<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>মিউজিক &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/civilization/society-and-culture/music/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Mon, 21 Sep 2026 08:38:10 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>মিউজিক &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamization-of-the-art-of-words/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamization-of-the-art-of-words/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 10 Aug 2026 05:33:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=17124</guid>

					<description><![CDATA[এক। প্রয়োজনীয়তা &#160; দার্শনিক ও ধর্মীয় সাহিত্য যেমন একটি জাতির মতাদর্শের মৌখিক বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন সেই মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হয়, ঠিক তেমনি মিউজিক ও শব্দশিল্পও একটি জাতির গভীরতম বিশ্বাসের &#8220;অনুবাদ&#8221;। এগুলো একটি বৃহৎ মোজাইকের ক্ষুদ্রাংশের মতো, যা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক। প্রয়োজনীয়তা</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>দার্শনিক ও ধর্মীয় সাহিত্য যেমন একটি জাতির মতাদর্শের মৌখিক বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন সেই মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হয়, ঠিক তেমনি মিউজিক ও শব্দশিল্পও একটি জাতির গভীরতম বিশ্বাসের &#8220;অনুবাদ&#8221;। এগুলো একটি বৃহৎ মোজাইকের ক্ষুদ্রাংশের মতো, যা সংস্কৃতির সামগ্রিক কাঠামোয় মিলে যায়, প্রতিটি টুকরো সেই জাতির বিশ্বদৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে এবং সেই একই চেতনার অন্যান্য বহিঃপ্রকাশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকে। সংস্কৃতিতে এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে শব্দশিল্প একটি জাতির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি অপরিহার্য রক্ষাকবচে পরিণত হয়।</p>
<p>মতাদর্শ যখন নান্দনিক সুর ও ছন্দে রূপান্তরিত হয়, সেই ‘অনুবাদ’কে ইংরেজিতে <em>মিউজিক</em> বলা হয়। শব্দটি সাধারণত শব্দশিল্পের সব ধরনের প্রকাশকে অন্তর্ভুক্ত করে, সেগুলোর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য কিংবা পরিবেশনার প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন। কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় এমন কোনো একক শব্দ বা পরিভাষা নেই, যা সামগ্রিকভাবে শব্দশিল্পের সব ধারাকে ধারণ করে।</p>
<p>আরবি <em>মুসিকা</em> (musiqa) শব্দটি প্রায়ই ইংরেজি <em>মিউজিক</em>-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর অর্থ ইংরেজি শব্দটির মতো ব্যাপক নয়। গ্রিক ভাষা থেকে আগত এই পরিভাষাটি মূলত সেসব শব্দশিল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো, যেগুলো পরিবেশনার প্রেক্ষাপট বা নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হয়েছে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিন্দিতও হয়েছে। বিপরীতে, ইসলাম যেসব শব্দশিল্পকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ও লালন করেছে, যেমন কোরআন তেলাওয়াত, আজান, তালবিয়া পাঠ কিংবা শি‘র, সেগুলো কখনোই <em>মুসিকা</em> পরিভাষার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।</p>
<p>এই কারণেই আমি অন্যত্র একটি নতুন পরিভাষার প্রস্তাব করেছি: <em>হান্দাসাহ আল-সাউত</em> (handasah al-sawt) (আল-ফারুকী ১৯৮২: ৩০ ও পরবর্তী পৃষ্ঠা)। এই পরিভাষাটি শব্দশিল্পের সব ধারাকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম এবং সে অর্থে ইংরেজি <em>মিউজিক</em> ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় ব্যবহৃত সমতুল্য শব্দগুলোর সঙ্গে যথার্থভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পরিভাষা এবং এর ব্যাপক তাৎপর্যকে সামনে রেখেই পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে যাবে।</p>
<blockquote><p>হান্দাসাহ আল-সাউত এমন একটি সাংস্কৃতিক উপাদান, যা কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বিষয়বস্তু ও রূপ নির্বিশেষে যেকোনো শব্দশিল্পের পক্ষে এই ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। কেবল সেই শিল্পই এমন ভূমিকা রাখতে পারে, যা তার জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে উঠে আসে এবং যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার জন্ম, সেই পরিমণ্ডলের বার্তা ও মূল্যবোধকে প্রকাশ করে। এ ধরনের শব্দশিল্প বা সংগীত-ঐতিহ্যের চর্চা ও প্রসার ইতিহাসের যেকোনো সময়ে, যেকোনো জাতির জন্যই অপরিহার্য। তবে বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য এর প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। কারণ আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে প্রতিনিয়ত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির এমন মিথস্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, যার ফলে নিজস্ব ও বহিরাগত উপাদানের মধ্যকার পার্থক্য ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। হান্দাসাহ আল-সাউত সেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি ও বিলুপ্তির বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত একমাত্র কার্যকর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যভাবে বললে, এটি উম্মাহর ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।</p></blockquote>
<p>বিগত কয়েক দশক ধরে ‘ইসলামীকরণ’ মুসলিম চিন্তক ও সংস্কারকদের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। তা সত্ত্বেও হান্দাসাহ আল-সাউতের প্রভাব ও তাৎপর্য সম্পর্কে যথেষ্ট উপলব্ধি নিয়ে ইসলামীকরণের প্রশ্নে অগ্রসর হয়েছেন, এমন লেখক ও চিন্তাবিদের সংখ্যা খুবই কম। আমরা জ্ঞানের ইসলামীকরণ, অর্থনীতির ইসলামীকরণ, সমাজতত্ত্বের ইসলামীকরণ, রাজনৈতিক চিন্তার ইসলামীকরণ, মনোবিজ্ঞানের ইসলামীকরণ, এমনকি পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের ইসলামীকরণের প্রচেষ্টাও দেখতে পাই। এসব আন্দোলন ও প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য এমন একটি সুদৃঢ় ইসলামী সত্তা ও পরিচয় গড়ে তোলা, যার ভিত্তিতে তারা সমকালীন জীবনের চাপিয়ে দেওয়া প্রভাবগুলোর মোকাবিলা করতে পারবে, সেগুলো এড়িয়ে চলতে পারবে কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হবে। ইসলামীকরণ ছাড়া একটি ইতিবাচক, সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্বমঞ্চে একটি প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে।</p>
<p>সংস্কৃতির এতগুলো দিকের ইসলামীকরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সমসাময়িক মুসলিমরা নিজেদের জীবনের নান্দনিক পরিসরের ইসলামীকরণ সম্পর্কে আশ্চর্যজনকভাবে উদাসীন। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই তাদের ঘর ফরাসি আসবাব কিংবা উনিশ শতকের ইউরোপীয় ধারার চিত্রকর্মে সাজিয়ে রাখেন। তারা পশ্চিমা বা হিন্দি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের মাধ্যমে বিনোদন গ্রহণ করেন, যেগুলো বিষয়বস্তু ও রূপ উভয় দিক থেকেই ইসলামী নয়। রেডিও, ক্যাসেটসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমও অ-ইসলামী সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিপূর্ণ। একইভাবে উদ্বেগজনক হলো রক্ষণশীল শ্রেণির বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া। মিউজিক কিংবা শব্দশিল্পের ইসলামী প্রকাশ নিয়ে তাদের কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা দ্রুত আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন, যেন শুধু মিউজিক শোনাই নয়, এ নিয়ে কথা বলাও তাদের কলুষিত করে ফেলতে পারে। মিশরের নতুন একটি ধর্মীয় গানের বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করার সময় এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী বলেছিলেন, তিনি আর কোনো ধরনের মিউজিকই শুনবেন না, কারণ তা ইসলামে নিষিদ্ধ হতে পারে। এমনকি কোনো ইসলামী সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতেও মিউজিকবিষয়ক প্রসঙ্গ সাধারণত স্থান পায় না। আর কতবার যে বিভিন্ন মুসলিম আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, মিউজিক হালাল নাকি হারাম, তার কোনো হিসাব নেই।</p>
<p>এ কথা সত্য যে, মুসলিমপ্রধান কিংবা অমুসলিম যেকোনো দেশেই প্রবীণ মুসলিমদের একটি বড় অংশ টেলিভিশন, চলচ্চিত্র বা ক্যাসেটের মাধ্যমে প্রচারিত অমুসলিম উৎসের সংগীতের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। তবে এই অনীহা বা প্রত্যাখ্যানের কারণ তারা খুব কমই বিশ্লেষণ করেন। তারা কেবল অনুভব করেন, সর্বশেষ পপ তারকাদের গান হোক কিংবা ইউরোপ ও আমেরিকার আধুনিক ধ্রুপদি সংগীত, এসব প্রকাশের টার্গেট অডিয়েন্স তারা নন এবং এগুলো এমন কোনো বার্তা বহন করে না, যা তারা শুনতে আগ্রহী। ধ্রুপদি ইসলামী সংগীত-ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের পরিচয়ই সমকালীন প্রচলিত সংগীত থেকে তাদের দূরত্ব তৈরি করেছে এবং শব্দশিল্পের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র রুচিবোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেই তরুণ প্রজন্মের কী হবে, যারা এলভিস প্রেসলি, রোলিং স্টোনস ও আর্নল্ড শোয়েনবার্গের জগতে জন্মেছে এবং বেড়ে উঠেছে? শিগগিরই প্রাপ্তবয়স্ক সমাজে প্রবেশ করতে যাওয়া এই মুসলিম তরুণদের খুব কমই ইসলামী শব্দশিল্পের ঐতিহ্যে দীক্ষিত হয়ে নিজেদের পরিচয় দৃঢ় করার সুযোগ পেয়েছে। কারণ তারা যেসব শব্দশিল্পের সংস্পর্শে আসে, তার অধিকাংশই বিজাতীয় সংস্কৃতি ও মতাদর্শ থেকে উৎসারিত। ভবিষ্যতে এর গুরুতর পরিণতি অনিবার্য, কেননা এর ফলে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ক্রমেই ক্ষয় ও বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়ছে।</p>
<p><em>ইসলামের আলোকে ব্যক্তিত্ব গঠনকে যদি অপরিহার্য বলে স্বীকার করা হয়, তবে সেই গঠনপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী সংস্কৃতির এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি দিককে উপেক্ষা করা যায় না। শব্দশিল্পের প্রভাব দৃশ্যমান না হলেও তা সর্বক্ষণ সক্রিয় এবং ব্যক্তি ও সমাজের ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। এ কারণেই সাংস্কৃতিক দীক্ষা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের পাশাপাশি হান্দাসাহ আল-সাউতের অবদান এবং এর ইসলামীকরণের গুরুত্ব সম্পর্কেও মুসলিমদের গভীরভাবে সচেতন হওয়া জরুরি।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই। শব্দশিল্প সম্পর্কে আমাদের মনোভাবের পটভূমি</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>শব্দশিল্প নিয়ে এমন উদাসীনতা এবং এর ইসলামীকরণের প্রতি অনাগ্রহের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।</p>
<p><strong>ক.</strong><br />
নান্দনিকতার প্রতি এই উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টির একটি কারণ হলো মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত সেই ধারণা, যার ভিত্তিতে সংগীতকে একটি ‘নিষিদ্ধ’ আনন্দ হিসেবে দেখা হয় এবং এতে অংশগ্রহণের সঙ্গে অপরাধবোধ বা দ্বিধা জড়িয়ে থাকে। এই ধারণার মূলে রয়েছে সংগীত ও শব্দশিল্পের বিভিন্ন রূপ নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বিতর্ক, যা আজও সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। এ বিষয়ে ইসলামী সভ্যতার মহান আলেম ও মুতাফাক্কিরগণের অসংখ্য বক্তব্য ও গ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও, যেমন আল-শাফিঈ (১৯০৬), ইমাম গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়্যাহ (১৯৬৬) এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেক্টর মাহমুদ শালতুত (১৯৬০), বিতর্কটি কখনো চূড়ান্ত মীমাংসায় পৌঁছায়নি। ফলে মিউজিক কিংবা শব্দশিল্পের শরয়ী ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা নিয়ে মুসলিম মানসে আজও বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।</p>
<p><strong>খ.</strong></p>
<p>শব্দশিল্প সম্পর্কে সমসাময়িক মনোভঙ্গির সঙ্গে <em>মুজিকা</em> &nbsp;শব্দটির ভুল উপলব্ধি ও ভিন্নধাচের ব্যাখ্যাও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরিভাষাটি <em>হান্দাসাহ আল-সাউত</em>-এর কেবল নির্দিষ্ট কিছু ধারাকে বোঝায় এবং সাধারণত বাদ্যযন্ত্রনির্ভর শব্দশিল্পের সঙ্গেই অধিকতর সম্পৃক্ত। ইংরেজি <em>মিউজিক</em> শব্দের মতো এর অর্থ কখনোই এতটা ব্যাপক ছিল না যে, তারতিল আল-কোরআন বা আজানের মতো শব্দশিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। অথচ এগুলোতেও সুরের শিল্পসম্মত বিন্যাস রয়েছে, যা ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত <em>মিউজিক</em> ধারণার অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই এই পার্থক্যটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করেননি। <strong>তবে ইসলামী সংস্কৃতিতে মিউজিকের বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক গড়ে উঠেছিলো, তার উদ্দেশ্য কখনোই সব ধরনের শব্দশিল্পকে একই বিচারের আওতায় আনা ছিল না। ফকীহগণ <em>মুজিকা</em>-বহির্ভূত ধারাগুলোর বৈধতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলেননি, আবার <em>মুজিকা</em>-র অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি ধারাকেও নির্বিচারে নিন্দা করেননি। তাই শব্দশিল্পের কোনো কোনো রূপের প্রত্যাখ্যানকে সমগ্র <em>হান্দাসাহ আল-সাউত</em>-এর ওপর আরোপিত সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা যথার্থ নয়।</strong> বরং এটি ছিল নেতৃত্ব ও সমাজের পক্ষ থেকে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন ও উদ্‌যাপনের রীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল করার প্রচেষ্টা, যেন তা ইসলামের মতাদর্শ ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।</p>
<p><strong>গ.</strong></p>
<p>হান্দাসাহ আল-সাউত ধারাগুলোর ইসলামীকরণে অনাগ্রহের তৃতীয় একটি কারণ হলো এই ভয় যে, যেকোনো ধরনের মুজিকায় সম্পৃক্ততা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক পবিত্র কোরআনে নিষিদ্ধ। বিষয়টি মোটেও এমন নয়; কোরআনে এমন কোনো আয়াত নেই, যা সাধারণভাবে শব্দশিল্পকে বা মুজিকা নামে পরিচিত ধারাগুলোকেও নিন্দা করে। এমনকি এই বিষয়ে কোরআনে সরাসরি কোনো উল্লেখও নেই। শব্দশিল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একমাত্র আয়াতগুলো কোরআনের তেলাওয়াত বা কোরআনকে সুন্দর সুরে তেলাওয়াতের নির্দেশ দেয় (যেমন ২৫:৩২; ৭৩:৪)। তবে মুজিকা যারা সমর্থন করেন কিংবা বিরোধিতা করেন, উভয় পক্ষই অন্যান্য আয়াতে তাদের মতের সমর্থন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।</p>
<p><strong>ঘ.</strong></p>
<p>সমসাময়িক ইসলামীকরণের প্রবক্তাদের রচনায় শব্দশিল্পের প্রতি উদাসীনতার চতুর্থ কারণ হলো, হাদীসে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন সম্পর্কে যা আছে বলে অনেক মুসলিম মনে করেন, তার প্রতি তাদের মনোভঙ্গি। মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের বিরুদ্ধবাদীরা কিছু হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিউজিককে নিন্দা করেছেন।<sup>১</sup> অন্যদিকে, যারা মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের সমর্থন করেন, তারা অন্যান্য হাদীস উল্লেখ করেন, যা তাদের অবস্থানের সমর্থন করে বলে মনে হয়।<sup>২</sup> উভয় পক্ষই আপাত-বৈপরীত্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা না করে, নিজেদের মতকে সমর্থন করে যাওয়ার চেষ্টা করেন।</p>
<p>নিশ্চয়ই নবী (সা.) এতটা অসংগতিপূর্ণ ছিলেন না যে, একটি বিষয়কে এক সময় নিন্দা করবেন এবং অন্য সময় একই বিষয়কে অনুমোদন করবেন। সুতরাং তাঁর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার পেছনে নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ছিলো। হতে পারে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল; অর্থাৎ, সেটি কি নান্দনিক ও সঙ্গীতগতভাবে সুন্দর, যথোচিত, এবং আখলাকীভাবে উন্নয়নমূলক ছিলো কিনা? অথবা নবীর (সা.) ভিন্ন প্রতিক্রিয়াগুলো হয়তো সেই মিউজিকের পরিবেশনার পরিস্থিতির কারণে ছিলো, যা সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও সমাজের পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো?</p>
<p><strong>ঙ.</strong></p>
<p>ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় শব্দশিল্পের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করার পঞ্চম একটি কারণ হতে পারে, <strong>সমসাময়িক মুসলিমদের ইসলামীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দশিল্প এবং এর বাইরের শব্দশিল্পের মধ্যে পার্থক্য করার সাধারণ ব্যর্থতা বা অক্ষমতা।</strong> অনেক সমসাময়িক মুসলিম নির্দিষ্ট ধরনের শব্দশিল্প পছন্দ করেন এবং অন্যগুলো জ্ঞাতসারে প্রত্যাখ্যান করেন। নিজেদের কাছে প্রশ্ন না করেই যে, প্রথমটি কেন শেষেরটির চেয়ে শ্রেয়। যেখানে অ-ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রভাব অনুপস্থিত বা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে নগণ্য, সেখানে এটি হয়তো কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না। কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসবাস করলেই সেরূপ পরিবেশ এক অবাস্তব স্বপ্নমাত্র। তাই কেউ কেউ নিজেদের ও পরিবারের চারপাশে এক &#8220;লৌহ যবনিকা&#8221; টানার চেষ্টা করেছেন, ইসলামের নান্দকিতার বাইরে হতে পারে, এমন শব্দশিল্প থেকে সন্তানদের বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছেন। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার প্রতিটি শহর ও গ্রামে পৌঁছে যাওয়ায়, এই বিচ্ছিন্নতার প্রচেষ্টা খুব কমই কার্যকর হয়। অন্যরা নির্বিশেষে সব ধরনের শব্দশিল্পকে নিষিদ্ধ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে যে শিল্পশূন্যতা তৈরি হয়, তা অনিবার্যভাবে অ-ইসলামী সঙ্গীতের দ্বারা পূর্ণ হয়, যা সমাজের তরুণদের মনে অনুপ্রবেশ করে। এই মানসিক ও নান্দনিক পলায়নপরতার পরিণতি সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।</p>
