<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>আন্তর্জাতিক রাজনীতি &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/politics-and-economy/international-politics/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Sat, 08 Aug 2026 15:11:22 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.3</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>আন্তর্জাতিক রাজনীতি &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>উম্মাহর উপর হামলে পড়া জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলায় আমাদের কী করণীয়?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/what-should-we-do-to-confront-the-zionists-that-is-attacking-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/what-should-we-do-to-confront-the-zionists-that-is-attacking-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 09 Mar 2026 15:40:33 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16669</guid>

					<description><![CDATA[ইরানের উপর বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এটা হলো, নাইন ইলেভেনের পরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা মোতাবেক ১৯তম ক্রুসেড। তাঁরা ২০০১ সালে আমাদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করে একের পর এক দেশ দখল করে নিলেও আমরা আমাদের ঘুম থেকেই এখনো উঠতে পারিনি।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>ইরানের উপর বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এটা হলো, নাইন ইলেভেনের পরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা মোতাবেক ১৯তম ক্রুসেড।</strong> তাঁরা ২০০১ সালে আমাদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করে একের পর এক দেশ দখল করে নিলেও আমরা আমাদের ঘুম থেকেই এখনো উঠতে পারিনি। নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই সকল মুসলিম দেশের একই পরিণতির কথা বার বার বলে আসছে।</p>
<p>এখন কথা হল, এই ক্রুসেড মোকাবেলা করার সামর্থ্য আমাদের আছে কিনা ? আমি মনে করি অবশ্যই আছে এবং এখনো যদি মুসলিম উম্মাহ তাঁর সম্ভাবনার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারে তাহলে অতীতের মত এই ক্রুসেডেও তাঁদেরকে পরাজিত করা সম্ভব।</p>
<p>এখন আসুন এ বিষয়ে আলোচনা করা যাক- আমাদের পক্ষে কী কী করা সম্ভব এবং কোন কোন বিষয়ে জনমত গঠন করা যেতে পারে,</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১. উম্মাহর সর্বোচ্চ ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগানো</strong></p>
<p>বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক এবং তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বন্ধ করতে হবে। আমি মনে করি জনগণ যদি রাজপথে শক্তভাবে নেমে আসে অবশ্যই এটা সম্ভব। যেমন, তুরস্কের জনগণ কঠিনভাবে অ্যামেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী হওয়ায় তুর্কীতে তাঁদের সামরিক ঘাটি থাকলেও সাম্রাজ্যবাদীরা সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা খুবই প্রশংসনীয়। শুধু ইসলামপন্থী দলগুলোই নয়, ঐতিহাসিকভাবেই ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বামপন্থী দলসমূহও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>২. রাজনৈতিকভাবে সমন্বয় কাউন্সিল গঠন</strong></p>
<p>ওআইসি, আরব লীগ, Gulf Cooperation Council), Economic Cooperation Organization, ডি-৮, Arab Maghreb Union সহ মুসলিমদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সব সংস্থা ও ঐক্য সংগঠনগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একক কেন্দ্র থেকে সমন্বয় করা উচিত।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৩. অর্থনৈতিক সংহতি বৃদ্ধি করা</strong></p>
<p>যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পণ্য বর্জনের আন্দোলনকে জোরালো করতে হবে ও এর পক্ষে প্রতিনিয়ত জনমত গঠন করতে হবে। তেলের সরবরাহ, খাদ্য ও রসদ সহায়তা বন্ধ করতে হবে। কৌশলগত প্রণালীসমূহ এবং বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য তহবিল গঠন ও এর মাধ্যমে মাধ্যমে ঐ সকল দেশের মানুষের সামাজিক জীবনধারাকে সচল রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালানো।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৪. যৌথ সামরিক বাহিনী</strong></p>
<p>মুসলিম দেশসমূহের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ানোর জন্য যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে একটি যৌথবাহিনী গঠন করা আবশ্যক। আকাশ প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সাইবার প্রতিরক্ষার জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বৃদ্ধি ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানোর জন্য প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। এর ফলে আক্রমণের সময় বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়ার বদলে দ্রুত ও সমন্বিত একক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৫. আইনী সহায়তা ও প্রক্রিয়াকে জোরদার করা</strong></p>
<p>সারা বিশ্বের মুসলিম আইনজীবী সংস্থা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে স্থায়ী টিম তৈরি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের শিকার দেশগুলোতে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ সংরক্ষণ ও সংগ্রহ করে তা আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা এবং জনমত গঠনের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৬. সিভিল সুরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি</strong></p>
<p>গাজাসহ, প্রতিটি সংকটপূর্ণ অঞ্চল ও মুসলিম দেশসমূহের জন্য জন্য আলাদা আলাদা ত্রাণ সরবরাহ, ফিল্ড হাসপাতাল এবং মানবিক সহায়তা করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করা উচিত। সীমান্তের প্রবেশদ্বার ও লজিস্টিক কেন্দ্রসমূহ যেনো যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এর জন্য প্রোটোকল তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য, পানি, ওষুধ, আশ্রয়স্থল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার জন্য পরিকল্পনা করা ও একক কেন্দ্র থেকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করার মত উদ্যোগ গ্রহন করা</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৭. মিডিয়ার ঐক্য</strong></p>
<p>মুসলিম দেশগুলিতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং রয়টার্সের মতো সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াকে বর্জন করে নিজস্ব মিডিয়ার মধ্যে নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।</p>
<p>একই সঙ্গে, উম্মাহর নিজস্ব আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বা বিদ্যমান সংস্থাগুলোর যৌথ কনসোর্টিয়াম শক্তিশালী করে মাঠ থেকে প্রাপ্ত যাচাইকৃত তথ্য ও চিত্রসমূহ একক কেন্দ্র থেকে মানসম্মত প্রোটোকলের মাধ্যমে প্রস্তুত করে বিশ্ব মিডিয়া এবং স্থানীয় সংবাদপত্রে একযোগে সরবরাহ করা উচিত।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৮. যৌথ গোয়েন্দা বিভাগ তৈরি</strong></p>
<p>মুসলিম দেশগুলোর জন্য যে বিষয়সমূহ হুমকি সেগুলিকে চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কতা জানানো এবং সংকট মোকাবেলার জন্য জন্য যৌথ গোয়েন্দা কেন্দ্র থাকা উচিত। স্যাটেলাইট, ওপেন সোর্স, সাইবার গোয়েন্দা এবং মাঠ থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টগুলো এক জায়গায় নিয়ে যাচাই করা হবে। এভাবে সম্ভাব্য হামলা বা ভুল তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা আগে থেকেই ধরতে পারা যাবে এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমসমূহ একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৯. ডিজিটাল মোবিলাইজেশন কেন্দ্র তৈরি</strong></p>
<p>মুসলিম দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব ইন্টারনেট সিস্টেম, ডেটা সেন্টার এবং সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে এবং সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সত্য বিকৃত করা কন্টেন্ট (ডিপফেক, ম্যানিপুলেটেড ভিডিও/সাউন্ড) চিহ্নিত করে তার প্রবাহ বন্ধ করতে হবে এবং উৎসের নেটওয়ার্কগুলো নিষ্ক্রিয় করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী প্রোপাগান্ডার মাত্রা ও প্রবাহ সীমিত করতে হবে এবং কন্টেন্টের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। মুসলিম ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে চলমান সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা অকার্যকর করতে হবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১০. শিক্ষাব্যবস্থা ও অভিন্ন কার্যকর ইচ্ছাশক্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ</strong></p>
<p>সাময়িক আবেগ কিনা ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ নয়, স্থায়ী, সুশৃঙ্খল এবং সঠিক প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বিভিন্ন প্লাটফর্মগুলোকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদের প্রেতাত্মা অ্যামেরিকা ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর বিরুদ্ধে জনরোষকে জাগিয়ে রাখার জন্য জিহাদী প্রেরণাকে সর্বদা জাগ্রত ও উজ্জীবিত রাখতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো এগুলা কে বাস্তবায়ন করবে বা আদৌও এগুলো সম্ভব কিনা ?</p>
<p>আমি মনে করি অবশ্যই সম্ভব। মুসলিম উম্মাহ এখনো অনেক সমৃদ্ধ। জনগণ এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সজাগ এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একাট্টা। এছাড়াও তেল, গ্যাস, পানিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের বড় একটি অংশ মুসলিম দেশসমূহে রয়েছে। উম্মতের আছে বিশাল এক যুবসমাজ ও অতীত গৌরব।</p>
<p>শুধু তাই নয় পাশ্চাত্যের দেশসমূহের সাধারণ জনগণও আজ তাঁদের দেশের এই সকল দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সেই সকল দেশেই আজ এমন এমন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠছে যারা জায়নবাদের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সোচ্চার। যেমন অ্যামেরিকাতেই এখন ইসরাইলের সমর্থন পক্ষে সমর্থন একদম তলানীতে হাজারো চেষ্টা করেও আর ইসরাইলের পক্ষে ন্যারাটিভ তৈরি করতে পারছে না।</p>
<p>এই জন্য আমরা যদি আল্লাহর উপর ভরসা করে কাজ শুরু করি ও স্বপ্ন বিনির্মাণ করি তাহলে অবশ্যই আমরা অতীতের ১৮ টি ক্রুসেডকে যেভাবে মোকাবেলা করেছি এই ১৯ তম ক্রুসেডকেও মোকাবেলা করতে পারবো এবং সমগ্র মানবতার জন্য ইসলামী সভ্যতা পুনরায় বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্ব দিবে ইনশাল্লাহ।</p>
<p>উস্তাদ এরবাকানের ভাষায়, <strong>&#8220;আমরা ডাঙায় জাহাজ তৈরি করেই যাবো, আল্লাহ তায়ালাই সাগরকে আমাদের পায়ের কাছে এনে দিবেন, ইনশাআল্লাহ&#8221;</strong>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/what-should-we-do-to-confront-the-zionists-that-is-attacking-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16669</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ভবিষ্যৎ গাজাঃ পথ চারটি, কিন্তু গন্তব্য একটি!</title>
		<link>https://rowyakbd.com/future-gaza-four-paths-but-one-destination/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/future-gaza-four-paths-but-one-destination/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. সামি আল-আরিয়ান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 16 Nov 2025 19:35:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16375</guid>

					<description><![CDATA[২০২৩ এর ৭ অক্টোবর পরবর্তী গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধটি ছিল ফিলিস্তিনিদের মনোবলকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ করে ফেলার উদ্দেশ্যে। এর লক্ষ্য ছিল গাজাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা এবং পশ্চিম তীরকে ভয় দেখানো। আগুন, ভয় ও অনাহারে একটি জাতিকে মুছে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>২০২৩ এর ৭ অক্টোবর পরবর্তী গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধটি ছিল ফিলিস্তিনিদের মনোবলকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ করে ফেলার উদ্দেশ্যে। এর লক্ষ্য ছিল গাজাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা এবং পশ্চিম তীরকে ভয় দেখানো। আগুন, ভয় ও অনাহারে একটি জাতিকে মুছে ফেলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। তবে এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা ভেঙে পড়েনি। তারা স্থির এবং অটলভাবে নিজেদের ভূমি ও সত্যের প্রতি এমন অবিচলতা প্রদর্শন করেছে যে, তাদের আন্দোলনকে কোনো অবরোধ বা অবিরত আক্রমণ দ্বারা মুছে ফেলা সম্ভব নয় এমনটিই প্রতীয়মান হয়েছে। সমগ্র পৃথিবী এক নৃশংস গণহত্যার সাক্ষী হয়েছে, যা লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে প্রতিটি ফোনে পৌঁছেছে। এবং একইসাথে প্রকাশিত হয়েছে সমকালীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুস্পষ্ট প্রবঞ্জনার চিত্র। যে ব্যবস্থা একদিক থেকে নিজেকে সভ্য দাবি করে, অপরদিকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে সকল ধরণের অস্ত্র সরবরাহ করে, সেই অস্ত্রের ব্যবহারে ছোট ছোট মাসুম শিশুদের হত্যা করছে এবং তাদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।</p>
<p><strong>এখন যায়নবাদী ইজরায়েলি শাসনের সামনে একটি বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, যা তারা অনেকদিন ধরে এড়িয়ে চলে এসেছিলো। এখন আর তারা চাইলেও নিজেদের আধিপত্যকে শান্তি প্রতিষ্ঠা হিসেবে , বর্ণবাদী আচরণকে নিজেদের নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে, হাজার হাজার মানুষকে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে বিতারণকে মানবিক সহয়তা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে না। তাদের সেই মুখোশ খুলে গিয়েছে। যায়নবাদীদের ফিলিস্তিনিদের উপর একক আধিপত্য ও বর্ণবাদী কর্তৃত্ব শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এমতাঅবস্থায় “ যায়নবাদী ব্যবস্থা নিজের গতিপথ পরিবর্তন করবে কিনা” এই প্রশ্নের পরিবর্তে&nbsp; তারা যে পথই অবলম্বন করুক প্রতিটি পথ তাদের পতনকে কিভাবে ত্বরান্বিত করবে সেটিই মূল প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।</strong></p>
<p>বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে প্রধানত চারটি ভিন্ন দৃশ্যপটকে লক্ষ্য করা যায়। সেগুলির প্রতিটি দৃশ্যপট বা সম্ভাব্য ঘটনা যায়নবাদী প্রকল্পের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য প্রকাশ করে। যায়নবাদীরা গণতন্ত্রের দাবি করে কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ, অনেকটা এরকম যে জমি চায় কিন্তু সেই জমির অধিকারী মানুষদের অবহেলা করে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায় কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে। যায়নবাদী আইডোলজির ধারক বাহকদের সম্ভাব্য প্রতিটি পথ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় সেটি হলো তাদের তৈরি করা আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা, যাতে ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয় ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>প্রথম দৃশ্যপটঃ দ্বৈত রাষ্ট্র সমাধান</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>বিশ্বব্যাপী এখনও তথাকথিত টু-স্টেট সল্যুশন-কে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ১৯৯৩ সাল থেকে চলে আসা ব্যর্থ অসলো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল হওয়ার কথা ছিল এই সমাধান। অসলো প্রক্রিয়া ছিল শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি চেষ্টা, যা মূলত ইজরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির ব্যর্থতার কারণে এই পথ আজও কার্যকর হয়নি এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা পুরোপুরিভাবে দূরে সরে গেছে।</p>
<p>বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানরা এই টু-স্টেট সমাধানের পক্ষে বিবৃতি প্রদান করে থাকেন, তবে সেগুলি অধিকাংশ সময় শুধুমাত্র মুখের বুলি হিসেবে থেকে যায়। কূটনীতিবিদরা এখনও পুরনো মানচিত্রগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করেন। অথচ এর বাস্তবতা খুবই সংকীর্ণ। টু-স্টেট এর সমাধানের ধারণা হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিম তীর এবং গাজার মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। তবে,অনেক আগেই অবৈধভাবে স্থাপিত বসতিগুলোর অপসারণ এবং জনগণের মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা আগেও উঠে এসেছে। কিন্তু আজও এটি সম্ভব হয়নি, কারণ পশ্চিম তীর এবং গাজা পুরোপুরিভাবে বিভক্ত, এবং হাজারো চেকপোস্ট এবং সেনাদের দ্বারা বেষ্টিত। ফলশ্রুতিতে এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।</p>
<p>এছাড়া পূর্ব জেরুজালেম ইতোমধ্যে কার্যত এবং আইনীভাবে ইজরায়েলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে, যা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে আরেকটি বড় বাধা। বহু বছর ধরে ইজরায়েল তাদের বসতিগুলি এমনভাবে বিস্তৃত করেছে এবং ভূখণ্ডকে ছোট ছোট দখলকৃত অঞ্চলে বিভক্ত করেছে, যার ফলে একটি স্থিতিশীল এবং কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তাদের সৃষ্টি করা এমন পরিস্থিতি থেকে ইজরায়েল দাবি করে যে, আলোচনার জন্য কিছুই অবশিষ্ট নেই। কারণ তারা পুরো অঞ্চলটির উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সব প্রেক্ষাপটের মধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এখন শুধু একটি রাজনৈতিক ধারণা হয়ে রয়ে গেছে, যেটি আসলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কঠিন পথ বেয়ে চলেছে।</p>
<p>যদি ধরে নেওয়া হয় , ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো বাস্তবিক উদ্যোগ নেওয়া হবে, তবে সেক্ষেত্রে ইজরায়েলকে ১৯৬৭ সালের পূর্বের গ্রীন লাইন সীমানায় ফিরে যেতে হবে। এর মাধ্যমে তাদের গ্রেটার ইজরায়েলের স্বপ্ন ব্যাহত হবে এবং দখল করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে। কিন্তু অধিকাংশ ইজরায়েলি মনে করে, একটি পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রকৃত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইহুদি জাতীয়তাবাদের জন্য একটি অস্তিত্বগত হুমকি । কারণ এটি ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে । তখন তারা &nbsp;শুধু একটি নিয়ন্ত্রিত ও শোষিত জনগণ নয়, বরং একটি অধিকারপ্রাপ্ত জাতি। রিফিউজি সমস্যাও সমাধান হবে না, কারণ সাত মিলিয়নেরও বেশি ফিলিস্তিনি যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছেন তারাও এখানে ফিরে আসার অধিকার দাবি করবে। অপর দিকে পূর্ব জেরুজালেমও তার জনগণের অধিকারেই থাকবে।</p>
<p><strong>এজন্য টু-স্টেট সমাধান ইজরায়েলি দখলদারিত্বের পতনের সূচনা করবে। কারণ এটি সেই মৌলিক বিষয়টিকেই স্বীকার করবে, যা ইজরায়েল বিগত এক শতাব্দী ধরে অস্বীকার করে এসেছে যে, ফিলিস্তিনিরা সমান মানবিক অধিকারপ্রাপ্ত, এবং তাদের অধিকার চেকপোস্টে হারিয়ে যাবে না। এই চরম বাস্তবতা ইজরায়েল জানে, এবং এজন্যই তারা এই সমাধানটি প্রতিরোধ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে। কখনোই তারা এটিকে মেনে নেবে না।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>দ্বিতীয় দৃশ্যপটঃ অভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>জর্ডান নদী এবং ভূমধ্যসাগরের মাঝে যে ভূমি রয়েছে, তা একক ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ এই ভূমি একটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। যায়নবাদী সরকার এই ফ্যাক্টটিকে ভালোভাবে বুঝে এজন্য তারা রাফাহ থেকে রাস আল নাকুরা এবং যাফা থেকে জেরিকো পর্যন্ত পুরো অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে।</p>
<p>যদি ইজরায়েল একক ভূখণ্ড হিসেবে এই ভূমির দাবি জোরালোভাবে চালিয়ে যায় এবং পরবরর্তীতে সম-অধিকার ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সরে আসে, তবে তারা আর নিজেদের &#8220;ইহুদি রাষ্ট্র&#8221; হিসেবে দাবি করতে পারবে না। কারণ যদি রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় , তবে তা ইহুদি জাতীয়তাবাদী ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েল হয় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে পারবে, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। অথবা একটি জাতিগত-ধর্মীয় রাষ্ট্র হতে পারবে। যেকোনো একটি বিষয় সম্ভব, দুইটি ফ্যাক্ট কখনো একসাথে চলতে পারে না।</p>
<p>এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের বর্তমান জনসংখ্যার পরিসংখ্যানই এই বিতর্কের সমাপ্তির জন্য যথেষ্ট। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের বাদে , এখনও ইজরায়েলি জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা ফিলিস্তিনিদের মাঝে বিদ্যমান। অর্থাৎ, জনসংখ্যার দিক থেকে ফিলিস্তিনিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠেছে যা যায়নবাদী ইজরায়েলের আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে কঠিন করে তোলে। যদি একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, তখন যায়োনিস্ট আন্দোলন তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে আর টিকতে পারবে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার এই সমাধানকে পৃথিবীর অনেক দেশ ও জনগণ সমর্থন করে এবং করবে । এটি এমন একটি রাষ্ট্রের ধারণা, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে এবং ধর্ম বা জাতির ভিত্তিতে কোনো ধরণের বৈষম্য করা হবে না। এজন্য নিশ্চিতভাবে যায়নবাদী শক্তি এই পরিবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ এটি তাদের মতাদর্শের সুস্পষ্ট মৌলিক নীতির বিপরীত।</p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<h5><strong>তৃতীয় দৃশ্যপটঃ একটি স্থায়ী বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>তৃতীয় বিকল্প পথটি হলো সেই পথ, যা যায়নবাদী শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করে আসছে। আর সেটা হলো আরও অধিক পরিমাণে ভূমি দখল করা এবং গ্রিন লাইনকে প্রকৃতপক্ষে মুছে ফেলে শুধুমাত্র কাগজে কলমে রেখে দেওয়া। যায়নবাদী শক্তি জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সার্বভৌমত্ব দাবি করে অথচ এর অধীনে থাকা জনগণের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি নারাজ । গাজাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পশ্চিম তীরকে সামরিক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। প্রতিনিয়ত অবৈধ বসতি স্থাপনের মাধ্যমে &nbsp;ভূমি দখল এবং ফিলিস্তিনিদের সকল দিক থেকে শ্বাসরোধ করে রেখছে যায়নবাদী শক্তি। অপরদিকে শুধুমাত্র ইহুদি নাগরিকদের জন্য রাস্তা এবং পৃথক দেয়াল তৈরি করা, বসতি এবং আউটপোস্ট সম্প্রসারণ করা এবং পরে তা বৈধ করা। পুরনো সত্যকে মুছে ফেলার জন্য নতুন নতুন আইন উদ্ভাবন। নিরাপত্তার দোহায় দিয়ে অন্যের উপর জুলুম, অস্থায়ী এর নামে স্থায়ী করে নেওয়া। ফিলিস্তিনিদের হয়রানি করা ,অবরুদ্ধ রাখা এবং তাদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানো, যতক্ষণ না তারা হাল ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে বা চলে যায়।</p>
<p>এটি ছিল গাজার জন্য এক চরম নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যা তুফান আল আকসার আগে ছিল। ২০২৩ এর ৭ অক্টোবরের পর, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আইনগত ও মোরাল এলিগেশনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং বি&#8217;টসেলেম এখন এই ব্যবস্থাকে অ্যাপার্থেইড হিসেবে আখ্যায়িত করছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ২০২৪ এর জানুয়ারি এবং মার্চ এ প্রাথমিক আদেশ জারি করেছে। আইসিসি প্রসিকিউটর ২০২৪ এর মে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা চেয়েছে। যায়নবাদী শক্তি এখনও সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে বা শক্তিশালী মিত্রদের সাহায্যের ডেকে আনতে পারে, তবে এটি আর নৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করতে পারে না কিংবা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। এটি তার নৈতিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণরুপে হারিয়ে ফেলেছে।</p>
<p>আন্তর্জাতিক সিভিল সোসাইটি এই পথটিকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিভিন্ন চার্চ, ইউনিয়ন, ছাত্রসংগঠন, পেশাদার সমিতি এবং সিভিল সোসাইটির নেতারা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করছেন। সরকারগুলো এখন আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক সম্মান নিশ্চিত করার জন্য অস্ত্র ও বাণিজ্য শর্তাধীন করতে চাপের মধ্যে রয়েছে। ইজরায়েল যত বেশি এই বিশাল জনসংখ্যাকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, ততই তারা সমগ্র পৃথিবী থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। উন্নত প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারের উপর নির্ভরশীল অর্থনীতি পরিত্যক্ত অবস্থায় বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না এবং যায়নবাদীদের মিলিটারাইজড সোসাইটিতে কখনো সংস্কৃতি ও জ্ঞান বিকশিত হতে পারবে না এমতাঅবস্থায়।</p>
<p>সময় যত গড়াবে যায়নবাদী শক্তির এই অন্যায়ের দেয়াল ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে। যখন সেই দেয়াল ভেঙে যাবে, তখন যায়োনিস্ট শক্তির কর্তৃত্ব ও আধিপত্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>চতুর্থ দৃশ্যপটঃ উচ্ছেদ</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>চতুর্থ বিকল্পটি হলো বিশাল সংখ্যক জনসংখ্যাকে জোরপূর্বক এই ভূমি থেকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া। এটা ইজরায়েলের পুরনো কৌশল,যা এখন আধুনিক রূপে উপস্থিত। এই ধারণার মূল হলো শাসক যদি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে অনত্র্য পাঠিয়ে দিবে। এটাকে স্বেচ্ছানির্বাচিত পুনর্বাসন এবং মানবিক করিডোরের মতো শব্দ ব্যবহার করে বৈধ উপস্থাপনের প্রচেষ্টা চালালেও, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো জাতিগত নির্মূলকরণ। গাজাবাসী তাদের এই হীন বাস্তবতা প্রকাশ করেছে। জায়োনিস্ট শাসনের এই প্রয়াস এবং সেই প্রয়াসের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। দুই বছরব্যাপী তীব্র বোমাবর্ষণের ও মানবইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার পরিচালনা করেছে যায়নবাদী শক্তি। এরপরও ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমি ত্যাগ করেনি। তারা তাদের সন্তানদের নিজ হাতে দাফন করেছে এবং সেখানেই রয়ে গেছে। তাদের এই অসীম সাহস ও অবিচলতা মহাকাব্যিক হয়ে থাকবে সমগ্র মানবতার ইতিহাসে &nbsp;।</p>
<p>পশ্চিম তীরও প্রতিরোধের এক অনন্য উদাহরণ । তারাও ক্রমাগত আক্রমণ এবং হয়রানির শিকার হয়েছে এবং পুনরায়&nbsp; ফিরে এসে নিজেদের বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করেছে। এই অঞ্চলের দেশগুলো জানে স্থানান্তরের পরিণতি তাদের নিজেদের সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। এজন্য&nbsp; তারা এই&nbsp; এর অংশ হতে পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। বিশ্ব এখন ক্যামেরা এবং ফোনের মাধ্যমে এক হয়ে গেছে। অপরাধ করে পূর্বের মতো গোপন করে রাখা সম্ভব নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক কোথাও ঠেলে দেওয়া আর সম্ভব নয়, কারণ তা আন্তর্জাতিক আইনকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলবে। বিগত দুই বছর ধরে গাজায় আমেরিকার সমর্থনে ইজরায়েলের যে ব্যাপক উচ্ছেদের প্রচেষ্টা ছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।</p>
<p>অতএব, গাজা বা পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে উচ্ছেদের আরেকটি প্রচেষ্টা যায়নবাদী শক্তির কর্তৃত্ব আর দ্রুত &nbsp;ধ্বংস করবে এবং বিশ্বব্যাপী এমনকি অনিচ্ছুক রাষ্ট্রগুলোকে সক্রিয় হতে বাধ্য করবে। এটি তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করবে, বিলম্ব করবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>এই চারটি পথের গন্তব্য</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>যে কোন পরিস্থিতি সামনে আসুক না কেন, রাজনৈতিকভাবে&nbsp; যায়োনিজমের পতনই একমাত্র পরিণতি। প্রতিটি দৃশ্যই দেখায় যে, যায়োনিস্ট শাসন তার নিজস্ব চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। একটি প্রকৃত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ তা হলে তার গ্রেটার ইজরায়েলের স্বপ্ন পরিত্যাগ করতে হবে।</em></p>
<p>এটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মেনে নিতে পারবে না, কারণ এতে তার স্বকীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যবাদী পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অ্যাপার্থেইড বজায় রাখা সম্ভব নয়, কারণ তা হলে এটি বৈশ্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যার প্রতি বছর সমর্থন এবং ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পাবে। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করাও সম্ভব নয়। কারণ এতে একটি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সঙ্কট সৃষ্টি হবে যা দ্রুত এর বিচ্ছিন্নতা এবং পতন ত্বরান্বিত করবে।</p>
<p><strong>এখানে আসলে প্রশ্ন বিজয় বা পরাজয়ের নয়। এটি হলো কৌশলগত পিছু হটনের নানা রূপের মধ্যে একটি নির্বাচন। এখন এটা আর শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়; এটি একটি ইজরায়েলি সমস্যা। যার মোকাবিলা করতে হবে পুরো পৃথিবীকে। যায়নবাদী শক্তি এমন একটি ব্যবস্থা, যা অন্যদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উপর দাঁড়িয়ে, তা ক্ষমতা ধরে রাখতে সব ধরনের উপায় অবলম্বন করবে। সমগ্র বিশ্বের করণীয় হলো এই যায়নবাদী কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার চক্রকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৈরি করা কাঠামো ও নীতিগুলো ভেঙে ফেলা।</strong></p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<h5><strong>কৌশলগতভাবে যায়নবাদী ব্যবস্থার পতন</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>কোনো কিছুকে ধ্বংসকরণ শুধু একটি স্লোগানের বিষয় নয় । এটি একটি বৃহৎ কৌশল। এর প্রথম ধাপ হলো জনগণকে তাদের ভূমিতে দৃঢ়ভাবে স্থির রাখা। গাজা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, ১৯৪৮ সালের সীমানার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যারা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া থেকে রক্ষা করা অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন হলো ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতে অব্যাহত উপস্থিতি এবং তাদের প্রতিরোধ ও অবিচল সংগ্রামকে &nbsp;সমর্থন করা। এর মানে হলো অবরোধ এবং দখল অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বন্দীদের মুক্তি, মানবিক সাহায্য ও পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থায়নকে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল থেকে রক্ষা করা এবং ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিয়ে পুনর্নির্মাণ পরিচালনা করা&nbsp; । আন্তর্জাতিক সাহায্য, জাতিসংঘের সংস্থা এবং বন্ধু রাষ্ট্রগুলির সহায়তায় এটি সম্ভব । কিন্তু বিদেশি বা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়। এই সংগ্রামে দৃঢ়তা হচ্ছে নৈতিক শক্তির মূল। ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতে স্থায়ী হওয়া ব্যতীত, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা একটি বিমূর্ত ধারণা হয়ে যাবে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় ধাপ হলো, একটি বৈশ্বিক আন্দোলন তৈরি করা যা যায়োনিস্ট প্রকল্পের প্রতিটি ভিত্তি চিহ্নিত করবে এবং দুর্বল করার জন্য কাজ করে যাবে । এই আন্দোলনকে যায়নবাদী ক্ষমতার উৎসগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সংসদগুলোতে লবি নেটওয়ার্ক যা দায়মুক্তি কেনে, পুঁজির প্রবাহ যা অবৈধ বসতি স্থাপন এবং অস্ত্র সরবরাহ করে, সার্ভিলেন্স টেকনোলজি যা শহরগুলোকে খোলা কারাগারে পরিণত করে, মিডিয়া যা অপরাধকে নিরাপত্তার জন্য প্রতিরোধের গল্পে রূপান্তরিত করে, একাডেমিক অংশীদারিত্ব যা অ্যাপার্থেইড উদ্ভাবন হিসেবে উপস্থাপন করে, এবং সামরিক কৌশল যা সম্মিলিত শাস্তিকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে।</strong></p>
<p>প্রতিটি কৌশলের প্রতিকৌশল আছে। বসতি ও অবরোধের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাণিজ্য এবং গবেষণা শর্তাধীন করা, অস্ত্র আমদানি নিষিদ্ধ করা, পুলিশ ও স্পাইওয়্যার বিনিময়ের বন্ধ করা, একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষা করা, এবং অ্যাপার্থেইড সাদা করার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করা। সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও অভ্যন্তরীণ আদালতের মাধ্যমে গুরুতর অপরাধের বিচার করা। আর্থিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিচারের আওতায় আনা। যেকোনো ভবিষ্যৎ রিভিশনিজমের বিরুদ্ধে ইতিহাস সংরক্ষণ করা, প্রতক্ষ্যদর্শীদের সাক্ষ্য এবং ডকুমেন্টেশন সংগ্রহ করা।</p>
<p>এই আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। এটি অবশ্যই ফিলিস্তিনিদের চারপাশে কেন্দ্রিক, তবে এটি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের কাজ নয়। এটি এমন ইউনিয়নগুলির প্রয়োজন হবে যারা বন্দরের মাধ্যমে অস্ত্র আমদানি বন্ধ করবে। এমন ডাক্তারদের প্রয়োজন হবে যারা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে চিকিৎসাকে ব্যবহার হতে দেবে না। এমন ইঞ্জিনিয়ারদের প্রয়োজন হবে যারা বোমা, কারাগার বা দেয়াল নির্মাণের জন্য চুক্তি করবে না। এমন শিল্পীদের প্রয়োজন হবে যারা মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে। এমন ছাত্র এবং অধ্যাপকদের প্রয়োজন হবে যারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সেন্সরশিপ বা প্রচারের হাতিয়ার হতে দেবে না। এমন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রয়োজন হবে যারা বলবে যে, ধর্মীয় গ্রন্থ বা নৈতিক শিক্ষাকে নৃশংসতা বা অমানবিকতা ঢাকার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এই আন্দোলনটি সকল বৈশ্বিক সংগ্রামগুলোর সম্মিলিত ভাষায় ন্যায়, অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এখানে এমন ইহুদিদের প্রয়োজন হবে যারা যায়োনিজমের বিরোধিতা করবে এবং যারা এই মিথ্যে ধারণাকে অস্বীকার করবে যে, ফিলিস্তিনিদের মুক্তি তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এটি এমন মুসলিম, খ্রিস্টান, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী এবং যারা ধর্মবিশ্বাসী নন তাদেরও প্রয়োজন হবে, যারা বুঝে যে, এই লড়াই ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।</p>
<p><strong>এই লড়াইটি আধিপত্য এবং সমানাধিকারের, ঔপনিবেশিক নির্মমতা থেকে মুক্ত হয়ে এক স্বাধীন ভবিষ্যতের, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং দাসত্বের বিপরীতে।</strong></p>
<p><strong>যায়োনিজমের নৈতিক কাঠামোটি স্পষ্ট। যায়োনিজম একটি বর্ণবাদী এবং আধিপত্যবাদী মতাদর্শ । একটি অবৈধ উপনিবেশ প্রকল্প যা বর্ণবাদী একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। যায়োনিজম কোনো ধর্ম নয়, এটি একটি আদর্শ। আমাদের সংগ্রাম হচ্ছে একটি আদর্শ এবং এর দ্বারা তৈরি কাঠামো এবং নীতির বিরুদ্ধে, কোনো ধর্ম বা জনগণের বিরুদ্ধে নয়। অ্যান্টিসেমিটিজম একটি বিষ, যা ইসলামোফোবিয়া এবং সকল প্রকার বর্ণবিদ্বেষের মতো একযোগে অস্বীকার করতে হবে।</strong></p>
<p>পাশাপাশি, খুব কাছাকাছি সময়েই, যায়নবাদী কর্তৃত্ব তার পুরানো আর্গুমেন্টকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। এটি নতুন অস্ত্রবিরতি চুক্তির জন্য চেষ্টা করবে যা অবরোধ বজায় রাখবে। পশ্চিম তীরে আরও ভূমি দখল করতে থাকবে। নাগরিক সমাজ এবং সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ বাড়াবে। প্রেক্ষাপট বিহীন আত্মরক্ষার বর্ণনা পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করবে। তারা এটি আশা করবে যে ক্লান্তি মানুষের মধ্যকার প্রতিরোধের উচ্ছ্বাসকে একসময় নিঃশেষ করে দিবে। আমাদের সকলে কাজটি হলো এই পতনকে ঠেকানো। আমাদের ক্যামেরাগুলোতে নজর রাখতে হবে , আদালতের আদেশগুলোকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করা।</p>
<p>এর মানে হলো, ছাত্রদের দাবীগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিতে পরিণত করা। শ্রমিক ইউনিয়ন যে প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত দেয়, সেটাকে শুধু কাগজে না রেখে সরাসরি কোম্পানির পণ্য কেনা-বেচা বা সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। পৌরসভাগুলোর সিদ্ধান্তগুলোকে ক্রয়নীতি হিসেবে পরিণত করা যা জায়োনিস্ট সহযোগী কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তি অস্বীকার করবে। সম্পাদকীয় মতামতগুলোকে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের জনসাধারণের প্রতিশ্রুতি হিসেবে পরিণত করা। এর মানে হলো, নিশ্চিত করা যে যায়নবাদী ইজরায়েল যখনই মানবতার মৌলিক নীতির লঙ্ঘন করবে তখন তাকে সেটা মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য করা ।</p>
<p>নিকট ভবিষ্যতে চতুর্মুখী চাপ বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে নতুন করে গঠন করতে সহয়তা করবে । কিছু রাষ্ট্র শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকরী পদক্ষেপে চলে যাবে। জাতিসংঘ কর্তৃক সদস্যপদ স্থগিত করা একটি বৈশ্বিক দাবি হয়ে উঠবে। অস্ত্রবিরতি সম্ভব হতে যাবে। টার্গেটেড নিষেধাজ্ঞাগুলো ছড়িয়ে পড়বে। বাণিজ্য পছন্দগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সম্মতির উপর নির্ভর করবে। কর্পোরেট বোর্ডগুলো উচ্চ ঝুঁকির সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাবে। সাংস্কৃতিক এবং একাডেমিক জীবন নৈতিক সীমানা তৈরি করবে যা অটুট থাকবে। যায়নবাদী শক্তি নতুন সিন্ধান্ত গুলোকে অত্যন্ত রাগের সহিত প্রতিহত করবে ।</p>
<p>তারা দাবি করবে আমরা এটি একমাত্র লক্ষ্যবস্তু ? &nbsp;প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। যখন একটি রাষ্ট্র গণহত্যা করে বা সহায়তা দেয়, যখন একটি বর্ণবাদী আইন তৈরি করে এবং সমাজে সেটার চর্চা করে, যখন এটি মানুষকে জঘন্য পশুর মতো আচরণ করে, তখন এটি স্বাভাবিক আচরণ পাওয়ার &nbsp;অধিকার হারায়। দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র আলাদা করা নয়। এটি আমাদের সাধারণ মানবতার জন্য ন্যূনতম দাবী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৭ অক্টোবরঃ যায়নবাদের পতনকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যম</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>গাজা সব ধরণের বিভ্রান্তি দূর করেছে। এটি ফিলিস্তিনিদের সাহস এবং দৃঢ়তা গভীরতা তুলে ধরেছে। এটি অন্যায়ের অংশীদারিত্ব এবং ষড়যন্ত্রের পরিণাম কি হতে পারে সেটিকে তুলে ধরেছে। যায়নবাদী শক্তি দুর্বলতাকে সমগ্র মানবতার সামনে উদ্ভাসিত করেছে।&nbsp; যারা ক্ষমতা বজায় রাখতে এবং নিজদের নিরাপদ বোধ করতে হাসপাতাল বোমা হামলা করেছে এবং অসংখ্য অগণিত মানুষকে অনাহারে রাখতে বাধ্য করেছে। উপরে উল্লেখিত চারটি দৃশ্যপট যায়োনিস্ট প্রকল্পের বিজয়ের পথ নয়; বরং এগুলি তার পতনের দিকে নিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন স্তর।</p>
<p><strong>এখন আমাদের কাজ হলো এই পতনকে দ্রুততর করা, এমন একটি বৈশ্বিক আন্দোলন গড়ে তোলা যা অপরাধের মাত্রা এবং আশা ও বিশ্বাসের বিস্তৃতি অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের কাজ হলো ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতে বাঁচিয়ে রাখা, ছন্ন-ছাড়া জীবনকে পুনর্নির্মাণ করা, অবরোধ বন্ধ করা, বন্দীদের মুক্তি দেওয়া, যারা নৃশংসতা চালানোর আদেশ দিয়েছে এবং যারা তা বাস্তবায়ন করেছে তাদের বিচার করা এবং আধিপত্যের কাঠামোগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা যতক্ষণ না সেগুলি ধ্বংস হয়ে যায়।</strong></p>
<p>ন্যায়বিচার কোনো উপহার নয়, এটি মানবতার সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। স্বাধীনতা কোনো স্লোগান নয়, এটি মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতা কোনো বিকল্প নয়, এটি একটি বাধ্যবাধকতা। আত্মনির্ভরতা কোনো ইলুশন নয়, এটিই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। প্রত্যাবর্তন কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি অধিকার। যখন আমরা এই সত্যগুলোকে আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করি, তখন যে পথটি অসম্ভব মনে হয়েছিল, তা হয়ে ওঠে একমাত্র বাস্তব এবং যুক্তিসঙ্গত পথ। ফিলিস্তিনের জনগণ বারবার বিপর্যয় ও সংকটের মধ্য দিয়ে এই সত্য বহন করেছে, এবং এখন পৃথিবী কেবলমাত্র এটা শুনতে শুরু করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ মেহেদী হাসান&nbsp;</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/future-gaza-four-paths-but-one-destination/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16375</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ট্রাম্পের পরিকল্পনা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের অধিকার কেড়ে নিয়ে দখলদারিত্ব বজায় রাখা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/trumps-plan-is-to-maintain-the-ocupation-by-taking-away-palestinians-rights/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/trumps-plan-is-to-maintain-the-ocupation-by-taking-away-palestinians-rights/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. সামি আল-আরিয়ান]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 02 Oct 2025 06:33:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16534</guid>

					<description><![CDATA[[গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের জন্য ট্রাম্পের &#8220;Day After&#8221; পরিকল্পনার পর্যালোচনা ও এই কুটিল পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে এই প্রবন্ধে] হামাস কিংবা তথাকথিত কর্তৃপক্ষ – কেউই অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাখে না। এই কুটিল পরিকল্পনা (Day]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">[গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের জন্য ট্রাম্পের &#8220;Day After&#8221; পরিকল্পনার পর্যালোচনা ও এই কুটিল পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে এই প্রবন্ধে]</p>
<p>হামাস কিংবা তথাকথিত কর্তৃপক্ষ – কেউই অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাখে না। এই কুটিল পরিকল্পনা (Day After) মূলত মধুতে বিষ মেশানোর মতো।</p>
<p><strong>প্রথমত, মধু হচ্ছেঃ</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>&#8211;</strong> যুদ্ধ বন্ধ করা।<br class="html-br"><strong>&#8211;</strong> ত্রাণ বিতরণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহের গাজায় প্রবেশের অনুমতি।<br class="html-br"><strong>&#8211;</strong> বন্দি বিনিময় ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্তদের মুক্তি। এছাড়া যারা দীর্ঘ সময় যাবৎ বন্দি আছে এবং যারা “আকসা ফ্লাড” (Aqsa Flood) এর পরবর্তী সময়ে বন্দি হয়েছে তাদেরও মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা।<br class="html-br"><strong>&#8211;</strong> গাজাকে পুনঃনির্মাণ ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি; যদিও এই শর্তটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কেননা এই কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটি আশঙ্কণীয়।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনার অন্য সব শর্তই মূলত মারাত্মক বিষ,</strong> যার লক্ষ্য হচ্ছে যায়নবাদীরা এতদিন যা পারেনি তা রাজনৈতিক চালের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করাঃ</p>
<ul>
<li>প্রতিরোধ আন্দোলনের সমাপ্তি ও সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ।</li>
<li>ইসরায়েলি সেনা পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাহার না করেই বন্দিদের মুক্তি।</li>
<li>গাজার নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ।</li>
<li>আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চাপিয়ে দেওয়া।</li>
<li>গাজাকে ‘ফিলিস্তিন ইস্যু’ থেকে আলাদা করে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করা।</li>
<li>গাজা ইস্যুকে ইসরায়েলের সমরিক দখল, গণহত্যা অভিযান, জাতিগত নিধন, যুদ্ধাপরাধ ও চলমান আগ্রাসনের ফল হিসেবে না দেখিয়ে ইসরায়েলি সংজ্ঞায়নে “ইসরায়েলের নিরাপত্তা” ইস্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা।</li>
</ul>
<p><strong>আর তৃতীয় কথা হচ্ছে,</strong> ট্রম্পের এই কুটিল পরিকল্পনার উপযুক্ত জবাব কি হতে পারে?<br class="html-br">এর উত্তর দুই দিক থেকে দেওয়া যায়ঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>ক)</strong> হামাস কিংবা ইসলামিক জিহাদ মুভমেন্ট এর দিক থেকে – যাদের কাছে ইসরায়েলি বন্দিরা রয়েছে।<br class="html-br"><strong>খ)</strong> ভবিষ্যতে গাজার শাসনব্যাবস্থা, তথাকথিত “Day After” পরিকল্পনা, দখলদারিত্বের অবসান ও ইসরায়েলি অথবা আন্তর্জাতিক কোনো আধিপত্য ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কেমন হবে সেই দিক থেকে।<br class="html-br">এই সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী মানসিকতার দ্বারা তৈরীকৃত পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখান করা উচিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একইভাবে, এই জবাবের আবার দুইটি দিক রয়েছেঃ<br class="html-br"><strong>১)</strong> প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য, তাদের বন্দি বিনিময়ের ক্ষেত্রে নিজেদের দেওয়া শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করার অধিকার আছে। এই শর্তগুলো ছিল-</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8211; স্থায়ীভাবে যুদ্ধ, হত্যা ও খাদ্য সংকটের অবসান।<br class="html-br">&#8211; গাজা থেকে পূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার।<br class="html-br">&#8211; খাদ্য, ওষুধ, বাসস্থান, জ্বালানি সহায়তার অবাধ প্রবেশ।<br class="html-br">&#8211; ইসরায়েলি বন্দিদের বিনিময়ে সমস্ত ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি।<br class="html-br">&#8211; গাজার পুনর্গঠন।</p>
<p>ট্রাম্পের পরিকল্পনায় এই শর্তগুলোর কয়েকটি থাকলেও, বাকিগুলো অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, <strong>যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পুণরায় যুদ্ধ যে শুরু হবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিপূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার এর কথা নেই।</strong> পরিকল্পনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তির কথা বলা হয়েছে যাদের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদী সাজাপ্রাপ্ত এবং ৭ অক্টোবরের পর পশ্চিম তীর থেকে বন্দি হওয়া অনেকেই থাকবেন। <strong>এক্ষেত্রে আকসা ফ্লাডের পর গ্রেফতারকৃত সকল বন্দিরা মুক্তি পাবেন কিনা তা অনিশ্চিত।</strong> পরিকল্পনায় গাজা পুনর্গঠণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা হবে বিদেশী হস্তক্ষেপে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে মূলত নতুন রূপে <strong>‘ডিল অফ দ্যা সেঞ্চুরী’র (Deal of the Century)</strong> আলোচনা চলছে যার মাধ্যমে জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি ও মুসলিমদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে।</p>
<p>পরিপূর্ণভাবে যুদ্ধ বন্ধ আর সমস্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির নিশ্চয়তা ছাড়া প্রতিরোধ আন্দোলন কখনোই ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তি দিতে পারে না। <strong>বন্দি বিনিময় ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হবে যেন পরিপূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার ও যুদ্ধ বন্ধ নিশ্চিত হয়। কেননা এই বন্দী বিনিময়ই হচ্ছে প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।</strong></p>
<p><strong>২)</strong> ভবিষ্যতে গাজার কর্তৃত্ব, গাজার সাথে পশ্চিম তীরের সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে অস্পষ্টতা, আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিরোধ সংগ্রামের ভবিষ্যৎ সহ “Day After”- এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় – এসব কেবল হামাস বা প্রতিরোধ আন্দোলন কিংবা মিলিটারি বা রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে কেউ এককভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। <strong>সমস্ত ফিলিস্তিনবাসীকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র তারা এই সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার রাখে না, এমনকি এ অধিকার রামাল্লাহর অকার্যকর কর্তৃপক্ষেরও নেই। এই বিষয়গুলোতে প্রত্যেক ফিলিস্তিনির (ফিলিস্তিনের ভেতরের ও বাইরের) মতামত গুরুত্বপূর্ণ। </strong>ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়া, ফিলিস্তিনিদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, তাদের মুক্তি, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা সহ যেকোনো অধিকারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং বিদেশি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা গাজা, পশ্চিম তীর, জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সকল প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে হামাস এবং প্রতিরোধ আন্দোলনকে দৃঢ় থাকতে হবে। এই সমস্ত বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ফিলিস্তিনের ভেতরের বাইরের সমস্ত ফিলিস্তিনিদের; কেবলমাত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের নয়, যদিও কোনো কোনো বিষয়ে তাদের আপত্তি থাকে।</p>
<p>আরব দেশগুলো এবং অন্যন্য ইসলামি রাষ্ট্র এবং পৃথিবীর স্বাধীন মানুষদের ইসরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে। ইসরায়েলের ঔদ্ধত্য আর ফিলিস্তিনিদের অধিকার, স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়াতে আমেরিকার একতরফা সহায়তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমেরিকার ভূমিকাকে সমর্থন না করে গাজায় গণহত্যা, ও গণহত্যার নিমিত্তে চালিয়ে যাওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।</p>
<p>এরকম না হলে ফিলিস্তিনি জনগণ কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না, প্রতিরোধ আন্দোলনও পরাজয় মেনে নেবে না। আর যায়নবাদী শত্রুরা গণহত্যা চালিয়েই যাবে। <strong>তাহলে গণহত্যা কিভাবে বন্ধ হবে??</strong> শুধুমাত্র গণহত্যাকারী আর তাদের সহযোগী সমর্থকদের উপর চাপ প্রয়োগ করেই এই গণহত্যা বন্ধ করা সম্ভব; নির্যাতিতদের চাপ প্রয়োগ কিংবা তাদেরকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে নয়। আর এটি প্রত্যেকটি মানুষের একটি নৈতিক, আদর্শিক এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>উপসংহারঃ</strong><br class="html-br">এই পরিকল্পনাটি (Day After) গণহত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল যা করতে পারেনি তা রাজনৈতিকভাবে সম্পন্ন করার একটি ধূর্ত প্রচেষ্টা। হামাস, কর্তৃপক্ষ, কিংবা অন্য কোনও দলেরই ফিলিস্তিনিদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। এর সমাধান হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতার অধিকারকে সমর্থন করে আন্তার্জাতিক আইন প্রণয়ন ও আইনি বৈধতার বাস্তবায়ন করে গণহত্যা ও খাদ্য সংকটের অবসান ঘটানো। এটাই হচ্ছে এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকরী রাজনৈতিক পন্থা, যা বাস্তবায়নের উপর সবার জোর দিতে হবে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না যার মাধ্যমে দখলদারিত্ব আর আধিপত্যকে বজায় রাখা হবে, আর গণহত্যা ও জাতিগত নিধনকে বৈধতা দেওয়া হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> নাজমুস সাকিব নাঈম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/trumps-plan-is-to-maintain-the-ocupation-by-taking-away-palestinians-rights/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16534</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণে ডি-৮</title>
		<link>https://rowyakbd.com/d-8-for-the-revival-of-the-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/d-8-for-the-revival-of-the-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হিশাম আল নোমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 09 Sep 2025 16:22:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16151</guid>

					<description><![CDATA[আমরা কি কখনো এমন কোনো বিশ্বব্যবস্থার কথা শুনেছি, যাতে যুদ্ধ হানাহানি নয়; বরং ব্যালেন্স অফ পাওয়ার (BOP) প্রতিষ্ঠায় সমমর্যাদা এবং সংলাপকে মূলনীতি ধরা হয়? কখনো কি শুনেছি এমন কোন বিশ্ববীক্ষার কথা, যা ‘Absolute Anarchy’ এর বদলে রাষ্ট্রসমূহকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কথা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা কি কখনো এমন কোনো বিশ্বব্যবস্থার কথা শুনেছি, যাতে যুদ্ধ হানাহানি নয়; বরং ব্যালেন্স অফ পাওয়ার (BOP) প্রতিষ্ঠায় সমমর্যাদা এবং সংলাপকে মূলনীতি ধরা হয়? কখনো কি শুনেছি এমন কোন বিশ্ববীক্ষার কথা, যা ‘Absolute Anarchy’ এর বদলে রাষ্ট্রসমূহকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে? বৈশ্বিক ক্ষুধামান্দ্য ও দারিদ্র্যের মোকাবেলায় যে বিশ্বব্যবস্থা দান খয়রাত ও চ্যারিটির মুখাপেক্ষী নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলে। যেখানে একজন মানুষও গরীব থাকবে না; অভুক্ত থাকা তো বহু দূর! শুনেছি কি এমন আন্তর্জাতিক বন্ধনের উপাখ্যান, &#8220;Violation of Sovereignty&#8221; নয় বরং পারস্পরিক সমঝোতা ও সৌহার্দ্যরে ভিত্তিতে সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই শান্তির প্রতিশ্রুতি দিতে সক্ষম?<br />
ভাবতে অকল্পনীয় লাগলেও গত শতাব্দীর একেবারে শেষ সময়ে এমনই এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনা ও তার কার্যক্রম শুরু হয় <strong>ডি-৮</strong> তথা <strong>Cooperation of Developing Countries</strong> এর। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সামগ্রিক একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনা হওয়ায় ডি-৮ এই পাশ্চাত্য জায়নবাদ নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সর্বদা ব্যাক স্টেজেই থেকে যায়। কোথাও একে নিয়ে বিশদ কোন আলাপ আলোচনার দেখা পাওয়া যায় না। না আছে মানসম্মত কোন আর্টিকেল বা ডকুমেন্টারি। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে তাই মোটামুটি বিশদভাবে ডি-৮ এর পরিচয়, কার্যক্ষমতা এবং অতীত ও বর্তমানের মূল্যায়নের একটি বিবৃতিমূলক বয়ান হাজির করার প্রয়াস চালানো হলো।</p>
<h4>&nbsp;</h4>
<h5>প্রেক্ষাপট</h5>
<p>বিংশ শতকের শুরুতে ইউরোপের শতাব্দীকালের উত্তেজনা বিষ্ফোরিত হয়ে সমগ্র দুনিয়াব্যাপী দুই দুইটি মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়ে যায়। গোটা মানবতা এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। কোটি কোটি আদম সন্তান Mechanical Killing এর শিকার হয় প্রথবারের মতো। মানতার ইতিহাসে জঘন্যতম এ অধ্যায়সমূহ বিশাল বিশাল কিছু ঘটনা বা পটপরিবর্তনের জন্ম দেয়, যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি, জার সাম্রাজ্যের পতন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংকোচন এবং অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটন করা। এদের পরিবর্তে ব্রিটিশ বাদে অন্যান্য দেশে ফ্যাসিস্ট সরকারকে প্রতিস্থাপিত করা। অতঃপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে একনায়ক হিটলার, স্ট্যালিন, মুসোলিনি, ফ্রাঙ্কোকে সরিয়ে দেয়া। বিশ্বে শান্তি স্থাপনের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়াল্টা কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হওয়া। যার উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে শান্তি, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র স্থাপন করা।</p>
<p>কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মেকি এই স্বাধীনতাকে একটি বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ করে দেয়া হয়, মানবাধিকার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি দেশ, সমাজ বা গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত করা হয়, যা তাদের বাইরে কারো জন্য প্রযোজ্য ছিল না। উপরন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ায় স্ট্যালিন ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকা ও তার মিত্রদের স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে। শুরু হয় Nuclear arms race এর মত ভয়াবহতর মানব বিধ্বংসী অস্ত্র মহড়া। এভাবেই জায়নবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে। এরপরেই জায়নবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়া নতুন বিশ্বব্যবস্থা দাঁড় করায়, যে সভ্যতা রক্ত ও সমাধির উপর প্রতিষ্ঠিত। নতুন এই সিস্টেমের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে ঘৃণা ও শত্রুতা।</p>
<p>৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন এবং Warsaw Pact বানচাল হবার পর ন্যাটোকে বিলুপ্ত করার দাবি উঠলে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এর বিপক্ষে মত দেন। <strong>তখন ফকল্যান্ড যুদ্ধে লৌহমানবী খেতাব পাওয়া এ ব্রিটিশ রমণী বলেন- “No ideology can survive without a common enemy. Our next enemy is Islam.” ইসলাম তখন তাদের এমন এক নিশানায় পরিণত হয়, সমগ্র দুনিয়া পাশ্চাত্যের নেতৃত্ব ইসলামের উপর হামলে পড়তে শুরু করে। ঠিক তখনই ন্যাটোর বেইজ কালার লাল থেকে সবুজ হয়ে যায়।</strong> সুতরাং তার এ উক্তি থেকে সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব যে, Bush কর্তৃক উদ্ভাবিত এই New World Order কাদের জন্য এবং কীসের জন্য?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ডি-৮ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা</h5>
<p>এমতাবস্থায় দৃশ্যপটে হাজির হন গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুসলিম সিংহপুরুষ প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান। তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকান ১৯৬৯ সাল থেকে মিল্লি গরুশ আন্দোলন যখন শুরু করেছিলেন তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল, জায়নবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপরীতে একটি ইসলামী ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা।<br />
ইসলামী ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু বিশ্বপরিস্থিতি পরবর্তী দুই দশকে এতোটাই পরিবর্তিত হয়ে যায়, যে তখন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্যের কারণে ১৯৭৬ সালের ওআইসি সম্মেলনে প্রস্তাবিত ইসলামী ইউনিয়নের পদক্ষেপ ১৯৯৬ সালে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে সৌদি-ইরান সমস্যা, অন্যদিকে ইরাকের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশের সমস্যা ইউনিয়ন গঠনকে কঠিন করে তুলে। ক্ষমতার লোভে মত্ত হয়ে কেউ কাউকে সামান্যতম সম্মান প্রদর্শন করছিল না।</p>
<p>এরই মধ্যে ৮০ এর দশকে আমেরিকার সাথে সৌদির ডলার চুক্তি বিশ্ব অর্থ-ব্যবস্থায় আমেরিকাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলে। জারি হয় অধুনা Petro-Dollar System.</p>
<p>কিন্তু প্রফেসর এরবাকান ইসলামী ঐক্যের ব্যপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন। ইসলামী ইউনিয়নের পরিবর্তে পরবর্তী ৫০ বছরের কথা মাথায় রেখে বিশ্বব্যাপী একটি অর্থনৈতিক ছক তৈরি করেন। একটি ইসলামী বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্নকে সামনে রেখে তার স্বপ্নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন <strong>ডেভেলপিং-৮</strong> অর্থাৎ ডি-৮। <strong>সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার মূলমন্ত্র যেখানে ‘শক্তিই সকল কিছু&#8217; সেখানে তার প্রতিষ্ঠিত ডি-৮ এর মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করেন ‘সবার উপরে হক’।</strong></p>
<p>তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় D-8 Organization for Economic Cooperation, সাধারণভাবে যাকে উন্নয়নশীল-৮ (D-8) বলা হয়। <em>১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের শিরান প্রাসাদে অনুষ্ঠিত “উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা” শীর্ষক সেমিনারে তিনি বৃহৎ মুসলিম উন্নয়নশীল দেশ সমূহের মাঝে সহযোগিতার এক বলিষ্ঠ চিন্তা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করেন। তখন থেকে ধারাবাহিক কিছু প্রস্ততিমূলক অধিবেশন শেষে ১৯৯৭ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত “দেশ ও সরকার প্রধান সম্মেলন” এর সমাপনী অধিবেশনে ইস্তাম্বুল ডেক্লারেশনের মাধ্যমে ডি-৮ দাপ্তরিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>D-8 এর মূলনীতিসমূহ</h5>
<p>D-8 এর লোগোতে ছয়টি তারা সংগঠনটির ৬টি মূলনীতিকে ইঙ্গিত করে। সেগুলো হলো-</p>
<blockquote><p>১. যুদ্ধ নয়, শান্তি।<br />
২. দ্বন্দ্ব নয়, সংলাপ।<br />
৩. শোষণ নয়, সহযোগিতা।<br />
৪. দ্বৈতনীতি নয়, আদালত।<br />
৫. অহমিকা নয়, সমতা।<br />
৬. বলপ্রয়োগ বা কর্তৃত্ববাদিতার পরিবর্তে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র (মত প্রকাশের স্বাধীনতা)।</p></blockquote>
<p>যেহেতু প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান ডি-৮ এর প্রস্তাবক, তার প্রস্তাবনা অনুসারেই ন্যায়ভিত্তিক এক দুনিয়া প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রয়াস, ডি-৮ এর এধরণের সামগ্রিক মূলনীতি গৃহীত হয়। <strong>তার অনবদ্য আত্মজীবনী ‘দাওয়াম’-এ তিনি নতুন দুনিয়ার প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, যার মূল মেরুদণ্ড এই ছ’টি মূলনীতিই।</strong> আমরা সেখান থেকে যে সারসংক্ষেপ পাই, তা হলো—</p>
<p><strong>যুদ্ধ নয়, শান্তি</strong>—এই মূলনীতির গূঢ়ার্থ হলো বস্তুবাদ নয়; বরং আধ্যাত্মিকতা। কারণ বস্তুবাদী মনস্তত্ত্বের একটি বৃহৎ অ্যাপ্রোচ হলো ডারউইনিজম। যেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শক্তিশালী জাতিগুলো তুলনামূলক কম শক্তিশালী জাতিগুলোকে শোষণ, অত্যাচার অনাচার এমনকি যুদ্ধের মাধ্যমে হলেও নিঃশেষ করে দিতে চায়। একে বর্তমান পরিভাষায় বলা হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ. সুতরাং একে মোকাবেলা করতে হলে আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে মানুষের মাঝে পারস্পরি সৌহার্দ্য, ভালোবাসা, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও শৃঙ্খলার চাষাবাদ করতে হবে।</p>
<p><strong>দ্বন্দ্ব নয়, সংলাপ</strong>-শান্তির ধারকবাহক ইসলামকে যেকোনো মূল্যে ধ্বংস করে দুনিয়াতে ফাসাদ ও ফেরাউনিয়াত কায়েম করতেই পাশ্চাত্যের যত আয়োজন। উপনিবেশের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো শক্তিমান মুসলিম সালাতানাতসমূহের পতন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর উসমানী খেলাফতের পতন ঘটানো এবং পরবর্তীতে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত মুসলিম দেশসমূহের নেতৃত্বে তাদের দোসর বসানো। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে কৃত্রিম সঙ্কট জারী করে শত্রুভাবাপন্ন করে তোলা। সেখানে অস্ত্র, মাদক ব্যবসা পরিচালনা। অস্থিতিশীল পরিবেশের ফায়দা নিয়ে খনিজ ও যাবতীয় সুবিধাদী লুট করা, এসবই পাশ্চাত্যের এজেন্ডা। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে মুসলিম দেশগুলোর জন্য দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের পথ নয়; বরং সংলাপের মাধ্যমে নিজেদের সকল সমস্যা সমাধান করা বাঞ্ছনীয়, অন্যথায় মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণ সুদূর পরাহত।</p>
<p><strong>শোষণ নয়, সহযোগিতা</strong>&#8211; উন্নতি এবং অগ্রগতি একটি সমন্বিত বিষয়। এককভাবে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। পাশ্চাত্যের ধনী কিছু দেশ তাদের ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে দরিদ্র দেশ গুলোকে ইচ্ছাকৃত দরিদ্র বানিয়ে রেখেছে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণে বাধ্য করার মাধ্যমে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সে ঋণের আসল তো দূরের কথা এমন কি আরোপিত সুদও তারা ঠিকমত পরিশোধ করতে পারছে না। এভাবে আয়ের সমতা নষ্ট করে— ধনীকে আরো ধনী, গরীবকে আরো গরীব বানিয়ে তারা দুনিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যেমন নিজের ঘরে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়, তেমনই শোষণের এই পরিক্রমা কখনোই বিশ্বশান্তি আনবে না। তাই সহযোগিতার রোল মডেল স্থাপন করে সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে নজির পেশ করতে হবে বিশ্ববাসীর সম্মুখে।</p>
<p><strong>দ্বৈতনীতি নয়, আদালত</strong>&#8211; ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার মূল কাঠামো আদালতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলেও পাশ্চাত্যের প্রপাগান্ডা ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সাথে জুড়ে দিয়েছে। তাদের প্রহসনমূলক দ্বিমুখিতা মুসলিম দেশগুলোর মানবিক জীবন যাত্রার শুধু অধঃপতনই ঘটিয়েছে। শুধু মুসলিম দেশগুলোই নয়; বরং অপেক্ষাকৃত দুর্বল অমুসলিম দেশগুলোতেও তারা এই দ্বৈতনীতি চালিয়ে বিভেদ এবং সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়েছে। এখান থেকে মুক্ত হতে হলে মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা শুধু মুসলিমদের জন্য নয়; বরং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য আদালতের সাথে নিশ্চিত করা জরুরী।</p>
<p><strong>অহমিকতা নয়, সমতা</strong>&#8211; বিগত শতাব্দী আমাদের দেখিয়েছে অর্থনৈতিকভাবে অগাধ শক্তিধর শুধুমাত্র ইউরোপই নয়, বরং দূর প্রাচ্যের দেশসমূহ মাত্র ১০-১৫ বছরের ব্যবধানে জেলেপল্লি থেকে ইকোনোমিক সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে। এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উৎকর্ষের জন্য সবার সমান সক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং বিশ্বশান্তির জন্য উঁচু নিচুর ব্যবধানকে ভুলে সমমর্যাদাকে ভিত্তি হিসেবে ধরতে হবে।</p>
<p><strong>বলপ্রয়োগ বা কর্তৃত্ববাদিতার পরিবর্তে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র (মত প্রকাশের স্বাধীনতা)</strong>&#8211; এই মূলনীতির মাধ্যমে প্রফেসর ড. এরবাকান প্রচলিত জায়নবাদের ক্রীড়নক জাতিসংঘ ব্যবস্থা, বিশ্বের ১৭০টি দেশকে নামমাত্র সদস্য রাষ্ট্র এবং নামমাত্র ক্ষমতা দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ৫টি রাষ্ট্রকে ভেটো ক্ষমতা প্রদান করে জায়নবাদের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এভাবে তারা যখন যেভাবে ইচ্ছা মানবতাকে লুণ্ঠন করে যাচ্ছে। এ ব্যবস্থার বিপরীতে ‘হক’কে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে একটি নতুন জাতিসংঘের প্রস্তাবনা পেশ করেন। তাঁর ভাষায়—</p>
<p>“এই জাতিসংঘের উদ্দেশ্য বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা নয়, জায়নবাদীদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ তাদের চিন্তার মূলে হলো ফেরাউনী চিন্তা। তাহলে এখন কি করতে হবে?</p>
<p>কি করতে হবে এর উত্তরে আমি বলি, <strong>আমাদেরকে নতুন একটি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যে জাতিসংঘ হবে হকের উপর প্রতিষ্ঠিত, কোন জাতি বা গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়, সত্যিকারের বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাই হবে এই জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য। এই জাতিসংঘে কারোর কোন ভেটো দেয়ার পাওয়ার থাকবে না।</strong></p>
<p>এরপর এই জাতিসংঘ এমন কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করবে যা সকল রাষ্ট্র মানতে বাধ্য হবে। কোন রাষ্ট্র তার জনগণের উপর জুলুম করতে পারবে না, সকল মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার দিতে বাধ্য থাকবে। মানুষের যেমন রাষ্ট্রের উপর অধিকার রয়েছে রাষ্ট্রেরও তেমন তার জনসাধারণের উপর অধিকার রয়েছে। আর সেটা হলো রাষ্ট্র জনগণের সাথে বৈষম্য মূলক আচরণ করতে পারবে না ও কোন ক্রমেই জুলুম করতে পারবে না, আর জনগণও অন্যের অধিকার হরণ করবে না এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কোন কাজ করবে না।&#8221;</p>
<p>এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ন্যায়ভিত্তিক একটি দুনিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মূলনীতি সমূহ প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং বিশ্বমানবতার সামনে আজকের এই জুলুমের দুনিয়ার আসল চেহারা তুলে ধরে তাদেরকে জাগ্রত করা প্রয়োজন।<br />
‘দাওয়াম’ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, নতুন দুনিয়ার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ-</p>
<ul>
<li><strong>নতুন জাতিসংঘ;</strong> সমানাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, বর্তমান ব্যবস্থার মত শক্তিমানের স্বার্থ সংরক্ষণকারী প্রহসনের নাট্যশালা নয়।</li>
<li>ন<strong>তুন রাজনৈতিক দীক্ষা;</strong> যা মানুষকে অসহিষ্ণু করে তুলে না, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য পাওয়ার এক্সারসাইজ করার জন্য বলে না, বরং মানুষের অধিকার প্রদান করার দীক্ষা দেয়।</li>
<li><strong>প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জন;</strong> প্রযুক্তিতে এমন সক্ষমতা অর্জন, যা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে মান বিধ্বংসী হবে না, বরং মানুষের সর্বোচ্চ উপকারে এসে মাসলাহাতের কাজ করবে।</li>
<li><strong>নতুন মুদ্রাব্যবস্থা;</strong> ডলারভিত্তিক শোষণযন্ত্র থেকে মানবতাকে মুক্তি দিতে নতুন মুদ্রাব্যবস্থা তথা ইসলামী দিনার।</li>
<li><strong>নতুন বিশ্বব্যাংক;</strong> বর্তমানে প্রচলিত কোন পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যাংক নয়, বরং বৈশ্বিকভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় এক ব্যাংক।</li>
<li><strong>নতুন IMF;</strong> যা মানুষকে শোষণ নয়, বরং দুনিয়াতে একজন ও যাতে দরিদ্র না থাকে, সে লক্ষ্যে কাজ করবে।</li>
<li><strong>নতুন সাংস্কৃতিক সাহায্য সংস্থা;</strong> বর্তমান হলিউডের মতো নগ্নতা ও অশ্লীলতার প্রচারক নয়, বরং সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর সংস্কৃতির বিকাশ ও পরিচর্যার জন্য জাতি সমূহের মাঝে সংস্কৃতি বিনিময় করবে।</li>
<li><strong>নতুন প্রচার ও প্রকাশনা সংস্থা;</strong> যেখান থেকে মানুষকে ম্যানিপুলেট করা হবে না, প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে জলঘোলা করা হবে না বরং সত্যটা জানানো হবে অকুণ্ঠচিত্তে।</li>
<li><strong>নারীদের প্রতি সব ধরণের জুলুম ও অত্যাচারের অবসান ঘটানো হবে।</strong> তাদের প্রকৃত অধিকার সংরক্ষণ করে মর্যাদা ও সম্মানের সর্বোচ্চ স্তরে আসীন করা হবে।</li>
</ul>
<p>নতুন এই দুনিয়া প্রতিষ্ঠার তিনটি ধাপ রয়েছে-</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১.</strong> ডি-৮ নিউক্লিয়াস প্রতিষ্ঠা।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>২.</strong> ডি-৮ পরবর্তীতে অগ্রসর ৬০ টি দেশ নিয়ে ডি-৬০ গঠন এবং সর্বশেষ সমগ্র পৃথিবীকে এক ছাতার নিচে আনতে ডি-১৬০ প্রতিষ্ঠা। এর সাথে যুক্ত হবে ১০টি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, যাদের হাতে সুপ্রিম পাওয়ার সোপর্দ করা থাকবে। এরা সবাই একত্রিত হলে ৫০০ কোটি বঞ্চিত জনতা সাম্রাজ্যবাদী বর্ণবাদীদের শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে হক ও আদালতের উপর ভিত্তি করে একটু নতুন দুনিয়ার পত্তন ঘটাবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৩.</strong> ২য় ইয়াল্টা কনফারেন্স আয়োজন করে নতুন এক দুনিয়ার ঘোষণা দেয়া হবে, যার মৌলিক শর্ত হবে, এমন এক শান্তিপূর্ণ দুনিয়া যা শোষিত জনতার অধিকার নিশ্চিত করবে হক ও আদালতের ভিত্তিতে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ভিশন :</h5>
<p>উপরোল্লি­খিত এই রূহ ও জযবাকে ধারণ করেই প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান নতুন দুনিয়ার নিউক্লিয়াস হিসেবে ডি-৮ কে একটি বিশ্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরেন এবং বলেন, ডি-৮ এবং বর্তমান উন্নত বিশ্বের জি-৮ (বর্তমান জি-৭) সমান্তরাল সংগঠন। অচিরেই ডি-৮ এবং জি-৮ এক টেবিলে বসে চুক্তি করবে এবং ২য় ইয়াল্টা কনফারেন্সের মাধ্যমে এক নতুন দুনিয়ার প্রবর্তন করবে।</p>
<p>যেহেতু প্রফেসর ড. এরবাকান সবসময় বলতেন, <strong>“হকের উপর প্রতিষ্ঠিত (ইসলামী) সভ্যতা শক্তির (Power) উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্য সভ্যতার চেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন।”</strong> তাই তিনি ইসলামী সভ্যতা ও ইসলামী ঐক্যের রূহকে ধারণকারী সংগঠন ডি-৮ এর উদ্দেশ্য হিসেবে শুধু সদস্য রাষ্ট্রসমূহের কল্যাণই নয়, বরং সমগ্র মানবতার উন্নয়ন ঘটানোকে নির্দেশ করেন।</p>
<p>১৯৯৭ সালে ইস্তাম্বুল সম্মেলনের ইশতেহার অনুসারে ডি-৮ এর উদ্দেশ্য হলো—</p>
<ul>
<li>&nbsp;বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থানের উন্নতি ঘটানো,</li>
<li>আন্তঃবাণিজ্যিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনয়ন ও নতুন সুযোগ তৈরি করা,</li>
<li>আন্তর্জাতিক পরিসরে নীতি-নির্ধারণীর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে বুলন্দ করা, এবং</li>
<li>বসবাসের জন্য আদর্শ মানদণ্ড স্থাপন করা।</li>
</ul>
<p><em>ডি-৮ এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুসারে তার প্রতিপাদ্যসমূহ হলো—</em></p>
<p><em>ক. সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাসমূহের কার্যকরী বিন্যাস সাধনের মাধ্যমে টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে যৌথ প্রচেষ্টাসমূহকে উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।</em></p>
<p><em>খ. জনমানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।</em></p>
<p><em>গ. সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ, চেম্বার অফ কমার্স এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বেসরকারী বাণিজ্যিক খাতকে শক্তিশালী করা।</em></p>
<p><em>ঘ. উন্নয়নশীল দেশসমূহের অগ্রগতির বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে অন্যান্য দেশ, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক সংস্থাসমূহ এমনকি বেসরকারী সংস্থাসমূহের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা।</em></p>
<p><em>ঙ. বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা পালনে ডি-৮ এর সমন্বিত শক্তি ও সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে একজোট হয়ে কাজ করা।</em></p>
<p>মূলকথা হচ্ছে, ডি-৮ এর মূলনীতিসমূহের আলোকে সদস্য দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান ও আর্থ-সামাজিক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিসরে অগ্রগতি নিয়ে আসার মাঝেই এই সংগঠনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিহিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ডি-৮ এর বৈশ্বিক ভিশন (২০১২-২০৩০):</h5>
<p>১২ নভেম্বর ২০১২ সালে ইসলামাবাদে আয়োজিত ডি-৮ এর ৮ম সম্মেলনে দেড়যুগ মেয়াদী ডি-৮ বৈশ্বিক ভিশন গৃহীত হয়। সংক্ষেপে এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>সদস্য দেশগুলোর মাঝে নিবিড় সহযোগিতা ও কার্যকর সমন্বয় সাধন করা এবং পারস্পরিক লাভজনক বিষয়ে আন্তঃনির্ভরশীলতা তৈরি করা।</li>
<li>আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সাথে সঙ্গতি বজায় রাখতে অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে লিয়াজোঁ রক্ষা করা।</li>
<li>সদস্য রাষ্ট্রসমূহের নিজ নিজ জাতীয় পরিসরে ডি-৮ এর সমর্থন বৃদ্ধি করা এবং এর আওয়াজ ও ভারত্বকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলিষ্ঠ করতে সমন্বিতভাবে কাজ করা।</li>
<li>সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় পরিসরে সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষে পারস্পরিক সমন্বয় মূলক অংশীদারিত্ব বাড়ানো।</li>
<li>সুশাসন, আইনের প্রয়োগ, সাবলীল অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা।</li>
<li>সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে উন্নত জীবন যাত্রার মান নিশ্চিতকরণে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিচালনা করা।</li>
</ul>
<p>চলমান ও অনাগত বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলায় কৌশলগত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সাধন করে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি সঙ্কট, কৃত্রিম অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ লাভ করা ইত্যাদি।</p>
<p><strong>এখানে উল্লি­খিত দুই সম্মেলনের মূল কথাগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নতুন এক দুনিয়ার প্রস্তাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে বৈশ্বিক সংগঠন ডি-৮ তার নিজস্ব ধাঁচ ও পরিভাষা হারিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক আইডিয়া গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। নতুন পন্থা পদ্ধতি ও ব্যবস্থা তৈরির পর্যায় থেকে অন্যান্যদের তৈরিকৃত পন্থা ও পরিভাষাই Adopt করে নিতে দেখা যায়। এভাবে ডি-৮ প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরের মাথায়ই তার রূহ ও জযবাকে হারিয়ে ফেলতে থাকে। বিশেষত ২০১১ সালে এরবাকান হোজার ইন্তেকালের মাত্র এক বছরের মাথায় এমন রেডিক্যাল চেঞ্জ বিস্ময়কর এবং হতাশাজনকই বটে।</strong></p>
<p>ডি-৮ এর প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের জীবনীগ্রন্থ &#8220;নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবক ও মহান মুজাহিদ নাজমুদ্দিন এরবাকান&#8221; গ্রন্থে ডি-৮ ভুক্ত দেশসমূহ ও তাদের শক্তিমত্তা ও গুরুত্ব অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয় এভাবে-</p>
<blockquote><p>&#8220;D-8 গঠনের জন্য প্রথমে তিনি (প্রফেসর এরবাকান) স্ট্র্যাটেজিক পজিশনে ৮টি দেশের কথা চিন্তা করেন। সেই সাথে দেশের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বিশ্বরাজনীতিতে কত বেশি প্রভাবান্বিত করতে পারবে সেটাকে প্রাধান্য দেন। আর সামরিক শক্তি তো অপরিহার্য একটি বিষয়। D-8-কে তিনি একটি পাওয়ার হাউজে পরিণত করতে চেয়েছিলেন যেন সংগঠনভুক্ত দেশসমূহের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং একই সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিমরা এমন এক শক্তি হয়ে ওঠবে যাতে করে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে জুলুমের শিকার মুসলিমদের উপর সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তি কখনো চোখ তুলে তাকাতে সাহস না করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>যে কয়টি দেশ নিয়ে D-8 গঠিত হয়েছিল—</p>
<p>১. তুরস্ক,<br />
২. ইরান,<br />
৩. মিশর,<br />
৪. মালয়েশিয়া,<br />
৫. ইন্দোনেশিয়া,<br />
৬. নাইজেরিয়া,<br />
৭. বাংলাদেশ এবং<br />
৮. পাকিস্তান।</p>
<p><strong>দেশগুলোকে কেন নির্বাচন করা হয়েছে:</strong> ভৌগোলিক দিক দিয়ে এই ৮ দেশের অবস্থান বিবেচনা করলে D-8 এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু তা বুঝা কষ্টসাধ্য ব্যপার নয়। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক রুটগুলোর উপর একটু চোখ বুলিয়ে আসি।<br />
<strong>তুরস্ক:</strong>&nbsp;তুরস্ক দেশটি সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুরস্ক সর্বদা সবার সামনেই অবস্থান করছিল। বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে তুরস্ক। ইউরোপ এবং এশিয়ার সংযোগস্থল। চানাক্কালের এবং বসফরাস প্রণালীর মতো দুটো কৌশলগত প্রণালী এই দেশটির অধীনে। ইউরোপের গলার কাঁটা হিসেবে বিবেচিত এই একই সাথে কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত ক্রেচ প্রণালী তুরস্কের এই দুই প্রণালী ছাড়া অচল। অর্থাৎ তুরস্কের যদি চায় তাহলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩টি প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ রাশিয়াকে এ পথেই বাণিজ্য করতে হয়।</p>
<p><strong>মিশর:</strong> ইতিহাস-ঐতিহ্য, নীল নদের অববাহিকায় গঠিত শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ মিশর হচ্ছে উত্তর আফ্রিকার অন্যতম একটি দেশ। আরব বিশ্বের সাথে যথাযথ সম্পর্ক রক্ষাকারী এবং এক সময়ে পৃথিবীর ৭০% অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী সুয়েজ ক্যানেল এর অধিকারী হচ্ছে মিশর। ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের সংযোগস্থল হচ্ছে সুয়েজ ক্যানেল। হযরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মিশরের গভর্নর এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে হযরত ওমরের কাছে দুই সাগরকে সংযুক্ত করার জন্য একটি ক্যানেল নির্মাণের পরামর্শ চেয়েছিলেন। হাল্কা শুরু হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি। উসমানী আমলে সুয়েজ ক্যানেলটি নির্মাণ করা হয়। <strong>এরপর থেকে প্রায় ২৫০ বছরের অধিক সময় থেকে এই প্রণালী বিশ্বের অর্থনীতির বৃহৎ একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সুয়েজ ক্যানেল ছাড়া লোহিত সাগরের বাব-আল মান্দেব এক প্রকার অর্থহীন। ইউরোপ থেকে এশিয়ার বাণিজ্য জাহাজের রুট একমাত্র এটিই।</strong></p>
<p><strong>ইরান:</strong> মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আরেকটি শক্তিশালী দেশ। আমেরিকার হাজারো অবরোধ সত্ত্বেও নিজ দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় নির্মাণ করে পুরো বিশ্বের কাছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রের প্রতিবিম্ব হয়ে আছে বিশ্বরাজনীতিতে। মুসলিম বিশ্বের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিকভাবে ইরান গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। বিখ্যাত হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। ভৌগোলিকভাবে তুরস্কের সমান গুরুত্ব ইরানের। দেশটির উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে পারস্য উপসাগর। পশ্চিমে ইরাক, তুরস্ক, আরমেনিয়া, আজারবাইজানের সাথে সীমান্ত রয়েছে দেশটির, অপরদিকে পূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী দেশ পাকিস্তান ও খনিজ সম্পদের অধিকারী আফগানিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে সীমানা ভাগ করে নিয়েছে ইরান। একই সাথে পারস্য সাগর পাড়ি দিলেই সৌদি, কুয়েত, কাতার, ওমান। <em>অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে পুরো মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র বলা যায় ইরানকে।</em></p>
<p><strong>মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া:</strong> বর্তমান মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে যদি কয়েকটি দেশকে বিবেচনা করা হয় তাহলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সবার উপরে স্থান পাবে। এই দু’দেশ নিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে তেমন আলোচনা না হলেও দেশ দুটির গুরুত্ব বুঝতে শুধুমাত্র মালাক্কা প্রণালীকে বিবেচনা করলেই হবে। এই প্রণালীর একপাশে মালয়েশিয়া অপরপাশে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশ। মালাক্কা প্রণালী হচ্ছে এই দুই দেশের অধীনে। পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপান, চীন, ও কোরিয়া উপদ্বীপের সকল বাণিজ্য এ প্রণালী দিয়েই করতে হয়। এছাড়া ভারত মহাসাগরে প্রবেশের অন্য কোনো পথ নেই।<br />
একবার ভাবুন, উপরোক্ত প্রত্যেকটি দেশ যদি শক্তিশালী হয় এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য পথে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে তাহলে এর ফলাফল হচ্ছে পুরো দুনিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এতটাই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে উল্লি­খিত প্রণালীগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে।</p>
<p><strong>নাইজেরিয়া:</strong> আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ একমাত্র দেশ হচ্ছে নাইজেরিয়া, একই সাথে প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আফ্রিকার এই দেশটি। সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ এই দেশটি উমাইয়া আমল থেকেই মুসলিম অধ্যুষিত। ফরেন ডিপ্লোমেসি তথা বৈদেশিক ক্ষেত্রে কী কী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তার উপর সর্বপ্রথম বই রচনা করে নাইজেরিয়া। আফ্রিকায় মুসলিমদের শক্ত অবস্থানের পেছনে নাইজেরিয়ার অবদান সেই ১৩ শতাব্দী থেকেই। ঐতিহাসিকভাবেই আফ্রিকার সব দেশের সাথেই নাইজেরিয়ার সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তাই আফ্রিকার দেশ হিসেবে সংগঠনে নাইজেরিয়ার স্থান সবার প্রথমে হওয়াটা অতি স্বাভাবিক।</p>
<p><strong>বাংলাদেশ:</strong> বাংলাদেশের উর্বর কৃষি জমিতে সাতশত বছরের উন্নত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কার না জানা? দেশটিতে নিকৃষ্টতম বৃটিশ শোষণের কয়েক বছর পূর্বের জিডিপি পরিসংখ্যানও যদি বিবেচনা করি- ২৩% নিয়ন্ত্রণ শুধু এ বাংলা অঞ্চলের-ই ছিল। যেখানে বর্তমান দুনিয়ার কথিত সুপার পাওয়ার সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার ১৮%।</p>
<p><strong>পাকিস্তান:</strong> দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের কথা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। ভারী শিল্পায়নের দারুণ সক্ষমতা, উন্নত কৃষি সম্ভাবনা, সমৃদ্ধ সামরিক শক্তি, কী নেই দেশটির!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>D-8 এর গুরুত্ব :</h5>
<p><strong>তেল:</strong> পৃথিবীর ১৫% তেল রিজার্ভ আছে এই ৮টি দেশে এবং এই ৮টি দেশ থেকে বাৎসরিক পৃথিবীর ১০% তেল উত্তোলন করা হয়। আবার এই ৮টি দেশকর্তৃক পৃথিবীর ৬.৭% তেল ব্যবহৃত হয়।</p>
<p><strong>গ্যাস:</strong> বিশ্বের ২৩.২% প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ আছে D-8 এর দেশসমূহে। সেই সাথে D-8 থেকে বছরে বিশ্বের ১৩.২% গ্যাস উত্তোলন করা হয়। আর D-8 এর দেশসমূহ প্রতিবছর বিশ্বের ১১.২% গ্যাস ব্যবহার করে থাকে।</p>
<p>এছাড়াও ব<strong>র্তমান বিশ্বের স্ট্র্যাটেজিক পদার্থ বোরন ও ক্রোমিয়াম ব্যাপক পরিমাণে মজুদ রয়েছে D-8 এর ভেতরে। বিশ্বের তুলা রপ্তানিতে D-8 এর দেশসমূহের বৃহৎ একটি ভূমিকা এখনো বিদ্যমান। স্ট্র্যাটেজিক পজিশন ছাড়াও D-8 এর অধীনে পৃথিবীর মধ্যভাগের সর্বোচ্চ এলাকা, সাথে রয়েছে ৮টি দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী।</strong></p>
<p>মুসলিম বিশ্বের কথা চিন্তা করলে, মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ৬০% জিডিপি হচ্ছে D-8 এর, একই সাথে OIC অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের ৬৫% জনশক্তি D-8 এর দেশসমূহ থেকেই। মুসলিম বিশ্বের বৈদেশিক বাণিজ্যের দিক থেকে D-8, ১০০ ভাগের মধ্যে ৫৮ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।</p>
<p><em>D-8 এর অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের সম্মিলিত জিডিপি ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থাৎ এটি বিশ্ব অর্থনীতির ৫%। অথচ নিজেদের তুলনায় তা কিছুই না। বিশ্ববাণিজ্যের ১৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অংশীদার হচ্ছে এই দেশসমূহ। যদি এখনো নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন করে এবং এসব প্রণালীতে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয় তাহলে পৃথিবীর ৭০% বাণিজ্য মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করবে। তার জন্য সব দেশকে একসাথে কাজ করতে হবে লড়তে হবে ।</em></p>
<p><strong>জনসংখ্যা:</strong> D-8 এর অন্তর্ভুক্ত ৮টি দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.১ বিলিয়ন অর্থাৎ তা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৬%। বর্তমানে ডি-৮ এর দেশসমূহের নিজেদের মধ্যে ব্যবসার পরিমাণ ১২০ বিলিয়নে উন্নীত করা না হলে মুসলিম বিশ্ব মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না।</p>
<p>জনসংখ্যা একটি শক্তি। এই জনশক্তিকে ঈমানের বলে বলীয়ান করে কাজে লাগাতে পারলে মুসলিম বিশ্বে এমন এক দুর্বার শক্তির সৃষ্টি হবে যাকে মোকাবেলা করার সামর্থ্য পৃথিবীর কোনো শক্তির থাকবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>কর্মপদ্ধতি, ধরণ, কাজের ক্ষেত্র</h5>
<h6><strong>ডি-৮ এর কাঠামো :</strong></h6>
<p>ডি-৮ এর মূল পর্যায়গুলো হচ্ছে—</p>
<p><strong>১. রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানদের সম্মেলন:</strong> সংস্থাটির সর্বোচ্চ পরিষদ, যেখানে ডি-৮ এর প্রতিপাদ্যগুলো বাস্তবায়নের স্বার্থ সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সভার বৈঠক চক্রাকারে ২ অথবা ৩ বছর অন্তর কোন সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত হয়।</p>
<p><strong>২. মন্ত্রী পরিষদ:</strong> এখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রীগণ যুক্ত থাকেন এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়। এরা বছরে অন্তত একবার অধিবেশনে বসে এবং প্রতি শীর্ষ সম্মেলনের পূর্বে একবার অবশ্যই আলোচনায় বসে।</p>
<p><strong>৩. কমিশন:</strong> এটা হচ্ছে নির্বাহী বিভাগ। যেখানে প্রতিটি সদস্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তৃক নিয়োগকৃত দূতগণ যুক্ত থাকেন। এরা মূলত মন্ত্রীপরিষদের অধীনে কাজ করেন। প্রতি কমিশনার তার নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। এরা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে স্ট্যান্ডিং কমিটি বা এড-হক গ্রুপ তৈরি করেন এবং তার তদারকি করেন। এরা বছরে অন্তত দুইবার বৈঠকে বসেন; একবার মন্ত্রীপরিষদ অধিবেশনের তাৎক্ষণিক পূর্বে।</p>
<p><strong>৪. সচিবালয়:</strong> ডি-৮ এর সচিবালয় ইস্তাম্বুলে অবস্থিত। এটা সব ধরণে কার্যক্রম এবং মিটিং এর আয়োজন ও তত্ত্বাবধান করে। এর প্রধান হন সেক্রেটারী জেনারেল যিনি মূলত ডি-৮ এর “Chief Administrative Officer”। তিনি একবারের জন্যই ৪ বছর মেয়াদের নির্বাচিত হন। তিনি ডি-৮ এর মাঝে সমন্বয় ও সমতা রক্ষা করেন এবং মূল সংস্থাগুলোর সকল অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডি-৮ এর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।</p>
<p>এছাড়াও ডি-৮ এর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যেকোন দেশের মাঝে উদ্ভূত বিরোধ ও উত্তেজনা নিরসন, অর্থনৈতিক বাজেট প্রণয়ন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সহ অন্যান্য আরো বেশ কয়েকটি বিভাগ রয়েছে।</p>
<p>ডি-৮ মূলত একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এই লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে ডি-৮, ৬টি সেক্টরে অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে।</p>
<p>১. বাণিজ্য<br />
২. শিল্প<br />
৩. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা<br />
৪. পরিবহন ও যোগাযোগ<br />
৫. পর্যটন<br />
৬. জ্বালানী</p>
<p>&nbsp;</p>
<h6>বর্তমান অবস্থা</h6>
<p>সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পরপরই পরিকল্পনা ছিল ডি-৮ এর মধ্যকার দেশসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, পরবর্তীতে একটি অভিন্ন মুদ্রা তৈরি করা। এরপর বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহ নিয়ে ডি-৬০ তৈরি করা। সকল দেশ এখানে চুক্তি অনুযায়ী কাজ করবে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হলে এবং এক মুসলিম দেশ অপর মুসলিম দেশের উপর নির্ভরশীল হলে এখানে কেউ নিজেকে আরেকজনের থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না এবং ইউরোপ ও পাশ্চাত্যকে গণনাতেই ধরবে না মুসলিম বিশ্ব।</p>
<p>D-8 প্রতিষ্ঠার পরপরই ৮টি দেশ নিজেদের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে।</p>
<p>প্রথম পদক্ষেপ ছিল, ১৯৯৭ তে তুরস্কে উৎপন্ন হেলিকপ্টার পাকিস্তানে বিক্রি করা। ৮টি দেশের মধ্যে ৬টি দেশ ভিসা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যেখান থেকে বাদ রয়ে যায় বাংলাদেশ ও মিশর।</p>
<p>পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয় ডি-৮ এর অধীনে। টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, লোহা, স্টীল, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে খুব দ্রুতই। সেই সাথে Shipping and Maritime Service-এর ক্ষেত্রে সকল দেশ চুক্তিবদ্ধ হয়।</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে সংগঠনটি সকল দেশসমূহের মধ্যকার ব্যবসার পরিমাণ সম্মিলিতভাবে মাত্র ১২০ বিলিয়ন ডলার। নিস্তেজ হয়ে পড়া এই সংগঠনটি টিকে আছে মূলত এই ১২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের কারণেই।</p>
<p>সাম্প্রতিক সময়ে ডি-৮ এর কর্মকাণ্ডের একটি চিত্রায়ণ ফুটে ওঠে মালয়েশিয়ান এক বিখ্যাত উপস্থাপকের টকশোতে দেয়া সংস্থাটির সাবেক সেক্রেটারী মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত কূটনৈতিক ও অর্থনীতিবিদ ‘দাতো কু জাফর কু শারী’ এর এক ইন্টারভিউতে।</p>
<p>উপস্থাপকের নানাবিধ প্রশ্নের জবাবে তিনি ডি-৮ কে নিয়ে যা বলেন, তার সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ—</p>
<p>ডি-৮ শুরুতে বেশ জোরেশোরে কাজ শুরু করলেও বৈশ্বিক পরিবর্তনশীল ঘটনা প্রবাহের মধ্যে সেরকম আলো ছড়াতে পারেনি। উপরন্তু সংযুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতামূলক মনোভাব বার বার ব্যহত হয়েছে নানাবিধ কারণেই। তারা সেখানে এক ধরণে ইতিবাচক মনোভাব আনয়নের প্রয়াস চালিয়েছেন।</p>
<p>বর্তমান জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকের মর্যাদায় আসীন এ সংস্থাটি নানা কারণেই এখনো গণপরিসরে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সাথে চুক্তি করে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রয়াস চলমান।</p>
<p>ডি-৮ শুরু থেকেই ইন্টেলেকচুয়ালিটির দিকে নজর দিয়ে এসেছে এবং পূর্বোল্লি­খিত পাকিস্তানে রিসার্চ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা ছাড়াও ইবনে সিনার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত ইরানের হামদানে ডি-৮ এর নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক বিষয়াবলির উপরে মাস্টার্স ও পি এইচ ডি পর্যায়ে প্রতি সদস্য রাষ্ট্র থেকে ৫ জন করে প্রতি বছর স্কলারশিপ প্রদান করা হচ্ছে।</p>
<p><strong>আপাতদৃষ্টিতে একাধিক সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে উত্তেজনা বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও ডি-৮ এর কল্যাণে আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রক্রিয়া চলমান। কারণ ডি-৮ অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা হওয়ায় রাজনৈতিক মতভেদকে এক পাশে রেখে ‘One for All : All for One’ পলিসি অনুসারে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন মিশর-তুরস্ক রাজনৈতিকভাবে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও এক তার্কিশ ডেভলপার কোম্পানি মিশরে ৫টি ইকোনমিক জোন তৈরি করে দেয়।</strong></p>
<p>পাশাপাশি বৃহৎপরিসরে সহযোগিতা ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ইতোমধ্যে ডি-৮ এর জন্য বিশেষায়িত তিনটি বিমান বন্দর রয়েছে—</p>
<p>১. সাবিহা গোজেন বিমানবন্দর, তুরস্ক,<br />
২. জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পাকিস্তান,<br />
৩. নাওয়াকিন্দি বিমানবন্দর, নাইজেরিয়া।</p>
<p>সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও এই প্রকল্পের আওতায় আসবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।</p>
<h6><strong>স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার—</strong></h6>
<p>নিজেদের মাঝে নিজস্ব মুদ্রার বিনিময়ের প্রস্তাবনা শুরু থেকে থাকলেও ডি-৮ এই প্রকল্পে এখন ও সফল হয়নি। তবে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর সাথে চুক্তি করে আঞ্চলিক মুদ্রা বিনিময় করতে D-Card এর প্রচলন খুব দ্রুতই করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যেখান থেকে ছাত্র, প্রবাসী শ্রমিক, প্রাইভেট ব্যাংকিং খাত ব্যাপক উপকৃত হতে পারবে। কেননা এখানে মুদ্রার মূল্যমান হিসেবে স্বর্ণের মজুদ সংরক্ষণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।</p>
<p>প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ডি-৮ চেম্বার অফ কমার্স প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তবে অতি সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানটি “যারা ডি-৮ এর চেয়ারম্যান থাকবে, তারাই চেম্বার অফ কমার্সের দায়িত্বে থাকবে” মূলনীতি অনুসারে খুব সহজেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। এর সদর দপ্তরের নাম হয়, D-8 Chamber of Commerce &amp; Industries, Kualalampur.</p>
<p>যার অধীনে ‘Creative Economy and Finance Center for D-8’ নামে চমৎকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যেখানে হালাল অর্থনীতি এবং ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়াও ইসলামী সভ্যতার অনন্য সব মীরাস যেমন জাকাত, ওয়াকফ, হিবা ও সাদাকাকে বর্তমান বিশ্বে গ্লোবাল ইকোনোমিতে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।</p>
<p>সদস্যদেশগুলোর বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারী, বিনিয়োগকারী, উৎপাদক সহ বিভিন্ন পর্যায়ে এসকল প্রকল্পের বিস্তৃতি রয়েছে। ডিজিটাল কারেন্সি, ব্লকচেইন ইত্যাদির সাথে ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে সংগতিপূর্ণ করতে চালু করা হয়েছে Muslim Youngster Entrepreneurship. পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে Robotic Association.</p>
<p>মসজিদসমূহকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষণ এবং দাতব্য ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠায় চালু করা হয়েছে— Waqf Foundation, Malaysia.</p>
<p>সমাজে মহত্তম এই ব্যবস্থাকে পুনরায় প্রচলন করতে শরিয়ার আলোকে জারী করা হচ্ছে নতুন ফতোয়া।</p>
<h6><strong>পর্যালোচনা-</strong></h6>
<p>অসীম সম্ভাবনা ও শক্তির আধার, মুসলিম উম্মাহর মুক্তির মনজিল ডি-৮ বর্তমানে স্থবির একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে এবং সময়ের পরিক্রমায় একটি বিশ্বজনীন বিকল্প জাতিসংঘ হওয়ার পথ থেকে সরে এসে প্রচলিত আঞ্চলিক সংস্থা সমূহের মত আচরণ শুরু করেছে। এ অবস্থার পেছনে বিশ্লে­ষকগণ দায়ী করেন সদস্য রাষ্ট্রসমূহ অন্য জোটে যুক্ত থাকায় সে সকল স্বার্থের বেড়াজালে পড়ে ডি-৮ কে আগ্রহভরে গ্রহণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। একে শক্তির উৎস নয়; বরং বোঝা হিসেবেই বয়ে বেড়াচ্ছেন। এখানে একটি উদাহরণই যথেষ্ট—</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ডি-৮ এর প্রস্তাবক হওয়া সত্ত্বেও ২০০২ সালের পর থেকে উ-৮ এর তুলনায় ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে বেশি ধাবিত হয়েছে তুরস্ক সরকার। অথচ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডি-৮ এর দিকে জোর দিলে হয়তো আজ ইউরোপ ও এশিয়াতে বিশ্বরাজনীতির নতুন চেহারা দেখতে পেত বিশ্ববাসী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বাংলাদেশ ও ডি-৮</h5>
<p>ডি-৮ এর অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র বাংলাদেশ সম্প্রতি টানা ২য় বারের মত সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সুতরাং ডি-৮ এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অতীতে বাংলাদেশ ও ডি-৮ সংক্রান্ত তেমন আশাব্যঞ্জক ইতিহাস না পাওয়া গেলেও সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১০ম ভার্চুয়াল ডি-৮ সম্মেলন, মন্ত্রীপরিষদ বৈঠক ও চেম্বার অফ কমার্সের মিটিং এ কর্তাব্যক্তিদের আলোচনা আশার সঞ্চার করেছে।</p>
<p>প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডি-৮ সম্মেলনে তার সভাপতির ভাষণে বলেন, “একা হয়ত আমরা কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার সামর্থ রাখি, কিন্তু এক সাথে পথচলা আমাদের বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।” ডি-৮ এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগামী ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তিনি তিনটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন— <strong>১. বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণকে দ্বিগুণ করা, ২. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং ৩. পৃথিবীর অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী টেক জায়ান্টে পরিণত হওয়া।</strong></p>
<p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ডি-৮ কে চলমান বৈশ্বিক মন্দা মোকাবেলায় সর্বোত্তম বিকল্প উল্লেখ করে বলেন, &#8220;ডি-৮ ভুক্ত দেশে ১.১ বিলিয়ন মানুষের একটি বিশাল মার্কেট রয়েছে। সদস্য দেশগুলো যদি এই মার্কেট ব্যবহার করে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় এবং অন্যান্য পারস্পরিক সহযোগিতা মাত্রা বৃদ্ধি করে তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানী ও খাদ্য সঙ্কট থেকে অনায়াসেই পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে।”</p>
<p>গত জুলাই মাসে ডি-৮ চেম্বার অফ কমার্সের বর্তমান বাংলাদেশি সভাপতি ফজলে ফাহিম তার তার বক্তব্যে ডি-৮ এর দেশগুলোর মাঝে আন্তঃমুদ্রা বিনিময় এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একইভাবে বাংলাদেশের সরকারী নীতি নির্ধারক মহল, যেমন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন, বাণিজ্য মন্ত্রী, বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয় উপদেষ্টা বিভিন্ন বক্তব্যে ডি-৮ ভুক্ত দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই চালু হতে যাওয়া ১০০ টি ইকোনমিক জোন এবং ২০ টি হাইটেক পার্কে বাড়তি সুযোগ ও অগ্রাধিকার এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা দেয়ার আশ্বাস প্রদান করেন এবং পারস্পরিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির অকৃত্রিম সহযোগী হতে আহ্বান জানান।</p>
<p>পারস্পরিক উন্নয়ন অগ্রগতি ও কোলাবোরেশনকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে এবারে মন্ত্রী পর্যায়ের ডি-৮ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন এক বারের জায়গায় প্রয়োজনে বছরে একাধিকবার অধিবেশন আহ্বানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।</p>
<p>সার্বিকভাবে বুঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারক মহল ডি-৮ এর শক্তিমত্তাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এবং সভাপতি রাষ্ট্র হিসেবে এই সংগঠনের মধ্য দিয়ে নিজেদের উন্নতি ও উৎকর্ষের হিসাব মিলাতে শুরু করেছে। যদি সত্যিকারার্থেই বাংলাদেশ সহ অন্যান্য রাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বের অপার সম্ভাবনাময় এ সংগঠনে পূর্ণ শক্তি বিনিয়োগ করে তবে খুব দ্রুতই এ সংগঠন প্রতিষ্ঠাকালীন প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার পথে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হবে।</p>
<p>ডি-৮, অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণের পাঠ চুকিয়ে আমরা যখন ২৫ বছর বয়সী নতুন দুনিয়ার এ প্রস্তাবনার দিকে তাকাই, তখন দেখতে পাই সংগ্রামী পূর্বপুরুষের তরফ থেকে অসামান্য এক হাতিয়ার আমাদের সামনে গড়াগড়ি খাচ্ছে, অথচ আমরা তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করছি না। সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাচ্ছি না; বরং প্রতিটি দেশই আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিসরে জুলুমতান্ত্রিক বিশ্ব শক্তিগুলোর অপরাজনীতির পাল্লায় পড়ে হিমশিম খাচ্ছি। এর কারণ কী?</p>
<p><em>এর কারণ হচ্ছে উম্মাহ চেতনাকে হারিয়ে ফেলা। যে উম্মাহ চেতনার বলে বলীয়ান হতে পারলে আজ আমরা সমগ্র মানবতার সামনে রহমতের ছায়া হয়ে উঠতে পারতাম। গোটা দুনিয়া থেকে সন্ত্রাস, বাড়াবাড়ি, যুদ্ধ, হানাহানি, জুলুম-সংঘাতকে প্রতিহত করে একটি বসবাসযোগ্য দুনিয়ার সু-সংবাদ দিতে পারতাম। ঠিক যে মুহূর্তে দুনিয়া বাইপোলার থেকে ইউনিপোলার হলো, তখন ও আমরা কিছু করতে পারিনি। বর্তমানে যখন ইউনিপোলার থেকে মাল্টিপোলার হচ্ছে, মুসলিম হিসেবে আমরা ইতিহাসের এ সন্ধিক্ষণে কোন ভূমিকাই রাখতে পারলাম না। আজ যখন বিশ্বমানবতা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য সামরিক জোট থেকে উদীয়মান পরাশক্তি চীন কিংবা তাকেও অতিক্রম করে BRICS এর মতো নবপ্রতিষ্ঠিত সংস্থার দিকে নজর ফিরাচ্ছে। ঠিক সে মূহুর্তে ডি-৮ এর মতো বিশ্ব পরিবর্তনের সক্ষমতা ও ভিশন সম্পন্ন এক বিশ্বজনীন প্রতিষ্ঠান কালের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।</em></p>
<p><strong>এখান থেকে মুক্ত হতে হলে যুব পরিসরে ডি-৮ ও ইসলামী ঐক্যের চিন্তার বীজ বুননের কোন বিকল্প নেই। সমসাময়িক দুনিয়া, চলমান দুনিয়ার নিকট অতীতের ইতিহাস, ইসলামী সভ্যতার উত্তরাধিকার ও সামগ্রিক শান্তির বয়ানকে অনাগত প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ ও ঐক্য এবং বিশ্বমানবতার চূড়ান্ত মুক্তির ভাবনাকে প্রত্যেকের জ্ঞান ও চেতনার মনিকোঠায় পৌঁছে দেয়ার কোন বিকল্প নেই।</strong></p>
<blockquote><p>বসবাস যোগ্য এক নতুন দুনিয়ার প্রস্তাবক, বিশ্ব মানবতার মুক্তি আন্দোলনের রাহবার প্রফেসর ড. নাজমুদ্দির এরবাকান তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে ডি-৮ নামক স্বপ্নের যে মনজিল আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন, তাকে তিনি নিজ ভাষায় চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে— “ডি-৮ হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর তরফ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রতি দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।”</p></blockquote>
<p><strong>আজ আমরা সবাই পাশ্চাত্য জায়নবাদী সভ্যতার সাড়ে তিনশো বছরে রক্তাক্ত ইতিহাস, বিগত শতাব্দীর বারুদ মেশা ইতিহাসের গন্ধ, পারমাণবিক হুমকিতে দুনিয়াকে সদা তটস্থ করে অবশেষে বায়োলজিক্যাল ওয়ারের মাধ্যমে সমগ্র মানবতার উপরে পতনোন্মুখ মরণ কামড়, বিশ্বব্যাপী পাওয়ার ট্রানজিশন, ফেরাউনী শক্তিগুলোর মধ্যে ঘন ঘন পরিবর্তনশীল দৃশ্যপট দেখে খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারছি, আজ নতুন একটি যুগের এবং নতুন একটি বিজয়ের প্রয়োজন। যা সমগ্র মানবতা আজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। নতুন একটি শান্তিময় দুনিয়া গঠন করার জন্য আমাদের এই মুসলিম উম্মাহ পুনরায় নেতৃত্ব দিবে। সম্মানিত একটি জাতির এবং সম্মানিত একটি ইতিহাসের উত্তরাধিকারীগণ এই বিজয়ের পতাকাবাহী হিসাবে কাজ করবে।</strong></p>
<p>সুতরাং আমাদের অবশ্যই সর্বাগ্রে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে। গৌরবোজ্জ্বল উম্মাহর সোনালী ইতিহাস ও মুক্তির ভাবনাকে বুলন্দ করে উম্মাহর প্রতিটি সদস্যকে পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া অসামান্য মীরাস, ডি-৮ ও নতুন দুনিয়ার প্রস্তাবনাকে সামনে রেখে সর্বাত্মকভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। ডি-৮ কে তার প্রতিষ্ঠাকালীন রূহ ও জযবার সাথে মিলিয়ে পাঠ করতে হবে। মুক্তির স্বপ্ন জ্বেলে যাওয়া এ সংস্থাকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে নিকট ভবিষ্যতে মুক্তি ও জাগরণের বন্দর হিসেবে। মানুষকে করতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী। তবেই ডি-৮ তার মূল লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ।</p>
<p>আমাদের জাতির সর্বাঙ্গীণ উৎকর্ষ ও কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে মুক্তি ও পুনর্জাগরণে চিন্তাকে সর্বাঙ্গণে ব্যাপৃত করতে হবে। বিপুল জনশক্তি, সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সুবিধাকে একক পরাশক্তিতে পরিণত করে যুলুমবাজ পাশ্চাত্য যায়নবাদী সভ্যতার মূলোৎপাটন করে ডি-৮ আগামীর জন্য মুক্তিদ্বার হিসেবে বিবেচিত হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p><strong>আমাদের চিন্তায় জাগরূক থাক মুক্তির আহ্বান,</strong><br />
<strong>আমাদের ভাবনায় জেগে থাক পুনর্জাগরণের আওয়াজ,</strong><br />
<strong>আমাদের সমগ্র জীবন ব্যয় হয়ে যাক একটি নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।</strong><br />
<strong>কায়েম হোক ‘হক ও আদালত’কে সর্বাগ্রে স্থান দেয়া এক বিশ্বব্যবস্থার, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে স্বপ্ন আমরা জারী রেখেছি।</strong></p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -57px; top: 12369.7px;">
<div class="gtx-trans-icon">&nbsp;</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/d-8-for-the-revival-of-the-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16151</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শ্বেতাংগ দর্শনের মূল কথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-essence-of-white-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-essence-of-white-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 28 Jun 2025 09:03:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15887</guid>

