216;এ্যাডভেঞ্চারাস অব শার্লক হোমস&#8217;র মধ্যে ডিটেকটিভ শার্লক হোমসের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও গবেষণাকৌশল পাঠককে মুগ্ধ করে নিঃসন্দেহেই। তবে বাস্তব জীবনে তার প্রত্যক্ষ কোনো প্রভাব নেই। অপরদিকে, যোয়ান বোয়ারের &#8216;গ্রেট হাজার&#8217; অথবা টলস্টয়ের &#8216;রিজারেকশন&#8217; বা &#8216;আনাকারেনিনা&#8217; কেবল সমাজ-জীবনের চিত্রাঙ্কনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সুস্থ ও ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ-জীবনের রূপায়ণের তাগিদের ইশারাও বহন করে। এ হিসাবে বিচার করলে Recreational and Recreative- এদুটিকেই সাহিত্যের দু&#8217;টি অবিচ্ছেদ্য অংশে হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।</p>
<p>সাম্যবাদী মহলে আর্টের সংজ্ঞা নির্দেশ করে বলা হয়,</p>
<blockquote><p>“আর্ট হচ্ছে সমাজ-জীবনের অন্তর্গত সত্তার যথার্থ প্রতিফলন। অর্থাৎ সমাজ-জীবনের যা কিছু আশা-আকাঙক্ষা সুখ-দুঃখ-সবকিছুই আর্টে প্রতিফলিত হয়।”</p></blockquote>
<p>তবে আর্টের অপর একটি সংজ্ঞায় বলা হয়,</p>
<blockquote><p>“আর্ট হচ্ছে শ্রেণী-সংগ্রামের একটি ধারালো অস্ত্র।”</p></blockquote>
<p>বলা বাহুল্য, শেষোক্ত সংজ্ঞার আলোকে বিচার করলে এ দুনিয়ার বহু আর্টই এ নামের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য। শ্রেণিবিভাজন সকল দেশে, সকল সমাজেই রয়েছে। কেবল বিত্তবান (Haves) ও বিত্তহারা (Have nots) নিয়েই সমাজ গঠিত নয়। একই ব্যক্তি, মননের দিক দিয়ে বিত্তহারার এক পর্যায়ভুক্ত হতে পারে, আবার অন্যদিক দিয়ে অন্য শ্রেণীভুক্তও হতে পারে। টলস্টয় ছিলেন বিত্তহারার দরদী বন্ধু এবং এজন্য নিজে বিত্ত ত্যাগ করে সাধারণ কৃষকের জীবন যাপন করতে তাঁর দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মানসে কিন্তু এ রূপায়ণ ছিলো ধর্মীয় সাধনারই এক অঙ্গ। কাজেই তাঁকে একদিকে যেমন বিত্তহীন শ্রেণীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন সাধনায় মগ্ন লোকেদের শ্রেণীভুক্তও বলা যায়, তেমনি বলা যায় তাঁর সৃষ্ট সমগ্র সাহিত্যে রয়েছে ব্যষ্টিজীবনের যথার্থ স্বীকৃতি। এ ব্যষ্টি জীবন একদিকে যেমন কোথাও বা নিবিত্ত/বিত্তহারা আবার কোথাও বা বিত্তবান হয়েও মানসের দিক থেকে সর্বহারা। কাজেই আর্ট কেবল যে শ্রেণীসংগ্রামের ধারালো অস্ত্রই হবে তার কোনো অর্থ হয় না।</p>
<p>আর্ট কোথাও বা শ্রেণীসংগ্রামের ধারালো অস্ত্ররূপে দেখা দিতে পারে। তার উদাহরণ রয়েছে ম্যাকসিম গোর্কির &#8216;মা&#8217; নামক উপন্যাসে। তবে সর্বত্র আর্ট এই একই উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হবে বলে পূর্বস্বীকৃতি সম্পূর্ণ বাস্তবতা বর্জিত। আর্ট সম্বন্ধে এমন ধারণা পোষণ করার ফলেই সাহিত্য সম্বন্ধেও অন্য ধারণার সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক, তবে এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে সাহিত্যের রূপ।</p>
<p>সমগ্র জীবনের অন্তর্ভুক্ত একটি সত্তার যথার্থ প্রতিফলন রূপেই হোক অথবা শ্রেণী-সংগ্রামের ধারালো অস্ত্রের রূপেই হোক, সাহিত্যকে পুনঃসৃষ্টিকারী (Recreative) বা অবসর-বিনোদনের সহায়ক (Recreational) হিসেবে ধারণা করাটাও বিচারযোগ্য। শ্রেণীসংগ্রামের ধারালো অস্ত্রের মন্ত্র নিয়ে দেখা দিলেও ম্যাক্সিম গোর্কির &#8216;মা&#8217; Recreative বা পুনঃসৃষ্টকারী সাহিত্যরূপে সর্বত্র স্বীকৃত। কাজেই আর্টের সাহিত্যিক রূপের মধ্যে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে তার কার্যকারিতা এবং মানব ও মানব-মানসের উপর তার প্রতিক্রিয়া।</p>
<p><strong>এজন্যই বোধহয় ইকবাল উদাত্ত স্বরে ঘোষণা করেছিলেন:</strong> <strong>There is no opium eating in Art- অর্থাৎ আর্ট বা শিল্পের রাজ্যে আফিমের জুড়ি নেই।</strong> অর্থাং শিল্প বা সাহিত্য সম্বন্ধে পূর্ববর্তী যে সব ধারণা সাহিত্যিক মহলে প্রচলিত ছিলো এবং ইংরেজ কবি অস্কার ওয়াইল্ডের (Oscar Wilde) একটি বচনের দোহাই দিয়ে যারা বলতেন-Art for Art&#8217;s sake-শিল্পের জন্যই শিল্প—তার তীব্র প্রতিবাদ স্বরূপই ইকবাল সপ্তম সুরে বলেছিলেন-শিল্প জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মতবাদ নয়।</p>
<p>এ বাণী আজ সর্বত্রই স্বীকৃত। অস্কার ওয়াইল্ডের ধারণাটি আজ সাহিত্যিক মহলেও এতোটা প্রচলিত নেই। তবে ওস্কার ওয়াইল্ডের মন্তব্যের মধ্যেও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। আর্ট জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মানস-বিলাস নয়, জীবনের সঙ্গে তার অচ্ছেদ্য যোগাযোগ রয়েছে। তবে আর্ট আবার সেবাদাসীও নয়, আর্টের রাজ্যে তার স্বকীয়তা-স্বাধীনতাও রয়েছে। কোনো বিশেষ শ্রেণি, বিশেষ মানুষ বা বিশেষ গোত্রের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণা আর্টের কাম্য হতে পারে না। সমগ্র মানব-জীবনই আর্টের পটভূমি। এজন্যই যে ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দলের প্রচারণার মাধ্যম হয়ে আর্ট দেখা দেয়, তখন স্বস্থান বিচ্যুতির ফলে আর্ট খেলো হয়ে পড়ে।</p>
<p>সাহিত্যের মূল বিচারে আরও একটি দিক বিশেষভাবেই বিবেচনার যোগ্য। মানব-জীবন অখণ্ড ও সামগ্রিক হলেও তাতে রয়েছে বিভিন্ন বৃত্তি ও প্রবৃত্তি। সেগুলোর ধরণ অনুযায়ী পূর্বোল্লেখিত চিত্তবিনোদনকারী সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সন্তোষদান একই জাতীয় সাহিত্যের মাধ্যমে সম্ভব না। &#8216;ঠাকুরমার ঝুলির&#8217; গল্প অবোধ শিশুদের মনে আগ্রহ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করতে পারে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক লোকের কাছে তা&#8217; সর্বদাই হাসির খোরাক জোগাবে। অপরদিকে পরিণত বয়স্ক লোকেরাও Thrillers পাঠে মনের মধ্যে অভূতপূর্ব সংবেদন অনুভব করে। তেমনি পুনঃসৃষ্টকারী (Recreative) সাহিত্যের নানাদিক থাকতে পারে। মানব-মানসে নব চিন্তার উন্মেষ, নব ভাবের প্রেরণা দানে বা নব ইচ্ছাশক্তি বলে বলীয়ান করাতে এজাতীয় সাহিত্য সক্ষম হ&#8217;তে পারে। মোদ্দাকথা, মানব-মানসের প্রতিটি স্তরের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি যদি সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু হয়, তাতেই আসে সাহিত্যের সার্থকতা আর এটাই সাহিত্যের চরম উৎকর্ষতা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্পিনোজার সারবস্তু (Substance) মননশীল জগতে যে ভাবনা-চিন্তার উদ্রেকে সফল হয়েছে, জোকোবির (Jacobi) প্রার্থনা ঠিক তেমনিই ভক্তদের কাছে এক নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে। ওয়ালট হুইটম্যানের (Walt Whitman) আহ্বান তেমনি মানব মনের ইচ্ছাশক্তিকে এক অভিনব দোল দিয়েছে।</p>
<p>ব্যষ্টির দিক থেকে হোক অথবা সমষ্টির দিক থেকে হোক, সাহিত্যের সঙ্গে সমাজের রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ। সাহিত্য ব্যষ্টি বা শ্রেণীতে আনন্দ পরিবেশন করে। সাহিত্য আবার কোনো একটি বিশেষ ভাবাদর্শে মানব-জীবনকে উদ্বুদ্ধ করে। মানব-জীবন ব্যাপক হওয়ায় তার সাহিত্যেও রয়েছে ব্যাপকতা। কোথাও বা আনন্দদানকারীরূপে সে মানব-জীবনের একটি বিশেষ দিককে আনন্দ পরিবেশন করে আবার কোথাও একটি বিশেষ দিকের আদর্শের প্রতি সমাজ-মানসকে উদ্বেলিত করে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/literature-and-society/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13927</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলায় ইসলামী সাহিত্যের ইতিহাস ও ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/history-and-personality-assessment-of-islamic-literature-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/history-and-personality-assessment-of-islamic-literature-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 25 Mar 2024 15:37:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13915</guid>

					<description><![CDATA[আমরা জানি যে, উনবিংশ শতাব্দীর ষষ্ঠ-সপ্তম দশকে ইংরেজরা ফারাজী ও ওহাবী প্রভৃতি ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করে। এর পরের বিশ থেকে পঁচিশ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ইংরেজ রাজত্ব শুরু হবার পরে উনবিংশ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা জানি যে, উনবিংশ শতাব্দীর ষষ্ঠ-সপ্তম দশকে ইংরেজরা ফারাজী ও ওহাবী প্রভৃতি ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করে। এর পরের বিশ থেকে পঁচিশ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে।</p>
<p>বাংলাদেশে ইংরেজ রাজত্ব শুরু হবার পরে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত হিন্দু সমাজের মধ্যে ধীরে ধীরে যে বিষ সংক্রমিত হয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মুসলমানের মধ্যেও তা অনুপ্রবিষ্ট হতে থাকে। এ সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কিছু মুসলমান খ্রীস্টান হতে থাকে। অশিক্ষা, নিজ ধর্মের প্রতি শিথিল বিশ্বাস এবং আর্থিক ও সাংসারিক মোহই স্বধর্ম ত্যাগ করে তদানীন্তন রাজধর্ম গ্রহণে সেদিন মুসলমানদেরও প্রেরণা যুগিয়েছিল।</p>
<p>হিন্দু সমাজকে শতাব্দীর শুরুতে এ ধরনের খ্রীস্টানধর্ম-মুখিতা থেকে বাঁচিয়েছিলেন রামমোহন। শতাব্দী শেষে মুসলমানদের মধ্যে আন্দোলন আরম্ভ করেন যশোর নিবাসী বাগ্মীপ্রবর মুন্সী মেহেরুল্লাহ এবং তাঁরই হাতে দীক্ষিত ধর্মান্তর গ্রহণকারী মুন্সী মোহাম্মদ জমিরুদ্দীন। এঁদের প্রধান অবলম্বন ছিল ওয়াজ। গ্রামে গ্রামে জেলায় জেলায় বক্তৃতা করে মুন্সী মেহেরুল্লাহ আশাতীত ফল লাভ করেছিলেন। বাঙালী মুসলিম সমাজকে রক্ষা করার ব্যাপারে মুন্সী মেহেরুল্লাহর দান অবশ্য অশেষ, কিন্তু তিনি কিংবা তাঁর অনুগামী জমিরুদ্দীন সংঘবদ্ধভাবে মুসলিম সমাজের মধ্যে চেতনা সৃষ্টি সেদিন করতে পারেননি। এঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এ যুগের বাঙালী মুসলমানকে ইসলামমুখী করে তুলেছিল একটি বিশেষ দল। সে দলটিকে &#8216;সুধাকর দল&#8217; আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।</p>
<p>এঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন খুলনা জেলার সাতক্ষীরার অন্তর্গত বাঁশদহের অধিবাসী এবং কলকাতা ডভটন ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের আরবী ও ফারসীর অধ্যাপক মৌলবী মেয়রাজউদ্দীন আহম্মদ, ময়মনসিংহের টাঙ্গাইলের অন্তর্গত চাড়ানের অধিবাসী এবং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার বাংলা ও সংস্কৃতের অধ্যাপক পণ্ডিত রেয়াজউদ্দীন আহমদ মাশহাদী, বসিরহাটের মোহাম্মদপুর নিবাসী মুন্সী শেখ আবদুর রহিম এবং ত্রিপুরা জেলার রূপসার অধিবাসী মুন্সী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ।</p>
<p>আর্থিক ও সাংসারিক প্রলোভনে পড়ে কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাঙালী মুসলমানেরা যে সেদিন খ্রীস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তা থেকে তাদের বাঁচানোর একমাত্র পথ ছিল তাদেরকে ইসলামী ঐতিহ্য এবং মুসলমানের জাতীয় ইতিহাস সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা। এতে সিদ্ধি লাভ করার জন্যে মাতৃভাষায় জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি করে সর্বসাধারণের মধ্যে পরিবেশন করা এবং সংবাদপত্রাদির মাধ্যমে ধর্ম ও কৃষ্টিমূলক বিষয়বস্তুর আলোচনা করে মুসলিম জনসাধারণের দৃষ্টি ফুটিয়ে তোলাই ছিল প্রশস্ত পথ। উল্লিখিত মনীষীবৃন্দ এ সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কলকাতায় একটা দল বাঁধলেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রথমত মুসলিম কৃষ্টি এবং ইসলামের তত্ত্ব-কথা সংক্রান্ত কতকগুলো বই-এর অনুবাদ করে খণ্ড খণ্ড আকারে প্রকাশ করতে লাগলেন। ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে সুপণ্ডিত এবং অভিজ্ঞ মনীষী জালালুদ্দীন আফগানী কর্তৃক ফারসী ভাষায় রচিত &#8216;নেচার এবং নেচারিয়া&#8217; নামক গ্রন্থের অনুবাদ করে &#8216;এসলাম তত্ত্ব&#8217; নাম দিয়ে প্রথম খণ্ড প্রকাশ করলেন। এর অল্পদিন পরেই মাওলানা আবদুল হক হাক্কানীকৃত &#8216;তফসিরে হাক্কানী&#8217;র উপক্রমণিকাভাগ থেকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদক বিষয়সমূহ অনুবাদ করে এঁরাই &#8216;এসলাম তত্ত্ব&#8217; দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করলেন। &#8216;এসলাম তত্ত্ব&#8217; (বা মুসলমান ধর্মের সার সংগ্রহ) এর প্রথম খণ্ড ১২৯৪ সাল, আশ্বিন মাসে অর্থাৎ ১৮৮৭ খ্রীস্টাব্দে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১২৯৫ সাল-১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।</p>
<p>&#8216;এসলাম তত্ত্ব&#8217; খণ্ডাকারে ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো বলে অনেকেই একে মাসিক পত্রিকা মনে করতেন। এসলাম তত্ত্ব খুব বেশি দিন চলেনি। তবু এর বিক্রয়লব্ধ অর্থে এবং ময়মনসিংহ করটিয়ার জমিদার হাফেজ মাহমুদ আলী খান এবং বর্ধমানের কুসুমগ্রামের জমিদার মুন্সী মোহাম্মদ এবরাহিমের অর্থানুকূল্যে শেখ আবদুর রহিম এবং মুন্সী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ &#8216;সুধাকর&#8217; নামক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১২৯৬ সালের (১৮৮৯) আশ্বিন মাসে প্রথম সংখ্যা &#8216;সুধাকর&#8217; প্রকাশিত হলো।</p>
<p>&#8216;সুধাকর&#8217; পত্রিকা নানা বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে বেশ কিছুদিন চলেছিল। এ পত্রিকার মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় বাঙালী মুসলমানেরা তাদের ধর্মের মহিমা, তত্ত্ব, তথ্য, জাতীয় ঐতিহ্য ও গৌরব সম্বন্ধে কিছুটা সচেতন হয়েছিল। সেকালে বঙ্কিম প্রমুখ মুসলিম- বিরোধী লেখক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে সব লেখা লিখতেন, &#8216;সুধাকরে&#8217; তার প্রতিবাদ বের হতো।</p>
<p>&#8216;সুধাকর&#8217; দল সাহিত্য ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবার পূর্বে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি পথে বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে কেউ যে অগ্রসর হয় নি, তা নয়। এ দলের বহু আগে থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মীর মশারফ হোসেন বাংলা সাহিত্য সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাঁর আগে শামসুদ্দীন মুহম্মদ সিদ্দিকীকে দেখা যায়। তাঁর &#8216;ভাবলাভ&#8217; এবং &#8216;উচিত শ্রবণ&#8217; ১৮৬৫ সালের আগেই রচিত ও প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাংলায় মুসলিম জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির নেশায় এঁরা যেমন করে মেতেছিলেন এবং প্রাণঢালা সাধনা করেছিলেন, এঁদের আগে তেমন আর কাউকে দেখা যায় না। তাছাড়া এমন সচেতন জাতীয়তাবোধও তাঁদের আগের কোনও মুসলমান-রচিত সাহিত্যে এমনভাবে ফুটে ওঠেনি। এঁরা আরবি ফারসী সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেছেন, হযরত মহাম্মদের (সাঃ) এবং অন্যান্য পীরপয়গম্বরের, খলিফাদের এবং তাঁর সাহাবীরা এবং ওলি আল্লাদের জীবনী লিখেছেন, ইসলাম ধর্মের গৌরবগাথা রচনা করেছেন, তার মহিমা ব্যাখ্যা করেছেন। একটি জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা তার মনোজীবনের স্পন্দন এবং অন্তর ও বহির্জীবনের প্রকাশে যে তার জাতীয় বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক এঁদের এ বোধ ছিল প্রখর। বাঙালী মুসলমান জাতির ঘোর দুর্দিনে এঁরাই সে জাতিকে ঘরমুখো করেছিলেন এবং নিজেদের চিনতে সহায়তা করেছিলেন। এক কথায় এ &#8216;সুধাকর&#8217; দলই যেভাবে মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি রচনা করেছিলেন সে পথেই অর্ধ শতাব্দীব্যাপী সাধনায় বাঙালী মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্য বিকশিত হয়েছে। অন্য কথায় মুসলিম জাতি এবং এ জাতির সাংস্কৃতিক জীবনের ধারা এঁদেরই হাতে লালিত ও বর্ধিত হয়েছে। মুসলিম বাংলা সাহিত্যে &#8216;সুধাকর&#8217; দলের ভূমিকা এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই বিচার করতে হবে। পরবর্তী মুসলিম সাহিত্যিকদের জন্যে এঁরা পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন এবং সে কারণেই আমাদের জাতীয় জীবনেও নবীন অধ্যায়ের সংযোজন করেছেন এবং বাঙালী মুসলমানের মনে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করে নব গৌরবের সূচনা করেছেন। এঁদের রচিত সাহিত্যের মূল্য যেমনই হোক না কেন, স্থান কাল পাত্র বিচারে বাংলা সাহিত্যে এঁদের ঐতিহাসিক ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম।</p>
<p>তাঁদের কৃতিত্ব বিচারের পর সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত তাঁদের প্রদর্শিত পথে যে সাহিত্য বাংলায় রচিত হয়েছে, এর পরে তার ধারাবাহিক আলোচনা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। মোটামুটিভাবে এ শাখার নাম ইসলামী সাহিত্য শাখা রাখা যেতে পারে। এ শাখায় মৌলিক গ্রন্থ, অনুবাদ, জীবনী সাহিত্য, দর্শন ও তত্ত্বালোচনা এবং হাদীস ও কোরআনের অনুবাদ, সংকলন ও আলোচনা পাশাপাশি ঠাঁই পেয়েছে। একই উদ্দেশ্যের পরিপোষক বলে বিভিন্ন পরিচ্ছেদে বিভক্ত না করে &#8216;ইসলামী সাহিত্য&#8217; শীর্ষক একই পরিচ্ছেদে এর সবটুকুরই আলোচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ</strong>(১৮৬১-১৯০৭):</p>
<p>এ শাখার শুরুতে পাচ্ছি, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহকে। তিনি যশোহর জেলার অধিবাসী ছিলেন। সংঘর্ষ মানুষের শক্তি বৃদ্ধির কারণ। মুন্সী মেহেরুল্লাহ ছিলেন সাধারণ মোল্লা মানুষ। অথচ খ্রীস্টান ধর্মের সঙ্গে প্রবল সংঘর্ষের ফলেই তাঁর সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত হয়েছিল। পাদ্রী জমিরুদ্দীনের সঙ্গে ধর্ম বিষয়ে তাঁর বাদানুবাদ হয়। ১৮৯২ খ্রীস্টাব্দে &#8216;খ্রীস্টীয় বান্ধব পত্রিকায়&#8217; জন জমিরুদ্দীন &#8216;আসল কোরআন কোথায়?&#8217; শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। উক্ত সালের ২০শে ও ২৭শে চৈত্র এবং পরবর্তী বৎসরের ২রা বৈশাখ ও ২৭শে জ্যৈষ্ঠ (১৩০০ সাল) &#8216;সুধাকর&#8217; পত্রিকায় মুন্সী মেহেরুল্লাহ &#8216;ঈষায়ী বা খ্রীস্টানী ধোঁকা ভঞ্জন&#8217; নামক একটি গবেষণামূলক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এ প্রবন্ধটি পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এতে মুন্সী মেহেরুল্লা অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে জমিরুদ্দীন কর্তৃক উত্থাপিত ছয়টি প্রশ্নের উত্তর দেন। ধর্ম সংক্রান্ত বাদানুবাদে পরাজিত হয়ে জন জমিরুদ্দীন মুন্সী মেহেরুল্লাহ্র কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং মুন্সী জমিরুদ্দীন নাম নিয়ে ইসলাম প্রচার ও রক্ষায় তাঁর সহকর্মী হয়ে ওঠেন।</p>
<p><strong>মুন্সী মেহেরুল্লাহর অন্যান্য বই:</strong></p>
<p>১. খ্রীস্টীয় ধর্মের অসারতা (১৮৮৬)</p>
<p>২. মেহেরুল ইসলাম (১৮৯৭)</p>
<p>৩. বিধবা গঞ্জনা ও বিষাদ-ভাণ্ডার (৩য় সংস্করণ ১৯০০)</p>
<p>৪. পান্দেনামা (২য় সংস্করণ ১৯০৮)</p>
<p>৫. হিন্দু ধর্ম-রহস্য ও দেবলীলা (১৮৯৬)।</p>
<p>৬. খ্রীস্টান-মুসলমান তর্কযুদ্ধ।</p>
<p>৭. রদ্দে খ্রীস্টীয়ান ও দলিলোল এসলাম (১৮৯৫)।</p>
<p>৮. বাবু ঈশানচন্দ্র মণ্ডল এবং চার্লস্ ফ্রেঞ্চের &#8216;এসলাম গ্রহণ&#8217; (সংগৃহীত)।</p>
<p>৯. শ্লোকমালা।</p>
<p>মুসলিম সমাজের সংস্কারের উদ্দেশ্যে &#8216;মেহেরুল ইসলাম&#8217; বাংলা পুঁথির ধরনে লিখিত। এই পুস্তকের গোড়াতে হযরত রসূলে করিমের &#8216;নাত&#8217; বা স্ততি বন্দনা আছে। আজও বহু বক্তা বা ওয়ায়েজ দরুদশরীফের মতো এগুলো আবৃত্তি করে থাকে। উক্ত গজলের শুরুতে এবং শেষে এ রকমের ধুয়া আছে:</p>
<blockquote><p>গাওরে মোসলেমগণ, নবীগুণ গাওরে।</p>
<p>পরান ভরিয়া সবে সল্লেআলা গাওরে।</p></blockquote>
<p><strong>&#8216;মেহেরুল ইসলাম&#8217; পুস্তকখানির একটা অসাধারণ বিশেষত্ব ছিল। এর ভাষা অত্যন্ত সরল এবং সর্বসাধারণের বোধগম্য অথচ রচনায় লালিত্য ও মাধুর্যের অভাব নেই।</strong></p>
<p>তাঁর বিখ্যাত &#8216;রদ্দে খ্রীস্টীয়ান ও দলিলোল এসলাম&#8217; নামক পুস্তকটি খ্রীস্টান পাদ্রীগণের আক্রমণের পাল্টা জবাবস্বরূপ খ্রীস্টান ধর্মের বিরুদ্ধে লিখিত হয়েছিল। এ পুস্তকটিতে মুন্সী মেহেরুল্লাহর প্রগাঢ় ধর্মজ্ঞান ও বাস্তববুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। সমাজ সেবা এবং খ্রীস্টান ধর্মের কবল থেকে ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের রক্ষা করাই ছিল তাঁর সাহিত্য কর্মের মূল প্রেরণা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মুন্সী মোহাম্মদ জমিরুদ্দীন</strong>(১৮৭০-১৯৩০):</p>
<p>মুন্সী মোহাম্মদ জমিরুদ্দীন ইসলাম ধর্ম প্রচারে মুন্সী মেহেরুল্লাহর সহচর ছিলেন। নদীয়ার মেহেরপুর মহকুমার গাঁড়োডোবা গ্রামে তিনি ১৮৭০ খ্রীস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুসলমান ছিলেন, কিন্তু সেকালের খ্রীস্টান মিশনারীদের সংস্পর্শে এসে ১৮৮৭ খ্রীস্টাব্দে ২৫শে ডিসেম্বর খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সঙ্গে ধর্ম সংক্রান্ত বাদানুবাদে লিপ্ত হয়ে আবার ইসলাম ধর্মের আশ্রয়ে ফিরে আসেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধর্ম প্রচার ও রক্ষা কার্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন।</p>
<p>তাঁর &#8216;রদ্দে খ্রীস্টান&#8217; সম্পর্কিত পুস্তিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে &#8216;ইসলামের সত্যতা সম্বন্ধে পরধর্মাবলম্বীদিগের মন্তব্য&#8217; (সংকলিত), পৃঃ ৫৯, প্রথম প্রকাশ ১৩৩৭ (১৯০০ খৃঃ)। হিন্দু ও খ্রীস্টানেরা ইসলামের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে যেখানে যা কিছু লিখেছেন তার কিছু অংশ গ্রহণ করে তিনি পরধর্মাবিলম্বীদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলবার জন্য এ বইটি বের করেছিলেন। এ বইটির চতুর্থ সংস্করণ ১৩২২ সালে এবং পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হয় নদীয়া গাঁড়াডোবা থেকে ১লা শ্রাবণ, ১৩৩৩ সালে। তিনি এ বইটি উৎসর্গ করেছিলেন নদীয়া-চাঁপা-তলা নিবাসী ইসলামধর্মপ্রাণ মুন্সী মোহাম্মদ ফজলে করিম ওরফে মোহাম্মদ ফুলবাস সাহেবকে।</p>
<p>তাঁর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বই &#8216;ইসলামী বক্তৃতা&#8217;। এটি অনুবাদ সংকলন। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫৮। ১৩২২ সালে তৃতীয় সংস্করণ বের হয়। তৃতীয় বই &#8216;শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ও পাদ্রীর ধোঁকা ভঞ্জন&#8217; প্রকাশিত হয় ১৩২৩ সালে। এটিই মুন্সী জমিরুদ্দীনের শ্রেষ্ঠ রচনা। এ বইটিতে একদিকে হযরত মহাম্মদের জীবনী আলোচনা ও মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেছেন, অন্যদিকে তিনি খ্রীস্টান পাদ্রীরা কিভাবে মুসলমানদের ধোঁকায় ফেলে খ্রীস্টান করতো তার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছেন।</p>
<p>তাঁর কবিতার বই &#8216;শোকানল&#8217; (পৃঃ ২৪)-এর ৩য় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩২৩ সালে। এ ছাড়া &#8216;আসল বাঙ্গালা গজল&#8217; নাম দিয়ে দরূদ শরিফ ও মোনাজাত (পৃঃ ৪৮, ১৩১৫ সাল) সংকলন করেন। &#8216;বিশুদ্ধ খতনামা&#8217; (পৃঃ ৩৬) নামেও তাঁর একটি পুস্তিকা ছিল।</p>
<p>মুন্সী মেহেরুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে জমিরুদ্দীন একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর &#8216;মেহের চরিত&#8217; (১৯০৭ খ্রিঃ) নামক পুস্তিকায় এ প্রবন্ধটি মুদ্রিত হয়। এছাড়া তিনি ধর্মপ্রচারমূলক আরও কয়েকটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁর নামের শেষে &#8216;বিদ্যাবিনোদ ও কাব্যনিধি&#8217; উপাধি ব্যবহার করা হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শেখ আবদুর রহিম </strong>(১৮৫৯-১৯৩১):</p>
<p>ঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলিম বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের আলো এবং সুধাকর দলের সুধী প্রধান ছিলেন শেখ আবদুর রহিম। জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির জন্য ঐকান্তিক অনুরাগ, নিষ্ঠা এবং সাধনা তাঁর মতো আর কারুর ছিল না। সাহিত্য সাধনা ছিল তার জীবনের মহান ব্রত। মুসলমানের জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির নেশা যে শুধু তাকে পেয়ে বসেছিল, তা নয়, বাঙালী মুসলমান যে এক বিরাট ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এবং মানব সভ্যতায় ইসলাম যে সুমহান দান রেখে গেছে, সে সম্বন্ধে বাঙালী মুসলমানকে অবহিত করতে হলে তার নিজ মাতৃভাষায় তার নিজস্ব সাহিত্য তাকে রচনা করতে হবে এ সত্যও তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। সেজন্যই জাতির সেবায় তিনি নিজেকে এমনভাবে নিয়োজিত করেছিলেন। &#8216;Literature, in a word, was with him not so much an end in itself but as a means to a further end, which was national not individual.&#8217; আবদুর রহিমের পক্ষে এ কথা যে কত সত্য, সেকালের বাঙালী মুসলমান সমাজ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে তাঁরাই তার মর্মানুধাবন করতে পারেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শেখ আবদুর রহিম রচিত গ্রন্থাদিঃ</strong></p>
<p>১. হজরত মোহাম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি (ফাল্গুন ১২৯৪ সাল, ১৮৮৭ খ্রীঃ) পৃঃ ৯৫৮। ২৮ বছর বয়সে লিখিত শেখ আবদুর রহিমের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯২৬ খ্রীস্টাব্দে। প্রায় সহস্র পৃষ্ঠাব্যাপী এ বৃহৎ গ্রন্থখানির নাম থেকেই এ গ্রন্থের বিষয়বস্তুর এবং গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। হযরতের জীবনী এবং ইসলামধর্মের মূলনীতি এ গ্রন্থে সুবিন্যস্ত এবং পুংখানুপুংখভাবে আলোচিত হয়েছে। এছাড়া স্থান ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম কিভাবে বিস্তার লাভ করেছিল তারও বিশ্লেষণ তিনি এ গ্রন্থে করেছেন। এটিই শেখ আবদুর রহিম রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি।</p>
<p>২. &#8216;ইসলাম ইতিবৃত্ত&#8217; (History of the Moslem World)। &#8216;ইসলাম ইতিবৃত্ত&#8217; (অর্থাৎ খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় হইতে মুসলমান ধর্ম ও সাম্রাজ্য বিস্তারের ধারাবাহিক ইতিহাস) প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯১০ খ্রীস্টাব্দে। &#8216;হজরত মুহম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি&#8217; এবং &#8216;ইসলামের ইতিবৃত্ত&#8217; একত্রে মিলিয়ে শেখ আবদুর রহিম মুসলিম জগতের পূর্ণ ইতিহাস রচনা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর কথায় &#8216;হজরত মুহম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি&#8217; ইসলামের ইতিবৃত্তের প্রথম খণ্ডরূপে গ্রহণ করিতে পারেন। তৎপর খলিফাগণের ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ডরূপে গৃহীত হইবে।&#8217; এ ইতিবৃত্ত খেলাফায়ে রাশেদীন থেকে আরম্ভ করে বনি ওস্মিয়া, বনি আব্বাসিয়া, বনি ফাতেমিয়া এবং স্পেনের বনি ওস্মিয়া প্রভৃতি প্রাচীন বংশের ইতিবৃত্ত এবং প্রত্যেক বংশের শাসনকালে তাদের রাজনীতি, সমাজ নীতি, শিক্ষা, পোশাক-পরিচ্ছদ, শিল্পবিজ্ঞান ও ধর্ম-বিস্তৃতি প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হবার কথা ছিল। এছাড়া ভারতবর্ষ, চীন, ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও আফ্রিকার অন্যান্য স্থানে ইসলাম বিস্তৃতি ও মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্তও ধারাবাহিকরূপে লিপিবদ্ধ হতো। এ সুবৃহৎ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্যে প্রতি মাসে খণ্ডাকারে ইসলামের ইতিবৃত্ত বের করার ব্যবস্থা করা হয়। ১৩১৭ সাল অর্থাৎ ১৯১০ খ্রীস্টাব্দে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড বের হবার পর, আমাদের দুর্ভাগ্য যে এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।</p>
<p>৩. ইসলাম-নীতি, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড (১৯২৫, ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ)। কোরআন ও হাদীসের উপদেশাবলী (১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ)।</p>
<p>৪. নামাজ তত্ত্ব বা নামাজ বিষয়ক যুক্তিমালা (পৃঃ ২০০) ১৩০৩ সাল, ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দ)।</p>
<p>৫. হজবিধি-১ম খণ্ড, পৃঃ ১৯০ (১৩১০ সাল, ১৯০৩ খ্রীস্টাব্দ)।</p>
<p>৬. রোজাতত্ত্ব (পৃঃ ১৩০), (১৩৩৪ সাল, ১৯২৮ খ্রীস্টাব্দ): এতে রোজার আবশ্যকতা, মাহাত্ম্য, সৌন্দর্য ও উপকারিতা প্রভৃতি বিষয় কোরআন ও হাদীস শরীফ থেকে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং রোজার বিরুদ্ধবাদীদের আপত্তিসমূহ যুক্তি ও তর্ক দিয়ে খণ্ডন করা হয়েছে।</p>
<p>৭. খোৎবা (অর্থাৎ জুম্ম্ম, ঈদুল ফেতর, ঈদুজ্জোহা ও বিবাহের খোৎবা) রচনা ১৩৩২ এর পূর্বে, প্রকাশ ১৩৩৯ সাল অর্থাৎ ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে (পৃঃ ৬৪)। ৯. এসলাম তত্ত্ব।</p>
<p>এছাড়া পণ্ডিত রিয়াজউদ্দীন মাশহাদী রচিত &#8216;সুরিয়া বিজয়&#8217; তিনি প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থটি ১৮৯৫ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। &#8216;সুরিয়া বিজয়&#8217; হয়ত আবুবকর সিদ্দিক কর্তৃক সিরিয়া বিজয়ের কাহিনী।</p>
<p>ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের সম্পর্কে এ বইগুলো ছাড়াও তিনি &#8216;ওয়াশিংটন আরভিং&#8217;-এর &#8216;টেলস্ অব্ আল্ হামারা&#8217;র &#8216;পিলগ্রিজ্ অব লাভ&#8217; নামক গল্পটির অনুবাদ করে &#8216;প্রণয়-যাত্রী&#8217; নাম দিয়ে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছিলেন। পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে এর আলোচনা করা হয়েছে। শেখ আবদুর রহিম কত বড়ো সাহিত্যব্রতী ছিলেন এসব পত্রপত্রিকার সম্পাদনা থেকে তার আরও সুষ্ঠু পরিচয় পাওয়া যায়:</p>
<p>১. সুধাকর (সাপ্তাহিক)।</p>
<p>২. মিহির (মাসিক)।</p>
<p>৩. মিহির ও সুধাকর (সাপ্তাহিক)।</p>
<p>৪. হাফেজ (মাসিক)।</p>
<p>৫. মোসলেম প্রতিভা (মাসিক)।</p>
<p>৬. মোসলেম হিতৈষী (সাপ্তাহিক)।</p>
<p>৭. ইসলাম দর্শন (মাসিক)।</p>
<p>শেখ আবদুর রহিম ১৩৩৬ সালের (১৯২৯ খ্রীঃ) মাসিক &#8216;মোহাম্মদী&#8217;তে ভাদ্র থেকে পৌষ পর্যন্ত পাঁচ সংখ্যায় বঙ্গ ভাষা ও মুসলমান সমাজ সম্বন্ধে একটি সুচিন্তিত ধারাবাহিক প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধটিতে সেকালের মুসলিম বাংলা সাহিত্যের এবং সাহিত্যসেবীদের সম্বন্ধে একটা স্বচ্ছ আলোচনার প্রয়াস তিনি পেয়েছেন।</p>
<p>শেখ আবদুর রহিমের সমগ্র সাহিত্য সাধনা ও সাহিত্য কীর্তির পথে তাঁকে প্রেরণা যুগিয়েছে জাতির জন্যে ঐকান্তিক দরদ এবং বাংলা সাহিত্য সাধনায় বাঙালী মুসলমানের উদাসীনতার জন্য তীব্র বেদনাবোধ। এমন স্বজাতি স্বধর্ম ও স্বসাহিত্যপ্রাণ বাংলা সাহিত্যসেবী মুসলমান খুব কমই দেখা গেছে। তাঁর চিন্তায় পরিচ্ছন্নতা ছিল, সে জন্য তাঁর বলার ভঙ্গীও ছিল সুস্পষ্ট এবং জোরালো, তার ভাষার বাঁধন শিথিল নয়, গুরুগম্ভীর সংস্কৃতানুসারী এবং ছন্দোময়, প্রকাশভঙ্গী সাবলীল এবং তীক্ষ্ম। বাংলা ভাষায় তাঁর যে অসাধারণ অধিকার ছিল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>মওলানা মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী </strong>(১৮৭৫-১৯৫০);</p>
<p>মওলানা মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৮৭৫ খ্রীস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার অন্তর্গত আড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি রংপুর জেলার একটি সিনিয়ার মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি ইসলাম প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারে প্রবৃত্ত হন এবং কর্মবহুল জীবনযাপন করার পর ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে ২৪শে অক্টোবর তারিখে পরলোকগমন করেন। চট্টগ্রামের অপর নাম &#8216;ইসলামাবাদ&#8217;। কর্মজীবনে তাই &#8216;ইসলামাবাদী&#8217; খেতাব দিয়েই তিনি সমধিক পরিচিত।</p>
<p>তিনি ছিলেন একাধারে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজ সেবক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বক্তা। ১৯২০ খ্রীস্টাব্দে তিনি খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি কংগ্রেসের সভ্য হিসেবে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণও করেছিলেন এবং কৃষক প্রজা আন্দোলনের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অবিভক্ত ভারতে &#8216;জমিওতে ওলামায়ে হিন্দের&#8217; বাংলা শাখার তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা।</p>
<p>সমাজ সেবক মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদীর শ্রেষ্ঠকীর্তি চট্টগ্রামের &#8216;কদম মোবারক&#8217; মসজিদ-সংলগ্ন এতিমখানার স্থাপনা। মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রধানত ইতিহাসমূলক রচনার জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এ শাখায় তার স্থান দেওয়ার কারণ তার সমগ্র সাহিত্যিক জীবনই তিনি ইসলাম ও বিশেষত তদানীন্তন ভারতীয় মুসলমানের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। তার রচিত বাংলা সাহিত্যে ইসলামমুখিতার সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।</p>
<p><strong>তাঁর রচিত পুস্তকগুলির নাম:</strong></p>
<p>(১) ভারতে মুসলমান সভ্যতা (১৯১৪) (২) নেজামুদ্দিন আউলিয়া (১৯১৬) (৩) তুরস্কের সুলতান (১৯১৮) (৪) ভারতে ইসলাম প্রচার (৫) মুসলমানের অভ্যুত্থান (৬) সমাজ সংস্কার (৭) খগোলশাস্ত্রে মুসলমান (৮) ভূগোলশাস্ত্রে মুসলমান (৯) কনস্টানটিনোপোল (১০) আওরঙ্গজেব (১১) মোসলেম বীরাঙ্গনা (১২) কোরআনে স্বাধীনতার বাণী (১৯৩৯) (১৩) ইসলামের উপদেশ (১৪) ইসলামের পুণ্য কথা প্রভৃতি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি বই বিভিন্ন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল; স্বতন্ত্র বই আকারে এখনো প্রকাশিত হয় নি। তাঁর &#8216;নেজামুদ্দিন আওলিয়া&#8217; গ্রন্থের ভূমিকায় নিম্নোক্ত গ্রন্থাবলীর উল্লেখ পাওয়া যায়: &#8216;শিল্পক্ষেত্রে মুসলমান&#8217;, &#8216;মুসলমান আমলে হিন্দুর অধিকার&#8217; প্রভৃতি। এছাড়া &#8216;নিম্নশিক্ষা ও শিক্ষাকর&#8217; (প্রথম সংস্করণ ১৯৪০) প্রভৃতি পুস্তিকার ও অসংখ্য ভাষণ এখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে।</p>
<p>&#8216;ভারতে মুসলমান সভ্যতা&#8217; তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি। বইটির মোট অধ্যায় সংখ্যা দশ। মুসলমান শাসনকালে ভারতে কি কি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল মুনীরুজ্জামান তার যথাযথ উল্লেখ করেছেন এ বইটিতে। মুসলমান সভ্যতা ভারতকে নানা দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। স্থাপত্য বিদ্যা, শাসন-ব্যবস্থা, বিদ্যাশিক্ষার বহুল বিস্তার এবং সাহিত্য সাধনার পথ সুগম করে মুসলমান রাজা-বাদশারা বিশ্বের দরবারে ভারতকে কিভাবে সমুন্নত করে তুলেছিলেন, গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গীর সাহায্যে যথেষ্ট শ্রম স্বীকার করে মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী তার বিশ্লেষণ করেছেন।</p>
<p>&#8216;ভারতে মুসলমান সভ্যতা&#8217; গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের তিনি বড়ো আশা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর সে আশা সফল হয় নি। কবি গোলাম মোস্তফা পরিচালিত &#8216;নও বাহার&#8217; পত্রিকায় গ্রন্থটির কয়েক অধ্যায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। মুনীরুজ্জামানের ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং রচনারীতিও বলিষ্ঠ। &#8216;ভারতে মুসলমান সভ্যতা&#8217; গ্রন্থটি থেকে তার কিছু নমুনা উদ্ধৃত করা হল:</p>
<p>&#8220;অনেক পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ ও তাঁহাদের পদানুসরণকারী এতদ্দেশীয় লেখকগণ ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান জাতিকে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পরম শত্রু এবং তাদের প্রতি নিতান্ত অনুদার বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহারা লিখিয়া গিয়াছেন মুসলমান শাসনাধীন ভিন্ন জাতীয় প্রজা সাধারণের প্রতি মুসলামন নরপতিগণ কঠোর ব্যবহার করিতেন। তাহাদিগকে তাহাদের প্রাপ্য অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখিতেন।&#8221;</p>
<p>&#8220;ইসলামধর্ম ও কার্যক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যবহার সম্পর্কে এ উক্তি সম্পূর্ণ বিপরীত। মুসলমানগণ ভিন্ন জাতীয় প্রজা সাধারণকে ধর্মে-কর্মে ও রাজ্যের ব্যাপারে যেরূপ স্বাধীনতা ও উচ্চাধিকার প্রদান করিয়াছিলেন জগতের ইতিহাসে তাহার দৃষ্টান্ত বিরল।&#8221; উর্দু ভাষায় প্রকৃত বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে একমাত্র মৌলানা শিবলী নোমানীই ইসলামের ইতিহাস রচনা করেছেন। বাংলা ভাষায় ইসলামের ইতিহাস রচনার ব্যাপারে মৌলানা শিবলী নোমানীই ছিলেন মুনীরুজ্জামানের আদর্শ।</p>
<p>T.W. Arnold-এর Preaching of Islam গ্রন্থের আদর্শে ও অনুসরণে মৌলানা মুনীরুজ্জামান তাঁর &#8216;ভারতে ইসলাম প্রচার&#8217; গ্রন্থটি রচনা করেন। ভারতে ইসলাম প্রচার সম্পর্কিত ব্যাপারে হিন্দুরা যেভাবে ইসলাম বিরোধী মনোভাব ও আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা পেয়েছে, মৌলানা মুনীরুজ্জামান এই বইটিতে তা খণ্ডন করবার যথাসাধ্য প্রয়াস পেয়েছেন।</p>
<p>হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে যে পার্থক্য ও বিরোধ তার মূর্ত ও জীবন্তরূপ আমরা দেখি শিবাজী ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে। মুনীরুজ্জামান তাঁর &#8216;আওরঙ্গজেব&#8217; গ্রন্থে এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক এবং আওরঙ্গজেবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিচার করেছেন।</p>
