<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>রাজনীতি ও অর্থনীতি &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/politics-and-economy/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Tue, 10 Feb 2026 13:01:21 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>রাজনীতি ও অর্থনীতি &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>মানব সভ্যতার প্রতি ইসলামী সভ্যতার অবদান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 Jan 2026 08:44:09 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16488</guid>

					<description><![CDATA[মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি খুব ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। বিশেষ করে &#8216;শক্তি&#8217;-র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহের নাম আলাদা হলেও তাদের মূলনীতি সমূহ ছিল এক ও অভিন্ন।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি খুব ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। বিশেষ করে &#8216;শক্তি&#8217;-র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহের নাম আলাদা হলেও তাদের মূলনীতি সমূহ ছিল এক ও অভিন্ন। তাদের সভ্যতার মূলে ছিল শোষণ ও জুলুম।।</p>
<p>কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত হল ইসলামী সভ্যতা। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল ইসলামী বিপ্লব, যা সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদ (সঃ) এর নেতৃত্বে হয়েছিল। এই বিপ্লব ছিল এমন এক বিপ্লব যা সকল নিয়ম নীতিকে পাল্টে দিয়ে সংগঠিত হয়েছিল এবং যার প্রভাবে সমগ্র পৃথিবী নতুন করে সেজেছিল।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা মানবতার জন্য কি এনেছে? কি দিয়েছে? আমি এর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করতে চাইঃ</p>
<p><strong>১। মানবাধিকার</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">সত্যিকারের মানবাধিকারের প্রবক্তা হল ইসলামী সভ্যতা। ইসলামী সভ্যতাই প্রথম মানুষকে মানবাধিকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের ধ্বজাধারীরা এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আংশিকভাবে একে গ্রহণ করলেও তাদের পন্থা ও ব্যবস্থা ফেরাউনী ব্যবস্থা তথা জুলুম তান্ত্রিক হওয়ার কারণে এই মানবাধিকারের ধারণার মধ্যকার মৌলিকত্বকে নষ্ট করে দেয় তথা degenerate করে ফেলে। আজকে সকল সমস্যার মূলে রয়েছে তাদের এই degeneration। তারা ইসলামের কাছ থেকে নেয় এবং প্রভাবিত হয় কিন্তু সেটাকে নষ্ট করে জুলুমে রূপান্তর করে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">দেখুন মানবাধিকার রক্ষা করার নামে তারা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছে কিন্তু এই জাতিসংঘে অন্যায় ভাবে &#8216;ভেটো পাওয়ার&#8217; নামে একটা ধারা যুক্ত করে দিয়েছে। আমি এটাকে বলি ফেরাউনী ধারা। এই ফেরাউনী ধারাকে ব্যবহার করে তারা যা ইচ্ছা তাই করে। তারা ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, কিন্তু Degenerate করে ফেলেছে।</p>
<p><strong>২। শোষনের বিলোপ সাধন</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার বিধান এনেছে ইসলামী সভ্যতা। এখানে থেকে ইলহাম নিয়ে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করে। মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করব এই কথার নামে তারা মানুষকে রাজনৈতিক শক্তির দাস বানিয়ে মানুষকে রাজনৈতিক শক্তির শোষণের শিকার বানিয়েছে। কারণ তাদের মূলে রয়েছে &#8216;শক্তি&#8217;। শক্তিকে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড মনে করে থাকে।</p>
<p><strong>৩। মুক্তবাজার অর্থনীতি</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">মুক্তবাজার অর্থনীতির ধরণা দিয়েছে ইসলাম। রাসূল (সঃ) সর্ব প্রথম মদিনার বাজারে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। সকলেই তার ইচ্ছামত ও মর্জিমত ক্রয় বিক্রয় করবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ (ক্যাপিটালিজম) এর প্রবর্তন করে। কিন্তু শক্তির পূজারী হওয়ার কারণে ও শক্তিকে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড মনে করার কারণে মনোপলি (একচেটিয়া), পূঁজিপতিদের শোষণের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে।</p>
<p><strong>৪। চুক্তির স্বাধীনতা</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">ইসলাম মানুষকে ন্যায়ের ভিত্তিতে চুক্তি করার স্বাধীনতা দিয়েছে। পাশ্চাত্য ভূমি আইন, বিয়ে শাদী ইত্যাদিতে কিছু আইন প্রবর্তন করেছে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু আইন প্রবর্তন করেছে। কিন্তু এই স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে মানুষকে সামগ্রিকভাবে দিতে পারেনি। সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানুষের যে স্বাধীনতা রয়েছে সেই স্বাধীনতা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করেছে।</p>
<p>৫। <strong>ইসলামে সামাজিক কাঠামোতে আপোষ রফা রয়েছে। </strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">পাশ্চাত্যের ধারকরা মুসলমানদের প্রভাবে তাদের প্রাচীন Feudalism এর স্থলে কোয়ালিশন গঠন করার পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কর্তৃত্বের অধীনে এবং রাষ্ট্রের সকল শক্তিকে কুক্ষিগতকারী আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসিতে রূপান্তরিত করে পুণরায় ফেরাউনিজমে (জুলুমতন্ত্রে) পরিণত করে।</p>
<p>[মিল্লি গরুশ আন্দোলনের নেতা ও তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকানের <strong>&#8216;ইসলামে জ্ঞানের ধারা ও জ্ঞানপদ্ধতি&#8217;</strong> নামক কনফারেন্স থেকে অনূদিত]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16488</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের চামড়া ও ট্যানারি শিল্প</title>
		<link>https://rowyakbd.com/leather-and-tannery-industry-in-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/leather-and-tannery-industry-in-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Oct 2025 16:43:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16234</guid>

					<description><![CDATA[কোরবানি ঈদের কাঁচা চামড়ার মূল্যের ভয়াবহ নিম্নমুখীতা, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত মুনাফা লাভের বিষয়, অদক্ষতা, কাঁচা চামড়া কেনা-বেচা নিয়ে মৌসুমী ব্যাবসায়ীদের ভীতি ও সিন্ডিকেট; এবং এর দরুণ সাধারণ জনগণের ক্ষোভ মিশ্রিত হতাশা যেন প্রতিবছরের নারকীয় দৃশ্য। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>কোরবানি ঈদের কাঁচা চামড়ার মূল্যের ভয়াবহ নিম্নমুখীতা, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত মুনাফা লাভের বিষয়, অদক্ষতা, কাঁচা চামড়া কেনা-বেচা নিয়ে মৌসুমী ব্যাবসায়ীদের ভীতি ও সিন্ডিকেট; এবং এর দরুণ সাধারণ জনগণের ক্ষোভ মিশ্রিত হতাশা যেন প্রতিবছরের নারকীয় দৃশ্য। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেগুলো ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় ভাগারে, নর্দমায় অথবা নদীতে। আর সঠিক সংরক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় হাজারও মুল্যবান চামড়া। ক্ষোভে-দুঃখে কেউ কেউ চিরদিনের জন্য এ’ব্যাবসা থেকে ইস্তফা নেয়। কাউকে তার শেষ সম্বল বা পুঁজিটুকু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হয়; পথের ভিখিরি হতে হয়।</p>
<p>নাম-মাত্র মূল্যে চামড়া কিনে কেন চামরাজাত পন্যের দাম আকাশছোঁয়া ধরা হয়?</p>
<p><strong>একবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে, পতোন্মুখ গার্মেন্টস ব্যাবসার বিকল্প হিসেবে ভাবা হয়েছিল চামড়া শিল্পকে। সে জন্য সরকার চামড়া শিল্পকে ‘এমারজিং এক্সপোর্ট সেক্টর’ হিসেবে ঘোষনা (নেক্সট টু আর এম জি) দিয়ে সবচেয়ে প্রায়োরিটি দেবার পরেও বাংলাদেশের চামড়া সেক্টরের কেন এ দৈন্য দশা?</strong><script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<!-- Fixed size ads --><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: inline-block; width: 728px; height: 90px;" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="3128429081"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এই শিল্পটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত ছিল। শিল্প কর্মসংস্থান তৈরিতেও বেশ ভাল ভূমিকা পালন করেও কেন পিছিয়ে পড়ল এ খাত?</strong></p>
<p>চামড়াজাত পন্য রপ্তানীর বিপরীতে ১৫% পর্যন্ত ক্যাশ ইনসেটিভ বা প্রণোদনা ঘোষনার পরেও কেন আমাদের এই শিল্পটা দিনের পর দিন চোরাবালির গহীনে অতলে তলিয়ে যাচ্ছে? কেন এই খাতের ভয়ংকর টালমাতাল অবস্থা?</p>
<p>কেউ এই সমস্যার গভীরে যেয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা করতে চায় না। আপামর জনতা সরকার ও ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে ক্ষান্ত দেয়; যেন এদের উপরে দায় চাপালেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ঈদের পর ঈদ যায়। জনগন কথা তুলে, আবার সেই জ্বালাময়ী বক্তব্য সবাই ভুলেও যায়। কিন্তু সমস্যার সমাধান কেউ দিতে পারে না। ফলশ্রুতি, পরিস্থিতি দিনদিন আরও ভয়ঙ্কর পথে অগ্রসরমান।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে এখন প্রায় ১১৩টি ট্যানারি রয়েছে যা প্রতি বছর ১৮০ মিলিয়ন বর্গফুট হাইড এবং চামড়া উৎপাদন করে। এছাড়াও প্রায় ৩০টি আধুনিক জুতো উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে যারা উচ্চ-মানের জুতো তৈরিতে নিযুক্ত। ২৫০০ এরও বেশি ছোট কোম্পানি বা উদ্যোক্তারা এই খাতের সাথে সম্পৃক্ত। বেশিরভাগ ট্যানারিগুলিতে যথাযথ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ভিদ নেই এবং প্রতিদিন ২০০০০ লিটার ট্যানারি ফ্লুয়েন্ট এবং ২৩২ টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদন করে। ট্যানারি বর্জ্য রিসাইকেল করার জন্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তি প্রয়োজন।</strong></p>
<p>১৯৪০’র দশকে এক ব্যবসায়ী আর.পি. শাহা কর্তৃক নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশের প্রথম ট্যানারি স্থাপন করা হয়েছিল। ট্যানারিটি পরে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় ৩০টি ট্যানারি ছিল। ১৯৭০’র দশকে শিল্পটির উন্নতি ও প্রসার ঘটে।</p>
<p>যুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে, বাংলাদেশ সরকার ৩০টি ট্যানারি অধিগ্রহণ করেছিল। নতুন সরকার এই ইউনিটগুলির পরিচালনা একটি সদ্য গঠিত ট্যানারি কর্পোরেশনকে ন্যস্ত করেছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাব এবং দুর্নীতিমূলক আচরণের কারণে সরকারের উদ্দেশ্যটি সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে, সরকার ট্যানারি কর্পোরেশন ত্যাগ করে এবং বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প কর্পোরেশনকে (বিসিআইসি) এটি হস্তান্তর করে। এর মধ্যে তিনটি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে দেওয়া হয়েছিল। উভয় কর্তৃপক্ষই ট্যানারিগুলি পরিচালনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।<br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>২০১০ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২০৬টি ট্যানারি ইউনিট ছিল। এর মধ্যে ১১৪ টি বৃহত্তর এবং মাঝারি ইউনিট এবং শিল্প অধিদপ্তরে নিবন্ধিত রয়েছে। কিছু রয়েছে কুটির শিল্প ধরণের এবং সরকারের অনিবন্ধিত। ট্যানারি শিল্পের সম্ভাব্য দিক বিবেচনা করে, ৩৫ টি ট্যানারিগুলি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছিল। এই ট্যানারিগুলি আমাদের কাঁচা চামড়ার ৬০% আন্তর্জাতিক মানের রূপান্তরে সক্ষম ছিল। প্রায় ১৯০টি ট্যানারি ইউনিট ঢকার হাজারীবাগে ট্যানারি এস্টেট নামে পরিচিত মাত্র একর জমিতে অবস্থিত। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের রেকর্ড অনুসারে ট্যানিং শিল্পে প্রায় ৬০০০০ শ্রমিক নিযুক্ত রয়েছে। এছাড়াও বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় শতাধিক প্রযুক্তিবিদ রয়েছেন যারা বিভিন্ন ট্যানারিতে কাজ করছেন। ট্যানারি শিল্পে এখন পর্যন্ত মোট মূলধন বিনিয়োগ করা হয়েছে ২.৫ বিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে সরকার অথবা ব্যাংক ফিনান্স প্রায় ১.২ বিলিয়ন টাকা। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ এবং ট্যানারি ইউনিটে তা পৌঁছে দেয়ার প্রক্রিয়াতে প্রায় ১৫০০ ব্যক্তি জড়িত। ট্যানারি শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রায় ১০০ টি প্রতিষ্ঠান কেমিক্যাল আমদানি করে।</strong> আমাদের দেশে চামড়া প্রসেস করার কেমিক্যাল প্রায় পুরোটা আসে অন্য দেশগুলো থেকে। আর ভারত নিজের উৎপাদিত কেমিক্যাল দিয়েই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে বড় খরচই হলো এর কেমিক্যালের। ফলে, চামড়াজাত পণ্যের দামও হয় আকাশচুম্বী। এছাড়াও ব্যাংকের দুর্বল নিয়মনীতি, অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ সাথে রাজনৈতিক প্রভাব, ট্যানারি মালিকদের লোনের টাকা আত্মসাতের প্রবণতায় এই শিল্পের অগ্রগতি থমকে যায়। যদিও ৯০’র দশক জুড়ে ছিল ট্যানারি শিল্পের স্বর্ণালী সময়! সেই সময়ের হাজারীবাগের রমরমা ট্যানারি বাণিজ্য এখন শুধুই স্মৃতি। জার্মান, ইতালি, স্পেন, কোরিয়া, জাপান,চীন, ভিয়েতনাম-সহ ইউরোপ আমেরিকার অনেক বড় বড় দেশ বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়া-জাত পণ্য কেনার জন্য ভিড় করত। কিন্তু চামড়া ব্যবসায়ীদের অসাধুতা, এলাকা ভিত্তিক ও রাজনৈতিক কোন্দল, সংগঠন গুলোর সমন্বয় হীনতা ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অভাব, পরিবেশ দূষণ, ব্যাঙ্ক লোনের নয়-ছয় সহ, আন্তর্জাতিক কন্সপিরেসি ও সর্বোপরি সরকারের ভুল নীতির ও কিছু ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ধীরে ধীরে চামড়া বাণিজ্য এখন কঙ্কালসম; ধ্বংসের মুখে পতিত প্রায়।</p>
<p>পরিবেশ দূষণ, নিম্নমানের চামড়া, বিদেশি ক্রেতাদের স্বার্থের আঘাত, অত্যাধুনিক মেশিনারিজ ও এক্সপার্টিজের অভাব, প্রতিযোগী আর প্রতিবেশী দেশের কুটচাল-সহ বিভিন্ন কারনে বিদেশী ক্রেতারা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করল। বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলো তাই এক এক করে বন্ধ হতে শুরু করল; দেউলিয়াত্ব ঘোষনা করতে থাকল।</p>
<p><strong>বর্তমানে বাংলাদেশ মানসম্পন্ন মহিষ, ভেড়া, গরু ও ছাগল উৎপাদন করছে। মানসম্পন্ন চামড়া উৎপাদন এবং রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে, বাংলাদেশ বিশ্বের ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চামড়া বাণিজ্যের মাত্র ০.৫% পূরণ করে। ২০১০’র পরে বাংলাদেশের চামড়ার বাজারের প্রায় একচ্ছত্র রাজত্ব করছে চায়নিজ বায়াররা। চাইনিজদের মনোপলি ব্যবসার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করল বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো। বিগত কয়েক বছরে ২.৬০-২.৮০ মার্কিন ডলার মূল্যের ফিনিশড লেদারের দাম নেমে এসেছে ১.৭০-১.৮ ডলার। লাইনিং আর ক্রাস্ট চামড়া যেখানে আগে বিক্রি হত ১.২০ থেকে ১.৫০ ডলার, যার মূল্য নেমে এসেছে .৭৫-.৯৫ ডলারে। এবং দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে যে, এই দাম ক্রমাগত নিম্নমুখী; বাণিজ্য এখন অন্তঃস্বারশূন্য। তবে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে হয়তো এখনও বেহাল দশার কিনারা থেকে চামড়াশিল্পকে তুলে আনা সম্ভব।</strong></p>
<p>বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বার্ষিক চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ আসে কোরবানির পশু থেকে। এই কোরবানির ঈদে সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং, দ্রুত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীরা যাতে লাভবান হতে পারেন এবং উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু চামড়া উৎপাদন নয়, বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে সম্ভাবনাময় চামড়া খাত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।</p>
<p>পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং চামড়া শিল্পোদ্যোক্তাদেরও সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করতে হবে। গৃহীত ঋণের অর্থ অন্যত্র ব্যয় বা বিনিয়োগ না করে চামড়া খাতেই বিনিয়োগ করা এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের বিষয়গুলোকে সুনিশ্চিত করতে হবে। একটি সম্ভাবনাময় খাতকে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুধু বাঁচিয়ে রাখাই নয়, জাগিয়ে তুলতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/leather-and-tannery-industry-in-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16234</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণে ডি-৮</title>
		<link>https://rowyakbd.com/d-8-for-the-revival-of-the-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/d-8-for-the-revival-of-the-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হিশাম আল নোমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 09 Sep 2025 16:22:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16151</guid>

					<description><![CDATA[আমরা কি কখনো এমন কোনো বিশ্বব্যবস্থার কথা শুনেছি, যাতে যুদ্ধ হানাহানি নয়; বরং ব্যালেন্স অফ পাওয়ার (BOP) প্রতিষ্ঠায় সমমর্যাদা এবং সংলাপকে মূলনীতি ধরা হয়? কখনো কি শুনেছি এমন কোন বিশ্ববীক্ষার কথা, যা ‘Absolute Anarchy’ এর বদলে রাষ্ট্রসমূহকে ঈড়হারহপব করে বিশ্বশান্তি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা কি কখনো এমন কোনো বিশ্বব্যবস্থার কথা শুনেছি, যাতে যুদ্ধ হানাহানি নয়; বরং ব্যালেন্স অফ পাওয়ার (BOP) প্রতিষ্ঠায় সমমর্যাদা এবং সংলাপকে মূলনীতি ধরা হয়? কখনো কি শুনেছি এমন কোন বিশ্ববীক্ষার কথা, যা ‘Absolute Anarchy’ এর বদলে রাষ্ট্রসমূহকে ঈড়হারহপব করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে? বৈশ্বিক ক্ষুধামান্দ্য ও দারিদ্র্যের মোকাবেলায় যে বিশ্বব্যবস্থা দান খয়রাত ও চ্যারিটির মুখাপেক্ষি নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলে। যেখানে একজন মানুষও গরীব থাকবে না; অভুক্ত থাকা তো বহু দূর! শুনেছি কি এমন আন্তর্জাতিক বন্ধনের উপাখ্যান, &#8220;Violation of Sovereignty&#8221; নয় বরং পারস্পরিক সমঝোতা ও সৌহার্দ্যরে ভিত্তিতে সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই শান্তির প্রতিশ্রুতি দিতে সক্ষম?<br />
ভাবতে অকল্পনীয় লাগলেও গত শতাব্দীর একেবারে শেষ সময়ে এমনই এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনা ও তার কার্যক্রম শুরু হয় ডি-৮ তথা Cooperation of Developing Countries এর। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সামগ্রিক একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনা হওয়ায় ডি-৮ এই পাশ্চাত্য যায়নবাদ নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সর্বদা ব্যাক স্টেজেই থেকে যায়। কোথাও একে নিয়ে বিশদ কোন আলাপ আলোচনার দেখা পাওয়া যায় না। না আছে মানসম্মত কোন আর্টিকেল বা ডকুমেন্টারী। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে তাই মোটামুটি বিশদভাবে ডি-৮ এর পরিচয়, কার্যক্ষমতা এবং অতীত ও বর্তমানের মূল্যায়নের একটি বিবৃতিমূলক বয়ান হাজির করার প্রয়াস চালানো হলো।</p>
<h4></h4>
<h5>প্রেক্ষাপট</h5>
<p>বিংশ শতকের শুরুতে ইউরোপের শতাব্দীকালের উত্তেজনা বিষ্ফোরিত হয়ে সমগ্র দুনিয়াব্যাপী দুই দুইটি মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়ে যায়। গোটা মানবতা এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। কোটি কোটি আদম সন্তান Mechanical Killing এর শিকার হয় প্রথবারের মতো। মানতার ইতিহাসে জঘন্যতম এ অধ্যায়সমূহ বিশাল বিশাল কিছু ঘটনা বা পটপরিবর্তনের জন্ম দেয়, যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি, জার সাম্রাজ্যের পতন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংকুচিতকরণ এবং অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটন করা। এদের পরিবর্তে ব্রিটিশ বাদে অন্যান্য দেশে ফ্যাসিস্ট সরকারকে প্রতিস্থাপিত করা। অতঃপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে একনায়ক হিটলার, স্ট্যালিন, মুসোলিনি, ফ্রাঙ্কোকে সরিয়ে দেয়া। বিশ্বে শান্তি স্থাপনের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়াল্টা কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হওয়া। যার উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে শান্তি, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র স্থাপন করা।</p>
<p>কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মেকি এই স্বাধীনতাকে একটি বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ করে দেয়া হয়, মানবাধিকার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি দেশ, সমাজ বা গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত করা হয়, যা তাদের বাইরে কারো জন্য প্রযোজ্য ছিল না। উপরন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ায় স্ট্যালিন ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকা ও তার মিত্রদের স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে। শুরু হয় Nuclear arms race এর মত ভয়াবহতর মানব বিধ্বংসী অস্ত্র মহড়া। এভাবেই যায়নবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে। এরপরেই যায়নবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়া নতুন বিশ্বব্যবস্থা দাঁড় করায়। যে সভ্যতা রক্ত ও সমাধির উপর প্রতিষ্ঠিত। নতুন এই সিস্টেমের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে ঘৃণা ও শত্রুতা।</p>
<p>৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন এবং Warsaw Pac বানচাল হবার পর ঘঅঞঙ-কে বিলুপ্ত করার দাবি উঠলে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এর বিপক্ষে মত দেন। <strong>তখন ফকল্যান্ড যুদ্ধে লৌহমানবী খেতাব পাওয়া এ ব্রিটিশ রমণী বলেন- “No ideology can survive without a common enemy. Our next enemy is Islam.” ইসলাম তখন তাদের এমন এক নিশানায় পরিণত হয়, সমগ্র দুনিয়া পাশ্চাত্যের নেতৃত্ব ইসলামের উপর হামলে পড়তে শুরু করে। ঠিক তখনই ন্যাটোর বেইজ কালার লাল থেকে সবুজ হয়ে যায়।</strong> সুতরাং তার এ উক্তি থেকে সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব যে, Bush কর্তৃক উদ্ভাবিত ঘবি New World Order কাদের জন্য এবং কীসের জন্য?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ডি-৮ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা</h5>
<p>এমতাবস্থায় দৃশ্যপটে হাজির হন গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুসলিম সিংহ পুরুষ প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান। তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকান ১৯৬৯ সাল থেকে মিল্লি গরুশ আন্দোলন যখন শুরু করেছিলেন তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল, যায়নবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপরীতে একটি ইসলামী ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা।<br />
ইসলামী ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু বিশ্বপরিস্থিতি পরবর্তী দুই দশকে এতোটাই পরিবর্তিত হয়ে যায়, যে তখন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্যের কারণে ১৯৭৬ সালের ঙওঈ সম্মেলনে প্রস্তাবিত ইসলামী ইউনিয়নের পদক্ষেপ ১৯৯৬ সালে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে সৌদি-ইরান সমস্যা, অন্যদিকে ইরাকের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশের সমস্যা ইউনিয়ন গঠনকে কঠিন করে তুলে। ক্ষমতার লোভে মত্ত হয়ে কেউ কাউকে সামান্যতম সম্মান প্রদর্শন করছিল না।</p>
<p>এরই মধ্যে ৮০ এর দশকে আমেরিকার সাথে সৌদির ডলার চুক্তি বিশ্ব অর্থ-ব্যবস্থায় আমেরিকাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলে। জারী হয় অধুনা Petro-Dollar System.</p>
<p>কিন্তু প্রফেসর এরবাকান ইসলামী ঐক্যের ব্যপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন। ইসলামী ইউনিয়নের পরিবর্তে পরবর্তী ৫০ বছরের কথা মাথায় রেখে বিশ্বব্যাপী একটি অর্থনৈতিক ছক তৈরি করেন। একটি ইসলামী বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্নকে সামনে রেখে তার স্বপ্নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন উবাবষড়ঢ়রহম-৮ অর্থাৎ ডি-৮। <strong>সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার মূলমন্ত্র যেখানে ‘শক্তিই সকল কিছু&#8217; সেখানে তার প্রতিষ্ঠিত ডি-৮ এর মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করেন ‘সবার উপরে হক’।</strong></p>
<p>তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় D-8 Organization for Economic Cooperation, সাধারণভাবে যাকে উন্নয়নশীল-৮ (D-8) বলা হয়। ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের শিরান প্রাসাদে অনুষ্ঠিত “উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা” শীর্ষক সেমিনারে তিনি বৃহৎ মুসলিম উন্নয়নশীল দেশ সমূহের মাঝে সহযোগিতার এক বলিষ্ঠ চিন্তা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করেন। তখন থেকে ধারাবাহিক কিছু প্রস্ততিমূলক অধিবেশন শেষে ১৯৯৭ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত “দেশ ও সরকার প্রধান সম্মেলন” এর সমাপনী অধিবেশনে ইস্তাম্বুল ডেক্লারেশনের মাধ্যমে ডি-৮ দাপ্তরিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>D-8 এর মূলনীতিসমূহ</h5>
<p>D-8 এর লোগোতে ছয়টি তারা সংগঠনটির ৬টি মূলনীতিকে ইঙ্গিত করে। সেগুলো হলো-</p>
<blockquote><p>১. যুদ্ধ নয়, শান্তি।<br />
২. দ্বন্দ্ব নয়, সংলাপ।<br />
৩. শোষণ নয়, সহযোগিতা।<br />
৪. দ্বৈতনীতি নয়, আদালত।<br />
৫. অহমিকা নয়, সমতা।<br />
৬. বলপ্রয়োগ বা কর্তৃত্ববাদিতার পরিবর্তে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র (মত প্রকাশের স্বাধীনতা)।</p></blockquote>
<p>যেহেতু প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান ডি-৮ এর প্রস্তাবক, তার প্রস্তাবনা অনুসারেই ন্যায়ভিত্তিক এক দুনিয়া প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রয়াস, ডি-৮ এর এধরণের সামগ্রিক মূলনীতি গৃহীত হয়। তার অনবদ্য আত্মজীবনী ‘দাওয়াম’-এ তিনি নতুন দুনিয়ার প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, যার মূল মেরুদণ্ড এই ছ’টি মূলনীতিই। আমরা সেখান থেকে যে সারসংক্ষেপ পাই, তা হলো—</p>
<p><strong>যুদ্ধ নয়, শান্তি</strong>—এই মূলনীতির গূঢ়ার্থ হলো বস্তুবাদ নয়; বরং আধ্যাত্মিকতা। কারণ বস্তুবাদী মনস্তত্ত্বের একটি বৃহৎ এ্যাপ্রোচ হলো ডারউইনিজম। যেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শক্তিশালী জাতিগুলো তুলনামূলক কম শক্তিশালী জাতিগুলোকে শোষণ, অত্যাচার অনাচার এমনকি বঃযহরপ পষবধহংরহম এর মাধ্যমে হলেও নিঃশেষ করে দিতে চায়। একে বর্তমান পরিভাষায় বলা হয় ঝড়পরধষ উধৎরিহরংস. সুতরাং একে মোকাবেলা করতে হলে আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে মানুষের মাঝে পারস্পরি সৌহার্দ্য, ভালোবাসা, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও শৃঙ্খলার চাষাবাদ করতে হবে।</p>
<p><strong>দ্বন্দ্ব নয়, সংলাপ</strong>-শান্তির ধারকবাহক ইসলামকে যেকোনো মূল্যে ধ্বংস করে দুনিয়াতে ফাসাদ ও ফেরাউনিয়াত কায়েম করতেই পাশ্চাত্যের যত আয়োজন। উপনিবেশের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো শক্তিমান মুসলিম সালাতানাতসমূহের পতন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর উসমানী খেলাফতের পতন ঘটানো এবং পরবর্তীতে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত মুসলিম দেশসমূহের নেতৃত্বে তাদের দোসর বসানো। প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে কৃত্রিম সঙ্কট জারী করে শত্রুভাবাপন্ন করে তোলা। সেখানে অস্ত্র, মাদক ব্যবসা পরিচালনা। অস্থিতিশীল পরিবেশে ফায়দা নিয়ে খনিজ ও যাবতীয় সুবিধাদী লুট করা, এসবই পাশ্চাত্যের এজেন্ডা। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে মুসলিম দেশগুলোর জন্য দ্বন্দ্ব যুদ্ধের পথ নয়; বরং সংলাপের মাধ্যমে নিজেদের সকল সমস্যা সমাধান করা বাঞ্ছনীয়, অন্যথায় মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণ সুদূর পরাহত।</p>
<p><strong>শোষণ নয়, সহযোগিতা</strong>&#8211; উন্নতি এবং অগ্রগতি একটি সমন্বিত বিষয়। এককভাবে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। পাশ্চাত্যের ধনী কিছু দেশ তাদের ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে দরিদ্র দেশ গুলোকে ইচ্ছাকৃত দরিদ্র বানিয়ে রেখেছে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণে বাধ্য করার মাধ্যমে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সে ঋণের আসল তো দূরের কথা এমন কি আরোপিত সুদও তারা ঠিকমত পরিশোধ করতে পারছে না। এভাবে আয়ের সমতা নষ্ট করে— ধনীকে আরো ধনী, গরীবকে আরো গরীব বানিয়ে তারা দুনিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিবেশিকে অভুক্ত রেখে যেমন নিজের ঘরে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়, তেমনই শোষণের এই পরিক্রমা কখনোই বিশ্বশান্তি আনবে না। তাই সহযোগিতার রোল মডেল স্থাপন করে সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে নজির পেশ করতে হবে বিশ্ববাসীর সম্মুখে।</p>
<p><strong>দ্বৈতনীতি নয়, আদালত</strong>&#8211; ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার মূল কাঠামো আদালতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলেও পাশ্চাত্যের প্রপাগাণ্ডা ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সাথে জুড়ে দিয়েছে। তাদের প্রহসনমূলক দ্বিমুখিতা মুসলিম দেশগুলোর মানবিক জীবন যাত্রার শুধু অধঃপতনই ঘটিয়েছে। শুধু মুসলিম দেশগুলোই নয়; বরং অপেক্ষাকৃত দুর্বল অমুসলিম দেশগুলোতেও তারা এই দ্বৈতনীতি চালিয়ে বিভেদ এবং সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়েছে। এখান থেকে মুক্ত হতে হলে মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা শুধু মুসলিমদের জন্য নয়; বরং সমগ্র বিশ্ববাসীর সাথে আদালতের সাথে নিশ্চিত করা জরুরী।</p>
<p><strong>অহমিকতা নয়, সমতা</strong>&#8211; বিগত শতাব্দী আমাদের দেখিয়েছে অর্থনৈতিকভাবে অগাধ শক্তিধর শুধুমাত্র ইউরোপই নয়, বরং দূর প্রাচ্যের দেশসমূহ মাত্র ১০-১৫ বছরের ব্যবধানে জেলেপল্ল­ী থেকে ইকনোমিক সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে। এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উৎকর্ষের জন্য সবার সমান সক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং বিশ্বশান্তির জন্য উঁচু নিচুর ব্যবধানকে ভুলে সমমর্যাদাকে ভিত্তি হিসেবে ধরতে হবে।</p>
<p><strong>বলপ্রয়োগ বা কর্তৃত্ববাদিতার পরিবর্তে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র (মত প্রকাশের স্বাধীনতা)</strong>&#8211; এই মূলনীতির মাধ্যমে প্রফেসর ড. এরবাকান প্রচলিত যায়নবাদের ক্রীড়নক জাতিসংঘ ব্যবস্থা, বিশ্বের ১৭০টি দেশকে নাম মাত্র সদস্য রাষ্ট্রকে নাম মাত্র ক্ষমতা দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ৫টি রাষ্ট্রকে ভেটো ক্ষমতা প্রদান করে যায়নবাদের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এভাবে তারা যখন যেভাবে ইচ্ছা মানবতাকে লুণ্ঠন করে যাচ্ছে। এ ব্যবস্থার বিপরীতে ‘হক’কে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে একটি নতুন জাতিসংঘের প্রস্তাবনা পেশ করেন। তাঁর ভাষায়—</p>
<p>“এই জাতিসংঘের উদ্দেশ্য বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা নয়, যায়নবাদীদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ তাদের চিন্তার মূলে হলো ফেরাউনী চিন্তা। তাহলে এখন কি করতে হবে?</p>
<p>কি করতে হবে এর উত্তরে আমি বলি, আমাদেরকে নতুন একটি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যে জাতিসংঘ হবে হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত, কোন জাতি বা গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়, সত্যিকারের বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাই হবে এই জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য। এই জাতিসংঘে কারোর কোন ভেটো দেয়ার পাওয়ার থাকবে না।</p>
<p>এরপর এই জাতিসংঘ এমন কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করবে যা সকল রাষ্ট্র মানতে বাধ্য হবে। কোন রাষ্ট্র তার জনগণের উপর জুলুম করতে পারবে না, সকল মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার দিতে বাধ্য থাকবে। মানুষের যেমন রাষ্ট্রের উপর অধিকার রয়েছে রাষ্ট্রেরও তেমন তার জনসাধারণের উপর অধিকার রয়েছে। আর সেটা হলো রাষ্ট্র জনগণের সাথে বৈষম্য মূলক আচরণ করতে পারবে না ও কোন ক্রমেই জুলুম করতে পারবে না, আর জনগণও অন্যের অধিকার হরণ করবে না এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কোন কাজ করবে না।&#8221;</p>
<p>এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ন্যায়ভিত্তিক একটি দুনিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মূলনীতি সমূহ প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং বিশ্বমানবতার সামনে আজকের এই জুলুমের দুনিয়ার আসল চেহারা তুলে ধরে তাদেরকে জাগ্রত করা প্রয়োজন।<br />
‘দাওয়াম’ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, নতুন দুনিয়ার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ-</p>
<ul>
<li>নতুন জাতিসংঘ; সমানাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, বর্তমান ব্যবস্থার মত শক্তিমানের স্বার্থ সংরক্ষণকারী প্রহসনের নাট্যশালা নয়।</li>
<li>নতুন রাজনৈতিক দীক্ষা; যা মানুষকে অসহিষ্ণু করে তুলে না, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য পাওয়ার এক্সারসাইজ করার জন্য বলে না, বরং মানুষের অধিকার প্রদান করার দীক্ষা দেয়।</li>
<li>প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জন; প্রযুক্তিতে এমন সক্ষমতা অর্জন, যা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে মান বিধ্বংসী হবে না, বরং মানুষের সর্বোচ্চ উপকারে এসে মাসলাহাতের কাজ করবে।</li>
<li>নতুন মুদ্রাব্যবস্থা; ডলার ভিত্তিক শোষণযন্ত্র থেকে মানবতাকে মুক্তি দিতে নতুন মুদ্রাব্যবস্থা তথা ইসলামী দিনার।</li>
<li>নতুন বিশ্বব্যাংক; বর্তমানে প্রচলিত কোন পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যাংক নয়, বরং বৈশ্বিকভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় এক ব্যাংক।</li>
<li>নতুন IMF; যা মানুষকে শোষণ নয়, বরং দুনিয়াতে একজন ও যাতে দরিদ্র না থাকে, সে লক্ষ্যে কাজ করবে।</li>
<li>নতুন সাংস্কৃতিক সাহায্য সংস্থা; বর্তমান হলিউডের মতো নগ্নতা ও অশ্লীলতার প্রচারক নয়, বরং সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর সংস্কৃতির বিকাশ ও পরিচর্যার জন্য জাতি সমূহের মাঝে সাংস্কৃতির বিনিময় করবে।</li>
<li>নতুন প্রচার ও প্রকাশনা সংস্থা; যেখান থেকে মানুষকে ম্যানুপুলেট করা হবে না, প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে জলঘোলা করা হবে না বরং সত্যটা জানানো হবে অকুণ্ঠচিত্তে।</li>
<li>নারীদের প্রতি সব ধরণের যুলুম ও অত্যাচারের অবসান ঘটানো হবে। তাদের প্রকৃত অধিকার সংরক্ষণ করে মর্যাদা ও সম্মানের সর্বোচ্চ স্তরে আসীন করা হবে।</li>
</ul>
<p>নতুন এই দুনিয়া প্রতিষ্ঠার তিনটি ধাপ রয়েছে-</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১.</strong> ডি-৮ নিউক্লিয়াস প্রতিষ্ঠা।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>২.</strong> ডি-৮ পরবর্তীতে অগ্রসর ৬০ টি দেশ নিয়ে ডি-৬০ গঠন এবং সর্বশেষ সমগ্র পৃথিবীকে এক ছাতার নিচে আনতে ডি-১৬০ প্রতিষ্ঠা। এর সাথে যুক্ত হবে ১০টি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, যাদের হাতে সুপ্রিম পাওয়ার সোপর্দ করা থাকবে। এরা সবাই একত্রিত হলে ৫০০ কোটি বঞ্চিত জনতা সাম্রাজ্যবাদী বর্ণবাদীদের শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে হক ও আদালতের উপর ভিত্তি করে একটু নতুন দুনিয়ার পত্তন ঘটাবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৩.</strong> ২য় ইয়াল্টা কনফারেন্স আয়োজন করে নতুন এক দুনিয়ার ঘোষণা দেয়া হবে, যার মৌলিক শর্ত হবে, এমন এক শান্তিপূর্ণ দুনিয়া যা শোষিত জনতার অধিকার নিশ্চিত করবে হক ও আদালতের ভিত্তিতে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও ভিশন :</h5>
<p>উপরোল্লি­খিত এই রূহ ও জযবাকে ধারণ করেই প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান নতুন দুনিয়ার নিউক্লিয়াস হিসেবে ডি-৮ কে একটি বিশ্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরেন এবং বলেন, ডি-৮ এবং বর্তমান উন্নত বিশ্বের জি-৮ (বর্তমান জি-৭) সমান্তরাল সংগঠন। অচিরেই ডি-৮ এবং জি-৮ এক টেবিলে বসে চুক্তি করবে এবং ২য় ইয়াল্টা কনফারেন্সের মাধ্যমে এক নতুন দুনিয়ার প্রবর্তন করবে।</p>
<p>যেহেতু প্রফেসর ড. এরবাকান সবসময় বলতেন, <strong>“হকের উপর প্রতিষ্ঠিত (ইসলামী) সভ্যতা শক্তির (Power) উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্য সভ্যতার চেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন।”</strong> তাই তিনি ইসলামী সভ্যতা ও ইসলামী ঐক্যের রূহকে ধারণকারী সংগঠন ডি-৮ এর উদ্দেশ্য হিসেবে শুধু সদস্য রাষ্ট্রসমূহের কল্যাণই নয়, বরং সমগ্র মানবতার উন্নয়ন ঘটানোকে নির্দেশ করেন।</p>
<p>১৯৯৭ সালে ইস্তাম্বুল সম্মেলনের ইশতেহার অনুসারে ডি-৮ এর উদ্দেশ্য হলো—</p>
<ul>
<li> বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থানের উন্নতি ঘটানো,</li>
<li>আন্তঃবাণিজ্যিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনয়ন ও নতুন সুযোগ তৈরি করা,</li>
<li>আন্তর্জাতিক পরিসরে নীতি-নির্ধারণীর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে বুলন্দ করা, এবং</li>
<li>বসবাসের জন্য আদর্শ মানদণ্ড স্থাপন করা।</li>
</ul>
<p>ডি-৮ এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুসারে তার প্রতিপাদ্যসমূহ হলো—</p>
<p>ক. সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাসমূহের কার্যকরী বিন্যাস সাধনের মাধ্যমে টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে যৌথ প্রচেষ্টাসমূহকে উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।</p>
<p>খ. জনমানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।</p>
<p>গ. সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ, চেম্বার অফ কমার্স এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বেসরকারী বাণিজ্যিক খাতকে শক্তিশালী করা।</p>
<p>ঘ. উন্নয়নশীল দেশসমূহের অগ্রগতির বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে অন্যান্য দেশ, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক সংস্থাসমূহ এমনকি বেসরকারী সংস্থাসমূহের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা।</p>
<p>ঙ. বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা পালনে ডি-৮ এর সমন্বিত শক্তি ও সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে একজোট হয়ে কাজ করা।</p>
<p>মূলকথা হচ্ছে, ডি-৮ এর মূলনীতিসমূহের আলোকে সদস্য দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান ও আর্থ-সামাজিক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিসরে অগ্রগতি নিয়ে আসার মাঝেই এই সংগঠনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিহিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ডি-৮ এর বৈশ্বিক ভিশন (২০১২-২০৩০):</h5>
<p>১২ নভেম্বর ২০১২ সালে ইসলামাবাদে আয়োজিত ডি-৮ এর ৮ম সম্মেলনে দেড়যুগ মেয়াদী ডি-৮ বৈশ্বিক ভিশন গৃহীত হয়। সংক্ষেপে এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>সদস্য দেশগুলোর মাঝে নিবিড় সহযোগিতা ও কার্যকর সমন্বয় সাধন করা এবং পারস্পরিক লাভজনক বিষয়ে আন্তঃনির্ভরশীলতা তৈরি করা।</li>
<li>আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সাথে সঙ্গতি বজায় রাখতে অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে লিয়াজোঁ রক্ষা করা।</li>
<li>সদস্য রাষ্ট্রসমূহের নিজ নিজ জাতীয় পরিসরে ডি-৮ এর সমর্থন বৃদ্ধি করা এবং এর আওয়াজ ও ভারত্বকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলিষ্ঠ করতে সমন্বিতভাবে কাজ করা।</li>
<li>সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় পরিসরে সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষে পারস্পরিক সমন্বয় মূলক অংশিদারিত্ব বাড়ানো।</li>
<li>সুশাসন, আইনের প্রয়োগ, সাবলীল অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা।</li>
<li>সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে উন্নত জীবন যাত্রার মান নিশ্চিতকরণে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিচালনা করা।</li>
</ul>
<p>চলমান ও অনাগত বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলায় কৌশলগত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সাধন করে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি সঙ্কট, কৃত্রিম অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ লাভ করা ইত্যাদি।</p>
<p><strong>এখানে উল্লি­খিত দুই সম্মেলনের মূল কথাগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নতুন এক দুনিয়ার প্রস্তাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে বৈশ্বিক সংগঠন ডি-৮ তার নিজস্ব ধাঁচ ও পরিভাষা হারিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক আইডিয়া গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। নতুন পন্থা পদ্ধতি ও ব্যবস্থা তৈরির পর্যায় থেকে অন্যান্যদের তৈরিকৃত পন্থা ও পরিভাষাই Adopt করে নিতে দেখা যায়। এভাবে ডি-৮ প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরের মাথায়ই তার রূহ ও জযবাকে হারিয়ে ফেলতে থাকে। বিশেষত ২০১১ সালে এরবাকান হোজার ইন্তেকালের মাত্র এক বছরের মাথায় এমন রেডিক্যাল চেঞ্জ বিস্ময়কর এবং হতাশাজনকই বটে।</strong></p>
<p>ডি-৮ এর প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের জীবনীগ্রন্থ &#8220;নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবক ও মহান মুজাহিদ নাজমুদ্দিন এরবাকান&#8221; গ্রন্থে ডি-৮ ভুক্ত দেশসমূহ ও তাদের শক্তিমত্তা ও গুরুত্ব অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয় এভাবে-</p>
<p>&#8220;D-8 গঠনের জন্য প্রথমে তিনি (প্রফেসর এরবাকান) স্ট্র্যাটেজিক পজিশনে ৮টি দেশের কথা চিন্তা করেন। সেই সাথে দেশের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বিশ্বরাজনীতিতে কত বেশি প্রভাবান্বিত করতে পারবে সেটাকে প্রাধান্য দেন। আর সামরিক শক্তি তো অপরিহার্য একটি বিষয়। D-8-কে তিনি একটি পাওয়ার হাউজে পরিণত করতে চেয়েছিলেন যেন সংগঠনভুক্ত দেশসমূহের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং একই সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিমরা এমন এক শক্তি হয়ে ওঠবে যাতে করে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে জুলুমের শিকার মুসলিমদের উপর সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তি কখনো চোখ তুলে তাকাতে সাহস না করে।&#8221;</p>
<p>যে কয়টি দেশ নিয়ে D-8 গঠিত হয়েছিল—</p>
<p>১. তুরস্ক,<br />
২. ইরান,<br />
৩. মিশর,<br />
৪. মালয়েশিয়া,<br />
৫. ইন্দোনেশিয়া,<br />
৬. নাইজেরিয়া,<br />
৭. বাংলাদেশ এবং<br />
৮. পাকিস্তান।</p>
<p><strong>দেশগুলোকে কেন নির্বাচন করা হয়েছে:</strong> ভৌগোলিক দিক দিয়ে এই ৮ দেশের অবস্থান বিবেচনা করলে D-8 এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু তা বুঝা কষ্টসাধ্য ব্যপার নয়। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক রুটগুলোর উপর একটু চোখ বুলিয়ে আসি।<br />
তুরস্ক দেশটি সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুরস্ক সর্বদা সবার সামনেই অবস্থান করছিল। বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে তুরস্ক। ইউরোপ এবং এশিয়ার সংযোগস্থল। চানাক্কালের এবং বসফরাস প্রণালীর মতো দুটো কৌশলগত প্রণালী এই দেশটির অধীনে। ইউরোপের গলার কাঁটা হিসেবে বিবেচিত এই একই সাথে কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত ক্রেচ প্রণালী তুরস্কের এই দুই প্রণালী ছাড়া অচল। অর্থাৎ তুরস্কের যদি চায় তাহলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩টি প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ রাশিয়াকে এ পথেই বাণিজ্য করতে হয়।</p>
<p><strong>মিশর:</strong> ইতিহাস-ঐতিহ্য, নীল নদের অববাহিকায় গঠিত শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ মিশর হচ্ছে উত্তর আফ্রিকার অন্যতম একটি দেশ। আরব বিশ্বের সাথে যথাযথ সম্পর্ক রক্ষাকারী এবং এক সময়ে পৃথিবীর ৭০% অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী সুয়েজ ক্যানেল এর অধিকারী হচ্ছে মিশর ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের সংযোগস্থল হচ্ছে সুয়েজ ক্যানেল। হযরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মিশরের গভর্নর এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে হযরত ওমরের কাছে দুই সাগরকে সংযুক্ত করার জন্য একটি ক্যানেল নির্মাণের পরামর্শ চেয়েছিলেন। হাল্কা শুরু হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি। উসমানী আমলে সুয়েজ ক্যানেলটি নির্মাণ করা হয়। <strong>এরপর থেকে প্রায় ২৫০ বছরের অধিক সময় থেকে এই প্রণালী বিশ্বের অর্থনীতির বৃহৎ একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সুয়েজ ক্যানেল ছাড়া লোহিত সাগরের বাব-আল মান্দেব এক প্রকার অর্থহীন। ইউরোপ থেকে এশিয়ার বাণিজ্য জাহাজের রুট একমাত্র এটিই।</strong></p>
<p><strong>ইরান:</strong> মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আরেকটি শক্তিশালী দেশ। আমেরিকার হাজারো অবরোধ সত্ত্বেও নিজ দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় নির্মাণ করে পুরো বিশ্বের কাছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রের প্রতিবিম্ব হয়ে আছে বিশ্বরাজনীতিতে। মুসলিম বিশ্বের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিকভাবে ইরান গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। বিখ্যাত হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। ভৌগোলিকভাবে তুরস্কের সমান গুরুত্ব ইরানের। দেশটির উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে পারস্য উপসাগর। পশ্চিমে ইরাক, তুরস্ক, আরমেনিয়া, আজারবাইজানের সাথে সীমান্ত রয়েছে দেশটির, অপরদিকে পূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী দেশ পাকিস্তান ও খনিজ সম্পদের অধিকারী আফগানিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে সীমানা ভাগ করে নিয়েছে ইরান। একই সাথে পারস্য সাগর পাড়ি দিলেই সৌদি, কুয়েত, কাতার, ওমান। অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে পুরো মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র বলা যায় ইরানকে।</p>
<p><strong>মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া:</strong> বর্তমান মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে যদি কয়েকটি দেশকে বিবেচনা করা হয় তাহলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সবার উপরে স্থান পাবে। এই দু’দেশ নিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে তেমন আলোচনা না হলেও দেশ দুটির গুরুত্ব বুঝতে শুধুমাত্র মালাক্কা প্রণালীকে বিবেচনা করলেই হবে। এই প্রণালীর একপাশে মালয়েশিয়া অপরপাশে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশ। মালাক্কা প্রণালী হচ্ছে এই দুই দেশের অধীনে। পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপান, চীন, ও কোরিয়া উপদ্বীপের সকল বাণিজ্য এ প্রণালী দিয়েই করতে হয়। এছাড়া ভারত মহাসাগরে প্রবেশের অন্য কোনো পথ নেই।<br />
একবার ভাবুন, উপরোক্ত প্রত্যেকটি দেশ যদি শক্তিশালী হয় এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য পথে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে তাহলে এর ফলাফল হচ্ছে পুরো দুনিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এতটাই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে উল্লি­খিত প্রণালীগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে।</p>
<p><strong>নাইজেরিয়া:</strong> আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ একমাত্র দেশ হচ্ছে নাইজেরিয়া একই সাথে প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আফ্রিকার এই দেশটি। সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ এই দেশটি উমাইয়া আমল থেকেই মুসলিম অধ্যুষিত। ফরেন ডিপ্লোমেসি তথা বৈদেশিক ক্ষেত্রে কী কী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তার উপর সর্বপ্রথম বই রচনা করে নাইজেরিয়া। আফ্রিকায় মুসলিমদের শক্ত অবস্থানের পেছনে নাইজেরিয়ার অবদান সেই ১৩ শতাব্দী থেকেই। ঐতিহাসিকভাবেই আফ্রিকার সব দেশের সাথেই নাইজেরিয়ার সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তাই আফ্রিকার দেশ হিসেবে সংগঠনে নাইজেরিয়ার স্থান সবার প্রথমে হওয়াটা অতি স্বাভাবিক।</p>
<p><strong>বাংলাদেশ:</strong> বাংলাদেশের উর্বর কৃষি জমিতে সাতশত বছরের উন্নত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কার না জানা? দেশটিতে নিকৃষ্টতম বৃটিশ শোষণের কয়েক বছর পূর্বের জিডিপি পরিসংখ্যানও যদি বিবেচনা করি- ২৩% নিয়ন্ত্রণ শুধু এ বাংলা অঞ্চলের-ই ছিল। যেখানে বর্তমান দুনিয়ার কথিত সুপার পাওয়ার সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার ১৮%।</p>
<p><strong>পাকিস্তান:</strong> দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের কথা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। ভারী শিল্পায়নের দারুণ সক্ষমতা, উন্নত কৃষি সম্ভাবনা, সমৃদ্ধ সামরিক শক্তি, কী নেই দেশটির!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>D-8 এর গুরুত্ব :</h5>
<p><strong>তেল:</strong> পৃথিবীর ১৫% তেল রিজার্ভ আছে এই ৮টি দেশে এবং এই ৮টি দেশ থেকে বাৎসরিক পৃথিবীর ১০% তেল উত্তোলন করা হয়। আবার এই ৮টি দেশকর্তৃক পৃথিবীর ৬.৭% তেল ব্যবহৃত হয়।</p>
<p><strong>গ্যাস:</strong> বিশ্বের ২৩.২% প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ আছে D-8 এর দেশসমূহে। সেই সাথে D-8 থেকে বছরে বিশ্বের ১৩.২% গ্যাস উত্তোলন করা হয়। আর D-8 এর দেশসমূহ প্রতিবছর বিশ্বের ১১.২% গ্যাস ব্যবহার করে থাকে।</p>
<p>এছাড়াও বর্তমান বিশ্বের স্ট্র্যাটেজিক পদার্থ বোরন ও ক্রোমিয়াম ব্যাপক পরিমাণে মজুদ রয়েছে D-8 এর ভেতরে। বিশ্বের তুলা রপ্তানিতে D-8 এর দেশসমূহের বৃহৎ একটি ভূমিকা এখনো বিদ্যমান। স্ট্র্যাটেজিক পজিশন ছাড়াও D-8 এর অধীনে পৃথিবীর মধ্যভাগের সর্বোচ্চ এলাকা, সাথে রয়েছে ৮টি দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী।</p>
<p>মুসলিম বিশ্বের কথা চিন্তা করলে, মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ৬০% জিডিপি হচ্ছে D-8 এর, একই সাথে OIC অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের ৬৫% জনশক্তি D-8 এর দেশসমূহ থেকেই। মুসলিম বিশ্বের বৈদেশিক বাণিজ্যের দিক থেকে D-8, ১০০ ভাগের মধ্যে ৫৮ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।</p>
<p>D-8 এর অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের সম্মিলিত জিডিপি ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থাৎ এটি বিশ্ব অর্থনীতির ৫%। অথচ নিজেদের তুলনায় তা কিছুই না। বিশ্ববাণিজ্যের ১৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অংশীদার হচ্ছে এই দেশসমূহ। যদি এখনো নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন করে এবং এসব প্রণালীতে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয় তাহলে পৃথিবীর ৭০% বাণিজ্য মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করবে। তার জন্য সব দেশকে একসাথে কাজ করতে হবে লড়তে হবে ।</p>
<p><strong>জনসংখ্যা:</strong> D-8 এর অন্তর্ভুক্ত ৮টি দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.১ বিলিয়ন অর্থাৎ তা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৬%। বর্তমানে ডি-৮ এর দেশসমূহের নিজেদের মধ্যে ব্যবসার পরিমাণ ১২০ বিলিয়নে উন্নীত করা না হলে মুসলিম বিশ্ব মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না।</p>
<p>জনসংখ্যা একটি শক্তি। এই জনশক্তিকে ঈমানের বলে বলীয়ান করে কাজে লাগাতে পারলে মুসলিম বিশ্বে এমন এক দুর্বার শক্তির সৃষ্টি হবে যাকে মোকাবেলা করার সামর্থ্য পৃথিবীর কোনো শক্তির থাকবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>কর্মপদ্ধতি, ধরণ, কাজের ক্ষেত্র</h5>
<h6><strong>ডি-৮ এর কাঠামো :</strong></h6>
<p>ডি-৮ এর মূল পর্যায়গুলো হচ্ছে—</p>
<p><strong>১. রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানদের সম্মেলন:</strong> সংস্থাটির সর্বোচ্চ পরিষদ, যেখানে ডি-৮ এর প্রতিপাদ্যগুলো বাস্তবায়নের স্বার্থ সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সভার বৈঠক চক্রাকারে ২ অথবা ৩ বছর অন্তর কোন সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত হয়।</p>
<p><strong>২. মন্ত্রী পরিষদ:</strong> এখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রীগণ যুক্ত থাকেন এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়। এরা বছরে অন্তত একবার অধিবেশনে বসে এবং প্রতি শীর্ষ সম্মেলনের পূর্বে একবার অবশ্যই আলোচনায় বসে।</p>
<p><strong>৩. কমিশন:</strong> এটা হচ্ছে নির্বাহী বিভাগ। যেখানে প্রতিটি সদস্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তৃক নিয়োগকৃত দূতগণ যুক্ত থাকেন। এরা মূলত মন্ত্রীপরিষদের অধীনে কাজ করেন। প্রতি কমিশনার তার নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। এরা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে স্ট্যান্ডিং কমিটি বা এড-হক গ্রুপ তৈরি করেন এবং তার তদারকি করেন। এরা বছরে অন্তত দুইবার বৈঠকে বসেন; একবার মন্ত্রীপরিষদ অধিবেশনের তাৎক্ষণিক পূর্বে।</p>
<p><strong>৪. সচিবালয়:</strong> ডি-৮ এর সচিবালয় ইস্তাম্বুলে অবস্থিত। এটা সব ধরণে কার্যক্রম এবং মিটিং এর আয়োজন ও তত্ত্বাবধান করে। এর প্রধান হন সেক্রেটারী জেনারেল যিনি মূলত ডি-৮ এর “Chief Administrative Officer”। তিনি একবারের জন্যই ৪ বছর মেয়াদের নির্বাচিত হন। তিনি ডি-৮ এর মাঝে সমন্বয় ও সমতা রক্ষা করেন এবং মূল সংস্থাগুলোর সকল অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডি-৮ এর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।</p>
<p>এছাড়াও ডি-৮ এর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যেকোন দেশের মাঝে উদ্ভূত বিরোধ ও উত্তেজনা নিরসন, অর্থনৈতিক বাজেট প্রণয়ন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সহ অন্যান্য আরো বেশ কয়েকটি বিভাগ রয়েছে।</p>
<p>ডি-৮ মূলত একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এই লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে ডি-৮, ৬টি সেক্টরে অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে।</p>
<p>১. বাণিজ্য,<br />
২. শিল্প,<br />
৩. কৃষি ও খাদ্য নিরপত্তা,<br />
৪. পরিবহন ও যোগাযোগ,<br />
৫. পর্যটন,<br />
৬. জ্বালানী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h6>বর্তমান অবস্থা</h6>
<p>সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পরপরই পরিকল্পনা ছিল উ-৮ এর মধ্যকার দেশসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, পরবর্তীতে একটি অভিন্ন মুদ্রা তৈরি করা। এরপর বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহ নিয়ে ডি-৬০ তৈরি করা। সকল দেশ এখানে চুক্তি অনুযায়ী কাজ করবে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হলে এবং এক মুসলিম দেশ অপর মুসলিম দেশের উপর নির্ভরশীল হলে এখানে কেউ নিজেকে আরেকজনের থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না এবং ইউরোপ ও পাশ্চাত্যকে গণনাই ধরবে না মুসলিম বিশ্ব।</p>
<p>D-8 প্রতিষ্ঠার পরপরই ৮টি দেশ নিজেদের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে।</p>
<p>প্রথম পদক্ষেপ ছিল, ১৯৯৭ তে তুরস্কে উৎপন্ন হেলিকপ্টার পাকিস্তানে বিক্রি করা। ৮টি দেশের মধ্যে ৬টি দেশ ভিসা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যেখান থেকে বাদ রয়ে যায় বাংলাদেশ ও মিশর।</p>
<p>পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয় উ-৮ এর অধীনে। টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, লোহা, স্টীল, ফার্মাসিটিক্যাল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে খুব দ্রুতই। সেই সাথে Shipping and Maritime Service-এর ক্ষেত্রে সকল দেশ চুক্তিবদ্ধ হয়।</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে সংগঠনটি সকল দেশসমূহের মধ্যকার ব্যবসার পরিমাণ সম্মিলিতভাবে মাত্র ১২০ বিলিয়ন ডলার। নিস্তেজ হয়ে পড়া এই সংগঠনটি টিকে আছে মূলত এই ১২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের কারণেই।</p>
<p>সাম্প্রতিক সময়ে ডি-৮ এর কর্মকাণ্ডের একটি চিত্রায়ণ ফুটে ওঠে মালয়েশিয়ান এক বিখ্যাত উপস্থাপকের টকশোতে দেয়া সংস্থাটির সাবেক সেক্রেটারী মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত কূটনৈতিক ও অর্থনীতিবিদ ‘দাতো কু জাফর কু শারী’ এর এক ইন্টারভিউতে।</p>
<p>উপস্থাপকের নানাবিধ প্রশ্নের জবাবে তিনি ডি-৮ কে নিয়ে যা বলেন, তার সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ—</p>
<p>ডি-৮ শুরুতে বেশ জোরেশোরে কাজ শুরু করলেও বৈশ্বিক পরিবর্তনশীল ঘটনা প্রবাহের মধ্যে সেরকম আলো ছড়াতে পারেনি। উপরন্তু সংযুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতামূলক মনোভাব বার বার ব্যহত হয়েছে নানাবিধ কারণেই। তারা সেখানে এক ধরণে ইতিবাচক মনোভাব আনয়নের প্রয়াস চালিয়েছেন।</p>
<p>বর্তমান জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকের মর্যাদায় আসীন এ সংস্থাটি নানা কারণেই এখনো গণপরিসরে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সাথে চুক্তি করে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রয়াস চলমান।</p>
<p>ডি-৮ শুরু থেকেই ইন্টেলেকচুয়ালিটির দিকে নজর দিয়ে এসেছে এবং পূর্বোল্লি­খিত পাকিস্তানে রিসার্চ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা ছাড়াও ইবনে সিনার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত ইরানের হামদানে ডি-৮ এর নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক বিষয়াবলির উপরে মাস্টার্স ও পি এইচ ডি পর্যায়ে প্রতি সদস্য রাষ্ট্র থেকে ৫ জন করে প্রতি বছর স্কলারশিপ প্রদান করা হচ্ছে।</p>
<p>আপাতদৃষ্টিতে একাধিক সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে উত্তেজনা বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও ডি-৮ এর কল্যাণে আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রক্রিয়া চলমান। কারণ ডি-৮ অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা হওয়ায় রাজনৈতিক মতভেদকে এক পাশে রেখে ‘One for All : All for One’ পলিসি অনুসারে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন মিশর-তুরস্ক রাজনৈতিকভাবে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও এক তার্কিশ ডেভলপার কোম্পানি মিশরে ৫টি ইকোনমিক জোন তৈরি করে দেয়।</p>
<p>পাশাপাশি বৃহৎপরিসরে সহযোগিতা ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ইতোমধ্যে ডি-৮ এর জন্য বিশেষায়িত তিনটি বিমান বন্দর রয়েছে—</p>
<p>১. সাবিহা গোজেন বিমানবন্দর, তুরস্ক,<br />
২. জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পাকিস্তান,<br />
৩. নাওয়াকিন্দি বিমানবন্দর, নাইজেরিয়া।</p>
<p>সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও এই প্রকল্পের আওতায় আসবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।</p>
<h6><strong>স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার—</strong></h6>
<p>নিজেদের মাঝে নিজস্ব মুদ্রার বিনিময়ের প্রস্তাবনা শুরু থেকে থাকলেও ডি-৮ এই প্রকল্পে এখন ও সফল হয়নি। তবে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর সাথে চুক্তি করে আঞ্চলিক মুদ্রা বিনিময় করতে D-Card এর প্রচলন খুব দ্রুতই করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যেখান থেকে ছাত্র, প্রবাসী শ্রমিক, প্রাইভেট ব্যাংকিং খাত ব্যাপক উপকৃত হতে পারবে। কেননা এখানে মুদ্রার মূল্যমান হিসেবে স্বর্ণের মজুদ সংরক্ষণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।</p>
<p>প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ডি-৮ চেম্বার অফ কমার্স প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তবে অতি সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানটি “যারা ডি-৮ এর চেয়ারম্যান থাকবে, তারাই চেম্বার অফ কমার্সের দায়িত্বে থাকবে” মূলনীতি অনুসারে খুব সহজেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। এর সদর দপ্তরের নাম হয়, D-8 Chamber of Commerce &amp; Industries, Kualalampur.</p>
<p>যার অধীনে ‘Creative Economy and Finance Center for D-8’ নামে চমৎকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যেখানে হালাল অর্থনীতি এবং ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়াও ইসলামী সভ্যতার অনন্য সব মিরাস যেমন যাকাত, ওয়াকফ, হিবা ও সাদাকাকে বর্তমান বিশ্বে গ্লোবাল ইকোনোমিতে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।</p>
<p>সদস্যদেশগুলোর বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারী, বিনিয়োগকারী, উৎপাদক সহ বিভিন্ন পর্যায়ে এসকল প্রকল্পের বিস্তৃতি রয়েছে। ডিজিটাল কারেন্সি, ব্লকচেইন ইত্যাদির সাথে ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে সংগতিপূর্ণ করতে চালু করা হয়েছে, Muslim Youngster Entrepreneurship. পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে Robotic Association.</p>
<p>মসজিদসমূহকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষণ এবং দাতব্য ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠায় চালু করা হয়েছে— Waqf Foundation, Malaysia.</p>
<p>সমাজে মহত্তম এই ব্যবস্থাকে পুনরায় প্রচলন করতে শরিয়ার আলোকে জারী করা হচ্ছে নতুন ফতোয়া।</p>
<h6><strong>পর্যালোচনা-</strong></h6>
<p>অসীম সম্ভাবনা ও শক্তির আধার, মুসলিম উম্মাহর মুক্তির মনজিল ডি-৮ বর্তমানে স্থবির একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে এবং সময়ের পরিক্রমায় একটি বিশ্বজনীন বিকল্প জাতিসংঘ হওয়ার পথ থেকে সরে এসে প্রচলিত আঞ্চলিক সংস্থা সমূহের মত আচরণ শুরু করেছে। এ অবস্থার পেছনে বিশ্লে­ষকগণ দায়ী করেন সদস্য রাষ্ট্র সমূহ অন্য জোটে যুক্ত থাকায় সে সকল স্বার্থের বেড়াজালে পড়ে ডি-৮ কে আগ্রহভরে গ্রহণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। একে শক্তির উৎস নয়; বরং বোঝা হিসেবেই বয়ে বেড়াচ্ছেন। এখানে একটি উদাহরণই যথেষ্ট—</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ডি-৮ এর প্রস্তাবক হওয়া সত্ত্বেও ২০০২ সালের পর থেকে উ-৮ এর তুলনায় ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে বেশি ধাবিত হয়েছে তুরস্ক সরকার। অথচ প্রতিষ্ঠার পর থেকে উ-৮ এর দিকে জোর দিলে হয়তো আজ ইউরোপ ও এশিয়াতে বিশ্বরাজনীতির নতুন চেহারা দেখতে পেত বিশ্ববাসী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বাংলাদেশ ও ডি-৮</h5>
<p>ডি-৮ এর অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র বাংলাদেশ সম্প্রতি টানা ২য় বারের মত সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সুতরাং ডি-৮ এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অতীতে বাংলাদেশ ও ডি-৮ সংক্রান্ত তেমন আশাব্যঞ্জক ইতিহাস না পাওয়া গেলেও সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১০ম ভার্চুয়াল ডি-৮ সম্মেলন, মন্ত্রীপরিষদ বৈঠক ও চেম্বার অফ কমার্সের মিটিং এ কর্তাব্যক্তিদের আলোচনা আশার সঞ্চার করেছে।</p>
<p>প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডি-৮ সম্মেলনে তার সভাপতির ভাষণে বলেন, “একা হয়ত আমরা কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার সামর্থ রাখি, কিন্তু এক সাথে পথচলা আমাদের বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।” ডি-৮ এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগামী ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তিনি তিনটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন— <strong>১. বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণকে দ্বিগুণ করা, ২. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং ৩. পৃথিবীর অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী টেক জায়ান্টে পরিণত হওয়া।</strong></p>
<p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ডি-৮ কে চলমান বৈশ্বিক মন্দা মোকাবেলায় সর্বোত্তম বিকল্প উল্লেখ করে বলেন, &#8220;ডি-৮ ভুক্ত দেশে ১.১ বিলিয়ন মানুষের একটি বিশাল মার্কেট রয়েছে। সদস্য দেশগুলো যদি এই মার্কেট ব্যবহার করে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় এবং অন্যান্য পারস্পরিক সহযোগিতা মাত্রা বৃদ্ধি করে তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানী ও খাদ্য সঙ্কট থেকে অনায়াসেই পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে।”</p>
<p>গত জুলাই মাসে ডি-৮ চেম্বার অফ কমার্সের বর্তমান বাংলাদেশি সভাপতি ফজলে ফাহিম তার তার বক্তব্যে ডি-৮ এর দেশগুলোর মাঝে আন্তঃমুদ্রা বিনিময় এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একইভাবে বাংলাদেশের সরকারী নীতি নির্ধারক মহল, যেমন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন, বাণিজ্য মন্ত্রী, বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয় উপদেষ্টা বিভিন্ন বক্তব্যে ডি-৮ ভুক্ত দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই চালু হতে যাওয়া ১০০ টি ইকোনমিক জোন এবং ২০ টি হাইটেক পার্কে বাড়তি সুযোগ ও অগ্রাধিকার এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা দেয়ার আশ্বাস প্রদান করেন এবং পারস্পরিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির অকৃত্রিম সহযোগী হতে আহ্বান জানান।</p>
<p>পারস্পরিক উন্নয়ন অগ্রগতি ও কোলাবোরেশনকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে এবারে মন্ত্রী পর্যায়ের ডি-৮ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন এক বারের জায়গায় প্রয়োজনে বছরে একাধিকবার অধিবেশন আহ্বানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।</p>
<p>সার্বিকভাবে বুঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারক মহল ডি-৮ এর শক্তিমত্তাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এবং সভাপতি রাষ্ট্র হিসেবে এই সংগঠনের মধ্য দিয়ে নিজেদের উন্নতি ও উৎকর্ষের হিসাব মিলাতে শুরু করেছে। যদি সত্যিকারার্থেই বাংলাদেশ সহ অন্যান্য রাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বের অপার সম্ভাবনাময় এ সংগঠনে পূর্ণ শক্তি বিনিয়োগ করে তবে খুব দ্রুতই এ সংগঠন প্রতিষ্ঠাকালীন প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার পথে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হবে।</p>
<p>ডি-৮, অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণের পাঠ চুকিয়ে আমরা যখন ২৫ বছর বয়সী নতুন দুনিয়ার এ প্রস্তাবনার দিকে তাকাই, তখন দেখতে পাই। সংগ্রামী পূর্বপুরুষের তরফ থেকে অসামান্য এক হাতিয়ার আমাদের সামনে গড়াগড়ি খাচ্ছে, অথচ আমরা তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করছি না। সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাচ্ছি না; বরং প্রতিটি দেশই আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিসরে যুলুমতান্ত্রিক বিশ্ব শক্তিগুলোর অপরাজনীতির পাল্লায় পড়ে হিমশিম খাচ্ছি। এর কারণ কী?</p>
<p>এর কারণ হচ্ছে উম্মাহ চেতনাকে হারিয়ে ফেলা। যে উম্মাহ চেতনার বলে বলীয়ান হতে পারলে আজ আমরা সমগ্র মানবতার সামনে রহমতের ছায়া হয়ে উঠতে পারতাম। গোটা দুনিয়া থেকে সন্ত্রাস, বাড়াবাড়ি, যুদ্ধ, হানাহানি, জুলুম-সংঘাতকে প্রতিহত করে একটি বসবাসযোগ্য দুনিয়ার সু-সংবাদ দিতে পারতাম। ঠিক যে মুহূর্তে দুনিয়া বাইপোলার থেকে ইউনিপোলার হলো, তখন ও আমরা কিছু করতে পারিনি। বর্তমানে যখন ইউনিপোলার থেকে মাল্টিপোলার হচ্ছে, মুসলিম হিসেবে আমরা ইতিহাসের এ সন্ধিক্ষণে কোন ভূমিকাই রাখতে পারলাম না। আজ যখন বিশ্বমানবতা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য ঘঅঞঙ জোট থেকে উদীয়মান পরাশক্তি চীন কিংবা তাকেও অতিক্রম করে ইজওঈঝ এর মতো নবপ্রতিষ্ঠিত সংস্থার দিকে নজর ফিরাচ্ছে। ঠিক সে মূহুর্তে ডি-৮ এর মতো বিশ্ব পরিবর্তনের সক্ষমতা ও ভিশন সম্পন্ন এক বিশ্বজনীন প্রতিষ্ঠান কালের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।</p>
<p><strong>এখান থেকে মুক্ত হতে হলে যুব পরিসরে ডি-৮ ও ইসলামী ঐক্যের চিন্তার বীজ বুননের কোন বিকল্প নেই। সমসাময়িক দুনিয়া, চলমান দুনিয়ার নিকট অতীতের ইতিহাস, ইসলামী সভ্যতার উত্তরাধিকার ও সামগ্রিক শান্তির বয়ানকে অনাগত প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ ও ঐক্য এবং বিশ্বমানবতার চূড়ান্ত মুক্তির ভাবনাকে প্রত্যেকের জ্ঞান ও চেতনার মনিকোঠায় পৌঁছে দেয়ার কোন বিকল্প নেই।</strong></p>
<p>বসবাস যোগ্য এক নতুন দুনিয়ার প্রস্তাবক, বিশ্ব মানবতার মুক্তি আন্দোলনের রাহবার প্রফেসর ড. নাজমুদ্দির এরবাকান তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে ডি-৮ নামক স্বপ্নের যে মনযিল আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন, তাকে তিনি নিজ ভাষায় চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে— “ডি-৮ হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর তরফ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রতি দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।”</p>
<p>আজ আমরা সবাই পাশ্চাত্য যায়নবাদী সভ্যতার সাড়ে তিনশো বছরে রক্তাক্ত ইতিহাস, বিগত শতাব্দীর বারুদ মেশা ইতিহাসের গন্ধ, পারমাণবিক হুমকিতে দুনিয়াকে সদা তটস্থ করে অবশেষে বায়োলজিক্যাল ওয়ারের মাধ্যমে সমগ্র মানবতার উপরে পতনোন্মুখ মরণ কামড়, বিশ্বব্যাপী পাওয়ার ট্রানজিশন, ফেরাউনি শক্তিগুলোর মধ্যে ঘন ঘন পরিবর্তনশীল দৃশ্যপট দেখে খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারছি, আজ নতুন একটি যুগের এবং নতুন একটি বিজয়ের প্রয়োজন। যা সমগ্র মানবতা আজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। নতুন একটি শান্তিময় দুনিয়া গঠন করার জন্য আমাদের এই মুসলিম উম্মাহ পুনরায় নেতৃত্ব দিবে। সম্মানিত একটি জাতির এবং সম্মানিত একটি ইতিহাসের উত্তরাধিকারীগণ এই বিজয়ের পতাকাবাহী হিসাবে কাজ করবে।</p>
<p>সুতরাং আমাদের অবশ্যই সর্বাগ্রে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে। গৌরবোজ্জ্বল উম্মাহর সোনালী ইতিহাস ও মুক্তির ভাবনাকে বুলন্দ করে উম্মাহর প্রতিটি সদস্যকে পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া অসামান্য মিরাস, ডি-৮ ও নতুন দুনিয়ার প্রস্তাবনাকে সামনে রেখে সর্বাত্মকভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। ডি-৮ কে তার প্রতিষ্ঠাকালীন রূহ ও জযবার সাথে মিলিয়ে পাঠ করতে হবে। মুক্তির স্বপ্ন জ্বেলে যাওয়া এ সংস্থাকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে নিকট ভবিষ্যতে মুক্তি ও জাগরণের বন্দর হিসেবে। মানুষকে করতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী। তবেই ডি-৮ তার মূল লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ।</p>
<p>আমাদের জাতির সর্বাঙ্গীণ উৎকর্ষ ও কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে মুক্তি ও পুনর্জাগরণে চিন্তাকে সর্বাঙ্গণে ব্যাপৃত করতে হবে। বিপুল জনশক্তি, সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সুবিধাকে একক পরাশক্তিতে পরিণত করে যুলুমবাজ পাশ্চাত্য যায়নবাদী সভ্যতার মূলোৎপাটন করে ডি-৮ আগামীর জন্য মুক্তিদ্বার হিসেবে বিবেচিত হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p><strong>আমাদের চিন্তায় জাগরূক থাক মুক্তির আহ্বান,</strong><br />
<strong>আমাদের ভাবনায় জেগে থাক পুনর্জাগরণের আওয়াজ,</strong><br />
<strong>আমাদের সমগ্র জীবন ব্যয় হয়ে যাক একটি নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।</strong><br />
<strong>কায়েম হোক ‘হক ও আদালত’কে সর্বাগ্রে স্থান দেয়া এক বিশ্বব্যবস্থার, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে স্বপ্ন আমরা জারী রেখেছি।</strong></p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -57px; top: 12369.7px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/d-8-for-the-revival-of-the-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16151</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে অর্থনৈতিক বিধানের উদ্দেশ্যসমূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. উমর চাপরা]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 19 Aug 2025 15:53:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16080</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম জীবনবিমুখ কোনো ধর্ম নয় (১) এবং এটি কখনো মানুষকে &#8220;আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ” (কোরআন, ৭:৩২) থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে না। বরং ইসলাম মানুষের প্রতি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এভাবে, &#8220;মানুষ জন্মগতভাবে গুনাহগার নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম জীবনবিমুখ কোনো ধর্ম নয় (১) এবং এটি কখনো মানুষকে &#8220;আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ” (কোরআন, ৭:৩২) থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে না। বরং ইসলাম মানুষের প্রতি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এভাবে, &#8220;মানুষ জন্মগতভাবে গুনাহগার নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি বা খলীফা এবং সে শুধুমাত্র নিজের কৃত গুনাহসমূহের জন্যই দায়ী থাকবে।&#8221; (আল কোরআন, ২:৩০) এমনকি &#8220;মানুষের জন্যই এই পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে।&#8221; (২:২৯)। সুতরাং আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহকে ত্যাগ করার মধ্যে নয়, বরং তার দেওয়া সীমারেখায় থেকে সেগুলোকে ভোগ করার মাঝেই কল্যাণ নিহিত।</p>
<p>যাবতীয় মানবীয় কার্যাবলি ইসলামের ধর্মীয় মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে জাগতিক কাজ বলে আলাদা করে কোনো বিভাজন নেই। অর্থনীতিসহ মানব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরণের কাজই আধ্যাত্মিক, যদি সেটি শান্তির জন্য হয় এবং ইসলামের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের সীমার মধ্যে হয়। এই লক্ষ্য এবং মূল্যবোধগুলোই ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণ করে। তাই, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আরো ভালো দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এই বিষয়গুলোর সঠিক বোঝাপড়া থাকা দরকার। এই মূল্যবোধ এবং লক্ষ্যগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>১. ইসলামের নৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।</li>
<li>২. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও আদালত।</li>
<li>৩. আয়ের ন্যায়সংগত বণ্টন।</li>
<li>৪. সামাজিক অগ্রগতির প্রেক্ষিতে ব্যক্তির স্বাধীনতা।</li>
</ul>
<p>এই লক্ষ্যগুলো ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আলোচনা এবং ব্যাখ্যা করার জন্য সম্পূর্ণ নয়, তবে পর্যাপ্ত ফ্রেমওয়ার্ক (কাঠামো) সরবরাহ করার পাশাপাশি সেসব বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে যা ইসলামী ব্যবস্থার সাথে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের পার্থক্য নিরূপণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ইসলামের নৈতিক মূল্যমান:</h5>
<p>&#8220;তোমরা আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহ থেকে খাও এবং পান করো, এবং দুনিয়াতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।&#8221; (আল-কোরআন, ২:৬০)</p>
<p>&#8220;হে মানবজাতি! এই পৃথিবীতে যা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, তা তোমরা খাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না।&#8221; (আল-কোরআন, ২: ১৬৮)</p>
<p>&#8220;হে ইমানদারগণ! আল্লাহ যা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন, তাকে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। এবং হালাল খাবার গ্রহণ করো, আর যে আল্লাহর উপর তোমরা ঈমান এনেছো আর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকো।&#8221; (আল-কোরআন, ৫: ৮৭-৮৮)</p>
<p>কোরআনে এরকম অসংখ্য আয়াত আছে (২), যেগুলো অর্থনীতিতে কোরআনী মূলনীতি তুলে ধরে। ইসলাম আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহসমূহকে ভোগ করার জন্য মুসলমানদের তাগিদ দিয়ে থাকে এবং মুসলিম সমাজে বস্তুগত উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে কোনো সংখ্যাগত সীমারেখ বেঁধে দেয় না। বরং এটি বস্তুগত উন্নতিকেও একটি সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করে।</p>
<p>&#8220;যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।&#8221; (আল কোরআন, ৬২: ১০)</p>
<p>আল্লাহ যদি তোমাদের সামনে জীবিকা উপার্জনের কোনো সুযোগ করে দেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এটিকে কাজে লাগাও যতক্ষণ না সেটি নিঃশেষ হয়ে যায়।(৩)</p>
<p>কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষরোপণ করে, অথবা জমি চাষাবাদ করে এবং সেখান থেকে যদি একটি পাখিও রিযিক আহরণ করে থাকে, তবে তা তার জন্য সাদকাহ হিসেবে আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে।(৪)</p>
<p>যারা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য এবং ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত থাকার জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে জমিনে রিযিক অন্বেষণ করে এবং প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হয়, তারা তাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে তাদের চেহারাগুলো পূর্ণ চাঁদের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে।(৫)</p>
<p>এমনকি ইসলাম আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে মানুষকে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের তাগিদ দিয়েছে (৬) এবং রাসূল (স.) বলেছেন যে, <strong>পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ নেই, যার জন্য আল্লাহ একটি প্রতিকার নির্ধারণ করে রাখেননি।</strong>(৭) সুতরাং, এটি সহজেই অনুমেয় যে মুসলিম সমাজে অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশ অন্যতম। কেননা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহকে মানবতার সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নতির স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা করার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে মানুষ তার আগমনের উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ করতে পারে।</p>
<p>ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করেছে, এবং মানুষকে জীবিকা অন্বেষণের তাগিদ দিয়েছে।(৮) এটি থেকে ধরে নেওয়া যায় যে, মুসলিম সমাজে আরেকটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা যেন কাজ করতে আগ্রহী মানুষ বা যারা কাজ খুঁজছে এরকম সকলেই তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী জীবিকা উপার্জনের উপায় খুঁজে পায়। যদি এটি সম্পন্ন না হয়, তবে মুসলিম সমাজ তার আধ্যাত্মিক ক্ষুধা নিবারণেও সক্ষম হবে না। কেননা, বেকার মানুষগুলো জীবনে অমানুষিক কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হবে যদি না সে অন্যের দয়া বা দানের উপর নির্ভর করে অথবা ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে কিংবা কোনো অসদুপায় অবলম্বন করে। আর এসবগুলো পন্থাই; বিশেষ করে প্রথম দুটি ইসলামের প্রাণসত্তার সাথে বেমানান।</p>
<p>অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে জোর দেবার বিষয়টি মূলত ইসলামের মৌল বার্তা থেকেই উদ্ভূত। ইসলাম এসেছেই মানবতার জন্য আর্শীবাদস্বরূপ, মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য, দারিদ্র্য এবং কষ্টের মধ্যে নিপতিত করার জন্য নয়। কোরআন এ ব্যাপারে বলেছে-</p>
<p>&#8220;আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সমগ্র মানবতার জন্য রহমত হিসেবে।&#8221; (আল-কোরআন, ২১: ১০৭)</p>
<p>&#8220;হে মানুষ! তোমাদের জন্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসিহত এসে গেছে, এটি সে জিনিস যা অন্তরের সমস্ত রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও নিয়ামত।&#8221; (আল-কোরআন, ১০:৫৭)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা-ই চান, যা কঠিন তা চান না।&#8221; (আল-কোরআন, ২: ১৮৫)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের বোঝাকে লাঘব করতে চান। কেননা, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।&#8221; (আল-কোরআন, ৪: ২৮)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো বোঝা চাপিয়ে দিতে চান না, বরং তিনি চান তোমাদের পরিশুদ্ধ করতে এবং তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহকে পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো।&#8221; (আল-কোরআন, ৫:৬)</p>
<p>এ আয়াতগুলোর উপর ভিত্তি করে মুসলিম ফকীহগণ সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মানুষের স্বার্থে উৎপাদন এবং মানুষের কষ্ট লাঘব করাই ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি।(৯) ইমাম গাযযালীর মতে, শরীয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ সাধন যা নির্ভর করে তাদের বিশ্বাসের নিরাপত্তা, জীবনের নিরাপত্তা, আকলের নিরাপত্তা, বংশের ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং এই পাঁচটি জিনিসের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় জনগণের স্বার্থরক্ষার কবচ এবং অনুমোদনযোগ্য।(১০) ইমাম ইবনে কাইয়ুম জোর দিয়ে বলেন, <strong>&#8220;শরীয়তের ভিত্তি হচ্ছে হিকমত এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের কল্যাণ সাধন। এই কল্যাণ নির্ভর করে পরিপূর্ণ আদালত, মারহামাত, মাসলাহাত এবং হিকমতের উপর। যা কিছু আদালত থেকে জুলুমের দিকে মারহামাত থেকে রূঢ়তার দিকে, মাসলাহাত থেকে দুর্দশার দিকে এবং হিকমত থেকে মূর্খতা/ নির্বুদ্ধিতার দিকে নিয়ে যায়, শরীয়তে তার কোনো স্থান নেই। &#8220;</strong>(১১)</p>
<p>কিন্তু এই অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে একজন মুসলিম যদি তার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে, অন্যের ক্ষতি করে, আদালত থেকে দূরে সরে গিয়ে এবং কল্যাণের বিষয়কে মাথায় না রেখে সম্পদ উপার্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তবে সে চরমপন্থায় চলে যায় এবং জাগতিক উন্নতির মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ইসলাম যেহেতু মানব জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, তাই কোরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে, &#8220;নামাজ শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করতে থাকো যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো।&#8221; (আল কোরআন, ৫৭ঃ ৭) অধিকাংশ আলেমদের মতে, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা বলতে বেশি বেশি ইবাদত করা বুঝায়নি, বরং এর মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে আখলাকী জীবন যাপনঃ(১২) হালাল উপার্জন, সবধরনের হারাম পন্থাকে বর্জন এবং সম্পদকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে, যার হিসাব কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে।(১৩) এই প্রেক্ষিতে হয়তো পৃথিবীর এবং এর কর্তৃত্বের অসারতা বিষয়ক কোরআনের আয়াত ও হাদীসগুলো বোঝা সহজ হবে।(১৪) সূক্ষ্ম এ কথাটি আক্ষরিক অর্থে বলা হয়নি, বরং এটি আধ্যাত্মিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট। যদি আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে বিসর্জন না দিয়ে সমস্ত পৃথিবীর কর্তৃত্বও অধিকার করা যায়, তাহলে তা ত্যাগ করার মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। রাসূল (স.) বলেন, &#8220;যে আল্লাহকে ভয় করে তার সম্পদ উপার্জনে কোনো দোষ নেই।&#8221;(১৫) কিন্তু সেখানে যদি কোনো বিবাদ ঘটে থাকে, তাহলে মানুষের উচিত ততটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা, যতটুকু সভাবে উপার্জন করা যায় সেটা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। কোরআন বলছে, &#8220;তাদের বলে দিন, ভালো এবং মন্দ কখনোই সমান নয়। যদিও মন্দের প্রাচুর্য তোমাদের মোহিত করে। হে বোধসম্পন্ন লোকেরা। তোমরা আল্লাহর নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো।&#8221; (আল কোরআন, ৫: ১০০) যে ব্যক্তি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সন্তুষ্টির উপর ইসলামের চিরন্তন মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়, সে খুব সহজেই দুনিয়াবী সম্পদকে বিসর্জন দিতে পারে। কেননা, তার সামনে আছে রাসূলের বাণী, &#8220;এই পৃথিবীর মোহ তো কেবল শয়তানের কারসাজি&#8221;(১৬) এবং &#8220;যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে সে আখেরাতকে হারিয়ে ফেলে আর যে ব্যক্তি আখিরাতকে ভালোবাসে সে দুনিয়াতেও এর প্রতিদান লাভ করে। সুতরাং তোমরা ক্ষণস্থায়ী জিনিসের তুলনায় চিরস্থায়ী জিনিসকে বেছে নাও।&#8221;(১৭)</p>
<p><strong>এভাবেই একদিকে বস্তুগত উন্নতির জন্য চেষ্টা করার তাগিদ দেয়া আবার একইসাথে এই জাগতিক প্রচেষ্টাকে একটি আখলাকী পাটাতনের উপর স্থাপন করার মাধ্যমে ইসলাম জাগতিক এবং নৈতিক বিষয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে যা জাগতিক চেষ্টাকে আধ্যাত্মিকতার অলংকারে সজ্জিত করে।</strong></p>
<p>وَٱبْتَغِ فِيمَآ ءَاتَىٰكَ ٱللَّهُ ٱلدَّارَ ٱلْـَٔاخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَآ أَحْسَنَ ٱللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ ٱلْفَسَادَ فِى ٱلْأَرْضِ ۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلْمُفْسِدِينَ</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে তোমার আখিরাতের ঘর নির্মাণের চেষ্টা করো, কিন্তু দুনিয়াতেও তোমার অংশের কথা ভুলে যেও না। আর আল্লাহ তোমার উপর যেমন দয়া করেছেন, তুমিও মানুষের প্রতি তেমনি দয়া করো। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।&#8221; (আল-কোরআন, ২৮: ৭৭)</p>
<p>সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম তারাই যারা তাদের দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় বিষয়ে সচেতন।(১৮)</p>
<p>&#8220;তোমাদের মধ্যে সে শ্রেষ্ঠ নয়, যে আখিরাতের জন্য দুনিয়াকে অস্বীকার করে, আবার সেও শ্রেষ্ঠ নয় যে দুনিয়ার জন্য আখিরাতকে অবহেলা করে। বরং তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়কেই প্রাধান্য দেয়।&#8221; (১৯)</p>
<p>এভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় দিকের উপর জোর দেওয়ার বিষয়টি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে, এ দুটো একত্রে পারস্পরিক শক্তির আধার হয়ে প্রকৃত মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে। জীবনে এদুটো দিকের কোনো একটিকে অবহেলা করেই প্রকৃত মানবকল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভব নয়। যদি শুধু জাগতিক বিষয়গুলোকে লালন করা হয় এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়হীনতা বিরাজমান থাকে তাহলে সমাজে হতাশা, অপরাধ, মাদকাসক্তি, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, ডিভোর্স, মানসিক অসুস্থতা, আত্মহত্যার মতো অসংগতিগুলো প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে যার সবগুলোই ব্যক্তিজীবনে মানসিক প্রশান্তির ঘাটতির কারণে হয়ে থাকে। আবার যদি শুধু আধ্যাত্মিক বিকাশকেই লালন করা হয়, তাহলে অনেকের কাছেই তা অবাস্তব এবং অকার্যকর হয়ে পড়বে। এভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের মধ্যে দ্বি-বিভাজন এবং দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে যা সমাজের যাবতীয় মূল্যবোধকেই হুমকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।</p>
<p>অন্য দুটি ব্যবস্থা, সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদে আধ্যাত্মিক এবং বস্তুগত জীবনের এই মেলবন্ধন অনুপস্থিত। কেননা, এ দুটি মতবাদই মূলত সেকুলার এবং অনৈতিক বা নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। উৎপাদনশীল প্রযুক্তি এবং জীবনমানের উন্নতির ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের অবদানকে যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের ভূমিকাকেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই দুটি ব্যবস্থাই মানবজীবনে আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>২. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং আদালত:</h5>
<p>&#8220;হে মানবজাতি। আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে মুত্তাকীগণই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৪৯:১৩)</p>
<p>&#8220;তোমাদের রব একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে এসেছো, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। শ্রেষ্ঠত কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে হয়। অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কালোর উপরও সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। (২০)</p>
<p>&#8220;মানবজাতির সূচনা হয়েছে আদম এবং হাওয়ার মাধ্যমে, আর তোমরা সবাই তাদের বংশধর। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ কারও কাছে তার বংশ বা গোত্র পরিচয় জানতে চাইবেন না। বরং সেদিন আল্লাহর সামনে সেই সবচেয়ে সম্মানিত হবে যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।</p>
<p>ইসলাম এমন এক সমাজ বিনির্মাণের কথা বলে যেখানে সকল মানুষ একই স্রষ্টার দ্বারা আবদ্ধ থাকে। সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, এটি কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে আবদ্ধ নয়, আর এক দম্পতি থেকে সৃষ্ট একই পরিবারের সদস্যের মতো ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসার বন্ধনে না কোনো জাতি, গোত্র বা বর্ণে, বরং যাবতীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এই ভ্রাতৃত্ব সমগ্র মানব জাতিকে এক করে। কোরআনের ভাষ্যমতে, &#8220;বলুন, হে মানুষ। আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।&#8221; (আল কোরআন, ৭:১৫৮) আর রাসূলুল্লাহ (স.) জোর দিয়ে বলেন, &#8220;আমি তোমাদের মধ্যে সাদা-কালো সবার জন্যই সমানভাবে প্রেরিত হয়েছি।&#8221;</p>
<p>আর স্বাভাবিকভাবেই এই সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের পূর্বশর্ত হলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে, যারা একই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্টি হওয়া ছাড়াও একই বিশ্বাসের বন্ধনেও আবদ্ধ যাকে কোরআন &#8216;দ্বীনি ভাই&#8217; (আল কোরআন, ৯:১১) (২৩) এবং &#8216;পরস্পরের প্রতি রহমশীল&#8217; (আল কোরআন, ৪৮:২৯) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাসূল (স.) বলেন,</p>
<p>&#8220;সমগ্র মানবজাতি আল্লাহর পরিবারভুক্ত আর তার কাছে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেই বেশি প্রিয় যে সর্বশ্রেষ্ঠ।&#8221;(২৪)</p>
<p>&#8220;জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি রহমশীল হও, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি রহমশীল হবেন।&#8221;(২৫)</p>
<p>&#8220;পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির ক্ষেত্রে আপনি মুসলমানদের একটি দেহের মতো পাবেন। এর এক অংশ আঘাত পেলে সারা দেহে সে ব্যথা অনুভূত হয়। &#8220;(২৬)</p>
<p>&#8220;এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে কখনো তার প্রতি অন্যায় আচরণ করে না, কখনো বিপদে তাকে একাকী ছেড়ে দেয় না কিংবা তাকে তাচ্ছিল্য করে না। (২৭)</p>
<p>&#8220;ইসলামের এই ভ্রাতৃত্বের ধারণা থেকেই ইসলাম আদালতের উপর এত গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি কোরআনে বলা হয়েছে, নবীগণের শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো দুনিয়ার বুকে আদালত প্রতিষ্ঠা।&#8221; (আল-কোরআন, ৫৭: ২৫)</p>
<p>আদালতবিহীন ঈমান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে কোরআন ঘোষণা করেছে- &#8220;তাদের জন্যই জন্যই রহমত এবং হেদায়াত যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জলুমের সাথে মিশ্রিত করে ফেলেনি।&#8221; (আল-কোরআন, ৬:৮২)</p>
<p><strong>সুতরাং ইসলাম মুসলমানদের আদালতের ব্যাপারে নিছক উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে তাগিদ দিয়ে গেছে, &#8220;আল্লাহ তোমাদের সৎকাজের এবং আদালত কায়েমের আদেশ দিচ্ছেন&#8221; (আল কোরআন, ১৬:৯০) এবং &#8220;যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, ইনসাফের ভিত্তিতে করো।&#8221; (আল কোরআন, ৩:৫৮)</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামে ইনসাফ এবং আদালতের গুরুত্ব এত বেশি যে, ন্যায়পরায়ণ হওয়াকে মুত্তাকী এবং মুমিন হবার শর্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে-</p>
<p>&#8220;হে ঈমানদারগণ। আল্লাহর জন্য তোমরা সত্যের উপর কায়েম থাকো এবং ইনসাফের সাক্ষী হও। কারও প্রতি দুশমনি যেন তোমাদেরকে ইনসাফ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। ইনসাফ করো। এটিই তাকওয়ার কাছাকাছি। আল্লাহকে ভয় করো। নিশচয়ই তোমরা যা কিছু করো, সে বিষয়ে আল্লাহ পুরোপুরি খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৫:৮)</p>
<p>এমনকি ইনসাফের ক্ষেত্রে যদি কারও নিজের বা তার কাছের মানুষদের ক্ষতি হয়ে যায়, তবুও তা কায়েম করতে বলা হয়েছে-</p>
<p>&#8220;এবং যখন তোমরা কথা বলো, ইনসাফের সহিত বলো, যদি তা তোমাদের নিকটাত্মীয়দের বিপক্ষেও যায়।&#8221; (আল কোরআন, ৬: ১৫২)</p>
<p>&#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে বা তোমাদের পিতামাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়, সে ধনী হোক বা দরিদ্র হোক। আল্লাহ সবার উত্তম হেফাজতকারী। কাজেই নফসের প্রতারণায় ইনসাফ থেকে দূরে সরে যেও না। যদি তোমরা (সত্য থেকে) বিচ্যুত হও বা ইনসাফ থেকে দূরে সরে যাও তাহলে মনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সকল তৎপরতার খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৪: ১৩৫)</p>
<p>এ বিষয়টি আরো বিস্তারিত অনুধাবনের জন্য আমরা ইসলামের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সামাজিক সুবিচার:</strong></p>
<p>ইসলাম যেহেতু সমগ্র মানবতাকে একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করে তাই আল্লাহর আইনে সকল মানুষই সমান। এখানে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। গোত্র-বর্ণ বা সামাজিক পদমর্যাদার জন্য মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন করা হয় না। এখানে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হলো আখলাক, যোগ্যতা, এবং মানবতার কল্যাণে ভূমিকা। পয়গাম্বর (স) বলেন-</p>
<p>&#8220;নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং ধন-সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের কাজ।&#8221;(২৮)</p>
<p>&#8220;তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যার আখলাক সর্বোত্তম।&#8221;(২৯)</p>
<p>আল্লাহর রাসূল (স.) সেসব মানুষ এবং জাতির জন্য ধ্বংসের সতর্কবাণী করেছেন, যারা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভেদেভেদ এবং অসাম্যের সৃষ্টি করে।</p>
<p><strong>“তোমাদের পূর্বের অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছিলো, কারণ যখন তাদের মধ্যে উচ্চবিত্তরা চুরি করতো, তাদের কোনো শাস্তি দেয়া হতো না। বিপরীতে নিম্নবিত্তের উপর শাস্তি কার্যকর হতো। খোদার কসম। যদি আমার আদরের দুলালী ফাতিমাও চুরি করতো আমি তার হাত কেটে দিতে দ্বিধা করতাম না।”(৩০)</strong></p>
<p>&#8220;যদি কেউ কোনো মুসলিম নারী অথবা পুরুষকে তার দারিদ্য বা অনটনের জন্য তাচ্ছিল্য বা উপহাস করে কেয়ামতের মাঠে আল্লাহ তাকে অপমানিত করবেন। &#8220;(৩১)</p>
<p>ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) তার গভর্ণর আবু মুসা আল আশয়ারী (রা.)-এর কাছে চিঠি লেখেন এই মর্মে-</p>
<p><strong>“সকল মানুষকে সমানভাবে দেখবে যেন দরিদ্ররা তোমার আদালত থেকে নিরাশ না হয়, আবার ধনীরা তোমার কাছে কোনো বাড়তি সুবিধা আশা না করে।&#8221;(৩২)</strong></p>
<p>ইসলামের প্রথম চার খলীফার শাসনামলেই আদালতের এই রূহ সর্বত্র বিদ্যমান ছিলো। কিছুটা শিথিল হলেও পরবর্তী শাসকরাও এটির অনুসরণ করেছেন, বিভিন্ন ঘটনায় যার নজির পাওয়া যায়। খলীফা হারুন উর রশিদের সময়কার বিখ্যাত ইমাম কাজী আবু ইউসুফের খলীফাকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠির বক্তব্য থেকে আমরা যেমনটি দেখতে পাই, &#8220;সকলের প্রতি সমান আচরণ করুন, হোক সে আপনার নিকটবর্তী অথবা দূরবর্তী&#8221; এবং &#8220;আপনার রাষ্ট্রের উন্নতি নির্ভর করবে কোরআনের আইন কায়েম করা এবং অন্যায় ও জুলুম নিরসন করার মধ্যে। &#8220;(৩৩)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অর্থনৈতিক সুবিচার:</strong></p>
<p>সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং সামাজিক সুবিচারের ধারণাটি অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি না এর সাথে অর্থনৈতিক সুবিচারের মেলবন্ধন ঘটে; যদি না সমাজে প্রত্যেকেই তার অবদানের মূল্য পেয়ে থাকে এবং একে অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কোরআন মুসলমানদের বলে, &#8220;কখনো অন্যের পাওনা আটকে রেখো না।&#8221; (আল কোরআন, ২৬: ১৮৩)।(৩৪)  ফলে প্রত্যেকে তার ন্যায্য পাওনা পেয়ে যাবে এবং কেউ অন্যের অংশ হস্তগত করে কাউকে বঞ্চিত করবে না। রাসূল (স.) উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন, &#8220;তোমরা জুলুমের ব্যাপারে সচেতন হও। কেননা, জুলুম কেয়ামতের মাঠে ঘোর অন্ধকারের মতো হবে।&#8221;(৩৫) শোষণ এবং জুলুমের ব্যাপারে এরূপ সতর্কবার্তার কারণ হলো সমাজে প্রতিটি মানুষের জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়ন যা ইসলামের মূল লক্ষ্য। হোক সে ভোক্তা, উদ্যোক্তা, বণ্টনকারী কর্মচারী অথবা মালিক) অধিকার সংরক্ষণ এবং এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, শ্রমিক বা কর্মচারী এবং মালিকের সম্পর্কের ব্যাপারে আদালতের ভিত্তিতে ইসলাম সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। একজন শ্রমিক মালিকের জন্য তার কর্মচারীকে বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত নয়। রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, দ্রব্য উৎপাদনে তার অবদানের জন্য ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকারী এবং একজন মুসলিম &#8220;ঠিন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিরাগভাজন হবে; যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি তার কৃত ওয়াদা পূর্ণ না করেই মৃত্যুবরণ করেছে, যে ব্যক্তি কোনো মুক্ত মানুষকে বিক্রি করে এবং মূল্য ভোগ করে, আর যে একজন শ্রমিক নিয়োগ করে তার উৎপাদিত পণ্য ভোগ করে, কিন্তু তার মজুরি শোধ করে না।&#8221;(৩৬) এই হাদীসে একজন মুক্ত মানুষকে ক্রীতদাসে পরিণত করা এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি আদায় না করাকে পাশাপাশি রাখার মাধ্যমে ইসলাম এ বিষয়ে কতটা কঠোর তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।</p>
<p><strong>এখানে শ্রমিকের &#8216;ন্যায্য মজুরি&#8217; এবং &#8216;শ্রমিক শোষণ&#8217; বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিকে আমাদের কোরআন এবং সুন্নতের আলোকে বুঝতে হবে। মার্কসের মতো ইসলাম শ্রম ব্যাতীত অন্য কোনো ফ্যাক্টর দ্বারা উৎপাদনের স্বীকৃতি দেয় না। তাই স্বাভাবিকভাবেই ইসলামে শ্রমিকের মজুরি এবং শ্রমিক শোষণের ধারণাটিও মার্কসের প্রস্তাবিত উদ্বৃত্ত মূল্যের (suplus value) ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।</strong> তাত্ত্বিকভাবে এরূপ বক্তব্য আসতে পারে যে, শ্রমিক কর্তৃক উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের সমপরিমাণ মূল্যই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি। কিন্তু বাস্তবে এভাবে মূল্য নির্ধারণ করা খুবই কষ্টসাধ্য তাই এই তত্ত্বের কার্যকরীতাও যৎসামান্য। কিন্তু বিভিন্ন হাদীস থেকে সর্বনিম্ন এবং আদর্শ মজুরি সম্পর্কে একটা গুণগত ধারণা পাওয়া যায়, যা অনেক বেশি বাস্তবিক। রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;একজন শ্রমিকের (নারী অথবা পুরুষ) ন্যূনতম মজুরি এমন হবে, যা দিয়ে সে পরিমিতভাবে তার খাদ্য ও বস্ত্রের চাহিদা পূরণ করতে পারবে এবং তাকে দিয়ে কখনো তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কাজ করানো যাবে না।&#8221;</strong>(৩৮) সুতরাং এই হাদীস থেকে এটা স্পষ্ট যে, একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এমন হওয়া চাই যা তার এবং তার পরিবারের মানসম্মতভাবে ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত হয় এবং এজন্য তাকে সাধ্যের অতিরিক্ত চাপ নিতে না হয়। মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক মান রক্ষার্থে সাহাবীরা এভাবেই শ্রমিকের মজুরি দিয়েছিলেন। ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রা) বলেন, &#8220;অদক্ষ নারী শ্রমিকদের তার বৃত্তিমূলক কাজে অতিরিক্ত চাপ দিওনা, তাতে করে সে হয়তো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। তোমার অধীন পুরুষদেরও অতিরিক্ত কাজের চাপ দিও না। তাহলে সে হয়তো চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারে। তোমার অধীনস্থদের প্রতি সহানুভূতিশীল হও, তাহলে তোমার রব তোমার প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। আর মনে রাখবে, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমার উপর ন্যস্ত।&#8221;(৩৯)</p>
<p>আরেকটি হাদীস থেকে আদর্শ মজুরি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। আদর্শ মজুরি এমন হবে যাতে কর্মচারী তার মালিকের সমমানের খাদ্য এবং বস্ত্রের আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়।</p>
<p><strong>“তোমাদের কর্মচারীগণ তোমাদের ভাই। যদিও আল্লাহ তাদের তোমাদের অধিনস্ত করেছেন। সুতরাং যে তার ভাইকে অধীন হিসেবে পায় সে যেন তাকে তাই খেতে দেয় যা &#8220;তোমাদের কর্মচারীগণ তোমাদের ভাই। যদিও আল্লাহ তাদের তোমাদের অধিনস্ত সে নিজে খায়, এবং তাই পরতে দেয়, যা সে নিজে পরিধান করে।&#8221;(৪০)</strong></p>
<p>সুতরাং ন্যায্য মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হতে পারবে না এবং এর কাক্সিক্ষত মান আদর্শ মজুরির যথাসম্ভব কাছাকাছি হবে যাতে করে আয়ের বৈষম্য যতটা সম্ভব কমানো সুতরাং ন্যায্য মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হতে পারবে না এবং এর কাঙ্ক্ষিত মান যায়। এর ফলে শ্রমিক ও মালিকের জীবনমানের মধ্যেকার যে ব্যবধান, যা সমাজে দুটি ভিন্ন শ্রেণির সৃষ্টি করে এবং ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা নষ্ট হয়ে যায়, যা মুসলিম সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি তাতেও একটা সেতুবন্ধন রচিত হয়। উপর্যুক্ত আলোচনার সারমর্ম হলো &#8216;ন্যূনতম&#8217; এবং &#8216;আদর্শ&#8217; এদুটি সীমারেখার মধ্যে চাহিদা (demand) এবং যোগানের (supply) এর মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা, মসলিম সমাজের আখলাকী অবস্থান, এবং রাষ্ট্রের বৈধ আইনের ভিত্তিতে শ্রমিক/কর্মচারীর প্রকৃত মজুরি নির্ধারিত হবে।</p>
<p>ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং আদর্শ মজুরিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ইসলাম এ বিষয়েও জোর দিয়েছে যে, শ্রমিকদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো যাবে না, যাতে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ে বা সে তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে না পারে।(৪১) যদি তাদেরকে সাধ্যের চেয়ে বেশি কোনো কাজ করতে হয় তাহলে অবশ্যই পর্যাপ্ত সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সে অতিরিক্ত চাপ না নিয়েই কাজটি করতে পারে। ইতোপূর্বে শ্রমিকদের ভাই হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে রাসূল (স.) আরও বলেছেন, &#8220;&#8230;এবং তাদের উপর তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিও না। যদি সেটা দিয়ে থাকো, তাহলে তাদের সাহায্য করো। &#8220;(৪২)</p>
<p>এই হাদীস থেকে ইসলামী মূলনীতি অনুযায়ী সর্বাধিক শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্প ঝুঁকির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন এর প্রত্যেকটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নির্ধারণ করা সম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মালিকের কাছ থেকে এসব আচরণ নির্ধারণের করার পাশাপাশি আদালতের স্বার্থে ইসলাম কর্মচারীর উপরও কিছু নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করেছে। প্রথম কর্তব্য হলো, নিজের সর্বোচ্চ যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এবং যথাযথ গুরুত্ব ও সচেতনতার সাথে যত্ন দিয়ে কাজ করা। রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, &#8220;আল্লাহ তোমাদের উপর কর্তব্যপরায়ণতাকে ফরয করেছেন&#8221;(৪৩) এবং &#8220;এবং তিনি চান যে তোমরা যখন কোনো কাজ করো, সেটি যথাযথভাবে সম্পাদন করো।&#8221;(৪৪)</p>
<p>সুতরাং সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্য যার উপর ইসলাম এতটা জোর দিয়েছে সেটি নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই কর্মচারীদেরও কর্মদক্ষ হতে হবে। অন্য একটি ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূল (স.) বলেন, <strong>“যে কর্মচারী একনিষ্ঠভাবে আল্লাহমুখী হবার পাশাপাশি, তার মালিকের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ দায়িত্ব এবং আনুগত্যের সাথে সম্পন্ন করে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। &#8220;</strong>(৪৫)</p>
<p>কর্মচারীদের দ্বিতীয় কর্তব্য হলো, বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন হওয়া। কোরআনের ভাষ্যমতে, শ্রেষ্ঠ কর্মচারী সে যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সৎ। (আল কোরআন, ২৮ : ২৬)। এবং রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;যখন কাউকে কোনো কাজের জন্য নিযুক্ত করা হয় এবং তার বিনিময়ে তার জীবিকা সরবরাহ করা হয়, তখন এর চেয়ে বাড়তি যা কিছু সে অর্জন করে তাই তার জন্য অন্যায়/হারাম।&#8221;</strong>(৪৬)</p>
<p>অতএব, মালিকের উপর অনেকগুলো দায়িত্ব অর্পণ করার পাশাপাশি ইসলাম শ্রমিকের কাছেও তার কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং বিশ্বস্ততা প্রত্যাশা করে। এবং এর লক্ষ্য হলো যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলিতে শ্রমিক এবং মালিক উভয়ের জন্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩. সম্পদের ইনসাফপূর্ণ বণ্টন:</strong></h5>
<p>ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুবিচারের ক্ষেত্রে ইসলামের অনন্য এবং প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও প্রাণসত্তার সাথে আয় ও সম্পদের অন্যায় বণ্টন খাপ খায় না। বরং ইসলাম সারা পৃথিবীতে যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ধন-সম্পদের অন্যায় বণ্টনের ফলে তা কেবল ধ্বংসই হয়। এছাড়াও, কোরআনের বর্ণনামতে যেহেতু পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ &#8220;আল্লাহর পক্ষ থেকে সমগ্র মানবতার জন্য উপহারস্বরূপ।&#8221; (আল কোরআন, ২: ২৯)। তাই এ সম্পদ কিছু ব্যক্তির মধ্যে পুঞ্জিভূত থাকার কোনো মানে হয় না। তাই ইসলাম ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের উপর জোর দেয় এবং ইসলামী ব্যবস্থার অধীনে আয় ও সম্পদের একটি পুনঃবণ্টননীতি প্রণয়ন করে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মানবিক এবং সম্মানজনক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত হয়। মূলত এর মাধ্যমে ইসলাম &#8220;পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা হিসেবে&#8221; (আল কোরআন, ২: ৩০) মানুষের মর্যাদাকে সবকিছুর উপরে সমুন্নত করতে চায়। কোনো মুসলিম সমাজ যদি এই রকম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি তার ধারণ করা নামের অযোগ্য বলে গণ্য হবে। <strong>যেমনটা রাসূল (স.) বলেছেন, &#8220;সে প্রকৃত মুসলিম নয়, যে পেট পুরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।&#8221;(৪৭)</strong></p>
<p>ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) এক জনসভায় ইসলামের আদালতপূর্ণ পুনঃবণ্টন নীতির ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, &#8220;সমাজের সম্পদে প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার রয়েছে। এমনকি আমি নিজেও এর চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারবো না। আল্লাহ যদি আমাদেরকে হায়াত দান করেন, তাহলে আমরা শীঘ্রই দেখতে পাবো যে, এমনকি সান&#8217;আ পর্বতের পাদদেশে একজন রাখালও তার ন্যায্য অংশ লাভ করবে। &#8220;(৪৮)</p>
<p>খলীফা আলী (রা.) এই বিষয়ে জোর দিতেন যে, &#8220;আল্লাহ ধনীর জন্য এটা বাধ্যতামূলক করেছেন যে সে দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ করবে। যদি দরিদ্ররা ক্ষুধার্ত অথবা পোশাকহীন বা দুর্দশার মধ্যে থাকে, তার মানে হলো ধনীরা গরীবকে তার অংশ থেকে বঞ্চিত করেছে। অতএব, আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং শান্তি দিবেন।&#8221;(৪৯) ফিকহবিদগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দরিদ্রদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের দায়িত্ব, এবং বিশেষ করে এ দায়িত্ব ধনীদের উপর ন্যস্ত। যদি স্বচ্ছল ব্যক্তিরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে রাষ্ট্র তাদের এটি করতে বাধ্য করতে পারবে।(৫০)</p>
<p>ইসলামের পুনঃবণ্টন ব্যবস্থা তিন ধাপে বিভক্ত। প্রথমত, ইসলামী ব্যবস্থায় বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তার ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, যাকাতের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ গরীবের (যারা কাজ করতে অক্ষম অথবা দাস) মধ্যে পুনঃবণ্টন করা। যাতে কোরআনের এ আয়াতের সত্যতা কায়েম হয়, &#8220;সম্পদ তোমাদের ধনীদের মধ্যেই পুঞ্জিভূত না থাকে।&#8221; (আল কোরআন, ৫৯ঃ ৭)। তৃতীয়ত, মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মিরাসের সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন যা সমাজে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনকে শক্তিশালী ভিত এর উপর স্থাপন করে।</p>
<p><strong>ইসলামের এই ইনসাফপূর্ণ বণ্টননীতি এবং অর্থনৈতিক সুবিচারের অর্থ এই নয় যে, সমাজে যার অবদান যাই হোক না কেন প্রত্যেকে সম্পদের সমান অংশ লাভ করবে। কেননা, সমাজে সকল মানুষের চরিত্র, সক্ষমতা এবং সমাজের প্রতি অবদান সবার সমান নয়। তাই ইসলাম যাকাতের মাধ্যমে সকল মানুষের জন্য জীবনযাত্রার সুষম মান নিশ্চিত করার পর প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও সমাজে তার অবদান অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়াকে সমর্থন করে।</strong> ইসলাম এই ইনসাফপূর্ণ বণ্টননীতিতে এতটাই জোর দিয়েছে যে, কোনো কোনো মুসলমান মনে করে যে, ইসলাম সম্পদের সমবণ্টনের কথা বলেছে। রাসূলের অন্যতম সাহাবী আবু যর (রা.) এই মত পোষণ করতেন যে, একজন মুসলিমের জন্য তার পরিবারের ভরণপোষণের অতিরিক্ত সম্পদ রাখা জায়েয নয়। কিন্ত রাসূল (স.)-এর অধিকাংশ সাহাবীই তার এই চরমপন্থার সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।(৫২) তবে, আবু যর (রা.) ও আয়ের সমবন্টনের পক্ষে ছিলেন না, বরং তিনি জমাকৃত সম্পদের সমবণ্টনের পক্ষে ছিলেন। অর্থাৎ, তার মতে ব্যক্তির নিজের প্রকৃত ব্যায়ের পর উদ্বৃত্ত সম্পদ সে তার দারিদ্র্য-পীড়িত ভাইদের কল্যাণে ব্যয় করবে। ইনসাফপূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থার পক্ষাবলম্বন সত্ত্বেও, আলেমগণ সকলে এ বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, একজন মুসলিম ন্যায়সংগত উপায়ে উপার্জন করে, এবং তার আয় ও সম্পদ থেকে যাকাত আদায় ও অন্যান্য ভূমিকার মাধ্যমে সমাজের প্রতি তার ফরয দায়িত্ব পালন করার পরও তার ভাইয়ের কল্যাণে আরো সম্পদ ব্যয় করার মধ্যে কোনো বাধা নেই। (৫৩) প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী ব্যবস্থার আলোকে যদি উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম মেনে চলা হয়, শ্রমিক এবং মজুরের মধ্যে আদালতপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়, সম্পদ ও আয় বণ্টনের ইনসাফপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় এবং ইসলামের মিরাস ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তাহলে মুসলিম সমাজে আয় ও সম্পদের স্কুল অসাম্য বিদ্যমান থাকা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>৪. সামাজিক অগ্রগতির সাপেক্ষে ব্যক্তি স্বাধীনতা:</h5>
<p>ইসলামী মূল্যবোধের অন্যতম স্তম্ভ হলো এই বিশ্বাস যে, মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি এবং সে আল্লাহ ছাড়া আর কারও মুখাপেক্ষী নয়। (আল কোরআন, ১৩: ৩৬, ৩১: ২২) এটি ইসলামে মানুষকে সব ধরণের জিঞ্জির থেকে মুক্তির অনন্য দলীল। কোরআন রাসূলের (স.) নবুয়তী মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে &#8220;মানুষের গলা থেকে সকল প্রকার দাসত্বের শৃঙ্খল খুলে ফেলা&#8221;-কে। (আল কোরআন, ৭: ১৫৭) এটি ইসলামের সেই রূহ যা খলীফা উমরকে (রা.) এই কথা বলতে প্রবৃত্ত করেছে যে, &#8220;তোমরা মানুষকে দাস বানাচ্ছো, অথচ তার মা তাকে স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন।&#8221;(৫৪) শাফেয়ী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্যেও এই একই প্রাণসত্তার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় যখন তিনি বলেন, &#8220;আল্লাহ তোমাকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন, তাই কখনো পরাধীন হয়ো না।&#8221;(৫৫)</p>
<p>যেহেতু মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাই কারও, এমনকি রাষ্ট্রেরও তার গলায় পরাধীনতার জিঞ্জির পরাবার অধিকার নেই। ফিকহবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, এবং মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির উপর কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করা যাবে না। <strong>হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে বলেন, &#8220;একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক এবং মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির উপর কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করা যাবে না, এমনকি যদি সে ব্যক্তিগত ক্ষতি, যেমন- সে কোনো লাভ ছাড়া বেহিসাবে অর্থ ব্যয় করতে থাকে।&#8221;</strong> এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার মানে হলো তার মনুষ্যত্বের অবমাননা করে তাকে পশু জ্ঞান করা। এর মাধ্যমে যে ক্ষতি হয়, তার ঐ সম্পদের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি। এবং একটা ছোট ক্ষতির মোকাবেলায় বড় ক্ষতিকে সমর্থন করা যায় না।(৫৬)</p>
<p>এই মতদ্বৈধতা তখনি কার্যকর হয়, যখন কোনো ব্যক্তি ইসলামের সীমারেখার মধ্যে থেকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের ক্ষতি সাধন করে থাকে। কিন্তু যদি কেউ অন্যের কোনো ক্ষতি করে থাকে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে বাধা দিতে হবে এবং এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে কোনো ভিন্নমত নেই। ইমাম আবু হানিফার ভাষায়, &#8220;একজন অদক্ষ চিকিৎসক, একজন দায়িত্বহীন বিচারক, অথবা একজন দেউলিয়া নিয়োগকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করো, কেননা, এর মাধ্যমে ছোট ক্ষতির বিপরীতে বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারবে।&#8221;(৫৭) ইসলামে সামাজিক উন্নতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রাথমিক গুরুত্ব সত্ত্বেও এটি সামাজিক দায়বদ্ধতামুক্ত নয়।</p>
<p>অপরাপর ব্যক্তি এবং সমাজের সাথে ব্যক্তির অধিকারকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দাঁড় করানোর জন্য ফকীহগণ নিম্নোক্ত মূলনীতিগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন(৫৮):</p>
<ul>
<li>ব্যক্তিস্বার্থের উপর সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।</li>
<li>যদিও &#8216;দুর্দশা লাঘব করা&#8217; এবং &#8216;কল্যাণের প্রসার&#8217; দুটিই শরীয়তের উদ্দেশ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত, প্রথমটির উপর দ্বিতীয়টি প্রাধান্য পাবে।</li>
<li>ছোট ক্ষতির মোকাবেলায় বড় ক্ষতিকে সমর্থন দেয়া যাবে না। অথবা ক্ষুদ্রতর কল্যাণের জন্য বৃহত্তর কল্যাণ ত্যাগ করা যাবে না। বিপরীতে, বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে ছোট ক্ষতি অথবা বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে ক্ষুদ্রতর কল্যাণ ত্যাগ করা অনুমোদনযোগ্য।</li>
</ul>
<p>কাজেই, ইসলামের নৈতিক সীমার মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতা ততক্ষণ প্রযোজ্য হবে যতক্ষণ এটি সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী না হয় এবং অন্যের অধিকার হরণ করা না হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:</strong></p>
<p>ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্য নিয়ে উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের দৃঢ় ভিত্তির উপর বস্তুগত উন্নতিকে স্থাপন করার মধ্য দিয়ে ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের পাটাতন নির্মিত হয়েছে। আধ্যাত্মিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র থেকে ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায়, এর মৌলিক কাঠামোও এই দুটি ব্যবস্থা থেকে আলাদা। তাই ইসলামের সাথে এই দুটি মতবাদ এবং ব্যবস্থার সাদৃশ্য খুঁজতে গেলে তা কেবল তিনটি ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণায়-ই পর্যবসিত করবে। তাছাড়া, ইসলামী ব্যবস্থা নিরন্তর মানবীয় ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, আয়ের ন্যায্য বণ্টন এবং সামজিক অগ্রগতির সাথে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি নিবেদিত। এই নিবেদন অবশ্যই আধাত্মিকতা কেন্দ্রিক এবং ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কারুকার্যে চমৎকারভাবে সজ্জিত। অন্যদিকে আধুনিক পুঁজিবাদের ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে এককেন্দ্রিক দর্শন। এর সামগ্রিক দর্শন সামজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয়ের ন্যায়সংগত বন্টনের লক্ষ্যে নির্মিত হয়নি এবং সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আধ্যাত্মিক প্রাণসত্তার বদলে এটি দলীয় স্বার্থচিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত হয়। আবার সমাজতন্ত্র যদিও দাবি করে যে, এটি একটি মৌলিক দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু, একদিকে মানবীয় ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতি উদাসীনতা এবং আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর স্থাপিত আদালত, নিরপেক্ষ বিচার ও ন্যায়পরায়ণতার অভাব, অন্যদিকে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অস্বীকারের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা এবং আত্মপরিচয়ের প্রতি অবমাননার ফলে তাদের এই দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।</p>
<p>ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি ইসলামের অঙ্গীকার এটিকে পরিষ্কারভাবে সমাজতন্ত্র অথবা অন্য যেকোনো মতবাদ ও ব্যবস্থা থেকে পৃথক করে তোলে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক সম্মতি, যা ব্যবসায়িক লেনদেনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত, তা মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান সকল ধারায় অবিসংবাদিতভাবে স্বীকৃত।(৫৯)<strong> “হে ঈমানদারগণ! কখনো একে অন্যের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। ব্যবসায়িক লেনদেন করো পারস্পরিক সম্পত্তির ভিত্তিতে” (আল কোরআন, ৪: ২৯)।</strong> কোরআনের এ আয়াত থেকেই মূলত এই মূলনীতিটি এসেছে। রাসূলুল্লাহ (স.) এরও এরকম একটি হাদীস আছে, &#8220;মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দাও। কেননা, আল্লাহ মানুষকে একে অন্যের মাধ্যমে রিযিক দিয়ে থাকেন।&#8221;(৬০) জীবন এবং স্বাধীনতার এই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে গ্রুপের অধীনে থাকে যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে কেউ পারে যদি উৎপাদন ও বণ্টনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যক্তি মালিকানা অথবা স্বেচ্ছাসেবী কেনাকাটা করতে পারে। ইসলাম এন্টারপ্রাইজের পাশাপাশি উদ্যোক্তা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকে সামনে এনেছে যা সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক সম্পত্তি অর্জন ও হস্তান্তর, পণ্যদ্রব্য বিক্রয় ও ব্যবহার, এবং যাকাত ব্যবস্থা ও মিরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট মূলনীতিগুলো কোরআন, সুন্নত ও ফিকহের কিতাবাদীতে বিস্তৃত আলোচিত হয়েছে।</p>
<p>দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ইসলামের ইতিহাসে বরাবরই এই মূলনীতিগুলো সার্বজনীনভাবে সমুন্নত ছিলো এবং ব্যতিক্রমগুলোকে ইসলামের মূলধারার সাথে কখনোই মেলানো যাবে না এবং এগুলো ইসলামী ব্যবস্থার নীতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।</p>
<p>সুসংগঠিত বাজার ব্যবস্থা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি স্বতন্ত্র দিক। কেননা, একদিকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এটি ছাড়া অকার্যকর হয়ে পড়বে, অন্যদিকে এটি ভোক্তাদের চাহিদা ও পছন্দের পণ্য ও দাম সম্পর্কে মত প্রকাশের এবং উদ্যোক্তাদের স্বাধীনভাবে নিজস্ব পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ করে করে দেয়।</p>
<p>ইসলাম মুনাফা লাভের প্রেরণাকে সমর্থন করে, যেটি যেকোনো ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে কোনো এন্টারপ্রাইজ পরিচালনার পূর্বশর্ত। চার মাযহাবের উপর ফিকহী গবেষণার জন্য বিখ্যাত আলেম আল-জাযিরী বলেন, &#8220;ইসলাম ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে পরস্পরের লাভবান হওয়াকে অনুমোদন করে।&#8221; যদি ফকীহগণ ক্রেতা এবং বিক্রেতার মুনাফা অর্জনকে নিষিদ্ধ করে দেয় কিংবা একেবারেই কোনো সীমা বেঁধে না দেয়-দুটোই ইনসাফহীনতায় পর্যবসিত হতে পারে। তাই তিনি এর মধ্যে সীমারেখা আরোপ করেন। এছাড়াও তিনি প্রতারণা, ভণ্ডামী এবং কোনো পণ্য অন্যায়ভাবে ভোগ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। (৬১)</p>
<p>এই বিধানের কারণ হলো, মুনাফা লাভের আগ্রহ আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার প্রেরণা যোগায়। সম্পদের কার্যকর বণ্টন যেকোনো সতেজ-সুস্থ সমাজের চালিকাশক্তি। কিন্তু, মুনাফাকে একটি উপকরণের পরিবর্তে মৌলিক উদ্দেশ্য প্রতিপন্ন করার চিন্তা থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধির সৃষ্টি হয়। তাই ইসলাম এক্ষেত্রে কিছু নৈতিক সীমা বেঁধে দিয়েছে যেন মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের বাসনা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী না হয় এবং ইসলামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত না করে।</p>
<p><strong>এন্টারপ্রাইজ ও ব্যক্তিগত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং মুনাফা লাভকে অনুমোদন দেবার মধ্য দিয়ে ইসলামী অর্থনীতি এন্টারপ্রাইজের স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদের সদৃশ হয়ে যায় না। দুটোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান দুটো প্রধান কারণে। প্রথমত, ইসলামী ব্যবস্থায় যদিও সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত, তবু এটি বান্দার কাছে আল্লাহপ্রদত্ত আমানত। কারণ আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছে এগুলো আমানত। </strong></p>
<p>কোরআনের ভাষ্যমতে-</p>
<p>&#8220;আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর অধীন।&#8221; (২: ২৮৪)</p>
<p>&#8220;(হে নবী।) এদের জিজ্ঞেস করো, এ যমীন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কার (মালিকানাধীন)? তারা বলবে, এ সবকিছুই আল্লাহর।&#8221; (২৩:৮৪-৮৫)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে দান করো।&#8221; (২৪:৩৩)</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, মানুষ যেহেতু পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা এবং সে যে সম্পত্তির মালিক তা তার কাছে আল্লাহর দেওয়া আমানত, তাই সে আমানতের শর্তাবলি মানতে বাধ্য।</strong> আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে সে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধের সীমারেখা, বিশেষ করে হালাল-হারাম, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, সামগ্রিক কল্যাণকামিতার মধ্যে আবদ্ধ। তাই সে যে সম্পদ উপার্জন করবে তা হালাল উপায়ে করতে হবে এবং এটিকে সে উদ্দেশ্যে ব্যয় করতে হবে, যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন। রাসূল (স.) ইরশাদ করেন, &#8220;এই সম্পদ নিঃসন্দেহে তাজা এবং সুমিষ্ট। কিন্তু যে এটিকে ন্যায়সংগতভাবে অর্জন করে, তার জন্য। আর যে এটিকে অন্যায় পন্থায় অর্জন করে, তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতো যে খেতেই থাকে, কিন্তু কখনো তৃপ্ত হয় না। (৬২)</p>
<p>এখন, এই দুটো বিষয় কী পার্থক্যের সৃষ্টি করে? এটি পরিষ্কার হবে যদি পুঁজিবাদী অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থা নিয়ে একটু আলোচনা করা যায়।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থাকে গণভোটের সাথে তুলনা করা যায় যেখানে একজন ব্যক্তি কর্তৃক ব্যয়কৃত প্রতিটি মুদ্রা একেকটি ব্যালট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং সকলের সব ব্যালটের ভিত্তিতে মোট জাতীয় সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় হবে। যদি দুধের পরিবর্তে লিকারের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তার কারণ হলো, লিকারের চাহিদা জনগণের মধ্যে বেশি। তাই জাতীয় সম্পদ থেকে লিকার উৎপাদনে ব্যয়ের অংশ বেশি। এভাবে মূল্য ব্যবস্থায়, প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম (optimum) বণ্টন নিশ্চিত হয়। বাজার ব্যবস্থা এখানে নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে আসীন হয় এবং কেবলমাত্র ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখনো নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে না। ইসলামে সম্পদের বরাদ্দ তখনই সর্বোত্তম হিসেবে গণ্য হয়, যদি তা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী না হয় এবং ভোক্তার পছন্দ অনুযায়ী হয়। প্রকৃত ইসলামী সমাজে এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা নেই এবং রাষ্ট্র সেখানে নিষ্ক্রিয় দর্শক হতে পারে না। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র তার জনগণকে ইসলামী মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে থাকে, ফলে তাদের পছন্দও সে আদলে হয়ে থাকে এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যের আলোকে পরিচালনা করে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে সম্পদের বণ্টন ইসলামী আদর্শের আলোকে হচ্ছে কিনা এ রায় কে দিবে? এটি কোনো গীর্জার হায়ারার্কির কর্তৃত্বে হবে না, কেননা ইসলাম এরকম কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। তাই ইসলামের আবহমান রাজনৈতিক আদর্শ অনুসারে গণতান্ত্রিক পন্থায় যেকোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> যেহেতু প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় মুদ্রাকে ব্যালটের সাথে তুলনা করা হয়, তাই ব্যক্তিভেদে সবার চাহিদা এবং জরুরতকে মুদ্রার মূল্যে বিবেচনা করা হয়। যদি দুজন ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবার জন্য সমান অর্থব্যয়ে প্রস্তুত থাকে, তবে ধরে নেওয়া হয় তাদের দুজনের কাছে এই জিনিসটির চাহিদা বা জরুরত একই। এমনকি এ ধরণের তুলনা যদি সম্ভবপর হয়ও, তাহলে মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় সম্পদের কাঙ্ক্ষিত বণ্টনের জন্য আয়ের সমবণ্টন বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। যদি তা না থাকে, তাহলে এধরণের বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদিত সম্পদের বণ্টন অধিকাংশ ভোক্তার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। এর ফলে একটি পুঁজিপতি উচ্চবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হবে যারা সংখ্যায় কম হওয়া সত্তেও তাদের হাতে জাতীয় সম্পদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুঞ্জিভূত থাকবে। এবং তথাকথিত ভোটের ওয়েট (weight) দিয়ে তারা দুর্লভ জাতীয় সম্পদগুলোকে সামাজিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরবে। ফলশ্রুতিতে জাতীয় সম্পদের যে বণ্টন হবে তাও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। অন্যদিকে ইসলামী অর্থনীতিতে মুদ্রাব্যবস্থা ব্যক্তিগত ভোটের মূল্যমানে নির্ধারিত হওয়ার পরিবর্তে কোনো একটি পণ্য বা সেবার জন্য সর্বমোট কতটি ভোট বিদ্যমান তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সুতরাং, এখানে সম্পদের প্রত্যাশিত বণ্টন নির্ধারণ করার পূর্বশর্ত হলো, আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, যা ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> একচেটিয়া (monopoly) ও মনোপসনি (monopsony) বাজার ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে, বা এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যাতে পণ্যের দামে (price) এর সঠিক খরচ (cost) ও উপকারিতা প্রতিফলিত হয় না। পণ্যের দাম তার সুযোগ ব্যয় থেকে কম-বেশি হওয়ার কারণ শুধু এই নয় যে, উদ্যোক্তার পারিশ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় কম বেশি হতে পারে। তার কাজের সামাজিক মূল্যমান ও উপকারিতাকে অবজ্ঞা করার কারণেও এটি ঘটতে পারে। অন্যদিকে ইসলামে সামাজিক অগ্রগতির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। যদিও মূল্য ব্যবস্থার আত্ম-সংশোধনের প্রবণতা বিদ্যমান যার ফলে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক স্বার্থের দূরত্ব দূর হওয়া সম্ভব, কিন্তু কার্যকারিতার (operational) ত্রুটি এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সীমিত স্বাধীনতার জন্য এটি অসহনীয় দীর্ঘ সময় নেয়। এই পরিস্থিতিতে কোনো একটি উন্নয়নমূলক সরকারব্যবস্থার নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনা ব্যতীত এই বাজার ব্যবস্থাটি কখনো সম্পদের সর্বোত্তম বণ্টন (optimum allocation) নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না।</p>
<p><strong>চতুর্থত,</strong> পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তি তার পণ্যের প্রাথমিক মালিক, তাই এগুলো দিয়ে সে যা খুশি তাই করতে পারে। নৈতিক কোনো সীমারেখা না থাকায়, সে চাইলে মূল্যবৃদ্ধির জন্য পণ্যকে পুড়িয়ে ফেলা বা সমুদ্রে নিক্ষেপ করার মতো জঘন্য কাজও করতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থায় যেহেতু সব সম্পদ আল্লাহর দেয়া আমানতস্বরূপ, তাই এটি একটি মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। জান-মালের ক্ষতি সাধনকে কোরআনে দুর্নীতি ও পাপের সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। (২ : ২০৫) এটি সে আয়াত, যা হযরত আবু বকরকে (রা.) তার সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে যুদ্ধে প্রেরণের সময় অন্যায়ভাবে কাউকে হত্য না করতে এবং এমনকি শত্রুপক্ষের ভূমিতেও কোনো শস্যক্ষেত ও পশুপাখির ক্ষতি না করার নসিহত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।(৬৩) যদি যুদ্ধক্ষেত্রেই এটি অনুমোদিত না হয়, তবে স্বাভাবিক সময়ে বা মূল্যবৃদ্ধির জন্য এধরণের কাজ গ্রহণযোগ্য হবার তো প্রশ্নই আসে না।</p>
<p><strong>পঞ্চমত,</strong> এমনকি বাজার পরিচালনায় সুস্থ প্রতিযোগিতার শর্তেও এটি বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা অচলাবস্থা মোকাবেলার জন্য কিংবা পণ্যদ্রব্যের ন্যায্য বণ্টনের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। তাই, এর জন্য সুনির্দিষ্ট আদর্শিক লক্ষ্য ভিত্তিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।</p>
<p><strong>ষষ্ঠ বিষয় হলো,</strong> এরকম প্রতিযোগিতা নির্ভর বাজারে সফলতার রাস্তাগুলো অনেক সময় নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয়ের ন্যায্য বন্টনের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকারের তত্ত্বাবধানে না থাকলে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অযোগ্যরা জায়গা পেয়ে যেতে পারে, আবার বিপরীতে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজগুলো পেছনে পড়ে থাকতে পারে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।</p>
<p>অতএব, ইসলাম যদিও একটি বাজার ব্যবস্থার রূপরেখা আমাদের দিয়ে দিয়েছে, তথাপি এটি অপরিবর্তনীয় চিরস্থায়ী কোনো কিছু নয়। মূলত এটি হলো একটি ব্যবস্থা যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা, বিশেষ করে ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটি। সেজন্য ইসলামী আদর্শের আলোকে প্রয়োজন ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বাজারব্যবস্থাকে সাজিয়ে নিতে হবে। ইসলাম এক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে সরকার এককভাবে কখনো অর্থনৈতিক সুবিচার ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তিতে একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে না, হয়তো কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করতে সক্ষম হবে। অন্যান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দূর করতে হলে আখলাকী দর্শনকে সমাজের গভীরে প্রোথিত হতে হবে। যাকে সজ্জিত হতে হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, সামাজিক উন্নয়ন এবং আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের আদর্শে। সুতরাং, পুঁজিবাদ যদিও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে এটিকে আলাদা করেছে সেকুলারিজম; এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার ও জনকল্যাণের স্বার্থে একটি সুস্পষ্ট আখলাকী দর্শনের অনুপস্থিতি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> নাজিয়া তাসনীম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা-</p>
<p>১. দ্রষ্টব্য: সূরা মায়েদার তাফসীর (০৫:৮৭), কাশশাফ, বৈরুত ১৯৪৭, খণ্ড ১. পৃ. ৬৭। ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, কায়রো, খণ্ড ২. পৃষ্ঠা. ৮৭-৮৮। আরও দেখুন, বুখারী, কায়রো, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৯-৫০; মুসলিম, কায়রো ১৯৫৫, খণ্ড ২, পৃ. ৮১২-১৮: দারেমী, দামেশক ১৩৪৯ হিজরী, খণ্ড ২. পৃ. ১৩৩।</p>
<p>২. কোরআন ২:১৭২, ৬:১৪২, ৭:৩১ এবং ১৬০, ১৬:১১৪, ২০:৮১, ২৩:৫১, ৩৪:১৫, ৬৭:১৫</p>
<p>৩. ইবনে মাজাহ, কায়রো, ১৯৫২. খণ্ড ২, পৃ. ৭২৭:২১৪৮</p>
<p>৪. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃঃ ১২৮; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১১৮৯:১২, এবং তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃ. ৬৬৬:১৩৮-২</p>
<p>৫. বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত, দামেশক, ১৩৮১ হিজরী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫৮:৫২০৭</p>
<p>৬. দ্রঃ &#8220;তোমরা কি দেখো না, নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন? আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ কোনো জ্ঞান, কোনো পথনির্দেশ বা কোনো দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে&#8221;। সূরা লোকমান, (৩১:২০); এছাড়া, কোরআনে অনুরূপ আরো বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, দ্রঃ ১৪:৩২-৩৩, ১৬:১২-১৪; ২২; ৬৫ এবং ৪৫:১২</p>
<p>৭. বুখারী, খণ্ড ৭, পৃ. ১৫৮; ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১১৩৮:৩৪৩৯</p>
<p>৮. &#8220;কারো নিকট ভিক্ষা করো না&#8221;, আবু দাউদ, কায়রো ১৯৫২, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮২; উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে অধিকতর উত্তম, বুখারী, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৩; নাসায়ী, খণ্ড ৫, পৃ. ৪৫-৪৬। এছাড়া দ্রঃ ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৩:২১৩৮; নাসায়ী, কায়রো ১৯৬৪, খণ্ড ৭, পৃ. ২১২</p>
<p>১. দ্র: আবু যাহরাহ, উসূল আল ফিকহ, দামেশক ১৯৫৭, পৃ. ৩৫৫</p>
<p>১০. আবু হামিদ আল গাজালী, আল মুসতাসফা, কায়রো ১৯৩৭, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯-৪০</p>
<p>১১. ইবনুল কাইয়্যিম, ই&#8217;লামুল মুয়াক্কিইয়ীন, কায়রো ১৯৫৫</p>
<p>১২. ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৬৭</p>
<p>১৩. ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৫, ২১৪৪</p>
<p>১৪. দ্রঃ কোরআন (৪:৭৭, ২৯:৬৪, ৫৭:২০-২১); ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৭৮:৪১১৪</p>
<p>১৫. বুখারী, পৃ. ১১৩:৩০১</p>
<p>১৬. বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত, দামেশক, ১৩৮১ হিজরী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫৯:৫২১৩</p>
<p>১৭. মুসনাদে আহমাদ, মিশকাতে উদ্ধৃত, খণ্ড ২, পৃ. ৬৩:১:৫১৭৯</p>
<p>১৮. ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৫:২১৪৩</p>
<p>১৯. ইবনে আসাকিরের বরাতে উদ্ধৃত, সামান্য শব্দভেদে একই রেওয়ায়েত উল্লেখ হয়েছে, সুয়ুতীর জামি আস সাগীর, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৫</p>
<p>২০. তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৮, পৃ. ৮৪</p>
<p>২১. ইবনে কাসীর, তাফসীর, খণ্ড ৪, পৃ. ২১৮, দেখুন-সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতের তাফসীর।</p>
<p>২২. শাতিবী, আল মুওয়াফিকাত ফি উসূল আশ শারীয়াহ, কায়রো, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৪: বুখারী, মুসলিম এবং নাসায়ীর বরাতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>২৩. আল কোরআন, ৩৩:৫, এবং ৪৯:১০</p>
<p>২৪. মিশকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৬১৩:৪৯৯৮, বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত।</p>
<p>২৫. প্রাগুক্ত, ৬০৮:৪৯৬৯, আবু দাউদ ও তিরমিযীর বরাতে উল্লিখিত।</p>
<p>২৬. বুখারী, খণ্ড ৮, পৃ. ১২; মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৯৯, একইসাথে দেখুন ৬৫ এবং ৬৭নং হাদীস।</p>
<p>২৭. মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৮৬:৩২</p>
<p>২৮. মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৮৭:৩৪</p>
<p>২৯. বুখারী, খণ্ড ৮, পৃ. ১৫</p>
<p>৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৯ এবং নাসায়ী, খণ্ড ৮, পৃ.৬৫</p>
<p>৩১. মুসনাদ ইমাম আলী আল রিদা, বৈরুত ১৯৬৬, পৃ. ৪৭৪</p>
<p>৩২. আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, কায়রো ১৩৬৭ হিজরী।</p>
<p>৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪ এবং ৬</p>
<p>৩৪. দেখুন, কোরআন ৮৩:১-৩</p>
<p>৩৫. মুসনাদ এবং বায়হাকীর শুআবুল ঈমানের বরাতে সুয়ূতী উদ্ধৃত করেছেন, খণ্ড ১, পৃ. ৮</p>
<p>৩৬. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ. ১১২</p>
<p>৩৭. কিছু উদ্ধৃতিতে (হাদীস অথবা অন্যান্য) &#8216;দাস&#8217;দের সাথে সম্পর্কিত হলেও অনুবাদে কর্মচারী ব্যবহার করা হয়েছে। একজন দাসের সাথেও যখন আদিল ও মানবিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সে তুলনায় একজন কর্মচারীর সাথেও অবশ্যই তার চেয়েও অধিক ভালো আচরণ করতে হবে।</p>
<p>৩৮. মালিক, মুয়াত্তা, কায়রো ১৯৫১, খণ্ড ২, পৃ. ৯৮০:৪০</p>
<p>৩৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৮১:৪২</p>
<p>৪০. বুখারী, পৃ. ১৫ এবং খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৫; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৮৩:৩৮</p>
<p>৪১. &#8220;আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তুমি ইনশাআল্লাহ আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত পাবে: (সূরা ত্বহা, ২৮:২৭), হযরত শুয়াইব (আ.) যখন মুসা (আ.) কে কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তখন এমনটা বলেছিলেন। যা যেকোনো কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি অনন্য কোরআনী উপদেশ।</p>
<p>৪২. বুখারী, খণ্ড ১. পৃ. ১৬ এবং খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৫; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৮৩:৩৮ এবং 80</p>
<p>৪৩. মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১৫৪৮:৫৭</p>
<p>৪৪. বায়হাকীর শুআবুল ঈমানের বরাতে সুয়তী উল্লেখ করেছেন, খণ্ড ১, পৃ. ৭৫</p>
<p>৪৫. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৬</p>
<p>৪৬. আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃ. ১২১</p>
<p>৪৭. বুখারী, পৃ. ৫২৪১১২</p>
<p>৪৮. হোসাইন হায়কল, উমার আল ফারুক, কায়রো ১৯৬৪, খণ্ড ২, পৃ. ২৩৩</p>
<p>৪৯. আবু উবাইদ, কিতাবুল আমওয়াল, কায়রো ১৩৫৩ হিজরী, পৃ. ৫৯৫:১৯০৯, সামান্য শব্দভেদে উল্লিখিত হয়েছে, নাহজুল বালাগা, কায়রো, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩১</p>
<p>৫০. প্রাসঙ্গিক বর্ণনার জন্য দেখুন, সিদ্দিকী, ইসলাম কা নাযারিয়ায়ে মিলকিয়াত, লাহোর ১৯৬৮, পৃ. ২৭২-৭৯</p>
<p>৫১. রাসূল (স.) যখন মুয়ায (রা.)-কে ইয়েমেনের গভর্ণর হিসেবে নিযুক্ত করেন, তখন তাকে দায়িত্বের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিলো, &#8216;মানুষকে এ কথা বোঝানো যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরজ করেছেন, যা সম্পদশালীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে, এবং দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা হবে&#8217;। দেখুন-বুখারী, খণ্ড ২, পৃ. ১২৪; তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃ. ২১:৬২৫; এবং নাসায়ী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩ এবং ৪১</p>
<p>৫২. সূরা তাওবার ৩৪ নং আয়াতের তাফসীর দেখুন, ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫২; এবং জাসসাস, আহকামুল কুরআন, কায়রো ১৯৫৭, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩০</p>
<p>৫৩.দ্র: তাফসীর ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫০-৫৩</p>
<p>৫৪. আলী আল তানতাবী ও নাজী আল তানতাবী, আখবারু উমার, দামেশক ১৯৫৯, পৃ. ২৬৮</p>
<p>৫৫. উদ্ধৃত, ইউসুফউদ্দীন, ইসলাম কি মাশি নাজরিয়াত, হায়দারাবাদ, ভারত, খণ্ড ১, পৃ. ১৪০</p>
<p>৫৬. আল হিদায়াহ, কায়রো ১৯৬৫, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮১, আরো দেখুন, জাযিরী, কিতাবুল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবাআ, কায়রো ১৯৩৮, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৯</p>
<p>৫৭. আল হিদায়াহ, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮১ এবং জাযিরী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৯</p>
<p>৫৮. এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার জন্য, দেখুন-শাতিবী, খণ্ড ২, পৃ.৩৪৮-৬৪; আবু যাহরাহ, পৃ. ৩৫০-৬৪; দাওয়ালিবী, আল মাদখাল ইলা ইলমিল উসূল আল ফিকহ, বৈরুত ১৯৬৫, পৃ. ৪৪৭-৪৯</p>
<p>৫৯. জাফিরী, খণ্ড ২, পৃ. ১৫৩-১৬৮</p>
<p>৬০. উদ্ধৃত, ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, কায়রো ১৯৬০, খণ্ড ২, পৃ. ১৬৭</p>
<p>৬১. জাফিরী, খণ্ড ২, পৃ. ২৮৩-২৮৪</p>
<p>৬২. মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৮:১২২</p>
<p>৬৩. মালিক, মুয়াত্তা, খণ্ড ২, পৃ. ৪৪৮:১০; আরও দেখুন, মাওয়ারদী, আহকামুস সুলতানিয়া, কায়রো, ১৯৬০, পৃ. ৩৪</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16080</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইবনে খালদুন ও ইলমুল উমরান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 31 Jul 2025 15:05:38 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15971</guid>