					<description><![CDATA[ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন যে শ্বেতাংগদের প্রতিপত্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। শ্বেতাংগ জাতিগুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য তাদের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। কারণ এটা স্বাভাবিক নিয়মের খেলাফ। রাসেল বিশ্বাস করতেন যে বিগত চার শতকের মতো সুখের সময় শ্বেতাংগদের জন্যে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন যে শ্বেতাংগদের প্রতিপত্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। শ্বেতাংগ জাতিগুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য তাদের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। কারণ এটা স্বাভাবিক নিয়মের খেলাফ। রাসেল বিশ্বাস করতেন যে বিগত চার শতকের মতো সুখের সময় শ্বেতাংগদের জন্যে আর আসবে না। তার মতে শ্বেতাংগ জাতিগুলোর মধ্যে কেবল রাশিয়ানরাই হয়তো এশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এশিয়ার লোকেরা সাম্রাজ্যবাদ ঘৃণা করে এবং তাদের ধারণা রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য নেই। এশিয়ার লোকেরা পাশ্চাত্য জাতিগুলোর শাসনাধীন ছিলো। এরা পাশ্চাত্যবাসীদের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার শিকার ছিলো। রাশিয়ার হাতে এভাবে ব্যবহৃত হবার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। এসব কারণে রাসেল সাহেব ভাবতেন যে এশিয়ায় পাশ্চাত্য দেশগুলোর প্রাধান্যকাল শেষ হয়ে গেছে। তিনি অবশ্য মনে করতেন যে ভারত পাশ্চাত্য ঘেঁষা হয়েই থাকবে। তিনি ধারণা করেছিলেন যে আরব জাহান- মিসর ও পাকিস্তানসহ- কমিউনিস্ট শিবিরে যোগ দেবে।</p>
<p>রাসেল সাহেব এই ভবিষ্যদ্বাণী ব্যক্ত করেছিলেন ১৯৫০ খৃস্টাব্দে। চীনে কমিউনিস্ট সরকার কায়েম হওয়া এবং অপরাপর ঘটনার কারণে এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের অভিমত এই যে এটা হচ্ছে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী মানসিকতার একটা অগভীর বিশ্লেষণ। বার্ট্রেন্ড রাসেল উদার চিন্তাধারার জন্যে খ্যাত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা, এর আদর্শবাদিতা এবং সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এগুলো একজন চিন্তাবিদের বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বব্যাপক পর্যালোচনার পথে বাধা হয়ে থাকে এবং নতুন কোন দৃষ্টিকোণ নিয়ে এগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।</p>
<p><strong>শ্বেতাংগদের শাসনকাল সমাপ্ত। কারণ তাদের সভ্যতার সীমিত প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। অনুসন্ধিৎসু মানব মনকে দেবার মতো কোন বাস্তবধর্মী ধারণা, চিন্তা, নীতি ও মূল্যমান এই সভ্যতার কাছে আর বাকী নেই।</strong> প্রকৃত উন্নতি ও অগ্রগতির পথে পরিচালিত করার জন্যে মানব জাতিকে এই সভ্যতা আর কিছু দিতে সক্ষম নয়। গ্লেট ব্রিটেনে ম্যাগনাকার্টার ফলশ্রুতি-কালে ফ্রান্স বিপ্লবের পরিণতি এবং আমেরিকাতে গণতান্ত্রিক পরীক্ষার ফল হিসেবে ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদানের পর এই সভ্যতা বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এই মূল্যবোধ যদিও অর্ধবিকশিত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সমৃদ্ধ হচ্ছিলো। কিন্তু এগুলো গতিশীল মানব সমাজের জন্যে যথেষ্ট ছিলো না। ইউরোপে এসব মূল্যবোধের বাস্তবায়নের পরও দেখা গেলো এগুলো মানুষের চলার পথের পাথেয় হিসেবে যথেষ্ট নয়।</p>
<p>এই সভ্যতা তার মূল উৎস হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো যে উৎসের সাথে সংযোগ রক্ষা না করতে পারলে সমাজ ব্যবস্থা, নীতিমালা এবং মূল্যবোধ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে না। আর সেই উৎসটি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান। এই ঈমানই সামগ্রিক অস্তিত্বের ব্যাখ্যাদান করে। বিশ্লেষণ করে মানুষের পজিশন এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্য। মূল উৎস হতে বিচ্ছিন্ন এই সভ্যতাটি তাই একটা সাময়িক সভ্যতা। মানব প্রকৃতির গভীরে যা কোনদিন তার শিকড় গাড়তে পারেনি।</p>
<p>স্বর্গীয় উৎস হতে উৎসারিত না হওয়ার কারণে এই সভ্যতা এমন সব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যেগুলো মানব-অস্তিত্ব ও প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক ছিলো। মৌলিকত্ব ও পদ্ধতির দিক থেকে এই সভ্যতা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনগুলোকে অবহেলাই করেছে যেসব প্রয়োজন মানব-সৃষ্টি ও গঠনের বিশেষত্বের কারণে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান। যেসব প্রাথমিক মূল্যবোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সেগুলো করা হলো অবহেলা। এগুলো যে কেবল অবহেলাই করা হয়েছে তাই নয়, বরং এগুলো ভীষণভাবে পদদলিত করা হয়েছে।</p>
<p>এই পরিস্থিতিতেই জন্ম নিলো নেতিবাচক আচরণের প্রচণ্ডতা- একটা মানসিক ব্যাধি। এই ব্যাধির ফলে ধর্মকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে আজকের সভ্যতা। মানব জীবনের বাস্তবতার প্রতি বৃদ্ধাংগুল দেখিয়ে মানবীয় প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে এবং ন্যায়নিষ্ঠ মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে এই সভ্যতা সম্মুখে এগুতে থাকলো।</p>
<p>এথেকেই বুঝা যায় এই সভ্যতাকালে মানবতার দুর্গতির কারণ। গোড়ার দিকে এই সভ্যতা মানবতার সেবা, উন্নতি ও কল্যাণের অভিপ্রায় নিয়েই অগ্রসর হচ্ছিলো। পরে তা গতিপথ হারিয়ে ফেলে। কোন সভ্যতা যখন মানব প্রকৃতি বিরোধী হয়, তখন একটা সংঘাত শুরু হয়। এই সংঘাতের পরিণতি সেজে আসে বিপত্তি, জান-মালের ক্ষতি, হতাশা-নিরাশা, ধ্বংস ও মৃত্যু। এই সংঘাতের শেষ পর্যায়ে অবশ্যম্ভাবী রূপে এই সভ্যতাই হয় পরাজিত। মানব প্রকৃতি হয় বিজয়ী। কারণ সভ্যতার ক্রমবিকাশমান পর্যায়গুলোর চেয়ে মানব প্রকৃতি আরো বেশী উন্নত ও স্থায়ী।</p>
<p>এই মানদণ্ডে বিচার করলে সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে রাশিয়ান, ব্রিটিশ, ফরাসী, সুইডিস, আমেরিকান এবং অন্যান্য সব সাদা আদমীরা একই পর্যায়ের। রাশিয়ানরা বরং বেশী পেছনে। কেননা তাদের স্বৈরাচারী ব্যবস্থাটাই তো পুলিশী নিয়ন্ত্রণ, রক্তপাত, শুদ্ধি অভিযান এবং শ্রম শিবিরে শাস্তি-ব্যবস্থা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। অন্য সব ব্যবস্থার চেয়ে এই ব্যবস্থা মানব প্রকৃতির অধিকতর বিরোধী। অস্তিত্ব, জীবন রহস্য ও বিশ্বজগত সম্বন্ধে মার্কসবাদের অজ্ঞতার কথা না-ই বা বললাম। মার্কসবাদ মানবাত্মা, এর প্রকৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। বস্তুগত লাভ ও জৈবিক ক্ষুধা নিবৃত্তির সংগ্রামে সার্বিক মানবিক কর্মোৎসাহ নিয়োগ করতে মার্কসবাদ চেষ্টিত। মার্কসবাদ সব ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পেছনে কেবলমাত্র উৎপাদন পদ্ধতিকেই ক্রিয়াশীল মনে করে। এই মতবাদ ওসব মানবিক মূল্যবোধ বাতিল করে দেয় যেগুলো পশুর ইতিহাস এবং মানুষের ইতিহাসকে পৃথক রূপ দিয়েছে। এই মতবাদ মানুষের সবচে&#8217; বড়ো কাজটিকে অস্বীকার করে। মার্কসবাদ স্বীকার করে না যে মানব সত্তাই ইতিহাস বিবর্তনের সর্বপ্রধান ইতিবাচক শক্তি। এই মতবাদ ভবিষ্যতকে মানবিক উত্তরাধিকার বিবর্জিত রূপে অংকন করেছে। ধারণা দেয়া হয়েছে মানুষগুলো সব ফিরিশতা সেজে সামর্থ্য অনুসারে উৎপাদন করবে এবং শুধু নিজের প্রয়োজন মতো পরিমিত সম্পদ গ্রহণ করবে। এই মতবাদ এই ধারণাও ব্যক্ত করেছে যে সব ক্রিয়াকাণ্ড সরকার বা নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা ব্যতিরেকেই সম্পন্ন হবে। এর জন্য জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেবার কোন প্রয়োজন নেই। বুর্জোয়া ব্যবস্থা উৎপাটিত হলে এবং সর্বহারাদের নেতৃত্ব কায়েম হলেই মানব-প্রকৃতি ও চরিত্রে এই বিরাট বিপ্লব আপনা আপনি ঘটে যাবে।</p>
<p>মার্কসীয় ঐতিহাসিক মতবাদ মানব-প্রকৃতি এবং মানব-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোকে অবোধগম্য করে তুলেছে। যতদিন পর্যন্ত মানব-প্রকৃতি সম্বন্ধে এই নিরেট অজ্ঞতা বিরাজ করবে এবং যতদিন মার্কসবাদে ওই পৌরাণিক কাহিনী গৃহীত থাকবে, ততদিন কোন বাস্তবমুখীন জীবন ব্যবস্থা আমরা এই মতবাদ থেকে আশা করতে পারি না। আর তাই এই মতবাদ স্বৈরতান্ত্রিক উপায়েই মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে হবে।</p>
<p>মার্কসীয় মতবাদ এবং বাস্তব রূপের মাঝেও আছে আকাশ-পাতালের পার্থক্য।</p>
<p>মূলনীতিগুলো থেকে অনুসৃত নীতিগুলো ভিন্ন মার্কসবাদীরা মার্কসবাদের অতি &#8216;পৰিত্ৰ&#8217; বক্তব্যকেও বর্জন করেছে। অবশ্য তারা এই বর্জনকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার আপ্রাণ কোশেশ করেছে। এই প্রসঙ্গে তারা এই খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়েছে যে মার্কসবাদ ক্রমবিকাশধর্মী। অথচ মার্কসবাদের মতো কড়া গতিহীন ও স্বৈরাচারী মতবাদ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। প্রাকৃতিক আইনের অমোঘ দাবীর কাছে মার্কসবাদের প্রধান নীতিগুলোকে মাথানত করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনি এবং এই জাতীয় রাষ্ট্রের নাগরিক হবার সৌভাগ্য জার আমলেও রাশিয়ানদের হয়েছিলো।</p>
<p>মার্কসবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র উবে যাবার কথা ছিলো। বিগত অর্ধ-শতাব্দীতে সে প্রক্রিয়ার অন্ততঃ সূচনা তো হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু রাষ্ট্র এখনো আছে। দিনের পর দিন তা মোটা হচ্ছে। জনগণের ও তাদের সর্বস্ব রাষ্ট্র গ্রাস করে ফেলছে। মার্কসবাদ অনুসারে স্বাভাবিক পন্থায় সরকার-ব্যবস্থা বিলীন হয়ে যাবার কথা ছিলো। অথচ আজ একটা শক্তিশালী সরকার অবলম্বন করেই মার্কসবাদকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এখন তো বেঁচে আছে শুধু সরকার। ব্যক্তি, জনগণ এবং মানব- প্রকৃতির বিশেষ অধিকার বেঁচে নেই। এগুলো মার্কসবাদের স্টীম রোলারের নীচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।</p>
<p>মার্কসবাদ অবোধগম্য &#8216;বৈজ্ঞানিক&#8217; ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়। রাশিয়ায় যে পুলিসী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা জার আমলেরই পুনরাবৃত্তি। এই পুলিশী ব্যবস্থা সীমিত কালের জন্যে কোন অনুন্নত দেশে প্রবর্তন করা সম্ভব। যেসব দেশ ও জাতি স্বীয় সত্তা সম্বন্ধে সচেতন, তারা এমন ব্যবস্থা বেশী দিন বরদাশত করতে পারে না। যেসব জাতি এই ব্যবস্থার অবিচারের শিকার তারা সহজাত প্রবৃত্তির তাকিদেই মার্কসবাদ বিরোধী। যদিও তারা অতীতে জার ও অন্যান্য ডিকটেটরদের অধীনে অনেক দিন ছিলো। শক্তি প্রয়োগ না করে এবং দমননীতি অবলম্বন না করে মার্কসবাদ টিকে থাকতে পারে না। <strong>কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে জীবনাযাত্রার সব উৎস রাষ্ট্রের কুক্ষিগত করা হয় এবং প্রশাসনিক যন্ত্রের ওপরে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ চক্রটি হয় সব ক্ষমতার মালিক। বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণ মনকে মার্কসীয় ভাবধারায় গড়ে তোলা হয়। তথ্য বিভাগ ও প্রচার যন্ত্রগুলোও রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। কমিউনিস্ট ছাড়া অন্য কোন লোককে শিক্ষালয়গুলোতে শিক্ষক নিযুক্ত করা হয় না। কমিউনিজমের প্রতি আনুগত্যশীল নয় বলে যাকে মনে হয় তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেয়া হয়।</strong> এই ধরনের অনেক কিছুই সেই সমাজে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এতো কড়াকড়ি ও নির্যাতনের মুখেও মানব প্রকৃতি সে মতবাদের প্রতি ঘৃণাভাব প্রদর্শন করে এবং বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ করে। মানব প্রকৃতি দীর্ঘকালের জন্যে এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না। ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন ছাড়া এই মতবাদ বাঁচতে পারে না, এটাই তো এই মতবাদের ব্যর্থতার উজ্জ্বল প্রমাণ।</p>
<p>এই বিশ্লেষণের আলোকে আমরা বলতে পারি যে বাট্রেন্ড রাসেলের ভবিষ্যদ্বাণী এক নড়বড়ে ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। বাস্তব সত্য সীমিত বস্তুবাদী মানসিকতার গণ্ডী ডিংগিয়ে সম্মুখে প্রবাহিত হচ্ছে।</p>
<p>অবশ্য সমস্যাটা সুগভীর এবং সিরিয়াস। আল্লাহ ও তাঁর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে অবস্থিত একটা সভ্যতার সমস্যা এটি। এটা সামাজিক ব্যবস্থা, চিন্তাধারা এবং জাগতিক মতবাদের সমস্যা। স্বর্গীয় উৎস হতে বিচ্ছিন্ন, মানবজীবনের সঠিক ব্যাখ্যাদানে ব্যর্থ এবং বিশ্বলোকের সাথে মানবজীবনের সম্পর্ক নির্ণয়ে অপারগ মতবাদের সমস্যা এটি।</p>
<p>এটা ভয়ানক নেতিবাচক আচরণের সমস্যা। এই মানসিক ব্যাধিটা, রাশিয়ান, আমেরিকান, ইংরেজ, ফরাসী, সুইস, সুইডিস ইত্যাদি জাতিসমূহের এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের এটা সাধারণ ব্যাধি। এই জাতিগুলো আজ এক বিপজ্জনক স্থানে পা রেখে দন্ডায়মান।</p>
<p>এসব দেশে যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত এগুলোর সাধারণ উৎস ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। পুঁজিবাদী আমেরিকায় গীর্জার দ্বার মুক্ত রাখা, কমিউনিস্ট রাশিয়ায় গীর্জা বন্ধ করে দেয়া অথবা সুইডেনের মতো সমাজবাদী দেশে নাস্তি কতাবাদের অবাধ প্রচার ব্যবস্থা করে গীর্জার প্রতি উদাসীনতা দেখানোর মধ্যে বড়ো রকমের কোন পার্থক্য নেই। স্বর্গীয় মতবাদের অণুপ্রেরণায় এগুলোর কোনটাই গড়ে উঠেনি। কাজেই এগুলোর বাহ্যিক পার্থক্য ও সমাজ ব্যবস্থার নানা ঢং আমাদের কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ নয়। কারণ ধর্মীয় মতবাদই তো সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকে, অন্য কোন মতবাদ নয়।</p>
<p>এই মৌলিক উৎস থেকেই সমাজ-ব্যবস্থা ও চিন্তার সঠিক মানদণ্ড পাওয়া সম্ভব। কারণ এটা মানব-প্রকৃতির গঠন-বৈশিষ্ট ও তার প্রকৃত চাহিদাসমূহ পূরণ করতে সক্ষম। এই হলো সমস্যার গভীর ও ব্যাপক বাস্তবতা। এই বাস্তবতা বার্ট্রেন্ড রাসেলের বর্ণিত বাস্তবতা থেকে ভিন্ন। রাসেল ছিলেন প্রচলিত বস্তুবাদী সভ্যতার হাতে বন্দী। পাশ্চাত্যের সব দার্শনিকই তাঁদের পরিবেশ ও নেতিবাচক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত। পাঁচটি শতাব্দীর প্রভাব তাদের চিন্তা ও দর্শনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।</p>
<p>এই দুর্বলতা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কাঠামোকে নড়বড়ে করে ফেলেছে। এর ফলে আত্মা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নিপতিত। মানবতাবাদী মূল্যবোধ লাঞ্ছিত। জীবনে বস্তুগত সমৃদ্ধি অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও কতগুলো অর্থহীন মূল্যবোধ প্রকৃত ও কল্যাণকর মূল্যবোধগুলোকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর ফলে মানবজীবন পশ্চাদমুখীনা অথবা স্থবিরতার শিকারে পরিণত হয়েছে এবং তার ক্রমোন্নতি বাধার সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বস্তুগত জীবনে বিপুল সমৃদ্ধি অর্জন করেও মানব জীবন তার স্বাভাবিক বর্ধন ও ক্রমবিকাশ-বঞ্চিত। বর্তমান সভ্যতা মানব- প্রকৃতিকে উপেক্ষা করছে। একে এড়িয়ে চলছে। এ জন্যে এই মারাত্মক পরিণতি আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p><strong>বস্তুবাদী সংস্কৃতির বাহ্যিক চাকচিক্য যাতে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে না দিতে পারে সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত। এই চাকচিক্যের প্রভাবে বিহ্বল হয়ে আমরা যেন মানব জীবনের নিদারুণ যন্ত্রণা উপেক্ষা না করি। মিসাইল এবং কৃত্রিম উপগ্রহের সমারোহের আড়ালে উঁকি মেরে তাকালে আমরা দেখতে পাবো মানব জাতি কত দ্রুত ধ্বংসের দিকে ছুটে চলছে।</strong></p>
<p>মানুষ আল্লাহর অতি প্রিয় সৃষ্টি। আশরাফুল মাখলুকাত। সে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। পৃথিবীর সবকিছু তারই জন্যে সৃষ্ট। মনুষ্যত্বের মাপকাঠি দিয়ে মানুষের অগ্রগতি বা পশ্চাৎগতি পরিমাপ করতে হয়। তার আত্মিক সুখ মানেই হচ্ছে তার প্রকৃতির সাথে সভ্যতার উপাদানগুলোর সংগতি।</p>
<p>কাজেই আমরা যদি মানবতা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোকে নিম্নগামী, দেখি, মানুষকে প্রেরণা, বৃদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে অধোগামী দেখি, মানুষের মূল দায়িত্ব পালন যদি নিশ্চল দেখি, মানুষকে যদি যন্ত্রণা, উদ্বেগ ও সংশয়বাদে হাবুডুবু খেতে দেখি তাকে যদি মনস্তাত্বিক বিপর্যয়, উন্মাদনা ও অপরাধ-প্রবণতার শিকার দেখি, তাকে যদি উদ্দেশ্যহীন জীবন-যাপন করতে দেখি, মদ-আফিম খেয়ে একঘেয়েমী তাড়াবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত দেখি এবং তাকে যদি স্বীয় সন্তানদের হত্যা অথবা বিক্রি করে রিফ্রিজারেটার অথবা ওয়াশিং ম্যাসিন ক্রয় করতে দেখি তখন আমরা কোন্ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি? মানবতার এই করুণ অবস্থা দেখে আমাদেরকে অবশ্যই বলতে হয় যে এই বিলাস-প্রিয় সভ্যতা মানুষের আত্মিক প্রয়োজন উপক্ষো করে বস্তুগত ও যান্ত্রিক সমৃদ্ধি অর্জন করে মানবতার অবক্ষয় ঠেকাতে পারেনি। মানবতাকে প্রকৃত সুখ দিতে পারেনি। বৈজ্ঞানিক ও বস্তুগত অগ্রগতি এই সভ্যতার ব্যর্থতা ঢাকতে পারেনি। এই সভ্যতা তার সম্মুখে দেখতে পাচ্ছে এক মহাবিপর্যয়। এই সত্যটি অপরিবর্তনীয় থাকছে যে</p>
<p>মানবগোষ্ঠী আরেকটি জীবন-ব্যবস্থার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করছে, যে ব্যবস্থায় ভুল-ভ্রান্তি থাকবে না, যা মানুষের জীবনকে কলুষিত করবে না এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতি, পরিণতি এবং জ্ঞানকেও পণ্ড করে দেবে না। মানুষের জন্যে আজ এমন এক ব্যবস্থা প্রয়োজন যা মানুষকে তার অস্তিত্বের সঠিক উপলব্ধি দান করবে এবং মানুষের উপযোগী ও তার প্রকৃতির সাথে সমিল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তার চিন্তা, বিজ্ঞান ও পরীক্ষণ-পরিণতির সদ্ব্যবহার করবে।</p>
<p>শ্বেতাঙ্গদের দিন ফুরিয়েছে। তারা আর সভ্যতার অঙ্গনে বিশেষ কোন ভূমিকা পালনের অবস্থায় নেই। রাশিয়ান, আমেরিকান, ব্রিটিশ, ফরাসী, সুইস, সুইডিস- সব শ্বেতাঙ্গের জন্যে একই কথা। পাশ্চাত্য মতবাদসমূহ এবং ইউরোপীয় মানসিক ব্যাধি স্কিজোফ্রেনিয়ার পরিণতিরূপেই এই ভূমিকা সমাপ্ত হয়েছে।</p>
<p>যেসব মতবাদ, ব্যবস্থা, সংগঠন ও পরিকল্পনার ওপর মানুষের জীবন গড়ে ওঠে সেগুলোকে অবশ্যই যুক্তিনির্ভর হতে হবে। এগুলোতে অবশ্যই মানুষের সঠিক মর্যাদা ও জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ণীত থাকতে হবে। মতবাদের উপস্থাপিত ব্যাখ্যা আর বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক ধারার মধ্যে থাকতে হবে মিল। নির্ভুল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মানব জীবনের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলোর অন্যতম। একে শ্বেতাঙ্গগণ উপেক্ষা করেছে। বরং এর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছে। এদিক থেকে পশ্চিম অথবা পূর্বের মানব রচিত সব ব্যবস্থাই একই ধরনের।</p>
<p>কিন্তু মানুষ অতীতে যা ছিলো আজো তাই আছে। তার চিন্তার উন্মেষ, হৃদয়ের প্রশান্তি, বিশ্বজগত ও জীবনের ব্যাখ্যা এবং স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে সে সবসময় একটা প্রত্যয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। সে এমন এক প্রত্যয় বা বিশ্বাস অনুসরণ করতে চায় যা তার স্বীয় সত্তা, তার কাল ও তার জেনারেশন হতে বৃহত্তর এবং তার বাস্তবতা হতে মহত্তর লক্ষ্যের স্বীকৃতি দেয়। সে চায় যে তার প্রত্যয়বাদ তাকে এমন এক সত্তার সাথে সম্পর্কিত করুক যিনি তাকে পদনির্দেশ ও নিরাপত্তা দান করতে সক্ষম। সে ওই সত্তাকে ভয় করতে চায়, ভালবাসতে চায়। সেই সত্তা থেকে সে তুষ্টি কামনা করবে এবং তাঁর কাছে সব উত্তম কাজ করার সাহায্য লাভের প্রার্থনা জানাবে। তাঁর কাছে পাপ নিয়ে উপস্থিত হতে সে লজ্জাবোধ করবে। এমন এক সত্তার প্রতি বিশ্বাস মানুষের অতীব প্রয়োজন। এথেকেই মানুষ অর্জন করে চিন্তার বিশেষ ধারা; আচরণের নীতিমালা এবং উপাসনার নিয়ম-কানুন। এটা অর্জিত হলে তার সামগ্রিক জীবন সংগতিপূর্ণ হয়। জীবন হতে দূর হয় সব বৈসাদৃশ্য।</p>
<p>দৈহিক ক্ষুধা, বস্তুগত সমৃদ্ধির নেশা ও ইন্দ্রিয় সুখের মাঝে একজন মানুষ কিছুকাল ডুবে থাকতে পারে। কিন্তু মানব সত্তা এই বস্তুগত প্রয়োজন ও প্রয়োজন পূরণের মাঝে নিঃশেষ হয়ে যায় না। বস্তুগত প্রয়োজন মিটে যাবার পরও আরো কিছু প্রয়োজন বাকী থেকে যায়। বরং বস্তুগত প্রয়োজন মিটে যাবার পরে পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সম্পদ দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয় এমন একটা ক্ষুধা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই ক্ষুধা ভিন্ন রকমের। এটা হচ্ছে মানুষের চেয়েও বৃহত্তর এক শক্তি, ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য বিশ্ব হতে বৃহত্তর এক বিশ্ব এবং পার্থিব জগত হতে ভিন্নতর এক জগতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষুধা। মানুষের মন চায় বাস্তব জীবনের আইন এবং তার বিবেকের আইনের মাঝে একটা সম্প্রীতি। তার মন কামনা করে মানুষের ব্যক্তিগত বাস্তবতা এবং বিশ্বলোকের বাস্তবতার মধ্যকার একটা মিল। মনের গভীরে প্রতিটি মানুষ এক আল্লাহর অনুসন্ধান করে ফিরে যিনি একাধারে তাকে নৈতিক এবং সামাজিক আইন নির্দেশ করবেন।</p>
<p>মানব সত্তার গভীরে লুক্কায়িত বিভিন্ন রকমের ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটাবার ব্যবস্থা না। দিয়ে কোন জীবনব্যবস্থাই মানুষের প্রকৃত ও সঠিক সুখ নিশ্চিত করতে গারে না। শ্বেতাংগদের সভ্যতায় এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টটির অভাব রয়েছে। আর প্রধানতঃ এই কারণে মানব সভ্যতায় শ্বেতাংগদের বিশেষ ভূমিকা পালনের দিন শেষ হয়ে গেছে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>এ. কে. এম. নাজির আহমদ<strong>।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-essence-of-white-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15887</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্বায়নের যুগে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠায় মুসলিম স্কলারদের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-scholars-in-establishing-maslahah-in-the-era-of-globalization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-scholars-in-establishing-maslahah-in-the-era-of-globalization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 20 Jun 2025 14:37:24 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15871</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে। দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক আমানাতদার সৎ বান্দার উপর, যাকে বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবে এবং হেদায়েত অনুসন্ধানীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরে থাকা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।</p>
<p>সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে। দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক আমানাতদার সৎ বান্দার উপর, যাকে বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবে এবং হেদায়েত অনুসন্ধানীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরে থাকা সত্যিকারের ক্বলব, আকল ও রূহের দর্শন পেয়েছে। যাকে প্রেরণ করা হয়েছে জুলুমপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আদালত ও হেদায়েতের পথে নিয়ে আসার জন্য।</p>
<p>সম্মানিত সুধী, বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম এবং কর্তব্যপরায়ণ ও ন্যয়ানুরাগ ব্যক্তিবর্গ, শুরুতেই সবাইকে ইসলামের সম্ভাষণ জানাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।</p>
<p>ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মুসলিম স্কলার কর্তৃক ইস্তাম্বুলে আয়োজিত এই ৫ম সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পেরে সত্যিই আমি আনন্দিত বোধ করছি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং মিথ্যাচার সত্ত্বেও ইস্তাম্বুলে আপনাদের এই আগমন সত্যি শহরটির জন্য সুফল বয়ে আনবে। এছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মুসলিম উম্মাহর জন্য আশীর্বাদ হয়ে থাকবে। তবে, নিজেদের ভেতরের একতা ব্যতীত প্রখ্যাত স্কলার এবং তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন চিন্তাশীলগণও মুসলিম উম্মাহর কোনো ভবিষ্যত বিনির্মাণ করতে পারবে না। আমি খুব আনন্দিত যে, আপনাদের মতো ধীসম্পন্ন স্কলার এবং চিন্তাশীলদের একত্রিত হবার মতো একটা পরিবেশ ইস্তাম্বুলে তৈরি হয়েছে।</p>
<p>সুপ্রিয় ভাই এবং বোনেরা,<br />
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বৈশ্বিক শান্তি বিনির্মাণ এবং বিশ্বকে পুনর্গঠন করার জন্য ইসলামকে সংবিধান হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এছাড়াও আপনারা জানেন যে, মানুষের সাথে তার নিজ সত্তা, অন্যান্য মানুষ এবং মহাবিশ্বের মাঝে সম্পর্ক তৈরি করার জন্যও ইসলাম এসেছে।  ইসলামের দৃষ্টিতে এই সমগ্র বিশ্বজাহান মহান আল্লাহর সৃষ্টি; এবং আমরাও, তবে তার বান্দা হিসেবে। অতএব, এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বিশ্বজাহান এবং আমরা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।</p>
<p>পক্ষান্তরে, তথাকথিত আধুনিক দার্শনিকরা এই বন্ধনকে বস্তুবাদী সম্পর্কে পরিণত করেছে। অথচ, ইসলাম বলেছে, মানুষরা হলো বিশ্বজাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অর্থাৎ আশরাফুল মাখলুকাত। আর আমাদের মানুষদেরকে এই লক্ষ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে যে, আমরা আরব-অনারব ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র বিশ্বে আদালত প্রতিষ্ঠা করবো। আমাদের সকলকে সমতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তাকওয়া ব্যতিত আর কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের মাঝে কোনোরূপ ভেদাভেদ থাকবে না। আর আমরাই হচ্ছে সকল জালিম এবং আগ্রাসন পরিচালনাকারীদের প্রধান শত্রু। কুরআনের ভাষ্যে, “একমাত্র জালেম ছাড়া আর কেউ শত্রু হতে পারে না।”</p>
<p>সম্মানিত সুধীমণ্ডলী,<br />
সুলহ, ইসলাহ, মাসলাহাত, ফাসাদ, ইফসাদ ও মাফসাদাত ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব এবং ইসলামী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিভাষা। কারণ, ফিকহে ইসলামী বা ইসলামী সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম একটি মূলনীতি হলো, আদালত প্রতিষ্ঠা করা এবং জুলুম প্রতিহত করা। বিষয়টির অন্যতম দলিল হলো একটি সার্বজনীন মূলনীতি,<br />
<strong>“দুনিয়াতে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা হলেই আল্লাহর ওয়াদা পূরণ হয়ে যায়।”</strong></p>
<p>কিন্তু, বর্তমান বিশ্বে মাসলাহাতকে পুঁজি করে অসংখ্য বিধ্বংসী সব কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। বিষয়টা যেন এই আয়াতটিরই প্রতিচ্ছবি,<br />
<strong>“যখন তাদের বলা হয়, তোমরা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না। তখন তারা বলে, আমরা মাসলাহাত প্রতিষ্ঠাকারী।”</strong><br />
আর বর্তমান বিশ্বে যা ঘটছে, এটা জুলুম ও নৃশংসতা ছাড়া আর কিছুই না। আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>“যখন সে কর্তৃত্ব লাভ করে, পৃথিবীতে তার সমস্ত প্রচেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত ও মানব বংশ ধ্বংস করার কাজে। অথচ আল্লাহ‌ (যাকে সে সাক্ষী মেনেছিল) বিপর্যয় মোটেই পছন্দ করেন না।”</p></blockquote>
<p>আর তাই আমাদেরকে এখন পৃথিবী থেকে মাফসাদাত প্রতিহত করে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মূলত, এখানেই আসে নবীর ওয়ারিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একজন আলেমের দায়িত্ব পালনের বিষয়। একজন আলেম শুধু জ্ঞানের দিক থেকেই নবীর ওয়ারিশ নয়, অথবা সুনির্দিষ্ট কিছু নস মুখস্থকরণ ও মিম্বারে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেই ওয়ারিশ নয়, বরং ওয়ারিশ হিসেবে তার দায়িত্ব হচ্ছে, দুনিয়াতে ইসলাহ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করা এবং বর্তমান জুলুমপূর্ণ ব্যবস্থা থেকে আদালতপূর্ণ সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করা। বর্তমান বিশ্বের জনসাধারণ এখন সাধারণ স্কলারের বিপরীতে মুসলিহ আলেম বা ভবিষ্যত বিনির্মানকারী স্কলারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। আল্লাহর ভাষায়,<br />
“তোমার রব এমন নন যে, তিনি জনবসতিসমূহ অন্যায়ভাবে ধ্বংস করবেন, অথচ তার অধিবাসীরা ভবিষ্যত বিনির্মানকারী।”</p>
<p>মাফসাদাত প্রতিহত করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলোর মধ্য থেকে একটি। আর মাফসাদাত উত্তরোত্তর বৃদ্ধির সময় কাজটার আবশ্যকতা আরো বৃদ্ধি পায়। বর্তমান মুসলিম উম্মাহ আজ মাফসাদাতের নিকৃষ্ট বেড়াজালে বন্দী। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলই আজ মাফসাদাতের বিষাক্ত থাবায় পর্যদুস্ত। এমন একটি সময়ে একমাত্র ইত্তিহাদ ও মাসলাহাতকে কেন্দ্র করে জ্ঞানার্জন করা ওলামায়ে কেরামই এই অবস্থা থেকে উম্মাহকে উত্তোরণের পথ বাতলে দিতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এখন এপর্যায়ে এসে আমরা দু&#8217;টি বার্তা দিয়ে যেতে চাই।<br />
প্রথম বার্তাটি মুসলিমদের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের প্রতি।</strong></p>
<p>বর্তমানে এমন অরাজকতার সময়ে মহান আল্লাহ আপনাদেরকে ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। আপনাদের এই সক্ষমতা রয়েছে যে, আপনারা যেকোনো বিষয়ের আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। এই ক্ষমতার মাধ্যমে আপনি আপনার দেশ ও জাতিকে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারেন অথবা অজ্ঞতা ও জুলুমের মধ্যে নিপতিত করে রাখতে পারেন।</p>
<p>মাসলাহাতকে পুঁজি করে দেশের উন্নতির পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘন বা কোনো ফাসাদ সৃষ্টি করা অনেক প্রাচীন একটা রীতি। এ&#8217;সব ক্ষমতাবানদের বলতে ইচ্ছে হয়, আল্লাহর সৃষ্টির উপর ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে কোন প্রশান্তিটা পেয়ে থাকেন আপনারা? মাসলাহাতের নামে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ভেতরে কোন উপকার নিহিত আছে?</p>
<p>আমাদের প্রথম বার্তাটা আপনাদেরই প্রতি, নিজেদের মহান এই দায়িত্বকে সঠিকভাবে পালন করে আপনারা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিষয়াদির সাক্ষী হতে পারেন! কারণ, ন্যায়পরায়ণ শাসক হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্যতম একটা নেয়ামত। পাথর এবং গাছেরা পর্যন্ত তাদের জন্য দোয়া করে।</p>
<p>অতএব, আপনাদের প্রতি অনুরোধ রইলো, আলমদেরকে তটস্থ করে না রেখে তাদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করুন। তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিবেন না। কারণ, সভ্যতা পুনর্গঠনে আপনার কাজে তাদের মতো সহযোগী আর কাউকে পাবেন না। এই বিষয় আলোচনাকালে সৌদি আরবের সম্মানিত শাসকদের নাম উল্লেখ প্রণিধানযোগ্য।</p>
<p>তাঁদের উদ্দেশ্যে আমাদের বার্তা হলো, প্রতিটি দেশ ও তার অধিবাসীদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব রয়েছে। একমাত্র শোষক ব্যতিত আর কেউ এটাকে অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু, উম্মাহ এখন মুসলিহ আলেমের দিকে চেয়ে রয়েছে। আলেমগণ নিজেদের দেশের অধিবাসী হলেও তাদের প্রভাব সীমানা পেরিয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই, আলেমগণ শুধু তার জন্মভূমির সম্পদ নন, তাঁরা সমগ্র বিশ্বের সম্পদ।</p>
<p>সমগ্র বিশ্বের ওলামায়ে কেরামের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সৌদি শাসকের নিকট থেকে তাঁর দেশের স্কলারদের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাই। তারা তো কোনো অপরাধ করেননি। মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, তাঁরা দেশ ও জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সেবক। কিন্তু, ন্যয়পরায়ণ শাসকের নিকট থেকে যেমন উত্তর পাওয়া যায়, সেভাবে কি আমরা আমাদের প্রশ্নের উত্তরগুলো পাবো সৌদি শাসকের নিকট থেকে? সুবিশাল আশা নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে রইলাম।</p>
<p>আজ আমরা ইলম, হিকমত ও দাওয়াহ সমৃদ্ধ এই অধিবেশন থেকে জামাল খাসোগি (রহ.)&#8217;র পরিবারকে সমবেদনা জানাচ্ছি। বলতে দ্বিধা নেই, তুরস্কের মাটিতে তাঁর মৃত্যুবরণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। এই ক্ষতি এতোটাই অপূরণীয় যে, এই শোকে মর্মর সাগরের পানিও কৃষ্ণ সাগরের পানির মতো কালো হয়ে যাতে পারে। যেহেতু আমরা এখনও তাঁর জানাযা আদায় করতে পারিনি, তাই সৌদি শাসকের নিকট তাঁর মরদেহ প্রকাশ করে ইস্তাম্বুলে পাঠানোর অনুরোধ করছি, যেন আমরা ওলামায়ে কেরাম জনসাধারণকে সাথে নিয়ে তাঁর জানাযা পড়তে পারি। আমরা সকলেই একসাথে তাঁর জানাযা আদায় করতে চাই। তবে, সেটা গায়েবানা জানাযা নয়। কারণ, কবরে রাখার পূর্বে এই জানাযার মাধ্যমে সম্মানিত হওয়াটা তাঁর অধিকার। জান্নাতে তাঁর সর্বোচ্চ মাকামের জন্য আমরা মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি এবং হত্যাকারীদের জন্য ধ্বংস কামনা করি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমার দ্বিতীয় বার্তাটি মুসলিম উম্মাহর বিশিষ্ট স্কলার, চিন্তাবিদ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি।</strong></p>
<p>উম্মাহর পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের সিস্টেম্যাটিক উন্নয়ন প্রয়োজন। যেনো আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে সমাজের নিকট রোল-মডেলে পরিণত হতে পারি।আমাদের যে ইন্সটিটিউটসমূহ হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সূতিকাগার ছিলো, সেগুলো আজ সাধারণ সমাজ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ—উভয় স্থানেই তার গতিময়তা ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, ইন্সটিটিউটগুলোর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলে যাওয়া।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে, ইন্সটিটিউটগুলো পরবর্তীতে তার নেতৃত্ব হারিয়ে শুধু প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং জনসাধারণও এদের ব্যাপারে  সবাই সন্দিহান হয়ে পড়েছে। আবার কোনো কোনো ইন্সটিটিউট বৈশ্বিকতা হারিয়ে নিজেদেরকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক স্কলারগণও এই পথে হেঁটেছেন। ফলে, উম্মাহর পুনর্গঠনের বিপরীতে উম্মাহ আরো ধ্বংসের পথে এগিয়ে গেছে।</p>
<p>আমরা তাঁদেরকে এই ঐক্যবদ্ধতার অধিবেশন থেকে বার্তা দিতে চাই,<br />
আল আযহার ও আয-যায়তুন বিশ্ববিদ্যালয়, সমগ্র বিশ্বের ফতওয়া ও দাওয়াহ ইন্সটিটিউট, বিশেষ করে, মুসলিম বিশ্বের সকল স্কলারদেকে বলতে চাই, আসুন, ভ্রাতৃত্ব ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে আবার নতুন করে সাজাই। যেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে ছাপিয়ে ক্ষমার প্রবণতাটা সমুন্নত হবে। যার মাধ্যমে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী এক অরাজকতার পর উম্মাহ আবার স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। আসুন, আমরা চিন্তার মতপার্থক্য ও মাযহাবকেন্দ্রীক বিতর্ককে তদস্থলে রেখে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই। আসুন, আমাদের সকলের ঐশীশক্তিকে কাজে লাগাই উম্মাহর উত্তরণের জন্য। যে উম্মাহর প্রত্যেকেরই স্রষ্টা, নবী ও জীবনধারণের উদ্দেশ্য একই। যেন আমরা সমগ্র বিশ্বে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সমুন্নত করতে পারি, যে রাষ্ট্রগুলো নিয়ে কেয়ামতের দিনে নবী (সা.) গর্ব করতে পারবেন। কাব্যিক ভাষায়,<br />
“দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর হে ওলামায়ে কেরাম, তোমরাই যদি বাতিকগ্রস্ত হয়ে থাকো, তাহলে জাতির কাণ্ডারি কে হবে?”</p>
<p>শ্রদ্ধেয় সুধী এবং বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম,<br />
যখন সবার আখলাকী উন্নয়ন সম্ভব হবে, তখন সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পুনর্গঠিত হতে শুরু করবে। আমাদের সমাজ দীর্ঘ একটা সময় ধরে আখলাকী সমস্যায় জর্জরিত। এ সমস্যার অসংখ্য কারণ রয়েছে। তবে, এখন সবগুলো উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কিন্তু, সমস্যাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটা হচ্ছে, আখলাকের সাথে সম্পর্কহীনতা। অথচ, এই আখলাকের মাধ্যমেই আমরা সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে শিখি। আর এই আখলাকহীনতাই আজ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। মূলত, এই আখলাকহীনতা ও বস্তুবাদী মানসিকতার জন্যই আজ আমরা পর্যদুস্ত।</p>
<p>বিজ্ঞানভিত্তিক ইন্সটিটিউট এবং মুসলিহ ওলামায়ে কেরামের মাঝে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরিই হবে উম্মাহর পুনর্গঠনের মূল পদক্ষেপ। নচেৎ, এই পুনর্গঠন কীভাবে সম্ভব হবে, যখন সমাজ দেখবে এদের সমাজ চালানোর ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে!? কারণ, বস্তুবাদী দর্শনে প্রভাবিত বিজ্ঞানের বহু ব্যাখ্যা আজ ওলামায়ে কেরামকে বিজ্ঞানের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে। যদিও এখানে, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উপকারিতা-ও অন্যতম একটা কারণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সত্যিকারার্থে, আমাদের সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলো আসলে কিছুই না। সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে মূলত কলোনাইজেশন, দাসত্ব, জুলুম ও অজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে, বা এগুলোর ছত্রছায়ায়।</p>
<p>কিন্তু, অনেক মুসলিম জনগোষ্ঠী আবার এই সমস্যা সমাধানকল্পে ইতিহাস পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে প্রতিশোধের আশ্রয় নিচ্ছে। এখন মূলত আমাদের নিজেদেরকে দায়ী করে প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কী ছিলাম আর কোন ভুলে আমরা এই অবস্থানে পৌঁছলাম? এবং আমরা তখন কী করেছিলাম, যখন এই সমস্যাগুলো আমাদের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করেছিলো?</p>
<p>এমন পরিস্থিতিতে যখন মুসলিম বিশ্বের কোথাও থেকে গোলাবারুদের ঘ্রাণ আসে, তখন আমাদের একটাই চাওয়া এবং একটাই দায়িত্ব-কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়; তা হলো, যেকোনো পন্থায় আমাদের মুসলিমদের রক্ত ঝড়ানো বন্ধ করা। এই সমস্যা সমাধানকল্পে অনেকে আবার আমাদেরকে উম্মাতান-ওয়াসাতান থেকেও সরিয়ে নিয়ে আসছে।</p>
<p>সম্মানিত বিজ্ঞ স্কলারগণ,<br />
আজকের এই অধিবেশনের মূল লক্ষ্য হলো, আমাদের আলেমগণেরই মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা। ভ্রাতৃত্ব, মাসলাহাত, ন্যায়, সত্য ও আদালত প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে যাওয়া। আমাদের এমন আলেম হওয়ার শপথ নেওয়া যে, যারা হজ্জের বিশাল সমাগমের সময়েও ছোট্ট একটা পিঁপড়ার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলবে। কারণ, নিরপরাধ মানুষ হত্যার ব্যাপারটা নিয়েও আমরা আজ ভয়ে জোরালো বিরোধিতা করতে পারি না।</p>
<p>আমার এখন প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়,<br />
আমাদের বিবেক ফিরিয়ে আনার জন্য এই ঝরানো রক্তগুলো কি যথেষ্ট নয়?<br />
অত্যাচার, ঔদ্ধত্য, অপমান, অসম্মান করে কি এখনও আত্মতৃপ্তি হয়নি?<br />
আসুন, আমরা গতানুগতিক সবকিছু থেকে বেরিয়ে আমাদের জ্ঞান, মন এবং কলমগুলোকে আবারো কাজে লাগাই। আসুন, সকল ধরনের ফিতনা দূরীকরণে আমাদের কণ্ঠকে আবারো সমুন্নত করি। আজকের এই অধিবেশন যেন আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করার অধিবেশনে পরিণত হয়।</p>
<p>যুগশ্রেষ্ঠ সম্মানিত স্কলারগণ,<br />
ইসলাম দু&#8217;টি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত—একত্ববাদ এবং একতা। অর্থাৎ, আল্লাহর একত্ববাদ এবং উম্মাহর অভ্যন্তরীণ একতা। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা যেন এই আয়াতটাকে প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছি,<br />
“যারা নিজেদের আলাদা আলাদা দ্বীন তৈরি করে নিয়েছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলের কাছে যা আছে তাতেই তারা মশগুল হয়ে আছে।”</p>
<p>এটা সত্য যে, পশ্চিমা ও ওরিয়েন্টালিস্টরা তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মুসলিমদের মাঝে বিভক্ত করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু, এরচেয়েও মারাত্মক যে বিষয়টা আমাদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, তা হলো আমাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কারণ, নিকটবর্তীদের নিকট থেকে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি গভীর।</p>
<p>পরিশেষে বলতে চাই,<br />
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, আমাদের মাঝে মতপার্থক্য থাকার পরেও উম্মাহর পুনর্গঠন এবং উম্মাহর মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদেরকে আত্মত্যাগ করা। ওয়াল্লাহি, শান্তি প্রতিষ্ঠাই হবে আমাদের সকল সমস্যা সমাধানের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। ওয়াল্লাহি, উম্মাহর মধ্যকার একতাই আমাদের বন্ধনকে আরো শক্তিশালী করবে।</p>
<p>কিন্তু, শয়তান তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই থাকবে। তবে, একমাত্র উলামায়ে কেরামই সে প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করতে পারে। এবং এই আয়াতকে আমরা আমাদের স্লোগান বানাতে চাই,</p>
<blockquote><p>“আমি তো আমার সাধ্য অনুযায়ী সংশোধন (পুনর্গঠন) করতে চাই। যা কিছু আমি করতে চাই তা সবই আল্লাহর তাওফীকের ওপর নির্ভর করে। তাঁরই ওপর আমি ভরসা করেছি এবং সব ব্যাপারে তাঁরই দিকে রুজু করি।”</p></blockquote>
<p>দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক সকল নবীদের সর্দার মুহাম্মাদ (সা.), তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবীদের উপর। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে (শেষ করছি)। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ মিফতাহুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-scholars-in-establishing-maslahah-in-the-era-of-globalization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15871</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইতিহাসের ধারায় আরাকান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 03 May 2025 11:46:29 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রোহিঙ্গা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15811</guid>

					<description><![CDATA[যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন–ই–আকবরীতে আরাকান সম্পর্কে লিখেছেন : সুবে বাঙ্গালাহ–ও দক্ষিণ–পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন–ই–আকবরীতে আরাকান সম্পর্কে লিখেছেন : <strong>সুবে বাঙ্গালাহ–ও দক্ষিণ–পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ। গাধা ও উট এখানে চড়া দামে বিক্রি হয়। এই রাজ্যে গরু ও মহিষ দেখা যায় না। এখানে মানুষ গাভি জাতীয় একপ্রকার প্রাণীর দুধ পান করে। এই দেশে মানুষ না হিন্দু, না মুসলমান। যমজ ভাতা ভগ্নীর মধ্যে এই দেশে বিবাহ প্রচলিত আছে। মাতা–পুত্র ব্যতীত আর সবার মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। এই দেশে লোকে তাদের পুরোহিতের (ওয়ালির) সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ। এখানে রাজপ্রাসাদে স্ত্রী লোক প্রহরীর কাজ করে। পুরুষ মানুষের মুখে দাড়ি হয় না।</strong></p>
<p><em>ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকান ছিল বার্মার একটি বিভাগ (Division)। এই বিভাগের ছিল চারটি জেলা। যথা : ১. আরাকান হিলট্রাক্টস, ২. আকিয়াব, ৩. সান্ডওয়ে ও ৪. কাউকপিউ। বর্তমানে আরাকান বা রাখাইন হলো মিয়ানমারের একটা প্রদেশ; বিভাগ আর নয়; কিন্তু বর্তমান আরাকান প্রদেশের আয়তন হলো আগের আরাকান বিভাগের চাইতে ছোট। এই ছোট হওয়ার কারণ, আরাকান হিলট্রাক্টসকে জুড়ে দেয়া হয়েছে মিয়ানমারের আরেকটা প্রদেশের সাথে। মিয়ানমার বর্তমানে সাতটা প্রদেশ (Constituent stats) এবং সাতটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি বিভাগে বাস করেন খাঁটি বর্মিভাষী জনসমষ্টি; কিন্তু আর সাতটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টির জনসমষ্টির মাতৃভাষা বর্মি বা ম্রনমা নয়। আরাকান হলো এমন একটি প্রদেশ, যার মানুষের মাতৃভাষা খাঁটি বর্মি নয়; কিন্তু বর্মি ভাষার খুবই কাছাকাছি। একে বলতে হয় প্রাচীন বর্মি ভাষার অনুরূপ। অর্থাৎ আরাকান প্রদেশের অবস্থান ভাষাগত দিক থেকে বর্মি পরিবারভুক্ত হলেও বেশ কিছুটা ভিন্ন।</em></p>
<p><em>আরাকানের সব লোক মঙ্গল মানবধারার নয়। এখানে অনেক মানুষের চেহারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অনুরূপ। তাদের চোখ আয়ত, নাক সরল ও উন্নত, মাথার চুল মসৃণ। তাদের পুরুষের মুখে দাড়ি গোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায়। এদের মাথা প্রধানত মধ্যমাকৃতির; কিন্তু যাদের মনে করা হয় একান্তভাবেই আরাকানীয় তাদের মাথার আকৃতি গোল, চুল ঋজু, চোখের ওপর পাতায় থাকে বিশেষ ধরনের ভাঁজ। যে কারণে তাদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট এবং বাঁকা। এদের গণ্ডের হাড় হয় উঁচু, যে কারণে এদের মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। পুরুষের মুখে দাড়িগোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায় না। এরা অনেক খর্বাকৃতির। মানবধারার দিক থেকে এদের বলা চলে, দক্ষিণ চীনের মঙ্গলধারার।</em></p>
<p><strong>ভূগোলের দিক থেকে আরাকান বার্মার (ব্রহ্ম) মূল ভূখণ্ড থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। বার্মা ও আরাকান পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণি দ্বারা। এই পর্বতশ্রেণিকে বলে আরাকান ওমা। এর মধ্য দিয়ে আছে তিনটি গিরিপথ। এই তিনটি গিরিপথের মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র একটি দিয়ে বছরে সব সময় যাতায়াত করা চলে। অন্য দু’টির মধ্য দিয়ে বর্ষাকালে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বার্মার মূল ভূ–খণ্ডের সাথে আরাকানের যোগাযোগ ছিল সমুদ্রপথে। জাপান বার্মার মূল ভূখণ্ড দখল করে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে। বার্মার মূল ভূখণ্ড থেকে জাপানিরা ১৯৪২ সালে সমুদ্রপথে স্পিডবোটে এসে করেছিল সম্পূর্ণ আরাকান দখল। আরাকান থেকে স্থলপথে এসে পৌঁছেছিল চট্টগ্রামের মহেশখালী পর্যন্ত। তবে তারা মহেশখালী দখলে রাখতে পেরেছিল না। আরাকানসহ বার্মা জাপানের দখলে ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে আরাকানে যাওয়া ছিল সহজ। বাংলাদেশ থেকে মানুষ গিয়েছে আরাকানে। আবার আরাকান থেকে মানুষ এসেছে বাংলাদেশে। এটা ঘটেছে বহু যুগ ধরেই।</strong></p>
<p>রোহিঙ্গা নামটির একটি বিশেষ ইতিহাস আছে। সংক্ষেপে তা হলো এই রকম : খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগে (১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি) নিম্ন ব্রহ্মের রাজা মেং–শো–আই আরাকান জয় করেন। আরাকানের রাজা মেং–শো-আ মউন যুদ্ধে হেরে পালিয়ে যান গৌড়ের সুলতান জালাল–আল–দীন শাহ–এর কাছে। তিনি আরাকানের পরাজিত রাজাকে অনেক সৈন্য প্রদান করেন গৌড়ের এক সেনাপতির অধীনে, যাতে করে আরাকানের রাজা মেং–শোআ মউন বার্মা রাজাকে পরাজিত করে আবার আরাকানের রাজা হতে পারেন; কিন্তু গৌড়ের এই সেনাপতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। মেং–শোআ মউন আবার বন্দী হন বার্মার রাজার কাছে। অনেক কষ্টে আরাকানের পরাজিত রাজা আবার গৌড়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এবার গৌড়ের সুলতান তাকে আর একজন সেনাপতির অধীনে আরো অনেক সৈন্য প্রদান করেন। এই সেনাপতি ও সৈন্যের সহযোগিতায় মেং–শোআ মউন যুদ্ধে জয়ী হন। তিনি আরাকানের নতুন রাজধানী গড়েন বাংলার সীমানার কাছে। এই রাজধানীর নাম দেন রোহং অথবা ম্রোহং। আরাকানের রাজা চান না গৌড়ের সৈন্য ফিরে যাক। গৌড়ের এসব মুসলমান সৈন্য থেকে যায় রাজধানী রোহং শহরে। এদেরই বংশধররা হলো রোহিঙ্গা। রোহং শহরকে বাংলা ভাষায় বলা হতে থাকে রোসাঙ্গ। একসময় রোসাঙ্গ আর আরাকানকে ডাকা হতে থাকে একই রোসাঙ্গ নামে। দৌলত কাজী তার <em>&#8216;সতী ময়নামতীতে&#8217;</em> লিখেছেন–</p>
<blockquote><p>কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী।<br />
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।।<br />
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধাচার।<br />
নাম শ্রীসুধর্ম্মা রাজা ধর্ম্ম অবতার।।<br />
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন।<br />
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।</p></blockquote>
<p>আরাকানের রাজারা গৌড়ের সাথে যোগাযোগ রেখে চলতেন। তারা তাই বাংলা ভাষা শিখতেন। আরাকানের রাজসভায় এই জন্য হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের চর্চা। <strong>দৌলত কাজী ছিলেন আরাকানের রাজসভার একজন খুবই খ্যাতনামা কবি।</strong> তিনি জন্মে ছিলেন চট্টগ্রামের অন্তর্গত বর্তমান রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে। সেখান থেকে প্রথম যৌবনে তিনি চলে যান আরাকানে। এ সময় আরাকানের রাজা ছিলেন থিরি থুধর্মা (১৬২২–১৬৩৫ খ্রি. রাজত্বকাল)। যার বাংলা নাম দাঁড়ায়, শ্রীসুধর্ম্মা। শ্রীসুধর্ম্মার লস্কর উজির (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) ছিলেন আশরাফ খান। আশরাফ খান ছিলেন চট্টগ্রামের বর্তমান উপজেলা হাটহাজারীর অন্তর্গত চারিয়া গ্রামের অধিবাসী। তিনি সেখান থেকে যান আরাকানে। তার সহায়তায় দৌলত কাজী আরাকানের রাজসভায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। দৌলত কাজী খ্যাত হয়ে আছেন <strong><em>&#8216;সতী ময়নামতী&#8217;</em></strong> নামক কাব্যগ্রন্থ রচনার জন্য। এটা তিনি রচনা করেন সাধন নামে উত্তর ভারতের একজন কবির লেখা কাব্য ময়না সৎ নামক কাব্যগ্রন্থের অনুসরণে। ময়না সৎ কাব্যগ্রন্থ লিখিত হয়েছে পূর্বী হিন্দিতে। <em>দৌলত কাজী তার কাব্য শেষ করার আগেই হঠাৎ ইন্তেকাল করেন। তার এই কাব্য সমাপ্ত করেন কবি আলাওল বেশ কিছু দিন পরে</em>। কবি আলাওলের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম <strong>&#8216;পদ্মাবতী।&#8217;</strong> এটি তিনি রচনা করেন মালিক মুহম্মদ জয়সি নামে উত্তর ভারতের একজন সুফি কবির লেখা <strong>&#8216;পাদুমাবৎ&#8217;</strong> নামক কাব্যগ্রন্থের ওপর নির্ভর করে। পাদুমাবৎও লিখিত হয়েছিল পূর্বী হিন্দিতে।<br />
বাংলা সাহিত্যের ওপর ফারসি সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাব বহুদিন আগে থেকেই পড়তে আরম্ভ করে। তবে নতুন করে আবার পড়ে সম্রাট শাজাহানের পুত্র বাংলার সুবেদার সুজার আমলে। সুজা বাংলার সুবেদার ছিলেন প্রায় ২০ বছর (১৬৩৯–১৬৬০)। সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার হাতে পরাজিত হয়ে আরাকানে প্রস্থান করেন। সুজার সময় সুবে বাংলার রাজধানী ছিল রাজমহল, যা এখন পড়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশে। আলাওল চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না। ছিলেন ফরিদপুর অঞ্চলের (ফাতেহাবাদ) লোক। তিনি তার পিতার সাথে নৌপথে কোথাও যাওয়ার সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে পড়েন। আলাওলের পিতা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় মারা যান। আলাওলকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা ধরে এনে বিক্রি করেন আরাকানে।</p>
<p><em>আলাওল অনেকগুলো ভাষা জানতেন। বাংলা, উড়িয়া, ফারসি, আরবি, পূর্বী হিন্দি ও সংস্কৃত। আলাওল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন &#8216;হফত পয়কর&#8217; ও &#8216;সিকান্দর নামা।&#8217; আলাওলের যেসব পুঁথি পাওয়া গিয়েছে, তা বাংলা অক্ষরে লিখিত নয়। সবই লিখিত আরবি–ফারসি অক্ষরে। আরাকানে সুজার সাথে আলাওলের বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। আরাকানের রাজা সুজাকে হত্যা করেন। এই হত্যার একটি কারণ ছিল আরাকানের রাজা সুজার এক কন্যাকে বিবাহ করতে চান; কিন্তু সুজা রাজি হন না। সুজার সাথে সখ্যতার জন্য আলাওলকে পড়তে হয় আরাকানের রাজার কোপে। সুজার মৃত্যুর পর তার সৈন্যসামন্ত ও লোকজন সবাই থেকে যায় আরাকানে। রবীন্দ্রনাথ ডালিয়া বলে একটি ছোট গল্প লিখেছেন। যার বিষয়বস্তু হলো– সুজার কন্যার সাথে আরাকান রাজার প্রেম। তবে এটা ইতিহাসের নিরিখে সত্য নয়; কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আরাকান রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আর কোনো লেখক আরাকান নিয়ে তার সময়ে এ রকম কিছু লিখেননি।</em></p>
<p><strong>মগ বলতে ঠিক কাদের বোঝাত, তা জানা যায় না। চট্টগ্রামে মগ বলতে একদল বাংলাভাষীকেও বোঝায়। যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই মগরা বলেন, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছিল বিহারের মগধ থেকে। দৌলত কাজী বলেছেন, সুধর্ম্মার পূর্বপুরুষও ছিলেন মগধ থেকে আগত। সম্ভবত এরা পূর্বী হিন্দি সম্বন্ধেও ছিলেন অবগত। তাই আরাকানের রাজসভায় কাব্যচর্চা করতে যেয়ে পূর্বী হিন্দিতে লিখিত বইয়ের অনুবাদ করতে হয়েছেন সচেষ্ট। সাধারণভাবে বাংলাদেশে এখনো মগের মুল্লুক বলতে, লোকে বোঝে চরম অরাজক রাজত্ব। সম্ভবত মগদের একাংশ পর্তুগিজ জলদস্যুদের সংশ্রবে এসে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর প্রকৃতির দস্যু। এই দস্যুদের সমূলে ধ্বংস করতে সক্ষম হন আওরঙ্গজেব কর্তৃক নিযুক্ত সুবেদার শায়েস্তা খান।</strong><br />
<strong>আরাকান আগে বার্মার অংশ ছিল না। আরাকান বার্মার বিশেষ অংশ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনামলে। যখন একে ব্রহ্মদেশের সাথে একটি বিভাগ হিসেবে যুক্ত করা হয়; কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলেও চট্টগ্রাম থেকে বহু মানুষ গিয়েছেন আরাকানে চাকরি করতে। বিশেষ করে পুলিশ ও শিক্ষা বিভাগে। এ ছাড়া হয়েছেন নৌপথে চলাচলকারী মোটর–বোটের সারেং ও মাঝি–মাল্লা। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আরাকানের আকিয়াব বন্দর পর্যন্ত রেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেটা সম্ভব হয়েছিল না।</strong></p>
<p>দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু ঘটনা আজকের রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্লেষণে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। <strong>জাপান বার্মাকে খুব সহজেই দখল করতে পেরেছিল। এর কারণ, কেবলই সামরিক কৌশল ছিল না। জাপান এ সময় বলেছিল, এশিয়া শাসিত হতে হবে এশীয়বাসীর দ্বারা।</strong> জাপান এশীয়। জাপানিরা ছিলেন ধর্মের দিক থেকে অনেকেই বৌদ্ধ। জাপান বলে, এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে তারা সহযোগিতা সৃষ্টি করতে চায়, যা এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রকে করে তুলবে সমসমৃদ্ধ। এর একটা প্রভাব পড়েছিল বার্মার মানুষের ওপর। তারা সহযোগিতা করেছিল জাপানের। বার্মার প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল দোবামা আসিওরে। এরা প্রথমে নেয় জাপানের পক্ষ। এরা আওয়াজ তোলে বার্মা হতে হবে বর্মিদের জন্য। এরা ছিল বিশেষভাবেই বর্মি জাতীয়তাবাদী।<br />
<strong>ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রায় দশ লাখ মানুষ সমুদ্রপথে বার্মায় গিয়েছিলেন, ব্যবসা–বাণিজ্য করতে। এরা অনেকেই বার্মায় নিয়োজিত হয়েছিলেন অসাধু ব্যবসা–বাণিজ্যে, ঠকিয়েছিলেন বর্মিদের। বর্মি জাতীয়তাবাদ তাই কেবল ব্রিটিশবিরোধী ছিল না, ভারতবিরোধীও ছিল।</strong> যুদ্ধের সময় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল এইসব ভারতীয়দের। আরাকানে এ সময় মুসলমানরা জাপানের পক্ষ নিতে চাননি। জাপানিরা বৌদ্ধ। জাপানিরা আরাকানি বৌদ্ধদের যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করবে, তারা মনে করেন মুসলমানদের জাপানিরা সে রকম করবে না। এ সময় ব্রিটিশ শাসকেরা প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তারা উত্তর আরাকানকে একটা আলাদা প্রদেশ করবে।<br />
<strong>উত্তর আরাকান মুসলিম প্রধান। কেবল তাই নয়, উত্তর আরাকানের বেশির ভাগ লোক দেখতে বাংলাদেশের অধিবাসীর মতো। উত্তর আরাকানে হাটেবাজারে চলতো চট্টগ্রামের বাংলাভাষা, আরাকানি ভাষা নয়।</strong> ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় আরাকান মুসলিম লীগ। এরা তোলে আরাকানকে বিভক্ত করার দাবি; কিন্তু আরাকান মুসলিম লীগের এই দাবি জিন্নাহ সাহেব সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, বার্মা এখন একটা পৃথক দেশ। আরাকানে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুললে ভারতে পাকিস্তান আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। <strong>আসলে আরাকান মুসলিম লীগ কখনই আরাকানভিত্তিক একটি দল ছিল না। ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক একটা দল, যাতে নেতৃত্ব দিতেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। যিনি ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের লোক। আরাকানি মুসলিম লীগ কোনো দিনই আরাকানে সাড়া জাগাতে পারে না।</strong></p>
<p>১৯৪৮ সালে বর্মা স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপর আরাকানি মুসলমানদের একাংশ কাশেম রাজার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন; কিন্তু এদের সংখ্যা খুব উল্লেখযোগ্য ছিল না। কাশেম রাজা পেশায় ছিলেন ধীবর। তিনি এক সময় সমুদ্রে মৎস্য শিকার করতেন; কিন্তু তিনি ছিলেন ভালো সংগঠক ও নেতৃত্ব গুণে গুণান্বিত। ফলে হয়ে উঠতে পারেন একজন বিশিষ্ট নেতা। তিনি গড়ে তোলেন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী। কাশেম রাজা পাকিস্তানের কাছে সাহায্য চান; কিন্তু পান না। কাশেম রাজা ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসে ধরা পড়েন ও কারারুদ্ধ হন। আরাকানে মুসলিম মুজাহিদরা হয়ে পড়েন শক্তিহীন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব চান না বার্মার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হোক। নাফ নদীর ওপারে ৫ মাইল জায়গা নিয়ে বর্মার সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। আইউব সেটা বার্মাকে ছেড়ে দিয়ে সীমান্ত সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসেন।<br />
বার্মা স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে আরাকানিরা স্বাধীন হতে চেয়েছিল; কেবলই আরাকানের মুসলমানরাই নয়। কিন্তু আরাকানের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ হলো মুসলমান। জেনারেল নে উইন ১৯৫৮ সালে বর্মায় ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন কঠোর বর্মি জাতীয়তাবাদী। তিনি মনে করেন আরাকানে রোহিঙ্গাদের প্রভাব প্রতিপত্তি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরাকান একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে। তার সময় থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গা নির্যাতন। যাতে করে রোহিঙ্গারা আরাকান ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসতে চায়। আজ যে সমস্যা আরাকানে সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ। রোহিঙ্গাদের ওপর আজ যে জঘন্য নির্যাতন হচ্ছে সেটা করছে মিয়ানমার মূল ভূখণ্ড থেকে আসা বর্মি সৈন্যরা। এর মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ, যার উদ্ভব হয়েছে বর্মার মূল ভূখণ্ডে, আরাকানে নয়।</p>
<p><strong>আরাকানে যা ঘটছে, তা ঘটতে পারার একটা কারণ হলো বাংলাদেশ একটা যথেষ্ট সবল রাষ্ট্র নয়। সবল রাষ্ট্র হলে বার্মার সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের ওপর এ রকম অত্যাচার করতে কখনো এতটা সাহসী হতো না। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের কাছে আবেদন জানাচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বহু মুসলমানের বাস। আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত এই দু’টি দেশের জনমতকে বিশেষভাবে পক্ষে পাওয়া। কেননা, এই দু’টি দেশ যদি বার্মার ওপর রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করে তবে তা কার্যকর হবে সবচেয়ে বেশি।</strong> তবে একান্তই যদি দেখা যায় যে, রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হচ্ছে না, তবে মনে হয় শেষ পর্যন্ত উচিত হবে রোহিঙ্গাদের স্বাধিকারের জন্য সব ধরণের সাহায্য প্রদান করা। রোহিঙ্গারা যদি হাতে অস্ত্র পান, তবে লড়াই করে তারা তাদের নিজেদের দাবি–দাবাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বলে মনে করার কারণ আছে। কেননা, মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে কারেন, শান, কাচিন প্রভৃতি জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। বর্মি বাহিনী খুব যে সুবিধার মধ্যে আছে, তা কিন্তু নয়। রোহিঙ্গাদের দমন করার জন্য মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার যদি অধিক সৈন্য পাঠাতে বাধ্য হয়, তবে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে অন্য জাতিসত্তাদের সংগ্রাম আরো জোরালো হবে। ফলে মিয়ানমারের সরকারকে পড়তে হবে যথেষ্ট জটিলতায়। মিয়ানমারের সাতটি প্রদেশেই আছে কম বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী তথা স্বাধীনতাকামী প্রবণতা। আজকের মিয়ানমার হলো ব্রিটিশ শাসনের ফল। কোনো খাঁটি বর্মি রাজা এত বড় অঞ্চলকে কখনো শাসন করতে পারেননি।</p>
<p><strong>০২ ডিসেম্বর ২০১৬</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15811</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/influence-of-islam-on-state-and-politics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/influence-of-islam-on-state-and-politics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 16 Apr 2025 17:32:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15774</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামে রাষ্ট্রের অবস্থান ইমাম হাসান আল বান্না ইসলামের ব্যাপকতা বর্ণনায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “যেমনিভাবে ইসলাম আকিদা ও ইবাদত, তেমনিভাবে ইসলাম হচ্ছে রাষ্ট্র ও ভূখণ্ড।” এই বাস্তবতাটির ঘোষণা এবং এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ ইসলামের প্রথম যুগের একটি বিশেষ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>ইসলামে রাষ্ট্রের অবস্থান</strong></p>
<p><strong>ইমাম হাসান আল বান্না ইসলামের ব্যাপকতা বর্ণনায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “যেমনিভাবে ইসলাম আকিদা ও ইবাদত, তেমনিভাবে ইসলাম হচ্ছে রাষ্ট্র ও ভূখণ্ড।”</strong> এই বাস্তবতাটির ঘোষণা এবং এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ ইসলামের প্রথম যুগের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইমাম বান্না তাঁর প্রত্যেকটি প্রবন্ধ ও আলোচনায় রাষ্ট্র ও ভূখণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিতেন। আর এই গুরুত্ব দেওয়ার কারণ আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।</p>
<p><strong>মুসলিমদের ভূখণ্ড জবরদখলকারী ঔপনিবেশিকরা অনেক মুসলিমের চিন্তায় এই বীজ বপন করতে সক্ষম হয়েছে যে- &#8216;ইসলাম শান্তির ধর্ম; রাষ্ট্র বা রাজনীতির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই&#8217;। তাদের চিন্তায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে- &#8216;ধর্ম মানেই পশ্চিমা চিন্তাধারার ধর্ম। রাষ্ট্রীয় কাজের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্রকে মানুষ স্বীয় বিচারবুদ্ধির নিরিখে সদা পরিবর্তনশীল চাহিদা এবং নিজ নিজ দক্ষতার আলোকে সাজিয়ে নেবে।&#8217;</strong></p>
<p>পশ্চিমে খ্রিষ্টবাদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, প্রাচ্যে ইসলামের সাথে ঔপনিবেশিকরা একই আচরণ করতে চেয়েছে। ঔপনিবেশিকদের মতে- &#8216;পশ্চিমে ধর্মের শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোনো বিপ্লব পূর্ণতা পায়নি। সুতরাং, প্রাচ্য তথা আরব কিংবা মুসলিম বিশ্বে বিপ্লব করতে চাইলে, অবশ্যই তা ধর্মের বিরুদ্ধেই করতে হবে।&#8217; অথচ প্রকৃত ব্যাপার হলো- পশ্চিমে ধর্ম মানে গির্জা ও পাদ্রির একচ্ছত্র ক্ষমতা; মানুষের অনুভূতি ও হৃদয়ের ওপর পুরোহিতদের স্বেচ্ছাচারিতা। আমাদের দ্বীন ইসলামে এর সুযোগ কোথায়! ইসলামে কোনো পোপ-পাদ্রি বা পুরোহিত নেই। নেই কোনো ধর্মীয় যাজকতন্ত্র। সুযোগ নেই হৃদয়-মনের সাথে কোনো স্বেচ্ছাচারিতারও।</p>
<p><em>ঔপনিবেশিকরা মুসলিমদের মাঝে এমন একটি পক্ষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যারা মনে করে- &#8216;রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে দ্বীনের কোনো ভূমিকা নেই। আর দ্বীন ও রাজনীতি সম্পূর্ণ পৃথক দুটি ব্যাপার।&#8217; তারা বলে- &#8216;এটি ইসলামের ক্ষেত্রেও সত্য, যেমনি সত্য খ্রিষ্টবাদের ক্ষেত্রেও।&#8217; ঔপনিবেশিকরা একটি প্রবাদের বহুল প্রচলন ঘটিয়েছে। সেই প্রবাদটি হলো- الدين لله والوطن للجميع &#8216;দ্বীন আল্লাহর, রাষ্ট্র সবার&#8217;। কথাটি সত্য বটে, কিন্তু এই কথার প্রচলন ও প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য খারাপ।</em></p>
<p><strong>ঔপনিবেশিকরা &#8216;দ্বীন আল্লাহর&#8217; কথাটার মধ্যে দ্বীনের অর্থ করেছে- &#8216;বান্দার ব্যক্তিসত্তার সাথে আল্লাহর একান্ত সম্পর্ককে&#8217;। অর্থাৎ, দ্বীনের অবস্থান কেবল ব্যক্তিগত জীবনে; এর বাইরে রাষ্ট্র বা সমাজের অঙ্গনে দ্বীনের কোনো অবস্থান নেই। এ চিন্তাধারার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো- কামাল আতাতুর্ক সৃষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি রাষ্ট্র।</strong> নিপীড়ন, জুলুম, রক্তবন্যা আর অস্ত্রের মুখে তুর্কি মুসলিমদের ওপর এই ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সাথে যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ করে টিকে থাকা ইসলামের সর্বশেষ রাজনৈতিক দুর্গ উসমানী খিলাফত ভেঙে পড়ার পর মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতা আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠালাভ করে। এরপর বেশ কিছু মুসলিম সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক তুরস্ককে অনুসরণ করতে শুরু করে। তারা ফৌজদারি ও নাগরিক আইন ইত্যাদি থেকে ইসলামকে সরিয়ে দেয়। ইসলামকে সীমাবদ্ধ করা হয় শুধু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনে। আসলে এর মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিষয়াদি থেকে ইসলামের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি ও রীতিনীতির অনুপ্রবেশের জন্য মুসলিম বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>আরবের বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা আতাতুর্কের কর্মকাণ্ডকে অনুসরণ ও পছন্দ করে। আর পছন্দ করার এই বিষয়টাকে তারা গোপন করার প্রয়োজনও বোধ করে না। এমনকি তৎকালীন মিশরের সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক দলের নেতা এবং ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেন- &#8220;আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় কামাল আতাতুর্কের পদক্ষেপ আমি পছন্দ করছি।&#8221; ইমাম হাসান আল বান্না তার কথার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন।<br />
পশ্চিমাদের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড়ো দৃশ্যমান বিজয় হলো- তাদের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা শুধু আধুনিক নাগরিকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আগাগোড়া ইসলামি ধারায় পড়াশোনা করা কিছু লোকও তাদের চিন্তায় প্রভাবিত হয়েছে। এমনকি আল আযহারের মতো প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের কতিপয় ব্যক্তিও তাদের সাথে একাত্ম হয়েছে! আলী আবদুর রাজ্জাক লিখিত আল ইসলাম ওয়া উসুলুল হুকুম (ইসলাম ও শাসনব্যবস্থা) বইটি তার প্রমাণ।<br />
উল্লেখ্য, আলী আবদুর রাজ্জাকের বইটি প্রকাশের পর জনসাধারণের মাঝে এবং বিশেষ করে আল আযহারের ভেতরে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। আল আযহার শীর্ষ আলিমদের নিয়ে তার জন্য সালিশি বৈঠক ডাকে। সেখানে তাকে আলিমদের অঙ্গন থেকে বহিষ্কৃত ঘোষণা করা হয়। আবদুর রাজ্জাকের বইটির বিরুদ্ধে আল আযহার এবং আল আযহারের বাইরের আলিমরাও মজবুতভাবে কলম ধরেন।</p>
<p>এসব কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক-পৃষ্ঠপোষকদের মোকাবিলায় ইসলামের ব্যাপকতা তুলে ধরা অধিক গুরুত্ববহ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামি শিক্ষা ও বিধিবিধানে ইসলামের জীবন্ত দিকগুলো স্পষ্ট করা জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন- রাষ্ট্রগঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি এবং শাসনব্যবস্থার শিষ্টাচার। এই বাস্তবতায় এটি ঘোষণা করা ওয়াজিব হয়ে পড়ল যে- &#8216;রাষ্ট্র, শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে ইসলাম থেকে আলাদা করা যায় না।&#8217;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামি জ্ঞানের উৎস থেকে দলিল</strong></p>
<p>উপর্যুক্ত বিষয়গুলো কোনো ইসলামি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা নেতাকর্মীদের উদ্ভাবিত কথা নয়। ইসলামি জ্ঞানের মৌলিক উৎসে এর জোরালো বয়ান এসেছে। ইসলামের ইতিহাস এবং যুগে যুগে দাওয়াতি কার্যক্রমে রয়েছে তার অজস্র দলিল-প্রমাণ। ইসলামি জ্ঞানের উৎসের অগণিত দলিল থেকে নিম্নোক্ত দুটি আয়াতই এর জন্য যথেষ্ট।</p>
<blockquote><p>আল্লাহ তায়ালা বলেন-</p>
<p>إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمْنَتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا ﴿٥٨﴾ يَأَيُّهَا الَّذِينَ امَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُوْلِ<br />
&#8220;নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা করবে, তখন তা ন্যায়পরায়ণতার সাথেই করবে। আল্লাহ তোমাদের সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী। হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা (শাসন ও বিচারের) দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের। তারপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ো, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ করো&#8230;।&#8221; সূরা নিসা: (৫৮-৫৯)</p></blockquote>
<p><span style="font-size: 16px;">প্রথম আয়াতে রাষ্ট্রের প্রশাসক ও বিচারকদের উদ্দেশে বলা হয়েছে- তারা যেন আমানত রক্ষা করে এবং ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করে। আমানত ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি উম্মাহকে ধ্বংস করে দেয় এবং দেশকে চরম ক্ষতির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। সহিহ হাদিসে এসেছে-</span></p>
<p>قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم &#8221; فَإِذَا ضُيْعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ &#8220;. قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا قَالَ إِذَا وُسِدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ&#8221;.<br />
&#8220;নবি সা. বলেন- &#8216;যখন আমানতদারীতা উঠে যাবে, তখন কিয়ামতের জন্য অপেক্ষা করবে।&#8217; সাহাবিদের মধ্য থেকে একজন প্রশ্ন করলেন- &#8216;কীভাবে আমানত হারিয়ে যায়?&#8217; রাসূল সা. বললেন- &#8216;যখন অনুপযুক্ত ব্যক্তির ওপর কোনো দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো&#8217;।&#8221; (বুখারি: ৫৯)</p>
<p>দ্বিতীয় আয়াতে সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। তারা যেন দায়িত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য করে। শর্ত হলো- এই দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের মধ্য থেকে হবেন। এই আনুগত্যকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের পরে আনা হয়েছে। মতবিরোধকালে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মানদণ্ড ধরতে বলা হয়েছে। এসব কিছুর চূড়ান্ত দাবি হচ্ছে- মুসলিমদের নিজেদের রাষ্ট্র থাকবে। সবাই এই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করবে। যদি রাষ্ট্রই না থাকে, তাহলে ওপরের আদেশগুলো দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক!</p>
<p><strong>এই আয়াত দুটোর বিস্তারিত তাফসির পাওয়া যাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার- السياسة الشرعية في إصلاح الراعي والرعية রাজনীতি) শিরোনামীয় প্রসিদ্ধ গ্রন্থে। পুরো বইটি এই দুই আয়াতের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত।</strong><br />
এরপর সুন্নাহর দলিলের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। রাসূল সা. বলেন-<br />
مَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةٌ .<br />
<em>&#8220;কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছে, অথচ তার গলায় বাইয়াত নেই, সে জাহিলি মৃত্যুবরণ করেছে।&#8221;</em></p>
<p>ইসলামের বিধান লঙ্ঘনকারী কোনো ব্যক্তির হাতে তো একজন মুসলিম কোনোভাবেই বাইয়াত গ্রহণ করতে পারে না। এটা হারাম। যে বাইয়াত আমাদের মুক্তি দেবে তা হলো- আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালাকারীর হাতে বাইয়াত। যতক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের বাইয়াতের পরিবেশ অনুপস্থিত থাকবে, ততক্ষণ প্রত্যেক মুসলিম অবিশ্রান্তভাবে গুনাহর ভাগীদার হতে থাকবে। কাঙ্ক্ষিত বাইয়াত গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত কেবল দুটি কাজই এ গুনাহ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। যথা:</p>
<p>এক. ইসলামি শরিয়তবিরোধী সকল কায়েমি ব্যবস্থার বিরোধিতা করা- অক্ষমতার ক্ষেত্রে অন্তত মনে মনে হলেও।<br />
দুই. সুদৃঢ়ভাবে ইসলামি জীবনব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সর্বদা সক্রিয় থাকা, যেন এই সম্মিলিত চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরে আসে।</p>
<p>খিলাফত, ইমারত, বিচার, ইমাম (শাসক-নেতা), ইমামের গুণাবলি, নাগরিকদের ওপর তার অধিকার, কল্যাণমূলক কাজে সহায়তা, দায়িত্বশীলের জন্য উপদেশ, সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় আমীরের আনুগত্য, দায়িত্বশীলদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ, আল্লাহ নির্ধারিত দণ্ডসমূহ বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয়ে রয়েছে অগণিত দলিল। মানুষের অধিকার সংরক্ষণে শাসকের দায়িত্বসমূহ, বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ, সুস্থ-সবল ও শক্তিমানদের তত্ত্বাবধান, অসুস্থদের সেবা, সালাত প্রতিষ্ঠা, যাকাত আদায়, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম, বিচারিক আইন, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিধি সম্পর্কে এসেছে অজস্র হাদিস।</p>
<p><em>আমরা ইমামত ও খিলাফতসংক্রান্ত বিষয়গুলো ইসলামি আকিদা ও উসুলুদ দ্বীনের কিতাবে দেখতে পাই। ফিকহের কিতাবেও এর বিস্তৃত আলোচনা দেখা যায়। এ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় সংবিধান, প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে আলাদা আলাদা বিশেষায়িত অসংখ্য কিতাবাদি পাওয়া যায়। যেমন- আল মাওয়ারদির আহকামুস সুলতানিয়‍্যাহ, আবু ইয়ালার আহকামুস সুলতানিয়‍্যাহ, ইমামুল হারাইমাইনের আল গিয়াসি, ইবনে তাইমিয়ার সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, ইবনে জামায়াহর তাহরিরুল আহকাম, ইমাম আবু ইউসুফের আল-খারাজ, ইয়াহইয়া ইবনে আদমের আল-খারাজ, আবু উবাইদের আল-আমওয়াল, ইবনে যানজুয়াহর আল-আমওয়াল- এরকম আরও অজস্র বইপুস্তক। এর সবগুলোই রচিত হয়েছে প্রশাসক ও বিচারকদের দায়িত্বের ধরন, প্রকৃতি, বিচারিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি, দায়িত্ব প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামের ইতিহাস থেকে দলিল</strong></p>
<p>ইসলামের ইতিহাস জানাচ্ছে- ঐশী হিদায়াতের ধারক এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল সা. তাঁর শক্তি, চিন্তা ও সামর্থ্যের বড়ো অংশ বিনিয়োগ করেছেন, যা হবে দাওয়াতের ভূখণ্ড এবং তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের একান্ত জায়গা। যে রাষ্ট্রে শরিয়াহর কর্তৃত্ব ছাড়া অন্য কারও কর্তৃত্ব থাকবে না। এজন্য রাসূল সা. বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়েছেন। রাসূল সা. চেয়েছেন, তারা ঈমান আনুক এবং তাকে ও তাঁর দাওয়াহকে সুরক্ষা দিক। এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তায়ালা আউস ও খাযরাজদের কবুল করেন। তাদের মাঝে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে।<br />
আউস ও খাযরাজদের ৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী হজের মৌসুমে রাসূল সা.-এর কাছে আগমন করেন এবং বাইয়াত গ্রহণ করেন। সেইসাথে তারা অঙ্গীকার করেন- তারা নিজেদের এবং নিজ পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের যেভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনি আল্লাহর রাসূলকেও নিরাপত্তা প্রদান করবেন। এরপর আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা শ্রবণ, আনুগত্য, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধার ওপর বাইয়াত গ্রহণ করলেন।</p>
<p>রাসূল সা.-এর মদিনায় হিজরত একটি অনন্য ইসলামি সমাজ গড়ার প্রয়োজনেই হয়েছিল, যে সমাজের ওপর গড়ে উঠবে একটি অনুপম রাষ্ট্র। মদিনা ছিল একটি দারুল ইসলাম, একটি নতুন ধারার রাষ্ট্রের নমুনা- যার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন স্বয়ং রাসূল সা.। তিনি ছিলেন একাধারে ইমাম ও নেতা, ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।<br />
আল্লাহর রাসূলের প্রতিষ্ঠিত সেই রাষ্ট্রে যোগদান করা, রাসূল সা.-এর শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কাজ করা, সে রাষ্ট্রের ছায়ায় জীবনযাপন করা, সে রাষ্ট্রের সেনাপতিদের অধীনে জিহাদ করা- সে সময়ের সব ঈমানদারের ওপর ছিল ফরজ। ইসলামের শত্রুদের ও কুফরের ভূমি থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করা, সারা দুনিয়া থেকে মুমিন মুজাহিদদের দলে যোগদান করা এবং তাদের মতো চরিত্রকে ধারণ করা ছাড়া দ্বীনে পূর্ণতা আসত না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-<br />
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُمْ مِنْ وَلَا يَتِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ حَتَّى يُهَاجِرُوا<br />
&#8220;যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করেনি, হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তোমাদের (মুসলিমদের) নেই।&#8221; (সূরা আনফাল: ৭২)</p>
<p>&#8230; فَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ أَوْلِيَاءَ حَتَّى يُهَاجِرُوا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ &#8230;<br />
&#8220;আল্লাহর পথে হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের কাউকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।&#8221; (সূরা নিসা: ৮৯)</p>
<p>কিছু মুসলিম স্বেচ্ছায় দারুল হারব ও দারুল কুফরে বসবাস করছিল এবং এর ফলে তারা দ্বীনের নির্দেশনা, একান্ত করণীয় বিষয়াদি এবং আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলো স্বচ্ছন্দে ও যথাযথভাবে পালন করতে পারছিল না। আল্লাহ তায়ালা সেসকল মুসলিমদের কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করে বলেন-<br />
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِينَ أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيْمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِيْنَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ فَتُهَاجِرُوْا فِيْهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَلَهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴿2﴾ إِلَّا الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيعُوْنَ حِيْلَةً وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا ﴿﴾ فَأُولَئِكَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَعْفُوَ عَنْهُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَفُوا غَفُوْرًا (1)<br />
&#8220;যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে তাদের প্রাণ কবজ করার সময় ফেরেশতাগণ বলেন- তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে- &#8216;দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম।&#8217; প্রত্যুত্তরে ফেরেশতাগণ বলেন- &#8216;আল্লাহর জমিন কি এমন প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে পারতে?&#8217; এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত মন্দ আবাস! তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও পায় না আল্লাহ অচিরেই তাদের পাপ মোচন করবেন। কারণ, আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, ক্ষমাশীল।&#8221; (সূরা নিসা: ৯৭-৯৯)</p>
<p>আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সা.-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম সর্বপ্রথম নিজেদের নেতৃত্ব নির্ধারণে ব্যস্ত হয়েছেন। এ কাজটা সাহাবাগণ রাসূল সা.- এর দাফনের পূর্বেই সম্পন্ন করেছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম যথাসম্ভব দ্রুত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর হাতে বাইয়াত নেন এবং তাঁর কাছে সকল দায়দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। এরপর প্রত্যেক যুগেই একই পরিস্থিতিতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সাহাবি ও তাবেয়িগণের ঐতিহাসিক এই ইজমাকে পরবর্তী আলিমগণ ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতীক এবং ইমামের হাতে বাইয়াত গ্রহণ ওয়াজিব হওয়ার দলিল হিসেবে গণ্য করেছেন।</p>
<p>বর্তমান সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতা দৃশ্যপটে আসার পূর্বে মুসলিমরা কখনও নিজেদের দ্বীন ও রাষ্ট্রকে আলাদাভাবে দেখেনি। সাম্প্রতিককালে দ্বীন ও রাষ্ট্রকে আলাদা করার প্রবণতা সম্পর্কে রাসূল সা. পূর্বেই আমাদের সতর্ক করেছেন এবং এই প্রবণতার বিরোধিতা করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। যেমন, <em>মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. বর্ণিত হাদিস, তিনি বলেন-</em><br />
<em>سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: ألا إن رحى الإسلام دائرة فدوروا مع الكتاب حيث دار ، ألا إن الكتاب والسلطان سيفترقان فلا تفارقوا الكتاب ألا إنه سيكون عليكم أمراء يقضون لأنفسهم ما لا يقضون لكم إن عصيتموهم قتلوكم وإن أطعتموهم أضلوكم . قالوا : يا رسول الله كيف نصنع؟ قال: كما صنع أصحاب عيسى ابن مريم نشروا بالمناشير وحملوا على الخشب. موت في طاعة الله خير من حياة في معصية الله.</em><br />
<em>&#8220;আমি রাসূল সা.-কে বলতে শুনেছি- &#8216;সাবধান! ইসলামের চাকা একটি বৃত্তে ঘুরছে। সুতরাং তোমরা ইসলামের সাথে ঘুরতে থাকো। সাবধান! কুরআন ও সুলতান অচিরেই আলাদা হয়ে যাবে (অর্থাৎ, দ্বীন ও রাষ্ট্র)। সুতরাং তোমরা কিতাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। সাবধান! অচিরেই তোমাদের মাঝে কিছু শাসকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা নিজেদের জন্য যা ফয়সালা করবে, তোমাদের জন্য তা করবে না। যদি তোমরা তাদের অবাধ্য হও, তারা তোমাদের হত্যা করবে। আর যদি তাদের আনুগত্য করো, তবে তোমাদের পথভ্রষ্ট করবে।&#8217; সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন, &#8216;হে আল্লাহর রাসূল, তখন আমরা কী করব?&#8217; রাসূল সা. বললেন, &#8216;ঠিক ঈসা ইবনে মারইয়ামের অনুসারীরা যা করেছে, তোমরা তা-ই করবে। তাদের করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে, শুলে চড়ানো হয়েছে। আল্লাহর আনুগত্যের মাঝে মৃত্যু, আল্লাহর অবাধ্যতার মাঝে বাঁচার চেয়ে উত্তম&#8217;।&#8221;</em></p>
<p><strong>ইসলামের ভাবধারা থেকে দলিল</strong></p>
<p>ইসলাম ও ইসলামের রিসালার প্রকৃতি হলো- এটি সর্বজনীন দ্বীন, সার্বজনীন শরিয়াহ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই শরিয়াহ জীবনের সকল দিকে মনোনিবেশ করে। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় দিককে ইসলাম অবহেলা করবে- এ কথা চিন্তাতীত। রাষ্ট্রকে অসৎ, নাস্তিক ও পাপীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া ইসলামের বৈশিষ্ট্যের সাথে মানানসই নয়। এটা তো অকল্পনীয় যে- রাষ্ট্রকে অসৎ লোকেরা চালাবে, আর ইসলামি শরিয়াহ শুধু আকিদা ও ইবাদত নিয়ে নির্দেশনা দেবে।</p>
<p>এই দ্বীন শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার দিকে আহ্বান করে এবং যেকোনো ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা অপছন্দ করে। এমনকি রাসূল সা. আমাদের সালাতের কাতার সোজা করতে এবং অধিক জ্ঞানীকে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়েছেন। আরও নির্দেশ দিয়েছেন- সফরের সময়ও কাউকে দায়িত্বশীল বানিয়ে নিতে।</p>
<p><strong>ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর السياسة الشرعية গ্রন্থে বলেন-</strong><br />
<strong>&#8220;এটা জানা জরুরি যে, মানবীয় প্রয়োজন বা জাগতিক বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা দ্বীনের সবচেয়ে বড়ো ওয়াজিব। এটি ছাড়া দ্বীন ও দুনিয়া কোনোটারই অস্তিত্ব নেই। সমাজ ও সামষ্টিকতা ছাড়া আদম সন্তানদের চাহিদাসমূহ পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, মানুষ একে অপরের মুখাপেক্ষী। আর সমাজ ও সামষ্টিকতার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব অপরিহার্য।</strong> সেজন্যই আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন-<br />
إِذَا خَرَجَ ثَلَاثَةٌ فِي سَفَرٍ فَلِيُؤَمِرُوا أَحَدَهُمْ .<br />
&#8220;তোমাদের তিনজন যদি সফরে বের হও, তবে একজনকে আমির হিসেবে নিযুক্ত করো।&#8221;</p>
<p>ইবনে উমর রা.-এর সূত্রে ইমাম আহমাদের বর্ণনা, নবি সা. বলেছেন-<br />
لا يحل لثلاثة يكونون في فلاة من الأرض إلا أمروا عليهم أحدهم<br />
&#8220;তোমাদের তিনজন যদি নির্জন কোনো মেরুতেও থাকো, একজনকে নেতা নিযুক্ত না করা জায়েয হবে না।&#8221;<br />
আমরা জানি, নবি সা. সফরের ছোটো কাফেলায়ও নেতৃত্ব বাধ্যতামূলক করেছেন। আসলে রাসূল সা. সকল সামাজিক প্রেক্ষাপটে নেতৃত্ব সম্পর্কে সতর্ক করতে চেয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজে বাধাদানকে ওয়াজিব করেছেন। এ কাজ দুটো শক্তি ও নেতৃত্ব ছাড়া যথার্থভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয়।</p>
<p>এভাবে মহান আল্লাহ তায়ালা এমন অনেক কিছু আমাদের ওপর আবশ্যক করেছেন, যা ক্ষমতা ও নেতৃত্ব ছাড়া যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব; যেমন- জিহাদ, ন্যায়বিচার, হজ, জুমা, ঈদ, মজলুমের সাহায্য, শরয়ি দণ্ড বাস্তবায়ন ইত্যাদি।<strong> এ কারণে বলা হয়- &#8216;সুলতান (শাসনক্ষমতা) পৃথিবীতে আল্লাহর ছায়া।&#8217;</strong> এসব বাস্তবতা ও জরুরতের কারণেই সালফে সালেহিনের অনেকে যেমন- ফাদল ইবনে ইয়াজ, আহমাদ ইবনে হাম্বলসহ অনেকে বলতেন- &#8216;যদি আমাদের ইচ্ছাপূরণের সুযোগ থাকত, তবে আমরা শাসনক্ষমতা চাইতাম।&#8221;<br />
ইমামদের এমন আকাঙ্ক্ষার কারণ হলো- শাসনক্ষমতার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বহু সৃষ্টির কল্যাণ সাধন করেন।</p>
<p>একটি জীবনধারা হিসেবে ইসলাম মানবজীবনকে নিবিড়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সমাজকে শাসন করতে চায় এবং আল্লাহর আদেশের আলোকে মানবচরিত্রকে সাজাতে চায়। বক্তৃতা-বিবৃতি কিংবা সুন্দর সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মানবচরিত্রের পূর্ণতা সাধন সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান, নসিহত ও শিক্ষা শুধু মানুষের বিবেকের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ, বিবেকের অসুস্থতা বা মৃত্যুর সাথে এই সকল বিধানের বাস্তবায়নের অনুভূতি ও শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।<br />
আমিরুল মুমিনীন উসমান ইবনে আফফান রা. বলেন-<br />
إن الله لينع بالسلطان ما لا يزع بالقرآن<br />
&#8220;কিছু কাজ আল্লাহ তায়ালা সুলতানের (রাষ্ট্রশক্তি) হাত দিয়ে করান- যা কেবল কুরআনের (উপদেশের) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় না।&#8221;<br />
কিছু মানুষকে কুরআন ও মিজান সুপথ দেখায়, আর কিছু মানুষকে সুপথে রাখতে পারে কেবল আইন ও লোহা (শাস্তির ভয়)। আল্লাহ তায়ালা বলেন-<br />
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ<br />
وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ<br />
&#8220;নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও মিযান- যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে; আর আমি লৌহ দিয়েছি যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।&#8221; সূরা হাদিদঃ ২৫</p>
<blockquote><p>ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-<br />
“যে কিতাব থেকে সরে যাবে, তাকে লোহা (শক্তি) প্রয়োগ করে ঠিক করা হবে। আর এ কারণেই দ্বীনের তত্ত্বাবধায়করা কুরআন ও তরবারির সমন্বয়ে কাজ করেছেন।&#8221;</p>
<p>ইমাম গাযালি রহ. বলেন- &#8220;দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়া ছাড়া দ্বীন পূর্ণতা পায় না। রাষ্ট্র ও দ্বীন জমজ ভাই। দ্বীন মৌলিক স্তম্ভ, আর শাসক তার রক্ষক। যার মৌলিকত্ব নেই, তার অস্তিত্বই নেই। আর যার রক্ষক নেই, তার ধ্বংস অনিবার্য। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের পরিচালনা শাসক ছাড়া পূর্ণতা পায় না।&#8221;</p></blockquote>
<p>ইসলামি জ্ঞানের উৎসগুলোতে যদি ইসলামি রাষ্ট্রের আবশ্যকতার কথা নাও আসত, যদি রাসূল সা. ও সাহাবিগণ এর বাস্তবায়ন করে নাও দেখাতেন, তারপরও ইসলামের স্বভাবজাত প্রকৃতি নিজ প্রয়োজনেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে বাধ্যতামূলক করে দিত। আর তা হতো ইসলামের বিশ্বাস, প্রতীক, শিক্ষা, বোধ, চারিত্রিক গুণাবলি, নিয়মনীতি ও শরিয়তের মাধ্যমে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।<br />
ইসলামের দাবি বাস্তবায়নে প্রতিটি যুগেই রাষ্ট্রের চাহিদা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে এর চাহিদা আরও তীব্রতর। কেননা, এখন চিন্তা ও দর্শনভিত্তিক আদর্শিক রাষ্ট্রের প্রবর্তন হয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইন, বিচার, অর্থনীতি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রাজনীতি সবই এই আদর্শের মানদণ্ডে চলে। উদাহরণত আমরা সমাজতান্ত্রিক ও কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি।</p>
<p><strong>আধুনিক বিজ্ঞান এখন উন্নতির চরম শিখরে অবস্থান করছে। রাষ্ট্র চাইলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের চিন্তা, বিশ্বাস, আবেগ-অনুভূতি, রুচি, চরিত্র ইত্যাদির ওপর কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। এমন সুযোগ পূর্বের কোনো সময় ছিল না। রাষ্ট্র এখন ওপরে বসে যন্ত্র ব্যবহার করে সমাজের মূল্যবোধ, চিন্তার গণ্ডি ও চরিত্রকে পরিবর্তন করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এ কাজে রাষ্ট্রের শক্তিশালী কোনো প্রতিপক্ষও নেই।</strong><br />
<strong>ইসলামি রাষ্ট্র একটি আদর্শিক রাষ্ট্র। এটি একটি বিশ্বাস এবং জীবনধারার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রু থেকে জাতিকে রক্ষার কোনো নিরাপত্তাযন্ত্র নয়; বরং এ রাষ্ট্রের দায়িত্বসীমা অনেক বিস্তৃত ও গভীর। জাতিকে ইসলামের বুনিয়াদ ও শিক্ষার আলোকে শিক্ষিত ও অনুশীলনকারী হিসেবে গড়ে তোলা- এই রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ইসলামি আকিদা, চিন্তা ও শিক্ষার বিকাশ এবং বাস্তব জীবনে এর অনুশীলনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা হবে প্রত্যেক সত্যনিষ্ঠের জন্য অনুকরণীয় এবং বিপথগামীর বিপক্ষে উদাহরণ।</strong></p>
<blockquote><p>এজন্যই ইবনে খালদুন খিলাফতের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে-<br />
&#8220;শরিয়তপ্রণেতার কাছে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার পুরোটাই আখিরাতের কল্যাণের জন্য বিবেচ্য। সুতরাং, সমগ্র মানবতাকে পরকালীন ও দুনিয়াবি কল্যাণের বিবেচনায় শরয়ি দর্শনের দিকে উদ্বুদ্ধ করা এবং দ্বীন ও তৎসংশ্লিষ্ট দুনিয়ার রাজনীতি রক্ষণাবেক্ষণে শরিয়তপ্রণেতার প্রতিনিধিত্ব করাই খিলাফত।&#8221;<br />
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রশংসায় এমন গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, যা রাষ্ট্র ও কর্তৃত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন-<br />
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنْهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَآتَوُا الزَّكُوةَ وَ آمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ<br />
&#8220;আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ হতে বিরত করবে।&#8221; সূরা হজ: ৪১</p></blockquote>
<p><em>রিবয়ি ইবনে আমির রা. পারসিকদের সেনাপতি রুস্তমকে ইসলামি রাষ্ট্রের নির্দশন নিয়ে বলেছিলেন-</em><br />
<em>الله ابتعثنا لنخرج من شاء من عبادة العباد إلى عبادة الله، ومن ضيق الدنيا إلى سعتها، ومن جور الأديان إلى عدل الإسلام .</em><br />
<em>&#8220;আল্লাহ তায়ালা আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে বান্দার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে আখিরাতের প্রাচুর্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্যান্য ধর্মের অত্যাচার-অনাচার থেকে ইসলামের সুবিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।&#8221;</em><br />
<em>ইসলামের আদর্শিক রাষ্ট্র কোনো আঞ্চলিক বা জাতীয়তাবাদী চরিত্রের রাষ্ট্র নয়; বরং এ রাষ্ট্র একটি বৈশ্বিক বার্তার বাহক। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন- তাদের কাছে থাকা আলো ও হিদায়াতের দিকে গোটা মানবতাকে আহ্বান জানানোর। তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন মানবতার ওপর সাক্ষী হওয়ার। পুরো মানবজাতির শিক্ষকতার দায়িত্বও তাদের ওপর অর্পিত।</em></p>
<p>মুসলিমরা অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর মতো ইতিহাসের গতিধারায় গড়ে উঠা কোনো জাতি নয়। মুসলিমরা নিজ থেকে তৈরি হয়নি এবং নিজেদের জন্যও তৈরি হয়নি। মূলত মানবজাতির কল্যাণের জন্য মুসলিমদের বের করে নিয়ে আসা হয়েছে। আর এজন্য আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের বানিয়েছেন মধ্যপন্থী জাতি। মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের উদ্দেশে বলেছেন-<br />
وَكَذلِكَ جَعَلْتُكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُوْنُوْا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ<br />
&#8220;আমি এভাবে তোমাদের মধ্যপন্থী উম্মাহ করেছি, যেন তোমরা মানবতার জন্য সাক্ষী হও।&#8221; সূরা বাকারা: ১৪৩<br />
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ<br />
&#8220;তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে মানবতার জন্য বের করা হয়েছে।&#8221; সূরা আলে ইমরান: ১১০</p>
<p>আমরা ইতিহাসে পাতা উল্টালে দেখতে পাই, হুদাইবিয়ার সন্ধির পর প্রথম সুযোগেই রাসূল সা. তৎকালীন দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য সকল রাজা-বাদশাহ ও আমিরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। তাওহিদের কাছে সমর্পণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন- &#8216;ঈমানের পথ গ্রহণ না করলে নিজেদের ও অধীনস্থদের পাপের ভার বইতে হবে।&#8217; রাসূল সা. এ চিঠিগুলোর সমাপ্তি টানতেন এ আয়াতের মাধ্যমে-<br />
قُلْ يَأَهْلَ الْكِتٰبِ تَعَالَوْا إِلى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ )<br />
&#8220;আপনি বলে দিন- &#8216;হে আহলে কিতাব, তোমরা এমন এক কালিমার দিকে এসো, যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সমান। আর তা হলো- আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করব না এবং আল্লাহ ছাড়া আমাদের কেউ অপর কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করব না।&#8217; এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দিন- &#8216;তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমরা মুসলিম&#8217;।&#8221; সূরা আলে ইমরান: ৬৪</p>
<p><strong>ইসলামের ধারক একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা </strong></p>
<p>বর্তমান সময়ে ইসলামি দাওয়াহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, ছোটো পরিসরে হলেও একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই রাষ্ট্রটি তার ধ্যান- ধারণা, সরকারব্যবস্থা, জীবনাচার, সভ্যতা, বস্তুগত দিক ও সাহিত্যে ইসলামের সামগ্রিক ধারণাকে লালন করবে। এই রাষ্ট্রের দরজা খোলা থাকবে জুলুম, বিদআত ও কুফরের দেশ থেকে হিজরতকারী মুমিনদের জন্য। শুধু ইসলামের জন্য নয়, গোটা মানবতার জন্যই এমন একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন। এই ইসলামি রাষ্ট্রটি মানবতার সামনে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়ের নমুনা পেশ করবে।<br />
উদাহরণ পেশ করবে পার্থিবতা ও আধ্যাত্মিকতার সুষম ভারসাম্যের। এ রাষ্ট্র হবে যুগপৎভাবে সভ্যতার উন্নতির ও চরিত্রের উৎকর্ষতার নজির, হবে বৃহত্তর ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের পথে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। এই ইসলামি রাষ্ট্রই গোটা উম্মাহকে পর্যায়ক্রমে ইসলামি খিলাফতের ছায়ায় একই তোরণের নিচে নিয়ে আসবে।</p>
<p>বাস্তবতা হচ্ছে- সকল বিরোধী শক্তিগুলো একাট্টা হয়ে এমন একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্মুখে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা কোনোমতেই এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হতে দেওয়াকে বরদাশত করবে না। এই রাষ্ট্রকে ঠেকাতে তারা নিজেদের সর্বশক্তি ব্যয় করবে- এ রাষ্ট্রটি যত কম দৈর্ঘ্য বা জনসংখ্যারই হোক না কেন। এমনকি পশ্চিমারা মার্কসীয় রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করে। কমিউনিস্টরা গণতন্ত্রীদের সাথে সন্ধি করে। কিন্তু তাদের কেউই ইসলামি রাষ্ট্রকে বরদাশত করতে রাজি নয়।<br />
বিশ্বের কোথাও ইসলামি আন্দোলন দাঁড়িয়ে গেলে পশ্চিমারা একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। সাথে সাথে হুমড়ি খেয়ে পড়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কুফরি শক্তিগুলো। তারা সুন্দর সুন্দর কথা বলে। ছলনা দেখায়। আবার খাদ্য অবরোধও করে। নির্যাতনের স্টিমরোলার চালায়। হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। একটার পর একটা হামলা চালাতেই থাকে। তাই ইসলামি আন্দোলনগুলোকে সর্বদা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আশার আলো দেখতে হয়। এক সাগর হতাশা ও আঘাতকে সহ্য করে কাঙ্ক্ষিত উচ্চাশার সোপানের দিকে এগিয়ে চলতে হয়।</p>
<p><strong>আমাদের যদি একটা সরকার থাকত</strong></p>
<p><strong>ইমাম হাসান আল বান্না বলেন-</strong><br />
<strong>&#8220;আমাদের যদি বিশুদ্ধ ইসলাম, প্রকৃত ঈমান, বিশুদ্ধ চিন্তার ধারক এবং এর বাস্তবায়নকারী একটি সরকার থাকত! যে সরকার তাদের কাছে সঞ্চিত সম্পদ ও জ্ঞানের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার ঐতিহ্য ও মহত্ত্ব সম্পর্কে সমঝদার এবং যারা বিশ্বাস করে- উম্মাহর সকল ব্যাধির সমাধান ও মানবজাতির পথপ্রাপ্তি ইসলামেই রয়েছে। তাহলে আমরা গোটা দুনিয়াকে ইসলামের খুঁটিতে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানাতে পারতাম। অন্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানাতে পারতাম- আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার ওপর গবেষণা আর পর্যবেক্ষণের। তাদের মাঝে নিয়মিত দাওয়াতি কার্যক্রম, সৌহার্দ্য বিনিময় এবং প্রতিনিধি দল প্রেরণের মাধ্যমে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে পারতাম। অন্যান্য সরকারের তুলনায় এটা হতো আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কার্যকারিতার সমন্বয়। এর মাধ্যমে জাতি প্রাণশক্তি নবায়নের এবং গৌরব ও আলোকশক্তি রক্ষার সুযোগ পেত। সেইসাথে নাগরিকদের হৃদয়ে উদ্যম ও কর্মস্পৃহা জাগত এবং তাদের কার্যশক্তি প্রভাবিত হতো।</strong></p>
<p>মজার ব্যাপার হলো, সমাজতন্ত্রীরা নিজেদের মতবাদের গুণকীর্তন প্রচার করে। অর্থ খরচ করে নিজ আদর্শের দিকে ডাকে। নিজেদের পথচলায় তারা জনতাকে পাশে চায়- যেন তাদের পথ উদ্দীপনাময় ও দাপুটে হয়। সমাজতন্ত্রীরা অনুসারীদের উদ্দীপনার খোরাক জোগাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তারা চায়, সকল রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের সামনে নুয়ে পড়ুক।<br />
সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদগুলোর কিছু পাগলপ্রাণ সমর্থক থাকে। তারা নিজেদের ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তা, লেখনীশক্তি, সম্পদ, প্রচারমাধ্যম সবকিছু এ মতবাদের প্রসার ও প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যয় করে, যেন এ মতবাদকে কেন্দ্র করেই তাদের বাঁচা-মরা আবর্তিত হচ্ছে।<br />
আমাদের সামনে ইসলামের দিকে আহ্বানকারী এমন কোনো রাষ্ট্রের উপস্থিতি নেই- যে রাষ্ট্রটি ইসলামের সৌন্দর্যসমূহ একত্রিত করে নিষ্কলুষ ও অবিকৃত ইসলামকে একটি আন্তর্জাতিক নীতি হিসেবে উপস্থাপন করবে এবং যার মাধ্যমে মানবতার সকল সমস্যার সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান সম্ভব হবে।</p>
<p>মুসলিমদের ওপর দাওয়াতি কাজ ফরজ। এটা যেমন ব্যক্তিপর্যায়ে ফরজ, ঠিক তেমনি সামষ্টিক পর্যায়েও ফরজ। অর্থাৎ, জাতিগতভাবে মুসলিমদের ওপর দাওয়াতি কাজ ফরজ। কোনো ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে উঠার পূর্বেও দাওয়াতি কাজ ফরজ। রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার পর এ কাজটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-<br />
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ<br />
&#8220;তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই, যারা কল্যাণের দিকে মানুষকে ডাকবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। তারাই হবে সফলকাম।&#8221; সূরা আলে ইমরান: ১০৪</p>
<p>আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের অবস্থা কী? আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রায় সকলেই বিজাতীয় শিক্ষায় বড়ো হয়েছে। তারা আধিপত্যবাদীদের চিন্তার অনুগত এবং তাদের চিন্তার বৃত্তেই ঘূর্ণায়মান। আধিপত্যবাদীদের সন্তুষ্টি ছাড়া আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানরা নিশ্বাসও নিচ্ছে না।<br />
আমরা তাদের বলেছি এবং বলছি- আপনারা স্বাধীনচেতা সিদ্ধান্ত নিন এবং আধিপত্যবাদীদের অনুকরণ ছেড়ে বেরিয়ে আসুন। এটা আপনাদের অবস্থান দুর্বল করবে না; বরং শক্তিশালী করবে। আফসোস! আমাদের কথাগুলো তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না।<br />
আমরা বড়ো আশা-ভরসা নিয়ে মিশরের শাসকের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য! এই দাওয়াতের কোনো কার্যকর প্রভাব তৎকালীন শাসকের মাঝে পরিলক্ষিত হয়নি। যে জাতি নিজের অস্তিত্ব, বাসস্থান, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইসলাম খুইয়ে বসেছে, তারা কীভাবে অন্যের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেবে? সে জাতি তো অন্যকে ইসলামের দিকে নিয়ে আসার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।</p>
<p>প্রিয় ভাইয়েরা! বর্তমানে মুসলিম জাতি দাওয়াতি দায়িত্ব পালন করছে না। আর দাওয়াতি কাজে মনোনিবেশ না করার কারণ কী জানেন? কারণ, বর্তমান প্রজন্মের দাওয়াতি কাজে উৎসাহ ও অক্ষমতা প্রমাণিত। সুতরাং, এ দায়িত্ব নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে।<br />
প্রিয় তরুণ ভাইয়েরা! তোমাদের দাওয়াতি তৎপরতায় সৃজনশীলতা আনো। দাওয়াতি কাজে পরিশ্রম করো। মানুষকে নাফস ও কলবের মুক্তি শেখাও। চিন্তা ও বুদ্ধির প্রকৃত স্বাধীনতা বাতলে দাও। জিহাদ ও কর্মে স্বাধীন করে তোল। কুরআন ও ইসলামের প্রাচুর্যে সাধারণ মানুষের দ্বিধাগ্রস্ত মনকে ভরিয়ে দাও। তাদের মুহাম্মদি ফৌজে শামিল করে নাও। অচিরেই দেখবে, তাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ মুসলিম শাসক হয়ে অবির্ভূত হয়েছে। আর সেই শাসক নিজেও জিহাদ করবে, অন্যদেরও জিহাদে উৎসাহ জোগাবে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ তারিক মাহমুদ</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/influence-of-islam-on-state-and-politics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15774</post-id>	</item>
		<item>
		<title>লিবারেলিজম ও লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 15 Apr 2025 14:56:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15761</guid>

