<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>সাক্ষাৎকার &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/interview-and-personality/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Fri, 24 Jul 2026 11:19:17 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>সাক্ষাৎকার &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>বায়তুল মাকদিস বিজয়ের স্বপ্ন ও সংগ্রাম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-dreams-and-struggles-for-freeing-baitul-maqdis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-dreams-and-struggles-for-freeing-baitul-maqdis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 24 Jul 2026 11:19:17 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাক্ষাৎকার]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16962</guid>

					<description><![CDATA[[প্রফেসর ডক্টর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। তিনি একইসাথে ইসলামের ইতিহাস, ভূরাজনীতি ও বাইতুল মাকদিস বিষয়ক গবেষণায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে, ‘বারাকা সার্কেল থিওরি’ এবং ‘আমান থিওরি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><em>[</em><em>প্রফেসর ডক্টর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ</em><em>, </em><em>গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। তিনি একইসাথে ইসলামের ইতিহাস</em><em>, </em><em>ভূরাজনীতি ও বাইতুল মাকদিস বিষয়ক গবেষণায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে</em><em>, ‘</em><em>বারাকা সার্কেল থিওরি’ এবং ‘আমান থিওরি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন</em><em>, </em><em>যা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভূরাজনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইতুল মাকদিস ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন এবং ‘রোড টু বাইতুল মাকদিস’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করেন। বাংলাদেশে অবস্থানের শেষ মুহূর্তে </em><em>রোয়াকের পক্ষ থেকে নেওয়া</em><em> এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনের লক্ষ্য</em><em>, </em><em>গবেষণা</em><em>, </em><em>ফিলিস্তিনের সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন।]</em></p>
<p><strong><em>&nbsp;</em></strong></p>
<p><strong>রোয়াক:</strong><strong>&nbsp;</strong>উস্তাদ, আমরা জানি যে ১৯৪৮ সালে যখন দ্বিতীয়বার ফিলিস্তিনে আক্রমণ চালানো হয়েছিলো, তখন আপনার পরিবারকেও নিজ গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিলো। এরপর জীবনের ১৮ বছর ধরে আপনি শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করেছিলেন। কঠিন সেই সময়টা আপনারা কীভাবে অতিবাহিত করেছিলেন এবং শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠার পরও কীভাবে নিজেকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা স্কলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;আলহামদুলিল্লাহ। ওয়াস্‌সালাতু ওয়াস্‌সালামু আ’লা রাসূলিল্লাহ। রাব্বিশ্‌রাহলি…<br />
১৯৪৮ সালের ঘটনা সম্পর্কে একটু বলি। আমাদের ফিলিস্তিনি পূর্বপুরুষরা শান্তিপূর্ণভাবেই নিজেদের গ্রামে বসবাস করতো। গ্রামটির নাম ছিল জারনূকা (Zarnuqa), যা বাইতুল মাকদিস এলাকার একটি অংশ ছিলো। সেখানে ছিলো তাদের সুখী জীবন, ছিলো নিজস্ব আঙিনা এবং প্রত্যেকের আপন আপন স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ করে সেই সুখের জীবন তছনছ করে দেয় জায়োনিস্ট বাহিনী। সেই গ্রামে তারা আক্রমণ করে নির্দয়ভাবে গ্রামবাসীদের হত্যা করতে শুরু করে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় এবং সবাইকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে।</p>
<p>আমাদের গোটা পরিবার— আমার বাবা-মা, দাদা এবং তাঁর তিনটি সন্তান– দুই মেয়ে ও এক ছেলে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো। এই কঠিন যাত্রাপথে তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে মারা গেছে। মেয়েদের নাম ছিল সোফিয়া ও আমিনা, আর ছেলের নাম ছিল আলী। তবে, আলহামদুলিল্লাহ, বাবা-মা বেঁচে গিয়েছিলেন।</p>
<p>এরপর জাতিসংঘের নিকট থেকে তারা কিছু তাবু পেয়েছিলেন। এভাবে তারা একটি আশ্রয়স্থল খুঁজে পান বটে, তবে সেটি ছিলো পুরোপুরি অনিরাপদ। তবুও, সেই তাঁবুই ছিলো আমাদের জন্য অস্থায়ী নতুন ঘর। দশ বছর পর, সেই জীর্ণ তাঁবুতে—যেখানে আমাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলো কেটেছিল—আমি জন্ম নিলাম। যখন আমি ছোটো ছিলাম, চোখ খেলার পর চারপাশে কোনো আধুনিক জীবন বা উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখতে পাইনি, দেখেছিলাম শুধুই তাঁবু, খালি মাঠ এবং শূন্যতা। তবে, সেই শূন্যতা থেকেই আমাদের সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো।</p>
<p>শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা ও গ্রীষ্মের অস্বস্তিকর গরম—প্রকৃতপক্ষে, দুই ঋতুতে জীবনের সংগ্রাম ছিলো অবিশ্বাস্য। সত্যি বলতে, আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই ছিলো সংগ্রামের, যেখানে ৫০০ জন মানুষের জন্য একটিমাত্র টয়লেটের বাস্তবতা ছিলো আমাদের অকপট জীবনচর্চার একটি অংশ। আমাদের পরিবার ছিলো একটি কৃষক পরিবার। বাবা এবং দাদা ছিলেন কৃষি কাজের সাথে জড়িত। তাঁদের জীবনের সব ছিলো জমি, যদিও তাঁরা কখনো ধনী হতে পারেননি। ‘কৃষি-জমি’ ছিলো তাদের সকল স্বপ্ন ও আস্থার কেন্দ্র, ঠিক অভিভাবকের মতো, যা হারানোর পর তাঁদের কাছে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার মতো আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। বাবা প্রতিদিন এক গ্রাম থেকে ডিম কিনে অন্য গ্রামে বিক্রি করতেন। সেই ডিম বিক্রির সামান্য লাভে আমরা একমাত্র খাবার, অর্থাৎ রুটি কিনতাম; আমার মা সেই রুটি নিজ হাতে তৈরি করতেন। বাংলাদেশে যেমন নিয়মিত বাজার দেখা যায়, আমাদের সেরকম ছিলো না। আমাদের কাছে বাজারের সুযোগ ছিলো সীমিত, হয়তো সপ্তাহে একদিনই কোনোমতে বাজার বসতো। আমরা জাতিসংঘের UNRWA তাঁবুতে চালু হওয়া স্কুলে যেতাম। আমার কাছে ভালো কাপড় ছিলো না; কোনো শার্ট থাকলেও তা ছেঁড়া, প্যান্টও একই অবস্থা। আর স্কুলে যেতে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হতো, অনেক সময় আবার আমাদের পায়ে জুতোও থাকতো না।</p>
<p>তবুও, আমার মা-বাবা ছিলেন অসাধারণ স্নেহশীল এবং সন্তানদের শিক্ষিত করার ব্যাপারে গভীরভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তারা আমার এবং আমার ছয় বোনের স্কুল-যাওয়া নিশ্চিত করেছিলেন। জীবনের প্রথম ১৮ বছরে আমি কখনও বিদ্যুৎ দেখিনি। আমার বয়স যখন আঠারো, একদিন প্রথমবারের মতো দেয়ালে এক সুইচ দেখতে পেলাম ও হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল—আমি ভেবেছিলাম, এটা মনে হয় কোনো যাদু!</p>
<p>আমার বাবা, যিনি লিখতে-পড়তে জানতেন না, প্রায়ই আমাকে বলতেন, “আবদুল ফাত্তাহ, আমরা আমাদের বাড়ি ও ভূমি হারিয়েছি, তবে একমাত্র উপায়—শিক্ষা, যা সেই হারানো সবকিছুকে ফিরিয়ে আনতে পারে।”</p>
<p>আমার কাছে তিনি ছিলেন জীবনের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি, যদিও তাঁর হাতে কোনো আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট বা ডিগ্রী ছিলো না। শেষে, বাবাই আমার পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেন। কোনো সরকারী স্কলারশিপ বা আন্তঃসংস্থাগত সহযোগিতা ছাড়াই, তাঁর নিজস্ব ছোট ব্যবসা—ডিম বিক্রি থেকে শুরু করে ফলমূল ও শাকসবজি বিক্রির মাধ্যমে—আমাকে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ করে দেন। নিজস্ব ছোট ব্যবসা শুরু করে তিনি ডিম, ফলমূল ও শাকসবজি বিক্রি করতেন; ঠিক যেমন আমি এখানে ঢাকায় এসে দেখতে পেয়েছি।</p>
<p>ওই ব্যবসার ধারাবাহিকতায়, বাবাই আমাকে বিদেশে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠাতেন, যতদিন না আমি এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শেষ করি। ১৯৮৬ সালে পিএইচডি সমাপ্তির পর আমি দেশে ফিরে আসি, কিন্তু প্রকাশ্যে ফিরে আসার এক বছর পর, ১৯৮৭ সালে, প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হয়। সেই কঠিন সময়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আমাকে লক্ষ্য করে</p>
<p>পরবর্তীতে তাঁদের গোয়েন্দারা একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে আসতো। ১৯৯২ সালে তাঁরা আমাকে নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের মতে, আমার লেখালেখি যেকোনো অস্ত্রের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। নির্বাসনের পর আমাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখানেই আমি নিজের একাডেমিক যাত্রা পুনরায় শুরু করি।</p>
<p>আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আমি আমার একাডেমিক ক্যারিয়ারে উন্নতি করতে থাকি এবং প্রফেসর পদে অধিষ্ঠিত হই, যা যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে উচ্চতর একাডেমিক পদ। এটি ছিল আমার সংক্ষিপ্ত জীবনের গল্প—১৯৪৮ সাল থেকে ২০০১ সালে চেয়ার পদে উপনীত হওয়া পর্যন্ত। আজ সেই মাইলফলকটি পার হওয়ার প্রায় ২৪ বছর পূর্ণ হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;উস্তাদ, যেহেতু নির্বাসনের প্রসঙ্গ এলো, আমরা শুনেছি যে নির্বাসনের সময় আপনি প্রখ্যাত মুজাহিদ ইসমাইল হানিয়ার সাথে সময় কাটিয়েছেন। আপনি কি তাঁর সঙ্গের কিছু স্মৃতি শেয়ার করবেন?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;হ্যাঁ, আমি একা ছিলাম না। নির্বাসনের সময়, আমাদের সাথে ছিলো পবিত্র ভূমি বায়তুল মাকদিসের ৪১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আমার ভাই ইসমাইল হানিয়া তখন ছিল টগবগে তরুণ; গাজার যেসব লোক তাঁকে চেনে, তারা আজও তাঁর স্মৃতি ভালোবাসার সহিত হৃদয়ে ধারণ করে। সেই সময়টাতেই তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। নিঃসন্দেহে, তখন থেকেই তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিচ্ছুরিত হতো। যদিও শুরুর দিকে তাঁর নেতৃত্ব ততোটা স্পষ্ট ছিলো না, কারণ তিনি তখন খুবই তরুণ ছিলেন। পরবর্তীতে যখন বিভিন্ন শহরে প্রতিনিধি নির্বাচন শুরু হলো, তখন তিনি বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে শক্তপোক্তভাবেই আবির্ভূত হলেন। আমার মনে হয়, সেই বছরগুলোতেই আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব আরও দৃঢ় ও গভীর হয়েছিলো, যা পরবর্তীতে ক্রমান্বয়েই বৃদ্ধি পেয়েছিলো। আলহামদুলিল্লাহ রব্বিল আলামিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong><strong>&nbsp;</strong>উস্তাদ,আপনি প্রায়ই আপনার সেমিনার ও বক্তৃতায় স্বাধীনতার কথা বলে থাকেন। আমার কৌতুহল হলো, আপনি ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি দ্বারা কোন বিষয়টিকে উদ্দেশ্য করেন?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong> প্রথমেই বলি, যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালেই আমাকে ‘স্বাধীনতা’ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হওয়া লাগে। সেখানকার উদার চিন্তাধারায় স্বাধীনতাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। তবে অনেকেই স্বাধীনতার নামে এমনসব কাজ করে, যা নীতিহীন এবং আইনের অপব্যবহার।</p>
<p>আমার কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো গভীর উপলব্ধির বিষয়। যখন আমি ইসলাম শিখলাম এবং আমাদের গৌরবময় ইতিহাস অধ্যয়ন করলাম, তখনই আমি অনুভব করলাম খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ‘মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে।’ কথাটি কতটা সত্য এবং গভীর। অর্থাৎ, সুবিশাল এই দুনিয়ায় কোনো মানুষই দাস হয়ে জন্মায় না; প্রত্যেক মানুষই প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনভাবে জন্মায়।</p>
<p><em>তাই আমার মতে</em><em>, </em></p>
<blockquote><p><em>স্বা</em><em style="font-size: 16px;">ধীনতার মানে হলো</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">চিন্তা করার স্বাধীনতা</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">নিজের কাজ করার স্বাধীনতা</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা</em><em style="font-size: 16px;">; </em><em style="font-size: 16px;">তবে এসবের সাথে ‘দায়িত্ব’-এর বিষয়টিও জরুরি। আমার বিশ্বাস</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">স্বাধীনতা মানে হলো দায়বদ্ধতার সাথে স্বাধীনতা</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">যেখানে থাকবে দায়িদায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">যা আমরা কুরআন ও রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর জীবন থেকে শিখেছি। আমি মানুষকে উৎসাহিত করি মুক্তভাবে চিন্তা করতে</em><em style="font-size: 16px;">, </em><em style="font-size: 16px;">যাতে করে তার মাঝে সৃজনশীলতা ফুটে উঠে এবং সে উম্মাহর কল্যাণে কাজ করে।</em></p></blockquote>
<p><em>ইসলাম শেখায়</em><em>, </em><em>স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খল বা বিশৃঙ্খলা নয়</em><em>, </em><em>বরং দায়িত্বশীলভাবে স্বাধীন থাকা। আপনি মুক্ত থাকবেন</em><em>, </em><em>তবে আপনার কাজ এবং চিন্তার জন্য আপনাকে আল্লাহ</em><em>, </em><em>সমাজ ও নৈতিকতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। একইসাথে</em><em>, </em><em>এই মুক্তি ও স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আসতে থাকতে হবে। যদি কেউ তার স্বাধীনতার অপব্যবহার করে সমাজ</em><em>, </em><em>ইসলাম বা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কাজ করে</em><em>, </em><em>তাহলে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত</em><em>, </em><em>যেনো স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।</em></p>
<p>অথচ, আজকের পশ্চিমা দেশে, স্বাধীনতার নামে অনেক কাজ করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই নিজেদের লিঙ্গ পরিবর্তন করছে এবং তা আইনের অধীনে বৈধ। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এটাই স্বাধীনতার আসল অর্থ নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;দারুণ! সত্যিই স্বাধীনতা শব্দটিকে আমরা এভাবে দেখিনি আগে। তবে যেহেতু আমরা বেশ কয়েকদিন ধরে আপনার ক্লাস করেছি। আপনি প্রায়ই Occupation of mind বা মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব এবং occupation of land বা ভূমির দখলদারিত্ব নিয়ে বলে থাকেন। অনুগ্রহ করে এই বিষয়টি আমাদের জন্য সহজ করে ব্যাখ্যা করলে আমরা এখান থেকে উপকৃত হতে পারবো।</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong> হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমি দেখেছি যে, আমাদের উপর দু’ধরণের দখলদারিত্ব আসে। প্রথমটি হলো—ভূমির দখল, যেখানে শত্রু বাহিনী সরাসরি আমাদের ভূমি, দেশ এবং ঘরবাড়ি দখল করে নেয়। দ্বিতীয়টি হলো—আকলের দখল, যেখানে কেউ আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়।</p>
<p>এখন, এই দু’টি দখলদারিত্বের মূল উৎস হচ্ছে ঔপনিবেশিক শক্তি। তাদের প্রথম কাজ হলো, মানুষকে মানসিকভাবে দাস বানিয়ে ফেলা বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বন্দী করা। কারণ, আমাদের আকল থেকেই আমাদের প্রতিটা কাজের পরিকল্পনা ও চিন্তার সূচনা হয়। যদি মন ও আকল স্বাধীন না থাকে, তাহলে কোনো মানুষ কখনই তার ভূমি মুক্ত করার স্বপ্নও দেখতে পারে না। এমনকি এমন আকল ব্যবহার করে কখনও সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই, আকলের মুক্তি ছাড়া ভূমির মুক্তি কখনও সম্ভব না।</p>
<p>দুঃখজনকভাবে, গত শতাব্দীজুড়ে অনেক মুসলিম শুধুমাত্র তার ভূমির স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে গেছে। তবে তারা ভুলে গেছে যে, ভূমি স্বাধীন হলেও যদি আকল পরাধীন থাকে, তাহলে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয় না। ফলস্বরূপ, আজ অনেক দেশে স্বাধীনতার দাবি থাকলেও, তাঁদের শিক্ষা, চিন্তা, সংস্কৃতি এবং স্বপ্নগুলো পশ্চিমা ঔপনিবেশিক চিন্তায় বন্দী। একে বলা যায় বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব।</p>
<p>সুতরাং, আমার বক্তব্য হলো, ভূমির স্বাধীনতার আগে আকলের স্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি। যদি আকল ও চিন্তা মুক্ত থাকে, তবে ভূমি নিজেও প্রকৃত স্বাধীন হবে এবং এভাবেই এক সত্যিকারের স্বাধীন সমাজ গড়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong><strong>&nbsp;</strong>উস্তাদ, আপনি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতার স্বপ্ন লালন করেছেন, আবার আমরা এ-ও জানি যে, আপনার জীবনের প্রধান ভিশন হচ্ছে বায়তুল মাকদিসের মুক্তি। তো সাধারণইত মুক্তির স্বপ্ন যারা দেখে, তারা বিপ্লবী যোদ্ধা হয়। কিন্তু আপনি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কেন আপনি সরাসরি যুদ্ধের মাঠে না গিয়ে সারা জীবন জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত থাকলেন? এ বিষয়টা আমাদের কাছে খুবই কৌতুহলোদ্দীপক।</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;তোমার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার চারপাশের অনেকেই—এমনকি আমার শহীদ ভাই আবদুল্লাহ এবং অন্যান্য আত্মীয়রা—সরাসরি সামরিক অঙ্গনে লড়াই করেছেন। সামরিক সংগ্রামের গুরুত্ব নিয়ে আমার কোনো দ্বিধাই ছিলো না। কিন্তু একদিন আমার পিতা আমাকে একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবন বদলে দেয়। তিনি বলেছিলেন, “<em>আমাদের মাতৃভূমি মুক্ত করতে হলে</em><em>, </em><em>প্রথম অস্ত্র হতে হবে শিক্ষা।”</em></p>
<p>আমি যখন মাত্র ১১ বছর বয়সে এই কথা শুনলাম, তখন থেকেই হৃদয়ে গেঁথে গেলো যে আমার যুদ্ধ হবে কলমের এবং জ্ঞানের; আমার যুদ্ধ হবে চিন্তার যুদ্ধ। আবার ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমি বুঝতে পারলাম, ইসলামের প্রথম ওহী ছিল, “পড়ো! তোমার প্রভু আল্লাহর নামে পড়ো!” এই বাক্য থেকেই শিখলাম যে ইসলামের শক্তি জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই নিহিত। পরে গবেষণায়ও দেখলাম, সামরিক শক্তি ও রাজনীতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি সবকিছুর ভিত্তিই হচ্ছে জ্ঞান।</p>
<p>এই বিশ্বাস নিয়ে আমি আমার জীবনের ৩৫ বছরেরও বেশি সময় শিক্ষা ও জ্ঞানের আন্দোলনে নিয়োজিত থেকেছি। আমি মনে করি, এই পথেও এক ধরণের জিহাদ রয়েছে। ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন,</p>
<blockquote><p><em>জিহাদের ২৩টি স্তর আছে</em><em>; </em><em>সরাসরি যুদ্ধ করা তো সহজ স্তর—অস্ত্র ধরে লড়াই করা</em><em>, </em><em>কিন্তু সবচেয়ে কঠিন হলো নিজের ও উম্মাহের আকল ও চিন্তাধারাকে মুক্ত করা এবং ভবিষ্যতের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তৈরি করা।</em></p></blockquote>
<p>সুতরাং, আমার জিহাদ হলো, মুমূর্ষু মুসলিম উম্মাহর আকলকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে তাদের চিন্তা ও জ্ঞানকে শক্তিশালী করা। এটাই আমার লড়াই, এটাই আমার যুদ্ধ। ইনশাআল্লাহ, যতদিন না বায়তুল মাকদিস ও মুসলিম উম্মাহ প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে, আমি এই যুদ্ধ অব্যাহত রাখবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;আপনি বলেছিলেন, জ্ঞানচর্চার পথে আপনি বায়তুল মাকদিসকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এখন আমার প্রশ্ন হলো, কেউ যদি উম্মাহ বা মানবতার জন্য কাজ করতে চায়, তাহলে তার জন্য কি বায়তুল মাকদিসকে কেন্দ্র করে কাজ শুরু করা আবশ্যক?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong><strong>&nbsp;</strong>বিষয়টা আবশ্যক, তবে একটু ব্যাখ্যা করি। আসলে আমাকে বায়তুল মাকদিসের দিকে টেনে নিয়েছিলেন আমার মা। প্রথম দিকেতো এটা আমার নিজের কোনো সিদ্ধান্ত ছিলো না।</p>
<p><em>আমার মা</em><em>, </em><em>যিনি লিখতে-পড়তে পারতেন না</em><em>, </em><em>তিনি আমার ছোটবেলায় প্রায়ই আমাকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যেতেন। মা যখন মহিলাদের সঙ্গে ‘ডোম অব দ্য রক’-এ নামাজ পড়তেন</em><em>, </em><em>তখন আমি চারপাশে খেলতাম। নামাজ শেষে মা আমাকে নিয়ে এসে ডেকে বলতেন</em><em>, “</em><em>আবদুল ফাত্তাহ</em><em>, </em><em>তুমি এই পাথরটা দেখছো</em><em>? </em><em>এখান থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা.) আকাশে মেরাজে গমন করেছিলেন।”</em></p>
<p>মায়ের এই কথা শুনেই আমার হৃদয়ে আল-মসজিদুল আকসার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা জন্মে এবং সেই ভালোবাসা থেকেই পরবর্তীতে এটি আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, আমার বাবার কাছ থেকে শোনা কথা—“শিক্ষা, শিক্ষা, শিক্ষা” এবং মায়ের সঙ্গে মসজিদুল আকসায় যাওয়া থেকেই বায়তুল মাকদিসের প্রতি আমার ভালোবাসার জন্ম।</p>