					<description><![CDATA[&#160; এ প্রবন্ধে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, শুরুতেই তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই, ১. ইবনে খালদুনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। ২. ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরান কী? ৩. সমাজবিজ্ঞান বা Sociology কী? ৪. ইলমুল উমরান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&nbsp;</p>
<p style="text-align: left;"><strong>এ প্রবন্ধে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, শুরুতেই তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই,</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>১. ইবনে খালদুনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>২. ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরান কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৩. সমাজবিজ্ঞান বা Sociology কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৪. ইলমুল উমরান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে পারে?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>৫. ইবনে খালদুন বর্তমান দুনিয়ার প্রেক্ষিতে কতটা প্রাসঙ্গিক এবং আমরা তাঁর নিকট থেকে কীভাবে উপকৃত হতে পারি?</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের সামনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, তা হলো ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় যে থিওরিগুলো দিয়েছেন, সেগুলোকে আমরা সমাজবিজ্ঞান বা Sociology নামে অভিহিত করতে পারি কিনা? এ প্রশ্নটিকে আগে সুস্পষ্ট করার জন্য বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান (Sociology) বিভাগের পাঠ্য বই হিসেবে পঠিত এন্থনি গিডেন্সের লেখা Sociology নামক বইটি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই।</p>
<p>আগে দেখা যাক এন্থনি গিডেন্স সমাজবিজ্ঞানকে (Sociology) কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে,</p>
<p>&#8220;Sociology is the scientific study of human social life, groups and societies. It is a dazzling and compelling enterprise, as its subject matter is our own behavior as social beings. The scope of sociology is extremely wide, ranging from the analysis of passing encounters between individuals on the street to the investigation of crime, international relations and global forms of terrorism.&#8221;</p>
<p><em>অর্থাৎ,  সমাজ এবং সমাজের প্রতিষ্ঠানাদির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান। সমাজের মৌলিক উপাদান এবং সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের আচরণকে বিশ্লেষণ করাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের কাজ। যার দরুণ এটি বেশ সমৃদ্ধ এবং প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। সমাজবিজ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত। যেমন, দুজন পথচারীর সাময়িক বিবাদের বিশ্লেষণ থেকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মানুষের জীবনাচরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী সময়োপযোগী আলাপন উপস্থাপন করাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের নিত্যদিনের কাজ।</em></p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর নিজের তৈরিকৃত ডিসিপ্লি­ন ইলমুল উমরানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;انه لما كانت حقيقة التاريخ انه خبر عن الإجتماع الإنساني الذي هو عمران العالم ، وما يعرض لطبيعة ذالك العمران من الأحوال&#8221;</p>
<p>&#8220;ইলমুল উমরান হলো এমন জ্ঞান যা বিশ্বজগতের উমরানের সাথে সম্পর্কিত মানুষের সমাজ এবং প্রকৃতির দাবি অনুসারে তার মধ্যে সৃষ্ট অবস্থাসমূহ এবং সে সকল অবস্থার আবশ্যিক ফলাফল হিসেবে ইতিহাস এবং ইতিহাসের হাকীকতকে বিষয়বস্তু হিসেবে গণ্য করে থাকে।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এন্থনি গিডেন্সের প্রদত্ত সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা এবং ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরানের সংজ্ঞার মধ্যে কতগুলো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।</p>
<p><strong>প্রথমত</strong><strong>, </strong>ইলমুল উমরানের মধ্যে ইতিহাস বড় একটি ফ্যাক্টর।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত</strong><strong>,</strong> ইবনে খালদুনের মতে, সমাজ বলতে মানবসমাজ বুঝানো হয়, সে ক্ষেত্রে মানুষের একত্রে বসবাসের বিষয়টি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। ইবনে খালদুন মানুষের সামাজিক জীবনকে স্বীয় ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়, বরং অত্যাবশ্যকীয় (Imperative) একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। মানবসমাজকে অত্যাবশ্যকীয় (Imperative) একটি বিষয় হিসেবে দেখার অর্থ হলো এ বিষয়টিকে একটি মেটাফিজিক্যাল বিষয় হিসেবে দেখা কিংবা অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা। তাহলে আমরা এ কথা বলতে পারি, সমাজকে অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা ইলমুল উমরানের মূল বিষয়।</p>
<p>অপরদিকে সমাজবিজ্ঞান (Sociology) সমাজকে একটি মওজুদ বা বিদ্যমান বিষয় হিসেবে দেখে। বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞান এ মওজুদ বা বিদ্যমান সমাজের বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থাকে বিশ্লেষণ করে।</p>
<blockquote><p><strong>এখানে আমরা যে মৌলিক পার্থক্যটি দেখতে পাই, তা হলো, সমাজবিজ্ঞানের (Sociology) ক্ষেত্রে ইতিহাস কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। এটি শুধুমাত্র মওজুদ বা বিদ্যমান সমাজকে ব্যাখ্যা করে।</strong></p></blockquote>
<p>অপরদিকে ইলমুল উমরান মানুষকে ও সমাজকে ঐতিহাসিক একটি অস্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করে। ঐতিহাসিক একটি অস্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করার কারণে সে অস্তিত্বটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে তার অস্তিত্বকে ধারাবাহিক রাখে সে বিষয়কে বিশ্লেষণ করে থাকে। এজন্য ইলমুল উমরানের ক্ষেত্রে ‘সময়’ এর ব্যপারটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>যেমন, এ বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য আমাদেরকে মুকাদ্দিমার সূচিপত্র ও এন্থনি গিডেন্সের Sociology বইয়ের সূচিপত্রকে তুলনামূলকভাবে নিরীক্ষণ করতে হবে। এ তুলনামূলক নিরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট একটি ধারণা পাব।</p>
<p>প্রথমেই যদি এন্থনি গিডেন্সের Sociology বইয়ের সূচিপত্রের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, তিনি প্রথমেই ‘সমাজবিজ্ঞান (Sociology) কী’ এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি বিশ্বায়ন (Globalization) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারপরের অধ্যায়সমূহে তিনি সমাজবিদ্যাগত প্রশ্ন ও উত্তর (Asking and Answering Sociological Questions), সমাজবিজ্ঞানে তাত্ত্বিক চিন্তা (Theoretical Thinking in Sociology), সামাজিক যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন (Social Interaction and Everyday Life), সামাজিকীকরণ, জীবনযাত্রা ও বার্ধক্য (Socialization, Life-Course and Ageing), পরিবার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কসমূহ (Families and Intimate Relationships), স্বাস্থ্য, অসুস্থতা ও অক্ষমতা (Health, Illness and Disability), স্তরবিন্যাস ও শ্রেণি (Stratification and Class) দরিদ্রতা, সামাজিক বাধা ও সমাজ কল্যাণ (Poverty, Social Exclusion and Welfare), বৈশ্বিক বৈষম্য (Global Inequality), লিঙ্গ ও যৌনতা (Sexuality and Gender), বর্ণ, জাতিভুক্ত ও অভিবাসন (Race, Ethnicity and Migration), আধুনিক সমাজে ধর্ম (Religion in Modern Society), গণমাধ্যম (The Media), প্রতিষ্ঠান/সংগঠন ও বিস্তৃতি/নেটওয়ার্ক (Organization and Networks), শিক্ষা (Education), অর্থনৈতিক জীবন ও কর্ম (Work and Economic Life) অপরাধ ও বিচ্যুতি (Crime and Deviance) রাজনীতি, সরকার ও সন্ত্রাসবাদ (Politics, Government and Terrorism), নগর ও নাগরিক অবস্থান (Cities and Urban Spaces), পরিবেশ ও ঝুঁকি (The Environment and Risk) নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে সাধারণত এ সকল বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়।</p>
<p>কিন্তু ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমার দিকে যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো, এর প্রথম অধ্যায়ে তিনি যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হলো একটি জীবসত্তা হিসেবে মানুষ কীভাবে অন্য মানুষের সাথে বসবাস করছে, মানুষের মৌলিকত্বের সাথে এ বিষয়টির সম্পর্ক কী এবং মূলগত দিক থেকে মানুষের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত না হয়েও কীভাবে এটি সমাজে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এবং মানুষ কর্তৃক বসবাসকৃত সমাজের এ ব্যবস্থাপনাটি কার্য ও কারণের সম্বন্ধের (Causality Order) মাধ্যমে তুলে ধরার অর্থ হলো এ বিষয়টিকে অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা। সমাজকে অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে সমাজ কীভাবে অস্তিত্ব ও বিকাশ লাভ করে, সে বিষয়টিকেও তিনি উপস্থাপন করেছেন।</p>
<p>পরবর্তীতে তিনি সমাজ মূলগতভাবে যেমন, ঠিক সেভাবেই বিকশিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দুটি ভিন্ন উপাদানকে উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে <strong>প্রথমটি হলো;</strong> ‘মানুষ যদি এমন একটি আচরণের মধ্যে থাকে যে, আমি যদি আমার নিকটবর্তীজনকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমি নিজেও আমার নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবো না’। সমাজের মানুষ যদি এ ধরনের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে আলোকে তাদের সমাজকে গড়ে না তুলে, তাহলে তারা একত্রে বসবাস করতে পারবে না। যেমন, মানবশিশু খুবই দুর্বল ও অসহায় হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। সমাজ যদি তাকে বড় হওয়ার জন্য ও বেঁচে/টিকে থাকার জন্য সাহায্য না করে, তাহলে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। এক অর্থে ইবনে খালদুন এ বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন, আল্লাহ মানুষকে একটি প্রজাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ যেন এভাবে টিকে থাকতে পারে এজন্য তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে আল্লাহ তায়ালা একটি ‘অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নীতি’ দান করেছেন। সে নীতিটি হলো মানুষজন মুসলিম হোক বা না হোক, তারা যেন একটি প্রজাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, সেভাবেই একে অপরকে রক্ষা করে থাকে। এ বিষয়টি হলো মানুষের সমাজজীবনের পর্যায়, এটি পরবর্তীতে পর্যায় থেকে পর্যায়ক্রমে অতিবাহিত হতে থাকে। অর্থাৎ, <strong>আসাবিয়্যাত হলো মানুষের জীবনকে সমাজবদ্ধভাবে পরিচালনা করার প্রথম ধাপ।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়টি হলো,</strong> একটি সমাজ হিসেবে মানুষের টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশকেও মানুষের বাসোপযোগী হতে হবে। পরিবেশ যদি মানুষের বসবাসের উপযোগী না হয়, তাহলে মানুষের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। যার কারণে মরুভূমিতেও উমরান গড়ে উঠবে না, আবার বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলেও উমরান গড়ে উঠবে না।</p>
<p>এ দুটি মূলনীতি উমরানের জন্য অপরিহার্য।</p>
<p>মানুষের একসাথে বসবাস করার জন্য এ দুটি মূলনীতির সাথে ইবনে খালদুন তৃতীয় একটি মূলনীতি যুক্ত করেন। তিনি বলেন, <strong>যদি কোনো কওম বা গোত্রের নিকট কোনো পয়গাম্বর আসে</strong><strong>, </strong><strong>তাহলে সে পয়গাম্বরের উম্মতের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী চেতনা থাকতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যে চেতনার বলে তারা উম্মতের সকলকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে। আর সে প্রচেষ্টা হতে হবে এমন</strong><strong>, </strong><strong>যেমনটা একজন মা তার সন্তানকে রক্ষা করার জন্য করে থাকেন।</strong></p>
<p>ফলশ্রুতিতে সামাজিক অস্তিত্বের তৃতীয় মেটাফিজিক্যাল মূলনীতিটি হলো ‘নবুওয়ত’। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইবনে খালদুনকে নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা জ্ঞাতসারে হোক কিংবা অজ্ঞাতসারে হোক এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করে থাকেন। এ ‘নবুওয়ত’ এর মাধ্যমে সৃষ্ট আসাবিয়্যাত রক্ত সম্পর্কীয় আসাবিয়্যাতকে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত করে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তাঁর এ সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে একইসাথে একজন পয়গাম্বরকে ইত্তিবা বা অনুসরণকারীদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার প্রথম অধ্যায়ে সাধারণভাবে আল-উমরানুল বাশারীর মধ্যে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর রচিত গ্রন্থ <strong>“আল-মাবাহিসুল মাশরিকিয়্যা”</strong> এর মেটাফজিক্যাল পদ্ধতিকে সমাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। এ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থাকা অতীব জরুরী।</p>
<p>এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ ও ‘উমরান আল বাদাবী’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ অধ্যায়ে তিনি মানুষের জীবনপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দুটি মৌলিক ক্যাটাগরিকে পরস্পর থেকে পৃথকভাবে তুলে ধরেছেন। সে মৌলিক ক্যাটাগরির মধ্যে একটি হলো সে সময়ে মানুষ যাযাবর হিসেবে বসবাস করত। বিশেষত যারা গ্রামীণ জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলো। তাদের যাযাবর হিসেবে বসবাস করার অর্থ আবার এ নয় যে, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা ছিল না। তাদেরও একটি ব্যবস্থাপনা ছিল, ইবনে খালদুন যেটিকে ‘উমরান আল বাদাবী’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। অপরদিকে শহরে বসবাসকারীগণ, যেটিকে তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সত্যিকারের উমরান অবশ্যই শহরের মধ্যে বিকশিত উমরান। এরপর তিনি ‘উমরান আল হাদারী’ নিয়ে আলোচনা করেন এবং এর পূর্বশর্তসমূহ কী কী সেগুলো নিয়েও আলোচনা করেন।</p>
<p>এক অর্থে বলতে গেলে এন্থনি গিডেন্স তাঁর Sociology নামক গ্রন্থে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার প্রায় সকল বিষয় নিয়েই ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার এ অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ আংশিকভাবে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তবে এন্থনি গিডেন্স সমাজবিজ্ঞান (Sociology) হিসেবে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, সে বিষয়গুলোকে ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমার ইলমুল উমরানের মধ্যকার একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>এখন পর্যন্ত আমরা যে আলোচনা করলাম, তা থেকে বুঝতে পারি যে, বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান বলতে যা বুঝায়, তা ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বের নিকটে খুবই সামান্য। ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞানের যে তত্ত্ব দিয়েছেন তা অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক। বর্তমান সময়ে যে বিষয়কে সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয়, সেটিকে ইবনে খালদুনের ইলমুল উমরানের মধ্যে একটি অধ্যায়ের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>এরপর ইবনে খালদুন আরেকটু অগ্রসর হয়ে পরবর্তী ধাপে মানুষের একত্রে বসবাস করার ফলে সৃষ্ট ব্যবস্থাপনাসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। <strong>মানুষের তৈরি রাষ্ট্রকে ইবনে খালদুন দুভাগে বিভক্ত করেছেন। একটি হলো ‘মুলক’ অপরটি হলো ‘খেলাফত’।</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের মতে, মুলক (Kingdom) হলো এমন জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, যাদের নিকটে কোনো পয়গাম্বর আসেনি।</p>
<p>আর খেলাফত হলো সে রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা একজন পয়গাম্বরের অনুসারীগণ যখন সে পয়গাম্বরের সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে কোনো আইনী ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলে।</p>
<p>এ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে, মূলকের ক্ষেত্রে আকলী ও আমলী (প্রায়গিক) হিকমত প্রযোজ্য, আর খেলাফতের ক্ষেত্রে শরয়ী হিকমত প্রযোজ্য।</p>
<p>এক স্থানে ইবনে খালদুন বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর আদেশকে ‘মুলক’ এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ করেন, তবে এটি এমন সমাজের জন্য প্রযোজ্য, যে সমাজে পয়গাম্বর আসেননি কিংবা যে সমাজ পয়গাম্বরের সাথে কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি কিংবা সম্পর্ককে বিছিন্ন করে ফেলেছে।”</p>
<p>চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি শহর ও শহরের জীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন। শহরের জীবনের বিষয়টি আসলে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, শহরের জীবন ধারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p><strong>আল ফারাবীর ভাষায়, “মানুষ আখলাকী কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) মূলত শহরের মাধ্যমে লাভ করে থাকে।”</strong></p>
<p>কেননা, একজন মানুষ যত বেশি ও যত ধরনের মানুষের সাথে মিশে, সে নিজেকে তত বেশি বিকশিত করতে পারে। এজন্য যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ইনসানে কামিল কোথায় খুঁজে পাব, তাহলে আমি জবাবে বলব সবচেয়ে বড় ইনসানে কামিল বড় বড় শহরের মধ্যে পাওয়া যায়, গ্রামগঞ্জে কিংবা গুহার ভেতরে ইনসানে কামিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।</p>
<p>যে ব্যক্তি সমাজ থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে গুহার মধ্যে বসবাস করে, তার আখলাকী শ্রেষ্ঠত্ব তো কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে গ্রামে বসবাসকারী মানুষের সুযোগও সীমাবদ্ধ।</p>
<p>অপরদিকে এমন এক ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যার অঢেল সম্পদ রয়েছে এবং সে রাজনৈতিকভাবে অনেক বড় শক্তির নিয়ন্ত্রক কিংবা এমন একজন সেনাপতির কথাই ধরুন, যে অনেক বড় একটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। এ ধরনের মানুষেরা যখন তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাজ করে থাকে, তখন এমন অনেক সময় তাদের সামনে আসে, যখন তাদের পক্ষে আদালত ও আখলাকের মূলনীতিসমূহ মেনে চলা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি তারা সে কঠিন অবস্থাতেও আখলাক ও আদালতের নীতিকে বিসর্জন না দেয়, তবে তখন সে অনুপাতে তাদের আখলাকী পূর্ণতা ফুটে উঠবে।</p>
<p>অনেক হাদীসেও আদিল বাদশাহ ও সৎ ব্যবসায়ীদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে যদি ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই, যদি কোনো ব্যক্তি এ কথা বলে, আমার ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে এজন্য আমি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদীর সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে শুধু নিজেকে রক্ষা করার জন্য একাকী বসবাস করে সেখানে আমার আখলাকী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবো, এমন ব্যক্তির এ আখলাকী সন্ধানের খুব বেশি মূল্য নেই।</p>
<p>সত্যিকার মারেফত হলো অনেক বড় বড় পদে থেকেও নিজেকে আখলাক ও আদালতের মূলনীতির আলোকে পরিচালিত করা।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার চতুর্থ অধ্যায়ে শহর সম্পর্কে অনেক ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে এখানে বিষয়টি শুধুমাত্র শহরের সোশিওলজির সাথে সম্পর্কিত নয়, শহরের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত আরও অনেক বিষয় তিনি এখানে আলোকপাত করেছেন।</p>
<p>মুকাদ্দিমার পঞ্চম অধ্যায় হলো জীবিকা সংক্রান্ত অধ্যায়। এ অধ্যায়ে তিনি জীবিকা অর্জনের উপায়, শিল্প-কৌশল এবং তৎসমুদয়ে ক্রিয়াশীল বিচিত্র অবস্থা ও সমস্যাবলি নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর এ সকল বিষয় সরাসরি অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত। এ অধ্যায়ে তিনি অর্থনীতি সংক্রান্ত এত অসাধারণ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন, যার কারণে শুধুমাত্র মুসলমানগণই নন, অনেক অমুসলিম অর্থনীতিবিদও ইবনে খালদুনকে অর্থনীতির জনক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। পাশ্চাত্যের যে সকল অর্থনীতিবিদগণ ইবনে খালদুনকে অর্থনীতির জনক হিসেবে বিবেচনা করেন, তাঁরা ছোটখাট কোনো অর্থনীতিবিদ নন। তাদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত অর্থনীতিবিদগণও রয়েছেন।</p>
<p><strong>ইবনে খালদুন অর্থনীতিকে ইলমুল উমরানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে দেখে থাকেন এবং স্থায়ী মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে যে বিষয়সমূহ পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়সমূহকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।</strong></p>
<p>এখানে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্য হলো সমাজবিজ্ঞানে শুধুমাত্র পদ্ধতিগত ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় বিষয়সমূহকে অনুসন্ধান করা হয়ে থাকে। কেননা, সমাজবিজ্ঞান সমাজের উৎপত্তির ফলে সৃষ্ট একেবারে মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় বিষয়সমূহ নিয়ে গবেষণা করে না । এর মূল কারণ হলো সমাজবিজ্ঞান স্থায়ী কিংবা অপরিবর্তনীয় কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বর্তমানে বিদ্যমান সমাজসমূহের জীবনধারার মধ্যে তুলনামূলকভাবে পরিবর্তনীয় ও অপেক্ষাকৃত কম পরিবর্তনীয় বিষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত করে এদের লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করে থাকেন।</p>
<p>অপরদিকে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে স্বতন্ত্র পর্যায়সমূহ রয়েছে।</p>
<p><strong>প্রথমটি হলো,</strong> সমগ্র মানবতা ও সমাজের অস্তিত্বের মূলকে গঠনকারী মূলনীতিসমূহকে ইবনে খালদুন অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলশ্রুতিতে এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান ও সাধারণভাবে সমাজবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত যত বিষয় রয়েছে, সকল বিষয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিভঙ্গি স্বতন্ত্র।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়টি হলো,</strong> তিনি চিরন্তন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অপেক্ষাকৃত কম পরিবর্তনীয় ও অধিক পরিবর্তনীয় বিষয়কে পরস্পর থেকে পৃথক করেন। এগুলোকে পৃথক করার পর এদেরকে একটিকে অপরটির সাথে সম্পৃক্ত করে বিশ্লেষণ করেন।</p>
<p><strong>মুকাদ্দিমার সর্বশেষ অধ্যায় হলো জ্ঞান সম্পর্কিত। এ অধ্যায়টি একইসাথে জ্ঞানের ইতিহাস ও জ্ঞানের দর্শন সম্পর্কিত একটি অধ্যায়। শুধু তাই নয়, একদিক থেকে দেখলে এ অধ্যায়কে জ্ঞানের এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়।</strong> ইবনে খালদুন এ অধ্যায়ে সমগ্র মানবতার উদ্ভাবিত জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে তিনি এ অধ্যায়ে জ্ঞান অর্জনের পন্থা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন এবং এ সম্পর্কে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ অধ্যায়কে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, এখানে ইবনে খালদুন চার পর্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করিয়েছেন।</p>
<ol>
<li>মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করার কারণে যেখানেই মানুষ রয়েছে সেখানেই সমাজ রয়েছে। সেটি বাদাবী (গ্রাম্য) কিংবা হাদারী (শহুরে) যে কোনোটি হতে পারে। এর অর্থ হলো এটি একটি মুভমেন্ট পয়েন্ট।</li>
<li> তাদের অস্তিত্ব কীভাবে সম্ভবপর হলো এটিকে বুঝার জন্য সহায়ক মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়।</li>
<li> এ সকল বিষয়কে কীভাবে জানা যাবে এ সংক্রান্ত প্রশ্ন।</li>
<li>আমরা এ সকল বিষয় সম্পর্কে কীভাবে জানি সে পন্থাকে নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি অনেক বড় একটি দৃষ্টিকোণ। এ সকল দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার সর্বশেষ অধ্যায়কে দাঁড় করিয়েছেন।</li>
</ol>
<p>এ সকল বিষয়কে সামনে রাখলে দেখতে পাই, বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞানে যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে, ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় সে সকল বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় স্বাভাবিকভাবেই তিনি যে সমাজে বসবাস করেছেন সে সমাজের অবস্থা তুলে ধরেছেন। সে সময়ে যেহেতু তিনি অনেক বড় বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালন করেছেন, সেজন্য সে সকল রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়কেও তিনি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি যেটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরেছেন, সেটি হলো ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মেটাফিজিক্স। তিনি রাযীর মেটাফিজিক্যাল তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন, শ্রেণিবিন্যাস করেছেন এবং লিপিবদ্ধ করেছেন।</p>
<p>অপরদিক থেকে দুটি বিষয়কে তিনি পৃথকভাবে তুলে ধরেন,</p>
<ul>
<li><em>চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয়।</em></li>
<li><em>ঐতিহাসিক কারণে অপেক্ষাকৃত কম বা বেশি পরিবর্তনীয়।</em></li>
</ul>
<p>যদিও আমি আমার এ আলোচনায় এন্থনি গিডেন্সের রচিত বইকে কেন্দ্র করে আলোচনা করেছি, তবে বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান একটি নয়। অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞান বা Sociology রয়েছে। যেমন জার্মান সোশিওলজি রয়েছে। যেমন, ম্যাক্স ওয়েবার জার্মান সোশিওলজিকে যেভাবে তুলে ধরেছেন, সেটির ধারণা ব্রিটিশদের সোশিওলজি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অপরদিক থেকে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিলে দ্যুর্খায়েমের সমাজবিজ্ঞান যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাই, জার্মান ও ব্রিটিশ সোশিওলজি থেকে ফ্রান্সের সোশিওলজি সম্পূর্ণ ভিন্ন। Marcel Mauss, Levi Strauss-সহ আরও অনেক ফরাসি সমাজবিজ্ঞানীর দিকে যদি তাকাই, তাহলেও দেখতে পাই, তাঁদের সমাজচিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।</p>
<p>অনুরূপভাবে, Social Theory-র নামে কিংবা সিস্টেম থিওরি হিসেবে গৃহীত অনেক তত্ত্ব রয়েছে, সেগুলোও আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। এছাড়াও মার্কসবাদীদের তৈরি করা সমাজতত্ত্বগুলোও সম্পূর্ণ ভিন্ন। <strong>এ কারণে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞান বুঝালে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটি সমাজবিজ্ঞান নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞানকে বুঝানো হয়। এগুলোর মধ্যে শুধু যে বিষয়টি অভিন্ন সেটি হলো এদের নাম একই, কিন্তু এদের মধ্যে খুব বেশি মিল নেই।</strong></p>
<p>এর কারণ হলো ফ্রান্সের সোশিওলজি ফ্রান্সের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে গবেষণা করেছে এবং সমাজ সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের উত্তর ফরাসি সমাজের উপর ভিত্তি করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।</p>
<p>জার্মান সোশিওলজি জার্মান সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেটির আলোকে তাদের সমাজবিজ্ঞান গঠন করে থাকে। ব্রিটিশরা ইংল্যান্ডের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে ও আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানীরা আমেরিকার সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে ধরে সে আলোকে তাদের সমাজবিজ্ঞানকে গড়ে তুলেছেন।</p>
<p>এখানেই ইবনে খালদুন থেকে আমাদের যে বিষয়টি শিখতে হবে সেটি আমরা খুঁজে পাই। ইবনে খালদুন আরব, তুর্কি, বারবার (আফ্রিকান) ও ফ্রাঙ্কদের সমাজবিজ্ঞানকে পরস্পরের চেয়ে ভিন্ন বলে অভিহিত করেন না। তাঁর মতে, সকল মানুষের জন্য ও সমাজের জন্যই প্রযোজ্য, এমন একটি বিষয় রয়েছে। সে বিষয়টি হলো সকল মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে, আর এ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করার মধ্যে একটি সংহতি বা আসাবিয়্যাত রয়েছে। আসাবিয়্যাত বা সংহতি ছাড়া সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা সম্ভব নয়।</p>
<p>এখানে লক্ষ্য করুন, সকল সমাজের জন্য প্রযোজ্য এমন একটি মূলনীতির কথা তিনি এখানে আলোচনা করছেন, সেটি হলো ‘আসাবিয়্যাত’।</p>
<p>ইবনে খালদুন <strong>দ্বিতীয় যে বিষয়টির </strong>প্রতি গুরুত্বারোপ করেন, তা হলো একটি সমাজের বৈশিষ্ট্য সে সমাজের ভৌগলিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে এটি পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত। ফলশ্রুতিতে সে পরিবেশকেও বিবেচনায় নিলে আমরা দেখতে পাই, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধারার সমাজ গড়ে উঠে।</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয় হলো</strong>, যদি মানুষগণ কোনো একজন পয়গাম্বরের অনুসরণ করে, তাহলে রক্তের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিকতার সম্পর্কও ছিন্ন করে সে পয়গাম্বরের অনুসারীদের মধ্যে একটি ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে ও সে পয়গাম্বরের দেখানো পন্থার আলোকে একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠে। আর সে সময়ে ইন্দোনেশিয়াতে বসবাসকারী মুসলমানদের সাথে মরক্কো, সাইবেরিয়া, আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়াতে বসবাসকারী মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তারা একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি সভ্যতা বিনির্মাণের জন্য চেষ্টা করে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ও অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও একজন পয়গাম্বরের অনুসরণের ফলে তাদের মধ্যে খুব শক্তিশালী একটি আসাবিয়াত (সংহতি) গড়ে উঠতে পারে।</p>
<blockquote><p><em>এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বর্তমান সময়ে যদি আমরা সমাজ নিয়ে গবেষণা করতে চাই তাহলে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে সেটি হলো পয়গাম্বররের অনুসরণকারী উম্মাহকে তথা মুসলিম উম্মাহকে একটি অভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এরপর এর নিচে উপবিভাগ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যে ভিন্নতা রয়েছে সেটি তুলে ধরতে হবে। আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী মুসলমানদের ভিন্নতা, উত্তর আফ্রিকাতে বসবাসকারী মুসলমানদের ভিন্নতা, মধ্য এশিয়া ও বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের ভিন্নতাকে তুলে ধরতে হবে। এগুলা একইসাথে এক, আবার একইসাথে এদের মধ্যে ভিন্নতাও রয়েছে। এটিকে আমরা ওয়াহদাতের মধ্যে কাসরাত (একের মাঝে বহুত্ব) বলে অভিহিত করতে পারি।</em></p></blockquote>
<p>এখন যদি রাশিয়ার কথা চিন্তা করি, রাশিয়ার সমাজ কোন মূলনীতিগুলোর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ প্রশ্নও আমাদেরকে করতে হবে। যেমন রাশিয়া যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে ছিল, তখন তারা নিজেদেরকে কম্যুনিস্ট হিসেবে দাবি করত। তবে এর পেছনে রাশিয়ার জাতীয়তাবাদ খুবই শক্তিশালী একটি ফ্যাক্টর ছিলো এবং তারা অন্যান্য অঞ্চলকে রাশিয়ার মধ্যে আত্মীকরণ করার জন্য চেষ্টা চালিয়েছে, তবে এক্ষেত্রে তারা সফল হতে পারেনি। কিন্তু এখন তারা রাশিয়ান জাতীয়তাবাদের সাথে অর্থোডক্সিয়া ধর্মবিশ্বাসকে একত্রিত করে নতুন করে একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p>অনুরূপভাবে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, সেখানে অর্থোডক্স, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা রয়েছে। এরা কেউ কাউকেই পছন্দ করে না। দেশ হিসেবে দেখলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও জার্মানি রয়েছে। ব্রিটেনও ছিল ইতিপূর্বে। কিন্তু এদের মধ্যে অভিন্ন কোনো কিছু না থাকা সত্ত্বেও, পঞ্চাশ বছর আগেও এরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণে একক একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং একটি অভিন্ন সমাজ গঠনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।</p>
<p>আমরা যখন বাইরে থেকে দেখি, তখন আমাদের মনে একটি প্রশ্ন আসে, সেটি হলো এরা কি আদৌ সফল হতে পারবে? আমরা এটি চাই যে তারা সফল হোক, দুনিয়ার সকল মানুষ তাদের মানবিক মর্যাদা নিয়ে আদালত ও শান্তির মধ্যে বসবাস করুক, কেউ কারোর উপর অত্যাচারের স্টীমরোলার পরিচালনা না করুক।</p>
<p>কিন্তু যদি বাস্ততার নিরিখে বিবেচনা করি, তাহলে কী দেখি? তাহলে দেখতে পাই যে, সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ কঠিন সংকটের সম্মুখীন। কেন? কারণ তাদের মধ্যে আসাবিয়্যাত নেই।</p>
<p>এখন বর্তমান সময়ে আমরা ইলমুল উমরানকে কীভাবে ব্যবহার করবো? আমি মনে করি এ নামে ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। তবুও যদি এটিকে আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট সহজভাবে তুলে ধরতে চাই, তাহলে আমরা একে ‘ইলমুল মাদানী’ (সভ্যতা সংক্রান্ত জ্ঞান) হিসেবে অভিহিত করতে পারি।</p>
<p>আমরা দেখতে পাই যে, ইলমুল উমরান বা ইলমুল মাদানী’র মধ্যে একইসাথে বিশ্বাস রয়েছে, আখলাক রয়েছে, রাজনীতি রয়েছে, আইন রয়েছে, একইসাথে সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান রয়েছে, একইসাথে সামাজিক মনস্তত্ত্ব, সাইকোলজি, মেটাফিজিক্স রয়েছে, এক অর্থে বলতে গেলে এর মধ্যে সকল কিছুই রয়েছে। এ বিষয়টিকে যদি বিবেচনায় নেই, তাহলে দেখতে পাই, ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমা আমাদেরকে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে সাহায্য করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইবনে খালদুন ও ইলমুল উমরান নিয়ে আলোচনা করার পর এ কথা অনায়াসেই বলা যায় যে, ইবনে খালদুনকে শুধুমাত্র একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করা একজন মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর কোনো একটি অঙ্গের নামে নামকরণ করার শামিল। যেমন মানুষের চোখ আছে, এখন তাকে শুধুমাত্র চোখ বলে ডাকা কি সমীচীন হবে? মানুষের কান আছে, এখন যদি কেউ তাকে কান বলে ডাকে, তাহলে কেমন হবে? এটি মোটেই ঠিক হবে না।</p>
<p>&#8211; একইভাবে ইবনে খালদুনকে অর্থনীতিবিদ বললেও ইবনে খালদুনের পরিচয়কে অসম্পূর্ণ করে রাখা হবে।</p>
<p>&#8211; ইবনে খালদুনকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলার অর্থ হলো তাঁকে অসম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা।</p>
<p>&#8211; ইবনে খালদুনকে শুধুমাত্র দার্শনিক বলে আখ্যায়িত করাও তাঁর প্রতি অবিচার করার শামিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><em>তাহলে আমরা ইবনে খালদুনকে কী নামে ডাকব? তাঁকে আমরা তাঁর রাখা নামেই ডাকব। সে নামটি কী? সেটি হলো, তিনি হলেন ‘ইলমুল উমরানের প্রতিষ্ঠাতা’।</em></p></blockquote>
<p>আর ‘ইলমুল উমরান’কে বর্তমান ভাষায় আমরা ‘ইলমুল মাদানী’ বা ‘সভ্যতা সংক্রান্ত জ্ঞান’ বলে অভিহিত করতে পারি। ইবনে খালদুন একইসাথে একটি সভ্যতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, কীভাবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, একটি সভ্যতা কোন ধরণের সংকটে নিপতিত হতে পারে এ সকল বিষয়কেও অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। আর সভ্যতা সংক্রান্ত সকল বিষয়কে এভাবে বর্ণনা করার কারণে ইবনে খালদুন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। কেননা আমরা ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ চাই। আমরা যেহেতু ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ চাই, তাই আমাদের অবশ্যই ইবনে খালদুনের মুখাপেক্ষী হতে হবে।</p>
<p>তবে একটি বিষয় না বললেই নয়, ইবনে খালদুনকে বুঝার ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট রয়েছে, অনেকেই তাঁকে না বুঝেই তাঁর ব্যাপারে অপবাদ দিয়ে থাকে। তাঁর কথার উদ্দেশ্য এবং মর্মকে বুঝার পরিবর্তে যদি তাঁকে শাব্দিকভাবে বুঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তাঁকে বুঝার জন্য বর্তমান সময়ে তাঁর শব্দসমূহই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে আক্ষরিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যদি ইবনে খালদুনকে বুঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে মুকাদ্দিমার লাইনসমূহই ইবনে খালদুনকে বুঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p>তাহলে কী করতে হবে?</p>
<p>ইবনে খালদুনের লেখাকে পড়তে হবে, তবে তাকে শুধু আক্ষরিকভাবেই নয় বরং বর্তমান সময় ও তাঁর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে এবং এক্ষেত্রে আমাদেরকে সফল হতে হবে।</p>
<p>ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমার মাধ্যমে যে কাজটি করেছেন সেটিকে আমরা সোশ্যাল অন্টোলজি নামে অভিহিত করতে পারি। আর ইবনে খালদুনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এ সোশ্যাল অন্টোলজি সৃষ্টি করতে পারা। সোশ্যাল অন্টোলজি সৃষ্টি করার দৃষ্টিকোণ থেকেও সত্যিকারার্থেই জ্ঞানের ইতিহাসে এর কোনো তুলনা নেই। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাশ্চাত্যের কিছু চিন্তাবিদ কিছু কিছু কাজ করেছেন যেগুলোকে সোশ্যাল অন্টোলজি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অনুরূপভাবে বিংশ শতাব্দীতেও কিছু দার্শনিক এরকম কিছু করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁদের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। তবে এদের কেউই ইবনে খালদুনের মত এক্ষেত্রে এত গভীর ও সামগ্রিক কোনো কিছু করতে পারেননি। যার কারণে ইবনে খালদুনের সাথে তাঁদের কোনো তুলনাই চলে না।</p>
<p>ইবনে খালদুনের এ সোশ্যাল অন্টোলজির মূল কাঠামোটি কী?</p>
<p>এ বিষয় সম্পর্কে ইবনে খালদুন <strong>প্রথম যে বিষয়টি উল্লেখ করেন সেটি হলো</strong> মানুষ মূলসত্তাগত দিক থেকে দুর্বল একটি সৃষ্টি এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল এক সৃষ্টজীব। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সকলেই এমন। আর সবচেয়ে নির্ভরশীল ব্যক্তি হলো সে, যার অবস্থান সমাজে সবচেয়ে উপরে।</p>
<p>যেমন ধরুন, আপনি এমন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট, যে দেশের জনসংখ্যা ১০ কোটি। এর অর্থ হলো আপনি একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সে দেশের ১০ কোটি মানুষের উপর নির্ভরশীল। তারা আপনাকে তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই আপনি শক্তিশালী। কিন্তু যদি তারা আপনার প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, পরের দিন আপনি সাধারণ একজন নাগরিক ছাড়া আর কিছু নন। মানুষের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ মূলসত্তাগত দিক থেকে দুর্বল এবং অন্যের মুখাপেক্ষী।</p>
<p><strong>দ্বিতীয় যে বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন,</strong> তা হলো মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য মানুষের সাথে কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগিতার চুক্তি করতে বাধ্য।</p>
<p><strong>তৃতীয় বিষয়টি হলো,</strong> যারা কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগিতার চুক্তি করে, তারা সুযোগ ও সম্ভাবনার আলোকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে। একটি নিজাম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়। সকল মানুষই এমন।</p>
<p><strong>চতুর্থ বিষয়টি হলো,</strong> কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার যে চুক্তি, সে চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠা প্রতিটি ব্যবস্থা (প্রতিষ্ঠান) একটি শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং একটি সমাজের মূল সে সমাজকে গঠনকারী মানুষগণের একে অপরকে সাহায্য ও সমর্থনের ক্ষেত্রে যে শক্তি, সে শক্তির সাথে সম্পর্কিত। পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থনের দিক থেকে মানুষ যত বেশি শক্তিশালী, তাদের বসবাসকৃত সে সমাজও তত বেশি শক্তিশালী।</p>
<p><strong>পঞ্চম বিষয়টি হলো,</strong> হাতে যে শক্তি আছে, তা যত বেশি ব্যবহার করা হবে, তত বেশি বৃদ্ধি পাবে ও বড় হবে। এ বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>সর্বশেষ বিষয় হলো প্রতিটি শক্তিরই একটি সীমা ও শেষ রয়েছে। সীমায় উপনীত হওয়া কিংবা উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া প্রতিটি শক্তিই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার স্থান অন্য শক্তির নিকট ছেড়ে দেয়।</p>
<p>ইবনে খালদুনের এ সোশ্যাল অন্টোলজির মূল ফ্রেমটির তৃতীয় বিষয়টির অর্থাৎ যারা কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার চুক্তি করে, তারা সুযোগ ও সম্ভাবনার আলোকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে এ প্রশ্নের জবাব সমাজবিজ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করে। সমাজবিজ্ঞান শুধু এ কাজটিই করে থাকে।</p>
<p>কিন্তু ইবনে খালদুনের সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এটি শুধুমাত্র একটি বিষয়, এছাড়া আর অন্য কিছু নয়।</p>
<p>এখন বর্তমান সময়ে আসা যাক। ইবনে খালদুন আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য কী বলেন? বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অনুষদে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হয়। সে সকল অনুষদের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দিকে যদি তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন, সেখানে ঐ সমাজের কোনো কিছু নিয়ে গবেষণা করা হয় না। যেমন, পাকিস্তান বলেন, তুরস্ক বলেন, মিসর বলেন কিংবা বাংলাদেশ বলেন, এ সকল দেশের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে নিজেদের দেশের সমাজ নিয়ে গবেষণা হয় না। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ইউরোপের যে সকল ধারা অনুসরণ করেন, সাধারণত সে সকল ধারার থিওরিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। যেমন, যদি কেউ জার্মান ভাষা জেনে থাকেন, তাহলে তিনি জার্মান চিন্তাবিদগণ জার্মান সমাজকে সামনে রেখে যে সকল থিওরি দিয়েছেন, সে সকল থিওরীকেই শিক্ষার্থীদেরকে শিখান।</p>
<p>আর যারা ইংরেজি জানেন, তারা আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানের থিওরিকে শিক্ষার্থীদেরকে শিখিয়ে থাকেন এবং আমেরিকার সমাজকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে তুলে ধরেন। একইভাবে যারা ফ্রেঞ্চ জানেন, তারাও ফ্রান্সের সমাজকে সমাজবিজ্ঞান হিসেবে তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।</p>
<p>এখন কথা হলো বাংলাদেশের সমাজে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশী যুবকগণ কি সমাজবিজ্ঞান বিভাগসমূহে তাদের নিজেদের সমাজ ও দেশ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়?</p>
<p>এর জবাব হলো, না, পায় না!</p>
<p>একবার চিন্তা করে দেখুন তো, এটি কত মারাত্মক একটি বিষয়!</p>
<p>শুধুমাত্র সমাজবিজ্ঞানই নয়, সকল বিভাগের ক্ষেত্রে এ একই কথা প্রযোজ্য। যারা অর্থনীতি পড়ে, তারা তাদের নিজেদের অর্থনীতি সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিবহাল?</p>
<p>তাহলে ইবনে খালদুন আমাদেরকে মূল যে বিষয়টি শিক্ষা দিয়ে থাকেন, সে বিষয়টি হলো <strong>আমরা যদি সমাজবিজ্ঞান তৈরি করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের সমাজকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সমাজবিজ্ঞান তৈরি করতে হবে।</strong> সমাজবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজকে একইসাথে জ্ঞানের বিষয় ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে তৈরি করতে হবে। যদি আমরা আমাদের সমাজকে একইসাথে জ্ঞানের বিষয় ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে তৈরি করতে পারি, তাহলে হয়তোবা আমরা আমাদের সমাজের উপর ভিত্তি করে এমন এমন সব থিওরী সৃষ্টি করতে সক্ষম হব, যেগুলো দেখে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা তাদের সমাজকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ পাবে। পরবর্তীতে তারা নিজেদেরকে পুনর্গঠন করতে পারবে। এটি হয়তো অনেকের কাছে কল্পনাপ্রসূত হতে পারে, কিন্তু এটি মোটেই অসম্ভব নয়। অতীতে তারা মূলত আমাদের সমাজ থেকেই শিখেছে, এখনো যদি আমরা এক্ষেত্রে সফল হতে পারি, তাহলে তারা আমাদের নিকট থেকেই শিখবে। কারণ আমরাই হলাম বিশ্ববিবেক।</p>
<p>এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে সমাজবিজ্ঞান সংক্রান্ত যত বিষয় রয়েছে সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজকে সামনে রেখে তত্ত্ব (থিওরী) ও মডেল দাঁড় করাতে হবে।</p>
<p style="text-align: left;"><strong>আর আমাদের সমাজ কী?</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>আমাদের সমাজ হলো মুসলিম সমাজ। আমাদের সমাজ ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ। এখন যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরেকটু বিস্তৃত করি, তাহলে আমাদের যারা সমাজবিজ্ঞান পড়ে, তাদের মৌলিক দায়িত্ব হলো মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার ঐক্যকে কীভাবে সুদৃঢ় করা যায়, কীভাবে মুসলমানদের মধ্যকার কথা ও কাজের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায় এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করা।</strong></p>
<p style="text-align: left;"><strong>ইনশাআল্লাহ, আমরা ধীরে ধীরে ইবনে খালদুন যেদিকে ইঙ্গিত করেছেন, সে দিক বিবেচনায় রেখে আমাদের সমাজবিজ্ঞানকে নতুন করে গড়ে তুলব। নতুন করে সমগ্র মানবতা আমাদেরকে দেখে নিজেদের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে নিবে। আর আমি বিশ্বাস করি, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ :</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ibn-khaldun-and-ilm-al-umran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15971</post-id>	</item>
		<item>
		<title>এক নতুন অর্থনীতির প্রয়োজন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/a-new-economy-is-needed/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/a-new-economy-is-needed/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Jul 2025 11:45:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15963</guid>