<p><strong>চ.</strong></p>
<p>শব্দশিল্পের ইসলামীকরণে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে না আসার ষষ্ঠ একটি কারণ হলো, এ বিষয়ে ইসলামী তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, অনেক মুসলিম তাদের নান্দনিক জীবনে কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তারা অবশ্যই এর ধর্মীয় ও নৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, কিন্তু এটি তাদের নান্দনিক ও সঙ্গীত-বোধ গড়ে তোলায় যে ভূমিকা রাখে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বিকশিত ও পরিবেশিত শব্দশিল্পের অন্যান্য ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে এটি কতটা প্রভাব রেখেছে, সেটি সম্পর্কে তারা সচেতন নয়।</p>
<p><strong>অবশ্যই মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গীত ঐতিহ্যের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু মরোক্কো থেকে দক্ষিণ ফিলিপাইন পর্যন্ত মুসলিমদের দ্বারা পরিবেশিত ও উপভোগ করা হান্দাসাহ আল-সাউতের অনেক ধারায় কিছু মূল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান এবং সেগুলো ইসলামী শব্দশিল্পের প্রাচীনতম শিল্প কোরআন তেলাওয়াতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।</strong> এই কোরআনি প্রভাব ও নির্ধারণকে প্রতিফলিত করে, এমন শব্দশিল্পকে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একইভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করা, নান্দনিক ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কখনো সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হয়নি। এটি এমন এক বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার, সেই সমসাময়িক মুসলিমদের জন্য অপেক্ষা করছে, যারা ইতিমধ্যে তাদের ভূমিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন এবং এখন হয়তো আরও বিধ্বংসী একটি সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক আগ্রাসনের ফল ভোগ করতে চলেছেন, যে আগ্রাসন তাদের মানসের গভীরে আঘাত হানছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন। হান্দাসাহ আল-সাউতের ইসলামীকরণ করার গুরুত্ব</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>আপনারা হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, হান্দাসাহ আল-সাউত কোরআনি নীতিমালার আলোকে ইসলামীকরণে অবদান রাখতে পারে?</p>
<p><strong>ক.</strong></p>
<p>প্রথমত, ইসলামী শব্দশিল্প যেভাবে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে, তা হলো তাওহীদের বার্তাকে শব্দে &#8220;অনুবাদ&#8221; করার ভূমিকা পালনের মাধ্যমে। সেই বার্তাকে প্রতিনিধিত্বকারী শব্দশিল্পগুলোকে কখনোই নিছক বিনোদন হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো এমন সৃজনশীলতার উদাহরণ, যা শ্রোতাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলো মানুষের দিকে, পার্থিব জগৎ ও তার কার্যকলাপের দিকে, কিংবা নিছক মানবিক আবেগের চিত্রায়নের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে না। এগুলোর একটি উচ্চতর লক্ষ্য আছে, এবং এগুলোর বিমূর্ত গুণাবলি সেই লক্ষ্যের প্রমাণ দেয়।</p>
<p><em><strong>শব্দশিল্পের প্রকাশ যখনই শ্রোতাকে উচ্চতর সত্তার দিকে চিন্তায় নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, অতিমাত্রায় ইন্দ্রিয়পরায়ণ বা পার্থিব ও মানবিক গুণাবলির চিত্রবর্ণনাকারী হয়ে পড়ে, মুসলিমরা তখনই তাতে সংশোধন বা প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করেছেন। মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের ইসলামী অর্গানাইজেশন উচিত মিউজিকে এমন এক অসীম প্যাটার্ন প্রতিফলিত করা, যার মডুলার এককে (modular units), পুনরাবৃত্তিতে, জটিলতায় ও অন্তহীন গুণে- কোরআনের সাহিত্যিক প্যাটার্নের নিখুত পরিপূরক হবে এবং এর দৃশ্যমান আরাবেস্কে (arabesque) রূপান্তরিত হবে। তাওহীদের বার্তার আলোকে সজ্জিত এই শব্দশিল্প, ব্যক্তি ও সমাজের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়াকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করবে।</strong></em></p>
<p><strong>খ.</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, হান্দাসাহ আল-সাউত ইসলামীকরণে যেভাবে অবদান রাখতে পারে তা হলো মুসলিমদের জাতীয় পরিচয়, নৃতাত্ত্বিক পটভূমি, এবং বসবাসের স্থান নির্বিশেষে একটি সাধারণ ও স্বজাত নান্দনিক শব্দ-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে।</strong> উম্মাহজুড়ে ইসলামী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলা ও টিকিয়ে রাখার জন্য, ইসলামীকরণ কার্যকর ও তা ব্যাপকতর হতে হবে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভাষাগত জাতীয়তা বা নৃতাত্ত্বিক জাতি-অহংকারের মাধ্যমে কখনো এটি অর্জন করা যাবে না। এটিকে অবশ্যই কোরআনী নীতিমালার ওপর ভিত্তি করতে হবে, যা সকল মুসলিমের কল্পনাকে উদ্দীপিত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীনকালে এই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল; এবং এখনো মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মুজিকা ও হান্দাসাহ আল-সাউতের অন্যান্য ধারার অনেক পরিবেশনায় কোরআন তেলাওয়াতের প্রভাবের ছাপ রয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত, বিজাতীয় নান্দনিক প্রভাব আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক। ভিডিও ও অডিও ক্যাসেট, স্যাটেলাইট রিলে এবং ট্রানজিস্টর রেডিওর মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মুসলিম বিশ্বের সুদূরতম প্রান্তেও ভিন্ন মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত শব্দশিল্পের আগ্রাসন নিয়ে এসেছে। তাওহীদ-ভিত্তিক শিল্পের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দশিল্পগুলোকে যদি উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া না হয়, তাহলে ইসলামী অস্তিত্বে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা অবশ্যই তাওহীদ বহির্ভূত শব্দশিল্প দ্বারা পূর্ণ হবে, বরং অনেক ক্ষেত্রে এরই মধ্যে হয়েছেও!</p>
<p><strong>গ.</strong></p>
<p>তাওহীদ-অনুপ্রাণিত শব্দশিল্পগুলো শুধুমাত্র বৈশ্বিক পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বকে মিউজিক্যালি ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমেই ইসলামীকরণে অবদান রাখতে পারে না (যাকে আমরা তাদের ইসলামীকরণ গুরুত্বের অনুভূমিক মাত্রা বলতে পারি), বরং এগুলো মুসলিমদের একটি উল্লম্ব মাত্রায়ও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। এর অর্থ হলো, যেকোনো জাতি বা অঞ্চলের মুসলিম সমাজ কর্তৃক লালিত ও সমর্থিত একটি সাধারণ শব্দশিল্প বা মিউজিকের ঐতিহ্য সেই সমাজকে যেসব পরস্পর-বিচ্ছিন্ন স্তরে বিভক্ত করে রেখেছে, সেগুলোর মধ্যকার বাধাগুলো অপসারণ করতে সহায়তা করবে।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহর যে দেশেই যাওয়া যাক, বিগত শতকগুলোতে দুটি পরস্পর-বিরোধী শিক্ষাব্যবস্থা মুসলিম সমাজকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। একটি হলো ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বা প্রাথমিক/মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চতর ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালিত। অপরটি পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলে গড়া। এই শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিবিভাজন একটি মেরুকৃত সমাজের জন্ম দিয়েছে, যেখানে এক ব্যবস্থার স্নাতকদের সঙ্গে অন্য ব্যবস্থার স্নাতকদের খুব কম মিল। বোঝাপড়ার অভাব, রাজনৈতিক কলহ, হতাশা, অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা- এই দুর্ভাগ্যজনক ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল। এটি চিন্তা, জ্ঞান ও কর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করে এবং মুসলিম সমাজের দুটি অংশকে পরস্পরের সঙ্গে অর্থবহভাবে যোগাযোগ ও সহযোগিতা করতে অক্ষম করে তোলে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে সংহতির বহু অভাবের কারণের মধ্যে এটি অন্যতম, এবং এটি অনেক মুসলিম দেশে বিপর্যয়কর সংঘর্ষের সম্ভাব্য অগ্নিস্ফুলনের মত অপেক্ষা করছে। এই সম্ভাব্য সমস্যা কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস এবং বসবাস, দৃশ্যমান ও শব্দ উভয় শিল্পের প্রকাশেও পার্থক্য জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক কালপর্বে জীবন ও সংস্কৃতির এই সব দিকই পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে। এসকল কিছু (শব্দশিল্পসহ) যদি পুনরায় ইসলামীকরণ না করা হয় এবং আমাদের সমাজকে উল্লম্বভাবে পুনরায় সংযুক্ত না করা হয়, তাহলে বিভিন্নভাবে শিক্ষিত মুসলিম সমাজের দুটি অংশের মধ্যে ক্রমাগত বিভাজন এবং এই পরিস্থিতি যে পরিণতির ইঙ্গিত দেয়, তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার। সমাধান কোথায়?</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>সমসাময়িক শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার প্রেরণা কোথা থেকে আসবে? বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকারগুলোর ওপর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই নির্ভর করা যাবে না, কারণ তারা অধিকাংশই এই ইসলামীকরণ থেকে প্রাপ্ত বৈশ্বিক এই অনুভূমিক (horizontal) ঐক্য ও জাতীয় উল্লম্ব (vertical) ঐক্যের সুফল সম্পর্কে অসচেতন বা উদাসীন। এছাড়া, বর্তমান সরকারগুলোর অধিকাংশ রাজনৈতিকভাবে এতটাই অস্থিতিশীল যে, ইসলামীকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ এটি তাদের একদিকে রক্ষণশীলদের, অন্যদিকে সেক্যুলারদের আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে।</p>
<p>আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠনগুলোও রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে শব্দশিল্পের ইসলামীকরণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তারা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অগ্রগতির ধারাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করার এই প্রবণতা দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই দৃশ্যমান। নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও টিকে থাকতে এবং ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে সক্ষম শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে, আমরা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক ধ্বংসের ক্ষেত্র তৈরি করতেই যেন বেশি অভ্যস্ত। মূলনীতি ও সুসংহত ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বদলে আমরা এমন নেতৃত্ব তৈরি করি, যারা অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসে, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সাফল্য অর্জন করে এবং পরে প্রতিপক্ষের কাছে স্থান হারায়।</p>
<p>নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেই পূর্ববর্তী নেতৃত্বের অর্জনগুলো বদলে দিতে শুরু করে। ফলে ইতিপূর্বে যতটুকু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিলো, তা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা উম্মাহ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আরও পিছিয়ে পড়ে। একসময় এই নেতৃত্বও প্রতিস্থাপিত হয় এবং আবারও শুরু হয় নতুন এক দফা ‘আমূল অস্ত্রোপচার’। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবে টিকে থাকলেও উম্মাহ তার কাছ থেকে প্রাপ্য সুফল লাভ করতে পারে না।</p>
<p><em><strong>সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ সূচনা ও পরিচালনার প্রত্যাশিত উৎস না হয়, তবে এই আন্দোলন কোথা থেকে আসবে? এটি আসতে পারে কেবল সেইসব মুসলিম ব্যক্তির কাছ থেকে, যারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাওহিদের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং সেই উপলব্ধি ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কাজ করেন। ব্যক্তি ও তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ইসলামকে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। একই শক্তিই শব্দশিল্পের ইসলামীকরণকেও বাস্তবে রূপ দেবে। কেবল তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রেরণা ও ইসলামীকরণের আহ্বানই স্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।</strong></em></p>
<p><em><strong>নিঃসন্দেহে, মুসলিম হিসেবে আমাদের আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাওহীদমুখী হয়ে ওঠা। আমাদের দ্বীনকে এমনভাবে সক্রিয় করে তুলতে হবে, যেন তা আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব ও অঙ্গীকারকে ধারণ করে। এর মধ্যে সেই নান্দনিক সৃষ্টিগুলোও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, যেগুলো সৃষ্টির সামর্থ্য আল্লাহ তাঁর খলিফাকে দিয়েছেন। একইভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত জীবনের সেইসব সৌন্দর্যও, যার প্রতি সংবেদনশীলতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ দিয়ে তিনি তাঁর খলিফাকে সৃষ্টি করেছেন।<sup>৩</sup> অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের পাশাপাশি যখন আমরা এই ক্ষেত্রেও সফল হব, কেবল তখনই দ্বীন ও জীবনের সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যা বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম আবির্ভূত হয়েছে।</strong></em></p>
<p>……………………………</p>
<p>১. উদাহরণস্বরূপ, একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা.) একটি বিশেষ ধরনের মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন শ্রবণ এড়ানোর উদ্দেশ্যে তাঁর দুই কানে আঙুল প্রবেশ করিয়েছিলেন (আবু দাউদ ১৩৯৬হি./১৯৫০: কিতাবুল আদব, অধ্যায় ৫২)। পরবর্তীকালে এই ঘটনাকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেন তা <em>মুজিকার</em> সব ধারা কিংবা সামগ্রিকভাবে হান্দাসাহ আল-সাউতের প্রতি একটি সাধারণ নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞা নির্দেশ করে।<br />
অপর একটি হাদীসে আবু উমামাহ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: “কোন ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে নিজ থেকে গান গায় না, বরং আল্লাহ তার প্রতি দুটি শয়তান প্রেরণ করেন; তারা তার দুই কাঁধে অবস্থান করে এবং তাদের গোড়ালি দিয়ে তার বক্ষে আঘাত করতে থাকে এবং ততক্ষণ সে গান গাইতে থাকে।” তবে এই বর্ণনাটি সহিহ আল-বুখারি বা সহিহ মুসলিমে স্থান পায়নি। <em>মুজিকা</em> কিংবা হান্দাসাহ আল-সাউতের বিভিন্ন ধারাকে নিরুৎসাহ সংক্রান্ত হাদীসের জন্য ইবনে আল-কায়সারানী (১৩৯০ হি./১৯৭০: ৭৫–৯৫) দ্রষ্টব্য।</p>
<p>২. অন্যদিকে, মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের প্রতি নবীর (সা.) অনুমোদনমূলক প্রতিক্রিয়ার দৃষ্টান্তও হাদীসে পাওয়া যায়। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন: “আল্লাহর রাসূল (সা.) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমার কাছে দুটি বালিকা <strong>বু’আস যুদ্ধের গান</strong> গাইছিল। নবী (সা.) শয্যায় শয়ন করলেন এবং মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আবূ বকর (রা.) প্রবেশ করে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, <strong>&#8220;আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নিকট শয়তানের বাদ্যযন্ত্র!&#8221;</strong> তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, <strong>&#8220;ওদের ছেড়ে দাও।&#8221;</strong> এরপর আবূ বকর (রা.) যখন অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন, আমি ইশারায় মেয়েদুটিকে বেরিয়ে যেতে বললাম, তারা চলে গেল। সেদিন ছিল ঈদের দিন।” (আল-বুখারি ১৯৭১: ৩৭)। ‘আয়িশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত অপর একটি ঘটনায় বলা হয়েছে: “মিনার দিনগুলোতে- অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে আগমন করেন। সে সময় দুই কিশোরী দফ বাজাচ্ছিল এবং নবী (সা.) কাপড় দিয়ে নিজেকে আবৃত করে শুয়ে ছিলেন। আবু বকর (রা.) তাদের তিরস্কার করলে নবী (সা.) মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে বলেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও; কারণ এগুলো ঈদের দিন এবং মিনায় অবস্থানের দিন।’” (আল-বুখারি ১৯৭১: ৫৫–৫৬)। <em>মুজিকা</em> ও <em>সামা</em> সমর্থিত হাদীসসমূহের সংকলনের জন্য রায়চৌধুরী (১৯৫৭: ৬৬–৭০), আল-গাজ্জালী (১৯০১–১৯০২), ইবনে আল-কায়সারানী (১৩৯০ হি./১৯৭০) এবং রবসন (১৯৩৮) দ্রষ্টব্য। এ প্রসঙ্গে আল-কারযাভী-ও প্রাসঙ্গিক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>৩. হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ‌ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্য সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করেছে? আর আল্লাহর দেয়া পবিত্র জিনিসগুলো কে নিষিদ্ধ করেছে?&nbsp;বলো, দুনিয়ার জীবনেও এ সমস্ত জিনিস ঈমানদারদের জন্য, আর কিয়ামতের দিনে এগুলো তো একান্তভাবে তাদেরই জন্য হবে।&nbsp;এভাবে যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের জন্য আমার কথাগুলো আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে থাকি।&nbsp;হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ‌ যেসব জিনিস হারাম করেছেন সেগুলো হচ্ছে: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা,&nbsp;গোনাহ,&nbsp;সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি,&nbsp;আল্লাহর সাথে তোমাদের কাউকে শরীক করা, যার স্বপক্ষে তিনি কোন সনদ পাঠাননি এবং আল্লাহর নামে তোমাদের এমন কোন কথা বলা, যা মূলত তিনি বলেছেন বলে তোমাদের জানা নেই।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তথ্যসূত্র:</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>১. আবু দাউদ। <em>সুনান</em>। ৪র্থ খণ্ড। সম্পাদনা: এম. এম. আবদুল হামিদ। কায়রো।</p>