<p>পরবর্তীতে দীর্ঘ পড়াশোনা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে আমি উপলব্ধি করি যে, ইসলামের জন্য কাজ করা মানে বায়তুল মাকদিসের জন্য সংগ্রাম করা, আর বায়তুল মাকদিসের মর্যাদা রক্ষা করা মানে ইসলামের শক্তি বহাল রাখা। এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিটি মুসলিমেরই অন্তত বায়তুল মাকদিসের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।</p>
<p>আজ, অনেক বছর পর, আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে এই পথে পরিচালিত করেছেন। আমার দৃঢ়বিশ্বাস যে, যদি মাসজিদুল আকসা মুক্ত হয়, তাহলে পুরো উম্মাহ মুক্ত হবে। আর যদি তা দখলদারদের কাছে থাকে, তবে উম্মাহও তাদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকবে।</p>
<p>এটাই আমার পথচলা। যদিও আমার পথ প্রতিটি মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে বিষয়টা আবশ্যক। মসজিদুল আকসার গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা সত্যিকার স্বাধীনতার ও শক্তিশালী উম্মাহ গঠনের পথে অগ্রসর হতে পারি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;আমরা জানি যে, ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই বায়তুল মাকদিস মুসলিমদের জন্য একটি অবিচ্ছেদ্য ও পবিত্স্থার ন। এটি ছিলো মুসলমানদের প্রথম কিবলা এবং আমাদের আকীদার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আজকের অনেক মুসলিম এ বিষয়টিকে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনের সমস্যা হিসেবে দেখেন। তাহলে আমরা কিভাবে আমাদের সমাজে এটিকে আকিদার বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে পারি এবং বায়তুল মাকদিসকে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;আজকের দিনে, আমাদের সমাজকে এই সত্যটি বুঝতে হবে যে, ইসলামের জন্য কাজ করা মানে বায়তুল মাকদিসের জন্য সংগ্রাম করা। এই জয়প্রাপ্তি শুধু ভূতাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক নয়, এটি একান্ত আমাদের আকীদার প্রশ্ন। আমার মতে, প্রতিটি মুসলিমের উচিত, যারা মানবতা বা উম্মাহর কল্যাণ চায়, বায়তুল মাকদিসের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া।</p>
<p><em>আমি মনে করি</em><em>, </em><em>আমাদের প্রথম কাজ হলো শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম</em><em>, </em><em>যাদের আমি ভবিষ্যতের নেতা বলি</em><em>, </em><em>তাদেরকে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ও কার্যকর শিক্ষা দেয়া দরকার। আমার বাবার মতো আমিও বলি</em><em>, </em><em>শিক্ষা</em><em>, </em><em>শিক্ষা এবং শিক্ষা! আমি দেখেছি আমরা এমন একটি উম্মাহ</em><em>, </em><em>যাদের পরিচয় লেখক হলেও আমরা নিজেই পড়ি না।</em></p>
<p>আমার একটি অনুরোধ হচ্ছে, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনি কি কখনও মাসজিদুল আকসা ও বায়তুল মাকদিস নিয়ে বই বা প্রবন্ধ পড়েছেন এবং কীভাবে এই বিষয়গুলো আমাদের ইসলামের আকীদার সাথে যুক্ত?</p>
<p>আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বায়তুল মাকদিসকে আমাদের সংস্কৃতির অংশ করা। এই সংস্কৃতি বাস্তবিকভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মডেল। তিনি বায়তুল মাকদিসকে মদিনার সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।</p>
<p>প্রথমত, আমাদের উচিত হচ্ছে, ইসলামী ও কুরআনী পরিভাষা ব্যবহার করা, যেনো আমরা আল-আরদুল মুকাদ্দাসাহ, বায়তুল মাকদিস এবং মাসজিদুল আকসা শব্দত্রয়ের মূল্য বুঝতে পারি এবং এ-নিয়ে গর্বিত হতে পারি।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, আমাদের উম্মাহকে স্পষ্ট আশা দিতে হবে যে, আল-আকসা মুক্ত হবে; বায়তুল মাকদিস মুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সমগ্র জীবনেই এ কাজটি করে গিয়েছেন, এবং এটিই আল্লাহর ওয়াদা, যা সূরা ইসরাতে বর্ণিত হয়েছে। সূরা ইসরা পড়ুন, তাহলে মুক্তির রোডম্যাপটি আপনার সামনে স্পষ্ট হবে।</p>
<p>তৃতীয়ত, বাংলাদেশসহ আমাদের সমাজে মুসলমানদের মধ্যে বায়তুল মাকদিস ও মাসজিদুল আকসা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও বিতর্ক করা দরকার।</p>
<p>চতুর্থত, আমার ব্যক্তিগত মডেল অনুযায়ী, প্রত্যেক রাতে ঘুমানোর আগে সূরা ইসরা পাঠ করা উচিত। দুর্ভাগ্যক্রমে, আজকের উম্মাহ এমন অভ্যাস থেকে বঞ্চিত। তিরমিযির বর্ণনায় আছে, উম্মুনা আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) ততক্ষণ পর্যন্ত ঘুমাতে যেতেন না, যতক্ষণ না তিনি সূরা বনি ইসরাইল পড়তেন।”</p>
<p>ভাবুন, তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন!<br />
এই চারটি বিষয়ে যদি আমরা আমাদের সমাজকে সচেতন করি, তাহলে ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশে এবং সমগ্র উম্মাহর মধ্যে ‘বায়তুল মাকদিস সংস্কৃতি’ প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong><strong>&nbsp;</strong>তাহলে উস্তাদ, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আপনি বায়তুল মাকদিসের মুক্তি সম্পর্কে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী।</p>
<p><strong><em>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</em></strong><em>&nbsp;</em><em>আলহামদুলিল্লাহ</em><em>, </em><em>আমার মনে কোনো শংকা নেই। এইযে</em><em>, </em><em>আমি এখন তোমাকে আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি</em><em>, </em><em>এটি যেমন আমার কাছে নিশ্চিত সত্য</em><em>, </em><em>তেমনি আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি—ইনশাআল্লাহ</em><em>, </em><em>বায়তুল মাকদিস মুক্ত হবে এবং আপনাদের প্রজন্মই তার সাক্ষী হবে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong><strong>&nbsp;</strong>উস্তাদ, আপনি এতটা দৃঢ় আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে পেয়েছেন?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;আমার আত্মবিশ্বাসের মূল উৎস হলো সূরা ইসরা। সূরা ইসরা—তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, তুমি যা পড়বে, তাই তোমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। এরপর, আমার আত্মবিশ্বাসের দ্বিতীয় উৎস হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস। তৃতীয়ত, এটি শুধু ইতিহাস থেকে নয়, বরং ইতিহাসের চলমান প্রবাহ থেকেও উদ্ভূত, যা সুন্নাতুল্লাহর পথে পরিচালিত হয়। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব, যেখানে ব্যাখ্যা করা হয় যে, কিভাবে একটি রাষ্ট্রের উত্থান হয় এবং একপর্যায়ে গিয়ে তার পতন হয়। এই চারটি মূল উৎসই আমাকে শক্তি, সাহস ও আত্মবিশ্বাস প্রদান করে। তবে তুমি যদি একবাক্যে জানতে চাও, তাহলে আমি বলবো, সবকিছুর মূলে রয়েছে কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;উস্তাদ, আমরা জানি আপনার সমগ্র জীবন জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় নিবেদিত ছিলো, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনার বিশেষ ব্যুৎপত্তি রয়েছে। আপনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের জনক। এর মাঝ থেকে বারাকাহ সার্কেল তত্ত্ব এবং আমান তত্ত্ব বেশ প্রসিদ্ধ। এ নিয়ে যদি সংক্ষেপে কিছু বলতেন…</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong> সংক্ষেপে বলাটা একটু কঠিন, তবে চেষ্টা করি। আমার নতুন ভূরাজনৈতিক তত্ত্ব—বারাকাহ সার্কেল তত্ত্ব—কোনো পূর্বপরিকল্পিত প্রচেষ্টার ফল নয়; বরং ধারাবাহিক ও গভীর গবেষণার ফসল। ব্রিটেন, জার্মানি ও আমেরিকার মতো পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে ভূমি দখল ও সম্প্রসারণের দিকে লক্ষ্য করে, সেখানে আমার এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এটি আকসা মুক্তির এক সুস্পষ্ট নকশা।</p>
<p>আমি গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছি, বায়তুল মাকদিসকে কেন্দ্র করে মুক্তির ক্ষেত্রে চারটি দেশ—মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও তুরস্ক—বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এই চারটি দেশের মাধ্যমে মুক্তির সামরিক প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন হবে ইনশাআল্লাহ। আর দূরবর্তী মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের জ্ঞান, চেতনা ও প্রস্তুতিতে উন্নত করতে হবে, যাতে মুক্তির সময় তারা সহযোগী হিসেবে অংশ নিতে পারে।</p>
<p>আর আমান তত্ত্ব মূলত মুক্তির পর বায়তুল মাকদিসের সমাজব্যবস্থা নিয়ে। মুক্তির পর সমাজে কীভাবে পারস্পরিক সম্মান ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা হবে—এটাই এই তত্ত্বের মূল বিষয়। আমি ‘আমান’ শব্দের ইংরেজি অর্থ—Mutual Respect and Peaceful Coexistence—এর সঙ্গে তুলনা করেছি। যেমন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনে সব ধর্মের মানুষ মুসলিম শাসনের অধীনে শান্তিতে বসবাস করতেন, ঠিক তেমনি এক নতুন সমাজ সৃষ্টি হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;আমরা সবাই জানি, আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনেরা কী অবর্ণনীয় সংগ্রাম ও অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে চলেছেন। তাদের জীবনের সীমাহীন দুঃকষ্ট সত্ত্বেও তাদের মুখে, তাদের চোখে বা তাদের চেহারায় কখনো হতাশার ছাপ দেখা যায় না, তারা হালও ছেড়ে দেয় না। প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:, আপনার দৃষ্টিতে—কোন বিশেষ গুণটি তাদেরকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে? এবং কোন বিষয়টি তাদেরকে এতটা দৃঢ়, একতাবদ্ধ ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;এ-সবই ইসলামী পরিবেশে লালিত-পালিত হওয়ার ফল। এটাই হলো প্রকৃত ইসলামী পরিবার গঠনের বাস্তব ফসল।</p>
<p>প্রথমত, তারা জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। একজন সৎ স্বামী বা একজন ধার্মিক স্ত্রী নির্বাচন করা তাদের পারিবারিক জীবনের মূল ভিত্তি। এখান থেকেই তাদের শক্তির যাত্রা শুরু হয়।<br />
দ্বিতীয়ত, কুরআন। অপারেশন ‘তুফান আল আকসা’ আসার আগ থেকেই সেখানে শুরু হয়েছিলো ‘তুফান আল-কুরআন’। ফিলিস্তিনের প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি ক্যাম্প, প্রতিটা শহর ও গ্রামেই সকল মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একত্র হয়ে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতো। কুরআনের এই বন্যায় তারা নিজেদের হৃদয় ভাসিয়ে দিয়েছিলো।</p>
<p><em>আজ গাজায় যারা অবিচল দাঁড়িয়ে আছে</em><em>, </em><em>সীমাহীন আগ্রাসনের মুখেও যারা অটল থেকেছে</em><em>, </em><em>তাদের ভেতরকার সেই অনন্য শক্তি এসেছে কুরআন থেকেই। কুরআনই তাদের আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কুরআনই তাদের দিয়েছে অফুরন্ত সাহস</em><em>, </em><em>ঈমানি দৃঢ়তা এবং অদম্য প্রতিরোধের শক্তি। এটাই ফিলিস্তিনিদের অদম্য শক্তির রহস্য</em><em>; </em><em>অর্থাৎ</em><em>, </em><em>ইসলামী পরিবার</em><em>, </em><em>ইসলামী মূল্যবোধ ও কুরআনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;উস্তাদ, তাহলে এবার একটু এই প্রসঙ্গে আসি। প্রথম সাক্ষাতেও আপনি মুসলিম পরিবার গঠনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা তো এমনিতেই মুসলিম পরিবারে জন্মেছি, মুসলিম সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি। তাহলে আবার মুসলিম পরিবার গড়ার বিষয়টি কী বা কেন?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong> পরিবার গঠনের প্রথম ধাপই হলো—সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন। একজন পুরুষের উচিত যোগ্য নারীকে বেছে নেওয়া, আর নারীরও উচিত যোগ্য পুরুষকে নির্বাচন করা। শুরুতেই যদি ভুল হয়, তাহলে তা হবে আজীবনের দুর্ভোগের কারণ।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, একটি মুসলিম পরিবার পরিচালিত হতে হবে কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত অনুযায়ী। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের আদর্শ হতে হবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচরণ দ্বারা গঠিত; প্রেরণা নিতে হবে উম্মাহাতুল মু’মিনীন—হযরত খাদিজা (রা.), হযরত আয়িশা (রা.), হযরত মাইমুনা (রা.) এবং হযরত উম্মে সালমা (রা.)-এর জীবন থেকে।</p>
<p>পরবর্তী ধাপ হলো সন্তান প্রতিপালন। সন্তান জন্মের আগেই, গর্ভাবস্থায় মা যেনো নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করেন—তা নিশ্চিত করতে হবে। আমি বহু বোনের কথা জানি, যারা গর্ভাবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করতেন, ফলে আল্লাহর কুদরতে তাদের সন্তানরা মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সেই কুরআন হিফজ করে ফেলেছে। কারণ, তাদের ইসলামী শিক্ষা শুরু হয়েছিলো গর্ভকাল থেকেই।</p>
<p>সন্তান জন্মের পরও বাবা-মা দুজনের ওপর সমান দায়িত্ব বর্তায়। শুধু মায়ের উপর বা শুধু বাবার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। দুজনকেই ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোকে সন্তানদের গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা আলোকবর্তিকা হয়ে সমাজে ভূমিকা রাখতে পারে।<br />
একটি প্রকৃত মুসলিম পরিবার গঠনের জন্য শুরুতেই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সন্তানের ইসলামী মূল্যবোধে পরিপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এটাই একটি সফল ও বরকতময় জীবনের ভিত্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong><strong>&nbsp;</strong>আমার শেষ প্রশ্ন—বাংলাদেশে আসার পর আপনার অনুভূতি কেমন ছিলো? আর এখন যখন বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন কেমন অনুভব করছেন?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong> সত্যি বলছি, বাংলাদেশে এসে আমি যা দেখেছি, তার জন্য আমার মন প্রস্তুত ছিলো না। আমি ইতিবাচক অর্থেই বলছি, নেতিবাচক নয়। আমি এখানে প্রায় পনেরো দিন কাটালাম, অথচ মনে হচ্ছে যেন মাত্র কয়েক ঘণ্টা!</p>
<p>কেন? কারণ, আমি এখানে আমার আপন ভাই-বোনদের মাঝে ছিলাম। এক মুহূর্তের জন্যও আমার নিজেকে বিদেশি বা বহিরাগত মনে হয়নি। বিমানবন্দরে নামার সেই প্রথম মুহূর্ত থেকে আজ অবধি মনে হয়েছে আমি যেনো নিজের ঘরেই আছি। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো একটু অচেনা লাগবে।</p>
<p>কিন্তু আল্লাহর কসম, এখানে আসার পর থেকে প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে—আমি বহুদিনের পরিচিত, বহুদিনের আপন এই মাটির সাথে। এটি সম্ভব হয়েছে এখানকার ভাইদের সীমাহীন ভালোবাসা, আতিথেয়তা এবং যত্নের কারণে। তারা এমন আন্তরিকতা দেখিয়েছে—যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।</p>
<p>বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার অনুভূতি—<em>সুবহানাল্লাহ! আমি যেনো এমন এক বাংলাদেশ দেখছি</em><em>, </em><em>যে বাংলাদেশ বহু বছরের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। হ্যাঁ</em><em>, </em><em>এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে</em><em>, </em><em>অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে</em><em>, </em><em>কিন্তু সেই প্রথম পদক্ষেপটা শুরু হয়েছে</em><em>, </em><em>আর এটাই সবচেয়ে বড় কথা।</em></p>
<blockquote><p><em>আমি আমার চোখে দেখেছি</em><em>, </em><em>বাংলাদেশ এক অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ। বিশেষ করে মানুষের মাঝে যে মেধা</em><em>, </em><em>মননশক্তি এবং উদ্দীপনা</em><em>, </em><em>তা সত্যিই অবাক করার মতো। অনেক জাতি তাদের এই মূলধন হারিয়ে ফেলেছে</em><em>, </em><em>কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তা ধারণ করে রেখেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অভাব হয়তো নেতৃত্বের</em><em>, </em><em>কিন্তু প্রতিভা</em><em>, </em><em>শক্তি ও সম্পদে এদেশ বেশ সমৃদ্ধ। শুধু প্রয়োজন আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সামনে এগিয়ে চলা। এই দেশ সত্যিই সুন্দর। আমরা একবার অল্প সময়ের জন্য গ্রামে গিয়েছিলাম</em><em>, </em><em>মাশাআল্লাহ! চারপাশে শুধু সবুজের সমারোহ। বিমান থেকে নিচে তাকালেও মনে হচ্ছিল—আল্লাহ তাআলা যেনো সবুজের কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছেন এই মাটিতে।</em></p></blockquote>
<p>আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আরও ভালো জীবনের হকদার। গাড়িতে চলার পথে যখন সাধারণ মানুষদের দেখি, তাদের চোখে অদম্য স্বপ্ন দেখি, অব্যক্ত কষ্ট দেখি। তখন মনে হয়, এরা আরও ভালো কিছুর অধিকারী হওয়ার যোগ্য। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহর ইচ্ছায়, দৃঢ় সংকল্প, মেধা ও সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ অবশ্যই উন্নতির চূড়ায় পৌঁছাবে এবং একদিন এই অঞ্চলের অন্যতম নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ আছে?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong> জ্ঞানকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হবে। জীবনের যেখানেই থাকুন না কেনো, শেখার সাধনা কখনোই থামানো যাবে না। জ্ঞানার্জন হতে হবে তোমাদের অস্ত্র, তোমাদের আত্মিক শক্তি।</p>
<p>তোমরা তোমাদের স্নাতক সম্পন্ন করো। এরপর মাস্টার্স করো। কিন্তু মাস্টার্সে থেমে থাকবে না, তোমাদের লক্ষ্য হতে হবে পিএইচডি, গবেষণা এবং বিশ্বমানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমি দেখেছি, এখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সধারীরাই শিক্ষকতা করছেন। কিন্তু উন্নত বিশ্বের বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাজ্য, তুরস্কসহ বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে হলে পিএইচডি বাধ্যতামূলক। আমার অন্তর থেকে আহ্বান হচ্ছে, তোমরা উচ্চশিক্ষার এই পথে এগিয়ে যাও। বিশ্বমানের শিক্ষক, গবেষক ও চিন্তাশীল নেতৃত্ব হয়ে ওঠো।</p>
<p>আর প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আমার বিশেষ বার্তা হচ্ছে, আপনারা দেশে ফিরে আসুন, ফিরে আসুন, ফিরে আসুন। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তিনবার বলছি, কারণ এটি শুধু অনুরোধ নয়, এটি এক জরুরি আহ্বান। বাংলাদেশের তরুণরা জেগে উঠেছে</p>
<p>এই নবযাত্রায় আপনাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও নেতৃত্ব অপরিহার্য। আপনারা যারা বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষায়, গবেষণায় বা ব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠিত, আপনাদের প্রত্যাবর্তনেই বাংলাদেশ পাবে তার প্রকৃত শক্তি। দেশের পথে, জাতির সেবায়, আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বাস রাখুন, আপনাদের হাত ধরেই একদিন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;উস্তাদ, আমরা কিভাবে আমাদের দেশ থেকেই মাকদিসি হয়ে উঠতে পারি?</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;এটা কোনো কঠিন বিষয় নয়।<br />
বায়তুল মাকদিসি হওয়ার একমাত্র শর্ত হচ্ছে, তুমি যদি তোমার জীবন ও তোমার অস্তিত্বের একটি অংশ বায়তুল মাকদিসের মুক্তির জন্য উৎসর্গ করো, তাহলে তুমিও মাকদিসি হতে পারবে।</p>
<p>তুমি যেমন তোমার দেশের জন্য, তোমার মাটি ও তোমার মানুষের জন্য সংগ্রাম করবে, ঠিক তেমনি তুমি যদি বায়তুল মাকদিসের জন্য, তার পবিত্র ভূমির মুক্তির জন্য কাজ করো, তবে তুমি নিজেও মাকদিসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। তখন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তোমাকে সেই পরিচয় থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। তোমার প্রার্থনা, তোমার সাধনা, তোমার শক্তির উৎস হবে বায়তুল মাকদিস। এভাবেই তুমি মাকদিসি হয়ে উঠতে পারবে।</p>
<p>মাকদিসি নামের এই মর্যাদা অর্জন করা ভৌগলিক কোনো বিষয় নয়। এটি হৃদয়ের, আত্মার ও ভালোবাসার প্রশ্ন। তোমার অন্তরে যদি এই পবিত্র মাটি, সেই মক্কা, মদীনা, আর আল-আকসা থাকে, তবে তুমিও একজন মাকদিসি। এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশাল উপহার, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রোয়াক:</strong>&nbsp;উস্তাদ, আপনার এই অমূল্য সময় ও ধৈর্য্যের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো। আপনার এই কথাগুলো আমাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। আপনার দারস, আপনার সান্নিধ্য, আপনার সাক্ষাৎ সবকিছু আমাদের জন্য অমূল্য। আপনার মাধ্যমে আমরা ফিলিস্তিনের সেসকল যুবকদের উদ্দেশ্যে সালাম পাঠাতে চাই, যারা নিজের জীবন বাজি রেখে উম্মাহর ইজ্জতকে রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। সেসকল মায়েদের সালাম পাঠাতে চাই, যারা একের পর এক সন্তানকে শাহাদাতের রাস্তায় হাসিমুখে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সেসকল বোনদের সালাম পাঠাতে চাই, যারা তাদের মেধা, যোগ্যতা, সাহস সবকিছু উম্মাহর জন্য উৎসর্গ করে আমাদের সামনে উপমা হয়ে আছেন। বাংলাদেশ থেকে তাদের প্রতি ভালোবাসা, সালাম এবং দোয়া।</p>
