<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>অর্থনীতি &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/politics-and-economy/economy/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Wed, 03 Jun 2026 13:53:25 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>অর্থনীতি &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>ইসলামে অর্থনৈতিক বিধানের উদ্দেশ্যসমূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. উমর চাপরা]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 19 Aug 2025 15:53:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16080</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম জীবনবিমুখ কোনো ধর্ম নয় (১) এবং এটি কখনো মানুষকে &#8220;আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ” (কোরআন, ৭:৩২) থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে না। বরং ইসলাম মানুষের প্রতি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এভাবে, &#8220;মানুষ জন্মগতভাবে গুনাহগার নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম জীবনবিমুখ কোনো ধর্ম নয় (১) এবং এটি কখনো মানুষকে &#8220;আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ” (কোরআন, ৭:৩২) থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে না। বরং ইসলাম মানুষের প্রতি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এভাবে, &#8220;মানুষ জন্মগতভাবে গুনাহগার নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি বা খলীফা এবং সে শুধুমাত্র নিজের কৃত গুনাহসমূহের জন্যই দায়ী থাকবে।&#8221; (আল কোরআন, ২:৩০) এমনকি &#8220;মানুষের জন্যই এই পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে।&#8221; (২:২৯)। সুতরাং আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহকে ত্যাগ করার মধ্যে নয়, বরং তার দেওয়া সীমারেখায় থেকে সেগুলোকে ভোগ করার মাঝেই কল্যাণ নিহিত।</p>
<p>যাবতীয় মানবীয় কার্যাবলি ইসলামের ধর্মীয় মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে জাগতিক কাজ বলে আলাদা করে কোনো বিভাজন নেই। অর্থনীতিসহ মানব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরণের কাজই আধ্যাত্মিক, যদি সেটি শান্তির জন্য হয় এবং ইসলামের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের সীমার মধ্যে হয়। এই লক্ষ্য এবং মূল্যবোধগুলোই ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণ করে। তাই, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আরো ভালো দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এই বিষয়গুলোর সঠিক বোঝাপড়া থাকা দরকার। এই মূল্যবোধ এবং লক্ষ্যগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>১. ইসলামের নৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।</li>
<li>২. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও আদালত।</li>
<li>৩. আয়ের ন্যায়সংগত বণ্টন।</li>
<li>৪. সামাজিক অগ্রগতির প্রেক্ষিতে ব্যক্তির স্বাধীনতা।</li>
</ul>
<p>এই লক্ষ্যগুলো ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আলোচনা এবং ব্যাখ্যা করার জন্য সম্পূর্ণ নয়, তবে পর্যাপ্ত ফ্রেমওয়ার্ক (কাঠামো) সরবরাহ করার পাশাপাশি সেসব বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে যা ইসলামী ব্যবস্থার সাথে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের পার্থক্য নিরূপণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ইসলামের নৈতিক মূল্যমান:</h5>
<p>&#8220;তোমরা আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহ থেকে খাও এবং পান করো, এবং দুনিয়াতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।&#8221; (আল-কোরআন, ২:৬০)</p>
<p>&#8220;হে মানবজাতি! এই পৃথিবীতে যা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, তা তোমরা খাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না।&#8221; (আল-কোরআন, ২: ১৬৮)</p>
<p>&#8220;হে ইমানদারগণ! আল্লাহ যা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন, তাকে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। এবং হালাল খাবার গ্রহণ করো, আর যে আল্লাহর উপর তোমরা ঈমান এনেছো আর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকো।&#8221; (আল-কোরআন, ৫: ৮৭-৮৮)</p>
<p>কোরআনে এরকম অসংখ্য আয়াত আছে (২), যেগুলো অর্থনীতিতে কোরআনী মূলনীতি তুলে ধরে। ইসলাম আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহসমূহকে ভোগ করার জন্য মুসলমানদের তাগিদ দিয়ে থাকে এবং মুসলিম সমাজে বস্তুগত উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে কোনো সংখ্যাগত সীমারেখ বেঁধে দেয় না। বরং এটি বস্তুগত উন্নতিকেও একটি সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করে।</p>
<p>&#8220;যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।&#8221; (আল কোরআন, ৬২: ১০)</p>
<p>আল্লাহ যদি তোমাদের সামনে জীবিকা উপার্জনের কোনো সুযোগ করে দেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এটিকে কাজে লাগাও যতক্ষণ না সেটি নিঃশেষ হয়ে যায়।(৩)</p>
<p>কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষরোপণ করে, অথবা জমি চাষাবাদ করে এবং সেখান থেকে যদি একটি পাখিও রিযিক আহরণ করে থাকে, তবে তা তার জন্য সাদকাহ হিসেবে আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে।(৪)</p>
<p>যারা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য এবং ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত থাকার জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে জমিনে রিযিক অন্বেষণ করে এবং প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হয়, তারা তাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে তাদের চেহারাগুলো পূর্ণ চাঁদের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে।(৫)</p>
<p>এমনকি ইসলাম আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে মানুষকে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের তাগিদ দিয়েছে (৬) এবং রাসূল (স.) বলেছেন যে, <strong>পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ নেই, যার জন্য আল্লাহ একটি প্রতিকার নির্ধারণ করে রাখেননি।</strong>(৭) সুতরাং, এটি সহজেই অনুমেয় যে মুসলিম সমাজে অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশ অন্যতম। কেননা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহকে মানবতার সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নতির স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা করার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে মানুষ তার আগমনের উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ করতে পারে।</p>
<p>ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করেছে, এবং মানুষকে জীবিকা অন্বেষণের তাগিদ দিয়েছে।(৮) এটি থেকে ধরে নেওয়া যায় যে, মুসলিম সমাজে আরেকটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা যেন কাজ করতে আগ্রহী মানুষ বা যারা কাজ খুঁজছে এরকম সকলেই তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী জীবিকা উপার্জনের উপায় খুঁজে পায়। যদি এটি সম্পন্ন না হয়, তবে মুসলিম সমাজ তার আধ্যাত্মিক ক্ষুধা নিবারণেও সক্ষম হবে না। কেননা, বেকার মানুষগুলো জীবনে অমানুষিক কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হবে যদি না সে অন্যের দয়া বা দানের উপর নির্ভর করে অথবা ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে কিংবা কোনো অসদুপায় অবলম্বন করে। আর এসবগুলো পন্থাই; বিশেষ করে প্রথম দুটি ইসলামের প্রাণসত্তার সাথে বেমানান।</p>
<p>অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে জোর দেবার বিষয়টি মূলত ইসলামের মৌল বার্তা থেকেই উদ্ভূত। ইসলাম এসেছেই মানবতার জন্য আর্শীবাদস্বরূপ, মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য, দারিদ্র্য এবং কষ্টের মধ্যে নিপতিত করার জন্য নয়। কোরআন এ ব্যাপারে বলেছে-</p>
<p>&#8220;আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সমগ্র মানবতার জন্য রহমত হিসেবে।&#8221; (আল-কোরআন, ২১: ১০৭)</p>
<p>&#8220;হে মানুষ! তোমাদের জন্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসিহত এসে গেছে, এটি সে জিনিস যা অন্তরের সমস্ত রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও নিয়ামত।&#8221; (আল-কোরআন, ১০:৫৭)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা-ই চান, যা কঠিন তা চান না।&#8221; (আল-কোরআন, ২: ১৮৫)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের বোঝাকে লাঘব করতে চান। কেননা, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।&#8221; (আল-কোরআন, ৪: ২৮)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো বোঝা চাপিয়ে দিতে চান না, বরং তিনি চান তোমাদের পরিশুদ্ধ করতে এবং তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহকে পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো।&#8221; (আল-কোরআন, ৫:৬)</p>
<p>এ আয়াতগুলোর উপর ভিত্তি করে মুসলিম ফকীহগণ সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মানুষের স্বার্থে উৎপাদন এবং মানুষের কষ্ট লাঘব করাই ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি।(৯) ইমাম গাযযালীর মতে, শরীয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ সাধন যা নির্ভর করে তাদের বিশ্বাসের নিরাপত্তা, জীবনের নিরাপত্তা, আকলের নিরাপত্তা, বংশের ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং এই পাঁচটি জিনিসের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় জনগণের স্বার্থরক্ষার কবচ এবং অনুমোদনযোগ্য।(১০) ইমাম ইবনে কাইয়ুম জোর দিয়ে বলেন, <strong>&#8220;শরীয়তের ভিত্তি হচ্ছে হিকমত এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের কল্যাণ সাধন। এই কল্যাণ নির্ভর করে পরিপূর্ণ আদালত, মারহামাত, মাসলাহাত এবং হিকমতের উপর। যা কিছু আদালত থেকে জুলুমের দিকে মারহামাত থেকে রূঢ়তার দিকে, মাসলাহাত থেকে দুর্দশার দিকে এবং হিকমত থেকে মূর্খতা/ নির্বুদ্ধিতার দিকে নিয়ে যায়, শরীয়তে তার কোনো স্থান নেই। &#8220;</strong>(১১)</p>
<p>কিন্তু এই অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে একজন মুসলিম যদি তার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে, অন্যের ক্ষতি করে, আদালত থেকে দূরে সরে গিয়ে এবং কল্যাণের বিষয়কে মাথায় না রেখে সম্পদ উপার্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তবে সে চরমপন্থায় চলে যায় এবং জাগতিক উন্নতির মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ইসলাম যেহেতু মানব জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, তাই কোরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে, &#8220;নামাজ শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করতে থাকো যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো।&#8221; (আল কোরআন, ৫৭ঃ ৭) অধিকাংশ আলেমদের মতে, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা বলতে বেশি বেশি ইবাদত করা বুঝায়নি, বরং এর মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে আখলাকী জীবন যাপনঃ(১২) হালাল উপার্জন, সবধরনের হারাম পন্থাকে বর্জন এবং সম্পদকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে, যার হিসাব কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে।(১৩) এই প্রেক্ষিতে হয়তো পৃথিবীর এবং এর কর্তৃত্বের অসারতা বিষয়ক কোরআনের আয়াত ও হাদীসগুলো বোঝা সহজ হবে।(১৪) সূক্ষ্ম এ কথাটি আক্ষরিক অর্থে বলা হয়নি, বরং এটি আধ্যাত্মিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট। যদি আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে বিসর্জন না দিয়ে সমস্ত পৃথিবীর কর্তৃত্বও অধিকার করা যায়, তাহলে তা ত্যাগ করার মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। রাসূল (স.) বলেন, &#8220;যে আল্লাহকে ভয় করে তার সম্পদ উপার্জনে কোনো দোষ নেই।&#8221;(১৫) কিন্তু সেখানে যদি কোনো বিবাদ ঘটে থাকে, তাহলে মানুষের উচিত ততটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা, যতটুকু সভাবে উপার্জন করা যায় সেটা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। কোরআন বলছে, &#8220;তাদের বলে দিন, ভালো এবং মন্দ কখনোই সমান নয়। যদিও মন্দের প্রাচুর্য তোমাদের মোহিত করে। হে বোধসম্পন্ন লোকেরা। তোমরা আল্লাহর নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো।&#8221; (আল কোরআন, ৫: ১০০) যে ব্যক্তি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সন্তুষ্টির উপর ইসলামের চিরন্তন মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়, সে খুব সহজেই দুনিয়াবী সম্পদকে বিসর্জন দিতে পারে। কেননা, তার সামনে আছে রাসূলের বাণী, &#8220;এই পৃথিবীর মোহ তো কেবল শয়তানের কারসাজি&#8221;(১৬) এবং &#8220;যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে সে আখেরাতকে হারিয়ে ফেলে আর যে ব্যক্তি আখিরাতকে ভালোবাসে সে দুনিয়াতেও এর প্রতিদান লাভ করে। সুতরাং তোমরা ক্ষণস্থায়ী জিনিসের তুলনায় চিরস্থায়ী জিনিসকে বেছে নাও।&#8221;(১৭)</p>
<p><strong>এভাবেই একদিকে বস্তুগত উন্নতির জন্য চেষ্টা করার তাগিদ দেয়া আবার একইসাথে এই জাগতিক প্রচেষ্টাকে একটি আখলাকী পাটাতনের উপর স্থাপন করার মাধ্যমে ইসলাম জাগতিক এবং নৈতিক বিষয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে যা জাগতিক চেষ্টাকে আধ্যাত্মিকতার অলংকারে সজ্জিত করে।</strong></p>
<p>وَٱبْتَغِ فِيمَآ ءَاتَىٰكَ ٱللَّهُ ٱلدَّارَ ٱلْـَٔاخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَآ أَحْسَنَ ٱللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ ٱلْفَسَادَ فِى ٱلْأَرْضِ ۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلْمُفْسِدِينَ</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে তোমার আখিরাতের ঘর নির্মাণের চেষ্টা করো, কিন্তু দুনিয়াতেও তোমার অংশের কথা ভুলে যেও না। আর আল্লাহ তোমার উপর যেমন দয়া করেছেন, তুমিও মানুষের প্রতি তেমনি দয়া করো। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।&#8221; (আল-কোরআন, ২৮: ৭৭)</p>
<p>সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম তারাই যারা তাদের দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় বিষয়ে সচেতন।(১৮)</p>
<p>&#8220;তোমাদের মধ্যে সে শ্রেষ্ঠ নয়, যে আখিরাতের জন্য দুনিয়াকে অস্বীকার করে, আবার সেও শ্রেষ্ঠ নয় যে দুনিয়ার জন্য আখিরাতকে অবহেলা করে। বরং তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়কেই প্রাধান্য দেয়।&#8221; (১৯)</p>
<p>এভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় দিকের উপর জোর দেওয়ার বিষয়টি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে, এ দুটো একত্রে পারস্পরিক শক্তির আধার হয়ে প্রকৃত মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে। জীবনে এদুটো দিকের কোনো একটিকে অবহেলা করেই প্রকৃত মানবকল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভব নয়। যদি শুধু জাগতিক বিষয়গুলোকে লালন করা হয় এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়হীনতা বিরাজমান থাকে তাহলে সমাজে হতাশা, অপরাধ, মাদকাসক্তি, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, ডিভোর্স, মানসিক অসুস্থতা, আত্মহত্যার মতো অসংগতিগুলো প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে যার সবগুলোই ব্যক্তিজীবনে মানসিক প্রশান্তির ঘাটতির কারণে হয়ে থাকে। আবার যদি শুধু আধ্যাত্মিক বিকাশকেই লালন করা হয়, তাহলে অনেকের কাছেই তা অবাস্তব এবং অকার্যকর হয়ে পড়বে। এভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের মধ্যে দ্বি-বিভাজন এবং দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে যা সমাজের যাবতীয় মূল্যবোধকেই হুমকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।</p>
<p>অন্য দুটি ব্যবস্থা, সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদে আধ্যাত্মিক এবং বস্তুগত জীবনের এই মেলবন্ধন অনুপস্থিত। কেননা, এ দুটি মতবাদই মূলত সেকুলার এবং অনৈতিক বা নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। উৎপাদনশীল প্রযুক্তি এবং জীবনমানের উন্নতির ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের অবদানকে যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের ভূমিকাকেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই দুটি ব্যবস্থাই মানবজীবনে আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>২. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং আদালত:</h5>
<p>&#8220;হে মানবজাতি। আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে মুত্তাকীগণই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৪৯:১৩)</p>
<p>&#8220;তোমাদের রব একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে এসেছো, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। শ্রেষ্ঠত কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে হয়। অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কালোর উপরও সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। (২০)</p>
<p>&#8220;মানবজাতির সূচনা হয়েছে আদম এবং হাওয়ার মাধ্যমে, আর তোমরা সবাই তাদের বংশধর। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ কারও কাছে তার বংশ বা গোত্র পরিচয় জানতে চাইবেন না। বরং সেদিন আল্লাহর সামনে সেই সবচেয়ে সম্মানিত হবে যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।</p>
<p>ইসলাম এমন এক সমাজ বিনির্মাণের কথা বলে যেখানে সকল মানুষ একই স্রষ্টার দ্বারা আবদ্ধ থাকে। সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, এটি কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে আবদ্ধ নয়, আর এক দম্পতি থেকে সৃষ্ট একই পরিবারের সদস্যের মতো ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসার বন্ধনে না কোনো জাতি, গোত্র বা বর্ণে, বরং যাবতীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এই ভ্রাতৃত্ব সমগ্র মানব জাতিকে এক করে। কোরআনের ভাষ্যমতে, &#8220;বলুন, হে মানুষ। আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।&#8221; (আল কোরআন, ৭:১৫৮) আর রাসূলুল্লাহ (স.) জোর দিয়ে বলেন, &#8220;আমি তোমাদের মধ্যে সাদা-কালো সবার জন্যই সমানভাবে প্রেরিত হয়েছি।&#8221;</p>
<p>আর স্বাভাবিকভাবেই এই সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের পূর্বশর্ত হলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে, যারা একই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্টি হওয়া ছাড়াও একই বিশ্বাসের বন্ধনেও আবদ্ধ যাকে কোরআন &#8216;দ্বীনি ভাই&#8217; (আল কোরআন, ৯:১১) (২৩) এবং &#8216;পরস্পরের প্রতি রহমশীল&#8217; (আল কোরআন, ৪৮:২৯) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাসূল (স.) বলেন,</p>
<p>&#8220;সমগ্র মানবজাতি আল্লাহর পরিবারভুক্ত আর তার কাছে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেই বেশি প্রিয় যে সর্বশ্রেষ্ঠ।&#8221;(২৪)</p>
<p>&#8220;জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি রহমশীল হও, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি রহমশীল হবেন।&#8221;(২৫)</p>
<p>&#8220;পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির ক্ষেত্রে আপনি মুসলমানদের একটি দেহের মতো পাবেন। এর এক অংশ আঘাত পেলে সারা দেহে সে ব্যথা অনুভূত হয়। &#8220;(২৬)</p>
<p>&#8220;এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে কখনো তার প্রতি অন্যায় আচরণ করে না, কখনো বিপদে তাকে একাকী ছেড়ে দেয় না কিংবা তাকে তাচ্ছিল্য করে না। (২৭)</p>
<p>&#8220;ইসলামের এই ভ্রাতৃত্বের ধারণা থেকেই ইসলাম আদালতের উপর এত গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি কোরআনে বলা হয়েছে, নবীগণের শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো দুনিয়ার বুকে আদালত প্রতিষ্ঠা।&#8221; (আল-কোরআন, ৫৭: ২৫)</p>
<p>আদালতবিহীন ঈমান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে কোরআন ঘোষণা করেছে- &#8220;তাদের জন্যই জন্যই রহমত এবং হেদায়াত যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জলুমের সাথে মিশ্রিত করে ফেলেনি।&#8221; (আল-কোরআন, ৬:৮২)</p>
<p><strong>সুতরাং ইসলাম মুসলমানদের আদালতের ব্যাপারে নিছক উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে তাগিদ দিয়ে গেছে, &#8220;আল্লাহ তোমাদের সৎকাজের এবং আদালত কায়েমের আদেশ দিচ্ছেন&#8221; (আল কোরআন, ১৬:৯০) এবং &#8220;যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, ইনসাফের ভিত্তিতে করো।&#8221; (আল কোরআন, ৩:৫৮)</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামে ইনসাফ এবং আদালতের গুরুত্ব এত বেশি যে, ন্যায়পরায়ণ হওয়াকে মুত্তাকী এবং মুমিন হবার শর্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে-</p>
<p>&#8220;হে ঈমানদারগণ। আল্লাহর জন্য তোমরা সত্যের উপর কায়েম থাকো এবং ইনসাফের সাক্ষী হও। কারও প্রতি দুশমনি যেন তোমাদেরকে ইনসাফ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। ইনসাফ করো। এটিই তাকওয়ার কাছাকাছি। আল্লাহকে ভয় করো। নিশচয়ই তোমরা যা কিছু করো, সে বিষয়ে আল্লাহ পুরোপুরি খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৫:৮)</p>
<p>এমনকি ইনসাফের ক্ষেত্রে যদি কারও নিজের বা তার কাছের মানুষদের ক্ষতি হয়ে যায়, তবুও তা কায়েম করতে বলা হয়েছে-</p>
<p>&#8220;এবং যখন তোমরা কথা বলো, ইনসাফের সহিত বলো, যদি তা তোমাদের নিকটাত্মীয়দের বিপক্ষেও যায়।&#8221; (আল কোরআন, ৬: ১৫২)</p>
<p>&#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে বা তোমাদের পিতামাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়, সে ধনী হোক বা দরিদ্র হোক। আল্লাহ সবার উত্তম হেফাজতকারী। কাজেই নফসের প্রতারণায় ইনসাফ থেকে দূরে সরে যেও না। যদি তোমরা (সত্য থেকে) বিচ্যুত হও বা ইনসাফ থেকে দূরে সরে যাও তাহলে মনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সকল তৎপরতার খবর রাখেন।&#8221; (আল কোরআন, ৪: ১৩৫)</p>
<p>এ বিষয়টি আরো বিস্তারিত অনুধাবনের জন্য আমরা ইসলামের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সামাজিক সুবিচার:</strong></p>
<p>ইসলাম যেহেতু সমগ্র মানবতাকে একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করে তাই আল্লাহর আইনে সকল মানুষই সমান। এখানে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। গোত্র-বর্ণ বা সামাজিক পদমর্যাদার জন্য মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন করা হয় না। এখানে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হলো আখলাক, যোগ্যতা, এবং মানবতার কল্যাণে ভূমিকা। পয়গাম্বর (স) বলেন-</p>
<p>&#8220;নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং ধন-সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের কাজ।&#8221;(২৮)</p>
<p>&#8220;তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যার আখলাক সর্বোত্তম।&#8221;(২৯)</p>
<p>আল্লাহর রাসূল (স.) সেসব মানুষ এবং জাতির জন্য ধ্বংসের সতর্কবাণী করেছেন, যারা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভেদেভেদ এবং অসাম্যের সৃষ্টি করে।</p>
<p><strong>“তোমাদের পূর্বের অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছিলো, কারণ যখন তাদের মধ্যে উচ্চবিত্তরা চুরি করতো, তাদের কোনো শাস্তি দেয়া হতো না। বিপরীতে নিম্নবিত্তের উপর শাস্তি কার্যকর হতো। খোদার কসম। যদি আমার আদরের দুলালী ফাতিমাও চুরি করতো আমি তার হাত কেটে দিতে দ্বিধা করতাম না।”(৩০)</strong></p>
<p>&#8220;যদি কেউ কোনো মুসলিম নারী অথবা পুরুষকে তার দারিদ্য বা অনটনের জন্য তাচ্ছিল্য বা উপহাস করে কেয়ামতের মাঠে আল্লাহ তাকে অপমানিত করবেন। &#8220;(৩১)</p>
<p>ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) তার গভর্ণর আবু মুসা আল আশয়ারী (রা.)-এর কাছে চিঠি লেখেন এই মর্মে-</p>
<p><strong>“সকল মানুষকে সমানভাবে দেখবে যেন দরিদ্ররা তোমার আদালত থেকে নিরাশ না হয়, আবার ধনীরা তোমার কাছে কোনো বাড়তি সুবিধা আশা না করে।&#8221;(৩২)</strong></p>
<p>ইসলামের প্রথম চার খলীফার শাসনামলেই আদালতের এই রূহ সর্বত্র বিদ্যমান ছিলো। কিছুটা শিথিল হলেও পরবর্তী শাসকরাও এটির অনুসরণ করেছেন, বিভিন্ন ঘটনায় যার নজির পাওয়া যায়। খলীফা হারুন উর রশিদের সময়কার বিখ্যাত ইমাম কাজী আবু ইউসুফের খলীফাকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠির বক্তব্য থেকে আমরা যেমনটি দেখতে পাই, &#8220;সকলের প্রতি সমান আচরণ করুন, হোক সে আপনার নিকটবর্তী অথবা দূরবর্তী&#8221; এবং &#8220;আপনার রাষ্ট্রের উন্নতি নির্ভর করবে কোরআনের আইন কায়েম করা এবং অন্যায় ও জুলুম নিরসন করার মধ্যে। &#8220;(৩৩)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অর্থনৈতিক সুবিচার:</strong></p>
<p>সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং সামাজিক সুবিচারের ধারণাটি অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি না এর সাথে অর্থনৈতিক সুবিচারের মেলবন্ধন ঘটে; যদি না সমাজে প্রত্যেকেই তার অবদানের মূল্য পেয়ে থাকে এবং একে অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কোরআন মুসলমানদের বলে, &#8220;কখনো অন্যের পাওনা আটকে রেখো না।&#8221; (আল কোরআন, ২৬: ১৮৩)।(৩৪)  ফলে প্রত্যেকে তার ন্যায্য পাওনা পেয়ে যাবে এবং কেউ অন্যের অংশ হস্তগত করে কাউকে বঞ্চিত করবে না। রাসূল (স.) উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন, &#8220;তোমরা জুলুমের ব্যাপারে সচেতন হও। কেননা, জুলুম কেয়ামতের মাঠে ঘোর অন্ধকারের মতো হবে।&#8221;(৩৫) শোষণ এবং জুলুমের ব্যাপারে এরূপ সতর্কবার্তার কারণ হলো সমাজে প্রতিটি মানুষের জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়ন যা ইসলামের মূল লক্ষ্য। হোক সে ভোক্তা, উদ্যোক্তা, বণ্টনকারী কর্মচারী অথবা মালিক) অধিকার সংরক্ষণ এবং এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, শ্রমিক বা কর্মচারী এবং মালিকের সম্পর্কের ব্যাপারে আদালতের ভিত্তিতে ইসলাম সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। একজন শ্রমিক মালিকের জন্য তার কর্মচারীকে বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত নয়। রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, দ্রব্য উৎপাদনে তার অবদানের জন্য ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকারী এবং একজন মুসলিম &#8220;ঠিন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিরাগভাজন হবে; যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি তার কৃত ওয়াদা পূর্ণ না করেই মৃত্যুবরণ করেছে, যে ব্যক্তি কোনো মুক্ত মানুষকে বিক্রি করে এবং মূল্য ভোগ করে, আর যে একজন শ্রমিক নিয়োগ করে তার উৎপাদিত পণ্য ভোগ করে, কিন্তু তার মজুরি শোধ করে না।&#8221;(৩৬) এই হাদীসে একজন মুক্ত মানুষকে ক্রীতদাসে পরিণত করা এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি আদায় না করাকে পাশাপাশি রাখার মাধ্যমে ইসলাম এ বিষয়ে কতটা কঠোর তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।</p>
<p><strong>এখানে শ্রমিকের &#8216;ন্যায্য মজুরি&#8217; এবং &#8216;শ্রমিক শোষণ&#8217; বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিকে আমাদের কোরআন এবং সুন্নতের আলোকে বুঝতে হবে। মার্কসের মতো ইসলাম শ্রম ব্যাতীত অন্য কোনো ফ্যাক্টর দ্বারা উৎপাদনের স্বীকৃতি দেয় না। তাই স্বাভাবিকভাবেই ইসলামে শ্রমিকের মজুরি এবং শ্রমিক শোষণের ধারণাটিও মার্কসের প্রস্তাবিত উদ্বৃত্ত মূল্যের (suplus value) ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।</strong> তাত্ত্বিকভাবে এরূপ বক্তব্য আসতে পারে যে, শ্রমিক কর্তৃক উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের সমপরিমাণ মূল্যই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি। কিন্তু বাস্তবে এভাবে মূল্য নির্ধারণ করা খুবই কষ্টসাধ্য তাই এই তত্ত্বের কার্যকরীতাও যৎসামান্য। কিন্তু বিভিন্ন হাদীস থেকে সর্বনিম্ন এবং আদর্শ মজুরি সম্পর্কে একটা গুণগত ধারণা পাওয়া যায়, যা অনেক বেশি বাস্তবিক। রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;একজন শ্রমিকের (নারী অথবা পুরুষ) ন্যূনতম মজুরি এমন হবে, যা দিয়ে সে পরিমিতভাবে তার খাদ্য ও বস্ত্রের চাহিদা পূরণ করতে পারবে এবং তাকে দিয়ে কখনো তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কাজ করানো যাবে না।&#8221;</strong>(৩৮) সুতরাং এই হাদীস থেকে এটা স্পষ্ট যে, একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এমন হওয়া চাই যা তার এবং তার পরিবারের মানসম্মতভাবে ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত হয় এবং এজন্য তাকে সাধ্যের অতিরিক্ত চাপ নিতে না হয়। মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক মান রক্ষার্থে সাহাবীরা এভাবেই শ্রমিকের মজুরি দিয়েছিলেন। ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রা) বলেন, &#8220;অদক্ষ নারী শ্রমিকদের তার বৃত্তিমূলক কাজে অতিরিক্ত চাপ দিওনা, তাতে করে সে হয়তো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। তোমার অধীন পুরুষদেরও অতিরিক্ত কাজের চাপ দিও না। তাহলে সে হয়তো চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারে। তোমার অধীনস্থদের প্রতি সহানুভূতিশীল হও, তাহলে তোমার রব তোমার প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। আর মনে রাখবে, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমার উপর ন্যস্ত।&#8221;(৩৯)</p>
<p>আরেকটি হাদীস থেকে আদর্শ মজুরি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। আদর্শ মজুরি এমন হবে যাতে কর্মচারী তার মালিকের সমমানের খাদ্য এবং বস্ত্রের আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়।</p>
<p><strong>“তোমাদের কর্মচারীগণ তোমাদের ভাই। যদিও আল্লাহ তাদের তোমাদের অধিনস্ত করেছেন। সুতরাং যে তার ভাইকে অধীন হিসেবে পায় সে যেন তাকে তাই খেতে দেয় যা &#8220;তোমাদের কর্মচারীগণ তোমাদের ভাই। যদিও আল্লাহ তাদের তোমাদের অধিনস্ত সে নিজে খায়, এবং তাই পরতে দেয়, যা সে নিজে পরিধান করে।&#8221;(৪০)</strong></p>
<p>সুতরাং ন্যায্য মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হতে পারবে না এবং এর কাক্সিক্ষত মান আদর্শ মজুরির যথাসম্ভব কাছাকাছি হবে যাতে করে আয়ের বৈষম্য যতটা সম্ভব কমানো সুতরাং ন্যায্য মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হতে পারবে না এবং এর কাঙ্ক্ষিত মান যায়। এর ফলে শ্রমিক ও মালিকের জীবনমানের মধ্যেকার যে ব্যবধান, যা সমাজে দুটি ভিন্ন শ্রেণির সৃষ্টি করে এবং ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা নষ্ট হয়ে যায়, যা মুসলিম সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি তাতেও একটা সেতুবন্ধন রচিত হয়। উপর্যুক্ত আলোচনার সারমর্ম হলো &#8216;ন্যূনতম&#8217; এবং &#8216;আদর্শ&#8217; এদুটি সীমারেখার মধ্যে চাহিদা (demand) এবং যোগানের (supply) এর মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা, মসলিম সমাজের আখলাকী অবস্থান, এবং রাষ্ট্রের বৈধ আইনের ভিত্তিতে শ্রমিক/কর্মচারীর প্রকৃত মজুরি নির্ধারিত হবে।</p>
<p>ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং আদর্শ মজুরিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ইসলাম এ বিষয়েও জোর দিয়েছে যে, শ্রমিকদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো যাবে না, যাতে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ে বা সে তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে না পারে।(৪১) যদি তাদেরকে সাধ্যের চেয়ে বেশি কোনো কাজ করতে হয় তাহলে অবশ্যই পর্যাপ্ত সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সে অতিরিক্ত চাপ না নিয়েই কাজটি করতে পারে। ইতোপূর্বে শ্রমিকদের ভাই হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে রাসূল (স.) আরও বলেছেন, &#8220;&#8230;এবং তাদের উপর তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিও না। যদি সেটা দিয়ে থাকো, তাহলে তাদের সাহায্য করো। &#8220;(৪২)</p>
<p>এই হাদীস থেকে ইসলামী মূলনীতি অনুযায়ী সর্বাধিক শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্প ঝুঁকির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন এর প্রত্যেকটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নির্ধারণ করা সম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মালিকের কাছ থেকে এসব আচরণ নির্ধারণের করার পাশাপাশি আদালতের স্বার্থে ইসলাম কর্মচারীর উপরও কিছু নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করেছে। প্রথম কর্তব্য হলো, নিজের সর্বোচ্চ যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এবং যথাযথ গুরুত্ব ও সচেতনতার সাথে যত্ন দিয়ে কাজ করা। রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, &#8220;আল্লাহ তোমাদের উপর কর্তব্যপরায়ণতাকে ফরয করেছেন&#8221;(৪৩) এবং &#8220;এবং তিনি চান যে তোমরা যখন কোনো কাজ করো, সেটি যথাযথভাবে সম্পাদন করো।&#8221;(৪৪)</p>
<p>সুতরাং সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্য যার উপর ইসলাম এতটা জোর দিয়েছে সেটি নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই কর্মচারীদেরও কর্মদক্ষ হতে হবে। অন্য একটি ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূল (স.) বলেন, <strong>“যে কর্মচারী একনিষ্ঠভাবে আল্লাহমুখী হবার পাশাপাশি, তার মালিকের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ দায়িত্ব এবং আনুগত্যের সাথে সম্পন্ন করে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। &#8220;</strong>(৪৫)</p>
<p>কর্মচারীদের দ্বিতীয় কর্তব্য হলো, বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন হওয়া। কোরআনের ভাষ্যমতে, শ্রেষ্ঠ কর্মচারী সে যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সৎ। (আল কোরআন, ২৮ : ২৬)। এবং রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;যখন কাউকে কোনো কাজের জন্য নিযুক্ত করা হয় এবং তার বিনিময়ে তার জীবিকা সরবরাহ করা হয়, তখন এর চেয়ে বাড়তি যা কিছু সে অর্জন করে তাই তার জন্য অন্যায়/হারাম।&#8221;</strong>(৪৬)</p>
<p>অতএব, মালিকের উপর অনেকগুলো দায়িত্ব অর্পণ করার পাশাপাশি ইসলাম শ্রমিকের কাছেও তার কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং বিশ্বস্ততা প্রত্যাশা করে। এবং এর লক্ষ্য হলো যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলিতে শ্রমিক এবং মালিক উভয়ের জন্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>৩. সম্পদের ইনসাফপূর্ণ বণ্টন:</strong></h5>
<p>ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুবিচারের ক্ষেত্রে ইসলামের অনন্য এবং প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও প্রাণসত্তার সাথে আয় ও সম্পদের অন্যায় বণ্টন খাপ খায় না। বরং ইসলাম সারা পৃথিবীতে যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ধন-সম্পদের অন্যায় বণ্টনের ফলে তা কেবল ধ্বংসই হয়। এছাড়াও, কোরআনের বর্ণনামতে যেহেতু পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ &#8220;আল্লাহর পক্ষ থেকে সমগ্র মানবতার জন্য উপহারস্বরূপ।&#8221; (আল কোরআন, ২: ২৯)। তাই এ সম্পদ কিছু ব্যক্তির মধ্যে পুঞ্জিভূত থাকার কোনো মানে হয় না। তাই ইসলাম ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের উপর জোর দেয় এবং ইসলামী ব্যবস্থার অধীনে আয় ও সম্পদের একটি পুনঃবণ্টননীতি প্রণয়ন করে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মানবিক এবং সম্মানজনক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত হয়। মূলত এর মাধ্যমে ইসলাম &#8220;পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা হিসেবে&#8221; (আল কোরআন, ২: ৩০) মানুষের মর্যাদাকে সবকিছুর উপরে সমুন্নত করতে চায়। কোনো মুসলিম সমাজ যদি এই রকম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি তার ধারণ করা নামের অযোগ্য বলে গণ্য হবে। <strong>যেমনটা রাসূল (স.) বলেছেন, &#8220;সে প্রকৃত মুসলিম নয়, যে পেট পুরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।&#8221;(৪৭)</strong></p>
<p>ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) এক জনসভায় ইসলামের আদালতপূর্ণ পুনঃবণ্টন নীতির ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, &#8220;সমাজের সম্পদে প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার রয়েছে। এমনকি আমি নিজেও এর চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারবো না। আল্লাহ যদি আমাদেরকে হায়াত দান করেন, তাহলে আমরা শীঘ্রই দেখতে পাবো যে, এমনকি সান&#8217;আ পর্বতের পাদদেশে একজন রাখালও তার ন্যায্য অংশ লাভ করবে। &#8220;(৪৮)</p>
<p>খলীফা আলী (রা.) এই বিষয়ে জোর দিতেন যে, &#8220;আল্লাহ ধনীর জন্য এটা বাধ্যতামূলক করেছেন যে সে দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ করবে। যদি দরিদ্ররা ক্ষুধার্ত অথবা পোশাকহীন বা দুর্দশার মধ্যে থাকে, তার মানে হলো ধনীরা গরীবকে তার অংশ থেকে বঞ্চিত করেছে। অতএব, আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং শান্তি দিবেন।&#8221;(৪৯) ফিকহবিদগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দরিদ্রদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের দায়িত্ব, এবং বিশেষ করে এ দায়িত্ব ধনীদের উপর ন্যস্ত। যদি স্বচ্ছল ব্যক্তিরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে রাষ্ট্র তাদের এটি করতে বাধ্য করতে পারবে।(৫০)</p>
<p>ইসলামের পুনঃবণ্টন ব্যবস্থা তিন ধাপে বিভক্ত। প্রথমত, ইসলামী ব্যবস্থায় বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তার ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, যাকাতের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ গরীবের (যারা কাজ করতে অক্ষম অথবা দাস) মধ্যে পুনঃবণ্টন করা। যাতে কোরআনের এ আয়াতের সত্যতা কায়েম হয়, &#8220;সম্পদ তোমাদের ধনীদের মধ্যেই পুঞ্জিভূত না থাকে।&#8221; (আল কোরআন, ৫৯ঃ ৭)। তৃতীয়ত, মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মিরাসের সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন যা সমাজে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনকে শক্তিশালী ভিত এর উপর স্থাপন করে।</p>
<p><strong>ইসলামের এই ইনসাফপূর্ণ বণ্টননীতি এবং অর্থনৈতিক সুবিচারের অর্থ এই নয় যে, সমাজে যার অবদান যাই হোক না কেন প্রত্যেকে সম্পদের সমান অংশ লাভ করবে। কেননা, সমাজে সকল মানুষের চরিত্র, সক্ষমতা এবং সমাজের প্রতি অবদান সবার সমান নয়। তাই ইসলাম যাকাতের মাধ্যমে সকল মানুষের জন্য জীবনযাত্রার সুষম মান নিশ্চিত করার পর প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও সমাজে তার অবদান অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়াকে সমর্থন করে।</strong> ইসলাম এই ইনসাফপূর্ণ বণ্টননীতিতে এতটাই জোর দিয়েছে যে, কোনো কোনো মুসলমান মনে করে যে, ইসলাম সম্পদের সমবণ্টনের কথা বলেছে। রাসূলের অন্যতম সাহাবী আবু যর (রা.) এই মত পোষণ করতেন যে, একজন মুসলিমের জন্য তার পরিবারের ভরণপোষণের অতিরিক্ত সম্পদ রাখা জায়েয নয়। কিন্ত রাসূল (স.)-এর অধিকাংশ সাহাবীই তার এই চরমপন্থার সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।(৫২) তবে, আবু যর (রা.) ও আয়ের সমবন্টনের পক্ষে ছিলেন না, বরং তিনি জমাকৃত সম্পদের সমবণ্টনের পক্ষে ছিলেন। অর্থাৎ, তার মতে ব্যক্তির নিজের প্রকৃত ব্যায়ের পর উদ্বৃত্ত সম্পদ সে তার দারিদ্র্য-পীড়িত ভাইদের কল্যাণে ব্যয় করবে। ইনসাফপূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থার পক্ষাবলম্বন সত্ত্বেও, আলেমগণ সকলে এ বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, একজন মুসলিম ন্যায়সংগত উপায়ে উপার্জন করে, এবং তার আয় ও সম্পদ থেকে যাকাত আদায় ও অন্যান্য ভূমিকার মাধ্যমে সমাজের প্রতি তার ফরয দায়িত্ব পালন করার পরও তার ভাইয়ের কল্যাণে আরো সম্পদ ব্যয় করার মধ্যে কোনো বাধা নেই। (৫৩) প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী ব্যবস্থার আলোকে যদি উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম মেনে চলা হয়, শ্রমিক এবং মজুরের মধ্যে আদালতপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়, সম্পদ ও আয় বণ্টনের ইনসাফপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় এবং ইসলামের মিরাস ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তাহলে মুসলিম সমাজে আয় ও সম্পদের স্কুল অসাম্য বিদ্যমান থাকা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>৪. সামাজিক অগ্রগতির সাপেক্ষে ব্যক্তি স্বাধীনতা:</h5>
<p>ইসলামী মূল্যবোধের অন্যতম স্তম্ভ হলো এই বিশ্বাস যে, মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি এবং সে আল্লাহ ছাড়া আর কারও মুখাপেক্ষী নয়। (আল কোরআন, ১৩: ৩৬, ৩১: ২২) এটি ইসলামে মানুষকে সব ধরণের জিঞ্জির থেকে মুক্তির অনন্য দলীল। কোরআন রাসূলের (স.) নবুয়তী মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে &#8220;মানুষের গলা থেকে সকল প্রকার দাসত্বের শৃঙ্খল খুলে ফেলা&#8221;-কে। (আল কোরআন, ৭: ১৫৭) এটি ইসলামের সেই রূহ যা খলীফা উমরকে (রা.) এই কথা বলতে প্রবৃত্ত করেছে যে, &#8220;তোমরা মানুষকে দাস বানাচ্ছো, অথচ তার মা তাকে স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন।&#8221;(৫৪) শাফেয়ী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্যেও এই একই প্রাণসত্তার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় যখন তিনি বলেন, &#8220;আল্লাহ তোমাকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন, তাই কখনো পরাধীন হয়ো না।&#8221;(৫৫)</p>
<p>যেহেতু মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাই কারও, এমনকি রাষ্ট্রেরও তার গলায় পরাধীনতার জিঞ্জির পরাবার অধিকার নেই। ফিকহবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, এবং মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির উপর কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করা যাবে না। <strong>হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে বলেন, &#8220;একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক এবং মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির উপর কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করা যাবে না, এমনকি যদি সে ব্যক্তিগত ক্ষতি, যেমন- সে কোনো লাভ ছাড়া বেহিসাবে অর্থ ব্যয় করতে থাকে।&#8221;</strong> এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার মানে হলো তার মনুষ্যত্বের অবমাননা করে তাকে পশু জ্ঞান করা। এর মাধ্যমে যে ক্ষতি হয়, তার ঐ সম্পদের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি। এবং একটা ছোট ক্ষতির মোকাবেলায় বড় ক্ষতিকে সমর্থন করা যায় না।(৫৬)</p>
<p>এই মতদ্বৈধতা তখনি কার্যকর হয়, যখন কোনো ব্যক্তি ইসলামের সীমারেখার মধ্যে থেকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের ক্ষতি সাধন করে থাকে। কিন্তু যদি কেউ অন্যের কোনো ক্ষতি করে থাকে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে বাধা দিতে হবে এবং এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে কোনো ভিন্নমত নেই। ইমাম আবু হানিফার ভাষায়, &#8220;একজন অদক্ষ চিকিৎসক, একজন দায়িত্বহীন বিচারক, অথবা একজন দেউলিয়া নিয়োগকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করো, কেননা, এর মাধ্যমে ছোট ক্ষতির বিপরীতে বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারবে।&#8221;(৫৭) ইসলামে সামাজিক উন্নতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রাথমিক গুরুত্ব সত্ত্বেও এটি সামাজিক দায়বদ্ধতামুক্ত নয়।</p>
<p>অপরাপর ব্যক্তি এবং সমাজের সাথে ব্যক্তির অধিকারকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দাঁড় করানোর জন্য ফকীহগণ নিম্নোক্ত মূলনীতিগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন(৫৮):</p>
<ul>
<li>ব্যক্তিস্বার্থের উপর সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।</li>
<li>যদিও &#8216;দুর্দশা লাঘব করা&#8217; এবং &#8216;কল্যাণের প্রসার&#8217; দুটিই শরীয়তের উদ্দেশ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত, প্রথমটির উপর দ্বিতীয়টি প্রাধান্য পাবে।</li>
<li>ছোট ক্ষতির মোকাবেলায় বড় ক্ষতিকে সমর্থন দেয়া যাবে না। অথবা ক্ষুদ্রতর কল্যাণের জন্য বৃহত্তর কল্যাণ ত্যাগ করা যাবে না। বিপরীতে, বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে ছোট ক্ষতি অথবা বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে ক্ষুদ্রতর কল্যাণ ত্যাগ করা অনুমোদনযোগ্য।</li>
</ul>
<p>কাজেই, ইসলামের নৈতিক সীমার মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতা ততক্ষণ প্রযোজ্য হবে যতক্ষণ এটি সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী না হয় এবং অন্যের অধিকার হরণ করা না হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:</strong></p>
<p>ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্য নিয়ে উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের দৃঢ় ভিত্তির উপর বস্তুগত উন্নতিকে স্থাপন করার মধ্য দিয়ে ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের পাটাতন নির্মিত হয়েছে। আধ্যাত্মিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র থেকে ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায়, এর মৌলিক কাঠামোও এই দুটি ব্যবস্থা থেকে আলাদা। তাই ইসলামের সাথে এই দুটি মতবাদ এবং ব্যবস্থার সাদৃশ্য খুঁজতে গেলে তা কেবল তিনটি ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণায়-ই পর্যবসিত করবে। তাছাড়া, ইসলামী ব্যবস্থা নিরন্তর মানবীয় ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, আয়ের ন্যায্য বণ্টন এবং সামজিক অগ্রগতির সাথে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি নিবেদিত। এই নিবেদন অবশ্যই আধাত্মিকতা কেন্দ্রিক এবং ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কারুকার্যে চমৎকারভাবে সজ্জিত। অন্যদিকে আধুনিক পুঁজিবাদের ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে এককেন্দ্রিক দর্শন। এর সামগ্রিক দর্শন সামজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয়ের ন্যায়সংগত বন্টনের লক্ষ্যে নির্মিত হয়নি এবং সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আধ্যাত্মিক প্রাণসত্তার বদলে এটি দলীয় স্বার্থচিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত হয়। আবার সমাজতন্ত্র যদিও দাবি করে যে, এটি একটি মৌলিক দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু, একদিকে মানবীয় ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতি উদাসীনতা এবং আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর স্থাপিত আদালত, নিরপেক্ষ বিচার ও ন্যায়পরায়ণতার অভাব, অন্যদিকে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অস্বীকারের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা এবং আত্মপরিচয়ের প্রতি অবমাননার ফলে তাদের এই দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।</p>
<p>ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি ইসলামের অঙ্গীকার এটিকে পরিষ্কারভাবে সমাজতন্ত্র অথবা অন্য যেকোনো মতবাদ ও ব্যবস্থা থেকে পৃথক করে তোলে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক সম্মতি, যা ব্যবসায়িক লেনদেনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত, তা মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান সকল ধারায় অবিসংবাদিতভাবে স্বীকৃত।(৫৯)<strong> “হে ঈমানদারগণ! কখনো একে অন্যের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। ব্যবসায়িক লেনদেন করো পারস্পরিক সম্পত্তির ভিত্তিতে” (আল কোরআন, ৪: ২৯)।</strong> কোরআনের এ আয়াত থেকেই মূলত এই মূলনীতিটি এসেছে। রাসূলুল্লাহ (স.) এরও এরকম একটি হাদীস আছে, &#8220;মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দাও। কেননা, আল্লাহ মানুষকে একে অন্যের মাধ্যমে রিযিক দিয়ে থাকেন।&#8221;(৬০) জীবন এবং স্বাধীনতার এই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে গ্রুপের অধীনে থাকে যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে কেউ পারে যদি উৎপাদন ও বণ্টনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যক্তি মালিকানা অথবা স্বেচ্ছাসেবী কেনাকাটা করতে পারে। ইসলাম এন্টারপ্রাইজের পাশাপাশি উদ্যোক্তা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকে সামনে এনেছে যা সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক সম্পত্তি অর্জন ও হস্তান্তর, পণ্যদ্রব্য বিক্রয় ও ব্যবহার, এবং যাকাত ব্যবস্থা ও মিরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট মূলনীতিগুলো কোরআন, সুন্নত ও ফিকহের কিতাবাদীতে বিস্তৃত আলোচিত হয়েছে।</p>
<p>দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ইসলামের ইতিহাসে বরাবরই এই মূলনীতিগুলো সার্বজনীনভাবে সমুন্নত ছিলো এবং ব্যতিক্রমগুলোকে ইসলামের মূলধারার সাথে কখনোই মেলানো যাবে না এবং এগুলো ইসলামী ব্যবস্থার নীতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।</p>
<p>সুসংগঠিত বাজার ব্যবস্থা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি স্বতন্ত্র দিক। কেননা, একদিকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এটি ছাড়া অকার্যকর হয়ে পড়বে, অন্যদিকে এটি ভোক্তাদের চাহিদা ও পছন্দের পণ্য ও দাম সম্পর্কে মত প্রকাশের এবং উদ্যোক্তাদের স্বাধীনভাবে নিজস্ব পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ করে করে দেয়।</p>
<p>ইসলাম মুনাফা লাভের প্রেরণাকে সমর্থন করে, যেটি যেকোনো ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে কোনো এন্টারপ্রাইজ পরিচালনার পূর্বশর্ত। চার মাযহাবের উপর ফিকহী গবেষণার জন্য বিখ্যাত আলেম আল-জাযিরী বলেন, &#8220;ইসলাম ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে পরস্পরের লাভবান হওয়াকে অনুমোদন করে।&#8221; যদি ফকীহগণ ক্রেতা এবং বিক্রেতার মুনাফা অর্জনকে নিষিদ্ধ করে দেয় কিংবা একেবারেই কোনো সীমা বেঁধে না দেয়-দুটোই ইনসাফহীনতায় পর্যবসিত হতে পারে। তাই তিনি এর মধ্যে সীমারেখা আরোপ করেন। এছাড়াও তিনি প্রতারণা, ভণ্ডামী এবং কোনো পণ্য অন্যায়ভাবে ভোগ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। (৬১)</p>
<p>এই বিধানের কারণ হলো, মুনাফা লাভের আগ্রহ আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার প্রেরণা যোগায়। সম্পদের কার্যকর বণ্টন যেকোনো সতেজ-সুস্থ সমাজের চালিকাশক্তি। কিন্তু, মুনাফাকে একটি উপকরণের পরিবর্তে মৌলিক উদ্দেশ্য প্রতিপন্ন করার চিন্তা থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধির সৃষ্টি হয়। তাই ইসলাম এক্ষেত্রে কিছু নৈতিক সীমা বেঁধে দিয়েছে যেন মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের বাসনা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী না হয় এবং ইসলামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত না করে।</p>
<p><strong>এন্টারপ্রাইজ ও ব্যক্তিগত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং মুনাফা লাভকে অনুমোদন দেবার মধ্য দিয়ে ইসলামী অর্থনীতি এন্টারপ্রাইজের স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদের সদৃশ হয়ে যায় না। দুটোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান দুটো প্রধান কারণে। প্রথমত, ইসলামী ব্যবস্থায় যদিও সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত, তবু এটি বান্দার কাছে আল্লাহপ্রদত্ত আমানত। কারণ আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছে এগুলো আমানত। </strong></p>
<p>কোরআনের ভাষ্যমতে-</p>
<p>&#8220;আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর অধীন।&#8221; (২: ২৮৪)</p>
<p>&#8220;(হে নবী।) এদের জিজ্ঞেস করো, এ যমীন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কার (মালিকানাধীন)? তারা বলবে, এ সবকিছুই আল্লাহর।&#8221; (২৩:৮৪-৮৫)</p>
<p>&#8220;আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে দান করো।&#8221; (২৪:৩৩)</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, মানুষ যেহেতু পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা এবং সে যে সম্পত্তির মালিক তা তার কাছে আল্লাহর দেওয়া আমানত, তাই সে আমানতের শর্তাবলি মানতে বাধ্য।</strong> আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে সে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধের সীমারেখা, বিশেষ করে হালাল-হারাম, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, সামগ্রিক কল্যাণকামিতার মধ্যে আবদ্ধ। তাই সে যে সম্পদ উপার্জন করবে তা হালাল উপায়ে করতে হবে এবং এটিকে সে উদ্দেশ্যে ব্যয় করতে হবে, যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন। রাসূল (স.) ইরশাদ করেন, &#8220;এই সম্পদ নিঃসন্দেহে তাজা এবং সুমিষ্ট। কিন্তু যে এটিকে ন্যায়সংগতভাবে অর্জন করে, তার জন্য। আর যে এটিকে অন্যায় পন্থায় অর্জন করে, তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতো যে খেতেই থাকে, কিন্তু কখনো তৃপ্ত হয় না। (৬২)</p>
<p>এখন, এই দুটো বিষয় কী পার্থক্যের সৃষ্টি করে? এটি পরিষ্কার হবে যদি পুঁজিবাদী অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থা নিয়ে একটু আলোচনা করা যায়।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থাকে গণভোটের সাথে তুলনা করা যায় যেখানে একজন ব্যক্তি কর্তৃক ব্যয়কৃত প্রতিটি মুদ্রা একেকটি ব্যালট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং সকলের সব ব্যালটের ভিত্তিতে মোট জাতীয় সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় হবে। যদি দুধের পরিবর্তে লিকারের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তার কারণ হলো, লিকারের চাহিদা জনগণের মধ্যে বেশি। তাই জাতীয় সম্পদ থেকে লিকার উৎপাদনে ব্যয়ের অংশ বেশি। এভাবে মূল্য ব্যবস্থায়, প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম (optimum) বণ্টন নিশ্চিত হয়। বাজার ব্যবস্থা এখানে নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে আসীন হয় এবং কেবলমাত্র ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখনো নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে না। ইসলামে সম্পদের বরাদ্দ তখনই সর্বোত্তম হিসেবে গণ্য হয়, যদি তা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী না হয় এবং ভোক্তার পছন্দ অনুযায়ী হয়। প্রকৃত ইসলামী সমাজে এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা নেই এবং রাষ্ট্র সেখানে নিষ্ক্রিয় দর্শক হতে পারে না। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র তার জনগণকে ইসলামী মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে থাকে, ফলে তাদের পছন্দও সে আদলে হয়ে থাকে এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যের আলোকে পরিচালনা করে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে সম্পদের বণ্টন ইসলামী আদর্শের আলোকে হচ্ছে কিনা এ রায় কে দিবে? এটি কোনো গীর্জার হায়ারার্কির কর্তৃত্বে হবে না, কেননা ইসলাম এরকম কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। তাই ইসলামের আবহমান রাজনৈতিক আদর্শ অনুসারে গণতান্ত্রিক পন্থায় যেকোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> যেহেতু প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় মুদ্রাকে ব্যালটের সাথে তুলনা করা হয়, তাই ব্যক্তিভেদে সবার চাহিদা এবং জরুরতকে মুদ্রার মূল্যে বিবেচনা করা হয়। যদি দুজন ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবার জন্য সমান অর্থব্যয়ে প্রস্তুত থাকে, তবে ধরে নেওয়া হয় তাদের দুজনের কাছে এই জিনিসটির চাহিদা বা জরুরত একই। এমনকি এ ধরণের তুলনা যদি সম্ভবপর হয়ও, তাহলে মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় সম্পদের কাঙ্ক্ষিত বণ্টনের জন্য আয়ের সমবণ্টন বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। যদি তা না থাকে, তাহলে এধরণের বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদিত সম্পদের বণ্টন অধিকাংশ ভোক্তার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। এর ফলে একটি পুঁজিপতি উচ্চবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হবে যারা সংখ্যায় কম হওয়া সত্তেও তাদের হাতে জাতীয় সম্পদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুঞ্জিভূত থাকবে। এবং তথাকথিত ভোটের ওয়েট (weight) দিয়ে তারা দুর্লভ জাতীয় সম্পদগুলোকে সামাজিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরবে। ফলশ্রুতিতে জাতীয় সম্পদের যে বণ্টন হবে তাও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। অন্যদিকে ইসলামী অর্থনীতিতে মুদ্রাব্যবস্থা ব্যক্তিগত ভোটের মূল্যমানে নির্ধারিত হওয়ার পরিবর্তে কোনো একটি পণ্য বা সেবার জন্য সর্বমোট কতটি ভোট বিদ্যমান তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সুতরাং, এখানে সম্পদের প্রত্যাশিত বণ্টন নির্ধারণ করার পূর্বশর্ত হলো, আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, যা ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> একচেটিয়া (monopoly) ও মনোপসনি (monopsony) বাজার ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে, বা এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যাতে পণ্যের দামে (price) এর সঠিক খরচ (cost) ও উপকারিতা প্রতিফলিত হয় না। পণ্যের দাম তার সুযোগ ব্যয় থেকে কম-বেশি হওয়ার কারণ শুধু এই নয় যে, উদ্যোক্তার পারিশ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় কম বেশি হতে পারে। তার কাজের সামাজিক মূল্যমান ও উপকারিতাকে অবজ্ঞা করার কারণেও এটি ঘটতে পারে। অন্যদিকে ইসলামে সামাজিক অগ্রগতির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। যদিও মূল্য ব্যবস্থার আত্ম-সংশোধনের প্রবণতা বিদ্যমান যার ফলে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক স্বার্থের দূরত্ব দূর হওয়া সম্ভব, কিন্তু কার্যকারিতার (operational) ত্রুটি এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সীমিত স্বাধীনতার জন্য এটি অসহনীয় দীর্ঘ সময় নেয়। এই পরিস্থিতিতে কোনো একটি উন্নয়নমূলক সরকারব্যবস্থার নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনা ব্যতীত এই বাজার ব্যবস্থাটি কখনো সম্পদের সর্বোত্তম বণ্টন (optimum allocation) নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না।</p>
<p><strong>চতুর্থত,</strong> পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তি তার পণ্যের প্রাথমিক মালিক, তাই এগুলো দিয়ে সে যা খুশি তাই করতে পারে। নৈতিক কোনো সীমারেখা না থাকায়, সে চাইলে মূল্যবৃদ্ধির জন্য পণ্যকে পুড়িয়ে ফেলা বা সমুদ্রে নিক্ষেপ করার মতো জঘন্য কাজও করতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থায় যেহেতু সব সম্পদ আল্লাহর দেয়া আমানতস্বরূপ, তাই এটি একটি মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। জান-মালের ক্ষতি সাধনকে কোরআনে দুর্নীতি ও পাপের সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। (২ : ২০৫) এটি সে আয়াত, যা হযরত আবু বকরকে (রা.) তার সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে যুদ্ধে প্রেরণের সময় অন্যায়ভাবে কাউকে হত্য না করতে এবং এমনকি শত্রুপক্ষের ভূমিতেও কোনো শস্যক্ষেত ও পশুপাখির ক্ষতি না করার নসিহত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।(৬৩) যদি যুদ্ধক্ষেত্রেই এটি অনুমোদিত না হয়, তবে স্বাভাবিক সময়ে বা মূল্যবৃদ্ধির জন্য এধরণের কাজ গ্রহণযোগ্য হবার তো প্রশ্নই আসে না।</p>
<p><strong>পঞ্চমত,</strong> এমনকি বাজার পরিচালনায় সুস্থ প্রতিযোগিতার শর্তেও এটি বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা অচলাবস্থা মোকাবেলার জন্য কিংবা পণ্যদ্রব্যের ন্যায্য বণ্টনের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। তাই, এর জন্য সুনির্দিষ্ট আদর্শিক লক্ষ্য ভিত্তিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।</p>
<p><strong>ষষ্ঠ বিষয় হলো,</strong> এরকম প্রতিযোগিতা নির্ভর বাজারে সফলতার রাস্তাগুলো অনেক সময় নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার এবং আয়ের ন্যায্য বন্টনের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকারের তত্ত্বাবধানে না থাকলে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অযোগ্যরা জায়গা পেয়ে যেতে পারে, আবার বিপরীতে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজগুলো পেছনে পড়ে থাকতে পারে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।</p>
<p>অতএব, ইসলাম যদিও একটি বাজার ব্যবস্থার রূপরেখা আমাদের দিয়ে দিয়েছে, তথাপি এটি অপরিবর্তনীয় চিরস্থায়ী কোনো কিছু নয়। মূলত এটি হলো একটি ব্যবস্থা যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা, বিশেষ করে ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটি। সেজন্য ইসলামী আদর্শের আলোকে প্রয়োজন ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বাজারব্যবস্থাকে সাজিয়ে নিতে হবে। ইসলাম এক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে সরকার এককভাবে কখনো অর্থনৈতিক সুবিচার ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তিতে একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে না, হয়তো কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করতে সক্ষম হবে। অন্যান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দূর করতে হলে আখলাকী দর্শনকে সমাজের গভীরে প্রোথিত হতে হবে। যাকে সজ্জিত হতে হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার, সামাজিক উন্নয়ন এবং আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের আদর্শে। সুতরাং, পুঁজিবাদ যদিও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে এটিকে আলাদা করেছে সেকুলারিজম; এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার ও জনকল্যাণের স্বার্থে একটি সুস্পষ্ট আখলাকী দর্শনের অনুপস্থিতি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> নাজিয়া তাসনীম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা-</p>
<p>১. দ্রষ্টব্য: সূরা মায়েদার তাফসীর (০৫:৮৭), কাশশাফ, বৈরুত ১৯৪৭, খণ্ড ১. পৃ. ৬৭। ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, কায়রো, খণ্ড ২. পৃষ্ঠা. ৮৭-৮৮। আরও দেখুন, বুখারী, কায়রো, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৯-৫০; মুসলিম, কায়রো ১৯৫৫, খণ্ড ২, পৃ. ৮১২-১৮: দারেমী, দামেশক ১৩৪৯ হিজরী, খণ্ড ২. পৃ. ১৩৩।</p>
<p>২. কোরআন ২:১৭২, ৬:১৪২, ৭:৩১ এবং ১৬০, ১৬:১১৪, ২০:৮১, ২৩:৫১, ৩৪:১৫, ৬৭:১৫</p>
<p>৩. ইবনে মাজাহ, কায়রো, ১৯৫২. খণ্ড ২, পৃ. ৭২৭:২১৪৮</p>
<p>৪. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃঃ ১২৮; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১১৮৯:১২, এবং তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃ. ৬৬৬:১৩৮-২</p>
<p>৫. বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত, দামেশক, ১৩৮১ হিজরী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫৮:৫২০৭</p>
<p>৬. দ্রঃ &#8220;তোমরা কি দেখো না, নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন? আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ কোনো জ্ঞান, কোনো পথনির্দেশ বা কোনো দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে&#8221;। সূরা লোকমান, (৩১:২০); এছাড়া, কোরআনে অনুরূপ আরো বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, দ্রঃ ১৪:৩২-৩৩, ১৬:১২-১৪; ২২; ৬৫ এবং ৪৫:১২</p>
<p>৭. বুখারী, খণ্ড ৭, পৃ. ১৫৮; ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১১৩৮:৩৪৩৯</p>
<p>৮. &#8220;কারো নিকট ভিক্ষা করো না&#8221;, আবু দাউদ, কায়রো ১৯৫২, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮২; উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে অধিকতর উত্তম, বুখারী, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৩; নাসায়ী, খণ্ড ৫, পৃ. ৪৫-৪৬। এছাড়া দ্রঃ ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৩:২১৩৮; নাসায়ী, কায়রো ১৯৬৪, খণ্ড ৭, পৃ. ২১২</p>
<p>১. দ্র: আবু যাহরাহ, উসূল আল ফিকহ, দামেশক ১৯৫৭, পৃ. ৩৫৫</p>
<p>১০. আবু হামিদ আল গাজালী, আল মুসতাসফা, কায়রো ১৯৩৭, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯-৪০</p>
<p>১১. ইবনুল কাইয়্যিম, ই&#8217;লামুল মুয়াক্কিইয়ীন, কায়রো ১৯৫৫</p>
<p>১২. ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৬৭</p>
<p>১৩. ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৫, ২১৪৪</p>
<p>১৪. দ্রঃ কোরআন (৪:৭৭, ২৯:৬৪, ৫৭:২০-২১); ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৭৮:৪১১৪</p>
<p>১৫. বুখারী, পৃ. ১১৩:৩০১</p>
<p>১৬. বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত, দামেশক, ১৩৮১ হিজরী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫৯:৫২১৩</p>
<p>১৭. মুসনাদে আহমাদ, মিশকাতে উদ্ধৃত, খণ্ড ২, পৃ. ৬৩:১:৫১৭৯</p>
<p>১৮. ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৫:২১৪৩</p>
<p>১৯. ইবনে আসাকিরের বরাতে উদ্ধৃত, সামান্য শব্দভেদে একই রেওয়ায়েত উল্লেখ হয়েছে, সুয়ুতীর জামি আস সাগীর, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৫</p>
<p>২০. তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৮, পৃ. ৮৪</p>
<p>২১. ইবনে কাসীর, তাফসীর, খণ্ড ৪, পৃ. ২১৮, দেখুন-সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতের তাফসীর।</p>
<p>২২. শাতিবী, আল মুওয়াফিকাত ফি উসূল আশ শারীয়াহ, কায়রো, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৪: বুখারী, মুসলিম এবং নাসায়ীর বরাতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>২৩. আল কোরআন, ৩৩:৫, এবং ৪৯:১০</p>
<p>২৪. মিশকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৬১৩:৪৯৯৮, বায়হাকীর শু&#8217;আবুল ঈমানের উদ্ধৃতিতে মিশকাতে উল্লিখিত।</p>
<p>২৫. প্রাগুক্ত, ৬০৮:৪৯৬৯, আবু দাউদ ও তিরমিযীর বরাতে উল্লিখিত।</p>
<p>২৬. বুখারী, খণ্ড ৮, পৃ. ১২; মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৯৯, একইসাথে দেখুন ৬৫ এবং ৬৭নং হাদীস।</p>
<p>২৭. মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৮৬:৩২</p>
<p>২৮. মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৮৭:৩৪</p>
<p>২৯. বুখারী, খণ্ড ৮, পৃ. ১৫</p>
<p>৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৯ এবং নাসায়ী, খণ্ড ৮, পৃ.৬৫</p>
<p>৩১. মুসনাদ ইমাম আলী আল রিদা, বৈরুত ১৯৬৬, পৃ. ৪৭৪</p>
<p>৩২. আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, কায়রো ১৩৬৭ হিজরী।</p>
<p>৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪ এবং ৬</p>
<p>৩৪. দেখুন, কোরআন ৮৩:১-৩</p>
<p>৩৫. মুসনাদ এবং বায়হাকীর শুআবুল ঈমানের বরাতে সুয়ূতী উদ্ধৃত করেছেন, খণ্ড ১, পৃ. ৮</p>
<p>৩৬. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ. ১১২</p>
<p>৩৭. কিছু উদ্ধৃতিতে (হাদীস অথবা অন্যান্য) &#8216;দাস&#8217;দের সাথে সম্পর্কিত হলেও অনুবাদে কর্মচারী ব্যবহার করা হয়েছে। একজন দাসের সাথেও যখন আদিল ও মানবিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সে তুলনায় একজন কর্মচারীর সাথেও অবশ্যই তার চেয়েও অধিক ভালো আচরণ করতে হবে।</p>
<p>৩৮. মালিক, মুয়াত্তা, কায়রো ১৯৫১, খণ্ড ২, পৃ. ৯৮০:৪০</p>
<p>৩৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৮১:৪২</p>
<p>৪০. বুখারী, পৃ. ১৫ এবং খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৫; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৮৩:৩৮</p>
<p>৪১. &#8220;আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তুমি ইনশাআল্লাহ আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত পাবে: (সূরা ত্বহা, ২৮:২৭), হযরত শুয়াইব (আ.) যখন মুসা (আ.) কে কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তখন এমনটা বলেছিলেন। যা যেকোনো কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি অনন্য কোরআনী উপদেশ।</p>
<p>৪২. বুখারী, খণ্ড ১. পৃ. ১৬ এবং খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৫; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৮৩:৩৮ এবং 80</p>
<p>৪৩. মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১৫৪৮:৫৭</p>
<p>৪৪. বায়হাকীর শুআবুল ঈমানের বরাতে সুয়তী উল্লেখ করেছেন, খণ্ড ১, পৃ. ৭৫</p>
<p>৪৫. বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৬</p>
<p>৪৬. আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃ. ১২১</p>
<p>৪৭. বুখারী, পৃ. ৫২৪১১২</p>
<p>৪৮. হোসাইন হায়কল, উমার আল ফারুক, কায়রো ১৯৬৪, খণ্ড ২, পৃ. ২৩৩</p>
<p>৪৯. আবু উবাইদ, কিতাবুল আমওয়াল, কায়রো ১৩৫৩ হিজরী, পৃ. ৫৯৫:১৯০৯, সামান্য শব্দভেদে উল্লিখিত হয়েছে, নাহজুল বালাগা, কায়রো, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩১</p>
<p>৫০. প্রাসঙ্গিক বর্ণনার জন্য দেখুন, সিদ্দিকী, ইসলাম কা নাযারিয়ায়ে মিলকিয়াত, লাহোর ১৯৬৮, পৃ. ২৭২-৭৯</p>
<p>৫১. রাসূল (স.) যখন মুয়ায (রা.)-কে ইয়েমেনের গভর্ণর হিসেবে নিযুক্ত করেন, তখন তাকে দায়িত্বের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিলো, &#8216;মানুষকে এ কথা বোঝানো যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরজ করেছেন, যা সম্পদশালীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে, এবং দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা হবে&#8217;। দেখুন-বুখারী, খণ্ড ২, পৃ. ১২৪; তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃ. ২১:৬২৫; এবং নাসায়ী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩ এবং ৪১</p>
<p>৫২. সূরা তাওবার ৩৪ নং আয়াতের তাফসীর দেখুন, ইবনে কাসীর, তাফসিরু কুরআনিল আযীম, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫২; এবং জাসসাস, আহকামুল কুরআন, কায়রো ১৯৫৭, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩০</p>
<p>৫৩.দ্র: তাফসীর ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫০-৫৩</p>
<p>৫৪. আলী আল তানতাবী ও নাজী আল তানতাবী, আখবারু উমার, দামেশক ১৯৫৯, পৃ. ২৬৮</p>
<p>৫৫. উদ্ধৃত, ইউসুফউদ্দীন, ইসলাম কি মাশি নাজরিয়াত, হায়দারাবাদ, ভারত, খণ্ড ১, পৃ. ১৪০</p>
<p>৫৬. আল হিদায়াহ, কায়রো ১৯৬৫, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮১, আরো দেখুন, জাযিরী, কিতাবুল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবাআ, কায়রো ১৯৩৮, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৯</p>
<p>৫৭. আল হিদায়াহ, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮১ এবং জাযিরী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৯</p>
<p>৫৮. এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার জন্য, দেখুন-শাতিবী, খণ্ড ২, পৃ.৩৪৮-৬৪; আবু যাহরাহ, পৃ. ৩৫০-৬৪; দাওয়ালিবী, আল মাদখাল ইলা ইলমিল উসূল আল ফিকহ, বৈরুত ১৯৬৫, পৃ. ৪৪৭-৪৯</p>
<p>৫৯. জাফিরী, খণ্ড ২, পৃ. ১৫৩-১৬৮</p>
<p>৬০. উদ্ধৃত, ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, কায়রো ১৯৬০, খণ্ড ২, পৃ. ১৬৭</p>
<p>৬১. জাফিরী, খণ্ড ২, পৃ. ২৮৩-২৮৪</p>
<p>৬২. মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৭২৮:১২২</p>
<p>৬৩. মালিক, মুয়াত্তা, খণ্ড ২, পৃ. ৪৪৮:১০; আরও দেখুন, মাওয়ারদী, আহকামুস সুলতানিয়া, কায়রো, ১৯৬০, পৃ. ৩৪</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/objectives-of-economic-provisions-in-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16080</post-id>	</item>
		<item>
		<title>এক নতুন অর্থনীতির প্রয়োজন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/a-new-economy-is-needed/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/a-new-economy-is-needed/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Jul 2025 11:45:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15963</guid>

					<description><![CDATA[দুনিয়ার অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে একটা নতুন চিৎকার ধ্বনিয়া উঠিয়াছে। এই চিৎকার যেমনি ভাঙ্গা গলার,তেমন বলিষ্ঠও নয়; তবু উহার প্রতি জনগণের উৎকণ্ঠা না জাগিয়া পারে নাই। সে চিৎকার হইল, একটু নতুন অর্থব্যবস্থা (New Economic order) চাই যাহা বর্তমানের বিরাজমান অর্থ ব্যবস্থার দুর্বহ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দুনিয়ার অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে একটা নতুন চিৎকার ধ্বনিয়া উঠিয়াছে। এই চিৎকার যেমনি ভাঙ্গা গলার,তেমন বলিষ্ঠও নয়; তবু উহার প্রতি জনগণের উৎকণ্ঠা না জাগিয়া পারে নাই। সে চিৎকার হইল, একটু নতুন অর্থব্যবস্থা (New Economic order) চাই যাহা বর্তমানের বিরাজমান অর্থ ব্যবস্থার দুর্বহ চাপে নির্যাতিত নিষ্পেষিত ও শোষিত –বঞ্চিত জনগণকে নিষ্কৃতি ও স্বস্তি দিতে পারিবে। কেননা বর্তমানের যাবতীয় মানব-রচিত অর্থব্যবস্থা মানবজাতির অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে। শুধু তাহাই নয়, যে অর্থ ব্যবস্থা বর্তমানে বিভিন্ন দেশে কার্যকর রহিয়াছে, তাহা পুঁজিবাদ হউক, কি সমাজতন্ত্র, মানুষের জীবনে নিত্যনতুন জটিল সমস্যা ও অর্থনৈতিক ব্যাধির সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। সাধারণ মানুষকে ঠেলিয়া দিতেছে নির্মম কষ্টদায়ক দারিদ্র ও দুঃসহ অভাব অনটনের গভীরতম পংকে। এই অর্থব্যবস্থা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে পেট ভরিয়া খাবার, লজ্জা ঢাকার বস্ত্র ও রৌদ্র-বৃষ্টি, পথিকের শাণিত-উষ্ণ দৃষ্টিবান হইতে রক্ষাকারী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করিয়া দিতে সম্পূর্ণ অক্ষমতার প্রমাণ দিয়াছে। নানাবিধ রোগ-ব্যাধি, রক্তহীনতা ও অপুষ্টি হইতে মুক্তি দেওয়া উহার পক্ষে সম্ভবপর হয় নাই।</p>
<p>অথচ এই মানব-দুশমন অর্থব্যবস্থাই বর্তমান সময়ের বিশ্বমানবতাকে অক্টোপাশে বাঁধিয়া রাখিয়াছে,বন্দী করিয়াছে দাসত্বের দুশ্ছেদ্র শৃঙ্খলে। উহার দাপট-প্রতাপে প্রত্যেকটি নর-নারী কঠিনভাবে প্রকম্পিত হইতেছে প্রতি মুহূর্তে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার আকাশ ছোঁয়া পার্থক্য দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। বরং দরিদ্ররা ক্রমশ অধিকতর দারিদ্রের গভীরে তলাইয়া যাইতেছে। আর ধনীরা শনৈঃ শনৈঃ উচ্চ হইতেও উচ্চতর পর্যায়ে উঠিয়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে। ইহারফলে সমাজ-সভ্যার স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট হইতেছে। মুদ্রাস্ফীতির প্লাবন-স্রোতে সাধারণ মানুষ রসাতলে ভাসিয়া যাইতেছে। ক্ষুধা ও রোগ মানব দেহের গোশত ও মগজ কুরিয়া কুরিয়া খাইতেছে, বিন্দু বিন্দু করিয়া শুষিয়া নিতেছে রক্তের শেষবিন্দুটিও। দরিদ্র জনতা করভারে জর্জরিত। কর প্রথার পর্বত তাহাদের মেরুদণ্ড ভাংগিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিতেছে। সুদী কারবার সুদভিত্তিক অর্থনীতি লুটিয়া নিতেছে মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া ও রক্ত নিঙড়াইয়া উপার্জন করা শেষ করিটিও। বস্তুত এই হইল বর্তমান দুনিয়ার প্রচলিত সর্বপ্রকার অর্থব্যবস্থার তিক্ত বিষাক্ত পরিণতি। অথচ এই সব কয়টি অর্থব্যবস্থা-ই মানুষকে ভূ-স্বর্গের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা-অগ্রগতি দানের প্রতিশ্রুতি দিয়া জনজীবনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এখানে তাহাই তাহাদিগকে লইয়া যাইতেছে দারিদ্রের দাউ-দাউ করিয়া জ্বলিতে থাকা জাহান্নামের দিকে অতি দ্রুত গতিতে। উহাদের গাল ভরা দাবি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা প্রমাণিত হইয়াছে।</p>
<p>অবশ্য মজার কথা হইল, বর্তমানে প্রচলিত পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি পরস্পরকে এই অবস্থার জন্য অভিযুক্ত ও দায়ী করিতেছে। কেননা বর্তমান মানবতার মর্মান্তিক অবস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করিতে কোনোটাই প্রস্তুত নয় বরং এই সবের প্রত্যেকটিই অপরটিকে প্রতিরোধ করিবার জন্য সর্বশক্তি কোনোটাই করিয়া চলিয়াছে। অথচ মানবরচিত এই কয়টি অর্থনীতির সার নির্যাস অভিন্ন পরিণতি সর্বতোভাবে এক। একই পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে সমগ্র মানবকুলকে। এককথায়, সে পরিণতি নিয়োগ Exploitation of masses by a handful coterie মুষ্টিমেয় কতিপয় কর্তৃক ব্যাপক জনগোষ্ঠীর শোষণ।</p>
<blockquote><p><em><strong>বর্তমানে প্রচলিত অর্থব্যবস্থা সমূহের নামের পার্থক্য থাকিলেও এই সব গুলিই একই মৌল হইতে নির্গত, একই উৎস হইতে উৎসারিত। কমিউনিস্ট ঘোষণাপত্র (Communists manifesto) এবং মিলস –এর Political Economy দুইটি ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী অর্থব্যবস্থা উপস্থাপিত করিলেও উভয়টিই একই সময়ে- ১৮৪৮ সনে প্রকাশিত ও উপস্থাপিত হইয়াছিল। একই স্থান- অর্থাৎ লন্ডন- হইতে দুইটিই আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। আর এই দুইটি অর্থব্যবস্থার পশ্চাতেই প্রেরণাদায়ী শক্তি হিসাবে কাজ করিয়াছে বিশ্ব ইহুদীবাদ। এই দুইটি অর্থব্যবস্থার মধ্যে একটি হইল ব্যক্তিতান্ত্রিক পুঁজিবাদ আর অপরটি হইল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ- যদিও উহার নাম দেওয়া হইয়াছে সমাজতন্ত্র (Socialism)। কিন্তু দুইটিই জনমানুষকে শোষণ করার উপর নির্ভরশীল। এই দুইটির মধ্যে কোন পার্থক্য থাকিলে তাহা শুধু মাত্রার পার্থক্য মাত্র। কিন্তু শোষণ এক ব্যক্তি দ্বারা হউক, কি হউক রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক, তাহাতে মূল বা পরিণতির দিক দিয়া কোনই পার্থক্য সূচিত হয় না।</strong></em></p></blockquote>
<p>তবে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে রাষ্ট্রের হাতে অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তির সম্পূর্ণ একীভূত হওয়ার কারণে উহার শোষণটা সর্বাত্মক যেমন, তেমনি ‍খুবই নির্দয় ও মর্মান্তিক। সেখানে মানুষ সম্পূর্ণ রূপে নিরুপায় ও চরমভাবে অসহায়। ব্যক্তিতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণে- মানুষ বলিয়া- কিছুটা দয়ার অবকাশ থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক শক্তি হিসাবে রাষ্ট্রের শোষণে দয়া-মায়া-ক্ষমার কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে না। বরং সেখানে দয়া, সহানুভূতি বা মানবিক সহমর্মিতার কথা চিন্তা করাই অবাস্তব। কমিউনিজম সমাজতন্ত্রের চরম ও চূড়ান্ত রূপ। উহারই উপর অর্পিত হইয়াছে পুঁজিবাদকে চিরস্থায়ী করণের কঠিন দায়িত্ব এবং উহা তাহাই করিতেছে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করিয়া। কেননা সমাজতন্ত্রের নিজস্ব কোন অর্থনীতি নাই, ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা। আসলে উহা একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যবস্থা (Political System) মাত্র। প্রকৃত পক্ষে উহার অর্থ সংস্থা ও ব্যবস্থাপনা ঠিক তাহাই, যাহা পুঁজিবাদের সংস্থা ও ব্যবস্থাপনা। কাল মার্কস একজন সাংবাদিক পিতার সন্তান ছিলেন। তাঁহার রাজনৈতিক বিষয়াদির সমালোচনা করার দক্ষতা ছিল প্রচন্ড। তাঁহার রচনাবলীতে অর্থনৈতিক বিষয়াদি পর্যায়ে যাহা কিছু পরিলক্ষিত হয় তাহা মূলত পুঁজিবাদ হইতে ভিন্নতর কিছু নয়। এমন কি, কমিউনিষ্টদের বাইবেল ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’- পুঁজিবাদের সাফল্যের উপর একটা গুরুত্বপূর্ণ দলীল ছাড়া আর কিছুই নয়। উহাতে বলা হইয়াছে:</p>
<p><strong>The bourgeosie during its rule for nearly 100 years has created more massive and more closed productive forces than have all preceding generations together.</strong></p>
<p>শ্রম মূল্য মতাদর্শের (Labour theory of value) ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়, সমাজতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষ বিপুল সংখ্যক সাধারণ অ-নিপুণ-অযোগ্য শ্রমিকদিগকে সকল ধরনের যোগ্য ও সুদক্ষ শ্রমিকদের সমান পর্যায়ে আনিয়া শ্রম মূল্যকে গণিত শাস্ত্রের গণনা পদ্ধতি চালু করিতে এখন পর্যন্তও সক্ষম হয় নাই। শ্রম-মূল্য মতাদর্শের ভিত্তিতে মূল্য (Value) নির্ধারণ করিতেও সফল হইতে পারে নাই সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা-বিশারদরা।</p>
<p>বস্তুত সমাজতান্ত্রিক মুল্য নির্ধারণ পদ্ধতি যে অতিশয় অসন্তোষজনক, তাহা সর্বজনস্বীকৃত সত্য। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাড়তি মূল্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের তুলনায় অনেক উচ্চ ও বেশী। তাই উহা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের ক্ষেত্রেই তাহা বেশী প্রযোজ্য। Prof. Kantorovich linear programming-এর উদগাত। তিনি যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মূল্য গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করিয়অছেন, তাহা বিভিন্ন পণ্যের আপেক্ষিক ‍দুষ্প্রাপ্যতার ভিত্তিতে গড়িয়া উঠিয়াছে,-যেমন উহার পড়তা খরচ ধরিয়া করা হয়।</p>
<p>বড় বড় ব্যবসায়ের পরিবর্তে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া মালিকানার অধীন বহু সংখ্যক ব্যবসায় পরিচালিত হইতেছে। ফলে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থা / Corporations-সমূহ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সহকারেই সমধিক প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ট্রেড ইউনিয়নসমূহ শক্ত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হইয়াছে। শুরু তে দুইটি পদ্ধতির মধ্যে যে সামান্য পার্থক্য ছিল, এখন তাহা আদৌ পরিলক্ষিত হইতেছে না। বরঞ্চ উভয় পদ্ধতির মধ্যে সাদৃশ্য ও সাযুজ্য প্রকট।</p>
<p style="text-align: left;"><em>দুইটিই সুদের ভিত্তিতে চলে। আর তাহাই হইল সাধারণ মানুষকে শোষণ করার বড় হাতিয়ার। এই উভয় ধরনের অর্থ-ব্যবস্থার মূলে আসল অবদান ইয়াহুদীদের। আর বর্তমান দুনিয়ার অর্থনীতি যে ইয়াহুদীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত, তাহা কাহারো অজানা থাকার কথা নয়। The jews and modern Capitalism গ্রন্থ প্রণেতা সম্বার্ট(Sombart) বলিয়াছেন: <strong>The Jews were responsible for both the outward for, and finward spirit of capitalism .</strong></em></p>
<p>পঞ্চদশ ও ষষ্ঠাদশ শতাব্দীর মধ্যে (১৪৯২ খৃস্টাব্দ) ইয়াহুদীরা স্পেন (১৪৯২ খৃঃ) পর্তুগাল(১৪৯৫-১৪৯৭ খৃঃ) কলন (১৪২৪ খৃঃ) ও অন্যান্য শহর-নগর এবং পরবর্তী সময়ে কতিপয় ইতালীয় শহর হইতে বহিষ্কৃত ও বিতাড়িত হইয়াছিল। দক্ষিণ দিক হইতে তাহাদিগকে উত্তর দিকে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। তাহারা বিলাস দ্রব্যের যেমন অলংকার, সিল্ক ও মূল্যবান পাথর প্রভৃতির একচেটিয়া ব্যবসায়ের মালিক হইয়া বসে। রপ্তানি বাণিজ্যেও তাহাদের প্রাধান্য ছিল। তাহারা বহু সংখ্যক উপনিবেশ গড়িয়া তোলার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। কলম্বাসকেও তাহারা অপরিমেয় অর্থ দিয়াছিল। এই কলম্বাসও একজন ইয়াহুদী ব্যক্তি ছিল। এইভাবে আধুনিক রাষ্ট্রে তাহারাই অর্থের বড় যোগানদার হইয়া দাঁড়ায়। তাহারাই এই সব নতুন গড়িয়া উঠা রাষ্ট্রসমূহের নিকট বিক্রয় করে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ও খাদ্য। <strong>The Jewes and modern Captalism</strong> গ্রন্থে বলা হইয়াছে: <strong>“Arm in arm, the jew and the ruler stride through the age”</strong>পুঁজিবাদ যত উপায় ও পন্থা-পদ্ধতির সার্থক প্রয়োগ করিয়া সাধারণ মানুষের রক্ত শোষণ করিয়াছে তাহার সবগুলিরই অস্ত্রাগার নির্মাণ করিয়াছে ইয়াহুদীরাই। তন্মধ্যে সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থা, ঋণপত্রের (Securities) বাজার, Modern credit instruments, stock promotion, instalment selling, বিজ্ঞাপন ও আধুনিক পত্র-পত্রিকা পরিচালনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য।</p>
<p><strong>মনে রাখা আবশ্যক, ইয়াহুদীদের একটা বিশেষত্ব হইল, একবার যে ইয়াহুদী, সে সব সময়ই ইয়াহুদী-দ্বিতীয় ও তৃতীয় বংশ শাখায় পৌঁছিয়া গেলেও সে আবশ্যক থাকিবে। এই বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি ও কতকগুলি অবস্থানগত সুযোগ-সুবিধা ও ঘটনা দুর্ঘটনা দুনিয়ায় সর্বাধিক প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী হইয়া উঠিতে তাহাদিগকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করিয়াছে।</strong></p>
<p>ইয়াহুদীরা দুর্বল ও স্বল্প সংখ্যক, তাহাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তাহারা সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন ও সার্বক্ষণিকভাবে বিরাজমান, পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত। তাহাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম ও কায়-কারবার তাহাদের নিজেদের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত ও সম্পাদিত।</p>
<p>আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেশন, বিশ্ব সমিতি, ফ্রীম্যাসন, লায়ন ও রোটারী ক্লাব, বহুল প্রচলিত আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকা,বৃত্তি, সভা-সম্মেলন এবং বহু সংখ্যক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য (Visible and invisible) কর্মতৎপরতা তাহারা সমানভাবে অবলীলাক্রমে চালাইতেছে এবং তাহাতে দুনিয়ার সব ধরনের মানুষকে সচেতন বা অবচেতনভাবে জড়িত করিয়া রাখিয়াছে। আর একটা অজানা পরিণতির দিকে ঠেলিয়া লইয়া যাইতেছে এই নাবুঝ মানুষগুলিকে। সারা দুনিয়ার মানুষ ইয়াহুদীদের প্রতি যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তাহারা এই সব কর্মতৎপরতার দ্বারা তাহারই প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেছে মাত্র।</p>
<p>তাই বর্তমানে বিরাজিত এই সব অর্থ ব্যবস্থা যখন অচল হইয়া গিয়াছে, তখন তাহাদের আয়োজিত নাটকের নায়কেরা (Protogonists) শুরু করিয়াছে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে লোকদিগকে ভীত-সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিতে এবং ইসলামী অর্থব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে নানাভাবে সুদ ও জুয়ার সহিত সম্পৃক্ত করিয়া উহাকেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ করিয়া দিতে। কেননা একমাত্র এই অর্থ ব্যবস্থা-ই তাহাদের সর্বাত্মক শোষণ, স্বার্থপরতা ও ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ খতম করিয়া দিতে সক্ষম। তাহারা ভালো করিয়াই জানে ও অনুধাবন করিতে পারিয়াছে যে, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করিতে পারে কেবলমাত্র ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যবস্থা- তাহা যে রূপের ও যে আকার-আকৃতেই হউক-না-কেন। তাহাদের চালু করা বিষাক্ত সুদ প্রথা ও অন্যান্য মারাত্মক ব্যবস্থাগুলির সমস্ত খারাপ প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবকে কেবলমাত্র ইসলাম-ই পারে ধুইয়া মুছিয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সম্পূর্ণ সুস্থ ও দোষমুক্ত করিয়া তুলিতে।</p>
<p>তাই ইসলাম ও ইসলামী অর্থব্যবস্থায় প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে তাহারা নতুন বোতলে সেই পুরাতন মদ্যই পরিবেশন করিতে শুরু করিয়াছে সর্বাত্মক শক্তি দিয়া- যদিও তাহা কিছুটা পরিশীলিত করিয়া। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার পুরাতন ভিত্তির উপর তাহারা নতুন প্রাসাদ গড়িয়া তুলিয়াছে সমাজতন্ত্রের নামে। কিন্তু সমাজতন্ত্র কোন দিক দিয়াই কোন নতুন ব্যবস্থা নয়। এই জন্য শুরুতে তাহারা যে পদ্ধতিতে কাজ করিয়াছিল, এখনো অব্যাহতভাবে তাহাই চালাইয়া যাইতেছে। মূল অর্থব্যবস্থায় নিহিত আসল ক্ষতি ও দোষ-ত্রুটি তাহারা কিছুমাত্র দূর করে নাই। ফলে সাধারণ মানবতার বিপদকে দীর্ঘায়িতই করা হইয়াছে। এই কারণে আজ একথা বলা ছাড়া কোন উপায়ই নাই যে, বর্তমানে প্রচলত গোটা অর্থ ব্যবস্থাকেই উহার মূল ভিত্তি, শিকড় ও শাখা-প্রশাখা সহ সম্পূর্ণরূপে উৎপাটিত করিয়া সম্পূর্ণ নতুনভাবে এবং অবিলম্বেই ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়িত করিয়া তুলিতে হইবে।</p>
<p>আধুনিক পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইসলামী অর্থব্যবস্থা পুরাপুরি খাপ খাইয়া যাইতে পারে এবং যে কোন সময়ের যে কোন চ্যালেঞ্জকে সুষ্ঠুরূপে পূর্ণ সার্থকতা সহকারে মুকাবিলা করিতে- যে কোন সমস্যার সমাধান দিতে সম্পূর্ণ সক্ষম। একমাত্র এই অর্থব্যবস্থাই যথার্থ, স্বাভাবিক এবং সর্বপ্রকারের শোষণ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত। সেই সঙ্গে সার্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি প্রগতি ও নিরাপত্তার বিধান করা উহার পক্ষে খুবই সহজ। নির্বিশেষ সমস্ত মানুষের সার্বিক কল্যাণ বিধান কেবলমাত্র এই অর্থনীতির পক্ষেই সম্ভব। সমস্ত মানুষ জুলুম ও বঞ্চনা বন্ধ করিয়া দেয় ইসলামী অর্থনীতির বিশেষ ধন বণ্টন পদ্ধতি। ইহা মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণকে বন্ধ করিয়া তোলে। ধন-সম্পদের একীভূত পুঞ্জীভূত (concentration of wealth) হওয়া ও পারস্পরিক অসাম্য ও পুঁজিবাদের অন্যান্য অশুভ প্রতিক্রিয়ার মুকাবিলায় শক্ত প্ররোধ গড়িয়া তুলিতে পারে একমাত্র এই অর্থব্যবস্থা। সেই সঙ্গে ইসলামী অর্থব্যবস্থায় বেশী মাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত করে সুষম, সুষ্ঠু ও সুবিচারপূর্ণ অর্থ বণ্টনের মাধ্যমে।</p>
<p>ঠিক এই কারণে আধুনিক বিশ্বের বহু সংখ্যক অমুসলিম চিন্তাবিদ অর্থনীতিবিদ প্রকাশ্যে ইসলামী অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবি জানাইয়াছেন। কেননা অর্থনৈতিক দিক দিয়া বঞ্চিত নিঃস্ব সর্বস্বান্ত বিশ্ব মানবতাকে কেবল মাত্র এই অর্থ ব্যবস্থাই রক্ষা করিতে ও বাঁচাইতে পারে, বাঁচার মত বাঁচার সুযোগ করিয়া দিতে পারে। <strong>দুইজন অমুসলিম অধ্যাপকের একটা চিঠি দৈনিক Gardian পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়ছিল উহাতে তাঁহারা লিখিয়াছিলেন:</strong></p>
<p><strong>The Muslims system seems to us to have great merit. The western World should study it and perhaps adopt it in whole or in part.</strong></p>
<p>কিন্তু নিজেদের মতের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসী, নাস্তিক ও সংশয়বাদী ব্যক্তিরা ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই না জানিয়া না বুঝিয়া উহা অধ্যয়ন না করিয়া উহার প্রতি তীব্র বিদ্বেষাত্মক ও কপটতাপূর্ণ মনোভাব এখন পর্যন্ত পোষণ করে। এই কারণে প্রচলিত অর্থব্যবস্থা পূতিগন্ধময় ক্ষুদ্রায়তন জলাশয় সেচিয়া ফেলিয়া নির্দোষ-আবিলতাহীন স্বচ্ছ পানির আগমন ও প্রবাহিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করিয়া দিতে তাহারা প্রস্তুত হইতে পারিতেছে না। তাহারা উপসাহ ও বিদ্রূপচ্ছলে প্রশ্ন করে: What is Islamic economic system? &#8230;.. ইসলামী অর্থব্যবস্থা আবার কি? এই প্রশ্ন অবশ্য বহু সংখ্যক মুসলিম নামধারী চিন্তাবিদ ও নীতি-নির্ধারক ব্যক্তির মনেও ধ্বনি –প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। উঠিয়াছে হয় এই কারণে যে, তাহারা ইসলামের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অথবা ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিই তাহারা ঈমান হারাইয়া সম্পূর্ণ ভিন্নতর মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন।</p>
<p>এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি বিদ্যামূলক (Technological) উন্নতি-অগ্রগতির দৃষ্টিতে ইসলামী অর্থনীতির ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন, চিন্তা-গবেষণা এবং চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া একান্তই আবশ্যক বলিয়া মনে করি। এই কাজে ইসলামী অর্থনীতিবিদদের যাহারা আধুনিক অর্থনীতি, উহার তত্ত্ব ও ব্যবস্থা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী- আগাইয়া আসা ও তাহাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথ পালন করিতে চেষ্টা করা একান্তই কর্তব্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উৎসঃ মাওলানা আব্দুর রহিম রচিত &#8216;ইসলামী অর্থনীতি&#8217; নামক গ্রন্থের ভূমিকা থেকে নেওয়া।   এই গ্রন্থটি ১৯৫৬ সনে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 554px; top: -2px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/a-new-economy-is-needed/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15963</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা; সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের অনন্য উপমা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 07 Jul 2025 15:00:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15906</guid>