<p>২. আল-বুখারি, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল। <em>সহিহ আল-বুখারি</em>। ২য় খণ্ড। অনুবাদ: মুহাম্মদ মুহসিন খান। মদিনা: ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, ১৯৭১।</p>
<p>৩. আল-ফারুকী, লুইস লামিয়া (ইবসেন)।</p>
<ul>
<li>“মিউজিক এবং মিউজিশিয়ানদের ব্যাপারে শরিয়ত।” <em>ইসলামিক থট অ্যান্ড কালচার</em>। সম্পাদনা: ইসমাঈল রাজি আল-ফারুকী। ওয়াশিংটন ডিসি: ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট, ১৯৮২, পৃ. ২৭–৫২।</li>
<li>“মুসলিম বিশ্বের মিউজিকের সংস্কৃতিতে ধারাবাহিকতার উপাদান।” <em>প্রোগ্রেস রিপোর্টস ইন এথনোমিউজিকোলজি</em>, ১(২), ১৯৮৩–৮৪, পৃ. ১–১৮।</li>
<li>“মিউজিক, মিউজিশিয়ান এবং মুসলিম আইন।” <em>এশিয়ান মিউজিক</em>, ১৬(১), ১৯৮৫, পৃ. ৩–৩৬।</li>
</ul>
<p>৪. আল-গাজালী, আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ।</p>
<ul>
<li><em>ইহইয়া উলুমুদ্দীন</em>। ২য় খণ্ড। কায়রো: মাতবাআত আল-ইস্তিকামাহ।</li>
<li><em>ইহইয়া উলুমুদ্দীন</em>-এর অংশবিশেষ, ডানকান বি. ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক “ইমোশনাল রিলিজিয়ন ইন ইসলাম অ্যাজ অ্যাফেক্টেড বাই মিউজিক অ্যান্ড সিঙ্গিং” শিরোনামে অনূদিত। <em>জার্নাল অব দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি</em>, ১৯০১–০২।</li>
</ul>
<p>৫. ইবনে আল-কায়সারানী, আবুল ফাদল মুহাম্মদ ইবনে তাহির ইবনে আলি ইবনে আহমদ আল-মাকদিসি আল-শায়বানি। <em>কিতাব আল-সামা</em>। সম্পাদনা: আবুল ওয়াফা আল-মারাফি। কায়রো: হাই কমিটি ফর ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স, ১৩৯০ হি./১৯৭০।</p>
<p>৬. ইবন তাইমিয়্যাহ, তাকি আদ-দিন আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে আবদুল হালিম। “কিতাব আল-সামা ওয়াল-রাকস।” <em>মাজমুআত আল-রাসাইল আল-কুবরা</em>। ২য় খণ্ড। কায়রো: মাতবাআত মুহাম্মদ আলি সুবাইহ, ১৯৬৬, পৃ. ২৯৫–৩৩০।</p>
<p>৭. আল-নাবুলুসি, আবদুল গনি। <em>ইযাহ আল-দালালাত ফি সামা আল-আলাত</em>। দামেস্ক: মাকতাবাত আল-হাফনিয়্যাহ, ১৩০২ হি./১৮৮৪।</p>
<p>৮. আল-কারযাভী, ইউসুফ। <em>ইসলামে হালাল ও হারাম</em>। অনুবাদ: কামাল এল-হেলবাওয়ি, এম. মইনউদ্দিন সিদ্দিকী ও সৈয়দ শুকরি। ইন্ডিয়ানাপোলিস: আমেরিকান ট্রাস্ট পাবলিকেশনস।</p>
<p>৯. রবসন, জেমস। <em>ট্র্যাক্টস অন লিসেনিং টু মিউজিক</em>। লন্ডন: দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৩৮।</p>
<p>রায়চৌধুরী, এম. এল। <em>মিউজিক ইন ইসলাম</em>। কলকাতা: এইচ. ভট্টাচার্য, ১৯৫৭।</p>
<p>১০. আল-শাফিঈ, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস। <em>কিতাব আল-উম্ম</em>। রিওয়ায়াত: আল-রাবি ইবনে সুলায়মান। কায়রো: বুলাক, ১৯০৬।</p>
<p>১১. শালতুত, মাহমুদ। <em>আল-ফাতাওয়া</em>। কায়রো: দার আল-শুরুক, ১৯৬০, পৃ. ৩৫৫–৩৫৯।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ সাব্বির হাসান সিফাত</strong>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamization-of-the-art-of-words/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">17124</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ঐতিহ্য, আদব ও আধ্যাত্মিকতার আলোকে মিউজিক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/music-in-the-light-of-tradition-adab-and-spirituality/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/music-in-the-light-of-tradition-adab-and-spirituality/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 04 Aug 2026 16:04:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=17079</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহ, আমাদের বর্তমান কালচারাল ট্রেন্ডগুলো মিউজিককে মূলত বিনোদন এবং উপভোগের একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকে। বাজনার বিট যত দ্রুত হয়, গানের কথাগুলো যত গুরুতর হয়, ততই যেনো শ্রোতারা আমোদিত হন এবং তাদের সংগীত অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন। কিন্তু সর্বাধিক জোরে উচ্চারিত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহ,</p>
<p>আমাদের বর্তমান কালচারাল ট্রেন্ডগুলো মিউজিককে মূলত বিনোদন এবং উপভোগের একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকে। বাজনার বিট যত দ্রুত হয়, গানের কথাগুলো যত গুরুতর হয়, ততই যেনো শ্রোতারা আমোদিত হন এবং তাদের সংগীত অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন। কিন্তু সর্বাধিক জোরে উচ্চারিত এই আওয়াজ আর কথার সাথে সাথে মানব রূহেও আসে গভীর শূন্যতা। একজন মুসলিম শ্রোতা তাই স্বাভাবিকভাবেই তার ঈমান ও মিউজিকের মধ্যকার সম্পর্ক আসলে কীরূপ, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন।</p>
<p><strong>আজকের দিনে ‘ইসলাম ও মিউজিক’ নিয়ে সবচেয়ে সাধারণ যেই দুটি চিন্তা আমরা দেখতে পাই, দুটিই হলো প্রান্তিক। একদল শুধু মিউজিকের অপপ্রয়োগ/ভুলপ্রয়োগ দেখতে পান এবং সম্পূর্ণরূপে মিউজিককে পরিহার করেন। আরেকদল যেকোনো ধরণের মিউজিককে অনুমোদন দেন যতক্ষণ সেটার গায়ে ‘হালাল’ ট্যাগ থাকে, দ্বীনের পরিভাষাগুলোকে এভাবে ইচ্ছেমতো কপি-পেস্ট করে যেকোনো মিউজিকের উপর বসিয়ে দিলেই সেটা হালাল হয়ে যাবে, সেই মিউজিকের ধরণ যেমনই হোক না কেনো, বিষয়টা যেনো এমন কিছু! কিন্তু তারপরেও ইসলামী সভ্যতার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা বৈচিত্র্যময় সুর ও মিউজিকের যেই প্রতিধ্বনি আজো আমরা শুনতে পাই, তা আমাদেরকে তৃতীয় আরেকটি রাস্তায় নিয়ে যায়; সেই মিউজিকের সন্ধানে, যা প্রামাণিকভাবেই ইসলামী।</strong> এই সন্ধানের উদ্যোগ মোটেও সহজ নয়। এরজন্য সিলসিলাগতভাবে যেই মিউজিক্যাল ঐতিহ্য আমাদের নিকট পৌঁছেছে, সেটার সাথে আমাদের অন্তর্নিহিত সম্পর্ককে যেমন মজবুতভাবে গড়তে হবে তেমনি মানবহৃদয়ের সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর সামনে আমাদের রূহকে উন্মোচিত করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী সাউন্ডস্কেপের কেন্দ্রে রয়েছে ‘পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত’, যা মিউজিক হিসেবে বিবেচিত না হলেও সন্দেহাতীতভাবেই মিউজিক্যাল একটি বিষয়। আজান এবং এর সাথে সাথে পবিত্র কুরআনের সুর ও ছন্দ শতাব্দীকাল ধরেই মুসলিমদের রূহে রেখে গেছে এক অমোচনীয় ছাপ, একইসাথে এটি মিউজিক্যাল ট্র্যাডিশন এবং কবিতার ধারাগুলোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কুরআন অনেকগুলো মিউজিক্যাল ধারাতেই প্রতিধ্বনিত হয়, নবী করীম (সাঃ) এর প্রশংসাতে গাওয়া নাতে, আল্লাহর নিকট চাওয়া দোয়াতে, সমবেত যিকিরের মাহফিলে কিংবা সূফীদের দরগাহ-খানকাতে।</strong></p>
<p>যাইহোক, মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিদ্যমান এই বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য আমাদের দেখায় যে মিউজিক ইসলামী হওয়ার জন্য দৃশ্যমানভাবে সুস্পষ্ট কুরআনিক হতে হবে এমনটা জরুরী নয়। ট্র্যাডিশনাল ইসলামী মিউজিক আরবীয় মুওয়াশশাহ ও কাসীদা, ভারতীয় উপমহাদেশের কাওয়ালী ও কাফী, পারস্যের দাস্তাঘ, তুর্কির মাকাম মিউজিকসহ আরো অসংখ্য অঞ্চলের লোকঐতিহ্যকে, এগুলোর সুর এবং প্রভাবের বহুমাত্রিকতাকে পরিবেষ্টন করেই গড়ে উঠেছে। এই বহুবিধ ভিন্নতা সত্ত্বেও সকল অঞ্চলের ইসলামী মিউজিক তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদকেই প্রতিফলিত করে। <strong>ট্র্যাডিশনাল ইসলামী মিউজিক এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যা মূলত তাওহীদী; আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামগ্রিকতা, অবিনশ্বরতার সাথে যেই ফিতরাতের উপর আমরা সৃষ্টি হয়েছি সেই ঐকতানকে একত্রিত করে আমাদেরকে আবারো ফিতরাতমুখী হওয়ার ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।</strong> যদিও বিভিন্ন ধরণের ইসলামী মিউজিকে এই অনুভুতির বা ভাবের প্রকাশ এবং প্রবলতা কমবেশি হয়, তবে জান্নাতের চিরায়ত খুশবুর ন্যায় এটি সবসময়ই বিদ্যমান থাকে। স্পষ্টভাবে কোনো ধর্মীয় থিম বা উপাদানের উল্লেখ ব্যতীতই এই বৈশিষ্ট্য ইসলামী মিউজিকে থাকে, যেমনটা আমরা অনেক জায়গার ইসলামী লোকঐতিহ্যে দেখতে পাই; যেখানে প্রেমিকের হৃদয়ের ব্যাকুল কাতরতা তার প্রেমাস্পদকে প্রায় ঐশ্বরিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে এবং আমরা যারা এগুলো বুঝতে পারি তা আমাদেরকে খোদার কথা এবং সেই প্রকৃত ভালোবাসার (ইশক) কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।</p>
<p>&nbsp; &nbsp;&nbsp;</p>
<p>ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মিউজিকের যে আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক রূপ রয়েছে সেটা অনুবিদ্ধ রয়েছে সুরের মধ্যে, এমন স্কেল বা মাত্রায় যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধ্বনির উঠানামার মাধ্যমে বিপুল অভিব্যক্তিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগায় এবং এমন স্বর ব্যবহার করে যা পাশ্চাত্য সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয় না। বিভিন্ন ঐতিহ্যে অসংখ্য বিন্যাসে পাওয়া যায়, এমনকি একই ঐতিহ্যের উস্তাদগণের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়; ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মিউজিকের এই সুরেলা গঠন মানবীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক মনোভাবের যে অসীম প্রকরণ রয়েছে তার যথাযথ প্রকাশের পন্থা দেখিয়ে দেয়। তথাপি সুরের এই প্রকাশভঙ্গীর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো বোধগম্যতা কীভাবে ওস্তাদ থেকে শাগরেদে সিলসিলা হিসেবে সঞ্চারিত হয়।</p>
<p><strong>ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সঙ্গীতের শিক্ষায় একটি নির্দিষ্ট শিষ্টাচার গভীরভাবে মিশে আছে, ইসলামী পরিভাষায় যাকে আমরা ‘আদব’ বলে থাকি। আদব ধারণাটির বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে: এটি গান গাওয়ার ভঙ্গি, বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ধরন, শ্রোতার সঙ্গে যোগাযোগের রীতি, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পদ্ধতি, এমনকি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি সম্মান জানানোর নিয়ত—সব কিছুকেই নির্দেশ করতে পারে।</strong> আদব আমাদের বাহ্যিক আচরণকে সুন্দর করে তোলে, আর এর মাধ্যমে আমাদের অভ্যন্তরীণ সত্তাকেও পরিশীলিত করে। সঙ্গীত বা যেকোনো শিল্পকর্ম যখন আদবের সাথে চর্চা করা হয়, তখন তা নিছক পরিবেশনা ও শ্রোতার বিনোদনের বিষয় নয়; বরং তা নিজেকে এবং শ্রোতার প্রতিটি স্বতন্ত্র আত্মাকে শিক্ষিত করার একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়। এই অর্থে সঙ্গীতের সঙ্গে জিকিরের চর্চার গভীর সাদৃশ্য রয়েছে—জিকির হলো আধ্যাত্মিক সাধনায় আল্লাহর নামসমূহ ও কোরআনের বাণীর পুনরাবৃত্তি। <strong>নির্দিষ্ট শব্দের পুনরাবৃত্তি, শ্বাস-প্রশ্বাসের পদ্ধতি, এমনকি উচ্চারণের সময় পরিধেয় বস্ত্র—এসবই তাৎপর্যপূর্ণ, যা অনুশীলনকারীর রূহে আখলাকী গুণাবলীর ছাপ ফেলে এবং গভীরভাবে প্রোথিত করে; ঠিক যেভাবে কোনো বাদ্যযন্ত্র ধরার ভঙ্গি, বাজানো সুর এবং সঙ্গীতজ্ঞের অভ্যন্তরীণ মনোভাবও একই কাজ করে। এর লক্ষ্য রূহের কোনো ক্ষণস্থায়ী অবস্থা নয়, বরং তার একেবারে মূল সত্তায় এক স্থায়ী রূপান্তর।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>ইসলামী সংগীতে মানবকণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রসমূহকে বিবেচনা করা হয় দায়িত্ব তথা আমানত হিসেবে- যা সেই শিল্পীর হাতে ন্যস্ত থাকে যিনি বছরের পর বছর কোনো গুরুর/উস্তাদের সান্নিধ্যে শিক্ষা গ্রহণ করেন। একইসাথে নিজের নফসের পরিশুদ্ধি ও ইসলামী আদবের অনুশীলনের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এমন সুর ও ধারা হস্তান্তরিত হয় যা সিলসিলাগতভাবে সেইসকল মহান শিক্ষকগণের দ্বারা নির্মিত, যাঁদের যুগ আজকের সময়ের থেকে অনেক বেশি গভীরভাবে পবিত্রতায় পরিব্যাপ্ত ছিলো। এভাবে যখন হৃদয় থেকে হৃদয়ে যথাযথ ভক্তি ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে অন্তর্জগতকে মিউজিকের সাহায্যে নতুনভাবে তৈরী করা হয়, তখন শত শত বছরের অভিব্যক্তি ও মননকে ধারণ করার জন্য যেমন সেটি উপযুক্ত হয়ে উঠে, একইসাথে খোদাপ্রদত্ত যে অনন্য উপহারসমূহ একজন সংগীতজ্ঞকে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর রূহানী প্রকাশ করার সক্ষমতাও সেই মুহূর্তে তিনি অর্জন করেন।</p></blockquote>
<p><strong>তাওহীদের চেতনা, আদবের চর্চা এবং ফিতরাতের নিকট প্রত্যাগমন, এ সমস্তকিছুই নন-ট্র্যাডিশনাল মিউজিকে অনুপস্থিত। কিন্তু এগুলোই ইসলামী মিউজিকের সবচেয়ে মূল্যবান অংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ বিষয়গুলোকে ইসলামী সঙ্গীত ঐতিহ্যে সবসময় সংরক্ষণ করা হয়।</strong> আমরা এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করি যেখানে প্রায়শই মিউজিককে মানুষের আবেগ-অনুভূতিসমূহের ম্যানিপুলেশনের জন্য অথবা দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ সমস্যা থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়ার জন্য একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংগীতধারায়ও আবেগের গভীর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে সুরারোপিত প্রেমকাব্যের মধ্যে। তবে এই আবেগকে সর্বদাই একটি উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করা হয়, ইশকের তীব্রতাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে একমাত্র অনন্ত প্রিয়তম তথা &#8216;খোদা&#8217; হলেন আমাদের প্রকৃত গন্তব্য। <strong>ফলে বাস্তব জীবন ও জগৎ থেকে পলায়নপ্রবণতার মাধ্যমে নয় বরং অসীম শান্তি ও পরম সত্য তথা ‘হক’ এর প্রতি ভালোবাসার স্মরণই ইসলামী মিউজিকের মৌলিকত্ব।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এভাবে, বর্তমান সময়ের প্রায় সকল ধ্রুপদী কিংবা জনপ্রিয় মিউজিক হলো ‘অনুভূমিক’ (Horizontal), যেগুলো মানুষের অন্তরে কেবল অন্তহীন সাধারণ কিংবা কখনো কখনো ক্ষতিকর আবেগকে জাগ্রত করে তোলে। পক্ষান্তরে, ইসলামী মিউজিকের প্রকৃতি হলো ‘উল্লম্ব’ (Vertical)। এটি যেনো মহান আল্লাহর পবিত্র নামের ‘আলিফ’এর মতো, যার মহত্ত্ব ও বিশেষত্ত্ব নিয়ে মুসলিম সূফী ও দার্শনিকগণ শত-সহস্র বছর ধরে আলোচনা-গবেষণা করে চলেছেন। এটি আমাদেরকে সেই অত্যুৎকৃষ্ট, অতীন্দ্রিয় বাস্তবতার দিকে, পরবর্তী জীবনের দিকে নির্দেশ করে এবং অনন্ত প্রিয়তমের প্রতি আমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে, যার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা এই দুনিয়ার সফরে এসেছি। এবং কখনো কখনো এটি আমাদেরকে এমন এক বেহেশতী রিহলায় (সফরে) নিয়ে যায় যার মাধ্যমে আমরা যেনো&nbsp; খোদার সান্নিধ্যে পৌঁছে যাই।</p>
<p><strong>ইসলামী মিউজিকের যেসকল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সেগুলো নানানভাবে সকল ইসলামী শিল্পের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেঃ কুরআনের রূহানী চেতনা হতে অনুপ্রাণিত, উস্তাদ থেকে শাগরেদের নিকট আত্মগত বিকাশের ঐতিহ্যের মাধ্যমে চলে আসা ও খোদার স্মরণকে আমাদের মধ্যে জাগিয়ে তোলার জন্য কিছু সৃষ্টি করা।</strong> তবুও ইসলামী মিউজিক এমন আরেকটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে যা এটিকে মসজিদের স্থাপত্য কিংবা কুরআন তিলাওয়াতের মতো শিল্পগুলো থেকে আলাদা করে এবং আমাদের বসবাসরত বর্তমান দুনিয়ার জন্য যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বাসের পার্থক্যকে উপেক্ষা করেই মানবসভ্যতার সকল সদস্যের সাথে কথা বলার এক অনন্য ক্ষমতা ইসলামী মিউজিকের রয়েছে। এই হিকমতের উৎপত্তি এমন শব্দহীন ঐকতান হতে যা সকল মানুষের রূহের গভীরেই বিদ্যমান রয়েছে এবং মানুষের এই ‘ফিতরাতকে’ উদ্দেশ্য করেই ইসলামী মিউজিক কথা বলে। এই সাধারণ ঐকতানের কারণেই ইসলামী মিউজিক ইসলাম-পূর্ব যেসকল সংগীত ঐতিহ্য এর গভীরতর চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো, সেগুলোকে সর্বদা আত্মস্থ করেছে, সেটি ইরানে হোক আর ইন্দোনেশিয়াতে। <strong>ইসলামী সংগীত ঐতিহ্য হস্তান্তরের এই পরিপূর্ণতা এবং মূল্যবোধসমূহকে ধারণকারী উস্তাদদের জীবন্ত উপস্থিতি ও সোহবত, ইসলামী মিউজিককে আত্মিক পরিচর্যা, অতীন্দ্রিয়ের স্মরণ এবং পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের এক অসাধারণ প্রতিনিধিতে পরিণত করেছে। ক্রমশ আরো অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং খোদার স্মরণ হতে বিস্মৃত হতে যাওয়া আজকের দুনিয়ায় এই বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যতীত মানব সভ্যতা টিকে থাকতে সক্ষম হবেনা।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমার নিজের সংগীত-যাত্রা, আমাদের মিউজিককে প্রকৃত অর্থে ইসলামী করে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন ধারাক্রমিক গভীরতা ও ব্যক্তিগতভাবে এর বিকাশ ও অনুশীলনের একটি সফর ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আমি আমার ক্ষুদ্র সৃষ্টিকর্মসমূহের সকল পর্যায়ে আমার উপলব্ধির ও যোগ্যতার সবটুকু দিয়ে উপরোক্ত গুণাবলীসমূহকে ফুটিয়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু এর থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমার শ্রোতাদেরকে সেই সমস্ত উপাদানসমূহকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, কুরআনের চেতনাকে ধারণ করে সৃষ্ট এই শিল্পকর্মটির পেছনে যে চিন্তা ও মনন সাহায্য করেছে, সেগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করানোই ছিলো আমার নিয়ত। এটি নিঃসন্দেহে এমন একটি চলমান সফর যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত নতুন করে শিখছি এবং এখনও অনেক পথ বাকি রয়েছে। একাডেমিক ও শৈল্পিক, দুইক্ষেত্রেই অনেক কাজ করতে হবে- বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের নিকট আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও শিল্পকে গভীরতা দান করার জন্য এই প্রচেষ্টাকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হবে বলেই আমি আশা রাখছি।</p>