					<description><![CDATA[মানবতাকে দীর্ঘ বারোশত বছর আদালত ও মারহামাতের সুশীতল ছায়া দানকারী এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধনকারী ইসলামী সভ্যতার পতনের পরে মানবতাকে জাহেলিয়াত ও জুলুমের নিগূঢ় আধাঁরে নিপতিতকারী বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার যে আধুনিক শোষণ চলছে, এ শোষণকে বুঝার জন্য লিবারেলিজম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানবতাকে দীর্ঘ বারোশত বছর আদালত ও মারহামাতের সুশীতল ছায়া দানকারী এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধনকারী ইসলামী সভ্যতার পতনের পরে মানবতাকে জাহেলিয়াত ও জুলুমের নিগূঢ় আধাঁরে নিপতিতকারী বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার যে আধুনিক শোষণ চলছে, এ শোষণকে বুঝার জন্য লিবারেলিজম কী, লিবারেলিস্টদের ওয়াদা কী, তারা বিশ্বকে মূলত কী দিতে চায়, তাদের তাকলীফ তথা প্রস্তাবনা কী- এ বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝা জরুরী। লিবারেলিজম বিগত প্রায় তিন শতাব্দীব্যাপী প্রভাবশালী ও বিজয়ী একটি চিন্তা। আমরা বর্তমানে কেমন দুনিয়ায় বসবাস করছি, এ দুনিয়ায় কোন কোন চিন্তাধারা প্রভাবশালী, তা যদি আমরা বুঝতে না পারি, তাহলে আমাদের পক্ষে ইসলামের আহ্বান, ইসলামের আদালত, ইসলাম কর্তৃক মানুষকে দেওয়া মর্যাদার বিষয়গুলোকে অন্য কোনো চিন্তার বিপরীতে যৌক্তিক ও বিজয়ী হিসেবে হাজির করা সম্ভব হবে না। লিবারেলিজমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই এ মুহূর্তে আমাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো বর্তমানের এ জাহেলিয়াতকে ভালোভাবে জানা ও বুঝা। হযরত উমর (রা.) এর ভাষায়- &#8220;যে জাহেলিয়াতকে ভালোভাবে চিনতে পারেনি, জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি, তার পক্ষে ইসলামকে খুব ভালোভাবে জানা সম্ভব নয়।&#8221; লিবারেলিজম এবং এর চিন্তাধারা পৃথিবীতে একটি প্রগতিশীল চিন্তাধারা হিসেবে পরিচিত। এ আলোচনার পূর্বে প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে প্রগতিবাদ সম্পর্কে আলোকপাত জরুরী। সাধারণত প্রগতিবাদের দুটি ধারণা পাওয়া যায়:</p>
<p>১. সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও</p>
<p>২. লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ।</p>
<p>কোনো চিন্তাধারার স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো তা আগামীর পৃথিবীকে কী দিতে চায়, মানুষকে কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়, তা তুলে ধরতে পারা: অন্যথায় তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিটি চিন্তাধারার একটি ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন থাকা বাঞ্ছনীয়। যেমন- বর্তমান বস্তুবাদী World View বা বিশ্বদর্শনের একটি ধারণা হলো, যত দিন যাচ্ছে, পৃথিবী তত সুন্দর এবং কল্যাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একইভাবে আমাদের মুসলমানদের একটি শ্রেণির ইতিহাসের ব্যপারে ধারণা হলো যত দিন যাচ্ছে, মানুষ তত খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো এ দুটির একটি ইফরাত, অন্যটি তাফরিত। কারণ সত্যিকারার্থে মানবজাতির ইতিহাসের প্রকৃতি শুধুমাত্র উর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী নয়, বরং তা চক্রাকার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ ব্যপারে বলেন,</p>
<p><strong>&#8220;আমি মানুষের মধ্যে খারাপ দিন এবং ভালো দিনগুলোকে চক্রাকারে আবর্তন করি।&#8221;</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের ইতিহাস দর্শনের দিকে লক্ষ্য করলে আমাদের ইতিহাসের প্রকৃতিতে অনেকটা এ রকমই দেখতে পাবো, কখনো তা উর্ধ্বমুখী, কখনো নিম্নমুখী, আবার কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে উর্ধ্বমুখী হয়েছে, আবার নিম্নমুখী হয়েছে। অর্থাৎ তা একটি আবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এটিই সবচেয়ে যৌক্তিক ইতিহাস দর্শন। ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন থাকার ধারাবাহিকতায় সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদেরও আলাদা আলাদা ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন রয়েছে এবং তারা পৃথিবীকে তাদের ভবিষ্যৎ দর্শনের দিকেই ধাবিত করতে চায়। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ উভয়েই প্রগতি (Progress) চায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো তাদের প্রগতির (Progress) সর্বশেষ পর্যায় কী, তারা কোথায় গিয়ে থামতে চায়? সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদের ক্ষেত্রে প্রগতির সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো শ্রেণি বৈষম্য, অর্থাৎ বুর্জোয়া ও প্রলিটারিয়েতদের মধ্যকার সংঘাত। আর তাদের প্রগতির শেষ পর্যায় হলো শ্রেণিহীন একটি সমাজ বা Classless Society তৈরি, যে সমাজে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো সম্পদ থাকবে না, সবাই সমান থাকবে এবং ধর্মের কোনো স্থান থাকবে না। বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রের যে ধরণ, তাদের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের ধরণ তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের আকাঙ্ক্ষিত সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, পরিবারের সাথে পরিবারের সম্পর্কসহ এ ধরনের বিষয়গুলো নতুন করে বিন্যস্ত হবে। কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিকের মতে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবারের অস্তিত্বই থাকবে না। তারা তাদের এ চিন্তাধারাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, বলকান এবং আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই, তাদের কৃত ওয়াদা এবং তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।</p>
<p>এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের &#8220;অ্যানিমেল ফার্ম&#8221; (Animal Farm), যেখানে সুস্পষ্টভাবে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদের ইতিহাস পড়লেই বুঝা যায়, এটি ছিল মূলত একটি ইউটোপিয়া, যার সাথে মানুষের ফিতরাত ও মানব ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই সাথে এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল একটি আন্দোলন, যে আন্দোলন মানুষের শক্তিকে পুঁজি করে, পুঁজিবাদের প্রতি মানুষের আক্রোশকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল একটি ব্যর্থ বিপ্লব, যা কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির বেশি, কিন্তু শুধুমাত্র সোভিয়েত রাশিয়ার ৭০ বছরের আমলে মারা গেছেন ৬ কোটিরও বেশি মানুষ। একটি বিপ্লব বা একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী পরিমাণ মানুষকে খুন করা হয়েছে! এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পরেই তাদের উপলব্ধিতে এসেছে যে, তাদের এ তথাকথিত মতবাদ প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এবং এ মতবাদ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যদিও বিভিন্ন আদলে তাদের আন্দোলন এখনো জারি আছে, কিন্তু তার অনুভূতি যতদিন যৌবনের তেজ থাকে, শক্তি-সামর্থ থাকে, ততদিনই জারি থাকে, তারপর তারা কেউ ব্যবসা করে, কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঢোকে, তারপর তারা লিবারেলিস্ট হয়ে যায়। এটিই তাদের ইউটোপিয়া। এ ধরণের ইউটোপিয়া লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদের প্রস্তাবিত ভবিষ্যত দর্শনেও পরিলক্ষিত।</p>
<p>সমাজতান্ত্রিক এবং লিবারেলিস্টদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হলো সমাজতান্ত্রিকরা বিপ্লবকে (Revolution) প্রাধান্য দিয়ে থাকে, অন্যদিকে লিবারেলিস্টরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক পরিবর্তন, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন, আইনের পরিবর্তন, সংস্কৃতির পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মৌলিক এ পার্থক্যের দিক থেকে লক্ষ্য করলে উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই ব্রিটেনের কথা উল্লেখ করা যায়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের একটি হলো ব্রিটেন, যে রাষ্ট্র আমূল পরিবর্তনের (Radical change) মাধ্যমে স্থিতিশীলতা লাভ করেছে। ব্রিটেনে সে অর্থে কোনো রক্তাক্ত বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। অনন্য শক্তিধর দেশ জাপানও কোনো রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে সমাজ পরিবর্তনের পন্থা হিসেবে রক্তাক্ত বিপ্লবকে বেছে নেওয়া অন্যতম প্রধান রাষ্ট্র হলো ফ্রান্স। ফ্রান্স আজও স্থিতিশীল হতে পারেনি, আজও হরতালে অগ্নি সংযোগে প্যারিসের রাজপথ পুড়ে যায়। নেপোলিয়নের ফ্রান্সে বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিমাণ মানুষ মারা গিয়েছে, তা অকল্পনীয়। আর তাদের এ বিপ্লবের কারণ হলো যে কোনো মূল্যে প্রভাব বিস্তার। সমাজের একটি অংশ যখন তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করবে এবং যখন তারা শক্তির অধিকারী হবে, তখন সমাজের বাকি অংশ যদি তাদের পক্ষে না আসে বা তাদের মতাদর্শের আলোকে কাজ করতে না পারে, তাহলে তারা যে কোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করবে। তারা হয় তাদের হত্যা করবে, না হয় নির্বাসনে পাঠাবে। এটিই তাদের বিপ্লবের মূল কথা।</p>
<p>একইভাবে লিবারেলিস্টদের চিন্তাধারায় বিপ্লবের পরিবর্তে বিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তাঁদের মূলনীতি হলো Revolution নয় Evolution। অর্থাৎ তারা মানুষকে ধাপে ধাপে পরিবর্তন, পরিবর্ধন এমনকি রূপান্তরের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যায়। লিবারেলিজমের আলোকে সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো শিক্ষা, মিডিয়া, আইন এবং অন্যান্য উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ। যার কারণে আমরা তাদের পন্থা সহজে বুঝতে পারি না। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, <strong>সমাজতান্ত্রিকরা সরাসরি মাথায় আঘাত করে</strong><strong>, </strong><strong>আর লিবারেলিস্টরা এনেস্থিসিয়া দিয়ে অচেতন করে ধীরে ধীরে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে যায়</strong><strong>, </strong><strong>অথচ আমরা টেরও পাই না।</strong> <strong>কিন্তু উভয়টিরই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো মানুষকে শোষণ করা এবং মানুষের উপর আধিপত্য কায়েম করা।</strong></p>
<p>এ সমাজতান্ত্রিক এবং লিবারেলিস্টদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যও রয়েছে, তা হলো উভয়েই নিজেদের চিন্তাধারাকে বৈজ্ঞানিক বলে দাবি করে এবং তারা দাবি করে যে তারা ডগম্যাটিক নয়। তাদের অন্যতম একটি চিন্তাধারা হলো ইউরোপের একজন নিউটনের পূর্বে বিজ্ঞান ছিল না, সবই ছিল থিওলজি বা হিকমা। যেহেতু তারা তার পরবর্তী যুগে বসবাস করছে, তাই তাদের জন্য প্রযোজ্য হলো; বৈজ্ঞানিক নয়, এমন বিষয়গুলোকে ধর্তব্যে না নেওয়া। তারা তাদের নিজ নিজ চিন্তাধারাকে বৈজ্ঞানিক দাবি করার কারণ হলো তারা মনে করে তাদের চিন্তাধারাকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে, এছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পন্থা নেই। আর তা বাস্তবায়িত হলে দুনিয়া একটি সুন্দর দুনিয়া হবে এবং এর ফলে দুনিয়া সমৃদ্ধির সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তারপর আর কোনো ধরনের অনুসন্ধানের প্রয়োজন হবে না। তখন ইতিহাসও তার লক্ষ্যে উপনীত হবে। তারপর তাদের মধ্যে কেউ কেউ &#8220;The End of History&#8221; বই রচনা করবে! অতঃপর তাদের সজ্জিত দুনিয়ায় সকলকে বসবাস করতে হবে।</p>
<p>আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে বলা যায়, সমাজতান্ত্রিক ও লিবারেলিস্টদের দর্শনকে বৈজ্ঞানিক বলার মূল কারণ হলো তাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা। মুসলমানরা আখিরাতের প্রতি যেমন দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তাদের চিন্তাধারার প্রতি তাদের বিশ্বাসও অনুরূপ। অর্থাৎ যে বিষয়টি বৈজ্ঞানিক, সেটিই একমাত্র সত্য। গোটা বিশ্বকেও এ সত্য মেনে নিতে হবে, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, অন্যথায় পরিণতি হবে করুণ। তাদের মতে, তাদের এ প্রগতির সামনে যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে যে কোনো মূল্যে, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সরিয়ে দিতে হবে, এ দুনিয়াতে বসবাস করার কোনো অধিকার তার নেই। সোভিয়েত রাশিয়া এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। তৎকালীন সময়ে যারা পুঁজিবাদ এবং বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী ছিল, তাদেরকে হত্যা করা হতো বা নির্বাসনে পাঠানো হতো। বর্তমানে বলকান, ককেশাস এবং সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তার মূল কারণও এটিই। তাদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সামনে যারাই দাঁড়াবে, যারাই তাদের ভিশনের বিরোধী, তারা একইসাথে উন্নতি, অগ্রগতি এবং প্রগতির বিরোধী, আর এজন্য তাদের যে কোনো মূল্যে নিঃশেষ করতে হবে। লিবারেলিজম নিয়ে আলোচনার সর্বাগ্রে লিবারেলিজমের সংজ্ঞা নিয়ে আলোকপাত জরুরী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এন্ড্রো হেইউড (Andrew Heywood) তার &#8220;Politics&#8221; নামক গ্রন্থে লিবারেলিজমের মূল ধারণা (key-idea) হিসেবে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>১. Individualism.</li>
<li>২. Freedom.</li>
<li>৩. Reason.</li>
<li>৪. Equality.</li>
<li>৫. Toleration.</li>
<li>৬. Consent.</li>
<li>৭. Constitutionalism.</li>
</ul>
<p>এখানে তারা reason এর ক্ষেত্রে progress বা প্রগতিকে এবং equality এর ক্ষেত্রে meritocracy কে প্রাধান্য দিয়েছে। Consent এর ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, চুক্তির ভিত্তিতে সমতা থাকতে হবে। সাদা চোখে এ ধরনের বই পড়লে কেউ লিবারেলিজমের বিরোধিতা করবে না, কিন্তু এর পেছনের দর্শন জানলে যে কেউ আশ্চর্য হয়ে যাবে। তারা আমাদের সবাইকে প্রতারিত করে, পূর্বে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এনেস্থিসিয়া দিয়ে অচেতন করে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হচ্ছে, অথচ আমরা টেরই পাচ্ছি না। কিন্তু যখন এনেস্থিসিয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে, তখন আমরা দেখছি আমাদের কারো চোখ নেই, কারো হাত নেই, কারো পা নেই! এহেন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় হলো আমাদের ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হবে যে, তারা কীভাবে আমাদের প্রতারিত করছে। আর এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জানতে হবে লিবারেলিজম কী, লিবারেলিস্টরা কেমন স্বপ্ন নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছিল এবং তাদের মূল ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন কী। মূলত লিবারেলিস্টদের ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন হলো তারা দুনিয়াকে জান্নাতে পরিণত করবে। কিন্তু তারা কেমন জান্নাতের স্বপ্ন দেখে? লিবারেলিজমের পেছনে কার্যকরী সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। মূলত ব্রিটিশ সম্প্রসারণবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক যে বিকাশ, এ চিন্তার পেছনের মূল চিন্তা হলো লিবারেলিজম। অর্থাৎ ব্রিটিশ পুঁজিবাদের সম্প্রসারণই হলো লিবারেলিজমের মূল লক্ষ্য।</p>
<p>লিবারেলিস্ট অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার &#8220;The End of History and The Last Man&#8221; বইয়ের মূল কথা হলো- &#8220;অর্থনীতির ক্ষেত্রে লিবারেলিজম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেসি। এ দুটি ছাড়া মানুষের আর কোনো গন্তব্য নেই। আর এ গন্তব্যে পৌঁছানোর মানে হলো আর কোনো কিছু অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই।&#8221;</p>
<p>Bernard Mandeville এর বিখ্যাত বই &#8220;The Fable of the Bees&#8221;, তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এ বইয়ে তিনি আখলাক এবং অর্থনীতিকে পরস্পর থেকে আলাদা করছেন। তবে এ আখলাক হলো খ্রিস্টান ধর্মের আখলাক। তার মতে অর্থনীতির মূলভিত্তি হলো সুদভিত্তিক পুঁজিবাদ। এ বইটি মূলত একটি উপন্যাস, যেখানে মৌমাছিদের ঠিকভাবে কাজ না করা, অলস বসে থাকার পেছনে ধর্মীয় (খ্রিস্টান ধর্ম) বৈরাগ্যবাদকে তুলে ধরা হয়েছে। যখন দ্বীন থেকে আখলাককে সরিয়ে নেওয়া হলো, তখন মৌমাছিদের উৎপাদন ব্যপকভাবে বেড়ে যায় এবং তারা সমৃদ্ধি লাভ করে। মৌমাছিরা ঠিকভাবে কাজ না করার কারণ হলো বৈরাগ্যবাদ, আর এ বৈরাগ্যবাদ খ্রিস্টানদের রূহানিয়াত। ম্যান্ডেভিলের ভাষ্যে, &#8220;যদি আমরা উন্নতি এবং অগ্রগতি চাই, তাহলে আমাদের আখলাক ও দ্বীন থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যথায় আমরা উন্নতি করতে পারবো না।&#8221; এ বইয়ের উপর ভিত্তি করে অর্থনীতির জনক হিসেবে পরিচিত এডাম স্মিথ তার &#8220;The Wealth of Nations&#8221; বই লিখেন, যে বইকে অর্থনীতির বাইবেল বলা হয়। এ বই আখলাক এবং অর্থনীতিকে আলাদা করাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। পরবর্তীতে এ বইয়ের উপর ভিত্তি করেই মার্কেন্টালিজম বা ব্রিটেনের অর্থনীতি দাঁড়ায়। এখানেই লিবারেলিস্ট অর্থনীতির বীজ গ্রোথিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উপরোক্ত বিষয়গুলোকে ভালোভাবে না বুঝলে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ বণিক সভ্যতাকে, বর্তমান অর্থনীতির মূল ভিত্তিকে বুঝা সম্ভব নয়। আমরা ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে কথা বলি, ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কথা বলি, কিন্তু আমরা জানি না যে টাকার সংজ্ঞা কী! মার্কেন্টালিজম বুঝা ছাড়া কারো পক্ষে বর্তমান অর্থনীতি নিয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। অর্থনীতি এবং আখলাকের মধ্যকার বিভাজনকে না বুঝে কারো পক্ষে অর্থনীতি নিয়ে কল্যাণমূলক কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদীদের বিখ্যাত ঐতিহাসিক বাকল (Henry Thomas Buckle) বলেন, &#8220;যারা মেধাবী ও গতিশীল, তাদের আখলাককে নয়, বরং মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ মেধা অগ্রসর হয়, শানিত হয়, কিন্তু আখলাক এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা, যার জন্য যা ইচ্ছা তাই করা যায় না।&#8221; অর্থাৎ, তাদের মতে তাদের প্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দ্বীন ও আখলাক। এক্ষেত্রে এ দ্বীন ও আখলাক হলো খ্রিস্টান ধর্ম ও খ্রিস্টানদের আখলাক। একইভাবে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো অধ্যয়ন করি, তখন দেখতে পাই, দ্বীন ও আখলাক বাদ দিয়ে এমন এক ধরনের অর্থনৈতিক দর্শন ও সমাজদর্শন দাঁড় করানো হচ্ছে, যার সাথে আমাদের সমাজের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন আমরা তাদের বর্জনকৃত দ্বীন ও আখলাকের সাথে আমাদের দ্বীন (ইসলাম) ও আখলাককে মিলিয়ে ফেলছি?</p>
<p>আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, &#8220;আমরা দুনিয়া ও আবিরাত উভয় জগতে কণ্যান চাই&#8221; এবং আল্লাহ বলেন, &#8216;দুনিয়ায় তোমাকে যে অংশ দেওয়া হয়েছে, সেটি তুমি ভুলে যেও না। আমাদের মূল সমস্যা হলো আমরা স্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক নিত্তপণ করতে পারছি না, সমন্বয় করতে পারছি না। সমন্বয় করতে না পারার মূল কারণ হলো দ্বীনের ব্যাপারে প্রান্তিক ধারণা। ইসলামে দ্বীন ও দুনিয়ার স্বরূপ তেমন তা সঠিকভাবে না জানার কারণে কেউ শুধু দ্বীনের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে, আবার কেউ শুধু দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। অথচ দুটোই ইসলামের আদালতকে খারিজ করে দিচ্ছে। এ বিষয়টি আমাদের বুঝা প্রয়োজন, সেই সাথে আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে যে, বর্তমান ব্যবস্থায় দ্বীন বলতে যে খ্রিস্টানদের ধর্ম এবং আখলাক বলতে যে খ্রিস্টানদের আখলাককে বুঝানো হয়, এর সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ এবং লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ উভয়টিই দ্বীন ও আখলাককে প্রধান শত্রু মনে করে, এক্ষেত্রে তারা এক। তাদের পার্থক্য হলো মালিকানা নিয়ে ধারণার ক্ষেত্রে। লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ মালিকানা রক্ষার চেষ্টা করে, আর সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ মালিকানা উৎখাতের চেষ্টা করে, অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানা বলতে কিছু থাকবে না।</p>
<p>বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষ সম্পদের মালিক নয়, মালিক হলো এরিস্ট্রোক্রেটরা। স্পেন ছাড়া সমগ্র ইউরোপে দশ হাজার এরিস্ট্রোক্রেট আছে, যাদেরকে Land Lord বলা হয়। মূলত তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য প্রণিত ব্যবস্থাই হলো লিবারেলিজম। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনের কথা বলা যায়, ব্রিটেনের অর্থনীতি ভূমি মালিকানার সাথে সম্পর্কিত। যেমন- ব্রিটেনের পার্লামেন্টে দুইটি হাউজ রয়েছে, হাউজ অব কমন্স এবং হাউজ অব লর্ডস। হাউজ অব কমন্সের সদস্য সংখ্যা ৬৫০ জন এবং হাউজ অব লর্ডসের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০০ জন। প্রকাশ্যে হাউজ অব কমন্স এর বির্তক প্রচারিত হয়, কিন্তু কোনো নীতিই হাউজ অব কমন্সে পাস হয় না। অর্থাৎ এটি একটি কমিটি ছাড়া কিছুই নয়। সেই সাথে হাউজ অব কমন্সে যারা নির্বাচিত হয়, তাদেরকে এরিস্ট্রোক্রেটরা প্রোপাগান্ডার জন্য টাকা, ঘুষ প্রদান করে। অন্যদিকে আমেরিকার ধর্ম হলো Civil Religion। এই Civil Religion-ই তাদের প্রথম মূলনীতি। তাদের দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, ব্যক্তিগত সম্পদে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না। মূলত এরিস্ট্রোক্রেটদের মালিকানা সু-সংহত করবে, তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করবে এ ধরনের পদ্ধতিই লিবারেলিজম।</p>
<p>এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় দার্শনিক, লিবারেলিজম চিন্তাধারার বড় অগ্রপথিক জন লক এর বিখ্যাত বাণী, <strong>&#8220;</strong><strong>প্রথম মালিকানা কীভাবে অর্জিত হলো তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই</strong><strong>, </strong><strong>মালিকানা অর্জিত হওয়ার পর তা রক্ষা করাই হলো মূল বিষয়।&#8221;</strong> এ অনুসারে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বাংলা অঞ্চলসহ গোটা পৃথিবী থেকে যত কিছু লুট করে নিয়ে সংরক্ষণে রাখা হয়েছে, এগুলোর জন্য কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে তারা রাজি নয়, বরং তাদের চিন্তার বিষয় হলো কীভাবে এসব সম্পদ তারা রক্ষা করবে। আমাদের দেশে যদি কেউ ব্যাংকে মোটা অংকের টাকা জমা দিতে যায়, প্রশাসন প্রথমেই তারা টাকার উৎস অনুসন্ধান করবে। অন্যদিকে আমেরিকাতে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে দুই ট্রিলিয়নের বেশি টাকা পাচার হয়। টাকা পাচারকারীদের জান্নাত হলো আমেরিকা এবং কানাডা। অথচ এসব দেশে এ টাকার উৎস নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থাই নেই। একইভাবে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জন লক বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>রাষ্ট্র হলো মালিকানা রক্ষা করার জন্য গঠিত একটি ব্যবস্থা। মালিকানা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্র মানুষকে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারে।&#8221;</strong></p>
<p>ব্রিটেন এরিস্ট্রোক্রেটদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যেখানে তারাই সম্পদের মালিক। সম্পদের মালিকানা রক্ষায় তাদের নীতি হলো &#8220;যে মালিকানার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।&#8221; অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো এরিস্ট্রোকেটদের ভূমির মালিকানা রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। মার্কস তার &#8220;Das Capital&#8221; বইয়ে তৎকালীন লন্ডনের অবস্থা তুলে ধরেছেন। এ বইয়ে তিনি শ্রমিকদের উপর কৃত অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। লন্ডনের ফ্যাক্টরিগুলোতে বিভিন্ন শর্তের আলোকে মানুষকে কাজ করানো হতো। সে শর্তগুলো এতটাই কঠিন ছিল যে, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যুবকরা তাদের যৌবনের উৎসাহ, উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলতো, শিশুরা হারিয়ে ফেলতো শৈশবের কোমলতা। তার এ বই মূলত ক্যাপিটালজমের নির্মম জুলুম-নির্যাতনের বর্ণনা, যেখানে তিনি লন্ডনকে এ জুলুম-নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে, এ জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছিলো এরিস্ট্রোক্রেটরা। তাদের সম্পদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, অন্যদিকে প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণি দিন দিন দরিদ্র হচ্ছিলো, নির্যাতিত, নিপিড়ীত হচ্ছিলো।</p>
<p>তারা তাদের শিল্পের বিকাশের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশকে শেষ করে দিয়েছে, বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন অঞ্চলকে শোষণ করেছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, সে সময়ে জন লক, জন স্টুয়ার্ট মিল, থমাস ম্যালথাস-সহ বড় বড় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীদের ভূমিকা কী ছিল? তিক্ত হলেও সত্য, তারা জুলুমকে গ্রহণযোগ্য বানানোর জন্য এবং সমগ্র পৃথিবীতে একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার জন্য তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। যেমন- জন লকের তত্ত্ব। এর উদাহরণ আমরা এডাম স্মিথের পুঁজি সম্পর্কিত বইগুলোতেও দেখতে পাই। তার মতে প্রাকৃতিক সম্পদ বা নগদ টাকা পুঁজি নয়, পুঁজি হলো শ্রম। তাদের চিন্তাধারা, ব্যবস্থাকে সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই মূলত তারা এ ধরনের তত্ত্ব আবিষ্কার করতো। সামগ্রিকভাবে তাদের লক্ষ্য ছিল মালিকানার উপর ভিত্তি করে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যে ব্যবস্থা মালিকানা বৃদ্ধি করবে, ধনীদেরকে আরও ধনী বানাবে। সেই সাথে অন্য মানুষের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তারা তৈরি করবে, যেটি বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করবে।</p>
<p>সে সময়ে এত বিস্তৃত অর্থে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস শিল্পায়নের সাথে জড়িত। শোষিতরা যেন তাদের ফ্যাক্টরিতে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতে পারে, সেই মানে তাদেরকে উন্নীত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। এটিই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ইতিহাস। আর তালের ব্যবস্থার অধীনে মানুষকে কাজ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে নিয়ে আসা হয় ব্যক্তিস্বার্থকে। মানুষের মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তুমি যদি কাজ করো, তাহলে তুমি ধনী হতে পারবে, যাকে বলা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। এখানে আখলাক এবং দ্বীনের কোনো স্থান নেই। ডেভিড হিউম বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>যদি আমরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই</strong><strong>, </strong><strong>তবে তাদেরকে ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ধাবিত করতে হবে। কেননা ব্যক্তিস্বার্থ এমন একটি বিষয়</strong><strong>, </strong><strong>যা তাকে ব্যবস্থা (</strong><strong>System) </strong><strong>থেকেই অর্জন করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যার কারণে তাকে অবশ্যই ব্যবস্থার অধীনে আসতে হবে।&#8221;</strong> ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ছুঁটে চলা মানুষের চিন্তায় থাকে সে কীভাবে কর্পোরেট, ব্যবস্থার (System) একজন ভালো শ্রমিক হবে। ব্যক্তিস্বার্থকে ব্যবহার করে মানুষকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি আমরা ফেরাউনের শাসনব্যবস্থায়ও দেখতে পাই। ফেরাউন তার জাতির উপর সবচেয়ে বেশি জুলুম করতো, তাদেরকে নিগৃহীত করতো, নিপীড়িত করতো, অসম্মানিত করতো, তবুও তারা ফেরাউনের আনুগত্য করতো, কারণ তারা ছিল ফাসেক জাতি। আর ফাসেক হলো তারা, যারা আল্লাহ এবং রাসূলের (স.) চেয়ে, আল্লাহর জন্য সংগ্রামের চেয়ে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ, সম্পদ, পরিবারকে বেশি গুরুত্ব বা প্রাধান্য দেয়। এমনকি কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ছুটে বেড়ায়, শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন গঠন করে, তাহলে সে সারাদিন আল্লাহকে স্মরণ করলেও, নামাজ পড়লেও সে ফাসেক জাতিরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আর এটি করতে পারলেই তারা সফল। এ লক্ষ্যেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সকল ব্যবস্থা তাদের চিন্তার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। একজন মুসলমানের উচিত এ ব্যপারে সজাগ থাকা। কারণ যে ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে না ছুটে মানুষের কল্যাণের পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর এ বিষয়টি আল্লামা ইকবাল তার &#8220;আসরারে খুদী ও রমুজে বেখুদী&#8221;তে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। এজন্য আমাদের খুদীকে বিকশিত করতে হবে, ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করতে হবে। একইসাথে এর মাধ্যমে যেন সমাজের মানুষ উপকৃত হয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়, তারা যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্রীড়নকে পরিণত না হয়, সে আলোকে কাজ করা আমাদের আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। শুধুমাত্র অর্থের পেছনে ছুটে বেড়ালে আমাদের জীবন হবে লাঞ্চিত, নিপীড়িত।</p>
<p>দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম একজন শেয়ার হোল্ডার। তিনি নিজেও একজন লর্ড ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, By the natural growth of civilization, power passes individual to masses. And the worth and importances of an individual as compared with the mass sink into grater and grater insignificance! অর্থাৎ, &#8220;সভ্যতার ক্রমবিকাশের যে প্রাকৃতিক গতিধারা, তা ক্ষমতাকে ব্যক্তির হাত থেকে একটি গোষ্ঠীর হাতে নিয়ে যায় (এখানে গোষ্ঠী বলতে সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি) এবং যখন ব্যক্তির মূল্য বা গুরুত্বকে এ গোষ্ঠীর সাথে তুলনা করা হয়, তখন ব্যক্তি মূল্যহীন হয়ে পড়ে।&#8221; ব্যক্তি যদি মূল্যহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সে কাজ করবে কেন? মূলত এটিই হলো লিবারেলিজম। তাদের ভাষ্যে, &#8220;সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে গোষ্ঠীসমূহের শক্তি আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। এখানে মূল বিষয় হলো বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ, এখানে ব্যক্তির ভূমিকা অর্থহীন। এখানে ব্যক্তি উৎপাদনের একটি উপাদান মাত্র।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যে শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে মানুষ বসবাস করবে এবং এ শিক্ষাব্যবস্থাকে অবশ্যই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি উপ-শাখা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।&#8221;</strong> অর্থাৎ তারা মনে-প্রাণে এটিই বিশ্বাস করাবে যে, আমাদের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে হয় ইউরোপ, না হয় আমেরিকা। মূলত এসব কারণেই আমাদের ফিকহ ভিত্তি হারিয়েছে, মুসলমানরা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে, মাদরাসাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে, তার স্থলে বর্তমান ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেছে। তারা শুধুমাত্র এ শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, সেই সাথে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে যে, এর চেয়ে ভালো কোনো ব্যবস্থা হয় না। আর তাদের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তাদের দুটি পন্থা রয়েছে-</p>
<p>১. অর্থনৈতিক শক্তি।</p>
<p>২. মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।</p>
<p>পূর্বে লিবারেলিস্টদের অর্থনৈতিক শক্তি আলোচিত হয়েছে। এবারের আলোচ্য বিষয় তাদের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি। মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তৎকালীন সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উপন্যাস (যেমন- ড্যানিয়েল ডিফোর &#8220;রবিনসন ক্রুসো&#8221;), আর বর্তমানে সিনেমা। অর্থনীতি আর মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা বুঝানোর চেষ্টা করে যে, এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতে পারে না। তারা বলে, তারা প্রতিটি ব্যক্তিকে শক্তিশালী বানায়, তাকে Freedom বা মুক্তি নেয়, Reason বা মুক্তচিন্তা দেয়, Equality বা সমতা দেয়, Toleration বা ধৈর্য্য শেখায়, Consent বা একতা শেখায়, Constitutionalism শেখায়। আদতে তারা শক্তিশালী করার নামে মানুষকে নফসের দাস হিসেবে গড়ে তুলে, মানুষের নফসের চাহিদা, আবেগ, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাকেই মানুষের স্বপ্নে পরিণত করে, এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যতটুকু স্বাধীনতা দরকার, ততটুকু স্বাধীনতার ব্যবস্থাই তারা করে। মূলত পুঁজিবাদ কোনো পণ্য বানানোর পূর্বে তার ক্রেতা বানায়। তাদের প্রদত্ত স্বাধীনতা হলো মানুষের জৈবিক চাহিদা বা নফসের চাহিদা পূরণ করার স্বাধীনতা, সেই সাথে যতদিন কেউ পুঁজিবাদের সেবা করবে, ততদিন সে স্বাধীন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো &#8216;American Dream&#8217;।</p>
<p>American Dream হলো একজন সঙ্গী, একটি কুকুর, দুইটি সন্তান, খাবার ভর্তি একটি ফ্রিজ, একটি ভালো গাড়ি। আর এটি কিন্তু বর্তমানে Dream of the World, যুব সমাজের স্বপ্ন! ইসলাম মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। কিন্তু একইসাথে ইসলাম মানুষকে শেখায় মানুষের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে শুধুমাত্র কয়েকটি বৈষয়িক বিষয়ের মধ্যে নামিয়ে আনা মানবতার প্রতি অপমান, কারণ মানুষ হলো খলিফাতুল্লাহ। এজন্য আমাদের জীবনে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। কাদেসিয়ার যুদ্ধের আগে পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের সামনে রিবঈ (রা.) এর ভাষণ এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন, <strong>&#8220;আল্লাহ আমাদরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর গোলাম বানানোর জন্য, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে আখিরাতের বিশালতার দিকে ধাবিত করার জন্য। আমরা বিভিন্ন ধর্ম কর্তৃক সৃষ্ট মানুষের গোলামী থেকে মানুষকে মুক্ত করে ইসলামের আদালতের দিকে নিয়ে যেতে চাই।&#8221;</strong> অথচ আমরা গোলামী করি কোম্পানির! আমাদের জীবনের স্বপ্ন একটা কোম্পানির কর্পোরেট অফিসার হওয়া। আমরা আমাদের জীবনকে American Dream এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি, অথচ আমাদের জন্য সমগ্র পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, সমগ্র মহাকাশ, মহাজগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে! আমরা যদি শুধুমাত্র আমাদের জীবনকে, জীবনের লক্ষ্যকে কয়েকটি বস্তুগত চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখি, সেটি হবে আমাদের নিজেদের প্রতিই অপমান। কারণ, আমরা হিবাতুল্লাহ (আল্লাহর দেওয়া উপহার)। আমাদের ভেতরে আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া রূহ রয়েছে। এজন্য আমাদের সর্বপ্রথম আমাদের মানবিক মর্যাদা বা খুদীকে আবিষ্কার করতে হবে।</p>
<p>লিবারেলিজমের দর্শনকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, লিবারেলিজম নামে যা দেখানো হয়, তা Irony ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে ইউরোপের অনেক ভালো ভালো চিন্তাবিদও রয়েছেন, যাদেরকে ভালোভাবে পড়া উচিৎ। <strong>কেউ যদি পুঁজিবাদকে ভালোভাবে খণ্ডন করতে চায়, তাহলে তার জন্য মার্কস এর &#8220;Das Capital&#8221; পড়াই যথেষ্ট। কেউ যদি ড্যানিয়েল ডিফোর &#8220;রবিনসন ক্রুসো&#8221; কে খন্ডন করতে চায়, তাহলে তার উচিত Michel Tournier রচিত &#8216;Friday&#8217; নামক গ্রন্থটি পড়া। কেউ যদি লিবারেলিজমকে খণ্ডন করতে চায়, তাহলে তার জন্য বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক কার্ল স্কিমিদ এর বইগুলো পড়াই যথেষ্ট।</strong> তার একটি বিখ্যাত বই হলো &#8220;Political Theology: Four New Chapters on the Concept of Sovereignty&#8221;। কার্ল স্কিমিদের মতে, <strong>&#8220;সত্যিকারের লিবারেলিজম আমাদের সামনে উপস্থাপিত লিবারেলিজমের সম্পূর্ণ বিপরীত।&#8221;</strong> এটিই মূলত লিবারেলিজমের সার-নির্যাস।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এবারের আলোচ্য বিষয় এ লিবারেলিস্টরা কেমন দুনিয়া চায় বা তাদের ওয়াদাকৃত জান্নাতের স্বরূপ কেমন। লিবারেলিস্টদের লক্ষ্য হলো World State বা বিশ্বরাষ্ট্র। তাদের মতে বিশ্বরাষ্ট্রই হলো ইতিহাসের সর্বশেষ পর্যায়, তারপর আর কিছু নেই। বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে, আর এটি তারা প্রতিষ্ঠা করবে, যারা এ চিন্তাধারায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ এরিস্ট্রোক্রেট, ডেমোক্রেটিক, ক্যাপিটালিস্ট চিন্তাধারায় বিশ্বাসীরা। অন্যদের দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ বিশ্বরাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন হবে তা সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক, ব্রিটেনের ইতিহাসে এংলো স্যাক্সন ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে বড় দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব, এ কথা অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রযুক্তি দুনিয়ার অনেক কিছুই তার &#8220;Principia Mathematica&#8221; এর উপর নির্ভরশীল। Logic and Linguistic এ তার ভূমিকা অনন্য, এক্ষেত্রে তার বিকল্প নেই। বার্ট্রান্ড রাসেলেরই স্বপ্ন ছিল বিশ্বরাষ্ট্র। লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত এ জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি তিনি। তার রচিত &#8220;Scientific Outlook&#8221; বইটি লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাতের রূপরেখা।</p>
<p>তিনি বিশ্বরাষ্ট্রকে তুলে ধরছেন এভাবে, &#8220;লিবারেলিজমের উপর ভিত্তি করে যে আধুনিক সমাজ তৈরি হবে, সেটি হবে প্রোপাগান্ডার উপর ভিত্তি করে। আর এ প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা মানুষকে বুঝাবে। এ পদ্ধতিতে তৈরিকৃত প্রোপাগান্ডাই হবে আধুনিক সমাজের মূলভিত্তি অর্থাৎ Advertisement&#8221;। রাসেলের এ কল্পিত দুনিয়ায় গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না, কারণ গণতন্ত্র থাকলে বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। Oligarchy এর উপর ভিত্তি করে বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, আর এ Oligarchy ভূমির উপর ভিত্তিশীল হবে না, এটি হবে বিজ্ঞানীদের একটি সমাজ অর্থাৎ Scientific Oligarchy, যেখানে বিজ্ঞানীগণ হবেন মূল স্তম্ভ। তিনি তার বইয়ে বলছেন, উদাহরণ স্বরূপ রাশিয়ার কথাই ধরা যাক, আজকের গতিশীল ও মেধাবীরা একবার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার পর প্রথম দিকে অধিকাংশ মানুষের বিরোধীতার সম্মুখীন হলেও তাঁরা তাঁদেরকে ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখতে সক্ষম হবে। দিন যত অতিবাহিত হবে ক্ষমতা ততই বংশগত অলিগার্কদের হাত থেকে বুদ্ধিজীবী অলিগার্কদের হাতে চলে যাবে। যে সকল দেশ দীর্ঘদিন যাবত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে সেই সকল দেশে এই অলিগার্কদের একচ্ছত্র আধিপত্য অগাস্টাসের রোমের মত ডেমোক্রেসির ছায়াতলে আশ্রয় নিতে পারবে। তবে অন্যান্য স্থানে এই অলিগার্কদের মুখোশ খুব দ্রুতই খসে পড়তে পারে। যদি নতুন ধরণের একটি সমাজকে তৈরি করতে হয় তাহলে সেখানে চিন্তাগত Oligarchy অবশ্যম্ভাবী। এখানে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, নতুন এক ধরণের অলিগার্ক গড়ে উঠবে আর এই অলিগারশিক গ্রুপ (মানুষের মধ্যে ছোট্ট একটি গোষ্ঠী) রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাকে ব্যবহার করবে এবং তাঁদের শাসন ব্যবস্থা যেন মানুষের সামনে গ্রহণযোগ্যতা পায় এই ভাবে তাঁরা মানুষকে কনভিন্স করার চেষ্টা করবে। আর এই ক্ষেত্রে প্রপাগাণ্ডা হবে তাঁদের মূল হাতিয়ার।</p>
<p>এরপর তিনি আরও বলেন, সে অলিগার্কদের মধ্যে মাঝেমধ্যে সমস্যা হলেও, দিনশেষে অলিগার্কদেরই একটি শ্রেণি সমগ্র পৃথিবীর ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবে এবং একটি বিশ্বব্যপী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে; এক্ষেত্রে রাশিয়া একটি উদাহরণ। তাদের এ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বরাষ্ট্র খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। অর্থাৎ ছোট একটি গোষ্ঠী সমগ্র দুনিয়াকে শাসন করার জন্য একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে এবং এবং সমগ্র দুনিয়াকে তাঁরা সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন করবে! সমগ্র মানবতার ভবিষ্যতের জন্য লিবারেলিস্টদের এটাই হলো ওয়াদা! এমন একটি সমাজই সবচেয়ে অগ্রসর সমাজ বলে বিবেচিত হবে! রাসেলের ভাষায়, তাদের এ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বরাষ্ট্র খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। এই উভয় অবস্থায় একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আর সেটা হলো; যেকোনো অবস্থায় তাদের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিকে ধারণ করতে হবে। অন্যথায় তাঁদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভবপর হবে না। বৈজ্ঞানিক পন্থা সর্বদায় সংগঠন (Organization) চায়, আর বিজ্ঞান যত বেশী অগ্রসর হবে তাঁর কাঙ্ক্ষিত সংস্থাও ততবেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে! তাঁরা কেমন একটি সংগঠন (Organization) চাচ্ছে? এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ! কেননা যে ব্যক্তি এই কথা বলছেন তিনি মার্ক্সিস্ট কিংবা সোশ্যালিস্ট কোনো ব্যক্তি নন। এই ব্যক্তি একজন ব্রিটিশ লর্ড। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দার্শনিকদের একজন। এই ব্যক্তি এই সব কথা বলছে। এই ব্যক্তি মানবতার জন্য এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, এখানে যুদ্ধকে এক পাশে রেখে চিন্তা করলে আন্তর্জাতিক একটি ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স এবং ট্রেড সিস্টেমের দরকার, যার মাধ্যমে শুধু কিছু দেশ নয়, সকল দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতি নিশ্চিত হবে। এর মানে কী? International Organization of Credit and Banking এর মানে কী? এর অর্থ হলো সকল অর্থনৈতিক লেনদেন একটি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। কাকে কত ঋণ দেওয়া হবে, কোন খাতে দেওয়া হবে, কোন খাতে দেওয়া যাবে না, এই সকল বিষয়ই একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। রাসেলের মতে, এ ধরণের বিশ্বরাষ্ট্রের সুবিধাসমূহ হবে অনেক বেশি। প্রথমত যুদ্ধের কোনো ভয় থাকবে না। তবে অস্ত্র তৈরি করার জন্য যে প্রতিযোগিতা করা হচ্ছে নিঃসন্দেহে সেটা বৃথা যাবে না। বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ও রাসায়নিক অস্ত্র থেকে উপকৃত হতে হবে যেন কেউ শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পারে। কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা কখনো কখনো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবর্তিত হলেও হতে পারে। কিন্তু এটি শুধুমাত্র ব্যক্তি পরিবর্তন করবে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। এটি তার স্বকীয়তা রক্ষা করার জন্য যে কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা চালাতে পারবে। যদি এ রকম একটি বিশ্বরাষ্ট্রকে কোনো প্রজন্ম একবার ধরে রাখতে পারে, তাহলেই এটি স্থিতিশীল হবে। কীভাবে স্থিতিশীল হবে? এর জবাবে রাসেল বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক সুবিধা অর্জিত হবে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার কারণে অপচয় বলতে কোনো কিছু থাকবে না, পেশাগত জীবনে কোনো ধরণের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে না, দরিদ্রতা থাকবে না, খারাপ ও ভালো দিন চক্রাকারে আবর্তিত হবে না, যারা কাজ করবে তাঁরা আরাম আয়েশে জীবন যাপন করবে। আর যারা কাজ করতে অনাগ্রহ দেখাবে তাঁদের স্থান হবে জেলখানা। অর্থনীতিকে জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজে লাগানো হবে। (অর্থাৎ কতজন মানুষ জন্ম নিবে এটা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের উপর)। হয়তোবা সকল মানুষকে শুধুমাত্র একটি স্থলভূমিতে রাখা হবে। মানুষের জীবনকে হুমকিতে ফেলে দিতে পারে এমন ধরনের সকল বিষয়কে উৎখাত করা হবে এবং অকাল মৃত্যুর হার কমে আসবে।</p>
<p>বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর এই চিত্রিত বিশ্বরাষ্ট্রকেই জান্নাত হিসেবে অভিহিত করেন! এমন একটি রাষ্ট্রই হলো লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাত। আর তাঁদের এই জান্নাতে মানুষের অবস্থা কেমন হবে এটা রাসেলের মুখেই শুনা যাক, <strong>“আর এ ওয়াদাকৃত জান্নাতে মানুষ সুখী হবে কি হবে না সেটা আমি জানি না। বসবাস করার জন্য সকল কিছুকে অর্জন করার পর মানুষ সুখী হবে কি হবে না সেটার জন্য কি করা প্রয়োজন সেই শিক্ষা হয়তোবা জৈব রসায়ন (Biochemistry) দিবে।&#8221;</strong> এখানে রাসেল বায়োকেমেস্ট্রির কথা কেন আনলেন? এর অর্থ হলো মানুষকে সুখে রাখার জন্য ঔষধ তৈরি করা হবে। মনে করেন আজকে আপনার মন খারাপ, একটা ট্যাবলেট খেয়ে নিবেন যা আপনাকে খুশিতে রাখবে। এরপর সে প্রশান্তি অনুভব করবে। লিবারেলিস্টদের চিন্তাধারায় সুখ বলতে এতটুকুই। এখন কথা হলো নেশা করার সাথে সুখ পাওয়ার জন্য ঔষধ খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কি? মানুষকি তাঁর ব্যথা কিংবা দুঃখকে ভুলে থাকার জন্য নেশা করে না? একবার চিন্তা করুন মানুষকে জৈব রসায়ন (Biochemistry) এর মাধ্যমে সুখী করার চিন্তা কেমন একটি চিন্তাধারা!!</p>
<p>শুধু তাই নয় দেখুন লিবারেলিস্টরা তাঁদের জান্নাতে মানুষ সুখে রাখার জন্য কোন ধরণের প্রস্তাবনা পেশ করে। রাসেলের ভাষায়, কেউ কেউ মানসিক অশান্তির কারণে অরাজকতা সৃষ্টিকারী হতে পারে বলে তাঁদেরকে দমিয়ে রাখার জন্য বিপজ্জনক কিছু খেলাধুলার আবিষ্কার করা যেতে পারে। জুলুমকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়ে খেলাধুলাতে স্থানান্তর করা হবে। প্রস্তাবিত সমাধানের দিকে খেয়াল করুন। আর খেলাধুলার ক্ষেত্রে কী এখন এগুলোই হচ্ছে না? বর্তমানে ক্রীড়াজগতে আমরা তাকালে দেখতে পাই যে বিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে এবং সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যদি খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, মানুষের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কমিয়ে আনা ও তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রিত একটি স্রোতের দিকে ধাবিত করা। <strong>তিনি আরও বলেন, ফুটবলের পরিবর্তে আকাশ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা যেতে পারে। এক দিক থেকে দেখলে রাসেলের এই প্রস্তাবনা হলো, রোমানদের গ্লাডিয়েটরের আধুনিক রূপ! তদের প্রস্তাবিত জান্নাতে মানুষকে গ্লাডিয়েটর হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়</strong>। তাঁদের চিন্তার সীমানা এতটুকুই।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, মৃত্যু যখন মানুষের হাতের মুঠোয় থাকবে, বিজয়ের নেশায় মৃত্যুর দিকেও ধাবিত হওয়া থেকে দ্বিধা করবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে উপর থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষকে বিনোদন দেওয়া ছাড়া হয়তো অন্য কিছু হবে না, হয়তো এমন দিনও আসবে যখন তাঁকে বীরের মর্যাদা দেওয়া হবে। অর্থাৎ এমনভাবে প্রোপাগান্ডা চালানো হবে যে, অমুক ব্যক্তি এত হাজার ফিট উপর থেকে গড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। সে সকলের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ইত্যাদি বলে মানুষের নিকটে এই ধরনের খেলাকে গ্রহণযোগ্য করা হবে। রাসেলের ভাষায়, এ ধরণের আরো অনেক পন্থা অবলম্বন করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সুনিয়ন্ত্রিত একটি শিক্ষাব্যবস্থা ও খাদ্যব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার অরাজকতার চিন্তা ও অন্যান্য অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।</p>
<p>আর মানুষের জীবন ধারাকেও একটি সানডে স্কুলের কোচিং সেন্টারের মত নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অবশ্যই সেখানে একটি বিশ্বজনীন ভাষা তৈরি করা হবে। আর এই বিশ্বজনীন ভাষাটি কেমন হবে? এই ক্ষেত্রে রাসেলের প্রস্তাবনা হলো, এই ভাষা হবে হয় এসপেরান্টো (Esperanto), আর না হয় পিডগিন ইংলিশ (Pidgin English)। আর অতীতের অনেক কিছুকেই এই ভাষায় অনুবাদ করা হবে না। কেননা ঐ সকল চিন্তা এই ভাষার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না। যারা ইতিহাস নিয়ে কাজ করবে তাঁরা ‘হ্যামলেট’ এবং ‘অথেলোর’ মত গ্রন্থসমূহকে ব্যাখ্যা করার জন্য সরকার থেকে অনুমতি নিতে পারবে তবে এগুলা জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে। শিশুদেরকে রেড ইন্ডিয়ান ও অন্য কোনো জাতির ইতিহাস পড়ার সুযোগ দেওয়া হবে না!</p>
<p>এটিই লিবারেলিজমের ওয়াদাকৃত জান্নাত। এখানে আমরা হয় তাদের ব্যবস্থার গোলাম হবো, অন্যথায় আমাদের জায়গা হবে কারাগারে। এ জান্নাতে মানুষের সুখ মূখ্য নয়, বরং তারা মানুষকে কল্পিত সুখে ডুবিয়ে রাখবে মাদক ও ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে। আর তাদের ভাষা হিসেবে পিডগিন ইংরেজিকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো এ ভাষায় ব্যাকরণ মুখ্য নয়, শুধুমাত্র ভাব প্রকাশই মুখ্য। ভাষা হলো চিন্তা ও ধারণা প্রকাশের বড় একটি মাধ্যম। প্রতিটি ভাষাতেই মূল্যবোধের কথা উল্লেখিত আছে, স্রষ্টার কথা উল্লেখিত আছে। প্রতিটি ভাষাতেই ভালোর কথা বলা হয়েছে, খারাপের কথা বলা হয়েছে, জাতির বীরত্বের গৌরবের কথা বলা হয়েছে। আর এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এমন দুনিয়ার জন্য তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে পিডগিন ইংরেজিকে (Pidgin English)। আর পূর্বের বইগুলো এ পিডগিন ইংরেজিতে অনূদিত না হওয়ার কারণ হলো এর ফলে উদ্ভূত আবেগকে তারা অর্থনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে সমর্থ হবে না। সেই সাথে তারা সকলকে অতীত ভুলিয়ে দিয়ে অতীত ইতিহাসের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কবিহীন এক জাতিতে রূপান্তরিত করতে চায়। আর সত্যিকার ভালোবাসার ধারণা মুছে দিয়ে এর পরিবর্তে তাৎক্ষণিক বিনোদনের ব্যপারগুলোকে তুলে ধরতে চায়, যা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সহায়ক। এখন যদি আমরা বর্তমান দুনিয়ার সাথে তাদের ওয়াদাকৃত জান্নাতকে মিলিয়ে দেখি, তবে কী দেখবো? আমেরিকার প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, তাহলে আমেরিকা চীনের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে রাশিয়ার সাথে কেন সংঘর্ষে গেলো? কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বিশ্বরাষ্ট্র একটু হলেও ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্প চীনের দিকে নজর দিতে গিয়ে রাশিয়ার দিকে নজর দিতে পারেনি, যে কারণে ন্যাটো দুর্বল হয়ে গিয়েছে। যায়নবাদী সভ্যতা ন্যাটোর মাধ্যমেই ইউরোপে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। আর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কিন্তু মানুষ মারা গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না, কিন্তু যেকোনো মূল্যে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে, ন্যাটোর অবস্থান ঠিক রাখতে হবে। এটিই হচ্ছে মূল ব্যপার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ বিষয়গুলোকে আমাদের সামগ্রিকভাবে পড়তে ও উপলব্ধি করতে হবে। নিজে উপলব্ধি করে অপরকে উপলব্ধি করানো, মানুষের সামনে তুলে ধরা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আমাদেরকে মুসলমানদের মধ্যকার সাহায্য ও সম্প্রীতির জাগরণ ঘটাতে হবে, ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে দিতে হবে, সেই সাথে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ডি-৮ এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাধ্যমে এ উদ্যোগ আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে আর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অথচ এই ডি-৮ ছিল একবিংশ শতাব্দীর যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় আশার বাতিঘর। ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রায় পরিণত হয় ১৯৯৭ সালে, অন্যদিকে আমাদের অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা ইসলামিক দিনারের ধারণা সৃষ্টি হয় ১৯৭৪ সালে। আমাদেরকে লিবারেলিস্টদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজস্ব অর্থনেতিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে এ মুহূর্তে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন সবচেয়ে বেশি জরুরী। আমাদেরকে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।</p>
<p>লিবারেলিস্টদের বৈজ্ঞানিক রূপরেখার জবাব আল্লামা ইকবাল ১৯৩২ সালেই দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমাদের বড় বড় আলেমগণ আমাদের সতর্ক করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তারা কাজ করেছেন। আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচ এক অর্থে তাদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো সতর্কবার্তা। কিন্তু আমরা এখনো নিজেদেরকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারি না, যার ফলে তাদের কৌশল গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের। যদি আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা না করি, তাহলে আমরা ধাপে ধাপে বিশ্বরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ শিকারে পরিণত হবো। কিন্তু আমরা যদি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, কাজ করি, তাহলে সফলতা অবশ্যই আসবে, এটি আল্লাহর ওয়াদা। এ লক্ষ্যে যদি আমরা ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারি, তবে তা বিশ্বের ১৯০ কোটি মুসলমানের আশার আলো হবেই। <strong>জুলুম কখনোই চিরস্থায়ী হয় না, আজ হোক বা কাল, জুলুমের পতন ঘটবেই। কিন্তু এ পতন কতটুকু ত্বরান্বিত হবে তা নির্ভর করে আমাদের চেষ্টা ও কাজের উপর।</strong> ফেরাউনী সাম্রাজ্যের যদি পতন হতে পারে, রোম সাম্রাজ্যের যদি পতন হতে পারে, সাসানীদের যদি পতন হতে পারে, এই যায়নবাদী সভ্যতারও পতন অবশ্যই হবে এবং তা হবে আমাদের হাত ধরেই, ইনশাআল্লাহ।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 370px; top: 3755.56px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15761</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/cultural-slavery-is-not-apart-from-politacal-slavery/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/cultural-slavery-is-not-apart-from-politacal-slavery/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Feb 2025 13:34:18 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15548</guid>

					<description><![CDATA[এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের ঈমান এবং মানুষ হিসেবে আমাদের অনন্য পরিচিতির দিক থেকে বিদেশী রাজনৈতিক শাসনের চাইতে সাংস্কৃতিক অধীনতা অনেক বেশী ক্ষতিকর। তবে বাস্তবে সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে শুধুমাত্র সম্পৃক্তই নয় বরং সকল ইচ্ছা ও কাজে তা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের ঈমান এবং মানুষ হিসেবে আমাদের অনন্য পরিচিতির দিক থেকে বিদেশী রাজনৈতিক শাসনের চাইতে সাংস্কৃতিক অধীনতা অনেক বেশী ক্ষতিকর। তবে বাস্তবে সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে শুধুমাত্র সম্পৃক্তই নয় বরং সকল ইচ্ছা ও কাজে তা অবিভাজ্য। প্রায় ৬শ বছর আগে কৃতি মুসলমান ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তার মুকাদ্দিমায় এই সত্য স্বীকার করেছেনঃ</p>
<blockquote><p><em>“বিজিতরা সব সময় বিজয়ীদের পোশাক, প্রতীক, বিশ্বাস এবং অন্যান্য আচার প্রথা অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ সব সময় বিজয়ীদের কাছে প্রিয় পাত্র হতে আগ্রহী হয়। এটা দুই কারণে হয় প্রথমতঃ বিজয়ীদের প্রতি শ্রদ্ধা, দ্বিতীয়তঃ বিজয়ীদের মত যোগ্যতার অধিকারী হলে তাদের পরাজয় হতো না- এই মনোভাব হেতু যোগ্যতা অর্জনের জন্যে। এই বিশ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হলে এটা একটা ব্যাপক আস্থার ভাব সৃষ্টি করে এবং বিজয়ীদের সকল কিছু অনুকরণে বিজিতরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই বিশ্বাস অজ্ঞাতভাবে অথবা বিজয়ের জন্যে বিজয়ীদের শারীরিক ও অস্ত্রের শক্তির চাইতে আচার আচরণ প্রাধান্য বিস্তার করেছে- এই বিশ্বাস থেকে সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় তখন এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে বিজয়ীদের অনুকরণ পরাজয়ের কারণ দূরীভূত করবে। এইভাবে দেখা যায় বিজিতরা পোশাক, অস্ত্র ধারণ যন্ত্রপাতি এবং জীবন ধারণের সকল পদ্ধতিতে বিজয়ীদের অনুকরণ করে। বস্তুত প্রতিটি দেশই তার বৃহৎ বিজয়ী প্রতিবেশীকে অনুকরণের চেষ্টা করে। স্পেনের মুসলমানেরা বিজয়ী প্রতিবেশী খৃষ্টানদেরকে অনুকরণ করেছে। খৃষ্টানদের পোষাক, অলঙ্কার এবং আচার আচরণের বিভিন্ন দিক এমন কি ঘরে ছবি রাখার ব্যাপারে মুসলমানরা তাদের অনুকরণ করেছে। সযত্ন পর্যবেক্ষণে এই </em><em>হীনম্মন্যতা</em> <em>সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।” </em></p></blockquote>
<p>ইবনে খালদুন মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তার সময়ের স্পেনিশ মুসলমানদের ন্যায় আজকের ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরাও অনুকরণ করছে। অবশ্য এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় বিদেশী সভ্যতার অন্ধ ও সমালোচনাহীন অনুকরণ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। আমাদের বিদেশী প্রভুরা শাসনের প্রথম লগ্ন থেকেই খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের জীবন পদ্ধতিকে ধ্বংস করে সেখানে তাদের আচার পদ্ধতি চালুর ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তার ফলশ্রুতিতে অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তাদের আচার প্রথা প্রবেশ করেছে।</p>
<p>প্রায় একশ বছর আগে বৃটিশ সরকার উপমহাদেশের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদান এবং কার্যকরভাবে শাসনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দানের জন্যে ড. উইলিয়াম হান্টারকে নিযুক্ত করেছিলেন। সেই হিসেবে ১৮৭১ সালে তিনি লিখলেন: “আমাদের ভারতীয় মুসলমান, তারা কি রাণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বিবেকের কাছে বাধা! মুসলমানদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে ফেলার জন্যে এবং তাদেরকে অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিদেশী প্রভুত্ব মেনে নিতে শান্তভাবে আত্মসমর্পণ করানোর জন্যে &#8216;সবজান্তা&#8217; ড. হান্টার প্রস্তাব করেছেন ইংরেজী শিক্ষার।</p>
<p>তার বইয়ের সমাপ্তি পর্বে তিনি তার সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। &#8220;এভাবে মুসলমান যুবকদেরকে আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনার ভিত্তিতে শিক্ষিত করে তুলতে পারি। তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে এবং ধর্মশিক্ষার বিষয়ে সামান্যতম হস্তক্ষেপ না করেই আমরা তাদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারি যাতে করে তারা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করলেও ধর্মান্ধ হবে না। বিশ্বের অন্যতম চরম গোঁড়া সম্প্রদায় হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুরা যেভাবে সহনশীলতার শিক্ষা পেয়েছে, মুসলমানদেরকেও সেই পদ্ধতি অনুসরণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। অনুরূপ সহনশীলতা মুসলমানদেরকে তাদের পূর্ব-পুরুষদের গোঁড়ামী থেকে মুক্ত করে আনবে, যে গোঁড়ামী তাদেরকে নিষ্ঠুরতা, নির্দয়তা ও অপরাধজনক কাজের মধ্যে টেনে নিয়ে গেছে। আর এসবই তারা করে এসেছে ধর্ম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে। মুসলমানী আইনশাস্ত্র আবশ্যিক বিষয় হিসেবে নিয়মিত পড়ানো হবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু এটাকেই শিক্ষার মৌল লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবে না। মুসলমানী আইন মানে মুসলমানী ধর্ম, মুসলমানরা সমগ্র পৃথিবীতে তাদের আইনানুগ অধিকারে বিশ্বাসী। তারা আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব আনুগত্য অথবা খৃষ্টান সরকারের অধীনতার কথা জানে না। মুসলমানী আইন সরকারের কোন প্রয়োজন এবং জীবন সম্পর্কে তার ছাত্রদেরকে কোন ধারণা দেয় না। এর পরিবর্তে আমাদের উচিত একটা উদীয়মান মুসলিম জাতি গড়ে তোলা যারা নিজস্ব সংকীর্ণ শিক্ষা পদ্ধতি ও মধ্যযুগীয় ভাবধারার গণ্ডীতে আবদ্ধ না থেকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞানের নমনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। ইংরেজী প্রশিক্ষণ জীবনের লাভজনক অধ্যায়ে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেবে। কোন্ পদ্ধতি প্রবর্তনের দ্বারা হিন্দু ও মুসলমানদের সমভাবে উচ্চতর ধর্মীয় ধারণায় উন্নীত করা সম্ভব সে সম্পর্কে আমি এখানে কিছু বলতে চাই না। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে অনুরূপ উন্নত অবস্থায় তারা একদিন উপনীত হবে এবং এতদিন নেতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও আমাদের প্রবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে এ বিষয়ে প্রাথমিক পদক্ষেপ।&#8221;</p>
<p>হান্টারের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে এবং আজ আমরা তার ফল ভোগ করছি। বংশ পরম্পরায় পাওয়া সেই সম্পত্তি ৪৭ এর স্বাধীনতার পরও সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় এখনও বহাল রয়েছে। বৃটিশ শিক্ষা পদ্ধতি এতই দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে যে, সমগ্র উপমহাদেশে আধুনিকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতার বস্তুবাদ ও নাস্তিক্যবাদের মোকাবিলা করার জন্যে পর্যাপ্ত ইসলামী জ্ঞান দানে সক্ষম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও কোথাও নেই। আমাদের যুবকেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোন আকর্ষণ ছাড়াই বড় হচ্ছে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।</p>
<p>বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে Lord cromer ছিলেন আরব বিশ্বের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব। ১৮৮৩ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত পঁচিশ বছর প্রতিবন্ধকতাহীনভাবে তিনি মিশর শাসন করেন। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কৌশল জানার জন্যে তার বিরাট বই Modern Egypt অপরিহার্য। বই এর সমাপ্তিতে তিনি কোন সন্দেহের অবকাশ রাখেননি যে, সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের চাইতে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের নীতিই ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p><strong>কোন বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতিকের চিন্তা করা ঠিক নয় যে, ইসলামকে পুনর্জীবন দানে সক্ষম- এমন পরিকল্পনা তাদের রয়েছে, বস্তুত ইসলাম এখনো মরে যায়নি, বরং শতাব্দী ধরে টিকে থাকার যোগ্য। তবে রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে তা মৃতপ্রায়, তার ক্রমাগত অবনতি কোন আধুনিক তত্ত্ব প্রয়োগে, তা যতই দক্ষতার সঙ্গে করা হোক না কেন ঠেকানো যাবে না।</strong> এই পর্যন্ত যতটুকু বিচার করা যায় তাতে দু&#8217;টি মাত্র বিকল্প পন্থা সম্ভব। মিশরকে পর্যায়ক্রমে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে নতুবা বৃটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে নিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই দুই বিকল্পের প্রথমটির পক্ষে। আমরা যা করব তাতে ভাল, জোরদার এবং স্থিতিশীল সরকারের ব্যবস্থা করতে হবে যা অরাজকতা এবং দেউলিয়াত্ব দূর করে মিশরকে ইউরোপের জন্যে সমস্যায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। এ ধরনের সরকারের কাজে আমাদের বেশী মাথা ঘামানো উচিত নয়। তবে আমাদের বিদায়ের পর সরকারকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যা পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ&#8230;.. এটা মনে করা ঠিক হবে না যে মিশরে সম্পূর্ণ মুসলমানী নীতির ওপর প্রাচীন চিন্তাধারা ও পশ্চাদগামী সরকার প্রতিষ্ঠার সময় ইউরোপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে। মিশর যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে ঐ ধরনের চিন্তাধারা অনুসৃত হলে বস্তুগত স্বার্থের সাংঘাতিক ক্ষতি হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যারা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান এবং সমস্যার সমাধান চান তাদেরকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মিশরের নতুন বংশধর পশ্চিমা সভ্যতা সত্যিকারভাবে অনুসরণ বা গ্রহণে বাধ্য হয়। আমার বিশ্বাস ইংল্যাণ্ডের সুমহান পরিচালনায় পশ্চিমা সভ্যতার রশ্মি কৃষ্ণ আফ্রিকার সবচাইতে দুর্ভেদ্য স্থানে গিয়ে পৌছুবে এবং এমনকি মিশরের ক্লেদাক্ত কৃষকেরা ও তাতে নতুন জীবন লাভ করবে। মিশরীয়দের অজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও আমি এখনো আশা করি বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ বংশধরেরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে যে, Anglo-saxon জাতির লোকেরা প্রথম তাদের অত্যাচারী কৃতদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে, তারা তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে যে, তারাও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকারী, তারা তাদের সামনে নৈতিক অগ্রগতি এবং চিন্তার স্বাধীনতা ও বস্তুগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের পথ উন্মুক্ত করে খুলে দিয়েছে পশ্চিমা সভ্যতার সত্যিকার মহাসড়ক।”</p>
<p>এটাই ছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্য, স্বাধীনতার পরও কেন আমাদের ওপর বিদেশী প্রভাব এত জোরদার তার জবাবও এই বৃটিশ শাসকের উক্তি থেকে পাওয়া যাবে। বস্তুত সকল প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের স্বাধীনতা একটা সামান্য ব্যাপার মাত্র। দীর্ঘদিন আমাদের দেশ বিদেশী শাসনাধীন ছিল, আমাদের জনগণকে অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে বিদেশী প্রভুরা খুব যত্নের সঙ্গে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এইভাবে তারা সাফল্যের সঙ্গে বিশেষত সামাজিক দিক থেকে প্রাজ্ঞ লোকদের মধ্য থেকে একদল সাক্ষী গোপাল ও গৃহশত্রু বিভীষণ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। তথাকথিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়ার পর আমাদের নেতৃত্ব এই পশ্চিমা চক্রের হাতে গিয়ে পড়ে।</p>
<p>বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে এই নেতৃত্ব অব্যাহত থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল। কারণ আমাদের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশই তাদের ধ্যান-ধারণা এবং তাদেরকে ঘৃণা করতো এই কারণে গণতান্ত্রিক পন্থায় পশ্চিমা সভ্যতার বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ল। এই জন্যে খুবই শক্ত হাতে একনায়কত্ব চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা হলো। যারা এর বিরোধীতা করলো তাদেরকে নির্দয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করা হলো। এমনকি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের জনগণকে দেয়া গণতান্ত্রিক সুযোগ সুবিধা মুসলমানদের দিতে রাজী হবে না, কারণ তারা ভাল করেই জানে মুসলমানদের মনে ইসলামের প্রভাব খুবই জোরদার, গণতান্ত্রিক রায় প্রকাশের সুযোগ একবার আসলেই সকল মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আর এই অবস্থা হলে এশিয়া ও আফ্রিকায় তাদের প্রভুত্ব চিরদিনের জন্যে খতম হয়ে যাবে। এই জন্যে ইসলামী আন্দোলনকে তাদের বিরাট ভয়, বিশ্বব্যাপী তাদের সংগঠিত সকল চক্রান্তের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনকে শেষ করা।</p>
<p>রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত অর্থনৈতিক দাসত্বকেও আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, বরং বলা যায় অর্থনৈতিক দাসত্বই আমাদের এই পরিস্থিতিতে নিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিদেশী সাহায্যের টোপ গেলাতে উৎকণ্ঠিত। উচ্চ হারে সুদ নিয়ে এই সাহায্য শেষ পর্যন্ত গ্রহীতা দেশকে ভিক্ষুকে পরিণত করে। এতে কোন অতিশয়োক্তি নেই যে, পশ্চিমা বিরাট বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো তাদের সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের প্রধান মাধ্যম। অনুন্নত (এখন উন্নয়নগামী) মুসলিম দেশসমূহে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পর্যায়ক্রমে বিরাট বিরাট বিলাসবহুল ভবন, অত্যাধুনিক কারুকার্যের হোটেল, শহরের রূপ পাল্টিয়ে দেয়।</p>
<p>ব্যবস্থা হয় নৈশ ক্লাব এবং ক্যাবারে নাচের। হলিউড থেকে অপরাধমূলক ও অবৈধ যৌন সংসর্গের জঘন্য ছবি আসে, তার অনুকরণে দেশে ছবি নির্মিত হয়, পর্ণ ছবি, পুস্তক এবং বিদঘুটে পোশাক এসে বাজারে সয়লাবের সৃষ্টি করে যা সামাজিক উৎকর্ষতার চূড়ান্ত বিকাশ বলে বিবেচিত হয়। খাদ্যে ভেজাল দেয়া আমাদের শরিয়তে বিরাট পাপ বলে গণ্য হলেও এই পরিবেশে তা দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং অন্যের জীবন ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে ভেজালদানকারী দিনে দিনে প্রাচুর্যের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। মাদক দ্রব্যের ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, আমাদের বেতারগুলো কদর্য ও নগ্ন গানের দ্বারা সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে।</p>
<p>বিদেশী প্রভাবিত শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্থায় পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করিয়ে মেয়েদেরকে চাকুরীতে নেয়া হয়। এই ভাবে আমাদের মহিলারা স্ত্রী, মা, বোন এবং কন্যার পবিত্র আসন থেকে বাস ট্রেনের টিকেট সংগ্রাহক, ব্যাংকের কেরানী, টেলিফোন অপারেটর, সেলস গার্ল, বিমানবালা, রেস্তোঁরার ওয়েট্রেস, হোটেলের কক্ষ সেবিকা, ফ্যাশান মডেল এবং বেতার, টেলিভিশন, ছায়াছবি ও রাষ্ট্র আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গায়িকা ও নর্তকীতে পরিণত হয়। এইভাবে পর্যায়ক্রমে পর্দা, বাড়ী, পরিবার অবৈধ যৌন সংসর্গের জোয়ারে ভেসে যায়। যুবক যুবতীরা একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গড়ে উঠে। এইসব ব্যাপার আকস্মিকভাবে হয় না। বরং আমাদের ওপর যারা প্রভুত্ব বজায় রাখতে চায় তারা খুবই সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে আমাদের জীবন প্রবাহে এ সবের অনুপ্রবেশ করিয়ে দেয়। আমাদের শত্রুরা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে আমাদের অধঃপতন ঘটিয়ে দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে ছোট করতে চায়। তাদের স্বার্থেই আমাদের অধঃপতন ঘটুক আমাদের দেশ দুর্নীতিতে ভেসে যাক এটাই তাদের কাম্য।</p>
<p><strong>এই ভীতি কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্যে আমাদেরকে বুঝতে হবে রাজনৈতিক দাসত্ব আর সাংস্কৃতিক দাসত্ব কেন অবিচ্ছেদ্য, সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে যে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া সত্যিকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। বিরোধী এবং বিদেশী শাসনের অধীনে ইসলামের উৎকর্ষ অসম্ভব। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের ইসলামী পুনর্জাগরণের সকল আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানাতে হবে এবং আমাদের সরকার যাতে আইন হিসেবে ইসলামের নির্ভেজাল শরিয়তকে গ্রহণ করে সে জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ইসলামী আন্দোলনকে সকল গণসংযোগ মাধ্যমের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে।</strong></p>
<p>কোন বিদেশী শক্তি যাতে আমাদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি করতে না পারে তার তীব্র বিরোধিতা করতে হবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে আমাদের সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব সম্পদ ও বন্ধু মুসলিম দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে। প্লেগরূপী বিদেশী সাহায্য অবশ্যই পরিহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনে, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিবর্গের সঙ্গে আমাদেরকে সমঅংশীদার হিসেবে সৎ ব্যবসার ওপর জোর দিতে হবে। ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ সব সময় ইসলামকে তাদের শক্তিশালী শত্রু জ্ঞান করে আসছেন ফলে তাদের নতুন বংশধরেরা একই দৃষ্টি ভঙ্গিতে ইসলামকে অধ্যয়ন করে থাকে।</p>
<p>পশ্চিম ইউরোপ থেকে উদ্ভুত বস্তুবাদী দর্শনই প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামী জীবন পদ্ধতি পুনরুজ্জীবনে সব চাইতে বড় বাধা হয়ে আছে। এই কারণে আমাদের কিছু উলেমাকে পাশ্চাত্যের অধিবাসী হয়ে ইউরোপের সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম এবং দর্শন পড়তে হবে যাতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নত দর্শন উপস্থাপন করা যায়। এই ভাবে সকল দিক থেকে আমাদেরকে সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করতে হবে যাতে আমাদের ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি করে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>এ কে এম হানিফ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/cultural-slavery-is-not-apart-from-politacal-slavery/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15548</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের সমুদ্র আইন ও সমসাময়িক ভাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 02 Feb 2025 13:13:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15511</guid>

					<description><![CDATA[আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ জাতির অধিকারের ব্যাপার হতে পারে না। সমুদ্রে থাকতে হবে সব জাতির জাহাজ চলাচলের সমান অধিকার। কিন্তু একটা দেশের কাছে অবস্থিত সমুদ্রে কিছু দূর পর্যন্ত থাকা উচিত সে দেশের কর্তৃত্ব। কারণ তা না থাকলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশটির নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। প্রত্যেকটি জাতি চায় তার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা চাওয়া হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। যেকোনো আইনে তাই একে নিতে হবে বিশেষ বিবেচনায়।</p>
<p><strong>গ্রোশিয়াসের এই প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা নিয়ে সূত্রপাত ঘটে সমুদ্র আইনের। ঠিক হয় একটা সমুদ্র তীরবর্তী দেশ, সেই দেশ থেকে কামানের গোলা ছুড়লে তা যত দূর গিয়ে পড়বে, সেই দূরত্বের মধ্যে সমুদ্র সীমানা হবে তার নিজের। সেখানে থাকবে তার কর্তৃত্ব। সে সময় কামানের গোলা খুব বেশি দূর যেত না। সাধারণত কামানের পাল্লা ছিল পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু ক্রমেই কামানের পাল্লা বাড়তে থাকে। আর সমুদ্র আইনে দেখা দেয় জটিলতা। এখন একটা দেশের সমুদ্র নিয়ে হয়েছে অনেক সুস্পষ্ট আইন।</strong> আইন না বলে একে আসলে বলা উচিত কনভেনশন বা প্রথা। গঠিত হয়েছে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল &#8220;International Tribunal for the Law of the Sea&#8221;, সংক্ষেপে (ITLOS)। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই এই ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত। এই দুই দেশই মেনে নিয়েছে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের অধিকার।</p>
<p>বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার জন্য এই ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল মিয়ানমারের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবরে। মামলার রায় এখন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বিরোধ ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার। আর মিয়ানমার পেয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। এই রায়ে এই দুই দেশের কেউ-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হারজিত হয়নি কারো। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে বলছে, এই রায়ে বাংলাদেশ জিতেছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।<br />
সমুদ্রতীরবর্তী একটা দেশের ভূমির কিছুটা অংশ থাকে সমুদ্রের পানির মধ্যে। এখানে সমুদ্রের গভীরতা সাধারণত থাকে ১৮০ মিটারের কাছাকাছি। সমুদ্রের পানির মধ্যে একটা দেশের ডুবে থাকা এই অংশকে বলে মহীসোপান (Continental Shelf)।</p>
<p>মহীসোপান ঢালুভাবে নেমে যায় সমুদ্রের মধ্যে। এই ঢালু জায়গাকে বলা হয় মহীঢাল (Continental Slope)। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে দু’ভাবে। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়। বিশেষ করে ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ ডাঙার যে অংশে এসে আছড়ে পড়ে সেই অংশে। কারণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ডাঙার এই অংশ ক্ষয় হয়। এখানে এসে জমতে পারে সমুদ্রের পানি অগভীরভাবে। আবার মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে জমে। <strong>আমাদের দেশে সমুদ্র উপকূলে মহীসোপান বেড়ে চলেছে। এটা হতে পারছে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে এসে জমার ফলে। পলিমাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে সমুদ্র। ফলে বাড়ছে বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ। বাংলাদেশ সমুদ্রের যে অংশ পেল, নদীবাহিত পলিমাটি জমে সমুদ্র ভরাট হয়ে একদিন সেখানে জেগে উঠবে মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি। সেটা হবে বাংলাদেশেরই অংশ।</strong> আপাতত সমুদ্রের যে এলাকা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ পেতে পারল, সেখানে বাংলাদেশের জেলেরা গিয়ে অবাধে মাছ ধরতে পারবে, যা অনেক পরিমাণে পূরণ করবে বাংলাদেশের মৎস্যের চাহিদা। সমুদ্রের পানির নিচে এখন যে অংশ আছে, সেখানে পাওয়া যেতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল, যা উঠাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে পারবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ।</p>
<p>ভারতের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেনি। কারণ ভারত চায়নি এই ট্রাইব্যুনালে যেতে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হেগে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। এই আদালত যে রায় দেবে ভারত তা না-ও মানতে পারে। কারণ কোনো দেশ এই আদালতের সালিশ মানতে সেভাবে বাধ্য নয়। বাংলাদেশ তাই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার সমুদ্রের ওপর অধিকার যেভাবে পেতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে তা পেতে পারবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে গিয়ে ভুল কাজ করেনি। কারণ তার নৌবহর এমন শক্তিশালী নয় যে, সে সামরিক শক্তিবলে ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের তাই নির্ভর করতে হবে আন্তর্জাতিক সালিস আদালতেরই ওপর।</p>
<p>মিয়ানমার ও ভারতের ইতিহাস ভিন্ন। মিয়ানমার বা বার্মা একসময় ছিল ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। যেমন প্রদেশ ছিল বাংলা। মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ-ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কিন্তু মিয়ানমার ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। থাকে না আর ব্রিটিশ-ভারতের একটি প্রদেশ হয়ে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ-ভারত থেকে হতে পেরেছিল পৃথক। যদি সে এভাবে পৃথক হতে না পারত তবে ভারত হয়তো এখন দাবি করত মিয়ানমারকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। যেমন সে দাবি করছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে।</p>
<p>মিয়ানমারের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমানা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশকে যেমন ভারত তিন দিক থেকে ঘিরে আছে, মিয়ানমার সেভাবে ঘিরে নেই। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ নেই। কিন্তু ভারতের সাথে বাংলাদেশের আছে ঐতিহাসিক বিরোধ। মিয়ানমারের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের চার গুণের বেশি। কিন্তু মিয়ানমার তা বলে চাচ্ছে না বাংলাদেশকে দখল করে তাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু ভারত স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। তাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে উঠছে কঠিন। ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা হওয়াও তাই যে সহজ হবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। সেখানেও দু’টি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ বাধার সৃষ্টি করতে পারে।</p>
<p>মিয়ানমারের যে প্রদেশকে আমরা বলি আরাকান, আর মিয়ানমার এখন বলে রাখাইন, তার সাথে আমাদের আছে সাধারণ সীমানা। কিন্তু এই সীমানা নিয়ে এখন আর কোনো বিরোধ নেই। এটা নিষ্পত্তি হতে পেরেছে পাকিস্তান আমলে। আরাকানি মুসলমানদের সাধারণভাবে বলা হয় রোহিঙ্গা। সাধারণ বৌদ্ধ আরাকানি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের ফলে ১৯৯১ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, যাদের অনেকে এখনো আরাকানে ফিরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে এদের যাপন করতে হচ্ছে খুবই করুণ জীবন। তবে বার্মার সাথে এ নিয়ে বাংলাদেশ জড়াতে চাচ্ছে না বিবাদে। <strong>ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের দোহাজারী রেলস্টেশন থেকে আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ স্থাপনের একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান মিয়ানমারকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে। আরাকানসহ সমস্ত মিয়ানমার ১৯৪২ সালে চলে যায় জাপানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকেছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। এরপর বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের।</strong> এ রকম রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে ভৌগোলিক কারণে বাড়বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমাণ। আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।</p>
<p><strong>আরাকানের সাথে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এখনো সহজ হতে পারেনি। বাংলাদেশের সাথে আরাকানের রেল যোগাযোগ হলে আরাকানে ব্যবসায়-বাণিজ্য তাই বাংলাদেশের সাথে বেড়ে যেতেই চাইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য সৃষ্টি করবে উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর বিশেষ পরিবেশ। ভারত সম্ভবত চাচ্ছে না এ রকম মৈত্রীর বন্ধন গড়ে ওঠা। তাই বাংলাদেশে ভারতঘেঁষা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিল, মিয়ানমার মানতে ইচ্ছুক নয় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়।</strong> মিয়ানমার সৈন্যসমাবেশ করছে আরাকান-বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন্তু আরাকানে এ রকম সৈন্যসমাবেশ মিয়ানমার ঘটায়নি। এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমরা মিয়ানমারের সাথে কোনো সংঘাত চাই না। আমরা কোনো সংঘাত চাই না ভারতেরও সাথে।</p>
<p>তাই আমরা মামলা করেছি আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। আইনের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আসতে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন আসলে কোনো আইন কি না তা নিয়ে আছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক। কারণ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারী দেশকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শাস্তি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আইনের পক্ষে শক্তির সমর্থন না থাকলে আইনের বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হতে বাধ্য। সমুদ্র আইন আছে, কিন্তু সমুদ্র আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তি প্রদানের কোনো ব্যবস্থা এখনো নেই।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15511</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সিনেমা; শুধুই কি বিনোদন?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/is-cinema-just-entertainment/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/is-cinema-just-entertainment/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 14 Dec 2024 07:54:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15297</guid>