<p><strong>প্রফেসর আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি:</strong>&nbsp;আমি-ও কৃতজ্ঞ। এই মুহূর্তগুলো আমি যতদিন বেঁচে থাকব, মনে রাখব। আল্লাহর ইচ্ছায়, তোমাদের সকল কাজ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তোমাদের সকলকে মাকদিসি হয়ে ওঠার তাওফিক দিক, আমিন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ: </strong>জান্নাত আরা তাবাসসুম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-dreams-and-struggles-for-freeing-baitul-maqdis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16962</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামি শরীয়া ও মানবাধিকার বিষয়ে ওয়ায়েল হাল্লাক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/wael-hallaq-on-islamic-sharia-and-human-rights/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/wael-hallaq-on-islamic-sharia-and-human-rights/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. ওয়ায়েল হাল্লাক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 31 Mar 2026 13:59:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাক্ষাৎকার]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16707</guid>

					<description><![CDATA[[এই সাক্ষাৎকারটি ডেইলি ফিলোসফি(DP)-কে ২০২১ সালে দেয়া একটি সাক্ষাৎকার। ] [অধ্যাপক ওয়ায়েল বি. হাল্লাক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী আইন, ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একজন শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, এই সাক্ষাৎকারে, আমরা শাসন ও মানবাধিকারের পশ্চিমা এবং ইসলামী ধারণার]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">[এই সাক্ষাৎকারটি ডেইলি ফিলোসফি(DP)-কে ২০২১ সালে দেয়া একটি সাক্ষাৎকার। ]</p>
<p style="text-align: center;"><em>[অধ্যাপক</em> <em>ওয়ায়েল</em> <em>বি</em><em>. </em><em>হাল্লাক</em> <em>কলম্বিয়া</em> <em>বিশ্ববিদ্যালয়ে</em> <em>ইসলামী</em> <em>আইন</em><em>, </em><em>ইসলামী</em> <em>বুদ্ধিবৃত্তিক</em> <em>ইতিহাসের</em> <em>একজন</em> <em>শীর্ষস্থানীয়</em> <em>পণ্ডিত।</em> <em>আফগানিস্তানের</em> <em>সাম্প্রতিক</em> <em>ঘটনাবলীর</em> <em>দ্বারা</em> <em>অনুপ্রাণিত</em> <em>হয়ে</em><em>, </em><em>এই</em> <em>সাক্ষাৎকারে</em><em>, </em><em>আমরা</em> <em>শাসন</em> <em>ও</em> <em>মানবাধিকারের</em> <em>পশ্চিমা</em> <em>এবং</em> <em>ইসলামী</em> <em>ধারণার</em> <em>মধ্যে</em> <em>বিতর্ক</em> <em>সম্পর্কে</em> <em>তাঁর</em> <em>মতামত</em> <em>জিজ্ঞাসা</em> <em>করছি।</em><em> ]</em></p>
<p><em><strong>DP:</strong></em> প্রফেসর ওয়ায়েল বি. হাল্লাক, আজ আপনাকে আমাদের সাথে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত এবং সম্মানিত। আপনি ইসলামী আইন এবং ইসলামী ইতিহাসের উপর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের একজন, এবং আপনি আমাদের কাছে শরীয়ার কিছু জটিলতা ব্যাখ্যা করার জন্য অত্যন্ত উদারভাবে সম্মত হয়েছেন।</p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: </strong></em>এখানে এসে খুশি হলাম। আপনার আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em><strong>DP:</strong> আপনার<strong> &#8220;দ্য ইম্পসিবল স্টেইট&#8221; </strong>বইটিতে আপনি যুক্তি দিয়েছেন&nbsp;যে আধুনিক অর্থে, &#8216;একটি ইসলামী রাষ্ট্র অসম্ভব&#8217;। আপনি বলেছেন যে এমনকি আধুনিক মুসলমানদেরও পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্রের মৌলিক অনুমিতিগুলি মেনে নিতে অসুবিধা হবে। আপনি&nbsp; কি আমাদের পাঠকদের জন্য খুব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে পারবেন,</em> এটা কেন?&nbsp;</p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong></em> আমি ধরে নিচ্ছি যে, আধুনিক রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট নৈতিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, এ ব্যপারে আমরা একমত। আমার যুক্তি হল যে, এটি&nbsp; ইসলামের সামগ্রিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।&nbsp;</p>
<p>এতে সন্দেহ নেই যে, ইসলাম মানে অনেক কিছু। এটি শরীয়া এবং তাসাউফ এবং আরও অনেক কিছু। কিন্তু আমাদের জন্য, বিশেষ করে আজকাল, শরীয়া ব্যবস্থা ও সুফি তরিকার বৈচিত্র্য এবং বহুত্বকে হৃদয়ঙ্গম করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ হবে। শরীয়াতে রয়েছে বিভিন্ন মাযহাব, যার প্রত্যেকটিতে আছে অভ্যন্তরীণ কিন্তু নানামুখী ব্যাখ্যা। একইভাবে, সুফিবাদও শরিয়ার মতই ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং বৈচিত্র্যময়, এবং সত্য বলতে আরও বেশি।&nbsp;</p>
<p>তবুও, এই সমস্ত বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতার দীর্ঘ পরিসরে, ইসলামে একজন নাগরিক-সত্তাকে কোথাও লালন-পালন করার কোনো আয়োজন নেই। একজন নাগরিক হওয়া মানে জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা, মনস্তাত্ত্বিকভাবে, চূড়ান্ত অস্তিত্বগত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে। রাষ্ট্র ও জাতি জীবন ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু রাষ্ট্র ও জাতি একজন মুসলিম ব্যক্তির বিশ্বাস ও আনুগত্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র ও জাতি এমন একটি নৈতিক আদর্শের কেন্দ্রস্থল নয় এবং হতে পারে না যেখানে মুসলমানদের জন্য জীবনের অর্থ, আবাস নিহিত থাকে।</p>
<p><strong>এই প্রেক্ষাপটে আমাদেরকে বুঝতে হবে কেন নবীজীর (সা) উদাহরণ শরিয়া এবং সুফি উভয় মতবাদের ক্ষেত্রেই এত কেন্দ্রীয় ছিল, যা প্রায়শই এক ও অভিন্ন। আসলে নবীজী (সা) নিজেই এই ধরনের নীতিগত অনুকরণের গুরুত্ব এবং কেন্দ্রীয়তা অর্জন করেননি। বরং এর কারণ হল, কোন এক সত্তার উপাসনা করার জন্য, সেই সত্তাকে নিজের আত্মগঠনের প্রযুক্তির উদাহরণ হতে হবে, যেভাবে ব্যক্তিসত্তা নিজেকে একজন নৈতিক সত্তা হিসেবে গঠন করবে।</strong> এই সচেতন এবং সুচিন্তিত প্রযুক্তি ব্যতীত কোনো ইসলাম হতে পারে না, এবং মিশেল ফুকো তাঁর College de France এর বক্তৃতায় আমাদেরকে বারবার দেখিয়েছেন যে, এই প্রযুক্তিগুলো বিদ্যমান জীবনযাত্রার আধুনিক পদ্ধতি থেকে উধাও হয়ে গেছে &#8211; যার জন্য আমরা চড়া মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছি।&nbsp;</p>
<p>আধুনিক রাষ্ট্র জবরদস্তি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে বাইরে থেকে ব্যক্তিকে গঠন করে। ইসলাম তাদের ভেতর থেকে গঠন করে, নিজের উপর সচেতনভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আত্মদর্শন এবং আত্ম-শৃঙ্খলার একটি প্রক্রিয়া, নৈতিক আত্ম-শিক্ষার একটি প্রক্রিয়া।&nbsp;</p>
<p>তাই ইসলামে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কিন্তু বিপরীতে, আধুনিক রাষ্ট্রে এটি সমষ্টিগত এবং এতে স্ব-ক্ষমতার&nbsp; অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার অভাব রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong><em>DP:</em></strong> <em>যদি আমি আপনাকে স্পষ্ট করে বুঝতে পারি আপনি বলছেন যে, আমরা প্রায়শই ইসলামী আইন এবং পশ্চিমা সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে বিরোধ হিসাবে যা দেখি তা আসলে ইসলামের সমস্যা নয়। তাহলে এটি ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সমাজের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য? আপনি কি মনে করেন যে, ধরুন, একটি খ্রিস্টান বা কনফুসিয়ান সমাজের সেক্যুলার রাষ্ট্রের ছাঁচে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য একই রকম সমস্যা থা</em>কবে?</p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong> </em>&nbsp;যে কোনো সমাজ যদি নৈতিক মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাদের অস্তিত্বকে ধর্মনিরপেক্ষ পদ্ধতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়া গভীরভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। আসুন আমরা মনে রাখি ধর্মনিরপেক্ষতা কী, <strong>ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল ধর্মীয় জীবনকে ব্যক্তিগত জীবনে বিভক্ত করে না। বরং এটি ধর্ম কী এবং কোথায় ও কীভাবে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে তা নির্ধারণ করে দেয়। রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, সেক্যুলারিজম হল রাষ্ট্র কর্তৃক ঈশ্বরকে হত্যাতুল্য (secularism is the murder of God by state)।</strong> রাষ্ট্র যেকোনো ধর্মীয় অনুশীলনকে সীমাবদ্ধ, সীমিত, বাতিল বা হ্রাস করতে পারে, এবং এইভাবে ধর্মীয় ক্ষেত্রের মান এবং পরিমাণ নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে, যেমনটি এটি উপযুক্ত মনে করে। এর কারণ রাষ্ট্র হলো চূড়ান্ত সার্বভৌম, যার অস্তিত্বের নিজস্ব কারণ রয়েছে &#8211; যাকে আমরা রাষ্ট্রের যুক্তি বা raison d’etat বলি, মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে এটি একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ধারণা।</p>
<p>এখন আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গেলে, আমি বলব যে ধর্ম যদি নীতিগত মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক ব্যবস্থা হয়, তাহলে হ্যাঁ, আধুনিক রাষ্ট্রের হাতে সকল ধর্মই প্রায় একই ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em><strong>DP:</strong>পশ্চিমা সংবেদনশীলতা এবং মূল্যবোধের জন্য বিশেষ উদ্বেগের দুটি ক্ষেত্র হল জাতিসংঘ ধাঁচের মানবাধিকার এবং ইসলামী রাষ্ট্রগুলিতে নারীর অধিকার। আপনি কি মনে করেন যে একটি ইসলামী সমাজের অবশ্যই এই অধিকারগুলিকে উপেক্ষা করা উচিত, নাকি আমরা এমন একটি মধ্যপন্থী ইসলামী রাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে পারি যা সত্যিকার অর্থে এবং সৎভাবে একই সাথে ইসলামিক এবং অধিকারের এই পশ্চিমা ধারণাগুলিকে সম্মান করতে পারে?</em></p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong></em> নিঃসন্দেহে এই জটিল প্রশ্নগুলোর জন্য উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর জটিল এবং দুর্গম ইতিহাসে প্রবেশ করা প্রয়োজন, যে সময়ে মুসলিম বিশ্ব কার্যত উপনিবেশিত ছিলো এবং এর সামাজিক কাঠামো, এর প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোসহ, ভেঙে ফেলা হয়েছিল। গত দুই শতাব্দীতে কী ঘটেছিল তা না বুঝে মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কারও কথা বলা উচিত নয়।</p>
<p>সংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং মানবাধিকারের ইসলামী ধারণার মধ্যে ব্যবধান ততটা বিশাল নয় যতটা আমরা কল্পনা করি। বিভিন্ন ধরণের ইসলামোফোবিয়া রয়েছে যা ইসলামের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে বিকৃত করেছে, এবং এটি তেমনই একটি ধরণ। আইনী ইতিহাসবিদদের গবেষণায় এখন অনেক সম্মানজনক যুক্তি উঠে এসেছে যে যুদ্ধ আইনসহ ইউরোপীয় আন্তর্জাতিক আইন, অন্যান্য আইনি বিধান এবং এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলিও ইসলামের আইনি ঐতিহ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এই ঐতিহ্য যুদ্ধবন্দীদের অবস্থা এবং যুদ্ধকালীন আচরণের প্রতি নিবিড়ভাবেবে সংবেদনশীল, যা অনেক আধুনিক মনকে অবাক করে দিতে পারে। কিছু &#8220;সর্বজনীন অধিকার&#8221; ডিক্রির (decree) বিরুদ্ধে কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরোধ নীতিগত বিষয় নয়, বরং এটি অধিকারের বিশেষভাবে পশ্চিমা ধারণার প্রত্যাখ্যান।</p>
<p><strong>নারীদের বিষয়টি আরও জটিল। প্রথমত, পশ্চিমা আইনগুলি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নারীদের পূর্ণ আইনি মর্যাদা স্বীকৃতি দিতে শুরু করে (অন্যান্যের মধ্যে, বৈবাহিক সম্পত্তি আইন এবং ভোটাধিকার ইত্যাদি)। বিপরীতে, শরীয়া সপ্তম শতাব্দী থেকে নারীদের পূর্ণ আইনি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।&nbsp;</strong></p>
<p>ইসলামে নারী ও পুরুষের আইনি ক্ষমতা একই, এমন একটি পরিস্থিতি যা এখন এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। সমস্যা হল, নারীরা একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো, যেখানে তারা মূলত সুরক্ষিত ছিল, এখান থেকে সরে একটি আধুনিক, পুঁজিবাদী সামাজিক কাঠামোতে এসেছে। এখানে তাদের নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইতোমধ্যে অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে ঊনবিংশ শতকের পূর্ববর্তী শরিয়া ব্যবস্থার অধীনে নারীরা একটি সংবেদনশীল আইনি ম্যাট্রিক্সে সুরক্ষিত ছিল এবং ব্যাপকভাবে ইউরোপীয় আইন নির্ভর তথাকথিত আধুনিক আইনি সংস্কারের তুলনায় আইনি অধিকারের দিক থেকে অনেক ভালোভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল।&nbsp;</p>
<p>এসবের সাথে আরও যুক্ত করলে, মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশগুলিতে মাঝে মাঝে নারীর মর্যাদার অতিরিক্ত উদারীকরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেখানে খণ্ডিত এবং অস্থিতিশীল পশ্চিমা পরিবার তাদের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক মডেল তৈরি করতে পারেনি। অনেকেই বুঝতে পেরেছেন যে নারীর উদারীকরণ কাঠামোগতভাবে পুঁজিবাদের সাথে সম্পর্কিত, যা সমাজের সামাজিক কাঠামোকে কার্যকরভাবে ধ্বংস করার জন্য দায়ী (এবং পশ্চিমা পারিবারিক কাঠামোর উপর ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছে)।</p>
<p>এবং আমি এখানে জোর দিয়ে বলতে চাই যে ইসলামে ‘উম্মাহ’ ধারণাটি, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ স্তরে (অর্থাৎ, স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালেবান এবং তাদের মতো গোষ্ঠীগুলোর (যারা সকলেই ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু, এবং মূলত মূলধারার মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছন্ন) স্পষ্ট মৌলবাদ এবং ধর্মান্ধতা ছাড়াও অনেক কিছু বিবেচনা এবং ভাবার আছে। শুধু মুসলিম সমাজ নয়, পুরো বিশ্ব কিভাবে নারী অধিকার, পুঁজিবাদ, অধিকারের ধারণার মধ্যকার কাঠামোগত সংযোগ &#8211; অর্থাৎ, এই অধিকারগুলি আসলে কী কাজ করে, পারিবারিক মূল্যবোধের উপর কীভাবে তারা প্রভাব ফেলে &#8211; ইত্যাদি মোকাবেলা করতে পারে তা নিয়ে ভাবতে হবে।&nbsp;</p>
<p>অন্য কথায়, নারীর দুর্দশার সমাধান (মুসলিম বিশ্ব এবং অন্যত্র) নিজে নিজেই হবে না, বরং এটি আমাদের সকলের কাছে আমাদের নিজেদের জন্য তৈরি ব্যবস্থার কাঠামোগত এবং প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি করে। <strong>নারী অধিকারের প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি যেন এটি একটি বিচ্ছিন্ন এবং সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত বিভাগ, একটি বিশাল পদ্ধতিগত (methodological) ভুল।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em><strong>DP:</strong></em> <em>শরীয়া</em> <em>আইন</em><em>, </em><em>অন্যান্য</em> <em>আইনী</em> <em>ব্যবস্থার</em> <em>মতো</em><em>, </em><em>প্রক্রিয়া</em> <em>তৈরি</em> <em>করেছে</em> <em>যা</em> <em>সময়ের</em> <em>সাথে</em> <em>অভিযোজনের</em> <em>অনুমোদন</em> <em>দেয়।</em> <em>কুরআন</em> <em>এবং</em> <em>নবীর</em><em> (</em><em>সা</em><em>) </em><em>বাণী</em> <em>যা</em> <em>অকাট্য</em> <em>তার</em> <em>পাশাপাশি</em><em>, </em><em>ইসলামী</em> <em>আইনে</em> <em>আদর্শের</em> <em>উৎস</em> <em>হিসেবে</em> <em>কিয়াস</em> <em>বা</em> <em>সাদৃশ্যমূলক</em> <em>যুক্তি</em> <em>এবং</em> <em>ইজমা</em> <em>বা</em> <em>আইনগত</em> <em>ঐক্যমত্যও</em> <em>অন্তর্ভুক্ত</em> <em>রয়েছে।</em> <em>এগুলো</em> <em>কি</em> <em>আধুনিক</em> <em>পশ্চিমা</em> <em>ধাঁচের</em> <em>আইনি</em> <em>ব্যবস্থায়</em> <em>ভালোভাবে</em> <em>প্রতিফলিত</em> <em>হয়</em><em>?</em> <em>পশ্চিমা</em> <em>রাষ্ট্রীয়</em> <em>আইন</em> <em>এবং</em> <em>ঐতিহ্যবাহী</em> <em>ইসলামী</em> <em>আইনের</em> <em>মধ্যে</em> <em>পার্থক্য</em> <em>কি</em> <em>কেবল</em> <em>নিয়মের</em> <em>বিষয়বস্তু</em><em>, </em><em>নাকি</em> <em>এই</em> <em>নিয়মগুলো</em> <em>কীভাবে</em> <em>বিকশিত</em> <em>এবং</em> <em>প্রয়োগ</em> <em>করা</em> <em>হয়</em> <em>তার</em> <em>মধ্যে</em> <em>গভীর</em> <em>পার্থক্য</em> <em>রয়েছে</em> <em>যা</em> <em>শরিয়াহের</em> <em>উপর</em> <em>ভিত্তি</em> <em>করে</em> <em>একটি</em> <em>আধুনিক</em> <em>ব্যবস্থা</em> <em>গড়ে</em> <em>তোলা</em> <em>অসম্ভব</em> <em>করে</em> <em>তোলে</em><em>?</em></p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong></em> শরীয়া প্রকৃতপক্ষে নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে আইনি পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করেছিল, যেমনটি আমি এবং আমার অন্যান্য সহকর্মীরা দুই দশকেরও বেশি সময় আগে অনেক লেখায় দেখিয়েছি। বিষয়টি পরিবর্তনের সক্ষমতা সম্পর্কে নয় বরং এটি গুণগত এবং অমীমাংসাযোগ্য পার্থক্যের সমস্যা। অন্য কথায়, সমস্যাটি হল নৈতিক শক্তির একটি অপূরণীয় ফাঁক।&nbsp;</p>
<p>আমি যদি আপনাকে একটি উদাহরণ দেই, যা আধুনিক মুসলিমদের মধ্যে শরিয়া এবং এর কার্যকারিতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এটি হল ইসলামী ব্যাংকিং এবং ইসলামী ‍ফিন্যান্স বা অর্থায়ন। প্রশ্ন হল: মুসলিমরা কীভাবে তাদের আর্থিক লেনদেন &#8220;শরিয়া-পদ্ধতিতে&#8221; একটি প্রভাবশালী এবং বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করবে। আমি মনে করি আমরা একমত হতে পারি যে, পুঁজিবাদ বিশেষভাবে একটি নীতিগত ব্যবস্থায় আবদ্ধ নয়, সম্পত্তি এবং সম্পদের সমতাভিত্তিক বন্টনের নীতির উপর তো দূরের কথা। পুঁজিবাদ এবং এর কর্পোরেশনগুলো কাছে মৌলিক সত্য হল যে, অর্থ অর্থের জন্যই তৈরি করা উচিত। <strong>ইসলামী ব্যবস্থা, শরিয়া-তাসাউফের বিভিন্ন ধারার মধ্যে, পুঁজিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা ধর্মীয় অনুশীলনের একটি গভীর ম্যাট্রিক্স দ্বারা পরিবেষ্টিত। অর্থ এবং অর্থ উপার্জন তাই সৃষ্ট জগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, অর্থাৎ এগুলো দৈনন্দিন অনুশীলনের নৈতিক ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় অনুশীলনের অপরিহার্য উপাদান। ইসলামে অর্থ নীতিশাস্ত্রের একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্য কথায়, অর্থ ছিল একটি নৈতিক ক্ষেত্র।</strong></p>
<p>আধুনিক ইসলামী ফিনান্স সাধারণত পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের উপর আধিপত্য বিস্তারের আগে সহস্রাব্দ ধরে প্রচলিত শরিয়া ঐতিহ্য অনুসরণ করার অর্থ কী তা বোঝার ক্ষেত্রে কারিগরি ধাঁচের এবং ভাসা ভাসা । <strong>আধুনিক ইসলামী ফিনান্স মনে করে যে, সুদ এবং ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব এই বিভ্রম তৈরি করে এমন কিছু কৌশলই সমস্যা চিরতরে সমাধান করে দেবে।</strong></p>
<p><strong>এটা আত্মপ্রতারণা বৈ কিছু নয়। আধুনিক পুঁজিবাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে ইসলামী ফিনান্সকে অন্তর্ভুক্ত করার কোন উপায় নেই, কারণ ইসলামী &#8220;অর্থনীতিতে&#8221; একটি শক্তিশালী নৈতিক মাত্রা এবং উপাদান রয়েছে যা অবাধ আধুনিক পুঁজিবাদের নেই।</strong> আমি আমার বিভিন্ন লেখায় এ বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি এবং ব্যাখ্যা করেছি; উদাহরণস্বরূপ, কেন শরিয়া কর্পোরেশনের ধারণায় ‘সীমিত দায় কোম্পানি’র (limited liability company) উত্থানের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। (আমার বই <strong>“Restating Orientalism”</strong>&#8211; দেখতে পারেন এ বিষয়ে)</p>
<p>ইসলামী আইন ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের ১২শ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নিষেধাজ্ঞার&nbsp; উপর জোর দেওয়া হয়েছিল, যদিও কর্পোরেশন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি উপকরণ শরিয়ার অনুশাসনের ভাণ্ডারে বিদ্যমান ছিল। শরিয়া ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে এবং নিবিড়ভাবে জনহিতকর, এবং মূলধনের পুনর্বণ্টন এবং পুনর্বিনিয়োগ পদ্ধতিগুলো সেই ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য এবং জোরালো অংশ ছিল।&nbsp;</p>