<p>আজকের তরুণ মুসলিমরা যারা এই জগতে প্রবেশ করছে, তারা যদি নিজেদের মিউজিককে সত্যিই ‘ইসলামী’ বলতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে বিনয় থাকতে হবে। তাদেরকে বুঝতে হবে যে নিয়ত যতই উত্তম থাকুকনা কেনো, আমাদের ঐতিহ্যের আন্তরিক একজন অনুশীলনকারী হওয়া ও এই চেতনাকে নিজের মধ্যে আত্মীকরণ করা নতুনত্ব ও ধর্মান্তকরণের আগে প্রাধান্য পাবে। সত্যকে কখনোই মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করা যাবেনা, কারণ এটি করলে ফিতনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। <strong>সাম্প্রতিক জনপ্রিয় কোনো মিউজিকের ‘হালাল বিকল্প’ হওয়া মিউজিককে ইসলামী করে তোলেনা। যুগের ক্ষণস্থায়ী চাহিদা মেটাতে আমাদের ঐতিহ্যকে বিকৃত করার এই প্রবণতা কেবল যা কিছু আমাদের হস্তান্তরিত হয়েছে সেগুলোরই ক্ষতি করেনা; বরং আমরা আসলে কারা, এই বোধকেও হারিয়ে ফেলে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রকৃত ইসলামী মিউজিক তার নিজস্ব রূপ ও বিষয়বস্তু হতে ভিন্নও নয়, বিচ্ছিন্নও নয়। এটি তার উৎপত্তি ও উৎস সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন, যা হলো হক এবং তাওহীদ, আল্লাহ। এই সচেতনতা সরাসরি কুরআন থেকে উদ্ধৃত আয়াত বা শব্দের মাধ্যমে প্রতিফলিত হোক অথবা আমাদের মানব অস্তিত্বের যেকোনো মাত্রা থেকে অঙ্কিত হোক, এটি সর্বদা অনুগ্রহপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন হয়ে থাকে; মিউজিকের রূপই এর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়পূর্ণ চেতনাকে প্রতিফলিত করে। এর উদ্দেশ্য হলো শ্রোতা ও সুরকারকে তাদের নিজ রূহের সেই গভীরতায় নিয়ে যাওয়া, যার কেন্দ্রে রয়েছেন স্বয়ং ‘রাহমানুর রাহীম’।</strong> ইসলামী মিউজিক আমাদের মনকে কলুষিত করে ফেলে এমন অর্থহীন লিরিক্সে যেমন সন্তুষ্ট থাকেনা, তেমনি আনন্দ ও জীবনের জন্য আমাদের গভীর পিপাসাকে জাগ্রত না করে যেসকল অন্তঃসারশূন্য সুর বর্তমানে সৃষ্টি করা হয় সেগুলোকেও সঠিক হিসেবে দেখেনা। মিউজিক হলো বেহেশত থেকে আসা একটি পবিত্র আমানত যা আমাদেরকে হকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আসুন, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের নিকট হস্তান্তরিত হিকমাহ, ইলম এবং অসাধারণ সঙ্গীত সম্ভারকে আত্মস্থ করি এবং নম্রতার সাথে সংগীতশিল্পীর খোদাপ্রদত্ত কন্ঠকে ব্যবহার করে নতুনত্ব আনয়ন করি। একমাত্র তখনই আমরা যা সৃষ্টি করবো সেটি অনন্য হবে, অকৃত্রিম এবং ইসলামীও হবে; যা আমাদেরকে পরিশেষে সমস্ত কিছুর কেন্দ্র মহান ‘আল্লাহ’র দিকেই ধাবিত করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ওয়াল্লাহু আ’লাম (আল্লাহই সর্বোত্তম অবগত)।</p>
<p>সামি ইউসুফ &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/music-in-the-light-of-tradition-adab-and-spirituality/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">17079</post-id>	</item>
		<item>
		<title>একুশ শতকের বাংলাদেশে সিনেমা ও মিউজিক অঙ্গন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/cinema-and-music-in-21st-century-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/cinema-and-music-in-21st-century-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 13 May 2026 14:48:38 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16812</guid>

					<description><![CDATA[এক. আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনকে বৃহদাকারে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা- সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানা এবং ইসলামী ঘরানা। এখানে ইসলামী ঘরানা বললেও ইসলামী ঘরানার মাঝেও আছে আবার কয়েকটি ভাগ; যেমন- ক্বওমী-কেন্দ্রিক ধারা, পীর-কেন্দ্রিক ধারা, ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতের ধারা ইত্যাদি। তবে এক্ষেত্রে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4 style="font-family: Kalpurush;">এক.</h4>
<p>আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনকে বৃহদাকারে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা- সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানা এবং ইসলামী ঘরানা। এখানে ইসলামী ঘরানা বললেও ইসলামী ঘরানার মাঝেও আছে আবার কয়েকটি ভাগ; যেমন- ক্বওমী-কেন্দ্রিক ধারা, পীর-কেন্দ্রিক ধারা, ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতের ধারা ইত্যাদি।</p>
<p>তবে এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই দু&#8217;টোর বাইরে যে আর কোনো ঘরানা নেই, তা নয়। যেমন, মধ্য ডানপন্থী ঘরানা-টাও আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনের বড় একটা অংশ; কিন্তু, আমরা যখন যুবমানসের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলবো, তখন আসলে এই ঘরানা ততোটা প্রভাবশালী হতে পারে না। এক পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় যে, এই চিন্তাঙ্গনে হয় সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানার প্রভাব বেশি পড়েছে আর নাহয় ইসলামী ঘরানার প্রভাব বেশি পড়েছে।</p>
<p>আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনের এভাবে দুইভাগ হওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে দেখিয়েছেন লেখক ও গবেষক ফাহমিদ-উর-রহমান। তিনি তার ‘বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ বিতর্ক’ বইয়ে এই বিষয়টা ঐতিহাসিকভাবে টেনেছেন। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও চিন্তাঙ্গনকে একত্রে টেনে নিয়ে তিনি আলাপ তোলেন যে, ১৭৫৭-এর ইংরেজ-মুসলিম দ্বন্দ্বটা ১৯৪৭-এর সময় হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে রূপ লাভ করে; এবং ১৯৭১-এর পর তা সময়ে সময়ে কলকাতা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীতার অকল্যাণে আজকের এই পর্যায়ে এসে রূপ নেয়। আর এখানে সেকুলার, বাম ও লিবারেল ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ হলেও তাদের চিন্তাগত কমন শত্রু ইসলাম হওয়ার কারণে তারা ইসলামের বিপরীতে একত্রে জোটবদ্ধ হয়েছে।</p>
<p>আর এর প্রভাবের কারণেই আমাদের দেশের বিনোদন সেক্টর এবং যুবমানসের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গেলে উপরোক্ত দুইটি ধারাকে সামনে রাখতে হবে। এজন্যই হয়তো বিগত তিন দশকের যুবমানসে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনয়নের ফ্যাক্টর বা ক্ষেত্রগুলোয় কখনও ইসলামী ঘরানা আবার কখনও সেকুলার-বাম ঘরানার পাল্লা ভারী হয়েছে; যদিও ইসলামী ঘরানার পাল্লা ভারী হওয়ার ক্ষেত্র খুবই কম।</p>
<p>যাইহোক, বিনোদন মানেই তো আর সংস্কৃতি নয়, কিন্তু আমাদের দেশে এটাই যেহেতু সংস্কৃতির বড় একটি অংশ, তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিনোদন সেক্টর নিয়ে আলাপ তোলা প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে বিনোদন সেক্টরের দিকে নজর দিলে দুইটি দিককে সামনে রাখতে হয়। যথা- সিনেমা অঙ্গন এবং সঙ্গীত অঙ্গন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">দুই.</h4>
<p>প্রথমেই আসা যাক সিনেমা অঙ্গনের ক্ষেত্রে&#8230;</p>
<p>বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস নতুন নয়। অবাক করার বিষয় হলো, পুরো ভারতবর্ষের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির হাতেখড়ি হয় বাঙালিদের হাত ধরেই। কলকাতার প্রভাব বাংলায় পড়লে নবাবদের তত্ত্বাবধানেই ঢাকায় সিনেমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এজন্য ইংরেজ আমলেই এদেশে মুভি হয়েছে এবং থিয়েটারেও চলেছে। পাকিস্তান আমলেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনকি একাত্তরের সেই যুদ্ধের সময়েও সেই বছর বাংলাদেশে ৮টি সিনেমা মুক্তি পায়। একাত্তরের পর সিনেমা অঙ্গন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। যদি সেই সময়টায় জহির রায়হান বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো আজকের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসটাই ভিন্ন হতে পারতো।</p>
<p>একাত্তরের পর থেকে আমজাদ হোসেন ও চাষী নজরুল ইসলামের হাত ধরে বাংলাদেশের সিনেমা অঙ্গন ঘুরে দাঁড়ালে তৈরি হতে থাকে অসংখ্য সিনেমা হল। আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ভালো পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। এমনকি বলিউডকে টেক্কা দেওয়ার পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। যুবসমাজ-সহ সব বয়সীই তখন সিনেমার প্রতি ভালো রকমের আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।</p>
<p>কিন্তু তারপর থেকে এটাকেই পুঁজি করে ব্যবসা করা শুরু হয়; শুরু হয় কাটপিস ও নোংরা মুভি নির্মাণ। সেজন্য নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে পড়ে যেতে বাংলার সিনেমার সুসময়। মূলত নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে সালমান শাহের মৃত্যু এই অঙ্গনে খারাপ সময়ের সূচনা করে দেয়। যাইহোক, সবমিলিয়ে মানুষ তখন হল বিমুখ হতে শুরু করে, যার প্রভাব আজও এদেশের সিনেমা অঙ্গন পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।</p>
<p>নব্বইয়ের দশকের সিনেমার সেই স্বর্ণযুগের সময়ে বছরে ৭০-৮৫টি মুভি রিলিজ হলেও ২০১৫-১৬ সালে তা ১৫-তে এসে ঠেকে; এগুলোর ভেতর আবার ৯০ভাগই ছিলো অখাদ্য। কিন্তু, বর্তমানে রায়হান রাফি, তানিম নূর, রেদওয়ান রনি, মেজবাউর রহমান সুমন, শিহাব শাহীন-এর মতো পরিচালকের হাত ধরে বিগত কয়েক বছর ধরে এই খড়া কাটতে শুরু করেছে।<br />
আবার প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে এদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিলো ১৪৩৫টি; ২০১৯ সালে এর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১৭৪-এ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">তিন.</h4>
<p>নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যখন কেবল-টিভি ও সিডি-ডিভিডি প্রচলিত হতে শুরু করে, তখন থেকে এদেশের জনসাধারণ আর সিনেমামুখী হতে চায়নি। আর সেই সময়টায় যেহেতু উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে টিভি ও সিডি-ডিভিডির প্রচলন হয়, আবার যেহেতু যুবসমাজ বরাবরই আধুনিকতাকে গ্রহণ করে থাকে, সেজন্য সেই সময় সিনেমা অঙ্গনের দিকটা যুবসমাজকে ভালোই প্রভাবিত করে। আর নয়া প্রযুক্তির সিনেমা-নাটকে তারাই বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে।</p>
<p>যখন বাংলাদেশে সিনেমার দুর্দিন চলছিলো, সেই সময় এখানে হাত দেন লেখক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ। তার হাত ধরেই বিএফডিসি-র বাইরেও ভালো ভালো সিনেমা আসতে থাকে। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ অনেককেই আবার তখন তিনি হলে টানতে শুরু করেন। এসময় হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও সামনে এগিয়ে আসেন। কিন্তু, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আসলে আর সেই অর্থে ঘুরে দাঁড়ায়নি। আশি-নব্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পীরা তখন হয় অন্যদিকে সরে যেতে শুরু করে আর নাহয় এই অঙ্গন থেকেই বেরিয়ে যায়।</p>
<p>যখন থেকে বিনোদনের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির এমন পতন হতে থাকে, তখন থেকে শুরু হয় নাটক-টেলিফিল্মের যুগ। হুমায়ূন আহমেদ একা হাতে তখন দায়িত্ব নিয়ে এই বিনোদন অঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা করেন। এক পর্বের নাটক থেকে শুরু করে ধারাবাহিক—সবখানেই তিনি পারদর্শিতা ও মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন।</p>
<p>সেই সময় হুমায়ূন-ফারুকীর পাশাপাশি আদনান আল রাজীব, রেদওয়ান রনি, ইফতেখার আহমেদ ফাহমি-এর মতো আরো অনেক পরিচালক এদিকে হাত দেন। তারা আর্বান কালচারকে সামনে তুলে আনেন; মিডল ক্লাসের সংগ্রাম ও জীবনধারাকে তুলে ধরতে শুরু করেন; সমাজে নিম্নবিত্ত পরিবারের অবস্থান নিয়ে কাজ করেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করেন। এর ফলে এই অঙ্গনটা স্বভাবতই যুবসমাজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।</p>
<p>একদিকে যে-ই সিনেমা সকল বয়সী মানুষের কাছেই পৌঁছতো, সে-ই সিনেমার দুর্দিন চলায়, দেশে টিভি-ক্যাসেট আসায় এবং সিনেমার পরিবর্তে এমনতর কন্টেন্টের প্রচলন বেশি হওয়ায় সকল বয়সী মানুষ থেকে সরে এসে এই পুরো অঙ্গনটাই যুবসমাজ-কেন্দ্রিক হয়ে যায়। আর এভাবেই যুবমানসের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারার সূচনা হয়।</p>
<p>যদি কেউ বিগত তিন দশকে বিনোদন জগতের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করেন, তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন বিনোদন জগতের এই নাটক অঙ্গনটা কীভাবে যুবসমাজের মাঝে প্রভাব বিস্তার করেছে। নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের শুরুর দশকের নাটক-টেলিফিল্মগুলো যুবসমাজকে কতোটা বুঁদ করে রেখেছিলো, তা বলার বাইরে। গত দশকের ঈদ ও বিভিন্ন উৎসব মানেই ছিলো বিভিন্ন জনরার নাটক-টেলিফিল্মের প্রচারণা। বিগত কয়েকবছর যেমন ঈদ এলেই সিনেমার একটা সাজ-সাজ রব পড়ে যায়, নাটক-টেলিফিল্ম নিয়ে ঠিক তেমনটাই হতো গত দশকে। যদিও বর্তমানে নাটক-টেলিফিল্মের মাঝেও ভালো গল্পের অভাব দেখা গেছে; তবে আবার ক্ষেত্রবিশেষে নাটকের অধঃপতন হয়েছে বললেও ভুল হবে না।</p>
<p>আর এসব দিয়েই যুবসমাজের মানসপটে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ এবং আধুনিকতার বার্তা দেওয়া হতো; আর সেই বার্তাতেই তারা প্রভাবিত হয়ে পড়তো। আধুনিক প্রযুক্তি এতোটা সহজলভ্য না হওয়ার পরেও যুবসমাজ যে তখন আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো, তার নেপথ্যে ছিলো এসব নাটক-টেলিফিল্ম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">চার.</h4>
<p>আর অন্যদিকে, এসবের বিপরীতে তখন ইসলামী ঘরানায় টেলিভিশন বিষয়টাই হারামে সীমাবদ্ধ ছিলো; যদিও এই সিদ্ধান্ত দেওয়া তাদের অনেকেই এখন নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান করে থাকে। আবার, সেই সময়ে টেলিভিশনকে হারাম করে দেওয়ার এমন সিদ্ধান্তও আসলে বৃহদাকারে যুবসমাজে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। শুধুমাত্র ইসলামী ঘরানার নির্দিষ্ট কিছু মতাদর্শের অনুসারীদের মাঝেই এমন ফতোয়া সীমাবদ্ধ ছিলো।</p>
<p><strong>সিনেমার মতো মিউজিক অঙ্গনও ইসলামী ঘরানায় নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের শুরুর দশকে হারামে সীমাবদ্ধ ছিলো; এমনকি এখনও আমাদের দেশে মিউজিককে হারাম হিসেবেই দেখা হয়। অথচ, ইসলামের দৃষ্টিতেই মিউজিক কখনই সত্তাগতভাবে হারাম নয়; এটি একটি জ্ঞানের ধারা; এটি একটি প্রাচীন শিল্প।</strong> আমাদের দেশে মিউজিককে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয় বিধায় সতর্কতা হিসেবে আলেমগণ হারাম ফতোয়া দিতেই পারেন, এতে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই; তবে এর উপর ভিত্তি করে পুরো মিউজিক শিল্পকেই হারামে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।</p>
<p>এসব কারণে আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশকে ইসলামী ঘরানার রাজনৈতিক দলের ধারা সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর বাইরে তেমন কোনো সঙ্গীতই দেখা যায়নি। বলতে গেলে এই দিকটা কবি মতিউর রহমান মল্লিক একা হাতে দেখেছিলেন। এরপর এই শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে আইনুদ্দিন আল আজাদের হাত ধরে কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা হয়। এটা অনেকটা কওমী ধারার প্রতিষ্ঠান।</p>
<p>সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং কলরব শিল্পীগোষ্ঠী এই শতকের শুরুর দশকে ইসলামী ঘরানার সঙ্গীত অঙ্গনকে প্রজ্বলিত রেখেছিলো। এসময় এবং এর পরবর্তী সময়টায় সাইফুল্লাহ মানসুর, নওশাদ মাহফুজ ও মশিউর রহমান লিটন ইসলামী ঘরানায় যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এছাড়াও, গত এক দশকে কলরবের জনপ্রিয় শিল্পীদের বাহিরে ইসলামী ঘরানায় ওবায়দুল্লাহ তারেক, মোনায়েম বিল্লাহ, গাজী আনাস, আবু ওবায়দা, ইকবাল হোসাইন জীবন, মাহমুদ হুযাইফা, মাযহারুল ইসলাম এই অঙ্গনে অবদান রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে, কলরব ও সাইমুমের সমকক্ষ পর্যায়ের আরো কিছু শিল্পীগোষ্ঠী তৈরি হওয়ায় তাদের অবস্থান আর পূর্বের মতো নেই।</p>
<p>যাইহোক, কলরব আর সাইমুমের সঙ্গীতগুলোয় মিউজিকের কোনো অংশই ছিলো না। অথচ, সেই সময়টায় কাফেলা এবং এই জাতীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোয় মিউজিক সমৃদ্ধ সঙ্গীতই ব্যবহার করা হতো; এক্ষেত্রে বিখ্যাত শিল্পী সামী ইউসুফের ‘আল-মুয়াল্লিম’ এলবামের সঙ্গীতগুলোর সাহায্য নেওয়া হতো। একদিকে ঠিকই জনমানসে পৌঁছার জন্য তৎকালীন ইসলামী টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে মিউজিক সমৃদ্ধ ইসলামী সঙ্গীতের ব্যবহার হতো, অথচ অন্যদিকে মিউজিকের সঠিক ব্যবহার না করে এটাকেই হারামে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিলো।</p>
<p>যদিও বর্তমানে এসব থেকে বেরিয়ে এসে অনেকেই এখন তাদের সঙ্গীতে মিউজিক কম্পোজ করছে, কিন্তু এসব কারণেই সঙ্গীত অঙ্গনেও ইসলামী ঘরানা বৃহদাকারে যুবমানসে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিলো। কিন্তু, এর বিপরীতে ঠিকই অন্যান্য ধারার সঙ্গীত অঙ্গন পুরো দেশের বৃহৎ যুবসমাজকে মাতিয়ে রেখেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">পাঁচ.</h4>
<p>গত তিন-সাড়ে তিন দশকে সেকুলার অঙ্গনে এই ঘরানায় এতো ধরনের কাজ হয়েছে, তার হিসেব বলার বাইরে। তবে আলোচনার সুবিধার্থে ব্যান্ড দল আর দুয়েকজন শিল্পীর কথা তুললেই আশা করি এর একটা চিত্র পাওয়া যাবে।</p>