					<description><![CDATA[আচ্ছা, ধরুন তো, প্রতিদিনের মতোই কাকডাকা ভোরে—শহরে থাকেন হেতু—কিচিরমিচির মধুর তানের পরিবর্তে এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো আপনার। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ত্যাগ করলেন আপনি। ঘুমজড়ানো চোখে প্রভাতের স্নিগ্ধ কোমল বাতাসে দু&#8217;কদম হাঁটলেন কি হাঁটলেন না! প্রাতরাশ সাড়লেন চিরাচরিতভাবে। বিরক্তিভরা মন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p dir="ltr">আচ্ছা, ধরুন তো, প্রতিদিনের মতোই কাকডাকা ভোরে—শহরে থাকেন হেতু—কিচিরমিচির মধুর তানের পরিবর্তে এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো আপনার। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ত্যাগ করলেন আপনি। ঘুমজড়ানো চোখে প্রভাতের স্নিগ্ধ কোমল বাতাসে দু&#8217;কদম হাঁটলেন কি হাঁটলেন না! প্রাতরাশ সাড়লেন চিরাচরিতভাবে। বিরক্তিভরা মন নিয়ে শরীরে কর্পোরেট পোশাক জড়ালেন। অফিস যাওয়ার পথে টানা দুই ঘণ্টা জ্যামে বসে ধুলাবালির স্বাদ নিলেন। বিরক্তিকর অসহ্য হর্নের কারণে কর্ণকুহরের উপর চললো নিদারুণ অত্যাচার। কর্মস্থলে গিয়ে শুনতে হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের তর্জন গর্জন আর উর্ধ্বতনের হম্বিতম্বি।</p>
<p dir="ltr">কাজের চাপে দুপুর পেরিয়ে দিন গড়িয়ে কখন যে বিকেল হয়ে এলো, তার কোনো হদিস পেলেন না। ঘণ্টা বা বেলের আওয়াজে ঘোর কাটলো আপনার। বুঝলেন, সময় হয়েছে বাড়ি ফেরার। পথিমধ্যে আহারাদির সামগ্রি কেনার জন্য যাত্রাবিরতি করলেন কোনো এক বাজারে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে ক্রয়ক্ষমতার গ্রাফচার্টে আপনার রেখা নেমে এসেছে একেবারে তলানিতে। মস্তিষ্কের নিউরনে দুশ্চিন্তার ঝড়ের প্রভাবটা ফুটে উঠলো জুলফি বেয়ে গড়িয়ে পড়া কয়েকফোটা ঘামের মাধ্যমে। দোকানীর সাথে অহেতুক দরাদরি করে কাঁচাবাজারগুলো ব্যাগে পুরে নিয়ে আবারও পথ ধরলেন বাড়ির উদ্দেশে।</p>
<p dir="ltr">বাড়িতে এসে দায়সারাভাবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নিলেন। এই দায়সারাভাবে করার কারণও আছে; অফিস বা প্রতিষ্ঠানের একগাদা কাজ বাকী আছে, বাড়িতে বসেই যেগুলো শেষ করতে হবে আপনাকে। দিনভর পরিশ্রমের পর ঘরের মানুষদের সাথে দু&#8217;দণ্ড ভালো-মন্দ গল্প করবেন, সৃষ্টিগত এই চাহিদা ও মনের প্রবল এই ইচ্ছাকেও মাটিচাপা দিতে হলো। বাড়ির কর্তা হিসেবে আপনার কাছে থেকে প্রাপ্য সময়টুকুও পেলো না আপনার পরিজনেরা।</p>
<p dir="ltr">যতটুটুই বা একসাথে বসা হয় বা গল্প করা হয়, তাও সেটা হয় রাতের খাবারের টেবিলে। খুবই সামান্য সময়ের জন্য সুযোগ পান একে অপরকে কাছে থেকে দেখার, একে অপরের চাওয়া ও পাওয়া-না পাওয়ার গল্পগুলো শোনার। সবকিছুর পর, কী যেনো একটা না পাওয়ার হতাশা নিয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলেন। প্রশান্তিময় সুখনিদ্রা&#8230;? কবে যে আপনাকে ত্যাজ্য করে হারিয়ে গিয়েছে অজানা কোথাও, সে হিসেব কষতে বসলে নিজের প্রতিই অভিশাপ দিতে ইচ্ছে করে আপনার।<br />
কোনো পরিবর্তন ছাড়াই এভাবেই বিরক্তিকর এক রুটিনমাফিক যন্ত্রমানব হয়ে আপনাকে অতিবাহিত করতে হয় আপনার প্রতিটা দিন। জীবনের প্রতি আপনার চরম অনীহা; জীবনের প্রতি আপনি মারাত্মক বিরক্ত, মাত্রাতিরিক্ত অতিষ্ঠ। কিন্তু, নিয়ম ও সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন আপনি; চাইলেও পারবেন না এখান থেকে বেরিয়ে আসতে।</p>
<p dir="ltr">
এরপর এলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সবকিছু ফেলে সরিষা-পরিমাণ সামান্য সুখের খোঁজে নেমে পড়লেন। আধুনিকতায় আপনি পরিচিত বলে মনস্থির করলেন মুভি দেখার। অতএব, জীবনের এমন একঘেয়েমি থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পেতে আপনি ঢুঁ মারলেন কোনো এক থিয়েটারে। উদ্দেশ্য, ঘন্টাদুয়েক সময় কাটাবেন সুবিশাল এক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, হারিয়ে যাবেন অজানা এক রাজ্যে; যেনো জীবনের সকল কষ্ট, ব্যথা, বেদনাকে ভুলে যেতে পারেন কয়েক মুহুর্তের জন্য, উপভোগ করতে চান অজস্র বন্ধুর পথে প্যাঁচানো দু&#8217;দিনের এই জীবনকে। কিন্তু, বিধিবাম! বিপত্তিটা ঘটলো ঠিক এখানেই।</p>
<p dir="ltr">যে মুভিটা দেখতে বসলেন, সেখানে এমন কিছুর চিত্রায়ন হয়েছে, যা আপনার সমগ্র চিন্তাকে ওলট-পালট করে দিলো। বিনোদনের পরিবর্তে আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে জীবনের সংজ্ঞাটা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করলো। জীবনটাকে সামান্য সময়ের জন্য উপভোগ করতে এসে থিয়েটার থেকে বেরিয়ে পড়লেন সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে করতে। উত্তর খুঁজে পেলেন নিজের উপর বিরক্ত, জীবনের উপর অতিষ্ঠ এবং প্রশান্তির দূরে চলে যাওয়ার কারণগুলোর।</p>
<p dir="ltr">থিয়েটারের চেয়ারে বসে বিগ-স্ক্রিনের তাকিয়ে সিনেমাটা দেখার সময় আপনার উপলব্ধি হলো, জুলুমপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থাপনার যাঁতাকলে পড়ে আপনি হয়েছেন একজন মানসিক দাস, আপনার জীবনটা হয়েছে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত একজন গোলামের মতো। যানবহনের তীব্র হর্ন ও ধুলাবালিময় সড়ক মূলত যথোপযুক্ত নগরব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ফলাফল। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি মূলত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৈরিকৃত একটা বিষয়, যার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে পশ্চিমা অর্থনৈতিক বিশ্বদর্শন। যেখানে ধনীরা হবে আরো ধনী এবং দরিদ্ররা একেবারে নিঃশেষ হয়ে তারা হবে ধনীদের গোলামে পরিণত। অফিস বা প্রতিষ্ঠানে কাজের চাপ মূলত আপনার পরিজন থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যমূলক হাতিয়ার, যেখানে আপনার মতোই আপনার প্রতিষ্ঠান প্রধান বা উর্ধ্বতনরাও নিজেদের অজান্তেই হয়ে গিয়েছে ঘৃণ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একেকটা খুঁটি।</p>
<p dir="ltr">ফলশ্রুতিতে, পরিজন থেকে দূরে থাকায় একটা সময় আপনি হয়ে পড়বেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সবাইকে বাদ রেখে ভাববেন শুধু নিজেকে নিয়ে। আপনার চিন্তা আবর্তিত হবে শুধু আপনাকে কেন্দ্র করেই। পরিবার-পরিজন একসময় বিতৃষ্ণার উপকরণ হয়ে দাড়াবে। আপনার মানসিক প্রশান্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপনার থেকে বহুদূর চলে যাবে। অতঃপর&#8230;? আপনার জীবনটা হয়ে যাবে গৎবাঁধা নিয়ম ও রুটিনে আবদ্ধ। থাকবে না কোনো নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা। আপনার অজান্তেই আপনাকে চালিয়ে নেওয়া হবে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য, আপনি নির্দ্বিধায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে পালন করবেন তাদের আদেশ। সর্বোপরি আপনি হবেন, অন্যের চিন্তার উপর ভর করে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করা সুস্থ-মস্তিষ্কহীন বিবেক বিবর্জিত এক যন্ত্রমানব!<br />
এখন একটু ভেবে দেখুন তো, আপনার জীবনের মূল্য ও জীবনবোধটা উপলব্ধি করতে পারলেন থিয়েটারে এসে।</p>
<p dir="ltr">জীবনবোধের সংজ্ঞাটা পরিবর্তন হতে শুরু করলো বিগ-স্ক্রিনের জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরিকৃত একটা চিত্রায়ন দেখে। সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থাপনাকে জানার শুরুটাও হলো ঠিক এখান থেকেই। আপনার ভেতরে জাগরিত হয়ে গেলো সমাজ পরিবর্তনের একটা সুপ্ত ইচ্ছা।</p>
<p dir="ltr">
আপনি কিন্তু বিনোদন নিতে এসে নিজের অজান্তেই এতোকিছুর সাথে পরিচিত হয়ে গেলেন। না চাইলেও আপনি এখন ভাবতে বাধ্য হবেন। কারণ, ভাবার মতো একটা মূল উপাদান আপনার ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন, কারণ, বিগ-স্ক্রিনে চিত্রায়িত সিনেমাটি আপনার জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সিনেমাটা যেনো আপনার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। আপনার জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনা থেকে শুরু করে হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, পাওয়া-না পাওয়া–সবকিছুই ঐ সিনেমায় চিত্রায়িত হয়েছে। আপনার ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি আজ পেয়ে গেলেন।</p>
<p dir="ltr">হ্যাঁ, এখানেই রয়েছে একটা সিনেমার স্বার্থকতা ও সিনেমার মূল দর্শন। অতএব, মোটাদাগে বলা চলে, &#8220;সিনেমা&#8221; শুধু বিনোদনের উৎকৃষ্ট একটা মাধ্যমই নয়, বরং এটা একটা আর্ট, একটা শিল্প, বিপ্লবের মুখপাত্র এবং সাহিত্যের মতো সামাজিক দর্পণ।</p>
<p dir="ltr">বিশ্বাস হচ্ছে না?<br />
তাহলে এখনই দেখতে বসুন চার্লি চাপলিনের <strong>মডার্ন টাইমস</strong> মুভিটি।</p>
<blockquote>
<p dir="ltr">বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকের শুরুতেই ব্ল্যাক মানডে ও ব্ল্যাক থার্সডে-র মাধ্যমে শুরু হওয়া গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহানন্দার সেই প্রেক্ষাপটেই পুঁজিবাদি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অর্থের জন্য মানুষের যন্ত্রমানবে পরিণত হবার স্বরূপ তুলে ধরে এবং বিত্তশালীদের অর্থের লোলুপতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করার মাধ্যমে একজন যুবকের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনাচরণ এবং অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হওয়া একটি পরিবারের খাবারের জন্য নিত্যদিনের খাদ্যযুদ্ধকে অসাধারণভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে ১৯৩৬ সালে নির্মিত চার্লি চ্যাপলিনের এই “মডার্ন টাইমস” মুভিটিতে। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটকেই উপজীব্য করেই গড়ে তোলা হয়েছে মুভিটির সামগ্রিক কাঠামো।</p>
</blockquote>
<p dir="ltr">(আরো বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর ষষ্ঠ সংখ্যার সিনেমা পর্যালোচনা অংশটুকু)</p>
<p dir="ltr">অতএব, এটা অস্বীকার জো নেই যে, সিনেমার মাধ্যমে কোনো এক সমাজের মানুষ এবং সে সমাজের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। সিনেমার মাধ্যমে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ে আমাদের সমগ্র জীবনের সারাংশ আঁকা সম্ভব। একটা জাতির জাতীয় পরিচয় বহনের একটা মাধ্যমও হলো এই সিনেমা। কারণ, এটি এমন একটি মাধ্যম, যাকে ব্যবহার করে একটা দেশের সংস্কৃতি, জীবনাচরণ, জীবন দর্শনকে পৃথিবীব্যাপি পরিচিত করে দেওয়া যায় অতি সহজেই। কোনো সমাজ এবং সে সমাজের মানুষের জীবনাচরণ অতি দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত সময়ে বুঝতে সে সমাজকে নিয়ে নির্মিত মুভি-সিনেমাগুলো দেখাই যথেষ্ট।</p>
<p dir="ltr">সমাজ পরিবর্তন বা সামাজিক বিপ্লবের মুখপাত্র হলো সিনেমা। শুধু জনসাধারণের স্বপ্নের প্রতিফলনই নয়, বরং তাদের চিন্তাকে তৈরি করে দেওয়া, চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বা চিন্তার পরিবর্তনও সম্ভব সিনেমার মাধ্যমে। মানুষের জীবনের দুর্দশা, দুঃখ-কষ্ট ও অসংখ্য সমস্যার সমাধান দেওয়া এবং হাজারো সব প্রশ্নের উত্তর দেবার অন্যতম এক উপাদান হলো সিনেমা।</p>
<p dir="ltr">সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন, ম্যাগাজিন—এসব এমন এক মাধ্যম, যাকে ব্যবহার করে মানুষের ভেতরে থাকা আইডিয়াগুলোকে মানুষের মাঝে অতি সহজেই অতি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া যায়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায়। কাজটা সম্ভব হয় জনসাধারণের অজান্তেই; কারণ, তাদের অধিকাংশই থিয়েটারে আসে শুধুমাত্র বিনোদনের খোরাক পেতে।</p>
<p dir="ltr">সর্বোপরি, কেউ যদি ভাবে, স্ক্রিনে চিত্রায়িত বিষয়টার মাঝে ন্যূনতম কোনো দর্শন, সত্য বা কোনো বার্তা নেই, তাহলে সে ব্যক্তিটি কেনো যেনো তার জীবন থেকে ঘন্টাদুয়েক সময় অযথাই নষ্ট করলো।</p>
<p dir="ltr">মূলত, এসবই হলো সিনেমার দর্শন। তবে এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে, সকল মুভিই কি এমন দর্শনকে সামনে রেখে নির্মিত? উত্তরটা হলো, হ্যাঁ, সব মুভিই এমন দর্শনকে সামনে রেখে নির্মিত বা চিত্রায়িত। তবে মতাদর্শ এবং উদ্দেশ্যগত ভিন্নতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ,</p>
<p dir="ltr">আমেরিকান চলচ্চিত্র-হলিউড বা এই মতাদর্শের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বর্তমান সিনেমাপ্রেমী যুবসমাজকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে। যেমন,</p>
<ul>
<li dir="ltr">০১. অবসর যাপনের জন্য সিনেমাকে যারা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে। এদের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের দর্শন হলো, যুবকরা যেনো সবকিছু ফেলে তাদের তৈরিকৃত জগতের মাঝেই বিচরণ করে।</li>
<li dir="ltr">০২. যারা সিনেমাকে একটা আর্ট, বিপ্লব আর সমাজের দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করে। এদের ক্ষেত্রে তাদের দর্শন হলো, সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা দৃশ্যায়নের মাধ্যমে যুবকদের মাঝে তাদের অজান্তেই নিজেদের দর্শন ও চিন্তা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া।</li>
</ul>
<p dir="ltr">বিষয়টা অনেকটা নির্ভর করে ডিরেক্টর এবং ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানির নিজস্ব দর্শনের উপর। যে ফিল্ম প্রোডাকশন হাউস যে দর্শনকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, সে কোম্পানি তার সেই দর্শন বা সেই মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সিনেমা চিত্রায়িত করে। অতএব বলা যায়, তাদের নিজেদের মাঝে মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও তাদের উদ্দেশ্য একটাই; যেভাবেই হোক, যুবসমাজকে ফিকশোনাল একটা ওয়ার্ল্ডে বসবাস করানো। নিজেদের দর্শন ও নিজেদের চিন্তা দিয়ে তাদেরকে চিন্তা করানো।<br />
যেহেতু মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ফিল্ম প্রোডাকশন হাউসগুলোর মাঝে মতাদর্শগত ও উদ্দেশ্যমূলক ভিন্নতা রয়েছে, অতএব এটা সুনিশ্চিত যে, সবগুলো মুভি বা সিনেমা কখনও একই ক্যাটাগরির হবে না।</p>
<p dir="ltr">এখানে উল্লেখ্য যে, যে মুভিগুলো সমাজ পরিবর্তনের দর্শনকে সামনে রেখে নির্মিত হয়, কোনো এক চিন্তাকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যকে ঘিরে চিত্রায়িত হয়, সামাজিক দুঃখ-দুর্দশার পরিস্ফুটনকে কেন্দ্রে রেখে আবর্তিত হয়, চিন্তার উৎপাদন করতে পারে বা থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করে, কোনো বিপ্লবের মুখপাত্র হবার যোগ্যতা ও সক্ষমতা রাখে অথবা কোনো বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, এসব মুভিগুলোকে এই দর্শনের ছাঁচে ফেলা যায়। এই ক্যাটাগরির মুভি-সিনেমাগুলোকে “ক্ল্যাসিক্যাল” এবং “বিয়োন্ড টাইম” মুভি নামেও ডাকা হয়।</p>
<p dir="ltr">সে যাইহোক, এবার কয়েকটা উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p dir="ltr">আমি সকলেই জানি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা সত্য যে, অতীতের সোনালী ইতিহাসকে স্ক্রিনে চিত্রায়ন করাও একধরনের পলিটিকাল পলিসি। বর্তমানের বৈশ্বিক এই রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে এটা করা এখন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি, অতীতের ইতিহাসকে কাল্পনিক ঘটনার সাথে জুড়ে দিয়ে সিনেমার চিত্রায়নটাও ক্ষেত্রবিশেষে অলিখিত ও অত্যাবশ্যক একটি নিয়ম হয়ে গিয়েছে। কারণ, এতে করে সিনেমাটা দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসাসফল হয় এবং একইসাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও কূটকৌশল সফল হয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>হলিউডের হাজারো সিনেমা থেকে মাত্র একটা সিনেমার নাম বলা যায়, যেটাতে শুধু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক স্বার্থোদ্ধার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং শত্রু মনোভাবাপন্ন দেশগুলোর বিরুদ্ধে চরম পর্যায়ের মিথ্যাচার করে বিশ্বব্যাপী ঘৃণা, বিদ্বেষ ও জনরোষ সৃষ্টি করার সকল ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।</strong></p>
<p>সেই মুভিটা হলো, বিখ্যাত সাইফাই একশন থ্রিলার ফ্র্যাঞ্চাইজি <strong>“ট্রান্সফরমার্স”</strong>-এর তৃতীয় কিস্তি <strong>“ট্রান্সফরমার্স : ডার্ক অব দ্যা মুন”</strong>। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সিনেমাটোগ্রাফিতে <strong>“ফাস্ট কাটিং”</strong> নামে পরিচিত বিখ্যাত পরিচালক মাইকেল বে। এই ভদ্রব্যক্তি সেই লোক, যিনি <strong>”থারটিন আওয়ার”</strong>-এর মতো মুভি পরিচালনা করেছেন। অতএব, এই ব্যক্তির পরিচালিত সিনেমাগুলো কেমন হবে, সেটা আর বলতে হচ্ছে না।</p>
<p>এই সিনেমায় মূলত চন্দ্রাভিযান হওয়ার উদ্দেশ্য দেখানো হয়, চন্দ্রাভিযানের ৬-৭ বছর আগে চাঁদে আননোন একটা স্পেসশিপ ক্র্যাশ করে। সেটার ব্যাপারে এখন রিসার্চ করতে হবে। কিন্তু, রাশিয়ারও এ&#8217;ব্যাপারে অবগত থাকার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় রিসার্চ করার জন্য এখন চাঁদে যাওয়া প্রয়োজন। এমনকি, সিনেমাটিতে এসব দৃশ্যগুলোয় জন এফ কেনেডি-সহ চন্দ্রাভিযানের সেই সময়ের সাদাকালো রিয়েল ফুটেজ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, সত্য ঘটনার সাথে এভাবে ফ্যান্টাসি মিশিয়ে সিনেমাটা ব্যবসাসফল ও দর্শকপ্রিয় হবার সাথে সাথে স্বার্থান্বেষী মনোভাব প্রচার করা।</p>
<p>এরপরের ঘটনাপ্রবাহে মানুষ-রোবটের এলায়েন্স হয়, প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়। এমনকি এই আমেরিকাই এখন মানুষ-মানুষে হানাহানি বন্ধ করতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার করে!</p>
<p>মুভির ভাষাতেই বলি। ট্রান্সফরমার্স-এর মূল চরিত্রগুলোর দলনেতা হচ্ছে অপটিমাস প্রাইম। পশ্চিমাদের ভাষ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের কল্পিত তাও আবার ‘নিষিদ্ধ’ নিউক্লিয়ার সাইটের উদ্দেশে মুভির প্রেক্ষাপটে ট্রান্সফরমার্স-এর মূল চরিত্রগুলো যাত্রা করে। সে সময় অপটিমাস প্রাইমকে বলতে শোনা যায়,</p>
<p>❝In the years since our arrival, our new home, Earth, has seen much change. Long-range defense systems watch the skies. Energon detectors guard its cities now. So now we assist our allies in solving human conflicts, to prevent mankind from bringing harm to itself.❞</p>
<p>অথচ, এরচেয়ে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে, জানা নেই। পৃথিবী বিধ্বংসী শক্তি স্বয়ং বলছে, তারা নাকি মানবহিতৈষী</p>
<p>সিনেমাটিতে মূলত সাই-ফাই একশন থ্রিলার জনর-এর হলেও ফ্র্যাঞ্চাইজির মুভিগুলোতে পলিটিক্স, ডিপ্লোম্যাসি আর সিক্রেট এজেন্সির উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মুভিগুলোর ব্যপ্তি ছিলো ওয়ার্ল্ডওয়াইড। রাশিয়া থেকে শুরু করে চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ হয়ে ল্যাতিন আমেরিকা পর্যন্ত।</p>
<p>এমনকি, ফ্র্যাঞ্চাইজির মুভিগুলোতে মানুষ-রোবটের এলায়েন্স হওয়ার প্রথম প্রশ্নটাই ছিলো, এই প্রযুক্তি যদি চিন-রাশিয়ার হাতে যায়, তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে?</p>
<p>মানুষ-রোবটের এলায়েন্স না হওয়ার ১০১টা যুক্তি থাকলেও এই প্রশ্নের কাছে গভর্নমেন্ট আর সিক্রেট এজেন্সির মতামত এক। অর্থাৎ, তারা চায় যেকোনো মূল্যে নেতৃত্বের সিংহাসন হাতে রাখতে।</p>
<p>আবার একজন দর্শক যখন অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি, মনোমুগ্ধকর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং স্বদেশ বিজয়ী হবার তৃপ্তিদায়ক এক হ্যাপি এন্ডিং দেখে, তখন সিনেমায় দেখানো প্রতিটি দৃশ্যই তার কাছে বাস্তবধর্মী মনে হবে এবং সিনেমায় দেওয়া বার্তাগুলো দর্শকের মগজে গেঁথে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই, এসব সিনেমা একটু সতর্ক হয়ে দেখা উচিত!</p>
<p>এখানেই শেষ নয়!<br />
আরো আছে, যেসবে তাদের দ্বিচারিতা ফুটে ওঠে।<br />
কোনো একটা জিনিসের যাচ্ছেতাই ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংস করে ঐ জিনিসটার প্রতিই আবার দরদ দেখানোটা পশ্চিমাদের অতি পরিচিত একটা স্বভাব।</p>
<p>প্রাণীদেরকে নিয়ে নিষ্ঠুর আর অমানবিক সব এক্সপেরিমেন্ট থেকে শুরু করে মানুষকে পর্যন্ত গিনিপিগ বানিয়েছে তারা। শিল্পায়নের নাম করে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে প্রকৃতির অবস্থাটা দুরবস্থা করতে এমন কোনো উপায় বাকী নেই, যেটার ব্যবহার তারা করেনি। প্রতি বছর শয়ে শয়ে পাখি মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিল্ডিংয়ের থাই গ্লাস বা কাচের জানালার সাথে ধাক্কা খেয়ে। ইনকা, মায়া, এযটেক সভ্যতাকে ধ্বংস করে সেসব জায়গায় ইট-পাথরের বস্তি বানিয়ে রেখেছে এখন তারা</p>
<p>অথচ, নেটফ্লিক্সের বিখ্যাত ডকু সিরিজ <strong>Our Planet</strong>-এর দ্বিতীয় সিজনের সম্ভবত প্রথম এপিসোডেই বিখ্যাত ন্যারেটর <strong>David Attenborough</strong> বলেন,</p>
<p>❝Across the island, chicks are dying. There is now so much plastic in our oceans, that it reaches even the most remote islands on Earth, carried here by the currents. And only now are we beginning to understand that all life on Earth depends on the freedom to move.❞</p>
<p>প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে প্রাণীদের উদ্বাস্তু করে এখন এসে তারা প্রকৃতির উপর দরদ দেখাচ্ছে। তারা বলছে, মানুষ নাকি কেবল বুঝতে শুরু করেছে প্রাণীদেরকে তাদের মতো করেই রেখে দিতে হয়।<br />
কিন্তু কোথায়? উন্নতির নাম করে শিল্পায়নের আগে তো কখনও প্রাণীরা তাদের জীবন নিয়ে এতোটা বিপাকে পড়েনি! উন্নতি কি আগে হয়নি?<strong> উসমানীয়দের সময়ে বরং প্রতিটি দালানেই নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকতো, যেখান থেকে পাখিরা বিশ্রাম নিতো আর খাবার খেতো। এমনকি, কোনো অঞ্চলে পাখিদের সুবিধার জন্য উঁচু উঁচু দালান নির্মাণ করা নিষিদ্ধ ছিলো।</strong></p>
<p>দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, পশ্চিমাদের এতোসব কাজ-কারবার যতোটা না আশ্চর্যজনক, তারচেয়েও বেশি আশ্চর্যজনক হলো, মানুষরা এসব আবার বিনা দ্বিধায় বিশ্বাসও করে থাকে।</p>
<p>এবার একটু আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটের দিকে নজর বুলিয়ে এই আলোচনার সমাপ্তি আঁকা যাক।<br />
আমাদের দেশে সিনেমা হল কেন বিলুপ্ত হলো, এর উত্তর খুঁজতে বসলে অবশ্য অনেকগুলো উত্তরই পাওয়া যাবে। তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা হলো ঝানু পরিচালক এবং অভিজ্ঞ গল্প-কথকের অভাব।</p>
<p>স্বাধীনতা উত্তর আমাদের সিনেমা অঙ্গন বেশ নামডাক অর্জন করেছিলো। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ১৯৮৯ এ মুক্তিপ্রাপ্ত “<strong>বেদের মেয়ে জোসনা</strong>” সিনেমাটি। হাল আমলের হাইপ তোলা কোনো সিনেমাই সেই পুরনো আমলের সিনেমার সফলতার ধারেকাছে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।</p>
<p>এমন উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি সিনেমার কারণে সিনেমা হলগুলোয় দর্শকের উপচেপড়া ভিড় দেখা যেতো। ছুটির দিনগুলোর বিশেষ আর্কষণই যেনো ছিলো সিনেমা হলগুলো। ইদানীং যেমন বিভিন্ন পার্ক রিসোর্টের প্রতি টান থাকে জনসাধারণের, তেমনি সে আমলে ছুটির দিনগুলোয় সিনেমা হলগুলোয় জায়গা পাওয়াটা কঠিন হয়ে যেতো।</p>
<p>এমন সফলতায় ভাটা পড়তে খুব একটা সময় লাগে না। বিনোদন ক্রমান্বয়ে ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, ভালো রুচিশীল সিনেমা নির্মাণে সময় ব্যয় হয়। কিন্তু, দর্শকদের এমন সিনেমাপ্রেম আর হলমুখিতা দেখে কয়েকজন পরিচালক ব্যবসায় নেমে পড়ে।</p>
<p>সেক্টরটা বিনোদন থেকে ব্যবসায় রূপান্তর হওয়ায় কমার্শিয়াল মুভির নামে প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমা তৈরির চল শুরু হয়। আর এসবের জন্য তো না লাগে কোনো ঝানু পরিচালক, না লাগে অভিজ্ঞ গল্প-কথক। ফলে, রুচিশীল দর্শক হারাতে শুরু করে সিনেমা হলগুলো। এক এক করে খালি হতে শুরু করে একটা পর্যায়ে এসে দর্শকশূন্য হয়ে পড়ে সিনেমা হলগুলো।</p>
<p>ফলাফল এসে দাঁড়ায়, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সারাদেশে যেখানে প্রায় সাড়ে চোদ্দোশত সিনেমা হল ছিলো, মাত্র এক যুগের ব্যবধানে সেখানে সিনেমা হলের সংখ্যা এসে দাড়ায় সাতশ&#8217;তে। কয়েকবছর আগে তা আরো নেমে এসে সংখ্যাটা হয় মাত্র একশোতে।</p>
<p>মূলত, যে বিষয়টার জন্য এতোগুলো কথা নিয়ে আসা, সেটা হলো, হুমায়ূন আহমেদ-এর “যমুনার জল দেখতে কালো” নাটকটা নিয়ে বলা।<br />
সেসময়ের সিনেমা সেক্টরের এমন দুরবস্থাকে ব্যঙ্গ করে হুমায়ূন আহমেদ এই নাটকটা পরিচালনা করেন। যেহেতু তিনি ছিলেন একজন বাম, আবার নামকরা পরিচালক, বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক “<strong>বাকের ভাই</strong>” চরিত্র যেখানে তারই সৃষ্টি, এমনকি অনেকে লেখক হুমায়ূন আহমেদ-এর চেয়ে পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ-কেই বেশি পছন্দ করে থাকে, সে হিসেবে দেশের সিনেমাঙ্গনের এমন দুরবস্থাকে কটাক্ষ করতে দেরি ন্যূনতমও কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি।</p>
<p>নাটকটার সময়কাল নিয়ে খুব একটা জানা যায় না। তবে, কলাকুশলীদের বয়স দেখলে টের পাওয়া যায়, সিনেমাঙ্গনে যেসময় এমন দুরবস্থা এবং নাটকের জয়জয়কার চলছিলো, এমন সময়ে পরিচালনা করা হয় নাটকটি।<br />
বাম ঘরানার এই সমালোচক পরিচালকের স্যাটায়ারমূলক নাটকটার কয়েকটা পয়েন্ট উল্লেখ না করলেই না। যেমন,</p>
<ul>
<li>১. অভিনেতাদের নামমাত্র অভিনয়।</li>
<li>২. যখন-তখন অভিনেতা পরিবর্তন করা।</li>
<li>৩. সিনেমার নামে পয়সার ব্যবসা।</li>
<li>৪. কমার্শিয়াল মুভির নামে প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমা তৈরি।</li>
<li>৫. পরিচালকদের উপর প্রোটাগোনিস্টদের আধিপত্য।</li>
<li>৬. প্রোটাগোনিস্টদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এবং সেসব নিয়ে কানাঘুষা।</li>
<li>৭. পুরো অভিনয় সেক্টরের উপর সংবাদকর্মীদের আধিপত্য।</li>
<li>৮. কমার্শিয়াল মুভির প্রতি নজর দেওয়ায় একই গল্প বারবার নিয়ে আসা।</li>
<li>৯. পরিচালকের জ্ঞানের দৈন্যতা এবং কলাকুশলীদের অযোগ্যতা।</li>
</ul>
<p>এসব দিক-সহ আরো অনেকগুলো দিককে ঝানু এই পরিচালক একেবারে হাস্যরসাত্মকভাবে কটাক্ষ করে উপস্থাপন করেছেন “যমুনার জল দেখতে কালো” নাটকটিতে।</p>
<p>অতএব, পরিশেষে এসে এটা বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, সিনেমা যেমন একদিকে একটা আর্ট, একটা শিল্প, বিপ্লবের মুখপাত্র এবং সাহিত্যের মতো সামাজিক দর্পণ; তেমনি অন্যদিকে সিনেমা শুধু সিনেমা না, এটা মানুষের চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম এবং পলিটিক্স ও ডিপ্লোমেসির অন্যতম সেরা একটি হাতিয়ার।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/is-cinema-just-entertainment/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15297</post-id>	</item>
		<item>
		<title>গাজা এবং মুসলিম উম্মাহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/gazza-and-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/gazza-and-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 07 Nov 2024 10:22:22 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15204</guid>

					<description><![CDATA[।। বিসমিল্লাহির রহমানীর রাহীম ।। &#160; জালিমের বিচারক এবং মজলুমের সহায়ক শক্তিশালী সেই মহান রবের নামে শুরু করছি। প্রশংসা তাঁর, যিনি সর্বদা নিত্য-নতুন কর্ম সম্পাদন করেন, যিনি মুমিনদের হৃদয়কে অবিচল রাখেন এবং অত্যাচারীদের হৃদয়ে ভীতি সঞ্চার করেন। দুরূদ ও সালাম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">।। বিসমিল্লাহির রহমানীর রাহীম ।।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p style="text-align: left;">জালিমের বিচারক এবং মজলুমের সহায়ক শক্তিশালী সেই মহান রবের নামে শুরু করছি। প্রশংসা তাঁর, যিনি সর্বদা নিত্য-নতুন কর্ম সম্পাদন করেন, যিনি মুমিনদের হৃদয়কে অবিচল রাখেন এবং অত্যাচারীদের হৃদয়ে ভীতি সঞ্চার করেন। দুরূদ ও সালাম প্রেরিত হোক মানবজাতির সর্দার মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রতি।</p>
<p>সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, বিশিষ্ট দায়ীগণ এবং বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম!<br />
আপনাদেরকে ইসলামের সম্ভাষণ জানাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।</p>
<p>আজ এখানে আমরা একত্রিত হয়েছি বর্ণনাতীত আমাদের এই দুঃখটাকে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। গাজায় আমার ভাইয়েরা আজ অবরুদ্ধ ও কারাবন্দি, শিশুরা আজ ক্ষতবিক্ষত এবং বোনেরা আজ নিপীড়িত ও বিতাড়িত। আমাদের নিজেদের এখন প্রশ্ন করা উচিত, আজ এখানে আমরা কোন ভাষায় কথা বলবো! যদিও বা বলি, তাহলে কোন কথাগুলো বলবো! আমরা কি পশ্চিমা অত্যাচারী রাষ্ট্রের সমালোচনাতেই ক্ষান্ত থাকবো নাকি মুসলিম ঘুমন্ত রাষ্ট্রসমূহের প্রতি চেয়ে থাকবো? নাকি আমরা চুপচাপ বসে থেকে গাজার অধিবাসীদের এমন দুর্বিষহ জীবন প্রত্যক্ষ করে যাবো?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সম্মানিত ভাইয়েরা,<br />
আজ আমি আমার অনুভূতি সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরতে চাই। মহান রবের শপথ, দীর্ঘদিন যাবত আমি এসব ভেবে আসছি। আর এটা কোনো বিষয় না যে, একথাগুলো আমি ফিলিস্তিনের সেনাবাহিনীর সামনে বলবো নাকি গাজার অবরুদ্ধ অধিবাসীদের সামনে বলবো। এমনকি, কেয়ামতের দিনে আমার এসব কথার দায়ভার আমিই নেবো। এসব কথা যেন সেই সোনালী অতীতে ফিরে যাবার সোপান হয়।</p>
<p>আজ আমি শুধু গাজার অধিবাসীদের নিয়ে কথা বলবো না, অথবা, তাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়া বা তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবো না, বরং, আজ আমি সবার মাঝে একটি মেলবন্ধন তৈরি করার বিষয়টির প্রতি নজর দেবো।</p>
<p><strong>গাজার অধিবাসীদের নিকট থেকে আমি ধৈর্য এবং ইস্তিকামাতের শিক্ষা গ্রহণ করি। গাজার নিষ্পাপ শিশুদের অশ্রুর মাঝে আমি ভবিষ্যৎ খুঁজতে থাকি। গাজার মুজাহিদদের সাহসিকতায় আমি বীরত্ব ও সাহসিকতার দর্শন পাই।</strong> গাজার অধিবাসীদের ঐক্যের মাধ্যমে আমি বিশ্বভ্রাতৃত্বের আশার সঞ্চার করে থাকি। তারা আমাদেরকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সম্মান, মর্যাদা, সাহসিকতা ও বীরত্বের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায়, আজকের গাজা আমাদেরকে এমন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যা আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানে পাই না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সম্মানিত উপস্থিতি,<br />
আজ আমি চারটি বার্তা প্রদান করতে চাই।</p>
<p><strong>প্রথম বার্তাটি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি,</strong><br />
সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে আজ পশ্চিমা সভ্যতার বাস্তবরূপ উন্মোচিত হয়েছে। তাদের দ্বিচারিতা, দখলদারিত্ব ও স্বার্থোদ্ধারের স্বভাবগুলো আজ সবার নিকট পরিচিত। পাশ্চাত্যের দখলদারী মনোভাবের কারণে পৃথিবীবাসী আজ বাকরুদ্ধ। তারা লাঞ্ছিত, আল্লাহর কসম, তারা বিতাড়িত। তাদের বর্ণিত ইতিহাসেই তারা লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত। গাজায় আজ যা হচ্ছে, তা মূলত তাদের ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি করছে তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি ও পাশ্চাত্যের কৃত অন্যায়গুলো কারো অজানা নয়। এরপর তারা এই ভূমিকে ইহুদিদেরকে দান করে দিলো। এই ভূমির মালিক তারা নয়। এই ভূমি তাদেরকেই দেওয়া হয়েছে, যারা অত্যাচারী। পশ্চিমারাই ইহুদিদেরকে অত্যাচারী, নিষ্ঠুর এবং খুনী হতে সাহায্য করেছে। এভাবেই তারা সভ্যতার ধ্বজাধারীতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>এই সময়ে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, পশ্চিমারা এখনও ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে দেখে। তারা তাদের আইডিওলজির মাধ্যমে অনেককিছুর সমাপ্তি টেনেছে, আইডিওলজিক্যাল সমাপ্তি, সভ্যতার সমাপ্তি, ইতিহাসের সমাপ্তি। আর আমি বলি, প্রতিটি শিশুর কান্না, প্রতিটি নারীর সম্মান এবং প্রতিটি পুরুষের জীবনের বিনিময়ে আজকের এই সভ্যতার পরিসমাপ্তি হবে গাজার প্রতিটি পাথরের নিচে। পাশ্চাত্যকে সহযোগিতা করা প্রত্যেকের কবর রচিত হবে গাজার এই প্রাঙ্গণ থেকেই।</p>
<p>পশ্চিমা নেতারা ইজরায়েল সফরে আসে। এরপর তারা কী বলে? তারা বলে, একজন জায়োনিস্ট হওয়ার জন্য ইহুদি হওয়া কখনও শর্ত নয়। আর আমি বলি, গাজার অধিবাসীর দুর্দশা বুঝার জন্য শুধু মানুষ হওয়াই যথেষ্ট, ফিলিস্তিন বা আরব অঞ্চলের মানুষ হওয়া শর্ত নয়।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় বার্তাটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি,</strong><br />
জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে, প্রতিটি দেশের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবে, তারা শুধুমাত্র শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার মাত্র। কিন্তু বাস্তবে, তারা জনগণের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে অত্যাচারীদের শক্তি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। তারা সুপরিকল্পিতভাবেই তাদের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করেছে। তাদের কার্যক্রম গাজার কোনো উপকারে আসেনি। কোনো শিশুর জীবন বাঁচাতেও অবদান রাখেনি। কোনো নারীর অধিকার নিয়েও তারা সচেতন হয়নি। গাজার কোনো মসজিদ এবং হাসপাতাল রক্ষার ক্ষেত্রেও তারা অবদান রাখেনি।</p>
<p>অন্যদিকে, আমাদের Organisation of Islamic Cooperation (OIC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বায়তুল মাকদিস এবং ফিলিস্তিনকে যায়োনিজমের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আজ জেদ্দার পথে-প্রান্তরেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। লোক-দেখানো প্রাতিষ্ঠানিক কিছু কার্যক্রম এবং সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন তাদের মৌলিক কার্যক্রম বাদ দিয়ে বৃহৎ মুসলিম দেশগুলোর সমিতিতে পরিণত হয়েছে। সকল নেতৃবৃন্দের প্রতি (তুরস্কের মন্ত্রীবর্গ-সহ) আমার বক্তব্য হলো, এ বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত থাকুন যে, আজকের পর থেকে গাজা শুধু তুরস্কের জন্যই নয়, বরং ফিলিস্তিন-সহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর স্ট্র্যাটেজিকে নিয়ন্ত্রণ করবে।</p>
<p><strong>আমার তৃতীয় বার্তা হলো মুসলিম উম্মাহর আলেমগণের প্রতি,</strong><br />
বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম,<br />
উসমানীয় খেলাফত ছিলো মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানের একটি কেন্দ্র, যা আজ হারিয়ে গিয়েছে। পরবর্তীতে আলেমগণ মাযহাব, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক, ভৌগলিক-সহ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ যেনো, একটি আন্দোলন ছিন্নভিন্ন হওয়ার নামান্তর।</p>
<p>আলেমগণ এখন সাধারণ মুসলিমদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে অক্ষম। মুসলিম যুবসমাজের মাঝে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে অক্ষম। আবার, তাদের কেউ কেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। সর্বোপরি, আলেমগণ মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত অবস্থাকে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। তাহলে কীভাবে আমরা উম্মাহকে একতাবদ্ধ করবো, যেখানে আমরা নিজেরাই শতধা-বিভক্ত? তাহলে কীভাবে আমরা উম্মাহর নিকট থেকে নেতৃত্ব ও প্রতিহতের আশা করবো, যেখানে আমরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ব্যতিব্যস্ত? এমতাবস্থায়, মুসলিম উম্মাহর বিরাট এই সংকটকালে ফিলিস্তিনের জন্য সকল মতাদর্শের আলেমগণকে একত্রিত হবার বিনীত অনুরোধ করছি।</p>
<p><strong>আমার চতুর্থ বার্তা উম্মাহর যুবসম্প্রদায়ের প্রতি,</strong><br />
হে মুসলিম যুবকেরা,<br />
তোমরাই আগামীর কারিগর। ফিলিস্তিন সংকট এসময় তোমাদের সবচেয়ে বড় ভাবনার বিষয়। এরমাঝেই রয়েছে তোমাদের সম্মান ও মুক্তি। মৌলিক বিষয়াবলীকে পাশে রেখে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়ায় তোমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম উম্মাহর মুক্তি আন্দোলন সফল হতে পারেনি। কিন্তু, আমি তোমাদের নিকট আশা করবো, তোমার তাদের মতো হয়ো না। তোমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সঠিকভাবে পালন করো।</p>
<p>পরিশেষে, স্মরণ করতে চাই গাজার সাহসী অধিবাসীদের।<br />
আপনার ধৈর্য ধরুন, অবিচল থাকুন, একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করুন। এটা ভুলবেন না, মহান রব সর্বদা আপনাদের সাথেই রয়েছে, তিনি কখনও আপনাদেরকে ছেড়ে যাবেন না। আপনারা এখন মর্যাদার আসনে সমাসীন। আপনারাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। আপনাদের ব্যাপারেই রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় একঘণ্টা অবস্থান করা লায়লাতুল কদরে হাজরে আসওয়াদে সালাত আদায়ের চেয়েও উত্তম।</p>
<p>আপনারাই <strong>অগ্রগামী</strong>, যারা আপনাদের বাধা প্রদান করে তারাই নিকৃষ্ট।<br />
আপনারাই <strong>সম্মানিত</strong>, যারা আপনাদের নিয়ে কথা বলে তারাই লাঞ্ছিত।<br />
আপনারাই <strong>সত্যবাদী</strong>, যারা আপনাদের ছেড়ে গিয়েছে তারাই মিথ্যাবাদী।<br />
আপনারাই বরং প্রকৃত শক্তির অধিকারী এবং রুকু-সেজদা আদায়কারী।<br />
কেউ আপনাদের পেছন থেকে ক্ষতিসাধন করতে পারবে না, লাঞ্ছিতও করতে পারবে না।<br />
আপনারাই <strong>আল্লাহর প্রকৃত সৈনিক</strong>, যারাই আপনাদের পেছন থেকে ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তারাই শয়তানের দোসর।</p>
<p>হে ইসলামের মাতৃকুল, হে গাজার নারী, হে বীরের জন্মদাত্রী, হে প্রজন্মের বয়োবৃদ্ধা!<br />
তোমাদের বীরত্বের সামনে আমরা তুচ্ছ। তোমাদের প্রচেষ্টা এবং অবিচলতার সামনে আমরা পরাজিত। একজন মা সাধারণত একবার জান্নাত লাভ করে থাকেন। কিন্তু আপনারা তিনবার জান্নাত লাভ করে থাকেন। প্রথমবার সন্তান জন্মদান করে, দ্বিতীয়বার তাদেরকে লালনপালন করে, তৃতীয়বার দ্বিধাহীন চিত্তে তাদেরকে শাহাদাতের পথে উৎসর্গ করে।</p>
<p>হে গাজার দুঃসাহসী বালকেরা!<br />
জন্মলগ্ন থেকেই তোমরা মহান, বন্দী থেকেও তোমরা স্বাধীন। নৃশংস শত্রুরা তোমাদের পেছনেই পড়ে রয়েছে। কারণ, মুসলিম উম্মাহর আগামীর কারিগর তোমরা বালকরাই।</p>
<blockquote><p>হে মুসলিম উম্মাহ!<br />
তোমাদের ভাইয়েরা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তোমাদের আশায় বসে রয়েছে, তোমাদের সহযোগিতা কামনা করে।<br />
আমাদের বক্তব্যগুলো কি গাজার শিশুদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করবে?<br />
আমাদের নিরর্থক মন্তব্যগুলো কী গাজার নারীদের রক্ষা করবে?<br />
আমাদের নির্লজ্জ বাণীগুলো কি আমাদের ব্যর্থতাকে আড়াল করবে?<br />
অথবা, গাজার মুজাহিদদের কি সহযোগিতা করবে?</p></blockquote>
<p>গাজার অধিবাসীরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। তারা শুধু আমাদের নিকট থেকে সহযোগিতাটাই কামনা করে। বাস্তবতা হলো, দুর্বিষহ এই সময়ে যদি আমরা এক হতে না পারি, তাহলে আর কখনও আমরা এক হতে পারবো না। ফিলিস্তিনিরা, বিশেষ করে গাজার অধিবাসীরা আজ কঠিন এক মুহূর্ত অতিক্রম করছে। <strong>এসময়েই হয় আমরা তাদের সহযোগী হবো নতুবা আমরা বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হবো। এর বাইরে আর কোনো পথ উন্মুক্ত নেই।</strong></p>
<p>মহান রবের নিকট কামনা করি,<br />
একে অপরের মাধ্যমে তিনি যেন আমাদেরকে শক্তিশালী করে তোলেন। আমাদেরকে একে অপরের সহযোগী করে গড়ে তোলেন। আমাদেরকে একে অপরের নিরাপত্তার স্থল হওয়ার সুযোগ প্রদান করেন। গাজার মুজাহিদ এবং বীরসেনানীদের সাহায্য করার তৌফিক দান করেন। তিনি যেন গাজার শিশু, নারী, অধিবাসী এবং তাদের স্থাপনাগুলোকে রক্ষা করেন। সর্বোপরি, মাসজিদুল আকসার প্রাঙ্গণে বিজয়ের দুরাকাত সালাত আদায়কে তিনি যেন আমাদের জন্য আবশ্যক করে রাখেন।</p>
<p>দুরূদ ও সালাম প্রেরিত হোক রাসূল সা., তাঁর সাহাবী এবং তার পরিবারবর্গের উপর। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/miftahur_rahman/">মিফতাহুর রহমান</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/gazza-and-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15204</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কৌলিন্যবাদ ও প্রাথমিক আলাপ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/elitism-and-initial-conversation/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/elitism-and-initial-conversation/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হিশাম আল নোমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 01 Nov 2024 11:51:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15179</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম &#160; হাল যমানায় মুসলিমদের উপরে দমন পীড়ন অত্যাচারের মাত্রাটা বিশ্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এরকম প্রহসনের ধারা মুসলিম উম্মাহর উপরে এই প্রথম নয়! এই ধারাতো ইসলামের একেবারে শুরু থেকেই, যার ফলাফলই তো ছিল ইতিহাসের গতিপথ পালটে দেয়া সায়্যিদুল]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>হাল যমানায় মুসলিমদের উপরে দমন পীড়ন অত্যাচারের মাত্রাটা বিশ্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এরকম প্রহসনের ধারা মুসলিম উম্মাহর উপরে এই প্রথম নয়!</p>
<p>এই ধারাতো ইসলামের একেবারে শুরু থেকেই, যার ফলাফলই তো ছিল ইতিহাসের গতিপথ পালটে দেয়া সায়্যিদুল মুরসালীন ও তাঁর সাহাবীগণের হিজরত। এর পরের ইতিহাসতো শুধু ইসলামের বিজয়ের ইসলামের মহিমান্বিত সম্প্রসারণের&#8230;.</p>
<p>আজকের পরিণতির এই নিষ্ঠুর ধারার সূচনাটা হয়েছিল আলমে ইসলামীর একেবারে পশ্চিম থেকে, ফেরদাউসে মাকফুদ আন্দালুস থেকে। স্পেনের যমীন থেকে সম্পূর্ণ ইসলামকে নির্মূল করতে সফল হলো ইউরোপীয়ানরা। এর পরের কয়েক শতাব্দী মোটামুটি এই মুসিবত থেকে উম্মাহ মুক্ত ছিল।</p>
<p>উপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়গুলোতে হতে থাকল ক্ষমতার পালাবদল। ইউরোপীয়ানরা মুসলিম ভূখন্ডগুলো শোষণ করে সাফ করে দিল, উপর্যুপরি লুণ্ঠনের পরে ক্ষমতার মসনদের নাগাল দিয়ে গেল মুসলিম বিরোধী শক্তিগুলোকে। আফ্রিকায় খ্রিষ্টানদের হাতে, হিন্দুস্তানে হিন্দুদের হাতে, আর পূর্ব এশিয়া ( মালয়, ইন্দোচীন) অঞ্চলে উঠে আসল চীনা সংস্কৃতিঘেঁষা বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টানরা। এই ধারারই আরেকটি মুখ ছিল কম্যুনিস্টদের দখলে, চীন এবং রাশিয়া-মধ্য এশিয়াকে ভাগ করে নিল; তুর্কিস্তান রাখল চীন আর পামিরের অপর প্রান্তের মধ্য এশিয়ার তুর্কি ভূখন্ডগুলো এবং সেই সাথে ককেশাশ অঞ্চল (কাস্পিয়ানের উভয় প্রান্ত)। সর্বশেষ ধাক্কা হিসেবে এলো উসমানীয়দের পতন, শুধুমাত্র আনাতোলিয়া তুর্কিদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বলকান ছিনিয়ে নেয়া হলো। ইরাক ও বিলাদে শামকে যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স ভাগ করে নিল,  সেই সাথে বন্টিত হলো উত্তর আফ্রিকাও।  এদের সাথে সেখানে ইতালিও উপস্থিত। খুব দ্রুতই এরা প্রতিষ্ঠা করে ফেলল ফিলিস্তিনের মাটিতে বর্তমান বিশ্বের ক্যান্সার, পাশ্চাত্যের জারজ সন্তান ইজরাইল। যাইহোক,  সে ইতিহাসের গলিতে হাঁটতে গেলে সফর শেষ হবেনা হয়ত।</p>
<p>আলমে ইসলামীর যেখানেই এরা পরিবর্তন সাধন করেছে সেখানেই ইসলামের বিপরীত কোন বয়ান বা মতবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে। যেমনঃ গণতন্ত্র, কম্যুনিজম, সোশ্যালিজম, ক্যাপিটালিজম,  ফ্যাসিজম,  ন্যাশনালিজম,  অধুনা জায়োনিজম, হিন্দুইজম, বুদ্ধইজম আরো কত কি! মাওলানা মওদূদী এসকল &#8216;ইজম&#8217; কে একই মায়ের সন্তান বলে আখ্যায়িত করেছেন। এসকল মতবাদের বাস্তবায়নের জন্য তারা যথাসাধ্য সকল কার্যক্রমই সম্পাদন করেছে। মুসলিমদের সকল স্বাধীনতা হরণ করে নিজেদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিস্টেম চাপিয়ে দেয়ার সর্বাত্নক চেষ্টা চালিয়েছে; কিছুটা আঞ্চলিকভাবে আর কিছুটা বিশ্বজনীনভাবে। কখনো প্রত্যক্ষভাবে কখনো পরোক্ষভাবে। মস্তিষ্ক দখলের এ চক্রান্ত এখন পর্যন্ত বিন্দুমাত্র গতিহ্রাস করেনি বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে।</p>
<p>আঞ্চলিকভাবে এন্টি মুসলিম অপারেশনে তাদের কিছু কমন বয়ান আছে, যেগুলোকে তারা বিভিন্ন আঙ্গিকে হাজির করে থাকে। অধিকাংশ সময় তারা সবচেয়ে সফল এন্টি মুসলিম অপারেশনের গতিধারাই অবলম্বন করে। আন্দালুসে যেমন মুসলিম বিতাড়ন সম্পন্ন হয়েছিল, এরাও চায় ঠিক একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে একই লক্ষ্য অর্জন করতে।</p>
<p>তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামের অপসারণ। যেখানে শুধুই মুসলিমগণ বিদ্যমান সেখানে আভ্যন্তরীণভাবে ইসলামের সাবস্টিটিউট দাঁড় করানো হয়, যেমন আরব দেশ সমূহে, তুর্কিতে, উপমহাদেশের মুসলিম দেশ দুটি, মালয় অঞ্চল। এখানে সেক্যুলারিজম আর পুঁজিবাদের সমন্বয়ে জাতীয়তাবাদ (আরব, তুর্কি, বাঙালী,মালয়) দাঁড়িয়ে গেল। যেগুলো ভিতর থেকে ইসলামের প্রাণসত্ত্বাকে,  ইসলামের বিশ্বজনীনতাকে দূর্বার গতিতে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে লাগল। মধ্য এশিয়ায় কম্যুনিজম এসে তো আল্লাহর প্রতি মুসলিমদের বিশ্বাসটাই কেড়ে নিতে সোচ্চার। যেখানে ইমান নিয়েই টানাটানি সেখানে ইসলামের অস্তিত্বের ভয়াবহতা নিয়ে প্রশ্নের কোন অবকাশ থাকেনা।</p>
<p>যেখানে মুসলিমের সাথে অন্য কোন জাতির উপস্থিতি আছে বা উপনিবেশকরা মুসলিমদের অপজিটে যে শক্তিকে উত্থিত করে গেছে (হিন্দুস্তানে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদ, তুর্কিস্তানে চীনা জাতীয়তাবাদ, বলকানে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন (ক্রুসেডীয় ধারার ঝান্ডাবাহক), ফিলিস্তিনে ইজরাইল (জায়নবাদের হেডকোয়ার্টার), আফ্রিকায় বর্ণবাদ, রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের ক্রিমিয়ায় ও ককেশাশের চেচনিয়ায় রুশ জাতীয়তাবাদ। ফিলিপিনের মিন্দানাও,  থাইল্যান্ডের পাত্তানি, মায়ানমারের আরাকান- এসকল অঞ্চলে চায়না সংস্কৃতি প্রভাবিত বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতি সমূহ) তারা জাতীয়তাবাদের বয়ান তুলে সেখানে মুসলিমদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে, অভিবাসিত করছে,  নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বন্দী করছে। এর সবচেয়ে বড় বড় উদাহরণ আমাদের সামনে এই মুহুর্তে চলমান।</p>
<p>এদের সকলেরই এসকল গণহত্যা ও আগ্রাসনের পেছনে যুক্তি একটাই; ”মুসলিমরা এই মাটির মানুষ নয়,  এদেরকে এদের নিজের মাটিতে ফেরত যেতে হবে, অন্যথায় মৃত্যুবরণ করতে হবে। এই ভুখন্ডে এদের জীবিত থাকার কোন অধিকার নাই। কেননা এরা বহিরাগত।” তাদের চূড়ান্ত টার্গেট থাকে- হয় মুসলিমকে ইসলাম ছাড়তে হবে,  আর নাহয় ইসলাম নিয়ে এলাকা ছাড়তে হবে। ঠিক ৫০০ বছর আগেকার ইসলাম নির্মূলের স্পেনীয় ধারা। বলছিলাম সম্প্রতিকালে সেই ধারারই একজোটে বিশ্বজনীন হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে&#8230;.</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শেষোক্ত এই মোটিভের পেছনে ইসলাম বিরোধীদের যে ভিত্তি রয়েছে তাকে আমরা &#8216;কৌলিন্যবাদ&#8217; বলতে পারি, যাকে শ্রেষ্ঠত্ববাদ, সম্ভ্রান্তবাদ বা হামবড়াভাবও বলা যেতে পারে।</p>
<p>এই কৌলিন্যের শিকড় প্রথিত থাকে গোত্রে, বর্ণে, জাতিতে, ভূমিতে,  ইতিহাসে, ঐতিহ্যে, ভাষায়, বিশেষ কোন সিফাতে (গুণ,ক্ষমতা)। ঠিক একারণেই বিভিন্ন জাতির জাতীয় বীর থাকে। জাতীয় ঐতিহাসিক বয়ান থাকে। কখনো বা ধর্মের নাম মিশিয়ে ক্রুসেডের মত বয়ান তৈরী করা হয়। এগুলো তাদের চিন্তা-চেতনা, মিশন- ভিশন, মত ও পথের পাথেয় হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে ওই সকল জাতিগোষ্ঠী নিজেদের শিকড় বা ভিত্তির নাগাল পেয়ে থাকে। এই কৌলিন্যবাদ তাদের আশা আকাঙখা, ভাবনা ভরসা, আবেগ অনুভূতির সিংহভাগ জুড়ে থাকে। এটা তাদের এমন এক স্বপ্ন দেখিয়ে থাকে যার মাধ্যমে তারা বিশেষ কোন লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের সর্বস্ব বিলীন করা সহ যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণের সাহস করতে পারে। এসকল ভিশন তাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত হয় এবং সেই লক্ষ্যপানে সমগ্র জাতিসত্ত্বা ধাবিত হতে থাকে। এমন এক পর্যায় আসে যখন তারা তা বাস্তবায়নের জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তত থাকে। একে আমিরা জাতীয় ভিশন বলতে পারি। যেমন হিন্দুত্ববাদীদের রামরাজ্য, জায়নবাদীদের প্রমিজড ল্যান্ড( প্রতিশ্রুত ভূমি) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রা ইত্যাদি, এরকম উদাহরণের তালিকা আরো বিশাল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইনসানী ইতিহাসের সূচনাটা হয়েছিল ঠিক এই কৌলিন্যের কারণেই। সূরা সোয়াদে আল্লাহ এই সূচনার ঘটনাটা এভাবে বর্ননা করেছেন যেঃ</p>
<p>إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلٰٓئِكَةِ إِنِّى خٰلِقٌۢ بَشَرًا مِّن طِينٍ</p>
<p>যখন তোমার রব ফেরশ্‌তাদেরকে বললো, “আমি মাটি দিয়ে একটি মানুষ তৈরি করবো। (৩৮:সোয়াদ:৭২)</p>
<p>فَإِذَا سَوَّيْتُهُۥ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِى فَقَعُوا لَهُۥ سٰجِدِينَ</p>
<p>তারপর যখন অমি তাকে পুরোপুরি তৈরি করে ফেলবো এবং তার মধ্যে নিজের প্রাণ ফুঁকে দেবো। তখন তোমরা তার সামনে সিজদাবনত হয়ে যেয়ো।” (৩৮:সোয়াদ:৭৩)</p>
<p>فَسَجَدَ الْمَلٰٓئِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ</p>
<p>এ হুকুম অনুযায়ী ফেরেশ্‌তারা সবাই সিজদাবনত হয়ে গেলো, (৩৮:সোয়াদ:৭৪)</p>
<p>إِلَّآ إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكٰفِرِينَ</p>
<p>কিন্তু ইবলিস নিজে শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করলো এবং সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেলো। (৩৮:সোয়াদ:৭৫)</p>
<p>قَالَ يٰٓإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَىَّ ۖ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْعَالِينَ</p>
<p>রব বললেন, “হে ইবলিস! আমি আমার দু’হাত দিয়ে যাকে তৈরি করেছি তাকে সিজদা করতে তোমাকে কিসে বাঁধা দিয়েছে? তুমি কি বড়াই করছো, না তুমি কিছু উচ্চ মর্যাদার অধিকারী?” (৩৮:সোয়াদ:৭৬)</p>
<p>قَالَ أَنَا۠ خَيْرٌ مِّنْهُ ۖ خَلَقْتَنِى مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُۥ مِن طِينٍ</p>
<p>সে জবাব দিল, “আমি তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ, তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো আগুন থেকে এবং তাকে মাটি থেকে।” (৩৮:সোয়াদ:৭৭)</p>
<p>قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ</p>
<p>বললেন, “ঠিক আছে, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, তুমি বিতাড়িত (৩৮:সোয়াদ:৭৮)</p>
<p>وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِىٓ إِلٰى يَوْمِ الدِّينِ</p>
<p>এবং প্রতিদান দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি আমার লানত।” (৩৮:সোয়াদ:৭৯)</p>
<p>قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِىٓ إِلٰى يَوْمِ يُبْعَثُونَ</p>
<p>সে বললো, “হে আমার রব! একথাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এদেরকে যখন পুনরায় উঠানো হবে সে সময় পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।” (৩৮:সোয়াদ৮০)</p>
<p>قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ</p>
<p>বললেন, ঠিক আছে, তোমাকে সেদিন পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হলো (৩৮:সোয়াদ:৮১)</p>
<p>إِلٰى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ</p>
<p>যার সময় আমি জানি।” (৩৮:সোয়াদ:৮২)</p>
<p>قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ</p>
<p>সে বললো, “তোমার ইজ্জতের কসম, আমি এদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবোই, (৩৮:সোয়াদ:৮৩)</p>
<p>إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ</p>
<p>তবে একমাত্র যাদেরকে তুমি একনিষ্ঠ করে নিয়েছো তাদেরকে ছাড়া।” (৩৮:সোয়াদ:৮৪)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সামনে উক্ত ঘটনাটি কথোপকথন আকারে বর্ননা করেছেন এবং খুব সুসংহতভাবে ইবলিসের অবাধ্যতার কারণ চিহ্নিত করে দিয়েছেন যা হলো &#8216;শ্রেষ্ঠত্ববোধ&#8217;। অবাধ্যতার শাস্তি স্বরুপ তাকে বহিষ্কার করা হলে তখনও সে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে বসে এবং আল্লাহর ইযযতের কসম করে বলেঃ তোমার একনিষ্ঠ বান্দা ছাড়া সকলকেই আমি পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।</p>
<p>অতঃপর ইবলিস তার চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী আদম ও হাওয়াকে আঃ কে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করে দুনিয়াতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। দুনিয়ার যমীনে সংঘটিত প্রথম রক্তপাতের পেছনেও দায়ী ছিল এই কৌলিন্যবোধ। কেননা ইবলিস কাবিল কে এভাবে প্ররোচিত করতে থাকে যে- তুমি বড় সন্তান,  তোমার পছন্দ আগে, কে কি কুরবানী করল বা আল্লাহর কি ফয়সালা হলো তা দেখার বিষয় নয়; তোমার লক্ষ্য হাসিল করাটাই মুখ্য। সুতরাং হত্যা করো হাবিলকে আর নিজের প্রাপ্য বুঝে নাও। ঠিক এভাবেই ইবলিস কাবিলের কৌলিন্যে আঘাত করে এবং মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকান্ডটি, প্রথম রক্তপাতটি ঘটিয়ে ফেলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সেই দুনিয়ার শুরু থেকেই আমরা যদি নবীগণের ইতিহাস লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাই যে, অধিকাংশ নবী ও রাসূলগণকে দাওয়াতি মিশন বাস্তবায়ন করতে কৌলিন্যবাদের সাথেই মোকাবেলায় জড়িয়েছেন।</p>
<ul>
<li>হযরত ইবরাহীম আঃ স্বগোত্রীয় কুলীন মূর্তিপূজকদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে ব্যাবিলন ত্যাগ করেন, (নমরুদের খোদায়ী দাবী এবং ইবরাহীম খলিলুল্লাহর দাঁতভাঙ্গা জবাবে তার পরাস্ত হওয়ার ইতিহাস তো সর্বজনবিদিত) সেখান থেকে মিশরে যান। সেখানেও এক কুলীন রাজার কুনজরে পড়েন। এরপরে আরবে এসে মক্কা প্রতিষ্ঠিত করেন।</li>
<li>হযরত ইউসুফ আঃ প্রথমত তার কৌলিন্যবোধ সম্পন্ন বড় ভাইদের দ্বারা তার বাবা হযরত ইয়াকুব আঃ এর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। তার ভাইদের চিন্তাধারা ছিল- আমরা এতগুলো বড়ভাই থাকতে ছোট ইউসুফ কেন বাবার উত্তরাধিকার পাবে? এটা হতে দেয়া যায়না, সুতরাং বিদায় করো। দ্বিতীয়বার তিনি নির্দোষ হওয়ার পর ও মিশরের রাজার কৌলিন্যবোধের অসহায় শিকারে পরিণত হন। নিজের স্ত্রী ই অপরাধী এবং ইউসুফ আঃ সম্পূর্ণ নির্দোষ ও পূতঃ পবিত্র এটা জানার পরও রাজা তার নিজের মান ইজ্জতের ব্যাপার বলে ইউসুফ আঃ কে কারাগারে প্রেরণ করেন।</li>
<li>হযরত মূসা আঃ যে প্রেক্ষাপটে দুনিয়াতে আসেন, ঠিক তখনই ফেরাউনের কৌলিন্যবোধ এমন পর্যায়ে পৌছে গেল যে, সে নিজেকে খোদা দাবী করে বসল। ইসরাইলীদের ওপর দমন পীড়ন নীতি প্রণয়ন করল, কেননা তারা সে সময়ে ছিল ঐশী জ্ঞানের ধারক। তারা ফেরাউনকে ইলাহ বলে স্বীকার করতে প্রস্তত ছিলনা। যার সমাধান স্বরুপ ফেরাউনী রাজত্বে ইসরাইলীদের সকল শিক্ষাদীক্ষা বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র কারিগরী শিক্ষা দেয়া হতে থাকল যাতে তারা ফেরাউনকে ইলাহ বলে অস্বীকার করার কোন চিন্তাও তারা না করতে পারে। (ঠিক যেমন এই সময়কার পাশ্চাত্য সভ্যতা মৌলিক জ্ঞানের চর্চার পরিসর কমিয়ে দিয়ে কারিগরীর দুয়ারকে হাজারগুণ সম্প্রসারণ করে দিয়েছে। এজন্যই পাশ্চাত্য সভ্যতাকে ফেরাউনী সভ্যতার ধারা বলা হয়ে থাকে) ঠিক এমন সময়ই সে জানতে পারল এক ইসরাইলী শিশুর কথা যে তাকে ও তার খোদায়ীকে ধ্বংস করবে। ফলশ্রুতিতে সে ইসরাইলীদের গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদান রহিত করে দিল। এরপরের  ইলাহী কুদরত তো আমাদের সকলেরই জানা।</li>
<li>হযরত ঈসা আঃ এর জন্ম আল্লাহপাক সাধারণ নিয়মের বাইরে সংঘটিত করলেন। সেই থেকেই তিনি ও তাঁর মা হযরত মারইয়াম আঃ এর পেছনে পড়ে গেল তৎকালীন ইহুদী কুলীন শ্রেনী। অবশেষ হযরত ইসা আঃ এর রিসালাতও অস্বীকার করে ফেলল এমনকি তাকে হত্যার জন্য বেরিয়ে পড়ল এই কুলীন শাষক শ্রেণী। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ পাক রুহুল্লাহ কে আসমানেই উঠিয়ে নিলেন।</li>
<li>সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ সাঃ এর দাওয়াতি কাজের মূল বাধা ছিল মক্কার তৎকালীন কুলীন শ্রেণী। মূর্তি পূজক ও মূর্তী তৈরীকারক সেই সাথে মূর্তির ব্যবসায়ীগণ সকলেই জোট গঠন করেছিল ইসলামের বিরুদ্ধে। আবু জাহেল, আবু লাহাব, উতবা,শায়বা রাতের আঁধারে নিজ নিজ জায়গা থেকে আল্লাহর রাসূলের কালামে পাকের তেলাওয়াত শুনতো, ইসলামের সৌন্দর্যে মোহিত হতো তবুও দিনের বেলায় নির্যাতন ও বিদ্রুপের বন্যা বইয়ে দিত শুধু কৌলিন্যের খাতিরে। কেননা ইসলামে কৌলিন্যের কোন বিশেষ স্থান নেই,  আল্লাহর বান্দা সকলেই সমান, নাই কোন ভেদাভেদ। এটাই ছিল হুজ্জাতুল বিদার ভাষণের মূল প্রতিপাদ্য। সুতরাং ইসলাম যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়,  তাহলে তাদের সম্ভ্রান্তবাদ হুমকির মুখে পড়বে। হারিয়ে যাবে তাদের হামবড়া ভাবের বাহার। ঠিক এতটুকু স্বার্থের খাতিরে তারা ইসলামকে অস্বীকার করে বসল!</li>
<li>একইভাবে মদিনায় ইহুদীরা নিজেদের কৌলিন্যের কারনে কখনোই হযরত মুহাম্মাদ সাঃ কে বরণ করে নিতে পারেনি এবং আজীবন তাঁর জন্য সকল প্রকার হুমকির বন্দোবস্ত করেছে। (হত্যাচেষ্টা থেকে শুরু করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া পর্যন্ত, সব!) যদিও তারা জানত যে শেষ নবীর আবির্ভাব আরবে হবে। এজন্য তারা আরবে বসতি করল। কিন্তু দেখা গেল যে, শেষ রাসূল তাদের বনু ইসহাক থেকে নয় বরং বনু ইসমাঈল থেকে এলেন যা তাদের কৌলিন্যে মারাত্নক আঘাত করল।</li>
<li>এরকমভাবে অধিকাংশ জায়গায় নবী রাসূলগণ এই কুলীন শ্রেণীর বিরুদ্ধে দাওয়াতী মিশন পরিচালনা করে গেছেন। হযরত নূহ আঃ, হযরত ইউনুস আঃ, হযরত হূদ আঃ, হযরত সালেহ আঃ, হযরত শুয়াইব আঃ, হযরত লূত আঃ এর কথা কোরআনে সরাসরি বর্নিত। তাদের সংগ্রাম যে কুলীন শ্রেনীর বিপরীতে ছিল তার বর্ননায় আল্লাহ &#8216;আখি&#8217; বা ভাই শব্দের ব্যবহার করেছেন। কেননা ওই সকল জাতি তাদের নবী রাসূলদের নিচুজাত, বা তাদের চেয়ে কম সম্ভ্রান্ত মনে করত। আল্লাহ তাদের জবাব দিলেন ভাই শব্দ দ্বারা। ভাই এমন একটি সম্পর্ক,  যার অধিকার,  মর্যাদা,  ক্ষমতা এবং সকল কিছুই সমান সমান হয়ে থাকে। সুতরাং আল্লাহ নিশ্চিত করে দিলেন যে,  তোমাদের চেয়ে আমার আম্বিয়াগণের কৌলিন্য কোন অংশেই কম নয় বরঞ্চ তাঁরা আমার বিশেষ বান্দা।</li>
</ul>
<p>(এ ব্যাপারে সূরাতুশ শুয়ারা পড়ার পরামর্শ রইল)</p>
<p>সুতরাং নবীগণের ইতিহাস পর্যবেক্ষণে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে- তাওহীদের দাওয়াত অস্বীকার করার পেছনে যে মোটিভ কাজ করে সেটা হচ্ছে কৌলিন্যবোধ। যা সরাসরি শয়তানি স্বভাব বা চিন্তা। শয়তান ঠিক তার কসম অনুযায়ী নিজের দোষের দ্বারা দুষ্ট করে বিপথগামী করে চলেছে মানবজাতিকে। একেবারে ইনসানী ইতিহাসের শুরু থেকেই সে একই ক্রমধারা বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহার করে চলেছে।</p>
<p><strong>এই</strong> <strong>কৌলিন্যবাদের</strong> <strong>ভিত্তি</strong> <strong>মূলত</strong> <strong>শ্রেষ্ঠত্ব।</strong> <strong>শ্রেষ্ঠত্বের</strong> <strong>প্রশ্ন</strong> <strong>সামনে</strong> <strong>চলে</strong> <strong>আসায়</strong> <strong>কৌলিন্যদুষ্ট</strong> <strong>কোন</strong> <strong>জনগোষ্ঠি</strong> <strong>অপর</strong> <strong>কোন</strong> <strong>জনগোষ্ঠিকে</strong> <strong>বরদাশত</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেনা।</strong> <strong>ঠিক</strong> <strong>এ কারণেই </strong><strong>সভ্যতা</strong> <strong>সমূহের</strong> <strong>উত্থান</strong> <strong>পতন</strong> <strong>প্র</strong><strong>ক্রি</strong><strong>য়া</strong> <strong>চলে</strong> <strong>আসছে।</strong> <strong>যেমনঃ</strong> <strong>প্রাচীন</strong> <strong>কালে</strong> <strong>রোমান</strong><strong>&#8211;</strong><strong>পারসিক</strong> <strong>দ্বন্দ্ব</strong><strong>, </strong><strong>আর্য</strong><strong>&#8211; </strong><strong>অনার্য</strong> <strong>দ্বন্দ্ব</strong><strong>,  </strong><strong>সাদা</strong><strong>&#8211; </strong><strong>কালোর</strong> <strong>ব</strong><strong>র্ণ</strong><strong>ভেদ</strong><strong>, </strong><strong>ইহুদীদের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>খৃষ্টানদের</strong> <strong>এবং</strong> <strong>এই</strong> <strong>একই</strong> <strong>ধারায়</strong> <strong>অন্যান্য</strong> <strong>আরো</strong> <strong>মোকাবেলা।</strong></p>
<blockquote><p><em>পক্ষান্তরে</em> <em>দ্বীনে</em> <em>ইসলামে</em> <em>এরকম</em> <em>কৌলিন্যবাদের</em> <em>কোন</em> <em>স্থান</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>ফলশ্রুতিতে</em> <em>উপরোক্ত</em> <em>অন্তর্দ্বন্দ্বপূর্ণ</em> <em>জাতি</em> <em>গুলো</em> <em>ইসলামের</em> <em>বিরুদ্ধ</em> <em>শক্তিতে</em> <em>একজোট</em> <em>হয়ে</em> <em>গেল</em><em>, </em><em>এবং</em> <em>যার</em> <em>যার</em> <em>জা</em><em>য়গা</em> <em>থেকে</em> <em>একই</em> <em>ক্রমধারা</em> <em>অবলম্বন</em> <em>করায়</em> <em>ইসলামের</em> <em>বিরুদ্ধে</em> <em>আগ্রাসন</em> <em>আজ</em> <em>বিশ্বজনীনতা</em> <em>পেয়েছে।</em> কারণ <em>তারা</em> <em>যেখানে</em> <em>এক</em> <em>জাতিই</em> <em>আরেক</em> <em>জাতিকে</em> <em>বরদাশত</em> <em>করতে</em> <em>পারেনা</em> <em>সেখানে</em> <em>কৌলিন্যবাদের</em> <em>উৎখাতকারী</em> <em>ইসলামকে</em> <em>তারা</em> <em>বরদাশত</em> <em>করতে</em> <em>যাবে</em> <em>কেন</em><em>? </em><em>আর</em> <em>বিশ্বজনীন</em> <em>একটি</em> <em>দ্বীনের</em> <em>বয়ানও</em> <em>বিশ্বজনীন</em><em>, </em><em>সুতরাং</em> <em>বিশ্বজনীন</em> <em>বিষয়ের</em> <em>বিশ্বজনীন</em> <em>বিরোধীতা</em> <em>প্রতিবন্ধকতাটা</em> <em>আসাই</em> <em>স্বাভাবিক।</em></p></blockquote>
<p>কিন্ত অত্যন্ত আফসোসের বিষয়, আমরা যে জায়গাটাতে ভুল করে ফেলি সেটা হলো- আমরা এন্টি ইসলামের এই রূপটাকে বিশ্বজনীনভাবে মিলিয়ে দেখতে ব্যর্থ হই বরং এটাকে আঞ্চলিক-সাম্প্রদায়িক লড়াই হিসেবে বিচার করে থাকি। ঠিক এই কারনেই এক অঞ্চল থেকে ইসলামের উপরে আঘাত আসালে অন্য অঞ্চল চুপ থাকে। কেননা আত্মচিন্তা ইনসানের ফিতরাত।</p>
<p>আমরা বুঝতে পারিনা যে, এই আগ্রাসন সমগ্র দ্বীনে ইসলামকে অপসারণের আগ্রাসন, এটা আসলে আল্লাহর সাথে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে ইবলিশের করা কসমের বাস্তবায়ন, এটা হক্ব ও বাতিলের মাঝে চলে আসা এক চিরন্তন লড়াই।</p>
<p>আমরা কীভাবে এসকল বিষয় উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই যেখানে- আমাদের বিশ্বাস এক, আমাদের রাসূল এক, আমাদের দ্বীন এক, কালিমা এক, আমাদের একক উম্মাহ ঘোষণা করা হয়েছে, একে অপরকে ভাই- ভাই সম্পর্ক দেয়া হয়েছে (যে পদ্ধতি আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নির্দেশ করেছেন)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কৌলিন্যবাদদুষ্ট হিসেবে শয়তানের সাথে আমাদের দ্বন্দ্বের যায়গাটা ঠিক কোথায়? আসুন নিরূপণ করি।</p>
<p>আসলে ইসলাম আর শয়তানি কৌলিন্যবাদের লক্ষ্য একই তবে লক্ষ্যমাত্রা ভিন্ন।</p>
<p>উভয়েরই লক্ষ্য ইবাদত (দাসত্ব) প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>আর লক্ষ্যমাত্রা হলোঃ- কৌলিন্যবাদ চায় খালেকের পরিবর্তে মাখলুকের ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে। যা আল্লাহর সরাসরি নিষেধ, এবং আল্লাহ এই অপরাধ কক্ষনোই ক্ষমা করবেন না। কারণ এটা সেই অবাধ্যতা যা শয়তান আল্লাহর সাথে করে বিতাড়িত হয়েছে। আর এটা সরাসরি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অভিশপ্ত হওয়া মাত্র। এজন্য তারা জাহানে আল্লাহর পরিবর্তে বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর রাজত্ব কায়েম করে আদতে যা শয়তানেরই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা বৈকি!</p>
<p>আর ইসলাম চায় সর্বময় ক্ষমতার মালিক, সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত কায়েম করতে। তাওহীদের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং সে অনুযায়ী আল্লাহর খলিফা হিসেবে প্রেরিত মানব জাতির মাধ্যমে জাহান পরিচালনা করা। যা আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ এবং এটি একমাত্র তাঁরই হক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আর সার্বভৌমত্ব (হুকুমাত) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য পাঁচটি বিষয়ের ওপর অধিকার প্রয়োজনঃ-</p>
<ul>
<li>১.শহরত বা প্রসিদ্ধি, প্রতিষ্ঠা পাওয়া</li>
<li>২.দৌলত বা সম্পদ,অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ</li>
<li>৩.কুওয়াত বা শক্তিমত্তা, সক্ষমতা</li>
<li>৪.রিয়াসাত বা নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারক হওয়া</li>
<li>৫.আযমত বা মহত্ব, সুপার পাওয়ারে পরিণত হওয়া</li>
</ul>
<p>পাঁচটি আপেক্ষিক বিষয় নিয়ন্ত্রন করে উপরোক্ত পাঁচটি বিষয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছা যায়ঃ-</p>
<ul>
<li>১.আদালত- ন্যায়ের মানদন্ড, ইনসাফ, ইহসান</li>
<li>২.আমানত- নিরাপত্তা, সোশ্যাল সিকিউরিটি, জুলুম নিয়ন্ত্রণ</li>
<li>৩.সালামত- শান্তি, সাবলীলতা, ফাসাদ নিয়ন্ত্রণ</li>
<li>৪.মুসাওয়াত- সমতা, ঐক্য নিয়ন্ত্রন, অধিকার নিশ্চিত করণ</li>
<li>৫.দারাজাত- সভ্যতার অগ্রগতির মাধ্যম, যেমনঃ জ্ঞানের উৎকর্ষ, ভাষার সমৃদ্ধি, শক্তিশালী সংস্কৃতি, ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা বা সিস্টেম ইত্যাদি।</li>
</ul>
<p>আর এই দশটি ধাপের নতিজা বা ফলাফল হচ্ছে হুকুমাত। আর এখানেই ইসলামী হুকুমাতের সাথে কৌলিন্যবাদী শয়তানী হুকুমাতের পার্থক্য। ইসলামের সাথে কৌলিন্যবাদ দোষে দুষ্ট অন্যান্য সভ্যতার আকাশ পাতাল তফাতটা ঠিক এখানেই।</p>
<p>কৌলিন্যবাদ সবসময় প্রথম পাঁচটি শর্ত পূরণের চেষ্টা চালিয়ে পরবর্তী আপেক্ষিক পাঁচটি বিষয় বিগড়ে, ধ্বংস করে, হত্যা করে,দলিত মথিত করে।</p>
<p>আর ইসলাম সর্বাবস্থায় প্রথমোক্ত পাঁচটি শর্ত পূরণ করেছে পরবর্তি পাঁচটি বিষয়কে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠাও ও সাফল্যের সর্বোচ্চ শীর্ষে আরোহণ করিয়ে। এবং এভাবেই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও খলিফা হিসেবে মুসলিমগণ তা পরিচালনা করেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা যেখানেই গিয়েছে, সেখানকার প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা না থাকলে নতুন ধারার অভূতপূর্ব সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে। যেমন আন্দালুসে, আর প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা থাকলে তাকে আরো বেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করেছে। যেমন পারস্যে, বাংলায়।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা অতীত সকল সভ্যতার জ্ঞানকে উন্নয়ন করেছে, বিজিত সভ্যতার ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করেছে। অর্থনীতিকে অকল্পনীয় মাত্রায় গতিশীল করেছে। এক কথায় বিশ্বজনীন ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে সাজিয়েছে।</p>
<p>পক্ষান্তরে কৌলিন্যবাদের জীবাণুবাহী পাশ্চাত্য জায়নবাদী সভ্যতা ও তার দোসররা যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই সভ্যতার ধ্বংস সাধন করেছে। ভাষাকে হত্যা করেছে, সংস্কৃতিকে পঙ্গু করে দিয়ে নিজেদের খাপছাড়া সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিকে এক কেন্দ্রিক করে নিজেদের আঙ্গুল ফুলিয়ে কলাগাছ করে অন্যদের না খাইয়ে মেরেছে। মানুষের মধ্য হতে মূল্যবোধ ও অনুভূতি ছিনিয়ে নিচ্ছে। এরকম আত্নসাতের মাত্রা আরো লম্বা আরো গভীর এবং আরো ভয়ঙকর।</p>
<p>হাল যমানায় শয়তানি কৌলিন্যবাদের ধারক বাহক পাশ্চাত্য জায়নবাদী সভ্যতা ও তার দোসররা নিজেদের ফাটা ঢোল নিজের পিটিয়েই কুল কিনার করতে পারছেনা। ফাটা ঢোল বলার কারন তাদের কৃতকর্মের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে। ইসলামের সাথে কৌলিন্যবাদের দ্বন্দ্বের ইতিহাসভিত্তিক উদাহরণ গুলো সামনে আসলেই একে একে উন্মোচিত হবে সভ্যতার আড়ালে ঢাকা চরম জাহেলিয়াতপূর্ণ অসভ্যতার। আর এই মুখোশ উন্মোচিত হতেই হবে, কেননা পাশ্চাত্য মনে করে ইসলাম মধ্যযুগীয় ধর্ম ব্যবস্থা এবং এর ঝান্ডাবাহীদের হাত থেকে ইসলামকে ছিনিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে ওই সকল জনগোষ্ঠীকে সভ্যতার কাতারে শামিল করাটা তাদের আজন্ম দায়িত্ব! এজন্য তারা যেখানে যেভাবে পারছে ইসলাম বিতাড়ন এবং সেখানকার অধিবাসীদের সভ্যতার কাতারে শামিল করছে(!)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দেখা যাক এবার উদাহরণ গুলোঃ-</p>
<ul>
<li>কৌলিন্যবাদের মরন ছোবলে নীল হয়ে যাওয়া ইসলাম মদিনায় নির্বাসিত হলো এবং সেখানে বহু বাধা বিপত্তি ও হুমকি মোকাবেলা করে মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করল এবং একসময় মক্কা বিজয় করে নিল। হাজারো নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়ানো মুসলিমরা সেদিন রক্তপাতহীন বিপ্লবের যে নজীর স্থাপন করেছে, সমগ্র বিশ্বে এমন উপমা পাওয়া যাবেনা। সকলকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করা হলো, যেখানে সকল মুশরিক অত্যাচারীরা থর থর করে কাঁপছিল, সেখানে এমন অপ্রত্যাশিত ক্ষমা পাওয়াটা কি পরিমাণ রহমত স্বরুপ ছিল!</li>
<li>বিনা রক্তপাতে অর্ধজাহানের শাসনকর্তা হযরত উমরের (রাঃ) জেরুজালেম অধিকারের পরে ইউরোপীয়ানরা ক্রুসেড পরিচালনা করে যখন কুদস দখল করে নিল,  তারা আরদুল মুকাদ্দাসে এই পরিমাণ মুসলিমের রক্ত ঝড়ালো যে, ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্ত সে রক্তে ডুবে গেল। পক্ষান্তরে ইসলামের বীর সেনাপতি সালাহুদ্দিন আল আইয়ুবী যখন কুদস কে পুনরুদ্ধার করলেন তখন স্থানীয় খ্রীষ্টানদের জানমাল সব নিয়েই নিরাপত্তার সাথে শহর ত্যাগ করার অনুমতি দিলেন!</li>
<li>আঁধারের চরম স্তরে পতিত থাকা ইউরোপে সভ্যতার কিংবদন্তি চেরাগ জ্বালে এই ইসলামই। প্রতিষ্ঠা করে ৮০০ বছরের কিংবদন্তী সোনালী ইতিহাসের সভ্যতা আন্দালুস । যার উপরে ভিত্তি করে আজকের পাশ্চাত্য এতদূর। কিন্তু সে ইউরোপীয়ানরাই স্পেনের মাটি থেকে মুসলিম বিতাড়ন করে ফেলল!</li>
<li>ইউরোপের পূর্বদিকে ইসলাম যখন কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করেছিল, তখন শহরবাসী হাজিয়া সোফিয়ায় সমবেত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিল, তখন সুলতান ফাতিহ মেহমেদ তাদের ক্ষমা ঘোষনা করলেন আর তাদের বাইজেন্টাইন সভ্যতার প্রতীক হাজিয়া সোফিয়াকে মসজিদের মর্যাদা দান করলেন। পক্ষান্তরে আন্দালুসের মাটিতে যখন ইউরোপীয় আগ্রাসন চলে, তখন তারা সকল কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। মুসলিমদের তিল তিল করে গড়ে তোলা লাইব্রেরীর বইগুলো সব পানিতে ফেলে দিল। তা সংখ্যায় এত ছিল যে স্রোত পর্যন্ত আটকে গিয়েছিল! যেখানে কনস্টান্টিনোপলে মুসলিমরা বিধর্মীদের ধর্মগৃহে নিরাপত্তা প্রদান করলো আর তারা আন্দালুসের মুসলিমদের নিরাপত্তা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারল! মুসলিমদের মসজিদগুলোকে ক্যাস্টাইলে পরিবর্তন করে ফেলা হল!</li>
<li>মুসলিমগন ফ্রান্সের দুর্ভিক্ষের সহায়তায় জাহাজভর্তি ত্রাণ পাঠানোর নজীর স্থাপন করেছে যেখানে একদিন এই ইউরোপীয়রাই জাহাজ ভর্তি হিজরতকামী মুসলিমদের যিন্দা পুড়িয়ে মেরেছিল!</li>
<li>ইসলাম ইউরোপের বলকানে প্রবেশ করে অন্তর্দ্বন্দ্বপূর্ণ শত শত ছোট ছোট রাজ্যের অস্থিতিশীল ব্যবস্থাকে আদল ও ইনসাফ দিয়ে পরিবর্তন করে শান্তির বাতাস বইয়ে দিল আর পাশ্চাত্য মুসলিম অঞ্চলগুলোতে উপনিবেশের মাধ্যমে প্রবেশ করে যুদ্ধের আগুন জ্বেলে দিল। যার ধারাবাহিকতা এখনো শেষ হয়নি। ইরাক সিরিয়ার হাজার বছরের সভ্যতা আমেরিকা মাটির সাথে মিশিয়ে দিল। রাশিয়া ধ্বংস করে ছাই করে দিল মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা। উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়রা আজ ব্যস্ত হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সভ্যতার নাম ও নিশানা মুছে দিতে!</li>
<li>প্রায় দু হাজার বিছর নির্বাসিত থাকার পরে ফিলিস্তিনের মাটিতে অবৈধভাবে ঠাই পাওয়া ইহুদীরাও আজ মুসলিমের মাথা নিয়ে হোলি খেলে। এর ইতিহাস এই পরিমাণ ভয়ঙকর যে- এর আলোচনায় গেলে বর্তমান গোটা সিস্টেম নিয়েই আলোচনা করতে হবে!</li>
<li>ভারতবর্ষে চার শ্রেণীর বর্ণবাদ সহ অন্যান্য সকল যুলুমের উৎখাত করে ৮০০ বছরের ন্যায় ভিত্তিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করল ইসলাম আর সেই ইসলামকেই আজকে বহিরাগত বলে খতম করে দেয়ার অপচেষ্টার পারাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছে কৌলিন্যবাদীরা।</li>
<li>অপর দিকে আমেরিকার মাটিতে ইউরোপীয়ানরা মাত্র চার শতক আগে পৌছেই তিন তিনটে সভ্যতা ধ্বংস করল (ইনকা, মায়ান, এ্যাজটেক)। ষোড়শ শতাব্দীতে রেড ইন্ডিয়ানদের মেরে মাত্র এক শতাব্দীতে জনসংখ্যা কমিয়ে আট কোটি থেকে মাত্র এক কোটিতে নামিয়ে নিয়ে আসলো যেখানে স্বাভাবিক ভাবে প্রজননের মাধ্যমে একশ বছরে জনসংখ্যা আরো কোটি তিনেক বাড়ার কথা! গনগত্যার মাত্রাটা উপলব্ধী করা যাচ্ছে! সেই সাথে তারা আফ্রিকার উপরের তাদের পঙ্কিলতার কালো হাত বাড়িয়ে দিল। আমেরিকার নতুন মাটিতে ব্যাপক পরিমানে আফ্রিকান মানব দাস হিসেবে পাচার করে আফ্রিকার জনসংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসল! যুলুমের একটি মাত্র উদাহরণ দিচ্ছিঃ সপ্তদশ শতকে যখন ইউরোপীয় সৈন্যদের কুমিরের চামড়া নির্মিত বুটের বেশ চাহিদা দেখা গেল, তখন এরা কুমির শিকার করতে লাগল। যেহেতু হরিণ ও খরগোশ কিনতে টাকা বেশি লাগত, তাই এরা কুমিরের টোপ হিসেবে মানুষের সন্তান ব্যবহার করত। কালো মানুষের সন্তান বলে কথা! কি নির্মমতা, কি অসভ্যতা- যা কল্পনারও অতীত। (তারাই নাকি আজকের সভ্যতার মশালবাহী, মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ববাসীকে জানান দিচ্ছে(!)স্ট্যাচু অব লিবার্টি!)</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>এটাতো শুধু তাদের অতীত ইতিহাস, বর্তমানের পাপাচার গুলো নিয়ে আলোচনাই হয়ত শেষ করা যাবেনা। এই এরাই কিনা আজকে সভ্যতার ধ্বজা ধারী, যারা দুনিয়াকে গ্লোবাল ভিলেজ বানিয়ে সভ্যতার কাতারে শামিল করার প্রয়াস ব্যক্ত করে। দুনিয়ার সকল প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার অধিকার যেন এদের পৈত্রিক উত্তরাধিকার(!)।</p>
<p>শেষ করতে চাই একটি প্রশ্ন দিয়ে-</p>
<p>একটু ভেবে দেখেন একটি জিনিস, ভারতে মুসলিমরা যদি ৮০০ বছরের ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করার পর ও যদি বহিরাগত হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং নির্মুল এর শিকার হয়, তবে আমেরিকার মাটিতে তিন তিনটে সভ্যতার ধ্বংস সাধন করে আধুনা মার্কিনীরা (অভিবাসী ইউরোপীয়ানরা) আমেরিকার মাটিতে বহাল তবিয়তে থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে পারে কীভাবে&#8230;.???</p>
<p>কোন অধিকার আছে তাদের যে কৌলিন্যবোধ তাদের এতখানি নাক উঁচু করে দিয়েছে!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজ কোন সে শক্তির কারণে কৌলিন্যবাদ নিজেকে ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বীতার কাতারে শামিল করার প্রয়াস পাচ্ছে? কোত্থেকে তাদের এত হিম্মত আসছে। কীভাবে তারা ইসলামকে মধ্যযুগীয়, অসভ্য আখ্যা দিয়ে নিজেদের সভ্য ও সভ্যতার কারিগর বলতে পারছে? যেখানে তাদের সমগ্র ইতিহাসই বর্বরতার, যুলুমের, অত্যাচারের। ইতিহাস সাক্ষী, এরা গড়তে জানেনা, জানে শুধু ধ্বংস করতে। এদের গড়া সভ্যতাও ঠিক এমনই ভঙ্গুর, যেকোন সময় ভেঙ্গে যেতে পারে। এর অসামঞ্জস্যতার মাত্রা এতটাই প্রকট। আল্লাহ কোরআনে তো এদের দিকেই ইশারা করেছেন</p>
<blockquote><p>وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِى الْأَرْضِ قَالُوٓا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ</p>
<p>যখনই তাদের বলা হয়েছে, যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা একথাই বলেছে, আমরা তো সংশোধনকারী।</p>
<p>أَلَآ إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ</p>
<p>সাবধান! এরাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী, তবে তারা এ ব্যাপারে সচেতন নয়।</p></blockquote>
<p>সুতরাং এরাই হচ্ছে প্রকৃত অসভ্য এবং নির্লজ্জ একটি ধারা যা শয়তানের সরাসরি ডিরেকশনে পরিচালিত হয়ে থাকে। সকল অসভ্যতার মূল এই কৌলিন্যবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা ও তার ধারক বাহকেরা।</p>
<p>এরা আজকে হুকুমতের আসনে আসীন ঠিক মুসলিমদের গাফিলতির জন্য, ইসলামী সভ্যতার ধারক বাহকদের উচিত সে গাফিলতি ঝেড়ে ফেলে কৌলিন্যবাদী ফেরাউনী সভ্যতার পতন ঘটিয়ে পুনরায় ইসলামী সুমহান ঐশী সভ্যতার পুনরুত্থান ঘটানো এবং দুনিয়ার সর্বত্র সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা। সেই সাথে মানব জাতিকে শয়তানের খপ্পর থেকে মুক্ত করে আল্লাহর লা&#8217;নতের আওতার বাইরে নিয়ে গিয়ে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথে পরিচালিত করা।</p>
<p>বনের বাঘ যখন শিকার করে তখন সে শিকারকে তাড়া করে, এক পর্যায়ে শিকারকে ছাড়িয়ে যায় এবং সামনে থেকে হামলা করে শিকারের সবচেয়ে নাজুক জায়গা- গলায় আক্রমণ চালায়। ঠিক সেভাবেই বুনো শুয়োরের মত হম্বিতম্বি করতে থাকা কৌলিন্যবাদের ধারক বাহক পাশ্চাত্য যায়নবাদী সভ্যতা ও তার ধারক বাহকদের লম্ফঝম্ফে মাথা না ঘামিয়ে এদের মূল ভিত্তিতে আঘাত করে চূর্ণ বিচূর্ণ করে একটি ঐশী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা করাটা এখন সময়ের দাবী।</p>
<p>সে দাবী পুরণের জন্যই মুসলিমদের ফিরে যেতে হবে ইসলামের মৌলিক ভিত্তি ও উসূলের দিকে। ইসলামী সভ্যতার কালজয়ী সোনালী ইতিহাসের দিকে।  মুসলিমদের হতে হবে শিকড় সন্ধানী। চিনে নিতে হবে শত্রু-মিত্র। সর্বত্র হাকীকত অন্বেষণ করে নিজেদের চিনে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে হবে সর্ব শক্তি নিয়ে তাওহীদের প্রতিষ্ঠায় যমীনের সর্বত্র।  সর্বাত্নক মোকাবেলায় নামতে হবে শয়তানী শক্তি ও তার ধারক বাহক দের বিরুদ্ধে।  গুড়িয়ে দিতে হবে বাতিলের প্রাসাদ এবং আল্লাহর খলিফা হিসেবে যমীনের সর্বত্র কায়েম করতে হবে আদালতের ভিত্তি,  এবং তখনই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠিত হবে যমীনে।</p>
<p>ইসলামী হুকুমাত বা সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা কোন সাধারণ জয় পরাজয়,  দখল বা পুনর্দখলের খেলা নয়,  বারং এটা একটি বিশ্বজনীন ভিশন।  যার চূড়ান্ত লক্ষ্যই হচ্ছে মানবতার মুক্তি। সুতরাং অন্যান্য সভ্যতা, জাতির মত ইসলাম কেও উত্থান পতনশীল কোন শক্তি জ্ঞান করাটা মোটেও সমীচীন নয়। বরং এর উৎপত্তিই হয়েছে মানবতার কল্যাণের জন্য।  অর্থাৎ যতদিন মানবতা আছে, ইসলাম ও ততদিন থাকবে। অর্থাৎ জয় পরাজয়ের হিসাব নিকাশে না গিয়ে সমগ্র ইনসানিয়াতকে মহা পরাক্রমশালী  আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার গোলামীর মধ্যে নিয়ে এসে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করাই হবে উদ্দেশ্য।</p>
<p>যেমন আল্লাহ তায়ালা কুরয়ান মাজীদে আমাদের শিখিয়েছেন,</p>
<p>رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِى الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِى الْءَاخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ</p>
<p>হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও এবং আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। (২: আল-বাক্বারাহ: ২০১)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/elitism-and-initial-conversation/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15179</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলার কৃষি; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও বর্তমান দুরবস্থার সুলুক সন্ধান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 01 Nov 2024 11:24:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15174</guid>