					<description><![CDATA[দুনিয়ার অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে একটা নতুন চিৎকার ধ্বনিয়া উঠিয়াছে। এই চিৎকার যেমনি ভাঙ্গা গলার,তেমন বলিষ্ঠও নয়; তবু উহার প্রতি জনগণের উৎকণ্ঠা না জাগিয়া পারে নাই। সে চিৎকার হইল, একটু নতুন অর্থব্যবস্থা (New Economic order) চাই যাহা বর্তমানের বিরাজমান অর্থ ব্যবস্থার দুর্বহ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দুনিয়ার অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে একটা নতুন চিৎকার ধ্বনিয়া উঠিয়াছে। এই চিৎকার যেমনি ভাঙ্গা গলার,তেমন বলিষ্ঠও নয়; তবু উহার প্রতি জনগণের উৎকণ্ঠা না জাগিয়া পারে নাই। সে চিৎকার হইল, একটু নতুন অর্থব্যবস্থা (New Economic order) চাই যাহা বর্তমানের বিরাজমান অর্থ ব্যবস্থার দুর্বহ চাপে নির্যাতিত নিষ্পেষিত ও শোষিত –বঞ্চিত জনগণকে নিষ্কৃতি ও স্বস্তি দিতে পারিবে। কেননা বর্তমানের যাবতীয় মানব-রচিত অর্থব্যবস্থা মানবজাতির অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে। শুধু তাহাই নয়, যে অর্থ ব্যবস্থা বর্তমানে বিভিন্ন দেশে কার্যকর রহিয়াছে, তাহা পুঁজিবাদ হউক, কি সমাজতন্ত্র, মানুষের জীবনে নিত্যনতুন জটিল সমস্যা ও অর্থনৈতিক ব্যাধির সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। সাধারণ মানুষকে ঠেলিয়া দিতেছে নির্মম কষ্টদায়ক দারিদ্র ও দুঃসহ অভাব অনটনের গভীরতম পংকে। এই অর্থব্যবস্থা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে পেট ভরিয়া খাবার, লজ্জা ঢাকার বস্ত্র ও রৌদ্র-বৃষ্টি, পথিকের শাণিত-উষ্ণ দৃষ্টিবান হইতে রক্ষাকারী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করিয়া দিতে সম্পূর্ণ অক্ষমতার প্রমাণ দিয়াছে। নানাবিধ রোগ-ব্যাধি, রক্তহীনতা ও অপুষ্টি হইতে মুক্তি দেওয়া উহার পক্ষে সম্ভবপর হয় নাই।</p>
<p>অথচ এই মানব-দুশমন অর্থব্যবস্থাই বর্তমান সময়ের বিশ্বমানবতাকে অক্টোপাশে বাঁধিয়া রাখিয়াছে,বন্দী করিয়াছে দাসত্বের দুশ্ছেদ্র শৃঙ্খলে। উহার দাপট-প্রতাপে প্রত্যেকটি নর-নারী কঠিনভাবে প্রকম্পিত হইতেছে প্রতি মুহূর্তে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার আকাশ ছোঁয়া পার্থক্য দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। বরং দরিদ্ররা ক্রমশ অধিকতর দারিদ্রের গভীরে তলাইয়া যাইতেছে। আর ধনীরা শনৈঃ শনৈঃ উচ্চ হইতেও উচ্চতর পর্যায়ে উঠিয়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে। ইহারফলে সমাজ-সভ্যার স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট হইতেছে। মুদ্রাস্ফীতির প্লাবন-স্রোতে সাধারণ মানুষ রসাতলে ভাসিয়া যাইতেছে। ক্ষুধা ও রোগ মানব দেহের গোশত ও মগজ কুরিয়া কুরিয়া খাইতেছে, বিন্দু বিন্দু করিয়া শুষিয়া নিতেছে রক্তের শেষবিন্দুটিও। দরিদ্র জনতা করভারে জর্জরিত। কর প্রথার পর্বত তাহাদের মেরুদণ্ড ভাংগিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিতেছে। সুদী কারবার সুদভিত্তিক অর্থনীতি লুটিয়া নিতেছে মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া ও রক্ত নিঙড়াইয়া উপার্জন করা শেষ করিটিও। বস্তুত এই হইল বর্তমান দুনিয়ার প্রচলিত সর্বপ্রকার অর্থব্যবস্থার তিক্ত বিষাক্ত পরিণতি। অথচ এই সব কয়টি অর্থব্যবস্থা-ই মানুষকে ভূ-স্বর্গের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা-অগ্রগতি দানের প্রতিশ্রুতি দিয়া জনজীবনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এখানে তাহাই তাহাদিগকে লইয়া যাইতেছে দারিদ্রের দাউ-দাউ করিয়া জ্বলিতে থাকা জাহান্নামের দিকে অতি দ্রুত গতিতে। উহাদের গাল ভরা দাবি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা প্রমাণিত হইয়াছে।</p>
<p>অবশ্য মজার কথা হইল, বর্তমানে প্রচলিত পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি পরস্পরকে এই অবস্থার জন্য অভিযুক্ত ও দায়ী করিতেছে। কেননা বর্তমান মানবতার মর্মান্তিক অবস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করিতে কোনোটাই প্রস্তুত নয় বরং এই সবের প্রত্যেকটিই অপরটিকে প্রতিরোধ করিবার জন্য সর্বশক্তি কোনোটাই করিয়া চলিয়াছে। অথচ মানবরচিত এই কয়টি অর্থনীতির সার নির্যাস অভিন্ন পরিণতি সর্বতোভাবে এক। একই পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে সমগ্র মানবকুলকে। এককথায়, সে পরিণতি নিয়োগ Exploitation of masses by a handful coterie মুষ্টিমেয় কতিপয় কর্তৃক ব্যাপক জনগোষ্ঠীর শোষণ।</p>
<blockquote><p><em><strong>বর্তমানে প্রচলিত অর্থব্যবস্থা সমূহের নামের পার্থক্য থাকিলেও এই সব গুলিই একই মৌল হইতে নির্গত, একই উৎস হইতে উৎসারিত। কমিউনিস্ট ঘোষণাপত্র (Communists manifesto) এবং মিলস –এর Political Economy দুইটি ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী অর্থব্যবস্থা উপস্থাপিত করিলেও উভয়টিই একই সময়ে- ১৮৪৮ সনে প্রকাশিত ও উপস্থাপিত হইয়াছিল। একই স্থান- অর্থাৎ লন্ডন- হইতে দুইটিই আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। আর এই দুইটি অর্থব্যবস্থার পশ্চাতেই প্রেরণাদায়ী শক্তি হিসাবে কাজ করিয়াছে বিশ্ব ইহুদীবাদ। এই দুইটি অর্থব্যবস্থার মধ্যে একটি হইল ব্যক্তিতান্ত্রিক পুঁজিবাদ আর অপরটি হইল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ- যদিও উহার নাম দেওয়া হইয়াছে সমাজতন্ত্র (Socialism)। কিন্তু দুইটিই জনমানুষকে শোষণ করার উপর নির্ভরশীল। এই দুইটির মধ্যে কোন পার্থক্য থাকিলে তাহা শুধু মাত্রার পার্থক্য মাত্র। কিন্তু শোষণ এক ব্যক্তি দ্বারা হউক, কি হউক রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক, তাহাতে মূল বা পরিণতির দিক দিয়া কোনই পার্থক্য সূচিত হয় না।</strong></em></p></blockquote>
<p>তবে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে রাষ্ট্রের হাতে অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তির সম্পূর্ণ একীভূত হওয়ার কারণে উহার শোষণটা সর্বাত্মক যেমন, তেমনি ‍খুবই নির্দয় ও মর্মান্তিক। সেখানে মানুষ সম্পূর্ণ রূপে নিরুপায় ও চরমভাবে অসহায়। ব্যক্তিতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণে- মানুষ বলিয়া- কিছুটা দয়ার অবকাশ থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক শক্তি হিসাবে রাষ্ট্রের শোষণে দয়া-মায়া-ক্ষমার কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে না। বরং সেখানে দয়া, সহানুভূতি বা মানবিক সহমর্মিতার কথা চিন্তা করাই অবাস্তব। কমিউনিজম সমাজতন্ত্রের চরম ও চূড়ান্ত রূপ। উহারই উপর অর্পিত হইয়াছে পুঁজিবাদকে চিরস্থায়ী করণের কঠিন দায়িত্ব এবং উহা তাহাই করিতেছে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করিয়া। কেননা সমাজতন্ত্রের নিজস্ব কোন অর্থনীতি নাই, ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা। আসলে উহা একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যবস্থা (Political System) মাত্র। প্রকৃত পক্ষে উহার অর্থ সংস্থা ও ব্যবস্থাপনা ঠিক তাহাই, যাহা পুঁজিবাদের সংস্থা ও ব্যবস্থাপনা। কাল মার্কস একজন সাংবাদিক পিতার সন্তান ছিলেন। তাঁহার রাজনৈতিক বিষয়াদির সমালোচনা করার দক্ষতা ছিল প্রচন্ড। তাঁহার রচনাবলীতে অর্থনৈতিক বিষয়াদি পর্যায়ে যাহা কিছু পরিলক্ষিত হয় তাহা মূলত পুঁজিবাদ হইতে ভিন্নতর কিছু নয়। এমন কি, কমিউনিষ্টদের বাইবেল ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’- পুঁজিবাদের সাফল্যের উপর একটা গুরুত্বপূর্ণ দলীল ছাড়া আর কিছুই নয়। উহাতে বলা হইয়াছে:</p>
<p><strong>The bourgeosie during its rule for nearly 100 years has created more massive and more closed productive forces than have all preceding generations together.</strong></p>
<p>শ্রম মূল্য মতাদর্শের (Labour theory of value) ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়, সমাজতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষ বিপুল সংখ্যক সাধারণ অ-নিপুণ-অযোগ্য শ্রমিকদিগকে সকল ধরনের যোগ্য ও সুদক্ষ শ্রমিকদের সমান পর্যায়ে আনিয়া শ্রম মূল্যকে গণিত শাস্ত্রের গণনা পদ্ধতি চালু করিতে এখন পর্যন্তও সক্ষম হয় নাই। শ্রম-মূল্য মতাদর্শের ভিত্তিতে মূল্য (Value) নির্ধারণ করিতেও সফল হইতে পারে নাই সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা-বিশারদরা।</p>
<p>বস্তুত সমাজতান্ত্রিক মুল্য নির্ধারণ পদ্ধতি যে অতিশয় অসন্তোষজনক, তাহা সর্বজনস্বীকৃত সত্য। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাড়তি মূল্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের তুলনায় অনেক উচ্চ ও বেশী। তাই উহা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের ক্ষেত্রেই তাহা বেশী প্রযোজ্য। Prof. Kantorovich linear programming-এর উদগাত। তিনি যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মূল্য গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করিয়অছেন, তাহা বিভিন্ন পণ্যের আপেক্ষিক ‍দুষ্প্রাপ্যতার ভিত্তিতে গড়িয়া উঠিয়াছে,-যেমন উহার পড়তা খরচ ধরিয়া করা হয়।</p>
<p>বড় বড় ব্যবসায়ের পরিবর্তে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া মালিকানার অধীন বহু সংখ্যক ব্যবসায় পরিচালিত হইতেছে। ফলে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থা / Corporations-সমূহ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সহকারেই সমধিক প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ট্রেড ইউনিয়নসমূহ শক্ত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হইয়াছে। শুরু তে দুইটি পদ্ধতির মধ্যে যে সামান্য পার্থক্য ছিল, এখন তাহা আদৌ পরিলক্ষিত হইতেছে না। বরঞ্চ উভয় পদ্ধতির মধ্যে সাদৃশ্য ও সাযুজ্য প্রকট।</p>
<p style="text-align: left;"><em>দুইটিই সুদের ভিত্তিতে চলে। আর তাহাই হইল সাধারণ মানুষকে শোষণ করার বড় হাতিয়ার। এই উভয় ধরনের অর্থ-ব্যবস্থার মূলে আসল অবদান ইয়াহুদীদের। আর বর্তমান দুনিয়ার অর্থনীতি যে ইয়াহুদীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত, তাহা কাহারো অজানা থাকার কথা নয়। The jews and modern Capitalism গ্রন্থ প্রণেতা সম্বার্ট(Sombart) বলিয়াছেন: <strong>The Jews were responsible for both the outward for, and finward spirit of capitalism .</strong></em></p>
<p>পঞ্চদশ ও ষষ্ঠাদশ শতাব্দীর মধ্যে (১৪৯২ খৃস্টাব্দ) ইয়াহুদীরা স্পেন (১৪৯২ খৃঃ) পর্তুগাল(১৪৯৫-১৪৯৭ খৃঃ) কলন (১৪২৪ খৃঃ) ও অন্যান্য শহর-নগর এবং পরবর্তী সময়ে কতিপয় ইতালীয় শহর হইতে বহিষ্কৃত ও বিতাড়িত হইয়াছিল। দক্ষিণ দিক হইতে তাহাদিগকে উত্তর দিকে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। তাহারা বিলাস দ্রব্যের যেমন অলংকার, সিল্ক ও মূল্যবান পাথর প্রভৃতির একচেটিয়া ব্যবসায়ের মালিক হইয়া বসে। রপ্তানি বাণিজ্যেও তাহাদের প্রাধান্য ছিল। তাহারা বহু সংখ্যক উপনিবেশ গড়িয়া তোলার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। কলম্বাসকেও তাহারা অপরিমেয় অর্থ দিয়াছিল। এই কলম্বাসও একজন ইয়াহুদী ব্যক্তি ছিল। এইভাবে আধুনিক রাষ্ট্রে তাহারাই অর্থের বড় যোগানদার হইয়া দাঁড়ায়। তাহারাই এই সব নতুন গড়িয়া উঠা রাষ্ট্রসমূহের নিকট বিক্রয় করে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ও খাদ্য। <strong>The Jewes and modern Captalism</strong> গ্রন্থে বলা হইয়াছে: <strong>“Arm in arm, the jew and the ruler stride through the age”</strong>পুঁজিবাদ যত উপায় ও পন্থা-পদ্ধতির সার্থক প্রয়োগ করিয়া সাধারণ মানুষের রক্ত শোষণ করিয়াছে তাহার সবগুলিরই অস্ত্রাগার নির্মাণ করিয়াছে ইয়াহুদীরাই। তন্মধ্যে সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থা, ঋণপত্রের (Securities) বাজার, Modern credit instruments, stock promotion, instalment selling, বিজ্ঞাপন ও আধুনিক পত্র-পত্রিকা পরিচালনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য।</p>
<p><strong>মনে রাখা আবশ্যক, ইয়াহুদীদের একটা বিশেষত্ব হইল, একবার যে ইয়াহুদী, সে সব সময়ই ইয়াহুদী-দ্বিতীয় ও তৃতীয় বংশ শাখায় পৌঁছিয়া গেলেও সে আবশ্যক থাকিবে। এই বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি ও কতকগুলি অবস্থানগত সুযোগ-সুবিধা ও ঘটনা দুর্ঘটনা দুনিয়ায় সর্বাধিক প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী হইয়া উঠিতে তাহাদিগকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করিয়াছে।</strong></p>
<p>ইয়াহুদীরা দুর্বল ও স্বল্প সংখ্যক, তাহাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তাহারা সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন ও সার্বক্ষণিকভাবে বিরাজমান, পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত। তাহাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম ও কায়-কারবার তাহাদের নিজেদের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত ও সম্পাদিত।</p>
<p>আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেশন, বিশ্ব সমিতি, ফ্রীম্যাসন, লায়ন ও রোটারী ক্লাব, বহুল প্রচলিত আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকা,বৃত্তি, সভা-সম্মেলন এবং বহু সংখ্যক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য (Visible and invisible) কর্মতৎপরতা তাহারা সমানভাবে অবলীলাক্রমে চালাইতেছে এবং তাহাতে দুনিয়ার সব ধরনের মানুষকে সচেতন বা অবচেতনভাবে জড়িত করিয়া রাখিয়াছে। আর একটা অজানা পরিণতির দিকে ঠেলিয়া লইয়া যাইতেছে এই নাবুঝ মানুষগুলিকে। সারা দুনিয়ার মানুষ ইয়াহুদীদের প্রতি যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তাহারা এই সব কর্মতৎপরতার দ্বারা তাহারই প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেছে মাত্র।</p>
<p>তাই বর্তমানে বিরাজিত এই সব অর্থ ব্যবস্থা যখন অচল হইয়া গিয়াছে, তখন তাহাদের আয়োজিত নাটকের নায়কেরা (Protogonists) শুরু করিয়াছে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে লোকদিগকে ভীত-সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিতে এবং ইসলামী অর্থব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে নানাভাবে সুদ ও জুয়ার সহিত সম্পৃক্ত করিয়া উহাকেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ করিয়া দিতে। কেননা একমাত্র এই অর্থ ব্যবস্থা-ই তাহাদের সর্বাত্মক শোষণ, স্বার্থপরতা ও ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ খতম করিয়া দিতে সক্ষম। তাহারা ভালো করিয়াই জানে ও অনুধাবন করিতে পারিয়াছে যে, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করিতে পারে কেবলমাত্র ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যবস্থা- তাহা যে রূপের ও যে আকার-আকৃতেই হউক-না-কেন। তাহাদের চালু করা বিষাক্ত সুদ প্রথা ও অন্যান্য মারাত্মক ব্যবস্থাগুলির সমস্ত খারাপ প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবকে কেবলমাত্র ইসলাম-ই পারে ধুইয়া মুছিয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সম্পূর্ণ সুস্থ ও দোষমুক্ত করিয়া তুলিতে।</p>
<p>তাই ইসলাম ও ইসলামী অর্থব্যবস্থায় প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে তাহারা নতুন বোতলে সেই পুরাতন মদ্যই পরিবেশন করিতে শুরু করিয়াছে সর্বাত্মক শক্তি দিয়া- যদিও তাহা কিছুটা পরিশীলিত করিয়া। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার পুরাতন ভিত্তির উপর তাহারা নতুন প্রাসাদ গড়িয়া তুলিয়াছে সমাজতন্ত্রের নামে। কিন্তু সমাজতন্ত্র কোন দিক দিয়াই কোন নতুন ব্যবস্থা নয়। এই জন্য শুরুতে তাহারা যে পদ্ধতিতে কাজ করিয়াছিল, এখনো অব্যাহতভাবে তাহাই চালাইয়া যাইতেছে। মূল অর্থব্যবস্থায় নিহিত আসল ক্ষতি ও দোষ-ত্রুটি তাহারা কিছুমাত্র দূর করে নাই। ফলে সাধারণ মানবতার বিপদকে দীর্ঘায়িতই করা হইয়াছে। এই কারণে আজ একথা বলা ছাড়া কোন উপায়ই নাই যে, বর্তমানে প্রচলত গোটা অর্থ ব্যবস্থাকেই উহার মূল ভিত্তি, শিকড় ও শাখা-প্রশাখা সহ সম্পূর্ণরূপে উৎপাটিত করিয়া সম্পূর্ণ নতুনভাবে এবং অবিলম্বেই ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়িত করিয়া তুলিতে হইবে।</p>
<p>আধুনিক পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইসলামী অর্থব্যবস্থা পুরাপুরি খাপ খাইয়া যাইতে পারে এবং যে কোন সময়ের যে কোন চ্যালেঞ্জকে সুষ্ঠুরূপে পূর্ণ সার্থকতা সহকারে মুকাবিলা করিতে- যে কোন সমস্যার সমাধান দিতে সম্পূর্ণ সক্ষম। একমাত্র এই অর্থব্যবস্থাই যথার্থ, স্বাভাবিক এবং সর্বপ্রকারের শোষণ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত। সেই সঙ্গে সার্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি প্রগতি ও নিরাপত্তার বিধান করা উহার পক্ষে খুবই সহজ। নির্বিশেষ সমস্ত মানুষের সার্বিক কল্যাণ বিধান কেবলমাত্র এই অর্থনীতির পক্ষেই সম্ভব। সমস্ত মানুষ জুলুম ও বঞ্চনা বন্ধ করিয়া দেয় ইসলামী অর্থনীতির বিশেষ ধন বণ্টন পদ্ধতি। ইহা মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণকে বন্ধ করিয়া তোলে। ধন-সম্পদের একীভূত পুঞ্জীভূত (concentration of wealth) হওয়া ও পারস্পরিক অসাম্য ও পুঁজিবাদের অন্যান্য অশুভ প্রতিক্রিয়ার মুকাবিলায় শক্ত প্ররোধ গড়িয়া তুলিতে পারে একমাত্র এই অর্থব্যবস্থা। সেই সঙ্গে ইসলামী অর্থব্যবস্থায় বেশী মাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত করে সুষম, সুষ্ঠু ও সুবিচারপূর্ণ অর্থ বণ্টনের মাধ্যমে।</p>
<p>ঠিক এই কারণে আধুনিক বিশ্বের বহু সংখ্যক অমুসলিম চিন্তাবিদ অর্থনীতিবিদ প্রকাশ্যে ইসলামী অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবি জানাইয়াছেন। কেননা অর্থনৈতিক দিক দিয়া বঞ্চিত নিঃস্ব সর্বস্বান্ত বিশ্ব মানবতাকে কেবল মাত্র এই অর্থ ব্যবস্থাই রক্ষা করিতে ও বাঁচাইতে পারে, বাঁচার মত বাঁচার সুযোগ করিয়া দিতে পারে। <strong>দুইজন অমুসলিম অধ্যাপকের একটা চিঠি দৈনিক Gardian পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়ছিল উহাতে তাঁহারা লিখিয়াছিলেন:</strong></p>
<p><strong>The Muslims system seems to us to have great merit. The western World should study it and perhaps adopt it in whole or in part.</strong></p>
<p>কিন্তু নিজেদের মতের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসী, নাস্তিক ও সংশয়বাদী ব্যক্তিরা ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই না জানিয়া না বুঝিয়া উহা অধ্যয়ন না করিয়া উহার প্রতি তীব্র বিদ্বেষাত্মক ও কপটতাপূর্ণ মনোভাব এখন পর্যন্ত পোষণ করে। এই কারণে প্রচলিত অর্থব্যবস্থা পূতিগন্ধময় ক্ষুদ্রায়তন জলাশয় সেচিয়া ফেলিয়া নির্দোষ-আবিলতাহীন স্বচ্ছ পানির আগমন ও প্রবাহিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করিয়া দিতে তাহারা প্রস্তুত হইতে পারিতেছে না। তাহারা উপসাহ ও বিদ্রূপচ্ছলে প্রশ্ন করে: What is Islamic economic system? &#8230;.. ইসলামী অর্থব্যবস্থা আবার কি? এই প্রশ্ন অবশ্য বহু সংখ্যক মুসলিম নামধারী চিন্তাবিদ ও নীতি-নির্ধারক ব্যক্তির মনেও ধ্বনি –প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। উঠিয়াছে হয় এই কারণে যে, তাহারা ইসলামের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অথবা ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিই তাহারা ঈমান হারাইয়া সম্পূর্ণ ভিন্নতর মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন।</p>
<p>এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি বিদ্যামূলক (Technological) উন্নতি-অগ্রগতির দৃষ্টিতে ইসলামী অর্থনীতির ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন, চিন্তা-গবেষণা এবং চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া একান্তই আবশ্যক বলিয়া মনে করি। এই কাজে ইসলামী অর্থনীতিবিদদের যাহারা আধুনিক অর্থনীতি, উহার তত্ত্ব ও ব্যবস্থা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী- আগাইয়া আসা ও তাহাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথ পালন করিতে চেষ্টা করা একান্তই কর্তব্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উৎসঃ মাওলানা আব্দুর রহিম রচিত &#8216;ইসলামী অর্থনীতি&#8217; নামক গ্রন্থের ভূমিকা থেকে নেওয়া।   এই গ্রন্থটি ১৯৫৬ সনে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 554px; top: -2px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/a-new-economy-is-needed/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15963</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা; সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের অনন্য উপমা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 07 Jul 2025 15:00:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15906</guid>

					<description><![CDATA[এক ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক</strong></h4>
<p>ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময় যখন এসব শব্দসমূহ সামগ্রিকতাকে পরিমণ্ডল করে ব্যাপৃত হতো, সেসব শব্দগুলোর প্রতিটিই আজ নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠীর স্বার্থান্বেষণের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।</p>
<p>নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠী বলতে যে শোষণ ও স্বার্থপরতার বিষবাষ্প নিঃসরণকারী মানবতার এক পরম শত্রু এবং সেকিউলারিজমের নামে রব বা সৃষ্টিকর্তাবিহীন তথাকথিত আধুনিক পরজীবী পাশ্চাত্য সভ্যতা-কে বুঝানো হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো সভ্যতায় যদি লিবারেলিজমের জনক জন লক, বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন, আখলাক বিবর্জিত মনস্তত্ত্বের জনক সিগমুণ্ড ফ্রয়েড-সহ ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্তে, থমাস হবস, ইমানুয়েল কান্ট, বার্ট্রান্ড রাসেল-এর মতো দার্শনিকদের মৌলিক ভিত্তি রোপিত থাকে—যারা দর্শন চর্চার নামে মূলত মানবজাতির রূহ থেকে মানবতা, নৈতিকতা, আখলাক, মারহামাত, আদালত দূরীকরণে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত ছিলো—তাহলে বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, এমন একটি সভ্যতার নিকট থেকে মানবতা আশা করা সত্যিকারার্থেই অমাবস্যার রজনীতে চন্দ্রালোক খোঁজার মতোই ব্যর্থ প্রচেষ্টার নামান্তর।</p>
<p>উল্লেখ্য, এখানে অনেকে হয়তো আক্ষরিক অর্থের দৃষ্টিকোণে ক্যাপিটালিজম এবং সোশালিজম ও তার আপডেট ভার্সন কমিউনিজম-এর মাঝে মরিচীকা-সদৃশ কিছু তফাত পেয়ে তাদের মধ্যকার বিস্তর ফারাক প্রমাণের প্রচেষ্টায় নত হবেন, তবে বাস্তবিকপক্ষে জায়োনিজম, লেবারেলিজম, ডায়ালেকটিজম, ক্যাপিটালিজম, সোশালিজম ও কমিউনিজম—সহ এমন সকল ইজম (ism) আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। মূলত, মানবজাতিকে নিকৃষ্টতর পদ্ধতিতে শোষণ করার নিমিত্তে সময়ে সময়ে তারা মুদ্রার পৃষ্ঠতল পরিবর্তন করে থাকে, এব্যতীত আর অন্যকিছু নয়।</p>
<p>মানবসভ্যতার শোষক স্বার্থান্বেষী পশ্চিমা দার্শনিকদের অন্যতম একজন হলেন রেনে দেকার্তে। দেকার্তিয়ান/কার্তেসিয়ান ফিলোসফি বা রেনে দেকার্তের দর্শনসমূহের প্রথম রূলস ছিলো, “I think, therefore I am” অর্থাৎ, “আমি চিন্তা করতে পারি, তাই আমার অস্তিত্ব রয়েছে”, যা তিনি ১৬৩৭ সালে তাঁর গ্রন্থ “Discourse on the Method”-এ তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ, তারা যতটুকু চিন্তা করে বা তারা যেভাবে চিন্তা করে, ততটুকুতেই তাদের অবস্থান সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে এই দর্শনটি পশ্চিমাদের দর্শনে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে, তারা তাদের মতো করেই ইতিহাসের বলয় তৈরি করে। এই দর্শনটি যেহেতু সমগ্র পশ্চিমের মৌলিক দর্শনে রূপ লাভ করেছিলো, সেহেতু তাদের অতীত ইতিহাস লিপিবদ্ধের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। এমনকি,  তাদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য সম্পূর্ণ বানোয়াট ও বিকৃত ইতিহাস লেখতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেনি।</p>
<p>এসবের উদাহরণ পাওয়া যায় তাদের ইতিহাস চর্চায়। ইতিহাসের পর্যায়ক্রম বা সময়কাল বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা তাদের সময়কালকে নিজেদের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে। তাদের পর্যায়কালকে যদি সহজভাবে উত্থাপন করা যায়, তাহলে বিষয়টা এমন হয় যে,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০২. ঐতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০৩. ভবিষ্যৎ যুগ।</li>
</ul>
<p>এখানে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলতে সহজ ভাষায় মানবজাতির পূর্ববর্তী যুগ বা ডাইনোসর যুগকে বোঝানো হয়। মানবজাতির ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে তারা ঐতিহাসিক যুগকে তিনভাগে আবার ভাগ করে। অর্থাৎ,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাচীন যুগ,</li>
<li>০২. মধ্য যুগ,</li>
<li>০৩. আধুনিক যুগ।</li>
</ul>
<p>এসবের মধ্যে প্রাচীন যুগকে তারা আবার তিনভাগে ভাগ করেছে। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. প্রস্তর যুগ,</li>
<li>০২. ব্রোঞ্জ যুগ,</li>
<li>০৩. লৌহ যুগ।</li>
</ul>
<p>এরপর, তাদের ইতিহাস অনুযায়ী মধ্যযুগের সময়সীমা ছিলো তথাকথিত ইউরোপীয় রেনেসাঁ পর্যন্ত। <strong>অথচ, তারা কাদের নিকট থেকে কীভাবে সভ্য হতে শুরু করলো, তা তারা বরাবরই লুকিয়ে রাখে। যে মধ্যযুগকে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে, সে অন্ধকার যুগ থেকেই তারা কোন পরশ পাথরের স্পর্শে রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ ঘটালো, সে বর্ণনার ক্ষেত্রেও তারা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। সে যাইহোক, তাদের তথাকথিত রেনেসাঁ-র পর থেকে তারা নিজেদেরকে দুনিয়াব্যাপী সভ্য বলে পরিচিত করতে থাকে। “প্রথমবার কীভাবে সম্পদ অর্জিত হয়, তা ধর্তব্য নয়, বরং সেসব সম্পদকে তখন সংরক্ষণ করা দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়ে”—দার্শনিক জন লক-এর এমন দর্শন ইউরোপীয়দের আরো স্বেচ্ছাচারী ও নৃশংস বানিয়ে ফেলে</strong>। মানবজাতিকে সভ্য বানানোর বুলি আওড়িয়ে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তারা সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে বর্ণনাতীত যে শোষণ ও নিষ্পেষণ চালিয়েছে, তা আজ আর কারও অজানা নয়।</p>
<p>এই হলো তাদের ইতিহাস বর্ণনার পন্থা। কিন্তু, এর বিপরীতে গিয়ে তাদেরই কথিত অন্ধকার মধ্যযুগের সময় ইসলামী সভ্যতা মানবেতিহাসের পাতায় যে ইতিহাস রচনা করেছে; সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, মারহামাত ও আখলাকের সাথে যে সমগ্র বিশ্ব পরিচালনা করেছে এবং ইসলামী সভ্যতার দর্শনসমূহ যে উপমা উপস্থাপন করেছে, তা পশ্চিমাদের স্বার্থাভিলাষের মূলে কুঠারাঘাত করে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের যে সময়কে গোল্ডেন এজ বা স্বর্ণালী সময় বলা হয়, সেসময়কে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুতেই শেষ নয়, আমরা মুসলিম উম্মাহ যেনো পুনরায় ঘুরে দাড়াতে না পারি, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” বিষয়টি নিয়ে পর্যন্ত অসংখ্য পুস্তক রচনা করেছে। অথচ, রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে স্পষ্ট বর্ণনা পাই যে, আমরা যদি জেনেও থাকি, আগামীকাল কেয়ামত সংঘটিত হবে, তবুও যেনো আমরা গাছ রোপণ করতে পিছপা না হই। এখানে, গাছ রোপণের বিষয়টি এসেছে মূলত রূপকার্থে; এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানবজাতির জন্য সকল ধরনের কল্যাণকর কাজ জারি রাখা।</p>
<p>মহান রবের একজন খলিফা হিসেবে পৃথিবী বিনির্মাণ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য; এবং আমরা তা বাস্তবায়ন করে এসেছি সুদীর্ঘ বারোশত বছরেরও বেশি সময় ধরে। মূলত, তাদের শোষণের ধারা বজায় রাখতে এবং আমাদের এই বিশ্বজনীন ও সামগ্রিক চিন্তাধারার বিরোধিতা করতে গিয়েই তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” মতবাদের উত্থান করেছে। আবার, এটাও অস্বীকার করার জো নেই যে, এই বিষয়টি থেকেই মূলত আমাদের মুসলিম উম্মাহর ভেতরে “কেয়ামত নিকটবর্তী”-এর মতো অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী একটি তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে; যা সরাসরি রাসূল (সা.)-এর হাদীস পরিপন্থী একটা চিন্তাধারা।</p>
<p>অতএব এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পশ্চিমাদের দর্শন ও তাদের ইতিহাসের সাথে আমাদের দর্শন ও ইতিহাস চর্চার মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সেহেতু, আমাদেরকে পশুসমতুল্য করা পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত থেকে মনোযোগী হতে হবে আমাদেরই রেফারেন্স, তথ্যসূত্র ও পুস্তকাদির দিকে। মোটাদাগে বলে যায়, আমাদের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে থাকতে হবে সদা-সতর্ক। আমাদের শাসন ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো বিশাল কলেবরে উপস্থাপন করে আদিল ও ন্যয়পরায়ণ শাসকদেরকে তারা যে নিকৃষ্টতর করে উপস্থাপন করে থাকে, সেদিকে আমাদের যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে। এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে এটাও আমাদের বিশেষ নজরে রাখতে হবে যে, আমাদের ইতিহাস নিয়ে তাদের প্রশংসামূলক পর্যালোচনার পেছনেও থাকতে পারে অন্যকোনো দুরভিসন্ধি; উদাহরণস্বরূপ ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ-এর কথাও ধর্তব্য হতে পারে।</p>
<p>এই বিষয়টিকে কেন্দ্রে রেখেই এবার একটু ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই</strong></h4>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র এবং সাংস্কৃতিক নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ স্রষ্টার বিশেষ মহিমাধন্য অপার এক লীলাভূমি। মহান রব যেনো এই অঞ্চল এবং তার মানুষের উপর নিজ হাতে রহমত প্রেরণ করেছেন; প্রকৃতিগত বিচিত্রতা, উর্বর ভূমি এবং জনসাধারণের কর্মঠ মানসিকতা-র মাধ্যমে এই অঞ্চলকে নেয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। ফলশ্রুতিতে, সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলের উপর শ্রেষ্ঠ সব বিজেতাদের নজর পড়েছিলো। অতএব, এটাও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বিশ্ব মানচিত্র অঙ্কনের সূচনা থেকেই এই অঞ্চলটি তার ব্যতিক্রমী প্রভাব প্রস্ফুটিত করতে থাকে।</p>
<p>ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রস্তর যুগে খ্রিস্টপূর্ব ৭০-৫০ হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে ভারতে মানবজাতির আগমন ঘটে। এরপর ১২ হাজার বছর পূর্বে ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা সুফলাচন্দ্রিকা নামক একটি অঞ্চলে কৃষির উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর থেকে কৃষি ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে থাকে। এই সময়টায় ইরানের ওদিক থেকে বিশাল জনগোষ্ঠী ভারতের এদিকে অভিবাসন করে। ভারতের স্থানীয় অধিবাসী ও অভিবাসন করে আসা জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে যে জাতির উদ্ভব হয়, তাদের হাতেই গড়ে ওঠে সুবিশাল হরোপ্পা মহেঞ্জোদারো-র বিখ্যাত সেই সিন্ধু সভ্যতা। সময়টা ছিলো তখন ব্রোঞ্জ যুগ।</p>
<p>সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তীতে যে যুগ শুরু হয়, তা হলো বৈদিক যুগ। বৈদিক যুগ মূলত ব্রোঞ্জ যুগকে অতিক্রম করে লৌহ যুগের প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলমান ছিলো। বৈদিক যুগের পরে যথাক্রমে জনপদ, পুরু জাতি, কুরু সাম্রাজ্য, ষোড়শ মহাজনপদ, নন্দ সাম্রাজ্য ও মৌর্য্য বংশ এই অঞ্চল শাসন করেছিলো। পরবর্তীতে যারা ভারত শাসন করে, তারা হলো যথাক্রমে— শুঙ্গ রাজবংশ, সাতবাহানা সাম্রাজ্য, কুষাণ সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য, কামরূপ সাম্রাজ্য, পল্লব রাজবংশ, কদম্ব রাজবংশ, চালুক্য রাজবংশ, রাষ্ট্রকূট রাজবংশ এবং পাল সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে যেসব রাজবংশ বা সাম্রাজ্যের নাম উল্লেখ করা হলো, তারা যে সমগ্র ভারতের মূল শাসক ছিলো, বিষয়টা মোটেও তেমন না। বরং, সমগ্র ভারত তখন বিশাল বিশাল সব বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ছিলো, সেহেতু পরবর্তীতে উল্লেখ করা রাজবংশ বা সাম্রাজ্যগুলো বলতে গেলে একই সময়েই তারা তাদের অঞ্চলগুলো শাসন করেছে। আর এসবের সমাপ্তি ঘটতে শুরু করে ত্রয়োদশ শতকের একেবারে উষালগ্নে, অর্থাৎ, মুসলমান কর্তৃক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর থেকে। সূচনা হয় তখন ভারত ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়, ভারতবাসী উপলব্ধি করতে শুরু করে জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা এবং অবলোকন করতে শুরু করে সমগ্র ভারতজুড়ে একই শাসকের শাসন।</p>
<p>ভারতে মুসলিম শাসনকে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. সুলতানী আমল (১২০৬-১৫২৬),</li>
<li>০২. মুঘল আমল (১৫২৬-১৭৫৭)।</li>
</ul>
<p>সুলতানী আমলকে দিল্লি সালতানাত নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সময় মুসলিমদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্য। দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলে কয়েকটি রাজবংশ ভারতকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে। তারা হলো,</p>
<ul>
<li>০১. মামলুক রাজবংশ (১২০৬-১২৯০),</li>
<li>০২. খিলজী রাজবংশ (১২৯০-১৩২০),</li>
<li>০৩. তুঘলক রাজবংশ (১৩২০-১৪১৪),</li>
<li>০৪. সৈয়দ রাজবংশ (১৪১৪-১৪৫১),</li>
<li>০৫. লোদী রাজবংশ (১৪৫১-১৫২৬)।</li>
</ul>
<p>দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলের পরে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনভার গ্রহণ করে মুঘলরা। লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল শাসনের সূচনা করেন ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কামান ব্যবহারকারী মুঘল সালতানাতের প্রথম শাসক সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর। এই সময় মুঘলদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো মারাঠা সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আসবে, তা হলো, ১২০৬ সালে যে মুসলিমরা দিল্লি সালতানাতের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসনের পুনঃসূচনা করে বটে, তবে এসবের ভিত্তিপ্রস্তর কিন্তু একদিনে স্থাপিত হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রায় কয়েকশত বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। বিগত পাঁচ শতাব্দী যাবত এই শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিলো। এই সময়ের ইতিহাসকে তিনটি ভাগে বা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম অভিযানের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়।</p>
<p><strong>প্রথম পর্যায় শুরু হয় ৭১২ সালে তরুণ বিজেতা মুহাম্মাদ বিন কাসেম-এর সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের মাধ্যমে। এই বিজয়ের পর থেকে ভারতবর্ষে মুসলিমরা গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীর পর্যায় পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। জনসাধারণও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবেই সমগ্র ভারতবর্ষজুড়ে পরিচিত হতে শুরু করে।</strong></p>
<p>এই ধারাবাহিকতায় হাওয়া লাগে দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে, অর্থাৎ, দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের মাধ্যমে। তিনি একাধারে সতেরোবার ভারত অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত ইরানের গজনভী বংশের শাসক। তিনি তাঁর অঞ্চলে যে প্রায় ত্রিশ বছর যাবত শাসন করেছিলেন, তা ছিলো ভারতের তৎকালীন স্বর্ণালী সময়। বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আবু রায়হান আল-বেরুনী ছিলেন সুলতান মাহমুদের দরবারের অন্যতম একজন সদস্য, যিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এছাড়াও সুলতান মাহমুদের সাথে সখ্যতা ছিলো মহাকবি ফেরদৌসীর, যার শাহনামা এখনও বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। উল্লেখ্য যে, শাহনামা নিয়ে সুলতান মাহমুদের বিষয়ে যা ছড়ানো হয়, তার সুস্পষ্ট কোনো দলিল বা ভিত্তি নেই।</p>
<p>এরপর, তৃতীয় পর্যায়ে এসে চিরস্থায়ীভাবে ভারতে মুসলিম শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, যার শুরুটা হয় মুইযুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরীর ভারত অভিযানের কল্যাণে। ১১৭৫ সালে মুলতান বিজয়, ১১৭৮ সালে আনহিলওয়ারা বিজয়, ১১৮২ সালে সিন্ধু বিজয় এবং ১১৮৬ সালে ত্বরাইনের প্রথম যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলেও ১১৯২ সালে ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ার্জনের মাধ্যমে ভারতে ঘুরী রাজবংশ নিজেদের শক্তিমত্তার অস্তিত্বের জানান দেয়। প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে শুরু হয় মুসলিমদের চিরস্থায়ী শাসনের উপমা নিদর্শন। এরপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেই তাঁর একজন চৌকস সেনাপতি কুুতুবউদ্দিন আইবেক-এর হাতেই স্থাপিত হয় দিল্লি সালতানাতের ভিত্তিপ্রস্তর। দিল্লি সালতানাতের সময় যে যে রাজবংশ ভারতবর্ষকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে, তাদের নাম তো পূর্বে উল্লেখিত হয়েছেই।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের পর শুরু হয় মুঘল আমল। মুঘল আমলের ছয়জন শাসক  সবচেয়ে পরিচিত। যথাক্রমে তাঁরা হলেন,</p>
<ul>
<li>০১. জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০),</li>
<li>০২. নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ হুমায়ুন ১৫৩০-১৫৪০, ১৫৫৫-৫৬),</li>
<li>০৩. জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫),</li>
<li>০৪. নূরুদ্দুন মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭),</li>
<li>০৫. শিহাবুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহজাহান (১৬২৭-১৬৫৮),</li>
<li>০৬. মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদ আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬৫৮-১৭০৭)।</li>
</ul>
<p>তাঁদের মাঝে সম্রাট আকবর এবং আলমগীর—দু&#8217;জন মিলেই শাসন করেছেন শতবছরেরও বেশি সময় ধরে। এরপর, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে শুধু বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়, যা অদ্যাবধি উদিত হয়নি।</p>
<p>যেকোনো অঞ্চলের ইতিহাসেরই উত্থান-পতন থাকে, থাকে সে সময়ের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। সে হিসেবে মুসলিম শাসনামাল বলা হোক বা ভারতের সমগ্র ইতিহাসই ধরা হোক—উভয়ক্ষেত্রেই মুঘল আমলই ছিলো ভারতবর্ষের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। আখলাক, আদালত ও মারহামাতে পরিপূর্ণ একটি সমাজ তুলে ধরেছিলো সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা, যা হতভম্ব করে দিয়েছিলো সমগ্র ভারতবাসীকে।</p>
<p>তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, মুসলিম শাসনামল যে একেবারে “ধোয়া তুলসী পাতা” বা শতভাগ নিখুঁত ছিলো, তা কোনো মুসলিম ইতিহাসবেত্তা-ই স্বীকার করেন না। এমনকি, আদালত ও আখলাকবিহীন কাজকর্মের জন্য তারাই সর্বপ্রথম শাসক বা অপরাধীদের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু, প্রতিটি রাজবংশ বা শাসকের সময়ের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফুলে ফেঁপে তুলে ইতিহাস বর্ণনা করেছে ইংরেজ ইতিহাসবীদ ও তাদের দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। এমনকি, আমরা মুসলিমরাও এখন আমাদেরই ইতিহাস অধ্যয়ন করি ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিহাস লেখকদের তথ্যসূত্রকে কেন্দ্রে রেখে। ফলশ্রুতিতে, বর্তমান ভারতে মুঘল শাসকগণ আজ নেতিবাচকভাবে পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘ দেড়-দুইশত বছর যাবত। অথচ, প্রকৃত ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।</p>
<p>এবার তাহলে সে ইতিহাসের দিকেই একটু নজর বুলানো যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>তিন</strong></h4>
<p>একেবারে শুরুতেই “ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি”—চারটি পরিভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস বর্ণনা করা হয় সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি-র। অন্যদিকে, সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, একটা ব্যতিত আরেকটা অসম্পূর্ণ। আবার এ&#8217;দুয়ে মিলে হয় সভ্যতা, আর সর্বশেষে এই সভ্যতারই ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। অতএব, এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, এসব পরিভাষা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু এসবের মাঝে রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা, সেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টি এলে অবশ্যই অন্য বিষয়গুলোও অবধারিতভাবে চলে আসবে।</p>
<p>ইতোপূর্বে মুসলিম শাসনামলের সময়কালটা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে বলা যায়, সভ্যতার ইতিহাসের কিঞ্চিৎ ফুটে উঠেছে এখানে। কিন্তু, ইতিহাস তো শুধু এভাবে বর্ণনা করলে হয় না, সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়টিও ফুটিয়ে তুলতে হয়। অতএব, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টার প্রতিও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>সহজ ভাষায় বলা হয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ হলো, সমাজের সকলে মিলে একত্রে শান্তিতে বসবাস বা সহাবস্থান করা; আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর সংজ্ঞায়ন এভাবেই করা হয়। অথচ, শুধুমাত্র সমাজের ভেতরে পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করা বা সহাবস্থান করাই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নয়, বরং ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্য এবং প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা-সহ “সমাজ”-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ই এখানে অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি এসবের প্রতিটিতেই আদালত বিরাজমান থাকে, মূলত তখনই একটি সমাজে প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>এখানেই শেষ নয়, একটি সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর ইতিহাস তখনই জানতে ও বুঝতে পারা যায়, যখন সে সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে পূর্বাপর বা সমসাময়িক অন্যান্য সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে তুলনা করা হয়, চাই সে সমাজ-সভ্যতা স্থানীয় হোক বা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সমাজ-সভ্যতা হোক। তবে এটা সত্য যে, স্থানীয় পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার সাথে তুলনা করলেই বরং তখন পার্থক্যটা আরো বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতএব, ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামল বা সমাজ-সভ্যতার সাথে তার পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার তুলনা করলে মুসলিম সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যাবে।</p>
<p>যেহেতু তুলনামূলক আলোচনাকেই কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে, সেহেতু গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ এবং আদালতের মধ্যকার পার্থক্য জানাটা সকলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বুঝার স্বার্থে আদালতকে বলা যেতে পারে ন্যায় অধিকার এবং গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ-কে বলা যেতে পারে সমান অধিকার। সকলের নিকট এটা সুস্পষ্ট হতে হবে যে, ন্যায় অধিকার আর সমান অধিকার কখনও এক বিষয় নয়। ন্যায় অধিকার হলো, যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দেওয়া। বিপরীতে, সমান অধিকার হলো, সবার মাঝে সমবণ্টন করা। সমান অধিকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, কেউ হয়তো প্রয়োজন অনুপাতেও সম্পদ পায় না আবার কেউ প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পায়। কিন্তু, ন্যায় অধিকারে কখনও তা হয় না, সবাই সবার প্রাপ্যটুকুই পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সমান অধিকারটা ন্যায় অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহর নিকট এই ন্যায় অধিকারই হলো আদালত। তবে এটা স্মর্তব্য যে, “আদালত” শব্দটি যতোটা সামগ্রিকতা ও বিস্তৃত অর্থ ধারণ করতে পারে, “ন্যায় অধিকার” শব্দটি কখনও তা পারবে না।</p>
<p>সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান বলতে যে সামাজিক একটা পরিবেশে শুধুমাত্র সহাবস্থান করাকে বুঝানো হচ্ছে না, তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, সমাজ বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত সকল দৃষ্টিকোণকে বিবেচনা করেই যেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিষয়টি ফুটে ওঠে, সেহেতু সমাজ-এর সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় থেকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>💠</strong><strong>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p><span style="font-size: 16px;">ভারতবর্ষে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় অবদান হলো, ধর্মীয় বৈষম্য বিদূরিত করা। কেননা, ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের ধর্মীয় অবস্থা অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক অবস্থায় ছিলো। তখন ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম প্রচলিত ছিলো। মহাবীর নামে এক ক্ষত্রীয় সন্ন্যাসী ভারতে জৈন ধর্ম প্রবর্তন করেন। গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম প্রবর্তন করেন, তিনি সিদ্ধার্থ নামেও পরিচিত ছিলেন। মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের সময় বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। গুপ্ত শাসনামল থেকে বৌদ্ধ ধর্মের পতন শুরু হয়। এ সময় থেকে ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনজাগরণ সূচিত হয়।</span></p>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে ভারতে হিন্দু ধর্মই ছিলো প্রধান ধর্ম। ভারতের বেশিরভাগ রাজাই ছিলেন হিন্দু। তারা হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সমাজের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিলো সবচেয়ে বেশি। বৈশ্য ও শূদ্ররা নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত ছিলো। তাদের ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করা এমনকি শোনাও নিষিদ্ধ ছিলো। দুর্নীতিপরায়ণ ব্রাহ্মণরা জনসাধারণের দুর্বলতা ভীতির সুযোগ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ব্রাহ্মণদের আক্রমণাত্মক মনোভাব বৌদ্ধদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করে। ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্যাতিত বৌদ্ধরা ভারতে আক্রমণ করতে মুসলমানদেরকে আমন্ত্রণ জানায় এবং আরবদেরকে স্বাগত জানায়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক হাবীব বলেন, <strong>❝ব্রাহ্মণগণ ইচ্ছাপূর্বক জনগণকে অজ্ঞ করে রাখতেন এবং সমাজে এভাবে তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেন।❞</strong></p>
<p><strong>ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন, ❝পণ্ডিত ব্রাহ্মণগণ ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে অত্যাচারীর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।❞</strong></p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে দিল্লির সুলতানি আমলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ভারতের মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ভারতের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো।</p>
<p>ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময় ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিলো না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে এবং ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে তোলে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p><strong>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দিল্লির সুলতানরা হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব পালনে কোনোদিন বাধা দেননি। দিল্লির সমগ্র সুলতানি আমলে অমুসলিম নাগরিকদের অর্থাৎ &#8220;জিম্মিদের” উপর কোনো ধরনের কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়নি।</strong> কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে, “দিল্লির সুলতানি আমলে অমুসলিম প্রজারা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের মন্দির ধ্বংস করা হয়। তাদেরকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়।”</p>
<p>তাদের এ বক্তব্য মোটেও সত্য নয়। কারণ, দিল্লির সুলতানি আমলে কোনো হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়নি; যদি ধ্বংস করা হতো, তাহলে প্রাক মুসলিম এবং মুসলিম আমলের মন্দির আজ আর দেখা যেতো না।</p>
<p>এটাও জানা যায় যে, কোনো কোনো সুলতান হিন্দুদের উৎসবেও যোগদান করতেন। যেমন সুলতান মুহম্মদ-বিন-তুঘলক হিন্দুদের “হোলি” উৎসবে যোগদান করতেন। সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী জৈন আচার্য মহাসেনকে ধর্ম আলোচনার জন্য কর্নাট থেকে আহ্বান করেন। এছাড়া দিগম্বর জৈন পূর্ণচন্দ্র ও শ্বেতাম্বর জৈন রামচন্দ্র সুরী প্রভৃতি জৈন আচার্যরা সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর আতিথ্য গ্রহণ করেন।</p>
<p>ইবনে বতুতা বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মুহম্মাদ-বিন তুঘলকের শাসনামলে অনেক হিন্দু কর্মচারী সুলতানী রাষ্ট্রের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি জনৈক হিন্দু কর্মচারীকে সিন্ধুর শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত করেন। সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে ছিলেন যথেষ্ট তৎপর।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>দিল্লির সুলতানী আমলের ধর্মীয় এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দের ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো মুঘল আমলেও; এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে তা আরো জোড়ালোভাবে। সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দের দৃষ্টিকোণে সুলতান আওরঙ্গজেব ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ, এই সুলতানকেই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কলুষিত করা হয়েছে। তাঁর নামেই আজ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে যে, তিনি নির্বিচারে গণহারে হিন্দুবধ করেছেন, অথচ, তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।</p>
<p>মহান এই সুলতানের বিরুদ্ধে আনীত ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো,</p>
<ul>
<li>০১. হিন্দু মন্দির ও টোল ধ্বংস,</li>
<li>০২. হিন্দু কর্মচারীদের পদচ্যুতি,</li>
<li>০৩. হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন।</li>
</ul>
<p>কিন্তু, সুলতান আওরঙ্গজেব রাজ্যশাসন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, তিনি কখনই বিধর্মীদের প্রতি অন্যায়, অবিচার এবং জোর জবরদস্তি করেননি। বরং তিনি ভারতের সকল ধর্মের জনগণের প্রতি তার সহিষ্ণুতার মনোভাব প্রদর্শন করেছেন।</p>
<p><strong>প্রথমত, </strong>এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ইতিহাস যে, আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং হিন্দুমন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর সময়ে নির্মিত দিল্লি, আগ্রা, বেনারস, মথুরাপুর, গুজরাট প্রভৃতি স্থানে নির্মিত বহু মন্দির আজও বর্তমান রয়েছে। সম্রাট কর্তৃক বেনারসের গভর্নরের নিকট লিখিত ফরমানে জানা যায় যে, তিনি বৈধ উপায়ে নির্মিত মন্দির বিনষ্ট না করার নির্দেশ দেন। প্রধানত যেসব মন্দির রাজদ্রোহ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর যে সমস্ত মন্দির গড়ে উঠেছিলো, বরং সেগুলো তিনি ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষভাগে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে এসে সম্রাটের সহিষ্ণু মনোভাবের পরিচয় পেয়েছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন,<strong> “Everyone is free to serve and worship God in his own way”.</strong></p>
<p><strong>ঐতিহাসিক শর্মাও স্বীকার করেন যে, আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে হিন্দুগণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতো। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজপুত সেনাপতি ভীমসিংহ আহমেদাবাদে প্রায় ৩০০ মসজিদ ভেঙেছিলেন। কিন্তু, আওরঙ্গজেব তাকে কোনো ধরনের শাস্তি না দিয়ে তাকে মারাঠাদের দমন করতে পাঠান।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, </strong>আওরঙ্গজেব হিন্দু কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করে সে জায়গায় মুসলমানদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন বলে যে অভিযোগ করা হয়, তা সত্য নয়। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি কতিপয় হিন্দু কেরানি, দেওয়ান ও রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি হিন্দুদের প্রতি বৈরী ও রুষ্ট হয়ে তাদেরকে পাইকারি-হারে চাকরি হতে বরখাস্ত করেন। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক দফতরে একজন করে হিন্দু-মুসলমান নিয়োগ দেন। কিছু হিন্দু কর্মচারী সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করলেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করে পূর্বপদে বহাল রাখেন। চরম বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব যশোবন্ত সিংহকে শুধু ক্ষমাই করেননি বরং তাকে যথাযচিত সম্মান প্রদর্শন করেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং বিনা অপরাধে হিন্দু কর্মচারীদেরকে পদচ্যুত করেছিলেন—এ কথা চিন্তাই করা যায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> অমুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য সামরিক কার্যের পরিবর্তে তাদের উপর আওরঙ্গজেব জিজিয়া কর ধার্য করেন। হিন্দুদের উপর থেকে প্রায় ৮০ প্রকার কর উঠিয়ে নেয়ার ফলে রাষ্ট্রের অর্থভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়ে। তারপরও হিন্দুরা অনুগত না হয়ে আক্রমণ-ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। কাজেই দীর্ঘ ২০ বছর পরে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও শত্রুভাবাপন্ন হিন্দুদেরকে নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার উদ্দেশে সম্রাট হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনরায় ধার্য করেন। ভি.ডি. মহাজন স্বীকার করেন যে,</p>
<blockquote><p>❝এই কর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার উপর ধার্য হয়নি। বস্তুত, দরিদ্র, স্ত্রীলোক, খোড়া, নাবালক ও উন্মাদগ্রস্ত ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই তিনি জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, হিন্দুদের ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে এমন একজন মহান শাসকের উপর এমন সব অভিযোগ পেশ যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেহেতু বলা যায়, এমন সব মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন মূলত ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ইতিহাসবীদদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের মনোভাবকেই বরং আরো স্পষ্ট করে তোলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<p>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর আলোচনার পূর্বে আমাদেরকে এটা বরং আগে বুঝতে হবে যে, বিনোদন ও সংস্কৃতি এক বিষয় নয়। বিনোদন মূলত সংস্কৃতিরই একটা অংশ। কেননা, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজই কোনো না কোনো সংস্কৃতির আলোকে করে থাকি। অর্থাৎ, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরের কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাতে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষ যা করে, তাই সংস্কৃতি। অতএব, সংস্কৃতির আলোচনায় শুধু বিনোদন অন্তর্ভূক্ত হবে না; বরং সমাজের সামগ্রিক বিষয়গুলোই সংস্কৃতিতে আলোচনা হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। প্রাথমিক অবস্থায় হিন্দু সমাজে উদারতা বিদ্যমান ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রাবিড়, আর্য, শক, হুন, কুষাণ প্রভৃতি জাতীয় লোকজন আসে এবং হিন্দু সমাজের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের আলাদা সত্তা হারিয়ে হিন্দু সমাজের সাথে এক হয়ে যায়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এ চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।</p>
<p>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাব উল-হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতবর্ষের সমাজে নারীদের অবস্থা ছিলো বড়ই করুণ। নারীদের অধিকার ছিলো খুবই সীমিত। নারীদের সাধারণত ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সমাজে পুরুষেরা বহু বিবাহ করতো। কিন্তু, নারীদের দ্বিতীয় বিবাহের কোনো নিয়ম ছিলো না। গ্রিকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্য যুগে সমাজে নারীদের মর্যাদা ছিলো এবং তারা সাহিত্য দর্শনে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী ছিলো। আল বেরুনী তার “কিতাব-উল-হিন্দ” নামক গ্রন্থে বৈদিক যুগের নারী জাতির উচ্চ মর্যাদার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আল-বেরুনী আরও বলেন যে,</p>
<p>❝সে সময় নারীদেরকে শিক্ষা প্রদান করা হতো এবং শাসন-ক্ষেত্রে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলো।❞</p>
<p>তবে এটা যে বৈদিক সমাজের সামগ্রিক চিত্র ছিলো না, তা আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে নারীর অপমানের বিষয়টি উঠে আসে সতীদাহ প্রথা থেকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতীয় সমাজে অনেক কু-প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিলো। অনেক কু-প্রথাকে সমাজে ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হতো। কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা, নরবলি এবং গঙ্গীয় শিশু কন্যা বিসর্জন ইত্যাদি কাজকে হিন্দুরা ধর্মীয় পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। এছাড়াও তখন দেবদাসী প্রথাও প্রচলিত ছিলো।</p>
<p>আবার ভারতের হিন্দু সমাজে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিলো। দাস-দাসী কেনা-বেচা হতো এবং প্রাসাদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এটি তখন সামাজিক অনুশাসনে পরিণত হয়।</p>
<p>মোদ্দাকথা, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিলো। সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ছিলো। জাতিভেদ প্রথা সমাজকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিলো। নারীরা ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সমাজে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। এমনকি, ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসকরা সমাজের কোনো উন্নয়নে পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি।</p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>বিপরীতে ভারতের মুসলিম সমাজের অন্য এক চিত্র দেখা যায়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আসার আগে গ্রিক, শক, হুন, পারসিক প্রভৃতি জাতির লোকজন আসে। তারা তাদের নিজস্ব কোনো সভ্যতা ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসেনি। তারা হিন্দু সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এরপর, ৭১২ সালে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর মুসলিম বিজেতারা এদেশে এক উন্নত সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে আসেন। তারা দীর্ঘদিন ভারতবর্ষে অবস্থান করেন। মুসলমানরা হিন্দুদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়নি এবং মুসলমানরা তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এন. সি. মেহতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝ইসলাম যেখানে এসেছে, সেখানেই মার্জিত রুচি এবং মর্যাদাবোধের প্রকাশ ঘটেছে। এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রত্যেক মুসলমান প্রধানত একটি সামাজিক, সহজ ও মুক্ত জীবন-যাপন করে।❞</p></blockquote>
<p>মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর ভারতের সমাজ-কাঠামোর উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ইসলামের উদার, সহনশীল নীতি ও হিন্দু সমাজের কঠোরতা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর প্রবল প্রভাব পড়ে। এর ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাছাড়া ইসলামের প্রভাবে বর্ণভিত্তিক ভারতীয় সমাজে আরও অনেক নতুন নতুন উপবর্ণ ও গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।</p>
<p>বিন কাসিমের এই অভিযানের পর ভারতবর্ষের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপা বলেন যে,</p>
<p>❝তুর্কিরা বাহ্যত স্থানীয় খাদ্য ও পোশাক গ্রহণ করে। কিন্তু, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ইসলামের কোনো কোনো সামাজিক চিন্তা ভারতীয় জীবনের অংশ হয়ে যায়। ইসলামের প্রভাবে ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু মহিলাদের মধ্যে পর্দার প্রচলন ঘটে। প্রাচীন ইরানে (পারস্য) এ প্রথার প্রচলন হলেও ভারতে আরবীয় ও তুর্কিরা এ প্রথা আমদানি করে।❞</p>
<p>এই পর্যায়ে পূর্বের একটি কথা আবারো উল্লেখ করতে হয় যে, মুসলিম শাসনামলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময়ে ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিোল না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে,</p>
<p><strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong></p>
<p>ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র-এর মতে,</p>
<p><strong>❝ভারতীয়দের সুগভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্য সম্পর্কে সমুন্নত ধ্যান-ধারণার সাথে তুর্কি ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণে শেষ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>রোমিলা থাপার মতে,</p>
<p><strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>সতীদাহ প্রথা নিয়ে বলতে গেলে ইবনে বতুতার মুহম্মাদ-বিন তুঘলককে নিয়ে একটা মন্তব্য তুলে ধরতে হয়, তিনি বলেন,</p>
<p><strong>❝সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে সর্বদা ছিলেন তৎপর।❞</strong></p>
<p>শুধু মুহাম্মাদ বিন তুঘলকই না, বরং সম্রাট বাবর, আকবর এবং আওরঙ্গজেবও সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে ভূমিকা পালন করেন। সম্রাট আকবর একবার নিজে গিয়ে এমন হিংস্র কর্মকাণ্ডে বাধা দেন এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে আইন পর্যন্ত প্রণয়ন করেন।</p>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>মোদ্দাকথা, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। মুসলমানরা ভারতে এসে এখানে শ্রেণিহীন সমাজ গঠনে ভারতীয়দেরকে উদ্বুদ্ধ করে। দিল্লির সুলতানি আমলে ভারতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর, এমনকি মুঘল আমলেও, ইসলামী ভাবধারা ভারতের সমাজ, আচার-আচরণ, ধর্ম, স্থাপত্য, শিল্প, ভাষা-সাহিত্য, সঙ্গীত ও বিজ্ঞানকে প্রভাবান্বিত করে। এভাবেই, ইসলামী ভাবধারা অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>শিক্ষা</strong><strong>, </strong><strong>সাহিত্য ও স্থাপত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম পূর্ব ভারতের অবস্থা খুবই নাজুক ও হ-য-ব-র-ল হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তারা বেশ এগিয়ে ছিলো। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সভ্যতার যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছিলো। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনামলে দেশের সর্বত্র শিক্ষায়তন গড়ে উঠেছিলো। মঠ, টোল, পাঠশালা, কলেজ এমনকি কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। বিহারে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও পশ্চিম ভারতের বালভী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ। এছাড়াও উদন্তপুর, বারানসী, বিক্রমশীলা প্রভৃতি স্থানে উচ্চশিক্ষার সু-ব্যবস্থা ছিলো। মালব ও আজমীরে সংস্কৃতি কলেজ স্থাপিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মশাস্ত্র ও বেদান্ত ছাড়াও দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হতো।</p>
<p>প্রাক-মুসলিম আমলে ভারতবর্ষে হিন্দু কাব্য, নাটক, উপন্যাস ও গদ্য সাহিত্যের বিকাশ লাভ করে। সাহিত্যিক হিসেবে ভগবতি, বাহমান, জয়দেব, রাজ শেখর, শ্রীহর্ষ, কালিদাস প্রমুখ খ্যাতি লাভ করেন। আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত ও নাগার্জুন জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত-শাস্ত্র ও চিকিৎসা-বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পে ভারতীয়রা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে। কৈলাশ মন্দির, ভুবনেশ্বর ও কোনারকের মন্দির ছাড়াও ইলোরা, অজন্তা, খাজুরাহ, গান্ধার ও সাঁচির চিত্র ও স্থাপত্য কীর্তি ভারতীয়দের উচ্চমানের শিল্প নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। এ সময় ভারতীয়রা সঙ্গীত চর্চায়ও ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে।</p>
<h4></h4>
<h4><strong>মুসলিম ভারত</strong></h4>
<p>এখন তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, তবে তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান নেই? এক্ষেত্রে উত্তর হলো, শিক্ষা-সাহিত্যে মুসলামদের অবদানের অনস্বীকার্য। পূর্বের এমন একটা ভঙ্গুর সমাজকে যে ইসলামী সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে তারা যে শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>দিল্লির সুলতানি আমলে ভাষা ও সাহিত্যের উপর ইসলামী ভাবধারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ভারতে তুর্কিদের আগমনের সাথে সাথে এদেশে ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু হয়। ফার্সি ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ফার্সি ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পারস্যের অনুকরণে ভারতেও তখন সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পরবর্তী ফার্সি সাহিত্য ভারতীয় বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত হতে থাকে। এ&#8217;ক্ষেত্রে ভারতের তোতা পাখি হিসেবে খ্যাত আমীর খসরুর ভূমিকা ছিলো সর্বাগ্রে।</p>
<p>ভারতে মুসলিম আগমনের সাথে সাথে বই লেখা ও তাতে চিত্রাঙ্কনে যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতে প্রাচীন যুগে জৈন ধর্মশাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য সেগুলোর অনেক অনুলিপি তৈরি করা হতো অথবা পুরনো বইয়ের ভিত্তিতে নতুন বই তৈরি করা হতো। পুথিগুলো ছিলো মূলত তালপাতার। চিকন ও লম্বা তালপাতার উপরে আলঙ্কারিক চিত্রাঙ্কনের কোনো ধরনের সুযোগ ছিলো না। ভারতে মুসলিম শাসনামলে এসব গ্রন্থ রচনা ও চিত্রাঙ্কনের রীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আরব বণিকরা পশ্চিম ভারতে সর্বপ্রথম কাগজ ব্যবহারের প্রচলন ঘটায়। এর ফলে জৈন ধর্মের পুথিগুলো তখন থেকে কাগজে লেখা শুরু হয় এবং তাতে চিত্রাঙ্কনের ব্যাপক সুযোগ হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা প্রভৃতি থেকে ভারতীয় ও ইসলামের সমন্বয় ঘটে। এই মুসলিমদের মাধ্যমেই আরবীয় ইউনানি (ভেষজ) চিকিৎসা ভারতে আসে। আবার ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি পশ্চিম এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>শিক্ষাকেন্দ্র</strong></h4>
<p>শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের বিষয়টি সামনে চলে আসে। সে হিসেবে মুসলিম ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিন্তু, পুরো ভারতবর্ষের সবগুলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আমাদের বুঝার সুবিধার্থে শুধু বাংলার আশেপাশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করা হলো,</p>
<h5>লক্ষ্মণাবতী গৌড় :</h5>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (১২০৪) লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়। সমসাময়িক দিল্লি দরবারের ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ ১২৪৪ সালে বাংলায় আগমন করে বাংলায় অনেক মসজিদ-মাদরাসা দেখতে পান এবং তিনি মন্তব্য করেন যে, বখতিয়ার খিলজীই বাংলায় অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করেন। বাংলায় মুসলিম অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র ছিলো লক্ষ্মণাবতী (গৌড়)। এখানে সুলতানি যুগের অনেক মসজিদ, মাদরাসা, শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, গৌড় ছিল মধ্যযুগে মুসলিম বাংলার অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র। গৌড়ের বিখ্যাত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন কাজী রুকনদ্দীন সমরকন্দী। এছাড়াও, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ দুই বছর গৌড়ে বসবাস করেন। প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ জালালুদ্দীন গজনবী এ শহরে কয়েক বছর অবস্থান করেন। এছাড়াও তিনি বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন ইওয়াজ খলজীর (১২১৩-১২২৭) সভাকক্ষে ভাষণ দেন। বিশিষ্ট কবি ও পণ্ডিত ব্যক্তি শামসুদ্দীন দবীর ও কাজী আসির বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দীন বুগরা খানের রাজসভা অলঙ্কৃত করেন।</p>
<h5>সোনারগাঁও :</h5>
<p>সোনারগাঁও ছিলো বাংলায় ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। আর এ কেন্দ্রের মধ্যবিন্দু ছিলেন বিখ্যাত পীর মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা। তিনি বোখারায় জন্মগ্রহণ করেন, খোরাসানে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দিল্লিতে আসেন। দিল্লি থেকে সরাসরি সুলতান গিয়াস-উদ্দীন বাংলায় আসেন। সোনারগাঁওয়ে এসে তিনি খানকা স্থাপন করেন। এখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলো সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাকেন্দ্র বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব ছিলো। তাঁর খ্যাতনামা শিষ্য ছিলেন পীর শরফুদ্দীন ইহইয়া মানেরী। বিখ্যাত পীর ও পণ্ডিত শেখ আলাউল হক যখন সোনারগাঁওয়ে নির্বাসনে আসেন, তখন তিনি তাঁর সংস্পর্শে আসেন এবং দু&#8217;বছর এখানে কাটান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ছিলো “মাকামাত” ও “নাম-ই-হক”। তিনি ইসলামী শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। এ মহামানব ও মহান শিক্ষক, বাংলা অঞ্চলে শিক্ষার আলোর দিশারী ৭০০ হিজরি মতান্তরে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সোনারগাঁয়ে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।</p>
<h5>সাতগাঁও :</h5>
<p>মধ্যযুগে আরেকটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো সাতগাঁও। এখান থেকে বেশ কয়েকটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, এখানে মাদরাসা তৈরি করা হয়, যার একটি ছিলো বাংলার সুলতান রুকনুদ্দীন কায়কাউসের সময়ে; যেটি ছিলো ১২৯৩ সালে কাজী আল-নাসির মুহাম্মদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি আল-নাসির মাদরাসা নির্মাণে অনেক অর্থ সাহায্য করেন এবং ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ব্যয় নির্বাহের জন্য অনেক অর্থ সাহায্য করেন। আবার বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের ১৩১৩ সালে আরেকটি মসজিদ নির্মাণের প্রমাণও পাওয়া যায়।</p>
<h5>পান্ডুয়া :</h5>
<p>পাণ্ডুয়া ছিল বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র। এটি ছিলো ধর্মীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। কারণ, শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজী, শেখ আখী সিরাজুদ্দীন উসমান, শেখ আলাউল হক, নূর কুতুব-উল-আলম, শেখ জাহিদসহ অসংখ্য পীর-আউলিয়াদের শিক্ষায় পাণ্ডুয়া ধন্য হয়েছে। মুসলিম শাসকদের রাজধানীও ছিলো পাণ্ডুয়া। বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। ফলে, পাণ্ডুয়া ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্রের পাদপীঠের মর্যাদা লাভ করে। আবার বিখ্যাত পীর হযরত নূর কুতুব-উল-আলম (র.) পাণ্ডুয়ায় একটি বড় মাদরাসা ও চিকিৎসালয় নির্মাণ করেন। পাণ্ডুয়া মূলত বহু বিদ্বান পণ্ডিতদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে কয়েকজন বিখ্যাত পণ্ডিতের আবির্ভাব হয়, যারা পান্ডুয়ার বুকে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হন।</p>
<p>এ-তো গেলো শুধু বাংলা ও তার আশপাশের অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র। দিল্লি থেকে সুদূর বাংলারই যদি শিক্ষার এই অবস্থা হয়, তাহলে দিল্লি-সহ সমগ্র ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ রচনার প্রয়োজন পড়বে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পাঠ্যক্রম</strong></h4>
<p>এবার একটু পাঠ্য তালিকার দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাত হোক বা মুঘল আমল হোক, মুসলিম ভারতের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো কুরআন, হাদিস, ধর্ম ও আইনশাস্ত্র এবং অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহ। এছাড়াও, যুক্তিবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয়ও মাদরাসায় গুরুত্ব সহকারে পাঠদান করা হতো। এই পাঠ্য তালিকার কথা বলতে গিয়ে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক আবুল ফজল বলেন,</p>
<blockquote><p>❝প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নীতিশাস্ত্র, গণিত, কৃষি, পরিমাপ-শাস্ত্র, জ্যামিতি, জ্যোতিশাস্ত্র, চরিত্র নির্ণয়বিদ্যা, গার্হস্থ্য বিদ্যা, সরকারি আইন-কানুন, চিকিৎসা বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, উচ্চতর অংক শাস্ত্র, বিজ্ঞানসমূহ, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করা উচিত।❞</p></blockquote>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা বাগদাদের আব্বাসীয় আমলের (৭৫০-১২৫৮) প্রচলিত শিক্ষানীতি ও পাঠ্য তালিকা অনুসরণ করেন। পাশাপাশি, বাংলা অঞ্চলেও তা অনুসরণ করা হয়। বাংলায় আগত মুঘল কর্মচারীরা বাংলার অনেক চিকিৎসক ও তাদের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলেছেন। বাংলার নবাবী আমলের দরবারী ঐতিহাসিকরাও তা উল্লেখ করেছেন। যেমন, “বাহারিস্তান-ই-গায়বী”-র লেখক মীর্জা নাথান এবং ”সিয়ার-উল-মুতাখখেরিন”-এর লেখক গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মতে, বাংলায় অনেক দক্ষ চিকিৎসক, হাকিম ও কবিরাজ ছিলেন। ফরাসি পর্যটক ও মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক বার্নিয়ার বাংলায় এসে বাংলার চিকিৎসক ও তাদের চিকিৎসা পদ্ধতির সম্পর্কে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ দেশের মুসলিম চিকিৎসকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। পক্ষান্তরে, শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় হিন্দুদের অজ্ঞতার কথাও তিনি স্পষ্ট করে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ভাষা সাহিত্য </strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভাষা ও সাহিত্যের পেছনে উদারতার সাথে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁরা আরবি ও ফারসি ভাষা ছাড়াও হিন্দি, সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষারও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ যুগে উল্লিখিত ভাষাগুলো ছাড়াও বাংলা, মারাঠি প্রভৃতি প্রাদেশিক ভাষাসমূহেরও যথেষ্ট বিকাশ লাভ ঘটেছিলো। মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো। <strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন, <strong>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</strong></p>
<p>বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন।</p>
<p>এই যুগে এদেশের সাধারণ প্রচলিত কথ্য ভাষার সাথে আরবি ও ফারসি শব্দ মিশ্রিত হয়ে উর্দু নামক একটি নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়। মুঘল আমলে উর্দু ভাষা যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। উর্দু-সাহিত্য চর্চা প্রথম শুরু করেন আমীর খসরু। সুলতানি আমলে আরেকজন বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক ছিলেন আমীর খসরু। ইতিহাসে তিনি “ভারতবর্ষের তোতাপাখি” নামে আজও অমর হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক নোমানী বলেন, ❝বিগত ছয়শত বছরের মধ্যে ভারতবর্ষে তাঁর ন্যায় সর্বতোমুখী প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেনি।❞</p>
<p>“খাজায়নুল ফতুহ”, “তারিখ-ই-আলাই”, “তুঘলক নামা” প্রভৃতি তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ। আমীর হাসান দেহলবী ছিলেন মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের সভাকবি ও শিল্পী। তিনি “দিউয়ান” নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। বদরুদ্দীন নামক আরেকজন উঁচুদরের কবি মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের দরবার অলঙ্কৃত করেন। এছাড়াও, সাহিত্যিক হিসেবে মালিক মুহাম্মদ যায়সী, দৌলত কাজী প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ&#8217;যুগে শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে জৌনপুর ছিলো বিখ্যাত। সেখানে বহু জ্ঞানী-গুণী, কবি ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো।</p>
<p>আবার, সুলতানি আমলে অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো। তাঁদের মধ্যে মিনহাজ-ই-সিরাজের “তাবাকাত-ই-নাসিরী”, জিয়াউদ্দীন বারানীর “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, শামস-ই-সিরাজ আফিফের “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, ইয়াহিয়া বিন-আহমদের “তারিখ-ই-মুবারক শাহী”, হাসান নিজামীর “তাজুল মা&#8217;সীর” এবং ইসামীর “ফুতুহ-উস-সালাতিন” ছিলো সেই যুগের কয়েকটি বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ। এসব ইতিহাস পাঠে সুলতানি আমলের ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক বিবরণ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।</p>
<p><strong>এছাড়াও, মুঘল আমলের ঐতিহাসিক বাদাউনী, আবুল ফজল, ফিরিস্তা, কাফিখান, আব্দুল হামিদ লাহোরী, নিজামুদ্দীন আহমদ বখশী প্রমুখ ইতিহাস লেখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। মুঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং বাবর ছিলেন একজন পণ্ডিত ও কবি। তিনি “তুযক-ই-বাবুর” লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।</strong> তাঁর আত্মচরিত ইতিহাস সাহিত্যের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তাঁর আত্মচরিত রচনা করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। হুমায়ুনের ভগ্নি গুলবদন বেগম রচিত “হুমায়ুননামা”, ফিরিস্তার “তারিখ-ই-ফিরিস্তা”, আবুল ফজলের “আকবরনামা” ও “আইন-ই-আকবরী” নিযামুদ্দীনের “তাবাকাত ই-আকবরী”, আব্বাস শিরওয়ানীর “তারিখ-ই-শেরশাহী” প্রভৃতি গ্রন্থের ঐতিহাসিক মান ছিলো অত্যন্ত উঁচুস্তরের। সাহিত্যে জাহানারা ও জেবুন্নেছা সে যুগে সুনাম অর্জন করেন। মুঘল আমলে কবি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন ফৈজী, রামদাস, সুরদাস, তুকারাম ও রামপ্রসাদ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong> স্থাপত্য শিল্প</strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রকার নতুন স্থাপত্য শিল্পের প্রবর্তন করেন। এগুলো সাধারণত মক্কা, দামেস্ক, মিসর, বাইজান্টাইন এবং ইরানের স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে ও আদর্শে নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক ফারগুসন একে “ইন্দো-সারাসিন” বা পাঠান স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক হ্যাভেল একে ভুল করে অন্তরঙ্গে ও বহিরঙ্গে হিন্দু স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্পরীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক স্যার জন মার্শাল বলেন,</p>
<p>❝ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য কেবলমাত্র বৈচিত্র্যময় স্থানীয় (আরবীয়) স্থাপত্য কিংবা শুধুমাত্র হিন্দু স্থাপত্যের সংশোধিত রীতি নয়। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য সমানভাবে না হলেও এটা উভয় উৎসের সংমিশ্রণে উদ্ভূত হয়েছে।❞</p>
<p>প্রাথমিক যুগের সুলতানরা তাঁদের ইমারত নির্মাণে স্থানীয় হিন্দু কারিগরদের নিযুক্ত করতেন। ফলে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে হিন্দু প্রভাব দেখা যায়। কাজেই ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য শিল্পে বিশেষ কতকগুলো হিন্দু শিল্পরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। পরবর্তীকালে এদেশে বিপুলসংখ্যক মুসলিম কারিগর ও শিল্পী আগমন করলে সুলতানি আমলের ইমারতগুলো নির্মাণে স্থাপত্য শিল্পে হিন্দু-প্রভাব লোপ পেতে থাকে।</p>
<p><strong>দিল্লিতে মুসলমানদের প্রথম “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটি নির্মাণে কুতুবুদ্দীন আইবেক ২৭টি মন্দিরের উপাদান ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। তাঁর নির্মিত “কুতুব মিনারটি” মূলত আজান দেওয়ার জন্য নির্মিত একটি গম্বুজ-বিশেষ। “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটির অনুকরণে কুতুবুদ্দীন আইবেক আজমীরে “আড়াই দিনকা ঝোপড়া” নির্মাণ করেন। এ যুগের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে ইলতুৎমিশ কর্তৃক বদাউনে নির্মিত মসজিদ, হাউজে শামশী, শামস-ই-ঈদগাহ প্রভৃতি ছিলো সমধিক প্রসিদ্ধ।</strong> এ&#8217;আমলে অনেক প্রাদেশিক শাসকও স্থাপত্য শিল্পের পেছনে উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। জৌনপুরী শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের স্বাক্ষর হিসেবে জৌনপুরের “অটলা মসজিদ”, “জাম-ই-মসজিদ” ও “লাল দরওয়াজা” প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিলো।</p>
<p>বাংলার স্বাধীন সুলতানগণের দ্বারা নির্মিত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, দরবেশ খানজাহান আলীর মাজার, গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, কদম রসুল মসজিদ, হুসেন শাহের সমাধি ইত্যাদি বাংলার স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়াও মালবের রাজধানী মণ্ডুতে নির্মিত জামে মসজিদ, হিন্দু মহল, জাহাজ মহল, হুসাং শাহের সমাধি, বাহাদুর শাহের প্রাসাদ, গুলবর্গার জামে মসজিদ, ফিরোজ শাহ বাহমনীর সমাধি সৌধ, মাহমুদ গাওয়ানের মাদরাসা ভবন, আহমেদাবাদের জামে মসজিদ ইত্যাদি সেই যুগের স্থাপত্য শিল্পের এক অক্ষয় স্বাক্ষর বহন করে আছে।</p>
<p>মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে ভারতীয়, মিসরীয়, ইরানি, সিরীয়, বাইজান্টাইন রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে। এ রীতির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে মুঘল আমলে।</p>
<p>মুঘল আমলের স্থাপত্যশিল্পে ভারত বিশ্ববিখ্যাত ছিলো। উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যশিল্পসমূহ হলো, তাজমহল, লালকেল্লা, ফতেপুর সিক্রি, হুমায়ুনের সমাধি ভবন এবং ইতমাদ্দৌলার সমাধি। মুঘলদের এই বিরাট কর্মযজ্ঞে অসংখ্য দক্ষ শ্রমিক আত্মনিয়োগ করেছিলো। তাদের দক্ষতায় ভারতীয় ও পারসিক শিল্পের সমন্বয়ে এক নতুন শিল্পধারা ভারতে প্রবর্তিত হয়েছিলো। এই স্থাপত্যশিল্পের মূল উপাদান ছিলো ইট, পাথর ও চুন। শ্বেতপাথর ও লালপাথরের নিখুঁত ব্যবহারে স্থাপত্য শিল্প এক অভাবনীয় মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলো।</p>
<p>এই স্থাপত্য শিল্পের সঙ্গে যেমন মুঘল রাজমিস্ত্রি জড়িত ছিলো, তেমনি এসব উপাদান সরবরাহের কাজে হাজার হাজার মানুষও ছিলো জড়িত। ইট, বালি ও পাথর শিল্প ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এ&#8217;যুগে সৌধশিল্প উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ&#8217;ধরনের উৎকর্ষ লাভ কখনই সম্ভব ছিলো না। গ্রামে ও শহরে গৃহনির্মাণকারী, খাল খননকারী, পাথর কাটার কারিগর, ইট প্রস্তুতকারী, রাজমিস্ত্রি, কাঠচেরাইকারী, খোদাইশিল্পী, পালিশের কারিগর, ছাদপেটাই মিস্ত্রি, চুন প্রস্তুতকারক, কুয়োখননকারী ইত্যাদি অসংখ্য কারিগর সহজলভ্য ছিলো। পাশাপাশি, দুর্গ, প্রাসাদ, বাড়ি, মন্দির, সেতু, রাস্তা জাহাজ ইত্যাদি নির্মাণে অনেক শ্রমিক নিয়োজিত ছিলো।</p>
<p>এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাজমহল নিয়ে সম্রাট শাহজাহান-এর নামে চরম যে মিথ্যাচার করা হয়, ইতিহাসে আদতে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনকি, ভারত সরকার পর্যন্ত এমন মিথ্যাচারিতার বিপরীত মন্তব্য পোষণ করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সঙ্গীত</strong></h4>
<p>ইসলামের প্রভাবে ভারতে সঙ্গীতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কবি, সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু সঙ্গীতের তত্ত্বগত ও ব্যবহারগত দিক দিয়ে বিশেষ দক্ষ ছিলেন। তিনি অনেক পারসিক রাগ যেমন—ইমন, ঘোর, খানম প্রভৃতি ব্যবহার ভারতে করেন। ভারতে তবলা, সেতার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব ছিল‌ো। উত্তর ভারতের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে এক বিশিষ্ট উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুসলমানদের যথেষ্ট অবদান অনস্বীকার্য। দিল্লির সুলতানি আমলে সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ঘটে। জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহীম শাহ শর্কীর পৃষ্ঠপোষকতায় উভয় ধারার সমন্বয় ঘটে। দিল্লির তুঘলক বংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটান। তাঁর সময়ে ভারতীয় ক্লাসিক গ্রন্থ &#8220;রাগদর্শন” ফার্সি ভাষায় অনূদিত হয়।</p>
<p>সম্রাট বাবর, হুমায়ুন, আকবর সঙ্গীতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, এমনকি সকলেই সঙ্গীত শাস্ত্রের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিলাস খান, লালাখান, তানসেন প্রমুখ গায়ক ছিলেন মুঘল দরবারের অলংকারস্বরূপ। তানসেনের জামাতা লালাখান, জনার্দন ভাট, মহাপট্টক, জগন্নাথ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ। আবুল ফজলের মতে,</p>
<blockquote><p>❝আকবরের দরবারে প্রায় ৩৬ জন গায়ক সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন। তানসেন-এর ন্যায় গায়ক গত দু&#8217;শ&#8217; বছরেও ভারতবর্ষে দেখতে পাওয়া যায়নি।❞</p></blockquote>
<p>মালবের বাজ বাহাদুর ছিলেন আরেকজন হিন্দি গায়ক। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে সাধক রামাদাস বিখ্যাত ছিলেন। জৌনপুরের হুসেন শাহ শরকী, বিজাপুরের আদিল শাহ এবং লখনৌর নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ মুঘল আমলের শেষের দিকে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের অকাতরে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করতেন। এসময় কলকাতায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সঙ্গীতের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে ঐতিহাসিক মোহাম্মদ শালীহ এবং তার ভাইও সঙ্গীতে বিখ্যাত ছিলেন। জাহাঙ্গীর স্বয়ং একজন সুদক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি অসংখ্য হিন্দি সঙ্গীত রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। সঙ্গীতানুরাগী বাদশাহ হিসেবে সর্বজনবিদিত শাহজাহান দিল্লির দিওয়ান-ই-খাসে প্রতি সন্ধ্যায় সঙ্গীতের আসর বসাতেন।  ঐতিহাসিক জে. এন. সরকার বলেন,</p>
<blockquote><p>❝শাহজাহানের সুমধুর কণ্ঠস্বর এতই আকর্ষণীয় ছিলো যে, বহু সুফি দুনিয়ার সকল মোহমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সান্ধ্য আসরে এসে যোগদান করতেন এবং গান শুনতে শুনতে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন।❞</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>রাজনীতি</strong><strong>, </strong><strong>প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতাপূর্ণ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। এ রাজ্যগুলোর মধ্যে ছিলো না কোনো একতা। অধিকন্তু, তাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় স্থায়িত্ব ছিলো না। আর সামাজিক দিক দিয়ে সংকীর্ণতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, বর্ণপ্রথা সমাজকে একেবারে কলুষিত করে দিয়েছিলো।</p>
<p>মৌর্য সম্রাট অশোক উত্তরে হিমালয় ও উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ পর্বতমালা হতে দক্ষিণে মহীশূর এবং পশ্চিমে পারস্যের সীমানা ও আরব সাগর হতে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে একক রাজনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করতে সক্ষম হন। খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে তার মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন উত্তর ভারতে এবং চাণক্য সম্রাট পুলকেশিন মোটামুটিভাবে ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু, তাদের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। সমগ্র ভারতবর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V.A. Smith (ভিনসেন্ট স্মিথ) বলেন, ❝ভারতবর্ষের ইতিহাসের আংশিক ঐক্য হর্ষের সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছিলো।❞</p>
<p>পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, প্রজাদের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা, গোত্রীয় বিরোধ, বিভিন্ন রাজ্যগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ-সহ ইত্যকার নানা কারণে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা একেবারে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিলো। ফলশ্রুতিতে, শাসকদের অত্যাচারে একপ্রকার অতীষ্ঠ হয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণ মুসলিম শাসকদের নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করে। অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, ভারত বিজয়ের পথ উন্মোচন হয় মূলত স্থানীয়দেরই সাহায্যের মাধ্যমে।</p>
<p>এই যদি হয় মুসলিম পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, তাহলে প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার কথা জ্ঞানীমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। রাজনৈতিক এমন বিশৃঙ্খলার সময় যে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর প্রশাসনিক কার্যক্রমই যখন এমন হয়ে পড়ে, তখন সমগ্র বিচারব্যবস্থাই যে ডুমুরের ফুলের মতো অস্পৃশ্য হয়ে পড়বে, সেটাও আর কলমের ডগায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন মনে হয় না। অধিকন্তু, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টাই যেখানে উপেক্ষিত এবং স্বার্থান্বেষণ ও স্বার্থসিদ্ধিই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে পড়ে, সেখানে বিচারব্যবস্থা যে চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর একনায়কতন্ত্রে রূপ লাভ করবে, এই বিষয়টাও সহসাই উপলব্ধি করা যায়। আবার যেখানে জাতপ্রথার নিরিখেই সমাজের ভালোমন্দের তারতম্য হয়, সেখানে আদতে বিচারব্যবস্থার নাম নেওয়াটাই বিলাসিতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>পক্ষান্তরে, মুসলিম ভারতে এর উল্টোচিত্র দেখা যায়।</p>
<p>এই প্রবন্ধের একেবারে শুরুতেই মুসলিম ভারতের ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক ধারার সফলতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এরপর একাধারে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্যে মুসলিম শাসনামলের এতোসব উৎকর্ষতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রমের শক্তিমত্তা ও সমৃদ্ধশালিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তথাপি, আরেকটু আলোচনা করা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রশাসন</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে প্রত্যেক শাসকই ভারতের প্রশাসন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ক্রমান্বয়ে যুগোপযোগী করে তোলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত থাকতেন। মুসলিম পূর্ব ভারতে যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ছিলো সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এবং হ-য-ব-র-ল, সেখানে মুসলিম শাসনামলে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে শাসন ব্যবস্থা জারি রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো দাড় করানো হয়েছিলো। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকেই স্বতন্ত্র মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। আইন, শাসন, বিচারবিভাগ-সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ প্রতিনিয়তই শাসক তদারকি করতেন। এমনকি, এগুলোর প্রতিটিরই আবার অসংখ্য সাব-ডিপার্টমেন্ট ছিলো। এছাড়াও, কৃষি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র বিভাগ বা মন্ত্রণালয় ছিলো।</p>
<p>এর বাইরেও জনসাধারণের সুবিধার্থে স্থানীয় প্রতিনিধিও নিয়োগ করা হতো। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্য-প্রধান সে রাজ্যটিকে একজন স্বাধীন শাসকের মতোই শাসন করতো। তবে, তাঁরা শাসক বা উজির/মন্ত্রীর নিকট জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ থাকতো; তাঁদের নিকট নিয়মিত জবাবদিহি করতো হতো।</p>
<p><strong>প্রশাসনিক কার্যক্রমে কখনও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়নি ভারতের মুসলিম শাসনামলে। সবসময় যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রশাসনিক কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজন কখনই প্রশ্রয় পায়নি। এমনকি এটা পর্যন্ত শোনা যায় যে, দিল্লির সুলতানি আমলে দেশীয় মুসলমানদের বিপরীতে ভিন্নধর্মী স্থানীয়দেরকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়া হতো।</strong> সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক থেকে শুরু করে ইব্রাহীম লোদী পর্যন্ত এই ৩২০ বছরে দরবারে উজির বা প্রধান সেনাপতির (সিপাহসালার) পদ কোনো ভারতীয় মুসলমান পায়নি। সেসময় অমুসলিম নাগরিকদের প্রতিই উদারতা প্রদর্শন করা হয়।</p>
<p>আবার, মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>মুঘল আমলে মনসবদারি পদ্ধতিতে সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এই মনসবদারি প্রথা মুঘলদের নতুন উদ্ভাবন নয়। মুঘলদের আগে সম্ভবত মধ্য এশিয়ায় এই প্রথা প্রচলিত ছিলো। মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং-এর শাসনামলে মনসবদারি প্রথা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো। সৈন্যবাহিনীকে বিভিন্ন পদমর্যাদার রীতি সুলতানি আমলেও চলে আসছিলো। শেরশাহ এবং তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ সেনাবাহিনীর নতুন সংস্কার সাধন করেন। বাবর ও হুমায়ুন সময় ও সুযোগের অভাবে সেনা বিভাগের তেমন কোনো সংস্কার করে যেতে পারেননি। সিংহাসনে আরোহণ করে আকবর সেনাবাহিনীর শোচনীয় অবস্থা লক্ষ্য করলে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার খাতিরে সেনাবাহিনীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শাহবাজ খানের মাধ্যমে মনসবদারি প্রথার উপর ভিত্তি করে এক অভিনব সামরিক সংগঠন সৃষ্টি করেন। তাঁর এই প্রথার মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সেনাবাহিনীর পুনঃগঠন করা। আকবর এই মনসবদারি প্রথা প্রবর্তন করে মুঘলদের সামরিক ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিচারব্যবস্থা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসকগণ আইনের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য আইন ছিলো সমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সুলতানরা বদ্ধপরিকর ছিলেন। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সব সুলতান আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন একটি শিকল বাঁধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতেন, যেনো যেকোনো বিচারপ্রার্থী খুব সহজেই সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝জনসাধারণের অভিযোগ শ্রবণের জন্য তাঁর প্রাসাদে শিকলে বাঁধা একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং অভিযোগকারীরা তা বাজিয়ে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো।❞</p></blockquote>
<p>তাছাড়া, বিচার কার্যের জন্য আইন হিসেবে কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস ব্যবহার করা হতো। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এতো বেশি কঠোর ছিলেন যে, অপরাধীরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতো। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন,</p>
<blockquote><p>❝সুলতানের (বলবন) ন্যায়বিচারের জন্য লোকে এতই ভীতসন্ত্রস্ত থাকতো যে, কেউ কখনো ভৃত্য এবং ক্রীতদাসদের প্রতি অসদাচরণ করতে সাহস পেতো না।&#8221;</p></blockquote>
<p>মুঘল আমলে সাম্রাজ্যের বিচার বিভাগীয় প্রধানকে বলা হতো “কাজী-আল-কুজ্জাত” বা “প্রধান বিচারপতি”। তাঁকে হতে হতো আইনজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ, সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ও নিষ্ঠাবান মুসলমান। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার করতেন। তাছাড়া প্রাদেশিক কাজী, সরকার কাজী, পরগণা কাজী ও কাজী-ই-আসকার (সেনাবাহিনীর সঙ্গের কাজী) বিচারকার্য সমাধান করতেন।</p>
<p>বিচারব্যবস্থায় মুফতীদের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। তাঁরা বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন না। তবে প্রয়োজনে কাজী তাঁদের ধর্মীয় বিষয়ে মতামত গ্রহণ করতেন। তারা শরিয়ত অনুযায়ী &#8220;ফতোয়া&#8221; দিতেন। যখন কাজী কোনো কারণে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারতেন না, তখন &#8220;মীর আদিল&#8221; তাঁর কার্য-সম্পাদন করতেন। তিনি কাজীর তুলনায় ঊর্ধ্বতন কর্মচারী ছিলেন।</p>
<p>মুঘল আমল ছিলো একনায়কতান্ত্রিক শাসন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস ছিলো সম্রাটের হাতে। তারপরও মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, তাঁকে যেমন শরিয়ত মোতাবেক চলতে হতো, আবার তেমনি শরিয়তের পাশাপাশি সম্রাটকে রাষ্ট্রের অভিজাত সম্প্রদায়, সেনাবাহিনী, উলামা ও আইন বিশারদদের সমর্থন লাভ করতে হতো। তাঁরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। দোষী যেই হোক না কেনো, শাস্তি তাকে পেতেই হতো। <strong>সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহানের অপরাধের বিরুদ্ধে রায় দেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধেও শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। সম্রাট আকবর বলতেন, ❝আমি স্বয়ং কোনো অপরাধ করলেও নিজের বিরুদ্ধে রায় দিবো।❞</strong></p>
<p>কাজেই বলা যায় যে, মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মুঘলদের অবদান ছিলো অপরিসীম। প্রত্যেক মুঘল সম্রাটই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন, তা ইতিহাসের পরতে পরতে প্রমাণ বহন করে চলেছে। ইসলামী আইনের চোখে সবাই ছিলো সমান। ইবনে হাসান বলেন, ❝এটা নিশ্চিত যে, মুঘল বিচার পদ্ধতি ছিলো যুগের ও সমাজের জন্য উপযোগী।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মুসলিম শাসনামলে বিচারব্যবস্থার নমুনা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে বিচার ব্যবস্থা কেমন ছিলো, তার তিনটি উপমা নিচে উপস্থাপন করা হলো।</p>
<h5><strong>প্রথম</strong></h5>
<p>সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সুলতান। সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহ একজন ন্যায়বিচারক শাসক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতিনে সুলতানের ন্যায়বিচারের একটি কাহিনী রয়েছে। তিনি একদা তীর ছুঁড়তে গিয়ে এক বিধবা মহিলার পুত্রকে হত্যা করে ফেলেন। বিধবা মহিলা তৎকালিন প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজ উদ্দিনের কাছে বিচারপ্রার্থী হলেন। প্রধান বিচারপতি নির্ভয়ে সুলতানের নামে সমন জারী করলেন। সুলতান বিচারপতির আদালতে হাজির হলে বিচারপতি কোনো রকম সম্মান প্রদর্শন না করে তাঁর বিরুদ্ধে বিধবার আনীত অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বিধবাকে ক্ষতিপূরণ দানে সন্তুষ্ট করতে না পারলে শরীয়ত মতে সুলতান দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সুলতান বিধবাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং বিধবা অভিযোগের সন্তোষজনক মিমাংসার কথা বিচারপতিকে অবহিত করেন।</p>
<p>সুলতান তখন শাহী আসন থেকে উঠে এসে বিচারপতিকে সালাম দিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার রাজ্যে এমন একজন ন্যায় বিচারক আছেন এজন্য দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। বিচারপতি, আপনি আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে আমার তরবারি দিয়েই আমি আপনার মস্তক ছেদ করতাম।❞</p></blockquote>
<p>প্রতি উত্তরে বিচারপতি বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার নির্দেশ আপনি অমান্য করলে আমিও আপনাকে বেত্রাঘাত করতাম।❞</p></blockquote>
<p>পরবর্তীতে, সুলতান বিচারপতিকে ন্যায়বিচারের জন্য পুরষ্কৃত করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>দ্বিতীয়</strong></h5>
<p>একবার সম্রাট আলমগীরের সৈন্যবাহিনী এক মুসলিম সেনাপতির অধীনে পাঞ্জাবের এক পল্লীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ পথিমধ্যে জনৈক ব্রাক্ষণের এক অপরূপ সুন্দরী কন্যার প্রস্ফুটিত গোলাপের মত মুখশ্রী দেখে লোভাতুর সেনাপতি তার পিতার নিকট মেয়েটিকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসে এবং সিদ্ধান্ত জারি করে যে, আজ থেকে এক মাস পরেই সে তার বাড়ীতে বর-বেশে উপস্থিত হবে। কন্যার পিতা নিজে সম্রাট আলমগীরের নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে বাদশার সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সম্রাট তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। সাথে এ-ও জানালেন যে, নিদিষ্ট দিনে তিনি ব্রাহ্মণের বাড়িতে উপস্থিত থাকবে। ব্রাহ্মণ নানা চিন্তার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এরপর, বিবাহের আগের দিন সম্রাট আলমগীর একাই এসে উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণের বাড়িতে। ব্রাহ্মণ হতবাক!</p>
<p><strong>সম্রাট সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণের এক পুরাতন জীর্ণ কামরায় সারা রাত এবাদত  বন্দেগী ও মোনাজাত-প্রার্থনায় অশ্রুবিসর্জন করে কাটালেন। ব্রাহ্মণের পরিবারবর্গ এ দৃশ্য দেখার পর আবারও অবাক হলেন। পরদিন মুঘল সেনাপতি বর-বেশে ব্রাহ্মণের ঘরে উপস্থিতি হলো। বিবাহের পূর্বে কন্যাকে একবার দেখা উত্তম। সেজন্য, সেনাপতি কন্যাকে দেখতে চাইলো। প্রত্যুত্তরে ব্রাহ্মণ সম্রাটের শেখানো অনুযায়ী সম্রাটের কামরার দিকেই ইশারা করলেন। সেনাপতি ঘরে প্রবেশ করেই দেখলো খোলা তরবারি হাতে সম্রাট আলমগীর বসে রয়েছেন।</strong></p>
<p>যৌবনের বুকভরা আবেগ আর মুখভরা হাসি নিমিষেই সম্রাটকে দেখার পর অদৃশ্য হয়ে গেলো। যে সেনাপতির দাপটে শত্রু সৈন্যরা থরথর করে কাঁপে, যার মাঝে ভয়-ভীতি অথবা দুর্বলতা কখনও স্থান পায় না, আজ সেই মহাবীর কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ভীষণ শব্দে যেনো কেঁপে উঠলো। নিজেকে সামলে নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করলেও দুঃখ, লজ্জা, শাস্তি আর অপমানের আশংকায় সেনাপতি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কন্যার পিতা সম্রাট আলমগীরের সুবিচার, দায়িত্ববোধ আর অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা দেখে আনন্দে বললেন,</p>
<p>❝আপনি আমার, বিশেষ করে আমার কন্যার ইজ্জত রক্ষা করেছেন। আপনার এই ঋণ অপরিশোধ্য।❞</p>
<p>সম্রাট আলমগীর ব্রাহ্মণকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করে বললেন,</p>
<p>❝এই মহান দায়িত্ব আমার। আমি যে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি এতেই আমি ধন্য।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>তৃতীয়</strong></h5>
<p>মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ছিলেন আঠারো শতকের ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল নারীদের একজন। জন্মের সময় তার নাম দেয়া হয়েছিলো মিহরুন নিসা। কিন্তু স্বামী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর পরে তার নাম পাল্টে রেখেছিলেন নূরজাহান (জগতের আলো)। নূরজাহান কবি, স্থপতি ও দক্ষ শিকারি ছিলেন। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে প্রিয়তম স্ত্রীতে পরিণত হন। সারাটি দিন তিনি নুরজাহানকে নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকতেন। নিজ স্ত্রীর বিচার করার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল হলেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ন্যায়বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।</p>
<p>সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেই সময়ে সাধারণ প্রজাদের সরাসরি সাক্ষাতের কোনো অনুমতি ছিলো না। তিনি তখন মুজাদ্দিদে আলফেসানীর পরামর্শে দরবারের বাইরের ফটকে একটি শিকল রাখেন, যেটি একেবারে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শয়নকক্ষ পর্যন্ত সংযুক্ত ছিলো, যার সঙ্গে একটা ঘণ্টাও বাঁধা ছিলো। যেকোনো অত্যাচারিত, উপবাসী, অবহেলিত কেউ অথবা রাজকর্মচারীদের দ্বারা যার কাজ সমাধান হয়নি, এমন মুসলিম-অমুসলিম প্রজা সেই শিকল টানলেই বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কক্ষে ডাকতেন এবং তাঁর সন্তোষজনক সমাধান করেই তবে ক্ষান্ত হতেন।</p>
<p>একদিন রূপ লাবণ্যের জীবন্ত প্রতীক নুরজাহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রূপচর্চা করছিলেন। এমন সময় এক বিকৃত মস্তিষ্ক হিন্দু প্রজা বিনা অনুমতিতেই নুরজাহানের কক্ষে উপস্থিত হয়ে পড়েন। নুরজাহান সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু প্রজাকে গুলি করে মেরে ফেলেন। নিহত হিন্দু প্রজার আত্মীয় শিকল টানলেন এবং জাহাঙ্গীরের নিকট নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী হলেন। <strong>বিচারকের আসনে তখন জাহাঙ্গীর এবং আসামীর কাঠগড়ায় তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহান। কঠিন এই মুর্হুতেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ভুললেন না ইসলামের বিধান। জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রীর ব্যাপারে রায় ঘোষণা করলেন মৃত্যুদন্ড। রায় ঘোষণার সাথে সাথে সকলেই হতবাক হয়ে গেলেন। স্বয়ং নূরজাহান তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এমন সময় সম্রাট জাহাঙ্গীরের মন্তব্য ছিলো,</strong></p>
<blockquote><p>❝ইসলামের আইনে তুমি তাকে হত্যা করতে পারতে কারোর প্রাণনাশের বা ব্যাভিচারের অপরাধে। কিন্তু সে দোষ তো তার ছিলো না। সে ছিলো বিকৃত মস্তিষ্ক। অতএব, আমি আবার বলছি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তোমার মৃত্যুদন্ড।❞</p></blockquote>
<p>একজন মহান শাসক কর্তৃক ইসলামের এই ইনসাফ-ভিত্তিক ন্যায়বিচার দেখে বিচারপ্রার্থী হিন্দু প্রজারা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেছিলো,</p>
<blockquote><p>❝হে ন্যায়পরায়ণ বাদশা! আমরা প্রাণদন্ড চাই না। নূরজাহানকে আমরা ক্ষমা করে দিলাম। কারণ, তিনি তো আর ইচ্ছে করে খুন করেননি। তিনি যা করেছেন তা তো নিজের আত্মরক্ষার জন্যই করেছেন।❞</p></blockquote>
<h4><strong>💠</strong><strong>অর্থনৈতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>পূর্বেই বলা হয়েছে, সমগ্র ভারতবর্ষ হলো মহান রবের নেয়ামতধন্য অপার এক লীলাভূমি। কিন্তু, এতো নেয়ামত সত্ত্বেও মুসলিমপূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ ভঙ্গুর। দু&#8217;বেলা দু&#8217;মুঠো আহারের জন্য জনসাধারণের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো। এসব বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ ছিলো, অর্থনীতির সুষমবণ্টন না থাকা এবং যোগ্য অর্থনীতিবীদ না থাকা। অবশ্য, যেখানে ধর্মের নামে অধর্ম চর্চা করা হতো, শাসনের নামে জনগণকে শোষণ করা হতো, জাতিভেদ ও জাতপ্রথা যেখানে সমাজকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিলো—সর্বোপরি, ভারতের সামগ্রিক অবস্থাই ছিলো যেখানে বিশৃঙ্খল, সেখানে অর্থনৈতিক সুদিনের বিষয় কল্পনা করাটাই ছিলো অতিরঞ্জন। বর্তমান সময়ের মতোই সেসময়েও ধনীরা হয়ে যেতো আরো ধনী এবং দরিদ্ররা হয়ে যেতো একেবারে নিঃশেষ; ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কিছুদিনের মাথায় স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে যেতো কোনো একজনের কৃতদাস। কিছুদিন পূর্বে একই ঘরে বসবাস করা একই পরিবারের সদস্যদের ঠিকানা হতো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।</p>
<p>ভারতবর্ষ ছিলো একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের এক ষষ্ঠাংশ (৬ ভাগের ১ ভাগ) রাষ্ট্রকে কর হিসেবে দিতে হতো। এ করকে &#8220;ভাগ&#8221; বলা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, মৌর্য ও গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলো। এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়। খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীতে বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতে আসেন। তিনি গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিবরণ দেন। তার মতে মগধের লোক সমৃদ্ধশালী ও ধনী ছিলো এবং তাদের মধ্যে সৎ কাজ করার প্রবণতাও ছিলো। এ সময়ে বাংলার তাম্রলিপ্তি বন্দর একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। এখান থেকে বঙ্গদেশের বণিকরা বড় বড় জাহাজে সিংহল, মালয়, যবদ্বীপ প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। ভারতবর্ষে শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। কার্পাস বস্ত্র উৎপাদন এবং রপ্তানির জন্য গুজরাট এবং বাংলাদেশ খ্যাতি লাভ করে। ঢাকার মসলিন ছিলো সেসময় পৃথিবী বিখ্যাত।</p>
<p>সে যাইহোক, ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী থাকলেও সম্পদ বণ্টন ও ভোগের ক্ষেত্রে ছিলো চরম বৈষম্য ও অব্যবস্থা। অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ লোকের জীবনযাত্রার মধ্যে ছিলো ব্যাপক ব্যবধান। সমাজের সাধারণ মানুষ যেমন—কামার, কুমার, ছুতার, স্বর্ণকার এবং কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত‌ো। কিন্তু, সুফল ভোগ করতো অভিজাত শ্রেণির লোকেরা; তারা অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>সমগ্র ভারতের ইতিহাসে চরম অর্থনৈতিক উৎকর্ষতার যুগ হচ্ছে মুসলিম শাসনামল। মুসলিমরা এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে সফলতা লাভ করেনি। মুঘলামলে এই ভারতবর্ষ সমগ্র পৃথিবীর ২৮-৩০% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। আজকের ইউরোপীয়দেরকে এই ভারতবর্ষ থেকেই স্কলারশিপ বা বৃত্তি প্রদান করা হতো। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে রাজ্য পরিচালনার জন্য নামেমাত্র কর নেওয়া হতো। কর নেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম কোনো বৈষম্য করা হতো না। যার জন্য যেটা ন্যায্য, তার জন্য সেটাই ধার্য করা হতো। মুসলিমদের জন্য যাকাত, ওশর, সদকা ও ফেতরার মতো বিষয়গুলো সেভাবেই ধার্য করা হতো। পাশাপাশি, অন্যদের জন্য অবস্থা অনুযায়ী জিযিয়া ও খারাজ গ্রহণ করা হতো। মুসলিম শাসনামলে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য আলাদা দফতর বা মন্ত্রণালয় দক্ষ হাতে পরিচালনা করা হতো। এমনকি, মুসলিম শাসকদের প্রতিটি পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং সেসব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না, তা স্বয়ং শাসক নিয়মিত তদারকি করতেন। পণ্যসমূহের বাজারমূল্য নির্ধারণ করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি শাসকগণ, বরং মুদ্রাব্যবস্থাতেও এনেছিলেন অভূতপূর্ব বিবর্তন; বিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে নিত্য নতুন মুদ্রার প্রচলনও শুরু করতেন শাসকগণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে আমলে বস্ত্রশিল্পে চরম উন্নতি লাভ করে। গুজরাট ও বাংলা ছিলো বস্ত্রশিল্পের প্রধান ঘাটি। এমনকি, এই অঞ্চলে এমনসব পোশাক তৈরি করা হতো, যেসব পোশাক তৈরিতে আবহাওয়াকে পর্যন্ত কাজে লাগানো হতো। সিল্ক, মসলিন, সুসতরি ভিরাইন, কিংখাব ছিলো সে সময়ের জগদ্বিখ্যাত সব পোশাকের নাম। শুধু পোশাকেই নয়; বরং তুলা শিল্প, পশম শিল্প, ধাতু শিল্প, জুয়েলারি শিল্প, পাথর শিল্প, কাঠ শিল্প, কাগজ শিল্প, কাঁচ শিল্প এবং চিনি শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিলো মুসলিম শাসকগণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ব্যবসা বাণিজ্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা ভারতে আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাত্রা আসে। দিল্লির সুলতানি আমল-সহ মুঘল আমলেও কেন্দ্রীয় শাসন, কৃষি-শিল্পের উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নগরায়ন ও মুদ্রা ব্যবস্থার বিকাশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। এ সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রসার ঘটে। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর সময়ে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এ সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. অভ্যন্তরীণ বা আন্তঃবাণিজ্য,</li>
<li>০২. বৈদেশিক বা বহিঃবাণিজ্য।</li>
</ul>
<p>মুসলিম শাসনামলে ভারতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিলো। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিলো প্রাদেশিক রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলো। যেমন—মুলতান, দিল্লি, আমরোহা, মীরাট, মালবের ধর, অযোধ্যা, দেবগিরি, লক্ষণাবতী, কাশ্মীর, গুজরাট, বিজয়নগর; এসব শহর ও বন্দরগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে। সেসময় বিভিন্ন ধরনের পণ্য-দ্রব্য আমদানি-রপ্তানি করা হতো। গ্রাম থেকে খাদ্যশস্য এসব বাণিজ্যকেন্দ্রে আসতো। এসব কেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি করা হতো। গুজরাটের সুরাট ও ম্যাংগ্রল হতে ঘোড়া, গম, চাল, তুলা, কাপড় এবং আরও বহু জিনিসপত্র ভারতের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার এখানে নিয়ে আসা হতো নারকেল, পালিশের শক্ত গুঁড়ো, খনিজ পদার্থ, মোম, এলাচ ও মসলা। ব্যবসায়ীরা উপকূল বাণিজ্যে দিউ, মালাবার, ভাতকল, গোয়া, চাল ও দাভোলের সঙ্গে ভালোই লাভ করতো। বারবোসা বলেছেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মালাবারের জাহাজে করে লোহা, ভাতকলের চিনি, গোলমরিচ, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, চন্দনকাঠ, সিল্ক &#8216;দিউ&#8217; বন্দরে যেতো এবং আসার সময় মালাক্কা ও চীন হতে এখানে বিশেষ করে সিল্কের কাপড়, দেশীয় বস্ত্র, ঘোড়া, গম ও আফিম নিয়ে আসতো। আবার বাংলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে করে চিনি ও কাপড় নিয়ে ক্যাম্বের ও মালাবার যেতো কমোরিন অন্তরীপ হয়ে।❞</p></blockquote>
<p>ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বরাবরই চলতো জলপথে ও স্থলপথে। ইসলামের অভ্যুত্থান ও মূর জাতির আধিপত্য হেতু ইউরোপের সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের পণ্য যাওয়ার পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। কারণ, আরব বণিকরা ভারতীয় পণ্য লোহিত সাগরে বয়ে নিয়ে যেতো; সেখান থেকে যেতো দামাস্কাস ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। তারপর, সেখান থেকে ভারতীয় পণ্য বিভিন্ন অঞ্চলে বাগদাদ ও ইউরোপে ছড়িয়ে যেতো। মূর বণিকদের দ্বারাও ভারতীয় পণ্য বিদেশের বাজারে পৌঁছে যেতো। বিশেষ করে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, সুদূর পূর্বাঞ্চলের মালয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যেতো। স্থলপথে ভারতীয় পণ্য প্রধানত চারটে দেশে যেতো, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, পারস্য ও ইরাক। মুলতান-কোয়েটা সড়ক, খাইবার গিরিপথ ও কাশ্মীর যাওয়ার রাস্তাগুলোই ঐসব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো; এই পথেই আবার বাণিজ্য হতো। বিদেশি বাজার থেকে ভারতে বিলাসদ্রব্য ও অন্যান্য দ্রব্য চলে আসতো এবং সাধারণভাবে সব রকমের প্রয়োজনীয় পণ্যের এদেশে ভালো বাজার ছিলো। আবার পারস্য উপকূলের কোনো কোনো দেশ ভারতের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল ছিলো। বারবোসার বক্তব্য অনুসারে বাংলার সাদা চিনি বিদেশে প্রচুর রপ্তানি হতো।</p>
<p>সমুদ্র বাণিজ্যে প্রধানত বাংলা ও গুজরাট বন্দরের মাধ্যমেই এই রপ্তানি বাণিজা চলতো। গুজরাটের প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো বহুমূল্য পাথর, নীল, তুলো, পশুর চামড়া এবং আরও বহু জিনিস। সুতি ও অন্যান্য বস্ত্রই ছিলো প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। গৌণ রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে ছিলো বহুমূল্য রক্তিম পাথর, তিল তেল, চন্দন কাঠ, সুবাসিত তেল, দস্তা, আফিম, নীল এবং মালাক্কা ও চীন দেশে থেকে নিয়ে আসা কিছু ঔষধপত্র। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রপ্তানি হতো গম, জোয়ার, চাল, ডাল, তৈলবীজ, সেন্ট এবং আরও অনেক দ্রব্য। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বারবোসার মতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো চিনি। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h5><strong>রাজস্ব ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>মুঘল শাসনামলে ভারতের রাজস্বব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী ছিলো। বাবর ও হুমায়ুনের আমলে সুলতানি আমলের প্রশাসন কাঠামোর উপরই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো। তবে আকবরের রাজত্বকালে মুঘলদের রাজস্ব ব্যবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন আনয়ন করা হয়। এ আমলে সুষ্ঠু নিয়ম-নীতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হতো। রাজকোষও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে বিরাট সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ, শিল্প-স্থাপত্যের উৎকর্ষ সাধন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তাদের প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন হতো।</p>
<p>সম্রাট আকবরের শাসনামলে সরকারের আয়ের উৎস ছিলো কয়েকটি। যথা,</p>
<ul>
<li>(১) ভূমি রাজস্ব,</li>
<li>(২) বাণিজ্য শুল্ক,</li>
<li>(৩) টাকশাল,</li>
<li>(৪) উত্তরাধিকার স্বত্ব</li>
<li>(৫) উপঢৌকন,</li>
<li>(৬) ক্ষতি পূরণের অর্থ।</li>
</ul>
<p>এগুলোর মধ্যে ভূমি রাজস্ব ছিলো সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। সম্রাট আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। শের শাহের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যা পরবর্তী সময়ে লোপ পায়, তা আকবর পুনরায় শুরু করেন। সম্রাট আকবর পর পর একাধিক দেওয়ানের প্রচেষ্টা পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমলকে “দিওয়ান-ই-আশরাফ” বা “প্রধান রাজস্ব সচিব” নিযুক্ত করেন এবং রাজস্ব সংস্কারের নির্দেশ দেন। সম্রাট আকবর শেরশাহের রাজস্ব ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন করেন, তা তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব ও মেধার পরিচায়ক।</p>
<p>মুঘল সম্রাট আকবরের রাজস্ব নীতির সুফল সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এসবের ফলে রাজকর সুনির্দিষ্ট হয়। রাজস্ব কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধ হয়। সম্রাটের আয় বৃদ্ধি পায়। সম্রাট বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অধিক অর্থ ব্যয় করতে পারেন। এর ফলে কৃষককুল সমৃদ্ধশালী হয়। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর আগে বার্ষিক খাজনার পরিমাণ ছিল ১৭, ৪৫,০০,০০০ টাকা। এছাড়াও,</p>
<ul>
<li>ক. কৃষকদের আর্থিক উন্নতি হয়।</li>
<li>খ. অনাবৃষ্টি ও খরাজনিত কারণে কর মওকুফ হয়।</li>
<li>গ. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।</li>
<li>ঘ. দৈনন্দিন ব্যবহারের দ্রব্যাদির মূল্য হ্রাস,</li>
<li>ঙ. জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়,</li>
<li>চ. গরু, ষাঁড়, লবণ প্রভৃতির উপর নির্ধারিত কর বাতিল।</li>
</ul>
<p>এসব প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V. A. Smith বলেন,</p>
<p>❝সংক্ষেপে বলতে গেলে, আকবরের রাজস্ব শাসন ছিলো প্রশংসনীয়। নিয়ম-কানুন ছিলো বিজ্ঞচিত এবং কর্মচারীবৃন্দকে জনগণের প্রতি সদয় হতে বাস্তব নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>কৃষি-ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরদিনই ছিলো কৃষিনির্ভর। ভারতের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ লোকের জীবিকাই ছিলো কৃষি। মুঘল সম্রাটরা কৃষির প্রতি বিশেষ নজর দেন। মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থা যে খুব খারাপ ছিলো তা বলা যায় না। যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা সে যুগে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মুঘল আমলে মুঘল প্রশাসন ও অভিজাতবর্গ ছিলো কৃষিজাত আয়ের উপর নির্ভরশীল। মুঘল আমলের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অপেক্ষা যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থার পরিচয় বিখ্যাত আফ্রিকার শাসক ইবন বতুতার বিবরণ থেকে জানা যায়। বারবোসা, মাহুয়ান ও বার্থেমার বিবরণ থেকেও ভারতের কৃষি ও শিল্পের অনেক তথ্য পাওয়া যায়।</p>
<p>পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতীয় কৃষকরা অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করতেন। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে মোট ৪১ রকমের রবি ও খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। তিনি আগ্রা অঞ্চলে ১৬টি রবি শস্য ও ২৫টি খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। শূন্য পুরাণ থেকে জানা যায় যে, ৫০ রকমের চাল বাংলায় উৎপাদন হতো। ভারতীয় কৃষকরা অন্যান্য দেশ থেকে আনা নতুন শস্যও উৎপাদন করতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার ২টি নতুন পণ্য—তামাক ও ভুট্টা এদেশে উৎপাদিত হতে থাকে। নদীমাতৃক ভারতবর্ষের মাটি পলিমাটি দ্বারা গঠিত হওয়ায় জমি ছিলো খুবই উর্বর। বছরে ২ থেকে ৩ বার ফসল উৎপাদন হতো। সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী “বাবরনামা” থেকে জানা যায় যে, বৈচিত্র্যের জন্য উৎপাদন ছিলো ভারতীয় কৃষকদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের পশ্চিম উপকূলে তামাকের চাষ শুরু হয় এবং পরবর্তী ৫০ বছরের মধ্যে সমগ্র মুঘল-ভারতে তামাকের চাষ সম্প্রসারিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রে ভুট্টা চাষ হতো। মরিচ চাষ মুঘল-ভারতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃদ্ধি পায়। আলু ইউরোপীয় বণিকরা আমেরিকা হতে এদেশে আনেন। কফি দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে সামান্য উৎপাদিত হতো, কিন্তু তা চাষ ভারতীয় কৃষকদের অজানা ছিলো।</p>
<p>ধান, পাট, গম, কার্পাস, তৈলবীজ, আদা, মরিচ, রেশম এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল, বার্লি এবং আরও অসংখ্য রকমের রবিশস্য ও ইক্ষু ভারতের মাটিতে ভালো ফলতো। মুঘল নথিপথে অর্থকরী ফসলকে “জিনিস-এ-কামিল” বলা হয়েছে। কার্পাসের পাশাপাশি ইক্ষু ছিলো এই ধরনের অর্থকরী ফসল। নানাবিধ ফল-মূল ও শাক-সবজির চাষ মুঘল যুগে হতো। বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন শস্যের ভিত্তিতে আজকের মতো সেসময়ও শস্য উৎপাদনে খ্যাতি অর্জন করেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার</strong></h4>
<p>এখন এতোসব আলোচনার পরিসমাপ্তিতে একটা প্রশ্ন বা মন্তব্য আসতে পারে যে, ভারতের মুসলিম শাসনামলের সাথে পূর্বের শাসনামলের তুলনামূূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ পাওয়া গেলেও শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে তো হিন্দু-মুসলিম তুলনা করা হয়নি, বরং এই দু&#8217;টি সেক্টরে পূর্বের সাথে তুলনা করে উন্নতি ও উৎকর্ষতা দেখানো হয়েছে।</p>
<p>এর উত্তরে এখানে দু&#8217;টি বিষয় আসবে। যথা,</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সামগ্রিক, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণও সেজন্য হয় সামগ্রিক। কখনও এভাবে দু&#8217;টি ধর্মের জন্য কাজ করে না ইসলামী সভ্যতা। বরং, মুসলিমদের নিজেদের ভেতরে মারহামাতপূর্ণ একটা সমাজ বিনির্মাণ করে তারপর সমাজের সকলকে একসাথে নিয়ে আদালত ও মারহামাতপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী সভ্যতায় হিন্দু-মুসলিম বলে আলাদা কোনোকিছু ছিলো না। কেননা, এখানে হিন্দুদের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও বড় একটা অংশ বসবাস করতো। এমনকি, এই বৌদ্ধ জনসাধারণই মুসলিমদেরকে ভারত অভিযানে আমন্ত্রণ জানায়।</p>
<p>আবার, হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সহাবস্থান বজায় রাখা বা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি সেক্টরে হিন্দু-মুসলিম একত্রে কাজ করাটাই শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের উদাহরণ নয়, বরং মুসলিম সমাজের মাঝেও যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগে থাকে, সে সমাজকেও সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটা সমাজ বলা যায় না। অতএব, এখানে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান বলে আদতে কিছুই নেই। যা আছে তা হলো, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষকে নিয়ে আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূর্ণ একটি সমাজ বিনির্মাণ করা; যা ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী ভারতীয় উপমহাদেশে প্রমাণ করে দেখিয়ে এসেছে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong></p>
<p>হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় যেভাবে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উপমা পেশ করা হয়েছে, সেটার সাথে তুলনা করে অবশ্য শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে সে উপমা পাওয়া যায় না; বরং এখানে উন্নতি ও অগ্রগতির বিষয়টাই তুলনামূলকভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু, এখানে আরেকটা বিষয় উঠে আসে যে, প্রাক-মুসলিম ভারতে যেসব সেক্টরে সুস্পষ্টরূপে অসামাজিকতা বা সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিপরীত কার্যক্রম লক্ষ্য করা যেতো, সেসব সেক্টরগুলোকে ধরে ধরে মুসলিম ভারতের সময়কার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>আবার যেখানে রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-বিষয়টা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে অর্থনীতিতে যে স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তখনই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যায়, যখন শিক্ষা-সাহিত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সমানভাবে শিক্ষা অর্জন করতে পারে। কেননা, সঠিক শিক্ষা ব্যতীত কখনই ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নিদর্শন পাওয়া যায় না। সে হিসেবে, যেখানে তুলনামূলক পার্থক্য দেখানোর প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেটাই করা হয়েছে; এবং যেখানে মুসলিম শাসনামলের উন্নতি ও সমৃদ্ধি উপস্থাপনের প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেসব বিষয়ই উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অতএব, পরিসমাপ্তিতে বলা যায় যে,</strong></p>
<p>সার্বিক আলোচনায় এবং সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসে মুসলিম শাসনামল বা ইসলামী সভ্যতাই একমাত্র সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা পেশ করেছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, নারী, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতি-সহ সমাজ নামক বিষয়টির সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রতিটি বিষয়েই ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নিশ্চিত করেছিলো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূ্র্ণ যে সমাজের নিদর্শন উপস্থাপন করেছিলো, তাবত ভারতীয় ইতিহাসের আর কোনো সভ্যতাই সে নিদর্শন পেশ করতে সক্ষম হয়নি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানই নয় শুধু, বরং খোদ ভারতের ১০০কোটি মানুষও এখন আবারও ইসলামী সভ্যতার সামাজিক অবকাঠামো অর্থাৎ নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটি সমাজের জন্য মুখিয়ে আছে। পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন ভারতের যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, আর কোথাও থেকে হোক বা না হোক, যে বাংলার ভূমি থেকেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, সেই বাংলার উর্বর জমিন থেকেই আবারো স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাওলাঃ</strong></p>
<p>১. ইসলাম ও জ্ঞান, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
২. আন্তর্জাতিক শোষণ ও মুক্তির পন্থা, হাসান আল ফিরদাউস।<br />
৩. সাম্রাজ্যবাদ, ফাহমিদ-উর-রহমান।<br />
৪. দাওয়াম, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
৫. পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম।<br />
৬. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক।<br />
৭. আলিম ইসলামের ইতিহাস, লেকচার পাবলিকেশন্স।<br />
৮. মুসলিম ভারতের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।<br />
৯. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (মুঘল আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১০. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (সুলতানি আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১১. মুসলিম প্রশাসনব্যবস্থা, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।<br />
১২. মুসলিম প্রশাসন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ, ড. মুহম্মদ আলী আসগর খান, শেখ মুহম্মদ লুৎফর রহমান, মোখলেছুর রহমান।<br />
১৩. সোনারগাঁও: বাংলায় ইলমী সিলসিলার অনন্য মিনার, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম।<br />
১৪. সুলতানী আমলে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার উৎপত্তি ও বিকাশ, ড. আব্দুল করিম।<br />
১৫. মুসলিম শাসনে ন্যায়বিচার, তোফাজ্জল বিন আমীন।<br />
১৬. বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা হাসান আল ফিরদাউস (মিহওয়ার ৪র্থ সংখ্যা)<br />
১৭. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ডক্টর এম. এ রহিম।<br />
১৮. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খান।<br />
১৯. আমাদের জাতিসত্ত্বার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।<br />
২০. বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15906</post-id>	</item>
		<item>
		<title>স্বাধীনতার আড়ালে থেকে যাওয়া কথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Jun 2025 08:31:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15875</guid>