<p><strong>শরিয়া আইনগত ব্যক্তিত্বকেও (juristic personality) প্রত্যাখ্যান করে কারণ এটি প্রতিটি (মানুষ) ব্যক্তি মুসলিমকে এমন যেকোনো আচরণের জন্য দায়ী করে যা অন্যের সম্পত্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে।</strong> এই যুক্তি আমাদের অর্থনীতির পদ্ধতির সাথে এবং অবশ্যই আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রার পদ্ধতির সাথে বেশ অপরিচিত। এর অর্থ হল, উনিশ শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি মুসলিম দেশগুলির বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে শরিয়া এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করার জন্য আগ্রাসীভাবে একটি নীতি অনুসরণ করেছিল। শরিয়া ছিল মুক্ত-বাজার অর্থনীতির পরিপন্থী, অত্যন্ত জনহিতকর এবং দরিদ্রদের পক্ষে পরিচালিত হত এমনভাবে যা আধুনিক পুঁজিবাদ গ্রহণ করতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em><strong>DP:</strong></em> <em>কোনো কোনো পণ্ডিত বলেছেন যে, ইসলামী আইনের যে জানালাটি এখনও সহজলভ্য এবং ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ছিল (ইজতিহাদ) তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বন্ধ হয়ে আসছে এবং আজ তা খুবই সংকীর্ণ, যদি আদৌ বিদ্যমান থেকে থাকে। কিন্তু আপনি এই মূল্যায়নের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আপনি কি সংক্ষেপে আমাদের বলতে পারেন কেন?</em></p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong></em> ইসলামী আইনের বন্ধাত্য এবং অপরিবর্তনশীলতার ধারণা ছিল একটি প্রাচ্যবাদী মিথ যা অনেক আগেই খণ্ডন করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তি এবং তাদের শিক্ষাবিদদের বাহিনী (armies of academicians) মুসলিম বিশ্বে আইনের পরিবর্তন এবং পুনর্গঠনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এটি প্রচার করেছিল।</p>
<p>&nbsp;শরিয়াহ অপরিবর্তনীয় কিনা, প্রশ্ন সেটা এই নয়। প্রশ্ন হলো, শরিয়া তার নৈতিক শক্তি না হারিয়ে—অর্থাৎ, তার পরিচয় না হারিয়ে—আধুনিকতা, আধুনিক পুঁজিবাদ এবং তাদের শাখা-প্রশাখা এবং আধিপত্যবাদী প্রভাবকে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে।</p>
<p>&nbsp;ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে আমি যে উদাহরণটি দিয়েছি তা আমার বক্তব্যকে ভালোভাবে তুলে ধরে এবং গত দুই শতাব্দী ধরে আমাদের জীবনকে পরিচালিত করে আসা &#8211; আমাদের মনে রাখতে হবে &#8211; সেই ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত অসুবিধাগুলো সামনে আসে &#8211; যা আমাদের পরিবেশগত, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>আধুনিক প্রকল্পের ব্যর্থতা এতটাই যে, তারা বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষকে &#8211; মুসলিম এবং অমুসলিম উভয়কেই &#8211; বিরতি দিচ্ছে, ভাবতে বাধ্য করছে যে আসন্ন বিপর্যয়ের ছায়ায় বসবাসকারী তাদের জীবন পুনর্বিবেচনা করার জন্য তারা তাদের পুরানো ঐতিহ্য থেকে কী শিক্ষা নিতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em><strong>DP:</strong></em> <em>&nbsp;আচ্ছা মানবাধিকার কি সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন ধারণা, সে সম্পর্কে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে হয়। আপনি কি মনে করেন যে জাতিসংঘের মতো মানবাধিকার একটি পশ্চিমা ধারণা? এটি কি নৈতিকভাবে সঠিক যে পৃথিবীর সমস্ত সমাজ এই অধিকারগুলোকে সম্মান করবে, নাকি আমাদের মেনে নিতে হবে যে অন্যান্য সংস্কৃতিগুলি তাদের নিজস্ব, কখনও কখনও অতুলনীয়, মূল্যবোধ ব্যবস্থার উপর জোর দিতে পারে?</em></p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong></em> আমি মনে করি না যে ক্ষমতা ব্যবস্থার একটি অংশ বা একটি দিক বুঝা সম্ভব, যদি না বুঝতে পারি যে সেই দিক বা অংশটি কীভাবে বৃহত্তর সমগ্রের দ্বারা গঠিত, সংযুক্ত, প্রভাবিত, অথবা কাঠামোগত এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে আচ্ছন্ন। আজকের তথাকথিত সার্বজনীন মানবাধিকার আর যাই হোক সার্বজনীন নয়, কারণ এগুলো বেশিরভাগই আধিপত্যকারী পশ্চিমা শক্তিগুলোর অভিজ্ঞতার ফসল। আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকার এবং আরও অনেক কিছু ক্ষমতাবানদের দ্বারা গঠিত হয়, আর বাকিগুলি সে লাইন ধরে চলে।</p>
<p>প্রতিটি সমাজ বা সংস্কৃতিকে যদি তার নিজস্ব ধারায় ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা তৈরি হবে, এবং এর সাথে সাথে, প্রতিটি সমাজকে আবার যদি তার নিজস্ব শর্তে বিকাশ হতে দেওয়া হয়, তাহলে মানবাধিকারের নিজস্ব ধারণা তৈরি হবে।</p>
<p><strong>সমস্যা দেখা দেয় যখন একটি সমাজ বা সংস্কৃতির &#8220;বাস্তুতন্ত্র&#8221; (ecology) ধ্বংস হয়ে যায়, যেমনটি ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে ইসলামের ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদী ইউরোপের হাতে ঘটেছিল। ১৯শ শতাব্দী শেষ হয়ে যাওয়ার পর, পূর্বের ব্যবস্থার কোনও কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। শরিয়াকে কার্যত ধ্বংস করা হয়েছিল, একইভাবে সুফিবাদ এবং আরও অনেক কিছুকেও; এবং যে কয়েকটি ক্ষেত্র বেঁচে গিয়েছিল (যেমন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন), সেখানে মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সান্ত্বনায় (lip service) রূপান্তরিত করা হয়েছিল।</strong></p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো, মুসলিমরা কীভাবে মানবাধিকারের (এবং আরও অনেক কিছুর) ক্ষেত্রে শরীয়ার প্রকৃত চেতনা পুনরুদ্ধার করবে এবং এমন ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করবে যা এখন কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি মাত্র।&nbsp;</p>
<p>অতএব, প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে আমাদের অন্যান্য সংস্কৃতির মানবাধিকার ধারণা গ্রহণ করা উচিত কিনা। সত্যিকার অর্থে উদ্বেগজনক প্রশ্ন হল, এই সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট অধিকারগুলি কী কী যা পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে? আমরা কীভাবে এগুলি পুনরুদ্ধার করব, যা এমন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠেছে যা আজ আর চলনসই নয়?</p>
<p>নিঃসন্দেহে, অতীতের এই ধরণের ব্যবস্থাগুলি বিরাট সাফল্য অর্জন করেছিল, কিন্তু তাদের চেতনা কিংবা আমাদেরকে আজকের মানুষের অবস্থার উন্নতিতে সাহায্য করবে এমন চেতনা পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা কোন ধরণের অনুসন্ধানমূলক পদ্ধতি (heuristic methodology) ব্যবহার করব?</p>
<p>আমাদের বর্তমান অত্যন্ত সমস্যা জর্জরিত, সারা বিশ্ব জুড়ে এত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, এবং ভবিষ্যৎ আমাদের অজানা। আমাদের যা করার আছে, তা হলো আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে যা কিছু ভালো এবং খারাপ হয়েছে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া। ইতিহাস কেবল ঘটনার একটি ধারাবাহিকতা নয়,&nbsp; কিংবা একটি অগ্রসরমান একরৈখিকতা নয় যা মৃত মানুষ এবং ঘটনাগুলিকে পিছনে ফেলে যায়। ইতিহাসও একটি নীতিগত সময়, আর নীতিগত সময় চিরন্তন।&nbsp;</p>
<p><em><strong>DP:</strong></em> প্রফেসর হাল্লাক, সাক্ষাতকারটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।</p>
<p><em><strong>ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:</strong></em> আপনাকে স্বাগতম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ&nbsp;</strong>মোনায়েম খান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/wael-hallaq-on-islamic-sharia-and-human-rights/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16707</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের যাত্রা, কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/special-interview-on-the-journey-activities-and-future-plans-of-the-institute-of-islamic-thought-and-research/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/special-interview-on-the-journey-activities-and-future-plans-of-the-institute-of-islamic-thought-and-research/#comments</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 23 Jan 2026 16:17:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাক্ষাৎকার]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16472</guid>

					<description><![CDATA[(ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাসান আল ফিরদাউস; জ্ঞানের আন্দোলন হিসেবে ইন্সটিটিউটের যাত্রা, এর কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন জনাব সা’দ মুসান্না।)   সা’দ মুসান্না: ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী? আপনারা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>(ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাসান আল ফিরদাউস; জ্ঞানের আন্দোলন হিসেবে ইন্সটিটিউটের যাত্রা, এর কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন জনাব সা’দ মুসান্না।)</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী</strong><strong>? </strong><strong>আপনারা কী চাচ্ছেন</strong><strong>? </strong><strong>নতুন শিক্ষা আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>এক্ষেত্রে মূল ভিশন কী</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> প্রথম বিষয় হচ্ছে, ব্রিটিশদের শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলেছে প্রায় ১৯০ বছরের অধিক সময়কাল ধরে। এ শোষণ-সাম্রাজ্যবাদ পরবর্তী আমাদের বাংলাদেশ। আমরা যদি ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকের কিছু বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করি; যেমন আসাম রাজ্য বা পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কিছুটা উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, প্রস্তাবনা এসেছে।</p>
<p>এরপর ১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, এর আলোচনায় শুধু বাংলা নয়, দক্ষিণ ভারত থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে অনেক কথাবার্তা হয়েছে; হয়েছে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম। কিন্তু এখানে সকল আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে কম আলোচিত বা গুরুত্ব না পাওয়া বিষয় হলো <strong>সিলেবাস</strong> নিয়ে আলোচনা।</p>
<p>আলোচনা হয়েছে এখানকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, পূর্ববঙ্গের অবস্থা, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব কিংবা অসাম্প্রদায়িকতার বয়ান বা নিজেদের মতো করে আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, তার নিজস্ব সিলেবাস কাঠামো, নিজস্ব মেথড, নিজস্ব চিন্তা। এটা নিয়ে বড় ধরনের কোনো আলাপ আমরা লক্ষ্য করি না।</p>
<p>এর মানে হলো, আমাদের এই সিলেবাসটি মূলত ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রদত্ত একটি সিলেবাস কাঠামো। এর মাধ্যমে আমাদের জাতির চাওয়া-পাওয়া পূরণ কিংবা মুক্তি সম্ভব নয়, এটা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। সুতরাং, আমাদের <strong>নিজস্ব মেথড</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব চিন্তাধারা</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব সিলেবাস প্রয়োজন</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>যেকোনো জাতি তার শিকড়ের সন্ধান পায় অতীত থেকে। অর্থাৎ অতীতে গিয়েই একটি জাতি তার ভবিষ্যৎকে দেখতে শুরু করে। কাজ ও সমাজ গঠনের যে বয়ান</strong><strong>, </strong><strong>সেদিকে তাকালে দেখা যায় এগুলো আসে শিক্ষা ও চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকে। এবং বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যে জ্ঞানের স্রোত সমাজে প্রবাহিত হয়</strong><strong>, </strong><strong>তা-ই মূলত জাতির কাজে</strong><strong>, </strong><strong>ব্যক্তিত্ব গঠনে</strong><strong>, </strong><strong>প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে</strong><strong>।</strong></p>
<p>কিন্তু আমাদের দেশে এই জ্ঞানের ধারাটি দাঁড়িয়ে আছে উপনিবেশ কর্তৃক সৃষ্ট মূলনীতির উপর ভিত্তি করে। উপনিবেশ কর্তৃক সৃষ্ট ইতিহাসের বয়ানের উপর ভিত্তি করেই সবকিছু সাজানো হয়েছে। এগুলো আমাদের ভাঙতে হবে। এটা ভাঙতে না পারলে আমরা প্রশ্নাতীতভাবে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের মধ্যেই নিপতিত হয়ে থাকব।</p>
<p>এটিকে ভাঙতে হলে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস লাগবে, নিজস্ব মেথডলজি দাঁড় করাতে হবে। আর সেটা দেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি সব কিছুর মেথডলজি তৈরি করবে, ভবিষ্যতের প্রস্তাবনা দেবে।</p>
<p><em>এটা হওয়ার জন্য যেমন ব্যক্তিত্বের জাগরণ দরকার</em><em>, </em><em>তেমনি এসবের মধ্য দিয়েই জাতির বিবেক স্পন্দন হিসেবে প্রস্ফুটিত হবে। অর্থাৎ একটি সভ্যতার ভিত্তি</em><em>, </em><em>একটি রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি শুরু হবে শিক্ষাঙ্গন থেকে</em><em>।</em></p>
<p>আজকের দিন পর্যন্ত যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকাই, দেখা যাবে সেগুলো রাজনীতির আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং সেই এপ্রোচেই পরিচালিত হচ্ছে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পর্যন্ত রাজনীতির আতূড়ঘর হিসেবেই আছে। কিন্তু একই সাথে প্রশ্ন হলো, এই যে ব্যক্তিত্বের জাগরণ, ভবিষ্যৎ দেখানোর মতো মেথড, ইশতেহার, চিন্তা এখান থেকে উঠে আসছে কি না? কিংবা এই চিন্তা থেকে সেরকম ব্যক্তি তৈরি হচ্ছে কি না? সেই ব্যক্তিরা কি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছে? তারা কি রাষ্ট্র ও সমাজে অবদান রাখছে? এটাই মূলত আউটপুট।</p>
<p>তাই এভাবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন, সেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ এই জায়গায় আপাতদৃষ্টিতে আমরা কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করি না। কেন? আমাদের একাডেমিয়া আজ যেহেতু এ সকল নিয়ন্ত্রণাধীন, সুতরাং প্রত্যেকটি বিষয়েই সেই উপনিবেশিক কাঠামোর ছাপ রয়ে গেছে।</p>
<p>যেমন, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা, কোনোটার সঠিক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ ৪৭-এ মানুষ নেমেছিল অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য। বেকারত্ব, প্রযুক্তির ঘাটতি, কৃষির পর্যাপ্ত উৎপাদনের অসুবিধা এসব কারণে মানুষ দুর্ভোগে ছিল। অনাহার ও খাদ্য সংকট ছিল ব্যাপক। এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না।</p>
<p>৪৭-এর পরে মুসলিম লীগ এলেও, জমিদার প্রথা উঠলেও, তারা অর্থনৈতিক পরিবর্তন, কৃষি, বেকারত্ব, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কোনো ক্ষেত্রেই সঠিক সমাধান দিতে পারেনি। চেষ্টা করলেও তা হয়নি। এক পর্যায়ে তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। পরবর্তীতে অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী উঠে এসেছে।</p>
<p>এরপর ৭১ হলো। আমরা যদি দেখি, একই কারণে ৭১ সংঘটিত হয়েছে। সেই অর্থনৈতিক দুর্দশা, শিল্প প্রযুক্তির অভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতা, সামাজিক নিরাপত্তার সংকট সব মিলিয়ে একই ধরনের ক্রাইসিসের মধ্য দিয়েই ৭১ ঘটেছে। সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার না পেয়ে বারবারই কখনো অস্ত্র ধরেছে, কখনো আন্দোলনে নেমেছে।</p>
<p>আমরা যদি আজকের দিন পর্যন্ত দেখি, গত ষাট বছরে এত গণঅভ্যুত্থান হয়েছে শুধু ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার কারণে। অর্থাৎ <em>প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রকে গঠন করা</em><em>, </em><em>প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো</em><em>, </em><em>সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে জাতির অধিকার নিশ্চিত করা</em><em>।</em></p>
<blockquote><p><em>আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বই ছিল জাতিকে গড়ার প্রস্তাবনা প্রদান করা। পাশাপাশি জাতি গঠনের শিক্ষা</em><em>, </em><em>মানুষ গড়ার গুরুত্ব</em><em>, </em><em>জাতিকে ভবিষ্যৎ দেখানোর কাজটা ছিল আমাদের একাডেমিয়ার তথা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনগুলোর। কিন্তু আশানুরূপ হয়নি</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>এরপর গিয়ে আমরা সবাই দোষারোপ করছি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বা রাজনীতিকে। কিন্তু রাজনীতিও একমাত্র মুক্তির উপায় নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার বা প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের একটি দায় রয়ে গেছে যেটা সবসময় আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।</p>
<p><strong>আমাদের ইনস্টিটিউট সেই জায়গা থেকে শিক্ষা আন্দোলনের দায়িত্ব জাতিকে উপলব্ধি করাতে চায়</strong><strong>, </strong><strong>বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনগুলোর সত্যিকারের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করতে চায়</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>এবং এটা কিভাবে করবে</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>শিক্ষা আন্দোলনকে নিজস্বতা দিয়ে</strong><strong>; </strong><strong>তথা নিজস্ব ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব ইতিহাসচর্চা</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব মেথডলজির মাধ্যমে</strong><strong>; </strong><strong>এভাবে আমরা এমন এক ভবিষ্যতের ইশতেহার বা প্রস্তাবনা তৈরি করতে চাই</strong><strong>, </strong><strong>যেখান থেকে জাতির বিবেক এবং স্পন্দন জাগ্রত হতে পারে</strong><strong>।</strong></p>
<p>এটাই মূলত ইনস্টিটিউট প্রাসঙ্গিক করতে চায়। আর এজন্য ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সম্পূরক প্রশ্নের সাথে কিছু বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে—</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার পতন পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থান, তাদের পরিচালিত একটি বিশ্বব্যাপী কাঠামো, এরাই দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।</p>
<p>এই সময়ে সবাই অজানা অবস্থায় নিপতিত। কারণ, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যদি দেখি, সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যা কল্পনাতীত। দ্বিতীয়ত, মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, আত্মিক প্রশান্তি, রূহানী খোরাক এসব ক্ষেত্রে দুনিয়া এক ভয়াবহ শূন্যতার মধ্যে আছে। সত্যিই সারা পৃথিবী এখন অসুখী।</p>
<p>আপনি যদি প্রতিটি সেক্টরে লক্ষ্য করেন, দেখবেন সময়কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে আলেমগণ, চিন্তাবিদগণ, দার্শনিকগণ পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ এসময়কাল কে অস্বাভাবিক সময় বা ‘পোস্ট-নরমাল’ নামে অহিবিত করছেন, যেটা আমরা ইশতেহারে বলেছি; কেউ একে ‘হাকিকত-পরবর্তী সময়’ বলে অভিহিত করছেন; কেউ কেউ ইনসান পরবর্তী ‘পোস্ট হিউম্যান’ যুগ বলে উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ এমন এক সময় এসেছে যা আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করছে, হাকিকত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা তা বুঝতেও পারছি না। এতটাই অসহায়তার মধ্যে দিয়ে পৃথিবী হাঁটছে।</p>
<p>ডিজিটালাইজেশন এবং সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল রূপ, জ্ঞানার্জনের নতুন পদ্ধতিতে নানা রকম বিশৃঙ্খলা সবকিছু আমাদেরকে এক প্রকার হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করেছে। এর ফলশ্রুতিতে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যে তরুণ শ্রেণি, যাদের সবচেয়ে বেশি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি হতাশাগ্রস্ত।</p>
<p>তবে আমরা যদি পূর্বের সময়ের দিকে তাকাই, অথবা বাংলার আগের সময়কাল যেটি ছিল; তখন আমরা এক বিশাল সিভিলাইজেশনাল প্রজেক্ট এর মধ্যে দিয়ে সুবিশাল সভ্যতা দাঁড় করিয়েছিলাম, যেখানে ন্যায়ভিত্তিক আদালত ছিল, অর্থনীতি ছিল সুবিন্যস্ত, সংকট থাকলেও মানুষ ভালো ছিল, মানুষ তার ভবিষ্যৎকে খুঁজে পেত। সেই সময় সাক্ষ্য দেয় যে ওই যে মেথড-ফিকহ নির্ভর সমাজ, উসুল ও মেথডলজি নির্ভর সমাজ, যেটা মুসলমানদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল, তা ছাড়া বর্তমান দুনিয়াকে নতুনভাবে দাঁড় করানো, মুক্তির পথ দেওয়া সম্ভব নয়।</p>
<p>অর্থাৎ একমাত্র সমাধান আমরা ঘুরেফিরে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও ইসলামী সভ্যতার পুনঃনির্মাণের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সমাধানের প্রসঙ্গে চিন্তা করলেও দেখা যায়, আমাদের ফিকহ, উসুল, মেথডলজি এই চর্চা আমাদের করতেই হবে। ইসলামী সভ্যতার ধারণাকে পুনরায় চিন্তা করতে হবে, ইতিহাসকে নতুনভাবে বুঝতে হবে, এবং আমাদের সভ্যতার জ্ঞান, মেথডলজি, চিন্তাধারা ও ইতিহাসচর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।</p>
<p>পূর্ববর্তী সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই সাথে ভবিষ্যৎকে দেখতে হবে। এর জন্য অবশ্যই একটি ইনস্টিটিউশনাল উদ্যোগ নিতে হবে, শিক্ষা ও আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম থেকে; যেখানে ব্যক্তিত্ব গঠন হবে, প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, জাতিকে সচেতন করা হবে, বিষয়গুলোকে প্রাসঙ্গিক করা হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে জাতীয় মান উন্নত হবে।</p>