<p>বর্তমান সময়ের অন্যতম মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডগুলোর মধ্যে আর্টসেল, ব্ল্যাক, অর্থহীন, শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ-এর নাম উল্লেখযোগ্য। বর্তমানের মিউজিক-প্রিয় তরুণ সমাজের কাছে এসব নাম খুবই পরিচিত। এখানে আর্টসেলের একটা উদাহরণই যথেষ্ট। আর্টসেল ব্যান্ড ১৯৯৯ সালে কলেজ পড়ুয়া ৪জন তরুণের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। তাদের প্রথম এলবামেই তারা বাজিমাত করে দিয়ে একেবারে মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডে পরিণত হয়েছিলো। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে একবার কনসার্ট হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেই তারিখে কনসার্টের স্থানে সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার পরেও সেখানে প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলো শুধুমাত্র তাদের জন্য। অথচ, ব্যান্ড কনসার্টে শুধুমাত্র একটি ব্যান্ডের এমন আয়োজনে, তাও আবার বৃষ্টি-বাদলের দিনে, এতো মানুষের উপস্থিতি সাধারণত অকল্পনীয় বিষয়।</p>
<p>এছাড়াও, হারিয়ে যাওয়া এই শতকের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডগুলোর মধ্যে আছে ২০০৫ সালের ‘আইকনস’, ২০০০ সালের ‘দ্যা ওয়াটসন ব্রাদার্স’, ২০০১ সালের ‘ভাইব’ ইত্যাদি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">ছয়.</h4>
<p>ব্যান্ডের পাশাপাশি কয়েকজন শিল্পীও গত তিন-সাড়ে তিন দশকে এই ঘরানার মিউজিকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছে- ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিৎ, হাবিব ওয়াহিদ, খালিদ হাসান মিলু, শায়ান চৌধুরী অর্ণব, তাহসান খান, নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, দিলশাদ নাহার কনা, প্রীতম হাসান ইত্যাদি।</p>
<p>এখানে জেমসের পরিচয়ের জন্য তার নামটাই যথেষ্ট। সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশার একটি পরিবার থেকে উঠে এসে রক-মেটাল মিউজিক শিল্পের গুরু হয়ে ওঠাটা মোটেও সহজকিছু ছিলো না। কিন্তু, তিনি তা করে দেখিয়েছেন। উপরের কয়েকটি ব্যান্ড তো এই শতকের শুরুর দিকে এসেছে, কিন্তু জেমস তার প্রতিভা দেখানো শুরু করেছে সেই নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে। তিনি গ্রাম বাংলার গানগুলোকে রক জনরায় পরিচিত করানোর চেষ্টা করেন। আবার, এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের গানকে রক জনরায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন দেখেই হয়তো তার জনপ্রিয়তা বেড়েছিলো।</p>
<p>এমনকি, চলচ্চিত্র নায়ক মান্না নিজেই একবার জেমসকে মুভির জন্য গান তৈরি করতে অনুরোধ করেছিলেন; অথচ রক জনরা আর মুভির গানের মাঝে থাকে আকাশ-পাতাল তফাত। বাংলাদেশের মুভিতে গান গাওয়ার পাশাপাশি বলিউডেও গান গেয়ে মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।</p>
<p>জেমস বিভিন্ন এলবামে কাজ করতে গিয়ে পরিচিত হন প্রিন্স মাহমুদের সাথে, যাদের কাছে থেকেই এসেছে ’মা’ ও ‘বাবা’ গান। ২০০০ সালে এই প্রিন্স মাহমুদই রক জনরার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ দুই শিল্পী জেমন ও আইয়ুব বাচ্চুকে এক এলবামে নিয়ে আসেন। এখান থেকেই এসেছে জনপ্রিয় সেই ‘বাংলাদেশ’ গানটি, যে গান এখনও যুবসমাজের ফোনে ফোনে বাজে। এজন্যই হয়তো রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে কর্পোরেট জবহোল্ডারও তাকে পছন্দ করে।</p>
<p>রক জনরায় জেমসের পাশাপাশি আইয়ুব বাচ্চুর নামও আসবে এখানে। আইয়ুব বাচ্চুর একটা ঘটনা এখানে বর্ণনা করলেই মনে হয় যথেষ্ট হবে। বাংলা সিনেমার বিখ্যাত ‘আম্মাজান’ গানটি তারই গাওয়া। যেদিন স্টুডিওতে এই গান রেকর্ড হবে, সেদিনের খবরটি কোনোভাবে চাউর হয়ে যায়, এজন্য সেদিন স্টুডিওর সামনে আমজনতার ভিড় জমে গিয়েছিলো শুধুমাত্র আইয়ুব বাচ্চুকে দেখতে। কেননা, সেই সময়টায় জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু ছিলো সঙ্গীত অঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">সাত.</h4>
<p>এই দুইজনের সাথে আরো আসবে হাবিব ওয়াহিদের নাম; যিনি বাংলার সঙ্গীত অঙ্গনকে একাই ২০-৩০ বছর সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। তৎকালীন কালচারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছিলো, সেগুলোর প্রায় সবই হাবিব ওয়াহিদ ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। তিনি একাই বাংলা মিউজিকে অসংখ্য কমার্শিয়াল খাত তৈরি করে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালের দিকে মাত্র ২০ বছর বয়সে হাবিব ওয়াহিদ উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সাথে কাজ করেছিলেন। এভাবেই তার যাত্রার সূচনা হয় অনেকটা। এরপর থেকে পরের এক দশকে তিনি তার অঙ্গনে অসাধারণ সব এলবাম বের করতে থাকেন। আর এসব এলবাম তখন থেকে শুরু করে এখনও জনপ্রিয় হয়ে আছে।</p>
<p>শাহ আব্দুল করিমের গান-সহ বাংলাদেশের অনেক লোকসঙ্গীতকে আধুনিকভাবে সামনে আনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি; যেমন- বন্দে মায়া লাগাইসে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গড়ে চলে না, আসি বলে গেলা বন্ধু আইলানা, বসন্ত বাতাসে সইগো ইত্যাদি।</p>
<p>এরপর হাবিব ওয়াহিদ সেই একুশ শতকের শুরুর দশকের বাংলার সিনেমার দুর্দিনের সময়ে বাংলায় সিনেমায় গানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ‘হৃদয়ের কথা’ এবং ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ সিনেমায় করা হাবিবের গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। বর্তমান সময়ের যুবসমাজের বড় একটা অংশ ভালো করেই জানে যে, এসব গান ছাড়া তাদের চলতো বা চলে কিনা!</p>
<p>এছাড়াও, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া গ্রামীণফোন, বাংলালিংক এবং নেসক্যাফে-র টিভিসি বিজ্ঞাপনের সেইসব গান ও কম্পজিশনগুলো যুবসমাজের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলো। নেসক্যাফের ‘চলো সবাই’, বাংলালিংকের ‘শুনতে কি পাও&#8217; বা জিপি-র ‘চলো বাংলাদেশ’ ও ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’-র মতো গান ও কম্পজিশন আজও বাংলাদেশে টিভিসির জন্য তৈরি হয়নি।</p>
<p>হাবিব ওয়াহিদই শিরিন ও ন্যান্সির মতো শিল্পীদের খুঁজে বের করেছিলেন; যেসব শিল্পীদেরকে আজকের যুবসমাজ ভালোভাবেই চেনে। প্রীতম হাসানকেও হাবিব ওয়াহিদই তুলে এনেছে; যে প্রীতম হাসান বিগত কয়েক বছরের হিট সিনেমার গানগুলো বলতে গেলে একা হাতে কম্পজিশন করেছে। এছাড়াও প্রীতম হাসানই বাংলাদেশের সেলিব্রেশন জনরার জন্য হাত দিয়েছিলেন; যার কারণে গত দশকে বিয়েবাড়ির আয়োজনের মতো বিভিন্ন আয়োজন-অনুষ্ঠানে প্রীতম হাসানের কম্পজিশন করা উল্লেখযোগ্য তিনটি গান যুবসমাজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিলো; এবং অবশ্য এখনও এসব গান বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনে বাজানো হয়ে থাকে। আবার কোক স্টুডিওর ‘দেওরা’ ও ‘মা-লো-মা’ গান দিয়ে এই ঘরানার মিউজিক অঙ্গনে প্রীতম তার প্রতিভার সাক্ষর রাখছে।</p>
<p>মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই শতকের শুরু থেকে গত দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুবসমাজের মাঝে যতগুলো গান জনপ্রিয় হয়েছে, তার অর্ধেকের সাথেই হাবিব ওয়াহিদের কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">আট.</h4>
<p>এতোসব আলোচনার অর্থ এ-ই যে, এতোগুলো ব্যান্ড ও এতোগুলো শিল্পী তাদের ঘরানার মিউজিক শিল্পে যে পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন এবং এফোর্ট দিয়েছেন, তার ফলাফলও তারা পেয়েছেন। এজন্যই হয়তো, গত তিন-দশকে এই ঘরানার মিউজিক অঙ্গনের ধারেকাছেও আসতে পারেনি ইসলামী ঘরানার সঙ্গীত অঙ্গন। যার ফলে বিনোদন অঙ্গনটা দিয়ে যুবসমাজকে শক্তপোক্তভাবে আঁকড়ে ধরা গিয়েছিলো; যে কাজটা ইসলামী ঘরানা বৃহদাকারে করতে ব্যর্থ হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>(এই লেখাটি মূলত বড় একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ। মূল লেখাটি ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর দশম সংখ্যায় ‘একুশ শতকের যুবমানসে সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও বাংলাদেশ: নয়া ব্যবস্থাপনায় আমাদের ভাবনা’ শিরোনামে এসেছে। প্রবন্ধের আকার বেশ বড় হওয়ায় মূল লেখায় এই অংশটুকু সংক্ষেপ করা হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাওলা</strong></p>
<p>আর্টিকেল (রোয়াক ব্লগ)</p>
<ul>
<li>ইসলামে মিউজিক দৃষ্টিভঙ্গি &#8211; ড. ইউসুফ আল কারযাভী</li>
<li>সামি ইউসুফ: মিউজিক শিল্পে আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন – হাসান আল ফিরদাউস</li>
<li>সিনেমা; শুধুই কি বিনোদন? &#8211; মিফতাহুর রহমান</li>
</ul>
<p>লিংক</p>
<ul>
<li>https://bn.wikipedia.org/wiki/জেমস_(সঙ্গীতজ্ঞ)</li>
<li>https://m.dailyinqilab.com/article/422321/জেমস-এক-সংগ্রামী-জীবনের-উপাখ্যান</li>
<li>https://www.deshrupantor.com/540914/জেমসের-নগরবাউল-জেমস-হয়ে-ওঠার-গল্প</li>
<li>https://bn.wikipedia.org/wiki/হাবিব_ওয়াহিদ</li>
<li>https://www.bbc.com/bengali/in_depth/2010/07/100716_mb_habib_wahid</li>
<li>https://www.prothomalo.com/entertainment/song/238v0c4p1t</li>
<li>https://www.prothomalo.com/entertainment/song/1l9z4msxp9</li>
<li>https://bn.wikipedia.org/wiki/প্রীতম_হাসান</li>
<li>https://www.prothomalo.com/special-supplement/তারুণ্যের-শিল্পী-প্রীতম-হাসান</li>
<li>https://www.bbc.com/bengali/multimedia/2015/10/151007_gangolpo_pritom_hasan</li>
<li>https://samakal.com/music/article/340861/রহস্য-আর-অ্যাকশনে-প্রীতমের-নতুন-অধ্যায়</li>
<li>https://www.jagonews24.com/probash/article/940646</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/cinema-and-music-in-21st-century-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16812</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে মিউজিক দৃষ্টিভঙ্গি (দ্বিতীয় পর্ব)</title>
		<link>https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-second-part/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-second-part/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 31 Aug 2024 11:55:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14763</guid>

					<description><![CDATA[যারা গান হালাল মনে করেন, তাদের দলিল ওপরে যারা গান-বাজনা হারাম মনে করেন, তাদের দলিলসমূহ একে একে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওসব দলিল পর্যালোচনা করার পর তার সবগুলোই অসার প্রমাণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি দলিলও মজবুত প্রমাণিত হয়নি। যখন গান হারাম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>যারা গান হালাল মনে করেন, তাদের দলিল</strong></h4>
<p>ওপরে যারা গান-বাজনা হারাম মনে করেন, তাদের দলিলসমূহ একে একে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওসব দলিল পর্যালোচনা করার পর তার সবগুলোই অসার প্রমাণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি দলিলও মজবুত প্রমাণিত হয়নি। যখন গান হারাম হওয়ার দলিলগুলো অযথার্থ প্রমাণিত হলো, তখন গানের হুকুম &#8216;সাধারণত সবকিছু হালাল&#8217;- এই মূলনীতির ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে হালাল সাব্যস্ত হবে।</p>
<p>হারাম হওয়ার দলিলগুলো অযথার্থ প্রমাণিত হওয়ার পর হালাল হওয়ার পক্ষে কোনো নস বা দলিল না থাকলেও এই মূলনীতির ভিত্তিতে তা হালাল হিসেবে গণ্য হবে। তবে এর সাথে যুক্ত হচ্ছে সুস্পষ্ট ও সহিহ অনেকগুলো নস, ইসলামের সহনশীল স্পিরিট, সাধারণ মূলনীতি এবং সাধারণ সর্বজনীন নীতিমালা। আমরা তার বিবরণ পেশ করছি-</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রথমত: ইসলামি নসের (কুরআন-সুন্নাহর) আলোকে</strong> <strong>গান-বাজনা</strong></p>
<p>যারা গান-বাজনা হালাল মনে করেন, তারা বেশ কিছু সহিহ হাদিস দ্বারা দলিল দিয়েছেন। তার একটি হলো, নবি কারিম সা.-এর বাড়িতে আয়িশা রা. এর ঘরে দুই গায়িকার গান করা সংক্রান্ত হাদিস। আবু বকর রা. তাদের এ কথা বলে তাদের ধমক দেন, &#8220;রাসূলের বাড়িতে শয়তানের স্তুতি গান করা হচ্ছে?&#8221;</p>
<p>এ থেকে প্রমাণিত হয়, গায়িকা দু জন ছোটো ছিল না, যেমনটি কেউ কেউ মনে করেন। কারণ, তারা ছোটো হলে আবু বকর রা. এর মতো একজন সজ্জন মানুষের এভাবে জোরে তাদের ধমক দেওয়ার কথা নয়।</p>
<p>নবি কারিম সা. আবু বকর রা. কে ধমক দিতে নিষেধ করেন। কারণ, তিনি এই গানের মাধ্যমে ইহুদিদের জানাতে চাচ্ছিলেন, আমাদের দ্বীনে আনন্দ-বিনোদনের সুযোগ আছে। তিনি তাদের আরও জানাতে চাচ্ছিলেন, আল্লাহ তাকে সহনশীল স্বভাবজাত এক দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, অন্যের কাছে ইসলামকে উত্তমভাবে উপস্থাপন করা এবং দ্বীনের সহনশীলতা ও সহজতা প্রকাশ করা আবশ্যক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইমাম বুখারি ও আহমাদ আয়িশা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর এক আত্মীয়া মেয়েকে এক আনসারির সাথে বিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. বললেন, &#8216;তোমরা কি মেয়েটিকে কোনো উপহার-সামগ্রী দিয়েছ?&#8217; তারা বললেন, &#8216;হ্যাঁ।&#8217; তারপর তিনি বললেন, &#8216;তার সাথে গান গাইতে পারে এমন কাউকে কি পাঠিয়েছ?&#8217; আয়িশা রা. বললেন, &#8216;না।&#8217; তখন রাসূল সা. বললেন, &#8216;আনসাররা এমন এক সম্প্রদায়, যাদের মাঝে গান গাওয়ার রেওয়াজ আছে। যদি তার সাথে এমন কাউকে পাঠাতে, যে গান গাইত (তা হলে ভালো হতো)</strong>&#8211;</p>
<p>أتيناكم أتيناكم- فحيانا وحياكم</p>
<p>আমরা তোমাদের তরে এসেছি,</p>
<p>তোমাদের তরে এসেছি,</p>
<p>আমাদের প্রতি স্বাগত জানাও,</p>
<p>তোমাদের প্রতিও স্বাগত!&#8217;</p>
<p>এ হাদিস প্রমাণ করে, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর প্রথা ও মেজাজ-মর্জির প্রতি লক্ষ রাখা এবং তা মূল্যায়ন করা জরুরি। কারও নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও মেজাজ-মর্জি অন্য সকলের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।</p>
<p>নাসায়ি ও হাকিম আমির ইবনে সাদ থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেন এবং হাকিম তা সহিহ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, &#8220;আমি কুরযা ইবনে কাব ও আবু মাসউদ আনসারি রা. এর বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলাম। সেখানে কয়েকজন দাসী গান করছিল। তখন আমি বললাম, &#8220;রাসূল সা. এর বদরি সাহাবিদের সামনে এভাবে গান গাওয়া হচ্ছে!&#8217; তখন তাঁরা বললেন, &#8216;তোমার ইচ্ছা হলে আমাদের সাথে বসে গান শোনো, আর ইচ্ছা না হলে চলে যাও। কারণ, বিয়ের অনুষ্ঠানে গানের অনুমতি আমাদের দেওয়া হয়েছে।&#8221;</p>
<p>ইবনে হাযম তাঁর সনদে ইবনে সিরিন থেকে বর্ণনা করেন, &#8220;এক লোক মদিনায় কতিপয় দাসী বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসে। সে দাসীগুলো আবদুল্লাহ ইবনে জাফরের কাছে এনে দেখাল। তখন তিনি এক দাসীকে গান গাইতে আদেশ করলে দাসীটি গান গাইল। সেখানে ইবনে উমর রা.ও তা শুনেছিলেন। ইবনে জাফর দাসীটির দরদাম ঠিক করে কিনে নিলেন। পরে লোকটি ইবনে উমরের কাছে এসে বলল, &#8216;হে আবু আবদুর রহমান। আমি সাতশত দিরহামের বিনিময়ে দাসীটি বিক্রি করে ঠকেছি।&#8217; ইবনে উমর রা. লোকটিকে নিয়ে পুনরায় ইবনে জাফরের কাছে এসে বললেন, &#8216;সে মনে করছে সাতশত দিরহামে দাসীটি বিক্রি করে সে ঠকেছে। হয় আপনি কিছু দিরহাম তাকে বেশি দিন, না হয় বেচা-কেনা বাতিল করে তার দাসী তাকে ফেরত দিয়ে দিন।&#8217; ইবনে জাফর বললেন, &#8216;আমি দাসীটি ফেরত দেবো&#8217;।&#8221;</p>
<p>ইবনে হাযম বলেন, এতে লক্ষণীয় বিষয় হলো- ইবনে উমর রা. নিজে দাসীর গান শুনেছেন এবং একজন গায়িকা দাসীর বেচা-কেনার মধ্যস্ততাও করেছেন। এ হাদিসের সনদ সহিহ; এটি কোনো বানোয়াট জাল হাদিস নয়।<sup>১</sup></p>
<p>যারা গান হালাল মনে করেন, তারা আল্লাহ তায়ালার নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারাও দলিল দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-</p>
<blockquote><p>وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةٌ أَوْ لَهْوًا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا قُلْ مَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ اللَّهْوِ وَمِنَ</p>
<p>التِّجَارَةِ وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ</p>
<p>&#8220;যখন তারা ব্যাবসা ও ক্রীড়া-কৌতুক দেখল, তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে ছুটে গেল। বলে দিন- আল্লাহর নিকট যা আছে, তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যাবসার চেয়ে উত্তম। আর আল্লাহই উত্তম রিযিকদাতা।&#8221; (সূরা জুমুআ : ১১)</p></blockquote>
<p>আলোচ্য আয়াতে ক্রীড়া-কৌতুককে ব্যাবসার সাথে একাকার করে আলোচনা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে ব্যাবসা হালাল। (সুতরাং ক্রীড়া-কৌতুকও হালাল হওয়ার কথা।) এখানে এতদুভয় কাজকে কেবল এ কারণেই নিন্দা করা হয়েছে যে, সাহাবিরা রাসূলে কারিম সা. কে খুতবারত অবস্থায় রেখে বাইরে ব্যবসায়ী কাফেলার আগমন উপলক্ষ্যে খুশি হয়ে বাজনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা সেসব হাদিস দ্বারাও দলিল দিয়ে থাকেন, যাতে বর্ণিত হয়েছে যে- কিছু কিছু সাহাবি কার্যতই গান শুনেছিলেন এবং গান শোনাকে সমর্থনও করেছিলেন। তাঁরা এমন এক আদর্শ প্রজন্ম, যাদের অনুকরণ-অনুসরণ করলে হিদায়াত পাওয়া যায়।</p>
<p>তারা গান শোনা হালাল হওয়ার পক্ষে ইজমার কথাও বলে থাকেন, যা কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন। আমরা সে প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত: ইসলামের প্রাণসত্তা ও মৌলিক নীতিমালার আলোকে গান</strong></p>
<p><strong>ক.</strong> গান মূলত এক ধরনের মনোতুষ্টকারী উপকরণ। মানুষের মন ও বিবেক তা পছন্দ করে, মানবপ্রকৃতি তা আনন্দদায়ক মনে করে, তাদের শ্রবণেন্দ্রিয় তা শোনার প্রতি আগ্রহবোধ করে। গান কানের খোরাক, যেমনিভাবে সুস্বাদু খাবার পাকস্থলির খোরাক, সুদৃশ্য চোখের খোরাক, সুঘ্রাণ নাসিকার খোরাক। এসব পবিত্র ও উপভোগ্য জিনিসগুলো ইসলামে হারাম না হালাল?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এটা প্রসিদ্ধ যে, আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলের জন্য তাদের অপকর্মের শাস্তিস্বরূপ দুনিয়ার কিছু পবিত্র জিনিস হারাম করে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-</p>