					<description><![CDATA[আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সাবেক পাকিস্তানের আমজনতার আর্থসামাজিক উন্নয়ন। কেবলমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কল্যাণ সাধন নয়। শেখ মুজিব তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজোরিটি পার্টির নেতা।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শেখ মুজিব নিজেকে সাবেক পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন। কেবলই পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন না। তিনি নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন সাবেক নিখিল পাকিস্তানকে; কেবলমাত্র বাংলাদেশকে নয়।</p>
<p>অনেকে বলছেন, শেখ মুজিব হলেন, আজকের বাংলাদেশের জনক। কিন্তু তিনি নিজে এ ধরনের কোনো মনোভাব পোষণ করেননি। তিনি চেয়েছেন সাবেক সমগ্র পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিতে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের অনেক রকম বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের একটি শুদ্ধ নমুনা পাওয়া যাবে ‘স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা’ নামক পুস্তিকায়। বইটি সম্পাদনা করেন, ফজলুল হক বাঙ্গালী, মেসবাহউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম। (প্রকাশনা ও প্রচার সংস্থা, মুজিবনগর, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত (১৯৭১)।)</p>
<p>এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রদত্ত Legal Framework Order (1970) মেনে। যাতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান হবে একটা প্রজাতন্ত্র ও ফেডারেশন। এর রাষ্ট্রিক মতাদর্শ (Ideology) হতে হবে ইসলাম এবং এই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হতে পারবেন না। এই মূলনীতিসমূহের সঙ্গে কোন অসঙ্গতিপূর্ণ সংবিধান রচিত হলে প্রেসিডেন্ট (ইয়াহিয়া) পারবেন তা বাতিল করে দিতে।</p>
<p>১৯৭১-এর পর পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই ভিন্ন হয়ে পড়েছে। ১৯৯৮ সালে ১১ মে ভারত রাজস্থানের মরুভূমিতে ভূগর্ভে তার নিজের তৈরি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে ভারতের চাইতে পিছিয়ে নেই। <strong>১৯৯৮ সালের ২৮ মে বেলুচিস্তানের মরুভূমির ভূগর্ভে পাকিস্তান ঘটায় তার তৈরি পাঁচটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ। এরপর ঐ একই সালে আরো শক্তিশালী পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় পাকিস্তান। যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় হইচই। কারণ, পাকিস্তান একটি ধনী রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তান বানাতে পেরেছে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বোমা।</strong></p>
<p>গুজব রটে পাকিস্তান খুব সস্তায় পরমাণু বোমা তৈরির কৌশল আবিষ্কার করতে পেরেছে। ভারত যা পারেনি। পাকিস্তান যদি সস্তায় পারমাণবিক বোমা তৈরি করে অন্য দেশে বিক্রি করে, তবে তার পরিণতি দাঁড়াতে পারে ভয়াবহ। কিন্তু পাকিস্তান এভাবে বোমা তৈরি করে বিদেশের কাছে বিক্রি করেনি। রেখেছে কেবল নিজের প্রতিরক্ষার জন্য সংরক্ষিত। পাকিস্তান এখন তৈরি করতে পারছে এমন রকেট, যার সাহায্যে তার পক্ষে সম্ভব ভারতের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ। সমর বিজ্ঞানের দিক থেকে পাকিস্তানকে অবহেলা করা যায় না।</p>
<p>পরিস্থিতি পাল্টেছে ঠিকই। কিন্তু সেটা যে ভারতের জন্য অনুকূল হয়েছে, এরকম ভাববার কোনো কারণ নেই। ভারত এখন মিত্রবিহীন দেশ। কিন্তু পাকিস্তান ঠিক তা নয়। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে চীন গড়েছে নৌঘাঁটি। কাশ্মিরের কাছে চীন গড়েছে এমন সড়ক, যার মাধ্যমে সে যে কোন সময় লাদাঘ অঞ্চলে সৈন্য পাঠাতে পারে। শ্রীলঙ্কার উত্তরে জাফলা অঞ্চলেও চীন নৌঘাঁটি গড়ে তুলেছে বলে প্রকাশ। নেপালের সাথে চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন হতে পেরেছে খুবই উন্নত। বেইজিং থেকে কাঠমান্ডু এখন সহজেই আসতে পারা সম্ভব। আমাদের দেশে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর দল ভারতকে যতটা শক্তিমান ভাবছেন, ভারত আসলে সে পর্যায়ে এখনো এসে পৌঁছাতে পেরেছে বলে মনে করবার কোনো হেতু নেই। আওয়ামী লীগ যদি মনে করেই থাকে যে, বাংলাদেশে সে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হতে পারবে, তবে মনে হয় সে ভুল হিসাবই করছে।</p>
<p>শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে ঠিক কী চেয়েছিলেন আমরা এখনও তা জানি না। ইন্দিরা গান্ধী একটি বই লিখেছেন My Truth নামে। বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন, স্কোয়াড্রন লিডার (অব:) মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম। তিনি বইটির নাম দিয়েছেন ‘আমার সত্যকথন’। এই বইতে ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে : ‘তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ভাবপ্রবণ, উষ্ণ হৃদয়ের লোক, যিনি একজন আইনপ্রণেতার চেয়ে পিতৃসুলভ ব্যক্তিত্বের বেশি অধিকারী ছিলেন। উপরন্তু তিনি সংগ্রামের বেশির ভাগ সময় দূরে অবস্থান করেছিলেন। আমি বলতে চাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় তার চিন্তাধারা, জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বতন্ত্র ছিল, যারা এ সকল বিষয়ে অংশ নিয়েছিলেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমি মনে করি না যে তিনি তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই তাঁরা যা কিছু করেছিলেন, তাঁর (মুজিব) নামে ও তাঁর জন্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি এ সকল লোকদের গুরুত্ব দেননি, বরঞ্চ তাদের গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। এতে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী ছিল।’</p>
<p>এখন আওয়ামী লীগ দাবি করছে, শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। এতে তিনি বলেন- তিনি যতদূর জানেন, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায়ের পথ এখনও রুদ্ধ হয়ে যায়নি। তিনি তার সেই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, শেখ মুজিব হলেন একজন মধ্যপন্থী নেতা। তিনি কোন বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত নন। শেখ মুজিব একজন মার্কিনবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিও নন। আসলে একসময় তার বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল যে, তিনি মার্কিন ঘেঁষা নেতা।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথায়- And he is not an extremist, he was a moderate person. In fact, if I may use the term, he used to be called by some others an American stooge at one time। ইন্দিরা গান্ধী তার এই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর। তার আগে নয়। শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশে ঘটেছে বিরাট গণহত্যা। বাংলাদেশে মানুষ তাই ভাবতে শুরু করে স্বাধীন হওয়ার কথা। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথা-……the cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as know, has not asked far independence, even now. but after he was arrested, after there was this tremendous massacre, it people should say: ` after this how can we live together? we have to be separate.’</p>
<p>বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, হাজার বছরের বাঙালির কথা। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর উপরোক্ত কথা যথার্থ হলে বলতে হবে শেখ মুজিব ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামনা করেননি। শর্মিলা বসু তার ডেড রেকনিং বইতে বলেছেন- ইন্দিরা গান্ধী সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যা বলেছিলেন, সেটা ছিল একটা ধাপ্পা। কারণ তিনি নিজে নিচ্ছিলেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করার নামে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিরাট যুদ্ধের প্রস্তুতি। কিন্তু ধাপ্পা হলেও ইন্দিরা গান্ধী যা বলেছেন, তা থেকে প্রমাণিত হয় না, শেখ মুজিব চাচ্ছিলেন পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে। শেখ মুজিবের লক্ষ্য নিয়ে তার মনেও ছিল সংশয়।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে India Speaks নামক বইতে। বইটি ভারত সরকারের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে প্রচার করা হচ্ছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। আর বলা হচ্ছে শেখ মুজিব ছিলেন, এই জাতীয়তাবাদের জনক। যার ভিত্তিতে বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভব সম্ভব হতে পেরেছে। কিন্তু ১৯৭১-এর দলিল দস্তাবেজ আমরা যা হাতের কাছে পাচ্ছি, তা সমর্থন করছে না আওয়ামী লীগের দাবিকে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বলেন যে, তিনি পাকিস্তান ভেঙে দিতে যাচ্ছেন না, তিনি চাচ্ছেন বর্তমান পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Link) বজায় রাখতে। সাংবাদিক মাসকারেনহ্যাসের এই কথার প্রতিবাদ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ করেছে বলে আমার মনে হয় না।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে তার দুইজন উপদেষ্টার ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন হলেন দুর্গাপ্রসাদ দার (ধর); আর একজন হলেন পি এন হাক্সার। এরা উভয়েই ছিলেন জন্মসূত্রে কাশ্মিরের লোক। আর এরা উভয়েই ছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। এদের দু’জনের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের ২৫ বছরের শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তিনিও ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর খুবই আপন লোক। ইন্দিরা গান্ধী হয়তো ভেবেছিলেন শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে আর কখনই ফিরবেন না। তার প্রাণদণ্ড হবে। এর ফলে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ ও তার দলের লোকদের সহায়তায় করে চলতে পারবেন।</p>
<p>কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টু জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে। ফিরে আসতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁকে বাংলাদেশে আসবার জন্য; যাতে বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি। তিনি পাকিস্তান থেকে ৮ জানুয়ারি পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে করে যান লন্ডনে। সেখানে যেয়ে দেখা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথের সঙ্গে। লন্ডন থেকে তিনি ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি বিমানে করে আসেন নায়াদিল্লি। দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে।</p>
<p>তারপর ঐ একই ব্রিটিশ বিমানে করে যাত্রা করেন ঢাকায়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আপত্তি তুলেছিল। বলেছিল, ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করে ঢাকা যাওয়া ঠিক হবে না। কেননা, গ্রেট ব্রিটেন তখনও বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেনি। কিন্তু শেখ মুজিব তাদের আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করেই এসে পৌঁছান ঢাকায়। কেন তিনি এরকম করার প্রয়োজনীয়তা দেখেছিলেন, সেটা এখনও জানা যায়নি। গ্রেট ব্রিটেন বাংলাদেশকে একটা পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে।</p>
<p>শেখ মুজিব সরাসরি পাকিস্তান থেকে নয়াদিল্লিতে না আসায়, ভারতে সৃষ্টি হতে পেরেছিল দারুণ প্রতিক্রিয়া। এ সময় আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় ট্রামে বাসে লোককে বলতে শুনেছিলাম, শেখ মুজিবুর রহমানকে ইন্দিরা গান্ধীর অতটা বিশ্বাস করা উচিত হয়নি। এ রকম কথাও কথা অনেককে বলতে শুনেছিলাম যে, ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহরলাল নেহেরু সৃষ্টি করেছিলেন একটি পাকিস্তান, তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী সেই একটি পাকিস্তানকে খন্ডিত করে সৃষ্টি করলেন দুটি পাকিস্তান। যার ফলে ভারতে পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়েই পড়ল।</p>
<p>বাংলাদেশ হওয়ার পর শেখ মুজিব চান বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে কোন বিবাদ-বিসম্বাদে না জড়াতে। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। শেখ মুজিব এর পরপর যান লাহোরে। সেখানে তিনি যোগ দেন ওআইসি সম্মেলনে। এবং বাংলাদেশকে করেন ওআইসির সদস্য। শেখ মুজিব কেবল বিশুদ্ধ বাঙালি হতে চাননি। তাঁর মধ্যে কাজ করেছে একটা মুসলিম উম্মাহ চেতনা। তিনি চাননি বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিযুক্ত করে রাখতে।</p>
<p>এরপর ১৯৭৪ সালে ২৭ জুন জুলফিকার আলী ভুট্টু ঢাকায় আসেন শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে। জেড এ ভুট্টু ঢাকায় ছিলেন তিন দিন। এ সময় মুজিব ও ভুট্টুর মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্বন্ধ নিয়ে হয়েছিল হৃদ্যতাপূর্ণ আলোচনা। শেখ মুজিবকে জুলফিকার আলী ভুট্টু আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানে যেতে। শেখ মুজিব গ্রহণ করেছিলেন সেই আমন্ত্রণ। বর্তমানে পাকিস্তানের অধিবাসীরাও চাচ্ছেন না বাংলাদেশের সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ। বর্তমানে পাকিস্তানে এখনো বাস করছেন প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ ও তাদের বংশধর। পাকিস্তান চাচ্ছে না এদের বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিতে। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ চাচ্ছে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে রাজনীতি করতে। কিন্তু শেখ মুজিব সেটা চাননি। বর্তমান আওয়ামী লীগ আর সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগকে এক করে দেখা যায় না।</p>
<p>অন্য দিকে আর একটি কথা ভুলে গেল চলে না যে, সারা ব্রিটিশ-ভারতে মোট মুসলমানের সংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ ছিলেন বাঙালি মুসলমান। আসলে তারা চেয়েছিলেন বলেই সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভায় পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। আজ কথায় কথায় বলা হয় পাকিস্তান আমাদের ওপর চেপে বসেছিল। কিন্তু ইতিহাসে এর সমর্থন মেলে না।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15875</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী অর্থনীতিতে ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-role-of-islamic-institutions-in-islamic-economics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-role-of-islamic-institutions-in-islamic-economics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. আসাদ জামান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 May 2025 07:06:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15849</guid>

					<description><![CDATA[“কোন দলটি উত্তম, যারা আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির উপর তাদের ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলো তারা, নাকি তারা-যারা একটি পতনোন্মুখ পাহাড়ের কিনারায় তা স্থাপন করেছিলো, যা তাদের সাথে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পড়ে গিয়েছিল?” ইসলামী আইন অথবা সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ইসলামী অনুশীলনের উপর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>“কোন দলটি উত্তম, যারা আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির উপর তাদের ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলো তারা, নাকি তারা-যারা একটি পতনোন্মুখ পাহাড়ের কিনারায় তা স্থাপন করেছিলো, যা তাদের সাথে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পড়ে গিয়েছিল?”</p>
<p>ইসলামী আইন অথবা সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ইসলামী অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে কিছু অনন্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো একটি ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই বিলুপ্ত বা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। আধুনিককালের সকল সমাজকে একই পথ অনুসরণের ধারণার কারণে ইসলামী ঐতিহ্যগুলো শুধুমাত্র ঐতিহাসিক মূল্য রাখে, বর্তমানের জন্য সেগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। ইসলামী বিশ্বে ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর আত্মশক্তি পুনরুদ্ধার এবং তাদের পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চলছে। উপরে উদ্ধৃত কোরআনের আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠার পিছনের উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমসাময়িক চাহিদার সাথে খাপ খাওয়ানো বা আধুনিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইসলামী শরীয়তের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চ্যালেঞ্জটি হলো, ইসলামী আদর্শ ও লক্ষ্যের মধ্যে টানাপোড়েন এবং ঔপনিবেশিক/আধুনিক/ইসলামী কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য যা সারা বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনকে উৎসাহিত করে তোলে। সামনে আমি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, ওয়াকফ (ট্রাস্ট বা এনডাউমেন্ট), হিসবাহ বা বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে পৃথক পৃথক বিভাগে আলোচনা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h6>ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ</h6>
<p>ইসলামে সুদের উপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সুদ-ভিত্তিক লেনদেনের কেন্দ্রিকতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রথম বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো সুদের বিকল্পের বিকাশ। এই বিষয়ে সাহিত্যের একটি বিশাল ভাণ্ডার আছে; সিদ্দিকীর (২০০৪) একটি সাম্প্রতিক জরিপে যা উঠে এসেছে। আমি এ সমস্যা সমাধানের তিনটি ভিত্তি নিয়ে নিচে আলোচনা করছি,</p>
<ul>
<li><strong>প্রথম ভিত্তি,</strong></li>
</ul>
<p>সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ উপায় হলো এই যুক্তি দেওয়া যে, আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যে সুদ প্রচলিত তা কোরআনে নিষিদ্ধ সুদের মতো নয়। এই পথটি খ্রিস্টান ও ইহুদিদের দ্বারা বেছে নেওয়া পথের সমতুল্য, একাধিক প্রচেষ্টা সত্তে¡ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণ এটিকে অস্বীকার করেছেন। মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, কোরআন হলো আল্লাহর নাযিলকৃত বাণী এবং হাদীসে ধারণ করা ঐতিহ্যগুলো মৌলিকভাবে সঠিক। জোন্স (১৯৮৯) দেখান যে সুদের উপর বিধিনিষেধের পুনঃব্যাখ্যা আক্ষরিক না হয়ে রূপক হিসেবে খ্রিস্টান বিশ্বের স্বার্থকে বৈধ করার একটি মৌলিক পদক্ষেপ ছিলো।</p>
<ul>
<li><strong>দ্বিতীয় ভিত্তি,</strong></li>
</ul>
<p>দ্বিতীয় ভিত্তি হলো, বিদ্যমান আধুনিক প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা, যা ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক পরিচালিত হয়। এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হওয়ায় আরও বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে। এম.এন. আইয়ুব (২০০২) এবং জাহের ও হাসান (২০০১) কীভাবে সুদ ছাড়াই কাজ করতে পারে এমন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। এবিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স বই হলো IIBI (১৯৯২) কর্তৃক প্রকাশিত The Encyclopedia of Islamic Banking and Insurance। ইকবাল এবং খান (২০০৪) ‘ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর মাধ্যমে এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নকশা তুলে ধরেন, যা পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি পূরণ করে এবং শরীয়ত মোতাবেক পরিচালিত হবে। সুদ এবং সুদের সাথে সম্পর্কিত নৈতিক বিপর্যয় রোধে খ্রীস্টানদের গৃহীত পন্থার সাথে এ নকশার বিস্তর ফারাক রয়েছে;  জোনস(১৯৮৯)।</p>
<ul>
<li><strong>তৃতীয় ভিত্তি,</strong></li>
</ul>
<p>তৃতীয় একদল লেখক বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান পুঁজিবাদী কাঠামো থেকে আমূল আলাদা এবং এই ধরনের কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিপ্লবের প্রয়োজন; উদাহরণস্বরূপ দেখুন, আনসারি (২০০০), তাসিন (২০০১) এবং ভাদিল্লো। প্রকৃতপক্ষে, অধিকাংশ মুসলিম চিন্তাবিদগণ এবিষয়ে একমত যে, মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো একইধরণের অমুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমূল আলাদা, কিন্তু রূপান্তরের জন্য উপযুক্ত কৌশল নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয় পথটি (আগের অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে) হলো বিবর্তনীয় পরিবর্তন এবং বিদ্যমান পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অনুশীলনে পরিবর্তন সাধনের একটি উপায়, যাতে ইসলামী শরীয়তের গুরুতর লঙ্ঘন থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় এবং একটি ইসলামী ব্যবস্থার মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সূচনা হয়। হাফিজ এবং আল-হাসান (২০০৬) এর মতো বিপ্লবী পদ্ধতির সমর্থকরা অবশ্য বিশ্বাস করেন যে, এই ধরণের পদ্ধতিগুলো বাস্তবে কার্যকরী নয় এবং আদর্শ পদ্ধতির সাথে আপোষ করার ফলে ইসলামের বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হয়ে যাবে।</p>
<p>তৃতীয় পদ্ধতির প্রাথমিক ধারণা এবং ইসলামী বীমার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ গাজী এবং অন্যদের গবেষণাপত্রের (১৯৯২) তৃতীয় অধ্যায়ের ভূমিকায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের প্রতিলিপি বা পরিবর্তন করার পরিবর্তে একটি প্রতিষ্ঠান কোন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে সে দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করা উচিত। যদি এই উদ্দেশ্য ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে তা অর্জনের জন্য ইসলামী বিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। মিরাখোর (২০০৭) ঐতিহাসিক প্রমাণ সরবরাহ করেন, যা পরামর্শ দেয় যে, ঐতিহ্যবাহী ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপযুক্ত পরিবর্তন একই ধরণের পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে বেশ দক্ষতার সাথে কাঙ্খিত উদ্দেশ্য সম্পাদন করতে পারে।</p>
<p>আধুনিক পুঁজিবাদী আর্থিক ব্যবস্থাগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে এবং আজ ব্যাক্তিগত ও সরকারী উভয়ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহায়তাকারী একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। যেমনটি অনেক লেখক উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিম সংস্কারকগণ একটি বড় অসুবিধার সম্মুখীন হন, কেননা আর্থিক ব্যবস্থা হলো একটি সমন্বিত ও সুসংহত কাঠামো, এবং একটি ইসলামী ব্যবস্থার জন্য টুকরো টুকরো পরিবর্তন রচনা, পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। ট্রাস্ট ও জনসাধারণের স্বার্থের উপর ভিত্তি করে সুদমুক্ত  একটি ইসলামী ব্যবস্থা দ্বারা বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন একটি কঠিন কাজ, এর জন্য একই সাথে বিভিন্ন ফ্রন্টে পরিবর্তন এবং হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।</p>
<p>কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, অর্থ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা, স্টক এক্সচেঞ্জ, সরকারী অর্থ ও ঋণ পরিচালনা, বন্ধক, সুদভিত্তিক উপকরণ ছাড়াই স্থিতিশীল আয়ের ধারা সৃষ্টি এবং অন্যান্য ভোক্তা ঋণের জন্য প্রস্তাবনা নিয়ে প্রচুর পরিমাণে লেখালেখি (এবং অনেক বিতর্ক) রয়েছে। বিদ্যমান পুঁজিবাদী উপকরণের বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো সুকুক (বন্ডের একটি ইজারা এবং বাই-ব্যাক বিকল্প), যা একটি তাত্তি¡ক প্রস্তাব থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামী অর্থের বৃহত্তম উৎসগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। প্রাসঙ্গিক সাহিত্য জরিপ করার পরিবর্তে আমরা উপরে উল্লিখিত তৃতীয় ভিত্তি অনুসরণ করি এবং আর্থিক সমস্যার ইসলামী সমাধানের মূলনীতিগুলো এবং বর্তমান পুঁজিবাদী সমস্যাগুলোর থেকে কীভাবে সেগুলো আলাদাÑতা নিয়ে আলোচনা করি। প্রথমত, একটি আর্থিক ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ভিত্তি নিয়ে আলোচনা, দ্বিতীয়ত জনগণের আমানতের নিরাপত্তা প্রদানের উপায় এবং তৃতীয়ত কীভাবে সেই আমানতগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি</h5>
<p>একটি ইসলামী অর্থনীতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে গঠন করা হবে, তা দেখার জন্য আমাদের অবশ্যই এই ধারণাটির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে যে, চ‚ড়ান্ত অর্থে অর্থ হলো একটি মাধ্যম বা উপায়, যা একটি ইসলামী অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এটি পুঁজির অন্তহীন সঞ্চয় ধারণার বিপরীত, যা পুঁজিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং যার মধ্যে অর্থে উপার্জনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো, আরও অর্থ উপার্জন করা। ইসলামের দাবি হলো, মানুষের জীবন, তার সম্পদ ও সকল প্রচেষ্টা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হওয়া উচিত। কোরআনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সাফল্যের জন্য অর্থ ব্যয় করার বিষয়াদি নিয়ে অসংখ্য উপদেশ রয়েছে (কোরআন ২৮:৭৭) এবং মূল্যবান সামাজিক প্রকল্পের জন্য অর্থ ব্যয় করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সহযোগিতা ও আস্থার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজে ব্যক্তিরা ন্যূনতম সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের উপর নির্ভর করতে পারে, কেননা তারা তাদের বিপদের সময় অন্যদের সহায়তা লাভ করতে পারে। অনেক ইসলামী বিধান এই ধরনের সহযোগিতার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, অপরিচিত ব্যক্তিরা আতিথেয়তা লাভের অধিকারী। একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো, ম্যালকম এক্স (১৯৬৫,পৃ. ২১৩) তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় লিখেছেন যে, “আমেরিকাতে আমার অভিজ্ঞতা আমাকে এই বিশ্বাসের দিকে পরিচালিত করেছে যে শ্বেতাঙ্গ এবং অ-শ্বেতাঙ্গের মধ্যে কখনও একতা এবং ভ্রাতৃত্বের চেতনার অস্তিত্ব থাকতে পারে না&#8230;।”</p>
<p>সহযোগিতা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করার ধারণার উপর সাধারণ আপত্তি হলো, এটি শুধুমাত্র ছোটো কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যেই সম্ভব, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো সহজেই টিকিয়ে রাখা যায়। ভৌগলিকভাবে ব্যাপকভাবে লেনদেন ছড়িয়ে থাকা বৃহৎ জনসংখ্যার মধ্যে এটা নিশ্চিত করা হয় যে, শুধুমাত্র আধুনিক বেনামী এবং চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারে। যাইহোক, এই মতের বিপরীতে যথেষ্ট দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, লোপেজ (১৯৭৬) দেখান যে ‘বাণিজ্যিক বিপ্লব’ এর (৯৫০-১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ) যুগে তৎকালীন পরিচিত বিশ্ব জুড়ে অবাধে শরীয়ত সমর্থিত ‘আর্থিক ঝুঁকি ভাগাভাগি’ পদ্ধতি দ্বারা সমর্থিত বাণিজ্য সচল ছিলো, যার বিকাশ হয়েছিলো মুসলিম দেশগুলোতে। মিরাখোর (২০০৭) উল্লেখ করেছেন যে, সুদভিত্তিক চুক্তির চেয়ে এই পদ্ধতিগুলোর জন্য বেশি আস্থার প্রয়োজন এবং পরামর্শ দেন যে, ক্রুসেড, মোঙ্গোল আক্রমণ ও বিউবোনিক প্লেগ দ্বারা বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে আঘাত আসে, তা মানুষের বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয় এবং পরবর্তীতে ব্যবসার প্রভাবশালী পন্থা হিসেবে সুদভিত্তিক লেনদেন উদ্ভবের দিকে পরিচালিত করে। আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য, আমরা লক্ষ্য করি যে ইতিহাস আমানত ও পারস্পরিক সহযোগিতার ইসলামী প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে একটি বিশ্ব অর্থনীতির বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রমাণ করে, যদিও সমসাময়িক বিশ্ব অর্থনীতিতে এগুলো পরিকল্পনা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা সৃষ্টি করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সঞ্চয়</h5>
<p>উপরে আলোচিত কিছু উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আমাদের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান আমানত-কে পুনরুজ্জীবিত ও আধুনিকীকরণ করতে হবে। আগেকার যুগে মানুষ বিশ্বস্ত লোকদের কাছে নিজেদের সম্পদ আমানত রাখতো। আমাদের ‘দারুল আমানত’ এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান দরকার, যা নিরাপদে আমানত রাখার কাজটি সম্পন্ন করবে। এটি আধুনিক ব্যাংকগুলোর অন্যতম প্রধান কাজ, যা অবশ্য মুনাফাভিত্তিক। আমাদের দার আল-আমানাহ সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এর একটি প্রাথমিক কাজ হবে আমানতকারীদের আমানতের মূল্য সংরক্ষণ করা। আধুনিক সময়ে এর জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন প্রয়োজন, যেহেতু কাগজের টাকা আগের সময়ের সোনার সমতুল্য নয়। এমন হতে পারে যে, আমানতকারীকে একটি সীমাবদ্ধ সম্ভাবনার অনুমতি দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে আমানতের মূল্য একটি সম্মত সূচক অনুসারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমানতগুলো স্থিতিশীলতার জন্য অপ্টিমাইজ করা মুদ্রার একটি বান্ডিলে সংরক্ষণ করা যেতে পারে, বা ভোগ্যপণ্যের স্থানীয় সূচীযুক্ত ঝুড়ি আকারে, বা আরও নির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যতের বিশেষ প্রয়োজন, যেমন শিশুদের শিক্ষার ব্যয়ভারের জন্য চুক্তি করা যেতে পারে। কিছু মুসলমানের দ্বারা ব্যাংক-সুদের পক্ষে দেওয়া মূল যুক্তিটি হলো আমানতের প্রকৃত মূল্য হ্রাস করার জন্য মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা। প্রস্তাবিত ধরণের একটি প্রতিষ্ঠান সুদের আশ্রয় না নিয়ে এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সামাজিকভাবে লাভজনক প্রকল্পের জন্য আমানতের ব্যবহার</h5>
<p>আধুনিক ব্যাংকগুলোর একটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো উদ্বৃত্ত অর্থ জমা করা এবং তা বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করা। প্রতিষ্ঠান এবং (সাধারণত কিছু পরিমাণে) আমানতকারী উভয়ের সুবিধার জন্য সঞ্চয়ের মূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরি করা হয়েছে; সামগ্রিকভাবে, যে উপায়ে তহবিল বিনিয়োগ করা হয়, তা ব্যাঙ্কের ব্যক্তিগত উদ্বেগ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ব্যবস্থাটি সম্পদের ঘনত্ব বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে।</p>
<p>এর পরিবর্তে আমাদের দারুল আমানত মানুষ ও সমাজের কল্যাণে বিনিয়োগ করতে পারে, সামাজিক সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করতে এবং সম্পদের ইসলাম প্রদর্শিত প্রবাহমানতার দিকে পরিচালিত করে। এই প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সামাজিক কল্যাণের জন্য সর্বোত্তম সুযোগ সন্ধান করা (এর আমানতকারীদের পক্ষে) এবং এই ধরনের সুযোগগুলোতে বিনিয়োগ করা। শুরুতে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে জমাকৃত সম্পদের উপর যাকাত ধার্য করা যায়, তাহলে এ পরিমাণ সম্পদ দাতব্য কাজে ব্যবহারের জন্য সে দায়ী থাকবে। উপরন্তু, যথেষ্ট পরিমাণে সম্পদ কর্জে হাসানা (দাতব্য উদ্দেশ্যে তৈরি একটি সুদ-মুক্ত ঋণ) হিসেবে ব্যবহারযোগ্য থাকবে, ঠিক যেমন প্রচলিত ব্যাংকগুলো রিজার্ভ/তারল্যের একটি ক্ষুদ্রাংশ থেকে অর্জন করতে পারে। এই ধরনের ব্যবহার অবশ্যই আমানতকারীদের সম্মতিতে হতে হবে। যাইহোক, ইসলামের ইতিহাসে এই ধরনের অসংখ্য ঘটনা এবং নজির রয়েছে।</p>
<p>উপরে যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, দরিদ্রদের সাহায্য করা এবং সমাজের কল্যাণের জন্য কাজ করা কেবল মুসলমানদের দায়িত্বই নয়, তারা এটি করার সর্বোত্তম সুযোগগুলো সন্ধান করার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত হয়। ঠিক যেমন আধুনিক ব্যাঙ্কগুলো এই দুনিয়ায় সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগগুলো সন্ধান করে, তেমনি দারুল আমানত পরকালে সর্বোত্তম বিনিয়োগের সন্ধান করবে (সমর্থনের জন্য সর্বোত্তম সামাজিক কারণ)। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হতে পারে মানুষকে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা করা; যেহেতু এ ধরণের বিনিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল আছে।</p>
<p>মুসলিমরা যুক্তি-তর্ক দিয়ে এ ধারণা পেশ করেছেন যে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং কেউ কেউ এটিকে আদর্শবাদী, আবেগী এবং অবাস্তব বলে সমালোচনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরণের কার্য সম্পাদনকারী বড় বড় ফাউন্ডেশন এবং দাতব্য সংস্থা  ইতোমধ্যেই সারা বিশ্বে বিদ্যমান, যদিও মূলত সেগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ইসলামী নীতির একটি পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, যা এই প্রেরণা ও অনুশীলনগুলোকে কেন্দ্রীয় ও আধুনিক ব্যাংকিং অনুশীলনকে প্রান্তিক করে তুলবে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানুষ ও সামাজিক পুঁজির গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক (২০০৬) দেখায় যে, মানুষের দক্ষতা হলো জাতীয় সম্পদের প্রধান উপাদান; আরও বলে যে, উপরে প্রস্তাবিত ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত উন্নয়ন কৌশলগুলোর চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও দক্ষতার সাথে এগিয়ে নিতে পারে। অধিকন্তু, কাহফ (২০০০) এবং হক্সটার ও অন্যদের (২০০২) গবেষণায় উপস্থাপিত ঐতিহাসিক প্রমাণগুলো পরামর্শ দেয় যে, এ ধরণের কার্যকলাপ অতীতে ইসলামী সমাজে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ঘটেছে। ইসলামী চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্য ইসলামী চেতনা ব্যবহার করার সম্ভাবনা মালয়েশিয়ায় তাবুং হাজি দ্বারা ব্যাপক সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে, যা মুসলমানদের হজ্জ পালন ও এই উদ্দেশ্যে সঞ্চয়-এ উদ্বুদ্ধ করে; বিস্তারিত জানার জন্য ওজঞও (১৯৯৫) দেখুন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক অর্থ</h5>
<p>পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারী/আমানতকারীদের অর্থকে আরও অর্থোপার্জনের জন্য ব্যবহার করা। বিপরীতে, ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই ইসলামী শরীয়ত (অর্থ সংগ্রহ, বিনিয়োগ এবং ব্যয়ের প্রক্রিয়ায়) এবং চেতনার (কাক্সিক্ষত সামাজিক লক্ষ্য, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি এবং সহযোগিতার প্রচারে) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। সুদ এবং প্রতিযোগিতার নীতিগুলো যা পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থাগুলোর ভিত্তি, তা সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বিকাশের জন্য প্রতিক‚ল। বিশেষত, উপরে শুরু হওয়া সুদের আলোচনাকে আরও বিকাশের জন্য, নিচে আরো দুটি যুক্তি তুলে ধরা হলো, যা ইসলামী মূলনীতির সাথে সুদের দ্ব›দ্বকে সুস্পষ্ট করে তোলে। যথা :</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong></p>
<p>বিনিয়োগ ক্রিয়াকলাপগুলো অবশ্যই কিছু অংশীদারিত্বের উপর ভিত্তি করে হতে হবে, যার অনেকগুলো রূপ এবং প্রকরণ সম্ভব। এ অংশীদারিত্ব নিছক আর্থিক নয়; অংশীদারদের ব্যবসার ভাগ্য ভাগাভাগি করে নিতে হয়। এইভাবে, শাইলকের আইনী চুক্তির প্রয়োগ নিয়ে মুসলমানদের কোনো সমস্যা নেই, বরং কষ্টের সময়ে অ্যান্টোনিওর জন্য তার মধ্যে যে সহানুভূতির অভাব দেখা গিয়েছিলো, তা মুসলমানদের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। সুদভিত্তিক চুক্তিগুলো ইসলামী চেতনার পরিপন্থী। কারণ সেখানে ব্যবসায়িক ফলাফল নির্বিশেষে ঋণদাতাকে পরিশোধ করতে হয়, প্রয়োজনে জামানত থেকে তার শরীরের ও মাংসের পাউন্ড তুলে নেয়। আধুনিক সময়ে বন্ধকগুলোর ফোরক্লোজারের সময় একই ধরণের কাজ করে, যেখানে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষক এবং বাড়ির মালিকদের আর্থিক বিপর্যয়ের সুবিধা নেয়। সুদভিত্তিক লেনদেন অন্যের ভাগ্যের প্রতি উদাসীনতা বাড়ায় এবং তা সহযোগিতা ও সম্প্রদায়ের অনুভূতির বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong></p>
<p>হালাল হওয়ার জন্য উপার্জন অবশ্যই উৎপাদনশীল কার্যকলাপ বা বাস্তব পরিষেবার উপর ভিত্তি করে করা উচিত। একজনের প্রয়োজনের বাইরে আর্থিক সম্পদের মালিকানা কোনো উৎপাদনশীল কার্যকলাপ নয়। যাইহোক, উদ্যোগ-যার মধ্যে বিচার-মিমাংসা, ভালো ব্যবসার সুযোগ নির্বাচন এবং এই ধরনের নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত ঝুঁকি নেওয়া জড়িত-একটি উৎপাদনশীল কার্যকলাপ। এভাবে প্রকৃত পণ্য এবং পরিষেবাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ন্যায়-ভিত্তিক লেনদেন ইসলামে অনুমোদিত, নিখাদ আর্থিক লেনদেনগুলো নয়; এ ইসলামী চেতনা আধুনিক ব্যাংকিংয়ের চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক, যেখানে প্রকৃত লেনদেনে ব্যাঙ্কের জড়িত হওয়া প্রায়শই আইনীভাবে নিষিদ্ধ-ব্যাংক শুধুমাত্র একটি বিশুদ্ধ আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। যদিও প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে ইসলামী উদ্দেশ্যগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায় না, কিছু পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান ইসলামী আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাই এগুলোকে ইসলামী অর্থনীতির মডেল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের বর্তমান বিনিয়োগ ব্যাংকে ব্যবহৃত কিছু কৌশল এবং উদ্যোগ কাজে আসে এবং তাই এগুলো অনুকরণ করা যেতে পারে। কারণ, এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর দ্বারা ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেয়া হয়, যা মূলত ইসলামী শরীয়ত মেনে চলে। ছোটো থেকে মাঝারি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তহবিলের একটি উপযুক্ত উৎস হতে পারে। বর্তমান পশ্চিমা আর্থিক উপকরণগুলোকে ইসলামী শরীয়তের দাবির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর প্রায়োগিক সমস্যা দেখা দেয়; এর একটি সহজবোধ্য সারাংশের জন্য উসমানির (২০০০) লেখাটি দেখা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>তাকাফুল (বীমা)</strong></h5>
<p>আতিকুজ্জাফর খান (২০০৫) এর মতে, ইউরোপ এবং উসমানী খেলাফতের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে মুসলমানরা প্রথম বীমা অনুশীলন সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলো। আমি অনুমান করি যে, ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক উভয় জীবনেই সমবায়ের অনুশীলন বীমার প্রয়োজনীয়তাকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। এ কারণেই ৪/১০ এবং ৮/১৪ শতকের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইসলামী আধিপত্যের সময় ব্যাপক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থাকা সত্তে¡ও বীমার প্রয়োজন বা বীমা প্রবর্তন হয়নি। বীমার অনুমতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ইসলামী শরীয়ত প্রণেতারা সাধারণত নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, আতিকুজ্জাফর খান (২০০৫) বিংশ শতাব্দীতে বীমা সংক্রান্ত মুসলিম চিন্তাবিদদের সম্মিলিত রায়ের ইতিহাস দিয়েছেন। যদিও তারা বীমার  উপযোগিতাকে স্বীকার করেছে, তারা দেখতে পেয়েছে যে, এটি বিভিন্ন কারণে ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।</p>
<p>প্রথমত, একটি বীমা চুক্তিতে যাবার (প্রাপ্ত পণ্য বা প্রদত্ত মূল্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা) থাকে; ক্ষতির ক্ষেত্রে একটি বড় অংকের পাওনা পরিশোধ হতে পারে, কিন্তু ক্ষতি না থাকলে, এই ধরনের অর্থ পরিশোধ করা হয় না। গড় পরিসংখ্যান আইন ‘অনিশ্চয়তা’ দূর করে বা হ্রাস করে-এমন যুক্তিগুলো ইসলামী পণ্ডিতদের দ্বারা বিবেচনা করা হয়েছে এবং প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। উপরন্তু, <strong>একটি বীমা চুক্তি জুয়া খেলার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা নিষিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে বীমাকৃত এবং বীমাকারী দৈবভাবে একটি ঘটনা ঘটার উপর বাজি ধরে। এছাড়াও, পরিশোধের প্রয়োজন হলে, বীমাকৃত ব্যক্তি পুরস্কার হিসেবে প্রদত্ত অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ পান। এটিকে সুদের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা নিষিদ্ধ।</strong> সবশেষে, ‘অর্জিত’ মজুরির সমস্যা রয়েছে-বীমা কোম্পানী যেটির জন্য অর্থপ্রদান করছে তার দ্বারা কী (আসল) পরিষেবা প্রদান করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বীমা কোম্পানির দ্বারা কোন ক্ষতি হয় যার জন্য ক্ষতির ক্ষেত্রে দায় বহন করতে হবে? ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম প্রদান বা ক্ষতিপূরণ উভয়ই ইসলামী শরীয়তে গ্রহণযোগ্য শর্তে সমর্থনযোগ্য বলে মনে হয় না। যদিও এই সকল প্রশ্নের পিছনে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে, তবুও উপরে উল্লেখিত সর্বসম্মত মতামত হলো, পশ্চিমে প্রচলিত বিদ্যমান বীমা চুক্তির বেশিরভাগই ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, ১০ শা’বান ১৩৯৮ (১৬ই জুলাই ১৯৭৮) মক্কায় অনুষ্ঠিত ইসলামী আইন সমাবেশের সিদ্ধান্ত, যেখানে একজনের ভিন্নমত ছিলো; তুলে ধরেছেন আতিকুজ্জামান খান (২০০৫)।</p>
<p>প্রচলিত বীমা পদ্ধতি এবং ইসলামী আইনের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ সম্পর্কে প্রায় সর্বসম্মত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হলো, কোন বিকল্পগুলো সম্ভব হতে পারে? গাজী এবং অন্যরা (১৯৯২) বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসলামী শরীয়তের রঙে ঢেলে সাজাবার পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরামর্শ দেন যে, আমাদের ইসলামী বিকল্পগুলোর নতুন নাম দেওয়া উচিত যাতে ইসলামী ও পুঁজিবাদী বীমার মধ্যে আমূল পার্থক্য বিদ্যমান থাকে। এটি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে, যাতে ইসলামী বীমাকে এখন তাকাফুল বলা হয়। গাজী প্রমুখ (১৯৯২) বিভিন্ন ধরণের বীমা চুক্তির উদ্দেশ্য বিবেচনা করে তাদের উদ্দেশ্য এবং ইসলামী শরীয়তের মধ্যে সামঞ্জস্যের মূল্যায়ন করেন এবং একই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির পরামর্শ দেন যা ইসলামী শরীয়তের এখতিয়ারভুক্ত রয়েছে। সাধারণভাবে, বীমার উদ্দেশ্যগুলো (যার মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য সুরক্ষা এবং উত্তরাধিকারীদের জন্য বিধান) শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যাইহোক, একটি ইসলামী কাঠামোর মধ্যে এই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োজন। ইসলামী পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জনের জন্য আমরা বিস্তৃত রূপরেখায় কিছু ঘটনা আলোচনা করি। বিস্তারিত জানার জন্য, IIBI (ও৯৯২) দ্বারা সংকলিত Encyclopedia of Islamic Banking and Insurance দেখুন। এছাড়াও, আকরাম খানের (১৯৮৩, ১৯৯১, এবং ১৯৯৮) টীকাযুক্ত গ্রন্থপঞ্জিগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত সাহিত্যের একটি প্রাথমিক ধারণা প্রদান করে।</p>
<p>জীবনবীমা এবং পেনশন পরিকল্পনার জন্য সরকার-স্পন্সরকৃত পরিকল্পনাগুলো সাধারণত গ্রহণযোগ্য, যেহেতু সরকার তার নাগরিকদের খেয়াল রাখার জন্য দায়বদ্ধ। অন্যান্য উদ্দেশ্যে বেসরকারী খাতের বীমা প্রকল্পগুলো বেশি উপযুক্ত। যাইহোক, সাধারণ নীতিগুলো যার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, তা প্রচলিত বীমা চুক্তি থেকে ভিন্ন। গাজী প্রমুখ (১৯৯২) নোট করেছেন যে, বীমার ভিত্তি হতে পারে শুধুমাত্র সহযোগিতা, পারস্পরিক সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির উপর। তাই এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার আসল ও মৌলিক লক্ষ্য ব্যবসা, মুনাফা অর্জন এবং অর্থ মজুত করা। আতিকুজ্জাফার খান (২০০৫) অনুরূপ মতামত পোষণকারী অন্যান্য পণ্ডিতদের রেফারেন্স প্রদান করেছেন।</p>
<p><strong>ইসলামী আইন শুধুমাত্র পারস্পরিক বীমার অনুমতি দেয়, যেখানে একটি দল সম্মিলিতভাবে তার সদস্যদের স্বার্থরক্ষা করবে এবং বিপদের সময়ে তাদের সমর্থন করার জন্য কাজ করবে। উদ্দেশ্য যদি একে অপরকে সাহায্য করা হয় এবং বীমা চুক্তিতে কোনো লাভের উদ্দেশ্য জড়িত না থাকে, তাহলে পূর্বে আলোচিত ঘারার, জুয়া, সুদ এবং অযৌক্তিক অর্থপ্রদানের উপাদানগুলো বর্জন করা হয়।</strong> পশ্চিমা বীমার সৃষ্ট কিছু সমস্যা, যা দু’পক্ষের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে, প্রায়োগিক সাহিত্যে সেসব ‘নৈতিক বিপদ/ moral hazard’ এবং প্রতিকূল নির্বাচন/ adverse selection’ নামে পরিচিত। বেসরকারি চিকিৎসা বীমার ক্ষেত্রে রোগীদের খরচ কমানোর জন্য খুব সামান্য প্রণোদনা থাকে, ডাক্তাররা চিকিৎসার জন্য ব্যয়বহুল বিকল্প বেছে নিতে পারেন বা নিয়ে থাকেন এবং অতিরিক্ত মেডিকেল টেস্ট দেন; যেন বীমা কোম্পানিগুলোও খরচ সাশ্রয়ের জন্য প্রণোদনা কমিয়েছে, কারণ তারা গ্রাহকদের খরচ অতিক্রম করতে পারে। ফলস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি বীমাসহ রোগী প্রতি খরচ; ইউকে, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি এবং জাপানের মতো দেশগুলোÑযেখানে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োগ করা হয়Ñতার তুলনায় দ্বিগুণ হয়। লেভিন গ্রুপের (২০০৫) রিপোর্ট বেসরকারি চিকিৎসা বীমার অদক্ষতা নথিভুক্ত করে। পরীক্ষামূলক অর্থনীতির ফলাফলগুলো দেখায় যে, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমস্যাগুলো হ্রাস করা যেতে পারে যখন সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা হয় এবং স্বার্থপর আচরণ যা গোষ্ঠীর স্বার্থকে উপেক্ষা করে তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। জামান (২০১৪, ২০১৩) দেখায় কীভাবে বীমার ক্ষেত্রে ইসলামী পদ্ধতির মধ্যে এই সমস্যাগুলো এড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।</p>
<p>ইসলামী বীমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদের ঘনত্ব রোধ করা। গাজী প্রমুখ (১৯৯২) বলেন যে, “ইসলাম ধন-সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ/সঞ্চয় করাকে নিষিদ্ধ করে। তাই, এমন কোনো আশ্বাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু লোক ধনী হতে পারে&#8230;।” এই উদ্বেগের কারণ হলো যে, বীমার প্রচলিত ফর্মগুলোর জন্য বীমাকারীকে খুব ধনী হতে হবে। এটি অ্যাডাম স্মিথের (১৮৮৭) গবেষণাপত্রের শুরুর দিকেই উল্লেখ করা হয়েছিলো। বীমার ব্যাপক বিস্তৃতি মুনাফা অর্জন এবং সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ প্রদান করে যা শুধুমাত্র ধনীরাই ব্যবহার করতে পারে, ফলশ্রæতিতে সম্পদের ঘনত্ব বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে। বীমার পারস্পরিক রূপগুলো এই সমস্যাটি এড়াতে পারে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করা এবং নিজেদের মধ্যে বীমার বোঝা ভাগ করার মাধ্যমে।</p>
<p>ইসলামী শরীয়তের কাঠামোর মধ্যে বীমা প্রদানের জন্য বেশ কয়েকটি ভিন্ন মডেল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত তাকাফুল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একটি মডেল ওয়াকফের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা এর সদস্যদের সহায়তা প্রদান করে। আরেকটি মডেল উপহার (তাবাররু) এর ধারণা ব্যবহার করে এবং এছাড়াও বেশ কয়েকটি মিশ্রিত ও বিকল্প ফর্ম প্রস্তাব করা হয়েছে। আর্থিক প্রকৌশলের এই অংশটির পেছনের ধারণাটি হলো বিদ্যমান বীমা প্রকল্পগুলোর সমরূপ একটি সমন্বয় তৈরি করার জন্য ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য ইসলামী চিন্তাগুলো ব্যবহার করা। কিছু লেখক ঐতিহাসিক ইসলামী প্রতিষ্ঠানের উপর ভিত্তি করে আরো মৌলিক চিন্তা প্রস্তাব করেছেন; এর পেছনে মূল ধারণা হলো বিস্তৃত পরিমণ্ডলে দায়িত্ববোধ। উপরে যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, বিপদের সময়ে পরিবারই আমাদের সহযোগিতার প্রথম উৎস। যদি এটি অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়, তাহলে বর্ধিত পরিবার দায়ভার বহন করবে বলে আশা করা হয়। এমনকি আরও বড় সমস্যায় পড়লে তা সমাধান করা সমগ্র গোত্র/সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব হয়ে পড়ে।</p>
<p>এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃজনশীল অভিযোজন বীমার বিকল্প প্রদান করতে পারে। পরিবার এবং গোত্রের পরিবর্তে, উদাহরণস্বরূপ, প্রথমে একটি শহর এবং তারপর একটি দেশের মধ্যে বাস মালিকদের একটি সমিতি গঠন করা সম্ভব। সাধারণভাবে বলতে গেলে, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যক্তিত্ববাদী প্রবণতা তাদের ইসলামের সাথে বেমানান করে তোলে, যদিও বীমার ক্ষেত্রে, কিছু পশ্চিমা মডেল রয়েছে যেগুলোর ইসলামের মধ্যে অভিযোজনের সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান স্বাস্থ্য-বীমাব্যবস্থার সাথে উপরে আলোচনা করা প্রস্তাবগুলোর কিছু সাদৃশ্য রয়েছে, যেখানে ব্যক্তিদেরকে গোষ্ঠীতে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং সকল গোষ্ঠী একই ধরণের বাধ্যতামূলক সুযোগ-সুবিধা পায়। এছাড়াও, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সংগঠনগুলো একটি মডেল অফার করে, যা দ্বারা পারস্পরিক বীমার ইসলামী মডেলগুলোর সাথে সমন্বয় করা সম্ভব। এখানে একদল লোক মাসিক অর্থ প্রদান করে, যা চিকিৎসক ও ভবন পরিষেবা নিয়োগের খরচ বহন করে এবং এই গোষ্ঠীর সকল প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য চাহিদাগুলো তাদের দ্বারা পূরণ করা হয়। এই ধরনের পরিষেবা চুক্তি ইসলামী আইনের মধ্যে অনুমোদিত (নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে) এবং এটি বীমা চুক্তির একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ওয়াকফ (এন্ডোমেন্ট/ট্রাস্ট)</strong></h5>
<p>ওয়াকফ একটি অনন্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান, যেটি অতীতে ইসলামী সুশীল সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছে; যদিও এটি বর্তমানে প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে, যার কারণ পরবর্তীতে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামী আইনের অধীনে যে কেউ সামাজিক কল্যাণের সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য তার কোনো সম্পত্তি, তার ফল এবং তা থেকে প্রাপ্ত আয় স্থায়ীভাবে দান করতে পারে। আওকাফকে নবী (স.) ‘চিরস্থায়ী দাতব্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং উৎসাহিত করেছিলেন; সংক্ষিপ্ত ভ‚মিকার জন্য কাহাফের গবেষণাপত্র দেখুন। ইতিমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে, সম্পদশালীদের দায়িত্ব রয়েছে অভাবীদের খুঁজে বের করার এবং এমনভাবে সাহায্য করার (ঋণ বা উপহার হিসেবে) যাতে তারা অসম্মানিত না হয়।</p>
<p>বিপরীতে, ওয়েবারের মতে, পুঁজিবাদের প্রাণসত্তা হলো নিজের স্বার্থে সম্পদের অযৌক্তিক সাধনা, যা অনেক অর্থনীতিবিদকে অর্থ উপার্জনে এমন প্রাধান্য দিতে পরিচালিত করেছে যে, এমনকি দরিদ্রদের সাহায্য করাকেও অর্থ উপার্জনের একটি উপায় হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ধনী মুসলমানরা আওকাফ স্থাপন করে, যা উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবহার করার সর্বোত্তম উপায়গুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেহেতু সম্পত্তি (সাধারণত জমি) ব্যবহার করা হয় না, তাই তা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব তাত্তি¡কভাবে চিরস্থায়ী দাতব্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে; এটি ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্বের একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মুমিন জীবনের উদ্দেশ্য। আওকাফের অনেক বিষয়ে ইসলাহীর (২০০৩) ইংরেজি নিবন্ধের একটি গ্রন্থপঞ্জি রয়েছে এবং সেইসাথে সেখানে আরবী ভাষায় আরও বিস্তৃত গ্রন্থপঞ্জির উল্লেখ রয়েছে, যেহেতু আরবী ভাষায় এই বিষয়ে আরও কাজ রয়েছে। পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাতব্য ফাউন্ডেশন এবং সম্ভবত এনজিওগুলোকে ওয়াকফের সাথে তুলনা করা যায়, পার্থক্য হলো ওয়াকফ ইসলামী শরীয়তের উপর ভিত্তি করে একটি বিস্তৃত নিয়মের অধীন।</p>
<p>কাহফ (২০০০), আঞ্জুম (১৯৯৫), এবং সাইত ও লিম (২০০৬, অধ্যায় ৭) এর মতো অনেক লেখক ইসলামের ইতিহাসে ওয়াকফের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সকলেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ওয়াকফ ইসলামী অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ অংশ গঠন করেছে এবং সুশীল সমাজের সকল স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছে। অনুমান করা হয় যে, উসমানী খেলাফতের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমি এই ধরণের ট্রাস্টের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছিল। মরিয়ম হোয়েক্সটার এবং অন্যদের মতে (২০০২)-</p>
<p>“শহুরে এলাকা গঠনে ওয়াকফের অবদানকে খুব কমই আঁচ করা যায়&#8230; (ইসলামী) শহরে জনপরিবেশের একটি বড় অংশ প্রকৃতপক্ষে অনুদানের ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো।”</p>
<p>যদিও ইসলামী ভূমি জুড়ে লক্ষ লক্ষ আওকাফ বিভিন্নধর্মী দাতব্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিলো, এর মধ্যে পাঁচটি প্রধান বিভাগ ছিলো : খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ধর্ম। কাহফ (এন.ডি., ২০০০) এই বিভিন্ন ক্ষেত্রের আপেক্ষিক আকার নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ এবং রেফারেন্স তুলে ধরেছেন। সাইত ও লিম (২০০৬) এর মতে, উসমানীরা নিজেদেরকে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের জন্য দায়বদ্ধ মনে করতো না, যেহেতু আওকাফ জনগণের এ চাহিদাগুলোর পর্যাপ্ত যতœ নিচ্ছিলো। এইভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য বর্তমান ইউরোপীয় কল্যাণ রাষ্ট্র মডেলের একটি ঐতিহাসিক ইসলামী বিকল্প গঠন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী মেথডোলজির দুটি স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে :</strong></p>
<ul>
<li>আওকাফ স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হতো। রাষ্ট্র-চালিত সিস্টেমের তুলনায় তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে স্থানীয় তথ্য ছিলো এবং তাই তারা আরও দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারতো।</li>
<li>সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে, সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে- ইসলামের এই দাবিও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছিলো।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>সাইত ও লিম  (২০০৫, পেপার ৭) লেখেন যে “ইসলামী ভ‚মিতে সম্পদ পুনঃবণ্টনে আওকাফের পদ্ধতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সফল হয়েছে”, যা ন্যায়সঙ্গত ফলাফলের দিকে পরিচালিত করে এবং কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পদের সঞ্চালন করে। এছাড়াও, অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন উপার্জনের সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে আওকাফ সিভিল সোসাইটিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতায়িত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে, রাষ্ট্র এই ক্ষমতাকে দাবিয়ে রাখার এবং বিভিন্ন উপায়ে আওকাফকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু এ ধরণের প্রচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছিলো।</p>
<p>মহিলারা একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আওকাফ প্রদান করেছেন বা পরিচালনা করেছেন এবং সিভিল সোসাইটিতে একইভাবে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছেন; ফাইজার (২০০৭) এর উপর প্রয়োজনীয় গ্রন্থপঞ্জি উল্লেখ করেছেন। আওকাফের মাধ্যমে শিক্ষার সমান প্রবেশাধিকার এবং ইসলামী সমাজে শিক্ষার প্রতি সাধারণ সম্মান প্রদানের কারণে সকল সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বের জায়গাগুলো ঐ সমাজের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হাতে ছিলো; কাহফ (২০০০) আবদুল মালিক আল-সায়িদ এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, “কখনও কখনও, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম পÐিতরা সমাজের দরিদ্র ও দাস শ্রেণি থেকে এসেছেন এবং প্রায়শই তারা শাসকদের নীতির তীব্র বিরোধিতা করতেন।”</p>
<p>ওয়াকফের একটি শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ওয়াকফ এবং তাদের কার্যক্রম সংক্রান্ত নিয়মাবলী, ওয়াকফের জন্য বিভিন্ন ধরণের সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি এবং আওকাফের প্রধান ও ছোটখাটো দিক নিয়ে ইসলামী আইনের বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে বিতর্কের বিষয়ে একটি বিশাল সাহিত্য রয়েছে। একবার চালু হয়ে গেলে ওয়াকফ সহজে বন্ধ করা যায় না। অধিকন্তু, ওয়াকফের প্রতিষ্ঠাতার মূল উদ্দেশ্য সহজে পরিবর্তন করা যায় না। এই ইসলামী নিয়মের কারণে কুরন (২০০৪) যুক্তি দিয়েছিলো যে, ইসলামী সভ্যতার পতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অনেক আওকাফ এমন কাজে আটকে ছিলো, যা সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী আইনে যথেষ্ট গতিশীলতা এবং নমনীয়তা রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে এর সৃজনশীল অভিযোজন নথিভুক্ত করা যেতে পারে, যেমনটি আমরা এই বইতে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি। বরং এটা স্পষ্ট যে, সামগ্রিকভাবে ইসলামী সমাজ স্থবির হয়ে পড়েছিলো এবং বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। হজসন (১৯৭৪) মুসলিমদের পতনের কারণ সম্পর্কে বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যা ওরিয়েন্টালিস্টদের বিশ্লেষণ দ্বারা পেশকৃত বেশিরভাগ প্রাথমিক ত্রুটিগুলোকে এড়িয়ে যায়। ইসলাহী (২০০৩) এর গ্রন্থপঞ্জীতে আওকাফকে কীভাবে হালনাগাদ এবং আধুনিকীকরণ করা যায় সে সম্পর্কিত প্রচুর নিবন্ধের তালিকা রয়েছে।</p>
<p>ইসলামী শরীয়তে আওকাফের দৃঢ় ভিত্তির কারণে অনেক মুসলিম শাসকদের দ্বারা তার প্রভাব রোধ করার প্রচেষ্টাকে সে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলো। যাইহোক, ঔপনিবেশিক শক্তি ইসলামী আইন মানতে বাধ্য ছিলো না। শুধুমাত্র সম্পদের জন্যই নয়, বরং আওকাফের সাংগঠনিক শক্তি ও বস্তুগত সম্পদ প্রায়ই উপনিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলো বলে তারা প্রচুর পরিমাণে ওয়াকফের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিলো।</p>
<p>উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে, বিভিন্ন জটিল কারণে, বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ আওকাফকে বিলুপ্ত, জাতীয়করণ বা এর উপর কঠোর প্রবিধান তৈরি করেছে। সাইত এবং লিম (২০০৫, পেপার ৭, পৃ. ১৫) লেখেন যে, ওয়াকফের বিলুপ্তি জনসেবার ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে, যা অনেক মুসলিম দেশে রাষ্ট্র সহজে পূরণ করতে পারেনি। যাইহোক, ওয়াকফের ‘ধারণা’ উভয়ই প্রভাবশালী রয়ে গেছে এবং এর পুনরুজ্জীবনের স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। পাবলিক পলিসি এবং মুসলিম জীবনের সকল দিকের উপর প্রভাববিস্তারকারী একটি হাতিয়ার হিসেবে ওয়াকফ কাজ করেছে এবং করে যাচ্ছে।</p>
<p>ওয়াকফের প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং অতীতে এটিকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আজ মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। কীভাবে আওকাফের আইনকে নমনীয় করা যায়, প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় এবং আধুনিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা ইসলামী অর্থনৈতিক সাহিত্যে প্রচুর আছে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সকল দিক নিয়ে আলোচনা করে অসংখ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাইত এবং লিম (২০০৫ পেপার ৭, ২০০৬) কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা করে উল্লেখ করেন যে, কুয়েত এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে। এছাড়াও মনজার কাহফ (১৯৯৮ন, ২০০০, হ.ফ.) এবং আনাস যারকা (১৯৯৪) আলোচনা করেন, কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় এবং অর্থায়নের উপযুক্ত পুরানো ও নতুন পদ্ধতিগুলো চিহ্নিত করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>হিসবাহ (অডিট বা জবাবদিহিতা)</h5>
<p>মনজার কাহফ (১৯৯৬, অধ্যায় ৬) বিভিন্ন ধরণের বাজার ব্যর্থতার একটি প্রাথমিক ভূমিকা প্রদান করেন, যার জন্য রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তিনি ইসলামী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চেতনা নিয়েও আলোচনা করেন, যা অবাধ বাণিজ্যের পথে বাধা হ্রাস করার সাথে সাথে এজাতীয় সমস্যার একটি সহযোগিতামূলক সমাধান খুঁজে বের করে। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম কর্মের সকল ক্ষেত্রে (বাজার সহ) ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর অনেক বেশি জোর দেয় এবং কেবল সামাজিক স্বার্থের প্রয়োজন হলেই তা নিয়ন্ত্রণ করে। কাহফ (১৯৯৬, অধ্যায় ৬, পৃ. ৫৫) উল্লেখ করেছেন যে, আল-হিসবাহ-এর আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান, যা ইসলামের প্রথম দিন থেকে চালু ছিলো এবং সিস্টেমের স্পিরিট চালু রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেতো, এমন শর্তাবলী নির্ধারণ করে যা জনগণের স্বাস্থ্য ও স্বার্থ সংরক্ষণ করে, ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা করে, ব্যবসা ও শ্রম বিরোধ সমাধান করে এবং ভালো মার্কেট-বিহেভিয়ারের প্রচার ও অনুসরণ নিশ্চিত করে।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নাজ (১৯৯১) ইসলামী শরীয়তে হিসবাহর ভিত্তি, ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে এর তাত্তি¡ক ও ঐতিহাসিক কার্যাবলী এবং একটি ইসলামী কাঠামোর মধ্যে অন্যান্য বিচার বিভাগীয় ও নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের সাথে এর মিল ও পার্থক্য-সহ হিসবাহের একটি ব্যাপক সমীক্ষা দেন। বাজারের নিয়ন্ত্রণ হিসবাহের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটি এবং আমাদের অর্থনীতির বিষয় হওয়ার করার কারণে আমি প্রধানত এই দিকটির উপর আলোচনা করবো। যাইহোক, নাজ উল্লেখ করেছেন যে, বেশ কিছু পশ্চিমা লেখক হিসবাহর অনুবাদ মার্কেট সুপারভাইজার ব্যবহার করেছেন, যা হিসবাহের তুলনায় খবই সংকীর্ণ অর্থ বহন করে, যার মধ্যে জনসাধারণের আখলাকী সকল দিক অন্তর্ভুক্ত। ব্যাখ্যাস্বরূপÑ</p>
<ul>
<li>অনাথ এবং বিধবাদের জন্য সঙ্গী খোঁজা (যখন তারা নিজেরা তা করতে অক্ষম),</li>
<li>নিশ্চিত করা যে শিক্ষকরা ছাত্রদের খুব বেশি কঠোর শাস্তি দেননি,</li>
<li>ইসলামী আচরণবিধি প্রয়োগ করা, যার মধ্যে সামাজিক রীতিসিদ্ধ আচরণগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে,</li>
<li>কূপ, খাল বা শহরের দেয়ালের মতো সরকারি সম্পত্তি মেরামত।</li>
</ul>
<p>সাধারণত, হিসবাহ এমন ক্ষেত্রে জনস্বার্থ রক্ষা করে যেখানে আদালতে মামলা নিয়ে যেতে পারে এমন কোনো তাৎক্ষণিক সংক্ষুব্ধ পক্ষ নেই। বাজারের মধ্যে হিসবাহর দায়িত্ব হলো, সরকারী মান অনুসারে প্রদত্ত মানের স্ট্যাম্প অনুযায়ী ওজন এবং পরিমাপ, বিক্রিত পণ্যের মান নিশ্চিত, মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রতিরোধ, মূল্যবৃদ্ধির জন্য পণ্য মজুদ প্রতিরোধ, গোপন চুক্তি এবং একচেটিয়া কর্ম ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ; এবং সাধারণভাবে জনস্বার্থ রক্ষা করা। নদী বা পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়গুলোও হিসবাহের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। নাজ (১৯৯১) এর অধ্যায় ৫-এ ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এর বিভিন্ন ভ‚মিকা এবং তা বাস্তবায়নের একটি নিরীক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। একটি সূ² কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, হিসবাহ শুধুমাত্র পাবলিক বিষয়গুলোর সাথে সম্পর্কিত দৃশ্যমান অনৈতিকতাগুলো নিয়ে কাজ করে। যদি লোকেরা ব্যক্তিগতভাবে মদ্যপান করে বা জুয়া খেলে, হিসবাহ এটি তদন্ত এবং উন্মোচন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে, কোরআন (৪৯:১২) আদেশ দেয় যে ব্যক্তিগত কর্মের তদন্ত করা উচিত নয়।</p>
<p>হিসবাহকে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের সাথে তুলনা করার ক্ষেত্রে আমি প্রথমে মুক্ত বাজার ব্যবস্থার একটি সুপরিচিত ঘাটতি লক্ষ্য করি যে, যেখানে একটি ছোটো গোষ্ঠী অনেক বেশি লাভবান হয় এবং যেখানে একটি বৃহৎ গোষ্ঠীর উপর অল্প পরিমাণ ক্ষতিকে বন্টন করা হয়, সেখানে মুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা সাধারণত সেই ছোটো গোষ্ঠির স্বার্থের পক্ষে এবং জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়। এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে ক্লাস অ্যাকশন স্যুটের ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যথেষ্ট আইন ও সাহিত্য এই সমস্যাটির সমাধান করেছে। ভোক্তা অ্যাডভোকেট ও অ্যাক্টিভিস্ট রাল্ফ নাদেরের কর্মজীবনের একটি গবেষণায় জনস্বার্থে বড় বড় কর্পোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণের কারণে সৃষ্টপ্রধান সমস্যাগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রবার্ট পিটফস্কি (১৯৭৭) বিজ্ঞাপনের প্রেক্ষাপটে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, যখন নিউজিল্যান্ডের ভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয় (২০০৫) এ বিষয়ে একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা করেছে এবং সাহিত্য সমীক্ষা প্রদান করেছে। তাই এটা খুবই আগ্রহের বিষয় যে, শুরু থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে রাল্ফ নাদেরের চিত্রিত সরকারী প্রতিষ্ঠান ইসলামী সরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান ছিলো।</p>
<p>সাধারণভাবে, অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকদের laissez-faire ওরিয়েন্টেশন এবং বাজারের ফলাফলগুলোকে (market outcomes) সর্বোত্তম ধরে নেয়ার ফলে বাজারের ব্যর্থতার স্বীকৃতি যথেষ্ট বিলম্বিত হয়, যা ভোক্তাদের ক্ষতি করে এবং সমস্যা থেকে প্রতিকারের উপযুক্ত পদ্ধতি বিকাশে ব্যর্থ হয়। ফ্রিডম্যান (২০০৫) চরমপন্থা অবলম্বন করে যুক্তি দেন যে, “ব্যবসার একমাত্র ব্যবসা হলো মুনাফা অর্জন করা”, যা ইঙ্গিত করে যে লাভের তাড়নায় সামাজিকভাবে ক্ষতিকারক পরিণতি উপেক্ষা করা যেতে পারে। ইসলাম এই বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, ফার্ম-সহ সকল কর্মীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা অর্পণ করে এবং হিসবাহ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার আকারে জবাবদিহিতা নিরীক্ষণ ও প্রয়োগের ব্যবস্থা রাখে।</p>
<h6></h6>
<h5>পরিবেশগত সুরক্ষা, বাস্তুবিদ্যা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ</h5>
<p>দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপ এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রা অনুসরণের সামাজিক পরিণতির মধ্যে আমরা পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, যা এ গ্রহের মানব ও অন্যান্য জীবনকে যথেষ্ট হুমকির সম্মুখীন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, রিচার্ড রবিনস (২০০৭) লিখেছেন যে, একটি ধনী দেশে একজন ব্যক্তির জীবনমান বজায় রাখার জন্য গড়ে প্রায় ৫ হেক্টর উৎপাদনশীল জমি প্রয়োজন, যেখানে বিশ্বব্যাপী ব্যক্তি প্রতি মাত্র ১.৭ হেক্টর জমি বিদ্যমান রয়েছে। বিলাসবহুল জীবনধারার চাহিদা পূরণের প্রক্রিয়া গ্রহের সম্পদকে এমন ব্যাপকভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, যা আমাদের সমসাময়িক এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম উভয়ের জন্যই স্পষ্টত অন্যায়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে, ‘টেকসই উন্নয়ন (sustainable development)’ ধারণা, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে এমন পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রস্তাব করে। এটি তার আকাঙ্খিত ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে নাটকীয়ভাবে ভিন্ন, যেমনটি ইউসরি (২০০৫) আলোচনা করেছেন। এইভাবে, টেকসই উন্নয়নের কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে-যদিও অবশ্যই সব নয়-অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই মুখ্য উদ্দেশ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয় যাতে ভবিষ্যতে সম্পদের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে।</p>
<p>ইসলামী দৃষ্টিতে প্রাকৃতিক সম্পদ একটি পবিত্র আমানত এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এগুলো রক্ষা করা মানুষের একটি মৌলিক দায়িত্ব। অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনক্রমেই এখানে (সরাসরি) লক্ষ্য নয়, তবে এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন, দারিদ্র্য বিমোচন এর একটি উপায় হতে পারে। এম. ফাহিম খান (২০০৩) ভোক্তা আচরণের তত্তে¡র সাথে এই বিষয়গুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদিও পরিবেশ সুরক্ষার কিছু দিক হিসবাহের অধীনে পড়ে, তবুও পরিবেশগত সমস্যাগুলো সাধারণত সামগ্রিকভাবে সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। পাশাপাশি, পরিবেশ সুরক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাষ্ট্র, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দ্বারা নেওয়া যেতে পারে। কোরআন (২:২০৪-২০৫) এমন লোকদের সম্পর্কে তিরস্কার করে, যাদের কথাবার্তা মানুষকে মুগ্ধ করে, কিন্তু তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং ফসল ও বংশধারা ধ্বংস করে। মহানবী (স.) মদীনার চারপাশে বারো মাইলের একটি সবুজ বেষ্টনী স্থাপন করেছিলেন এবং এই এলাকায় গাছ কাটা বা শিকার নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি পানীয় জলের দূষণও নিষিদ্ধ করেছিলেন; ফকীহরা বলেছেন যে, আবর্জনা এবং বর্জ্য দ্রব্য নদীতে ফেলা জায়েজ নয়। এছাড়াও তিনি অনুর্বর জমির পুনরুজ্জীবনকে উৎসাহিত করেছেন, এ কাজ যারা করে তাদের জমির স্বত্বাধিকারী করার মাধ্যমে। এ ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ইসলামের স্বর্ণযুগে ফকীহগণ পরিবেশ দূষিত করে এমন কর্মকাÐের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করেন। বিস্তারিত জানার জন্য মুনাওয়ার ইকবাল (২০০৫) দেখুন।</p>
<p>ইসলাম সকল প্রাকৃতিক সম্পদকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করেছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদকে সংরক্ষন করার জন্য রাষ্ট দায়বদ্ধ থাকবে এবং তাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেনো সকলেই সেগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে। অনাগত মানব সন্তানদের প্রতি ইনসাফের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ এবং তাদের ব্যবহার এমনভাবে প্রয়োজন যা সবার জন্য ন্যায্য। উদাহরণস্বরূপ, নবী (স.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা নদীর ধারে থাকলেও পানির কয়েক ফোঁটাও অপচয় না করতে। সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো যে, তারা গাছ পোড়াবে না বা কৃষি জমি ধ্বংস করবে না। পশু, উদ্ভিদ বা প্রাণীক‚লের আবাসস্থল ধ্বংস করাও অনুমোদিত নয়। বৃক্ষ ও ফুলগাছ লাগানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং এগুলোকে সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, আপনি যদি বৃক্ষ রোপণরত থাকেন এবং এ অবস্থায় কিয়ামত এসে পড়ে, তাহলেও তা রোপণ করতে থাকুন। আদালত শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং পশুদের প্রতিওÑএমনকি পশুদের উপর অত্যাচার করা বা শুধুমাত্র আনন্দের জন্য তাদের শিকার করা নিষিদ্ধ। সেবার জন্য ব্যবহৃত পশুদের সাথে অবশ্যই ন্যায্য আচরণ করা উচিত এবং তাদের আঘাত করা বা কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।</p>
<p>উপরন্তু, মুসলমানদেরকে বিলাসবহুল জীবনধারা অনুসরণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে অযথা খরচের মাধ্যমে অতিরিক্ত সুখ জীবনে সন্তুষ্টি বা সুস্থ অনুভ‚তির দিকে নিয়ে যায় না; সম্পদের অন্বেষণ মানুষকে মোহের দিকে নিয়ে যায়, যেমন কোরআন (৩:১৮৫) বলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম সমাজের বর্তমান অবস্থার বিশদ পরিসংখ্যান এবং এর পরিবর্তে নীতিগত অগ্রাধিকারগুলো মনজার এবং কাহফ (২০০৩) তুলে ধরেছেন। মালয়েশিয়ার প্রেক্ষাপটে ইসলামী পদ্ধতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন এম. এ. চৌধুরী এবং এম. এস. সালেহ (১৯৯৩)। অনেক সহজ অর্থনীতির যুগে ইসলামী নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির দূরদৃষ্টি (বিচক্ষণতা ও বিজ্ঞতা) বিস্ময়কর।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-role-of-islamic-institutions-in-islamic-economics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15849</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানাগুলোর রূপান্তর করবে কে?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:17:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15783</guid>

					<description><![CDATA[শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্কহীনতার সমস্যা শুধু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং প্রকটভাবে উপস্থিত আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিষয়ে পড়া স্নাতকদের বেলাতেও। চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের অনেকাংশে এখন চাহিদা নেই। সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্কহীনতার সমস্যা শুধু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং প্রকটভাবে উপস্থিত আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিষয়ে পড়া স্নাতকদের বেলাতেও। চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের অনেকাংশে এখন চাহিদা নেই।</p>
<p>সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপমতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ শতাংশ স্নাতক বেকার। কী দেশ, কী শিক্ষাব্যবস্থা—অর্ধেকই বেকার!</p>
<p>বিআইডিএস জরিপে উঠে আসে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৪২ থেকে ৪৮ শতাংশই বেকার অবস্থায় রয়েছেন।</p>
<p>অন্য জরিপে দেখা গেছে, তাঁরা শিক্ষা সমাপ্তির পরে প্রায় তিন-চার বছর বেকার থাকেন। বেকার অবস্থায় থাকা তরুণর মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি বিএ পাস করেছিলেন। ২৩ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে স্নাতক অর্জন করেছেন। লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্টে পাস করেছেন প্রায় ২১ শতাংশ। বেকারদের ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পাস করেছেন ইসলামের ইতিহাস এবং বাংলায়। তবে ইংরেজি, অর্থনীতি ও হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক করা শিক্ষার্থীরা কম বেকার হয়েছেন। অর্থনীতি বা ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ের এবং হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও বেকারত্বের শিকার হয়েছেন, তবে কম।</p>
<p>এটা হাস্যকর যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পলিটিক্যাল সায়েন্সে পড়েন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর হন এমন দেশে, যেখানে দিনের ভোট রাতে হয়, সব পর্যায়ের নির্বাচনে ভোট চুরির ঘটনা ঘটে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য নেই, এমনকি নেই কোনো উপলব্ধিও।</p>
<p>নির্বাচন ও ভোটাধিকারহীন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দেশে রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়ে হাজারে হাজারে তরুণ বেকার থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সমাজ, প্রতিষ্ঠান, সরকার ও রাষ্ট্রের মৌলিক ধারণাও অনেক শিক্ষার্থীর তৈরি হয় না।</p>
<p>এ রকম বহু মানহীন বিষয়ে, নিম্নস্তরের কারিকুলামে, অযোগ্য শিক্ষকের অধীনে এবং ক্লাসহীন শিক্ষায়, চাকরি বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক না থাকা বিষয়ে পড়িয়ে আমাদের ছেলেমেয়েকে শিক্ষার নামে সস্তা সার্কাসে ঠেলে দেওয়ার মহা আয়োজন হয়েছে।</p>
<p>শিক্ষার নামে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হচ্ছে, কারা পড়াচ্ছেন, কেন পড়ানো হচ্ছে—এসবের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নেই বললেই চলে। প্রায়ই দেখা যায়, চাকরির পরীক্ষায় কেউ পাস করে না বলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল হয়।</p>
<p>বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি মতে (১১ ডিসেম্বর ২০২৩), প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কেউই কাট নম্বর পায়নি বলে (যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায়) নবম গ্রেডের সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদের নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এ রকম প্রায়ই হয়।</p>
<p>হাজারে হাজারে, লাখে লাখে চাকরির আবেদন কিন্তু দক্ষতাসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থী নেই। এটা জিপিএ-নির্ভর অসার শিক্ষাব্যবস্থার অনিবার্য ফল! এমন খবর দেখলে মনে হয়, শিক্ষাব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে গেছে।</p>
<p>সহজ প্রশ্ন, উদার মূল্যায়ন, অটো পাস, জিপিএ-৫, প্রশ্নপত্র ফাঁসের চর্চা প্রতিষ্ঠিত করে, গণিত ও বিজ্ঞানশিক্ষাকে সংকুচিত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্কস পাওয়া শিক্ষার্থী মাত্র ১০ শতাংশের আশপাশেই থেকেছে। অথচ যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নেন, তাঁদের অধিকাংশই জিপিএ-৫ বা এর খুব কাছাকাছি পাওয়া।</p>
<p>আমাদের বেসরকারি খাতে দক্ষতাকেন্দ্রিক চাকরির বাজারে বিদেশিরা এমন উচ্চ হারে ঢুকছে, যা দেশের চাকরির বাজার ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুকূল নয়।</p>
<p><strong>উচ্চশিক্ষিত বেকার দেশের জন্য বড় বোঝা। কলেজ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে গোনা বিষয় বাদে অন্য সব বিষয়ে পড়ে এসব পড়ালেখা চাকরিতে প্রয়োগ করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ চাকরি না পেয়ে নিজেদের পড়ার সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয়ে ব্যবসা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বাণিজ্য করে</strong><strong>, </strong><strong>উদ্যোক্তা হয়ে আয় করেন</strong><strong>, </strong><strong>যার জন্য আদৌ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে কি না</strong><strong>, </strong><strong>সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।</strong></p>
<p>কথা ছিল, বিদেশিরা নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির খাতে দেশের চাকরি বাজারে দু-তিন বছরের জন্য ঢুকবেন, এ সময়ে নলেজ ট্রান্সফার করে স্থানীয় রিসোর্স ডেভেলপ করা হবে। কর্মদক্ষতা এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো কার্যকর কৌশলগত পরিকল্পনা নেই।</p>
<p>বাংলাদেশে এত এত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অথচ দেশে রাজনৈতিক সমস্যার অন্ত নেই এবং মূলত প্রায় সব সমস্যাই রাজনৈতিক। দেশে এত ইতিহাসবিদ অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিথ্যার মধ্যে বড় হচ্ছে। দেশে এত সমাজবিজ্ঞান কিংবা সমাজকল্যাণ স্নাতক, অথচ সমাজে কার্যকর কোনো কল্যাণ নেই।</p>
<p>দেশে এত এত সমাজবিজ্ঞানী, সমাজে তার প্রভাবের লেশমাত্র নেই। দেশে এত আইন পড়ুয়া বিজ্ঞ আইনজীবী, অথচ আইনের শাসন নেই, জুলুমের আইনি প্রতিকার নেই। অর্থনীতিবিদের অভাব নেই, অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পায় না জনগণ। তাহলে এই পড়াশোনার ফায়দা কী?</p>
<p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোনো চাহিদা সমাজ ও রাষ্ট্রে নেই। বাস্তবতা হচ্ছে শুধু পলিটিক্যাল ক্যাডার সৃষ্টির জন্য এসব বিষয় চালু আছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করে, চাঁদাবাজি মস্তানি মারামারি করে বেড়ান। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শেষে এঁরা জাতীয় বোঝা, এঁদের প্রধান ব্যবসা হয় সরকারি তদবির, ঘুষের দালালি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি নিয়ে চুরি করা।</p>
<p>এক দল আছে যেকোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যায়, দক্ষতার সঙ্গে এদের কোনো সংযোগ ঘটে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে গণহারে বিবিএ, এমবিএ কোর্স। এসব কোর্সের আসনের সঙ্গে চাকরির বাজার বা  ইন্ডাস্ট্রি-চাহিদার কোনো ম্যাপিং নেই।</p>
<p>প্রথম আলোর ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতায় নানা সময়ে তরুণদের সফলতা ছাপানো হয়। সেখানে দেখা যায়, তরুণদের কেউ বিরিয়ানি রান্না করে পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ খাতা বানিয়ে বিক্রি করছেন, কেউ শিঙাড়া-চপের দোকান দিয়েছেন, কেউ ক্যাকটাস বিক্রি করছেন, আবার কেউ মাছ-মাংস কেটে-ধুয়ে রান্নার উপযোগী করে সরবরাহ করছেন। কেউ ভারত-পাকিস্তান থেকে কাপড় এনে, চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য এনে ফেসবুক লাইভে এসে বিক্রি করছেন।</p>
<p>কাহিনিগুলো অসংখ্য বেকার তরুণকে উৎসাহিত করবে সন্দেহ নেই।  যাঁরা এসব কাজ করছেন, তাঁদের সবাই উচ্চশিক্ষিত বেকার। সৎ থেকে করা প্রত্যেকটা কাজই সম্মানের, কর্ম তৈরির জন্য এবং সমাজের জন্য দরকারি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় কেন চাকরির চাহিদা না থাকা বিষয়ে এত বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি করছে, পাবলিক মানি নষ্ট অর্থাৎ আসন নষ্ট করবে কেন?</p>
<p>আসলে দক্ষতার বিপরীতে শিক্ষার নাম শুধু অপশিক্ষায় নামিয়ে দিয়ে ছেলেমেয়েদের বেকারত্ব উপহার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা উদ্দেশ্যহীন বিষয়ে পড়ছেন, আসলে অনেকে না পড়েই পাস করছেন।</p>
<p><strong>জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার উৎপাদনকারী বিষয়গুলোকে দেশের মাত্র কয়েকটি কলেজে সংকুচিত করে, আসনগুলোতে বাজার চাহিদানির্ভর শিক্ষা (লেখকের চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ বইতে আলোচ্য) কারিকুলামনির্ভর শিক্ষার নতুন নতুন বিষয় আনা লাগবে, চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে আসন বাড়াতে হবে—যেখানে চাকরির বাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা প্রাধান্য পাব। কারিগরি ও শিল্প দক্ষতা উৎপাদনকে সেন্টার পয়েন্ট ফোকাস করা হবে।</strong></p>
<p>এমনকি সামাজিক বিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, ইংরেজি ও বাংলার মতো বিষয়ে পড়লেও শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা তৈরি জন্য দরকারি আধুনিক কারিগরি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং ইন্ডাস্ট্রি ট্রেনিং দিতে হবে।</p>
<p>আমাদের শিক্ষা দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। অন্তত আরেকটি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি দল কি ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থার দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের প্রতিজ্ঞা করবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15783</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বেকারদের জন্য নতুন চাকরি তৈরির দায়িত্ব কার?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 16 Apr 2025 16:33:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15768</guid>