					<description><![CDATA[এক ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক</strong></h4>
<p>ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময় যখন এসব শব্দসমূহ সামগ্রিকতাকে পরিমণ্ডল করে ব্যাপৃত হতো, সেসব শব্দগুলোর প্রতিটিই আজ নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠীর স্বার্থান্বেষণের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।</p>
<p>নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠী বলতে যে শোষণ ও স্বার্থপরতার বিষবাষ্প নিঃসরণকারী মানবতার এক পরম শত্রু এবং সেকিউলারিজমের নামে রব বা সৃষ্টিকর্তাবিহীন তথাকথিত আধুনিক পরজীবী পাশ্চাত্য সভ্যতা-কে বুঝানো হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো সভ্যতায় যদি লিবারেলিজমের জনক জন লক, বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন, আখলাক বিবর্জিত মনস্তত্ত্বের জনক সিগমুণ্ড ফ্রয়েড-সহ ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্তে, থমাস হবস, ইমানুয়েল কান্ট, বার্ট্রান্ড রাসেল-এর মতো দার্শনিকদের মৌলিক ভিত্তি রোপিত থাকে—যারা দর্শন চর্চার নামে মূলত মানবজাতির রূহ থেকে মানবতা, নৈতিকতা, আখলাক, মারহামাত, আদালত দূরীকরণে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত ছিলো—তাহলে বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, এমন একটি সভ্যতার নিকট থেকে মানবতা আশা করা সত্যিকারার্থেই অমাবস্যার রজনীতে চন্দ্রালোক খোঁজার মতোই ব্যর্থ প্রচেষ্টার নামান্তর।</p>
<p>উল্লেখ্য, এখানে অনেকে হয়তো আক্ষরিক অর্থের দৃষ্টিকোণে ক্যাপিটালিজম এবং সোশালিজম ও তার আপডেট ভার্সন কমিউনিজম-এর মাঝে মরিচীকা-সদৃশ কিছু তফাত পেয়ে তাদের মধ্যকার বিস্তর ফারাক প্রমাণের প্রচেষ্টায় নত হবেন, তবে বাস্তবিকপক্ষে জায়োনিজম, লেবারেলিজম, ডায়ালেকটিজম, ক্যাপিটালিজম, সোশালিজম ও কমিউনিজম—সহ এমন সকল ইজম (ism) আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। মূলত, মানবজাতিকে নিকৃষ্টতর পদ্ধতিতে শোষণ করার নিমিত্তে সময়ে সময়ে তারা মুদ্রার পৃষ্ঠতল পরিবর্তন করে থাকে, এব্যতীত আর অন্যকিছু নয়।</p>
<p>মানবসভ্যতার শোষক স্বার্থান্বেষী পশ্চিমা দার্শনিকদের অন্যতম একজন হলেন রেনে দেকার্তে। দেকার্তিয়ান/কার্তেসিয়ান ফিলোসফি বা রেনে দেকার্তের দর্শনসমূহের প্রথম রূলস ছিলো, “I think, therefore I am” অর্থাৎ, “আমি চিন্তা করতে পারি, তাই আমার অস্তিত্ব রয়েছে”, যা তিনি ১৬৩৭ সালে তাঁর গ্রন্থ “Discourse on the Method”-এ তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ, তারা যতটুকু চিন্তা করে বা তারা যেভাবে চিন্তা করে, ততটুকুতেই তাদের অবস্থান সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে এই দর্শনটি পশ্চিমাদের দর্শনে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে, তারা তাদের মতো করেই ইতিহাসের বলয় তৈরি করে। এই দর্শনটি যেহেতু সমগ্র পশ্চিমের মৌলিক দর্শনে রূপ লাভ করেছিলো, সেহেতু তাদের অতীত ইতিহাস লিপিবদ্ধের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। এমনকি,  তাদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য সম্পূর্ণ বানোয়াট ও বিকৃত ইতিহাস লেখতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেনি।</p>
<p>এসবের উদাহরণ পাওয়া যায় তাদের ইতিহাস চর্চায়। ইতিহাসের পর্যায়ক্রম বা সময়কাল বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা তাদের সময়কালকে নিজেদের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে। তাদের পর্যায়কালকে যদি সহজভাবে উত্থাপন করা যায়, তাহলে বিষয়টা এমন হয় যে,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০২. ঐতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০৩. ভবিষ্যৎ যুগ।</li>
</ul>
<p>এখানে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলতে সহজ ভাষায় মানবজাতির পূর্ববর্তী যুগ বা ডাইনোসর যুগকে বোঝানো হয়। মানবজাতির ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে তারা ঐতিহাসিক যুগকে তিনভাগে আবার ভাগ করে। অর্থাৎ,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাচীন যুগ,</li>
<li>০২. মধ্য যুগ,</li>
<li>০৩. আধুনিক যুগ।</li>
</ul>
<p>এসবের মধ্যে প্রাচীন যুগকে তারা আবার তিনভাগে ভাগ করেছে। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. প্রস্তর যুগ,</li>
<li>০২. ব্রোঞ্জ যুগ,</li>
<li>০৩. লৌহ যুগ।</li>
</ul>
<p>এরপর, তাদের ইতিহাস অনুযায়ী মধ্যযুগের সময়সীমা ছিলো তথাকথিত ইউরোপীয় রেনেসাঁ পর্যন্ত। <strong>অথচ, তারা কাদের নিকট থেকে কীভাবে সভ্য হতে শুরু করলো, তা তারা বরাবরই লুকিয়ে রাখে। যে মধ্যযুগকে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে, সে অন্ধকার যুগ থেকেই তারা কোন পরশ পাথরের স্পর্শে রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ ঘটালো, সে বর্ণনার ক্ষেত্রেও তারা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। সে যাইহোক, তাদের তথাকথিত রেনেসাঁ-র পর থেকে তারা নিজেদেরকে দুনিয়াব্যাপী সভ্য বলে পরিচিত করতে থাকে। “প্রথমবার কীভাবে সম্পদ অর্জিত হয়, তা ধর্তব্য নয়, বরং সেসব সম্পদকে তখন সংরক্ষণ করা দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়ে”—দার্শনিক জন লক-এর এমন দর্শন ইউরোপীয়দের আরো স্বেচ্ছাচারী ও নৃশংস বানিয়ে ফেলে</strong>। মানবজাতিকে সভ্য বানানোর বুলি আওড়িয়ে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তারা সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে বর্ণনাতীত যে শোষণ ও নিষ্পেষণ চালিয়েছে, তা আজ আর কারও অজানা নয়।</p>
<p>এই হলো তাদের ইতিহাস বর্ণনার পন্থা। কিন্তু, এর বিপরীতে গিয়ে তাদেরই কথিত অন্ধকার মধ্যযুগের সময় ইসলামী সভ্যতা মানবেতিহাসের পাতায় যে ইতিহাস রচনা করেছে; সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, মারহামাত ও আখলাকের সাথে যে সমগ্র বিশ্ব পরিচালনা করেছে এবং ইসলামী সভ্যতার দর্শনসমূহ যে উপমা উপস্থাপন করেছে, তা পশ্চিমাদের স্বার্থাভিলাষের মূলে কুঠারাঘাত করে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের যে সময়কে গোল্ডেন এজ বা স্বর্ণালী সময় বলা হয়, সেসময়কে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুতেই শেষ নয়, আমরা মুসলিম উম্মাহ যেনো পুনরায় ঘুরে দাড়াতে না পারি, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” বিষয়টি নিয়ে পর্যন্ত অসংখ্য পুস্তক রচনা করেছে। অথচ, রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে স্পষ্ট বর্ণনা পাই যে, আমরা যদি জেনেও থাকি, আগামীকাল কেয়ামত সংঘটিত হবে, তবুও যেনো আমরা গাছ রোপণ করতে পিছপা না হই। এখানে, গাছ রোপণের বিষয়টি এসেছে মূলত রূপকার্থে; এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানবজাতির জন্য সকল ধরনের কল্যাণকর কাজ জারি রাখা।</p>
<p>মহান রবের একজন খলিফা হিসেবে পৃথিবী বিনির্মাণ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য; এবং আমরা তা বাস্তবায়ন করে এসেছি সুদীর্ঘ বারোশত বছরেরও বেশি সময় ধরে। মূলত, তাদের শোষণের ধারা বজায় রাখতে এবং আমাদের এই বিশ্বজনীন ও সামগ্রিক চিন্তাধারার বিরোধিতা করতে গিয়েই তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” মতবাদের উত্থান করেছে। আবার, এটাও অস্বীকার করার জো নেই যে, এই বিষয়টি থেকেই মূলত আমাদের মুসলিম উম্মাহর ভেতরে “কেয়ামত নিকটবর্তী”-এর মতো অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী একটি তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে; যা সরাসরি রাসূল (সা.)-এর হাদীস পরিপন্থী একটা চিন্তাধারা।</p>
<p>অতএব এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পশ্চিমাদের দর্শন ও তাদের ইতিহাসের সাথে আমাদের দর্শন ও ইতিহাস চর্চার মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সেহেতু, আমাদেরকে পশুসমতুল্য করা পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত থেকে মনোযোগী হতে হবে আমাদেরই রেফারেন্স, তথ্যসূত্র ও পুস্তকাদির দিকে। মোটাদাগে বলে যায়, আমাদের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে থাকতে হবে সদা-সতর্ক। আমাদের শাসন ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো বিশাল কলেবরে উপস্থাপন করে আদিল ও ন্যয়পরায়ণ শাসকদেরকে তারা যে নিকৃষ্টতর করে উপস্থাপন করে থাকে, সেদিকে আমাদের যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে। এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে এটাও আমাদের বিশেষ নজরে রাখতে হবে যে, আমাদের ইতিহাস নিয়ে তাদের প্রশংসামূলক পর্যালোচনার পেছনেও থাকতে পারে অন্যকোনো দুরভিসন্ধি; উদাহরণস্বরূপ ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ-এর কথাও ধর্তব্য হতে পারে।</p>
<p>এই বিষয়টিকে কেন্দ্রে রেখেই এবার একটু ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই</strong></h4>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র এবং সাংস্কৃতিক নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ স্রষ্টার বিশেষ মহিমাধন্য অপার এক লীলাভূমি। মহান রব যেনো এই অঞ্চল এবং তার মানুষের উপর নিজ হাতে রহমত প্রেরণ করেছেন; প্রকৃতিগত বিচিত্রতা, উর্বর ভূমি এবং জনসাধারণের কর্মঠ মানসিকতা-র মাধ্যমে এই অঞ্চলকে নেয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। ফলশ্রুতিতে, সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলের উপর শ্রেষ্ঠ সব বিজেতাদের নজর পড়েছিলো। অতএব, এটাও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বিশ্ব মানচিত্র অঙ্কনের সূচনা থেকেই এই অঞ্চলটি তার ব্যতিক্রমী প্রভাব প্রস্ফুটিত করতে থাকে।</p>
<p>ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রস্তর যুগে খ্রিস্টপূর্ব ৭০-৫০ হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে ভারতে মানবজাতির আগমন ঘটে। এরপর ১২ হাজার বছর পূর্বে ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা সুফলাচন্দ্রিকা নামক একটি অঞ্চলে কৃষির উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর থেকে কৃষি ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে থাকে। এই সময়টায় ইরানের ওদিক থেকে বিশাল জনগোষ্ঠী ভারতের এদিকে অভিবাসন করে। ভারতের স্থানীয় অধিবাসী ও অভিবাসন করে আসা জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে যে জাতির উদ্ভব হয়, তাদের হাতেই গড়ে ওঠে সুবিশাল হরোপ্পা মহেঞ্জোদারো-র বিখ্যাত সেই সিন্ধু সভ্যতা। সময়টা ছিলো তখন ব্রোঞ্জ যুগ।</p>
<p>সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তীতে যে যুগ শুরু হয়, তা হলো বৈদিক যুগ। বৈদিক যুগ মূলত ব্রোঞ্জ যুগকে অতিক্রম করে লৌহ যুগের প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলমান ছিলো। বৈদিক যুগের পরে যথাক্রমে জনপদ, পুরু জাতি, কুরু সাম্রাজ্য, ষোড়শ মহাজনপদ, নন্দ সাম্রাজ্য ও মৌর্য্য বংশ এই অঞ্চল শাসন করেছিলো। পরবর্তীতে যারা ভারত শাসন করে, তারা হলো যথাক্রমে— শুঙ্গ রাজবংশ, সাতবাহানা সাম্রাজ্য, কুষাণ সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য, কামরূপ সাম্রাজ্য, পল্লব রাজবংশ, কদম্ব রাজবংশ, চালুক্য রাজবংশ, রাষ্ট্রকূট রাজবংশ এবং পাল সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে যেসব রাজবংশ বা সাম্রাজ্যের নাম উল্লেখ করা হলো, তারা যে সমগ্র ভারতের মূল শাসক ছিলো, বিষয়টা মোটেও তেমন না। বরং, সমগ্র ভারত তখন বিশাল বিশাল সব বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ছিলো, সেহেতু পরবর্তীতে উল্লেখ করা রাজবংশ বা সাম্রাজ্যগুলো বলতে গেলে একই সময়েই তারা তাদের অঞ্চলগুলো শাসন করেছে। আর এসবের সমাপ্তি ঘটতে শুরু করে ত্রয়োদশ শতকের একেবারে উষালগ্নে, অর্থাৎ, মুসলমান কর্তৃক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর থেকে। সূচনা হয় তখন ভারত ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়, ভারতবাসী উপলব্ধি করতে শুরু করে জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা এবং অবলোকন করতে শুরু করে সমগ্র ভারতজুড়ে একই শাসকের শাসন।</p>
<p>ভারতে মুসলিম শাসনকে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. সুলতানী আমল (১২০৬-১৫২৬),</li>
<li>০২. মুঘল আমল (১৫২৬-১৭৫৭)।</li>
</ul>
<p>সুলতানী আমলকে দিল্লি সালতানাত নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সময় মুসলিমদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্য। দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলে কয়েকটি রাজবংশ ভারতকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে। তারা হলো,</p>
<ul>
<li>০১. মামলুক রাজবংশ (১২০৬-১২৯০),</li>
<li>০২. খিলজী রাজবংশ (১২৯০-১৩২০),</li>
<li>০৩. তুঘলক রাজবংশ (১৩২০-১৪১৪),</li>
<li>০৪. সৈয়দ রাজবংশ (১৪১৪-১৪৫১),</li>
<li>০৫. লোদী রাজবংশ (১৪৫১-১৫২৬)।</li>
</ul>
<p>দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলের পরে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনভার গ্রহণ করে মুঘলরা। লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল শাসনের সূচনা করেন ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কামান ব্যবহারকারী মুঘল সালতানাতের প্রথম শাসক সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর। এই সময় মুঘলদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো মারাঠা সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আসবে, তা হলো, ১২০৬ সালে যে মুসলিমরা দিল্লি সালতানাতের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসনের পুনঃসূচনা করে বটে, তবে এসবের ভিত্তিপ্রস্তর কিন্তু একদিনে স্থাপিত হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রায় কয়েকশত বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। বিগত পাঁচ শতাব্দী যাবত এই শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিলো। এই সময়ের ইতিহাসকে তিনটি ভাগে বা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম অভিযানের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়।</p>
<p><strong>প্রথম পর্যায় শুরু হয় ৭১২ সালে তরুণ বিজেতা মুহাম্মাদ বিন কাসেম-এর সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের মাধ্যমে। এই বিজয়ের পর থেকে ভারতবর্ষে মুসলিমরা গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীর পর্যায় পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। জনসাধারণও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবেই সমগ্র ভারতবর্ষজুড়ে পরিচিত হতে শুরু করে।</strong></p>
<p>এই ধারাবাহিকতায় হাওয়া লাগে দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে, অর্থাৎ, দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের মাধ্যমে। তিনি একাধারে সতেরোবার ভারত অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত ইরানের গজনভী বংশের শাসক। তিনি তাঁর অঞ্চলে যে প্রায় ত্রিশ বছর যাবত শাসন করেছিলেন, তা ছিলো ভারতের তৎকালীন স্বর্ণালী সময়। বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আবু রায়হান আল-বেরুনী ছিলেন সুলতান মাহমুদের দরবারের অন্যতম একজন সদস্য, যিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এছাড়াও সুলতান মাহমুদের সাথে সখ্যতা ছিলো মহাকবি ফেরদৌসীর, যার শাহনামা এখনও বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। উল্লেখ্য যে, শাহনামা নিয়ে সুলতান মাহমুদের বিষয়ে যা ছড়ানো হয়, তার সুস্পষ্ট কোনো দলিল বা ভিত্তি নেই।</p>
<p>এরপর, তৃতীয় পর্যায়ে এসে চিরস্থায়ীভাবে ভারতে মুসলিম শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, যার শুরুটা হয় মুইযুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরীর ভারত অভিযানের কল্যাণে। ১১৭৫ সালে মুলতান বিজয়, ১১৭৮ সালে আনহিলওয়ারা বিজয়, ১১৮২ সালে সিন্ধু বিজয় এবং ১১৮৬ সালে ত্বরাইনের প্রথম যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলেও ১১৯২ সালে ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ার্জনের মাধ্যমে ভারতে ঘুরী রাজবংশ নিজেদের শক্তিমত্তার অস্তিত্বের জানান দেয়। প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে শুরু হয় মুসলিমদের চিরস্থায়ী শাসনের উপমা নিদর্শন। এরপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেই তাঁর একজন চৌকস সেনাপতি কুুতুবউদ্দিন আইবেক-এর হাতেই স্থাপিত হয় দিল্লি সালতানাতের ভিত্তিপ্রস্তর। দিল্লি সালতানাতের সময় যে যে রাজবংশ ভারতবর্ষকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে, তাদের নাম তো পূর্বে উল্লেখিত হয়েছেই।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের পর শুরু হয় মুঘল আমল। মুঘল আমলের ছয়জন শাসক  সবচেয়ে পরিচিত। যথাক্রমে তাঁরা হলেন,</p>
<ul>
<li>০১. জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০),</li>
<li>০২. নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ হুমায়ুন ১৫৩০-১৫৪০, ১৫৫৫-৫৬),</li>
<li>০৩. জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫),</li>
<li>০৪. নূরুদ্দুন মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭),</li>
<li>০৫. শিহাবুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহজাহান (১৬২৭-১৬৫৮),</li>
<li>০৬. মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদ আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬৫৮-১৭০৭)।</li>
</ul>
<p>তাঁদের মাঝে সম্রাট আকবর এবং আলমগীর—দু&#8217;জন মিলেই শাসন করেছেন শতবছরেরও বেশি সময় ধরে। এরপর, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে শুধু বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়, যা অদ্যাবধি উদিত হয়নি।</p>
<p>যেকোনো অঞ্চলের ইতিহাসেরই উত্থান-পতন থাকে, থাকে সে সময়ের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। সে হিসেবে মুসলিম শাসনামাল বলা হোক বা ভারতের সমগ্র ইতিহাসই ধরা হোক—উভয়ক্ষেত্রেই মুঘল আমলই ছিলো ভারতবর্ষের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। আখলাক, আদালত ও মারহামাতে পরিপূর্ণ একটি সমাজ তুলে ধরেছিলো সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা, যা হতভম্ব করে দিয়েছিলো সমগ্র ভারতবাসীকে।</p>
<p>তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, মুসলিম শাসনামল যে একেবারে “ধোয়া তুলসী পাতা” বা শতভাগ নিখুঁত ছিলো, তা কোনো মুসলিম ইতিহাসবেত্তা-ই স্বীকার করেন না। এমনকি, আদালত ও আখলাকবিহীন কাজকর্মের জন্য তারাই সর্বপ্রথম শাসক বা অপরাধীদের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু, প্রতিটি রাজবংশ বা শাসকের সময়ের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফুলে ফেঁপে তুলে ইতিহাস বর্ণনা করেছে ইংরেজ ইতিহাসবীদ ও তাদের দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। এমনকি, আমরা মুসলিমরাও এখন আমাদেরই ইতিহাস অধ্যয়ন করি ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিহাস লেখকদের তথ্যসূত্রকে কেন্দ্রে রেখে। ফলশ্রুতিতে, বর্তমান ভারতে মুঘল শাসকগণ আজ নেতিবাচকভাবে পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘ দেড়-দুইশত বছর যাবত। অথচ, প্রকৃত ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।</p>
<p>এবার তাহলে সে ইতিহাসের দিকেই একটু নজর বুলানো যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>তিন</strong></h4>
<p>একেবারে শুরুতেই “ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি”—চারটি পরিভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস বর্ণনা করা হয় সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি-র। অন্যদিকে, সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, একটা ব্যতিত আরেকটা অসম্পূর্ণ। আবার এ&#8217;দুয়ে মিলে হয় সভ্যতা, আর সর্বশেষে এই সভ্যতারই ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। অতএব, এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, এসব পরিভাষা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু এসবের মাঝে রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা, সেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টি এলে অবশ্যই অন্য বিষয়গুলোও অবধারিতভাবে চলে আসবে।</p>
<p>ইতোপূর্বে মুসলিম শাসনামলের সময়কালটা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে বলা যায়, সভ্যতার ইতিহাসের কিঞ্চিৎ ফুটে উঠেছে এখানে। কিন্তু, ইতিহাস তো শুধু এভাবে বর্ণনা করলে হয় না, সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়টিও ফুটিয়ে তুলতে হয়। অতএব, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টার প্রতিও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>সহজ ভাষায় বলা হয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ হলো, সমাজের সকলে মিলে একত্রে শান্তিতে বসবাস বা সহাবস্থান করা; আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর সংজ্ঞায়ন এভাবেই করা হয়। অথচ, শুধুমাত্র সমাজের ভেতরে পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করা বা সহাবস্থান করাই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নয়, বরং ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্য এবং প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা-সহ “সমাজ”-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ই এখানে অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি এসবের প্রতিটিতেই আদালত বিরাজমান থাকে, মূলত তখনই একটি সমাজে প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>এখানেই শেষ নয়, একটি সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর ইতিহাস তখনই জানতে ও বুঝতে পারা যায়, যখন সে সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে পূর্বাপর বা সমসাময়িক অন্যান্য সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে তুলনা করা হয়, চাই সে সমাজ-সভ্যতা স্থানীয় হোক বা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সমাজ-সভ্যতা হোক। তবে এটা সত্য যে, স্থানীয় পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার সাথে তুলনা করলেই বরং তখন পার্থক্যটা আরো বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতএব, ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামল বা সমাজ-সভ্যতার সাথে তার পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার তুলনা করলে মুসলিম সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যাবে।</p>
<p>যেহেতু তুলনামূলক আলোচনাকেই কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে, সেহেতু গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ এবং আদালতের মধ্যকার পার্থক্য জানাটা সকলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বুঝার স্বার্থে আদালতকে বলা যেতে পারে ন্যায় অধিকার এবং গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ-কে বলা যেতে পারে সমান অধিকার। সকলের নিকট এটা সুস্পষ্ট হতে হবে যে, ন্যায় অধিকার আর সমান অধিকার কখনও এক বিষয় নয়। ন্যায় অধিকার হলো, যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দেওয়া। বিপরীতে, সমান অধিকার হলো, সবার মাঝে সমবণ্টন করা। সমান অধিকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, কেউ হয়তো প্রয়োজন অনুপাতেও সম্পদ পায় না আবার কেউ প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পায়। কিন্তু, ন্যায় অধিকারে কখনও তা হয় না, সবাই সবার প্রাপ্যটুকুই পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সমান অধিকারটা ন্যায় অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহর নিকট এই ন্যায় অধিকারই হলো আদালত। তবে এটা স্মর্তব্য যে, “আদালত” শব্দটি যতোটা সামগ্রিকতা ও বিস্তৃত অর্থ ধারণ করতে পারে, “ন্যায় অধিকার” শব্দটি কখনও তা পারবে না।</p>
<p>সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান বলতে যে সামাজিক একটা পরিবেশে শুধুমাত্র সহাবস্থান করাকে বুঝানো হচ্ছে না, তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, সমাজ বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত সকল দৃষ্টিকোণকে বিবেচনা করেই যেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিষয়টি ফুটে ওঠে, সেহেতু সমাজ-এর সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় থেকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>💠</strong><strong>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p><span style="font-size: 16px;">ভারতবর্ষে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় অবদান হলো, ধর্মীয় বৈষম্য বিদূরিত করা। কেননা, ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের ধর্মীয় অবস্থা অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক অবস্থায় ছিলো। তখন ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম প্রচলিত ছিলো। মহাবীর নামে এক ক্ষত্রীয় সন্ন্যাসী ভারতে জৈন ধর্ম প্রবর্তন করেন। গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম প্রবর্তন করেন, তিনি সিদ্ধার্থ নামেও পরিচিত ছিলেন। মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের সময় বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। গুপ্ত শাসনামল থেকে বৌদ্ধ ধর্মের পতন শুরু হয়। এ সময় থেকে ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনজাগরণ সূচিত হয়।</span></p>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে ভারতে হিন্দু ধর্মই ছিলো প্রধান ধর্ম। ভারতের বেশিরভাগ রাজাই ছিলেন হিন্দু। তারা হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সমাজের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিলো সবচেয়ে বেশি। বৈশ্য ও শূদ্ররা নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত ছিলো। তাদের ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করা এমনকি শোনাও নিষিদ্ধ ছিলো। দুর্নীতিপরায়ণ ব্রাহ্মণরা জনসাধারণের দুর্বলতা ভীতির সুযোগ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ব্রাহ্মণদের আক্রমণাত্মক মনোভাব বৌদ্ধদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করে। ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্যাতিত বৌদ্ধরা ভারতে আক্রমণ করতে মুসলমানদেরকে আমন্ত্রণ জানায় এবং আরবদেরকে স্বাগত জানায়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক হাবীব বলেন, <strong>❝ব্রাহ্মণগণ ইচ্ছাপূর্বক জনগণকে অজ্ঞ করে রাখতেন এবং সমাজে এভাবে তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেন।❞</strong></p>
<p><strong>ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন, ❝পণ্ডিত ব্রাহ্মণগণ ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে অত্যাচারীর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।❞</strong></p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে দিল্লির সুলতানি আমলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ভারতের মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ভারতের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো।</p>
<p>ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময় ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিলো না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে এবং ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে তোলে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p><strong>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দিল্লির সুলতানরা হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব পালনে কোনোদিন বাধা দেননি। দিল্লির সমগ্র সুলতানি আমলে অমুসলিম নাগরিকদের অর্থাৎ &#8220;জিম্মিদের” উপর কোনো ধরনের কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়নি।</strong> কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে, “দিল্লির সুলতানি আমলে অমুসলিম প্রজারা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের মন্দির ধ্বংস করা হয়। তাদেরকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়।”</p>
<p>তাদের এ বক্তব্য মোটেও সত্য নয়। কারণ, দিল্লির সুলতানি আমলে কোনো হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়নি; যদি ধ্বংস করা হতো, তাহলে প্রাক মুসলিম এবং মুসলিম আমলের মন্দির আজ আর দেখা যেতো না।</p>
<p>এটাও জানা যায় যে, কোনো কোনো সুলতান হিন্দুদের উৎসবেও যোগদান করতেন। যেমন সুলতান মুহম্মদ-বিন-তুঘলক হিন্দুদের “হোলি” উৎসবে যোগদান করতেন। সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী জৈন আচার্য মহাসেনকে ধর্ম আলোচনার জন্য কর্নাট থেকে আহ্বান করেন। এছাড়া দিগম্বর জৈন পূর্ণচন্দ্র ও শ্বেতাম্বর জৈন রামচন্দ্র সুরী প্রভৃতি জৈন আচার্যরা সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর আতিথ্য গ্রহণ করেন।</p>
<p>ইবনে বতুতা বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মুহম্মাদ-বিন তুঘলকের শাসনামলে অনেক হিন্দু কর্মচারী সুলতানী রাষ্ট্রের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি জনৈক হিন্দু কর্মচারীকে সিন্ধুর শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত করেন। সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে ছিলেন যথেষ্ট তৎপর।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>দিল্লির সুলতানী আমলের ধর্মীয় এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দের ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো মুঘল আমলেও; এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে তা আরো জোড়ালোভাবে। সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দের দৃষ্টিকোণে সুলতান আওরঙ্গজেব ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ, এই সুলতানকেই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কলুষিত করা হয়েছে। তাঁর নামেই আজ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে যে, তিনি নির্বিচারে গণহারে হিন্দুবধ করেছেন, অথচ, তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।</p>
<p>মহান এই সুলতানের বিরুদ্ধে আনীত ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো,</p>
<ul>
<li>০১. হিন্দু মন্দির ও টোল ধ্বংস,</li>
<li>০২. হিন্দু কর্মচারীদের পদচ্যুতি,</li>
<li>০৩. হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন।</li>
</ul>
<p>কিন্তু, সুলতান আওরঙ্গজেব রাজ্যশাসন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, তিনি কখনই বিধর্মীদের প্রতি অন্যায়, অবিচার এবং জোর জবরদস্তি করেননি। বরং তিনি ভারতের সকল ধর্মের জনগণের প্রতি তার সহিষ্ণুতার মনোভাব প্রদর্শন করেছেন।</p>
<p><strong>প্রথমত, </strong>এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ইতিহাস যে, আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং হিন্দুমন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর সময়ে নির্মিত দিল্লি, আগ্রা, বেনারস, মথুরাপুর, গুজরাট প্রভৃতি স্থানে নির্মিত বহু মন্দির আজও বর্তমান রয়েছে। সম্রাট কর্তৃক বেনারসের গভর্নরের নিকট লিখিত ফরমানে জানা যায় যে, তিনি বৈধ উপায়ে নির্মিত মন্দির বিনষ্ট না করার নির্দেশ দেন। প্রধানত যেসব মন্দির রাজদ্রোহ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর যে সমস্ত মন্দির গড়ে উঠেছিলো, বরং সেগুলো তিনি ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষভাগে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে এসে সম্রাটের সহিষ্ণু মনোভাবের পরিচয় পেয়েছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন,<strong> “Everyone is free to serve and worship God in his own way”.</strong></p>
<p><strong>ঐতিহাসিক শর্মাও স্বীকার করেন যে, আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে হিন্দুগণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতো। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজপুত সেনাপতি ভীমসিংহ আহমেদাবাদে প্রায় ৩০০ মসজিদ ভেঙেছিলেন। কিন্তু, আওরঙ্গজেব তাকে কোনো ধরনের শাস্তি না দিয়ে তাকে মারাঠাদের দমন করতে পাঠান।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, </strong>আওরঙ্গজেব হিন্দু কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করে সে জায়গায় মুসলমানদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন বলে যে অভিযোগ করা হয়, তা সত্য নয়। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি কতিপয় হিন্দু কেরানি, দেওয়ান ও রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি হিন্দুদের প্রতি বৈরী ও রুষ্ট হয়ে তাদেরকে পাইকারি-হারে চাকরি হতে বরখাস্ত করেন। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক দফতরে একজন করে হিন্দু-মুসলমান নিয়োগ দেন। কিছু হিন্দু কর্মচারী সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করলেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করে পূর্বপদে বহাল রাখেন। চরম বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব যশোবন্ত সিংহকে শুধু ক্ষমাই করেননি বরং তাকে যথাযচিত সম্মান প্রদর্শন করেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং বিনা অপরাধে হিন্দু কর্মচারীদেরকে পদচ্যুত করেছিলেন—এ কথা চিন্তাই করা যায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> অমুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য সামরিক কার্যের পরিবর্তে তাদের উপর আওরঙ্গজেব জিজিয়া কর ধার্য করেন। হিন্দুদের উপর থেকে প্রায় ৮০ প্রকার কর উঠিয়ে নেয়ার ফলে রাষ্ট্রের অর্থভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়ে। তারপরও হিন্দুরা অনুগত না হয়ে আক্রমণ-ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। কাজেই দীর্ঘ ২০ বছর পরে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও শত্রুভাবাপন্ন হিন্দুদেরকে নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার উদ্দেশে সম্রাট হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনরায় ধার্য করেন। ভি.ডি. মহাজন স্বীকার করেন যে,</p>
<blockquote><p>❝এই কর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার উপর ধার্য হয়নি। বস্তুত, দরিদ্র, স্ত্রীলোক, খোড়া, নাবালক ও উন্মাদগ্রস্ত ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই তিনি জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, হিন্দুদের ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে এমন একজন মহান শাসকের উপর এমন সব অভিযোগ পেশ যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেহেতু বলা যায়, এমন সব মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন মূলত ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ইতিহাসবীদদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের মনোভাবকেই বরং আরো স্পষ্ট করে তোলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<p>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর আলোচনার পূর্বে আমাদেরকে এটা বরং আগে বুঝতে হবে যে, বিনোদন ও সংস্কৃতি এক বিষয় নয়। বিনোদন মূলত সংস্কৃতিরই একটা অংশ। কেননা, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজই কোনো না কোনো সংস্কৃতির আলোকে করে থাকি। অর্থাৎ, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরের কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাতে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষ যা করে, তাই সংস্কৃতি। অতএব, সংস্কৃতির আলোচনায় শুধু বিনোদন অন্তর্ভূক্ত হবে না; বরং সমাজের সামগ্রিক বিষয়গুলোই সংস্কৃতিতে আলোচনা হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। প্রাথমিক অবস্থায় হিন্দু সমাজে উদারতা বিদ্যমান ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রাবিড়, আর্য, শক, হুন, কুষাণ প্রভৃতি জাতীয় লোকজন আসে এবং হিন্দু সমাজের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের আলাদা সত্তা হারিয়ে হিন্দু সমাজের সাথে এক হয়ে যায়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এ চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।</p>
<p>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাব উল-হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতবর্ষের সমাজে নারীদের অবস্থা ছিলো বড়ই করুণ। নারীদের অধিকার ছিলো খুবই সীমিত। নারীদের সাধারণত ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সমাজে পুরুষেরা বহু বিবাহ করতো। কিন্তু, নারীদের দ্বিতীয় বিবাহের কোনো নিয়ম ছিলো না। গ্রিকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্য যুগে সমাজে নারীদের মর্যাদা ছিলো এবং তারা সাহিত্য দর্শনে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী ছিলো। আল বেরুনী তার “কিতাব-উল-হিন্দ” নামক গ্রন্থে বৈদিক যুগের নারী জাতির উচ্চ মর্যাদার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আল-বেরুনী আরও বলেন যে,</p>
<p>❝সে সময় নারীদেরকে শিক্ষা প্রদান করা হতো এবং শাসন-ক্ষেত্রে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলো।❞</p>
<p>তবে এটা যে বৈদিক সমাজের সামগ্রিক চিত্র ছিলো না, তা আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে নারীর অপমানের বিষয়টি উঠে আসে সতীদাহ প্রথা থেকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতীয় সমাজে অনেক কু-প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিলো। অনেক কু-প্রথাকে সমাজে ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হতো। কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা, নরবলি এবং গঙ্গীয় শিশু কন্যা বিসর্জন ইত্যাদি কাজকে হিন্দুরা ধর্মীয় পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। এছাড়াও তখন দেবদাসী প্রথাও প্রচলিত ছিলো।</p>
<p>আবার ভারতের হিন্দু সমাজে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিলো। দাস-দাসী কেনা-বেচা হতো এবং প্রাসাদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এটি তখন সামাজিক অনুশাসনে পরিণত হয়।</p>
<p>মোদ্দাকথা, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিলো। সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ছিলো। জাতিভেদ প্রথা সমাজকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিলো। নারীরা ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সমাজে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। এমনকি, ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসকরা সমাজের কোনো উন্নয়নে পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি।</p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>বিপরীতে ভারতের মুসলিম সমাজের অন্য এক চিত্র দেখা যায়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আসার আগে গ্রিক, শক, হুন, পারসিক প্রভৃতি জাতির লোকজন আসে। তারা তাদের নিজস্ব কোনো সভ্যতা ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসেনি। তারা হিন্দু সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এরপর, ৭১২ সালে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর মুসলিম বিজেতারা এদেশে এক উন্নত সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে আসেন। তারা দীর্ঘদিন ভারতবর্ষে অবস্থান করেন। মুসলমানরা হিন্দুদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়নি এবং মুসলমানরা তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এন. সি. মেহতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝ইসলাম যেখানে এসেছে, সেখানেই মার্জিত রুচি এবং মর্যাদাবোধের প্রকাশ ঘটেছে। এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রত্যেক মুসলমান প্রধানত একটি সামাজিক, সহজ ও মুক্ত জীবন-যাপন করে।❞</p></blockquote>
<p>মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর ভারতের সমাজ-কাঠামোর উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ইসলামের উদার, সহনশীল নীতি ও হিন্দু সমাজের কঠোরতা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর প্রবল প্রভাব পড়ে। এর ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাছাড়া ইসলামের প্রভাবে বর্ণভিত্তিক ভারতীয় সমাজে আরও অনেক নতুন নতুন উপবর্ণ ও গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।</p>
<p>বিন কাসিমের এই অভিযানের পর ভারতবর্ষের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপা বলেন যে,</p>
<p>❝তুর্কিরা বাহ্যত স্থানীয় খাদ্য ও পোশাক গ্রহণ করে। কিন্তু, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ইসলামের কোনো কোনো সামাজিক চিন্তা ভারতীয় জীবনের অংশ হয়ে যায়। ইসলামের প্রভাবে ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু মহিলাদের মধ্যে পর্দার প্রচলন ঘটে। প্রাচীন ইরানে (পারস্য) এ প্রথার প্রচলন হলেও ভারতে আরবীয় ও তুর্কিরা এ প্রথা আমদানি করে।❞</p>
<p>এই পর্যায়ে পূর্বের একটি কথা আবারো উল্লেখ করতে হয় যে, মুসলিম শাসনামলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময়ে ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিোল না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে,</p>
<p><strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong></p>
<p>ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র-এর মতে,</p>
<p><strong>❝ভারতীয়দের সুগভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্য সম্পর্কে সমুন্নত ধ্যান-ধারণার সাথে তুর্কি ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণে শেষ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>রোমিলা থাপার মতে,</p>
<p><strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>সতীদাহ প্রথা নিয়ে বলতে গেলে ইবনে বতুতার মুহম্মাদ-বিন তুঘলককে নিয়ে একটা মন্তব্য তুলে ধরতে হয়, তিনি বলেন,</p>
<p><strong>❝সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে সর্বদা ছিলেন তৎপর।❞</strong></p>
<p>শুধু মুহাম্মাদ বিন তুঘলকই না, বরং সম্রাট বাবর, আকবর এবং আওরঙ্গজেবও সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে ভূমিকা পালন করেন। সম্রাট আকবর একবার নিজে গিয়ে এমন হিংস্র কর্মকাণ্ডে বাধা দেন এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে আইন পর্যন্ত প্রণয়ন করেন।</p>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>মোদ্দাকথা, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। মুসলমানরা ভারতে এসে এখানে শ্রেণিহীন সমাজ গঠনে ভারতীয়দেরকে উদ্বুদ্ধ করে। দিল্লির সুলতানি আমলে ভারতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর, এমনকি মুঘল আমলেও, ইসলামী ভাবধারা ভারতের সমাজ, আচার-আচরণ, ধর্ম, স্থাপত্য, শিল্প, ভাষা-সাহিত্য, সঙ্গীত ও বিজ্ঞানকে প্রভাবান্বিত করে। এভাবেই, ইসলামী ভাবধারা অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>শিক্ষা</strong><strong>, </strong><strong>সাহিত্য ও স্থাপত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম পূর্ব ভারতের অবস্থা খুবই নাজুক ও হ-য-ব-র-ল হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তারা বেশ এগিয়ে ছিলো। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সভ্যতার যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছিলো। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনামলে দেশের সর্বত্র শিক্ষায়তন গড়ে উঠেছিলো। মঠ, টোল, পাঠশালা, কলেজ এমনকি কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। বিহারে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও পশ্চিম ভারতের বালভী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ। এছাড়াও উদন্তপুর, বারানসী, বিক্রমশীলা প্রভৃতি স্থানে উচ্চশিক্ষার সু-ব্যবস্থা ছিলো। মালব ও আজমীরে সংস্কৃতি কলেজ স্থাপিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মশাস্ত্র ও বেদান্ত ছাড়াও দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হতো।</p>
<p>প্রাক-মুসলিম আমলে ভারতবর্ষে হিন্দু কাব্য, নাটক, উপন্যাস ও গদ্য সাহিত্যের বিকাশ লাভ করে। সাহিত্যিক হিসেবে ভগবতি, বাহমান, জয়দেব, রাজ শেখর, শ্রীহর্ষ, কালিদাস প্রমুখ খ্যাতি লাভ করেন। আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত ও নাগার্জুন জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত-শাস্ত্র ও চিকিৎসা-বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পে ভারতীয়রা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে। কৈলাশ মন্দির, ভুবনেশ্বর ও কোনারকের মন্দির ছাড়াও ইলোরা, অজন্তা, খাজুরাহ, গান্ধার ও সাঁচির চিত্র ও স্থাপত্য কীর্তি ভারতীয়দের উচ্চমানের শিল্প নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। এ সময় ভারতীয়রা সঙ্গীত চর্চায়ও ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে।</p>
<h4></h4>
<h4><strong>মুসলিম ভারত</strong></h4>
<p>এখন তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, তবে তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান নেই? এক্ষেত্রে উত্তর হলো, শিক্ষা-সাহিত্যে মুসলামদের অবদানের অনস্বীকার্য। পূর্বের এমন একটা ভঙ্গুর সমাজকে যে ইসলামী সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে তারা যে শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>দিল্লির সুলতানি আমলে ভাষা ও সাহিত্যের উপর ইসলামী ভাবধারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ভারতে তুর্কিদের আগমনের সাথে সাথে এদেশে ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু হয়। ফার্সি ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ফার্সি ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পারস্যের অনুকরণে ভারতেও তখন সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পরবর্তী ফার্সি সাহিত্য ভারতীয় বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত হতে থাকে। এ&#8217;ক্ষেত্রে ভারতের তোতা পাখি হিসেবে খ্যাত আমীর খসরুর ভূমিকা ছিলো সর্বাগ্রে।</p>
<p>ভারতে মুসলিম আগমনের সাথে সাথে বই লেখা ও তাতে চিত্রাঙ্কনে যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতে প্রাচীন যুগে জৈন ধর্মশাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য সেগুলোর অনেক অনুলিপি তৈরি করা হতো অথবা পুরনো বইয়ের ভিত্তিতে নতুন বই তৈরি করা হতো। পুথিগুলো ছিলো মূলত তালপাতার। চিকন ও লম্বা তালপাতার উপরে আলঙ্কারিক চিত্রাঙ্কনের কোনো ধরনের সুযোগ ছিলো না। ভারতে মুসলিম শাসনামলে এসব গ্রন্থ রচনা ও চিত্রাঙ্কনের রীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আরব বণিকরা পশ্চিম ভারতে সর্বপ্রথম কাগজ ব্যবহারের প্রচলন ঘটায়। এর ফলে জৈন ধর্মের পুথিগুলো তখন থেকে কাগজে লেখা শুরু হয় এবং তাতে চিত্রাঙ্কনের ব্যাপক সুযোগ হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা প্রভৃতি থেকে ভারতীয় ও ইসলামের সমন্বয় ঘটে। এই মুসলিমদের মাধ্যমেই আরবীয় ইউনানি (ভেষজ) চিকিৎসা ভারতে আসে। আবার ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি পশ্চিম এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>শিক্ষাকেন্দ্র</strong></h4>
<p>শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের বিষয়টি সামনে চলে আসে। সে হিসেবে মুসলিম ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিন্তু, পুরো ভারতবর্ষের সবগুলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আমাদের বুঝার সুবিধার্থে শুধু বাংলার আশেপাশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করা হলো,</p>
<h5>লক্ষ্মণাবতী গৌড় :</h5>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (১২০৪) লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়। সমসাময়িক দিল্লি দরবারের ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ ১২৪৪ সালে বাংলায় আগমন করে বাংলায় অনেক মসজিদ-মাদরাসা দেখতে পান এবং তিনি মন্তব্য করেন যে, বখতিয়ার খিলজীই বাংলায় অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করেন। বাংলায় মুসলিম অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র ছিলো লক্ষ্মণাবতী (গৌড়)। এখানে সুলতানি যুগের অনেক মসজিদ, মাদরাসা, শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, গৌড় ছিল মধ্যযুগে মুসলিম বাংলার অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র। গৌড়ের বিখ্যাত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন কাজী রুকনদ্দীন সমরকন্দী। এছাড়াও, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ দুই বছর গৌড়ে বসবাস করেন। প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ জালালুদ্দীন গজনবী এ শহরে কয়েক বছর অবস্থান করেন। এছাড়াও তিনি বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন ইওয়াজ খলজীর (১২১৩-১২২৭) সভাকক্ষে ভাষণ দেন। বিশিষ্ট কবি ও পণ্ডিত ব্যক্তি শামসুদ্দীন দবীর ও কাজী আসির বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দীন বুগরা খানের রাজসভা অলঙ্কৃত করেন।</p>
<h5>সোনারগাঁও :</h5>
<p>সোনারগাঁও ছিলো বাংলায় ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। আর এ কেন্দ্রের মধ্যবিন্দু ছিলেন বিখ্যাত পীর মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা। তিনি বোখারায় জন্মগ্রহণ করেন, খোরাসানে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দিল্লিতে আসেন। দিল্লি থেকে সরাসরি সুলতান গিয়াস-উদ্দীন বাংলায় আসেন। সোনারগাঁওয়ে এসে তিনি খানকা স্থাপন করেন। এখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলো সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাকেন্দ্র বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব ছিলো। তাঁর খ্যাতনামা শিষ্য ছিলেন পীর শরফুদ্দীন ইহইয়া মানেরী। বিখ্যাত পীর ও পণ্ডিত শেখ আলাউল হক যখন সোনারগাঁওয়ে নির্বাসনে আসেন, তখন তিনি তাঁর সংস্পর্শে আসেন এবং দু&#8217;বছর এখানে কাটান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ছিলো “মাকামাত” ও “নাম-ই-হক”। তিনি ইসলামী শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। এ মহামানব ও মহান শিক্ষক, বাংলা অঞ্চলে শিক্ষার আলোর দিশারী ৭০০ হিজরি মতান্তরে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সোনারগাঁয়ে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।</p>
<h5>সাতগাঁও :</h5>
<p>মধ্যযুগে আরেকটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো সাতগাঁও। এখান থেকে বেশ কয়েকটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, এখানে মাদরাসা তৈরি করা হয়, যার একটি ছিলো বাংলার সুলতান রুকনুদ্দীন কায়কাউসের সময়ে; যেটি ছিলো ১২৯৩ সালে কাজী আল-নাসির মুহাম্মদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি আল-নাসির মাদরাসা নির্মাণে অনেক অর্থ সাহায্য করেন এবং ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ব্যয় নির্বাহের জন্য অনেক অর্থ সাহায্য করেন। আবার বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের ১৩১৩ সালে আরেকটি মসজিদ নির্মাণের প্রমাণও পাওয়া যায়।</p>
<h5>পান্ডুয়া :</h5>
<p>পাণ্ডুয়া ছিল বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র। এটি ছিলো ধর্মীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। কারণ, শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজী, শেখ আখী সিরাজুদ্দীন উসমান, শেখ আলাউল হক, নূর কুতুব-উল-আলম, শেখ জাহিদসহ অসংখ্য পীর-আউলিয়াদের শিক্ষায় পাণ্ডুয়া ধন্য হয়েছে। মুসলিম শাসকদের রাজধানীও ছিলো পাণ্ডুয়া। বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। ফলে, পাণ্ডুয়া ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্রের পাদপীঠের মর্যাদা লাভ করে। আবার বিখ্যাত পীর হযরত নূর কুতুব-উল-আলম (র.) পাণ্ডুয়ায় একটি বড় মাদরাসা ও চিকিৎসালয় নির্মাণ করেন। পাণ্ডুয়া মূলত বহু বিদ্বান পণ্ডিতদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে কয়েকজন বিখ্যাত পণ্ডিতের আবির্ভাব হয়, যারা পান্ডুয়ার বুকে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হন।</p>
<p>এ-তো গেলো শুধু বাংলা ও তার আশপাশের অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র। দিল্লি থেকে সুদূর বাংলারই যদি শিক্ষার এই অবস্থা হয়, তাহলে দিল্লি-সহ সমগ্র ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ রচনার প্রয়োজন পড়বে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পাঠ্যক্রম</strong></h4>
<p>এবার একটু পাঠ্য তালিকার দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাত হোক বা মুঘল আমল হোক, মুসলিম ভারতের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো কুরআন, হাদিস, ধর্ম ও আইনশাস্ত্র এবং অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহ। এছাড়াও, যুক্তিবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয়ও মাদরাসায় গুরুত্ব সহকারে পাঠদান করা হতো। এই পাঠ্য তালিকার কথা বলতে গিয়ে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক আবুল ফজল বলেন,</p>
<blockquote><p>❝প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নীতিশাস্ত্র, গণিত, কৃষি, পরিমাপ-শাস্ত্র, জ্যামিতি, জ্যোতিশাস্ত্র, চরিত্র নির্ণয়বিদ্যা, গার্হস্থ্য বিদ্যা, সরকারি আইন-কানুন, চিকিৎসা বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, উচ্চতর অংক শাস্ত্র, বিজ্ঞানসমূহ, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করা উচিত।❞</p></blockquote>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা বাগদাদের আব্বাসীয় আমলের (৭৫০-১২৫৮) প্রচলিত শিক্ষানীতি ও পাঠ্য তালিকা অনুসরণ করেন। পাশাপাশি, বাংলা অঞ্চলেও তা অনুসরণ করা হয়। বাংলায় আগত মুঘল কর্মচারীরা বাংলার অনেক চিকিৎসক ও তাদের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলেছেন। বাংলার নবাবী আমলের দরবারী ঐতিহাসিকরাও তা উল্লেখ করেছেন। যেমন, “বাহারিস্তান-ই-গায়বী”-র লেখক মীর্জা নাথান এবং ”সিয়ার-উল-মুতাখখেরিন”-এর লেখক গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মতে, বাংলায় অনেক দক্ষ চিকিৎসক, হাকিম ও কবিরাজ ছিলেন। ফরাসি পর্যটক ও মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক বার্নিয়ার বাংলায় এসে বাংলার চিকিৎসক ও তাদের চিকিৎসা পদ্ধতির সম্পর্কে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ দেশের মুসলিম চিকিৎসকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। পক্ষান্তরে, শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় হিন্দুদের অজ্ঞতার কথাও তিনি স্পষ্ট করে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ভাষা সাহিত্য </strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভাষা ও সাহিত্যের পেছনে উদারতার সাথে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁরা আরবি ও ফারসি ভাষা ছাড়াও হিন্দি, সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষারও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ যুগে উল্লিখিত ভাষাগুলো ছাড়াও বাংলা, মারাঠি প্রভৃতি প্রাদেশিক ভাষাসমূহেরও যথেষ্ট বিকাশ লাভ ঘটেছিলো। মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো। <strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন, <strong>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</strong></p>
<p>বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন।</p>
<p>এই যুগে এদেশের সাধারণ প্রচলিত কথ্য ভাষার সাথে আরবি ও ফারসি শব্দ মিশ্রিত হয়ে উর্দু নামক একটি নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়। মুঘল আমলে উর্দু ভাষা যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। উর্দু-সাহিত্য চর্চা প্রথম শুরু করেন আমীর খসরু। সুলতানি আমলে আরেকজন বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক ছিলেন আমীর খসরু। ইতিহাসে তিনি “ভারতবর্ষের তোতাপাখি” নামে আজও অমর হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক নোমানী বলেন, ❝বিগত ছয়শত বছরের মধ্যে ভারতবর্ষে তাঁর ন্যায় সর্বতোমুখী প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেনি।❞</p>
<p>“খাজায়নুল ফতুহ”, “তারিখ-ই-আলাই”, “তুঘলক নামা” প্রভৃতি তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ। আমীর হাসান দেহলবী ছিলেন মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের সভাকবি ও শিল্পী। তিনি “দিউয়ান” নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। বদরুদ্দীন নামক আরেকজন উঁচুদরের কবি মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের দরবার অলঙ্কৃত করেন। এছাড়াও, সাহিত্যিক হিসেবে মালিক মুহাম্মদ যায়সী, দৌলত কাজী প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ&#8217;যুগে শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে জৌনপুর ছিলো বিখ্যাত। সেখানে বহু জ্ঞানী-গুণী, কবি ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো।</p>
<p>আবার, সুলতানি আমলে অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো। তাঁদের মধ্যে মিনহাজ-ই-সিরাজের “তাবাকাত-ই-নাসিরী”, জিয়াউদ্দীন বারানীর “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, শামস-ই-সিরাজ আফিফের “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, ইয়াহিয়া বিন-আহমদের “তারিখ-ই-মুবারক শাহী”, হাসান নিজামীর “তাজুল মা&#8217;সীর” এবং ইসামীর “ফুতুহ-উস-সালাতিন” ছিলো সেই যুগের কয়েকটি বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ। এসব ইতিহাস পাঠে সুলতানি আমলের ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক বিবরণ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।</p>
<p><strong>এছাড়াও, মুঘল আমলের ঐতিহাসিক বাদাউনী, আবুল ফজল, ফিরিস্তা, কাফিখান, আব্দুল হামিদ লাহোরী, নিজামুদ্দীন আহমদ বখশী প্রমুখ ইতিহাস লেখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। মুঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং বাবর ছিলেন একজন পণ্ডিত ও কবি। তিনি “তুযক-ই-বাবুর” লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।</strong> তাঁর আত্মচরিত ইতিহাস সাহিত্যের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তাঁর আত্মচরিত রচনা করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। হুমায়ুনের ভগ্নি গুলবদন বেগম রচিত “হুমায়ুননামা”, ফিরিস্তার “তারিখ-ই-ফিরিস্তা”, আবুল ফজলের “আকবরনামা” ও “আইন-ই-আকবরী” নিযামুদ্দীনের “তাবাকাত ই-আকবরী”, আব্বাস শিরওয়ানীর “তারিখ-ই-শেরশাহী” প্রভৃতি গ্রন্থের ঐতিহাসিক মান ছিলো অত্যন্ত উঁচুস্তরের। সাহিত্যে জাহানারা ও জেবুন্নেছা সে যুগে সুনাম অর্জন করেন। মুঘল আমলে কবি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন ফৈজী, রামদাস, সুরদাস, তুকারাম ও রামপ্রসাদ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong> স্থাপত্য শিল্প</strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রকার নতুন স্থাপত্য শিল্পের প্রবর্তন করেন। এগুলো সাধারণত মক্কা, দামেস্ক, মিসর, বাইজান্টাইন এবং ইরানের স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে ও আদর্শে নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক ফারগুসন একে “ইন্দো-সারাসিন” বা পাঠান স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক হ্যাভেল একে ভুল করে অন্তরঙ্গে ও বহিরঙ্গে হিন্দু স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্পরীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক স্যার জন মার্শাল বলেন,</p>
<p>❝ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য কেবলমাত্র বৈচিত্র্যময় স্থানীয় (আরবীয়) স্থাপত্য কিংবা শুধুমাত্র হিন্দু স্থাপত্যের সংশোধিত রীতি নয়। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য সমানভাবে না হলেও এটা উভয় উৎসের সংমিশ্রণে উদ্ভূত হয়েছে।❞</p>
<p>প্রাথমিক যুগের সুলতানরা তাঁদের ইমারত নির্মাণে স্থানীয় হিন্দু কারিগরদের নিযুক্ত করতেন। ফলে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে হিন্দু প্রভাব দেখা যায়। কাজেই ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য শিল্পে বিশেষ কতকগুলো হিন্দু শিল্পরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। পরবর্তীকালে এদেশে বিপুলসংখ্যক মুসলিম কারিগর ও শিল্পী আগমন করলে সুলতানি আমলের ইমারতগুলো নির্মাণে স্থাপত্য শিল্পে হিন্দু-প্রভাব লোপ পেতে থাকে।</p>
<p><strong>দিল্লিতে মুসলমানদের প্রথম “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটি নির্মাণে কুতুবুদ্দীন আইবেক ২৭টি মন্দিরের উপাদান ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। তাঁর নির্মিত “কুতুব মিনারটি” মূলত আজান দেওয়ার জন্য নির্মিত একটি গম্বুজ-বিশেষ। “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটির অনুকরণে কুতুবুদ্দীন আইবেক আজমীরে “আড়াই দিনকা ঝোপড়া” নির্মাণ করেন। এ যুগের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে ইলতুৎমিশ কর্তৃক বদাউনে নির্মিত মসজিদ, হাউজে শামশী, শামস-ই-ঈদগাহ প্রভৃতি ছিলো সমধিক প্রসিদ্ধ।</strong> এ&#8217;আমলে অনেক প্রাদেশিক শাসকও স্থাপত্য শিল্পের পেছনে উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। জৌনপুরী শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের স্বাক্ষর হিসেবে জৌনপুরের “অটলা মসজিদ”, “জাম-ই-মসজিদ” ও “লাল দরওয়াজা” প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিলো।</p>
<p>বাংলার স্বাধীন সুলতানগণের দ্বারা নির্মিত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, দরবেশ খানজাহান আলীর মাজার, গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, কদম রসুল মসজিদ, হুসেন শাহের সমাধি ইত্যাদি বাংলার স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়াও মালবের রাজধানী মণ্ডুতে নির্মিত জামে মসজিদ, হিন্দু মহল, জাহাজ মহল, হুসাং শাহের সমাধি, বাহাদুর শাহের প্রাসাদ, গুলবর্গার জামে মসজিদ, ফিরোজ শাহ বাহমনীর সমাধি সৌধ, মাহমুদ গাওয়ানের মাদরাসা ভবন, আহমেদাবাদের জামে মসজিদ ইত্যাদি সেই যুগের স্থাপত্য শিল্পের এক অক্ষয় স্বাক্ষর বহন করে আছে।</p>
<p>মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে ভারতীয়, মিসরীয়, ইরানি, সিরীয়, বাইজান্টাইন রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে। এ রীতির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে মুঘল আমলে।</p>
<p>মুঘল আমলের স্থাপত্যশিল্পে ভারত বিশ্ববিখ্যাত ছিলো। উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যশিল্পসমূহ হলো, তাজমহল, লালকেল্লা, ফতেপুর সিক্রি, হুমায়ুনের সমাধি ভবন এবং ইতমাদ্দৌলার সমাধি। মুঘলদের এই বিরাট কর্মযজ্ঞে অসংখ্য দক্ষ শ্রমিক আত্মনিয়োগ করেছিলো। তাদের দক্ষতায় ভারতীয় ও পারসিক শিল্পের সমন্বয়ে এক নতুন শিল্পধারা ভারতে প্রবর্তিত হয়েছিলো। এই স্থাপত্যশিল্পের মূল উপাদান ছিলো ইট, পাথর ও চুন। শ্বেতপাথর ও লালপাথরের নিখুঁত ব্যবহারে স্থাপত্য শিল্প এক অভাবনীয় মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলো।</p>
<p>এই স্থাপত্য শিল্পের সঙ্গে যেমন মুঘল রাজমিস্ত্রি জড়িত ছিলো, তেমনি এসব উপাদান সরবরাহের কাজে হাজার হাজার মানুষও ছিলো জড়িত। ইট, বালি ও পাথর শিল্প ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এ&#8217;যুগে সৌধশিল্প উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ&#8217;ধরনের উৎকর্ষ লাভ কখনই সম্ভব ছিলো না। গ্রামে ও শহরে গৃহনির্মাণকারী, খাল খননকারী, পাথর কাটার কারিগর, ইট প্রস্তুতকারী, রাজমিস্ত্রি, কাঠচেরাইকারী, খোদাইশিল্পী, পালিশের কারিগর, ছাদপেটাই মিস্ত্রি, চুন প্রস্তুতকারক, কুয়োখননকারী ইত্যাদি অসংখ্য কারিগর সহজলভ্য ছিলো। পাশাপাশি, দুর্গ, প্রাসাদ, বাড়ি, মন্দির, সেতু, রাস্তা জাহাজ ইত্যাদি নির্মাণে অনেক শ্রমিক নিয়োজিত ছিলো।</p>
<p>এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাজমহল নিয়ে সম্রাট শাহজাহান-এর নামে চরম যে মিথ্যাচার করা হয়, ইতিহাসে আদতে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনকি, ভারত সরকার পর্যন্ত এমন মিথ্যাচারিতার বিপরীত মন্তব্য পোষণ করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সঙ্গীত</strong></h4>
<p>ইসলামের প্রভাবে ভারতে সঙ্গীতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কবি, সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু সঙ্গীতের তত্ত্বগত ও ব্যবহারগত দিক দিয়ে বিশেষ দক্ষ ছিলেন। তিনি অনেক পারসিক রাগ যেমন—ইমন, ঘোর, খানম প্রভৃতি ব্যবহার ভারতে করেন। ভারতে তবলা, সেতার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব ছিল‌ো। উত্তর ভারতের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে এক বিশিষ্ট উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুসলমানদের যথেষ্ট অবদান অনস্বীকার্য। দিল্লির সুলতানি আমলে সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ঘটে। জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহীম শাহ শর্কীর পৃষ্ঠপোষকতায় উভয় ধারার সমন্বয় ঘটে। দিল্লির তুঘলক বংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটান। তাঁর সময়ে ভারতীয় ক্লাসিক গ্রন্থ &#8220;রাগদর্শন” ফার্সি ভাষায় অনূদিত হয়।</p>
<p>সম্রাট বাবর, হুমায়ুন, আকবর সঙ্গীতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, এমনকি সকলেই সঙ্গীত শাস্ত্রের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিলাস খান, লালাখান, তানসেন প্রমুখ গায়ক ছিলেন মুঘল দরবারের অলংকারস্বরূপ। তানসেনের জামাতা লালাখান, জনার্দন ভাট, মহাপট্টক, জগন্নাথ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ। আবুল ফজলের মতে,</p>
<blockquote><p>❝আকবরের দরবারে প্রায় ৩৬ জন গায়ক সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন। তানসেন-এর ন্যায় গায়ক গত দু&#8217;শ&#8217; বছরেও ভারতবর্ষে দেখতে পাওয়া যায়নি।❞</p></blockquote>
<p>মালবের বাজ বাহাদুর ছিলেন আরেকজন হিন্দি গায়ক। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে সাধক রামাদাস বিখ্যাত ছিলেন। জৌনপুরের হুসেন শাহ শরকী, বিজাপুরের আদিল শাহ এবং লখনৌর নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ মুঘল আমলের শেষের দিকে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের অকাতরে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করতেন। এসময় কলকাতায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সঙ্গীতের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে ঐতিহাসিক মোহাম্মদ শালীহ এবং তার ভাইও সঙ্গীতে বিখ্যাত ছিলেন। জাহাঙ্গীর স্বয়ং একজন সুদক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি অসংখ্য হিন্দি সঙ্গীত রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। সঙ্গীতানুরাগী বাদশাহ হিসেবে সর্বজনবিদিত শাহজাহান দিল্লির দিওয়ান-ই-খাসে প্রতি সন্ধ্যায় সঙ্গীতের আসর বসাতেন।  ঐতিহাসিক জে. এন. সরকার বলেন,</p>
<blockquote><p>❝শাহজাহানের সুমধুর কণ্ঠস্বর এতই আকর্ষণীয় ছিলো যে, বহু সুফি দুনিয়ার সকল মোহমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সান্ধ্য আসরে এসে যোগদান করতেন এবং গান শুনতে শুনতে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন।❞</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>রাজনীতি</strong><strong>, </strong><strong>প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতাপূর্ণ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। এ রাজ্যগুলোর মধ্যে ছিলো না কোনো একতা। অধিকন্তু, তাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় স্থায়িত্ব ছিলো না। আর সামাজিক দিক দিয়ে সংকীর্ণতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, বর্ণপ্রথা সমাজকে একেবারে কলুষিত করে দিয়েছিলো।</p>
<p>মৌর্য সম্রাট অশোক উত্তরে হিমালয় ও উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ পর্বতমালা হতে দক্ষিণে মহীশূর এবং পশ্চিমে পারস্যের সীমানা ও আরব সাগর হতে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে একক রাজনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করতে সক্ষম হন। খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে তার মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন উত্তর ভারতে এবং চাণক্য সম্রাট পুলকেশিন মোটামুটিভাবে ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু, তাদের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। সমগ্র ভারতবর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V.A. Smith (ভিনসেন্ট স্মিথ) বলেন, ❝ভারতবর্ষের ইতিহাসের আংশিক ঐক্য হর্ষের সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছিলো।❞</p>
<p>পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, প্রজাদের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা, গোত্রীয় বিরোধ, বিভিন্ন রাজ্যগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ-সহ ইত্যকার নানা কারণে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা একেবারে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিলো। ফলশ্রুতিতে, শাসকদের অত্যাচারে একপ্রকার অতীষ্ঠ হয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণ মুসলিম শাসকদের নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করে। অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, ভারত বিজয়ের পথ উন্মোচন হয় মূলত স্থানীয়দেরই সাহায্যের মাধ্যমে।</p>
<p>এই যদি হয় মুসলিম পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, তাহলে প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার কথা জ্ঞানীমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। রাজনৈতিক এমন বিশৃঙ্খলার সময় যে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর প্রশাসনিক কার্যক্রমই যখন এমন হয়ে পড়ে, তখন সমগ্র বিচারব্যবস্থাই যে ডুমুরের ফুলের মতো অস্পৃশ্য হয়ে পড়বে, সেটাও আর কলমের ডগায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন মনে হয় না। অধিকন্তু, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টাই যেখানে উপেক্ষিত এবং স্বার্থান্বেষণ ও স্বার্থসিদ্ধিই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে পড়ে, সেখানে বিচারব্যবস্থা যে চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর একনায়কতন্ত্রে রূপ লাভ করবে, এই বিষয়টাও সহসাই উপলব্ধি করা যায়। আবার যেখানে জাতপ্রথার নিরিখেই সমাজের ভালোমন্দের তারতম্য হয়, সেখানে আদতে বিচারব্যবস্থার নাম নেওয়াটাই বিলাসিতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>পক্ষান্তরে, মুসলিম ভারতে এর উল্টোচিত্র দেখা যায়।</p>
<p>এই প্রবন্ধের একেবারে শুরুতেই মুসলিম ভারতের ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক ধারার সফলতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এরপর একাধারে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্যে মুসলিম শাসনামলের এতোসব উৎকর্ষতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রমের শক্তিমত্তা ও সমৃদ্ধশালিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তথাপি, আরেকটু আলোচনা করা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রশাসন</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে প্রত্যেক শাসকই ভারতের প্রশাসন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ক্রমান্বয়ে যুগোপযোগী করে তোলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত থাকতেন। মুসলিম পূর্ব ভারতে যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ছিলো সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এবং হ-য-ব-র-ল, সেখানে মুসলিম শাসনামলে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে শাসন ব্যবস্থা জারি রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো দাড় করানো হয়েছিলো। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকেই স্বতন্ত্র মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। আইন, শাসন, বিচারবিভাগ-সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ প্রতিনিয়তই শাসক তদারকি করতেন। এমনকি, এগুলোর প্রতিটিরই আবার অসংখ্য সাব-ডিপার্টমেন্ট ছিলো। এছাড়াও, কৃষি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র বিভাগ বা মন্ত্রণালয় ছিলো।</p>
<p>এর বাইরেও জনসাধারণের সুবিধার্থে স্থানীয় প্রতিনিধিও নিয়োগ করা হতো। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্য-প্রধান সে রাজ্যটিকে একজন স্বাধীন শাসকের মতোই শাসন করতো। তবে, তাঁরা শাসক বা উজির/মন্ত্রীর নিকট জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ থাকতো; তাঁদের নিকট নিয়মিত জবাবদিহি করতো হতো।</p>
<p><strong>প্রশাসনিক কার্যক্রমে কখনও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়নি ভারতের মুসলিম শাসনামলে। সবসময় যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রশাসনিক কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজন কখনই প্রশ্রয় পায়নি। এমনকি এটা পর্যন্ত শোনা যায় যে, দিল্লির সুলতানি আমলে দেশীয় মুসলমানদের বিপরীতে ভিন্নধর্মী স্থানীয়দেরকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়া হতো।</strong> সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক থেকে শুরু করে ইব্রাহীম লোদী পর্যন্ত এই ৩২০ বছরে দরবারে উজির বা প্রধান সেনাপতির (সিপাহসালার) পদ কোনো ভারতীয় মুসলমান পায়নি। সেসময় অমুসলিম নাগরিকদের প্রতিই উদারতা প্রদর্শন করা হয়।</p>
<p>আবার, মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>মুঘল আমলে মনসবদারি পদ্ধতিতে সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এই মনসবদারি প্রথা মুঘলদের নতুন উদ্ভাবন নয়। মুঘলদের আগে সম্ভবত মধ্য এশিয়ায় এই প্রথা প্রচলিত ছিলো। মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং-এর শাসনামলে মনসবদারি প্রথা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো। সৈন্যবাহিনীকে বিভিন্ন পদমর্যাদার রীতি সুলতানি আমলেও চলে আসছিলো। শেরশাহ এবং তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ সেনাবাহিনীর নতুন সংস্কার সাধন করেন। বাবর ও হুমায়ুন সময় ও সুযোগের অভাবে সেনা বিভাগের তেমন কোনো সংস্কার করে যেতে পারেননি। সিংহাসনে আরোহণ করে আকবর সেনাবাহিনীর শোচনীয় অবস্থা লক্ষ্য করলে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার খাতিরে সেনাবাহিনীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শাহবাজ খানের মাধ্যমে মনসবদারি প্রথার উপর ভিত্তি করে এক অভিনব সামরিক সংগঠন সৃষ্টি করেন। তাঁর এই প্রথার মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সেনাবাহিনীর পুনঃগঠন করা। আকবর এই মনসবদারি প্রথা প্রবর্তন করে মুঘলদের সামরিক ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিচারব্যবস্থা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসকগণ আইনের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য আইন ছিলো সমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সুলতানরা বদ্ধপরিকর ছিলেন। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সব সুলতান আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন একটি শিকল বাঁধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতেন, যেনো যেকোনো বিচারপ্রার্থী খুব সহজেই সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝জনসাধারণের অভিযোগ শ্রবণের জন্য তাঁর প্রাসাদে শিকলে বাঁধা একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং অভিযোগকারীরা তা বাজিয়ে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো।❞</p></blockquote>
<p>তাছাড়া, বিচার কার্যের জন্য আইন হিসেবে কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস ব্যবহার করা হতো। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এতো বেশি কঠোর ছিলেন যে, অপরাধীরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতো। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন,</p>
<blockquote><p>❝সুলতানের (বলবন) ন্যায়বিচারের জন্য লোকে এতই ভীতসন্ত্রস্ত থাকতো যে, কেউ কখনো ভৃত্য এবং ক্রীতদাসদের প্রতি অসদাচরণ করতে সাহস পেতো না।&#8221;</p></blockquote>
<p>মুঘল আমলে সাম্রাজ্যের বিচার বিভাগীয় প্রধানকে বলা হতো “কাজী-আল-কুজ্জাত” বা “প্রধান বিচারপতি”। তাঁকে হতে হতো আইনজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ, সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ও নিষ্ঠাবান মুসলমান। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার করতেন। তাছাড়া প্রাদেশিক কাজী, সরকার কাজী, পরগণা কাজী ও কাজী-ই-আসকার (সেনাবাহিনীর সঙ্গের কাজী) বিচারকার্য সমাধান করতেন।</p>
<p>বিচারব্যবস্থায় মুফতীদের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। তাঁরা বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন না। তবে প্রয়োজনে কাজী তাঁদের ধর্মীয় বিষয়ে মতামত গ্রহণ করতেন। তারা শরিয়ত অনুযায়ী &#8220;ফতোয়া&#8221; দিতেন। যখন কাজী কোনো কারণে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারতেন না, তখন &#8220;মীর আদিল&#8221; তাঁর কার্য-সম্পাদন করতেন। তিনি কাজীর তুলনায় ঊর্ধ্বতন কর্মচারী ছিলেন।</p>
<p>মুঘল আমল ছিলো একনায়কতান্ত্রিক শাসন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস ছিলো সম্রাটের হাতে। তারপরও মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, তাঁকে যেমন শরিয়ত মোতাবেক চলতে হতো, আবার তেমনি শরিয়তের পাশাপাশি সম্রাটকে রাষ্ট্রের অভিজাত সম্প্রদায়, সেনাবাহিনী, উলামা ও আইন বিশারদদের সমর্থন লাভ করতে হতো। তাঁরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। দোষী যেই হোক না কেনো, শাস্তি তাকে পেতেই হতো। <strong>সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহানের অপরাধের বিরুদ্ধে রায় দেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধেও শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। সম্রাট আকবর বলতেন, ❝আমি স্বয়ং কোনো অপরাধ করলেও নিজের বিরুদ্ধে রায় দিবো।❞</strong></p>
<p>কাজেই বলা যায় যে, মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মুঘলদের অবদান ছিলো অপরিসীম। প্রত্যেক মুঘল সম্রাটই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন, তা ইতিহাসের পরতে পরতে প্রমাণ বহন করে চলেছে। ইসলামী আইনের চোখে সবাই ছিলো সমান। ইবনে হাসান বলেন, ❝এটা নিশ্চিত যে, মুঘল বিচার পদ্ধতি ছিলো যুগের ও সমাজের জন্য উপযোগী।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মুসলিম শাসনামলে বিচারব্যবস্থার নমুনা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে বিচার ব্যবস্থা কেমন ছিলো, তার তিনটি উপমা নিচে উপস্থাপন করা হলো।</p>
<h5><strong>প্রথম</strong></h5>
<p>সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সুলতান। সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহ একজন ন্যায়বিচারক শাসক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতিনে সুলতানের ন্যায়বিচারের একটি কাহিনী রয়েছে। তিনি একদা তীর ছুঁড়তে গিয়ে এক বিধবা মহিলার পুত্রকে হত্যা করে ফেলেন। বিধবা মহিলা তৎকালিন প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজ উদ্দিনের কাছে বিচারপ্রার্থী হলেন। প্রধান বিচারপতি নির্ভয়ে সুলতানের নামে সমন জারী করলেন। সুলতান বিচারপতির আদালতে হাজির হলে বিচারপতি কোনো রকম সম্মান প্রদর্শন না করে তাঁর বিরুদ্ধে বিধবার আনীত অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বিধবাকে ক্ষতিপূরণ দানে সন্তুষ্ট করতে না পারলে শরীয়ত মতে সুলতান দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সুলতান বিধবাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং বিধবা অভিযোগের সন্তোষজনক মিমাংসার কথা বিচারপতিকে অবহিত করেন।</p>
<p>সুলতান তখন শাহী আসন থেকে উঠে এসে বিচারপতিকে সালাম দিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার রাজ্যে এমন একজন ন্যায় বিচারক আছেন এজন্য দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। বিচারপতি, আপনি আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে আমার তরবারি দিয়েই আমি আপনার মস্তক ছেদ করতাম।❞</p></blockquote>
<p>প্রতি উত্তরে বিচারপতি বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার নির্দেশ আপনি অমান্য করলে আমিও আপনাকে বেত্রাঘাত করতাম।❞</p></blockquote>
<p>পরবর্তীতে, সুলতান বিচারপতিকে ন্যায়বিচারের জন্য পুরষ্কৃত করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>দ্বিতীয়</strong></h5>
<p>একবার সম্রাট আলমগীরের সৈন্যবাহিনী এক মুসলিম সেনাপতির অধীনে পাঞ্জাবের এক পল্লীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ পথিমধ্যে জনৈক ব্রাক্ষণের এক অপরূপ সুন্দরী কন্যার প্রস্ফুটিত গোলাপের মত মুখশ্রী দেখে লোভাতুর সেনাপতি তার পিতার নিকট মেয়েটিকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসে এবং সিদ্ধান্ত জারি করে যে, আজ থেকে এক মাস পরেই সে তার বাড়ীতে বর-বেশে উপস্থিত হবে। কন্যার পিতা নিজে সম্রাট আলমগীরের নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে বাদশার সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সম্রাট তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। সাথে এ-ও জানালেন যে, নিদিষ্ট দিনে তিনি ব্রাহ্মণের বাড়িতে উপস্থিত থাকবে। ব্রাহ্মণ নানা চিন্তার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এরপর, বিবাহের আগের দিন সম্রাট আলমগীর একাই এসে উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণের বাড়িতে। ব্রাহ্মণ হতবাক!</p>
<p><strong>সম্রাট সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণের এক পুরাতন জীর্ণ কামরায় সারা রাত এবাদত  বন্দেগী ও মোনাজাত-প্রার্থনায় অশ্রুবিসর্জন করে কাটালেন। ব্রাহ্মণের পরিবারবর্গ এ দৃশ্য দেখার পর আবারও অবাক হলেন। পরদিন মুঘল সেনাপতি বর-বেশে ব্রাহ্মণের ঘরে উপস্থিতি হলো। বিবাহের পূর্বে কন্যাকে একবার দেখা উত্তম। সেজন্য, সেনাপতি কন্যাকে দেখতে চাইলো। প্রত্যুত্তরে ব্রাহ্মণ সম্রাটের শেখানো অনুযায়ী সম্রাটের কামরার দিকেই ইশারা করলেন। সেনাপতি ঘরে প্রবেশ করেই দেখলো খোলা তরবারি হাতে সম্রাট আলমগীর বসে রয়েছেন।</strong></p>
<p>যৌবনের বুকভরা আবেগ আর মুখভরা হাসি নিমিষেই সম্রাটকে দেখার পর অদৃশ্য হয়ে গেলো। যে সেনাপতির দাপটে শত্রু সৈন্যরা থরথর করে কাঁপে, যার মাঝে ভয়-ভীতি অথবা দুর্বলতা কখনও স্থান পায় না, আজ সেই মহাবীর কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ভীষণ শব্দে যেনো কেঁপে উঠলো। নিজেকে সামলে নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করলেও দুঃখ, লজ্জা, শাস্তি আর অপমানের আশংকায় সেনাপতি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কন্যার পিতা সম্রাট আলমগীরের সুবিচার, দায়িত্ববোধ আর অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা দেখে আনন্দে বললেন,</p>
<p>❝আপনি আমার, বিশেষ করে আমার কন্যার ইজ্জত রক্ষা করেছেন। আপনার এই ঋণ অপরিশোধ্য।❞</p>
<p>সম্রাট আলমগীর ব্রাহ্মণকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করে বললেন,</p>
<p>❝এই মহান দায়িত্ব আমার। আমি যে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি এতেই আমি ধন্য।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>তৃতীয়</strong></h5>
<p>মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ছিলেন আঠারো শতকের ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল নারীদের একজন। জন্মের সময় তার নাম দেয়া হয়েছিলো মিহরুন নিসা। কিন্তু স্বামী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর পরে তার নাম পাল্টে রেখেছিলেন নূরজাহান (জগতের আলো)। নূরজাহান কবি, স্থপতি ও দক্ষ শিকারি ছিলেন। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে প্রিয়তম স্ত্রীতে পরিণত হন। সারাটি দিন তিনি নুরজাহানকে নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকতেন। নিজ স্ত্রীর বিচার করার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল হলেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ন্যায়বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।</p>
<p>সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেই সময়ে সাধারণ প্রজাদের সরাসরি সাক্ষাতের কোনো অনুমতি ছিলো না। তিনি তখন মুজাদ্দিদে আলফেসানীর পরামর্শে দরবারের বাইরের ফটকে একটি শিকল রাখেন, যেটি একেবারে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শয়নকক্ষ পর্যন্ত সংযুক্ত ছিলো, যার সঙ্গে একটা ঘণ্টাও বাঁধা ছিলো। যেকোনো অত্যাচারিত, উপবাসী, অবহেলিত কেউ অথবা রাজকর্মচারীদের দ্বারা যার কাজ সমাধান হয়নি, এমন মুসলিম-অমুসলিম প্রজা সেই শিকল টানলেই বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কক্ষে ডাকতেন এবং তাঁর সন্তোষজনক সমাধান করেই তবে ক্ষান্ত হতেন।</p>
<p>একদিন রূপ লাবণ্যের জীবন্ত প্রতীক নুরজাহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রূপচর্চা করছিলেন। এমন সময় এক বিকৃত মস্তিষ্ক হিন্দু প্রজা বিনা অনুমতিতেই নুরজাহানের কক্ষে উপস্থিত হয়ে পড়েন। নুরজাহান সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু প্রজাকে গুলি করে মেরে ফেলেন। নিহত হিন্দু প্রজার আত্মীয় শিকল টানলেন এবং জাহাঙ্গীরের নিকট নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী হলেন। <strong>বিচারকের আসনে তখন জাহাঙ্গীর এবং আসামীর কাঠগড়ায় তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহান। কঠিন এই মুর্হুতেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ভুললেন না ইসলামের বিধান। জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রীর ব্যাপারে রায় ঘোষণা করলেন মৃত্যুদন্ড। রায় ঘোষণার সাথে সাথে সকলেই হতবাক হয়ে গেলেন। স্বয়ং নূরজাহান তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এমন সময় সম্রাট জাহাঙ্গীরের মন্তব্য ছিলো,</strong></p>
<blockquote><p>❝ইসলামের আইনে তুমি তাকে হত্যা করতে পারতে কারোর প্রাণনাশের বা ব্যাভিচারের অপরাধে। কিন্তু সে দোষ তো তার ছিলো না। সে ছিলো বিকৃত মস্তিষ্ক। অতএব, আমি আবার বলছি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তোমার মৃত্যুদন্ড।❞</p></blockquote>
<p>একজন মহান শাসক কর্তৃক ইসলামের এই ইনসাফ-ভিত্তিক ন্যায়বিচার দেখে বিচারপ্রার্থী হিন্দু প্রজারা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেছিলো,</p>
<blockquote><p>❝হে ন্যায়পরায়ণ বাদশা! আমরা প্রাণদন্ড চাই না। নূরজাহানকে আমরা ক্ষমা করে দিলাম। কারণ, তিনি তো আর ইচ্ছে করে খুন করেননি। তিনি যা করেছেন তা তো নিজের আত্মরক্ষার জন্যই করেছেন।❞</p></blockquote>
<h4><strong>💠</strong><strong>অর্থনৈতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>পূর্বেই বলা হয়েছে, সমগ্র ভারতবর্ষ হলো মহান রবের নেয়ামতধন্য অপার এক লীলাভূমি। কিন্তু, এতো নেয়ামত সত্ত্বেও মুসলিমপূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ ভঙ্গুর। দু&#8217;বেলা দু&#8217;মুঠো আহারের জন্য জনসাধারণের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো। এসব বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ ছিলো, অর্থনীতির সুষমবণ্টন না থাকা এবং যোগ্য অর্থনীতিবীদ না থাকা। অবশ্য, যেখানে ধর্মের নামে অধর্ম চর্চা করা হতো, শাসনের নামে জনগণকে শোষণ করা হতো, জাতিভেদ ও জাতপ্রথা যেখানে সমাজকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিলো—সর্বোপরি, ভারতের সামগ্রিক অবস্থাই ছিলো যেখানে বিশৃঙ্খল, সেখানে অর্থনৈতিক সুদিনের বিষয় কল্পনা করাটাই ছিলো অতিরঞ্জন। বর্তমান সময়ের মতোই সেসময়েও ধনীরা হয়ে যেতো আরো ধনী এবং দরিদ্ররা হয়ে যেতো একেবারে নিঃশেষ; ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কিছুদিনের মাথায় স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে যেতো কোনো একজনের কৃতদাস। কিছুদিন পূর্বে একই ঘরে বসবাস করা একই পরিবারের সদস্যদের ঠিকানা হতো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।</p>
<p>ভারতবর্ষ ছিলো একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের এক ষষ্ঠাংশ (৬ ভাগের ১ ভাগ) রাষ্ট্রকে কর হিসেবে দিতে হতো। এ করকে &#8220;ভাগ&#8221; বলা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, মৌর্য ও গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলো। এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়। খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীতে বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতে আসেন। তিনি গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিবরণ দেন। তার মতে মগধের লোক সমৃদ্ধশালী ও ধনী ছিলো এবং তাদের মধ্যে সৎ কাজ করার প্রবণতাও ছিলো। এ সময়ে বাংলার তাম্রলিপ্তি বন্দর একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। এখান থেকে বঙ্গদেশের বণিকরা বড় বড় জাহাজে সিংহল, মালয়, যবদ্বীপ প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। ভারতবর্ষে শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। কার্পাস বস্ত্র উৎপাদন এবং রপ্তানির জন্য গুজরাট এবং বাংলাদেশ খ্যাতি লাভ করে। ঢাকার মসলিন ছিলো সেসময় পৃথিবী বিখ্যাত।</p>
<p>সে যাইহোক, ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী থাকলেও সম্পদ বণ্টন ও ভোগের ক্ষেত্রে ছিলো চরম বৈষম্য ও অব্যবস্থা। অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ লোকের জীবনযাত্রার মধ্যে ছিলো ব্যাপক ব্যবধান। সমাজের সাধারণ মানুষ যেমন—কামার, কুমার, ছুতার, স্বর্ণকার এবং কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত‌ো। কিন্তু, সুফল ভোগ করতো অভিজাত শ্রেণির লোকেরা; তারা অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>সমগ্র ভারতের ইতিহাসে চরম অর্থনৈতিক উৎকর্ষতার যুগ হচ্ছে মুসলিম শাসনামল। মুসলিমরা এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে সফলতা লাভ করেনি। মুঘলামলে এই ভারতবর্ষ সমগ্র পৃথিবীর ২৮-৩০% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। আজকের ইউরোপীয়দেরকে এই ভারতবর্ষ থেকেই স্কলারশিপ বা বৃত্তি প্রদান করা হতো। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে রাজ্য পরিচালনার জন্য নামেমাত্র কর নেওয়া হতো। কর নেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম কোনো বৈষম্য করা হতো না। যার জন্য যেটা ন্যায্য, তার জন্য সেটাই ধার্য করা হতো। মুসলিমদের জন্য যাকাত, ওশর, সদকা ও ফেতরার মতো বিষয়গুলো সেভাবেই ধার্য করা হতো। পাশাপাশি, অন্যদের জন্য অবস্থা অনুযায়ী জিযিয়া ও খারাজ গ্রহণ করা হতো। মুসলিম শাসনামলে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য আলাদা দফতর বা মন্ত্রণালয় দক্ষ হাতে পরিচালনা করা হতো। এমনকি, মুসলিম শাসকদের প্রতিটি পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং সেসব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না, তা স্বয়ং শাসক নিয়মিত তদারকি করতেন। পণ্যসমূহের বাজারমূল্য নির্ধারণ করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি শাসকগণ, বরং মুদ্রাব্যবস্থাতেও এনেছিলেন অভূতপূর্ব বিবর্তন; বিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে নিত্য নতুন মুদ্রার প্রচলনও শুরু করতেন শাসকগণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে আমলে বস্ত্রশিল্পে চরম উন্নতি লাভ করে। গুজরাট ও বাংলা ছিলো বস্ত্রশিল্পের প্রধান ঘাটি। এমনকি, এই অঞ্চলে এমনসব পোশাক তৈরি করা হতো, যেসব পোশাক তৈরিতে আবহাওয়াকে পর্যন্ত কাজে লাগানো হতো। সিল্ক, মসলিন, সুসতরি ভিরাইন, কিংখাব ছিলো সে সময়ের জগদ্বিখ্যাত সব পোশাকের নাম। শুধু পোশাকেই নয়; বরং তুলা শিল্প, পশম শিল্প, ধাতু শিল্প, জুয়েলারি শিল্প, পাথর শিল্প, কাঠ শিল্প, কাগজ শিল্প, কাঁচ শিল্প এবং চিনি শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিলো মুসলিম শাসকগণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ব্যবসা বাণিজ্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা ভারতে আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাত্রা আসে। দিল্লির সুলতানি আমল-সহ মুঘল আমলেও কেন্দ্রীয় শাসন, কৃষি-শিল্পের উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নগরায়ন ও মুদ্রা ব্যবস্থার বিকাশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। এ সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রসার ঘটে। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর সময়ে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এ সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. অভ্যন্তরীণ বা আন্তঃবাণিজ্য,</li>
<li>০২. বৈদেশিক বা বহিঃবাণিজ্য।</li>
</ul>
<p>মুসলিম শাসনামলে ভারতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিলো। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিলো প্রাদেশিক রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলো। যেমন—মুলতান, দিল্লি, আমরোহা, মীরাট, মালবের ধর, অযোধ্যা, দেবগিরি, লক্ষণাবতী, কাশ্মীর, গুজরাট, বিজয়নগর; এসব শহর ও বন্দরগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে। সেসময় বিভিন্ন ধরনের পণ্য-দ্রব্য আমদানি-রপ্তানি করা হতো। গ্রাম থেকে খাদ্যশস্য এসব বাণিজ্যকেন্দ্রে আসতো। এসব কেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি করা হতো। গুজরাটের সুরাট ও ম্যাংগ্রল হতে ঘোড়া, গম, চাল, তুলা, কাপড় এবং আরও বহু জিনিসপত্র ভারতের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার এখানে নিয়ে আসা হতো নারকেল, পালিশের শক্ত গুঁড়ো, খনিজ পদার্থ, মোম, এলাচ ও মসলা। ব্যবসায়ীরা উপকূল বাণিজ্যে দিউ, মালাবার, ভাতকল, গোয়া, চাল ও দাভোলের সঙ্গে ভালোই লাভ করতো। বারবোসা বলেছেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মালাবারের জাহাজে করে লোহা, ভাতকলের চিনি, গোলমরিচ, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, চন্দনকাঠ, সিল্ক &#8216;দিউ&#8217; বন্দরে যেতো এবং আসার সময় মালাক্কা ও চীন হতে এখানে বিশেষ করে সিল্কের কাপড়, দেশীয় বস্ত্র, ঘোড়া, গম ও আফিম নিয়ে আসতো। আবার বাংলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে করে চিনি ও কাপড় নিয়ে ক্যাম্বের ও মালাবার যেতো কমোরিন অন্তরীপ হয়ে।❞</p></blockquote>
<p>ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বরাবরই চলতো জলপথে ও স্থলপথে। ইসলামের অভ্যুত্থান ও মূর জাতির আধিপত্য হেতু ইউরোপের সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের পণ্য যাওয়ার পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। কারণ, আরব বণিকরা ভারতীয় পণ্য লোহিত সাগরে বয়ে নিয়ে যেতো; সেখান থেকে যেতো দামাস্কাস ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। তারপর, সেখান থেকে ভারতীয় পণ্য বিভিন্ন অঞ্চলে বাগদাদ ও ইউরোপে ছড়িয়ে যেতো। মূর বণিকদের দ্বারাও ভারতীয় পণ্য বিদেশের বাজারে পৌঁছে যেতো। বিশেষ করে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, সুদূর পূর্বাঞ্চলের মালয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যেতো। স্থলপথে ভারতীয় পণ্য প্রধানত চারটে দেশে যেতো, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, পারস্য ও ইরাক। মুলতান-কোয়েটা সড়ক, খাইবার গিরিপথ ও কাশ্মীর যাওয়ার রাস্তাগুলোই ঐসব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো; এই পথেই আবার বাণিজ্য হতো। বিদেশি বাজার থেকে ভারতে বিলাসদ্রব্য ও অন্যান্য দ্রব্য চলে আসতো এবং সাধারণভাবে সব রকমের প্রয়োজনীয় পণ্যের এদেশে ভালো বাজার ছিলো। আবার পারস্য উপকূলের কোনো কোনো দেশ ভারতের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল ছিলো। বারবোসার বক্তব্য অনুসারে বাংলার সাদা চিনি বিদেশে প্রচুর রপ্তানি হতো।</p>
<p>সমুদ্র বাণিজ্যে প্রধানত বাংলা ও গুজরাট বন্দরের মাধ্যমেই এই রপ্তানি বাণিজা চলতো। গুজরাটের প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো বহুমূল্য পাথর, নীল, তুলো, পশুর চামড়া এবং আরও বহু জিনিস। সুতি ও অন্যান্য বস্ত্রই ছিলো প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। গৌণ রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে ছিলো বহুমূল্য রক্তিম পাথর, তিল তেল, চন্দন কাঠ, সুবাসিত তেল, দস্তা, আফিম, নীল এবং মালাক্কা ও চীন দেশে থেকে নিয়ে আসা কিছু ঔষধপত্র। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রপ্তানি হতো গম, জোয়ার, চাল, ডাল, তৈলবীজ, সেন্ট এবং আরও অনেক দ্রব্য। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বারবোসার মতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো চিনি। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h5><strong>রাজস্ব ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>মুঘল শাসনামলে ভারতের রাজস্বব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী ছিলো। বাবর ও হুমায়ুনের আমলে সুলতানি আমলের প্রশাসন কাঠামোর উপরই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো। তবে আকবরের রাজত্বকালে মুঘলদের রাজস্ব ব্যবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন আনয়ন করা হয়। এ আমলে সুষ্ঠু নিয়ম-নীতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হতো। রাজকোষও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে বিরাট সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ, শিল্প-স্থাপত্যের উৎকর্ষ সাধন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তাদের প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন হতো।</p>
<p>সম্রাট আকবরের শাসনামলে সরকারের আয়ের উৎস ছিলো কয়েকটি। যথা,</p>
<ul>
<li>(১) ভূমি রাজস্ব,</li>
<li>(২) বাণিজ্য শুল্ক,</li>
<li>(৩) টাকশাল,</li>
<li>(৪) উত্তরাধিকার স্বত্ব</li>
<li>(৫) উপঢৌকন,</li>
<li>(৬) ক্ষতি পূরণের অর্থ।</li>
</ul>
<p>এগুলোর মধ্যে ভূমি রাজস্ব ছিলো সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। সম্রাট আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। শের শাহের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যা পরবর্তী সময়ে লোপ পায়, তা আকবর পুনরায় শুরু করেন। সম্রাট আকবর পর পর একাধিক দেওয়ানের প্রচেষ্টা পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমলকে “দিওয়ান-ই-আশরাফ” বা “প্রধান রাজস্ব সচিব” নিযুক্ত করেন এবং রাজস্ব সংস্কারের নির্দেশ দেন। সম্রাট আকবর শেরশাহের রাজস্ব ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন করেন, তা তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব ও মেধার পরিচায়ক।</p>
<p>মুঘল সম্রাট আকবরের রাজস্ব নীতির সুফল সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এসবের ফলে রাজকর সুনির্দিষ্ট হয়। রাজস্ব কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধ হয়। সম্রাটের আয় বৃদ্ধি পায়। সম্রাট বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অধিক অর্থ ব্যয় করতে পারেন। এর ফলে কৃষককুল সমৃদ্ধশালী হয়। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর আগে বার্ষিক খাজনার পরিমাণ ছিল ১৭, ৪৫,০০,০০০ টাকা। এছাড়াও,</p>
<ul>
<li>ক. কৃষকদের আর্থিক উন্নতি হয়।</li>
<li>খ. অনাবৃষ্টি ও খরাজনিত কারণে কর মওকুফ হয়।</li>
<li>গ. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।</li>
<li>ঘ. দৈনন্দিন ব্যবহারের দ্রব্যাদির মূল্য হ্রাস,</li>
<li>ঙ. জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়,</li>
<li>চ. গরু, ষাঁড়, লবণ প্রভৃতির উপর নির্ধারিত কর বাতিল।</li>
</ul>
<p>এসব প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V. A. Smith বলেন,</p>
<p>❝সংক্ষেপে বলতে গেলে, আকবরের রাজস্ব শাসন ছিলো প্রশংসনীয়। নিয়ম-কানুন ছিলো বিজ্ঞচিত এবং কর্মচারীবৃন্দকে জনগণের প্রতি সদয় হতে বাস্তব নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>কৃষি-ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরদিনই ছিলো কৃষিনির্ভর। ভারতের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ লোকের জীবিকাই ছিলো কৃষি। মুঘল সম্রাটরা কৃষির প্রতি বিশেষ নজর দেন। মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থা যে খুব খারাপ ছিলো তা বলা যায় না। যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা সে যুগে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মুঘল আমলে মুঘল প্রশাসন ও অভিজাতবর্গ ছিলো কৃষিজাত আয়ের উপর নির্ভরশীল। মুঘল আমলের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অপেক্ষা যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থার পরিচয় বিখ্যাত আফ্রিকার শাসক ইবন বতুতার বিবরণ থেকে জানা যায়। বারবোসা, মাহুয়ান ও বার্থেমার বিবরণ থেকেও ভারতের কৃষি ও শিল্পের অনেক তথ্য পাওয়া যায়।</p>
<p>পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতীয় কৃষকরা অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করতেন। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে মোট ৪১ রকমের রবি ও খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। তিনি আগ্রা অঞ্চলে ১৬টি রবি শস্য ও ২৫টি খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। শূন্য পুরাণ থেকে জানা যায় যে, ৫০ রকমের চাল বাংলায় উৎপাদন হতো। ভারতীয় কৃষকরা অন্যান্য দেশ থেকে আনা নতুন শস্যও উৎপাদন করতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার ২টি নতুন পণ্য—তামাক ও ভুট্টা এদেশে উৎপাদিত হতে থাকে। নদীমাতৃক ভারতবর্ষের মাটি পলিমাটি দ্বারা গঠিত হওয়ায় জমি ছিলো খুবই উর্বর। বছরে ২ থেকে ৩ বার ফসল উৎপাদন হতো। সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী “বাবরনামা” থেকে জানা যায় যে, বৈচিত্র্যের জন্য উৎপাদন ছিলো ভারতীয় কৃষকদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের পশ্চিম উপকূলে তামাকের চাষ শুরু হয় এবং পরবর্তী ৫০ বছরের মধ্যে সমগ্র মুঘল-ভারতে তামাকের চাষ সম্প্রসারিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রে ভুট্টা চাষ হতো। মরিচ চাষ মুঘল-ভারতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃদ্ধি পায়। আলু ইউরোপীয় বণিকরা আমেরিকা হতে এদেশে আনেন। কফি দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে সামান্য উৎপাদিত হতো, কিন্তু তা চাষ ভারতীয় কৃষকদের অজানা ছিলো।</p>
<p>ধান, পাট, গম, কার্পাস, তৈলবীজ, আদা, মরিচ, রেশম এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল, বার্লি এবং আরও অসংখ্য রকমের রবিশস্য ও ইক্ষু ভারতের মাটিতে ভালো ফলতো। মুঘল নথিপথে অর্থকরী ফসলকে “জিনিস-এ-কামিল” বলা হয়েছে। কার্পাসের পাশাপাশি ইক্ষু ছিলো এই ধরনের অর্থকরী ফসল। নানাবিধ ফল-মূল ও শাক-সবজির চাষ মুঘল যুগে হতো। বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন শস্যের ভিত্তিতে আজকের মতো সেসময়ও শস্য উৎপাদনে খ্যাতি অর্জন করেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার</strong></h4>
<p>এখন এতোসব আলোচনার পরিসমাপ্তিতে একটা প্রশ্ন বা মন্তব্য আসতে পারে যে, ভারতের মুসলিম শাসনামলের সাথে পূর্বের শাসনামলের তুলনামূূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ পাওয়া গেলেও শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে তো হিন্দু-মুসলিম তুলনা করা হয়নি, বরং এই দু&#8217;টি সেক্টরে পূর্বের সাথে তুলনা করে উন্নতি ও উৎকর্ষতা দেখানো হয়েছে।</p>
<p>এর উত্তরে এখানে দু&#8217;টি বিষয় আসবে। যথা,</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সামগ্রিক, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণও সেজন্য হয় সামগ্রিক। কখনও এভাবে দু&#8217;টি ধর্মের জন্য কাজ করে না ইসলামী সভ্যতা। বরং, মুসলিমদের নিজেদের ভেতরে মারহামাতপূর্ণ একটা সমাজ বিনির্মাণ করে তারপর সমাজের সকলকে একসাথে নিয়ে আদালত ও মারহামাতপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী সভ্যতায় হিন্দু-মুসলিম বলে আলাদা কোনোকিছু ছিলো না। কেননা, এখানে হিন্দুদের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও বড় একটা অংশ বসবাস করতো। এমনকি, এই বৌদ্ধ জনসাধারণই মুসলিমদেরকে ভারত অভিযানে আমন্ত্রণ জানায়।</p>
<p>আবার, হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সহাবস্থান বজায় রাখা বা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি সেক্টরে হিন্দু-মুসলিম একত্রে কাজ করাটাই শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের উদাহরণ নয়, বরং মুসলিম সমাজের মাঝেও যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগে থাকে, সে সমাজকেও সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটা সমাজ বলা যায় না। অতএব, এখানে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান বলে আদতে কিছুই নেই। যা আছে তা হলো, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষকে নিয়ে আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূর্ণ একটি সমাজ বিনির্মাণ করা; যা ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী ভারতীয় উপমহাদেশে প্রমাণ করে দেখিয়ে এসেছে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong></p>
<p>হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় যেভাবে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উপমা পেশ করা হয়েছে, সেটার সাথে তুলনা করে অবশ্য শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে সে উপমা পাওয়া যায় না; বরং এখানে উন্নতি ও অগ্রগতির বিষয়টাই তুলনামূলকভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু, এখানে আরেকটা বিষয় উঠে আসে যে, প্রাক-মুসলিম ভারতে যেসব সেক্টরে সুস্পষ্টরূপে অসামাজিকতা বা সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিপরীত কার্যক্রম লক্ষ্য করা যেতো, সেসব সেক্টরগুলোকে ধরে ধরে মুসলিম ভারতের সময়কার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>আবার যেখানে রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-বিষয়টা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে অর্থনীতিতে যে স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তখনই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যায়, যখন শিক্ষা-সাহিত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সমানভাবে শিক্ষা অর্জন করতে পারে। কেননা, সঠিক শিক্ষা ব্যতীত কখনই ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নিদর্শন পাওয়া যায় না। সে হিসেবে, যেখানে তুলনামূলক পার্থক্য দেখানোর প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেটাই করা হয়েছে; এবং যেখানে মুসলিম শাসনামলের উন্নতি ও সমৃদ্ধি উপস্থাপনের প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেসব বিষয়ই উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অতএব, পরিসমাপ্তিতে বলা যায় যে,</strong></p>
<p>সার্বিক আলোচনায় এবং সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসে মুসলিম শাসনামল বা ইসলামী সভ্যতাই একমাত্র সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা পেশ করেছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, নারী, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতি-সহ সমাজ নামক বিষয়টির সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রতিটি বিষয়েই ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নিশ্চিত করেছিলো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূ্র্ণ যে সমাজের নিদর্শন উপস্থাপন করেছিলো, তাবত ভারতীয় ইতিহাসের আর কোনো সভ্যতাই সে নিদর্শন পেশ করতে সক্ষম হয়নি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানই নয় শুধু, বরং খোদ ভারতের ১০০কোটি মানুষও এখন আবারও ইসলামী সভ্যতার সামাজিক অবকাঠামো অর্থাৎ নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটি সমাজের জন্য মুখিয়ে আছে। পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন ভারতের যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, আর কোথাও থেকে হোক বা না হোক, যে বাংলার ভূমি থেকেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, সেই বাংলার উর্বর জমিন থেকেই আবারো স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাওলাঃ</strong></p>
<p>১. ইসলাম ও জ্ঞান, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
২. আন্তর্জাতিক শোষণ ও মুক্তির পন্থা, হাসান আল ফিরদাউস।<br />
৩. সাম্রাজ্যবাদ, ফাহমিদ-উর-রহমান।<br />
৪. দাওয়াম, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
৫. পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম।<br />
৬. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক।<br />
৭. আলিম ইসলামের ইতিহাস, লেকচার পাবলিকেশন্স।<br />
৮. মুসলিম ভারতের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।<br />
৯. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (মুঘল আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১০. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (সুলতানি আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১১. মুসলিম প্রশাসনব্যবস্থা, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।<br />
১২. মুসলিম প্রশাসন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ, ড. মুহম্মদ আলী আসগর খান, শেখ মুহম্মদ লুৎফর রহমান, মোখলেছুর রহমান।<br />
১৩. সোনারগাঁও: বাংলায় ইলমী সিলসিলার অনন্য মিনার, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম।<br />
১৪. সুলতানী আমলে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার উৎপত্তি ও বিকাশ, ড. আব্দুল করিম।<br />
১৫. মুসলিম শাসনে ন্যায়বিচার, তোফাজ্জল বিন আমীন।<br />
১৬. বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা হাসান আল ফিরদাউস (মিহওয়ার ৪র্থ সংখ্যা)<br />
১৭. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ডক্টর এম. এ রহিম।<br />
১৮. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খান।<br />
১৯. আমাদের জাতিসত্ত্বার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।<br />
২০. বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15906</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী অর্থনীতিতে ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-role-of-islamic-institutions-in-islamic-economics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-role-of-islamic-institutions-in-islamic-economics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. আসাদ জামান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 May 2025 07:06:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15849</guid>