<p>হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর সমসাময়িককালে এবং তার পরেও মুসলিম বীরাঙ্গনাগণ কিভাবে যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশগ্রহণ করেছেন এবং পুরুষদের সুখ-দুঃখের অংশভাগী হয়েছেন তার বর্ণনা করে বাঙালী মুসলিম মহিলারাও যাতে সেভাবে অনুপ্রাণিত হন, তার ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন তাঁর &#8216;মোসলেম বীরাঙ্গনা&#8217; বইটিতে। মুসলমানের সর্বাঙ্গীন উন্নতি ও প্রতিষ্ঠা কামনাই ছিল তাঁর সাহিত্যিক জীবনের স্বপ্ন ও সাধ, কিন্তু তাদেরকে যথারীতি প্রতিষ্ঠা করার সাধ্য বোধ হয় তাঁর ছিল না।</p>
<p>মৌলানা মুনীরুজ্জামান সুধাকর দলের মুখপাত্র মৌলবী মেয়রাজুদ্দীন ও পণ্ডিত রিয়াজউদ্দিন মাশহাদীর স্নেহের পাত্র ছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জীবনে এঁদের যথেষ্ট প্রভাব পড়েছিল। ১৯১১ সালে &#8216;বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি&#8217;র গঠন ব্যাপারে তিনিই প্রধান উদ্যোগী ছিলেন এবং বাঙালী মুসলমানকে সচেতন করার জন্যে জীবনের ব্রত হিসেবে সাংবাদিকতা গ্রহণ করেছিলেন।</p>
<p>তিনি প্রথমে সাপ্তাহিক &#8216;সোলতান&#8217; এবং পরে দৈনিক &#8216;সোলতান&#8217; সম্পাদনা করেন। প্রথমে &#8216;মিহির ও সুধাকর&#8217;-এ লিখেই তিনি সাহিত্যিক খ্যাতি অর্জন করেন। পরে &#8216;আল্- ইসলাম&#8217; (১৯১৫-২১) প্রভৃতি সেকালের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সমাজ সম্বন্ধে বহু মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেন। ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে তিনি দৈনিক &#8216;আমীর&#8217; নামক পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। মুনীরুজ্জামান ছিলেন প্যান ইসলামাবাদী। কি করলে মুসলিম জাতি আবার হৃত গৌরব ফিরে পাবে সে চিন্তাই তাঁর মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল। তাঁর সমগ্র সাহিত্য কীর্তির মধ্যে তাঁর চিন্তার এ বলিষ্ঠ ধারা সুস্পষ্ট হয়ে রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দীন মোহাম্মদ গঙ্গোপাধ্যায় </strong>(১৮৫৩-১৯১৬):</p>
<p>দীন মোহাম্মদ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন হিন্দু। তাঁর নাম ছিল মনোরঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়। এ কুলীন ব্রাহ্মণ সন্তান বরিশাল জেলার নথুল্লাবাদ গ্রামের বিখ্যাত গাঙ্গুলী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা জেলার আড়াই হাজার থানার অন্তর্গত নোয়াগাঁও গ্রামের মৌলানা ফৈজদ্দিন লস্করের নিকট ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং সেই গ্রামে বহু বৎসর বাস করেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর মৌলভী দীন মোহাম্মদ গঙ্গোপাধ্যায় নামে পরিচিত হন। দীন ইসলাম সম্পর্কে তিনি ভালো বক্তৃতা করতে পারতেন। পাবনা জেলার সুজানগর থানার অন্তর্গত তাড়াবাড়িয়া গ্রামে ১৯১৬ সালে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। &#8216;ক্রুসেড ও জেহাদ&#8217; (১ম খণ্ড) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এটি ১৩১৫ সাল অর্থাৎ ১৯০৮ খ্রীস্টাব্দে ৬নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা থেকে আবদুল লতিফ কর্তৃক সামযন্ত্রে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। &#8216;ক্রুসেড্ ও জেহাদ&#8217;  বইটি একটি ইতিহাসভিত্তিক রচনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শেখ আবদুল জব্বার </strong>(১৮২৮-১৯১৮);</p>
<p>ইসলামী ইতিহাস ও তমদ্দুনমূলক রচনা শাখায় ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার অন্তর্গত বনগ্রামনিবাসী শেখ আবদুল জব্বারের নাম উল্লেখ করবার মতো। ছাত্র অবস্থাতেই শেখ আবদুল জব্বারের প্রবন্ধাদি &#8216;মিহির ও সুধাকর&#8217; এ প্রকাশিত হতো। এ পর্যায়ে তাঁর লেখা-</p>
<p>১. &#8216;মক্কা শরীফের ইতিহাস&#8217; (১৩১৩ সাল-১৯০৬ খ্রীঃ) ২. &#8216;ইসলাম চিত্র ও সমাজ চিত্র&#8217; (আশ্বিন, ১৩১৪ সাল-১৯০৭ খ্রীঃ) ৩. &#8216;মদিনা শরীফের ইতিহাস&#8217; (১৩১৪ সাল) ৪. &#8216;ইসলাম সঙ্গীত&#8217; (১৩১৫ সাল, ১৯০৮ খ্রীঃ) ৫. &#8216;আদর্শ রমণী&#8217;-১ম ভাগ (১৩১৬ সাল, ১৯০৯ খ্রীঃ) ৬. &#8216;জেরুজালেম বা বয়তুল মকাদ্দাসের ইতিহাস&#8217; (১৩১৭ সাল, ১৯১০ খ্রীঃ) ৭. &#8216;আদর্শ রমণী&#8217;-দ্বিতীয় ভাগ (১৩১৯ সাল, ১৯১২ খ্রীঃ) ৮. &#8216;হজরতের জীবনী&#8217; (১৩২০ সাল, ১৯১৩ খ্রীঃ) ৯. &#8216;নূরজাহান বেগম&#8217; (১৯১৩ খ্রীঃ) ১০. &#8216;দেবী রাবেয়া&#8217; (১৯১৩ খ্রীঃ) এবং ১১. &#8216;গাজী&#8217; (১৩২৪ সাল, ১৯১৭ খ্রীঃ) প্রভৃতি অনেক কয়টি পুস্তকের সাক্ষাৎ পাই।</p>
<p>অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন তাঁর &#8216;বাংলা সাহিত্য মুসলিম সাধনা&#8217; ২য় খণ্ডে &#8216;আদম- হাওয়া&#8217; ও &#8216;স্বপ্ন বিচার&#8217; নামক আরও দুটি বইয়ের নাম করেছেন এবং তৎপ্রণীত &#8216;হজরতের জীবনী&#8217; ও &#8216;দেবী রাবেয়া&#8217;র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পাঠ্য তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ শেখ আব্দুল জব্বার সম্পর্কে বলেনঃ তিনি সাহিত্যের জন্য কি করিয়া গিয়াছেন, তাহা আমি না বলিলেও তাঁহার অবদানরাজি চিরকাল ঘোষণা করিবে। আমাদের সমাজে তিনি একজন অদ্ভুত লোক ছিলেন।&#8221; (সাধনা, চট্টগ্রাম)</p>
<p>&#8216;দেবী রাবেয়া&#8217;র ভূমিকায় সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী লিখেছেনঃ &#8220;বঙ্গ সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত খ্যাতনামা গ্রন্থকার ও সুলেখক মৌলভী শেখ আব্দুল জব্বার সাহেব মনোহারিণী ভাষায় সরস বর্ণনায় মহাতপস্বিনী রাবিয়া দেবীর মধুর জীবন চরিত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তাঁহার গ্রন্থ পাঠ করিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছি।&#8221;</p>
<p>সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে ইসলামের খেদমত করা শেখ আবদুল জব্বারের ব্রত ছিল। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ও প্রকৃতি থেকে তা সহজেই হৃদয়ঙ্গম করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মুন্সী আবদুল লতিফ</strong></p>
<p>মুন্সী আবদুল লতিফ বর্ধমান জেলার আউসগ্রাম থানার অধীন জামতাপাড়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তিনি উনিশ শতকের সাত কি আট দশকের দিকে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩৬ সালের ৩১শে জানুয়ারি। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশে তিনি একজন কংগ্রেসভক্ত জাতীয়তাবাদী মুসলমান ছিলেন। তা সত্ত্বেও সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানের সেবায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ &#8216;জোলেখা&#8217; ১৯১০-১১ সালে প্রকাশিত হয়। কোরআনের সূত্র ধরে তিনি এ গ্রন্থে ইউসুফ- জোলেখার অমর প্রেমের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ &#8216;কোরআনের উপাখ্যান&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯১৬-১৭ সালে। আবদুল লতিফের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি &#8216;ঐতিহাসিক চরিত্র জেন-নেসা বেগম&#8217; বাংলা ১৩৩৫ সাল মোতাবেক ইংরেজি ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ হিন্দু লেখক আওরঙ্গজেব-দুহিতা জেবুন নিসার চরিত্রে যে দোষারোপ করেন, আবদুল লতিফ ঐতিহাসিক তথ্য ও যুক্তি তর্কের সাহায্যে তা খণ্ডন করেন। তাঁর এ বইটিতে গবেষকের শ্রমশীলতা ও নিষ্ঠার ছাপ রয়েছে। এছাড়া &#8216;আল এসলাম&#8217; পত্রিকাতে তাঁর লেখা &#8216;মোস্তফা চরিতালোচনা&#8217; বছর দেড়েক ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। আবদুল লতিফের ভাষা ছিল মার্জিত সরল এবং সাবলীল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কাজী আকরাম হোসেন </strong>(১৮৯৬-১৯৬২):</p>
<p>বাংলা ভাষায় যাঁরা ইসলামের ইতিহাস ও ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তাঁদের সঙ্গে খুলনার কাজী আকরাম হোসেনের নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর সুবিখ্যাত &#8216;ইসলামের ইতিহাস&#8217; রচনারীতির দিক থেকে ক্লাসিকের মর্যাদা পাবার যোগ্য। আরব জগতে ইসলামের উদ্ভবকাল থেকে শুরু করে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে স্পেন ও ভারতে কিভাবে ইসলামের বিস্তার সম্ভব হয়েছে কাজী আকরাম হোসেন ঐতিহাসিকের সততা এবং সাহিত্যিকের মন নিয়ে তার বিশদ এবং মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন। &#8216;ইসলামের ইতিহাস&#8217; তাঁর হাতে যথারীতি সাহিত্য হয়ে উঠেছে।</p>
<p>এছাড়া &#8216;যুগবাণী&#8217; নামক কাব্য গ্রন্থে তিনি ইকবালের কবিতার অনুবাদ করেন। মৌলানা জালালুদ্দীন রুমীর বিখ্যাত &#8216;মসনবী&#8217; গ্রন্থের কিয়দংশের কাব্যানুবাদ (১৯৪৬) এবং শেখ সা&#8217;দীর &#8216;করীমা&#8217; বা &#8216;পাদনামা&#8217;র কাব্যানুবাদ (১৯৪৬) বাংলা ভাষায় কাজী আকরাম হোসেনের উল্লেখযোগ্য দান। তিনি সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে শিক্ষা বিভাগে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন। সরকারী চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে খুলনা আর. কে. গার্লস কলেজে তিন বছর অধ্যক্ষের কাজ করেন। সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করে কাজী আকরাম হোসেন ঢাকায় হোসেনী দালান এলাকায় নিজ বাসভবনে ১৯৬২ সালে এন্তেকাল করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গিরিশচন্দ্র সেন</strong>(১৮৩৪-১৯১০):</p>
<p>ব্রাহ্মধর্মের মধ্যে নববিধানের প্রবর্তনকারী ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন তাঁর কয়েকজন অনুবর্তীকে বিভিন্ন আলোচনায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এঁদের মধ্যে গিরিশচন্দ্র সেন এবং গৌরগোবিন্দ রায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। গিরিশচন্দ্র ইসলামের সাধনা ও সংস্কৃতির আলোচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ঢাকা জেলার পাঁচদোনা গ্রামে ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দে গিরিশচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন এবং পরিণত বয়সে ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দে মারা যান। গিরিশচন্দ্রই সর্বপ্রথম কোরআন শরীফের সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ (১৮৮১-৮৬) এবং মিল্কাত শরীফের প্রায় অর্ধাংশের অনুবাদ প্রকাশ করেন।</p>
<p>গিরিশচন্দ্র ইসলামী বিষয় সম্পর্কিত আলোচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তাঁর গুরু কেশবচন্দ্র সেনের নির্দেশে ও অনুপ্রেরণায়। এ বিষয়ে কেশব সেনও ব্রাহ্মধর্মের আদি প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবেন। ব্রাহ্মধর্ম হিন্দু, খ্রীষ্ট ও&#8217; ইসলাম ধর্মের এক অপরূপ সমন্বয়। ভারতে এ ধর্ম সমন্বয়-সাধন-মানসে উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দূরদর্শী ও মুক্তবুদ্ধি রামমোহন প্রাণপণ সংগ্রাম করেছিলেন এবং হিন্দু, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কিত বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেছিলেন।</p>
<p>হিন্দু ও খ্রীষ্টান শাস্ত্র সম্বন্ধে রাজা রামমোহন রায় যে-সব আলোচনা করেছিলেন তার অধিকাংশই এখনও রক্ষিত আছে। কিন্তু তাঁর মুসলিম শাস্ত্রাদি সম্পর্কিত আলোচনা আমাদের হস্তগত হয়নি। তবু তাঁর &#8216;তোহফাতুল মুয়াহেদীন&#8217; গ্রন্থে এবং তাঁর রচনার নানাস্থানে ইসলাম ও মুসলমান সম্বন্ধে বিক্ষিপ্ত উক্তি ও আভাস-ইংগিত থেকে তাঁর চিত্তের উপরে মুসলিম সাধনার প্রভাবের স্বরূপ অনেকখানি বুঝতে পারা যায়। তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতীক উপাসনার প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা এবং খ্রীষ্টান সমাজের ত্রিত্ববাদের প্রতিও তার বিরূপতার মূলে কোরআনের শিক্ষাই সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে।</p>
<p>ব্রাহ্মরা নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক এবং স্রষ্টায় বিশ্বাসী। ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে মুসলমানদের সঙ্গেই ব্রাহ্মদের যথেষ্ট মিল রয়েছে। মুসলমান ভক্ত সাধকদের চরিত্রের সঙ্গে ব্রাহ্মরা তাদের জীবনের ঘনিষ্ঠ যোগ স্থাপন করতে এক সময়ে মোটেই কুণ্ঠিত ছিল না। মুসলমান ওলি-আল্লাদের তপোনিষ্ঠা, ত্যাগ স্বীকার, বৈরাগ্য, ভক্তি, প্রেমমত্ততা এবং আধ্যাত্মিক ভাব সাধনার তুলনা বড়ো বেশি পাওয়া যায় না। এঁরা মুসলমানদের গৌরবের আশ্রয় হলেও মানুষ মাত্রেরই ভক্তিভাজন। ভক্ত গিরিশচন্দ্র এঁদের জীবন- সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন এবং পুণ্যব্রতে অনুপ্রাণিত হয়েই মুসলমান তাপসদের জীবনী আলোচনা করেছেন। শারহোল কল্প&#8217;, &#8216;কল্ফোল আস্রার&#8217;, &#8216;মারফতোর রফস&#8217; এই তিনটি গ্রন্থে মুসলমান ওলি-আল্লা ও সুফী দরবেশদের জীবনচরিত বিবৃত হয়েছে। এ সব গ্রন্থের সার সংকলন করে মওলানা</p>
<p>ফরিদুদ্দিন আত্তার&#8217;তাযকেরাতুল আওলিয়া&#8217; নামক ফারসী ভাষায় একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গিরিশচন্দ্র &#8216;তাযকেরাতুল আওলিয়া&#8217; অবলম্বন করে &#8216;তাপসমালা&#8217; লেখেন। তাঁর তাপসমালা &#8216;তাযকেরাতুল আওলিয়া&#8217;র আক্ষরিক অনুবাদ না হলেও মূলত অনুবাদই। কোন কোন স্থানে ভাবানুবাদ এবং কোন কোন স্থানে আক্ষরিক অনুবাদ। তাছাড়া বাহুল্য বোধে অনেক জায়গা তিনি বাদ দিয়েই অনুবাদ করেছেন।</p>
<p>&#8216;তাপসমালা&#8217;য় ছয় খণ্ডে ছিয়ানব্বই জন ওলি-আল্লার জীবনী আলোচিত হয়েছে। ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বেই গিরিশচন্দ্রের &#8216;তাপসমালা&#8217;-রচনার কাজ শেষ হয়। প্রতি খণ্ডেরই পাঁচের অধিক সংস্করণ হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় &#8216;তাপসমালা&#8217; জনপ্রিয় হয়েছিল। বাংলা ভাষায় &#8216;তাপসমালা&#8217; রচনা গিরিশচন্দ্রের অবিস্মরণীয় দান। তিনি বাংলা সাহিত্যের সূফী দরবেশের জীবনী আলোচনা করে এ শাখার গোড়াপত্তন করেন। তাঁর পর বহু মুসলমান লেখকই মুসলিম পীর দরবেশ ও তাপসের কাহিনী রচনা করেছেন। এছাড়া গিরিশচন্দ্র সেন দিওয়ান-ই-হাফিম্, গুলিস্তা, বুস্তা, মকতুবাত-ই-মখদুম শরফউদ্দিন মুনিরী, মম্নতী-ই-রুমী, মন্তিকুত্তয়র, কিমিয়া-ই সাদাত, গুলশন-ই আস্থার পুস্তকগুলোর আংশিক অনুবাদ করেন এবং ইসলাম সম্বন্ধে নিম্নলিখিত পুস্তকগুলো মৌলিকভাবে রচনা করেন &#8216;মহা-পুরুষ মোহাম্মদ ও তৎপ্রবর্তিত এসলাম ধর্ম&#8217;, &#8216;চারিজন ধর্মনেতা&#8217; (পৃঃ ৮৮), &#8216;এমাম হাসান ও হোসায়নের জীবনী&#8217;, &#8216;মহাপুরুষ চরিত&#8217; (১ম ভাগ), &#8216;মহাপুরুষ চরিত (২য় ভাগ) (হয়তের জীবনী) এবং &#8216;চারিটি সাধ্বী মুসলমান নারী।&#8217; ভাই গিরিশচন্দ্রের ইসলাম সম্পর্কিত অনুবাদ ও মৌলিক গ্রন্থ সংখ্যা মোট একুশটি।</p>
<p>&#8216;তত্ত্বরত্নমালা&#8217; (বা তত্ত্বশাস্ত্র সম্বন্ধীয় রচনাবলী) ভাই গিরিশচন্দ্র কর্তৃক পারস্য পুস্তক &#8216;মস্তিকুত্তয়র&#8217; ও &#8216;মসনবি মৌলবী রোম&#8217; থেকে সংকলিত। সবটা অনুবাদ নয়, অনেকস্থানে মূলের ভাবমাত্র অবলম্বন করে &#8216;তত্ত্বরত্নমালা&#8217; লিখিত হয়েছে। ১৯১৪ সনে এ বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ছোট ছোট গল্পের আকারে এ গ্রন্থে নানা নীতিকথা ও শিক্ষণীয় বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এতে নীরস তত্ত্ব ছাড়াও এমন অনেক বিষয় স্থান পেয়েছে, যা চিত্তকেও প্রফুল্ল করে।</p>
<p>সুধাকর দলের সুধীবৃন্দ যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ইসলামী সাহিত্য রচনা শুরু করেছিলেন, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মধ্যেই তার উৎকৃষ্ট ফল ফলেছিল। কলকাতায় বসে এ গুণীগণ বাংলা ভাষায় ইসলাম &#8216;চার করবার এবং বাঙালী মুসলিম জনসাধারণকে হেদায়েত করে তাদের জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছিলেন। ১৮৮৭-৮৮ খ্রীষ্টাব্দে &#8216;এসলাম তত্ত্ব&#8217; প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় &#8216;মোহামেডান লিটারারী সোসাইটি&#8217; প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিছুদিন যেতে না যেতে এ লিটারারী সোসাইটির কার্যকলাপ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রসারিত করারও প্রয়াস হয়েছিল। এরই সমসূত্রে হজরত মখদুম শাহের আভাসভূমি রাজশাহীতে &#8216;আঞ্জুমানে হেমায়েতে এসলাম&#8217; এবং &#8216;নূর-অল-ঈমান&#8217; নামক সমাজ সংগঠনমূলক দুইটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। &#8216;আঞ্জুন হেমায়েতে এসলামের&#8217; প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৭১ খ্রীষ্টাব্দে আর ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ৩&#8221; &#8216;নূর-অল্-ঈমা&#8217; সমাজ। আরবের সেই বিখ্যাত &#8216;এখওয়ানোস ছাফা&#8217; নামক সমাজের অনুকরণে এবং বিদ্যানুরাগী ইংরেজ রাজপুরুষদিগের স্থাপিত &#8216;এসিয়াটিক সোসাইটি&#8217; সমাজের কিছু সাদৃশ্যে উত্তরবঙ্গে (রাজশাহীতে) &#8216;নূর-অল- ঈমান&#8217; সমাজ স্থাপিত হয়েছিল। মীর্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর পুত্র মীর্জা মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী খুব সম্ভব &#8216;নূর-অল্-ঈমান&#8217; সমাজের সম্পাদক ছিলেন। &#8216;নূর-অল-ঈমান&#8217; মাসিক পত্রিকা &#8216;নূর-অল-ঈমান&#8217; সমাজের ছিল মুখপত্র। বাংলা ১৩০৭ সালের আষাঢ় মাসে (১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে) এ মাসিক পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। মুসলমানদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের পথে নিয়ে আসাই ছিল &#8216;নূর-অল্-ঈমান&#8217; সমাজ এবং তার মুখপত্র &#8216;নূর-অল্-ঈমান&#8217; পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য। পত্রিকাটি &#8216;নূর-অল্-ঈমান&#8217; সমাজ কর্তৃক সম্পাদিত এবং মীর্জা ইউসুফ আলী কর্তৃক &#8216;শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সজ্জীকৃত&#8217; হয়।</p>
<p>এ সমাজের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য কাজ মুসলিম জগতের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মহাত্মা ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহ্র &#8216;কিমিয়া সাআদাৎ&#8217; গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ। অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন মৌলভী মীর্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী স্বয়ং। দার্শনিক ইমাম গাজ্জালীর &#8216;কিমিয়া সাআদাৎ&#8217; পাঁচ খণ্ডে রচিত। বাংলায় প্রথমত পাঁচ খন্ডের অনুবাদ সাত ভাগে প্রকাশিত হয়। পরে অবশ্য সাত ভাগকে প্রত্যেক খণ্ডের অনুগামী করে পাঁচ খন্ড করা হয়। ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দের আগেই এ অনুবাদের কাজ শেষ হয়েছিল। অনুবাদক মীর্জা ইউসুফ আলী &#8216;কিমিয়া সাআদাৎ&#8217;-এর উপযুক্ত বাংলা নাম দিয়েছেন &#8216;সৌভাগ্য স্পর্শমণি&#8217;। পাঁচ খণ্ডের অনুবাদ দেড় হাজার পৃষ্ঠায় শেষ হয়েছে। খণ্ডগুলোর নাম &#8216;দর্শন পুস্তক&#8217;, এবাদত পুস্তক&#8217;, &#8216;ব্যবহার পুস্তক&#8217;, &#8216;বিনাশন পুস্তক&#8217; ও &#8216;পরিত্রাণ পুস্তক&#8217;।</p>
<p>ইসলাম শুধু ধর্ম নয়-পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভের এবং খোদার সঙ্গে একাত্ম হবার পথ বা ব্যবহার-বিধি। মানুষ জগতে কিভাবে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হযরত মোহাম্মদ (সঃ)। সংসার পথে ধীরে ধীরে চিত্ত শান্ত ও আত্মদমন করে মনুষ্যত্ব কিভাবে বিকশিত হতে পারে, মুসলমানের ধর্ম জীবনে ইসলামের আনুষ্ঠানিক ব্যবহার-বিধিও মনুষ্যত্ব বিকাশের পথে কিভাবে সহায়ক হতে পারে, &#8216;সৌভাগ্য স্পর্শমণি&#8217;তে তার সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ছোট থেকে বড়ো হয় কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভ করে না; তার জন্য প্রয়োজন হয় সাধনার। ইসলাম প্রদর্শিত পথে সংযম, শালীনতা, চরিত্রোন্নতির পথ ধরে সোপানে সোপানে কিভাবে মানুষ তার চরম লক্ষ্য আল্লাহতে পৌছার &#8216;সৌভাগ্য&#8217; লাভ করে, তারই অনুপম ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইমাম গাজ্জালী তাঁর &#8216;কিমিয়া সাআদাৎ&#8217; গ্রন্থে। মীর্জা ইউসুফ আলী সুন্দর ও সাবলীল বাংলা গদ্যে &#8216;কিমিয়া সাআদতে&#8217;র অনুবাদ করে অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই &#8216;সৌভাগ্য স্পর্শমণি&#8217; নাম দিয়েছেন। শুধু ইসলামী বিষয়বস্তু বলে নয়, বাংলা অনুবাদ সাহিত্যেও &#8216;সৌভাগ্য স্পর্শমণি&#8217; এক মহত্তর অবদান। এছাড়া মুসলমান সমাজের উন্নতির জন্য কি কি উপায় অবলম্বন করা যায় তার ইঙ্গিত দিয়ে মীর্জা ইউসুফ আলী &#8216;দুগ্ধ সরোবর&#8217; নামেও একখানি &#8216;কওমী পুস্তিকা&#8217; প্রণয়ন ও প্রচার করেছিলেন। ১৩০৭ সালের (১৯০০ খৃঃ) &#8216;নূর-অল্-ঈমান&#8217; পত্রিকায় এ বইটির সমালোচনা হয়েছিল।</p>
<p>এ সময়েই (১৯০৩) যশোরের খড়কী নিবাসী মৌলভী মোহাম্মদ আবদুল করিম &#8216;তাসাওয়াফ&#8217; সম্বন্ধে &#8216;এরশাদে খালেকিয়া বা খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্ব&#8217; (পৃঃ ২৯৮) নামক একটি মৌলিক বই রচনা করেন। আবদুল করিম নিজের নক্শবন্দীয়া তরীকার একজন কামেল সূফী সাধক। মোহাম্মদ আবদুল করিমের &#8216;খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্বে&#8217;র মতো বাংলায় তাসাওয়াফ সম্পর্কিত সুলিখিত বই আর দ্বিতীয়টি দেখা যায় না। মোহাম্মদ আবদুল করিম ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে এন্তেকাল করেন-তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে ১৯৪৯ খৃষ্টাব্দে &#8216;খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্বের&#8217; চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয়।</p>
<p>এ ধারার অর্থাৎ &#8216;মারিফাত&#8217; বা সুফী সাধনা বিষয়ক অনেক গ্রন্থ বাঙলা ভাষায় লিখিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মুন্সী আজিমউদ্দিন রচিত &#8216;খোলাহাতুল মারিফাত&#8217; (১৮৬৮)। মোহাম্মদ মল্লিক রচিত &#8216;আখবারুল মারিফাত&#8217; (১৮৭৬)। মওলানা শামসুল হক রচিত &#8216;তালিমুদ্দীন&#8217; (৫ম সংস্করণ ১৯৬৩) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে নদীয়া শান্তিপুর নিবাসী মোজাম্মেল হকের (১৮৬০-১৯৩৩) &#8216;তাপস কাহিনী&#8217; (১৯০০ খ্রীঃ দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯১৪) এবং &#8216;মহর্ষি মনসুর&#8217; (১ম সংস্করণ, ১৮৯৮ পৃঃ ৯০) স্মরণীয়। মোজাম্মেল হক তাঁর &#8216;তাপস কাহিনী&#8217;তে &#8216;হযরত আবদুল কাদির&#8217;, &#8216;নিজাম উদ্দীন আউলিয়া, &#8216;ইমাম জাফর সাদেক&#8217;, &#8216;ইব্রাহিম আদহাম বন্ধী&#8217;, &#8216;তপস্বী ফাজিল আয়াজ&#8217;, &#8216;তপস্বী বশর হাফী&#8217; ও &#8216;দরবেশ আবু হেস্&#8217; প্রমুখ সাতজন মহাতপা আউলিয়ার জীবন কাহিনী তাঁদের ধ্যান-ধারণা, অলৌকিক তপোনিষ্ঠা ও খোদাপ্রেমের বিষয় আলোচনা করেছেন। &#8216;মহর্ষি মনসুর&#8217;, &#8216;আনাল হক&#8217; বা &#8216;অহম ব্রহ্মাম্মি&#8217; এ মহাবাণী প্রচারক মহাতাপস মনসুরের জীবন কাহিনী। অলৌকিক এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় মানুষ কতবড়ো সিদ্ধি লাভ করতে পারে, মহর্ষি মনসুরের জীবন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর সম্বন্ধে যে সব অনৈতিহাসিক গল্প ও প্রবাদ প্রচলিত আছে সেগুলো এবং একখানি উর্দু পুস্তিকার মর্ম অবলম্বন করে স্বাধীনভাবে এ গ্রন্থখানি তিনি রচনা করেছেন। গ্রন্থখানি সুখপাঠ্য। মনসুরের ধর্মোন্মত্ততা এবং উপলব্ধ সত্যের জন্যে অবিচলিত আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিবশত মোজাম্মেল হক তাঁকে সূক্ষ্মদর্শী মহামানবরূপে অঙ্কিত করছেন।</p>
<p>কেদারনাথ মিত্রের &#8216;মুসলমান ভক্তচরিত&#8217; (মাঘ ১৩৩৫ ১৯২৮ খ্রীঃ) এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মহর্ষি আবিস করণী, মহর্ষি ফাজিল আয়াজ, মহর্ষি আবু ওসমান হায়রী, মহর্ষি আবু হাফেজ, মহর্ষি ইব্রাহিম আদম, মহর্ষি হাসান বসোরী, মহর্ষি মালেক দিনার, মহর্ষি জুনিদ, মহর্ষি সরি সব্জী, মহর্ষি ইউসুফ হোসেন এবং তপস্বিনী রাবেয়া প্রমুখ এগারজন ওলি-আল্লার জীবনী &#8216;মুসলমান ভক্তচরিতে&#8217; আলোচিত হয়েছে। কেদারনাথ মিত্র এঁদের সাধনায় ও চারিত্রিক আদর্শে মুগ্ধ হয়ে ভক্তের মতো এঁদের জীবনী লিখেছেন। চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের &#8216;রাবেয়া&#8217;  গ্রন্থও উল্লেখযোগ্য। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং মোহিতলাল মজুমদার মুসলমানী অধ্যাত্মমূলক কিছু কবিতা অনুবাদ করেন।</p>
<p>মওলানা মুনীরুজ্জমান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) লিখিত ‘নেজামুদ্দীন আওলিয়া&#8217; (১৯১৬) গ্রন্থটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। খাজা নিজামুদ্দীন আওলিয়ার জীবন এবং তাঁর সাধন-কাহিনী এ গ্রন্থে মুনীরুজ্জামান লিপিবদ্ধ করেছেন।</p>
<p>বাংলা সহিত্যে বহু অনুবাদ এবং মৌলিক গ্রন্থই এ শাখাকে সমৃদ্ধ করেছে। শেখ ফজলুল করিম &#8216;ছামীতত্ত্ব&#8217; (পৃঃ ২৭) নাম দিয়ে ১৯০৩ সালে &#8216;আসবাত-উস্-হামী&#8217;র বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। নীতিভূষণ শেখ ফজলুল করিম তাঁর সমসাময়িক কালের বাঙালী মাত্রেরই নৈতিক জীবনের উন্নতি বিধান ও চিত্তশুদ্ধির জন্য বাংলা ভাষায় ইসলামের আদর্শ সাধক ও সুফীদের জীবনী রচনা করেছিলেন। &#8216;রাজর্ষি এব্রাহিম&#8217;, &#8216;বিবি রহিমা&#8217; এবং &#8216;পথ ও পাথেয়&#8217; প্রভৃতি অনেকগুলো বই তিনি এ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই লিখিছেন। অকৃত্রিম আন্তরিকতা এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণাবেগ তাঁর রচিত সাহিত্যকে ধর্মের পথে পরিচালিত করেছিল। একালের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখকদের অন্যতম শেখ ফজলুল করিম সম্পর্কে অন্যত্র আমরা বিশদ আলোচনা করেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী</strong> (১৮৬৩-১৯২৯):</p>
<p>১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে &#8216;ঈদুল আজহা&#8217; (পৃঃ ১৭৪) প্রকাশ করেন। &#8216;ঈদুল আজহা&#8217;র তত্ত্বকথাও তিনি এ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি তাঁর &#8216;মৌলুদ শরীফ&#8217; (পৃঃ ১৭৯) প্রকাশ করেন। এতে হযরতের (সঃ) জন্ম থেকে দুগ্ধপান কাল পর্যন্ত বাল্য জীবনী বর্ণিত হয়েছে। পুস্তকটি সুলিখিত।</p>
<p>সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার ধনবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার ১৯০৬ সনে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনিও জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯১১-১২ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গীয় আইন সভার সভ্য ছিলেন। পরে তিনি কেন্দ্রীয় আইন সভারও সভ্য এবং লর্ড রেনোল্ডসের মন্ত্রিসভারও সদস্য নিযুক্ত হন। মুসলমান সমাজের প্রতি নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর অকৃত্রিম দরদ ছিল। মুসলমানদের সাহিত্য ও জাতীয় সেবার সুবিধার জন্য জনৈক সাংবাদিককে তিনি একটি প্রেস কিনে দিয়েছিলেন। তাঁর কলিকাতাস্থ বাসভবনের পার্শ্বে প্রেসটি স্থাপন করা হয়েছিল। এ প্রেস থেকেই &#8216;মিহির ও সুধাকর&#8217; পত্রিকা প্রকাশিত হতো।</p>
<p>ছমিরুদ্দিন আহমদ ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর &#8216;মোহাম্মদীয় ধর্ম সোপান&#8217; ১ম খণ্ড (কান্দেমা পৃঃ ১০০) এবং দ্বিতীয় খণ্ড (নামায, পৃঃ ১৩২) প্রকাশ করেন।</p>
<p>অবিভক্ত বাংলার মুসলমান সরকারী পুলিশ কর্মচারীদের মধ্যে সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৭৬-১৯৫৬) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর &#8216;তাপসী রাবেয়া&#8217; (৩য় সংস্করণ, ১৯৩১, পৃঃ ১০৬) এ বিভাগের একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ। এখানে এমদাদ আলী তাপসী রাবেয়ার শুধু বহির্জীবনের ঘটনা বর্ণনা করেন নি। তাঁর জন্ম-মৃত্যু ও বহির্জীবনের ইতিহাস যৎসামান্য উল্লেখ করে অধিকাংশ স্থান জুড়েই তিনি তাঁর সাধনকাহিনী বর্ণনা করেছেন। খোদাপ্রেমে মশগুল হলে মানুষ কি ভাবে তাঁর &#8216;তনুমনধন জীবনযৌবন&#8217; খোদার রাহে লুটিয়ে দিতে পারে তাপসী রাবেয়ার অন্তর্জীবনের ধারাবাহিক উন্নতি বিচার প্রসঙ্গে এমদাদ আলী তার সুষ্ঠু নির্দেশ দিয়েছেন। এ বইটিকে মোটামুটি দু&#8217;ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ৬৪ পৃষ্ঠায় তাপসী রাবেয়ার জীবন স্বপ্ন ও সাধনার কথা, পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে সুফী মতবাদ এবং সুফী সাধনার তত্ত্ব বিশ্লেষিত হয়েছে। বর্ণনাভঙ্গী অত্যন্ত সাবলীল: চিন্তার স্বচ্ছতা থাকার জন্য দ্বিতীয় অংশে সুফী তত্ত্বের দুরূহ বিষয়বস্তুও বর্ণনায় সহজ গতি পেয়েছে। মুসলিম সমাজকে পটভূমি হিসেবে অবলম্বন করে তিনি ১৩৩৫ সালে (১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে) &#8216;হাফেজ&#8217; নামক একটি পত্রোপন্যাসও রচনা করেছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি &#8216;নবনূর&#8217; পত্রিকার সম্পাদনা। এ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাঙালী মুসলিম সমাজকে নানাভাবে জাগ্রত করার প্রয়াস পেয়েছেন।প্রসঙ্গক্রমে মৌলবী আযহার আলী প্রণীত এবং মোহাম্মদ কোরবান আলী সম্পাদিত &#8216;খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী&#8217;র জীবনী গ্রন্থের উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি প্রকাশিত হয় ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে এবং অষ্টম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে।</p>
<p>শেখ হাবিবুর রহমান (সাহিত্যরত্ন)-এর &#8216;ইসলাম ধর্ম তত্ত্ব&#8217; (৯২ পৃঃ) ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয়। &#8216;গুলিস্তান&#8217; (১৯৩৩), &#8216;বোস্তান&#8217; এবং আওরঙ্গজেবের জীবনেতিহাস &#8216;আলমগীর&#8217; শেখ হাবিবুর রহমানের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য-কীর্তি। ইসলামী বিষয়বস্তু ছাড়াও তিনি &#8216;কর্মবীর মুন্সী মেহেরুল্লাহ&#8217; (পৃঃ ১৫২, ১৯৩৪ খ্রীঃ) এবং &#8216;আমার সাহিত্য জীবন&#8217; শীর্ষক আত্মজীবনী রচনা করেন।</p>
<p>১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে গোলাম রসুল খোনকারের &#8216;মাজেজাত&#8217; (পৃঃ ৫৯) লিখিত হয়। মাজেজাত অর্থ অলৌকিক ঘটনাবলী। প্রত্যেক নবীই কিছু কিছু মাজেজার অধিকারী ছিলেন। এ ধরনের কিছু, মাজেজার কথা এ ছোট্ট পুস্তিকাটিতে গোলাম রহুল উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>এ শাখায় কতগুলো উল্লেখযোগ্য বই; গোলাম মোহাম্মদের &#8216;ইসলাম সার সংগ্রহ&#8217; (পৃঃ ৭৬, অনুবাদ ১৯১৩), মধুসূদন ঘোষালের &#8216;মোসলেম গৌরব&#8217; (পৃঃ ৫৬, ১৯১৪), দেওয়ান শাহ্ আবদুর রশীদ চিশতীর &#8216;জ্ঞান সিন্ধু বা গহে তাওহিদ&#8217; (পৃঃ ১৭৮, ১৯১৯) ছদরউদ্দীন আহমদের (?) &#8216;এল্মে তাছাওয়াফ্&#8217; (পৃঃ ২৪০, ২য় সংস্করণ, ১৯২৪)। এল্মে তাছাওয়াফে&#8217;র লেখকের নাম নেই, ছদরউদ্দিন আহমদের নাম প্রকাশক হিসেবে স্থান পেয়েছে। মোহাম্মদ মোবারকের (প্রকাশক) &#8216;হযরতের রচনাবলী (পৃঃ ৩২, ২য় সংস্করণ, ১৯২৪) গ্রন্থটি সম্ভবত খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ রচিত। &#8216;এসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্য&#8217; (১ম খণ্ড, ২য় সংস্করণ, ১৯২৪) গ্রন্থকারের নাম নেই; প্রকাশক মোহাম্মদী বুক এজেন্সী, কলকাতা। বাংলার মুসলমানদের ধর্ম ও নৈতিক জীবনের কল্যাণ সাধনাই ছিল এ গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য। কবি গোলাম মোস্তফাকৃত &#8216;এখওয়ানুস সাফা&#8217;র অনুবাদ &#8216;জয়- পরাজয়&#8217; এবং &#8216;মোসাদ্দাস-ই-হালি&#8217;র ক্যাবানুবাদও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য।</p>
<p>&#8216;মোস্তফা চরিতে&#8217;র লেখক মৌলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর লেখা &#8216;সমস্যা ও সমাধান&#8217; (১৯২৬?) এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করার মতো বই। তাঁর সমস্যা ও সমাধানে অবশ্য ইসলামের তত্ত্বকথার আলোচনা নেই, কিন্তু ইসলামী সমাজব্যবস্থায় ইসলাম ধর্মমতের পরিপ্রেক্ষিতে সুদ, ব্যাঙ্কিং, সঙ্গীত ইত্যাদি নানা সমস্যামূলক আলোচনা ও তার সুষ্ঠু সমাধানের ইঙ্গিত তিনি দিতে পেরেছেন। এ কালের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এদিক থেকে প্রবন্ধকার মৌলানা আকরাম খাঁর দান অবিস্মরণীয়।</p>
<p>এ পর্যায়ে বহু ভাষাবিদ সাধক ও পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি তিনি আজীবন ইসলাম ধর্মকে বুঝবার এবং তার সেবা করবার যথাযোগ্য প্রয়াস করে এসেছেন। সেই সাধনার বশবর্তী হয়ে ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে তিনি বহু প্রবন্ধাদি রচনা করেছেন। তাঁর &#8216;ইসলাম ও বিশ্বসেবা&#8217; &#8216;ইসলামে নারীর ধর্ম সম্বন্ধীয় অধিকার&#8217;, &#8216;ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ&#8217;, &#8216;ইসলামী সমাজের রূপ&#8217;, &#8216;ইসলাম-মানবতার মুক্তিদূত&#8217; প্রভৃতি বিভিন্ন সময়ে রচিত বিশটি প্রবন্ধের একটি মূল্যবান সংকলন &#8216;ইসলাম প্রসঙ্গ&#8217; নামে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারী ১৯৬৩। রয়াল সাইজের ১২৬ পৃষ্ঠার বই। বাংলায় ইসলাম সম্পর্কে যত আলোচনা হয়েছে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি উল্লেখযোগ্য এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত বোখারী শরীফেরও তিনি অংশবিশেষ অনুবাদ করেন।</p>
<p>ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের (জন্ম ১৯০৬ সাল) &#8216;বঙ্গে সুফী প্রভাব&#8217; (পৃঃ ২৬০, ১৯৩৩) এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। &#8216;বঙ্গে সুফী প্রভাব&#8217; গবেষণামূলক গ্রন্থ। এতে সূফী মতবাদের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা আছে। শরীয়তী ইসলাম এবং সূফী মতবাদের সামঞ্জস্য ও পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশে সূফী মতবাদ কিভাবে বিস্তার লাভ করেছিল এবং এখনও বাঙালী মুসলমানের জীবনে সূফী মতবাদ কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে আছে তার নির্দেশ এনামুল হক এ বইটিতে দিয়েছেন। এরই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য এনামুল হকের &#8216;পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম&#8217; (পৃঃ ১৫০, ১৯৫৮) বইটি। এই বইটিতে তিনি বাংলাদেশে মুসলমানদের প্রথম আগমন থেকে শুরু করে এদেশে মুসলিম রাজত্বের সময়কার উল্লেখযোগ্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং বাংলাদেশে এত অধিক সংখ্যক মুসলমান কেন হলো তারও একটি মীমাংসায় পৌঁছবার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>ইসলামী বিষয়বস্তু সম্বন্ধে অন্যান্য বই: আবদুল্লাহ্ সুহরওয়ার্দীর &#8216;Sayings of Muhammad&#8217;-এর উপরে ভিত্তি করে রচিত মোহাম্মদ ইয়াছিনের &#8216;ইসলামের বিশেষত্ব&#8217; (৫৬ পৃঃ ১৯৩০?) ও এ. এ. রহমানী রচিত &#8216;সওগাতে মোসলেম&#8217; (৩৪ পৃঃ ১৯৩৫)। মোহাম্মদ ইয়াছিনের &#8216;ইসলামের বিশেষত্ব&#8217; এক মৌলবী সাহেব এবং এক শিষ্যের মধ্যে প্রশ্নোত্তর ছলে লিখিত। মৌলবী সাহেব তাঁর শিষ্যকে ইসলামের বিশেষত্ব কোথায় তা শেখাবার প্রয়াস পেয়েছেন। আর এ. এ. রহমানীর &#8216;সওগাতে মোসলেম&#8217; আহমদীয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রচার পুস্তিকা। খুলাফা-ই-রাশেদীনের লেখক এ. জেড. নূর আহমদের &#8216;মোহাদ্দেস প্রসঙ্গ&#8217; (৩২ পৃঃ ১৯৩৭), &#8220;বোখারী&#8217;, &#8216;নয়ি&#8217;, &#8216;আবু দাউদ&#8217;, &#8216;ইবনে মাজা,&#8217; &#8216;মুসলিম ও তিরমিজি&#8217; প্রভৃতি হাদিস বেত্তাদের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী সংকলন। এ প্রবন্ধটি ১৩৩৪ সনে ঢাকা থেকে প্রকাশিত মুসলিম সমাজের মুখপাত্র &#8216;শিখায়&#8217; প্রকাশিত হয় এবং পরে পুস্তকাকারে বের হয়। এ. জেড. নূর আহমদের অন্যান্য বই: &#8216;হযরতের কথামৃত&#8217; (নবী আকরামের বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত খোতবার অনুবাদ), &#8216;কুরআনের কথা,&#8217; &#8216;নয়া যামানা&#8217; এবং &#8216;রাষ্ট্রগুরু জামাল উদ্দীন আফগানী&#8217; ইত্যাদি।</p>
<p>মৌলানা রুমীর মসনবীর গদ্যানুবাদ করেন মৌলবী আযহার আলী বস্তিয়ারী। এ অনুবাদ গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৯৬। এর এগারটি সংস্করণ হয়েছিল।</p>