					<description><![CDATA[চাকরির বাজারে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালকের ১৫ পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৪৫ জন। ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১৩ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮১টি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল প্রায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>চাকরির বাজারে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালকের ১৫ পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৪৫ জন। ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১৩ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮১টি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল প্রায় ৩ লাখ। বেকারত্বের এমন বিপর্যয়কারী পরিস্থিতি নিয়ে সরকার দৃশ্যত নির্বিকার।</p>
<p>দেশের সবচেয়ে বড় চাকরির বিজ্ঞাপনের সাইট বিডিজবস-এর তথ্যমতে, তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থানে আগস্ট ২০২২-এর পর নেতিবাচক ধারা শুরু হয়েছে; কমছে চাকরির বিজ্ঞপ্তি, শূন্য পদ এবং বিজ্ঞাপন দানকারী কোম্পানির সংখ্যাও।</p>
<p><strong>২০২২ সালের শেষ চার মাসে, পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় চাকরির বিজ্ঞাপনের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ ও শূন্য পদ কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। এ সময় কর্মী খোঁজা কোম্পানির সংখ্যা কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালে বিডিজবস সাইটে তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ২৫৫টি কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। মোট চাকরির পদসংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৪৮, শূন্য পদ ৫ হাজার ৩৯৩। যদিও ২০২১ সালের শেষ চার মাসে বিডিজবস সাইটে তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ৩৫৮টি কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাকরির পদসংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২০০, শূন্য পদ ছিল ৬ হাজার ৮১০।</strong></p>
<p>বিডিজবসের চাকরির বিজ্ঞাপন কমার হার, পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। টানা ১৩ মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর গত সেপ্টেম্বরে দেশে রপ্তানি আয় কমে। পাশাপাশি আছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, ডলারের উচ্চমূল্যে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়া, এলসি বন্ধ ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ সংকট। তবে সরকার সবকিছুই যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মন্দার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা থাকলেও উন্নত বিশ্বে করপোরেট লভ্যাংশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং বেকারত্বের হার রেকর্ড পর্যায়ে কম। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতসহ সার্বিক বেকারত্ব পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ডলার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা, ঋণপত্র সংকটও দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দা, সরকারের উচ্চ ঋণ ও খোলা বাজারে ডলার বিক্রয়জনিত তারল্য সংকট, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ঠকিয়ে ঋণ খেলাপিদের একতরফা সুবিধা দানের কাঠামোগত সমস্যা।</p>
<p><strong>বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার, সঙ্গে শুরু হয়েছে স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমবাজারের বেকারত্ব। একদিকে কর্ম তৈরির সরকারি কৌশল নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডলার-সংকট, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ খাতে পাচার এবং কেলেঙ্কারিজনিত মন্দার থাবা। দক্ষতা তৈরিতে শিল্পে ও শিক্ষালয়ে ট্রেনিং পরিকল্পনা নেই। দেশের বেকারত্বের কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও চাকরি তৈরির মাসিক ড্যাশবোর্ডও নেই। ফলে সরকার ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে।</strong></p>
<p>বাংলাদেশের চাকরি বাজারে আগে থেকেই দক্ষ জনবলপ্রাপ্তির সমস্যা রয়েছে। বাজার চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার কোর্স-কারিকুলামের সংযোগ স্থাপিত হয়নি বলে এক পদের বিপরীতে শত শত আবেদনকারী থাকেন, কিন্তু যোগ্য ও দক্ষ রিসোর্স পাওয়া যায় না।</p>
<p>বরং আবেদনপত্র নিরীক্ষণে অপচয় হয় সময় ও অর্থ। তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রায় সব শিল্পই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। অটোমেশন বাড়ছে, নিম্ন দক্ষতার চাকরি কমছে, ঘটনাটা এখনই ঘটতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় নতুন শিল্প চাহিদার দক্ষতার ভিত্তিতে একাডেমি ও ইন্ডাস্ট্রির যৌথ সমন্বয়ে দ্রুত দক্ষ শ্রমিক তৈরির রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। একটা নিরবচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি শ্রমিকপ্রতি মাথাপিছু রেমিট্যান্সও বাড়বে। সময়ের সঙ্গে কারিগরি দক্ষ চাকরি বাড়ছে, অদক্ষ কিংবা স্বল্প দক্ষ চাকরি কমছে। দেশে ও দেশের বাইরে এই পরিস্থিতির সুবিধা নিচ্ছে বিদেশিরা। অভ্যন্তরীণ শিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিক—তিন ক্ষেত্রেই দক্ষতার চাহিদা প্রযোজ্য। বিশ্বে যুদ্ধ ও মন্দা না হলেও শ্রমবাজারে দক্ষতার এই রূপান্তর ঘটতেই থাকবে।</p>
<p>দেশের প্রায় ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ শ্রমবাজার অপ্রাতিষ্ঠানিক। ফলে চাকরি বাড়াতে বেসরকারি খাতে সত্যিকার বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ দরকার, এমন স্বচ্ছ উদ্যোগ যেখানে বিনিয়োগের নামে ঋণ নিয়ে সেটা পাচার কিংবা ভোগে ব্যয় হবে না। সরকারকে ক্ষুদ্র, এসএমই ও বৃহৎ ব্যবসা ও শিল্পের ভালো ব্যবসায়ীর ডেটাবেইস তৈরি করতে হবে, যাঁরা ঋণ নিয়ে কিস্তি ফেরত দেন ও ব্যবসা করেন। তথ্যশালার আলোকে ক্রেডিট রেটিং-ভিত্তিক আধুনিক ঋণদান ব্যবস্থা দরকার। ব্যাংক ঋণ দানের ডিজিটাল ফিনটেক সমাধান ও আর্থিক তথ্যনির্ভর নতুন ডিজিটাল কৌশল বের করাও জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, ক্ষুদ্র বা ব্যাস্টিক অর্থনীতির চাকরি বাঁচানো মন্দাকবলিত অর্থনীতির বড় কাজ। প্রশাসনের দুর্নীতি ও সরকারের অপখরচের লাগাম টেনে ধরে সামাজিক নিরাপত্তা ও চাকরি বাড়ানোর উদ্যোগ চাই।</p>
<p>বর্তমানে আমানত প্রবাহ কম ও তারল্য সংকট পরিস্থিতিতে ছয়-নয় সুদের হার কাজ করছে না বলে এটা উঠিয়ে, ব্যাংক ঋণ পাচার ও গায়েবের দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করে অর্থবহ শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। কর্মী ছাঁটাই না করার শর্তে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে হবে এবং খেলাপি ঋণ না করা ব্যবসা ও শিল্প মালিকদের সহজ শর্তের ঋণ প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। অর্থাৎ বর্ধিত বেকারত্বের ধারা থামাতে মুদ্রানীতিকে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ফ্লেক্সিবল করতে হবে।কোম্পানি গুলোতে কর্মরত জনসম্পদকে নতুন মেশিনে, রোবোটিক অপারেশন পরিচালনায় দক্ষ করার জন্য ম্যাসিভ প্রোগ্রাম দরকার। আধুনিক অটোমেশন করা উৎপাদন পরিবেশের সঙ্গে তাল মেলাতে শ্রমিকদের দক্ষতা অর্জনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা, ট্রেনিং বাজেট ও ট্রেনিং জরুরি।</p>
<p>পাশাপাশি বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে ধীরে ধীরে বিদেশি শ্রমিক কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে, দেশীয় শ্রমিক নিয়োগে গুরুত্বারোপ করা চাই। অবশ্যই নতুন কর্মদক্ষতার মানবসম্পদ বিদেশ থেকে আনতে হবে এবং সেখানেও দক্ষতা হস্তান্তরের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার মোট শ্রমবাজারের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশের নিয়োগদাতা। বর্ধিত বেকারত্বের সমস্যার মুখে সরকারি শূন্য পদে নিয়োগের হার বৃদ্ধি করা দরকার। সেবা খাতে মাথাপিছু নিয়োগের কর্মসংস্থান বান্ধব বাজেটীয় কৌশল দরকার। মাথাপিছু শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা কর্মী নিয়োগ বাড়িয়ে সরকারি কর্মসংস্থানকে অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। তবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ায়, প্রশাসন অদক্ষ ও অযোগ্য কর্মচারী ও কর্মকর্তার ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে!</p>
<p>সরকারি নিয়োগে তরুণদের দুটি দাবি উল্লেখযোগ্য। কোটার দৌরাত্ম্য ও বেকারদের কাছে চাওয়া আবেদন ফি’র অন্যায্যতা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী ও পোষ্য কোটা মিলে ছিল ৮০ শতাংশ। ২০ শতাংশ পুরুষ কোটার পরে মেধা কোটার কার্যকর হার শূন্য। এমন সমস্যা রেল, ডাক বিভাগসহ আরও কিছু খাতে। রাষ্ট্রীয় নিয়োগের নামে অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগের এমন সাক্ষাৎ প্রতারণা অর্থহীন। নারী ও পোষ্য কোটার ৮০ শতাংশের পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নাটক সাজানোর অর্থ হচ্ছে, লাখ লাখ বেকার চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে আবেদন ফি নেওয়ার ব্যবসা জারি রাখা। এই দুর্বৃত্তপনা বন্ধ হোক! চাকরিতে কয়েক দশকের নারী অগ্রাধিকার চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নারীরা এখন শিক্ষায় ও চাকরিতে এমনিতেই বেশ এগিয়ে আছে। তাই তাঁদের ২০ শতাংশের বেশি কোটা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। প্রাথমিকের শিক্ষকেরা এখন ভালো বেতন পান। তাঁদের সন্তানদের জন্য পোষ্য কোটার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই’ (২৯ ডিসেম্বর ২০২২ প্রথম আলো)। অগ্রহণযোগ্য কোটা বাতিল, সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি নেওয়ার ব্যবসা বন্ধ, সীমিত হলেও চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা চালু, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নম্বর প্রকাশসহ চাকরি প্রার্থীদের ন্যায্য দাবি মানা দরকার।</p>
<p><strong>বেকারত্বের মিছিলে নতুন সমস্যা, তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক নিয়োগ কমা। ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প মোট ৩ হাজার ৫০০টি রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনকারী কারখানার তথ্য সংগ্রহ করে দেখিয়েছে, নারী শ্রমিকদের হার ৫৮ শতাংশ ও পুরুষদের ৪২ শতাংশ। অথচ একটা সময় নারী শ্রমিক প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল। করোনাকালে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্যস্ফীতিতে শহরে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে, গরিব মানুষ শহর ছাড়ছে বলে পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক সরবরাহ কমছে। আছে কারিগরি সমস্যা। রোবট, কাটিং মেশিন, লেজার মেশিন, অটোমেটিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারীদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেওয়া হয় না বলে, নারীর তুলনায় পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের হার বাড়ছে। কমবয়সী নারীর প্রখর আলো, গরম, মাইক্রো ফাইবারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘ শ্রমঘণ্টার শ্রমঘন কাজে নারীর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ক্ষতি বাড়ছে বলে নারীরা পোশাক শিল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন। প্রান্তিক অর্থনীতির বর্ধিত নারী বেকারত্ব দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে শোচনীয় করবে। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান দরকার।</strong></p>
<p>বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার, সঙ্গে শুরু হয়েছে স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমবাজারের বেকারত্ব। একদিকে কর্ম তৈরির সরকারি কৌশল নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডলার-সংকট, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ খাতে পাচার এবং কেলেঙ্কারিজনিত মন্দার থাবা। দক্ষতা তৈরিতে শিল্পে ও শিক্ষালয়ে ট্রেনিং পরিকল্পনা নেই। দেশের বেকারত্বের কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও চাকরি তৈরির মাসিক ড্যাশবোর্ডও নেই। ফলে সরকার ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে।</p>
<p>বেকারত্বের সরকারি সংখ্যা অযৌক্তিক, এই দিয়ে ফলপ্রসূ কৌশল তৈরিও অসম্ভব। বেকারত্বের সরকারি সংখ্যাও রেকর্ড করেছে। মধ্যবিত্ত দেশগুলোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য বেকার ভাতা, বাংলাদেশে এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। জীবিকা বাঁচাতে না পারলে অর্থনীতি কীভাবে বাঁচবে, এই প্রশ্নের উত্তর কাঠামোগতভাবে খুঁজতে হবে সরকারকে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15768</post-id>	</item>
		<item>
		<title>লিবারেলিজম ও লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 15 Apr 2025 14:56:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15761</guid>

					<description><![CDATA[মানবতাকে দীর্ঘ বারোশত বছর আদালত ও মারহামাতের সুশীতল ছায়া দানকারী এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধনকারী ইসলামী সভ্যতার পতনের পরে মানবতাকে জাহেলিয়াত ও জুলুমের নিগূঢ় আধাঁরে নিপতিতকারী বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার যে আধুনিক শোষণ চলছে, এ শোষণকে বুঝার জন্য লিবারেলিজম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানবতাকে দীর্ঘ বারোশত বছর আদালত ও মারহামাতের সুশীতল ছায়া দানকারী এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধনকারী ইসলামী সভ্যতার পতনের পরে মানবতাকে জাহেলিয়াত ও জুলুমের নিগূঢ় আধাঁরে নিপতিতকারী বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার যে আধুনিক শোষণ চলছে, এ শোষণকে বুঝার জন্য লিবারেলিজম কী, লিবারেলিস্টদের ওয়াদা কী, তারা বিশ্বকে মূলত কী দিতে চায়, তাদের তাকলীফ তথা প্রস্তাবনা কী- এ বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝা জরুরী। লিবারেলিজম বিগত প্রায় তিন শতাব্দীব্যাপী প্রভাবশালী ও বিজয়ী একটি চিন্তা। আমরা বর্তমানে কেমন দুনিয়ায় বসবাস করছি, এ দুনিয়ায় কোন কোন চিন্তাধারা প্রভাবশালী, তা যদি আমরা বুঝতে না পারি, তাহলে আমাদের পক্ষে ইসলামের আহ্বান, ইসলামের আদালত, ইসলাম কর্তৃক মানুষকে দেওয়া মর্যাদার বিষয়গুলোকে অন্য কোনো চিন্তার বিপরীতে যৌক্তিক ও বিজয়ী হিসেবে হাজির করা সম্ভব হবে না। লিবারেলিজমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই এ মুহূর্তে আমাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো বর্তমানের এ জাহেলিয়াতকে ভালোভাবে জানা ও বুঝা। হযরত উমর (রা.) এর ভাষায়- &#8220;যে জাহেলিয়াতকে ভালোভাবে চিনতে পারেনি, জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি, তার পক্ষে ইসলামকে খুব ভালোভাবে জানা সম্ভব নয়।&#8221; লিবারেলিজম এবং এর চিন্তাধারা পৃথিবীতে একটি প্রগতিশীল চিন্তাধারা হিসেবে পরিচিত। এ আলোচনার পূর্বে প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে প্রগতিবাদ সম্পর্কে আলোকপাত জরুরী। সাধারণত প্রগতিবাদের দুটি ধারণা পাওয়া যায়:</p>
<p>১. সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও</p>
<p>২. লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ।</p>
<p>কোনো চিন্তাধারার স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো তা আগামীর পৃথিবীকে কী দিতে চায়, মানুষকে কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়, তা তুলে ধরতে পারা: অন্যথায় তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিটি চিন্তাধারার একটি ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন থাকা বাঞ্ছনীয়। যেমন- বর্তমান বস্তুবাদী World View বা বিশ্বদর্শনের একটি ধারণা হলো, যত দিন যাচ্ছে, পৃথিবী তত সুন্দর এবং কল্যাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একইভাবে আমাদের মুসলমানদের একটি শ্রেণির ইতিহাসের ব্যপারে ধারণা হলো যত দিন যাচ্ছে, মানুষ তত খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো এ দুটির একটি ইফরাত, অন্যটি তাফরিত। কারণ সত্যিকারার্থে মানবজাতির ইতিহাসের প্রকৃতি শুধুমাত্র উর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী নয়, বরং তা চক্রাকার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ ব্যপারে বলেন,</p>
<p><strong>&#8220;আমি মানুষের মধ্যে খারাপ দিন এবং ভালো দিনগুলোকে চক্রাকারে আবর্তন করি।&#8221;</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের ইতিহাস দর্শনের দিকে লক্ষ্য করলে আমাদের ইতিহাসের প্রকৃতিতে অনেকটা এ রকমই দেখতে পাবো, কখনো তা উর্ধ্বমুখী, কখনো নিম্নমুখী, আবার কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে উর্ধ্বমুখী হয়েছে, আবার নিম্নমুখী হয়েছে। অর্থাৎ তা একটি আবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এটিই সবচেয়ে যৌক্তিক ইতিহাস দর্শন। ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন থাকার ধারাবাহিকতায় সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদেরও আলাদা আলাদা ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন রয়েছে এবং তারা পৃথিবীকে তাদের ভবিষ্যৎ দর্শনের দিকেই ধাবিত করতে চায়। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ ও লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ উভয়েই প্রগতি (Progress) চায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো তাদের প্রগতির (Progress) সর্বশেষ পর্যায় কী, তারা কোথায় গিয়ে থামতে চায়? সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদের ক্ষেত্রে প্রগতির সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো শ্রেণি বৈষম্য, অর্থাৎ বুর্জোয়া ও প্রলিটারিয়েতদের মধ্যকার সংঘাত। আর তাদের প্রগতির শেষ পর্যায় হলো শ্রেণিহীন একটি সমাজ বা Classless Society তৈরি, যে সমাজে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো সম্পদ থাকবে না, সবাই সমান থাকবে এবং ধর্মের কোনো স্থান থাকবে না। বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রের যে ধরণ, তাদের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের ধরণ তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের আকাঙ্ক্ষিত সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, পরিবারের সাথে পরিবারের সম্পর্কসহ এ ধরনের বিষয়গুলো নতুন করে বিন্যস্ত হবে। কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিকের মতে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবারের অস্তিত্বই থাকবে না। তারা তাদের এ চিন্তাধারাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, বলকান এবং আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই, তাদের কৃত ওয়াদা এবং তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।</p>
<p>এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের &#8220;অ্যানিমেল ফার্ম&#8221; (Animal Farm), যেখানে সুস্পষ্টভাবে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদের ইতিহাস পড়লেই বুঝা যায়, এটি ছিল মূলত একটি ইউটোপিয়া, যার সাথে মানুষের ফিতরাত ও মানব ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই সাথে এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল একটি আন্দোলন, যে আন্দোলন মানুষের শক্তিকে পুঁজি করে, পুঁজিবাদের প্রতি মানুষের আক্রোশকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল একটি ব্যর্থ বিপ্লব, যা কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির বেশি, কিন্তু শুধুমাত্র সোভিয়েত রাশিয়ার ৭০ বছরের আমলে মারা গেছেন ৬ কোটিরও বেশি মানুষ। একটি বিপ্লব বা একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী পরিমাণ মানুষকে খুন করা হয়েছে! এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পরেই তাদের উপলব্ধিতে এসেছে যে, তাদের এ তথাকথিত মতবাদ প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এবং এ মতবাদ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যদিও বিভিন্ন আদলে তাদের আন্দোলন এখনো জারি আছে, কিন্তু তার অনুভূতি যতদিন যৌবনের তেজ থাকে, শক্তি-সামর্থ থাকে, ততদিনই জারি থাকে, তারপর তারা কেউ ব্যবসা করে, কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঢোকে, তারপর তারা লিবারেলিস্ট হয়ে যায়। এটিই তাদের ইউটোপিয়া। এ ধরণের ইউটোপিয়া লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদের প্রস্তাবিত ভবিষ্যত দর্শনেও পরিলক্ষিত।</p>
<p>সমাজতান্ত্রিক এবং লিবারেলিস্টদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হলো সমাজতান্ত্রিকরা বিপ্লবকে (Revolution) প্রাধান্য দিয়ে থাকে, অন্যদিকে লিবারেলিস্টরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক পরিবর্তন, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন, আইনের পরিবর্তন, সংস্কৃতির পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মৌলিক এ পার্থক্যের দিক থেকে লক্ষ্য করলে উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই ব্রিটেনের কথা উল্লেখ করা যায়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের একটি হলো ব্রিটেন, যে রাষ্ট্র আমূল পরিবর্তনের (Radical change) মাধ্যমে স্থিতিশীলতা লাভ করেছে। ব্রিটেনে সে অর্থে কোনো রক্তাক্ত বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। অনন্য শক্তিধর দেশ জাপানও কোনো রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে সমাজ পরিবর্তনের পন্থা হিসেবে রক্তাক্ত বিপ্লবকে বেছে নেওয়া অন্যতম প্রধান রাষ্ট্র হলো ফ্রান্স। ফ্রান্স আজও স্থিতিশীল হতে পারেনি, আজও হরতালে অগ্নি সংযোগে প্যারিসের রাজপথ পুড়ে যায়। নেপোলিয়নের ফ্রান্সে বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিমাণ মানুষ মারা গিয়েছে, তা অকল্পনীয়। আর তাদের এ বিপ্লবের কারণ হলো যে কোনো মূল্যে প্রভাব বিস্তার। সমাজের একটি অংশ যখন তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করবে এবং যখন তারা শক্তির অধিকারী হবে, তখন সমাজের বাকি অংশ যদি তাদের পক্ষে না আসে বা তাদের মতাদর্শের আলোকে কাজ করতে না পারে, তাহলে তারা যে কোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করবে। তারা হয় তাদের হত্যা করবে, না হয় নির্বাসনে পাঠাবে। এটিই তাদের বিপ্লবের মূল কথা।</p>
<p>একইভাবে লিবারেলিস্টদের চিন্তাধারায় বিপ্লবের পরিবর্তে বিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তাঁদের মূলনীতি হলো Revolution নয় Evolution। অর্থাৎ তারা মানুষকে ধাপে ধাপে পরিবর্তন, পরিবর্ধন এমনকি রূপান্তরের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যায়। লিবারেলিজমের আলোকে সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো শিক্ষা, মিডিয়া, আইন এবং অন্যান্য উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ। যার কারণে আমরা তাদের পন্থা সহজে বুঝতে পারি না। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, <strong>সমাজতান্ত্রিকরা সরাসরি মাথায় আঘাত করে</strong><strong>, </strong><strong>আর লিবারেলিস্টরা এনেস্থিসিয়া দিয়ে অচেতন করে ধীরে ধীরে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে যায়</strong><strong>, </strong><strong>অথচ আমরা টেরও পাই না।</strong> <strong>কিন্তু উভয়টিরই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো মানুষকে শোষণ করা এবং মানুষের উপর আধিপত্য কায়েম করা।</strong></p>
<p>এ সমাজতান্ত্রিক এবং লিবারেলিস্টদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যও রয়েছে, তা হলো উভয়েই নিজেদের চিন্তাধারাকে বৈজ্ঞানিক বলে দাবি করে এবং তারা দাবি করে যে তারা ডগম্যাটিক নয়। তাদের অন্যতম একটি চিন্তাধারা হলো ইউরোপের একজন নিউটনের পূর্বে বিজ্ঞান ছিল না, সবই ছিল থিওলজি বা হিকমা। যেহেতু তারা তার পরবর্তী যুগে বসবাস করছে, তাই তাদের জন্য প্রযোজ্য হলো; বৈজ্ঞানিক নয়, এমন বিষয়গুলোকে ধর্তব্যে না নেওয়া। তারা তাদের নিজ নিজ চিন্তাধারাকে বৈজ্ঞানিক দাবি করার কারণ হলো তারা মনে করে তাদের চিন্তাধারাকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে, এছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পন্থা নেই। আর তা বাস্তবায়িত হলে দুনিয়া একটি সুন্দর দুনিয়া হবে এবং এর ফলে দুনিয়া সমৃদ্ধির সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তারপর আর কোনো ধরনের অনুসন্ধানের প্রয়োজন হবে না। তখন ইতিহাসও তার লক্ষ্যে উপনীত হবে। তারপর তাদের মধ্যে কেউ কেউ &#8220;The End of History&#8221; বই রচনা করবে! অতঃপর তাদের সজ্জিত দুনিয়ায় সকলকে বসবাস করতে হবে।</p>
<p>আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে বলা যায়, সমাজতান্ত্রিক ও লিবারেলিস্টদের দর্শনকে বৈজ্ঞানিক বলার মূল কারণ হলো তাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা। মুসলমানরা আখিরাতের প্রতি যেমন দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তাদের চিন্তাধারার প্রতি তাদের বিশ্বাসও অনুরূপ। অর্থাৎ যে বিষয়টি বৈজ্ঞানিক, সেটিই একমাত্র সত্য। গোটা বিশ্বকেও এ সত্য মেনে নিতে হবে, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, অন্যথায় পরিণতি হবে করুণ। তাদের মতে, তাদের এ প্রগতির সামনে যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে যে কোনো মূল্যে, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সরিয়ে দিতে হবে, এ দুনিয়াতে বসবাস করার কোনো অধিকার তার নেই। সোভিয়েত রাশিয়া এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। তৎকালীন সময়ে যারা পুঁজিবাদ এবং বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী ছিল, তাদেরকে হত্যা করা হতো বা নির্বাসনে পাঠানো হতো। বর্তমানে বলকান, ককেশাস এবং সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তার মূল কারণও এটিই। তাদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সামনে যারাই দাঁড়াবে, যারাই তাদের ভিশনের বিরোধী, তারা একইসাথে উন্নতি, অগ্রগতি এবং প্রগতির বিরোধী, আর এজন্য তাদের যে কোনো মূল্যে নিঃশেষ করতে হবে। লিবারেলিজম নিয়ে আলোচনার সর্বাগ্রে লিবারেলিজমের সংজ্ঞা নিয়ে আলোকপাত জরুরী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এন্ড্রো হেইউড (Andrew Heywood) তার &#8220;Politics&#8221; নামক গ্রন্থে লিবারেলিজমের মূল ধারণা (key-idea) হিসেবে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>১. Individualism.</li>
<li>২. Freedom.</li>
<li>৩. Reason.</li>
<li>৪. Equality.</li>
<li>৫. Toleration.</li>
<li>৬. Consent.</li>
<li>৭. Constitutionalism.</li>
</ul>
<p>এখানে তারা reason এর ক্ষেত্রে progress বা প্রগতিকে এবং equality এর ক্ষেত্রে meritocracy কে প্রাধান্য দিয়েছে। Consent এর ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, চুক্তির ভিত্তিতে সমতা থাকতে হবে। সাদা চোখে এ ধরনের বই পড়লে কেউ লিবারেলিজমের বিরোধিতা করবে না, কিন্তু এর পেছনের দর্শন জানলে যে কেউ আশ্চর্য হয়ে যাবে। তারা আমাদের সবাইকে প্রতারিত করে, পূর্বে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এনেস্থিসিয়া দিয়ে অচেতন করে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হচ্ছে, অথচ আমরা টেরই পাচ্ছি না। কিন্তু যখন এনেস্থিসিয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে, তখন আমরা দেখছি আমাদের কারো চোখ নেই, কারো হাত নেই, কারো পা নেই! এহেন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় হলো আমাদের ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হবে যে, তারা কীভাবে আমাদের প্রতারিত করছে। আর এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জানতে হবে লিবারেলিজম কী, লিবারেলিস্টরা কেমন স্বপ্ন নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছিল এবং তাদের মূল ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন কী। মূলত লিবারেলিস্টদের ওয়াদা বা ভবিষ্যৎ দর্শন হলো তারা দুনিয়াকে জান্নাতে পরিণত করবে। কিন্তু তারা কেমন জান্নাতের স্বপ্ন দেখে? লিবারেলিজমের পেছনে কার্যকরী সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। মূলত ব্রিটিশ সম্প্রসারণবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক যে বিকাশ, এ চিন্তার পেছনের মূল চিন্তা হলো লিবারেলিজম। অর্থাৎ ব্রিটিশ পুঁজিবাদের সম্প্রসারণই হলো লিবারেলিজমের মূল লক্ষ্য।</p>
<p>লিবারেলিস্ট অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার &#8220;The End of History and The Last Man&#8221; বইয়ের মূল কথা হলো- &#8220;অর্থনীতির ক্ষেত্রে লিবারেলিজম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেসি। এ দুটি ছাড়া মানুষের আর কোনো গন্তব্য নেই। আর এ গন্তব্যে পৌঁছানোর মানে হলো আর কোনো কিছু অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই।&#8221;</p>
<p>Bernard Mandeville এর বিখ্যাত বই &#8220;The Fable of the Bees&#8221;, তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এ বইয়ে তিনি আখলাক এবং অর্থনীতিকে পরস্পর থেকে আলাদা করছেন। তবে এ আখলাক হলো খ্রিস্টান ধর্মের আখলাক। তার মতে অর্থনীতির মূলভিত্তি হলো সুদভিত্তিক পুঁজিবাদ। এ বইটি মূলত একটি উপন্যাস, যেখানে মৌমাছিদের ঠিকভাবে কাজ না করা, অলস বসে থাকার পেছনে ধর্মীয় (খ্রিস্টান ধর্ম) বৈরাগ্যবাদকে তুলে ধরা হয়েছে। যখন দ্বীন থেকে আখলাককে সরিয়ে নেওয়া হলো, তখন মৌমাছিদের উৎপাদন ব্যপকভাবে বেড়ে যায় এবং তারা সমৃদ্ধি লাভ করে। মৌমাছিরা ঠিকভাবে কাজ না করার কারণ হলো বৈরাগ্যবাদ, আর এ বৈরাগ্যবাদ খ্রিস্টানদের রূহানিয়াত। ম্যান্ডেভিলের ভাষ্যে, &#8220;যদি আমরা উন্নতি এবং অগ্রগতি চাই, তাহলে আমাদের আখলাক ও দ্বীন থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যথায় আমরা উন্নতি করতে পারবো না।&#8221; এ বইয়ের উপর ভিত্তি করে অর্থনীতির জনক হিসেবে পরিচিত এডাম স্মিথ তার &#8220;The Wealth of Nations&#8221; বই লিখেন, যে বইকে অর্থনীতির বাইবেল বলা হয়। এ বই আখলাক এবং অর্থনীতিকে আলাদা করাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। পরবর্তীতে এ বইয়ের উপর ভিত্তি করেই মার্কেন্টালিজম বা ব্রিটেনের অর্থনীতি দাঁড়ায়। এখানেই লিবারেলিস্ট অর্থনীতির বীজ গ্রোথিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উপরোক্ত বিষয়গুলোকে ভালোভাবে না বুঝলে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ বণিক সভ্যতাকে, বর্তমান অর্থনীতির মূল ভিত্তিকে বুঝা সম্ভব নয়। আমরা ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে কথা বলি, ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কথা বলি, কিন্তু আমরা জানি না যে টাকার সংজ্ঞা কী! মার্কেন্টালিজম বুঝা ছাড়া কারো পক্ষে বর্তমান অর্থনীতি নিয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। অর্থনীতি এবং আখলাকের মধ্যকার বিভাজনকে না বুঝে কারো পক্ষে অর্থনীতি নিয়ে কল্যাণমূলক কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদীদের বিখ্যাত ঐতিহাসিক বাকল (Henry Thomas Buckle) বলেন, &#8220;যারা মেধাবী ও গতিশীল, তাদের আখলাককে নয়, বরং মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ মেধা অগ্রসর হয়, শানিত হয়, কিন্তু আখলাক এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা, যার জন্য যা ইচ্ছা তাই করা যায় না।&#8221; অর্থাৎ, তাদের মতে তাদের প্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দ্বীন ও আখলাক। এক্ষেত্রে এ দ্বীন ও আখলাক হলো খ্রিস্টান ধর্ম ও খ্রিস্টানদের আখলাক। একইভাবে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো অধ্যয়ন করি, তখন দেখতে পাই, দ্বীন ও আখলাক বাদ দিয়ে এমন এক ধরনের অর্থনৈতিক দর্শন ও সমাজদর্শন দাঁড় করানো হচ্ছে, যার সাথে আমাদের সমাজের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন আমরা তাদের বর্জনকৃত দ্বীন ও আখলাকের সাথে আমাদের দ্বীন (ইসলাম) ও আখলাককে মিলিয়ে ফেলছি?</p>
<p>আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, &#8220;আমরা দুনিয়া ও আবিরাত উভয় জগতে কণ্যান চাই&#8221; এবং আল্লাহ বলেন, &#8216;দুনিয়ায় তোমাকে যে অংশ দেওয়া হয়েছে, সেটি তুমি ভুলে যেও না। আমাদের মূল সমস্যা হলো আমরা স্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক নিত্তপণ করতে পারছি না, সমন্বয় করতে পারছি না। সমন্বয় করতে না পারার মূল কারণ হলো দ্বীনের ব্যাপারে প্রান্তিক ধারণা। ইসলামে দ্বীন ও দুনিয়ার স্বরূপ তেমন তা সঠিকভাবে না জানার কারণে কেউ শুধু দ্বীনের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে, আবার কেউ শুধু দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। অথচ দুটোই ইসলামের আদালতকে খারিজ করে দিচ্ছে। এ বিষয়টি আমাদের বুঝা প্রয়োজন, সেই সাথে আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে যে, বর্তমান ব্যবস্থায় দ্বীন বলতে যে খ্রিস্টানদের ধর্ম এবং আখলাক বলতে যে খ্রিস্টানদের আখলাককে বুঝানো হয়, এর সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ এবং লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ উভয়টিই দ্বীন ও আখলাককে প্রধান শত্রু মনে করে, এক্ষেত্রে তারা এক। তাদের পার্থক্য হলো মালিকানা নিয়ে ধারণার ক্ষেত্রে। লিবারেল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদ মালিকানা রক্ষার চেষ্টা করে, আর সমাজতান্ত্রিক প্রগতিবাদ মালিকানা উৎখাতের চেষ্টা করে, অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানা বলতে কিছু থাকবে না।</p>
<p>বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষ সম্পদের মালিক নয়, মালিক হলো এরিস্ট্রোক্রেটরা। স্পেন ছাড়া সমগ্র ইউরোপে দশ হাজার এরিস্ট্রোক্রেট আছে, যাদেরকে Land Lord বলা হয়। মূলত তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য প্রণিত ব্যবস্থাই হলো লিবারেলিজম। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনের কথা বলা যায়, ব্রিটেনের অর্থনীতি ভূমি মালিকানার সাথে সম্পর্কিত। যেমন- ব্রিটেনের পার্লামেন্টে দুইটি হাউজ রয়েছে, হাউজ অব কমন্স এবং হাউজ অব লর্ডস। হাউজ অব কমন্সের সদস্য সংখ্যা ৬৫০ জন এবং হাউজ অব লর্ডসের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০০ জন। প্রকাশ্যে হাউজ অব কমন্স এর বির্তক প্রচারিত হয়, কিন্তু কোনো নীতিই হাউজ অব কমন্সে পাস হয় না। অর্থাৎ এটি একটি কমিটি ছাড়া কিছুই নয়। সেই সাথে হাউজ অব কমন্সে যারা নির্বাচিত হয়, তাদেরকে এরিস্ট্রোক্রেটরা প্রোপাগান্ডার জন্য টাকা, ঘুষ প্রদান করে। অন্যদিকে আমেরিকার ধর্ম হলো Civil Religion। এই Civil Religion-ই তাদের প্রথম মূলনীতি। তাদের দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, ব্যক্তিগত সম্পদে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না। মূলত এরিস্ট্রোক্রেটদের মালিকানা সু-সংহত করবে, তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করবে এ ধরনের পদ্ধতিই লিবারেলিজম।</p>
<p>এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় দার্শনিক, লিবারেলিজম চিন্তাধারার বড় অগ্রপথিক জন লক এর বিখ্যাত বাণী, <strong>&#8220;</strong><strong>প্রথম মালিকানা কীভাবে অর্জিত হলো তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই</strong><strong>, </strong><strong>মালিকানা অর্জিত হওয়ার পর তা রক্ষা করাই হলো মূল বিষয়।&#8221;</strong> এ অনুসারে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বাংলা অঞ্চলসহ গোটা পৃথিবী থেকে যত কিছু লুট করে নিয়ে সংরক্ষণে রাখা হয়েছে, এগুলোর জন্য কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে তারা রাজি নয়, বরং তাদের চিন্তার বিষয় হলো কীভাবে এসব সম্পদ তারা রক্ষা করবে। আমাদের দেশে যদি কেউ ব্যাংকে মোটা অংকের টাকা জমা দিতে যায়, প্রশাসন প্রথমেই তারা টাকার উৎস অনুসন্ধান করবে। অন্যদিকে আমেরিকাতে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে দুই ট্রিলিয়নের বেশি টাকা পাচার হয়। টাকা পাচারকারীদের জান্নাত হলো আমেরিকা এবং কানাডা। অথচ এসব দেশে এ টাকার উৎস নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থাই নেই। একইভাবে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জন লক বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>রাষ্ট্র হলো মালিকানা রক্ষা করার জন্য গঠিত একটি ব্যবস্থা। মালিকানা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্র মানুষকে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারে।&#8221;</strong></p>
<p>ব্রিটেন এরিস্ট্রোক্রেটদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যেখানে তারাই সম্পদের মালিক। সম্পদের মালিকানা রক্ষায় তাদের নীতি হলো &#8220;যে মালিকানার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।&#8221; অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো এরিস্ট্রোকেটদের ভূমির মালিকানা রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। মার্কস তার &#8220;Das Capital&#8221; বইয়ে তৎকালীন লন্ডনের অবস্থা তুলে ধরেছেন। এ বইয়ে তিনি শ্রমিকদের উপর কৃত অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। লন্ডনের ফ্যাক্টরিগুলোতে বিভিন্ন শর্তের আলোকে মানুষকে কাজ করানো হতো। সে শর্তগুলো এতটাই কঠিন ছিল যে, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যুবকরা তাদের যৌবনের উৎসাহ, উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলতো, শিশুরা হারিয়ে ফেলতো শৈশবের কোমলতা। তার এ বই মূলত ক্যাপিটালজমের নির্মম জুলুম-নির্যাতনের বর্ণনা, যেখানে তিনি লন্ডনকে এ জুলুম-নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে, এ জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছিলো এরিস্ট্রোক্রেটরা। তাদের সম্পদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, অন্যদিকে প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণি দিন দিন দরিদ্র হচ্ছিলো, নির্যাতিত, নিপিড়ীত হচ্ছিলো।</p>
<p>তারা তাদের শিল্পের বিকাশের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশকে শেষ করে দিয়েছে, বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন অঞ্চলকে শোষণ করেছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, সে সময়ে জন লক, জন স্টুয়ার্ট মিল, থমাস ম্যালথাস-সহ বড় বড় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীদের ভূমিকা কী ছিল? তিক্ত হলেও সত্য, তারা জুলুমকে গ্রহণযোগ্য বানানোর জন্য এবং সমগ্র পৃথিবীতে একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার জন্য তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। যেমন- জন লকের তত্ত্ব। এর উদাহরণ আমরা এডাম স্মিথের পুঁজি সম্পর্কিত বইগুলোতেও দেখতে পাই। তার মতে প্রাকৃতিক সম্পদ বা নগদ টাকা পুঁজি নয়, পুঁজি হলো শ্রম। তাদের চিন্তাধারা, ব্যবস্থাকে সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই মূলত তারা এ ধরনের তত্ত্ব আবিষ্কার করতো। সামগ্রিকভাবে তাদের লক্ষ্য ছিল মালিকানার উপর ভিত্তি করে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যে ব্যবস্থা মালিকানা বৃদ্ধি করবে, ধনীদেরকে আরও ধনী বানাবে। সেই সাথে অন্য মানুষের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তারা তৈরি করবে, যেটি বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করবে।</p>
<p>সে সময়ে এত বিস্তৃত অর্থে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস শিল্পায়নের সাথে জড়িত। শোষিতরা যেন তাদের ফ্যাক্টরিতে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতে পারে, সেই মানে তাদেরকে উন্নীত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। এটিই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ইতিহাস। আর তালের ব্যবস্থার অধীনে মানুষকে কাজ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে নিয়ে আসা হয় ব্যক্তিস্বার্থকে। মানুষের মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তুমি যদি কাজ করো, তাহলে তুমি ধনী হতে পারবে, যাকে বলা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। এখানে আখলাক এবং দ্বীনের কোনো স্থান নেই। ডেভিড হিউম বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>যদি আমরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই</strong><strong>, </strong><strong>তবে তাদেরকে ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ধাবিত করতে হবে। কেননা ব্যক্তিস্বার্থ এমন একটি বিষয়</strong><strong>, </strong><strong>যা তাকে ব্যবস্থা (</strong><strong>System) </strong><strong>থেকেই অর্জন করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যার কারণে তাকে অবশ্যই ব্যবস্থার অধীনে আসতে হবে।&#8221;</strong> ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ছুঁটে চলা মানুষের চিন্তায় থাকে সে কীভাবে কর্পোরেট, ব্যবস্থার (System) একজন ভালো শ্রমিক হবে। ব্যক্তিস্বার্থকে ব্যবহার করে মানুষকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি আমরা ফেরাউনের শাসনব্যবস্থায়ও দেখতে পাই। ফেরাউন তার জাতির উপর সবচেয়ে বেশি জুলুম করতো, তাদেরকে নিগৃহীত করতো, নিপীড়িত করতো, অসম্মানিত করতো, তবুও তারা ফেরাউনের আনুগত্য করতো, কারণ তারা ছিল ফাসেক জাতি। আর ফাসেক হলো তারা, যারা আল্লাহ এবং রাসূলের (স.) চেয়ে, আল্লাহর জন্য সংগ্রামের চেয়ে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ, সম্পদ, পরিবারকে বেশি গুরুত্ব বা প্রাধান্য দেয়। এমনকি কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে ছুটে বেড়ায়, শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন গঠন করে, তাহলে সে সারাদিন আল্লাহকে স্মরণ করলেও, নামাজ পড়লেও সে ফাসেক জাতিরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আর এটি করতে পারলেই তারা সফল। এ লক্ষ্যেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সকল ব্যবস্থা তাদের চিন্তার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। একজন মুসলমানের উচিত এ ব্যপারে সজাগ থাকা। কারণ যে ব্যক্তিস্বার্থের পেছনে না ছুটে মানুষের কল্যাণের পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর এ বিষয়টি আল্লামা ইকবাল তার &#8220;আসরারে খুদী ও রমুজে বেখুদী&#8221;তে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। এজন্য আমাদের খুদীকে বিকশিত করতে হবে, ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করতে হবে। একইসাথে এর মাধ্যমে যেন সমাজের মানুষ উপকৃত হয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়, তারা যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্রীড়নকে পরিণত না হয়, সে আলোকে কাজ করা আমাদের আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। শুধুমাত্র অর্থের পেছনে ছুটে বেড়ালে আমাদের জীবন হবে লাঞ্চিত, নিপীড়িত।</p>
<p>দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম একজন শেয়ার হোল্ডার। তিনি নিজেও একজন লর্ড ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, By the natural growth of civilization, power passes individual to masses. And the worth and importances of an individual as compared with the mass sink into grater and grater insignificance! অর্থাৎ, &#8220;সভ্যতার ক্রমবিকাশের যে প্রাকৃতিক গতিধারা, তা ক্ষমতাকে ব্যক্তির হাত থেকে একটি গোষ্ঠীর হাতে নিয়ে যায় (এখানে গোষ্ঠী বলতে সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি) এবং যখন ব্যক্তির মূল্য বা গুরুত্বকে এ গোষ্ঠীর সাথে তুলনা করা হয়, তখন ব্যক্তি মূল্যহীন হয়ে পড়ে।&#8221; ব্যক্তি যদি মূল্যহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সে কাজ করবে কেন? মূলত এটিই হলো লিবারেলিজম। তাদের ভাষ্যে, &#8220;সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে গোষ্ঠীসমূহের শক্তি আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। এখানে মূল বিষয় হলো বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ, এখানে ব্যক্তির ভূমিকা অর্থহীন। এখানে ব্যক্তি উৎপাদনের একটি উপাদান মাত্র।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>যে শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে মানুষ বসবাস করবে এবং এ শিক্ষাব্যবস্থাকে অবশ্যই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি উপ-শাখা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।&#8221;</strong> অর্থাৎ তারা মনে-প্রাণে এটিই বিশ্বাস করাবে যে, আমাদের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে হয় ইউরোপ, না হয় আমেরিকা। মূলত এসব কারণেই আমাদের ফিকহ ভিত্তি হারিয়েছে, মুসলমানরা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে, মাদরাসাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে, তার স্থলে বর্তমান ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেছে। তারা শুধুমাত্র এ শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, সেই সাথে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে যে, এর চেয়ে ভালো কোনো ব্যবস্থা হয় না। আর তাদের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তাদের দুটি পন্থা রয়েছে-</p>
<p>১. অর্থনৈতিক শক্তি।</p>
<p>২. মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।</p>
<p>পূর্বে লিবারেলিস্টদের অর্থনৈতিক শক্তি আলোচিত হয়েছে। এবারের আলোচ্য বিষয় তাদের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি। মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তৎকালীন সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল উপন্যাস (যেমন- ড্যানিয়েল ডিফোর &#8220;রবিনসন ক্রুসো&#8221;), আর বর্তমানে সিনেমা। অর্থনীতি আর মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা বুঝানোর চেষ্টা করে যে, এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতে পারে না। তারা বলে, তারা প্রতিটি ব্যক্তিকে শক্তিশালী বানায়, তাকে Freedom বা মুক্তি নেয়, Reason বা মুক্তচিন্তা দেয়, Equality বা সমতা দেয়, Toleration বা ধৈর্য্য শেখায়, Consent বা একতা শেখায়, Constitutionalism শেখায়। আদতে তারা শক্তিশালী করার নামে মানুষকে নফসের দাস হিসেবে গড়ে তুলে, মানুষের নফসের চাহিদা, আবেগ, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাকেই মানুষের স্বপ্নে পরিণত করে, এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যতটুকু স্বাধীনতা দরকার, ততটুকু স্বাধীনতার ব্যবস্থাই তারা করে। মূলত পুঁজিবাদ কোনো পণ্য বানানোর পূর্বে তার ক্রেতা বানায়। তাদের প্রদত্ত স্বাধীনতা হলো মানুষের জৈবিক চাহিদা বা নফসের চাহিদা পূরণ করার স্বাধীনতা, সেই সাথে যতদিন কেউ পুঁজিবাদের সেবা করবে, ততদিন সে স্বাধীন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো &#8216;American Dream&#8217;।</p>
<p>American Dream হলো একজন সঙ্গী, একটি কুকুর, দুইটি সন্তান, খাবার ভর্তি একটি ফ্রিজ, একটি ভালো গাড়ি। আর এটি কিন্তু বর্তমানে Dream of the World, যুব সমাজের স্বপ্ন! ইসলাম মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। কিন্তু একইসাথে ইসলাম মানুষকে শেখায় মানুষের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে শুধুমাত্র কয়েকটি বৈষয়িক বিষয়ের মধ্যে নামিয়ে আনা মানবতার প্রতি অপমান, কারণ মানুষ হলো খলিফাতুল্লাহ। এজন্য আমাদের জীবনে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। কাদেসিয়ার যুদ্ধের আগে পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের সামনে রিবঈ (রা.) এর ভাষণ এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন, <strong>&#8220;আল্লাহ আমাদরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর গোলাম বানানোর জন্য, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে আখিরাতের বিশালতার দিকে ধাবিত করার জন্য। আমরা বিভিন্ন ধর্ম কর্তৃক সৃষ্ট মানুষের গোলামী থেকে মানুষকে মুক্ত করে ইসলামের আদালতের দিকে নিয়ে যেতে চাই।&#8221;</strong> অথচ আমরা গোলামী করি কোম্পানির! আমাদের জীবনের স্বপ্ন একটা কোম্পানির কর্পোরেট অফিসার হওয়া। আমরা আমাদের জীবনকে American Dream এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি, অথচ আমাদের জন্য সমগ্র পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, সমগ্র মহাকাশ, মহাজগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে! আমরা যদি শুধুমাত্র আমাদের জীবনকে, জীবনের লক্ষ্যকে কয়েকটি বস্তুগত চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখি, সেটি হবে আমাদের নিজেদের প্রতিই অপমান। কারণ, আমরা হিবাতুল্লাহ (আল্লাহর দেওয়া উপহার)। আমাদের ভেতরে আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া রূহ রয়েছে। এজন্য আমাদের সর্বপ্রথম আমাদের মানবিক মর্যাদা বা খুদীকে আবিষ্কার করতে হবে।</p>
<p>লিবারেলিজমের দর্শনকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, লিবারেলিজম নামে যা দেখানো হয়, তা Irony ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে ইউরোপের অনেক ভালো ভালো চিন্তাবিদও রয়েছেন, যাদেরকে ভালোভাবে পড়া উচিৎ। <strong>কেউ যদি পুঁজিবাদকে ভালোভাবে খণ্ডন করতে চায়, তাহলে তার জন্য মার্কস এর &#8220;Das Capital&#8221; পড়াই যথেষ্ট। কেউ যদি ড্যানিয়েল ডিফোর &#8220;রবিনসন ক্রুসো&#8221; কে খন্ডন করতে চায়, তাহলে তার উচিত Michel Tournier রচিত &#8216;Friday&#8217; নামক গ্রন্থটি পড়া। কেউ যদি লিবারেলিজমকে খণ্ডন করতে চায়, তাহলে তার জন্য বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক কার্ল স্কিমিদ এর বইগুলো পড়াই যথেষ্ট।</strong> তার একটি বিখ্যাত বই হলো &#8220;Political Theology: Four New Chapters on the Concept of Sovereignty&#8221;। কার্ল স্কিমিদের মতে, <strong>&#8220;সত্যিকারের লিবারেলিজম আমাদের সামনে উপস্থাপিত লিবারেলিজমের সম্পূর্ণ বিপরীত।&#8221;</strong> এটিই মূলত লিবারেলিজমের সার-নির্যাস।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এবারের আলোচ্য বিষয় এ লিবারেলিস্টরা কেমন দুনিয়া চায় বা তাদের ওয়াদাকৃত জান্নাতের স্বরূপ কেমন। লিবারেলিস্টদের লক্ষ্য হলো World State বা বিশ্বরাষ্ট্র। তাদের মতে বিশ্বরাষ্ট্রই হলো ইতিহাসের সর্বশেষ পর্যায়, তারপর আর কিছু নেই। বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে, আর এটি তারা প্রতিষ্ঠা করবে, যারা এ চিন্তাধারায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ এরিস্ট্রোক্রেট, ডেমোক্রেটিক, ক্যাপিটালিস্ট চিন্তাধারায় বিশ্বাসীরা। অন্যদের দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ বিশ্বরাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন হবে তা সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক, ব্রিটেনের ইতিহাসে এংলো স্যাক্সন ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে বড় দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব, এ কথা অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রযুক্তি দুনিয়ার অনেক কিছুই তার &#8220;Principia Mathematica&#8221; এর উপর নির্ভরশীল। Logic and Linguistic এ তার ভূমিকা অনন্য, এক্ষেত্রে তার বিকল্প নেই। বার্ট্রান্ড রাসেলেরই স্বপ্ন ছিল বিশ্বরাষ্ট্র। লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত এ জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি তিনি। তার রচিত &#8220;Scientific Outlook&#8221; বইটি লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাতের রূপরেখা।</p>
<p>তিনি বিশ্বরাষ্ট্রকে তুলে ধরছেন এভাবে, &#8220;লিবারেলিজমের উপর ভিত্তি করে যে আধুনিক সমাজ তৈরি হবে, সেটি হবে প্রোপাগান্ডার উপর ভিত্তি করে। আর এ প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা মানুষকে বুঝাবে। এ পদ্ধতিতে তৈরিকৃত প্রোপাগান্ডাই হবে আধুনিক সমাজের মূলভিত্তি অর্থাৎ Advertisement&#8221;। রাসেলের এ কল্পিত দুনিয়ায় গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না, কারণ গণতন্ত্র থাকলে বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। Oligarchy এর উপর ভিত্তি করে বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, আর এ Oligarchy ভূমির উপর ভিত্তিশীল হবে না, এটি হবে বিজ্ঞানীদের একটি সমাজ অর্থাৎ Scientific Oligarchy, যেখানে বিজ্ঞানীগণ হবেন মূল স্তম্ভ। তিনি তার বইয়ে বলছেন, উদাহরণ স্বরূপ রাশিয়ার কথাই ধরা যাক, আজকের গতিশীল ও মেধাবীরা একবার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার পর প্রথম দিকে অধিকাংশ মানুষের বিরোধীতার সম্মুখীন হলেও তাঁরা তাঁদেরকে ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখতে সক্ষম হবে। দিন যত অতিবাহিত হবে ক্ষমতা ততই বংশগত অলিগার্কদের হাত থেকে বুদ্ধিজীবী অলিগার্কদের হাতে চলে যাবে। যে সকল দেশ দীর্ঘদিন যাবত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে সেই সকল দেশে এই অলিগার্কদের একচ্ছত্র আধিপত্য অগাস্টাসের রোমের মত ডেমোক্রেসির ছায়াতলে আশ্রয় নিতে পারবে। তবে অন্যান্য স্থানে এই অলিগার্কদের মুখোশ খুব দ্রুতই খসে পড়তে পারে। যদি নতুন ধরণের একটি সমাজকে তৈরি করতে হয় তাহলে সেখানে চিন্তাগত Oligarchy অবশ্যম্ভাবী। এখানে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, নতুন এক ধরণের অলিগার্ক গড়ে উঠবে আর এই অলিগারশিক গ্রুপ (মানুষের মধ্যে ছোট্ট একটি গোষ্ঠী) রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাকে ব্যবহার করবে এবং তাঁদের শাসন ব্যবস্থা যেন মানুষের সামনে গ্রহণযোগ্যতা পায় এই ভাবে তাঁরা মানুষকে কনভিন্স করার চেষ্টা করবে। আর এই ক্ষেত্রে প্রপাগাণ্ডা হবে তাঁদের মূল হাতিয়ার।</p>
<p>এরপর তিনি আরও বলেন, সে অলিগার্কদের মধ্যে মাঝেমধ্যে সমস্যা হলেও, দিনশেষে অলিগার্কদেরই একটি শ্রেণি সমগ্র পৃথিবীর ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবে এবং একটি বিশ্বব্যপী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে; এক্ষেত্রে রাশিয়া একটি উদাহরণ। তাদের এ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বরাষ্ট্র খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। অর্থাৎ ছোট একটি গোষ্ঠী সমগ্র দুনিয়াকে শাসন করার জন্য একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে এবং এবং সমগ্র দুনিয়াকে তাঁরা সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন করবে! সমগ্র মানবতার ভবিষ্যতের জন্য লিবারেলিস্টদের এটাই হলো ওয়াদা! এমন একটি সমাজই সবচেয়ে অগ্রসর সমাজ বলে বিবেচিত হবে! রাসেলের ভাষায়, তাদের এ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বরাষ্ট্র খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। এই উভয় অবস্থায় একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আর সেটা হলো; যেকোনো অবস্থায় তাদের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিকে ধারণ করতে হবে। অন্যথায় তাঁদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভবপর হবে না। বৈজ্ঞানিক পন্থা সর্বদায় সংগঠন (Organization) চায়, আর বিজ্ঞান যত বেশী অগ্রসর হবে তাঁর কাঙ্ক্ষিত সংস্থাও ততবেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে! তাঁরা কেমন একটি সংগঠন (Organization) চাচ্ছে? এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ! কেননা যে ব্যক্তি এই কথা বলছেন তিনি মার্ক্সিস্ট কিংবা সোশ্যালিস্ট কোনো ব্যক্তি নন। এই ব্যক্তি একজন ব্রিটিশ লর্ড। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দার্শনিকদের একজন। এই ব্যক্তি এই সব কথা বলছে। এই ব্যক্তি মানবতার জন্য এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, এখানে যুদ্ধকে এক পাশে রেখে চিন্তা করলে আন্তর্জাতিক একটি ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স এবং ট্রেড সিস্টেমের দরকার, যার মাধ্যমে শুধু কিছু দেশ নয়, সকল দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতি নিশ্চিত হবে। এর মানে কী? International Organization of Credit and Banking এর মানে কী? এর অর্থ হলো সকল অর্থনৈতিক লেনদেন একটি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। কাকে কত ঋণ দেওয়া হবে, কোন খাতে দেওয়া হবে, কোন খাতে দেওয়া যাবে না, এই সকল বিষয়ই একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হবে। রাসেলের মতে, এ ধরণের বিশ্বরাষ্ট্রের সুবিধাসমূহ হবে অনেক বেশি। প্রথমত যুদ্ধের কোনো ভয় থাকবে না। তবে অস্ত্র তৈরি করার জন্য যে প্রতিযোগিতা করা হচ্ছে নিঃসন্দেহে সেটা বৃথা যাবে না। বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ও রাসায়নিক অস্ত্র থেকে উপকৃত হতে হবে যেন কেউ শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পারে। কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা কখনো কখনো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবর্তিত হলেও হতে পারে। কিন্তু এটি শুধুমাত্র ব্যক্তি পরিবর্তন করবে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। এটি তার স্বকীয়তা রক্ষা করার জন্য যে কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা চালাতে পারবে। যদি এ রকম একটি বিশ্বরাষ্ট্রকে কোনো প্রজন্ম একবার ধরে রাখতে পারে, তাহলেই এটি স্থিতিশীল হবে। কীভাবে স্থিতিশীল হবে? এর জবাবে রাসেল বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক সুবিধা অর্জিত হবে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার কারণে অপচয় বলতে কোনো কিছু থাকবে না, পেশাগত জীবনে কোনো ধরণের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে না, দরিদ্রতা থাকবে না, খারাপ ও ভালো দিন চক্রাকারে আবর্তিত হবে না, যারা কাজ করবে তাঁরা আরাম আয়েশে জীবন যাপন করবে। আর যারা কাজ করতে অনাগ্রহ দেখাবে তাঁদের স্থান হবে জেলখানা। অর্থনীতিকে জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজে লাগানো হবে। (অর্থাৎ কতজন মানুষ জন্ম নিবে এটা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের উপর)। হয়তোবা সকল মানুষকে শুধুমাত্র একটি স্থলভূমিতে রাখা হবে। মানুষের জীবনকে হুমকিতে ফেলে দিতে পারে এমন ধরনের সকল বিষয়কে উৎখাত করা হবে এবং অকাল মৃত্যুর হার কমে আসবে।</p>
<p>বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর এই চিত্রিত বিশ্বরাষ্ট্রকেই জান্নাত হিসেবে অভিহিত করেন! এমন একটি রাষ্ট্রই হলো লিবারেলিস্টদের ওয়াদাকৃত জান্নাত। আর তাঁদের এই জান্নাতে মানুষের অবস্থা কেমন হবে এটা রাসেলের মুখেই শুনা যাক, <strong>“আর এ ওয়াদাকৃত জান্নাতে মানুষ সুখী হবে কি হবে না সেটা আমি জানি না। বসবাস করার জন্য সকল কিছুকে অর্জন করার পর মানুষ সুখী হবে কি হবে না সেটার জন্য কি করা প্রয়োজন সেই শিক্ষা হয়তোবা জৈব রসায়ন (Biochemistry) দিবে।&#8221;</strong> এখানে রাসেল বায়োকেমেস্ট্রির কথা কেন আনলেন? এর অর্থ হলো মানুষকে সুখে রাখার জন্য ঔষধ তৈরি করা হবে। মনে করেন আজকে আপনার মন খারাপ, একটা ট্যাবলেট খেয়ে নিবেন যা আপনাকে খুশিতে রাখবে। এরপর সে প্রশান্তি অনুভব করবে। লিবারেলিস্টদের চিন্তাধারায় সুখ বলতে এতটুকুই। এখন কথা হলো নেশা করার সাথে সুখ পাওয়ার জন্য ঔষধ খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কি? মানুষকি তাঁর ব্যথা কিংবা দুঃখকে ভুলে থাকার জন্য নেশা করে না? একবার চিন্তা করুন মানুষকে জৈব রসায়ন (Biochemistry) এর মাধ্যমে সুখী করার চিন্তা কেমন একটি চিন্তাধারা!!</p>
<p>শুধু তাই নয় দেখুন লিবারেলিস্টরা তাঁদের জান্নাতে মানুষ সুখে রাখার জন্য কোন ধরণের প্রস্তাবনা পেশ করে। রাসেলের ভাষায়, কেউ কেউ মানসিক অশান্তির কারণে অরাজকতা সৃষ্টিকারী হতে পারে বলে তাঁদেরকে দমিয়ে রাখার জন্য বিপজ্জনক কিছু খেলাধুলার আবিষ্কার করা যেতে পারে। জুলুমকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়ে খেলাধুলাতে স্থানান্তর করা হবে। প্রস্তাবিত সমাধানের দিকে খেয়াল করুন। আর খেলাধুলার ক্ষেত্রে কী এখন এগুলোই হচ্ছে না? বর্তমানে ক্রীড়াজগতে আমরা তাকালে দেখতে পাই যে বিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে এবং সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যদি খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, মানুষের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কমিয়ে আনা ও তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রিত একটি স্রোতের দিকে ধাবিত করা। <strong>তিনি আরও বলেন, ফুটবলের পরিবর্তে আকাশ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা যেতে পারে। এক দিক থেকে দেখলে রাসেলের এই প্রস্তাবনা হলো, রোমানদের গ্লাডিয়েটরের আধুনিক রূপ! তদের প্রস্তাবিত জান্নাতে মানুষকে গ্লাডিয়েটর হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়</strong>। তাঁদের চিন্তার সীমানা এতটুকুই।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, মৃত্যু যখন মানুষের হাতের মুঠোয় থাকবে, বিজয়ের নেশায় মৃত্যুর দিকেও ধাবিত হওয়া থেকে দ্বিধা করবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে উপর থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষকে বিনোদন দেওয়া ছাড়া হয়তো অন্য কিছু হবে না, হয়তো এমন দিনও আসবে যখন তাঁকে বীরের মর্যাদা দেওয়া হবে। অর্থাৎ এমনভাবে প্রোপাগান্ডা চালানো হবে যে, অমুক ব্যক্তি এত হাজার ফিট উপর থেকে গড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। সে সকলের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ইত্যাদি বলে মানুষের নিকটে এই ধরনের খেলাকে গ্রহণযোগ্য করা হবে। রাসেলের ভাষায়, এ ধরণের আরো অনেক পন্থা অবলম্বন করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সুনিয়ন্ত্রিত একটি শিক্ষাব্যবস্থা ও খাদ্যব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার অরাজকতার চিন্তা ও অন্যান্য অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।</p>
<p>আর মানুষের জীবন ধারাকেও একটি সানডে স্কুলের কোচিং সেন্টারের মত নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অবশ্যই সেখানে একটি বিশ্বজনীন ভাষা তৈরি করা হবে। আর এই বিশ্বজনীন ভাষাটি কেমন হবে? এই ক্ষেত্রে রাসেলের প্রস্তাবনা হলো, এই ভাষা হবে হয় এসপেরান্টো (Esperanto), আর না হয় পিডগিন ইংলিশ (Pidgin English)। আর অতীতের অনেক কিছুকেই এই ভাষায় অনুবাদ করা হবে না। কেননা ঐ সকল চিন্তা এই ভাষার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না। যারা ইতিহাস নিয়ে কাজ করবে তাঁরা ‘হ্যামলেট’ এবং ‘অথেলোর’ মত গ্রন্থসমূহকে ব্যাখ্যা করার জন্য সরকার থেকে অনুমতি নিতে পারবে তবে এগুলা জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে। শিশুদেরকে রেড ইন্ডিয়ান ও অন্য কোনো জাতির ইতিহাস পড়ার সুযোগ দেওয়া হবে না!</p>
<p>এটিই লিবারেলিজমের ওয়াদাকৃত জান্নাত। এখানে আমরা হয় তাদের ব্যবস্থার গোলাম হবো, অন্যথায় আমাদের জায়গা হবে কারাগারে। এ জান্নাতে মানুষের সুখ মূখ্য নয়, বরং তারা মানুষকে কল্পিত সুখে ডুবিয়ে রাখবে মাদক ও ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে। আর তাদের ভাষা হিসেবে পিডগিন ইংরেজিকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো এ ভাষায় ব্যাকরণ মুখ্য নয়, শুধুমাত্র ভাব প্রকাশই মুখ্য। ভাষা হলো চিন্তা ও ধারণা প্রকাশের বড় একটি মাধ্যম। প্রতিটি ভাষাতেই মূল্যবোধের কথা উল্লেখিত আছে, স্রষ্টার কথা উল্লেখিত আছে। প্রতিটি ভাষাতেই ভালোর কথা বলা হয়েছে, খারাপের কথা বলা হয়েছে, জাতির বীরত্বের গৌরবের কথা বলা হয়েছে। আর এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এমন দুনিয়ার জন্য তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে পিডগিন ইংরেজিকে (Pidgin English)। আর পূর্বের বইগুলো এ পিডগিন ইংরেজিতে অনূদিত না হওয়ার কারণ হলো এর ফলে উদ্ভূত আবেগকে তারা অর্থনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে সমর্থ হবে না। সেই সাথে তারা সকলকে অতীত ভুলিয়ে দিয়ে অতীত ইতিহাসের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কবিহীন এক জাতিতে রূপান্তরিত করতে চায়। আর সত্যিকার ভালোবাসার ধারণা মুছে দিয়ে এর পরিবর্তে তাৎক্ষণিক বিনোদনের ব্যপারগুলোকে তুলে ধরতে চায়, যা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সহায়ক। এখন যদি আমরা বর্তমান দুনিয়ার সাথে তাদের ওয়াদাকৃত জান্নাতকে মিলিয়ে দেখি, তবে কী দেখবো? আমেরিকার প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, তাহলে আমেরিকা চীনের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে রাশিয়ার সাথে কেন সংঘর্ষে গেলো? কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বিশ্বরাষ্ট্র একটু হলেও ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্প চীনের দিকে নজর দিতে গিয়ে রাশিয়ার দিকে নজর দিতে পারেনি, যে কারণে ন্যাটো দুর্বল হয়ে গিয়েছে। যায়নবাদী সভ্যতা ন্যাটোর মাধ্যমেই ইউরোপে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। আর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কিন্তু মানুষ মারা গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না, কিন্তু যেকোনো মূল্যে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে, ন্যাটোর অবস্থান ঠিক রাখতে হবে। এটিই হচ্ছে মূল ব্যপার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ বিষয়গুলোকে আমাদের সামগ্রিকভাবে পড়তে ও উপলব্ধি করতে হবে। নিজে উপলব্ধি করে অপরকে উপলব্ধি করানো, মানুষের সামনে তুলে ধরা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আমাদেরকে মুসলমানদের মধ্যকার সাহায্য ও সম্প্রীতির জাগরণ ঘটাতে হবে, ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে দিতে হবে, সেই সাথে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ডি-৮ এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাধ্যমে এ উদ্যোগ আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে আর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অথচ এই ডি-৮ ছিল একবিংশ শতাব্দীর যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় আশার বাতিঘর। ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রায় পরিণত হয় ১৯৯৭ সালে, অন্যদিকে আমাদের অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা ইসলামিক দিনারের ধারণা সৃষ্টি হয় ১৯৭৪ সালে। আমাদেরকে লিবারেলিস্টদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজস্ব অর্থনেতিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে এ মুহূর্তে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন সবচেয়ে বেশি জরুরী। আমাদেরকে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।</p>
<p>লিবারেলিস্টদের বৈজ্ঞানিক রূপরেখার জবাব আল্লামা ইকবাল ১৯৩২ সালেই দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমাদের বড় বড় আলেমগণ আমাদের সতর্ক করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তারা কাজ করেছেন। আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচ এক অর্থে তাদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো সতর্কবার্তা। কিন্তু আমরা এখনো নিজেদেরকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারি না, যার ফলে তাদের কৌশল গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের। যদি আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা না করি, তাহলে আমরা ধাপে ধাপে বিশ্বরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ শিকারে পরিণত হবো। কিন্তু আমরা যদি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, কাজ করি, তাহলে সফলতা অবশ্যই আসবে, এটি আল্লাহর ওয়াদা। এ লক্ষ্যে যদি আমরা ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারি, তবে তা বিশ্বের ১৯০ কোটি মুসলমানের আশার আলো হবেই। <strong>জুলুম কখনোই চিরস্থায়ী হয় না, আজ হোক বা কাল, জুলুমের পতন ঘটবেই। কিন্তু এ পতন কতটুকু ত্বরান্বিত হবে তা নির্ভর করে আমাদের চেষ্টা ও কাজের উপর।</strong> ফেরাউনী সাম্রাজ্যের যদি পতন হতে পারে, রোম সাম্রাজ্যের যদি পতন হতে পারে, সাসানীদের যদি পতন হতে পারে, এই যায়নবাদী সভ্যতারও পতন অবশ্যই হবে এবং তা হবে আমাদের হাত ধরেই, ইনশাআল্লাহ।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 370px; top: 3755.56px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/liberalism-and-the-promised-paradise-of-liberals/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15761</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনীতি প্রসঙ্গে ইসলাম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islam-about-politics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islam-about-politics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 11 Apr 2025 17:15:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15751</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামের ব্যাপকতাকে ধূলির আস্তরণ সরিয়ে মানুষের সামনে পুনরায় উদ্ভাসিত করতে ইমাম হাসান আল বান্নাকে অবিশ্রান্ত সংগ্রাম করতে হয়েছে। তেরো শত বছর ধরে ইসলাম যা ছিল- সেদিকে মুসলিমদের আবার ফিরিয়ে আনতে তিনি সর্বাত্মক পরিশ্রম করেছেন। ইসলামী আইন ও পথনির্দেশ সমগ্র মানবজীবনকে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামের ব্যাপকতাকে ধূলির আস্তরণ সরিয়ে মানুষের সামনে পুনরায় উদ্ভাসিত করতে ইমাম হাসান আল বান্নাকে অবিশ্রান্ত সংগ্রাম করতে হয়েছে। তেরো শত বছর ধরে ইসলাম যা ছিল- সেদিকে মুসলিমদের আবার ফিরিয়ে আনতে তিনি সর্বাত্মক পরিশ্রম করেছেন।</p>
<p>ইসলামী আইন ও পথনির্দেশ সমগ্র মানবজীবনকে শামিল করে। শুধু জন্ম থেকে মৃত্যু নয়; জন্মের পূর্বের এবং মৃত্যু পরবর্তী বিষয়ও ইসলামী আইনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- ইসলামে ভ্রূণ সংক্রান্ত কিছু বিধানও রয়েছে। এমনকি মানুষ মারা যাওয়ার পরও বেশ কিছু বিধান রয়েছে।</p>
<p>ইসলাম মুসলিমদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সকল বিষয়ে পথনির্দেশনা দেয়। শৌচকর্মের শিষ্টাচার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা যুদ্ধ, সন্ধি- সবক্ষেত্রেই ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে।</p>
<p>ইমাম হাসান আল বান্নার এ প্রচেষ্টার ফলাফল আজ স্পষ্ট। আজ প্রত্যেকটি মুসলিম ভূখণ্ডে এমন বিশাল সংখ্যক মানুষ আছে- যারা ইসলামের ব্যাপকতায় বিশ্বাস করে। তারা আকীদা, শরিয়াহ, দ্বীন ও রাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামের দিকে আহ্বান করে। ঔপনিবেশিকদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের বলি হওয়া একটি বড়ো অংশও আজ ইসলামের দিকে ফিরে এসেছে। তারা ঔপনিবেশিকদের চাপিয়ে দেওয়া চিন্তার বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গোয়েন্দাদের উদ্ভাবিত মানদণ্ড ছেড়ে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামী জাগরণের বিকাশ ঘটছে। এই গোয়েন্দারা ইসলামের ভীতিকর রূপ তৈরি করতে অসংখ্য সভা, সেমিনার ও সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। তারা প্রচুর পরিমাণে অর্থও বিনিয়োগ করতো। উসতাজ ফাহমি হুয়াইদির মতে, সে সময় শত্রুগোয়েন্দাদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন ছিল ১২০ টির মতো।</p>
<p>পাশ্চাত্য-চিন্তার দাসরা সুবহে সাদিককে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। আটকে দেওয়ার চেষ্টা করত সূর্যোদয়কে। তারা চেষ্টা করত ইতিহাসের চাকাকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে থামানোর। পাশ্চাত্যপন্থীরা জোর গলায় বলতে চায়- &#8216;ধর্মে কোনো রাজনীতি নেই আর রাজনীতিতে কোনো ধর্ম নেই।&#8217;</p>
<p>পাশ্চাত্যবাদীরা জোরপূর্বক ঔপনিবেশিক সময়টি ফিরিয়ে আনতে চায়। অথচ তা আমরা অর্ধশতাব্দী পূর্বেই পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে এসেছি। পাশ্চাত্যপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ বহুদিন ধরে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপকে &#8216;রাজনৈতিক ইসলাম&#8217; বলে সংজ্ঞায়িত করছে। অথচ সকল মাযহাবের ফকীহ, উসূলবিদ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও মুতাকাল্লিমগণ ইসলামকে পবিত্রতা অর্জনের অধ্যায় থেকে শুরু করে জিহাদের অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহকারে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কুরআন-সুন্নাহর ইসলামকে পাশ্চাত্যবাদীরা &#8216;রাজনৈতিক ইসলাম&#8217; নাম দিতে চাচ্ছে।</p>
<p>এসকল শেকড়হীন বুদ্ধিজীবীরা চায় যে, মানুষ ইসলামকে ঘৃণা করুক! কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ প্রচলিত রাজনীতিকে ঘৃণা করে। কেননা, ঔপনিবেশিকদের চাপিয়ে দেওয়া রাজনীতি তাদের ওপর অনেক দুর্যোগ নিয়ে এসেছিল এবং বহুভাবে ভুগিয়েছিল। রাজনীতির প্রতি জনগণের এই ঘৃণাকে পাশ্চাত্যপন্থীরা ইসলামের পুনর্জাগরণের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চায়।</p>
<p>আল্লাহপ্রদত্ত ইসলাম যখন রাজনৈতিক, তখন আমরা এ বিষয়ে লুকোচুরি করব কেন? আল্লাহপ্রদত্ত ইসলাম জীবনকে আল্লাহ ও কায়সারের মাঝে ভাগ করাকে সমর্থন করে না। বরং এই ইসলাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয় যে কায়সার, কিসরা, ফিরাউন এবং পৃথিবীর রাজা-মহারাজা সবাই আল্লাহর গোলাম।</p>
<p>পাশ্চাত্যপন্থীরা চাচ্ছে- আমরা আল্লাহর কিতাব, নবী(সাঃ) এর সুন্নত, উম্মাহর ইজমা এবং আমাদের উত্তরাধিকার সত্যপথ ছেড়ে দিই। তারা চায়- সমুদ্রের ওপারের রাষ্ট্রনায়কদের সন্তুষ্ট করতে নতুন ইসলাম বানাতে! তারা আধ্যাত্মিক ইসলাম চায় না। ব্রাহ্মণ্যবাদী ইসলাম চায়- যা মৃত ব্যক্তির ওপর কুরআন তিলাওয়াতেই সন্তুষ্ট থাকবে; জীবিতদের জন্য নয়। তারা চায়- ঘরের দেয়াল কুরআনের আয়াত দিয়ে কারুকার্যমণ্ডিত হবে, কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সকল অনুষ্ঠান শুরু হবে, কিন্তু বাদবাকি সব কায়সারের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে। বিচার কীভাবে চলবে, কোন কাজ কীভাবে হবে- সবই কায়সারের মর্জিতে নির্ধারিত হবে!</p>
<p>কুরআন-সুন্নাহর ইসলাম, আমাদের সালাফ ও পূর্বসূরিদের ইসলামই পরিপূর্ণ ইসলাম। এই ইসলাম জীবনের বিভক্তি ও দ্বীনের বিভাজন সহ্য করে না। রুহানী ইসলাম, আখলাকী ইসলাম, তাত্ত্বিক ইসলাম, তালীম-তারবিয়াতি ইসলাম, জিহাদী ইসলাম, সমাজ-অর্থনীতির ইসলাম, রাজনীতির ইসলাম- এভাবে ইসলামকে আলাদা করা যাবে না; বরং ইসলাম এ সবগুলোর সমষ্টি। এসবের প্রত্যেকটি অঙ্গনেই আছে ইসলামের বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; আছে বিধিবিধান ও নির্দেশনা।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে ইমাম হাসান আল বান্না বলেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;দ্বীন ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলার সময় দুটোকে পৃথক করে দেখে না- এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। তারা দ্বীন ও রাজনীতি এ দুটোকে দুই প্রান্তে রাখে। এ কারণেই বলা হয়- &#8216;এটি ইসলামি সংস্থা, রাজনীতির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই&#8217;, &#8216;এটি একটি রাজনীতিমুক্ত দ্বীনি সমাবেশ&#8217;। বহু দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্রের শুরুতে লেখা হয় &#8216;এটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান&#8217;।</p></blockquote>
<p>এই তত্ত্বের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার দিকে যাওয়ার পূর্বে আমরা দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে চাই।</p>
<p><strong>এক</strong><strong>.</strong></p>
<p>রাজনীতি ও সংগঠন পুরোপুরি একই জিনিস নয়; বরং এতদুভয়ের মাঝে আছে অনেক পার্থক্য এবং সেইসাথে আছে অনেক মিলও। আবার কিছু বিষয় স্পষ্টত ভিন্ন প্রকৃতির। একজন ব্যক্তি সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক হতে পারে; যদিও কোনো সংগঠনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত লোকের অবস্থা এমনও হতে পারে, সে রাজনীতির কিছুই বোঝে না। আবার কেউ যুগপৎ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক হতে পারে। হতে পারে দলীয় রাজনীতিক বা রাজনৈতিক দলীয়। আমি যখন রাজনীতি নিয়ে কথা বলব, তখন সাধারণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলব। দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে উম্মাহর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির ওপর দৃষ্টিপাত করব।</p>
<p><strong>দুই</strong><strong>.</strong></p>
<p>ইসলামের ব্যাপকতর ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ অমুসলিমরা যখন ইসলামের কোনো দিক নিয়ে হতাশ হয়েছে, যেমন- মুসলিমদের দৃঢ় মনোবল, জানমাল উৎসর্গ করার প্রবণতা, ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা ইত্যাদি তখন তারা ইসলামের নাম, বাহ্যিক রূপ ও সত্তার ওপর কথা বলে মুসলিমদের সরাসরি আঘাত না দিয়ে ইসলামকে নির্দিষ্ট কিছু কর্মের গণ্ডিতে সীমিত করতে চেয়েছে। তারা ইসলামের নাম, চেহারা ও বাহ্যিক দিকগুলো ছেড়ে দিয়েছে। কারণ, ইসলামের এ খণ্ডিত রূপ নিজেও পুষ্ট নয় এবং অন্যকেও পুষ্টির জোগান দিতে পারে না।</p>
<p>পাশ্চাত্যপন্থীরা মুসলিমদের বুঝিয়েছে- ইসলাম এক জিনিস, সমাজ অন্য জিনিস। ইসলাম এক বিষয়, আইন আরেক বিষয়। ইসলামের সাথে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণ সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ইসলামের সম্পূর্ণ বাইরের একটি বিষয়। ইসলামকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রিয় ভাইয়েরা! ইসলাম যদি হয় রাজনীতিবিহীন, সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতিমুক্ত কিছু, তাহলে ইসলাম আসলে কী? তবে কি ইসলাম কেবল নামাজের এই রাকাতগুলো? নাকি রাবিয়া আল আদাবিয়ার এই কথামালা- &#8216;ইসতিগফারেরও ইসতিগফার দরকার!&#8217; আর কুরআন কি এ জন্যই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে নাযিল হয়েছে?</p>
<blockquote><p>تِبْيَـٰنًۭا لِّكُلِّ شَىْءٍۢ وَهُدًۭى وَرَحْمَةًۭ وَبُشْرَىٰ لِلْمُسْلِمِينَ</p>
<p>&#8220;আমি মুসলিমদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা, পথনির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম।&#8221; (সূরা নাহল: ৮৯)</p></blockquote>
<p>ইসলামী তত্ত্বের এই ক্ষুদ্রকরণ চেষ্টা এবং ইসলামকে সংকীর্ণ এই গণ্ডিতে সীমিতকরণ মূলত ইসলামের শত্রুদের দীর্ঘমেয়াদী চেষ্টার ফসল। তারা ইসলামকে একটি সীমিত গণ্ডিতে বাঁধতে চেয়েছিল। আর এ কথা বলে হাসাহাসি করতে চেয়েছিল- &#8216;আমরা তো তোমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছি। তোমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম তো ইসলাম।&#8217;</p>
<p><em>প্রিয় ভাইয়েরা! আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে স্পষ্ট করে বলতে চাই, বিরোধী পক্ষগুলো এবং মুসলিম নামধারী ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে যে অর্থে ব্যবহার করতে চাচ্ছে- তা প্রকৃত ইসলাম নয়। তারা ইসলামকে সীমাবদ্ধ করতে চাচ্ছে। ইসলামের সাথে শর্ত লাগিয়ে দিতে চাচ্ছে। আকীদা ও ইবাদত, ভূখণ্ড ও জাতীয়তা, নম্রতা ও শক্তি প্রদর্শন, চরিত্র ও পার্থিবতা, সংস্কৃতি ও আইনের সমষ্টির নাম ইসলাম। একজন মুসলিম ইসলামের বিধিবিধান দ্বারা আদেশপ্রাপ্ত। উম্মাহর সকল বিষয় তাকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। যে ব্যক্তি মুসলিমদের বিষয়াদিতে গুরুত্ব দেয় না, সে মুসলিমদের দলভুক্ত নয়।</em></p>
<p>আমি নিশ্চিত, আমাদের পূর্ববর্তী প্রাথমিক যুগের মুসলিমরা ইসলামের এই ব্যাপকতর অর্থই বুঝেছেন। তারা ইসলামের নিয়মনীতি মেনেই বিচারকার্য, জিহাদ ও লেনদেন পরিচালনা করতেন। তারা সকল দুনিয়াবি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন ইসলামের গণ্ডির ভেতরে থেকেই এবং একইভাবেই আখিরাতমুখী কাজগুলোও করতেন।</p>
<p>প্রথম খলিফা সাইয়্যিদুনা আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর ওপর আল্লাহ রহম করুন। তিনি বলেছেন-</p>
<p>&#8220;উটের দড়ি হারিয়ে গেলেও আমি তা কুরআনে খুঁজে পাই।&#8221;</p>
<p>প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা জিয়াউদ্দিন আর রইস তাঁর <em>&#8216;আন নাজরিয়‍যাতুস সিয়াসিয়্যাতুল ইসলামিয়্যাহ&#8217;</em> (ইসলামি রাজনীতির তত্ত্ব) গ্রন্থে বলেন-</p>
<p><strong>&#8220;সন্দেহাতীতভাবে মুহাম্মাদ(সা.) এবং তাঁর অনুসারী মুমিনরা যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যদি সেই রাষ্ট্রকে বাহ্যিক কর্মকাণ্ড এবং আধুনিক রাজনৈতিক মানদণ্ডে বিবেচনা করা হয়, তাহলে &#8216;রাজনীতি&#8217; শব্দের প্রত্যেকটি অর্থের বিবেচনায় তা ছিল- রাজনৈতিক রাষ্ট্র। একইসাথে যদি এই রাষ্ট্রের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ইতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং মূল ভিত্তিকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একে বলতে হবে- দ্বীনি রাষ্ট্র।&#8221;</strong></p>
<p>সুতরাং, রাষ্ট্রব্যবস্থা একই সময়ে দুটি বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হতে পারে। কারণ, ইসলামের মৌলিকত্ব বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিককেই একসাথে মিলিয়ে নেয়। সেইসাথে মানুষের কর্মকে দুনিয়াবী ও পরকালীন জীবনে প্রভাবক হিসেবে দেখায়। অর্থাৎ, ইসলামের দর্শন দুটো বিষয়কেই একীভূত করে নেয়।</p>
<p>কেবল দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য ছাড়া এ দুয়ের মাঝে আর কোনো বিভাজন ইসলাম স্বীকার করে না। সত্তাগতভাবেই তারা একসাথে গঠিত বা সাজানো এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাদের একটিকে অপরটি থেকে আলাদা করে কল্পনা করা যায় না। এটি ইসলামের স্বাভাবিক প্রকৃতির মাঝেই সুস্পষ্ট। এটা প্রমাণের জন্য বড়ো কোনো পরিশ্রমের দরকার হয় না। ইতিহাসের বাস্তবতা এটাকেই জোরালোভাবে সমর্থন করে। অতীতের সকল যুগে মুসলিমদের আকীদা-বিশ্বাস ছিল এটাই। এমনকি প্রাচ্যবিদরা পর্যন্ত ইসলামি পরিবেশের কাছাকাছি না থাকলেও এটা বুঝতে শুরু করেছে। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো- কিছু জন্মসূত্রে মুসলিম, যারা নিজেদের সংস্কারক বলেও দাবি করে, তারাই প্রকাশ্যে এই সত্যকে অস্বীকার করছে। তাদের দাবি হলো- &#8216;ইসলাম শুধুই একটি ধর্মীয় দাওয়াত।&#8217; তারা বোঝাতে চাচ্ছে- &#8216;ইসলাম কেবল একটি বিশ্বাস এবং মানুষের সাথে রবের আত্মিক সম্পর্ক মাত্র; দুনিয়ার জীবনের বৈষয়িক বিষয়াবলির সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই; এখানে যুদ্ধ ও  সম্পদের ইস্যুগুলো রয়েছে- যার মূল রাজনীতি।&#8217; তাদের সকল কথার সারকথা হলো- &#8216;দ্বীন এক জিনিস, আর রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।&#8217;</p>
<p>এই সকল নামধারী মুসলিমদের কথার জবাবে ইসলামি স্কলারদের কথা আনার তেমন দরকার নেই। কেননা, এই নামধারী মুসলিমরা কখনোই প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে চায় না। তারা নিজেরা যা বলে, তা নিয়েই তৃপ্ত থাকতে চায়। ইতিহাসের বাস্তবতা নিয়েও কথা বলে লাভ নেই। তাতে তারা বড়ত্বের প্রতিযোগিতা শুরু করবে। তো আমরা কিছু ওরিয়েন্টালিস্ট ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে এই প্রসঙ্গটা শেষ করতে চাই। এই ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষকরা নিজেদের মতামত স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছে। তাদের মতগুলো উল্লেখ করার কারণ হলো- জন্মসূত্রে এই সকল কথিত মুসলিম সংস্কারবাদীরা ওরিয়েন্টালিস্টদের চেয়ে বেশি আধুনিক যুগের সাথে কখনোই সম্পৃক্ত ছিল না। তারা আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির ব্যবহারে ওরিয়েন্টালিস্টদের চেয়ে বেশি সক্ষমও নয়।</p>
<p>বিজ্ঞানের অঙ্গনে ওরিয়েন্টালিস্টরা প্রত্যেকটি দিক থেকে তাদের চেয়ে এগিয়েই ছিল। তারা ওরিয়েন্টালিস্টদের মান্যও করে খুব গুরুত্বের সাথে। সুতরাং ওরিয়েন্টালিস্টদেরই কিছু উক্তি নিয়ে আসা এখানে প্রাসঙ্গিকই হবে-</p>
<p>* Dr. V. Fitzgerald: “ইসলাম নিছক একটি ধর্ম নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাও।”</p>
<p>এরপরও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কিছু আধুনিক দাবিদার মুসলিম সন্তানের আবির্ভাব ঘটেছে। তারা এ দুটোকে আলাদা করতে চায়। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ধারণা স্পষ্ট হলে দেখা যায়, ইসলাম অঙ্গাঙ্গিভাবে এ দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে; এর একটি থেকে অপরটিকে আলাদা করা যায় না।</p>
<p>* C. A. Nallino: “মুহাম্মদ সা. একই সময়ে একটি দ্বীন এবং একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর পুরো জীবন জুড়ে রয়েছে এ দুটোর বিস্তার।”</p>
<p>* Dr. Schacht: “ইসলাম ধর্মের চেয়েও বেশি কিছু। ইসলাম আইনি ও রাজনৈতিক তত্ত্বও বর্ণনা করেছে। মোটকথা, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা- যা দ্বীন ও রাষ্ট্রকে একইসাথে শামিল করে।”</p>
<p>* R. Strothmann: “স্পষ্টতই ইসলাম একটি রাজনৈতিক ধর্ম। ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা একাধারে ছিলেন রাজনীতিক, বিচারক ও রাষ্ট্রনায়ক।”</p>
<p>* D. B. Macdonald: “এখানেই (মদিনা) প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ইসলামী আইনের বুনিয়াদি দিকগুলো তৈরি হয়েছে।”</p>
<p>* Sir. T. Arnold: “নবি সা. একই সময়ে একটি ধর্মের প্রধান এবং একটি রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন।”</p>
<p>* H. A. R. Gibb০ : “ইসলাম শুধু ব্যক্তিপর্যায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস নয়। ইসলাম একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিচ্ছে, যার রয়েছে নিজস্ব বিচারপদ্ধতি, আইনকানুন ও প্রশাসন।”</p>
<p>এই কথাগুলো তাদের জন্যই উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের শুধু পাশ্চাত্যের কথাই সন্তুষ্ট করতে পারে। এই কথাগুলো তাদের বড়ো বড়ো কথা থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ তারিক মাহমুদ </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islam-about-politics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15751</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/cultural-slavery-is-not-apart-from-politacal-slavery/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/cultural-slavery-is-not-apart-from-politacal-slavery/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মরিয়ম জামিলা]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Feb 2025 13:34:18 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15548</guid>