					<description><![CDATA[“কোন দলটি উত্তম, যারা আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির উপর তাদের ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলো তারা, নাকি তারা-যারা একটি পতনোন্মুখ পাহাড়ের কিনারায় তা স্থাপন করেছিলো, যা তাদের সাথে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পড়ে গিয়েছিল?” ইসলামী আইন অথবা সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ইসলামী অনুশীলনের উপর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>“কোন দলটি উত্তম, যারা আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির উপর তাদের ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলো তারা, নাকি তারা-যারা একটি পতনোন্মুখ পাহাড়ের কিনারায় তা স্থাপন করেছিলো, যা তাদের সাথে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পড়ে গিয়েছিল?”</p>
<p>ইসলামী আইন অথবা সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ইসলামী অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে কিছু অনন্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো একটি ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই বিলুপ্ত বা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। আধুনিককালের সকল সমাজকে একই পথ অনুসরণের ধারণার কারণে ইসলামী ঐতিহ্যগুলো শুধুমাত্র ঐতিহাসিক মূল্য রাখে, বর্তমানের জন্য সেগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। ইসলামী বিশ্বে ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর আত্মশক্তি পুনরুদ্ধার এবং তাদের পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চলছে। উপরে উদ্ধৃত কোরআনের আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠার পিছনের উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমসাময়িক চাহিদার সাথে খাপ খাওয়ানো বা আধুনিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইসলামী শরীয়তের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চ্যালেঞ্জটি হলো, ইসলামী আদর্শ ও লক্ষ্যের মধ্যে টানাপোড়েন এবং ঔপনিবেশিক/আধুনিক/ইসলামী কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য যা সারা বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনকে উৎসাহিত করে তোলে। সামনে আমি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, ওয়াকফ (ট্রাস্ট বা এনডাউমেন্ট), হিসবাহ বা বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে পৃথক পৃথক বিভাগে আলোচনা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h6>ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ</h6>
<p>ইসলামে সুদের উপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সুদ-ভিত্তিক লেনদেনের কেন্দ্রিকতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রথম বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো সুদের বিকল্পের বিকাশ। এই বিষয়ে সাহিত্যের একটি বিশাল ভাণ্ডার আছে; সিদ্দিকীর (২০০৪) একটি সাম্প্রতিক জরিপে যা উঠে এসেছে। আমি এ সমস্যা সমাধানের তিনটি ভিত্তি নিয়ে নিচে আলোচনা করছি,</p>
<ul>
<li><strong>প্রথম ভিত্তি,</strong></li>
</ul>
<p>সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ উপায় হলো এই যুক্তি দেওয়া যে, আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যে সুদ প্রচলিত তা কোরআনে নিষিদ্ধ সুদের মতো নয়। এই পথটি খ্রিস্টান ও ইহুদিদের দ্বারা বেছে নেওয়া পথের সমতুল্য, একাধিক প্রচেষ্টা সত্তে¡ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণ এটিকে অস্বীকার করেছেন। মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, কোরআন হলো আল্লাহর নাযিলকৃত বাণী এবং হাদীসে ধারণ করা ঐতিহ্যগুলো মৌলিকভাবে সঠিক। জোন্স (১৯৮৯) দেখান যে সুদের উপর বিধিনিষেধের পুনঃব্যাখ্যা আক্ষরিক না হয়ে রূপক হিসেবে খ্রিস্টান বিশ্বের স্বার্থকে বৈধ করার একটি মৌলিক পদক্ষেপ ছিলো।</p>
<ul>
<li><strong>দ্বিতীয় ভিত্তি,</strong></li>
</ul>
<p>দ্বিতীয় ভিত্তি হলো, বিদ্যমান আধুনিক প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা, যা ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক পরিচালিত হয়। এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হওয়ায় আরও বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে। এম.এন. আইয়ুব (২০০২) এবং জাহের ও হাসান (২০০১) কীভাবে সুদ ছাড়াই কাজ করতে পারে এমন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। এবিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স বই হলো IIBI (১৯৯২) কর্তৃক প্রকাশিত The Encyclopedia of Islamic Banking and Insurance। ইকবাল এবং খান (২০০৪) ‘ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর মাধ্যমে এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নকশা তুলে ধরেন, যা পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি পূরণ করে এবং শরীয়ত মোতাবেক পরিচালিত হবে। সুদ এবং সুদের সাথে সম্পর্কিত নৈতিক বিপর্যয় রোধে খ্রীস্টানদের গৃহীত পন্থার সাথে এ নকশার বিস্তর ফারাক রয়েছে;  জোনস(১৯৮৯)।</p>
<ul>
<li><strong>তৃতীয় ভিত্তি,</strong></li>
</ul>
<p>তৃতীয় একদল লেখক বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান পুঁজিবাদী কাঠামো থেকে আমূল আলাদা এবং এই ধরনের কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিপ্লবের প্রয়োজন; উদাহরণস্বরূপ দেখুন, আনসারি (২০০০), তাসিন (২০০১) এবং ভাদিল্লো। প্রকৃতপক্ষে, অধিকাংশ মুসলিম চিন্তাবিদগণ এবিষয়ে একমত যে, মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো একইধরণের অমুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমূল আলাদা, কিন্তু রূপান্তরের জন্য উপযুক্ত কৌশল নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয় পথটি (আগের অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে) হলো বিবর্তনীয় পরিবর্তন এবং বিদ্যমান পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অনুশীলনে পরিবর্তন সাধনের একটি উপায়, যাতে ইসলামী শরীয়তের গুরুতর লঙ্ঘন থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় এবং একটি ইসলামী ব্যবস্থার মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সূচনা হয়। হাফিজ এবং আল-হাসান (২০০৬) এর মতো বিপ্লবী পদ্ধতির সমর্থকরা অবশ্য বিশ্বাস করেন যে, এই ধরণের পদ্ধতিগুলো বাস্তবে কার্যকরী নয় এবং আদর্শ পদ্ধতির সাথে আপোষ করার ফলে ইসলামের বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হয়ে যাবে।</p>
<p>তৃতীয় পদ্ধতির প্রাথমিক ধারণা এবং ইসলামী বীমার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ গাজী এবং অন্যদের গবেষণাপত্রের (১৯৯২) তৃতীয় অধ্যায়ের ভূমিকায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের প্রতিলিপি বা পরিবর্তন করার পরিবর্তে একটি প্রতিষ্ঠান কোন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে সে দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করা উচিত। যদি এই উদ্দেশ্য ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে তা অর্জনের জন্য ইসলামী বিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। মিরাখোর (২০০৭) ঐতিহাসিক প্রমাণ সরবরাহ করেন, যা পরামর্শ দেয় যে, ঐতিহ্যবাহী ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপযুক্ত পরিবর্তন একই ধরণের পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে বেশ দক্ষতার সাথে কাঙ্খিত উদ্দেশ্য সম্পাদন করতে পারে।</p>
<p>আধুনিক পুঁজিবাদী আর্থিক ব্যবস্থাগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে এবং আজ ব্যাক্তিগত ও সরকারী উভয়ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহায়তাকারী একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। যেমনটি অনেক লেখক উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিম সংস্কারকগণ একটি বড় অসুবিধার সম্মুখীন হন, কেননা আর্থিক ব্যবস্থা হলো একটি সমন্বিত ও সুসংহত কাঠামো, এবং একটি ইসলামী ব্যবস্থার জন্য টুকরো টুকরো পরিবর্তন রচনা, পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। ট্রাস্ট ও জনসাধারণের স্বার্থের উপর ভিত্তি করে সুদমুক্ত  একটি ইসলামী ব্যবস্থা দ্বারা বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন একটি কঠিন কাজ, এর জন্য একই সাথে বিভিন্ন ফ্রন্টে পরিবর্তন এবং হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।</p>
<p>কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, অর্থ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা, স্টক এক্সচেঞ্জ, সরকারী অর্থ ও ঋণ পরিচালনা, বন্ধক, সুদভিত্তিক উপকরণ ছাড়াই স্থিতিশীল আয়ের ধারা সৃষ্টি এবং অন্যান্য ভোক্তা ঋণের জন্য প্রস্তাবনা নিয়ে প্রচুর পরিমাণে লেখালেখি (এবং অনেক বিতর্ক) রয়েছে। বিদ্যমান পুঁজিবাদী উপকরণের বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো সুকুক (বন্ডের একটি ইজারা এবং বাই-ব্যাক বিকল্প), যা একটি তাত্তি¡ক প্রস্তাব থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামী অর্থের বৃহত্তম উৎসগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। প্রাসঙ্গিক সাহিত্য জরিপ করার পরিবর্তে আমরা উপরে উল্লিখিত তৃতীয় ভিত্তি অনুসরণ করি এবং আর্থিক সমস্যার ইসলামী সমাধানের মূলনীতিগুলো এবং বর্তমান পুঁজিবাদী সমস্যাগুলোর থেকে কীভাবে সেগুলো আলাদাÑতা নিয়ে আলোচনা করি। প্রথমত, একটি আর্থিক ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ভিত্তি নিয়ে আলোচনা, দ্বিতীয়ত জনগণের আমানতের নিরাপত্তা প্রদানের উপায় এবং তৃতীয়ত কীভাবে সেই আমানতগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি</h5>
<p>একটি ইসলামী অর্থনীতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে গঠন করা হবে, তা দেখার জন্য আমাদের অবশ্যই এই ধারণাটির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে যে, চ‚ড়ান্ত অর্থে অর্থ হলো একটি মাধ্যম বা উপায়, যা একটি ইসলামী অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এটি পুঁজির অন্তহীন সঞ্চয় ধারণার বিপরীত, যা পুঁজিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং যার মধ্যে অর্থে উপার্জনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো, আরও অর্থ উপার্জন করা। ইসলামের দাবি হলো, মানুষের জীবন, তার সম্পদ ও সকল প্রচেষ্টা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হওয়া উচিত। কোরআনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সাফল্যের জন্য অর্থ ব্যয় করার বিষয়াদি নিয়ে অসংখ্য উপদেশ রয়েছে (কোরআন ২৮:৭৭) এবং মূল্যবান সামাজিক প্রকল্পের জন্য অর্থ ব্যয় করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সহযোগিতা ও আস্থার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজে ব্যক্তিরা ন্যূনতম সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের উপর নির্ভর করতে পারে, কেননা তারা তাদের বিপদের সময় অন্যদের সহায়তা লাভ করতে পারে। অনেক ইসলামী বিধান এই ধরনের সহযোগিতার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, অপরিচিত ব্যক্তিরা আতিথেয়তা লাভের অধিকারী। একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো, ম্যালকম এক্স (১৯৬৫,পৃ. ২১৩) তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় লিখেছেন যে, “আমেরিকাতে আমার অভিজ্ঞতা আমাকে এই বিশ্বাসের দিকে পরিচালিত করেছে যে শ্বেতাঙ্গ এবং অ-শ্বেতাঙ্গের মধ্যে কখনও একতা এবং ভ্রাতৃত্বের চেতনার অস্তিত্ব থাকতে পারে না&#8230;।”</p>
<p>সহযোগিতা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করার ধারণার উপর সাধারণ আপত্তি হলো, এটি শুধুমাত্র ছোটো কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যেই সম্ভব, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো সহজেই টিকিয়ে রাখা যায়। ভৌগলিকভাবে ব্যাপকভাবে লেনদেন ছড়িয়ে থাকা বৃহৎ জনসংখ্যার মধ্যে এটা নিশ্চিত করা হয় যে, শুধুমাত্র আধুনিক বেনামী এবং চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারে। যাইহোক, এই মতের বিপরীতে যথেষ্ট দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, লোপেজ (১৯৭৬) দেখান যে ‘বাণিজ্যিক বিপ্লব’ এর (৯৫০-১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ) যুগে তৎকালীন পরিচিত বিশ্ব জুড়ে অবাধে শরীয়ত সমর্থিত ‘আর্থিক ঝুঁকি ভাগাভাগি’ পদ্ধতি দ্বারা সমর্থিত বাণিজ্য সচল ছিলো, যার বিকাশ হয়েছিলো মুসলিম দেশগুলোতে। মিরাখোর (২০০৭) উল্লেখ করেছেন যে, সুদভিত্তিক চুক্তির চেয়ে এই পদ্ধতিগুলোর জন্য বেশি আস্থার প্রয়োজন এবং পরামর্শ দেন যে, ক্রুসেড, মোঙ্গোল আক্রমণ ও বিউবোনিক প্লেগ দ্বারা বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে আঘাত আসে, তা মানুষের বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয় এবং পরবর্তীতে ব্যবসার প্রভাবশালী পন্থা হিসেবে সুদভিত্তিক লেনদেন উদ্ভবের দিকে পরিচালিত করে। আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য, আমরা লক্ষ্য করি যে ইতিহাস আমানত ও পারস্পরিক সহযোগিতার ইসলামী প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে একটি বিশ্ব অর্থনীতির বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রমাণ করে, যদিও সমসাময়িক বিশ্ব অর্থনীতিতে এগুলো পরিকল্পনা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা সৃষ্টি করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সঞ্চয়</h5>
<p>উপরে আলোচিত কিছু উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আমাদের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান আমানত-কে পুনরুজ্জীবিত ও আধুনিকীকরণ করতে হবে। আগেকার যুগে মানুষ বিশ্বস্ত লোকদের কাছে নিজেদের সম্পদ আমানত রাখতো। আমাদের ‘দারুল আমানত’ এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান দরকার, যা নিরাপদে আমানত রাখার কাজটি সম্পন্ন করবে। এটি আধুনিক ব্যাংকগুলোর অন্যতম প্রধান কাজ, যা অবশ্য মুনাফাভিত্তিক। আমাদের দার আল-আমানাহ সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এর একটি প্রাথমিক কাজ হবে আমানতকারীদের আমানতের মূল্য সংরক্ষণ করা। আধুনিক সময়ে এর জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন প্রয়োজন, যেহেতু কাগজের টাকা আগের সময়ের সোনার সমতুল্য নয়। এমন হতে পারে যে, আমানতকারীকে একটি সীমাবদ্ধ সম্ভাবনার অনুমতি দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে আমানতের মূল্য একটি সম্মত সূচক অনুসারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমানতগুলো স্থিতিশীলতার জন্য অপ্টিমাইজ করা মুদ্রার একটি বান্ডিলে সংরক্ষণ করা যেতে পারে, বা ভোগ্যপণ্যের স্থানীয় সূচীযুক্ত ঝুড়ি আকারে, বা আরও নির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যতের বিশেষ প্রয়োজন, যেমন শিশুদের শিক্ষার ব্যয়ভারের জন্য চুক্তি করা যেতে পারে। কিছু মুসলমানের দ্বারা ব্যাংক-সুদের পক্ষে দেওয়া মূল যুক্তিটি হলো আমানতের প্রকৃত মূল্য হ্রাস করার জন্য মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা। প্রস্তাবিত ধরণের একটি প্রতিষ্ঠান সুদের আশ্রয় না নিয়ে এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সামাজিকভাবে লাভজনক প্রকল্পের জন্য আমানতের ব্যবহার</h5>
<p>আধুনিক ব্যাংকগুলোর একটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো উদ্বৃত্ত অর্থ জমা করা এবং তা বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করা। প্রতিষ্ঠান এবং (সাধারণত কিছু পরিমাণে) আমানতকারী উভয়ের সুবিধার জন্য সঞ্চয়ের মূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরি করা হয়েছে; সামগ্রিকভাবে, যে উপায়ে তহবিল বিনিয়োগ করা হয়, তা ব্যাঙ্কের ব্যক্তিগত উদ্বেগ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ব্যবস্থাটি সম্পদের ঘনত্ব বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে।</p>
<p>এর পরিবর্তে আমাদের দারুল আমানত মানুষ ও সমাজের কল্যাণে বিনিয়োগ করতে পারে, সামাজিক সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করতে এবং সম্পদের ইসলাম প্রদর্শিত প্রবাহমানতার দিকে পরিচালিত করে। এই প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সামাজিক কল্যাণের জন্য সর্বোত্তম সুযোগ সন্ধান করা (এর আমানতকারীদের পক্ষে) এবং এই ধরনের সুযোগগুলোতে বিনিয়োগ করা। শুরুতে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে জমাকৃত সম্পদের উপর যাকাত ধার্য করা যায়, তাহলে এ পরিমাণ সম্পদ দাতব্য কাজে ব্যবহারের জন্য সে দায়ী থাকবে। উপরন্তু, যথেষ্ট পরিমাণে সম্পদ কর্জে হাসানা (দাতব্য উদ্দেশ্যে তৈরি একটি সুদ-মুক্ত ঋণ) হিসেবে ব্যবহারযোগ্য থাকবে, ঠিক যেমন প্রচলিত ব্যাংকগুলো রিজার্ভ/তারল্যের একটি ক্ষুদ্রাংশ থেকে অর্জন করতে পারে। এই ধরনের ব্যবহার অবশ্যই আমানতকারীদের সম্মতিতে হতে হবে। যাইহোক, ইসলামের ইতিহাসে এই ধরনের অসংখ্য ঘটনা এবং নজির রয়েছে।</p>
<p>উপরে যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, দরিদ্রদের সাহায্য করা এবং সমাজের কল্যাণের জন্য কাজ করা কেবল মুসলমানদের দায়িত্বই নয়, তারা এটি করার সর্বোত্তম সুযোগগুলো সন্ধান করার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত হয়। ঠিক যেমন আধুনিক ব্যাঙ্কগুলো এই দুনিয়ায় সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগগুলো সন্ধান করে, তেমনি দারুল আমানত পরকালে সর্বোত্তম বিনিয়োগের সন্ধান করবে (সমর্থনের জন্য সর্বোত্তম সামাজিক কারণ)। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হতে পারে মানুষকে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা করা; যেহেতু এ ধরণের বিনিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল আছে।</p>
<p>মুসলিমরা যুক্তি-তর্ক দিয়ে এ ধারণা পেশ করেছেন যে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং কেউ কেউ এটিকে আদর্শবাদী, আবেগী এবং অবাস্তব বলে সমালোচনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরণের কার্য সম্পাদনকারী বড় বড় ফাউন্ডেশন এবং দাতব্য সংস্থা  ইতোমধ্যেই সারা বিশ্বে বিদ্যমান, যদিও মূলত সেগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ইসলামী নীতির একটি পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, যা এই প্রেরণা ও অনুশীলনগুলোকে কেন্দ্রীয় ও আধুনিক ব্যাংকিং অনুশীলনকে প্রান্তিক করে তুলবে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানুষ ও সামাজিক পুঁজির গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক (২০০৬) দেখায় যে, মানুষের দক্ষতা হলো জাতীয় সম্পদের প্রধান উপাদান; আরও বলে যে, উপরে প্রস্তাবিত ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত উন্নয়ন কৌশলগুলোর চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও দক্ষতার সাথে এগিয়ে নিতে পারে। অধিকন্তু, কাহফ (২০০০) এবং হক্সটার ও অন্যদের (২০০২) গবেষণায় উপস্থাপিত ঐতিহাসিক প্রমাণগুলো পরামর্শ দেয় যে, এ ধরণের কার্যকলাপ অতীতে ইসলামী সমাজে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ঘটেছে। ইসলামী চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্য ইসলামী চেতনা ব্যবহার করার সম্ভাবনা মালয়েশিয়ায় তাবুং হাজি দ্বারা ব্যাপক সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে, যা মুসলমানদের হজ্জ পালন ও এই উদ্দেশ্যে সঞ্চয়-এ উদ্বুদ্ধ করে; বিস্তারিত জানার জন্য ওজঞও (১৯৯৫) দেখুন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক অর্থ</h5>
<p>পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারী/আমানতকারীদের অর্থকে আরও অর্থোপার্জনের জন্য ব্যবহার করা। বিপরীতে, ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই ইসলামী শরীয়ত (অর্থ সংগ্রহ, বিনিয়োগ এবং ব্যয়ের প্রক্রিয়ায়) এবং চেতনার (কাক্সিক্ষত সামাজিক লক্ষ্য, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি এবং সহযোগিতার প্রচারে) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। সুদ এবং প্রতিযোগিতার নীতিগুলো যা পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থাগুলোর ভিত্তি, তা সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বিকাশের জন্য প্রতিক‚ল। বিশেষত, উপরে শুরু হওয়া সুদের আলোচনাকে আরও বিকাশের জন্য, নিচে আরো দুটি যুক্তি তুলে ধরা হলো, যা ইসলামী মূলনীতির সাথে সুদের দ্ব›দ্বকে সুস্পষ্ট করে তোলে। যথা :</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong></p>
<p>বিনিয়োগ ক্রিয়াকলাপগুলো অবশ্যই কিছু অংশীদারিত্বের উপর ভিত্তি করে হতে হবে, যার অনেকগুলো রূপ এবং প্রকরণ সম্ভব। এ অংশীদারিত্ব নিছক আর্থিক নয়; অংশীদারদের ব্যবসার ভাগ্য ভাগাভাগি করে নিতে হয়। এইভাবে, শাইলকের আইনী চুক্তির প্রয়োগ নিয়ে মুসলমানদের কোনো সমস্যা নেই, বরং কষ্টের সময়ে অ্যান্টোনিওর জন্য তার মধ্যে যে সহানুভূতির অভাব দেখা গিয়েছিলো, তা মুসলমানদের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। সুদভিত্তিক চুক্তিগুলো ইসলামী চেতনার পরিপন্থী। কারণ সেখানে ব্যবসায়িক ফলাফল নির্বিশেষে ঋণদাতাকে পরিশোধ করতে হয়, প্রয়োজনে জামানত থেকে তার শরীরের ও মাংসের পাউন্ড তুলে নেয়। আধুনিক সময়ে বন্ধকগুলোর ফোরক্লোজারের সময় একই ধরণের কাজ করে, যেখানে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষক এবং বাড়ির মালিকদের আর্থিক বিপর্যয়ের সুবিধা নেয়। সুদভিত্তিক লেনদেন অন্যের ভাগ্যের প্রতি উদাসীনতা বাড়ায় এবং তা সহযোগিতা ও সম্প্রদায়ের অনুভূতির বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong></p>
<p>হালাল হওয়ার জন্য উপার্জন অবশ্যই উৎপাদনশীল কার্যকলাপ বা বাস্তব পরিষেবার উপর ভিত্তি করে করা উচিত। একজনের প্রয়োজনের বাইরে আর্থিক সম্পদের মালিকানা কোনো উৎপাদনশীল কার্যকলাপ নয়। যাইহোক, উদ্যোগ-যার মধ্যে বিচার-মিমাংসা, ভালো ব্যবসার সুযোগ নির্বাচন এবং এই ধরনের নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত ঝুঁকি নেওয়া জড়িত-একটি উৎপাদনশীল কার্যকলাপ। এভাবে প্রকৃত পণ্য এবং পরিষেবাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ন্যায়-ভিত্তিক লেনদেন ইসলামে অনুমোদিত, নিখাদ আর্থিক লেনদেনগুলো নয়; এ ইসলামী চেতনা আধুনিক ব্যাংকিংয়ের চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক, যেখানে প্রকৃত লেনদেনে ব্যাঙ্কের জড়িত হওয়া প্রায়শই আইনীভাবে নিষিদ্ধ-ব্যাংক শুধুমাত্র একটি বিশুদ্ধ আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। যদিও প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে ইসলামী উদ্দেশ্যগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায় না, কিছু পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান ইসলামী আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাই এগুলোকে ইসলামী অর্থনীতির মডেল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের বর্তমান বিনিয়োগ ব্যাংকে ব্যবহৃত কিছু কৌশল এবং উদ্যোগ কাজে আসে এবং তাই এগুলো অনুকরণ করা যেতে পারে। কারণ, এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর দ্বারা ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেয়া হয়, যা মূলত ইসলামী শরীয়ত মেনে চলে। ছোটো থেকে মাঝারি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তহবিলের একটি উপযুক্ত উৎস হতে পারে। বর্তমান পশ্চিমা আর্থিক উপকরণগুলোকে ইসলামী শরীয়তের দাবির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর প্রায়োগিক সমস্যা দেখা দেয়; এর একটি সহজবোধ্য সারাংশের জন্য উসমানির (২০০০) লেখাটি দেখা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>তাকাফুল (বীমা)</strong></h5>
<p>আতিকুজ্জাফর খান (২০০৫) এর মতে, ইউরোপ এবং উসমানী খেলাফতের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে মুসলমানরা প্রথম বীমা অনুশীলন সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলো। আমি অনুমান করি যে, ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক উভয় জীবনেই সমবায়ের অনুশীলন বীমার প্রয়োজনীয়তাকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। এ কারণেই ৪/১০ এবং ৮/১৪ শতকের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইসলামী আধিপত্যের সময় ব্যাপক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থাকা সত্তে¡ও বীমার প্রয়োজন বা বীমা প্রবর্তন হয়নি। বীমার অনুমতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ইসলামী শরীয়ত প্রণেতারা সাধারণত নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, আতিকুজ্জাফর খান (২০০৫) বিংশ শতাব্দীতে বীমা সংক্রান্ত মুসলিম চিন্তাবিদদের সম্মিলিত রায়ের ইতিহাস দিয়েছেন। যদিও তারা বীমার  উপযোগিতাকে স্বীকার করেছে, তারা দেখতে পেয়েছে যে, এটি বিভিন্ন কারণে ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।</p>
<p>প্রথমত, একটি বীমা চুক্তিতে যাবার (প্রাপ্ত পণ্য বা প্রদত্ত মূল্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা) থাকে; ক্ষতির ক্ষেত্রে একটি বড় অংকের পাওনা পরিশোধ হতে পারে, কিন্তু ক্ষতি না থাকলে, এই ধরনের অর্থ পরিশোধ করা হয় না। গড় পরিসংখ্যান আইন ‘অনিশ্চয়তা’ দূর করে বা হ্রাস করে-এমন যুক্তিগুলো ইসলামী পণ্ডিতদের দ্বারা বিবেচনা করা হয়েছে এবং প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। উপরন্তু, <strong>একটি বীমা চুক্তি জুয়া খেলার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা নিষিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে বীমাকৃত এবং বীমাকারী দৈবভাবে একটি ঘটনা ঘটার উপর বাজি ধরে। এছাড়াও, পরিশোধের প্রয়োজন হলে, বীমাকৃত ব্যক্তি পুরস্কার হিসেবে প্রদত্ত অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ পান। এটিকে সুদের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা নিষিদ্ধ।</strong> সবশেষে, ‘অর্জিত’ মজুরির সমস্যা রয়েছে-বীমা কোম্পানী যেটির জন্য অর্থপ্রদান করছে তার দ্বারা কী (আসল) পরিষেবা প্রদান করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বীমা কোম্পানির দ্বারা কোন ক্ষতি হয় যার জন্য ক্ষতির ক্ষেত্রে দায় বহন করতে হবে? ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম প্রদান বা ক্ষতিপূরণ উভয়ই ইসলামী শরীয়তে গ্রহণযোগ্য শর্তে সমর্থনযোগ্য বলে মনে হয় না। যদিও এই সকল প্রশ্নের পিছনে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে, তবুও উপরে উল্লেখিত সর্বসম্মত মতামত হলো, পশ্চিমে প্রচলিত বিদ্যমান বীমা চুক্তির বেশিরভাগই ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, ১০ শা’বান ১৩৯৮ (১৬ই জুলাই ১৯৭৮) মক্কায় অনুষ্ঠিত ইসলামী আইন সমাবেশের সিদ্ধান্ত, যেখানে একজনের ভিন্নমত ছিলো; তুলে ধরেছেন আতিকুজ্জামান খান (২০০৫)।</p>
<p>প্রচলিত বীমা পদ্ধতি এবং ইসলামী আইনের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ সম্পর্কে প্রায় সর্বসম্মত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হলো, কোন বিকল্পগুলো সম্ভব হতে পারে? গাজী এবং অন্যরা (১৯৯২) বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসলামী শরীয়তের রঙে ঢেলে সাজাবার পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরামর্শ দেন যে, আমাদের ইসলামী বিকল্পগুলোর নতুন নাম দেওয়া উচিত যাতে ইসলামী ও পুঁজিবাদী বীমার মধ্যে আমূল পার্থক্য বিদ্যমান থাকে। এটি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে, যাতে ইসলামী বীমাকে এখন তাকাফুল বলা হয়। গাজী প্রমুখ (১৯৯২) বিভিন্ন ধরণের বীমা চুক্তির উদ্দেশ্য বিবেচনা করে তাদের উদ্দেশ্য এবং ইসলামী শরীয়তের মধ্যে সামঞ্জস্যের মূল্যায়ন করেন এবং একই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির পরামর্শ দেন যা ইসলামী শরীয়তের এখতিয়ারভুক্ত রয়েছে। সাধারণভাবে, বীমার উদ্দেশ্যগুলো (যার মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য সুরক্ষা এবং উত্তরাধিকারীদের জন্য বিধান) শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যাইহোক, একটি ইসলামী কাঠামোর মধ্যে এই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োজন। ইসলামী পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জনের জন্য আমরা বিস্তৃত রূপরেখায় কিছু ঘটনা আলোচনা করি। বিস্তারিত জানার জন্য, IIBI (ও৯৯২) দ্বারা সংকলিত Encyclopedia of Islamic Banking and Insurance দেখুন। এছাড়াও, আকরাম খানের (১৯৮৩, ১৯৯১, এবং ১৯৯৮) টীকাযুক্ত গ্রন্থপঞ্জিগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত সাহিত্যের একটি প্রাথমিক ধারণা প্রদান করে।</p>
<p>জীবনবীমা এবং পেনশন পরিকল্পনার জন্য সরকার-স্পন্সরকৃত পরিকল্পনাগুলো সাধারণত গ্রহণযোগ্য, যেহেতু সরকার তার নাগরিকদের খেয়াল রাখার জন্য দায়বদ্ধ। অন্যান্য উদ্দেশ্যে বেসরকারী খাতের বীমা প্রকল্পগুলো বেশি উপযুক্ত। যাইহোক, সাধারণ নীতিগুলো যার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, তা প্রচলিত বীমা চুক্তি থেকে ভিন্ন। গাজী প্রমুখ (১৯৯২) নোট করেছেন যে, বীমার ভিত্তি হতে পারে শুধুমাত্র সহযোগিতা, পারস্পরিক সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির উপর। তাই এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার আসল ও মৌলিক লক্ষ্য ব্যবসা, মুনাফা অর্জন এবং অর্থ মজুত করা। আতিকুজ্জাফার খান (২০০৫) অনুরূপ মতামত পোষণকারী অন্যান্য পণ্ডিতদের রেফারেন্স প্রদান করেছেন।</p>
<p><strong>ইসলামী আইন শুধুমাত্র পারস্পরিক বীমার অনুমতি দেয়, যেখানে একটি দল সম্মিলিতভাবে তার সদস্যদের স্বার্থরক্ষা করবে এবং বিপদের সময়ে তাদের সমর্থন করার জন্য কাজ করবে। উদ্দেশ্য যদি একে অপরকে সাহায্য করা হয় এবং বীমা চুক্তিতে কোনো লাভের উদ্দেশ্য জড়িত না থাকে, তাহলে পূর্বে আলোচিত ঘারার, জুয়া, সুদ এবং অযৌক্তিক অর্থপ্রদানের উপাদানগুলো বর্জন করা হয়।</strong> পশ্চিমা বীমার সৃষ্ট কিছু সমস্যা, যা দু’পক্ষের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে, প্রায়োগিক সাহিত্যে সেসব ‘নৈতিক বিপদ/ moral hazard’ এবং প্রতিকূল নির্বাচন/ adverse selection’ নামে পরিচিত। বেসরকারি চিকিৎসা বীমার ক্ষেত্রে রোগীদের খরচ কমানোর জন্য খুব সামান্য প্রণোদনা থাকে, ডাক্তাররা চিকিৎসার জন্য ব্যয়বহুল বিকল্প বেছে নিতে পারেন বা নিয়ে থাকেন এবং অতিরিক্ত মেডিকেল টেস্ট দেন; যেন বীমা কোম্পানিগুলোও খরচ সাশ্রয়ের জন্য প্রণোদনা কমিয়েছে, কারণ তারা গ্রাহকদের খরচ অতিক্রম করতে পারে। ফলস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি বীমাসহ রোগী প্রতি খরচ; ইউকে, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি এবং জাপানের মতো দেশগুলোÑযেখানে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োগ করা হয়Ñতার তুলনায় দ্বিগুণ হয়। লেভিন গ্রুপের (২০০৫) রিপোর্ট বেসরকারি চিকিৎসা বীমার অদক্ষতা নথিভুক্ত করে। পরীক্ষামূলক অর্থনীতির ফলাফলগুলো দেখায় যে, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমস্যাগুলো হ্রাস করা যেতে পারে যখন সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা হয় এবং স্বার্থপর আচরণ যা গোষ্ঠীর স্বার্থকে উপেক্ষা করে তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। জামান (২০১৪, ২০১৩) দেখায় কীভাবে বীমার ক্ষেত্রে ইসলামী পদ্ধতির মধ্যে এই সমস্যাগুলো এড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।</p>
<p>ইসলামী বীমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদের ঘনত্ব রোধ করা। গাজী প্রমুখ (১৯৯২) বলেন যে, “ইসলাম ধন-সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ/সঞ্চয় করাকে নিষিদ্ধ করে। তাই, এমন কোনো আশ্বাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু লোক ধনী হতে পারে&#8230;।” এই উদ্বেগের কারণ হলো যে, বীমার প্রচলিত ফর্মগুলোর জন্য বীমাকারীকে খুব ধনী হতে হবে। এটি অ্যাডাম স্মিথের (১৮৮৭) গবেষণাপত্রের শুরুর দিকেই উল্লেখ করা হয়েছিলো। বীমার ব্যাপক বিস্তৃতি মুনাফা অর্জন এবং সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ প্রদান করে যা শুধুমাত্র ধনীরাই ব্যবহার করতে পারে, ফলশ্রæতিতে সম্পদের ঘনত্ব বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে। বীমার পারস্পরিক রূপগুলো এই সমস্যাটি এড়াতে পারে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করা এবং নিজেদের মধ্যে বীমার বোঝা ভাগ করার মাধ্যমে।</p>
<p>ইসলামী শরীয়তের কাঠামোর মধ্যে বীমা প্রদানের জন্য বেশ কয়েকটি ভিন্ন মডেল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত তাকাফুল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একটি মডেল ওয়াকফের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা এর সদস্যদের সহায়তা প্রদান করে। আরেকটি মডেল উপহার (তাবাররু) এর ধারণা ব্যবহার করে এবং এছাড়াও বেশ কয়েকটি মিশ্রিত ও বিকল্প ফর্ম প্রস্তাব করা হয়েছে। আর্থিক প্রকৌশলের এই অংশটির পেছনের ধারণাটি হলো বিদ্যমান বীমা প্রকল্পগুলোর সমরূপ একটি সমন্বয় তৈরি করার জন্য ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য ইসলামী চিন্তাগুলো ব্যবহার করা। কিছু লেখক ঐতিহাসিক ইসলামী প্রতিষ্ঠানের উপর ভিত্তি করে আরো মৌলিক চিন্তা প্রস্তাব করেছেন; এর পেছনে মূল ধারণা হলো বিস্তৃত পরিমণ্ডলে দায়িত্ববোধ। উপরে যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, বিপদের সময়ে পরিবারই আমাদের সহযোগিতার প্রথম উৎস। যদি এটি অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়, তাহলে বর্ধিত পরিবার দায়ভার বহন করবে বলে আশা করা হয়। এমনকি আরও বড় সমস্যায় পড়লে তা সমাধান করা সমগ্র গোত্র/সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব হয়ে পড়ে।</p>
<p>এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃজনশীল অভিযোজন বীমার বিকল্প প্রদান করতে পারে। পরিবার এবং গোত্রের পরিবর্তে, উদাহরণস্বরূপ, প্রথমে একটি শহর এবং তারপর একটি দেশের মধ্যে বাস মালিকদের একটি সমিতি গঠন করা সম্ভব। সাধারণভাবে বলতে গেলে, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যক্তিত্ববাদী প্রবণতা তাদের ইসলামের সাথে বেমানান করে তোলে, যদিও বীমার ক্ষেত্রে, কিছু পশ্চিমা মডেল রয়েছে যেগুলোর ইসলামের মধ্যে অভিযোজনের সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান স্বাস্থ্য-বীমাব্যবস্থার সাথে উপরে আলোচনা করা প্রস্তাবগুলোর কিছু সাদৃশ্য রয়েছে, যেখানে ব্যক্তিদেরকে গোষ্ঠীতে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং সকল গোষ্ঠী একই ধরণের বাধ্যতামূলক সুযোগ-সুবিধা পায়। এছাড়াও, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সংগঠনগুলো একটি মডেল অফার করে, যা দ্বারা পারস্পরিক বীমার ইসলামী মডেলগুলোর সাথে সমন্বয় করা সম্ভব। এখানে একদল লোক মাসিক অর্থ প্রদান করে, যা চিকিৎসক ও ভবন পরিষেবা নিয়োগের খরচ বহন করে এবং এই গোষ্ঠীর সকল প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য চাহিদাগুলো তাদের দ্বারা পূরণ করা হয়। এই ধরনের পরিষেবা চুক্তি ইসলামী আইনের মধ্যে অনুমোদিত (নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে) এবং এটি বীমা চুক্তির একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ওয়াকফ (এন্ডোমেন্ট/ট্রাস্ট)</strong></h5>
<p>ওয়াকফ একটি অনন্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান, যেটি অতীতে ইসলামী সুশীল সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছে; যদিও এটি বর্তমানে প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে, যার কারণ পরবর্তীতে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামী আইনের অধীনে যে কেউ সামাজিক কল্যাণের সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য তার কোনো সম্পত্তি, তার ফল এবং তা থেকে প্রাপ্ত আয় স্থায়ীভাবে দান করতে পারে। আওকাফকে নবী (স.) ‘চিরস্থায়ী দাতব্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং উৎসাহিত করেছিলেন; সংক্ষিপ্ত ভ‚মিকার জন্য কাহাফের গবেষণাপত্র দেখুন। ইতিমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে, সম্পদশালীদের দায়িত্ব রয়েছে অভাবীদের খুঁজে বের করার এবং এমনভাবে সাহায্য করার (ঋণ বা উপহার হিসেবে) যাতে তারা অসম্মানিত না হয়।</p>
<p>বিপরীতে, ওয়েবারের মতে, পুঁজিবাদের প্রাণসত্তা হলো নিজের স্বার্থে সম্পদের অযৌক্তিক সাধনা, যা অনেক অর্থনীতিবিদকে অর্থ উপার্জনে এমন প্রাধান্য দিতে পরিচালিত করেছে যে, এমনকি দরিদ্রদের সাহায্য করাকেও অর্থ উপার্জনের একটি উপায় হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ধনী মুসলমানরা আওকাফ স্থাপন করে, যা উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবহার করার সর্বোত্তম উপায়গুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেহেতু সম্পত্তি (সাধারণত জমি) ব্যবহার করা হয় না, তাই তা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব তাত্তি¡কভাবে চিরস্থায়ী দাতব্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে; এটি ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্বের একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মুমিন জীবনের উদ্দেশ্য। আওকাফের অনেক বিষয়ে ইসলাহীর (২০০৩) ইংরেজি নিবন্ধের একটি গ্রন্থপঞ্জি রয়েছে এবং সেইসাথে সেখানে আরবী ভাষায় আরও বিস্তৃত গ্রন্থপঞ্জির উল্লেখ রয়েছে, যেহেতু আরবী ভাষায় এই বিষয়ে আরও কাজ রয়েছে। পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাতব্য ফাউন্ডেশন এবং সম্ভবত এনজিওগুলোকে ওয়াকফের সাথে তুলনা করা যায়, পার্থক্য হলো ওয়াকফ ইসলামী শরীয়তের উপর ভিত্তি করে একটি বিস্তৃত নিয়মের অধীন।</p>
<p>কাহফ (২০০০), আঞ্জুম (১৯৯৫), এবং সাইত ও লিম (২০০৬, অধ্যায় ৭) এর মতো অনেক লেখক ইসলামের ইতিহাসে ওয়াকফের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সকলেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ওয়াকফ ইসলামী অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ অংশ গঠন করেছে এবং সুশীল সমাজের সকল স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছে। অনুমান করা হয় যে, উসমানী খেলাফতের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমি এই ধরণের ট্রাস্টের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছিল। মরিয়ম হোয়েক্সটার এবং অন্যদের মতে (২০০২)-</p>
<p>“শহুরে এলাকা গঠনে ওয়াকফের অবদানকে খুব কমই আঁচ করা যায়&#8230; (ইসলামী) শহরে জনপরিবেশের একটি বড় অংশ প্রকৃতপক্ষে অনুদানের ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো।”</p>
<p>যদিও ইসলামী ভূমি জুড়ে লক্ষ লক্ষ আওকাফ বিভিন্নধর্মী দাতব্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিলো, এর মধ্যে পাঁচটি প্রধান বিভাগ ছিলো : খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ধর্ম। কাহফ (এন.ডি., ২০০০) এই বিভিন্ন ক্ষেত্রের আপেক্ষিক আকার নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ এবং রেফারেন্স তুলে ধরেছেন। সাইত ও লিম (২০০৬) এর মতে, উসমানীরা নিজেদেরকে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের জন্য দায়বদ্ধ মনে করতো না, যেহেতু আওকাফ জনগণের এ চাহিদাগুলোর পর্যাপ্ত যতœ নিচ্ছিলো। এইভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য বর্তমান ইউরোপীয় কল্যাণ রাষ্ট্র মডেলের একটি ঐতিহাসিক ইসলামী বিকল্প গঠন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী মেথডোলজির দুটি স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে :</strong></p>
<ul>
<li>আওকাফ স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হতো। রাষ্ট্র-চালিত সিস্টেমের তুলনায় তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে স্থানীয় তথ্য ছিলো এবং তাই তারা আরও দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারতো।</li>
<li>সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে, সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে- ইসলামের এই দাবিও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছিলো।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>সাইত ও লিম  (২০০৫, পেপার ৭) লেখেন যে “ইসলামী ভ‚মিতে সম্পদ পুনঃবণ্টনে আওকাফের পদ্ধতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সফল হয়েছে”, যা ন্যায়সঙ্গত ফলাফলের দিকে পরিচালিত করে এবং কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পদের সঞ্চালন করে। এছাড়াও, অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন উপার্জনের সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে আওকাফ সিভিল সোসাইটিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতায়িত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে, রাষ্ট্র এই ক্ষমতাকে দাবিয়ে রাখার এবং বিভিন্ন উপায়ে আওকাফকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু এ ধরণের প্রচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছিলো।</p>
<p>মহিলারা একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আওকাফ প্রদান করেছেন বা পরিচালনা করেছেন এবং সিভিল সোসাইটিতে একইভাবে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছেন; ফাইজার (২০০৭) এর উপর প্রয়োজনীয় গ্রন্থপঞ্জি উল্লেখ করেছেন। আওকাফের মাধ্যমে শিক্ষার সমান প্রবেশাধিকার এবং ইসলামী সমাজে শিক্ষার প্রতি সাধারণ সম্মান প্রদানের কারণে সকল সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বের জায়গাগুলো ঐ সমাজের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হাতে ছিলো; কাহফ (২০০০) আবদুল মালিক আল-সায়িদ এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, “কখনও কখনও, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম পÐিতরা সমাজের দরিদ্র ও দাস শ্রেণি থেকে এসেছেন এবং প্রায়শই তারা শাসকদের নীতির তীব্র বিরোধিতা করতেন।”</p>
<p>ওয়াকফের একটি শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ওয়াকফ এবং তাদের কার্যক্রম সংক্রান্ত নিয়মাবলী, ওয়াকফের জন্য বিভিন্ন ধরণের সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি এবং আওকাফের প্রধান ও ছোটখাটো দিক নিয়ে ইসলামী আইনের বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে বিতর্কের বিষয়ে একটি বিশাল সাহিত্য রয়েছে। একবার চালু হয়ে গেলে ওয়াকফ সহজে বন্ধ করা যায় না। অধিকন্তু, ওয়াকফের প্রতিষ্ঠাতার মূল উদ্দেশ্য সহজে পরিবর্তন করা যায় না। এই ইসলামী নিয়মের কারণে কুরন (২০০৪) যুক্তি দিয়েছিলো যে, ইসলামী সভ্যতার পতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অনেক আওকাফ এমন কাজে আটকে ছিলো, যা সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী আইনে যথেষ্ট গতিশীলতা এবং নমনীয়তা রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে এর সৃজনশীল অভিযোজন নথিভুক্ত করা যেতে পারে, যেমনটি আমরা এই বইতে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি। বরং এটা স্পষ্ট যে, সামগ্রিকভাবে ইসলামী সমাজ স্থবির হয়ে পড়েছিলো এবং বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। হজসন (১৯৭৪) মুসলিমদের পতনের কারণ সম্পর্কে বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যা ওরিয়েন্টালিস্টদের বিশ্লেষণ দ্বারা পেশকৃত বেশিরভাগ প্রাথমিক ত্রুটিগুলোকে এড়িয়ে যায়। ইসলাহী (২০০৩) এর গ্রন্থপঞ্জীতে আওকাফকে কীভাবে হালনাগাদ এবং আধুনিকীকরণ করা যায় সে সম্পর্কিত প্রচুর নিবন্ধের তালিকা রয়েছে।</p>
<p>ইসলামী শরীয়তে আওকাফের দৃঢ় ভিত্তির কারণে অনেক মুসলিম শাসকদের দ্বারা তার প্রভাব রোধ করার প্রচেষ্টাকে সে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলো। যাইহোক, ঔপনিবেশিক শক্তি ইসলামী আইন মানতে বাধ্য ছিলো না। শুধুমাত্র সম্পদের জন্যই নয়, বরং আওকাফের সাংগঠনিক শক্তি ও বস্তুগত সম্পদ প্রায়ই উপনিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলো বলে তারা প্রচুর পরিমাণে ওয়াকফের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিলো।</p>
<p>উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে, বিভিন্ন জটিল কারণে, বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ আওকাফকে বিলুপ্ত, জাতীয়করণ বা এর উপর কঠোর প্রবিধান তৈরি করেছে। সাইত এবং লিম (২০০৫, পেপার ৭, পৃ. ১৫) লেখেন যে, ওয়াকফের বিলুপ্তি জনসেবার ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে, যা অনেক মুসলিম দেশে রাষ্ট্র সহজে পূরণ করতে পারেনি। যাইহোক, ওয়াকফের ‘ধারণা’ উভয়ই প্রভাবশালী রয়ে গেছে এবং এর পুনরুজ্জীবনের স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। পাবলিক পলিসি এবং মুসলিম জীবনের সকল দিকের উপর প্রভাববিস্তারকারী একটি হাতিয়ার হিসেবে ওয়াকফ কাজ করেছে এবং করে যাচ্ছে।</p>
<p>ওয়াকফের প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং অতীতে এটিকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আজ মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। কীভাবে আওকাফের আইনকে নমনীয় করা যায়, প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় এবং আধুনিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা ইসলামী অর্থনৈতিক সাহিত্যে প্রচুর আছে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সকল দিক নিয়ে আলোচনা করে অসংখ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাইত এবং লিম (২০০৫ পেপার ৭, ২০০৬) কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা করে উল্লেখ করেন যে, কুয়েত এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে। এছাড়াও মনজার কাহফ (১৯৯৮ন, ২০০০, হ.ফ.) এবং আনাস যারকা (১৯৯৪) আলোচনা করেন, কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায় এবং অর্থায়নের উপযুক্ত পুরানো ও নতুন পদ্ধতিগুলো চিহ্নিত করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>হিসবাহ (অডিট বা জবাবদিহিতা)</h5>
<p>মনজার কাহফ (১৯৯৬, অধ্যায় ৬) বিভিন্ন ধরণের বাজার ব্যর্থতার একটি প্রাথমিক ভূমিকা প্রদান করেন, যার জন্য রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তিনি ইসলামী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চেতনা নিয়েও আলোচনা করেন, যা অবাধ বাণিজ্যের পথে বাধা হ্রাস করার সাথে সাথে এজাতীয় সমস্যার একটি সহযোগিতামূলক সমাধান খুঁজে বের করে। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম কর্মের সকল ক্ষেত্রে (বাজার সহ) ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর অনেক বেশি জোর দেয় এবং কেবল সামাজিক স্বার্থের প্রয়োজন হলেই তা নিয়ন্ত্রণ করে। কাহফ (১৯৯৬, অধ্যায় ৬, পৃ. ৫৫) উল্লেখ করেছেন যে, আল-হিসবাহ-এর আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান, যা ইসলামের প্রথম দিন থেকে চালু ছিলো এবং সিস্টেমের স্পিরিট চালু রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেতো, এমন শর্তাবলী নির্ধারণ করে যা জনগণের স্বাস্থ্য ও স্বার্থ সংরক্ষণ করে, ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা করে, ব্যবসা ও শ্রম বিরোধ সমাধান করে এবং ভালো মার্কেট-বিহেভিয়ারের প্রচার ও অনুসরণ নিশ্চিত করে।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নাজ (১৯৯১) ইসলামী শরীয়তে হিসবাহর ভিত্তি, ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে এর তাত্তি¡ক ও ঐতিহাসিক কার্যাবলী এবং একটি ইসলামী কাঠামোর মধ্যে অন্যান্য বিচার বিভাগীয় ও নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের সাথে এর মিল ও পার্থক্য-সহ হিসবাহের একটি ব্যাপক সমীক্ষা দেন। বাজারের নিয়ন্ত্রণ হিসবাহের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটি এবং আমাদের অর্থনীতির বিষয় হওয়ার করার কারণে আমি প্রধানত এই দিকটির উপর আলোচনা করবো। যাইহোক, নাজ উল্লেখ করেছেন যে, বেশ কিছু পশ্চিমা লেখক হিসবাহর অনুবাদ মার্কেট সুপারভাইজার ব্যবহার করেছেন, যা হিসবাহের তুলনায় খবই সংকীর্ণ অর্থ বহন করে, যার মধ্যে জনসাধারণের আখলাকী সকল দিক অন্তর্ভুক্ত। ব্যাখ্যাস্বরূপÑ</p>
<ul>
<li>অনাথ এবং বিধবাদের জন্য সঙ্গী খোঁজা (যখন তারা নিজেরা তা করতে অক্ষম),</li>
<li>নিশ্চিত করা যে শিক্ষকরা ছাত্রদের খুব বেশি কঠোর শাস্তি দেননি,</li>
<li>ইসলামী আচরণবিধি প্রয়োগ করা, যার মধ্যে সামাজিক রীতিসিদ্ধ আচরণগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে,</li>
<li>কূপ, খাল বা শহরের দেয়ালের মতো সরকারি সম্পত্তি মেরামত।</li>
</ul>
<p>সাধারণত, হিসবাহ এমন ক্ষেত্রে জনস্বার্থ রক্ষা করে যেখানে আদালতে মামলা নিয়ে যেতে পারে এমন কোনো তাৎক্ষণিক সংক্ষুব্ধ পক্ষ নেই। বাজারের মধ্যে হিসবাহর দায়িত্ব হলো, সরকারী মান অনুসারে প্রদত্ত মানের স্ট্যাম্প অনুযায়ী ওজন এবং পরিমাপ, বিক্রিত পণ্যের মান নিশ্চিত, মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রতিরোধ, মূল্যবৃদ্ধির জন্য পণ্য মজুদ প্রতিরোধ, গোপন চুক্তি এবং একচেটিয়া কর্ম ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ; এবং সাধারণভাবে জনস্বার্থ রক্ষা করা। নদী বা পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়গুলোও হিসবাহের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। নাজ (১৯৯১) এর অধ্যায় ৫-এ ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এর বিভিন্ন ভ‚মিকা এবং তা বাস্তবায়নের একটি নিরীক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। একটি সূ² কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, হিসবাহ শুধুমাত্র পাবলিক বিষয়গুলোর সাথে সম্পর্কিত দৃশ্যমান অনৈতিকতাগুলো নিয়ে কাজ করে। যদি লোকেরা ব্যক্তিগতভাবে মদ্যপান করে বা জুয়া খেলে, হিসবাহ এটি তদন্ত এবং উন্মোচন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে, কোরআন (৪৯:১২) আদেশ দেয় যে ব্যক্তিগত কর্মের তদন্ত করা উচিত নয়।</p>
<p>হিসবাহকে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের সাথে তুলনা করার ক্ষেত্রে আমি প্রথমে মুক্ত বাজার ব্যবস্থার একটি সুপরিচিত ঘাটতি লক্ষ্য করি যে, যেখানে একটি ছোটো গোষ্ঠী অনেক বেশি লাভবান হয় এবং যেখানে একটি বৃহৎ গোষ্ঠীর উপর অল্প পরিমাণ ক্ষতিকে বন্টন করা হয়, সেখানে মুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা সাধারণত সেই ছোটো গোষ্ঠির স্বার্থের পক্ষে এবং জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়। এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে ক্লাস অ্যাকশন স্যুটের ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যথেষ্ট আইন ও সাহিত্য এই সমস্যাটির সমাধান করেছে। ভোক্তা অ্যাডভোকেট ও অ্যাক্টিভিস্ট রাল্ফ নাদেরের কর্মজীবনের একটি গবেষণায় জনস্বার্থে বড় বড় কর্পোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণের কারণে সৃষ্টপ্রধান সমস্যাগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রবার্ট পিটফস্কি (১৯৭৭) বিজ্ঞাপনের প্রেক্ষাপটে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, যখন নিউজিল্যান্ডের ভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয় (২০০৫) এ বিষয়ে একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা করেছে এবং সাহিত্য সমীক্ষা প্রদান করেছে। তাই এটা খুবই আগ্রহের বিষয় যে, শুরু থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে রাল্ফ নাদেরের চিত্রিত সরকারী প্রতিষ্ঠান ইসলামী সরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান ছিলো।</p>
<p>সাধারণভাবে, অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকদের laissez-faire ওরিয়েন্টেশন এবং বাজারের ফলাফলগুলোকে (market outcomes) সর্বোত্তম ধরে নেয়ার ফলে বাজারের ব্যর্থতার স্বীকৃতি যথেষ্ট বিলম্বিত হয়, যা ভোক্তাদের ক্ষতি করে এবং সমস্যা থেকে প্রতিকারের উপযুক্ত পদ্ধতি বিকাশে ব্যর্থ হয়। ফ্রিডম্যান (২০০৫) চরমপন্থা অবলম্বন করে যুক্তি দেন যে, “ব্যবসার একমাত্র ব্যবসা হলো মুনাফা অর্জন করা”, যা ইঙ্গিত করে যে লাভের তাড়নায় সামাজিকভাবে ক্ষতিকারক পরিণতি উপেক্ষা করা যেতে পারে। ইসলাম এই বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, ফার্ম-সহ সকল কর্মীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা অর্পণ করে এবং হিসবাহ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার আকারে জবাবদিহিতা নিরীক্ষণ ও প্রয়োগের ব্যবস্থা রাখে।</p>
<h6></h6>
<h5>পরিবেশগত সুরক্ষা, বাস্তুবিদ্যা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ</h5>
<p>দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপ এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রা অনুসরণের সামাজিক পরিণতির মধ্যে আমরা পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, যা এ গ্রহের মানব ও অন্যান্য জীবনকে যথেষ্ট হুমকির সম্মুখীন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, রিচার্ড রবিনস (২০০৭) লিখেছেন যে, একটি ধনী দেশে একজন ব্যক্তির জীবনমান বজায় রাখার জন্য গড়ে প্রায় ৫ হেক্টর উৎপাদনশীল জমি প্রয়োজন, যেখানে বিশ্বব্যাপী ব্যক্তি প্রতি মাত্র ১.৭ হেক্টর জমি বিদ্যমান রয়েছে। বিলাসবহুল জীবনধারার চাহিদা পূরণের প্রক্রিয়া গ্রহের সম্পদকে এমন ব্যাপকভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, যা আমাদের সমসাময়িক এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম উভয়ের জন্যই স্পষ্টত অন্যায়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে, ‘টেকসই উন্নয়ন (sustainable development)’ ধারণা, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে এমন পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রস্তাব করে। এটি তার আকাঙ্খিত ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে নাটকীয়ভাবে ভিন্ন, যেমনটি ইউসরি (২০০৫) আলোচনা করেছেন। এইভাবে, টেকসই উন্নয়নের কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে-যদিও অবশ্যই সব নয়-অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই মুখ্য উদ্দেশ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয় যাতে ভবিষ্যতে সম্পদের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে।</p>
<p>ইসলামী দৃষ্টিতে প্রাকৃতিক সম্পদ একটি পবিত্র আমানত এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এগুলো রক্ষা করা মানুষের একটি মৌলিক দায়িত্ব। অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনক্রমেই এখানে (সরাসরি) লক্ষ্য নয়, তবে এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন, দারিদ্র্য বিমোচন এর একটি উপায় হতে পারে। এম. ফাহিম খান (২০০৩) ভোক্তা আচরণের তত্তে¡র সাথে এই বিষয়গুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদিও পরিবেশ সুরক্ষার কিছু দিক হিসবাহের অধীনে পড়ে, তবুও পরিবেশগত সমস্যাগুলো সাধারণত সামগ্রিকভাবে সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। পাশাপাশি, পরিবেশ সুরক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাষ্ট্র, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দ্বারা নেওয়া যেতে পারে। কোরআন (২:২০৪-২০৫) এমন লোকদের সম্পর্কে তিরস্কার করে, যাদের কথাবার্তা মানুষকে মুগ্ধ করে, কিন্তু তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং ফসল ও বংশধারা ধ্বংস করে। মহানবী (স.) মদীনার চারপাশে বারো মাইলের একটি সবুজ বেষ্টনী স্থাপন করেছিলেন এবং এই এলাকায় গাছ কাটা বা শিকার নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি পানীয় জলের দূষণও নিষিদ্ধ করেছিলেন; ফকীহরা বলেছেন যে, আবর্জনা এবং বর্জ্য দ্রব্য নদীতে ফেলা জায়েজ নয়। এছাড়াও তিনি অনুর্বর জমির পুনরুজ্জীবনকে উৎসাহিত করেছেন, এ কাজ যারা করে তাদের জমির স্বত্বাধিকারী করার মাধ্যমে। এ ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ইসলামের স্বর্ণযুগে ফকীহগণ পরিবেশ দূষিত করে এমন কর্মকাÐের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করেন। বিস্তারিত জানার জন্য মুনাওয়ার ইকবাল (২০০৫) দেখুন।</p>
<p>ইসলাম সকল প্রাকৃতিক সম্পদকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করেছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদকে সংরক্ষন করার জন্য রাষ্ট দায়বদ্ধ থাকবে এবং তাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেনো সকলেই সেগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে। অনাগত মানব সন্তানদের প্রতি ইনসাফের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ এবং তাদের ব্যবহার এমনভাবে প্রয়োজন যা সবার জন্য ন্যায্য। উদাহরণস্বরূপ, নবী (স.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা নদীর ধারে থাকলেও পানির কয়েক ফোঁটাও অপচয় না করতে। সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো যে, তারা গাছ পোড়াবে না বা কৃষি জমি ধ্বংস করবে না। পশু, উদ্ভিদ বা প্রাণীক‚লের আবাসস্থল ধ্বংস করাও অনুমোদিত নয়। বৃক্ষ ও ফুলগাছ লাগানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং এগুলোকে সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, আপনি যদি বৃক্ষ রোপণরত থাকেন এবং এ অবস্থায় কিয়ামত এসে পড়ে, তাহলেও তা রোপণ করতে থাকুন। আদালত শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং পশুদের প্রতিওÑএমনকি পশুদের উপর অত্যাচার করা বা শুধুমাত্র আনন্দের জন্য তাদের শিকার করা নিষিদ্ধ। সেবার জন্য ব্যবহৃত পশুদের সাথে অবশ্যই ন্যায্য আচরণ করা উচিত এবং তাদের আঘাত করা বা কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।</p>
<p>উপরন্তু, মুসলমানদেরকে বিলাসবহুল জীবনধারা অনুসরণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে অযথা খরচের মাধ্যমে অতিরিক্ত সুখ জীবনে সন্তুষ্টি বা সুস্থ অনুভ‚তির দিকে নিয়ে যায় না; সম্পদের অন্বেষণ মানুষকে মোহের দিকে নিয়ে যায়, যেমন কোরআন (৩:১৮৫) বলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম সমাজের বর্তমান অবস্থার বিশদ পরিসংখ্যান এবং এর পরিবর্তে নীতিগত অগ্রাধিকারগুলো মনজার এবং কাহফ (২০০৩) তুলে ধরেছেন। মালয়েশিয়ার প্রেক্ষাপটে ইসলামী পদ্ধতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন এম. এ. চৌধুরী এবং এম. এস. সালেহ (১৯৯৩)। অনেক সহজ অর্থনীতির যুগে ইসলামী নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির দূরদৃষ্টি (বিচক্ষণতা ও বিজ্ঞতা) বিস্ময়কর।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-role-of-islamic-institutions-in-islamic-economics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15849</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানাগুলোর রূপান্তর করবে কে?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:17:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15783</guid>

					<description><![CDATA[শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্কহীনতার সমস্যা শুধু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং প্রকটভাবে উপস্থিত আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিষয়ে পড়া স্নাতকদের বেলাতেও। চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের অনেকাংশে এখন চাহিদা নেই। সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্কহীনতার সমস্যা শুধু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং প্রকটভাবে উপস্থিত আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিষয়ে পড়া স্নাতকদের বেলাতেও। চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের অনেকাংশে এখন চাহিদা নেই।</p>
<p>সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপমতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ শতাংশ স্নাতক বেকার। কী দেশ, কী শিক্ষাব্যবস্থা—অর্ধেকই বেকার!</p>
<p>বিআইডিএস জরিপে উঠে আসে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৪২ থেকে ৪৮ শতাংশই বেকার অবস্থায় রয়েছেন।</p>
<p>অন্য জরিপে দেখা গেছে, তাঁরা শিক্ষা সমাপ্তির পরে প্রায় তিন-চার বছর বেকার থাকেন। বেকার অবস্থায় থাকা তরুণর মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি বিএ পাস করেছিলেন। ২৩ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে স্নাতক অর্জন করেছেন। লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্টে পাস করেছেন প্রায় ২১ শতাংশ। বেকারদের ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পাস করেছেন ইসলামের ইতিহাস এবং বাংলায়। তবে ইংরেজি, অর্থনীতি ও হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক করা শিক্ষার্থীরা কম বেকার হয়েছেন। অর্থনীতি বা ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ের এবং হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও বেকারত্বের শিকার হয়েছেন, তবে কম।</p>
<p>এটা হাস্যকর যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পলিটিক্যাল সায়েন্সে পড়েন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর হন এমন দেশে, যেখানে দিনের ভোট রাতে হয়, সব পর্যায়ের নির্বাচনে ভোট চুরির ঘটনা ঘটে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য নেই, এমনকি নেই কোনো উপলব্ধিও।</p>
<p>নির্বাচন ও ভোটাধিকারহীন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দেশে রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়ে হাজারে হাজারে তরুণ বেকার থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সমাজ, প্রতিষ্ঠান, সরকার ও রাষ্ট্রের মৌলিক ধারণাও অনেক শিক্ষার্থীর তৈরি হয় না।</p>
<p>এ রকম বহু মানহীন বিষয়ে, নিম্নস্তরের কারিকুলামে, অযোগ্য শিক্ষকের অধীনে এবং ক্লাসহীন শিক্ষায়, চাকরি বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক না থাকা বিষয়ে পড়িয়ে আমাদের ছেলেমেয়েকে শিক্ষার নামে সস্তা সার্কাসে ঠেলে দেওয়ার মহা আয়োজন হয়েছে।</p>
<p>শিক্ষার নামে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হচ্ছে, কারা পড়াচ্ছেন, কেন পড়ানো হচ্ছে—এসবের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নেই বললেই চলে। প্রায়ই দেখা যায়, চাকরির পরীক্ষায় কেউ পাস করে না বলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল হয়।</p>
<p>বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি মতে (১১ ডিসেম্বর ২০২৩), প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কেউই কাট নম্বর পায়নি বলে (যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায়) নবম গ্রেডের সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদের নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এ রকম প্রায়ই হয়।</p>
<p>হাজারে হাজারে, লাখে লাখে চাকরির আবেদন কিন্তু দক্ষতাসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থী নেই। এটা জিপিএ-নির্ভর অসার শিক্ষাব্যবস্থার অনিবার্য ফল! এমন খবর দেখলে মনে হয়, শিক্ষাব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে গেছে।</p>
<p>সহজ প্রশ্ন, উদার মূল্যায়ন, অটো পাস, জিপিএ-৫, প্রশ্নপত্র ফাঁসের চর্চা প্রতিষ্ঠিত করে, গণিত ও বিজ্ঞানশিক্ষাকে সংকুচিত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্কস পাওয়া শিক্ষার্থী মাত্র ১০ শতাংশের আশপাশেই থেকেছে। অথচ যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নেন, তাঁদের অধিকাংশই জিপিএ-৫ বা এর খুব কাছাকাছি পাওয়া।</p>
<p>আমাদের বেসরকারি খাতে দক্ষতাকেন্দ্রিক চাকরির বাজারে বিদেশিরা এমন উচ্চ হারে ঢুকছে, যা দেশের চাকরির বাজার ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুকূল নয়।</p>
<p><strong>উচ্চশিক্ষিত বেকার দেশের জন্য বড় বোঝা। কলেজ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে গোনা বিষয় বাদে অন্য সব বিষয়ে পড়ে এসব পড়ালেখা চাকরিতে প্রয়োগ করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ চাকরি না পেয়ে নিজেদের পড়ার সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয়ে ব্যবসা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বাণিজ্য করে</strong><strong>, </strong><strong>উদ্যোক্তা হয়ে আয় করেন</strong><strong>, </strong><strong>যার জন্য আদৌ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে কি না</strong><strong>, </strong><strong>সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।</strong></p>
<p>কথা ছিল, বিদেশিরা নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির খাতে দেশের চাকরি বাজারে দু-তিন বছরের জন্য ঢুকবেন, এ সময়ে নলেজ ট্রান্সফার করে স্থানীয় রিসোর্স ডেভেলপ করা হবে। কর্মদক্ষতা এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো কার্যকর কৌশলগত পরিকল্পনা নেই।</p>
<p>বাংলাদেশে এত এত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অথচ দেশে রাজনৈতিক সমস্যার অন্ত নেই এবং মূলত প্রায় সব সমস্যাই রাজনৈতিক। দেশে এত ইতিহাসবিদ অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিথ্যার মধ্যে বড় হচ্ছে। দেশে এত সমাজবিজ্ঞান কিংবা সমাজকল্যাণ স্নাতক, অথচ সমাজে কার্যকর কোনো কল্যাণ নেই।</p>
<p>দেশে এত এত সমাজবিজ্ঞানী, সমাজে তার প্রভাবের লেশমাত্র নেই। দেশে এত আইন পড়ুয়া বিজ্ঞ আইনজীবী, অথচ আইনের শাসন নেই, জুলুমের আইনি প্রতিকার নেই। অর্থনীতিবিদের অভাব নেই, অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পায় না জনগণ। তাহলে এই পড়াশোনার ফায়দা কী?</p>
<p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোনো চাহিদা সমাজ ও রাষ্ট্রে নেই। বাস্তবতা হচ্ছে শুধু পলিটিক্যাল ক্যাডার সৃষ্টির জন্য এসব বিষয় চালু আছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করে, চাঁদাবাজি মস্তানি মারামারি করে বেড়ান। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শেষে এঁরা জাতীয় বোঝা, এঁদের প্রধান ব্যবসা হয় সরকারি তদবির, ঘুষের দালালি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি নিয়ে চুরি করা।</p>
<p>এক দল আছে যেকোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যায়, দক্ষতার সঙ্গে এদের কোনো সংযোগ ঘটে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে গণহারে বিবিএ, এমবিএ কোর্স। এসব কোর্সের আসনের সঙ্গে চাকরির বাজার বা  ইন্ডাস্ট্রি-চাহিদার কোনো ম্যাপিং নেই।</p>
<p>প্রথম আলোর ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতায় নানা সময়ে তরুণদের সফলতা ছাপানো হয়। সেখানে দেখা যায়, তরুণদের কেউ বিরিয়ানি রান্না করে পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ খাতা বানিয়ে বিক্রি করছেন, কেউ শিঙাড়া-চপের দোকান দিয়েছেন, কেউ ক্যাকটাস বিক্রি করছেন, আবার কেউ মাছ-মাংস কেটে-ধুয়ে রান্নার উপযোগী করে সরবরাহ করছেন। কেউ ভারত-পাকিস্তান থেকে কাপড় এনে, চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য এনে ফেসবুক লাইভে এসে বিক্রি করছেন।</p>
<p>কাহিনিগুলো অসংখ্য বেকার তরুণকে উৎসাহিত করবে সন্দেহ নেই।  যাঁরা এসব কাজ করছেন, তাঁদের সবাই উচ্চশিক্ষিত বেকার। সৎ থেকে করা প্রত্যেকটা কাজই সম্মানের, কর্ম তৈরির জন্য এবং সমাজের জন্য দরকারি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় কেন চাকরির চাহিদা না থাকা বিষয়ে এত বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি করছে, পাবলিক মানি নষ্ট অর্থাৎ আসন নষ্ট করবে কেন?</p>
<p>আসলে দক্ষতার বিপরীতে শিক্ষার নাম শুধু অপশিক্ষায় নামিয়ে দিয়ে ছেলেমেয়েদের বেকারত্ব উপহার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা উদ্দেশ্যহীন বিষয়ে পড়ছেন, আসলে অনেকে না পড়েই পাস করছেন।</p>
<p><strong>জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার উৎপাদনকারী বিষয়গুলোকে দেশের মাত্র কয়েকটি কলেজে সংকুচিত করে, আসনগুলোতে বাজার চাহিদানির্ভর শিক্ষা (লেখকের চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ বইতে আলোচ্য) কারিকুলামনির্ভর শিক্ষার নতুন নতুন বিষয় আনা লাগবে, চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে আসন বাড়াতে হবে—যেখানে চাকরির বাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা প্রাধান্য পাব। কারিগরি ও শিল্প দক্ষতা উৎপাদনকে সেন্টার পয়েন্ট ফোকাস করা হবে।</strong></p>
<p>এমনকি সামাজিক বিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, ইংরেজি ও বাংলার মতো বিষয়ে পড়লেও শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা তৈরি জন্য দরকারি আধুনিক কারিগরি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং ইন্ডাস্ট্রি ট্রেনিং দিতে হবে।</p>
<p>আমাদের শিক্ষা দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। অন্তত আরেকটি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি দল কি ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থার দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের প্রতিজ্ঞা করবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15783</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বেকারদের জন্য নতুন চাকরি তৈরির দায়িত্ব কার?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 16 Apr 2025 16:33:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15768</guid>

					<description><![CDATA[চাকরির বাজারে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালকের ১৫ পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৪৫ জন। ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১৩ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮১টি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল প্রায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>চাকরির বাজারে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালকের ১৫ পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৪৫ জন। ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১৩ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮১টি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল প্রায় ৩ লাখ। বেকারত্বের এমন বিপর্যয়কারী পরিস্থিতি নিয়ে সরকার দৃশ্যত নির্বিকার।</p>
<p>দেশের সবচেয়ে বড় চাকরির বিজ্ঞাপনের সাইট বিডিজবস-এর তথ্যমতে, তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থানে আগস্ট ২০২২-এর পর নেতিবাচক ধারা শুরু হয়েছে; কমছে চাকরির বিজ্ঞপ্তি, শূন্য পদ এবং বিজ্ঞাপন দানকারী কোম্পানির সংখ্যাও।</p>
<p><strong>২০২২ সালের শেষ চার মাসে, পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় চাকরির বিজ্ঞাপনের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ ও শূন্য পদ কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। এ সময় কর্মী খোঁজা কোম্পানির সংখ্যা কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালে বিডিজবস সাইটে তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ২৫৫টি কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। মোট চাকরির পদসংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৪৮, শূন্য পদ ৫ হাজার ৩৯৩। যদিও ২০২১ সালের শেষ চার মাসে বিডিজবস সাইটে তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ৩৫৮টি কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাকরির পদসংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২০০, শূন্য পদ ছিল ৬ হাজার ৮১০।</strong></p>
<p>বিডিজবসের চাকরির বিজ্ঞাপন কমার হার, পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। টানা ১৩ মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর গত সেপ্টেম্বরে দেশে রপ্তানি আয় কমে। পাশাপাশি আছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, ডলারের উচ্চমূল্যে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়া, এলসি বন্ধ ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ সংকট। তবে সরকার সবকিছুই যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মন্দার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা থাকলেও উন্নত বিশ্বে করপোরেট লভ্যাংশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং বেকারত্বের হার রেকর্ড পর্যায়ে কম। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতসহ সার্বিক বেকারত্ব পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ডলার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা, ঋণপত্র সংকটও দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দা, সরকারের উচ্চ ঋণ ও খোলা বাজারে ডলার বিক্রয়জনিত তারল্য সংকট, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ঠকিয়ে ঋণ খেলাপিদের একতরফা সুবিধা দানের কাঠামোগত সমস্যা।</p>
<p><strong>বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার, সঙ্গে শুরু হয়েছে স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমবাজারের বেকারত্ব। একদিকে কর্ম তৈরির সরকারি কৌশল নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডলার-সংকট, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ খাতে পাচার এবং কেলেঙ্কারিজনিত মন্দার থাবা। দক্ষতা তৈরিতে শিল্পে ও শিক্ষালয়ে ট্রেনিং পরিকল্পনা নেই। দেশের বেকারত্বের কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও চাকরি তৈরির মাসিক ড্যাশবোর্ডও নেই। ফলে সরকার ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে।</strong></p>
<p>বাংলাদেশের চাকরি বাজারে আগে থেকেই দক্ষ জনবলপ্রাপ্তির সমস্যা রয়েছে। বাজার চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার কোর্স-কারিকুলামের সংযোগ স্থাপিত হয়নি বলে এক পদের বিপরীতে শত শত আবেদনকারী থাকেন, কিন্তু যোগ্য ও দক্ষ রিসোর্স পাওয়া যায় না।</p>
<p>বরং আবেদনপত্র নিরীক্ষণে অপচয় হয় সময় ও অর্থ। তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রায় সব শিল্পই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। অটোমেশন বাড়ছে, নিম্ন দক্ষতার চাকরি কমছে, ঘটনাটা এখনই ঘটতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় নতুন শিল্প চাহিদার দক্ষতার ভিত্তিতে একাডেমি ও ইন্ডাস্ট্রির যৌথ সমন্বয়ে দ্রুত দক্ষ শ্রমিক তৈরির রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। একটা নিরবচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি শ্রমিকপ্রতি মাথাপিছু রেমিট্যান্সও বাড়বে। সময়ের সঙ্গে কারিগরি দক্ষ চাকরি বাড়ছে, অদক্ষ কিংবা স্বল্প দক্ষ চাকরি কমছে। দেশে ও দেশের বাইরে এই পরিস্থিতির সুবিধা নিচ্ছে বিদেশিরা। অভ্যন্তরীণ শিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিক—তিন ক্ষেত্রেই দক্ষতার চাহিদা প্রযোজ্য। বিশ্বে যুদ্ধ ও মন্দা না হলেও শ্রমবাজারে দক্ষতার এই রূপান্তর ঘটতেই থাকবে।</p>
<p>দেশের প্রায় ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ শ্রমবাজার অপ্রাতিষ্ঠানিক। ফলে চাকরি বাড়াতে বেসরকারি খাতে সত্যিকার বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ দরকার, এমন স্বচ্ছ উদ্যোগ যেখানে বিনিয়োগের নামে ঋণ নিয়ে সেটা পাচার কিংবা ভোগে ব্যয় হবে না। সরকারকে ক্ষুদ্র, এসএমই ও বৃহৎ ব্যবসা ও শিল্পের ভালো ব্যবসায়ীর ডেটাবেইস তৈরি করতে হবে, যাঁরা ঋণ নিয়ে কিস্তি ফেরত দেন ও ব্যবসা করেন। তথ্যশালার আলোকে ক্রেডিট রেটিং-ভিত্তিক আধুনিক ঋণদান ব্যবস্থা দরকার। ব্যাংক ঋণ দানের ডিজিটাল ফিনটেক সমাধান ও আর্থিক তথ্যনির্ভর নতুন ডিজিটাল কৌশল বের করাও জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, ক্ষুদ্র বা ব্যাস্টিক অর্থনীতির চাকরি বাঁচানো মন্দাকবলিত অর্থনীতির বড় কাজ। প্রশাসনের দুর্নীতি ও সরকারের অপখরচের লাগাম টেনে ধরে সামাজিক নিরাপত্তা ও চাকরি বাড়ানোর উদ্যোগ চাই।</p>
<p>বর্তমানে আমানত প্রবাহ কম ও তারল্য সংকট পরিস্থিতিতে ছয়-নয় সুদের হার কাজ করছে না বলে এটা উঠিয়ে, ব্যাংক ঋণ পাচার ও গায়েবের দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করে অর্থবহ শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। কর্মী ছাঁটাই না করার শর্তে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে হবে এবং খেলাপি ঋণ না করা ব্যবসা ও শিল্প মালিকদের সহজ শর্তের ঋণ প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। অর্থাৎ বর্ধিত বেকারত্বের ধারা থামাতে মুদ্রানীতিকে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ফ্লেক্সিবল করতে হবে।কোম্পানি গুলোতে কর্মরত জনসম্পদকে নতুন মেশিনে, রোবোটিক অপারেশন পরিচালনায় দক্ষ করার জন্য ম্যাসিভ প্রোগ্রাম দরকার। আধুনিক অটোমেশন করা উৎপাদন পরিবেশের সঙ্গে তাল মেলাতে শ্রমিকদের দক্ষতা অর্জনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা, ট্রেনিং বাজেট ও ট্রেনিং জরুরি।</p>
<p>পাশাপাশি বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে ধীরে ধীরে বিদেশি শ্রমিক কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে, দেশীয় শ্রমিক নিয়োগে গুরুত্বারোপ করা চাই। অবশ্যই নতুন কর্মদক্ষতার মানবসম্পদ বিদেশ থেকে আনতে হবে এবং সেখানেও দক্ষতা হস্তান্তরের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার মোট শ্রমবাজারের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশের নিয়োগদাতা। বর্ধিত বেকারত্বের সমস্যার মুখে সরকারি শূন্য পদে নিয়োগের হার বৃদ্ধি করা দরকার। সেবা খাতে মাথাপিছু নিয়োগের কর্মসংস্থান বান্ধব বাজেটীয় কৌশল দরকার। মাথাপিছু শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা কর্মী নিয়োগ বাড়িয়ে সরকারি কর্মসংস্থানকে অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। তবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ায়, প্রশাসন অদক্ষ ও অযোগ্য কর্মচারী ও কর্মকর্তার ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে!</p>
<p>সরকারি নিয়োগে তরুণদের দুটি দাবি উল্লেখযোগ্য। কোটার দৌরাত্ম্য ও বেকারদের কাছে চাওয়া আবেদন ফি’র অন্যায্যতা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী ও পোষ্য কোটা মিলে ছিল ৮০ শতাংশ। ২০ শতাংশ পুরুষ কোটার পরে মেধা কোটার কার্যকর হার শূন্য। এমন সমস্যা রেল, ডাক বিভাগসহ আরও কিছু খাতে। রাষ্ট্রীয় নিয়োগের নামে অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগের এমন সাক্ষাৎ প্রতারণা অর্থহীন। নারী ও পোষ্য কোটার ৮০ শতাংশের পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নাটক সাজানোর অর্থ হচ্ছে, লাখ লাখ বেকার চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে আবেদন ফি নেওয়ার ব্যবসা জারি রাখা। এই দুর্বৃত্তপনা বন্ধ হোক! চাকরিতে কয়েক দশকের নারী অগ্রাধিকার চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নারীরা এখন শিক্ষায় ও চাকরিতে এমনিতেই বেশ এগিয়ে আছে। তাই তাঁদের ২০ শতাংশের বেশি কোটা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। প্রাথমিকের শিক্ষকেরা এখন ভালো বেতন পান। তাঁদের সন্তানদের জন্য পোষ্য কোটার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই’ (২৯ ডিসেম্বর ২০২২ প্রথম আলো)। অগ্রহণযোগ্য কোটা বাতিল, সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি নেওয়ার ব্যবসা বন্ধ, সীমিত হলেও চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা চালু, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নম্বর প্রকাশসহ চাকরি প্রার্থীদের ন্যায্য দাবি মানা দরকার।</p>
<p><strong>বেকারত্বের মিছিলে নতুন সমস্যা, তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক নিয়োগ কমা। ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প মোট ৩ হাজার ৫০০টি রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনকারী কারখানার তথ্য সংগ্রহ করে দেখিয়েছে, নারী শ্রমিকদের হার ৫৮ শতাংশ ও পুরুষদের ৪২ শতাংশ। অথচ একটা সময় নারী শ্রমিক প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল। করোনাকালে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্যস্ফীতিতে শহরে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে, গরিব মানুষ শহর ছাড়ছে বলে পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক সরবরাহ কমছে। আছে কারিগরি সমস্যা। রোবট, কাটিং মেশিন, লেজার মেশিন, অটোমেটিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারীদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেওয়া হয় না বলে, নারীর তুলনায় পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের হার বাড়ছে। কমবয়সী নারীর প্রখর আলো, গরম, মাইক্রো ফাইবারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘ শ্রমঘণ্টার শ্রমঘন কাজে নারীর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ক্ষতি বাড়ছে বলে নারীরা পোশাক শিল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন। প্রান্তিক অর্থনীতির বর্ধিত নারী বেকারত্ব দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে শোচনীয় করবে। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান দরকার।</strong></p>
<p>বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার, সঙ্গে শুরু হয়েছে স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমবাজারের বেকারত্ব। একদিকে কর্ম তৈরির সরকারি কৌশল নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডলার-সংকট, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ খাতে পাচার এবং কেলেঙ্কারিজনিত মন্দার থাবা। দক্ষতা তৈরিতে শিল্পে ও শিক্ষালয়ে ট্রেনিং পরিকল্পনা নেই। দেশের বেকারত্বের কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও চাকরি তৈরির মাসিক ড্যাশবোর্ডও নেই। ফলে সরকার ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে।</p>
<p>বেকারত্বের সরকারি সংখ্যা অযৌক্তিক, এই দিয়ে ফলপ্রসূ কৌশল তৈরিও অসম্ভব। বেকারত্বের সরকারি সংখ্যাও রেকর্ড করেছে। মধ্যবিত্ত দেশগুলোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য বেকার ভাতা, বাংলাদেশে এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। জীবিকা বাঁচাতে না পারলে অর্থনীতি কীভাবে বাঁচবে, এই প্রশ্নের উত্তর কাঠামোগতভাবে খুঁজতে হবে সরকারকে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15768</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানবতাবাদের বাস্তব রূপায়ণের প্রয়াস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Jan 2025 06:01:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মানবতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15365</guid>