<p>আসলে এটাই আমাদের ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: আপনারা কী চাচ্ছেন বা আপনাদের অবদানগুলো কী</strong><strong>, </strong><strong>অথবা কী করছেন</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> যেটা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, একটি প্রতিষ্ঠান আসলে কে গড়ে? গড়ে তার শিক্ষকরা, সিলেবাসের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা যদি দেখি, আমাদের দেশে শিক্ষক বলতে যা বোঝায়, আসল অর্থে তা কতজন আছে? শিক্ষক বলতে সত্যিকারার্থে শিক্ষক, চাকরিজীবী না। শিক্ষক বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তিকে, যিনি ব্যক্তিত্ব তৈরি করার জন্য, জাতির ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করেন।</p>
<p>এই যে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক, এটা যে নেই, এমন না। অবশ্যই আছে। যদি আমরা তাদের নিয়ে কাজ করতে পারি, বা কাজ করতে চাই, তাহলে আমার মনে হয়েছে যে, সত্যিই জাতির বর্তমান যুব সম্প্রদায় একটা আশার আলো দেখতে পাবে।</p>
<p>শিক্ষক ছাড়া কখনোই কেউ উপমা খুঁজে পায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় না। এটাই যুগে যুগে হয়ে এসেছে। আপনারা যাদের বড় মনে করেন, তারা কারও না কারও ছায়ায় বেড়ে উঠেছে, এটা অনস্বীকার্য।</p>
<p>এই অবস্থান থেকে আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক, যারা রয়েছেন, দেশীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের যেসব শিক্ষক আছেন, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার। শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার, দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য কাজ করছি।</p>
<p>আমার মর্যাদা নির্ভর করে মাতৃভূমির বা দেশের জন্য আমি কী অবদান রাখলাম, সেই প্রশ্নের উত্তরে।</p>
<p>প্রজন্ম তৈরির জন্য চেষ্টা করতে হবে অর্থাৎ একটি স্থায়ী মুক্তির দিকে ধাবিত হতে হলে নিজেদেরকে অবশ্যই জাতির রূহ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং এরপর জাতির বিবেক এবং স্পন্দনে পরিণত হতে হবে। এটা ছাড়া জাতির অবস্থা আমরা বুঝব না, বা ভবিষ্যৎকে দেখাতে পারব না।</p>
<p>এর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে আসবে ভাষা-<strong>বাংলা ভাষা</strong><strong>, </strong><strong>যেটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। এই ভাষাকে জাগ্রত করা</strong><strong>, </strong><strong>নতুন পরিভাষা সৃষ্টি করা</strong><strong>, </strong><strong>এটা অপরিহার্য। কারণ আমরা সবসময় দেখেছি</strong><strong>, </strong><strong>যে কোনো গণঅভ্যুত্থান</strong><strong>, </strong><strong>বিপ্লব</strong><strong>, </strong><strong>রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে যেমন পরিভাষা প্রয়োজন</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি অন্যান্য সবক্ষেত্রেও নতুন পরিভাষার প্রয়োজন হয়</strong><strong>।</strong></p>
<p>পরিভাষাগুলোর জন্ম দেয় কারা? এই পরিভাষাগুলো কোনো ব্যক্তিত্ব নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই তৈরী করে। এটাই যুগে যুগে হয়ে আসছে। এজন্য আমরা ভাষার বিনির্মাণ এবং বাংলা ভাষাকে জাগ্রত না করতে পারলে আসলে কোনো কিছুই হবে না।</p>
<p>সেই কারণে আমরা নিরপেক্ষ জায়গা থেকে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে, ভবিষ্যতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি—সব কিছুকে একটি প্রস্তাবনা বা ভবিষ্যতের রূপরেখা হিসেবে দেখানোর মতো একটি মেথডলজি হাজির করতে চাই। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।</p>
<p><strong>সেই জায়গা থেকে আমাদের যেসব শিক্ষক বা বড় বড় আলেম আছেন</strong><strong>, </strong><strong>তাদের মধ্যে অন্যতম সম্মানিত ওস্তাদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ</strong><strong>; </strong><strong>যার দীর্ঘ দারস</strong><strong>, </strong><strong>চিন্তা ও মেথড দিয়ে আমরা উপকৃত হয়েছি। ফিলিস্তিনের প্রফেসর ড. আবদুল ফাত্তাহ আল ওয়াইসি</strong><strong>; </strong><strong>তার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির দিশা শেখার সুযোগ পেয়েছি</strong><strong>।</strong></p>
<p>আমরা পেয়েছি প্রফেসর ড. ওয়াসফি আশুর, প্রফেসর ড. জাসের আওদা, প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইজ্জেত, যারা মিশরের শ্রেষ্ঠ আলেমদের অন্যতম। তাদের কাছ থেকে আমরা দারস গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি।</p>
<p>আমরা বিখ্যাত সভ্যতাবিশারদ, দার্শনিক প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন উস্তাজকে পেয়েছি। একই সাথে মরক্কোর গাজ্জালি খ্যাত ত্বহা আবদুর রহমান-এর চিন্তা বোঝার জন্য সম্মানিত শিক্ষকের দারস পেয়েছি। আমরা মুক্তি ও সংগ্রামের অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. সামি আল আরিয়ান-কে পেয়েছি।</p>
<p>আমরা পেয়েছি বাস্তবিক বা জীবন্ত কিংবদন্তি হাজী ইব্রাহীম মুরাদ-কে। আমরা পেয়েছি প্রখ্যাত আখলাকবিদ, শহরতত্ত্ব বিশারদ প্রফেসর ড. ইউসুফ ইয়ালানিজকে। একই সাথে পেয়েছি আধুনিক অর্থনীতি এবং ইসলামের প্রাসঙ্গিকতার অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. আসাদ জামান-কে।</p>
<p>আমরা পেয়েছি জর্ডানের ওস্তাদ ড. ইউসুফ আল কুরাইশি, লেবাননের ওস্তাদ প্রফেসর ড ওয়ানিস আল মাবরুককে। এভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বড় বড় শিক্ষকের দারস গ্রহণ করার পাশাপাশি দেশীয় অঙ্গনের যেসব শিক্ষক আমাদের মুগ্ধ করেছেন, সত্যিকারার্থে গড়ে তোলার ভূমিকা রেখেছেন, তাদের আমরা পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের ওস্তাদ বুরহান উদ্দিন আজাদ-এর কথা অবশ্যই বলতে হয়। একই সাথে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় থাকা শিক্ষকগণ আমাদের প্রতিনিয়ত দারস দিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের ক্লাস নিয়েছেন।</p>
<p>আমরা চেষ্টা করেছি এই মডেল ও উপমাগুলো হাজির করতে এবং তাদের সঙ্গে শেখার একটি সুযোগ তৈরি করতে। যা আমাদের ছাত্রদেরকে জাতির রূহ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে অবশ্যই ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: আপনাদের অবদানের জায়গা কী কী বা কী কী কাজ হয়</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> এর উত্তরে বলা যায়, <strong>আমাদের যে একাডেমিক কাজ</strong><strong>, </strong><strong>তা আমাদের একাডেমি বিভাগ সম্পন্ন করে। শিক্ষকদের যেসব কথা বলা হলো</strong><strong>, </strong><strong>সেগুলো মূলত একাডেমি বিভাগের অবদান। আমরা এ পর্যন্ত এক বছর মেয়াদী কোর্সের তিনটি ব্যাচ সম্পন্ন করেছি। একটি সমাবর্তন হয়েছে</strong><strong>, </strong><strong>সামনে আরেকটি সমাবর্তন হবে। এছাড়া </strong><strong> </strong><strong>আমরা দুই বছর মেয়াদি কোর্স পরিচালনা করছি</strong><strong>, </strong><strong>যেখানে উলুমুল কোরআন</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামী চিন্তায় হাদিস মেথডলজি</strong><strong>, </strong><strong>ইলমুল কালাম</strong><strong>, </strong><strong>উসুল ও মাকাসিদ</strong><strong>, </strong><strong>বালাগাত মান্তিক</strong><strong>, </strong><strong>উসুল ও ফিকহ</strong><strong>, </strong><strong>শরিয়া</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামিক অর্থনীতি</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামী দর্শন থেকে শুরু করে লজিক ও ক্রিটিকাল থিংকিং</strong><strong>, </strong><strong>অ্যানালিটিক্যাল থিংকিং</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামিক জ্ঞানের উসুল ও মেথডলজি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত দুটি ব্যাচ সম্পন্ন হয়েছে এবং একটি সমাপ্তির পথে রয়েছে</strong><strong>।</strong></p>
<p>আমরা এই কোর্সগুলোর মাধ্যমে উপরোক্ত বিষয়ের অনেকগুলোর বেসিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে বিশ্বসভ্যতা ও ইসলাম, গণিত, উসুলে সিরাত, ইসলামিক চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (D-8), আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব, তাসাউফ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইভিত্তিক পাঠচক্র পরিচালনা করা হয়। এই ক্লাসগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোর্স সমাপ্ত করছে।</p>
<p>সেই সঙ্গে তারা বাস্তব কাজেও সম্পৃক্ত হচ্ছে। কেউ অনুবাদক হিসেবে অবদান রাখছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গাতে গবেষণামূলক কাজে যুক্ত রয়েছে। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য বা অনুবাদ কাজে অবদান রাখার ক্ষেত্রে আমরা অনেক শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে দেখতে পাচ্ছি। এ পর্যন্ত আমাদের যেসব শিক্ষার্থী কোর্স সমাপ্ত করেছে বা সমাপ্তির পথে রয়েছে তাদের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এই দুই হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তত আমরা একটি বড় ধরনের চিন্তার সাথে, পদ্ধতিগত জ্ঞানের সাথে, সরাসরি শিক্ষকদের সংস্পর্শে আনতে পেরেছি।</p>
<p>আমি মনে করি, আমাদের জন্য এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য এটি একটি নতুন সংযোজন। কারণ, আমাদের ক্লাসগুলো অধিকাংশ নতুন সংযোজন হিসেবে বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।</p>
<p>একই সঙ্গে আমাদের গবেষণা বিভাগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অবদান রয়েছে। এখানে <strong>ষাটটির অধিক প্রকাশনা</strong> ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এবং আমাদের প্রকাশনাগুলো মানহীন বা গবেষণা বহির্ভূত নয়, এরকম কোনো লেখা আমরা প্রকাশ করি না। সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই আমরা বই প্রকাশের চেষ্টা করি।</p>
<p>এই সবকিছুই আমাদের নিজস্ব সংযোজন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে কাজ থাকলেও আমরা নতুন করে এগুলোকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ আমরা অগ্রগামী হতে পেরেছি।</p>
<p>আমাদের একই সঙ্গে <strong>রোয়াক ব্লগ</strong> রয়েছে এবং সেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রবন্ধ রয়েছে, যেগুলো অনুবাদ, মৌলিক লেখনি, সংকলিত লেখা ইত্যাদির অন্তর্ভুক্ত। আমি মনে করি, এগুলো বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় এনসাইক্লোপিডিয়াতে পরিণত হবে এবং হতে যাচ্ছে। যার প্রমাণ রোয়াক ব্লগ দেখলেই বোঝা যাবে।</p>
<p>অনুবাদের ক্ষেত্রে, এই রোয়াক ব্লগ, প্রকাশনা, পত্রিকা সবকিছুর ক্ষেত্রেই অবদান রেখে যাচ্ছে আমাদের অনুবাদ বিভাগ, যেটি গবেষণা বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয়। গবেষণা বিভাগের অন্যতম একটি বিভাগ হলো <strong>ত্রৈমাসিক মিহওয়ার</strong><strong>।</strong> এখন পর্যন্ত আমরা মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশ করেছি। এটি খুবই মৌলিক এবং বড় বড় শিক্ষকদের লেখনি, চিন্তা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। যা যুবসমাজের মাঝে একটি বড় ধরনের আশার সঞ্চার করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্ধশতাধিক পাঠচক্র পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ, এই পত্রিকা ইতোমধ্যে একটি চিন্তাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>আমরা এই সব বিষয়ের পাশাপাশি আমাদের <strong>আন্তর্জাতিক বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>ছাত্র বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>ছাত্রী বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>মাদরাসা বিভাগ</strong> সবক্ষেত্রে চিন্তাগুলোকে চর্চার জন্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমাদের পাঠচক্রগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।</p>
<p>দারস বাড়ি পাঠচক্রের ব্যানারে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিমাসে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, এই পাঠচক্রগুলো একদিন একটি বড় ধরনের জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।</p>
<p>বাংলাদেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গঠন, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে সংকট আমরা লক্ষ্য করেছি, এই পাঠচক্রগুলো থেকে এবং আমাদের কোর্সগুলো থেকে যে মানুষগুলো গড়ে উঠছে, যারা নিয়মিত চিন্তাচর্চা করছে, দেশ ও জাতি নিয়ে ভাবছে, তারা অবশ্যই অবদান রাখবে।</p>
<p>এই যে অবদান রাখার মতো একটি প্রজন্ম আমরা দাঁড় করাতে পেরেছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান এবং সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন নিয়ে আপনাদের চিন্তা ও পরিকল্পনা কী</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> আসলে এক্ষেত্রে যেটা বলতে হয়, তা হলো পরিকল্পনা আছে বলেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলছি। আমাদের ইনস্টিটিউটের আওতাধীন এতগুলো বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। এখান থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক যে চিন্তাটা করছি, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এসব চিন্তা ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেন আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়, আঞ্চলিক ব্রাঞ্চগুলো যেন শক্তিশালী অবস্থানে আসে। <strong>এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠুক যেখানে আপামর সাধারণ জনগণ নিজেদের রূহের খোরাক খুঁজে পাবে</strong><strong>, </strong><strong>ছাত্ররা তাদের শিক্ষার খোরাক খুঁজে পাবে</strong><strong>, </strong><strong>চিন্তাশীল যুব সম্প্রদায় তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে। পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তারা সেই ভবিষ্যৎ ও অতীত উভয়কেই চর্চা করতে পারবে</strong><strong>, </strong><strong>বর্তমানকে বিশ্লেষণ করতে পারবে</strong><strong>।</strong></p>
<p>এটি একটি জাতিকে দাঁড় করানোর জন্য সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আমি মনে করি, এটি যদি না দাঁড়ায়, একটি জাতি কখনোই দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান বড় ধরনের একটি মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু একটি গণঅভ্যুত্থান দিয়ে আমি আমার জাতিকে গঠন করে ফেলতে পারবো না। একটি জাতির দুই শত বছরে আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি, শিক্ষা কাঠামোর নিজস্ব যে রূপায়ন, সেটি হয়নি। আমরা যদি একটি গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল সত্যিই তুলে ধরতে চাই, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের এ কাজগুলো করতে হবে। আর এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন।</p>
<p>এই বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের জন্যই আমরা আমাদের ইনস্টিটিউটের ব্রাঞ্চগুলো, বিভাগগুলো, সকল স্তরেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। এবং এই যে ব্যক্তিরা তৈরি হবে, এক একজন ব্যক্তিই তো এক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান, একটি জাতীয় স্বপ্নের প্রতীক। এজন্য তারা কিভাবে তৈরী হবে, প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি কিভাবে তৈরি করবে, কিভাবে ছাত্রদেরকে স্কলারশিপ দেবে, কিভাবে আন্তর্জাতিক স্কলারদের সাথে পরিচিত করবে, কিভাবে ক্লাসিক জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হবে, পরিভাষার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নতুন পরিভাষার সৃষ্টি করবে, কীভাবে ইলমি সিলসিলার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ইলমি সিলসিলার শুভ সূচনা করবে, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিজেদেরকে কীভাবে গড়ে তুলবে, এই প্রত্যেকটা বিষয় মূলত তারা এখান থেকে শিখছে এবং এই সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে। এটাই আমাদের অঙ্গনকে একটি বড় অবস্থানে নিয়ে যাবে। এজন্য এটাকে বলবেন আমাদের মূল পরিকল্পনা।</p>
<p>আর অন্যদের ক্ষেত্রে যদি দেখি, বিশেষ করে আমরা যাদের সবচেয়ে নিজস্ব ও কাছের মনে করি, যাদের ইলমি চর্চার বদৌলতে বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত ইলমি চর্চা যে শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষ করে দেওবন্দী ঘরানার যে মাদ্রাসাগুলো। এই সকল মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে যেন আমরা সুন্দরভাবে তাদের সাথে বসে একত্রে বিভিন্ন রিসার্চ উপহার দিতে পারি, তাদের থেকে আমরা উপকৃত হতে পারি, তাদের সাথে মিলে জাতির প্রস্তাবনা, ইসলামী জ্ঞান চর্চা, সমাজতত্ত্ব, জাতীয় সংহতির যে আলাপ, সেগুলো আমরা করতে পারি।</p>
<p>এই যে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর ক্ষেত্রে এবং একই সাথে মাদ্রাসা কাঠামোর ক্ষেত্রেও, এই পরিবেশটা যদি আমরা তৈরি করতে পারি, এখান থেকে অনেক ইন্সটিটিউশন, প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় মানের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে, যারা দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখানে যারা কাজ করছে আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যের আলোকে আমরা তাদের সাথে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করব, সহযোগিতা করার চেষ্টা করব, সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: সর্বশেষ প্রশ্ন-এ ক্ষেত্রে আসলে কোন বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বা বাঁধা হিসেবে দেখছেন</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> বাঁধা বলতে আমার কাছে এখানে যেটা মনে হয়েছে, তা হলো, ইতিপূর্বে যেটা বললাম, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মনে করি সব পরিবর্তন হয়ে যাবে, অর্থাৎ এই যে সাময়িক চিন্তা করা এবং একপেশে চিন্তা করা<strong>, </strong><strong>শুধুমাত্র রাজনীতি দিয়েই কিংবা শুধুমাত্র একটা বিষয় দিয়েই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যাবে</strong><strong>, </strong><strong>এই মনোভাবটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এটা কেন আমি একটা জাতির জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখি তার কারণ হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>অবশ্যই রাজনীতি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট</strong><strong>, </strong><strong>কিন্তু এটাকে যখন একমাত্র পয়েন্ট হিসেবে বা প্রধান পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়</strong><strong>, </strong><strong>তখন কিন্তু আমরা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ পাই না। যেমন</strong><strong>, </strong><strong>সামাজিক প্রতিষ্ঠান</strong><strong>, </strong><strong>শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান</strong><strong>, </strong><strong>সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এসব গড়ে তোলার প্রতি কারো কোনো আগ্রহ থাকে না</strong><strong>, </strong><strong>শক্তি খুঁজে পায় না</strong><strong>, </strong><strong>আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় না। আমার কাছে মনে হয়েছে</strong><strong>, </strong><strong>বাংলাদেশে এটা সবচেয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ</strong><strong>।</strong></p>
<p>কেউ সত্যি খুঁজে পাওয়া, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার যে উৎসমূল, সেটাই শুরুতেই নিঃশেষ করে দেওয়া হয়।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি আমি দেখছি তা হলো, এই দেশকে শক্তিশালী করবে, সভ্যতাকে শক্তিশালী করবে, একটা সিভিলাইজেশনাল প্রজেক্ট দাঁড় করাবে, এ ধরণের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা কি? আমি শক্তিশালী হয়ে রাষ্ট্রকে দখল করবো, দেশকে দখল করবো, এইটাই মূল চিন্তা। যখন আমি শক্তিশালী হয়ে দেশকে দখল করবো, তখন কিন্তু আমার সাথে যাদের চিন্তার মিল নেই আমি তাদের বিরোধিতা করবো। সেটা গুপ্তভাবে হোক কিংবা প্রকাশ্যভাবে হোক। এই গুপ্ত কিংবা প্রকাশ্য বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত দেশের ক্ষতি করছে, জাতির মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করছে। এটা শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠান নয়, সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য সমানভাবে চ্যালেঞ্জ।</p>