					<description><![CDATA[এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের ঈমান এবং মানুষ হিসেবে আমাদের অনন্য পরিচিতির দিক থেকে বিদেশী রাজনৈতিক শাসনের চাইতে সাংস্কৃতিক অধীনতা অনেক বেশী ক্ষতিকর। তবে বাস্তবে সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে শুধুমাত্র সম্পৃক্তই নয় বরং সকল ইচ্ছা ও কাজে তা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের ঈমান এবং মানুষ হিসেবে আমাদের অনন্য পরিচিতির দিক থেকে বিদেশী রাজনৈতিক শাসনের চাইতে সাংস্কৃতিক অধীনতা অনেক বেশী ক্ষতিকর। তবে বাস্তবে সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে শুধুমাত্র সম্পৃক্তই নয় বরং সকল ইচ্ছা ও কাজে তা অবিভাজ্য। প্রায় ৬শ বছর আগে কৃতি মুসলমান ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তার মুকাদ্দিমায় এই সত্য স্বীকার করেছেনঃ</p>
<blockquote><p><em>“বিজিতরা সব সময় বিজয়ীদের পোশাক, প্রতীক, বিশ্বাস এবং অন্যান্য আচার প্রথা অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ সব সময় বিজয়ীদের কাছে প্রিয় পাত্র হতে আগ্রহী হয়। এটা দুই কারণে হয় প্রথমতঃ বিজয়ীদের প্রতি শ্রদ্ধা, দ্বিতীয়তঃ বিজয়ীদের মত যোগ্যতার অধিকারী হলে তাদের পরাজয় হতো না- এই মনোভাব হেতু যোগ্যতা অর্জনের জন্যে। এই বিশ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হলে এটা একটা ব্যাপক আস্থার ভাব সৃষ্টি করে এবং বিজয়ীদের সকল কিছু অনুকরণে বিজিতরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই বিশ্বাস অজ্ঞাতভাবে অথবা বিজয়ের জন্যে বিজয়ীদের শারীরিক ও অস্ত্রের শক্তির চাইতে আচার আচরণ প্রাধান্য বিস্তার করেছে- এই বিশ্বাস থেকে সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় তখন এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে বিজয়ীদের অনুকরণ পরাজয়ের কারণ দূরীভূত করবে। এইভাবে দেখা যায় বিজিতরা পোশাক, অস্ত্র ধারণ যন্ত্রপাতি এবং জীবন ধারণের সকল পদ্ধতিতে বিজয়ীদের অনুকরণ করে। বস্তুত প্রতিটি দেশই তার বৃহৎ বিজয়ী প্রতিবেশীকে অনুকরণের চেষ্টা করে। স্পেনের মুসলমানেরা বিজয়ী প্রতিবেশী খৃষ্টানদেরকে অনুকরণ করেছে। খৃষ্টানদের পোষাক, অলঙ্কার এবং আচার আচরণের বিভিন্ন দিক এমন কি ঘরে ছবি রাখার ব্যাপারে মুসলমানরা তাদের অনুকরণ করেছে। সযত্ন পর্যবেক্ষণে এই </em><em>হীনম্মন্যতা</em> <em>সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।” </em></p></blockquote>
<p>ইবনে খালদুন মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তার সময়ের স্পেনিশ মুসলমানদের ন্যায় আজকের ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরাও অনুকরণ করছে। অবশ্য এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় বিদেশী সভ্যতার অন্ধ ও সমালোচনাহীন অনুকরণ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। আমাদের বিদেশী প্রভুরা শাসনের প্রথম লগ্ন থেকেই খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের জীবন পদ্ধতিকে ধ্বংস করে সেখানে তাদের আচার পদ্ধতি চালুর ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তার ফলশ্রুতিতে অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তাদের আচার প্রথা প্রবেশ করেছে।</p>
<p>প্রায় একশ বছর আগে বৃটিশ সরকার উপমহাদেশের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদান এবং কার্যকরভাবে শাসনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দানের জন্যে ড. উইলিয়াম হান্টারকে নিযুক্ত করেছিলেন। সেই হিসেবে ১৮৭১ সালে তিনি লিখলেন: “আমাদের ভারতীয় মুসলমান, তারা কি রাণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বিবেকের কাছে বাধা! মুসলমানদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে ফেলার জন্যে এবং তাদেরকে অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিদেশী প্রভুত্ব মেনে নিতে শান্তভাবে আত্মসমর্পণ করানোর জন্যে &#8216;সবজান্তা&#8217; ড. হান্টার প্রস্তাব করেছেন ইংরেজী শিক্ষার।</p>
<p>তার বইয়ের সমাপ্তি পর্বে তিনি তার সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। &#8220;এভাবে মুসলমান যুবকদেরকে আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনার ভিত্তিতে শিক্ষিত করে তুলতে পারি। তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে এবং ধর্মশিক্ষার বিষয়ে সামান্যতম হস্তক্ষেপ না করেই আমরা তাদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারি যাতে করে তারা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করলেও ধর্মান্ধ হবে না। বিশ্বের অন্যতম চরম গোঁড়া সম্প্রদায় হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুরা যেভাবে সহনশীলতার শিক্ষা পেয়েছে, মুসলমানদেরকেও সেই পদ্ধতি অনুসরণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। অনুরূপ সহনশীলতা মুসলমানদেরকে তাদের পূর্ব-পুরুষদের গোঁড়ামী থেকে মুক্ত করে আনবে, যে গোঁড়ামী তাদেরকে নিষ্ঠুরতা, নির্দয়তা ও অপরাধজনক কাজের মধ্যে টেনে নিয়ে গেছে। আর এসবই তারা করে এসেছে ধর্ম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে। মুসলমানী আইনশাস্ত্র আবশ্যিক বিষয় হিসেবে নিয়মিত পড়ানো হবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু এটাকেই শিক্ষার মৌল লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবে না। মুসলমানী আইন মানে মুসলমানী ধর্ম, মুসলমানরা সমগ্র পৃথিবীতে তাদের আইনানুগ অধিকারে বিশ্বাসী। তারা আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব আনুগত্য অথবা খৃষ্টান সরকারের অধীনতার কথা জানে না। মুসলমানী আইন সরকারের কোন প্রয়োজন এবং জীবন সম্পর্কে তার ছাত্রদেরকে কোন ধারণা দেয় না। এর পরিবর্তে আমাদের উচিত একটা উদীয়মান মুসলিম জাতি গড়ে তোলা যারা নিজস্ব সংকীর্ণ শিক্ষা পদ্ধতি ও মধ্যযুগীয় ভাবধারার গণ্ডীতে আবদ্ধ না থেকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞানের নমনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। ইংরেজী প্রশিক্ষণ জীবনের লাভজনক অধ্যায়ে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেবে। কোন্ পদ্ধতি প্রবর্তনের দ্বারা হিন্দু ও মুসলমানদের সমভাবে উচ্চতর ধর্মীয় ধারণায় উন্নীত করা সম্ভব সে সম্পর্কে আমি এখানে কিছু বলতে চাই না। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে অনুরূপ উন্নত অবস্থায় তারা একদিন উপনীত হবে এবং এতদিন নেতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও আমাদের প্রবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে এ বিষয়ে প্রাথমিক পদক্ষেপ।&#8221;</p>
<p>হান্টারের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে এবং আজ আমরা তার ফল ভোগ করছি। বংশ পরম্পরায় পাওয়া সেই সম্পত্তি ৪৭ এর স্বাধীনতার পরও সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় এখনও বহাল রয়েছে। বৃটিশ শিক্ষা পদ্ধতি এতই দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে যে, সমগ্র উপমহাদেশে আধুনিকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতার বস্তুবাদ ও নাস্তিক্যবাদের মোকাবিলা করার জন্যে পর্যাপ্ত ইসলামী জ্ঞান দানে সক্ষম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও কোথাও নেই। আমাদের যুবকেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোন আকর্ষণ ছাড়াই বড় হচ্ছে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।</p>
<p>বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে Lord cromer ছিলেন আরব বিশ্বের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব। ১৮৮৩ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত পঁচিশ বছর প্রতিবন্ধকতাহীনভাবে তিনি মিশর শাসন করেন। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কৌশল জানার জন্যে তার বিরাট বই Modern Egypt অপরিহার্য। বই এর সমাপ্তিতে তিনি কোন সন্দেহের অবকাশ রাখেননি যে, সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের চাইতে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের নীতিই ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p><strong>কোন বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতিকের চিন্তা করা ঠিক নয় যে, ইসলামকে পুনর্জীবন দানে সক্ষম- এমন পরিকল্পনা তাদের রয়েছে, বস্তুত ইসলাম এখনো মরে যায়নি, বরং শতাব্দী ধরে টিকে থাকার যোগ্য। তবে রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে তা মৃতপ্রায়, তার ক্রমাগত অবনতি কোন আধুনিক তত্ত্ব প্রয়োগে, তা যতই দক্ষতার সঙ্গে করা হোক না কেন ঠেকানো যাবে না।</strong> এই পর্যন্ত যতটুকু বিচার করা যায় তাতে দু&#8217;টি মাত্র বিকল্প পন্থা সম্ভব। মিশরকে পর্যায়ক্রমে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে নতুবা বৃটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে নিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই দুই বিকল্পের প্রথমটির পক্ষে। আমরা যা করব তাতে ভাল, জোরদার এবং স্থিতিশীল সরকারের ব্যবস্থা করতে হবে যা অরাজকতা এবং দেউলিয়াত্ব দূর করে মিশরকে ইউরোপের জন্যে সমস্যায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। এ ধরনের সরকারের কাজে আমাদের বেশী মাথা ঘামানো উচিত নয়। তবে আমাদের বিদায়ের পর সরকারকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যা পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ&#8230;.. এটা মনে করা ঠিক হবে না যে মিশরে সম্পূর্ণ মুসলমানী নীতির ওপর প্রাচীন চিন্তাধারা ও পশ্চাদগামী সরকার প্রতিষ্ঠার সময় ইউরোপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে। মিশর যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে ঐ ধরনের চিন্তাধারা অনুসৃত হলে বস্তুগত স্বার্থের সাংঘাতিক ক্ষতি হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যারা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান এবং সমস্যার সমাধান চান তাদেরকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মিশরের নতুন বংশধর পশ্চিমা সভ্যতা সত্যিকারভাবে অনুসরণ বা গ্রহণে বাধ্য হয়। আমার বিশ্বাস ইংল্যাণ্ডের সুমহান পরিচালনায় পশ্চিমা সভ্যতার রশ্মি কৃষ্ণ আফ্রিকার সবচাইতে দুর্ভেদ্য স্থানে গিয়ে পৌছুবে এবং এমনকি মিশরের ক্লেদাক্ত কৃষকেরা ও তাতে নতুন জীবন লাভ করবে। মিশরীয়দের অজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও আমি এখনো আশা করি বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ বংশধরেরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে যে, Anglo-saxon জাতির লোকেরা প্রথম তাদের অত্যাচারী কৃতদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে, তারা তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে যে, তারাও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকারী, তারা তাদের সামনে নৈতিক অগ্রগতি এবং চিন্তার স্বাধীনতা ও বস্তুগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের পথ উন্মুক্ত করে খুলে দিয়েছে পশ্চিমা সভ্যতার সত্যিকার মহাসড়ক।”</p>
<p>এটাই ছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্য, স্বাধীনতার পরও কেন আমাদের ওপর বিদেশী প্রভাব এত জোরদার তার জবাবও এই বৃটিশ শাসকের উক্তি থেকে পাওয়া যাবে। বস্তুত সকল প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের স্বাধীনতা একটা সামান্য ব্যাপার মাত্র। দীর্ঘদিন আমাদের দেশ বিদেশী শাসনাধীন ছিল, আমাদের জনগণকে অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে বিদেশী প্রভুরা খুব যত্নের সঙ্গে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এইভাবে তারা সাফল্যের সঙ্গে বিশেষত সামাজিক দিক থেকে প্রাজ্ঞ লোকদের মধ্য থেকে একদল সাক্ষী গোপাল ও গৃহশত্রু বিভীষণ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। তথাকথিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়ার পর আমাদের নেতৃত্ব এই পশ্চিমা চক্রের হাতে গিয়ে পড়ে।</p>
<p>বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে এই নেতৃত্ব অব্যাহত থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল। কারণ আমাদের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশই তাদের ধ্যান-ধারণা এবং তাদেরকে ঘৃণা করতো এই কারণে গণতান্ত্রিক পন্থায় পশ্চিমা সভ্যতার বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ল। এই জন্যে খুবই শক্ত হাতে একনায়কত্ব চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা হলো। যারা এর বিরোধীতা করলো তাদেরকে নির্দয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করা হলো। এমনকি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের জনগণকে দেয়া গণতান্ত্রিক সুযোগ সুবিধা মুসলমানদের দিতে রাজী হবে না, কারণ তারা ভাল করেই জানে মুসলমানদের মনে ইসলামের প্রভাব খুবই জোরদার, গণতান্ত্রিক রায় প্রকাশের সুযোগ একবার আসলেই সকল মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আর এই অবস্থা হলে এশিয়া ও আফ্রিকায় তাদের প্রভুত্ব চিরদিনের জন্যে খতম হয়ে যাবে। এই জন্যে ইসলামী আন্দোলনকে তাদের বিরাট ভয়, বিশ্বব্যাপী তাদের সংগঠিত সকল চক্রান্তের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনকে শেষ করা।</p>
<p>রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত অর্থনৈতিক দাসত্বকেও আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, বরং বলা যায় অর্থনৈতিক দাসত্বই আমাদের এই পরিস্থিতিতে নিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিদেশী সাহায্যের টোপ গেলাতে উৎকণ্ঠিত। উচ্চ হারে সুদ নিয়ে এই সাহায্য শেষ পর্যন্ত গ্রহীতা দেশকে ভিক্ষুকে পরিণত করে। এতে কোন অতিশয়োক্তি নেই যে, পশ্চিমা বিরাট বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো তাদের সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের প্রধান মাধ্যম। অনুন্নত (এখন উন্নয়নগামী) মুসলিম দেশসমূহে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পর্যায়ক্রমে বিরাট বিরাট বিলাসবহুল ভবন, অত্যাধুনিক কারুকার্যের হোটেল, শহরের রূপ পাল্টিয়ে দেয়।</p>
<p>ব্যবস্থা হয় নৈশ ক্লাব এবং ক্যাবারে নাচের। হলিউড থেকে অপরাধমূলক ও অবৈধ যৌন সংসর্গের জঘন্য ছবি আসে, তার অনুকরণে দেশে ছবি নির্মিত হয়, পর্ণ ছবি, পুস্তক এবং বিদঘুটে পোশাক এসে বাজারে সয়লাবের সৃষ্টি করে যা সামাজিক উৎকর্ষতার চূড়ান্ত বিকাশ বলে বিবেচিত হয়। খাদ্যে ভেজাল দেয়া আমাদের শরিয়তে বিরাট পাপ বলে গণ্য হলেও এই পরিবেশে তা দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং অন্যের জীবন ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে ভেজালদানকারী দিনে দিনে প্রাচুর্যের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। মাদক দ্রব্যের ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, আমাদের বেতারগুলো কদর্য ও নগ্ন গানের দ্বারা সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে।</p>
<p>বিদেশী প্রভাবিত শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্থায় পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করিয়ে মেয়েদেরকে চাকুরীতে নেয়া হয়। এই ভাবে আমাদের মহিলারা স্ত্রী, মা, বোন এবং কন্যার পবিত্র আসন থেকে বাস ট্রেনের টিকেট সংগ্রাহক, ব্যাংকের কেরানী, টেলিফোন অপারেটর, সেলস গার্ল, বিমানবালা, রেস্তোঁরার ওয়েট্রেস, হোটেলের কক্ষ সেবিকা, ফ্যাশান মডেল এবং বেতার, টেলিভিশন, ছায়াছবি ও রাষ্ট্র আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গায়িকা ও নর্তকীতে পরিণত হয়। এইভাবে পর্যায়ক্রমে পর্দা, বাড়ী, পরিবার অবৈধ যৌন সংসর্গের জোয়ারে ভেসে যায়। যুবক যুবতীরা একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গড়ে উঠে। এইসব ব্যাপার আকস্মিকভাবে হয় না। বরং আমাদের ওপর যারা প্রভুত্ব বজায় রাখতে চায় তারা খুবই সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে আমাদের জীবন প্রবাহে এ সবের অনুপ্রবেশ করিয়ে দেয়। আমাদের শত্রুরা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে আমাদের অধঃপতন ঘটিয়ে দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে ছোট করতে চায়। তাদের স্বার্থেই আমাদের অধঃপতন ঘটুক আমাদের দেশ দুর্নীতিতে ভেসে যাক এটাই তাদের কাম্য।</p>
<p><strong>এই ভীতি কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্যে আমাদেরকে বুঝতে হবে রাজনৈতিক দাসত্ব আর সাংস্কৃতিক দাসত্ব কেন অবিচ্ছেদ্য, সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে যে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া সত্যিকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। বিরোধী এবং বিদেশী শাসনের অধীনে ইসলামের উৎকর্ষ অসম্ভব। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের ইসলামী পুনর্জাগরণের সকল আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানাতে হবে এবং আমাদের সরকার যাতে আইন হিসেবে ইসলামের নির্ভেজাল শরিয়তকে গ্রহণ করে সে জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ইসলামী আন্দোলনকে সকল গণসংযোগ মাধ্যমের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে।</strong></p>
<p>কোন বিদেশী শক্তি যাতে আমাদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি করতে না পারে তার তীব্র বিরোধিতা করতে হবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে আমাদের সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব সম্পদ ও বন্ধু মুসলিম দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে। প্লেগরূপী বিদেশী সাহায্য অবশ্যই পরিহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনে, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিবর্গের সঙ্গে আমাদেরকে সমঅংশীদার হিসেবে সৎ ব্যবসার ওপর জোর দিতে হবে। ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ সব সময় ইসলামকে তাদের শক্তিশালী শত্রু জ্ঞান করে আসছেন ফলে তাদের নতুন বংশধরেরা একই দৃষ্টি ভঙ্গিতে ইসলামকে অধ্যয়ন করে থাকে।</p>
<p>পশ্চিম ইউরোপ থেকে উদ্ভুত বস্তুবাদী দর্শনই প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামী জীবন পদ্ধতি পুনরুজ্জীবনে সব চাইতে বড় বাধা হয়ে আছে। এই কারণে আমাদের কিছু উলেমাকে পাশ্চাত্যের অধিবাসী হয়ে ইউরোপের সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম এবং দর্শন পড়তে হবে যাতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নত দর্শন উপস্থাপন করা যায়। এই ভাবে সকল দিক থেকে আমাদেরকে সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করতে হবে যাতে আমাদের ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি করে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>এ কে এম হানিফ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/cultural-slavery-is-not-apart-from-politacal-slavery/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15548</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 09 Feb 2025 13:56:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15531</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জাতিসত্তার একটি উপাদান হলো ভাষা। আর একটি উপাদান হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ২০১২ সালে প্রকাশ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতিসত্তার উপাদান দু’টি। একটি হলো বাংলা ভাষা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জাতিসত্তার একটি উপাদান হলো ভাষা। আর একটি উপাদান হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ২০১২ সালে প্রকাশ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতিসত্তার উপাদান দু’টি। একটি হলো বাংলা ভাষা আর একটি হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা। আওয়ামী লীগের জয় বাংলা আওয়াজের সাথে শেখ মুজিবের এই ধারণা মনে হচ্ছে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই বাংলা আসলে কোন বাংলা; আর বাঙালি বলতেই বা ঠিক কাদের বুঝতে হবে। কেননা বাংলাভাষী মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশ বাস করেন বাংলাদেশে আর ৪০ শতাংশ বাস করেন ভারতে। এর মূলে আছে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ১৯৪৭ সালে বাংলা প্রদেশ ভাগ হয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে।</p>
<p>যার উদ্ভব এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে হতে পেরেছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, মুসলিম লীগে দ্বিজাতিতত্ত্ববাদ ছিল সঠিক। অথচ এখন আওয়ামী লীগের কিছু তাত্ত্বিক বলছেন, ধর্মকে রাজনীতির সাথে জড়ানো ছিল প্রতিক্রিয়াশীলতা। এদের কথা মানলে শেখ মুজিবকেও বলতে হয় একজন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদ। এ উপমহাদেশে কাকে বলব জাতীয়তাবাদ আর কাকে বলব সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় মনোভাবের অভিব্যক্তি, সেটি নির্ণয় করা খুবই কঠিন। ভারতে শিখেরা এখন চাচ্ছে স্বাধীন হতে। একটা পৃথক রাষ্ট্র গড়তে, যা তারা ইতঃপূর্বে চাননি। এই শিখ জাতীয়তাবাদের মূলে আছে শিখ ধর্মবিশ্বাস। আছে গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা, যা প্রধানত শিখরাই বিশেষভাবে চর্চা করে থাকেন। ১৯৪৭ সালে ভাগ হয় ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশ; আর ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব প্রদেশ। পূর্ব পাঞ্জাব পড়ে পাকিস্তানে আর সাবেক পাঞ্জাব প্রদেশের পশ্চিম ভাগ পড়ে ভারতে।</p>
<p>ভারতের পাঞ্জাব বিভক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে দু’টি প্রদেশ। একটির নাম হচ্ছে পাঞ্জাব। যেখানে বাস করেন প্রধানত শিখরা। যার সরকারি ভাষা হলো পাঞ্জাবি। আর তা লেখা হয় গুরুমুখী অক্ষরে। অন্য দিকে সাবেক পাঞ্জাবের হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে এখন গঠিত হয়েছে ভারতের হরিয়ানা প্রদেশ, যার সরকারি ভাষা হয়েছে সংস্কৃত শব্দবহুল হিন্দি ভাষা। তা লেখা হয় দেবনাগরি অক্ষরে। ভারতে জাতিসত্তার সমস্যা এখনো মেটেনি। শিখ জাতীয়তাবাদকে কেউ বলছেন না ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা কথাটি যেন কেবল মুসলমানদের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারছে। এর মূলে আছে ভারতের একসময়ের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও পরে প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর চিন্তাচেতনা। যার একটা প্রভাব থাকতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের তাত্ত্বিকদের ওপর। এদের প্রভাবেই আওয়ামী লীগ বলছে, বিশেষভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। গ্রহণ করছে না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণাকে।</p>
<p>আমাদের বর্তমান জাতীয় নির্বাচনে দু’টি প্রধান ইস্যু হচ্ছে, বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, আর একটি হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চর্চাকে আবার ফিরিয়ে আনা। এর কোনোটাই কাম্য নয় আওয়ামী লীগের। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। যা আগে এ অঞ্চলে ছিল না। তার এই শক্তি সঞ্চয়ের মূলে কাজ করছে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা, যা হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্যতম উপাদান।</p>
<p>বাংলাদেশের মানুষের নৃ-জাতিক ইতিহাস এখনো যথাযথভাবে পরীক্ষিত হয়নি। এর বেশির ভাগই হয়ে আছে অজানা। একসময় মনে করা হতো বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে ইসলাম প্রচার প্রধানত ঘটেছিল নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে; উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে নয়। উচ্চবর্ণের হিন্দু বলতে বোঝায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের। বাংলাদেশে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে কায়স্থদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ১৯৪১ সালে জার্মান ইহুদি মহিলা গবেষক (J. W. E. Macfarlan) পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমানের রক্তের গ্রুপের হার নির্ণয় করেন। এবং দেখেন, তার মিল হচ্ছে নিম্নবর্ণের হিন্দু বলে কথিতদের রক্তের গ্রুপের সাথে। এর ফলে ভাবা আরম্ভ হয়, নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়ার ধারণা সঠিক। কিন্তু পরবর্তীকালে দিলীপ কুমার সেনের গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের হার হলো তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরেই অনুরূপ। (দ্রষ্টব্য, Indian Anthropology. Edt T. N. Madan and Gopala Sarana; Asia publishing House, London 1962)।</p>
<p>তাই আগের মতো আর বলা যায় না যে, কেবল নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই উচ্চবর্ণের ঘৃণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এখন জানা গিয়েছে, কুমিল্লা অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন প্রথমে দেব ও পরে চন্দ্র বংশের রাজারা। এরা হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন বৌদ্ধ। এদের রাজত্ব দক্ষিণবঙ্গেও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশে তাই হিন্দুরা নন, বৌদ্ধরাই সম্ভবত দলে দলে গ্রহণ করেন ইসলাম। যেমন তারা গ্রহণ করেছেন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার জনসমষ্টিকে একত্র করলে আমরা দেখতে পাই, এ অঞ্চলেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলমানের বাস। সম্ভবত আরবি ভাষার পরই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলমান কথা বলেন বাংলা ভাষায়। বাংলাদেশ টিকে থাকলে একদিন বাংলা ভাষাকে বিশ্বে মুসলমানের ভাষা হিসেবে গণ্য করা হবে। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন পড়েছে বাংলাদেশের মানুষের ওপর।</p>
<blockquote><p>বঙ্গ নামটি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। ভারতের খ্যাতনামা মহিলা নৃতাত্ত্বিক Irawati Karve (ইরাবতী কার্ভে), তার মতে, <strong>বঙ্গ শব্দটি আর্য ভাষা পরিবারের নয়। নামটি এসেছে চীনা পরিবারভুক্ত কোনো ভাষা থেকে। চীনা পরিবারভুক্ত ভাষায় ‘য়ং’ ধ্বনি সাধারণত নদীর নামের সাথে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। যেমন- ইয়াংসিকিয়ং, হোয়াংহো, সাংপো প্রভৃতি। বঙ্গ ছিল একটা নদীর নাম। আর তার তীরবর্তী মানুষদের বলা হতো বাঙালি। এরা চীনাদের মতো একই পদ্ধতিতে ধান চাষ করত। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখি, মুসলিম নৃপতিদের শাসনামলে বঙ্গ নামটি একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাস বইয়ে উল্লিখিত হতে। ফারসিতে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বলা হতো মুলুক বাঙ্গালাহ।</strong> এর মধ্যে পড়ত রাজধানী গৌড়। মুসলিম শাসনামলের আগে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতো না।</p></blockquote>
<p>মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৮৫ সালে তার ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের প্রস্তাবনায় লিখেছেন-</p>
<p><em>‘অলীক কূনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে</em><br />
<em>নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।’</em><br />
অর্থাৎ <strong>মাইকেল মধুসূদনের সময়ও সাধারণত বাংলা ভাষায় বঙ্গ বলতে বুঝাত পূর্ববঙ্গকে। আর পশ্চিমবঙ্গ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো রাঢ় নামটি।</strong> পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নামের পরিবর্তে প্রদেশটির নাম করতে চাচ্ছেন কেবলই বঙ্গ। আমার মনে হয়, এ রকম নামকরণ করলে আমাদের ইতিহাস রচনায় হতে পারবে যথেষ্ট বিভ্রান্তি। এমনকি আমাদের জাতিসত্তার রূপ নিয়ে সৃষ্টি হতে পারবে অস্পষ্টতা।</p>
<p>একসময় বলা হতো বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার হতে পেরেছে প্রধানত বল প্রয়োগের মাধ্যমে। মুসলমান নৃপতিরা জোর করে হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু এখন এই মতকে আর আগের মতো ধরে রাখা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারি শুরু হয় ১৮৭১ সাল থেকে। এ সময় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল বেশি। এরপর আদমশুমারি হয় ১৮৮১ সালে। এই আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা কমতে এবং মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে। এরপর থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ক্রমেই মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে। কেন এমন হতে পেরেছে, তার কারণ জানা যায় না।</p>
<p>তবে একটি মত হলো হিন্দুদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে বহু ব্যক্তি গ্রহণ করতে থাকেন কেরানির চাকরি। রুদ্ধঘরে কেরানিগিরি করতে গিয়ে ঘটে এদের স্বাস্থ্যহানি। কমে এদের প্রজননক্ষমতা। কিন্তু মুসলমানেরা লেখাপড়া শিখে কেরানি হতে চাননি। তারা মুক্ত প্রকৃতিতে করেছেন ক্ষেতখামারে কাজ। হয়েছেন নৌকার মাঝিমাল্লা। মুক্ত প্রকৃতিতে তাদের স্বাস্থ্য থেকেছে অটুট। কমেনি তাদের প্রজননক্ষমতা। তাই বাড়তে পেরেছে হিন্দুর তুলনায় মুসলমানের সংখ্যা।</p>
<p>এই ধারণার কিছুটা সমর্থন পাওয়া যায় এ ঘটনা থেকে, যেসব মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছেন তাদের গর্ভে অধিক সন্তানের জননী হওয়া থেকে। ইংরেজ আমলে জোর করে হিন্দুকে মুসলমান করার সুযোগ ছিল না। তাই বলা চলে না বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ হিন্দুদের বল প্রয়োগ করে মুসলমান করা।</p>
<p>সারা দেশ এখন নির্বাচনে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। মহলবিশেষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় এলে এ দেশে হিন্দুরা বাস করতে পারবেন না। কিন্তু কোনো ইসলামপন্থী দলই এ দেশ থেকে চাচ্ছে না হিন্দু বিতাড়ন করতে। কারণ, এ দেশে এখন হিন্দু আর বেশি নেই। তা ছাড়া যেসব হিন্দু আছেন, তাদের মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুর চেয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুই বেশি। যারা ভারতে চলে যেতে এমনিতেই ইচ্ছুক নন। থাকতে চান এ দেশের মাটিকে আঁকড়ে ধরে। সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছে জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনীতি করার জন্য। তাদের মারদাঙ্গা করে ক্ষমতা দখল করার ইচ্ছা থাকলে তারা কখনোই নির্বাচনে অংশ নিত না। সেই পথেই চলার জন্য সুসংগঠিত হতে থাকত।</p>
<p>গণতন্ত্রের একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবেই। ব্রিটেনে আছে একাধিক রাজনৈতিক দল। ব্রিটেনে প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র। নির্বাচন আরম্ভ হয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধি হওয়ার জন্য। আর এ জন্যই বিলাতে প্রথম সৃষ্টি হতে পারে রাজনৈতিক দল। কিন্তু বিলাতের আইনে রাজনৈতিক দলের কোনো স্বীকৃতি নেই। রাজনৈতিক দল সেখানে হলো আইনের বাইরে বাড়তি প্রতিষ্ঠান। তা আইনিও নয় আবার বেআইনিও নয়। রাজনৈতিক দলকে বলে Extra Legal Growth। বিলাতের কোনো লিখিত সংবিধান নেই। বিলাতের শাসনব্যবস্থা চলেছে বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টকৃত কতগুলো অ্যাক্টের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে লিখিত সংবিধান। তাতেও নেই কোনো রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি। সেখানেও রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে এক্সট্রা লিগ্যাল গ্রোথ হিসেবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের আইনি নিবন্ধন ব্যবস্থা কেন করা হয়েছে, আমার কাছে তা স্বচ্ছ নয়। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী একটি সংবিধানসম্মত দল নয়। তাই সে পারছে না জাতীয় নির্বাচনে দল হিসেবে অংশগ্রহণ করতে।</p>
<p>অথচ এ দেশেও সেটি পেরেছে একসময় দল হিসেবে দাঁড়াতে। কেবল তাই নয়, হতে পেরেছে মন্ত্রিসভার সদস্য। জামায়াত দল হিসেবে দাঁড়াতে না পারলেও, জামায়াতের প্রার্থীরা কম করে ২৩ জন দাঁড়িয়েছেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে। এ ছাড়া, বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়েছেন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীকে আইনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি। জামায়াতে ইসলামীকে সমালোচনা করা হচ্ছে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী দল হিসেবে। কিন্তু সে যদি জঙ্গিবাদ চাইত, তবে নির্বাচনে অংশ নিত না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা আমার বোধগম্য নয়। কেননা, যে বামপন্থী দল একদিন চেয়েছিল বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব করতে; অর্থাৎ সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করতে, তাদের কিন্তু সংবিধান পরিপন্থী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না।</p>
<p>আওয়ামী লীগ একদিন করেছিল বাকশাল প্রতিষ্ঠা। বাকশাল ছিল একটা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখনো আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থার জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ করেনি। কিন্তু তাকে পোহাতে হচ্ছে না কোনো আইন-আদালতের ঝঞ্ঝাট। ইলেকশন কমিশনার বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর যেসব সদস্য নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অথবা নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, তারা নির্বাচন করতে পারবেন। তার এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই মনে হবে গণতন্ত্রের অনুকূল।<br />
ধর্ম কেবল যে আমাদের দেশের রাজনীতিতেই সংযুক্ত হতে পারছে তা নয়। ইউরোপের বহু দেশেই আছে ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল। বিশেষ করে জার্মানিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বিভক্ত হয় পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানিতে। পশ্চিম জার্মানিতে ক্ষমতায় আসে খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল। আর তাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে গড়ে ওঠে পশ্চিম জার্মানি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। এখন পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানি একত্র হয়েছে।</p>
<p>জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তিনি হলেন একজন খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী হওয়ার কারণে কেন তাকে একটি অনিবন্ধিত দল হতে হবে, সেটি বোঝা যথেষ্ট কঠিন। ধর্ম মানুষকে একটা উৎসর্গের মনোভাব প্রদান করে, যা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে সেবামূলক রাজনীতিতে।</p>
<p>আমাদের রাজনীতির একটা বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এই রাজনীতি যতটা না সেবামূলক, তার চেয়ে অনেক বেশি হলো দাবিমূলক। যদিও দেশে সেবামূলক রাজনীতির প্রয়োজনই বেশি। রাজনীতিতে থাকতে হয়, যাকে বলে পাবলিক স্পিরিট এর প্রাধান্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15531</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানবতাবাদের বাস্তব রূপায়ণের প্রয়াস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Jan 2025 06:01:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মানবতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15365</guid>

					<description><![CDATA[হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ) এর প্রিয়তম সাহাবী হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) জীবনী সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে দু&#8217;খানা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এ দু&#8217;টি পুস্তকে জীবনদর্শন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে আলোচনা থাকলেও বিশ্বস্তভাবে কোন আলোচনা হয়নি। বর্তমানে বাংলা ভাষায় আবু যর গিফারী]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ) এর প্রিয়তম সাহাবী হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) জীবনী সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে দু&#8217;খানা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এ দু&#8217;টি পুস্তকে জীবনদর্শন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে আলোচনা থাকলেও বিশ্বস্তভাবে কোন আলোচনা হয়নি। বর্তমানে বাংলা ভাষায় আবু যর গিফারী (রাঃ) অপরিচিত নাম না হলেও তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী পাঠক-পাঠিকার সম্যক পরিচয় নেই। যে জীবনদর্শনের আলোকে তিনি তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানকে আমীর মুয়াবিয়া (রাঃ), আমীর আমর বিন আস্ (রাঃ) ও মারওয়ানের কবল থেকে উদ্ধার করে সত্যিকারের ইসলামী শাসনব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা বর্তমানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; কেননা বর্তমানে ইসলামের নামে অনেক কিছুই প্রবর্তিত হচ্ছে।</p>
<p>কুরআন-উল-কারীমে আল্লাহকে ধারণা করা হয়েছে মালিক-উল-মুলক অর্থাৎ সমস্ত মুলকের মালিক হিসেবে। তিনি একমাত্র মালিক হলে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ, বাতাস অর্থাৎ এ বিশ্বজগতের সব কিছুরই মালিক তিনি। আল্লাহ্ সব কিছুরই মালিক হলে এ দুনিয়ায় মানুষের কি কোন সম্পদের উপর দাবি- দাওয়া নেই? তার উত্তর অতি স্পষ্ট ভাষায় দিয়েছেন সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মাওলানা মাহমুদুল হাসান মরহুম মাগফুর। তিনি একটি প্রসিদ্ধ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এ আয়াতে মানুষের অধিকারের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:</p>
<p>هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا &#8211;</p>
<p>&#8220;আল্লাহ্ পৃথিবীর সবকিছুই মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন।&#8221; অর্থাৎ সকল জিনিসই মানুষের প্রয়োজন মিটানোর জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন। কোন জিনিসই সৃষ্টিগতভাবে ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নয়। পক্ষান্তরে উহা সকলেরই সম্পত্তি বটে। যেহেতু সব জিনিসই মানুষের মঙ্গলার্থে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কারণে সকল জিনিসেই মানুষের ভোগ-দখলের অধিকার রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন কোনও জিনিস কারো ভোগ-দখলে থাকবে, তাকেই কেবল এ জিনিসের একমাত্র মালিক বলে গণ্য করা হবে, অন্য কেউ তার উপর আধিপত্য খাটাতে পারবে না। তবে, কোন জিনিসের ভোগ দখলকারীর এও জেনে রাখা উচিত যে, সে নিজ দরকারের অতিরিক্ত বস্তু অনর্থক নিজ কবলে না রেখে অন্যকে অবাধে ভোগ-দখল করতে দেবে। কেননা মানুষ হিসাবে সৃষ্টির ভোগাধিকার প্রত্যেক মানুষেরই প্রাপ্য। <strong>এ</strong> <strong>কারণেই</strong> <strong>রীতিমত</strong> <strong>যাকাত</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করা</strong> <strong>সত্ত্বেও</strong> <strong>প্রয়োজনের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>সঞ্চয়</strong> <strong>করা</strong> <strong>কারো</strong> <strong>উচিত</strong> <strong>নয়।</strong> <strong>নবীগণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ধর্মভীরু</strong> <strong>লোকগণ</strong> <strong>এ</strong> <strong>কারণেই</strong> <strong>ধন</strong> <strong>সঞ্চয়</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বিরত</strong> <strong>থেকেছেন।</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কি</strong> <strong>হাদীস</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পরিষ্কার</strong> <strong>বুঝা</strong> <strong>যায়</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>সাহাবাগণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>তাবেঈগণ</strong> <strong>প্রয়োজনের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>বস্তু</strong> <strong>রাখা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করা</strong> <strong>হারাম</strong> <strong>বলেছেন।</strong> মোটের উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু সঞ্চয় বা ব্যবহার যে অনুচিত ও অসঙ্গত তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তুতে সব সৃষ্টিই মানুষের জন্য নীতি অনযায়ী সকল মানুষের দাবি রয়েছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু ভোগ-দখলকারী তার নিজের প্রয়োজনীয় অংশের অতিরিক্ত ভোগ করার দরুন অন্যায় দখলকারী বলে গণ্য হবে।</p>
<p>যুদ্ধলব্ধ মালের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। যুদ্ধলব্ধ মালেও প্রয়োজনের অতিরিক্তটুকু একই পর্যায়ভুক্ত। যুদ্ধলব্ধ মালকে বণ্টনের পূর্বে সকল মুজাহিদেরই মাল বা সম্পত্তি বলা চলে। এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল সকল মানুষেরই সম্পত্তি। যুদ্ধলব্ধ মাল প্রত্যেক মুজাহিদই প্রয়োজন অনুসারে খরচ করতে পারে। কেউ এ অর্থ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপব্যয় বা সঞ্চয় করলে সে আত্মসাৎকারী বলে অভিহিত হবে।</p>
<p>এ মতবাদের পোষকতায় নিম্নলিখিত দলিলাদি পেশ করা যায়-</p>
<p>সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনে হাজম জাহেরী (রহঃ) বলেছেন: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ</p>
<p>&#8220;জনাব রসূলে আকরাম (সা) বলেছেন যে, যে ব্যক্তির কাছে শক্তি ও সামর্থ্যে অর্জিত সরঞ্জাম নিজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত আছে, তার উচিত ঐ অতিরিক্ত মাল দুর্বলকে দান করা। যে ব্যক্তির কাছে খাওয়া-পরার অতিরিক্ত উপাদান রয়েছে, তার পক্ষে উচিত অতিরিক্ত মাল দীন-দুঃখীকে দান করা।&#8221;</p>
<p>আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন: &#8216;নবী করীম এভাবে বিভিন্ন উক্তি করেছেন যাতে আমার এরূপ ধারণা জন্মেছে যে, আমাদের মধ্যে কারো কোন প্রকারের মালের উপর দাবি বা হক থাকতে পারে না।&#8217;</p>
<p>হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন: <strong>“</strong><strong>যে</strong> <strong>বিষয়ে</strong> <strong>আমার</strong> <strong>আজ</strong> <strong>ধারণা</strong> <strong>জন্মেছে</strong> <strong>সে</strong> <strong>সম্পর্কে</strong> <strong>যদি</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>অনুরূপ</strong> <strong>ধারণা</strong> <strong>জন্মাতো</strong> <strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>আমি</strong> <strong>কখনও</strong> <strong>দেরী</strong> <strong>করতাম</strong> <strong>না</strong><strong>; </strong><strong>বরং</strong> <strong>নিঃসন্দেহে</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>ধন</strong> <strong>এনে</strong> <strong>গরীব</strong> <strong>মুহাজিরদের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বণ্টন</strong> <strong>করে</strong> <strong>দিতাম।</strong><strong>“</strong></p>
<p>হযরত আবু ওবায়দা (রাঃ) ও তিনশত সাহাবা দ্বারা সত্য বলে গৃহীত বর্ণনা থেকে জানা যায়: কোন এক সময়ে যখন খাওয়া-পরার দ্রব্যাদি শেষ হওয়ার উপক্রম হয় তখন জনাব রসূলে আকরাম সাহাবা হযরত আবূ ওবায়দাকে হুকুম দেন, &#8220;যার যা কিছু আছে উপস্থিত করো।&#8221; তারপর সমস্ত দ্রব্য এক জায়গায় জড়ো করে সবকিছু তাদের মাঝে সমানভাবে বেটে দিয়ে তিনি সকলের জীবন ধারণের উপযুক্ত বন্দোবস্ত করে দেন।&#8217;</p>
<p>হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা&#8217;আলা ধনীদের উপর গরীবদের জীবিকা পরিপূর্ণভাবে সরবরাহ করা ফরয করেছেন। যদি তারা (গরীবেরা) ক্ষুধিত ও নগ্ন থাকে অথবা জীবিকার জন্য বিপদগ্রস্ত হয় তাহলে ধনীরা দায়িত্বশীল নয় বলেই গণ্য করতে হবে। এজন্য আল্লাহর কাছে কিয়ামতের দিন তাদের জবাবদিহি হতে হবে এবং সংকীর্ণতার জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।“ এরকম আরও হাদীস ও কুরআন-উল করীমের দলিল দ্বারা ইমাম ইবনে হাজম (রহঃ) নিম্নরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেনঃ-</p>
<p><strong>‘</strong><strong>প্রত্যেক</strong> <strong>মহল্লার</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>গরীব</strong><strong>&#8211;</strong><strong>দুঃখীদের</strong> <strong>জীবিকার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>জামিন</strong><strong> (</strong><strong>দায়ী</strong><strong>) </strong><strong>হওয়া</strong> <strong>ফরয</strong><strong> (</strong><strong>অবশ্য</strong> <strong>কর্তব্য</strong><strong>)</strong><strong>।</strong> <strong>যদি</strong> <strong>বায়তুল</strong> <strong>মালের</strong> <strong>আমদানি</strong> <strong>ঐ</strong> <strong>গরীবদের</strong> <strong>জীবিকা</strong> <strong>সরবরাহের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>যথেষ্ট</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়</strong> <strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>সুলতান</strong> <strong>বা</strong> <strong>আমীর</strong> <strong>ধনীদিগকে</strong> <strong>এজন্য</strong> <strong>বাধ্য</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেন</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>বলপূর্বক</strong> <strong>গরীবদের</strong> <strong>প্রয়োজনে</strong> <strong>গ্রহণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেন।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>জীবিকা</strong> <strong>সংস্থানের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>জরুরী</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>অনুযায়ী</strong> <strong>ক্ষুধার</strong> <strong>অন্ন</strong><strong>, </strong><strong>পরিধানের</strong> <strong>বস্ত্র</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ঝড়</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বৃষ্টি</strong> <strong>রোধ</strong> <strong>ও</strong> <strong>প্লাবন</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>রক্ষা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>বাসগৃহের</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>করার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>এ</strong> <strong>অর্থ</strong> <strong>ব্যয়</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হবে।</strong><strong>‘</strong></p>
<p>হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রেওয়ায়েত (বর্ণনা) প্রসঙ্গে নানাবিধ তর্ক- বিতর্কের পর ইবনে হাজম (রহঃ) বলেন: সাহাবাদের (রাঃ) সার্বজনীন মত (ইজমা) এই যে, <strong>‘</strong><strong>যদি</strong> <strong>কেউ</strong> <strong>ক্ষুধিত</strong> <strong>অথবা</strong> <strong>নগ্ন</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>অথচ</strong> <strong>জরুরী</strong> <strong>সরবরাহ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বঞ্চিত</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>মিটানোর</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>করা</strong> <strong>ফরয।</strong><strong>‘</strong></p>
<p>হযরত আবু যর গিফারীও (রাঃ) উপরোক্ত অর্থনৈতিক মতবাদই প্রচার করেছিলেন। তিনি এ অর্থনীতি সংক্রান্ত মতবাদ খলীফা হযরত উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতের সময় প্রচার করে নির্বাসিত হয়েছিলেন। এ মতবাদকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় <strong>ইসলামী</strong> <strong>অর্থনীতির</strong> <strong>মূলসূত্র</strong> <strong>বর্তমান</strong> <strong>কালের</strong> <strong>পুঁজিবাদ</strong><strong> (Capitalism) </strong><strong>বা</strong> <strong>সাম্যবাদ</strong><strong> (Communism) </strong><strong>থেকে</strong> <strong>সম্পূর্ণ</strong> <strong>ভিন্নধর্মী</strong> <strong>এক</strong> <strong>আদর্শমূলক</strong> <strong>নীতি।</strong> পুঁজিবাদে ব্যষ্টিকে কল্পনা করা হয় একক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও তার করায়ত্ত সবকিছুরই মালিক হিসাবে। সে যেমন তা ইচ্ছাধীন সবকিছুই উপার্জন করতে পারে, তেমনি সবকিছু ব্যয়ও করতে পারে। <em>সুবিখ্যাত</em> <em>ইংরেজ</em> <em>অর্থনীতিবিদ</em> <em>এ্যাডাম</em> <em>স্মিথের</em> <em>মতবাদে</em><em> (Laissez Faire) </em><em>পাওয়া</em> <em>ব্যষ্টিকে</em> <em>অবাধ</em> <em>স্বাধীনতা</em> <em>দিতে</em> <em>হবে</em> <em>উপার্জনের</em> <em>ক্ষেত্রে।</em> <em>পুঁজিবাদের</em> <em>ক্ষেত্র</em> <em>রাজার</em> <em>অধীন</em> <em>রাজত্বও</em> <em>হতে</em> <em>পারে</em> <em>অথবা</em> <em>জনগণ</em> <em>পরিচালিত</em> <em>সার্বভৌম</em> <em>রাষ্ট্রও</em> <em>হতে</em> <em>পারে।</em> <em>মার্কসীয়</em> <em>মতবাদের</em> <em>ইতিহাস</em> <em>ব্যাখ্যার</em> <em>সূত্র</em> <em>অনুসারে</em> <em>ব্যষ্টির</em> <em>মালিকানার</em> <em>নীতি</em> <em>স্বীকৃত</em> <em>হলে</em> <em>এবং</em> <em>ব্যষ্টি</em> <em>মানসে</em> <em>এ</em> <em>মালিকানার</em> <em>দৈত্য</em> <em>চেপে</em> <em>বসলে</em> <em>সে</em> <em>যেমন</em> <em>তার</em> <em>প্রতিবেশী</em> <em>বা</em> <em>সর্বসাধারণ</em> <em>মানুষকে</em> <em>তার</em> <em>শরীক</em> <em>বলে</em> <em>স্বীকার</em> <em>করতে</em> <em>স্বীকৃত</em> <em>হয়</em> <em>না</em><em>, </em><em>তেমনি</em> <em>তার</em> <em>প্রয়োজনের</em> <em>অতিরিক্ত</em> <em>উদ্বৃত্ত</em> <em>সে</em> <em>রাষ্ট্রের</em> <em>হাতে</em> <em>ছেড়ে</em> <em>দিতেও</em> <em>সম্মত</em> <em>হয়</em> <em>না।</em> <em>সে</em> <em>তার</em> <em>গণ্ডির</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিজেকে</em> <em>একক</em> <em>প্রভু</em> <em>বলেই</em> <em>গণ্য</em> <em>করে।</em> <em>এজন্যই</em> <em>সে</em> <em>যেমন</em> <em>তার</em> <em>সম্পদ</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>মানুষকে</em> <em>বঞ্চিত</em> <em>করতে</em> <em>চায়</em> <em>তেমনি</em> <em>রাষ্ট্রকেও</em> <em>সম্পূর্ণভাবে</em> <em>বঞ্চিত</em> <em>করতে</em> <em>চায়।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের এ কথা ভুললে চলবে না যে, কোন রাষ্ট্রের গঠনে ও তার পরিচালনায় মানব-মানসে থাকে এক বিশিষ্ট আদর্শ কার্যকরী। সে আদর্শের রূপায়ণের জন্য যেসব মানুষ নিয়োজিত হয়, তাদের মানসে সে আদর্শ প্রবল থাকলে তা অনায়াসেই ফলিত হতে পারে। আদর্শে আস্থাহীন লোকের দ্বারা তার রূপায়ণের কোন সম্ভাবনা নেই। <strong>এজন্য</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>রূপায়ণের</strong> <strong>পূর্বে</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>প্রস্তুতি</strong> <strong>সর্বাধিক</strong> <strong>প্রয়োজনীয়।</strong> <strong>মানস</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>হলে</strong> <strong>অনায়াসেই</strong> <strong>রাষ্ট্র</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে।</strong> ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক সূত্রের আলোকে ইসলামী ভূমি-নীতিরও সূত্র পাওয়া যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে, হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) ইসলামের মূলনীতি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের উপর গুরুত্ব আরোপ করে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তা আলোকে নানাবিধ প্রশ্নের মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলেন। এ নীতির আলোকে বিচার করলে আমরা তাঁর ভূমি-নীতিরও মূল্য নির্ণয় করতে সমর্থ হব।</p>
<p><em>একথা</em> <em>ইতিহাসবিদিত</em> <em>সত্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আরবের</em> <em>মাটিতে</em> <em>জাহিলিয়াতেও</em> <em>রাজতন্ত্রের</em> <em>বা</em> <em>সমাজতন্ত্রের</em> <em>কোন</em> <em>প্রাধান্য</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em> <em>আরবের</em> <em>মাটির</em> <em>মানুষ</em> <em>ছিল</em> <em>ত্রিবিধ</em> <em>পর্যায়ের।</em> <em>মক্কা</em> <em>বা</em> <em>অন্যান্য</em> <em>শহরে</em> <em>ছিল</em> <em>বণিক</em> <em>সমাজের</em> <em>প্রাধান্য।</em> <em>সমগ্র</em> <em>মরুভূমিতে</em> <em>ছিল</em> <em>পশুচারণকারী</em> <em>পর্যায়ের</em> <em>বেদুঈনদের</em> <em>বাস।</em> <em>তায়েফ</em> <em>বা</em> <em>অন্যান্য</em> <em>উর্বর</em> <em>ভূমিতে</em> <em>ছিল</em> <em>মুষ্টিমেয়</em> <em>কৃষক</em> <em>পর্যায়ের</em> <em>লোক।</em> <em>কাজেই</em> <em>সমগ্র</em> <em>দেশের</em> <em>লোক</em> <em>এক</em> <em>পর্যায়ে</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em></p>
<p>জনাব রসূলে আকরাম (সাঃ) কর্তৃক ইসলাম প্রচারিত হলে এবং পরবর্তীকালে মিসর, সিরিয়া, ইরাক পারস্য প্রভৃতি দেশ বিজিত হলে সেসব দেশের সামস্ত সর্দারদের বিস্তৃত ভূসম্পত্তি খলীফা উমর (রাঃ) সেসব দেশের সর্বসাধারণের মধ্যে ভাগ করে বিলিয়ে দেন। আমর ইবনুল আস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবাগণের শত অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁদেরকে ঐসব ভূমির তিল পরিমাণ ভূমিও তিনি জায়গীরস্বরূপ দান করেননি। <strong>জনাব</strong> <strong>রসুলে</strong> <strong>আকরাম</strong><strong> (</strong><strong>সাঃ</strong><strong>) </strong><strong>ও</strong> <strong>সাহাবাগণের</strong> <strong>জীবনী</strong> <strong>পর্যালোচনা</strong> <strong>করলে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>মূল</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>শোষণবিহীন</strong> <strong>সমাজব্যবস্থার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বিবেচনা</strong> <strong>করলে</strong> <strong>সামন্ততান্ত্রিক</strong> <strong>ভূমি</strong> <strong>বিলি</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ব্যবস্থাকে</strong> <strong>নাজায়েয</strong> <strong>বলে</strong> <strong>অভিহিত</strong> <strong>করা</strong> <strong>যায়।</strong> বাংলা ও পাক-ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পূর্বেও ইসলাম-বিরোধী জায়গীরদারী প্রথা চালু ছিল, সেসব প্রথা বিলোপ করে লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৮৩ সালে দশশালা বন্দোবস্ত প্রথার প্রবর্তন করেন এবং এ প্রথাই ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথারূপে স্থিরিকৃত হয়। এ প্রথা জায়গীরের মত না হলেও পরোক্ষে এদেশে এক সামন্ততন্ত্রের পরে দেখা দেয় পুঁজিবাদ। কাজেই রাজগীর শেষেই পুঁজিবাদের আবির্ভাব স্বাভাবিক। তবে ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে সীমিত রাজগী (Limited Monarchy) থাকায় রাজগী থাকলেও পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসারে কোন বিপত্তি দেখা দেয়নি। সমগ্র উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজার পতাকা যেমন দেশ-বিদেশে উড্ডীয়মান হয়েছে, তেমনি ইংরেজ বণিকদের আধিপত্যও দুনিয়া জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। <strong>পুঁজিবাদের</strong> <strong>গোড়ার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>ব্যষ্টি</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>ও</strong> <strong>বণ্টনের</strong> <strong>বেলায়</strong> <strong>সম্পূর্ণ</strong> <strong>স্বাধীন।</strong> <strong>তার</strong> <strong>ইচ্ছামতো</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>সে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>সে</strong> <strong>বণ্টনও</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে।</strong></p>
<p><strong>অপরদিকে</strong> <strong>মার্কস</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্রদর্শিত</strong> <strong>সাম্যবাদের</strong> <strong>মূলকথা</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>কোন</strong> <strong>বিশেষ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>সম্পদ</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>করায়ত্ত</strong> <strong>করে</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>তার</strong> <strong>সাধ্যানুসারে</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>বিভাগে</strong> <strong>শ্রম</strong> <strong>করার</strong> <strong>সুবিধা</strong> <strong>দিতে</strong> <strong>হবে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তা</strong> <strong>প্রয়োজনানুসারে</strong> <strong>তা</strong> <strong>যাবতীয়</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>পূরণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হবে।</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>তার</strong> <strong>ইচ্ছানুসারে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করার</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>বণ্টনের</strong> <strong>বেলায়ও</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> <strong>প্রকৃতপক্ষে</strong> <strong>এ</strong> <strong>রাষ্ট্রে</strong> <strong>আদি</strong> <strong>সংখ্যা</strong><strong> (unit) </strong><strong>ব্যষ্টি</strong> <strong>নয়</strong><strong>, </strong><strong>সমষ্টি</strong> <strong>বা</strong> <strong>তার</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>রাষ্ট্র।</strong> <strong>এক্ষেত্রে</strong> <strong>ব্যষ্টির</strong> <strong>খাওয়া</strong><strong>&#8211;</strong><strong>পরা</strong> <strong>বা</strong> <strong>সর্ববিধ</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>পরিপূরণে</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>রয়েছে।</strong> <strong>এতে</strong> <strong>ব্যষ্টির</strong> <strong>কোন</strong> <strong>স্বাধীনতা</strong> <strong>নেই।</strong></p>
<p><strong>ইসলামী</strong> <strong>রাষ্ট্রে</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>এককভাবে</strong> <strong>বা</strong> <strong>যৌথ</strong> <strong>পদ্ধতিতে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করার</strong> <strong>স্বাধীনতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>আইন</strong> <strong>অনুসারে</strong> <strong>বণ্টন</strong> <strong>করার</strong> <strong>স্বাধীনতাও</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তবে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>সময়ই</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>উপার্জিত</strong> <strong>ধন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সম্পদের</strong> <strong>মালিক</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>তাকে</strong><strong> Custodian </strong><strong>বা</strong> <strong>রক্ষক</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>অনেকগুলো</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>পালন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>যাকাত</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করার</strong> <strong>পর</strong> <strong>আরও</strong> <strong>যেসব</strong> <strong>হক</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তাতে</strong> <strong>তার</strong> <strong>পক্ষে</strong> <strong>পুঁজি</strong> <strong>সৃষ্টি</strong> <strong>করা</strong> <strong>সম্ভবপর</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যষ্টির স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে যদি ব্যষ্টির উপার্জিত সবকিছুই রাষ্ট্রের অপরাপর জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয়, তা&#8217;হলে ব্যষ্টির অথবা রাষ্ট্রের পক্ষে বড় বড় কল-কারখানা প্রভৃতির প্রতিষ্ঠা করে দেশে শিল্পের অগ্রগতি কিসে সম্ভবপর হবে? তার উত্তরে বলা যায়, উৎপাদনে সক্ষম লোকেরা তাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্র যেমন প্রয়োজন অনুসারে তা থেকে জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারে, তেমনি উদ্বৃত্ত থেকে রাষ্ট্রের পরিচালনাধীনে নানাবিধ শিল্প প্রতিষ্ঠানেরও ব্যবস্থা করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তা সাধ্যানুসারে উপার্জন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। গ্রাসাচ্ছাদনের উপযুক্ত উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার নানাবিধ চাহিদা পূরণের জন্য উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তিগণ যেমন দায়ী, রাষ্ট্রও তেমনি দায়ী। ধনী স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তার উপার্জনের উদ্বৃত্ত রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্র পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, অন্ধ ও অসমর্থ লোকের খোরপোশের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের সুবর্ণযুগে এ নীতিই অনুসৃত হয়েছিল। সে যুগে হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) বিখ্যাত ধনী ছিলেন; কিন্তু তিনি প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে অন্য দশজন মুসলিম থেকে পৃথক আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করতেন না। রাষ্ট্রের তলবের সময় তিনি তাঁর ধনাগার উজাড় করে অকাতরে সবকিছুই বিতরণ করতেন। কাজেই ধনসম্পদ তাঁর ধনাগারে থাকা এবং বায়তুল মালে থাকা প্রায় সমানই ছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই ছিল যে বায়তুল মালের ধন রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী অর্থনীতির মূলসূত্র ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিরই ফলশ্রুতি। ইংরেজ বণিকেরা সামন্ত জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি করেছিল এবং দেশের সর্বসাধারণ মানুষকে দাস শ্রেণিতে পরিণত করেছিল। বর্তমানে সে প্রথা রহিত হয়েছে বটে, তবে জোতদারী প্রথা রহিত হয় নাই। এক এক জন জোতদার স্বনামে ও বেনামীতে হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক হয়ে পূর্বেকার জমিদার শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। অথচ দেশে ভূমিহীন লক্ষ লক্ষ লোকের অভাব অনটনের সীমা নেই। বর্তমানে জোতদারদের পক্ষে এত বিশাল ক্ষেত্রে চাষ- আবাদ করা সম্ভবপর নয় বলে তারা এসব জমিজমা ভাগে চাষ-আবাদ করেন। কোথাও ফসলের এক-তৃতীয়াংশ, কোথাও অর্ধেক চাষীকে দিতে হয়। এ সম্বন্ধে আমাদের ফিকাহ শাস্ত্রকার তথা সাহাবাগণের অভিমত কি ছিল তা স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত রয়েছে।</p>
<p>হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) মতে,</p>
<blockquote><p><em>জমিকে লগ্নিতে বা ভাগে দেওয়া নাজায়েয: কারণ যার কাছে অতিরিক্ত জমি রয়েছে এবং সে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে অসমর্থ, তার পক্ষে উচিত অপর মুসলিম ভাইকে জমি থেকে উপস্বত্ব ভোগ করতে দেওয়া। জমির মালিক খোদ আল্লাহ্ রক্ষক হিসাবে সে তার প্রয়োজন মতই ভোগ করবে। তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মতের পোষকতায় প্রথম শ্রেণির সাহাবাদের সমর্থন রয়েছে।</em></p></blockquote>
<p>এ সম্বন্ধে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেছেন: &#8220;আল্লাহর রসূল (সাঃ) ফরমায়েছেন, যার কাছে জমি আছে সে নিজেই চাষাবাদ করবে বা অন্যকে বিনা লাভে (মুফত) সহানুভূতি প্রদর্শনপূর্বক চাষ করতে দেবে। যদি এ দু&#8217;য়ের মধ্যে কোনটাতেই সে রাযী না হয়, তাহলে নিজ জমিকে সে হস্তান্তর করবে।</p>
<p>হযরত জাবের (রাঃ) বলেন: আল্লাহ্র রসূল (সাঃ) জমির পরিবর্তে কোন কিছু গ্রহণ (Exchange) বা ইজারার দ্বারা উপকৃত হতে নিষেধ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) নিজ জমিকে হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ)-এর আমল থেকে মুয়াবিয়ার (রাঃ) আমলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত চাষীদের (কর্ষণকারীদের) লগ্নিতে বন্দোবস্ত দিতেন; কিন্তু যখন তিনি হযরত রাফে (রাঃ)-এর হাদীস শুনতে পেলেন, তখন তিনি এ কাজ এ ভয়ে ছেড়ে দিলেন যে সম্ভবত হযরত (সাঃ) তাঁর শেষজীবনে এ সম্পর্কে মীমাংসা করেছেন। তবে এ মতবাদের বিরুদ্ধেও অপরাপর সাহাবাগণ মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতবাদের আলোচনাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।</p>
<p>হানজালা বিন যায়েদ (রাঃ) বলেন: আমি রাফে বিন খাদিজকে (রাঃ) জমি ইজারা দান সম্পর্কে তাঁর মত অনুসন্ধান করলাম। এর উত্তরে তিনি বললেন, হযরত নবী করীম (সাঃ) এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রূপা ও সোনার বদলে অর্থাৎ নগদ টাকার পরিবর্তেও কি নিষিদ্ধ? তখন তিনি বললেন, এতে কোন আপত্তি নেই।</p>
<p>(বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, কিতাবুল মুজারেয়া)</p>
<p>হযরত আবুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন: নবী করীমের নিষেধের অর্থ এ নয় যে, এ কাজ হারাম বা নাজায়েয; তবে ভ্রাতৃত্ব বা সৌহার্দ প্রদর্শনের জন্য জমি ইজারা বা মুজারেয়া না দেওয়াই উচিত। মুসলমানগণ নিজে নিজের জমি চাষ করবে, অথবা তা একে অন্যের মধ্যে সৌহার্দ ও বন্ধুত্ব স্থাপনের উদ্দেশ্যে অপরের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ভাইকে বিনা লাভে দেওয়াই ভাল।</p>
<p>হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন: যেহেতু হযরতের সময়ে জমির ব্যাপারে বহু ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হতো, এজন্য নবী করীম নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইজারা ও মুজারেয়া মানুষের মঙ্গলার্থে নিষেধ করেছেন, মূলত একে রহিত করেন নি। এ বাধা মানুষের কল্যাণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বলবত ছিল।</p>
<p>(হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা-২য় খণ্ড, পৃ. ১১৭)</p>
<p>ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) বলেন: নগদ লাগান (ইজারা) জায়েয, কিন্তু জমি ভাগে বা মুজারেয়াতে দেওয়া নাজায়েয।</p>
<p>তাউস (রহঃ) ও ইবনে হাজম (রহঃ) বলেন: জমি ভাগে বা মুজারেয়াতে দেওয়া জায়েয কিন্তু নগদ লগ্নি বা ইজারাতে দেওয়া নাজায়েয। কওমের অধিকাংশ আলিম বলেন যে, জমি নগদ টাকার পরিবর্তে বা ভাগে ইজারা দেওয়া উভয়ই জায়েয এ প্রথা সালফ ও খলফ অর্থাৎ সাহাবা ও তাবেয়ীনদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। মোটামুটি এ সম্পর্কে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে সকল রকমের সিদ্ধান্তেরই সম্ভাবনা রয়েছে। কোন না কোন ফিকাহশাস্ত্রবিদের সঙ্গে যে কারো মতের মিল থাকতে পারে। নগদ লগ্নি জায়েয সম্পর্কে যেসব বর্ণনা হাদীসের কিতাবে আছে, ইমাম নাসায়ীর (রহঃ) মতে, সেসব বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় নগদ লগ্নি ইজারা দেওয়া বলেই প্রমাণিত হয়। সাঈদ বিন্ মুসায়েবের (রহঃ) বর্ণনাতে বুঝা যায়, নগদ লগ্নি না দেওয়া নবী করীমের আদেশ নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুরূপ যেসব ফকিহ্, জমি ভাগে দেওয়া জায়েয বলে খয়বরের ইয়াহুদী ও রসূলের (সাঃ) মধ্যকার ব্যাপারকে প্রমাণস্বরূপ উপস্থিত করেন, তাঁদের মতামত উল্লেখ করে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) উত্তর দেন যে, খয়বরের ইয়াহুদীদের জমির মালিক বলে গণ্য করা হয়েছিল একথা সত্য। এখানে সমস্যা হচ্ছে কওমের ব্যক্তিগণের মধ্যে জমিদারী (বর্তমান কালের জোতদারী) সম্পর্ক। হাদীস শরীফে এসব প্রথার সৃষ্টি সম্পর্কে পরিষ্কার নিষেধ রয়েছে।</p>
<blockquote><p>এ সমস্ত বর্ণনার সারমর্ম এই যে, <em>নবুয়তের</em> <em>সময়</em> <em>ও</em> <em>খুলাফায়ে</em> <em>রাশেদীন</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>যদিও</em> <em>জমি</em> <em>নগদ</em> <em>লগ্নি</em> <em>বা</em> <em>ভাগে</em> <em>দেওয়া</em> <em>প্রচলিত</em> <em>ছিল</em><em>, </em><em>তবুও</em> <em>নবী</em> <em>করীম</em><em> (</em><em>সা</em><em>) </em><em>জমিদারীর</em><em> (</em><em>জোতদারী</em><em>) </em><em>এ</em> <em>সাধারণ</em> <em>ও</em> <em>সহজ</em><em>&#8211;</em><em>সরল</em> <em>পন্থা</em> <em>অপছন্দনীয়</em> <em>বলে</em> <em>এবং</em> <em>মরুয়ত</em> <em>বা</em> <em>সদ্ব্যবহারের</em> <em>দিক</em> <em>থেকে</em> <em>একে</em> <em>নিকৃষ্টতম</em> <em>পন্থা</em> <em>বলেই</em> <em>মনে</em> <em>করতেন।</em> <em>এর</em> <em>দরুন</em> <em>কওমের</em> <em>মধ্যে</em> <em>পরস্পর</em> <em>অধিক</em> <em>ঝগড়া</em><em>&#8211;</em><em>বিবাদ</em> <em>হওয়ার</em> <em>ফলে</em> <em>পরস্পর</em> <em>শত্রুতা</em><em>, </em><em>দ্বেষ</em><em>, </em><em>হিংসা</em> <em>বেড়ে</em> <em>গিয়ে</em> <em>মারামারি</em><em>, </em><em>ঝগড়াঝাটিতে</em> <em>পরিণত</em> <em>হতে</em> <em>পারে।</em> <em>অতএব</em> <em>ইমাম</em> <em>বা</em> <em>নেতাকে</em> <em>ইসলাম</em> <em>অনুমতি</em> <em>দেয়</em> <em>যে</em> <em>তিনি</em> <em>এ</em> <em>প্রথা</em><em> (System) </em><em>সার্বজনীন</em> <em>কল্যাণের</em> <em>খাতিরে</em> <em>রহিত</em> <em>করতে</em> <em>পারেন।</em> <em>যদি</em> <em>ইসলামের</em> <em>খলীফা</em> <em>সার্বজনীন</em> <em>কল্যাণের</em> <em>খাতিরে</em> <em>অথবা</em> <em>ইসলামের</em> <em>মঙ্গলের</em> <em>জন্য</em> <em>জমিগুলোর</em> <em>স্বহস্ত</em> <em>কর্ষণজনিত</em> <em>মালিকানা</em> <em>বাদ</em> <em>দিয়ে</em> <em>জমিদারী</em><em> (</em><em>জোতদারী</em><em>) </em><em>প্রথাকে</em> <em>রহিত</em> <em>করেন</em><em>, </em><em>তবুও</em> <em>রাষ্ট্রের</em> <em>অবশ্য</em> <em>কর্তব্য</em> <em>হবে</em> <em>খরিদ</em> <em>করা</em> <em>মালিকানাস্বত্বের</em> <em>জমির</em> <em>উচিত</em> <em>মূল্য</em> <em>বায়তুল</em><em>&#8211;</em><em>মাল</em> <em>থেকে</em> <em>মালিকদের</em> <em>প্রদান</em> <em>করা।</em></p></blockquote>
<p><strong>অতএব</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>রাজনীতি</strong> <strong>ধারায়</strong> <strong>এরূপ</strong> <strong>জমিদারীর</strong> <strong>দৃষ্টান্ত</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>যেখানে</strong> <strong>জমির</strong> <strong>মালিক</strong> <strong>ও</strong> <strong>চাষী</strong> <strong>দু</strong><strong>&#8216;</strong><strong>জনেই</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>রূপে</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>হয়।</strong> পৃথিবীর প্রাচীন ও বর্তমানকালের বিরাট জমিদারী, তালুকদারী প্রভৃতিকে জবরদস্তি বন্দোবস্তের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত বলা যায়। এসবের সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। বর্তমানকালে এক একজন জোতদারের অধীনে এতগুলো জমি থাকা এবং তাকে শোষণের অবকাশ দেওয়া ইসলামী নীতিসঙ্গত ব্যাপার নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামের অভ্যুত্থান থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত মুসলিম সমাজে প্রচলিত ভূমি সম্বন্ধে আলোচনা করলে নিম্নলিখিত সত্যটিই প্রকটিত হয়। <strong>জনাব রসূলে আকরাম (সাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের (রাঃ) আমলে আনসার ও মুহাজিরদের ভূসম্পত্তির মালিকানার অর্থ এই ছিল যে, যে জমি তারা জায়গীর স্বরূপ চেয়েছিলেন তা তাদের সহজ-সরল জীবনযাপনের পক্ষে ছিল পর্যাপ্ত। তারা অনাবাদী জমিকে আবাদ করে ফসল ফলানোর উপযোগী করে তুলতেন। এগুলো বর্তমানকালের জমিদারী বা জোতদারের মত বড় বড় বসতি এলাকা ছিল না, মাত্র কতক আবাদী জমির সমষ্টি ছিল। এসব জমি কোন কোন সাহাবা ইজারা দিতেন আবার কেউ কেউ নিজেও চাষাবাদ করতেন। তবে বিজিত দেশের সমূহ সম্পত্তি সরকারের অধীনে আদিম বাসিন্দাদের হাতে থাকতো এবং এর মালগুজারী বা খাজনা ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে বায়তুল-মালে পরিণত হত।</strong> <strong>যে</strong> <strong>ব্যবস্থার</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>মুষ্টিমেয়</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>হাতে</strong> <strong>জমিজমা</strong> <strong>এমনভাবে</strong> <strong>গিয়ে</strong> <strong>পড়ে</strong> <strong>যে</strong> <strong>চাষীরা</strong> <strong>পণ্যদ্রব্যে</strong> <strong>পরিণত</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>এ</strong> <strong>প্রকার</strong> <strong>প্রথার</strong> <strong>কোন</strong> <strong>আভাস</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>শাসনতন্ত্রে</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> হযরত উমর (রাঃ) রোমানদের এ প্রকার জমিদারীকে রহিত করেন। হযরত উমরের (রাঃ) খিলাফতের সময় ইরান, রোম, মিসর, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি দেশ জয় করা হলে ইরানের বাদশাহের যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল ও মুসলিমদের যে জমি জায়গীর দেওয়া হয়েছিল তাছাড়া সাধারণ জমি কৃষকদের হাতেই ছিল।</p>
<p>যখন হযরত উমর (রাঃ)-এর সময় ইরাক ও সিরিয়া বিজিত হয় তখন সাহাবীরা আবেদন করেন যে ঐ দেশসমূহের জমি যেন তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে তাদের জমির মালিক বলে গণ্য করা হয়। হযরত বেলাল (রাঃ) ও হযরত যুবাইর (রাঃ) বিশেষভাবে এ সম্পর্কে বারবার আবেদন জানান। হযরত উমর এরূপ ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি বলেন, সমস্ত ভূমি সরকারের অধীন থাকবে এবং তার সকল আয় মুসলমানদের প্রয়োজন ও আবশ্যকীয় বিষয়াদির জন্য ওয়াক্ফ্ফ বলে গণ্য হবে।</p>
<p>ইমাম আবূ ইউসুফ (রহঃ) বলেন, হযরত উমর (রাঃ)-এর ফরমান অনুযায়ী মুজাহিদ ও বিজেতাদের মধ্যে জমি বণ্টন নিষিদ্ধ। (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ২৪- ২৯) এ নীতি হযরত ফারুকে আজম (রাঃ) কেবল মুখেই প্রচার করেন নি, কার্যেও পরিণত করেছেন। পরবর্তী মালিকগণও এ নীতির অনুসরণ করেছিলেন। হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর পরে এবং হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-এর সময়ে যে সব দেশ বিজিত হয়েছিল সে সব দেশের অধিকাংশ জমিই সরকারের অধীন থাকতো এবং চাষীদের থেকে আদায়কৃত খাজনা বা লগ্নি সরকার কর্তৃক নানাবিধ প্রয়োজনে ব্যয় করা হত। মুজাহিদ ও বিজয়ীদের বারংবার আবেদন সত্ত্বেও ঐসব দেশের জমি জায়গীর বা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি। হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের শেষের দিকে এ নীতি লঙ্ঘন করায় হযরত আবু যর গিফারী তাঁকে এ নীতির কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেন। <strong>কোন</strong> <strong>সময়ে</strong> <strong>হযরত</strong> <strong>ফারুকে</strong> <strong>আজম</strong><strong> (</strong><strong>রাঃ</strong><strong>) </strong><strong>মুসলমানদেরকে</strong> <strong>জমিদারী</strong> <strong>ও</strong> <strong>চাষাবাদ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>এই</strong> <strong>বলে</strong> <strong>বিরত</strong> <strong>রেখেছেন</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>মুসলমানদের</strong> <strong>নিজেদের</strong> <strong>ও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>পরিবার</strong> <strong>পরিজনদের</strong> <strong>বৃত্তি</strong> <strong>বায়তুলমাল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়।</strong> <strong>তাহলে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কারণই</strong> <strong>থাকতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>না</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>তাঁরা</strong> <strong>খিলাফতের</strong> <strong>বা</strong> <strong>সরকারের</strong> <strong>কাজকর্মের</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়ে</strong><strong>, </strong><strong>জিহাদ</strong> <strong>ও</strong> <strong>আল্লাহর</strong> <strong>বাণীর</strong> <strong>সহায়ক</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>বলদের</strong> <strong>লেজের</strong> <strong>পিছনে</strong> <strong>ঘোরাফিরা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>যাবেন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ দীর্ঘ আলোচনার ফলে বোঝা যায়, দ্বিবিধ কারণে জমিদারী বা ভাগে চাষাবাদ করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিতান্ত গর্হিত ব্যবস্থা। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের প্রতিনিধিত্বের নীতি অনুসরণ করে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) একে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছেন। কেননা এ দুনিয়ার ধন সম্পদ ও ভূমি সবকিছুরই মালিক আল্লাহ্ তা&#8217;আলা হলে মানুষের কোন মালিকানা থাকতে পারে না। তার কাছে গচ্ছিত সম্পদ সে নিজে উপভোগ করবে, তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার অপর ভাইকে ভোগ করতে দেবে। খলীফা উমর (রাঃ) মুসলিমদের দখলে থাকার দরুন, তারা কোন পরিশ্রম না করেও উপস্বত্ব পাওয়ার দরুন, অলস ও বিলাসী মানব গোষ্ঠীতে পরিণত না হয়, সে জন্য ভাগে চাষাবাদ দেওয়া দূরের কথা, কৃষিকার্য থেকেও তাদের বিরত করেছেন। তাই দেখা যায়, উভয়ের দৃষ্টিকোণ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল একই। অর্থাৎ মানবতার কল্যাণের জন্যই তারা উভয়ে জমি থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপস্বত্ব লাভ করাকে নিষিদ্ধ করেছেন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15365</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মধ্যযুগের অর্থনৈতিক চিন্তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/medieval-economic-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/medieval-economic-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 25 Oct 2024 06:58:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15136</guid>

					<description><![CDATA[মধ্যযুগের অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে আলোচনার আগে, ইতিহাসে মধ্যযুগের আবির্ভাব কীভাবে হলো, তা জানা জরুরি। অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাসকে দুইভাগে ভাগ করা হতো। হযরত পয়গম্বরের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালকে বলা হতো প্রাচীন যুগ; এবং রাসুলের (সা:) আগমনের মধ্য দিয়ে সূচনা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মধ্যযুগের অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে আলোচনার আগে, ইতিহাসে মধ্যযুগের আবির্ভাব কীভাবে হলো, তা জানা জরুরি।</p>
<p><strong>অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাসকে দুইভাগে ভাগ করা হতো। হযরত পয়গম্বরের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালকে বলা হতো প্রাচীন যুগ; এবং রাসুলের (সা:) আগমনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিলো আধুনিক যুগের।</strong> তৎকালীন সময়ের সব বড় বড় দার্শনিকরাই এক বাক্যে এটিকে স্বীকার করেন। উনবিংশ শতাব্দীতে এসে ইতিহাসে মধ্যযুগের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয় এবং এটিকে সম্পৃক্ত করা হয় রোমান সাম্রাজ্যের সাথে। তাদের মতে, রোমান সাম্র‍্যাজ্যের উত্থানের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের সূচনা হয়। আর এর শেষ হয়, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমের পতনের মধ্য দিয়ে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিলো সুলতান ফাতিহর মাধ্যমে। অর্থাৎ তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুলতান ফাতিহ একটি যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এটি তাদের একটি কাল্পনিক আবিষ্কার। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। এর ফলে ইসলামী সভ্যতার প্রাসঙ্গিকতাকে ইতিহাস থেকে দূর করে দেয়া হয়। একটি জাতিকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে তুলে ধরার জন্যই মূলত তাদের এই কল্পকাহিনী। হেগেলের মতে, একটা জাতিকে আমরা ততটুকুই আমাদের ইতিহাসে স্থান দিবো, যতটুকু তার বর্তমানে অস্তিত্ব আছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর পরে মধ্যযুগ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং এর মাধ্যমে তারা তাদের পুস্তকসমূহ থেকে ইসলামের ইতিহাসকে বাদ দেয়।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীক বা তারও আগে যেসব সভ্যতা ছিলো সেগুলোকে তাদের ইচ্ছামতো বর্ণনা করার পরে রোমান সাম্রাজ্য এবং রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের ঘটনাপ্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে ষষ্ঠ শতকের ঘটনাপ্রবাহকে বোঝায়। এ বর্ণনার মধ্যে মাঝেমধ্যে তারা ওসমানী খেলাফতকে নিয়ে আসে। তবে ওসমানী খেলাফতকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র এবং প্রগতির বাধা হিসেবে তুলে ধরে। দুঃখজনক হলেও, এই কল্পিত বিভাজনটি পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন আসে, এ কাজটি তারা কোন চিন্তার ভিত্তিতে করলো?</p>
<p><strong>এখানে, ফিলোসফিক্যাল ট্রান্সফরমেশন বা দার্শনিক রূপান্তর ছিলো মূল। আর এই রূপান্তর ঘটান মূলত ইমানুয়েল কান্ট।</strong> <strong>ইমানুয়েল</strong> <strong>কান্টের</strong><strong> ‘</strong><strong>ক্রিটিক</strong> <strong>অব</strong> <strong>পিওর</strong> <strong>রিজন</strong><strong>’</strong><strong>র</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>এটি</strong> <strong>তুলে</strong> <strong>ধরার</strong> <strong>চেষ্টা</strong> <strong>করেন</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>সকল</strong> <strong>অবজেক্টস</strong> <strong>বা</strong> <strong>উপাদানের</strong> <strong>সময়</strong><strong>, </strong><strong>স্থান</strong> <strong>এবং</strong> <strong>মানসিকতা</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>আকলের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সম্পর্কিত।</strong> <strong>তার</strong> <strong>মতে</strong> <strong>হাকীকত</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>কিছু</strong> <strong>নেই।</strong> <strong>কোন</strong> <strong>বিষয়কে</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>মস্তিষ্ক</strong> <strong>যেভাবে</strong> <strong>ধারণ</strong> <strong>করে</strong><strong>, </strong><strong>সেটি</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সেভাবেই</strong> <strong>ধরা</strong> <strong>দেয়।</strong> <strong>এর</strong> <strong>আসল</strong> <strong>অস্তিত্ব</strong> <strong>ভিন্নও</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে।</strong> তিনি এর পেছনে অনেক যুক্তি পেশ করেছেন। তার মতে, যেহেতু সময়, স্থান সবকিছু আকলের সাথে সম্পর্কিত, তাই মানুষ নিজের ইচ্ছামতো অতীত বা ভবিষ্যতকে সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান সময়ের মানুষের জীবনপ্রণালীকে যদি আমরাই সৃষ্টি করে থাকি, তাহলে সময়কেও আমরা আমাদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করতে পারবো। একইসাথে সম্পৃক্ত ভবিষ্যতকেও আমাদের মতো করে সাজাতে পারবো এবং অতীতের ঘটনাসমূহকে সামনে এনে এমনভাবে তুলে ধরবো, যেন আমাদের কথা এবং লেখার মধ্যেই হাকীকত নিহিত। মুতলাক (Absolute) হাকীকত বলে কিছুই নেই। এর বিপরীতে,<strong> ইসলামী সভ্যতা মুতলাক হাকীকতকে স্বীকার করে। এখানে হাকীকতকে মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনা। হাকীকতকে মানুষ সর্বোচ্চ পড়তে পারে, বুঝতে পারে এবং এর মাধ্যমে নিজে হাকীকতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু সে নিজে এটা সৃষ্টি করতে পারেনা।</strong> যেমন, আমাদের আকীদার যে বই সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয় <strong>‘আকীদায়ে নাসাফী’</strong> এই বইয়ের শুরুতেই বলা হয়েছে,</p>
<blockquote><p> حقائق الأشياء ثابتة، والعلم بها متحقق</p>
<p>(হাক্বাইকুল আশইয়ায়ী সাবিতাতুন, ওয়াল ইলমু বিহা মুতাহাক্কিকুন)<br />
-আশইয়ার হাকীকত স্থির, আর এ সংক্রান্ত জ্ঞান হলো হাকীকত।</p></blockquote>
<p>কিন্তু কান্ট এই হাকীকতকে অস্বীকার করেছেন এবং কান্টের চিন্তার উপর ভিত্তি করে এবং এর মধ্য দিয়ে যে নতুন যুগের শুরু হয়, তা হলো মডার্নিজম। এর মাধ্যমে ইতিহাস থেকে শুরু করে সবকিছুকে ফিকশন হিসেবে তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ের চিন্তকরা এইসব ফিকশনকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পোস্ট ট্রুথ বা পোস্ট মডার্নিজম এর সূচনা হয়। এসময় তারা মুসলমানদের ইতিহাসসমূহকে ফিকশন আখ্যা দিয়ে সেগুলোকেও প্রত্যাখ্যান করে। এটা করার মাধ্যমে তারা মুসলমানদের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলেছে।</p>
<p>দ্বিতীয় যে বিষয়টি দিয়ে তারা ইসলামী সভ্যতাকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করেছে তা হলো, আজকে আমরা ইসলামী সভ্যতা বলতে বুঝি সাতশ থেকে বারোশো সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ আব্বাসী খেলাফতের পতন পর্যন্ত সময়কে। অথচ এরপরে ইসলামের ইতিহাসে অনেকগুলো বড় বড় সালতানাত আমরা দেখতে পাই। আমাদের বাংলা সালতানাত গঠিতই হয়েছে বারোশো সালের পরে। এসব সালতানাতসমূহ দোর্দণ্ড প্রতাপে দুনিয়াকে শাসনও করেছে। ওরিয়েন্টালিস্টদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এটিকে তারা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো ইতিহাসে মধ্যযুগ বলে কিছুই নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মধ্যযুগের (৫০০-১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ) খ্রিষ্টান ইউরোপের অর্থনৈতিক চিন্তা:</strong></h4>
<p>পশ্চিম রোমান সভ্যতার উত্থান থেকে এর পতন পর্যন্ত সময়কালকে মূলত তারা মধ্যযুগ বলে থাকে। এই তথাকথিত মধ্যযুগে আসলে তাদের নিজস্ব কোন চিন্তাধারা নেই। এই সময়ে মূলত ইসলামী সভ্যতাই ছিলো পৃথিবীর ভাগ্যনিয়ন্তা। মুসলমানরা যেভাবে চিন্তা করতো, সারা পৃথিবী সেভাবে চিন্তা করতো। এজন্য তাদের জন্য এটা অন্ধকার যুগ। তাদের মতে, তৎকালীন সমাজ ব্যাবস্থাকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে সামন্ততান্ত্রিক, অন্যদিকে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ব ছিলো চার্চের কাছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক চিন্তা বলে আলাদাভাবে তেমন কিছু পাওয়া যায়না। অর্থনৈতিক চিন্তা রাজনৈতিক ও আখলাকী চিন্তার সাথে মিশ্রিত ছিলো। সেসময়ের ইউরোপে প্রভাবশালী চিন্তা ছিলো ক্যাথলিক চার্চের চিন্তা।</p>
<p><strong>এখানে আরও একটা বড় মিথ্যা লুকিয়ে আছে। কারণ পশ্চিম ইউরোপের চিন্তা বলে যাকে বোঝানো হচ্ছে তার মধ্যে স্পেন নেই, ফ্রান্স এবং ইতালীর একটা বড় অংশ নেই। অথচ এগুলো পশ্চিম ইউরোপের একটা বড় অংশ। তৎকালীন স্পেনে (আন্দালুসিয়ায়) বিদ্যমান ছিলো ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত এক গৌরবময় সভ্যতা।</strong> ফ্রান্সের একটা বড় অংশও এই সভ্যতার অংশ ছিলো। পরবর্তীতে কানুনী সুলতান সুলেমানের সময় ভিয়েনা পর্যন্ত ছিলো ওসমানী খেলাফতের পতাকাতলে। পূর্ব ইউরোপ বা বলকান অঞ্চল (ক্রোয়েশিয়া থেকে লিথুনিয়া পর্যন্ত) ছিলো ইসলামী সভ্যতার ছায়াতলে। ভলগা নদীর তীরে ককেশাস অঞ্চল ছিলো মুসলমানদের অধীনে। ইতালীর সিসিলি, টলেডো থেকে শুরু করে বিরাট একটা অঞ্চল ছিলো মুসলমানদের অধীনে।</p>
<p>যাই হোক, তাদের দাবী অনুসারে, অর্থনৈতিক চিন্তাধারা শুরু হয়েছে মার্কেন্টাইলিজমের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নাবিকেরা যেদিন থেকে আবিষ্কার (মূলত শোষণ) এর উদ্দেশ্যে সারা দুনিয়ায় বেরিয়ে পড়ে সেদিন থেকেই মার্কেন্টাইলিজম বা বণিক সভ্যতার সূচনা হয়। মার্কেন্টাইলিস্ট যুগে প্রবেশের মাধ্যমে যেসব চিন্তা ছিলো তার মধ্যে অন্যতম হলো স্কলাস্টিসিজম।</p>
<h4></h4>
<p><strong>স্কলাস্টিজম:</strong></p>
<p>এই শব্দটি এসেছে স্কলা/ স্কুল থেকে। <strong>তথাকথিত</strong> <strong>মিডল</strong> <strong>এইজের</strong> <strong>শিক্ষা</strong> <strong>ব্যবস্থার</strong> <strong>নাম</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>স্কুল।</strong> <strong>এসময়</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে</strong> <strong>যেসব</strong> <strong>বিষয়</strong> <strong>পড়ানো</strong> <strong>হতো</strong> <strong>তা</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>মূলত</strong> <strong>গ্রীক</strong> <strong>ফিলোসফির</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>খ্রিষ্টান</strong> <strong>থিওলজি।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>মেথড</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>ডিডাকটিভ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইনডাকটিভ।</strong> <strong>ডিডাকটিভ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>সাধারণ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নির্দিষ্ট</strong> <strong>সিদ্ধান্তের</strong> <strong>দিকে</strong> <strong>আসা।</strong> <strong>ইনডাকটিভ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>পার্ট</strong><strong>/ </strong><strong>ঘটনা</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>একটা</strong> <strong>সাধারণ</strong> <strong>সিদ্ধান্তে</strong> <strong>আসা।</strong> স্কলাস্টিক চিন্তাধারার প্রতিনিধি হলেন থমাস আকুইনাস। তিনি দক্ষিণ ইতালীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। ১২১৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার সবচেয়ে বড় কাজ হলো গ্রীক ফিলোসফির সাথে খ্রিষ্টান থিওলজির সমন্বয় সাধন। (যেমনটা ইমাম গাজ্জালি আকল এবং নাকলের মধ্যে সমন্বয় করেছিলেন।) এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চান যে, খ্রিষ্টান থিওলজি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নয়। জোসেফ শুম্পিটারের মতে পাঁচশ বছরের একটা বিরতির পর যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম পুনরায় অর্থনৈতিক চিন্তাকে নিয়ে আসেন, তিনি হলেন আকুইনাস। তার বিখ্যাত বই সুম্মা থিওলজিকা (অতঃপর থিওলজি)। <strong>খ্রিস্টান</strong> <strong>ধর্মের</strong> <strong>মূল</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বৈরাগ্যবাদ।</strong> <strong>এর</strong> <strong>বাইরে</strong> <strong>গিয়ে</strong> <strong>আকুইনাস</strong> <strong>বলেন</strong><strong>, </strong><strong>সমাজ</strong> <strong>দুটি</strong> <strong>ভিত্তির</strong> <strong>উপর</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong><strong>: </strong><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>সামাজিক</strong> <strong>গঠনের</strong> <strong>ক্ষেত্রে</strong> <strong>শ্রমিক</strong> <strong>শ্রেণির</strong> <strong>অবদান</strong> <strong>বা</strong> <strong>পরিশ্রম</strong> <strong>২</strong><strong>. </strong><strong>এদের</strong> <strong>মধ্যকার</strong> <strong>কাজের</strong> <strong>ক্ষেত্রে</strong> <strong>সমন্বয়।</strong> মানুষের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জীবিকা উপার্জন। তাই তার মতে, জীবিকা উপার্জন ধর্ম কর্তৃক নিন্দিত কোন কাজ হতে পারেনা। মানুষ সঠিক এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য জীবিকা উপার্জন করতে পারবে। এবিষয়টিকে তিনি থিওরি আকারে নিয়ে আসেন। প্রাচীন গ্রীসে ব্যবসাকে খারাপ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু, থমাস আকুইনাসের মতে, সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবেনা, এই শর্তে ব্যবসা করা যাবে। তিনিও দাসপ্রথা এবং ব্যক্তিমালিকানাকে স্বীকৃতি দেন। স্কলাস্টিক চিন্তার একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিনিও সুদের বিরোধীতা করেন। যেহেতু সুদ হচ্ছে শোষণের মাধ্যম এবং টাকা দিয়ে টাকা আয় করার উপায়, তাই তার মতে সুদ নিষিদ্ধ।</p>
<p>এর বাইরে এ চিন্তা নিয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায়না। নিকোলা ওরেসমিয়াস এবং থমাস এই দুইজন ব্যক্তির নাম পাওয়া গেলেও তাদের চিন্তাধারা খুব বেশি পাওয়া যায়না।</p>
<p><strong>থমাস</strong> <strong>আকুইনাসের</strong> <strong>চিন্তাধারাকে</strong> <strong>সংক্ষেপে</strong> <strong>কয়েকটি</strong> <strong>ভাগে</strong> <strong>ভাগ</strong> <strong>করা</strong> <strong>যায়।</strong></p>
<ul>
<li><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>মানব</strong> <strong>স্বভাবের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>কাজ।</strong></li>
<li><strong>২</strong><strong>. Reason &amp;</strong><strong> faith  (</strong><strong>আকল</strong> <strong>এবং</strong> <strong>নাকল</strong> <strong>এর</strong> <strong>উপর</strong> <strong>কাজ)</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে তিনি হায়ারার্কি করেছেন। <span style="font-size: 16px;">প্রথমে সায়েন্স, তারপর ফিলোসফি এবং এরপর থিওলজি এভাবে রেখেছেন। তিনি বলেন, “we must bear in mind that there are two kinds of science. There are some which proceed from a principle known by the natural light of intelligence such as arithmetic and geometric light. There are some which proceed from a principle known by the light of higher science. Thus, the science of perspective proceeds from principle established by geometry and music proceeds from principle established by arithmetic.” এটা মূলত ইবনে সিনার মিউজিক বইয়ের সারাংশ। তার নেচার অব গডের চিন্তা আমাদের কালামী চিন্তার সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি গডকে প্রমাণের ক্ষেত্রে যে কারণগুলো দেখিয়েছেন, সেগুলো আল ফারাবীর চিন্তার সাথে মিলে যায়। ফারাবীর মতে ফার্স্ট কজ আকল। মাদিনাতুল ফাদিলাহ এটা দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর তার দ্য আল্টিমেট নেসেসিটি, পারফেক্ট সোর্স, পারপাস সুদূর থিওরির সাথে সম্পর্কিত।  রাষ্ট্রের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, State is a natural product of human nature. এটা তিনি মাদিনাতুল ফাদিলাহ থেকে নিয়েছেন। সেখানে আছে,“মানুষ জন্মগতভাবেই সভ্য।” তার যে common good এর চিন্তা, the function of a state is to secure the common good. এটি এসেছে আলা আদালাতু আসাসুল মূলক- (হযরত ওমর রা) থেকে।</span></p>
<ul>
<li>৩. law, reason এগুলো নিয়ে তার কাজ আছে। ল’কে তিনি চারভাগে ভাগ করেছেনঃ <strong>natural law, human law, eternal law, divine law.</strong></li>
<li><strong>৪</strong><strong>. Just war </strong><strong>এর</strong> <strong>ক্ষেত্রে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>বলেছেন</strong><strong>, a declaration by the ruler to defend against enemies. </strong><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>শাসক</strong> <strong>চাইলেই</strong> <strong>যুদ্ধ</strong> <strong>ঘোষণা</strong> <strong>দিতে</strong> <strong>পারে।</strong> <strong>যুদ্ধের</strong> <strong>বৈধতার</strong> <strong>একমাত্র</strong> <strong>কারণ</strong> <strong>এটিই।</strong> <strong>এর</strong> <strong>মাধ্যম</strong> <strong>ক্রুসেডকে</strong> <strong>বৈধতা</strong> <strong>দিয়েছেন।</strong></li>
</ul>
<p><strong>যুদ্ধের</strong> <strong>ন্যায়সংগত </strong><strong>কারণ</strong> <strong>হিসেবে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>বলেন</strong><strong>, Just cause for an attack on an enemy because they deserve it on account of some faults, such as avenging wrongs they have committed.</strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>তারা</strong> <strong>কোন</strong> <strong>আক্রমণ</strong> <strong>করার</strong> <strong>সম্ভাবনা</strong> <strong>আছে</strong> <strong>জানলে</strong> <strong>আমরা</strong> <strong>আগেই</strong> <strong>সেটা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারবো।</strong> <strong>ইরাকে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>এটা</strong> <strong>করেছে।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>রাসায়নিক</strong> <strong>অস্ত্র</strong> <strong>আছে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>আক্রমণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>এই</strong> <strong>বাহানায়</strong> <strong>আমরাও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>আক্রমণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারবো।</strong></p>
<p>তবে আমার মনে হয়েছে, এখানে মূলত জোসেফ শুম্পিটার অর্থনৈতিক চিন্তাকে গতিশীল রাখার জন্য এগুলোকে টেনে নিয়ে এসেছেন। তথাকথিত মধ্যযুগে তাদের আসলে সেরকম নিজস্ব কোন চিন্তা ছিলোনা।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/medieval-economic-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15136</post-id>	</item>
		<item>
		<title>প্রাচীন গ্রীসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/economic-thought-of-ancient-greece/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/economic-thought-of-ancient-greece/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 29 Sep 2024 14:24:37 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14904</guid>

					<description><![CDATA[প্রাচীন গ্রীসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এর রাষ্ট্রব্যবস্থা; যাকে city state বলা হতো, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক জোসেফ শুম্পিটার এর মতে, প্রাচীন গ্রীসের চিন্তাধারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের বাস্তবিক বিষয়াবলীকে গুরুত্ব দিতো। এই চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিলো polis]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রাচীন গ্রীসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এর রাষ্ট্রব্যবস্থা; যাকে city state বলা হতো, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক জোসেফ শুম্পিটার এর মতে, প্রাচীন গ্রীসের চিন্তাধারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের বাস্তবিক বিষয়াবলীকে গুরুত্ব দিতো। এই চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিলো polis এর উপর ভিত্তি করে। গ্রীক সভ্যতার মতাদর্শ অনুযায়ী, সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এবং প্রতিফলিত রূপ হচ্ছে পলিস। সভ্যতা কেবল পলিসে’ই গড়ে তোলা সম্ভব।  polis একটি পরিভাষা। এর মাধ্যমে গ্রীসে city state, শহর এবং এই শহর ও city state এর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বোঝাতো।<strong> প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় অর্থনৈতিক বা অন্যান্য বিষয়ের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে। এর কারণ হলো</strong><strong>  polis </strong><strong>কে কেন্দ্রে রাখা। </strong><strong>অর্থনীতিকে তারা কম গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহ বেশিরভাগ পরিচালনা করতো </strong><strong>slave (</strong><strong>দাস) এবং </strong><strong>patricians; </strong><strong>যাদের তারা নাগরিক হিসেবে গণ্য করতোনা। ফলে গ্রীক দার্শনিকদের চিন্তাধারায় অর্থনীতির সেরকম কোন থিওরি পাওয়া যায়না। যেগুলো পাওয়া যায় তা তাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের থিওরির মধ্যে থেকে।</strong><strong> </strong></p>
<p>প্লেটোর মতে রাষ্ট্রের মৌলিক কাজ হলো দুটি:</p>
<p><strong>১. শাসক নির্বাচন করা</strong></p>
<p><strong>২. নির্বাচিতদের নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা।</strong></p>
<p>তবে তাদের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিলো city state বা ঘর পরিচালনা। এ বিষয়টি নিয়ে Xenophon সর্বপ্রথম তার রচিত গ্রন্থ Oikonomikos এ আলোচনা করেন। oikos বলতে বুঝায় ‘গৃহ বা ঘর’, nomos বলতে বুঝায় ‘আইন বা রীতি’। অর্থাৎ Oikonomikos বলতে বুঝায় গৃহ পরিচালনার রীতি।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীসে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে তারা marketing approach নয়, বরং administrative approach এ চিন্তা করতো। মার্কেটিং অ্যাপ্রোচ হলো উৎপাদন ও কেনা-বেচার সাথে সংশ্লিষ্ট। তারা তাদের অর্থনৈতিক চিন্তাকে এই কেন্দ্রিক না করে গৃহস্থালির বা রাষ্ট্রের কর্মকান্ড কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছে।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীসে ব্যবসা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিখ্যাত ঐতিহাসিক M. Finley বলেন, তারা ব্যবসায়িক পন্থায় সম্পদ উপার্জনকে খুব বেশি পছন্দ করতোনা। পাশাপাশি যেহেতু তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দাস এবং প্যাট্রিসিয়ানদের হাতে ছিলো, যারা গ্রামে বাস করতো এবং নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতোনা, তাই এরিস্টোক্র‍্যাটদের এটা নিয়ে মাথাব্যাথা ছিলোনা। এর ফলে প্রাচীন গ্রীস এবং রোমান সভ্যতায় ব্যবসা ও প্রযুক্তির সেরকম কোন উন্নতি সাধিত হয়নি৷</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরিস্টোক্র্যাটরা আইন ও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকতো। এর মাধ্যমে যেহেতু তারা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতো, এর দ্বারাই তারা সম্পদ উপার্জন করতো।</p>
<p>Xenophon (খ্রীস্টপূর্ব ৪৩০- ৩৫৪ খ্রী) তিনি মূলত এথেন্সের একজন ঐতিহাসিক। তিনি ভাড়াটে সৈন্য ছিলেন। টাকার বিনিময়ে যুদ্ধ করতেন। সক্রেটিসের যুগের ছিলেন বলে তিনি সক্রেটিসের ও ছাত্র ছিলেন। সক্রেটিসের  রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনকেই মূলত লিখিতভাবে Oikonomikos/ ওইকনমিয়া গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থের মূল আলোচ্য বিষয় গৃহাস্থলির কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়। এই গ্রন্থটি যতটা না অর্থনীতির, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দর্শনের গ্রন্থ। এখানে তিনি সম্পদ উৎপাদন ও বন্টন নীতি নিয়ে আলোচনা করেছে। তিনি বলেন, যেহেতু সম্পদ সীমিত বা স্থিতিশীল; এর উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে নেতারা। এখানে মূল ভিত্তি হলো man-power বা শ্রমশক্তি। বাড়ি, খামার বা ফার্ম যাই হোকনা কেন পরিচালকের পন্থার উপর বন্টননীতি নির্ভর করে। এক্ষেত্রে কর্মবন্টনের চেয়ে পেশাগত দক্ষতাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। যার পেশাগত দক্ষতা যত বেশি সে উৎপাদনের ক্ষেত্রে তত বেশি ভূমিকা রাখে এবং ঐ উৎপাদনের বন্টন ব্যবস্থাও সুন্দর হয়। অর্থাৎ এখানে Xenophon কর্মবন্টনের চেয়ে administration/ প্রশাসনিকভাবে পরিচালনা ও পেশাগত দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।</p>
<p>Xenophon এর আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে Cyropedia. তিনি যখন ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যান, তখন পারস্য সম্রাটের নেতৃত্ব ও যোগ্যতা নিয়ে এই বইটি লিখেন। এই বইয়ের কারণেই মূলত তাকে ঐতিহাসিক বলা হয়।</p>
<p>Oikonomikos এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় Subjective value theory. এবিষয়টি পরবর্তীতে এরিস্টটল বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তার চিন্তার আরেকটি দিক হলো, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দাস এবং প্যাট্রিসিয়ানদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য আমাদের সিটি স্টেইটকে উন্নত এবং আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করতে হবে। ফলত সারা দুনিয়া থেকে দাস এবং প্যাট্রিসিয়ানরা আমাদের এখানে কাজ করতে আসবে। আজকের পাশ্চাত্যকেও এ নীতি অনুসরণ করতে দেখা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্লেটোর চিন্তাধারা:</strong></h4>
<p>প্লেটোর (খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৭- খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৭) আরবী নাম আফলাতুন। তিনি মূলত সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন। আখলাক, দর্শন, মানতিক, রাজনৈতিক দর্শন, গণিত সব কিছু নিয়েই তিনি কাজ করেছেন৷ তবে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন তার রিপাবলিক এর জন্য। রিপাবলিক এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় আইডিয়াল স্টেইট (আদর্শ রাষ্ট্র) এবং কর্মবণ্টন। এখানে তিনি সবচেয়ে বেশি আলাপ করেছেন আদালত নিয়ে৷ তিনি বলেছেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো ফযিলতপূর্ণ জীবন৷ তার মতে ফযিলতপূর্ণ সমাজ কেবল আদালতের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব৷</p>
<p><strong>রিপাবলিক এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো ইউটোপিয়া। এখানে তিনি ইউটোপিয়া বলতে অলীক কল্পনাকে বুঝাননি। এখানে ইউটোপিয়া বলতে সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের যে চিন্তাভাবনা</strong><strong>, </strong><strong>তাকে বুঝিয়েছেন। প্লেটোর ইউটোপিয়া হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>একটি আইডিয়াল স্টেইট প্রতিষ্ঠা করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>এবং এর জন্য যে আখলাকী আদর্শগুলো প্রয়োজন সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। </strong></p>
<p>প্লেটোর মতে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব ৩ টি:</p>
<ul>
<li>১. মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ</li>
<li>২. রাষ্ট্রকে রক্ষা করা (defense system)</li>
<li>৩. প্রশাসন (administration)</li>
</ul>
<p>আদর্শ রাষ্ট্রের জনগণকে তিনি ৩ ভাগে ভাগ করেন:</p>
<ul>
<li>১. যারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করে</li>
<li>২. সৈন্যবাহিনী</li>
<li>৩. সাধারণ জনগণ</li>
</ul>
<p>প্লেটোর এই বন্টন বর্ণপ্রথার ভিত্তিতে ছিলোনা, বরং পেশার ভিত্তিতে ছিলো। তার মতে, যদি কেউ জন্মগতভাবে দাস না হয়ে থাকে, তাহলে নিজ যোগ্যতায় সে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদেও অধিষ্ঠিত হতে পারে৷ অর্থাৎ তিনিও দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছেন।</p>
<p>প্লেটোর মতে রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করবে, তারা প্রাইভেট সম্পদ বা সম্পদের ব্যক্তিমালিকানার অধিকারী হতে পারবেনা; তারা কোন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করবেনা। তারা একটি ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড এর জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রাষ্ট্র থেকে বেতন নিবে৷ খুব বেশি ধনী বা খুব বেশি দরিদ্র হওয়া মানুষের ফিতরাতের পরিপন্থী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>এরিস্টটলের চিন্তা</strong>:</h4>
<p>এরিস্টটল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন চিন্তাবিদ। রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, আখলাক, ইতিহাস, মানতিক, মেটাফিজিক্স, রেটোরিক, পদার্থবিজ্ঞান, ফিলোসোফি অব সায়েন্স, ফিলোসোফি অব মাইন্ড, সাইকোলজি, ভূতত্ব; এককথায় জ্ঞানের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব চিন্তা রয়েছে। মেটাফিজিক্স এর মতো বিষয়েও তার গ্রন্থ রয়েছে। নিকোমাখেন এথিক্স এ তিনি soul, virtues, partnership এবিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। পলিটিক্স এর ক্ষত্রে সংবিধান, বেইজ স্টেইট, বিপ্লব এসকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন৷ রেটোরিক এ আলোচনা করেছেন রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে। পোয়েট্রিক্স এ তিনি আলোচনা করেছেন ট্র‍্যাজেডি এবং এপি-পোয়েট্রি নিয়ে৷ জীবজন্তুর ইতিহাস, প্রজন্ম, গতিবিধি নিয়ে কাজ করেছেন। তার ছাত্র আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট তাকে এ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য একটি আলাদা বন প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। লজিক বা যুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে তিনি categories, interpretation, prior of analysis, posterior of analysis এসকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরিস্টটলের জ্ঞান চর্চার মেথড হচ্ছে এম্পিরিকাল বা গবেষণামূলক। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি প্রকৃতিকে এভাবে পরখ করে দেখেছেন।</p>
<p>পাশ্চাত্যের অধিকাংশ চিন্তাবিদই এরিস্টটলকে অর্থনৈতিক চিন্তার জনক মনে করে থাকেন। মূলত তার দুটি বইয়ে অর্থনৈতিক চিন্তা পাওয়া যায়। একটি হলো Politics (Politica), আরেকটি  Nicomachean ethics.</p>
<p>পলিটিক্সের প্রথম  এবং পঞ্চম অধ্যায়ে তিনি অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>Nicomachean ethics এ মূলত আখলাকের আলোচনার মধ্যে অর্থনৈতিক বিষয়ের আলোচনা এসেছে৷</p>
<blockquote><p>এরিস্টটল এবং প্লেটোর চিন্তার মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে এনালিটিক্যাল থিংকিং। এনালিটিক্যাল থিংকিং এ মূলত ডিডাকটিভ মেথড ব্যবহৃত হয়। এরিস্টটল তার প্রত্যেকটি গ্রন্থে মানতিককে ভালোভাবে ব্যবহার করেছেন এবং তার প্রত্যেকটি তত্ত্বকে তিনি কারণ এবং ফলাফল (cause and effect) এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। জোসেফ শুম্পিটারের মতে, এনালিটিক্যাল হিস্ট্রি অব ইকোনমিকস এর দৃষ্টিকোণ থেকে এরিস্টটল গুরুত্বহীন একজন চিন্তাবিদ। এবং তার মতে, এরিস্টটল প্রাচীন গ্রীক রাষ্ট্রের সিটি স্টেইট এবং এর ব্যবস্থাপনার আখলাকী বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো এই প্রশাসনিক এবং আখলাকী চিন্তার একটা অংশ৷ অর্থাৎ, এরিস্টটলের চিন্তাধারা মৌলিকভাবে অর্থনৈতিক চিন্তাধারা নয়। বর্তমান ফিলোসফি অব সায়েন্সের অন্যতম দাবী হলো বিজ্ঞানকে অবশ্যই value free হতে হবে। এখানে কোন নরম্যাটিভ বিষয় আসবেনা। অর্থনীতি যেহেতু নিজেকে বিজ্ঞান বলে দাবী করে, তাই এখানেও আখলাক আলোচ্য বিষয় নয়। এজন্য ন্যায়-অন্যায় বা এধরণের কোন প্রশ্ন আসতে পারবেনা। অথচ সায়ন্স ও একটা আদর্শ অনুসরণ করে। সায়েন্সের আদর্শ হচ্ছে পজিটিভিজম।</p></blockquote>
<p>এরিস্টটলের মতে রাষ্ট্র হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। তার মতে, “রাষ্ট্র হলো একটি আখলাকী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ ব্যাবস্থাপনা।” সময়গত দিক বিবেচনায় পরিবার ও সমাজ রাষ্ট্রের আগে আসলেও রাষ্ট্র হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়। এরিস্টটলের মতে রাষ্ট্র হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তিনি মনে করেন স্বভাবগতভাবেই মানুষ রাজনৈতিক সত্ত্বা। মানুষ তার মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্যই রাষ্ট্র গঠন করে থাকে। রাষ্ট্র বা সিটি স্টেইটকে এরিস্টটল পলিস বলে থাকেন। তার মতে ভালো এবং খারাপের সাথে সংশ্লিষ্ট আবেগ-অনুভূতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এরিস্টটলের মতে ভালো মানুষ তিনিই যিনি রাষ্ট্রের আইন এবং বিধানকে ভালোভাবে পালন করে থাকেন। আর ফযিলতপূর্ণ মানুষ তিনি, যিনি আদালত সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা রাখেন। আদালত হচ্ছে রাষ্ট্রের মেরুদন্ড।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এরিস্টটল মনে করেন সম্পদ দুইভাবে উপার্জন করা যায়:</strong></p>
<ul>
<li><strong>মানুষের জরুরি প্রয়োজন পূরণের জন্য (যেগুলো পশুপালন এবং কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত)</strong></li>
<li><strong>অর্থ-সম্পদকে পুঞ্জিভুত করে রাখার জন্য সম্পদ উপার্জন (ব্যবসা ও প্রয়োজনহীন ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে)</strong></li>
</ul>
<p>প্রথমটিকে তিনি Oikonomikos  এবং দ্বিতীয়টিকে Chrematistics বলে অভিহিত করেন। দ্বিতীয়টিকে তিনি খারাপ কাজ হিসেবে দেখেন। বর্তমানে আমরা যে অর্থনীতি দেখি তাকে Chrematistics এর একটি প্রতিশব্দ বলা যায়। সতেরশো শতাব্দীর দিকে এটি political economy নামে পরিচিত ছিলো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এই নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ আমরা বর্তমানে যাকে অর্থনীতি বলে থাকি, সেটি প্রাচীন গ্রীসের Chrematistics এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যা এরিস্টটলের মতে এক অর্থে অবৈধ বলা যায়।</p>
<p>ক্যাসেনোফন, প্লেটো সবার মতেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল নাগরিকদের একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী, ভালো জীবন দিতে হবে৷ আর এটা করা যায় একমাত্র শহরের মাধ্যমে। শহরে বসবাসকারী মানুষরাই একমাত্র ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে। যেহেতু ব্যবসার দ্বারা কোন উৎপাদন করা যায়না, এজন্য এরিস্টটল এর পক্ষে নন। এছাড়াও তার মতে, যেহেতু ব্যবসার মাধ্যমে সীমাহীন সম্পদ উপার্জন করা যায়, তাই এটি অবৈধ।</p>
<p>Value Theory:</p>
<p>এরিস্টটলের মতে, যেসব সম্পদকে ব্যক্তি কর্তৃক উপার্জন করা সম্ভব, এর প্রত্যেকটির সাথে দুটি মূল্য সংশ্লিষ্ট আছে:</p>
<ul>
<li>১. ব্যবহারিক মূল্য</li>
<li>২. বিক্রয় মূল্য</li>
</ul>
<p>ব্যবহারিক মূল্য হলো, জিনিসটি ব্যবহার করে মানুষের কতটুকু প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে তার পরিমাপ। আর বিক্রয়মূল্য হচ্ছে ক্রেতা কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য। এটি ব্যবহারের উপযোগিতার উপর নির্ভর করেনা। যেমন, পানির অপর নাম জীবন হওয়া সত্বেও পানি অত্যন্ত সস্তা। কিন্তু ডায়মন্ডের সেরকম কোন প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও এটা এত মূল্যবান। এই মূল্য ক্রেতা কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য।</p>
<p>এরিস্টটল তার Nicomachean ethics এ এবিষয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, কোন দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকতে হবে। কোন সম্পদ দুষ্প্রাপ্য হলেই বা ক্রেতা কর্তৃক মূল্য বেশি দিতে চাইলেই তার মূল্য বাড়ানো যাবেনা। একটা ভারসাম্য রাখতে হবে। এরিস্টটল এখানে ভ্যালু থিওরি নিয়ে আলোচনা করেননি।</p>
<p>তার আলোচনার আরেকটি বিষয় ছিলো সম্পদের মালিকানা বা মুলকিয়াত। এক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তি মালিকানাকে স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ মানুষকে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে মালিকানার অধিকার দিতে হবে। এটা সমষ্টিগত নয়, ব্যক্তিগত হতে হবে। যদি কোন সম্পদের সমষ্টিগত মালিকানা থাকে, তা একইসাথে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং উৎপাদনকে ব্যহত করে। এর একটা কারণ হলো নাগরিকদের ভালো বা সুন্দর জীবনযাপন ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদের উপর নির্ভর করে। কারণ ব্যক্তিমালিকানার অধীনে সম্পদ না থাকলে সে তার মৌলিক অধিকার পূরণে প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করতে পারবেনা।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে সমাজের মানুষ সুখী হতে পারবেনা। ক্যাসেনোফন, প্লেটো সবার মতেই, মানুষের জন্য সুখী-সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করা জরুরি। এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাস-দাসীরাও কি এই ব্যক্তি মালিকানার অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা? এরিস্টটলের মতামত হলো, মানুষ দুই ধরণের; স্বাধীন মানুষ এবং গোলাম। যারা স্বাধীন হয়ে জন্ম গ্রহণ করে তারা মূলত নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বা সমাজ পরিচালনার জন্য জন্ম গ্রহণ করে। আর দাস-দাসীদের জন্ম হয় স্বাধীন মানুষদের সেবা করার জন্য। ফলে এরিস্টটলের মতানুযায়ী, এই দাস-দাসীরাও মানুষের ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদে রূপান্তরিত হয়। এরিস্টটল মূলত তিনি যে সমাজে বসবাস করতেন, সে সমাজের ব্যবস্থাপনাকে বৈধতা দেয়ার জন্য আদর্শিক একটা দৃষ্টিকোণ থেকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এর কোন প্রায়োগিক বা মানতিকী ব্যাখ্যা নেই। তার কোন এনালিটিক্যাল থিওরিই এটিকে সিদ্ধ করেনা। এটি পুরোপুরিই তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট।</p>
<p>এরিস্টটলের মতে, টাকার কোন নমিনাল ভ্যাল্যু নেই। এর মূল্য রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত। টাকা হচ্ছে শুধুমাত্র মুবাদালা করার মাধ্যম। সে নিজে কোন ভ্যালু বহন করেনা। সুদ হচ্ছে টাকা থেকে টাকা উপার্জন করা। যেহেতু এখানে কোন উৎপাদন হচ্ছেনা, তাই তার মতে অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে ঘৃণিত মাধ্যম হচ্ছে সুদ। এমনকি এটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ একটি কাজ। এটি সমাজের ভারসাম্যকে নষ্ট করে। অর্থাৎ আদালতের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি এটাকে অবৈধ মনে করেছেন।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীসের অর্থনীতিকে আমরা মোটের উপর এই তিনজন ব্যক্তির চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সংকলকঃ</strong> নাজিয়া তাসনিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/economic-thought-of-ancient-greece/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14904</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাশিয়ান কর্মকর্তাদের ছয়টি আফ্রিকান দেশ ভ্রমণের নেপথ্যে</title>
		<link>https://rowyakbd.com/behind-the-scenes-of-russian-officials-trip-to-six-african-countries/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/behind-the-scenes-of-russian-officials-trip-to-six-african-countries/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হিশাম আল নোমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 23 Sep 2024 13:46:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14853</guid>