<p>খোন্দকার আমীনউদ্দিন আহমদের &#8216;দাওয়াতে এসলাম&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দে (প্রথম সংস্করণ, ২৩৫ পৃঃ)। ১৯০৯ সনে কলকাতা টাউন হলে ভারত ধর্ম মহামণ্ডলী (Parliament of religions)-এর এক অধিবেশন হয়। উক্ত অধিবেশনে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে প্রবন্ধ পড়ার ভার পড়ে খাজা কামালুদ্দীন, সালাহুদ্দীন খোদাবশ্, মীর্জা আবুল ফজল এবং খোন্দকার আমীনউদ্দিন আহমদের ওপর। খোন্দকার আমীনউদ্দিন আহমদ ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে উক্ত অধিবেশনে যে প্রবন্ধটি পড়েছিলেন, তারই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ তাঁর &#8216;দাওয়াতে এসলাম&#8217;। প্রাচীনকাল থেকে দুনিয়াতে যত ধর্ম প্রচারিত হয়েছে সেগুলোরই স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে তিনি হযরত মোহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক প্রচারিত ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন। যে যুগে প্রাচীন ধর্মগুলো পৃথিবীতে এসেছিল, তার প্রত্যেকটি জন্ম নিয়েছিল যুগের প্রয়োজনে। কালক্রমে মানুষের হাতে পড়ে সে সব ধর্মের বিকৃতি ঘটে। ইসলাম কোনযুগের ধর্ম নয়, মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির, দ্বার মুক্ত করে দিয়ে যুগাতীত কালের ধর্ম হিসেবে ইসলাম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা করে আমীনউদ্দীন ইসলামের স্বাভাবিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিই অমুসলমানদের সহানুভূতিসম্পন্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাঁর &#8216;দাওয়াতে এসলাম&#8217;-এ। ঢাকার আমিনাবাদ নিবাসী মোহাম্মদ মোজাফফার হোসেন একজন প্রবন্ধকার। তাঁর &#8216;ইসলামের পার্থিব উন্নতি&#8217; (জানুয়ারী ১৯৪২), &#8216;পর্দাতত্ত্ব&#8217; (২য় সংস্করণ, অক্টোবর ১৯৪২) এবং &#8216;পরিবার নহে কারাগার&#8217; মূলত সমাজতত্ত্বমূলক রচনা।</p>
<p>আলহাজ কাজী মৌলানা মোঃ গোলাম রহমানের &#8216;মকছদোল মো&#8217;মেনীন বা বেহেস্তের কুঞ্জী&#8217;র (১ম ও ২য় খণ্ডের) চৌদ্দটি সংস্করণ হয়। এই বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৩২। কোরআন হাদীসের নানা উদ্ধৃতির সাহায্যে ইসলামের ব্যাখ্যা করার প্রয়াস এবং ইসলামের &#8216;আরাকান&#8217; সম্বন্ধে সাধারণের শিক্ষাপোযোগী আলোচনা আছে এ বইটিতে।</p>
<p>আযহার আলী প্রণীত &#8216;খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী&#8217;র সম্পাদক মোহাম্মদ কোরবান আলীর &#8216;উমদাতুল ইসলাম&#8217; (পৃঃ ৩৪৩)-এর চতুর্থ সংস্করণ বের হয় ১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দে। ইসলামের ব্যবহার-বিধি, নামায, রোজা, হজ, যাকাত এবং ইসলামের নিয়মকানুন শিক্ষা দেবার মহৎ উদ্দেশ্যে এ বইটি রচিত।</p>
<p>&#8216;কোরআনের আলো&#8217; প্রকাশের কিছুদিন পরে মুহম্মদ আযহারুদ্দীন ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দে &#8216;তাঁর &#8216;হাদীসের আলো&#8217; গ্রন্থ (পৃঃ ৩০৪) প্রকাশ করেন।</p>
<p>&#8216;হাদীসের আলো বা হাদীস শরীফের বঙ্গানুবাদ&#8217; সিয়া সেত্তাহ্, মিশকাতুল মাসাবিহ্, জামায়েস্ সাগীর প্রভৃতি হাদীসের বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো থেকে মোট এক হাজার পঁচিশটি সহি হাদিসের সুন্দর ও সরল বঙ্গানুবাদ। মহাপুরুষের উদার বাণী মানবজাতির সাধারণ সম্পত্তি। তাতে মানবমাত্রেরই সমান অধিকার। এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আযহারুদ্দীন হযরতের সহস্রাধিক মূল্যবান বাণীকে আরবী থেকে বাংলায় নিয়ে এসে বাংলা ভাষাভাষীরই কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। এছাড়া &#8216;আরবের আলো&#8217; নামেও তাঁর আর একটা গ্রন্থ পাওয়া যায়। &#8216;আরবের আলো&#8217; হযরতের জীবনী। &#8216;কোরআনের আলো&#8217; &#8216;হাদীসের আলো&#8217; ও &#8216;আরবের আলো&#8217; গ্রন্থত্রয়ীর সাহায্যে মুহম্মদ আযহারুদ্দীন ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সংস্কৃতি সম্বন্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে চেয়েছেন, তা পরিস্কার বোঝা যায়।</p>
<p>এ পর্যায়ে সৈয়দ আবদুর রহমান নামক আর একজন লেখকের নাম পাওয়া যায়। তিনি জামালপুর জেলার জোকারপড়া গ্রামের অধিবাসী। এ পর্যায়ে তাঁর দৃষ্টি গ্রন্থের পরিচয় পাই-&#8216;এনায়েত রহমান&#8217; এবং &#8216;উমদাতল মসায়েল&#8217;। এগুলো জনসাধারণকে ইসলামী শরা-শরীয়ত শেখানোর উদ্দেশ্যে রচিত। &#8216;উমদাতল মসায়েল&#8217; প্রথম ভাগ কলকাতা ১৫৯নং কড়েয়া রোডস্থিত রেয়াজুল ইসলাম প্রেসে মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ কর্তৃক ১৩১৯ সালে (১৯০৬ খ্রীঃ) মুদ্রিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>পবিত্র কোরআনের অনুবাদ ও মর্মবাণী সংকলন;</strong></p>
<p>১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় কোরআন শরীফের অনুবাদ প্রকাশে কোনো মনীষীরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়নি। এ গুরুকর্তব্যভার বহন করার জন্যে সর্বপ্রথমে এগিয়ে এসেছিলেন-ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ গিরিশচন্দ্রের কোরআনের অনুবাদের চতুর্থ সংস্করণের গোড়াতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে লিখেছেন, &#8216;গিরিশচন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনা ও অনুপম সিদ্ধিকে জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে।&#8217;</p>
<p>পবিত্র কোরআনের ও অন্যান্য ইসলামী ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশের গুরুদায়িত্ব গিরিশচন্দ্রের ওপর ন্যস্ত করার সময় কেশবচন্দ্র প্রার্থনা করেছিলেন-&#8216;তোমার জীবন মহাপুরুষ মোহাম্মদের স্পিরিটে মহিমান্বিত ও অনুপ্রাণিত হউক।&#8217; তাঁর ধর্মজীবনের সব সাধনা ও সিদ্ধির মধ্যে এ প্রার্থনাটি সার্থক হয়ে আছে।</p>
<p>১৮৮১-১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে গিরিশচন্দ্রের কোরআনের সঠিক বাংলা অনুবাদ মুদ্রিত হয় এবং সম্পূর্ণ অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে। এ অনুবাদ গ্রন্থ মূল আরবী ছাড়া প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণের সমস্ত মুদ্রণ ব্যাপারেই গিরিশচন্দ্র তত্ত্বাবধান করেন। তাঁর অনূদিত কোরআনের চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর বহু পরে, ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে।</p>
<p>কোরআন অনুবাদ করে বাংলায় চার কোটি মুসলমান জনসাধারণকে তাদের আল্লাহর রসূলের ও কোরআনের সঙ্গে পরিচিত করেছেন-সর্ব প্রথম ভাই গিরিশচন্দ্র সেনই। এ মহান পুণ্য ব্রত-সাধনায় তিনি ছিলেন অগ্রদূত। পাদ্রী উইলিয়াম গোল্ডস্যাকও কোরআন শরীফের পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ করেন।</p>
<p>গিরিশচন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তার বহু পরে কোরআনের আংশিক অনুবাদ করেন মৌলবী মুহম্মদ নঈমুদ্দীন। নঈমুদ্দীন ১৮৩২ খৃষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত করটিয়া সবুজগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২৬ খৃষ্টাব্দে ইহধাম ত্যাগ করেন। আরবী, ফারসী, বাংলা এবং উর্দু প্রভৃতি ভাষায় তাঁর দখল ছিল। তিনি মুর্শিদাবাদ, এলাহাবাদ, জোনপুর, গাজীপুর দিল্লী, আগ্রা প্রভৃতি অঞ্চল ভ্রমণ করে সেখানকার আলেম ও মোহাদ্দেসের সংস্পর্শে এসে ইসলামী শরা-শরিয়াত ও শাস্ত্রাদি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী হন। ভাই গিরিশচন্দ্রের পরে মুসলমানদের মধ্যে তিনিই বোধহয় কোরআন শরীফের প্রথম সার্থক অনুবাদক। তিনি প্রথম থেকে তেইশ পারার অনুবাদ করার পর ইেেন্তকাল করেন। তাঁর এ অনুবাদ জলপাইগুড়ি জেলার খানবাহাদুর রহিম বক্স সাহেবের চেষ্টায় মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। কোরআনের প্রথম তেইশ পারার অনুবাদের পূর্বেই তিনি আমপারার অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কোরআনের অনুবাদ সঠিক হওয়া সত্ত্বেও সুখপাঠ্য। জানা যায় তিনি বোখারী শরীফেরও অনুবাদ করেছিলেন।</p>
<p>&#8216;জব্দাতুল মসায়েল&#8217; রচনা মৌলবী নঈমুদ্দীনের অন্যতম মহৎ কীর্তি। &#8216;জব্দাতুল মসায়েল&#8217; (১ম ও ২য় খণ্ড) প্রথম সংস্করণ ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতাস্থ বি.পি.এম. প্রেসে মুদ্রিত হয়। ময়মনসিংহ জেলার জমিদার হাফেজ মাহমুদ আলীর অর্থানুকূল্যে &#8216;জব্দাতুল মসায়েল&#8217; গ্রন্থের প্রকাশ সম্ভব হয়। &#8216;জব্দাতুল মসায়েল&#8217; একটি সুবৃহৎ গ্রন্থ। প্রথম খণ্ডের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৮৭ এবং দ্বিতীয় খণ্ডের ৩৫৫। এটির প্রথম খণ্ড দশম সংস্করণ এবং দ্বিতীয় খণ্ড তৃতীয় সংস্করণ ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। &#8216;জব্দাতুল মসায়েল&#8217; অর্থাৎ মুসলমানী ব্যবস্থাসমূহের সার সংগ্রহ প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে লিখিত। এটি নির্দিষ্ট কোনো একটি পুস্তকের অনুবাদ নয়, শরে বেকায়া, হেদায়া, কাজীখান, জামেয়র রমুজ, কামুজ ফতোয়াই আলমগীরী, দায়রোল মোখতার প্রভৃতি বিখ্যাত গ্রন্থের সংকলন। বাংলা ভাষায় ইসলামী শরা-শরীয়ত তথা বিধিবিধান সম্পর্কিত এটি একটি অমূল্য পুস্তক।</p>
<p>&#8216;এনসাফ্&#8217; &#8216;আদেল্লায় হানিফীয়া&#8217;, &#8216;কালেমাতুল কোফর&#8217;, &#8216;সেরাতুল মোস্তাকিম&#8217;, &#8216;এছবাতে আখেরজ্জোহর&#8217;, &#8216;রফা-এদায়েন&#8217;, &#8216;ফতোয়ায়ে আলমগীরী&#8217; (১ম-৪র্থ খণ্ড) প্রভৃতি গ্রন্থও মৌলবী নঈমুদ্দীন রচনা করেছিলেন। হাফেজ মাহমুদ আলী তাঁকে করটিয়ার মাহমুদিয়া প্রেস নামে একটি প্রেস দান করেছিলেন। এ প্রেস থেকে তিনি আখবারে ইসলামিয়া নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করে প্রকাশ করতেন। এটি ছিল &#8216;শরীয়ত&#8217; বিষয়ক পত্রিকা। মীর মোশররফ হোসেনের &#8216;গোজীবন&#8217; পুস্তিকাটির কঠোর সমালোচনা করে &#8216;আখবারে ইসলামিয়া&#8217; পত্রিকায় ফতোয়া প্রকাশ হয়েছিল। এরপরে সম্পূর্ণ কোরআন শরীফের সঠিক অনুবাদ করেন জেলা চব্বিশ পরগণার অধিবাসী মৌলবী আব্বাস আলী।</p>
<p>মৌলবী আব্বাস আলীর কোরআনের অনুবাদ প্রকাশিত হবার কিছু পরে &#8216;প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় কথা&#8217; এবং &#8216;সাহাবিয়া&#8217; গ্রন্থদ্বয়ের লেখক রংপুরের খান বাহাদুর তসলিমুদ্দীন আহমদ (১৮৫২-১৯২৭ খ্রীঃ) প্রতি দশ পারা করে তিন খণ্ডে সম্পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদে মূল আরবী নেই। কিন্তু প্রত্যেক পৃষ্ঠার মাথায় সূরা, রুকু এবং আয়াতের সংখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং অনুবাদেও আয়াতের সংখ্যা লেখা হয়েছে। খান বাহাদুর তসলিমুদ্দীন ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দে কোরআন শরীফের অনুবাদ শুরু করেন এবং ১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে শেষ করেন। তিনি কোরআন শরীফের একটি সূচীপত্র বা Co-cordance রচনায় হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু তা শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর খণ্ড কোরআন-অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯২২, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯২৩ এবং তৃতীয় খণ্ড ১৯২৫ সালে। তসলিমুদ্দীন আইন ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে রংপুরে তিনি ওকালতী শুরু করেছিলেন। টাঙ্গাইল নিবাসী মৌলবী আবুল ফজল আবদুল করিমও সম্পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ করেছিলেন। আবদুল করিমের অনুবাদে মুল আরবীও আছে। ইনি প্রথমে হাই স্কুলের হেড মৌলবী ছিলেন, পরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ও ফারসী ছাপার প্রুফ রীডার হন।</p>
<p>১৯৩৮ সালে মৌলবী মোহাম্মদ আবদুল হাকিম ও মোহাম্মদ আলী হাসান মিলিতভাবে কোরআন শরীফের মূল আরবীসহ বিশুদ্ধ বঙ্গানুবাদ ও বিস্তৃত তফসির বের করেন এটিই এ যাবৎ প্রকাশিত কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অনুবাদের বিশুদ্ধতা ও মৌলিক সৌন্দর্য তফসীরের গবেষণা ও প্রাচুর্য এবং ভাষায় মূলানুসারী অপূর্ব ব্যঞ্জনার জন্য এ অনুবাদ সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হয়েছে। মূল কোরআনের আয়াতমালার পাশে নম্বরসহ বিশুদ্ধ বঙ্গানুবাদ এবং নিম্নে বিস্তৃত তফসীর রয়েছে। অনুবাদের সঙ্গে সেল, রওয়েল, পামার, স্যার সৈয়দ আহমদ ও মৌলবী মোহাম্মদ আলী প্রভৃতি আধুনিক অনুবাদক ও তফসীরকারের যুক্তিপূর্ণ সমালোচনাও আছে। খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁর সমগ্র কোরআনের অনুবাদ মূল আরবীসহ প্রকাশিত হয় ১৯৫২ খ্রীষ্টাব্দে। তাঁর অনুবাদের ভাষা সহজ ও সরল; স্থানে স্থানে টীকাও আছে।</p>
<p>উল্লিখিত পূর্ণ কিংষা প্রায়-পূর্ণ অনুবাদগুলো ছাড়া অনেকেই কোরআন শরীফের আংশিক অনুবাদ করেছেন এবং কেউ কেউ কোরআনের উৎকৃষ্ট আয়াত এবং অংশসমূহের বাংলা সংকলন বেরু করেছেন। এদের মধ্যে ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে কিরণ গোপাল সিংহ কোরআনের সার সংকলন করে প্রকাশ করেন। এটি ধারাবাহিক অনুবাদ নয়, বিভিন্ন স্থান থেকে নীতিমূলক বিষয়বস্তুর সংকলন।মৌলানা রহুল আমীন অনুবাদ করেন &#8216;আমপারা&#8217;র এবং শুরু থেকে আরও তিন সিপারার।</p>
<p>মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ &#8216;আমপারা&#8217; এবং শুরু থেকে সূরা আল্ এমরান পর্যন্ত কোরআনের অনুবাদ করেন। আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে ১৯২২ সালে মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ &#8216;আমপারা&#8217;র অনুবাদ করেছিলেন। &#8216;উন্মুল কেতাব&#8217; নাম দিয়ে মৌলানা সাহেব সূরা ফাতেহার অনুবাদও স্বতন্ত্র পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে মৌলানা সাহেব কোরআনের অনুবাদে লিপ্ত থেকে পাঁচ খণ্ডে সম্পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেন।</p>
<p>মৌলবী এয়ার আহমদও আমপারার অনুবাদ করেন।</p>
<p>ডক্টর মুহম্মদ কুদরত-ই-খুদা &#8216;পবিত্র কোরআনের পূত কথা&#8217; (মহাগ্রন্থ আল কোরআনের বাণীর বাংলা বিবরণ, প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) যথাক্রমে ১৯৪৫ এবং ১৯৪৭ সালে বের করেন। এ দুইভাগের পাঁচ সিপারা পর্যন্ত কোরআনের মহাবাণীর অন্তনির্হিত মর্ম যুগের পরিপ্রেক্ষিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বুঝবার প্রয়াস আছে।</p>
<p>কাজী নজরুল ইসলাম কবিতায় আমপারার অনুবাদ করেন।</p>
<p>বরিশালের মীর ফজলে আলী কোরআনের কতগুলো অংশ কবিতানুবাদ ক&#8217;রে &#8216;কোরআন কণিকা&#8217; নাম দিয়ে ছেপে বের করেন। তাঁর কবিতানুবাদ সুন্দর হয়েছিল। এ প্রসংগে মুহম্মদ আযহারুদ্দীনের &#8216;কোরআনের আলো&#8217;র কথা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে।</p>
<p>&#8216;পয়গম্বর কাহিনী&#8217; এবং &#8216;এসরাইল বংশীয় নবীগণ&#8217;-এর লেখক ফজলুর রহিম চৌধুরীর &#8216;কোরআনের সুবর্ণ কুঞ্জিকা&#8217;ও বিশেষ স্মরণীয়। এটি কোরআন শরীফের উৎকৃষ্ট অংশ বিশেষের একটি চয়নিকা।</p>
<p>ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সূরা ফাতেহার অনুবাদ ও তফসীর এবং &#8216;আলমতারা&#8217; পর্যন্ত অন্যান্য দশটি সুরার অনুবাদ &#8216;মহাবাণী&#8217; নাম দিয়ে প্রকাশ করেন ১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে। তিনি কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয়ে বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। সেগুলো &#8216;কোরআন প্রসঙ্গ&#8217; নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়েছে।</p>
<p>এছাড়া সিরাজুল ইসলামের &#8216;হযরতের অমৃতবাণী&#8217; এবং মৌলবী নকীবুদ্দীনের &#8216;কোরআন তত্ত্ব&#8217; (১-৫ খণ্ড) এ বিভাগের উল্লেখ করার মতো বই। মৌলবী মুহম্মদ তৈমুরেরও কোরআন শরীফের একটি সার সংকলন পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গবেষণা এবং চেষ্টায় কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এবং এ ধরনের অনুবাদ ভবিষ্যতেও প্রকাশিত হতে থাকবে, কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে একটি প্রমাণিক এবং নির্ভরযোগ্য অনুবাদের অপেক্ষায় আমরা ছিলাম। পাকিস্তান আমলে বর্তমান ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ইসলামিক একাডেমী নামে পরিচিত ছিল। উক্ত ইসলামিক একাডেমী দেশের প্রখ্যাত উলামা ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিকদের সমন্বয়ে গঠিত এ একটি উচ্চ পর্যায়ের বোর্ডের মাধ্যমে বাংলা ১৩৭৪ সালে কোরআন শরীফের বাংলা তরজমার প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই সমগ্র অনুবাদটি প্রকাশিত হয়। অনুবাদটি যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছে এবং বর্তমানে এর সপ্তদশ মুদ্রণ বাজারে চলছে। এই অনুবাদটি কেন প্রকাশ করা হল সে সম্পর্কে প্রথম সংস্করণের প্রকাশকের কথায় বলা হযছে: &#8216;বাঙলা ভাষায় অনেক কয়েকটি তফসীর এবং তরজমা থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক একাডেমী আরেকখানি তরজমা প্রকাশের দায়িত্ব কেন গ্রহণ করিল, সে সম্পর্কে দুটি কথা শুরুতেই বলা প্রয়োজন। প্রথমত কুরআনুল করীমের ভাষায় যে গতি-স্বাচ্ছন্দ্য, ধ্বনি-গাম্ভীর্য ও ব্যঞ্জনা রহিয়াছে বাংলা তাফসীর ও তরজমাগুলিতে তাহা পাওয়া যায় না; মূলের ভাবোদ্দীপনা তরজামায় রক্ষিত না হওয়ায় কুরআনুল করীমের অন্যান্য মাহাত্ম্য সম্পর্কে পাঠক পাঠিকাদের কোন ধারণাই জন্ম না। দ্বিতীয়ত মামুলী রচনারীতি তথা ভাষার দুর্বলতা ও আড়ষ্টতায় দরুন বহু ক্ষেত্রেই কুরআনুর করীমের আয়াতসমূহের নিগূঢ় তাৎপর্য ও অর্থ ঢাকা পড়িয়া গিয়েছে। তৃতীয়ত বাংলা ভাষায় এখনো মূলানুগ অথচ সুখপাঠ্য একখানি সার্থক তরজমার অভাব রহিয়াছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।&#8217; এই অনুবাদ ও সম্পাদনার দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা হচ্ছেন শামসুল উলামা বেলায়েত হোসেন, মাওলানা আবদুর রহমান কাশগরী, মুহাম্মদ মাহমুদ মুস্তফা শা&#8217;বান, শামসুল উলমা মুহম্মদ আমীন আব্বাসী, ডক্টর সিরাজুল হক, ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, মাওলানা ফজলুল করীম, এ. এফ এম আবদুল হক ফরিদী, আহমদ হুসাইন, মাওলানা আলাউদ্দিন আল-আজহারী, অধ্যক্ষ এ এইচ, এম আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা মীর আবদুস সালাম, অধ্যাপক শাহেদ আলী, মাওলানা মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ্, হাফেজ মইনুল ইসলাম এবং আবুল হাশিম।&#8221;</p>
<p>আমি নিম্নে এই অনুবাদ থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি। উদ্ধৃতিটি সূরা আল ইমরানের সপ্তম থেকে নবম আয়াত পর্যন্ত: &#8220;তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছেন যাহার কতক আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন; এইগুলি কিতাবের মূল অংশ; আর অন্যগুলি রূপক; যাহাদের অন্তরে সত্য লঙ্ঘন প্রবণতা রহিয়াছে শুধু তাহারাই ফিতনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যাহা রূপক তাহার অনুসরণ করে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ ইহার ব্যাখ্যা জানে না। আর যাহারা জানে সুগভীর তাহারা বলে আমরা ইহা বিশ্বাস করি, সমস্তই আমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে আগত; এবং বোধশক্তি- সম্পন্ন ব্যতীত অপর কেহ শিক্ষা গ্রহণ করে না। হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শকের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য-লঙ্ঘনপ্রবণ করিও না এবং তোমার নিকট হইতে আমাদিগকে করুণা দাও, তুমিই মহাদাতা। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি মানব জাতিকে একদিন সমাবেশ করিবে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই; আল্লাহ নির্ধারিত সময়ের ব্যতিক্রম করেন না।&#8221; ইসলামী ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত কুরআন শরীফের অনুবাদ গ্রন্থের নাম: &#8216;আল-কুরআনুল করীম&#8217;।</p>
<p>কুরআন শরীফের আর একটি সুন্দর বাংলা অনুবাদ করেছেন মাওলানা মহিউদ্দিন খান। এ অনুবাদটি লাহোরের বিশিষ্ট আলেম মুক্তি মুহম্মদ শফীর উর্দু অনুবাদের বাংলা অনুবাদ। কিন্তু উর্দু অনুবাদের বাংলা অনুবাদ হলেও এ অনুবাদটি অত্যন্ত সুন্দর এবং তাৎপর্যবহ হয়েছে। মাওলানা মুহিউদ্দিনের ভাষা সুন্দর এবং সুশঙ্খল। সাধারণত আলেম সম্প্রদায়ের বাংলা রচনা যেমন দুর্বল হয়ে থাকে তেমন নয়। অনুবাদের সংগে কিছুটা তাফসীর এবং ব্যাখ্যাও আছে।</p>
<p>কুরআন শরীফের বিখ্যাত তাফসীর হচ্ছে &#8216;তাফসীর ইবনে কাসীর।&#8217; এর একটি অনুবাদ বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত মোট ১৩টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন ড. মুহম্মদ মুজিবর রহমান। এই অনুবাদটি সম্পূর্ণ প্রকাশিত হলে বাংলা ভাষায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসাবে গৃহীত হবে। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যে সমস্ত তাফসীর শাস্ত্র ব্যক্তিত্ব অমরত্ব লাভ করেছেন তার মধ্যে হাফিজ ইমাদুদ্দিন, ইসমাঈল ইবনু কাসীরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদক মুজিবুর রহমানের বাংলা ভাষা সৃমদ্ধ, বলিষ্ঠ এবং সাবলীল। এই গ্রন্থের জন্য একটি তাফসীর পাবলিকেশন কমিটি রয়েছে। এ কমিটির সদস্যবর্গ নিজেদের উদ্যোগে এই তাফসীরটি প্রকাশ করে চলেছেন।</p>
<p>মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর কোরআন শরীফের বিখ্যাত তফসির &#8216;তাফহীমুল কোরআন&#8217;-এর বঙ্গানুবাদ করেছেন (১৯৮০)। মওলানা আবদুর রহীম সাধারণ তরজমার রীতি পরিত্যাগ করে স্বচ্ছন্দে অনুবাদের পথ বেছে নিয়েছেন যেহেতু শাব্দিক তরজমা দ্বারা কোরআনের মূল ভাবধারা অনুধাবনের ব্যাপার অনেক দিক থেকে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মূল তফসিরটি বিশ্ববিখ্যাত এবং আরব বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হযরত মোহাম্মদ </strong><strong>(সঃ) সাহাবী এবং অন্যান্য পীর পয়গম্বরদের জীবনী ও বাণী:</strong></p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীর নবম দশকে &#8216;সুধাকর দল&#8217; বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ধারার সূত্রপাত করেন। এঁদের এবং এ ধারার অনুবর্তীদের প্রধান উপজীব্য ছিল ইসলাম ধর্ম, সূফীতত্ত্ব ও দর্শন এবং ইসলামী কাহিনী ইত্যাদি নিয়ে বই রচনা করা। এ বিষয়বস্তুর মধ্যে হযরত মুহম্মদের (সঃ) জীবনী ও বাণী (অর্থাৎ হাদীস সংগ্রহ) হযরতের পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীর জীবনকাহিনী, তাদের সহিষ্ণুতা, ধর্মপ্রচার ব্রত, খোলাফায়ে রাশেদীন এবং হযরতের অন্যান্য সাহাবীর জীবনই প্রাধান্য লাভ করেছে। এসব জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে তাঁদের ধর্মাদর্শের ব্যাখ্যাও এঁদের জীবনীকাররা দিয়েছেন। এ বিভাগে সব চেয়ে বেশি রচিত হয়েছে হযরত মোহাম্মদের (সঃ) জীবনী।</p>
<p>বাংলা ভাষায় ভাই গিরিশচন্দ্র সেনই হযরত মুহাম্মদের প্রথম জীবনী লেখক। তারপরই শেখ আবদুর রহিমের নাম পাওয়া যায়। এর পরেই সুধাকর দলের মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ হযরতের জীবনী লেখেন। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ রচিত &#8216;হযরত মোহাম্মদ মোস্তফার জীবনচরিত&#8217; শীর্ষক গ্রন্থটির ভূমিকা থেকে এ চমৎকার তথ্যটুকু উদ্ধৃত করা প্রয়োজন বলে মনে করি:</p>
<blockquote><p>&#8220;আঁ হযরত (ছালঃ) এর &#8216;ছওয়ানে-ওমরি&#8217; (জীবনচরিত) আরবী, পারশী ও উর্দু ভাষায় অনেক আছে; কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন কোটি বংগীয় মুসলমানের মধ্যে ৫০ বৎসর পূর্বেও তাঁহার পবিত্র জীবনী কোনও মুসলমান লেখক লেখেন নাই। সর্বপ্রথম কোরআনের বঙ্গানুবাদক, নববিধানী ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী আচার্য কেশবচন্দ্র সেনের ভক্ত শিষ্য, বাবু গিরিশচন্দ্র সেন আঁ হযরত (ছালঃ) এর একখানি জীবনচরিত বাংলা ভাষায় লিখিয়া প্রকাশ করেন। উহাতে তাঁহার ব্রাহ্ম ধর্ম-বিশ্বাসের ছায়াপাত ছিল; পরে ১২৯১ কিংবা ৯২ সালে (প্রকৃতপক্ষে ১২৯৪) সাল অর্থাৎ ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে) কলিকাতাস্থ ডভ এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজদ্বয়ের সুযোগ্য আরব্য এবং পারশ্যধ্যাপক, উৎসাহের জ্বলন্ত মূর্তি এবং স্বজাতিগতপ্রাণ, আমাদের শ্রদ্ধেয় বন্ধু মহানুভব মৌলবী মেয়রাজুদ্দীন আহমদ মরহুম মনসুরের সাহায্যে &#8216;মিহির ও সুধাকর&#8217; এবং &#8220;মোসলেম হিতৈষী&#8217; সম্পাদক ভ্রাতৃবর মুন্সী শেখ আবদুর রহিম সাহেব আঁ হযরতের একখানি জীবন-চরিত লিখিয়া মুদ্রিত করেন। পূর্বোক্ত মৌলবী সাহেব মরহুম আরবী ও পারশী ভাষার প্রামাণ্য ইতিহাসসমূহ হইতে ইহার মাল মসলা সংগ্রহ করিয়া দিয়াছিলেন। কাজেই পুস্তকখানি উপাদেয় এবং মুসলমানদিগের পাঠের বিশেষ উপযোগী হইয়াছিল। এই জীবনী খানিতে ইসলামধর্মনীতি সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হইয়াছে।&#8221;</p></blockquote>
<p>এ আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় রামপ্রাণ গুপ্ত সম্ভবত হযরতের চতুর্থ জীবনীকার।</p>
<p>রামপ্রাণ গুপ্তের &#8216;হযরত মোহাম্মদ&#8217; (পৃঃ ৫৫) লিখিত হয় ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে। এ পুস্তকটিতে রামপ্রাণ গুপ্ত সত্যধর্ম ইসলাম প্রচারে হযরতের সাধারণ কথা ব্যক্ত করেছেন। হযরতের জীবন যে একাধারে কর্মযোগ ও ধর্ম সাধনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রামপ্রাণ গুপ্ত তাতেই মোহিত হয়েছেন এবং সে কথাই এখানে ব্যক্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। রামপ্রাণ গুপ্তের ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত বৃহত্তর গ্রন্থ &#8216;ইসলাম কাহিনী&#8217; ইসলাম ধর্মকথা এবং ইসলামের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনার সংকলন।</p>
<p>&#8216;সঞ্জীবনী&#8217; সম্পাদক বাবু কৃষ্ণকুমার মিত্রও &#8216;মহম্মদ চরিত&#8217; নাম দিয়ে হযরতের জীবনী লিখেছিলেন। তাঁর লিখিত হযরতের জীবনী প্রধানত হিন্দু ও ব্রাহ্ম সমাজে গৃহীত হয়েছিল।</p>
<p>১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে আবুল হোসেন &#8216;হযরত মোহাম্মদের জীবন&#8217; রচনা করেন। এই বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২১৮।</p>
<p>এর কিছু পরের রচনা রংপুরের অধিবাসী খান বাহাদুর তসলিমুদ্দীন আহমদের (১৮৫২-১৯২৭) হযরত মুহাম্মদের জীবনী &#8216;সম্রাট পয়গম্বর&#8217;। তার মৃত্যুর পর ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে বইটি প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটি হযরত মুহাম্মদের জীবনী হিসেবে প্রামাণ্য এবং সুলিখিত। হযরতের জীবনের প্রধান ঘটনাবলী নিয়ে ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তসলিমুদ্দীন এ বইটি লিখেছেন। ইসলাম প্রচারক হযরতের জীবনাদর্শ বাঙালী সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং তার সমসূত্রে বাঙালী মুসলমানের চরিত্র সুদৃঢ় হোক এ সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়েই তসলিমুদ্দীন লেখনী ধরেছিলেন। &#8216;সম্রাট পয়গম্বর&#8217;-এ তাঁর আদর্শ অক্ষুণ্ণ রয়েছে।</p>
<p>তাঁর অপর গ্রন্থ দুটি-&#8216;প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় কথা&#8217; (প্রথম সংস্করণ, ১৯১৫) খ্রীঃ) এবং &#8216;সাহাবিয়া&#8217; (ডিসেম্বর ১৯২৬ খ্রীঃ)। &#8216;প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় কথা&#8217; প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ &#8216;মিশকাতুল মাসাবিহ&#8217; থেকে প্রায় শ&#8217; পাঁচেক হাদিসের অনুবাদ সৎশিক্ষা, শিষ্টাচার, সুব্যবহার ও সৎজীবন সংক্রান্ত বিষয়বস্তুর ওপরে হযরতের বাণী থেকে তসলিমুদ্দীন তাঁর &#8216;প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় কথা&#8217; সংকলন করেছেন।</p>
<p>&#8216;সাহাবিয়া&#8217; (বা পয়গম্বর সহযোগিনী অষ্টবিংশতি মুসলিম মহিলা) গ্রন্থে তিনি হযরতের সহধর্মিণী, তাঁর কন্যা এবং আত্মীয়া সহযোগিনীদেরই জীবন কাহিনী অতি সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিবৃত করেছেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগের মহীয়সী মহিলাবৃন্দ কিরূপে হযরতের সেবায় আত্মোৎসর্গ করেছিলেন এ বইটিতে তার বিশিষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। হযরতের স্ত্রী, কন্যা ও সাহাবিয়ারা ছিলেন মুসলিম নারী সমাজের শিরোভূষণ; গৃহধর্মে, ইসলামের পরিচর্যায় ধর্মযুদ্ধে, হযরতের সেবায় এবং জ্ঞানানুসরণে এ মহীয়সী মহিলারা যে আদর্শ রেখে গেছেন তা সকল দেশের সকলকালের নারী সমাজের অনুকরণীয়। এছাড়া তস্লিমুদ্দীন &#8216;মৌলুদ নফিসা&#8217; এবং &#8216;সুরিয়া বিজয়&#8217;ও রচনা করেছিলেন। &#8216;মৌলুদ নফিসা&#8217; বা জন্মোৎসবের কোনো কবিতা পড়ে মনে হয়, যেন সেগুলো তাঁর সাধন মুহূর্তের।</p>
<p>মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ রচিত &#8216;মোস্তফা চরিত&#8217; (১৯২১) হযরত মোহাম্মদের জীবন আলোচনামূলক ৭৭৫ পৃষ্ঠার একটি বৃহৎ গ্রন্থ। মুহাম্মদ আকরম খাঁর &#8216;মোস্তফা চরিত&#8217; শুধু গতানুগতিক জীবনী নয়। হযরতের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে অন্যান্য জীবনীকার যে পন্থা অবলম্বন করেছেন তিনি তা করেন নি। অন্যান্য জীবনীকার হযরতের জীবনের ঘটনাবলী সম্বন্ধে প্রধানত &#8216;তন্ত্রী&#8217;, &#8216;তবকাত&#8217;, &#8216;ইবনে হিশাম&#8217; ও &#8216;ওয়াকেদী&#8217;র উপরেই নির্ভর করেছেন, কোরআন হাদিসের মাপকাঠিতে তাঁদের বর্ণনার সত্যাসত্য নির্ধারণ করার চেষ্টা করেন নি। মৌলানা সাহেব শুধু ইতিহাসকারদের বর্ণনার ওপরে নির্ভর না করে কোরআন হাদীসের তুলাদন্ডে তাঁদের বর্ণনার সত্যাসত্য বিচার করেছেন। &#8216;মোস্তফা চরিত&#8217;-এ অন্ধ ভক্তির উচ্ছ্বাস নেই। প্রত্যেকটি ঘটনাকে তিনি ঐতিহাসিকের মন নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বিচারসহ করে যাঁচাই করে দেখেছেন। তাঁর ভাষা বলিষ্ঠ এবং যুক্তিবহ। ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠতা হযরত মহাম্মদ সম্বন্ধে মুসলিম জগতের যেসব শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে &#8216;মোস্তফা চরিত&#8217;-এরও একটা বিশিষ্ট স্থান আছে। বাংলা ভাষায় হযরতের জীবনী ও ধর্মালোচনা সংক্রান্ত গ্রন্থাদির মধ্যে &#8216;মোস্তফা চরিত&#8217; অবিসংবাদিতভাবে শ্রেষ্ঠ রচনা। এছাড়া মৌলানা সাহেবের &#8216;মোস্তফা চরিতের বৈশিষ্ট্য&#8217; শীর্ষক একটি পুস্তিকাও পাওয়া যায়।</p>
<p>মৌলানা আকরম খাঁ ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে ২৪ পরগনার অন্তর্গত হাকিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আকরম খাঁর পূর্ব পুরুষগণ হিন্দু ছিলেন।</p>
<p>রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় আকরম খাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। মাসিক &#8216;মোহাম্মদী&#8217; ও &#8216;দৈনিক আজাদ&#8217; সম্পাদনার ভেতর দিয়ে মুসলিম বাংলার ইতিহাসে তিনি একটি Institution-এর স্রষ্টা।</p>
<p>গোলাম মোস্তফার &#8216;বিশ্বনবী&#8217; (১৯৪২) হযরত মোহাম্মদের জীবনী এবং ইসলামধর্মের প্রচার ও বিস্তৃতি সম্পর্কে এ শতাব্দীতে রচিত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বইটি অত্যন্ত সুলিখিত এবং সুখপাঠ্য। গোলাম মোস্তফা কবি। &#8216;বিশ্বনবী&#8217;তে তার কবি মনের প্রকাশ সুস্পষ্ট এবং রচনাও আবেগপ্রণেদিত। &#8216;বিশ্বনবী&#8217; রচনা গোলাম মোস্তফার সাহিত্যিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।</p>
<p>খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ রচিত &#8216;ইসলাম ও আদর্শ মহাপুরুষ&#8217; ও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এ বইটি লিখিত হয় ১৯২৪ সালের দিকে। আহসানুল্লাহ ভক্ত; সুতরাং ইসলাম-প্রচারক আদর্শ মহাপুরষ হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনী লিখতে গিয়ে তার গ্রন্থে যে ভক্ত মনের পরিচয় তিনি দেবেন তা অবধারিত। এ বইটিতে প্রকৃতপক্ষে ঘটেছেও তাই। এ বইটিতে সূফী তত্ত্বের প্রভাব পড়েছে।</p>
<p>মৌলানা আবদুল খালেক রচিত &#8216;ছাইয়েদুল মুরছালীন&#8217; (প্রথম খন্ড-মূল গ্রন্থ পৃঃ ৮৭১, ভূমিকা ইত্যাদি পূর্ব কথা ৯০-১০০; ২৪নং বখশীবাজার ঢাকা থেকে মওদুদুর রহমান, আবু আহমদ মোবাশের কর্তৃক ১৩৫৭ সনে (১৯৫০ খ্রীঃ) প্রকাশিত) হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর অর্ধনা প্রকাশিত জীবনীগ্রন্থগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বিরাট গ্রন্থটির রচনায় লেখকের শ্রমশীলতা এবং হযরতের প্রতি অকৃত্রিম হৃদয়ানুরাগ লক্ষ্য করবার মতো। তবে এ ভাষাতে ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে।</p>
<p><strong>এ পর্যায়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নামও স্মরণীয়। হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর জীবনী ও বাণী সম্পর্কিত অনেক কয়টি বই তিনি লিখেছেন। &#8216;</strong>শেষ নবীর সন্ধানে&#8217; (মার্চ ১৯৬১, ছোটদের রসুলুল্লাহ্&#8217;, (সঃ) আগস্ট ১৯৬২), &#8216;অমর কাব্য&#8217; (অক্টোবর ১৯৬৩) নামক তিনটি বই এ ধারায় তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। &#8216;বিশ্বের শেষ নবীর&#8217; (সঃ) জীবন বৃত্তান্তে কতকগুলি সমস্যা আছে। &#8216;শেষ নবীর সন্ধানে&#8217; পুস্তকটিতে তিনি সে-সমস্যাগুলির সন্ধান ও সমাধান দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। &#8216;রসূলুল্লাহ সকল মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁকে জানা চাই। তাঁর আদর্শে জীবন গ&#8217;ড়ে তোলা চাই। বাল্যকালে মনে যে ভাবের ছাপ পড়ে, তা স্থায়ী হয়। এ জন্য &#8216;ছোটদের রসূলুল্লাহ&#8217; তিনি লিখেছেন ও প্রকাশ করেছেন। তাঁর &#8216;অমর কাব্য&#8217; মুহম্মদ শরফুদ্দীন বিন্ স&#8217;ঈদ বিন্ হসন বুসীরী (রাঃ) রচিত &#8216;কসীদতুল বর্দ; ও কার বিন্ যুহয়র (রাঃ) রচিত &#8216;বানত-সু- আদ&#8217; কাব্য দুইটির সরল গদ্যানুবাদ। কসীদতুল বুর্দ: কাব্য হিসেবেই কেবল বিখ্যাত নয়, পবিত্র ও পুণ্যজনক বলে হযতের (সঃ) ভক্তগণের নিত্য পাঠ্য ওযীফা। ডক্টর শহীদুল্লাহ, এ কাব্যটি নির্ভুল গদ্যানুবাদ করে অশেষ পুণ্যার্জন করেছেন।</p>
<p><strong>শহীদুল্লাহ সাহেবের ইব্বালকৃত &#8216;শিকওয়াহ ও জওয়াব-ই-শিকওয়াহ&#8217;র অনুবাদ (১ম সং ১৯৪২, ৩য় সং ১৯৬৪) এবং দীওয়ান-ই-হাফিজ (সঞ্চয়ন) অনুবাদও (১ম সং ১৯৩৮) প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য।</strong></p>
<p>প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী লিখিত হযরতের জীবন &#8216;মরুভাস্কর&#8217; (১ম সং ১৯৪১, ২য় সং ১৯৪৭, পৃঃ ২০৫) এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। বুলবুল সম্পাদক হাবীবুল্লাহ বাহার &#8216;উন্নত জীবন সিরিজ&#8217; নামক একটি সিরিজ সম্পাদনা করতে ব্রতী হয়েছিলেন। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর &#8216;মরুভাস্কর&#8217; এ সিরিজেরই একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বিচারসহ মন, পাণ্ডিত্য ও চিন্তাশীলতার জন্যে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর খ্যাতি আছে। &#8216;মরুভাস্কর&#8217;-এ হযরতের জীবনে যে দিকগুলো রূপায়িত হয়েছে তাতে ওয়াজেদ আলী তাঁর খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছেন।</p>
<p>মাওলানা মুহিউদ্দিন খান আল্লামা শিবলী নোমানীর সীরাতুন্নবীর একটি সংক্ষেপিত বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। এইটি শিবলী নোমানীর গ্রন্থে জীবনী অংশের উপর ভিত্তি করে রচিত। নোমানীর গ্রন্থটি বিশ্ব সাহিত্যের সর্ববৃহৎ জীবনীগ্রন্থগুলির অন্যতম। এ গ্রন্থটি দীর্ঘকাল যাবৎ সীরাত শাস্ত্রের একখানা আকর গ্রন্থরূপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাঁর গ্রন্থটি উর্দুতে রচিত ছিল এবং ৬ খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছিল। মাওলানা মুহিউদ্দিন একখণ্ডে সংক্ষেপিতভাবে বাংলা প্রকাশিত করেছেন। এ গ্রন্থটিও বাংলা ভাষায় রসূলের জীবনী গ্রন্থে একটি মূল্যবান সংযোজন।</p>
<p>সীরাত গ্রন্থগুলির মধ্যে প্রাচীনতম গ্রন্থ হচ্ছে &#8216;সীরাতে ইবনে হিশাম&#8217;। এর একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ আকরমে ফারুক করেছেন। এটি মোজাম্মেল হক কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে ঢাকাস্থ বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম প্রকাশের তারিখ ১৯৮৮। এ অনুবাদের ভাষা সুন্দর এবং মনোজ্ঞ।</p>
<p>বাংলা ভাষায় এই ধারা সর্বশেষ গ্রন্থ সৈয়দ আলী আহসান রচিত &#8216;মহানবী&#8217;। এই গ্রন্থ প্রকাশের তারিখ ১৯৯৪। এবং এটি প্রকাশ করেছেন আহমদ পাবলিশিং হাউজ। এ গ্রন্থ সম্পর্কে প্রকাশকের প্রতিবেদন নিম্নে উপস্থিত করা হল:</p>
<p>&#8216;বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আহসান একজন অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তাঁর আশ্চর্য অধিগম্যতা আছে। শিল্পকলা বিষয়েও তাঁর পরিণত বুদ্ধি এবং বিচার বিশ্লেষণ সকলকে মুগ্ধ করেছে। মানবতাবোধের সকল অঙ্গনকে তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছেন।</p>
<p>আবাল্য তিনি ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁর পূর্বপুরুষ সকলকেই সূফী মতাদর্শে দীক্ষিত ছিলেন। শৈশবে পারিবারিক পরিবেশে আরবী ফারসী ও উর্দু শিক্ষা লাভ করেছেন। তাঁর দুটি ধর্মীয় গ্রন্থ ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। গ্রন্থ দুটির নাম &#8216;হে প্রভু আমি উপস্থিত&#8217; এবং &#8216;নাহজুল বালাঘা।&#8217; সম্প্রতি তিনি মহানবী সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের একটি অসাধারণ জীবনীগ্রন্থ আমাদের উপঢৌকন দিয়েছেন। সাহিত্যের একটি বিস্ময় পরিচর্যা ঘটেছে। একটি মহান জীবন এবং প্রজ্ঞার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তিনি এ গ্রন্থটি রচনা করেছেন। যে জীবন মানুষকে অভিভূত করে। যে জীবন বিধাতার নিকট আত্মসমর্পণের একটি অলৌকিক পরিচয় বহন করে এবং যে জীবন সকল মানবের কল্যাণে সর্ব সময়ের জন্য নিয়োজিত সেই জীবনের একটি মনোজ্ঞ আলেখ্য &#8216;মহানবী&#8217; গ্রন্থটি। আমরা এ গ্রন্থটি পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে গর্ববোধ করছি।&#8221;</p>
<p>&#8216;প্রিয়তম নবী&#8217; বলে মহানবীর একটি জীবনী শিশির দাস নামে এক ভদ্রব্যক্তি লিখেছেন। বইটি প্রকাশ পায় ১৯৮৭ সালের কলকাতা থেকে। গ্রন্থটি ভক্তের দৃষ্টিতে লেখা। লেখক সমগ্র জীবনীটি কুরআন শরীফ এবং হাদীসের আলোকে উপস্থাপিত করেছেন। যতদূর মনে হয় শিশির দাস একজন একেশ্বরবাদী পুরুষ।</p>