<p>এ কারণে আমরা মনে করি, নানাবিধ বাঁধা এ পর্যন্ত এসেছে। এরপর এসেছে তীর্যক মন্তব্য, মিথ্যাচার, নানাবিধ জুলুম, মনস্তাত্ত্বিকভাবে হোক, মন্তব্যের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্যান্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে হোক; এসব এসেছে কিছু অদূরদর্শী, অপরিণামদর্শী গ্রুপের দ্বারা, যারা মনে করে যে একমাত্র আমরাই শক্তিশালী হব, আমরাই রাষ্ট্রকে দখল করবো, আমরাই ইসলামের ঠিকাদার। আর ইসলাম নিয়ে কাজেরও আমরাই ঠিকাদার। এটা যে কোনো পন্থীর জন্যই জাতীয় দিক থেকে দুঃখজনক।</p>
<p>আমরা চেষ্টা করেছি, কোনো ধরনের সংঘাতে না গিয়ে, কোনো ধরনের সংঘর্ষে না গিয়ে, শক্তিশালী দলিল, যুক্তি এবং আমাদের কাজের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে।</p>
<p>এরপরও একটা বিষয় রয়েছে, সেটা হলো, অনেকেই চেয়েছে আমাদের উপর রাজনৈতিক প্রলেপ দিয়ে দেওয়া কিংবা কোনো কোনো গুপ্ত সংগঠনের সাথে মিলিয়ে ফেলা। এক্ষত্রে আমি বলবো, ইসলামের কোনো কিছুই গোপন নয়; ইসলাম সব কিছু প্রকাশ্যে রেখেছে। আমরা এই গুপ্ত নীতির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি। এবং এই বিরোধিতার কারণেই আমরা পূর্বে যে জুলুমের কথা বললাম, তার শিকার হয়েছি। একইভাবে জাতির যে সাংস্কৃতিক বিভাজন, জাতির যে আস্থা, সেটা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই নষ্ট হয় এই গুপ্ততার কারণে।</p>
<p>এটা যখন নষ্ট হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মতো যারা নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে জাতি গঠনের কাজ করতে চায়, তাদেরকেও মানুষ এই গুপ্তদের সাথে মিলিয়ে ফেলে। এটা শুধু আমাদের ক্ষেত্রে নয়, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল এটার ভুক্তভোগী। প্রত্যেকটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও এটার ভুক্তভোগী। মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে, কার উপর আস্থা রাখবে, এটা খুঁজে পাচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য বড় ধরনের বাঁধা।</p>
<p>এজন্য আমরা এই ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা জাতির মান উন্নয়নের জন্য, নিজেদেরকে জাতির রুহ হিসেবে গঠন করার জন্য, জাতির ব্যক্তি সমাজকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে চেষ্টা চালাচ্ছি। এই চিন্তাটাকে প্রাসঙ্গিক করার জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোনো নিয়ন্ত্রণাধীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে এসব করা সম্ভব নয়; বরং উল্টো, এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান দিয়েই রাজনীতিকে গঠন করা সম্ভব, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া সম্ভব, সাংস্কৃতিক ইশতেহার দেওয়া সম্ভব।</p>
<p>সুতরাং এই ধরনের প্রতিষ্ঠান কখনো কোনো দলের আওতাধীন হয়ে, কারো সহযোগিতা নিয়ে চলতে পারে না। এই ধারণা যদি কেউ করে থাকে বা এই ধরনের ভুল প্রত্যাশা যদি কারো থাকে যে আমরা তাদের সাথে যুক্ত হব, আমরা সেটা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি ইতিপূর্বে, এবং করে যাবো।</p>
<blockquote><p>দ্বিতীয়ত, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই, শিক্ষা আন্দোলন হিসেবেই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই শিক্ষা আন্দোলনকে কোনোভাবেই বিতর্কিত করা, মিথ্যাচার করা, বিভিন্ন জুলুমের সম্মুখীন করা যাবে না। আমরা কারো বিরোধী নই, আমরা কারো বিকল্প নই। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে এতটুকু স্পষ্ট যে আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তায় সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ডকট্রিনের আলোকে আমাদের লক্ষ্যপানে পরিচালিত হচ্ছি।</p></blockquote>
<p>সুতরাং এটার মাধ্যমে সকলের উপকৃত হওয়ার একটি সিলসিলা তৈরি হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আমরা দৃঢ় থাকবো এবং যত বাধাই আসুক, চ্যালেঞ্জ আসুক, আমরা তা মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাবো।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/special-interview-on-the-journey-activities-and-future-plans-of-the-institute-of-islamic-thought-and-research/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>1</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16472</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী দর্শন সম্বন্ধে আন্তরিক হওয়ার গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/importance-of-being-sincere-about-islamic-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/importance-of-being-sincere-about-islamic-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. সাইয়েদ হোসাইন নাসর]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 08 Sep 2024 09:40:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাক্ষাৎকার]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14795</guid>

					<description><![CDATA[(সাইয়েদ হোসেইন নাসর এবং হামজা ইউসুফ, দুইজন অত্যন্ত বড়মাপের চিন্তাবিদ৷ তারা কয়েক দশক ধরে একে অপরকে চেনেন। এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে তাদের মধ্যে হওয়া আলাপচারিতার রেকর্ডের সম্পাদিত প্রতিলিপি।) &#160; তারা এই আলোচনায় ঐতিহ্যগত ইসলামী দর্শন এবং মেটাফিজিক্স নিয়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">(সাইয়েদ হোসেইন নাসর এবং হামজা ইউসুফ, দুইজন অত্যন্ত বড়মাপের চিন্তাবিদ৷ তারা কয়েক দশক ধরে একে অপরকে চেনেন। এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে তাদের মধ্যে হওয়া আলাপচারিতার রেকর্ডের সম্পাদিত প্রতিলিপি।)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তারা এই আলোচনায় ঐতিহ্যগত ইসলামী দর্শন এবং মেটাফিজিক্স নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর সাথে সম্পর্কহীন চিন্তকেরা কীভাবে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে ঝুকির মধ্যে ফেলেন, যার কিনা তার নিজস্ব মহিমায়ই আধুনিক সমাজে অবদান রাখতে সক্ষমতা রয়েছে।</p>
<p><strong>হামজা ইউসুফ:</strong> আমি সম্প্রতি একটি কনফারেন্সের উপস্থিত ছিলাম, যেখানকার লোকদের আমার সাথে দেখা হলে আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি যে তারা কী করে? তারা বলল তারা দার্শনিক। আমি মজা করে তাদের জিজ্ঞেস করলাম, সক্রেটিসের মত?</p>
<p>আজকের দুনিয়ায় লোকজন দার্শনিক শব্দটিকে বেশ চমকপ্রদ হিসেবে উচ্চারণ করে থাকে, কিন্তু আপনি তো সত্যিই একজন দার্শনিক— সেই বিরল লোকদের মধ্যে একজন যাকে মহান আল্লাহ আকল এবং সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ভূষিত করেছেন।</p>
<p>সমগ্র মানবতাকে জর্জরিত করে এমন চিরায়ত অস্তিত্বগত সমস্যাবলি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য আপনি প্রচুর সময় পেয়েছেন, সেই সাথে প্রতিটি নতুন যুগের সাথে আসা বিশাল সব সমস্যা নিয়েও ভাবার সুযোগ পেয়েছেন। আপনি সম্ভবত জাপানি দার্শনিক কেইজি নিশিতানির সাথে পরিচিত, তিনি বলেছেন যে নিহিলিজম (শূন্যবাদ) একটি চিরন্তন সমস্যা।</p>
<p><strong>সাইয়্যেদ হোসাইন নাসর:</strong> হ্যাঁ।</p>
<p><strong>হামজা ইউসুফ:</strong> নিহিলিজম কখনো হারিয়ে যায় না; বরং এটি ঘুরেফিরে বারবার হাজির হয় এবং মানুষকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু আপনি একজন বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানের একজন দার্শনিকও, তাই আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। শুরুতেই প্রশ্ন থাকছে, E. A. Burtt এর বই, The Metaphysical Foundations of Modern Science কতটা প্রাসঙ্গিক?</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> এটি বহু দশক আগে লেখা একটি ক্ল্যাসিক্যাল বই। খুব ভালো বই।</p>
<p><strong>হামজা ইউসুফ:</strong> তিনি ওই বইয়ে যে বিষয়ে কথা বলেছেন তার মধ্যে একটি হল যে প্রাক-আধুনিক মানুষ- বাহ্যিক জগতের সাথে অন্তরের যোগাযোগকে বাস্তব মনে করে।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> হ্যাঁ।</p>
<figure id="attachment_14796" aria-describedby="caption-attachment-14796" style="width: 623px" class="wp-caption aligncenter"><img fetchpriority="high" decoding="async" class="wp-image-14796 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/09/Pictu.jpg" alt="ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লিখিত আখলাক-ই নাসিরির একটি পৃষ্ঠা" width="623" height="527" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/09/Pictu.jpg 623w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/09/Pictu-300x254.jpg 300w" sizes="(max-width: 623px) 100vw, 623px" /><figcaption id="caption-attachment-14796" class="wp-caption-text">ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লিখিত আখলাক-ই নাসিরির একটি পৃষ্ঠা</figcaption></figure>
<p><strong>হামজা ইউসুফ:</strong> তাই ‘জ্ঞানতত্ত্ব’ তাদের জন্য সত্যিই কোন সমস্যা ছিল না। তারপরে তিনি সেখানে এই যুক্তি দেন যে, আধুনিক দর্শনের মূল উদ্বেগ হল জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology)। কারণ আজকের দার্শনিকদের এই পোস্ট-কান্টিয়ান (কান্ট পরবর্তী) দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যে বাস্তবতা (Reality) কেবল একটি বিশিষ্ট ঘটনামাত্র।</p>
<p>তিনি বলেছেন, “অন্তত জর্জ বার্কলে এবং লিবনিজের কাজ দিয়ে শুরু হওয়া আধুনিক মেটাফিজিক্সের ক্ষেত্রে এর জ্ঞানতাত্ত্বিক ফোকাস ছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সূত্র রয়েছে; মূলত প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে একটি অসফল প্রতিবাদের ধারাবাহিকতার মধ্যে সেটি নিহিত।&#8221;</p>
<p>তারপর তিনি বলেন, যে বিষয়টি আমাকে এখানে আগ্রহী করে তুলেছে তা হলো: বার্কলে, হিউম, কান্ট, ফিচটে, হেগেল, জেমস, বার্গসন—সবাই এক ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। সেটি হচ্ছে মহাজাগতিক পরিকল্পনার গুরুত্ববহ জায়গাটিতে মানুষকে তার উচ্চ আধ্যাত্মিক স্বত্ব সমেত পুনঃস্থাপন করার প্রচেষ্টা।</p>
<p>এই প্রচেষ্টাগুলির ক্রমাগত রদবদল এবং মানুষকে বোঝানোর ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক এবং ধারাবাহিক ব্যর্থতা এটাই প্রকাশ করে যে তারা যে দৃষ্টিভঙ্গিকে আক্রমণ করে যাচ্ছিল তা কতটা শক্তভাবে মানুষের মনোজগৎকে দখল করে ছিল এবং এখন সম্ভবত আগের যেকোন প্রজন্মের চেয়েও বেশি, আমরা এমন দার্শনিকদের খুঁজে পাই যারা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ হতে উদগ্রীব। নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এমন মনোভাব নিয়ে এই যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত এবং ময়দান ত্যাগ করতে প্রস্তুত।</p>
<p>আপনি সেই ব্যক্তিদের মধ্যে একজন যারা &#8220;ময়দান ত্যাগ&#8221; করতে অস্বীকার করেছেন। আমি সে সম্পর্কে আপনার কিছু চিন্তা শুনতে চাই।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হুসাইন নাসর:</strong> বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এই সমস্যাটি একটি দীর্ঘ সময় যাবত আলোচিত হয়েছে নিশ্চয়ই। এর কারণ হিসেবে আমি মনে করি, বার্কলে এবং হেগেলের মতো লোকেরা এবং আপনি যাদের কথা উল্লেখ করেছেন সেই ধরণের সমস্ত লোকেরা যারা পশ্চিমা দার্শনিক অর্থে আদর্শবাদী (আইডিয়ালিস্ট) ছিল এবং মেটাফিজিক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিল, তারা সম্পূর্ণরূপে সফল হয়নি কারন আসল মেটাফিজিক্স তাদের কাছে প্রকৃতপক্ষেই মওজুদ ছিল না।</p>
<p><strong>দর্শনের একটি শাখা হিসেবে মেটাফিজিক্স এবং বাস্তবতার সর্বোচ্চ বিজ্ঞান হিসেবে মেটাফিজিক্স, কোনভাবেই এ দুটি গুলিয়ে ফেলা যাবেনা। তারা বিষয়সমূহের প্রকৃতি নিয়ে একটা আংশিক বোঝাপড়া অর্জন করতে পেরেছিল। উদাহরণস্বরূপ, বার্কলের আইডিয়ালিজম প্রকৃতপক্ষেই রেস এক্সটেন্সা (বর্ধিত বিষয়) এবং রেস কগিটান্স (চিন্তাগত বিষয়)<sup>১</sup> এর মাঝে বিদ্যমান দুনিয়া সংক্রান্ত কার্তেসিয়ান দ্বিখন্ডনের একটিকে বাতিল করে দেয়ার উপরে প্রতিষ্ঠিত।</strong></p>
<p>বাস্তবতা কি আসলেই অন্তরে, নাকি বহির্জগতে? (ওহী ছাড়া মানুষ তার আভ্যন্তরীণ চিন্তার বাইরে বহির্জগতের বিষয় বুঝতে পারেনা, এটা যেহেতু পাশ্চাত্যের কাছে নেই- অনুবাদক) তাই তারা বহির্জগৎকে খারিজ করে দিলো। কিন্তু এই দ্বিখণ্ডন নিজেই একটা মিথ্যা। দেকার্তের সময় থেকেই আসলে পাশ্চাত্যের লোকজন কখনোই এই মিথ্যা দ্বিখন্ডনকে গভীরভাবে পরখ করেনি।</p>
<p>কিন্তু উনিশ শতক পরবর্তী সময়ে কিছু মেটাফিজিক্স বিশারদ, যেমন জার্মানির ফ্রানজ ভন বাদের এই দ্বিখন্ডনকে শক্তভাবে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। এবং আজ আমার বন্ধু ওলফগ্যাং স্মিথ, যিনি আপনার মতই ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা এবং খুব স্মরণীয় একজন ফিজিসিস্ট এবং ঐতিহ্যগত দার্শনিক। তিনি এই সংক্রান্ত মিথ্যা নিয়ে বিস্ময়কর কিছু লিখেছেন।</p>
<p>যেমন খুব ক্ষুদ্র ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করায় অত্যন্ত সফল বিষয় হচ্ছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স। কেন এর কোন দার্শনিক ভিত্তি নেই? কারণ এটা সেই মিথ্যা কার্তেসিয়ান দ্বিখন্ডনই আঁকড়ে ধরে থাকতে চাচ্ছিল, কিন্তু তা ঠিক মত কাজ করেনি।</p>
<p>সুতরাং আপনার-আমার মত ইসলামের মেটাফিজিকাল ঐতিহ্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি হিসাবে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে আঁকড়ে থাকা উচিত এবং এসব কৃত্রিম সমস্যার দ্বারা প্রতারিত হওয়া অনুচিত।</p>
<p>পশ্চিমা সমস্যা সমাধানের জন্য সেইসব সমস্যার আসল কারণ সংবলিত মিথ্যাকে ফাঁস করে দিতে হবে। এজন্যই আমি পাশ্চাত্য চিন্তার বিস্তৃত ইতিহাস লিখি না। আমার একটি বই, ‘রিলিজিয়ন অ্যান্ড দ্য অর্ডার অফ নেচারে’, আমি প্রকৃতি দর্শনের বিভিন্ন মিথ্যা ঘরানার সাথে মোকাবেলা করেছি। তবে সাধারণত আমি মূলে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছি, যে ভুলগুলো সপ্তদশ শতাব্দীতেই ঘটে গিয়েছিল।</p>
<p>এই কার্তেসিয় দ্বিখন্ডন সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ইবনে সিনা, সোহরাওয়ার্দী, মোল্লা সাদরা, ইমাম গাজালী এবং ইসলামের সমস্ত মহান আলেম, দার্শনিক এবং মুতাফাক্কিরগণ যা বলেছেন সে সব কিছুর বিরুদ্ধে।</p>
<p><strong>হামজা ইউসুফ:</strong> হ্যাঁ, পাশ্চাত্যের হাতে একটা সাবলীল ঐতিহ্য ধারণ করার কোন পথ বাকী ছিলনা কেননা তাদের ঐতিহ্য অস্থিসার হয়ে গিয়েছিল, আবার বিশাল এক মেটাফিজিক্যাল ঐতিহ্যের অধিকারী ক্যাথলিক ধারাও মধ্যযুগের মত সেই মানের কোন বুদ্ধিজীবী উৎপাদন করতে পারছিলোনা।</p>
<p>আবার মুসলমানদেরও কিন্তু সমস্যা ছিল। প্রথমত, ইরানী মক্তব ব্যাতিরেকে আমাদের সুন্নি বলয়ে, কুর্দি এবং ইন্দো-পাকিস্তানি ধারার মত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, সমগ্র আরব বিশ্বে কোন কারণে- দর্শন পুরোপুরি মৃত্যুবরণ করে এবং যুক্তি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ থেকে বস্তুগত যুক্তি প্রায় সম্পূর্ণ সরিয়ে দেয়া হয়। তো এখানে আমাদের ঐতিহ্যের একটা বিচ্ছেদ আছে। আপনি কীভাবে সেটা পুনরুদ্ধার করবেন?</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> এটা খুব ভাল একটা প্রশ্ন। আপনি যদি পঞ্চাশ বছর আগে আমাকে এই প্রশ্নটা করতেন, তাহলে আমার জবাব খুবই ভিন্নরকম হতো।</p>
<p>সৌভাগ্যবশত, ইবরাহীম মাদকৌর এবং ১৯৪০ এবং ৫০ এর দশকের প্রসিদ্ধ মিশরীয় দার্শনিক আলেমদের সময় থেকে আরব বিশ্বে, বিশেষ করে আরবের হৃদয় খ্যাত মিশরে দার্শনিক ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের গুরুত্ব প্রতিভাত হতে থাকে।</p>
<p>এই ঐতিহ্য ফাতিমী আমলে এবং তার পরবর্তি কিছু সময়ে মিশরে বিদ্যমান ছিল। যা ক্রমান্বয়ে বিভাজিত হয়ে যায় কিছুটা ইমাম গাযালী পরবর্তী নতুন দার্শনিক কালামের মধ্যে, আর কিছুটা দার্শনিক সুফিবাদের মধ্যে। শিয়া প্রভাবান্বিত ইরাক ছাড়া আরব বিশ্ব থেকে এই স্বতন্ত্র দার্শনিক মক্তবটি অদৃশ্য হয়ে যায়। মোটকথা, ইরাক বাদে সমস্ত প্রধান জ্ঞানকেন্দ্রগুলি থেকে এ সংক্রান্ত আরবী জ্ঞান গায়েব হয়ে যায়।</p>
<p>অনেক আরব এখন সেটা পুনর্জাগরিত করার গুরুত্ব উপলব্ধি করছেন। তারা ৮০’র দশকেও চেষ্টা করেছিল। যখন বেলজিয়ামে সংসদসমূহ কর্তৃক আরবীর ওপরে প্রথম কনফারেন্স আয়োজিত হয়; তারা আরব জাতীয়তাবাদকে নিশান হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল।</p>
<p>কোন কোন ক্ষেত্রে সমসাময়িক আরব প্রেক্ষাপটে ইসলামী চিন্তার পুনর্জাগরণ ঘটেছে। এমনকি বর্তমান স্বৈরশাসনের মাঝেও মিশরে আমার ছয় সাতটি বই আরবীতে প্রকাশিত হয়েছে।</p>
<p>ইবরাহীম মাদকৌর, আব্দুর রহমান বাদাভী এবং সমস্ত বিখ্যাত মিশরীয় দার্শনিক, এমনকি পরবর্তীদের নিয়েও সেখানে নতুনভাবে প্রচন্ড আগ্রহ তৈরী হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী মওলাযাদার উপর তাদের ডক্টরেট থিসিস করছেন, যা পঞ্চাশ বছর আগেও শোনা যায়নি।</p>
<p>এই নতুন ইসলামী দর্শন- যার আবাস পারস্যে এবং গভীরভাবে পারসিক বিষয়াবলির প্রভাবাধীন ইসলামী উপাদান সংবলিত উপমহাদেশে এবং কিছুটা হলেও তুরস্কে- ধীরে ধীরে মিশরীয়দের, তিউনিসিয়ানদের এবং অন্যান্যদের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সম্পূর্ণরূপে স্বীকৃত হচ্ছে।</p>
<p>কারণ ইসলামী বিশ্ব একটি একক বিশ্ব। আমি বলতে পারি না যে, যা মিশরীয় ঐতিহ্য তা আমার ঐতিহ্য নয়, বা যা পারস্যের তা মিশরীয়দের ঐতিহ্য নয়। আপনি এটা পুরোপুরি জানেন; আমার এটা নিয়ে আর বলার দরকার নেই।</p>
<p>সুতরাং, আমি মনে করি সৌভাগ্যবশত আমরা আরবদের একটি নতুন প্রজন্ম পেতে শুরু করেছি। যদিও এই আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই মূলত প্রতিটি আরব দেশে ধনীদের সন্তানদের শিক্ষা দেয়। আবার এটাও সত্য যে, মুসলিম পরিবারগুলি তাদের সন্তানদের মিশনারি স্কুলে পাঠায়। এসব কিছু সত্ত্বেও, আসলেই তরুণ মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যে একটি নতুন শ্রেণীর উত্থান ঘটেছে। তারা চিন্তাবিদ এই অর্থে যে, প্রকৃতপক্ষেই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যে গ্রোথিত একটি স্পষ্ট দার্শনিক ধারণা রয়েছে। এবং আমি এটা নিয়ে খুব, খুব আশাবাদী।</p>
<p><strong>হামজা ইউসুফ:</strong> আপনি অবশ্যই এই পুনরুজ্জীবনে অবদান রাখা গুটিকয়েক কণ্ঠস্বরের মধ্যে একজন ছিলেন।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> আমি সামান্য কিছু অবদান রাখতে পেরেছি। বস্তুত আল্লাহই আমাকে এর জন্য প্রস্তুত করেছেন। আমি পারস্যের দার্শনিক ধারায় জন্মগ্রহণ করেছি। তারপর আমি বহু বছর পাশ্চাত্যে অধ্যয়ন করেছি, যেখানে আমার অনেক বড় বড় স্কলারের সাথে সাক্ষাত ঘটে। এরপরে পারস্যে ফিরে গিয়ে আবার অধ্যয়ন করেছি। এতে আমি ইসলামি-ফারসি দার্শনিক ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্যের ঐতিহ্য উভয়ে জ্ঞানই অর্জন করতে পেয়েছিলাম।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> এটা আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দিকে নিয়ে আসলো, আপনি জানেন আমার পিতা দর্শনের একজন ছাত্র আবার একইসাথে অধ্যাপকও ছিলেন। তাই খুব অল্প বয়সেই পাশ্চাত্য দর্শন আমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব দার্শনিক ধারা পুনঃসন্ধানের পাশাপাশি আপনি আমাদের তরুণ আলেমদের জন্য পাশ্চাত্য দর্শন অধ্যয়ন কতটা জরুরী মনে করেন?</p>
<p>আপনিতো জানেনই উভয় ধারাকে একত্রে অধ্যয়ন করাটা কতোটা দুরূহ ব্যাপার। সেই প্রাক-সক্রেটিস আমল থেকে গ্রেট হেলেনিস্টিক সময় পর্যন্ত, মধ্যযুগীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঘটনাপ্রবাহ এরপরে দেকার্তের আগমণ এবং হিউমের আবার সেই ধারাকে পরিত্যাগ করা, তারপরে কান্টের পাশ্চাত্য মেটাফিজিক্সের মুমূর্ষু অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে মেটাফিজিক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা, পাশ্চাত্যের এই পুরো অভিযাত্রা বোঝাটা আমাদের তরুন আলেমদের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> এটা খুব ভাল একটা প্রশ্ন, আমি বেশ কয়েকবার এর জবাব দিয়েছি। কিন্তু আমাকে এখানে তা আবারও বলতে হবে, কারণ পাশ্চাত্যকে আমাদের সকল দিক থেকে জানতে হবে।</p>
<p>আমাদের দার্শনিকদের পাশ্চাত্য দর্শন জানতে হবে, কিন্তু একজন জীবিত মানুষের মতো করে। জীবন্ত মানুষ যেমন নিজের ভিতরে যা আছে তার ভিত্তিতে বাইরের কিছু জানতে পারে, ঠিক তেমন করে।</p>
<p>প্রথমে একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু থাকতে হবে। এর দ্বারা আমি কী বোঝাচ্ছি? আমি বোঝাচ্ছি, সেই সকল মুসলিম যারা পাশ্চাত্যে অধ্যয়ন করছেন, তাদের পাশ্চাত্যকে অধ্যয়ন করার সময় এর মধ্যে বিলীন হওয়া যাবেনা, বরং একনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে সেসব অধ্যয়ন করতে হবে।</p>