					<description><![CDATA[আফ্রিকায় প্রভাবশালী পরাশক্তিগুলোকে আরো দুর্বল করতে এবং তাদের প্রভাব নিঃশেষ করতে রাশিয়া সে শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নতুন কৌশল প্রণয়ন করেছে। আফ্রিকা নিয়ে রাশিয়ার আগ্রহ কোন সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোতে আফ্রিকার অন্যতম ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স, মহাদেশটিতে ক্রমাগতভাবে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আফ্রিকায় প্রভাবশালী পরাশক্তিগুলোকে আরো দুর্বল করতে এবং তাদের প্রভাব নিঃশেষ করতে রাশিয়া সে শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নতুন কৌশল প্রণয়ন করেছে।</p>
<p>আফ্রিকা নিয়ে রাশিয়ার আগ্রহ কোন সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোতে আফ্রিকার অন্যতম ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স, মহাদেশটিতে ক্রমাগতভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। রাশিয়া এখন চাচ্ছে আফ্রিকায় ফ্রান্সের বিকল্প হয়ে উঠতে।</p>
<p>এই কৌশলের নবিনতর পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরভ এবং উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনুস বেক ইয়েভকুরভ  বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ধারাবাহিকভাবে সফর করেছেন।</p>
<p>এসব সফরে রাশিয়ান কূটনৈতিকদের চারটি গন্তব্য ছিল : <strong>গিনি, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বুরকিনা ফাসো এবং শাদ। অন্যদিকে সামরিক কর্মকর্তারা লিবিয়া সফর শেষে নাইজার এবং মালি সফর করেন।</strong></p>
<p>ল্যাভরভ ৩ রা জুন, ২০২৪ শে গিনি ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তার কূটনৈতিক সফর শুরু করেন। যেখানে রুসাল সহ বেশ কিছু রাশিয়ান কোম্পানি কাজ করছে। রুশ দূতাবাসের তথ্যমতে এই রুসাল রাশিয়ার এ্যালুমিনিয়াম প্লান্টগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহ করে, এ খাতের মোট উৎপাদনের শতকরা ২৫ ভাগই রুসালের অবদান।</p>
<p>জুনের ৪ তারিখ তিনি কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে পৌঁছান, যেখানে শুধু ২০২৩ সালের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যের মাত্রা আচানক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সফরের সময় আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্যে ছিল উভয়পক্ষের মধ্যে সামরিক প্রকৌশলগত সহযোগীতা বৃদ্ধি করা।</p>
<p>কঙ্গোতে কিছু রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠানো হবে মর্মে ২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। এখনও দেশটিতে অত্যাধুনিক রুশ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে দর কষাকষি চলছে।</p>
<p>জুনের ৫ তারিখ, ল্যাভরভ বুরকিনা ফাসো পৌঁছান। যে দেশটিতে বর্তমান মস্কোর সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সরকারের শাসন জারী রয়েছে। সেখানে তিনি জানান যে, “বুরকিনা ফাসোতে রুশ প্রশিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।“</p>
<p>বুরকিনা ফাসোতে ল্যাভরভের সফরকালীন বক্তব্য থেকে তাস নিউজ এজেন্সি উদ্ধৃতি করেছে-“ প্রেসিডেন্ট ইবরাহীম তাওরে ক্ষমতায় আসার পরে আমাদের দেশের সাথে সর্বপ্রথম যে চুক্তি হয়, তখন থেকেই আমরা খুব নিবিড়ভাবে সামরিক এবং সমর প্রকৌশল খাত সহ সকল ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগীতা বজায় রেখেছি।“</p>
<p>একই দিনে ল্যাভরভ চতুর্থ দেশ হিসেবে শাদে পৌঁছান এবং বলেন, “আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিতে পারি যে আমাদের বন্ধুত্ব কোনভাবেই আমাদের সাথে থাকা ফ্রান্সের সম্পর্ককে প্রভাবিত করবেনা। ফ্রান্সের পদ্ধতিই ভিন্ন; তারা এই মূলনীতি মেনে চলে যে, হয় তুমি আমার সাথে, নয় তুমি আমার বিরুদ্ধে।”</p>
<p>বুরকিনা ফাসো এবং শাদের সাথে ইতিহাসে প্রথমবারের মত রাশিয়ার সংযোগ স্থাপিত হলো এই সফরের মধ্য দিয়ে, যা গত দুই বছরের মধ্যে ল্যাভরভের ষষ্ঠ আফ্রিকা মহাদেশ সফরের একটা অংশ ছিল।</p>
<p>জুলাই, ২০২২ সালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশর, ইথিওপিয়া , উগান্ডা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ভ্রমণ করেন। এরপরে তিনি জানুয়ারী, ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইসওয়াতিনি, এ্যাঙ্গোলা এবং ইরিত্রিয়া সফর করেন। একই বছর ফেব্রুয়ারীতে তিনি মালি, মৌরিতানিয়া এবং সুদানেও সফর করেন। মে মাসের শেষ এবং জুনের শুরতে কেনিয়া, বুরুন্ডি, মোজাম্বিক সফর করেন। ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে আগস্ট মাসে তিনি সফর করেন দক্ষিণ আফ্রিকায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সামরিক সফর</strong></h4>
<p>সমান্তরালভাবে নর্থ আফ্রিকান নিউজ ২০২৪ সালের জুনের ২ তারিখ প্রতিবেদন করে যে, পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী জেনারেল, খলিফা হাফতার জুনের শুরতে রাজমায় অবস্থিত জেনারেল কমান্ড হেডকোয়ার্টারে রুশ উপ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইউনুস বেক ইয়েভকুরভকে স্বাগত জানান।</p>
<p>একই উৎসের তথ্যমতে, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধ সহ সামরিক ও অর্থনৈতিক খাতে তাদের ইতিবাচক অগ্রগতির গুরুত্ব তুলে ধরে খলিফা হাফতার দুই দেশের ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।</p>
<p>রাশিয়ার সামরিক দূত সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পারষ্পারিক সহায়তার দিকে ইঙ্গিত করে লিবিয়ার জেনারেল কমান্ড ফোর্সের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তার দেশের অবদানের কথা তুল ধরেন।</p>
<p>নোভা নিউজের খবর অনুসারে, ২০২৪ এর ৪ জুন ইয়েভকুরভ লিবিয়ার বেনগাযি থেকে নাইজারে পৌঁছান।</p>
<p>একই সূত্র উল্লেখ করে যে, রাশিয়ান সামরিক কর্মকর্তা নাইজারের বর্তমান সামরিক সরকারের প্রধান আব্দুর রহমান ছিয়ানি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী সালিফৌ মোদির সাথে সাক্ষাত করেন। যেখানে সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগীতার আলোচনা স্থান পায়।</p>
<p>উভয়পক্ষ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত সমাধান খোঁজার লক্ষ্যে পারস্পারিক শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে কৌশলগত অংশিদারিত্ব শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করে। ইয়েভকুরভ নাইজারকে তাদের সকল বৈধ উদ্যোগে সমর্থন করার জন্য রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।</p>
<p>ইয়েভকুরভ প্রকৃতপক্ষে নাইজার এবং রাশিয়ার মধ্যে একাধিক খাতে সহযোগিতার একটি স্মারক স্বাক্ষর করতে ৪ ডিসেম্বর, ২০২৩-এ নিয়ামে এসেছিলেন।</p>
<p>আফ্রিনজ ওয়েবসাইট ৫ জুন, ২০২৪-এ রিপোর্ট করেছে যে রাশিয়ার উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইউনুস বেক ইয়েভকুরভ মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারার সাথে দেখা করেছেন।</p>
<p>সূত্রটি উল্লেখ করেছে যে মন্ত্রী সাদিওর সাথে মালিতে এই বৈঠকে দুই দেশের মাঝে ইতোমধ্যে ভালোভাবে এগিয়ে চলা সামরিক সহযোগিতার দিকে মনোনিবেশ করা হয়।</p>
<p>এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিরলস যুদ্ধে মালিকে সমর্থন করার জন্য রাশিয়া তার প্রস্তুতি এবং অবিচল প্রতিশ্রুতি কখনোই লুকানোর চেষ্টা করেনি।</p>
<p>ওয়েবসাইটটি উল্লেখ করেছে যে &#8220;এই সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ, মালিয়ান সেনাবাহিনী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি থেকে অঞ্চলগুলির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রভাব বলয় নষ্ট করা</strong></h4>
<p>রাশিয়ার এই পদক্ষেপ সমূহের ব্যাখ্যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আহমেদ নুরুদ্দীন বলেছেন যে রাশিয়ার অভিষ্ঠ লক্ষ্যগুলি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বিশেষ করে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে চার চার দফা সফর এটারই ইঙ্গিত দেয় যে, ন্যাটো দেশগুলির দ্বারা আরোপিত একঘরে করন থেকে রাশিয়া যেকোন মূল্যে মুক্তি পেতে চাইছে।</p>
<p>তিনি আল-ইস্তিকলালকে বলেন যে এই সফর ও পদক্ষেপের মাধ্যমে  রাশিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, সামগ্রিকভাবে আফ্রিকায় ফরাসি এবং পশ্চিমা প্রভাব বলয় ভেঙে ফেলা। সকল পক্ষকে ক্লান্ত করে দেবার কৌশল প্রয়োগ করে তাদের দুর্বল ও নির্মূল করে দেয়া। এখানে, &#8220;পক্ষ&#8221; বলতে আফ্রিকান দেশগুলি, লাতিন আমেরিকার দেশগুলি এবং এশিয়ান দেশগুলি উদ্দেশ্য।<br />
বিশেষভাবে নুরুদ্দীন দেখান যে &#8220;২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করার পর রাশিয়ার গৃহীত এই কৌশলটি আফ্রিকা অঞ্চলে পশ্চিমা প্রভাবকে দুর্বল করে চলেছে। এবং এখানে রাশিয়া উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।&#8221;</p>
<p>নুরুদ্দীন আরও ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে এই কৌশলটিতে নিরাপত্তা এবং সমর সংক্রান্ত দিকগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সামরিক সহায়তা প্রদান এবং আফ্রিকান শিক্ষার্থীদের রাশিয়ান ইনস্টিটিউটে প্রবেশ করানো। আবার, পুরো আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে থাকা দেশগুলিতে ওয়াগনার গ্রুপ বাহিনী মোতায়েন বৃদ্ধির মাধ্যমেও এই কৌশলের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে।</p>
<p>বিশেষভাবে তিনি উল্লেখ করেন, <strong>&#8220;এই সমস্ত কিছু রাশিয়াকে পশ্চিমের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক স্বার্থ অর্জন করতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ; যখন আমরা ফ্রান্সকে মালি থেকে অপমানিত এবং নাইজার, বুর্কিনা ফাসো এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার হতে দেখেছি।&#8221;</strong></p>
<p>তিনি জোর দিয়ে বলেন, &#8220;এই দেশগুলি, তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ভঙ্গুরতা সত্ত্বেও, একাধিক স্তরে ফরাসি অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স দ্বারা শোষিত হয়ে আসা নাইজারের একটি ইউরেনিয়াম খনি রয়েছে যা ফ্রান্সের পারমাণবিক শক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।&#8221;<br />
&#8220;উপরন্তু, প্যারিস সাধারণত উপকূলীয় এবং আফ্রিকান দেশগুলিতে প্রচুর পরিমাণে সোনা, হীরা এবং মূল্যবান ধাতব খনির উপর শোষণ পরিচালনা করে।&#8221;</p>
<p>তাই, নুরদ্দীন পুনর্ব্যক্ত করেন যে রাশিয়া যখন ফ্রান্সকে চারটি দেশ থেকে বহিষ্কার হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ময়দানে আসে, তখন এটি একদিকে যেমন সরাসরি ফ্রান্সের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় এবং অন্যদিকে, আফ্রিকার এই দেশগুলিতে ফ্রান্সের কৌশলগত নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্যদিকে, ইউরেশিয়া-আরব স্টাডিজ সেন্টার (সিএইএস) এর গবেষক দিমিত্রি ব্রিডজে বলেছেন যে রাশিয়া এখন বিভিন্ন আফ্রিকান দেশ সমূহের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং তাদের কাছে যেতে আগ্রহী। এটা আফ্রিকায় যেকোন সময় পা রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে তার গৃহীত কৌশল।</p>
<p>তিনি আল-ইস্তিকলালকে এটা পরিষ্কার করেন যে, ল্যাভরভের এই সফরটিই প্রমাণ হিসবে যথেষ্ট যে রাশিয়া আফ্রিকায় ফ্রান্সের দুর্বল নীতি থেকে উপকৃত হয় এবং আফ্রিকান দেশগুলিতে ফ্রান্সের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক ভূমিকার জন্য প্রত্যাখ্যান প্রকল্পে বিনিয়োগ করে।</p>
<p>&#8220;বিশেষ করে ফ্রান্স যেহেতু আফ্রিকাকে কিছুই দেয়নি; না জনগণের মুক্তিকে সমর্থন করে, না মহাদেশটির জন্য ভাল একটি অর্থনৈতিক মডেল হিসাবে কাজ করে। উল্টো ফ্রান্সের দৃষ্টিভঙ্গি হলো আফ্রিকান এই দেশগুলির পলিসিকে ম্যানিপুলেট করা এবং তাদের খনিজ সম্পদ লুট করা।&#8221;</p>
<p>রাশিয়ান এই একাডেমিক গবেষক জোর দিয়ে বলেন যে মস্কো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আফ্রিকান বিষয়গুলোতে সরাসরি নিযুক্ত রয়েছে, &#8220;সাংস্কৃতিক এন্ট্রিপয়েন্টগুলোর মধ্য দিয়ে রাশিয়া আফ্রিকা মহাদেশে তার সফট পাওয়ারকে আরো শক্তিশালী করতে চায়। যেমন শিক্ষা, স্নাতক পর্যায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, রুশ ভাষার প্রসার ও পাঠদান ইত্যাদি।&#8221;</p>
<blockquote><p>ব্রিডজে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে রাশিয়া প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে আফ্রিকান সামরিক নেতাদের একটি নতুন অভিজাত শ্রেণী তৈরি করতে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে আফ্রিকার দেশীয় নীতিতে বেশ প্রভাব রাখবে। এছাড়াও, বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সহযোগিতার জন্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে আফ্রিকা কর্পস; এমন একটি প্রকল্প যা আফ্রিকা মহাদেশের ভবিষ্যত বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।</p></blockquote>
<p>তিনি আরো উল্লেখ করেন যে আফ্রিকায় সোভিয়েত নীতির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার থেকে রাশিয়া উপকৃত হচ্ছে, কেননা আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নীতির তুলনায় এটি ততোটা নেতিবাচক নয়। মস্কো একটি বহুমাত্রিক ডাইমেনশনের জন্য এই পলিসি তৈরি করেছে।</p>
<p>তিনি এ ব্যাপারটাও একেবারে উড়িয়ে দেননি যে রাশিয়া বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সাথে তার সম্পর্ক গভীর করবে। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা রাশিয়ার অর্থনীতির সাথে পাশ্চাত্য, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংঘর্ষের একটি ক্ষেত্র তৈরি করবে।</p>
<p>বিশেষজ্ঞ এই ব্যক্তি আরও উল্লেখ করেন যে অভিবাসন এবং বৈদেশিক সম্পর্ক সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউনিয়ন নীতিগুলির ব্যর্থতার আভাস হিসেবে বেশিরভাগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশে চরম ডানপন্থী প্রভাবের উত্থান ঘটছে। এর মধ্য দিয়েই রুশ-পশ্চিমা প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে ।</p>
<p>রুশ কর্মকাণ্ড থেকে আফ্রিকা কী সুবিধা পাবে সে সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে, আহমেদ নুরুদ্দীন বলেছেন যে প্রথম সুবিধাটি হলো কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে বৈচিত্র‍্য আনা। এটি সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলি বা প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে বৃহত্তর সার্বভৌম লাভ অর্জনের জন্য কৌশলের নতুন এক মানদন্ড স্থাপন করবে।</p>
<p>অন্য একটি সাক্ষাতকারে তিনি আল-ইস্তিকলালকে বলেছিলেন, “আমরা দেখতে পাই যে আফ্রিকান দেশগুলি রাশিয়া থেকে গম আমদানির উপর প্রচুর নির্ভরশীল, ২০% গম রাশিয়া থেকে আমদানি হয়ে আসে। তাছাড়া, আফ্রিকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়াও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করে।”</p>
<p>COVID-19 সংকট আফ্রিকার কাছে প্রমাণ করেছে যে রাশিয়ার উপর নির্ভর করা যেতে পারে, কারণ এটি এমন সময়ে বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছিল যখন এই ভ্যাকসিনগুলি বিশ্বব্যাপী দুষ্প্রাপ্য ছিল। আবার বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে কীভাবে সেসময় ইউরোপ নিজের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।</p>
<p><strong>নুরুদ্দিন আরও বলেন যে</strong> <strong>রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্রের উৎস। এদিকে অস্ত্র প্রদানের ক্ষেত্রে মূলত আফ্রিকান দেশগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করার লক্ষ্যে পাশ্চাত্য অন্যায্যভাবে এক প্রকার অধিকার দাবি করে;  যেমন মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র ইত্যাদী। অথচ আসল উদ্দেশ্য এসবের ছদ্মবেশে আফ্রিকান দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং নীতিসমূহে নাক গলানো। অথচ পাশ্চাত্যের মত এই অনধিকার চর্চা না করেই আফ্রিকার বাজারে রাশিয়া সেসব অস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>ফরাসি দৃষ্টিকোণ</h4>
<p>ফরাসি সহ ইউরোপীয় মিডিয়া, আফ্রিকায় রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে উপেক্ষা করেনি। বরং নিশ্চিত করেছে যে মস্কো আফ্রিকা মহাদেশে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। যেমনটি উঠে এসেছে ফরাসি ওয়েবসাইট আফ্রিকা নিউজের ৭ জুন, ২০২৪ -এর সম্পাদকীয়তে।</p>
<p>ওয়েবসাইটটি উল্লেখ করেছে যে ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের বিকল্প হিসেবে রাশিয়া এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক আফ্রিকান সরকারের জন্য পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হয়ে উঠেছে।</p>
<p>এতে আরো বলা হয় যে, মস্কো প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি ওয়াগনার এবং এর সম্ভাব্য উত্তরসূরি আফ্রিকান লিজিওনের ব্যবহারের মাধ্যমে আফ্রিকান দেশগুলির সাথে তার সামরিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছে। যেখানে রাশিয়ান ভাড়াটে সৈন্যরা আফ্রিকান নেতাদের রক্ষা করা থেকে শুরু করে চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশগুলিকে সহায়তা করে থাকে।</p>
<p>এই প্রবন্ধে উঠে এসেছে যে রাশিয়া ইউক্রেনে তার আগ্রাসনের বিষয়ে ৫৪ টি আফ্রিকান দেশের অনেকের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন বা কমপক্ষে নিরপেক্ষতা চায়৷ কেননা আফ্রিকান দেশগুলি জাতিসংঘের বৃহত্তম ভোটিং ব্লক গঠন করে।</p>
<p>সম্পাদকীয়টিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে আফ্রিকান দেশসমূহ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাশিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট এসব সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।</p>
<p>একই উৎসের তথ্যমতে, সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের প্রতি জনগণের হতাশা ও ক্ষোভকে রাশিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রোধে পরিণত করেছে এবং সেসব দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।</p>
<p>সামরিক অভ্যুত্থানগুলি ফ্রান্স এবং পাশ্চাত্য ঘেঁষা সরকারগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু, বেকারত্ব এবং অন্যান্য অসুবিধা দূর করতে খুব একটা কাজ করেনি।</p>
<p>রাশিয়া রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করেই নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করে। যা রাশিয়াকে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার অধীনে থাকা মালি, নাইজার এবং বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলিতে একটি আকর্ষণীয় অংশীদার করে তোলে। এর বিনিময়ে, মস্কো আফ্রিকান দেশগুলোর কাছে খনিজ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা চায়।</p>
<p>আফ্রিকা নিউজ উল্লেখ করেছে যে <strong>&#8220;রাশিয়া মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে সোনা এবং হীরা, কঙ্গোতে কোবাল্ট, সুদানে সোনা এবং তেল, মাদাগাস্কারে ক্রোমাইট এবং জিম্বাবুয়েতে প্ল্যাটিনাম এবং হীরা, সেইসাথে নামিবিয়াতে ইউরেনিয়ামের অ্যাক্সেস পেয়েছে।“</strong></p>
<p>এতে আরও বলা হয়েছে যে, ওয়াগনার এবং রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে আফ্রিকান সোনার বাণিজ্য থেকে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।</p>
<p>বিপরীতে, ২৮ মে ২০২৪ -এ ফরাসি ম্যাগাজিন লে গ্র্যান্ড কন্টিনেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত &#8220;&#8221;Militarizing Africa: Soviet Assets for Russian Doctrine,&#8221; শিরোনামের একটি গবেষণায় যুক্তি দেখানো হয় যে &#8221; আফ্রিকা মহাদেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদী লেনদেনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য রাশিয়ার একটি কৌশল এবং পরিকল্পনাগত অভাব রয়ে গিয়েছে।&#8221;</p>
<p>সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয় যে &#8220;আফ্রিকাতে সোভিয়েত নীতি পশ্চিমা পুঁজিবাদের বিকল্প প্রস্তাবনা হিসেবে একটি আদর্শের মধ্যে নিহিত ছিল। কিন্তু, বর্তমানে আফ্রিকায় রাশিয়ার কৌশলগুলি সাধারণত সুবিধাবাদী, মৌলিক সম্পদের উৎস সমূহের দখল এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে রাজনৈতিক পুঁজি অর্জনের দিকেই মনোনিবেশ করে।&#8221;</p>
<p>একই সূত্রমতে, &#8220;আফ্রিকা মহাদেশে চলমান অস্থিতিশীলতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কারণেই সেখানে রাশিয়ার পুনরুত্থান ঘটে চলেছে।&#8221;</p>
<p>&#8220;রাশিয়ার পাশ্চাত্য বিরোধী মতবাদ অনেক আফ্রিকান অভিজাতের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা ঔপনিবেশিক দায় সম্পর্কে ন্যায্য ভাবেই ঐতিহাসিক অভিযোগ উত্থাপন করে এবং পাশ্চাত্যের সাথে একটি বস্তুনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হওয়াকে রাশিয়ার সাথে তাদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ন্যায্যতা প্রমাণের দলিল হিসবে পেশ করে।&#8221;</p>
<p>উপসংহারে এসে এই প্রতিবেদন বলছে, &#8220;এই পরিস্থিতিতে, রাশিয়ার আক্রমণের মুখে ইউক্রেন &#8211; আফ্রিকান দেশগুলিকে তার পক্ষে জমায়েত করার মত এক বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>(মূলঃ আল-ইস্তিকলাল পত্রিকা</p>
<p>অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/behind-the-scenes-of-russian-officials-trip-to-six-african-countries/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14853</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 01 Sep 2024 11:25:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইলমুল কালাম]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14770</guid>

					<description><![CDATA[তৌহীদ ঘোষণা করে যে, &#8220;তোমাদের উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ, যার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। তাই তাঁর উপাসনা এবং ইবাদাত কর১।&#8221; মুমিনগণ যে একটি মাত্র ভ্রাতৃসমাজ, যার সদস্যরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে পরস্পরকে ভালবাসবে, যারা একে অপরকে ন্যায়বিচার করতে ও ধৈর্য্যশীল হতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তৌহীদ ঘোষণা করে যে, &#8220;তোমাদের উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ, যার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। তাই তাঁর উপাসনা এবং ইবাদাত কর<sup>১</sup>।&#8221; মুমিনগণ যে একটি মাত্র ভ্রাতৃসমাজ, যার সদস্যরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে পরস্পরকে ভালবাসবে, যারা একে অপরকে ন্যায়বিচার করতে ও ধৈর্য্যশীল হতে পরামর্শ দেয়<sup>২</sup>, যারা ব্যতিক্রমহীনভাবে সকলে একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়না<sup>৩</sup>। যারা একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে, সৎকাজে উৎসাহ দেয় এবং মন্দকার্য নিষেধ করে<sup>৪</sup> যার পরিণতিতে আল্লাহ এবং তার রাসুলকে মেনে চলে<sup>৫</sup>-এ সমুদয়ই হচ্ছে সমাজের বিষয়ে তৌহীদের প্রাসঙ্গিকতা।</p>
<p>উম্মাহর স্বপ্ন এক, তেমনি এক হচ্ছে অনুভূতি অথবা ইচ্ছা এবং কর্ম, উম্মাহর সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মনোভঙ্গিতে, তাদের চরিত্রে ও তাদের বাহুতে, চিন্তার একটা ঐক্যমত রয়েছে। উম্মাহ হচ্ছে এমন একটি মানবিক ব্যবস্থা যা মন, হৃদয় এবং বাহু, এই তিনের ঐক্যমতে ঘটিত। এ একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃসমাজ, যা বর্ণ যেমন স্বীকার করেনা তেমনি স্বীকার করেনা নৃতাত্বিক পরিচয়। এর দৃষ্টিতে সকল মানুষই এক, কেবলমাত্র সদাচারণ ও ধার্মিকতার মানদন্ড দ্বারা যার পরিমাপ হবে<sup>৬</sup>। এর কোন সদস্য যদি জ্ঞান, ক্ষমতা, খাদ্য বা আরাম আয়েশ অর্জন করে, তার কর্তব্য হচ্ছে অন্য সবাইকে তাতে শরীক করা, যদি কোন সদস্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, সাফল্য বা সমৃদ্ধি অর্জন করে, সে অবস্থায় তার কর্তব্য হবে, অন্যেরাও যাতে প্রতিষ্ঠিত, সফল ও সমৃদ্ধশালী হতে পারে, সেজন্য সাহায্য করা<sup>৭</sup>। এটি এমন একটি মানবিক ব্যবস্থা, যার সদস্যরা উম্মাহর মূল্যায়ন ও নীতিমালা দ্বারা নিজের জীবন শাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এবং অন্য সকল মানুষের জীবন যাতে অনুরূপ নীতিমালার দ্বারা শাসিত হয় তার জন্য চেষ্টা করে। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা হতে পারে, এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সদস্য হতে পারে; তারা উম্মাহর সদস্য বলে এই সদস্যপদ সমস্ত বৈষম্য ও পার্থক্যের উপর শরীয়াকে দেয় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। উম্মাহর ভিত্তি প্রজাতির (race) উপর নয়, অঞ্চল বা ভাষার উপর নয়, রাজনীতিক এবং সামরিক সার্বভৌমত্বের উপর নয়। অতীত ইতিহাসের উপরও নয়, এর বুনিয়াদ হচ্ছে ইসলামের উপর। নর-নারী নির্বিশেষে যে কেউ ইসলামকে তার ধর্ম বলে গণ্য করে এবং চায় যে, এর আইন কানুন দ্বারা তার জীবন শাসিত হবে, সে বাস্তবে এবং কার্যত উম্মাহর একজন সদস্য, দ্বারা শাহাদার আইনগত চাহিদার এই হচ্ছে অর্থ। তাছাড়া অন্য কোন প্রয়োজনটা আবশ্যক নয়। এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে কোন ব্যক্তিই শরীয়াহ কর্তৃক স্বীকৃত সকল অধিকার সকল সুযোগ সুবিধা ভোগের অধিকারী হয়ে উঠে এবং নিজেকে শরীয়াহর সমস্ত দায়িত্বের অধীনে স্থাপন করে।</p>
<p>ব্যক্তি মুসলমান, পৃথিবীর যে কোন স্থানে বাস করতে পারে এবং সেই দেশের আইনের প্রতি আনুগত্যশীল হতে পারে, যতক্ষণ না সে সব আইন জীবনের সেই সব ক্ষেত্রে শরীয়ার বিরোধিতা করে, যার দ্বারা তার নিজের জীবন প্রভাবিত হয়। যখন যে অঞ্চলে সে বাস করে, তার আইন কানুন যদি ইসলামের বিপরীতে তার জীবনকে প্রভাবিত করে, তখন একটি ইসলামিক অঞ্চলে হিযরত করার বিকল্প তার থাকে। অথবা ইসলামিক কিংবা ভিন্নতর কোন বাহ্য উদ্দেশ্য পূরণের আশায় সে তার নিজের জীবনে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সহ্য করে যেতে পারে। তার পক্ষে উম্মাহ হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য নয়। অবশ্য প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে অন্য সকলকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত করা, নিজের অঞ্চলে উম্মাহকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। দেশের আইন হিসাবে শরীয়াহর প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে তার কর্তব্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>তৌহীদ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>খিলাফত</strong></h4>
<p>উপরে যে উম্মাহর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সে উম্মাহ হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা পূরণের জন্য বিশ্ব পুনর্গঠন বা বিশ্ব সংস্কারের বাহন। এ হচ্ছে সৃষ্টিতে আল্লাহর খিলাফত, কেননা মানুষের বিষয়ে সৃষ্টির সূচনা লগ্নে প্রদত্ত এই ভবিষ্যত বাণী অবশ্যই সম্প্রসারিত হবে উম্মাহ পর্যন্ত এবং তার যুক্তি হচ্ছে পূর্ববর্তী অংশে উল্লেখিত যুক্তিসমূহ। সমভাবে উম্মাহ একটি রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্বের অর্থে এবং সার্বভৌম শক্তির জন্য যে সব অঙ্গ ও ক্ষমতা সার্বভৌমত্বকে বলবৎ করার জন্য প্রয়োজন সে সমুদয়ের অর্থে। রাষ্ট্র হিসাবে উম্মাহর উল্লেখ করতে হবে খিলাফত হিসাবে, দাওলাত হিসাবে নয়। ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য খিলাফত হচ্ছে নিকটতর এবং তৌহীদের ঘনিষ্ঠতর, যে তৌহীদ একটি সরাসরি এবং কুরআনি সিদ্ধান্ত<sup>৮</sup>। দ্বিতীয়টি হচ্ছে &#8216;দাওলাত&#8217; একটি আধুনিক ধারণা যার অবস্থান কুরআনের প্রতিনিধিত্ব বা খিলাফতের ধারণা থেকে সবচাইতে দূরতম ব্যবধানে। আর খিলাফতের এই ধারণাটি হচ্ছে উম্মাহর মূল শর্ত। আমরা যখন খিলাফত উল্লেখ করতে রাষ্ট্রকে বুঝাই তখন উম্মাহ এবং পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্য আমাদের মনে রাখতে হবে। তাই উম্মাহর সার্বভৌমত্ব বলবৎ করার ক্ষেত্রে খিলাফতই হচ্ছে উম্মাহ। এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে না হলেও উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব এর দ্বারাই গঠিত। খিলাফতের বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা রাষ্ট্রতত্বের ক্ষেত্রে তৌহীদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে চাইছি। খিলাফত হচ্ছে ত্রিমুখী ঐক্মত্য দৃষ্টির ঐকমত্য, ক্ষমতার ঐকমত্য এবং উৎপাদনের ঐকমত্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>ইজমা</strong> <strong>আর</strong><strong>&#8211;</strong><strong>রুইয়াহ্</strong> <strong>বা</strong> <strong>দৃষ্টির</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>ইজমা আর-রুইয়াহ্ বা দৃষ্টির ঐকমত্য হচ্ছে মানসিক ঐক্য বা চৈতন্য এবং এর রয়েছে তিনটি উপাদান। প্রথম হচ্ছে, যে সব মূল্যায়ন নিয়ে আল্লাহর ইচ্ছা ঘটিত সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান এবং তাদের বাস্তব রূপায়ণ ইতিহাসে যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে জ্ঞান। স্পষ্টতই ইহা পদ্ধতিবদ্ধ এবং ঐতিহাসিক, দৃষ্টির উপাদানগুলো প্রকৃতিগতভাবেই অপরিসীম, অন্তহীন। তাই সমস্ত কিছু সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টির প্রয়োজন নেই, কেবলমাত্র তার সার নির্যাসেরই প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রয়োজন হওয়া উচিত। এটি হচ্ছে একটি কাঠামো, একটি পদ্ধতি, স্তরে স্তরে বিন্যাস এবং সিদ্ধান্তের জন্য আবশ্যক যার পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন, যা একবার আয়ত্ব হলে এক জনের পক্ষে সমন্বিততার মধ্যে যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা আবিস্কার করা এবং প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়। মূল্যমানের পদ্ধতিবদ্ধ জ্ঞান সম্পর্কে এ হচ্ছে বিশেষ করে সত্য। আর এই জ্ঞানের উৎস হচ্ছে প্রত্যাদেশ অর্থাৎ কুরআন এবং সুন্নাহ এবং যুক্তি, বুদ্ধি এর নিজস্ব প্রক্রিয়ার উপলদ্ধির মাধ্যমে, ন্যায়শাস্ত্র ও জ্ঞানতত্ত্ব এবং সাধারণভাবে সত্য সম্পর্কে উপলব্ধি (পরাতত্ত্ব) নিসর্গ সম্পর্কে উপলব্ধি (প্রকৃতি বিজ্ঞান), মানুষের সম্পর্কে জ্ঞান (নৃতত্ব, মনস্তত্ব এবং নীতিশাস্ত্র), এবং সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান (সমাজ বিজ্ঞানসমূহ)। প্রত্যাদেশের ক্ষেত্রে যেমন নয়, তেমনি বুদ্ধির ক্ষেত্রেও দৃষ্টির একাডেমিক ফল আবশ্যক নয়, যা উপাদানের পদ্ধতিগত ধারণা নিয়ে গঠিত, বরং তা হতে হবে ইনটুইটি স্বজ্ঞালব্ধ, অর্থাৎ এমন একটি উপলব্ধির আলোর অভিজ্ঞতা হতে হবে যা, যে কোন অঞ্চলকে আলোকিত করতে পারে, দৃষ্টির জন্য ইসলামের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এমন একটি ছবি প্রতিষ্ঠিত ক&#8217;রে<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একদিকে ইতিহাসে ইসলামী মূল্যমানসমুহ যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল, সেই আন্দোলন এবং ইসলামী মূল্যমানগুলোর বাস্তবায়ন সম্পর্কে জ্ঞান মূখ্যত একটি অভিজ্ঞতার বস্তু<sup>১০</sup>। এই জন্যই প্রথম দিকের মুসলমানরা মহানবী সম্পর্কে সকল বিবরণ এবং তাঁর সাহাবাদের জীবন থেকে আহরিত ঘটনাবলী জানার জন্য অবিরাম চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই এধরনের চাহিদা দেখা যায়, কারণ অনুসারীদের জন্য তাদের বিশ্বাসের অনুযায়ী ধারণা কি করে একটি কংক্রীট রূপে প্রকাশ পায় তার জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যমান বাস্তবায়নের বিশেষ উপাদানগুলো তাদের ছাত্রদের উপর একটি সার্থক এবং বাঞ্চনীয় শিক্ষকীয় প্রভাব বিস্তার করে। এগুলো তাদের পদ্ধতিগত অধ্যয়নের উপাদানগুলো থেকে সহজে বোঝা এবং স্মরণ রাখা যায়। যাই হোক খিলাফতের জন্য যে দৃষ্টিভঙ্গির উৎপাদন আবশ্যক তার জন্য উভয়টিই সমরূপে আবশ্যক।</p>
<p>মূল্যমানের পদ্ধতিগত উপলব্ধি এবং ইতিহাসে সেগুলোর রূপায়ণ, এ দুটি বিষয় নিয়ে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানের জ্ঞানের অভাবে এবং বর্তমান কি করে সেগুলোকে নতুন করে বাস্তবায়িত করতে পারে, সেই জ্ঞান ছাড়া প্রায় এখন অসম্পূর্ণ। <strong>যেহেতু খিলাফত পশ্চাৎমুখী হতে পারে এবং বর্তমানের মধ্যে বাস করতে পারে এবং ভবিষ্যতেও কার্যকর হবে, সেজন্য বর্তমানের সঙ্গে মূল্যমানকে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক। স্থির করতে হবে বাস্তবে অস্তিত্বশীল কোন উপাদান কোন মূল্যমানকে বাস্তবায়িত করবে, সেগুলো রূপায়ণের বেলায় কেমন করে বর্তমান অবস্থাগুলো মূল্যমানসমুহের শ্রেণীর উপর প্রভাব বিস্তার করে।</strong></p>
<p>এখানে যে ইজমা আর-রুইয়াহর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে ধর্মীয় জ্ঞানের একটি উৎস বলে ধরা হয়েছে। রাসুল্লাহর এই হাদিস, &#8220;আমার উম্মাহ অসত্য বা মিথ্যার ব্যাপারে একমত হবেনা&#8221;, উম্মাহর জনমতের উপর প্রায় একটি পবিত্রতা আরোপ করেছে। তা সত্ত্বেও এ কোন অনড় মত নয় বরং সব সময়ই উন্মুক্ত<sup>১১</sup>। এই উম্মুক্ততাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে ইজতিহাদে, যা কেবল সামর্থ নয়, বরং প্রত্যেক বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন মুসলমানের কর্তব্য, ইসলামী সত্য ও মূল্যমানের সমগ্র পরিসর বা তার কোন অংশকে নতুন করে আত্মসাৎ করে। প্রকৃতিগতভাবেই ইজতিহাদ গতিশীল এবং সৃজনধর্মী এবং তার স্বগুণেই উপলব্ধিক্ষম মনের কাছে খুবই আবেদনশীল। ইজতিহাদকেও রাসুলুল্লাহ এই হাদীসে অভিনন্দনের যোগ্য বলে গণ্য করেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;যে কেউ ইজতিহাদ করে একটি ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সেও একটা সৎ কাজ করলো। যে কেউ ইজতিহাদ করে সত্যে উপনীত হয়, সে দ্বিগুণ পূণ্য লাভ করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>ইজতিহাদ এবং ইজমা সম্মিলিতভাবে সৃষ্টি করে একটি দ্বান্দিক গতি, যা চিন্তার রাজ্যে ইসলামী গতিশীলতা গঠন করে। কারণ ইজমা যেখানে উপলব্ধি লাভের প্রয়াসে চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় সেখানে তা ক্রমাগতই লংঘিত হয় ইজতিহাদের সৃজনধর্মী শক্তির বলে। অন্যপক্ষে, যেখানে ইজতিহাদ উপলব্ধির সর্বোচ্চ বাঞ্ছিত লক্ষ্য বলে পবিত্র বলে গণ্য হয় সেখানে তা সকল মুসলমানকে এর বৈধতা সম্পর্কে বিশ্বাসী করার প্রয়োজনে তা হয় নিয়ন্ত্রিত, সংশোধিত এবং সমালোচনা অর্থাৎ সকলের দ্বারা তা (ইজমা) তা সমর্থিত হবার প্রয়োজনে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>ইজমা</strong> <strong>আল্</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ইরাদা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইচ্ছার</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>ক্ষমতার ঐকমত্য হচ্ছে ইচ্ছার মিল বা ঐক্য এবং এর দুটি উপাদান আছে আল্ আসাবিয়া (সামাজিক সংহতি) যার বলে মুসলমানরা বিভিন্ন ঘটনা এবং পরিস্থিতিতে একইভাবে আল্লাহর আহবানের প্রতি সম্মিলিত আনুগত্যে সাড়া দেবার জন্য নিজেরা অঙ্গীকার করে এবং আন্- নিজাম, সিদ্ধান্তের বাস্তব রূপদানে সামর্থবান, মুসলিমদের কাছে পৌছাতে এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ করতে এবং সাংগঠনিক এবং যৌক্তিক কাঠামো মূল্যমানের ঔচিত্যকে ব্যক্তির গ্রুপ ও তাদের নেতাদের কর্তব্যের রূপদানে পারঙ্গম।</p>
<p>আল আসাবিয়া দৃষ্টিগত ঐক্যের সমান বা ফল নয়। এই ধরনের ঐকমত্যের দ্বারা আসাবিয়াকে সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ করা যেতে পারে। <strong>আসলে এই ধরনের ঐকমত্য ছাড়া আসাবিয়ার অস্তিত্ব অসম্ভব, কেননা যেখানে কোনো ব্যাপারে ঐকমত্য নেই, সেখানে কখনো সংহতি অর্জিত হতে পারে না। দৃষ্টিগত ঐকমত্যের চাইতেও আসাবিয়ার চাহিদা আরো বেশী, এর অভিব্যক্তি ঘটে আন্দোলনের সঙ্গে নিজের অভিন্নতা ঘোষণার সিদ্ধান্তে।</strong> বলতে গেলে উম্মাহর অর্ণবজানে নিজের ভাগ্য সমর্পণ করতে এবং পরে আহবানে সাড়া দিতে- অর্থাৎ আহবান বা দাওয়াতে ইতিবাচক &#8220;হ্যাঁ&#8221; বলতে এবং দাওয়াতে যা কিছু চায় তা ইতিবাচকভাবে সম্পাদন করতে।</p>
<p>খোদ্‌ এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি নির্মিত হয় একটি দীর্ঘ মনস্তাত্বিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ার উপর, যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি নিজেকে উম্মাহর সঙ্গে অভিন্ন রূপে দেখতে পায়, যার পরিশেষে তার চৈতন্য হয়ে উঠে বাস্তবায়নমুখী এবং মানুষ নিজেকে উম্মাহর ঐতিহাসিক ঘূর্ণাবর্ত ও সূচীমুখ হিসাবে খিলাফতের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই মনস্তাত্বিক প্রক্রিয়া শিক্ষা এবং অনুশীলনের বিষয়বস্তু হতে পারে। যেখানে তা হয় সেখানে এই প্রক্রিয়া হয়ে উঠে মার্জিত এবং সমৃদ্ধ। তবে জন্মের মাধ্যমেও প্রকৃতিগতভাবে এর আবির্ভাব হতে পারে এবং গোত্র বা গোষ্ঠীর বদ্ধ পরিবেশে তা লালিত পালিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে বিচার বুদ্ধিহীন। অন্ধ আরেক নিজেকে গোত্র বা জাতের সঙ্গে একাত্ম পণ্য করার এই অর্থে ইবনে খলদুন আসাবিয়াকে সমাজ সংহতির ভিত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন<sup>১২</sup>। যেহেতু ইসলামে এই বাস্তব উপাদানগুলো অতিক্রান্ত হয়েছে তৌহীদের আদর্শের দ্বারা সে কারণে ইসলামের আসাবিয়া হবে একটি নতুন প্রক্রিয়ার, একটি নতুন সংস্কৃতির ফল (আল্লাহর অভিপ্রেত আদলে  সক্রিয় ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের চেহারা বদল করা)। তাই আসাবিয়া হবে ইচ্ছাকৃত লালিত পালিত বিকশিত এবং পরিণত। কেবলমাত্র প্রকৃতিগতভাবে একটি অনৈচ্ছিক বিকাশ নাও হতে পরে, ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের জাতীয়তাবাদী অনুভূতির সঙ্গেও একে এক করে দেখা যাবেনা যা প্রায় বর্ণিত হয় অচেতন, অনৈচ্ছিক, অবর্ণনীয়রূপে অন্তর্গত এবং গূঢ় বলে, প্রকৃতপক্ষে যা গোত্র গোষ্ঠীতন্ত্রের আসাবিয়া। ইসলামী আসাবিয়া ইচ্ছাকৃত, পরিস্কারভাবে বিশ্লেষণযোগ্য একটি নৈতিক ও দায়িত্বপূর্ণ কর্ম। এ আসাবিয়া হচ্ছে তৌহীদের স্বচ্ছ আলোকে, তৌহীদের সকল তাৎপর্যের পূর্ণ প্রভায় উম্মাহর ভাগ্যের সঙ্গে, নিজেকে অভিন্ন গণ্য করার অঙ্গীকার এবং তাতে অংশগ্রহণ। এ দৃষ্টান্ত পাই আমরা এর বিশুদ্ধতমরূপে মক্কায় হজ্জ যাত্রীদের সম্মিলিত ধ্বনিতে যখন তারা কাবা ঘর তাওয়াফ করে অথবা যখন আরাফার দিকে ধাবিত হয়; &#8220;লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক&#8221;- (তোমার আহ্বানে হে প্রভু এখানে আমরা হাজির, তোমার আহবানে)। আর এ হচ্ছে বহু শতাব্দী ধরে যে ভৌগোলিক বা গোত্র গোষ্ঠী ধর্মী বা সংস্কৃতিগত বৈশেষিকতা খাস পাশ্চাত্য জাতীয়তার চরিত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী ধ&#8217;রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত<sup>১৩</sup>।</p>
<p>যেহেতু আসাবিয়া ভূমন্ডলের একটি বিস্তৃত অঞ্চলে বিস্তৃত বিশ্বজনীন উম্মাহ্-গঠনকারী একটি উপাদান সে কারণে আল আসাবিয়া মুসলমানের ব্যক্তিগত মূহুর্তের একটি সত্য মাত্র হতে পারেনা। পরিস্থিতি এবং ঘটনায় সাড়া দিতে গিয়ে মুসলমান যখনি সক্রিয় হতে ইচ্ছা করে বা বাধ্য হয় তখন তা একটি অবাধ তরঙ্গোচ্ছাস হিসাবে কাজ করতে পারেনা; এরূপ কাজ হবে জগৎব্যাপী বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির জনক। আসাবিয়া ইসলাম সম্মত এবং সে কারণে দায়িত্বশীল হতে হলে শৃংখলার অধীন, অবশ্যই হবে নিয়ম গভীরতা ও দিশার দিক দিয়ে এবং অন্য সকল মুসলমানের সঙ্গে সমবায়মূলক ক্রিয়াকান্ডের সঙ্গে নিজেকে অভিন্নভাবে যুক্ত করার জন্য শৃংখলার অধীন। এটাই হচ্ছে আন্-নিজামের রূপ, যে বিষয়ে তৌহীদের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে ইজমা-প্রথা মুসলমানদের তৈরি করেছে। এই নিজামের দিকে লক্ষ্য করে, আমাদের পিতৃপুরুষেরা ভালভাবেই জানতেন যে প্রত্যেক মুসলমানকে হতে হবে অক্ষরজ্ঞান এবং সাহিত্যের রুচীসম্পন্ন তাকে কুরআনের বৃহৎ অংশ সম্পর্কে অবশ্যই জ্ঞান রাখতে হবে, নবী চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে এবং সাহাবাদের জীবনী জানতে হবে, তার গৃহের নিকটবর্তী জামাতে এবং ইবাদতে অংশগ্রহণ করতে হবে- (অর্থাৎ অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ইবাদত করতে হবে- আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি নিকটবর্তী মসজিদে সালাতের সময় যে মুসলমানদের কাঁধ পরস্পর স্পর্শ করা উচিত, এই তাগিদের মানে এই যে, এতে করে, একের কাছে অপরের অস্তিত্ব জীবন্ত হয়ে উঠবে, একের সঙ্গে অপরের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিচয় এবং শব্দটির আক্ষরিক অর্থে বৃহত্তর উম্মাহর সঙ্গে সহযোগিতার উপলব্ধি. বাস্তব হয়ে উঠবে, যাতে করে আল্লাহ যে সকলের প্রভু এবং মালিক ইবাদতকারীর চেতনায় তা মুদ্রিত হয়ে যায়। এ সমস্তই পরিকল্পিত হয়েছে খিলাফতের আনুষ্ঠানিক সংগঠনের প্রস্তুতি হিসাবে। সেকালে মসজিদ ছিলো এবং একালেও তা হওয়া উচিত সকল ইসলামী কর্মতৎপরতার কেন্দ্র, ইসলামের আবশ্যিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু, কারণ মসজিদে মুসলমানরা দৈনিক মিলিত হত, তৌহীদের বন্ধনে তার সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে একটি জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করতো এবং লাভ করতো আধ্যাত্মিক, নৈতিক, রাজনৈতিক জীবনীশক্তির দৈনিক বরাদ্দ। এই খোরাক সরবরাহ করা যায় এবং প্রকৃতই তা সরবরাহ করা হতো যে কোন মুসলিম কর্তৃক, যার অধিকতর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছিলো তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার, যাতে খোদ খলিফাকেও বাদ দেওয়া হতোনা। আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালার দিকে আহবান কর মানুষকে প্রজ্ঞা এবং অধিকতর সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে<sup>১৪</sup>। এবং রাসুলুল্লাহর (সঃ) নসিহত প্রদানের আদর্শে স্বাধীনভাবে প্রদত্ত পরামর্শ, যে নসিহতের আদর্শকে ইজতিহাদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে<sup>১৫</sup>। সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে এই সম্পর্ক ও সংসর্গ রূপ নেবে জুম্মার সালাতে যেখানে ঈমামের খুৎবা হচ্ছে একটি গঠনমূলক স্তম্ভসদৃশ। খুৎবার বিষয়বস্তু হবে বর্তমান পরিস্থিতি, মুসলামান সমাজকে যে সব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে সেসবের উপরই খুৎবা দেবেন ইমাম। খুৎবাতে যে কুরআন এবং হাদিসের কিছু উল্লেখ থাকে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামী প্রজ্ঞার বক্তব্য পেশ করা এবং এভাবে তার প্রাসঙ্গিকতা ঘোষণা করা। আমির (শাসক) নিজেই যে জুম্মার সালাতের ইমাম হবেন, এই প্রথার উদ্দেশ্য ছিলো কার্যকর করার জন্য সপ্তাহের আলাপ আলোচনা থেকে যে ঐক্যমতের সৃষ্টি হয় তার সুস্পষ্ট রূপদান কিংবা ঐকমত্য অর্জিত না হলে নেতৃত্বকে ঘিরে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং উপস্থিত প্রশ্নের আবশ্যক বিচার ও প্রতিবাদের ব্যবস্থা করা। ইসলামের এ সমস্ত ইবাদত পৃথিবী এবং মানুষের বাস্তব রূপান্তর, যে উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে খোদ কুরআন<sup>১৬</sup>, পৃথিবীস্বরূপ আল্লাহর জমিদারীতে রায়ত এবং কৃষকের বাস্তব খিদমত, মরুভূমিকে খুটি করে উপনিষদীয় গুরুর, তথা সন্যাসীর, শারীরিক কসরত, তথা যোগ সাধন নয়, কোন ধর্মীয় ঐতিহ্যের আত্মনিঃগ্রহ, বিশ্বের অস্বীকৃতি এবং ইতিহাস প্রত্যাখ্যান নয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>আমলের</strong> <strong>ইজমা</strong> <strong>বা</strong> <strong>কার্যের</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>কার্যক্ষেত্রে পূর্বে উল্লেখিত সমস্ত প্রস্তুতির চূড়ান্ত শীর্ষ হচ্ছে ইজমা আল-আমাল। এ হচ্ছে ইজমা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠা ঔচিত্যের রূপ। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা ইজমা-ইজতিহাদ দ্বন্দের চিরন্তন গতিশীলতার মতই কখনো নিঃশেষ হতে পারেনা। মানুষকে তার বেহেস্তের অধিকার অর্জনের প্রয়াসে, দেশকালের মধ্যে আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তাবায়িত করা এমন একটি প্রয়াস কেবল বিচার দিবসই যাতে যতি টানতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উম্মাহর বৈষয়িক চাহিদাগুলো পুরণের ব্যবস্থা, এর প্রত্যেক সদস্যকে এমন একটি শিক্ষাদান যাতে করে তার পূর্ণ আত্মপরিচয় সম্ভব হবে; আরো রয়েছে উম্মাহর সফল প্রতিরক্ষার জন্য বৈদেশিক শত্রুর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার বৈষয়িক ও নৈতিক উপায়ের ব্যবস্থা করা এবং তৎসহ সারা পৃথিবীতে আল্লাহর অভিপ্রায় রূপায়ণের জন্য নৈতিক ও বৈষয়িক উপায়ের ব্যবস্থা।</p>
<p>আল্লাহর অভিপ্রায়ের সার নির্যাস হচ্ছে, উম্মাহর বৈষয়িক চাহিদা পুরণ এবং সে কারণে তা ধর্মেরও মর্মকথা। যেহেতু তার খিদমত করার জন্য আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন<sup>১৭</sup> এবং আল্লাহর জমিনে রায়ত-কৃষকের মত এই দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন<sup>১৮</sup>&#8211; তাতে করে ইহা অনিবার্য হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ চান মানুষ জমি চাষ করবে, প্রকৃতির উপাদান এবং শক্তিগুলোকে ব্যবহার করবে এবং তার খুশীমত সভ্যতার বিকাশ ঘটাবে<sup>১৯</sup>। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করতে গিয়ে কুরআন দারিদ্রকে শয়তানের অঙ্গীকার বলে বর্ণনা করেছে<sup>২০</sup>। এবং ধর্মের সঙ্গে ক্ষুধার্তের খাদ্য দান এবং দুর্বলের রক্ষণকে অভিন্ন গণ্য করেছে<sup>২১</sup>। বিশেষ করে মানুষ যখন আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন করে<sup>২২</sup>, তখন মানুষের খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের স্বাভাবিক প্রতিফল এই যে, সে সৃষ্টির মাধুর্য এবং আনন্দ উপভোগ করবে। মেসোপটেমীয় দৃষ্টিতে মানুষের সৃজনের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আল্লাহর জমিনে স্থাপন করা হয়েছে, তাঁর ভৃত্য হিসাবে। কিন্তু মানুষের এই সৃজন কর্মই হচ্ছে সংঘবদ্ধ কৃষিকর্ম, বাঁধ তৈরী, সেচ এবং পানি নিষ্কাশন, খাল খনন, শষ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য, পিরামিড, মন্দির নির্মাণ, লিখন ও হিসাব রক্ষণ পদ্ধতি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রাম-সরকার, নগরী, প্রদেশ, জাতি এবং বিশ্ব পর্যায়ে সরকার প্রতিষ্ঠার সূচনা। সংক্ষেপে আল্লাহর এই সৃজন কর্মই হচ্ছে বিশৃংখলা থেকে সৃষ্টিকে শৃংখলার অধীনে আনয়ন এবং শৃংখলাবদ্ধ জগতের সৃষ্টি<sup>২৩</sup>।</p>
<p>সেমিটিক মন কখনো সংসারত্যাগীর সংসার বর্জন বা আত্মনিগ্রহের অর্থ বুঝতে সক্ষম নয়, ইহা কখনো কাম ও প্রজনন, খাদ্য ও আরাম আয়েশকে স্বাভাবিক পাপ বলে গণ্য করেনা। এর দৃষ্টিতে পাপ হচ্ছে এসবের অপব্যবহার, কখনো প্রকৃতির বিষয় হিসাবে এগুলো পাপ নয়। খ্রীষ্টান ধর্ম বস্তুর সকল ভীতিসহ যে গ্নষ্টিক (gnostic) ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকারস্বরূপ গ্রহণ করে, তাই খ্রীষ্টান আন্দোলনে সংসার বর্জন ও আত্মনিগ্রহরে বীজ বপন করে। ইসলাম অবশ্যই শ্রম বা উপবাসের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটিঃ আত্মসংযমের অনুশীলন এবং অভাবগ্রন্থের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি। একই আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর খাদ্য, পানীয় এবং আনন্দের মাধ্যমে অবশ্যই ভাঙতে হবে রোজা।</p>
<p>খলিফাকে যদি মানুষের বৈষয়িক চাহিদা অবশ্যই পূরণ করতে হয় যা প্রত্যাশা করা হয় খলিফার কাছ থেকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে মানুষের এই বৈষয়িক চাহিদা কি পরিমাণ হলে যথেষ্ট হবে। ন্যূনতম চাহিদা সহজেই নির্ণয় করা যায়; সে চাহিদা হচ্ছে সকল মানুষের জন্য দুর্ভিক্ষ, ব্যাধি এবং শিশু মৃত্যুর প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন তাই হচ্ছে ন্যূনতম চাহিদা, কিন্তু সর্বোচ্চ চাহিদা নির্ণয় করা অসম্ভব, কেননা প্রকৃতির ব্যবহারের সীমা অথবা প্রকৃতির খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা নির্ণয় করা যায়না। এদুটিই হচ্ছে মানুষের কল্যাণের জন্য, আল্লাহ তায়ালা প্রকৃতি বা তার পদ্ধতির মধ্যে যে নিয়ম প্রবর্তন করেছেন সেগুলোর উপর মানুষের কর্ম প্রসারণশীল কর্তৃত্বের বিষয়<sup>২৪</sup>। কুরআন আমাদেরকে জানাচ্ছে আসমানে এবং জমিনে যা কিছু আছে সমস্তই আমাদের কল্যাণের জন্য। রাসুল্লাহ (সঃ) বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;যে কেউ রাত্রে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে যখন তার একদিনের পথে কোথাও একটি মাত্র মানুষও ক্ষুধার্ত থাকে, সে আল্লাহকে কষ্ট দিয়েছে।&#8221;</p></blockquote>
<p>এবং দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রাঃ) ঘোষণা করেছিলেন</p>
<blockquote><p>&#8220;আমি ভয় করি যে, বিচার দিবসে নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে দায়ী করবেন, প্রত্যেকটি খচ্ছরের জন্য যা হোচট খায় বা পড়ে যায়, খিলাফতের সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মেরামতহীন ভাঙ্গাচুড়া রাস্তায়<sup>২৫</sup>।&#8221;</p></blockquote>
<p>নিশ্চয়ই ইসলাম অন্য সকল ধর্মের মতই দান খয়রাতের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম দান খয়রাতকে বলে সাদাকা (শাব্দিক ভাবে যার অর্থ হচ্ছে সত্যপরায়ণতার একটি খন্ড) যার দ্বারা ইসলাম একে একজনের ঈমানের সত্যতার অভিব্যক্তি এবং সূচক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু সকল ধর্মের চাইতে স্বতন্ত্রভাবে ইসলাম ব্যবস্থা করেছে যাকাতের, যা বার্ষিক শতকরা আড়াই ভাগ হিসাবে একটি সম্পদ কর এবং তা আদায় করা হয় রাষ্ট্রীয় আইনের অনুমোদনক্রমে। ইসলাম যে একে যাকাত বলে (মাধুর্য বা মিষ্টতা) এর দ্বারা ইসলাম বোঝাতে চায় যে, আমরা যদি আমাদের সম্পদে আমাদের সঙ্গী সাথীদের অংশীদার না করি, তাহলে বছরে সে সম্পদ হয়ে উঠে তেতো। অধিকন্তু ইসলাম বঞ্চিতদেরকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে, তাদের জন্য ভিক্ষা, দান বা অপমানজনকভাবে ছুঁড়ে মারা কোনো রুটীর টুকরো নয়, বরং এ হচ্ছে বিত্তবানের সম্পদ তাদের হক, তাদের অধিকার<sup>২৬</sup>। ইসলাম একচেটিয়া ব্যবসা যেমন নিষিদ্ধ করেছে, তেমনি নিষিদ্ধ করেছে মজুতদারী এবং মানুষের উপর মানুষের শোষণের প্রধান হাতিয়ারস্বরূপ সুদকে উচ্ছেদ করেছে<sup>২৭</sup>। পক্ষান্তরে যেখানে ইচ্ছা এবং সর্বত্র আল্লাহের অনুগ্রহ সন্ধানের জন্য মানুষকে নির্দেশ দিয়েছে<sup>২৮</sup>। এদেরকে সেই প্রকৃতপক্ষে অনুগ্রহ প্রাচুর্যের সন্ধানে দেশ দেশান্তরে যেতে বলেছে, তলে আল্লাহর নৈতিক বিধানের আওতায়- বিশ্বাসঘাতকতা, প্রবঞ্চনা, চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন বা লুটপাট না করে এবং এভাবে একবার প্রাচুর্য অর্জনের পর সেই বিপুল সম্পদের কোন অংশ কিংবা তার বহুগুণ বৃদ্ধিতে যাকাত প্রদান করে তিক্ততা দূর ক&#8217;রে মধুর করে তুলতে হবে। এবং এভাবে সাদাকাত দ্বারা এই বৃত্তির অধিকারীর সত্যবাদিতা প্রমাণ করতে হবে<sup>২৯</sup>।</p>
<p>উম্মাহর প্রত্যেকটি সদস্য যাতে পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়ামত অর্জন ও ভোগ করতে পারে তার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করাই অবশ্য খিলাফতের দায়িত্ব। কিন্তু এই লক্ষ্য, মহৎ এবং আবশ্যক হলেও যে মুহুর্তে একে মানব জীবনের একমাত্র বা চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে গণ্য করা হয় তখনই তা পর্যবসিত হয় তাহা পাশবিকতায় এবং অধঃপতনে, যাতে মানুষের ব্যক্তিত্বের ঘটে বিকৃতি এবং গোটা ঐশী অভিপ্রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা<sup>৩০</sup>। মানুষের বৈষয়িক প্রয়োজনগুলো নির্দোষ এবং বস্তুতই উত্তম; সম্ভাব্য উচ্চতম মাত্রায় এগুলোর পরিপূরণ আবশ্যক। কিন্তু জীবনের গোটা বৈষয়িক দিকটি যেগুলো রক্ষা করবে, সেগুলো ব্যক্তি বা সমগ্রভাবে উম্মাহর আধ্যাত্মিক মর্মের উপায় বা বাহন মাত্র। বৈষয়িক অর্জনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে গণ্য করার মানে হচ্ছে আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।</p>
<p>এ হচ্ছে এরূপ দাবীরই নামান্তর যে, আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে একটি শূন্য বিষয়, আচার অনুষ্ঠান ও মনস্তাত্বিক আত্মরূপান্তরের দেহ বিযুক্ত জীবন, যা বস্তুগত জীবন অনুসন্ধানের বিকল্প ইসলামে আধ্যাত্মিক জীবন হচ্ছে তিনটি পর্যায়ের, যা একই সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে। এর প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, উম্মাহর সাধারণ বৈষয়িক কাজকর্মে ব্যক্তির অংশগ্রহণ। এর মাধ্যমে মানুষের নিজের বৈষয়িক প্রয়োজনকে উম্মাহর কাজকর্মের প্রয়োজনের অধীনে স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে দুটি পর্যায়ে নিজের এবং অন্যদের শিক্ষার জন্য প্রয়াস; যেমন প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব মানুষের জন্য প্রকৃতির ব্যবহারকে অধিকতর সম্ভব এবং সহজসাধ্য করে তোলে; এবং ইজমা ইজতিহাদের দ্বান্দ্বিকতা হয়ে উঠতে পারে গতিশীল, সৃজনধর্মী এবং ঐশী অভিপ্রায়ের আরো উঁচু হতে উঁচুতর ক্ষমতার স্তর পর্যন্ত পৌছুতে পারে। তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে নন্দনতাত্বিক সৃষ্টি, যাতে উম্মাহর আকুতি এবং জীবনরূপ পায়- কারণ উম্মাহ মূল্যবান বা ঐশী অভিপ্রায়কে বাস্তব এবং রূপায়িত করে তুলে ইতিহাসের পরিক্রমায়।</p>
<p>ইজমা ইজতিহাদের (উৎপাদনের মতৈক্য) দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যের জন্য এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করা যার বদৌলতে পূর্ণ আত্মপরিচয় অর্জন সম্ভব হয়<sup>৩১</sup>। আল্লাহর বান্দা হিসাবে কোনো ব্যক্তি তার পেশাকে উপলদ্ধি করেনা, যদিনা তার ব্যক্তিগত সম্ভাবনা ও ক্ষমতার চূড়ান্ত বিকাশ ও সম্ভাব্য পূর্ণতম ব্যবহার হয়। এধরনের ব্যক্তি নিজেকে অসুখী বলে মনে করবেনা এবং এধরনের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি ব্যর্থ সমাজ হবেনা, কিন্তু মেধার পূর্ণ ব্যবহার না হলে, শক্তি অব্যবহৃত থাকলে এবং উৎসাহ উদ্দীপনা অপূর্ণ থাকলে, উম্মাহর গন্ডীর বাইরে আত্মউপলব্ধির প্রলোভন অথবা খিলাফতকে ক্ষতিগ্রস্থ এবং ব্যর্থ করার প্রবণতা থেকেই যাবে। খিলাফতকে দুটিই করতে হবে: &#8220;প্রয়োজন সৃষ্টি করা অর্থাৎ সদস্যদের মধ্যে সত্য সম্ভাবনা জাগ্রত করা এবং সেগুলোর পরিপূরণের উপায়ের ব্যবস্থা করা।&#8221; যদি পূর্বোক্ত ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হয় সে পাবে এমন একটি উম্মাহ যা অজ্ঞ এবং অজাগ্রত ও অর্বাচীন লোকদের নিয়ে গঠিত, যদি দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দেশ ত্যাগের মাধ্যমে নিজেকে শূন্য ও ধ্বংস করার পথ উম্মুক্ত করে দেবে, অথবা অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক কাজের মাধ্যমে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং বিদেশীদের শোষণের মাধ্যমে আত্মবিনাসের পথ উন্মুক্ত করে দেবে।</p>
<p>উৎপাদনের ঐকমত্য চরিতার্থ করার জন্য খেলাফত অবশ্যই উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করবে, শত্রুর আক্রমণ থেকে উম্মাহর কার্যকর প্রতিরক্ষার জন্য, প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করবে<sup>৩২</sup>। কোনো সদস্যই স্বেচ্ছাসেবী নয়। বরং সকলেই বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাবদ্ধ সৈনিক, যখন উম্মাহর মূল অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে, অথবা যখন পৃথিবীতে আল্লাহর বাণীকে সবার উপরে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য তাদের সার্ভিস প্রয়োজন।</p>
<p>চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ইজমা আল-আমালের এই দিকটির দ্বারাই উম্মাহর সর্বোচ্চ সাফল্য স্থিরীকৃত হয়, অর্থাৎ পৃথিবীকে ইসলামের জীবন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করায় এর অবদান নির্ণিত হয়। পেশা বা বৃত্তির এই দিকটি উম্মাহকে সেই স্তরে উন্নীত করে যেখানে পৌঁছানোর পর সে মানুষের ইতিহাসের এবং বিশ্ব ইতিহাসের মোকাবেলা করতে পারে। এই পর্যায়ে উম্মাহর সাফল্য হচ্ছে আল্লাহর দৃষ্টিতে উম্মাহর চূড়ান্ত যৌক্তিকতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>তৌহীদ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>ক্ষমতা</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>ইসলাম</strong> <strong>ও</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>বিশ্ব</strong><strong>: </strong><strong>দুঃখজনক</strong> <strong>কতগুলো</strong> <strong>বাস্তবতা</strong></p>
<p>মুসলিম বিশ্ব আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর কালামকে সবার উপরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি মহাসম্ভাবনাপূর্ণ শক্তি, কেননা এই মুহুর্তে মুসলিম বিশ্বে বাস করছে আটলান্টিক থেকে পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে, একশত কোটির বেশী মানুষ এবং তা এখন ইউরোপ এবং আমেরিকাতে শিকড় গাড়তে ও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। তার নিজের জন্য এবং পৃথিবীর জন্য এটি একটি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আল্লাহর অভিপ্রেত লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্ব এখনো তার ক্ষমতার বিকাশ ও ব্যবহার থেকে দূরে। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিশ্ব তার নিজের ক্ষমতা, নিজের বিকাশের জন্য প্রয়োগ, স্বদেশে তার ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যর্থ প্রয়াস ও অমুসলমানদের স্বার্থে গঠনমূলক প্রচেষ্টায় সেই সব শক্তির অপচয়ের মধ্যে একটি অনিশ্চিত ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।</p>
<p>মুসলিম দেশগুলোর সংবিধানের অধিকসংখ্যকই ঘোষণা করে যে, রাষ্ট্রের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। কেবলমাত্র একটি দেশই, সৌদি আরব, এই ঘোষণাকে গুরুত্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছে, যার লক্ষণ হচ্ছে রাষ্ট্রে শরীয়াহর কার্যকরণ। অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো কিছু সংখ্যকের, যেমন- পাকিস্তান ও কুয়েতের স্থান এর পরেই, কারণ এই সব দেশের সংবিধান ঘোষণা করেছে, ইসলাম হচ্ছে রাষ্ট্রের এবং উম্মাহর মূল শর্ত, তবে এর সঙ্গে তারা যোগ করেছে পাশ্চাত্য বর্ণনামূলক এসব ধারণা যে, তারা যে জাতি বা রাষ্ট্র এর কারণ তারা একটি জাতি গোষ্ঠী, একটি অঞ্চল এবং সার্বভৌমত্ব সমবায়ে তাদের জাতি বা রাষ্ট্র গঠিত, এটি এমন একটি বিবেচনা যাতে অপরিহার্য শর্ত হিসাবে ইসলাম অসম্পূর্ণ বলে গণ্য। তৃতীয় শ্রেণীর রাষ্ট্রগুলো যেমন মিশর, মরক্কো এবং সুদান ইত্যাদি। যারা ইসলামকে কেকের উপর বরফের একটি আবশ্যক আস্তর বলে গণ্য করে, যে কেকটির অন্তর্গত কাঠামো এবং বিন্যাস গঠিত পাশ্চাত্যের ধ্যান ধারণার দ্বারা, ইসলামী ধ্যান ধারণার দ্বারা নয়। জাতীয়তাবাদ নামক এক নতুন শুউবীয়া বা গোত্রবাদ পাশ্চাত্য ধরনের (রক্ত এবং মাংসের) রোমান্টিসিজম দ্বারা নির্ধারিত হয় অভিবাসন, এবং ন্যাচারালাইজেসনের আইন কানুন, নেতাদের সক্রিয় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও অন্যান্য শিক্ষিত শ্রেণীর জীবন আচরণের রূপ এবং নিজেদের সামাজিক প্রতিকৃতি যা জনগণের শিক্ষা এবং প্রেরণার জন্য পরিকল্পিত ও প্রচারিত হচ্ছে। এমন কোন মুসলমান দেশই নেই যা মদীনায় রাসুল্লাহর সমগ্র সময়ে মহানবীর সমাজ যে নিরবিচ্ছিন্ন মবিলাইজেশন ও সতর্ক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে সেই মবিলাইজেশন ও সর্তকতার মধ্যে নিজেকে পরিচালিত করেছে। এবং সম্ভবত মুসলিম বিশ্বের সবচাইতে নিকৃষ্ট দিক হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে তার দেউলিয়াপনা। এমন কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব কোথাও নেই যা পাঁচ বছর বয়স্ক মুসলিম শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তার সম্ভাবনাপূর্ণ বিকাশে তাকে উম্মাহর নিকট প্রত্যর্পণ করে। পৃথিবীকে রূপান্তরিত করার জন্য মুসলিমদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণের কোন সুযোগ সুবিধা আমাদের নেই- সে সুযোগ সুবিধা নেই ঐশী নক্সার আদলে উপাদান উপকরণকে রূপ দেওয়ার এই চেতনায় যে, সেই ঐশী নক্সাই হচ্ছে তার ব্যক্তিগত জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। পি. এইচ. ডি অথবা এম. ডি. গ্রাজুয়েটদের মোট সংখ্যার অনুপাতে শিক্ষিত ইমিগ্রান্ট এবং হতাশ বসবাসকারীদের হার ভয়ংকরভাবে অনেক উচ্চে, এর পরিসরের অন্যপ্রান্তে শিক্ষিতদের সঙ্গে অশিক্ষিতদের সর্বোচ্চ হার আতংকজনক।</p>
<p>মুসলমানরা যে দীর্ঘদিনের নিদ্রা থেকে জেগে উঠতে শুরু করেছে তাতে বিচলিত হবার কিছু নেই, তাদের সমাজগুলো আর্থিক সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে যে দুর্বল অথবা তাদের রাষ্ট্রগুলো যে নিষ্ক্রীয়তা ও আলস্য থেকে পৃথক ধ্বনি তুলে এলোমোলোভাবে পা ফেলে দাঁড়াচ্ছে তাতেও বিচলিত হবার কিছু নেই। বিচলিত হবার বিষয় হচ্ছে উম্মাহর এই মুহূর্তে বর্তমান ও ভবিষ্যতের এই সন্ধিকালে মুসলিম নেতাদের উম্মাহ সম্পর্কে দূরদৃষ্টির অভাব। আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হচ্ছে এই দূরদৃষ্টির অভাবের ফল এবং ইসলামী নাগরিকদের গড়ে তোলার চেষ্টার সম্পূর্ণ অভাব, যে নাগরিকেরা ইসলামী আদর্শের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কারণ সে একবিংশ শতাব্দীতে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সজাগ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>ক্ষমতার</strong> <strong>প্রতিশ্রুতি</strong></p>
<p>কোনো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মুসলিমই এই শতাব্দীতে উম্মাহর দুঃখজনক ব্যর্থতাগুলো সম্পর্কে মুসলিম রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত যে সব কৈফিয়ত দিয়ে থাকেন, সেগুলো বোঝেনা বা গ্রহণ করেনা এবং কেউ এ যুক্তি গ্রহণ করেনা যে, খিলাফতের নেতাদের উদ্যোগ গ্রহণের পূর্বেই জনতার মধ্যে থেকেই আসতে হবে। যে এলিট শ্রেণীর এ বিষয়ে উৎকৃষ্টতর জ্ঞান আছে নিশ্চয়ই তাদের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তারা সংখ্যায় প্রচুর। ইতিহাসের এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন মুসলিম উম্মায় ইচ্ছা-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তাকে গতিশীল করে তোলা। এবং কেবল তখনই তা সম্ভবপর হতে পারে, যখন নেতারা প্রস্ততি গ্রহণ করবেন, কর্তা হিসাবে ইতিহাসের গতিধারায় হস্তক্ষেপের বিপজ্জনক ভূমিকায়, এর বোগী বা কর্ম (object) হিসাবে নয়<sup>৩৩</sup>।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহ কর্তৃক ইতিহাসে হস্তক্ষেপের সূচনা হয় গৃহেই, খিলাফতকে নির্মাণ করার ধৈর্য্যপূর্ণ অবিচলিত প্রয়াসের মাধ্যমে যা বর্তমান কোন মুসলিম রাষ্ট্রেই বিদ্যমান রয়েছে বলে মনে হয়না। যেখানে নোঙ্গর ফেলতে হবে তার একটি সাময়িক বুনিয়াদ সম্পর্কে নিশ্চিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই খিলাফতকে অবশ্যই সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে মবিলাইজ করার জন্য চেষ্টিত হতে হবে, এবং মার্চ করে অগ্রসর হবার জন্য ডাক দিতে হবে। এই উদ্দেশ্য পুরণের জন্য খোদ খিলাফতের বিলুপ্তি ছাড়া আর কোন প্রয়াসই বাহুল্য বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। খিলাফতের কর্মচারী ও পরিচালকদেরকে কোরবান করা যেতে পারে বা কোরবানী করা উচিত, যদি কোরবানী ছাড়া অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রগতি সম্ভব না হয়। যে মুহূর্তে উম্মাহ প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াবে সেই মুহূর্তে আবু বকরের খিলাফত আবার আয়ত্বে এসে যাবে আর তা হবে সর্বকালের মহত্তম মুহূর্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকা:</strong></p>
<p>১. তোমাদের এই উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য এবং আমি তোমাদের রাব্ব, তোমরা আমার বন্দেগী কর (২১: ৯২)।</p>
<p>২. (মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্থ) তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, একে অপরকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং ধৈর্য্যশীল হতে আদেশ করেছে (১০৩: ৩)- যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং ধৈর্য্য ও দয়া দাক্ষিণ্যের নির্দেশ দেয় (৯০: ১৭)।</p>
<p>৩. আল্লাহ রজ্জু দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়োনা, স্মরণ কর তার অনুগ্রহের কথা, তোমাদের মিলনের কথা, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু এবং তোমরা হয়ে উঠলে পরস্পরের ভাই এবং যখন তোমরা ধ্বংসের অতল গহ্বরে কিনারে উপনীত হয়েছিলে এবং তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছিলেন, এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে দেখান তার নির্দশন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার (৩: ১০৩)।</p>
<p>৪. তোমাদের মধ্য থেকে একটি উম্মাহ্ হউক, যে সৎকাজের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে, মন্দ কাজ নিষেধ করবে। প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>৫. আল্লাহ এবং তাঁর নবীকে মেনে চল, যদি তোমরা প্রকৃতই মুমিন হও (৮: ১)।</p>
<p>৬. আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই মহত্তম তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে পুণ্যব্রতী, সবচেয়ে সদাচারী (৪৯: ১৩)।</p>
<p>৭. তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর সৎকর্মে ও পুণ্যকাজে, মন্দকর্মে ও সীমা লংঘনে নয় (৫: ২)।</p>
<p>৮. খিলাফাহ, খুলাফাহ, খালায়েফ, ইয়াস্তাখলিফুকুম প্রভৃতি শব্দগুলোর দ্বারা কুরআনের আয়াতে এর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>৯. তোমাদের মধ্য থেকে একটি উম্মাহ্ হউক যে সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কর্ম বারণ করে, প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>১০. ইসলামী আইন-কানুনের কংক্রীট রূপদান ও বাস্তবায়নের এই ত্যাগীদের ইসলামে এবং ইউটোপিয়াবাদী ধর্মগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীতে, একটি বাস্তব ধর্ম হিসেবে ইসলাম খ্যাতি অর্জন করে।</p>
<p>১১. ইসলামে জনকণ্ঠ বা জনমতকে কখনো আল্লার কণ্ঠের সমান গণ্য করা হয়নি, বরং জনকণ্ঠ বা জনমত সবসময়ই আল্লাহর নির্দেশের অনুবর্তি ও অধীনে রয়েছে, জনমত যখন আল্লাহর আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তখনই তা বাধ্যতামূলক এবং যখন আল্লাহর বাণী থেকে ভিন্নপথ অবলম্বন করে তখনই তা নিন্দনীয় হয়।</p>
<p>১২. Abd al Rahman ibn Khaldun. Al Muqaddimah (Cairo: Matbaut Mustafa. Muhammad n.) pp. 127 if.</p>
<p>১৩. দেখুন এই গ্রন্থকারের (Christion Ethics Chap 1 VII Urubah and Religion pp. ff</p>
<p>১৪. তোমরা রবের পথের দিকে আহ্বান কর, প্রজ্ঞা ও শোভন প্রচারের মাধ্যমে, অবিশ্বাসীদের সঙ্গে সংলাপে সবসময় শ্রেষ্ঠতর এবং শোভনতর যুক্তি উত্থাপন কর (১৬: ১২৫)।</p>
<p>১৫. শাসকের বৈধ সমালোচনাকে উৎসাহিত করার জন্য মহানবী বলেছেন, &#8220;যে কেউ শাসকের জবাবদিহি বাধ্য করার প্রয়াসে মারা যায়, সে শহীদের মৃত্যুবরণ করে&#8221; এবং কোন জাতি যখন দেখে একটি শাসক জবরদাস্ত স্বৈরশাসন চালাচ্ছে এবং তাকে থামাবার জন্য চেষ্টা করছেনা তখন সে জাতি এমন একটি অপরাধ করে যার জন্য সে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়ে।</p>
<p>১৬. আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা করে (১৩: ১১), তারাই সদাচারী যারা পৃথিবীতে তাদেরকে ক্ষমতা দেওয়া হলে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দকর্ম নিষেধ করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে সমস্ত কিছুর প্রত্যাবর্তন আল্লাহর নিকট (১২: ৪১)।</p>
<p>১৭. আমি জ্বীন এবং মানবজাতিকে আমার ইবাদত ছাড়া জন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি (৫১: (৫১:৫৬)। ৫৬)।</p>
<p>১৮. হে জনগোষ্ঠী, আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে তোমাদেরকে স্থাপন করেছেন যাতে তোরা পৃথিবীতে বাস করতে পার। অতএব তার ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁর নিকট অনতাপ কর, তিনি হচ্ছেন প্রভু, তিনি নিকটেই আছেন এবং তিনি দয়ালু (১১: ৬১)।</p>
<p>১৯. যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে রাজত্ব দান করবেন যেমন তিনি দিয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে তিনি তাদের নিকট থেকে যা গ্রহণ করেছিলেন তাদের সেই ধর্মকে শক্তিশালী করবার জন্য তিনি কথা দিয়েছিলেন এবং তাদের আতংক ও নিরাপত্তহীনতাকে আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তায় পরিণত করতে। তদের কাজ হচ্ছে তাঁর ইবাদত করা এবং কোনো কিছুতেই তাঁর শরীক না করা, যারা ঈমান আনেনা তারা অন্যায়চারী (২৪: ৫৫)।</p>
<p>২০. দারিদ্র হচ্ছে শয়তানের প্রতিশ্রুতি, শয়তান তোমাদেরকে অশ্লীল ও পাপকর্ম করতে নির্দেশ দেয়, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন, তার দয়া ক্ষমা ও অনুগ্রহের, তিনি সবকিছু জানেন। তিনি প্রাচুর্যময় (২: ২৬৮)।</p>
<p>২১. তুমি কি দ্বীনের অস্বীকারকারীেেদর দেখেছো, সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি সে এতিমকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়, যে মিসকিনকে খাদ্য দানে নির্দেশ দেয়না (১০৭: ১-৩)।</p>
<p>২২. বল হে মোহাম্মদ, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যে সব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা দিয়েছেন, কে তা নিষিদ্ধ করেছে? বল, এই পৃথিবীতে এগুলো মুমিনদেরই জন্য এবং পরকালে তারা এগুলো উপভোগ করবে। এরূপে আল্লাহ জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন (৭: ৩২)।</p>
<p>২৩. Pritchard. Ancient Near Eastern. Tests 60.</p>
<p>২৪. আসমানে এবং জমিনে যা কিছু আছে সমস্ত কিছুই তোমাদের অধীন করেছেন। যারা চিন্তা করে এবং বিচার করে, তাদের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন (৪৫: ১৩) আল্লাহই তোমাদের জন্য ধরিত্রীকে করেছেন বশীভূত, তোমাদের উদ্দেশ্য সাধন ও কর্মের জন্য তাই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে ভক্ষণ কর এবং স্মরণ রাখ যে তার কাছেই তোমাদের ফিরতে হবে (৬৭:১৫)।</p>
<p>২৫. Mohammad Husayn Haykal-Al Faruq Umar (Cairo Matbaat Misr 1364) Vol. 2 p. 200.</p>
<p>২৬. এবং তারা তাদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতের অধিকার স্বীকার করে (৫১: ১৬)।</p>
<p>২৭. (দুর্ভাগ্য তাদের) যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে এবং মনে করে যে, তাদের সম্পদ অমরতা দান করবে (১০৪: ২-৩) আল্লাহ ক্রয় বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন (২০২: ২৭৫) ২৮. যখন সালাত সম্পন্ন হয়, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান কর এবং</p>
<p>আল্লাহকে বার বার স্মরণ কর যাতে তোমরা প্রকৃতই সফলকাম হতে পার (৬২: ১০)। (হে মোহাম্মদ) তাদের থেকে একটি অংশ গ্রহণ কর অভাবগ্রস্থকে দেবার জন্য। এবং তাতে তাদের অন্তরের সৎকর্মশীলতা দৃঢ় হবে। তাদের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা কর, তাদের জন্য তোমার প্রার্থনা, তাদের জন্য সৃষ্টি করবে আত্মবিশ্বাস, কারণ আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৯: ১০৩)।</p>
<p>২৯. যাকাতের আদেশ বিষয়ক কুরআনের আয়াত অসংখ্য। দেখুন Barakat. Al Murshid&#8230; Zakah. বিশেষ করে কুরআন ৯: ১০৩)।</p>
<p>৩০. প্রকৃতপক্ষে অন্য মূল্যগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো একটি মূল্যের অনুসরণ হচ্ছে সেই মূল্যের উপর একটি জুলুম। একচ্ছত্র শাসন এই ধরনের কোনো একটি মূল্যের অনুসরণে বাড়াবাড়ি যা মূল্য অনুসরণের প্রয়াস এবং তার উদ্দেশ্য দুটিকেই দুষিত করে এবং সেগুলোকে মূল্যহীন করে তোলে।</p>
<p>৩১. পাঠ কর তোমার রবের নামে যিনি স্রষ্টা (৯৬: ১)&#8230; পাঠ কর তোমার প্রভু মহিমান্বিত, তিনি লিখতে শিখিয়েছেন, তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে আগে কখনো জানতনা (৯৬: ৩-৫)। মুমিনগণের একসঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়, তাদের কিছু সংখ্যকের উচিত ধর্মের অনুসরণের জন্য এবং এর নিয়ম কানুন আদেশ নিষেধের চর্চার জন্য গৃহে অবস্থান করা কারণ তাদের সাথীরা যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তাদেরকে শিক্ষাদানের জন্য তদের প্রয়োজন হবে, যেন তারা পাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে (ধর্মের নির্দেশ মত) (১: ১২২)।</p>
<p>৩২. তোমাদের সর্বশক্তি নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবার জন্য তৈরী হও। তোমাদের অশ্বারোহী যোদ্ধাগণকে এভাবে বিন্যস্ত কর, যাতে আল্লাহর শত্রুগণ এবং তোমাদের শত্রুগণ ভীত হয় এবং অন্যেরাও ভীত হ্যা, যাদের তোমরা হয়তো জাননা, কিন্তু আল্লাহ জানেন। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে যা কিছু ব্যয় কর, সমস্ত কিছুই তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তোমাদের পুরস্কারসহ এবং তোমাদের প্রতি অবিচার করা হবেনা (৮:৬০)।</p>
<p>৩৩. (হে বিশ্বাসীগণ) আল্লাহ যা ইতিহাসেই নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া আর কিছুই তোমাদের উপর আপতিত হবেনা, তিনি আমাদের রব, আমরা মুমিনগণ সবসময়ই তার উপর নির্ভর করবো। বল তোমরা কি আমাদের জন্য দুটি মঙ্গলের একটির প্রতীক্ষা করছো (শাহাদাত এবং জান্নাত, অথবা যুদ্ধে বেঁচে থাকা এবং শত্রুর উপর বিজয়) এবং আমরা প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদের শান্তি দিবেন সরাসরি নিজ পক্ষ হতে অথবা আমাদের হস্তের দ্বারা (৯: ৫১-৫২)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14770</post-id>	</item>
		<item>
		<title>স্বৈরাচারী শাসকের পতন : বাংলার জনবিপ্লবে আরব নেতৃবৃন্দের পরামর্শ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-fall-of-the-autocrat-advice-from-arab-leaders-in-the-bengal-revolution/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-fall-of-the-autocrat-advice-from-arab-leaders-in-the-bengal-revolution/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. জাসের আল আওদাহ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 08 Aug 2024 11:49:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14645</guid>

					<description><![CDATA[হে বাংলার প্রিয় উম্মাহ এবং সম্মানিত জনসাধারণ, সমগ্র আরববিশ্বে বিগত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে চলমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতির আলোকে বিগত একদশকে আরব জনসাধারণ যেসব বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছে আপনাদের সাথে সেসব পরামর্শমূলক আলোচনাই করতে চাই। এমনকি, ইতোমধ্যেই আপনাদের দেশের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>হে বাংলার প্রিয় উম্মাহ এবং সম্মানিত জনসাধারণ,</strong><br />
সমগ্র আরববিশ্বে বিগত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে চলমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতির আলোকে বিগত একদশকে আরব জনসাধারণ যেসব বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছে আপনাদের সাথে সেসব পরামর্শমূলক আলোচনাই করতে চাই। এমনকি, ইতোমধ্যেই আপনাদের দেশের চলমান এই পরিস্থিতিতেও একই বিষয়াদি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই আলোচনার কারণ এটাই যে, বাংলায় বসবাসরত প্রিয় জনসাধারণ যেনো পূর্বে আরববিশ্বে ঘটে যাওয়া সেসব পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারে। মুসলিম উম্মাহর প্রধান শত্রুরা-সহ দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা দেশদ্রোহী শত্রুরাও আপনাদের এই বিপ্লবের হাওয়া অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চায় বাংলার জনবিপ্লবকে বাতিল করতে, তারা চায় বাংলার জনসাধারণকে পরাধীন করতে, তারা চায় বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের উপরে আরো হিংস্রভাবে নিপীড়ন চালিয়ে যেতে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে, যেনো আরবের মতো তারা একই পরিবেশ বাংলার ভূমিতেও তৈরি করতে না পারে।</p>
<p>আপনাদের প্রতি অনুরোধ রইলো,<br />
এখনই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা আন্দোলনের সূতিকাগার স্থানগুলোকে ফেলে রেখে ঘরে ফিরে যাবেন না। এমনকি, একমুহুর্তের জন্যও ফাঁকা রাখবেন না। সরকারের অবর্তমানে আগত সেনাবাহিনীদের সকলেই কিন্তু দেশের কল্যাণ চায় না; আবার, তাদের মধ্য থেকে যারা দেশের কল্যাণ চায়, তাদেরকেও কিন্তু সকলে চিনে না; ফলে তারা যা-ই বলুক না কেনো, তাদের বক্তব্যকে চূড়ান্তভাবে মেনে নিবেন না। <strong>মনে রাখবেন, এদেরই একাংশের হাতে কিন্তু বিগত কিছুদিনে ছোটো-বড়ো অসংখ্য ছাত্র ও জনসাধারণ নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। যারা নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করেছে, যাদের হাতে উদীয়মান মেধাবী তরুণদের তাজা রক্ত লেগে আছে এবং রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার-বিভাগীয় যেসব নেতৃবৃন্দের হাত বাংলার আপামর জনসাধারণের রক্তে রঞ্জিত, একমাত্র মৃত্যুদণ্ড ব্যতিত আর কোনো বিচারই তাদের ক্ষেত্রে আপনাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়।</strong> মানবতা রক্ষার তথাকথিত এসব আইনের নামে যারা আপনাদের উপর দীর্ঘ একটা সময় ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জুলুম করে এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার ছাড় দেবেন না; হোক সে যুবক, প্রৌঢ় বা বয়োবৃদ্ধ! বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই অতিসত্বর একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দাবী করবেন না, চাই সে নির্বাচন সুষ্ঠু হোক বা অন্যায্য হোক। এমনকি, চলমান এই পরিস্থিতিতে পূর্বের মতোই সর্বজনীন, সাধারণ ও বেসামরিক সরকারের দাবী করে বসবেন না।</p>
<p><strong>এসবের কারণগুলো হলো,</strong></p>
<p><strong>০১.</strong><br />
আপনাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমার চেয়ে কিন্তু আপনারাই ভালো বুঝবেন যে, বর্তমানে যারা সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদেরকে বিগত স্বৈরাচারী শাসকই নিযুক্ত করেছেন। সেহেতু, তাদের অনেকের ভেতরেই বিগত শাসকের অন্যায়, অবিচার, জুলুমের পরোক্ষ মতামত রয়েছে এবং স্বভাবগতভাবে একই হবে। মনে রাখবেন, মাত্র এক ঘণ্টার জন্য হলেও সমগ্র সেনাবাহিনীর উপর বিশ্বাস রাখবেন না। কারণটাও শক্তিশালী যে, যেহেতু বর্তমান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ বিগত স্বৈরাচারী শাসকই নিযুক্ত করেছেন, সেহেতু দুর্নীতি রোধ করার বিপরীতে সেটাকে আরো রক্ষা করা এবং জনসাধারণের উপর অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে জুলুম করার ক্ষেত্রে বিগত স্বৈরাচারী শাসকের পাশাপাশি তারাও কিন্তু সমভাবে অপরাধী।</p>
<p><strong>০২.</strong><br />
<strong>ইসলামী শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সর্বজনীন সরকার-কে সামরিক শাসনের বিকল্প হিসেবে দেখা হয় না। কেননা, ন্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি ও আদালতপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা-র জন্য ইসলাম যেকোনো ধরনের সরকারকে সাধুবাদ জানায়।</strong> মূল কথা, নেতৃত্বে যারই আগমন ঘটুক না কেন, তাকে আদালত, মারহামাত ও বিশ্বাস-কে প্রাধান্য দিতে হবে; নতুবা তাকেও গ্রহণ করা হবে না। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হলো, বিগত স্বৈরাচারী শাসকের পরে আগত সেনাবাহিনীর মধ্যে এমন সংখ্যক চিন্তা লালনকারী এবং দেশ ও জাতির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গকারী সৈন্য-সংখ্যা খুবই কম রয়েছে।</p>
<p>আপনাদের এখন মূল কাজ হলো, জাতির জন্য উৎসর্গকৃত সেসব প্রাণ খুঁজে খুঁজে বের করে দেশের নেতৃত্বের ভার তাদের হাতে অর্পণ করা, যাতে করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক ও বিচার-বিভাগীয়-সহ বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরেই যেনো আদালত, মারহামাত ও বিশ্বাস প্রতিস্থাপিত হয় এবং বসবাসযোগ্য একটি বাংলাদেশ পুনঃগঠিত হয়। এমনকি, তারা যদি চলমান এই গনহত্যার হত্যকারীদের কঠিন বিচার করে, তবুও তাদেরকেই সমর্থন করুন।</p>
<p><strong>০৩.</strong><br />
বর্তমান এই পরিস্থিতিতে কখনই আপনারা আপনাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে এসে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন না বা সেসব বিষয়গুলোকে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু বানাবেন না। যদিও সেসব বিষয়গুলো বর্তমান পরিস্থিতির মাত্রাতিরিক্ত বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা নিয়ে হোক না কেনো। এছাড়াও, নিহতদের নিয়ে মাতামাতি করা, সাম্প্রদায়িকতা-সহ যতো ধরনের মনোযোগ-বিশৃঙ্খলকারী বিষয় আছে, সেসবকে দূরে রাখতে হবে। নতুবা, এতে করে দেশ ও জাতির শত্রুরা আপনাদেরকে বিশৃঙ্খল করে দিতে সক্ষম হবে এবং আপনাদের অভ্যন্তরেই বিভাজন সৃষ্টি করে দেবে। তবে, এসব নিয়ে ততটুকু আলোচনাই করবেন, যতটুকু আন্দোলন ও বিপ্লবের জন্য উপকারী হবে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে ব্যবহৃত হবে।</p>
<p><strong>০৪.</strong><br />
<strong>আপনাদের লক্ষ্য কিন্তু তথাকথিত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা বা আপনাদের দেশে ইউরোপীয় কৃষ্টিকালচার প্রতিষ্ঠা করা নয়। আপনাদের লক্ষ্য হলো দেশ ও জাতির কল্যাণে ন্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি ও আদালতপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা-র সূচনা করা।</strong> আর এসব সম্ভব হবে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে থাকা জীবন উৎসর্গকারী সেই হাতেগোনা কয়েকজন-এর দ্বারাই, যারা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং আপনাদের বিপ্লবকে বিপথে পরিচালনাকারী ও প্রোপাগাণ্ডা সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত মিডিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে, বা প্রয়োজনে সেগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে।</p>
<p><strong>০৫.</strong><br />
মনে রাখবেন, বিগত বিপ্লবে নৃশংসভাবে হত্যার পেছনে—এমনকি বিগত এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে তাদের অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণে তারা যেসব আইনগুলোকে সামনে রাখে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোর কিন্তু কোনো অস্তিত্ব নেই; অথবা থাকলেও সেসব আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য গণহত্যায় সমর্থন নয়। খেয়াল করলে দেখবেন, বিগত এক যুগে তারা যে আইনগুলোই প্রণয়ন করেছে, সেগুলো দিয়েই কিন্তু দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের ক্ষতি করে গিয়েছে। অর্থাৎ, তাদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্যই তারা এসব আইন প্রণয়ন করেছে। ফলে, এগুলোর প্রতিটি আইনই অবৈধ; কেননা এসব আইন দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের কোনো কল্যাণে আসেনি। অতএব, অতিসত্বর এসব আইন বিলুপ্ত করে দিবেন এবং এমন আইন প্রণয়নে সর্বদা বাধা হয়ে দাঁড়াবেন।</p>
<p><strong>০৬.</strong><br />
আপনাদের দেশের চলমান এই পরিস্থিতি কখনই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়, চাই সে নির্বাচন সুষ্ঠু হোক বা অন্যায্য। দেশের ইসলামী দলগুলোর প্রতি অনুরোধ রইলো, <strong>দীর্ঘ সময়ের জুলুমের পর মরিচীকাতুল্য এই ক্ষমতা পাওয়ার সুযোগের ফাঁদে পা দিবেন না। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক পন্থায় আপনারা রাজনীতিতে পদার্পণ করেন না। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, জনসাধারণকে আপনাদের যতোই প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকুক না কেনো, রাজনৈতিকভাবে বা রাজনীতির শক্তিতে বাকী রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আপনারাই কিন্তু অনেক পিছিয়ে।</strong> এটা মেনে নিয়ে নিজেদেরকে গুছিয়ে নিন, সংঘবদ্ধ করুন। বাকী দলগুলো দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে ব্যয় করেছে, কমবেশি তারা রাজনীতির অলি-গলিতে চলাচল করেছে; কিন্তু আপনারা তাদের মতো করে রাজনীতিতে সময় দেননি। মাঠে-ময়দানে আপনাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া বা রাজনীতিতে আপনাদেরকে বিশৃঙ্খল করে দেওয়া বাকী দলগুলোর চেয়ে সহজ হবে। এটাও কিন্তু সত্য যে, জনসাধারণকে আপনাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকলেও রাষ্ট্র বা বর্তমান সেনাবাহিনীর উপরে আপনাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা কম। সাথে এটাও সত্য যে, দেশের আপামত জনতাকে যারা নৃশংসভাবে খুন করেছে এবং যারা দেশের সম্পদ নষ্ট করেছে, তারা কিন্তু আপনাদের পেছনেই লেগে রয়েছে; এমনকি তারা আপনাদের সর্বশেষ কর্মীকে পর্যন্ত হত্যা করতে পিছপা হবে না। কারণ, জনসাধারণের মাঝে তাদের চেয়ে আপনারা দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এখন, আপনাদের প্রতি অনুরোধ রইলো, নিজেদের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির অলি-গলি ও পথ-ঘাট ভালোভাবে চিনে নিয়ে নিজেদেরকে সংঘবদ্ধ করুন এবং গুছিয়ে নিন।</p>
<p><strong>০৭.</strong><br />
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে আমার অনুরোধ হলো, স্বল্পমেয়াদে নিজেদের আন্দোলনের স্বার্থকতা রক্ষার জন্য মিডিয়াগুলোকে প্রভাবিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের আন্দোলনের স্বার্থকতা রক্ষার জন্য প্রচুর পরিমাণে অধ্যয়ন করতে হবে। দুর্নীতিবাজ ও প্রোপাগাণ্ডা সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত মিডিয়াগুলোকে শক্তহাতে দমন করতে হবে এবং তাদের ভুবন-ভোলানো বক্তব্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে না; এক্ষেত্রে নিজেও সতর্ক থাকতে হবে এবং অপরকেও সতর্ক করতে হবে। সত্যিকারার্থে, প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যে কোথাও ‘স্বাধীন মিডিয়া’ বলে কিছুই নেই। ফলে এই মুহূর্তে লক্ষ্য রাখা উচিত, কারা সত্য ও সঠিক খবরাখবর প্রকাশ করে। আর যারাই মিথ্যা ও প্রোপাগাণ্ডা-মূলক খবর প্রচার করে, এখনই তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান এই আন্দোলনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং এর স্বার্থকতা রক্ষা করতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মনোযোগী হতে হবে। কেননা, এই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শিক্ষিত একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা এই আন্দোলনের স্বার্থকতাকে বয়ে নিয়ে বেড়াবে এবং ন্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি ও আদালতপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা-কে দীর্ঘায়িত করবে।</p>
<p><strong>পরিশেষে আপনাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই,</strong><br />
এসবই আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল, যেসব অভিজ্ঞতার সূচনা হয়েছিলো আরব বসন্তের মাধ্যমে। আরব বসন্তের সেই সময়ে আমাদেরকেও এমন কথাগুলোই বলেছিলেন উম্মাহর মহান মুজাহিদগণ। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য যে, আমরা সেসব কথাগুলোকে খুব একটা প্রাধান্য দেইনি। যার ফলে আজ আমরা এই অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছি। দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ রইলো, আপনারা একই ভুল দুইবার করবেন না, একই গর্তে দু&#8217;বার পা দেবেন না। সতর্ক থাকুন, চোখ-কান খোলা রাখুন। মহান রব সাক্ষী, আমরা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ মৌলিক বিষয়গুলোই বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের প্রচেষ্টাকে কবুল করুক।<br />
<strong>আল্লাহুম্মা আমীন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ: মিফতাহুর রহমান। </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-fall-of-the-autocrat-advice-from-arab-leaders-in-the-bengal-revolution/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14645</post-id>	</item>
		<item>
		<title>১৩ জুলাই ২০২৪; আমাদের দেশ, মাটি ও মানুষ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 13 Jul 2024 11:53:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14551</guid>