<blockquote><p>فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا * وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِين مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا</p>
<p>&#8220;ইহুদিদের পাপের কারণে এবং আল্লাহর পথে অধিক পরিমাণে বাধা দেওয়ায় আমি তাদের জন্য হারাম করে দিয়েছি বহু পূত-পবিত্র বস্তু- যা মূলত তাদের জন্য হালাল ছিল। এটা এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল। আর এ কারণেও, তারা অন্যায়ভাবে অপরের সম্পদ জবরদখল করত। বস্তুত আমি অকৃতজ্ঞদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি বেদনাদায়ক শাস্তি।&#8221; (সূরা নিসা: ১৬০-১৬১)</p></blockquote>
<p>আল্লাহ তায়ালা সাইয়িদুনা মুহাম্মাদ সা. কে নবি হিসেবে পাঠানোর সুসংবাদ এবং তাঁর রিসালাতের শিরোনাম পূর্বের গ্রন্থগুলোতে এভাবেই দিয়েছেন-</p>
<blockquote><p>يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَزِمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ</p>
<p>وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالُ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ</p>
<p>&#8220;তিনি তাদের নির্দেশ দেবেন সৎকর্মের, বারণ করবেন দুষ্কর্ম থেকে। তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করবেন এবং নিষিদ্ধ করবেন হারাম বস্তুসমূহ। আর তাদের ওপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেবেন এবং বন্দিত্ব অপসারণ করবেন, যা তাদের ওপর বিদ্যমান ছিল।&#8221; (সূরা আরাফ: ১৫৭)</p></blockquote>
<p>সুতরাং সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ পছন্দ করে, এমন কোনো পবিত্র বস্তু ইসলামে সাধারণত হারাম করা হয়নি। যেহেতু এ দ্বীন চিরস্থায়ী ও সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত, তাই তিনি এ উম্মাহর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সকল পবিত্র জিনিস হালাল করে দিয়েছেন।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-</p>
<blockquote><p>يَسْأَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ</p>
<p>&#8220;তারা আপনার কাছে জানতে চায়- তাদের জন্য কী কী হালাল করা হয়েছে? আপনি বলে দিন- তোমাদের জন্য পূত-পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করে দেওয়া হয়েছে।&#8221; (সূরা মায়িদা: ৪)</p></blockquote>
<p>আল্লাহ তায়ালা কোনো মানুষকে এ অধিকার দেননি যে, সে নিজের জন্য বা পরের জন্য- যেসব পবিত্র জিনিস আল্লাহ তায়ালা রিযিক হিসেবে দিয়েছেন, তা হারাম ঘোষণা করবে; এমনকি এক্ষেত্রে তার নিয়ত শুদ্ধ হলেও কিংবা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন কাম্য হলেও। কারণ, হারাম-হালাল করাটা একমাত্র আল্লাহর হক ও অধিকার। এ অধিকার কোনো বান্দা প্রয়োগ করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-</p>
<blockquote><p>قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللهُ لَكُم مِّن رِزْقٍ فَجَعَلْتُم مِنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ اللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى</p>
<p>اللَّهِ تَفْتَرُونَ .</p>
<p>&#8220;হে নবি। আপনি বলে দিন- তোমরা নিজেরাই লক্ষ করে দেখো, যা কিছু আল্লাহ তোমাদের জন্য রিযিক হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন, তোমরা সেগুলোর মধ্য থেকে কোনোটাকে হারাম আর কোনোটাকে হালাল সাব্যস্ত করছ? বলো, তোমাদের কি তা আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছ?&#8221; (সূরা ইউনুস: ৫৯)</p></blockquote>
<p>আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ কর্তৃক হালালকৃত পূত-পবিত্র জিনিসকে হারাম করা এবং হারামকৃত অপছন্দনীয় জিনিসকে হালাল করা একই ধরনের অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। উভয় কর্ম আল্লাহর ক্ষোভ ও গযব নিয়ে আসে এবং এতদুভয় কর্মের কর্তাকে সুস্পষ্ট ক্ষতির গভীর গর্তে এবং চরম গোমরাহিতে নিক্ষেপ করে। আল্লাহ তায়ালা জাহিলি যুগের যেসব লোক এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত ছিল তাদের প্রসঙ্গে বলেন-</p>
<p>قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ قَتَلُوا أَوْلادَهُمْ سَفَهَا بِغَيْرِ عِلْمٍ وَحَرَّمُوا مَا رَزَقَهُمُ اللَّهُ افْتِرَاءِ عَلَى اللَّهِ قَدْ</p>
<p>ضَلُّوا وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ .</p>
<p>&#8220;যারা নিজ সন্তানদের নির্বুদ্ধিতাবশত কোনো প্রমাণ ছাড়াই হত্যা করেছে এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের যেসব রিযিক দিয়েছেন, সেগুলোকে হারাম করে নিয়ে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে, নিশ্চয় তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে; তারা সুপথগামী হয়নি।&#8221; (সূরা আনআম: ১৪০)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ.</strong> আমরা চিন্তা করলে দেখতে পাই যে, গানের প্রতি অনুরাগ ও আকর্ষণ এবং মিষ্টি সুরের প্রতি মোহ মানুষের স্বভাবজাত ও মজ্জাগত ব্যাপার। এমনকি সুরেলা গান দোলনায় ক্রন্দনরত শিশুর কান্না পর্যন্ত থামিয়ে দেয়। এ কারণেই যুগ যুগ থেকে মায়েরা এবং শিশু লালনকারী মহিলারা ও নার্সরা গান করে শিশুদের ঘুম পাড়ায়। এমনকি পশু-পাখি পর্যন্ত সুমিষ্ট সুরের মূর্ছনায় সুললিত গানের দ্বারা প্রভাবিত হয়।</p>
<p>ইমাম গাযালি তাঁর এহইয়াউ উলুমুদ্দিন গ্রন্থে বলেন, &#8220;যাকে গান প্রভাবিত করে না, সে অস্বাভাবিক, ত্রুটিপূর্ণ ও আত্মাহীন, সৌন্দর্যবোধহীন এবং প্রাণীর প্রতি মায়া-দয়াহীন মানুষ।&#8221;</p>
<p>এমনকি কিছুটা নির্বোধ স্বভাবের প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও উটকে চালকের গান এমনভাবে প্রভাবিত করে যে, সে গানের সুরের মূর্ছনায় ভারী বোঝাকে হালকা এবং দূরের কঠিন পথকে সহজ ও সংক্ষিপ্ত ভাবতে থাকে। এ সুর তার মধ্যে এক প্রকারের প্রশান্তি নিয়ে আসে। ফলে দেখা যায়- সে গান শুনতে পেলে তার গলা বাড়িয়ে দেয়, কান সজাগ করে তোলে এবং দ্রুত চলতে আরম্ভ করে, যার কারণে পিঠের ভারী বোঝা পর্যন্ত নড়াচাড়া করতে থাকে।&#8221;<sup>২</sup></p>
<p>গানের প্রতি অনুরাগ যদি স্বভাবগত ব্যাপার হয়ে থাকে, তাহলে কি এ দ্বীন মানুষের স্বভাব ও মজ্জাগত ব্যাপারের বিরুদ্ধাচরণ এবং তা প্রত্যাখ্যান করতে এসেছে? না, কখনও নয়; বরং দ্বীন এসেছে তাকে সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত করতে। তাকে যথাযথ দিক-নির্দেশনা দিতে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, &#8220;নবিগণ মানুষের স্বভাব ও ফিতরাতকে পূর্ণতা দান করতে ও সুবিন্যস্ত করতে এসেছেন; তাকে পরিবর্তন ও বিকৃত করতে আসেননি।&#8221;</p>
<p>এ কথার একটি প্রমাণ হলো- &#8220;মহানবি সা. যখন হিজরত করে মদিনায় এলেন, তখন মদিনাবাসীরা দুটি দিন উৎসব হিসেবে পালন করত। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, &#8216;এ দুটি দিন কীসের?&#8217; তারা জবাবে বলল, &#8216;আমরা এ দুদিন জাহিলি যুগ থেকেই আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে পালন করে আসছি।&#8217; তখন রাসূল সা. বললেন, &#8216;আল্লাহ তায়ালা এ দুই দিনের পরিবর্তে তোমাদের আরও উত্তম দুটি দিন উপহার দিয়েছেন- ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন&#8217;।&#8221; <sup>৩</sup></p>
<p><strong>আয়িশা রা. বলেন, &#8220;আমি নবি সা.-কে দেখলাম, তিনি আমাকে তাঁর চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। তখন আমি মসজিদে খেলাধুলারত হাবশিদের খেলা দেখছিলাম। আমি খেলা দেখে পরিতৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাকে ঢেকে রেখেছিলেন।&#8221; এক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় যে, নবি কারিম সা. বিনোদনের প্রতি উৎসাহী এক তরুণীর আগ্রহের যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>গান যদি হয় বিনোদনের অন্তর্ভুক্ত, তাহলে বিনোদন তো হারাম নয়। আর মানুষ তো সর্বদা আনন্দ ও বিনোদনবিহীন গম্ভীর হয়ে থাকতে পারে না।</p>
<p>&#8220;সাহাবি হানযালা রা. এর একবার মনে হলো, তিনি বউ-বাচ্চা নিয়ে আনন্দ-বিনোদন করার কারণে এবং রাসূলের সামনে থাকাবস্থা ও নিজের বাড়িতে থাকাবস্থার মধ্যে মনের বৈপরীত্যের কারণে মুনাফিক হয়ে গেছেন। রাসূল সা. তাকে বললেন, &#8216;হানযালা, কিছু সময়ের জন্য ওরকম হওয়া যায়&#8217;।&#8221;<sup>৪</sup></p>
<p>আলী ইবনে আবু তালিব রা. বলেন, &#8220;তোমরা তোমাদের মনকে কিছুক্ষণ পর পর প্রশান্তি দাও। কারণ, মনকে বাধ্য করা হলে তা অন্ধ হয়ে যায়।&#8221; তিনি আরও বলেন, &#8220;মানুষের শরীর যেমন পরিশ্রান্ত হয়, তেমনি মনও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং তাকে উজ্জীবিত করার কৌশল অনুসন্ধান করো।&#8221;</p>
<p>আবু দারদা রা. বলেন, &#8220;আমি বিনোদনের মাধ্যমে নিজের মনকে কখনও কখনও পরিতৃপ্ত করি- যাতে এর দ্বারা উত্তম কাজ করতে শক্তি পাই।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>যারা বলেন, গান বা খেলতামাশা (সুতরাং বর্জনীয়); ইমাম গাযালি তাদের প্রতিউত্তরে বলেন-</strong></p>
<p><strong>&#8220;হ্যা, তা অবশ্যই তা-ই। গোটা দুনিয়াটাই তো খেল-তামাশা। নারীদের সাথে সব ধরনের খুনশুটি তো খেল-তামাশাই; তবে সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে যে মিলিত হওয়া তা এরূপ নয়। তেমনিভাবে অশ্লীলতাবিহীন ক্রীড়া-কৌতুকও হালাল। রাসূল সা. স্বয়ং নিজে এবং তাঁর সাহাবিগণও সময়ে সময়ে তা করেছেন বলে বর্ণিত আছে।</strong></p>
<p>হাবশিদের বিভিন্ন কসরত প্রদর্শনের চেয়ে বেশি ক্রীড়া-কৌতুক আর কোথায় আছে? তা-ও হাদিস দ্বারা বৈধ প্রমাণিত হয়েছে। তাই আমরা বলতে চাই- ক্রীড়া-কৌতুক অন্তরকে পরিতৃপ্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত করে। যখন মনকে বাড়াবাড়ি রকম বাধ্য করা হয়, তখন তা অন্ধ হয়ে পড়ে। তাকে তৃপ্ত করা মানে কর্মমুখী করার জন্য তৈরি করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সার্বক্ষণিক দ্বীনি শিক্ষায় নিয়োজিত থাকলে জুমার দিনের ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, একদিনের ছুটি বা কর্মবিরতি বাকি দিনগুলোতে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে; সব সময় নফল নামাজে ব্যস্ত থাকলে কোনো কোনো সময় ফরজ ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণেই কিছু কিছু সময় নামাজ আদায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ, কিছু সময়ে বিরতি কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির সহায়ক, আর আনন্দ-বিনোদন কর্মশীল হতে সাহায্য করে।</p>
<p>সাধারণ মানুষ এক নাগাড়ে কর্মব্যস্ত ও সৎকর্মের কঠোর সাধনায় লিপ্ত থাকতে পারে না। কেবল নবি-রাসূলগণই তাতে টানা কর্মব্যস্ত থাকতে পারেন।</p>
<p>অতএব, আনন্দ-বিনোদন হলো হৃদয়-মনের অলসতা ও জড়তা কাটিয়ে উঠার মহৌষধ। সুতরাং তা বৈধ হওয়াই বাঞ্চনীয়। কিন্তু তা অতিরঞ্জিত হওয়া উচিত নয়। যেমন- ওষুধের ব্যবহার প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশি হওয়া উচিত নয়। কাজেই এ নিয়তে আনন্দ-বিনোদনে সম্পৃক্ত হওয়াও ইবাদত।</p>
<p>যে ব্যক্তি কিছু বিনোদনের মাধ্যমে ভালো কোনো কাজ করার প্রেরণা পায়, তার জন্য গান শোনা মুস্তাহাব হওয়া উচিত- যাতে সে এর মাধ্যমে পূর্বে উল্লিখিত উদ্দেশ্যে উপনীত হতে পারে। হ্যাঁ, এটা কামিল বা শীর্ষচূড়ায় উপনীত ব্যক্তিদের বেলায় ত্রুটি প্রমাণ করে। কারণ, কামিল লোকদের অনর্থক বিনোদনের মাধ্যমে মনে প্রশান্তি আনার প্রয়োজন হয় না। তবে দুর্জনের উত্তম কর্মও অনেক সময় সুজনের কুকর্মের সমতুল্য হয়।</p>
<p>অন্তরের চিকিৎসা, হৃদয়ে প্রশান্তির উপায় এবং তাকে সঠিকপথে পরিচালিত করার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে যারা অবগত, তারা অবশ্যই এ কথাও জানেন যে, এসব উপকরণ মনে প্রশান্তি আনার এমন মহৌষধ- যার বিকল্প নেই।&#8221;<sup>৫</sup></p>
<p>ইমাম গাযালির উপর্যুক্ত বক্তব্য অতি মূল্যবান ও বাস্তবানুগ- যা তাঁর ইসলামের মূল প্রাণসত্তাকে গভীরভাবে অনুধাবনের প্রমাণ বহন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>যারা গান বৈধ মনে করেন</strong></h4>
<p>এ-তো গেল কুরআন-হাদিস ও ইসলামের মূলনীতির আলোকে গান হালাল ও বৈধ হওয়ার দলিল। কোনো ফকিহ তা বৈধ বলে অভিমত না দিলেও এসব দলিল গান বৈধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। তবে তা বৈধ হওয়ার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন অনেক সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি ও ফকিহ।</p>
<p>মদিনাবাসীগণ তাকওয়া-পরহেজগারিতে কিংবদন্তিতুল্য হওয়া সত্ত্বেও, যাহেরি মাযহাবের অনুসারীগণ কুরআন-হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণে কড়াকড়ি করা সত্ত্বেও, সুফিগণ রুখসত বাদ দিয়ে আজিমত গ্রহণ ও কঠোর নীতি অবলম্বন করা সত্ত্বেও তারা সকলেই গান হালাল মনে করতেন।</p>
<p>ইমাম শাওকানি নাইলুল আউতার-এ বলেন, &#8220;মদিনাবাসী, যাহেরি মাযহাবের অনুসারী এবং সুফিরা গান বৈধ হওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন; এমনকি সাথে গিটার ও সেতার বাজানো হলেও।&#8221;</p>
<p>উসতায আবু মানসুর বাগদাদি আশ-শাফেয়ি গান সংক্রান্ত তাঁর এক গ্রন্থে বলেন, &#8220;আবদুল্লাহ ইবনে জাফর গান শোনার ব্যাপারে কোনো বাধা আছে বলে মনে করতেন না। তিনি তাঁর দাসীদের জন্য নিজে সুর নির্মাণ করতেন এবং তাদের কণ্ঠে সেই সুরে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান শুনতেন। আর তাও তিনি আলী রা. এর খিলাফতকালে করতেন।&#8221; তিনি কাজী শোরাইহ, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, আতা ইবনে রাবাহ যুহরি ও শাবি থেকেও অনুরূপ গান শোনার কথা বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইমামুল হারমাইন আন-নিহায়া গ্রন্থে এবং ইবনে আবিদ দুনিয়া বলেন, &#8220;ইতিহাসবিদগণ গান শোনার ব্যাপারে এমন কথাও বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর কয়েকজন দাসী ছিল- যারা সেতার বাজাতে পারত। একবার আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তাঁর কাছে গেলেন, তখন তাঁর পাশে একটি সেতার ছিল। তখন তিনি বললেন, &#8216;হে রাসূলের সাথি! আপনার পাশে ওটা কী?&#8217; উত্তরে তিনি বললেন, &#8216;ওটা হলো শাম দেশের একটা পাল্লা: এর মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি মাপা হয়&#8217;।&#8221;</p>
<p>হাফেজ আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাযম তাঁর গান সংক্রান্ত এক পুস্তিকায় তাঁর নিজের সনদে ইবনে সিরিন থেকে বর্ণনা করেন, &#8220;এক লোক কিছু দাসী নিয়ে বিক্রির জন্য মদিনায় এলেন, লোকটি ইবনে উমরের বাড়িতে মেহমান হলেন। দাসীদের মধ্যে এক দাসী বাজনা বাজিয়ে গান গাইতে পারত। তখন এক লোক এসে তার সাথে দাসীটি কেনার জন্য দরদাম করল, কিন্তু তার পছন্দ হলো না। ইবনে উমর রা. বললেন, &#8216;তুমি এদের নিয়ে এমন কারও কাছে যাও, যে এই লোকের চেয়ে তোমার জন্য বেশি উপকারী হবে।&#8217; তিনি বললেন, &#8216;তেমন লোক কে?&#8217; ইবনে উমর বললেন, &#8216;আবদুল্লাহ ইবনে জাফর।&#8217; লোকটি দাসীদের তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি তাদের মধ্য থেকে এক দাসীকে আদেশ করে বললেন, বীণা নিয়ে গান গেয়ে শোনাও। দাসীটি গান গেয়ে শোনাল। তারপর দাসীটি আব্দুল্লাহ ইবনে জাফরের কাছে বিক্রি করে লোকটি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর কাছে ফিরে এলেন এবং পুরো ঘটনাটি তাকে অবহিত করলেন।&#8221;</p>
<p>ইকদুল ফরিদ-এর লেখক বিশিষ্ট সাহিত্যিক আল্লামা আবু আমর বর্ণনা করেন, &#8220;আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একদিন ইবনে জাফরের কাছে গেলেন। তখন সেখানে এক দাসীকে দেখতে পেলেন, যার কোলে একটি সেতার ছিল। তখন তিনি ইবনে উমরকে জিজ্ঞাসা করলেন, &#8216;এতে কি আপনি কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন?&#8217; ইবনে উমর রা. জবাবে বললেন, &#8216;না, এতে সমস্যা নেই&#8217;।&#8221;</p>
<p>মাওয়ারদি মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁরা উভয়ে ইবনে জাফরের কাছে বীণা বাজানো শুনেছিলেন। আবুল ফারজ ইসফাহানি বর্ণনা করেন, &#8220;হাসসান ইবনে সাবিত রা. আজজালা আল মিলার কাছে ড্রাম বাজিয়ে তাঁর নিজের রচিত একটি কবিতাকে গান হিসেবে শুনেছিলেন।&#8221; আবুল আব্বাস মুবাররাদও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আদফাবি উল্লেখ করেছেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ খিলাফত লাভের পূর্বে তাঁর দাসীদের গান শুনতেন। ইবনে সামআনি তাউস থেকে গান শোনার অনুমতি দিতেন বলে বর্ণনা করেছেন। ইবনে কুতাইবা ও আল ইমতা গ্রন্থের লেখক উভয়ে মদিনার তাবেয়ি কাজী সাদ ইবনে ইবরাহিম ইবনে আবদুর রহমান যুহরি থেকে গান শোনার অনুমতি আছে বলে বর্ণনা করেছেন। আবু ইয়ালা আল খলিলি তাঁর ইরশাদ নামক গ্রন্থে এ অনুমতির কথা মদিনার মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে সালামা আল-মাজেশুন থেকে বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বুইয়ানি কাফালের সূত্রে বর্ণনা করেন, মালেক ইবনে আনাসের মাযহাব মতে- বীণা সহকারে গান শোনা বৈধ। আবু তালিব মাক্কি তাঁর কুতুল কলুব নামক গ্রন্থে শুবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস মিনহাল ইবনে আমরের বাড়িতে তানপুরা বাজিয়ে গান শুনেছিলেন।</p>
<p>আবুল ফযল ইবনে যাহের তাঁর গান সংক্রান্ত এক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, মদিনাবাসীদের মধ্যে বীণা বাজিয়ে গান শোনা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত ছিল না।</p>
<p>ইবনে নাহাবি তাঁর আল ওমদা নামক গ্রন্থে বলেন, ইবনে তাহির বলেছেন, গান হালাল হওয়ার বিষয়ে মদিনাবাসীদের ইজমা হয়েছে। ইবনে তাহির বলেন, সমস্ত যাহেরি মাযহাবিরাও এ অভিমত গ্রহণ করেছেন।</p>
<p>আদফাবি বলেন, সাদ ইবনে ইবরাহিম থেকে গান বৈধ হওয়া সংক্রান্ত অভিমত বর্ণনার ব্যাপারে কোনো বর্ণনাকারী দ্বিমত পোষণ করেননি। তাঁর হাদিস সকল মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন; অর্থাৎ সিহাহ সিত্তাহ তথা বুখারি, মুসলিম ও সকল সুনানে বর্ণিত হয়েছে।</p>