<p><strong>পাশ্চাত্য দর্শন অধ্যয়ন করে আমাদের এমন অনেক স্কলার আছে, কিন্তু তাদেরকে নীল তিমির মত করেই পাশ্চাত্য দর্শন গ্রাস করে ফেলেছে। তারা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পাশ্চাত্য দর্শনকে পড়ছেনা; বরং বস্তাপচা পাশ্চাত্য দার্শনিক হয়ে উঠছে। এরকম বহু আছে, কিন্তু আমাদের তাদেরকে দরকার নেই। আমাদের দরকার তাদেরকে, যাদের শিকড় ইসলামের দার্শনিক, মেটাফিজিক, সুফী, কালামী ধারা অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে ইসলামের ইলমী সিলসিলায় প্রোথিত। এবং তারা এই দৃষ্টিকোণ থেকে পাশ্চাত্যকে অধ্যয়ন করবে।</strong></p>
<p>আমরা তো পাশ্চাত্যকে নকল করে চলেছি। এমনকি খাবারের সময় চামচ কীভাবে হাতে রাখতে হবে, সেখানেও! কিন্তু পাশ্চাত্যের লোকজন? তারা ইসলামী দর্শনকে পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণ থেকেই পড়েছে যতক্ষণ না হেনরি করবিন এসে আরো ভারসাম্যপূর্ণ হবার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>পাশ্চাত্যের লেখকদের পাশ্চাত্য দর্শন, ইসলামী দর্শন, ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, সুফীবাদ নিয়ে যত বই আছে, সব পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। তবে আমাদের এই হীনমন্যতা কেন? আমরা হলাম সেই মডার্নিস্ট যারা পাশ্চাত্যকে নকল করার চেষ্টা চালাচ্ছি, তো এই জায়গাটাতে আমরা কেন পাশ্চাত্যের অনুকরণ করিনা?</p>
<p>আমি নিজেও পাশ্চাত্যকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ার চেষ্টা করছি। এটা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে শেখাতে হবে। এমনকি এখানেও এই ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিনের নির্বাসিত জীবনে, ইসলামী বিশ্বে আমার অসংখ্য ছাত্র আছে। তারা আমার কাছে আসে, এবং আমি তাদেরকে এই একটি বিষয়ই শিক্ষা দেই।</p>
<p>আমি বলব আপনারা এখানে বড় বড় সব পাশ্চাত্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, হ্যা! আপনাদের পাশ্চাত্যকে জানতে হবে৷ কিন্তু আপনাকে পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শিখতে হবে। একেবারে নিখাঁদ এবং শিকড় সমৃদ্ধ হবার চেষ্টা করুন।</p>
<p>যেমন আপনি, একজন চমৎকার আরবী বিশারদ। আপনি যদি ইংরেজী ভুলে যেতেন, তাহলে যাইতুনা কলেজে আপনি আর আরবীর ক্ষেত্রে কোন অবদান রাখতে পারতেন না। আপনি এখানে প্রভাবশালী কারণ আপনার ইংরেজী খুব ভালো; তারপর আপনি আরবী শিখেছেন এবং একজন আরবী ধারায় অভিজ্ঞ আলেমে পরিণত হয়েছেন। বিশেষভাবে চিন্তার মধ্য দিয়ে, কারণ চিন্তা ভাষার চেয়ে আরো বেশি গুরুত্ববহ।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> ঠিক।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> চিন্তার সাথে সাথে আপনার সেই চিন্তার প্রেক্ষাপট (matrix) জানা থাকতে হবে। পাশ্চাত্যকে পাশ্চাত্যেরই দৃষ্টিকোণ থেকে জানার চেষ্টা করা তো নিজেই একধরণের সাংস্কৃতিক মৃত্যুর মত। ঔপনিবেশিক সময়ে মুসলিমদের এই অবস্থা হয়েছিল, হিন্দু, আফ্রিকান সহ সমগ্র অ-পশ্চিমী জনগণের এই হাল হয়েছিল। কিন্তু পাশ্চাত্যেই এ বিষয়গুলোতে ভাঙ্গন ধরতে থাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ দিয়ে। যখন তারা সভ্যতার সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছিল এবং নিজেদের মহান এক সভ্যতা বলে ভাবত।</p>
<p>আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের ইসলামী সভ্যতা মৃত্যুবরণ করেনি। এর অনেক কিছু দুর্বল হয়ে গিয়েছে, অস্থিসার হয়েছে, কোন কোন যায়গায় বিস্মৃত হতে গেছে। কিন্তু কখনোই মারা যায়নি। ইনশাআল্লাহ অচিরেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আমরা ইসলামী সভ্যতারর পুনর্জাগরণের সাক্ষী হতে যাচ্ছি।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> ইনশা আল্লাহ। আপনি জানেন, এটা যাইতুনার লক্ষ্য উদ্দেশ্যের আওতায় পড়ে; দুটো সভ্যতাকেই বোঝার চেষ্টা করা। আমরা চাই আমাদের ছাত্ররা মুসলিম বিশ্বদর্শনের দৃষ্টিকোণ দিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে পরখ করুক।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর: </strong>ঠিক তাই।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> কিন্তু প্রায়শই আমি যেটা ঘটতে দেখি তা হলো, আমরা আমাদের নিজেদের ধারায় গভীরভাবে প্রোথিত না থাকার কারণে পাশ্চাত্য চিন্তা এক ধরণের মোহের মত কাজ করে। আমার কাছে এর একটা ভাল উদাহরণ আছে। যেমন কালাম, দার্শনিক কালাম এসবকে এনালিটিক্যাল ফিলোসফির দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করা। এটা হচ্ছে কারণ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ফাউন্ডেশন এসব গবেষণায় ফান্ড দিচ্ছে, আবার পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দার্শনিকই এনালিটিক। কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে যে, এটা তো আমাদের জন্য রীতিমতো মৃত্যুফাঁদ।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর</strong>: অবশ্যই, তারা ভ্রান্ত বিষয়গুলোতেই টাকা ঢালছে। আপনারা যদি ওসব করেন, তাহলে আমাদের যাওয়ার কোন জায়গা থাকবেনা। আমাদের এখন প্রয়োজন হলো আমাদের নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। ইসলামী বিশ্বে অথবা যাইতুনার মত যায়গায়; কিংবা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষা, ইতিহাস, চিন্তা, এবং অবশ্যই ধর্মকে উপজীব্য করে চলা বিশ্বের যোকন প্রান্তে অবস্থিত ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে।</p>
<p>বিশেষভাবে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়াবলিতে মনযোগী হয়েছেন, ইসলামী চিন্তা, বৃহৎ পরিসরে ইসলামী দর্শন ইত্যাদির মধ্যে, তাদের অবশ্যই জানতে হবে, ইবনে সিনা বেঁচে থাকলে ডেভিড হিউমের ব্যাপারে কী বলতেন?</p>
<p><strong>মানুষ লিখেছে হিউম ইমাম গাযালী থেকে ধার করেছে কারণ সে গাযালীর মত হুবহু ‘আগুনের মাঝে তুলার’ উদাহরণ ব্যবহার করেছে। এটা কোনভাবে দুর্ঘটনাক্রমে তো হতে পারেনা। আমারও মত এটিই৷ পাশ্চাত্যের উপরে ইসলামী চিন্তার এই অপরিসীম প্রভাব সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। কিন্তু শুধুমাত্র পাশ্চাত্য দর্শন খুঁজে চলাতো নিজেই এক ধরণের ধ্বংসাত্মক ব্যাপার।</strong></p>
<p>আমাদের এটা জানতে হবে, কিন্তু এটাও জানতে হবে যে এটা অনুকরণ করার মত কিছু না। এটা বোঝার মত বিষয়, এর সঙ্গে কিছু পরিভাষা জড়িত, এটা সমালোচনা করার মত বিষয়, এটা ভয় পাবার মত কিছুনা। যদি এতে কিছু শেখার থাকে, শিখুন! আলহামদুলিল্লাহ ভালো!</p>
<p>যেমন ধরুন, এনালিটিক্যাল ফিলোসফি একটা উদ্ভট ব্যাপার। কিন্তু এর একটা দিক রয়েছে যা ইসলামী দর্শনের সাথে খুব মিলে যায়। আমি যখন পারস্যে মহান উস্তাদদের সোহবতে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী দর্শন অধ্যয়ন করছিলাম, সেখানে প্রথম বিষয়ই ছিল পরিভাষা সমূহের সংজ্ঞা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখা। যেখানে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে পরিভাষাগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট। সুতরাং ঐ দৃষ্টিকোণ থেকে এনালিটিক্যাল ফিলোসফি আমরা যা নিয়ে বলছিলাম ঠিক তাই, কিন্তু এর শেষটা হয় অন্যরকম। কারন এনালিটিক্যাল ফিলোসফি হচ্ছে মেটাফিজিক্স বিরুদ্ধ একটা জিনিস। কিন্তু মোল্লা সাদরা, সোহরাওয়ার্দী বা ওনাদের মত যে কাউকে পড়লেই আপনি পরিশেষে আল্লাহকে জানতে সক্ষম হবেন।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> ঠিক।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সকল সহকর্মী এনালিটিক্যাল ফিলোসফার। আমি ভাষার সুস্পষ্টতার কথা বলেছি৷ আমি এমন ধারা থেকে এসছি যেটা দর্শন শুরুই করে এমন সংজ্ঞায়ন দিয়ে যেগুলো সবসময়ই অনেক সুনির্দিষ্ট।</p>
<p>ইসলামী দর্শন হচ্ছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মত, আধুনিক দর্শন বা পাশ্চাত্য দর্শনের মত নয়৷ আপনি যখন এটমিক ফিজিক্সে প্রোটনের কথা বলেন, তখন এর নির্দিষ্ট একটা সংজ্ঞা আছে৷ ইসলামী দর্শনেও আপনি যখন জাওহার, আ&#8217;রায, হারাকাহ যাই বলেন না কেন, এর একটা সুনির্দিষ্ট অর্থবহতা রয়েছে। যদিও আপনারা হয়ত ‘ইল্লত’ কে ইংরেজীতে “cause” হিসেবে অনুবাদ করেন। এটা একটা অস্পষ্ট অর্থ দিচ্ছে কিন্ত আরবীতে কিন্তু এটা ব্যাপক সুস্পষ্ট৷</p>
<p>আমি যখন ঐতিহ্যবাহী দর্শন অধ্যয়ন করছিলাম, তখন উস্তাদ আমাদের বলতেন শব্দের অর্থ, পরিভাষা এবং অভিব্যক্তি জানার জন্য আমরা যেন অবশ্যই আহলুল ইসতিলাহ (যেসকল বিশেষজ্ঞ পরিভাষা সমূহের সংজ্ঞা দিয়ে থাকেন) এর স্মরণাপন্ন হই। এরপরে আপনি ইসলামী দর্শন শিখতে পারবেন।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> ঠিক।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> সুতরাং আমাদের এজন্য ছাত্রদের এটা বলতে হবেনা যে আহলুল ইসতিলাহগণ সঠিক কারণ লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু দার্শনিক এটাকে সঠিক বলছেন। আমি এর বিরুদ্ধে। ঐ হীনমন্যতা এখনও আমাদের ইসলামী দুনিয়ায় রয়ে গিয়েছে যার উপর ভিত্তি করে পারস্যে গ্যেটে অনূদিত হয়েছিলেন এবং বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন।</p>
<p>মুসলমানরা আজ কেন বলছে গ্যেটে মহান ছিলেন? কারণ তিনি জার্মান ভাষায় লেখায় জার্মানরাই বলেছে যে গ্যেটে মহান ছিলেন, এজন্য। এখন এই ধরণের বাকবিতন্ডা আমরা ইসলামী দুনিয়ায় হরহামেশাই করে থাকি। আমরা আরবে যথেষ্ট সফর করে দেখেছি এবং বাকি ইসলামী জগতেরও একই অবস্থা। আমাদের এখান থেকে উত্তরণ করতে হবে। আমাদের অবশ্যই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।</p>
<p><strong>হামযা ইউসুফ:</strong> হ্যাঁ।</p>
<p><strong>সাইয়েদ হোসাইন নাসর:</strong> আমি ইতোমধ্যেই আমার সময়ের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আমি সত্যিকারার্থেই আপনার জন্য দোয়া করতে চাই এবং যাইতুনাতে আপনি যা করে চলেছেন তার প্রশংসা করতে চাই। এটা এই দেশে (আমেরিকায়) খুব খুব গুরুত্বপূর্ন একটা প্রচেষ্টা এবং ইতোমধ্যেই এর কিছু সাফল্যও রয়েছে। নির্ভিক থাকার চেষ্টা করুন, আরো ঐতিহ্যমুখী হয়ে উঠুন এবং বেশি বিক্ষিপ্ত হবেন না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকাঃ</strong></p>
<p>১. রেস এক্সটেন্সা এবং রেস কগিটান্স পশ্চিমা দার্শনিক দেকার্তের বিখ্যাত দুটি পরিভাষা। দেকার্তের মূল সৃষ্টি, ‘ডিসকোর্স অন মেথডে তিনি এই পরিভাষা দুটি উল্লেখ করেছেন। রেস এক্সটেনসা বলতে মূলত বর্ধিত বিষয়, বহির্গত অস্তিত্ব বা বাহ্যিক কাঠামো বুঝায়। পক্ষান্তরে রেস কগিটান্স বলতে চিন্তাগত বিষয়, বা অভ্যন্তরীণ/আত্মিক বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/hisham_al_noman/">হিশাম আল নোমান</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/importance-of-being-sincere-about-islamic-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14795</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব কি আরোপিত নাকি গৃহীত?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/is-the-intellectual-slavery-of-muslims-imposed-or-accepted/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/is-the-intellectual-slavery-of-muslims-imposed-or-accepted/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. ওয়ায়েল হাল্লাক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 26 Feb 2023 07:21:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সাক্ষাৎকার]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7639</guid>

					<description><![CDATA[ওয়ায়িল হাল্লাকের সাথে দুই পর্বের সাক্ষাতকারের এটি হচ্ছে ২য় পর্ব। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন হাসান আজাদ। এখানে তিনি মুসলিম উম্মাহর বর্তমান জ্ঞানের ধারা এবং পাশ্চাত্যের জ্ঞান উৎপাদনের ধারার মধ্যে যে সংঘর্ষ দেখছেন, তার ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে, তিনি “বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব” এর দ্বারা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ওয়ায়িল হাল্লাকের সাথে দুই পর্বের সাক্ষাতকারের এটি হচ্ছে ২য় পর্ব। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন হাসান আজাদ। এখানে তিনি মুসলিম উম্মাহর বর্তমান জ্ঞানের ধারা এবং পাশ্চাত্যের জ্ঞান উৎপাদনের ধারার মধ্যে যে সংঘর্ষ দেখছেন, তার ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে, তিনি “বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব” এর দ্বারা পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক জগত এবং জ্ঞান পরিচালন প্রক্রিয়াগুলোর আনক্রিটিক্যাল (Uncritical) বিকাশকে নির্দেশ করেছেন। তিনি বলছেন, এরকম বিষয়ের সুদূরপ্রসারী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইতিহাস থেকে (যেমন “বায়তুল হিকমাহ”) বহুমাত্রিকতা ও মুক্তচিন্তাকে অস্বীকার করার সময় (যা পূর্ববর্তী যুগকে চিহ্নিত করেছিল) শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক হায়ারার্কি (ক্রমোচ্চধারা) রক্ষার ক্ষেত্রে মুল্যবোধ নির্ধারণ পর্যন্ত এর প্রভাব রয়েছে। ১ম পর্বে হাল্লাকের সমালোচনা ছিল এর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ লজিক ব্যবহার করে এর সবচাইতে বড় বৈপরীত্ব সমাধানের জন্য প্রস্তাবনা হাজির করার পরিবর্তে এর পূর্ব ব্যবস্থাপনার শিকড়কে চ্যালেঞ্জ করার উপর।</p>
<p><strong>হাসান আজাদঃ </strong>আপনি আধুনিক যুগে ক্ষমতা ও জ্ঞানের মধ্যকার পরিবর্তনশীল সম্পর্ককে মেনে নিতে মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তির কি কোনো দায় নেই?</p>
<p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>অবশ্যই আছে। পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবিদের যদি কোন ভূমিকা থেকেও থাকে তবে তা খুবই অল্প। (যদিও আমরা জানি যে, পাশ্চাত্যের অনেকে বুদ্ধিজীবি ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার উর্বর ভূমি হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন) কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর হাতেগোনা যেকজন নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবি এধরণের কাজ করেছেন তারা বৃহদার্থে আমরা যে ইউরোপ-আমেরিকাকে বুঝে থাকি সে ইউরোপ আমেরিকার নন । আর বিশ্বে এখন মূলধারা বলতে ইউরোপ-আমেরিকাকেই বুঝানো হয় ফলে বাদবাকি গোটা বিশ্বই প্রান্তিক পর্যায়ের হিসেবে বিবেচ্য। আমাদের এটা ভুলে গেলে বোকামী হবে যে, পাশ্চাত্যের লিবারেল দুনিয়া সতেরো শতাব্দী থেকে অবিচ্ছিন্যভাবে একই চিন্তাগত ভিত্তির উপর কাজ করে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চার্যজনক বিষয় হচ্ছে, ইউরোপ ও আমেরিকানরা শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বাধীনতার  জন্য নিয়ে  শত শত বক্তব্য বিবৃতি থেকে  শুরু করে সামান্ত প্রভুদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হলেও একই সময়ে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাদের স্থাপিত উপনিবেশে এমনকি আপন গৃহের কৃতদাসদের উপর যে জৃলুম নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাতে ( এক্ষেত্রে হিপোক্রিট জনলক এবং &#8211; নব্য রোমান বিচারপতিরা)  তারা একবারও ভেবে দেখেনি। এদিকে তাদের যেন কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। এক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, মুক্তির থিওরী যেন একেবারেই নির্বিকার। জনলক একদিকে দ্বিধাহীনচিত্তে দাস ব্যবসায় নিজের সম্পদ বিনিয়োগ করে যাচ্ছিলো, অন্যদিকে জোড়ালোভাবে স্বাধীনতার কথা বলে যাচ্ছিলো! সত্যি বলতে কি আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের অধিকাংশই এরকম ছিলো! দুয়েকজন ছাড়া প্রায় সবার কর্মকান্ড দেখলে মনে হবে এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাবিদদের  তেমন কেউই মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বুঝতো না। তাদের নির্যাতন ধরন দেখলে তারা যে মানুষ তা মনেই হবে! তারা এতোটাই বর্বর। দুঃখজনকভাবে এই বর্বরতা এখনো ভিন্ন রুপে, ভিন্ন কায়দায় বহাল তবিয়তে চলমান।</p>
<p>এটাতো ভূমিকা মাত্র। এই ভুমিকার আরেকটা দিক হচ্ছে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীদের “আয়নায় শত্রু দেখা”র নীতি – সম্ভবত এটা একধরণের অক্ষমতা – যেমনটা Roxanne Euben অসাধারণভাবে বলেছেন। বিগত তিন শতাব্দী ধরে  পাশ্চাত্য  ‘ধর্ম’, ‘ধর্মীয়’ ‘ম্যাটাফিজিক্স’ এরকম কিছু নিশ্চল ধারণার মধ্যে ঘুরপাঁক খাচ্ছে। আর এইধারণাগুলো এতটোই নিশ্চল যে এগুলো তারা নিজেদের কোন সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে  পাচ্ছে না, ফলে মেটাফিজিক্সের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য একেবারেই হতাশ।েএমন হতাশায় ঢুবে থাকলেও পাশ্চাত্য  ইসলামের ব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার (পাশ্চাত্য ইসলামকে কেবল “ঐতিহাসিক” ঘটনা হিসেবে ধার্তব্যে আনে মেটফিজিক্যাল সত্ত্বা হিসেবে নয়)  যার ফলে ইসলাম পাশ্চাত্যে কেবল “অন্য জগত”এর সত্তা হিসেবে দেখা হয় , যা (বুদ্ধিদীপ্ত) মানুষের আত্নিক অবস্থান থেকে দূরে ;তাদের চিন্তাগত অক্ষমতা কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয় তাদের অক্ষমতা এতটাই প্রকট যে এমনকি তারা তাদের উদ্ভাবিত জ্ঞানের সাথে নিজস্ব বাস্তব জগতের সম্পর্ক  অনুমান করতেও অক্ষম। যেমন তারা নিজস্ব একটা  অনুমানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণের মেশিনে রেথে পরিচিত ও অভ্যাসগত প্রতিটি কাজকে এনালিটিক্যাল আর্কাইভের একটি অংশ করে তুলেছে। যেমনঃ নিজস্ব একটি অনুমান থেকে একটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করা এবং সে আলোকে এমন ফলাফল আনা যেন মন হয় পূর্বানুমিত ধারণাটিই সেই ঘটনা তৈরি করেছে। অথচ ঘটনাটি ঘটার আসল কারণ  অন্যকিছুও হতে পারে। এই ত্রুটিপূর্ণ পন্থায় সত্য উদঘাটিত হয় না। তাদের এধরণের বিশ্লেষণমূলক ত্রুটিগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা বুঝতে পারি যে তারা পশ্চিমা ট্রাডিশনে একই প্রশ্নগুলো কিভাবে মোকাবেলা করে আর একই বিষয়ে অন্যদের ক্ষেত্রে কিভাবে দেখে। মূলত বিশ্লেষণমূলক এই পন্থাটা একটা দ্বৈতনীতির (ডাবল স্ট্যান্ডার্ড)  উপর প্রতিষ্ঠিত । এক্ষেত্রে আধুনিক রাষ্ট্র ও সেক্যুলারিজম – এ দুটি বাধ্যতামূলক বিষয়।</p>
<p>আসলে এই বিষয়ে অনেক কিছুই বলা যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, উদাহরণস্বরুপ, পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা অন্য ধারার সাথে আদৌতে কখনো মিলিত হয় নি, বিশেষ করে ইসলামের সাথে, সিরিয়াস কিংবা তুলনামূলক কম কোনো বিষয়ে কোথাও ইসলামের সাথে মিলিত হয় নি। তার পরিবর্তে, এই তিন শতাব্দীর জার্নিতে যখনই বাধ্য হয়ে মোকাবেলা করতে হয়েছে তখন একটি নিন্দামূলক রায় পেশ করে  এরকম সম্পর্ককে বাতিল করে দিয়েছে। ইসলামের প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন সম্পূর্ণরুপে অযৌক্তিক – এক্ষেত্রে তাদের বিশ্লেষণমূলক পন্থার অবশ্যই এর ভূমিকা আছে। অথচ ব্যাপারটা অত্যন্ত বিদ্রুপাত্মক যে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি নিজেকে ব্যাখ্যা করেছে যুক্তি ও যুক্তিবাদী অনুসন্ধানের শ্রেষ্ঠ আবাসস্থল হিসেবে।</p>
<p><strong>হাসান আজাদঃ কেউ কেউ বলেন যে, আধুনিক মুসলিম চিন্তাভাবনায় মৌলিকত্বের যে অভাব রয়েছে, সেটা মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীদের অবমাননার বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? </strong></p>
<p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>এই ব্যাপারে আমি সংক্ষেপে জবাব দিতে চাই। “মুসলিম বিশ্ব” আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের চাইতে অনেক বড়। এটা অনেক উন্নত এবং আমরা যাকে “আধুনিক ইসলাম” বলি, তার চাইতে অনেক জটিল। আমি বলতে চাই আমার লেখা Impossible State বইটি পড়লেই আপনি বুঝবেন আমি কী বুঝাতে চাচ্ছি।</p>
<p><strong>হাসান আজাদঃ তার মানে অবশ্যই উভয় পক্ষেরই করার অনেক কিছু আছে যদি তারা মূল আলোচনায় আসতে চায়, কিন্তু এ কাজের জন্য কি উভয়েই সমানভাবে দায়ী? </strong></p>
<p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>বিষয়টা সংখ্যা দিয়ে সমান সমানভাবে পরিমাপ করা যায় কিনা, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে আমি বলব যে, পাশ্চাত্য সভ্যতাকে একটি বিরাট নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, যা তারা শোচনীয়ভাবে এড়িয়ে গেছে (যেগুলো লিখলে অনেক পৃষ্ঠা হয়ে যাবে)। অন্যদিকে, মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বে তাদের নিজেদের পরিচয় ও কন্ঠস্বরকে খুঁজে পেতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এবং আমাদের পৃথিবী আজকাল আগের চেয়ে ছোটো মনে হচ্ছে। এখনকার মুসলিম চিন্তাবিদেরা (এবং অচিন্তাবিদেরা) যারা আকলী ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনার অভাবে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ভয়ানকভাবে আক্রমণ করছে, তারা কি পরিমাণ মাযহাবী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে, এ ব্যাপারে নিজেরা খুবই কম সচেতন। আমি এটাকে বিদ্রুপাত্মক মনে করি যে, তারা নাকি “মধ্যযুগীয় আকল” বা “আকলের অভাব” এর সমালোচনা করবে যেখানে তারা অন্যের অনুকরণের চাইতে ভালো কিছু করতে পারে না। যেমনটা পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীদের প্রতি তাদের মনোভাব দেখা যায় যে যেকোনো সময় ফুকো, দেরিদা, বা অন্যরা তাদের মাঝে ফ্যাশনেবল হয়ে উঠে। কিন্তু সবচাইতে বাজে দেখায়, যখন তারা কোনো সুক্ষ প্রমাণাদি বা গভীর পর্যালোচনা ছাড়াই লিবারেলিজমের সমালোচনা করে। তারা যে চিন্তাকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছে, সেটা যৌক্তিক কিনা, এ ব্যাপারে তারা যাচাই বাছাই করে না। তারা জিগ্যেস করেনি তারা যে চিন্তা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে যাচ্ছে, সেটা ভিন্ন পরিবেশে বিশেষ করে তাদের পরিবেশে ফাংশনাল কিনা বা উপকারী কিনা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আমাদের জীবন যাত্রায় এই সিস্টেমগুলো প্রভাব ফেলছে কিনা, এ ব্যাপারে তারা প্রশ্ন করেনি। তারা নিজেদেরকে সেই অবস্থানে রেখেছে, যেখানে গত শতাব্দীর মুসলিম বুদ্ধিজীবীদেরকে অন্যায়ভাবে রাখা হয়েছে। এটি চরম বিড়ম্বনার দিক।</p>