					<description><![CDATA[এক. মনে করুন, আপনি একজন প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার। দামী একটা ক্যামেরা নিয়ে ঢুঁ মারছেন উত্তরের কৃষিনির্ভর কোনো একটি গ্রামের মেঠোপথ ধরে। থেকে থেকে ক্লিক-ক্লিক শব্দ তুলে ভরে যাচ্ছে আপনার ক্যামেরার মেমোরি। ইতি-উতি তাকিয়ে পছন্দমাফিক কম্পোজিশন খুঁজছেন আপনি। সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>মনে করুন, আপনি একজন প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার। দামী একটা ক্যামেরা নিয়ে ঢুঁ মারছেন উত্তরের কৃষিনির্ভর কোনো একটি গ্রামের মেঠোপথ ধরে। থেকে থেকে ক্লিক-ক্লিক শব্দ তুলে ভরে যাচ্ছে আপনার ক্যামেরার মেমোরি। ইতি-উতি তাকিয়ে পছন্দমাফিক কম্পোজিশন খুঁজছেন আপনি।</p>
<p>সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে তখন। দূরদিগন্তে সূর্য উঁকি দিচ্ছে, গাছ বা কৃষিক্ষেত-এর পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তিম বা কমলা-রং। রক্তিম সে আলোয় ডানা মেলে ক্ষুধার্ত পেটে পাখিরা তাদের নীড় ছাড়তে শুরু করেছে, চতুর্দিকে কান-জুড়ানোর পাখির কলকাকলি। ঘাস ও পাতার ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ভোরের আলোয় মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। সূর্য-গাছ-পাখি-কৃষিক্ষেত—সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। ন্যাচার-ফোটোগ্রাফির জন্য একেবারে উপযুক্ত এক সময়। মনের আনন্দে ছবি তুলেই যাচ্ছেন আপনি। প্রতিটি ছবি যেনো পূর্বের ছবির সৌন্দর্যকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>হঠাৎ-ই আপনার চোখ পড়লো দূরের এক মেঠোপথে। একজন কৃষক তার কাঁধে করে ভার বয়ে নিয়ে চলছেন তার নিজস্ব গন্তব্যে। দু&#8217;পাশে ঝুলছে কোনো এক শস্যে পরিপূর্ণ দু&#8217;টি ডালা। আপনার এবং আপনার অবজেক্টের (কৃষক) মাঝে রয়েছে বেশ বড়সড় একটা কৃষিজমি; সে জমির পাতা ও ঘাসের উপরের তরল বিন্দুগুলো আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে। ছবির জন্য একেবারে দারুণ মুহূর্ত। ক্যামেরাটা চোখের সামনে তুলে একাধারে অনেকগুলো ছবি তুললেন। চোখ থেকে আপনার প্রিয় যন্ত্রটি নামিয়ে ছবিগুলো দেখলেন, স্যাটিসফাইড।</p>
<p>এবার তাহলে ফেরার পালা। ফিরলেন বাসায়। বেছে বেছে দুয়েকটা ছবি সযত্নে রেখে দিলেন। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কারও বাগিয়ে আনলেন কৃষকের সেই ছবিটি দিয়ে।</p>
<p>কিন্তু, আমার মনে আপনার জন্য কিছু প্রশ্ন আছে।<br />
আপনি কি একবারও সেই কৃষকের নিকট গিয়ে তার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে প্রশ্ন করেছেন?<br />
লেন্সের সহায়তায় যে মানুষটার প্রতিকৃতির জন্য আপনি পুরস্কার পর্যন্ত জয় করলেন, সেই কৃষকের মনেও কি তখন এতোটা সুখ ছিলো?<br />
সে কি তার পরিশ্রম আর ফলানো শস্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছে?<br />
আপনি যে ছবিটি দিয়ে গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, সেখানে সেই কৃষক কি আদৌ ভালো আছেন?<br />
গ্রাম-বাংলার সৌন্দর্যই যাদের জন্য, তারাই যদি ভালো না থাকে, তাহলে আপনার এই ছবি তার কী উপকারে আসবে?<br />
আপনার ছবিটা কি তাহলে বাস্তবতা-বিবর্জিত হলো না?<br />
অন্যর দুর্দশাকে সুন্দর দ্বারা পরিবর্তন করে সেটাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করাটা কি অন্যায় না?</p>
<p>উত্তরগুলো জানা খুবই জরুরি। কারণ, গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বুলি আওড়িয়ে প্রতিবছর এমন অসংখ্য ছবি তোলা হচ্ছে। ভুল বার্তা দিয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে মানুষ ও পর্যটকদের। লক্ষ লক্ষ মানুষ উত্তরের এমন এলাকাগুলোয় এসে ভ্রমণ করছে—নিজ খরচ, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে। নিজেদের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা-মনোকষ্ট প্রকৃতির কাছে ন্যস্ত করে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তার স্থানে বদল করে নিয়ে খুশিমনে তারা বাড়ি ফিরছে।</p>
<p><strong>কিন্তু, যারা এই প্রকৃতিকে এমন পরম যত্নে আগলে রেখেছে, যাদের সহায়তায় ফলে আত্মিক প্রশান্তির এমন অসাধারণ এক পরিবেশ উপভোগ করছে সবাই, যাদের হাড়-ভাঙা খাটুনি ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে একেবারে তাজা ও টাটকা শস্য পাচ্ছি আমরা, একবারও কি তাদের নিয়ে আমরা প্রশ্ন করেছি যে, তারা কেমন আছে? কী খাচ্ছে? দৈনন্দিন জীবন কেমন?</strong> সাধারণ খরচের ন্যূনতম অর্থও আসে কোথা থেকে? ফসল কাটার পরমুহূর্তে তাদের অনুভূতি কী? তারা কি তাদের পরিশ্রম ও ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়? তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কী কী সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? নাকি অর্থ বরাদ্দের নামে সব লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছে?</p>
<p>এগুলো গেলো কৃষক বা চাষীর ক্ষেত্রগুলোতে উদিত হওয়া কিছু প্রশ্ন। আবার শস্যের ক্ষেত্রেও এমনই কিছু প্রশ্নের উদয় হয়। যেমন, একই পেশায় নিয়োজিত থাকার পরেও পূর্বের প্রজন্মের তুলনায় এই প্রজন্মের গড়-বয়স কমছে কেন? একই জমির একই শস্য কেন আমাদেরকে পূর্বের মতো শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়ক হচ্ছে না? কেন কৃষকেরা প্রতিনিয়তই শ্বাসকষ্টের রোগী হচ্ছে এবং সে সংখ্যাটা কেন উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে? রাসায়নিক সার বা রাসায়নিক ঔষধের পরিমাণ কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত? এতো পরিমাণ রাসায়নিক সার বা রাসায়নিক ঔষধ দেবার পরেও কেন শস্যে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমে না?</p>
<p>প্রশ্নগুলো উত্তর জানা জরুরি। শুধু প্রশ্ন করে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করার কোনো অর্থই হয় না। বিপরীতে যৌক্তিক প্রতিটি প্রশ্নের জন্য প্রয়োজন যৌক্তিক ব্যাখ্যা। নতুবা বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও বড় ধরনের কোনো ঘাপলা রয়েছে। আর সেসবের সমাধানও করতে হবে।</p>
<p>চলুন, তাহলে এবার এসব সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার জগতটাকে উন্মোচন করি। একটু দেখে আসি বাংলার কৃষকেরা কেমন আছেন! জেনে আসি তাঁদের উৎপাদিত ফসলগুলো কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত!  বর্তমান এই বিশ্বব্যবস্থাপনার কাছে তাঁরা কতোটুকু জিম্মি! রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা কতোটুকু অসহায়! কতোটা দুর্বিষহ তাঁদের দৈনন্দিন জীবন!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>প্রথমেই একটু নজর দেই একজন কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে।</p>
<p>“আধুনিকতা”র বর্তমান এই সময়েও একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবনটা খুবই দুর্বিষহ। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বা ঘামে ভেজা একটা শরীর নিয়ে একদম ভোরে জেগে ওঠে সাধারণ একজন কৃষক। বাসায় থাকে না পর্যাপ্ত পরিমাণের খাবার। যতটুকু থাকে, তা দিয়ে সকাল-দুপুরের খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। অতএব, দু&#8217;মুঠো চিড়ে-গুড় খেয়ে কৃষির সরঞ্জামাদি নিয়ে সকালে বের হয় জমির উদ্দেশ্যে।</p>
<p>সকাল-দুপুর কাটে জমিতেই। মাঝে একটু দুবেলা খাওয়ার জন্য কাজ থেকে অবসর নিতে হয়। বাসা থেকেই বাটিতে করে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় জমিতেই। দুপুরে খাওয়ার পর হয়তো কোনো এক গাছের নিচে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নেয়। এভাবেই কাটে বিকেল পর্যন্ত। বিকেলের দিকে টুকটাক কিছু সবজি নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় একজন কৃষক।</p>
<p>সবজি বিক্রি শেষে যতটুকু বা আয় হয়, তা নিয়ে পরেরদিনের খাবারের জন্য চাল-ডাল কেনা হয়। আবার যেসব সবজি সকালে বিক্রি করতে হয়, সেসব সবজি দিনের শুরুতে নির্দিষ্ট বড় একটি হাটে বিক্রি করে সে অর্থ দিয়ে আগামী কিছুদিনের খাবারের জন্য বাজার করে নিয়ে আসে অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করা একজন কৃষক।</p>
<p>দিনভর একটানা হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যার পরে পরিবারের সকলের সাথে কথা বলার সুযোগ হয় একজন কৃষকের। সেসময়টাতেই খোঁজ নেয় সে পরিবারের বাকী সদস্যদের। অর্থাভাবে সন্তানদের সে দিতে পারে না পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ। আবার, বাহ্যিক বেশভূষার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও প্রতিনিয়ত সে হয় নিগৃহীতের শিকার। অর্থাভাবে বাধ্য হয়ে কৃষকরা তাদের সন্তানদেরকে ভর্তি করিয়ে দেয় সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু, এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার মান যে কতোটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার ভয়াবহ সমীকরণ আমরা পত্রিকার পাতা থেকে শুরু করে একজন শিক্ষার্থীর মুখেও শুনি।</p>
<p>এই গেলো এক অবস্থার কৃষকদের জীবন। আরেক অবস্থার কৃষকদের জীবনটাও এমন। তবে, বিভিন্ন মৌসুমে ফলিত ফসল, যেমন–চাল, গম বা আলু নিজেদের জন্যই রেখে দেয় পরের মৌসুমে পুনরায় ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত। সে সময় পর্যন্ত শুধু এই ফসলটুকুই তাদের খাবারের একমাত্র সম্বল।</p>
<p>এদের আয়ের সময়ই থাকে মাত্র তিনটে। রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২, অর্থাৎ, একমাত্র ফসল ঘরে তোলার সময়ই বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয়, সে আয় দিয়েই তাদের পরের মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চলতে হয়। এরা আবার সবজি বিক্রি না করে লম্বা সময়ের ফসলের পেছনে নজর দেয়। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের জীবনটাও পূর্বের অবস্থার কৃষকদের মতোই।</p>
<p><strong>এখানে দু&#8217;ধরনের কৃষকদের কথা তুলে ধরা হলো। একদল শুধু দীর্ঘকালীন সময়ের ফসলগুলো নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করে, আরেকদল প্রতিনিয়ত স্বল্পকালীন টাটকা সবজি বিক্রি করে। তবে, এরা যে আবার দীর্ঘকালীন ফসল ফলায় না, বিষয়টা তেমনও না। অথবা, যারা শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ফসল বিক্রি করে, তারা যে আবার একেবারেই সবজি ফলায় না, সেটাও না। কিন্তু, এখন প্রশ্ন হলো, স্বল্পকালীন হোক বা দীর্ঘকালীন, কৃষকরা কি তাদের কষ্ট, পরিশ্রম ও ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়?</strong></p>
<p>মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে গত কয়েকবছর ধরেই টেলিভিশন-পত্রিকায় কৃষকদের আন্দোলন বা বিক্ষোভের ঘটনা আমরা শুনে আসছি। ফসল কাটার পর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সড়কে ফসল ফেলে বিক্ষোভ বা অবরোধ করা গত কয়েক বছরের একেবারে সাধারণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>জমি চাষ থেকে শুরু করে বীজ ক্রয়, বীজ বপণ, পরবর্তী পরিচর্যা, সেচ প্রদান, কয়েকধাপে রাসায়নিক সার দেওয়া, আগাছা নির্মূল, ফসল কাটা ও মাড়াই করা এবং পরিশেষে বাজারজাত করা—দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন কৃষক তার ফসলের মুখ দেখতে পায়। কিন্তু, এই প্রক্রিয়ার প্রতিটা পর্যায়েই এখন যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, একজন কৃষক তার ফসল বিক্রি করে লাভ তো দূরে থাক, ব্যয়িত অর্থই সে এখন তুলতে পারে না।</p>
<p>এই ন্যায্যমূল্যটুকু না পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো মধ্যস্বত্বভোগী  একটি দল। সরকার কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তাদের জন্য কৃষকরা নির্দিষ্ট সে দামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কেননা, এতো পরিমাণ ফসল হয়তো তাকে এদামেই বিক্রি করতে হবে নতুবা তার ফসলগুলো পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে।</p>
<p>এখন, একজন কৃষক যদি ৩-৫ মাস টানা পরিশ্রমের পর তার ব্যয়িত অর্থই তুলতে না পারে, তাহলে সে কীসের উপর ভিত্তি করে কৃষিকাজ চালু রাখবে? এদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য রয়েছে, কৃষিকাজ ছেড়ে তারা ইতোমধ্যে শহরমুখী হয়ে শিল্প-কারখানার সাথে সম্পর্কিত কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের অবস্থা প্রতিনিয়তই অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমাদের সামনে প্রতিবছর দারিদ্র্যের যে হার উপস্থাপন করা হয়, তা যে পুরোটাই সাজানো একটি মিথ্যা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>অর্থাৎ, অর্থনৈতিক দিক থেকে গ্রাম-বাংলার প্রতিটি কৃষকই চরম দারিদ্রের মাঝে দিনাতিপাত করে। কোনো দুর্ঘটনায় যদি তাদের আকস্মিকভাবে অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তখন তাদের একমাত্র সম্বল হয় গ্রামীণ ব্যাংকগুলো। সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটি সুদের হারে টাকা তুলে এনে সে খরচ বহন করে। একারণেই গ্রামের এমন কোনো কৃষক নেই, যে এমন ঋণের জালে আবদ্ধ না, এসব সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি না।</p>
<p><strong>শোনা যায়, প্রতিবছরই রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এসব দরিদ্র কৃষকদের জন্য ভর্তুকি হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার ১০-২০%-ও যদি তাদের কাছে পৌঁছাতো, তাহলে দৈনন্দিন খাবারের ক্ষেত্রে অন্তত টানাপোড়েনে থাকতে হতো না একটি কৃষক পরিবারের।</strong> তাহলে টাকাগুলো যায় কোথায়? উত্তরটা হয়তো সকলেরই জানা, কিন্তু মুখ খোলার সামর্থ্য নেই গ্রাম্য কোনো চেয়ারম্যান বা মেম্বারেরও।</p>
<p>এমনকি, দেশের আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে যখন আইএমএফ-এর নিকট থেকে “আর্থিক সাহায্য”-এর নামে চড়া সুদে ঋণ চাওয়া হয়,  আইএমএফ তখন শর্ত দেয় যে, এই “আর্থিক সাহায্য” তখনই দেওয়া হবে, যখন দেশের কৃষি সেক্টরে ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হবে।</p>
<p>বিষয়টা অদ্ভুত না? আমরা “আর্থিক সাহায্য”-এর নামে চড়া সুদে ঋণ নিতে গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ একটা বিষয়ে কেন সে শর্ত দেবে? তাহলে কি বৈশ্বিকভাবেই কৃষিকে কোণঠাসা করা হচ্ছে? নাকি মানবসভ্যতাকে কুক্ষিগত করার একটা মাধ্যম হিসেবে কৃষিকে ব্যবহার করা হচ্ছে? বিষয়টার তাহলে শুরু ও শেষ কোথায়? মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে কি বৈদেশিক কোনো সংস্থার যোগসূত্র আছে? গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর এমন চড়া সুদে ঋণ দিয়ে পুরো একটা সমাজকে জিম্মি করার অর্থ কী তাহলে? এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য কী আসলে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>এবার তাহলে কৃষিপণ্যের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>আজ থেকে একযুগ আগেও চাষের জন্য প্রায় ৯০% কৃষক নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করতো। এতে যে ফলন খারাপ হতো, তা-ও নয়। সবসময় প্রায় একই পরিমাণের ফসল পেতো। এজন্য তারা বলে দিতে পারতো অমুক জমিতে এই বীজে এতো পরিমাণ ফলন হবে। কিন্তু, মাত্র একযুগের ব্যবধানে কৃষকের নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজের ফলন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে, <strong>বাধ্য হয়ে কৃষকদেরকে আজ প্যাকেটজাত বীজ এবং হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।</strong></p>
<p>এর অন্যতম একটি কারণ হলো, জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা। <strong>কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জমির উর্বরতা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। একপর্যায়ে গিয়ে বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজগুলো রাসায়নিক সার মিশ্রিত মাটির সাথে অভিযোজন করতে পারে না। ফলে, ফলনের পরিমাণ উত্তরোত্তর কমতে থাকে। তখন কৃষক বাধ্য হয় প্যাকেটজাত বীজ এবং হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকতে।</strong></p>
<p>তবে, প্যাকেটজাত বীজ বা হাইব্রিড বীজের পাশাপাশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করার পরেও কেন তাহলে জমির উর্বরতা কমছে? ফ<strong>সলের ফলন বেশি হলেও কেন সে ফসলকে খেয়ে পূর্বের মতো শক্তি অর্জন করা সম্ভব হয় না? গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন যুবকের কেন এখন শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা হচ্ছে?</strong> বিষয়গুলো কি তাহলে প্যাকেটজাত বীজ, হাইব্রিড বীজ বা পাশাপাশি রাসায়নিক সারের কোনোভাবে সম্পৃক্ত?</p>
<p>প্রথমেই আসি প্যাকেটজাত বীজ বা হাইব্রিড বীজের বিষয়ে। মূলত, হাইব্রিড বীজ ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে উচ্চমাত্রায় কীটনাশক, সেচ ও সার ব্যবহার করার প্রয়োজন পরে। অন্যদিকে, বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজগুলো পরবর্তী বছরে একই পরিমাণল ফসল এবং পণ্য উৎপাদন করে বা তারচেয়েও কম করে, তাই কৃষক প্রতি বছর নতুন বীজ কিনতে বাধ্য হয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার তাড়নায় কৃষক প্রতি বছর হাইব্রিড বীজের পিছনে টাকা খরচ করছে। এভাবেই মূলত ধ্বংসাত্মক এই বৃত্তটির উদ্ভব হয়েছে।</p>
<p>এবার আসি রাসায়নিক সারের বিষয়। মূলত, রাসায়নিক সারের পুরো অংশটাই বিষাক্ত। রাসায়নিক সারের মাধ্যমে বা কীটনাশক ব্যবহার করে ফসলের যে পরিমাণ উপকার করা হচ্ছে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষরা। কৃষকরা এসব সার বা কীটনাশক স্প্রে-র মতো ব্যবহার করার সময় তাদের নাক, মুখ ও রোমকূপে প্রবেশ করে তাদের শারীরিক ক্ষতি করছে। পাশাপাশি, এসব ফসল খেয়ে মানুষের মাঝে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং ক্যান্সারের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে।</p>
<p>কিন্তু, এসব কীটনাশক বা রাসায়নিক সার স্লো-পয়জন বা দীর্ঘস্থায়ী বিষ হওয়ায় আমরা এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না, এর প্রভাবটা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় নির্দিষ্ট একটা বয়সে গিয়ে। তবে, এসব খাবার খেয়ে শরীর দুর্বল লাগা বা শরীরে মেদ জমার বিষয়টা কিন্তু আমরা আবার ঠিকই অনুভব করতে বা বুঝতে পারি।</p>
<blockquote><p>এরচেয়েও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, <strong>যে কোম্পানিগুলো হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন করে বাজারজাত করে, তারাই আবার সেসব বীজের কীটনাশকও উৎপাদন করে। এমনকি, এসব কোম্পানিই আবার মানুষের জন্য ঔষধও উৎপাদন করে থাকে। সেসব কোম্পানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটা হলো, Cargill-কারগিল, DuPont-ডুপন্ট, Pioneer-পাইওনিয়র, Bayar-বায়ার, Monsanto-মনসান্টো, Syngenta-সিনজেনটা, BASF-বাসফ ও Hayera-হায়েরা।</strong></p></blockquote>
<p>অতএব,<strong> বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তারাই বীজের মাঝে অপ্রতিরোধ্য সব কীট এবং মানুষের বিভিন্ন রোগের ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে দেয়।</strong> ফলশ্রুতিতে, কৃষক বা চাষীরা ঐসব রোগের কীটনাশকই খুঁজে বেরায় এবং পরিশেষে, মানুষের রোগের ক্ষেত্রেও তাদের নিকটই যেতে হয়। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ একটা জাতি এসব কোম্পানির কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।</p>
<p>আবার, আশির দশকে সবুজ বিপ্লব শুরু হলে হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়া হয়। এরপর নব্বইয়ের দশকে “জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র”-এর চিন্তাভাবনা শুরু হয়। বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে বীজগুলো নিজেদের আয়ত্তে রাখার জন্যে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও তাদের সংগঠনগুলো নতুন পরিকল্পনা করে। তারা জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোর থেকে বীজ হাতিয়ে নেয়ার জন্যে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় রকেফেলার ফাউন্ডেশন, গেটস ফাউন্ডেশনসহ এরকম সাম্রাজ্যবাদী সংগঠনগুলো নরওয়ের সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়।</p>
<p>এটি সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে করার কারণ এখানে প্রচুর বরফ থাকে এবং এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত না করতে পারে। এই কারণগুলোকে প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে নিয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে কেন এরকম একটি আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রের দরকার। এভাবে বুঝিয়ে কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে চাপ প্রয়োগ করে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই তারা বীজ সংরক্ষণ করে আসছে।</p>
<p>এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা ঘটনা হলো, ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পর তাদের জাতীয় বীজ সংরক্ষণাগার থেকে অনেক বীজের নমুনা হারিয়ে যায়, যা আজও পাওয়া যায়নি! সেগুলো কোথায় গেছে, তার হদিসও কেউ দিতে পারেনি। এমনকি, সিরিয়ার সংকট তৈরি হওয়ার পর স্বয়ং সভালবার্ড থেকেও কিছু সিরিয়ান বীজ হারিয়ে যায়!</p>
<p>কৃষি ও খাদ্যের মাধ্যমে যে আমাদেরকে আমাদের অজান্তেই শোষণ করা হচ্ছে, তার একটা উদাহরণ পাওয়া যায় আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও যায়নবাদীদের অন্যতম হোতা হেনরি কিসিঞ্জারের একটি উক্তির মাঝে,<br />
<strong>❝যদি আপনি তেল নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে আপনি দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, যদি আপনি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে আপনি বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আর এই খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই আপনাকে এর মূল উপাদান বীজকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।❞</strong><br />
সে আলোকে এটা বলাই যায় যে, কোনো দেশের উপর অবরোধ আরোপ করতে হলে শুধুমাত্র বীজের উপর অবরোধ করেই তাদের সহজে কাবু করা সম্ভব হবে।</p>
<p>তাহলে আশা করি, একজন পাঠক হিসেবে হেনরি কিসিঞ্জার-এর মন্তব্য, নরওয়ের বিখ্যাত সভালবার্ড বীজ সংরক্ষণাগার আর হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন—এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় করতে পেরেছেন।</p>
<p>অতএব, আইএমএফ-এর ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষিতে ভর্তুকি কম দেওয়ার শর্ত, গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর চড়া সুদে ঋণ প্রদান করে কৃষকশ্রেণিকে জিম্মি করা বা মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া ব্যবসার পেছনের রহস্যগুলো তাহলে এবার একটু হলেও খোলাসা হয়েছে বলে আশা করি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>সাধারণত কোনো কিছুর সমালোচনা করলে নিশ্চায়ই কোনো কিছুর সাথে তুলনা করেই সমালোচনা করা হয়। অর্থাৎ, সমালোচনার অবশ্যই একটা ভিত্তি থাকে। বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও কৃষকের বর্তমান অবস্থাটা সমালোচনামূলকভাবে সামগ্রিক যে বিষয়টা তুলে ধরা হলো, তারও একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সেটি হলো, ইসলামী সভ্যতায় বাংলা অঞ্চলে কৃষির ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা। তাহলে বর্তমানে আমাদের অবস্থা এতোটা শোচনীয় কেন? এর উত্তর জানতে হলে আগে পশ্চিমাদের দর্শন নিয়ে একটু জানা প্রয়োজন।</p>
<p>শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের হোতা এবং জায়নবাদের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমাদের দর্শনই হলো মানুষকে মানুষ মনে না করা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় কথায়, আচরণ এবং দর্শনে। যেমন,</p>
<ul>
<li>০১. শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধারণা হলো, “আমি সাদা, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি ইউরোপীয়, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমার জন্ম আমেরিকায়, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”</li>
<li>০২. ইউরোপীয়দের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্বাস হলো, “ইউরোপীয়দের ন্যায় যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোনো জাতির অস্তিত্ব নেই।”</li>
<li>০৩. বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদের মূল দর্শনই হলো শক্তির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার। ডারউইনের &#8216;সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট&#8217; তত্ত্বও এ শক্তির আধিপত্যের ধারণারই ফলাফল। তারা ব্যতীত বাকীরা ধ্বংস হয়ে যাবে-এটিই তাদের নিয়তি।</li>
<li>০৪. আমরা সকলেই জানি, বর্তমান পৃথিবী জায়নবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই জায়নবাদী ইহুদীদের অন্যতম নাথান রথচাইল্ড একবার বলেছিলেন,<br />
❝সাম্রাজ্য পরিচালনা করার জন্য কে রাজা হলো তা আমার দেখার বিষয় নয়, আমার দেখার বিষয় হলো টাকা বা অর্থ। সত্যিকারের শাসক মূলত সে-ই, যার অর্থ আছে।❞</li>
<li>০৫. চার্চিল আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। আমাদের গম, চাল খাদ্য সঙ্কট দূর করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তারা আমাদের এ সকল খাদ্যদ্রব্য লুট করে নিয়ে যাওয়ার কারণে ৪.৩০ মিলিয়ন বাঙালী খাদ্যাভাবে মৃত্যুবরণ করে। দুর্ভিক্ষের বিষয়ে চার্চিলকে জিজ্ঞেস করা হলে চার্চিল জবাব দেন,<br />
❝তারা যদি এত সন্তান জন্ম না দিতো, তাহলে তো এত মৃত্যুবরণ করতো না!❞</li>
</ul>
<p>নিজেদেরকে এমন শ্রেষ্ঠ মনে করার কারণেই ভারত উপমহাদেশে এসে তারা শোষণ, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। নিজেদের এমন দর্শনের কারণেই পরিকল্পিতভাবে ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসনের নামে শোষণ ও আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে।</p>
<p>ব্রিটিশদের শোষণের ভয়াবহতা এতোই ছিলো যে, সঠিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, ১৭৭১ সালের দুর্ভিক্ষের পূর্বে বাংলাদেশের রাজস্ব (১৭৬৮ সালে) ছিলো ১ কোটি ৫২ লক্ষ ৪ হাজার ৮ শত ৫৬ টাকা। কিন্তু, এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এ&#8217;অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরও ১৭৭১ সালে রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৫ শত ৭৬ টাকায়। একটু চিন্তা করলেই আমরা এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারব। তাদের শাসনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় জনগণ এ ধরণের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।</p>
<p>“বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা&#8221; নামক গ্রন্থে হেমাচন্দ্র কান্নগো বলেন, <strong>এই জমিদাররা প্রতি একরে এতো বেশি খাজনা এবং জুলুমপূর্ণ কর আরোপ করা শুরু করে, যা ছিলো সম্পূর্ণ বে-আইনী। কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ, সরকারকে প্রদান করা অর্থের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিলো। অর্থাৎ সরকারকে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই যেধরণের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও অর্থনীতির ধস নেমে আসে, জুলুমের শিকার হতে থাকে তার থেকে ৫ গুণ বেশি খাজনা এ&#8217;সব জমিদাররা আদায় করতে শুরু করে। এদিকে ব্রিটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তাদের ভূমির রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত যে রাজস্ব ছিল তার থেকে আরও বৃদ্ধি করে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ৩৩ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন এক ভয়াবহ আগ্রাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।</strong></p>
<p>মেমোরেন্টাম অন দি পার্লামেন্ট সেটেলমেন্টের ৪০ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তাদেরই এজেন্ট সেন্সেস কমিশনার স্যার টমাস মন্ড্রোর মতে, ১৮৪২ সালে উপমহাদেশে ভূমিহীন কৃষকের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। কিন্তু ১৮৭২ সালে অর্থাৎ ৩০ বছরের ব্যবধানে আমাদের ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ লক্ষে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ করতে করতে ১৯৩১ সালে দেখা যায়, সেন্সেস অনুসারে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলা অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ৭০ ভাগ জনগণই ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছে। বাকী যে ৩০% এর ভূমির মালিকানা ছিলো, খোঁজ করলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মালিকানা ছিলো নিতান্তই হাতে গোনা কয়েকজনেরই। অধিকাংশই ছিলো জমিদার কিংবা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত এজেন্ট। এরা মূলত লুণ্ঠনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে জমিদার এবং খাজনাভোগী শ্রেণির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তারা জুলুমকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে, তাদের শোষণের মাত্রা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতে তাদের এজেন্টদের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করতে থারে যা দশ বছরের ব্যবধানে ৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>এস. কে চ্যাটার্জীর বইয়ের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে মোট দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ছিল ১৩ এবং এইসব দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও অধিক। কিন্তু, ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের ফল সহজপন্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং ৪ কোটি সমপরিমাণ মানুষের প্রায় ৬ মাসের খাদ্য ও সব শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণের জন্য রেলপথের স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ১৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। উপমহাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জমিজমা, বিভিন্ন সম্পদ, মাঠ, ঘর-বাড়ি নষ্ট করে তার উপর দিয়ে রেলপথ বসায় এবং দেখানো হয় তারা অনেক পরিকল্পিত, উন্নত ও সংরক্ষিত উপায়ে উন্নয়ন করছে। অথচ এই স্থাপনার ক্ষেত্রে তারা মোটেও জনগণ এবং কৃষকদের বাস্তবিক অবস্থার দিকে নজর দেয়নি। তারা নজর দিয়েছিলো তাদের লুণ্ঠনের দিকেই, লুণ্ঠন তরান্বিত হওয়ার পন্থার দিকেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, তাদের তৈরিকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী যদি অফিসিয়ালি মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সংখ্যা এটা হয়, তাহলে বুঝাই যাচ্ছে তা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের। প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলির অবস্থা তাহলে কি হয়েছিলো? ২০ বছরের ব্যবধানে যদি কোটি কোটি লোক মারা যায়, তাহলে সত্যিকার বাস্তবিক অবস্থা কি হয়েছিলো? উপমহাদেশে যার ফল আমরা আজও ভোগ করছি।</p>
<p>যাইহোক, এভাবেই তারা ভারতের সবেচেয়ে বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি কৃষিকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তাহলে কৃষিতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল এবং তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের তুলনা করলেই বিষয়টা আরো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবন এবং কৃষিপণ্য ও কৃষির সামগ্রিক অবস্থা মাত্রই তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, পশ্চিমাদের মনোভাবটাও আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়েছে এবং এদেশের কৃষির প্রতি তাদের ‘সুমহান’ কৃতকর্মের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, তাদের নিয়ে আর বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। সেহেতু, এবার একটু ইসলামী সভ্যতায় বাংলা অঞ্চলে কৃষির ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা-দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের সময় যতদিন বাংলা তার অধীনস্থ ছিলো, ততোদিন সালতানাতের সবেচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থের যোগান দেওয়া হতো এই বাংলা থেকে। মুঘল আমলে এই বাংলাই সমগ্র বিশ্বের ২৫-২৯% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। বাংলার এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণটা ছিলো কৃষির প্রাচুর্য। বাংলার মাটি ছিলো যেমন উর্বর, এর আবহাওয়াও ছিলো তেমনি উপযোগী।</p>
<p>বাংলায় যে পরিমাণ শস্য উৎপাদন হতো, প্রায় ৫০-৬০টি দেশে সেসব রপ্তানি করা হতো। মুসলিমরাই ছিলো চিনির উদ্ভাবক, কেননা এই অঞ্চলে যে পরিমাণ আখের চাষ হতো, তা আর কোথাও হতো না। এমনকি, আজকে সারা বিশ্বে প্রচলিত মশলাপাতির প্রায় ৭০-৭৫%-ই এই ভারতীয় উপমহাদেশে আবিষ্কৃত। মুঘল আমলের মশলাগুলো আজও সমানভাবে সমাদৃত।<br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-2983821056776451" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-2983821056776451" data-ad-slot="6155617955"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>বাদশাহ আলমগীরের সময় বাংলার কৃষি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। মীর জুমলা (১৫৯১- ১৬৬৩) এবং শায়েস্তা খাঁর (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) আমলে উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছিল সর্বাধিক সস্তা। টাকায় আট মণ চা পাওয়া যেত। এ&#8217;সময় বাংলা অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে।</strong></p>
<p>এই বাংলা অঞ্চল নদীমাতৃক হওয়ায় বাংলার নদীর মাছগুলোর জন্য প্রায় ৫০টিরও অধিক অঞ্চল থেকে বাণিজ্য করতে আসতো। যেহেতু এই অঞ্চলের পাশেই রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র, আবার সে সময়ের বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় মাধ্যম সমুদ্রপথ হওয়ায় এই বাংলা সমগ্র বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলো। বার্থেমা ও বাবুর্সা ১৬ শতকে এই অঞ্চল ভ্রমণ করে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝এখানকার মানুষেরা প্রতিটি শহরকেই একেকটি বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।❞</p></blockquote>
<p>এভাবেই বাংলা অঞ্চল এভাবেই সমগ্র বিশ্বের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভ্রমণপিপাসুরা বাংলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শুধু যে কৃষিতেই বাংলা অঞ্চল সমৃদ্ধশালী ছিলো, তা নয়। বরং, নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার ছিলো এই বাংলা অঞ্চল। সামগ্রিকভাবে কয়েকজনের কয়েকটি বক্তব্য শোনা যাক।</p>
<ul>
<li>০১. ইবনে বতুতা—<br />
<strong>❝নদী পথে মিশরের নীল নদের মতো ডানে-বামে ছিলো অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজী এবং গ্রামের পর গ্রাম। আমরা গ্রাম ও উদ্যানরাজীর মধ্য দিয়ে ১৫ দিনের মতো চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে আমরা একটি সাজানো উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলেছি।❞</strong></li>
<li>০২. একজন চীনা দূত—<br />
<strong>❝এর অঞ্চলে ভূমি এতটাই উর্বর এবং এর উৎপাদন এতই বেশি যে, একই জমিতে প্রতি বছর দুই থেকে তিন ধরণের ফসল তারা পায়। কোনো রকম যত্ন না করেও অঞ্চলের ভূমি থেকে কৃষকরা তাদের চাহিদার থেকেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে।❞</strong></li>
<li>০৩. আবুল ফজল—<br />
<strong>❝বাংলার মাটি এতো বেশি উর্বর ছিলো যে, একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হতো। যদি এই অঞ্চলের চালের প্রত্যেক প্রকার থেকে একটি করে শস্যকণা সংগ্রহ করা হতো তাহলে একটি কলস ভরে উঠতো।❞</strong></li>
</ul>
<p>এরপর,<br />
আমরা দ্রব্যমূল্যের ক্রয় ক্ষমতার দিকে তাকালে লক্ষ্য করি, সে সময়ের সবকিছু বিদেশে রপ্তানি হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের ফলে ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ আখলাকী উদ্যোগের ফলে প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত সস্তা দরে পাওয়া যেতো। বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় লেখকগণ বিকৃতভাবে উল্লেখ করলেও দেখা যায়, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিলো। যার ফলে সবাই নিজ চাহিদা মতো খাবার ক্রয় করতে পারতেন। এমনকি ক্রয় করার পরেও তাদের কাছে অর্থ উদ্ধৃত থেকে যেতো। এজন্যই ইবনে বতুতা মন্তব্য করেন পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন একটি দেশ দেখেননি যেখানে জিনিসপত্র বাংলা অঞ্চলের মতো এতো সস্তায় বিক্রি হয়। তিনি দেখেন যে এ দেশ চালে পরিপূর্ণ ও ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর।</p>
<p>১৬৪০ সালে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ভ্রমণ করে সিবাস্তিয়ান মাররিক বলেন, প্রত্যেক বাজারে বা শহরে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্য, সুতির বস্ত্র প্রভৃতির প্রাচুর্য এতো বেশি ও সস্তা ছিল যে মাত্র একটি বাজার থেকে এসব জিনিসপত্র অল্প দামে ক্রয়পূর্বক জাহাজ বোঝাই করে নেওয়া যেতো। যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলের সাথেই ব্যবসা করতে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতো। এ অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক হারে উৎপাদন করে তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতো।</p>
<p>এছাড়াও তিনি মন্তব্য করেন, শহরগুলিতে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য এতটাই সাধ্যের মধ্যে ছিলো যে তিনি দিনে কয়েকবার আহার করতে প্রলুব্ধ হতেন। ইবনে বতুতা অনেকগুলো দ্রব্যের বর্ণনা দেন। যেমন–মাত্র ৮ দিরহামে ৮০ রাতল ধান পাওয়া যেতো। ১ রৌপ্য দিনারে ২৫ রাতল চাল পাওয়া যেতো। ১ আনা ৯ পাইয়ে বর্তমান ওজনের ১ মণ চাল পাওয়া যেতো। এভাবে প্রতিটি পণ্যই এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অনেক সস্তা ছিলো। যার ফলে এ&#8217;অঞ্চলের মানুষ যতটুকু আয় করতেন ততটুকু দিয়ে তারা তাদের খাদ্য, বস্তু কেনার পরেও তাদের আয়ের একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থাকতো।</p>
<p>সে আমলে জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক বেশি ছিলো। পাশাপাশি মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বলয়ের কারণে মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী হয়ে উঠে। নারী-পুরুষ সকলেই তাদের স্ব-স্ব জায়গা থেকে সাধ্যমতো পরিশ্রম করে। যার ফলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান, কৃষির ভিত্তি, বস্ত্র বা সব ক্ষেত্রে বিশাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আখলাকী এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট একটি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর শ্রমনীতির দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতেন তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে তার বাৎসরিক অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটে যেতো।</p>
<p>যেমন, <strong>মুঘল সালতানাতের সময়কালে শ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারিত ছিলো সেটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক মজুরি হিসেবে তৎকালীন সময়ে একজন শ্রমিক দুই দম আয় করতেন। তাহলে তার মাসে আয় হতো ৬০ দম অর্থাৎ বছরে তার আয় হতো আঠারো টাকার সমান। জীবন ধারণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতোটাই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল যে, ইবনে বতুতা বলেন তার জনৈক বন্ধু আল মাসুদী বাংলা অঞ্চলের একজন নাগরিক যিনি বছরে আয় করেন ১৮ টাকা। কিন্তু তার বছরে খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র ক্রয় করতে ব্যয় হয় ৮ দিরহাম বা ১ টাকা। পারিবারিক অন্যান্য সদস্যের চাহিদা এবং খাদ্য-বস্ত্র সব মিলিয়ে তার আয়ের তিন ভাগের দুইভাগ খরচ হতো।</strong> আর এক ভাগ থেকে যেত। কারও কারও ক্ষেত্রে ১ ভাগ ব্যয় হতো আর বাকি দুই ভাগই উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যেতো। আবার তিনি বলেন, অনেকের সারা বছর ২ বা ৩ টাকার বেশি প্রয়োজন পড়তো না। ফলে ১৫ টাকার মতো উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। এসব উদ্বৃত্ত টাকা সেই সময়ের মুসলমানদেরকে ওয়াকফ, দান, সাদাকাহ, যাকাতের দিকে ব্যাপকভাবে ধাবিত করে।</p>
<p>মুসলিমরা তাদের এই বাৎসরিক উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি অংশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রেরণ করতো। বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল, দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল, যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে এমন অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। রাষ্ট্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি বাজেট দিতে পারতো। যার কারণে বলা হয় ইসলামী সভ্যতার ১২শত বছরের শাসনামল ছিল পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনামল। গোটা দুনিয়াতে হত দরিদ্র খুঁজে পাওয়া, অনাহারী মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাত তথা ইসলামী সভ্যতা যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ৭ শত বছরে আমাদের অর্থনৈতিক জিডিপি ছিলো ২৯%। অর্থাৎ যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ইসলামী সভ্যতার এ অঞ্চলে সেই বিশাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কেমন? সে ব্যাপারে আমরা কতটুকুই বা অবগত?</p>
<p>অথচ, বর্তমানে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। হাল আমলের গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা, নারীরা এবং তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না তাদের সঠিক চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সব ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যতটুকুই বা খাদ্য পাচ্ছে সেটুকুও ভেজাল মিশ্রিত। এগুলো খেয়ে রোগগ্রস্ত হওয়ার পরেও পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা পেলেও যে ঔষধ আমরা ভক্ষণ করি তা সেই একই চক্রের ফসল।</p>
<p>কথিত যে নয়া ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক উপলব্ধি, সচেতনতা তৈরি ব্যতীত মুক্তির পথ খোঁজা আকাশকুসুম কল্পনা। শুধু বীজ, খাদ্য ও ওষুধ নয় প্রত্যেকটি সেক্টর-ই আজ পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দি। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকানের ভাষায়, &#8220;আমরা সবাই যায়নবাদের কারাগারে বন্দী, সেখানে আমরা কতিপয় অবাধ্য কয়েদি। কিন্তু দিন শেষে সবাই কয়েদী।&#8221;</p>
<p>মুক্তি জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনার আলোকে সামনে অগ্রসর হয়ে নতুন বাংলাদেশ তথা হারানো ঐতিহ্যের বিনির্মাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বের সেই সোনালী ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা কাজ করি তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব। কেননা আগের সেই খনিজ সম্পদ, জমি, বনাঞ্চল, কৃষক, মানব সম্পদ, নদী, সমুদ্র এখনও বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>পাঁচ. অন্তিম রেখা</strong></h5>
<p>মূলত এতক্ষণ যে আলোচনা করা হলো, তা ছিলো, ইতিহাসের আলোকে বর্তমান কৃষি ও কৃষকের সরেজমিন পর্যালোচনা। সম্পূর্ণ বিষয়ের পেছনে উৎসাহ ও উদ্দীপনা জাগিয়েছে সময়ের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা—জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ <strong>“মিহওয়ার”</strong>।</p>
<p>ইতিহাসকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা এবং বর্তমান সময়ের কৃষি ও কৃষকের চরম দুরবস্থার মধ্যকার বিষয়ের অসাধারণ পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে মিহওয়ার পত্রিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায়।</p>
<p>পত্রিকাটির দ্বিতীয় সংখ্যায় এসেছে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর সম্মানিত প্রেসিডেন্ট তরুণ কৃষিবিদ শ্রদ্ধেয় <a href="https://rowyakbd.com/author/mars_bd/">আশিকুর রহমান সৈকত</a>-এর লেখা <strong>“<a href="https://rowyakbd.com/agricultural-systems-and-seeds-the-future-of-human-civilization-in-jain-hands/">কৃষিব্যবস্থা ও বীজঃ যায়নবাদীদের হাতের মুঠোয় মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ</a>”</strong> শীর্ষক প্রবন্ধটি।<br />
এবং তৃতীয় সংখ্যায় এসেছে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ত্রৈমাসিক মিহওয়ার পত্রিকার সম্পাদক তরুণ চিন্তক <a href="https://rowyakbd.com/author/hasan_al_firdaus/">হাসান আল ফিরদাউস</a>-এর লেখা <strong>“বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা : প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা”</strong> শীর্ষক প্রবন্ধটি।</p>
<p>দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় লিখিত প্রবন্ধ দু&#8217;টি অধ্যয়নের পরেই জানার আগ্রহ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্যই একেবারে সরেজমিনে যাওয়া এবং কৃষকদের সাথে সময় অতিবাহিত করে তাদের জীবন সম্পর্কে অবহিত হওয়া।<br />
এই আলোচনায় মূলত তত্ত্বের আলোকে বর্তমান সময়ের কৃষি ও কৃষকের চরম দুরবস্থার সত্যতা তুলে ধরার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। তত্ত্বের পাশাপাশি তথ্যের জন্য উক্ত প্রবন্ধ দু&#8217;টি পড়ে অনুধাবন করার অনুরোধ রইলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15174</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাশিয়ান কর্মকর্তাদের ছয়টি আফ্রিকান দেশ ভ্রমণের নেপথ্যে</title>
		<link>https://rowyakbd.com/behind-the-scenes-of-russian-officials-trip-to-six-african-countries/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/behind-the-scenes-of-russian-officials-trip-to-six-african-countries/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হিশাম আল নোমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 23 Sep 2024 13:46:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14853</guid>

					<description><![CDATA[আফ্রিকায় প্রভাবশালী পরাশক্তিগুলোকে আরো দুর্বল করতে এবং তাদের প্রভাব নিঃশেষ করতে রাশিয়া সে শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নতুন কৌশল প্রণয়ন করেছে। আফ্রিকা নিয়ে রাশিয়ার আগ্রহ কোন সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোতে আফ্রিকার অন্যতম ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স, মহাদেশটিতে ক্রমাগতভাবে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আফ্রিকায় প্রভাবশালী পরাশক্তিগুলোকে আরো দুর্বল করতে এবং তাদের প্রভাব নিঃশেষ করতে রাশিয়া সে শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নতুন কৌশল প্রণয়ন করেছে।</p>
<p>আফ্রিকা নিয়ে রাশিয়ার আগ্রহ কোন সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোতে আফ্রিকার অন্যতম ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স, মহাদেশটিতে ক্রমাগতভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। রাশিয়া এখন চাচ্ছে আফ্রিকায় ফ্রান্সের বিকল্প হয়ে উঠতে।</p>
<p>এই কৌশলের নবিনতর পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরভ এবং উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনুস বেক ইয়েভকুরভ  বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ধারাবাহিকভাবে সফর করেছেন।</p>
<p>এসব সফরে রাশিয়ান কূটনৈতিকদের চারটি গন্তব্য ছিল : <strong>গিনি, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বুরকিনা ফাসো এবং শাদ। অন্যদিকে সামরিক কর্মকর্তারা লিবিয়া সফর শেষে নাইজার এবং মালি সফর করেন।</strong></p>
<p>ল্যাভরভ ৩ রা জুন, ২০২৪ শে গিনি ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তার কূটনৈতিক সফর শুরু করেন। যেখানে রুসাল সহ বেশ কিছু রাশিয়ান কোম্পানি কাজ করছে। রুশ দূতাবাসের তথ্যমতে এই রুসাল রাশিয়ার এ্যালুমিনিয়াম প্লান্টগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহ করে, এ খাতের মোট উৎপাদনের শতকরা ২৫ ভাগই রুসালের অবদান।</p>
<p>জুনের ৪ তারিখ তিনি কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে পৌঁছান, যেখানে শুধু ২০২৩ সালের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যের মাত্রা আচানক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সফরের সময় আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্যে ছিল উভয়পক্ষের মধ্যে সামরিক প্রকৌশলগত সহযোগীতা বৃদ্ধি করা।</p>
<p>কঙ্গোতে কিছু রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠানো হবে মর্মে ২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। এখনও দেশটিতে অত্যাধুনিক রুশ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে দর কষাকষি চলছে।</p>
<p>জুনের ৫ তারিখ, ল্যাভরভ বুরকিনা ফাসো পৌঁছান। যে দেশটিতে বর্তমান মস্কোর সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সরকারের শাসন জারী রয়েছে। সেখানে তিনি জানান যে, “বুরকিনা ফাসোতে রুশ প্রশিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।“</p>
<p>বুরকিনা ফাসোতে ল্যাভরভের সফরকালীন বক্তব্য থেকে তাস নিউজ এজেন্সি উদ্ধৃতি করেছে-“ প্রেসিডেন্ট ইবরাহীম তাওরে ক্ষমতায় আসার পরে আমাদের দেশের সাথে সর্বপ্রথম যে চুক্তি হয়, তখন থেকেই আমরা খুব নিবিড়ভাবে সামরিক এবং সমর প্রকৌশল খাত সহ সকল ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগীতা বজায় রেখেছি।“</p>
<p>একই দিনে ল্যাভরভ চতুর্থ দেশ হিসেবে শাদে পৌঁছান এবং বলেন, “আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিতে পারি যে আমাদের বন্ধুত্ব কোনভাবেই আমাদের সাথে থাকা ফ্রান্সের সম্পর্ককে প্রভাবিত করবেনা। ফ্রান্সের পদ্ধতিই ভিন্ন; তারা এই মূলনীতি মেনে চলে যে, হয় তুমি আমার সাথে, নয় তুমি আমার বিরুদ্ধে।”</p>
<p>বুরকিনা ফাসো এবং শাদের সাথে ইতিহাসে প্রথমবারের মত রাশিয়ার সংযোগ স্থাপিত হলো এই সফরের মধ্য দিয়ে, যা গত দুই বছরের মধ্যে ল্যাভরভের ষষ্ঠ আফ্রিকা মহাদেশ সফরের একটা অংশ ছিল।</p>
<p>জুলাই, ২০২২ সালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশর, ইথিওপিয়া , উগান্ডা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ভ্রমণ করেন। এরপরে তিনি জানুয়ারী, ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইসওয়াতিনি, এ্যাঙ্গোলা এবং ইরিত্রিয়া সফর করেন। একই বছর ফেব্রুয়ারীতে তিনি মালি, মৌরিতানিয়া এবং সুদানেও সফর করেন। মে মাসের শেষ এবং জুনের শুরতে কেনিয়া, বুরুন্ডি, মোজাম্বিক সফর করেন। ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে আগস্ট মাসে তিনি সফর করেন দক্ষিণ আফ্রিকায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সামরিক সফর</strong></h4>
<p>সমান্তরালভাবে নর্থ আফ্রিকান নিউজ ২০২৪ সালের জুনের ২ তারিখ প্রতিবেদন করে যে, পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী জেনারেল, খলিফা হাফতার জুনের শুরতে রাজমায় অবস্থিত জেনারেল কমান্ড হেডকোয়ার্টারে রুশ উপ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইউনুস বেক ইয়েভকুরভকে স্বাগত জানান।</p>
<p>একই উৎসের তথ্যমতে, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধ সহ সামরিক ও অর্থনৈতিক খাতে তাদের ইতিবাচক অগ্রগতির গুরুত্ব তুলে ধরে খলিফা হাফতার দুই দেশের ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।</p>
<p>রাশিয়ার সামরিক দূত সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পারষ্পারিক সহায়তার দিকে ইঙ্গিত করে লিবিয়ার জেনারেল কমান্ড ফোর্সের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তার দেশের অবদানের কথা তুল ধরেন।</p>
<p>নোভা নিউজের খবর অনুসারে, ২০২৪ এর ৪ জুন ইয়েভকুরভ লিবিয়ার বেনগাযি থেকে নাইজারে পৌঁছান।</p>
<p>একই সূত্র উল্লেখ করে যে, রাশিয়ান সামরিক কর্মকর্তা নাইজারের বর্তমান সামরিক সরকারের প্রধান আব্দুর রহমান ছিয়ানি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী সালিফৌ মোদির সাথে সাক্ষাত করেন। যেখানে সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগীতার আলোচনা স্থান পায়।</p>
<p>উভয়পক্ষ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত সমাধান খোঁজার লক্ষ্যে পারস্পারিক শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে কৌশলগত অংশিদারিত্ব শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করে। ইয়েভকুরভ নাইজারকে তাদের সকল বৈধ উদ্যোগে সমর্থন করার জন্য রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।</p>
<p>ইয়েভকুরভ প্রকৃতপক্ষে নাইজার এবং রাশিয়ার মধ্যে একাধিক খাতে সহযোগিতার একটি স্মারক স্বাক্ষর করতে ৪ ডিসেম্বর, ২০২৩-এ নিয়ামে এসেছিলেন।</p>
<p>আফ্রিনজ ওয়েবসাইট ৫ জুন, ২০২৪-এ রিপোর্ট করেছে যে রাশিয়ার উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইউনুস বেক ইয়েভকুরভ মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারার সাথে দেখা করেছেন।</p>
<p>সূত্রটি উল্লেখ করেছে যে মন্ত্রী সাদিওর সাথে মালিতে এই বৈঠকে দুই দেশের মাঝে ইতোমধ্যে ভালোভাবে এগিয়ে চলা সামরিক সহযোগিতার দিকে মনোনিবেশ করা হয়।</p>
<p>এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিরলস যুদ্ধে মালিকে সমর্থন করার জন্য রাশিয়া তার প্রস্তুতি এবং অবিচল প্রতিশ্রুতি কখনোই লুকানোর চেষ্টা করেনি।</p>
<p>ওয়েবসাইটটি উল্লেখ করেছে যে &#8220;এই সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ, মালিয়ান সেনাবাহিনী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি থেকে অঞ্চলগুলির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রভাব বলয় নষ্ট করা</strong></h4>
<p>রাশিয়ার এই পদক্ষেপ সমূহের ব্যাখ্যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আহমেদ নুরুদ্দীন বলেছেন যে রাশিয়ার অভিষ্ঠ লক্ষ্যগুলি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বিশেষ করে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে চার চার দফা সফর এটারই ইঙ্গিত দেয় যে, ন্যাটো দেশগুলির দ্বারা আরোপিত একঘরে করন থেকে রাশিয়া যেকোন মূল্যে মুক্তি পেতে চাইছে।</p>
<p>তিনি আল-ইস্তিকলালকে বলেন যে এই সফর ও পদক্ষেপের মাধ্যমে  রাশিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, সামগ্রিকভাবে আফ্রিকায় ফরাসি এবং পশ্চিমা প্রভাব বলয় ভেঙে ফেলা। সকল পক্ষকে ক্লান্ত করে দেবার কৌশল প্রয়োগ করে তাদের দুর্বল ও নির্মূল করে দেয়া। এখানে, &#8220;পক্ষ&#8221; বলতে আফ্রিকান দেশগুলি, লাতিন আমেরিকার দেশগুলি এবং এশিয়ান দেশগুলি উদ্দেশ্য।<br />
বিশেষভাবে নুরুদ্দীন দেখান যে &#8220;২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করার পর রাশিয়ার গৃহীত এই কৌশলটি আফ্রিকা অঞ্চলে পশ্চিমা প্রভাবকে দুর্বল করে চলেছে। এবং এখানে রাশিয়া উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।&#8221;</p>
<p>নুরুদ্দীন আরও ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে এই কৌশলটিতে নিরাপত্তা এবং সমর সংক্রান্ত দিকগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সামরিক সহায়তা প্রদান এবং আফ্রিকান শিক্ষার্থীদের রাশিয়ান ইনস্টিটিউটে প্রবেশ করানো। আবার, পুরো আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে থাকা দেশগুলিতে ওয়াগনার গ্রুপ বাহিনী মোতায়েন বৃদ্ধির মাধ্যমেও এই কৌশলের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে।</p>
<p>বিশেষভাবে তিনি উল্লেখ করেন, <strong>&#8220;এই সমস্ত কিছু রাশিয়াকে পশ্চিমের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক স্বার্থ অর্জন করতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ; যখন আমরা ফ্রান্সকে মালি থেকে অপমানিত এবং নাইজার, বুর্কিনা ফাসো এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার হতে দেখেছি।&#8221;</strong></p>
<p>তিনি জোর দিয়ে বলেন, &#8220;এই দেশগুলি, তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ভঙ্গুরতা সত্ত্বেও, একাধিক স্তরে ফরাসি অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স দ্বারা শোষিত হয়ে আসা নাইজারের একটি ইউরেনিয়াম খনি রয়েছে যা ফ্রান্সের পারমাণবিক শক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।&#8221;<br />
&#8220;উপরন্তু, প্যারিস সাধারণত উপকূলীয় এবং আফ্রিকান দেশগুলিতে প্রচুর পরিমাণে সোনা, হীরা এবং মূল্যবান ধাতব খনির উপর শোষণ পরিচালনা করে।&#8221;</p>
<p>তাই, নুরদ্দীন পুনর্ব্যক্ত করেন যে রাশিয়া যখন ফ্রান্সকে চারটি দেশ থেকে বহিষ্কার হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ময়দানে আসে, তখন এটি একদিকে যেমন সরাসরি ফ্রান্সের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় এবং অন্যদিকে, আফ্রিকার এই দেশগুলিতে ফ্রান্সের কৌশলগত নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্যদিকে, ইউরেশিয়া-আরব স্টাডিজ সেন্টার (সিএইএস) এর গবেষক দিমিত্রি ব্রিডজে বলেছেন যে রাশিয়া এখন বিভিন্ন আফ্রিকান দেশ সমূহের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং তাদের কাছে যেতে আগ্রহী। এটা আফ্রিকায় যেকোন সময় পা রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে তার গৃহীত কৌশল।</p>
<p>তিনি আল-ইস্তিকলালকে এটা পরিষ্কার করেন যে, ল্যাভরভের এই সফরটিই প্রমাণ হিসবে যথেষ্ট যে রাশিয়া আফ্রিকায় ফ্রান্সের দুর্বল নীতি থেকে উপকৃত হয় এবং আফ্রিকান দেশগুলিতে ফ্রান্সের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক ভূমিকার জন্য প্রত্যাখ্যান প্রকল্পে বিনিয়োগ করে।</p>
<p>&#8220;বিশেষ করে ফ্রান্স যেহেতু আফ্রিকাকে কিছুই দেয়নি; না জনগণের মুক্তিকে সমর্থন করে, না মহাদেশটির জন্য ভাল একটি অর্থনৈতিক মডেল হিসাবে কাজ করে। উল্টো ফ্রান্সের দৃষ্টিভঙ্গি হলো আফ্রিকান এই দেশগুলির পলিসিকে ম্যানিপুলেট করা এবং তাদের খনিজ সম্পদ লুট করা।&#8221;</p>
<p>রাশিয়ান এই একাডেমিক গবেষক জোর দিয়ে বলেন যে মস্কো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আফ্রিকান বিষয়গুলোতে সরাসরি নিযুক্ত রয়েছে, &#8220;সাংস্কৃতিক এন্ট্রিপয়েন্টগুলোর মধ্য দিয়ে রাশিয়া আফ্রিকা মহাদেশে তার সফট পাওয়ারকে আরো শক্তিশালী করতে চায়। যেমন শিক্ষা, স্নাতক পর্যায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, রুশ ভাষার প্রসার ও পাঠদান ইত্যাদি।&#8221;</p>
<blockquote><p>ব্রিডজে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে রাশিয়া প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে আফ্রিকান সামরিক নেতাদের একটি নতুন অভিজাত শ্রেণী তৈরি করতে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে আফ্রিকার দেশীয় নীতিতে বেশ প্রভাব রাখবে। এছাড়াও, বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সহযোগিতার জন্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে আফ্রিকা কর্পস; এমন একটি প্রকল্প যা আফ্রিকা মহাদেশের ভবিষ্যত বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।</p></blockquote>
<p>তিনি আরো উল্লেখ করেন যে আফ্রিকায় সোভিয়েত নীতির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার থেকে রাশিয়া উপকৃত হচ্ছে, কেননা আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নীতির তুলনায় এটি ততোটা নেতিবাচক নয়। মস্কো একটি বহুমাত্রিক ডাইমেনশনের জন্য এই পলিসি তৈরি করেছে।</p>
<p>তিনি এ ব্যাপারটাও একেবারে উড়িয়ে দেননি যে রাশিয়া বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সাথে তার সম্পর্ক গভীর করবে। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা রাশিয়ার অর্থনীতির সাথে পাশ্চাত্য, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংঘর্ষের একটি ক্ষেত্র তৈরি করবে।</p>
<p>বিশেষজ্ঞ এই ব্যক্তি আরও উল্লেখ করেন যে অভিবাসন এবং বৈদেশিক সম্পর্ক সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউনিয়ন নীতিগুলির ব্যর্থতার আভাস হিসেবে বেশিরভাগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশে চরম ডানপন্থী প্রভাবের উত্থান ঘটছে। এর মধ্য দিয়েই রুশ-পশ্চিমা প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে ।</p>
<p>রুশ কর্মকাণ্ড থেকে আফ্রিকা কী সুবিধা পাবে সে সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে, আহমেদ নুরুদ্দীন বলেছেন যে প্রথম সুবিধাটি হলো কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে বৈচিত্র‍্য আনা। এটি সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলি বা প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে বৃহত্তর সার্বভৌম লাভ অর্জনের জন্য কৌশলের নতুন এক মানদন্ড স্থাপন করবে।</p>
<p>অন্য একটি সাক্ষাতকারে তিনি আল-ইস্তিকলালকে বলেছিলেন, “আমরা দেখতে পাই যে আফ্রিকান দেশগুলি রাশিয়া থেকে গম আমদানির উপর প্রচুর নির্ভরশীল, ২০% গম রাশিয়া থেকে আমদানি হয়ে আসে। তাছাড়া, আফ্রিকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়াও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করে।”</p>
<p>COVID-19 সংকট আফ্রিকার কাছে প্রমাণ করেছে যে রাশিয়ার উপর নির্ভর করা যেতে পারে, কারণ এটি এমন সময়ে বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছিল যখন এই ভ্যাকসিনগুলি বিশ্বব্যাপী দুষ্প্রাপ্য ছিল। আবার বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে কীভাবে সেসময় ইউরোপ নিজের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।</p>
<p><strong>নুরুদ্দিন আরও বলেন যে</strong> <strong>রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্রের উৎস। এদিকে অস্ত্র প্রদানের ক্ষেত্রে মূলত আফ্রিকান দেশগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করার লক্ষ্যে পাশ্চাত্য অন্যায্যভাবে এক প্রকার অধিকার দাবি করে;  যেমন মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র ইত্যাদী। অথচ আসল উদ্দেশ্য এসবের ছদ্মবেশে আফ্রিকান দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং নীতিসমূহে নাক গলানো। অথচ পাশ্চাত্যের মত এই অনধিকার চর্চা না করেই আফ্রিকার বাজারে রাশিয়া সেসব অস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>ফরাসি দৃষ্টিকোণ</h4>
<p>ফরাসি সহ ইউরোপীয় মিডিয়া, আফ্রিকায় রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে উপেক্ষা করেনি। বরং নিশ্চিত করেছে যে মস্কো আফ্রিকা মহাদেশে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। যেমনটি উঠে এসেছে ফরাসি ওয়েবসাইট আফ্রিকা নিউজের ৭ জুন, ২০২৪ -এর সম্পাদকীয়তে।</p>
<p>ওয়েবসাইটটি উল্লেখ করেছে যে ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের বিকল্প হিসেবে রাশিয়া এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক আফ্রিকান সরকারের জন্য পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হয়ে উঠেছে।</p>
<p>এতে আরো বলা হয় যে, মস্কো প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি ওয়াগনার এবং এর সম্ভাব্য উত্তরসূরি আফ্রিকান লিজিওনের ব্যবহারের মাধ্যমে আফ্রিকান দেশগুলির সাথে তার সামরিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছে। যেখানে রাশিয়ান ভাড়াটে সৈন্যরা আফ্রিকান নেতাদের রক্ষা করা থেকে শুরু করে চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশগুলিকে সহায়তা করে থাকে।</p>
<p>এই প্রবন্ধে উঠে এসেছে যে রাশিয়া ইউক্রেনে তার আগ্রাসনের বিষয়ে ৫৪ টি আফ্রিকান দেশের অনেকের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন বা কমপক্ষে নিরপেক্ষতা চায়৷ কেননা আফ্রিকান দেশগুলি জাতিসংঘের বৃহত্তম ভোটিং ব্লক গঠন করে।</p>
<p>সম্পাদকীয়টিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে আফ্রিকান দেশসমূহ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাশিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট এসব সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।</p>
<p>একই উৎসের তথ্যমতে, সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের প্রতি জনগণের হতাশা ও ক্ষোভকে রাশিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রোধে পরিণত করেছে এবং সেসব দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।</p>
<p>সামরিক অভ্যুত্থানগুলি ফ্রান্স এবং পাশ্চাত্য ঘেঁষা সরকারগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু, বেকারত্ব এবং অন্যান্য অসুবিধা দূর করতে খুব একটা কাজ করেনি।</p>
<p>রাশিয়া রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করেই নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করে। যা রাশিয়াকে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার অধীনে থাকা মালি, নাইজার এবং বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলিতে একটি আকর্ষণীয় অংশীদার করে তোলে। এর বিনিময়ে, মস্কো আফ্রিকান দেশগুলোর কাছে খনিজ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা চায়।</p>
<p>আফ্রিকা নিউজ উল্লেখ করেছে যে <strong>&#8220;রাশিয়া মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে সোনা এবং হীরা, কঙ্গোতে কোবাল্ট, সুদানে সোনা এবং তেল, মাদাগাস্কারে ক্রোমাইট এবং জিম্বাবুয়েতে প্ল্যাটিনাম এবং হীরা, সেইসাথে নামিবিয়াতে ইউরেনিয়ামের অ্যাক্সেস পেয়েছে।“</strong></p>
<p>এতে আরও বলা হয়েছে যে, ওয়াগনার এবং রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে আফ্রিকান সোনার বাণিজ্য থেকে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।</p>
<p>বিপরীতে, ২৮ মে ২০২৪ -এ ফরাসি ম্যাগাজিন লে গ্র্যান্ড কন্টিনেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত &#8220;&#8221;Militarizing Africa: Soviet Assets for Russian Doctrine,&#8221; শিরোনামের একটি গবেষণায় যুক্তি দেখানো হয় যে &#8221; আফ্রিকা মহাদেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদী লেনদেনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য রাশিয়ার একটি কৌশল এবং পরিকল্পনাগত অভাব রয়ে গিয়েছে।&#8221;</p>
<p>সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয় যে &#8220;আফ্রিকাতে সোভিয়েত নীতি পশ্চিমা পুঁজিবাদের বিকল্প প্রস্তাবনা হিসেবে একটি আদর্শের মধ্যে নিহিত ছিল। কিন্তু, বর্তমানে আফ্রিকায় রাশিয়ার কৌশলগুলি সাধারণত সুবিধাবাদী, মৌলিক সম্পদের উৎস সমূহের দখল এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে রাজনৈতিক পুঁজি অর্জনের দিকেই মনোনিবেশ করে।&#8221;</p>
<p>একই সূত্রমতে, &#8220;আফ্রিকা মহাদেশে চলমান অস্থিতিশীলতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কারণেই সেখানে রাশিয়ার পুনরুত্থান ঘটে চলেছে।&#8221;</p>
<p>&#8220;রাশিয়ার পাশ্চাত্য বিরোধী মতবাদ অনেক আফ্রিকান অভিজাতের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা ঔপনিবেশিক দায় সম্পর্কে ন্যায্য ভাবেই ঐতিহাসিক অভিযোগ উত্থাপন করে এবং পাশ্চাত্যের সাথে একটি বস্তুনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হওয়াকে রাশিয়ার সাথে তাদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ন্যায্যতা প্রমাণের দলিল হিসবে পেশ করে।&#8221;</p>
<p>উপসংহারে এসে এই প্রতিবেদন বলছে, &#8220;এই পরিস্থিতিতে, রাশিয়ার আক্রমণের মুখে ইউক্রেন &#8211; আফ্রিকান দেশগুলিকে তার পক্ষে জমায়েত করার মত এক বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>(মূলঃ আল-ইস্তিকলাল পত্রিকা</p>
<p>অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/behind-the-scenes-of-russian-officials-trip-to-six-african-countries/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14853</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসরাইলকে শায়েস্তা করার পন্থা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ways-to-discipline-israel/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ways-to-discipline-israel/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 14 Apr 2024 08:45:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[D-60]]></category>
		<category><![CDATA[D-8]]></category>
		<category><![CDATA[আজাদ]]></category>
		<category><![CDATA[আমাদের দুটি মানচিত্র]]></category>
		<category><![CDATA[আমেরিকা্‌]]></category>
		<category><![CDATA[ইরানের]]></category>
		<category><![CDATA[ইসরাইলকে শায়েস্তা করার পন্থা]]></category>
		<category><![CDATA[উদ্দিন]]></category>
		<category><![CDATA[ডি-৮]]></category>
		<category><![CDATA[তুরস্কের]]></category>
		<category><![CDATA[বুরহান]]></category>
		<category><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম দেশগুলো]]></category>
		<category><![CDATA[যায়নবাদ হল একটি কুমিরের মত]]></category>
		<category><![CDATA[রোয়াক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13974</guid>

					<description><![CDATA[যায়নবাদ হল একটি কুমিরের মত। এর উপরের চোয়াল হল আমেরিকা আর নিচের চোয়াল হল ইউরোপিয় ইউনিয়ন। এর জিহ্বা আর দাত হল ইসরাইল এবং এর শরীর সহ অন্যান্য অঙ্গসমূহ হল মুসলিমদেশ সমূহ সহ অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী, মিডিয়া বাবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">যায়নবাদ হল একটি কুমিরের মত। এর উপরের চোয়াল হল আমেরিকা আর নিচের চোয়াল হল ইউরোপিয় ইউনিয়ন। এর জিহ্বা আর দাত হল ইসরাইল এবং এর শরীর সহ অন্যান্য অঙ্গসমূহ হল মুসলিমদেশ সমূহ সহ অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী, মিডিয়া বাবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং এর সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠন।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমি এর উপর এত জোর দিচ্ছি কেন? কারন আমাদের ভুল ধারনা হল, আমরা যায়নবাদ বলতে শুধু ইয়াহুদী জাতি আর ইসরাইলকেই বুঝে থাকি। এই বৃহৎ কুমিরটি আজ বিশ্বকে গ্রাস করে শান্তি শৃঙ্খলাকে হজম করে গাজাতে নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করছে।বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আজ সবচেয়ে বড় বাধা হল এই যায়নবাদ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমরা মানবজাতিকে কিভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারি? কারন Great Middle East Project হল যায়নবাদীদের আকিদার সাথে সম্পর্কিত, এই বিষয়কে তারা তাদের দ্বীনে অংশ বলে মনে করে থাকে। ইসরাইল এর প্রতিটি প্রধানমন্ত্রী এই কথাটি বলে থাকেন যে, <em><strong>&#8221; আমাদের দুটি মানচিত্র রয়েছে একটি হল দেওয়ালে খচিত অপরটি হল আমাদের অন্তরে খচিত মানচিত্র।&#8221;</strong></em></div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">এটা হল ইসরাইল এর পরিকল্পনা।মুসলিম হিসাবে আমরা কি করে থাকি? OIC সহ অন্যান্য সংগঠন এর নামে বিভিন্ন সম্মেলন এর আয়জন করে থাকি এবং সেখানে সারাদিন ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে থাকি এবং সভাশেষে আমরা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে সারা দুনিয়ায় প্রচার করে থাকি, বলি যে অনতিবিলম্বে ইরাক থেকে আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। টেলিভিশন অথবা পত্র পত্রিকায় এই খবর দেখে রকফেলাররা কফির কাপে আয়েশী টান দিয়ে ব্যঙ্গাত্মক অট্টহাসি দিয়ে বলে তোমরা এই সকল অবাস্তব পরিকল্পনা নিয়েই বসে থাকো আর তোমরা জেনে রাখো যে আমরা আমাদের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা পদে পদে বাস্তবায়ন করছি ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">এমনকি ইরানীরা মনে করে যে আমরা নিজেরা পারমানবিক বোমা বানাচ্ছি আমরা আধুনিক অস্ত্র বানাচ্ছি .. ইত্যাদি। সাবধান! এই সকল চিন্তার মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতারিত করবেননা । আপনারা যদি এই পথেই চলতে থাকেন তাহলে শত বছরেও ইসরাইলীদের কিছুই করতে পারবেননা । তাহলে আমরা কি করব ? এর থেকে উত্তরণের একটাই পথ হচ্ছে আমাদেরকে কোরআনের আলোকে নতুন দুনিয়া সৃষ্টি করতে হবে । কারন ইসলাম ছাড়া বিশ্ব শান্তি অসম্ভব ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto"><strong>আমরা কিভাবে এই নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করব?</strong></div>
<div dir="auto">আমি ২৪ জুন ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হয়ে পার্লামেন্ট থেকে শপথ নেয়ার পর আমি আমার অফিসে আসি। এর পর সর্বপ্রথম আমেরিকার রাষ্ট্রদূত আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে । সে আমাকে বলে যে আমরা জানি যে আপনাদের দাওয়াত হচ্ছে ইসলাম আর আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন অবশ্যই আমরা এটা পছন্দ করিনি । কিন্তু আপনাদের সাথে আমাদের কাজ করতে হবে ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">তবে ৬ টি শর্তে আপনার সাথে কাজ করতে পারি ।</div>
<div dir="auto"><strong>১/ ইরানের সাথে আপনাদের বাণিজ্য পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলারের বেশি করতে পারবেননা।</strong></div>
<div dir="auto"><strong>২/ ইরানে যেতে পারবেননা,</strong></div>
<div dir="auto"><strong>৩/ মুসলিম দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে পারবেননা ,</strong></div>
<div dir="auto"><strong>৪/ তুরস্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত আমেরিকা আর ইসরাইলের অংগ সংগঠনগুলোর কাজে বাধা দিতে পারবেননা ।</strong></div>
<div dir="auto"><strong>৫/ তুরস্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটি সমূহকে বন্ধ করতে পারবেননা ।</strong></div>
<div dir="auto"><strong>৬/ ইরাকের পাইপ লাইন গুলো উন্মুক্ত করতে পারবেননা ।</strong></div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমাদের ইতিহাসে আলী পাশার একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে । সেটা হল, আমি যে রাষ্ট্রীয় কাজ করতে যাইনা কেন প্রথমে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে পরামর্শ করি এবং সে যা বলে আমি ঠিক তার বিপরীতটাই করি ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমিও ঠিক একই কাজটি করেছি । সে যা বলেছে তার বিপরীত কাজগুলাই করেছি সে বলেছিল ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য করতে পারবেননা অথচ আমি ইরানের শুধুমাত্র গ্যাসের জন্যই ২.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করি এমনকি আমি সিদ্ধান্ত নেই যে ইরানের সাথে তুরস্কের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ১০ বিলিয়ন, ২০ বিলিয়ন, ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই সীমিত থাকবেনা বরং আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জার্মানি এবং ফ্রান্সের সাথে যতটুকু সম্পর্ক রয়েছে তার চাইতেও বেশি হবে ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">১৫ দিন পর আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ারেম .এম ক্রিস্টিফার এবং আঙ্কারার রাষ্ট্রদূত ক্রসমানার এই দুই ইয়াহুদি শলাপরামর্শ করে, যে যাই হোক না কেন রেফা পার্টি এবং এরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে । তাদের সেই ষড়যন্ত্রের দলিলগুলো আমার কাছে আছে ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমি এই সকল কথা কেন বলছি ? আমরা দোয়া করি যে ইরানের ইসলামী বিপ্লব তার পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে । কিন্তু আমরা এটা জানি যে আমাদেরকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য ওরা যে ষড়যন্ত্র করছে আর ইরানের বিপ্লবও যাতে লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে এই জন্য তারা সকল ধরনের ষড়যন্ত্র করে যাবে এবং আপনারা এদেরকে সুযোগ না দেয়ার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকবেন । কারন যায়নবাদীরা ৫৭০০ বছরেরে একটি পুরাতন সংগঠন ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto"><strong><em>আমেরিকার চল্লিশটি রণতরী রয়েছে এবং তারা হুমকি দিয়ে বলে যে ইরানকে ভালভাবে শায়েস্তা করবে । এমতাবস্থায় আমরা কি খালি বসে থাকব? নাকি ৪১ টি রণতরী বানাবো ? আর এগুলো বানাতে যে সময় লাগবে সেই সময়টুকুতে ওরা আমাদের নিঃশ্বেষ করে দিবে আর এই রণতরীগুলো বানানোর জন্য আমরা এত আর্থিক যোগানইবা কোথা থেকে দেবো ? আমরা ৪১ টি বানাতে বানাতে ওরা ৮০ টি বানিয়ে ফেলবে । তাহলে আমরা যায়নবাদকে কিভাবে পরাজিত করব ?</em></strong></div>
<p>&nbsp;</p>
<picture><source media="(min-width: 650px)"></picture> <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon2.0" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" style="width: auto;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/Dawam-ads-Banner-1.png"></a></p>
<p>&nbsp;</p>
<div dir="auto">আল্লাহ মহান রাব্বুল আলামিন দয়াবান এবং দয়ালু । প্রযুক্তির উন্নয়ন ইসলামের জন্য একটি অনেক বড় একটি নিয়ামত । আমরা এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করব যে আমাদেরকে আক্রমণ করার সময় তাদের ক্ষেপনাস্ত্র গুলো দিয়েই তাদের রণতরীগুলো ধ্বংস করে দিব । এটা কি সম্ভব নয় ? হ্যাঁ এটা ইলেক্ট্রিক্যাল ইলেকট্রনিক্সে সম্ভব।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমরা ওজন ছাড়া বিমান তেহরান থেকে তেলআবিবে পাঠাবো আর এখানে বসে দেখবো । এরপর এটি ইসরাইলে অবস্থিত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানবে । এগুলো কি সম্ভব ? হ্যাঁ সম্ভব আমি এগুলোর প্রটোটাইপ তৈরি করে নিয়ে এসেছি । কারন টেকনোলজির কোন শেষ নেই । ইরানের ইসলামী বিপ্লব নতুন দুনিয়া সূচনার একটি দরজা । তুরস্ক এবং ইরানের সম্পর্ক হচ্ছে একটি বীজের মত । এর চারপাশে রয়েছে D-8 । D-8 এর চারপাশে রয়েছে D-60 । ৬০ টি মুসলিম দেশ এবং নিপীড়িত ১০০ টি দেশ । এরপর রাশিয়া চীন আফ্রিকা ভারত সহ ৬০০ কোটি মানুষকে নিয়ে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে চাই।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমরা কমন মুদ্রা হিসেবে ইসলামী দিনার চালু করবো । ইসলামী জাতিসংঘ এবং নিজস্ব ন্যাটো প্রতিষ্ঠা করব। আর এভাবে আমরা একটি নতুন দুনিয়া গড়ব ।</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা ইব্রাহিমের ৪৬ আয়াতে বলেছেন।</div>
<blockquote>
<div dir="auto">﴿وَقَدْ مَكَرُوا مَكْرَهُمْ وَعِندَ اللَّهِ مَكْرُهُمْ وَإِن كَانَ مَكْرُهُمْ لِتَزُولَ مِنْهُ الْجِبَالُ﴾</div>
<div dir="auto">&#8221; তারা তাদের সব রকমের চক্রান্ত করে দেখেছে কিন্তু তাদের প্রত্যেকটি চক্রান্তের জবাব আল্লাহর কাছে ছিল, যদিও তাদের চক্রান্তগুলো এমন পর্যায়ের ছিল যাতে পাহাড় টলে যেতো৷&#8221;</div>
</blockquote>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন</div>
<div dir="auto">إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ</div>
<div dir="auto">&#8220;যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তাহলে কেও তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না।&#8221;</div>
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">আমি এর আগে ইরানে D-8 খুলেছিলাম । এখন আমি আসছি দুটি লক্ষ্য নিয়ে-</div>
<ul>
<li dir="auto">১/ ইরানের বিপ্লবের অভীষ্ট লক্ষ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করার জন্য । যদি আত্মবিশ্বাস রাখেন আপনারাই বিজয়ী হবেন । আল্লাহ আপনাদের সহায় হবেন ।</li>
<li dir="auto">২/ ইরান এবং তুরস্ক নতুন বিপ্লবের সূচনা করবে ইনশাআল্লাহ্‌ ।</li>
</ul>
<div dir="auto">(২০০৯ সালে ইরান সফরে দেওয়া বক্তব্যের আংশিক অনুবাদ)</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">&nbsp;</div>
<div dir="auto">অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ways-to-discipline-israel/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13974</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদঃ অনতিবাহিত এক অতীত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/expolitation-and-imperialism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/expolitation-and-imperialism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 24 Jan 2024 11:41:12 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13349</guid>

					<description><![CDATA[ সৃষ্টিগতভাবে প্রতিটি মানুষের ইজ্জত এবং মর্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কারণ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সম্মানিত করে। তাই আমরা আমাদের বর্তমান দুনিয়াকে  পরিবর্তন করে এমন একটা নতুন দুনিয়া বিনির্মাণ করতে চাই, যে দুনিয়ায় মানুষ  ইজ্জতের সাথে বসবাস করতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong> </strong>সৃষ্টিগতভাবে প্রতিটি মানুষের ইজ্জত এবং মর্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কারণ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সম্মানিত করে। তাই আমরা আমাদের বর্তমান দুনিয়াকে  পরিবর্তন করে এমন একটা নতুন দুনিয়া বিনির্মাণ করতে চাই, যে দুনিয়ায় মানুষ  ইজ্জতের সাথে বসবাস করতে সক্ষম হবে। মহান আল্লাহ মুসলিম হিসেবে আমাদেরকেই এ দায়িত্ব দিয়েছেন, একই সাথে যুবক বা তরুন হিসেবে আগামী দিনের মুসলিম উম্মাহর কর্ণধার আমরা। এজন্য আমাদের জন্য নতুন দুনিয়া বিনির্মানের এ দায়িত্ব পালন এক অর্থে ফরজ। আমরা যদি এই দুনিয়াকে পরিবর্তন করতে চাই তাহলে প্রথমে  আমাদেরকে বর্তমান দুনিয়া সম্পর্কে জানতে হবে। বলা হয়, বর্তমানে আমরা পোস্ট কলোনিয়াল যুগে বসবাস করছি। সত্যি কি আমরা পোস্ট কলোনিয়াল যুগে বসবাস করছি নাকি আমরা যে শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে ছিলাম সেখানেই এখনও আমরা পড়ে আছি? এ বিষয়টি আগে আমাদেরকে খুব ভালোভাবে জানতে হবে।</p>
<p>প্রথম কথা হচ্ছে এই শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ এ বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এ বিষয়টি কেন আমাদেরকে খুব ভালোভাবে বুঝা উচিত? আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহ তিনবার সবচেয়ে বড় হুমকির সম্মুখীন হয় এবং দখলে নিপতিত হয়।</p>
<p><strong>‌</strong><strong>প্রথমবার</strong> <strong>হল; </strong><strong>ক্রুসেডারদের</strong> <strong>আক্রমন</strong><strong>।</strong> যে আক্রমণের ফলে বায়তুল মাকদিস বা সমগ্র আকসা সাম্রাজ্যবাদী অর্থাৎ ক্রুসেডারদের বা ইউরোপিয়ানদের দখলে চলে যায়।</p>
<p><strong>দ্বিতী</strong><strong>য়বার হল; মো</strong><strong>ঙ্গলদের</strong> <strong>আক্রমণ</strong><strong>।</strong> যে আক্রমণের মাধ্যমে আমাদের আব্বাসি খেলাফতের আনুষ্ঠানিকভাবে পতন ঘটে অর্থাৎ বাগদাদের পতনের মধ্য দিয়ে। যদিও মোঙ্গলরা মামলুকীদের কাছে আইন জালুতের যুদ্ধে পরাজয় বরণ করার পর ধীরে ধীরে তাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্ম ইসলাম গ্রহণ করে। তারা পরবর্তীতে ইসলামের সেবক হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়</strong> <strong>আক্রমণটি</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>সাম্রাজ্যবাদী</strong> <strong>কলোনিয়ালিস্ট</strong> <strong>বা</strong> <strong>এই</strong> <strong>শোষকদের</strong> <strong>আক্রমণ</strong><strong>।</strong> আর এই আক্রমণের ফলে মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত,নিপীড়িত এবং নির্যাতিত হয়েছি আমরা অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা। বিশেষভাবে বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত-নিগৃহীত এবং নির্যাতিত হয়েছে, গণহত্যার শিকার হয়েছে এবং আজ অবধি আমরা তাদের সেই শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। এখন প্রশ্ন থাকতে পারে ব্রিটিশরা তো চলে গেছে সেই ৪৭ এ। তাহলে আমরা এখনো কিভাবে তাদের কলোনি? এজন্যই প্রবন্ধের নামকরণ করা হয়েছে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ অনতিবাহিত এক অতীত। আমরা একে আজ অতীত হিসেবে আখ্যায়িত করলাম এটা মোটেও আমাদের জন্য অতীত নয় আজকের আলোচনা থেকে আশা করি এটি আমাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে প্রতিপাদন হবে।</p>
<p>সূরা আনফালের ৪২ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন;</p>
<p>وَلَٰكِن لِّيَقْضِيَ اللَّهُ أَمْرًا كَانَ مَفْعُولًا لِّيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَن بَيِّنَةٍ وَيَحْيَىٰ مَنْ حَيَّ عَن بَيِّنَةٍ ۗ وَإِنَّ اللَّهَ لَسَمِيعٌ عَلِيمٌ</p>
<p>এটি বদরের যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি আয়াত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা আগেই নিয়েছিলেন অর্থাৎ যারা টিকে থাকবে যারা বেঁচে থাকবে যাতে সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রমাণ এর ভিত্তিতে বেঁচে থাকে। আবার যারা ধ্বংস হবে তারাও যাতে সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে ধ্বংস হয়। এজন্য আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে, আমরা আসলে কিসের উপর ভিত্তি করে আমাদের জীবনকে পরিচালনা করব আমাদের আন্দোলনকে পরিচালনা করব?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর উত্তরসূরী হিসেবে, হযরত মুসা এবং হারুন আলাইহি সালামের উত্তরসূরী হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু, আলী (রা), ফাতেমা, আসিয়া,  সুলতান ফাতিহ, ইকবালের উত্তরসূরী হিসেবে আমরা আসলে কিসের উপর ভিত্তি করে আমাদের চিন্তা এবং দর্শনকে এবং আমাদের জীবনকে পরিচালনা করব, এমনকি এর ভিত্তিতে একটি নতুন দুনিয়া গড়বো?</p>
<p>আমরা যদি শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, এই শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ ষোড়শ শতাব্দী থেকে অর্থাৎ ১৫০০ সাল থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীর বা মানব সভ্যতার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ এটাকে আমরা গত ৫০০ বছর ধরে সমগ্র পৃথিবীর ভাগ্যাকাশে একটা কালো মেঘ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। একইভাবে এটাকে আমরা দুনিয়ার ইতিহাসের একটি নতুন মাত্রা বলতে পারি।</p>
<p>ইতিপূর্বে বলেছি আমরা মুসলমানরা তিনবার সবচেয়ে বড় আক্রমণের শিকার হয়েছি, কিন্তু এর কোনটি সাম্রাজ্যবাদীদের মত এত সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী ছিল না এবং  এত স্থায়ী ছিল না। এ আক্রমণ আমাদের উপর যেভাবে এসেছে। তবে এ ৫০০ বছরের পুরো সময়ে এক না। অর্থাৎ এই ৫০০ বছরকে আমরা সমান্তরালভাবে বিচার করতে পারি না। শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ হল, দুনিয়ার ইতিহাসের সর্বশেষ পাঁচশত বছরের ভাগ্যকে নিরূপণকারী একটি পর্যায়। অর্থাৎ দুনিয়ার ইতিহাসের একটি মাত্রা। তবে এর রূপ এক এক শতাব্দীতে এক এক রকম। একেক অঞ্চলে এর রঙ একেক রকম। যেমন মধ্য এশিয়াতে একরকম, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকাতে একরকম, উপমহাদেশে এক রকম। একই ভাবে উত্তর ও দক্ষিন অ্যামেরিকার ক্ষেত্রেও ভিন্ন।</p>
<p>আমরা যদি সাম্রাজ্যবাদকে বুঝতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই ৫০০ বছর অর্থাৎ কলম্বাসের তথাকথিত আমেরিকার আবিষ্কার দিয়ে শুরু হওয়া যে শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ এটাকে অঞ্চলভিত্তিক, সময় ভিত্তিক, এমনকি ব্যক্তি ভিত্তিক বিভাজিত করে পড়তে হবে।</p>
<p>যেমন এটা মধ্য এশিয়াতে একরকম অর্থাৎ রাশিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত যে সাম্রাজ্যবাদ সেটা একরকম। আবার উত্তর আফ্রিকা এবং মিশরে ফ্রান্সের মাধ্যমে পরিচালিত সেটা একরকম। ‌ ভারতের হিন্দুস্তান তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এক রকম আবার উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এই ভিন্নতাকে আমাদেরকে বিবেচনায় নিতে হবে।</p>
<p>তবে এদের একটি অভিন্ন বিষয় আছে। ‌এদের মধ্যে অভিন্ন বিষয় হল, এর মাধ্যমে যদি আমরা সাম্রাজ্যবাদকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই তবে তা হলো,<strong> “বৈদেশিক সংখ্যালঘু কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছা ও অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাঁদের যা কিছু আছে সেগুলোকে নিজেদেরকে স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা এবং এই সিস্টেম বা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের সম্পদকে- সে দেশের সকল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন: সে দেশের বিভিন্ন মিলসগুলো) লুণ্ঠন করে, সে দেশের সকল সম্পদকে কুক্ষিগত করে তাঁদের কেন্দ্রীয় দেশে (যেমন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেন্দ্র ছিল লন্ডন, একইভাবে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির  কেন্দ্র ছিল নেদারল্যান্ডস) প্রেরন করা।”</strong></p>
<p>একই সাথে ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী একদল মানুষকে তারা এ শোষণের অংশীদার বানাত। শুধু তাই নয় এই গোষ্ঠীকে তারা একটা নাম দিত। এটা অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হতো যাকে আমরা এলিট গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। আমাদের ক্ষেত্রে এটা ছিল আমাদের আমাদের দেশের জমিদাররা।  এ গোষ্ঠীকে এলিট গোষ্ঠী নামে নামকরণ করে তাঁদেরকে স্বেচ্ছাসেবী বানানো। যারা একটা স্বার্থের জন্য শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষ হয়ে কাজ করতো। তাদের (শোষক) সাথে মিলে তাদের নিজেদের দেশকে মানুষকে শোষণের জন্য  শোষকদের পক্ষ নিয়ে কাজ করতো। ‌ এভাবে আমরা শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ কে সংজ্ঞায়িত করতে পারি।</p>
<p>শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ যেন স্তিমিত হয়ে না যায় এক্ষেত্রে তারা এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করে। যার মাধ্যমে এমন একটা শ্রেণি বা এমন একটা গোষ্ঠী তারা তৈরি করে যাতে করে এর মাধ্যমে যে শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে উঠবে তারা তাদের সেবক হিসেবে কাজ করতে পারে। তাদের মেকানিজমের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে তাদের পরিচালিত, তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা- যা এখনো আমাদের দেশসহ আমাদের সকল অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত আছে। মূলত এটি তাদের কমন (অভিন্ন) একটি বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>আমরা যদি শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা না করি তাহলে এটা বলতে কী বুঝায় এই বিষয়টাকে সঠিকভাবে মোটেই বোঝা সম্ভব হবে না।</p>
<p>এটা আমাদের পূর্ববর্তী যেসব আক্রমণকারী; ক্রুসেডার এবং মোঙ্গলদের আক্রমণের চাইতে সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।  মোঙ্গলদের আক্রমণের সময় আমরা দেখেছি তারা এসেছে, বাগদাদকে আক্রমণ করেছে বাগদাদের সকল লাইব্রেরীগুলোকে পুড়িয়ে দিয়েছে গণহত্যা চালিয়েছে এবং হয় তারা চলে গেছে না হয় সেখানের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা কর্তৃক ওখানের প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতির মধ্যে নিজেরা বিলীন হয়ে গিয়েছে।   কিন্তু শোষকদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা হয়নি। <strong>এটা সম্পূর্ণ নতুন একটা পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই, স্থায়ীভাবে ও পদ্ধতিগতভাবে একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তৈরি করে সেটার আলোকে তাদের সমগ্র কালকে পরিচালিত করে যা এখনো জারি রয়েছে।</strong> যেমন এখন আমাদের যে ওয়ার্ল্ড ভিউ এটা ব্রিটেনের দেওয়া। আমাদের জাস্টিস বা বিচার ব্যবস্থা হল ব্রিটিশদের বিচার ব্যবস্থা। আমাদের অর্থনীতি সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী  অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাহলে কিভাবে আমরা এই শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি পাবো?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের যে বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম তা হলো,  স্থায়ী ও পদ্ধতিগতভাবে একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে সেটার আলোকে তারা যেসকল  অঞ্চলকে  শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্র ভূমিতে পরিণত করেছিল সেটাকে তারা পরিচালনা করেছে। এর আবার ভিন্ন ভিন্ন পন্থাও আছে। যেমন উত্তর অ্যামেরিকা। সেখানে পশ্চিম ইউরোপীয়রা  যাওয়ার পরে সেখানে বসবাসকারি প্রায় সকলকেই হত্যা করে। তারা কেন সেখানে তাঁদেরকে হত্যা করে? এর অন্যতম কারন হল সেখানের অধিবাসীরা যাযাবর হিসেবে বসবাস করত। অর্থাৎ মাটির সাথে তাঁদের মালিকানার সম্পর্ক ছিল না। মালিকানা সত্তকে গ্রহণ না করে যাযাবর একটা জীবন তারা যাপন করত। ইউরোপীয়রা  দেখল, এদেরকে আমরা গোলাম বানাতে পারবো না। যার ফলে তাঁদেরকে গোলাম বানিয়ে হালচাষ করাতে পারত না। এই কারণে তাঁদের সামনে একটি মাত্র পথই খোলা ছিল সেটা হল হত্যা করে তাঁদেরকে শেষ করে দেওয়া। সকল রেড ইন্ডিয়ানকে  তারা হত্যা করে। আবার ওই অঞ্চলকে আবাদ করার জন্য নিজেদের শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য আফ্রিকা থেকে মানুষদেরকে ধরে নিয়ে এসে দাস বানিয়েছে। তাই বলা হয়েছিল তাদের চিত্র এবং ৪০০ বছরের যে সাম্রাজ্যবাদ এর মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। এটা অঞ্চল ভেদে, দেশ ভেদে, সময় ভেদে।</p>
<p>আবার আলজেরিয়াতে ফরাসিরা আসার সাথে সাথে দেখতে পায় এখানে একটি শক্তিশালী সভ্যতা সংস্কৃতি আছে‌ এখানে তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে এখানে তাদের ভাষা কে বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছে তাদের জীবনধারাকে বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছে আর অন্যান্য অনেক পন্থাই এখানে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।এটা   কেননা সেখানে বসবাসকারি মানুষের স্থায়ী একটি জীবন ধারা ছিল। এই কারণে সেখানে  ভিন্ন পন্থা অবলম্ববন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমার আলোচনার যে বিষয়বস্তু , সেটাকে আমরা উপনিবেশবাদ বলতে পারতাম। এটা না বলে আমরা কেন সাম্রাজ্যবাদ বলে আখ্যায়িত করলাম? শোষকদের কে ইংরেজিতে বলা হয় exploiters. কিন্তু কোথাও ব্রিটিশদেরকে এক্সপ্লোয়েটের হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি। আখ্যায়িত করা হয়েছে কলোনাইজার হিসেবে।</strong></p>
<p>আমাদের বই পুস্তকে বা তারা উপনিবেশবাদ বলতে যেটা বুঝায় &#8211;</p>
<p>উপনিবেশবাদ বা কলোনাইজেশনের সাথে কলোনি বা উপনিবেশ বানানোর একটি সম্পর্ক রয়েছে।</p>
<p><strong>কলোনি বা উপনিবেশ বানানোর অর্থ হল, সাধারণ কোন একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক বসবাসকৃত একটি অঞ্চল থেকে অন্য একটি অঞ্চলে সেখানে বসতি স্থাপন করা। এবং সেখানে অবস্থা বুঝে তাদের নিজেদের কল্যাণে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা। এটা হল উপনিবেশবাদের মূল অর্থ। এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে কলোনাইজেশন বা উপনিবেশবাদ খুব বেশী নেতিবাচক কোন কিছু নয়। যেমন তোরা নিজেদের স্বার্থে ইন্ডিয়াতে এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বানিয়েছে এবং ব্যবসা বাণিজ্য করেছে। কিন্তু কেন আমরা তাদেরকে শোষক বলছি? আমরা কেন তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করছি? ‌এটা মূলত কলোনাইজার বা উপনিবেশের এটা মৌলিক সংজ্ঞা।</strong></p>
<p>তারা আমাদের সাথে সবসময় খেলতে আসে ভাষা এবং পরিভাষা দিয়ে। আমরা মুসলমানরা খুব কম তাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি। আমরা যেখানে সবচেয়ে বেশি পরাজিত , সেটা হচ্ছে কুটনীতির টেবিলে। যার কারণে কলোনাইজেশন এর মত গণহত্যার ইতিহাসকে  খুব স্বাভাবিকভাবে তারা সংজ্ঞায়িত করতে পেরেছে। ‌ আমাদের জিহাদ আমাদের শরীয়তকে তারা ধ্বংস করে দিয়েছে।</p>
<p>এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ হল উপনিবেশবাদের নামে পশ্চিম ইউরোপের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এই কারণে পূর্বের যে কোন কলোনাইজেশনের চেয়ে এটা ভিন্ন। কলোনাইজেশন কিন্তু অতীতেও হয়েছে কিন্তু এটা একেবারেই ভিন্ন। যেমন ইতিপূর্বেও রোম অনেক দেশে দখল করেছে এবং শাসন করেছে। ফনেশিয়া ও  গ্রীকদের অনেক  কলোনি ছিল। কিন্তু বর্তমান যে কলোনাইজেশন এটা অতীতের রোম, ফনেসিয়া বা গ্রীকদের Colonization এর চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা পূর্বের এই সকল কলোনির চেয়ে ভিন্ন।</p>
<p>এই ভিন্নতা বুঝার জন্য আমাদেরকে বুঝতে হবে মডার্ন ইউরোপের মূলে কি রয়েছে? মডার্ন ইউরোপীয়দের সৃষ্টিজগতের সাথে সম্পর্ক, এবং আশেপাশের অন্যান্য মানুষের সাথে তাঁদের তৈরিকৃত সম্পর্ক ও মহাবিশ্বের সাথে তাদের সম্পর্ক, এই সম্পর্কের স্বরূপ সম্পর্কে জানতে হবে।</p>
<p>এখন এই মডার্ন ইউরোপের মূলে কি রয়েছে?</p>
<p>যারা সমগ্র পৃথিবীকে নির্যাতন, লুণ্ঠন, শোষণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছে না এদের মূল বিষয়টা কি? বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিচে’ এই বিষয়কে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, মডার্নিটির মূল হল Will to Power অর্থাৎ তাহাক্কুমের ইরাদা। প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছাকে মর্ডান ইউরোপের ভাষায় বলা হয়, উইল টু পাওয়ার।</p>
<p>এর মূল কথা হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের মূল কারন হল শক্তি সঞ্চয় করা এবং সঞ্চয়কৃত শক্তির মাধ্যমে তাঁর আশে পাশে যা কিছু আছে সেগুলোর উপর তাহাক্কুম বা আধিপত্য কায়েম করা, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা ও নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা। এজন্য বর্তমানে তাদের যে ফিজিক্সের ধারণা, তা হলো- প্রকৃতপক্ষে আমি কিভাবে আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে উপকৃত হতে পারি বা নিজের স্বার্থকে হাসিল করতে পারব। এর ব্যাকগ্রাউন্ডে যদি আমরা এক ধাপ পেছনে যাই তাহলে দেখতে পাই, দেকার্তের কার্টেসিয়ান থট সেখানে আছে Cogito Ergusum বা I am there, because I am thinking- আমি চিন্তা করি বলেই আমি আছি এ কথার পেছনেও  will to power এই বিষয়টি লুকায়িত।</p>
<p>আমরা যদি আরও এক ধাপ পেছনে যাই খ্রিস্টান যে ধর্মতত্ত্ব এর মধ্যেও এ বিষয়টি আমরা খুঁজে পাই। সেটা হল খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে দেখতে পাব  যে, হযরত ঈসার পরে খ্রিস্টান ধর্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলো পাউলস। খ্রিষ্টান ধর্মে হযরত ঈসার পরে পাউলস কর্তৃক তৈরিকৃত পরিভাষার মধ্যে একটি হল “অন্যরা”। এই অন্যরা বা আদার্স হল ইয়াহুদীরা। খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বে এমন একটি চিন্তা আছে, যা পাউলসের চিন্তাকে সামারাইজ করে পাই; হযরত ঈসা যখন ফিরে আসবে তখন যারা তাঁকে স্রষ্টা হিসেবে গ্রহন করবে তারা চিরস্থায়ী জীবন পাবে আর যারা গ্রহণ করবে না তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।</p>
<p><strong>এর অর্থ কী?</strong></p>
<p><em><strong>এর অর্থ হল যারা খ্রিষ্টান না তাঁদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। যার ফলে বেঁচে থাকার পূর্ব শর্ত হল, চার্চের অনুগত হওয়া।</strong></em></p>
<p>পরবর্তীতে আসে পঞ্চম শতাব্দীতে Augustine এর চিন্তা-ধারা, তিনিও খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিকদের একজন। তিনি এই চিন্তা বা আদার্স বিষয়টাকে এমন  ভিত্তির উপর দাঁড় করান যা পরবর্তীতে Inquisition ও ক্রুসেডের জন্ম দেয়। মর্ডান ইউরোপীয় যে স্টেট, এর  রূহের মধ্যে কিভাবে সাম্রাজ্য এবং শোষণ গেঁথে আছে এটাকে যদি বুঝতে চাই তাহলে আমাদেরকে এক ধাপ পেছনে, রেনে দেকার্তের কার্তেসিয়ান থট বুঝতে হবে। এরপর এক ধাপ পেছনে খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের কাছে যেতে হবে। তাহলে কেন সাম্রাজ্যবাদ হত্যাযজ্ঞ চালাবে, সবাইকে তার নিজের কাজে ব্যবহার করবে- এর কারণও আমরা খুঁজে পাই। পরবর্তীতে এই চিন্তা ক্যাথলিক চার্চের মূল দর্শন হিসেবে জারি থাকে।</p>
<p><strong> এখন খ্রিস্টানদের আদার্স হিসেবে পরিবর্তিত হয়েছে ইহুদীদের পরিবর্তে মুসলমানরা। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাদের ক্রুসেডগুলো বারবার মুসলমানদের জিহাদি প্রেরণা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের শক্তি এবং আকলের শক্তির কাছে পরাজিত হয়। ফলে একপর্যায়ে তারা হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু তারা একটা জায়গায় আশা পায় তা হল আন্দালুসিয়ার গ্রানাডা পতনের মাধ্যমে। অর্থাৎ ১৪৯২ সালে তারা নতুন করে আশা খুঁজে পায় এবং তারা বলতে শুরু করে যে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে যেহেতু তাড়াতে পেরেছি তাহলে মুসলমানদেরকে সমগ্র পৃথিবী থেকেও তাড়িয়ে দিতে পারব।</strong></p>
<p>এই মন্ত্র সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রথম পদক্ষেপ হলো ক্রিস্টোফার কলম্বাস। সে মূলত আমেরিকা আবিষ্কার করতে যায় নাই। কারণ আমেরিকার সাথে দুনিয়ার সীমা আছে। মূলত ক্রিস্টফার কলম্বাস যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অর্থনৈতিক শক্তি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেনাবাহিনী আনার জন্য। এই লক্ষ্যেই মূলত কলম্বাস সহ অন্যরা অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহের জন্য। এ উদ্দেশ্যে সে তথাকথিত আবিষ্কারের নেশায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।  এই তথাকথিত আবিষ্কারের নামে তারা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই মানুষকে খ্রিষ্টান বানিয়েছে ও তাঁদের সম্পদকে লুণ্ঠন করেছে আর না হয় তাঁদেরকে হত্যা করেছে।</p>
<p>এই কারণে খ্রিষ্টান ধর্মের মূলতত্ত্ব ও কার্টেসিয়ান চিন্তার মাধ্যমে সামগ্রিকতা লাভকারী এই চিন্তাকে বিবেচনা করা ছাড়া এবং এই অর্থে সেক্যুলার চিন্তাকে উপলব্ধি করা ছাড়া পশ্চিম ইউরোপীয়রা কিভাবে মানবতার ইতিহাসে শুধুমাত্র নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র একটি তাহাক্কুমের ফরম বা নিপীড়ন মূলক ব্যবস্থা হিসেবে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদকে গঠন করেছে সেটাকে বুঝতে পারব না।</p>
<p><strong>সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে ‘অন্যরা’ অর্থাৎ যারা খ্রিষ্টান নয় তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। এই চিন্তাকে খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ব থেকে বের করে এনে সেক্যুলারাইজডকারী এবং বিশেষ করে থমাস হবের মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রের আদর্শে পরনিতকারী এবং সেই রাষ্ট্রের জন্য সকল প্রকার পন্থাকে গ্রহণ করাকে বৈধতা দানকারী একটি চিন্তা হিসেবে বুঝলে তাঁদের শোষণ ও সাম্রাজ্যের মূলমন্ত্রকে বুঝতে পারব।</strong></p>
<p>সাম্রাজ্যবাদীরা এসব অঞ্চল বা দেশসমূহ কে লুণ্ঠন করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। এখানে আমরা বলেছি যে, সাম্রাজ্যবাদী ও শোষকরা বা এই সকল দেশ সমূহ  একেক সময় একেক পন্থাকে গ্রহণ করে। কখনোবা মিশনারী কার্যক্রম, কখনো ব্যবসা আবার কখনোবা শিক্ষাকে ব্যবহার করে থাকে। কখনো সেনাবাহিনী, আবার কখনোবা বিভিন্ন চুক্তিকে ব্যবহার  করে থাকে। এর জন্য এর বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। কখন কোনটা ব্যবহার করবে সেটা তারা অবস্থা বুঝে সিন্ধান্ত নিয়ে থাকে।</p>
<p>যেমন থমাস ম্যালথুস, যিনি ছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। An Essay on the Principle of Population নামক বইয়ে তিনি বলেছেন, জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে, সম্পদ বা খাদ্য বাড়ে গাণিতিক হারে।‌ তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির অন্যতম একজন কর্মকর্তা। তিনি কেবল কর্মকর্তা ছিলেন না তিনি সেই সময় ইন্ডিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছিলেন। ‌ যেমন জন স্টুয়ার্ট মিল তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম একজন শেয়ার হোল্ডার ছিলেন।</p>
<p>থমাস হবস এর রাষ্ট্রের যে মূল আদর্শ তার মৌলিক পরিভাষা হচ্ছে পার্সোনালিটি। পার্সোনালিটি শব্দটি দিয়ে আমরা কর্মক্ষম ও যোগ্য, ব্যক্তিত্ত্ববান একজন মানুষকে জানি, কিন্তু তিনি এটাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি বলেন, একটি জনগোষ্ঠীও যদি একসাথে কাজ করার চুক্তি করে ও সমবায়ের ভিত্তিতে কাজ করে তাহলে তারাও একটি ফা’য়িল (কর্মক্ষম)  হিসেবে গৃহীত হবে। তারাও কোন স্বার্থকে সামনে রেখে এক সাথে কাজের  মাধ্যমে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। তার এই পার্সোনালিটি আর ইসলামী সভ্যতায় মুরুয়াত বা ব্যক্তিত্ব এর মাঝে সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে।</p>
<p>এটা বিস্তারিত জানতে হলে  ইমাম মাওয়ারদির আদাবুদ্দিন ওয়াদ দুনিয়া গ্রন্থে মুরুয়াত নামে একটি অধ্যায় আছে, সেটি পড়তে হবে। এক হাকিমকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে ‘আকল’ এবং ‘মুরুয়াতে’র মধ্যে পার্থক্য কী? <strong>তখন</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>জবাব</strong> <strong>দিয়েছেন</strong><strong>, </strong><strong>আকল</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>উপকারী</strong> <strong>যে</strong> <strong>কাজ</strong> <strong>সে</strong> <strong>কাজটা</strong> <strong>করা, </strong> <strong>আর</strong> <strong>মুরুয়াত</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কাজকে</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>সুন্দর</strong> <strong>ভাবে</strong> <strong>করা</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা সবচেয়ে বেশি লুন্ঠিত নির্যাতিত হয়েছি যাদের মাধ্যমে, তাদের ক্ষেত্রে যদি দেখি, তারা হচ্ছে ব্রিটিশ aristrocat। ইংল্যান্ডের দুইটি  পার্লামেন্ট রয়েছে। একটি হচ্ছে সাধারণ পার্লামেন্ট আরেকটা হচ্ছে হাউজ অফ লর্ডস অফ দা ইউনাইটেড কিংডম যা এরিস্টোক্র‍্যাটের। আর এটাই হল মূল পার্লামেন্ট‌। হাউজ অব লর্ডসের সদস্যসংখ্যা ৭০০ জন এবং হাউজ অফ কমন্সের  ৬০০ জন। ‌  হাউস অফ লর্ডস হলো মূলত এরিস্টোক্র‍্যাটদের জন্য।</p>
<p>এটাকে যদি আমরা ব্রিটিশ এরিসটোক্র্যাট গ্রুপকে বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাই যে এরিস্টোক্রাটরা; যাদেরকে আমরা House of Lords of the United Kingdom হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে ও সমবায়ের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। এবং তাঁদের মধ্যে থেকে একজনকে Peerage নির্বাচিত করে একজন ব্যক্তি হিসেবে নিজেদেরকে পরিচালিত করতে পারে। এই প্রেসিডেন্ট কে তারা তাদের প্রতিনিধি বানায় এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যখন যা লাগে সেটার আলোকে তাদের পরিকল্পনা এবং কর্ম গ্রহণ করে থাকে।এবং নিজেদের স্বার্থে কাজ করে থাকে। যেমন ওসমানীদের সাথে তারা কখনো লড়াইয়ে যায়নি কেননা যখনই লড়াই গিয়েছে সেখানেই হেরেছে।  এজন্য তারা ওসমানীদের সাথে সবসময় চুক্তি করত। কারণ তারা জানতো এখানে পারা যাবে না। কোথাও চুক্তি (উসমানী), কোথাও যুদ্ধ, কোথাও গনহত্যা, কোথাও ব্যবসার (হিন্দুস্তান) নামে সকল কিছুকে দখল করে ফেলেছে। ‌</p>
<p>তাদের এই পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করে হাউজ অব লর্ড স এর সদস্যরা।</p>
<ul>
<li>এই সকল বিষয়কে বিবেচনায় নিলে আমরা এই কথা বলতে পারি যে, মূলগতভাবে খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ব দ্বারা লালিত, ফরম বা গঠনগত দিক থেকে আধুনিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহারকারী আবার একই সাথে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমেও ধারাবাহিকতা দানকারী এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বকে সামনে রেখে এটাকে সেক্যুলার এই আদর্শে রুপান্তরিত করে।</li>
<li>একই সাথে তারা অন্য সমাজ ও দেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে দাবী করে।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এই চিন্তাকে তারা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে, তাদের অন্যান্য পন্থার মাধ্যমে এটা আমাদের মন মগজে গেঁথে দিতে দিতে সক্ষম হয়েছে। তারাই সকল মেকানিজম ও চিন্তা তথা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের চিন্তাভাবনাকে দার্শনিক ফর্ম দিয়ে, আধুনিক মডার্ন স্টেট এর আদর্শে পরিণত করেছে এবং এই আদর্শকে পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে যেমন ইংল্যান্ডের হাউস অফ লর্ডসের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে এটা প্রয়োগ করেছে। এটা হচ্ছে মূলত তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড। এখানে মূল হলো ধর্ম দর্শন, এমনকি তাদের জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও অন্যান্য চিন্তাগুলো এক্ষেত্রে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।</strong></p>
<p>তারা এটা আমাদের উপর কীভাবে প্রয়োগ করেছে?  আমাদের উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তারা ভেবেছে, আমরা যদি তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাই, তাদেরকে শোষণ করতে চাই, শোষণ করার জন্য সর্বাগ্রে যে বিষয়টি করতে হবে সেটা হল, তাঁদের আত্মবিশ্বাসকে শেষ করে দেওয়া। এই জন্য তারা ইতিহাসবিহীন একটি জাতিতে পরিণত করার জন্য আমাদের সকল কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশে তারা প্রথম এই কাজটি করে। ইসলাম আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলাম ভারতীয় উপমহাদের ১০০০ বছরের ভাগ্য নিয়ত্ত্বা ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে মোহাম্মদ বিন কাসিম এর মধ্য দিয়ে যে বিজয় এবং বাংলা অঞ্চলে আরব বণিকদের মধ্য দিয়ে ইসলামের যে প্রচার এবং প্রসার যা ভারতীয় উপমহাদেশের এক হাজার বছরের ভাগ্যনিয়ত্তা ছিল। এককথায় ইসলামই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এমন একটা জায়গায় এসে তারা সর্বপ্রথম আক্রমণ চালায় ওই সময়ের ভাষা এবং ধর্মের উপরে। তারা প্রথমে এসে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার যে ভাষা সেটাকে পরিবর্তন করে দেয়। এটা তারা রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে করে।</p>
<p>দ্বিতীয় আঘাতটি করে তারা আমাদের দ্বীনের উপরে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মাযহাব হানাফী মাযহাব। আকিদায় আমরা আশয়ারী-মাতুরিদি। ব্রিটিশরা আসার পর তারা ব্রিটিশ সালাফিজমের পথকে উন্মোচিত করেছে। অর্থাৎ তারা দ্বীনকে এমন অবস্থায় নিয়েছে যাতে আমরা সেই দ্বীনকে পালন করতে না পারি। এই দ্বীন যেন আমাদের ভিতরে ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্য  জন্ম দেয়। এজন্য ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ফরমেট বা সমস্যার সৃষ্টি হয় সালাফিজমের মাধ্যমে। মাত্র ৫০ থেকে ৬০ বছরের পরেই আহলে কোরআন, আহলে হাদিস এর জন্ম হয়।</p>
<p>ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন সময়ে ২২ হাজার পাউন্ড দিয়েছে মিশকাতুল মাসাবিহ কে অনুবাদ করার জন্য। কারণ মিশকাতুল মাসাবিহকে বলা যায়, আমাদের মুসলমানদের হ্যান্ডবুক। এটাকে তারা আগে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা চালায় এবং এক্ষেত্রে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফান্ডিং করে।</p>
<p><em><strong>এ কারণে ভাষা যদি শক্তিশালী না হয় তাহলে দ্বীনও শক্তিশালী হবে না। এজন্য ভাষাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমাদের দেশের মানুষের ভাষা বাংলা। কিন্তু আমাদের শিক্ষার ভাষা কি বাংলা? আজকে আমরা বাংলা ভাষায় ইসলামকে সঠিকভাবে তুলে ধরার মতো কোন কিছু কি করতে পেরেছি?</strong></em></p>
<p>তারা তো তাদের কাজ করেছে তারা এসে আমাদের ভাষার উপর আক্রমণ চালিয়েছে,  আমাদের পরিভাষার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এটা করে তারা বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এবং বাংলা ভাষার সাথে মুসলমানরা যাতে দূরত্ব বজায় রাখে এজন্য সব সকল ধরনের পন্থা অবলম্বন করেছে। ‌ পরবর্তীতে মুসলমানরাও বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা হিসেবে দূরে সরিয়ে দিয়ে রেখেছে। ‌ অথচ যে কোন চিন্তাধারার ক্ষেত্রে মানুষ যদি তার মাতৃভাষাকে ভালোভাবে না জানে অন্য ভাষাও ভালোভাবে শিখতে পারবে না ভালোভাবে চিন্তা করতে পারবে না। একারণে তারা প্রথমে আক্রমণ চালায় আমাদের দ্বীনের উপরে আর সেটা করে আমাদের আলেমদেরকে হত্যা করার মাধ্যমে, তারা আমাদের দারস বাড়িগুলো ধ্বংস করে দেয়। ওদের যত প্রতিষ্ঠান ছিল তা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং আমাদের দ্বীন যাতে একটি অনুসৃত দ্বীন না হয়, ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্য সৃষ্টি হবে বহুধা অথবা বিভক্ত হবে এটার জন্য সকল ধরনের কার্যক্রম তারা চালায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজকে যদি আমরা শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই এজন্য আমাদেরকে আমাদের দ্বীনকে ভালোভাবে বুঝতে হবে দ্বীনুল মুত্তাবা’ অর্থাৎ অনুসরণযোগ্য  যে দ্বীন। আর এক্ষেত্রে আমরা ইসলামের ইতিহাসে হেরা থেকে শুরু করে প্রবাহমান নদীগুলোর দিকে যদি আমরা দেখি সবচেয়ে প্রশস্ত এবং প্রবাহমান নদী হল উসুলবিদ বা আহলে রায়ের ধারা। এটা সবচেয়ে বড় ধারা। কারন এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা এবং এর বীজ বপন করেছেন হযরত ওমর (রা)। আব্বাস খিলাফতের রাষ্ট্র,  ওসমানী, মুঘলসহ  আন্দলুসিয়ার যে খেলাফত দেখি- এই ফিকহের আলোকে রাষ্ট্র  পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা যদি আমাদের দ্বীনকে একটি অনুসরণযোগ্য একটি দ্বীনে পরিণত করতে চাই তাহলে আমাদেরকে পুনরায় এই উসুলি ধারা যার প্রতিনিধিত্ব শুধুমাত্র হানাফীরাই করে না যার শুরু  হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা&#8217;আলা আনহু, ইমাম আবু হানিফা থেকে ইমাম গাজ্জালী। ‌ অথচ ইমাম গাজ্জালী কে দেখানো হয়, তার সময় এসে জ্ঞান মরে গেছে অথচ তিনি তার পূর্বের ৪০০ বছরের জ্ঞান কে সামারাইজ করেছেন এবং তারপর ৬০০ বছর এর জ্ঞানকে  ডাইমেনশন দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি হলো ইমাম শাতেবী। তিনি যখন দেখলেন আমাদের হানাফী উসুল বা আমাদের ক্লাসিক উসুল দিয়ে ইসলামকে যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য একটি বিশ্বজনীন দ্বীন হিসেবে পরিচালনা করতে পারব না, তখন তিনি মুয়াফাকাত লিখে মাকাসিদের আলোকে এই দ্বীনকে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এরপর ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি এর চিন্তা দেখলে, সেই সময় ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট হচ্ছে, তারা আমাদের বাংলা অঞ্চলে চলে আসছে। বিভিন্ন অঞ্চলকে তারা সাম্রাজ্যবাদের অধীনে নিয়েছে৷ তখন তিনি নতুন করে উসুল প্রণয়ন করেন, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা। তারপর আসেন আল্লামা ইকবাল। তিনি ঐসময়ের দুনিয়াকে নতুনভাবে রিড করেন। রিড করে ইসলামের গতিশীলতা কীভাবে আসতে পারে, আগামী দিনের সভ্যতা হিসেবে ইসলামী সভ্যতা কীভাবে গতিশীল হবে, পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, মুসলমানগণ কীভাবে জ্ঞান এবং সভ্যতায় নতুন ভাবে নিজেদের জায়গা গ্রহণ করতে পারে এজন্য তিনি কবিতার মাধ্যমে,  লেখনির মাধ্যমে, রাজনীতির মাধ্যমে আমাদের সামনে বিশাল এক মেনিফেস্টো তুলে ধরেন। এজন্য আমরা সাম্রাজ্যবাদ এবং শাসকদের চিন্তাধারা থেকে যদি মুক্তি পেতে চাই তাহলে আমাদেরকে খুব ভালোভাবে এই ধারাকে অনুসরণ করতে হবে খুব ভালোভাবে রিড করতে হবে এমনকি আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া যে জ্ঞান তাকে নবায়ন করে আমাদের যুগের আলোকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই ভাষার উপর জোর দিতে হবে। এজন্য আমাদের মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি আরবি ভাষাকে মাতৃভাষার মত  রপ্ত করতে হবে। অন্যথায় আমাদের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের কাছ থেকে কখনো মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের তথাকথিত যারা এলিট তারা কথা বলার সময় অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক ইংরেজি বলে, এমনকি  আরবির শিক্ষক  বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে লেকচার দেয়। দৈন্যতা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষের এসকল আচরণ করতে পারে! এখন আমাদের প্রয়োজন আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করা কারণ আমাদের ভাষা ইংরেজি ভাষার চেয়ে কোন অংশে কম না। শেক্সপিয়ারের চাইতে আলাউল ছোট কবি না। আমাদেরকে এগুলো নতুন ভাবে জাগ্রত করতে হবে এবং নতুনভাবে সামনে তুলে ধরতে হবে।</p>
<p><em><strong>তারপর তারা যে কাজটা করে যে আমাদের অতীত বলতে কিছু নাই। এটা হচ্ছে আমাদের উপর উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের চিন্তার প্রভাব এর সবচেয়ে বড় প্রভাব হচ্ছে আমাদের অতীত বলতে কিছু নেই এটা তারা কেন বলতো এটা করার মূল কারণ হচ্ছে তারা যে অঞ্চলে গিয়েছে সে অঞ্চলের মানুষদেরকে তারা অসভ্য বর্বর এমনকি সভ্যতাহীন একটি জাতি হিসেবে দেখতো তাদের কাছে মানুষ হচ্ছে দুই পা ওয়ালা প্রাণী যেমন ছাগলের পা গরুর চারপা এরকম মানুষও দুই পা ওয়ালা প্রাণী ছাড়া আর কিছু না।</strong> </em>যখন ইচ্ছা হাত কেটে ফেলতো, যখন ইচ্ছা ফাঁসিতে ঝুলাতো, যখন ইচ্ছা পিটাতো যখন ইচ্ছা আগুনে ফেলত, যখন ইচ্ছে কৃত্রিমভাবে খরা সৃষ্টি করে হত্যা করত এটা হচ্ছে তাদের অসভ্য বা বর্বর জাতির সাথে আচরণ। কারণ তারা মনে করত তারাই একমাত্র মানুষ অন্যরা মানুষ নয়। তাদের মতে তাদের যে বিবর্তনবাদের ধাপ তা ইউরোপিয়ানরা ছাড়া অন্য কেউ অতিক্রম  করতে পারেনি। এজন্য তারা যে অঞ্চলে গেছে সে অঞ্চলের  মানুষদেরকে হত্যা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করত না।</p>
<p>এর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই পাশ্চাত্যের সবচেয়ে বড় দার্শনিক হেগেল তার দ্য হিস্ট্রি অফ ফিলোসফি বইয়ে। সেখানে একটা ক্যাটাগরি আছে- তা হলো ইতিহাসবিহীন জাতি। ইতিহাসবিহীন জাতি কারা? তাদের কথা হচ্ছে যারা বর্তমানে ক্ষমতাবান নয় তাদের ইতিহাসে কোন জায়গা নেই। এ কারণে মানব সভ্যতার ইতিহাসে বাঙালি জাতির গৌরব, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের অবদান আমরা খুঁজে পাই না। এগুলো কোথাও পড়ানো হয় না কারণ আমাদের বর্তমানে কোন অস্তিত্ব নাই। এটা শুধুমাত্র হেগেল না, এটা পাশ্চাত্য দার্শনিকদের ফিলোসফি বা হিস্ট্রির মূল কথা। তারা আমাদেরকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে গ্রহণ করে। এটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ইতিহাস পড়ি তখন আমাদের নিজেদের ইতিহাসের প্রতি আমাদের ঘৃণা সৃষ্টি হয়। আমাদের সমাজবিজ্ঞান বলতে কিছু নাই অর্থনীতি বলতে কিছু নাই কেন এই প্রবণতার কারণে  আমাদের অস্তিত্বই নাই। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে করা হয়। কিন্তু এটা ইসলামিক স্টাডিজ এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ হাদিসের ইতিহাস আমরা কতটুকু জানি? ইতিহাস আমরা জানি ইমাম গাজ্জালী পর্যন্ত অর্থাৎ পঞ্চম হিজরী শতাব্দী  পর্যন্ত। তাদের কথা হলো জ্ঞান গাজ্জালীর মাধ্যমে মরে গেছে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে ইমাম গাজ্জলীর পর ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বড় দার্শনিক জন্ম নিয়েছে। যেমন ফখরুদ্দিন রাজি তিনি এত বড় চিন্তাবিদ, মুয়াফাকাতের লেখক ইমাম শাতিবীসহ আরও অনেক চিন্তাবিদ।</p>
<p>তাদের সত্যায়িত করার জন্য এটা আমার গোগ্রাসে গিলে নিয়েছি। বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসায় দেখবেন না যে উসুলের ইতিহাস আছে, হাদিসের ইতিহাস আছে, দর্শনের ইতিহাস আছে, আখলাকের ইতিহাস আছে- এটা পঞ্চম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আমাদেরকে শুধু সোশাল সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাবজেক্ট গুলোকে মুক্ত করলে হবে না আমাদেরকে মুক্ত করতে হবে তাফসীর এবং হাদিসকে। কারণ আমরা তাফসীরের ইতিহাস জানি না, হাদিসের ইতিহাস জানি না। আর জানলেও তা আংশিক।</p>
<p>আমরা তাদের এই বয়ানকে গ্রহণ করে তাদের কথাকে স্বীকৃতি দিয়েছি যে ঠিকই আছে আমরা ইতিহাসবিহীন জাতি, গাজ্জালীর পরে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের চিন্তা ও দর্শন নামে কোন দিন কোন লেকচার শোনা হয় না। আমরা যে ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জাতি মর্যাদা পূর্ণ জাতি এটা আমাদেরকে নতুন করে আবিষ্কার করে আবার আমাদের আত্মবিশ্বাসকে জাগ্রত করতে হবে। আমরা ইতিহাসবিহীন জাতি নই, ইতিহাসবিহীন জাতি ইউরোপ নিজে কারণ তার কোন ইতিহাস নেই,  তার ইতিহাস সম্পূর্ণ ফিকশন।</p>
<p>আমাদের ইতিহাসবিহীনতার আরেকটি বড় প্রমাণ হচ্ছে আমাদের শহরগুলো। এগুলো কে কি শহর বলা হয়? এগুলোকে বস্তি বলতেও লজ্জা লাগে। ঢাকা কি আজকে আমাদের হাতের কামাই নয়? আমাদের শহরগুলো, বাসা বাড়ি গুলো একজনের বেডরুম থেকে আরেকজনের বেডরুম দেখা যায়, এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে? একটা মুসলিম দেশে অথচ তথাকথিত ইসলামের নাম দিয়ে দিয়ে তারা এগুলোকে ইসলামী বানিয়েছে। কোন কিছু নাম দিয়ে ইসলামী হয় না, এর মধ্যে ইসলামের রুহ থাকতে হয়।</p>
<p><strong>যে ইয়াসরিবকে আল্লাহর রাসূল মদিনায় রূপান্তর করেছিলেন সেটা ইসলামী মূল্যবোধের মাধ্যমে, যদি সেই সকল মূল্যবোধ একটি শহরের মধ্যে না পাওয়া যায় তাহলে ওটা কোনক্রমে ইসলামী শহর না।</strong></p>
<p><strong>জিওগ্রাফির ক্ষেত্রে যদি আমরা দেখি গ্রিনিচ হচ্ছে পৃথিবীর কেন্দ্র। এটা কিভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র হতে পারে? সেটাতো পৃথিবীর এক প্রান্তে। যদি পৃথিবীর কেন্দ্র হয় সেটা মক্কা হবে।</strong></p>
<p><strong>গ্রিনিচকে পৃথিবীর কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করার কারণে  আমরা আমেরিকার কাছে সাউথ ইস্ট এশিয়া। মধ্যপ্রাচ্য তার কাছে মিডিল ইস্ট। সৌদি আরবের কাছে কিভাবে তা মধ্যপ্রাচ্য হয়? যদি আমরা এভাবে চিন্তা করি তাহলে আমাদের ধারনার পরিবর্তন  হবে এবং আমরা নতুন করে কিছু একটা কিছু করতে পারবো। এই সাম্রাজ্যবাদ এবং শোষণ এখনো অতিবাহিত হয়নি। আমরা এখনো সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের যাতাকলে। </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/expolitation-and-imperialism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13349</post-id>	</item>
		<item>
		<title>গ্রানাডা, গাজা ও মুসলিম উম্মাহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/granada-gaza-and-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/granada-gaza-and-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 05 Jan 2024 15:57:24 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ফিচারড]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13077</guid>