<p>ড. ওসমান গনি &#8216;মহানবী&#8217; বলে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে কলকাতা থেকে। তিনি ইসলামের ধারাবাহিক ইতিহাস নয় খণ্ডে প্রকাশ করেছেন। তার প্রথম খণ্ডটি হলো মহানবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী। এছাড়া হযরতের জীবনের কতগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে ছোটদের উপযোগী করে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনা করেন ছোটদের &#8216;হযরত মোহাম্মদ&#8217; (১৯৪৮ খৃঃ)। এ বইটিতে ধর্ম ও অর্ধমের পার্থক্য আলো আর কালো তথা আলো আঁধারের মধকার পার্থক্যরূপে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। বিষয়বস্তুর নির্বাচন তত্ত্ব-গন্ধী হলেও সহজ বর্ণনার জন্যে ছোটদের বোধগম্য হয়ে উঠেছে। হযরতকে বলা হয়েছে অন্ধকার যুগের আলো, নাম দেওয়া হয়েছে &#8216;আলোক শিশু&#8217;।</p>
<p>এ পর্যায়ে সফিউদ্দীন আহমদ (১৮৭৭-১৯২২?) নামক আর একজন লেখকের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর &#8216;ফাতেমা জোহরা&#8217;, &#8216;হযরত আলী&#8217; &#8216;হযরত বড় পীর সাহেবের জীবনী&#8217; &#8216;মজলিস&#8217; প্রভৃতি গ্রন্থ এ পর্যায়ে রচনা হিসেবে উল্লেখের দাবী রাখে। তিনি (মোহাম্মদী বুক এজেন্সী) &#8216;ছোটদের হযরত মোহাম্মদ&#8217;, পুণ্য কাহিনী, শিশুর &#8216;সৈয়দ সাহেব&#8217;, &#8216;কনৌজ কুমারী&#8217; &#8216;প্রতাপনন্দিনী&#8217; এবং &#8216;দুইটি ভগ্নী&#8217; প্রভৃতি উপন্যাসও রচনা করেছিলেন। তাঁর শিশুদের জন্য লেখা বইগুলো সহজ ভাষায় রচিত হয়েছিল। তাঁর উপন্যাসগুলো গ্রাম্যতাদোষ মুক্ত নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এয়াকুব আলী চৌধুরী</strong>(১৮৮৭-১৯৩৮):</p>
<p>ফরিদপুর জেলার পাংশা গ্রামের এয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৭-১৯৩৮) ইসলাম ধর্ম, ইসলাম দর্শন, তাসাওওয়াফ এবং তমদ্দুনের ভিত্তিতে তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্য রচনা করেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর নাম &#8216;মানব মুকুট&#8217;, &#8216;নূরনবী&#8217;, &#8216;শান্তিধারা&#8217; এবং &#8216;ধর্মের কাহিনী&#8217;। ইসলাম বিষয়বস্তুর ওপরে রচিত হওয়া সত্ত্বেও বইগুলো অত্যন্ত সুলিখিত বলে এদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেরই অকুণ্ঠ প্রীতি ও প্রশংসা অর্জন করেছে। ফলে প্রত্যেকটি বইয়ের বহু সংস্করণ হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে &#8216;মানব মুকুট&#8217;-এর (পৃঃ ৭৮) পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। &#8216;নূরনবী&#8217;র (পূঃ ১১৪) তৃতীয় সংস্করণ হয় ১৯৫০ সালে, ১৯৪৮ সালে হয় &#8216;শান্তিধারা&#8217;র ষষ্ঠ সংস্করণ। &#8216;ধর্মের কাহিনী&#8217; (পৃঃ ৫৬) ১৯১৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হলেও তার পঞ্চম সংস্করণ প্রকশিত হয় ১৯৫২ সালে।</p>
<p>&#8216;মানব মুকুট&#8217; ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী হযরত মুহাম্মদের জীবন ও শিক্ষাকে ভিত্তি করে রচিত। এ গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন দিক থেকে মহানবীর জীবন ও শিক্ষাদর্শের আলোচনা করেছেন। মহানবীর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে এ গ্রন্থে তিনি অপরূপ সত্যানুসন্ধিৎসার পরিচয় দিয়েছেন; তারই ফলে লাভ করেছেন তিনি হযরতের প্রচারিত সার্বজনীন আদর্শের সন্ধান।</p>
<p>তাঁর &#8216;শান্তিধারা&#8217; গ্রন্থে ছ&#8217;টি প্রবন্ধ রয়েছে: &#8216;শান্তিধারা&#8217;, &#8216;ইসলামের স্বরূপ;&#8217;, &#8216;ইসলামের ধারা,&#8217; &#8216;রমজান&#8217;, &#8216;আজান&#8217;, &#8216;উপাসনা&#8217;। ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ &#8216;শান্তি।&#8217; ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত প্রবন্ধগুলোকে তাই একত্রে গ্রথিত করে &#8216;শান্তিধারা&#8217; নাম দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে প্রবন্ধগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হলেও এগুলো সমসূত্রে গ্রথিত এবং ইসলামের আদর্শ, সৌন্দর্য, মহত্ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বই এ প্রবন্ধগুলোর অন্তর্নিহিত মূলতত্ত্ব। আর ধর্মের নামে সংসারে মানুষকে প্রতিনিয়ত অধর্ম করতে দেখে তাঁর প্রাণে যে বেদনা ধ্বনিত হয়েছে তা থেকেই স্বতঃ উৎসারিত হয়েছে তাঁর &#8216;ধর্মের কাহিনী।&#8217; ধর্মের কাহিনীতে, &#8216;পূর্বাভাস,&#8217; &#8216;খোদাভক্তি,&#8217; &#8216;নামায,&#8217; &#8216;সত্য&#8217;, &#8216;স্বার্থ&#8217;, &#8216;দয়া,&#8217; &#8216;দান&#8217;, &#8216;অতিথি সেবা&#8217;, &#8216;সুদ&#8217; প্রভৃতি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।</p>
<p>ছোটদের জন্য হযরত মুহাম্মদের জীবনী কম লেখা হয়নি। শিশু পাঠ্য হিসেবে হযরতের জীবন এখনও কম লেখা হচ্ছে না, কিন্তু এদিকেও এয়াকুব আলী চৌধুরীর &#8216;নূরনবী&#8217; অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ রচনা। হযরত চরিত্রের কোমল মধুর দিকগুলো ততধিক কোমল সুন্দর করে এয়াকুব আলী তাঁর নূরনবীতে অঙ্কিত করেছেন। এ বই-এর ভাষা শিশুদের জন্য শুধু সহজবোধ্য নয় মধুর বলেই আকর্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথও এ গ্রন্থ-খানা সম্পর্কে বলেছিলেন, &#8216;ইঁহার ভাষা সরল ও সুন্দর এবং রচনা প্রণালী শিশু পাঠকের পক্ষে মনোরম। এরূপ সহজ বাংলা লেখা কঠিন কাজ।&#8221; পাঁচ সাত বছর বয়স্ক শিশুপাঠ্য বই মঈনুদ্দীনের &#8216;আমাদের নবী&#8217;র কথা বাদ দিলে হযরতের জীবনী সম্পর্কিত</p>
<p>এধরনের শিশুদের উপযোগী বই ইদানীং আর লেখা হয়নি। এয়াকুব আলী চৌধুরী যে একজন উঁচুদরের সাহিত্যিক ছিলেন এও তার আর এক বিস্ময়কর পরিচয়।</p>
<p>এয়াকুব আলীর মতো খ্যাতনামা সাহিত্যিক বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে খুব কমই জন্মেছে। তিনি ছিলেন চিন্তাশীল এবং দার্শনিক। তাঁর চিন্তাশীলতা &#8216;মানব মুকুট&#8217;-এর মধ্যে স্ফূর্তি পেয়েছে। সে জন্যে হযরতের জীবনী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর ভাষাও হয়ে উঠেছে অপূর্ব ধ্বনিব্যঞ্জনাময়-গতিশীল। &#8216;মানব মুকুট&#8217; ও &#8216;শান্তিধারা&#8217; একই বিষয়ের এপিঠ ও ওপিঠ। এয়াকুব আলী অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ছিলেন; তাঁর আবেগ প্রবণতা তাঁর যুক্তিবাদিতাকে ক্ষুণ্ণ করেনি। ইসলামী বিষয়বস্তুও যে উন্নততর সাহিত্যের উপাদান হতে পারে এয়াকুব আলীর সাহিত্য সাঙ্গনাই তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সমগ্র বাংলা গদ্য সাহিত্যের উৎকর্ষাপকর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখা যাবে এয়াকুব আলীর মধুর ও প্রসাদগুণবিশিষ্ট গদ্য-বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিকাশে যথেষ্ট সহায়তা করেছে। হিন্দু মুসলমান সকল বাঙালী সাহিত্যিকল্পের মধ্যে তাঁর যে একটি বিশিষ্ট স্থান আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাব্যে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনী লেখেন কবি মোজাম্মেল হক (শান্তিপুরের) এবং কাজী নজরুল ইসলাম। মোজাম্মেল হকের বই-এর নাম &#8216;হযরত মোহাম্মদ&#8217;। নজরুলের &#8216;মরুভাস্কর&#8217; হযরতের অসম্পূর্ণ জীবনী।</p>
<p>কোরবান আলী লিখিত &#8216;শান্তিকর্তা হযরত মোহাম্মদ&#8217; (সঃ) এবং আবদুল জব্বার সিদ্দিকীর &#8216;মানুষের নবী&#8217; (১৯৫৩) ও এ-বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মতো বই।</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনী ছাড়াও অন্যান্য নবীর জীবনী ও কাহিনী বাংলা সাহিত্যে কম লেখা হয়নি। খ্যাত ও অখ্যাতনামা বহু সাহিত্যিক এদিকে লেখনি চালনা করেছিলেন। এ বিভাগের মুসলিম সমাজচিত্রমূলক উপন্যাস &#8216;আবদুল্লাহ&#8217;র লেখক খান বাহাদুর কাজী ইমদাদুল হকের &#8216;নবী কাহিনী&#8217; অত্যন্ত সুলিখিত বই। &#8216;নবী কাহিনী&#8217; প্রথম প্রকাশিত হয় এ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের দিকে। এই বইটির সপ্তম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দে। &#8216;নবী কাহিনী&#8217;তে &#8216;হযরত আদম&#8217;, &#8216;হযরত নূহ,&#8217; &#8216;শাদ্দাতের বেহেস্ত&#8217;, &#8216;আদ ও সমুদ&#8217;, &#8216;হযরত ইব্রাহিম্&#8217;, &#8216;হযরত ইউসুফ&#8217;, &#8216;হযরত মুসা&#8217;, হযরত আইয়ুব&#8217;, &#8216;হযরত দাউদ,&#8217; &#8216;হযরত সোলায়মান&#8217;, &#8216;হযরত ইউনুস&#8217; এবং &#8216;হযরত ঈসা&#8217; প্রমুখ বারজন নবীর কাহিনী অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক করে বর্ণনা করা হয়েছে। নবীকাহিনী মূলত শিশুদের জন্য রচিত; কিন্তু শিশু ও শিশুদের পিতামাতা নবীদের সুখ-দুঃখের এবং ত্যাগ সাধনার কাহিনী একই সঙ্গে উপভোগ করতে পারে। নিছক শিশুপাঠ্য বই হিসেবেও এটি এয়াকুব আলী চৌধুরীর &#8216;নূরনবী&#8217;র সমপর্যায়ের রচনা।</p>
<p>আলাউদ্দীন আহমদ (১৮৫১-১৯১৫) মাসিক &#8216;ইসলাম প্রচারক&#8217; পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁর মুদ্রিত পুস্তকের নাম &#8216;ওমর চরিত&#8217;। পুস্তকটি ১৩১০ সাল অর্থাৎ ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। হযরত ওমরের চরিত্র ও আদর্শ রক্ষা করাই এ গ্রন্থে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিল। এ ছাড়া তিনি &#8216;ইসলাম প্রচারক&#8217;-এ ধারাবাহিকভাবে &#8216;তফসীরে হাক্কানী&#8217;র বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেন। এবং &#8216;হযরত বড় পীর সাহেবের জীবন চরিত&#8217;ও রচনা করেন। পারস্যের শেখ সাদী, জালালুদ্দীন রুমী প্রমুখ বিভিন্ন কবির জীবনীও তিনি &#8216;ইসলাম প্রচারক&#8217;-এ প্রকাশ করেছিলেন। আলাউদ্দীন আহমদ পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার চৌহালী নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলেন।</p>
<p>সেকালের সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর সম্পাদক নাজির আহম্মদ চৌধুরীর লেখা বই &#8216;ফারুক চরিত&#8217; ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। &#8216;ফারুক চরিত&#8217; হযরত ওমরের আদর্শোজ্জ্বল জীবনের কাহিনী। সৈয়দ আবদুর রউফের &#8216;হযরত ওমর&#8217; (১৯২৭) ও এ প্রসঙ্গ স্মরণীয়।</p>
<p>আবু আহমদ আবুদল ওয়াহেদ ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে &#8216;হযরত মুসার জীবনী লেখেন। মীর্জা সুলতান আহমদ রচিত &#8216;হযরত এব্রাহিম&#8217; ১৯২৭ এর প্রসঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য বই। একজন অজ্ঞাতনামা লেখকের &#8216;খলিল গুলজার&#8217; নামক হযরত ইব্রাহীমের জীবনী ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।</p>
<p>এস্ ওয়াজেদ আলী রচিত &#8216;পীর পয়গম্ববের কথা&#8217; বিভিন্ন পয়গম্বর ও ওলি আল্লাদের বাণী-সংকলন। আম্বিয়াদের অনেক কাহিনী বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে, যেমন আমির নামক জনৈক অনুবাদকের মূল ফারসী থেকে অনূদিত &#8216;কেছাছুল আম্বিয়া&#8217; (১৮৬৮), আবুল হোসেনের &#8216;হাকিকাতুল আম্বিয়া&#8217; (১৮৭৬), মোহাম্মদ তাজউদ্দীন ও মোহম্মিদ খাতিরের &#8216;কোলাছাতুল আম্বিয়া&#8217; (১৮৮১), কাজী মোহাম্মদ গোলাম রহমানের &#8216;তাজকেরাতুল আম্বিয়া&#8217; (১৯৫৯) আবদুস সোবহানের &#8216;নবী কাহিনী&#8217; (১৯৬০) এবং গাজী শামছুর রহমানের &#8216;নবীদের কথা&#8217; (১৯৬৮)।</p>
<p>আবযজোহা নূর আহমদের &#8216;খুলাফা-ই-রাশেদীন&#8217; (১৯৫৩) এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য &#8216;পয়গম্বর-কাহিনী&#8217; এবং &#8216;এসরাইল বংশীয় নবীগণ প্রভৃতি গ্রন্থ রচিয়তা ফজলুর রহিম চৌধুরীর &#8216;মেশকাত শরীফ&#8217;। এটি মেশকাতুল মাসাবিহর বাছা বাছা হাদিসের অনুবাদ; সাত&#8217;শ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত। প্রকশিত হয় ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে। বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে ফজলুরর রহিমের মেশকাতের এ সুবৃহৎ অনুবাদের একটি বিশিষ্ট স্থান আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি বোখারী শরীফের ও (১৯২৮) আংশিক অনুবাদ করেছিলেন।</p>
<p>কোরআনের অনুবাদক এবং &#8216;ইসলাম পরিচিতি&#8217;র লেখক খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁর (১৮৮৯-১৯৬৪) &#8216;শেষ নবী&#8217; (১৯৪৯) পুস্তকটি হযরত মোহাম্মদের জীবন বৃত্তান্ত। হযরতের জীবন এবং কোরআনের মধ্যে পরস্পরের সম্বন্ধ তিনি তাঁর এ বইটিতে দেখিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর &#8216;মেশকাতুল মাসাবিহ্&#8217;র অনুবাদও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিন খণ্ডের তিনি &#8216;মেশকাত শরীফে&#8217;র পূর্ণ অনুবাদ করেন। তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। প্রথম খণ্ডে তিনি একটা মূল্যবান ভূমিকা সংযোজিত করেছেন। তাঁর &#8216;সহীহ বুখারী তজরীদ&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। বাংলা সাহিত্যের পবিত্র কোরআন হাদীসের অনুবাদ ইসলামের মর্মব্যাখ্যার জন্য আবদুর রহমান খানের নামও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।</p>
<p>মওলানা ফজলুল করিম-এর নামও বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য রচনার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি &#8216;আদর্শ মানব&#8217; বা হযরতের আদর্শ জীবনী ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়। চার খণ্ডে প্রকাশিত &#8216;মেশকাত শরীফ&#8217;-এর বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে।</p>
<p>এছাড়া এ বিভাগে আবুল মনসুর আহমদের &#8216;মুসলমানী কথা&#8217;, হাবীবুল্লাহ বাহার লিখিত &#8216;ওমর ফারুক&#8217;, বেগম শামসুন্নাহার লিখিত &#8216;পুণ্যময়ী&#8217;, তোরাব আলীর &#8216;ছোটদের মোস্তফা,&#8217; &#8216;ছোটদের ফারুক চরিত&#8217; প্রভৃতি বইগুলোর নাম করা যেতে পারে।</p>
<p>কাজী আবদুল ওদুদের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল হযরত মোহাম্মদের (সঃ) জীবনী লেখার। তার সেই স্বপ্নের ফল &#8216;হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম&#8217; প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৭৩ বাংলা সাল মোতাবেক ১৯৬৬ খ্রীষ্টাব্দে। হযরতের মানস ও চরিত্র সম্বন্ধে এ গ্রন্থে তিনি যে আলোচনা করেছেন তার ভিত্তিভূমি হচ্ছে &#8216;কোরআন ও হাদীস।&#8217; কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন ঢাকার মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। মুসলিম সাহিত্য সমাজ সেদিন বাঙালী মুসলমানের জীবনে মুক্তবুদ্ধি ও চিন্তা স্বাধীনতার সংঘাত সৃষ্টি করেছিল। হযরতের চরিত্রের বিশালতা, ইসলাম ধর্মপ্রচারে তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, ধৈর্য্য, সহনশীলতা এবং সর্বোপরি তাঁর মহত্ত্ব ও ঔদার্য প্রভৃতি মহৎ গুণাবলীকে কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর এ গ্রন্থেই বুঝবার প্রয়াস পেয়েছেন অন্ধ বিশ্বাসে নয়, মুক্ত মন দিয়ে বিচারসহ করে। পরধর্মাবলম্বী পাঠকও আবদুল ওদুদ সাহেবের এ গ্রন্থ পাঠ করে হযরত মহাম্মদের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হবে। এদিকে থেকে কাজী আবদুল ওদুদের &#8216;হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম&#8217; হযরতের জীবন চরিতগুলোর মধ্যে একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ। পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত ফুলবাড়ী গ্রামের ডক্টর গোলাম মকসুদ হিলালী রচিত &#8216;হযরতের জীবনী প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৬৭ খ্রীস্টাব্দে। তার কথায় আল্লামা শিবলী নু&#8217;মানী সাহেবের &#8216;সীরাতুন্নবী&#8217; গ্রন্থের শেষভাগে প্রদত্ত পয়গম্বর সাহেবের আচার ব্যবহার ও চরিত্র সম্বন্ধী অংশই এ পুস্তকের ভিত্তি।</p>
<p>হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবন কাহিনীর সঙ্গে ইসলামের শিষ্টাচারী খলিফা চতুষ্টয়- &#8216;খুলাফা-ই-রাশেদীনে&#8217;র জীবন কথা না জানলে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান হয় না। পৃথকভাবে এই খলিফা চতুষ্টয়ের জীবনী অনেকে লিখলেও তাদের জীবনকথার যথার্থ ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা বাংলা সাহিত্যে ছিল না বললেই চলে। বাংলা ভাষায় আমাদের ইসলামী সাহিত্যের এ অভাব দূর করবার জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ইসলামে &#8216;খুলাফা-ই-রাশেদীন&#8217; তথা &#8216;শিষ্টচারী খলিফা চতুষ্টয়ে&#8217;র জীবনী লেখানোর একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেই পরিকল্পনা অনুসারে কবি গোলাম মোস্তফার &#8216;হযরত আবু বকর&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে আবদুল মওদুদের (১৯০৮- ১৯৭১) &#8216;হযরত ওমর&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে, মুহম্মদ বরকতুল্লাহর &#8216;হযরত ওসমান&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে এবং আবুল ফজলের &#8216;হয়রত আলী&#8217; প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে।</p>
<p>হযরত আবুবকর সিদ্দিকের অনেকগুলো জীবনী বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শামসুর রহমান আলজামালীর &#8216;প্রতিষ্ঠা বা হযরত আবুবকরের সংক্ষিপ্ত জীবনী&#8217; (১৯২২), হেদায়েত হোসেন মোরশেদের &#8216;খলিফা আবুবকর&#8217; (১৯৬৩), ফজলুর রহমানের &#8216;হযরত আবুবকর&#8217; (১৯৬৪), আবদুল হক মাশরেকীর&#8217;হযরত আবুবকর&#8217; (১৯৬৬)-এর গোলাম রব্বানীর &#8216;হযরত আবুবকর সিদ্দিক&#8217; (১৯৬৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কারবালা সংক্রান্ত সাহিত্য:</strong></p>
<p>মুসলিম ঐতিহ্য ও ইসলামের ইতিহাসের কাহিনী সম্পর্কিত বিষয়বস্তু অবলম্বন করে বহু সাহিত্যিকই বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন দিক সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। বিশেষত কারবালার ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে বহু কবিই কাব্য রচনা করেছেন। মুসলিম ইতিহাসের এ মর্মস্পর্শী কাহিনী গদ্য সাহিত্যিকদেরও যে উপজীব্য হয়নি, তা নয়। মীর মশাররফ হোসেনের &#8216;বিষাদসিন্ধু&#8217;ই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সমগ্র বাংলা গদ্য সাহিত্যে &#8216;বিষাদসিন্ধু&#8217;র মতো সৃষ্টি খুব কম পাওয়া যায়। ফজলুর রহিম চৌধুরীর &#8216;মহরম চিত্র&#8217; (১৯১৭) এবং কাব্যে কায়কোবাদের &#8216;মহরম শরীফ&#8217; (১৯১৩) এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। মুসলমানদের জীবনে কারবালার ঘটনা একটি মর্মবিদারক ঐতিহাসিক সংঘটন। এ ঘটনাকে অবলম্বন করে বহু কাব্য কাহিনী অতীতে রচিত হয়েছে, তবে আধুনিকালে গদ্য রচয়িতারাও এ ঘটনাকে অবলম্বন করে উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। মীর মশাররফ হোসেনের নাম আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। ১৮৮৫ থেকে ১৯৯০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর &#8216;বিষাদ সিন্ধু&#8217; বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ গদ্যরচনা। আবুল মালী মোহাম্মদ হামিদ আলীর &#8216;কাসেম বধ কাব্য&#8217; এবং &#8216;জয়নাল উদ্ধার&#8217; প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯০৬ এবং ১৯০৯ খৃষ্টাব্দে। অন্যান্য গ্রন্থ হচ্ছে মোহাম্মদউদ্দীন আহমদের &#8216;মোহররম কান্ড&#8217; (১৯১২), মোহাম্মদ আবদুল বারীর (১৮৭২-১৯৪৪) &#8216;কারবালা&#8217; (১৯১৩), ফজলুর রহিম চৌধুরীর &#8216;মহরম চিত্র&#8217; (১৯১৭), খয়রাতুল্লার (১৯২৪-১৯৩৬) &#8216;কারবালা&#8217; (১৯০৬) আমির হোসেন আলকাদেরীর &#8216;কারবালার যুদ্ধ&#8217; (১৯৩৬), খান বাহাদুর আবেদ আলীর &#8216;মহরম পর্ব&#8217; আবদুল গফুর সিদ্দীকির &#8216;বিষাদ সিন্ধুর ঐতিহাসিক পটভূমি,&#8217; ডক্টর গোলাম সাকলায়েনের &#8216;কারবালার কাহিনী&#8217;, মুহম্মদ বরকত উল্লাহর &#8216;কারবালার যুদ্ধ ও নবী বংশের ইতিবৃত্ত&#8217; (১৯৫৭) এবং &#8216;কারবালা ও ইমাম বংশের ইতিবৃত্ত&#8217; (১৯৬৫)।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/history-and-personality-assessment-of-islamic-literature-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13915</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জনসমাজের সাহিত্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/public-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/public-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী নজরুল ইসলাম]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 21 Mar 2024 13:24:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13835</guid>

					<description><![CDATA[[১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা ৫নং ম্যাঙ্গো লেন দৈনিক &#8216;কৃষক&#8217; পত্রিকার অফিসগৃহে, জন সাহিত্য সংসদের শুভ-উদ্বোধনে সভাপতি কাজী নজরুল ইসলামের প্রদত্ত অভিভাষণ।] &#160; সাহিত্যে সবারই প্রয়োজন আছে, দুনিয়ায় হাতিও আছে, আরশোলাও আছে। তাদের কে বড়! কে ছোট! বলা যায় না। তার কারণ,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>[১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা ৫নং ম্যাঙ্গো লেন দৈনিক &#8216;কৃষক&#8217; পত্রিকার অফিসগৃহে, জন সাহিত্য সংসদের শুভ-উদ্বোধনে সভাপতি কাজী নজরুল ইসলামের প্রদত্ত অভিভাষণ।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সাহিত্যে সবারই প্রয়োজন আছে, দুনিয়ায় হাতিও আছে, আরশোলাও আছে। তাদের কে বড়! কে ছোট! বলা যায় না। তার কারণ, হাতি খুব বড় কিন্তু আরশোলা উড়তে পারে।</p>
<p>জনসাহিত্যের উদ্দেশ্য হলো জনগণের মতবাদ সৃষ্টি করা এবং তাদের জন্য রসের পরিবেশন করা। আজকাল সাম্প্রদায়িকতা ব্যাপারটা জনগণের একটা মস্ত বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে; এর সমাধানও জনসাহিত্যের একটা দিক। সাময়িক পত্রিকাগুলোর দ্বারা আর তাদের সম্পাদকীয় প্রবন্ধ দ্বারা কিছুই হবে না। সম্পাদকীয় মত উপর থেকে উপদেশের শিলাবৃষ্টির মতো শোনায়। তাতে জনগণের মনের উপর কোনো ছাপ পড়ে না। জনমতও সৃষ্টি হয় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যাঁদের গ্রামের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা সেখান থেকেই তাঁদের সাহিত্য আরম্ভ করুন। স্থায়ী সাহিত্য চাই। বক্তৃতা, প্রবন্ধ তাদের প্রাণে দাগ কাটতে পারে না। তাদের মতো করে তাদের কথা, তাদের গল্প বলুন। তারা তো বুঝতে পারে না। কিন্তু সাবধান, আপনাদের মুরুব্বিয়ানা ভাব প্রকাশ না পায় তার মধ্যে, তা হলে তারা পালিয়ে যাবে। চাষীরাও আয়না রাখে; নিজেদের চেহারা যদি তার মধ্যে দেখতে পায় তবে যত্ন করে রাখবে।</p>
<p>আমিও একবার ভাবছিলাম; জারির গান, গাজির গান ওদের ভাষায় লিখে ওদের জন্য চালাব তা হয়ে উঠে নাই।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে আমার নিজের বিষয়ে কিছু বক্তব্য আমার আছে। কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কি দিয়েছি, জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল, তাই আমি সহজভাবে বলেছি, আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু সঙ্গীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোনো আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে। সাহিত্যে আমার দান কতটুকু তা আমার জানা নেই। তবে এইটুকু মনে আছে সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি। আমি আট বছর গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছি। তখন যৌবন ছিল, আর আমিও তার চঞ্চলতা নিয়ে যুবক। কিছুর ভয় করিনি। খেতাম হোটেলে, শুতাম মসজিদে, যুবসমাজকে খুব ভালবাসতাম, কিন্তু বহু মেশার পরেও আমি দেখলাম তাদের সাথে যেন আমার আগের মতো মিশা হয়ে উঠছেনা। আমি নিজেকে দোষ দিয়েছি; আমার নিজের ব্যর্থতায় আমি নিজেকেই দায়ী করেছি। তারপর সে পথ ছেড়ে যে পথে আজ চলেছি সে পথে এসে পড়লাম। আর মনে করলাম, ও পথের যোগ্য আমি নই। ও সাহিত্য সম্বন্ধে আমার আত্মবিশ্বাস নেই। আমার নিজের উপর যে সম্বন্ধে নিজেরই বিশ্বাস নেই, সে সম্বন্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আমার সাজেনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজকাল জনসাধারণের জন্য দরদ জেগেছে সবার মধ্যে, কত রকম ‘ইজম’ মতবাদ এর জন্য সৃষ্টি হয়েছে। যা-ই হোক, তাদের এই দরদ যদি সত্যিকারের প্রাণের দরদ হয়, তবেই মঙ্গলের। বাইর থেকে তাদের দরদ দেখালে তারা বিশ্বাস করে না। তাদেরই একজন হতে হবে। তাদের কাছে টর্চলাইট হাতে নিয়ে গেলে তারা সরে দাঁড়াবে, কেরোসিনের ডিবে হাতে করে গেলে, তার থেকে যত ধোঁয়াই বের হোক না কেন, তাদেরকে আকর্ষণ করবেই। কারণ, টর্চলাইটে তারা অনভ্যস্ত। ওতে তাদের চোখ ঝলসায়। কেরোসিনের ডিবে ওদের নিজেদের জিনিস। অবশ্য যাদের টর্চ-লাইটই সম্বল, তাদের পথ শহরের দিকে; গ্রামের দিকে, জনসাধারণের দিকে গেলে তাদের ঠিক হবে না। যাঁরা জ্ঞান বুদ্ধিসম্পন্ন, তাঁদের আমি জনসাহিত্য গড়ার জন্য আসতে বলি না। কিন্তু এমনও তো সাহিত্যিক আছেন, যাঁদের সম্বল কেরোসিনের ডিবে। এ পথ কিন্তু সোজা নয়; কঠিন। ত্যাগ চাই এর পিছনে; পরে দুঃখ করলে কোনো লাভ হবে না। জনসাধারণের যা সমস্যা, তা সাহিত্যিকরাই সমাধান করতে পারবেন। জনগণের সাথে সম্বন্ধ করতে হলে তাদের আত্মীয় হতে হবে। তারা আত্মীয়ের গালি সহ্য করতে পারে, কিন্তু অনাত্মীয়ের মধুর বুলিকে গ্রাহ্য করে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ওদের জন্য যে সাহিত্য, তা ওরা এখনো যেমনভাবে পুঁথি পড়ে, আমির হামজা, সোনাভান, আলেফ লায়লা, কাসাসুল আম্বিয়া পড়ে, তখনো সেইভাবে পড়বে। ওদের সাহিত্যের মধ্য দিয়ে ওদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। যা বলবার বলতে হবে। কিন্তু যেন কান্ডারী বা অহংকারী ভাব ধরা না পড়ে। সে জন্য তথাকথিত ভদ্র পোশাক পরিহিত ভদ্রলোকদের নেমে আসতে হবে কাঁদার মধ্যে তাদেরকে টেনে তোলার জন্য। নেমে এসে যদি ওদের ওঠানোর চেষ্টা করা যায়, তবে সে-চেষ্টা সফল হবে, নইলে না।</p>
<p>আজকাল আমাদের সাহিত্য বা সমাজনীতি সবই টবের গাছ। মাটির সাথে সংস্পর্শ নেই। কিন্তু জনসাহিত্যের জন্য জনগণের সাথে যোগ থাকা চাই। যাদের সাহিত্য সৃষ্টি করব, তাদের সম্বন্ধে না জানলে কী করে চলে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নিজের কওমের যদি মঙ্গল করতে চাই, তবে তার জন্য অপর কাউকে গাল দেয়ার দরকার করে না। যারা অপরকে গাল দিয়ে ‘কওম’;‘কওম’ করে চিৎকার করে, তারা ঐ এক পয়সায় মক্কা-মদিনা দেখানেওয়ালাদেরই মতো। <strong>তারা কওমের জন্য চিৎকার করতে করতে হয়ে যান মন্ত্রী, আর ত্যাগ করতে করতে জমিদার বনে যান।</strong> কওমের খেদমত করতে করতে কওম যাচ্ছে গরিব হয়ে, আর গড়ে উঠেছে নেতাদের দালান ইমারত। <strong>হযরত ওমর রা., হযরত আলি রা. এঁরা অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছেন; কিন্তু নিজেরা কুঁড়েঘরে থেকেছেন, ছেঁড়া কাপড় পরেছেন, সেলাই করে, কেতাব লিখে, সেই রোজগারে দিনাতিপাত করেছেন।</strong> ক্ষিধেয় পেটে পাথর বেঁধে থেকেছেন; তবু রাজকোষের টাকায় বিলাসিতা করেননি। এমন ত্যাগীদের লোকে বিশ্বাস করবে না কেন?</p>
<p>কওমের সত্যিকার কল্যাণ করতে হলে ত্যাগ করতে হবে হযরত ইব্রাহিমের মতো।</p>
<p>দুদিন বাদে কোরবানির ঈদ আসছে। ঈদের নামাজ আমাদের শিখিয়েছে, সত্যিকার কোরবানি করলেই মিলবে নিত্যানন্দ। আমরা গরু-ছাগল কোরবানি করে খোদাকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করছি। তাতে করে আমরা নিজেদেরকেই ফাঁকি দিচ্ছি। আমাদের মনের ভিতর যেসব পাপ, অন্যায়, স্বার্থপরতা ও কুসংস্কারের গরু-ছাগল যা আমাদের সৎবৃত্তির ঘাস খেয়ে আমাদের মনকে মরুভূমি করে ফেলছে-আসলে কোরবানি করতে হবে সেইসব গরু-ছাগলের। হজরত ইব্রাহিম আ. নিজের প্রাণতুল্য পুত্রকে কোরবানি করেছিলেন বলেই তিনি নিত্যানন্দের অধিকারী হয়েছিলেন। আমরা তা করিনি বলে আমরা কোরবানি শেষ করেই চিড়িয়াখানায় যাই তামাসা দেখতে। আমি বলি ঈদ করে যারা চিড়িয়াখানায় যায় তারা চিড়িয়াখানায় থেকে যায় না কেন?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এমনি ত্যাগের ভিতর দিয়ে মানুষকে যারা আপনার করে নিতে পারবে তারাই হবে মানবতার অগ্রপথিক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>নয়া জামানা</em></p>
<p><em>১ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা</em></p>
<p><em>ফাল্গুন, ১৩৪৫</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/public-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13835</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা কবিতার আসরে আল্লামা ইকবাল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/allama-iqbal-at-bengali-poetry-gathering/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/allama-iqbal-at-bengali-poetry-gathering/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 16 Mar 2024 11:08:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13794</guid>

					<description><![CDATA[এক দেশের কাব্য অন্য দেশের ভাষায় রূপান্তরিত হয় বিবিধ কারণে। এক পরিবেশের নিসর্গলোক অন্য পরিবেশে অবশ্যই দীপ্তিমান হতে পারে না, এক নির্দিষ্ট সীমার সৌন্দর্য অন্য সীমায় হয়তো বা রূপ রহিত, একই সূর্য কোথাও খরপ্রভ, আবার কোথাও নির্বাণ উন্মুখ, কিন্তু তবুও]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এক দেশের কাব্য অন্য দেশের ভাষায় রূপান্তরিত হয় বিবিধ কারণে। এক পরিবেশের নিসর্গলোক অন্য পরিবেশে অবশ্যই দীপ্তিমান হতে পারে না, এক নির্দিষ্ট সীমার সৌন্দর্য অন্য সীমায় হয়তো বা রূপ রহিত, একই সূর্য কোথাও খরপ্রভ, আবার কোথাও নির্বাণ উন্মুখ, কিন্তু তবুও যে কোনো ক্ষেত্র থেকে প্রতিটি অবস্থায় উপভোগ করা যায়। আমরা এই বিশ্ব সাহিত্যের বিচিত্র সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অনুবাদের দ্বারস্থ হই। অনুবাদের একটি কারণ হচ্ছে, আপনার সাহিত্যকে বিচিত্র সম্ভারে পরিবৃদ্ধ ও সমৃদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, অনুবাদের মধ্যে সেই বস্তুকে আহরণ করা, যার সঙ্গে আমাদের ভাবগত ও আদর্শগত সম্পর্ক রয়েছে। দর্শন, বিজ্ঞান এবং অন্যবিধ জ্ঞান ভান্ডারের ক্ষেত্রে অনুবাদের দ্বারা আমাদের ভাণ্ডারের পরিপুষ্টি ও প্রসার ঘটে থাকে, কেননা এদের আবেদন সব ক্ষেত্রেই আমাদের বোধি ও মননের প্রতি। কিন্তু যে ক্ষেত্রে আবেদন হৃদয়ের প্রতি এবং হৃদয়জাত বৃত্তির প্রতি, সে ক্ষেত্রে অনুবাদের জন্য একটি প্রখর অনুশাসন রয়েছে। বিদেশের কাব্য পাঠে যেখানে আমার হৃদয় থেকে আনন্দ শতধারায় নিঃসৃত হয় না, যেখানে আবার গৃহবেষ্টিত মালঞ্চের লতাপল্লব বিদেশের বৃক্ষের ছায়ায় লজ্জিত ও বর্ণহীন হয়, যেখানে বিদেশের সৌভাগ্য আমার স্বাভাবিক জীবনধারার পরিপন্থী, সেখানে অনুবাদের মূল্য নেই, সেখানে রূপায়িত কাব্য Eliat- এর ভাষায় ভগ্ন পাষাণ ফলকের উপর নির্ণিমেষ সূর্যরশ্মির মতো আর নয়।</p>
<p>ইংল্যান্ডের রোমান্টিক যুগের বায়রনকে বিদেশীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম জার্মানরা প্রশস্তি জানায়। তাঁর আবেগ, দুর্বুদ্ধিতা, জীবনের প্রতি পরিহাস কুটিল দৃষ্টি তাকে জার্মানির মনন ও হৃদয়বৃত্তির সঙ্গে একাত্ম করেছে। তাই তাঁর কাব্যের অনুবাদও দেশে অত সহজে হতে পেরেছিলো। শেলীর তন্ময়তা, ভাবাবেগ যা দিগন্তের ক্রমশঃ অপসৃয়মান বর্ণ-বৈচিত্র্যের মতো মধুর অথচ সাধারণ বোধশক্তির আয়ত্তাতীত, অত্যন্ত সহজে ফরাসীদের অনুভূতিপ্রবণ মনে দোলা দিয়েছিল। তাই ফরাসী ভাষায় তাঁর কাব্যের প্রচুর অনুবাদ হয়েছে। আঁদ্রে মোরায়া তো তাঁকে দীর্ঘগ্রীব, প্রসারিত পক্ষ, নভোচারী বিহঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন।</p>
<p><strong>বাংলা ভাষায় বিদেশী সাহিত্য অনূদিত হয়েছে প্রধাণত দুইটি কারণে। প্রথমত, এতদ্দেশীয় জনসাধারণের ধর্ম বোধের পোষকতার জন্যে।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, সমপর্যায়ে ভাবাবেগ ও জীবনাদর্শের প্রশ্রয়ের জন্যে। মহাভারতকার কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস লিখেছিলেন, সূর্যোদয়ে যেমন তমোরাশি বিনষ্ট হয়। মহাভারত শুনলে সেইরূপ কায়িক, বাচিক ও মানুসিক সকল পাপ দূর হয়। সুতরাং মহাভারতের অনুবাদ হয়েছে, এখনও হচ্ছে।</strong></p>
<p>কোরআন শরীফের অনুবাদ কিন্তু মোসলমানেরা প্রথম করেনি। তার অবশ্য অন্য কারণ রয়েছে, কোরান শরীফের ভাষা এরূপ সংক্ষিপ্ত যার সারগর্ত যে, প্রকৃত তথ্যটি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হলে আয়াতের বহির্ভূত অনেক কথাই পাদ পূরণরূপে বলা অত্যাবশ্যক। কিন্তু আধিদৈনিক অভিশাপের ছাত্র কোনো মুসলমান এ কাজে প্রথম অগ্রসর হয়নি। হিন্দুর সে ভয় ছিলো না তাই কোরআনের প্রথম অনুবাদক হিসাবে তাই গিরীশচন্দ্র সেন। আত্ম এর রুদ্ধকপাট যখন অর্গলমুক্ত হলো তখন অনেকেই এ পথে এগিয়ে এলেন। এভাবে বাংলা ভাষায়  এমাম গাজ্জালির অনুবাদ হয়েছে। এমাম গাজ্জালি মহাসমুদ্রের মতো আকাশের ন্যায় অপার, কোথাও ক্রীড়াচঞ্চল, কোথাও পর্বতপ্রমাণ জলরাশিতে আবৃত। কিন্তু অনুবাদ সেইরূপ উজ্জ্বল হয়নি। কেননা, অনুবাদক লক্ষ্য করেছেন, নৈতিক প্রবচনের উপর। অথচ ভাষার শিথিলতা সেই নীতিকথাও মন্থর হয়েছে। সাদীর নীতিকথার সঙ্গে কাব্যভাব বিজড়িত, তাই সাদী আমাদের গ্রহাঙ্গনের মৈত্রী পেয়েছেন অত্যন্ত সহজে বাতকম্পিত বৃক্ষপত্রের মতো আমাদের মন নব নব আবেশে জ্বলে উঠে।</p>
<p>এরপর আমাদের হৃদয়বৃত্তির যোগসূত্রের সন্ধান করেছি হাফেজের দীওয়ানে, গজলে ওমরের রুবাইয়াতে। অন্তরদৃষ্টি খুঁজেছি, রহস্য খুজেছি। সাধারণ সৌন্দর্য নয় শুধু সৌন্দর্যের সুষমার অন্তরালে জীবনের যে নিগূঢ় বঞ্চনা রয়েছে, তাকে বুদ্ধির আয়ত্তে আনতে চেয়েছি। তাই তো হাফেজের গান আমাদের কানে নিত্যকালের জন্যে অনুরন রেখে গেছে-</p>
<blockquote><p>&#8220;কা&#8217;তর হ&#8217;য়ো না, যে উদ্যানে তুমি এখন আছ সেখানে আরো একবার প্রাণের স্পন্দন দেখা দেবে: তোমার সামনে যে গোলাপের অবগুণ্ঠন আছে, হে রাত্রির গীতিকার, তা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না?&#8221;</p>
<p>&#8220;এ জীবনের রহস্য যদি না-ই জেনে থাকো তা হলেও মুহ্যমান হয়ো না। আগুণ্ঠনের মধ্যেও প্রচুর আনন্দ সংগুপ্ত আছে।&#8221;</p>
<p>&#8220;প্রাণ আমার দিনের ঘূর্ণিবায়ু যদি তোমায় এই ক্ষণভঙ্গুর গৃহখানি ধ্বংস করে দেয়, তা&#8217;হলে দুঃখ করো না, কারণ প্রলয় হ&#8217;তেও তোমাকে বাঁচাবার জন্য প্রেম সঞ্চিত আছে।&#8221;</p>
<p>&#8220;দীনহীনের মতো এক কোণে প&#8217;ড়ে আছে দারিদ্র তোমার সহচর, নির্জন রাত্রির গভীর অন্ধকারে তুমি একা, এসবের জন্য দুঃখ ক&#8217;রো না হাফেজ, দুঃখ ক&#8217;রো না, তোমার ভালবাসা, তোমার গান যে তোমারই।&#8221;</p></blockquote>
<p>যিনি রাত্রিকে তমোময়, দিবসকে কর্মময়, পর্বতকে দ্বিধাহীন এবং সমুদ্রকে উচ্ছ্বসিত করেছেন, সেই পরম করুণাময় আল্লাহ তা&#8217;আলার নামে যে আরব্য উপন্যাস আরম্ভ হয়েছে, সেখানে অসম্ভব ও প্রতীতি জন্মায়, সেখানে বাস্তব অবাস্তবের মধ্যে কোনো সীমারেখা নেই, সে কাহিনী বিচিত্রভাবে আমাদের হৃদয় বৃত্তিতে শিহরণ আনে। শাহরিয়ারকে আমরা বহুবার অনুসরণ ক&#8217;রেছি, যিনি ক্ষণদ্যুতির মতো<br />
উজ্জ্বলিত তলোয়ারের আঘাতে রিরংস জর্জরিত বহু রমণীর দেহকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন।</p>
<p><strong>ইকবালও বাংলাতে অনূদিত হয়েছেন উপরোক্ত দু&#8217;টি কারণেই।</strong><br />
<strong>প্রথমত, আমাদের হৃদয়বৃত্তির সঙ্গে যোগসূত্র নির্ণয়ের জন্য&#8217; দ্বিতীয়ত, ধর্মবোধের পোষকতা ও তত্ত্বজিজ্ঞাসার মীমাংসার জন্য।</strong> বাংলাতে তাঁর প্রথম অনুদিত গ্রন্থ শেকোয়া, সে সময় বাঙালী মুসলমান নজরুল ইসলামকে পুরোভাগে রেখে আপন দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তি খুঁজছে, স্বস্তিহীন মুহূর্তে সে আল্লার বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছে, তখন ইকবালের শেকোয়ায় সে আপন মনের অনুরণন শুনেছিলো। চরম দারিদ্র্যে নিষ্পিষ্ট, দুঃখে জর্জরিত এবং তৎহেতু আত্মঘাতী কবি আশরাফ আলী খান শেকোয়া প্রথম তর্জমা করেছিলেন। আশ্চর্য আবেগ এবং গতির মধ্যে আশরাফ আলী শেকোয়ায়  আপন মনের প্রতিফলন দেখেছিলেন, তাই তাঁর অনুবাদ আক্ষরিক না হলেও আন্তরিকতায় উজ্জ্বল এবং কাব্য-সৌন্দর্য নবোদিত বর্ণবৈচিত্র্যের মতো আবেগ এবং গতির মধ্যে আশরাফ আলীর পর শেকোয়ার তর্জমা অনেক হয়েছে। মুহাম্মদ সুলতান, মীজানুর রহমান ও ডক্টর শহীদুল্লাহ এই তিনজনের নামই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মী<strong>জানুর রহমান ও ডক্টর শহীদুল্লাহ মূলকে যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন, তাই তাদের রূপায়ণে ইকবালের বক্তব্যের বিকৃতি ঘটেনি। কিন্তু কাব্যিক মাধুর্য ক্ষুণ্ন হয়েছে, একে তাঁরা দোষের মনে করেননি, কেননা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো বাংলার পরিবেশে ইকবালকে যথাযথভাবে পরিদৃশ্যমান করা, সুদৃশ্যমান নয়। মুহাম্মদ সুলতানের অনুবাদ সুখপাঠ্য এবং তৃপ্তিসঞ্চারী।</strong></p>
<p>আমাদের ধর্মবোধের পোষকতা এবং তত্ত্বজিজ্ঞাসার জন্য অনূদিত হয়েছে ইকবালের &#8216;আসরারে খুদী&#8217; ও &#8216;রমুযে বেখুদী&#8217;। উভয়ই গ্রন্থই নিগূঢ় দার্শনিক তত্ত্বসমন্বিত, নিশ্চিন্তে বোধগম্য নয়। &#8216;আসরারে খুদী&#8217;র প্রথম বাংলা তর্জমা করেন সৈয়দ আবদুল মান্নান, অনুবাদ জনপ্রিয়ও হয়েছে। আবদুল মান্নান গদ্যে তর্জমা করেছেন। এরপর আমি সপ্তম অধ্যায় পর্যন্ত কাব্যানুবাদ করেছিলাম। আমি মূলকে যথাযথভাবে অনুসরণ করিনি, শুধু মূলীভূত তত্ত্ব এবং আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছি। ফররুখ আহমদও কাব্যে অংশবিশেষ অনুবাদ করেছেন।</p>