					<description><![CDATA[হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ) এর প্রিয়তম সাহাবী হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) জীবনী সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে দু&#8217;খানা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এ দু&#8217;টি পুস্তকে জীবনদর্শন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে আলোচনা থাকলেও বিশ্বস্তভাবে কোন আলোচনা হয়নি। বর্তমানে বাংলা ভাষায় আবু যর গিফারী]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ) এর প্রিয়তম সাহাবী হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) জীবনী সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে দু&#8217;খানা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এ দু&#8217;টি পুস্তকে জীবনদর্শন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে আলোচনা থাকলেও বিশ্বস্তভাবে কোন আলোচনা হয়নি। বর্তমানে বাংলা ভাষায় আবু যর গিফারী (রাঃ) অপরিচিত নাম না হলেও তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী পাঠক-পাঠিকার সম্যক পরিচয় নেই। যে জীবনদর্শনের আলোকে তিনি তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানকে আমীর মুয়াবিয়া (রাঃ), আমীর আমর বিন আস্ (রাঃ) ও মারওয়ানের কবল থেকে উদ্ধার করে সত্যিকারের ইসলামী শাসনব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা বর্তমানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; কেননা বর্তমানে ইসলামের নামে অনেক কিছুই প্রবর্তিত হচ্ছে।</p>
<p>কুরআন-উল-কারীমে আল্লাহকে ধারণা করা হয়েছে মালিক-উল-মুলক অর্থাৎ সমস্ত মুলকের মালিক হিসেবে। তিনি একমাত্র মালিক হলে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ, বাতাস অর্থাৎ এ বিশ্বজগতের সব কিছুরই মালিক তিনি। আল্লাহ্ সব কিছুরই মালিক হলে এ দুনিয়ায় মানুষের কি কোন সম্পদের উপর দাবি- দাওয়া নেই? তার উত্তর অতি স্পষ্ট ভাষায় দিয়েছেন সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মাওলানা মাহমুদুল হাসান মরহুম মাগফুর। তিনি একটি প্রসিদ্ধ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এ আয়াতে মানুষের অধিকারের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:</p>
<p>هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا &#8211;</p>
<p>&#8220;আল্লাহ্ পৃথিবীর সবকিছুই মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন।&#8221; অর্থাৎ সকল জিনিসই মানুষের প্রয়োজন মিটানোর জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন। কোন জিনিসই সৃষ্টিগতভাবে ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নয়। পক্ষান্তরে উহা সকলেরই সম্পত্তি বটে। যেহেতু সব জিনিসই মানুষের মঙ্গলার্থে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কারণে সকল জিনিসেই মানুষের ভোগ-দখলের অধিকার রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন কোনও জিনিস কারো ভোগ-দখলে থাকবে, তাকেই কেবল এ জিনিসের একমাত্র মালিক বলে গণ্য করা হবে, অন্য কেউ তার উপর আধিপত্য খাটাতে পারবে না। তবে, কোন জিনিসের ভোগ দখলকারীর এও জেনে রাখা উচিত যে, সে নিজ দরকারের অতিরিক্ত বস্তু অনর্থক নিজ কবলে না রেখে অন্যকে অবাধে ভোগ-দখল করতে দেবে। কেননা মানুষ হিসাবে সৃষ্টির ভোগাধিকার প্রত্যেক মানুষেরই প্রাপ্য। <strong>এ</strong> <strong>কারণেই</strong> <strong>রীতিমত</strong> <strong>যাকাত</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করা</strong> <strong>সত্ত্বেও</strong> <strong>প্রয়োজনের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>সঞ্চয়</strong> <strong>করা</strong> <strong>কারো</strong> <strong>উচিত</strong> <strong>নয়।</strong> <strong>নবীগণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ধর্মভীরু</strong> <strong>লোকগণ</strong> <strong>এ</strong> <strong>কারণেই</strong> <strong>ধন</strong> <strong>সঞ্চয়</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বিরত</strong> <strong>থেকেছেন।</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কি</strong> <strong>হাদীস</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পরিষ্কার</strong> <strong>বুঝা</strong> <strong>যায়</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>সাহাবাগণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>তাবেঈগণ</strong> <strong>প্রয়োজনের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>বস্তু</strong> <strong>রাখা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করা</strong> <strong>হারাম</strong> <strong>বলেছেন।</strong> মোটের উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু সঞ্চয় বা ব্যবহার যে অনুচিত ও অসঙ্গত তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তুতে সব সৃষ্টিই মানুষের জন্য নীতি অনযায়ী সকল মানুষের দাবি রয়েছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু ভোগ-দখলকারী তার নিজের প্রয়োজনীয় অংশের অতিরিক্ত ভোগ করার দরুন অন্যায় দখলকারী বলে গণ্য হবে।</p>
<p>যুদ্ধলব্ধ মালের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। যুদ্ধলব্ধ মালেও প্রয়োজনের অতিরিক্তটুকু একই পর্যায়ভুক্ত। যুদ্ধলব্ধ মালকে বণ্টনের পূর্বে সকল মুজাহিদেরই মাল বা সম্পত্তি বলা চলে। এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল সকল মানুষেরই সম্পত্তি। যুদ্ধলব্ধ মাল প্রত্যেক মুজাহিদই প্রয়োজন অনুসারে খরচ করতে পারে। কেউ এ অর্থ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপব্যয় বা সঞ্চয় করলে সে আত্মসাৎকারী বলে অভিহিত হবে।</p>
<p>এ মতবাদের পোষকতায় নিম্নলিখিত দলিলাদি পেশ করা যায়-</p>
<p>সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনে হাজম জাহেরী (রহঃ) বলেছেন: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ</p>
<p>&#8220;জনাব রসূলে আকরাম (সা) বলেছেন যে, যে ব্যক্তির কাছে শক্তি ও সামর্থ্যে অর্জিত সরঞ্জাম নিজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত আছে, তার উচিত ঐ অতিরিক্ত মাল দুর্বলকে দান করা। যে ব্যক্তির কাছে খাওয়া-পরার অতিরিক্ত উপাদান রয়েছে, তার পক্ষে উচিত অতিরিক্ত মাল দীন-দুঃখীকে দান করা।&#8221;</p>
<p>আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন: &#8216;নবী করীম এভাবে বিভিন্ন উক্তি করেছেন যাতে আমার এরূপ ধারণা জন্মেছে যে, আমাদের মধ্যে কারো কোন প্রকারের মালের উপর দাবি বা হক থাকতে পারে না।&#8217;</p>
<p>হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন: <strong>“</strong><strong>যে</strong> <strong>বিষয়ে</strong> <strong>আমার</strong> <strong>আজ</strong> <strong>ধারণা</strong> <strong>জন্মেছে</strong> <strong>সে</strong> <strong>সম্পর্কে</strong> <strong>যদি</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>অনুরূপ</strong> <strong>ধারণা</strong> <strong>জন্মাতো</strong> <strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>আমি</strong> <strong>কখনও</strong> <strong>দেরী</strong> <strong>করতাম</strong> <strong>না</strong><strong>; </strong><strong>বরং</strong> <strong>নিঃসন্দেহে</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>ধন</strong> <strong>এনে</strong> <strong>গরীব</strong> <strong>মুহাজিরদের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বণ্টন</strong> <strong>করে</strong> <strong>দিতাম।</strong><strong>“</strong></p>
<p>হযরত আবু ওবায়দা (রাঃ) ও তিনশত সাহাবা দ্বারা সত্য বলে গৃহীত বর্ণনা থেকে জানা যায়: কোন এক সময়ে যখন খাওয়া-পরার দ্রব্যাদি শেষ হওয়ার উপক্রম হয় তখন জনাব রসূলে আকরাম সাহাবা হযরত আবূ ওবায়দাকে হুকুম দেন, &#8220;যার যা কিছু আছে উপস্থিত করো।&#8221; তারপর সমস্ত দ্রব্য এক জায়গায় জড়ো করে সবকিছু তাদের মাঝে সমানভাবে বেটে দিয়ে তিনি সকলের জীবন ধারণের উপযুক্ত বন্দোবস্ত করে দেন।&#8217;</p>
<p>হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা&#8217;আলা ধনীদের উপর গরীবদের জীবিকা পরিপূর্ণভাবে সরবরাহ করা ফরয করেছেন। যদি তারা (গরীবেরা) ক্ষুধিত ও নগ্ন থাকে অথবা জীবিকার জন্য বিপদগ্রস্ত হয় তাহলে ধনীরা দায়িত্বশীল নয় বলেই গণ্য করতে হবে। এজন্য আল্লাহর কাছে কিয়ামতের দিন তাদের জবাবদিহি হতে হবে এবং সংকীর্ণতার জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।“ এরকম আরও হাদীস ও কুরআন-উল করীমের দলিল দ্বারা ইমাম ইবনে হাজম (রহঃ) নিম্নরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেনঃ-</p>
<p><strong>‘</strong><strong>প্রত্যেক</strong> <strong>মহল্লার</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>গরীব</strong><strong>&#8211;</strong><strong>দুঃখীদের</strong> <strong>জীবিকার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>জামিন</strong><strong> (</strong><strong>দায়ী</strong><strong>) </strong><strong>হওয়া</strong> <strong>ফরয</strong><strong> (</strong><strong>অবশ্য</strong> <strong>কর্তব্য</strong><strong>)</strong><strong>।</strong> <strong>যদি</strong> <strong>বায়তুল</strong> <strong>মালের</strong> <strong>আমদানি</strong> <strong>ঐ</strong> <strong>গরীবদের</strong> <strong>জীবিকা</strong> <strong>সরবরাহের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>যথেষ্ট</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়</strong> <strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>সুলতান</strong> <strong>বা</strong> <strong>আমীর</strong> <strong>ধনীদিগকে</strong> <strong>এজন্য</strong> <strong>বাধ্য</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেন</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>বলপূর্বক</strong> <strong>গরীবদের</strong> <strong>প্রয়োজনে</strong> <strong>গ্রহণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেন।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>জীবিকা</strong> <strong>সংস্থানের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>জরুরী</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>অনুযায়ী</strong> <strong>ক্ষুধার</strong> <strong>অন্ন</strong><strong>, </strong><strong>পরিধানের</strong> <strong>বস্ত্র</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ঝড়</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বৃষ্টি</strong> <strong>রোধ</strong> <strong>ও</strong> <strong>প্লাবন</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>রক্ষা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>বাসগৃহের</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>করার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>এ</strong> <strong>অর্থ</strong> <strong>ব্যয়</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হবে।</strong><strong>‘</strong></p>
<p>হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রেওয়ায়েত (বর্ণনা) প্রসঙ্গে নানাবিধ তর্ক- বিতর্কের পর ইবনে হাজম (রহঃ) বলেন: সাহাবাদের (রাঃ) সার্বজনীন মত (ইজমা) এই যে, <strong>‘</strong><strong>যদি</strong> <strong>কেউ</strong> <strong>ক্ষুধিত</strong> <strong>অথবা</strong> <strong>নগ্ন</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>অথচ</strong> <strong>জরুরী</strong> <strong>সরবরাহ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বঞ্চিত</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>মিটানোর</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>করা</strong> <strong>ফরয।</strong><strong>‘</strong></p>
<p>হযরত আবু যর গিফারীও (রাঃ) উপরোক্ত অর্থনৈতিক মতবাদই প্রচার করেছিলেন। তিনি এ অর্থনীতি সংক্রান্ত মতবাদ খলীফা হযরত উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতের সময় প্রচার করে নির্বাসিত হয়েছিলেন। এ মতবাদকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় <strong>ইসলামী</strong> <strong>অর্থনীতির</strong> <strong>মূলসূত্র</strong> <strong>বর্তমান</strong> <strong>কালের</strong> <strong>পুঁজিবাদ</strong><strong> (Capitalism) </strong><strong>বা</strong> <strong>সাম্যবাদ</strong><strong> (Communism) </strong><strong>থেকে</strong> <strong>সম্পূর্ণ</strong> <strong>ভিন্নধর্মী</strong> <strong>এক</strong> <strong>আদর্শমূলক</strong> <strong>নীতি।</strong> পুঁজিবাদে ব্যষ্টিকে কল্পনা করা হয় একক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও তার করায়ত্ত সবকিছুরই মালিক হিসাবে। সে যেমন তা ইচ্ছাধীন সবকিছুই উপার্জন করতে পারে, তেমনি সবকিছু ব্যয়ও করতে পারে। <em>সুবিখ্যাত</em> <em>ইংরেজ</em> <em>অর্থনীতিবিদ</em> <em>এ্যাডাম</em> <em>স্মিথের</em> <em>মতবাদে</em><em> (Laissez Faire) </em><em>পাওয়া</em> <em>ব্যষ্টিকে</em> <em>অবাধ</em> <em>স্বাধীনতা</em> <em>দিতে</em> <em>হবে</em> <em>উপার্জনের</em> <em>ক্ষেত্রে।</em> <em>পুঁজিবাদের</em> <em>ক্ষেত্র</em> <em>রাজার</em> <em>অধীন</em> <em>রাজত্বও</em> <em>হতে</em> <em>পারে</em> <em>অথবা</em> <em>জনগণ</em> <em>পরিচালিত</em> <em>সার্বভৌম</em> <em>রাষ্ট্রও</em> <em>হতে</em> <em>পারে।</em> <em>মার্কসীয়</em> <em>মতবাদের</em> <em>ইতিহাস</em> <em>ব্যাখ্যার</em> <em>সূত্র</em> <em>অনুসারে</em> <em>ব্যষ্টির</em> <em>মালিকানার</em> <em>নীতি</em> <em>স্বীকৃত</em> <em>হলে</em> <em>এবং</em> <em>ব্যষ্টি</em> <em>মানসে</em> <em>এ</em> <em>মালিকানার</em> <em>দৈত্য</em> <em>চেপে</em> <em>বসলে</em> <em>সে</em> <em>যেমন</em> <em>তার</em> <em>প্রতিবেশী</em> <em>বা</em> <em>সর্বসাধারণ</em> <em>মানুষকে</em> <em>তার</em> <em>শরীক</em> <em>বলে</em> <em>স্বীকার</em> <em>করতে</em> <em>স্বীকৃত</em> <em>হয়</em> <em>না</em><em>, </em><em>তেমনি</em> <em>তার</em> <em>প্রয়োজনের</em> <em>অতিরিক্ত</em> <em>উদ্বৃত্ত</em> <em>সে</em> <em>রাষ্ট্রের</em> <em>হাতে</em> <em>ছেড়ে</em> <em>দিতেও</em> <em>সম্মত</em> <em>হয়</em> <em>না।</em> <em>সে</em> <em>তার</em> <em>গণ্ডির</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিজেকে</em> <em>একক</em> <em>প্রভু</em> <em>বলেই</em> <em>গণ্য</em> <em>করে।</em> <em>এজন্যই</em> <em>সে</em> <em>যেমন</em> <em>তার</em> <em>সম্পদ</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>মানুষকে</em> <em>বঞ্চিত</em> <em>করতে</em> <em>চায়</em> <em>তেমনি</em> <em>রাষ্ট্রকেও</em> <em>সম্পূর্ণভাবে</em> <em>বঞ্চিত</em> <em>করতে</em> <em>চায়।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের এ কথা ভুললে চলবে না যে, কোন রাষ্ট্রের গঠনে ও তার পরিচালনায় মানব-মানসে থাকে এক বিশিষ্ট আদর্শ কার্যকরী। সে আদর্শের রূপায়ণের জন্য যেসব মানুষ নিয়োজিত হয়, তাদের মানসে সে আদর্শ প্রবল থাকলে তা অনায়াসেই ফলিত হতে পারে। আদর্শে আস্থাহীন লোকের দ্বারা তার রূপায়ণের কোন সম্ভাবনা নেই। <strong>এজন্য</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>রূপায়ণের</strong> <strong>পূর্বে</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>প্রস্তুতি</strong> <strong>সর্বাধিক</strong> <strong>প্রয়োজনীয়।</strong> <strong>মানস</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>হলে</strong> <strong>অনায়াসেই</strong> <strong>রাষ্ট্র</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে।</strong> ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক সূত্রের আলোকে ইসলামী ভূমি-নীতিরও সূত্র পাওয়া যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে, হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) ইসলামের মূলনীতি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের উপর গুরুত্ব আরোপ করে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তা আলোকে নানাবিধ প্রশ্নের মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলেন। এ নীতির আলোকে বিচার করলে আমরা তাঁর ভূমি-নীতিরও মূল্য নির্ণয় করতে সমর্থ হব।</p>
<p><em>একথা</em> <em>ইতিহাসবিদিত</em> <em>সত্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আরবের</em> <em>মাটিতে</em> <em>জাহিলিয়াতেও</em> <em>রাজতন্ত্রের</em> <em>বা</em> <em>সমাজতন্ত্রের</em> <em>কোন</em> <em>প্রাধান্য</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em> <em>আরবের</em> <em>মাটির</em> <em>মানুষ</em> <em>ছিল</em> <em>ত্রিবিধ</em> <em>পর্যায়ের।</em> <em>মক্কা</em> <em>বা</em> <em>অন্যান্য</em> <em>শহরে</em> <em>ছিল</em> <em>বণিক</em> <em>সমাজের</em> <em>প্রাধান্য।</em> <em>সমগ্র</em> <em>মরুভূমিতে</em> <em>ছিল</em> <em>পশুচারণকারী</em> <em>পর্যায়ের</em> <em>বেদুঈনদের</em> <em>বাস।</em> <em>তায়েফ</em> <em>বা</em> <em>অন্যান্য</em> <em>উর্বর</em> <em>ভূমিতে</em> <em>ছিল</em> <em>মুষ্টিমেয়</em> <em>কৃষক</em> <em>পর্যায়ের</em> <em>লোক।</em> <em>কাজেই</em> <em>সমগ্র</em> <em>দেশের</em> <em>লোক</em> <em>এক</em> <em>পর্যায়ে</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em></p>
<p>জনাব রসূলে আকরাম (সাঃ) কর্তৃক ইসলাম প্রচারিত হলে এবং পরবর্তীকালে মিসর, সিরিয়া, ইরাক পারস্য প্রভৃতি দেশ বিজিত হলে সেসব দেশের সামস্ত সর্দারদের বিস্তৃত ভূসম্পত্তি খলীফা উমর (রাঃ) সেসব দেশের সর্বসাধারণের মধ্যে ভাগ করে বিলিয়ে দেন। আমর ইবনুল আস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবাগণের শত অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁদেরকে ঐসব ভূমির তিল পরিমাণ ভূমিও তিনি জায়গীরস্বরূপ দান করেননি। <strong>জনাব</strong> <strong>রসুলে</strong> <strong>আকরাম</strong><strong> (</strong><strong>সাঃ</strong><strong>) </strong><strong>ও</strong> <strong>সাহাবাগণের</strong> <strong>জীবনী</strong> <strong>পর্যালোচনা</strong> <strong>করলে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>মূল</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>শোষণবিহীন</strong> <strong>সমাজব্যবস্থার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বিবেচনা</strong> <strong>করলে</strong> <strong>সামন্ততান্ত্রিক</strong> <strong>ভূমি</strong> <strong>বিলি</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ব্যবস্থাকে</strong> <strong>নাজায়েয</strong> <strong>বলে</strong> <strong>অভিহিত</strong> <strong>করা</strong> <strong>যায়।</strong> বাংলা ও পাক-ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পূর্বেও ইসলাম-বিরোধী জায়গীরদারী প্রথা চালু ছিল, সেসব প্রথা বিলোপ করে লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৮৩ সালে দশশালা বন্দোবস্ত প্রথার প্রবর্তন করেন এবং এ প্রথাই ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথারূপে স্থিরিকৃত হয়। এ প্রথা জায়গীরের মত না হলেও পরোক্ষে এদেশে এক সামন্ততন্ত্রের পরে দেখা দেয় পুঁজিবাদ। কাজেই রাজগীর শেষেই পুঁজিবাদের আবির্ভাব স্বাভাবিক। তবে ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে সীমিত রাজগী (Limited Monarchy) থাকায় রাজগী থাকলেও পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসারে কোন বিপত্তি দেখা দেয়নি। সমগ্র উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজার পতাকা যেমন দেশ-বিদেশে উড্ডীয়মান হয়েছে, তেমনি ইংরেজ বণিকদের আধিপত্যও দুনিয়া জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। <strong>পুঁজিবাদের</strong> <strong>গোড়ার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>ব্যষ্টি</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>ও</strong> <strong>বণ্টনের</strong> <strong>বেলায়</strong> <strong>সম্পূর্ণ</strong> <strong>স্বাধীন।</strong> <strong>তার</strong> <strong>ইচ্ছামতো</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>সে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>সে</strong> <strong>বণ্টনও</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে।</strong></p>
<p><strong>অপরদিকে</strong> <strong>মার্কস</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্রদর্শিত</strong> <strong>সাম্যবাদের</strong> <strong>মূলকথা</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>কোন</strong> <strong>বিশেষ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>সম্পদ</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>করায়ত্ত</strong> <strong>করে</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>তার</strong> <strong>সাধ্যানুসারে</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>বিভাগে</strong> <strong>শ্রম</strong> <strong>করার</strong> <strong>সুবিধা</strong> <strong>দিতে</strong> <strong>হবে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তা</strong> <strong>প্রয়োজনানুসারে</strong> <strong>তা</strong> <strong>যাবতীয়</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>পূরণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হবে।</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>তার</strong> <strong>ইচ্ছানুসারে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করার</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>বণ্টনের</strong> <strong>বেলায়ও</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> <strong>প্রকৃতপক্ষে</strong> <strong>এ</strong> <strong>রাষ্ট্রে</strong> <strong>আদি</strong> <strong>সংখ্যা</strong><strong> (unit) </strong><strong>ব্যষ্টি</strong> <strong>নয়</strong><strong>, </strong><strong>সমষ্টি</strong> <strong>বা</strong> <strong>তার</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>রাষ্ট্র।</strong> <strong>এক্ষেত্রে</strong> <strong>ব্যষ্টির</strong> <strong>খাওয়া</strong><strong>&#8211;</strong><strong>পরা</strong> <strong>বা</strong> <strong>সর্ববিধ</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>পরিপূরণে</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>রয়েছে।</strong> <strong>এতে</strong> <strong>ব্যষ্টির</strong> <strong>কোন</strong> <strong>স্বাধীনতা</strong> <strong>নেই।</strong></p>
<p><strong>ইসলামী</strong> <strong>রাষ্ট্রে</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>এককভাবে</strong> <strong>বা</strong> <strong>যৌথ</strong> <strong>পদ্ধতিতে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করার</strong> <strong>স্বাধীনতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>আইন</strong> <strong>অনুসারে</strong> <strong>বণ্টন</strong> <strong>করার</strong> <strong>স্বাধীনতাও</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তবে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>সময়ই</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>উপার্জিত</strong> <strong>ধন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সম্পদের</strong> <strong>মালিক</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>তাকে</strong><strong> Custodian </strong><strong>বা</strong> <strong>রক্ষক</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>অনেকগুলো</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>পালন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>যাকাত</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করার</strong> <strong>পর</strong> <strong>আরও</strong> <strong>যেসব</strong> <strong>হক</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তাতে</strong> <strong>তার</strong> <strong>পক্ষে</strong> <strong>পুঁজি</strong> <strong>সৃষ্টি</strong> <strong>করা</strong> <strong>সম্ভবপর</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যষ্টির স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে যদি ব্যষ্টির উপার্জিত সবকিছুই রাষ্ট্রের অপরাপর জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয়, তা&#8217;হলে ব্যষ্টির অথবা রাষ্ট্রের পক্ষে বড় বড় কল-কারখানা প্রভৃতির প্রতিষ্ঠা করে দেশে শিল্পের অগ্রগতি কিসে সম্ভবপর হবে? তার উত্তরে বলা যায়, উৎপাদনে সক্ষম লোকেরা তাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্র যেমন প্রয়োজন অনুসারে তা থেকে জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারে, তেমনি উদ্বৃত্ত থেকে রাষ্ট্রের পরিচালনাধীনে নানাবিধ শিল্প প্রতিষ্ঠানেরও ব্যবস্থা করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তা সাধ্যানুসারে উপার্জন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। গ্রাসাচ্ছাদনের উপযুক্ত উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার নানাবিধ চাহিদা পূরণের জন্য উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তিগণ যেমন দায়ী, রাষ্ট্রও তেমনি দায়ী। ধনী স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তার উপার্জনের উদ্বৃত্ত রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্র পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, অন্ধ ও অসমর্থ লোকের খোরপোশের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের সুবর্ণযুগে এ নীতিই অনুসৃত হয়েছিল। সে যুগে হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) বিখ্যাত ধনী ছিলেন; কিন্তু তিনি প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে অন্য দশজন মুসলিম থেকে পৃথক আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করতেন না। রাষ্ট্রের তলবের সময় তিনি তাঁর ধনাগার উজাড় করে অকাতরে সবকিছুই বিতরণ করতেন। কাজেই ধনসম্পদ তাঁর ধনাগারে থাকা এবং বায়তুল মালে থাকা প্রায় সমানই ছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই ছিল যে বায়তুল মালের ধন রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী অর্থনীতির মূলসূত্র ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিরই ফলশ্রুতি। ইংরেজ বণিকেরা সামন্ত জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি করেছিল এবং দেশের সর্বসাধারণ মানুষকে দাস শ্রেণিতে পরিণত করেছিল। বর্তমানে সে প্রথা রহিত হয়েছে বটে, তবে জোতদারী প্রথা রহিত হয় নাই। এক এক জন জোতদার স্বনামে ও বেনামীতে হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক হয়ে পূর্বেকার জমিদার শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। অথচ দেশে ভূমিহীন লক্ষ লক্ষ লোকের অভাব অনটনের সীমা নেই। বর্তমানে জোতদারদের পক্ষে এত বিশাল ক্ষেত্রে চাষ- আবাদ করা সম্ভবপর নয় বলে তারা এসব জমিজমা ভাগে চাষ-আবাদ করেন। কোথাও ফসলের এক-তৃতীয়াংশ, কোথাও অর্ধেক চাষীকে দিতে হয়। এ সম্বন্ধে আমাদের ফিকাহ শাস্ত্রকার তথা সাহাবাগণের অভিমত কি ছিল তা স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত রয়েছে।</p>
<p>হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) মতে,</p>
<blockquote><p><em>জমিকে লগ্নিতে বা ভাগে দেওয়া নাজায়েয: কারণ যার কাছে অতিরিক্ত জমি রয়েছে এবং সে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে অসমর্থ, তার পক্ষে উচিত অপর মুসলিম ভাইকে জমি থেকে উপস্বত্ব ভোগ করতে দেওয়া। জমির মালিক খোদ আল্লাহ্ রক্ষক হিসাবে সে তার প্রয়োজন মতই ভোগ করবে। তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মতের পোষকতায় প্রথম শ্রেণির সাহাবাদের সমর্থন রয়েছে।</em></p></blockquote>
<p>এ সম্বন্ধে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেছেন: &#8220;আল্লাহর রসূল (সাঃ) ফরমায়েছেন, যার কাছে জমি আছে সে নিজেই চাষাবাদ করবে বা অন্যকে বিনা লাভে (মুফত) সহানুভূতি প্রদর্শনপূর্বক চাষ করতে দেবে। যদি এ দু&#8217;য়ের মধ্যে কোনটাতেই সে রাযী না হয়, তাহলে নিজ জমিকে সে হস্তান্তর করবে।</p>
<p>হযরত জাবের (রাঃ) বলেন: আল্লাহ্র রসূল (সাঃ) জমির পরিবর্তে কোন কিছু গ্রহণ (Exchange) বা ইজারার দ্বারা উপকৃত হতে নিষেধ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) নিজ জমিকে হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ)-এর আমল থেকে মুয়াবিয়ার (রাঃ) আমলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত চাষীদের (কর্ষণকারীদের) লগ্নিতে বন্দোবস্ত দিতেন; কিন্তু যখন তিনি হযরত রাফে (রাঃ)-এর হাদীস শুনতে পেলেন, তখন তিনি এ কাজ এ ভয়ে ছেড়ে দিলেন যে সম্ভবত হযরত (সাঃ) তাঁর শেষজীবনে এ সম্পর্কে মীমাংসা করেছেন। তবে এ মতবাদের বিরুদ্ধেও অপরাপর সাহাবাগণ মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতবাদের আলোচনাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।</p>
<p>হানজালা বিন যায়েদ (রাঃ) বলেন: আমি রাফে বিন খাদিজকে (রাঃ) জমি ইজারা দান সম্পর্কে তাঁর মত অনুসন্ধান করলাম। এর উত্তরে তিনি বললেন, হযরত নবী করীম (সাঃ) এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রূপা ও সোনার বদলে অর্থাৎ নগদ টাকার পরিবর্তেও কি নিষিদ্ধ? তখন তিনি বললেন, এতে কোন আপত্তি নেই।</p>
<p>(বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, কিতাবুল মুজারেয়া)</p>
<p>হযরত আবুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন: নবী করীমের নিষেধের অর্থ এ নয় যে, এ কাজ হারাম বা নাজায়েয; তবে ভ্রাতৃত্ব বা সৌহার্দ প্রদর্শনের জন্য জমি ইজারা বা মুজারেয়া না দেওয়াই উচিত। মুসলমানগণ নিজে নিজের জমি চাষ করবে, অথবা তা একে অন্যের মধ্যে সৌহার্দ ও বন্ধুত্ব স্থাপনের উদ্দেশ্যে অপরের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ভাইকে বিনা লাভে দেওয়াই ভাল।</p>
<p>হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন: যেহেতু হযরতের সময়ে জমির ব্যাপারে বহু ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হতো, এজন্য নবী করীম নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইজারা ও মুজারেয়া মানুষের মঙ্গলার্থে নিষেধ করেছেন, মূলত একে রহিত করেন নি। এ বাধা মানুষের কল্যাণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বলবত ছিল।</p>
<p>(হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা-২য় খণ্ড, পৃ. ১১৭)</p>
<p>ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) বলেন: নগদ লাগান (ইজারা) জায়েয, কিন্তু জমি ভাগে বা মুজারেয়াতে দেওয়া নাজায়েয।</p>
<p>তাউস (রহঃ) ও ইবনে হাজম (রহঃ) বলেন: জমি ভাগে বা মুজারেয়াতে দেওয়া জায়েয কিন্তু নগদ লগ্নি বা ইজারাতে দেওয়া নাজায়েয। কওমের অধিকাংশ আলিম বলেন যে, জমি নগদ টাকার পরিবর্তে বা ভাগে ইজারা দেওয়া উভয়ই জায়েয এ প্রথা সালফ ও খলফ অর্থাৎ সাহাবা ও তাবেয়ীনদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। মোটামুটি এ সম্পর্কে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে সকল রকমের সিদ্ধান্তেরই সম্ভাবনা রয়েছে। কোন না কোন ফিকাহশাস্ত্রবিদের সঙ্গে যে কারো মতের মিল থাকতে পারে। নগদ লগ্নি জায়েয সম্পর্কে যেসব বর্ণনা হাদীসের কিতাবে আছে, ইমাম নাসায়ীর (রহঃ) মতে, সেসব বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় নগদ লগ্নি ইজারা দেওয়া বলেই প্রমাণিত হয়। সাঈদ বিন্ মুসায়েবের (রহঃ) বর্ণনাতে বুঝা যায়, নগদ লগ্নি না দেওয়া নবী করীমের আদেশ নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুরূপ যেসব ফকিহ্, জমি ভাগে দেওয়া জায়েয বলে খয়বরের ইয়াহুদী ও রসূলের (সাঃ) মধ্যকার ব্যাপারকে প্রমাণস্বরূপ উপস্থিত করেন, তাঁদের মতামত উল্লেখ করে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) উত্তর দেন যে, খয়বরের ইয়াহুদীদের জমির মালিক বলে গণ্য করা হয়েছিল একথা সত্য। এখানে সমস্যা হচ্ছে কওমের ব্যক্তিগণের মধ্যে জমিদারী (বর্তমান কালের জোতদারী) সম্পর্ক। হাদীস শরীফে এসব প্রথার সৃষ্টি সম্পর্কে পরিষ্কার নিষেধ রয়েছে।</p>
<blockquote><p>এ সমস্ত বর্ণনার সারমর্ম এই যে, <em>নবুয়তের</em> <em>সময়</em> <em>ও</em> <em>খুলাফায়ে</em> <em>রাশেদীন</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>যদিও</em> <em>জমি</em> <em>নগদ</em> <em>লগ্নি</em> <em>বা</em> <em>ভাগে</em> <em>দেওয়া</em> <em>প্রচলিত</em> <em>ছিল</em><em>, </em><em>তবুও</em> <em>নবী</em> <em>করীম</em><em> (</em><em>সা</em><em>) </em><em>জমিদারীর</em><em> (</em><em>জোতদারী</em><em>) </em><em>এ</em> <em>সাধারণ</em> <em>ও</em> <em>সহজ</em><em>&#8211;</em><em>সরল</em> <em>পন্থা</em> <em>অপছন্দনীয়</em> <em>বলে</em> <em>এবং</em> <em>মরুয়ত</em> <em>বা</em> <em>সদ্ব্যবহারের</em> <em>দিক</em> <em>থেকে</em> <em>একে</em> <em>নিকৃষ্টতম</em> <em>পন্থা</em> <em>বলেই</em> <em>মনে</em> <em>করতেন।</em> <em>এর</em> <em>দরুন</em> <em>কওমের</em> <em>মধ্যে</em> <em>পরস্পর</em> <em>অধিক</em> <em>ঝগড়া</em><em>&#8211;</em><em>বিবাদ</em> <em>হওয়ার</em> <em>ফলে</em> <em>পরস্পর</em> <em>শত্রুতা</em><em>, </em><em>দ্বেষ</em><em>, </em><em>হিংসা</em> <em>বেড়ে</em> <em>গিয়ে</em> <em>মারামারি</em><em>, </em><em>ঝগড়াঝাটিতে</em> <em>পরিণত</em> <em>হতে</em> <em>পারে।</em> <em>অতএব</em> <em>ইমাম</em> <em>বা</em> <em>নেতাকে</em> <em>ইসলাম</em> <em>অনুমতি</em> <em>দেয়</em> <em>যে</em> <em>তিনি</em> <em>এ</em> <em>প্রথা</em><em> (System) </em><em>সার্বজনীন</em> <em>কল্যাণের</em> <em>খাতিরে</em> <em>রহিত</em> <em>করতে</em> <em>পারেন।</em> <em>যদি</em> <em>ইসলামের</em> <em>খলীফা</em> <em>সার্বজনীন</em> <em>কল্যাণের</em> <em>খাতিরে</em> <em>অথবা</em> <em>ইসলামের</em> <em>মঙ্গলের</em> <em>জন্য</em> <em>জমিগুলোর</em> <em>স্বহস্ত</em> <em>কর্ষণজনিত</em> <em>মালিকানা</em> <em>বাদ</em> <em>দিয়ে</em> <em>জমিদারী</em><em> (</em><em>জোতদারী</em><em>) </em><em>প্রথাকে</em> <em>রহিত</em> <em>করেন</em><em>, </em><em>তবুও</em> <em>রাষ্ট্রের</em> <em>অবশ্য</em> <em>কর্তব্য</em> <em>হবে</em> <em>খরিদ</em> <em>করা</em> <em>মালিকানাস্বত্বের</em> <em>জমির</em> <em>উচিত</em> <em>মূল্য</em> <em>বায়তুল</em><em>&#8211;</em><em>মাল</em> <em>থেকে</em> <em>মালিকদের</em> <em>প্রদান</em> <em>করা।</em></p></blockquote>
<p><strong>অতএব</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>রাজনীতি</strong> <strong>ধারায়</strong> <strong>এরূপ</strong> <strong>জমিদারীর</strong> <strong>দৃষ্টান্ত</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>যেখানে</strong> <strong>জমির</strong> <strong>মালিক</strong> <strong>ও</strong> <strong>চাষী</strong> <strong>দু</strong><strong>&#8216;</strong><strong>জনেই</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>রূপে</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>হয়।</strong> পৃথিবীর প্রাচীন ও বর্তমানকালের বিরাট জমিদারী, তালুকদারী প্রভৃতিকে জবরদস্তি বন্দোবস্তের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত বলা যায়। এসবের সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। বর্তমানকালে এক একজন জোতদারের অধীনে এতগুলো জমি থাকা এবং তাকে শোষণের অবকাশ দেওয়া ইসলামী নীতিসঙ্গত ব্যাপার নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামের অভ্যুত্থান থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত মুসলিম সমাজে প্রচলিত ভূমি সম্বন্ধে আলোচনা করলে নিম্নলিখিত সত্যটিই প্রকটিত হয়। <strong>জনাব রসূলে আকরাম (সাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের (রাঃ) আমলে আনসার ও মুহাজিরদের ভূসম্পত্তির মালিকানার অর্থ এই ছিল যে, যে জমি তারা জায়গীর স্বরূপ চেয়েছিলেন তা তাদের সহজ-সরল জীবনযাপনের পক্ষে ছিল পর্যাপ্ত। তারা অনাবাদী জমিকে আবাদ করে ফসল ফলানোর উপযোগী করে তুলতেন। এগুলো বর্তমানকালের জমিদারী বা জোতদারের মত বড় বড় বসতি এলাকা ছিল না, মাত্র কতক আবাদী জমির সমষ্টি ছিল। এসব জমি কোন কোন সাহাবা ইজারা দিতেন আবার কেউ কেউ নিজেও চাষাবাদ করতেন। তবে বিজিত দেশের সমূহ সম্পত্তি সরকারের অধীনে আদিম বাসিন্দাদের হাতে থাকতো এবং এর মালগুজারী বা খাজনা ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে বায়তুল-মালে পরিণত হত।</strong> <strong>যে</strong> <strong>ব্যবস্থার</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>মুষ্টিমেয়</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>হাতে</strong> <strong>জমিজমা</strong> <strong>এমনভাবে</strong> <strong>গিয়ে</strong> <strong>পড়ে</strong> <strong>যে</strong> <strong>চাষীরা</strong> <strong>পণ্যদ্রব্যে</strong> <strong>পরিণত</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>এ</strong> <strong>প্রকার</strong> <strong>প্রথার</strong> <strong>কোন</strong> <strong>আভাস</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>শাসনতন্ত্রে</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> হযরত উমর (রাঃ) রোমানদের এ প্রকার জমিদারীকে রহিত করেন। হযরত উমরের (রাঃ) খিলাফতের সময় ইরান, রোম, মিসর, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি দেশ জয় করা হলে ইরানের বাদশাহের যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল ও মুসলিমদের যে জমি জায়গীর দেওয়া হয়েছিল তাছাড়া সাধারণ জমি কৃষকদের হাতেই ছিল।</p>
<p>যখন হযরত উমর (রাঃ)-এর সময় ইরাক ও সিরিয়া বিজিত হয় তখন সাহাবীরা আবেদন করেন যে ঐ দেশসমূহের জমি যেন তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে তাদের জমির মালিক বলে গণ্য করা হয়। হযরত বেলাল (রাঃ) ও হযরত যুবাইর (রাঃ) বিশেষভাবে এ সম্পর্কে বারবার আবেদন জানান। হযরত উমর এরূপ ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি বলেন, সমস্ত ভূমি সরকারের অধীন থাকবে এবং তার সকল আয় মুসলমানদের প্রয়োজন ও আবশ্যকীয় বিষয়াদির জন্য ওয়াক্ফ্ফ বলে গণ্য হবে।</p>
<p>ইমাম আবূ ইউসুফ (রহঃ) বলেন, হযরত উমর (রাঃ)-এর ফরমান অনুযায়ী মুজাহিদ ও বিজেতাদের মধ্যে জমি বণ্টন নিষিদ্ধ। (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ২৪- ২৯) এ নীতি হযরত ফারুকে আজম (রাঃ) কেবল মুখেই প্রচার করেন নি, কার্যেও পরিণত করেছেন। পরবর্তী মালিকগণও এ নীতির অনুসরণ করেছিলেন। হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর পরে এবং হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-এর সময়ে যে সব দেশ বিজিত হয়েছিল সে সব দেশের অধিকাংশ জমিই সরকারের অধীন থাকতো এবং চাষীদের থেকে আদায়কৃত খাজনা বা লগ্নি সরকার কর্তৃক নানাবিধ প্রয়োজনে ব্যয় করা হত। মুজাহিদ ও বিজয়ীদের বারংবার আবেদন সত্ত্বেও ঐসব দেশের জমি জায়গীর বা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি। হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের শেষের দিকে এ নীতি লঙ্ঘন করায় হযরত আবু যর গিফারী তাঁকে এ নীতির কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেন। <strong>কোন</strong> <strong>সময়ে</strong> <strong>হযরত</strong> <strong>ফারুকে</strong> <strong>আজম</strong><strong> (</strong><strong>রাঃ</strong><strong>) </strong><strong>মুসলমানদেরকে</strong> <strong>জমিদারী</strong> <strong>ও</strong> <strong>চাষাবাদ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>এই</strong> <strong>বলে</strong> <strong>বিরত</strong> <strong>রেখেছেন</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>মুসলমানদের</strong> <strong>নিজেদের</strong> <strong>ও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>পরিবার</strong> <strong>পরিজনদের</strong> <strong>বৃত্তি</strong> <strong>বায়তুলমাল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়।</strong> <strong>তাহলে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কারণই</strong> <strong>থাকতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>না</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>তাঁরা</strong> <strong>খিলাফতের</strong> <strong>বা</strong> <strong>সরকারের</strong> <strong>কাজকর্মের</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়ে</strong><strong>, </strong><strong>জিহাদ</strong> <strong>ও</strong> <strong>আল্লাহর</strong> <strong>বাণীর</strong> <strong>সহায়ক</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>বলদের</strong> <strong>লেজের</strong> <strong>পিছনে</strong> <strong>ঘোরাফিরা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>যাবেন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ দীর্ঘ আলোচনার ফলে বোঝা যায়, দ্বিবিধ কারণে জমিদারী বা ভাগে চাষাবাদ করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিতান্ত গর্হিত ব্যবস্থা। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের প্রতিনিধিত্বের নীতি অনুসরণ করে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) একে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছেন। কেননা এ দুনিয়ার ধন সম্পদ ও ভূমি সবকিছুরই মালিক আল্লাহ্ তা&#8217;আলা হলে মানুষের কোন মালিকানা থাকতে পারে না। তার কাছে গচ্ছিত সম্পদ সে নিজে উপভোগ করবে, তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার অপর ভাইকে ভোগ করতে দেবে। খলীফা উমর (রাঃ) মুসলিমদের দখলে থাকার দরুন, তারা কোন পরিশ্রম না করেও উপস্বত্ব পাওয়ার দরুন, অলস ও বিলাসী মানব গোষ্ঠীতে পরিণত না হয়, সে জন্য ভাগে চাষাবাদ দেওয়া দূরের কথা, কৃষিকার্য থেকেও তাদের বিরত করেছেন। তাই দেখা যায়, উভয়ের দৃষ্টিকোণ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল একই। অর্থাৎ মানবতার কল্যাণের জন্যই তারা উভয়ে জমি থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপস্বত্ব লাভ করাকে নিষিদ্ধ করেছেন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15365</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মধ্যযুগের অর্থনৈতিক চিন্তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/medieval-economic-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/medieval-economic-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 25 Oct 2024 06:58:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15136</guid>

					<description><![CDATA[মধ্যযুগের অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে আলোচনার আগে, ইতিহাসে মধ্যযুগের আবির্ভাব কীভাবে হলো, তা জানা জরুরি। অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাসকে দুইভাগে ভাগ করা হতো। হযরত পয়গম্বরের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালকে বলা হতো প্রাচীন যুগ; এবং রাসুলের (সা:) আগমনের মধ্য দিয়ে সূচনা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মধ্যযুগের অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে আলোচনার আগে, ইতিহাসে মধ্যযুগের আবির্ভাব কীভাবে হলো, তা জানা জরুরি।</p>
<p><strong>অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাসকে দুইভাগে ভাগ করা হতো। হযরত পয়গম্বরের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালকে বলা হতো প্রাচীন যুগ; এবং রাসুলের (সা:) আগমনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিলো আধুনিক যুগের।</strong> তৎকালীন সময়ের সব বড় বড় দার্শনিকরাই এক বাক্যে এটিকে স্বীকার করেন। উনবিংশ শতাব্দীতে এসে ইতিহাসে মধ্যযুগের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয় এবং এটিকে সম্পৃক্ত করা হয় রোমান সাম্রাজ্যের সাথে। তাদের মতে, রোমান সাম্র‍্যাজ্যের উত্থানের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের সূচনা হয়। আর এর শেষ হয়, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমের পতনের মধ্য দিয়ে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিলো সুলতান ফাতিহর মাধ্যমে। অর্থাৎ তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুলতান ফাতিহ একটি যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এটি তাদের একটি কাল্পনিক আবিষ্কার। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। এর ফলে ইসলামী সভ্যতার প্রাসঙ্গিকতাকে ইতিহাস থেকে দূর করে দেয়া হয়। একটি জাতিকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে তুলে ধরার জন্যই মূলত তাদের এই কল্পকাহিনী। হেগেলের মতে, একটা জাতিকে আমরা ততটুকুই আমাদের ইতিহাসে স্থান দিবো, যতটুকু তার বর্তমানে অস্তিত্ব আছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর পরে মধ্যযুগ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং এর মাধ্যমে তারা তাদের পুস্তকসমূহ থেকে ইসলামের ইতিহাসকে বাদ দেয়।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীক বা তারও আগে যেসব সভ্যতা ছিলো সেগুলোকে তাদের ইচ্ছামতো বর্ণনা করার পরে রোমান সাম্রাজ্য এবং রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের ঘটনাপ্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে ষষ্ঠ শতকের ঘটনাপ্রবাহকে বোঝায়। এ বর্ণনার মধ্যে মাঝেমধ্যে তারা ওসমানী খেলাফতকে নিয়ে আসে। তবে ওসমানী খেলাফতকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র এবং প্রগতির বাধা হিসেবে তুলে ধরে। দুঃখজনক হলেও, এই কল্পিত বিভাজনটি পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন আসে, এ কাজটি তারা কোন চিন্তার ভিত্তিতে করলো?</p>
<p><strong>এখানে, ফিলোসফিক্যাল ট্রান্সফরমেশন বা দার্শনিক রূপান্তর ছিলো মূল। আর এই রূপান্তর ঘটান মূলত ইমানুয়েল কান্ট।</strong> <strong>ইমানুয়েল</strong> <strong>কান্টের</strong><strong> ‘</strong><strong>ক্রিটিক</strong> <strong>অব</strong> <strong>পিওর</strong> <strong>রিজন</strong><strong>’</strong><strong>র</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>এটি</strong> <strong>তুলে</strong> <strong>ধরার</strong> <strong>চেষ্টা</strong> <strong>করেন</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>সকল</strong> <strong>অবজেক্টস</strong> <strong>বা</strong> <strong>উপাদানের</strong> <strong>সময়</strong><strong>, </strong><strong>স্থান</strong> <strong>এবং</strong> <strong>মানসিকতা</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>আকলের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সম্পর্কিত।</strong> <strong>তার</strong> <strong>মতে</strong> <strong>হাকীকত</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>কিছু</strong> <strong>নেই।</strong> <strong>কোন</strong> <strong>বিষয়কে</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>মস্তিষ্ক</strong> <strong>যেভাবে</strong> <strong>ধারণ</strong> <strong>করে</strong><strong>, </strong><strong>সেটি</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সেভাবেই</strong> <strong>ধরা</strong> <strong>দেয়।</strong> <strong>এর</strong> <strong>আসল</strong> <strong>অস্তিত্ব</strong> <strong>ভিন্নও</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে।</strong> তিনি এর পেছনে অনেক যুক্তি পেশ করেছেন। তার মতে, যেহেতু সময়, স্থান সবকিছু আকলের সাথে সম্পর্কিত, তাই মানুষ নিজের ইচ্ছামতো অতীত বা ভবিষ্যতকে সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান সময়ের মানুষের জীবনপ্রণালীকে যদি আমরাই সৃষ্টি করে থাকি, তাহলে সময়কেও আমরা আমাদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করতে পারবো। একইসাথে সম্পৃক্ত ভবিষ্যতকেও আমাদের মতো করে সাজাতে পারবো এবং অতীতের ঘটনাসমূহকে সামনে এনে এমনভাবে তুলে ধরবো, যেন আমাদের কথা এবং লেখার মধ্যেই হাকীকত নিহিত। মুতলাক (Absolute) হাকীকত বলে কিছুই নেই। এর বিপরীতে,<strong> ইসলামী সভ্যতা মুতলাক হাকীকতকে স্বীকার করে। এখানে হাকীকতকে মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনা। হাকীকতকে মানুষ সর্বোচ্চ পড়তে পারে, বুঝতে পারে এবং এর মাধ্যমে নিজে হাকীকতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু সে নিজে এটা সৃষ্টি করতে পারেনা।</strong> যেমন, আমাদের আকীদার যে বই সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয় <strong>‘আকীদায়ে নাসাফী’</strong> এই বইয়ের শুরুতেই বলা হয়েছে,</p>
<blockquote><p> حقائق الأشياء ثابتة، والعلم بها متحقق</p>
<p>(হাক্বাইকুল আশইয়ায়ী সাবিতাতুন, ওয়াল ইলমু বিহা মুতাহাক্কিকুন)<br />
-আশইয়ার হাকীকত স্থির, আর এ সংক্রান্ত জ্ঞান হলো হাকীকত।</p></blockquote>
<p>কিন্তু কান্ট এই হাকীকতকে অস্বীকার করেছেন এবং কান্টের চিন্তার উপর ভিত্তি করে এবং এর মধ্য দিয়ে যে নতুন যুগের শুরু হয়, তা হলো মডার্নিজম। এর মাধ্যমে ইতিহাস থেকে শুরু করে সবকিছুকে ফিকশন হিসেবে তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ের চিন্তকরা এইসব ফিকশনকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পোস্ট ট্রুথ বা পোস্ট মডার্নিজম এর সূচনা হয়। এসময় তারা মুসলমানদের ইতিহাসসমূহকে ফিকশন আখ্যা দিয়ে সেগুলোকেও প্রত্যাখ্যান করে। এটা করার মাধ্যমে তারা মুসলমানদের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলেছে।</p>
<p>দ্বিতীয় যে বিষয়টি দিয়ে তারা ইসলামী সভ্যতাকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করেছে তা হলো, আজকে আমরা ইসলামী সভ্যতা বলতে বুঝি সাতশ থেকে বারোশো সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ আব্বাসী খেলাফতের পতন পর্যন্ত সময়কে। অথচ এরপরে ইসলামের ইতিহাসে অনেকগুলো বড় বড় সালতানাত আমরা দেখতে পাই। আমাদের বাংলা সালতানাত গঠিতই হয়েছে বারোশো সালের পরে। এসব সালতানাতসমূহ দোর্দণ্ড প্রতাপে দুনিয়াকে শাসনও করেছে। ওরিয়েন্টালিস্টদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এটিকে তারা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো ইতিহাসে মধ্যযুগ বলে কিছুই নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মধ্যযুগের (৫০০-১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ) খ্রিষ্টান ইউরোপের অর্থনৈতিক চিন্তা:</strong></h4>
<p>পশ্চিম রোমান সভ্যতার উত্থান থেকে এর পতন পর্যন্ত সময়কালকে মূলত তারা মধ্যযুগ বলে থাকে। এই তথাকথিত মধ্যযুগে আসলে তাদের নিজস্ব কোন চিন্তাধারা নেই। এই সময়ে মূলত ইসলামী সভ্যতাই ছিলো পৃথিবীর ভাগ্যনিয়ন্তা। মুসলমানরা যেভাবে চিন্তা করতো, সারা পৃথিবী সেভাবে চিন্তা করতো। এজন্য তাদের জন্য এটা অন্ধকার যুগ। তাদের মতে, তৎকালীন সমাজ ব্যাবস্থাকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে সামন্ততান্ত্রিক, অন্যদিকে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ব ছিলো চার্চের কাছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক চিন্তা বলে আলাদাভাবে তেমন কিছু পাওয়া যায়না। অর্থনৈতিক চিন্তা রাজনৈতিক ও আখলাকী চিন্তার সাথে মিশ্রিত ছিলো। সেসময়ের ইউরোপে প্রভাবশালী চিন্তা ছিলো ক্যাথলিক চার্চের চিন্তা।</p>
<p><strong>এখানে আরও একটা বড় মিথ্যা লুকিয়ে আছে। কারণ পশ্চিম ইউরোপের চিন্তা বলে যাকে বোঝানো হচ্ছে তার মধ্যে স্পেন নেই, ফ্রান্স এবং ইতালীর একটা বড় অংশ নেই। অথচ এগুলো পশ্চিম ইউরোপের একটা বড় অংশ। তৎকালীন স্পেনে (আন্দালুসিয়ায়) বিদ্যমান ছিলো ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত এক গৌরবময় সভ্যতা।</strong> ফ্রান্সের একটা বড় অংশও এই সভ্যতার অংশ ছিলো। পরবর্তীতে কানুনী সুলতান সুলেমানের সময় ভিয়েনা পর্যন্ত ছিলো ওসমানী খেলাফতের পতাকাতলে। পূর্ব ইউরোপ বা বলকান অঞ্চল (ক্রোয়েশিয়া থেকে লিথুনিয়া পর্যন্ত) ছিলো ইসলামী সভ্যতার ছায়াতলে। ভলগা নদীর তীরে ককেশাস অঞ্চল ছিলো মুসলমানদের অধীনে। ইতালীর সিসিলি, টলেডো থেকে শুরু করে বিরাট একটা অঞ্চল ছিলো মুসলমানদের অধীনে।</p>
<p>যাই হোক, তাদের দাবী অনুসারে, অর্থনৈতিক চিন্তাধারা শুরু হয়েছে মার্কেন্টাইলিজমের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নাবিকেরা যেদিন থেকে আবিষ্কার (মূলত শোষণ) এর উদ্দেশ্যে সারা দুনিয়ায় বেরিয়ে পড়ে সেদিন থেকেই মার্কেন্টাইলিজম বা বণিক সভ্যতার সূচনা হয়। মার্কেন্টাইলিস্ট যুগে প্রবেশের মাধ্যমে যেসব চিন্তা ছিলো তার মধ্যে অন্যতম হলো স্কলাস্টিসিজম।</p>
<h4></h4>
<p><strong>স্কলাস্টিজম:</strong></p>
<p>এই শব্দটি এসেছে স্কলা/ স্কুল থেকে। <strong>তথাকথিত</strong> <strong>মিডল</strong> <strong>এইজের</strong> <strong>শিক্ষা</strong> <strong>ব্যবস্থার</strong> <strong>নাম</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>স্কুল।</strong> <strong>এসময়</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে</strong> <strong>যেসব</strong> <strong>বিষয়</strong> <strong>পড়ানো</strong> <strong>হতো</strong> <strong>তা</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>মূলত</strong> <strong>গ্রীক</strong> <strong>ফিলোসফির</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>খ্রিষ্টান</strong> <strong>থিওলজি।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>মেথড</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>ডিডাকটিভ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইনডাকটিভ।</strong> <strong>ডিডাকটিভ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>সাধারণ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নির্দিষ্ট</strong> <strong>সিদ্ধান্তের</strong> <strong>দিকে</strong> <strong>আসা।</strong> <strong>ইনডাকটিভ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>পার্ট</strong><strong>/ </strong><strong>ঘটনা</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>একটা</strong> <strong>সাধারণ</strong> <strong>সিদ্ধান্তে</strong> <strong>আসা।</strong> স্কলাস্টিক চিন্তাধারার প্রতিনিধি হলেন থমাস আকুইনাস। তিনি দক্ষিণ ইতালীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। ১২১৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার সবচেয়ে বড় কাজ হলো গ্রীক ফিলোসফির সাথে খ্রিষ্টান থিওলজির সমন্বয় সাধন। (যেমনটা ইমাম গাজ্জালি আকল এবং নাকলের মধ্যে সমন্বয় করেছিলেন।) এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চান যে, খ্রিষ্টান থিওলজি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নয়। জোসেফ শুম্পিটারের মতে পাঁচশ বছরের একটা বিরতির পর যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম পুনরায় অর্থনৈতিক চিন্তাকে নিয়ে আসেন, তিনি হলেন আকুইনাস। তার বিখ্যাত বই সুম্মা থিওলজিকা (অতঃপর থিওলজি)। <strong>খ্রিস্টান</strong> <strong>ধর্মের</strong> <strong>মূল</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বৈরাগ্যবাদ।</strong> <strong>এর</strong> <strong>বাইরে</strong> <strong>গিয়ে</strong> <strong>আকুইনাস</strong> <strong>বলেন</strong><strong>, </strong><strong>সমাজ</strong> <strong>দুটি</strong> <strong>ভিত্তির</strong> <strong>উপর</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong><strong>: </strong><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>সামাজিক</strong> <strong>গঠনের</strong> <strong>ক্ষেত্রে</strong> <strong>শ্রমিক</strong> <strong>শ্রেণির</strong> <strong>অবদান</strong> <strong>বা</strong> <strong>পরিশ্রম</strong> <strong>২</strong><strong>. </strong><strong>এদের</strong> <strong>মধ্যকার</strong> <strong>কাজের</strong> <strong>ক্ষেত্রে</strong> <strong>সমন্বয়।</strong> মানুষের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জীবিকা উপার্জন। তাই তার মতে, জীবিকা উপার্জন ধর্ম কর্তৃক নিন্দিত কোন কাজ হতে পারেনা। মানুষ সঠিক এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য জীবিকা উপার্জন করতে পারবে। এবিষয়টিকে তিনি থিওরি আকারে নিয়ে আসেন। প্রাচীন গ্রীসে ব্যবসাকে খারাপ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু, থমাস আকুইনাসের মতে, সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবেনা, এই শর্তে ব্যবসা করা যাবে। তিনিও দাসপ্রথা এবং ব্যক্তিমালিকানাকে স্বীকৃতি দেন। স্কলাস্টিক চিন্তার একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিনিও সুদের বিরোধীতা করেন। যেহেতু সুদ হচ্ছে শোষণের মাধ্যম এবং টাকা দিয়ে টাকা আয় করার উপায়, তাই তার মতে সুদ নিষিদ্ধ।</p>
<p>এর বাইরে এ চিন্তা নিয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায়না। নিকোলা ওরেসমিয়াস এবং থমাস এই দুইজন ব্যক্তির নাম পাওয়া গেলেও তাদের চিন্তাধারা খুব বেশি পাওয়া যায়না।</p>
<p><strong>থমাস</strong> <strong>আকুইনাসের</strong> <strong>চিন্তাধারাকে</strong> <strong>সংক্ষেপে</strong> <strong>কয়েকটি</strong> <strong>ভাগে</strong> <strong>ভাগ</strong> <strong>করা</strong> <strong>যায়।</strong></p>
<ul>
<li><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>মানব</strong> <strong>স্বভাবের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>কাজ।</strong></li>
<li><strong>২</strong><strong>. Reason &amp;</strong><strong> faith  (</strong><strong>আকল</strong> <strong>এবং</strong> <strong>নাকল</strong> <strong>এর</strong> <strong>উপর</strong> <strong>কাজ)</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে তিনি হায়ারার্কি করেছেন। <span style="font-size: 16px;">প্রথমে সায়েন্স, তারপর ফিলোসফি এবং এরপর থিওলজি এভাবে রেখেছেন। তিনি বলেন, “we must bear in mind that there are two kinds of science. There are some which proceed from a principle known by the natural light of intelligence such as arithmetic and geometric light. There are some which proceed from a principle known by the light of higher science. Thus, the science of perspective proceeds from principle established by geometry and music proceeds from principle established by arithmetic.” এটা মূলত ইবনে সিনার মিউজিক বইয়ের সারাংশ। তার নেচার অব গডের চিন্তা আমাদের কালামী চিন্তার সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি গডকে প্রমাণের ক্ষেত্রে যে কারণগুলো দেখিয়েছেন, সেগুলো আল ফারাবীর চিন্তার সাথে মিলে যায়। ফারাবীর মতে ফার্স্ট কজ আকল। মাদিনাতুল ফাদিলাহ এটা দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর তার দ্য আল্টিমেট নেসেসিটি, পারফেক্ট সোর্স, পারপাস সুদূর থিওরির সাথে সম্পর্কিত।  রাষ্ট্রের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, State is a natural product of human nature. এটা তিনি মাদিনাতুল ফাদিলাহ থেকে নিয়েছেন। সেখানে আছে,“মানুষ জন্মগতভাবেই সভ্য।” তার যে common good এর চিন্তা, the function of a state is to secure the common good. এটি এসেছে আলা আদালাতু আসাসুল মূলক- (হযরত ওমর রা) থেকে।</span></p>
<ul>
<li>৩. law, reason এগুলো নিয়ে তার কাজ আছে। ল’কে তিনি চারভাগে ভাগ করেছেনঃ <strong>natural law, human law, eternal law, divine law.</strong></li>
<li><strong>৪</strong><strong>. Just war </strong><strong>এর</strong> <strong>ক্ষেত্রে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>বলেছেন</strong><strong>, a declaration by the ruler to defend against enemies. </strong><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>শাসক</strong> <strong>চাইলেই</strong> <strong>যুদ্ধ</strong> <strong>ঘোষণা</strong> <strong>দিতে</strong> <strong>পারে।</strong> <strong>যুদ্ধের</strong> <strong>বৈধতার</strong> <strong>একমাত্র</strong> <strong>কারণ</strong> <strong>এটিই।</strong> <strong>এর</strong> <strong>মাধ্যম</strong> <strong>ক্রুসেডকে</strong> <strong>বৈধতা</strong> <strong>দিয়েছেন।</strong></li>
</ul>
<p><strong>যুদ্ধের</strong> <strong>ন্যায়সংগত </strong><strong>কারণ</strong> <strong>হিসেবে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>বলেন</strong><strong>, Just cause for an attack on an enemy because they deserve it on account of some faults, such as avenging wrongs they have committed.</strong></p>
<p><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>তারা</strong> <strong>কোন</strong> <strong>আক্রমণ</strong> <strong>করার</strong> <strong>সম্ভাবনা</strong> <strong>আছে</strong> <strong>জানলে</strong> <strong>আমরা</strong> <strong>আগেই</strong> <strong>সেটা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারবো।</strong> <strong>ইরাকে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>এটা</strong> <strong>করেছে।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>রাসায়নিক</strong> <strong>অস্ত্র</strong> <strong>আছে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>আক্রমণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>এই</strong> <strong>বাহানায়</strong> <strong>আমরাও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>আক্রমণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারবো।</strong></p>
<p>তবে আমার মনে হয়েছে, এখানে মূলত জোসেফ শুম্পিটার অর্থনৈতিক চিন্তাকে গতিশীল রাখার জন্য এগুলোকে টেনে নিয়ে এসেছেন। তথাকথিত মধ্যযুগে তাদের আসলে সেরকম নিজস্ব কোন চিন্তা ছিলোনা।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/medieval-economic-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15136</post-id>	</item>
		<item>
		<title>প্রাচীন গ্রীসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/economic-thought-of-ancient-greece/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/economic-thought-of-ancient-greece/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 29 Sep 2024 14:24:37 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14904</guid>

					<description><![CDATA[প্রাচীন গ্রীসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এর রাষ্ট্রব্যবস্থা; যাকে city state বলা হতো, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক জোসেফ শুম্পিটার এর মতে, প্রাচীন গ্রীসের চিন্তাধারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের বাস্তবিক বিষয়াবলীকে গুরুত্ব দিতো। এই চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিলো polis]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রাচীন গ্রীসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এর রাষ্ট্রব্যবস্থা; যাকে city state বলা হতো, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক জোসেফ শুম্পিটার এর মতে, প্রাচীন গ্রীসের চিন্তাধারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের বাস্তবিক বিষয়াবলীকে গুরুত্ব দিতো। এই চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিলো polis এর উপর ভিত্তি করে। গ্রীক সভ্যতার মতাদর্শ অনুযায়ী, সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এবং প্রতিফলিত রূপ হচ্ছে পলিস। সভ্যতা কেবল পলিসে’ই গড়ে তোলা সম্ভব।  polis একটি পরিভাষা। এর মাধ্যমে গ্রীসে city state, শহর এবং এই শহর ও city state এর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বোঝাতো।<strong> প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় অর্থনৈতিক বা অন্যান্য বিষয়ের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে। এর কারণ হলো</strong><strong>  polis </strong><strong>কে কেন্দ্রে রাখা। </strong><strong>অর্থনীতিকে তারা কম গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহ বেশিরভাগ পরিচালনা করতো </strong><strong>slave (</strong><strong>দাস) এবং </strong><strong>patricians; </strong><strong>যাদের তারা নাগরিক হিসেবে গণ্য করতোনা। ফলে গ্রীক দার্শনিকদের চিন্তাধারায় অর্থনীতির সেরকম কোন থিওরি পাওয়া যায়না। যেগুলো পাওয়া যায় তা তাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের থিওরির মধ্যে থেকে।</strong><strong> </strong></p>
<p>প্লেটোর মতে রাষ্ট্রের মৌলিক কাজ হলো দুটি:</p>
<p><strong>১. শাসক নির্বাচন করা</strong></p>
<p><strong>২. নির্বাচিতদের নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা।</strong></p>
<p>তবে তাদের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিলো city state বা ঘর পরিচালনা। এ বিষয়টি নিয়ে Xenophon সর্বপ্রথম তার রচিত গ্রন্থ Oikonomikos এ আলোচনা করেন। oikos বলতে বুঝায় ‘গৃহ বা ঘর’, nomos বলতে বুঝায় ‘আইন বা রীতি’। অর্থাৎ Oikonomikos বলতে বুঝায় গৃহ পরিচালনার রীতি।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীসে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে তারা marketing approach নয়, বরং administrative approach এ চিন্তা করতো। মার্কেটিং অ্যাপ্রোচ হলো উৎপাদন ও কেনা-বেচার সাথে সংশ্লিষ্ট। তারা তাদের অর্থনৈতিক চিন্তাকে এই কেন্দ্রিক না করে গৃহস্থালির বা রাষ্ট্রের কর্মকান্ড কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছে।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীসে ব্যবসা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিখ্যাত ঐতিহাসিক M. Finley বলেন, তারা ব্যবসায়িক পন্থায় সম্পদ উপার্জনকে খুব বেশি পছন্দ করতোনা। পাশাপাশি যেহেতু তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দাস এবং প্যাট্রিসিয়ানদের হাতে ছিলো, যারা গ্রামে বাস করতো এবং নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতোনা, তাই এরিস্টোক্র‍্যাটদের এটা নিয়ে মাথাব্যাথা ছিলোনা। এর ফলে প্রাচীন গ্রীস এবং রোমান সভ্যতায় ব্যবসা ও প্রযুক্তির সেরকম কোন উন্নতি সাধিত হয়নি৷</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরিস্টোক্র্যাটরা আইন ও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকতো। এর মাধ্যমে যেহেতু তারা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতো, এর দ্বারাই তারা সম্পদ উপার্জন করতো।</p>
<p>Xenophon (খ্রীস্টপূর্ব ৪৩০- ৩৫৪ খ্রী) তিনি মূলত এথেন্সের একজন ঐতিহাসিক। তিনি ভাড়াটে সৈন্য ছিলেন। টাকার বিনিময়ে যুদ্ধ করতেন। সক্রেটিসের যুগের ছিলেন বলে তিনি সক্রেটিসের ও ছাত্র ছিলেন। সক্রেটিসের  রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনকেই মূলত লিখিতভাবে Oikonomikos/ ওইকনমিয়া গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থের মূল আলোচ্য বিষয় গৃহাস্থলির কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়। এই গ্রন্থটি যতটা না অর্থনীতির, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দর্শনের গ্রন্থ। এখানে তিনি সম্পদ উৎপাদন ও বন্টন নীতি নিয়ে আলোচনা করেছে। তিনি বলেন, যেহেতু সম্পদ সীমিত বা স্থিতিশীল; এর উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে নেতারা। এখানে মূল ভিত্তি হলো man-power বা শ্রমশক্তি। বাড়ি, খামার বা ফার্ম যাই হোকনা কেন পরিচালকের পন্থার উপর বন্টননীতি নির্ভর করে। এক্ষেত্রে কর্মবন্টনের চেয়ে পেশাগত দক্ষতাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। যার পেশাগত দক্ষতা যত বেশি সে উৎপাদনের ক্ষেত্রে তত বেশি ভূমিকা রাখে এবং ঐ উৎপাদনের বন্টন ব্যবস্থাও সুন্দর হয়। অর্থাৎ এখানে Xenophon কর্মবন্টনের চেয়ে administration/ প্রশাসনিকভাবে পরিচালনা ও পেশাগত দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।</p>
<p>Xenophon এর আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে Cyropedia. তিনি যখন ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যান, তখন পারস্য সম্রাটের নেতৃত্ব ও যোগ্যতা নিয়ে এই বইটি লিখেন। এই বইয়ের কারণেই মূলত তাকে ঐতিহাসিক বলা হয়।</p>
<p>Oikonomikos এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় Subjective value theory. এবিষয়টি পরবর্তীতে এরিস্টটল বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>তার চিন্তার আরেকটি দিক হলো, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দাস এবং প্যাট্রিসিয়ানদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য আমাদের সিটি স্টেইটকে উন্নত এবং আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করতে হবে। ফলত সারা দুনিয়া থেকে দাস এবং প্যাট্রিসিয়ানরা আমাদের এখানে কাজ করতে আসবে। আজকের পাশ্চাত্যকেও এ নীতি অনুসরণ করতে দেখা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্লেটোর চিন্তাধারা:</strong></h4>
<p>প্লেটোর (খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৭- খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৭) আরবী নাম আফলাতুন। তিনি মূলত সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন। আখলাক, দর্শন, মানতিক, রাজনৈতিক দর্শন, গণিত সব কিছু নিয়েই তিনি কাজ করেছেন৷ তবে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন তার রিপাবলিক এর জন্য। রিপাবলিক এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় আইডিয়াল স্টেইট (আদর্শ রাষ্ট্র) এবং কর্মবণ্টন। এখানে তিনি সবচেয়ে বেশি আলাপ করেছেন আদালত নিয়ে৷ তিনি বলেছেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো ফযিলতপূর্ণ জীবন৷ তার মতে ফযিলতপূর্ণ সমাজ কেবল আদালতের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব৷</p>
<p><strong>রিপাবলিক এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো ইউটোপিয়া। এখানে তিনি ইউটোপিয়া বলতে অলীক কল্পনাকে বুঝাননি। এখানে ইউটোপিয়া বলতে সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের যে চিন্তাভাবনা</strong><strong>, </strong><strong>তাকে বুঝিয়েছেন। প্লেটোর ইউটোপিয়া হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>একটি আইডিয়াল স্টেইট প্রতিষ্ঠা করতে হবে</strong><strong>, </strong><strong>এবং এর জন্য যে আখলাকী আদর্শগুলো প্রয়োজন সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। </strong></p>
<p>প্লেটোর মতে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব ৩ টি:</p>
<ul>
<li>১. মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ</li>
<li>২. রাষ্ট্রকে রক্ষা করা (defense system)</li>
<li>৩. প্রশাসন (administration)</li>
</ul>
<p>আদর্শ রাষ্ট্রের জনগণকে তিনি ৩ ভাগে ভাগ করেন:</p>
<ul>
<li>১. যারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করে</li>
<li>২. সৈন্যবাহিনী</li>
<li>৩. সাধারণ জনগণ</li>
</ul>
<p>প্লেটোর এই বন্টন বর্ণপ্রথার ভিত্তিতে ছিলোনা, বরং পেশার ভিত্তিতে ছিলো। তার মতে, যদি কেউ জন্মগতভাবে দাস না হয়ে থাকে, তাহলে নিজ যোগ্যতায় সে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদেও অধিষ্ঠিত হতে পারে৷ অর্থাৎ তিনিও দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছেন।</p>
<p>প্লেটোর মতে রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করবে, তারা প্রাইভেট সম্পদ বা সম্পদের ব্যক্তিমালিকানার অধিকারী হতে পারবেনা; তারা কোন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করবেনা। তারা একটি ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড এর জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রাষ্ট্র থেকে বেতন নিবে৷ খুব বেশি ধনী বা খুব বেশি দরিদ্র হওয়া মানুষের ফিতরাতের পরিপন্থী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>এরিস্টটলের চিন্তা</strong>:</h4>
<p>এরিস্টটল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন চিন্তাবিদ। রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, আখলাক, ইতিহাস, মানতিক, মেটাফিজিক্স, রেটোরিক, পদার্থবিজ্ঞান, ফিলোসোফি অব সায়েন্স, ফিলোসোফি অব মাইন্ড, সাইকোলজি, ভূতত্ব; এককথায় জ্ঞানের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব চিন্তা রয়েছে। মেটাফিজিক্স এর মতো বিষয়েও তার গ্রন্থ রয়েছে। নিকোমাখেন এথিক্স এ তিনি soul, virtues, partnership এবিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। পলিটিক্স এর ক্ষত্রে সংবিধান, বেইজ স্টেইট, বিপ্লব এসকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন৷ রেটোরিক এ আলোচনা করেছেন রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে। পোয়েট্রিক্স এ তিনি আলোচনা করেছেন ট্র‍্যাজেডি এবং এপি-পোয়েট্রি নিয়ে৷ জীবজন্তুর ইতিহাস, প্রজন্ম, গতিবিধি নিয়ে কাজ করেছেন। তার ছাত্র আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট তাকে এ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য একটি আলাদা বন প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। লজিক বা যুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে তিনি categories, interpretation, prior of analysis, posterior of analysis এসকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরিস্টটলের জ্ঞান চর্চার মেথড হচ্ছে এম্পিরিকাল বা গবেষণামূলক। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি প্রকৃতিকে এভাবে পরখ করে দেখেছেন।</p>
<p>পাশ্চাত্যের অধিকাংশ চিন্তাবিদই এরিস্টটলকে অর্থনৈতিক চিন্তার জনক মনে করে থাকেন। মূলত তার দুটি বইয়ে অর্থনৈতিক চিন্তা পাওয়া যায়। একটি হলো Politics (Politica), আরেকটি  Nicomachean ethics.</p>
<p>পলিটিক্সের প্রথম  এবং পঞ্চম অধ্যায়ে তিনি অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।</p>
<p>Nicomachean ethics এ মূলত আখলাকের আলোচনার মধ্যে অর্থনৈতিক বিষয়ের আলোচনা এসেছে৷</p>
<blockquote><p>এরিস্টটল এবং প্লেটোর চিন্তার মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে এনালিটিক্যাল থিংকিং। এনালিটিক্যাল থিংকিং এ মূলত ডিডাকটিভ মেথড ব্যবহৃত হয়। এরিস্টটল তার প্রত্যেকটি গ্রন্থে মানতিককে ভালোভাবে ব্যবহার করেছেন এবং তার প্রত্যেকটি তত্ত্বকে তিনি কারণ এবং ফলাফল (cause and effect) এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। জোসেফ শুম্পিটারের মতে, এনালিটিক্যাল হিস্ট্রি অব ইকোনমিকস এর দৃষ্টিকোণ থেকে এরিস্টটল গুরুত্বহীন একজন চিন্তাবিদ। এবং তার মতে, এরিস্টটল প্রাচীন গ্রীক রাষ্ট্রের সিটি স্টেইট এবং এর ব্যবস্থাপনার আখলাকী বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো এই প্রশাসনিক এবং আখলাকী চিন্তার একটা অংশ৷ অর্থাৎ, এরিস্টটলের চিন্তাধারা মৌলিকভাবে অর্থনৈতিক চিন্তাধারা নয়। বর্তমান ফিলোসফি অব সায়েন্সের অন্যতম দাবী হলো বিজ্ঞানকে অবশ্যই value free হতে হবে। এখানে কোন নরম্যাটিভ বিষয় আসবেনা। অর্থনীতি যেহেতু নিজেকে বিজ্ঞান বলে দাবী করে, তাই এখানেও আখলাক আলোচ্য বিষয় নয়। এজন্য ন্যায়-অন্যায় বা এধরণের কোন প্রশ্ন আসতে পারবেনা। অথচ সায়ন্স ও একটা আদর্শ অনুসরণ করে। সায়েন্সের আদর্শ হচ্ছে পজিটিভিজম।</p></blockquote>
<p>এরিস্টটলের মতে রাষ্ট্র হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। তার মতে, “রাষ্ট্র হলো একটি আখলাকী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ ব্যাবস্থাপনা।” সময়গত দিক বিবেচনায় পরিবার ও সমাজ রাষ্ট্রের আগে আসলেও রাষ্ট্র হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়। এরিস্টটলের মতে রাষ্ট্র হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তিনি মনে করেন স্বভাবগতভাবেই মানুষ রাজনৈতিক সত্ত্বা। মানুষ তার মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্যই রাষ্ট্র গঠন করে থাকে। রাষ্ট্র বা সিটি স্টেইটকে এরিস্টটল পলিস বলে থাকেন। তার মতে ভালো এবং খারাপের সাথে সংশ্লিষ্ট আবেগ-অনুভূতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এরিস্টটলের মতে ভালো মানুষ তিনিই যিনি রাষ্ট্রের আইন এবং বিধানকে ভালোভাবে পালন করে থাকেন। আর ফযিলতপূর্ণ মানুষ তিনি, যিনি আদালত সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা রাখেন। আদালত হচ্ছে রাষ্ট্রের মেরুদন্ড।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এরিস্টটল মনে করেন সম্পদ দুইভাবে উপার্জন করা যায়:</strong></p>
<ul>
<li><strong>মানুষের জরুরি প্রয়োজন পূরণের জন্য (যেগুলো পশুপালন এবং কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত)</strong></li>
<li><strong>অর্থ-সম্পদকে পুঞ্জিভুত করে রাখার জন্য সম্পদ উপার্জন (ব্যবসা ও প্রয়োজনহীন ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে)</strong></li>
</ul>
<p>প্রথমটিকে তিনি Oikonomikos  এবং দ্বিতীয়টিকে Chrematistics বলে অভিহিত করেন। দ্বিতীয়টিকে তিনি খারাপ কাজ হিসেবে দেখেন। বর্তমানে আমরা যে অর্থনীতি দেখি তাকে Chrematistics এর একটি প্রতিশব্দ বলা যায়। সতেরশো শতাব্দীর দিকে এটি political economy নামে পরিচিত ছিলো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এই নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ আমরা বর্তমানে যাকে অর্থনীতি বলে থাকি, সেটি প্রাচীন গ্রীসের Chrematistics এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যা এরিস্টটলের মতে এক অর্থে অবৈধ বলা যায়।</p>
<p>ক্যাসেনোফন, প্লেটো সবার মতেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল নাগরিকদের একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী, ভালো জীবন দিতে হবে৷ আর এটা করা যায় একমাত্র শহরের মাধ্যমে। শহরে বসবাসকারী মানুষরাই একমাত্র ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে। যেহেতু ব্যবসার দ্বারা কোন উৎপাদন করা যায়না, এজন্য এরিস্টটল এর পক্ষে নন। এছাড়াও তার মতে, যেহেতু ব্যবসার মাধ্যমে সীমাহীন সম্পদ উপার্জন করা যায়, তাই এটি অবৈধ।</p>
<p>Value Theory:</p>
<p>এরিস্টটলের মতে, যেসব সম্পদকে ব্যক্তি কর্তৃক উপার্জন করা সম্ভব, এর প্রত্যেকটির সাথে দুটি মূল্য সংশ্লিষ্ট আছে:</p>
<ul>
<li>১. ব্যবহারিক মূল্য</li>
<li>২. বিক্রয় মূল্য</li>
</ul>
<p>ব্যবহারিক মূল্য হলো, জিনিসটি ব্যবহার করে মানুষের কতটুকু প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে তার পরিমাপ। আর বিক্রয়মূল্য হচ্ছে ক্রেতা কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য। এটি ব্যবহারের উপযোগিতার উপর নির্ভর করেনা। যেমন, পানির অপর নাম জীবন হওয়া সত্বেও পানি অত্যন্ত সস্তা। কিন্তু ডায়মন্ডের সেরকম কোন প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও এটা এত মূল্যবান। এই মূল্য ক্রেতা কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য।</p>
<p>এরিস্টটল তার Nicomachean ethics এ এবিষয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, কোন দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকতে হবে। কোন সম্পদ দুষ্প্রাপ্য হলেই বা ক্রেতা কর্তৃক মূল্য বেশি দিতে চাইলেই তার মূল্য বাড়ানো যাবেনা। একটা ভারসাম্য রাখতে হবে। এরিস্টটল এখানে ভ্যালু থিওরি নিয়ে আলোচনা করেননি।</p>
<p>তার আলোচনার আরেকটি বিষয় ছিলো সম্পদের মালিকানা বা মুলকিয়াত। এক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তি মালিকানাকে স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ মানুষকে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে মালিকানার অধিকার দিতে হবে। এটা সমষ্টিগত নয়, ব্যক্তিগত হতে হবে। যদি কোন সম্পদের সমষ্টিগত মালিকানা থাকে, তা একইসাথে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং উৎপাদনকে ব্যহত করে। এর একটা কারণ হলো নাগরিকদের ভালো বা সুন্দর জীবনযাপন ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদের উপর নির্ভর করে। কারণ ব্যক্তিমালিকানার অধীনে সম্পদ না থাকলে সে তার মৌলিক অধিকার পূরণে প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করতে পারবেনা।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে সমাজের মানুষ সুখী হতে পারবেনা। ক্যাসেনোফন, প্লেটো সবার মতেই, মানুষের জন্য সুখী-সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করা জরুরি। এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাস-দাসীরাও কি এই ব্যক্তি মালিকানার অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা? এরিস্টটলের মতামত হলো, মানুষ দুই ধরণের; স্বাধীন মানুষ এবং গোলাম। যারা স্বাধীন হয়ে জন্ম গ্রহণ করে তারা মূলত নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বা সমাজ পরিচালনার জন্য জন্ম গ্রহণ করে। আর দাস-দাসীদের জন্ম হয় স্বাধীন মানুষদের সেবা করার জন্য। ফলে এরিস্টটলের মতানুযায়ী, এই দাস-দাসীরাও মানুষের ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদে রূপান্তরিত হয়। এরিস্টটল মূলত তিনি যে সমাজে বসবাস করতেন, সে সমাজের ব্যবস্থাপনাকে বৈধতা দেয়ার জন্য আদর্শিক একটা দৃষ্টিকোণ থেকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এর কোন প্রায়োগিক বা মানতিকী ব্যাখ্যা নেই। তার কোন এনালিটিক্যাল থিওরিই এটিকে সিদ্ধ করেনা। এটি পুরোপুরিই তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট।</p>
<p>এরিস্টটলের মতে, টাকার কোন নমিনাল ভ্যাল্যু নেই। এর মূল্য রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত। টাকা হচ্ছে শুধুমাত্র মুবাদালা করার মাধ্যম। সে নিজে কোন ভ্যালু বহন করেনা। সুদ হচ্ছে টাকা থেকে টাকা উপার্জন করা। যেহেতু এখানে কোন উৎপাদন হচ্ছেনা, তাই তার মতে অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে ঘৃণিত মাধ্যম হচ্ছে সুদ। এমনকি এটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ একটি কাজ। এটি সমাজের ভারসাম্যকে নষ্ট করে। অর্থাৎ আদালতের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি এটাকে অবৈধ মনে করেছেন।</p>
<p>প্রাচীন গ্রীসের অর্থনীতিকে আমরা মোটের উপর এই তিনজন ব্যক্তির চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সংকলকঃ</strong> নাজিয়া তাসনিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/economic-thought-of-ancient-greece/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14904</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান; জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫</title>
		<link>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 30 Jun 2024 13:53:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি খাত]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫]]></category>
		<category><![CDATA[সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান;]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14504</guid>