					<description><![CDATA[১৪৯২ সালে আন্দালুসিয়ার সর্বশেষ দুর্গ গ্রানাডার পতনের প্রাক্কালে সেখানের মুসলমানগণ তাঁদের সাহায্যের জন্য উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের নিকটে সহায়তা কামনা করে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। আজকে আমি আমার আলোচনাকে সেই চিঠির হৃদয়বিদারক কিছু লাইন দিয়ে শুরু করতে চাই। আমি এটাকে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>১৪৯২ সালে আন্দালুসিয়ার সর্বশেষ দুর্গ গ্রানাডার পতনের প্রাক্কালে সেখানের মুসলমানগণ তাঁদের সাহায্যের জন্য উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের নিকটে সহায়তা কামনা করে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। আজকে আমি আমার আলোচনাকে সেই চিঠির হৃদয়বিদারক কিছু লাইন দিয়ে শুরু করতে চাই। আমি এটাকে কবিতা নয় বরং মার্সিয়া হিসেবে অভিহিত করতে চাই। <strong>&nbsp;</strong></p>
<ul>
<li>سلام عليكم مِن عبيد تخلّفوا بأندلس بالغرب في أرض غُربة</li>
</ul>
<p><em>পশ্চিমে</em><em>, </em><em>আন্দালুসিয়ার</em> <em>অপরিচিত</em> <em>ভূমিতে</em> <em>বসবাসকারী</em> <em>বান্দাদের</em> <em>পক্ষ</em> <em>থেকে</em> <em>আপনাকে</em> <em>সালাম</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>سلام عليكم مِن عبيد أصابهم مصاب عظيم يا لها من مصيبة</li>
</ul>
<p><em>ভয়াবহ</em> <em>এক</em> <em>বিপদ</em> <em>ও</em> <em>মুসিবতে</em> <em>নিপতিত</em> <em>বান্দাদের</em> <em>পক্ষ</em> <em>থেকে</em> <em>আপনাদের</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>سلام عليكم من شيوخ تمزّقت شيوبهم بالنتف من بعد عِزّة</li>
</ul>
<p><em>সম্মানজনক</em> <em>একটি</em> <em>জীবন</em> <em>যাপনের</em> <em>পর</em> <em>পাকা</em> <em>চুলের</em> <em>মাধ্যমে</em> <em>সজ্জিত</em> <em>বৃদ্ধদের</em> <em>পক্ষ</em> <em>থেকে</em> <em>আপনাদের</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>سلام عليكم من وجوه تكشّفت على جملة الأعلاج من بعد سترة</li>
</ul>
<p><em>সেই</em> <em>সকল</em> <em>পর্দানশীল যুবতী মেয়েদের পক্ষ থেকে সালাম</em><em> , </em><em>জোর করে যাদের হিজাবকে খুলে ফেলা হয়েছে</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>سلام عليكم مِن بنات عواتق يسوقهم اللباط قهرا لخلوة</li>
</ul>
<p><em>সেই</em> <em>সকল</em> <em>মুক্ত</em> <em>ও</em> <em>স্বাধীন</em> <em>মেয়েদের</em> <em>পক্ষ</em> <em>থেকে</em> <em>সালাম</em><em>&nbsp; </em><em>জানাই</em> <em>সন্যাসীরা</em> <em>যাদেরকে</em> <em>দিয়ে</em> <em>জোর</em> <em>করে</em> <em>তাঁদের</em> <em>যৌন</em> <em>লালসাকে</em> <em>পূর্ণ</em> <em>করতে</em> <em>চেয়েছে</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>سلام عليكم من عجائز أكرهت على أكل خنزير ولحم جيفة</li>
</ul>
<p><em>সেই</em> <em>সকল</em> <em>বৃদ্ধ</em> <em>নারীদের</em> <em>পক্ষ</em> <em>থেকে</em> <em>আপনাদেরকে</em> <em>সালাম</em> <em>জানাই</em> <em>যাদেরকে</em> <em>শুকর</em> <em>ও</em> <em>মরা</em> <em>লাশের</em> <em>গোশত</em> <em>খেতে</em> <em>বাধ্য</em> <em>করা</em> <em>হয়েছে</em><em>।</em></p>
<p>ঐতিহাসিক মাক্কারী রচিত <strong><em>আযহারুর</em> <em>রিয়াদ</em> <em>ফি</em> <em>আখবারি</em> <em>ইয়ায</em></strong> নামক গ্রন্থে এই ১০০ লাইনের এই মার্সিয়াটি উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দালুসিয়ার মুসলমানগণ ক্রুসেডার দ্বারা কিভাবে নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে তা এই মার্সিয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। নির্মমভাবে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের অবস্থাকে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁদেরকে ধর্মান্তর করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করার জন্য কিভাবে চাপ দেওয়া হয়েছে সেই চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সবশেষে ক্রুসেডারদের নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য কালক্ষেপণ না করে উসমানীদেরকে এগিয়ে আসতে বলা হয়।</p>
<p>মার্সিয়াতে উল্লেখিত অবরোধ ও বর্বরতা সময়ের ব্যবধানে আজ আমাদের গাজা ও ফিলিস্তিনে বসবাসকারী ভাই বোনের উপর যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ঐ সময়ের উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশসমূহ এবং ততকালীন সময়ের শক্তিশালী দুই সালতানাত মামলুকি ও উসমানীরা কেন তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারলো না এই বিষয় নিয়ে আজও যেমন আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে একইভাবে আজকের মুসলিম দেশসমূহ কেন গাজার নারী ও শিশুদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে না এই বিষয় নিয়ে ইতিহাস আমাদেরকে একদিন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।</p>
<p>ইতিহাস আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে দুইশত কোটি মুসলমানের চোখের সামনে এত বড় একটি গণহত্যা কিভাবে পরিচালিত হতে পারে? এত বড় বড় মুসলিম রাষ্ট্র থাকতে নিষ্পাপ শিশু ও অসহায় নারীদের জন্য সাহায্য পাঠাতেও কিভাবে ব্যর্থ হল !<br />
<a href=" https://rkmri.co/5eomTMRAoSlM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Sunnat-O-hadis-01.jpg" height="133"></a></p>
<p>আমরা আমাদের আজকের এই আলোচনায় আন্দালুসিয়ায় ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও গাজার গণহত্যার ক্ষেত্রে আমাদের নির্লিপ্ততা ও ব্যর্থতাকে এক সাথে তুলে ধরার চেষ্টা করব।</p>
<p><em><strong>প্রথমত, ঐ সময়ের মুসলিম উম্মাহ আন্দালুসিয়ার গ্রানাডাবাসীকে উদ্ধার করার জন্য কেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেনি?</strong></em></p>
<p><em><strong>দ্বিতীয়ত, আর মুসলিম উম্মাহ কেন গাজাবাসীর আহবানে সাড়া দিতে পারছে না?</strong></em></p>
<p>এই সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে আন্দালুসিয়া নিয়ে আমি কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই।</p>
<p>***</p>
<p>আন্দালুসিয়া ……… কিংবা আমাদের হৃদয়ে স্থানলাভকারী নাম,&nbsp; ‘আমাদের হারিয়ে যাওয়া জান্নাত’ …… ঐ সময়ে শুধুমাত্র ইসলাম কিংবা মুসলমানদের-ই নয়&nbsp; সমগ্র মানবতার গৌরব হিসেবে বিবেচিত হওয়া আমাদের প্রাচীন এক সভ্যতার নাম। এটি এমন এক গৌরবময় সভ্যতার নাম যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ ইবেরিয়ান উপদ্বীপে, তুলেইটুলা, কর্ডভা ও ইশবিলিয়াতে একসঙ্গে মিলে মিশে বসবাস করেছে। শুধু তাই নয়, এক সাথে বসবাস করার আখলাক ও আইনের এমন এক দৃষ্টান্তকে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছিল যা সমগ্র মানবতার জন্য এক গৌরবউজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করেছে।</p>
<p>এই অঞ্চল&nbsp; আলেমগণ ও তাঁদের শিক্ষার্থীদের দ্বারা, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের দ্বারা এবং&nbsp; দার্শনিক ও লেখকদের দ্বারা এমনভাবে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল যে, যেন এটি ছিল মানব আকল ও হিকমতের এক অনুপম নমুনা। এটি ছিল এমন এক সভ্যতা যা, পূর্ব ও পশ্চিমকে একত্রিতকারী, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপকে এক মোহনায় মিলিতকারী অনুপম এক সেতুবন্ধনের নাম।</p>
<p><strong>এই সভ্যতায় &nbsp;দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও স্থাপনা মানুষের সাথে মিলে এমন এক সভ্যতার নজীর তৈরি করেছিল যা ছিল মানবতার জন্য আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এক সম্মিলন স্থল।</strong></p>
<p><strong>দ্বীনে মুবিন ইসলাম, আদালত ও মারহামাত এবং জ্ঞান ও হিকমত একটি অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হলে মানবতাকে কি দিতে পারে তাঁর একটি নমুনায়ে ইমতিছাল (অনুপম উপমা) হল আন্দালুসিয়া। এই আন্দালুসিয়া হল, আমাদের ইসলামী সভ্যতার সারাংশ ও আমাদের গৌরব।</strong></p>
<p>কিন্তু আমাদের এই গৌরব, আমাদের হারিয়ে যাওয়া জান্নাত ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক অভিলাষের কারণে সৃষ্ট হওয়া তাফরিকা (অনৈক্য) –র ফলে ২২ টি ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এত ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়েই ক্ষান্ত হয়নি, এই রাষ্ট্রসমূহ একে অপরের সাথে যুদ্ধেও জড়িয়ে পরে এবং এই সকল রাষ্ট্রের শাসকরা একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।&nbsp; মূলুকে তাওয়ায়িফ নামে অভিহিত হওয়া এই সময়ে উত্তরের খ্রিষ্টান রাষ্ট্রসমূহ মুসলমানদের মধ্যকার এই অনৈক্য ও বিভাজনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চল থেকে মুসলমানদেরকে বিতাড়িত করে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার সুযোগ পায়।</p>
<p>ইউরোপের ইতিহাসে Reconquista&nbsp; নামে পরিচিতি পাওয়া অর্থাৎ আন্দালুসিয়াকে মুসলমানদের হাত থেকে পুনরোদ্ধারের একটি নতুন সময় শুরু হয়। এই ভাবে খ্রিষ্টান রাজারা আন্দলুসিয়ার শহর সমূহকে একের পর এক দখল করে নেয় এবং সকল মুসলমানকে গ্রানাডায় অবস্থান নিতে বাধ্য করে। সবশেষে তারা গ্রানাডায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদেরকে অবরোধ করে, আজকে&nbsp; যায়নবাদীরা যেমনিভাবে ফিলিস্তিনের মুসলমানদেরকে গাজায় অবরুদ্ধ করে রেখেছে।</p>
<p>ক্যাস্টিলিয়া ও আরাগণ রাজ্যের একীভূত করণ এবং উসমানীগণ কর্তৃক ইস্তানবুল বিজয়ের প্রতিশোধ হিসেবে ইউরোপ থেকে মুসলমানদেরকে বিতাড়িত করার ব্যাপারে পোপের আপোষহীন ও কঠোর মনোভাব এই যুদ্ধের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই অবরোধের ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে&nbsp; মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে গ্রানাডার পতন ঘটে এবং আন্দালুসিয়ার সর্বশেষ দুর্গ এই ভাবে ইতিহাসে তাঁর জায়গা করে নেয়।</p>
<p>মূলত গ্রানাডাবাসীও গাজাবাসীর ন্যায় এক কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তারা সেখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। স্পেনিশরা গ্রানাডাবাসীকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে না পেরে কখনো কখনো আপোষের পথ বেঁছে নেয়, আবার কখনোওবা তাঁদেরকে চুক্তির মাধ্যমে প্রতারিত করার চেষ্টা করে। স্পেনিশরা তাদেরকে ওয়াদা&nbsp; দেয় যে, মুসলমানদের শাসনামলে অন্য ধর্মের মানুষরা যে সকল স্বাধীনতা ভোগ করেছিল তাঁদেরকেও সেই একই স্বাধীনতা দেওয়া হবে। তারা নিশ্চয়তা দেয় যে, যদি মুসলমানরা আত্মসমর্পণ করে তাহলে তারা তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করার পাশাপাশি&nbsp; স্বাধীন চিন্তা ও বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। স্পেনিশরা আরও ওয়াদা দেয় যে, তারা তাঁদের মসজিদ ও গুরুত্ত্বপূর্ণ স্থাপনাকে স্পর্শও করবে না। আর যারা চলে যেতে চায় তাঁরা তাঁদের ধনসম্পদ নিয়ে গ্রানাডা থেকে নিরাপদে চলে যেতে পারবে। কিন্তু চুক্তিতে স্বাক্ষর করে গ্রানাডায় প্রবেশ করার পর তারা তাঁদের দেওয়া ওয়াদাকে ভঙ্গ করে। এবং তারা চুক্তির সকল&nbsp; ধারাকে লঙ্গন করে মুসলমানদেরকে যে কোন তিনটির একটিকে বেঁছে নিতে বলা হয়। সেগুলো হল, ১। মৃত্যু বরণ করা, ২। খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করা, ৩। খালি হাতে নির্বাসনে চলে যাওয়া।</p>
<p>গ্রানাডাবাসী তাঁদের এই ট্রাজেডিকে উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের নিকটে পাঠনো&nbsp; চিঠিতে এই ভাবে তুলে ধরেঃ</p>
<ul>
<li>وقلّتْ لنا الأقواتُ واشتدت حالنا أطعناهم بالكره خوف الفضيحة</li>
</ul>
<p><em>আমাদের</em> <em>সকল</em> <em>খাবার</em> <em>শেষ</em> <em>হয়ে</em> <em>গেছে</em><em>, </em><em>আমরা</em> <em>খুব</em> <em>কঠিন</em> <em>অবস্থায়</em> <em>রয়েছি</em><em>।</em> <em>নির্যাতনের</em> <em>ভয়ে</em> <em>তাদের</em> <em>আনুগত্যকে</em> <em>মেনে</em> <em>নিতে</em> <em>বাধ্য</em> <em>হয়েছি</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>وخوفا على أبنائنا وبناتنا مِن أن يؤسروا أو يقتلوا شرّ قتلة</li>
</ul>
<p><em>আমাদের</em> <em>যুবক</em><em>&#8211;</em><em>যুবতীদেরকে</em> <em>ক্রীতদাস</em> <em>বানানো</em> <em>হবে</em> <em>আর</em> <em>না</em> <em>হয়</em> <em>নিকৃষ্টভাবে</em> <em>হত্যা</em> <em>করা</em> <em>হবে</em> <em>এই</em> <em>ভয়ে</em> <em>আমরা</em> <em>আত্মসমর্পণ</em> <em>করেছি</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>فقال لنا سلطانهم وكبيرهم لكم ما شرطتم كاملاً بالزيادة</li>
</ul>
<p><em>তাদের</em> <em>শাসকগণ</em> <em>ও</em> <em>নেতৃস্থানীয়রা</em> <em>আমাদেরকে</em> <em>ওয়াদা</em> <em>দিয়েছিল</em> <em>যে</em><em>, “ </em><em>তোমাদেরকে</em> <em>যে</em> <em>ওয়াদা</em> <em>দেওয়া</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেটা</em> <em>এবং</em> <em>তাঁর</em> <em>চেয়েও</em> <em>বেশী</em> <em>রক্ষা</em> <em>করা</em> <em>হবে</em><em>”</em><em>।</em><em>&nbsp; </em></p>
<ul>
<li>وأبدى لنا كتيبا بعهد وموثق وقال لنا هذا أماني وذمتي</li>
</ul>
<p><em>“</em><em>এই</em> <em>হল</em> <em>তোমাদেরকে</em> <em>দেওয়া</em> <em>আমাদের</em> <em>ওয়াদা</em> <em>ও</em> <em>প্রতিশ্রুতি</em><em>” </em><em>এই</em> <em>কথা</em><em>&nbsp; </em><em>বলে</em> <em>আমাদেরকে</em> <em>চুক্তিনামা</em> <em>দেখানো</em> <em>হয়</em></p>
<ul>
<li>فلمّا دخلنا تحت عقد ذمامهم بدا غدرهم فينا بالنقض العزيمة</li>
</ul>
<p><em>আর</em> <em>আমরা</em> <em>যখনি</em> <em>তাদের</em> <em>অধীনে</em> <em>এসেছি</em> <em>তখন</em><em>&#8211;</em><em>ই</em> <em>তারা</em> <em>তাদের</em> <em>ওয়াদাকে</em> <em>ভুলে</em> <em>গিয়েছে</em> <em>এবং</em> <em>আমাদেরকে</em> <em>ফিরিয়ে</em> <em>দিয়েছে</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>وخان عهودا كان قد غرّنا بها ونُصرنا بِعنف وسطوة</li>
</ul>
<p><em>আমাদেরকে</em> <em>যে</em> <em>চুক্তির</em>&nbsp;<em>নামে</em> <em>প্রতারিত</em> <em>করেছে</em>&nbsp;<em>সেটাকে</em> <em>ভঙ্গ</em> <em>করেছে</em> <em>এবং</em> <em>শক্তি</em> <em>ব্যবহার</em> <em>করে</em> <em>জোর</em> <em>করে</em> <em>আমাদেরকে</em> <em>খ্রিষ্টান</em> <em>বানিয়েছে</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>غدرنا ونُصرنا وبُدّل ديننا ظلمًا وعُوملنا بكلّ قبيحة</li>
</ul>
<p><em>আমরা</em> <em>প্রতারিত</em> <em>হয়েছি</em><em>, </em><em>পরাজিত</em> <em>হয়েছি</em><em>, </em><em>আমাদের</em> <em>দ্বীনকে</em> <em>হারিয়েছি</em> <em>এবং</em> <em>সকল</em> <em>প্রকার</em> <em>খারাপ</em> <em>আচরণের</em> <em>শিকার</em> <em>হয়েছি</em><em>।</em></p>
<p>***</p>
<p>মার্সিয়া বা চিঠি থেকে জানা যায় যে, গ্রানাডাবাসী শুধুমাত্র গণহত্যা, ধ্বংসলীলা ও নিপীড়নের শিকার-ই হয়নি। একই সাথে দীর্ঘ আটশত বছর ধরে সমগ্র মানবতাকে আলোকিতকারী একটি সভ্যতাকেও ধ্বংস করা হয়েছে। লাইব্রেরী তো দূরে থাক একটি বইকেও তাঁরা রাখে নাই। হা ভুল শুনেন নাই সকল বইকেই তারা পুড়িয়ে দেয়।</p>
<p><strong>গ্রানাডাবাসী</strong> <strong>উসমানী</strong> <strong>সুলতানের</strong> <strong>নিকট</strong> <strong>তাঁদের</strong> <strong>অনুযোগকে</strong> <strong>এইভাবে</strong> <strong>তুলে</strong> <strong>ধরে</strong><strong>,</strong></p>
<ul>
<li>وأحرق ما كانت لنا من مصاح ف وخلّطها بالزبل أو بالنجاسة</li>
</ul>
<p><em>আমাদের</em> <em>হাতে</em> <em>যত</em> <em>কোরআন</em> <em>শরীফ</em> <em>ছিল</em> <em>সকল</em> <em>মুসহাফকে</em> <em>পুড়িয়ে</em> <em>ফেলে</em> <em>এবং</em> <em>সেগুলোর</em> <em>মধ্যে</em> <em>নাজাসাতের</em> <em>মিশ্রন</em> <em>ঘটায়</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>وكلّ كتاب كان في أمر ديننا ففي النار ألقوه بِهُزء وحقرة</li>
</ul>
<p><em>দ্বীন</em> <em>সম্পর্কে</em> <em>আমাদের</em> <em>যত</em> <em>বই</em> <em>পুস্তক</em> <em>ছিল</em> <em>সেগুলো</em> <em>নিয়ে</em> <em>উপহাস</em> <em>করে</em> <em>সকল</em> <em>বইকে</em> <em>পুড়িয়ে</em> <em>ফেলে</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>ولم يتركوا فيها كتابا لمسلم ولا مصحفاً يخلى به للقراءة</li>
</ul>
<p><em>কোন</em> <em>মুসলমানদের</em> <em>নিকটে</em> <em>একটি</em> <em>বইকে</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>রাখার</em> <em>সুযোগ</em> <em>দেয়নি</em><em>, </em><em>একজন</em> <em>মুসলমান</em> <em>একাকী</em> <em>থাকা</em> <em>অবস্থায়</em> <em>পড়ার</em> <em>মত</em> <em>একটি</em> <em>মুসহাফও</em> <em>তাঁরা</em> <em>রাখেনি</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>ومن صام أو صلى ويُعلم حاله ففي النار يلقوه على كل حالة</li>
</ul>
<p><em>যদি</em> <em>জানতে</em> <em>পারতো</em> <em>যে</em> <em>কেউ</em> <em>নামাজ</em> <em>পড়েছে</em> <em>কিংবা</em> <em>রোজা</em> <em>রেখে</em> ছে<em>তাদের</em> <em>সবাইকে</em> <em>পুড়িয়ে</em> <em>ফেলেছে</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>ومن لم يجيء مِنّا لموضع كفرهم يعاقبه اللباط شر العقوبة</li>
</ul>
<p><em>যারাই</em> <em>তাঁদের</em> <em>কুফরীর</em> <em>উপসনালয়ে</em> <em>আসতে</em> <em>অস্বীকার</em> <em>করেছে</em> <em>তাদেরকেই</em> <em>তাঁরা</em> <em>পোপের</em> <em>ফতওয়ার</em> <em>মাধ্যমে</em> <em>শাস্তি</em> <em>প্রদান</em> <em>করেছে</em><em>।</em></p>
<p>এরকম একটি যুলুম ও ধ্বংসলীলার মধ্যে বসবাসকারী আন্দালুসিয়ার মুসলমানগণ উম্মতের মুসলিম ভাইদের নিকট থেকে সাহায্যের প্রত্যাশী ছিল। হা, আজকে যেমন গাজার মুসলমান ভাইয়েরা অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রতি মুহূর্তে সিনা উপত্যকা ও ভুমধ্য সাগরের দিকে তাকিয়ে অসহায় পলকে তাঁদের মুসলমান ভাইদের নিকট থেকে সাহয্যের অপেক্ষা করছে, যারা তাঁদেরকে যায়নবাদীদের জুলুম থেকে উদ্ধার করবে। অনুরূপভাবে সেই সময়ের গ্রানাডাবাসীও ভুমধ্য সাগর ও জিব্রালটার প্রণালীর দিকে ছাতক পাখির মত তাকিয়ে ছিল।</p>
<p><strong>আন্দালুসিয়ার মুসলমানগণ সেই সময়ে তিন অঞ্চলে তিনটি প্রতিনিধি দল ও তিনটি বার্তার মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিল।</strong></p>
<p><strong>প্রথম</strong> <strong>প্রতিনিধি</strong> <strong>দল</strong><strong>,</strong> হাফসি ও মারিনিগণের অধ্যুষিত অঞ্চল মরক্কো, তিউনিসিয়া, এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>প্রতিনিধি</strong> <strong>দল</strong><strong>,</strong> মিশর, শাম ও হারামাইন অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণকারী মামলুকিদের নিকটে।</p>
<p><strong>তৃতীয়</strong> <strong>প্রতিনিধি</strong> <strong>দল</strong> <strong>গিয়েছিল</strong><strong>,</strong> আনাতোলিয়া ও পূর্ব রোমেলিয়াকে নিয়ন্ত্রণকারী উসমানী সালতানাতের নিকটে।</p>
<p>এখন আমরা আমাদের আসল সমস্যার প্রথমটিতে আসলাম। <em>এ<strong>ই</strong></em><strong> <em>তিনটি</em> <em>বড়</em> <em>বড়</em> <em>সালতানাত</em> <em>গ্রানাডার</em> <em>মুসলমানদেরকে</em> <em>কেন</em> <em>সাহায্য</em> <em>করতে</em> <em>পারেনি</em><em>? </em></strong>&nbsp;ঐ সময়ে আরও একটি বড় শক্তি ছিল। সেটা ছিল সাফাভী রাষ্ট্র, বর্তমান সময়ে ইরান&nbsp; যে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এদের কেহ-ই গ্রানাডাবাসীর আহবানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসতে পারেনি! এর কারণ কি ছিল?</p>
<p><strong>প্রথমত</strong>, ঐ সময়ে উত্তর আফ্রিকার দেশ সমূহে মুসলমান গোত্র সমূহের মধ্যে অনেক বেশী প্রতিযোগীতা ও শত্রুতা বিরাজ করছিল এবং নিজেদেরকে মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ ও যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। শুধু তাই নয় একে অপরের বিরুদ্ধে স্পেন ও পর্তুগীজের খ্রিষ্টান শাসকদের সাথে লিয়াজু রক্ষা করে চলত এবং তাঁদের প্রতিপক্ষদেরকে নির্মূল করার জন্য জোট করত।</p>
<p>গ্রানাডাবাসীগণ তাদের নিকট সাহায্য চাইলে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করার মত কাউকে খুঁজে পায়নি এবং তাঁরা তাদের আচরণে হতাশ হয়ে পড়ে। আজকের গাজাবাসীরা যেমন তাঁদের প্রতিবেশীদের আচরণে হতাশ। এখানে থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হচ্ছিল তারা তাঁদের আখলাকী ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছিল।<br />
<a href=" https://rkmri.co/3yyeyyNMEATM/"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src=" https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Zubo-jiggasa-01.jpg" height="133"></a></p>
<p><strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>প্রতিনিধি</strong> <strong>দল</strong> <strong>গিয়েছিল</strong> <strong>মামলুকিদের</strong> <strong>নিকটে</strong><strong>।</strong> আন্দালুসবাসীর সাহায্যের আবেদন মামলুকিদের নিকটে পৌঁছে। মামলুকিরা গ্রানাডার পতনের মাত্র কয়েক বছর পূর্বে ১৪৮৮ সালে উসমানীদের শাসনাধিন আদানা শহরকে অবরোধ করে রেখেছিল। অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করত যে আগে উসমানীদেরকে পরাজিত করা প্রয়োজন। এই জন্য তারা গ্রানাডায় যাওয়ার পরিবর্তে আরও দূরে অবস্থিত মুসলিম শাসনাধিন একটি শহরকে অবরোধ করার জন্য সেনাবাহিনী প্রেরণ করে! মামলুকিরা গ্রানাডাবাসীকে সরাসরি সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়। কিছু কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে পোপকে হুমকি দিয়েই নিজেদের দায়িত্ত্ব শেষ করে। পোপকে উদ্দেশ্য করে বার্তা পাঠায় যে, <strong><em>গ্রানাডায়</em></strong> <strong><em>মুসলমানদের</em></strong> <strong><em>উপর</em></strong> <strong><em>এই</em></strong> <strong><em>জুলুম</em></strong> <strong><em>ও</em></strong> <strong><em>নির্যাতন</em></strong> <strong><em>অব্যাহত</em></strong> <strong><em>থাকলে</em></strong> <strong><em>আমরা</em></strong> <strong><em>মামলুকী</em></strong> <strong><em>রাষ্ট্র</em></strong> <strong><em>হিসেবে</em></strong> <strong><em>মিশর</em></strong> <strong><em>ও</em></strong> <strong><em>লেভান্টে</em></strong> <strong><em>অবস্থানরত</em></strong> <strong><em>সকল</em></strong> <strong><em>খ্রিষ্টানকে</em></strong> <strong><em>হত্যা</em></strong> <strong><em>করব</em></strong><strong><em>।</em></strong> কিন্তু তাঁদের এই হুমকি হালে পানি পায়নি। কেননা ঐ সময়ে পোপের আশেপাশে যারা ছিল তারা পোপকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, মুসলমানগণ এটা করতে পারবে না। কেননা তাদের যুদ্ধের আখলাকে বেসামরিক মানুষ ও নিরপরাধ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদেরকে হত্যা করার কোন বিধান নেই। এই জন্য তারা এই কাজ কখনো করতে পারবে না। এই ভাবে তারা পোপের শঙ্কাকে দূরীভূত করতে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয় এর জবাব হিসেবে তারা মামলুকি সুলতানের নিকট মিথ্যা বার্তা পাঠিয়ে বলে যে, গ্রানাডার মুসলমানরা স্বেচ্ছায় খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি, মুসলমানগণ কেন মামলুকিদের নিকটে সাহায্য চেয়ে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে এই অপরাধে তাঁদের উপর জুলুম ও নির্যাতনকে আরও বাড়িয়ে দেয়।</p>
<p><strong>তৃতীয় প্রতিনিধি দল যায় উসমানী রাষ্ট্রের নিকটে।</strong> আন্দলুসিয়ার মুসলমানগণ উসমানী রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন ধরণের সহায়তা চেয়ে আবেদন পাঠায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল, আমি আমার আলোচনাটি যে মার্সিয়ার মাধ্যমে শুরু করেছি সেই মার্সিয়াটি। উক্ত মার্সিয়াটি সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদকে সালাম প্রদানকারী কিছু পংতিমালার দ্বারা শুরু হয়েছে। গ্রানাডাবাসীগণ উসমানীদের ইস্তানবুল বিজয়সহ বিভিন্ন বিজয়গাথা ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে উসমানী রাষ্ট্রের সুলতান, আলেম উলামা, বিচারক ও প্রশাসকদেরকে গ্রানাডাবাসীর পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।</p>
<p>আমি তাদের আহ্বানকে হুবুহু আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই,</p>
<ul>
<li>سلام كريم دائم متجدّد أخصّ به مولاي خير خليفة</li>
</ul>
<p><em>খলিফাদের</em> <em>মধ্যকার</em> <em>শ্রেষ্ঠ</em> <em>খলিফার</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>سلام على مولاي ذي المجد والعلا ومَن ألبس الكفّار ثوبَ المذلّة</li>
</ul>
<p><em>কাফেরদেরকে</em> <em>লাঞ্ছিত</em> <em>ও</em> <em>পরাজিতকারি</em> <em>দৃঢ়তার</em> <em>অধিকারীর</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>سلام على مولاي مَن دار ملكه قسنطينة أكرم بها من مدينة</li>
</ul>
<p><em>সালতানাতের</em> <em>রাজধানী</em> <em>ইস্তানবুলের</em> <em>অধিপতির</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>سلام على القاضي ومَن كان مِثلَه من العلماء الأكرمين الأجِلّة</li>
</ul>
<p><em>শায়খুল</em> <em>ইসলাম</em> <em>ও</em> <em>তাঁর</em> <em>মত</em> <em>বড়</em> <em>বড়</em> <em>আলেমদের</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>سلام على أهل الدّيانة والتُّقى ومَن كان ذا رأي من أهل المشورة</li>
</ul>
<p><em>দ্বীনদার</em> <em>ও</em> <em>আকলে</em> <em>সালীমের</em> <em>অধিকারী</em> <em>শুরার</em> <em>সদস্যদের</em> <em>প্রতি</em> <em>সালাম</em><em>,</em></p>
<p>সালাম জানানোর পর উসমানী রাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ জানানো হয় যে তাঁরা যেন খ্রিষ্টানদেরকে চুক্তি মেনে জুলুম বন্ধ করতে বাধ্য করে কিংবা সেখানে বসবাসকারীরা যেন তাদের ধন সম্পদসহ হিজরত করতে পারে এই ব্যবস্থা করে দেয়।</p>
<ul>
<li>ودين النصارى أصله تحت حكمكم ومِن ثمّ يأتيهم إلى كلّ كورة</li>
</ul>
<p><em>মূলত</em> <em>খৃস্টধর্ম</em> <em>আপনাদের</em> <em>হুকুমের</em> <em>আওতাধীন</em><em>, </em><em>তারা</em> <em>সেখান</em> <em>থেকে</em> <em>সর্বত্র</em> <em>ছড়িয়ে</em> <em>পড়ছে</em><em>, </em></p>
<ul>
<li>عسى تنظروا فينا وفيما أصابنا لعلّ إله العرش يأتي برحمة</li>
</ul>
<p><em>আশা</em> <em>করি</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আপনারা</em>&nbsp;<em>আমাদের</em> <em>এবং</em> <em>আমাদের</em> <em>উপর</em> <em>যে</em> <em>মুসিবত</em> <em>এসেছে</em> <em>সেটাকে</em> <em>দেখতে</em> <em>পাবেন</em><em>।</em> <em>আর</em> <em>এই</em> <em>ভাবে</em> <em>হয়ত</em> <em>আরশের</em> <em>রব</em> <em>আমাদের</em> <em>উপর</em> <em>রহম</em> <em>করবেন</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>عسى ديننا يبقى لنا وصلاتنا كما عاهدونا قبل نقض العزيمة</li>
</ul>
<p><em>আশা</em> <em>করি</em> <em>যে</em><em>, </em><em>চুক্তি</em> <em>ভঙ্গ</em> <em>করার</em> <em>পূর্বে</em> <em>আমাদেরকে</em> <em>যে</em> <em>ওয়াদা</em> <em>দিয়েছিল</em> <em>সেই</em> <em>ওয়াদা</em> <em>মোতাবেক</em> <em>আমরা </em><em>আমাদের</em> <em>দ্বীনকে</em> <em>পালন</em> <em>করার</em> <em>পাশাপাশি</em> <em>নামাজ</em> <em>আদায়</em> <em>করতে</em> <em>পারব</em><em>।</em></p>
<ul>
<li>وإلا فيجلونا جميعاً من أرضهم بأموالنا للغرب دار الأحبة</li>
</ul>
<p><em>অথবা</em> <em>আমাদেরকে</em> <em>আমাদের</em> <em>ধনসম্পদ</em> <em>সহ</em> <em>আমাদের</em> <em>পছন্দনীয়</em> <em>অঞ্চল</em> <em>উত্তর</em> <em>আফ্রিকাতে</em>&nbsp;<em>যাওয়ার</em> <em>অনুমতি</em> <em>দেয়</em><em>।</em></p>
<p><strong>এই মার্সিয়া পড়ার পর আমরা আমাদের যে প্রশ্নে উপনীত হয়েছি তা হলঃ উসমানী সুলতান এই সাহায্যের আবেদনের জবাবে কি করেছিল?</strong></p>
<p>প্রথমত আমি এই কথা বলতে চাই, বিষয়টি এমন নয় যে, উসমানী সুলতান তাঁদের এই সাহায্যের আবেদনে কোন সাড়া দেয়নি। উসমানী রাষ্ট্র কামাল রেইসের নেতৃত্ব ছোট একটি নৌবাহিনী প্রেরণ করে, যদিও তাঁরা মুসলমানদের রক্ষায় কার্যকরী কোন ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এছাড়াও গ্রানাডার মুসলমানদেরকে উত্তর আফ্রিকাতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে উসমানী রাষ্ট্র বারবারসকে সাহায্য করে। গ্রানাডার মুসলিম জাগরণে উসমানী রাষ্ট্র তাঁদের সাহায্যার্থে আলজেরিয়ার উপর দিয়ে যোদ্ধা ও অস্র পাঠায়। অনুরূপ ভাবে ঐ সময়ে আলেজেরিয়ার উপর দিয়ে পাঠানো একটি নৌবহর মারিয়্যা তীরবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়ে ডুবে যায়। এছাড়াও উসমানী রাষ্ট্র ফ্রান্সের সাথে চুক্তি করে স্পেনে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ফ্রান্স পরবর্তীতে চুক্তি ভঙ্গ করে স্পেনের পক্ষ নেয়। এই কথা বলা যায় যে, উসমানী রাষ্ট্র তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রানাডার মুসলমাদেরকে সাহায্য করার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁদের এই প্রচেস্টা গ্রানাডাবাসীকে রক্ষা করার জন্য&nbsp; যথেষ্ট ছিল না।</p>
<p>একই সাথে এই বিষয়টিও ভুলে গেলে চলবে না যে, স্পেন রাজ্য ঐ সময়কার&nbsp; বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে পাশ্চাত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল। ১৫৫২ সাল পর্যন্ত লিবিয়া এবং ১৫৭৪ সাল পর্যন্ত তিউনিশিয়া এই সাম্রাজ্যের দখলে ছিল।</p>
<p>অবস্থা যাই হোক না কেন ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, উসমানী রাষ্ট্র আন্দালুসিয়ার মুসলিম ভাইদেরকে রক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যাহায্য প্রেরণ করতে পারেনি। এই বিষয়টি চারটি ফ্যাক্টরের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা সম্ভবঃ</p>
<p><strong>প্রথমত</strong>, উসমানী স্থলবাহিনীর পক্ষে ইউরোপ কিংবা উত্তর আফ্রিকা হয়ে আন্দালুসিয়ায় পৌঁছা খুব কঠিন ছিল। কেননা তখন উসমানী এমন কোন শক্তি ছিল না যার উপর ভর করে ইউরোপের অনেকগুলো দেশ পাড়ি দিয়ে আন্দালুসিয়ায় যেতে পারবে। অপর দিকে উত্তর আফ্রিকা দিয়ে যেতে হলে মামলুকিদের শাসনাধীন মিশর ও সিরিয়া পাড়ি দিয়ে যেতে হত, সেটাও তখন সম্ভব ছিল না।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত</strong>, ঐ সময়ে উসমানী রাষ্ট্র নৌশক্তিতে খুব বেশী শক্তিশালী ছিল না। মূলত কানুনী সুলতান সুলাইমানের সময়ে বারবারস খায়রুদ্দিন পাশার নেতৃত্বে উসমানী&nbsp; রাষ্ট্র নৌশক্তিতে শক্তিশালী অবস্থায় উপনীত হয়। বলা হয়ে থাকে যে এর পেছনেও ছিল আন্দালুসিয়ার চেতনা। অন্য কোন অঞ্চলে যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে যেন উসমানী রাষ্ট্র তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারে এই জন্যই নৌ-শক্তির প্রতি বিশেষ গুরুত্ত্বারোপ করা হয়। আরও বলা হয়ে থাকে যে, উসমানী রাষ্ট্র কর্তৃক উত্তর আফ্রিকার দেশসমূহের কর্তৃত্ব নেওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল আন্দালুসিয়াকে পুনরুদ্ধার করা।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত</strong>,&nbsp; সাফাভীদের কারণে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধ। ঐ সময়ে উসমানী রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দখল করে নেওয়ার জন্য সাফাভীরা আনাতোলিয়ান অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করত। যার কারণে উসমানী রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যাপক বেগ পেতে হয়।</p>
<p><strong>চতুর্থত</strong>, হয়তবা এটা সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ কারণ। সেটা হল, ফাতিহ সুলতান মেহমেদের পুত্র এবং সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের ভাই, জেম সুলতান ঐ সময়ে পোপের হাতে বন্দী ছিল। আর পোপ জেম সুলতানকে উসমানী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতো।</p>
<p>এখানে&nbsp; দেখা যাচ্ছে যে, যে সকল কারণে ঐ সময়ে মুসলিম উম্মাহ গ্রানাডাবাসীর পাশে দাঁড়াতে পারেনি আজও একই কারণে তিন মাস ধরে সমগ্র দুনিয়ার সামনে ইসরাইল গাজায় যে ভয়াবহ গণহত্যা চালাচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ সেটাকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে। শুধু তাই নয় আজকের মুসলমানগণ তৎকালীন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও এই শক্তিকে তাঁরা নিজেদের জনগণের উপর যুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।</p>
<p>বন্দী সুলতানের ব্যাপারে আসলে, <strong><em>এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ঐ সময়ে একজন জেম সুলতান পোপের হাতে বন্দী ছিল কিন্তু আজকে শত শত সুলতান নিজেদের স্বার্থের কারণে দুশমনের শৃঙ্খলে বন্দী</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>ঐ সময়ে জেম সুলতান হয়ত সরাসরি বন্দী ছিল কিন্তু আজকের সুলতানরা বিভিন্নভাবে বন্দী</em></strong><strong><em>।</em></strong> <strong><em>যার কারণে এদের কেহই গাজার নির্যাতিত</em></strong><strong><em>, </em></strong><strong><em>মাজলুম ভাইদের পাশে দাঁড়াতে পারছে না</em></strong><strong><em>।</em></strong></p>
<p>গাজা আজ সমগ্র মানবতার জন্য এবং একই সাথে সমগ্র উম্মতের জন্য একটি নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। আমরা হয়তবা এর পরের ঘটনাবলীকে গাজা ট্রাজেডির আগে ও গাজা ট্রাজেডির পরে এই ভাবে বিবেচনা করব। এই কারণে ঐতিহাসিক এই মুহূর্তে আমাদের সকলের উপর অর্পিত দায়িত্বকে আমাদের পালন করতে হবে। সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে দোষারোপ করা এবং যালেমদেরকে অভিশাপ দেওয়া হয়ত আমাদের কাছে বেশী প্রিয় হতে পারে , কিন্তু আমাদের নিজেদের দায়িত্ত্ব ও কর্তব্যকেও ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ত্বের&nbsp; ব্যাপারে আল্লাহ অন্যদেরকে নয় আমাদেরকেই প্রশ্ন করবেন। এই কারণে আমাদের নিজেদেরকে পক্ষে যতটুকু সম্ভব সেই দায়িত্ত্বকে সঠিকভাবে পালন করার পাশাপাশি আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিবাদ ও নিন্দাকে অব্যাহত রাখব।</p>
<p>আজকে গাজায় যা ঘটছে সেটা মুসলিম উম্মাহর জন্য এবং একই সাথে সমগ্র মানবতার জন্য একটি ক্রসরোড। মুসলিম উম্মাহ ১৫ শ শতাব্দীতে গ্রানাডা অবরোধের ক্ষেত্রে যে ক্রসরোডের মূখোমূখী হয়েছিল সেই সময়ে প্রত্যাশিত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আন্দালুসিয়ার পতনকে ঠেকাতে পারেনি। আজকেও আমরা একই অবস্থার সম্মুখীন। আজকেও আমরা অপর একটি সভ্যতাকে হারানোর কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। সেটা হল নবীদের পূণ্যভূমি কুদস সভ্যতা। এই সভ্যতাকে রক্ষায় মুসলিম উম্মাহর সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক গাজার&nbsp; বীর সন্তানরা তাঁদের সর্বস্ব&nbsp; দিয়ে লড়ে যাচ্ছে। আজকে যদি আমরা মুসলিম উম্মাহর এই প্রাণকেন্দ্রকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হই তাহলে সমগ্র ইতিহাসকাল জুড়ে আমাদের মান সম্মানও ধুলায় মিশে থাকবে।</p>
<p><strong>সম্মানিত পাঠক পাঠিকা ভাই ও বোনেরা,</strong></p>
<p>ফিলিস্তিনে আজকে যারা লড়ে যাচ্ছে তাঁরা কেবলমাত্র একটি ভূমিকে কিংবা এই দেশকে রক্ষা করার জন্য লড়ছে না। একই সাথে তাঁরা <strong>Absolute Evil</strong> তথা দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণিত একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। আমাদের এই বীর সন্তানরা এই ঘৃণিত শক্তির আসল চেহারাকে উম্মোচিত করে দিয়েছে। এই ঘৃণিত শক্তি দুনিয়াতে আসলে কি চায় সেটার মুখোশকে উম্মোচন করে দিয়েছে। আজকে যায়নবাদীরা শুধুমাত্র গণহত্যায় চালাচ্ছে না, ফিতরাতের সাথে সম্পর্কিত সকল সুন্দর মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা আজ মানব সভ্যতার বিরুদ্ধে ও মানুষের ফিতরাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছে। এই যুদ্ধে হয়ত প্রথমবারের মত বিশ্ববাসী তাঁদের আসল চেহারাকে এত কাছ থেকে অবলোকন করছে। যারা ইবাদতগাহ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, স্কুল, মাদারাসা ও আশ্রয়স্থল সহ এমন কোন স্থানে নেই যেখানে বোমা হামলা চালাচ্ছে না।<br />
<img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Islami-gyane-usuler-dhara-01.jpg" height="133"></p>
<p>অপরদিক থেকে ৭ অক্টোবর থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ ও মানবতা অনেক কিছুই শিখেছে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন হওয়ার পাশাপাশি আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস, জিহাদ, শাহাদাত ও আল্লাহর প্রতি ভরসাকে নতুন করে শিখেছে। বন্ধু ও শত্রুকে সুস্পষ্টভাবে চিনতে পেরেছে এবং ঐক্যের অর্থকে জানতে পেরেছে। <strong>সমগ্র</strong> <strong>গাজা </strong><strong>&nbsp;</strong><strong>মাটির</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>মিশে</strong> <strong>গেলেও</strong> <strong>কোমলমতি</strong> <strong>শিশুদের</strong> <strong>মুখ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>উচ্চারিত</strong> <strong>হয়েছে</strong> <strong>হাসবুন্নাল্লাহ</strong> <strong>ওয়া</strong> <strong>নি</strong><strong>’</strong><strong>মাল</strong> <strong>ওয়াকিল</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>আল্লাহই</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>যথেষ্ট</strong> <strong>আর</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>কতই</strong> <strong>না</strong> <strong>উত্তম</strong> <strong>অভিভাবক</strong><strong>।</strong> এই ছোট ছোট শিশুরা আমাদেরকে শিখিয়ে দিল এই কথার অর্থ কি। তাঁরা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, অর্ধেক খেজুর খেয়েও কিভাবে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে ঈমান ও ইচ্ছার শক্তি কি করতে পারে এবং&nbsp; ঈমানী শক্তির দেওয়া ধৈর্য , দৃঢ়তা, ইস্তিকামাত সকল শক্তির উপর যে বিজয়ী হতে পারে আমাদেরকে এই শিক্ষা দিয়েছে। তাঁরা আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছে যে, সকল সংগঠন, মিডিয়া, চিন্তাধারা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও খেলাধুলা সকল কিছুই আজ একটি গোষ্ঠীর তাবেদার। ন্যাটো ও জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানসমূহসহ তথা কথিত মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মত মূলনীতি সমূহের ক্ষেত্রে যে তাঁরা আন্তরিক নয়, এটা দেখিয়ে দিয়েছে। গ্লোবাল দুনিয়া আমাদের উপর&nbsp; যে সকল চিন্তা, জ্ঞান ও ঘটনাকে সঠিক বলে এত দিন চাপিয়ে দিচ্ছিল সেগুলো যে কৃত্রিমতা ছাড়া আর অন্য কিছু নয় সেটাকে তুলে ধরেছে। গাজা এক অর্থে লিটমাস পেপারের ভূমিকা পালন করেছে, কারা ইনসাফ ও বিবেকের অধিকারী, কারা তাদের ইচ্ছা শক্তিকে হারিয়ে ফেলেছে, কাঁদের হৃদয়ে মোহর মারা হয়েছে এবং কারা অন্ধ হয়ে পড়েছে তাদেরকে বিশ্ববিবেকের সামনে তুলে ধরেছে। পাশ্চাত্যেও যে কত বিবেকবান মানুষ রয়েছে তাঁদেরকে আমাদের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গাজা ওসিলা হয়েছে। ১০৯৬ সালের ক্রসেডের রূহকে খৃস্টান দুনিয়া কিভাবে লালন করে রেখেছে এবং যায়নবাদীদেরকে পাশে নিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে কি কি পরিকল্পনা করেছে সেটাকে সুস্পষ্ট করার ক্ষেত্রে গাজা গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ।</p>
<p>আমি বিশ্বাস করি যে, আজকের দুনিয়া গাজা নামক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে অনেক বেশী ঋণী থাকবে এবং গাজার নিষ্পাপ শিশু, নারী ও আবাল বৃদ্ধা বনিতাদের নিকট থেকে অনেক কিছু শিখবে।</p>
<p style="text-align: center;">&nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp;<strong> ***</strong></p>
<p>আজকে আমরা গবেষণা করছি যে, তৎকালীন সময়ের মুসলমানরা কেন&nbsp; গ্রানাডার পাশে কেন দাঁড়াতে পারে নাই , আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি যে &nbsp;আমাদের নাতিদেরকে &nbsp;যেন এই ধরণের গবেষণা করতে না হয়। তাঁদেরকে যেন এই প্রশ্ন না করতে হয় যে, আমাদের দাদারা কেন গাজাবাসীর পাশে দাঁড়াতে পারে নাই। আজকে যদি আমরা আমাদের দায়িত্বকে পালন করতে ব্যর্থ হই তাহলে ইতিহাসের সামনে, ইজ্জতের অধিকারী গাজাবাসীর সামনে আমাদের কোন বাহানাই চলবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আমাদের রবের সামনে আমরা কি জবাব দেব?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/granada-gaza-and-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13077</post-id>	</item>
		<item>
		<title>গাজার সংকটকালে পশ্চিমাদের স্বরূপ উন্মোচন এবং উম্মাহর কর্তব্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/uncovering-the-character-of-the-west-during-the-gaza-crisis-and-the-duty-of-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/uncovering-the-character-of-the-west-during-the-gaza-crisis-and-the-duty-of-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 21 Dec 2023 12:00:37 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[arab]]></category>
		<category><![CDATA[gaza]]></category>
		<category><![CDATA[genocide]]></category>
		<category><![CDATA[muslim ummah]]></category>
		<category><![CDATA[palestine]]></category>
		<category><![CDATA[আরব]]></category>
		<category><![CDATA[গাজা]]></category>
		<category><![CDATA[ফিলিস্তিন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13021</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রহমানীর রাহীম জালিমের বিচারক এবং মজলুমের সহায়ক শক্তিশালী সেই মহান রবের নামে শুরু করছি। প্রশংসা তাঁর, যিনি সর্বদা নিত্য-নতুন কর্ম সম্পাদন করেন, যিনি মুমিনদের হৃদয়কে অবিচল রাখেন এবং অত্যাচারীদের হৃদয়ে ভীতি সঞ্চার করেন। দরূদ ও সালাম প্রেরিত হোক মানবজাতির]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহির রহমানীর রাহীম</p>
<p>জালিমের বিচারক এবং মজলুমের সহায়ক শক্তিশালী সেই মহান রবের নামে শুরু করছি। প্রশংসা তাঁর, যিনি সর্বদা নিত্য-নতুন কর্ম সম্পাদন করেন, যিনি মুমিনদের হৃদয়কে অবিচল রাখেন এবং অত্যাচারীদের হৃদয়ে ভীতি সঞ্চার করেন। দরূদ ও সালাম প্রেরিত হোক মানবজাতির সর্দার মুহাম্মাদ সা. এর প্রতি।</p>
<p>সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, বিশিষ্ট দায়ীগণ এবং বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম!</p>
<p>আপনাদেরকে ইসলামের সম্ভাষণ জানাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।</p>
<p>আজ এখানে আমরা একত্রিত হয়েছি বর্ণনাতীত আমাদের এই দুঃখটাকে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। গাজায় আমার ভাইয়েরা আজ অবরুদ্ধ ও কারাবন্দি, শিশুরা আজ ক্ষতবিক্ষত এবং বোনেরা আজ নিপীড়িত ও বিতাড়িত। আমাদের নিজেদের এখন প্রশ্ন করা উচিত, আজ এখানে আমরা কোন ভাষায় কথা বলবো! যদিও বা বলি, তাহলে কোন কথাগুলো বলবো!</p>
<p>আমরা কি পশ্চিমা অত্যাচারী রাষ্টের সমালোচনাতেই ক্ষান্ত থাকবো নাকি মুসলিম ঘুমন্ত রাষ্ট্রসমূহের প্রতি চেয়ে থাকবো? নাকি আমরা চুপচাপ বসে থেকে গাজার অধিবাসীদের এমন দুর্বিষহ জীবন প্রত্যক্ষ করে যাবো?</p>
<p>সম্মানিত ভাইয়েরা,</p>
<p>আজ আমি আমার অনুভূতি সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরতে চাই। মহান রবের শপথ, দীর্ঘদিন যাবত আমি এসব ভেবে আসছি। আর এটা কোনো বিষয় না যে, একথাগুলো আমি ফিলিস্তিনের সেনাবাহিনীর সামনে বলবো নাকি গাজার অবরুদ্ধ অধিবাসীদের সামনে বলবো। এমনকি, কেয়ামতের দিনে আমার এসব কথার দায়ভার আমিই নেবো। এসব কথা যেনো সেই সোনালী অতীতে ফিরে যাবার সোপান হয়।</p>
<p>আজ আমি শুধু গাজার অধিবাসীদের নিয়ে কথা বলবো না, অথবা, তাদেরকে শান্তনা দেওয়া বা তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবো না, বরং, আজ আমি সবার মাঝে একটি মেলবন্ধন তৈরি করার বিষয়টির প্রতি নজর দেবো।</p>
<p>গাজার অধিবাসীদের নিকট থেকে আমি ধৈর্য এবং ইস্তিকামাতের শিক্ষা গ্রহণ করি। গাজার নিষ্পাপ শিশুদের অশ্রুর মাঝে আমি ভবিষ্যৎ খুঁজতে থাকি। গাজার মুজাহিদদের সাহসিকতায় আমি বীরত্ব ও সাহসিকতার দর্শন পাই। গাজার অধিবাসীদের ঐক্যের মাধ্যমে আমি বিশ্বভ্রাতৃত্বের আশার সঞ্চার করে থাকি।</p>
<p>তারা আমাদেরকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সম্মান, মর্যাদা, সাহসিকতা ও বীরত্বের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায়, আজকের গাজা আমাদেরকে এমন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যা আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানে পাই না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সম্মানিত উপস্থিতি,</p>
<p><strong>আজ আমি চারটা বার্তা প্রদান করতে চাই।</strong></p>
<p><strong>প্রথম বার্তাটি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি।</strong></p>
<p>সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে আজ পশ্চিমা সভ্যতার বাস্তবরূপ উন্মোচিত হয়েছে। তাদের দ্বিচারিতা, দখলদারিত্ব ও স্বার্থোদ্ধারের স্বভাবগুলো আজ সবার নিকট পরিচিত। পাশ্চাত্যের দখলদারী মনোভাবের কারণে পৃথিবীবাসী আজ বাকরুদ্ধ। তারা লাঞ্ছিত, আল্লাহর কসম, তারা বিতাড়িত। তাদের বর্ণিত ইতিহাসেই তারা লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত। গাজায় আজ যা হচ্ছে, তা মূলত তাদের ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি করছে তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি ও পাশ্চাত্যের কৃত অন্যায়গুলো কারো অজানা নয়। এরপর তারা এই ভূমিকে ইহুদিদেরকে দান করে দিলো। এই ভূমির মালিক তারা নয়। এই ভূমি তাদেরকেই দেওয়া হয়েছে, যারা অত্যাচারী। পশ্চিমারাই ইহুদিদেরকে অত্যাচারী, নিষ্ঠুর এবং খুনী হতে সাহায্য করেছে। এভাবেই তারা সভ্যতার ধ্বজাধারীতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>এই সময়ে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, পশ্চিমারা এখনও ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে দেখে। তারা তাদের আইডিওলজির মাধ্যমে অনেককিছুর সমাপ্তি টেনেছে, আইডিওলজিক্যাল সমাপ্তি, সভ্যতার সমাপ্তি, ইতিহাসের সমাপ্তি। আর আমি বলি, প্রতিটি শিশুর কান্না, প্রতিটি নারীর সম্মান এবং প্রতিটি পুরুষের জীবনের বিনিময়ে আজকের এই সভ্যতার পরিসমাপ্তি হবে গাজার প্রতিটি পাথরের নিচে। পাশ্চাত্যকে সহযোগিতা করা প্রত্যেকের কবর রচিত হবে গাজার এই প্রাঙ্গণ থেকেই।</p>
<p>পশ্চিমা নেতারা ইজরায়েল সফরে আসে। এরপর তারা কী বলে? তারা বলে, একজন জায়োনিস্ট হওয়ার জন্য ইহুদি হওয়া কখনও শর্ত নয়। আর আমি বলি, গাজার অধিবাসীর দুর্দশা বুঝার জন্য শুধু মানুষ হওয়াই যথেষ্ট, ফিলিস্তিন বা আরব অঞ্চলের মানুষ হওয়া শর্ত নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয় বার্তাটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি।</strong></p>
<p>জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে, প্রতিটি দেশের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবে, তারা শুধুমাত্র শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার মাত্র। কিন্তু বাস্তবে, তারা জনগণের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে অত্যাচারীদের শক্তি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। তারা সুপরিকল্পিতভাবেই তাদের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করেছে। তাদের কার্যক্রম গাজার কোনো উপকারে আসেনি। কোনো শিশুর জীবন বাঁচাতেও অবদান রাখেনি। কোনো নারীর অধিকার নিয়েও তারা সচেতন হয়নি। গাজার কোনো মসজিদ এবং হাসাপাতাল রক্ষার ক্ষেত্রেও তারা অবদান রাখেনি।</p>
<p>অন্যদিকে, আমাদের Organisation of Islamic Cooperation (OIC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বায়তুল মাকদিস এবং ফিলিস্তিনকে জায়োনিজমের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আজ জেদ্দার পথে-প্রান্তরেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। লোকদেখানো প্রাতিষ্ঠানিক কিছু কার্যক্রম এবং সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন তাদের মৌলিক কার্যক্রম বাদ দিয়ে বৃহৎ মুসলিম দেশগুলোর সমিতিতে পরিণত হয়েছে। সকল নেতৃবৃন্দের প্রতি (তুরস্কের মন্ত্রীবর্গ-সহ) আমার বক্তব্য হলো, এবিষয়ে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত থাকুন যে, আজকের পর থেকে গাজা শুধু তুরস্কের জন্যই নয়, বরং ফিলিস্তিন-সহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর স্ট্র্যাটেজিকে নিয়ন্ত্রণ করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমার তৃতীয় বার্তা হলো মুসলিম উম্মাহর আলেমগণের প্রতি।</strong></p>
<p>বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম,</p>
<p>উসমানীয় খেলাফত ছিলো মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানের একটি কেন্দ্র, যা আজ হারিয়ে গিয়েছে। পরবর্তীতে আলেমগণ মাযহাব, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক, ভৌগলিক-সহ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ যেনো, একটি আন্দোলন ছিন্নভিন্ন হওয়ার নামান্তর।</p>
<p>আলেমগণ এখন সাধারণ মুসলিমদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে অক্ষম। মুসলিম যুবসমাজের মাঝে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে অক্ষম। আবার, তাদের কেউ কেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। সর্বোপরি, আলেমগণ মুসলম উম্মাহর প্রকৃত অবস্থাকে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। তাহলে কীভাবে আমরা উম্মাহকে একতাবদ্ধ করবো, যেখানে আমরা নিজেরাই শতধা-বিভক্ত? তাহলে কীভাবে আমরা উম্মাহর নিকট থেকে নেতৃত্ব ও প্রতিহতের আশা করবো, যেখানে আমরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ব্যতিব্যস্ত? এমতাবস্তায়, মুসলিম উম্মাহর বিরাট এই সংকটকালে ফিলিস্তিনের জন্য সকল মতাদর্শের আলেমগণকে একত্রিত হবার বিনীত অনুরোধ করছি।</p>
<p><a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/11/মসজিদে-আকসা.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>আমার চতুর্থ বার্তা উম্মাহর যুবসম্প্রদায়ের প্রতি।</strong></p>
<p>হে মুসলিম যুবকেরা,</p>
<p>তোমরাই আগামীর কারিগর। ফিলিস্তিন সংকট এসময় তোমাদের সবচেয়ে বড় ভাবনার বিষয়। এরমাঝেই রয়েছে তোমাদের সম্মান ও মুক্তি। মৌলিক বিষয়াবলীকে পাশে রেখে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়ায়</p>
<p>তোমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম উম্মাহর মুক্তি আন্দোলন সফল হতে পারেনি। কিন্তু, আমি তোমাদের নিকট আশা করবো, তোমার তাদের মতো হয়ো না। তোমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সঠিকভাবে পালন করো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>পরিশেষে স্মরণ করতে চাই গাজার সাহসী অধিবাসীদের।</strong></p>
<p>আপনার ধৈর্য ধরুন, অবিচল থাকুন, একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করুন। এটা ভুলবেন না, মহান রব সর্বদা আপনাদের সাথেই রয়েছে, তিনি কখনও আপনাদেরকে ছেড়ে যাবেন না। আপনারা এখন মর্যাদার আসনে সমাসীন। আপনারাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। আপনাদের ব্যাপারেই রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় একঘণ্টা অবস্থান করা লায়লাতুল কদরে হাজরে আসওয়াদে সালাত আদায়ের চেয়েও উত্তম।</p>
<blockquote><p>আপনারাই অগ্রগামী, যারা আপনাদের বাধা প্রদান করে তারাই নিকৃষ্ট।</p>
<p>আপনারাই সম্মানিত, যারা আপনাদের নিয়ে কথা বলে তারাই লাঞ্ছিত।</p>
<p>আপনারাই সত্যবাদী, যারা আপনাদের ছেড়ে গিয়েছে তারাই মিথ্যাবাদী।</p>
<p>আপনারাই বরং প্রকৃত শক্তির অধিকারী এবং রুকু-সেজদা আদায়কারী।</p>
<p>কেউ আপনাদের পেছন থেকে ক্ষতিসাধন করতে পারবে না, লাঞ্ছিতও করতে পারবে না।</p>
<p>আপনারাই আল্লাহর প্রকৃত সৈনিক, যারাই আপনাদের পেছন থেকে ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তারাই শয়তানের দোসর।</p></blockquote>
<p>হে ইসলামের মাতৃকুল, হে গাজার নারী, হে বীরের জন্মদাত্রী, হে প্রজন্মের বয়বৃদ্ধা!</p>
<p>তোমাদের বীরত্বের সামনে আমরা তুচ্ছ। তোমাদের প্রচেষ্টা এবং অবিচলতার সামনে আমরা পরাজিত। একজন মা সাধারণত একবার জান্নাত লাভ করে থাকেন। কিন্তু আপনারা তিনবার জান্নাত লাভ করে থাকেন। প্রথমবার সন্তান জন্মদান করে, দ্বিতীয়বার তাদেরকে লালনপালন করে, তৃতীয়বার দ্বিধাহীনচিত্তে তাদেরকে শাহাদাতের পথে উৎসর্গ করে।</p>
<p>হে গাজার দুঃসাহসী বালকেরা!</p>
<p>জন্মলগ্ন থেকেই তোমরা মহান, বন্দী থেকেও তোমরা স্বাধীন। নৃশংস শত্রুরা তোমাদের পেছনেই পড়ে রয়েছে। কারণ, মুসলিম উম্মাহর আগামীর কারিগর তোমরা বালকরাই।</p>
<p>হে মুসলিম উম্মাহ!</p>
<p>তোমাদের ভাইয়েরা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তোমাদের আশায় বসে রয়েছে, তোমাদের সহযোগিতা কামনা করে।</p>
<blockquote><p>আমাদের বক্তব্যগুলো কি গাজার শিশুদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করবে?</p>
<p>আমাদের নিরর্থক মন্তব্যগুলো কী গাজার নারীদের রক্ষা করবে?</p>
<p>আমাদের নির্লজ্জ বাণীগুলো কি আমাদের ব্যর্থতাকে আড়াল করবে?</p>
<p>অথবা, গাজার মুজাহিদদের কি সহযোগিতা করবে?</p></blockquote>
<p>গাজার অধিবাসীরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। তারা শুধু আমাদের নিকট থেকে সহযোগিতাটাই কামনা করে। বাস্তবতা হলো, দুর্বিষহ এই সময়ে যদি আমরা এক হতে না পারি, তাহলে আর কখনও আমরা এক হতে পারবো না। ফিলিস্তিনিরা, বিশেষ করে গাজার অধিবাসীরা আজ কঠিন এক মুহূর্ত অতিক্রম করছে। এসময়েই হয় আমরা তাদের সহযোগী হবো নতুবা আমরা বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হবো। এর বাইরে আর কোনো পথ উন্মুক্ত নেই।</p>
<p>মহান রবের নিকট কামনা করি,</p>
<blockquote><p>একে অপরের মাধ্যমে তিনি যেনো আমাদেরকে শক্তিশালী করে তোলেন। আমাদেরকে একে অপরের সহযোগী করে গড়ে তোলেন। আমাদেরকে একে অপরের নিরাপত্তার স্থল হওয়ার সুযোগ প্রদান করেন। গাজার মুজাহিদ এবং বীরসেনানীদের সাহায্য করার তৌফিক দান করেন। তিনি যেনো গাজার শিশু, নারী, অধিবাসী এবং তাদের স্থাপনাগুলোকে রক্ষা করেন। সর্বোপরি, মাসজিদুল আকসার প্রাঙ্গনে বিজয়ের দু&#8217;রাকাত সালাত আদায়কে তিনি যেনো আমাদের জন্য আবশ্যক করে রাখেন।</p></blockquote>
<p>দরূদ ও সালাম প্রেরিত হোক রাসূল সা., তাঁর সাহাবী এবং তার পরিবারবর্গের উপর।</p>
<p>আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ মিফতাহুর রহমান</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/uncovering-the-character-of-the-west-during-the-gaza-crisis-and-the-duty-of-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13021</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী ঐক্য ও জাতীয়তাবাদ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islami-unity-and-nationalism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islami-unity-and-nationalism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আলীয়া ইজ্জেতবেগোভিচ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 04 Jan 2023 12:29:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী ঐক্য]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী ঐক্য ও জাতীয়তাবাদ]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয়তাবাদ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7577</guid>

					<description><![CDATA[আমরা এই কথা বলি যে, আজকের দিনে ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে একটা অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য হলো দুনিয়ার সকল মুসলমান ও সকল মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে নিয়ে একটি ইউনিয়ন তৈরি করা। বর্তমান পরিস্থিতির যে দাবী সেই দাবীর কারণেই মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া, উষ্ণমণ্ডলীয় আফ্রিকা থেকে মধ্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা এই কথা বলি যে, আজকের দিনে ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে একটা অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য হলো দুনিয়ার সকল মুসলমান ও সকল মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে নিয়ে একটি ইউনিয়ন তৈরি করা। বর্তমান পরিস্থিতির যে দাবী সেই দাবীর কারণেই মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া, উষ্ণমণ্ডলীয় আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল ইসলামী ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রাম করা।</p>
<p><em>আমরা যখন এই ভিশনের কথা বলি তখন আমাদের মধ্যকার অনেকেই যারা নিজেদেরকে বাস্তববাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন তাঁরা যে কি পরিমাণ অস্বস্তিবোধ করেন সেটা ভালোভাবেই জানা আছে। আর এই কারণে আমরা আমাদের এই ভিশনকে আরও সুস্পষ্টভাবে ও উচ্চস্বরে তুলে ধরি যেন তাঁদের অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়। মুসলিম জনগণকে নিম্নমানের একটি জীবনধারা গ্রহণে বাধ্যকারী এবং কোন ধরণের উদ্যোগ ও উদ্দীপনার ক্ষেত্রে কোন স্থানদানে অস্বীকারী এই রিয়ালিজম তথা বাস্তবতাকে&nbsp; প্রত্যাখ্যান করছি। </em></p>
<p><strong>রূহবিহীনতা ও দুনিয়াকে শাসনকারী শক্তিবর্গকে তোয়াজ করার ফলে সৃষ্ট এই রিয়ালিজম হল এমন এক চিন্তা যা রাজাদেরকে রাজা ও প্রজাদেরকে আজীবন প্রজা হিসেবেই থাকার দীক্ষা দিয়ে থাকে। ইতিহাস শুধুমাত্র ধারাবাহিক পরিবর্তনের নামই নয়,&nbsp; একই সাথে তা অসম্ভব ও অপ্রত্যাশিতের বাস্তবায়ন হওয়ারও এক উপাখ্যানের নাম। এছাড়াও আমাদের সময়ে আজকে যা বাস্তবতা পঞ্চাশ বছর পূর্বেও এর প্রায় সবকিছুকেই অসম্ভব বলে মনে হত।</strong></p>
<blockquote><p>অবশ্য দুই ধরণের বাস্তববাদিতা দৃশ্যমানঃ একটি হল আমাদের অপরটি হল কাপুরুষ ও রূহহীন মানুষদের।</p></blockquote>
<p>আমাদের মতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হল, মুসলমানগণ তাঁদের অভিন্ন সমস্যাকে সমাধান করার জন্য এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একত্রে ও সমন্বয় করে চলার জন্য কিছু আধি-রাষ্ট্রিক (অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক) ফোরামকে গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে।</p>
<p>আমাদের তথাকথিত বাস্তববাদীদের (কাপুরুষ ও রূহহীন) কাছে এগুলো অবাস্তব। তারা বর্তমান অবস্থাকেই বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। যা আমাদের বাস্তববাদিতার কাছে সামঞ্জস্যহীন ও হাস্যকর। আজকের এই সংযোগ ও কেন্দ্রিকতার যুগেও আরব জাতির তেরটি ভিন্ন জাতি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়া, অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয়েও মুসলিম দেশ&nbsp; সমূহের বিপরীতমুখী অবস্থান নেওয়া,&nbsp; ইথোপিয়া কিংবা কাশ্মীরের মুসলমানদের জন্য হৃদয় বিগলিত না হওয়া, আরব রাষ্ট্রসমূহ ও ইসরাইলের মধ্যকার দ্বন্দ যখন চরম পর্যায়ে সেই সময়েও শত্রুভাবাপন্ন দেশের সাথে ইরানের মত মুসলিম দেশের বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলাসহ আর অনেক বিষয়কে কোন ভাবে গ্রহণ করা যায় না। এখানে যদি অবাস্তব কিছু থেকে তাহল, তবে তা মুসলমানদের ঐক্য নয়, বরং তার অনুপস্থিতি &#8211; বিভাজন ও বিভেদাবস্থা। যা আজ আমরা বাস্তবে দেখতে পাই।</p>
<p>প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সমূহের সাথে যতক্ষণ পর্যন্ত সাংঘর্ষিক না হওয়া পর্যন্ত এমন কোন উদ্দেশ্য নেই যা মানুষের অভিন্ন ইচ্ছা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার দ্বারা বাস্তবায়িত হয় না। আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন এবং তাঁর জন্য শ্রম ব্যয় করা হয়েছে এমন যে কোন ইউটোপিয়া, আর ইউটোপিয়া থাকে না। কিন্তু যারা এটাকে বিশ্বাস করে না এবং এর জন্য পরিশ্রম করতে চায় না তাঁদের দুর্বলতাকে তাঁদের লজ্জাজনক<strong> ‘রিয়ালিজম’</strong> এর মধ্যে খুঁজে ফেরা দরকার। মুসলমানদের ঐক্যকে যারা অবাস্তব ও অলীক স্বপ্ন বলে থাকে তাঁরা মূলত তাঁদের অনুভূত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। এই অসম্ভাব্যতা আসলে বাস্তবের নয় তাঁদের হৃদয়ের। ইসলামী ঐক্যের ধারণা কারো আবিষ্কার নয় অথবা কোনো আদর্শবাদী বা সংস্কারকের নিছক স্বপ্ন বিলাস নয়। ইসলামী ঐক্যের চিন্তা বিধৃত আছে কোরআনের এই বাণীর মধ্যে-&nbsp; <em>মু’মিনগণ হলো পরস্পরের ভাই</em>। এক সাথে রোজা পালন, একটি আধ্যাত্মিক ঐক্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাবা এবং মক্কায় পালিত হওয়া হজ্জের মত বিষয় সমূহ অবিরতভাবে এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের জজবা ও চেতনাকে জাগ্রত রাখে। আর এই কারণেই সমগ্র উম্মাহর মধ্যে সর্বদায় একটি সমজাতীয় সত্ত্বা ও ঐক্যের চেতনাকে জাগ্রত করে রেখেছে। দূরের যে কোন একটি মুসলিম দেশে কোন একটি বিপর্যয় নেমে আসার পর আমরা যদি মুসলিম সমাজকে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে তাঁদের সৌহার্দ ও সহমর্মতা দেখেই আমরা আঁচ করতে পারি যে এই ঐক্যের চেতনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কতটুকু জাগ্রত।</p>
<p><em><strong>আচ্ছা মুসলিম জনগণের মধ্যকার যে চেতনা এই ইসলামী ঐক্যের চেতনা কেন বাস্তব জীবনধারা ও মুসলমানদের রাজনীতির মধ্যে বড় কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না?</strong></em></p>
<p><em><strong>কেননা এটা শুধুমাত্র একটি আবেগ-অনুভূতি হিসেবেই রয়ে যায় এবং অভিন্ন তাকদীর ও স্বার্থের জন্য যে অবস্থান তৈরি হওয়া দরকার সেই অবস্থায় উপনীত হয় না! ফিলিস্তিন, ক্রাইমিয়া, পূর্ব-তুর্কিস্তান, কাশ্মীর কিংবা ইথিওপিয়াসহ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানদের উপর যে জুলুম নির্যাতন চলছে এটা নিয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সমানভাবে ব্যথিত হলেও তাঁদের সে ব্যথা ও নিন্দা কেন কখনোই একটি একশন (কর্মে) পরিণত হয় না? হলেও কেনই বা তা এমন একটি কর্মসূচীতে পরিণত হয় না যেটার মাধ্যমে তাঁদের উপর জুলুম-নির্যাতনের অপসারণ হতে পারে?</strong></em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই প্রশ্নের জবাব হল, পাশ্চাত্যে প্রশিক্ষিত কিংবা পাশ্চাত্য চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত শাসকগোষ্ঠীর সাথে সাধারণ মানুষের চিন্তাধারার তফাৎ। যার কারণে এরা ইসলামী ঐক্যের চেতনা নিয়ে নয় বরং জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোন থেকেই আচরণ করে থাকে। ফলশ্রুতিতে মুসলিম জনগণের জজবা ও ভাবনার জগত বিভক্ত ও বিপরীতমুখী হয়ে পড়েছে। আর অবস্থা এমন হওয়ায় কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং নেতৃত্বের জায়গায় ইসলামী ঐক্যের চেতনাকে যারা লালক করেন এমন নেতৃত্ব না আসলে অবস্থা কোন দিনও পরিবর্তন হবে না।</p>
<p>আর এই কারণে সমকালীন ইসলামী ঐক্যের চিন্তা আমাদের সচেতনতা ও অনুভূতিকে একই সুরে মেলানোর একটি প্রচেষ্টা যা পাশাপাশি দেখিয়ে দেয় আমরা বাস্তবে কি চাই আর কোন বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করি।</p>
<p>এই অবস্থা, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে জাতীয়তাবাদের চরিত্র ও তাঁদের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।</p>
<p>দুনিয়ার সকল স্থানেই জাতীয়তাবাদ জনগণের প্রভাবশালী একটি চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেননা এটা জনগণের চাওয়াকে (ভাষা, লোকগাথা,সঙ্গীত ইত্যাদি)&nbsp; সমর্থনকারী একটি আন্দোলন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। অপরদিকে মুসলিম দেশসমূহে এই বিষয়টি বিকাশটি ব্যহত হওয়ায় অজাতীয়-জাতীয়তাবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শুধু তাই নয় এটা এমন একটি জাতীয়তাবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ&nbsp; করেছে যা জাতীয়তাবাদী কিংবা জনবান্ধব নয়। এর কারণ হল, একদিক থেকে জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উপর প্যান ইসলামী চিন্তার প্রাধান্য লাভ করা এবং অপর দিক থেকে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারাকে ইসলামের একটি বিকল্প হিসেবে দেখানোর কারণে জনগণ শুরুতেই এটাকে অনৈসলামী একটি চিন্তা হিসেবে অভিহিত করেছে। জনগণের অতীত ও ঐতিহ্যের সাথে ( এই ঐতিহ্যে সব সময়েই ইসলামী) এই সকল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্বাভাবিক একটি বিরোধ থাকার কারণে অনেক মুসলিম দেশেই এই সকল জাতীয়তাবাদীরা সাম্রাজ্যবাদীদের পদাঙ্ককেই অনুসরণ করেছে এবং তাঁরা এমন একটি পন্থা অবলম্বন করেছে যা সমাজের রীতি ও প্রথা বিরোধী। যেমন কিছু কিছু আরব দেশে আরবী ভাষার মর্যাদা ও অবস্থান সেই সকল দেশের শাসকদের কাছে ইংরেজী ও ফ্রেঞ্চের চেয়ে বেশী মর্যাদাবান নয়। অর্থাৎ এখনো তাঁরা সাম্রাজ্যবাদীদের পদাঙ্ককেই অনুসরণ করে চলছে। এই ব্যাপারে যদি তাঁরা কিছু করার চেষ্টাও চালায় তবু তাঁরা সফল হতে পারবে না কেননা এই বিষয়ে তাঁরা আন্তরিক নয়। তবে ভবিষ্যতে কেউ হয়ত ভাষার হৃত মর্যাদা ও গৌরবকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে। (একটি উপমাঃ ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনকে দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর ইবরানী ভাষাকে পুনুরুজ্জীবিত করেছে। যদিও এর ইতিপূর্বে এই ভাষা প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><strong>আরবী ভাষাকে ভুলিয়ে দেওয়ার যে পরিকল্পনা এর কারণ খুব সহজেই অনুমেয়। কোরআনে কারীম ও ইসলামী সভ্যতার ভাষা হিসেবে পরিচিত এই ভাষা, আরব কিংবা আরবদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উপাদানের চেয়ে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বড় একটি উপাদান।</strong></p></blockquote>
<p>জাতীয়তাবাদের নেতৃত্বদানকারী এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে তাঁদের মধ্যে থেকেই সৃষ্ট নেতা কিংবা প্রশাসকরা তাদের ভাষায় কথা বলাকে পছন্দ করে এক কালে যারা তাঁদেরকে শোষণ ও নির্যাতন করেছে। প্রকৃত কথা হল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ইসলাম ছাড়া দেশপ্রেম হতে পারে না। এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সমূহের জন্ম অনৈসলামিকতার গর্ভে।এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল মধ্যপ্রাচ্য! এই অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে সিরিয়া ও লেবাননের খ্রিষ্টান বুদ্ধিজীবীরা। এরা আমেরিকান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেছে ( সিরিয়ার প্রোটেস্টান কলেজ ও বৈরুতের St. George University)। তুরস্কে মুস্তাফা কামালের আন্দোলন ও ইন্দোনেশিয়াতে সুকারনোর পঞ্চশীলা আন্দোলন, কিছু কিছু আরব দেশে বাস পার্টি এবং মুসলিম দেশ সমূহের জাতীয়তাবাদীদের ঐতিহাসিক মূলকে যদি অনুসন্ধান করা হয় তাহলে এই একই বিষয় দেখতে পাব। ইসলামী ঐক্যে যে চিন্তা এটা সব সময় মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন হিসেবে মুসলিম জনগণের মনিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে আর জাতীয়তাবাদী চিন্তা সর্বদায় ভিনদেশী চিন্তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।</p>
<p>অর্থাৎ মুসলিম জনগণ জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে গ্রহণ করতে ‘যোগ্য’ নয়। এখন এই বাস্তবতাকে কি অস্বীকার করার উপায় আছে?</p>
<p>ধর্মীয় সমাজের চিন্তা যে জাতীয়তাবাদী চিন্তার ঊর্ধ্বে এই বিষয়টিকে যদি কিছুক্ষণের জন্যও উপেক্ষা করি তাহলেও এই লেখাটি লেখার সময়টিকে যদি বিবেচনায় নেই তাহলে আমার উচিত ছিল আমাদের জনগণকে এই বলে সতর্ক&nbsp; করা যে, ‘ এই যোগ্যতা তথা জাতীয়তাবাদী হওয়ার চিন্তাকে বাদ দিন’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরেও জাতীয়তাবাদী সমাজে বসবাসকারীরাও ধাপে ধাপে বিস্তৃত একটি ভিত্তির উপর একত্রিত হওয়া সম্ভব এমন একটি অভিন্ন জীবন ধারার দিকে এগিয়ে যাবে। বর্তমান সময়েও ফ্রান্স ও জার্মানির দূরদর্শী ব্যক্তিরা তাঁদের নিজেদের জনগণকে কমমাত্রায় জার্মান ও ফরাসী এবং বেশী মাত্রায় ইউরোপীয় হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এই পরামর্শ শুরুতেও একটু অবাস্তব মনে হলেও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠা, বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে গঠনমূলক একটি ঘটনা। সকল প্রকার জাতীয়তাবাদের উর্দ্ধে উঠে গঠিত এই ফোরাম জাতীয়তাবাদের উপর ইউরোপীয় জনগণের প্রথম প্রকৃত বিজয়। জাতীয়তাবাদ; ছোট এমনকি মাঝারি ধরণের রাষ্ট্রের জন্যও অনেক ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি বিলাসীতায় পরিণত হয়েছে।</p>
<p>আধুনিক দুনিয়া এই বিষয়ে এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করছে যার উপমা ইতিহাসে আর পাওয়া দুষ্কর।&nbsp; শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদির জন্য ব্যয় অবিশ্বাস্য রকমভাবে বেড়ে গিয়েছে। ফলশ্রুতিতে এই সকল বিষয়কে বাস্তবায়ন করার জন্য এতবেশী মানব সম্পদ ও উপাদানের প্রয়োজন যে যা ইতিপূর্বে আর কক্ষনো দেখা যায়নি। আর শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, প্রতিরক্ষা এর বিষয় সমূহ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় এটা শুধুমাত্র বড় বড় জাতি কিংবা বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে গঠিত জোট ছাড়া অন্য কারোর পক্ষে এই সকল বিষয়কে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান সময়ে সমগ্র দুনিয়াকে দুইটি বড় বড় জোট শাসন করছে। একটি হল অ্যামেরিকা অপরটি হল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এদের মধ্যে তৃতীয়টি হল ইউরোপ যা আস্তে আস্তে সামনে অগ্রসর হচ্ছে ও নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। যে সমাজ তাঁর দুইশত মিলিয়ন জনসংখ্যাকে একত্রিত করতে পারে না এবং জিডিপিতে দুইশত বিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে পারে না (এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান)&nbsp; এমন একটি সমাজ প্রবাহমান গতিধারার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না এবং তাঁকে তাঁর জন্য পূর্ব নির্ধারিত নিকৃষ্ট অবস্থানেই থাকতে হবে। এই ধরণের সমাজ অন্যকে পরিচালনা করা তো দূরে থাকুক নিজেকেই পরিচালনা করতেই সক্ষম নয়। উন্নয়নের হার আর এই সকল ডাটার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে থাকে। চীন উন্নতি ও অগ্রগতির দিক থেকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের চেয়ে অনেক পেছনে থাকলেও তাঁর বিশাল মানব সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের বদৌলতে আজ তাঁদের সাথে যে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত সেই প্রতিযোগীতায় চীন নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে। এই অবস্থা মুসলিম উম্মাহর উম্মাহর জন্যও একটি বিরাট সুযোগ। কেননা মুসলিম উম্মাহও মানব সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদে অনেক এগিয়ে কিন্তু সে তাঁর এই সকল সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ায় উন্নতি ও অগ্রগতিতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এই বিষয়টি মুসলিম দেশ সমূহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ও পারস্পারিক সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে।</p>
<p>দ্রুতগতিতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি মুসলিম দেশ সমূহের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে দুনিয়াতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশী হল মিশর ও পাকিস্তানে। আনুমানিক দুইকোটি মুসলমান প্রতি বছর দুনিয়াতে আসছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হার যদি মুসলিম দেশ সমূহে চলতে থাকে তাহলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ মুসলিম দেশ সমূহের জনসংখ্যা হবে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুন। অনাগত এমন কোটি কোটি মুসলমানকে সাদরে গ্রহন করে, তাঁদেরকে সঠিকভাবে লালন পালন করে গড়ে তুলে সম্মানজন একটি জীবিকার ব্যবস্থা কি আমরা করতে পারব? জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটার সাথে সমান্তরালভাবে যদি আমাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি না ঘটে তাহলে আমাদেরকে অনেক নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে। বিগত বিশ বছরে জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক কম হওয়ায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের মাথাপিছু আয় আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। মুসলিম জনসংখ্যার এই বৃদ্ধি যখন ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী একটি মুসলিম উম্মাহ গঠনের পেছনে সবচেয়ে বড় একটি শক্তি হওয়ার কথা ছিল, তা না হয়ে আমাদের অব্যবস্থাপনার কারণে আজ তা একটি সংকট ও অসহায়ত্ত্বে পরিণত হয়েছে।</p>
<p><em><strong>একথা দিনের আলোর মত সুস্পষ্ট যে মুসলিম দেশ সমূহ একক ভাবে এই সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এই অবস্থা থেকে মুসলমানদেরকে যে বিষয়টি উদ্ধার করতে পারে সেটা হল ‘ ইসলামী ঐক্য’। এই ইসলামী ঐক্যই পারে মুসলমানদেরকে পশ্চাৎপদতা ও স্থবিরতা থেকে মুক্ত করে নতুন একটি ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার দ্বারকে উম্মোচন করতে। যেই সমস্যাকে আরবগণ, তুর্কীগণ, পার্সিয়ানদের পক্ষে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, সেই সমস্যাকে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।</strong></em></p>
<p>প্রতিটি মুসলিম দেশ কেবলমাত্র তখনই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে ও উন্নতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতে পারবে যখন সমগ্র মুসলিম উম্মাহ-ই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে ও উন্নতি করতে পারবে। কুয়েত ও লিবিয়ার মত ধনী দেশ সমূহ দারিদ্রতা ও দুর্দশার সাগরে সমৃদ্ধির দ্বীপ হয়ে টিকে থাকতে পারবে না। যদি ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও সাহায্য সহযোগীতাকে যদি বৃদ্ধি না করে এবং তাঁদের পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশ সমূহের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে না দেয় এবং স্বার্থপরের মত আচরণ করে তাহলে এটা কি অন্য দেশ গুলোকেও একই আচরণের দিকে ধাবিত করবে না? আর এটা এমন এক বিশৃঙ্খলা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি করবে যা আমাদের দুশমনরা আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়। ধনী মুসলিম দেশ সমূহ, ইসলাম কর্তৃক তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ত্বকে যদি পালন করে তাহলে তাঁরাও তাঁদের স্বার্থকে রক্ষা করতে সমর্থ হবে।</p>
<p>প্রতিটি মুসলিম দেশের সামনে যে বিকল্প রয়েছে এই বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্টঃ হয় অন্য মুসলিম দেশের সাথে পারস্পারিক সাহায্য ও সহযোগিতাকে বৃদ্ধি করে অগ্রগতি ও উন্নতির পথকে নিশ্চিত করে সকল ধরণের সমস্যাকে সমাধান করার চেষ্টা চালাবে আর না হয় প্রতিনিয়ত আরও বেশী পিছিয়ে পড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা শোষিত হবে। আমরা যে আজ ঐতিহাসিক একটি প্রেক্ষাপটে অবস্থান করছি যদি এই সময়ে আমরা ইসলামী ঐক্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে মুসলিম উম্মাহ নতুন একটি মাত্রা পাবে। এই ঐক্যের বানী শুধুমাত্র আদর্শনবাদী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি আকাঙ্ক্ষাই নয়। বর্তমান উম্মাহর জন্য আজ এটি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সমূহের একটি। মুসলিম উম্মাহ যদি আজকের অবস্থার পরিবর্তন চায় এবং সম্মান ও মর্যাদার সাথে বিশ্বদরবারে নিজের প্রাপ্য স্থানকে অধিকার করে নিতে চায় তাহলে এই ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। যে উদ্দেশ্যে কিংবা যে কারণেই হোক না কেন আজকে যারা মুসলিম উম্মাহর এই বিভাজনকে সমর্থন করে তারা বাস্তবিকই অর্থেই মুসলমানদেরকে শত্রুদের পক্ষাবলম্বন করছে। যখন যেভাবেই সুযোগ পাওয়া যাবে সেখানেই ইসলামী ঐক্যের ধারণাকে তুলে ধরতে হবে।</p>
<p><strong>মুসলিম জনগণের মধ্যে ইসলামী ঐক্যের যে সুপ্তবাসনা, সেটা যেন ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক সম্মলিন। যা তাঁকে তাঁর পূর্বপুরুষদের সাথে এক মোহনায় মিলিত করেছে। জাতীয়তাবাদের প্রভাবে যারা প্রভাবান্বিত তাঁরা যদিও এই বিষয়টিকে দেখতে পাবে না। কেননা এই ব্যাপারে তাঁরা ছিন্নমূল।।</strong></p>
<p>অনুবাদক: <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ </a></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islami-unity-and-nationalism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7577</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্ব সমস্যা ও ইসলাম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/world-problems-and-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/world-problems-and-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 16 Nov 2022 14:36:49 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[বিশ্ব সমস্যা]]></category>
		<category><![CDATA[বিশ্ব সমস্যা ও ইসলাম]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7550</guid>