<p>এভাবে বিচিত্রভাবে বাংলা কবিতার আসরে আমরা ইকবালকে পেয়েছি। বাংলার হাওয়ায় তাঁর গান ভেসেছে, বাংলার জলকল্লোলে তাঁর কণ্ঠ শুনেছি। তাঁর হৃদয়ের বিপুলতা দেখেছি বাংলার আকাশে। যেমন নবোদিত সূর্য সমুদ্রের কল্লোলের যেমন পরিমাপ হয় না অথচ তা দেখে বিহবল ও আনিন্দিত হওয়া যায়, তেমনি ইকবালের গভীরতা, ব্যাপকতা ও বিপুলতা আয়ত্তাতীত কিন্তু আমাদের জন্য সংবেদনশীল ও আনন্দদীপ্ত। তাঁর আত্মজিজ্ঞাসার বাণী আমাদের জন্য পরম অমোঘ-</p>
<blockquote><p>&#8220;যদি তুমি কভু রাতের আঁধারে<br />
একান্ত নিরালায়<br />
নির্বাক মনে জেগে থাকো কোথা<br />
জীবন প্রত্যাশায়<br />
আদর্শ বাণী জীবন্ত করো তুমি-<br />
উষার আলোতে উজ্জ্বল হোক মনের ধুসর ভূমি।<br />
আল্লাহর কাছে সে আদর্শের বাতি হয়তো ম্লান<br />
প্রকৃতির কাছে দীপ্ত তারারা আনিয়াছে কল্যাণ;<br />
স্বর্গ থেকেও আলোকোজ্জ্বল রূপে<br />
মানুষের মনে মোহন স্বপ্ন আনিয়াছে চুপে চুপে।<br />
বিজিত হয়েছে মানুষ তাহার কাছে<br />
বশীকরণের যাদু তার জানা আছে<br />
আকর্ষণের ক্ষমতা তাহার একান্ত সঞ্চয়;<br />
অতীত কালের জমানো মিথ্যা আর নয় আশায়<br />
যে ভেঙ্গেছে সেই মিথ্যার কুহেলিকা<br />
পৃথিবীতে সেই জ্বেলেছে এবার প্রাণের নবীন শিখা।<br />
সংঘাতে তার মনের আবর্তন<br />
শেষ বিচারের রুদ্র দিনের জানালো আমন্ত্রণ।&#8221; (আসরারে খুদী)</p></blockquote>
<p><strong>ঋণ স্বীকার: ইকবাল সংসদ-২০০৭।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/allama-iqbal-at-bengali-poetry-gathering/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13794</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা ভাষা ও জাতীয় জাগরণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/poet-kazi-nazrul-islam-in-bengali-language-and-national-awakening/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/poet-kazi-nazrul-islam-in-bengali-language-and-national-awakening/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 03 Mar 2024 13:05:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13739</guid>

					<description><![CDATA[আজকে যে সময় দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, সে সময় আমাদের ভাষা এবং আমরা—উভয়েই আগ্রাসনের শিকার। এই উপমহাদেশের মুসলমানসহ এই পূর্ববঙ্গের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই নির্বিশেষে আজকে ভাষা-আগ্রাসনের শিকার। এই ভাষা-আগ্রাসন এসেছে ভারত থেকে, এসেছে কলকাতা থেকে। এই আগ্রাসনের একটা এসেছে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজকে যে সময় দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, সে সময় আমাদের ভাষা এবং আমরা—উভয়েই আগ্রাসনের শিকার। এই উপমহাদেশের মুসলমানসহ এই পূর্ববঙ্গের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই নির্বিশেষে আজকে ভাষা-আগ্রাসনের শিকার। এই ভাষা-আগ্রাসন এসেছে ভারত থেকে, এসেছে কলকাতা থেকে।</p>
<p>এই আগ্রাসনের একটা এসেছে ওয়েস্টার্ন প্রবাহের মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে টেকনোলজিক্যাল যে জাঁতাকলে আমরা পিষ্ট হচ্ছি বা উজ্জীবিত হচ্ছি সেটার ভিতর দিয়ে। আরেকটা হচ্ছে ব্রিটিশদের সংস্কৃতির মাধ্যমে। অর্থাৎ একটা বিজ্ঞানগত আগ্রাসন, আরেকটা হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। তবে, দুটো মিলিয়েই পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।</p>
<p>এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের স্বরূপটা তাহলে কেমন? আপনারা দেখবেন যে এখন বাংলাদেশের কোনো চ্যানেলে বা কোনো মিডিয়াতে কখনোই এই কথা বলা হয়না যে- অমুকের লাশ আজ গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হলো বা বায়তুল মোকাররমে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। বরং বলা হয় যে, অমুকের মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লাশ হচ্ছে কালচারাল বা আমার নিজস্ব আইডেন্টিটির অর্থাৎ বাঙালি মুসলিমদের শব্দ। লাশকে বিতাড়িত করে মরদেহ ঢুকাচ্ছি, মরদেহ ইংরেজি ডেড-বডির বাংলারূপ। যেহেতু কলকাতায় বিশেষ কারণে তারা লাশ শব্দ ব্যবহার করে না, তাদের নিজস্বতা রক্ষা করার জন্য এটা দোষের কোন কিছু নয়। কলকাতার লোকেরা যদি তার নিজস্ব ভাষাকে রক্ষা করতে চায় সেটাতে দোষ বা দোষের কিছু নাই। কিন্তু দোষ হচ্ছে তখন, যখন আমরা আমাদের কালচারকে ফেলে রেখে ওইটাকে গলার মালা হিসেবে পড়িয়ে নিই। আমাদের সাহিত্যের পাতা থেকে লাশগুলো আজ বিতাড়িত হয়ে মরদেহ হয়ে গেছে।</p>
<p>আপনারা দেখবেন যে সংবাদপত্রের ভাষা, মিডিয়ার ভাষা বা আমাদের নিজেদের ভাষা—সবক্ষেত্রেই পানি বিতাড়িত হয়েছে। সেখানে জল ঢুকে গেছে। জল এবং পানি একই জিনিস বুঝায়, এটার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্যটা হল কালচারাল। ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান থেকে শুরু করে আসাম পর্যন্ত এই দেড়শ কোটি মানুষের সবাই সকাল বিকাল রাত্রি দুপুরে পানি পান করে। শুধুমাত্র কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের চার-পাঁচ কোটি হিন্দুরা জল পান করে। এটার মধ্যেও দোষের কিছু নাই, তারা তাদের নিজস্বতা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। সেজন্য তারা পানি শব্দকে পরিহার করে। আমরা এই দেড়শ কোটি মানুষের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে আমরা এই জলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি।</p>
<p>এখন মরহুম শব্দের ব্যবহার উঠিয়ে বলা হয় প্রয়াত। কিন্তু এটাও আমাদের সংস্কৃতি নয়। এটা ধর্মীয় বিভাজন নয়, সুস্পষ্টত এটা একটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এরকম অসংখ্য আগ্রাসনে আমরা বর্তমান সময়ে কম্পমান। এরকম অবস্থায় যখন আমরা আজকের আলোচনাটা করছি এটার প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত উজ্জ্বল। এই প্রাসঙ্গিকতাকে অস্বীকার না করে বরং পাঠ করাটা দরকারি।</p>
<p>এই দেশের বৌদ্ধ-বিহারগুলো ছিলো জ্ঞানচর্চা-ধর্মচর্চা এবং বাংলা ভাষার অন্যতম পিঠস্থান। যদিও বাংলা ভাষা চর্চা করতো এই অঞ্চলের আদি মানুষেরা। যারা তৎকালীন সময়ে নগরে প্রবেশ করার অধিকারও অনেক সময় পেতো না। গরিব বা বস্তিবাসী হওয়ার কারণে তারা নগরে প্রবেশ করার অধিকার না পেলেও সে সময়ের আমাদের এই গরিব মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। পাল শাসকেরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, যে কারণে যখন সেনরা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের ধ্বংস করেছে তখনই হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন কত বই, কত কী! হয়তো আগুন দিয়ে জ্বালিয়েও দিয়েছে তারা। কারণ আপনারা জানেন যে, সেনরা এ দেশের শাসন ক্ষমতা নেওয়ার পরে কতগুলো বিধান জারি করেছিল। তারমধ্যে এরকম একটি বিধান ছিলো,</p>
<blockquote><p>“অষ্টাদশ পুরানানি রামস্য চরিতানি<br />
ভাষায় মানব শ্রুত্বা রৌরব নরকং ব্রজেৎ।”</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ, অষ্টাদশ পুরাণ এবং রামের চরিত্র ইত্যাদি যারা পাঠ করবে বা শ্রবণ করবে মানব রচিত ভাষায় (বাংলা ভাষায়), তাদের অবস্থা হবে রৌরব নামক নরকে।</p>
<p>অর্থাৎ বাংলা ভাষায় কথা বলার সমস্ত দরজা রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এমন নির্যাতন-পীরন চালানো হলো যে, যারা জান নিয়ে পালাতে পেরেছিলো তারাই শুধুমাত্র তিব্বতে, নেপালে আশ্রয় নিয়ে জান বাঁচাতে পেরেছিলো। তাদের হাত দিয়েই আমরা সামান্য কয়েকটা বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ও এর ৪৭ টি গান পেয়েছিলাম। বাকি সবকিছুই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এজন্য বাংলা ভাষার আদি-নিদর্শন মধ্যযুগের। বৌদ্ধ যুগের পরের যুগ যদি ধরি তাহলে ৬৫০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় করার আগ পর্যন্ত এই ৫৫০ বছরের বাংলাভাষা চর্চার ইতিহাস এখানে আর পাওয়া যায় না। বাংলা ভাষায় সেসময়ের কোনো আদি নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আমাদেরকে পেতে হয়েছে নেপাল থেকে, নিয়ে আসতে হয়েছে তিব্বত থেকে। কি ঘটেছে আসলে?</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে তারা বাংলা ভাষা চর্চার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। তারা মনে করেছিলো দেবতাদের ভাষা হল সংস্কৃত, তাই শুধু সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতে হবে। সংস্কৃত ভাষার বাইরে আর কোনো ভাষা থাকতে পারবে না। দেবভাষার বিরুদ্ধাচরণ যারা করবে তাদেরকে কতল করে দেয়া হবে। বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে মানুষদেরকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, জিহ্বা কেটে দেয়া হয়েছে। এসব ভয়ংকর ব্যাপার। যদিও সেনরা সংস্কৃত-ভাষার অশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। জয়দেব গীতগোবিন্দ লিখেছেন এই বাংলাদেশে সেনদের দরবারে বসে। অসাধারণ কাব্য সেটা, কিন্তু মনে রাখতে হবে সেটা সংস্কৃত ভাষায় লেখা। অথচ যারা সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্যচর্চায় এত উৎসাহ দিচ্ছিলো, তারাই আবার বাংলা ভাষার জন্য সমস্ত দমন-পীড়নের রাস্তা উন্মুক্ত করে বাংলা ভাষা চর্চার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলো। ফ্যাসিবাদী যে কায়দাটা ঠিক এখন আমাদের দেশে বিরাজমান, অনেকটা সেই কায়দার মতো, বরং হয়ত এর চেয়ে আরেকটু বেশি নির্মম ছিলো।</p>
<p>তখন বাংলার মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের ফলে এই বাংলা ভাষা মৃত্যু দশা থেকে রক্ষা পেয়েছে। মুসলমানরা যেহেতু এই রাষ্ট্রের অধিকার নিয়েছিলো সেনদের কাছ থেকে, অতএব মুসলমানদের সাথে যদি কারো শত্রুতা থেকে থাকে সেটা ছিলো সেন রাজাদের সাথে, যারা ব্রাহ্মণ্যবাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল, যারা এই কাস্ট সিস্টেমকে তাদের সঙ্গে এদেশে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সাধারণ জনগণের সাথে তুর্কি-পাঠানদের কোনো বিরোধ ছিল না। সংগত কারণেই তারা সাধারণ মানুষের সাথে আত্মীয়তা করতে চেয়েছিলো। সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে চেয়েছিলো এবং ইসলামের মধ্যকার সাম্য-মৈত্রীর ভ্রাতৃত্বকে তারা সামনে নিয়ে এসেছিল।</p>
<p>মূলত এই দেশের মানুষ যারা প্রায় দেড়শো বছর ধরে নির্যাতিত হয়েছিলো সেই কাস্ট সিস্টেমে, সে লোকগুলো মুসলমানদের আগমনের ফলে একটা মুক্তির সোপান পেয়ে গিয়েছিলো। সংগত কারণেই তারা আকৃষ্ট হয়েছে মুসলমানদের প্রতি। আবার বন কেটে বসত নির্মাণ, জমি উদ্ধার, ভূমি উদ্ধার, কৃষির জমি সম্প্রসারণ এগুলোর ভেতর দিয়ে মুসলিম সাধকেরা, মুসলিম শাসকরা বিশেষ করে মোঘল আমলে এটার ব্যাপক বিস্তার হয়েছিলো। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষগুলো একেবারে ৯০% মানুষ ইসলামের পতাকাতলে এসেছিল। এই যে পতাকাতলে আসার ব্যাপারটা, এটা যে অনেক সিগনিফিকেন্ট এবং মিনিংফুল আমাদেরকে সেটা মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটা কিন্তু তরবারি দিয়ে হইনি। তরবারি দিয়ে ইসলাম প্রচারিত হয়নি এটার প্রমাণ ইটন সাহেবরা দিয়েছেন, অসীম রায়েরা দিয়েছেন; অতএব আমি আর সেটার দিকে আগাচ্ছিনা।</p>
<p>মুসলমানদের হাত দিয়ে যখন বাংলা ভাষার এই রুদ্ধ-দ্বার খুলে গেলো, মুসলমানরা তখন বাংলা-সাহিত্য চর্চার জন্য স্থানীয়দেরকে তাদের দরবারে আহ্বান করলো। স্থানীয়দের পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করলো। এই প্রক্রিয়াতে গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ আমাদের ইতিহাসের প্রথম শাসক, প্রথম সুলতান, প্রথম সম্রাট, প্রথম শাসক—যিনি অনুভব করলেন জনগণকে আমাদের সামনে আনতে হলে জনগণের ভাষাকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমি আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই, মুসলমানরা আসার আগে বাংলা ভাষা ছিলো গরিব মানুষের ভাষা, বস্তির ভাষা, গাছতলার ভাষা। ব্রাহ্মন্যবাদীরা কটাক্ষ করে যেটাকে বলতো বটতলার ভাষা, সেই বটতলা-হাটতলাগুলো থেকে তাদের বাংলা-ভাষাকে মুসলিম শাসকেরা তাদের দরবারে নিয়ে আসে এবং গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা সম্মানের সঙ্গে আসন করে নেয়। দরবারের অর্থায়নে রচনা করা শুরু হলো বইপত্র এবং আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে এটি ব্যাপকভাবে বন্যার মতো দেখা দিলো।</p>
<p>আজম সাহেবের সভাকবি শাহ মুহাম্মদ সগির, যাকে বলা হয় মুসলিম বাংলার প্রথম কবি, তিনি রাষ্ট্রের টাকায় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রের নির্দেশে বাংলা ভাষায় প্রথম গ্রন্থ ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনা করেন। মুসলমানরা অংশগ্রহণ করলেন। মুসলমানদের দ্বিধা ছিল যে বাংলা ভাষা আমরা মুসলমানরা চর্চা করতে পারবো কিনা! কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে নবী বংশের সৈয়দ সুলতান ষোড়শ শতাব্দীর কবি। তিনি লিখেছেন,</p>
<blockquote><p>“যারে যেই ভাষে প্রভু করিল সৃজন<br />
সেই ভাষ হয় তার অমূল্য রতন।”<br />
আব্দুল আলীম তো আরো ছিলেন কড়া। তিনি আরও একধাপ বাড়িয়ে বলেন-<br />
&#8220;যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,<br />
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”</p></blockquote>
<p>বাংলা ভাষার পক্ষে এভাবে ডিফেন্ড করা, বাংলা ভাষার পক্ষে এভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া এরকম নজির বাংলা ভাষার ইতিহাসের আর কোথাও খুঁজে পাবেন না। মুসলমানরা বাংলা ভাষার অংশগ্রহণ করা শুরু করলো। পাশাপাশি আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, নুসরত শাহের সময়ে আরো যেটা হলো, হিন্দুদেরকেও সামনে নিয়ে আসা হলো।<br />
বিদ্যাপতি প্রধান নরপতি দেশপ্রীতিম বিরসার, বিদ্যাপতি এসব কথা বলেছেন। এমনকি মঙ্গলকাব্যেও লেখা হয়েছে এসব। মুকুন্দ রাম, বিজয় গুপ্তের বইয়েও মুসলমানদের কথা উল্লেখ আছে।</p>
<p>১২০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ—সে সময় পর্যন্ত বাংলায় লেখা হয়েছে মুসলমানদের টাকায়। রাষ্ট্রের টাকায় লেখা হচ্ছিলো ভগবৎ গীতা, রাষ্ট্রের টাকায় লেখা হয়েছিলো রামায়ণ, রাষ্ট্রের টাকায় লেখা হয়েছিল ‘মহাভারত’। মুসলমানরা সত্যিকার অর্থে রাজকোষ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো এই দেশের জনগণের সাথে আত্মিক সম্পর্ক করার জন্য। এই সম্পর্ক করার ভেতর দিয়ে বাংলাভাষা সত্যিকার অর্থে পুষ্পে-পত্রে-পল্লবে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এজন্য দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন-</p>
<p><strong>“মুসলমানদের বাংলা বিজয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য অশেষ কল্যাণের কারণ হয়েছে এবং সম্ভাবনার সিংহ দুয়ার খুলে দিয়েছে।”</strong></p>
<p>ডক্টর এনামুল হক বলেছেন-<br />
<strong>“মুসলমানরা যদি বাংলা বিজয় না করতো, তাহলে পৃথিবীতে ভাষা হিসেবে বাংলা চিরকালের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যেতো।”</strong></p>
<p>অথচ কলকাতার ঐতিহাসিকেরা এই বখতিয়ার খলজি থেকে ১৩৫০ সাল অর্থাৎ ইলিয়াস শাহ পর্যন্ত সময়টাকে বলে অন্ধকার যুগ। পাপ করছে সেনরা আর সেই পাপের দায়ভার তুলে এনে পাঠান-তুর্কিদের উপর চাপানো হচ্ছে। এই যে পাঠান এবং তুর্কিদের উপর দোষ চাপিয়ে একটা অন্ধকার যুগের আবিষ্কার করা হয়েছে, এটা কিন্তু আমাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। এটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।</p>
<p>এটা হলো মুসলিম শাসনামলে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সামান্য খন্ডচিত্র মাত্র। এইভাবে বাংলা ভাষা হয়ে উঠে আরবি-ফার্সি-উর্দুর সংমিশ্রণে সত্যিকার অর্থে জন-গণমনতান্ত্রিক একটি ভাষা। এমনকি ভারতচন্দ্র তার রচিত</p>
<blockquote><p>‘অন্নদামঙ্গল’ গ্রন্থে লিখেছেন,<br />
“না রবে প্রসাদগুণ না হবে রসাল<br />
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল ৷৷”</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ যদি আমি আরবি, ফার্সি, উর্দু শব্দ বাদ দিয়ে ভাষা চর্চা করি তাহলে না রবে প্রসাদ গুণ আর না হবে রসাল। অর্থাৎ এর কোনো সাহিত্যিক মূল্যও থাকবে না। এর কোন রসময়তাও থাকবে না। অতএব মুসলমানদের ভাষাকে সাথে নিয়ে আমি ভাষা বলছি এই কারণে যে, এতে সাহিত্যের যে ভাষাটা সেটা আরো সুস্বাদু হয়ে উঠবে।</p>
<p>এইরকম মিশ্র একটি আবহাওয়া তৈরি করে নিরঙ্কুশভাবে ১২০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষা কতগুলো শাখায় বিভক্ত হয়। পদাবলী শাখা, মঙ্গলকাব্যের ধারা, নাত সাহিত্যের ধারা, রোমান্টিক প্রণয়-উপাখ্যানের ধারা, বাংলা রাজ-দরবারের বাংলাসভা, মর্সিয়া সাহিত্যের ধারা, লোকসাহিত্যের ময়মনসিংহ গীতিকা, ধাঁধা, ছড়া, রূপকথা, উপকথা অর্থাৎ শত শত শাখায় বাংলা ভাষা সম্প্রসারিত হয়েছিলো, এক কথায় বাংলা ভাষার জাগরণ ঘটেছিলো।</p>
<p>১৮০০ সালে ইংরেজরা বাংলা ভাষা, যে ভাষা হিন্দু মুসলিম মিলনের ভাষা ছিলো, সেই ভাষাটাকে সাম্প্রদায়িক বানানোর জন্য বাংলা ভাষা থেকে বায়ান্ন শতাংশ মানুষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে ভাষা চর্চা করার প্রবণতা দেখা যায়। তখনকার বাংলা অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৫২ শতাংশ এবং নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাও মুসলমানদের ভাষায় কথা বলতো। আমাদের মনে রাখতে হবে হিন্দুদের বৃহৎ অংশ ৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন করেছিল। এর কারণ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদ, হিন্দুত্ববাদ; তারা সমর্থন করেছিলো মহাজন ও জমিদারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। বাঙালি মুসলমান এবং পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের কাছে পাকিস্তান ছিল একটি ইউটোপিয়া। যেখানে গেলে এই জমিদার, মহাজন-ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকদের হাত থেকে মুক্তি ঘটবে। সে জন্য তারা পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিয়েছিলো।</p>
<p>এই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বায়ান্ন শতাংশ মানুষের ভাষাকে অস্বীকার করে বাংলা ভাষার শরীর থেকে আরবি ফার্সি উর্দু শব্দগুলোর অপসারণ করেছিলো। বাংলা ভাষাকে ক্ষতবিক্ষত করে সেই ক্ষতবিক্ষত দেহকে মোচন করা এবং ক্ষতগুলোকে ভরাট করার জন্য তারা সংস্কৃত থেকে জটিল শব্দগুলোকে নিয়ে আসলো। এতে করে বাংলার সাথে বাংলাদেশের জনগণের সত্যিকারের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেলো। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলার প্রধান ছিলেন ‘উইলিয়াম কেরি’। তিনি ছিলেন খ্রিস্টান পাদ্রী। অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক একজন ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এবং তার সাম্প্রদায়িকতার একটাই উদ্দেশ্য ছিল যে, নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠী। যাদেরকে নিয়ে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সংস্কৃতায়িত বাংলা নির্মাণ করলেন, তারা সবাই হলেন ব্রাহ্মণ।</p>
<p>মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, তারিণীচরণ মিত্র এরা একেবারে নীতি-নিষ্ঠ ন্যায়নিষ্ঠ কঠোর-কঠিন রক্ষণশীল কাঠব্রাহ্মণ। এই কাঠ-মার্কা ব্রাহ্মণদের হাতে গিয়ে বাংলা ভাষা পুরোপুরি বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। এই বিকলাঙ্গ বাংলা ভাষা যখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, তখনই তার স্বাভাবিক বিকাশ স্থবির হয়ে গেলো। একসময় আমরা ধরেই নিলাম বাংলা ভাষা হলো সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত। যেটা একেবারেই পুরোপুরি মিথ্যা একটি বয়ান। বাংলা ভাষার সাথে সংস্কৃতির কোন সম্পর্কই নাই। বাংলা ভাষার সাথে সম্পর্ক হলো ‘প্রাকৃত’ এর। এটা হল পুরোপুরি আরবি মিশ্রিত।</p>
<p>উইলিয়াম কলেজের বাংলাকে কিছুটা তরল করেছিলেন ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’। বঙ্কিম ফোর্ট উইলিয়ামের এই বাংলা গদ্যটাকে মানুষের কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেছিলেন তার “দুর্গেশনন্দিনী” উপন্যাসের মাধ্যমে। কিন্তু তার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো আজকের বিজেপির মতো। আজকে ভারতের বিজেপি যা চিন্তা করছে, এরকম চিন্তা ভাবনাই করে গিয়েছিলেন বঙ্কিম তখনকার সময়ে। কিন্তু ভাষাসীম বঙ্কিমকে অবশ্যই স্যালুট করতে হয়। তিনি সংস্কৃতির এই আবরণ থেকে অর্থাৎ ফোর্ট-উইলিয়াম কলেজের নির্মিত প্রাণহীন বাংলা ভাষাকে কিছুটা প্রাণ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার পরে এটাকে আরো রসালো করেছিলেন মীর মোশাররফ হোসেন খান।</p>
<p>কিন্তু বাংলা ভাষা তার স্বাভাবিক গতি আর ফিরে পায়নি। এই ভাষার স্বাভাবিক গতি ফিরে আসার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত, কাজী নজরুল ইসলামের জন্মের আগ পর্যন্ত। কাজী নজরুল ইসলামের জন্মই হলো মুসলমানদের জন্য সত্যিকারের রেনেসাঁ।</p>
<p>হিন্দুদের এডুকেশনাল রেনেসাঁ যেটাকে বলে থাকি আমরা, সেই শিক্ষা সাহিত্যের আন্দোলন শুরু হয়েছিলো ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই হিন্দু কলেজে মুসলিমদের প্রবেশ করতে দেয়া হতো না। না ছাত্র হিসেবে না শিক্ষক হিসেবে। এই হিন্দু কলেজের মাধ্যমে ধাপে ধাপে উঠে আসলো তাদের প্রতিভাগুলো। এবং একটি রেনেসাঁ হলো যেটাকে তারা সো কল্ড বেঙ্গল রেনেসাঁ বলে। যদিও এটাকে বেঙ্গল রেনেসা বলে তারা, তথাপি এটা হলো বর্ণহিন্দু-ব্রাহ্মণ্যবাদের রেনেসাঁ। সাধারণ হিন্দুদের সাথে বা সাধারণ মুসলমানদের সাথে এই রেনেসাঁর চুলপরিমান ও কোন সম্পর্ক ছিল না।</p>
<p>মুসলমানদের রেনেসাঁ হতে আরো ৮০ বছর লাগলো। ৮০ বছর পরে ১৮৯৯ সালে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মের ভেতর দিয়ে সত্যিকার অর্থে মুসলমানদের জাগরণ ঘটলো। কাজী নজরুল ইসলামের জন্মের আগে দু-চার জন মুসলিম লেখক যে ছিলেননা তা না। মীর মোশাররফ হোসেন, খন্দকার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, বেগম রোকেয়া, কায়কোবাদ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী—তাঁরা ছিলেন। এরা হলেন নজরুলের আগের প্রজন্ম। কিন্তু বিখ্যাত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা ছিলেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো।</p>
<p>মীর মশাররফ হোসেন বিশাল ব্যক্তিত্ব। অনেক অনুসারী তৈরি করেছেন কিন্তু জাতিকে জাগ্রত করতে পারেননি। বেগম রোকেয়া নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। কিন্তু গোটা জাতিকে জাগানোর জন্য বা ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য মানুষকে তেমনভাবে উজ্জীবিত করতে পারেননি। ইসমাইল হোসেন সিরাজী; যে ইসমাইল হোসেন সিরাজী সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন “তিনি হলেন আমার মানসপিতা। ইসমাইল হোসেন সিরাজী যদি অনলপ্রবাহ না লিখতেন তাহলে আমি অগ্নিবীণা বাজাতে পারতাম না।” এমন সম্মান দিয়েছেন তিনি, সেই সিরাজিও জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন একরকম।</p>
<p>কিন্তু নজরুল হলেন সঙ্গবদ্ধ বিস্তরভূমির বিশাল ভূখণ্ডের মালিক। নজরুলের যখন জন্ম হলো ঝাঁকে ঝাঁকে মুসলিম তরুণ-তরুণীরা ঝাপিয়ে পড়লো সাহিত্য চর্চায়। ঝাঁপিয়ে পড়লো সাংবাদিকতায়, ঝাঁপিয়ে পড়লো সঙ্গীতে, জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে। এটা হল জাগরণ, রেভ্যুলেশন। যদি নজরুলের জন্ম না হতো তাহলে কি আমরা রসুল উদ্দিন, ফররুখ আহমেদ আল মাহমুদদের পেতাম? কিছুই পেতাম না। শাহেদ আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা শওকত আলীকে পেতাম? সংগীতে তো আমাদের এমন অবস্থা যে, সংগীত যেনো লবণশূন্য তরকারির মতো। নজরুল যদি না হতো আব্বাস উদ্দিনের জন্ম হতো না, আব্বাস উদ্দিনের জন্ম না হলে মতিউর রহমান মল্লিকের জন্ম হতো না।</p>
<p>নজরুল ছিলেন আশার আলো বা আলোকবর্তিকা বা বাতিঘর। যে বাতিঘর দিয়ে দূরবর্তী জাহাজকে কুলে ভেড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একসময় বাতিঘর গুলোই জাহাজকে পথের দিশা দিত। কবি নজরুল ছিলেন আমাদের জাতির বাতিঘর।</p>
<p><strong>নজরুল প্রথমে যেটা করলেন সেটা হল ভাষাবিদ্রোহ। ভাষা বিদ্রোহ হলো নজরুলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ। অথচ আমরা তাঁর রাজনৈতিক বিদ্রোহ, শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, অন্যায় অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা বলি। কিন্তু নজরুলের ভাষা বিদ্রোহ কতটা যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা নজরুল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বেধে দেয়া বাংলা ভাষার ফ্রেমকে ভেঙ্গে চুরমার করে বাংলা ভাষাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের আগের বারোশো সাল থেকে আঠারোশো সাল পর্যন্ত চলে আসা বাংলা ভাষার কাছে।</strong> এবং দেখেন নজরুলের ভাষাগুলো কি ছিলো-</p>
<blockquote><p>“কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি-মাল্লা<br />
তারি মুখে সারি গান লাশারিকাল্লা।”</p></blockquote>
<p>এই যে এই বাংলা, এই ভাষা পূর্ব বাংলার মানুষের, এই ভাষা আমার। এই জিনিসটা নজরুল নিলেন। আমার জায়নামাজ, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ফিরে আসলো আবার সাহিত্যের পাতায় নজরুলের আগমনের মাধ্যমে। এবং ভাষার যে অসাধারণ ব্যঞ্জনা এবং মিশ্রনের যে বাহাদুরি সেটা নজরুল করে দেখালেন। লা-শারিকল্লাহ এর সাথে পাকা মাঝি-মাল্লা, মাল্লার সাথে আল্লাহ এই যে অনুপ্রাসের খেলা। এরকম তার ফাতেহা-ই-দোয়াজ দহম, ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম—কোনটাকে রেখে কোনটার কথা বলবো!</p>
<p>তারপর এই যে ইসলামী গান, এক্ষেত্রে আমি মনে করি যে, নজরুলের ইসলামী গান বাংলাভাষী বাংলার মানুষ কিছুটা হীনমন্যতায় ভোগে হেতু কথাটা তুলে ধরতে জানে না। রাসূলের সময় থেকে শুরু করে আজকের সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে যত হামদ-নাত লেখা হয়েছে, এগুলো নজরুলের লেখার তুলনায় কিছুই নয়। আমাদের দেশের একজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী প্রফেসর ডঃ এবনে গোলাম সামাদ একটা কথা বলেছেন-<br />
“প্রায়োগিক পৃথিবীর দিকে তাকালে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে আগামীর মুসলিম বিশ্বের ভাষা হবে বাংলা এবং বাংলা যদি আগামী মুসলিম বিশ্বের ভাষা হয়ে উঠে তাহলে অবধারিতরূপে নজরুল অধিকার লাভ করবে এক নাম্বার স্থান”।<br />
কারণ নজরুলকে তো বাংলা অনুবাদ করে সেখান থেকে আরবিটাই কাটাতে পারি নাই আজ পর্যন্ত।</p>
<p>আমি চীনে গিয়েছিলাম তখন নজরুলের এক সেট রচনাবলী নিয়ে গিয়েছিলাম চীনের ডেপুটি ফরেইন মিনিষ্টারের সাথে। আমাদের সাক্ষাৎ চলাকালে সেখানে তাকে বইগুলো দিলাম। এটা ১৯৯৯-২০০০ সালের কথা। তিনি জিজ্ঞেস করেন এই লোকটা কে? তখন আমি ব্যাখ্যা করলাম তোমরা যে কমিউনিজমের কথা বলো এই কমিউনিজম বাংলা ভাষায় তার থেকে বেশি কথা আর কেউ বলে নাই। সাম্যবাদী, বাস্তবহারা, সর্বহারা- নামে তার বই আছে “কুলি-মজুর” নামে তার কবিতা আছে। শ্রমিকের নামে শ্রমিকের গান, জীবনের গান, কৃষকের গান, এটা সর্বহারা কাব্যে ভরা। “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নয় কিছু মহীয়ান”। মানুষের পক্ষে বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য উচ্চারণ হলো “গাহি সাম্যের গান”।</p>
<p>মানুষের জন্য এই প্রাণপাত করা কবি বাংলা সাহিত্যে তো নাই, বাহিরের পৃথিবীতেও নাই। এই সমতুল্য একটি শব্দ পাবেন না। এরকম উচ্চারণে যে নজরুলের যাত্রা শুরু, সেই নজরুলের সমসাময়িক পৃথিবী কেমন ছিলো? ওই সময়ে রুশ বিপ্লব চলছিল। ১৯১৭ সালে নজরুল ছিলেন তখন ১৮ বছরের। সেই সময় রুশ বিপ্লবে লেলিনের পাশে দাঁড়িয়ে যিনি রুশ বিপ্লবকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তার একজন হলেন মাইকোভস্কি আরেকজন হলেন ম্যাক্সিম গোর্কি। দুজন কবিই কম্যুনিস্ট সোসাইটিতে খুবই বিখ্যাত। এই সময়কার বুলগেরিয়ার কবি বা আরো অন্যান্য দেশের কবিরা পাবলো নেরুদা বা তুরস্কের নাজমিন—এরা সমসাময়িক পৃথিবীর মানুষ। এরকম বড় বড় কবিদের মধ্যেও নজরুলের স্থান থাকবে সবার উপরে। কারণ এরা সবাই ছিলেন একমাত্রিক। কিন্তু নজরুল ছিলেন মাল্টি ডাইমেনশনাল। এইরকম ভাষা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের ১০০ বছরে মানুষ সম্পর্কে নজরুলের চেয়ে এত সফল শব্দ আর কেউ প্রয়োগ করতে পারেনি। কত দারুণ করে লিখেছেন, “এই হৃদয়ের চেয়ে বড় আর কোনো মন্দির কাবা নাই।”</p>
<p>নজরুলের ভাষা বিদ্রোহের অন্তহীন ব্যাপার আছে। তার বিদ্রোহী কবিতাটা পড়ে দেখেন তিনি বলেছেন</p>
<blockquote><p>“ধরি, স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।</p></blockquote>
<p>মানে জিব্রাইলের আগুনের পাখা আমি সাপটে ধরি,</p>
<blockquote><p>খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,<br />
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী,<br />
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী।”</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ ইসলামের সাথে গ্রীক মিথলজি, গ্রীক মিথলজির সাথে সেমেটিক মিথলজি, সেমেটিক মিথলজির সাথে ইন্ডিয়ান মিথলজি। হিন্দু ধর্মবাদের সাথে মুসলিম ধর্মচিন্তা সংমিশ্রণ করে এই যে একটা ককটেল নজরুল বানালেন বিদ্রোহী কবিতার মধ্যে, এর সমতুল্য কবিতা বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই। আমাদের ট্রাজেডি হলো, আমরা এগুলো তুলে ধরতে পারি না।</p>
<p>ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, নজরুলের দুর্ভাগ্য আর তোমাদের সৌভাগ্য। নজরুলের মতো এরকম বিরাট কবিকে যদি তরবারি ধরি, সে তরবারি রাখার জন্য যে খাপ দরকার, সেই খাপটা তোমাদের নেই। তোমাদের খাপে নজরুল খাপ খায় না। নজরুলের আসার দরকার ছিলো আমাদের ইরানে, তোমাদের ওখানে না। মহররম কে কেন্দ্র করে নজরুল যে গান কবিতা লিখে গেছেন সেগুলো এখনো আমাদের ইরানের কোন কবিরা লিখতে পারে নাই।</p>
<p>ভাষা বিদ্রোহের পাশাপাশি নজরুল ইসলামী জাতীয় জাগরণকে তিনি যোগ করেছেন। তিনি কবিতার নাম দিলেন খালিদ, ওমর ফারুক, নওরোজ, সওগাত ইত্যাদি। নজরুলের প্রথম বই এবং বাংলা ভাষার রেভ্যুলেশন “অগ্নিবীণা” কাব্যের এগারোটা কবিতার মধ্যে সাতটা কবিতাই হলো মুসলিম মিথ নিয়ে।</p>
<blockquote><p>“শাতিল্ আরব! শাতিল্ আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।<br />
শহীদের লোহু, দিলিরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।”</p></blockquote>
<p>এই যে অসাধারণ একটা জাগরণ ঘটালেন তিনি এসে, ‘দে যাকাত দে যাকাত’ বলে, অর্থাৎ যাকাত নিয়ে যে গান বানানো যায় এটা নজরুল না হলে আমরা কি জানতে পারতাম? এরপর, “রোজা নতুন করে রিজওয়ানের দ্বার খুলেছে” রোজা কে নিয়ে গান বানালেন। তার যে ঈদুল ফিতরের উপর নাটক ছিলো এটা হলো বাংলা ভাষায় লেখা ঈদকেন্দ্রিক প্রথম নাটক “ঈদুল ফিতর”।<br />
সেখানে তিনি বলতেছেন-</p>
<blockquote><p>“নাই হল মা বসন ভূষণ এই ঈদে আমার<br />
আল্লাহ আমার মাথার মুকুট, রসূল গলার হার।”</p></blockquote>
<p>এইভাবে ইসলামিক জীবন ব্যবস্থাকে প্র্যাকটিক্যাল জীবনের সাথে সংযুক্ত করাটা বড় ধরনের একটা জাগরণের ব্যাপার। এটা ছোটখাটো ক্ষুদ্র কোনো লেখক দিয়ে হয় না।</p>
<p>এইভাবে তিনি ভাষা বিদ্রোহের পাশাপাশি জাতীয় জাগরণ ঘটালেন। এই জাগরণ কেন ঘটালেন? নজরুলের সাথে অন্যান্য কবি লেখকদের পার্থক্যটা কোথায়?</p>
<p>একটা কথায় মাথায় রাখতে হবে যে, ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলাদেশ বিভক্ত হয়ে গেলো। একটি অংশ গেল মুক্তিযুদ্ধের পথে, মাতৃভূমির স্বাধীনতার লক্ষ্যে সিরাজউদ্দৌলার নেতৃত্বে। আরেকটা অংশ মীরজাফরের নেতৃত্বে চলে গেলো দেশের স্বাধীনতাকে বিক্রি করার জন্য। দেশের স্বাধীনতা ইংরেজদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য যেভাবে এখন আমরা ভারতের হাতে আমাদের স্বাধীনতা তুলে দিচ্ছি, ঠিক সেভাবে। এই যে দুটো ধারা, একটা হলো দেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের ধারা, মোকাবেলার ধারা, মুক্তিযুদ্ধের ধারা। আরেকটা হলো সহযোগিতার ধারা, রাজাকারদের ধারা, দেশের স্বাধীনতাকে বিক্রি করার ধারা।</p>
<p>১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতা বিরোধী তাদেরকে আমরা কি বলি? রাজাকার বলি। তেমনি ১৭৫৭ সালে যারা স্বাধীনতা বিরোধী ছিল তারা কি রাজাকার না? ১৮৫৭ সালে কলকাতা কেন্দ্রিক বাবু বুদ্ধিজীবীরা আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষে শত শত আর্টিকেল লিখেছিলো। কলকাতার একটা পাখিও মহান সেই স্বাধীনতার যুদ্ধে সিপাহী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেনি। সারা ভারত স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত কিন্তু একটা মাত্র শহর ব্রিটিশদের গোলামিতে লিপ্ত। সে শহরটার নাম “কলকাতা”। ১৭৫৭ সালের যুদ্ধে কলকাতার টোলের পণ্ডিতরা কোনো চুল পরিমাণ ভূমিকা তো রাখেইনি বরং লিখেছে-</p>
<p><strong>“হে ভারতীয় জনগণ, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করো বৃদ্ধ অথর্ব বাহাদুর শাহ যেন ধ্বংস হয়ে যায়। এই পাপিষ্ঠ নরাধম সিপাহীগুলোকে যেন কাটিয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলানো হয়।”</strong><br />
এই ধরনের ভাষায় আর্টিকেল লিখেছে কলকাতায় বুদ্ধিজীবীরা।</p>
<p>পলাশীর বিপর্যয়ের পরে বাংলা বিহার উড়িষ্যা যখন কান্নায় মুহ্যমান, সেই মুহূর্তে মাত্র একটি শহরে বিজয় মিছিল বের হয়েছিলো, সেই শহরটি হলো কলকাতা। স্বাধীনতা চলে যাওয়ার পরে যারা আনন্দ মিছিল করতে পারে তারা কখনোই আমাদের বন্ধু নয়। মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজ্য রক্ষা করার জন্য তারা ভারতে সেদিন মিছিল করেছিলো। টাকা তুলেছিল, ফান্ড দিয়েছিল ব্রিটিশদের জন্য। তাহলে তারা কি রাজাকার না? এটা হল সহযোগীতার ধারা তথা রাজাকারের ধারা। কলকাতার সব মানুষই রাজাকার তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়, তবে কলকাতার অবস্থানটা রাজাকারের অবস্থানে।</p>
<p>তারপরে এই যে বিভাজনটা হলো, একটা ধারা চলে গেলো মোকাবেলার রাস্তায় বা মুক্তিযুদ্ধের রাস্তায়, সেই মুক্তিযুদ্ধের রাস্তায় ফকির মজনু শাহ, মীর-কাসীম, তিতুমীর এরা জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করে লড়াই করতে করতে নিঃস্ব হয়ে হারিয়ে গেলেন।<br />
আর অন্যদিকে, সহযোগিতার, সমঝোতা, সমন্বয়, সম্প্রীতির ধারা ফুলে-ফেফে কলকাতায় বিশাল পাহাড় হয়ে উঠলো।</p>
<p>যে একটা ধারা মোকাবেলার পথে গেলো, ১৭৫৭ সালের পরে এই ধারাটিই বক্সার এবং উদয়নালয়ের যুদ্ধে মীর-কাসেমের সাথে ছিলেন, সেখান থেকে তারা আস্তে আস্তে পরাজিত হতে হতে নিঃস্ব নির্যাতিত ফকির মজনু শাহের সাথে কিছুদিন ঘুরলেন। তারপর নিঃস্ব রিক্ত হতে হতে হতে ধুলোয় মিশে গেলেন। এই যে ধুলোয় মিশে গেলেন—নজরুলই তাদেরকে আবার টেনে তুললেন।</p>
<p>নজরুলকে যে কাজী বলা হয় নজরুল তো কোনো বিয়ে পড়ানোর কাজী নয়। নজরুলের পূর্বপুরুষ ছিলেন বিহারের অধিবাসী, তার পূর্বপুরুষ ছিলেন পাটনার হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস যাকে কাজিউল কুজ্জাত বলা হতো। কাজিউল কুজ্জাত ছিলেন উদয়নালা এবং বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসেম আলীর সাহায্যকারী। আর এই অপরাধে তাকে পালাতে হয় এবং তারা দুর্গম-দুর্ভেদ্য মরুভূমির মতো জায়গা চুরুলিয়াতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আশ্রয় নিয়ে তিনি একটি মক্তব করতে পেরেছিলেন, সেই মক্তবের পাশাপাশি একটি মসজিদ এবং হাজী পালোয়ান নামের এক ব্যক্তির একটি মাজার—এই তিনটি জিনিস নিয়ে তিনি পরিবারকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন। আশ্রয়স্থল গড়ে উঠলো।</p>
<p>চুরুলিয়া ছিল এমন একটি গ্রাম, যার বিশ-পঁচিশ মাইলের ভিতরে কোনো বাড়িঘর ছিলো না। এই দূর্ভেদ্য গ্রামে ফকির আহমদ গাজীর সচ্ছল সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকেরা জীবিকার জন্য এমন কোনো কাজ নেই যে তাঁরা করেননি। এমন একটি দুঃখী পরিবারে নজরুলের জন্ম। এইরকম অবস্থায় দুই দুটো বিপর্যয়ের পরে আল্লাহর রহমত হিসেবে বা তার করুণা হিসেবে একটি মানুষের জন্ম হলো চুরুলিয়া গ্রামে। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ধারা, যে ধারাটা ধুলায় মিশে গিয়েছে, সে ধারার প্রতি হঠাৎ আল্লার নজর পড়লো, তিনি সেখানে করুনা করলেন। সেই করুণাটা হলো কাজী নজরুল ইসলাম।</p>
<p>কিন্তু মজার বিষয় হলো, এরকম একটি অবস্থায় ১৮৬৮ সালে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার নামের একজন ব্রিটিশ তার একটি বইয়ে লিখেছেন, এখন থেকে ১০০ বছর আগে ভারতবর্ষের কোনো মুসলমান গরীব ছিলো এটা কল্পনাই করা যেতো না। ১০০ বছরে আমরা এভাবে একটি সোসাইটিকে এমনভাবে নিঃশেষ করে দিয়েছি যে, ভারতবর্ষে কোন মুসলমান ধনী আছে এটা চিন্তাই করা যায় না। এমন ভাবে আমরা একটা জাতিকে নিঃশেষ করে দিয়েছি।</p>
<p>আরেকটা ধারা, যারা সহযোগিতার পথে গেলো, রাজাকারের পথে গেলো, তারা ফুলে-ফেফে উঠে বড় হতে হতে চিরস্থায়ী-বন্দোবস্ত জমিদার হয়ে গেলো। এ রাজাকারের ধারায় মহাপুরুষ দু-চারজন যে জন্মাননি তা নয়। বিরাট বিরাট মহাজন, মহা মহা বুদ্ধিজীবী এভাবে ফুলে-ফেফে উঠতে উঠতে এই ধারায় সর্বোচ্চ শিখরে একটা মহাপ্রাণ মানুষের জন্ম হলো, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।</p>
<p>রবীন্দ্রনাথ হল সাজানো বাগানের উপর রাজত্ব করেছেন। অপরদিকে নজরুল এর রাজত্ব কর্তৃত্ব তো হয়ইনি বরং তাকে কষ্টে অমানবিক জীবনযাপন করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মতো তৈরি করা খাবারের প্লেট নজরুলের সামনে কেউ তুলে দেয়নি। তাকে একটি দিশাহীন-আশাহীন, ভাষাহীন, ধুলায়-ধুসরিত, পরাজিত, পরাভূত, পর্যদুস্ত, লাঞ্ছিত, নিগৃহীত-নিষ্পেষিত একটা জাতিকে জাগাতে হয়েছে।</p>