<p>মাওয়ারদি বীণা বাজানো হালাল হওয়ার কথা কোনো কোনো শাফেয়ি মাযহাবের অনুসারীদের থেকে বর্ণনা করেছেন। আবুল ফযল ইবনে তাহির ইসহাক ইবনে সিরাজি থেকে; আসনাবি তাঁর মুহিম্মাত গ্রন্থে বুইয়ানি ও মাওয়ারদি থেকে; ইবনে নাহাবি উসতায আৰু মানসুর থেকে; ইবনে মুলকান ওমদা গ্রন্থে ইবনে যাহির থেকে; আদফাবি শায়খ ইযযুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম থেকে; ইমতা গ্রন্থের লেখক আবু বকর ইবনে আরাবি থেকে তা বৈধ হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন। এমনকি আদফাবি তা বৈধ হওয়া সম্বন্ধে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।</p>
<p>এরা সকলেই কোনো না কোনো প্রসিদ্ধ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান গেয়ে শোনা বৈধ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।</p>
<p>আর বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গান শোনা সম্পর্কে আদফাবি আল ইমতা নামক গ্রন্থে বলেন, ইমাম গাযালি তাঁর ফিকহ গ্রন্থে তা হালাল হওয়ার পক্ষে ফকিহদের ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন। আর ইবনে তাহির এ ব্যাপারে সাহাবি ও তাবেয়িদের ইজমা সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তাজ আল ফাজারি ও ইবনে কুতাইবা এ ব্যাপারে হারামাইনবাসীদের ইজমা আছে বলে মন্তব্য করেছেন। মাওয়ারদি বলেন, হিজাযের আদিবাসীরা বছরের সেরা দিনগুলোতে পর্যন্ত-যাতে কিনা ইবাদত-বন্দেগি ও যিকির-আযকার করার আদেশ আছে- গান-বাজনা করার অনুমতি দিতেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইবনে নাহাবি &#8216;আল-উমদা&#8217; নামক গ্রন্থে বলেন-</p>
<p><strong>একদল সাহাবি ও তাবেয়ি গান শুনেছেন এবং গেয়েছেন বলে বর্ণিত আছে। সাহাবিদের মধ্যে উমর রা. গান শুনেছিলেন বলে ইবনে আবদুল বার প্রমুখ বলেছেন; উসমান রা, গান শুনেছিলেন বলে মাওয়ারদি এবং আল-বামাখ গ্রন্থের লেখক ও রাফেয়ি বলেছেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর গান শোনার কথা ইবনে আবু শাইবা বর্ণনা করেছেন।</strong></p>
<p>সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. এর গান শোনার কথা ইবনে কুতাইবা বলেছেন। আবু মাসউদ আনসারি রা.-এর গান শোনার কথা বায়হাকি বর্ণনা করেছেন। বিলাল, আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম ও উসামা ইবনে যায়েদ রা.-এর গান শোনার কথা বাইহাকি বর্ণনা করেছেন। হামযা রা.-এর গান শোনার কথা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।</p>
<p>ইবনে উমর রা. এর গান শোনার কথা ইবনে জাফর ও ইবনে আবদুল বার বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. এর গান শোনার কথা আবু তালিব মাঝি উল্লেখ করেছেন। হাসসান রা. এর গান শোনার কথা আবুল ফরজ ইস্পাহানি বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. এর গান শোনার কথা যুবাইর ইবনে বাককার বর্ণনা করেছেন। কারযা ইবনে কাব রা. এর গান শোনার কথা আল আগানির লেখক বর্ণনা করেছেন। মুগিরা ইবনে শুবা রা. এর গান শোনার কথা আবু তালিব মাক্কি বর্ণনা করেছেন। আমর ইবনুল আস রা. এর গান শোনার কথা মাওয়ারদি বর্ণনা করেছেন। আয়িশা ও রুবাই রা. এর গান শোনার কথা সহিহ বুখারি ইত্যাদিতে বর্ণিত আছে।</p>
<p>তাবেয়িদের মধ্যে যাদের গান শোনার কথা বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা হলেন- সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, সালেম ইবনে আবদুল্লাহ, উমর ইবনে হাসসান, খারিজা ইবনে যায়েদ, কাজী শুরাইহ, সাঈদ ইবনে যুবাইর, আমর আশ-শাবি, আবদুল্লাহ ইবনে আবু আতিক, আতা ইবনে আবু রাবাহ, মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব যুহরি, উমর ইবনে আবদুল আজিজ, সাদ ইবনে ইবরাহিম যুহরি প্রমুখ।</p>
<p>তাবে-তাবেয়িদের মাঝে এ সংখ্যা তো অগণিত। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধরা হলেন চার মাযহাবের ইমাম, ইবনে উয়াইনা ও শাফেয়ি মাযহাবের সকল অনুসারী প্রমুখ।&#8221; ইবনে নাহাবির কথা এখানেই শেষ। এসব কথা শাওকানি তাঁর নাইলুল আউতার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।<sup>৬</sup></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গান বৈধ হওয়ার জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে</strong></h4>
<p>আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, গান শোনা বৈধ হওয়ার জন্য বেশ কিছু জরুরি শর্ত রয়েছে- যা অবশ্যই পূরণ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>১.</strong> আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সব ধরনের গান হালাল নয়। এ বিষয়টির প্রতি আমরা পুনর্বার জোর দিতে চাই। আমরা বলতে চাই- গান হালাল হওয়ার জন্য অবশ্যই তার বিষয়বস্তু ইসলামের শিক্ষা ও শিষ্টাচারের সাথে সংগতিশীল হতে হবে। সুতরাং <strong>আবু নওয়াসের নিম্নোক্ত গান কিছুতেই বৈধ হতে পারে না-</strong></p>
<p>&#8220;আমার নিন্দা করো না, তোমার নিন্দা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করে;</p>
<p>আমার চিকিৎসা করো সেই জিনিস দিয়ে, যা নিজেই রোগ।&#8221; (অর্থাৎ মদ দ্বারা)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তেমনিভাবে কবি শাওকির এ গানও বৈধ হতে পারে না-</strong></p>
<p>&#8220;চলে গেছে রমজান,</p>
<p>অতএব, সাকি! দাও মোরে সুরার পাত্র,</p>
<p>সুরার আগ্রহে হৃদয় মোর ভারাক্রান্ত।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এর চেয়ে আরও জঘন্য হলো ইলিইয়া আবু মাযির রচিত আত-তালাসিম নামক গানের এই উক্তি-</strong></p>
<p>&#8220;এসেছি আমি এ ধরায় জানি না কোথা থেকে,</p>
<p>তবে আমি এসেছি এটা সত্য,</p>
<p>সামনে রাস্তা দেখেছি তাই চলেছি,</p>
<p>কিভাবে এসেছি? কী করে রাস্তা দেখেছি, জানি না।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কারণ, <strong>এ গানে ঈমানের মূল কথা তথা- স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, পরকাল ও নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাসকে অস্বীকার করা হয়েছে।</strong></p>
<p>অনুরূপভাবে অঞ্চলিক ভাষায় রচিত &#8216;কে মোরে বানাল&#8217; গানটিও ইলিয়া আবু মাযির গানের মতো ঈমানের মৌলিক বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে।</p>
<p>তেমনিভাবে &#8216;দুনিয়াটা সিগারেট আর সুরার পাত্র বৈ আর কী?&#8217; গানটি ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থী। কারণ, ইসলাম মাদকদ্রব্যকে নাপাক ও শয়তানের প্ররোচনার ফল বলে ঘোষণা দিয়েছে। যারা সুরা পান করে, বানায়, বিক্রি করে, বহন করে, এমনকি তা তৈরিতে যে কোনো রকমের সহযোগিতা করে, তাদের সকলকেই ইসলামে লানত ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে। তেমনিভাবে ধুমপানও একটা আপদ- তা মানুষের দেহ, মন ও অর্থের বিরাট ক্ষতি করে। এটি নানান রোগ-ব্যাধিরও কারণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যেসব গান জালিম স্বৈরাচারী ফাসিক শাসকদের প্রশংসা করে-যারা আমাদের এ উম্মাহকে শাসনের আবরণে মূলত শোষণ করেছে ও করছে- তাও ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি। কারণ, ইসলাম জালিম, জালিমদের দোসর এমনকি যারা জালিমের জুলুমের প্রতিবাদ করে না, তাদের সকলকে লানত করে। সুতরাং যে গানে তাদের প্রশংসা করা হয়, সে গান সম্বন্ধে ইসলামের অবস্থান কী ধরনের হতে পারে- তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>যে গান সীমালঙ্ঘনকারী ইভটিজার, ব্যভিচারী ও লোভী চোখের নারী কিংবা পুরুষদের প্রশংসা করে, সে গানও ইসলামি শিষ্টাচারবিরোধী। কারণ, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আহবান জানায়-</p>
<blockquote><p>قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ</p>
<p>&#8220;মুমিনদের বলুন, তারা যেন নিজ দৃষ্টিকে অবনত রাখে।&#8221; (সূরা নূর: ৩০)</p>
<p>وَقُل لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِ هِنَ</p>
<p>&#8220;আর মুমিন নারীদের বলুন, তারাও যেন দৃষ্টিকে নত রাখে।&#8221; (সূরা নূর: ৩১)</p></blockquote>
<p>নবি কারিম সা. আলী রা. কে বলেছিলেন, &#8220;হে আলী! একবার চোখ পড়ে গেলে, দ্বিতীয়বার চোখ দিয়ো না। কারণ, প্রথমবারের দৃষ্টি ক্ষমাযোগ্য হলেও, দ্বিতীয়বারের দৃষ্টি ক্ষমাযোগ্য হবে না।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>২.</strong> তা ছাড়া গান গাওয়ার পদ্ধতিও তা হালাল বা হারাম হওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো গানের বিষয়বস্তু ইসলামি মূল্যবোধ ও শিক্ষার পরিপন্থি নয়; কিন্তু গায়ক-গায়িকার গাওয়ার পদ্ধতি, গানের সুর অথবা তাদের অঙ্গভঙ্গিতে সুড়সুড়ির উপাদান থাকে: কিংবা গায়ক-গায়িকার ইচ্ছায় সুপ্ত যৌনতাকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা থাকে অথবা অসুস্থ মনের মানুষকে উত্তেজিত করার বাসনা থাকে। তাহলে গান হালালের সীমানা থেকে হারামের সীমায় উপনীত হবে কিংবা অন্তত সন্দেহজন বা মাকরুহর স্থানে চলে যাবে। এমন অনেক গান প্রচার করা হয়- যাতে গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে এমন মাদকতা ও আকর্ষণ থাকে; যা প্রবৃত্তি ও যৌনবৃত্তিকে জাগ্রত করে কিংবা প্রেম-প্রীতিতে শ্রোতা মাতাল হয়ে পড়ে। বিশেষত যুবক-যুবতিদের উত্তেজিত ও মাতাল করার জন্য এসব ধরনের উত্তেজক ক্রিয়াকাণ্ড করা হয়ে থাকে।</p>
<p>কুরআন নবি কারিম সা. এর স্ত্রীগণকে সম্বোধন করে বলে-</p>
<blockquote><p>فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ</p>
<p>&#8220;তোমরা (পরপুরুষের সাথে) কোমল ভঙ্গিতে কথা বলো না- তা করলে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন কেউ কুবাসনা করতে পারে।&#8221; (সূরা আহযাব: ৩২)</p></blockquote>
<p>সুতরাং যদি কোমল কণ্ঠস্বরের সাথে ছন্দ, সুর, মিউজিক ও উত্তেজিত করার মতো প্রক্রিয়া থাকে, তাহলে তার হুকুম কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৩.</strong> তৃতীয় আরেকটি বিষয় হলো, গানের সাথে হারাম কিছু থাকা চলবে না। যেমন- মদপান, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা ও বেহায়াপনা ইত্যাদি। প্রাচীনকাল থেকেই গান-বাজনার আসরে এসব হয়ে আসছে। যখনই গান-বাজনার অনুষ্ঠানের কথা আসে, তখনই এসব বিষয়ের কথাও মনে পড়ে। বিশেষত দাসী ও নারীদের গান-বাজনার অনুষ্ঠানে এসব হয়ে থাকেই।</p>
<p>সুনানে ইবনে মাজাহ সহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসে এ কথাই বোঝানো হয়েছে- &#8220;আমার উম্মতের কিছু লোক মদপান করবে। এমনকি মদকে তারা অন্য নামে নামকরণ করবে। তাদের সামনে গায়িকারা গান- বাজনা করবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের সহ ভূমিধস করাবেন এবং তাদের বানর ও শূকরে পরিণত করবেন।&#8221;</p>
<p>আমরা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করতে চাই। সেটি হলো- অতীতে গান শোনার জন্য গানের আসরে যাওয়ার প্রয়োজন হতো, গায়ক-গায়িকা ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গদের সাথে মেলামেশা করতে হতো। এসব আসরে প্রায়ই শরিয়ত ও দ্বীনবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হতো। কিন্তু আজকের দিনে গানের আসর ও গায়ক-গায়িকাদের থেকে দূরে অবস্থান করেও গান শোনা যায়। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি গানের হুকুমকে কিছুটা হালকা ও সহজতর করার একটা দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৪.</strong> গানের ক্ষেত্রে অন্যান্য মুবাহ ও বৈধ জিনিসের মতো অতিরঞ্জন পরিহার করা আবশ্যক। বিশেষত আবেগতাড়িত গান শোনার ব্যাপারে- যাতে প্রেম- প্রীতি নিয়ে কথা থাকে। কারণ, মানুষ কেবল আবেগসর্বস্ব প্রাণী নয়, আর আবেগও কেবল প্রেমে সীমাবদ্ধ নয়, প্রেমও কেবল নারীর সাথে সুনির্দিষ্ট নয়, নারীও শুধু দেহসর্বস্ব কোনো সত্তা নয়। এ কারণেই আবেগতাড়িত এসব প্রেমের গান কম শোনাই বাঞ্চনীয় । তাতে গা ভাসিয়ে না দেওয়াই কর্তব্য। এ আমাদের জীবনের অন্যান্য সব পরিকল্পনা ও গান শোনার মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকা আবশ্যক। দ্বীন পালন ও দুনিয়া উপভোগের মধ্যেও থাকতে হবে একটা সমতা ও ভারসাম্য। দুনিয়া পালনের ক্ষেত্রেও থাকতে হবে ব্যক্তির অধিকার ও সমষ্টির অধিকার আদায়ে সাম্য। ব্যক্তিকেও রাখতে হবে তার বৃদ্ধি-বিবেক ও আবেগের মধ্যে সামঞ্জস্যতা। তেমনিভাবে মানুষের সমস্ত আবেগ যথা- প্রেম-প্রীতি, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, সৌর্যবীর্য, সাহসিকতা, স্নেহ-মমতা, মাতৃত্ব, পিতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব, সততা ইত্যাদির মধ্যেও থাকতে হবে ভারসাম্য। কারণ, মানুষের সব ধরনের আবেগেরই রয়েছে হক ও অধিকার।</p>
<p>বিশেষ কোনো আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি অবশ্যই অপরাপর আবেগ ও অধিকারে কমতি করে ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি, আত্মা ও ইচ্ছাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এভাবে তা সমাজের অধিকার, বৈশিষ্ট্য ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। সর্বোপরি এই অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি দ্বীন, ধর্ম, নৈতিকতা ও আদর্শকে নিঃশেষ করেই হয়ে থাকে।</p>
<p>ইসলাম সব ক্ষেত্রেই এমনকি ইবাদত-বন্দেগিতেও অতিরঞ্জন এবং বাড়াবাড়ি হারাম ঘোষণা করেছে। কাজেই এ দ্বীন কী করে খেল-তামাশায় বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনকে প্রশ্রয় দেবে? তা বৈধ হলেও তাতে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকাকে কীভাবে সমর্থন করবে?</p>
<p>যারা গান-বাজনা নিয়ে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকে, তা প্রমাণ করে- তাদের মন-মস্তিষ্ক বড়ো বড়ো দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ব্যাপারে অসতর্ক। আরও প্রমাণ করে যে, তারা অনেক হক ও অধিকার আদায়কে তুচ্ছজ্ঞান করে- যা মানুষের এই সংক্ষিপ্ত জীবনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদায় করা আবশ্যক ছিল। ইবনে মুকাফফা যথার্থই বলেছেন, &#8220;আমি এমন কোনো অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি দেখিনি- যেখানে অধিকার হরণ ও হক বিনষ্টকরণ নেই।&#8221; হাদিসে আছে, &#8220;বুদ্ধিমান মানুষ কেবল তিনটি বিষয়ের প্রতিই লোভ করতে পারে- জীবনযাপনে সচ্ছলতা, পরকালের সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং হারাম নয় (হালাল) এমন আনন্দ-বিনোদন।&#8221;</p>
<p>অতএব আমাদের উচিত, এই তিনটি বিষয়ের জন্য সময়কে পরিকল্পিত ও যথার্থভাবে ভাগ করা। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন- কীসে তার জীবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করেছে? কোন কাজে তার যৌবনকাল কাটিয়েছে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৫.</strong> এ আলোচনার পর আরও কিছু বিষয় থাকে, যে ক্ষেত্রে প্রত্যেক গানের শ্রোতাকেই নিজের জন্য নিজেকে ফকিহ ও মুফতি হতে হয়। যদি গান অথবা বিশেষ কোনো গান তার প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে, তাকে অশ্লীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে সর্বদা কল্পজগতে নিয়ে যায়, তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে পশুত্বকে উজ্জীবিত করে, তখন তাকে সে গান-বাজনা পরিহার করতে হবে। তাকে সেই জানালা বন্ধ করে দিতে হবে, যে জানালা দিয়ে তার মন-মানসিকতায়, তার দ্বীন-ধর্ম ও চরিত্রের অভ্যন্তরে ফিতনার বাতাস ঢুকে পড়ে। এভাবেই তাকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সুস্থির হতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মুসলিমদের বাস্তব জীবনে গান-বাজনা</strong></h4>
<p>যারা মুসলিমদের বাস্তব অবস্থার দিকে তাকায়, তাদের জীবনযাপন দেখে তারা দ্বীনদার মুসলিমের জীবন এবং পূত-পবিত্র গান শোনার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য দেখতে পায় না।</p>
<p>একজন সাধারণ মুসলিমের শ্রবণেন্দ্রিয় শ্রুতিমধুর সুর ও কণ্ঠস্বর দ্বারা প্রতিদিন আন্দোলিত ও পরিতৃপ্ত হয়। হয়তো কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা- যা সুললিত কণ্ঠে তাজবিদ সহকারে কারীদের তিলাওয়াতের মধ্যে পাওয়া যায়। অথবা আযান দ্বারা- যা প্রতিদিন পাঁচবার সুমধুর সুরে ধ্বনিত হয়। এটা নবির যুগ থেকে প্রজন্মান্তরে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। যে সাহাবি এক সত্য স্বপ্নে আযানের নির্দেশনা পেয়েছিলেন, তিনি তা নবির কাছে বর্ণনা করলে নবিজি সা. তাকে বলেছিলেন, &#8220;তা বিলালকে শিখিয়ে দাও। কারণ, সে তোমার চেয়ে বেশি সুমধুর সুরের অধিকারী।&#8221; কিংবা মুনাজাত দ্বারা- যা সুমিষ্ট সুরে সুললিত কণ্ঠে করা হয়। ফলে হৃদয় নম্র হয় এবং অনুভূতিকে নাড়া দেয়। তেমনিভাবে নাতে রাসূলের মাধ্যমেও- যা মুসলিমরা যুগ যুগ ধরে শুনে আসছে সেই সময় থেকে, যখন রাসূল সা. এর মদিনায় আগমন উপলক্ষ্যে আনসারি মেয়েরা সুমিষ্ট কণ্ঠে গেয়েছিলেন-</p>
<p>طلع البدر علينا من ثنيات الوداع</p>
<p>وجب الشكر علينا ما دعى الله داع</p>
<p>আমার মনে পড়ে, প্রায় বিশ বছর আগে একবার এই সংগীতটি ইন্দোনেশিয়ার এক মাদরাসায় ছোটো ছোটো মেয়েদের কণ্ঠে শুনে অভিভূত হয়েছিলাম, তারা সুমধুর সুরে সমস্বরে কোরাস গাচ্ছিল। আমরা সেখানে কাতারের একটি প্রতিনিধি দল গিয়েছিলাম। এ সংগীতের সুললিত সুর তখন আমাদের চোখ অশ্রুসিক্ত ও হৃদয় আর্দ্র করে দিয়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অতীতের মুসলিমরা এমন কিছু শ্রুতিমধুর সুর আবিষ্কার করেছিলেন, যার মাধ্যমে তারা মনে প্রশান্তি আনয়ন করতেন এবং জীবনকে আনন্দে ভরে দিতেন; বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে। আমরা শৈশব ও যৌবনের প্রারম্ভে এসব সুমধুর লোকসংগীত শুনেছি, যার সবই ছিল পরিবেশ থেকে সৃষ্ট স্বভাবজাত গান, হৃদয়ের গাঁথা। তাতে তাদের মূল্যবোধ প্রতিফলিত হতো এবং এর পরিপন্থী কোনো কিছু থাকত না।</p>