					<description><![CDATA[&#160; সূচনা বর্তমান যুগে দুনিয়ার মানুষ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। মানুষের এই সমস্যার কোন সংখ্যা নেই, নেই কোন সীমা পরিসীমা। সমস্যার ব্যাপকতা ও গভীরতা অন্তহীন। সর্বদিকব্যাপী এ সমস্যার আঘাতে মানবতা আজ জর্জরিত, ক্ষত বিক্ষত। এক কথায় বলা চলে, আজকের মানুষের জীবনের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সূচনা</strong></p>
<p>বর্তমান যুগে দুনিয়ার মানুষ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। মানুষের এই সমস্যার কোন সংখ্যা নেই, নেই কোন সীমা পরিসীমা। সমস্যার ব্যাপকতা ও গভীরতা অন্তহীন। সর্বদিকব্যাপী এ সমস্যার আঘাতে মানবতা আজ জর্জরিত, ক্ষত বিক্ষত। এক কথায় বলা চলে, আজকের মানুষের জীবনের আর এক নাম সমস্যা; শুধু সমস্যাই আজকের মানুষের প্রধানতম পরিচয়।</p>
<p>আজকের মানুষের সমস্যা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে যেমন প্রচন্ডরূপ ধারণ করেছে তেমনি পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর আঘাত আজ অত্যন্ত সাংঘাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মানুষের সমস্যা বিশ্বরূপ লাভ করেছে, বিশ্ব সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মানুষের জীবন-পাত্র সমস্যা-সংঘাতের হলাহলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে।</p>
<p>আজকের মানুষের যেমন খাওয়া পরার সমস্যা তেমনি সমস্যা থাকার, শিক্ষা লাভ করার, সমস্যা চিকিৎসার, সমস্যা কথা বলার, কাজ করার ব্যাপারে স্বাধীনতা না থাকার, সমস্যা সামান্যতম মৌলিক মানবীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার। কেননা আজ মানুষ সাধারণভাবে সব মানুষই এসব অনস্বীকার্য অধিকার হতে বঞ্চিত।</p>
<p>মানুষের এ সমস্যা যেমন বাইরের দিক থেকে, তেমনি মানুষের ভিতরকার দিক থেকেও, মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও। আর এ সমস্যা যেমন নিছক জীব হিসেবে- প্রাণী হিসেবে, আর সব জীব-তথা প্রাণীর মত; তেমনি মানুষ হিসেবে আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে বেঁচে থাকার সমস্যাও আজ জটিল।</p>
<p>মানুষের এ সমস্যা সামগ্রিক সর্বাত্মক। বিশেষ কোন দেশের বিশেষ কোন লোক বা সমাজের নয়, এ সমস্যা হচ্ছে সারা পৃথিবীর মানুষের, দেশ জাতি-শ্রেণী বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের।</p>
<p>মানুষের সমস্যাবলী সম্পর্কে এমনি সামগ্রিক দৃষ্টিতেই আমার এ আলোচনা, বিশেষ কোন দেশ বা শ্রেণীর দৃষ্টিতে নয়। মানবীয় সমস্যা সম্পর্কে এ প্রাথমিক ও মোটামুটি ধরনের কথা কয়টি বলার পর কতগুলি মৌলিক ও প্রধান সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করতে প্রবৃত্ত হচ্ছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অন্ন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বস্ত্র</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বাসস্থান</strong><strong>&#8211;</strong><strong>চিকিৎসা</strong> <strong>ও</strong> <strong>শিক্ষা</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>খাদ্য ও বস্ত্র মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে অপরিহার্য। খাদ্য না হলে যেমন মানুষের জীবন বাঁচেনা, তেমনি মৌসুম উপযোগী বস্ত্র ও পোশাকের ব্যবস্থা না হলে মানুষের কষ্টের অবধি থাকে না। আর লজ্জা ঢাকবার জন্যই প্রয়োজনীয় বস্ত্র না হলে মানুষ পারে না মানুষের মতো মনুষ্যত্বের মর্যাদা রক্ষা করে বাঁচতে।</p>
<p>কিন্তু বর্তমানে দুনিয়ায় এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছে, যারা দু&#8217;বেলা পেট ভরে খেতে পায়না, না খেয়ে থাকতে বাধ্য হয়। তেমনি এমন অনেক মানুষও রয়েছে যারা মৌসুম উপযোগী পোশাক তো দূরের কথা, লজ্জা নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুটুকুও না পেয়ে উলংগ থাকতে বাধ্য হচ্ছে।</p>
<p>কিন্তু দুনিয়ায় বাস্তবিকই কি খাওয়া পরার জিনিসের এত অভাব?</p>
<p>প্রথমেই দুনিয়ার খাদ্য সম্পদ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।</p>
<p>বর্তমানে পৃথিবীর খাদ্যোৎপাদনের পরিমাণ পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি। আজ মানুষের সংখ্যা যত না বেড়েছে- সত্যি কথা এই যে, খাদ্যের পরিমাণ বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি।</p>
<p>১৬৫০ সন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই তিন শতাব্দী কাল সময়ে দুনিয়ার জনসংখ্যা চারগুণ বেশি হয়েছে, আর খাদ্যোৎপাদনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও যন্ত্র পাতির আবিষ্কার উদ্ভাবনী হয়েছে শত শত গুণ বেশি।</p>
<p>১৬৫০ সনের দুনিয়া শিল্প ও বিজ্ঞানের দিক দিয়ে ছিল চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত, কিন্তু আজ মানুষ কয়েক মিনিটের মধ্যেই মহাশূন্যে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারছে, মানুষের তৈরি স্পুটনিক গ্রহজগত দখলের পরিকল্পনা করছে।</p>
<p>নিছক অর্থনৈতিক বিচারেও পৃথিবীতে খাদ্যের কোন অভাব হতে পারে না। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জে, ভি., বার্ণেল (MA.FR. ফিজিঙ্কের অধ্যাপক, বিজ্ঞান এবং অর্থনীতি বিষয়ে বহুসংখ্যক গ্রন্থ প্রণেতা) বলেন:</p>
<p>&#8220;দুই বিলিয়ন একর চাষের জমিকে ইংল্যান্ডের প্রথায় চাষ করলে গোটা দুনিয়ার জনমানবের প্রয়োজনেরও অনেক বেশি ফসল ফলাতে পারা যায়। বার্নেল অনুমান করেছেন বর্তমান দুনিয়ায় প্রায় চার বিলিয়ন একর জমিতে চাষ করা হয় এবং এই পরিমাণ জমিতে ফসল ফলে। চার বিলিয়ন মানে চার শত কোটি একর (এক বিলিয়ন=একশত কোটি)। এই পরিমাণ জমি হচ্ছে সমগ্র স্থলভাগের শতকরা ১২ ভাগ মাত্র। অতএব বাকি জমির একটি নিম্নতম অংশও চাষযোগ্য করা হলে এবং তাতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রথা প্রয়োগ করা হলে যে দুনিয়ায় খাদ্যভাব বলতে কোন জিনিসের নাম গন্ধ পর্যন্ত থাকতে পারে না তা বলাই বাহুল্য।</p>
<p>এত হলো ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু বর্তমানের খাদ্যাভাব সমস্যার সমাধান কি করে করা যেতে পারে? প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে দুনিয়ার সত্যিই কি কোনো খাদ্যাভাব রয়েছে? হিসেব করে দেখলে দেখা যাবে, খাদ্যাভাব বলতে কোন জিনিস বর্তমানেও থাকতে পারে না। সি বি ফাস্ট (পলিটিক্যাল জিওগ্রাফী বিশেষজ্ঞ) বলেছেন। বর্তমানে যত পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয়, তা থেকেও এখনকার জনসংখ্যার তিন গুণ বেশি লোককে খাওয়ানো চলে।</p>
<p>ফাস্ট-এর একথা নিছক অনুমানভিত্তিক নয়, বাস্তব অবস্থার সতর্ক পর্যালোচনা ও সূক্ষ্ম হিসেব নিকেষের উপর ভিত্তি করেই তিনি একথা বলেছেন। কাজেই একথায় কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না যে, দুনিয়ায় মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভাব বলতে কিছুই নেই।</p>
<p>কিন্তু তবু মানুষ-বহু মানুষ, কত মানুষ, তার সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব নয়- আজ না খেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। খাদ্য সম্পদের এই বিপুল প্রাচুর্যের পরিপ্রেক্ষিতে মানবতার একাংশের এক বিরাট অংশের না খেয়ে থাকার বাস্তবিকই কোন কারণ রয়েছে। সে কারণ যে কি, তা পৃথিবীর মানব দরদী চিন্তাশীলদেরই বিচার্য।</p>
<p>পৃথিবীতে খাদ্যাভাব নেই, আছে খাদ্যের প্রাচুর্য। এ সত্ত্বেও যে মানুষ উপোস থাকতে বাধ্য হচ্ছে তার মূলে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। খাদ্য সম্পদের অপচয়, বিনষ্টকরণ এবং প্রয়োজন ভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থার অভাব এ কয়টিই তার মধ্যে প্রধান উল্লেখযোগ্য কারণ।</p>
<p>আমেরিকা প্রতি বছর লাখ লাখ টন খাদ্য নষ্ট করছে মুনাফার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য। ব্রাজিলের &#8216;ন্যাশনাল কফি কাউন্সিল&#8217; নিয়মিতভাবে উৎপন্ন কফি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে থাকে। কিংবা আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ১৯৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তুলোর উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয় এবং উৎপন্ন তুলো নষ্ট করে ফেলার জন্য কৃষকদের জমির পরিমাণ অনুপাতে এক সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়।</p>
<p>১৯৪০-৪২ সনে মূল্য কমে যাওয়ার দরুন মুনাফার পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার ভয়ে বিপুল পরিমাণ উৎপন্ন আলু সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। এইভাবে দুনিয়ার মানুষের খাদ্য ও নিত্যব্যবহার্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদীর যে অপচয় করা হয়, নষ্ট করে দেয়া হয়, তার সঠিক হিসেব করা আজও সম্ভব হয়নি। আর মুনাফা কম হওয়ার ভয়ে জরুরি জিনিসের উৎপাদন কমিয়ে দেয়া তো বর্তমানে দুনিয়ায় জাতিসমূহের জাতীয় মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>অথচ আল্লাহ তায়ালা এই জমি সৃষ্টি করেছিলেন এই জন্যে যে, যত বেশি সম্ভব ফসল ফলাতে হবে, উৎপন্ন ফসল সকল মানুষের মধ্যে ইনসাফ সহকারে বণ্টন করতে হবে। কোন জমিকে বেকার ফেলে রাখার কোন অধিকার কারো থাকতে পারেনা। জমির উৎপন্ন ফসল নষ্ট করে নিয়ে মানুষকে Essential Commodity থেকে বঞ্চিত করে অস্বাভাবিক মানে মূল্য বৃদ্ধি করে বিপুল মুনাফা করার অধিকারও কারোরই থাকতে পারে না।</p>
<p>কাজেই একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, দুনিয়ায় না খাবার অভাব আছে, না পরিধেয় বস্ত্রের অভাব, না বস্ত্র তৈরির উপাদনের কোন অভাব। কিন্তু তবু মানুষ না খেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে খাবার কিনতে পারে না বলে, প্রয়োজনীয় বস্ত্র সংগ্রহ করতে পারছেনা তা কিনবার সামর্থ্য নেই বলে। অর্থনীতিবিদ কার্লাইল লিখেছেন: “এক শ্রেণীর লোক চিৎকার করছে তাদের তৈরি বিশ লক্ষ জামা বেকার পড়ে আছে, তার খরিদ্দার কেউ নেই; আর অপর দিকে বিশ লক্ষ লোক চিৎকার করছে তাদের কাছে শরীর ঢাকবার মত বস্ত্র নেই বলে।” অথচ দুনিয়ায় এমন কোন নীতিও গ্রহণ করা হচ্ছে না, এমন ব্যবস্থাও অবলম্বন করা হচ্ছে না, যার অনিবার্য ফলে প্রত্যেকটি মানুষই তার খাদ্য ও বস্ত্র আপনা থেকেই লাভ করতে পারে। দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রও এর দায়িত্ব নিজ থেকে গ্রহণ করছে না।</p>
<p>খাওয়া পরার ব্যাপারে দুনিয়ার মানুষের এই বঞ্চনা যে কত ব্যাপক, তা দুনিয়ার সেরা ধনীদেশ আমেরিকার অবস্থা দেখলেই স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়।</p>
<p>আমেরিকায় সম্প্রতি বেকার লোকের সংখ্যা (রয়টার পরিবেশিত খবর অনুযায়ী) ৪৫ লক্ষ ৪০ হাজারের উর্ধ্বে এবং সেখানে এক বেলা না খেয়ে থাকে এমন লোকের সংখ্যা (প্রেসিডেন্ট কেনেডির ভাষায়) ১ কোটি ৭০ লক্ষ মার্কিন নাগরিক। আর আড়াই কোটি আমেরিকান পুষ্টিকর খাদ্য না পেয়ে অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।</p>
<p>অথচ আমেরিকা হচ্ছে সবচেয়ে বড় ধনী দেশ। দুনিয়ার শতকরা ছ&#8217;ভাগ লোক মাত্র আমেরিকায় বাস করে, আর খাদ্য শষ্য সেখানে উৎপন্ন হয় দুনিয়ার তুলনায় শতকরা ২০ ভাগ। দুনিয়ার স্বর্ণপুঁজির শতকরা ৮০ ভাগ ও রৌপ্যপুঁজির শতকরা ৬০ ভাগ আমেরিকার হাতে নিবদ্ধ ।</p>
<p>তা সত্ত্বেও আমেরিকায় যদি অত লোক বেকার হয়ে থাকে, অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে বা না খেয়ে থাকতে বাধ্য হয়, তাহলে দুনিয়ার অন্যন্য দেশে-বিশেষ করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনুগত দেশের লোকদের অবস্থা যে কিরূপ মারাত্মক, তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>দুনিয়ার মানুষের থাকার সমস্যার কথাও আমরা এরই সঙ্গে দেখে নিতে পারি। আজ অনেক মানুষ ফুটপাতে, গাছের তলায় বা ছাদহীন ঘরে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘের সামাজিক কমিটিতে সেক্রেটারি জেনারেলের পেশ করা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, বিশ্বের সাড়ে ১২কোটি থেকে ১৭ কোটি পরিবারের বাসগৃহ নেই। এ অবস্থায় তারা বৃষ্টির পানিতে ভিজে, রৌদ্রের উত্তাপে শুকায়। পুত্র পরিজন নিয়ে এ অবস্থায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটানো যে কত মর্মান্তিক, তা আর কি বলবো। কিন্তু এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে শুধু এই যে, তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা নেই বলে জমি কিনতে পারছে না, নিজস্ব জমি নেই বলে নির্মাণ করতে পারছে না নিজের জন্য বসবাসের স্থায়ী কোন ঘর। শুধু তাই নয়, দুনিয়ার অনেক মানুষই পায় না গৃহনির্মানের প্রয়োজনীয় উপাদান ও সামগ্রী।</p>
<p>অথচ না আছে দুনিয়ায় জমি-জায়গার কোন অভাব, না আছে দ্রব্য-সামগ্রী ও উৎপাদনের কোন কমতি। বিভিন্ন দেশে বিভক্ত এই দুনিয়ার কোন কোন অংশে রয়েছে সীমাহীন জনশূন্য এলাকা, আয়তনের তুলনায় লোকসংখ্যা সেখানে কম, যেমন আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ। আবার অনেক দেশে লোকবসতি প্রতি বর্গমাইলে আটশ থেকে দু&#8217;হাজার পর্যন্ত। ঘনবসতির এলাকার লোকদের এই জনশূন্য এলাকায় বসবাস করতে দেওয়া হলে দুনিয়ায় শুধু আজই নয়- কোন দিনই বোধ হয় স্থানাভাব ঘটতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন দেশের জাতীয় রাষ্ট্রগুলোই এ পথের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।</p>
<p>গ্রেট বৃটেনের রয়েল সোসাইটি অব হেলথ এর প্রেসিডেন্ট ও স্বাস্থ্য বিশারদ বলেন: দুনিয়ার জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান করার জন্যে লোকদের উচিত পৃথিবী ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য গ্রহলোকে বসবাস করতে চেষ্টা করা। প্রতি বছর দুনিয়ায় এত সংখ্যক লোক বৃদ্ধি পাচ্ছে, যত লোক বর্তমানে রয়েছে বৃটেনে। কাজেই অপরাপর গ্রহজগতে বসবাস শুরু না করলে দুনিয়ার লোকবসতি সমস্যার সমাধান হতে পারে না।</p>
<p>আমাদের মতে অপরাপর গ্রহলোকে বসবাস শুরু করার প্রয়োজন এখনি দেখা দেয়নি। বর্তমান সময় পর্যন্ত এই ভূপৃষ্ঠেই এখনকার জনসংখ্যার তিন গুণ বেশি লোকের বাস হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার পরিধি বর্তমান অপেক্ষা চারগুণ বড়। কিন্তু জনসংখ্যা হচ্ছে এক কোটির কম। এই বিরাট মহাদেশে যদি দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে লোক সরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়, তবে সেখানেই একশত কোটি লোক বাস করতে পারে। কানাডা ও আমেরিকার আয়তনও বিপুল ও বিশাল, সেখানেও ঘন বসতির এলাকা থেকে লোক সরিয়ে নেয়া যেতে পারে। সউদী আরবের আয়তন ভারতের এক চতুর্থাংশ মাত্র, আর জনসংখ্যা নব্বই লাখের বেশি নয়। সেখানে যদি ঘনবসতির মুসলিম এলাকা থেকে লোক সরিয়ে নিয়ে বাস করতে দেয়া হয়, আর সেজন্যে বার্ষিক কোটা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, তবে সেখানেই বিশ কোটি মানুষ খুব সহজেই বাস করতে পারে। আফ্রিকার বিরাট ভূখন্ড প্রায় শূন্য পড়ে আছে, একে বসবাসের উপযুক্ত করে তোলা হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত স্থানাভাব থাকবে না ।</p>
<p>শিক্ষা মানুষের বুনিয়াদী প্রয়োজনের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাই মানুষকে অপরাপর জীব থেকে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য দান করে, মানুষ লাভ করে মনুষ্যত্ব। এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকলে মানুষ পশুত্বের স্তর থেকে উর্ধ্বে উন্নীত হতে পারে না।</p>
<p>কিন্তু এই অপরিহার্য শিক্ষা থেকে দুনিয়ার অধিকাংশ লোকই আজ বঞ্চিত। অথচ দুনিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় নেই এমন কথা নয়। তবুও সাধারণভাবে দুনিয়ার মানুষ যে তার মৌলিক প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাচ্ছেনা এতেও কোন সন্দেহ নেই। কেননা দুনিয়ার অধিকাংশ লোকই শিক্ষা লাভের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সম্বল থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া এমন অনেক দেশও রয়েছে যেখানে বিশেষ পলিসি করে সাধারণ মানুষকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে, আর সৃষ্টি করা হচ্ছে একশ্রেণীর জর্জ বড়লোক। ফলে বলা যেতে পারে যে, শিক্ষা দুনিয়ায় এখনো কেবল মাত্র বড়লোকদেরই ভাগ্যলিপি, আর গরীব জনসাধারণ এক্ষেত্রেও অন্যান্য হাজারো ক্ষেত্রের মত চির অবহেলিত।</p>
<p>এ সম্পর্কে আর একটি কথা। দুনিয়ার মানুষ শিক্ষা আদৌ পাচ্ছেনা। একথাও অবশ্য নয়। হয়ত দুনিয়ার শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকদের সংখ্যা গুণেও শেষ করা যাবে না। কিন্তু যে শিক্ষা তারা পাচ্ছে, তা আর যাই হোক, মানুষকে &#8216;মানুষ&#8217; করে না, মনুষ্যত্ব শিখায় না, মানুষ হিসাবে জীবন, যাপন করা-বসবাস করার শিক্ষা দেয় না। বর্তমানে যে শিক্ষা মানুষকে দেয়া হচ্ছে, তা মানুষকে পাখী বা জন্তু জানোয়ারের জীবন যাপন করার পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। বর্তমানের শিক্ষা মানুষকে পাখীর মতো শূন্য লোকে উড়বার, সমাজ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হিংস্র জন্তুর মত বিচরণ করার এবং অতল সমুদ্রে কুমির হাঙরের মত সাঁতার কাটার কৌশল শিখায়, এ ব্যাপারে দক্ষতার সৃষ্টি করে- এসবই ঠিক, কিন্তু তা মানুষ সুলভ গুণপনা ও জ্ঞান বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে জাগায় না।</p>
<p>রোগে-অসুখে চিকিৎসা লাভের অধিকার মানুষের সাধারণ অধিকার। কিন্তু দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ ও সমাজে সর্বসাধারণের এই অধিকার সাধারণভাবে স্বীকৃত হলেও কার্যত তাদের সে অধিকার দেয়া হয় না।</p>
<p>প্রায় দেশেই দেখা যায়, চিকিৎসা লাভের সুষ্ঠু ও উচ্চতম সুযোগ-সুবিধে কেবল বড় লোকেরাই পেয়ে থাকে। যাদের টাকা আছে তারা যেমন নিজস্বভাবে অর্থ খরচ করে চিকিৎসা লাভ করতে পারে তেমনি সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগও অবাধে ও পূর্ণমাত্রায়ই গ্রহণ করতে পারে তারাই। কিন্তু যাদের অর্থ নেই, তারা যেমন নিজস্বভাবে ডাক্তারের ডিজিট ও ঔষধের মূল্য আদায় করতে সমর্থ হয় না, তেমনি সরকারি ব্যবস্থাপনার সুবিধেটুকুও তারা ভোগ করবার সুযোগ পাচ্ছে না। এর মূলে সরকারি নীতির ভুলই একমাত্র কারণ নয়, চিকিৎসকদের এবং ঔষধ ব্যবসায়ীদের মহানুভবতা, মানবপ্রীতি ও জনসেবা সুলভ মনোবৃত্তির অভাব এবং তাদের অপরিসীম অর্থলোলুপতাও এক্ষেত্রে প্রচণ্ডভাবে কাজ করে, তাতে সন্দেহ নেই।</p>
<p>বস্তুতঃ বিশ্বমানবের মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে মানুষের এই মর্মান্তিক অবস্থা মানুষের পরস্পরে এই অমানুষিক তারতম্যই আজ এক বিরাট ও মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের এ সংকট এ সমস্যার আলোচনা বিশ্বপর্যায়ে অনুষ্ঠিত হলেও এর সমাধানের কোন কার্যকরী পন্থা গ্রহণ আজও সম্ভব হয়নি, মানুষের জীবনকে এ সংকট থেকে মুক্ত করা আজও এক সুখস্বপ্নেই পরিণত হয়ে রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>পারিবারিক</strong> <strong>জীবনের</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>পারিবারিক জীবন মানব জীবনের এক প্রাথমিক ও ভিত্তিমূলক দিক, বিক্ষুব্ধ জীবন-সমুদ্রে পরিবার হচ্ছে নোঙর বিশেষ, শ্রান্ত-ক্লান্ত দূরপথের যাত্রীর জন্য এ হচ্ছে পান্থশালা।</p>
<p>পারিবারিক জীবনের মূলকথা হচ্ছে শান্তি, স্থিতি, গভীর বিশ্বাস ও ঐকান্তিক নির্ভরতা। যে পরিবারে এ ভাবধারা যথাযথভাবে বর্তমান, সে পরিবার মানুষের জীবনে বয়ে আনে অফুরন্ত কল্যাণের প্রস্রবণ। আর যেখানে তা নেই, সে পরিবার জাহান্নামের শামিল, জ্বালা-যন্ত্রণার তুষানল ।</p>
<p>বর্তমান সময় বিশ্ব মানবের পারিবারিক জীবন সাধারণ বিচারে দেখা যায় অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। পরিবার থেকে বিদায় নিয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা, শান্তি ও নির্ভরতা। তার প্রতি রক্ত কণিকায় মিলেমিশে গেছে পুঞ্জ পুঞ্জ অবিশ্বাসের বিষ। আর তা সংক্রমিত হয়ে জর্জরিত করে তুলেছে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান এবং পিতা ও মাতাকে। এক কথায় আজকের মানুষের পরিবার এক চরম ভাঙন ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক থেকেই সূচনা হয় একটি পরিবারের কিন্তু আজ সে সম্পর্ক শিথিল হয়েছে। আজ স্বামীর বিশ্বাস নেই স্ত্রীর প্রতি, স্ত্রীর কোন আস্থা-বিশ্বাস নেই স্বামীর উপর। উভয় উভয়কে সন্দেহের চোখে দেখতে বাধ্য হচ্ছে। হচ্ছে এই জন্যে যে, স্বামী নিজ স্ত্রীর অজ্ঞাতসারে কিংবা তার চোখের সম্মুখেই পরস্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছে, কাঁধ ও নিতম্বের উপর হাত রেখে নাচছে, রাত কাটাচ্ছে ভিন্ন মেয়েলোকদের সাথে। মিটিং করছে, ভ্রমণ করছে, পার্টিতে যাচ্ছে। স্ত্রীও আজ স্বাধীনা, স্বেচ্ছাচারিণী। ভিন পুরুষের সাথে বন্ধুতা পাতাচ্ছে, প্রীতি করছে, সান্ধ্যবিহারে যাচ্ছে, নাচের আসরে মিলিত হচ্ছে, নাচছে পরের হাতে হাত দিয়ে, বুকে বুক দিয়ে। অভিনয়ে ভিন্ন পুরুষের প্রেমিকা সাজছে, স্ত্রীর ভূমিকা অবলম্বন করছে। এরূপ অবস্থায় না স্ত্রী নিজকে স্বামীর নিকট অকৃত্রিম নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা সহকারে সপে দিতে পারে, না স্বামী এরূপ স্ত্রীকে একান্ত আপনার বলে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারে। অথচ দাম্পত্য জীবনের মাধুর্য এর ভিতরেই নিহিত। পারিবারিক সংস্থার স্থিতি এরই উপর নির্ভরশীল।</p>
<p>ফ্রান্সের একটি ঘটনার কথা সংবাদপত্রে পড়েছিলাম। স্বামী সারা রাত নাইট ক্লাবে কাটিয়ে ঘরে ফিরে দেখতে পায় তারই স্ত্রী অপর এক অপরিচিত পুরুষের কণ্ঠলগ্ন হয়ে শুয়ে আছে।</p>
<p>এরূপ অবস্থায় কোন স্বামীই মাথা ঠিক রাখতে পারে না, তা বলাই স্বামী স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তোমার কাছে এ কে শুয়ে আছে?</p>
<p>স্ত্রী কিন্তু এ প্রশ্নের জওয়াব দেয়ার কোন দায়িত্বই বোধ করে না, না পায় কোন ভয়। সে পাল্টা প্রশ্ন করে বসে সারারাত কোথায় কাটিয়েছে?</p>
<p>এ কেবল একটি পরিবারেরই ব্যাপার নয়, পশ্চিমা দেশ ও পাশ্চাত্য সভ্যতায় প্রভাবান্বিত দুনিয়ার প্রায় সব পরিবারেরই এই ছবি। স্বামী নিজ বিবাহিতা স্ত্রীর ধার ধারে না, স্ত্রী পরোয়া করে না স্বামীর। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইচ্ছা মত বিপরীত লিংগের বন্ধু জোগাড় করে নেয়, আর বিচরণ করে বেড়ায় যত্রতত্র। এর ফলে সমাজে জারজ সন্তানের জন্ম হচ্ছে গণ্ডায় গণ্ডায়। আমেরিকাতেই এসোসিয়েটেড প্রেস অব আমেরিকার রিপোর্ট মতে, প্রতি বৎসর জারজ সন্তানের জন্ম হয় দু&#8217;লাখেরও বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী শিশু সদন ব্যুরোর প্রধান মিসেস ক্যাথারিন বি, ও টিপার এর বিবৃতি অনুযায়ী বর্তমানে তাদের সংখ্যা ১,৪১,৬০০ হতে ২,০৮,৭০০ এর কোঠায় উন্নীত হয়েছে।</p>
<p>মানব শিশুর লালন পালন ও শিক্ষাদীক্ষা দানের দৃষ্টিতেও পারিবারিক জীবনের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। এক কথায় পিতামাতার গভীর অকৃত্রিম স্নেহ মমতা দরদপূর্ণ লালনপালন ব্যতীত মানব শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ, উৎকর্ষ সাধন ও অগ্রগতি বিধান সুষ্ঠুরূপে আদৌ সম্পন্ন হতে পারে না। কিন্তু আজকের মানব শিশু পিতা-মাতার এ লালন-পালন থেকে বঞ্চিত। মা মার্কেট করছে, মিটিং ও পার্টিতে শরীক হচ্ছে, সিনেমা থিয়েটার বিচিত্রানুষ্ঠানে নাচে অংশ গ্রহণ করে বেড়াচ্ছে, নাইট ক্লাবে রাত কাটিয়ে দিচ্ছে, কোন কোন মা আবার দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর শিশু সন্তানের লালন পালন ও দেখাশোনা সর্বতোভাবে সোপর্দ করে দিয়েছে ধাত্রীর উপর, দাসীর উপর। মা অফিসে বা কারখানায় কাজ করছে, আর শিশু-সন্তান বাড়িতে পড়ে থেকে ক্যাঁ ক্যাঁ করছে, কিংবা চাকর বাকর তার দেখা শোনা করছে। অথবা কিন্ডারগার্টেনে আর কোন কোন দেশে জাতীয় শিশু তহবিলে জমা করে দেয়া হচ্ছে।</p>
<p>এর ফলে যে আগামী মানব সমাজ গড়ে উঠছে, তাদের যেমন ব্যক্তিত্ব গঠন হচ্ছে না, তেমনি মজবুত হতে পারছে না তাদের নৈতিক মেরুদণ্ড। সব হতচ্ছাড়া ভ্যাগাবন্ড, লম্পট বদমায়েশ বা শয়তান প্রকৃতির মানুষ তৈরি হচ্ছে।</p>
<p>পশ্চিমা দেশগুলোতে ভবিষ্যৎ বংশধর কিরূপে গড়ে উঠছে, তা সঠিকরূপে আন্দাজ করার জন্যে নিম্নে একটি সাম্প্রতিক খবরের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি,</p>
<p>&#8220;হটিংটন: গত শুক্রবার রুবালকরেজ কলেজের ১৬ বৎসর বয়স্কা ছাত্রী শরেনডান একটি দোনালা বন্দুক দিয়ে তাহার পিতা সিভটরডান এবং মাতা রোজকে হত্যা করে। ইহার ফলে নিজে এবং তাহার ১২ হইতে ২০ বৎসর পর্যন্ত বয়সের ৬ জন ভাইবোন এতিম হইয়া পড়ে।</p>
<p>এই হত্যাকাণ্ডের কারণ স্বরূপ উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ছাত্রীটির পিতামাতা তাহাকে তাহার প্রেমিকের সঙ্গে সঙ্গদানের অবকাশ দিতে আপত্তি করে ও ছোট ভাই বোনদের দেখাশোনা করতে বলে। (দৈনিক আজাদ, ২২শে মে ৬১)”</p>
<p>দাম্পত্য জীবনের বন্ধন আজ শুধু শিথিলই হচ্ছে না, স্বামী স্ত্রীর উভয়ই একে অপরের নিকট অসহ্য হয়ে উঠছে। একজন অপর জনের কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করছে। স্বামী হয়তো স্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ব্যভিচার বা পরপুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কের মিথ্যে অভিযোগ তুলছে, আবার কোথায়ও স্ত্রী তুলছে স্বামীর বিরুদ্ধে এই জঘন্য অভিযোগ। আর এ উপায়েই একজন অপর জনের কাছ থেকে রেহাই পেতে চাচ্ছে।</p>
<p>এরই ফলে তালাকের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এক আমেরিকাতেই প্রতি তিনটি বিয়ের একটি অবশ্যই তালাকে পরিণত হচ্ছে। আর যেখানে সহজ উপায়ে তালাক লাভ সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে একজন অপরজনকে নিজ হাতে কিংবা অপর লোকের সাহায্যে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করছে না।</p>
<p>আজকাল এমন ঘটনাও ব্যাপকভাবে ঘটছে যে বয়স্কা মেয়ে কোন পুরুষ বন্ধুর সাথে পালিয়ে যাচ্ছে এবং কোথায়ও বা বিবাহিত হয়ে একত্রে থাকতে শুরু করছে, আর কোথাও বিবাহ ব্যতিরেকেই একত্রে থাকছে, সন্তান জন্মাচ্ছে। এমনও দেখা যায়, বাড়িতে কাউকে Paying guest রাখা হয়েছে- সে সুযোগে আপনার স্ত্রীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হচ্ছে আর সে আপনার স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। মোটামুটিভাবে এই অবস্থাই চলছে দুনিয়ার প্রায় সব বড় বড় সভ্য দেশে। মুসলিম জাহানেও পশ্চিমী সভ্যতার প্রভাব পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক জীবনে এমনি ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিতে শুরু করেছে, সে দেশে ঠিক যেসব অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বিগত একশ দেড়শ বছরের ইতিহাসে, মুসলিম জাহানে আজ সেগুলোই দেখা দেওয়া সবে মাত্র শুরু হয়েছে।</p>
<p>কোন কোন দেশে সরকারি নির্দেশ বলে পারিবারিক সংস্থা ভেঙ্গে দিয়ে সেখানে &#8216;কমিউন&#8217; প্রথার প্রচলন করা হয়েছে। কমিউনগুলো হচ্ছে ঠিক গুরু-মেষ, ছাগল প্রকৃতি গৃহপালিত পশুর হাধালের মত, একই স্থানে খাওয়া-থাকা মুতা-শোয়া&#8217; সব চলছে। মানুষ সেখানে সর্বতোভাবে পশুর স্তরে নেমে গেছে। কিন্তু মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়া মানবীয় সমস্যার সমাধান নয়। মানুষের জীবনে তাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এমন আরো অসংখ্য সমস্যা যার কোন সমাধানই খুঁজে পাওয়া যায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সামাজিক</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>বর্তমানে মানুষের সামাজিক জীবন অসংখ্য জটিলতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, সামাজিক জীবনে দেখা দিয়েছে নানাবিধ  সমস্যা। মানুষ স্বভাবতঃই সামাজিক জীব হওয়া সত্ত্বেও এই সমাজ ও সামাজিক ক্ষেত্রই আজ মানুষের পক্ষে দুঃসহ হয়ে উঠেছে। এমন সব অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে মানুষ আর সঠিকভাবে সামাজিক জীবন যাপন করতে পারছে না, সামাজিক জীবনের মর্যাদা, শান্তি ও সমৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>সামাজিক জীবনে স্বাভাবিক শান্তি মর্যাদা ও কল্যাণ লাভের জন্য সর্বপ্রথম বুনিয়াদী জিনিস হচ্ছে মানুষের ঐক্য- মানুষের একত্ব, সমাজের সকল মানুষ যে এক অবিভাজ্য, বংশ, বর্ণ, ভাষা, অর্থ, ভৌগলিক, আঞ্চলিকতা ও মর্যাদার নিক দিয়ে তাদের মধ্যে যে থাকতে পারে না কোন বিভেদ ও বৈষম্য, একথা আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। বরং আজকের মানুষ এসব দিক দিয়েই যেমন খণ্ড বিখণ্ড, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন, তেমনি বিভেদ বৈষম্যের অসংখ্য প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে মানুষের মধ্যে। ফলে মানুষের মধ্যে যেমন নেই ঐক্য, তেমনি নেই সকল মানুষকে এক ভাবা, সমান মনে করার ভাবধারা।</p>
<p>প্রথমে বংশভিত্তিক বিভেদের কথাই বলা যাক। বংশীয় আভিজাত্যবোধ অতীত কালের মত বর্তমানেও প্রচণ্ড আকার ধরণ করেছে। ছোট পর্যায়ে দেখা যায়, সৈয়দ, মোগল, পাঠান ইত্যাদি বংশের লোক অন্যান্য বংশোদ্ভূত লোকদের ঘৃণার চোখে দেখে থাকে, হীন ও নীচ মনে করে। এদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে যেমন তারা রাজি হয় না, একত্রে উঠা বসা ও খাওয়া দাওয়া করতেও প্রস্তুত হয় না। মনে করা হয়, &#8220;আমরা উচ্চ ও শরীফ বংশের লোক, আর ওরা নীচ ও নগণ্য বংশ সম্বত।&#8221; এ বিভেদ সাধারণ স্তরের লোকের মধ্যে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।</p>
<p>বিরাট পর্যায়ে দেখা যায়, জাপানের বৌদ্ধধর্মবিশ্বাসী লোকেরা সেখানকার সম্রাটকে সূর্যদেবতার সন্তান- জনগণের বংশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক বংশোদ্ভূত বলে বিশ্বাস করে, তাই তাকে কেবল আইনগত শাসক বলেই মনে করে না, দেবতার বংশধর- দেবতারূপে পূজাও করে। সম্রাটের প্রতি জনগণের এই ধারণা ও আচরণ কেবলমাত্র এজন্যেই সম্ভব হচ্ছে যে, তাদের বংশে ও সম্রাটের বংশে আসমান জমিনের পার্থক্য রয়েছে, তারা হীন ও নীচ বংশের লোক, আর সম্রাট হচ্ছেন উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ বংশোদ্ভূত। অথচ এ যে কত বড় মিথ্যে তা তাদের মনে কখনো জাগছেনা। ফলে তারা সম্রাটের মতই মানুষ, মানব বংশোদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও তারই অন্ধ পূজা ও দাসত্ব করে যাচ্ছে।</p>
<p>জার্মানীতে এই আভিজাত্যবোধের প্রাবল্য শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাসীর পক্ষেই মারাত্মক আকার ধারণ করে। হিটলার এই বোধকে উত্তেজিত করে তোলে। তাদের মনে ব্যাপক ও প্রবলভাবে এই ধারণা জাগিয়ে দেয় যে, “আমরা আর্য বংশোদ্ভূত দুনিয়ার সকল মানুষের অপেক্ষা বংশের দিক দিয়ে উঁচু ও অভিজাত, অতএব দুনিয়াবাসীদের উপর প্রভুত্ব করার, শাসন চালাবার একমাত্র অধিকার আমাদেরই।” দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সৃষ্টির মূলে বৈষয়িক ও রাজনৈতিক কারণ আর যতকিছুই থাক না কেন, সেই সঙ্গে জার্মানীর জনগণের এই বংশীয় আভিজাত্যবোধও তীব্রভাবে বর্তমান, এতে কোন সন্দেহ নেই।</p>
<p>আর বর্ণবিদ্বেষ, এই বংশ বিদ্বেষের মাত্রাকে অতিক্রম করে গেছে। বর্তমানে দুনিয়ার কালো চামড়ার লোকেরা সর্বত্র ঘৃণিত, মানবীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত। পক্ষান্তরে, শ্বেতাঙ্গদের এই বর্ণভিত্তিক আত্মগৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ কালোদের জীবনে নামিয়ে এনেছে হতভাগ্যের অমানিশা। আমেরিকায় এই বর্ণবিদ্বেষ ও বর্ণভিত্তিক ভেদাভেদের দরুন শতাব্দীকাল ধরে যে অমানুষিক নিপীড়ন অনুষ্ঠিত হচ্ছে নিগ্রোদের উপর, তার ইতিহাস নিঃসন্দেহে যেমন দীর্ঘ তেমনি মর্মবিদারক। সেখানে নিগ্রোদের সত্যিকারভাবে অধিকার নেই শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে একসাথে বসবাস করার, একই শিক্ষাই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করার, একই ট্রামে, বাসে, ট্রেনে ভ্রমণ করার, একই কাউন্সিলে সমান মর্যাদার সদস্য হিসেবে আসন গ্রহণ করার। এমনকি আদালতের বিচারের ক্ষেত্রেও তারা শ্বেতাঙ্গদের সমান সুবিচার লাভের অধিকারী নয়। একই ধরনের অপরাধের দন্ড শ্বেতাঙ্গদের বেলায় যা নিগ্রোদের বেলায় তা অবশ্যই তার একশ গুণ বেশি মরাত্মক হবে। আমেরিকার বাস্তব ঘটনাই এসব কথা প্রমাণ করছে। সেখানে কোন শ্বেতাংগ যদি কোন নিম্নো মহিলাকে ধর্ষণ করে, তাহলে আদালতে তার শাস্তি বড়জোর সামান্য কিছু জরিমানা অথবা দু&#8217;চারটি বেত্রাঘাত; কিন্তু কোনো নিগ্রো যদি শ্বেতাংগ মহিলার দেহ স্পর্শ মাত্র করে, তবে তার শাস্তি নির্ঘাৎ মৃত্যুদণ্ড এবং সত্য কথা এই যে, নিছক বর্ণবিভেদ ছাড়া এর মূলে অপর কোন কারণই নিহিত নেই।</p>
<p>কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের এই বিদ্বেষ, এই নিপীড়ন কেবল আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, আধুনিক দুনিয়ার সবচেয়ে সুসভ্য বলে কথিত ইংরেজও এ ব্যাপারে কিছুমাত্র কম বলা যায় না। এই সেদিন মাত্র ইংল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডেই ওয়েন্ট ইন্ডিজদের বিরুদ্ধে এ বিদ্বেষ বাষ্পের প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়েছিল। আফ্রিকার মাউ মাউ অভ্যুত্থানের মূলে রাজনৈতিক কারণ ছাড়া এই বর্ণবাদগত কারণও কম কাজ করেনি।</p>
<p>ভাষা বিদ্বেষও দেখা যায় মাঝে মাঝে। কোথাও এক ভাষাভাষী লোক অপর ভাষাভাষীকে পছন্দ করতে পারছে না, নিজের ভাই বলে গ্রহণ করতে পারছে না। এর ফলে মাঝে মাঝে সুস্থ পরিবেশ ও শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনেও অতি আকস্মিকভাবে নেমে আসে মৃত্যুর যবনিকা। প্রচীনকালে অন্যান্য ভাষাভাষীদের ঘৃণা করত ভাষার কারণে, মনে করত: তারা সব ‘আজম&#8217;-গোংগা-বোবা; সেখানে আজ আরবী ভাষার ভিত্তিতেই দুনিয়ার সাধারণ মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র এক জাতীয়তা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুতে বাঙ্গালী অবাঙ্গালীদের মধ্যে এই ভাষাগত বিভেদ দেখা দিয়েছিল। ১৯৫৪ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৭ বৎসর পরে- পুর্ব পাকিস্তানের আদমজী জুটমিলে যে মারাত্মক ধরনের দাঙ্গা হয়েছিল তার মূলে অন্যান্য যত কারণই থাকনা কেন, বাঙ্গালী অবাঙ্গালী বিদ্বেষও ছিল তার অন্যতম প্রধান কারণ। ভারতের আসাম প্রদেশে অসমীয়াভাষী ও বাংলাভাষীদের মধ্যে প্রবল বিদ্বেষ বিস্ফোরিত হয়েছে। ফলে বহু বাংলাভাষীকে প্রাণ দিতে হয়েছে, আর বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী অসমীয় নিজেদের শতাব্দীকালীন আবাসভূমি ত্যাগ করে বাংলা ভাষার কেন্দ্রে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখনো তার জের চলছে পুরাদমে।</p>
<p>সামাজিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্যে ব্যক্তিদের পারস্পরিক ক্ষেত্রে গভীর ঐক্য, মিল-মিশ ও ঐকান্তিকতার প্রয়োজন। কিন্তু ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থের সংঘাতে সামাজিক শৃংখলা ও শান্তি আজ বিনষ্ট প্রায় । সামাজিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য, মাতৃকারী বা সরদারী লাভের জন্য বহু মানুষ সমাজের এক শ্রেণীর লোকদের নিয়ে দল পাকায়, সমাজে দলাদলির সৃষ্টি করে। দলভারী করার বিভেদ ও হিংসাদ্বেষের সৃষ্টি করে। এজন্যে খুনখারাবী চালাতেও দ্বিধাবোধ করে না। ফলে সামাজিক শান্তি, শৃখংলা ও মানুষের নিরাপত্তা ব্যাহত হচ্ছে।</p>
<p>অর্থসম্পদ ও ধনদৌলত কমবেশি হওয়ার কারণে মানব সমাজে আজ দেখা দিয়েছে মারাত্মক শ্রেণী বিভেদ, মালিক ও মজুরে দেখা দিয়েছে সর্বদাহী প্রতিহিংসা। আধুনিক সমাজে এ সমস্যাও অতি আধুনিক।</p>
<p>আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে আজ প্রত্যেক ভৌগোলিক এলাকায় গড়ে উঠেছে এক একটি অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তা। এক জাতি অপর জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপর জাতির মানুষ ধ্বংস হয়ে গেলে, কঠিন বিপদের সম্মুখীন হলেও তার প্রতিবেশী জাতির লোকদের সেজন্য কোন মাথা ব্যথা নেই, দুঃখ নেই, নিপীড়িত মানবতার প্রতি নেই কোন সহানুভূতি। এই স্বতন্ত্র জাতিগুলোই তার অন্তর্ভুক্ত জনগণের পক্ষে &#8216;খোদা&#8217; স্বরূপ। এক একজন জাতীয়তাবাদী লোক আজ অকুণ্ঠিত আওয়াজে ঘোষণা করছে, My nation, Wrong or right</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অর্থনৈতিক</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>বর্তমান দুনিয়ার মানুষ এক সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন। মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা আজ সারা দুনিয়ার এক অন্যতম প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু একশত বৎসর পূর্বে অন্তত পাক ভারতের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ বৎসর পূর্বেও- এরূপ অবস্থা ছিল না। তখনকার প্রায় প্রত্যেকটি মানুষই শ্রম ও চেষ্টা সাধনা করে নিজদের প্রয়োজন পূরণ করে নিতে পারত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা হচ্ছে এই যে, ইউনেস্কোর (Unesco) এক রিপোর্ট অনুযায়ী দুনিয়ার তিন ভাগের দু&#8217;ভাগ লোকই কঠিন দারিদ্রে (Abject poverty) নিমজ্জিত [Amrita Bazar Patrica July-30-1955]। যেসব দেশে বাহ্যত:- খুবই স্বাচ্ছন্দ্য ও সচ্ছলতা পরিপুষ্ট হয়, সেখানেও এই সচ্ছলতা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ধনীলোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সাধারণ জনতার অবস্থা মর্মান্তিকই রয়েছে। আমেরিকা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ধনীদেশ, ইতিপূর্বে তার উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু সেখানকার পনেরো ষোল কোটি অধিবাসীর মধ্যে মাত্র ১৪৮ জন লোকই হচ্ছে কোটিপতি। আর এরাই সমগ্র দেশের শিল্প ও বাণিজ্য দখল করে আছে। বৃটেনের অর্ধেক বাসিন্দা চরম দারিদ্র্যে দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। চার্লস কিংসলে (Charles Kingsle) নামক এক ইংরেজ একবার বলেছিল, &#8220;ইংল্যান্ড কেবল ধনশালী লোকদেরই জন্যে খুশিময় স্থান। কিন্তু আমার মত দরিদ্রের পক্ষে এ কঠিন জায়গা।&#8221;</p>
<p>দুনিয়ার এ দুটো বড় ধনী দেশের অবস্থাই যখন এরূপ, তখন অন্যান্য অনুন্নত দেশের অবস্থা যে কি, তা না বললেও চলে। কিন্তু এর কারণ কি?</p>
<p>এক কথায় বলা যেতে পারে, বর্তমান দুনিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুস্পষ্ট শোষণমূলক, বিপুল ও বিরাট সংখ্যক মানুষকে শোষণ করে, বঞ্চিত করে, প্রতারিত করে, অল্প সংখ্যক লোক সমস্ত ধন সম্পদ কুক্ষিগত করে নিচ্ছে এবং নিজেদের আয়েশ আরাম ও বিলাসিতার প্রাসাদ গড়ছে তালার পর তালা।</p>
<p>পুঁজিবাদী দেশ, আধা পুঁজিবাদী আধা সামন্তবাদী দেশ, আর সমাজতান্ত্রিক দেশের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রকৃতই কোন পার্থক্য নেই।</p>
<p>আজকের দুনিয়ার জমি ক্ষেত আর শিল্প কারখানায় কোটি কোটি মজুর দিন রাত খাটছে, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছে; কিন্তু না পাচ্ছে উপযুক্ত মজুরি, না পাচ্ছে পেটভরা দুবেলার ভাত, না পাচ্ছে মানবোপযোগী সম্মান ও মর্যাদা, না পাচ্ছে একবিন্দু শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা।</p>
<p>এই মজুরদের খাটিয়ে যে মুনাফা লাভ করা হয়, তার খুব সামান্য এবং নগন্য অংশই তাদের ভাগে পড়ে। বরং শতকরা আশিভাগ মুনাফাই মালিকপক্ষ হরণ করে নেয়, লুটে নেয় সবটুকু মজা আর সার।</p>
<p>বর্তমান দুনিয়ার অর্থনৈতিক লেন-দেন সুদের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে। কি আভ্যন্তরীণ লেনদেন, ব্যবসায়, আর কি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ঋণ, সবক্ষেত্রে সুদই হচ্ছে একমাত্র ভিত্তি। সুদ ছাড়া এসবের কোন একটি কাজই সমাধা করা যায় না। ফলে সাধারণভাবে ব্যক্তি ও জাতির নিকট সঞ্চিত অর্থসম্পদ শোষিত হয়ে পুঁজিবান ব্যক্তি ও জাতির পকেটস্থ হচ্ছে। একদিকে অর্থ নিঃশেষে শূন্য হয়ে যাচ্ছে, আর অপরদিকে তাই সঞ্চিত হয়ে পাহাড় সমান স্ফীত হয়ে উঠছে। বর্তমানের অর্থব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতিই হচ্ছে এই। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হবার পর তৎকালীন অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে।</p>
<p>জুয়াখেলার নানাবিধ ধরন, রূপ ও পদ্ধতি আজ মানব সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। এক শ্রেণীর মানুষ এর মাধ্যমে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, আর একশ্রেণীর মানুষ ভাগ্যের খেলায় রাতারাতি লক্ষপতি হয়ে উঠছে। কেবলমাত্র টেলিফোনের সাহায্যে পণ্য ক্রয় ও বিক্রয়ের কাজ করে এক শ্রেণীর লোক আজ বিপুল মুনাফা লুটে নিচ্ছে। অথচ এভাবে অর্থোপার্জন করায় না থাকে বিশেষ কোন দায়িত্ব বা ঝুঁকি, না প্রয়োজন হয় কোন শ্রম বা খাটুনীর। ফলে সাধারণভাবে প্রায় সকল মানুষের মনে অগণিত অর্থলাভের এবং রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাবার এ ধরনের সব পথ-পন্থা ও উপায়ের প্রতি প্রগাঢ় আস্থা জন্মাচ্ছে, শ্রমবিমুখ মানুষের অধিকাংশ এদিকে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।</p>
<p>আর শ্রম-খাটুনী ও দায়িত্ব এবং ঝুঁকির কাজসমূহ, যা না হলে কোন জাতি সত্যিকারভাবে গড়ে উঠতে পারে না- দিন দিন পরিত্যক্ত হচ্ছে। মানুষ হয়ে উঠছে অলস, সুখপ্রিয়, বিলাসী ও সুযোগসন্ধানী। সাধারণভাবে মানব জাতির এ কর্মবিমুখতা ভবিষ্যতের মানুষের জন্যে কঠিন বিপদ ঘনিয়ে দিতে পারে, একথা আজ চিন্তাশীলমাত্রকেই ভাবিয়ে তুলবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>বর্তমান দুনিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। একটি দেশের ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে এই জটিলতা কুণ্ডলী পাকিয়ে পাঁকিয়ে বিরাট আকার ধারণ করে, গ্রাস করে নেয় সারা বিশ্বকে।</p>
<p>একটি দেশের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জটিলতার বীজ উপ্ত হয়। একজন ব্যক্তি ক্ষুদ্র পরিবেশে প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তার করতে চেষ্টা করে, অপর কারো সাথে সংঘর্ষ হলে তাকে পরাজিত করে নিজস্ব প্রভাবকে প্রবল ও স্থায়ী করে নেবার জন্যে সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সেজন্যে সে নানা প্রলোভন দেখিয়ে অপর লোকদের নিয়ে দল জোটায়। ফলে এই প্রতিযোগিতা বিভিন্ন পার্টি ও দলের মধ্যে চলতে শুরু করে। একদল অপর দলের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়, বিরোধী দলের নেতা ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কাঁদা ছুড়া-ছুড়ি করে, কুৎসা রটায়, জনসমক্ষে হীন প্রমাণিত করার জন্যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করতেও দ্বিধাবোধ করে না। ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা ক্ষমতালোভ এবং জনগণের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্ব করার লিপসা দলীয় ও গোষ্ঠীগত পর্যায়ে অভিব্যক্ত হয়। কোথাও একটি দল নানাবিধ অপকৌশল অবলম্বন করে ক্ষমতা দখল করে, আর কোথাও অস্ত্রের প্রাবল্যে দেশের কোটি কোটি জনগণকে পদানত করে নেয়। কায়েম করে এক দুর্ভেদ্য ডিক্টেটরী শাসন। আজ বেশ কয়েকটি দেশেই এ ডিক্টেটরী শাসন কায়েম রয়েছে। আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জটিলতার এ এক ভয়াবহ অবস্থা।</p>
<p>আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জটিলতার মূলেও ঠিক এ জিনিসই কাজ করে। উপনিবেশবাদই হচ্ছে এ যুগের এক বিরাট বিশ্বসমস্যা। ইউরোপ আমেরিকা ও চীন রাশিয়ার উপনিবেশবাদ আজও দুনিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষকে কতগুলি বড় বড় দেশকে পদানত ও পর্যুদস্ত করে রেখেছে। কেবলমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিতেই এসব দেশকে পদানত করে রেখে তারা সন্তুষ্ট থাকেনি, সে সঙ্গে এসব পদানত দেশে বিজয়ী জাতিগুলি নিজদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ভাবধারা জীবনযাপন পদ্ধতি ও মূল্যমান চাপিয়ে দিতেও প্রবলভাবে চেষ্টা করছে। কোন এক মুহূর্তে এ পদানত জাতিগুলির মনে আজাদী লাভের চেতনা জাগ্রত হতে না পারে, তার জন্যেও এদের চেষ্টার অবধি নেই। এতদা শর্তেও যদি কোথায়ও আজ আন্দোলনের উন্মেষ ঘটেছে তাহলে সশস্ত্র দমন নীতির মাধ্যমে গোটা দেশ ও জাতিকেই নিষ্পেষিত করে ছেড়েছে। এককালে সমগ্র এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার উপর ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী তথা উপনিবেশবাদ জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছিল। ক্রমে এক একটি জাতি এ অধীনতম নাগ-পাশ থেকে মুক্তিলাভ করেছে বটে; কিন্তু এখনও আফ্রিকার বিরাট অংশ ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের তলে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে, আজাদীর জন্য আর্তনাদ করছে।</p>
<p>একদিন সমগ্র আরব দেশই ছিল ইংরেজের কবলিত-পদানত। আজ এর মধ্যে যেসব দেশকে আমরা স্বাধীন দেখতে পাচ্ছি, আজাদী লাভের জন্যে তাদের বড় রক্তাক্ত সংগ্রাম করতে হয়েছে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত চালাতে হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। আজাদী লাভের জন্য বিরাট কোরবানি দিতে হয়েছে তাদের। স্বাধীন মুক্ত আরব জাহানকে নানাবিধ কুচক্রে জড়িয়ে পদানত করে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের চেষ্টা এখনো শেষ হয়নি।</p>
<p>আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশবাদ নিঃশেষে মরে যাচ্ছে। কিন্তু শ্বেতাংগ ঔপনিবেশিকগণ এখনো তার স্মৃতি জাগ্রত রাখবার জন্যে শেষ চেষ্টায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। তাদের ইচ্ছা হচ্ছে দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার পতাকা চিরতরে উড্ডীন রাখা, এ বিরাট অঞ্চলের বিপুল ধন-সম্পদ কেবল মাত্র ইউরোপীয়দের ভোগদখলের জন্যে কুক্ষিগত করে রাখা। এসব দেশের প্রকৃত বাসিন্দাগণ নিজেদের দেশেই সকল প্রকার মানবীয় মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত দক্ষিণ রোডেশিয়া ও মধ্য আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী স্যার রয় ওয়েলেনস্কি (Sir Ray Welensky) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী কেবলমাত্র বর্ণ ও বংশের ভিত্তিতে লক্ষ লক্ষ আফ্রিকান ও এশীয় মানুষকে মানবীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে এবং আফ্রিকায় আর এক কংগো সৃষ্টির চেষ্টায় মেতে উঠেছে।</p>
<p>এসব প্রাচীন ধরনের ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও আমেরিকার পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিকতা ও চীন-রাশিয়ার সাম্যবাদী সমাজতান্ত্রিক ঔপনিবেশবাদ আধুনিক যুগের অবদান। আমেরিকা স্বাধীন দুনিয়ার অনুন্নত দেশসমূহে বিস্তার করেছে আন্তর্জাতিক সাহায্যদানের এক দুর্ভেদ্য ষড়যন্ত্র জাল। জাতীয়তাবাদী চীন এবং রাশিয়ার অন্যান্য কয়েকটি দেশই আজ এ ফাঁদে পড়ে ছটফট করছে। চীন ব্যতীত সমগ্র কমিউনিস্ট জগতই আজ রাশিয়ার সাম্যবাদী সাম্রাজ্যবাদের জালে বন্দী। মধ্য এশিয়ার প্রায় সমগ্র মুসলিম এলাকাকে রাশিয়া গ্রাস করে নিয়েছে। আফগানিস্তানকে নুতনভাবে রাশিয়ার কবলিত করা হচ্ছে। আর পাকিস্তানের দিকে করাল জিহবা লালায়িত হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকা কিউবাকে প্রায় গ্রাস করে নিয়েছে। রাশিয়ার কবলে একবার পড়ে গেলে নিষ্কৃতি লাভের আর কোন উপায়ই যে থাকে না তা আজ কারও অজানা নেই। হাঙ্গেরীর আজাদীকামী যুবশক্তি একবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল রাশিয়ার অক্টোপাস হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের রাশিয়া প্রেরিত ট্যাংক ও মেশিনগানের তলায় পড়ে নিমর্মভাবে নিষ্পেষিত ও চূর্ণবিচূর্ণ হতে হয়েছে। আজ হাঙ্গেরী এক বিরাট সমাধিক্ষেত্র।</p>
<p>চীনের সাম্যবাদী সাম্রাজ্যবাদের লেলিহান জিহবা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনুন্নত দেশগুলির দিকে বিলোলিত। বার্মা ও ভারতে গেরিলা সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছে। তিব্বতকে ইতিপূর্বেই গ্রাস করে নিয়েছে চীন। চীনের এ সাম্রাজ্যবাদও যে নিছক রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ নয়, তার প্রমাণ তিব্বত দখল করেই চীন সেখানে শুরু করেছে কমিউনিজমের ব্যাপক প্রচারণা। চরিত্রের দিক দিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জবরদস্তি করে ব্যাভিচারী হতে বাধ্য করেছে।</p>
<p>কিউবা, কংগো, লাওস ও ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রুশ আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চক্রদ্বয়ের চাপ প্রবল আকার ধারণ করেছে। একটি দেশ অপরটিকে &#8216;সাম্রাজ্যবাদী&#8217; বলে গাল দিচ্ছে; অথচ কার্যত উভয়ই সেখানে &#8216;সাম্রাজ্যবাদী&#8217; ছাড়া আর কিছু নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আন্তর্জাতিক</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>উপরে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা প্রসংগে যা কিছু বলা হয়েছে, তাই হচ্ছে বর্তমান দুনিয়ার আন্তর্জাতিক জটিল সমস্যার যতরূপ। বিচ্ছিন্নভাবে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদী চক্রদ্বয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিশ্ব পরিস্থিতিকে চরমভাবে অশান্ত, অনিশ্চিত ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। পূর্বর মত এই খণ্ডদ্বন্দ্বই যে এক সর্বগ্রাসী বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে তাতে আজ কারুরই সন্দেহ থাকতে পারে না। উভয় চক্রই দুনিয়ার সামনে বিশ্বশান্তি স্থাপনের সংকল্প প্রকাশ করছে, যুদ্ধে বিরাগ-অনাসক্তি এবং শান্তির জন্যে একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছে বলে প্রচার করছে এবং দুনিয়ার যেখানে যতবড় সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রই তারা করুক না কেন, কেবলমাত্র শান্তি স্থাপনই তাদের চরম লক্ষ্য বলে ঘোষণা করতেও লজ্জাবোধ করছে না। সেই সংগে অপর শিবিরকে নিজদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সমর সজ্জার কথা জানিয়ে হুমকি দিতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না।</p>
<p>বিশ্বযুদ্ধ যেকোন মুহূর্তেই যেকোন ছুতায় বাজতে পারে, শিবিরদ্বয়ের কর্তাদের ভাষণ-বক্তৃতা ও তৎপরতা লক্ষ্য করলেই তা&#8217; নিশ্চিতরূপে বুঝা যায়। আর যুদ্ধ বাঁধলে সাম্রাজ্যবাদীদের আপাত লাভ যে রয়েছে তা অতীত ইতিহাসই আমাদিগকে নিঃসন্দেহে জানিয়ে দেয়। অথচ অতীত যুদ্ধসমূহের মারাত্মক পরিণতির কথা যাদের মনে জাগরূক রয়েছে, তারা কিছুতেই যুদ্ধ সৃষ্টির কোন অবস্থাকেই মন দিয়ে স্বীকার করে নিতে পারে না; বরং যুদ্ধের নাম শুনলেই তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।</p>
<p>তাই যুদ্ধের বিশেষ করে বর্তমান আণবিক যুগের যে কোন যুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে বিশ্বের জনগণেরই গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। এ দৃষ্টিতে পৃথিবীর অতীত অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা এখানে করা যাচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>যুদ্ধ</strong> <strong>সেকালে</strong> <strong>ও</strong> <strong>একালে</strong></p>
<p>বর্তমান শতকের প্রথমার্ধেক কালের মধ্যেই পর পর দুটো বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হল। কিন্তু সে যুদ্ধ প্রাচীনকালের মত যুদ্ধ নয়। প্রাচীনকালে চেঙ্গীস খাঁ, হালাকু যা করেছে যুদ্ধ, করেছে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও আলেকজান্ডার দি গ্রেট; তাদের যুদ্ধের বিপুল লোকক্ষয় ও সম্পত্তি বিনাশ হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সে ক্ষয় ও ক্ষতির কোন তুলনাই হতে পারে না এ শতকের যুদ্ধের সাথে। প্রাচীন যুদ্ধের মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের মর্মান্তিক স্মৃতি জনগণের হৃদয়পট থেকে নিঃশেষে মুছে যাবার আগেই পর পর দুটো বিশ্বযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হল।</p>
<p>পূর্বে মানুষকে আমরা, এ যুগের লোকেরা মুর্খ, অশিক্ষিত, বর্বর বলে ঘৃণা করি; কিন্তু এই শতকের সভ্য মানুষেরাই বা কোন সভ্যতা ও মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়েছে তা একবার ভেবে দেখা দরকার।</p>
<p>তা&#8217; ছাড়া পূর্বে যুদ্ধ হত খুবই সীমাবদ্ধ আকারে। যার বা যাদের স্বার্থে যুদ্ধহত, কেবল সেই বা তারাই ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হত। বেসামরিক লোকদের সাধারণত তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হত না। নিরো ও তৈমুর লঙের যুদ্ধ তো বর্তমান শতকের দুটি মহাযুদ্ধের সামনে একেবারে নগণ্য- অনুল্লেখযোগ্য। আজ ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কর্তৃত্বের লোভ, আন্তর্জাতিক বন্দরে বাজার সৃষ্টির মতলবে বড় বড় ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র একেবারে অন্ধ হয়ে গেছে। মানুষের মর্মবিদারী হাহাকার রাষ্ট্রদুরন্ধরদের কর্ণকুহরে পৌঁছায় না। বিজ্ঞানের অবদান অতি আধুনিক আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা যে যুদ্ধ হয়, তা&#8217; কেবল যোদ্ধা ও শত্রুদেরই ধ্বংস করে না, বেসামরিক নিরীহ জনগণকেও চূড়ান্তভাবে ধ্বংস ও সর্বশান্ত করে দেয়। নিশ্চিহ্ন করে দেয় যুদ্ধ এলাকার বিরাট জনপদ, শহর নগর গ্রাম; এক একটি বিরাট ভূখন্ডকে পর্যন্ত নাস্তানাবুদ করে দেয় ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>১ম</strong> <strong>মহাযুদ্ধ</strong> <strong>ও</strong> <strong>তার</strong> <strong>কারণ</strong></p>
<p>কিন্তু যুদ্ধ কেন বাধে, কেন এক এক ব্যক্তি- একটি দেশের বিরাট বাহিনী ধ্বংস যজ্ঞে মেতে উঠে? এ নির্ভুল জবাব প্রত্যেকটি যুদ্ধের ইতিহাস আলোচনা ও যাচাই করলেই পাওয়া যেতে পারে।</p>
<p>প্রথম মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয় কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণে; রাজনৈতিক আক্রোশ প্রতিহিংসা ও রাষ্ট্র-সীমা বৃদ্ধিকরণের মতলবে। এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে রাশিয়া, ফ্রান্স, গ্রেটবৃটেন, ইটালী প্রভৃতি বড় বড় দেশ ও রাষ্ট্র। এরা পরস্পরের বিরুদ্ধতা ও শত্রুতার বশবর্তী হয়ে একে অপরের নিধনযজ্ঞে লেগে যায়।</p>
<p>রাশিয়া ও বৃটেনের মধ্যে শত্রুতার বীজ উপ্ত হয়েছিল ১৯০৪ থেকেই। ইটালী ও ফ্রান্সের মধ্যে তিউনিসিয়া নিয়ে বিবাদ চলে আসছিল ৫০ বৎসর থেকে। বৃটেন ও ফ্রান্স চৌদ্দশতক থেকেই একে অপরের প্রকাশ্য দুশমন হয়ে রয়েছিল। আর সার্বিয়া ছিল অস্ট্রিয়ার দুশমন। ইটালী যুদ্ধে যোগদান করেছিল শুধু এমন কতগুলি স্থান দখল করার মতলবে, যা দীর্ঘ দিন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার অধীনে ছিল।</p>
<p>পৃথিবীর এই প্রথম মহাযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ ধ্বংস হয়েছিল, হয়েছিল পঙ্গু, অঙ্গহীন, অন্ধ-বধির ও জখমী। বহু লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নির্মমভাবে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>বিশ্বযুদ্ধ</strong></p>
<p>প্রথম মহাযুদ্ধের প্রায় বিশ বৎসর পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, প্রথম মহাযুদ্ধের পর বড় বড় বিজয়ী রাষ্ট্রগুলোর মাঝে যে ভার্সাই সন্ধি অনুষ্ঠিত হয়, তাতেই এই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বীজ বপন করা হয়েছিল। তাছাড়া ইংরেজ দীর্ঘকাল ধরে সারা পৃথিবীব্যাপী যে জঘন্যধরণের কূটনীতি চালিয়ে ছিল, তার ফলে মানব জীবনের চরম অশান্তি ও বিপর্যয় শুরু হয়েছিল।</p>
<p>ভার্সাই সন্ধির ফলে অস্ট্রিয়ার অস্তিত্ব পর্যন্ত বিলীন হয়ে গিয়েছিল। তাকে ভাগ করে রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরী, চেকোশ্লোভাকিয়া ও যুগোশ্লাভিয়া নামে কয়েকটি দেশের জন্ম দান করা হয়। এর কিছু অংশ দেওয়া হয় ইটালীকে।</p>
<p>ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে ইংরেজ বিদ্রোহ শুরু করিয়ে দেয়। ফলে সুযোগ বুঝে ইংরেজ ইরাক দখল করে বসে। সিরিয়া ফ্রান্সের অধীন হয়ে যায়। লেবানন নামে এক নুতন রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং বালফোর ঘোষণার ফলে আরব জগতের বুকে ইসরাইল রাষ্ট্রকে এক বিষাক্ত ফোঁড়া হিসাবে বসিয়ে দেয়া হয়।</p>
<p>ভার্সাই সন্ধির ফলে সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে জার্মানীর উপর। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তাকে কোণঠাসা করে দেয়া হয়, নিরস্ত্র করা হয়। তাকে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হয়। জার্মানী এরূপ অবস্থা মেনে নিতে কিছুতেই রাযী হতে পারেনা। কাজেই এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে জার্মানী কৃতসংকল্প হয়। প্রথমেই জার্মানী চেকোশ্লোভাকিয়ার নিকট থেকে জার্মান এলাকা ফেরত নিয়ে নেয়। আর পোল্যান্ডের কাছ থেকে ট্রানজিট এবং করিডর ফিরিয়ে পাবার জন্য দাবি পেশ করা হয়। এর ফলেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জলে উঠে এবং অনতি বিলম্বে তাতে জড়িত হয়ে পড়ে দুনিয়ার বড় বড় রাষ্ট্র ও দেশ।</p>
<p>এ আলোচনার ফলে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে, পররাষ্ট্র লোলুপতা, সাম্রাজ্যবাদ, দুর্বল জাতিকে কোণঠাসাকরণ, অধিকৃত দেশের জনগণকে সকল প্রকার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি চালানোই হচ্ছে এসব যুদ্ধ সংঘর্ষের মৌলিভূত কারণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>মহাযুদ্ধের</strong> <strong>ক্ষয়ক্ষতি</strong></p>
<p>দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলে ১৯৩৯ সন থেকে ৪৫ সন পর্যন্ত। এতে দুনিয়ার মানুষের চরম ধ্বংস সাধিত হয়। জাতিসংঘের একটি কমিশন এই ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ, তথ্য ও পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছে। তা থেকে যে লোমহর্ষক তথ্য জানা গেছে, এখানে তার কিয়দাংশ পেশ করা হচ্ছে। এ থেকে বিরাট বিপুল ধ্বংস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যেতে পারে</p>
<p>এ যুদ্ধে সারা দুনিয়ায় মরেছে ও জখমি হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি লোক। পনেরো কোটি লোকের ঘর-বাড়ি জ্বলে ভস্ম হয়ে গিয়েছে। আড়াই কোটি লোক নিজের দেশ, ঘর-বাড়ি, জন্মভূমি ও বিষয় সম্পত্তি সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে ভিন্ন দেশে- দূরতম কোন দেশে নির্বাসিত হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।</p>
<p>এ যুদ্ধে যত ধনদৌলত ও দ্রব্যসামগ্রী বরবাদ হয়েছে, তা&#8217; যদি দুনিয়ার মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হতো তা&#8217;হলে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, আয়ারল্যান্ড, সোভিয়েট রাশিয়া ও বেলজিয়ামের বাসিন্দাদের প্রত্যেকটি পরিবারকে ৮ হাজার টাকার দ্রব্য-সামগ্রী, একখানা করে পাকা বাড়ি, ৬০ হাজার টাকার ফার্নিচার ও ৩ লক্ষ টাকা নগদ দেয়া যেতো। এছাড়াও দু&#8217;লক্ষ লোক বাস করে এমন প্রত্যেকটি শহরের নিম্নোক্ত খাতসমূহে নিম্নোল্লেখিত হার অনুযায়ী বন্টন করা যেত।</p>
<p>১। সাড়ে সাইত্রিশ কোটি টাকা লাইব্রেরি করার জন্যে।</p>
<p>২। সাড়ে সাইত্রিশ কোটি টাকা স্কুল কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার জন্য এবং</p>
<p>৩। সাড়ে সাইত্রিশ কোটি টাকা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য।</p>
<p>অপর এক আনুমানিক হিসাব মতে, এ যুদ্ধে বিভিন্ন জাতি যা কিছু খরচ করেছে, সেই বিত্ত সম্পত্তি ও অর্থ সম্পদ যদি দুনিয়ার আড়াই শত কোটি লোকের মধ্যে সমান হারে ভাগ করে দেয়া হতো তা&#8217;হলে দুনিয়ার এক একটি ব্যক্তি ত্রিশ হাজার করে টাকা পেত।</p>
<p>অর্থাৎ দশ জন লোকের এক একটি পরিবার তিন লক্ষ টাকার মত পেতে পারত, যার দ্বারা প্রত্যেকটি পরিবার প্রতিমাসে আড়াই শত টাকা করে খরচ করে এক শত বৎসর কাল পর্যন্ত অনায়াসেই জীবন যাপন করতে পারত।</p>
<p>প্রসংগত: উল্লেখ করা যেতে পারে যে, একা বৃটেনই এ যুদ্ধে দৈনিক পনেরো মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি আমাদের টাকার হিসাবে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করেছে।</p>
<p>কিন্তু এ হলো মহাযুদ্ধের ধ্বংসলীলার হিসাব নিকাশ। এক একটি যুদ্ধে যে কি ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে এবং মানব জীবনের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে যে কতখানি ব্যাহত করে, তা এ হিসাব নিকাশ থেকে সুস্পষ্টরূপে অনুভব করা যায়। কিন্তু এখন যদি কোন বিশ্বযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা কিছুতেই প্রাচীনকালের সিকান্দার নিপোলিয়নের যুদ্ধের মত হবেনা, হবেনা ১ম ও ২য় মহাযুদ্ধের মত বরং তা যে এসবের তুলনায় শতগুণ বেশি ধ্বংস ডেকে আনবে, তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। তা ছাড়া আগের এ যুদ্ধগুলো যে যুগে অনুষ্ঠিত হয় তাকে বিজ্ঞানের বস্তুবিজ্ঞান ও যন্ত্রবিজ্ঞানের দিক দিয়ে বড়জোর যৌবনকাল বলা যেতে পারে। বর্তমানে বিজ্ঞানের যে উৎকর্ষ ও অগ্রগতি হয়েছে, অন্য কথায় যত মারণাস্ত্র এ যুগে আবিষ্কৃত হয়েছে, পূর্বে তার অস্তিত্ব ছিল না। কাজেই এখনকার যুদ্ধ নিশ্চিত রূপেই হবে সর্বংসী ও চুড়ান্ত ধ্বংসকারী। এখনকার আণবিক বোমা বিগত যুদ্ধে ব্যবহৃত আণবিক বোমার তুলনায় ২৫ হাজার গুণ বেশি ধ্বংসাত্মক। বিজ্ঞানীগণ বলেছেন: বর্তমানে কেবল দুটে হাউড্রোজেন বোমা দিয়ে সারা দুনিয়াকে নিঃশেষে ধ্বংস করা যেতে পারে। অথবা উত্তর মেরুতে একটি আর দক্ষিণ মেরুতে একটি হাইড্রোজেন বোমা ছাড়লে এমন সাংঘাতিকভাবে বিস্ফোরণ হবে যে, সেখানকার কেবল বরফ গলেই সারা দুনিয়ার সমুদ্রসমূহে এক মহা প্লাবন ও পানিস্ফীতি ঘটাবে, যার ফলে ধরিত্রির বুকের সমস্ব মানুষ ও সভ্যতা-তামাদ্দুনের সব নাম-নিশানা পর্যন্ত ধুয়ে মুছে শেষ করে দেবে। মানুষের নিজের হাতের তৈরি জিনিস দ্বারা এরূপ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের অনুষ্ঠান করার সুযোগ-সুবিধে ইতিপূর্বে ইতিহাসের আর কোন অধ্যায়ে কখনো সম্ভব হয়নি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শা</strong><strong>ন্তি স্থাপনের</strong> <strong>চেষ্টা</strong> <strong>ও</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong></p>
<p>এতক্ষণ পর্যন্ত যা কিছু আলোচনা করা হল, তা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, দুনিয়ার বড় বড় রাষ্ট্রকর্তা ও পুরস্করগণ বিশ্বমানবতাকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করার জন্যে সকল ব্যবস্থাপনাই সম্পূর্ণ করে নিয়েছে; এখন শুধু সুইচ অন করার কাজটুকুই বাকি। আর যে মুহূর্তে তা হয়ে যাবে, সেই মুহূর্তেই দেখা যাবে, সারা পৃথিবী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>কিন্তু বিশ্ব মানব কি চির দিনই কেবল ধ্বংসযজ্ঞে মেতে রয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য কি পৃথিবীতে কোন চেষ্টাই করা হয়নি? -হয়নি, একথা বললে সত্যের অপলাপ করা হবে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত একদিকে যেমন ধ্বংসের লীলা সৃষ্টি করা হয়েছে তেমনি অপর দিকে নানাভাবে চেষ্টাও করা হয়েছে এই সর্বধ্বংসী যুদ্ধ প্রতিরোধ ও বিশ্বশান্তি স্থাপনের জন্যে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>লীগ</strong> <strong>অব</strong> <strong>নেশন্স</strong></p>
<p>এই পর্যায়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টার ফলে ১৯২০ সনে প্রথম মহাযুদ্ধের পরে গঠিত হয় লীগ অব নেশন্স। প্রায় বিশ বৎসর পর্যন্ত দুনিয়ার বড় বড় রাষ্ট্র ধুরন্ধরগণ এ মারফতে বিশ্বে শান্তি স্থাপনের জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকে।</p>
<p>কিন্তু এ চেষ্টায় আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার কোন অস্তিত্ব ছিল না। রাষ্ট্র ধুরন্ধরদের মধ্যে এ ক্ষেত্রে চরম স্বার্থপরতা, মুনাফেকী ও পরস্পরের বিরুদ্ধে কুটিল হিংসা ও ষড়যন্ত্র দেখা গেছে। যারাই শান্তি স্থাপনের কাজে বাহ্যত ব্যস্ত, তারাই প্রকৃতপক্ষে ব্যস্ত ছিল বিশ্বব্যাপী চরম অশান্তির বীজ বপনের কাজে, গোপনে ও সন্তর্পণে। ফলে আগ্নেয়গিরির উপর প্রাসাদ নির্মাণের মতই লীগ অব নেশন্স কাজ করতে শুরু করল। দুনিয়ার বিজয়ী দেশের কর্তাগণই ইহার উপর কর্তৃত্ব করতে লাগল। ইকবালের ভাষায় এরা সব ছিল &#8216;কাঞ্চনচোর&#8217;। ফলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সুচিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই লীগ অব নেশন্স তাসের ঘরের মত চুরমার হয়ে যায়। যুদ্ধ প্রতিরোধ ও শান্তি স্থাপনের এ প্রচেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থ হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>জাতিসংঘ</strong></p>
<p>এরপর বিশ্বশান্তি স্থাপনের দ্বিতীয় প্রচেষ্টার ফলে গঠিত হয় বর্তমান জাতিসংঘ (United Nations Organizations) দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানী, ইটালী ও জাপান মিত্র পক্ষের নিকট পরাজয় বরণ করে। তখন ২৫শে জুন সানফ্রান্সিসকোতে ৫০ জাতির সম্মেলনে এক চার্টারে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে এই জাতিসংঘ গঠিত হয়। দুনিয়ার জনগণের এ প্রতিনিধিরা বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার সংকল্প ঘোষণা করে এ চার্টারের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষের প্রতি ইনসাফ, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন, প্রশস্ততর স্বাধীন উন্মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, সকলে মিলে এক রক্ষা বুহ্য রচনা, সম্মিলিতনীতিতে কাজ করা, অকারণ অস্ত্র ব্যবহার রোধ এবং সকল মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ বিধানের প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করা হয় এই চার্টারে।</p>
<p>স্বীকার করতে হবে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিশ্বশান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে UNO এক অতুলনীয় প্রচেষ্টা। এত বড় ও এত বিরাট ক্ষমতা-ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান রচনা মানুষের ইতিহাসে এটাই হচ্ছে প্রথম ঘটনা।</p>
<p>প্রসঙ্গত: UNO এর পরিচয় দানের উদ্দেশ্যে এর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা আবশ্যক বোধ হচ্ছে। তাতে এক দিকে যেমন এর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যাবে, তেমনি এত বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিশ্বশান্তি স্থাপনের ব্যাপারে যে বিরাট কল্যাণের আশা করা যেতে পারে, তাও বুঝা যাবে। আর সেই সঙ্গে এ ব্যর্থতা যে কত বড় ব্যর্থতা, মানবতার চরম ব্যর্থতা তাও উপলব্ধি করা যাবে।</p>
<p>জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় অফিস বিল্ডিং মানহাটন দ্বীপে ৬ ব্লকে ১৮ একর জমির উপর স্থাপিত। ৩৯ তলার একটি বিরাট প্রাসাদ নির্মাণে দুনিয়ার মানুষের ব্যয় হয়েছে মোট ২১ কোটি ৩৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনের জন্য প্রতি বৎসর খরচ হচ্ছে ৪০ কোটি ডলার।</p>
<p>এর সমগ্র প্রাসাদটিই এয়ার কন্ডিশান করা। শীতাতপের কোন বালাই নেই সেখানে। এখানে একটি ভুগর্ভস্থ গ্যারেজ রয়েছে, যাতে একই সংগে আড়াই হাজার মোটর গাড়ী থাকতে পারে। কিন্তু কার্যতঃ এ প্রতিষ্ঠান দুনিয়ার আড়াই শত কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না, পারছে না দুর্বল জাতিগুলোকে বড় বড় জাতিগুলির হামলা শোষণ ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে।</p>
<p>এর সেক্রেটারিয়েটে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে, যাতে করে কেন্দ্রীয় অফিস থেকে জরুরি কাগজপত্র ও ফাইল ইত্যাদি নিমেষমাত্রের মধ্যে বিল্ডিং এর অন্যান্য সমস্ত কক্ষে পৌঁছে যেতে পারে ।</p>
<p>কিন্তু কার্যত: এ প্রতিষ্ঠানকে দুনিয়ার সেরা বেনিয়া রাষ্ট্রগুলো এমনভাবে করায়ত্ত করে রেখেছে যে, হকদারকে হক পৌঁছে দেয়ার কোন ব্যবস্থাই এর দ্বারা করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে পৌঁছতে পারছে না দুনিয়ার দুঃখ জর্জরিত মযলুম জাতিগুলির রক্তলেখা কোন চিঠি ।</p>
<p>এর জেনারেল এসেম্বলীতে বক্তৃতা শোনবার জন্যে এমন সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে যে, একই বক্তৃতাকে (বক্তৃতা চলাকালেই) বিভিন্ন জতির প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কানে এয়ারফোন লাগিয়ে একই সময় রুশ, ফরাসী, চীনা ও ইংরেজী ভাষায় শুনতে পারে।</p>
<p>বক্তৃতা শোনবার ও কথা বুঝবার এ এক অতুলনীয় ব্যবস্থা, তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু তা সত্ত্বেও দুনিয়ার মযলুম মানবতার আর্তনাদ তারা শুনতে পায় না। নিপীড়িত মানবতার জন্যে এ প্রতিষ্ঠান কার্যত: কিছুই করতে পারছে না।</p>
<p>এই প্রসাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষার জন্যে এর পাথর, &#8216;ছংগে&#8217; মম&#8217;র এর গালীচা চেয়ার, টেবিল, আলমারী ও অন্যান্য সাজসজ্জা, সরঞ্জাম-সামান এর সদস্য দেশগুলি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।</p>
<p>একে সজ্জিত করেছে সকল দেশের লোকেরা, এক মনে এক ধ্যানে। উদ্দেশ্য ছিল একে গড়বার ব্যাপারে দুনিয়ার জাতিগুলো যেমন ঐক্য, সামা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি ঐক্য,</p>
<p>সাম্য ও আন্তরিকতার সাথে তারা সকলে মিলে চেষ্টা করবে বিশ্বশান্তি স্থাপনের জন্যে, সেজন্যে এদের পরস্পরের মধ্যে দেখা দেবে না কোন মতবিরোধ, হিংসা বিদ্বেষ। কিন্তু কার্যত দেখা গেল, দুনিয়ায় শান্তি সংস্থাপনের ব্যাপারে প্রতিনিধি জাতিগুলোর মধ্যে না আছে কোন মতৈক্য, না আছে আন্তরিকতা ও অকপটতা।</p>
<p>জাতিসংঘের মত বিরাট ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান বর্তমান থাকা সত্ত্বেও আজ এক জাতি অপর জাতিকে পদানত করে রেখেছে, গোলাম বানিয়ে দুচ্ছেদ্য জিঞ্জীরে বেঁধে রেখেছে। U.N.O. র সদস্য ও জাতিসংঘ ঘোষিত মানবীয় অধিকার চার্টারে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র কেবলমাত্র মেশিনগান ও ট্যাংকের বলে অপর রাষ্ট্রের স্বাধীনতা হরণ করে নিচ্ছে, চালাচ্ছে অত্যাচার নিষ্পেষণের স্টীমরোলার। নিজ দেশের জনগণের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার কেবলমাত্র গায়ের জোরেই কেড়ে নিচ্ছে, কিন্তু জাতিসংঘের এই বিরাট প্রতিষ্ঠান নির্বাক নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকছে, কার্যত: কিছুই করতে পারছে না। এক একটি সদস্য রাষ্ট্র অপর সদস্যরাষ্ট্রের কিয়দংশ অস্ত্রবলে দখল করে নিচ্ছে, চিৎকার করছে, ফরিয়াদ করছে মযলুম রাষ্ট্র ও জনতা, কিন্তু জাতিসংঘ নীরব দর্শক বিরাট পাষাণ প্রতিমূর্তি হয়ে থাকছে, কিছুই করছে না বা করতে পারছে না। কোন কোন প্রধান ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র আবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের সাহায্যে ইনসাফের সকল প্রস্তাব প্রচেষ্টাকেই বানচাল করে দিচ্ছে। কিন্তু জাতিসংঘ অক্ষম, পঙ্গু, স্থবির, পাহাড় হয়ে রয়েছে &#8216;টু&#8217; শব্দটি পর্যন্ত করতে পারছে না। জাতিসংঘের সদস্য দুই প্রতিবেশীরাষ্ট্রের মধ্যে যুগযুগ ধরে চলছে মারাত্মক বিবাদ ও দ্বন্দ্ব, কিন্তু জাতিসংঘ না পারছে এই বিবাদের ইনসাফপূর্ণ মীমাংসা করতে, না পারছে বিবাদমান সদস্য রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যে কোন মিলন সৃষ্টি করতে।</p>
<p>দুনিয়ার স্বাধীন মানুষদের সমন্বয়ে গড়া এ জাতিসংঘ দুনিয়ার মানুষকে স্বাধীনতা দিতে পারেনি। এখনো দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ নিতান্ত গোলামী জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে; কিন্তু তবু জাতিংঘের উপর পত্ পত্‌ করে উড়ছে মানবীয় স্বাধীনতার পতাকা। কাজেই একথা দ্বিধাহীন কণ্ঠেই বলা যেতে পারে যে, U.N.O তার উদ্দেশ্য পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।</p>
<p>আফ্রিকার মাউমাউ আন্দোলন ও বৃটিশের অমানুষিক দমন নীতি, আলজেরিয়ার আন্দোলন ও ফরাসী সরকারের নিষ্পেষণ নীতি, কংগো, লাওস ও কিউবার অবস্থা, তিব্বত ও কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘের চোখে অংগুলি দিয়ে প্রমাণ করছে যে, “তুমি লীগ অব নেশনের চেয়েও লজ্জাস্করভাবে ব্যর্থ হয়েছো।&#8221;</p>
<p>কিন্তু এর ব্যর্থতার কারণ কি? আমার মতে এর সাংগঠনিক দিকে এমন কতকগুলি ত্রুটি রয়েছে যার দরুণ এ ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে ভেটো ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান। বড় শক্তিগুলোকে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা ও অধিকার দেওয়া হয়েছে। কোন প্রস্তাব তাদের কারো মর্জি বা স্বার্থের বিপরীত হলেই ভেটো প্রয়োগ করে বসে। জাতিসংঘের সমস্ত ক্ষমতা, কর্মতৎপরতা সেখানে এসেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কোন সিদ্ধান্তই তা বিশ্বমানবের পক্ষে যতই কল্যাণকর হোক না কেন গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>শুধু তাই নয়, জাতিসংঘ কার্যত কয়েকটি বড় বড় রাষ্ট্রের একচেটিয়া ইজারাদারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।</p>
<p>এর কারণ হচ্ছে এই যে, কার্যত: সমস্ত ইখতিয়ার তো সিকিউরিটি কাউন্সিলের হাতে নিবদ্ধ। আর তার স্থায়ী সদস্য হচ্ছে জাতীয়তাবাদী চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, বৃটেন ও আমেরিকা এই পাঁচটি দেশ মাত্র। এদের একটি দেশও কোন ব্যাপারে মতবিরোধ করলে, রাজী না হলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। কাজেই দুনিয়ার এ বড় বড় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর কোনও একটি যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মানবতার মুক্তির কোন কার্যক্রম সমর্থন করতে পারে না, তা নিঃসন্দেহে বোঝা যায়। তারা ইচ্ছে করলে দুনিয়ার যে কোন দেশ বা অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনকে আদৌ সমর্থন না করারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, সেজন্যে না কেউ তাদের কাছে কৈফিয়ৎ চাইতে পারে, না কারো কাছে তাদের জওয়াবদিহি করতে হতে পারে। জাতিসংঘ চার্টারের ২৫ ধারা অনুযায়ী সিকিউরিটি কাউন্সিলের রায় মানতে সকলেই একান্তভাবে বাধ্য। তাহলে একথা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, জাতিসংঘ দুনিয়ার মযলুম মানবতার মুক্তির পথ নির্দেশ করতে পারে না। এ হচ্ছে মানবতার চির দুশমন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর শানিত হাতিয়ার বিশেষ।</p>
<p>সবচেয়ে বড় কথা, সর্বজাতির এই বিরাট প্রতিষ্ঠানের সামনে এমন কোন সম্মিলিত আদর্শের অস্তিত্ব নেই, যার কাছে সকলেই নির্বিবাদে আত্মসমর্পণ করতে পারে, যার ভিত্তিতে নিজদের পারস্পরিক সকল বিরোধ ও মনোমালিন্য দূর করে নিতে পারে। ফলে আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণের জন্যে একটি কমিশন নিয়োগ হওয়া সত্ত্বেও তা নিয়ন্ত্রিত হতে পারছে না, তার নিয়ন্ত্রণ যেনে নিচ্ছে না কেউই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সর্বজাতি</strong> <strong>পুলিশ</strong> <strong>বাহিনী</strong></p>
<p>জাতিসংঘের এই ব্যর্থতা, পঙ্গুতা ও অকর্মণ্যতা দেখে প্রাক্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড এটলী সম্প্রতি এক ভাষণে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনী গঠন করা আবশ্যক। জাতিসংঘের হাতে নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই বলে তার কোন সিদ্ধান্তই কার্যকরী হতে পারছে না। অতএব জাতিসংঘের হাতে এই আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনী থাকা একান্তই আবশ্যক। তাহলে জাতিসং স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করতে পারবে।</p>
<p>এ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা মেনে নেয়া কঠিন। বর্তমানে শুধু প্রস্তাব পাস করা ও সিদ্ধান্ত করার ক্ষেত্রেই যখন জাতিসংঘ কোন নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করতে পারছে না, পারছে না দুনিয়ার জাতিসমূহের প্রতি নির্বিশেষ ও নিরপেক্ষ ইনসাফ করতে, তখন তার হাতে আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনী থাকলে কোন কল্যাণ লাভ করা সম্ভব হবে? এখনি যখন পক্ষপাতিত্ব ও না-ইনসাফী হয়ে যাচ্ছে, তখন তার হাতে পুলিশ বাহিনী থাকলে তাও যে সেই পক্ষপাতির ও জুলুমের কাজে ব্যবহৃত হবে, তা কে রোধ করতে পারবে? শক্তি বা হাতিয়ার নিজেই কখনো শাস্তি স্থাপন করতে পারে না, সেজন্য সর্বপ্রথম চাই শাস্তি স্থাপনের জন্য অপরিহার্য নিরপেক্ষ ও ইনসাফের নীতি এবং সর্বজনগ্রাহ্য এক উন্নত আদর্শ ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বিশ্বরাষ্ট্র</strong> <strong>গঠনের</strong> <strong>প্রস্তাব</strong></p>
<p>জাতিসংঘের যুদ্ধপ্রতিরোধ ও বিশ্বশান্তি স্থাপন ক্ষমতার প্রতি হতাশ ও নিরাশ হয়ে একালের সেরা দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বার্ট্রান্ড রাসেল বিশ্বরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেছেন। তিনি মনে করেন, এই বিশ্বরাষ্ট্র গঠন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের যুদ্ধাশংকা তিরোহিত হতে পারে না, পারে না বিশ্ব সমস্যার সমাধান হতে। কিন্তু বিশ্বরাষ্ট্র যে হাওয়ার উপর কায়েম হতে পারে না, তার জন্যে চাই বিশ্বমত এমন একটি মতাদর্শ যা দুনিয়ার সব মানুষ, সব জাতি অকুণ্ঠভাবে মেনে নিতে পারে, অন্তত মেনে নিতে কোন দুর্লংঘ্য বাধা হতে পারে না। এবং বর্তমান বিশ্বের জাতিগুলোর সামনে এই বিশ্বমত বলতে যে কিছুই নেই, একথা রাসেল এত বড় দার্শনিক হয়েও খেয়াল করলেন না কেন তা বুঝে উঠা মুশকিল ব্যাপার।</p>
<p>রাসেলের প্রস্তাবে বলা হয়েছে। এই বিশ্বরাষ্ট্র গঠন করতে হবে ফেডারেশন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ বর্তমান দুনিয়ার জাতীয় রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে বিশ্বরাষ্ট্র গঠন করা হবে, সর্বজাতির সমান সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে।</p>
<p>কিন্তু দুনিয়ার জাতীয়তাবাদের পরিণাম ও বর্তমান জাতিসংঘের দৃষ্টিতে স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ জাতিসমূহের ভূমিকায় দৃষ্টিতে প্রস্তাবিত বিশ্বরাষ্ট্রের ব্যর্থতাও পরিস্ফুট হয়ে উঠে। কেননা দুনিয়ায় আজ পর্যস্তকার যুদ্ধবিগ্রহগুলো তো জাতীয়তা জাতীয় হিংসা বিদ্বেষ ও পররাষ্ট্র লোলুপতার কারণে সংঘটিত হয়েছে, Nationalism।</p>
<p>বর্তমান Nationalism ই হচ্ছে বিশ্বশান্তি স্থাপনের পথে প্রধানতম বাধা। একথা প্রত্যক্ষ করার পর সেই জাতীয়তাভিত্তিক বিশ্বরাষ্ট্রের সাফল্যে আশাবাদী হওয়া কি করে সম্ভব হতে পারে? আজ এ জাতিগুলোকে আদর্শানুগ করে তোলার এক গ্রন্থিতে বেঁধে রাখার রজ্জু কি আছে? মধ্যযুগের ইউরোপে পোপদের কর্তৃত্বই ছিল জাতিসমূহের মিলসূত্র, সব জাতিই পোপদের কর্তৃত্ব অন্ধভাবে মেনে নিত, কিন্তু এখন সে পোপতন্ত্রের অবসান হয়েছে। বর্ণ, ভাষা, ধর্ম কোন কিছুই বিশ্বজাতিসমূহের মাঝে মিলন ও ঐক্য সৃষ্টি করতে পারে না। তাহলে এ বিশ্বরাষ্ট্র কায়েম হতে পারে কিরূপে, কায়েম হয়ে টিকতেই বা পারবে কয়দিন, আর নিরপেক্ষ ইনসাফ কায়েম করাই বা তার পক্ষে কি করে সম্ভব?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বিজ্ঞানীদের</strong> <strong>প্রচেষ্টা</strong></p>
<p>আণবিক যুদ্ধের আশংকায় ভীত-বিহবল পৃথিবীর বিজ্ঞানীগণের ধারণা: জাতিসংঘই আণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে পারে। সম্প্রতি ৭২০ জন বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবি জাতিসংঘের নিকট সেজন্যে এক আবেদন পেশ করেছেন। এ আবদনের ফল যে কিছুই নয়, কেবল আবেদন নিবেদন ও স্বাক্ষর অভিযান দ্বারাই যে আণবিক যুদ্ধের আশংকা তিরোহিত হতে পারে না, এ সোজা কথাটুকু বিজ্ঞানী বুদ্ধিজীবীদের বোঝা উচিত। যার হাতে এ অস্ত্র রয়েছে, সে যদি এর ব্যবহারের পথে কোন বাধার সম্মুখীন না হয়, নিজের ভেতরেও সেজন্য কোন তাকীদ অনুভব না করে, তাহলে কেবল বিজ্ঞানীদের আবেদনের কারণে তার ব্যবহার কেউ বন্ধ করবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বিশ্ব</strong> <strong>সমস্যা</strong> <strong>সমাধানের</strong> <strong>কার্যকরী</strong> <strong>পথ</strong></p>
<p>এই আলোচনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত মানব জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ দিক ও বিভাগের প্রকৃত সমস্যা সুপরিস্ফুট করে তুলতে চেষ্টা করা হয়েছে, সেই সঙ্গে ইশারা ইঙ্গিতে একথাও বুঝাতে করা হয়েছে যে, এসব সমস্যার সমাধানের জন্য আজ যত চেষ্টাই করা হয়েছে, তা সবই নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এতে করে জনগণের মনে এ প্রশ্ন তীব্রভাবে জাগতে পারে যে, তাহলে মানবতার মুক্তি কোথায়, কিভাবে সম্ভৰ সমস্যাসমূহের সমাধান, কিরূপে সম্ভব অপেক্ষাকৃত উন্নত পদ্ধতিতে বিশ্বশান্তি স্থাপন?</p>
<p>এ সম্পর্কে আমাদের চূড়ান্ত মত এই যে, ইসলামী জীবনাদর্শ ব্যতীত মানব জীবনের এই সব সমস্যার কোন সমাধানই সম্ভব নয়। আদর্শ ও নীতির দিক দিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করলেই একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হতে পারে। আর বিশ্বসমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হতে পারে না বিশ্বরাষ্ট্র ব্যতীত, হতে পারে না বিশ্বশান্তি স্থাপন ।</p>
<p>কিন্তু এ বিশ্বরাষ্ট্রের জন্যে অপরিহার্য হচ্ছে একটি বিশ্বমত, নির্বিশেষে সর্বজন গ্রাহ্য একটি মতাদর্শ। এরূপ একটি বিশ্বমত হতে পারে শুধু তাই, যাতে সর্বপ্রথমেই স্বীকৃত হবে দুটো কথা</p>
<p>১। বিশ্ব স্রষ্টার প্রভুত্ব, সার্বভৌমত্ব এবং</p>
<p>২। বিশ্বমানবের একত্ব, ঐক্য, একবংশ জাত ও পরস্পর ভাই ভাই হওয়া। বর্তমান দুনিয়ার মতবাদসমূহের মধ্যে ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন মতই এইরূপ আদর্শিক বুনিয়াদ ছাড়া বিশ্বরাষ্ট্রও সম্ভব নয়, বিশ্বশান্তিও স্থাপিত হতে পারে না।</p>
<p>বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, &#8216;কোন আন্তর্জাতিক প্রভুত্ব সম্পন্ন শক্তির সম্মুখে পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার না করলে অকৃত্রিম আত্মসমর্পণের সাথে নিজেকে সোপর্দ না করলে দুনিয়ার মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক প্রভুত্বসম্পন্ন শক্তি কে, এরূপ এক সত্তা পেশ করতে পারে কোন মতাদর্শ?</p>
<p>ইসলাম খোদা সম্পর্কে যে ধারণা ও আকীদা পেশ করেছে তার দৃষ্টিতে ইসলামের খোদাই হতে পারেন সেই আন্তর্জাতিক প্রভুত্ব ও মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা। দুনিয়ার অপর কোন মতবাদ খোদা সম্পর্কে সেরূপ ধারণা কেন দেয়নি, যাতে করে তাদের মত অনুযায়ী খোদাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা সম্পন্ন সত্তারূপে গ্রহণ করা যেতে পারে। অতএব বিশ্বরাষ্ট্র স্থাপন ও বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্যে ইসলামের খোদাকে চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব ও প্রভুত্বের মালিক সত্তা মনে করেই এদিকে অগ্রসর হতে হবে। কেবল জাতিসমূহের সমন্বয়ে গঠিত World state ই একাজ করতে সমর্থ হবে না, যেমন আজ পর্যন্ত তেমন কোন প্রতিষ্ঠানই তা করতে পারেনি।</p>
<p>দ্বিতীয় বিষয় সম্পর্কে বিবেচনা করলেও আমরা দেখতে পাই, দুনিয়ার মতবাদগুলি মানুষকে মানবতাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে দিয়েছে এবং সে ভাগের ভিত্তি হচ্ছে বংশ, বর্ণ, অঞ্চল, ভাষা এবং শ্রেণী- অর্থনৈতিক শ্রেণী। আর গণতন্ত্রের যুগে তা হচ্ছে ভৌগোলিক আঞ্চলিকতা ভিত্তিক জাতীয়তা। পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, মানুষের পরস্পরের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টির এ মতগুলোই হচ্ছে মূলগত কারণ। মতবাদের জগতে একমাত্র ইসলামই হচ্ছে এমন এক আদর্শ, যাতে মানুষকে এসব বৈষয়িক ও বস্তুমূলক জিনিসর ভিত্তিতে ভাগ করেন। এগুলোর দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, ইসলাম সেগুলোকে অতি স্বাভাবিক পার্থক্য হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে; কিন্তু এগুলোর ভিত্তিতে মানবতার মধ্যে অধিকারও মর্যাদার ক্ষেত্রে কোনরূপ পার্থক্য, তারতম্য ও অগ্রাধিকার সৃষ্টি  করতে ইসলাম আদৌ প্রস্তুত নয়। ইসলাম মানুষের মধ্যে শুধু মাত্র একটি দিক  দিয়েই পার্থক্য করে, তা হচ্ছে ইসলাম পালন করা ও না করার দিক। কিন্তু এ কারণেও মানুষের মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য করা হয় না, অগ্রাধিকার ও মর্যাদার দিক দিয়ে পার্থক্য করা হয় মাত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মতবাদসমূহের</strong> <strong>পরিণাম</strong></p>
<p>দুনিয়ায় মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনের সূচনা থেকেই বিভিন্ন মতবাদেরও সূচনা হয়েছে। কতশত মতবাদ যে দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত মানুষের নিকট পেশ করা হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। বর্তমানে মতবাদ হিসেবে যে কয়টির স্থিতি এখনো দেখা যায়, তার মধ্যে রাজতন্ত্র, ডিক্টেটরশিপ, গণতন্ত্র ও কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র- এ কয়টিরই নাম করা যেতে পারে। আমরা পূর্বের দীর্ঘ আলোচনায় দেখেছি যে, এ মতগুলোর কোনটিই মানুষের জীবন-সমস্যার সুষ্ঠু ও সঠিক কোন সমাধানই দিতে পারেনি। বরং দুনিয়ার যাবতীয় সমস্যাই মূলত: সৃষ্টি হয়েছে এসব মতবাদের কারণে। এ গুলোর এ ব্যর্থতার পর মানবতা হয়ত আশান্বিত হয়ে থাকতে পারে যে, এতদাপেক্ষাও উন্নত ও কল্যাণকর কোন মতাদর্শ রচিত হবে এবং মানবতার যাবতীয় সমস্যার সমধান করে দেবে। কিন্তু বিগত তিন চারশ বছরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাস একথা প্রমাণ করে যে, কমিউনিজম ও সমাজতন্ত্রের পর আর কোন মতাদর্শই মানবসমাজে রচিত হয়নি, উদ্ভাবিত হয়নি। এতে করে একথা জোর করেই বলা যেতে পারে যে, দুনিয়ায় আর কোন নতুন মতবাদ আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, আদর্শ ও মতবাদের দিক দিয়ে দুনিয়ার মানবতা বন্ধ্যা হয়ে গেছে। বর্তমানের মতবাদসমূহের তুলনায় উন্নত ও অধিকতর মানবতাবাদী আর কোন মতবাদ রচিত হওয়া বাস্তবিকই সম্ভব নয়। আমি আবার বলছি, মানুষের জন্য সামগ্রিক কল্যাণের নিয়ামক হতে পারে কেবলমাত্র সেই মতাদর্শ, যা যুগপতভাবে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যার একই মূলসূত্রভিত্তিক সমাধান পেশ করতে পারবে। এরূপ মতবাদ ইসলাম ভিন্ন আর কিছুই হতে পারে না। কাজেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আমরা বাধ্য হচ্ছি, এ সিদ্ধান্ত ছাড়া বিশ্বের মানবতার কোন গতিই নেই যে, ইসলাম হচ্ছে বিশ্বমানবতার ভবিষ্যৎ, একমাত্র রক্ষাকবচ। এই ইসলামকে বাস্তবায়িত করা না হলে দুনিয়ার ধ্বংস অনিবার্য।</p>
<p>এজন্য দুনিয়াবাসীর সামনে দুটো মাত্র পথ খোলা রয়েছে। হয় ইসলামকে পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং তারই ভিত্তিতে মানুষের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে এ ধ্বংসোন্মুখ বিশ্বকে রক্ষা করতে হবে। আর তা না হলে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসকে বরণ করে নিতে হবে। সে ধ্বংস যে কবে হবে তা যদিও নির্দিষ্ট করে বলা যায় না; কিন্তু ধ্বংস যে নিশ্চিত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার মাঝখানে তৃতীয় কোন পথ হতে পারে না।</p>
<p>কাজেই আজ ইসলামের &#8216;প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি বিশ্ব-মানবকে কোরআনের আকুল আহ্বান জানাচ্ছি:</p>
<p>تعالوا إلى كلمة سواء بيننا وبينكم الا نعبد إلا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا أربابا من دون الله</p>
<p>-“এসো হে মানুষ! এমন একটি কথার দিকে, যা তোমাদের ও আমাদের মাঝে সব দিক দিয়েই সমান। তা হচ্ছে এই যে, (আমরা ও তোমরা মিলে এই নীতি অবলম্বন করব যে,) আমরা এক আল্লাহ ব্যতীত আর কারো বন্দেগী ও দাসত্ব করব না, তাঁর সাথে কাউকেই (কোন জিনিসকেই) শরীক করব না: এমনকি আমরাও পরস্পর পরস্পরকে রব বলে মেনে নেব না; খোদাকে বাদ দিয়ে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৬৪)</p>
<p>নবী করীম (সা.) বলেছেন:</p>
<p>إن ربكم واحد وإن أباكم واحد كلكم من آدم وآدم من تراب</p>
<p>-“নিশ্চয়ই তোমাদের খোদা এক এবং সকলের পিতা নিশ্চয়ই একজন। অর্থাৎ তোমরা সকলেই আদম বংশজাত। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।</p>
<p>সৃষ্টিকর্তার একত্ব ও তওহীদ-বিশ্বাস মানুষের জন্যে অপরিহার্য, নিরপেক্ষ ও সার্বভৌম শক্তি উপস্থাপিত করে। যে সমাজের মানুষ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে খোদাকেই একমাত্র সার্বভৌম সত্তারূপে স্বীকার করে নেয়, সে সমাজে ব্যক্তিদের জীবনে প্রকৃতই কোন সমস্যা দেখা দিতে পারে না, কোন সমস্যা দেখা দিলেও খোদায়ী সার্বভৌমত্তের বুনিয়াদে তার সুষ্ঠু সমাধান অনতিবিলম্বে করে যেতে পারে। এ আলোচনায় সবিস্তারে যে সব সমস্যার উল্লেখ করা হয়েছে তার কোন একটি ও এমন নয়, যার সমাধান খোদায়ী সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে করা যায় না। বিশেষতঃ মানবীয় প্রভুত্বের কারণে বিশ্বব্যাপী যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে তা নিমিষে নিঃশেষ হতে পারে। কেননা খোদাকে চূড়ান্ত সার্বভৌম শক্তিরূপে মেনে নিলে কোন ব্যক্তিই নিজে প্রভুত্বের লোভী হতে পারে না। এরই সঙ্গে সারা বিশ্বের সমগ্র মানুষের একত্ব ও অভিন্নতার ধারণাকেও মিলিয়ে দেখা আবশ্যক। সমগ্র মানুষ যদি পরস্পরকে একই বংশোদ্ভূত ও সমান ভাই মনে করতে পারে, তা হলে বর্তমান সময়ে মানুষের পরস্পরে যে হিংসা দ্বেষ, যে শ্রেণী-পার্থক্য, যে উঁচু নিচের, আশরাফ আতরাফের, কালো ধলার তারতম্য রয়েছে, যা মানুষের জীবনকে আজ দুর্বিসহ করে তুলেছে, তা নিমিষে বিলীন হয়ে যেতে পারে এবং এ দু&#8217;য়ের বিনিময়ে স্থাপিত হতে পারে এমন এক বিশ্বরাষ্ট্র, যা বিশ্বমানবের কোন সমস্যাকেই অসমাধিত রাখবে না। এ বিষয়টিকে আমাদেরকে আরো একটু গভীর দৃষ্টিতে সবিস্তারে বিচার করে দেখতে হবে। অন্যথায় এ কথা কয়টির গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাবে না। সেজন্যে এখানে আরো খানিকটা আলোচনা করা যাচ্ছে।</p>
<p>উপরে যে দুটো নীতির কথা বলা হয়েছে তা স্বীকার করে নিলে সবচেয়ে বড় কাজ হবে এই যে, মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার এক আমূল পরিবর্তন সূচিত হবে। প্রাচীন অবস্থার অবসানে সৃষ্টি হবে এক নতুন রকমের চিন্তা ও মানসিকতা। চিন্তাপদ্ধতি, জীবনের উদ্দেশ্য, চেষ্টা সাধনা ও যাবতীয় কাজ কর্মের লক্ষ্য বদলে যাবে। এক কথায় বলা যায়, এ নীতি গ্রহণ করলে প্রাচীন মানুষ থেকে এক নতুন মানবসমাজ গড়ে উঠবে। বর্তমানের বস্তুবাদী ও জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গী খতম হয়ে গিয়ে সেখানে দৃঢ়মূল হবে খোদাবাদী দৃষ্টি। জীবন দর্শন ও জীবন বিধানও সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হবে। বস্তুত: ইসলাম খোদা সম্পর্কে যে ধারণা পেশ করেছে, তার কাছে দুনিয়ার অন্যান্য দার্শনিক ও ধর্মবিদদের পেশ করা ধারণার কোন তুলনা কোন সামধ্যই হতে পারে না।</p>
<p>ইসলামের দৃষ্টিতে খোদা কেবলমাত্র সর্বাত্মক, সর্বজ্ঞ ও মহান, পবিত্র সত্তাই নন, তাঁর সাথে মানুষের দৈনন্দিন জিন্দেগীর সরাসরি সম্পর্কও রয়েছে। মানব জীবনের জন্যে তিনি সব সময়ই বিধান ও ব্যবস্থা প্রেরণ করেছেন। আর তার সর্বশেষ বিধান পাঠিয়েছেন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদের (সাঃ) মারফতে, যা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হবে। সূরা বাকারার ২৫৫ আয়াতে আল্লাহ নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে,</p>
<p>الله لا إله إلا هو الحي القيوم &#8211; لا تأخذه سنة ولا نوم &#8211; له ما في السماوات وما في الأرض</p>
<p>ইসলামের এ তওহীদ দর্শনের ভিত্তিতে আমরা পাঁচটি মূলনীতি অনায়াসে পেতে পারি, যার ভিত্তিতে বর্তমান দুনিয়ার মানুষের সর্ববিধ সমস্যার সমাধান অতি সহজেই লাভ করতে পারি। মূলনীতিগুলো যথাক্রমে এখানে পেশ করা যাচ্ছেঃ</p>
<p>১। দুনিয়ার কোন ব্যক্তি বা জাতি নিজের ও নিজ দেশ ও জাতির নিরঙ্কুশ সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ ও ব্যবহারের অধিকারী হতে পারে না। এ মূলনীতি গ্রহণ ও কার্যকরী হলে একদিকে যেমন ব্যক্তিদের পরস্পরের ঝগড়া বিবাদ ও হিংসাদ্বেষের অবসান হবে, তেমনি মানবীয় প্রভুত্বের কারণে উদ্ভূত এই যুদ্ধ-বিগ্রহ, রেষারেষি, হিংসা-দ্বেষ ও লুঠতরাজজনিত অশান্তিরও মুলোৎপাটন হতে পারে।</p>
<p>২। সারা দুনিয়ার সার্বভৌমত্ব ও প্রভুত্বের একচ্ছত্র মালিক হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ।</p>
<p>দুনিয়ার সব মানুষ ও সব জাতি তাঁরই অধীন, তারই প্রজা। প্রথমেই নেতিবাচক মূলনীতির পর এ অস্তিবাচক মূলনীতি প্রভুত্ব সার্বভৌমত্বের যাবতীয় কোন্দল দূর করতে পারে। তাছাড়া এর ভিত্তিতে এই বিশ্ব প্রকৃতিতে মানুষের যে আসল ও প্রকৃত মর্যাদা তা সুপ্রকট হয়ে উঠে। আল্লাহ তায়ালা এই দুনিয়ার কাউকেই প্রভুত্ব ও চূড়ান্ত মালিকানা কর্তৃত্ব দান করেননি। বরং মানুষকে করেছেন এ দুনিয়ায় তাঁর প্রতিনিধি, তাঁর কর্মচারী। এদের কাজই হচ্ছে সকল ব্যাপারে প্রকৃত মালিক খোদার মর্জি মোতাবেক কাজ করা, তাঁরই সন্তোষ বিধানকে লক্ষ্যস্থলে পরিণত করা। এ নীতি মানুষের প্রকৃতি ও মনস্তত্ত্বের সাথেও পূর্ণসামঞ্জস্যশীল। তাই খোদাকে একমাত্র চূড়ান্ত প্রভু ও সার্বভৌম শক্তিরূপে মেনে নিতে কারো মনে কোন দ্বিধা বা সংকোচ থাকতে পারে না। মানুষের গোলামী করায় মানুষের যে কোন মর্যাদাই থাকতে পারে না, বরং তার বদলে সকল মানুষ মিলে এক খোদার গোলামী করায় যে সাম্য ও শান্তি বিরাজমান, এ কথা সকলের পক্ষেই সহজবোধ্য হতে পারে।</p>
<p>তাহলে, মানুষ জীবনবিধান ও আইন কানুন কোথা থেকে পাবে, মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহুর্তেই যার প্রয়োজন দেখা দেয়? এর জবাব তৃতীয় মূলনীতিতেই পাওয়া যায়।</p>
<p>৩। দুনিয়ার প্রত্যেকটি দেশ ও জাতির একমাত্র কাজ হচ্ছে প্রকৃত মালিক ও বিধানদাতার দেয়া বিধান সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ ও অনুসরণ করে চলা, যা তিনি তাঁর নবীদের শেষ নবীর মাধ্যমে নাজিল করেছেন। আল্লাহ বাস্তবিকই মানব জাতিকে নিরুদ্দেশ ও অন্ধকারে হাতড়ে মরার জন্যে সৃষ্টি করেননি; নিতান্ত অসহায় করেও ছেড়ে দেননি এই পৃথিবীতে। বরং সব সময়ই তিনি পথ নির্দেশ করেছেন, জীবন যাপনের সার্বিক বিধান দান করেছেন, দিয়েছেন শাসন ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় আইন-কানুন।</p>
<p>৪। দুনিয়ায় সব মানুষ শুরু থেকেই মানুষ এবং একই মা ও বাবার ঔরসজাত সন্তান। স্মরণাতীতকাল থেকে মানুষে মানুষে বর্ণ, বংশ ও ভাষা ইত্যাদির দিক দিয়ে তারতম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব কারণে পার্থক্য করা হচ্ছে তাদের মৌলিক মানবীয় অধিকারে।</p>
<p>বর্তমানেও এ জিনিস প্রচণ্ডরূপে বর্তমান। ফলে মানুষের পরস্পরে হিংসা দ্বেষ, রেষারেষি ও টানা হেঁচড়া প্রাণান্তকর হয়েছে। আজ পর্যন্ত কোন চেষ্টা ও ব্যবস্থাই এর অবসান করতে সমর্থ হয়নি, কিন্তু খোদার তাওহীদ-দর্শনই হচ্ছে এসব শেষ করার একমাত্র অমোঘ হাতিয়ার। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন জলদ গম্ভীর স্বরে:</p>
<p>ياأيها الناس إنا خلقناكم من ذكر وأنثى وجعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا إن أكرمكم عند الله أتقاكم إن</p>
<p>الله عليم خبيره</p>
<p>“হে মানব জাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একই পুরুষ (পিতা) ও স্ত্রী (মাতা) থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন কবীলা ও গোত্রে এ উদ্দেশ্যে যে, তোমরা পরস্পরের নিকট পরিচিত হবে। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মাঝে অধিক সম্মানার্হ ব্যক্তি সেই, যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুই জানেন, সব বিষয়ে ওয়াকিফহাল।” (সূরা হুজরাত, আয়াত-১৩)</p>
<p>৫। এই জীবনের অবসানের পর আর একটি জীবন আসবে, যেখানে সব মানুষই উপস্থিত হবে, হতে বাধ্য হবে খোদার সম্মুখে এবং সেখানে নিজ নিজ দুনিয়ার জীবনের কাজ কর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিবে ।</p>
<p>এ নীতিটি প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন সুষ্ঠু ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ মূলনীতি বিশ্বাস না করলে কোন মানুষই মানবতার নিঃস্বার্থ খেদমত করতে পারে না। পারে না মানুষ অপর মানুষের উপর থেকে যুলুম শোষণ নির্যাতন বন্ধ করতে। এটি বিশ্বাসই মানুষকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পাপ ও অন্যায় আচরণ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। এ বিশ্বাসের প্রভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বে, মানসিকতায়, দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজে কর্মে, আচরণে, চেষ্টা সাধনা ও শ্রমমেহনতে এক মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়। বিশ্বে প্রকৃত ও স্থায়ী শান্তি সর্বক্ষেত্রে সর্বব্যাপী শান্তি-স্থাপন করার উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না এ বিশ্বাস ছাড়া। এ বিশ্বাস হচ্ছে ইসলামী আদর্শের অন্যতম ভিত্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আন্তর্জাতিক</strong> <strong>ক্ষমতা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ভারসাম্য</strong></p>
<p>বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেখানে মাত্র দুটো শিবিরের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দেখা যায় এবং যার ফলে যুদ্ধাশংকা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে, এর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে আবশ্যক হবে দুনিয়ার নিরপেক্ষ কতগুলি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি তৃতীয় শিবির গঠন করা। উপরে ইসলামের যে দুটো বুনিয়াদের উল্লেখ করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে যদি একটি রাষ্ট্র কোথাও স্থাপিত হয়, তাহলে অনতিবিলম্বে আরো কতগুলো নিরপেক্ষ এবং উক্ত বুনিয়াদঘয়ে বিশ্বাসী রাষ্ট্রের এক আন্তর্জাতিক জোট তৈয়ার হতে পারে এবং এ রাষ্ট্রজোটই উভয় শিবিরের মাঝখানে থেকে ক্ষমতার এক ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে। এ রাষ্ট্রজোট যেমন নিজদের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রকে গড়ে তুলবে উক্ত বুনিয়াদদ্বয়ের ভিত্তিতে গড়া জীবনব্যবস্থা অনুযায়ী, তেমনি উভয় শিবিরের মাঝখানে তা বিশ্বমানবতাকে এক তৃতীয় আলোকজ্জ্বল পথের সন্ধান দেবে। এ রাষ্ট্রজোট যদি মাঝখানে থেকে আণবিক শক্তির ন্যায় সকল প্রকার প্রলযংকরী  অস্ত্রের ব্যবহার করার বিরোধিতা করে, যুদ্ধ না করার জন্যে যদি ক্রমাগত আন্তর্জাতিক চাপের সৃষ্টি করে, তাহলে, বর্তমানের যুদ্ধাশংকা অপেক্ষাকৃতভাবে অনেকখানি হ্রাস পাবে। এ রাষ্ট্রজোট যদি সত্যিই আদর্শবাদী ও নীতিপরায়ণ হয়, মানবকল্যাণকর নীতির উপর যদি দৃঢ়তাসহকারে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে বর্তমান দুনিয়ার শক্তিদ্বয়ও তাকে সমীহ না করে কিছুতে পারবে না, একথা নিঃসন্দেহ।</p>
<p>বর্তমানের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের জন্যে এ অপরিহার্য ভূমিকা কে কেন গ্রহণ করবে, তাই হচ্ছে আজকের এক অমোঘ প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জওয়াব দিতে পরে কে? আমাদের বিচারে এ প্রশ্নের সঠিক ও বাস্তব জওয়াব দিতে পারে একমাত্র পাকিস্তান, পাকিস্তানই আজ এক আন্তর্জাতিক ইসলামী জোট তৈরী করে দুনিয়ার পরিস্থিতিই বদলে দিতে পারে অতি সহজেই, কিন্তু পাকিস্তান এ কঠিন- এ বিরাট দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত কিনা, তা এখানকার অধিবাসী জনগণেরই বিবেচ্য। <strong>(</strong><strong>ইসলামী</strong> <strong>সেমিনারের</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>দিনের</strong><strong> (</strong><strong>৩রা</strong> <strong>মার্চ</strong> <strong>৬১</strong><strong>) </strong><strong>প্রথম</strong> <strong>অধিবেশনে</strong> <strong>প্রদত্ত</strong> <strong>উদ্বোধণী</strong> <strong>ভাষণ</strong><strong>)</strong><strong>  </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৯৩২ সনে লীগ অব নেশান্স এর International Institute of Intellectual co-operation এর ফরমায়েশ অনুযায়ী প্রফেসর আইনস্টাইন দার্শনিক ফ্রয়ডের নিকট জিজ্ঞেস করেছিলেন, “মানবতাকে যুদ্ধের নির্মমতা থেকে রক্ষা করা যায় কি?”</p>
<p>বহু বৎসর অতীত হয়ে গেছে এ প্রশ্ন উঠেছিল, এরপর আর একটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়ে গেছে; কিন্তু এর সঠিক জওয়াব আজও দেওয়া হয়নি। এর জওয়াব দুটো দিক দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে ।</p>
<p>যুদ্ধ একেবারে হতে পারবে না যে কাজ করলে বা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে, তা  গ্রহণ করে যুদ্ধাশংকা সম্পূর্ণরূপে দূর করে দেওয়া। তখন আণবিক যুদ্ধের কোন আশংকাই থাকবে না, তার সম্ভাবনাই একেবারে শেষ হয়ে যাবে, এরূপ জওয়াব একমাত্র খোদাই দিতে পারেন, অপর কোন শক্তি নয় ।</p>
<p>আর একটি জওয়াব হচ্ছে, যুদ্ধের প্রকৃত কারণ, মানবীয় প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের দাসত্ব খতম করা। এরূপ করতে পারলে নিঃসন্দেহে যুদ্ধাশংকা দূর হবে।</p>
<p>আমাদের কর্তব্য হচ্ছে দুনিয়া থেকে মানবীয় প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব খতম করা | এবং খোদায়ী প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় বুনিয়াদে প্রতিষ্ঠিত করা। এজন্যে সাধনা করা, সংগ্রাম করা, জিহাদ করা।</p>
<p>-এ জওয়াব কি আমাদের ভাল লাগে?</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/world-problems-and-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7550</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের পুনর্জাগরণ: ধর্মীয় বিপ্লব নাকি রাজনৈতিক বিপ্লব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-renaissance-religious-revo-lution-or-political-revolution/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-renaissance-religious-revo-lution-or-political-revolution/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আলীয়া ইজ্জেতবেগোভিচ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 21 Oct 2022 14:44:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামের পুনর্জাগরণ: ধর্মীয় বিপ্লব নাকি রাজনৈতিক বিপ্লব]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনৈতিক বিপ্লব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7477</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী ব্যবস্থা একই সাথে বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমন্বয়। তাহলে ইসলামী ব্যবস্থায় কিভাবে উপনীত হব? ধর্মীয় নবায়নের মাধ্যমে নাকি রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে? এই প্রশ্নের জবাব হল, ধর্মীয় চিন্তার নবায়ন ছাড়া ইসলামের পুনর্জাগরণ শুরু হবে না, তবে রাজনৈতিক বিপ্লব ছাড়াও এটা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী ব্যবস্থা একই সাথে বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমন্বয়। তাহলে ইসলামী ব্যবস্থায় কিভাবে উপনীত হব? ধর্মীয় নবায়নের মাধ্যমে নাকি রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে?</p>
<p>এই প্রশ্নের জবাব হল, <strong><em>ধর্মীয় চিন্তার নবায়ন ছাড়া ইসলামের পুনর্জাগরণ শুরু হবে না, তবে রাজনৈতিক বিপ্লব ছাড়াও এটা সফলতার সাথে পূর্ণতায় পৌঁছাবে না। এই জবাব, ইসলামী পুনর্জাগরণকে দ্বিমুখী একটি বিপ্লব হিসেবে সঙ্গায়িত করে।</em></strong> একটি হল, আখলাকী বিপ্লব, অপরটি হল সামাজিক বিপ্লব। এই জবাবের মধ্যে ধর্মীয় চিন্তার নবায়নের প্রতি বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। এর প্রতি জোর দেওয়ার কারণ হল, ইসলামের প্রকৃতি ও মূলনীতি সমূহের পাশাপাশি মুসলিম দুনিয়ার কিছু অবশ্যস্বীকার্য বাস্তবতা।</p>
<p>আজকে যদি আমরা মুসলিম দেশ সমূহের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, মুসলমানদের মধ্যে আজ আখলাকহীনতা, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, কুসংস্কার, অলসতা, দ্বিমুখীতা, অনৈসলামী কৃষ্টি-কালচার এবং চরম বস্তুবাদীতা ব্যপকভাবে দানা বেঁধে উঠেছে। শুধু তাই নয় এর সাথে যুক্ত হয়েছে উদ্যোগ ও স্বপ্নের নির্মম অনুপস্থিতি। অবস্থা যখন এমন তখন কি কোন ধরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার অনতিবিলম্বে শুরু করা সম্ভব?</p>
<blockquote><p><strong>ইতিহাসের মঞ্চে যথাযথ ভূমিকা পালন করার পূর্বে প্রত্যেক জাতিকেই একটি অভ্যন্তরীণ আত্মশুদ্ধির পথ পাড়ি দিতে হয় এবং কিছু কিছু মৌলিক আখলাকী মূল্যবোধকে সত্যিকার ভাবে হৃদয় দিয়ে ধারণ করতে হয়। দুনিয়ার মঞ্চে আত্মপ্রকাশকারী প্রতিটি শক্তিই, বলিষ্ঠ আখলাকের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়। আর প্রতিটি পরাজয়ই শুরু হয় আখলাকী অধঃপতনের মধ্য দিয়ে। যা কিছুই করতে চাওয়া হোক না কেন সর্বাগ্রে সেটা মানুষের রূহের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। কেননা রূহের জাগরণ ছাড়া কোন জাগরণই সম্ভবপর নয়।</strong></p></blockquote>
<p>ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হিসেবে ইসলামী চিন্তার নবায়ন বলতে কি বুঝানো হয় ?</p>
<p><strong>সর্বাগ্রে এটা দুইটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেঃ নতুন এক জজবা ও নতুন এক ইচ্ছাশক্তি (ইরাদা)</strong></p>
<p>ধর্মীয় চিন্তার নবায়ন করার অর্থ&nbsp; হল,&nbsp; জীবনের মূল উদ্দেশ্য কি, কেন ও কিসের জন্য বেঁচে আছি এবং কিভাবে বেঁচে থাকা প্রয়োজন , এই সকল বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট একটি জজবার অধিকারী হওয়া। এই উদ্দেশ্য কি ব্যক্তিগত কিংবা অভিন্ন কিছু মানে উন্নীত হওয়া ,&nbsp; নিজ দেশ ও জাতির জন্য মান-মর্যাদা বইয়ে নিয়ে আসা, নিজেকে সত্যায়িত করা, নাকি আল্লাহর বিধানকে দুনিয়াতে বিজয়ী করা? আমাদের অবস্থান থেকে ধর্মীয় চিন্তার নবায়ন করার অর্থ হল, নিজেকে মুসলমান বলে দাবিকারী কিংবা তাঁদেরকে এই নামে অভিহিত করার ব্যক্তিদেরকে ইসলামীকরণ করা। এই ইসলামীকরণের সূচনাবিন্দু হল, আল্লাহর প্রতি অটল ও অবিচল ঈমান এবং ইসলামের যে আখলাকী মূল্যবোধ রয়েছে সেই সকল মূল্যবোধকে যথাযথ আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়ন।</p>
<p>ধর্মীয় চিন্তার&nbsp; নবায়নের দ্বিতীয় মৌলিক ধাপ হল, মূল উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কিত জজবার যে দাবী সে দাবীকে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রস্তুত থাকা। এই কারণে ধর্মীয় চিন্তার নবায়নের অর্থ হল মানসম্পন্ন একটি উচ্চ আখলাক ও উৎসাহ-উদ্দীপনাকে হৃদয়ে লালন করা এবং&nbsp; <strong>বস্তুর উপর রূহের প্রভাব যে অপরিসীম এটার উপর বিশ্বাস করা</strong>। শুধু তাই নয়, এমন একটি আদর্শ লালন করা যে আদর্শ সাক্ষ্য দেয় সাধারণ মানুষ অসীম সাহসী হয়ে থাকে এবং তাঁরা আত্মত্যাগের জন্যও সদা প্রস্তুত থাকে। বিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তির (ইরাদা) দিক থেকেও এটা অনেকটা নতুন ধরণের বিশ্বাস ও উদ্যোগ যার ভিত্তিতে সবাই তাঁদের আদর্শের জন্য চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকার করতে উজ্জীবিত হবে।</p>
<p>এই নব চেতনা ও রূহে উপনীত হওয়া ছাড়া বর্তমান মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সত্যিকারের কোন পরিবর্তন আসা সম্ভবপর নয়।</p>
<p><strong><em>এই বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময় অনেক সময় দেখতে পাই যে,&nbsp; অনেকেই সংক্ষিপ্ত পন্থায় ক্ষমতা দখল করে ইসলামী ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করার কথা চিন্তা করে থাকেন। তাঁরা বলে থাকেন যে এই ভাবে ক্ষমতায় গিয়ে তাঁরা যথাযথ প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ধারাবাহিকভাবে জনগণকে ধর্মীয়, আখলাকী ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা দিয়ে ইসলামী ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন।&nbsp;</em></strong></p>
<p><strong><em>এই ধরণের চিন্তা প্রলোভন ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইতিহাসের পাতায় এমন কোন সত্যিকারের বিপ্লব পাওয়া যায় না, যা ক্ষমতার বিন্দু থেকে শুরু হয়েছে। সত্যিকারের বিপ্লব শিক্ষার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং সেই শিক্ষা ব্যবস্থা তাঁর মূলে আখলাকী একটি আহ্বানকে ধারণ করেছে।&nbsp;&nbsp;</em></strong></p>
<p>অপর দিক থেকে যারা ইসলামী ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকে ক্ষমতা ও বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চান, তাঁদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় এমন ধরণের সরকার ও প্রতিষ্ঠান কোথা থেকে আসবে? তখন তাঁরা এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেন না। এই ধরণের সরকার কে প্রতিষ্ঠা করবে? কে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে এবং এই সরকার ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ কোথা থেকে আসবে? সর্বশেষে, এই সরকারের কর্মকাণ্ড সমূহকে কে পর্যবেক্ষণ করবে এবং যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হবে সেটাকে বাদ দিয়ে যে তাঁরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা শুরু করবে না এর নিশ্চয়তা কে দিবে?</p>
<p>ক্ষমতায় যারা থাকে তাঁদেরকে এক গ্রুপকে দিয়ে অন্য গ্রুপকে পরিবর্তন করা যায়, এটা নিত্তনৈমিত্তিক&nbsp; একটি ব্যাপার। একজনের জুলুম ও স্বৈরতন্ত্র অপরের মাধ্যমে পরিবর্তন করা কিংবা দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির সম্পদও অপরের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব। নাম, পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং স্লোগান সমূহকে পরিবর্তন করা যায়।&nbsp; কিন্তু&nbsp;&nbsp; এসব কিছুর মাধ্যমে পৃথিবীর এক নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ইসলামী ব্যবস্থার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব নয়, যার মাধ্যমে মানুষের সাথে নিজের, অন্যের এবং তাবৎ জগতের এক নতুন সম্পর্কের গতিপথ রচিত হয়।</p>
<p>শক্তি অর্জন কিংবা ক্ষমতা দখলের ভাবনার মধ্যে আছে মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা, নিজের প্রবৃত্তির মোকাবেলায় যে জিহাদ তার প্রাথমিক ও কষ্টদায়ক পথটা পরিহার করা। <strong><em>মানুষকে তৈরি করে তাঁকে পরিচালনা করা কঠিন কিন্তু তাঁর চেয়েও কঠিন হল নিজেকে তৈরি করে সঠিক পথে পরিচালিত করা।</em></strong></p>
<blockquote><p>ধর্মীয় পুনর্জাগরণের সূচনাই হয় নিজেকে দিয়ে এবং নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে। অপর দিকে শক্তি প্রয়োগ ও জবরদস্তির ঘটনা ঘটে অন্যকে দিয়ে। আর এ&nbsp; কারণেই এই চিন্তাটা এত বেশী চিত্তাকর্ষক।</p></blockquote>
<p>এই কারণে যে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হল ইসলামী ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, সর্বাগ্রে সেই আন্দোলনকে একটি আখলাকী আন্দোলন হতে হবে। আর এই ধরণের আন্দোলনের মাধ্যমেই কেবল মানুষকে আখলাকী দৃষ্টিকোণ থেকে উজ্জীবিত ও উচ্চ মর্যাদায় আসীন করা যাবে । মানুষ যেন আরও ভালো মানুষে পরিণত হতে পারে এই জন্য আন্দোলনের মধ্যে আখলাকী কর্মকাণ্ডের ধারাকে ব্যাপকভাবে জারী রাখতে হবে। ইসলামী আন্দোলন ও সাধারণ রাজনৈতিক দলের মধ্যে এটাই হল মৌলিক পার্থক্য। কেননা সাধারণ রাজনৈতিক দলসমূহ একই চিন্তা ও অভিন্ন স্বার্থে একত্রিত হওয়ার পরে তাঁদের মধ্যে আখলাকী কোন মূল্যবোধ কিংবা আখলাকী কোন দায়িত্ত্ববোধ নেই।</p>
<p>ধর্মীয় চিন্তার নবায়নকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি ইসলামের মূল উৎস সমূহের মধ্যেও সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যায়।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> কোরআনে কারীম উল্লেখ করেছে যে অভ্যন্তরীণ পুনর্জাগরণ হল জনগণের অবস্থার পরিবর্তন বা উন্নতির পূর্বশর্ত।</p>
<p><strong>দ্বিতিয়ত,</strong> এই অমোঘ বিধানটি হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক&nbsp; ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে এবং প্রথম যুগে ইসলামকে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় সত্যায়িত হয়ে আছে। প্রথম তের বছর ধরে কোরআনে কারীমের শুধুমাত্র ঈমানী ও দায়িত্ত্বশীলতা সংক্রান্ত বিষয়ে জোর প্রদানের বিষয়টিও এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। এই ১৩ বছর ধরে কোরআনে কারীম কোন ক্রমেই রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার বিষয়ে কোন ধরণের মতামত পেশ করেনি এবং সামাজিক সমস্যা সংক্রান্ত ইসলামী কোন সমাধানও তুলে ধরেনি।</p>
<p><strong>ধর্মীয় চিন্তার নবায়নের পূর্বে তিনটি গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় চাই;</strong></p>
<p><strong>১।</strong> কোরআনে কারীমের আদেশ সমূহের, বিশেষ করে শিকড় সমূহ গভীরে প্রোথিত এমন সামাজিক সমস্যা সমূহ সংক্রান্ত বিষয়াদি কিংবা ক্ষমতাসীন অথবা সম্পদশালীদেরকে বিরক্ত করে এমন আদেশ সমূহের মধ্যে কোন ধরণের পরিবর্তন না ঘটিয়ে এবং কোন প্রকার আপোষ না করে সেই আদেশ সমূহকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে দৃঢ়তা প্রয়োজন সেটা কেবলমাত্র ধর্মীয় চিন্তার নবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। ধর্মীয় চিন্তার নবায়নের মাধ্যমে কোন প্রকারের শক্তি প্রয়োগ না করেই এবং ঘৃণাবোধকে জাগিয়ে না তুলেই করা সম্ভব। কেননা তখন সকলেই কিংবা নতুনভাবে জাগ্রত সমাজের অধিকাংশই মনে করবে যে এটাই হচ্ছে স্রষ্টার নির্দেশ এবং আদালতের মানদণ্ড, যা আমাদের সকলের মেনে চলতে হবে।</p>
<p><strong>২।</strong> ইসলামী পুনর্জাগরণ, এমন মানুষ ছাড়া কল্পনাও করা যাবে না যারা এই ধর্মীয় পুনর্জাগরণের জন্য বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিকভাবে সকল কিছুকেই ত্যাগ করতে প্রস্তুত। অনুরূপভাবে পারস্পারিক আস্থা ও সহযোগিতা ছাড়াও এই জাগরণের কথা চিন্তাও করা যায় না। <em>আবার এই বৃহৎ ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কুরবানীর ফলাফল যে নিজের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও অন্যকে অধীনস্ত করে রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হবে না এর নিশ্চয়তা কে দেবে? কোন ব্যবস্থা একটি নৈতিক ব্যর্থতার ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারবে যার উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে সুপ্রচুর।</em> ইসলামী ব্যবস্থাসহ প্রতিটি ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত ঘোষিত নীতির চেয়ে সেই সব মানুষকে প্রতিফলিত করে যারা এর প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত।</p>
<p><strong>৩।</strong>&nbsp; মুসলিম উম্মাহ আজ ঘোরতর পশ্চাদপদতার মধ্যে&nbsp; নিপতিত। এই অবস্থা থেকে মুসলিম উম্মাহকে উদ্ধার করতে হলে শিক্ষা ও শিল্পায়নের দিকে জোর দিতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এই ক্ষেত্রে&nbsp; গৃহীত পরিকল্পনাসমূহকে বাস্তবায়ন করতে হবে।&nbsp; <em><strong>ত</strong>বে পাশ্চাত্যের হুবুহু অনুকরণ করতে গিয়ে যদি যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া যদি উন্নয়নের দিকে যাওয়া হয় সেই অতি উন্নয়ন স্বৈরাচার, দুর্নীতি, পারিবারিক ব্যবস্থার অবক্ষয়, দ্রুত ও বৈষম্যমূলকভাবে সম্পদ বৃদ্ধি, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অবিবেচক ও সম্পদশীল লোকদের উত্থান, ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে অপরিকল্পিত নগরায়ন, সমাজের ভাঙ্গন ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ততা বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি ও গণিকাবৃত্তির প্রসারের মত আরও অনেক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।</em> এই অপসংস্কৃতি ও আদিমতার তুফানকে মোকাবেলা করার জন্য অনুপম পন্থা হল, আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং ধর্মীয় অনুশাসনকে সমাজের সকলে বাস্তবায়ন। এই ক্ষেত্রে ধর্মই পারে সংস্কৃতিকে ধর্মহীন সভ্যতা থেকে রক্ষা করতে। নিছক বস্তুগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আদিমতার প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারে। যার অহরহ নজির আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি।</p>
<p>উৎসঃ ইসলামী ডেক্লারেশন</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদক: <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ </a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-renaissance-religious-revo-lution-or-political-revolution/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7477</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কুদুস আমাদের সম্মান ও ইজ্জতের প্রতীক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/qudus-is-a-symbol-of-our-honor-and-dignity/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/qudus-is-a-symbol-of-our-honor-and-dignity/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[তেমেল কারামোল্লাওলু]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 17 May 2022 08:19:23 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বায়তুল মাকদিস]]></category>
		<category><![CDATA[বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7121</guid>