<p>এটি হলো নজরুল আগমনের প্রেক্ষাপট। তাকে একসঙ্গে অনেকগুলো দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিলো। প্রথম দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে এই স্থবির মুসলিম জাতির গায়ের ভেতর রক্ত সঞ্চালন করে, দেহের ভিতরে প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে এসে, ট্রমা থেকে বের করে নিয়ে এসে, প্রশিক্ষিত করে এবং স্বাবলম্বী করে। তারপর নজরুল রাস্তা দেখিয়েছেন মুসলিমদের; কোন পথ পরাধীনতার এবং কোন পথ স্বাধীনতার সেটা উপলব্ধি করিয়েছেন। অর্থাৎ জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির পাটাতন নজরুলকে তৈরি করতে হয়েছে নিজের হাতে। তার আগে এই পাটাতন ছিল না আমাদের। সেই পাটাতনের উপরে দাঁড়িয়ে, শক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন এই পথ হল স্বাধীনতার পথ, এই পথ হল ধ্বংসের পথ, তুমি এখন কোন পথে যাবে? এই পথে গেলে বৃটিশের দালালি আর এই পথে গেলে মুক্তি।</p>
<p>বাঙালি মুসলমান মুক্তির পথটাকেই বেছে নিয়েছে। নজরুলকে এতগুলো দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল একই সঙ্গে। বাংলা ভাষা কেন, সারা পৃথিবীতে খুব কম কবিকেই তার জাতির জন্য, তার দেশের জন্য একসঙ্গে এতগুলো দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।</p>
<p>নজরুলের আরেকটি দায়িত্ব ছিল মানুষ এবং মানবতা। মানুষ এবং মানবতার পক্ষে নজরুলের চাইতে এত বেশি সফলভাবে শিল্পসম্মত শব্দ পৃথিবীতে আর কোনো কবি ব্যবহার করতে পারেনি। আবার একই সঙ্গে পরাধীনতা ও শোষণের বিরুদ্ধে নজরুল যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এর কোনো দ্বিতীয় নজির পৃথিবীতে নেই।</p>
<p>আবার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে নজরুলকে বিশ্লেষণ করলেও নজরুল অসামান্য। যেমন, মিউজিক নজরুলের জীবনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সঙ্গীতে তো আমাদের এমন অবস্থা যে, সংগীত লবণশূন্য তরকারির মতো। নজরুল যদি না হতো, তাহলে আব্বাস উদ্দিনের জন্ম হতো না। আব্বাস উদ্দিনের জন্ম না হলে মতিউর রহমান মল্লিকের জন্ম হতো না। নজরুল ছিলেন আশার আলো বা আলোকবর্তিকা বা বাতিঘর। যে বাতিঘর দিয়ে দূরবর্তী জাহাজ কে কুলে ভেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। একসময় বাতিঘর গুলোই জাহাজকে পথের দিশা দিত। কবি নজরুল ছিলেন আমাদের জাতির বাতিঘর।</p>
<p>আলাউদ্দিন খা, রবি শংকর, মোজার্ড বেটোফ্যান; পৃথিবীর অমর সুর-স্রষ্টারা ৫০, ৬০, ৭০ বছরের সাধনা করে হয়ত দশটা-পনেরটা রাগ তৈরি করতে পেরেছিলো অথবা ১৯-২০ টা সিম্ফনি তৈরি করে রেখে যেতে পেরেছিলো। আর অপরদিকে, ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সাল, মাত্র এই ১০ বছরের সংগীত জীবনে নজরুল পৃথিবীতে ছিল না এমন আঠারোটি রাগ তৈরি করে গিয়েছিল যা অবিশ্বাস্য। একটি মানুষ এরকম কিভাবে পারেন যেখানে সুর সম্রাটরা নিজেদের জীবনের ৫০ থেকে ৬০টি বছর অতিবাহিত করতে হয়েছিলো। তিনি বিস্ময়কর এক মানুষ ছিলেন। গানকে তিনি ভিত্তি দিয়ে গেলেন। নজরুলের যদি জন্ম না হতো তাহলে আজকে মুসলমানদের এই গান গাইতে হত,<br />
“দ্বীনের নবী মোস্তফা রাস্তা দিয়ে হাইটা যায়,<br />
হরিণ একটা বান্দা ছিল গাছেরই তলায়”<br />
এসব অন্ত-সারশূন্য গান গেয়ে আমাদেরকে সংগীতের স্বাদ মেটাতে হতো। নজরুল এসে সেই অভাব পূরণ করে দিয়ে গেছেন। তিনি রচনা করলেন-</p>
<blockquote><p>“তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে”</p></blockquote>
<p>অথবা,</p>
<blockquote><p>“ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো দুনিয়ায়<br />
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।”<br />
এরকম গান পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাবেন?</p></blockquote>
<p>তার রচিত গান ছাড়া আমাদের ঈদই যেন অপূর্ণাঙ্গ থেকে যায়। “রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ” এটাতো মুসলমানদের ঈদের জাতীয় সংগীত। একটা কবি কখন বড় হয়? যখন তার জাতির আত্মার সাথে তার আত্মা একাকার হয়ে যায়। নজরুলের গান ছাড়া আমাদের ঈদই হয় না, তার গান ছাড়া মহররমই হয় না।</p>
<p>মর্সিয়া সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ নিঃসন্দেহে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু এবং তারও আগে সপ্তদশ শতাব্দীর কবি হায়াত মাহমুদের “জন্ম নেওয়া”।<br />
এগুলো হলো কারবালা কেন্দ্রিক মর্মান্ত জীবন কাহিনীর উপর। কিন্তু সামান্য কবিতায় গানে এদেরকে ধরে রেখে তাদের চাইতেও অধিক পারঙ্গমতা অর্জন করা এই ক্ষুদ্র ব্রেনের দ্বারা হবে না। নজরুলকে এমন একটি মস্তিষ্ক উপরওয়ালা দান করেছেন। সংখ্যার বিচারে বাদ দিলেও তার রচিত মিশ্র রাগের সংখ্যাই হলো ৪৯। আবার নজরুলের গানগুলো গাইতে হয় শিল্পীদের ২০০ রকম কন্ঠের উঁচুনিচুর মধ্য দিয়ে। নজরুলের গানে ২০০ রকমের ফ্রিকোয়েন্সির ব্যবহার আছে। উচ্চাঙ্গ সংগীত নজরুলকে ছাড়া চর্চা করা যায় না। গানের ক্ষেত্রে তিনি অবিশ্বাস্য রকম বিশালত্ব দান করেছিলেন।</p>
<p>শেরে বাংলা বলতেন, যদি আমার এক পার্শ্ব নজরুল আর আরেক পাশে আব্বাস উদ্দিন থাকে তাহলে বাংলাদেশে ভোট করার জন্য আমার আর কাউকে লাগবে না। বাংলার মানুষ নজরুলের গান আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে মাতিয়ে ফেলেছিলেন তারা। এখানেও তিনি জাতীয় জাগরণের জন্য অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন!</p>
<p>১৯২৯ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের অবস্থান মধ্য গগনে, বিশাল তার প্রতিভা। নোবেল পেয়েছিলেন ১৯১৩ সালে। তার নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও বহু পরে ১৯২৯ সালে নজরুলকে জাতির তরফ থেকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো কলকাতার হলে। সভাপতিত্ব করেছেন সে সময়ের উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের সশস্ত্র আন্দোলনের পরবর্তীকালের হিরো নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, আয়োজক ছিলেন মোঃ নাসির উদ্দিন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদেরা। সেই অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, আমাদের দেশে অনেক বড় কবি আছে কিন্তু আমরা যখন যুদ্ধে যাবো, তখন নজরুলের গান আমাদের পাথেয়। আমরা যখন জেলখানায় যাবো, তখন নজরুলের গান গাইতে গাইতে যাব। আমরা যখন জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসার আন্দোলন করবো, তখনও নজরুলের গান গাইবো-</p>
<blockquote><p>“লাথি মার ভাংরে তালা<br />
যতসব বন্দিশালা<br />
আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা।”<br />
“এই শিকল পরা ছল<br />
মোদের এই শিকল পরা ছল<br />
এই শিকল পরেই<br />
শিকল তোদের করবো রে বিকল।”<br />
“দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার<br />
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার!”</p></blockquote>
<p>পৃথিবীর কোথাও আছে এরকম গান?<br />
জাতীয় জাগরনের প্রতিটা ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। কবিতা গানে তো তার কোন তুলনাই হয় না।</p>
<blockquote><p>চল চল‌ চল‌,<br />
চল চল‌ চল‌&#8230;<br />
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল<br />
নিম্নে উতলা ধরণী–তল<br />
অরুণ প্রাতের তরুণ দল<br />
চল‌ রে চল‌ রে চল‌‌</p></blockquote>
<p>আবার যদি গানের পরে চলচ্চিত্রের কথায় আসি, তাহলে বলা চলে, নজরুল এদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পাইওনিয়ার তথা অগ্রপথিক। আমাদের দেশের মূর্খ চলচ্চিত্রকারেরা এ খবর রাখেই না। বাংলাভাষী কবিদের মধ্যে নজরুল হলো প্রথম চলচ্চিত্রকার, যিনি চলচ্চিত্রের সবকটা মাধ্যমে কাজ করেছেন শুধুমাত্র ক্যামেরা ছাড়া। তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ফিল্ম মেকার। কিন্তু, আছে কোথাও এর কোনো স্বীকৃতি?</p>
<p>এবার আসেন অসাম্প্রদায়িকতায়। ভণ্ডামি বলি, সততা বলি, অথবা প্রতারণাই বলি, অনেকের মধ্যেই ছিল এগুলো। রবীন্দ্রনাথ থাকার পরেও কাজী নজরুল ইসলামের জন্য সেই ১৯২৯ সালের অনুষ্ঠানের ঘোষণা করা হয়েছিল। কেন করা হয়েছিল? তারা কি জানতেন না রবীন্দ্রনাথ উপরে আছে? জানতেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন-</p>
<blockquote><p>“আমার কবিতা, জানি আমি,<br />
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী &#8211;<br />
কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,<br />
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,<br />
যে আছে মাটির কাছাকাছি,<br />
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।”</p></blockquote>
<p>আবার,</p>
<blockquote><p>“অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন ক&#8217;রে!<br />
আকাশ কাঁপে তারার আলোর গানের ঘোরে॥</p></blockquote>
<p>কি বুঝলেন? এমন লাইন রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে আছে! অবিশ্বাস্য মনে হয়নি লাইনগুলো? কিন্তু, আসলেই এগুলো রবীন্দ্রনাথের লেখা। কাকে নিয়ে লেখা বা কার উদ্দেশ্যে লেখা? অবশ্যই নজরুলকে নিয়ে লেখা। ২৩ বছরের একটি ছোকড়াকে তিনি পছন্দ না করলে বসন্তনামা উৎসর্গ করতেন? তার এই কর্মকাণ্ডে ব্রিটিশরা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো এই ভেবে যে, এরকম একজন প্রিজনারকে নোবেলধারী ব্যক্তি তার বই উৎসর্গ করছেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন পৃথিবীতে বাংলা সাহিত্যে তারপরে যে এসেছেন তিনি আর কেউ নয় কাজী নজরুল ইসলাম। কারণ নজরুলের প্রতি বই উৎসর্গ করার কারণে রবীন্দ্রনাথের শিষ্য নামক চামচারা বলেছিলো, এই ২৩ বছরের ছোকড়ার জন্য আপনি একটি বই উৎসর্গ করলেন এটা কি শোভা পায়? তাকে আবার কবি সাহেব “কবি শ্রীমান কাজী নজরুল ইসলাম” পর্যন্ত বলেছেন, এটা কী করে হয়? সে আবার কিসের কবি?</p>
<p>রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন,</p>
<blockquote><p>“তোমরা তাহলে নজরুলের কবিতা পড়োনি। পড়লেও অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছিলে মাত্র। ভিতরের রস আস্বাদন করতে পারোনি তোমরা। যদি করতে, তাহলে বোকার মতো কথা বলতে না। নজরুল যা লিখেছে, তা শুধু কাব্য নয় মহাকাব্য। আমার বয়স যদি আজ তার কাছে থাকতো, তাহলে সে যা লিখছে আমিও তাই লিখতাম। আমিও এগুলোই লেখার চেষ্টা করতাম। কাজেই কাজী নজরুল ছিলেন জাতীয় জাগরণের অনন্য প্রতিভু। আমরা যে কথাগুলো বলতে পারছি না, নজরুল সে কথাগুলোই বলে। ওকে অনুধাবন করো, অনুসরণ করো। জাতীয় জাগরণে নজরুল এতটাই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে যে তাকে বাদ দেওয়া যায় না।”</p></blockquote>
<p>আমরা বলে থাকি, বেঁচে থাকার জন্য চারটি জিনিস প্রয়োজন, আলো, বাতাস খাদ্য, পানি। এগুলো যেমন বেঁচে থাকার জন্য জরুরী, তেমনি জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য চারটি জিনিসের অপরিহার্য। এই চারটি জিনিস বাংলা সাহিত্যে একমাত্র একসঙ্গে একত্রে চমৎকার ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করে যিনি আমাদের আত্মার অধিস্বর হয়েছেন, আমাদের চেতনালোকের নায়ক হয়েছেন, তিনি হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। একারণেই ইংল্যান্ডে যেমন এত বড় বড় কবি লেখক থাকার পরও শেক্সপিয়ার যেভাবে তাদের জাতীয় কবি; আমেরিকার যেমন হুইটম্যান, রবার্ট ট্রাস্টের মতো কবি থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের আত্মা; জাপানে কত বড় বড় নোবেল লড়িয়েট কবি থাকার পরেও যেমন নুগুচি হলেন তাদের আত্মা; ইরান—যেখানে হাফিজের মত কবি সম্পর্কে গোটে বলেছেন, পরকালে যদি স্রষ্টার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার ক্ষমতা থাকতো তাহলে আমি একটাই জিনিস চাইবো যে-হাফিজের মাহফিলে বসে সরাব পান করতে চাই, সেই হাফিজের মতো কবি থাকা সত্ত্বেও ইরানের জাতীয় কবি হলেন ফেরদৌসী। কেন ফেরদৌসী? কারন ইরান মনে করে তাদের জাতিসত্তা, তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য এই সমস্ত কিছু একসঙ্গে ফেরদৌসীর শাহনামার মধ্যে যেভাবে স্পন্দিত হয়েছে, সেভাবে আর কারো কাব্যে হয়নি; তেমনি আমাদের এখানেও মাথার উপরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থাকার পরেও নজরুল হয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি।</p>
<blockquote><p>“মাথার উপরে রয়েছে রবি<br />
রয়েছে সোনার শত ছেলে”</p></blockquote>
<p>রবীন্দ্রনাথ আমাদের নক্ষত্র খচিত আকাশ আর নজরুল হলো আমাদের সুজলা-সুফলা; আমার মৃত্তিকার পৃথিবী। রবীন্দ্রনাথ গরিবের ঘরে বেনারসি শাড়ি, নজরুল হলেন প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাপড়, আমাদের ঘর, আমাদের দৈনন্দিন জীবন। মাথার উপরে নক্ষত্র খচিত আকাশের যেমন দরকার আছে তেমনি দরকার মাটির পৃথিবী। সে মাটির পৃথিবীর নায়ক হলেন কাজী নজরুল ইসলাম।</p>
<p>এবার আসি অসাম্প্রদায়িকতায়। ব্রিটিশরা ভারতে আসার আগে এই সাম্প্রদায়িকতা ছিলো না। অনেককেই অনেক বড় বড় বুলি আওড়াতে দেখা যায়, কিন্তু সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক কবি এই উপমহাদেশে ছিলেন একজনই, তিনি হলেন নজরুল। তিনি লেখায়, কবিতায়, গানে যেমন এটা প্রমাণ করে গেছেন, তেমনি প্রমাণ করে গেছেন ব্যক্তি জীবনেও। তার একটা লাইনই আছে,</p>
<blockquote><p>“হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন হে,<br />
কাণ্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র”</p></blockquote>
<p>তিনি বলছেন,<br />
হিন্দু না মুসলিম এটা জিজ্ঞাস করে কে? কান্ডারীর বলা উচিত, আমার মায়ের ছেলেরা মারা যাচ্ছে। এই নজরুলই আবার বলেছেন,</p>
<blockquote><p>“মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান।<br />
মুসলিম তার নয়ণ-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥”</p></blockquote>
<p>এরকম একটা লাইন দেখানো কি সম্ভব বাংলা সাহিত্যের মধ্য থেকে? তার এরকম অসংখ্য উদ্ধৃতি আছে। অসাম্প্রদায়িক একটি বাংলাদেশ যদি নির্মাণ করতে চাই, তাহলে নজরুলকে আমাদের সর্বসম্মুখে রাখতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশের এতো এতো শঠতা এবং শয়তানি, এর বাইরে যে বাংলাদেশের জনমনে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের সৃষ্টি হওয়া বা বাংলাদেশের মুসলমানরা সত্যি সত্যিই যে অসাম্প্রদায়িক ছিলো, তার বড় প্রমাণ হলো নজরুল। নজরুল আমাদের চেতনার বাতিঘর। নজরুল আমাদের দিকনির্দেশক কম্পাস। নজরুল আমাদের প্রাণের সত্যিকারের পুরুষ। সেজন্য নজরুলের চেতনায় যেহেতু আমরা আলোকিত সেহেতু আমাদেরকে অসম্প্রদায়িক হতেই হবে।</p>
<p>এমনিতেও মুসলমানরা ধর্মগতভাবে অসাম্প্রদায়িক। মুসলমানদের আবেগতাড়িতভাবে সাম্প্রদায়িক কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অসম্প্রদায়িক। আবার যখন সত্যিকারের আলোচনায় বসা হয়, তখন কই থেকে কারা যেনো বলে, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। অথচ, এসব জিনিসগুলো মুসলমানরা অনেক আগে থেকেই শিখে আসছে। রাসূলের হাদীস, তোমার প্রতিবেশী যদি তোমার হাতে নিরাপদ হয় তাহলে তুমি ভালো মানুষ। অতএব, আমাদের প্রতিবেশীর উপর আমাদের হক আছে, সে হিন্দু হোক বা বৌদ্ধ হোক অমুসলিম হোক। নজরুল সেই ইসলামী আধ্যাত্মিকতার সত্যিকার বিকাশ ঘটিয়েছেন তার লেখক জীবন-সহ তার সব কিছুতে।</p>
<p>এর পরে আসি নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে।<br />
তসলিমা নাসরিন আর বেগম রোকেয়ার মাঝে পার্থক্য কি? পার্থক্য খুবই সামান্য। দুজনই নারীবাদী কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি পার্থক্যের কারণে একজনকে জাতি মাথার উপরে নিয়ে রাখে আরেকজনকে ঘৃণার চোখে দেখে। বেগম রোকেয়ার নারীবাদীতার অর্থ হলো- কন্সট্রাক্টিভনেস। তিনি মনে করেন নারীকে সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারলে সামাজিক বৈষম্য দূর হবে। দেশ সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের একটি রাস্তায় অগ্রসর হবে। একটি গাড়ির একটা চাকা ছোটো আরেকটা চাকা বড় হলে সেই গাড়ি তো চলবে না, সেটা একই জায়গায় ঘুরপাক খাবে। অর্থাৎ দুটো চাকাকে সমানতালে একই সাথে আগাতে হবে। ঠিক তেমনি নারী-পুরুষকে সমানতালে রাখতে হবে। বেগম রোকেয়া পর্দাপ্রথা নিজে মানতেন। তিনি বলেছেন পর্দা উন্নতির পথে কোন বাধা নয়। উন্নতির পথে বরং বাধা হলো পর্দা যদি না থাকে। তাহলে তো পশুর সাথে তোমার কোনো পার্থক্য নাই, পশুর সাথে তোমার প্রভেদ কি? এটা হল বেগম রোকেয়ার কথা। বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণের অর্থ হলো- নারীকে শিক্ষিত করো, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করো। এবং শিক্ষিত করো মানে হল সুশিক্ষিত করো।</p>
<p>আর তসলিমা নাসরিনের নারী জাগরণ মানে হল নারীর শিক্ষা নিয়ে তসলিমা নাসরিনের কোন মাথা ব্যাথা নেই। নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যাপারে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তার মাথাব্যথা হলো নারীর যৌনাঙ্গ নিয়ে। সারাক্ষণ এটা উন্মুক্তভাবে ছেড়ে দিতে হবে, এখানে কোনো বিধি নিষেধ চলবে না। অর্থাৎ she is a destructive। বেগম রোকেয়া যদি হয় কনস্ট্রাক্টিভ তাহলে তসলিমা নাসরিন হল ডেসট্রাক্টিভ।<br />
এই ডেসট্রাক্টিভ নজরুলের রাস্তা না বরং নজরুলের রাস্তা হল কনস্ট্রাক্টিভনেস। নজরুল হলো প্রডাক্টিভ, বেগম রোকেয়া হলেন প্রোডাক্টিভ। আর তসলিমা হলেন রিয়াক্টিভ, প্রতিক্রিয়াশীল।</p>
<p>এসব বিষয় মাথায় রেখে আমরা যদি নজরুলের নারীকে নিয়ে কবিতাগুলো পাঠ করি, তাহলে আমরা দেখবো নারীর জন্য নজরুল যা করে গেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনল কবি কোথাও এরকম লিখেনি, যা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন। যেমন,</p>
<blockquote><p>“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর<br />
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”</p>
<p>“নারীর বিরহে, নারীর মিলনে‌ নর পেল কবি-প্রাণ<br />
যত কথা হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।”</p>
<p>“জ্ঞানের লক্ষী, গানের লক্ষী, শষ্য-লক্ষী নারী,<br />
সুষম-লক্ষী নারীওই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী।”</p>
<p>“দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশিথে হয়েছে বঁধু<br />
পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে নারী যোগায়েছে মধু।”</p>
<p>“শষ্য ক্ষেত্র উর্বর হল,পুরুষ চালাল হাল,<br />
নারী সেই মাঠে শষ্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।”</p>
<p>“স্বর্ণ-রৌপ্যভার,<br />
নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হয়েছে অলঙ্কার।”</p></blockquote>
<p>এরকমভাবে নারীত্বের ব্যাপারে যদি নারী অধিকারের কথা বলি কনস্ট্রাক্টিভ ধারায়, তাহলে নজরুলের চেয়ে সফল শব্দ, সফল কাব্য বা সফল সাহিত্য-সম্ভার পৃথিবীতে কেউ দিতে পারেননি। এখানেও তিনি পাইওনিয়ার।</p>
<p>সর্বোপরি, মোদ্দাকথা হলো, আমাদের ভাষা বিদ্রোহ নিয়ে কথা বলা উচিত। এটা কোনো সাম্প্রদায়িক ব্যাপার নয়, এটি সাংস্কৃতিক শূন্যতা, সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা। নজরুল চর্চার একটাই উদ্দেশ্য হবে যেনো আমরা এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনটাকে ধরতে পারি। বুঝতে হবে কেনো এই শব্দ ব্যবহার করা হয় আর কেনো ওই শব্দ ব্যবহার করা হয় না, এই অর্থগুলো যদি বুঝে ফেলি তাহলে আত্মশক্তি আরো বেড়ে যাবে।</p>
<p>একসঙ্গেই এতোকিছুর সমাহার বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কবিতা, সংগীত, চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা, শিশু-সাহিত্য, ধর্ম, সংগীত—এমন কোন দিক নেই যেটাতে নজরুলকে বাদ দেওয়া যাবে। প্রত্যেকটা দিকেই নজরুল পাইওনিয়ার এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। এই জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-</p>
<blockquote><p>“যে আছে মাটির কাছাকাছি,<br />
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।”</p></blockquote>
<p>আমরা যতবারই মানুষের কথা বলবো, নজরুল ছাড়া এর উপায় নাই। আমরা যদি একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলি, তাহলে নজরুল ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা যদি নারীদের নিয়ে কথা বলি, তাহলেও নজরুলের বিকল্প নেই। জাতীয় কবি তো সেই হয় যে জাতির আত্মার সাথে, হৃদয়ের সাথে, মনের সঙ্গে, মগজের সঙ্গে, তার স্বপ্নের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, ঐতিহ্যের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে, ভূগোলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং জাতিকে উজ্জীবিত করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। সেই কাজ বাংলাদেশে একমাত্র নজরুলই করেছেন। অতএব তিনি আমাদের জাতীয় কবি। রবীন্দ্রনাথ নিজেও অনেক বড় কবি এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা যেখানে প্রতিফলিত হয়, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন সেটা শুধু কাব্য নয় সেটা হলো মহাকাব্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন নজরুলের কবিতা শুধু কবিতা নয়, একেকটা মহা কবিতা।</p>
<p>ইংল্যান্ডে মিল্টন ছিলেন, বায়রন ছিলেন, সেলফি ছিলেন, আরো কত বড় কবি ছিলেন ইংরেজি ভাষায়। কিন্তু ইংল্যান্ডের জাতীয় কবি হলেন শেক্সপিয়র। একজন ড্রামাটিস্ট নাট্যকার যিনি মাত্র দু-চারটে কবিতা লিখেছেন, কিন্তু ইংরেজ জাতির সব গৌরব গাঁথার কথা সেখানে আছে। রাশিয়ার পুশকিন আর ভারতের রবীন্দ্রনাথ। যে কারণে ভারতের জাতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ, সেই একই কারণে নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। এই অন্তর্নিহিত তাৎপর্যগুলো আমাদেরকে বুঝতে হবে।</p>
<p>এই আলোচনার বিষয় এটা যে, নজরুল এবং আমাদের বিধ্বস্ত বাংলা। আমরা ভাষা আগ্রাসনের শিকার। আমাদেরকে এখন জাগতে হবে ভাষা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। আমরা যদি এখনও না জাগি তাহলে আর কবে জাগবো? আর যদি জাগতেই হয় তাহলে নজরুলের ভাষা বিদ্রোহের স্বরূপটা আমাদের জানতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাভাষাকে আবারও বারোশো সাল থেকে ১৮০০ সাল এর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ধারণ করতে হবে তখনকার বাংলাকে, কিন্তু গতি থাকতে হবে বর্তমানের সাথে তাল মিলিয়ে। বদরের মাঠ থেকে আমি এখন লাঠি নিয়ে এসে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবোনা। আমাকে নিতে হবে বদরের মাঠ থেকে বদরের সেই আধ্যাত্মিক শক্তি। যদি শুধু লাঠি নিয়ে আসি তাহলে তো মারাই যাবো।</p>
<p>সেভাবেই পূর্বের বাংলা ভাষার আধ্যাত্মিক শক্তি নিয়ে এসে আমাকে জানতে হবে বুঝতে হবে বর্তমানে কিভাবে এটার প্রয়োগ করবো। ১২০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত যে বাংলা এই বাংলা আমার আত্মা, আমার আধ্যাত্মিকতা, আমার শক্তি। সেই আধ্যাত্মিক শক্তির আলোকে যদি আজকের বাংলাকে বা বাংলাদেশের বাংলাকে সাজানো যায় তাহলে আমি মনে করি নজরুলের জন্য আজকের এই আলোচনাটা সবদিক থেকে স্বার্থক।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/poet-kazi-nazrul-islam-in-bengali-language-and-national-awakening/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13739</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা সাহিত্যে আলাওলের কথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/alaol-in-bengali-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/alaol-in-bengali-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 15 Apr 2023 07:16:57 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7699</guid>

					<description><![CDATA[শ্রীযুক্ত সুকুমার সেনের নাম বাংলা সাহিত্যে বিশেষতঃ ঐতিহাসিক সাহিত্যে সুপরিচিত। বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে ইতিহাস লিখিয়া তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছেন। তাহার পাণ্ডিত্য ও বিদ্যাবত্তা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চদরের। তিনি অকুতোভয়, সত্য মিথ্যা যাহাই লিখুন, তজ্জন্য কাহারও কোন পরোয়া করেন না। তাহার]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শ্রীযুক্ত সুকুমার সেনের নাম বাংলা সাহিত্যে বিশেষতঃ ঐতিহাসিক সাহিত্যে সুপরিচিত। বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে ইতিহাস লিখিয়া তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছেন। তাহার পাণ্ডিত্য ও বিদ্যাবত্তা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চদরের। তিনি অকুতোভয়, সত্য মিথ্যা যাহাই লিখুন, তজ্জন্য কাহারও কোন পরোয়া করেন না। তাহার বিদ্যার এমনই জোর যে, সমালোচকের ভ্রুকুটিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট প্রদর্শন করিয়া তাহার কলম সমান বেগেই চলিতে থাকে। যাহাদের ধর্ম্মে সত্যকে বসুমতীর সহিত ওজনে বেশী ভারী করা হইয়াছে, সেই সত্যের প্রতি তাহার কণামাত্র শ্রদ্ধা নাই। পাঠকগণ আমার এরূপ প্রত্যেক কথার প্রমাণ পাইবেন তাঁহার বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এবং তাহার সম্প্রতি প্রকাশিত &#8216;ইসলামী বাঙ্গালা সাহিত্য’ নামক গ্রন্থে। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে গেলে প্রবন্ধ-কলেবর অত্যন্ত বড় হইবে। তাই আজ কেবল শেষোক্ত গ্রন্থ সম্বন্ধেই কয়েকটি কথা বলিব।</p>
<p>পাকিস্তানের কোন পত্রিকা দেখা সুকুমার বাবুর পক্ষে সম্ভব না হইতে পারে মনে করিয়া এই প্রবন্ধকৃত বিষয়টি কলিকাতার &#8216;শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত করিয়া তাহার নিকট তাঁহার ঐরূপ লেখার প্রমাণ জানিতে চাহিয়াছিলাম। পাঠকগণ দেখিবেন তাঁহার প্রমাণ দেওয়ার কোন উপায়ই নাই। তাই কোন কথা না বলিয়া তিনি কাপুরুষের মত মুখ লুকাইয়া আছেন।<br />
&#8211; লেখক</p>
<p>তিনি গ্রন্থ লিখিয়াছেন ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য&#8217; সম্বন্ধে কিন্তু গ্রন্থের নাম দিয়াছেন &#8216;ইসলামী বাংলা সাহিত্য&#8217;। প্রথমতঃ ইসলাম একটি ধর্ম্মের নাম। যারা ইসলাম ধর্ম মানিয়া চলে তাদের বলা হয় &#8216;মুসলমান&#8217;। &#8216;ইসলামী বাংলা সাহিত্য বলিলে তার অর্থ দাড়ায় &#8220;ইসলাম ধৰ্ম্ম বিষয়ক সাহিত্য। অবশ্য মুসলমানেরাও অনেক সময় ইসলাম শব্দের অপপ্রয়োগ করে। মুসলমান সম্পর্কিত সবকিছু &#8216;মুসলিম এবং ঐ ধর্ম সম্পর্ক সবকিছু ইসলামিক।</p>
<p>দ্বিতীয়তঃ মুসলমান রচিত সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য এবং তাহা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অবশ্য আলোচ্য বিষয় এবং অপরিহার্য অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তজ্জন্য পৃথক নামে গ্রন্থ রচনায় স্বভাবতঃই মনে হয়, -চণ্ডালোশ্বপচানান্তু বহির্গ্রামাৎ প্রতিশ্রয় ইত্যাদি নীতিই যেন প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহাতে ডাক্তার সুকুমার সেনের মনোভাবের প্রতি মুসলমানের মনে অশ্রদ্ধার ভাব জন্মিবার যথেষ্ট কারণ থাকিলেও তৎপ্রতি ভ্রুক্ষেপ করিবার লোক তিনি নহেন। এমনই নিৰ্ভীক তিনি। আলোচনা-যোগ্য বহু মুসলমান কবি থাকা সত্ত্বেও তিনি মাত্র কয়েকজনের কথা আলোচনা করিয়াছেন। এসব আলোচনায় তিনি মুসলমানদিগকে যুগপৎ পিঠ থাবড়ানি ও কানমলা দিয়া ক্ষান্ত হইয়াছেন। ন্যায়সঙ্গত যুক্তিতর্ক অগ্রাহ্য করিয়া তিনি অনেক কবির আবির্ভাবকাল সম্বন্ধেও তাঁহার অযৌক্তিক মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিয়াছেন। তাহার গ্রন্থের এতদধিক সমালোচনা আজ আমার উদ্দেশ্য নহে।</p>
<p>পাঠকগণকে একথা বলিয়া দেওয়া বোধহয় অনাবশ্যক যে, সত্যের সন্ধান ও উদ্ধারই ঐতিহাসিকের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র ভূষণ। সুকুমার বাবু সেরূপ একজন সত্যসন্ধানী ঐতিহাসিক হইয়া কিভাবে সত্যের মস্তকে পদাঘাত করিয়া সত্য-লেশ শূন্য কথা প্রচার করিতে সঙ্কোচ বোধ করেন নাই, এ স্থলে আমি তাহারই দুইটি দৃষ্টান্ত পাঠকগণের সম্মুখে উপস্থিত করিতেছি।</p>
<p>প্রথম দৃষ্টান্ত – তদীয় গ্রন্থের ৩০ পৃষ্ঠায় লিখিত হইয়াছে, &#8220;পুত্রকে (আলাওলকে) হাম্মাদরা কন্দী কারে রোসাঙ্গে নিয়ে এসে রাজার ফৌজে বিক্রি করলে”।</p>
<p>উদ্ধৃত কথাগুলিতে যে সত্যের লেশমাত্র নাই তাহা স্বয়ং আলাওলের উক্তিই প্রমাণ করিবে। যথা :</p>
<p>“কার্য্যগতি যাইতে পন্থে বিধির ঘঠন।<br />
হাম্মাদের নৌকা সঙ্গে হইল দরশন।<br />
বহু যুদ্ধ আছিল সহিদ হৈল তাত।<br />
রণক্ষতে ভোগ যোগে আইলুম এখাত ।<br />
কহিতে বহুল কথা দুঃখ আপনার।<br />
রোসাঙ্গে আসিয়া হৈলুম রাজ আসোয়ার।&#8221;<br />
(পদ্মাবতী)</p>
<p>&#8220;কাৰ্য্য হেতু পন্থ ক্রমে আছে কৰ্ম্ম-লেখা।<br />
দুষ্ট হাম্মাদ সঙ্গে হই গেল দেখা<br />
বহু যুদ্ধ করিয়া সহিদ হৈল বাপ<br />
রণক্ষতে রোসাঙ্গে আইলুম মহাপাপ ৷৷<br />
না পাইলুম সহিদ পদ আছে আয়ু শেষ।<br />
রাজ আসোয়ার হৈলুম আসি এই দেশ৷৷&#8217; (সেকান্দরনামা)</p>
<p>&#8220;কাৰ্য্য হেতু পন্থে যাইতে নৌকার গমণে।<br />
দৈবগতি হৈল দেখা হাম্মাদের সনে।।<br />
বহু যুদ্ধ করিয়া সহিদ হৈল পিতা।<br />
রণক্ষতে ভাগ্যবলে আমি আইলুং এথা ॥<br />
কতেক আপনা দুঃখ কহিনু প্রকাশি।<br />
রাজ আসওয়ার হৈলুং রোসাঙ্গেত আসি।&#8217;</p>
<p>(লোর-চন্দ্রানী)</p>
<p>আলাওল তো বলিয়াছেন, হাম্মাদের সঙ্গে যুদ্ধে পিতাকে হারাইয়া নিজে রণক্ষত হইয়া তিনি রোসাঙ্গে গমন করেন এবং রাজার আসোয়ার হন। সুকুমারবাবু উল্লিখিত রূপ অদ্ভুত  সন্দেশ কোথায় পাইলেন?</p>
<p>দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত-</p>
<p>তাঁহার গ্রন্থের ৩১ পৃষ্ঠায় তিনি লিখিয়াছেন &#8216;রাজ্যার্থ ভাগিনী ভগিনীর পালিতপুত্র রাজকুমার মাগন ঠাকুরের অনুরোধে&#8230;।</p>
<p>সুকুমার বাবু একজন অগাধ-বিদ্যা বিদ্বান ও পণ্ডিত বলিয়া দেশে মশহুর। তিনি আলাওলের গ্রন্থগুলি কখনও পড়িবার অবসর পান নাই। তথাপি আলাগুলের কথা লিখিয়া বিদ্যা ও পাণ্ডিত্য জাহির করিবার তাহার এত শখ কেন, কি জানি। উপরের কথাগুলিতে তাঁহার যে অজ্ঞতা সূচিত হইয়াছে, তাহা অত্যন্ত শোচনীয় ও লজ্জাজনক। যে বিষয়ে যাহার পূর্ণ জ্ঞান নাই, সে বিষয়ে বিদ্যা জাহিরের চেষ্টা করিয়া লোকের উপহাস্যস্পদ হওয়া অপেক্ষা নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কার্য্য।</p>
<p>প্রাগুদ্ধৃত বাক্যে একটি কথাও সত্য নাই। এখানে প্রকৃত কথা কি। নিম্নে তা বলিতেছি। আলাওল লিখিয়াছেন,-</p>
<p>&#8220;ছিলিম শাহার বংশ৷ যদ্যপি হইল ধ্বংস<br />
নৃপগিরি হইল রাজ্য পাল।<br />
****<br />
এক পুত্র এক কন্যা সংসারেতে ধন্য ধন্যা<br />
জনমিল নৃপতি সম্ভব।</p>
<p>চলিতে ত্রিদিব স্থান পুত্রে কৈলা রাজ্য দান<br />
যারে দেখি লজ্জিত বাসব।<br />
*<br />
ছাদ উমদোর নাম রূপে গুণে অনুপাম<br />
মহাবুদ্ধি ভাগ্য অতিরেক।”<br />
(পদ্মাবতী)</p>
<p>অর্থাৎ আরাকান রাজা সলিম শাহ (Meng Radzaggy) ১৫৯১-১৬১২ খৃঃ অঃ পর্যন্ত রাজত্ব করিবার পর তৎ-পুত্র Meng- Kha Moung ১৬১২-১৬২২ খ্রীঃ অব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তারপর তৎপুত্র থিরিপু-ধৰ্ম্মা (Thirithu Dharma) ১৬২২-১৬৩৮ খ্রী:অ: পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তৎপর তৎপুত্র Meng Tsani (মেঙ্গ সানি) মাত্র ২৮ দিন রাজত্ব করিবার পর এই বংশ বিলুপ্ত হয়। অতঃপর রাজা থা-সা-টার (Thatsa-ta ১৫২৫-৩১ খ্রী: অ:) প্রপৌত্র নর-বদি-গ্যি (আলাওলের ‘নৃপগিরি&#8217;) রাজা হন। তাঁহার রাজ্যকাল (১৬৩৮-৪৫ খৃঃ অঃ) তারপর তাঁহার পুত্র থা-দো-মিস্তার (আলাওলের &#8216;ছাদ উমদার) রাজপদে অভিষিক্ত হন। (আরাকানের ইতিহাস স্রষ্টব্য)।</p>
<p>দেখা যাইতেছে, রাজা নর-বাদি-গ্যির এক পুত্র ও এক কন্যা ছিল। মৃত্যুকালে তিনি পুত্রকে রাজ্য দিয়া যান এবং কন্যাকে রোসাঙ্গের অধিবাসী মাগন নামক ছিদ্দিক বংশজাত এক মহাশয় মোছলমানের হাতে (অভিভাবকত্বে) রাখিয়া যান। পরে সেই কন্যা তাহার ভাই উক্ত পুত্রের সঙ্গে পরিণীতা হইয়া মুখ্য পাটেশ্বরী হন ( মঘ রাজাদের মধ্যে সহোদরা ভগ্নীকে বিবাহ করার প্রথা প্রচলিত ছিল )। সুতরাং মাগন সেই কন্যার পালিত পুত্র না হইয়া বরং তাহার অভিভাবক ছিলেন। সেই কন্যা পাটরাণী হইয়া মাগনকে প্রধান আমাত্যপদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। এস্থলে আলাওলের লেখা দেখিলেই পাঠকেরা সকল কথা স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারিবেন।</p>
<p>&#8220;যখান আছিল বৃদ্ধ নির্ণ অধিকারী।<br />
যশস্বিনী রাজ-গৃহে আছিল কুমারী।।<br />
পরম সুন্দরী কন্যা অতি সুচরিতা।<br />
বহু স্নেহে নৃপতি পোষিল নিম্ন সুতা।।<br />
বহু ধন-রত্ন দিলা বহুল ভাণ্ডার।<br />
বহুল কিঙ্কর দিলা বহু অলংকার ।<br />
কন্যার শৈশব দেখি ভাবে নরনাথ।<br />
এতেক সম্পদ সমর্পিমু কার হাত।<br />
এক মহাপুরুষ আছিল সেই দেশে।<br />
মহাসত্ত্ব মোছলমান ছিদ্দিকের বংশে।<br />
নানাগুণ পারগ মহত কুলশীল।<br />
তাহাকে আনিয়া রাজা কন্যা সমৰ্পিল ।<br />
বৃদ্ধ নরপতি যদি গেল স্বর্গপুরী।<br />
সেই কন্যাবর হইল মুখ্য পাটেশ্বরী।<br />
শৈশবের পাত্র দেখি বহুস্নেহে ভাবি।<br />
মুখ্য আমাত্য করি রাখিলা মহাদেবী।&#8221;</p>
<p>(পদ্মাবতী)</p>
<p>অর্থাৎ বৃদ্ধ নির্ণ অধিকারী (রাজা নরবদিগ্যি)। নিজ শিশুকন্যাকে অতি আদর যত্নে লালনপালন করেন। তাহাকে বহু ধনরত্ন, বহু কিঙ্কর, বহু অলঙ্কার দিয়াছিলেন। এ সব ধনরত্ন আর শিশুকন্যাকে মৃত্যুকালে কাহার হাতে সমর্পণ করিয়া যাইবেন, তজ্জন্য রাজা বড় চিন্তান্বিত ছিলেন। সেই দেশে মাগন নামে ছিদ্দিক বংশ-জাত এক মহা গুণশালী মুসলমান ছিলেন। রাজা তাঁহাকে আনিয়া তাঁহার হস্তে কন্যাকে সমর্পণ করিলেন। রাজার মৃত্যুর পর সেই কন্যা মুখ্য পাটেশ্বরী হইলেন। মুখ্য পাটরাণী হইয়া তিনি মাগনকে প্রধান আমাত্য পদে বরণ করিলেন।</p>
<p>ডক্টর-ঔপাধিক সুকুমার বাবু কেমন সত্য সন্ধানী ঐতিহাসিক ও গবেষণাকারী, পাঠকগণকে দেখাইলাম। আলাওলের &#8216;পদ্মাবতী খানি একটু খুলিয়া দেখিলে তিনি মাগনকে &#8216;রাজকুমার&#8217; বলিয়া লিখিয়া গবেষণার ও বিজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রদর্শন করিতেন না। তিনি বোধহয় আলাওলের ভাষার মর্ম্মও বুঝেন না, তাই মাগনকে ভগিনীর পালিত পুত্র বলিয়াছেন।</p>
<p>বড়ই দুঃখের কথা যে, এত বড় জ্ঞানী ও পণ্ডিত লোক হইয়া তিনি অর্থলোভে এরূপ অনৃতবাদ-কলঙ্কিত গ্রন্থ লিখিয়া লোকের মনে কুসংস্কার সৃষ্টি করিতেছেন ইসলামের চক্ষে অত্যন্ত দোষাবহ ও সর্ববস্থা বৰ্জ্জনীয়।</p>
<p>দিলরুবা<br />
মাঘ ১৩৫৯</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/alaol-in-bengali-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7699</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, একটি পর্যালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bengali-language-and-literature-a-review/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bengali-language-and-literature-a-review/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 15 Feb 2023 13:39:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7633</guid>

					<description><![CDATA[আমাদের ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো। ভাষা ও সাহিত্যে আমাদের অর্জনকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমার যতটুকু পড়াশুনা তার আলোকে আমি দেখতে পাই বাংলাভাষা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এটা এমনি করে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফররুখ এবং এর পরে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমাদের ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো। ভাষা ও সাহিত্যে আমাদের অর্জনকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমার যতটুকু পড়াশুনা তার আলোকে আমি দেখতে পাই বাংলাভাষা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এটা এমনি করে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফররুখ এবং এর পরে অন্যান্য কবি সাহিত্যিক যারা এসেছেন, তাদের চেষ্টা ও সাধনার ফলেই এই ভাষা একটি শক্তিশালী রূপ গ্রহণ করে। এই ভাষার একটি বড় সুবিধা হলো বিদেশী শব্দ ভাণ্ডার থেকে অবলীলায় শব্দ গ্রহণ করা। একদিকে সংস্কৃত, অন্যদিকে আরবী এবং ফার্সী থেকে ব্যাপকভাবে শব্দ গ্রহণ এবং পরবর্তীকালে যেহেতু ইংরেজরা দু&#8217;শো বছর এদেশ শাসন করে সেখান থেকে বাংলা ভাষায় ইংরেজী শব্দও ব্যাপক ভাবে প্রবেশ করে। ফলে দেখা যায় বিশ্বের যে কয়টি ভাষার শব্দ ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ তার মধ্যে বাংলা একটি। যদিও এই বিষয়টি অবশ্যই গবেষণার দাবীদার।</p>
<p>যদি একটি ভাষার শব্দভাণ্ডার খুব ব্যাপক হয় তাহলে সে ভাষা যেকোনো বিষয় প্রকাশ (Express) করতে পারে। যেকোনো বিষয় সে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। আমি মনে করি বাংলা ভাষার মাধ্যমে বর্তমানে যেকোনো বিষয়, যেকোনো কিছু প্রকাশ করা সম্ভব—তার শব্দভাণ্ডারের ব্যাপকতার কারণে। তুলনামূলকভাবে শব্দভাণ্ডার অতি অল্প হলে সে ভাষার মাধ্যমে কখনো ব্যাপক চিন্তাধারা তুলে ধরা সম্ভব হয় না। বাংলা ভাষার মাধ্যমে বর্তমানে যেকোনো দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি বা সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান কিংবা সকল কিছু প্রকাশ করা সম্ভব। তবে বিজ্ঞানকে প্রকাশ করতে গেলে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক যে শব্দমালা সেগুলোকে গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে যেগুলো গ্রহণ করা হয়েছে তার ফলে যেহেতু কোনো সমস্যা হয়নি, তাই প্রয়োজনে আরো গ্রহণ করলেও কোনো সমস্যা হবে না বলেই আমার বিশ্বাস।</p>