					<description><![CDATA[একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে একটি পরিবার কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে, সেই অর্থবছরে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি কী হবে, ঢাকার একজন শিক্ষার্থী নিত্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কতটা সহজে সংগ্রহ করতে পারবে অথবা রাজশাহীর একজন কৃষক তার উৎপাদিত আমের ন্যায্যমূল্য পাবেন কি-না– এগুলোর প্রতিটিই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এক কথায়, কোনো একটি দেশের ব্যক্তি পরিসর থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় বিষয়াদি; এমনকি আন্তর্জাতিক বিশ্বে সেই দেশটির কূটনৈতিক পন্থা নির্ধারণ কেমন হবে– এ সবকিছুই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এজন্য বাজেটকে এক অর্থে একটি জাতির ভাগ্যলিপি হিসেবেও উল্লেখ করা যায়।</p>
<p>প্রতি বছরের ন্যায় ‘সুখি, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে এবারও জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৪.২ শতাংশ এবং চলতি বাজেটের তুলনায় ৪.৬ শতাংশ বেশি। প্রতি বছর বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও কেন দেশের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। পাশাপাশি বাজেটের কলেবর বৃদ্ধি আদৌ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য সহায়ক নাকি বোঝা স্বরূপ, তাও আলোচনা করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে বাজেটের খাতগুলোও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের পর্যালোচনা</h3>
<p>একটি দেশের বাজেটের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো হলো শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য। কারণ দেশের সকলেই এ খাতগুলোর উপর সরাসরি নির্ভরশীল এবং এগুলোর উপরেই দেশের অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন ছিলো এ খাতগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বরাবরের মতোই অবহেলিত রয়েছে এ খাতগুলো। বর্তমান অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রেক্ষিতে যদি আমরা বিস্তারিত আলাপ করি, সেক্ষেত্রে দেখা যায়–</p>
<p>★<strong> শিক্ষা খাত</strong></p>
<p>আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষার হার এখনো আশানুরূপ পরিমাণে বাড়েনি। ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এর সুবাদে প্রাথমিকে ধীরে ধীরে প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও এসব শিক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশি মাধ্যমিক স্তর পার হতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর ২০২৩ সালের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলো ৯২ লাখের বেশি। ২০২৪ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৬৬ হাজারে।</p>
<p>পারিবারিক দরিদ্রতা, শিক্ষার ব্যয়ভার মেটানোর অক্ষমতা এবং চাকরি নির্ভর পড়াশোনাকেই শিক্ষা হারের এ দুর্দশার কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি হিসাব মতে দারিদ্র‍্যের হার ১৮.৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তব সংখ্যা এরচেয়ে দ্বিগুণ বেশি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর জরিপ অনুসারে, ২০২০ সালের শেষে দারিদ্যের হার ছিলো ৪২ শতাংশ। এর মাঝে দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বাস করছে ২৮.৫ শতাংশ নাগরিক। এদিকে ভর্তি ফি, টিউশন ফি, শিক্ষার উপকরণ খরচ, প্রাইভেট-কোচিং বাবদ ইত্যাদি সবই এ বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে।</p>
<p>এর পাশাপাশি, গ্লোবালাইজেশনের সময়ে এসে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল, সেখানে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সকল কিছুরই ব্যয়ভার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইটি পণ্যগুলোর দাম দিনদিন বাড়ছেই। ডিজিটালাইজেশনের সময়ে এসে এমন লাগামহীন অবস্থা শিক্ষাব্যবস্থায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।</p>
<p>অথচ এতসব কিছু বিচার বিবেচনায় না নিয়ে প্রতি বছর শিক্ষা খাতে বাজেটের হার কমছেই। শিক্ষাখাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে বরাদ্দ ছিলো জিডিপির ১.৮৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১.৭৬ শতাংশে নেমে আসে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১.৬৯ শতাংশে, যা মোট বাজেটের ১১.৮৮ শতাংশ। অঙ্কের হিসেবে ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।</p>
<p>একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ইন্ডিপেনডেন্ট এর সূত্রানুযায়ী এ বছরের বাজেটে ৫৬ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মতো। এবং বণিকবার্তার সূত্রানুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি। সেক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের পেছনে গবেষণা বাবদ অর্থ বরাদ্দ মাত্র ১ লক্ষ টাকার কিছু বেশি। একজন শিক্ষক মাত্র এই কয় টাকার উপর নির্ভর করে গবেষণায় কতটা মনোনিবেশ করতে পারবে বলে মনে হয়? তাহলে কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার প্রতি অনীহা বা অনাস্থা প্রদর্শন করবে না?</p>
<p>আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও বর্তমান শিক্ষার মান হিসেবে এই খাতে বাজেটের পরিমাণ নিতান্তই কম। আইএলও এবং ইউনেস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মান মোট বাজেটের ২০ শতাংশ আর জিডিপির ৬ শতাংশ। এর তুলনায় যে নগণ্য বরাদ্দ আমাদের বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কীভাবে একটি দেশের শিক্ষার মানের উন্নতি আশা করা যায়? এছাড়া, গবেষণার জন্য তো আলাদা বাজেট নেই-ই। উচ্চশিক্ষার জন্য গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না পারছে একটি শিক্ষিত ও জ্ঞাননির্ভর জাতি গঠন করতে, না পারছে জাতীয় শিক্ষার মান উন্নত করতে। তারচেয়েও দুর্ভাগ্যজনক হলো এ বরাদ্দের ক্ষুদ্র একটি অংশই শিক্ষাখাতে সত্যিকারার্থে ব্যয় হয়, সিংহভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগী দুর্নীতিবাজ শ্রেণির পকেটে।</p>
<p>স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরোলেও শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের মান, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের আবাসান সংকট, গবেষণার দৈন্যদশা, জ্ঞানচর্চার সুষ্ঠু আবহ– এসবের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন নেই। সব মিলিয়ে অবস্থার চরম করুণ পরিপ্রেক্ষিতে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষাখাতে যতটুকু বাজেট দেওয়া হচ্ছে, তার সম্পূর্ণটাই কি এ খাতে ব্যয় হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে স্বল্প পরিমাণ বাজেটের অংশটুকুও? এই প্রশ্ন জাতির প্রতিটি সচেতন বিবেকের। <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hasan-vai-1.jpg" height="123" /></a>★<strong> কৃষি খাত</strong></p>
<p>শত শত নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত কৃষি। শুধু আমাদের দেশেরই নয়, বরং যে কোনো দেশেরই উন্নতি-অগ্রগতির প্রধান বাহন এ কৃষি খাত। আমরা দেখি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন ও রাশিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পখাতে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃষিকে কখনোই অবহেলা করেনি। যার ফলে, সারা বিশ্বে গম, ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনেও শীর্ষস্থানে রয়েছে এ দেশগুলোই।</p>
<p>এদিকে বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদেও কৃষির সাথে যুক্ত (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩)। অথচ এ দেশের কৃষি খাতের অবস্থা দিনদিন ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হচ্ছে। রপ্তানির পরিমাণ তো বৃদ্ধি পাচ্ছেই না, উল্টো যত দিন যাচ্ছে, আমদানির পরিসংখ্যান যেন তরতর করে বাড়ছে। যেখানে ইলিশ, পাট, চালসহ আরও নানান কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে ছিলো, সেখানে বর্তমান সময়ে এসে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ভুট্টা, ডাল, মসলা, ফল, নারকেল, নারকেলের শাঁস, সারসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি আমদানি করতে হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাতীয় অর্থ।</p>
<p>বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপাত্ত অনুসারে, কৃষি পণ্য আমদানিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার কোটি ডলার) বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সূত্র অনু্যায়ী, একই অর্থবছরে সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে বিলিয়ন ডলারের (৫০০ কোটি) বেশি। ফলে দেখা যাচ্ছে, কৃষি পণ্য ও সার আমদানিতে বাংলাদেশকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ বছরে মূল্যস্ফীতি ও চাহিদা বাড়ার কারণে কৃষিতে আমদানির এ পরিমাণ বেড়ে তিনগুণও হতে পারে।</p>
<p>রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দামও। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কৃষি বাজার। যে সবজি পূর্বে ৩০/৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত, তা এখন ১০০ টাকা ছুঁয়েছে। বেড়েছে চালের দাম, মাছের দাম, মুরগীর দামও। তেলের দামও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে এ দাম বাড়ানো হয়, অথচ যখন বিশ্ববাজারে দাম আবার কমে, তখন স্থানীয় বাজারে দাম কমার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।</p>
<p>এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক বাজেটের মাত্র ৪.৭ (বণিকবার্তা) শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কৃষি খাতে। যদিও গতবারের তুলনায় এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বেশি, তবু বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশের জন্য এমন বরাদ্দ খুবই আশঙ্কাজনক। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক জরিপে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে; সেই জরিপে দেখা যায়, খাবার কিনতে হিমশিম খাওয়া মানুষের হার ৬৮ শতাংশ। দেশের জনগণের এই দুর্দশা ঘোচাতে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিলো এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু নতুন বাজেট আবারও হতাশ করেছে জনগণকে। কেননা, সেই পদক্ষেপের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না বাজেটে। তার মানে আগামীতেও সহজে পরিবর্তন হচ্ছে না চলমান পরিস্থিতি। বাজেট আসছে যাচ্ছে, কিন্তু সেই পুরনো ভুত কাঁধে নিয়েই এগোচ্ছে গোটা জাতি।</p>
<p>★<strong> স্বাস্থ্য খাত</strong></p>
<p>বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত। কিন্তু, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।</p>
<p>সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে জনপ্রতি চিকিৎসা-ব্যয় গড়ে ৫৪ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় পাঁচ হাজার ৯৯৪ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা নিতে বহির্গমনকারী রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ। বিডার হিসাবে, এ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর আস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশে বিগত বছরগুলোয় সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বাড়লেও চিকিৎসকের মান ও সেবার পরিধি প্রসারিত হয়নি। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরেই যেতে হয় সামর্থ্যবানদের।</p>
<p>কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কী অবস্থা? এখন পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে বিশেষায়িত সেবা পৌঁছায়নি। নির্ভুল রোগ নিরীক্ষা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব সংকটের কারণে রোগীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে বেসরকারি হাসপাতালে যায়। যখন সেখানেও প্রয়োজনীয় সেবা মেলে না, তখন যাদের সক্ষমতা রয়েছে, তারা বিদেশে চলে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তারা? তারা তাদের সমস্যাবলি শরীরে নিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে থাকে।</p>
<p>স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য হাসপাতাল রয়েছে মাত্র ৮,৪৯৪। যার সবগুলো মিলিয়ে শয্যাসংখ্যা মাত্র ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৩০১ টি। জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা যে অতি নগণ্য, তা পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।</p>
<p>চিকিৎসা ব্যবস্থার এহেন করুণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট মাত্র ৫.১৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। একটি দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের সকল জনগণের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার জন্য এই ক্ষুদ্র অংশ কোনোমতেই যথেষ্ট নয়।</p>
<p>★ <strong>অন্যান্য</strong></p>
<p>এ তো মাত্র কয়েকটি খাতের পর্যালোচনা। অন্য সবকটি খাতই পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় খাতগুলোতে যথাযথ বাজেট নেই। এমন সব খাতে বরাদ্দ বেশি দিয়ে রাখা হয়েছে, যেগুলো আদতে মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোনো পরিবর্তন আনছে না, দেশের সামগ্রিক উন্নতিতেও অবদান রাখছে না। পাশাপাশি কোনো খাতেই সঠিক ব্যয় হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ শ্রেণি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বরাদ্দকৃত এ প্রয়োজনের তুলনায় ক্ষুদ্রাংশও ঠিকঠাক পৌঁছাচ্ছে না জনগণের দোরগোড়ায়।</p>
<p><strong>বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ৩.৮%, পরিবহন ও যোগাযোগে ১০.৪০% বরাদ্দ রেখে বাজেট করা হলেও তা কি আদৌ বাস্তবায়ন করা হয়? এ খাত দুইটির সাথে প্রক্রিয়াধীন ও প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট জড়িত, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ছেই। কখনো কখনো তা একই ধরনের প্রকল্পে উন্নত রাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।</strong> প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কাঁচামালের যোগান সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। এক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা ও তা উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা মোটেও নেই। প্রযুক্তিও ব্যবহার হচ্ছে বিদেশীদের। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও কোনো দেশী কোম্পানির কাছে নেই। প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই বিদেশী। আর শ্রমিকদের মধ্যে দেশীয় যারা, তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাও নিতান্তই সামান্য। তাহলে কার পেছনে ব্যয় হচ্ছে এত অর্থ?</p>
<p>বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছোট-বড় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াট হলেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৭৮২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তার উপর এ অংশ থেকেই বিতরণ ক্ষতি হয়েছে ৮.৪৮%। যার ফলস্বরুপ এখনো ২১% বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে।</p>
<p>পরিবহন ও যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত নগরজীবনে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। যানজটের ফলে দীর্ঘ একটি সময় অপচয় হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সময়। নগরবাসীদের অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তো দিন দিন বাড়ছেই। কেবল ২০২১ সালেই সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮৫১৬ জন। একটা প্রতিবেদনে এ রকম দেখালেও মূলত বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।</p>
<p>বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে রেল ও নৌপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিলো। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নৌ-পথ অর্ধেকের বেশি কমেছে। রেলপথ গুরুত্ব পায়নি, বরং রেলযাত্রার উপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সড়কপথ বাড়লেও এসবের মান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।<br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<h3>📌 সুদভিত্তিক বাজেট</h3>
<p>সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো প্রতিবারের মতো এবারের বাজেটও একটি সুদভিত্তিক বাজেট। আমরা যেখানে দেখতে পেলাম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বাজেটের যথেষ্ট বরাদ্দ নেই, সেখানে সুদের মতো একটি সম্পূর্ণ অযাচিত খাতেই ব্যয় হচ্ছে বাজেটের ১৪.২৪%। অর্থাৎ, মোট বাজেটের ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুধু সুদ হিসেবেই দিতে হবে আগামী এক বছরে।</p>
<p>অথচ, এই সুদ কেবল ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, একইসাথে অর্থনৈতিক দিকে থেকে একটি ভয়াবহ বিষয়। ৯২% মুসলমানের দেশে ১৪.২৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই; অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতিরাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দরিদ্রতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার, সামাজিক নিরাপত্তা খাত এর মতো যে সকল খাতে দুর্নীতি বেশি, সে সকল খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিলো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্দকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি! আর মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কীভাবে পরিশোধ করবো? অথচ</p>
<p>আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সা.) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সব সময়ই সুদের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ, এই সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও এই অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সা.)। এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি</h3>
<p>অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদের ভয়াবহ আরেকটি কুফল হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। বর্তমানে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার চলছে ৯.৮%। এই অবস্থার মাঝেও প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ৬.৫%। অথচ আমরা দেখেছি গত অর্থবছরে ৬% লক্ষ্যমাত্রা ধরেও তার লাগাম টেনে ধরতে পারেনি সরকার। বরং আকাঙ্ক্ষিত অঙ্কের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে ৩.৮% বেড়ে গেছে এই সংখ্যাটা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 ঘাটতি নির্ভর বাজেট</h3>
<p>অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারের বাজেটও সম্পূর্ণ ঘাটতি বাজেট। মোট বাজেটের পরিমাণ ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাকী ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা পুরোটাই ঘাটতি থাকছে। যা মোট বাজেটের ৩২.১২ শতাংশ।</p>
<p>অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েই এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ঋণ নেয়ার ধারাবাহিকতা আজ নতুন নয়। প্রতিবছরই ঋণের বোঝা বাড়ছে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭৪ ডলারে। টাকার হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজারের বেশি টাকা। সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুটির উপরও এই ঋণের ভার বর্তাবে।</p>
<p>বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি নিরাপদ সীমার মাঝে পড়ে। অথচ ২৩-২৪ অর্থবছরেরই ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫.৫ শতাংশের বেশি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে চার দশমিক ছয় শতাংশ (ডেইলি স্টার)। এই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ঋণ ও প্রতিবছর যে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে, এ নিয়ে বাজেট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তো লক্ষ্যণীয় নয়ই, বরং নামেমাত্র যেনো বাজেট পেশ করতে হবে, এজন্যই বাজেট পেশ করা হচ্ছে।</p>
<p>কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, “আর্থিক বিবৃতি প্রদান একপ্রকার ধর্মীয় আচার হয়ে দাড়িয়েছে, যা পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে এবং তার সম্ভাব্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রভূত বাকচাতুরীর দ্বারা উচ্চকিত রূপে পাঠ করা হয় (যা কখনোই পাঁচ ঘণ্টার নিচে সম্পন্ন হওয়ার নয়) অর্থাৎ নানাবিধ নর্তন, কুর্দন, ভাব ও ভঙ্গিমার সঙ্গে চার ঘণ্টার একটি বক্তৃতা প্রদান করা হয়।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 কালো টাকা সাদা করার জঘন্য নীতি</h3>
<p>এদিকে এ বাজেট যেনো কালোবাজারি ও দুর্নীতিবাজদের জন্য নিদারুণ খুশির সংবাদ নিয়ে এসেছে। মাত্র ১৫% কর দিয়েই অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা হবে আইনানুগভাবে বৈধ। পঞ্চাশ লাখ টাকা ইনকাম করলে ৩০% টাকা কর দিতে হবে, কিন্তু কালো টাকা সাদা করতে ১৫% কর দিতে হবে। এখন যারা কালো টাকা সাদা করবে, তারা তো আর পঞ্চাশ লাখ টাকার মতো নামেমাত্র টাকা সাদা করবে না। তাদের টাকার অঙ্কই তো হবে কমপক্ষে কয়েকশ&#8217; কোটি টাকা, তাহলে সেখানে কীভাবে এতো কম করহারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়!?</p>
<p>এই ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থনীতি বিশ্লেষকগণও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, “মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার এই ব্যবস্থা সৎ ও বৈধ আয়ের ব্যক্তি করদাতাকে নিরুৎসাহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে”। ঘোষিত অর্থ ও সম্পদের ব্যাপারে কোনো কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন করার সুযোগ না রাখা দেশে দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে টিআইবি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 বেকারত্বের অভিশাপ</h3>
<p>আমরা ইতঃপূর্বেই দেখেছি দেশের বর্তমান বেকারত্বের হার যেভাবে বাড়ছে, তা সত্যিই একটি জাতির জন্য উদ্বেগজনক। কেননা, বেকারত্ব একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভঙ্গুর করে দেয়, দেশজ উৎপাদন কমে যায় এবং অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত করে। শুধু তাই নয়, বেকারত্বকে একটি জাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, যারা হতে পারতো দেশের উন্নয়নের সোপান, একটি দেশকে সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী কারিগর, সেই বিপুল মানবসম্পদ নিদারুণভাবে অপচয় হচ্ছে। আবার, বেকার যুবসমাজ সহজেই নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। যার ফলে জাতির মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় ঘটে চরম অধঃপতন। আর এই অবক্ষয় সামগ্রিকভাবে বিনষ্ট করে সামাজিক নিরাপত্তা।</p>
<p>এহেন পরিস্থিতিতেও, ৪ লক্ষ কর্মক্ষম যুবক বেকার থাকা সত্ত্বেও, এমনকি তাদের বিশাল একটি সংখ্যা শিক্ষার বিবেচনা সর্বোচ্চ স্তর তথা অনার্স-মাস্টার্স পাড়ি দেয়ার পরেও, তাদের বেকারত্ব নিরসনে বাজেটে নেই কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা বা নির্দেশনা। ভাসা-ভাসা সুরে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ যেসব বিষয়ে বলা হচ্ছে, সেগুলোকেও যথেষ্ট মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। তবে তাহলে কোথায় সেই উদ্বেগ কাটানোর প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ? কেনই বা এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না নীতি-নির্ধারকগণ? কী সেই অজানা কারণ যা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে আমাদের মনে? প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে বের করা আমাদের সবারই একান্ত দায়িত্ব।</p>
<p>কেননা, এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা; সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো; চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সা:) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।<br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hhhhhhhhhhhhhhhhh.jpg" height="123" /></a>সবশেষে এটাই বলতে চাই,<br />
লক্ষ্য করুন– এতো এতো জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বাজেট, যার উপর গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়, সেটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই, যৌক্তিক প্রস্তাবনাও নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা! অনলাইনে যতটুকুই দেখা যায় বা কাজ আছে, তার সবই তথ্যনির্ভর পত্রিকালাপ! কেননা ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা ও সমালোচনা অসম্ভব; যদি না নিম্নোক্ত বিষয়ে পারদর্শী হয়-</p>
<ul>
<li> Philosophy of Politics.</li>
<li>International Economics.</li>
<li>Political Economy.</li>
<li>Philosophy of Economics.</li>
<li>General Economy.</li>
<li> Economic System of Islam.</li>
<li>মাকাসিদ আশ-শারিয়িয়্যাহ।</li>
</ul>
<p>এসব বিষয়ে কোনো পারদর্শীতা কিংবা জ্ঞান আমার নেই। তবুও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এতটুকু বুঝি যে, এব্যাপারে সঠিক পর্যালোচনা এবং জাতীয় প্রস্তাবনা আমাদের দিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সব ধরনের সিভিল সোসাইটির এব্যাপারে এগিয়ে আসার কোনই বিকল্প নেই।</p>
<p>সম্মিলিত উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতেই; ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে এবং কথিত উন্নয়নের স্লোগান বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রশিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎসশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে এগিয়ে যেতে হবে।</p>
<ul>
<li>কেননা আমাদের রয়েছে–• ১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ</li>
<li>তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত</li>
<li>ইন্ডাস্ট্রি-কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা</li>
<li>দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)</li>
<li>গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর</li>
<li>বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ</li>
<li>বনাঞ্চল</li>
<li>মৎসশিল্প ইত্যাদি</li>
</ul>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট-সহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জনবিরোধী এই দুর্ভাগ্যের উপাখ্যান ঘোষণার এই ক্ষণে এখন প্রয়োজন, দেশ ও জাতির স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন মুক্তিকামী যুবজনতার পক্ষ থেকে এক নয়া ন্যায়ভিত্তিক ইশতেহার ঘোষণা করার। সে প্রত্যাশায়…</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14504</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদঃ অনতিবাহিত এক অতীত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/expolitation-and-imperialism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/expolitation-and-imperialism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 24 Jan 2024 11:41:12 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13349</guid>

					<description><![CDATA[ সৃষ্টিগতভাবে প্রতিটি মানুষের ইজ্জত এবং মর্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কারণ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সম্মানিত করে। তাই আমরা আমাদের বর্তমান দুনিয়াকে  পরিবর্তন করে এমন একটা নতুন দুনিয়া বিনির্মাণ করতে চাই, যে দুনিয়ায় মানুষ  ইজ্জতের সাথে বসবাস করতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong> </strong>সৃষ্টিগতভাবে প্রতিটি মানুষের ইজ্জত এবং মর্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কারণ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সম্মানিত করে। তাই আমরা আমাদের বর্তমান দুনিয়াকে  পরিবর্তন করে এমন একটা নতুন দুনিয়া বিনির্মাণ করতে চাই, যে দুনিয়ায় মানুষ  ইজ্জতের সাথে বসবাস করতে সক্ষম হবে। মহান আল্লাহ মুসলিম হিসেবে আমাদেরকেই এ দায়িত্ব দিয়েছেন, একই সাথে যুবক বা তরুন হিসেবে আগামী দিনের মুসলিম উম্মাহর কর্ণধার আমরা। এজন্য আমাদের জন্য নতুন দুনিয়া বিনির্মানের এ দায়িত্ব পালন এক অর্থে ফরজ। আমরা যদি এই দুনিয়াকে পরিবর্তন করতে চাই তাহলে প্রথমে  আমাদেরকে বর্তমান দুনিয়া সম্পর্কে জানতে হবে। বলা হয়, বর্তমানে আমরা পোস্ট কলোনিয়াল যুগে বসবাস করছি। সত্যি কি আমরা পোস্ট কলোনিয়াল যুগে বসবাস করছি নাকি আমরা যে শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে ছিলাম সেখানেই এখনও আমরা পড়ে আছি? এ বিষয়টি আগে আমাদেরকে খুব ভালোভাবে জানতে হবে।</p>
<p>প্রথম কথা হচ্ছে এই শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ এ বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এ বিষয়টি কেন আমাদেরকে খুব ভালোভাবে বুঝা উচিত? আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহ তিনবার সবচেয়ে বড় হুমকির সম্মুখীন হয় এবং দখলে নিপতিত হয়।</p>
<p><strong>‌</strong><strong>প্রথমবার</strong> <strong>হল; </strong><strong>ক্রুসেডারদের</strong> <strong>আক্রমন</strong><strong>।</strong> যে আক্রমণের ফলে বায়তুল মাকদিস বা সমগ্র আকসা সাম্রাজ্যবাদী অর্থাৎ ক্রুসেডারদের বা ইউরোপিয়ানদের দখলে চলে যায়।</p>
<p><strong>দ্বিতী</strong><strong>য়বার হল; মো</strong><strong>ঙ্গলদের</strong> <strong>আক্রমণ</strong><strong>।</strong> যে আক্রমণের মাধ্যমে আমাদের আব্বাসি খেলাফতের আনুষ্ঠানিকভাবে পতন ঘটে অর্থাৎ বাগদাদের পতনের মধ্য দিয়ে। যদিও মোঙ্গলরা মামলুকীদের কাছে আইন জালুতের যুদ্ধে পরাজয় বরণ করার পর ধীরে ধীরে তাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্ম ইসলাম গ্রহণ করে। তারা পরবর্তীতে ইসলামের সেবক হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়</strong> <strong>আক্রমণটি</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>সাম্রাজ্যবাদী</strong> <strong>কলোনিয়ালিস্ট</strong> <strong>বা</strong> <strong>এই</strong> <strong>শোষকদের</strong> <strong>আক্রমণ</strong><strong>।</strong> আর এই আক্রমণের ফলে মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত,নিপীড়িত এবং নির্যাতিত হয়েছি আমরা অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা। বিশেষভাবে বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত-নিগৃহীত এবং নির্যাতিত হয়েছে, গণহত্যার শিকার হয়েছে এবং আজ অবধি আমরা তাদের সেই শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। এখন প্রশ্ন থাকতে পারে ব্রিটিশরা তো চলে গেছে সেই ৪৭ এ। তাহলে আমরা এখনো কিভাবে তাদের কলোনি? এজন্যই প্রবন্ধের নামকরণ করা হয়েছে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ অনতিবাহিত এক অতীত। আমরা একে আজ অতীত হিসেবে আখ্যায়িত করলাম এটা মোটেও আমাদের জন্য অতীত নয় আজকের আলোচনা থেকে আশা করি এটি আমাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে প্রতিপাদন হবে।</p>
<p>সূরা আনফালের ৪২ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন;</p>
<p>وَلَٰكِن لِّيَقْضِيَ اللَّهُ أَمْرًا كَانَ مَفْعُولًا لِّيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَن بَيِّنَةٍ وَيَحْيَىٰ مَنْ حَيَّ عَن بَيِّنَةٍ ۗ وَإِنَّ اللَّهَ لَسَمِيعٌ عَلِيمٌ</p>
<p>এটি বদরের যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি আয়াত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা আগেই নিয়েছিলেন অর্থাৎ যারা টিকে থাকবে যারা বেঁচে থাকবে যাতে সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রমাণ এর ভিত্তিতে বেঁচে থাকে। আবার যারা ধ্বংস হবে তারাও যাতে সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে ধ্বংস হয়। এজন্য আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে, আমরা আসলে কিসের উপর ভিত্তি করে আমাদের জীবনকে পরিচালনা করব আমাদের আন্দোলনকে পরিচালনা করব?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর উত্তরসূরী হিসেবে, হযরত মুসা এবং হারুন আলাইহি সালামের উত্তরসূরী হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু, আলী (রা), ফাতেমা, আসিয়া,  সুলতান ফাতিহ, ইকবালের উত্তরসূরী হিসেবে আমরা আসলে কিসের উপর ভিত্তি করে আমাদের চিন্তা এবং দর্শনকে এবং আমাদের জীবনকে পরিচালনা করব, এমনকি এর ভিত্তিতে একটি নতুন দুনিয়া গড়বো?</p>
<p>আমরা যদি শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, এই শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ ষোড়শ শতাব্দী থেকে অর্থাৎ ১৫০০ সাল থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীর বা মানব সভ্যতার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ এটাকে আমরা গত ৫০০ বছর ধরে সমগ্র পৃথিবীর ভাগ্যাকাশে একটা কালো মেঘ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। একইভাবে এটাকে আমরা দুনিয়ার ইতিহাসের একটি নতুন মাত্রা বলতে পারি।</p>
<p>ইতিপূর্বে বলেছি আমরা মুসলমানরা তিনবার সবচেয়ে বড় আক্রমণের শিকার হয়েছি, কিন্তু এর কোনটি সাম্রাজ্যবাদীদের মত এত সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী ছিল না এবং  এত স্থায়ী ছিল না। এ আক্রমণ আমাদের উপর যেভাবে এসেছে। তবে এ ৫০০ বছরের পুরো সময়ে এক না। অর্থাৎ এই ৫০০ বছরকে আমরা সমান্তরালভাবে বিচার করতে পারি না। শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ হল, দুনিয়ার ইতিহাসের সর্বশেষ পাঁচশত বছরের ভাগ্যকে নিরূপণকারী একটি পর্যায়। অর্থাৎ দুনিয়ার ইতিহাসের একটি মাত্রা। তবে এর রূপ এক এক শতাব্দীতে এক এক রকম। একেক অঞ্চলে এর রঙ একেক রকম। যেমন মধ্য এশিয়াতে একরকম, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকাতে একরকম, উপমহাদেশে এক রকম। একই ভাবে উত্তর ও দক্ষিন অ্যামেরিকার ক্ষেত্রেও ভিন্ন।</p>
<p>আমরা যদি সাম্রাজ্যবাদকে বুঝতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই ৫০০ বছর অর্থাৎ কলম্বাসের তথাকথিত আমেরিকার আবিষ্কার দিয়ে শুরু হওয়া যে শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ এটাকে অঞ্চলভিত্তিক, সময় ভিত্তিক, এমনকি ব্যক্তি ভিত্তিক বিভাজিত করে পড়তে হবে।</p>
<p>যেমন এটা মধ্য এশিয়াতে একরকম অর্থাৎ রাশিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত যে সাম্রাজ্যবাদ সেটা একরকম। আবার উত্তর আফ্রিকা এবং মিশরে ফ্রান্সের মাধ্যমে পরিচালিত সেটা একরকম। ‌ ভারতের হিন্দুস্তান তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এক রকম আবার উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এই ভিন্নতাকে আমাদেরকে বিবেচনায় নিতে হবে।</p>
<p>তবে এদের একটি অভিন্ন বিষয় আছে। ‌এদের মধ্যে অভিন্ন বিষয় হল, এর মাধ্যমে যদি আমরা সাম্রাজ্যবাদকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই তবে তা হলো,<strong> “বৈদেশিক সংখ্যালঘু কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছা ও অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাঁদের যা কিছু আছে সেগুলোকে নিজেদেরকে স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা এবং এই সিস্টেম বা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের সম্পদকে- সে দেশের সকল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন: সে দেশের বিভিন্ন মিলসগুলো) লুণ্ঠন করে, সে দেশের সকল সম্পদকে কুক্ষিগত করে তাঁদের কেন্দ্রীয় দেশে (যেমন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেন্দ্র ছিল লন্ডন, একইভাবে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির  কেন্দ্র ছিল নেদারল্যান্ডস) প্রেরন করা।”</strong></p>
<p>একই সাথে ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী একদল মানুষকে তারা এ শোষণের অংশীদার বানাত। শুধু তাই নয় এই গোষ্ঠীকে তারা একটা নাম দিত। এটা অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হতো যাকে আমরা এলিট গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। আমাদের ক্ষেত্রে এটা ছিল আমাদের আমাদের দেশের জমিদাররা।  এ গোষ্ঠীকে এলিট গোষ্ঠী নামে নামকরণ করে তাঁদেরকে স্বেচ্ছাসেবী বানানো। যারা একটা স্বার্থের জন্য শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষ হয়ে কাজ করতো। তাদের (শোষক) সাথে মিলে তাদের নিজেদের দেশকে মানুষকে শোষণের জন্য  শোষকদের পক্ষ নিয়ে কাজ করতো। ‌ এভাবে আমরা শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ কে সংজ্ঞায়িত করতে পারি।</p>
<p>শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ যেন স্তিমিত হয়ে না যায় এক্ষেত্রে তারা এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করে। যার মাধ্যমে এমন একটা শ্রেণি বা এমন একটা গোষ্ঠী তারা তৈরি করে যাতে করে এর মাধ্যমে যে শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে উঠবে তারা তাদের সেবক হিসেবে কাজ করতে পারে। তাদের মেকানিজমের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে তাদের পরিচালিত, তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা- যা এখনো আমাদের দেশসহ আমাদের সকল অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত আছে। মূলত এটি তাদের কমন (অভিন্ন) একটি বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>আমরা যদি শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা না করি তাহলে এটা বলতে কী বুঝায় এই বিষয়টাকে সঠিকভাবে মোটেই বোঝা সম্ভব হবে না।</p>
<p>এটা আমাদের পূর্ববর্তী যেসব আক্রমণকারী; ক্রুসেডার এবং মোঙ্গলদের আক্রমণের চাইতে সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।  মোঙ্গলদের আক্রমণের সময় আমরা দেখেছি তারা এসেছে, বাগদাদকে আক্রমণ করেছে বাগদাদের সকল লাইব্রেরীগুলোকে পুড়িয়ে দিয়েছে গণহত্যা চালিয়েছে এবং হয় তারা চলে গেছে না হয় সেখানের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা কর্তৃক ওখানের প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতির মধ্যে নিজেরা বিলীন হয়ে গিয়েছে।   কিন্তু শোষকদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা হয়নি। <strong>এটা সম্পূর্ণ নতুন একটা পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই, স্থায়ীভাবে ও পদ্ধতিগতভাবে একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তৈরি করে সেটার আলোকে তাদের সমগ্র কালকে পরিচালিত করে যা এখনো জারি রয়েছে।</strong> যেমন এখন আমাদের যে ওয়ার্ল্ড ভিউ এটা ব্রিটেনের দেওয়া। আমাদের জাস্টিস বা বিচার ব্যবস্থা হল ব্রিটিশদের বিচার ব্যবস্থা। আমাদের অর্থনীতি সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী  অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাহলে কিভাবে আমরা এই শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি পাবো?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের যে বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম তা হলো,  স্থায়ী ও পদ্ধতিগতভাবে একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে সেটার আলোকে তারা যেসকল  অঞ্চলকে  শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্র ভূমিতে পরিণত করেছিল সেটাকে তারা পরিচালনা করেছে। এর আবার ভিন্ন ভিন্ন পন্থাও আছে। যেমন উত্তর অ্যামেরিকা। সেখানে পশ্চিম ইউরোপীয়রা  যাওয়ার পরে সেখানে বসবাসকারি প্রায় সকলকেই হত্যা করে। তারা কেন সেখানে তাঁদেরকে হত্যা করে? এর অন্যতম কারন হল সেখানের অধিবাসীরা যাযাবর হিসেবে বসবাস করত। অর্থাৎ মাটির সাথে তাঁদের মালিকানার সম্পর্ক ছিল না। মালিকানা সত্তকে গ্রহণ না করে যাযাবর একটা জীবন তারা যাপন করত। ইউরোপীয়রা  দেখল, এদেরকে আমরা গোলাম বানাতে পারবো না। যার ফলে তাঁদেরকে গোলাম বানিয়ে হালচাষ করাতে পারত না। এই কারণে তাঁদের সামনে একটি মাত্র পথই খোলা ছিল সেটা হল হত্যা করে তাঁদেরকে শেষ করে দেওয়া। সকল রেড ইন্ডিয়ানকে  তারা হত্যা করে। আবার ওই অঞ্চলকে আবাদ করার জন্য নিজেদের শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য আফ্রিকা থেকে মানুষদেরকে ধরে নিয়ে এসে দাস বানিয়েছে। তাই বলা হয়েছিল তাদের চিত্র এবং ৪০০ বছরের যে সাম্রাজ্যবাদ এর মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। এটা অঞ্চল ভেদে, দেশ ভেদে, সময় ভেদে।</p>
<p>আবার আলজেরিয়াতে ফরাসিরা আসার সাথে সাথে দেখতে পায় এখানে একটি শক্তিশালী সভ্যতা সংস্কৃতি আছে‌ এখানে তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে এখানে তাদের ভাষা কে বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছে তাদের জীবনধারাকে বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছে আর অন্যান্য অনেক পন্থাই এখানে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।এটা   কেননা সেখানে বসবাসকারি মানুষের স্থায়ী একটি জীবন ধারা ছিল। এই কারণে সেখানে  ভিন্ন পন্থা অবলম্ববন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমার আলোচনার যে বিষয়বস্তু , সেটাকে আমরা উপনিবেশবাদ বলতে পারতাম। এটা না বলে আমরা কেন সাম্রাজ্যবাদ বলে আখ্যায়িত করলাম? শোষকদের কে ইংরেজিতে বলা হয় exploiters. কিন্তু কোথাও ব্রিটিশদেরকে এক্সপ্লোয়েটের হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি। আখ্যায়িত করা হয়েছে কলোনাইজার হিসেবে।</strong></p>
<p>আমাদের বই পুস্তকে বা তারা উপনিবেশবাদ বলতে যেটা বুঝায় &#8211;</p>
<p>উপনিবেশবাদ বা কলোনাইজেশনের সাথে কলোনি বা উপনিবেশ বানানোর একটি সম্পর্ক রয়েছে।</p>
<p><strong>কলোনি বা উপনিবেশ বানানোর অর্থ হল, সাধারণ কোন একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক বসবাসকৃত একটি অঞ্চল থেকে অন্য একটি অঞ্চলে সেখানে বসতি স্থাপন করা। এবং সেখানে অবস্থা বুঝে তাদের নিজেদের কল্যাণে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা। এটা হল উপনিবেশবাদের মূল অর্থ। এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে কলোনাইজেশন বা উপনিবেশবাদ খুব বেশী নেতিবাচক কোন কিছু নয়। যেমন তোরা নিজেদের স্বার্থে ইন্ডিয়াতে এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বানিয়েছে এবং ব্যবসা বাণিজ্য করেছে। কিন্তু কেন আমরা তাদেরকে শোষক বলছি? আমরা কেন তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করছি? ‌এটা মূলত কলোনাইজার বা উপনিবেশের এটা মৌলিক সংজ্ঞা।</strong></p>
<p>তারা আমাদের সাথে সবসময় খেলতে আসে ভাষা এবং পরিভাষা দিয়ে। আমরা মুসলমানরা খুব কম তাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি। আমরা যেখানে সবচেয়ে বেশি পরাজিত , সেটা হচ্ছে কুটনীতির টেবিলে। যার কারণে কলোনাইজেশন এর মত গণহত্যার ইতিহাসকে  খুব স্বাভাবিকভাবে তারা সংজ্ঞায়িত করতে পেরেছে। ‌ আমাদের জিহাদ আমাদের শরীয়তকে তারা ধ্বংস করে দিয়েছে।</p>
<p>এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ হল উপনিবেশবাদের নামে পশ্চিম ইউরোপের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এই কারণে পূর্বের যে কোন কলোনাইজেশনের চেয়ে এটা ভিন্ন। কলোনাইজেশন কিন্তু অতীতেও হয়েছে কিন্তু এটা একেবারেই ভিন্ন। যেমন ইতিপূর্বেও রোম অনেক দেশে দখল করেছে এবং শাসন করেছে। ফনেশিয়া ও  গ্রীকদের অনেক  কলোনি ছিল। কিন্তু বর্তমান যে কলোনাইজেশন এটা অতীতের রোম, ফনেসিয়া বা গ্রীকদের Colonization এর চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। এটা পূর্বের এই সকল কলোনির চেয়ে ভিন্ন।</p>
<p>এই ভিন্নতা বুঝার জন্য আমাদেরকে বুঝতে হবে মডার্ন ইউরোপের মূলে কি রয়েছে? মডার্ন ইউরোপীয়দের সৃষ্টিজগতের সাথে সম্পর্ক, এবং আশেপাশের অন্যান্য মানুষের সাথে তাঁদের তৈরিকৃত সম্পর্ক ও মহাবিশ্বের সাথে তাদের সম্পর্ক, এই সম্পর্কের স্বরূপ সম্পর্কে জানতে হবে।</p>
<p>এখন এই মডার্ন ইউরোপের মূলে কি রয়েছে?</p>
<p>যারা সমগ্র পৃথিবীকে নির্যাতন, লুণ্ঠন, শোষণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছে না এদের মূল বিষয়টা কি? বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিচে’ এই বিষয়কে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, মডার্নিটির মূল হল Will to Power অর্থাৎ তাহাক্কুমের ইরাদা। প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছাকে মর্ডান ইউরোপের ভাষায় বলা হয়, উইল টু পাওয়ার।</p>
<p>এর মূল কথা হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের মূল কারন হল শক্তি সঞ্চয় করা এবং সঞ্চয়কৃত শক্তির মাধ্যমে তাঁর আশে পাশে যা কিছু আছে সেগুলোর উপর তাহাক্কুম বা আধিপত্য কায়েম করা, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা ও নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা। এজন্য বর্তমানে তাদের যে ফিজিক্সের ধারণা, তা হলো- প্রকৃতপক্ষে আমি কিভাবে আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে উপকৃত হতে পারি বা নিজের স্বার্থকে হাসিল করতে পারব। এর ব্যাকগ্রাউন্ডে যদি আমরা এক ধাপ পেছনে যাই তাহলে দেখতে পাই, দেকার্তের কার্টেসিয়ান থট সেখানে আছে Cogito Ergusum বা I am there, because I am thinking- আমি চিন্তা করি বলেই আমি আছি এ কথার পেছনেও  will to power এই বিষয়টি লুকায়িত।</p>
<p>আমরা যদি আরও এক ধাপ পেছনে যাই খ্রিস্টান যে ধর্মতত্ত্ব এর মধ্যেও এ বিষয়টি আমরা খুঁজে পাই। সেটা হল খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে দেখতে পাব  যে, হযরত ঈসার পরে খ্রিস্টান ধর্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলো পাউলস। খ্রিষ্টান ধর্মে হযরত ঈসার পরে পাউলস কর্তৃক তৈরিকৃত পরিভাষার মধ্যে একটি হল “অন্যরা”। এই অন্যরা বা আদার্স হল ইয়াহুদীরা। খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বে এমন একটি চিন্তা আছে, যা পাউলসের চিন্তাকে সামারাইজ করে পাই; হযরত ঈসা যখন ফিরে আসবে তখন যারা তাঁকে স্রষ্টা হিসেবে গ্রহন করবে তারা চিরস্থায়ী জীবন পাবে আর যারা গ্রহণ করবে না তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।</p>
<p><strong>এর অর্থ কী?</strong></p>
<p><em><strong>এর অর্থ হল যারা খ্রিষ্টান না তাঁদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। যার ফলে বেঁচে থাকার পূর্ব শর্ত হল, চার্চের অনুগত হওয়া।</strong></em></p>
<p>পরবর্তীতে আসে পঞ্চম শতাব্দীতে Augustine এর চিন্তা-ধারা, তিনিও খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিকদের একজন। তিনি এই চিন্তা বা আদার্স বিষয়টাকে এমন  ভিত্তির উপর দাঁড় করান যা পরবর্তীতে Inquisition ও ক্রুসেডের জন্ম দেয়। মর্ডান ইউরোপীয় যে স্টেট, এর  রূহের মধ্যে কিভাবে সাম্রাজ্য এবং শোষণ গেঁথে আছে এটাকে যদি বুঝতে চাই তাহলে আমাদেরকে এক ধাপ পেছনে, রেনে দেকার্তের কার্তেসিয়ান থট বুঝতে হবে। এরপর এক ধাপ পেছনে খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের কাছে যেতে হবে। তাহলে কেন সাম্রাজ্যবাদ হত্যাযজ্ঞ চালাবে, সবাইকে তার নিজের কাজে ব্যবহার করবে- এর কারণও আমরা খুঁজে পাই। পরবর্তীতে এই চিন্তা ক্যাথলিক চার্চের মূল দর্শন হিসেবে জারি থাকে।</p>
<p><strong> এখন খ্রিস্টানদের আদার্স হিসেবে পরিবর্তিত হয়েছে ইহুদীদের পরিবর্তে মুসলমানরা। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাদের ক্রুসেডগুলো বারবার মুসলমানদের জিহাদি প্রেরণা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের শক্তি এবং আকলের শক্তির কাছে পরাজিত হয়। ফলে একপর্যায়ে তারা হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু তারা একটা জায়গায় আশা পায় তা হল আন্দালুসিয়ার গ্রানাডা পতনের মাধ্যমে। অর্থাৎ ১৪৯২ সালে তারা নতুন করে আশা খুঁজে পায় এবং তারা বলতে শুরু করে যে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে যেহেতু তাড়াতে পেরেছি তাহলে মুসলমানদেরকে সমগ্র পৃথিবী থেকেও তাড়িয়ে দিতে পারব।</strong></p>
<p>এই মন্ত্র সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রথম পদক্ষেপ হলো ক্রিস্টোফার কলম্বাস। সে মূলত আমেরিকা আবিষ্কার করতে যায় নাই। কারণ আমেরিকার সাথে দুনিয়ার সীমা আছে। মূলত ক্রিস্টফার কলম্বাস যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অর্থনৈতিক শক্তি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেনাবাহিনী আনার জন্য। এই লক্ষ্যেই মূলত কলম্বাস সহ অন্যরা অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহের জন্য। এ উদ্দেশ্যে সে তথাকথিত আবিষ্কারের নেশায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।  এই তথাকথিত আবিষ্কারের নামে তারা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই মানুষকে খ্রিষ্টান বানিয়েছে ও তাঁদের সম্পদকে লুণ্ঠন করেছে আর না হয় তাঁদেরকে হত্যা করেছে।</p>
<p>এই কারণে খ্রিষ্টান ধর্মের মূলতত্ত্ব ও কার্টেসিয়ান চিন্তার মাধ্যমে সামগ্রিকতা লাভকারী এই চিন্তাকে বিবেচনা করা ছাড়া এবং এই অর্থে সেক্যুলার চিন্তাকে উপলব্ধি করা ছাড়া পশ্চিম ইউরোপীয়রা কিভাবে মানবতার ইতিহাসে শুধুমাত্র নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র একটি তাহাক্কুমের ফরম বা নিপীড়ন মূলক ব্যবস্থা হিসেবে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদকে গঠন করেছে সেটাকে বুঝতে পারব না।</p>
<p><strong>সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে ‘অন্যরা’ অর্থাৎ যারা খ্রিষ্টান নয় তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। এই চিন্তাকে খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ব থেকে বের করে এনে সেক্যুলারাইজডকারী এবং বিশেষ করে থমাস হবের মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রের আদর্শে পরনিতকারী এবং সেই রাষ্ট্রের জন্য সকল প্রকার পন্থাকে গ্রহণ করাকে বৈধতা দানকারী একটি চিন্তা হিসেবে বুঝলে তাঁদের শোষণ ও সাম্রাজ্যের মূলমন্ত্রকে বুঝতে পারব।</strong></p>
<p>সাম্রাজ্যবাদীরা এসব অঞ্চল বা দেশসমূহ কে লুণ্ঠন করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। এখানে আমরা বলেছি যে, সাম্রাজ্যবাদী ও শোষকরা বা এই সকল দেশ সমূহ  একেক সময় একেক পন্থাকে গ্রহণ করে। কখনোবা মিশনারী কার্যক্রম, কখনো ব্যবসা আবার কখনোবা শিক্ষাকে ব্যবহার করে থাকে। কখনো সেনাবাহিনী, আবার কখনোবা বিভিন্ন চুক্তিকে ব্যবহার  করে থাকে। এর জন্য এর বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। কখন কোনটা ব্যবহার করবে সেটা তারা অবস্থা বুঝে সিন্ধান্ত নিয়ে থাকে।</p>
<p>যেমন থমাস ম্যালথুস, যিনি ছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। An Essay on the Principle of Population নামক বইয়ে তিনি বলেছেন, জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে, সম্পদ বা খাদ্য বাড়ে গাণিতিক হারে।‌ তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির অন্যতম একজন কর্মকর্তা। তিনি কেবল কর্মকর্তা ছিলেন না তিনি সেই সময় ইন্ডিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছিলেন। ‌ যেমন জন স্টুয়ার্ট মিল তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম একজন শেয়ার হোল্ডার ছিলেন।</p>
<p>থমাস হবস এর রাষ্ট্রের যে মূল আদর্শ তার মৌলিক পরিভাষা হচ্ছে পার্সোনালিটি। পার্সোনালিটি শব্দটি দিয়ে আমরা কর্মক্ষম ও যোগ্য, ব্যক্তিত্ত্ববান একজন মানুষকে জানি, কিন্তু তিনি এটাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি বলেন, একটি জনগোষ্ঠীও যদি একসাথে কাজ করার চুক্তি করে ও সমবায়ের ভিত্তিতে কাজ করে তাহলে তারাও একটি ফা’য়িল (কর্মক্ষম)  হিসেবে গৃহীত হবে। তারাও কোন স্বার্থকে সামনে রেখে এক সাথে কাজের  মাধ্যমে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। তার এই পার্সোনালিটি আর ইসলামী সভ্যতায় মুরুয়াত বা ব্যক্তিত্ব এর মাঝে সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে।</p>
<p>এটা বিস্তারিত জানতে হলে  ইমাম মাওয়ারদির আদাবুদ্দিন ওয়াদ দুনিয়া গ্রন্থে মুরুয়াত নামে একটি অধ্যায় আছে, সেটি পড়তে হবে। এক হাকিমকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে ‘আকল’ এবং ‘মুরুয়াতে’র মধ্যে পার্থক্য কী? <strong>তখন</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>জবাব</strong> <strong>দিয়েছেন</strong><strong>, </strong><strong>আকল</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>উপকারী</strong> <strong>যে</strong> <strong>কাজ</strong> <strong>সে</strong> <strong>কাজটা</strong> <strong>করা, </strong> <strong>আর</strong> <strong>মুরুয়াত</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কাজকে</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>সুন্দর</strong> <strong>ভাবে</strong> <strong>করা</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা সবচেয়ে বেশি লুন্ঠিত নির্যাতিত হয়েছি যাদের মাধ্যমে, তাদের ক্ষেত্রে যদি দেখি, তারা হচ্ছে ব্রিটিশ aristrocat। ইংল্যান্ডের দুইটি  পার্লামেন্ট রয়েছে। একটি হচ্ছে সাধারণ পার্লামেন্ট আরেকটা হচ্ছে হাউজ অফ লর্ডস অফ দা ইউনাইটেড কিংডম যা এরিস্টোক্র‍্যাটের। আর এটাই হল মূল পার্লামেন্ট‌। হাউজ অব লর্ডসের সদস্যসংখ্যা ৭০০ জন এবং হাউজ অফ কমন্সের  ৬০০ জন। ‌  হাউস অফ লর্ডস হলো মূলত এরিস্টোক্র‍্যাটদের জন্য।</p>
<p>এটাকে যদি আমরা ব্রিটিশ এরিসটোক্র্যাট গ্রুপকে বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাই যে এরিস্টোক্রাটরা; যাদেরকে আমরা House of Lords of the United Kingdom হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে ও সমবায়ের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। এবং তাঁদের মধ্যে থেকে একজনকে Peerage নির্বাচিত করে একজন ব্যক্তি হিসেবে নিজেদেরকে পরিচালিত করতে পারে। এই প্রেসিডেন্ট কে তারা তাদের প্রতিনিধি বানায় এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যখন যা লাগে সেটার আলোকে তাদের পরিকল্পনা এবং কর্ম গ্রহণ করে থাকে।এবং নিজেদের স্বার্থে কাজ করে থাকে। যেমন ওসমানীদের সাথে তারা কখনো লড়াইয়ে যায়নি কেননা যখনই লড়াই গিয়েছে সেখানেই হেরেছে।  এজন্য তারা ওসমানীদের সাথে সবসময় চুক্তি করত। কারণ তারা জানতো এখানে পারা যাবে না। কোথাও চুক্তি (উসমানী), কোথাও যুদ্ধ, কোথাও গনহত্যা, কোথাও ব্যবসার (হিন্দুস্তান) নামে সকল কিছুকে দখল করে ফেলেছে। ‌</p>
<p>তাদের এই পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করে হাউজ অব লর্ড স এর সদস্যরা।</p>
<ul>
<li>এই সকল বিষয়কে বিবেচনায় নিলে আমরা এই কথা বলতে পারি যে, মূলগতভাবে খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ব দ্বারা লালিত, ফরম বা গঠনগত দিক থেকে আধুনিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহারকারী আবার একই সাথে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমেও ধারাবাহিকতা দানকারী এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বকে সামনে রেখে এটাকে সেক্যুলার এই আদর্শে রুপান্তরিত করে।</li>
<li>একই সাথে তারা অন্য সমাজ ও দেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে দাবী করে।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এই চিন্তাকে তারা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে, তাদের অন্যান্য পন্থার মাধ্যমে এটা আমাদের মন মগজে গেঁথে দিতে দিতে সক্ষম হয়েছে। তারাই সকল মেকানিজম ও চিন্তা তথা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের চিন্তাভাবনাকে দার্শনিক ফর্ম দিয়ে, আধুনিক মডার্ন স্টেট এর আদর্শে পরিণত করেছে এবং এই আদর্শকে পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে যেমন ইংল্যান্ডের হাউস অফ লর্ডসের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে এটা প্রয়োগ করেছে। এটা হচ্ছে মূলত তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড। এখানে মূল হলো ধর্ম দর্শন, এমনকি তাদের জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও অন্যান্য চিন্তাগুলো এক্ষেত্রে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।</strong></p>
<p>তারা এটা আমাদের উপর কীভাবে প্রয়োগ করেছে?  আমাদের উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তারা ভেবেছে, আমরা যদি তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাই, তাদেরকে শোষণ করতে চাই, শোষণ করার জন্য সর্বাগ্রে যে বিষয়টি করতে হবে সেটা হল, তাঁদের আত্মবিশ্বাসকে শেষ করে দেওয়া। এই জন্য তারা ইতিহাসবিহীন একটি জাতিতে পরিণত করার জন্য আমাদের সকল কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশে তারা প্রথম এই কাজটি করে। ইসলাম আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলাম ভারতীয় উপমহাদের ১০০০ বছরের ভাগ্য নিয়ত্ত্বা ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে মোহাম্মদ বিন কাসিম এর মধ্য দিয়ে যে বিজয় এবং বাংলা অঞ্চলে আরব বণিকদের মধ্য দিয়ে ইসলামের যে প্রচার এবং প্রসার যা ভারতীয় উপমহাদেশের এক হাজার বছরের ভাগ্যনিয়ত্তা ছিল। এককথায় ইসলামই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এমন একটা জায়গায় এসে তারা সর্বপ্রথম আক্রমণ চালায় ওই সময়ের ভাষা এবং ধর্মের উপরে। তারা প্রথমে এসে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার যে ভাষা সেটাকে পরিবর্তন করে দেয়। এটা তারা রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে করে।</p>
<p>দ্বিতীয় আঘাতটি করে তারা আমাদের দ্বীনের উপরে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মাযহাব হানাফী মাযহাব। আকিদায় আমরা আশয়ারী-মাতুরিদি। ব্রিটিশরা আসার পর তারা ব্রিটিশ সালাফিজমের পথকে উন্মোচিত করেছে। অর্থাৎ তারা দ্বীনকে এমন অবস্থায় নিয়েছে যাতে আমরা সেই দ্বীনকে পালন করতে না পারি। এই দ্বীন যেন আমাদের ভিতরে ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্য  জন্ম দেয়। এজন্য ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ফরমেট বা সমস্যার সৃষ্টি হয় সালাফিজমের মাধ্যমে। মাত্র ৫০ থেকে ৬০ বছরের পরেই আহলে কোরআন, আহলে হাদিস এর জন্ম হয়।</p>
<p>ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন সময়ে ২২ হাজার পাউন্ড দিয়েছে মিশকাতুল মাসাবিহ কে অনুবাদ করার জন্য। কারণ মিশকাতুল মাসাবিহকে বলা যায়, আমাদের মুসলমানদের হ্যান্ডবুক। এটাকে তারা আগে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা চালায় এবং এক্ষেত্রে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফান্ডিং করে।</p>
<p><em><strong>এ কারণে ভাষা যদি শক্তিশালী না হয় তাহলে দ্বীনও শক্তিশালী হবে না। এজন্য ভাষাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমাদের দেশের মানুষের ভাষা বাংলা। কিন্তু আমাদের শিক্ষার ভাষা কি বাংলা? আজকে আমরা বাংলা ভাষায় ইসলামকে সঠিকভাবে তুলে ধরার মতো কোন কিছু কি করতে পেরেছি?</strong></em></p>
<p>তারা তো তাদের কাজ করেছে তারা এসে আমাদের ভাষার উপর আক্রমণ চালিয়েছে,  আমাদের পরিভাষার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এটা করে তারা বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এবং বাংলা ভাষার সাথে মুসলমানরা যাতে দূরত্ব বজায় রাখে এজন্য সব সকল ধরনের পন্থা অবলম্বন করেছে। ‌ পরবর্তীতে মুসলমানরাও বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা হিসেবে দূরে সরিয়ে দিয়ে রেখেছে। ‌ অথচ যে কোন চিন্তাধারার ক্ষেত্রে মানুষ যদি তার মাতৃভাষাকে ভালোভাবে না জানে অন্য ভাষাও ভালোভাবে শিখতে পারবে না ভালোভাবে চিন্তা করতে পারবে না। একারণে তারা প্রথমে আক্রমণ চালায় আমাদের দ্বীনের উপরে আর সেটা করে আমাদের আলেমদেরকে হত্যা করার মাধ্যমে, তারা আমাদের দারস বাড়িগুলো ধ্বংস করে দেয়। ওদের যত প্রতিষ্ঠান ছিল তা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং আমাদের দ্বীন যাতে একটি অনুসৃত দ্বীন না হয়, ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্য সৃষ্টি হবে বহুধা অথবা বিভক্ত হবে এটার জন্য সকল ধরনের কার্যক্রম তারা চালায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজকে যদি আমরা শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই এজন্য আমাদেরকে আমাদের দ্বীনকে ভালোভাবে বুঝতে হবে দ্বীনুল মুত্তাবা’ অর্থাৎ অনুসরণযোগ্য  যে দ্বীন। আর এক্ষেত্রে আমরা ইসলামের ইতিহাসে হেরা থেকে শুরু করে প্রবাহমান নদীগুলোর দিকে যদি আমরা দেখি সবচেয়ে প্রশস্ত এবং প্রবাহমান নদী হল উসুলবিদ বা আহলে রায়ের ধারা। এটা সবচেয়ে বড় ধারা। কারন এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা এবং এর বীজ বপন করেছেন হযরত ওমর (রা)। আব্বাস খিলাফতের রাষ্ট্র,  ওসমানী, মুঘলসহ  আন্দলুসিয়ার যে খেলাফত দেখি- এই ফিকহের আলোকে রাষ্ট্র  পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা যদি আমাদের দ্বীনকে একটি অনুসরণযোগ্য একটি দ্বীনে পরিণত করতে চাই তাহলে আমাদেরকে পুনরায় এই উসুলি ধারা যার প্রতিনিধিত্ব শুধুমাত্র হানাফীরাই করে না যার শুরু  হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা&#8217;আলা আনহু, ইমাম আবু হানিফা থেকে ইমাম গাজ্জালী। ‌ অথচ ইমাম গাজ্জালী কে দেখানো হয়, তার সময় এসে জ্ঞান মরে গেছে অথচ তিনি তার পূর্বের ৪০০ বছরের জ্ঞান কে সামারাইজ করেছেন এবং তারপর ৬০০ বছর এর জ্ঞানকে  ডাইমেনশন দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি হলো ইমাম শাতেবী। তিনি যখন দেখলেন আমাদের হানাফী উসুল বা আমাদের ক্লাসিক উসুল দিয়ে ইসলামকে যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য একটি বিশ্বজনীন দ্বীন হিসেবে পরিচালনা করতে পারব না, তখন তিনি মুয়াফাকাত লিখে মাকাসিদের আলোকে এই দ্বীনকে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এরপর ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি এর চিন্তা দেখলে, সেই সময় ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট হচ্ছে, তারা আমাদের বাংলা অঞ্চলে চলে আসছে। বিভিন্ন অঞ্চলকে তারা সাম্রাজ্যবাদের অধীনে নিয়েছে৷ তখন তিনি নতুন করে উসুল প্রণয়ন করেন, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা। তারপর আসেন আল্লামা ইকবাল। তিনি ঐসময়ের দুনিয়াকে নতুনভাবে রিড করেন। রিড করে ইসলামের গতিশীলতা কীভাবে আসতে পারে, আগামী দিনের সভ্যতা হিসেবে ইসলামী সভ্যতা কীভাবে গতিশীল হবে, পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, মুসলমানগণ কীভাবে জ্ঞান এবং সভ্যতায় নতুন ভাবে নিজেদের জায়গা গ্রহণ করতে পারে এজন্য তিনি কবিতার মাধ্যমে,  লেখনির মাধ্যমে, রাজনীতির মাধ্যমে আমাদের সামনে বিশাল এক মেনিফেস্টো তুলে ধরেন। এজন্য আমরা সাম্রাজ্যবাদ এবং শাসকদের চিন্তাধারা থেকে যদি মুক্তি পেতে চাই তাহলে আমাদেরকে খুব ভালোভাবে এই ধারাকে অনুসরণ করতে হবে খুব ভালোভাবে রিড করতে হবে এমনকি আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া যে জ্ঞান তাকে নবায়ন করে আমাদের যুগের আলোকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই ভাষার উপর জোর দিতে হবে। এজন্য আমাদের মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি আরবি ভাষাকে মাতৃভাষার মত  রপ্ত করতে হবে। অন্যথায় আমাদের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের কাছ থেকে কখনো মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের তথাকথিত যারা এলিট তারা কথা বলার সময় অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক ইংরেজি বলে, এমনকি  আরবির শিক্ষক  বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে লেকচার দেয়। দৈন্যতা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষের এসকল আচরণ করতে পারে! এখন আমাদের প্রয়োজন আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করা কারণ আমাদের ভাষা ইংরেজি ভাষার চেয়ে কোন অংশে কম না। শেক্সপিয়ারের চাইতে আলাউল ছোট কবি না। আমাদেরকে এগুলো নতুন ভাবে জাগ্রত করতে হবে এবং নতুনভাবে সামনে তুলে ধরতে হবে।</p>
<p><em><strong>তারপর তারা যে কাজটা করে যে আমাদের অতীত বলতে কিছু নাই। এটা হচ্ছে আমাদের উপর উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের চিন্তার প্রভাব এর সবচেয়ে বড় প্রভাব হচ্ছে আমাদের অতীত বলতে কিছু নেই এটা তারা কেন বলতো এটা করার মূল কারণ হচ্ছে তারা যে অঞ্চলে গিয়েছে সে অঞ্চলের মানুষদেরকে তারা অসভ্য বর্বর এমনকি সভ্যতাহীন একটি জাতি হিসেবে দেখতো তাদের কাছে মানুষ হচ্ছে দুই পা ওয়ালা প্রাণী যেমন ছাগলের পা গরুর চারপা এরকম মানুষও দুই পা ওয়ালা প্রাণী ছাড়া আর কিছু না।</strong> </em>যখন ইচ্ছা হাত কেটে ফেলতো, যখন ইচ্ছা ফাঁসিতে ঝুলাতো, যখন ইচ্ছা পিটাতো যখন ইচ্ছা আগুনে ফেলত, যখন ইচ্ছে কৃত্রিমভাবে খরা সৃষ্টি করে হত্যা করত এটা হচ্ছে তাদের অসভ্য বা বর্বর জাতির সাথে আচরণ। কারণ তারা মনে করত তারাই একমাত্র মানুষ অন্যরা মানুষ নয়। তাদের মতে তাদের যে বিবর্তনবাদের ধাপ তা ইউরোপিয়ানরা ছাড়া অন্য কেউ অতিক্রম  করতে পারেনি। এজন্য তারা যে অঞ্চলে গেছে সে অঞ্চলের  মানুষদেরকে হত্যা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করত না।</p>
<p>এর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই পাশ্চাত্যের সবচেয়ে বড় দার্শনিক হেগেল তার দ্য হিস্ট্রি অফ ফিলোসফি বইয়ে। সেখানে একটা ক্যাটাগরি আছে- তা হলো ইতিহাসবিহীন জাতি। ইতিহাসবিহীন জাতি কারা? তাদের কথা হচ্ছে যারা বর্তমানে ক্ষমতাবান নয় তাদের ইতিহাসে কোন জায়গা নেই। এ কারণে মানব সভ্যতার ইতিহাসে বাঙালি জাতির গৌরব, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের অবদান আমরা খুঁজে পাই না। এগুলো কোথাও পড়ানো হয় না কারণ আমাদের বর্তমানে কোন অস্তিত্ব নাই। এটা শুধুমাত্র হেগেল না, এটা পাশ্চাত্য দার্শনিকদের ফিলোসফি বা হিস্ট্রির মূল কথা। তারা আমাদেরকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে গ্রহণ করে। এটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ইতিহাস পড়ি তখন আমাদের নিজেদের ইতিহাসের প্রতি আমাদের ঘৃণা সৃষ্টি হয়। আমাদের সমাজবিজ্ঞান বলতে কিছু নাই অর্থনীতি বলতে কিছু নাই কেন এই প্রবণতার কারণে  আমাদের অস্তিত্বই নাই। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে করা হয়। কিন্তু এটা ইসলামিক স্টাডিজ এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ হাদিসের ইতিহাস আমরা কতটুকু জানি? ইতিহাস আমরা জানি ইমাম গাজ্জালী পর্যন্ত অর্থাৎ পঞ্চম হিজরী শতাব্দী  পর্যন্ত। তাদের কথা হলো জ্ঞান গাজ্জালীর মাধ্যমে মরে গেছে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে ইমাম গাজ্জলীর পর ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বড় দার্শনিক জন্ম নিয়েছে। যেমন ফখরুদ্দিন রাজি তিনি এত বড় চিন্তাবিদ, মুয়াফাকাতের লেখক ইমাম শাতিবীসহ আরও অনেক চিন্তাবিদ।</p>
<p>তাদের সত্যায়িত করার জন্য এটা আমার গোগ্রাসে গিলে নিয়েছি। বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসায় দেখবেন না যে উসুলের ইতিহাস আছে, হাদিসের ইতিহাস আছে, দর্শনের ইতিহাস আছে, আখলাকের ইতিহাস আছে- এটা পঞ্চম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আমাদেরকে শুধু সোশাল সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাবজেক্ট গুলোকে মুক্ত করলে হবে না আমাদেরকে মুক্ত করতে হবে তাফসীর এবং হাদিসকে। কারণ আমরা তাফসীরের ইতিহাস জানি না, হাদিসের ইতিহাস জানি না। আর জানলেও তা আংশিক।</p>
<p>আমরা তাদের এই বয়ানকে গ্রহণ করে তাদের কথাকে স্বীকৃতি দিয়েছি যে ঠিকই আছে আমরা ইতিহাসবিহীন জাতি, গাজ্জালীর পরে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের চিন্তা ও দর্শন নামে কোন দিন কোন লেকচার শোনা হয় না। আমরা যে ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জাতি মর্যাদা পূর্ণ জাতি এটা আমাদেরকে নতুন করে আবিষ্কার করে আবার আমাদের আত্মবিশ্বাসকে জাগ্রত করতে হবে। আমরা ইতিহাসবিহীন জাতি নই, ইতিহাসবিহীন জাতি ইউরোপ নিজে কারণ তার কোন ইতিহাস নেই,  তার ইতিহাস সম্পূর্ণ ফিকশন।</p>
<p>আমাদের ইতিহাসবিহীনতার আরেকটি বড় প্রমাণ হচ্ছে আমাদের শহরগুলো। এগুলো কে কি শহর বলা হয়? এগুলোকে বস্তি বলতেও লজ্জা লাগে। ঢাকা কি আজকে আমাদের হাতের কামাই নয়? আমাদের শহরগুলো, বাসা বাড়ি গুলো একজনের বেডরুম থেকে আরেকজনের বেডরুম দেখা যায়, এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে? একটা মুসলিম দেশে অথচ তথাকথিত ইসলামের নাম দিয়ে দিয়ে তারা এগুলোকে ইসলামী বানিয়েছে। কোন কিছু নাম দিয়ে ইসলামী হয় না, এর মধ্যে ইসলামের রুহ থাকতে হয়।</p>
<p><strong>যে ইয়াসরিবকে আল্লাহর রাসূল মদিনায় রূপান্তর করেছিলেন সেটা ইসলামী মূল্যবোধের মাধ্যমে, যদি সেই সকল মূল্যবোধ একটি শহরের মধ্যে না পাওয়া যায় তাহলে ওটা কোনক্রমে ইসলামী শহর না।</strong></p>
<p><strong>জিওগ্রাফির ক্ষেত্রে যদি আমরা দেখি গ্রিনিচ হচ্ছে পৃথিবীর কেন্দ্র। এটা কিভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র হতে পারে? সেটাতো পৃথিবীর এক প্রান্তে। যদি পৃথিবীর কেন্দ্র হয় সেটা মক্কা হবে।</strong></p>
<p><strong>গ্রিনিচকে পৃথিবীর কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করার কারণে  আমরা আমেরিকার কাছে সাউথ ইস্ট এশিয়া। মধ্যপ্রাচ্য তার কাছে মিডিল ইস্ট। সৌদি আরবের কাছে কিভাবে তা মধ্যপ্রাচ্য হয়? যদি আমরা এভাবে চিন্তা করি তাহলে আমাদের ধারনার পরিবর্তন  হবে এবং আমরা নতুন করে কিছু একটা কিছু করতে পারবো। এই সাম্রাজ্যবাদ এবং শোষণ এখনো অতিবাহিত হয়নি। আমরা এখনো সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের যাতাকলে। </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/expolitation-and-imperialism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13349</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কোরআনের ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাফাক্কুর</title>
		<link>https://rowyakbd.com/tafaqqur-on-the-occasion-of-1400-years-of-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/tafaqqur-on-the-occasion-of-1400-years-of-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আলীয়া ইজ্জেতবেগোভিচ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 29 Dec 2023 14:18:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[কোরআনের ১৪০০ বছর]]></category>
		<category><![CDATA[কোরআনের ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাফাক্কুর]]></category>
		<category><![CDATA[তাফাক্কুর]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13036</guid>