					<description><![CDATA[আজকের দিনে বাংলাদেশের যুব সমাজের চোখে চোখ রাখলে, সহজেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা যাচ্ছে- জাতীয় এক হতাশা আমাদের মাঝে নিমজ্জিত হয়েছে। চতুর্দিকে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, সংকট ও দুর্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনসহ হতাশাজনক ভবিষ্যৎ যখন বিভিন্ন ইস্যু হয়ে যুবসমাজের সামনে আসছে, তখন সে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজকের দিনে বাংলাদেশের যুব সমাজের চোখে চোখ রাখলে, সহজেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা যাচ্ছে- জাতীয় এক হতাশা আমাদের মাঝে নিমজ্জিত হয়েছে। চতুর্দিকে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, সংকট ও দুর্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনসহ হতাশাজনক ভবিষ্যৎ যখন বিভিন্ন ইস্যু হয়ে যুবসমাজের সামনে আসছে, তখন সে যুবসমাজের হতাশ না হওয়ার কোনো কারণ অবশিষ্ট থাকেনা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কাজ করা এবং কর্ম-ভাবনার বহু বিষয় রয়েছে। যেমন- নানাবিধ ইস্যু জারি থাকলেও, জাতীয় সংকট বহুমুখী। এই বহুমুখী সংকটকালের বেশ কিছু বিষয়কে যদি আমরা সামনে নিয়ে আসি তাহলে আমরা দেখতে পাই-</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> সিলেট বিভাগসহ আরও ১৭ টি জেলা ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত হয়েছে৷ এর অন্যতম একটি কারণ- আমরা আমাদের শহরগুলোকে, পানি ও নদী ব্যবস্থাপনাকে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আলোকেই গড়ে তুলেছি, সে আলোকেই পরিকল্পনা সাজাই এবং উন্নয়ন খুঁজে বেড়ায়। যেমন, আমাদের শহরগুলোতে পানি নিষ্কাশনের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই না; কিছুদিন আগে মাত্র দু&#8217;দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পুরো শহর ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো। শহরকে সুরক্ষা করার নাম দিয়ে আমরা নদীগুলোতে বাঁধ দিলেও, শহরে পানি নিষ্কাশনের জন্য নদীর সাথে সুন্দর সংযোগ স্থাপন করে বিভিন্ন ধরনের নগরায়ণ করা সম্ভব, এ বিষয়গুলো কখনো চিন্তা ও মানসপটে নেই না। ফলশ্রুতিতে, একটু বৃষ্টি হলেই শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়; আর শহরের এই জলাবদ্ধতায়, পানি যাওয়ার রাস্তা না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পানি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়, পরবর্তীতে দুর্গন্ধ নগরীতে পরিণত হয় এবং এসবের প্রভাব গ্রামাঞ্চলে গিয়ে পড়ছে।</p>
<p>অপরদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কোনো কারণ ছাড়াই বাঁধ ছেড়ে দেওয়া, তাদের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন নীতির কারণে মারাত্নক সংকট ও দূর্ভোগ নিয়মিত আমাদের পোহাতে হচ্ছে৷</p>
<p>আমাদের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকা যেমন সমস্যা; তেমনি একই সাথে যখন আমরা এসব পরিস্থিতিতে পড়ছি, সেই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সঙ্কটকাল মোকাবেলা করার যে উদ্যোগ, সেখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়-</p>
<p>গত কয়েক বছরে বন্যা হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে। এই জেলাগুলোতে যে হারে বন্যা হচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসের অধিক সময় ঐ অঞ্চলের বড় একটি অংশ তথা জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ বেকারত্বের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে; দিনের পর দিন পানিবন্দি! ভয়াবহ অবস্থায় সরকার, প্রশাসন, কোন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠীর দেখা নেই; উদ্যোগ নেই, প্রতিবাদ নেই! এগুলো নিয়ে আজ পর্যন্ত তেমন কোনো কাজ, জাতীয় উদ্যোগ লক্ষ্য করিনি৷ এমনকি কোনো ইস্যুও লক্ষ্য করবেন না৷ <strong>অথচ, বন্যা হলেই আমাদের একটাই কাজ তা হলো- বিভিন্ন দল, ধর্মীয় জনগোষ্ঠী, সেলেব্রিটি ব্যক্তিদের ত্রাণ নিয়ে দৌড়ানোর হিড়িক পড়ে যায়; যাতে লোকসম্মুখে জনপ্রিয় হওয়া যায়। এভাবে প্রতিবছর ত্রাণের মাধ্যমে কি আদৌ এ সমস্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব? এ সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কোন দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তাবনা কিংবা উদ্যোগ নাই। এটি জাতির জন্য বড় আশংকা এবং হতাশার বিষয়৷</strong></p>
<p>ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি দিলিপ দা কুনহা, উনার একটা গবেষণায় দেখিয়েছেন, বন্যা বলতে আমরা যা বুঝি এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। তিনি তার অঙ্কিত ছক-এ দেখিয়েছেন, পানি যখন এসকল বিষয়কে অতিক্রম করে, কিছু শর্ত পূরণ করে, তখন এটাকে আমরা বন্যা বলি। কিন্তু পানি সেসকল শর্তগুলোকে অতিক্রম করছে না, অর্থাৎ মানুষের অব্যাবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট এই দুর্দশা, এগুলোকে বন্যা বলা যায় না। এমনকি প্রকৃতিকেও দোষারোপ করা যায় না।</p>
<p>আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করলে বুঝা যায়, ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নদীর নিয়ন্ত্রণ এ বিষয়টি যুগযুগ ধরে চলে আসা একটি শোষণ৷ আর ঔপনিবেশিক আমলে এ ধরনের বাঁধ দেওয়া, এগুলোকে বিভিন্ন দাতা সংস্থার মাধ্যমে শক্ত অবস্থানে নেওয়া, দেশীয় বিভিন্ন সম্পদ নষ্ট করা, দেশের নদীগুলোকে মৃত করে ফেলা, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে দুর্ভোগে ফেলে, শহর রক্ষার নাম দিয়ে শহরকেও আরেকটি বড় ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে নিপতিত করা, এগুলো ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের কাজ ছিলো। এ কাজগুলো এখনো পর্যন্ত চরম মাত্রায় বিদ্যমান। অর্থাৎ এখনও আমরা মন-মানসে ব্রিটিশ জায়োনিজমের দাসত্ব করে যাই।</p>
<p>আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, সিভিল সোসাইটি কিংবা নাগরিক সমাজ; এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কেউ কিন্তু এগুলোকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করছে না। এখান থেকে উত্তরণের উপায় বাতলে দিচ্ছে না। অথচ এ নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা দেশের অন্যতম আয়ের উৎস, অর্থনীতিকে সচল রাখার বড় এক মাধ্যম। কিন্তু সে মাধ্যমকে আজকে উল্টো অর্থনৈতিক সংকট, ধ্বংস ও মানুষকে মহাদুর্দশায় নিপতিত করার অস্ত্রে পরিণত করেছি। বরাবরের ন্যায় আবারও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত হলো উপকূল অঞ্চলের লোকজন।</p>
<p>এ সকল পানি ব্যবস্থাপনা, নগর ব্যবস্থাপনা, নদী ব্যবস্থাপনা, সঙ্কট বা দুর্যোগগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাকারী, পানি বিশেষজ্ঞ, ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গ, বিজ্ঞানী, স্থপতিগণ সকলকে সাথে নিয়ে ও সকলের চিন্তাগুলোকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করা এবং জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করা আবশ্যক ছিল। এ কাজগুলোকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আমরা কোনো ইস্যু লক্ষ্য করলাম না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> প্রথম আলো কিংবা বণিক বার্তা-র মত পত্রিকাগুলোতে প্রায়শই দেখা যায় যে, গরিবরা মহাসংকটে, মধ্যবিত্তরা দুর্দশায়, এ ধরনের নানাবিধ প্রবন্ধ। টিসিবির পণ্যের জন্য হুমড়ি খেয়ে ঝাপিয়ে পড়ে কিংবা পরিচিত কাউকে দেখলেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবিত্তরা মুখ লুকাচ্ছেন কিংবা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না টিসিবির থেকে কাঙ্ক্ষিত পণ্য, এজাতীয় খবর! বারবার একই অভিযোগ করা হচ্ছে, মানুষের যে চাহিদা এর ৫ শতাংশও সরকারি টিসিবি থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মানুষের আয়ের উৎসের সংকটের কারণে দেশ এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, গরীব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা সত্যিই কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে তাদের দিন অতিবাহিত করছে।</p>
<p><strong>এখন</strong>, আমরা এখন যদি পর্যালোচনা করি, যে শর্করা জাতীয় খাবার বাজার থেকে কিনতে হয়, যেমন- চাল, আলু ইত্যাদি। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আলুর দাম ছিল পনেরো টাকা কেজি। ২০২২ বা ২৩ সালেও ছিল তা ২৮ টাকা বা ৩০ টাকা কেজি। এবছর বা আজকের দিনে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজিতে গিয়ে সেটা পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা যদি একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন লক্ষ্য করি, ২০১৮ সালে তাদের বেতন সর্বনিম্ন যে মজুরি ছিল একজন শ্রমিক ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বেতন পেতো। <strong>বর্তমানে তার বেতন সর্বসাকুল্যে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা হয়েছে। বেতন অনুপাত অনুযায়ী ডাবল হওয়া তো দূরের কথা, একদমই বাড়েনি। কিন্তু ১৫ টাকার আলু ৬০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিক্সাচালক বা এ ধরনের বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই, তারা দুপুরের খাবার না খেয়ে হয়তো গার্মেন্টস এর আশেপাশে এলাকায় টং দোকানে রুটি বা বনরুটি ইত্যাদি খাবার খায়, তারাও সংকটে! কারণ এগুলোর মূল্যও প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।</strong></p>
<p>অপরদিকে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তো আরো ভয়াবহ অবস্থা। নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ গার্মেন্টস সেক্টরেও বেশি। তারা টাকা বাঁচানোর জন্য সন্ধ্যায় টিফিন হিসেবে বা দুপুরের খাবার হিসেবে ঘর থেকে বিভিন্ন খাবার বানিয়ে নিয়ে আসে। কখনো চাল ভাজা, সস্তায় বিস্কুট, চানাচুর, কেউ আটা দিয়ে চাপটি, কেউ বা ডাল-ভাত কিংবা শুটকি তরকারী-ভাত। এই নারী শ্রমিকদের আয় যেখানে বৃদ্ধি পায়নি, যারা টাকা বাঁচানোর জন্য বাহিরে পর্যন্ত খান না, তাদের কাছে আলু বা চালের দাম কমেনি বরং কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের জন্য এই ধরনের খাবার বহন করা অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে গিয়েছে‌। আমিষ জাতীয় যে খাদ্য দ্রব্যগুলো রয়েছে, সবগুলোরই কিন্তু ব্যাপক আকারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় আয়ের যে উৎস, তা খুবই নগন্য।</p>
<p>বাংলাদেশ গার্মেন্টস পেশা থেকে অন্যান্য যেসব শ্রম পেশা আছে, সে তুলনায় শুধুমাত্র গার্মেন্টস সেক্টরে করোনাকালীন সময়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য যে শ্রেণী পেশার শ্রমিকগণ রয়েছে, তাদের কাজের যে ভয়াবহ অবস্থা অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয়ভার অনেক বেশি। একটা পরিবারের মানুষের খাবার খরচ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু যদি এক পরিবারে একজন মানুষ চাকরি করে তাহলে তাদের আয় ১২ হাজার টাকার বেশি না। সেক্ষেত্রে ক্ষুদে বিক্রেতা, ঠেলাগাড়ি টানা কিংবা পুরনো কাগজ সংগ্রহকারী লোকজন, দিনমজুর, বেসরকারি বা আধা সরকারি অফিসের কর্মচারী, যারা বিভিন্ন গাড়ির চালক, শিল্প শ্রমিক, হোটেল বয়, নারীদের ক্ষেত্রে গৃহকর্মী, ঝাড়ু দেওয়া কর্মী, পানি আনা, ক্যান্টিনে কাজ করা, কারখানায় নিম্ন স্তরের কাজ করা বা সেলাই করা মানুষ রয়েছে তাদের কি অবস্থা?</p>
<p>একটি জরিপ বলছে, <strong>৪৯ ভাগ শ্রমিক একদম রুগ্ন এবং পুষ্টিহীন</strong>, যাদের গড় আয়ু কমে আসছে। বিশিষ্ট লেখক মাহমুদ শফিক তাঁর ঢাকা নগরের বিপন্ন পরিবেশ গ্রন্থের ‘অবধারিত মৃত্যু’ অধ্যায়ে লিখছেন, বকুল (তালাকপ্রাপ্ত একজন নারী যার রিকশাচালক স্বামী তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন) বলেন: ‘আমার স্বামীর ছিল দানবের মতো দেহ। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। এখন বুঝতে পারি, রিকশা চালানো কত কষ্টের কাজ। কাজের শেষে দেহটা বিছানার সঙ্গে লেগে যেত। তার পাশে যে একজন মেয়েমানুষ শুয়ে আছে, সে তা মোটেও ভাবত না’। বিষয়টা ভাবতেও কেমন জানি গাঁ শিউরে উঠে…!</p>
<p>এরপর আমরা আরেকটি জরিপ যদি দেখি, <strong>প্রতি ১০ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের মাঝে অধিকাংশই তিন বেলা খায় না।</strong> অথবা খেলেও পুষ্টিহীন খাবার খায়। এদের ৯৮ ভাগ পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে থাকে এবং এর মূল কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে তারা ন্যায্য মজুরি পায় না। বাংলাদেশের ৮৭ ভাগ শ্রমিক; যারা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ কোম্পানি থেকে ঋণ নেয় এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে সুদের ঋণ গ্রহণ করে। <strong>৮৭ ভাগ শ্রমিক সারা বছর ঋণগ্রস্ত থাকে এবং ৬৩ ভাগ শ্রমিক বাকিতে চাল-ডাল কিনে।</strong> এসব নিয়ে তাদেরকেও বিভিন্ন ধরনের অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে হয়।</p>
<p>একইসাথে তাদের খাদ্য যোগানের সাথে সাথে তাদের বড় একটি যোগানের ক্ষেত্র হচ্ছে চিকিৎসা। তাদের পুষ্টির যে অবস্থা এক্ষেত্রে আমরা যদি বিভিন্ন জরিপগুলো দেখি তাহলে দেখা যায়, প্রতিটি শিশু, প্রত্যেকটি ব্যক্তি অপুষ্টির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা শহর কিংবা চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ সকল শহরের কিছু জরিপ যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি; দারোয়ান, পিয়ন, ঝাড়ুদার, মেথর, কুলি, মালি ও বর্জ্য কাগজ সংগ্রহক, বিভিন্ন মেকানিক, দর্জি বা কারখানার শ্রমিক, বাইন্ডিং প্রেসে কিংবা মেটাল সংক্রান্ত কারখানায় কর্মরত যে শ্রমিকরা অর্থাৎ নিম্নশ্রেণীর কর্মচারী যারা রয়েছে, তাদের অধিকাংশই কিন্তু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর মূল কারণ হচ্ছে তাদের ক্যালরি গ্রহণের অভাব অর্থাৎ এক্ষেত্রে একটা নীরব হাহাকার চলছে!</p>
<p>প্রথমত, তাদের ওজন কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, তাদের অসুস্থতা বেড়ে যায় এবং বৃদ্ধ শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মারা যাচ্ছে।</p>
<p>যে কোনো একজন শ্রমিক বিল্ডিংয়ে কর্মরত অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে, তাকে পরিচর্যা করার কেউ নেই, হাড় ভেঙে যাচ্ছে কিংবা মারা গেলেও তার দায়ভারকে গ্রহণ করবে কে? এ নিয়ে কোনো নীতিমালা আমরা আজ পর্যন্ত লক্ষ্য করিনি। এভাবে শত শত শ্রমিক বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, যার জরিপ আজ পর্যন্ত কখনও হয়নি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরপর আসা যাক গার্মেন্টস শ্রমিকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে; যাদেরকে শিক্ষিত বানানোর স্বপ্ন তাদের বাবা-মা দেখে। কিন্তু তাদের ব্যয়ভার বহন করে উঠতে পারে না; তাই তাঁদের বড় একটি অংশ তাদের সন্তানদেরকে এখন কর্মমুখী করার চেষ্টা করছে অর্থাৎ তাদের সন্তানরাও শ্রমিক হিসেবে গড়ে উঠছে। একইসাথে এই সন্তানরাও পুষ্টিহীন অবস্থায় বেড়ে উঠছে, কারণ পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা এতটাই ব্যয়বহুল, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয়না। ফলশ্রুতিতে তারা সুস্বাস্থ্যহীন প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠছে, দিনাতিপাত করছে। ‌</p>
<p>কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ কী আদৌ এরকম একটা দেশ?</p>
<p>যেখানে এরকম দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের কোটি কোটি জনগণের পথ চলতে হচ্ছে। যেখানে আমরা কয়েকদিন আগে দেখলাম চট্টগ্রামের ইসলামী ব্যাংকের একটি শাখায় দেড়শ ভরির অধিক স্বর্ণ উধাও হয়ে গিয়েছে। অমুক ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে। <strong>অপরদিকে ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ এ ধরনের লোকেরা কোটি টাকা বাহিরে পাচার করে নিশ্চিন্তে তাঁদের দিন পার করছে।</strong> কিন্তু সে পাচারের ক্ষেত্রে আমরা সুষ্ঠু সমাধান না দিয়ে চিন্তা করছি, কালো টাকা দেশে কেন ভোগ করতে পারে না, যার কারণে বাহিরে দেশে পাঠাচ্ছে। আবার কালো টাকা ভোগ করার সুবিধা যদি দেশে দেওয়া হয়, তাহলে সবাই এটি অর্জন করতে শুরু করবে। এসব নিয়েই তর্ক বিতর্ক শুরু হয়। এ বছর বাজেটে ১৫ % ভ্যাটের মাধ্যমে কালো টাকা বৈধ করার সিস্টেমেটিক ওয়েও দেখা যায়।</p>
<p>অথচ এসবের বিরুদ্ধে গণমুখী ব্যবস্থা নেওয়া কত বেশি জরুরি ছিল, সেসব নিয়ে কিন্তু আমাদের কোনো মাথাব্যথা কিংবা উদ্যোগ নেই।</p>
<ul>
<li>অপরদিকে হাজার হাজার শ্রমিক যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে রেমিটেন্স পাঠায়, তারাও নানাবিধ কষ্টের মধ্য দিয়ে উপার্জন করে। তাদের পরিবারেরও শহর অঞ্চলে সকলেরই বাড়ি ভাড়া করে থাকা সম্ভব নয়, সন্তানের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো সম্ভব হয়না। তবে, তারা তুলনামূলকভাবে সচ্ছল। মূল বিষয় হলো, তাদের এই কষ্টের টাকা বাংলাদেশে আসছে, তাদের অর্থ উপার্জনের চেয়েও বড় বিষয় তারা পরিবার থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকে। কেউ বাংলাদেশে এসে হয়তো বিয়ে করে, তাকে আবার ফিরে যেতে হয়। আবার যারা বিবাহিত অবস্থায় গিয়েছে, বছরের পর বছর পরিবার সন্তান থেকে দূরে, মা-বাবা থেকে দূরে পড়ে থাকে। এত সকল ত্যাগের মধ্য দিয়ে তাদের পাঠানো রেমিটেন্সগুলো দেশে আসে। হয়তোবা এরচেয়ে বেশি পাঠানো সম্ভব ছিল, যদি তারা দক্ষ হতো। কিন্তু তাদের অধিকাংশ মানুষই অদক্ষ, এ ধরনের মানুষরাই বিদেশে যায়, এটাও আরেক জাতীয় দুর্বলতা।</li>
</ul>
<p><strong>আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি ও আয়ের অন্যতম উৎস বিদেশে থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো আয়।</strong> <strong>সবমিলিয়ে যখন তাদের পাঠানো কষ্টের টাকাগুলো/রেমিটেন্সগুলো দেশে আসে এবং নানাভাবে বাইরেই পাচার হয়ে যাচ্ছে, গোটা জাতি শোষিত হচ্ছে! এরচেয়ে বড় জাতীয় লজ্জা আর কি হতে পারে আমাদের জন্য!? </strong></p>
<p>গত কয়েকবছরে প্রায় ২৫ লক্ষ শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে খালি হাতে! কিন্তু কেউ কি খবর রেখেছে তাদের? বা তাদের কোনো মৌলিক দাবির? তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে? তাদের পারিবারিক অসহায়ত্বের কোনো সমাধান কি হয়েছে? জমি বিক্রি করে আমাদের টগবগে যুবকরা বিদেশে গিয়ে অসহায় চেহারা নিয়ে রাতদিন খেটে যায়, নির্যাতিত হয়; তাদেরকেই যখন খালি হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তখন একটা লাইনও আমরা উচ্চারণ করি না! কোনো উদ্যোগ ও কর্মসূচি তো বহুদূর! আদৌ এর কোন সমাধান হয়েছে কি?</p>
<ul>
<li>এরপর যদি আসা যাক নারী শ্রমিকদের আলোচনায়, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা। নিয়মিতই দেশে প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের লাশ ফেরত আসছে। <strong>এক বছরে সবমিলিয়ে লাশ এসেছে ৪ হাজার ৮৮১ টি।</strong> এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও অনেক। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় <strong>সাড়ে তিনশ</strong>। তাঁদের মধ্যে <strong>৫৩ জনই আত্মহত্যা</strong> করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে! কোনটা আত্মহত্যা আর কোনটা হত্যা, তাইবা কে বলবে? কেনইবা পরিবারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আমাদের মায়েরা আত্নহত্যা করে? কেউ আছে আমাদের? আছে কোনো পররাষ্ট্রনীতি, কোনো বৈদেশিক শ্রম ও অধিকার মন্ত্রণালয়?</li>
</ul>
<p>এ সকল পরিস্থিতিতে সত্যিকার সমাধান বা উত্তরণের উপায় বের করতে এগুলোকেই জাতীয় অর্থনৈতিক ইস্যু কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা বিভিন্ন ধরনের অহেতুক ইস্যুতে ব্যস্ত। ফলশ্রুতিতে যুবকরা কেন-ই-বা হতাশ হবেনা?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> আমরা যদি লক্ষ্য করি, বাংলাদেশ আজ ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নিমজ্জিত। অপরদিকে এসকল জ্বালানি সংকট নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই, থিসিস বা রিসার্চ পেপার নাই, কোনো প্রস্তাবনা নেই কিংবা সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে কর্মসূচি নেই। কিছুদিন আগেও আমরা দেখতে পেয়েছি, সেন্টমার্টিন নিয়ে এত কথা ও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অথচ, সেন্টমার্টিন নিয়ে কোনো ধরনের থিসিস বা প্রস্তাবনা নেই। আসলে সেখানে কী হয়েছিল? এখানে কী আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা অথবা সুশীল সমাজের দুর্বলতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না? এগুলো কেন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয় না?</p>
<ul>
<li>এরপর যদি আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের পার্বত্য অঞ্চল এখনো পর্যন্ত একটি ধোঁয়াশায় নিপতিত হয়ে আছে। সেটি নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই, বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ কারো কোনো গঠিত প্রস্তাবনা নেই কিংবা এ বিষয়ে আমাদের কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নাই।</li>
</ul>
<p>আমরা কিছুদিন আগে মেতে উঠলাম ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে। এখানে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, আমাদের সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি নেই কেন? পররাষ্ট্রনীতি থাকলেও সেটা আদৌ কী? অর্থাৎ সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি যদি থাকতো, তাহলে এই নীতির উপর ভিত্তি করে ভিন্ন দেশের সাথে আমরা চুক্তি করতে পারতাম। সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতিই যেখানে নেই, সেখানে ছোটখাটো দুই-একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস কিংবা ছোট দুই-একটি খবর দেশের পলিসির কিই-বা পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ স্থায়ী মুক্তির জন্য কোনো ইশতেহার সামনে হাজির নেই, কোনো গবেষণা নেই, সুশীল সমাজের কাজ নেই, সেখানে যুব সমাজ কেন-ই-বা হতাশ হবে না?</p>
<ul>
<li>বাংলাদেশের দারিদ্র্য কিংবা যুব সমাজের হতাশা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দেশের মৌলিক আলাপের বিষয় হওয়া দরকার ছিল; শিক্ষাব্যবস্থা। আর এই সেক্টর দক্ষ যুব সম্প্রদায়ের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হবে, পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন খাতসমূহকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। এ ধরনের কোনোকিছুই কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি না অর্থাৎ আজকের এই যে ভয়াবহ বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে, এর পেছনের অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।</li>
</ul>
<p>জাতীয় সংকট পূরণে এ শিক্ষাব্যবস্থা কোনো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারছেনা। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে সকল বিষয়ে কোন প্রস্তাবনা নেই, কর্মপরিকল্পনা নেই।</p>
<p>সার্টিফিকেট ছাড়া ভিন্ন কোন অর্জনও নেই, বিবেকবোধ পর্যন্ত জাগ্রত হচ্ছেনা! বর্তমানে আমাদের এমন অবস্থা যে, রাস্তার পাশে বৃদ্ধ অসহায় নারীদের পড়ে থাকা, কিংবা যুবতী নারীরা শিশুসন্তান নিয়ে ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে, বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করছে, শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাসহ সকল কিছু থেকে বঞ্চিতরা পথে ঘুমাচ্ছে, সেসকল মানুষজনের দিকে তাকানোর পরেও শিক্ষার্থী সমাজের ভবিষ্যৎ ভাবনা, দেশকে গঠন করার ভাবনা, কাজ করার মানসিকতা তৈরি হচ্ছেনা। অর্থাৎ এক ভয়াবহ মানসিক দাসত্বের মধ্যে দিয়ে বড় হচ্ছি কিংবা দিন পার করছি। তার মূল কারণও আখলাক ও আধ্যাত্মিকতাহীন এই শিক্ষাব্যবস্থা। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যদি হাজির থাকে, কেন-ই-বা আমাদের যুব সম্প্রদায় হতাশ হবেনা?</p>
<ul>
<li>গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়ে আমাদের নজর দেওয়া আবশ্যক।</li>
</ul>
<p>কিছুদিন আগে ঈদ গেল! শুধুমাত্র গত এক বছরে- প্রায় ০৭ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু পরিসংখ্যান আমাদের আড়ালেই থাকে তা হচ্ছে- মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যারা নিহত হয়। রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, নদীপথেও দুর্ঘটনা ঘটছে; এগুলোকে শক্তিশালী করে সুন্দর একটি বিকল্প মাধ্যম বানানো যেত, কিন্তু নদীগুলোকেও আমরা হত্যা করছি।</p>
<p>অপরদিকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল সাইটে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কয়েক লক্ষ ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লক্ষ-লক্ষ ভুয়া চালক এখন বিদ্যমান। <strong>বিশেষ করে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মনির মারা যাওয়ার পর বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডক্টর শামসুল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাস্তার বাঁকগুলো অবৈজ্ঞানিক। যে ধরনের প্রশস্ততা থাকা দরকার সে ধরনের প্রশস্ততা নেই। রাস্তাগুলো যেখানে যে ধরনের বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা দরকার ছিল সেগুলো নেই।</strong></p>
<p>গাড়ির যে অবস্থা সেখানকার যে তদারকিসহ সকল জায়গাতেই একটা ব্যর্থতার পরিচয় আমরা দিয়ে যাচ্ছি। এগুলোকে জাতীয় ইস্যু, সংস্কার করা, সমাধান করা নিয়ে সে অর্থে দাবী উত্থাপন করতে দেখা যায়না, এমনকি জাতীয় রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুতে এ সকল বিষয়গুলোকে আমরা হরহামেশা অনুপস্থিত রেখে দিচ্ছি। অথচ দূর্ঘটনা আমাদের জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।</p>
<ul>
<li>সম্প্রতি হঠাৎ ব্যাপকভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে! দ্যা ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর ২০২৩ সালে ২৭৬২৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দৈনিক ৭৭টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মিডিয়া সেল থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সারা দেশে এই অগ্নিকাণ্ডে ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য ঘটনা মিডিয়া কভারেজের বাইরে ছিল।</li>
</ul>
<p>বিভিন্ন গ্যাস ফিল্ড, বিভিন্ন কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি বিষ্ফোরণ হয়ে বিভিন্ন বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। এসব কিন্তু সিস্টেমেটিক বিষয়ের সাথে জড়িত। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো চাইলেই সমাধান করা সম্ভব। যখন মারা যাচ্ছে, তখন কিছু কথাবার্তা হচ্ছে, কিছু গ্রুপ ত্রাণ দিচ্ছে, কোন কোন সংগঠন আবার সমবেদনা জানিয়ে প্রেস ব্রিফিং করছে কিন্তু তারপরে কেউ এ ব্যাপারে এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন থেকে শুরু করে কেউ কথা বলছে না, কেউ কোনো ভূমিকা রাখছে না। এ সকল ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যখন দেশ আগাচ্ছে, তখন যুব সম্প্রদায়ের মনে হতাশা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।</p>
<p><strong>কারণ এই সময়ে বসে আমরা দেখতে পাচ্ছি,</strong> সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে। সামগ্রিকভাবে আইনের শাসনে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। ঋণ খেলাপের দিক থেকেও বাংলাদেশ প্রথম সারিতে অবস্থান করে। এভাবে করে বাংলাদেশে ধর্ষণ সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে, গত দুই বছরে ১৭ হাজারের অধিক নারী-শিশু ধর্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ আইন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। এ সকল সহিংসতার দিক থেকে বাংলাদেশের ঢাকার অবস্থান চতুর্থ। ২০০২ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ ও গণধর্ষণের পর হত্যা, এছাড়াও বিভিন্ন যে হত্যাগুলো হয়েছে অর্থাৎ বিনা অপরাধে কিংবা হত্যা সংশ্লিষ্ট যে মামলাগুলো হয়েছে, তার ৯৭ ভাগেরই সাজা হয়নি। নাগরিক নিরাপত্তার বেলায়ও আমরা দেখতে পাই, ১১৩ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২ বা ১০৩ এ থাকছে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা, যানবাহন নির্মাণ-শিল্প, পাহাড়কাটা, জাহাজের কিংবা ট্রেনের নিচে অবহেলার জন্য দুর্ঘটনা, নানাবিধ কারণে শত শত হাজার হাজার মানুষ মরছে। বৈদ্যুতিক শক কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে, উচু জায়গা থেকে পড়ে গিয়ে একইভাবে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হচ্ছে। এর থেকেও বেশি নিহত হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিনা অপরাধে হত্যার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা সুষ্ঠু কোন সমাধান পাচ্ছিনা। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমাধান হচ্ছে না অর্থাৎ ৯৭ ভাগ অপরাধী এ পর্যন্ত সাজারই বাইরে থেকে গেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এ সকল পরিস্থিতিতে দেশের যুব সম্প্রদায়ের মূল অংশটি কিন্তু দেশ ছাড়ার জন্য উন্মুখ।</strong></p>
<p>যে দেশে বেকারত্ব, যে দেশের কৃষি সংকট, যে দেশে সুস্থ শিক্ষার সংকট, যে দেশে এরকম অনিরাপত্তা! এই ধরনের সৃষ্ট সমস্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত করা, সেখানে গোটা প্রজন্মই যেন বড় হচ্ছে দেশ ছাড়ার স্বপ্ন নিয়ে।</p>
<p>তবে সেখানে একটি বড় অবদান রাখতে পারতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহ। ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধী দল, তাঁদের কোন দল ক্ষমতায় আসার পরে প্রথমে কিছু ইনোভেটিভ, ভালো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিগত ছয় মাসে বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে সেটিও কিন্তু আমরা লক্ষ্য করিনি। একইভাবে এই সকল জায়গাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারতো বিরোধী দলগুলো, তারা কোনো ভূমিকা রাখছে না। মূল কথা হচ্ছে জাতীয় রাজনীতি চরম হাহাকারে নির্মিত হচ্ছে।</p>
<p>এ হাহাকারটা কিসের?</p>
<p>এ হাহাকার নেতৃত্বের হাহাকার, যুবক সমাজের প্রস্ফুটিত হওয়ার হাহাকার। কারণ শক্তিশালী যুববান্ধব নেতৃত্ব নেই, কিছু কথাবার্তা হলেও সেগুলো ফেসবুকের কিছু লেখালেখি, কিছু ইউটিউবের ভিডিও! অর্থাৎ কোনো ভিশনারি দলের পক্ষ থেকে শক্ত লিডারশিপ এবং জাতির সংকট উত্তরণের জন্য তাদের পক্ষ থেকে কোন যৌক্তিক আহ্বান করছেনা। <strong>যুব সমাজকেও গড়ে তোলার কোনো প্রচেষ্টা করছে না। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে এর ভয়াবহ যে শূন্যতা, তার বড় প্রমাণ হচ্ছে তরুণ নেতৃত্ব তুলে আনার জন্য কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক কোনো উদ্যোগ বর্তমানে আমরা লক্ষ্য করি না।</strong> বরঞ্চ নানাবিধ ইস্যুর ভীড়ে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। অথচ এই যুবসমাজকে গড়ে তোলার চেয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক যে উদ্যোগগুলো প্রয়োজন ছিল; এই প্রয়োজন সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বেকারত্ব, শিক্ষা কাঠামো, দেশের অব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়গুলোকে নিয়েই কিন্তু ইস্যু হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো কেউ করতে পারছে না। মূলত এই প্রত্যেকটি কাজ ছিল বড় বড় রাজনৈতিক দল, সংগঠন, অর্থনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর। অথচ কেউ এক্ষেত্রে স্বার্থক কিংবা সফল হতে পারেনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আবার সকলের একটি মুখস্ত দোষ দেওয়ার জায়গা তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে, তারা কিছু করতে দিচ্ছেনা। আসলে কি আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে? নাকি বাহ্যিকভাবে কোনো নেতৃবৃন্দ দেখা গেলেও তাদের হাতে আসলে দেশ নেই। মাফিয়া সিন্ডিকেট কিংবা ডিপ স্টেটগুলো দেশ চালাচ্ছে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের মত করে সমস্ত কিছুকে শোষণ করে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। আমরা সম্পূর্ণ একটি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছি।</p>
<p>আমরা যদি বিএনপি-জামাতের দিকে লক্ষ্য করি, তারা নির্বাচনের আগে একটু একটিভ হলেও বাকি সময়গুলোতে জাতীয় ইস্যু তারা নির্ধারণ করতে পারছে না। গণমুখী আহবান তাদের করতে হবে। এটা তাদেরকে করতে হবে, যদি তারা সামনে কিছু করতে চায়। তারা আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, তারাই দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ সংগ্রামকে এগিয়ে নেবে; এ ধরনের দৃঢ়তা তাদের জন্য আবশ্যক।</p>
<p>অর্থাৎ এই যে সংকট, এ সংকটগুলো কেন-ই-বা তৈরি হচ্ছে? এ প্রশ্ন কিন্তু আমরা করছি না। কারণ এ অবস্থা একদিনে হয়নি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। কেন জাতীয় ব্যর্থতা?</p>
<ul>
<li><strong><em>সমাজ গতিশীলতা হারিয়ে ফেলছে, আমরা ব্যক্তি পর্যায় থেকে কেউ কাজ করি না। কেউ দেশকে শক্তিশালী করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছি না।</em></strong></li>
<li><strong><em>সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তি চেপে বসা।</em></strong></li>
<li><strong><em>ডিপ-স্টেটগুলির নিয়ন্ত্রণ। </em></strong></li>
<li><strong><em>আমাদের সামাজিক সচেতনতাকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলা। এ সকল কারণগুলোর মধ্য দিয়ে একটা অজানা দাসত্ব ব্রিটিশ আমলের ন্যায় চেপে বসে আছে। </em></strong></li>
</ul>
<p>ফলশ্রুতিতে জ্বালানি খাতের মতো এতো বড় খাত কিংবা সাধারণ একটি খাতের কোনো সুষ্ঠু নীতি তৈরি করতে পারি না। যেমন- জ্বালানি খাতের ভুল নীতির কারণে আজকে বিদ্যুৎ সংকটে পড়তে হচ্ছে। সত্যিকারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নেই, থাকলেও তাদের নীতি সর্বদাই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় তৈরি হয় এবং সে আলোকেই প্রস্তাবনা দেয়। আমদানি নির্ভর জ্বালানি খাত বানানোর মতো অন্যতম কারণও এটি। খাদ্যের ক্ষেত্রে একই ভাবে এটি আমদানি নির্ভর করে রেখেছে। খাদ্য বিশেষজ্ঞ আমাদের নেই? সে ধরনের নেতৃত্ব কি নেই? সত্যিই তো নেই। যেখানে বড় বড় গোষ্ঠীর দলগুলি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সেখানে যুবকদের অবস্থা কিইবা হবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য বলতে চাই,</p>
<p>জাতীয় ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে, সমাজকে গতিশীল করতে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে মুক্ত করতে, সামাজিক সচেতনতা এবং দাসত্ব থেকে মুক্ত একটি যুব সম্প্রদায়কে গড়ে তুলতে; <strong>সর্বপ্রথম যুবকদেরকে একটি জাতীয় ভিশন দেখাতে হবে।</strong> প্রত্যেকটি ব্যক্তি যেনো তার ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে, নিজ ফিল্ডে জানা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারে, উপমা তুলে ধরতে পারে। সংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা শিক্ষা বা অন্য কোনো মাধ্যমে যুবকদের গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। ভিশনারী এই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলেই আজকের এই দিনের হতাশা যুব সম্প্রদায়ের মাঝে আত্মবিশ্বাস আকারে ফিরে পাবে।</p>
<p>কারণ আমরা সংগ্রামী জাতি, যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করেই আমাদের আজানকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, জাতীয় সত্তাকে টিকিয়ে রেখেছি, ঈমানকে টিকিয়ে রেখেছি, আমাদের মাটি ও মানুষের মৌলিক যে চেতনা সেটিকে টিকিয়ে রেখেছি। অতএব এ সকল বিষয়কে যেহেতু আমরা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, অর্থনীতি, পানি, নগর, গার্মেন্টস, জ্বালানি সকল ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে পারবো এবং জাতীয় নেতৃত্ব আমাদের যুব সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই দিতে পারবো, এ বিশ্বাস লালন করতে হবে এবং এটার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার ওয়াদা অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যোগ্য করে তুলবেন, ইনশাআল্লাহ।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 66px; top: 2202.93px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14551</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান; জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫</title>
		<link>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 30 Jun 2024 13:53:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি খাত]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫]]></category>
		<category><![CDATA[সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান;]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14504</guid>

					<description><![CDATA[একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে একটি পরিবার কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে, সেই অর্থবছরে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি কী হবে, ঢাকার একজন শিক্ষার্থী নিত্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কতটা সহজে সংগ্রহ করতে পারবে অথবা রাজশাহীর একজন কৃষক তার উৎপাদিত আমের ন্যায্যমূল্য পাবেন কি-না– এগুলোর প্রতিটিই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এক কথায়, কোনো একটি দেশের ব্যক্তি পরিসর থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় বিষয়াদি; এমনকি আন্তর্জাতিক বিশ্বে সেই দেশটির কূটনৈতিক পন্থা নির্ধারণ কেমন হবে– এ সবকিছুই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এজন্য বাজেটকে এক অর্থে একটি জাতির ভাগ্যলিপি হিসেবেও উল্লেখ করা যায়।</p>
<p>প্রতি বছরের ন্যায় ‘সুখি, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে এবারও জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৪.২ শতাংশ এবং চলতি বাজেটের তুলনায় ৪.৬ শতাংশ বেশি। প্রতি বছর বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও কেন দেশের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। পাশাপাশি বাজেটের কলেবর বৃদ্ধি আদৌ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য সহায়ক নাকি বোঝা স্বরূপ, তাও আলোচনা করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে বাজেটের খাতগুলোও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের পর্যালোচনা</h3>
<p>একটি দেশের বাজেটের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো হলো শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য। কারণ দেশের সকলেই এ খাতগুলোর উপর সরাসরি নির্ভরশীল এবং এগুলোর উপরেই দেশের অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন ছিলো এ খাতগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বরাবরের মতোই অবহেলিত রয়েছে এ খাতগুলো। বর্তমান অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রেক্ষিতে যদি আমরা বিস্তারিত আলাপ করি, সেক্ষেত্রে দেখা যায়–</p>
<p>★<strong> শিক্ষা খাত</strong></p>
<p>আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষার হার এখনো আশানুরূপ পরিমাণে বাড়েনি। ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এর সুবাদে প্রাথমিকে ধীরে ধীরে প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও এসব শিক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশি মাধ্যমিক স্তর পার হতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর ২০২৩ সালের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলো ৯২ লাখের বেশি। ২০২৪ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৬৬ হাজারে।</p>
<p>পারিবারিক দরিদ্রতা, শিক্ষার ব্যয়ভার মেটানোর অক্ষমতা এবং চাকরি নির্ভর পড়াশোনাকেই শিক্ষা হারের এ দুর্দশার কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি হিসাব মতে দারিদ্র‍্যের হার ১৮.৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তব সংখ্যা এরচেয়ে দ্বিগুণ বেশি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর জরিপ অনুসারে, ২০২০ সালের শেষে দারিদ্যের হার ছিলো ৪২ শতাংশ। এর মাঝে দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বাস করছে ২৮.৫ শতাংশ নাগরিক। এদিকে ভর্তি ফি, টিউশন ফি, শিক্ষার উপকরণ খরচ, প্রাইভেট-কোচিং বাবদ ইত্যাদি সবই এ বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে।</p>
<p>এর পাশাপাশি, গ্লোবালাইজেশনের সময়ে এসে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল, সেখানে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সকল কিছুরই ব্যয়ভার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইটি পণ্যগুলোর দাম দিনদিন বাড়ছেই। ডিজিটালাইজেশনের সময়ে এসে এমন লাগামহীন অবস্থা শিক্ষাব্যবস্থায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।</p>
<p>অথচ এতসব কিছু বিচার বিবেচনায় না নিয়ে প্রতি বছর শিক্ষা খাতে বাজেটের হার কমছেই। শিক্ষাখাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে বরাদ্দ ছিলো জিডিপির ১.৮৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১.৭৬ শতাংশে নেমে আসে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১.৬৯ শতাংশে, যা মোট বাজেটের ১১.৮৮ শতাংশ। অঙ্কের হিসেবে ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।</p>
<p>একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ইন্ডিপেনডেন্ট এর সূত্রানুযায়ী এ বছরের বাজেটে ৫৬ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মতো। এবং বণিকবার্তার সূত্রানুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি। সেক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের পেছনে গবেষণা বাবদ অর্থ বরাদ্দ মাত্র ১ লক্ষ টাকার কিছু বেশি। একজন শিক্ষক মাত্র এই কয় টাকার উপর নির্ভর করে গবেষণায় কতটা মনোনিবেশ করতে পারবে বলে মনে হয়? তাহলে কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার প্রতি অনীহা বা অনাস্থা প্রদর্শন করবে না?</p>
<p>আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও বর্তমান শিক্ষার মান হিসেবে এই খাতে বাজেটের পরিমাণ নিতান্তই কম। আইএলও এবং ইউনেস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মান মোট বাজেটের ২০ শতাংশ আর জিডিপির ৬ শতাংশ। এর তুলনায় যে নগণ্য বরাদ্দ আমাদের বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কীভাবে একটি দেশের শিক্ষার মানের উন্নতি আশা করা যায়? এছাড়া, গবেষণার জন্য তো আলাদা বাজেট নেই-ই। উচ্চশিক্ষার জন্য গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না পারছে একটি শিক্ষিত ও জ্ঞাননির্ভর জাতি গঠন করতে, না পারছে জাতীয় শিক্ষার মান উন্নত করতে। তারচেয়েও দুর্ভাগ্যজনক হলো এ বরাদ্দের ক্ষুদ্র একটি অংশই শিক্ষাখাতে সত্যিকারার্থে ব্যয় হয়, সিংহভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগী দুর্নীতিবাজ শ্রেণির পকেটে।</p>
<p>স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরোলেও শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের মান, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের আবাসান সংকট, গবেষণার দৈন্যদশা, জ্ঞানচর্চার সুষ্ঠু আবহ– এসবের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন নেই। সব মিলিয়ে অবস্থার চরম করুণ পরিপ্রেক্ষিতে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষাখাতে যতটুকু বাজেট দেওয়া হচ্ছে, তার সম্পূর্ণটাই কি এ খাতে ব্যয় হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে স্বল্প পরিমাণ বাজেটের অংশটুকুও? এই প্রশ্ন জাতির প্রতিটি সচেতন বিবেকের। <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hasan-vai-1.jpg" height="123" /></a>★<strong> কৃষি খাত</strong></p>
<p>শত শত নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত কৃষি। শুধু আমাদের দেশেরই নয়, বরং যে কোনো দেশেরই উন্নতি-অগ্রগতির প্রধান বাহন এ কৃষি খাত। আমরা দেখি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন ও রাশিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পখাতে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃষিকে কখনোই অবহেলা করেনি। যার ফলে, সারা বিশ্বে গম, ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনেও শীর্ষস্থানে রয়েছে এ দেশগুলোই।</p>
<p>এদিকে বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদেও কৃষির সাথে যুক্ত (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩)। অথচ এ দেশের কৃষি খাতের অবস্থা দিনদিন ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হচ্ছে। রপ্তানির পরিমাণ তো বৃদ্ধি পাচ্ছেই না, উল্টো যত দিন যাচ্ছে, আমদানির পরিসংখ্যান যেন তরতর করে বাড়ছে। যেখানে ইলিশ, পাট, চালসহ আরও নানান কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে ছিলো, সেখানে বর্তমান সময়ে এসে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ভুট্টা, ডাল, মসলা, ফল, নারকেল, নারকেলের শাঁস, সারসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি আমদানি করতে হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাতীয় অর্থ।</p>
<p>বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপাত্ত অনুসারে, কৃষি পণ্য আমদানিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার কোটি ডলার) বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সূত্র অনু্যায়ী, একই অর্থবছরে সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে বিলিয়ন ডলারের (৫০০ কোটি) বেশি। ফলে দেখা যাচ্ছে, কৃষি পণ্য ও সার আমদানিতে বাংলাদেশকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ বছরে মূল্যস্ফীতি ও চাহিদা বাড়ার কারণে কৃষিতে আমদানির এ পরিমাণ বেড়ে তিনগুণও হতে পারে।</p>
<p>রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দামও। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কৃষি বাজার। যে সবজি পূর্বে ৩০/৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত, তা এখন ১০০ টাকা ছুঁয়েছে। বেড়েছে চালের দাম, মাছের দাম, মুরগীর দামও। তেলের দামও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে এ দাম বাড়ানো হয়, অথচ যখন বিশ্ববাজারে দাম আবার কমে, তখন স্থানীয় বাজারে দাম কমার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।</p>
<p>এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক বাজেটের মাত্র ৪.৭ (বণিকবার্তা) শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কৃষি খাতে। যদিও গতবারের তুলনায় এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বেশি, তবু বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশের জন্য এমন বরাদ্দ খুবই আশঙ্কাজনক। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক জরিপে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে; সেই জরিপে দেখা যায়, খাবার কিনতে হিমশিম খাওয়া মানুষের হার ৬৮ শতাংশ। দেশের জনগণের এই দুর্দশা ঘোচাতে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিলো এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু নতুন বাজেট আবারও হতাশ করেছে জনগণকে। কেননা, সেই পদক্ষেপের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না বাজেটে। তার মানে আগামীতেও সহজে পরিবর্তন হচ্ছে না চলমান পরিস্থিতি। বাজেট আসছে যাচ্ছে, কিন্তু সেই পুরনো ভুত কাঁধে নিয়েই এগোচ্ছে গোটা জাতি।</p>
<p>★<strong> স্বাস্থ্য খাত</strong></p>
<p>বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত। কিন্তু, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।</p>
<p>সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে জনপ্রতি চিকিৎসা-ব্যয় গড়ে ৫৪ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় পাঁচ হাজার ৯৯৪ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা নিতে বহির্গমনকারী রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ। বিডার হিসাবে, এ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর আস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশে বিগত বছরগুলোয় সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বাড়লেও চিকিৎসকের মান ও সেবার পরিধি প্রসারিত হয়নি। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরেই যেতে হয় সামর্থ্যবানদের।</p>
<p>কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কী অবস্থা? এখন পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে বিশেষায়িত সেবা পৌঁছায়নি। নির্ভুল রোগ নিরীক্ষা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব সংকটের কারণে রোগীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে বেসরকারি হাসপাতালে যায়। যখন সেখানেও প্রয়োজনীয় সেবা মেলে না, তখন যাদের সক্ষমতা রয়েছে, তারা বিদেশে চলে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তারা? তারা তাদের সমস্যাবলি শরীরে নিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে থাকে।</p>
<p>স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য হাসপাতাল রয়েছে মাত্র ৮,৪৯৪। যার সবগুলো মিলিয়ে শয্যাসংখ্যা মাত্র ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৩০১ টি। জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা যে অতি নগণ্য, তা পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।</p>
<p>চিকিৎসা ব্যবস্থার এহেন করুণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট মাত্র ৫.১৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। একটি দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের সকল জনগণের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার জন্য এই ক্ষুদ্র অংশ কোনোমতেই যথেষ্ট নয়।</p>
<p>★ <strong>অন্যান্য</strong></p>
<p>এ তো মাত্র কয়েকটি খাতের পর্যালোচনা। অন্য সবকটি খাতই পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় খাতগুলোতে যথাযথ বাজেট নেই। এমন সব খাতে বরাদ্দ বেশি দিয়ে রাখা হয়েছে, যেগুলো আদতে মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোনো পরিবর্তন আনছে না, দেশের সামগ্রিক উন্নতিতেও অবদান রাখছে না। পাশাপাশি কোনো খাতেই সঠিক ব্যয় হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ শ্রেণি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বরাদ্দকৃত এ প্রয়োজনের তুলনায় ক্ষুদ্রাংশও ঠিকঠাক পৌঁছাচ্ছে না জনগণের দোরগোড়ায়।</p>
<p><strong>বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ৩.৮%, পরিবহন ও যোগাযোগে ১০.৪০% বরাদ্দ রেখে বাজেট করা হলেও তা কি আদৌ বাস্তবায়ন করা হয়? এ খাত দুইটির সাথে প্রক্রিয়াধীন ও প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট জড়িত, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ছেই। কখনো কখনো তা একই ধরনের প্রকল্পে উন্নত রাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।</strong> প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কাঁচামালের যোগান সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। এক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা ও তা উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা মোটেও নেই। প্রযুক্তিও ব্যবহার হচ্ছে বিদেশীদের। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও কোনো দেশী কোম্পানির কাছে নেই। প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই বিদেশী। আর শ্রমিকদের মধ্যে দেশীয় যারা, তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাও নিতান্তই সামান্য। তাহলে কার পেছনে ব্যয় হচ্ছে এত অর্থ?</p>
<p>বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছোট-বড় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াট হলেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৭৮২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তার উপর এ অংশ থেকেই বিতরণ ক্ষতি হয়েছে ৮.৪৮%। যার ফলস্বরুপ এখনো ২১% বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে।</p>
<p>পরিবহন ও যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত নগরজীবনে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। যানজটের ফলে দীর্ঘ একটি সময় অপচয় হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সময়। নগরবাসীদের অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তো দিন দিন বাড়ছেই। কেবল ২০২১ সালেই সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮৫১৬ জন। একটা প্রতিবেদনে এ রকম দেখালেও মূলত বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।</p>
<p>বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে রেল ও নৌপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিলো। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নৌ-পথ অর্ধেকের বেশি কমেছে। রেলপথ গুরুত্ব পায়নি, বরং রেলযাত্রার উপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সড়কপথ বাড়লেও এসবের মান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।<br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<h3>📌 সুদভিত্তিক বাজেট</h3>
<p>সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো প্রতিবারের মতো এবারের বাজেটও একটি সুদভিত্তিক বাজেট। আমরা যেখানে দেখতে পেলাম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বাজেটের যথেষ্ট বরাদ্দ নেই, সেখানে সুদের মতো একটি সম্পূর্ণ অযাচিত খাতেই ব্যয় হচ্ছে বাজেটের ১৪.২৪%। অর্থাৎ, মোট বাজেটের ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুধু সুদ হিসেবেই দিতে হবে আগামী এক বছরে।</p>
<p>অথচ, এই সুদ কেবল ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, একইসাথে অর্থনৈতিক দিকে থেকে একটি ভয়াবহ বিষয়। ৯২% মুসলমানের দেশে ১৪.২৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই; অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতিরাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দরিদ্রতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার, সামাজিক নিরাপত্তা খাত এর মতো যে সকল খাতে দুর্নীতি বেশি, সে সকল খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিলো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্দকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি! আর মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কীভাবে পরিশোধ করবো? অথচ</p>
<p>আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সা.) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সব সময়ই সুদের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ, এই সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও এই অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সা.)। এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি</h3>
<p>অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদের ভয়াবহ আরেকটি কুফল হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। বর্তমানে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার চলছে ৯.৮%। এই অবস্থার মাঝেও প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ৬.৫%। অথচ আমরা দেখেছি গত অর্থবছরে ৬% লক্ষ্যমাত্রা ধরেও তার লাগাম টেনে ধরতে পারেনি সরকার। বরং আকাঙ্ক্ষিত অঙ্কের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে ৩.৮% বেড়ে গেছে এই সংখ্যাটা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 ঘাটতি নির্ভর বাজেট</h3>
<p>অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারের বাজেটও সম্পূর্ণ ঘাটতি বাজেট। মোট বাজেটের পরিমাণ ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাকী ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা পুরোটাই ঘাটতি থাকছে। যা মোট বাজেটের ৩২.১২ শতাংশ।</p>
<p>অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েই এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ঋণ নেয়ার ধারাবাহিকতা আজ নতুন নয়। প্রতিবছরই ঋণের বোঝা বাড়ছে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭৪ ডলারে। টাকার হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজারের বেশি টাকা। সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুটির উপরও এই ঋণের ভার বর্তাবে।</p>
<p>বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি নিরাপদ সীমার মাঝে পড়ে। অথচ ২৩-২৪ অর্থবছরেরই ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫.৫ শতাংশের বেশি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে চার দশমিক ছয় শতাংশ (ডেইলি স্টার)। এই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ঋণ ও প্রতিবছর যে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে, এ নিয়ে বাজেট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তো লক্ষ্যণীয় নয়ই, বরং নামেমাত্র যেনো বাজেট পেশ করতে হবে, এজন্যই বাজেট পেশ করা হচ্ছে।</p>
<p>কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, “আর্থিক বিবৃতি প্রদান একপ্রকার ধর্মীয় আচার হয়ে দাড়িয়েছে, যা পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে এবং তার সম্ভাব্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রভূত বাকচাতুরীর দ্বারা উচ্চকিত রূপে পাঠ করা হয় (যা কখনোই পাঁচ ঘণ্টার নিচে সম্পন্ন হওয়ার নয়) অর্থাৎ নানাবিধ নর্তন, কুর্দন, ভাব ও ভঙ্গিমার সঙ্গে চার ঘণ্টার একটি বক্তৃতা প্রদান করা হয়।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 কালো টাকা সাদা করার জঘন্য নীতি</h3>
<p>এদিকে এ বাজেট যেনো কালোবাজারি ও দুর্নীতিবাজদের জন্য নিদারুণ খুশির সংবাদ নিয়ে এসেছে। মাত্র ১৫% কর দিয়েই অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা হবে আইনানুগভাবে বৈধ। পঞ্চাশ লাখ টাকা ইনকাম করলে ৩০% টাকা কর দিতে হবে, কিন্তু কালো টাকা সাদা করতে ১৫% কর দিতে হবে। এখন যারা কালো টাকা সাদা করবে, তারা তো আর পঞ্চাশ লাখ টাকার মতো নামেমাত্র টাকা সাদা করবে না। তাদের টাকার অঙ্কই তো হবে কমপক্ষে কয়েকশ&#8217; কোটি টাকা, তাহলে সেখানে কীভাবে এতো কম করহারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়!?</p>
<p>এই ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থনীতি বিশ্লেষকগণও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, “মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার এই ব্যবস্থা সৎ ও বৈধ আয়ের ব্যক্তি করদাতাকে নিরুৎসাহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে”। ঘোষিত অর্থ ও সম্পদের ব্যাপারে কোনো কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন করার সুযোগ না রাখা দেশে দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে টিআইবি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 বেকারত্বের অভিশাপ</h3>
<p>আমরা ইতঃপূর্বেই দেখেছি দেশের বর্তমান বেকারত্বের হার যেভাবে বাড়ছে, তা সত্যিই একটি জাতির জন্য উদ্বেগজনক। কেননা, বেকারত্ব একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভঙ্গুর করে দেয়, দেশজ উৎপাদন কমে যায় এবং অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত করে। শুধু তাই নয়, বেকারত্বকে একটি জাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, যারা হতে পারতো দেশের উন্নয়নের সোপান, একটি দেশকে সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী কারিগর, সেই বিপুল মানবসম্পদ নিদারুণভাবে অপচয় হচ্ছে। আবার, বেকার যুবসমাজ সহজেই নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। যার ফলে জাতির মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় ঘটে চরম অধঃপতন। আর এই অবক্ষয় সামগ্রিকভাবে বিনষ্ট করে সামাজিক নিরাপত্তা।</p>
<p>এহেন পরিস্থিতিতেও, ৪ লক্ষ কর্মক্ষম যুবক বেকার থাকা সত্ত্বেও, এমনকি তাদের বিশাল একটি সংখ্যা শিক্ষার বিবেচনা সর্বোচ্চ স্তর তথা অনার্স-মাস্টার্স পাড়ি দেয়ার পরেও, তাদের বেকারত্ব নিরসনে বাজেটে নেই কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা বা নির্দেশনা। ভাসা-ভাসা সুরে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ যেসব বিষয়ে বলা হচ্ছে, সেগুলোকেও যথেষ্ট মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। তবে তাহলে কোথায় সেই উদ্বেগ কাটানোর প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ? কেনই বা এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না নীতি-নির্ধারকগণ? কী সেই অজানা কারণ যা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে আমাদের মনে? প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে বের করা আমাদের সবারই একান্ত দায়িত্ব।</p>
<p>কেননা, এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা; সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো; চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সা:) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।<br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hhhhhhhhhhhhhhhhh.jpg" height="123" /></a>সবশেষে এটাই বলতে চাই,<br />
লক্ষ্য করুন– এতো এতো জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বাজেট, যার উপর গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়, সেটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই, যৌক্তিক প্রস্তাবনাও নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা! অনলাইনে যতটুকুই দেখা যায় বা কাজ আছে, তার সবই তথ্যনির্ভর পত্রিকালাপ! কেননা ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা ও সমালোচনা অসম্ভব; যদি না নিম্নোক্ত বিষয়ে পারদর্শী হয়-</p>
<ul>
<li> Philosophy of Politics.</li>
<li>International Economics.</li>
<li>Political Economy.</li>
<li>Philosophy of Economics.</li>
<li>General Economy.</li>
<li> Economic System of Islam.</li>
<li>মাকাসিদ আশ-শারিয়িয়্যাহ।</li>
</ul>
<p>এসব বিষয়ে কোনো পারদর্শীতা কিংবা জ্ঞান আমার নেই। তবুও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এতটুকু বুঝি যে, এব্যাপারে সঠিক পর্যালোচনা এবং জাতীয় প্রস্তাবনা আমাদের দিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সব ধরনের সিভিল সোসাইটির এব্যাপারে এগিয়ে আসার কোনই বিকল্প নেই।</p>
<p>সম্মিলিত উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতেই; ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে এবং কথিত উন্নয়নের স্লোগান বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রশিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎসশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে এগিয়ে যেতে হবে।</p>
<ul>
<li>কেননা আমাদের রয়েছে–• ১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ</li>
<li>তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত</li>
<li>ইন্ডাস্ট্রি-কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা</li>
<li>দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)</li>
<li>গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর</li>
<li>বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ</li>
<li>বনাঞ্চল</li>
<li>মৎসশিল্প ইত্যাদি</li>
</ul>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট-সহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জনবিরোধী এই দুর্ভাগ্যের উপাখ্যান ঘোষণার এই ক্ষণে এখন প্রয়োজন, দেশ ও জাতির স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন মুক্তিকামী যুবজনতার পক্ষ থেকে এক নয়া ন্যায়ভিত্তিক ইশতেহার ঘোষণা করার। সে প্রত্যাশায়…</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14504</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্বব্যবস্থার মৌলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principles-of-world-order/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principles-of-world-order/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 24 May 2024 11:57:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14315</guid>

					<description><![CDATA[আল্লাহ যেহেতু এক এবং একক, সে কারণে তার সকল আদেশই সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এই বিশ্বজনীনতা কর্তা হিসেবে অর্থাৎ আদেশ পালনকর্তা হিসেবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আবার কর্ম হিসেবেও মানুষের বেলায় প্রযোজ্য যাদের মধ্যে আল্লাহর আদেশগুলো পূরণ হয়। এর পূর্বে মানুষ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল্লাহ যেহেতু এক এবং একক, সে কারণে তার সকল আদেশই সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এই বিশ্বজনীনতা কর্তা হিসেবে অর্থাৎ আদেশ পালনকর্তা হিসেবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আবার কর্ম হিসেবেও মানুষের বেলায় প্রযোজ্য যাদের মধ্যে আল্লাহর আদেশগুলো পূরণ হয়। এর পূর্বে মানুষ একত্র হয়েছে রেস্ (নরগোষ্ঠী) অথবা সংস্কৃতির ভিত্তিতে কিংবা উভয়ের ভিত্তিতে। ইসলাম মানবিক মিলনের এক অভিনব ভিত্তি স্থাপন করেছে, উম্মাহ হচ্ছে সেই ভিত্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি দৃষ্টি, ইচ্ছা এবং কর্মের ত্রয়ী ঐকমত্য হচ্ছে উম্মাহ, যাতে কেবল মুসলমানরাই একমত হবে বলে আশা করা হয়। তাওহীদ যে বিশ্বজনীনতা বুঝায় তা একটি নতুন বিন্যাস দাবী করে। যেহেতু মুসলিম উম্মাহ একটি নতুন সমাজ, যার ভিত্তি গোত্র বা রেস নয় বরং ধর্ম, তাই আশা করা হয় অমুসলমানরাও এই নীতিই অনুসরণ করবে, অর্থাৎ তারা গোত্র এবং রেসের বন্ধন অতিক্রম করে ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদেরকে সংগঠিত করবে। আধুনিক পাশ্চাত্য প্রচার মাধ্যম ধর্মকে মনে করে পশ্চাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানব সংহতির অচল বিভেদমূলক ও সংকীর্ণ নীতি। কিন্তু ধর্ম মোটেই তা নয়। এখনো পৃথিবীতে মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ধর্ম। ধর্মেই আমরা পাই মানুষের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংজ্ঞা। খ্রীষ্টিয়ান চার্চের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য জাতিগুলোর দীর্ঘ এবং তিক্ত সংগ্রাম ধর্মের এই অপখ্যাতির জন্য দায়ী&#8217; [১] যেহেতু চার্চের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করেছে রাজার প্রতি আনুগত্য, নৃতত্ত্বকেন্দ্রীকতা এবং জাতীয়তাবাদের শক্তিসমূহ। [২]</p>
<p>তাই মিলনের ভিত্তি হিসেবে এবং ধর্মের উদ্দিষ্ট বিশ্বজনীন সমাজের বুনিয়াদ হিসেবে ধর্ম পরিত্যক্ত হয়েছে এবং চার্চের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের জন্য নিন্দিত হয়েছে। তাই পাশ্চাত্য মন এনলাইটেনমেন্টের আদর্শে মুখ ফিরিয়েছে। বিশ্বজনীন সম্প্রদায়ের আদর্শের দিকে যেখানে চার্চের একই আদর্শ অনুসৃত হল কেবল যুক্তির ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়। পরে আবার সে আদর্শ পরিত্যক্ত হয়, কারণ বৈপ্লবিক ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদী -সাম্রাজ্যবাদীদের মোকাবেলায় পশ্চিমা জগৎ তা সমর্থন করতে গিয়ে স্নায়ুর শক্তি হারিয়ে ফেলে।</p>
<p>ইসলাম পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছে বাস্তবতা সম্পর্কে তার নিজের ধারণা, তার নিজের আদর্শ, তার স্বজন ও বংশধরদের ও মানব জাতির চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে, আর এ সমুদয় নিয়েই গঠিত ইসলাম। ইসলাম অমুসলমানদের কাছ থেকে এ ধরনের একটি সত্যকে প্রত্যাহার করবেনা যা দ্বীনের উপর ভিত্তি করে নিজেদের সংগঠিত করে পালন করে থাকে। পক্ষান্তরে, ইসলাম এ তাগিদ দেয় যে তারা একইরূপ সম্মান ও মর্যাদা ভোগ করবে অন্য কোন ভিত্তির উপর নিজেদের পরিচয় দিতে বা সমাজ গঠনে অস্বীকৃতি জানিয়ে; বস্তুত এটা ইসলামের জন্য আরো সম্মাজনক যে, যারা ইসলাম অনুসরণ করবেনা তাদের পার্থিব জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে প্রতিযোগী হিসেবে দেখে এবং তাদের কেবল এই সব প্রশ্নের জবাবকে কেন্দ্র করে গঠিত সমাজ বলেই গণ্য করে। [৩]</p>
<p>হিযরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদেরকে দ্বীনের ভিত্তিতে একটি সংগঠনরূপে সংগঠিত করেন। তিনি &#8216;আওস&#8217; এবং &#8216;খাযরাজ&#8217; গোত্র দুটিকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ করেন, কোরাইশের সেই সব গোত্রীয় লোকদের সাথে, যাদেরকে তিনি মদীনায় পাঠাতে শুরু করেছিলেন। তদুপরি তিনি আযাদ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন দাসদের সঙ্গে, প্রভুকে তার প্রজার সঙ্গে, তাদের সকলের জন্য সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে আল্লাহর আইনকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় কায়েম করেছিলেন। সমভাবেই তিনি তাদের উপর নিজেকে স্থাপন করেছিলেন রাজনৈতিক ও বিচার বিষয়ক প্রধান হিসেবে। কিন্তু <strong>৬২২ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে মদীনায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি মুসলমান ও ইহুদীদের জন্য একটি সনদ ঘোষণা করেন, যে চুক্তিতে মুসলমান ও ইহুদীরা আবদ্ধ হবে এবং তদনুসারে তাদের জীবনকে গঠন করবে। এই সনদটি ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান এবং বিশ্বব্যবস্থার গঠনতন্ত্র, মানবজাতির জন্য যে ব্যবস্থার নির্মাণ হচ্ছে ইসলামের লক্ষ্য। এই সংবিধান বলবৎ করার মানেই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবর্তন এবং তৎসহ বিশ্ব ইতিহাসে একটি প্রতিযোগী আন্দোলন হিসেবে ইসলামের ঘোষণা। এই শেষোক্ত বিবেচনায় উদ্দীপিত হয়ে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ঘোষণা করেন যে, এই দিবসটি হচ্ছে ইসলামী ইতিহাসের সূচনা, ইসলামের সময়কে হিসেব করার শুরু।</strong> মূলত [৪] সংবিধানটি ছিলো একটি সনদ যার বলে সৃষ্টি হল ইসলামী রাষ্ট্র, এই সনদ বা চুক্তি হল রাসূলুল্লাহ (সা.), মুসলিমগণ এবং মদীনার ইহুদী ও বিভিন্ন গোত্রের লোকদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি। এই সনদের গ্যারান্টার হচ্ছেন আল্লাহ নিজে যার নামে তা প্রবর্তিত হল, এই সনদ প্রথমে গোত্রীয় আনুগত্যের পরিচয়ে দল গঠনের পদ্ধতিকে উচ্ছেদ করে এবং কর্তব্য, অধিকার ও দায়িত্বকে গোত্রের প্রতি আনুগত্য হিসেবে প্রকাশ করার নিয়ম রহিত করে। গোত্রবাদের স্থানে এই সনদ দ্বীনকে প্রথম নীতি হিসেবে স্থাপন করে এবং তার অধীনে বিভিন্ন গোত্র সামাজিক মর্যাদার এবং নানা জাতের লোকদের সংঘবদ্ধ করে। তখন থেকে সকল মুসলমান হল একটি মুক্ত, পরস্পর সম্পর্কযুক্ত উম্মাহর সদস্য, যার সামাজিক ঐক্যবন্ধন হচ্ছে ইসলাম। [৫] মুসলমানদের উম্মাহর পাশাপাশি ছিল আর একটি উম্মাহ-ইহুদী উম্মাহ। মুসলমানদের মত তারাও নিজেদেরকে গঠন করবে একটিমাত্র পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত সত্তায় তাদের গোত্রীয় আনুগত্য উপেক্ষা করে। তাদের উম্মাহ শাসিত হবে ইহুদী (তাওরাত) আইন দ্বারা এবং এর সদস্যদের জীবন পরিচালিত হবে রাব্বিগণ কর্তৃক ব্যাখ্যাত ইহুদী ধর্মের বিধিবিধান দ্বারা। ইসলামে রাষ্ট্রের কর্তব্য হচ্ছে ইহুদী উম্মাহর সুরক্ষা, রাব্বিনিক আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা, এবং এর কল্যাণ ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, শান্তি ও পরিবেশের ব্যবস্থা করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ছয় বছর পরে দক্ষিণ আরবের নাজরানের খ্রীষ্টানরা মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে সাক্ষাত করে ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করার জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে অভিনন্দিত করে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান, তাদের মধ্যে যারা ইসলাম কবুল করলো, তারা মুসলিম উম্মাহর ভেতর সামিল হয়ে গেল, কিন্তু যারা খ্রীষ্ট ধর্ম ত্যাগ করলনা রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ইহুদীদের মত আর একটি উম্মায় সংগঠিত করলেন, তাদের জন্য একই অগ্রাধিকার এবং কর্তব্যের নিশ্চয়তাসহ। পরবর্তীকালে খলিফারা একের পর এক একই মর্যাদা দিয়েছেন জরথুস্ত্রীয়, হিন্দু এবং বৌদ্ধগণকে। ইসলামী রাষ্ট্র সম্প্রসারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে নওমুসলিমরা মুসলিম উম্মাহর পরিসর স্ফীত করে তোলে, এবং যারা ইসলাম কবুল করলোনা তারা ইহুদী, খ্রীষ্টান ও অন্যান্য উম্মাহর সদস্য রয়ে যায়। প্রথমোক্তগণ ইসলামী রাষ্ট্রের পদাংক অনুসরণ করে, ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে নওমুসলিম লোকদের অন্তর্ভুক্ত ও অঙ্গীভূত করে নেয় এবং নতুন ব্যবস্থার নাগরিক হিসেবে তাদেরকে পুনর্বাসিত করে। প্রথম দিকের কয়েক যুগ পর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাথমিক আঞ্চলিক সম্প্রসারণের পর ইসলামী রাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণে সংখ্যাগুরু ছিলো অমুসলিমরা। রাষ্ট্রের সেবাযত্নের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের বিষয়বস্তু ছিলো এইসব অমুসলিমের ভবিষ্যত এবং নিশ্চয়তা, তাদের কল্যাণ এবং প্রতিষ্ঠাসমূহ।</p>
<p>আজকের দিনে জাতি অর্থে যাকে &#8216;স্টেট&#8217; বলা হয়, সেই অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র একটি রাষ্ট্র নয়। ইসলামী রাষ্ট্র একটি সমজাতিক সমগ্র নয়, একটি জাতীয়তামূলে সংহত একক নয়। সম্প্রদায় শব্দটির সংজ্ঞাবদ্ধ সদস্যদের একটি সম্প্রদায় নয়, যার একমাত্র যৌক্তিকতা হচ্ছে সকল বিষয়ের মানদণ্ড হিসেবে এর প্রতিরক্ষা ও খিদমত। ইসলামে রাষ্ট্র ছিল একটি সুদৃঢ় কেন্দ্র, যার প্রতিরক্ষার পেছনে ছিলো একটি প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি এবং একটি মুসলিম উম্মাহর সমর্থন ও স্বায়ত্তশাসিত ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহের একটি ফেডারেশনের সহযোগিতা, যে সম্প্রদায়গুলোর প্রত্যেকটিরই ছিলো নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তাদের সকলের উপর ছিলো ইসলামী রাষ্ট্র, তবে তার ক্ষমতা ছিলো কেবল নির্বাহী ক্ষমতা। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিলোনা। রাষ্ট্র নিজেকে যে আইনের অধীন মনে করতো তা হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত, তার অভিপ্রায়কে কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, পৃথিবীতে রাষ্ট্রের মিশন হচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র তার সম্প্রসারণ এবং তাতে করে সকল মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বের ভিত্তিতে একত্রীকরণ, কেননা আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন গোত্র, জাতিতে বিভক্ত করেছেন, পরিচয়ের সুবিধা এবং সহযোগিতার জন্য। [৬] ইসলামী রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব হচ্ছে আইনের, রাষ্ট্র তার সকল প্রতিষ্ঠানসহ এই আইনের নির্বাহী শক্তিমাত্র। এই ঐশী আইন রাষ্ট্রের মিশন হিসেবে বিধান দিয়েছে এই পৃথিবীকে এবং মানবজাতিকে আল্লাহ তাঁর প্রত্যাদেশ মারফত যে নমুনা দিয়েছেন সেই নমুনার আদলে রূপান্তরিত করতে।</p>
<p>ইসলামী রাষ্ট্র খ্রীষ্টান, ইহুদী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রের গঠনকারী উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতেই কেবল বাধ্য নয় বরং সমগ্র মানবজাতিকেই ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্গত করা তার দায়িত্ব। তাই অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানে এমন একটা জীবন ব্যবস্থার সুযোগ থাকবে যেখানে সকল সম্প্রদায় শান্তিতে বসবাস করবে পুরো ন্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে এবং একে অপরের সঙ্গে নানা কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সাথে। ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানে এ সকলেরই ব্যবস্থা করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ক. ইসলামে শান্তি</strong></h4>
<p>ইসলাম যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা পেশ করেছে তা হচ্ছে শান্তির ব্যবস্থা, পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্য যুদ্ধ এবং শত্রুতার চির অবসান ঘটাতে হবে। এই শান্তি সকলের জন্য, এবং ব্যক্তি ও গ্রুপ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য এই শান্তির দ্বার অবারিত। আল্লাহ মুসলমানদেরকে আদেশ করেছেন, &#8220;হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা শান্তিতে প্রবেশ কর সম্পূর্ণভাবে এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করোনা।&#8221; [৭] তিনি তাদেরকে আদেশ করেছেন সকল মানুষকে শান্তির দিকে আহ্বান করতে। &#8220;যদি তারা (বিরোধীগণ) শান্তির প্রতি আগ্রহশীল হয়, তোমরাও শান্তি অনুসরণ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন কর। [৮]&#8221; শান্তির ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে সকল মানুষকে এবং প্রত্যশা করা হয় যে, সকলেই তা গ্রহণ করবে এবং সর্বান্তকরণে সকলে শান্তিতে প্রবেশ করবে, শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যাবেনা। যদি কেউ প্রত্যাখ্যান করে তবে বুঝতে হবে সে দল শান্তি চায়না এবং তা যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল। নিদেনপক্ষে অবস্থা এই হতে পারে যে, শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান দ্বারা বুঝাতে পারে, যে দল শান্তির প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক স্থাপনে অনিচ্ছুক। কিন্তু এ তো &#8216;আইসোলেশনিজম&#8217; বা অন্যদের থেকে দূরে সরে থাকা; এই বিকল্প কিন্তু যুদ্ধের মতই নিন্দনীয় যদিও তা হিংসাত্মক নয়। কারণ এতে শান্তির দাবির প্রতি তাচ্ছিল্য বুঝায়। যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অথবা এর দ্বারা বুঝায় ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আদান প্রদানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জনগণকে নিরাপদ রাখার বাসনা। <strong>ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দুই বিকল্পের জন্যই শান্তি হচ্ছে জবরদস্তিমূলক জবাব; প্রথমত, যে কোন জনের পক্ষ থেকে শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা অমানবিক কাজ এবং দ্বিতীয়ত, যে লোকগুলোকে এ ধরনের আদান প্রদানের জন্য আহ্বান করা হয়েছে তাদের মর্যাদার জন্য তা অপমানজনক।</strong> বস্তুত নর-নারী নির্বিশেষে কেউ যাতে অন্যদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কোন মানুষকে একটা নিরেট পর্দার অন্তরালে আড়াল করা তার সততার বিশ্বাসযোগ্যতার উপর আক্রমণ এবং সে কারণে এরূপ কর্ম সেই লোকের বিরুদ্ধে একটি আগ্রাসী কার্য। ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে প্রকল্পিত আদান প্রদান হতে পারে ব্যবসায়িক এবং সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে, যা অন্য রাষ্ট্র আপত্তিকর মনে করতে পারে, কিন্তু তাতে সম্ভাব্য ভবিষ্যত সম্পর্কগুলোর সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায় না। সকল আর্থক এবং সামাজিক আদান প্রদানের পরও রয়েছে ইসলামের এই আদর্শগত দাবি যে, বিশ্বশন্তির একটি নতুন ব্যবস্থা হচ্ছে মানব জাতির অধিকার, যোগাযোগের এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষ আদান প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীন। অন্যের কথা শুনতে ও অন্যকে তার কথা শোনাতে, অন্যকে সত্যের ব্যাপারে বিশ্বাসী করতে এবং অন্যের দ্বারা নিজে বিশ্বাসী হবার বেলায় সে বাধাহীন, তার সামনে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবেনা। ইসলামী রাষ্ট্র তার সনদ দ্বারা বাধ্য আল্লাহর কালাম ঘোষণা করতে, এর দাবি এই যে, তার কথা শুনতে হবে। বাণীটি গৃহীত হলো কি, না হলো, তা একটি স্বতন্ত্র ব্যাপার, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পছন্দের ব্যাপারে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন, কিন্তু অন্যের কথা না শোনার ব্যাপারে মানুষ স্বাধীন নয়। এধরনের প্রত্যাখ্যান যখন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসে, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় তাদের নেতাগণ কর্তৃক জনগণের অবমাননা এবং ইসলামের বিচার সম্মত দাবীর প্রতি একটি অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়া।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>খ. জাতি সম্পর্কিত ইসলামী বিধান</strong></h4>
<p>যদি ইসলামী রাষ্ট্রের সনদের শান্তির প্রস্তাবের উত্তরে কোন একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র ইসলামের শান্তিতে বা নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে সদস্যপদের জন্য নির্ধারিত সকল অধিকার এবং প্রাধিকার লাভের অধিকারী হয়ে উঠে। এভাবে যে সদস্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রবেশ করল তার রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ অক্ষুন্ন থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, এ এগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের সুরক্ষার দাবিদার। এখন থেকে হিংসা বা বিপ্লবের মাধ্যমে কিংবা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সম্মতি ছাড়া এগুলো পরিবর্তন করা যাবেনা। এই সব প্রতিষ্ঠানের রায় ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধতা, সর্বোপরি আইন আদালতের রায় ও সিদ্ধান্ত লঙ্ঘনের পরিণামে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষমতা সঙ্গে সঙ্গে বলবৎ হবে। সেই জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারসমূহ তাদের নিজেদের আইন দ্বারা শাসিত হবে। জনগণ তাদের নিজেদের ধর্মের নীতিমালার আলোকে তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কিংবা যথাবিধি গঠিত ও নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যাখ্যার আলোকে তাদের নিজেদের জীবন অবাধে যাপন করবে। সকল মানুষকে আল্লাহর দিকে, তার দ্বীন ইসলামের দিকে আহ্বান করা মুসলমানের কর্তব্য বলে, এইসব নতুন নাগরিকের সঙ্গে মুসলমানরা সম্পর্ক স্থাপনে চেষ্টা করবে তাদের সঙ্গে ইসলামের বিষয়ে আলাপ আলোচনার আহ্বান জানাবে। অবশ্য নতুন নাগরিকদের প্রতি এবং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আল্লাহ মুসলমানদের আদেশ করেছেন দয়া ও সহানুভূতির সঙ্গে অমুসলমানদের কাছে ইসলামকে পেশ করতেঃ <strong>“মানুষকে তোমার প্রভুর দিকে আহ্বান কর হিকমত ও সৎ উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সৎভাবে।</strong>[৯] যদি তারা ইসলামের এই দাওয়াত গ্রহণ করে, তারা হবে মুসলমানদের ভ্রাতা ও ভগ্নী। আর যদি গ্রহণ না করে, তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে হবে এবং কোন অবস্থাই তাদের উপর পীড়ন করা যাবেনা। সর্বোপরি তাদেরকে ইসলামে দীক্ষিত করার প্রয়াসে জবরদস্তি, প্রতারণা, প্রলোভন বা ঘুষের আশ্রয় নেয়া চলবেনা। <strong>আল্লাহর আদেশ সম্পূর্ণই স্পষ্টঃ &#8220;দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই।&#8221; (কুরআন ২:২৫৬)</strong>। কোনো ব্যক্তিকে দ্বীনে দীক্ষিত করার জন্য জবরদস্তি, বা উৎকোচের আশ্রয় নিলে আল্লাহর গযব নেমে আসবে। অধিকন্তু ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে এর কোন বাধ্যবাধকতাই নেই। যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকদের সংঘর্ষ বাধে পুরনো নাগরিকদের সঙ্গে, সেখানে বাদী এবং বিবাদী প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ উম্মাহর আশ্রয় নিতে পারে। আদালত শুনানীর পর এই নীতিকে সম্মান করতে এবং তদনুসারে বিচার করতে বাধ্য হবে। যেখানে বিবাদের কারণটি সুস্পষ্ট নয় সেখানে উভয় পক্ষের সর্বোত্তম স্বার্থের খাতিরে এবং তাদের নিজ নিজ উম্মাহর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে একই আদালত বা উচ্চতর আদালতে এর মীমাংসা করতে হবে। আইনের প্রক্রিয়ার সুযোগ গ্রহণের জন্য শরীয়াহ প্রত্যেকের অধিকারই স্বীকার করে। ব্যক্তি হোক কিংবা গ্রুপ হোক, নতুন নাগরিকেরা আইনের সাহায্য নিতে পারে। অভিযোগটি অন্য কোনো মুসলিম ব্যক্তি, গ্রুপ, এমনকি খোদ ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হলেও তাতে কিছু আসে যায়না। অমুসলিম উম্মাহর যে কোন সদস্য খলিফা, ইসলামী রাষ্ট্র, মুসলিম উম্মাহ বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। ইসলামী আদালত স্বভাবতই এই অভিযোগ গ্রহণ করতে এবং আইন অনুসারে তা বিচার করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে কোনো ইসলামী আদালতে অভিযোগ পেশ করার জন্য বাদীর ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া মোটেই আবশ্যক নয়। পৃথিবীর সকল মানুষ, মুসলিম এবং অনাগরিকসহ সকলে ইসলামী বিচারালয়ে অভিযোগ পেশ করতে পারে। ইসলামী আন্তর্জাতিক আইনের এটি একটি মহৎ শ্রেষ্ঠত্ব যে, এ আইন কেবল সার্বভৌম জাতিসমূহের অধিকারই স্বীকার করেনা, একইভাবে ব্যক্তিবর্গের অধিকারও স্বীকার করে। এর ব্যাখ্যা এই যে, ইসলামী আইন তার লক্ষ্য হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তির স্বার্থে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছে, অথচ পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক আইন বিভিন্ন সার্বভৌম গ্রুপের মধ্যে সংগতি বিধানের চেষ্টা করে। গ্রুপের স্বার্থ যে ব্যক্তির স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে, সেকথা বিবেচনা না করেই- একথা প্রায়শই ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রবলের স্বার্থে। অসঙ্গত মনে হতে পারে যে, ইসলামী আইন অন্য রাষ্ট্রের কোনো নিঃস্ব নাগরিককে বা রাষ্ট্রপরিচয়হীন একজন নাগরিককেও গোটা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযুক্ত করার অধিকার দেয় এবং তার খলিফাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। কিন্তু <strong>ইসলামে আদালত কর্তৃক নির্দোষ ঘোষিত ব্যক্তির জন্য ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে- আদালতের ব্যয় সব সময় বহন করে অপরাধী। প্রবলপরাক্রান্ত খলিফার সম্মান এবং আরাম আয়েশের চাইতে এই নিঃস্বের সুবিচার আইনের দৃষ্টিতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যেমন খলিফার দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলেছিলেন: &#8220;আমি যতক্ষণ না প্রবলের কাছ থেকে দুর্বলের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পেরেছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার দৃষ্টিতে শক্তিশালী পক্ষ হবে তুচ্ছ। দুর্বল আমার দৃষ্টিতে হবে শক্তিশালী যতক্ষণ না আমি তাদেরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পেরেছি”। </strong>[১০]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সমভাবে ইসলামী আন্তর্জাতিক আইন আন্তর্জাতিক যুদ্ধে বন্দীদের পুনর্বাসনের জন্য প্রভূত যত্ন নিয়েছে। সাধারণত দেখা যায়, যুদ্ধোত্তর মীমাংসায় আলোচনার ক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দীরা বিভিন্ন গ্রুপের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাদের জীবন এবং ভাগ্য নির্ধারিত হয় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর গৃহীত স্বেচ্ছাচারী কনভেনশনের আওতায়। ইসলামিক আইনে এটা স্বীকৃত যে যুদ্ধবন্দীদের নিজেকে মুক্ত করার অধিকার আছে।</p>
<p>সে নিজে এবং নিজের উদ্যোগেই মুক্তি অর্জন করতে পারে- তার নিজের আত্মীয়- স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব মুক্তিপণস্বরূপ যা দিতে পারে তার সাহায্যে অথবা বিষয় সম্পদ বা খেদমতের বিনিময়ে সে ব্যক্তিগতভাবে যা উৎপাদন করতে পারে তার বিনিময়ে। ইসলামী রাষ্ট্র যুদ্ধবন্দীর নিজের প্রদত্ত অথবা তার পক্ষে প্রদত্ত উপযুক্ত মুক্তিপণ প্রত্যাখ্যান করতে পারেনা; ইসলামী আদালত এ ব্যাপারে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারে। <strong>ইসলামে বিধান রয়েছে সকল মুসলমান ব্যক্তি এবং গ্রুপ নির্বিশেষে তাদের যাকাতের এক সপ্তমাংশ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তপণ স্বরূপ ব্যয় করবে, যুদ্ধবন্দীরা মুসলমান হউক বা না হউক। ইসলাম একদিকে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিদান মহাপুণ্যের কর্ম বলে ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিদানকে মহাপাপের কাফফারা বলে ইসলাম ধর্মীয় নির্দেশ ঘোষণা করেছে।</strong> যখন কোনো মহিলা যুদ্ধবন্দী গর্ভবতী হয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে তার বন্দীত্বের অবসান হয় এবং আমৃত্যু সে তার বন্দীকর্তার স্বাধীন স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা ভোগ করে। ব্যক্তির জন্য এই সুবিচারের আগ্রহের ইসলামী আন্তর্জাতিক আইন ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সম্ভাবনার পথ খুলে দেয়। ইসলামী রাষ্ট্রে ক্রয় বিক্রয়ের অধিকার তার এলাকার ভেতর দিয়ে লোক চলাচল, পণ্য ও তহবিল চলাচলের অধিকার? ইসলামী রাষ্ট্র এবং আগ্রহী পরদেশী ব্যক্তির মধ্যে বিশেষ চুক্তির বিষয় হতে পারে, যাকে বলা হয় আল-ইস্তিমান। এসবের মধ্যেই ইসলামী আন্তর্জাতিক আইনের প্রধান বিবেচনার বিষয়ের ইঙ্গিত মেলে। যেমন, ন্যায়বিচার ও সুবিচার তৎসহ মুসলিম নাগরিক অথবা অনাগরিক নির্বিশেষে প্রত্যেকের নিজের কল্যাণ, নিজের শুভ ও সমৃদ্ধি অনুসন্ধানের স্বাধীনতা- সংক্ষেপে গ্রুপ বা দলের স্বার্থের আগে ব্যক্তি মানুষের স্বার্থের স্থান। কিন্তু পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক আইনে গ্রুপ বা সমষ্টির স্বার্থকেই সম্মান করা হয়। [১১]</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গ. যুদ্ধ বিগ্রহ</strong></h4>
<p>ব্যক্তি এবং গ্রুপের জন্য ইসলামী শান্তিতে প্রবেশের ফলে যে সব সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা হয় সে সমুদয়ের বিপরীতে, নতুন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য ছাড়া কেবল বাধ্যবাধকতাই রয়েছে। সেই বাধ্যবাধকতাটি হচ্ছে, বৎসরে একবার করে সকল অমুসলিমের উপর ধার্যকৃত একটি কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, এ করকে বলা হয় জিজিয়া। এই কর সকল অমুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক, যাকাতের চেয়ে অনেক কম। <strong>জিজিয়া সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের উপর ধার্য করা হয় এবং কেবলমাত্র এই শর্তে যে, এই লোকগুলো এই কর পরিশোধের জন্য আর্থিক দিক দিয়ে সমর্থ। যাজকমন্ডলী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকজন, রমনীগণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ, এই করের আওতায় পড়েনা। তারা মুসলমান হলে তা পরিশোধ করতে তারা বাধ্য থাকতো।</strong> ইসলামী আদালতসমূহ এই আইন ঘোষণা করছে যে, খ্রীষ্টান এবং ইহুদীদের কাছ থেকে একই বৎসরে সংগৃহীত অর্থ ইসলামী রাষ্ট্র অবশ্যই ফেরত দেবে, যদি রাষ্ট্র তাদের সীমান্ত গ্রামগুলোকে বাইজানটাইন শক্তি বা কোন অজ্ঞাত শত্রুর আক্রমণের হয়রানি থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। [১২]</p>
<p>অধিকন্তু, একটি ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে কাজ করার জন্য অমুসলিমদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ করা যাবেনা। রাষ্ট্র যেহেতু আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত, তাই অমুসলমানরা সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবে এবং প্রয়োজনবোধে তার জন্য প্রাণ দেবে, ন্যায়ের দিক থেকে তা প্রত্যাশা করা যায়না। নিশ্চয়ই সে স্বেচ্ছাসেবী হতে পারে এবং যদি সে স্বেচ্ছাসেবী হয়, তাকে মুসলিম বলে গণ্য করা হয় এবং সে মুসলমানদের উপর ধার্যকৃত যাকাত এবং তার সঙ্গে জিজিয়া- এই উভয় কর থেকেই অব্যাহতি পায়। এমন লোককে ইসলামী রাষ্ট্রে নিয়োগ দিতে পারে এবং সে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদে উন্নীত হতে পারে এবং অনেক ইহুদী এবং খ্রীষ্টান প্রধানমন্ত্রী এমনকি</p>
<p>উজিরে আজম পদে নিযুক্ত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্বিতীয় আব্দুর রহমানের দরবারে হাসদাই বিন সারপুত এবং উমাইয়াদের আমলে সারজিউদের নিয়োগ উল্লেখ করা যায়। [১৩]</p>
<p>যুদ্ধ ঘোষণা ও পরিচালনার জন্য ইসলামী আইন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার নির্বাহী কর্তৃপক্ষের হস্তে ন্যস্ত হয়, এ অধিকার হচ্ছে আদালতের, যা সাক্ষ্য তলব করবে যখন ইসলামী রাষ্ট্র বা তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বা অবিচার সংগঠিত হয়। <strong>নির্বিচারে হত্যা বা সম্পত্তি বিনাশ, যাজক, স্ত্রীলোক ও শিশুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে; অর্থাৎ আদালত এবং আল্লাহ কর্তৃক দণ্ডনীয় বলে ঘোষিত হয়েছে যদি না যাজক, রমনী ও শিশুগণ যুদ্ধক্ষেত্রে সশরীরে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। সবচেয়ে বড় কথা, ইসলাম আগ্রাসনকে নিষিদ্ধ করেছে এবং সে কারণে আত্মসম্প্রসারণ, যুদ্ধলব্ধ মাল অথবা ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।</strong> একই দৃষ্টান্ত দ্বারা ইসলামে মুসলমানদের নিজেদের জান বিনা দ্বিধায় কোরবান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যখন ন্যায়বিচার লংঘিত হয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কোরবানী কর্তব্য হয়ে ওঠে। ইসলাম এই শিক্ষা দেয় যে, একটি ন্যায় যুদ্ধে কোনো মুসলমান মারা গেলে সে স্বতঃই একজন শহীদ বলে গণ্য হয়, যার জন্য বেহেশতে স্থান নির্ধারিত। শাহাদাত হচ্ছে সর্বোচ্চ এবং মহত্তম মুকুট, যার দ্বারা কোন মানুষের জীবনকে ভূষিত করা যায়। &#8220;আল্লাহর উদ্দেশ্যে যারা জান দেয়, তাদেরকে মৃত বলোনা, তারা জীবিত যদিও তোমরা দেখনা&#8230;।&#8221; [১৪]</p>
<p>&#8220;যারা ঈমান এনেছে এবং মহানবীর সঙ্গে জেহাদ করেছে তাদের জান ও মাল দিয়ে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার এবং তারা মহাভাগ্যবান। আল্লাহ তাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন জান্নাত যার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদী, ওখানেই তাদের চিরস্থায়ী আবাস।&#8221; [১৫]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ অধ্যাপক শাহেদ আলী</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকাঃ </strong></p>
<p>১. এর প্রধান কারণ হচ্ছে, রোমান ক্যাথলিক চার্চের দূর্নীতি, যাদের যাজক নেতৃত্ব তাদের ইউরোপীয় প্রজাদের শাসন করতো। তাদের কাছ থেকে জবরদস্তি ধন-সম্পদ আদায় করতো এবং তা ব্যয় করতো তাদের নিজেদের স্বার্থে ও রোমের নান্দনিক পুনর্গঠনের জন্য।</p>
<p>২. Reinhold Niebuhr. An Interpretation of Christian Ethics (New York Harper. 1935) c,ov. 91. 235-244</p>
<p>৩. এ হচ্ছে জিম্মি শ্রেণী সম্পর্কে শরীয়াহর বক্তব্যের তাৎপর্য। ইসলাম মানুষের সংজ্ঞা দিয়েছে তাদের ধর্মীয় আনুগত্যের বিচারে, যারা মুসলিম ছিলোনা, তাদেরকে শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে, যে সম্প্রদায়গুলো নিয়ে গঠিত ছিলো যৌথ অস্তিত্ব। ইসলামী আইনের অর্থে পূর্ণ আইনগত ব্যক্তিত্বসহ।</p>
<p>৪. একাজ করে, ইসলাম একটি নতুনত্বের অবতারণা করে যা কিছু পূর্ববর্তী সকল ধর্ম থেকে পৃথক। যে সব ধর্মের জন্য ধর্মপ্রবর্তকের জন্ম অথবা মৃত্যু কিংবা তাঁর নবুয়তের &#8216;সূচনাকেই, তাদের কালের সূচনা গণ্য করা হতো&#8217; ইহা ইহুদী ধর্ম থেকে ছিলো একইভাবে ভিন্ন, কেননা ইহুদী ধর্ম নির্বিচারে সৃষ্টির একটি তারিখ নির্ধারিত করে এবং সেই বিন্দু থেকে সকল সময়ের হিসাব করে।</p>
<p>৫. এই তোমাদের উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য এবং আমি তোমাদের রব রাব্ব, আমার ইবাদত কর (২১:৯২)।</p>
<p>৬. আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সেই হচ্ছে সবচেয়ে মহৎ যে সবচেয়ে ন্যায়নিষ্ঠ (৪৯: ১৩)।</p>
<p>৭. যে মুমিনগণ, তোমরা শাস্তিতে প্রবেশ করো পূর্ণভাবে এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে শয়তানের আদর্শ অনুসরণ করোনা, সে তোমাদের প্রকাশ শত্রু (২:২০৮)</p>
<p>৮. এবং শত্রু যদি শান্তির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে তোমরাও শান্তি অনুসরণ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৮:৬১)।</p>
<p>৯. তোমাদের প্রভুর প্রতি আহ্বান করো হিকমত এবং সুন্দর শোভন প্রচারের মাধ্যমে। অবিশ্বাসীদের</p>
<p>সঙ্গে উত্তম যুক্তি তর্কসহ কথা বলো (১৬:১২৫)।</p>
<p>১০. Ibn Hisham. The life of Muhammad Abyt A Guillaume (London Oxford University Press 1955) 687</p>
<p>১১. দ্র: জাতিপুঞ্জ সনদ ১৯৪৫, একই ব্যাপার ঘটেছিলো, জাতিসংঘের ক্ষেত্রে, যা স্থান গ্রহণ করে জাতিপুঞ্জের এবং হেগের আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে, যা আজও টিকে আছে।</p>
<p>১২. দেখুন: T. W. Arnold, The Preaching of Islam (Lahore: Sh Muhammad Asraf Publisher 1961) পৃ. ৬১।</p>
<p>১৩. Phillip K. Hitti. History of the Arabs (London Macmillan Co. 1963) পৃ. 195. 524</p>
<p>১৪. যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে মৃত গণ্য করোনা। তারা আল্লাহর কাছে জীবিত এবং তিনি তাঁদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেন (৩:১৬৯)।</p>
<p>১৫. কিন্তু নবী এবং তাঁর সঙ্গীগণ, তাঁদের অর্থবিত্ত এবং জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছেন তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কল্যাণ এবং তারাই সফলকাম (৯:৮৮)।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principles-of-world-order/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14315</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম ও রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/relationship-between-islam-and-politics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/relationship-between-islam-and-politics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 11 May 2024 11:20:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14214</guid>

					<description><![CDATA[আপনারা সকলেই জানেন যে পবিত্র কোরআনে হাদীদ নামে একটি সূরা রয়েছে। হাদীদ অর্থ হল, লোহা। সূরা হাদীদের ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আপনারা সকলেই জানেন যে পবিত্র কোরআনে হাদীদ নামে একটি সূরা রয়েছে। হাদীদ অর্থ হল, লোহা। সূরা হাদীদের ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:</p>
<p><em>لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ</em></p>
<p><em>অর্থাৎঃ</em><em> &#8220;</em><em>নিশ্চয়ই</em> <em>আমি</em> <em>আমার</em> <em>রাসূলদেরকে</em> <em>প্রেরণ</em> <em>করেছি</em> <em>স্পষ্ট</em> <em>প্রমাণসহ</em> <em>এবং</em> <em>তাদের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>দিয়েছি</em> <em>কিতাব</em> <em>ও</em> <em>ন্যায়</em> <em>নীতি</em><em>, </em><em>যাতে</em> <em>মানুষ</em> <em>সুবিচার</em> <em>প্রতিষ্ঠা</em> <em>করে।</em> <em>আমি</em> <em>লৌহও</em> <em>দিয়েছি</em> <em>যাতে</em> <em>রয়েছে</em> <em>প্রচন্ড</em> <em>শক্তি</em> <em>এবং</em> <em>রয়েছে</em> <em>মানুষের</em> <em>জন্য</em> <em>বহুবিধ</em> <em>কল্যাণ</em><em>; </em><em>এটা</em> <em>এ</em> <em>জন্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আল্লাহ</em> <em>প্রকাশ</em> <em>করে</em> <em>দিবেন</em> <em>কে</em> <em>প্রত্যক্ষ</em> <em>না</em> <em>করেও</em> <em>তাঁকে</em> <em>ও</em> <em>তাঁর</em> <em>রাসূলদেরকে</em> <em>সাহায্য</em> <em>করে।</em> <em>আল্লাহ</em> <em>সর্বশক্তিমান</em><em>, </em><em>পরাক্রমশালী</em><em>&#8220;</em><em>।</em></p>
<p>এই আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিতাব ও মীযানের সাথে সাথে লোহাও নাযিলের কথা বলেছেন। কোরআনের যারা বৈজ্ঞানিক তাফসীর করেন তারা বলে থাকেন যে, আকাশ থেকে বিভিন্ন ধরণের পাথর এসে দুনিয়ায় পড়েছে এর সাথে সাথে লোহাও দুনিয়াতে এসেছে। আমি এই ধরণের তাফসীরকে খুব বেশী গ্রহণযোগ্য মনে করি না।</p>
<p><strong>আমার</strong> <strong>মতে</strong><strong>, </strong><strong>এই</strong> <strong>আয়াতে</strong> <strong>আল্লাহ</strong> <strong>তায়ালা</strong> <strong>কিতাব</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>তার</strong> <strong>অবতীর্ণ</strong> <strong>আসমানী</strong> <strong>কিতাবের</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বুঝিয়েছেন</strong><strong>, </strong><strong>মীযান</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>আদালত</strong> <strong>বুঝিয়েছেন</strong><strong>, </strong><strong>আর</strong> <strong>লোহা</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>শক্তি</strong> <strong>ও</strong> <strong>ক্ষমতার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বুঝিয়েছেন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে বলেছেন, কিতাব বিহীন মীযান হবে না, আবার লোহা বিহীনও মিযান হবে না।</p>
<p>কেননা, লোহাবিহীন মীযান (আদালত) কিতাবকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, কিতাব বিহীন লোহা (শক্তি ও ক্ষমতা) মীযানকে (আদালত) অদৃশ্য করে দেয়।</p>
<p>যদি আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই তাহলে বলব যে, কিতাব হল, আদালতের উৎস; মীযান হল স্বয়ং আদালত নিজে, শক্তি ও ক্ষমতা হল, আদালতের প্রয়োগ।</p>
<p><em>এই</em> <em>তিনটি</em> <em>বিষয়</em> <em>এক</em> <em>সাথে</em> <em>না</em> <em>হলে</em> <em>সমস্যার</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>হয়।</em> <em>যেখানে</em> <em>কিতাব</em> <em>নেই</em> <em>সেখানে</em> <em>শক্তি</em> <em>ও</em> <em>ক্ষমতা</em> <em>‘</em><em>মীযানকে</em><em>’</em><em> (</em><em>আদালত</em><em>) </em><em>নির্ধারণ</em> <em>করে।</em></p>
<p><em>আর</em> <em>ঐ</em> <em>সময়ে</em> <em>আদালতের</em> <em>শক্তি</em> <em>নয়</em><em>, </em><em>শক্তির</em> <em>ও</em> <em>ক্ষমতার</em> <em>আদালত</em> <em>প্রভাবশালী</em> <em>বা</em> <em>কর্তৃত্বশালী</em> <em>হয়।</em></p>
<p>যদি মীযান না থাকে, তাহলে শক্তি ও ক্ষমতা, কিতাবকে তার নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং কিতাবকে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নিজের মত করে ব্যাখা করার চেষ্টা করে থাকে। কিতাব যখন শক্তি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণাধীন হয়, কিতাব তখন অকার্যকর হয়ে পড়ে।</p>
<p>এর জ্বলন্ত উদাহরণ হল পূর্ববর্তী পরিবর্তীত ও পরিবর্ধিত দ্বীন সমূহ। শক্তি ও ক্ষমতা না থাকলে মিযান (আদালত) শুধুমাত্র থিওরী হিসেবে র‍য়ে যায়, সমাজে ও রাষ্ট্রে যার কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। কিতাবকে মিযানের সাথে এক হয়ে সামাজিক জীবনে প্রভাবশালী হওয়ার জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, একটি শক্তির প্রয়োজন, যে শক্তি কিতাবের আইন সমূহকে বাস্তবায়ন করবে।</p>
<p><strong>সূরা</strong> <strong>হাদীদের</strong> <strong>এই</strong> <strong>আয়াতের</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>বুঝতে</strong> <strong>পারি</strong> <strong>যে</strong><strong>; </strong><strong>কিতাব</strong><strong>, </strong><strong>মিযান</strong> <strong>এবং</strong> <strong>হাদীদ</strong> <strong>তথা</strong> <strong>কিতাব</strong><strong>, </strong><strong>মিযান</strong><strong> (</strong><strong>আদালত</strong><strong>) </strong><strong>ও</strong> <strong>রাষ্ট্র</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>যখন</strong> <strong>একসাথে</strong> <strong>হবে</strong><strong>, </strong><strong>তখনই</strong> <strong>কেবলমাত্র</strong> <strong>পৃথিবীতে</strong> <strong>সুখ</strong> <strong>ও</strong> <strong>শান্তি</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong> <strong>হবে।</strong><br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 715px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/jubo-jiggasa.png" height="118" /></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/relationship-between-islam-and-politics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14214</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