<p><strong>কাজেই আমি বলব, খুবই শক্তিশালী একটি ভাষা আমরা পেয়েছি, যেটা গত এক দেড়শ বছরে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। বিশেষ করে গত পঞ্চাশ বছরে এই ভাষা আরো ব্যাপকতর সমৃদ্ধ হয়েছে। ইংরেজি শব্দের প্রবেশ এই সময় ব্যাপকতর হয়েছে। বিজ্ঞানের প্রয়োজনে এবং অন্যান্য কারণে বিশ্বের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অগ্রসর হয়েছে এই ভাষা।</strong></p>
<p>এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, সেটা হলো, আমরা একই সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম করেছি। যদিও বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করা ঠিক হয়েছে কিনা &#8211; এই নিয়ে কেউ কেউ মতভেদ করেন, তবে আমি মনে করি ঠিকই হয়েছে। ইংরেজি শিখবো, বিশ্বের ভাষা ঠিক আছে। ইংরেজির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ করতে হবে, তাও ঠিক আছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, এতবড় একটি শক্তিশালী ভাষা হওয়া সত্ত্বও আমাদের অফিসিয়াল ভাষা ইংরেজি হবে, এই কথা মনে করা একেবারেই অসঙ্গত।</p>
<p>যে কথা বলছিলাম, বাংলা ভাষা যে শিক্ষার মাধ্যম হয়ে গেল প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত &#8211; তার ফলে আরো অসংখ্য ইংরেজি শব্দ বিজ্ঞানের প্রয়োজনে আমরা গ্রহণ করে ফেললাম। এই ডেভেলপমেন্টটা হলো গত বিশ-ত্রিশ বছরে।</p>
<blockquote><p><strong>এখন সাহিত্য প্রসঙ্গে আসি। ভাষার মাধ্যমে আমরা সবই প্রকাশ করতে সক্ষম এরকম একটা অস্ত্র আমাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও সে তুলনায় আমাদের সাহিত্যের অর্জন ব্যাপক -এটা বলতে আমার দ্বিধা আছে। আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, চিন্তার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু লিখেছি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতির উপর কতটুকু লিখেছি, দর্শন বা অন্যান্য বিজ্ঞানে এবং সমাজ বিজ্ঞানের ওপর কতটুকু লিখেছি? বাস্তবে দেখা যাবে খুব কমই লিখেছি। কিছু টেক্সট বইয়ের অনুবাদ ছাড়া সত্যিকার অর্থে মূল কাজ আমরা যাকে বলি, তা বাংলা সাহিত্যে করিনি।</strong></p></blockquote>
<p>তেমনিভাবে উপন্যাস, গল্পের কথা বললেও বলব আমাদের অর্জন খুব বেশি নয়। নিশ্চয় বাংলায় অনেক জনপ্রিয় উপন্যাস লেখা হয়েছে। যেমন ছোট ছোট উপন্যাস যাকে নভেল বলা যায়- যখন একজন লেখক লেখেন &#8211; তখন হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু সাহিত্যের বিচার এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাষার সমৃদ্ধির তুলনায় সাহিত্যের দরবারে আমাদের অর্জন এখনো সেই পরিমাণ নয়। এরপর যদি কবিতা প্রসঙ্গে বলি তাহলে একথা ঠিক যে, আমাদের কবির সংখ্যা অনেক। অসংখ্য কবি আছেন, তার মধ্যে কেউ কেউ উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন।</p>
<blockquote><p><strong>কিন্তু তবু বলা যায় বাংলা ভাষা একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হলেও আমরা সামগ্রিকভাবে একটি শক্তিশালী সাহিত্য তৈরি করতে পেরেছি এমন কথা বলতে পারি না। তবে আমাদের সুযোগ রয়েছে। এই ভাষাকে ব্যবহার করে আমরা একটা শক্তিশালী সাহিত্য তৈরি করতে পারি। উপন্যাসের ক্ষেত্রে, গল্পের ক্ষেত্রে, আর কবিতার ক্ষেত্রে তো পারিই। সর্বোপরি একটা জাতিকে প্রতিনিধিত্ব (Represent) করার জন্য মূল যে চিন্তা (Thought) তার ক্ষেত্রেও। এর জন্যে যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, বিশ্ব সাহিত্যকে জানা (বিশ্বের যে দর্শন-সেটা রাজনৈতিক হোক বা অর্থনৈতিক হোক কিংবা সমাজ বা সভ্যতা সংক্রান্ত থিওরিই হোক) সে সম্পর্কে গভীর পড়াশুনা করা। তাহলেই আমাদের সাহিত্য শক্তিশালী হবে।</strong></p></blockquote>
<p>বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতিতে অনুবাদ সাহিত্য একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। অনুবাদ ক্ষেত্রে যে কাজ হয়েছে, বিশেষ করে বেশকিছু বিশ্বখ্যাত তাফসীর এরই মধ্যে অনূদিত হয়েছে। মাওলানা মওদূদীর তাফসীর তাফহীমুল কোরআন অনুবাদ হয়েছে। সাইয়েদ কুতুবের তাফসীর &#8216;ফি যিলালিল কুরআন&#8217; অনুবাদ হয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীর ও মুফতী শফীর তাফসীর মা&#8217;রেফুল কোরআন সহ অন্যান্য আরো কিছু উল্লেখযোগ্য তাফসীর অনুবাদ হয়েছে। অনুবাদ বাদে এই সময় বাংলায় মূল তাফসীরও লেখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাওলানা আকরাম খাঁর তাফসীর সহ আরো বেশ কিছু তাফসীরের কথা বলা যায়। প্রসঙ্গত এক্ষেত্রে গিরীশচন্দ্র সেনের নামও এসে যায়। তাফসীরের পর ছিহাহ-ছিত্তা সহ উল্লেখযোগ্য হাদীস গ্রন্থের অনুবাদের কথা উল্লেখ করা যায়। এছাড়া বেশ কিছু ইসলামী বইয়ের অনুবাদও হয়েছে। তবে হাদীস গ্রন্থগুলোর অনুবাদ হলেও হাদীস গ্রন্থের টিকাসমূহের (Commentry) পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হয়নি। এখন পর্যন্ত বোখারী, মুসলিমের যে সমস্ত কমেন্টারি ব্যাখ্যগ্রন্থ রয়েছে, তার পুরোপুরি অনুবাদ হয়নি । এ কথা অবশ্য বলা ভালো যে, আজকে কমেন্টারী অনুবাদ করতে গেলে নতুন করে টীকা যোগ করার (Annotation) প্রয়োজন হবে। কেননা তৎকালীন প্রেক্ষাপট আলাদা ছিল, পরিস্থিতি আলাদা ছিল, যেটা তাদের টিকা বা মতামতে প্রবেশ করেছে। সেদিক থেকে আজকে তার অনুবাদ করতে গেলে তার এনোটেশন লাগবে। তার নতুন করে নোট দিতে হবে।</p>
<p>ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে ইমাম গাজ্জালীর কিছু অনুবাদ হলেও ইবনে খালদুন, আল কিন্দি, আল ফারাবী, ইবনুল আরাবী এঁদের বইয়ের তেমন অনুবাদ হয়নি। আধুনিক লেখকদের মধ্যে ড. ইউসুফ আল কারদাভীর কিছু বইয়ের অনুবাদ হয়েছে। অনুবাদ হয়েছে মাও: মওদূদী, ড. মরিস বুকাইলি, আল্লামা আসাদ, সাইয়দ কুতুব, মোহাম্মদ কুতুবের বইয়ের। অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে ড. ত্বহা হোসাইন, ড. নাজীব কিলানী, নসীম হিজাযীর বইয়ের অনুবাদ হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামের উপর বাংলা ভাষায় কয়েক হাজার বই লেখা হয়েছে। এর মধ্যে মাওলানা আকরম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, মাওলানা আবদুর রহীম সাহেবের মত চিন্তাবিদদের লেখাগুলোও মান সম্পন্ন হলেও অন্যান্য অধিকাংশ লেখাই নিম্নমানের। এই গুলোকে নোটবুক বলে গণ্য করতে হবে। সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় মুসলিম দেশ। প্রথম ইন্দোনেশিয়া, দ্বিতীয় পাকিস্তান, তৃতীয় বাংলাদেশ, বর্তমানে। একসময় বাংলাদেশ দ্বিতীয় ছিল। আজ সেই দেশের ইসলামী সাহিত্য লেখার এবং অনুবাদের এই অবস্থা। ড. কারদাভী, ড. আব্দুল হামিদ আবু সলেমান, ড. ত্বহা জাবির আল আলিওয়ালি, মোহাম্মদ আল গাজ্জালী, ড. খুরশীদ আহমদ, ড. ওমর চাপরার লেখার সাথে তুলনামূলক বিচার করলে আমাদের অবস্থান বুঝা যাবে। তখনই আমরা আমাদের ভাষার মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণীয় ও প্রসারিত করতে ভূমিকা রাখতে পারবো।</p>
<p>একটি ভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি করার দু&#8217;টি পদ্ধতি থাকে। একটি ভাষা যদি নিজেই আরেকটি দেশের ভাষায় পরিণত হয়, একেবারে স্থানীয় ভাষা হয়ে যায়। আর একটি হলো, কোনো ভাষা যদি রাষ্ট্র ভাষা করা হয়। যেমন আরবীর ক্ষেত্রে কোরাইশদের ভাষা মধ্যপ্রাচ্যের পুরা অঞ্চলের ভাষা হয়ে গেছে। সেটা একটা পথ। অথবা আমরা যেমন দেখি ইংরেজি বিশ্বের প্রায় একশটি দেশের রাষ্ট্র ভাষা হয়েছে। আমরা এখনো দেখি ভারত ও পাকিস্তানের অফিসের ভাষা ইংরেজি। কিন্তু আমরা বাংলা ভাষাকে আমাদের অফিসিয়াল ভাষা করতে পেরেছি। যাইহোক, এই ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা অন্য একটি এলাকা দখল করে ফেলবে সে সম্ভাবনা নেই। কাজেই, বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিতি করার পদ্ধতি একটাই, সেটা হলো অনুবাদ আমাদের যা কিছু ভালো কাজ হয়েছে সেগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার। বিশেষ করে গল্প, কবিতা, ও উপন্যাস, তথা সৃজনশীল সাহিত্য গল্প উপন্যাস, কবিতা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আবেগকে উদ্বোধিত করে। সুতরাং আমাদের ভালো গল্প গুলোর অনুবাদ হওয়া দরকার। গল্পের সাথে সাথে শক্তিশালী উপন্যাস গুলো অনুবাদ হওয়া দরকার, শক্তিশালী কবিতাগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার।</p>
<p>সেই সাথে যদি জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা কোনো মৌলিক কাজ করে থাকি, যদিও আমি দেখছি না সেগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার &#8211; এর জন্য রাষ্ট্রের এবং সরকারের একটা দায়িত্ব আছে। সাহিত্যিকদেরও একটা দায়িত্ব আছে, এই জন্যে সংগঠন থাকা দরকার। বাংলা একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মার্কেটিং (Marketing), অনুবাদ (Translation), প্রচার (Campaign) ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আর অনুবাদ শুধু ইংরেজিতে নয়, অন্য ভাষাতেও হতে হবে। ইংরেজিতে করলে সুবিধা হলো অন্য ভাষায় রূপান্তর করা সহজ হয়। আমাদের দেশে ইংরেজি জানা লোক অনেক আছে। কিন্তু জার্মান জানা লোক অত নেই। অন্যান্য ভাষা জানা লোক ধরতে গেলে নেই-ই। সুতরাং অনুবাদ ইংরেজিতে করলে এবং মার্কেট হয়ে গেলে সেখান থেকে অটোমেটিক অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হয়ে যাবে। আর একটা পদ্ধতি হতে পারে, কয়েকটি বিশেষ ভাষায়, যে গুলোতে বিশ্বের বিরাট এক অংশ কথা বলে, যেমন চাইনিজ । কিছু চাইনিজ জানা লোক আমাদের আছে অথবা রাশিয়ায় পড়াশুনা করা রুশ জানা লোক আমাদের কিছু আছে। তাদের মাধ্যমে যদি আমরা অনুবাদ করি তাহলে সেটা একটা পদ্ধতি হতে পারে। সেটা করা উচিতও বলে আমি মনে করি। তেমনি ফ্রেঞ্চ জানা কিছু লোক আমাদের থাকতে পারে। তাদের মাধ্যমেও সেই ভাষায় আমরা সরাসরি অনুবাদ করতে পারি। তবে ইংরেজি করলে ইংরেজি থেকে অন্যান্য ভাষায় আবার পূনরায় অনুবাদের সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের ভাষাও শিক্ষা দেয়া হয় ।</p>
<p>সবচেয়ে ভালো হবে, যদি সরকার বাংলা একাডেমি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভিতর একটা করে অনুবাদ ব্যুরো খুলে ফেলেন। আলাদা নতুন কোনো সংগঠন করতে গেলে নানান ধরনের সমস্যা চলে আসে। তাদের একটা উইং (Wing) খুলে ফেলা বর্তমান কাঠামোর (Existing structure) মধ্যে সহজ হবে।</p>
<p>মনে রাখা দরকার, আরোপিত কিছুই মঙ্গলজনক হয় না। কিন্তু আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এটা আরোপ করা হয়েছে দুই ভাবে। মুসলিম লেখকদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে নানা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এবং ব্যক্তিগত জীবনে কিছু তিক্ততার কারণে। কিংবা নিজেদের পড়াশুনার কারণে ইসলাম সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না-এই ধরনের লেখকরা ইসলাম বিরোধী, তৌহিদ বিরোধী শব্দ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এইটুকু হলো আরোপিত ব্যাপার। আবার পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার সাথে আমাদের বাংলা ভাষার পার্থক্যের কারণেও এমন কিছু শব্দ এসেছে, এ অঞ্চলের জন্য যা আরোপিত। কেউ যদি এই দুই এলাকার ভাষা গভীর ভাবে পর্যালোচনা করেন তিনি এই পার্থক্য ধরতে পারবেন। ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে-এ সব বিষয়গুলোতে আমাদের বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bengali-language-and-literature-a-review/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7633</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ঊনবিংশ শতকে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদান ও মীর মোশাররফ হোসেনের সাহিত্য-কর্ম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/muslim-contribution-in-bangla-literature-and-the-great-literature-work-of-mir-mosarraf-hossen/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/muslim-contribution-in-bangla-literature-and-the-great-literature-work-of-mir-mosarraf-hossen/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 17 Jan 2023 17:02:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7594</guid>

					<description><![CDATA[১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা বোধ করি অন্য কোন বড় রকম ক্ষতির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এতদিন পর্যন্ত নবাব-জমিদার ও বিভিন্ন ধনিক-বণিক শ্রেণীর লোকদের আশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায় কবি-সাহিত্যিকগণ কাব্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা বোধ করি অন্য কোন বড় রকম ক্ষতির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এতদিন পর্যন্ত নবাব-জমিদার ও বিভিন্ন ধনিক-বণিক শ্রেণীর লোকদের আশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায় কবি-সাহিত্যিকগণ কাব্য ও সাহিত্যের চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু পলাশীর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক, সাহিত্যিক ও তামাদ্দুনিক ক্ষেত্রেও সমূহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। কবি ও বিদগ্ধ সংস্কৃতিসেবিগণ পৃষ্ঠপোষকহীন, অসহায় ছিন্নমূল মানুষে পরিণত হলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মনে সদা সশংয় ভাব বিরাজ করছিল। এই পরিবর্তমান অবস্থায় মানুষের মানস-রাজ্য নিতান্তই অভিব্যক্তিহীন, ফ্যাকাশে এবং সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। জনগণ সর্বদা ইংরেজ সৈন্যদের নানারূপ অত্যাচার, অর্থনৈতিক শোষণ প্রভৃতি বালা-মুসীবতের দুর্ভাবনায় চিন্তাকুল থাকতো। এরূপ পরিবেশ কখনো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বিকাশের উপযোগী নয়।</p>
<p>কিন্তু অর্থ-লিপ্সা ক্রমে রাজনৈতিক আধিপত্য লাভের আকাঙক্ষায় রূপান্তরিত হয়। এই বেনিয়া শ্রেণীর ইংরেজগণ যখন ছলে-বলে-কৌশলে রাজনৈতিক আধিপত্য লাভে সক্ষম হলো, তখন তাদের কাছ থেকে কল্যাণ-বুদ্ধিসম্পন্ন কোন সুশাসন প্রত্যাশা করা ছিল অবান্তর মাত্র। ব্যবসায়-বুদ্ধিসম্পন্ন ইংরেজগণ রাজনৈতিক হাতিয়ারকে অর্থনৈতিক শোষণের যন্ত্রে পরিণত করেছিল। সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক বিকাশের কোন কর্মসূচীই তাদের ছিল না। এরূপ পরিবেশে জনগণের চিন্তা বৃত্তি কোন বিকাশ ঘটা সম্ভব ছিল না। পরবর্তীকালে অবশ্য তারা উপলব্ধি করেছিল যে, রাজনৈতিক আধিপত্য স্থায়ী করতে হলে এ দেশের মানুষকে মানসিক দিক দিয়ে গোলামে পরিণত করা প্রয়োজন। ফলে, তারা এ দেশে বিশেষ এক জাতীয় ইউরোপীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি আমদানি করার প্রয়াস পেল। এদেশের মানুষকে তাদের দেশের মানুষের মত জ্ঞানী, গুণী ও বিদ্বান করে তোলার উদ্দেশ্যে এ জাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি আমদানি করা হয়নি; রবং দেশীয় জনগণের মধ্যে থেকে এক শ্রেণীর মানুষকে ট্রেনিং দিয়ে তাদেরকে এজেন্টে পরিণত করে তাদের মাধ্যমে এদেশে বেনিয়া শাসন শোষণের হাতিয়ারকে মযবুত করা এবং রাজনৈতিক গোলামির সাথে সাথে চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে হীনম্মন্যতা ও দাসত্ব সৃষ্টিই তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। এই নব শিক্ষা সভ্যতা আমদানির ফলে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেলেও দেশীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হলো। পরবর্তীকালে অবশ্য এই আঘাতের বেদনা কাটিয়ে ইংরেজদের শিক্ষা-সভ্যতার প্রত্যক্ষ প্রভাবে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রয়াস চলেছে, কিন্তু তাতে সময় লেগেছে কমপক্ষে এক শতাব্দীকাল। ইউরোপীয় শিক্ষা-সভ্যতা আমদানির সাথে সাথে রাজা ভাষণ এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও ইংরেজী ভাষার প্রচলন করা হয়। এতদিন পর্যন্ত রাজ-ভাষা ছিল ফারসী এবং সাহিত্যের ভাষা ছিল বাংলা বা ফারসী প্রভাবিত বাংলা। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই এই ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতেন।</p>
<p>তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের ব্যবহৃত ভাষায় যদিও আরবী-উর্দু-ফারসীর ব্যাপক প্রাধান্য ছিল; তবু হিন্দুদের ব্যবহৃত ভাষায়ও এর কোন কমতি ছিল না। সে আমলের শ্রেষ্ঠ বাঙালী কবি ভারতচন্দ্রের সুবিখ্যাত “অন্নদা মঙ্গল” কাব্যই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সুতরাং রাজ-কার্য ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ভাষার এই পরিবর্তনের দ্বারা নির্বিশেষে বাঙালী সাধারণেরই সমূহ ক্ষতি সাধিত হয়। ফলে সাহিত্য-সৃষ্টির ক্ষেত্রে চরম বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়। অবশ্য হিন্দুসমাজে এই বন্ধ্যাত্ব দীর্ঘস্থায়ী না হলেও মুসলমান সমাজে নানা কারণে এই বন্ধ্যাত্ব দীর্ঘদিন পর্যন্ত বহাল থাকে। ইংরেজদের আগমনের পূর্বে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক আধিপত্য ছিল মুসলমানদেরই হাতে। আকস্মিকভাবে এই আধিপত্য হারানোর বেদনা তাদেরকে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। উপরন্তু রাজকার্য ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইংরেজী ভাষা চালু করার কারণে মুসলমানদের মনে অধিকতর ঘৃণা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। গৌরবময় ঐতিহ্য ও বিগত দিনের দীর্ঘস্থায়ী ক্রুসেডের (মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কয়েক শতাব্দী স্থায়ী ধর্মযুদ্ধ) তিক্ততার কারণে ফিরিঙ্গি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ভাষাকে মুসলমানগণ কিছুতেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। এদিক থেকে হিন্দুদের সাথে তাদের পার্থক্য ছিল সুস্পষ্ট। ইংরেজদের আগমনের ফলে হিন্দুদেরকে কিছু হারাতে হয়নি। শাসন-ক্ষমতা মুসলমানদের হাত থেকে ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়ায় প্রত্যক্ষভাবে তাদের কোন ক্ষতি হয়নি। বরং মুসলমানদের তুলনায় তারা সহজে ইংরেজদের আধিপত্য স্বীকার করে নেয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ইংরেজদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিষ্ঠা লাভে সমর্থ হয়। রাজশক্তির আস্থা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে চাকরি-বাকরি ও শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রেও তারা অনেক অগ্রসর হয়। অন্যদিকে মুসলমানগণ মানসিক দিক দিয়ে সহজে ইংরেজদের আধিপত্য স্বীকার করে নিতে না পারায় এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত হারানো রাজশক্তি ফিরে পাবার আকাঙক্ষা মনে মনে পোষণ করায় তারা কেবল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও আধিপত্য হারিয়েছে তাই নয়; শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রেও অনেক পেছনে পড়ে গেছে। মূলত ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের পূর্ব পর্যন্ত এই অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থতা বরণ করায় মুসলমানদের রাজনৈতিক আধিপত্য লাভের আকাঙক্ষা সাময়িকভাবে নস্যাৎ হয়ে যায় এবং এর পর থেকে গত্যন্তর না দেখে তারা কেউ কেউ ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা-দীক্ষা অনুসরণে উদ্যোগী হয়। এ সময় কতিপয় মুসলিম মনীষী ও সমাজসেবী ব্যক্তিও এগিয়ে আসেন। মুসলমান সমাজের অধঃপতন ও দুরবস্থা অবলোকন করে তাঁরা অতিশয় ব্যথিত হন এবং শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানগণ যাতে দ্রুত এগিয়ে আসে, সে ব্যাপারে তারা সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু ইতিমধ্যে পুরো এক শতাব্দীকাল অতিবাহিত হয়েছে এবং ততদিনে শিক্ষাগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভৃতি সকল দিক দিয়ে মুসলমানদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। কিন্তু তবু এই সামাজিক শোচনীয় অবস্থা ও সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থতা বরণের পটভূমিতেই মুসলমানগণ সর্বপ্রথম ব্যাপক ও কিছুটা সচেতনভাবে ইংরেজী শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু ইংরেজী শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি এসময় মুসলমানদের আগ্রহ দেখা দিলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তারা কতিপয় অসুবিধারও সম্মুখীন হয়। প্রথমত ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা বিকাশের উপযোগী ছিল না। দ্বিতীয়ত ইংরেজী শিক্ষা-সভ্যতার নামে তখন যে শোষণ ও সামাজিক অনাচার আমদানি করা হয়েছিল, তা গ্রহণে মুসলমানগণ স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এ কারণেই পরবর্তীকালে মুসলমানদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার নামে আর এক জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এটা সমস্যার কোন সঠিক সমাধান ছিল না। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সীমিত অর্থে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও উক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চতম ডিগ্রী হাসিলের পরেও যথাযথ সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করা সম্ভব ছিল না; অর্থাৎ চাকরি-বাকরি লাভ বা সামাজিক কোন দায়িত্ব পালনের বা কোনরূপ উৎপাদনমুখী ভূমিকা পালনের যোগ্যতা সৃষ্টি হতো না। মসজিদ-মক্তবে বিনা বেতনের মুনশী মোল্লাগিরি বা অনুগ্রহের দান হিসেবে সামান্য কিছু দাক্ষিণ্য লাভই তাঁদের বিধিলিপিতে পরিণত হয়েছিল। তাই চাকরি-বাকরি লাভের উদ্দেশ্যে মুসলমানদের মধ্যে অনেকে ইংরেজী শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়। এভাবে মুসলমান সমাজ মূলত ত্রিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ইংরেজী শিক্ষিত আধুনিক সমাজ, আরেকদিকে আরবী-ফারসী শিক্ষিত ধর্মীয় আলেমশ্রেণী এবং এ দু&#8217;য়ের মাঝখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অশিক্ষিত সমাজ। এরূপ ত্রিধা বিভক্ত সমাজে ভারসাম্যমূলক সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ অতিশয় দুরূহ। বাংলাদেশে মুসলমানদের জন্য এটা এক অপ্রত্যাশিত ও চরম বিপর্যয়কর অবস্থা। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের পটভূমিতে মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যেতে পারে।</p>
<p>বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই নিম্নবর্ণ হিন্দু ও নির্যাতিত বৌদ্ধদের থেকে ধর্মান্তরিত হয়। বিদেশাগত মুসলমানদের মধ্যে দুটো শ্রেণী। প্রথমত ধর্ম-প্রচারক। তাঁরা খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতক থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আগমন করেন। বাংলাদেশের অসংখ্য মাজার ও বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদ আজো তাঁদের পবিত্র স্মৃতি বহন করে চলেছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর বিদেশাগত মুসলমান হলেন শাসক সম্প্রদায়। ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে তাঁরা এদেশে বিজয়াভিযান পরিচালনা করে গৌড়ের সেন রাজাদের বিতাড়িত করে মুসলিম রাজত্ব কায়েম করেন। এঁরা ছিলেন মূলত তুরস্কের অধিবাসী। এই দুই শ্রেণীর বিদেশাগত মুসলমানদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্দেশ্যগত পার্থক্য ছিল। ধর্মপ্রচারক মুসলমানদের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মাহাত্ম্য প্রচার এবং তাওহীদের মন্ত্রে সকলকে দীক্ষিত করা। ধর্ম-প্রচারক ও তাঁদের অনুসারী শিষ্যদের চরিত্র ছিল ত্যাগ-তিতিক্ষায় পরিপূর্ণ পূত-পবিত্র ও অনুসরণযোগ্য। ইসলামের সর্বজনীন মানবতাবাদ, সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব শতধাবিভক্ত পৌত্তলিক বাঙালী সমাজে এক বিশ্বয়কর বিপ্লব সৃষ্টি করে। পুণ্যাত্মা ধর্ম-প্রচারকদের উদ্দীপনাময় চরিত্র-মাহাত্ম্যও ছিল এক অবিস্মরণীয় মহৎ আকর্ষণ। ফলে এদেশে মুসলমানদের শাসন কায়েম হওয়ার পূর্ব থেকেই বহু লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলমান রাজত্ব কায়েম হওয়ার পরে ইসলাম ধর্ম এক অপ্রতিহত শক্তিতে পরিণত হয়। রাজশক্তির যদিও এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা ছিলা না, কিন্তু ইসলাম শাসক শ্রেণীর ধর্ম হওয়ার কারণে ইসলাম প্রচারে এটা একটা স্বাভাবিক অনুকূল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তাই দেখা গেল, মাত্র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক বা তারও অধিক সংখ্যক অধিবাসী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহিরাগত কোন ধর্ম বা আদর্শ এত অত্যল্প কালের মধ্যে এত অধিক সংখ্যক মানুষের নিকট গ্রহণীয় হয়েছে বলে জানা যায় না। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণ প্রধানত দু&#8217;টি। প্রথমটি হলো, ইসলামের বিশ্বজনীন মানবিক আবেদন; সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ইনসাফপূর্ণ উদার আদর্শবাদ এবং দ্বিতীয়টি হলো, তৎকালীন বিপর্যস্ত অবস্থা। বাংলার মাটি থেকে জৈন ধর্মের অস্তিত্ব তখন স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে যেটুকু মানবতাবাদের অস্তিত্ব ছিল, তা নিয়ে বাংলার মাটিতে হয়তো তা মোটামুটি স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতো; কিন্তু অসহিষ্ণু ব্রাহ্মণ্যবাদের রোষানলে বাংলার সমতলভূমি থেকে তা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। পাহাড়ী প্রত্যন্ত ও দুর্ভেদ্য বনাঞ্চলে এবং প্রচ্ছন্নভাবে লোকজ ধর্মের মধ্যে যদিও তার অস্তিত্ব কিছুটা বজায় ছিল, কিন্তু বাঙালী সমাজে তার প্রকাশ্য সদর্প আবির্ভাব ছিল একান্ত অসম্ভব। <strong>বাঙালী সমাজে তখন একমাত্র হিন্দুধর্মেরই প্রচন্ড দাপট। কিন্তু সে হিন্দু ধর্ম বেদ-উপনিষদের হিন্দুধর্ম নয়; হিন্দুধর্মের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদের সংকীর্ণ, বিভেদাত্মক, অনুদার আদর্শই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তার ফলে হিন্দুসমাজ শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং উচ-নিচের ব্যবধান এত প্রকট ছিল যে, সাম্য ও মানবতার আদর্শ সেখানে অবাস্তব কল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়ে পড়েছিল। তেত্রিশ কোটি দেবতার উপস্থিতি, চুতমার্গ, অবাঞ্ছিত অগণিত অমানবিক সংস্কার, ধর্মীয় নেতা ও সামাজপতিদের হৃদয়হীন শোষণ এবং নৈতিকতাহীন সমাজগ্রন্থি তখন নিতান্তই শিথিল হয়ে পড়েছিল। ইসলামের আগমনের সাথে সাথে তাই এই সমাজের ভিত সহজেই ধসে পড়ে। ইসলামের প্রগতিশীল মানবিক আদর্শ তখন বাংলার সমাজ-ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করে।</strong> মুসলিম রাজশক্তি তখন ইসলাম প্রচারে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা প্রদান করলে এবং শ্রীচৈতন্য প্রমুখ হিন্দু সমাজপতিগণ হিন্দুধর্মের সংস্কার সাধন ও পুনরুজ্জীবনের প্রয়াসে গভীরভাবে আত্মনিয়োগ না করলে হয়ত সমগ্র বাঙালী সমাজই তখন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে পড়তো।</p>
<p>কিন্তু ইসলামের এই অপ্রতিরোধ্য প্রসারের যুগেও সর্বাধিক অনুধাবনযোগ্য বিষয় হলো এই যে, মুসলিম রাজশক্তি কিংবা মুসলিম ধর্মপ্রচারকগণের মধ্যে কখনো অসহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। শাসক শ্রেণী প্রতিরোধহীন রাজকীয় আধিপত্য লাভেই সন্তুষ্ট ছিলেন আর স্বীয় ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্যই ছিল ধর্ম-প্রচারকগণের প্রধান হাতিয়ার। অবশ্য বিরুদ্ধ-শক্তির মোকাবিলায় কখনো কখনো সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়নি এমন নয়; কিন্তু ইতিহাসের সামগ্রিক পটভূমিতে তা ব্যাপক গুরুত্বের অধিকারী নয়। বাংলাদেশে ব্রাহ্মণ্য রাজশক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সাথে তাই এর পার্থক্য অতি সুস্পষ্ট। এক ব্যাপক সামাজিক প্রলয় ও নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ-যুগের অবসান ঘটিয়ে ব্রাহ্মণ্য সেন রাজাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের প্রসারের সাথে সাথে বাঙালী সমাজে আদর্শ ও মূল্যবোধগত তাৎপর্যময় ব্যাপক পুনর্বিন্যাস সংঘটিত হলেও তা সামাজিক অগ্রগতির পথে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেনি; নতুন ও প্রাণময় গতিসঞ্চার করেছে মাত্র। তাই দেখা যায়, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষার কদরদানি বেড়েছে; বাংলা-সাহিত্যের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। ইসলামের উদারনৈতিক আদর্শ এবং মুসলিম শাসক-সম্প্রদায়ের ঔদার্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমান সকলেই সাহিত্য চর্চার যথাযোগ্য অধিকার লাভ করেছে। অবশ্য সাংস্কৃতিক চেতনা ও ঐতিহ্যগত স্বাতন্ত্র্যের জন্যে উভয়ের সাহিত্য স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।</p>
<p>ইংরেজ আগমনের সাথে সাথে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। চরম হতাশাগ্রস্ত সামাজিক পরিবর্তনের পটভূমিতে শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ সম্ভব ছিল না। ফলে পলাশী যুদ্ধের পর প্রায় এক শতাব্দী কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোন উল্লেখযোগ্য অবদান চোখে পড়ে না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটাকে &#8216;তমসা &#8211; যুগ&#8217; বলে চিহ্নিত করা চলে। উক্ত এক শতাব্দী কালের মধ্যে একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছাড়া অন্য কোন উল্লেখযোগ্য কবিরই সন্ধান পাওয়া যায় না বলা চলে। এ সময়ে সামাজিক পরিবেশ ও মানুষের মানস-রাজ্য কতখানি ভাবলেশশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে পড়েছিল কবি ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায়ও তার প্রমাণ মেলে। বস্তুত বৈষ্ণব-কাব্যের মত গভীর ভাবসম্পন্ন কাব্য ও আলাওলের &#8216;পদ্মাবতী&#8217;র মত নিখুঁত শিল্প সৃষ্টির মত ধৈর্য ও সাধনা এ যুগের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিল না বললেই চলে। তবে এ সময় অধুনা প্রায় লুপ্ত এক শ্রেণীর সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছিল বটে, যেগুলোকে কবিয়ালদের গান, কীর্তন, গ্রাম্য ছড়া, আউল-বাউল এবং হেঁয়ালি জাতীয় বিভিন্ন নিম্নস্তরের সাহিত্য বলে আখ্যায়িত করা চলে। এ শ্রেণীর সাহিত্যের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দৈন্য, হতাশা- নৈরাশ্য, বৈরাগ্য ও হৃদয়বৃত্তির রুচিগর্হিত উৎকট প্রকাশ ঘটেছে মাত্র।</p>
<p>ঊনবিংশ শতকের শুরুতেই সামাজিক অস্থিরতা ও মানসিক দৈন্যভাব বিদূরিত হওয়ার লক্ষণ সূচিত হয়, কিন্তু সে লক্ষণ কেবলমাত্র বাঙালী হিন্দুসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কলকাতায় ১৮০০ খ্রীস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও ১৮১৭ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হওয়ার ফলে বাঙালী হিন্দু সমাজে নবজাগরণের সূচনা হয়। এ সময় পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখ সমাজ-সংস্কারক ও বিদ্বজ্জন ব্যক্তির আবির্ভাবের ফলেও হিন্দুসমাজে নবজাগরণের এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। কিন্তু মুসলমান সমাজে তখনো এমন কোন পরিবর্তনের সূচনা হয়নি। বরং ইংরেজদের বিরূপতা এবং রাজশক্তির অসহযোগিতার ফলে বাঙালী মুসলমান সমাজ তখনো চরম হতাশা ও দৈন্যদশার মধ্যে জীবন-যাপন করছিল। সামাজিক কর্মযোগ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে তাদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এ সময় তাদের মধ্যে বৈরাগ্যভাব ও আউল বাউলের জন্ম তাই এ দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় তথা বাস্তব দিক থেকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ও নিরাসক্ত হয়ে পড়ার ফলে আধ্যাত্মিক ও বৈরাগ্যভাবই তাদের মধ্যে প্রাধান্য লাভ করে। ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দে &#8216;সিপাহী বিদ্রোহে&#8217;র পরে অর্থাৎ উনবিংশ শতকের শেষার্ধে চরম বাস্তবতার নিদারুণ আঘাতে তাদের এই বৈরাগ্য ও নিরাসক্তভাবের অবসান ঘটতে থাকে। এ সময় মুসলমান সমাজে কিছুটা স্থিতিশীলতার ভাব লক্ষ্য করা যায় এবং তার ফলে কিছু কিছু সাহিত্য সৃষ্টির সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এ সময় রচিত সাহিত্যে ভাবাবেগের আধিক্য এবং সব হারানোর এক অস্বস্তিকর মনোবেদনার প্রকাশ চোখে পড়ে।</p>
<p>ঊনবিংশ শতাব্দীকে মুসলমানদের জন্য আত্মগ্লানি অপনোদন ও আত্ম-চেতনার বিকাশ সাধনের প্রচেষ্টার যুগ বলে অভিহিত করা যেতে পারে। দীর্ঘ-সুপ্তির অবসান ঘটিয়ে নব-অভ্যুত্থানের প্রথম লগ্নে তাদের মধ্যে এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাতন্ত্র্য পরিলক্ষিত হয়। এই স্বাতন্ত্র্য যেমন ভাষার ক্ষেত্রে, তেমনি ভাব, উপজীব্য, ঐতিহ্য-চেতনা ও জীবন-অনুভবের ক্ষেত্রেও।</p>
<p>ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মুসলমানগণ যখন সাহিত্য চর্চা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশটাও বিশেষভাবে বিচার্য। উনবিংশ শতকের শুরুতেই এক শ্রেণীর হিন্দু সংস্কৃত পন্ডিতদের প্রচেষ্টায় বাংলাভাষার রূপ-পরিবর্তনের প্রয়াস চলে। আরবী-উর্দু-ফারসী ভাষার অসংখ্য শব্দরাজি যা স্বাভাবিকভাবে বাঙালা ভাষার শব্দ-ভান্ডারের সাথে মিশে গিয়েছিল, সেগুলোকে &#8216;মুসলমানী জবান&#8217; রূপে আখ্যায়িত করে বাংলাভাষা থেকে ঝেটিয়ে তাড়িয়ে তার পরিবর্তে খাঁটি দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দাবলীতে বাংলা ভাষার নব-রূপায়ণের সযত্ন প্রয়াস চলে। দ্বিতীয়ত, ইংরেজী শিক্ষা-সভ্যতার প্রভাবে উনবিংশ শতকের শুরুতেই বাঙালী হিন্দু ধর্ম ও সমাজে নতুন পরিবর্তন ও নবজন্মের আভাস পরিলক্ষিত হয়। ধর্মীয়-চিন্তার ক্ষেত্রে এই বিবর্তন ব্রাহ্মণ সমাজের জন্ম দেয়। অনেকে হিন্দু ধর্ম পরিত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে এবং সনাতন হিন্দুধর্মের যারা অনুসারী তাদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে ধর্মীয় সংস্কার সাধনের প্রয়াস চলে। এই ধর্মীয় সংস্কার সাধনের প্রয়াসে অনেকে হিন্দু ধর্মের মাহাত্ম্য ও প্রাধান্য প্রমাণার্থে অন্য ধর্ম এবং বিশেষতঃ ইসলাম ধর্ম তথা মুসলমানদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রয়াসে লিপ্ত হয়। বঙ্কিম চন্দ্র ছিলেন এই গোষ্ঠীর সর্বাধিক সোচ্চার ও উচ্চকন্ঠ বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। ঊনবিংশ শতকে মুসলমানদের নবজাগরণ ও সাহিত্য চর্চার প্রয়াস প্রধানত এই সনাতনপন্থী হিন্দুদের মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণা ও বিদ্বিষ্ট আঘাতেরই প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া-কেন্দ্রিক। তাই এ যুগের সাহিত্যে আবেগ-উত্তেজনা এবং আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা যতটা রয়েছে, শিল্প-কলার উচ্চাঙ্গ প্রকাশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ততটা ঘটেনি। উক্ত একই কারণে সাহিত্য-সাধনার ক্ষেত্রে মুসলমানগণ স্বকীয় ঐতিহ্য ও স্বতন্ত্র জীবন-দৃষ্টি নিয়ে আবির্ভূত হন। স্বভাবতই এ সময় তাদের সাহিত্যে ধর্মভাবের প্রাধান্যও অনিবার্য হয়ে পড়ে।</p>
<p>ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত। কালগত বিচারে নয়; বরং উপজীব্য ও শিল্পগত বৈশিষ্ট্যের দ্বারাই আধুনিকতার বিচার হয়ে থাকে। মাইকেল মধুসূদন দত্তকেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম, উল্লেখযোগ্য ও অবিস্মরণীয় প্রতিভা বলে চিহ্নিত করা হয়। মধুসূদনের শিক্ষা, জীবন-পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বহুল পরিমাণে আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। মূলত মধুসূদনই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক। ইউরোপীয় শিক্ষা, সভ্যতা ও সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করে মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস পান। সাহিত্যের উপজীব্য যেমন পরিবর্তিত হয়, শিল্পগত বৈশিষ্ট্য ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও তেমনি নতুনত্ব আসে। মধুসূদনের পরে যাঁরা সাহিত্য রচনা করেছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁরা অনেকেই তাঁর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছেন। সমকালীন মুসলিম কবি-সাহিত্যিকগণও এর ব্যতিক্রম নন। কিন্তু মধুসূদনের প্রবর্তিত সাহিত্যের আঙ্গিক ও শিল্পগত বৈশিষ্ট্য তাঁরা যতটা অনুসরণ করেছেন উপজীব্য ও অনুপ্রেরণার দিক থেকে তেমনি তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য বর্তমান। স্বতন্ত্র ঐতিহ্য-চেতনা, স্বকীয় জীবন-দৃষ্টি ও নব-জাগরণের উদ্দীপনা এ সময় তাঁদের সাহিত্যসৃষ্টির প্রধান উপজীব্য। &#8216;ইয়ং বেঙ্গল&#8217;দের আবির্ভাব এ যুগে যেমন বাঙালী হিন্দুসমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল, ইসলামী ভাব-দর্শন ও ঐতিহ্য চেতনাও তেমনি মুসলিম সমাজে নব উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। এই ভাব-চেতনাকে উপজীব্য করেই এ যুগে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্য-সাধনার যাত্রা শুরু।</p>
<p>এবারে উনবিংশ শতকের কতিপয় বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক ও তাঁদের অবদানের বিশিষ্ট স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মীর মোশাররফ হোসেন</strong></p>
<p>মীর মোশাররফ হোসেন ঊনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক। এ শতকের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয়। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দে কুষ্টিয়া জেলার লোহানীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জমিদারের অধীনে চাকরি করেন। গভীর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সাথে তিনি দীর্ঘকাল সাহিত্য সাধনায় আত্মনিবেদিত ছিলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা সর্বমোট পঁয়ত্রিশ খানা বলে জানা যায়। এর মধ্যে &#8216;বিষাদ সিন্ধু” তাঁর সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় রচনা। তাঁর অন্যান্য রচনাবলী যদিও উপেক্ষণীয় নয়; তবু বিষাদ সিন্ধুর জনপ্রিয়তা এত অসাধারণ যে, বাংলা সাহিত্যে তিনি একমাত্র বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা হিসাবেই সমধিক খ্যাতিমান; বিশেষত বাঙালী মুসলমানের কাছে তিনি সবিশেষ মর্যাদার অধিকারী।</p>