					<description><![CDATA[আপনাদের স্বপ্ন কুদুস, আপনাদের ধ্যান ধারণা কুদুস, আপনাদের সংগ্রাম কুদুসের জন্য তাই আপনাদের প্রতি আমার সালাম। আপনারা হলেন জালিমের আতংক এবং মজলুমদের জন্য আশা তাই সালাম আপনাদের প্রতি। আপনাদের পূর্বপুরুষগণ দীর্ঘ ছয়শত বছর সমগ্র দুনিয়াকে আদালতের ভিত্তিতে শাসন করেছে, ফিলিস্তিনে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>আপনাদের স্বপ্ন কুদুস, আপনাদের ধ্যান ধারণা কুদুস, আপনাদের সংগ্রাম কুদুসের জন্য তাই আপনাদের প্রতি আমার সালাম। আপনারা হলেন জালিমের আতংক এবং মজলুমদের জন্য আশা তাই সালাম আপনাদের প্রতি। আপনাদের পূর্বপুরুষগণ দীর্ঘ ছয়শত বছর সমগ্র দুনিয়াকে আদালতের ভিত্তিতে শাসন করেছে, ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, আপনারা সেই মহাপুরুষদের উত্তরসূরি। জুলুম, নির্যাতন এবং দখলদারিত্ব যেন আজ জেরুজালেমের অপর নাম, এই অবস্থার উত্তরণ করে এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্ত্বার শহরে পরিবর্তন করে দারুস সালামে রুপান্তরিত করবেন আপনারাই। আমি এই সমাবেশ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শতাব্দীর চুক্তিকে শতাব্দীর আবর্জনা বলে আখ্যায়িত করছি। এই আবর্জনাকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিখিপ্ত করবেন আপনারাই।</strong></p>
<h5>সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার,</h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজ আমরা কুদুসের জন্য, মসজিদে আকসার জন্য, রামাল্লাহর জন্য, পশ্চিম তীরের জন্য এবং গাজার জন্য আজকের এই ময়দানে সমবেত হয়েছি। আজ আমরা এমন এক স্বাধীন ফিলিস্তিনের জন্য সমবেত হয়েছি যে স্বাধীন ফিলিস্তিনের রাজধানী হবে ‘আল-কুদুস’। আজকের এই মহাসমাবেশ কি শুধুমাত্র কুদুস ও ফিলিস্তিনের সমর্থনে ?</p>
<p>&#8211; না।</p>
<p>আজকের এই মহাসমাবেশ দুনিয়ার সকল নির্যাতিত ও নিপীড়িতদের জন্য, আজকের এই মহা সমাবেশ ইদলিবের জন্য, পূর্ব তুর্কিস্তানের জন্য, কাশ্মীরের জন্য এবং আরাকানের জন্য। ইস্তানবুলের আজকের এই মহাসমাবেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী ও জুলুমের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইন্তিফাদার ডাক দিচ্ছি।</p>
<p>এই ময়দানে উপস্থিত লাখো মানুষের আত্মবিশ্বাস ও চেতনা দেখে বলতে চাই, &#8216; হে জালিমরা, হে সাম্রাজ্যবাদীরা, হে যায়নবাদীরা, ফিলিস্তিন শুরু থেকে ইসলামের শহর এবং কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামেরই থাকবে ইনশাল্লাহ&#8217;। কারণ এই ময়দানে এমন মহাপুরুষদের উত্তরসূরীরা উপস্থিত, যাদের পূর্বসূরীরা সাম্রাজ্যবাদীদের দালালী করেনি বরং তারা সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করে বিশ্বের ইতিহাসকে নতুন করে রচনা করেছিল। এই ময়দানে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, ফাতিহ সুলতান মেহমেদ এর উত্তরসূরীরা উপস্থিত হয়েছে। ‘হায়াত হল ঈমান ও জিহাদ’ এই কথা বলে সকল কিছু দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী নাজমুদ্দিন এরবাকানের উত্তরসূরীরা উপস্থিত।</p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong></p>
<p>ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যে প্ল্যান মুসলিম উম্মাহ ও ফিলিস্তিনের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই প্ল্যানের মূল লক্ষ্য হল ফিলিস্তিনকে সম্পূর্ণভাবে ইসরাইলের হাতে তুলে দেওয়া। এই প্ল্যানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাংগুলী দেখানো হয়েছে।সকল ধরণের মানবিক মূল্যবোধকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এই প্ল্যান শান্তি নয় নতুন করে যুদ্ধের ময়দান প্রস্তুত করেছে। এটা শতাব্দীর চুক্তি নয়, এটা হল শতাব্দীর বিশ্বাসঘাতকতা, এটা হল শতাব্দীর নীলনকশা, এটা হল শতাব্দীর স্বেচ্ছাচারিতার চুক্তিপত্র। এই বিশ্বাসঘাতকতার চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হবে কারণ এটার উপযুক্ত স্থান ডাস্টবিন। বলা হচ্ছে যে, এই প্ল্যান অনুসারে দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। একটি ইসরাইল অপরটি নাকি ফিলিস্তিন। তারা তাদের পরিকল্পনা মাফিক কেমন একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে? তাদের মতে ফিলিস্তিন এমন একটি রাষ্ট্র হবে,</p>
<p>১। যে রাষ্ট্রের কোন সেনাবাহিনী থাকবে না,<br />
২। যে রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ড থাকবে না,<br />
৩। যে রাষ্ট্রের বর্ডার গেট থাকবে না,<br />
৪। মসজিদে আকসা সহ সমগ্র কুদুস ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।<br />
৫। এমনকি এই রাষ্ট্রের কোন রাজধানীও থাকবে না। কারণ তথা কথিত এই রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে যে স্থানকে নির্ধারণ সেটাও ইসরাইলেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে!</p>
<blockquote><p>এছাড়াও, এই চুক্তিপত্রে ৫০ বিলিয়ন ডলার ঘুষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের কথামত ফিলিস্তিন যদি তাদের এই সকল শর্ত সমূহকে গ্রহন করে তাহলে তারা নাকি ফিলিস্তিনকে ৫০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিবে। আমি এই সকল অর্থকে ঘুষ হিসেবে আখ্যায়িত করছি। এরবাকান হোজার ভাষায় বলতে চাই, ‘ আমাদেরকে ৫০ বিলিয়ন কেন, ১৫০ বিলিয়ন কেন, দুনিয়ার সকল সম্পদ এনেও যদি আমাদের সামনে বিছিয়ে দাও তবুও এক বিন্দু পরিমাণ মাটিও তোমাদের কাছে বিক্রি করা হবে না’। <strong>জান্নাত মাকান সুলতান আব্দুল হামিদ হানের ভাষায় বলতে চাই, ‘এই সকল ভূমি রক্তের বিনিময়ে ক্রয় করা হয়েছে। রক্তের বিনিময়ে কেনা ভূমি অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা যায় না। রক্ত দিয়ে কিনেছি রক্ত দিয়েই বিক্রি করব’।</strong></p></blockquote>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong></p>
<p>যারা অতীত সম্পর্কে অজ্ঞ তারা আজকের ঘটনা প্রবাহকে বুঝতে পারবে না, আর যারা আজকের ঘটনাকে প্রবাহকে বুঝতে পারে না তারা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে ১০০ বছরের একটি প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল নাম হল, গ্রেট ইসরাইল প্রজেক্ট। আজ আমরা যায়নবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের পাঁচদফা পরিকল্পনার মুখোমুখি দাড়িয়ে, এই দফাগুলো হলোঃ</p>
<p>১। ১৮৯৭ সালে প্রথম যায়নিস্ট কংগ্রেসের মাধ্যমে তারা তাদের প্রথম পদক্ষেপ গ্রহন করে। আর সেটা হল ফিলিস্তিনে ইয়াহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।<br />
২। দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল, ‘ব্যালফোর ডেক্লারেশন’। এই ডেক্লারেশনের মাধ্যমে তারা ইসরাইল রাষ্ট্রের চিন্তাকে রাজনৈতিক ময়দানে নিয়ে আসে।<br />
৩। তৃতীয় পদক্ষেপ ছিল, জাতিসংঘকে ব্যবহার ১৯৪৮ সালে তথাকথিত ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে।<br />
৪। চতুর্থ পদক্ষেপ ছিল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে গ্রেট মিডল ইস্ট প্রজেক্টের নামে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে নতুনভাবে অংকন করে একের পর এক তাদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন শুরু করে।<br />
৫। তাদের পঞ্চম পদক্ষেপ হল, ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্ল্যানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের বুকে সর্বশেষ প্যারেক মারার চেষ্টা করছে।</p>
<h5>&nbsp;</h5>
<h5>এরপরের সিরিয়ালে কি কি আছে?</h5>
<p>১। প্রমিসড ল্যান্ড আছে যা নীল ও ফোরাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।<br />
২। দিয়ারবাকির, মারদিন, চুকুরোভা এবং তাদের সর্বশেষ টার্গেট হল আমাদের প্রিয় দেশ তুর্কী।</p>
<p>আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আজকে যদি আমরা তাদেরকে ফিলিস্তিনে পরাজিত করতে না পারি তাহলে আগামীকাল তারা আমাদেরকে ইস্তানবুলে পরাজিত করবে। ইস্তানবুলকে দখল করার চেস্টা করবে। আজকে যদি আমরা ফিলিস্তিনকে রক্ষা করতে না পারি তাহলে আগামীকাল আমাদেরকে তুর্কীকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong></p>
<p><strong>সারা রাত-দিন কান্না কাটি করে লাভ নেই, এতে মুসলমানদের কোন ফায়দা বয়ে আনবে না। আজকে আমাদের যেসকল প্রশ্ন করা প্রয়োজন সে প্রশ্ন সমূহ হল,</strong></p>
<ul>
<li><em><strong>সাম্রাজ্যবাদীরা যখন একের পর এক তাদের সকল পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করে চলছে আমরা তখন কি করছি??</strong></em></li>
<li><em><strong>সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের শতবর্ষী পরিকল্পনা সমূহকে যখন সামনে নিয়ে আসছে তখন আমরা কি করছি?</strong></em></li>
<li><em><strong>বাগদাদ, শাম, কুদুস, কাবুলকে যখন তারা মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে আমরা তখন কি করছি?</strong></em></li>
<li><em><strong>এই অন্যায় ও জুলুমপূর্ণ ব্যবস্থাকে পরাজিত করে ন্যায় ভিত্তিক নতুন এক দুনিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি নাকি সাম্রাজ্যবাদের দালালী করে একে অপরকে হত্যা করছি?</strong></em></li>
<li><em><strong>আমাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পরিবর্তে কেন আজ আমরা মাজহাবী ভিন্নতাকে ও জাতিগত ভিন্নতাকে সামনে এনে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখছি?</strong></em></li>
</ul>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong></p>
<p>কেবলমাত্র শত্রুর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে কোন লাভ নেই। এটা হল দুর্বলদের কাজ। যারা নিজেদের ভূমিতে, নিজেদের অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোন পরিকল্পনা করতে পারে না তারা অন্যের দালালী করতে বাধ্য। সাম্রাজ্যবাদীরা শক্তিশালী বলে আজ মুসলিম উম্মাহর অবস্থা এমন নয় বরং আমরা উম্মাহ হিসেবে আমাদের দায়িত্ত্বপালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় আজ তারা আমাদের উপর এমন নির্যাতন চালানোর সাহস পাচ্ছে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, সাম্রাজ্যবাদীরা যখন কুদুসকে, ফিলিস্তিনকে দখল করে নিচ্ছে তখন আমরা দর্শকের ভূমিকা পালন করছি। আজকে যখন কুদুসকে ছিনতাই করা হচ্ছে তখন আমরা আমাদের মাজহাব নিয়ে ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে পড়ে আছি।</p>
<p>কুদুসের ও ফিলিস্তিনের মুসলমানদের উপর যখন নির্যাতন চালানো হচ্ছে তখন আমরা আমাদের ক্ষমতার মসনদকে ধরে রাখার জন্য নিশ্চুপ হয়ে বসে আছি। দিনে চল্লিশবার আল্লাহু আকবর বলে, দিন শেষে ট্রাম্পের কাছে আত্মসমর্পণ করছি।</p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা আমার,</strong></p>
<p>আমি আবারও বলছি, সাম্রাজ্যবাদীদের গ্রেট মিডল ইস্ট প্রজেক্টের বিপরীতে ‘গ্রেট ইসলামিক ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে আমাদের আরো অনেক-ক-ক-ক-ক-ক কাঁদতে হবে। ফিলিস্তিন আজ আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের শিকার। যার নেতৃত্ব দিচ্ছে যায়নবাদীরা। এই আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদকে কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক ইন্তিফাদার মাধ্যমেই মোকাবেলা করা সম্ভব। আমাদের ভিন্নতাকে সামনে নিয়ে এসে নয়, আমাদের ঐক্য সুসংহত করেই এই আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবেলা করা সম্ভব। কথার ফুলঝুড়ি নয়, এই জন্য এখন সময় হল কাজ করার। আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই ফিলিস্তিনকে মুক্ত করতে চাই তাহলে কথার ফুলঝুড়ি নয় শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। কারণ, ইসরাইল কখনো মুখের ভাষা বুঝে না, সে কেবল শক্তি ও অস্ত্রের ভাষা বুঝে। তাই সে যে ভাষা বুঝে তার সাথে সেই ভাষাতেই কথা বলতে হবে। আজ থেকে ৫১ বছর আগে ফিলিস্তিন ও মসজিদে আকসাকে রক্ষা করার জন্য OIC প্রতিষ্ঠা করা হয়। তুরস্ক এখন OIC প্রেসিডেন্ট। আজকের এই ময়দানে সমগ্র জাতি ফিলিস্তিন নিয়ে তার অভিব্যক্তিকে ব্যক্ত করেছে এখন দায়িত্ত্ব হল রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আছে তাদের। ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব জ্ঞাপন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রেস ব্রিফিং ইসরাইলকে আরো সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে।মুসলিম বিশ্বের নেতাদের দায়িত্ত্ব হল, উম্মাহর আহবানে সাড়া দেওয়া। উম্মাহর আহবানকে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহন করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রিয় ভাইয়েরা,</strong></p>
<p><strong>কি কি করতে হবে এটা সবাই জানে। তবুও আমি কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই, স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে</strong>&#8211;</p>
<ul>
<li><em>ডি-৮ সহ, সকল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠন সমুহকে এক্টিভ করা।</em></li>
<li><em>সকল মুসলিম দেশের উচিত হল, অনতিবিলম্বে ইসরাইলের সাথে সকল ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ছিন্ন করা</em></li>
<li><em>ইসরাইলের পণ্য বর্জন সহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ আরোপ করা।</em></li>
<li><em>যে সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন আইন ও আন্তর্জাতিক মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করে তাদেরকে সাথে নিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।</em></li>
<li><em>দক্ষিন অ্যামেরিকা থেকে এশিয়া পর্যন্ত ‘প্লাটফর্ম ফর প্যালেস্টাইন’ প্রতিষ্ঠা করা।</em></li>
<li><em>সকল মুসলিম দেশের আকাশপথ, জলপথ ও স্থলপথকে বন্ধ করা দেওয়া।</em></li>
<li><em>OIC র অধীনে ফিলিস্তিন শান্তি বাহিনী গঠন করতে হবে। এই বাহিনীকে সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করে, ফিলিস্তিনের মানুষের জান ও মালকে রক্ষা করার জন্য গাজায় পাঠাতে হবে এবং এই বাহিনীর ঘাটি হবে গাজা।</em></li>
</ul>
<p>আমি জানি এই সকল প্রস্তাবনা আমরা নিজেরা বলে নিজেরাই শুনছি। তবে আমি বিশ্বাস করি এমন একদিন আসবে যেদিন এর সকল ধারাই বাস্তবায়িত হবে ইনশাল্লাহ। কারণ এই বিশ্বাসকে ধারণকারীরা যখন ক্ষমতায় আসবে তখন এই সকল ধারাই হবে তাদের প্রথম কাজ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেঃ</strong></h4>
<ul>
<li>আমাদের প্রধান কাজ হল, মুসলিম দেশ সমূহ একে অপরের পেছনে না লাগা। আমাদের যে শক্তি ও সম্পদ আছে এই শক্তি ও সম্পদকে আমাদের একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য নয় একে অপরকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার করতে হবে।</li>
<li>আমাদেরকে সাম্রাজ্যবাদীদের নীলনকশাকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।</li>
<li>প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তিতে গুরুত্ত্ব দিতে হবে এবং এই ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করতে হবে।</li>
<li>সকল মুসলিম দেশের উচিত হবে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিজেদেরকে শক্তিশালী করা।</li>
<li>আমাদের সম্পদ সমূহকে সঠিক ভাবে ও সঠিক স্থানে ব্যবহার করতে হবে।</li>
<li>আমাদের মধ্যকার ব্যবসায়িক সম্পর্ককে বৃদ্ধি করতে হবে এবং এই ব্যবসা আমাদের নিজস্ব মুদ্রায় করতে হবে।</li>
<li>বিশ্ব মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় ‘ মুসলিম সেনাবাহিনী’ গঠনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।</li>
</ul>
<p><strong>হে মিল্লি গরুশের ভাইয়েরা,</strong></p>
<p>জেনে রাখুন! অবস্থা যতই কঠিন হোক না কেন, আমাদের বিশ্বাসে হতাশা ও বিষণ্ণতার কোন স্থান নেই। রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটবর্তী হয় এই কথা আমাদের মানসপটে সর্বদায় লালন করতে হবে। আজকে আপনারা এই ময়দানে সমবেত হয়ে নিজেদের যে দায়িত্ত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন আমি মনে করি এটা হল সুবহে সাদিকের পূর্বাভাস।আজকের ময়দানে আপনারা আপনাদের উচ্চকিত কণ্ঠে জুলুমের প্রতিবাদ করছেন। আজ আপনারা মুখের ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন। মনে রাখবেন, সেই দিন অনেক নিকটবর্তী যেই দিন আমরা এই জুলুম নির্যাতনকে হাত দ্বারা প্রতিহত করব ইনশাল্লাহ।</p>
<p>হে ইসলামি আন্দোলনের কর্মীরা মনে রাখবেন, জুলুম নির্যাতন চিরস্থায়ী হয় না হবে না।জালিমরা অবশ্যই অবশ্যই পরাজিত হবেই হবে। আজকের মুসলমানদের এই বিভাজন দেখে কেউ যেন একথা মনে না করে যে ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে না। ইনশাল্লাহ, একদিন অবশ্যই অবশ্যই ইসলামি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা হবেই হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সেই স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতিষ্ঠা অনেক নিকটবর্তী যে ফিলিস্তিনের রাজধানী হবে ‘আল-কুদস’।</strong><br />
<strong>ভুলে যাবেন না, ‘ বিজয় মুসলমানদের আর বিজয় নিকটবর্তী’</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদ: <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/qudus-is-a-symbol-of-our-honor-and-dignity/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7121</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতিতে মুসলিম যুবকদের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-youth-in-changing-global-politics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-youth-in-changing-global-politics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. সামি আল-আরিয়ান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 26 Apr 2022 18:30:59 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7083</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ, আমাকে এমন একটি কনফারেন্সে আমন্ত্রণ করার জন্য সর্বপ্রথম &#8220;ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট&#8221; কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং একই সাথে শ্রোতাদেরও আমাকে শুনতে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি সব সময়ই যুবকদের সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।</p>
<p>আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ,</p>
<p>আমাকে এমন একটি কনফারেন্সে আমন্ত্রণ করার জন্য সর্বপ্রথম &#8220;ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট&#8221; কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং একই সাথে শ্রোতাদেরও আমাকে শুনতে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি সব সময়ই যুবকদের সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমি বিশ্বাস করি, কেউ যখন যুবকদের নিয়ে কথা বলে তখন সে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। কারণ আজকের যুবকরাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আমাদের ভবিষ্যতকে বুঝার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে, আমাদের ইতিহাস এবং বর্তমানকে বুঝা। আমি আজ সংক্ষেপে আমাদের ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বকে তোমাদের সামনে তুলে ধরবো। আমার আজকের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমাদেরকে অনুপ্রাণিত করা যাতে তোমরা শুধুমাত্র তোমাদের দেশেরই নয় বরং সমগ্র উম্মাহর, সমগ্র মানবতার সার্বিক অবস্থা পরিবর্তন, উন্নতি এবং পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারো।</p>
<p>যেমনটা আবুল কাসেম হাজ্জ আল হামাদ বলেছেন, বিগত প্রায় ১৩শ বছর ছিল ইসলামের বিশ্বজনীনতার সময়। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা ইসলামের বিশ্বজনীনতার আরেকটা যুগের সূচনা করতে চলেছি যেটা এখন প্রতিষ্ঠিত নেই। আর ইতিহাসই আমাদেরকে এই পথ দেখাচ্ছে। ইসলামী সভ্যতার সেই ১৩শ বছরে এমন একটা সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা পুরো পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চল শাসন করেছে। এ সভ্যতায় ছিল উন্নত রাষ্ট্র, যেখানে বিদ্যমান ছিল উন্নত সংস্কৃতি, সামাজিক উন্নতি, সামাজিক উপাদান, সরকার ও আইন ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা, শিল্প, বিজ্ঞান ইত্যাদি। এই সভ্যতা ছিল অনেক দিক থেকেই অপ্রতিদ্বন্দী। আইন, দর্শন, শিক্ষা, মিস্টিসিজম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, কলা, বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রশাসন, স্থাপত্য, চিকিৎসাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সভ্যতা একেবারেই অনন্য। এমনকি এই সভ্যতা তার সবচেয়ে দূর্বল সময়েও ঐসকল আক্রমণকারীদের পরাজিত করেছে যারা তাদের উপর প্রভাবশালী হওয়ার কিংবা তাদের উপর দখলদারিত্ব চালানোর চেষ্টা করেছিল। এসকল আক্রমণকারীরা, যাদের শক্তিশালী কোন ধর্ম বিশ্বাস ছিল না, তারা মঙ্গোলদের মতোই বিলীন হয়ে গিয়েছে। আর যাদের ক্রসেডারদের মতো শক্তিশালী বিশ্বাস ছিল তারা অপসারিত হয়েছে।</p>
<p>কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে মুসলিম বিশ্ব এমনকি গোটা বিশ্বে ক্ষমতার পালা বদল ঘটে। এবার বিশ্ব ক্ষমতা চলে আসে ইউরোপীয়দের হাতে, যারা রেঁনেসার মাধ্যমে তাদের অন্ধকার যুগকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে এসেছিল। শিল্প বিপ্লব এবং সাম্রাজ্যবাদের সূচনার মধ্য দিয়ে জাতীয়তা এবং বিশ্বাসের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষত, সামরিক প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। নেপোলিয়নের মাধ্যমে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে মুসলিম বিশ্বের একেবারে কেন্দ্রে প্রচুর পরিমাণে সামরিক অভিযানের সূত্রপাত ঘটে। এসকল সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়ে গেলেও সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। কলম্বাসের আমেরিকায় গণহত্যা চালানো থেকে শতাব্দি কাল ধরে সাম্রাজ্যবাদ পুরো দুনিয়াতে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছিল এবং সব জায়গায় তাদের এই নৈরাজ্যকে বয়ে চলছিল। তারা পুঁজিবাদকে ধারণ করে এমন বহুজাতিক কোম্পানি এবং সামরিক ক্ষমতার উপর ভর করে আফ্রিকা এবং এশিয়ার শ্রম বাজার সহ অপরাপর ক্ষেত্রে লুটপাট, রাহাজানি চালিয়ে যাচ্ছিল। সাম্রাজ্যদীরা তাদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে চতুর্মুখী আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে মানুষ মারার দিক থেকে তাদের সমকক্ষ আর কেউ নেই। তারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকায় প্রায় ১০ মিলিয়ন বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছে। অথচ, এই সকল অঞ্চলে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন আদিবাসী ছিল। ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর আগে এই অঞ্চলে জনসংখ্যার ৯০-৯৫ ভাগই ছিল ভূমিপুত্র। উনিশ শতকের শেষের দিকে তথাকথিত ইন্ডিয়ান যুদ্ধ শেষে উত্তর আমেরিকায় ২ লক্ষ ৩৮ হাজারেরও কম বেসামরিক আদিবাসী অবশিষ্ট থাকে। অথচ এটা স্পষ্ট যে, ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন আমেরিকায় আসে তখন সেখানে মিলিয়ন, মিলিয়ন আমেরিকান আদিবাসী বাস করতো। ১৮৩৫ থেকে ১৮৪৫ এর মাঝামাঝি সময়ে বেলজিয়াম ১০-১৫ মিলিয়ন কংগোসকে হত্যা করেছে। একই সময়ে ডাচরা ইন্দোনেশিয়ায় তিন লক্ষাধিক মানুষ হত্যা করে। ফরাসিরা ১৮৩০ সাল থেকে আলজেরিয়ায় ১৩২ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে ১০ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করে। ইতালি, লিবিয়ার দুই তৃতীয়াংশ এবং ইথিওপিয়ার ২ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করে। অন্যদিকে বৃটিশরা ভারতে তাদের ঔপনিবেশিক শাসনে ৩৫ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করে। একই ভাবে রাশিয়ানরা মিলিয়ন, মিলিয়ন এশিয়ানকে নির্মূল করে। যখন মুসলিম বিশ্বের একেবারে কেন্দ্রে ১৯৪৮ সালে পশ্চিমা জায়োনিস্টরা নতুন করে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তখন তারা ১০ হাজারের অধিক মানুষকে হত্যা করে এবং ফিলিস্তিনের ৬০ ভাগ মানুষকে তাদের বাপ দাদার ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করে পবিত্র এই ভূমিকে দখল করে নেয়। এখনো মিলিয়ন, মিলিয়ন মানুষ শরণার্থী ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে।</p>
<p>ঔপেনিবেশিকরা তাদের উপনিবেশিকতা চাপিয়ে এই পবিত্র ভূমির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে চায়। তাদের এইসব গণহত্যা শুধুমাত্র নিরপরাধ মানুষ আর সমাজকে ধ্বংস করছে এমনটি নয়, বরং একটি দেশ, গোটা জাতি এবং তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। আজকে তাদের প্রায় ১৩০ মিলিয়নের বেশি ইজরায়েলি অবৈধ আবাসন, ১১০টি এয়ারপোর্টসহ অন্যান্য স্থাপনাসমূহের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রায় আশি শতাংশের বেশি ভূ-ভাগে অবৈধ দখলাদারিত্বের জাল বিছিয়ে বসেছে। ৮০% এর বেশি ইজরায়েল অধিবাসীদের জন্য নীতিবহির্ভূত আবাসন স্থাপন করেছে। বর্তমানে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর করা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে (যা এখনো পূর্ণ প্রতিফলিত) আমরা স্পষ্টভাবে ইজরায়েল রাষ্ট্রের কর্মনীতি সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পেরেছি।</p>
<p>ইজরায়েল, প্রত্যক্ষ উপনিবেশিকতার মাধ্যমে সারা মুসলিম জাহানের পবিত্র হৃদয়ে দখলদারিত্বকে অব্যাহত রেখেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই, নতুন আরব রাজনীতিতে বড় বড় যুদ্ধের সূচনা হয়। ১৯৪৮ সালের পূর্বে ফিলিস্তিন অঞ্চলটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির অনুগামী আরব বুর্জোয়া শ্রেণির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল যারা ছিল উপনিবেশ-পক্ষপাতি। বিশেষত মিসর, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়া ইত্যাদি ফিলিস্তিন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অভিজাত শ্রেণিগুলো ছিল এই ক্ষেত্রে অধিক অগ্রগামী। ৪৮ এর বিপর্যয়ের পর, বিভিন্ন আরব দেশসমূহ রাজতন্ত্রের পরিবর্তে রিপাবলিক পন্থাকে সাদর সম্ভাষণ জানানো শুরু করে। তবে সৌদি আরব, গাদ্দাফির শাসনাঞ্চল, মরক্কো এবং জর্ডান অঞ্চলে পূর্বের মতোই রাজতন্ত্র বজায় থাকে। আবার কিছু আরবদেশে পুঁজিবাদের বিপরীতে সমাজতন্ত্রকে বেছে নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তবে এই আন্তঃকোন্দল এবং ওলোট-পালটের পেছনে সামরিক শক্তি এবং অভিজাত শ্রেণির অন্তঃর্দ্বন্দ্ব ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়ে পড়ে। কিন্তু ৬৭ এর পরাজয় এবং তার ধংসাত্মক ফলাফলের কারণে খুব দ্রুতই এসব সমাজতন্ত্রী রিপাবলিক দলগুলো নিজেদের গ্রাউন্ড হারিয়ে ফেলে । একইসাথে সময়ের আলোকে উত্থিত হতে শুরু করে PLO প্ল্যাটফর্মের আন্ডারে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনবাসীর সকল প্রতিরোধসমূহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সংক্ষেপে বলতে গেলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মূলত স্বাধীনতাকামী এবং প্রতিরোধ বাহিনীদের একের পর এক আন্দোলন ইজরায়েলি আগ্রাসনের মোকাবেলায় দৃঢ় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে শুরু করে। ১৯৮২ সালে ইজরায়েলের পুনর্বার লেবানন দখলের প্রচেষ্টার পর থেকেই মূলত ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের হাওয়া বদলাতে শুরু করে। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে বাম ও সেক্যুলার মতাদর্শী দলের নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনবাসীর আন্দোলন ক্রমেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিশোধিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট ইসলামী আন্দোলনে রূপ নেয়। জাগরণ ঘটে &#8220;হামাস&#8221; বা &#8220;ইসলামি জিহাদ&#8221; বা &#8220;হিযবুল্লাহ&#8221; নামের ইসলামী ট্যাগ সমৃদ্ধ আন্দোলনসমূহের। সর্বোপরি, ইসলামী আন্দোলনসমূহ সার্বজনীনভাবে তাদের হিসেব মিলিয়ে ওঠে ২০০০-২০০৩ সালের কোন্দলের সময়ে। এসব ইসলামী আন্দোলন সমূহের স্বরূপ নিয়ে স্বয়ং সময়ই সাক্ষ্য দান করে। পরবর্তী বছরগুলোতে যখন লেবাননে হিযবুল্লাহর হাতে এবং গাজাতে হামাসের হাতে ইজরায়েল একের পর এক নাজেহাল হয়ে পালিয়ে যায়, ঘটনাচক্রের প্রবাহে ফিলিস্তিনবাসীর কর্তৃত্ব আপনা-আপনিই ইসলামী আন্দোলনসমূহের ঘাড়ে ন্যস্ত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ইজরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধের ফলাফল গোটা আরব দুনিয়াতেই ইসলামী আন্দোলনসমূহ নিয়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। বিশেষত হামাস এবং হিযবুল্লাহর কাছে ইজরায়েলের পলায়ন এবং পরাজয়ে আরববাসীর হৃদয়ে নতুন ঢেউ খেলে যায়। সমগ্র আরব বিশ্বেই তখন ইসলামী আন্দোলনসমূহ রাজনৈতিক বৈধতা পেতে শুরু করে। তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, আরব রাষ্ট্রগুলোর উপর জোর করে, লোভ দেখিয়ে কিংবা ভয় দেখিয়ে ইজরায়েল তাদের শাসন/শোষণ নীতি প্রণয়ন করতে অক্ষম। ইজরায়েলের এসব হুংকার, আল্টিমেটাম, ভীতি প্রদর্শন কোন কিছুই ইসলামী আন্দোলনগুলোকে থামাতে পারেনি, পারবেও না ইনশা-আল্লাহ।</p>
<p>একাবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষ দিকে আরব বিশ্বের অবস্থা এতোটাই করুণ হয়ে গিয়েছিল যে, হতাশ নাগরিকরা বারবার বলছিল, যথেষ্ট হয়েছে, আর না। একদিকে দুর্বল ও দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জনগণের কোটি কোটি সম্পদ লুট করে নিচ্ছিলো, অন্যদিকে ইরাক এবং আফগানিস্তানের উপর পশ্চিমারা যে ভয়ংকর আগ্রাসন চালাচ্ছিল তা থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। অনেক অঞ্চলে আল কায়েদা এবং আইএস এর মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সহিংসতার সৃষ্টি করে চলছিল। এরই মধ্যে, প্রাচ্যের কিছু দেশ যেমন তুরস্ক, ইরান এমনকি ইজরায়েলও অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন সেক্টরে উন্নয়ন করে যাচ্ছিল। সেখানে আরব বিশ্বের নাগরিকরা দেখছিল, তাদের উন্নয়ন স্থবির হয়ে আছে, না হয় আরও পশ্চাৎপদ হচ্ছে। ২০১০ এর নভেম্বরে, মিশরে মুবারক সরকার এক নির্লজ্জ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে যার ফলাফল, বিরোধীদলগুলো নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি। যেসব দেশে ধরে নেওয়া হয়েছিল অবাধ এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকেরা ক্ষমতায় এসেছে, সেসব দেশের শাসকেরাও তাদের নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি চরম মাত্রায় উদাসীন ছিল। এমনকি তারা এমন শাসন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো, যেখানে উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। এভাবে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং তিউনিসিয়ায়ও রাজতন্ত্রের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে।</p>
<p>আরব বিশ্ব যেহেতু ক্ষোভে জ্বলছিলো, এটাকে বিস্ফোরিত করতে প্রয়োজন ছিল সামান্য একটু স্ফুলিঙ্গের। ২০১০ এর ডিসেম্বরে এক সাধারণ তিউনিসিয়ান বিক্রেতাকে পুলিশ তার পণ্য বিক্রি করতে না দিলে, অর্থনৈতিকভাবে হতাশ সেই বিক্রেতা প্রকাশ্যে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনায় পুরো দেশে বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। যেমনটা লেনিন একবার বলেছিলেন, &#8220;There are decades where nothing happens and there are weeks where decades happen&#8221; ঠিক এমনটাই আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম ২০১১ সালে। কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো তিউনিসিয়া জুড়ে বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে পড়ে এবং অভ্যুত্থানের ২৮ দিনের মধ্যে স্বৈরচারী শাসক বেন আলী তার ২৩ বছরের স্বৈরশাসন গুটিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। দ্রুতই বিপ্লবী চেতনার হাওয়া বইতে শুরু করে মিশরেও। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে হুসনি মুবারকের পদত্যাগের জন্য আন্দোলন করে। মাত্র ১৮ দিনের অভ্যুত্থানে ২৯ বছরের স্বৈরশাসনকে বিদায় জানাতে বাধ্য হয় মুবারক। ২০১১ সালের ফ্রেবুয়ারির মধ্যে ইয়েমেন, লিবিয়া, মরোক্কো, জর্ডান, বাহরাইনে হাজার হাজার মানুষ মুক্তি এবং পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। মার্চ মাসে তাদের সাথে যোগ দেয় আরও কয়েক হাজার সিরিয়ান। একসময় যা কল্পনাতীত ছিল, তাই তখন দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে ৪টি রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং স্বৈরশাসনের পরিবর্তে সেখানে গণতান্ত্রিক নির্বাচন জায়গা দখল করে নেয়।</p>
<p>আরব বিশ্বে সংগঠিত এই বিপ্লবগুলো ছোটখাটো কোন আন্দোলন ছিল না। এগুলো ছিল বিশাল বড় গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু, শীঘ্রই বিপ্লবের বিরুদ্ধ-শক্তি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে আরব বসন্তের মাধ্যমে আরব বিশ্ব যা অর্জন করেছিল, যে রাজনৈতিক দিগন্তের উন্মোচন ঘটেছিল, তা পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে ফেলে। একই সাথে, &#8220;শোষণ ও দুর্নীতির অবসান&#8221; এবং &#8220;গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি&#8221;র যে স্বপ্ন তারা দেখতে শুরু করেছিলো, তার চূড়ান্ত অবসান ঘটে। এটা কেবল পশ্চিমা শক্তি কর্তৃক তৈরিকৃত নীতিগুলো সাথে আপোষই ছিল না বরং এটা ছিল জনগণের ইচ্ছাকে অসম্মান করা এবং তাদের স্বাধীনতা, মর্যাদা, সাম্যতা, আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও মত প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করা।</p>
<p>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছয় দশকের বেশি সময় ধরে যখনই মুসলিমরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে চেষ্টা চালিয়েছে, তখনই তাদের চেষ্টাকে দমন করা হয়েছে এবং বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ১৯৫৩ সালে ইরানে, ১৯৯২ সালে আলজেরিয়ায়, ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনে, ২০১৩ সালে মিশরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি দিলেই তা পরিষ্কার হয়ে উঠে। প্রকৃতপক্ষে, এই চিত্র আরও ভয়ংকর এবং ভবিষ্যৎ প্রকারান্তে অনিশ্চিত। আমরা এমন এক ক্রান্তিলগ্নে বসবাস করছি, যখন বিপর্যয়ের সকল উপাদান আমাদের সামনে জেঁকে বসেছে। যদিও আমরা মুসলমানরা পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৯০% উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে যেখানে বেশিরভাগই মুসলিম রাষ্ট্র। ৪শ মিলিয়ন আরব, তুরস্ক ও ইরানের অন্তর্ভুক্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ৫৫০ মিলিয়ন এবং আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া জুড়ে রয়েছে ৯০০ মিলিয়ন মুসলমান বসবাস করে। এই জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৩০ বছরের কম এবং এখনো তারা জানে না, তাদের ভবিষ্যৎ কী? আরব বিশ্বে প্রতিদিন ৬০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। ১৩০ মিলিয়নের বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে। একই অবস্থা বাংলাদেশেও। এখানে দারিদ্র্যের হার ২০% এরও বেশি। অর্থাৎ, প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন পার করে। নিরক্ষরতার হার অঞ্চলভেদে ৩০% থেকে ৫০%। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে দুর্নীতি এখন প্রকট ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৫ সাল, এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ধারণা করা হয়, ৬০০ বিলিয়ন মিশরীয় পাউন্ড বা ৪০ বিলিয়ন ডলার শুধুমাত্র দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়েছিল। সে বছর শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যেই সামরিক ব্যয় ২২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব নজীরবিহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। অঞ্চলভেদে ৩০% থেকে ৭৫%। যদিও মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো দরিদ্র নয়, কিন্তু তাদের এসব সম্পদ মাত্র গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে পুঞ্জিভূত । ২০০৮ এর দুর্ঘটনার পর, আরবরাষ্ট্র আমেরিকার অর্থনীতিতে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। এই অর্থ মুসলিম বিশ্বে বিনিয়োগ করার পরিবর্তে তারা শুধুমাত্র সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশ আমেরিকায় বিনিয়োগ করে। একটু চিন্তা করে দেখুন তো, মুসলিম বিশ্ব এই অর্থ দিয়ে কী কী করতে পারতো?</p>
<p>আমাদের এখন একটি নতুন ভিশন প্রয়োজন, প্রয়োজন একটি নতুন শক্তি কাঠামো। বিশ্ব শক্তি এখন যাদের হাতে তারা প্রচণ্ড মাত্রায় লোভী। বহুজাতিক (Multinational) কর্পোরেশনগুলো লোভী। তারা শুধু পৃথিবীকে দুর্দশার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব ভয়ানক, বিশেষ করে তরুণদের জীবনে। মাত্র ১ শতাব্দী আগে ঘটে যাওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ২০০ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। হতাহতের সংখ্যা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ২০ মিলিয়ন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ৫৫ মিলিয়ন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৩ মিলিয়ন, ১.৩ মিলিয়ন আফগানিস্তানে, ১ মিলিয়ন ১৯৮০ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধে। বেশিরভাগ সময়ই এই যুদ্ধগুলোর পেছনে কলকাঠি নাড়ে পশ্চিমারা। হাজার হাজার মানুষ বসনিয়ায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ আফ্রিকায় মারা যাচ্ছে এসব যুদ্ধের ফলে। বর্তমান বিশ্বে ৭৫ মিলিয়নের বেশি শরণার্থী ও উদ্বাস্তু রয়েছে। এদের বেশিরভাগই মুসলিম। এটি এমনই এক প্রকট সমস্যা যা অতি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। যদি এই মানুষগুলোর জন্য বসবাসের ব্যবস্থা না করা হয়, এদের স্বাভাবিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বন্ধ হয়ে যাবে। <strong>পুরো বিশ্ব জুড়ে দারিদ্র্য পীড়িত মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক। অর্থাৎ প্রতি বছর ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ ১০০০ ডলার এর কমে জীবন পরিচালনা করছে। এদের মধ্যে ১.২ বিলিয়ন শিশু এবং ১.৫ বিলিয়ন নারী। কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। শুধুমাত্র দারিদ্র্য এবং ক্ষুধার জন্য প্রতিদিন ২৫</strong><strong>,</strong><strong>০০০ মানুষ মারা যাচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>যার বেশিরভাগই শিশু। বিশ্বের জনসংখ্যার ৮০% অর্থাৎ ৫.৫ বিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন ১০ ডলার এর কমে জীবন পরিচালনা করে। যেখানে কিনা বিশ্বজুড়ে ১০০ জন মানুষ</strong><strong>, </strong><strong>হ্যাঁ! মাত্র ১০০ জন মানুষ বিশ্বের আয়ের ২৫ শতাংশের মালিক। একটু কল্পনা করুন তো</strong><strong>, </strong><strong>মাত্র ১০০ জন ব্যক্তি! আমরা এমনই এক নীতিবহির্ভূত</strong><strong>, </strong><strong>ন্যায়বিচারহীন পৃথিবীতে বসবাস করছি</strong><strong>।</strong> <strong>মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধনী ব্যক্তিরা জনসংখ্যার মাত্র ০.১%। মানে</strong><strong>, </strong><strong>হাজারের মধ্যে একজন ধনী। আর তার হাতেই সে দেশের সম্পদের ২০% এর বেশি থাকে। এভাবে মাত্র ১০ জন ধনীর সে দেশের মোট সম্পদের অর্ধেকের বেশি ভোগ করে যেখানে কিনা ৪০% দরিদ্র</strong><strong>, </strong><strong>কিছুই পায় না। দেখুন</strong><strong>, </strong><strong>গ্লোবাল ওয়ার্মিং এমন একটা ইস্যু যা পুরো মানবজাতির অস্তিত্ব ও বিকাশের জন্য হুমকিস্বরুপ। অথচ এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সজাগ দৃষ্টি না দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য ডিফেন্স সেক্টরে তারা প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। সংক্ষেপে</strong><strong>, </strong><strong>ধনী এবং শক্তিশালীরাই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জর্জ ওয়েল তার বিখ্যাত এক উপন্যাসে এভাবে বলেছিল, &#8220;War is peace, Freedom is slavery and Ignorance is strength&#8221;। আজকে আমরা এমনই এক অদ্ভুত পৃথিবীতে বাস করছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শান্তির নামে ইরাক, আফগানিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চল ধ্বংস করতে সৈন্য পাঠায়। তারা প্রমাণ করতে চায়, যুদ্ধ আসলেই শান্তি (War is peace) । দেশপ্রেমের ফাঁকা বুলি ছড়িয়ে, আইন পাশ করে, স্বাধীনতা রক্ষার নামে আমেরিকা নিজেই তার নাগরিকদের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছে। স্বাধীনতাই দাসত্ব (Freedom is slavery), তাই তারা অনবরত সংবাদ মাধ্যমের বাকস্বাধীনতা বন্ধ করে দিচ্ছে। ২০১১ সালে, আরব বসন্তের মাধ্যমে যে বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হলো তা লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার খুব স্পষ্ট ভাবেই মনে আছে, আমি তখন এমন এক অঞ্চলে ছিলাম, যেখানে আরববিশ্বের এই আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন এক সংস্কারের আশায় রাস্তায় নেমে এসেছিল। কিন্তু শেষে কী হলো? বিপ্লবের বিরোধী শক্তি এই পরিবর্তন দমন করতে উঠে পড়ে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত সফলও হলো। সমাজের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ছিল। কারণ সংস্কার ও পরিবর্তনের এই আন্দোলন, রাজনৈতিক অত্যাচার ও অর্থনৈতিক শোষণের উপর ভিত্তি করে দাঁড়ানো জুলুমপূর্ণ শাসন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দিত। স্বৈরশাসনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন হতো। কিন্তু এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষগুলো অজ্ঞতার দারুণ বুঝতেই পারলো না এতো কষ্ট করে অর্জিত অধিকার সমূহকে বিপ্লবের বিরুদ্ধ-শক্তি কী কৌশলে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাদের কাছ থেকে। এজন্যই তারা বলে, অজ্ঞতাই শক্তি (Ignorance is strength)।</p>
<p>আজ আমাদেরকে ঐতিহ্য ও মানবিক অগ্রগতিকে সমন্বয় করে এমন একটি পরিবর্তন আনতে হবে যা একই সাথে নির্ভরযোগ্য এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন। আমাদেরকে &#8220;Mother of Civilization&#8221; তৈরি করতে হবে। সার্বজনীন নীতিগুলোর উপর ভিত্তি এমন একটি সভ্যতার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে যেখানে থাকবে আলাদত, স্বাধীনতা, সাম্য এবং শান্তি। এটি শুধু ধনী কিংবা শক্তিশালীদের জন্যই না, এটি হবে সকল বর্ণের, ধর্মের মানুষের জন্য। সমগ্র মানবতার জন্য। আর এর ভিত্তি হবে ইসলামী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। আমাদেরকে এমন একটি প্রকল্প হাতে নিতে হবে, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারি। যেমনটা কুরআন আমাদেরকে বলছে, &#8220;আল্লাহ মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে&#8221;। এটাই সফলতার পূর্বশর্ত। পরির্বতনের জন্য আমাদের নিজেদেরকে আগে পরিবর্তন করতে হবে।</p>
<p>যুবকেরা, তরুণ বয়সে তোমরা যখন জীবনের জাহাজে আরোহণ করতে যাচ্ছো, তোমাদের কর্মপন্থা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য যেন এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বিশ্বপরিবর্তনের যে আন্দোলনের সাথে তোমরা যুক্ত হয়েছো, সে আন্দোলনের সফলতার জন্য তোমাদের নিজেদেরকে আগে পরিবর্তন করতে হবে। নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। তখনই কেবল আল্লাহ তোমাদের আন্দোলনে সফলতা দিবেন। শুধুমাত্র নিজেদের সমাজ কিংবা দেশ নিয়ে চিন্তা করো না। তোমাদের চিন্তা হতে হবে উম্মাহ কেন্দ্রিক। তোমাদেরকে এমন একটি মহৎ প্রকল্প হাতে নিতে হবে যা কিনা উম্মাহর অবস্থা পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। তোমাদেরকে তোমাদের প্রজেক্ট ঠিক করে নিতে হবে। প্রতিটা সমাজ, প্রতিটা কমিউনিটির নিজস্ব কিছু প্রজেক্ট বা প্রকল্প রয়েছে। প্রজেক্ট যাই হোক না কেন অবশ্যই সেখানে থাকতে হবে ন্যায়বিচার, মূল্যবোধ এবং সুশাসন । একই সাথে তা অত্যাচার, অবিচার, শোষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবে।</p>
<p><strong>মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করতে</strong><strong>, </strong><strong>মুসলিমদের অবস্থার পরিবর্তন করতে আমাদেরকে একই সাথে একটি স্থানীয় প্রকল্প এবং একটি বৈশ্বিক প্রকল্প হাতে নিতে হবে। স্থানীয় প্রকল্পটি আদালত</strong><strong>, </strong><strong>স্বাধীনতা</strong><strong>, </strong><strong>সাম্য</strong><strong>, </strong><strong>সুশাসন ও ইহসানের উপর ভিত্তি করে স্থানীয় জনগণের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। একই সাথে আমাদের বৃহত্তর বা বৈশ্বিক প্রকল্পটি নিয়েও কাজ করতে হবে। আমরা মুসলিমরা এক উম্মাহর অংশ। উম্মাহর জন্য কাজ করতে আমাদেরকে একটি বৈশ্বিক প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে একসাথে কাজ করতে হবে। এই মহান প্রকল্পটি বিশ্বজুড়ে অন্যায়</strong><strong>, </strong><strong>অত্যাচার</strong><strong>, </strong><strong>অবৈধ আধিপত্য নিরসনে কাজ করবে। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিন হচ্ছে সর্বোত্তম উদাহরণ</strong><strong>, </strong><strong>সংগ্রামের আদর্শ প্রতীক। এটা এজন্য নয় যে ফিলিস্তিনের সংগ্রাম অন্যদের চেয়ে অনন্য। ফিলিস্তিনি জনগণদের দুর্দশা</strong><strong>, </strong><strong>আফগানিস্তান</strong><strong>, </strong><strong>সিরিয়া</strong><strong>, </strong><strong>কাশ্মীর</strong><strong>, </strong><strong>রোহিঙ্গাদের দুর্দশার চেয়ে আলাদা নয়। কিন্তু ফিলিস্তিন কেন সংগ্রামের আদর্শ প্রতীক</strong><strong>? </strong><strong>এটা জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>ইজরায়েল আসলে কিসের প্রতিনিধিত্ব করে</strong><strong>? </strong><strong>ইজরায়েল হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর বিভক্ত ও বিভাজনের প্রতীক। তাই উম্মাহর ঐক্যের জন্য প্রয়োজন ইজরায়েল </strong><strong>&nbsp;</strong><strong>রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবাইকে একত্রে সংগ্রাম করা</strong><strong>।</strong></p>
<p>আমি বলছি না যে এই সংগ্রামটা মুসলিমদের সাথে ইহুদীদের। ইহুদীরা এই উম্মাহর অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। প্রকৃতপক্ষে ইজরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার এই প্রকল্পটি ইহুদীবাদকে জায়োনিজম নামক ধ্বংসাত্মক শক্তি থেকে বাঁচানোর জন্য। জায়োনিজম ইহুদী ধর্মকে একটি মহান ধর্ম নয়, বরং একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে নতুন ভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে। আর তাই, আমরা এখানে লড়াই করছি নিপীড়ন, স্বৈরাচার, দখল ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। আর এর প্রতিটাই ইজরায়েল প্রতিনিধিত্ব করে। তাই ইজরায়েলের সাথে আমাদের লড়াই মূলত মানবতার মুক্তির লড়াই। এই লড়াই শুধু মুসলমানদের না। এ লড়াই যেকোন স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্যই। এ সংগ্রামে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি আদর্শ, বসবাসযোগ্য নতুন এক পৃথিবী গড়তে পারবো। যেখাবে থাকবে না শোষণ, অত্যাচার, আধিপত্যবাদের জুলুম। যে পৃথিবীতে থাকবে আদালত, স্বাধীনতা, সাম্যতা এবং সত্যিকারের শান্তি। এই মহৎ প্রকল্পের জন্য আমাদের প্রয়োজন একদল যোগ্য মানুষ। হ্যাঁ, আমাদের প্রয়োজন তোমাদের মতো যুবকদের, যারা এ সংগ্রামকে নেতৃত্ব দিবে, সার্বজনীন ন্যায়বিচার, সত্য, স্বাধীনতা ও শান্তির জন্য কাজ করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমি যখন মুসলমানদের সাথে কথা বলি, আমি তাদেরকে ১৫টি পরামর্শ দিই যার উপর ভিত্তি তারা তাদের প্রজন্মকে যোগ্য ভাবে গড়ে তুলতে পারবে।</strong> <strong>আর এর মাধ্যমেই আমরা আমাদের উম্মাহর জন্য, মানবতার জন্য স্থানীয় এবং বৈশ্বিক পরিবর্তন সাধন করতে পারবো ইনশাআল্লাহ:</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">১) যুবকদের প্রতি আমার প্রথম পরামর্শ কিংবা উপদেশ হচ্ছে, &#8220;নিজেকে জানো&#8221;। তুমি যদি এমন এক আন্দোলনের সাথে থাকো কিংবা যুক্ত হতে চাও, যে আন্দোলনের কিনা বিশাল এক মহৎ লক্ষ্য রয়েছে, সে আন্দোলনে সফলতার জন্য প্রথমে তোমার নিজেকে জানতে হবে। নিজের যোগ্যতা এবং সামর্থ্য সম্পর্কে জানো। সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করো। নিজের দুর্বলতাগুলোকে খুঁজে বের করো। সেগুলোকে আমলে নাও । প্রত্যেকের কিছু না কিছু দুর্বলতা আছে, আসক্তি আছে। তোমার আসক্তি কোথায় খুঁজে বের করে তা দূর করো।</p>
<p style="padding-left: 40px;">জ্ঞানের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করো। জ্ঞান অন্বেষণ করো, ইতিহাস পড়ো। দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করো। তোমাকে জানতে হবে, তুমি কে? তুমি কিসের প্রতিনিধিত্ব করতেছো? তোমার যোগ্যতাগুলো কী কী? তোমার দুর্বলতা কোথায়? এটাই সফলতার প্রথম পদক্ষেপ।</p>
<p style="padding-left: 40px;">২) আমার দ্বিতীয় পরামর্শ হচ্ছে, &#8220;ভুল-ত্রুটি মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করো&#8221;। কেউ তোমার ভুল ধরিয়ে দিলে, নির্দ্বিধায় মেনে নেও। ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধন করো। অহংকারী হয়ো না। মানুষ মাত্রই ভুল করে। বিনয়ী হও।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৩) কখনোই, কোন অবস্থায়ই &#8220;হাল ছেড়ে দিবে না&#8221;। ব্যর্থতাকে ভয় পেয়ো না। বেশিরভাগ উদ্ভাবকরা সফল হওয়ার আগে অনেকবার ব্যর্থ হয়েছেন। ধৈর্য এবং অধ্যবসায় এমন দুটি মহৎ গুণ যা এই আন্দোলনের প্রতিটা যুবকের অর্জন করা উচিৎ। এই দুটো মহৎ গুণ তোমাদের ব্যক্তিগত এবং সামগ্রিক উন্নতি ও সাফল্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৪) &#8220;জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি ফোকাস রাখো&#8221;। মহৎ এবং বৃহৎ স্বার্থে কাজ করো। শুধু নিজের পরিবার, সমাজ কিংবা দেশের জন্য না, উম্মাহর জন্য, মানবতার জন্য কাজ করো। এমন কিছু করো যা কিনা তোমার চেয়েও বড়। এমন কিছু করো, যা কিনা আরও ১০০ জন মানুষকে উপকৃত করবে। সক্রিয় ও কর্মঠ থাকো। আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে মিশনমুখী হও।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৫) &#8220;মানবতার মুক্তির জন্য একটা কমন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করো&#8221;। এমন এক উদ্দেশ্য, যা পুরো মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। নিজেকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে চিন্তা করো। নিজের জন্য, নিজের পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র, উম্মাহ এবং মানবতার জন্য কাজ করো। অহংকার ও লোভ, খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখো।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৬) &#8220;চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে কৌশলী হও&#8221;। বড় করে চিন্তা করো। নিজের ভাবনাকে প্রসারিত করো। &#8220;Think globally even when you act locally&#8221;। উদাহরণ হিসেবে আমি তোমাদেরকে দাবা এবং ব্যাকগ্যামন খেলোয়াড়দের কথা বলতে চাই। দাবা খেলোয়াড় তার গুটির শক্তি এবং যোগ্যতা সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা রাখে। প্রতিপক্ষের চাল ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, সে অনুযায়ী সে তার পরবর্তী চাল চালে। সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে। আবার, ব্যাকগ্যামন খেলোয়াড় পরিস্থিতি বুঝে সে অনুযায়ী চাল দেয়। আমাদেরকে যেমন সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে হবে, একই সাথে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতেও চিন্তা করতে হবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৭) &#8220;বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাকে (ক্রিটিক্যাল থিংকিং) গুরুত্ব দেও&#8221;। ক্রিটিক্যাল থিংকিং করার জন্য যোগ্যতা অর্জন কর। প্রশ্ন কর। যুক্তি দিয়ে উত্তর বোঝার চেষ্টা কর। সত্যকে সামনে নিয়ে আসো, যদি সেটা প্রচলিত স্টিস্টেমের বিপরীতেও যায়। এটা খুব সহজ কোন কাজ না। নবীগণের মিশনই ছিল এটা। মুসা (আঃ) ফেরাউনকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, মুহাম্মদ (সঃ) কুরাইশ এবং তৎকালীন বিশ্ব শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।</p>
<p style="padding-left: 40px;">মানব ইতিহাসকে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা। আমাদের চিন্তায় যা কিছুই মানবিক বা মানুষের থেকে এসেছে, সেটা প্রশ্নাতীত নয়; বরং যে কোনো ধরনের আলোচনার জন্য উন্মুক্ত।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৮) &#8220;সময় এবং জীবনের সঠিক ও সুষম বিন্যস্ততা বজায় রাখো&#8221;। তোমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হচ্ছে সময়। এই সময়কে অপচয় করো না। অহেতুক কাজে তোমাদের সময় যেন ব্যয় না হয়। সময়ের সর্বোচ্চ সৎ ব্যবহার করো। সময় এমনই এক অমূল্য বস্তু যা একবার চলে গেলে আর কখনোই ফিরে আসবে না। টাইম ম্যানেজমেন্টকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নেও।</p>
<p style="padding-left: 40px;">৯) &#8220;একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতির মধ্য দিয়ে জীবন যাপন কর&#8221;। জীবনে নিয়মানুবর্তিতা, সংযম এবং শৃঙ্খলা না থাকলে কোনো কাজেই নিজের সর্বোচ্চটুকু দিতে পারবেনা। নিজের জীবনকে এমন ভাবে গুছিয়ে নেও, যেন তোমার চারপাশের মানুষ তোমাকে তাদের জীবনের রোল মডেল হিসেবে বেছে নেও।</p>
<p style="padding-left: 40px;">হাকিকতে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জন করো। মানবতার কল্যাণের জন্য কাজ করে যাও। তোমাদের সময় ও জীবন সুসংগঠিত না হলে এটি সম্ভব হবেনা।</p>
<p style="padding-left: 40px;">১০) &#8220;সকল ক্ষেত্রেই সর্বোৎকৃষ্ট, সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ পন্থায় নিজেকে উপস্থাপন করো।&#8221; যারা তোমাদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাদের প্রতি তোমরা ভালো আচরণ কর। পিতামাতা এবং পরিবারের প্রতি পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করো। কেউ যদি নিজের পরিবার, পিতামাতার প্রতিই তার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে না পারে, সে কীভাবে বিশ্বের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে?</p>
<p style="padding-left: 40px;">১১) &#8220;ধর্মীয় গোঁড়ামি মূলক আচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখো।&#8221; বিশ্বজনীন ন্যায়ের আন্দোলন ধারণাকে পোষণ করে নিজেকে গোটা মানবতার জন্য প্রস্তুত করো। সাম্প্রদায়ীকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো। তোমাদের প্রতি আমার এই পরামর্শটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি সবসময় মাথায় রাখবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">১২) নিজের ব্যক্তিসত্ত্বাকে সবসময় &#8220;নফসের গোলামী থেকে মুক্ত রাখো&#8221;। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার পূর্বে নিজেই নিজের কাজের আত্মপর্যালোচনা করো। মনে রাখবে, আমরা আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম জাতি এজন্যই যে, আমরা ভালো মন্দের পার্থক্য করে, নফসের গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে মানবতার বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।</p>
<p style="padding-left: 40px;">১৩) &#8220;আধ্যাত্মিকতাকে তোমার জীবনের সাথে অর্থবহ করে তোলো।&#8221; মানবতার মুক্তির জন্য কাজ করতে হলে আখলাক এবং আধ্যাত্মিকতাই হবে তোমাদের ভিত্তিমূল। অন্যথায়, আন্দোলন চালিয়ে নিতে প্রতি পদে পদে বাধাগ্রস্ত হবে এবং আন্দোলন কখনো সফলতার মুখ দেখবে না।</p>
<p style="padding-left: 40px;">১৪) &#8220;আল-কুরআন এর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোল।&#8221; তোমাদের সকল কাজের আঞ্জাম এই মহা গ্রন্থ থেকে অন্বেষণ করো।</p>
<ul>
<li style="list-style-type: none;">
<ul>
<li>-সৃষ্টিকর্তার সাথে তোমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হবে তাওহীদ।</li>
<li>-মানুষের সাথে তোমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হবে তাজকিয়াহ।</li>
<li>-বিশ্বের সাথে তোমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হবে ইমরান।</li>
</ul>
</li>
</ul>
<p style="padding-left: 40px;">বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ কর। এই জীবন ক্ষণস্থায়ী। মনে রেখো, যারা একদিন দুর্দান্ত ভাবে এই পৃথিবীতে পদার্পণ করতো, তারা আজ মাটির নিচে। একদিন তোমাদেরকেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। চিন্তা করো, এই পৃথিবীতে তোমরা তোমাদের পদচিহ্ন কীভাবে রেখে যেতে চাও? মানবতার কল্যাণের জন্য কী কী কাজ করে যেতে চাও যার মাধ্যমে মানুষ তোমাদেরকে তোমাদের মৃত্যুর পরও শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে?</p>
<p style="padding-left: 40px;">১৫) তোমাদের প্রতি আমার সর্বশেষ পরামর্শ বা উপদেশ হলো- এমন কিছুর সাথে নিজেদেরকে যুক্ত করো যা মানবতার মুক্তির জন্য কাজ করে। আর মানবতার মুক্তির মূল মেথডোলজি ইসলাম ব্যতীত অন্য কারো কাছে নেই এবং ইসলাম ছাড়া তা কোনদিনও সম্ভব নয়। সুতরাং মানবতাকে মুক্তি দিতে হলে, তোমাদেরকেই নেতৃত্বের স্থান গুলোতে সমাসীন হতে হবে। রাজনীতি করতে হবে। তোমাদের রাজনীতি হবে তোমাদের আধ্যাত্মিকতারই বহিঃপ্রকাশ।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>সায়েম মুহাইমিন, নাফিসা নাজমী ও মুশফিকুর রহমান<strong>।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-role-of-muslim-youth-in-changing-global-politics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7083</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