<p>কিছু বিড়ম্বনা নিয়ে বাঁচা যায় কিন্তু গোটা জীবনটাই বিড়ম্বনাপূর্ণ হবে, এটা কিভাবে হয়? আমাদের চারপাশে এমন অনেকে আছে, যাদের কারোরই তাদের সবচাইতে নির্দোষ ব্যক্তিকে উপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তবে কিছু বিড়ম্বনা ক্ষতিকর হতে পারে। অতীতের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন বিষয়ে বর্তমান যুগের মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের চাইতে অধিক জ্ঞান রাখতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি অনেক বেশি জানতেন। উদাহরণস্বরুপ, মুসলমানদের ফিকহী ধারা এবং অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা বারবার, কয়েক শতাব্দী ধরে, এমন এক ভয়ংকর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে যা মানব সমাজকে হাজার বছর ধরে মোকাবেলা করতে হয়েছে। আর সেটা হচ্ছে হুসুন কুবহুনের সমস্যা (অর্থ্যাৎ ভালো-খারাপ, মানুষ হিসেবে মানুষের তাকলিফ বা নৈতিক দায়িত্ব কি এসম্পর্কিত প্রশ্ন)</p>
<p>যা স্বাভাবিক মানুষ বহন করতে পারে এবং অবশ্য বহন করা উচিত ! প্রতিটি ক্ষেত্রে, মুসলিম ফকীহ এবং তাদের ফকীহ নন এমন  সহকর্মী বুদ্ধিজীবীরা এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ওয়াদাবদ্ধ ছিলেন যা ব্যক্তিকে তার তাকলিফ তথা নৈতিক দায়িত্ব পরিত্যাগ করতে বাধা দেয়। যদি প্রতিটি মানুষ তার জীবনের চুড়ান্ত দায়িত্ব কাধে তুলে নেয়, তাকে তার পরিণতির দায়ভার বহন করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বে এই সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকরণের নিদারুণ ফলাফল আজ পাশ্চাত্য সমাজকে এক নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে । যেমনঃ আজ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এমন নয় যে, প্রাচীন বৃটিশ পার্লামেন্ট সীমিত পরিসরে দায়ভার গ্রহণে সক্ষম কোম্পানীগুলোর এধরণের অনৈতিক কর্মকান্ড পুরোপুরি বুঝতে পারে নি। বরং বুঝতে পেরেছে। আসলে এটা মানব ইতিহাসে প্রথম কোন ঘটনা যেখানে বিচারিক ব্যক্তিত্বকে বৈধকরণের পর তারা তাদের আইনকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েেএর মূল উদ্দ্যেশের বাস্তবায়নে বাঁধা দেয়। এর মূল কারণ ছিল অনৈতিক চরিত্র ও তার স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু তখন এটা বিশ্বকে শাসন এবং ধ্বংস করার জন্য বেশ জোরেশোরেই পুনরায় বৈধতার রাজ্য ‘লন্ডন’এ আনা হয়। কিন্তু মূলত ছিল দেলাওয়ারে (আমেরিকারর একটা রাজ্য)। কিন্তু ফকীহগণ সর্বদাই নৈতিক (হুসুন কুবহুন) দায়দায়িত্ব ও মানুষের নৈতিক জবাবদিহিতার দিকে জোর দিয়েছেন, যদিও তাদের প্রায়োগিক জ্ঞান স্বতন্ত্র একটি যৌথ আইন দাঁড় করাতে পারতো (যেমন তাদের এই প্রায়োগিক চিন্তাগুলোর উপর ভর করেই ওয়াকফ ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।) এখন কিছু মানুষ অনুভব করতে পারছে হাজার বছর আগে আকলী বৈধতার শরয়ী পদ্ধতি ঠিক ততোটাই বাস্তবসম্মত ছিল যতটা আমরা বর্তমানে দেখে থাকি। আর বৃটিশ পালার্মান্টের এই ঘটনাই মূলত বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনকে মিথ্যা কাল্পনিক বিষয়ের আড়ালে নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ করে দেওয়ার প্রথম ব্যবস্থাপনা করে দিয়েছে। একে নৈতিক দায় এড়ানোর প্রাক ভ্রুণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।</p>
<p>বর্তমানে পাশ্চাত্য পরিমন্ডল কিংবা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক জগত &#8211; উভয় ক্ষেত্রেই এই দুরদর্শিতার অভাব রয়েছে। অবশ্য, আমি বলতে দ্বিধাবোধ করবো না যে, বৃহদার্থে, অদুরদর্শিতা হচ্ছে মডার্ণিটির অপর নাম। সুতরাং, সম্ভবত আমরা ভুলে যাবো আলী হারবের মতো শিক্ষিত ব্যক্তিকে, যিনি “প্রতিক্রিয়ামূলক দৃষ্টিভঙ্গি”র জন্য পিয়েরে বোর্দিওকে (Pierre Bourdieu) সমালোচনা করছেন। বোর্দিও কেন কিছু আধুনিক চর্চা ও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেছেন, হার্ব শুধু এটি বুঝার সুযোগই হারাননি, বরং আমরা যাকে “বিজ্ঞান” বলতে চাই এবিষয়েও হার্ব বোর্দিওর ক্রিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে অনুধাবন করার সুযোগও হারান। প্রায় ষাট বছর আগে সাইয়েদ কুতুব যেমন ছিলেন, তেমনি হারবও বুঝতে চান না যে, আপনি কোনো মুল্যবোধকে তার উৎস থেকে আলাদা করতে পারবেন না এবং একটিকে গ্রহণ করলে অন্যটিকেও গ্রহণ করতে হবে। কেননা মূল্যবোধ তার উৎস থেকে উদগত হয়, এটাকে আলাদা ভাবে গ্রহণ বা আরোপ করা যায় না।</p>
<p>প্রযুক্তিকে গ্রহণ করা ,বাহ বাহ দেওয়ার মানেই যে মূল্যবোধকে নিন্দা করা এমনটা ভাবা ফালতু কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই অনর্থক কাজটাই সাইয়েদ কুতুব করেছিলেন। এরচেয়েও গুরুতর সমস্যা হচ্ছে, এই ধরণের দূরদর্শি চিন্তাভাবনার অভাব হার্বের মতো লেখকদের যন্ত্রণা দেয়। আর এধরণের লেখকের সংখ্যাও অনেক। মুসলিম বুদ্ধিজীবিরা পাশ্চাত্য থেকে যেসব মূল্যবোধ গ্রহণ করবেন ভাবছেন, সেগুলোর সঠিক ধারণা কোথাও পাওয়া যায় না। আমি যতদুর জানি, স্বাধীনতার ধারণাকে, বিশেষ করে এর নেতিবাচক দিক নিয়ে, যেমন (ক) একটি টেকসই জীবন যাপনের অসম্ভাব্যতা; (খ) অনিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসাত্মক বিকাশের জন্য এর অপরিহার্যতা; (গ) সাম্প্রদায়িক ও পারিবারিক কাঠামোর ভাঙনে এর ভূমিকা এবং (ঘ) একটি নৈতিকভাবে অন্তসারশূন্য ব্যক্তি সৃষ্টি ইত্যাদি ইত্যাদি – এ বিষয়গুলো কেউ অতো গভীরভাবে যাচাই বাছাই করে দেখেনি। অবশ্য, এই বিষয়গুলো পাশ্চাত্যের মন-মানসের মধ্যে নেই, সর্বোচ্চ আছে এখানে সেখানে কিছু সংস্কার কার্য। কিন্তু মুসলিম বুদ্ধিজীবীদেরকে এক্ষেত্রে অবশ্যই এধরণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সমানভাবে দায়ী করা উচিত। মূলত, তাদের পাশ্চাত্য সমকক্ষদের করা কাঠামোগত প্রতারণাগুলো এবং কেন্দ্রিয় লিবার‍্যাল ধারণা ও চর্চার ধ্বংসাত্মক দিকগুলো প্রদর্শনে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। এগুলোর কোনোটাই বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ নয়, যা এখন পর্যন্ত আরব ও মুসলিম বিশ্বে অপ্রকাশিত রয়ে গেছে এবং যা পাশ্চাত্যের মুলধারার চিন্তাকে প্রভাবিত করে চলেছে। প্রশ্নবিদ্ধ এবং আধিপত্যবাদী উদারনৈতিক চিন্তা এবং সেগুলোর চর্চা শত বছরের পুরনো দাসত্বকে ফিরিয়ে এনেছে, আর তাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েই মুসলিম চিন্তাবিদরা এগিয়ে চলেছে।</p>
<p>অবশেষে দুটি বিষয় এখানে বলা প্রয়োজন। প্রথমত হচ্ছে, অবশ্যই বিজ্ঞান চর্চার নিজস্ব মুল্য রয়েছে, এবং আধুনিক বিশ্বের ক্রিটিক্যাল সংকটগুলো বিবেচনা করে এটি (আমি বিশ্বাস করি) সকল বুদ্ধিজীবীদের উপর বাধ্যতামূলক একটি নৈতিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান হলো যা অধ্যয়ন করে, সমালোচনা করে, ক্ষুদ্র ঘটনা ও মহাজাগতিক কার্যক্রমের মধ্যে লুকানো বিষয়গুলোকে উন্মুক্ত করে, যা একটি ক্ষণস্থায়ী মানবিক ক্রিয়া ও মহাজাগতিক কাঠামোর স্থায়িত্বের মধ্যে সম্পর্ককে বেধে রাখে এবং বোধগম্য করে তোলে যা কখনোই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে না, এবং এটি এমন একটি বিষয় শেলার যাকে পাশ্চাত্যের সহজাত চালক এবং আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের সুত্রবিন্দু বলে অবিহিত করেছেন, তা সর্বদা এড়িয়ে যাবে।</p>
<p>এই পরম শক্তিশালী, শতবর্ষের পুরনো বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাকে মুসলিম চিন্তাবিদদের হজম করা উচিত এবং আধুনিক যুগের চর্চিত বিষয়গুলোকে যাচাই বাছাই করা উচিত। তারা অন্যদের মতো এই বিশ্বের কাছে ঋণী। এবং এক্ষেত্রে সবচাইতে অগ্রগন্য উদাহরণ হচ্ছে ড. ত্বহা আব্দুর রহমান, উনাকে দিয়ে এই জ্ঞানের জার্নি শুরু করা যেতে পারে।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতিকে প্রমাণ করতে এবং প্রথম পয়েন্টে বলা বিষয়গুলোকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদেরকে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নিরন্তর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যেতে হবে এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় তারা ইউরোপ-আমেরিকার সুরে হারিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের এবং অন্যদের আরো প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যতের দিকে পরিচালিত করার জন্য, সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করতে তাদের প্রয়োজন একটি  শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্ঠা যার মাধ্যমে প্রথম পয়েন্টে বলা শর্তগুলোকে একীভূত করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে অন্যতম একটি শর্ত হচ্ছে এনলাইটেনমেন্টের গভীর ভিত্তিগুলোকের দিকে নজর দেওয়া এবং কিভাবে এই ভিত্তিগুলো সুক্ষ ভাঙনের (যদিও ব্যাপকভাবে ধ্বংসাত্মক নয়) দিকে পৃথিবীকে ধাবিত করেছিল। এখানে সবচাইতে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, দুয়েকটা ব্যতিক্রম বাদে (যেমন ত্বহা আব্দুর রহমান) মুসলিম ঐতিহ্যের মুল্যায়ন প্রায় সম্পূর্ণরুপে খারিজ করা হয়েছে। আধুনিক মুসলিমদের তাকলিদ প্রায় সীমাহীন নতুন অর্থ দাঁড় করিয়েছে।</p>
<p><strong>হাসান আজাদঃ পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপারে কী বলবেন? </strong></p>
<p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>আমার মনে হয় না যে তারা কোথাও পর্যাপ্ত কিছু করেছে। উপনিবেশবাদী ধারার অংশগ্রহণকারী হিসেবে এবং উপনিবেশবাদীদের উত্তরাধিকারী হিসেবে তারা যে উপনিবেশ গুলো ধ্বংস করেছিল, সেগুলোর পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে একটি নৈতিক দায়িত্ব পালন করে। নৈতিক বোঝা এখনো স্বীকৃতি দেওয়ার বাকি, কিন্তু স্বীকৃতির দ্বারা এই ব্যর্থতার ক্ষুদ্র অংশের  বোঝাও হ্রাস পাবে না। একটি জ্ঞানের সমষ্টি হিসেবে এবং জ্ঞান/ক্ষমতা পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে (যা বিশ্বের অনেক কিছু ধ্বংস করেছে) তাদের অবশ্যই এমন একটি নৈতিক বোঝা বহন করতে হবে। তারা মনোযোগের সাথে শোনার, বিনয় ও চিন্তার সাথে যুক্ত থাকার স্বতন্ত্র নৈতিক দায়িত্ব বহন করে। কিছুটা নম্রতার সাথে একটা লম্বা পথ তাদেরকে পাড়ি দিতে হবে এই চিন্তা করে যে, তাদের স্বাভাবিকের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু করতে হবে। সম্ভবত আমি খুব বেশি আশা করছি।</p>
<p><strong>হাসান আজাদঃ আমি নিশ্চিত যে, এই বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই তাদের উপনিবেশবাদী প্রজেক্টের ক্ষেত্রে নিষ্পাপ্যতার ঘোষণা দেবে, এবং আপনাকে এটা বলবে যে, তারা সরকারী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে খুবই সুক্ষ্ম ইত্যাদি। তারা আপনাকে বলবে যে, তারা নির্যাতিত ও দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতিশীল, হোক সে মুসলিম বা অন্য কেউ। </strong></p>
<p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>হ্যা, এটা খুবই সত্য কথা কিন্তু আমার আর্গুমেন্টকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিষয়টা জটিল, এবং আমি আপনাকে একটি লম্বা লেখা পড়তে বলবো যা আমি আমার একজন সমালোচকের জবাবে লিখেছিলাম এই বিষয়ের উপর। এটা ২০১১ সালে Islamic Law and Society তে প্রকাশিত হয়।</p>
<p><strong>হাসান আজাদঃ ইসলামী চিন্তার উপর আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে? </strong></p>
<blockquote><p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>চিন্তা ও গবেষণার রাজ্যে কোনো বুদ্ধিবৃত্তি মূলত ততক্ষণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, যতক্ষণ আমরা তাদেরকে বেঁচে থাকার অনুমতি দেই। লৌহ শিকল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে একটি বাহ্যিক কাজ, এবং এটা স্পষ্ট যে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আপনার বিরুদ্ধে বিধ্বংসী অস্ত্র চালাতে পারে। কিন্তু সে কি আপনার মনস্তত্ত্বের উপরও আক্রমণ করতে সক্ষম! মোটেও না! সেগুলো মানুষের মনস্তত্ত্ব; অন্যের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। কাউকে শারীরিকভাবে রুদ্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু মানসিকভাবে তো সে মুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে এবং নিজের ইচ্ছেমতো পৃথিবীকে সাজাতে পারেন। সুতরাং আপনার প্রশ্নের সংক্ষেপে জবাব হচ্ছে, অন্যদের উপর পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যবাদের তেমন কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমি একটি বিরাট উপনিবেশবাদী শক্তির বাহ্যিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তির প্রতিবন্ধকতাগুলো বুঝতে পারি, যেমন আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা বা গাজায় ইজরায়েলী আক্রমণ, কিন্তু আমি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বটা বুঝতে পারি না। ইউরোপ-আমেরিকানরা কতটা কঠিন পরিশ্রম করছে এবং মুসলমান, আফ্রিকান এবং বাদবাকি পৃথিবীকে মানসিকভাবে কিভাবে দাসে পরিণত করছে এগুলো আলোচনা করার মতো কোনো বিষয় না। এমনকি  এগুলো অজুহাত দেখানোর মতোও কোনো বিষয় নয়। যেমনটা আমি ইতোমধ্যেই বলেছি, দুয়েকটা কন্ঠস্বর ছাড়া মুসলিম লেখকরা এখন পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের পথটাই বেছে নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটা পুরনো সংগা এখানে স্মরণ করছি তা হচ্ছে, &#8220;একজন ব্যক্তি তখনই একটি দাসে পরিণত হয় যখন সে আরেকজনের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।&#8221; যদি কাউকে ইচ্ছার বিবরণ, কাজ, কাঠামো, নেতৃত্বের শিক্ষা ও পরিচালনার দৃষ্টান্ত শেখাতে হয়, তাহলে সে কিভাবে স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে বিদ্যমান থাকে? সে তো একটা দাসমাত্র। আর আমার কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগত সার্বিকভাবে এবিষয়গুলোকে অনুধাবন করে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে কাজ করছে। (অর্থ্যাৎ দিনশেষে মুসলমানরা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিমত্তা প্রয়োগ ও প্রদর্শন করার পরিবর্তে অনুকরণ ও দাসত্বই করে যাচ্ছে কেবল।)</p></blockquote>
<p><strong>হাসান আজাদঃ ঐ ব্যাপারে আপনার মতামত কী, যারা আব্বাসী খলিফা আল মামুন এবং তার প্রতিষ্ঠিত বায়তুল হিকমাহর উদাহরণ দেয়, এবং এর গ্রীক টেক্সটের অনুবাদের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নিয়ে কথা বলে, এবং ইসলামের দর্শন, অধিবিদ্যা, ইত্যাদির বিকাশের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা, এবং এসব ক্ষেত্রে এরকম উদাহরণ দেয় যে কিভাবে অতীতে মুসলিম চিন্তাবিদেরা নিজস্ব চিন্তা বিকাশের ক্ষেত্রে বিদেশী জ্ঞানের উৎসগুলোকে ব্যবহার করেছেন। আর তা করতে গিয়ে যে যুক্তিটা দাঁড় করানো হয় তা হচ্ছে, আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তা দর্শনের ক্ষেত্রে মুসলিম চিন্তাবিদদেরও একই কাজ করা উচিত? </strong></p>
<p><strong>ওয়াইল হাল্লাকঃ </strong>এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা আমাকে প্রায়ই করা হয়। আমি শুরু করতে চাই এভাবে, উনিশ ও বিশ শতাব্দীর আলোচনায় বায়তুল হিকমার বর্ণনাটি মূলত একটি অরিয়েন্টালিস্ট কেন্দ্রীক অবস্থান, যা অনেকবার বিভিন্ন উপায়ে পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আমি প্রকৃত ঘটনা কী বা বায়তুল হিকমার বিষয়টা ঠিক কী, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন করছি না। বরং এটা কিভাবে ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা হয়ে দাড়ালো এবং বিশেষ একটি আইডেন্টিটিতে রুপ নিল, সেটা বলতে চাই। এই বর্ণনাটির আরো অনেক সমান্তরাল বিষয় আছে, যার সবগুলোই একই অর্থে যায়, “সাংস্কৃতিক ধার-গ্রহণ” এর একটি আলোচনা গঠন করে যা একটি স্বাধীন ও অউপনৈবেশিক পরিচয়ের প্রকাশ ঘটায়। উদাহরণস্বরুপ, জোসেফ স্কট আইনের ক্ষেত্রে একই কথা বলেছেন। তিনি যুক্তি দেখান, ইসলামী আইন ধার করা হয়েছে রোমান, বাইজান্টাইন এবং ইহুদী আইন থেকে, যা তাদেরকে সামগ্রিকভাবে একটি পশ্চিমা পণ্য হিসেবে দেখায়। অন্যকথায়, ইসলাম গঠিত হয়েছে অন্যদের থেকে (যেমন ইউরোপ) “শিখে” বা এর বৈধ সংস্কৃতিকে ধার করে, (যা তার ভাষায়, সভ্যতার মূল বা ভিত্তি)। বর্তমানে আলোচনাটি এগিয়ে চলছে, মডার্ণিটির সাথে আবার অনেক কিছু বদলেও যাচ্ছে, এবং সেই “পুরনো” ইসলাম এখন আর আধুনিক বিশ্বের সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে না। তাই মুসলমানদের উচিৎ আবার পাশ্চাত্যের দিকে তাকানো এবং তাদের থেকে শেখা, যেমনটা তারা বারো কিংবা তের শতাব্দীর পূরবর্তী সময়কালে খুব ভালোভাবে করেছিল । সুপ্ত চৈতন্যগত অরিয়েন্টালিস্ট জ্ঞান হচ্ছে, মুসলমানরা সর্বদাই পাশ্চাত্য থেকে শিখেছে, তাহলে এখন কেন শিখছে না? সুতরাং বায়তুল হিকমার আলোচনাটি হচ্ছে একই সঙ্গীত ভিন্ন সুরে বাজানোর মতো আর কি।</p>
<p>কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এ ব্যাপারে অস্বীকার করার কিছুই নেই যে, মুসলমানরা প্রায় ৮ম শতাব্দী থেকে অন্যদের ব্যাপারে গভীরভাবে আগ্রহী ছিল। হোক সেটা ভারতীয়, প্রাচীন ইরান বা গ্রীকদের প্রতি। অবশ্যই মুসলমানরা তখন তাদের কাজগুলো অনুবাদ করেছিল, এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তির সাথে একীভূত করেছিল, সেগুলোর যতটুকু তারা উপকারী মনে করেছিল। এই মিলটা এতটাই বাস্তবিক ছিল যে, এটা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব যে ইসলামের থেকে গ্রীকদের কোনো উপাদানগুলো আলাদা। কিন্তু আমি অতোটা গুরুত্বারোপ করছি না যে, এই মিলটি করা হয়েছিল নিজস্ব (Native) জ্ঞান পদ্ধতির মাধ্যমে। যা গ্রহণ করার মত ছিল তা গ্রহণ করা হয় তবে এর পরিমাণ অতো বেশি নয়, তেমনি প্রত্যাখানও করা হয়েছিল। ইবনে হাজমের ধারা, ইমাম গাজালী ধারা, ইবনে তাইমিয়া ধারা, কিংবা অন্যান্য – এরকম জ্ঞানের বিভিন্ন ধারাগুলোই হচ্ছে এর শক্তিশালী প্রমাণ। এবং এটা আমার উসুলে ফিকহের সাথে দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতারও নির্যাস। এই উসুলে ফিকহের বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষে পরিপূর্ণ, যার প্রমাণও অসংখ্য। এটি বিশ্বের অনন্য একটি বিজ্ঞান, যার সাথে অন্য কোনো কালচারের বা বুদ্ধিবৃত্তিক গঠন কাঠামোর কোনো সাদৃশ্যতা নেই। উসুলে ফিকহ অবশ্যই কতিপয় বিষয়ে অন্যদের কাছ থেকে উপকৃত হয়েছে, তবে আমি মনে করি না যে কোনও  নেতৃত্ব স্থানীয় বুদ্ধিজীবি বলবেন যে, উসূলে ফিকহের নির্দিষ্ট ইসলামী আইডেন্টিটি নেই, যেখানে উসূলে ফিকহ মুসলমানদের একেবারে নিজস্ব প্রয়োজনে বিকশিত একটি জ্ঞান।</p>
<p>এখানে আমার কথা হচ্ছে, মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের যেমন ইউরোপ-আমেরিকা এবং এর এনলাইটেনমেন্টের তাকলিদ (অনুসরণ) পরিত্যাগ করতে হবে, তেমনি অবশ্যই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারণ করে বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে অধ্যয়ন করতে হবে। কারণ শুধু নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে অন্যদের দিকে, অন্য সংস্কৃতির দিকেও নজর দেওয়া উচিৎ, সেসবও যাচাই বাছাই করা উচিৎ। বিশেষ করে এশিয়ার (বৌদ্ধ, হিন্দু) দিকে। তবে এটি স্পষ্টভাবেই তর্কের বিষয় যে, ইউরোপ আমেরিকার চাইতে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ারও দেওয়ার অনেক কিছু আছে। বায়তুল হিকমাকে অবশ্যই একটি বিরাট জগত হতে হবে, এমন একটি জগত যেটা শুরু হয় একজনের মানসপটে এবং ক্রিটিক্যাল চিন্তার মধ্যে। আর এর শেষ কোথায়, তার ভবিষ্যৎবাণী করা যায় না এবং করা উচিতও নয়। তবুও, এই সকল কাজ শুরু করার জন্য তাদেরকে অবশ্যই চিন্তার সর্বোচ্চ শক্তিমত্তা ব্যয় করতে হবে। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে তাদের নিজস্ব ও স্বাধীন চিন্তার জগত সৃষ্টি করা।</p>
<p><strong>অনুবাদক: রিয়াজ আহমেদ</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/is-the-intellectual-slavery-of-muslims-imposed-or-accepted/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7639</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