					<description><![CDATA[এ বছর মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন নাজিলের ১৪০০ বছর পূর্ণ হলো। কোরআনের এই ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সমগ্র দুনিয়াতেই বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি নিজেও কোরআনকে পুনরায় অধ্যয়ন করে অনেক নতুন কিছু উপলব্ধি করেছি। এইবার কোরআন অধ্যয়ন করতে গিয়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এ বছর মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন নাজিলের ১৪০০ বছর পূর্ণ হলো। কোরআনের এই ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সমগ্র দুনিয়াতেই বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি নিজেও কোরআনকে পুনরায় অধ্যয়ন করে অনেক নতুন কিছু উপলব্ধি করেছি। এইবার কোরআন অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমি নতুন করে কী শিখলাম, এবং বিশেষ করে এইবার কোন কোন বিষয়গুলো আমার নজর কেড়েছে, সেই বিষয়সমূহ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই।</p>
<p>ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো &#8211; <strong>“ইসলাম শুধু একটি বিশ্বাসের নাম নয়, ইসলাম এর চেয়েও আরও অনেক বিস্তৃত বিষয়। ইসলাম কেবলমাত্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনধারাই নয়, একইসাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকেও পরিগ্রহকারী একটি দ্বীন”</strong>। মৌলিকভাবে সঠিক এই চিন্তাটি কাদের দ্বারা সৃষ্টি হলো, কেমন একটি জ্ঞান এবং যা সত্যের অধিকারী, এবং সর্বজনবিদিত এ দাবিকে কেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এসকল বিষয় সম্পর্কে অনেক বই পুস্তক লেখা হয়েছে। এখানে আমাদের জন্য যেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল, ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম বিশ্বাসের নাম নয়, ইসলাম মানুষের জীবনকে সামগ্রিকভাবে পরিগ্রহকারী একটি ব্যবস্থা।</p>
<p>সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী পুনর্জাগরণ নিয়ে অনেক বেশী আলোচনা হওয়ায় এই বিষয়টি সকলের মধ্যে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছে এবং একটি সংগ্রামী ধারায় রূপান্তরিত হয়েছে। শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক ও ব্যক্তিগত বিষয় সমূহ নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলির সমাধানও ইসলামেই রয়েছে (ভিনদেশি আইডিওলজি সমূহে নয়)।</p>
<p>ইসলাম মানুষের জীবনের সকল কিছুকেই সামগ্রিকভাবে পরিগ্রহ করে, এই আশ্চর্যজনক দাবিকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করে আমার নিজেকে এই প্রশ্ন করলাম, <strong>ইসলাম; বিশেষ করে তার প্রথম ও মৌলিক উৎস হিসেবে কোরআন কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বজনীন?</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন যুবক ছিলাম তখন এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করার সময় কোরআনকে অধ্যয়ন করে শুধুমাত্র দ্বীনী বিষয়সমূহ নয়, তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক &#8211; এমন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করতাম। কোরআনের মধ্যে আমি বৈজ্ঞানিক সত্য সমূহ, রাজনৈতিক, সামাজিক, এমনকি অর্থনৈতিক সিস্টেম সম্পর্কে নির্দেশনা খুঁজে পাব, এ ব্যাপারে আমার বিশ্বাস ছিলো অতান্ত শক্তিশালী। আমার এ শক্তিশালী বিশ্বাস &#8211; কোরআনের মধ্যে সরাসরি পাওয়া যাবে না, এমন বিষয়সমূহও কোরআনের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার নেশায় আকুল করে তুলতো। পরবর্তীতে যখন আস্তে-আস্তে চিন্তাগত দিক থেকে পরিপক্ব হওয়া শুরু করলাম, তখন আমার নিজস্ব জীবনবোধ আমার কিছু কিছু বিষয়কে সংশোধন করে দিতো এবং আমি উপলব্ধি করতে শুরু করি যে, মানুষের জীবন ও তাকদীরগত দিক থেকে দ্বীনি ও আখলাকী বিষয়সমূহই মূলত একমাত্র সত্য। কেননা আমি সেভাবেই চিন্তা করতাম যে, নিকট ভবিষ্যতে আমরা সবাই প্রতিষ্ঠিত হবো এবং হয়তোবা অনেক কম কাজ করে অনেক কিছুর মালিক হওয়ার পরেও সুখ এবং আত্মতৃপ্তি পাবো না &#8211; এটা দেখতে পেতাম। শুধুমাত্র নিজের জন্য বেঁচে থেকে এবং নিজের জন্য ব্যস্ত হয়ে পরস্পর একত্রে বসবাস করার দ্বীনি চিন্তাকে পরিত্যাগ করার কারণে ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক, জযবার স্থানটি দখল করে নিবে আবেগহীনতা এবং জীবনসঙ্কট। আর ইবাদতের সাথে গভীর চিন্তার পরিবর্তে দখল করে নিবে অর্থহীন এক মৃত্যু এবং তৈরি হবে এমন এক দুনিয়া: যেথায় পরবর্তীতে বসবাসকারীরা আমাদের উপর দিবে অভিশাপ।</p>
<p>মানুষের শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বৈষয়িক উন্নতি যে এককভাবে সুখ-শান্তি বয়ে আনতে পারে না, এটা প্রাচীনকাল থেকেই বড় বড় দ্বীনের প্রতিষ্ঠাতাগণ এবং আখলাকবিদগণ বলে আসছেন। তবে শুধুমাত্র বৈষয়িক উন্নতি ও অগ্রগতিই যে মানুষের জীবনে শান্তি বইয়ে আনতে পারে না, এটা আজ সবচেয়ে বেশী সুস্পষ্টভাবে মানুষের সামনে এসে ধরা দিয়েছে। আজকের এই যুগে ইউরোপ ও আমেরিকা এর বাস্তব সাক্ষী। একজন মানুষের সাথে অপর একজন মানুষের মধ্যকার পার্থক্য তাদের পরিচয়কে কীভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে নয়, বরং সত্যিকার অর্থেই তারা কী &#8211; এই ব্যাপারটার মাঝে নিহিত রয়েছে। একইভাবে দুইটি সমাজের মধ্যকার সত্যিকার পার্থক্য, তাদেরকে কীভাবে পরিচালিত করা হয়েছে তার মধ্যে নয়; বরং সেই সমাজের মানুষকে গঠনকারী মূল্যবোধসমূহের মাঝে নিহিত থাকে। মানুষকে সত্যিকার অর্থেই মানুষ করে তুলে তাদের মধ্যকার আখলাক, মানবতাবোধ, ব্যক্তিত্ব ও তাদের বিবেকবোধ। যে সমাজের মানুষ তাদের আখলাক ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলেছে, তাদের দ্বারা আদর্শ সমাজ গঠন করা অসম্ভব। এই ধরনের সমাজের মানুষ সামান্য স্বার্থ পেলেই তাদের আখলাকহীনতাকে প্রকাশ করে দেয়।</p>
<p>যদি একটি সমাজকে আখলাকী মূল্যবোধের উপর গড়ে তুলতে হয়, তাহলে সেই সমাজের শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। কারণ সমাজ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে মানুষের শিক্ষা-দীক্ষার উপর নির্ভর করে থাকে। কোরআনের ১৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই চিন্তা ভাবনাকে সামনে রেখে আমি কোরআন অধ্যয়ন করেছিলাম।</p>
<p>যৌবনকালে আমি সবসময় চিন্তা করতাম যে, সকল ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যাবলি মানুষকে ‘শিক্ষা দেওয়া’র মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। আমার রুহের মধ্যকার এই গোপন রহস্যটি একটি সমাধানে উপনীত হয়েছে। কোরআন কীভাবে মানুষের জীবনের সকল সমস্যার জবাব দিতে সক্ষম হয়েছিল? কোরআনকে ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম যে, মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান কোরআনে রয়েছে, তবে আমরা যেভাবে ধারণা করি সেভাবে নয়। মূলত কোরআন মানুষের এই দুনিয়ার জীবনকে ব্যাখ্যা করেছে এবং তাদের অবস্থাকে তুলে ধরে, মৌলিক হাকীকতসমূহকে তুলে ধরে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদেরকে মূলনীতি দিয়েছে। এই হাকীকতসমূহও দ্বীন ও আখলাকের বিষয়। আর মানুষের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এগুলোই হলো প্রতিটি মানুষের মৌলিক বিষয়। মানবজীবনকে পরিগ্রহকারী অন্যান্য বিষয়াবলির তুলনায় এই বিষয় দুটি আরও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাই, এই বিষয় দুইটি (দ্বীন ও আখলাক) ব্যতীত মানব জীবনের অগ্রগতি ও উন্নতি অসম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এখন, আমরা দেখতে পাই যে, কোরআনের মৌলিক হাকীকত সমূহ হচ্ছে- </strong></p>
<p>সকল কিছুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এই দুনিয়ার শক্তির সাথে, আইন ও কানুনের সাথে মানুষের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, সকল মানুষ তার কাজের হিসাব প্রদান করবে। সকল মানুষের জন্য দুইটি পথ সব সময় উন্মুক্ত রয়েছে &#8211; সে চাইলে খারাপ পথ কিংবা ভালো পথ বেছে নিতে পারে। মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সকল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।</p>
<p>এ সকল মৌলিক বিষয়ে এবং দ্বীন ও আখলাকের গুরুত্বের ব্যাপারে কারোর কোনো দ্বিমত করার ক্ষমতা নেই। একইসাথে একমাত্র ওহীভিত্তিক দুনিয়া-দর্শন ছাড়া অন্য কোন জীবন দর্শন নেই, এটিও যুক্তিসংগত ও বাস্তবভিত্তিক।</p>
<p>হুমকি এবং কষ্টের বিনিময়ে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা, নাকি মান সম্মান ও ইজ্জতকে বিকিয়ে দিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট ও আয়েশি জীবন যাপন করা &#8211; এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি বেছে নিব? এই প্রশ্নটি সকল মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। দুনিয়ার কোনো গবেষণাই এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। বিশ্বাস করবে কি করবে না, এই প্রশ্ন কিংবা এই ধরনের অন্যান্য প্রশ্নের মুখোমুখি হলে প্রতিটি মানুষই নিঃসঙ্গতায় পড়ে যায়। কেবলমাত্র এবং শুধুমাত্র ওহীই এই নিঃসঙ্গতাকে দূরীভূত করে দিতে পারে। এই সকল প্রশ্নের জবাব কেবলমাত্র ওহীর মধ্যেই রয়েছে। এ কারণে ওহী শুধুমাত্র মূল্যবান একটি বিষয়ই নয়, ওহী একইসাথে এমন এক জ্ঞান যার শুন্যতাকে পূর্ণ করা অসম্ভব।</p>
<p>মানুষের এ সকল বড় বড় প্রশ্নের জবাবে কোরআন কী বলে? কোরআন কোন ধরনের জবাব দেয়? পূর্বে উল্লিখিত এ সকল বড় বড় বিষয়ে কোরআনের অবস্থান কী? এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্যই হলো কোরআনকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার ক্ষেত্রে সাহায্য করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> কোরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রতি ঈমানকে মানুষের মনে বদ্ধমূল করে দেওয়া এবং একক, মহান ও ন্যায়পরায়ণ এক স্রষ্টার ব্যাপারে মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করে বিকাশ করা। এই অর্থে কোরআন সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং সবচেয়ে মহান একত্ববাদের উপমা।</strong></p>
<p>১. “পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর। যেদিকে তোমরা মুখ ফিরাবে, সেদিকেই আল্লাহর সত্তা বিরাজমান। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশালতার অধিকারী এবং সর্ব বিষয়ে অবহিত।” (সূরা আল-বাকারা: ১১৫)</p>
<p>২. “বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন আল্লাহর কথা মানতে অস্বীকার করছো? তোমরা যেসব কাজকর্ম করছো, তা সবই আল্লাহ প্রত্যক্ষ করছেন”। (সূরা আলে-ইমরান: ৯৮)</p>
<p>৩. “আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাজিল করেছেন এবং তোমাকে এমন বিষয় জানিয়ে দিয়েছেন, যা তোমার জানা ছিলো না। বস্তুত তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অসীম।” (সূরা আন-নিসা: ১১৩)</p>
<p>৪. “অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলগণের প্রতি ঈমান আনো এবং বলো না, তিন জন আছে। বিরত হও; এ তোমাদেরই পক্ষে কল্যাণকর। আল্লাহই অভিভাবক হিসেবে যথেষ্ট।” (সূরা আন-নিসা: ১৭১)</p>
<p>৫. “আল্লাহ কি তাঁর শোকর আদায়কারী বান্দাদেরকে এদের নিজেদের অপেক্ষাও বেশি জানেন না? আমার আয়াতের প্রতি যারা ঈমান আনে তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন তাদেরকে বলো, “তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” তোমাদের রব দয়া ও অনুগ্রহের নীতি নিজের জন্য অপরিহার্য করে নিয়েছেন। তোমাদের কেউ যদি অজ্ঞতাবশত কোনো খারাপ কাজ করে বসে, তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তাহলে তিনি তাকে মাফ করে দেন এবং নরম নীতি অবলম্বন করেন, এটি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহেরই প্রকাশ।&#8221; (সূরা আল-আনয়াম: ৫৩-৫৪)</p>
<p>৬. “ইবরাহীমের ঘটনা স্মরণ করো, যখন সে আপন পিতা আজরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছ? আমি তো তোমাকে ও তোমার দলের লোকজনকে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত দেখতে পাচ্ছি’। ইবরাহীমকে এভাবেই আমি জমিন ও আসমানের রাজ্য পরিচালন-ব্যবস্থা দেখাচ্ছিলাম। আর এজন্য যে, সে যেন নিঃসন্দেহে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অতঃপর যখন তার উপর রাত আচ্ছন্ন হয়ে এলো তখন সে একটি তারকা দেখতে পেলো। বললো, এ আমার রব। কিন্তু পরে তা যখন অস্তমিত হয়ে গেলো, তখন বললো, অস্ত হয়ে যাওয়া জিনিসের প্রতি আমি কিছুমাত্র অনুরাগী নই। পরে যখন উজ্জ্বল চন্দ্র দেখতে পেল তখন বললো, এ আমার রব। কিন্তু তাও যখন অস্তগমন করল, তখন বললো, আমার রব যদি আমাকে পথ না দেখান তাবে আমিও গোমরাহ লোকদের মধ্যে শামিল হয়ে পড়ব। এরপর যখন সূর্যকে উজ্জ্বল-উদ্ভাসিত দেখতে পেলো, তখন বলল, এ-ই হচ্ছে আমার রব। এটি সর্বাপেক্ষা বড়। কিন্তু পরে এটাও যখন ডুবে গেলো, তখন ইবরাহীম চিৎকার করে বলে উঠল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক বানাচ্ছ, আমি সেই সব থেকে মুক্ত। আমি তো একনিষ্ঠভাবে নিজের লক্ষ্য সেই মহান সত্তার দিকে কেন্দ্রীভূত করেছি, যিনি যমীন ও আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আল-আনয়াম: ৭৪-৭৯)</p>
<p>৭. “আল্লাহই শস্যবীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী। তিনিই জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং তিনিই বের করেন মৃতকে জীবিত থেকে। এ সমস্ত কাজ তো আল্লাহই করেন, তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে ছুটে চলছো? তিনিই রাতের আবরণ বিদীর্ণ করে রঙিন প্রভাতের উন্মেষ করেন। তিনিই রাতকে করেছেন প্রশান্তিকাল। তিনিই চন্দ্র ও সূর্যের উদয়াস্তের হিসেব নির্দিষ্ট করেছেন। বস্তুত এসবই সেই মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানীর নির্ধারিত পরিমাপ। আর তিনিই তোমাদের জন্য তারকাসমূহকে মরু-সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে পথ জানার উপায় বানিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ করো, আমি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি তাদের জন্য যারা জ্ঞান রাখে। আর তিনিই এক প্রাণসত্তা থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর প্রত্যেকের জন্য রয়েছে একটি অবস্থান স্থল এবং তাকে সোপর্দ করার একটি জায়গা। এ নিদর্শনগুলো সুস্পষ্ট করে দিয়েছি তাদের জন্য যার জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারী। আর তিনিই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন। তারপর তার সাহায্য সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপাদন করেছেন এবং তার দ্বারা শস্য-শ্যামল ক্ষেত-খামার ও গাছ-পালার সৃষ্টি করেছেন। তারপর তা থেকে বিভিন্ন কোষসম্পন্ন শস্যদানা উৎপাদন করেছেন, খেজুরের মোচা থেকে ফলের থোকা থোকা বানিয়েছেন, যা বোঝার ভারে নুয়ে পড়ে। আর সজ্জিত করেছেন আঙুর, যয়তুন ও ডালিমের বাগান, সাজিয়ে দিয়েছেন সেখানে ফলসমূহ পরস্পর সদৃশ, অথচ প্রত্যেকটি পৃথক বৈশিষ্ট্যেরও অধিকারী। এ গাছগুলো যখন ফলধারণ করে তখন তাদের ফল বের হওয়া ও তা পেকে যাওয়ার অবস্থাটি একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করো। এসব জিনিসেই সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিহিত রয়েছে তাদের জন্য, যারা ঈমান আনে।” (সূরা আল-আনয়াম: ৯৫-৯৯)</p>
<p>৮. “বলো, আমার নামাজ, আমার সর্বপ্রকার ইবাদত অনুষ্ঠানসমূহ, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই সারে জাহানের রব আল্লাহরই জন্য।” (সূরা আল-আনয়াম: ১৬২)</p>
<p>৯. “মূলত একথা তারা শুধু এ জন্যই বলবে যে, যে সত্যকে তারা পূর্বে আবৃত ও গোপন করে রেখেছিল, এক্ষণে তা উন্মুক্ত হয়ে তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে; নতুবা, তাদেরকে পূর্ববর্তী জীবনের দিকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তা হলেও তারা সেইসব কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। তারা তো বড়ই মিথ্যাবাদী। (তাই নিজেদের মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও তারা মিথ্যারই আশ্রয় নেবে)। আজ তারা বলে, জীবন বলতে যা কিছু আছে, তা শুধু এ দুনিয়ার জীবনটুকুই এবং মৃত্যুর পর আমরা কখনই পুনরুত্থান লাভ করব না।” (সূরা আল-আনয়াম: ২৮- ২৯)</p>
<p>১০. “বলুন, ‘আমার রব নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায়বিচারের।’ আর তোমরা প্রত্যেক সাজদাহ বা ইবাদতে তোমাদের লক্ষ্য একমাত্র আল্লাহকেই নির্ধারণ কর এবং তাঁরই আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁকে ডাক। তিনি যেভাবে তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টি করেছেন তোমরা সেভাবে ফিরে আসবে। একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে। কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি।” (সূরা আল-আ’রাফ: ২৯-৩০)</p>
<p>১১. “আমার সাহায্যকারী ও রক্ষাকর্তা হচ্ছেন সেই আল্লাহ, যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনি তার সালিহ বান্দাদেরকে সাহায্য করে থাকেন। পক্ষান্তরে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা না তোমাদের কোনো সাহায্য করতে পারে আর না তারা নিজেদের সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে।&#8221; (সূরা আ’রাফ: ১৯৬-১৯৭)</p>
<p>১২. “আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদের বের করেছেন এমন অবস্থায় যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, চিন্তা-ভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। এই লোকেরা কি কখনও পাখিদের দেখেনি যে, আকাশের শূন্যলোকে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে? আল্লাহ ছাড়া কে তাদেরকে ধরে রেখেছে? নিশ্চয়ই এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সেই লোকদের জন্য যারা ঈমান আনে।” (সূরা নাহল: ৭৮-৭৯)</p>
<p>১৩. “আল্লাহ তায়া’লা ন্যায়বিচার (ইনসাফ), অনুগ্রহ ও সিলায়ে রেহমীর নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অন্যায়, পাপাচার, নির্লজ্জতা ও জুলুম পীড়ন করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে নসিহত করেছেন, যেন তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো। তোমরা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ওয়াদা করার পর তা পূরণ করো এবং নিজেদের কসম পাকা-পোক্তভাবে করার পর তা ভঙ্গ করো না, যখন তোমরা আল্লাহকে নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে নিয়েছো। আল্লাহ তোমাদের সব কাজকর্ম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল রয়েছেন।&#8221; (সূরা নাহল: ৯০-৯১)</p>
<p>১৪. &#8220;আল্লাহর ওয়াদা-প্রতিশ্রুতিকে সামান্য ও নগণ্য ফায়দার বিনিময়ে বিক্রি করে দিও না। যা কিছু আল্লাহর কাছে রয়েছে, তা তোমাদের জন্য অধিক উত্তম-যদি তোমরা জানতে ও বুঝতে পারো। তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে আর যা আল্লাহর কাছে রয়েছে, তাই চিরদিন অবশিষ্ট থাকবে। আমরা অবশ্যই ধৈর্য ধারণকারীদেরকে তাদের উত্তম কাজ অনুপাতে প্রতিফল দান করব।&#8221; (সূরা নাহল: ৯৫-৯৬)</p>
<p>১৫. &#8220;আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে এ রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ। সূর্য ও চাঁদকে সেজদা করো না; সেজদা করো সেই আল্লাহকে যিনি এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, যদি বাস্তবিকই তোমরা তাঁরই ইবাদতকারী হয়ে থাকো।&#8221; (সূরা হা-মীম আস সাজদাহ: ৩৭)</p>
<p>১৬. &#8220;আর আল্লাহর নিদর্শনের মধ্যে একটি এই যে, তোমরা দেখতে পাচ্ছ, জমিন শুকনো জীর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে। অতঃপর যখনই আমরা তার ওপর পানি বর্ষণ করি, সহসা তা উথলে ওঠে-অঙ্কুরোদগমে স্ফীত হয়। যে আল্লাহ এ মৃত জমিনকে জীবন্ত করে দেন, তিনি মৃত লোকদেরকেও নিশ্চিতভাবে জীবন দান করবেন। নিঃসন্দেহে তিনি প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর ক্ষমতাবান।&#8221; (সূরা হা-মীম আস সাজদাহ: ৩৯)</p>
<p>১৭. &#8220;এরপর সে সেগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর ডান হাতে খুব করে আঘাত হানলো। সেই লোকেরা (ফিরে এসে) দ্রুতবেগে তার কাছে উপস্থিত হলো। সে বললঃ “তোমরা কি নিজেদেরই নির্মিত জিনিসের পূজা-উপাসনা করো? অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন আর তোমরা যে জিনিসগুলো বানিয়ে রাখো সেগুলোকেও।” (সূরা সাফফাত: ৯৩-৯৬)</p>
<p>১৮. &#8220;অতীব মহান ও শ্রেষ্ঠ সেই সত্তা, যার মুষ্ঠির মধ্যে রয়েছে সমগ্র সৃষ্টিলোকের কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্ব। প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর-ই তাঁর কর্তৃত্ব সংস্থাপিত। তিনিই মৃত্যু ও জীবন উদ্ভাবন করেছেন, যেন তোমাদেরকে পরখ করে দেখতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি যেমন সর্বজয়ী শক্তিমান, তেমনি ক্ষমাশীলও।&#8221; (সূরা মূলক: ১-২)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> একক, কাদিরে মুতলাক এবং সর্বোত্তম এক স্রষ্টার ধারণা সম্পর্কে এমন সুস্পষ্ট পরিভাষা সমূহের উপর নির্ভরশীল দ্বীন এবং ঈমানও সাধারণ মানুষের আকল এবং কালবের জন্য উন্মুক্ত। এবং স্রষ্টা সম্পর্কে এত সহজ ধারণা সকলের দ্বারাই অনুধাবনযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য। আর মানুষের এই ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো মহান আল্লাহর ইচ্ছাকে গ্রহণ করা এবং উত্তম কাজ করা।</strong></p>
<p>১. &#8220;নিশ্চয় জানো শেষ নবীর প্রতি বিশ্বাসী হোক, কি ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা সাবীই-যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনবে ও নেক কাজ করবে, তার পুরস্কার তার রব-এর কাছে রয়েছে এবং তার জন্য কোনো প্রকার ভয় ও চিন্তার কারণ নেই।&#8221; (সূরা বাকারা: ৬২)</p>
<p>২. &#8220;স্মরণ করো, ইসরাইল-সন্তানদের কাছ থেকে আমরা এ পাকাপোক্ত প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। পিতামাতার সাথে, আত্মীয়-স্বজনের সাথে, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। লোকদের সাথে ভালো কথাবার্তা বলবে, নামাজ কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। কিন্তু মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া তোমরা সকলেই এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ এবং এখন পর্যন্ত সেই অবস্থায়ই রয়েছে।&#8221; (সূরা বাকারা: ৮৩)</p>
<p>৩. &#8220;প্রত্যেকের জন্য একটি দিক রয়েছে, যেদিকে সে মুখ করে দাঁড়ায়। কাজেই তোমরা প্রতিযোগিতার সাথে কল্যাণের দিকে অগ্রসর হও। তোমরা যেখানেই থাকবে, আল্লাহ তোমাদেরকে নিশ্চয়ই পাবেন। কোনো জিনিসই তার শক্তিবহির্ভূত নয়।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৪৮)</p>
<p>৪. &#8220;হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ও নামাজের সাহায্যে প্রার্থনা করো, আল্লাহ ধৈর্যশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৫৩)</p>
<p>৫. &#8220;তোমাদের মুখ পূর্ব দিকে বা পশ্চিম দিকে ফিরাবার মধ্যে কোন পুণ্য নেই। বরং কাজ হচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ‌, কিয়ামতের দিন, ফেরেশতা আল্লাহ‌র অবতীর্ণ কিতাব ও নবীদেরকে মনে প্রাণে মেনে নেবে এবং আল্লাহ‌র প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্য প্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে। আর নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দান করবে। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে এবং বিপদে-অনটনে ও হক–বাতিলের সংগ্রামে সবর করবে তারাই সৎ ও সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৭৭)</p>
<p>৬. &#8220;হে ঈমানদারগণ! যা কিছু অর্থ-সম্পদ আমরা তোমাদেরকে দান করেছি, তা থেকে ব্যয় করো, সেই দিনটি উপস্থিত হওয়ার পূর্বে যে দিন না ক্রয়-বিক্রয় হবে, না বন্ধুত্ব কোনো কাজে আসবে আর না চলবে কোনো সুপারিশ। প্রকৃত জালিম তারাই, যারা কুফরির নীতি অবলম্বন করে।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৫৪)</p>
<p>৭. &#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের দান-খয়রাতের কথা বলে (অনুগ্রহের দোহাই দিয়ে) এবং কষ্ট দিয়ে তাকে সেই ব্যক্তির ন্যায় নষ্ট করো না, যে ব্যক্তি শুধু লোকদের দেখাবার উদ্দেশ্যেই নিজের ধন-মাল ব্যয় করে আর না আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, না পরকালের প্রতি। তার খরচের দৃষ্টান্ত এইরূপ : যেমন একটি পাথুরে চাতাল, যার ওপর মাটির আস্তর পড়ে ছিল-এর ওপর যখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ল, তখন সমস্ত মাটি ধুয়ে ভেসে গেল এবং গোটা চাতালটি নির্মল ও পরিষ্কার হয়ে পরে রইল। এই সব লোক দান-সদকা করে যে পুণ্য অর্জন করে, তার কিছুই তাদের হাতে আসে না। আর কাফেরদেরকে সঠিক পথ নির্দেশ করা আল্লাহর রীতি নয়।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৬৪)</p>
<p>৮. &#8220;পক্ষান্তরে যারা নিজেদের ধন-মাল খালেসভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য মনের ঐকান্তিক স্থিরতা ও দৃঢ়তা সহকারে খরচ করে, তাদের এই ব্যয়ের দৃষ্টান্ত এইরূপ। যেমন কোনো উচ্চ ভূমিতে একটি বাগান রয়েছে, প্রবল বেগে বৃষ্টি হলে দ্বিগুণ ফল ধরে, আর জোরে বৃষ্টি না হলেও বৃষ্টির রেণুই তার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়। বস্তুত তোমরা যা করো, সবই আল্লাহর গোচরীভূত রয়েছে।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৬৫)</p>
<p>৯. &#8220;তোমরা কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারো না, যতক্ষণ না তোমরা (আল্লাহর পথে) সেই সব জিনিস ব্যয় ও নিয়োগ করবে, যা তোমাদের প্রিয় ও পছন্দনীয়। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহ সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবহিত রয়েছেন। (সূরা আলে-ইমরান: ৯২)</p>
<p>১০. &#8220;হে ঈমানদারগণ! অঙ্গীকারসমূহ পুরোপুরি মেনে চলো। তোমাদের জন্য গৃহপালিত ধরনের সমস্ত জন্তুকে হালাল করা হয়েছে, সে সব বাদে, যা একটু পরই তোমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ইহরামের অবস্থায় শিকার কার্যকে নিজেদের জন্য হালাল করে নিও না। বস্তুত আল্লাহ যা-ই চান, তারই আদেশ দান করেন।&#8221; (সূরা মায়েদা: ১)</p>
<p>১১. &#8220;হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর আনুগত্য ও ভক্তির নিদর্শনসমূহের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করো না। হারাম মাসসমূহের কোনো মাসকে হালাল করে নিও না। কুরবানির জন্তু-জানোয়ারগুলোর ওপর হস্তক্ষেপ করো না; সে সব জন্তুর ওপরও হস্তক্ষেপ করো না, যে সবের গলদেশে খোদায়ী মানতের চিহ্নস্বরূপ পট্টি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেই সব লোককেও কোনো কষ্ট দিয়ো না, যারা নিজেদের পরোয়ারদেগারের অনুগ্রহ এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের সন্ধানে পবিত্র ও সম্মানিত ঘরে (কা’বায় যাচ্ছে। ইহরামের অবস্থা শেষ হয়ে গেলে অবশ্য তোমরা শিকার করতে পারো। আর দেখো, একদল লোক যে তোমাদের জন্য মসজিদে হারামের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, সেজন্য তোমাদের ক্রোধ যেন তোমাদেরকে এতদূর উত্তেজিত করে না তোলে যে, তোমরাও তাদের মোকাবিলায় অবৈধ বাড়াবাড়ি করতে শুরু করবে। যে সব কাজ পুণ্যময় ও আল্লাহর ভয়মূলক, তাতে সকলের সঙ্গে সহযোগিতা করো; আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজ, তাতে কারো একবিন্দু সাহায্য ও সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো, কেননা, তাঁর শান্তি অত্যন্ত কঠিন।&#8221; (সূরা মায়েদা: ২)</p>
<p>১২. &#8220;হে ঈমানদার লোকেরা! এই মদ, জুয়া, আস্তানা ও পাশা এ সবই নাপাক শয়তানি কাজ। তোমরা এটা পরিহার করো। আশা করা যায় যে, তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৯০)</p>
<p>১৩. &#8220;হে মুহাম্মাদ! এই লোকদেরকে বলো যে, তোমরা এসো, আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দেবো তোমাদের রব তোমাদের ওপর কি কি বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন। তা এই যে, তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরিক করবে না, ব্যবহার করবে, পিতামাতার সঙ্গে ভালো নিজেদের সন্তানদের দারিদ্রের ভয়ে হত্যা করবে না, কেননা আমিই তোমাদেরকে রিযিক দেই, এবং তাদেরকেও দেবো। নির্লজ্জতার বিষয় ও। প্রসঙ্গের কাছেও যাবেনা, তা প্রকাশ্যেই হোক, কি গোপনে। কোনো প্রাণ আল্লাহ্ যাকে সম্মানীয় করেছেন ধ্বংস করবে না, অবশ্য সত্য ও ন্যায় সহকারে (করা যাবে)। এসব কথা পালন করার জন্য তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভবত তোমরা বুঝে-শুনে কাজ করবে।&#8221; (সূরা আনয়াম: ১৫১)</p>
<p>১৪. &#8220;আরো এই যে, তোমরা ইয়াতীমের মাল-সম্পদের নিকটেও যাবে না, অবশ্য এমন নিয়ম ও পন্থায় (যেতে পারো) যা সর্বাপেক্ষা ভালো, যতদিন না সে জ্ঞানবুদ্ধি লাভের বয়স পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর মাপে এবং ওজনে পুরোপুরি ইনসাফ করো। আমরা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর দায়িত্বের বোঝা ততখানিই চাপাই, যতখানির সাধ্য তার রয়েছে। আর যখন কথা বলো, ইনসাফের কথা বলো: ব্যাপারটি নিজের আত্মীয়েরই হোক না কেন এবং আল্লাহর ওয়াদা পূরণ করো। এসব বিষয়ের হেদায়েত আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে দিয়েছেন; হয়ত তোমরা নসীহত কবুল করবে।&#8221; (সূরা আনয়াম: ১৫২)</p>
<p>১৫. &#8220;আমি কি তাকে দুটি চোখ, একটি জিহ্বা এবং দুটি ওষ্ঠ দেই নাই? আর আমি কি তাকে দুটি স্পষ্ট পথ দেখাই না? কিন্তু সে দুর্গম বন্ধুর পথ অতিক্রম করার সাহস করেনি। তুমি কি জানো সেই দুর্গম বন্ধুর পথটি কি? কোনো গলাকে দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা কিংবা উপবাসের দিনে কোনো নিকটবর্তী ইয়াতীম বা ধূলি মলিন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো। সেই সঙ্গে শামিল হওয়া সেই লোকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যারা পরস্পরকে ধৈর্য ধারণের ও (সৃষ্টিকুলের প্রতি) দয়া প্রদর্শনের উপদেশ দেয়। এ লোকেরাই দক্ষিণপন্থি। আর যারা আমার আয়াতসমূহ মেনে নিতে অস্বীকার করেছে তারা বামপন্থী। তাদের ওপর আগুন। একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।&#8221; (সূরা বালাদ: ৮-১৬)</p>
<p>১৬. সূর্য ও তার রৌদ্রের শপথ। চাঁদের শপথ যখন তা সূর্যের পিছনে পিছনে আসে। দিনের শপথ যখন তা (সূর্যকে) প্রকট করে তোলে। এবং রাতের শপথ যখন তা (সূর্যকে) আচ্ছাদিত করে নেয়। আকাশসমূহের এবং সেই সত্তার শপথ যিনি তা সংস্থাপিত করেছেন। আর পৃথিবীর ও সেই সত্তার শপথ, যিনি তাকে বিছিয়ে দিয়েছেন। মানব-প্রকৃতির এবং সেই সত্তার শপথ, যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তার পাপ ও তার তাকওয়া (সতর্কতা) তার প্রতি ইলহাম করেছেন। নিঃসন্দেহে কল্যাণ পেল সে, যে নিজের নফসের পবিত্রতা বিধান করল। এবং ব্যর্থ হলো সে, যে তাকে খর্ব ও গুপ্ত করল। (সূরা শামস: ১-১০)</p>
<p>১৭. &#8220;(লোকেরা) জিজ্ঞেস করছে মদ ও জুয়া সম্পর্কে কী নির্দেশ? বলে দাও এ দুটি জিনিসেই বড় পাপ রয়েছে, যদিও এতেই লোকদের জন্য কিছুটা উপকারিতাও আছে; কিন্তু উভয় কাজের পাপ উপকারিতা থেকে অনেক বেশি জিজ্ঞেস করছে? আমরা আল্লাহর পথে কি খরচ করব? বলো, যা কিছু তোমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত। বস্তুত, আল্লাহ তোমাদের জন্য এভাবে বিধানসমূহ স্পষ্টরূপে বিবৃত করেন।&#8221; (সূরা বাকারা: ২১৯)</p>
<p>১৮. &#8220;একটু মিষ্টি কথা এবং কোনো অপ্রিয় ব্যাপারে সামান্য উদারতা দেখানো সে দান অপেক্ষা ভালো যার পিছনে আসে দুঃখ ও তিক্ততা। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা গুণে ভূষিত।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৬৩)</p>
<p>১৯. &#8220;সেই পথে তীব্র গতিতে চলো, যা তােমাদের রব্ব-এর ক্ষমা এবং আকাশ ও পৃথিবীর সমান প্রশন্ত বেহেশতের দিকে চলে গেছে এবং যা সেই মুত্তাকী লোকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা সব সময়ই নিজেদের ধন-মাল খরচ করে, দুরবস্থায়ই হোক আর সচ্ছল অবস্থায়ই হোক, যারা ক্রোধকে হজম করে এবং অন্যান্য লোকদের অপরাধ মাফ করে দেয়। এই সব নেককার লোককেই আল্লাহ খুব ভালোবাসেন।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৩-১৩৪)</p>
<p>২০. &#8220;হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য অবলম্বন করো, বাতিলপন্থীদের মুকাবিলায় দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা প্রদর্শন করো, সত্যের খেদমতের জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ২০০)</p>
<p>২১. &#8220;ইয়াতিমদের ধন-সম্পত্তি তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। ভালো সম্পদ খারাপ সম্পদের সাথে বদল করো না এবং তাদের সম্পদ তোমাদের সম্পদের সাথে মিলিয়ে হজম করে ফেলো না। এটি অত্যন্ত বড় গুনাহ।&#8221; (সূরা নিসা: ২)</p>
<p>২২. &#8220;যারা ইয়াতিমদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে আগুন দ্বারা নিজেদের পেট বোঝাই করে এবং তারা নিশ্চয়ই জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।&#8221; (সূরা নিসা: ১০)</p>
<p>২৩. &#8220;সেই সব লোককেও আল্লাহ পছন্দ করেন না, যারা কার্পণ্য করে এবং অন্য লোককেও কার্পণ্য করার উপদেশ দেয় এবং আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দান করেছেন, তা লুকিয়ে রাখে এরূপ অকৃতজ্ঞ-নেয়ামত অস্বীকারকারী লোকদের জন্য আমরা অপমানকর আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছি।&#8221; (সূরা নিসা: ৩৭)</p>
<p>২৪. &#8220;নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের সব ক্রিয়াকার্য জানেন গোপন ও অদৃশ্য বিষয়ও এবং প্রকাশ্য ব্যাপারগুলোও। তিনি সে লোকদেরকে আদৌ পছন্দ করেন না যারা আত্ম-অহংকারে নিমজ্জিত।&#8221; (সূরা নাহল: ২৩)</p>
<p>২৫. &#8220;হে নবী! তোমার রব-এর পথের দিকে আহ্বান জানাও হেকমত ও উত্তম নসিহতের সাহায্যে। আর লোকদের সঙ্গে পরস্পর বিতর্ক করো এমন পন্থায়, যা অতি উত্তম। তোমার রবই বেশি ভালো জানেন, কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে আর কে সঠিক পথে আছে।&#8221; (সূরা নাহল: ১২৫)</p>
<p>২৬. &#8220;(হে নবী!) তিলাওয়াত করো এই কিতাব, যা ওহীর মাধ্যমে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে আর নামাজ আদায় করো: নিঃসন্দেহে নামাজ অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর যিকির তা থেকেও অধিক বড় জিনিস। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কিছু করো।&#8221; (সূরা আনকাবুত: ৪৫)</p>
<p>২৭. &#8220;ধ্বংস, হীন ঠকবাজদের জন্য (যারা মাপে বা ওজনে কম দেয়)। তাদের অবস্থা এই যে, লোকদের কাছ থেকে গ্রহণের সময় পুরোমাত্রায় গ্রহণ করে; কিন্তু তাদেরকে ওজন বা পরিমাপ করে দেওয়ার সময় তাদের ক্ষতিসাধন করে। এ লোকেরা কি চিন্তা করে না যে, একটা মহাদিবসে তাদেরকে উঠিয়ে আনা হবে? এটি সেই দিন, যেদিন সমস্ত মানুষ রাব্বুল আ’লামীনের সামনে দাঁড়াবে।&#8221; (সূরা মুতাফফিফীন, ১-৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> দ্বীন আকলের কোন ফসল নয়, তবে আকলের সাথে দ্বীনের কোনো সংঘর্ষও নেই। জ্ঞান ও বিজ্ঞান যদিও দ্বীনকে বিচার করার ও তাকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা রাখে না, তবুও জ্ঞান ও বিজ্ঞান তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে এবং আমাদের জযবার মাধ্যমে আমাদের গভীর চিন্তার গোপন রহস্য সমূহকে অনেক বেশী সম্প্রসারিত করতে পারে।</strong></p>
<p>১. &#8220;পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠণাকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন। তারা আপনা আপনি বলে ওঠে, হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সৃষ্টি করোনি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৯০-১৯১)</p>
<p>২. &#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না। নামাজ সেই সময় পড়া উচিত যখন তোমরা যা বলছো তা জানতে পারো। অনুরূপভাবে অপবিত্র অবস্থায়ও গোসল না করা পর্যন্ত নামাযের কাছে যেয়ো না। তবে যদি পথ অতিক্রমকারী হও, তাহলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। আর যদি কখনো তোমরা অসুস্থ হয়ে পড়ো, সফরে থাকো বা তোমাদের কেউ মলমূত্র ত্যাগ করে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ করে থাকো এবং এরপর পানি না পাও, তাহলে পাক পবিত্র মাটির সাহায্য গ্রহণ করো এবং তা নিজেদের চেহারা ও হাতের ওপর বোলাও। নিঃসন্দেহে আল্লাহ কোমলতা অবলম্বনকারী ও ক্ষমাশীল।&#8221; (সূরা নিসা: ৪৩)</p>
<p>৩. &#8220;তাদের মতো হয়ে যেয়ো না, যারা বললো, আমরা শুনেছি অথচ তারা শোনে না। অবশ্য আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার হচ্ছে সেই সব বধির ও বোবা লোক যারা-বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগায় না।&#8221; (সূরা আনফাল: ২১- ২২)</p>
<p>৪. &#8220;এদেরকে জিজ্ঞেস করো, আকাশ ও পৃথিবীর রব কে? বলো আল্লাহ! তারপর এদেরকে জিজ্ঞেস করো, আসল ব্যাপার যখন এই তখন তোমরা কি তাঁকে বাদ দিয়ে এমন মাবুদদেরকে নিজেদের কার্যসম্পাদনকারী বানিয়ে নিয়েছো যারা তাদের নিজেদের জন্যও কোন লাভ ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না? বলো অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হয়ে থাকে? আলো ও আঁধার কি এক রকম হয়? যদি এমন না হয়, তাহলে তাদের বানানো শরীকরাও কি আল্লাহর মতো কিছু সৃষ্টি করেছে, যে কারণে তারাও সৃষ্টি ক্ষমতার অধিকারী বলে সন্দেহ হয়েছে? বলো, প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। তিনি একক ও সবার ওপর পরাক্রমশালী।&#8221; (সূরা রা’দ: ১৬)</p>
<p>৫. &#8220;একমাত্র আল্লাহই সেই সময়ের জ্ঞান রাখেন। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে কি লালিত হচ্ছে। কোন প্রাণসত্তা জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কোন ব্যক্তির জানা নেই তার মৃত্যু হবে কোন যমিনে। আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন।&#8221; (সূরা লোকমান: ৩৪)</p>
<p>৬. &#8220;(এরা মানছে না) তাহলে কি এরা উটগুলো দেখছে না, কীভাবে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশ দেখছে না, কীভাবে তাকে উঠানো হয়েছে? পাহাড়গুলো দেখছে না, কীভাবে তাদেরকে শক্তভাবে বসানো হয়েছে? আর যমীনকে দেখছে না, কীভাবে তাকে বিছানো হয়েছে? বেশ (হে নবি) তাহলে তুমি উপদেশ দিয়ে যেতে থাকো। তুমি তো শুধুমাত্র একজন উপদেশক, এদের উপর বল প্রয়োগকারী নও।&#8221; (সূরা গাশিয়া: ১৭-২২)</p>
<p>৭. &#8220;(এই সত্যটি চিহ্নিত করার জন্য যদি কোন নিদর্শন বা আলামতের প্রয়োজন হয় তাহলে) যারা বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার করে তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর ঘটনাকৃতিতে, রাত্রদিনের অনবরত আবর্তনে, মানুষের প্রয়োজনীয় ও উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগর দরিয়ার চলমান জলযানসমূহে, বৃষ্টিধারার মধ্যে, যা আল্লাহ বর্ষণ করেন ওপর থেকে তারপর তার মাধ্যমে মৃত ভূমিকে জীবন দান করেন এবং নিজের এই ব্যবস্থাপনার বদৌলতে পৃথিবীতে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন, আর বায়ু প্রবাহে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।&#8221; (সূরা বাকারা: ১৬৪)</p>
<p>৮. &#8220;হে নবী! তোমার কাছে অহীর মাধ্যমে যে হেদায়াত পাঠানো হচ্ছে তুমি তার অনুসরণ করো। আর আল্লাহ ফায়সালা দান করা পর্যন্ত সবর করো এবং তিনিই সবচেয়ে ভালো ফয়সালাকারী।&#8221; (সূরা ইউসুফ: ১০৯)</p>
<p>৯. &#8220;আর তিনিই এ ভূ-তলকে বিছিয়ে রেখেছেন, এর মধ্যে পাহাড়ের খুঁটি গেড়ে দিয়েছেন এবং নদী প্রবাহিত করেছেন। তিনিই সব রকম ফল সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায় এবং তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে ফেলেন। এ সমস্ত জিনিসের মধ্যে বহুতর নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা-ভাবনা করে।&#8221; (সূরা রা’দ: ৩)</p>
<p>১০. &#8220;আর দেখো, পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন আলাদা আলাদা ভূখণ্ড, রয়েছে আঙুর বাগান, শস্যক্ষেত, খেজুর গাছ- কিছু একাধিক কান্ডবিশিষ্ট আবার কিছু এক কাণ্ড বিশিষ্ট, সবাই সিঞ্চিত একই পানিতে কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে আমি করে দেই তাদের কোনোটাকে বেশী ভালো এবং কোনোটাকে কম ভালো। এসব জিনিসের মধ্যে যারা বুদ্ধিকে কাজে লাগায় তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন।&#8221; (সূরা রা’দ: ৪)</p>
<p>১১. &#8220;পাক-পবিত্র সে সত্তা যিনি সব রকমের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, তা ভূমিজাত উদ্ভিদের মধ্য থেকে হোক অথবা স্বয়ং এদের নিজেদের প্রজাতির অর্থাৎ মানব জাতি মধ্য থেকে হোক কিংবা এমন জিনিসের মধ্য থেকে হোক যাদেরকে এরা জানেও না। এদের জন্য রাত হচ্ছে আর একটি নিদর্শন। আমি তার উপর থেকে দিনকে সরিয়ে দেই তখন এদের ওপর অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর সূর্য, সে তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলছে। এটি প্রবল পরাক্রমশালী জ্ঞানী সত্তার নিয়ন্ত্রিত হিসেবে আর চাঁদ, তার জন্য আমি মনযিল নির্দিষ্ট করে দিয়েছি, সেগুলো অতিক্রম করে সে শেষ পর্যন্ত আবার খেজুরের শুকনো ডালের মতো হয়ে যায়। না সূর্যের ক্ষমতা আছে চাঁদকে ধরে ফেলে এবং না রাত দিনের ওপর অগ্রবর্তী হতে পারে, সবাই এক একটি কক্ষপথে সন্তরণ করছে।&#8221; (সূরা ইয়াসিন: ৩৬-৪০)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> এখন যে আয়াত সমূহকে আমি উল্লেখ করেছি, সেই সকল আয়াতে আমরা দেখতে পাই যে, প্রকৃতির সাথে ইসলামের সম্পর্ক এবং বহিঃজগতের সাথে তার সম্পৃক্ততা আমাদের নজর কেড়ে নেয়। মহাগ্রন্থ আল কোরআন আল্লাহর প্রতি ঈমান সম্পর্কে, মানুষের দায়িত্ব ও আদালত সম্পর্কে যেমন বলে থাকে, একইভাবে আমাদেরকে পশু-পাখি, নদী-পাহাড়, তারকাপুঞ্জ, চন্দ্র-সূর্য, পিঁপড়া, মৌমাছি, খেজুর এবং উট সম্পর্কেও বলে থাকে। এই সকল সৃষ্ট বিষয় সমূহের অভ্যন্তরীণ এবং প্রাকৃতিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। </strong>এই দুনিয়ার ব্যাপারে ইসলাম আমাদের সামনে অনুপম এক দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে। হয়তোবা এটি ইসলামের আখলাকের ক্ষেত্রে ভালোবাসা ও মারহামাতের পরিবর্তে হক এবং আদালতকে বেশী প্রাধান্য দেওয়ার একটি জবাবও।</p>
<p>১. &#8220;হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও, তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের ব্যক্তিসত্তার অথবা তোমাদের বাপ-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও। উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে অনেক বেশী কল্যাণকামী। কাজেই নিজেদের কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে বিরত থেকো না। আর যদি তোমরা প্যাঁচালো কথা বলো অথবা সত্যতাকে পাশ কাটিয়ে চলো, তাহলে জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু করছো আল্লাহ তার খবর রাখেন।&#8221; (সূরা নিসা: ১৩৫)</p>
<p>২. &#8220;লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করেছে, তাদের জন্য কি হালাল করা হয়েছে? বলে দাও, তোমাদের জন্য সমস্ত পাক- পবিত্র জিনিস হালাল করা হয়েছে। আর যে-সব শিকারি প্রাণীকে তোমরা শিক্ষিত করে তুলেছ, যাদেরকে আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে তোমরা শিকার করা শিখিয়েছো, তারা তোমাদের জন্য যে-সব প্রাণী ধরে রাখে, তাও তোমরা খেতে পারো। তবে তার ওপর আল্লাহর নাম নিতে হবে। আর আল্লাহর আইন ভাঙার ব্যাপারে সাবধান। অবশ্য হিসাব নিতে আল্লাহর মোটেই দেরি হয় না।&#8221; (সূর মায়েদা: ৮)</p>
<p>৩. &#8220;এরা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম আহারকারী। কাজেই এরা যদি তোমাদের কাছে (নিজেদের মামলা নিয়ে) আসে তাহলে তোমরা চাইলে তাদের মীমাংসা করে দিতে অথবা অস্বীকার করে দিতে পারো। অস্বীকার করে দিলে এর তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর মীমাংসা করে দিলে যথার্থ ইনসাফ সহকারে মীমাংসা করো। কারণ আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৪২)</p>
<p>৪. &#8220;আর যদি তোমরা প্রতিশোধ নাও, তাহলে ঠিক ততটুকু নাও যতটুকু তোমাদের ওপর বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। কিন্তু যদি তোমরা সবর করো তাহলে নিশ্চিতভাবেই এটা সবরকারীদের পক্ষে উত্তম।&#8221; (সূরা নাহল: ১২৬)</p>
<p>৫. &#8220;(আমি তাকে বললাম) হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করবে। যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শান্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।” (সূরা সোয়াদ: ২৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> আদালত, সামাজিক আদালত এবং ইনসাফ সম্পন্ন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামের যে প্রচেষ্টা, সেটার মূল ভিত্তি হচ্ছে আখলাক। আমি এখন যে সকল আয়াতকে উল্লেখ করব, সেই সকল আয়াতসমূহ অতীতের মুসলমানদের ভুবনজয়ী ঐতিহাসিক বিজয় সমূহের সাথে বর্তমান মুসলিম সমাজের পরাজয়ের কারণ সমূহকে বুঝার জন্য সাহায্য করবে।</strong> যদি কোরআনের ব্যবস্থাকে অপচয়হীন এবং দুর্দশাহীন একটি ব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে আমাদেরকে আজকে একথা স্বীকার করতে হবে যে, কোরআনের ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ব্যবস্থা আমাদের সমাজে বিদ্যমান। যার ফলে আজকের মুসলিম সমাজে এত অপচয় ও দুর্দশা বিরাজ করছে।</p>
<p>১. &#8220;আর তোমরা জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু গনিমতের মাল লাভ করেছো তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আল্লাহ, তাঁর রসূল, আত্মীয়স্বজন, এতিম মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর প্রতি এবং ফায়সালার দিন অর্থাৎ উভয় সেনাবাহিনীর সামনা সামানি মোকাবিলার দিন আমি নিজের বান্দার ওপর যা নাফিল করেছিলাম তার প্রতি, (অতএব সানন্দে এ অংশ আদায় করো) আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর শক্তিশালী।&#8221; (সূরা আনফাল: ৪১)</p>
<p>২. &#8220;এ সদকাগুলো তো আসলে ফকীর মিসকীনদের জন্য। আর যারা সাদকা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত এবং যাদের জন্য মন জয় করা প্রয়োজন তাদের জন্য। তাছাড়া দাস মুক্ত করার, ঋণগ্রস্তের সাহায্য করার, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের উপকারে ব্যয় করার জন্য। এটা আল্লাহর পক্ষে থেকে একটি বিধান এবং আল্লাহর সবকিছু জানেন, তিনি বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ।&#8221; (সূরা তওবা: ৬০)</p>
<p>৩. &#8220;আর দেখো, আল্লাহ তোমাদের একজনকে আর একজনের ওপর রিযিকের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তারপর যাদেরকে এ শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে তারা এমন নয় যে নিজেদের রিযিক নিজেদের গোলামদের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে থাকে, যাতে উভয় এ রিযিকে সমান অংশীদার হয়ে যায়। তাহলে কি এরা শুধু আল্লাহরই অনুগ্রহ মেনে নিতে অস্বীকার করে?&#8221; (সূরা নাহল: ৭১)</p>
<p>৪. &#8220;তোমাদের মধ্য থেকে যারা প্রাচুর্য ও সামর্থ্যের অধিকারী তারা যেন এ মর্মে কসম খেয়ে না বসে যে, তারা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, গরিব-মিসকিন ও আল্লাহর পথে গৃহত্যাগকারীদেরকে সাহায্য করবে না। তাদেরকে ক্ষমা করা ও তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীলতা ও দয়া গুণে গুণান্বিত।&#8221; (সূরা নূর: ২২)</p>
<p>৫. &#8220;এবং যখন এদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দান করেছেন তার মধ্য থেকে কিছু আল্লাহর পথে খরচ করো তখন এসব কুফরিতে লিপ্ত লোক মু’মিনদেরকে জবাব দেয় “আমরা কি তাদেরকে খাওয়াবো, যাদেরকে আল্লাহ চাইলে নিজেই খাওয়াতেন? তোমরা তো পরিষ্কার বিভ্রান্তির শিকার হয়েছো।&#8221; (সূরা ইয়াসিন: ৪৭)</p>
<p>৬. &#8220;(এ সবই এজন্য) যাতে যে ক্ষতিই তোমাদের হয়ে থাকুক তাতে তোমরা মনক্ষুণ্ন না হও। আর আল্লাহ তোমাদের যা দান করেছেন। সেজন্য গর্বিত না হও। যারা নিজেরা নিজেদের বড় মনে করে এবং অহংকার করে, নিজেরাও কৃপণতা করে এবং মানুষকেও কৃপণতা করতে উৎসাহ দেয় আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। এরপর ও যদি কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আল্লাহ অভাবশূন্য ও অতি প্রশংসিত।&#8221; (সূরা হাদীদ: ২৩-২৪)</p>
<p>৭. &#8220;তুমি কি তাকে দেখেছো যে আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্ত্রিকে মিথ্যা বলছে? সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না।&#8221; (সূরা মাউন: ১-৩)</p>
<p>৮. &#8220;কাজেই (হে মুমিন!) আত্মীয়দেরকে তাদের অধিকার দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকে (দাও তাদের অধিকার)। এ পদ্ধতি এমন লোকদের জন্য ভালো যারা চায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তারাই সফলকাম হবে।&#8221; (সূরা রুম: ৩৮)</p>
<p>এই আয়াতের মাধ্যমে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা সম্পর্কিত এই হুকুম সমূহ, সমাজের দুর্বলদের অধিকারের সাথে শক্তিশালীদের দায়িত্ব সমূহকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সকল মানুষ যে সমান এই মূলনীতির মাধ্যমে অনুপম এক সাদৃশ্য রয়েছে। কোরআনে আলোকে নির্বাচিত কোনো সমাজ কিংবা উচ্চ বর্ণের কোনো জাতি নেই।</p>
<p>৯. &#8220;প্রথমে সব মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। (তারপর এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকেনি, তাদের মধ্যে মতভেদের সূচনা হয়) তখন আল্লাহ নবী পাঠান। তারা ছিলেন সত্য সঠিক পথের অনুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং অসত্য ও বেঠিক পথ অবলমম্বনের পরিণতির ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনকারী। আর তাদের সাথে সত্য কিতাব পাঠান, যাতে সত্য সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল তার মীমাংসা করা যায়। এবং প্রথমে তাদেরকে সত্য সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া হয়নি বলে এ মতভেদগুলো সৃষ্টি হয়েছিল, তা নয়। মতভেদ তারাই করেছিল যাদেরকে সত্যের জ্ঞান দান করা হয়েছিল। তারা সুস্পষ্ট পথনির্দেশ লাভ করার পরও কেবলমাত্র পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিল বলেই সত্য পরিহার করে বিভিন্ন পথ উদ্ভাবন করে। কাজেই যারা নবীদের ওপর ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ নিজের ইচ্ছাক্রমে সেই সত্যের পথ দিয়েছেন, যে ব্যাপারে লোকেরা মতবিরোধ করেছিল। আল্লাহ যাকে চান সত্য সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। (সূরা বাকারা: ২১৩)</p>
<p>১০. &#8220;হে মানব জাতি! তোমাদের রবকে ভয় করো। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে। আর সেই একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া। তারপর তাদের দুজনার থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। সেই আল্লাহকে ভয় করো যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে নিজেদের হক আদায় করে থাকো এবং আত্মীয়তা ও নিকট সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছেন।&#8221; (সূরা নিসা: ১)</p>
<p>১১. হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। (সূরা হুজুরাত: ১৩)</p>
<p>১২. তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই থাকতে হবে, যারা নেকী ও সৎকর্মশীলতার দিকে আহ্বান জানাবে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে তারাই সফলকাম হবে। (সূরা আলে-ইমরান: ১০৪)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> মানুষের মধ্যকার সমতা ও সমমর্যাদার বিষয়টি নারীদের সাথেও অনেক বেশী সংগতিপূর্ণ। এই বিষয়টির গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম নয়। সকলেই অবগত যে সমগ্র মানবতার অর্ধেকই হলো নারী। এই ক্ষেত্রে ইসলাম ইউরোপিয়ানদের তথাকথিত নারী অধিকার ও সমতা নয়, ইসলাম কোরআনের আলোকে মানুষের মর্যাদাকে নিরূপণ করে এবং নারীর সমতা ও মর্যাদা নিয়ে অনুপম একটি ধারণা পেশ করে থাকে। আর সমতার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম বিষয় হলো &#8211; নারী একজন মানুষ হিসেবে একই মূল্য ও মর্যাদার অধিকারী। নারী ও পুরুষের মূল্য ও মর্যাদা একই, তবে তারা একে অপরের চেয়ে ভিন্ন।</strong> কোরআন নারী পুরুষের মধ্যকার এই ভিন্নতাকে উঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এই সকল ভিন্নতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। নারীর ক্ষেত্রে ইসলাম ও পাশ্চাত্যের পার্থক্য এখানেই। ইসলাম চায় নারীর ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্যকে রক্ষা করে তাদেরকে সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে। আর পাশ্চাত্য চায় নারী ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্যকে তুলে দিয়ে তাদেরকে সমান মর্যাদা দিতে চায়। তবে সমতার প্রশ্নে কোরআন শুধুমাত্র এই বিষয়টিকে স্বীকৃতিই দেয় না, একইসাথে কেউ যেন ভুল অর্থ বের করতে না পারে, এমন বাক্য ব্যবহার করেছে।</p>
<p>১. &#8220;জবাবে তাদের রব বললেন, আমি তোমাদের কারো কর্মকাণ্ড নষ্ট করবো না। পুরুষ হও বা নারী, তোমরা সবাই একই জাতির অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যারা আমার জন্য নিজেদের স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করেছে এবং আমার পথে যাদেরকে নিজেদের ঘর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া ও কষ্ট দেয়া হয়েছে এবং যারা আমার জন্য লড়েছে ও মারা গেছে, তাদের সমস্ত গোনাহ আমি মাফ করে দেবো এবং তাদেরকে এমন সব বাগানে প্রবেশ করাবো যার নিচে দিয়ে ঝর্ণাধারা বয়ে চলবে। এসব হচ্ছে আল্লাহর কাছে তাদের প্রতিদান এবং সবচেয়ে ভালো প্রতিদান আল্লাহর কাছেই আছে।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৯৫)</p>
<p>২. &#8220;আর যা কিছু আল্লাহ তোমাদের কাউকে অন্যদের মোকাবিলায় বেশি দিয়েছেন তার আকাঙ্ক্ষা করো না। যা কিছু পুরুষেরা উপার্জন করেছে তাদের অংশ হবে সেই অনুযায়ী। আর যা কিছু মেয়েরা উপার্জন করেছে তাদের অংশ হবে সেই অনুযায়ী। হাঁ, আল্লাহর কাছে তাঁর ফজল ও মেহেরবানীর জন্য দোয়া করতে থাকো। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ সমস্ত জিনিসের জ্ঞান রাখেন।&#8221; (সূরা নিসা: ৩২)</p>
<p>৩. &#8220;মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। এরা ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে। এরা এমন লোক যাদের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হবেই। অবশ্যই আল্লাহ সবার ওপর পরাক্রমশালী এবং জ্ঞানী ও বিজ্ঞ। এ মুমিন পুরুষ ও নারীকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদেরকে তিনি এমন বাগান দান করবেন যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান হবে এবং তারা তার মধ্যে চিরকাল বাস করবে। এসব চির সবুজ বাগানে তাদের জন্য থাকবে বাসগৃহ এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।&#8221; (সূরা তওবা: ৭১-৭২)</p>
<p>৪. &#8220;পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবো এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে।&#8221; (সূরা নাহল: ৯৭)</p>
<p>৫. &#8220;যারা সতী সাধ্বী, সরলমনা মু’মিন মহিলাদের প্রতি অপবাদ দেয় তারা দুনিয়ায় ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশান্তি।&#8221; (সূরা নূর: ২৩)</p>
<p>৬. &#8221; হে নবী! মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্র পদ্ধতি। যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন। আর হে নবী! মু’মিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে। তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া স্বামী, বাপ, স্বামীর বাপ, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের, নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোনোরকম উদ্দেশ্য নেই এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ। তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।&#8221; (সূরা নূর: ৩০-৩১)</p>
<p>৭. &#8220;একথা সুনিশ্চিত যে, যে পুরুষ ও নারী মুসলিম, মুমিন, হুকুমের অনুগত, সত্যবাদী, সবরকারী, আল্লাহর সামনে বিনত, সাদকাদানকারী, রোযা পালনকারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী আল্লাহ তাদের জন্য মাগফিরাত এবং প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।&#8221; (সূরা আহযাব: ৭৩)</p>
<p>৮. &#8220;সেই দিন তাদের বলা হবে, হে আমার বান্দারা, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং কোনো দুঃখও আজ তোমাদের স্পর্শ করবে না। তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীরা জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমাদের খুশী করা হবে।&#8221; (সূরা যুখরুফ: ৬৯-৭০)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অর্থাৎ একটি নারীদের জন্য অপরটি পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট এরকম দুই ধরনের আখলাকের স্থান নেই। কোরআন এই অনুপম আখলাকের ধারণার আলোকে সকল মানুষের কাছ থেকে যা কিছু চেয়ে থাকে সেগুলো হলো: </strong></p>
<p>১. &#8220;তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন: তোমরা কারোর ইবাদাত করো না, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো। পিতামাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করো। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হয়, তাহলে তাদেরকে “উহ্” পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিও না। আর তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বলো। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো এবং দোয়া করতে থাকো এই বলেঃ হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।&#8221; (সূরা ইসরা: ২৩-২৪)</p>
<p>২. &#8220;এতীমের সম্পত্তির ধারে কাছে যেও না, তবে হ্যাঁ সুদপায়ে, যে পর্যন্ত না সে বয়োপ্রাপ্ত হয়ে যায়। প্রতিশ্রুতি পালন করো, অবশ্যই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে। মেপে দেবার সময় পরিমাপ পাত্র ভরে দাও এবং ওজন করে দেবার সময় সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো। এটিই ভালো পদ্ধতি এবং পরিণামের দিক দিয়েও এটিই উত্তম। এমন কোনো জিনিসের পেছনে লেগে যেও না, যে সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই। নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও দিল সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যমীনে দম্ভভরে চলো না। তুমি না যমীনকে চিরে ফেলতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে। এ বিষয়গুলোর মধ্য থেকে প্রত্যেকটির খারাপ দিক তোমার রবের কাছে অপছন্দনীয়।&#8221; (সূরা ইসরা: ৩৪-৩৮)</p>
<p>৩. &#8220;হে ঈমানদারগণ! নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তার অধিবাসীদেরকে সালাম করো। এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে। তারপর যদি সেখানে কাউকে না পাও, তাহলে তাতে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি না দেয়া হয়। আর যদি তোমাদের বলা হয়, ফিরে যাও তাহলে ফিরে যাবে, এটিই তোমাদের জন্য বেশী শালীন ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি এবং যা কিছু তোমরা করো আল্লাহ তা খুব ভালোভাবেই জানেন।&#8221; (সূরা নূর: ২৭-২৮)</p>
<p>৪. &#8220;হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাসদাসী এবং তোমাদের এমন সব সন্তান যারা এখনো বুদ্ধির সীমানায় পৌঁছেনি, তাদের অবশ্যই তিনটি সময়ে অনুমতি নিয়ে তোমাদের কাছে আসা উচিত: ফজরের নামাযের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক ছেড়ে রেখে দাও এবং এশার নামাযের পর। এ তিনটি তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এরপরে তারা বিনা অনুমতিতে এলে তোমাদের কোন গুনাহ নেই এবং তাদেরও না। তোমাদের পরস্পরের কাছে বারবার আসতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিজের বাণী সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন এবং তিনি সবকিছু জানেন ও বিজ্ঞ।&#8221; (সূরা নূর: ৫৮)</p>
<p>৫. &#8220;হে নবী, সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়। তুমি অসৎ কাজকে সেই নেকী দ্বারা নিবৃত্ত করো যা সবচেয়ে ভাল। তাহলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গিয়েছে। ধৈর্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারো ভাগ্যে জোটে না। এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না।&#8221; (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪-৩৫)</p>
<p>৬. &#8220;এটাই সেই জিনিস যার সুসংবাদ আল্লাহ তার সেই সব বান্দাদের দেন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে। হে নবী, এসব লোককে বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে আত্মীয়তার ভালবাসা অবশ্যই চাই। যে কল্যাণ উপার্জন করবে আমি তার জন্য তার সেই কল্যাণের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দিব। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড় ক্ষমাশীল ও নেক কাজের মর্যাদাদাতা।&#8221; (সূরা শুরা: ২৩)</p>
<p>৭. &#8220;আমি মানুষ এই মর্মে নির্দেশনা দিয়েছি যে, তারা যেন পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলো এবং কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছিলো। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান করাতে ত্রিশ মাস লেগেছে। এমন কি যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছেছে এবং তারপর চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয়েছে তখন বলেছেঃ “হে আমার রব, তুমি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে যে-সব নিয়ামত দান করেছো আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর এমন সৎ কাজ করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ করো। আমার সন্তানদেরকে সৎ বানিয়ে আমাকে সুখ দাও। আমি তোমার কাছে তওবা করছি। আমি নির্দেশের অনুগত (মুসলিম) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।&#8221; (সূরা আহকাফ: ১৫)</p>
<p>৮. &#8220;হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোনো গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।&#8221; (সূরা হুজুরাত: ৬)</p>
<p>৯. &#8220;ঈমানদারদের মধ্যকার দু’টি দল যদি পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। তারপরও যদি দু’টি দলের কোন একটি অপরটির বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে তবে যে দল বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করো। যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। এরপর যদি তারা ফিরে আসে তাহলে তাদের মাঝে ন্যায় বিচারের সাথে মীমাংসা করিয়ে দাও এবং ইনসাফ করো। আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবানী করা হবে।&#8221; (সূরা হুজুরাত: ৯-১০)</p>
<p>১০. &#8220;হে ঈমানদাগণ, বেশী ধারণা ও অনুমান করা থেকে বিরত থাকো কারণ কোনো কোনো ধারণা ও অনুমান গোনাহ। দোষ অন্বেষণ করো না। আর তোমাদের কেউ যেন কারো গিবত না করে। এমন কেউ কি তোমাদের মধ্যে আছে, যে তার নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? দেখো, তা খেতে তোমাদের ঘৃণা হয়। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ অধিক পরিমাণে তওবা কবুলকারী এবং দয়ালু।&#8221; (সূরা হুজুরাত: ১২)</p>
<p>১১. &#8220;মনমরা হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।&#8221; (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৯)</p>
<p>১২. &#8220;হে পুত্র! নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের হুকুম দাও, খারাপ কাজে নিষেধ করো এবং যা কিছু বিপদই আসুক সে জন্য সবর করো। একথাগুলোর জন্য বড়ই তাকিদ করা হয়েছে। আর মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কথা বলো না, পৃথিবীর বুকে চলো না উদ্ধত ভঙ্গিতে, আল্লাহ পছন্দ করেন না আত্মম্ভরি ও অহংকারীকে। নিজের চলনে ভারসাম্য আনো এবং নিজের আওয়াজ নীচু করো। সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে গাধার আওয়াজ।&#8221; (সূরা লোকমান: ১৭-১৯)</p>
<p>১৩. &#8220;আমি তাওরাত নাযিল করেছি। তাতে ছিল পথনির্দেশ ও আলো। সমস্ত নবী, যারা মুসলিম ছিল, সে অনুযায়ী এ ইহুদী হয়ে যাওয়া লোকদের যাবতীয় বিষয়ের ফায়সালা করতো। আর এভাবে রব্বানী ও আহবারও (এরই ওপর তাদের ফায়সালার ভিত্তি স্থাপন করতো)। কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এবং তারা ছিল এর ওপর সাক্ষী। কাজেই (হে ইহুদী গোষ্ঠী।) তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো। আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।&#8221; (সূরা মায়েদা: ৪৪)</p>
<p>১৪. &#8220;তোমরা অন্যদের সৎকর্মশীলতার পথ অবলম্বন করতে বলো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে যাও। অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করে থাকো। তোমরা কি জ্ঞান বুদ্ধি একটুও কাজে লাগাও না?&#8221; (সূরা বাকারা: ৪৪)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> মহাগ্রন্থ আল কোরআন সুদ এবং যারা সুদি কারবার করে তাদেরকে এমনভাবে নিন্দা জানায় যার দৃষ্টান্ত অন্য কোনো কিতাবে কিংবা কোরআনের আগে পরে রচিত কোনো আইনের গ্রন্থে দেখা যায় না। কোরআন এমন এক সমাজের ধারণা তুলে ধরে, যে সমাজের মূল ভিত্তি হবে আখলাক ও ইহসান, এই জন্য এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোরআন উচ্চকণ্ঠ হতে বাধ্য হয়। কোরআন সুদকে এবং সকল ধরণের সুদি কারবারকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং যারা বৈধ পথে উপার্জন করে তাদের পক্ষাবলম্বন করে থাকে।</strong> কোরআন শুধুমাত্র এর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে নি, একইসাথে সকল ধরনের শোষণ, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অন্যায়ভাবে উপার্জন করে যারা জীবন নির্বাহ করে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করে।</p>
<p>১. &#8220;কিন্তু যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এই অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে: ব্যবসা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। কাজেই যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌঁছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুদখোরি থেকে সে বিরত হয়, সে ক্ষেত্রে যা কিছু সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই এবং এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে। আর এই নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত ও বিকশিত করেন। আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞ দুষ্কৃতিকারীকে পছন্দ করেন না। অবশ্যই যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, নামাজ কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের প্রতিদান নিঃসন্দেহে তাদের রবের কাছে আছে এবং তাদের কোন ভয় ও মর্মজ্বালাও নেই। হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং লোকদের কাছে তোমাদের যে সুদ বাকি রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও, যদি যথার্থই তোমরা ঈমান এনে থাকো। কিন্তু যদি তোমরা এমনটি না করো তাহলে জেনে রাখো, এটা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এখনো তওবা করে নাও (এবং সুদ ছেড়ে দাও) তাহলে তোমরা আসল মূলধনের অধিকারী হবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপর জুলুম করাও হবে না।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৭৫-২৭৯)</p>
<p>২. &#8220;যে সুদ তোমরা দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের সম্পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তা বাড়ে না। আর যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকো, তা প্রদানকারী আসলে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করে।&#8221; (সূরা রূম: ৩৯)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>➤</strong><strong> সবশেষে, কেউ কেউ বিভিন্ন দলিলের উপর ভিত্তি করে জিহাদকে ইসলামের ষষ্ঠ রুকন বলে উল্লেখ করেছেন। আমিও তাদের এই মতকে সমর্থন করি। কারণ জিহাদবিহীন ইবাদত ও তাবলীগ রিয়া ছাড়া অন্যকিছু নয়। জিহাদ এবং শুধুমাত্র জিহাদের জযবাই পারে আমাদেরকে সত্যিকারের মুসলিম বানাতে।</strong></p>
<p>১. “আর তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না। কারণ যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা: ১৯০)</p>
<p>২. “আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না। অনুগ্রহ প্রদর্শনের পথ অবলম্বন করো, কেননা আল্লাহ অনুগ্রহ প্রদর্শনকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)</p>
<p>৩. তোমাদের যুদ্ধ করার হুকুম দেয়া হয়েছে এবং তা তোমাদের কাছে অপ্রীতিকর। হতে পারে কোনো জিনিস তোমরা পছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য খারাপ। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। (সূরা বাকারা: ২১৬)</p>
<p>৪. “তারপর তালুত যখন সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললো, সে বললোঃ “আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নদীতে তোমাদের পরীক্ষা হবে। যে তার পানি পান করবে সে আমার সহযোগী নয়। একমাত্র সে-ই আমার সহযোগী যে তার পানি থেকে নিজের পিপাসা নিবৃত্ত করবে না। তবে এক আধ আঁজলা কেউ পান করতে চাইলে করতে পারে। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ছাড়া বাকি সবাই সেই নদীর পানি আকণ্ঠ পান করলো। অতঃপর তালুত ও তার সাথী মুসলমানরা যখন নদী পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো তখন তারা তালুতকে বলে দিল, আজ জালুত ও তার সেনাদলের মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু যারা একথা মনে করছিল যে, তাদের একদিন আল্লাহর সাথে মোলাকাত হবে, তারা বললোঃ “অনেকবারই দেখা গেছে, স্বল্প সংখ্যক লোকের একটি দল আল্লাহর হুকুমে একটি বিরাট দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে। আল্লাহ সবরকারীদের সাথী।” (সূরা বাকারা: ২৪৯)</p>
<p>৫. “অবশেষে আল্লাহর হুকুমে তারা কাফেরদের পরাজিত করলো। আর দাউদ জালুতকে হত্যা করলো এবং আল্লাহ তাকে রাজ্য ও প্রজ্ঞা দান করলেন আর এই সাথে যা যা তিনি চাইলেন তাকে শিখিয়ে দিলেন। এভাবে আল্লাহ যদি মানুষদের একটি দলের সাহায্যে আর একটি দলকে দমন না করতে থাকতেন, তাহলে পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হতো। কিন্তু দুনিয়াবাসীদের ওপর আল্লাহর অপার করুণা (যে, তিনি এভাবে বিপর্যয় রোধের ব্যবস্থা করতেন)।” (সূরা বাকারা: ২৫১)</p>
<p>৬. “হে ঈমানদারগণ! এ আহলে কিতাবদের অধিকাংশ আলেম ও দরবেশের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা মানুষের ধন- সম্পদ অন্যায় পদ্ধতিতে খায়, এবং তাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে। যারা সোনা রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যন্ত্রণাময় আযাবের সুখবর দাও।” (সূরা তওবা: ৩৪)</p>
<p>৭. “তোমাদের ওপর যখন বিপদ এসে পড়লো তোমরা বলতে লাগলে, এ আবার কোথায় থেকে এলো? তোমাদের এ অবস্থা কেন? অথচ (বদরের যুদ্ধে) এর দ্বিগুণ বিপদ তোমাদের মাধ্যমে তোমাদের বিরোধী পক্ষের ওপর পড়েছিল। হে নবী! ওদের বলে দাও, তোমরা নিজেরাই এ বিপদ এনেছো। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের ওপর শক্তিমান।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৬৫)</p>
<p>৮. “হে ঈমানদানগণ! সবরের পথ অবলম্বন করো, বাতিলপন্থীদের মোকাবলায় দৃঢ়তা দেখাও, হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে।” (সূরা আলে-ইমরান: ২০০)</p>
<p>৯. “হে ঈমানদারগণ! মোকাবিলা করার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো। তারপর সুযোগ পেলে পৃথক পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বের হয়ে পড়ো অথবা একসাথে।” (সূরা নিসা: ৭১)</p>
<p>১০. “যে-সব মুসলমান কোন প্রকার অক্ষমতা ছাড়াই ঘরে বসে থাকে আর যারা ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তাদের উভয়ের মর্যাদা সমান নয়। যারা ঘরে বসে থাকে তাদের তুলনায় জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বুলন্দ করেছেন। যদিও সবার জন্য আল্লাহ কল্যাণ ও নেকীর ওয়াদা করেছেন তবুও তাঁর কাছে মুজাহিদদের কাজের বিনেময়ে বসে থাকা লোকেদের তুলনায় অনেক বেশী।” (সূরা নিসা: ৯৫)</p>
<p>এখন আমি বিশেষ একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেই বিষয়টি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান। দ্বীনের বিষয় আসলে আমরা সাধারণত মানুষকে দুইভাগে বিভক্ত করে থাকি: মু’মিন (বিশ্বাসী) ও কাফির (অবিশ্বাসী)। যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব যে, এই ধরনের বিভাজন করলে খুবই সরলীকরণ হয়ে যায়। এই দুই ধরনের মানুষ ছাড়াও সমাজে তৃতীয় একটি দল রয়েছে, আমরা অনেক সময় তাদেরকে উল্লেখ করতে ভুলে যাই। এই তৃতীয় দলটি হলো এমন দল যারা নিজেদেরকে বিশ্বাসী (মুমিন) দাবি করে এবং বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা এমন নয়। এরা কম হোক কিংবা বেশি হোক আল্লাহর ইবাদত করে, ঈদ উদযাপন করে, দ্বীনের নির্দিষ্ট কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করে। কিন্তু তারা ভয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করে, ব্যবসার ক্ষেত্রে মানুষকে প্রতারিত করে, অন্যের উপর ভর করে নিজের জীবন পরিচালনা করে, মদ পান করে, হারামভাবে জীবনকে উপভোগ করে এবং যেন এক হাজার বছর বেঁচে থাকবে এমনভাবে জীবন, সম্পদ ও পদপদবীকে ভয়ের সাথে রক্ষা করে অথবা শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানদের চাটুকারী করে। এই ধরণের মানুষদের অভিন্ন ও সুস্পষ্ট একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে &#8211; ‘ভয়’। আর এই ভয় তাদের জীবনের জন্য, তাদের সম্পদের জন্য এবং তাদের পদ-পদবীর জন্য। তাদের জীবন যেন ভয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে থাকে। তাদের সকল প্রচেষ্টা হয়ে থাকে শক্তিশালী গোষ্ঠীর কিংবা সরকারের সমর্থন অর্জন করার জন্য।</p>
<p>আর তাদের এত সকল ভয়ের মধ্যে একটি ভয়ের ঘাটতি রয়েছে আর সেটি হলো &#8211; “আল্লাহর ভয়”। তারা তাদের এই রুহ এবং অনির্ধারিত দ্বিমুখী একটি পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলে থাকে। তবে আমরা যদি এই তৃতীয় দলটির অস্তিত্বকে বিবেচনায় ধরি তাহলে দুনিয়ার অনেক কিছুকে অনেক সহজভাবে বুঝতে পারব। ‘কী হচ্ছে’, এর সাথে ‘কেন হচ্ছে’ সেটাও আমরা বুঝতে পারব।</p>
<p>বর্তমান মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দ্বীনের সত্যিকারের অনুসারীর সংখ্যা খুবই কম, তবে মৌখিকভাবে দ্বীনের স্বীকৃতিদানকারীদের সংখ্যা অনেক। দ্বীনের জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গকারীদের সংখ্যা খুবই কম, তবে দ্বীনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারকারীদের সংখ্যা অনেক। এরা দ্বীনকে শর্তহীনভাবে সামনে নিয়ে আসে, তবে ঐ একই দ্বীনের চাওয়াকে ব্যক্তিগত জীবনে খুব কমই বাস্তবায়ন করে। এই প্যারাডক্স এবং বাহ্যিকতা ও অভ্যন্তরের মধ্যকার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য খুবই সহায়ক।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোরআনের যে অবস্থান, তা আজকের অবস্থাকে খুব করুণভাবে তুলে ধরেছে। আজ মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের ঘরে গিয়ে দেখবেন কোরআনকে সবচেয়ে উঁচু স্থানে তুলে রাখা হয়েছে। কোরআনকে সবচেয়ে ভালো উপহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কোরআন ছাপার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মানুষ এখনো কোরআনের আয়াত দিয়ে সুন্দর সুন্দর ক্যালিগ্রাফি অঙ্কন করে এবং এর পৃষ্ঠা সমূহকে চাকচিক্য করে তুলে ধরার জন্য প্রতিযোগিতা করে।</p>
<p>শিশুরাও সর্বপ্রথম যে বইটি পড়তে শেখে সেটি হলো কোরআন। কিন্তু তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ এর মধ্যে আসলেই কী লেখা আছে, সেটা না জেনে এবং সেটার গুরুত্ব না বুঝেই বড় হবে ও জীবন যাপন করবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কোরআন হলো অনেক বড় একটি شعائر (সিম্বল)। কিন্তু বর্তমানে কুরআনকে এই শায়ায়ীর বা নিদর্শনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখে জীবন পাথেয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।</p>
<p>একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, কোরআন বুঝে পড়ার চেয়ে সুন্দর সুরে কোরআন পড়াকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আবার সুর দেওয়ার ক্ষেত্রেও আরব হোক কিংবা অনারব হোক, কেহই কোরআনের মৌলিক অর্থে উপনীত হতে পারছে না। এছাড়াও কোরআনের রয়েছে অনুপম এক সুরের দ্যোতনা। কখনো আদেশ দানকারী ও নিশ্চিত অর্থবোধক, আবার কখনো মিষ্টিভাবে সতর্ককারী ও দাওয়াতদানকারী এবং উচ্চস্বরে সতর্ককারী। কিন্তু যারা সুন্দর সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত করেন, তারা কি এসব বিষয় খেয়াল রাখেন?</p>
<p><strong>দ্বীন আরাম আয়েশের জন্য নয়। দ্বীন হলো একটি আহ্বান, একটি দায়িত্ব, একটি আবেদন। সত্যিকারের ঈমানদ্বার ও জযবাধারী একটি প্রজন্ম, জযবা ও চেতনাহীনভাবে দ্বীনকে ধারণাকারী একটি প্রজন্ম থেকে অনেক কিছু করতে সক্ষম। বিগত ১৪০০ বছর ধরে ইসলামের মধ্যে যে সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং যে আখলাক দেখতে পাচ্ছি, এটা শুরুর দিকের ৩ টি মুসলিম প্রজন্ম কর্তৃক তৈরিকৃত। ১৪০০ বছর আগে সেই তিনটি প্রজন্ম যা কিছু করেছেন মুসলিম উম্মাহ আজও সেটার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরবর্তীতে যারাই এসেছে তারা সকলেই এই তিন প্রজন্মকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তাদের নিকট থেকে প্রেরণা নিয়েছেন।</strong></p>
<blockquote><p>এই কারণে মুসলিম দেশসমূহে ভবিষ্যতে যে সকল বিপ্লব হবে তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম হবে দ্বীনি বিপ্লব। মানুষের রুহ এবং কলবের মধ্যে সংগঠিত হওয়া এই বিপ্লব অনেক মুজিযার জন্ম দিবে। আজকে যে সকল বিষয়কে অসম্ভব ও অকল্পনীয় মনে হচ্ছে সেই সকল কিছু অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে এই অদৃশ্য বিপ্লবের বদৌলতে। রুহ ও কালবের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই বিপ্লবের বদৌলতে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে, শোষক ও দখলদারদেরকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করবে, অভাব, কুসংস্কার, আদালতহীনতা, জুলুম ও মূর্খতা বিদায় নিবে। আমাদের শহর ও গ্রামগুলো হবে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি &#8211; এমন অনেক ক্ষেত্রে এমন এমন কাজ হবে, যেটার বদৌলতে মানুষ দেখতে পাবে এক নব সংস্কৃতি ও নব দিগন্ত।</p>
<p><span style="font-size: 16px;">হে আল্লাহ, তুমি সকল মুসমানদেরকে এবং সকল মানুষকে ঈমান দান করো। আমিন।</span></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>(সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/mamunmuzahid123/"><strong>বুরহান উদ্দিন আজাদ</strong></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/tafaqqur-on-the-occasion-of-1400-years-of-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13036</post-id>	</item>
		<item>
		<title>&#8216;উন্নত কৃষি&#8217; ইসলামী সভ্যতার অনন্য উপহার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/advanced-agriculture-a-gift-towards-the-mankind/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/advanced-agriculture-a-gift-towards-the-mankind/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 06 Jun 2023 12:08:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7801</guid>

					<description><![CDATA[কৃষিতে অসামান্য উন্নয়নের মাধ্যমে হোক কিংবা আরবীতে লেখা কৃষিকাজের নির্দেশনামূলক বিরাট গ্রন্থের উপর নির্ভর করেই হোক, ইসলামি কৃষি সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিকতার ইতিহাসবিদদের নিকট ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। Dr. Jaser Abu Safieh এর লেখা আরবী থেকে অনুদিত এ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>কৃষিতে অসামান্য উন্নয়নের মাধ্যমে হোক কিংবা আরবীতে লেখা কৃষিকাজের নির্দেশনামূলক বিরাট গ্রন্থের উপর নির্ভর করেই হোক, ইসলামি কৃষি সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিকতার ইতিহাসবিদদের নিকট ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। <strong>Dr. Jaser Abu Safieh</strong> এর লেখা আরবী থেকে অনুদিত এ প্রবন্ধটিতে ইসলামী কৃষি ঐতিহ্যের কিছু লক্ষণীয় দিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং কৃষি কিভাবে ইসলামী সমাজ সংস্কৃতির সাথে জড়িত হয়ে গিয়েছিল তাও দেখানো হয়েছে। কৃষিপন্য উৎপাদনে এর বৈপ্লবিক অর্জনগুলো উল্লেখ করে আরো বলা হয়েছে, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর আগ্রহ, ভাষাগত ধরণ, ঔষধ হিসেবে উদ্ভিদের ব্যবহার, এমনকি কৃষি বিজ্ঞানের উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।</p>
<p><strong>ভূমিকা </strong></p>
<p>ইসলাম সূচনালগ্ন থেকেই কৃষি কাজকে উৎসাহিত করে আসছে। সৃষ্টি প্রক্রিয়া ও পৃথিবীর প্রাণের সাথে সম্পর্কিত কোরআনে কতিপয় আয়াত আছে যা কৃষির সাথেও সম্পর্কযুক্ত । আবার কৃষি কাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে এমন হাদিসের সংখ্যাও প্রচুর। এজন্য মুসলিম শাসকেরাও কৃষিতে বিশেষভাবে মনোযোগী ছিলেন আর এটিই  ছিলো তখনকার অর্থনৈতিক কাজের প্রধান অংশ এবং ইসলামী অর্থনীতির স্তম্ভ। তাই, চাষের জন্য ভূমি পূনর্গঠন, নদী ও খাল খনন করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যেখানেই উপযুক্ত জমি পাওয়া যেতো, কারো জমি না থাকলে সেখানে তাদেরকে চাষ করার সুযোগ দেওয়া হতো। এটি একটি নজিরবিহীন ইতিহাসে পরিণত হয়।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7802" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি১.png" alt="" width="695" height="445" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি১.png 695w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি১-300x192.png 300w" sizes="(max-width: 695px) 100vw, 695px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ১: ইবনে আল-আওয়ামের <em>‘‘কিতাব আল-ফিলাহা’’</em> এর দুটি ছবি দেওয়া হয়েছে। আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-আওয়াম আল-ইশবিলি-এর লেখা<em> ‘‘কিতাব আল-ফিলাহা আল-আন্দালুসিয়া’’</em> (আন্দালুসিয়ান কৃষি গ্রন্থ)। ৩৫টি অধ্যায় সম্বলিত এই গ্রন্থে কৃষি, গৃহপালিত পশু ও পাখি পালন, মৌমাছি পালন এবং ৫৮৫ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৫০ এর বেশি ফল চাষ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মাটি, সার, গাছ কলম করা ও উদ্ভিদের রোগ নিয়েও মূল্যবান আলোচনা রয়েছে।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এর পাশাপাশি, কৃষিকে পৃথিবীতে মানব বসতি গড়ে ওঠার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হতো। কারণ যখনই মানুষ জমিতে লাঙ্গল চাষ, বীজ বপন ও ফসলের যত্ন নেওয়া শুরু করল, তখনই তারা যাযাবরের জীবন ছেড়ে বসতি গড়তে বাধ্য হয়। হয়তো এজন্যই উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তাঁর সৈন্যদেরকে অন্যদেশে কৃষি কাজকে পেশা হিসেবে নিতে প্রথমে নিষেধ করেছিলেন, যাতে তারা সংগ্রামের জীবন ছেড়ে বিশ্রাম ও শান্ত জীবনধারায় অভ্যস্ত না হয়ে যায়। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি তাঁর সৈন্যদের অন্যদেশেও কৃষি কাজের অনুমতি দিয়েছিলেন। এ প্রবন্ধে ইসলামী ইতিহাসে উদ্ভিদের প্রতি আগ্রহের তিনটি দিকের ওপর মূলত আলোকপাত করা হবেঃ ভাষা সংক্রান্ত দিক, চিকিৎসাশাস্ত্রে উদ্ভিজ্জ পন্যের ব্যবহার ও কৃষি বিজ্ঞানের বিকাশ।</p>
<p><strong>ভাষাবিদ্যা এবং চিকিৎসায় কৃষি ও উদ্ভিদ</strong></p>
<p>ভাষাবিদগণ  বিভিন্ন উদ্ভিদ সংগ্রহ করে, সেগুলোর নাম ও কৃষি সংক্রান্ত পারিভাষিক শব্দ সংগ্রহের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেন। এই প্রচেষ্টার ফলে তাদের শব্দভান্ডার ব্যাপক সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যার প্রতিফলন বেশ কিছু বিশেষ অভিধানে পাওয়া যায়। যেমন, ইবনে সিদাহ-এর <em>&#8216;আল মুখাসসাস&#8217;</em>। এসকল ভাষাগত প্রবন্ধ অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ব্যাপক তথ্য সম্বলিত। বিশেষ করে এসব প্রবন্ধে উল্লেখিত বর্তমান সময়ের Plant Anatomy Science সম্পর্কিত বিষয়ে লেখাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে যে কেউই অবাক হবেন।</p>
<p>এ সকল প্রবন্ধে উদ্ভিদের সকল পর্যায়ের বিকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত সঠিক বিবরণ লেখা হয়েছে। এ বিষয়গুলো যে যথোপযুক্ত ছিলো, তার প্রমাণ হিসেবে নিচে উল্লেখিত <em>আল মুখাসসাস</em> গ্রন্থের প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারিঃ</p>
<p>‘‘একটি তাল গাছের বীজ রোপন করা হলে, যখন এটি বড় হতে শুরু করে, তখন এর প্রথম পর্যায়কে বলা হয় ‘আল নাকিরা’। ভাষাবিদ আবু জাইদ ব্যাখ্যা করেন, ‘আল নাকিরা’ হলো বীজের পেছনে থাকা একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র, যা থেকে তাল গাছটির চারা গজায়। এর পরের পর্যায় হলো হার্প (Herp/নাজিমা), এরপর কাঁটা, এরপর প্লেইটওয়ার্ক (Plaitwork) এবং এরপর আরও ধাপ আছে। এভাবে যখন পাম গাছটি একটি বৃক্ষে পরিণত হয় তখন তাকে মাদুর (আল ফার্শ) বলা হয়, যখন পাম গাছের প্লেইটওয়ার্ক গুলো সংখ্যায় বেড়ে আরো চওড়া হয়ে যায় তখন তাকে শার্প (Sharp/আল সাফিফি) বলা হয়, এরপর স্ট্রাইপ (Stripe/আসিব), এরপর রস (আল নাসিঘা) এবং শেষ পর্যায়কে প্রনশিয়াল (Pronchial/শাইব) বলা হয়।’’</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7803" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি২.png" alt="" width="433" height="672" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি২.png 433w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি২-193x300.png 193w" sizes="(max-width: 433px) 100vw, 433px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ০২: ইবনে লুয়ুন এর করা কৃষি চুক্তির দলিল (৭৪০ হিজরী/১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দ)]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>চিকিৎসাশাস্ত্রের ক্ষেত্রে মুসলিমগণ উদ্ভিদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদ সংরক্ষণ করার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন। উমর আল-আনতাকি বন্য থাইম (এক প্রকার সুগন্ধিপাতাযুক্ত গাছ) সম্পর্কে বলেছেনঃ</p>
<p>‘‘চিকন পাতার এক প্রকার বন্য থাইম আছে যা প্রায় কালো রঙের। এর আরেক প্রজাতি আছে যাকে ‘‘গাধা বা পাহাড়ি থাইম’’ বলে যার পাতাগুলো তুলনামূলক চওড়া এবং স্বাদ একটু কম তেতো হয়। বাগানের থাইম গাছ পুদিনাপাতার গাছের মতো করে লাগানো হয়। এটি শূল রোগ ও প্রায় সকল বিষের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এটি সকল খাবারে সুন্দর স্বাদ আনে ও রক্ত পরিশোধন করে।’’</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষিতে ইসলামী ঐতিহ্যের দিক সমূহ</strong></p>
<p>ইসলামী কৃষি ঐতিহ্যের কেন্দ্রকে বৃহদার্থে বলা যায়<em> ‘‘যিরা’আত আল-আরদ’’</em> (ভূমি চাষ)। এটি হলো এই গবেষণার প্রধান বিষয়। এখানে ইবনে আল-‘আওয়াম-এর কথা উল্লেখ করা বেশি উপযুক্ত হবে, যেহেতু তিনি এই ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেনঃ</p>
<p>‘‘জমি চাষ করা বলতে বুঝায় কোন জমিকে প্রস্তুত করা, তাতে গাছ লাগানো, শস্য ফলানো, সেগুলোর যত্ন নেওয়া, এর পাশাপাশি উর্বর, অর্ধ উর্বর ও অনুর্বর ভূমি সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখা। এছাড়াও, কোন জমিতে কোন ধরনের গাছ লাগানো যাবে, প্রত্যেক গাছের জন্য কোন ধরনের পানি, কীটনাশক ও সার কোন সময়ে কত পরিমাণে দেয়া উপযুক্ত ও জরুরি এবং কিভাবে খাদ্যশস্য মজুদ করতে হবে এসকল জ্ঞানও এর অন্তর্ভুক্ত।’’</p>
<p>এই বিস্তর কৃষি জগৎ নিয়ে আরো বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ প্রবন্ধটিতে এর কিছু সংক্ষিপ্ত রূপরেখা প্রদান করবো মাত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অভিধান সংকলনে মাটি</strong></p>
<p>আন্দালুসিয়ান স্কলার ইবনে আল-‘আওয়াম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ <em>‘কিতাব আল-ফিলাহা ’</em> এ বলেন:</p>
<p>‘‘কৃষিকাজের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রথমেই জানতে হবে তা হলো মাটি, অর্থাৎ মাটি উর্বর বা ব্যবহারের উপযোগী কিনা। যে এ সম্পর্কে না জানবে, সে কৃষিকাজে সফল হতে পারবে না।’’ এই উক্তিটি থেকে এ কথা পরিষ্কার হয় যে একজন কৃষিবিদের মাটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। অর্থাৎ মাটির প্রকৃতি, ধরন, কোন গাছ কোন ধরনের মাটিতে লাগাতে হবে, মাটির শীতলতা, তাপ, আর্দ্রতা, শুষ্কতার মাত্রা এবং উদ্ভিদের ওপর এ সবগুলো ব্যাপারে প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।</p>
<p>মাটির প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মাটিকে আলোচ্য উপায়ে তালিকাভুক্ত করা যায়:  নরম মাটি, শক্ত মাটি, পাহাড়ি মাটি, বেলে মাটি, কালো মাটি, সাদা মাটি, হলদে মাটি, লাল মাটি, রুক্ষ মাটি এবং লালচে মাটি।</p>
<p>অন্য আরও বিষয়ের পাশাপাশি গাছ পঁচার কারণ সম্পর্কেও জ্ঞানার্জন করা উচিৎ, যা মাটির শ্রেণীবিন্যাসের সাথে সম্পর্কিত। এজন্য মাটি পরিবর্তন করা উচিৎ, যে পরামর্শ বর্তমানের কৃষিবিদগণ দেন। এছাড়া শোভা বর্ধক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রতি ছয় মাস অন্তর মাটি পরিবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>সেচ বিজ্ঞান</strong></p>
<p>মুসলিমরা যে সকল সেচের পদ্ধতি ব্যবহার করতেন তার মধ্যে কিছু ছিল খুবই সাদামাঠা, আবার কিছু ছিল বেশ জটিল। এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে ছিল দেশ ভেদে ভিন্নতা। আল-সাম্মান (এক বিখ্যাত পানির উৎস) সম্পর্কে ইতিহাসবিদ আল-হামদানি বলেছিলেন:</p>
<p>‘‘সেখানে পানি এতই গভীর ছিল যে ৭০ থেকে ১০০ ‘বা’ (৪ বা সমান ৩মিটার) পর্যন্ত গভীরতা ছিল। আবার পানি মজুদ করার জন্য শক্ত পাথর বেষ্টিত কৃত্রিম কূপ ও ছোট ঝিলও ছিল।’’</p>
<p>খুমারাওয়াইহ-এর সেচ প্রকৌশলগণ এক অদ্ভুত সেচ প্রক্রিয়ার নকশা করেছিলেন। তারা সোনার ন্যায় পিতল দ্বারা গাছের কান্ড আবৃত করতো। এই পিতলের আবরণ ও কান্ডের মাঝে সীসার তৈরি ছোট নল থাকতো যা দিয়ে পানি নির্গত হতো। এভাবে পুরো বাগানে পানি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হতো।</p>
<p>ভূগোলবিদ আল-ইস্তাখরি তার গ্রন্থ ‘আল-মাসালিক ওয়া-ই-মামালিক’ (রাস্তা ও রাজ্য)-এ বলেছেন:</p>
<p>‘‘মার্ভে (বর্তমান খোরাসান, ইরান) ১০,০০০ কর্মী বিশিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।’’</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7805" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৩.png" alt="" width="452" height="660" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৩.png 452w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৩-205x300.png 205w" sizes="(max-width: 452px) 100vw, 452px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৩: ‘কানজ আল-ফাওয়াইদ ফি তানভি আল-মাওয়া’ইদ’(মধ্যযুগীয় আরব-ইসলামী রন্ধন শিল্প) এটি একটি অজ্ঞাতনামা মধ্যযুগীয় আরবী ভাষায় লিখিত রান্নার বই। সম্ভবত মামলুক আমলের (১২৫০-১৫১৭) কোনো এক সময় সংকলিত। বইটিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার, মিষ্টি, পানীয়, ওষুধ ইত্যাদি তৈরির ৮০০ টিরও বেশি রেসিপি রয়েছে যার সাথে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পরামর্শও সংযুক্ত করা হয়ে হয়েছে।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত সেচের ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতিগুলো এতটাই কার্যকর ছিল যে এত সময় পরে এসেও বেশ কিছু পদ্ধতি এখনো বিদ্যমান আছে। বর্তমান স্পেনের আন্দালুসিয়ার কিছু অঞ্চলে এখনো সে সময়ের কিছু পদ্ধতি প্রচলিত আছে। আজও ভ্যালেনশিয়ার ওয়াটার কোর্টে প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক সেশন হয়, যেমনটি ইসলামী শাসনামলে হতো।</p>
<p>ইরাকের সামাররা- এর নিকটবর্তী আল-নাহরাওয়ান নদীর তীরে অবস্থিত ফৌখারা গেটে কিছু গাঠনিক নলাকার বস্তু পাওয়া যায় যা মুসলমানদের উন্নত সেচ প্রকৌশল বিজ্ঞানের প্রমাণ দেয়। একজন স্কলার এই বস্তুগুলো বিশ্লেষণ করে জানান যে, এগুলো বিশুদ্ধ কাদা মাটির তৈরি এবং এগুলোকে প্রাথমিকভাবে ১০৫০° সেলসিয়াসে গলানো হলে ক্ষয়রোধী বস্তুতে পরিণত হয়।</p>
<p>প্রত্যেকটি কৃষি বইতে পানির প্রকারভেদ এবং কোন ধরনের পানি কত পরিমাণে বিভিন্ন গাছের জন্য উপযোগী সে সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়। কিভাবে ও কি কি পরীক্ষণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি খুঁজে পাওয়া যায়, কোন ক্ষেত্রে পানি পাওয়ার জন্য মাটিতে ছিদ্র করতে হয় এসব সম্পর্কেও বিষদ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।</p>
<p>আরব বিজ্ঞানীগণ বুদবুদ ফোয়ারা থেকে সীসার নলের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা মাটির গভীরতা মেপে মাটির পৃষ্ঠের নিচ দিয়ে সেচ খাল খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা নদীর পানির স্তর মাপার যন্ত্রেরও উদ্ভাবন করেছিলেন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>সার</strong></p>
<p>ইবনে আল-হাজ্জাজ বলেন: ‘‘তোমাদের জানা প্রয়োজন যে, মাটিতে যদি সার না দেওয়া হয় তবে তা দূর্বল হয়ে যায় আবার যদি অতিরিক্ত দেয়া হয় তবে তা পুড়ে যায়।’’ এ তত্ত্বটি একটি দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচক্ষণ চিন্তার দিকে ইঙ্গিত করে। সময়ের সাথে সাথে উদ্ভিদ তার মাটিতে মজুদকৃত সব খাদ্য নিঃশেষ করে ফেলে এবং এই ঘাটতি মেটানোর প্রয়োজন কিন্তু তাই বলে অতিরিক্ত পরিমানে সার দেওয়া যাবে না। এজন্য কৃষিবিদগণ সার দেয়ার নির্দেশনাবলী যথাযথভাবে অনুসরণ করতে বলেন।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7804" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৪.png" alt="" width="588" height="714" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৪.png 588w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৪-247x300.png 247w" sizes="(max-width: 588px) 100vw, 588px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৪: আরবী ভাষায় প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি পান্ডুলিপিতে অঙ্কিত আখ গাছের চিত্র।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইবনে বাসসাল, ইবনে হাজ্জাজ ও ইবনে আল-‘আওয়াম সারের প্রকারভেদ এবং কোন ধরনের মাটি ও উদ্ভিদের জন্য কোন ধরনের সার উপযোগী তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা মাটিতে গাছের পাতা ও জৈবসারের ব্যবহার সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। ইবনে বাসসাল তাঁর পর্যবেক্ষণকে তিনভাগে ভাগ করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল শুধুমাত্র ঘাস, খড় ও ছাইয়ের মিশ্রন একটি গর্তে দিয়ে তাতে পানি দিয়ে পঁচানোর জন্য রেখে দেওয়া। সারের ব্যবহার উদ্ভিদ ও মাটির বিকাশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। ইবনে বাসসাল বলেন, মিষ্টি কুমড়া গাছ প্রথমে সারের পাত্রে লাগাতে হয়, এরপর গাছটি পোক্ত হয়ে গেলে তাকে সাধারণ মাটিতে লাগাতে হয়।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>রোপন শিল্প</strong></p>
<p>এ কথা বলা অতিরিক্ত হবে না যে, পুরোনো আরবী গ্রন্থগুলোতে রোপন শিল্প নিয়ে যে নির্দেশনাবলী আছে তা আজও যৌক্তিক। এই গ্রন্থের লেখকগণ উদ্ভিদবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যার মূলনীতি চর্চা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই নির্দেশনাগুলোর সংকলন করেন। কোন মাটির জন্য কোন ধরনের উদ্ভিদ উপযুক্ত তা অধ্যয়ন করে সে অনুযায়ী তাঁরা মাটি প্রস্তুত করতেন।</p>
<p>ইবনে বাসসাল মিষ্টিকুমড়া রোপন সম্বন্ধে বলেন, ‘‘আল-আন্দালুসের মতো শীত প্রধান দেশগুলোতে মিষ্টি কুমড়া জানুয়ারি মাসে সারের পাত্রে লাগাতে হয়। এরপর এপ্রিল মাসে তা যথেষ্ট পোক্ত হলে স্থায়ী মাটিতে স্থানান্তর করতে হয়।’’</p>
<p>সার দিয়ে রোপনের ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দেন:</p>
<p>‘‘মাটিতে সার দিয়ে সমান করে নিয়ে ২০ সেন্টিমিটার অন্তর ছোট ছোট গর্ত করতে হবে। বীজের সরু প্রান্ত যেন উপরের দিকে মুখ করে থাকে এমনভাবে প্রতিটি গর্তে চার থেকে পাঁচটি করে বীজ দিতে হবে। বীজগুলোকে পাঁচ সেন্টিমিটার পুরু করে সার দিয়ে ঢেকে জায়গাটিতে বাঁধাকপির পাতা দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দিতে হবে। বাঁধাকপির পাতা কনডেন্সার (বাষ্পকে ঘনীভূত করে জলে রূপান্তরের ব্যবস্থা) হিসেবে কাজ করে। সার থেকে তাপ উপরে উঠার পর বাঁধাকপির পাতা দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ঘনীভূত হয় এবং পানি কনা রূপে আবার উদ্ভিদে ফিরে আসে যা সেচের মতো কাজ করে। যখন গাছটি বড় হয়ে যথেষ্ট পোক্ত হবে, তখন তাকে অবশেষে বেড়া দিয়ে ঘেরা জমিতে স্থানান্তর করতে হবে।’’</p>
<p>এই জটিল প্রক্রিয়া আমাদের আধুনিক ড্রিপ সেচ ও গ্রীনহাউজের কথা মনে করিয়ে দেয়।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7806" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৫.png" alt="" width="696" height="504" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৫.png 696w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৫-300x217.png 300w" sizes="(max-width: 696px) 100vw, 696px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৫: ১৫’শ শতাব্দীতে আরবী ভাষায় লেখা উদ্ভিদবিদ্যার ওপর পান্ডুলিপি যা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল গ্রন্থাগারে রয়েছে। এটি ১৯৪২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা রবার্ট গ্যারেট কালেকশন থেকে পাওয়া যায়।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী কৃষি ঐতিহ্যে রোপন শিল্পের অগ্রগতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা পালংশাকের মতো কিছু সবজি সারা বছর চাষ করতেন। ইবনে আল-ফাকিহ আল-হামদানি বলেন, ইরাকে যে কোন জাতের ফল বা সবজি সারা বছরই পাওয়া যেত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষি রোগ নিয়ে বিতর্ক</strong></p>
<p>আরবীয় কৃষি বিশেষজ্ঞগণ উদ্ভিদের রোগ পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী ছিলেন এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। এমনকি অভিধান সংকলক, ইবনে সিদাহ্ তাঁর লেখা <em>আল-মুখাসসাস</em> গ্রন্থে উদ্ভিদের সুস্থ বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণগুলো নিয়ে সম্পূর্ণ একটি অধ্যায় লিখেছেন। তিনি পাতার ক্ষয়রোগ, অন্যান্য উদ্ভিদ, তাল গাছ ও গাছের গুড়ির রোগ নিয়েও অধ্যায় লিখেছেন।</p>
<p>কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গাছের মালিকেরা গাছগুলোকে রোগ মুক্ত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। আরবী কৃষি বইগুলো পড়লে বোঝা যায় যে, তারা তাদের উদ্ভিদকে রক্ষা করতে কঠোরভাবে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। তবে কখনো কখনো তাদের এই পদ্ধতিগুলোর তত্ত্ব বা চর্চার সাথে কুসংস্কারও মিশ্রিত থাকতো।</p>
<p>উদাহরণ স্বরূপ, ইবনে বাসসাল দ্বারা বর্ণিত পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন: মিষ্টি কুমড়া গাছের গোড়ায় ছত্রাকের আক্রমণ হয়ে গাছ শুকিয়ে গেলে, এর চিকিৎসা হিসেবে রোগাক্রান্ত অংশটিকে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয় এই আশায় যে নতুন করে গাছটি গজাবে। আবার আল-হাজ্জাজ-এর লেখা থেকে আল-আওয়াম উদ্ধৃতি দেন:</p>
<p>‘‘যদি এমন কোনো গাছ দেখা যায়, যার উৎপাদন কম ও ডালপালা দূর্বল, ফল গুলোতে পোকা ধরেছে ও ফল পড়ে যাচ্ছে এবং বছরের পর বছর একই অবস্থা চলছে, তাহলে বুঝতে হবে, সে গাছের মাটি ঠিক নেই। এর চিকিৎসার জন্য গাছের মূল কান্ড থেকে ২.৫ মিটার দূরত্বে গাছের শেকড়ের চারপাশ দিয়ে মাটি খনন করে আগের মাটি সরিয়ে নিতে হবে। খননকৃত গর্তটি অন্য জায়গা থেকে নতুন মাটি এনে ভরাট করে তার ওপর ভারী কাঠের টুকরো দিয়ে চাপা দিতে হবে। যদি গাছের শেকড়গুলো প্রায় পঁচে গিয়ে থাকে তবে সেগুলো কেটে ফেলে দিয়ে প্রাকৃতিক সার দিতে হবে। আর যদি শেকড় কেঁচোর আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায় তবে সারের সাথে ছাই মিশিয়ে সেখানে দিতে হবে। যদি মাটি বেশি আর্দ্র মনে হয় তাহলে সারের সাথে শুষ্ক লাল মাটি বা সাগর (বা নদীর) বালু মিশ্রিত মাটি দিয়ে গর্তটি ভরাট করতে হবে।’’</p>
<p>ইবনে হাজ্জাজ এভাবে আরও রোগের সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করে তা মোকাবিলা করার উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এটিও উল্লেখ্য যে ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ পঁচা সার থেকে আসা কেঁচো ও কীট দমনে ছাইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>গাছের প্রাকৃতায়ন (Naturalization)</strong></p>
<p>গাছের প্রাকৃতায়ন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ গাছের বন্য প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে গৃহজাত করণের প্রক্রিয়া উদ্দেশ্যহীনভাবে তৈরি হয়নি। এই প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে নিয়ম মেনে তৈরি করা হয়েছিল। আমরা ইবনে বাসসালের প্রাকৃতায়নের ওপর লেখা ভূমিকা থেকে এটাই জানতে পারি। তিনি বলেন:</p>
<p>‘‘প্রাকৃতায়নের ওপর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন যেহেতু, এক্ষেত্রে অগণিত ব্যর্থতার নজির আছে। অন্যদিকে, এই প্রক্রিয়া যেহেতু গাছের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় তাই বেশ সুবিধাজনক। এটি করতে গাছের প্রকৃতি ও বয়স জানতে হবে এবং প্রাকৃতায়নের সঠিক সময় বাছাই করতে হবে।’’</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7807" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৬.png" alt="" width="540" height="751" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৬.png 540w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৬-216x300.png 216w" sizes="(max-width: 540px) 100vw, 540px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৬: আবদেল-গনি ইবনে ইসমাইল আল-নাবলুসি, একজন সিরিয়ান লেখকের লেখা কৃষি বিষয়ক বই ‘ইলম আল-মিলাহা ফি ‘ইলম আল-ফিলাহা’র সূচীপত্র।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলমান বিজ্ঞানীগণ শুধু প্রাকৃতায়নের নিয়ম, প্রকারভেদ ও কৌশল  সম্পর্কেই বলেননি, বরং যে সব গাছে সাধারণত প্রাকৃতায়ন হয় না সেগুলোরও প্রাকৃতায়ন করিয়ে দেখিয়েছেন। যেমন, ডুমুর গাছের সাথে জলপাই গাছের এবং গোলাপ গাছের সাথে আঙ্গুর, আপেল ও কাঠবাদাম গাছের বিশেষ প্রাকৃতায়ন (naturalization) করানো হয়েছিল। এই বিশেষ প্রাকৃতায়ন শিল্প টোলেডো-তে এত উন্নত ছিল যে ইতিহাসবিদ ইবনে সা’ইদ বলেন যে তিনি এক গাছে কয়েক রকমের ফল দেখেছেন।</p>
<p>[**এখানে প্রাকৃতায়ন শব্দটি বেশ কিছু জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। মূল শব্দটি হলো Naturalization, একে আমরা প্রাকৃতায়ন শব্দে অনুবাদ করেছি। প্রাকৃতায়ন বলতে বন্য প্রকৃতির বৃক্ষকে গৃহজাত করার উপায় হিসেবে ধরা যায়, পাশাপাশি গাছে কলমের ন্যায় কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে এক গাছে একাধিক রকমের ফল ফলানোর প্রক্রিয়ার জন্যও শব্দটি ব্যবহার করা যায়।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ফল ও কৃষি পণ্য সংরক্ষণ</strong></p>
<p>ফল এবং কৃষি পণ্য সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায় আছে। আমরা এখানে অপ্রচলিত কিছু উপায় উল্লেখ করব। ইবনে হাজ্জাজ বলেন, আপেল, ডালিম, কুইন্স (Quince), নাসপাতি, জামির (Citron) এবং আঙ্গুর বিশেষ ধরনের কাঁচের পাত্র দ্বারা গাছেই সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এই বিশেষ কাঁচের পাত্রের মুখটি সরু ও ভিতরটা প্রশস্ত হয়। তাঁর মতে, এই পাত্রে পাঁকা ফলও সংরক্ষণ করা যায়। ফুল থাকাতেই এই কাঁচের পাত্রে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পাত্রটিকে শক্ত করে গাছের শাখার সাথে বেঁধে দেওয়া হয়। যদি কাঁচের পাত্রে ফল দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণের উদ্দেশ্য থাকে তবে পাত্রে বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়।</p>
<p>আবার মধুতে ফল ডুবিয়ে রেখেও দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়, এতে ফলের কোন পরিবর্তন হয় না। ইবনে বাসসাল বলেন, লিনেন কাপড়ের টুকরো জড়ানো বিশেষ মাটির পাত্রে আপেল সংরক্ষণ করা যায়। পাত্রের ভিতর এক সারি আপেল সাজিয়ে রেখে তার ওপর লিনেন কাপড় দিয়ে, তার ওপর আবার আরেক সারি আপেল রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে পুরো পাত্রটি পূর্ণ করে পাত্রটির মুখ মাটি দিয়ে সীল করে শীতল জায়গায় রেখে দেওয়া হয়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এটি রেফ্রিজারেটরে আপেল সংরক্ষণের পেছনের মূল ধারণা নয় তো?</p>
<p>ইবনে আল-হাজ্জাজ আরও বলেছেন যে গম, ডালিমের পাতা, গল (Galls, পরজীবির আক্রমণের ফলে গাছের পাতায় সৃষ্ট গুটি যা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়) ও ওক (Oak) কাঠের ছাই মিশিয়ে রাখলে গমকে ঘুন পোকা থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষি পণ্যের শিল্পায়ন</strong></p>
<p>আরবী কৃষি গ্রন্থ সমূহের ক্ষেত্রে একটি বহুল প্রচলিত নিয়ম ছিল যে, সকল কৃষি বইয়ে সংক্ষেপে হলেও কৃষি পণ্যের শিল্পায়ন নিয়ে কিছু বর্ণনা লেখা থাকবে। যেমন: কিসমিস, শুকনো ডুমুর, ভিনেগার, আচার, জ্যাম, চিনি, তুলা, তেল ও সুগন্ধি প্রস্তুত করণের বর্ণনা।</p>
<p>কিভাবে কিসমিস তৈরি করা হয় সে ব্যাপারেও ইবনে হাজ্জাজ বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বাগান মালিকদের পাঁকা আঙ্গুরের গুচ্ছের বোটা পর পর দুই থেকে তিন রাত মোচড় দিয়ে শুকানোর জন্য রেখে দেওয়ার নির্দেশনা দেন। কেউ যদি কিসমিস সংরক্ষণ করতে চান তবে ইবনে হাজ্জাজ মাটি দিয়ে লেপা বিশেষ জগ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী শুকনো আঙ্গুরের গুচ্ছ গুলোকে আঙ্গুরের শুকনো পাতার সাথে এই জগে রাখতে হবে এবং জগটি ভর্তি হয়ে গেলে তার উপর শুকনো আঙ্গুরের পাতার  আরেকটি পরত  দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। অবশেষে, জগগুলো ধোয়া ও আর্দ্রতা মুক্ত শীতল জায়গায় যেন রাখা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।</p>
<p>ইয়েমেন গাজর, জামির, মিষ্টি কুমড়া ও পীচ (জাম জাতীয়) ফল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। কঠিন হাদৌরি (Hadouri) মধু ছিল ইয়েমেনের বিশেষত্ব এবং একে মক্কা ও ইরাকের একটি মূল্যবান উপহার হিসেবে দেখা হতো। ইয়েমেনে এই বিশেষ মধু প্রস্তুত করতে মধুকে রোদে শুকানোর পর যত দিন না শক্ত হয়ে আসে তত দিন ক্যানে (ধাতুর তৈরি পাত্র বিশেষ) রেখে দেওয়া হতো। সবশেষে ক্যানগুলো সীল করা হতো।</p>
<p>মার্ভে (খোরাসান, ইরান) তরমুজ কাটা অবস্থায় ইরাকে রপ্তানি করা হতো। এ স্থানের মানুষ খাবারে স্বাদ বাড়াতে জলপাইয়ের আচারের সাথে মধু, তেল, থাইম (এক ধরনের সুগন্ধিপাতা) ও ধনিয়া মিশিয়ে ব্যবহার করতো।</p>
<p>আরবীয় ঐতিহ্যের শাস্ত্রীয় কৃষিবিদগণ বিভিন্ন ফুল, বিশেষ করে গোলাপের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় তাদের সুগন্ধি শিল্প সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। জুর শহর বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য বিখ্যাত ছিল। আল-নুওয়াইরি তাঁর গ্রন্থ, <em>‘নেহায়াতুল-আরব’</em> এর দ্বাদশ অধ্যায়ে পাতন পদ্ধতিতে সুগন্ধি ও আতর তৈরির বহু প্রণালী উপস্থাপন করেন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>বাগান এবং অন্যান্য শিল্প</strong></p>
<p>ইসলামী সংস্কৃতি কখনো উদ্ভিদের নান্দনিক দিককে অবজ্ঞা করেনি; বরং প্রকৃতির বিস্ময়কর সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষকে সৃষ্টিকর্তার মহিমা স্মরণ করিয়েছে। তাই বিভিন্ন রকম গোলাপ সহ অন্যান্য উদ্ভিদ ও অন্যান্য ফুল গাছ সমৃদ্ধ বাগান করার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া হতো। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-মাকরিযি ‘খুমারাওয়াইহ’-এর বাগানের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ</p>
<p>‘‘তিনি তার বাগানে বহু ধরনের উদ্ভিদ রোপন করেছেন। বিভিন্ন উচ্চতার পাম গাছ লাগিয়েছেন। কোনো গাছের ফল দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নাগাল পাওয়া যায় আবার কোনো গাছের ফল বসে থাকা অবস্থাতেই নাগাল পাওয়া যায়। আবার ফলগুলোর স্বাদও ভিন্ন। গোলাপ ও জাফরানের গাছও লাগানো হতো। এছাড়াও ভালভাবে বাগানের যত্ন নেয়ার জন্য মালি নিয়োগ করা হতো।’’</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার বিজ্ঞানীগণ আরবীয় ঐতিহ্যের অন্যান্য কৃষি শিল্পের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরনের কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। যেমন: বীজহীন আঙ্গুর, বারমাসি গোলাপ ইত্যাদি। এমনকি তাঁরা গোলাপ সহ কিছু ফুলের রঙও নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। তাঁরা ফুলের রঙ বাছাই করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। এছাড়া তাঁরা পানির ট্যাংক ঘেরা বেসিনে কমলা রেখে দিতেন, যাতে দেখে মনে হয় যে জলাধার থেকে কমলার গাছ উঠে এসেছে।</p>
<p>ইসলামী স্কলারর্সগণ তাদের আরও অনেক গৌরবময় সাফল্যের কথা লিখে গিয়েছেন। জলবায়ুর অবস্থা ও মাটির ধরন বিবেচনা করে তারা বহু বন্য উদ্ভিদকে নিয়ন্ত্রণে এনে সযত্নে বাগানে প্রতিপালন করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথমে এই নতুন উদ্ভিদ সমূহকে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মাটি দিয়ে, বিভিন্ন রকম বিশেষ পাত্রে লাগানো হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষিজ পণ্যের প্রসার</strong></p>
<p>১৯৭৪ সাল থেকে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের Andrew M. Watson এর উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এই ফলাফলে Watson ইসলামী বিশ্বে কৃষির আমূল পরিবর্তন এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে ভৌগোলিকভাবে সারা বিশ্বে কৃষির প্রসারের ইতিহাস সংকলন করেন। তিনি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ সমূহকে মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে মুসলিমদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেছেন। এভাবেই উষ্ণ জলবায়ুতে উপযুক্ত নতুন ধরনের শস্য ও লেবু জাতীয় ফলের বিকাশ হয়েছিল। তিনি ৭২৬ টি প্রজাতির উদ্ভিদকে তালিকাভুক্ত করেছেন যেগুলোকে আরবি উৎস থেকে ল্যাটিন নাম দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>১৩’শ শতাব্দী পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে ধরে তিনটি মহাদেশে (এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ) দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন আসার পেছনে ইসলামী কৃষির যে বাস্তবিক প্রভাব আছে তা দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল ওয়াটসনের অনুসন্ধান। তিনি এই পরিবর্তনের নাম দেন মধ্যযুগীয় সবুজ বিপ্লব (পরবর্তীতে এই নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘মুসলিম কৃষি বিপ্লব’, ‘ইসলামী কৃষি বিপ্লব’ ও ‘ইসলামী সবুজ বিপ্লব’)। এই সকল শব্দসমষ্টি একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, তা হলো ৮ম থেকে ১৩দশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম ভূখণ্ডে কৃষির আমূল পরিবর্তন।</p>
<p>ওয়াটসন যুক্তি দেখান, মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বের ব্যবসায়ীগণ পৃথিবী জুড়ে অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির ফলেই ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অংশের মাঝে অনেক ফসল এবং কৃষিকাজের বিস্তার সম্ভব হয়েছিল। এর সাথে আরও যুক্ত ছিল ইসলামী বিশ্ব ও এর বাহিরের অঞ্চলে ফসলের অভিযোজন এবং বিভিন্ন কৌশলের আয়ত্তকরণ। আফ্রিকার ফসল যেমন- শিম, চীনের ফসল যেমন- লেবু জাতীয় (Citrus) ফল এবং ভারত থেকে অসংখ্য ফসল যেমন- আম, ধান, তুলা এবং আখ প্রভৃতি ইসলামী ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওয়াটসনের মতে, আগে কখনও এই ফসলগুলো এই ভূখণ্ডে চাষ করা হয়নি। ইসলামী আমলে বিস্তার লাভ করা এমন আঠারোটি ফসলের তালিকা তৈরি করেছিলেন ওয়াটসন। কিছু লেখক এই সময়ে অসংখ্য ফসলের এমন বিস্তারকে ‘‘ফসলের বিশ্বায়ন’’ বলে আখ্যায়িত করেন। ওয়াটসন বলেন, ইসলামী বিশ্বে অর্থনীতি, জনসংখ্যা বন্টন, গাছপালার পরিমাণ, কৃষি উৎপাদন ও আয়, জনসংখ্যার মাত্রা, শহরাঞ্চলের বৃদ্ধি, শ্রমশক্তির বন্টন, যুক্ত শিল্প-কারখানা, রান্না, খাদ্য, এবং পোশাক প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই প্রবর্তনগুলো এবং সেই সাথে কৃষিক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পথপ্রদর্শনকারী ভূমিকা পালন করেছিল।</p>
<p>আমরা ইউরোপে আরবীয়দের আনা ফুলগুলো থেকেও কিছু উল্লেখ করতে পারি। যেমনঃ জুঁই, হলুদ গোলাপ, লাল ও সাদা ক্যামেলিয়া ইত্যাদি। উদ্ভিদের এই বিস্তারে আরবদের প্রভাবের প্রমাণ হিসাবে মোস্তফা আল-শেহাবী ফরাসি ভাষায় বেশ কয়েকটি গোলাপ এবং উদ্ভিদের নামের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন।</p>
<p>পরিশেষে, একটি মজার কথা উল্লেখ করা যায় যে, কিছু চীনা প্রাচীন নথিতে আমরা যে গল্প পাই তা ১৩’শ শতাব্দীর। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক হুই-লিন কিছু নথি উদ্ঘাটন করেছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল যে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগে ইসলামী বিশ্বের নাবিকেরা আমেরিকা পৌঁছেছিলেন এবং সেখান থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নিয়ে এসেছিলেন। এই তত্ত্বটি ছিল ড. ‘লি’ এর ৯ বছরের গবেষণার ফল। ড. লি দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে একাধিক স্থানে অনুসন্ধান ও গবেষণা পরিচালনার কাজে নিবেদিত ছিলেন। তাঁর নথিসমূহ নিশ্চিত করে যে, মুসলিমগণ ‘‘মোলান-পাই’’ নামে একটি অঞ্চলে পেঁপে, আনারস, কুমড়া এবং ভারতীয় ভুট্টা নিয়ে গিয়েছিলো, যা সম্ভবত আমেরিকার কোন অংশ।</p>
<p><strong>তথ্যসূত্র: </strong>Gleanings from the Islamic Contribution in Agriculture by Dr. Abu Jaser Safieh</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>অনুবাদঃ নওরীন নবী </strong></p>
<p><strong> </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/advanced-agriculture-a-gift-towards-the-mankind/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7801</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ভ্যাট ও সুদ নির্ভর অর্থনীতি; প্রেক্ষিত বাংলাদেশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/vat-and-interest-based-economy-bangladesh-in-perspective/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/vat-and-interest-based-economy-bangladesh-in-perspective/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী সালমা বিনতে সলিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 31 May 2023 12:02:46 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7788</guid>