<p>রচনার আকারের দিক থেকে যেমন, বৈচিত্র্যের দিক থেকেও। মোশাররফ হোসেন ঊনবিংশ শতকের এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা। তাঁর সমকালের তেমনি মীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি-প্রতিভা এবং বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রতিভূ মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবদান কাব্য –মহাকাব্য, সনেট, নাটক ও প্রহসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মধুসূদনের পর বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য প্রতিভা বঙ্কিম চন্দ্রের অবদানও কেবলমাত্র উপন্যাস, প্রবন্ধ ও রম্য জাতীয় রচনার মধ্যেই সীমিত। অবশ্য প্রাথমিক যুগে তিনি কবিতা জাতীয় রচনার চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু পরিণত বয়সে সেদিকে তিনি আর কখনো মনোযোগ দেননি। সেদিক থেকে মীর মোশাররফ হোসেনের বৈচিত্র্যপূর্ণ সাহিত্যপ্রয়াস সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।</p>
<p>তাঁর সমগ্র সাহিত্য-কর্মকে মোটামুটি ছয় ভাগে বিভক্ত করা চলে। (১) উপন্যাস জাতীয় রচনা, (২) আত্ম চরিতমূলক রচনা, (৩) নাটক, (৪) প্রহসন, (৫) কবিতা ও গান এবং (৬) প্রবন্ধ। &#8216;বিষাদ-সিন্ধু&#8217;, &#8216;রত্নাবতী&#8217; ও &#8216;উদাসীন পথিকের মনের কথা&#8217; প্রথম শ্রেণীভূক্ত রচনা। &#8216;গাজী মিয়ার বস্তানী&#8217;,দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত, &#8216;বসন্ত কুমারী&#8217; ও &#8216;জমিদার দর্পণ&#8217; তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত, &#8216;এর উপায় কি&#8217; চতুর্থ শ্রেণীভুক্ত, &#8216;গোরাই ব্রীজ&#8217;, &#8216; সঙ্গীত লহরী&#8217;, পঞ্চম এবং &#8216;গো-জীবন&#8217; প্রভৃতি ষষ্ঠ শ্রেণীর অন্তর্গত রচনা। তাঁর কিছু কিছু রচনা অবশ্য উনবিংশ শতকের মধ্যে পড়ে না, তবু উনবিংশ শতকের ভাব-চিন্তা ও সামাজিক পরিবেশই মূলত তাঁর সমগ্র রচনাবলীকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<p><strong>মীর মোশাররফ হোসেনের রচনায় মোটামুটি তিনটি ভাব পরিলক্ষিত হয়। (১) ইসলামী ভাব ও মুসলিম-ঐতিহ্য চেতনা, (২) সমাজ-সচেতনতা মানবিক মূল্যবোধ এবং (৩) মানবিক প্রেম ও মরমী সংবেদনশীলতা। </strong></p>
<p>ঊনবিংশ শতকে ইসলামী ভাব ও মুসলিম পুনর্জাগরণের যে উদ্দীপনাপূর্ণ প্রয়াস সমকালীন মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে লক্ষ্য করা গিয়েছিল, মীর সাহেবের রচনায়ও তার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। বিষাদ সিন্ধু এর সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। বিষাদ সিন্ধুকে যেমন উপন্যাস বলা মুশকিল, তেমনি ইতিহাসও বলা চলে না। কারণ এতে মাঝে মাঝে ঐতিহাসিক সত্যতার অপলাপ ঘটেছে, আবার আধুনিক উপন্যাসের শিল্পগত বাঁধন রীতিও নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করা হয়নি। তবে এটাকে মোটামুটি মধ্যযুগীয় কাহিনীর ঢং-এ ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাস জাতীয় রচনা বলে অভিহিত করা চলে। ইসলামের ইতিহাসের এক বিষাদ করুণ ঘটনাকে মানবিক সংবেদনা ও আর্তিতে পূর্ণ করে এমন এক অপরূপ মাহাত্ম্যে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তা এক অবিস্মরণীয় গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। বিষাদ সিন্ধুর আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অপরূপ বাক-বিন্যাস। বাক-বিন্যাসের বিরল নৈপুণ্য, আবেগ ও উচ্ছ্বাসপূর্ণ সুরময় প্রকাশ একে অনেকটা কাব্যের মহিমা দান করেছে। ঘটনা ও কাহিনীর দিক থেকে আবার এটাকে অনেকটা মহাকাব্যধর্মী বলে আখ্যায়িত করা চলে।</p>
<p>বিষাদ-সিন্ধুর মত রত্নাবতী ও উদাসীন পথিকের মনের কথায়ও উপন্যাসের বাঁধা রীতি সংযম ও নিষ্ঠার সাথে অনুসৃত হয়নি। এ জাতীয় রচনায় ঘটনা ও কাহিনীকে যথাযথ আকর্ষণীয় রূপে ফুটিয়ে তোলার দিকে লেখকের যতটা আন্তরিক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়, উপন্যাসের প্রকৃতি ও শিল্প-রীতির প্রতি লেখকের ততটা সজাগতা লক্ষ্য করা যায় না।</p>
<p>ইংরেজদের রাজ্য-বিস্তারের সাথে সাথে যেমন রাজনৈতিক-সামাজিক পীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণ চলছিল, তেমনি ইউরোপীয় সভ্যতার প্রভাবে উনবিংশ শতকে আমাদের সমাজে এক নব-মানবতাবাদের অভ্যুদয় ঘটে। মূলত মাইকেল মধুসূদনের সাহিত্যেই এই মানবতাবাদের প্রথম সুস্পষ্ট প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ&#8217; কাব্যে পৌরাণিক দশানন রাক্ষস রাবণের চরিত্রে যেমন মানবিক মূল্যবোধের জীবন্ত প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি স্বদেশ-প্রীতির চেতনা প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর রচিত সনেটসমূহের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে ঊনবিংশ শতকের সকল কবি-সাহিত্যিকের রচনাতেই এই অনুভূতির প্রকাশ কম-বেশী পরিলক্ষিত হয়। মীর মোশাররফ হোসেনের রচনাতেও মানবিক মূল্যবোধ ও স্বদেশ-প্রীতির আত্যন্তিক প্রকাশ ঘটেছে। এদিক থেকে তিনি ছিলেন প্রকৃত সমাজ-সচেতন সাহিত্যিক। তাঁর বিভিন্ন রচনায় তিনি মানবিক সংবেদনা ও সহানুভূতির সাথে লাঞ্ছিত ও দুর্দশাগ্রস্ত সমাজের করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। মোশাররফ হোসেনের সমকালে একদিকে বিদেশী শাসকের শোষণ, নীলক সাহেবদের হৃদয়হীন পীড়ন এবং অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শক্তির দেশীয় প্রতিত্ত্ব নব্য জমিদার ও সামন্ত প্রভুদের অমানুষিক অত্যাচারে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মোশাররফ হোসেনের দরদী মন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই নিগৃহীত মানবতার সকরুণ চিত্র অংকন করেছেন। তাঁর রচিত &#8216;উদাসীন পথিকের মনের কথা&#8217; উপন্যাস এবং &#8216;জমিদার দর্পণ&#8217; নাটকে যথাক্রমে ইংরেজ নীল &#8211; কুঠিয়ালদের নিপীড়ন ও দেশীয় সামন্ত-প্রভুদের অত্যাচারের মর্মন্তুদ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। &#8216;জমিদার-দর্পণ&#8217; নাটকে যদিও দীনবন্ধু মিত্রের রচিত &#8216;নীলদর্পণ&#8217; নাটকের কিছুটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বলে অনেকের ধারণা, তবু মানবিক সংবেদনার স্বতস্ফূর্ত প্রকাশে এবং ঊনবিংশ শতকের ঐতিহাসিক ও সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এ দুটি গ্রন্থের মর্যাদা অপরিসীম। সমাজের বিভিন্ন দুর্বলতা ও অন্যায়-অবিচারের কথা রস-সৃষ্টির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে মোশাররফ হোসেন বিশেষ কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচিত প্রহসন &#8216;এর উপায় কি’ এবং আত্ম-কথা জাতীয় রচনা &#8216;গাজী মিয়ার বস্তানী&#8217; এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। রস-সৃষ্টি হিসাবে &#8216;গাজী মিঞার বস্তানী&#8217; অত্যন্ত সার্থক সৃষ্টি। এতে নাই এমন রস পৃথিবীতে দুর্লভ। রস-সৃষ্টির মাধ্যমে এতে সামাজিক অনাচার ও ইংরেজদের নানাবিধ দৌরাত্ম্যের পরিচয় পেশ করা হয়েছে। ফলে চার-শ পৃষ্ঠার এ বিরাট গ্রন্থখানি বাজেয়াপ্ত করা হয়। সাহিত্য-সৃষ্টি হিসেবে অনেকে গ্রন্থখানিকে মীর মোশাররফ হোসেনের সর্বাধিক সার্থক ও অনন্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তাঁর এ-জাতীয় রচনাবলীতে তীক্ষ্ণ সমাজ-সচেতনতা মানবতাবোধের গভীর প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়।</p>
<p>মীর মোশাররফ হোসেনের &#8216;গোরাই ব্রীজ&#8217;, &#8216;সঙ্গীত লহরী&#8217;, &#8216;বেহুলা&#8217; প্রভৃতি কাব্য, সঙ্গীত ও গীতি-নাটকের মধ্যে একাধারে তাঁর প্রতিভার বহুমুখিতা এবং প্রেম ও মরমী ভাবের প্রকাশ ঘটেছে।</p>
<p>মোটামুটিভাবে এ কথা বলা যেতে পারে যে, মীর মোশাররফ হোসেন উনবিংশ শতকের এক স্মরণীয় প্রতিভা। তাঁর বিচিত্র অবদান বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ। ভাষা ও শিল্প-সৌকুমার্যের ক্ষেত্রে তিনি যে উন্নত মানের পরিচয় দিয়েছেন, পরবর্তীকালের কবি-সাহিত্যিকদের তা বহুলভাবে প্রভাবিত করেছে। এদিকে থেকে তাঁর কৃতিত্বকে কেবলমাত্র বঙ্কিম চন্দ্রের সাথেই তুলনা করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>_________________</p>
<p><strong>বাংলা সাহিত্যের ধারা</strong></p>
<p><strong>রোয়াক ডেস্ক</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/muslim-contribution-in-bangla-literature-and-the-great-literature-work-of-mir-mosarraf-hossen/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7594</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জাতির মূলস্তম্ভ দ্বীন ও ভাষা; বাংলাদেশে আমাদের জাতিসত্তার ইশতেহার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/religion-and-language-manifesto-of-our-political-nationhood/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/religion-and-language-manifesto-of-our-political-nationhood/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 22 Aug 2022 16:31:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7292</guid>

					<description><![CDATA[বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছি যে, বর্তমান অবস্থাকে বুঝতে হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখতে হয়। ১. বিশ্বজনীনতা ২. আঞ্চলিকতা এ দুটি বিষয়কে সামনে রাখার কারণে একটি মূলনীতিকে গ্রহণ করতে হয়, তা হলো ‘বিশ্বজনীন হওয়া ব্যতীত স্বীয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছি যে, বর্তমান অবস্থাকে বুঝতে হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখতে হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">১. বিশ্বজনীনতা</div>
<div dir="auto">২. আঞ্চলিকতা</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এ দুটি বিষয়কে সামনে রাখার কারণে একটি মূলনীতিকে গ্রহণ করতে হয়, তা হলো ‘বিশ্বজনীন হওয়া ব্যতীত স্বীয় অঞ্চলকে ধারণ করা যায় না। ফলশ্রুতিতে আমাদের পন্থা, আমাদের লক্ষ্যমাত্রার সাথে একটি বিষয়কে জড়িয়ে নিতে হয়, সেটি হলো আমাদের বর্তমান দুনিয়া কোন অবস্থায় আছে তা নির্ণয় করা, নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে পর্যালোচনা করে সংকট এবং ভবিষ্যতের সমাধান নিয়ে সর্বদা সচেতন থাকা। আর যদি ইসলামী সভ্যতার সন্তান হিসেবে, সম্মানিত জাতির সন্তান হিসেবে বিশ্বের সামনে আমরা বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা না দাঁড়াতে পারি, আমাদের অধিকার ও মর্যাদাকে তুলে ধরতে না পারি, তাহলে উম্মাহকে জাগিয়ে তোলা অনেকটাই অসম্ভব। কারণ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় একশো কোটি মুসলমানের বসবাস, আর এ মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যকই কথা বলে বাংলা ভাষায়। এ সংখ্যা ত্রিশ কোটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই একশো কোটি মুসলমানের কেন্দ্রবিন্দু এ বাংলা অঞ্চল-ই। সুতরাং যদি আমরা, ত্রিশ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান এ অঞ্চল থেকে জাগ্রত না হই, তাহলে একশো কোটি মুসলমানকে জাগ্রত করা অসম্ভব।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এজন্য আমাদের ভবিষ্যত ও নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠা বা শান্তিপূর্ণ একটি বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আল মাওয়ার্দীর তত্ত্বকে সামনে হাজির রাখতে হবে। এ তত্ত্বের মধ্যে তিনি ছয়টি বিষয় সম্পর্কে বলেছেন, যার একটি হলো الدين المتّبع, অর্থাৎ এমন একটি দ্বীন সমাজের মধ্যমণি বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে থাকতে হবে, যা অনুসরণযোগ্য।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">ইমাম মাওয়ার্দীর মূলনীতিগুলোকে &#8216;Normative values&#8217; হিসেবে অনুবাদ করা হয়ে থাকে, যার অর্থ মানুষ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে এমন একটি বিষয়। নরম্যাটিভ ভ্যালু মূলত এমন মূল্যবোধ যা সকল পর্যায়ের মানুষ গ্রহণ করে নেয়। এটি সহজাত মূল্যবোধ যা গ্রহণ করতে প্রশ্ন বা চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয় না। আল মাওয়ার্দীর মূলনীতিসমূহকে এ নামকরণের কারণ হলো তার উত্থাপিত মূলনীতিসমূহ সহজাত, যা মানুষের আকল স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে নেয়। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবো, বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলে দ্বীন হিসেবে ইসলামকে সবাই মেনে নিচ্ছে। তারা দ্বীন কতটুকু পালন করছে বা গ্রহণ করছে, তারচেয়েও বড় বিষয় হলো তারা সবাই দ্বীন অনুসরণ করার চেষ্টা করছে, তাদের মাঝে এ দ্বীনের গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে মূল আলাপ হল, তা অবশ্যই অনুসরণ যোগ্য হতে হবে, এবং যদি তা অনুসরণ যোগ্য না হয় তবে তা কখনোই দ্বীনুল মুত্তাবাআ হতে পারবে না।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সুতরাং আমরা যে অঞ্চলেই থাকি না কেন, এটি আমাদের জন্য আবশ্যকীয় একটি বিষয়। এটির সাথে পরবর্তী বিষয়গুলোও সম্পৃক্ত, অর্থাৎ সামগ্রিক আদালত, সামগ্রিক নিরাপত্তা, সমাজে সম্পদের প্রাচুর্য ও সুষ্ঠু বন্টন থাকা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তবধর্মী স্বপ্ন থাকা, যে স্বপ্ন মানুষের মাঝে ভিশন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে তুলে ধরবে। এভাবেই আল মাওয়ার্দী তার তত্ত্বটিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং এটি বাস্তবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য। যদি মুসলিম উম্মাহ কিংবা বা যে কোনো জাতি, গোষ্ঠী এটি পালন করে, তাহলে সেখানে আদালত, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই আমরা যদি দ্বীনুল মুত্তাবাআকে জাতির সামনে সঠিকভাবে হাজির করতে না পারি, তাহলে বুঝতেই পারছি যে, সেই শান্তিপূর্ণ দুনিয়ার দিকে, সত্যিকারের জাতিসত্তা বিনিমার্ণের দিকে আমরা হাঁটতে পারবো না, জাতির রূহকে উপলব্ধি করতে পারবো না। এজন্য আমাদের অন্যতম কাজ ও প্রধান স্তম্ভ হলো–</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<blockquote>
<div dir="auto">জাতির সামনে দ্বীনের সঠিক ব্যাখ্যা হাজির করা। যুগ, সময় এবং স্থানের প্রেক্ষাপটের আলোকে দ্বীনকে সুন্দরভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, চিন্তাকে নবায়ন করা। তাই আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার মহান উসূলী ধারা<strong> ‘আহলুর রায়’</strong> ধারাকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি, একইভাবে এ ধারার ছয়জন মহান ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে আমরা আমাদের পরবর্তী ব্যক্তিত্ব তৈরি এবং সেই লক্ষ্য পানে এগিয়ে চলার চেষ্টা করতে পারি, তাহলে অবশ্যই নতুন এক দিগন্তের পুনঃউন্মোচন হবে, ইনশাআল্লাহ্‌।</div>
</blockquote>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">সেই ছয়জন মহান ব্যক্তিত্বরা হলেন</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"><strong>• হযরত উমর (রা.)</strong></h3>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">প্রথমত আল্লাহর রাসূলের (স.) সহচরদের মধ্যে তিনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছেন। তার হাত ধরেই মূলত আহলুর রায় ধারার চিন্তা বিকশিত হয়। তার যে চিন্তা, তা অর্ধ পৃথিবীর চেয়েও বেশি জায়গা জয় করছে, কুদুস জয় করছে, এমনকি সে সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সভ্যতাগুলোর পতন হয়েছিলো এবং সেগুলো ইসলামের ছায়াতলে এসেছিলো। দ্বিতীয়ত তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি সমগ্র পৃথিবীতে আদালতের ধারণাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করছেন যে, আজ পর্যন্ত তার মতো কোনো শাসক আসেননি এবং কারো শাসন তার শাসন ও ন্যায়পরায়ণতার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারে। তৃতীয়ত তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামী সভ্যতাকে ধারাবাহিকতা দান করার জন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্মাণ করেছেন। চতুর্থত তিনিই সর্বপ্রথম ইজতেহাদকে সুস্পষ্ট ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন। পঞ্চমত তিনি জ্ঞানের বহু শাখার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। এভাবে উমর (রা.) আমাদের জন্য বিশাল একটি দ্বার উন্মোচন করেছেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম আবু হানিফা (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">তিনি হযরত উমর (রা.) এর ধারাকে অনুসরণ করে, আরও উন্নত করে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানদর্শন ও জ্ঞানতত্ত্বে নতুনভাবে রূহ সঞ্চার করেছেন। ইসলামের বিশ্বজনীনতাকে সামগ্রিকভাবে সামনে নিয়ে আসায় তাকে ‘ইসলামের বিশ্বজনীন রূপের প্রখর দৃষ্টিমান সাধক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পরবর্তী মুতাফাক্কির মুজতাহিদগণ!</div>
</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম গাজ্জালী (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">তিনি তার আগের চারশো বছরের সারসংক্ষেপ করে পরের ছয়শো বছরকে প্রভাবিত করেছেন। এজন্য তাকে<strong> ‘ইসলামী সভ্যতার সারমর্ম’</strong> হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। চিন্তকেরা অনেকেই ইসলামী চিন্তা দর্শনের ইতিহাস লেখার সময় ‘ইমাম গাজ্জালী পূর্ববর্তী’ আর ‘ইমাম গাজ্জালী পরবর্তী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন! (যদিও এ সংজ্ঞায়ন যৌক্তিক নয়, তবুও এর দ্বারা ইমাম গাজ্জালীর প্রভাব সম্বন্ধে আন্দাজ করা যায়)</div>
</div>
<div dir="auto"></div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম শাতেবী (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">যে সময়ে আমাদের ট্র্যাডিশনাল, ক্লাসিকাল ফিকহ non functional হয়ে যাচ্ছিলো, আন্দালুসিয়ার পতন ঘটছিলো এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ মোঙ্গলদের আক্রমণে একদম নাস্তানাবুদ হয়ে গেছিলো, সবাই কিয়ামতের জন্য অপেক্ষা করছিলো, সে সময়েই তিনি তার অমর গ্রন্থ<em><strong> “মুয়াফাকাত”</strong></em> এর মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্বের অংশ ‘ফিকহ’ এর ক্ষেত্রে মাকাসিদের মাধ্যমে নতুন ডাইমেনশন সৃষ্টি করেছেন।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর জন্ম ১৭০৭ সালে, যে সালে সুলতান আওরঙ্গজেব মৃত্যুবরণ করেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই মুঘল সালতানাতের পতন শুরু হয়। ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর ৫৭ বছরের জীবন কাটে এ ভয়াবহ সংঘাতপূর্ণ সময়েই। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৭৬৫ সালে। জীবদ্দশায় তিনি পাশ্চাত্যের ক্ষমতায়ন ও ডেভেলপমেন্টকে খুব ভালোভাবে দেখেছিলেন, তখন তিনি বলেন, <strong><em>“বর্তমানে আমাদের বিদ্যমান যে ধারণা, তা দিয়ে আর ইসলামী সভ্যতাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।” তখন তিনি তার অমর গ্রন্থ “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা” রচনা করেন।</em></strong> বড় সুফি হওয়া সত্ত্বেও তিনি বলেন, “কায়িম বিল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর নামে আমি টিকে থাকবো৷” (সুফিবাদের ধারণা ছিলো ‘ফানাফিল্লাহ’, অর্থাৎ আল্লাহর অধীনে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া।) শুধুমাত্র এ কারণেই সমগ্র পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলন তার ছাত্রদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছিলো। এমনকি পরবর্তীতে তৈরি হওয়া সকল মুক্তি আন্দোলনও এ ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছিলো।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto"><strong>• আল্লামা ইকবাল</strong></h3>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">তিনি পাশ্চাত্যের গগণবিজয়ী আধিপত্যকালীন সময়ে মুসলিম উম্মাহর সুদীর্ঘ সময়কার চিন্তাগত স্থবিরতা, জড়গ্রস্ততার বিপরীতে জ্ঞানকে যুগের সমালোচনার নিরিখে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জিহাদ ও ইজতেহাদের কাঠামো বয়ান সামনে নিয়ে এসেছিলেন তার অমর গ্রন্থ &#8220;Reconstruction of the Religious Thought in Islam&#8221; এর মাধ্যমে। এ গ্রন্থের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ জাগ্রত হয়।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এভাবে যদি আমরা ছয়জন ব্যক্তিত্বকে দেখি, তাহলে আমাদের পথ-পন্থা কী হবে, আমরা কীভাবে অগ্রসর হবো, আমাদের জাতিকে কী দিতে হবে– এসব কিছুই আমাদের সামনে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে। এ ব্যক্তিদের সামনে রেখেই আমরা আমাদের জ্ঞান চর্চা চালিয়ে যাবো। আমরা যা শিখবো, তা জাতির কল্যাণে কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখবো, চিন্তা করবো এবং বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবো। সেক্ষেত্রে আল্লাহ অবশ্যই ফলাফল দিবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। পাশাপাশি যদি আমাদের সোশিওলজি, সোশিওকালচারকে বুঝতে চাই এবং সেই রূহকে ধারণ করতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের এ অঞ্চলকে খুব ভালোভাবে পাঠ করতে হবে। এ মাটি, এ আবহাওয়া, এ পরিবেশ, এ সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করা ব্যতীত কখনোই ধার করা কোনো বিষয় দিয়ে আমরা এ সমস্যার সমাধান করতে পারবো না, জাতির সামনে দ্বীনুল মুত্তাবাআকে সামগ্রিকভাবে উপস্থাপন করতে পারবো না। যেমন আমরা যদি লক্ষ্য করি, ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী তার “হুজ্জাতুল্লাহুহিল বালিগা” দিল্লিতে বসে লিখলেও তা সমগ্র উপমহাদেশের সোশিওলজির সাক্ষ্য দেয়। “ফতোয়ায়ে আলমগীরি” আরবী ভাষায় লিখা হলেও তা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের রূহের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা, ব্রাহ্মণরা ওয়েস্টার্ন সিভিলাইজেশানের সোশিওলজিকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং সেগুলোকে পাঠ করতে বাধ্য করেছে, ফলশ্রুতিতে আমরা সমাধানের দিকে ধাবিত হতে পারছি না। এজন্য আমাদের জাতির রূহকে বুঝতে হলে নিজেদের ফিকহ বা বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞানকে, অঞ্চলের মানুষ ও ভূমিকে খুব ভালোভাবে বুঝে সেই আলোকে ইশতেহার রচনা করতে হবে। এটি দ্বীনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto">‘বাংলা ভাষা’ তথা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা</h3>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">বিগত ৩০০ বছর যাবত বাংলা ভাষা নিয়ে প্রকৃত অর্থে কোনো কাজ হচ্ছে না। এজন্য নতুন করে বাংলা ভাষাকে পুনর্জাগরিত করা, বাংলা ভাষাকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হতে হবে, এর কোনোই বিকল্প নেই। এক্ষত্রে আশার দিক হলো এত জুলুম, অত্যাচারের মাঝেও বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়নি, বরং সে তার আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তার নিজস্ব হরফে এখনো তাকে চর্চা করে যাচ্ছি, নতুন করে পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি যা পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে নিভে যায়নি আমাদের বাংলা ভাষার স্বকীয়তা!</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">বাংলা ভাষার অবস্থান অনেক উচ্চে। এখনো স্ব-মহিমায় বলতে পারা যায়, “বাংলা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা।” আরবী ছিলো সাধারণ একটি কওমের ভাষা, কিন্তু সেটি একটি বিশ্বজনীন ভাষায় রুপান্তরিত হয়েছে। আমরা বাংলা ভাষাকে বিশ্বজনীন করতে চাই না, তবে–</div>
<div dir="auto"></div>
<blockquote>
<div dir="auto">৪০ কোটি মানুষের ভাষা হিসেবে নতুন করে জাগরিত কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে চাই।</div>
<div dir="auto">জাতিসত্তাকে বোঝার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে প্রস্ফুটিত করতে চাই।</div>
<div dir="auto">আমাদের সংস্কৃতিকে বহনের সর্বপ্রধান মাধ্যম হিসেবে নতুন করে উত্থান ঘটাতে চাই। আর এ উত্থানকাব্যে বড় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করবে আমাদের যুবকরা, ইনশাআল্লাহ।</div>
</blockquote>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এটি কীভাবে সম্ভব? সেক্ষেত্রে উল্টো প্রশ্ন হলো, কেন সম্ভব নয়?</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">যে হিব্রু ভাষার গত ৬ হাজার বছরে কোনো অস্তিত্ব ছিলো না, সে হিব্রু ভাষাকে কি নতুন করে জাগরিত করে আন্তর্জাতিক ভাষায় পরিণত করা হয়নি?</div>
<div dir="auto">উসামানী ভাষার হরফ পরিবর্তন করে আজকের তুর্কি ভাষা তৈরি করা হয়েছে, মাত্র ৮০ বছরের ব্যবধানে সকল জ্ঞানকে তুর্কি ভাষায় রূপায়ন করে জাগরিত করা হয়নি?</div>
<div dir="auto">আজ থেকে কয়েকশো বছর আগেও চাষীদের বা গ্রাম্যদের ভাষা ছিলো উর্দু। এটি কি এখন একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা নয়?</div>
<div dir="auto">আজ থেকে দেড়শো বছর আগেও হিন্দি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না, সেই হিন্দি ভাষা কি আজ উপমহাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে না?</div>
<div dir="auto">শেক্সপিয়ার কি একাই ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করাননি?</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">তাহলে কেন হাজার বছর ধরে চলে আসা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা এবং সেই সাথে ৪০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে কেন আমরা নতুন করে দাঁড় করাতে পারবো না? কেন তা সম্ভব নয়? আমরা অবশ্যই পারবো। যদিও হতাশার দিক রয়েছে, কিন্তু এ ধরনের হতাশার দিক সকল অঞ্চলেই রয়েছে।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">বড় বড় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, বৃটিশদের দ্বারা প্রভাবিত পণ্ডিতরা আমাদের প্রতিনিয়তই বোঝানোর চেষ্টা করে যে, বাংলা ভাষা মুসলমানদের ভাষা নয়, বাংলা ভাষায় মুসলমানদের তেমন কোনো কাজ হয়নি, কোনো মৌলিক জ্ঞান চর্চা হয়নি, তাই এর দ্বারা জাগরণ সম্ভব নয়! কিন্তু বাস্তবতা যা, তা একটি উদাহরণের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে। উসমানীদের নিজেদের লিখিত ১৮ লক্ষ পৃষ্ঠার ইতিহাস তাদের সামনে আছে, সুলাইমানীয়া লাইব্রেরি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মাত্র একজন লেখক উসমানী আমলে প্রতি ১০০ বছরে মাত্র ৫০ জন করে চিন্তকের তালিকা দেখিয়েছেন, যাদের প্রায় প্রত্যেকের কমপক্ষে ৮০ টি করে বই আছে! যে সুবিশাল উসমানী খেলাফত ছয়শো বছর গোটা বিশ্বকে সবেচেয়ে বেশি প্রভাবের সাথে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের সম্পর্কেই বলা হয় যে, উসমানীদের সাধারণ তলোয়ার চালানো ছাড়া ভিন্ন কোনো কিছু করার যোগ্যতা ছিলো না বা ওই অর্থে কোনো কিছু ছিলো না!</div>
<div dir="auto">উসমানীদের তুলনায় বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরা কোনো ডকুমেন্ট রেখে যেতে পারেনি, দুইশো বছরের ব্রিটিশ আগ্রাসন আমাদের সবকিছুকে নিঃশেষ করে দিয়েছে! উসমানী অঞ্চল বা তুর্কিশ অঞ্চল, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনই প্রতিষ্ঠা হয়নি, সে অঞ্চলের ইতিহাসকেই যদি এভাবে অস্বীকার করা হয়, মিথ্যা ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে দুইশো বছর শোষণের শিকার আমাদের বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের ইতিহাস, ডকুমেন্ট তো মুছে ফেলা হবেই। আর যেহেতু কোনো ডকুমেন্ট অবশিষ্ট নেই, তাই তা অস্বীকার করা হবেই এবং আমাদেরকে নানাভাবে হীনমন্য করা হবেই! এবং এটিই স্বাভাবিক!</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">পাশাপাশি আমরা এটিও দেখতে পাই, ওরিয়েন্টালিস্ট ও ব্রাহ্মণ্যদের লেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস সর্বাবস্থায়ই আমাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গায় আঘাত করেছে। তারা আমাদের ইতিহাসবিহীন জাতিতে পরিণত কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে চাচ্ছে, এটিই তাদের উদ্দেশ্য।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">আমরা যদি এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে নতুন করে ডায়ালগ সৃষ্টি করতে পারি; বাংলার ত্বহা আব্দুর রহমান তৈরি কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে পারি, আল্লামা ইকবাল তৈরি কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে পারি; ইমানুয়েল কান্টের তত্ত্ব খন্ডন করে নতুন এক তত্ত্ব বাংলা ভাষায় দাঁড় করাতে পারি, তাহলে অবশ্য-অবশ্যই বাংলা ভাষাকেও সেভাবে হাজির করতে পারবো। আর বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অনুবাদ, ক্লাসিক গ্রন্থের বাংলা ব্যাখ্যা, ক্লাস, গবেষণা প্রবন্ধ, প্রস্তাবনাসহ নিজেদের যোগ্য করার মধ্য দিয়ে ক্লাসিক গ্রন্থ লেখার দিকে ধাবিত করা এখন আমাদের অন্যতম ইশতেহারে পরিণত হয়েছে। একইসাথে মৌলিক চিন্তা ও জ্ঞানের দিক দিয়ে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করতেও বাংলায় বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার তৈরি আমাদের অন্যতম ভিশনে রূপ নিয়েছে।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">দ্বীন এবং ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আমরা যে যে আন্দোলন শুরু করেছি, তার নাম দিয়েছি ‘জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের আন্দোলন’। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের নিকট ভবিষ্যৎ নিকট অতীতের চেয়ে অনেক ভালো হবে, ইনশাআল্লাহ।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">পরিশেষে, যে বিষয়টি বলতে চাই, দ্বীন এবং ভাষা যেহেতু জাতির মূল স্তম্ভ, আর এ দুটি বিষয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি, তাই পুনরায় নিখিল ভারতের ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের চিন্তা এবং ভিত্তি নির্মাণের সংগ্রাম এ বাংলা অঞ্চল থেকেই শুরু হবে, তার ভিত্তি প্রস্তর এ ভূমিতেই হবে– এটিও আমরা বিশ্বাস করি। এজন্যই আমরা বলতে চাই, ৭০০ বছরের সালতানাতের সাক্ষ্য বহনকারী দারসবাড়ি, আতিয়া মসজিদ এবং আন্দরকিল্লার সন্তান হিসেবে, ঈসা খাঁ, উমিদ শাহ ও শরীয়তুল্লাহর উত্তরসূরী হিসেবে এ অঞ্চলের যুবকদের মধ্যে ঈমান গ্রোথিত রয়েছে, তাদের মধ্যে সেই চেতনার রূহ এখনো বিদ্যমান। তাই আমরা যদি জাতির উপর পড়ে থাকে আস্তরণ বা ছাই সরিয়ে দিতে পারি, তাহলে জাতির ভিতরে লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি নতুন করে জেগে উঠবে। এ আগ্নেয়গিরি হবে আগামীর মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার, ভবিষ্যৎ নির্মানের অন্যতম স্তম্ভ এবং আমাদের পুনর্জাগরণের মিনার, ইনশাআল্লাহ।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/religion-and-language-manifesto-of-our-political-nationhood/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7292</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/literary-assessment/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/literary-assessment/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 27 Oct 2021 15:48:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6234</guid>

					<description><![CDATA[প্রতি বছর ১১ জ্যৈষ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যেহেতু তিনি কলকাতায় ভালো ছিলেন না, তাই তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রতি বছর ১১ জ্যৈষ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যেহেতু তিনি কলকাতায় ভালো ছিলেন না, তাই তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। বাংলাদেশ সরকার তাঁর থাকার জন্য সব ব্যবস্থাই করে। ঢাকায়ই তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাকে দাফন করা হয় তারঁই ইচ্ছানুসারে। প্রতি বছর তাঁর জন্মবার্ষিকীতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী পৃথক বাণী প্রদান করেন।</p>
<blockquote><p><em><strong>কবি-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে একটি সত্য আমাদের মানা উচিত যে, তাদের বিচার করতে হবে প্রধানত তাদের সাহিত্যকর্ম দ্বারা। তাদের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে বিচার করা ঠিক নয় এবং তাদের মহান সাহিত্যকর্মকে খাটো করাও সঙ্গত নয়। আমরা লক্ষ্য করেছি, যখন ফররুখ আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম, আল্লামা ইকবাল এবং রবীন্দ্রনাথের কথা আসে, তখনই কিছু লোকের কাছে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই প্রবল হয়ে ওঠে।</strong></em></p></blockquote>
<p>যেমন- <strong>কবি রবীন্দ্রনাথের</strong> ক্ষেত্রে তাঁর বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা, শিবাজীকে জাতীয় বীর মনে করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীতা এসবকেই প্রধান মনে করা হয় এবং তার সাহিত্যকর্মকে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয় না। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভীরভাবে হিন্দু দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তিনি বেদ, উপনিষদের কথাই প্রচার করেছেন। কিন্তু এরপরও তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং সেভাবেই তাকে বিচার করা উচিত।</p>
<p>তেমনিভাবে <strong>আল্লামা ইকবাল</strong> আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন। সেটাই তাঁর ক্ষেত্রে বড় করে দেখা হয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন উর্দু-ফার্সি সাহিত্যের একজন মহাকবি; সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন মুসলিম দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। তিনি কোনো গোত্র, ধর্ম বা এলাকার বিরুদ্ধে ছিলেন না। তিনি প্রধানত নিজের জাতির কথাই বলেছেন।</p>
<p>একইভাবে <strong>কবি ফররুখ আহমদের</strong> কথা এলেই তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শকে বড় করে দেখা হয়। তাঁর সাহিত্যকর্মকে কিছু লোক মোটেই গুরুত্ব দিতে চান না। কিন্তু তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি ইসলামের বাণী তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। কোনোভাবেই তিনি কোনো ধর্ম বা জাতির বিরুদ্ধে ছিলেন না।</p>
<p><strong>কাজী নজরুল ইসলাম</strong> একজন বিশ্বমানের কবি ছিলেন। বাংলা কিংবা অন্য যেকোনো ভাষায় তাঁর মানের খুব স্বল্পসংখ্যক কবিই রয়েছেন। তাঁর কবিতা ও গান বহুমুখী। স্বাধীনতার চেতনা উজ্জীবিত করার জন্য তিনি রাজনৈতিক কবিতা লিখেছেন। ব্রিটিশ শাসনামলে তাঁর কবিতা অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে জাতিকে লড়াই করার অনুপ্রেরণা জোগায়। শুধু তা-ই নয়, তাঁর গান ও কবিতা সব সময় যেকোনো স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তিনি বহু ইসলামী গান ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতায় তিনি কুরআনের অংশবিশেষ অনুবাদ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী তুলে ধরেছেন। এছাড়া তিনি হিন্দু জনগোষ্ঠী, গরিব এবং বঞ্চিতদের জন্যও কবিতা লিখেছেন।</p>
<p>আমরা লক্ষ্য করেছি, তাকে ‘অসাম্প্রদায়িক কবি প্রমাণ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়। নজরুল ইসলাম অবশ্যই সব মানুষের অধিকার চাইতেন; গরিবের, নারীর, অন্য সবার। কিন্তু তিনি অসংখ্য ইসলামী গান ও কবিতা রচনা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী লেখা এবং আমপারার কাব্য অনুবাদকে সাম্প্রদায়িক কাজ মনে করেননি। নিজের সম্প্রদায়ের জন্য, নিজের জাতির জন্য লেখা অন্যায় এবং সাম্প্রদায়িক হতে পারে না।</p>
<p>নজরুল-সাহিত্যের মৌলিক ইসলামী চরিত্রকে অস্বীকার করা ইসলাম বিদ্বেষেরই পরিচায়ক। সমাজ যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় এবং সেই সমাজ ও রাষ্ট্র যদি ইসলামের ভিত্তিতে চলে এবং অমুসলিমদের পূর্ণ অধিকার বহাল রাখা হয়, তাহলে তা সাম্প্রদায়িকতা নয়। একইভাবে কোনো সমাজ যদি খ্রিষ্টান কিংবা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় এবং সে সমাজ ও রাষ্ট্র ওই মতাদর্শের ভিত্তিতে সংগঠিত হয়, তা সাম্প্রদায়িক হবে না, যদি মুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের মানবাধিকার বহাল থাকে।</p>
<p>কবি নজরুল ইসলামের সঠিক মূল্যায়ন যে বাংলাদেশে হচ্ছে, তা বলা যায় না। আমরা যতটুকু জানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের বাংলা সাহিত্য কোর্সে নজরুলের যথাযোগ্য মূল্যায়ন হচ্ছে না। দ্রুতই এর অবসান হওয়া দরকার। আশা করি সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ দিকে নজর দেবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/literary-assessment/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6234</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