					<description><![CDATA[দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট মানে পণ্য ও সেবার দাম বাড়া-কমার খবর। তাই তাদের কাছে বাজেট বরাদ্দের চেয়ে বাজারে তার প্রভাবটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, করের হার বৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কত বাড়বে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট মানে পণ্য ও সেবার দাম বাড়া-কমার খবর। তাই তাদের কাছে বাজেট বরাদ্দের চেয়ে বাজারে তার প্রভাবটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, করের হার বৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কত বাড়বে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখবো, মোট রাজস্ব আয়ের ৫৪.৭% আসবে কর থেকে, অর্থাৎ ৩৩০০০ বিলিয়ন টাকা। এর মাঝে ভ্যাট ৩৮.৭%, আমদানি শুল্ক ১১.৫%, আয়কর ৩১.৮%, সম্পূরক শুল্ক ১৬.৫%, অন্যান্য ১.৫%।</p>
<p>অর্থাৎ বরাবরের মতো এ অর্থবছরেও রাজস্ব আয়ের অধিকাংশ আসবে কর থেকে, যার মূল হাতিয়ার হলো মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট। তার উপর বেসরকারি বিনিয়োগে আরো বেশি গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে আয়কর খাতে বড় বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে, ফলশ্রুতিতে ভ্যাট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে। জনগনের দুর্দশা, বিশেষত করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এ ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে ভ্যাটের পরিমাণ কমিয়ে আনার পরিবর্তে বেশিরভাগ খাতেই তা আগের অংকে বহাল রাখা হয়েছে, উপরন্তু কিছু খাতে ভ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। যার ফলে এ বছর ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ২৭ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা, গত বছর যা ছিলো ১ লক্ষ ২৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। প্রায় প্রতি অর্থবছরেই এ হার বেড়েছে। ১৯৯১ সালে ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকে আজ অবধি দেশের রাজস্ব আদায়ের মূল উৎস এটিই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয় কর বা ট্যাক্সকে রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত হিসাবে পরিণত করার পরিকল্পনা নিলেও ভ্যাটের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে জনগনই বার বার ভুক্তভোগী হচ্ছে। দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ আয়ের উৎস কমে যাচ্ছে, ঋণখেলাপি বাড়ছে, বাড়ছে আয় কর ফাঁকি; বাড়ছে পোশাক শিল্পের অস্থিরতা, রেমিটেন্সে ধ্বস, রপ্তানীতে নেতিবাচক প্রবণতা; বাড়ছে বড় বড় হোল্ডিংগুলো এক টাকাও কর না দিয়ে উল্টো ঋণ নিয়ে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার হার, বিনিয়োগের বেহাল অবস্থা ও দাতা সংস্থার নেতিবাচক অবস্থান। যার ফলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, আর সৃষ্ট ঘাটতি পূরণের জন্য ভ্যাটের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। ভ্যাট এর বড় একটি অংশ অন্যায়ভাবে দরিদ্র মানুষের মাধ্যমে পরিশোধ করানো হচ্ছে। রাষ্ট্র বড় বড় হোল্ডিং ও ধনীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে, বিনিময়ে তাদেরকে সুদ দেয়। দরিদ্র ও সাধারণ জনসাধারণের কাছ থেকে নেওয়া ভ্যাটের টাকা দিয়ে হোল্ডিং মালিক ও ধনীদেরকে সুদ দেয়।</p>
<p>ইবনে খালদুন বলেছিলেন,</p>
<blockquote><p>“আয় কমে যাওয়ার কারণে রাজস্বও কমে যায়, যা রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট হয় না। রাষ্ট্র তখন আরো বেশি হারে করারোপ করতে থাকে এবং ক্ষমতা ও সম্পদের সকল উৎসের উপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়। অধিকাংশ কর যারা দিয়ে থাকে, সেই ব্যবসায়ীদের কাজ-কর্ম ও আয় উপার্জনের আগ্রহে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সুতরাং যখন আয় কমে যায় তখন রাজস্ব আয়ও কমে। রাষ্ট্রও তখন উন্নয়ন ও জনকল্যাণে অর্থ ব্যয় করতে অপারগ হয়। উন্নয়ন কমে যায়, মন্দা আরো বেড়ে যায়, পতনের নিয়ামকসমূহ গতি পায় এবং শাসক গোষ্ঠীর পতন আসে।”</p>
<p>(আল মুকাদ্দিমাহ, পৃষ্ঠা ১৬৮, ২৭৯-৮২)</p></blockquote>
<p>দেশের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী একজন ব্যক্তির বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকার বেশি হলে তাকে ট্যাক্স দিতে হয়, এর কম আয় থাকলে ট্যাক্স দিতে হয় না। কিন্তু ফুটপাথে বসবাসকারী হত দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে কোটিপতি পর্যন্ত সবাইকে একই হারে ভ্যাট দিতে হয়, আয় থাকুক বা না থাকুক। যেমন ধনী মানুষেরা চাল, ডাল থেকে শুরু করে সাবান, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনে সুপার শপ থেকে, আর নিম্ন আয়ের মানুষেরা কিনে গ্রাম-গঞ্জ, পাড়ার দোকান থেকে। কিন্তু এসব পন্য যেখান থেকেই কেনা হোক, ভ্যাটের পরিমাণ একই। নিত্যব্যবহার্য থেকে শুরু করে বিলাসী পণ্য– সবকিছুতেই ভ্যাটের হার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই। এক্ষেত্রে কার আয় বেশি বা কার কম সেটা মূখ্য নয়। উল্টো রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য কর আদায়ে নতুন করনীতি ঘোষণা, কর হার ও করের আওতা বাড়ানো ও আয়কর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে ভ্যাটের আওতা। করের ভিত্তি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। কিছু সেবা থেকে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য আংশিক তুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে যেসব খাতে ৪ থেকে ৬ শতাংশ ভ্যাট ছিলো, সেসব খাতে ভ্যাটের পরিমাণ হয়ে যাচ্ছে উপর ১০-১৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ছোট ছোট প্লাস্টিক কারখানাগুলো এতদিন ভ্যাটের আওতামুক্ত ছিলো। এবারের বাজেটে তাদের উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়াও বহাল আছে প্লাস্টিকের কাঁচামাল আমদানির উপর আরোপিত শুল্ক, প্লাস্টিকের পণ্য রপ্তানির উপর আরোপিত ১.৫০% শুল্ক, যা গত অর্থবছরে ছিলো ০.৬০%। আর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সুরক্ষা খাতে। এখন ফল আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হয়। এবারের বাজেটে এটি বাড়িয়ে ২০ শতাংশ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে আমদানি করা ফলের দাম বেড়ে যাবে। বেড়েছে মোবাইল ফোনে কথা বলা, এসএমএস, ডেটা ব্যবহারের ভ্যাট। এভাবে প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য, খাতেই ভ্যাটের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।</p>
<p>ফলাফলস্বরূপ, পণ্যমূল্যে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি যুগান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ।</p>
<p>টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সরু চালের দাম কেজিতে ১.৬৭ শতাংশ বেড়েছে, মাঝারি আকারের চালের দাম কেজিতে ১১.৫৮ শতাংশ ও মোটা চাল কেজিতে ৮.১৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি খোলা আটার দাম বেড়েছে ৩.৩৩ শতাংশ। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৩৮.৮৯ শতাংশ, প্রতি লিটার বোতালজাত সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৩৪.৮৮ শতাংশ এবং লুজ পাম অয়েলের দাম বেড়েছে লিটারে ৭৫ শতাংশ। প্রতি কেজি মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩.৬৪ শতাংশ বেশি দরে। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৬.৬৭ শতাংশ বেশি দরে। দেশি হলুদ ২৫ শতাংশ, চিনি ১৬ শতাংশ, প্যাকেটজাত লবণ ৮.৩৩ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি প্রতি কেজিতে ২.১১ শতাংশ, প্রতি হালি (৪ পিস) ফার্মের ডিমের দাম ১৯.২৩ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে যেসব পণ্য দেশের বাহির থেকে আমদানী করতে হয়, সেসব পণ্যের উপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাটের প্রভাবে দাম বেড়ে যাচ্ছে। ভারতীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়লে আমদানীকৃত প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় ১০-১৫ গুণ।</p>
<p>এ তো গেলো ছোট একটা সমীক্ষা। ভ্যাট থেকে গৃহীত অর্থ জনগনের পেছনে ব্যয়ের পরিমাণের অনুপাত যদি দেখি, রাষ্ট্র জনগন থেকে নেওয়া প্রতি ১০০০ টাকার ১১৪ টাকাই ব্যয় করবে সুদ পরিশোধে, আর জনগনের খাদ্যের পেছনে ব্যয় করবে মাত্র ৫৩ টাকা!</p>
<p>বর্তমান বাংলাদেশ যেন তার বাস্তব প্রতিফলন! শুধু বাংলাদেশ নয়, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার এ বিশ্বের সর্বত্র এ জুলুম সূক্ষ্ম জাল বিস্তার করেছে।<picture><source media="(min-width: 650px)" /></picture> <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon2.0" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/agami-diner-sovvota.jpg" height="133" /></a></p>
<p>আপনি পৃথিবীর সে প্রান্তেই থাকেন না কেন, খাবার কেনার জন্য কোনো দোকানে গেলে খাবারের যে টাকা পরিশোধ করবেন, ভ্যাট গ্রহণের মাধ্যমে তার এক তৃতীয়াংশ ব্যবহার হবে সুদ পরিশোধে, আর তা বিভিন্ন মাধ্যমে যায়নবাদীদের কাছেই যাবে। রুটির কথাই ধরুন। রুটি বাজারজাত করার আগে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও পর্যায় পার হয়ে আসে। ধান/গম চাষ করার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ট্র্যাক্টর কেনা হয়, আর এর বিনিময়ে ব্যাংককে সুদ দিতে হয়। এছাড়াও কীটনাশক, সার কৃষি কাজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয়েও সুদ কার্যকরী। আর ট্রাক্টরসহ বাকি সব কিছুর সুদ সেটা পরিশোধের টাকা রুটি ক্রয়ের সময় আপনার থেকেই নেওয়া হয়।</p>
<p>এভাবেই প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে অর্থ বিভিন্নভাবে যায়নবাদীদের হাতে পৌঁছায়। প্রতি বছর পৃথিবীতে ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে, এর মধ্যে ৩৭.৫ ট্রিলিয়ন এই সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে যায়, অর্থাৎ মোট টাকার প্রায় অর্ধেক! এভাবেই তারা সূক্ষ্ম জাল বিস্তার করে গোটা দুনিয়াকে শুষে নিচ্ছে। এ পদ্ধতির মাধ্যমেই তারা দুনিয়ার সম্পদের একটি বড় অংশ তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীর যত বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, নামিদামি ব্র্যান্ড, সব কিছুতেই তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে বসেছে।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান বলেন, “আমরা যদি অর্থনীতির ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, সংগ্রহের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে শিকার, এরপরে কৃষি, এরপরে বিনিময়, এরপরে মাধ্যম ব্যবহার করে বিনিময়, মুসলমান দেশসমূহের মধ্যে অংশীদারিত্ব, এরপরে শ্রমিক বা শ্রম প্রথা। এরপর আমাদের এই বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীতে প্রচলিত হলো এই প্রথা। শ্রম প্রথা কী? অংশীদারিত্ব কী? শ্রম প্রথা বা শ্রমিক প্রথার মানে হলো, রাষ্ট্রীয় শক্তি আমার হাতে। আমি সব ব্যবস্থা চালু করবো। আমার ইচ্ছামত ট্যাক্স ও ভ্যাট বসাবো। এক কথায় বলতে গেলে আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করবো। না! তুমি যা ইচ্ছা তা করতে পারবে না, তুমি যাই হও না কেন! তুমি যদি দেশের পরাক্রমশালী সুলতানও হও, তবুও তুমি মানুষের অধিকারকে নষ্ট করতে পারবে না। এটি ভুল একটি চিন্তা যে, আমি রাষ্ট্র, আমি যা ইচ্ছা তাই করবো। এ কথা বলার অধিকার তোমার নেই। তুমি তোমার ইচ্ছামতো শাসন করতে পারবে না। তোমার উপর জনগণের অধিকার রয়েছে। তুমি মানুষের অধিকার দিতে বাধ্য।”</p>
<p>তার মতে, সুদ ভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পাঁচটি মূল ভাইরাস রয়েছে। যথা–</p>
<blockquote><p>১) সুদ</p>
<p>২) অন্যায়ভাবে আরোপিত ভ্যাট</p>
<p>৩) টাকশাল</p>
<p>৪) শেয়ার মার্কেট বা বিনিময় কেন্দ্র</p>
<p>৫) ঋণ</p></blockquote>
<p>এখন প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি জনগন থেকে ভ্যাট নিবে না? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, <strong>“নিবে, তবে রাষ্ট্রের যতটুকু নেওয়ার অধিকার আছে রাষ্ট্র ততটুকুই নিতে পারবে তার বেশি নয়। রাষ্ট্র হয়েছে বলেই তার ইচ্ছামতো নিতে পারবে না। রাষ্ট্র কেবলমাত্র ততটুকুই ভ্যাট নিতে পারবে, যতটুকু জনগণের কল্যাণে ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তার বেশি নয়।”</strong></p>
<p>এই জুলুম থেকে মুক্তির একমাত্র পন্থা হলো আদালত প্রতিষ্ঠা; সরকার এবং জনগনের মাঝে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করা। জনগন সরকারকে তার শত্রু ভাববে না, সরকার জনগনকে আয়ের উৎস হিসেবে দেখবে না। সরকার ভ্যাট আদায় করবে, তবে তা হতে হবে গ্রহণযোগ্য পন্থায়, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের অধিকার পরিমাণ ভ্যাট আদায় করবে। এক্ষেত্রে জনগনের কাছে প্রতিটা টাকার পাই পাই হিসাব তাকে দিতে হবে। এজন্য বাজেট প্রণয়ন ও তুলে ধরা জরুরী। স্বল্প আয়ের মানুষদের ভ্যাট মওকুফ করতে হবে, কাদের উপর কত শতাংশ ভ্যাট কার্যকর করা যাবে তা নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এ নিয়ে চিন্তা করার মতো কোনো দল নেই, অর্থনীতিবিদ নেই, কেউ এ নিয়ে প্রশ্নও উত্থাপন করে না, ফলশ্রুতিতে মানবতা আজ ধ্বংসের সম্মুখীন। এ অবস্থার পরিত্রাণে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এখনি সময় পুনরায় পরিবর্তন ও উন্নয়ন করার। যারা মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা সম্পর্কে জানে না, তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া যাবে না। শ্রমিক প্রথার মাধ্যমে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থা চালু এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এভাবেই আদালতের উপর ভিত্তি করে ঘোষিত হবে নতুন দুনিয়ার ইশতিহার…</p>
<p>এসকল চিন্তানুযায়ী সবশেষে বলতে চাই, আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণের মূলশিক্ষা, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।</p>
<p>ভ্যাট, ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে, কথিত উন্নয়নের ডায়ালগ বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ছোট শিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎস শিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে।</p>
<p>জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে আগাতে হবে।</p>
<p>আমাদের রয়েছে–</p>
<ul>
<li>১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ</li>
<li>তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত</li>
<li>ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা</li>
<li>দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)</li>
<li>গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর</li>
<li>বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ</li>
<li>বনাঞ্চল</li>
<li>মৎসশিল্প ইত্যাদি</li>
</ul>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকটসহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/vat-and-interest-based-economy-bangladesh-in-perspective/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7788</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের অভ্যুদয়কালে বিশ্ব অর্থনীতি কেমন ছিল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/how-was-the-world-economy-in-time-of-creation-of-bd/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/how-was-the-world-economy-in-time-of-creation-of-bd/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 26 Aug 2022 09:25:43 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7319</guid>

					<description><![CDATA[এক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুই–আড়াই দশক, অর্থাৎ ১৯৫০ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুবর্ণ যুগ হিসেবে পরিচিত। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পশ্চিম ইউরোপীয় এবং পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি ঘটে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়। দুই পরাশক্তির]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>এক,</strong></p>
<p>দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুই–আড়াই দশক, অর্থাৎ ১৯৫০ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুবর্ণ যুগ হিসেবে পরিচিত। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পশ্চিম ইউরোপীয় এবং পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি ঘটে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়। দুই পরাশক্তির অনুগামী দেশগুলোতে শর্তসাপেক্ষ সাহায্যের বিস্তৃতি ঘটে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে শিল্পায়িত দেশসহ উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলিতেও উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়।</p>
<p>রাশিয়ার সম্মতিতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত গোপন ষড়যন্ত্র চুক্তি ‘সাইকস-পিকট’-এর মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনে মধ্যপ্রাচ্যে বহু জাতি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পরও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫০ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে অনেক রাষ্ট্র হয় সোভিয়েত, নয় মার্কিন সাহায্য-সহযোগিতায় টিকে ছিল। বিশ্ব অর্থনীতি মোটা দাগে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক— এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়েছিল। দুই বিপরীত ধারার অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রতিযোগিতার প্রধানতম অনুষঙ্গ ছিল।</p>
<p>কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শুরুতেই সংকট সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদি উত্থানের কাল ১৯৭৩-৭৫ মন্দার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ১৯৭০-এর দশকের গোড়া ও মাঝের দিকের অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনার সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ রয়েছে। যেমন,</p>
<p><strong>এক.</strong> ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস আর্থিক ব্যবস্থার পতন;</p>
<p><strong>দুই.</strong> ব্রেটন উডস আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বসের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ‘গোল্ডেন উইন্ডো’ বন্ধ হওয়া (নিক্সন শক)। এতে মার্কিন ডলার ছাপানোর সঙ্গে স্বর্ণের চূড়ান্ত অর্থনৈতিক যোগসূত্রটি ছিন্ন করে ফেডারেল রিজার্ভকে আগের চেয়ে বেশি মুদ্রাস্ফীতিমূলক অর্থ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়;</p>
<p><strong>তিন.</strong> ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক তেলসংকট;</p>
<p><strong>চার</strong>. ১৯৭৩-৭৪ সালের শেয়ার ধস ও মন্দা। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আরেক দিকে অর্থনৈতিক স্থবিরতা।</p>
<p><strong>যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ১৯৬৫ সালে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ শতাংশ, ১৯৭৫ সালে তা দাঁড়ায় ১২ শতাংশে।</strong> ১৯৭১ সালে মার্কিন বাণিজ্যে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হয়েছিল। ঘাটতি কমাতে নিক্সন ১৯৭১ সালে ডলার অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৩ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা দারিদ্র্য বিমোচনকে বিশ্বের অন্যতম বড় দায়িত্ব বলে স্বীকৃতি দেন। তার আগে ১৯৬১ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি চালু হয়। এসবের ফলে দারিদ্র্যরেখার ধারণা, বিশ্ব ক্ষুধার সূচক, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়, গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের নিঃস্ব চেহারা আয়নায় দেখতে শুরু করে।</p>
<p>ইতিহাসবিদেরা ১৯৭০-এর দশককে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘পরিবর্তনের বাঁক’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ১৯৭৩ সালে চিলির সালভাদোর আয়েন্দের নির্বাচিত বামপন্থী সরকারকে সিআইএ ক্যু-এর মাধ্যমে উৎখাত করলে সে দেশে জেনারেল অগাস্তো পিনোশের সেনাশাসন কায়েম হয়। চিলিতেই প্রথম অর্থনীতিবিদ এফ এ হায়েক, তাঁর শিষ্য মিল্টন ফ্রিডম্যানসহ ‘শিকাগো বয়েজ’ নামে পরিচিত অর্থনীতিবিদেরা নিও-লিবেরালিজম নামের নতুন অর্থনীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তাঁরা দাবি করেন, এতে চিলির অর্থনীতির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।</p>
<p>এরপর কেনসিয়ান প্রগতিশীল উদারবাদী তত্ত্বকে (কিছুটা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি) বেসরকারিকরণের একমুখী নয়া উদারবাদী তত্ত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রবণতা শুরু হয়। এই সব কারণে ১৯৭১-৭৫ বিশ্ব অর্থনীতির বাঁক পরিবর্তনের কাল হিসেবে স্বীকৃত।</p>
<p><strong>সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দর্শন বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে কখনোই সফল বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়নি। মৌলিক নাগরিক সেবায় রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ জোরদার করার উদ্যোগ বেসরকারিকরণের পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতরে থেকেই দায়সারাভাবে চলতে থাকে। পর্যাপ্তসংখ্যক স্বাধীন ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি বলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ফলে রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা সেবাগুলো সাধারণ নাগরিকের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।</strong></p>
<p>১৯৭৫-৭৬-এর পরে সাময়িকভাবে মন্দা কেটে গেলেও ১৯৮০-৮১ সালে বিশ্বব্যাপী বহু দেশ আবারও অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তীব্রভাবে হ্রাস পায়, বেকারত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত দ্রুত মন্দা থেকে মুক্ত হলেও অনেক দেশে ১৯৮৩ সালেও মন্দা ছিল। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকের মন্দা, লাতিন দেশগুলোর ‘ঋণ সংকটে’ আরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এ সময় আর্থিক সংকটে পড়ে বহু দেশ বিশ্বব্যাংকের ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। ক্যারিবিয়ান ও সাব সাহারান আফ্রিকান দেশগুলোতেও দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>১৯৬০-৮০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকাসহ সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত অনেক দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। এসবের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরীক্ষামূলক উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি কৌশল চাপিয়ে দেয়। দেশগুলো গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও বাণিজ্য বৈষম্যে পতিত হয়। উত্তরণের পথ হিসেবে ১৯৮৯ সালে মার্কিন অর্থনীতিবিদ জন উইলিয়ামসন সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ১০ সেট বিস্তৃত সুপারিশমালা প্রস্তাব করেন, যা ‘পোস্ট ওয়াশিংটন কন্সেন্সাস’ নামে পরিচিত। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রণীত এসব পরামর্শ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ প্রয়োজনীয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির পথে থাকলে নিওলিবারেল ধারণাগুলো প্রতিষ্ঠিত করার তৎপরতা চলতে থাকে। কিন্তু যখন অর্থনীতি সংকটে পড়ে, তখন কিছুটা সংস্কার, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আর অধিক নাগরিক সেবা ও সুরক্ষার সাময়িক আওয়াজ ওঠে।</p>
<p>বিশ্বায়নের নামে মানুষ, রাষ্ট্র, সমাজ ও জাতিকে একীভূত করে বিশ্ব পুঁজি নতুন ক্ষমতাকাঠামোর জন্ম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কেবল অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হয়ে ব্যাপকতর বৈষম্যে পড়েছে। জন্ম নিচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা, আত্মপরিচয়ের সংকট, ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিস্তার, স্থানীয় সংস্কৃতির উচ্ছেদ। অর্থাৎ নয়া উদারবাদী, আধুনিকায়ন তত্ত্ব দেশে দেশে উন্নয়ন দর্শনের ছোট-বড় ক্ষত তৈরি করেছে। ফলে চার দশক পরে এসে নয়া উদারনীতিবাদের উত্থান ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নব্য উদারনীতিবাদের সঙ্গে কোভিড-১৯জনিত মন্দা যোগ হয়েছে। মহামারির ফলে বোঝা যাচ্ছে, নব্য উদারনীতিবাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে।</p>
<p>২০০৭-০৮ সালের মার্কিন মন্দা এবং ওয়ালস্ট্রিট দখল আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২০-এর করোনাকাল পর্যন্ত সময়ে নয়া উদারবাদের নেতিবাচক দিকগুলো সারা বিশ্বে অনেক ভালোভাবে উন্মোচিত হয়ে গেছে। বরং যেসব দেশে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় খাতের শক্তিশালী সংযোগ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া রয়েছে, সেসব দেশ করোনা–উদ্ভূত সংকটকে চরম পুঁজিবাদী দেশগুলোর চেয়ে বেশ ভালোভাবে মোকাবিলা করছে (চীন, ভিয়েতনাম, পশ্চিম ইউরোপ ইত্যাদি)।</p>
<p>বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মডেল নিয়ে কাজ করছে দেশগুলো যেখানে নয় উদারবাদের লাগাম টেনে রাষ্ট্রকে অধিক পরিমাণে সামাজিক সুরক্ষার দিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা ফেরাতে এবং পরিবেশ সুরক্ষার দিকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দেশে দেশে জনতুষ্টিবাদী সরকারের উত্থানে টেকসই উন্নয়ন প্রতিজ্ঞার বাস্তবায়ন খামখেয়ালিপূর্ণ থেকে গেছে। একদিকে পরিবেশ বিপর্যয়, অন্যদিকে ধনবৈষম্য বাড়ার প্রবণতা থামানো যাচ্ছে না।</p>
<p><strong>দুই,</strong></p>
<p>বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি সংকটময় ক্রান্তিকালে স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক কালেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি দীর্ঘ সুবর্ণ যুগের সমাপ্তি ঘটে এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিও সংকটে পড়ে কিছুটা প্রগতিশীল রূপ নেয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক মধ্য ধারার উদার ও মানবিক রাষ্ট্রীয় দর্শন শুরুতেই বিভাজিত দুই মেরুর বিশ্বে পরাশক্তিদের আস্থার টানাপোড়েন উপলব্ধি করে।</p>
<p><strong>স্নায়ুযুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সাফল্য অর্জনে কৌশলগত ভূমিকা রাখলেও সাবেক পুঁজিবাদী ধারার অর্থনীতিকে সমাজতান্ত্রিক পট পরিবর্তনের এক বিরাট চাপ তৈরি হয়, ফলে অতীতের দাতাদের থেকে আপাত সম্পর্ক ছিন্ন হয়।</strong> বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নতুন ধারার সঙ্গে মানিয়ে চলতে গিয়ে বহু বিষয়ে কঠিন স্থানীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। রাষ্ট্রীয়করণের নতুন নীতিগুলো দেশি সমাজ ব্যবস্থা, শিল্প ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শ্রমবাজার ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপরীক্ষিত ছিল বলে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না।</p>
<p>ফলে কিছু আইন বারবার পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হয়েছে। এতে একদিকে সময় নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে শিল্প অধিগ্রহণের কারণে অর্থনীতিতে ব্যাপক আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। বড় ও মাঝারি শিল্পের একমুখী রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, বেসরকারি খাতের বিকাশ বন্ধের জন্য বিনিয়োগে খুব নিম্ন সিলিং, লভ্যাংশের সীমা নির্ধারণ, বিদেশিদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার নিষিদ্ধকরণের ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্যসহ বহু কূটনৈতিক বিষয়ে বাংলাদেশ টানাপোড়েনে পড়ে।</p>
<p>পরে নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত আগ্রাসন। সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আগ্রাসনের প্রস্তুতি নিলে বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিস্তৃত হয়। এই সবকিছু মিলিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নবযাত্রা সহজ বা সুখকর ছিল না।<br />
প্রায় সর্বসম্মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র সংবিধানে গৃহীত হলেও এতে তৈরি হয় আন্তর্জাতিক মেরুকরণের গুরুতর সমস্যা।</p>
<p>মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও খাদ্য সাহায্য মার্কিন সমর্থনপুষ্ট ছিল (যেমন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ, পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি, কলেরা হাসপাতাল, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা ইত্যাদি)। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট দাতা সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ, এমনকি জাতিসংঘও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সাহায্যদানের আশ্বাসকে কার্যত কঠিন শর্তসাপেক্ষ করে দেয়।</p>
<p>সমাজতন্ত্র ও বেসরকারিকরণ (পুঁজিবাদ) প্রশ্নে বাংলাদেশের নতুন নির্মিত রাজনৈতিক অর্থনৈতিক আইন পশ্চিমা দেশ ও বৈদেশিক সাহায্যদাতা সংস্থাগুলো মেনে নেয়নি। অভ্যন্তরীণ মজুতদারি, ত্রাণ লুটপাট ও কালোবাজারি থেকে উদ্ভূত খাদ্যসংকট ১৯৭৪ সাল দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। বিদেশি খাদ্যসাহায্য আসতে বেশ দেরি হলে দুর্ভিক্ষ গুরুতর আকার ধারণ করে।</p>
<p>এই কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ১৯৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো সমাজতান্ত্রিক দর্শন থেকে স্থায়ীভাবে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দর্শন বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে কখনোই সফল বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়নি। মৌলিক নাগরিক সেবায় রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ জোরদার করার উদ্যোগ বেসরকারিকরণের পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতরে থেকেই দায়সারাভাবে চলতে থাকে। পর্যাপ্তসংখ্যক স্বাধীন ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি বলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ফলে রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা সেবাগুলো সাধারণ নাগরিকের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/how-was-the-world-economy-in-time-of-creation-of-bd/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7319</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সুদ, বেকারত্ব ও ঋণের উপাখ্যান ; জনস্বার্থ বিবর্জিত বাজেট ২০২২-২৩</title>
		<link>https://rowyakbd.com/budget-analysis-2022-23/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/budget-analysis-2022-23/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Jun 2022 08:42:33 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বেকারত্ব ও ঋণের উপাখ্যান ; জনস্বার্থ বিবর্জিত বাজেট ২০২২-২৩]]></category>
		<category><![CDATA[সুদ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7192</guid>

					<description><![CDATA[করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট যে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে, তাতে সমাধানের সামগ্রিক চিন্তাকে উপেক্ষা করে দেশের সকল সংকট ও সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই সমাধান আসবেনা, তাই হয়তো এবারের বাজেট ‘‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’’ শ্লোগানকে সামনে রাখা হয়েছে। গত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট যে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে, তাতে সমাধানের সামগ্রিক চিন্তাকে উপেক্ষা করে দেশের সকল সংকট ও সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই সমাধান আসবেনা, তাই হয়তো এবারের বাজেট <strong>‘‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’’</strong> শ্লোগানকে সামনে রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মধ্যে দিয়ে দিনপাত করেছে, সেটিই যখন সামলে উঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা; এমন পরিস্থিতিতেও প্রস্তাবিত নতুন বাজেটকে আমরা ‘জনগণের বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিতে পারছিনা, বরং ‘সুদ, বেকারত্ব, ঋণনির্ভর ও জনস্বার্থ বিবর্জিত’ বাজেট হিসেবে তুলে ধরতে হচ্ছে।</p>
<p>অবাক হয়ে বলতে হচ্ছে- যে বাজেটের উপর গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়, সেটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই, যৌক্তিক প্রস্তাবনাও নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা! অনলাইনে যতটুকুই দেখা যায় বা কাজ আছে, তার সবই তথ্যনির্ভর পত্রিকালাপ! কেননা ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা ও সমালোচনা অসম্ভব; যদি না নিম্নোক্ত বিষয়ে পারদর্শী হয়-</p>
<blockquote><p>• Philosophy of Politics.<br />
• International Economics.<br />
• Political Economy.<br />
• Philosophy of Economics.<br />
• General Economy.<br />
• Economic System of Islam.<br />
• মাকাসিদ আশ-শারিয়িয়্যাহ।</p></blockquote>
<p>এসব বিষয়ে কোনো পারদর্শীতা কিংবা জ্ঞান আমার নেই। তবুও কিছু ব্যক্তিগত চিন্তা ও আলোচনা তুলে ধরছি-</p>
<p>স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে ৫১ তম বছর অতিবাহিত করছে বাংলাদেশ। এরই মাঝে সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে দেশের ৫১ তম অর্থনৈতিক বাজেট। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে, দেশের জনগণেরর আর্থ-সামজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বাজেট কতটুকু যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে।</p>
<p>বিশেষজ্ঞদের দাবী অনুযায়ী, এবারের বাজেটে সংগত কারণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও শিক্ষাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী একটি বাজেট প্রস্তাবনার প্রয়োজন ছিল। যে বাজেটে প্রাধান্য পাওয়া আবশ্যক ছিল-</p>
<blockquote><p>• ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে আনা।<br />
• সুদের শোষণ থেকে মুক্তির চিন্তা।<br />
• রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধি।<br />
• বেকারত্ব ও দারিদ্র্য।</p></blockquote>
<p>কেননা এসব ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা বিভিন্ন খাতে শুধু অর্থ ব্যয় করে কখনোই সমাধান সম্ভব নয়।</p>
<p>এখন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সত্যিই বেড়েছে না-কি ঋণের কারণে মাথাপিছু আয় বেশি দেখাচ্ছে! সেটা নিয়েও পর্যালোচনা জরুরী। মূলত ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আমরা জানি যে, বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত <strong>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ঋণকেও আয় হিসেবে ধরা হয়ে থাকে! হর্তাকর্তারা উচ্চ সুদে ঋণ এনে উন্নয়নের নামে দুর্নীতির মহোৎসব চালিয়ে আবার এই ঋণের সুদ দেওয়ার জন্য নতুন করে ঋণ নেয়।</strong><br />
অথচ প্রতি বছরই বাজেটের বিশাল অংশ জুড়েই থাকে সুদ এবং সুদ। এ বছরের বাজেটেও দ্বিতীয় সর্ব বৃহৎ খাত হলো সুদ!! টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১১.৯ শতাংশ।</p>
<p>যেখানে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থার দরূন,</p>
<p>&#8212; দেশের ৪২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে।</p>
<p>&#8212; যেখানে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক বেকার, (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ জরিপ মতে, বেকার সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ ৮০ হাজার। বর্তমানে এই সংখ্যা কোন অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু করোনার সময়েই বেকারের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরো কয়েক কোটি যুবক। এমনকি শিক্ষিতশ্রেণির প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার। যার মাঝে স্নাতক পর্যায়ে উত্তীর্ণ রয়েছে প্রায় ৩৭% এবং স্নাতকোত্তর রয়েছে প্রায় ৩৪%)</p>
<p>&#8212; যেখানে খাদ্য সংকটে ভুগছে অর্ধেক জনগোষ্ঠী,<br />
সেখানে মোট বাজেটের এত বিশাল একটা অংশ শুধু সুদের পেছনেই ব্যয় হচ্ছে!!</p>
<p>• অথচ<strong> শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটের মাত্র ১২.০১%। জিডিপির হিসেবে যার পরিমাণ ১.৮৩%।</strong> জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ গতবারের তুলনায় কমেছে। বিশ্বে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম।</p>
<p><strong>ইউনেস্কো ও আইএলও’র তথ্যমতে, যেকোনো দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মান মোট বাজেটের ২০ শতাংশ আর জিডিপির ৬ শতাংশ।</strong> এর তুলনায় যে নগণ্য বরাদ্দ আমাদের বাজেটে যে দেয়া হয়েছে, তা দিয়ে কীভাবে একটি শিক্ষিত প্রজন্ম আশা করা যায়? গবেষণার জন্য তো আলাদা বাজেট নেই-ই। আবার, শিক্ষাখাতে বাজেট দেয়া হলেও &#8211; বর্তমান সময়ে যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা-কার্যক্রমের জন্য প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল, সেখানে অপটিক্যাল ফাইবারের</p>
<p>মতো আইটি পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ১০ শতাংশ এবং ল্যাপটপ আমদানিতে ভ্যাট বসানো হয়েছে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ সকল ধরনের প্রযুক্তি-পণ্যের দাম বেড়েছে। এ জাতীয় সকল সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ দ্বৈতনীতিরই নামান্তর। ডিজিটালাইজেশনের এই সময়ে এসে এমন পদক্ষেপ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।</p>
<p>• চিন্তা করুন এবারের বাজেট পেশ করা হয়েছে<strong><em> &#8220;কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন&#8221;</em></strong> শিরোনামে। এই কোভিড পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্যখাতে যে পরিমাণ ধ্বস নেমেছে তা কাটিয়ে ওঠা সহজসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য না রেখে <strong>স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৫.৪%</strong>। এই খাতে বাজেট যেখানে বাড়ানোর কথা, সেখানে না বাড়িয়ে এর বিপরীতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে সম্পৃক্ত দ্রব্যাদির মূল্য বাড়ানোতে প্রহসনেরই প্রমাণ মেলে।</p>
<p>• <strong>বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ৩.৮%, পরিবহন ও যোগাযোগে ১২%</strong> বরাদ্দ রেখে বাজেট করা হলেও তা কি আদৌও বাস্তবায়ন হয়!! এই খাত দুটির সাথে প্রক্রিয়াধীন ও প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট জড়িত। যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ছেই। কখনো কখনো তা একই ধরণের প্রকল্পে উন্নত রাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে কাঁচামালের যোগান সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। এক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা ও উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা মোটেও নেই। প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে বিদেশীদের। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও কোনো দেশি কোম্পানির কাছে নেই। প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই হচ্ছে বিদেশি। আর শ্রমিকদের মধ্যে দেশীয় যারা, তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাও নিতান্তই সামান্য। তাহলে কার পেছনে ব্যয় হচ্ছে এত অর্থ?</p>
<p>বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছোট-বড় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াট হলেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৭৮২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তার উপর এই অংশ থেকেই বিতরণ লস হয়েছে ৮.৪৮%। যার ফলাফলস্বরুপ এখনো ২১ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে।</p>
<p>• পরিবহন ও যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত নগরজীবনে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। যানজটের ফলে দীর্ঘ একটা সময় অপচয় হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রের সময় নষ্ট হচ্ছে। নগরবাসীদের অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তো দিন দিন বাড়ছেই। কেবল ২০২১ সালেই সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৮৫১৬ জন। একটা প্রতিবেদনে এরকম দেখালেও মূলত বাস্তব পরিসংখ্যান এর চেয়ে অনেকবেশি।</p>
<p>বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে রেল ও নৌপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিলো। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নৌ-পথ অর্ধেকের বেশি কমেছে। রেলপথ গুরুত্ব পায়নি। বরং রেলযাত্রার উপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সড়কপথ বাড়লেও এসবের মান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।<br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a><br />
• অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারের বাজেটও সম্পূর্ণ ঘাটতি বাজেট। <strong>মোট বাজেটের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা হলেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা।</strong> বাকী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা পুরোটাই ঘাটতি থাকছে। যা মোট বাজেটের ৩৬.১৪ শতাংশ। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েই এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ঋণ নেয়ার ধারাবাহিকতা আজ নতুন নয়। প্রতিবছরই ঋণের বোঝা বাড়ছে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩২ ডলারে। টাকার হিসেবে যার পরিমান ৪০ হাজারেরও বেশি। সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুটির উপরও এই ঋণের ভার বর্তাবে।<br />
বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি নিরাপদ সীমার মাঝে পড়ে। অথচ ২২-২৩ অর্থবছরেরই ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫.৫ শতাংশের বেশি। এই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ঋণ ও প্রতিবছর যে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে, এ নিয়ে বাজেট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তো লক্ষ্যণীয় নয়ই, বরং নামেমাত্র বাজেট পেশ করতে হবে, এজন্যই বাজেট পেশ করা হচ্ছে।</p>
<p>কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, ‘আর্থিক বিবৃতি প্রদান একপ্রকার ধর্মীয় আচার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে এবং তার সম্ভাব্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রভূত বাকচাতুরীর দ্বারা উচ্চকিত রূপে পাঠ করা হয় (যা কখনোই পাঁচ ঘণ্টার নিচে সম্পন্ন হওয়ার নয়) অর্থাৎ নানাবিধ নর্তন, কুর্দন, ভাব ও ভঙ্গিমার সঙ্গে চার ঘণ্টার একটি বক্তৃতা প্রদান করা হয়।’</p>
<p>• প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ-পাচার যে হচ্ছে, এতকাল পরে সরকারিভাবে এই প্রথম তা স্বীকার করেছে। কিন্তু বিদেশে পাচারকৃত অর্থ বৈধ করার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে মূলত এই অর্থপাচারকে বৈধতাই দেয়া হয়েছে। অর্থ-পাচারকারীরা বরং আরো সুযোগ পেয়ে গেলো এই অবৈধ কাজের! ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, <strong>প্রতি বছর বাংলাদেশে থেকেই ১০০০ থেকে ১৫০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়।</strong></p>
<p>ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইনন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে<strong> সোয়া চার লাখ কোটি টাকা</strong> পাচার হয়।</p>
<p>এই বিপুল পরিমাণ দেশীয় অর্থ বিদেশে পাচার হওয়া ঠেকাতে উপযুক্ত কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং এবারের বাজেটের আলোচনায় এই কাজের প্রতি উৎসাহিত করা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়ংকর অশানি সংকেত!</p>
<p>• একটু ভালোভাবেই লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাজেটটি সম্পূর্ণ বিত্তবান, ব্যবসায়ী, মুনাফাভোগী ও অর্থ পাচারকারীদের স্বার্থ মোতাবেকই হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছু রাখা হয়নি। পুঁজিবাদের নিয়ম অনুযায়ী এবারের বাজেটও হয়েছে অর্থবিত্তদের জন্য সুখকর এবং সাধারণ জনগণকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। রেমিট্যান্স এর উপর আড়াই শতাংশ প্রণোদনার সুযোগে শুধু মানি লন্ডারিংয়ের সাথে জড়িত ব্যাক্তিরাই উপকৃত হচ্ছে।</p>
<p>এ নিয়ে পরপর ৩ বছর কর্পোরেট কর কমানো হয়েছে। শুধু এ বছরেই কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর উপর আরোপিত করের ২.৫ শতাংশ কমানো হয়। এতে করে বড় ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলোই লাভবান হবে বেশি। তাদের ব্যয় সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর খাবারের দাম কমানোতে বিলাসিতার প্রতি প্রাধান্য দেয়ার ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে সাধারণ জনতাদের উপর কর আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বাজারে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার উত্তরণের চিন্তা না করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কাটিয়ে উঠার প্রতিও ভ্রুক্ষেপ নেই। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও বাড়বে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। ট্রেন-চলাচলের খরচ বেড়ে গেছে। অর্থাৎ এই বাজেটে ধনীদেরকে আরো ধনী হওয়ার সুযোগ এবং গরিবদেরকে আরও গরিব হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।</p>
<p>• এদিকে সরকারের আয়ের চেয়ে ঋণ বেশি। সরকার দাবী করে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কম। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে সরকার করের টাকার প্রায় ২০% আউট স্ট্যান্ডিং দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের খাতেই খরচ করে। এটাই বটম লাইন। ঋণের সুদ পাঁচ বছর আগেও এক অংকে ছিল। অর্থাৎ ৮-৯% সুদ বাবত খরচ মাত্র কয়েক বছরেই ১৯% ছাড়িয়েছে। বুঝা যাচ্ছে পরবর্তি যে কোন সরকারের জন্য বাজেট খরচ কতটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে?<br />
চলমান অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সরকারের আয় ছিল ২ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে সরকার শুধু অভ্যন্তরীণ ঋণ করেছে ২ লক্ষ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ হিসেব করলে পরিমাণটা আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থাৎ সরকারের আয়ের চেয়ে ঋণ ঢের বেশি।</p>
<p>এর পাশাপাশি লক্ষ্য করলে দেখবো যে,</p>
<p>• রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল ও দিক-নির্দেশনা নেই। সরকারি ব্যয় ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপটে উচিৎ ছিল ১০ শতাংশ কমানো।</p>
<p>• দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি গুরুত্বহীন থেকে গেছে। বাজার-অর্থনীতিতে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কী করতে পারে? বেসরকারি খাতের সঙ্গে ব্যাক্তি খাতের উপর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কীভাবে তা করবে সেই নির্দেশনা বাজেটে নেই। ভোক্তা অধিকার ও পণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য চাহিদার পরিমাণ জানা জরুরি। এর উপর ভিত্তি করে যোগানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু দ্রব্যমূল্যকে একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখানো হলেও বাজেটে এ সমস্যা সমাধানের জন্য কোন উদ্যোগ নেই।</p>
<p>• বড় বড় প্রকল্প গুলোর টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও চাহিদা মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে না, আমরা দেখছি চীন, ভারতের তুলনায় &#8211; এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়ও আমাদের নির্মাণ খরচ বেশি।</p>
<p>• দেশের অন্যতম বড় সংকট হচ্ছে- সামাজিক নিরাপত্তা। কিন্তু এই খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের দেড় শতাংশ বরাদ্দ, যা খুবই নগণ্য। এর উপর সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতনকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে দেখানো হয়। অন্যান্য খাতের ভর্তুকিও এই খাতে দেখানো হয়।</p>
<p>• কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেট দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬.২%। এদিকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে বর্তমানে ধান ছাড়া মোটামুটি সব ধরণের খাদ্যদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। আবার যেগুলো দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, কৃষকরা তার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকটে দিনাতিপাত করছে তারা। অথচ এ কৃষিই আমাদের সাড়ে সাতশো বছরের ইতিহাসে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।</p>
<p>• নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, জনগণের আয় বাড়েনি। গত কয়েকবছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো হয়নি বরং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নষ্ট করা হয়েছে। করোনার মধ্যে ২৫টি পাট কল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, একের পর এক চিনিকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যায় করলে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব পাটকল, চিনিকল চালু করা সম্ভব। এতে কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান ফিরে পাবে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, হাসপাতালে নার্স, ডাক্তারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে</p>
<p>প্রায় লক্ষ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব। এসব নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণে বাজেটে কোন বরাদ্দ বা নির্দেশনা নেই।</p>
<p>• আবার আবাসন খাত নিয়ে কোন কথা নেই। একইভাবে সংস্কৃতি ও ধর্ম খাতে মাত্র ০.৮% বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি কত বড় দৈন্যতা! এ দেশের যুব সমাজের নৈতিক চিন্তাগত অবস্থানের ভবিষ্যৎ তাহলে কী?</p>
<p>এইভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভয়াবহ অসামঞ্জস্য লক্ষণীয়। সুদের হার বাড়ছে, কিন্তু মৌলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোর বাজেট দিনকে দিন কমছে। ফলশ্রুতিতে একটি ফাঁদ তৈরি হচ্ছে!</p>
<p>এ বাজেট মূলত একটি মৌখিক বাজেট। মৌখিক কিছু আয় দেখানো হলেও তা মূলত মিথ্যা, কারণ তা ব্যাংক ঋণের সাথে মিলছে না। তবুও যদি এ মৌখিক বাজেট বাস্তবায়িত হতো, তাও একটি কথা ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরের বাজেট পর্যালোচনা দেখলে বোঝা যাবে বাস্তবায়নের হার ধীরে ধীরে কমছে তো কমেই যাচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের ৮১% বাস্তবায়ন হয়েছে, যেটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসে ৭৬% হয়ে গেছে আর গত অর্থবছরে নেমে এসেছে ৬০%-এর কমে। এভাবে অপচয়, অবৈধভাবে অর্থলুট, দুর্নীতির কারণে বাস্তবায়নের হার ক্রমেই কমছে, অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবতা নেই। অপরদিকে যে বিশাল অঙ্কের সুদ, তা যদি দেশের উন্নয়নের কাজে লাগানো যেতো, তাহলে পরিস্থিতি কেমন হতো তা খুব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কিছুই হবে না!</p>
<p>কোনো রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা, বড় ব্যক্তি এসব মৌলিক বিষয় নিয়ে সঠিক পর্যালোচনা তুলে ধরছে না। ফলশ্রুতিতে বাজেট সঠিকভাবে পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনার যে গুরুত্ব ও আবশ্যকীয়তা রয়েছে, যুবসমাজ ও জনগণ তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বাজেটের বিষয়টি একটি একাডেমিক তত্ত্বীয় বিষয় হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আমরা কেউ ভ্রুক্ষেপ করছি না, আর দেশের অবস্থা যা হওয়ার তাই হচ্ছে।</p>
<p><strong>৯০% মুসলমানের দেশে ১১.৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই;</strong> অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতিরাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দারিদ্র্যতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে, করোনাকালীন পরিস্থিতিতে যা চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার যে সকল জায়গাতে দুর্নীতি বেশি, যেমন– সামাজিক নিরাপত্তা খাত, সে সকল জায়গাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে? এ ক্রান্তিকালেও সেনা বাজেট বাড়ানো হচ্ছে কেন?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্ধকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের কাছাকাছি! সুদ পরিশোধ করতে হবে, মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কখন পরিশোধ করব? অথচ আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>পুঁজিবাদীদের শাসনের ফলাফলের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এ জুলুম ও শোষণ এখনও সমানভাবে বিদ্যমান। অর্থাৎ আমাদের দুর্দশার অন্যতম মূল কারণ সুদ। অথচ এটি নিয়ে আমরা কেউ কথা বলি না, উল্টো সুদকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সাঃ) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সবসময়ই সুদের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ এ সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও এই অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সাঃ)।<br />
এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা, সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো, চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।</p>
<p>ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে, কথিত উন্নয়নের ডায়ালগ বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ছোট শিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎসশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে আগাতে হবে।</p>
<p>আমাদের রয়েছে–</p>
<blockquote><p>• ১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ<br />
• তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত<br />
• ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা<br />
• দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)<br />
• গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর<br />
• বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ<br />
• বনাঞ্চল<br />
• মৎসশিল্প ইত্যাদি</p></blockquote>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকটসহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/budget-analysis-2022-23/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7192</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিদেশ নির্ভর অর্থনীতি নয় প্রয়োজন ব্যবসার সহজীকরণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/foreign-dependent-economy-does-not-need-business-facilitation/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/foreign-dependent-economy-does-not-need-business-facilitation/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 30 Apr 2022 16:45:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7103</guid>

					<description><![CDATA[অক্সিজেন উৎপাদন কারিগরি দিক থেকে খুব জটিল কোনো বিষয় নয় এই সময়ে এবং তা ব্যয়বহুলও নয়। মাত্র দু-তিন কোটি টাকা খরচেই চীন কিংবা জার্মানির অক্সিজেন প্রস্তুতকারকদের সহায়তায় মধ্যমানের একটা অক্সিজেন প্লান্ট তৈরি করা যায়। অথচ ভারতের করোনাকালীন জরুরি পরিস্থিতি এবং]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>অক্সিজেন উৎপাদন কারিগরি দিক থেকে খুব জটিল কোনো বিষয় নয় এই সময়ে এবং তা ব্যয়বহুলও নয়। মাত্র দু-তিন কোটি টাকা খরচেই চীন কিংবা জার্মানির অক্সিজেন প্রস্তুতকারকদের সহায়তায় মধ্যমানের একটা অক্সিজেন প্লান্ট তৈরি করা যায়। অথচ ভারতের করোনাকালীন জরুরি পরিস্থিতি এবং অক্সিজেনসহ কিছু জরুরি ও স্পর্শকাতর চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহের সংকটের সময় আমরা সেই ভারতের ওপরই ভরসা করছি। যাবতীয় দুর্যোগের সময় ভারত কিংবা চীনের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয়  বিকল্প নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে। দেশীয় উৎপাদনের কিংবা আমদানির বিকল্প একটা সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলে ভালো।</p>
<p>চাল, ডাল ও পেঁয়াজের মতো পচনশীল পণ্য, যা ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকভাবে রপ্তানি করে, সেগুলো ভারত থেকে একচেটিয়াভাবে আমদানি করার অর্থনীতি যৌক্তিক। ভারত থেকে পণ্য ক্রয় পরিবহন খরচ ও সময়ের দিক থেকে সাশ্রয়ী। পচনশীল আমদানি পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণের বদলে এখানে ছোট কিংবা মধ্য পরিসরে স্টোরেজের নীতি ব্যবসা সহনীয়। কিন্তু তাই বলে পচনশীল পণ্যের বাইরে অপরাপর যাবতীয় শিল্পের কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য নির্বিচারে ভারত বা চীন থেকে আমদানি করতে থাকলে সময়ে সময়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, মন্দা, অবকাঠামোগত কিংবা মানবসৃষ্ট সমস্যা এবং বিশেষভাবে রাজনৈতিক সংকটের সময়ে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়া বেশ স্বাভাবিক।</p>
<p>ভারত বিশ্বের প্রায় অর্ধেক টিকা উৎপাদন করলেও কাঁচামাল আসে ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা চীন থেকে, কাঁচামালের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন পরস্পর সংযুক্ত। ধারণা করা হচ্ছে, অতি চাহিদার জন্য কাঁচামাল সংকটে টিকা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাই বেশ চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় জরুরি সময়ে যেখানে ভারতেই টিকা ও অক্সিজেনের হাহাকার শুরু হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের শুধু ভারতের দিকেই তাকিয়ে থাকা বিব্রতকর বিষয়। এগুলো না পেয়ে দোষারোপের সংস্কৃতিতে যাওয়াকে ভালো চোখে দেখা যায় না। স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ভারতের জরুরি অবস্থায় রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত সময়ের বিবেচনায় যৌক্তিক। হ্যাঁ, অতীতে চাল-পেঁয়াজসহ বিভিন্ন দরকারি পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভারত বাজে উদাহরণ তৈরি করেছিল। পাট ও পাটপণ্য, বাংলাদেশে তৈরি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও মাছ ধরার জালের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে ভারত বাংলাদেশের কিছু খাতের বেশ ক্ষতি করেছে। তথাপি ভারতের করোনাজনিত অক্সিজেন বিপর্যয়ের মুখে ও টিকা তৈরির কাঁচামাল স্বল্পতার মধ্যে এই দুটি পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা স্বাভাবিক বিষয় বলেই বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে।</p>
<p>স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পরই একটি দেশ বিদেশে পণ্য রপ্তানি করবে। উপরন্তু সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যদি পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বেশি লাভ করা যায়, তাহলে সে পথে কে যাবে না? বাণিজ্যে তো বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই। লভ্যাংশনির্ভর বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি এখানে থাকে আচরণগত অর্থনীতির কৌশল খেলার বিষয়। ফলে চুক্তির টিকাও আসবে, যখন দেখা যাবে টিকার আন্তর্জাতিক চাহিদাটা কমে যাবে এবং টিকার দামও কমে যাবে। বিকল্প উৎসহীন একচেটিয়া ও একপক্ষীয় আমদানি নীতিতে গেলে এমন ভাগ্যই নিয়তি।</p>
<p><strong>এখানে মৌলিক একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কেন শিল্প কাঁচামাল, জীবন বাঁচানোর জরুরি ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় ‘প্রস্তুতকৃত পণ্য’ একটিমাত্র উৎস থেকেই আমদানি করতে হবে? কেন সুই থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ পর্যন্ত সবকিছুই আমদানি করতে হবে? কারণ দেশের শিল্প অবকাঠামো নিয়ে আমাদের কোনো লক্ষ্য ও অভীষ্ট তৈরি হয়নি। দূরদর্শিতা নেই বলে আমাদের কী কী মৌলিক উৎপাদন খাত থাকা চাই, তা সংজ্ঞায়িত হয়নি। তবে কারিগরিভাবে এই উত্তরটি বিশ্বব্যাংকের ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’ কিংবা ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ব্যবসা সূচক ১৬৮, বিপরীতে ভারতের ৬৩। বিশ্বে ১৯০টি দেশের মধ্যে প্রতিবেশী দুটো দেশের অবস্থানের পার্থক্য ১০৫। এই সূচকটা একটা আয়না, যেখানে খুব সহজে একটা দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, শিল্প ও ব্যবসার পরিবেশ বোঝা যায়।</strong><strong> </strong></p>
<p>২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স ছিল ৯৯। পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পর, যখন ব্যাপকসংখ্যক ব্যবসায়ীকে ধরে ধরে চাঁদা আদায় করা হয় এবং জেলে ভরা হয়। ২০০৮ সালে সূচকের অবনতি হয়ে ১১৫-তে নেমে যায়, পরের বছর আরও কমে হয় ১১৯। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এ সময় বাংলাদেশের আগে থেকেই থাকা জ্বালানি সংকট ব্যাপকতর হয়। বিরোধী ঘরনার ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রতিবন্ধকতা ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত সহনীয়ভাবে অব্যহত থাকে। ধীরে ধীরে ব্যবসা সহজীকরণ সূচক ২০১৩ সালে ১৩০-এ নামে। ২০১১ সালের শেয়ারবাজার ধসও ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে পিছিয়ে থাকার বড় কারণ ছিল।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7105" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-২.jpg" alt="" width="1024" height="635" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-২.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-২-300x186.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-২-768x476.jpg 768w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>একদলীয় শাসনের যাত্রা শুরুর বছরে (২০১৩-১৪) এক বছরেই বাংলাদেশের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকের ৪২ ধাপ অবনমন হয়। বিশ্বের বিনিয়োগ ও ব্যবসার ইতিহাসে এই পতন একটা রেকর্ডও হতে পারে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আস্থা ফিরে না আসায় বিরোধীদের পুঁজিগুলো বিনিয়োগে আসেনি বরং এই পুঁজির অনেকটাই সরকারি প্রভাবশালীদের মাধ্যমে লুট কিংবা বেদখল হয়েছে। ব্যক্তিসম্পদ বিনিয়োগের পরিবর্তে ভোগ হয়েছে, হয়েছে পাচার। এসময় বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বহু ব্যবসায়ীর টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে, অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। শাহবাগ আন্দোলনের আগে-পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াত ঘরনার ব্যসায়ীদের মালিকানাধীন কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, টিভি ও সংবাদপত্রও বন্ধ কিংবা বেহাত হয়ে যায়। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অচলাবস্থাজনিত আস্থাহীনতায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে একপর্যায়ে ব্যবসা সহজীকরণ সূচক ১৭৮-এ নেমে পড়ে। ২০২০ সালে এসে বাংলাদেশের ব্যবসা সূচক বিশ্বে ১৬৮তম হয়।</p>
<p>ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের তারতম্য আকাশ-পাতাল। নির্মাণসংক্রান্ত অনুমতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রভৃতি ঝামেলায় ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ১০৮টি অবস্থানে এগিয়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তি ও সাশ্রয়ী জ্বালানির সূচকে তারা ১৫৪টি অবস্থানে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ থেকে। ঋণপ্রাপ্তির দিক থেকে ৯৪টি অবস্থানে ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় ৫৯টি অবস্থানে তারা এগিয়ে রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ৩৬টি অবস্থানে এগিয়ে। সম্প্রতি এক শীর্ষ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, দেশে প্রকৃত করদাতাদের হেনস্তা করা হয় এবং প্রভাবশালীদের ছাড় দেয়া হয়। এতে সৎ ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ বাড়ছে। ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে এর সত্যতা মেলে। কর সহজীকরণের দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ৩৬টি দেশের অবস্থানে এগিয়ে।</p>
<p><strong>এর অর্থ হচ্ছে, ভারতে ব্যবসা ও শিল্প টিকিয়ে রাখা সহজ, পণ্য উৎপাদনের খরচ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। এভাবে চীনের সঙ্গে তুলনা করা হলে ব্যবধানটা আরও বেমানান ঠেকবে। সুতরাং বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বড্ড বেশি বলে সবাই চীন ও ভারতমুখী। কেন বাংলাদেশের পণ্য উৎপাদন খরচ খুব বেশি, এর এক লাইনের উত্তর না খুঁজে বরং খুঁজতে হবে ব্যবসা সহজীকরণের বৃহৎ পরিসরটায়।</strong></p>
<p>বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে যেতে মহাসড়কের পথে পথে পণ্যবাহী একটি ১০ টনের ট্রাককে চাঁদা দিতে হয় প্রায় সাড়ে ২২ হাজার টাকা (আনোয়ার পারভেজ, ২৬ জুলাই ২০১৩ প্রথম আলো), গ্রাম থেকে শহরে পণ্য আসতে দাম বেড়ে যায় ১০ থেকে ২০ গুণ। যেখানে পুলিশ ও পরিবহন সমিতির নামে চলে বেপারোয়া চাঁদা—এমন দেশে পণ্য উৎপাদন হবে না, বরং হবে আমদানি ও ট্রেডিং। এর ফলে সময়ে সময়ে সংকটে পড়াই আমাদের যৌক্তিক পরিণতি। স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন আমাদের ছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধাগুলো জানার গভীরতর বিদ্যায়তনিক অনুসন্ধান দরকার। জীবন চালাতে ও জীবন বাঁচাতে জরুরি পণ্যের একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দেশে উৎপাদন করে কর্মসংস্থান ও সরবরাহ সংকটের টেকসই সমাধানের বোধটা ফিরে আসুক।</p>
<p>শিল্প বিনিয়োগের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি প্রকল্প বা নীতির সমীক্ষা ও পর্যালোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অন্য কয়েকটি বাধা হচ্ছে—জমিস্বল্পতা, নিরবচ্ছিন্ন সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা, পরিবেশ ছাড়পত্র, চুক্তি বাস্তবায়ন, লেনদেনসহ আর্থিক অপরাধের বিচারিক নিষ্পত্তি, দক্ষ মানবসম্পদ প্রাপ্তি, ঘুষ, দুর্নীতি ও বেপারোয়া চাঁদাবাজি, জ্বালানি সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবেশ ছাড়পত্রসহ নানা ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি ছাড়াও অন্য বেশকিছু সমস্যা। রাজনৈতিক সদিচ্ছায় থাকলে এর অনেক কিছুই দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যায়।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7104" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-১.jpg" alt="" width="1024" height="493" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-১.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-১-300x144.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2022/04/ফয়েজ-আহমেদ-১-768x370.jpg 768w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>আমাদের প্রবৃদ্ধি যে কর্ম তৈরি করতে পারছে না, বেসরকারি বিনিয়োগ যে এগোচ্ছে না, ব্যবসা সূচক ছাড়া তার ভিন্ন কোনো প্রমাণ ও ব্যাখার প্রয়োজন নেই। বিনিয়োগবন্ধ্যার কারণগুলো খুবই কারিগরি ও অবকাঠামোগত। ব্যবসা সহজীকরণের বিদ্যুৎ উপ-সূচকে বাংলাদেশের মান ১০০-তে মাত্র ৩৪ দশমিক ৯, ভূমি নিবন্ধনে মাত্র ২৯, ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়নে ২২ দশমিক দুই, অর্থ ও ব্যবসায়িক মামলা নিষ্পত্তিতে মান মাত্র ২৮ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ৩১ দশমিক আট। এই বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান না করে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি আনার কাজ রাতারাতি এগিয়ে নেয়া যাবে না। সার্বিকভাবে বাংলাদেশে ব্যবসা করা কঠিন এবং পণ্য উৎপাদন করা ব্যয়বহুল। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার নামে হাজার কোটি খরচ হলো, তার সুফল বিনিয়োগে আসবে কবে? বিদ্যুৎ খাতে সরকার গত ১০ বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিলেও ব্যবসা ও শিল্পের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রাপ্তি সহজ হয়নি। বরং ১০ বছরে ১০ বার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ব্যবসা সহজীকরণে বড় বাধা।</p>
<p>ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে অগ্রগতি হলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সার্বিকভাবে গতি পাবে। ২০২৪ সালে এলডিসি উত্তরণের আগেই প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আনার সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের বোধগম্য অবকাঠামোগত উপযোগিতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য ব্যবসা সহজীকরণ সূচকের প্রতিটি উপখাতেই ব্যাপক অগ্রগতি প্রয়োজন। এই অগ্রগতিগুলো হলে এবং দেশে পণ্য উৎপাদন খরচ কমলেই জরুরি অবস্থায় কিংবা সংকটে বিদেশপানে তাকানোর বাধ্যবাধকতা কমে আসবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/foreign-dependent-economy-does-not-need-business-facilitation/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7103</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতার মৌমাছি বনাম পূঁজিবাদী সভ্যতার মৌমাছি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bees-of-islamic-civilization-vs-bees-of-capitalist-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bees-of-islamic-civilization-vs-bees-of-capitalist-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 11 Mar 2022 10:00:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী সভ্যতার মৌমাছি বনাম পূঁজিবাদী সভ্যতার মৌমাছি]]></category>
		<category><![CDATA[পূঁজিবাদী সভ্যতার মৌমাছি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6672</guid>

					<description><![CDATA[মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী বিপর্যয় ডেকে এনেছে পূঁজিবাদী সভ্যতা। বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে যে শ্রেণী বৈষম্য মানবতার ইতিহাসে তা আর কক্ষনো দেখা দেয়নি। সমগ্র মানবতা আজ পুঁজিবাদী সভ্যতার ফাঁদে বন্দী। ১৮৬০ সালে শিল্প উন্নত দেশ সমূহ দরিদ্র দেশ সমূহের তুলনায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী বিপর্যয় ডেকে এনেছে পূঁজিবাদী সভ্যতা। বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে যে শ্রেণী বৈষম্য মানবতার ইতিহাসে তা আর কক্ষনো দেখা দেয়নি। সমগ্র মানবতা আজ পুঁজিবাদী সভ্যতার ফাঁদে বন্দী। ১৮৬০ সালে শিল্প উন্নত দেশ সমূহ দরিদ্র দেশ সমূহের তুলনায় যেখানে ৩ গুন বেশী ধনী ছিল সময়ের ব্যবধানে সেই দেশ সমূহ ১৯৬০ সালে এসে ৬০ গুন বেশী ধনী দেশে রূপান্তরিত হয়। বর্তমান সময়ের তারা প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ গুন বেশী ধনী। <strong>আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির জনক বলা হয় অ্যাডাম স্মিথকে। তার </strong><strong>Wealth of Nations </strong><strong>বইকে আধুনিক অর্থশাস্ত্রের বাইবেল বলা হয়ে থাকে। অ্যাডাম স্মিথ মূলত প্রভাবিত হয়েছিলেন হল্যান্ডের দার্শনিক </strong><strong>Bernard Mandeville </strong><strong>দ্বারা এবং বিশেষ করে তার লেখা বই “</strong><strong>The Fable of the Bees or Private Vices, Public Benefits” </strong><strong>কে তিনি পরবর্তীতে থিওরিতে পরিণত করে পুঁজিবাদকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন।</strong></p>
<p>আসুন এখন Bernard Mandeville এর লেখা বই “The Fable of the Bees or Private Vices, Publick Benefits” কি আছে সেটাতে একটু চোখ বুলিয়ে নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনেক দিন আগে একটি মৌচাক ছিল। মৌচাকটি ছিল একটি ছোট রাষ্ট্রের মত। সেই রাষ্ট্রের পরিচালক মৌমাছিরা ছিল বড় বড় দুষ্কৃতিকারী। আদালত তো দূরে থাকুক আদালত নামে কোন শব্দেরই অস্তিত্ব ছিল না। মৌচাক নামক এই রাষ্ট্রটি রাষ্ট্রীয় ভাবে অনেক দুষ্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ফলাফল কেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে সেই রাষ্ট্রের কর্তাদের সকল কূটকৌশলকে তাদের বুদ্ধিমত্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হত। ধূর্ত প্রতারকদেরকে সবাই মান্য করে চলত।</p>
<p>সেই রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল মৌমাছির উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে নিজের জন্য একটি অংশকে নেওয়া। মৌচাকের সদস্যরা তাদের আয়-উপার্জন কে বেশী করার জন্য নতুন নতুন বিনিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি করলে রাষ্ট্রের অর্থনীতি একটু উন্নতির দিকে যায় এবং এক পর্যায়ে দেশটি উন্নতির উচ্চ শিখরে এসে উপনীত হয়। ধূর্ত প্রতারকদের হাত ধরে দেশ আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করলে, নেতাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ মৌমাছিরা বিদ্রোহ করে এক সাথে জড়ো হয় এবং তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে তাদের দেশে আখলাক পাঠানোর জন্য দোয়া করে। এই দোয়া সাথে সাথে সৃষ্টিকর্তার দরবারে কবুল হয়ে যায় এবং তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সকল মৌমাছিরা আখলাক সম্পন্ন হয়ে উঠে। ফলে ধন-সম্পদের প্রতি কোন মৌমাছিরই আর কোন লোভ লালসা ছিল না। কেউ আর নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহন করতে চাচ্ছিল না। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেক অপ্রত্যাশিত ফলাফলও দেখা দেওয়া শুরু করে। কেউ আর বিচারের জন্য কোর্টে যাচ্ছিল না, রাষ্ট্রের অনেক কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে। সকলেই কম করে ভোগ করা শুরু করে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করার ফলে উৎপাদন কমে যায়। সারা দেশ বেকারত্বে ছেয়ে যায়। সেখানে বসবাসকারীদের মধ্যে উন্নতি ও অগ্রগতির কোন প্রতিযোগিতা না থাকার ফলে কেউ আর নতুন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছিল না। অবস্থা এমন হওয়ায় সেনাবাহিনীও পুলিশের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যায়।</p>
<p>এই মৌচাকে বসবাসকারী সকল মৌমাছিরা ছিল শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে। তারা অন্য কোন মৌচাকের সাথে কোন ধরণের যুদ্ধ বিগ্রহ চাচ্ছিল না। কিন্তু একদিন এক শত্রু মৌচাক রাষ্ট্র এই আখলাক সম্পন্ন মৌচাকের উপর আক্রমন করলে আখলাক সম্পন্ন মৌচাকটি হেরে যায়। কারণ তাদের সেনাবাহিনী ও আরও অন্যান্য অনেক কিছু না থাকায় তারা হেরে যায়। অনেক মর্মান্তিক ঘটনার পরে তারা খুব কষ্টে একটি গাছের গর্তে লুকাতে সক্ষম হয় এবং সেখানে অল্প সংখ্যক আখলাক সম্পন্ন মৌমাছি নিজের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>Bernard Mandeville তার এই বইটি প্রকাশ করেন ১৭১৪ সালে। এই বইটি প্রকাশের পর সবচেয়ে মজার যে ঘটনা ঘটে তা হল এই বইটি সাহিত্যিক অঙ্গনের চেয়ে, অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতি ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে যারা চিন্তাভাবনা করতেন তাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। Bernard Mandeville তার বইয়ে দাবী করেন যে, সকল মানুষই স্বার্থপর, এটা তার জন্য খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয় এবং এমনটাই হওয়া উচিত। তার মতে সততা কিংবা পরার্থপরতা একটি সমাজকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে পেছনের দিকে নিয়ে যায়। লেখকের মতে শ্রমিক শ্রেণী থেকে শুরু করে ডাক্তার পর্যন্ত সমাজের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যদি স্বার্থপর হয়ে নিজের উন্নতির জন্য কাজ করে তাহলে সেই সমাজে প্রাচুর্যের সৃষ্টি হবে। তার মতে অন্যের ভালোর কথা চিন্তা করে কাজ করলে তা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। Bernard Mandeville র মতে <strong>&#8220;</strong><strong>চরিত্রহীন হওয়া ছাড়া একটি সমাজ কখনো উন্নতি লাভ করতে পারে না। সকল ধরণের সুখ কেবলমাত্র চরিত্রহীন হলেই পাওয়া সম্ভব। একমাত্র স্বার্থপরতাই মানুষকে সুখী করতে পারে।&#8221;</strong></p>
<p>মূলত এটাই হল বর্তমান পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি। এই নীতির উপর গড়ে উঠা পূঁজিবাদী সভ্যতার কারণেই সমগ্র মানবতা আজ এক ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন। Homo Economicus এর যে ধারণা এই ধারণা মূলত এই দর্শন থেকেই উৎসারিত।</p>
<p>পূঁজিবাদী সভ্যতার মূল কথাই হল স্বার্থপরতা ছাড়া, লোভ-লালসা ছাড়া এবং অন্যের সম্পদকে গ্রাস করা ছাড়া একটি দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। এখন আসুন জেনে নেই ইসলামী সভ্যতা কি বলে? মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলে আকরাম (সঃ) একটি হাদীসে বলেন,</p>
<blockquote><p>إن مَثَل المؤمن لكمَثَل النَّحلة، أكلَتْ طيبًا، ووضعَتْ طيبًا، ووقعَتْ فلم تكسِرْ ولم تُفسِدْ</p>
<p>অর্থাৎঃ “নিশ্চয় একজন মুমিনের উপমা হল মৌমাছির মত। সে উত্তম জিনিস খায় এবং উত্তম জিনিস উৎপাদন করে। সে তার অবস্থান গ্রহণ করবে কিন্তু কোন কিছু ভাঙবেও না ধ্বংসও করবে না।”</p></blockquote>
<p>এটাই হল ইসলামের মূল কথা। ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে মানুষের সেবাই হল স্রষ্টার সেবা। মৌমাছি যেমন উত্তম জিনিস উৎপাদন করে নিজে খায় এবং অন্যকে খাওয়ার সুযোগ করে দেয় একজন মুসলমানও তেমন হবে। ইসলাম চায় মানুষ পরস্পরের প্রতি নির্দয় ও নিষ্ঠুর হবার পরিবর্তে সহধর্মী ও সহযোগী হবে। <strong>ইসলাম একদিকে আখলাকের শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে অক্ষম ও পেছনে পড়ে থাকা মানুষের আশ্রয় প্রদানের মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায়</strong><strong>; আর </strong><strong>অপরদিকে সমাজে একটি শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তুলতে চায় যা অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাহায্য করার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবে</strong><strong>।</strong> ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এমন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে। আর সামাজিক স্বার্থের জন্যও তার স্বাধীনতা কোন ক্ষতির কারণ না হয় এবং অবশ্যই কল্যাণ হব হয়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bees-of-islamic-civilization-vs-bees-of-capitalist-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6672</post-id>	</item>
		<item>
		<title>হালের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বেকারত্ব ও ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/haler-orthonitite-voyaboho-bekarotto-o-chatrosomajer-vobisshot-onishcoyota/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/haler-orthonitite-voyaboho-bekarotto-o-chatrosomajer-vobisshot-onishcoyota/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 10 Jan 2022 07:01:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6104</guid>

					<description><![CDATA[করোনাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে বেড়েছে তা সত্যি, কিন্তু সমাধানের চিন্তা ও আওয়াজকে বাদ দিয়ে সংকট কেন্দ্রিক সব সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই কি মুক্তি পাওয়া যাবে? ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদন মতে বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>করোনাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে বেড়েছে তা সত্যি, কিন্তু সমাধানের চিন্তা ও আওয়াজকে বাদ দিয়ে সংকট কেন্দ্রিক সব সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই কি মুক্তি পাওয়া যাবে?</p>
<p>ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদন মতে বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য মতে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ১ কোটি ৩২ লাখ। বাংলাদেশে এখন ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশ। কিন্তু সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান কোথায়?<br />
চাকরির একেবারেই সাধারণ ছয়টি পদের বিপরীতে অনলাইন ও অফলাইনে আবেদন জমা পড়ে ৮২ হাজার ৬৫২টি! ভাবা যায় দেশের কী অবস্থা?</p>
<p>প্রশ্ন হলো এসবের জন্যও কি করোনা পরিস্থিতিই দায়ী? এসব কি একদিনেই হয়েছে? &#8216;না&#8217;।</p>
<p>আবার এখন করোনাকালীন যে অবস্থা, তাতে ভবিষ্যতে খাতা-কলমে এ সংখ্যা এবং জনজীবনের দুর্দশা যে কত গুণ বাড়বে তা হিসাবেরও বাইরে!</p>
<p>প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সময়ে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৫ লক্ষ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ সাড়ে আট কোটিতে পৌঁছাচ্ছে, যাদের দৈনিক আয় ১.৯ ডলারেরও কম। খাদ্য সংকটে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ। সংখ্যাগুলো কখনোই বাস্তবতাকে ধারণ করে না, তারপরও শুধুমাত্র সংখ্যার হিসেবেই পরিস্থিতি কী ভয়াবহ তা আমরা ভাবতে পারছি?</p>
<p>আবার দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মধ্যবিত্ত মানুষেরও আয় কমছে, ব্যক্তিগত সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে; সামষ্টিক বা পারিবারিক সঞ্চয় কমছে বলে ব্যক্তিগত ধার/ঋণের সুযোগ কমছে। এ সংকোচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বুঝা যায়, প্রতিনিয়তই বেকারত্বজনিত কর্মহীনতার কবলে পড়ে শিক্ষা খাতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পরিমাণ শুধু বাড়তেই থাকবে।<br />
কৃষি ও ভাসমান কাজে নিশ্চিতভাবে শিশুশ্রম বাড়বে।<br />
একইসাথে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ব্যাপকহারে বাড়বে।<br />
গ্রামীণ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশের হার কমে আসবে।</p>
<blockquote><p>তাহলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী?<br />
শিক্ষায় ঝরে পড়া বিশাল ছাত্র-সমাজকে নিয়ে কে ভাবছে? আগামীর প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের ভাবনা কী? রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে, প্রতিবাদ করে বা যে কোনো উপায়ে সংকট তুলে ধরে রাষ্ট্রকে সমাধান করতে বাধ্য করার ব্যাপারে কারোরই যেন মাথাব্যথা নেই!</p></blockquote>
<p>একটু চিন্তা করে দেখুন তো, বেকারত্ব আর ঝরে পড়ার পরিমাণ যখন বাড়বে, সামাজিক অপরাধ আর নিরাপত্তাহীনতা কি তখন কমবে? নাকি ভয়াবহ আকারে বাড়তে থাকবে?</p>
<p><strong>এদিকে অধ্যয়নরত ৪০% শিক্ষার্থীর অর্থ যোগান দেয় তার পরিবারের প্রবাসে থাকা সদস্যরা। তাদের কী অবস্থা?</strong><br />
<strong>এ আয় আমাদের রেমিট্যান্স আয়ও, যা দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ প্রবাস থেকে শ্রমিকরা ফিরে আসছে প্রতিনিয়ত! ফলে আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্সের পরিমাণও কমে যাচ্ছে । এখন পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন প্রায় ২৩ লক্ষ শ্রমিক, কিন্তু সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই!</strong></p>
<p>আবার খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে এ জাতীয় হাজারো ক্ষুদ্র শ্রেণি-পেশার মানুষদের এখন যা অবস্থা, তা তো আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পারছি ।</p>
<p>এসবের সমাধান কার কাছে?<br />
(হ্যাঁ, মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াবে । কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি পাশে না দাঁড়ায়, মানুষ কতদিন ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে সক্ষম হবে?)</p>
<p>কিছুদিন আগেও দেখেছিলাম করোনা সংকট মোকাবেলায় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক বরাদ্দ দিয়েছে যা সরাসরি এ শ্রেণি-পেশার মানুষেরা পেয়েছে। যেমন:<br />
যুক্তরাষ্ট্র ১ ট্রিলিয়ন ডলার, জার্মানি ৬১৪ বিলিয়ন ডলার, ব্রিটেন ৪১২ বিলিয়ন ডলার, স্পেন ২১৬ বিলিয়ন ডলার, কানাডা ৫৬.৮ বিলিয়ন ডলার, পোল্যান্ড ৫১.৩ বিলিয়ন ডলার, চেক রিপাবলিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, সুইডেন ২৯ বিলিয়ন ডলার, ইতালি ২৭ বিলিয়ন ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৭ বিলিয়ন ডলার, কাতার ২৩ বিলিয়ন ডলার, জাপান ১৯ বিলিয়ন ডলার, হংকং ১৫ বিলিয়ন ডলার, তুরস্ক ১৫ বিলিয়ন ডলার, সৌদি আরব ১৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে ।</p>
<p><strong>আমাদের দেশের বরাদ্দ কোথায়?</strong><br />
<strong>(হ্যাঁ, দেয়! কাদের দেয়? বড় বড় কোম্পানিগুলোকে দেয়, অর্থাৎ তেলা মাথায় তেল দেওয়া! আবার নামে যতটুকু দরিদ্রদের দেয়, তার কতটুকুই বা তাদের কাছে পৌঁছায়?)</strong></p>
<p>সব মিলিয়ে এ সংকট কবে কাটবে? কবে এ নিয়ে সরকার চাপে পড়বে? আমরাই বা কবে বৃহত্তর পরিসরে আওয়াজ তুলবো?</p>
<p>এসবের উত্তরে একটি কথা ঘুরেফিরেই শুনতে হয় &#8216;বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি দেশ, দরিদ্র্যতা এর নিত্য বিষয়&#8217;। অথচ আমাদের ৫০ এর উপরে খনিজ সম্পদ, সব বিদেশীদের হাতে ইজারা দেওয়া। ইউরেনিয়ামের মত দামী সম্পদ, যার জন্য এত যুদ্ধ, তা কিনা আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের বিনা পয়সায় দিয়ে যাচ্ছি!</p>
<p>এদিকে কৃষির ক্ষেত্রে &#8220;বণিক বার্তা&#8221;য় প্রকাশিত সবচেয়ে ভয়াবহ যে রিপোর্ট আমরা দেখেছি, তা হলো ধান ব্যতীত সকল প্রকার কৃষিদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে আমাদের! অথচ আমরা গান গাই &#8216;ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা&#8217;..</p>
<p>গার্মেন্টস খাতে যা হচ্ছে তা নিয়ে আর কী-ই বা বলবো! লাখ লাখ মানুষ পথে বসার উপক্রম!<br />
শুধু গার্মেন্টস কেন, সব খাতেই একই অবস্থা ।</p>
<p>আচ্ছা, এ কৃষি, শিল্প, খনিজ সম্পদ, বন্দর নিয়ে যদি আমাদের সমাজের নীতিনির্ধারকরা না ভাবেন, তবে মুক্তি আসবে কীভাবে?<br />
হাজারো বেকার ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে যদি কোনো পরিকল্পনাই না থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎই বা কী?</p>
<p>জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণকারী এ শিক্ষিত বেকার ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে না ভাবলে ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই নিমজ্জিত হতে থাকবে, আর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আগামী প্রজন্মের উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলো মারা পড়বে।</p>
<p>ঈদ পরবর্তী কুরবানীর গোশত খাওয়ার আনন্দঘন সময়ে আমার বেদনার সুর বাজানোর কারণ হলো সত্যিকারের আনন্দ আমরা করতে পারছিনা। মানুষ ভালো না থাকলে কিসের আনন্দ! করোনা চলে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে– বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এ দুর্দশা বহুদিনের। এখনই পদক্ষেপ না নিলে প্রতিদিন দুর্দশা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাই আজ করোনা সমস্যা, কাল আরেক সমস্যা, পরশু অন্য আরেক সমস্যার অজুহাতে বসে থাকলে চলবে না। এ সকল সমস্যা চলতেই থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। সমস্যার অজুহাতে নির্লিপ্ত হয়ে থাকলে অবস্থার উন্নতি কখনোই হবে না, বরং দিনকে দিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে থাকবে।</p>
<p>কিন্তু আমরা যদি আমাদের প্রত্যেকটি খাতকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং সে আলোকে কাজ করে যাই, তাহলে সকল সমস্যা ও সংকট মোকাবেলা অবশ্যই সহজ হয়ে যাবে এবং এতে করে স্থায়ী মুক্তির দিকেও ধাবিত হওয়া সম্ভব হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/haler-orthonitite-voyaboho-bekarotto-o-chatrosomajer-vobisshot-onishcoyota/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6104</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বৈদেশিক ঋণ উন্নয়ন নাকি শোষণের নতুন রূপ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/foreign-debt-development-or-new-forms-of-exploitation/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/foreign-debt-development-or-new-forms-of-exploitation/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. নূরুল আমিন]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 30 Oct 2021 10:53:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6332</guid>

					<description><![CDATA[&#160; বিবিএস এর এক হিসাব অনুযায়ী দেশে এখন মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬০,০০০.০০ টাকা। আমার পরিবারে এখন ছয়জন সদস্য আছেন, আমরা স্বামী স্ত্রী দুজন, ছেলে, ছেলের বউ ও দুজন নাতনি। এ হিসাবে আমাদের ছয়জনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩,৬০,০০০.০০ টাকা।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[
<p class="wp-block-paragraph">&nbsp;</p>
<blockquote>
<p>বিবিএস এর এক হিসাব অনুযায়ী দেশে এখন মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬০,০০০.০০ টাকা। আমার পরিবারে এখন ছয়জন সদস্য আছেন, আমরা স্বামী স্ত্রী দুজন, ছেলে, ছেলের বউ ও দুজন নাতনি। এ হিসাবে আমাদের ছয়জনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩,৬০,০০০.০০ টাকা। ঋণ নিয়ে বড় লোক হবার ব্যাপারে আমার উপর আমার পিতামাতার নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমি নিজেও সুদের কারণে ঋণকে ঘৃণা করি। আমার একটা গর্ব ছিল যে, আমার পরিবার ঋণমুক্ত। কিন্তু আমি চেষ্টা করলে কি হবে? আমি যে রাষ্ট্রের নাগরিক সে রাষ্ট্রই আমার পরিবারকে ঋণী করে ফেলেছে। এই টাকা শোধ করতে হবে আমাদের খাজনা, ট্যাক্স ও টোলের আকারে, যদিও এই ঋণ আমার সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনকে অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু উপকৃত করেছে সে সম্পর্কে আমি উল্লেখযোগ্য কিছুই জানি না।</p>
</blockquote>



<p class="wp-block-paragraph">বাংলাদেশের যে বৈদেশিক ঋণ তার অধিকাংশের যোগানদাতা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আইডিএসহ আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা ও দ্বিপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশসমূহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই এদের উত্থান ঘটেছে। এর আগে উন্নত-অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে ঋণ লেনদেনের খুব একটা নজির ছিল না বললেই চলে। <strong>বর্তমানে আমরা যাদের উন্নত দেশ বলি তারাও বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে উন্নত হয়েছে এমন নজির নেই। Development is self development.</strong></p>



<p class="wp-block-paragraph">নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী নিজস্ব শক্তিতে যে উন্নয়ন তা যেমন ফলপ্রসূ হয় তেমনি টেকসইও হয়। সুদভিত্তিক ঋণ নিয়ে অনুৎপাদনশীল প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেশের উন্নয়ন করা যায় না। এই ঋণ শোধ করতে হয় রাজস্ব আয় থেকে যা ঋণ গ্রহিতা বহু দেশই করতে পারে না। ফলে পুরাতন ঋণ শোধ করার জন্য নতুন ঋণ নিতে হয়। এমনকি পুরাতন ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যও নতুন ঋণ নেয়ার নজির রয়েছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের পৃষ্ঠপোষকতাধন্য বিভিন্ন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের জন্য বিভিন্ন দেশের উপর সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট গছিয়ে দেয়ারও দৃষ্টিান্ত রয়েছে। এগুলো আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা।</p>



<p class="wp-block-paragraph">এই অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে, কিছু কিছু ডোনার এজেন্সি (আসলে ক্রেডিট এজেন্সি) আছে যারা গত চার দশক ধরেই সরকারি এজেন্সিসমূহের কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। এই প্রশ্নটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই যে, অনেক সময় তারা এমন সব পদ্ধতির ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন, যে পদ্ধতিগুলো তাদেরই সুপারিশ ও অনুপ্রেরণায় উদ্ভাবন ও প্রচলন করা হয়েছিল। বলাবাহুল্য ৯০-এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য যত প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তার সিংহভাগ অর্থের উৎস ছিল বৈদেশিক সাহায্য এবং এখনো বিদ্যুৎ খাতসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত এই সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বৈদেশিক সাহায্য পেতে হলে প্রকল্প তৈরি করতে হয় এবং প্রকল্পে অর্থ সংস্থানের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে Consultancy Service তথা বিদেশি উপদেষ্টা নিয়োগ। এই উপদেষ্টারা আসেন দাতা দেশ বা সংস্থা থেকে। তাদের পেছনে ব্যয়িত অর্থের অডিট হয় না। তারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী স্থানীয় কাউন্টারপার্টও নিয়োগ দেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিকে ত্বরান্বিত করা এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার বা প্রযুক্তি হস্তান্তর হচ্ছে তাদের প্রধান কাজ। প্রকল্পের বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রণয়নের ব্যাপারে সরকারকে সাহায্য করাও তাদের কাজ। প্রকল্পের অর্থ ছাড়ও তাদের সুপারিশ বা অনুমোদন সাপেক্ষ বিষয়। উন্নয়ন ঋণ চুক্তি (Development credit Agreement) স্বাক্ষরের পর এর শর্তাবলী পালন করা উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব এবং এর বাইরে বিশেষ কোন শর্ত পালন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে কোনও এজেন্সি যখন তহবিল ছাড় বিলম্বিত করে তখন তাদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।</p>



<p class="wp-block-paragraph">আমাদের দেশে দাতা এজেন্সিগুলো প্রায়শঃই সরকারি এজেন্সিগুলোর উপর দোষ চাপিয়ে তহবিল ছাড় বিলম্বিত করে, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ এবং ব্যয় উভয়ই বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে উভয় পক্ষের ভূমিকা মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।</p>



<p class="wp-block-paragraph"><strong>প্রকল্প বাস্তবায়ন মন্থরতার জন্য এ যাবত যত সমীক্ষা ও মূল্যায়ন হয়েছে সেগুলোতে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে বিলম্বই হচ্ছে প্রধান এবং এই বিলম্বের জন্য উন্নয়ন সহযোগী নামে পরিচিত দাতা সংস্থাগুলোই বহুলাংশে দায়ী। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো অনেকগুলো সমস্যা আছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যা, সাজসরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বিলম্ব, ডিজাইনের ত্রুটি এবং সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের অক্ষমতা এবং প্রকল্প কর্মকাণ্ডের Sustainability-র অভাব প্রভৃতি।</strong></p>



<p class="wp-block-paragraph">এই সমস্যাগুলো দীর্ঘ দিনের এবং একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলো দূরীকরণের জন্য বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, ইউএনডিপিসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও এজেন্সি বহু সভাসমিতিতে মিলিত হয়েছে এবং দেখা গেছে যে যখন একটি কার্যকর সমাধান চিহ্নিত হয়েছে তখনি তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে দাতাসংস্থাগুলোর আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে। তারা নতুন ইস্যু সৃষ্টি করেছেন।</p>



<p class="wp-block-paragraph">বাংলাদেশের সেচ ও কৃষি খাতের প্রকল্পগুলোর দিকে নজর দিলেই একথা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাবে যে গ্লোবাল স্টেটেজিকে সামনে রেখে এক সময় তারা সমবায়কে কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের বাহন হিসেবে সমর্থন দিয়েছে এবং যখনই এ সংগঠনগুলো আত্মনির্ভরতা অর্জন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সেবা বিতরণের মজবুত এজেন্সিতে পরিণত হবার পর্যায়ে পৌঁছতে শুরু করেছে তখনি তারা বিভিন্নভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এখন তারা সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রমকে সহায়তা করতে চান না, কারণ এনজিওদের, সাধারণ মানুষের প্রতি যাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। জানা গেছে যে, বিশ্ব ব্যাংকসহ কয়েকটি সংস্থা এখন কমপিটিটিভ বিডিং-এর অজুহাত তুলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতের অর্থ ছাড় বিলম্বিত করছে।</p>



<blockquote class="wp-block-quote is-layout-flow wp-block-quote-is-layout-flow">
<p><em><strong>সত্তুরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে কৃষির আধুনিকায়ন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে তারা বাংলাদেশকে বিপুল অংকের প্রকল্প সাহায্য প্রদান করেছে। এই সাহায্য বা ঋণের আওতায় গভীর ও অগভীর নলকূপ, শক্তি চালিত পাম্প প্রভৃতি সরবরাহের জন্য তারা কমপিটিটিভ বিডিং এর অনুসরণ করেনি। বহুজাতিক এজেন্সিগুলোকে টেনে এনে তারা ইঞ্জিন সরবরাহের দায়িত্ব দিয়েছিল। এসব ইঞ্জিনের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তারা জবরদস্তি পল্লী উন্নয়ন এবং গভীর নলকূপ-২ প্রকল্পের উপর অচল ডয়েজ, উষা, কিষান ও চায়নীজ ইঞ্জিন চাপিয়ে দিয়েছিল যেগুলো কমিশনিং-এর ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অচল হয়ে পড়ে। কৃষকরা/সমবায়ীরা এসব সেচ যন্ত্রের ঋণের বোঝা এখনো পর্যন্ত বয়ে বেড়াচ্ছে। ইঞ্জিনের প্রতিস্থাপন তারা এখনো পায়নি। সত্তুরের দশকের প্রথম দিকে বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট পল্লী উন্নয়ন-১ প্রকল্পের আওতায় তাদেরই নির্দেশনায় চাহিদা যাচাই না করেই আমদানিকৃত অনেক কৃষি যন্ত্রপাতি বগুড়া ও ময়মনসিংহ জেলার ৭টি কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির গুদামে চার দশক ধরে পড়েছিল, নিলামে বিক্রি করতে গিয়েও খদ্দের পাওয়া যায়নি মর্মে রিপোর্ট পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।</strong></em></p>
</blockquote>



<p class="wp-block-paragraph">এই অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা পরিষ্কার যে বিশ্ব ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর স্বার্থ ও চাহিদা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও চাহিদার সাথে সঙ্গতিশীল নয়। তাদের অনেকেই প্রকল্প সাহায্যের নামে বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর স্বার্থকে প্রমোট করা ছাড়াও ঋণ এবং সুদের মহাজনী করে যা আমাদের নিজস্ব উদ্যোগের বিকাশকে ব্যাহত করে। এই অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য শুধু বৈদেশিক উৎসের উপর নির্ভরশীল না হয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। এতে বিদেশী ঋণ কমবে এবং জনগণের ভোগান্তিও কমবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/foreign-debt-development-or-new-forms-of-exploitation/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6332</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী অর্থনীতি : দর্শন ও কর্মকৌশল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-economy-philosophy-strategy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-economy-philosophy-strategy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 21 Sep 2021 05:43:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী অর্থনীতি : দর্শন ও কর্মকৌশল]]></category>
		<category><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6239</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী অর্থনীতি বর্তমানে একটি বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এ কথাও বলা যায় যে, এ সাবজেক্টের বয়সও খুব বেশি নয়। মাত্র সত্তর বা আশি বছর। এর আগে এটা পলিটিক্যাল সায়েন্সের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তখন এটাকে পলিটিক্যাল ইকোনমি বলা হতো। গত সত্তর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>ইসলামী অর্থনীতি বর্তমানে একটি বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এ কথাও বলা যায় যে, এ সাবজেক্টের বয়সও খুব বেশি নয়। মাত্র সত্তর বা আশি বছর। এর আগে এটা পলিটিক্যাল সায়েন্সের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তখন এটাকে পলিটিক্যাল ইকোনমি বলা হতো।</strong></p>
<p>গত সত্তর বছর ধরে ইসলামী অর্থনীতির ওপর ব্যাপক কাজ হচ্ছে। বেশ কিছু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সিনিয়র অর্থনীতিবিদ এই বিষয়ে কাজ করছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, ড. নাজাত উল্লাহ সিদ্দিকী, প্রফেসর ড. ওমর চাপড়া, ড. মনজের কাহাফ, ড. তরিকুল্লাহ খান, ড. মুনাওয়ার ইকবাল প্রমুখ। এছাড়াও অন্য স্কলাররা এই বিষয়ে অনেকে কাজ করেছেন। ধীরে ধীরে ইসলামী অর্থনীতি একটি পূর্ণ বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>ইসলামী অর্থনীতির ওপর আলোচনা করতে গেলে এর যে দর্শন বা কর্মকৌশল সেই বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। ইসলামী অর্থনীতির দর্শনই হলো এই অর্থনীতির ভিত্তি অথবা তার স্ট্র্যাটেজি বা কর্মকৌশলের ভিত্তি। কেননা, একটি বিল্ডিং যেমন নির্ভর করে তার ফাউন্ডেশনের ওপর, ফাউন্ডেশনটাই বলে দেয় বিল্ডিংটি কী রকম হবে, তেমনিভাবে ইসলামী অর্থনীতির দর্শন বলে দেয় যে, তার কর্মকৌশলটা কী হবে বা কী হওয়া উচিত।</p>
<p><em>কিন্তু সেই দর্শন এবং কর্মকৌশল আলোচনার আগে আমি মনে করি, বর্তমান বিশ্বে যা চলছে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা দরকার। বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক চলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে ক্যাপিটালিজম। <strong>আমরা যদি এই ক্যাপিটালিজমের সমস্যাগুলো বুঝতে পারি তা হলেই ইসলামী অর্থনীতির গুরুত্ব বুঝতে পারব।</strong> এটা এই জন্যই প্রয়োজন যে, বর্তমান রুলিং আইডিওলজি দৃশ্যত খুব শক্তিশালী, খুব সফল বলে মনে হয়। অনেকের এ-ও মনে হতে পারে যে, এর বুঝি কোনো দুর্বলতা নেই। কিন্তু এ কথাটা সত্য নয় এবং এ কথাটাই আমি এখানে আলোচনা করতে চাই।</em></p>
<p>ক্যাপিটালিজমের বয়স ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধরা হয়। প্রায় পাঁচ শ’ বছর এর বয়স। এই পাঁচ শ’ বছরে ক্যাপিটালিজম যে দুনিয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। তেমনি এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, ক্যাপিটালিজম বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য, অসমতা দূর করতে পারেনি। কাজেই ক্যাপিটালিজম দোষমুক্ত বা সমস্যামুক্ত এটা যেমন অতীতের ক্ষেত্রে বলা যায় না, তেমনি আজকেও বলা যায় না। আজকেও আমরা জাপানের অর্থনীতির মধ্যে একটা নিম্নগতির ধারা, আর্জেন্টিনাতে বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখি। সেখানে অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে পাঁচ-ছয় মাসে চারজন প্রেসিডেন্ট বদল হয়েছে এবং এখনো বিরাট ক্রাইসিস চলছে।</p>
<p>আমরা গত বিশ বছরে পুঁজিবাদী বিশ্বের অনেক সঙ্কট দেখেছি। সাউথ ইস্ট এশিয়ায় বিরাট অর্থনৈতিক ক্রাইসিস দেখলাম বিগত শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে এবং সেটি এখনো চলছে। ল্যাটিন আমেরিকাতেও আমরা বিভিন্ন সময় ক্রাইসিস দেখেছি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও আমরা বিভিন্ন সময় ডাউনটার্ন লক্ষ করেছি। এ সম্পর্কে অনেক কথা বলা যায়।</p>
<p>ক্যাপিটালিজম আমরা কম-বেশি সবাই বুঝি। বিভিন্ন অর্থনৈতিক মতবাদ প্রধানত পাশ্চাত্যেই তৈরি হয়েছে। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরাই এর ওপর বেশি কাজ করেছেন। এ কথাগুলো শুধু ক্যাপিটালিজমের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, সোশ্যালিজমের ক্ষেত্রেও সত্য। ওয়েলফেয়ার ইকোনমিকস নামে যা বিশ্বে চলছে সেটিও পাশ্চাত্যেরই অবদান। পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরাই এসব ধারণা নিয়ে এসেছেন।</p>
<p>ক্যাপিটালিজমের ভিত্তি ছিল বা এর পেছনে শুরুতে কাজ করত খ্রিষ্টান এথিকস বা খ্রিষ্টান নৈতিকতা। কারণ পাশ্চাত্যের যেখানে এর বিকাশ ঘটে সেই সমাজ মূলত খ্রিষ্টান সমাজ ছিল। মৌলিকভাবে জনগণ খ্রিষ্টীয় এথিকসে বিশ্বাস করত। ফলে ক্যাপিটালিজমের অর্থনৈতিক নীতিমালায় যা-ই ত্রুটি থাকুক না কেন, খ্রিষ্টান এথিকস তাকে মডারেট করত, তার খারাপ প্রভাবকে সংযত করত, তাকে নিয়ন্ত্রণ করত।</p>
<p>পরবর্তীকালে কোনো কোনো লেখকের দ্বারা <strong>অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুক্তবুদ্ধির যে আন্দোলন শুরু হয় তার মূল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ</strong>। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মকে জীবনের মৌলিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেয়ারও চেষ্টা করা হলো। এই আন্দোলনের কারণে বাস্তবে সেক্যুলারিজম প্রাধান্য পায় এবং সমাজ সেক্যুলারিস্ট হয়। সেখানে নৈতিকতা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং যুক্তিকে (রিজন) প্রাধান্য দেয়া হয়। এতে মনে করা হলো, যুক্তিই সবকিছুর সমাধান করতে পারে। যদিও আমরা জানি, যুক্তিবাদে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এর দ্বারা সব সমাধান করা যায় না। যুক্তিবাদ সত্ত্বেও মানুষের ভেতর মতবিরোধ দেখা দেয় এবং আজকে যেটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয় কালকে সেটি যুক্তিসঙ্গত থাকে না। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা সময় গেছে যখন যুক্তিকে  প্রায় পূজা করা হতো। আল্লাহর স্থানে, গডের স্থানে যুক্তিকে  নিয়ে আসা হলো। ভ্রান্ত ছিল সেটি, বিভ্রান্তি ছিল, ভুল ছিল।</p>
<p>এনলাইটমেন্ট মুভমেন্টের কারণে (ক্যাপিটালিজমের ভিত্তি হওয়ার কারণে বা এর ফলস্বরূপ) চলে এলো ম্যাটেরিয়ালিজম ভোগবাদ, ব্যক্তিবাদ, স্বার্থপরতার মতো বস্তুবাদের বিষয়গুলো। এর ফলে আসে হাই কনজাম্পশন। অন্যদিকে এটা একটা সামাজিক ডারউইনিজম সৃষ্টি করল। আমরা ডারউইনিজম সম্পর্কে জানি। ডারউইনিজম হচ্ছে জীবজগতের সেই ধারণা যা ডারউইন থেকে এসেছে বা ডারউইন উদ্ভাবন করেছে। অর্থাৎ জীবজগৎ সম্পর্কিত ডারউইনের ধারণাই ডারইউনিজম। এখানেও সোশ্যাল ডারউইনিজম বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পেয়েছে। এনলাইটমেন্ট মুভমেন্ট এবং ম্যাটেরিয়ালিজমের বিকাশের কারণে।</p>
<p>ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, অর্থনীতিতেও ন্যাচারাল সিলেকশন হবে এবং এখানে শুধু ফিটেস্টরাই সারভাইভ করবে। যোগ্যরাই বাঁচবে। অর্থনীতিতে যদি তা-ই হয় তা হলে তার মানে হবে প্রকৃতপক্ষে দুর্বলের কোনো স্থান থাকবে না, দরিদ্রের স্থান থাকবে না। যদি থাকেও তা হবে খুব সঙ্কীর্ণ।<br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 577px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/01/Islami-orthoniti.jpg" height="95" /></a><br />
সোজা কথায়,<strong> বিশ্ব অর্থনীতি বড়লোকের, যোগ্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে</strong>। অর্থাৎ ম্যাটেরিয়ালিজম এনলাইটমেন্ট মুভমেন্টের কারণে সোশ্যাল ডারউইনিজমের কারণে পুঁজিবাদ একটি ডকট্রিনে পরিণত হয়। অর্থনীতিতে শুধু যোগ্যরাই টিকে থাকবে তা দর্শনে পরিণত হয়। এতে দরিদ্রের প্রতি খ্রিষ্টান এথিকসের কারণে যে মায়া-মহব্বত ছিল, তাদের প্রতি যে দায়িত্ববোধ ছিল, সেটি উঠে গেল। এমনকি দর্শনের মাধ্যমে সেটি উঠে গেল। তখন তারা দরিদ্র মারা গেলে কী হবে সে যুক্তি খাড়া করতে পারল না। যোগ্যদের টিকে থাকার ফলে দরিদ্ররা মরে যাবে। এই ধরনের ফলাফল অষ্টাদশ শতাব্দীর মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের কারণে দেখা দিয়েছিল।</p>
<p><em>ক্যাপিটালিজমের থিওরির পেছনে কতগুলো অগ্রহণযোগ্য ধারণা ছিল যেগুলো কিছুটা আমাদের জানা দরকার। যেগুলো প্রকৃতপক্ষে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন তারা বলেন, অর্থনীতির আইনগুলো হচ্ছে ফিজিক্যাল ল-এর মতো। যেমন যেভাবে পৃথিবী ঘুরছে বা সূর্য যেভাবে চলছে নিজস্ব নিয়মে অথবা বায়ুপ্রবাহ-নদী বা সমুদ্রের গতি প্রভৃতি ফিজিক্যাল ল’জ যেমন সঠিক তেমনি ইকোনমিক ল’জ সঠিক। এখানে অর্থনীতির আইন ফিজিক্যাল আইনের মতোই এরকম একটা ধারণা নিয়ে আসা হলো। তারা এগুলো বিশ্বাস করে। কিন্তু এটা একেবারে সত্য নয়। আমরা জানি, বাজার ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকে। যেই পরিবর্তন আমাদের সোলার সিস্টেমে হয় না বা আমাদের ফিজিক্যাল ল’তে হয় না। অথচ যেকোনো বাজার ব্যাপক পরিবর্তনের সম্মুখীন। সুতরাং এ রকমই একটা ভুল ধারণার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপিটালিজম।</em></p>
<p>মানুষের কাজের মোটিভেশন বা কাজ করার প্রেরণাটা কী? সে সম্পর্কে তারা বলে, মানুষের কাজের মোটিভেশন হলো শুধু তার স্বার্থপরতা। মানুষ মূলত স্বার্থপর এবং তার স্বার্থপরতা, স্বার্থ উদ্ধার করাই হচ্ছে তার প্রকৃত মোটিভেশন। এটাকে তারা টেকনিক্যালি বলে, মানুষ হচ্ছে যুক্তিবাদী (র‌্যাশনাল)। এ যুক্তির পরিচয় হচ্ছে সে স্বার্থের জন্য কাজ করে। তবে এ কথা ঠিক, মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা রয়েছে এবং স্বার্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।</p>
<p>মানুষ কি কেবল স্বার্থের জন্যই কাজ করে? কথাটা মোটেই সত্য নয়। তা হলে দুনিয়ায় এত ত্যাগ মানুষ করতে পারত না। পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য মানুষ এত ত্যাগ করত না। এত চ্যারিটি দুনিয়াতে থাকত না।</p>
<p>তৃতীয়ত তারা একটি মূল্যবোধহীন অর্থনীতির জন্ম দিলো। তারা একটি ডকট্রিন খাড়া করল পজিটিভিজম নামে। পজিটিভিজমের কথা হলো, অর্থনীতিতে কোনো মূল্যবোধ নেই। অর্থনীতিতে মূল্যবোধ এলেই অর্থনীতি প্রভাবিত হয়ে যাবে। অর্থনীতি তার ন্যাচারাল কোর্স থেকে সরে পড়বে। অর্থনীতি একটি বিজ্ঞান হিসেবে থাকবে না। কিন্তু অর্থনীতির কার্যক্রমে কোনো মূল্যবোধ থাকবে না, এরকম দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত মারাত্মক। আর তা-ই যদি হয় তা হলে কোন যুক্তিতে আমরা দরিদ্রের জন্য কাজ করব? দারিদ্র্য কেন দূর করব? কেন আমরা বঞ্চিত জনগণের জন্য কাজ করব? এ সবই তো মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কিত।<br />
সুতরাং পজিটিভিজমের ধারণা ক্যাপিটালিজমে প্রবেশ করল, যে অর্থনীতিতে কোনো মূল্যবোধ নেই।</p>
<p><strong>ক্যাপিটালিজমের অপর নাম মূল্যবোধহীন অর্থনীতি। এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না অথচ এটাই চলছে ক্যাপিটালিজমের নামে। আবার বলা যায়, পুরোপুরি চলছে না। কারণ এগুলো সব আন-ন্যাচারাল (অস্বাভাবিক) ধারণা। এ জন্য হয়তোবা এগুলো থিওরিতে আছে তবে বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয় না।</strong></p>
<p>ক্যাপিটালিজম মার্কেট সিস্টেমের ওপর গুরুত্ব দেয়। মার্কেট সিস্টেমের গুরুত্ব সত্ত্বেও তার অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু সেটা তারা স্বীকার করে না। ক্যাপিটালিজমের মার্কেট সিস্টেমের অনেক ভালো দিক আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অ্যালোকেশন অব রিসোর্সের ক্ষেত্রে মার্কেট ভালো কাজ করে। কিন্তু আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, ক্যাপিটালিজমে মার্কেট সিস্টেমটাকে যেরকম পুরোপুরি পারফেক্ট মনে করা হয় তা কিন্তু সত্য নয়। বাস্তবে মার্কেট সিস্টেমের মাধ্যমে পুরোপুরি রিসোর্স বা সম্পদের সঠিক বণ্টন হয় না। ন্যায়বিচারমূলক বণ্টন হয় না। তার প্রমাণ বাস্তবে একটা দেশের জনগণের একটা অংশের হাতে প্রয়োজনীয় ক্রয় ক্ষমতা না থাকায় তারা কিনতে পারে না। যেমন, আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের কাছে ডলার বা পাউন্ড নেই। তারা কিনতে পারে না। তারা অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় জীবন সামগ্রী কিনতে পারে না বলে তাদের প্রয়োজনটা মার্কেটেই যায় না, যেতেও পারে না। তাদের দুধ বা ওষুধ দরকার হলেও সেই প্রয়োজন মার্কেটে আসছে না। তাদের বাড়ি দরকার, বাড়ি ভাড়া করা দরকার-সেই প্রয়োজন মার্কেটে যায় না। কারণ তারা সেটা কিনতে পারছে না।</p>
<p>অন্যদিকে মার্কেট সিস্টেমে যাদের টাকা আছে তারা চারটা-পাঁচটা গাড়ি কিনতে পারে। বিরাট বিরাট বাড়ি বানাতে পারে। অন্য দিকে যাদের টাকা নেই তারা দুধ পর্যন্ত কিনতে পারে না। ওষুধ কিনতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে দুটো ফল জনগণের হয়। পূর্ণ ও সঠিক ডিমান্ডটা মার্কেটে আসতে পারে না বর্তমান মার্কেট সিস্টেমের কারণে এবং দ্বিতীয়ত অগ্রাধিকার নষ্ট হয়ে যায়। দরকার দুধের অথচ মার্কেট বলছে বিলাস সামগ্রী বানাও। কেননা এর মাধ্যমে বাজারে সেসব দ্রব্যের চাহিদা এসেছে। গাড়ির চাহিদাটাই মার্কেটে আসছে। দুধের চাহিদা আর আসতে পারছে না।</p>
<p>সুতরাং মার্কেট সিস্টেম সঠিক পদ্ধতি নয় যার মাধ্যমে সম্পদের সমবণ্টন হতে পারে। কেননা, সম্পদ চলে যাবে সেই দিকে, যেদিক থেকে মার্কেটে ডিমান্ড আসছে। সম্পদ সেই দিকেই যাবে, যেই ডিমান্ডটি মার্কেটে আসে। ফলে যে ডিমান্ড আসছে না (দুধের ডিমান্ড পুরোপুরি আসছে না) সেদিকে তো সম্পদ রয়েছে। সুতরাং যারা মনে করেন মার্কেট সব সমস্যার সমাধান করবে তারা সম্পূর্ণ ভুল করে, মার্কেটের দাস হয়ে যায়। কিন্তু সেটা হওয়া ঠিক হবে না। বাজার গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাজার একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়।</p>
<p>এই কনটেক্সটে এখন ইসলামের অর্থনীতির যে মূল ভিত্তি বা তার যে কর্মকৌশল সে সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। বর্তমানে রুলিং আইডিওলজি ক্যাপিটালিজমের দুর্বলতা বোঝার কারণে ইসলামী অর্থনীতির কর্মকৌশল ভালো করে বোঝা সম্ভব। <em>ইসলামী অর্থনীতিবিদগণ তিনটি বিষয় বা ধারনাকে মূল ভিত্তি বলেছেন। একটি হলো তৌহিদ। এই তৌহিদ হচ্ছে এই পৃথিবী আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। এটা তাৎপর্যহীন সৃষ্টি নয়। সব মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। সব মানুষের গুরুত্ব রয়েছে এবং সব মানুষকে গুরুত্ব দিতে হবে।</em></p>
<p><strong>ইসলামী অর্থনীতির দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে খিলাফত।</strong> খিলাফত হলো মানুষ আল্লাহর খলিফা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ। সূরা বাকারা, সূরাতুল ফাতিরে এবং অন্যান্য সূরাতে এ কথা বলা হয়েছে। খিলাফত মানুষকে অত্যন্ত সম্মানিত করেছে। মানুষ কোনো চান্স প্রোডাক্ট নয়। হঠাৎ করে একটা এক্সিডেন্টের মাধ্যমে মানুষের সৃষ্টি সে রকম নয়। মানুষ জন্মগত অপরাধী ও নয়। যেমনটি পাশ্চাত্যে মনে করা হয়। খিলাফতের ধারণা মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে। খিলাফতের তাৎপর্য হলো বিশ্বভ্রাতৃত্ব। অর্থাৎ সব মানুষ ভাই বা ভাই-বোন এবং এ হিসেবে তারা মর্যাদার অধিকারী, সমতার অধিকারী, সমভাবে তাদের দিকে খেয়াল করতে হবে। খেয়াল করার প্রয়োজন রয়েছে। এর আরেকটা তাৎপর্য হলো, মানুষ মূল মালিক নয়। মূল মালিক আল্লাহ পাক এবং সম্পদ একটা আমানত মাত্র। সে সম্পদ মানুষ যেনতেনভাবে ব্যবহার করতে পারে না। সম্পদ ব্যবহার করতে হবে আল্লাহ তায়ালা যেভাবে চেয়েছেন ঠিক সেভাবে। এগুলো হলো খিলাফতের ধারণার গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য।</p>
<p><strong>তৃতীয় ভিত্তি জাস্টিস, ইনসাফ বা ন্যায়বিচার।</strong> আদল হলো কুরআনের পরিভাষা। কুরআনের প্রায় একশ’ আয়াত আছে, যেখানে জাস্টিসের কথা বলা হয়েছে। আরো এ কশ’ আয়াত আছে যেখানে জুলুমের নিন্দা করা হয়েছে। তার মানে হলো, অর্থনীতিতে জুলুম থাকলে চলবে না এবং ন্যায়বিচার আনতে হবে।</p>
<p>আরো পরিষ্কারভাবে বলা যায়, ইনসাফের দাবি হলো সব মানুষের প্রয়োজন পূর্ণ করতে হবে। সবার জন্য সম্মানজনক আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থনীতি এমনভাবে সাজাতে হবে, এমনভাবে কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে যাতে সবার আয়ের ব্যবস্থা হয়। যদি কারোর আয়ের ব্যবস্থা না হয় কিংবা যদি কেউ সম্মানজনক আয়ের ব্যবস্থা না করতে পারে অর্থাৎ যদি তার কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক দুর্বলতা থাকে বা অর্থনৈতিক কোনো বিপর্যস্ত অবস্থা থাকে সে অবস্থায় অনেকে হয়তো ইনকাম করতে পারল না; তা হলে তাদের ব্যবস্থা প্রথমে করতে হবে তার পরিবারের বা আত্মীয়-স্বজনদের। আর তারা যদি না পারে তা হলে রাষ্ট্রকে করতে হবে। এই হলো ন্যায়বিচার বা ইনসাফের দাবি।</p>
<p>এরপর ইসলামী অর্থনীতির কর্মকৌশল সম্পর্কে বলতে হয়। চারটি প্রধান কর্মকৌশলের কথা আমাদের অর্থনীতিবিদরা বলেছেন। এর মধ্যে একটা হলো নৈতিক ছাঁকনি। অর্থাৎ রিসোর্সের একটা পয়েন্ট অব টাইম বা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের একটা সীমা আছে এবং এর ডিমান্ড প্রায় সীমাহীন। ফলে এ দুটির মধ্যে মিলাতে গেলে ডিমান্ডের ওপর এমন এক ছাঁকনি দরকার যাতে ডিমান্ডগুলো একটু কমে আসে, সংযত থাকে।</p>
<p>একটি ছাঁকনি হলো প্রাইস, যেটা আধুনিক ক্যাপিটালিজমে আছে প্রাইসের মাধ্যমে ডিমান্ড সংযত করা হয়। আমার টাকা কম সুতরাং আমি কিনতে পারব না- এটা হচ্ছে এক ধরনের ছাঁকনি বা ফিল্টার, যার মাধ্যমে এটা হয়। ইসলাম এই প্রাইস ফিল্টার মেনে নিয়েছে। আবার মেনে নেয়ার সাথে সাথে আরেকটা জিনিস সে নিয়ে আসে। সেটাকে বলা হয় নৈতিক ফিল্টার। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে ইসলাম এমন একটা নৈতিকতা সৃষ্টি করেছে, এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে যে, মানুষ যেন অপব্যয় না করে। অতিভোগ যেন না করে। অতিরিক্ত ভোগের দিকে যেন তার নজর না যায়। নৈতিক ছাঁকনির গুরুত্ব অনেক। কেননা, মূল্য ছাঁকনি দ্বারা কেবল দরিদ্র মানুষের দাবি কমানো যায়। সুতরাং এই একটা স্ট্র্যাটেজি ইসলামী অর্থনীতিবিদরা সাজেস্ট করেছেন। মূল্য ছাঁকনি ছাড়াও কর্মকৌশলের অংশ হিসেবে একটা নৈতিক ছাঁকনি নিয়ে আসা। যাতে করে ডিমান্ড সংযত হয়। প্রাইসের মাধ্যমেও আমরা ডিমান্ডকে সংযত করব, অন্য দিক নৈতিক ছাঁকনির মাধ্যমে আমরা অতিরিক্ত ভোগ নিয়ন্ত্রণ করব। যত বেশি ভোগ করব, তত বেশি আল্লাহর কাছে দায়ী হবো। আমাদের জবাব দিতে হবে। এর জন্য চ্যারিটি করতে হবে। এসব মাধ্যম ডিমান্ড এর দাবি কমিয়ে এনেছে। যাতে কি না আমাদের কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ের রিসোর্সের প্রাপ্যতার সাথে ডিমান্ডের সংঘাতটা কমে আসে।</p>
<p>ইসলামী অর্থনীতিবিদগণ দ্বিতীয় যে কর্মকৌশলের কথা বলেছেন সেটা হলো প্রপার মোটিভেশন। আমাদের প্রপার মোটিভেশন থাকতে হবে, সৃষ্টি করতে হবে। ক্যাপিটালিজম এই মোটিভেশনকে একমাত্র স্বার্থ বলেছে। কিন্তু ইসলাম বলেছে, না, স্বার্থ ঠিকই আছে কিন্তু এই স্বার্থপরতাকে বিস্তার করে দিতে হবে। অর্থাৎ ক্যাপিটালিজম যেখানে দুনিয়াভিত্তিক স্বার্থের কথা বলে সেখানে ইসলামী অর্থনীতি দুনিয়া ও আখিরাতের স্বার্থের কথা বলে। এ দুটো মিলে যাতে লাভ সেটাই স্বার্থ। এডুকেশনের মাধ্যমে, মিডিয়ার মাধ্যমে, প্রচারের মাধ্যমে, ওয়াজের মাধ্যমে, দাওয়াতের মাধ্যমে- সর্ব উপায়ে এটা করতে হবে। জনগণের মাঝে উপযুক্ত মোটিভেশন সৃষ্টি করতে হবে। অর্থনৈতিক কাজকর্মে কেবল দুনিয়ার স্বার্থ দেখলে চলবে না। দুনিয়ার স্বার্থ এবং আখিরাতের স্বার্থ দেখতে হবে। সুতরাং ইসলাম-মোটিভেশনের স্বার্থপরতাকে বিস্তৃত করে দিয়েছে। বেসিক কর্মকৌশলের মধ্যে এটা রয়েছে।</p>
<p>উপরের বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সময় লাগবে। এ জন্য ইসলামী অর্থনীতিবিদরা তৃতীয় কর্মকৌশলও নির্ধারণ করেছেন (Social economic financial re-structuring) নামে। এবং এই বিষয়টিকেই তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। এর মাধ্যমে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ফাইন্যান্সিয়াল ব্যবস্থার পুনর্গঠন করতে হবে। এর সাহায্যে ব্যাংকিং সিস্টেমের মনিটারি পলিসির ফিসকেল সিস্টেমে পরিবর্তন করতে হবে। ব্যাংকের টাকা সৃষ্টির ক্ষমতাকে সংযত করতে হবে। পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ও মিডিয়াম শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধুমাত্র আরবান বেসড হলে চলবে না। এ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা ইসলামী অর্থনীতিবিদরা করেছে।</p>
<p>কর্মকৌশলের চতুর্থ দিক হলো (Social re-structuring, Economic Re-Structuring Ges Financial re-structuring) এর কাজটি করতে হবে সরকারকে। ইসলামের অবস্থা সমাজতন্ত্রের মত নয় যে, সরকার সব করবে। আবার পুঁজিবাদের মতোও নয় যে, মার্কেটই সব করবে। ইসলাম বলে, মার্কেটকে আশি ভাগ আর সরকারকে বিশ ভাগ করতে হবে (এ হার পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তন হতে পারে)। এটাই হচ্ছে, সরকারের ভূমিকা। আর এই চারটিই হলো ইসলামী অর্থনীতির মূল কর্মকৌশল।</p>
<p><strong>লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার।</strong><a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 577px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/01/Islami-orthoniti.jpg" height="95" /></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-economy-philosophy-strategy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6239</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাষ্ট্রব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা ও আমাদের চিন্তাধারা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-imbalance-of-the-state-system-and-our-way-of-thinking/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-imbalance-of-the-state-system-and-our-way-of-thinking/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Sep 2021 11:12:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনৈতিক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6095</guid>

					<description><![CDATA[যখন একটা জাতি তার উপর চলতে থাকা রাজনৈতিক জুলুম, অর্থনৈতিক ভয়াবহ ধ্বস এবং সকল আগ্রাসন থেকে মুক্তির চিন্তা বাদ দিয়ে দেয়! কোন কার্যকর কর্মসূচি, আলাপ বা উদ্যোগ নেওয়া ছেড়ে দেয়! তখন সেই জাতিকে নির্লজ্জ নানা ইস্যু তৈরি করে মূল বিষয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যখন একটা জাতি তার উপর চলতে থাকা রাজনৈতিক জুলুম, অর্থনৈতিক ভয়াবহ ধ্বস এবং সকল আগ্রাসন থেকে মুক্তির চিন্তা বাদ দিয়ে দেয়! কোন কার্যকর কর্মসূচি, আলাপ বা উদ্যোগ নেওয়া ছেড়ে দেয়!</p>
<p>তখন সেই জাতিকে নির্লজ্জ নানা ইস্যু তৈরি করে মূল বিষয় থেকে দূরে রাখা হবে এটাই স্বাভাবিক!</p>
<p>ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি, কৃষি, রাষ্ট্র ইত্যাদি নিয়ে কোন আলাপ বা প্রস্তাবনা আমরা দিচ্ছিনা কিংবা গত সময়ের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যখাত নিয়েও কোন মাথাব্যাথা নেই।<br />
তাহলে সব মাথাব্যাথা তো তৈরিকৃত ইস্যু নিয়েই হবে, এটাও স্বাভাবিক।</p>
<p>• GDP(Gross Domestic Product) তথা মোট উৎপাদিত দেশীজ পণ্য বেড়ে গেছে, আরো কত উন্নয়নের সূচক এখন দেখা যাচ্ছে!</p>
<p>অথচ BBS এর মতে করোনাকালীন সময়েই কর্মক্ষম মানুষ বেকার হয়েছে ৪ কোটি ৮২ লক্ষ! সরকারপন্থী গবেষক দলের মতেও, প্রথম দিকেই ৩ কোটি ৬৬ লক্ষ নতুন বেকার হয়েছে। আর CPD এর মতে ৫ কোটি। <strong><em>কিন্তু আসল হিসেব হলো এখন ৮ কোটি বেকার!</em></strong></p>
<p>হিসেব কমবেশী যাই হোক, কিন্তু মানুষের এখন আসল অবস্থা কী তা ভাবতে পারছি আমরা?</p>
<p>যারা আগেই বেকার ছিল, তাদের কী অবস্থা? এর প্রভাব কোথায় কোথায় পড়বে, কতটা ভয়াবহ আকারে ছড়াবে– ভাবতে পারি আমরা? যেখানে বর্তমান কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ৮ কোটি ৮০ লক্ষ। এগুলি প্রতিদিন বাড়ছে নাকি কমছে!?</p>
<p>•<strong><em> খাদ্য সংকটে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ।</em></strong></p>
<p>বিআইডিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ স্থায়ী কর্মসংস্থানহীন। বিশ্বব্যাংক গত অর্থবছরে ২% এবং চলতি অর্থবছরে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছে। কোটিপতি ধনী বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে অথচ সানেম গবেষণায় দেখা যাচ্ছে মহামারিতে দারিদ্র্য দ্বিগুণ হয়ে ৪২ শতাংশে পৌছেছে। বিআইডিএসও গবেষণা দেখিয়েছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশে কোটিকোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের কাতারে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ দারিদ্র্যবিরোধী লড়াইয়ের প্রায় ১৫টি বছর হারিয়ে গেছে। এটা কত ভয়াবহ ভাবছি একবারো?</p>
<p><strong><em>• দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও ৪ কোটি ৭৫ লক্ষ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ সাড়ে আট কোটিতে পৌঁছাচ্ছে, যাদের দৈনিক আয় ১.৯ ডলারেরও কম।</em></strong><br />
মানুষের আয় কমছে, ব্যক্তি-সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। সামষ্টিক বা পরিবারিক সঞ্চয় কমছে বলে ব্যক্তিগত ধার/ঋণের সুযোগ কমছে।</p>
<p>বেকারত্বজনিত কর্মহীনতায় পড়ে শিক্ষা খাতে ঝরে পড়া বাড়বে, কৃষি ও ভাসমান কাজে শিশু শ্রম বাড়বে। একই সাথে প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ঝরে পড়াও বাড়বে এবং হয়তো পাশের হারও কমে আসবে।</p>
<blockquote><p><strong>শিক্ষায় ঝরে পড়া বিশাল ছাত্র-সমাজকে নিয়ে কে ভাববে? কাউকে এই ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখছি কি? আর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে, প্রতিবাদ করে ও সংকট তুলে ধরে সমাধানের ব্যাপারে যেন কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই!</strong></p></blockquote>
<p>• বেকারত্ব আর ঝরে পড়া যখন বাড়বে, সামাজিক অপরাধ কি তখন কমবে? নাকি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ আকারে বাড়তে থাকবে?</p>
<p>• রেমিটেন্স আমাদের আয়ের খাতের অন্যতম, অথচ প্রবাস থেকে শ্রমিকরা ফিরে আসছে প্রতিনিয়ত! সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই! এখন পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন প্রায় ২০ লক্ষ! যা আভাস পাওয়া যাচ্ছে খুব শীঘ্রই ফিরবেন আরো কয়েক লক্ষ শ্রমিক!</p>
<p>অথচ আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি ও আয়ের অন্যতম উৎস বিদেশে থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো আয়। কোটি কোটি যোদ্ধাদের দুর্দশা বোঝার ক্ষেত্রে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। গত এক বছরে প্রায় ২০ লক্ষ শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে খালি হাতে! কিন্তু কেউ কি খবর রেখেছে তাদের? বা তাদের কোনো মৌলিক দাবির? তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে? তাদের পারিবারিক অসহায়ত্বের কোনো সমাধান কি হয়েছে?</p>
<blockquote><p><strong>জমি বিক্রি করে আমাদের টগবগে যুবকরা বিদেশে গিয়ে অসহায় চেহারা নিয়ে রাতদিন খেটে যায়, নির্যাতিত হয়; তাদেরকেই যখন খালি হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তখন একটা লাইনও আমরা উচ্চারণ করি না! কোনো উদ্যোগ ও কর্মসূচি তো বহুদূর!</strong></p></blockquote>
<p>আরোও কষ্টের ব্যাপার হল,<br />
বাংলার গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প চলমান ছিল, ছোট ছোট উদ্যোক্তার ভূমিকা ছিল, কিন্তু কৃষিতে ভয়াবহ ধ্বস নেমে এসেছে গত কয়েক দশকে! যতটুকুও আছে তা কায়িক শ্রম নির্ভর, আবার সেটাতেও নেই ন্যায্যতা! সবমিলিয়ে গাণিতিক হারে বেড়েছে নারী বেকারত্ব, নারী অসহায়ত্ব। আর এটাকেই ঘুণেধরা রাষ্ট্র কাজে লাগিয়েছে এবং পাচার করেছে লক্ষ লক্ষ নারীকে। বর্তমান সরকার ব্যাপকহারে তাদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।</p>
<p>বিগত মাত্র এক বছরে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৯০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ফলে নির্যাতন, বেকারত্ব বিষয়ে সুরাহায় না গিয়ে সরকার আরো শ্রমিক পাঠানোর ধান্দায় থেকেছে, আছে।</p>
<p><strong>যেটা বলতে চাচ্ছি, শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকেই দিনে আসছে গড়ে ১১ টি কফিন। এক বছরে এসেছে ৪ হাজার ৮৮১ টি। এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও অনেক। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় সাড়ে তিনশ। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জনই আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে!</strong></p>
<p>কোনটা আত্মহত্যা আর কোনটা হত্যা, তাইবা কে বলবে? কেনইবা পরিবারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আমাদের মায়েরা আত্নহত্যা করে? কেউ আছে আমাদের? আছে কোনো পররাষ্ট্রনীতি, কোনো বৈদেশিক শ্রম ও অধিকার মন্ত্রণালয়?<br />
আচ্ছা, এসব কি ইস্যু হতে পারেনা?</p>
<blockquote><p><strong>• আবার অর্থনীতির অন্যতম আরেক ভিত্তি আমাদের সমুদ্র বন্দর, যে বন্দর নানাবিধ অবকাঠামোগত সমস্যা, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও সামগ্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে! কিন্তু এ সকল সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার বদলে পুরো বন্দরকে দিয়ে দেওয়া হল ভারতের হাতে!</strong><br />
<strong>চিন্তা করা যায়? একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বন্দর নিয়ন্ত্রণ করবে ভিন্ন একটি দেশ।</strong></p></blockquote>
<p>• ৫০ এর উপরে খনিজ সম্পদ, সব বিদেশীদের হাতে ইজারা দেওয়া।<br />
ইউরেনিয়ামের মত দামী সম্পদ, যার জন্য এত যুদ্ধ, তা কিনা আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের বিনা পয়সায় দিয়ে যাচ্ছি! সবকিছু বাদ দিলাম, গ্যাস যে আমাদের কত বড় সম্পদ– তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র আমাদের, সেটাও নিয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীরা!</p>
<p>সেখানে সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হল, আমাদের সরকার বিদেশ থেকে আন্তর্জাতিক মূল্যের তিনগুণ দামে গ্যাস আমদানি করছে!! কোন লাইভ প্রোগ্রাম হয়েছে এটা নিয়ে? কোন ভাইরাল পোস্ট!</p>
<p>• এদিকে কৃষির ক্ষেত্রে বণিক বার্তায় প্রকাশিত যে সবচেয়ে ভয়াবহ রিপোর্ট আমরা দেখেছি তা হলো– ধান ব্যতীত সকল প্রকার কৃষিদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে আমাদের!!!</p>
<p>সারা দেশব্যাপী যে বেকারত্বের ভয়াবহ কালো ছায়া বিরাজমান। তাতে এই বেকার, চাকুরিহীন মানুষগুলো কোথায় যাচ্ছে? তাদের সন্তান, পরিবার সব কিছুই তো গ্রাম-কেন্দ্রিক, তাই তারা স্বাভাবিকভাবেই গ্রামমুখী হচ্ছে। কিন্তু গ্রামের যে সার্বিক অবস্থা তা দ্বারা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও সম্ভবপর নয়। এমনকি সরকার থেকেও তারা কোনো সহযোগিতা, ভর্তুকি পাচ্ছে না।</p>
<p><em><strong>অথচ সরকার থেকে কৃষি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা! এই বড় অঙ্কের অর্থ আসলে কোথায় যাচ্ছে, যেখানে ৭০% মানুষই ভূমিহীন চাষী!</strong></em> তারা তো সরকারের তালিকারই বাইরে, সরকার থেকে কোনো ঋণ পাচ্ছে না। আবার প্রত্যেক বারই ঘাটতি দেওয়া হচ্ছে। এই ঘাটতির টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে যেখানে ধান ছাড়া সব ফসলই আমাদেরকে বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে? এটা সহজেই অনুমেয়– এ জায়গাতেও বড় ধরণের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অযোগ্য নেতৃত্ব কাজ করছে।</p>
<p><strong><em>LLRD এর মতে বর্তমানে ৫০% পুরুষ এবং ৬০% নারী কৃষক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।</em></strong> বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ, অন্যান্য চাহিদার কারণে তারা নিজেদের উৎপাদিত ফসল, শাক-সবজি, নিজেদের চাষ করা মাছ নিজেরাই গ্রহণ করতে পারছে না। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সন্তানেরাও।</p>
<p>এমনকি অনেক বছর আগেও তাদের অবস্থা এ রকমই ছিল। আর তারা যতটুকু গ্রহণ করতে পারছে, সেটাতেও আছে কীটনাশক, সার আর ভেজালের সমাহার। তাহলে চিন্তা করে দেখুন, এই চাষী, হাওড়-নদীর জেলে, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক, নারী কৃষক, কুটির-শিল্পীদের নিয়ে, তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে আমরা একটুও ভাবছি? রাষ্ট্রের কোন সহযোগিতা বা উদ্যোগ আছে? আছে কি কোন পরিকল্পনা, পর্যালোচনা, প্রস্তাবনা? না, নেই।</p>
<p>• করোনাকালীন সময়ে শহরাঞ্চলের যে ২ কোটি পুরুষ কর্মসংস্থানহীন হয়ে পড়েছে তারা সবাই কিন্তু গ্রামেই ফিরে যাচ্ছে। ফলে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্বটা অনেকাংশে তাদের স্ত্রী অর্থাৎ নারীদের উপর চলে গেছে। গ্রামের নারীরা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করে কিছু টাকা আয় করে। এই আয়ের পরিমাণ-ই বা কতটুকু? তারা আদৌ ন্যায্যমূল্যটা পাচ্ছে? তাদের স্বাস্থ্যের কী অবস্থা, চিকিৎসার কী অবস্থা? আর যতটুকুই বা পাচ্ছে তা দিয়ে কি সংসার, একটি পরিবার চালানো সম্ভব? সবমিলিয়ে এই প্রশ্নগুলো কিন্তু থেকেই যায়!</p>
<blockquote><p><strong>কিন্তু কোন ইস্যু তৈরি হয় এসব নিয়ে?</strong></p></blockquote>
<p>• এদিকে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে রোগীর সংখ্যা, কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার কি হাল? তবুও আমাদের গুরুত্বহীন, অপরিচ্ছন্ন ও ভয়াবহ নোংরা পরিবেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা বাদই দিলাম!</p>
<p>প্রতিদিন যে হারে মানুষ মারা যাচ্ছে, এগুলিও নজরে পড়েনা আমাদের? এর উত্তরণের কোন কর্মসূচিই নেই!</p>
<p><strong>সব নজর তাহলে সাময়িক ইস্যু গুলিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-imbalance-of-the-state-system-and-our-way-of-thinking/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6095</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বর্তমান বাংলাদেশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/our-state-system-and-current-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/our-state-system-and-current-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Sep 2021 11:00:04 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা]]></category>
		<category><![CDATA[আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বর্তমান বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বর্তমান বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6083</guid>

					<description><![CDATA[চোখ মেলে তাকালেই কি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থা দেখা যায়? নাকি, ইস্যুতে ভরা বাংলাদেশের করুণ চিত্র ভেসে উঠে চোখের মণি কোঠায়? অবশ্য ইস্যুও খারাপ কিছু না, যদি তা মানবতার কল্যাণকামী কোন রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন ধারার গোষ্ঠীগুলো তৈরি করতো। কিন্তু বাস্তবতা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>চোখ মেলে তাকালেই কি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থা দেখা যায়?</strong></p>
<p>নাকি, <strong>ইস্যুতে ভরা বাংলাদেশের করুণ চিত্র ভেসে উঠে চোখের মণি কোঠায়?</strong></p>
<p>অবশ্য ইস্যুও খারাপ কিছু না, যদি তা মানবতার কল্যাণকামী কোন রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন ধারার গোষ্ঠীগুলো তৈরি করতো। কিন্তু বাস্তবতা হল মেরুদণ্ড সম্পন্ন এমন কোনো দল বা গোষ্ঠী এই মুহূর্তে নেই!</p>
<p><strong>বর্তমানে গোটা জাতি যে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার কয়েকটি আলামত হল-</strong></p>
<blockquote><p>•<strong> BBS এর মতে করোনাকালীন সময়েই কর্মক্ষম মানুষ বেকার হয়েছে ৪ কোটি ৮২ লক্ষ! সরকারপন্থী গবেষক দল বলছে, প্রথম ৬৬ দিনে ৩ কোটি ৬৬ লক্ষ নতুন বেকার হয়েছে। আর CPD এর মতে ৫ কোটি। কিন্তু আসল হিসেব হলো ১০০ দিনে ৭ কোটি বেকার! (প্রখ্যাত গবেষক শ্রদ্ধেয় ফাইয়াজ স্যারের মতেও এটিই।)</strong></p></blockquote>
<p>শতদিন চলে গেছে অনেক আগেই, এখন কী অবস্থা ভাবতে পারেন?</p>
<p>যারা আগেই বেকার ছিল, তাদের কী অবস্থা? এর প্রভাব কোথায় কোথায় পড়বে, কতটা ভয়াবহ আকারে ছড়াবে– ভাবতে পারি আমরা? <strong>যেখানে বর্তমান কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ৮ কোটি ৮০ লক্ষ।</strong></p>
<blockquote><p>• <strong>খাদ্য সংকটে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ।</strong></p></blockquote>
<p>স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। এগুলো কোনো সাময়িক সমস্যা নয়। ৬ কোটি লোক নতুন করে স্থায়ী বেকারত্বের ঝুঁকিতে আছে। প্রায় ৭ কোটি লোক ব্যবসা, চাকরি ও সঞ্চয় হারিয়ে দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে গিয়েছে, বাকীরা যাওয়ার পথে।<br />
অথচ, <em><strong>সিস্টেমেটিক ব্যর্থতা ও চিকিৎসা বিপর্যয় ঢাকতে, টালমাটাল অর্থনীতি আড়াল করতে, ব্যাংক লুট অব্যাহত রাখতে সরকার খাদ্য সংকট ও বেকারত্বকে অস্বীকার করে!</strong></em></p>
<p><strong>সবকিছু ঢেকে রাখা দরকার না? তাই নানাবিধ ইস্যু দিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বস্তিতেই আছেন। শুধু শেখ হাসিনার দোষ দিয়ে কী লাভ বলেন? সকল রাজনৈতিক দলও যে এখন শীতনিদ্রা যাপন করছে!</strong></p>
<blockquote><p><strong> ৫০ এর উপরে খনিজ সম্পদ, সব বিদেশীদের হাতে ইজারা দেওয়া।</strong></p></blockquote>
<p>ইউরেনিয়ামের মত দামী সম্পদ, যার জন্য এত যুদ্ধ, তা কিনা আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের বিনা পয়সায় দিয়ে যাচ্ছি! সবকিছু বাদ দিলাম, গ্যাস যে আমাদের কত বড় সম্পদ– তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র আমাদের, সেটাও নিয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীরা!</p>
<p>সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় কী জানেন?<br />
<strong>আমাদের সরকার বিদেশ থেকে আন্তর্জাতিক মূল্যের তিনগুণ দামে গ্যাস আমদানি করছে!! পূর্বের অবস্থা তবুও একটু ভালো। যদিও সেই ভালো অবস্থাতেই বহুদিন ধরে দ্বিগুণ দামে গ্যাস আমদানি করা হয়েছিল!</strong></p>
<p><strong>আমরা এটুকুতেই থেমে নেই। এই কেনা গ্যাসেরও অপচয় হচ্ছে। অপচয়ের একটা উদাহরণ দেই, ওয়াসা বিশুদ্ধ পানি দিতে সরবরাহ করতে পারে না, তাই শুধু ঢাকাতেই ৯১ শতাংশ গ্রাহক পানি ফুটিয়ে বা সেদ্ধ করে পান করেন, আর এ জন্য প্রতি বছর আনুমানিক ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হয়! নিজের সম্পদ দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে কিনেও যেন আমাদের শান্তি হয় না!</strong></p>
<blockquote><p><strong>• বন্যার অবস্থা আর কী বলবো! মূলত বন্যার পরিস্থিতি বেইজ করে ভাবলাম লিখি।</strong></p></blockquote>
<p>যাদের দেখলাম, তারা গত দুইমাস যাবত পানিবন্দী! ভয়াবহ অবস্থা। সরকার, প্রশাসন, কোন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠীর দেখা নেই; উদ্যোগ নেই, প্রতিবাদ নেই!<br />
অথচ পুরো ব্যাপারটাই রাজনৈতিক। ভারত বাঁধ খুলে দিচ্ছে, খরার সময় পুড়িয়ে মারছে আবার বর্ষার সময় বন্যায় ভাসিয়ে মারছে!</p>
<p>আমরা কেউ কি এসব নিয়ে কথা বলি? এগুলো নিয়ে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু কি দেখেন? কিছু দান-সদকা দিয়েই কি এসব সমাধান করা সম্ভব? কোটি কোটি মানুষ বেকার হচ্ছে, কর্মক্ষম যুবকেরা বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ঘরে খাবার নেই!<br />
<em><strong>কুর&#8217;আনের আয়াত পড়ে &#8216;এসব আল্লাহর গযব&#8217; বলে চালিয়ে দিলেই কি সমাধান হয়ে যাবে? এই বন্যা, নদী ভাংগনের গযব উন্নত দেশে হয় না কেন? নাকি পানিবিদ্যা, নগরায়ন, নদী ডিজাইন– এসব ইসলামে নেই?</strong></em></p>
<p>পানি, নদী ভাঙন, বন্যার কারণে টানা ৬ মাস মানুষকে বেকার থাকতে হবে! চালের বস্তা, বিরিয়ানির প্যাকেট দান করার ছবি দিয়ে এসব সমাধান কখনোই সম্ভব নয়। এটা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংকট, সুতরাং এটাকে সেভাবেই মোকাবিলা করতে হবে।</p>
<blockquote><p>• <strong>দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৫ লক্ষ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ সাড়ে আট কোটিতে পৌঁছাচ্ছে, যাদের দৈনিক আয় ১.৯ ডলারেরও কম।</strong><br />
<strong>মানুষের আয় কমছে, ব্যক্তি-সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। সামষ্টিক বা পরিবারিক সঞ্চয় কমছে বলে ব্যক্তিগত ধার/ঋণের সুযোগ কমছে। বেকারত্বজনিত কর্মহীনতায় পড়ে শিক্ষা খাতে ঝরে পড়া বাড়বে, কৃষি ও ভাসমান কাজে শিশু শ্রম বাড়বে। একই সাথে প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ঝরে পড়াও বাড়বে এবং হয়তো পাশের হারও কমে আসবে।</strong></p></blockquote>
<p>শিক্ষায় ঝরে পড়া বিশাল ছাত্র-সমাজকে নিয়ে কে ভাববে? কোনো ছাত্রসংগঠকে এই ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখছি কি? আর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে, প্রতিবাদ করে ও সংকট তুলে ধরে সমাধানের ব্যাপারে যেন কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই!</p>
<blockquote><p><strong>• বেকারত্ব আর ঝরে পড়া যখন বাড়বে, সামাজিক অপরাধ কি তখন কমবে? নাকি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ আকারে বাড়তে থাকবে?</strong></p></blockquote>
<blockquote><p><strong>• রেমিটেন্স আমাদের আয়ের খাতের অন্যতম, অথচ প্রবাস থেকে শ্রমিকরা ফিরে আসছে প্রতিনিয়ত! সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই! এখন পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন ১৪ লক্ষ, খুব শীঘ্রই ফিরবেন আরো ২৩ লক্ষ শ্রমিক!</strong></p></blockquote>
<blockquote><p><strong>• কৃষি খাত</strong><br />
<strong>• শিল্প খাত</strong><br />
<strong>• চিকিৎসা খাত</strong><br />
<strong>• যোগাযোগ ব্যবস্থা</strong></p></blockquote>
<p>এসব নিয়ে আলাপ না হয় আজ না-ই করলাম!<br />
আমার এসব বলাতে কতদূরই-বা কী হবে, তাইনা?</p>
<p>তবে একটা বিষয় বলতে চাই,</p>
<blockquote><p><strong>♦ কিছুদিন আগেই আমাদের বাজেট পাশ হল। যদিও দায়সারা কপি-পেস্ট বাজেট। কিন্তু বাজেট নিয়ে একটা মানসম্মত পর্যালোচনা দেখেছেন কেউ? (দু-চারজন লেখক, গবেষক ছাড়া? অথচ এই কাজ তো বড় বড় দলগুলোর, বড় ইন্সটিটিউটগুলোর) অন্তত আমার চোখে পড়েনি। যারাও কিছু বিবৃতি দিয়েছে, বুঝাই যায় মুখস্থ বুলি, দেখে দেখে রিডিং পড়ছে!</strong></p></blockquote>
<blockquote><p><strong>• সুদ!</strong></p>
<p><span style="font-size: 16px;">আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) বিদায় হজ্জের ওসিয়ত, যা থেকে মুক্ত না হলে মানবতার মুক্তি অসম্ভব। কিন্তু ইসলামপন্থী কাউকেই দেখা যায় না রাষ্ট্রীয় সুদ নিয়ে কিছু বলতে! একটা মানসম্মত প্রস্তাবনা, সুদের কুফল, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা কেউ করেনি। </span><strong style="font-size: 16px;">(এবারের ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেটে দ্বিতীয় সর্ব বৃহৎ খাতই হল সুদ! যে দেশে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়, যে দেশে একজন শ্রমিক ১২ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৮০০০ টাকা বেতন পায়, যে দেশে দরিদ্রতার কারণে মা-বাবা তার আদরের, কলিজার টুকরো সন্তানকে বিক্রি করে দেয়, যে দেশের মানুষ অর্থ যোগানের জন্য চোরা পথে জীবিকার সন্ধানে সাগরে ডুবে মরে, সে দেশ আজ ৬৩ হাজার কোটি টাকা সুদ দিচ্ছে! </strong><strong style="font-size: 16px;">কখনো প্রশ্ন করেছেন, এই টাকা কাদের দেওয়া হচ্ছে? এই টাকা দেওয়া হচ্ছে দেশের বড় বড় হোল্ডিংকে, যায়নবাদী ব্যাংক ও লবিদেরকে।)</strong></p>
<p><span style="font-size: 16px;">ইসলামী দলগুলো যদি এসব নিয়ে কথা না বলে, প্রতিবাদ না করে, সমাধানের সংগ্রাম না চালায়, আর সামান্য কিছু বললেও যদি তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র পরিসরের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে কি মুক্তি মিলবে কোনোদিন? এটা আদৌও সম্ভব?</span><br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a><br />
<strong style="font-size: 16px;">• আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি ও আয়ের অন্যতম উৎস বিদেশে থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো আয়। কোটি কোটি যোদ্ধাদের দুর্দশা বোঝার ক্ষেত্রে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। গত এক বছরে প্রায় ষোল লক্ষ শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে খালি হাতে! কিন্তু কেউ কি খবর রেখেছে তাদের? বা তাদের কোনো মৌলিক দাবির? তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে? তাদের পারিবারিক অসহায়ত্বের কোনো সমাধান কি হয়েছে? </strong><strong style="font-size: 16px;">জমি বিক্রি করে আমাদের টগবগে যুবকরা বিদেশে গিয়ে অসহায় চেহারা নিয়ে রাতদিন খেটে যায়, নির্যাতিত হয়; তাদেরকেই যখন খালি হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তখন একটা লাইনও আমরা উচ্চারণ করি না! কোনো উদ্যোগ ও কর্মসূচি তো বহুদূর!</strong></p>
<p><span style="font-size: 16px;">মজার ব্যাপার কি জানেন?</span></p>
<p><span style="font-size: 16px;">শুধু একটা উদাহরণ দিলেই উপলব্ধিতে আসবে, </span><span style="font-size: 16px;">বাংলার গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প চলমান ছিল, ছোট ছোট উদ্যোক্তার ভূমিকা ছিল, কিন্তু কৃষিতে ভয়াবহ ধ্বস নেমে এসেছে গত কয়েক দশকে! যতটুকুও আছে তা কায়িক শ্রম নির্ভর, আবার সেটাতেও নেই ন্যায্যতা!</span></p>
<p><span style="font-size: 16px;">সবমিলিয়ে গাণিতিক হারে বেড়েছে নারী বেকারত্ব, নারী অসহায়ত্ব। আর এটাকেই ঘুণে ধরা রাষ্ট্র কাজে লাগিয়েছে এবং পাচার করেছে লক্ষ লক্ষ নারীকে। বর্তমান সরকার ব্যাপকহারে তাদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে;</span><strong style="font-size: 16px;"> যেখানে অস্থিতিশীল অবস্থার জন্য বেশ কিছু বাজার বন্ধ, সেখানে সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ৬০ হাজার নারী।</strong><span style="font-size: 16px;"> বিগত মাত্র এক বছরে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৯০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ফলে নির্যাতন, বেকারত্ব বিষয়ে সুরাহায় না গিয়ে সরকার আরো শ্রমিক পাঠানোর ধান্দায় থেকেছে, আছে।</span></p>
<p><strong style="font-size: 16px;">যেটা বলতে চাচ্ছি, শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকেই দিনে আসছে গড়ে ১১ টি কফিন। এক বছরে এসেছে ৪ হাজার ৮৮১ টি। এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও অনেক। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় সাড়ে তিনশ। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জনই আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে!</strong></p>
<p><span style="font-size: 16px;">কোনটা আত্মহত্যা আর কোনটা হত্যা, তাই বা কে বলবে? কেনই বা পরিবারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আমাদের মায়েরা আত্নহত্যা করে? কেউ আছে আমাদের? আছে কোনো পররাষ্ট্রনীতি, কোনো বৈদেশিক শ্রম ও অধিকার মন্ত্রণালয়? (বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ দেশের ভিতরেও তার নারী শ্রমিকের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা দেয় না। ধর্মীয়শ্রেণি বই লিখে- নারী ফিতনা, কীভাবে পুরুষদের চরিত্র ধ্বংসের কারণ নারী ইত্যাদি।)</span></p></blockquote>
<p>যাই হোক, মজার ব্যাপার বলতে যেটা বুঝাচ্ছিলাম সেটা হল, আমাদের দৈন্যদশার কথা।<br />
<em><strong>দেশের প্রধান আয়ের ব্যাপারে, কোটি কোটি শ্রমিকের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দিচ্ছে! এবং তাদেরই ব্যর্থতা এটা!</strong></em></p>
<blockquote><p><strong>কিছুদিন আগে দেখলাম ধর্মীয় সেলিব্রিটি/শায়খ (ফেসবুকে তার কয়েক মিলিয়ন ফলোয়ার) ভিডিও বার্তায় বলছেন যে, নারীদের এ লাশ হয়ে ফিরে আসার জন্য নারীরা নিজেরাই দায়ী, তারা গায়রে মাহরাম ছাড়া বিদেশে কেনো গেল! তারা পর্দা বিধান পালন না করে কেনো বাহিরে যায়! পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা তাদের জন্য কাল হয়ে এসেছে!</strong></p></blockquote>
<p>তার মানে কী?<br />
এ সকল ধর্মীয় সেলিব্রেটিরা রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামী অর্থনীতি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, নারীর মর্যাদা, খাদ্যসংকট ও বেকারত্বসহ সামাজিক কোনো বিষয়েই ন্যূনতম ধারণা রাখার চেষ্টা করেন না বা সে আলোকে সমাধান খুঁজেন না, সব কিছুকেই ধর্মীয় খোলসে নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করাই তাদের কাজ!</p>
<p><strong>আজ এ রকমটা হওয়াই তো স্বাভাবিক, তাই না? কারণ দাবীগুলো, কথাগুলো বলার কথা ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের, জনগণের নেতাদের।</strong> <strong>তাই তাদের ব্যর্থতার কারণে ক্রিকেটার, ফেইসবুক হুজুর, টিকটক গায়ক আজকাল জনগণের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে!</strong></p>
<blockquote><p><strong>• দারিদ্রতার হার যেখানে বেড়ে গিয়ে প্রায় ৪০%, সেখানে অর্থনীতির অন্যতম আরেক ভিত্তি আমাদের সমুদ্র বন্দর, যে বন্দর নানাবিধ অবকাঠামোগত সমস্যা, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও সামগ্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে! কিন্তু এ সকল সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার বদলে পুরো বন্দরকে দিয়ে দেওয়া হল ভারতের হাতে!</strong></p></blockquote>
<p><em>চিন্তা করা যায়? একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বন্দর নিয়ন্ত্রণ করবে ভিন্ন একটি দেশ</em>। আবার চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক সাহেব গর্ব করে বললেন, <em><strong>&#8220;দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী অবশ্যই ভারতের পণ্যবাহী জাহাজগুলোকেই আগে প্রায়োরিটি দিতে হবে।&#8221; (সূত্র- ডেইলি স্টার, জুলাই ১৬, ২০২০)</strong></em></p>
<p>আচ্ছা, এসবে কি আমরা রাজনীতি খুঁজে পাই না? এসব কি বড় ইস্যু হতে পারে না? <strong><em>নাকি ইসলাম শুধুমাত্র আর্লি ম্যারেজ, সূরা কাহাফ রিমাইন্ডার, হাতমোজা পরা পর্দা, ডিপ্রেশন আর দাড়িতেই সীমাবদ্ধ?</em></strong><br />
অথচ আমাদের কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও মুক্তির ক্ষেত্র এই বন্দরগুলো।<br />
তাই কষ্ট নিয়ে এটাই বলতে হয় যে, <strong>মানুষের মুক্তি, মানবতার কল্যাণ ও ব্যবস্থাগত উন্নয়ন এসবে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভয়াবহভাবে ব্যর্থ!</strong></p>
<blockquote><p><strong>• সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপারগুলোর একটি হচ্ছে,</strong><br />
<strong>আমাদের নৌবাহিনীর অভ্যন্তরীণ শক্তি পুরোটাই এখন ভারতের হাতে! সবাই-ই লক্ষ্য করেছি এসব নিয়ে কোথাও কেউ কথা বলছে না, কোনো এজেন্ডাও নেই!</strong></p></blockquote>
<p>আমরা জানি যে, বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের বাণিজ্যিক সী লাইন অব কমিউনিকেশন স্লক, ওয়াটার টেরিটরিজ, মেরিন ফিশারিজ, মেরিটাইম সিকিউরিটি, হাইড্রোকার্বন রিজার্ভ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত। একটি নৌবাহিনীর অন্যতম কৌশলগত অবকাঠামো হলো তার সার্ভেইলেন্স ইনফ্রাস্ট্রকচার। আর ঠিক এটাই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে দাসবৃত্তিক সরকার।<br />
আচ্ছা, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা কোথায় রইলো? কেউ বলতে পারবেন?</p>
<p><strong>মানে আমাদের অভ্যন্তরীণ সব কিছু ভারত জানবে এবং যদি কখনো বাংলাদেশ নেভি ইন্ডিয়ামুখী হয়, তা সাথে সাথেই ট্রেক এন্ড ট্রেইস করতে পারবে তারা।</strong><br />
<strong>হায়রে স্বাধীনতা! ৭১ এর চেতনা!</strong></p>
<p>যেখানে আগ্রাসী ভারতীয় বাহিনীর দৈনন্দিন ঝামেলা, সামরিক বেসামরিক অন্যায়, ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রশ্রয়ে গড়ে উঠা সুবিশাল জলদস্যুতা, মৎস্য দস্যুতা, সুন্দরবন দস্যুতার নেটওয়ার্ক, মিয়ানমারের ড্রাগ ট্রাফিকিং নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশের ব্লকে ভারত ও মিয়ানমার উভয় দেশের হাইড্রোকার্বন ড্রিলিং অপতৎপরতা– সবই ভারতীয় বাহিনী করছে, সেখানে আমাদের সব তাদের হাতেই তুলে দিলাম!</p>
<p><strong>৯০% মুসলমানের দেশে কেউ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খবর রাখে না? লেখনী, লেকচার, ইসলাম চর্চা, ইসলামী রাজনীতি পুরোটাই যেন ধর্মীয় কিছু ইবাদতে সীমাবদ্ধ! তালিম-তারবিয়াত আর নসিহতের গণ্ডিবদ্ধ!</strong></p>
<blockquote><p>• এদিকে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে রোগীর সংখ্যা, নেই চিকিৎসা ব্যবস্থা। রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আমাদের অপরিচ্ছন্নতা ও ভয়াবহ নোংরা পরিবেশ।</p></blockquote>
<p>কোথাও কোনো ভালো ড্রেন ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই, সেখানে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে! সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার কী জানেন? গোটা ভারতের সকল আবর্জনা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার অববাহিকার বিপুল পানির স্রোত বহন করে এনে বাংলাদেশের কৃষিভূমি ও নদীগর্ভ হয়ে সাগরে ফেলছে।<br />
বাহ! কি অসাধারণ, তাইনা?<br />
আবার আমাদের অবস্থা তো আমরা ভালভাবেই জানি! সবচেয়ে বড় পরিবেশ দূষণকারী তো আমরা নিজেরাই, নিজেদের কোনো কিছু নিয়েই তো ভাবনা নেই! সেখানে গোটা উপমহাদেশীয় ময়লা, আবর্জনা এসে পড়ছে আমাদের উপরে!</p>
<p>কেউ কি আওয়াজ তুলেছে?<br />
<strong>নাকি &#8216;পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ&#8217; শুধু ব্যক্তির ইসলামে? সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যবস্থা– এসবে কি ইসলামের এই মূলনীতি প্রযোজ্য নয়?</strong><br />
<strong>নগরায়ন, নদী-ব্যবস্থা, ড্রেন-ব্যবস্থা কি ইসলামী সভ্যতায় ছিলো না?</strong></p>
<p>নিজের কাছেই প্রশ্ন করি, প্রকৃতি, বাস্তুসংস্থান ও কৃষি ভূমির রূহকে হত্যা করে কিভাবে এই সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা?</p>
<blockquote><p><strong>• সর্বোপরি কথা হল, আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন লাগবে। এছাড়া মুক্তি মিলবে না। ঋণ গ্রহণ, হাবিজাবি কথিত উন্নয়নের ডায়ালগ বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষিকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ছোট শিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎস্য শিল্প, পোল্ট্রি ও সবজি উৎপাদনে ব্যাপক পরিমাণে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সবাইকে কথা বলতে হবে</strong>।</p></blockquote>
<p>জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় সংকট মোকাবেলা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে আগাতে হবে। এসবের জন্য নাজমুদ্দিন এরবাকান হোজার মত সেরা সফলতম উদাহরণ আছে আমাদের সামনে।</p>
<p><strong>♦ আফসোসের বিষয় কি এটা নয়?</strong></p>
<p><em><strong>• </strong></em><strong>১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ,</strong><br />
<strong>• বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সম্ভাবনা,</strong><br />
<strong>• দুনিয়ার সেরা কৃষি (১০বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব),</strong><br />
<strong>• গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর,</strong><br />
<strong>• এত এত খনিজ সম্পদ,</strong><br />
<strong>• বনাঞ্চল,</strong><br />
<strong>• মৎসশিল্প ইত্যাদি দিয়ে মাত্র বিশটা বছর ভালভাবে কাজ করলে এদেশে বেকারত্ব, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট এসবের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না।</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।</p>
<p><em><strong>                       # ইসলামী সভ্যতা   </strong></em></p>
<p><em> <strong>                       # নতুন বাংলাদেশ</strong></em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/our-state-system-and-current-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6083</post-id>	</item>
		<item>
		<title>দুর্ভোগের ফিরিস্তিনামা; জাতীয় বাজেট ২০২১-২০২২</title>
		<link>https://rowyakbd.com/paradise-of-suffering-national-budget-2021-2022/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/paradise-of-suffering-national-budget-2021-2022/#comments</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 10 Jun 2021 11:34:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট ২০২১-২০২২]]></category>
		<category><![CDATA[দুর্ভোগের ফিরিস্তিনামা; জাতীয় বাজেট ২০২১-২০২২]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=5560</guid>

					<description><![CDATA[সম্প্রতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা পেশ হলো। নতুন অর্থবছরের এ বাজেট বাংলাদেশের ৫০ তম বাজেট পরিকল্পনা। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে গত অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জ ও সংকটে পতিত হয়েছিল সেটিই এখনো সামলে উঠতে পারেনি; এ পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত নতুন বাজেটকে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সম্প্রতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা পেশ হলো। নতুন অর্থবছরের এ বাজেট বাংলাদেশের ৫০ তম বাজেট পরিকল্পনা। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে গত অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জ ও সংকটে পতিত হয়েছিল সেটিই এখনো সামলে উঠতে পারেনি; এ পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত নতুন বাজেটকে আমাদের বড় একটি অংশ কার্যত ‘জনগণের বাজেট’ হিসেবেই আখ্যা দিচ্ছেন না, কেউ কেউ ‘দুরবস্থা থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও পরিকল্পনাহীন একটি গতানুগতিক মৌখিক বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।</p>
<p>দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যদি পর্যালোচনা করি, BBS এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, &#8220;করোনাকালীন সময়ে নতুন করে বেকার হয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ।&#8221;  ফলশ্রুতিতে মোট বেকারের সংখ্যা আট কোটি ছাড়িয়েছে, বেসরকারী সংস্থাগুলোর জরিপে এ তথ্যই উঠে আসে। অন্যদিকে CDP এর হিসাব অনুযায়ী, &#8220;দেশের ৪২% জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।&#8221; প্রথম আলোসহ অন্যান্য পত্র-পত্রিকা, সংস্থাগুলোর রিপোর্ট পর্যালোচনায় উঠে আসে, &#8220;৬ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ বর্তমানে খাদ্য সংকটে ভুগছে ও সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।&#8221; অন্যান্য সংকটের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম!</p>
<p>সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নমূলক একটি বাজেট প্রস্তাবনার প্রয়োজন ছিল। যে বাজেটে প্রাধান্য পেত &#8211;</p>
<p>• <strong>রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত সংকট</strong><br />
<strong>• বেকারত্ব</strong><br />
<strong>• দারিদ্র্য</strong></p>
<p>এসবসহ অন্যান্য সংকট নিরসনের বিষয়কে সামনে রেখে যদি আমাদের নীতি-নির্ধারকগণ গোছালো প্রস্তাবনা প্রনয়ণ করতেন, তবে করোনাকালীন পরিস্থিতি আমাদের বাজেটে বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ থাকত। অথচ এসব খাতে বরাদ্দের পরিমাণ মোট বাজেটের তুলনায় নগণ্য, বিশেষ করে নতুন করে বেকার ও দরিদ্র হওয়া মানুষদের যেন উপেক্ষাই করা হয়েছে। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ভেঙ্গে পড়া চিকিৎসা খাতের বাজেটও অপর্যাপ্ত।</p>
<h2>এর মূল কারণ কী?</h2>
<p>এ বছরের বাজেট ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, অন্যদিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের অর্ধেক!</p>
<p>এ ঘাটতি যে কত বেশি, তা একজন সাধারণ বিবেকসম্পন্ন মানুষের খুব সহজেই অনুমেয়। এ ঘাটতি পূরণ কীভাবে হবে ? আমাদের আয় কোথায় ? রেমিটেন্স খাত ছাড়া আমাদের অভ্যন্তরীণ কোনো শক্তিশালী আয় নেই, থাকলেও তা নগণ্য। আমাদের ভোক্তাবাজার, বৈদেশিক রপ্তানি আয় কমে গেছে, যাচ্ছে। অভ্যন্তরীন উৎসগুলোর আয়ও আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে না।</p>
<p><strong>সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়, তা হলো অর্থনৈতিক বাজেটে ১১.৪% রাষ্ট্রীয় সুদ প্রদান করা হচ্ছে, অর্থাৎ আমাদের মোট বাজেটের প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা শুধু সুদ দেওয়া হচ্ছে। আর এ সুদ যাচ্ছে দেশের বড় বড় হোল্ডিং, জায়নবাদী ব্যাংক এবং লবিদের কাছে। দেশের প্রেক্ষাপটে এটি রীতিমতো আশঙ্কাজনক।</strong></p>
<p>খাত অনুযায়ী বরাদ্দকৃত বাজেট যদি পর্যালোচনা করি, তবে দেখব–</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="alignnone size-full wp-image-5565" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/06/Screenshot_2021_0610_180943.png" alt="" width="960" height="559" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/06/Screenshot_2021_0610_180943.png 960w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/06/Screenshot_2021_0610_180943-300x175.png 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2021/06/Screenshot_2021_0610_180943-768x447.png 768w" sizes="(max-width: 960px) 100vw, 960px" /></p>
<p>• <strong>কৃষির</strong> মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেট দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩.৬%।</p>
<p>এদিকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে বর্তমানে ধান ছাড়া মোটামুটি সব ধরণের খাদ্যদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। আবার যেগুলো দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, কৃষকেরা তার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকটে দিনাতিপাত করছে তারা। <strong>অথচ এ কৃষিই আমাদের সাড়ে সাতশো বছরের ইতিহাসে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।</strong></p>
<p>• <strong>স্বাস্থ্য খাতে</strong> বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৫.৪%।</p>
<p>করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে এ খাত। ভেঙ্গে পড়া স্বাস্থ্য খাতের বাজেট অনেক বেশি বাড়ানো দরকার ছিল। কারণ ভেতর থেকে শক্তিশালী করে এমন বিষয়সমূহকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি রাষ্ট্র কখনো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।<br />
আবার যতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, জনগণ কি তা পুরোপুরি পাচ্ছে? পত্রিকার রিপোর্টসমূহ সাক্ষ্য দিচ্ছে চিকিৎসা খাতে দুর্নীতির মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।</p>
<p>• <strong>সংস্কৃতি ও ধর্ম</strong> খাতে মাত্র ০.৮% বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি কত বড় দৈন্যতা! এ দেশের যুব সমাজের নৈতিক চিন্তাগত অবস্থানের ভবিষ্যৎ তাহলে কী?</p>
<p>• <strong>যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে </strong>বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট বাজেটের ১১.৭%।</p>
<p>যে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে; লক্ষ লক্ষ ঘন্টা অপচয় হচ্ছে; হাজারো মানুষ পঙ্গু, অসহায় হচ্ছে, সে যোগাযোগ খাতে এ বাজেট নগণ্য। আবার দুর্নীতির কারণে এ বাজেটের অর্থও জনগণ পুরোপুরি পায় না, ১% ও পায় কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।</p>
<p>• <strong>গবেষণা</strong> খাতের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। অথচ কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন আলাদাভাবে গবেষণা করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ, নতুন উদ্ভাবন ও নতুন করে সবকিছুকে সাজানো। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাই নেই। যে খাত দেশের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটি নিয়েই কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।</p>
<blockquote><p><strong>সমাজসেবা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৫%। কিন্তু আজকে দেড় বছরের অধিক সময় ধরে চলমান মহামারী পরিস্থিতিতে মানবতা অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি বিপন্ন। এরূপ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র তার অভিভাবক সূলভ আচরণ না করে একদিকে কর আরোপ বাড়িয়ে চলেছে আর অন্যদিকে সমাজসেবা ও জননিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ৫%। এখানে দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাজ করে সত্যিকারার্থে  এই ৫% ও কি সমাজসেবায় ব্যয় হবে? যদি হয় তবে কিভাবে হবে?  এক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপসমূহ কি তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। অনুতাপের বিষয় আমাদের দেশে অনেক রাজনৈতিক দল বিদ্যমান থাকলেও এরূপ স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই মানবতার পক্ষাবলম্বনে নিজেদের তুলে ধরতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য হতাশার।</strong></p></blockquote>
<p>• বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭.২%, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক।</p>
<p>একইভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভয়াবহ অসামঞ্জস্য লক্ষণীয়। অপরদিকে সুদের হার বাড়ছে, কিন্তু মৌলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোর বাজেট দিনকে দিন কমছে। ফলশ্রুতিতে একটি ফাঁদ তৈরি হচ্ছে!</p>
<p>আবার এ বাজেট মূলত একটি মৌখিক বাজেট। মৌখিক কিছু আয় দেখানো হলেও তা মূলত মিথ্যা, কারণ তা ব্যাংক ঋণের সাথে মিলছে না।<br />
তবুও যদি এ মৌখিক বাজেট বাস্তবায়িত হতো, তাও একটি কথা ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরের বাজেট পর্যালোচনা দেখলে বোঝা যাবে বাস্তবায়নের হার ধীরে ধীরে কমছে, কমে যাচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের ৮১% বাস্তবায়ন হয়েছে, যেটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসে ৭৬% হয়ে গেছে আর গত অর্থবছরে নেমে এসেছে ৬০%-এ। এভাবে অপচয়, অবৈধভাবে অর্থ লুট, দর্নীতির কারণে বাস্তবায়নের হার ক্রমেই কমছে, অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবতা নেই। অপর দিকে যে বিশাল অঙ্কের সুদ, তা যদি দেশের উন্নয়নের কাজে লাগানো যেত, তবে পরিস্থিতি কেমন হতো তা খুব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কিছুই হবে না!</p>
<p><em>কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো গবেষণা সংস্থা, কোনো বড় ব্যক্তি এসব মৌলিক বিষয় নিয়ে সঠিক পর্যালোচনা তুলে ধরছে না। ফলশ্রুতিতে যুবসমাজ, জনগণ বাজেটের গুরুত্ব সঠিকভাবে পর্যালোচনা এবং প্রস্তাবনার যে আবশ্যকীয়তা রয়েছে, তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বাজেটের বিষয়টি একটি একাডেমিক তত্ত্বীয় বিষয় হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আমরা কেউ ভ্রুক্ষেপ করছি না, আর দেশের অবস্থা যা হওয়ার তাই হচ্ছে।</em></p>
<p><strong>৯০% মুসলমানের দেশে ১১.৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই; অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতি রাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দারিদ্র্যতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে, করোনাকালীন পরিস্থিতিতে যা চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। </strong>আবার যে সকল জায়গাতে দুর্নীতি বেশি, যেমন– সামাজিক নিরাপত্তা খাত, সে সকল জায়গাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে? এ ক্রান্তিকালেও সেনা বাজেট বাড়ানো হচ্ছে কেন?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্ধকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের কাছাকাছি! সুদ পরিশোধ করতে হবে, মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কখন পরিশোধ করব? অথচ আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>এদিকে বৈদেশিক ঋণ, বৈদেশিক বিনিয়োগও দিনকে দিন কমছে।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>পুঁজিবাদীদের শাসনের ফলাফলের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এ জুলুম ও শোষণ এখনো সমানভাবে বিদ্যমান।</p>
<p>অর্থাৎ আমাদের দুর্দশার অন্যতম মূল কারণ সুদ। অথচ এটি নিয়ে আমরা কেউ কথা বলি না, উল্টো সুদকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সাঃ) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।<br />
ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সুদের বিরুদ্ধতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ এ সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সাঃ)।<br />
এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<blockquote><p>এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা, সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো, চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p></blockquote>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।</p>
<p>ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে, কথিত উন্নয়নের ডায়লগ বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ছোট শিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎস শিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে।<br />
জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে আগাতে হবে।</p>
<p><strong>আমাদের রয়েছে–</strong></p>
<p><strong>• <em>১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ</em></strong><br />
<strong><em>• তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত</em></strong><br />
<strong><em>• ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা</em></strong><br />
<strong><em>• দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)</em></strong><br />
<strong><em>• গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর</em></strong><br />
<strong><em>• বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ</em></strong><br />
<strong><em>• বনাঞ্চল</em></strong><br />
<strong><em>• মৎসশিল্প ইত্যাদি</em></strong></p>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকটসহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/paradise-of-suffering-national-budget-2021-2022/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>1</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">5560</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পুঁজিবাদের অমানবিকতা বনাম ইসলামের নীতিবাদী অর্থনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-inhumanity-of-capitalism-vs-the-ethical-economics-of-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-inhumanity-of-capitalism-vs-the-ethical-economics-of-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 05 Mar 2021 09:38:33 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4322</guid>

					<description><![CDATA[পুঁজিবাদ বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ও অনুসৃত অর্থনৈতিক মতবাদ। ফরাসি বিপ্লবের আগে ও পরে ‘মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের নেতাদের হাতে এর বিকাশ ঘটে। তারা ছিলেন মূলত নাস্তিক। ফলে পুঁজিবাদ সম্পূর্ণ সেকুলার ও অনৈতিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এরই ফলে পুঁজিবাদের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় কয়েকটি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: left;"><span style="font-weight: 400;">পুঁজিবাদ বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ও অনুসৃত অর্থনৈতিক মতবাদ। ফরাসি বিপ্লবের আগে ও পরে ‘মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের নেতাদের হাতে এর বিকাশ ঘটে। তারা ছিলেন মূলত নাস্তিক। ফলে পুঁজিবাদ সম্পূর্ণ সেকুলার ও অনৈতিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এরই ফলে পুঁজিবাদের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় কয়েকটি অমানবিক ও সুবিচারবিরোধী তত্ত্ব বা থিওরী ।</span></p>
<p style="text-align: left;"><b>প্রথমত,</b><span style="font-weight: 400;"> তারা বলেন যে, অর্থনৈতিক আইন হচ্ছে প্রাকৃতিক আইনের মতো </span><span style="font-weight: 400;">(Economic laws are like natural laws)। সুতরাং অর্থনীতিকে নিজের গতিতে </span><span style="font-weight: 400;">চলতে দিতে হবে। বাজার ব্যবস্থায় বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে সরকার হস্তক্ষেপ করতে </span><span style="font-weight: 400;">পারবে না। এর অর্থ হচ্ছে, অবিচার বন্ধ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না ।</span></p>
<p style="text-align: left;"><b>দ্বিতীয়ত,</b><span style="font-weight: 400;"> তারা বলে থাকেন, মানুষ পুঁজিবাদী প্রাণী, সে আর্থিক স্বার্থ (Pecuniary in </span><span style="font-weight: 400;">Treat) ছাড়া কোনো কাজ করে না। এর অর্থ হচ্ছে, মানুষকে </span><span style="font-weight: 400;">নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার কথা বলা অর্থহীন। কিন্তু এ তত্ত্ব মানুষকে অমানুষ বানায়।</span></p>
<p style="text-align: left;"><b>তৃতীয়ত,</b><span style="font-weight: 400;"> তারা বলে থাকেন, অর্থনীতিকেও ডারউইনের তত্ত্ব ‘যোগ্যরাই টিকবে&#8217; </span><span style="font-weight: 400;">(Survival of the Fittest) এ ভিত্তি মেনে চলতে হবে। একে বলে সামাজিক ডারউইনবাদ (Social Darwinism)। অর্থাৎ, অযোগ্যরা টিকবে না। তাতে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। এটাই প্রাকৃতিক আইন। এরই ফলে অসংখ্য ছোট ফার্ম ধ্বংস হয়ে সারা বিশ্বের ৯০ শতাংশ সম্পদ মাত্র ১০০টি করপোরেশনের হাতে চলে গেছে। </span><span style="font-weight: 400;">সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং এ কাজে সুদ পুঁজিবাদকে সাহায্য করেছে। সুদের প্রকৃতিই হচ্ছে সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ।</span></p>
<p style="text-align: left;"><b>চতুর্থত,</b><span style="font-weight: 400;"> পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকেরা বলেন যে, অর্থনীতি একটি &#8220;ইতিবাচক বিজ্ঞান (Positive </span><span style="font-weight: 400;">Science)&#8221;। এখানে মূল্যবোধ থাকার কোনো সুযোগ নেই। মূল্যবোধকে টেনে আনলে অর্থনীতি স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ, পুঁজিবাদ হচ্ছে মূল্যবোধহীন অর্থনীতির </span><span style="font-weight: 400;">প্রবক্তা।</span></p>
<p style="text-align: left;"><span style="font-weight: 400;">পুঁজিবাদের ফলে গত ২০০ বছর কী হয়েছে? <strong>একদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু </strong></span><strong>দেশ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোকে লুট করেছে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশীয় পুঁজিবাদ দেশের জনগণকে শোষণ করেছে। পুঁজিবাদ দারিদ্র্য দূর করতে পারেনি। জনগণের </strong><span style="font-weight: 400;"><strong>মধ্যে তৈরি করেছে বৈষম্য ভয়াবহ।</strong> এমনকি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে সব সম্পদ কিছু ধনীর হাতে, </span><span style="font-weight: 400;">যেমন কর্পোরেশনগুলো, ব্যাংক, শেয়ারের মালিক। সাধারণ নাগরিকেরা বেতন দিয়ে </span><span style="font-weight: 400;">জীবন ধারণ করে; তাদের বলতে গেলে সঞ্চয় নেই। ক্রেডিট কার্ডে চলতে হয়। </span><span style="font-weight: 400;">বেকারও অনেক। তাদের অবস্থা কাহিল। অথচ পুঁজিবাদকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই </span><span style="font-weight: 400;">যেহেতু ধনীরাই রাষ্ট্র ও সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াতে পারছে না।</span></p>
<p style="text-align: left;"><span style="font-weight: 400;">বিশ্বে একমাত্র ইসলামই একটি নীতিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তা। ইসলামে বিশ্বাসী </span><span style="font-weight: 400;">লোকেরাই ইসলামী অর্থনীতি ও ইসলামী ব্যাংকিং এর ওপর সাহিত্য তৈরি করেছেন। </span><span style="font-weight: 400;">কিছু সুদহীন ব্যাংক চালু করেছেন। অন্য কো্নো ধর্ম তা করেনি। <strong>ইসলামী অর্থনীতির </strong></span><strong>ভিত্তি হচ্ছে নৈতিকতা, আল্লাহতে বিশ্বাস, মানুষকে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি মনে</strong><span style="font-weight: 400;"><strong>করা এবং সর্বোপরি, সুবিচারে বিশ্বাস</strong>। </span><span style="font-weight: 400;">ইসলামী অর্থনীতিতে বাজার থাকবে, তবে তা নিরঙ্কুশ (Absolute) হবে না। সরকার </span><span style="font-weight: 400;">সেখানে সুবিচারের প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করবে । একে ইসলামে ‘হিসবা’ (Supervision)</span><span style="font-weight: 400;">বলা হয়। ইসলামী অর্থনীতিতে মনোপলি ভেঙে ফেলা হবে, প্রয়োজনে জাতীয়করণ </span><span style="font-weight: 400;">করা হবে, প্রয়োজনে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হবে, লাভ বা মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করা হবে, </span><span style="font-weight: 400;">হারাম ও ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হবে ।</span></p>
<p style="text-align: left;"><span style="font-weight: 400;">তেমনিভাবে রাজস্ব নীতিতে (Fiscal Policy) ব্যাপক পরিবর্তন আনা হবে, বিশেষ </span><span style="font-weight: 400;">করে ব্যয় নীতিতে (Expenditure Policy)। সরকার যদি চায় তবে বিচার সহজ </span><span style="font-weight: 400;">করার জন্য কোর্ট ফি তুলে দিতে পারে (যেমন মুসলিম আমলে ছিল) এবং সেটি </span><span style="font-weight: 400;">চালানোর খরচ সরকার তার রাজস্ব থেকে বহন করবে (যেমন প্রাইমারি শিক্ষার ক্ষেত্রে করা হয়)। এর ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিচারালয়&nbsp; সহজ হবে। তেমনিভাবে </span><span style="font-weight: 400;">মুসলিম আমলের মতো যাদের সামর্থ্য নেই উকিলের মাধ্যম ছাড়া, তাদের কোর্টে </span><span style="font-weight: 400;">সরাসরি দরখাস্ত করার এবং বিচার চাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। </span><span style="font-weight: 400;">মুদ্রানীতিতে (Monetary Policy) বর্তমানের চেয়ে আরো ভালো করা সম্ভব। ড.</span><span style="font-weight: 400;">উমর চাপড়া তাঁর </span><b>Towards a Just Monetary Policy</b><span style="font-weight: 400;"> শীর্ষক লেখায় বলেছেন, </span><span style="font-weight: 400;">কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে টাকা ছাপে (যাতে খরচ অতি সামান্য) তা সরকারকে বিনা সুদে </span><span style="font-weight: 400;">দিতে হবে (জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য) এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে দিতে হবে </span><span style="font-weight: 400;">মুদারাবার ভিত্তিতে (লাভ-লোকসানে অংশীদারিত্ব পদ্ধতিতে)। এ টাকা যেহেতু &#8216;ফাও’ </span><span style="font-weight: 400;">টাকার মতো, তাই লাভ কম হলেও কিংবা না হলেও কোনো ক্ষতি হবে না। তেমনিভাবে তিনি বলেছেন যে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে টাকা বানায় (অর্থাৎ ব্যাংক যেভাবে Deposit Creation-এর মাধ্যমে জমা টাকাকে কয়েক গুণ বানিয়ে ফেলে)</span></p>
<p style="text-align: left;"><span style="font-weight: 400;">তার মালিকানা জনগণের বলে ধরতে হবে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক সে টাকা ব্যবহার </span><span style="font-weight: 400;">করে যে লাভ করবে তার অংশ (ধরুন, লাভের ৬০ শতাংশ) সরকারি ট্রেজারিতে জমা </span><span style="font-weight: 400;">দিতে হবে। অর্থাৎ জনগণকে তা দেয়া হবে। </span><span style="font-weight: 400;">ইসলামী অর্থনীতিতে সব সেক্টরই গুণগতভাবে পরিবর্তিত হবে (ব্যাংকব্যবস্থা, স্টক </span><span style="font-weight: 400;">মার্কেট, ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা)। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে যাবে, দারিদ্র্য দূর হবে </span><span style="font-weight: 400;">এবং জাকাতের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বিধান সম্ভব হবে। অমুসলিমদের </span><span style="font-weight: 400;">নিরাপত্তার জন্য জাকাতের পরিবর্তে অন্য রাজস্ব ব্যবহার করা হবে ।</span></p>
<p style="text-align: left;"><span style="font-weight: 400;">সর্বশেষে বলতে চাই, পুঁজিবাদের অমানবিকতার সমাধান সবখানে, অন্তত মুসলিম </span><span style="font-weight: 400;">বিশ্বের ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থনীতি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ড. উমর চাপড়ার ‘ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ&#8217; এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থশাস্ত্রের ভবিষ্যৎ&#8217; বই দুটি পড়ার জন্য অনুরোধ করছি।</span></p>
<p><strong>সূত্রঃ</strong> বিআইআইটি কর্তৃক প্রকাশিত <em>&#8220;উন্নত চিন্তা, মহৎ জীবন, আদর্শ সমাজ&#8221;</em> গ্রন্থ।</p>
<p style="text-align: left;">&nbsp;</p>

<p class="wp-block-paragraph">&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-inhumanity-of-capitalism-vs-the-ethical-economics-of-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4322</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