<p>এর মধ্য হতে &#8216;মোয়াবিল&#8217; নামক লোকসংগীতের কথা বলা যায়। লোকেরা এসব সংগীত নিজেরা গাইত এবং তা শোনার জন্য জমায়েত হতো। তা গাইত তাদের মধ্য থেকে মিষ্টি কণ্ঠের অধিকারী কেউ। সেসব সংগীতে থাকত ভালোবাসা, প্রেম-প্রীতি, মিলন-বিরহ ইত্যাদি বিষয়। কোনো কোনো সংগীতে থাকত দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের কথা এবং মানুষের জোর-জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ইত্যাদি বিষয়ও।</p>
<p>এসব সংগীত গাওয়া হতো বাদ্যযন্ত্রের বাজনাবিহীন, কিছু কিছু গাওয়া হতো বাঁশের এক ধরনের আরগুল (Arghul) নামক বাঁশিসহ। এসব স্বভাবশিল্পীদের মধ্যে কেউ কেউ &#8216;মাওয়াল&#8217; নামক গণসংগীত রচনা করত, আর তা সুর দিয়ে নিজেই তাৎক্ষণিকভাবে গাইত।</p>
<p>এর মধ্যে আর কিছু হলো ছন্দোবদ্ধ গল্প সংবলিত পুথি। এসব পুথিসাহিত্যে জাতীয় বীরদের জীবনী গেয়ে শোনানো হতো। তাদের বীরত্ব, প্রতিরোধ ও ধৈর্যের কাহিনি শোনানো হতো। লোকেরা তা শুনত আর নিজেরাও গাইত। এমনকি অনেকে পুরো গল্পটিই মুখস্ত করে নিত। যেমন- আদহাম শারকাবির গল্প, শফিকা ও মুতাওয়াল্লির কিচ্ছা, আইয়ুব মিশরি ও ইয়াতিম সাদ ইত্যাদি।</p>
<p>এর মধ্যে আর কিছু হলো জাতীয় বীরদের জীবনীকেন্দ্রিক মহাকাব্য। যেমন- আবু যায়েদ হিলালি নামক মহাকাব্য। এ মহাকাব্যের গল্প শোনার জন্য লোকেরা আসর বসাত এবং গল্প ও এর নায়কদের গানগুলোও লোককবিদের মুখ থেকে &#8216;রাবাবা&#8217; নামক সুরে শোনা হতো। এ সুর কেবল এ জাতীয় মহাকাব্যের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। অনেকেই এসব মহাকাব্যের বিশেষ অনুরাগী ছিল। এসব মহাকাব্য গাওয়া হতো অনেকটা আজকের দিনের ধারবাহিক নাটকের মতো পর্ব পর্ব করে।</p>
<p>আরেক ধরনের গান ছিল ঈদ ও বিভিন্ন আনন্দ উৎসবে গাওয়ার জন্য। যেমন- বিয়ে, জন্মদিন, শিশুর খতনা অনুষ্ঠান, কারও আগমন, অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান, রোগমুক্তি উৎসব এবং হাজিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ইত্যাদির গান।</p>
<p>সাধারণ মানুষ নিজে নিজেই অনেক ধরনের গান ও সুর নির্মাণ করে এবং তা বিভিন্ন উৎসবে গায়, যেমন- ফসল কাটার গান, নবান্নের গান ইত্যাদি।</p>
<p>শ্রমিক ও কামলাদের কোরাস গাওয়াও অনুরূপ, যারা নির্মাণকাজ করতে গিয়ে বা কোনো ভারী কিছু উত্তোলন করতে গিয়ে সমস্বরে- হেইয়্যা, হেইয়্যা, আল্লাহর নামে হেইয়্যা, আরও জোরে হেইয়্যা ইত্যাদি গান গায়। এসব গান গাওয়ার পেছনে সাহাবাদের যুগ থেকে শরিয়তের ভিত্তি আছে। সাহাবায়ে কেরাম যখন মসজিদের নববি নির্মাণের জন্য দূর থেকে নিজেদের কাঁধে পাথর বহন করে নিয়ে আসছিলেন, তখন তারা সমস্বরে কোরাশ গাচ্ছিলেন-</p>
<blockquote><p>اللهم إن العيش عيش الآخرة فأغفر للأنصار والمهاجرة</p>
<p>&#8220;হে আল্লাহ! জীবন তো নেই আখিরাতের জীবন ছাড়া,</p>
<p>ক্ষমা করে দিন সকলকে তাদের, আনসার-মুহাজির যারা।&#8221;</p></blockquote>
<p>এমনকি মায়েরা যখন তাদের শিশুদের আদর করেন বা তাদের ঘুম পাড়াতে চান, তখনও তারা ঘুমপাড়ানির গান গেয়ে থাকেন। এরূপ কিছু বিখ্যাত ঘুমপাড়ানি গানের একটি হলো-</p>
<blockquote><p>يا رب ينام يا رب ينام</p>
<p>&#8220;হে রব! ঘুম পড়িয়ে দাও। হে রব! ঘুম এনে দাও।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমার এখনও রমজান মাসে সেহরির সময়ের ডাকুয়াদের কথা মনে পড়ে। তারা মধ্য রাতের পর লোকদের ঘুম থেকে জাগানোর জন্য ঢোল বাজিয়ে সুরেলা কন্ঠে ঘুম জাগানো গান গাইত।</p>
<p>এখানে আরও যে চমৎকার গানের কথা উল্লেখ করা যায় তা হলো- হকার ও ফেরিওয়ালাদের গান। তারাও তাদের পণ্য বিক্রি করার জন্য সুর দিয়ে চমৎকার গান গায়। এসব গানের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করার জন্য পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে। যেমনটি সাধারণত কাপড় বিক্রেতা হকার এবং সবজি বিক্রেতা ফেরিওয়ালারা করে থাকে।</p>
<p>এভাবেই আমরা দেখতে পাই যে, গান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ওপপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মানুষ এমনি এমনি স্বাভাবিকভাবেই তা গেয়ে যায়। এর সাথে দ্বীনের কোনো সংঘাত আছে বলে তারা মনে করে না। আর আলেমরাও এসব সামাজিক গানের মধ্যে নিন্দা করার মতো কিছু আছে বলে মনে করেন না; বরং দেখা যায়- এসব গানে প্রায়ই ধর্মের বাণী, ঈমানের কথা, মূল্যবোধ ও উত্তম চরিত্রের কথা একাকার হয়ে আছে। তাতে আছে তাওহিদের বাণী, আল্লাহর জিকির, দুআ, দরুদ ইত্যাদি।<sup>৭</sup></p>
<p>এসব আমি মিশরেও দেখেছি, শ্যাম ও অন্যান্য আরব দেশসমূহেও দেখেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> ড. মাহফুজুর রহমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকাঃ</strong></p>
<p>১. ইবনে হাযম, মুহাল্লা, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৬৯।</p>
<p>২. গাযালি, এহইয়াউ উলুমুদ্দিন।</p>
<p>৩. আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ি।</p>
<p>৪. মুসলিম।</p>
<p>৫. এহইয়াউ উলুমুদ্দিন, পৃষ্ঠা ১১৫২-১১৫৩।</p>
<p>৬. শাওকানি, নাইলুল আউতার (বৈরুত দারুল জিল), খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৬৪-২৬৬।</p>
<p>৭. সামাজিক গানে ধর্মীয় দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কিছু সাধারণত পাওয়া যায় না। তবে কান্নার জন্য ভাড়াখাটুনি মহিলারা যেসব গান গেয়ে থাকে, তাতে কান্না উদ্রেককারী, ভয়ভীতি সৃষ্টিকারী এবং বিপদগ্রস্ত লোকদের ধৈর্য হারানোর ও আল্লাহর ফয়সালা মেনে না নেওয়ার মতো উপাদান থাকে- যা শরিয়তে নিন্দনীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-first-part/"><strong>&lt;&lt; প্রথম পর্ব</strong></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-second-part/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14763</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামে মিউজিক দৃষ্টিভঙ্গি (প্রথম পর্ব)</title>
		<link>https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-first-part/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-first-part/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 31 Aug 2024 11:14:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14756</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম নান্দনিকতার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। ইসলাম মানুষের সৌন্দর্য উপলব্ধিকারী ইন্দ্রিয়কে সজীব করতে চায়। কিছু কিছু নান্দনিকতা মানুষের শ্রবণেন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কিছু দর্শনেন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত। অন্যান্য ইন্দ্রিয়সমূহের সাথেও কিছু কিছু নান্দনিকতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমি এখন গান সম্বন্ধে আলোচনা করতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম নান্দনিকতার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। ইসলাম মানুষের সৌন্দর্য উপলব্ধিকারী ইন্দ্রিয়কে সজীব করতে চায়। কিছু কিছু নান্দনিকতা মানুষের শ্রবণেন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কিছু দর্শনেন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত। অন্যান্য ইন্দ্রিয়সমূহের সাথেও কিছু কিছু নান্দনিকতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমি এখন গান সম্বন্ধে আলোচনা করতে চাই, হোক তা মিউজিক সহকারে বা মিউজিকবিহীন। এখানে আমরা সেই বিখ্যাত প্রশ্নটির উত্তর আলোচনা করতে চাই- গান ও মিউজিক সম্বন্ধে ইসলামের হুকুম কী?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গান ও মিউজিক সম্বন্ধে ইসলামের হুকুম কী?</strong></h4>
<p>এটি একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তরে মুসলিমরা দ্বিধাবিভক্ত। জবাবের দ্বিধাবিভক্তির কারণে তাদের আচার-আচরণও বিভিন্ন ধরনের হয়েছে। তাদের কেউ সব ধরনের গান ও মিউজিক কান পেতে শোনে। তারা এরকম দাবিও করে যে, গান অপরাপর হালাল বস্তুর মতো একটি। এটি হালালই। কারণ, আল্লাহ পাক এটাকে তাঁর বান্দাদের জন্য হারাম করেননি।</p>
<p>আবার কেউ যেকোনো ধরনের গানের শব্দ কানে এলেই রেডিও বন্ধ করে দেন কিংবা নিজের কান বন্ধ করে নেন। তারা বলেন, গান হলো শয়তানের বাঁশি ও বেহুদা কথা, যা আল্লাহর যিকির ও নামাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে। বিশেষত গায়ক যদি হয় কোনো নারী। কারণ, তাদের মতে নারীর কণ্ঠস্বর গান ছাড়াই সতরের অন্তর্ভুক্ত। আর যদি তা গানের হয় তা হলে (তা হরাম হওয়ার কথা সহজেই অনুমেয়)। তারা তাদের অভিমতের পক্ষে কুরআনের কয়েকটি আয়াত, রাসূলের কিছু হাদিস এবং কিছু আলেমের অভিমত ও উক্তি দলিল হিসেবে পেশ করেন। আবার তাদের কেউ যেকোনো ধরনের মিউজিক প্রত্যাখ্যান করেন, এমনকি রেডিও টেলিভিশনে সংবাদের পূর্বে প্রচারিত মিউজিক পর্যন্ত বর্জন করেন।</p>
<p>তৃতীয় আরেক দল এ উভয় দলের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। তারা কখনও এক পক্ষে, আবার কখনও অন্য পক্ষে অবস্থান নেন। তারা অবশ্য এ বিষয়ে আলেমদের কাছে প্রশান্তিদায়ক চূড়ান্ত ফতোয়া কামনা করেন। কারণ, বিষয়টি মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। বিশেষত শ্রবণীয় ও দর্শনীয় প্রচারমাধ্যম মানুষের বাড়িঘরে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় প্রবেশ করেছে: এর ফলে গান-মিউজিকও ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাদের শ্রবণেন্দ্রিয়কে আকৃষ্ট করছে। তাই তারা গান ও মিউজিক সম্পর্কে মনে প্রশান্তি আসার মতো ফয়সালা প্রত্যাশা করেন।</p>
<p>মিউজিক সহ ও মিউজিক ছাড়া গান এমন একটা বিষয় যা নিয়ে আলেমদের মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। তারা কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন, আবার কিছু বিষয়ে মতভেদে লিপ্ত রয়েছেন।</p>
<p>তারা ওইসব গান হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন- যাতে অশ্লীলতা ও ফাসিকি বিদ্যমান এবং যা গুনাহর দিকে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ, গানের কথাই তো মূল- তার মধ্যে যা ভালো তা ভালোই, আর যা মন্দ তা মন্দই। যেসব উক্তিতে হারাম কিছু রয়েছে তা হারাম। অতএব, তার সাথে যদি ছন্দ, সুর ও হৃদয়গ্রাহী কিছু থাকে, তাহলে তার অবস্থা কীরূপ হতে পারে? তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>একইভাবে তারা অশ্লীলতা ও ফাসিকিমুক্ত গান হালাল হওয়ার ব্যাপারেও ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন- যা বাদ্যযন্ত্রমুক্ত ও উত্তেজক নয় এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গাওয়া হয়ে থাকে। আর তা যদি হয় বৈধ আনন্দ-বিনোদনের স্থানে, যথা- বিয়ের অনুষ্ঠানে, কাউকে স্বাগত জানানোর সময়, ঈদের দিন ইত্যাদিতে। তবে শর্ত হলো- তা পরপুরুষের সামনে কোনো নারীর কণ্ঠে গাওয়া যাবে না।</p>
<p>এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু সুস্পষ্ট কুরআনের আয়াত ও হাদিস রয়েছে; আমরা পরে তা আলোচনা করব।</p>
<p>এ ছাড়া বাকি অন্যান্য গানের ব্যাপারে তারা সুস্পষ্ট মতপার্থক্যে লিপ্ত। তাদের মধ্যে কেউ সব ধরনের গানকে হালাল বলেন- তা বাদ্যযন্ত্র সহ হোক কিংবা বাদ্যযন্ত্র বিহীন। আর কেউ কেউ সব ধরনের গান-বাজনা হারাম ঘোষণা করেন- তা বাদ্যযন্ত্র সহ হোক বা বাদ্যযন্ত্র ছাড়া। এমনকি তারা তা কবিরা গুনাহ বলেও উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>বিষয়টির গুরুত্বের কারণে এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা জরুরি বলে মনে করি। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ প্রসঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করাও আবশ্যক মনে করি- যাতে মুসলিমরা অকাট্য দলিলের অনুসরণ করে হালাল ও হারাম আলাদা করে নিতে পারে। তাদের যেন কারও কথার অন্ধ অনুসরণ করতে না হয়। তারা যেন দলিলের ভিত্তিতে এ বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হতে পারে এবং যথার্থ অবস্থান গ্রহণ করতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সাধারণত সবকিছুই হালাল</strong></h4>
<p>আলোচনার শুরুতে আমাদের একটি মূলনীতি জেনে নেওয়া আবশ্যক। তা হলো- আলেমগণ এ সিদ্ধান্তে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, মূলত সকল বস্তু হালাল। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-</p>
<blockquote><p>هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا</p>
<p>&#8220;তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।&#8221; (সূরা বাকারা: ২৯)</p></blockquote>
<p>কাজেই সুস্পষ্ট বিশুদ্ধ নস (কুরআন-সুন্নাহর উক্তি) কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত ইজমা ছাড়া কোনো কিছু হারাম হতে পারে না। অতএব, নস ও ইজমা না থাকলে; অথবা নস সুস্পষ্ট, কিন্তু সহিহ না হলে; কিংবা সহিহ, কিন্তু সুস্পষ্ট না হলে; সে নস কোনো কিছু হালাল হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে না। এ অবস্থায় বস্তুটি বিস্তৃত হালালের গণ্ডিতেই থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-</p>
<blockquote><p>وَقَدْ فَضَلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ</p>
<p>&#8220;তোমাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছে, তা বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলোও হালাল যদি তোমরা নিরুপায় হয়ে যাও।&#8221; (সূরা আনআম: ২৯)</p></blockquote>
<p>রাসূল সা. বলেছেন, &#8220;যা আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছেন তা হারাম। আর যেসব বিষয়ে নিরবতা অবলম্বন করেছেন তা ক্ষমাকৃত। সুতরাং তোমরা আল্লাহর ক্ষমাকৃত বস্তু গ্রহণ করো। কারণ, আল্লাহ কোনো কিছু ভুলে যান না।&#8221;</p>
<p>অতঃপর রাসূল সা. তিলাওয়াত করেন- وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا &#8211; &#8216;তোমার রব কোনো কিছু ভুলে যান না&#8217; আয়াতটি।”<sup>১</sup> রাসূল সা. আরও বলেছেন, &#8220;আল্লাহ তায়ালা কিছু কাজ ফরজ করে দিয়েছেন, তোমরা তা কখনও বর্জন করেবে না। আর কিছু ব্যাপারে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা লঙ্ঘন করবে না। তিনি দয়াপরবশ হয়ে (ভুলে গিয়ে নয়) কিছু ব্যাপারে নীরব থেকেছেন, সেসব ব্যাপারে অনুসন্ধান করবে না।<sup>২</sup></p>
<p>এটি যেহেতু শরিয়াহর একটি মূলনীতি, তাই কোন নস বা দলিলের ওপর ভিত্তি করে কেউ গান হারাম ঘোষণা করেছেন, আবার কেউ গানকে বৈধ ঘোষণা করেছেন- তা জানা আবশ্যক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গান হারাম ঘোষণাকারীদের দলিল ও তার পর্যালোচনা</strong></h4>
<p><strong>ক.</strong> গান হারাম ঘোষণাকারীগণ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও কোনো কোনো তাবেয়ি থেকে বর্ণিত এক বর্ণনার ওপর নির্ভর করেছেন। তারা নিম্নোক্ত আয়াতকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে গান হারাম বলে মন্তব্য করেছেন-</p>
<blockquote><p>وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهُوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَ هَا هُزُوًا أُولَئِكَ</p>
<p>لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِين</p>
<p>&#8220;এক শ্রেণির লোক মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা (লাহওয়াল হাদিস) সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তা দ্বারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এদের জন্যই অবমাননাকর শাস্তি।&#8221; (সূরা লুকমান: ৬)</p></blockquote>
<p>তারা এ আয়াতের لَهُوَ الْحَدِيثِ (অবান্তর কথাবার্তা)-কে গান বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এ ব্যাখ্যার পর্যালোচনায় ইমাম ইবনে হাযম বলেন, &#8220;কয়েকটি কারণে এ দলিল গ্রহণযোগ্য নয়-</p>
<p><strong>এক. রাসূল সা. ছাড়া আর কারও কথা হুজ্জত বা প্রমাণ নয়।</strong></p>
<p><strong>দুই. অপরাপর সাহাবি ও তাবেয়িগণ এ ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত করেছেন।</strong></p>
<p><strong>তিন. স্বয়ং আয়াতের বাক্যাবলিই তাদের এ ব্যাখ্যাকে বাতিল করে। কারণ তাতে বলা হয়েছে- &#8216;এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে।&#8217; নিঃসন্দেহে যারা এ কাজ করবে তারা তো কাফিরই গণ্য হবে। কেননা, তারা আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রুপের লক্ষ্যবস্তু বানায়।&#8221;</strong></p>
<p>তিনি আরও বলেন, &#8220;কোনো মানুষ যদি এ উদ্দেশ্যে আল-কুরআনও খরিদ করে যে, তা দ্বারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করবে, তাহলে তো সে-ই কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে এরূপ কর্মেরই নিন্দা করেছেন।</p>
<p>আর যারা অবান্তর কথাবার্তা বা গান আনন্দ-বিনোদন ও মনে প্রশান্তি আনার জন্য খরিদ করে, আর এর মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্য না থাকে- এ আয়াতে তাদের নিন্দা করা হয়নি। অতএব, তাদের উপর্যুক্ত বক্তব্যের সাথে আয়াতের সম্পর্ক নেই বলে প্রমাণিত হলো।</p>
<p>তেমনিভাবে যারা কুরআন তিলাওয়াত, হাদিস অধ্যয়ন, অবান্তর কথাবার্তা, গানবাজনা কিংবা অন্য যেকোনো কাজে ব্যস্ত থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়, তারা ফাসিক ও আল্লাহর নাফরমান। আর যারা উপর্যুক্ত যেকোনো কাজে সময় কাটায়, কিন্তু কোনো ফরজ কাজ থেকে গাফেল হয়ে পড়ে না তারা অবশ্যই সৎকর্মশীল।&#8221;<sup>৩</sup></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ.</strong> তারা মুমিনের প্রশংসায় অবতীর্ণ এ আয়াতকেও দলিল হিসেবে নিয়েছেন-</p>
<blockquote><p>وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ</p>
<p>&#8220;যখন তারা (মুমিনরা) অনর্থক কোনো কথাবার্তা শুনে, তা এড়িয়ে যায়। (সূরা কাসাস: ৫৫)</p></blockquote>
<p>তাদের মতে গানও اللَّغْوَ বা অনর্থক কথাবার্তার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।</p>
<p>এ বক্তব্যের পর্যালোচনায় বলা যায়, এ আয়াতের স্বাভাবিক অর্থ হলো- এখানে اللَّغْوَ বা অনর্থক কথাবার্তা বলতে গালাগালি, ভর্ৎসনা, তিরস্কার জাতীয় মন্দ কথা বোঝানো হয়েছে। আয়াতের বাকি অংশ তা-ই প্রমাণ করে-</p>
<blockquote><p>وَإِذَا سَمِعُوا اللَّهُوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا تَبْتَغِي</p>
<p>الْجَاهِلِينَ</p>
<p>&#8220;তারা যখন অবাঞ্ছিত কথাবার্তা শুনে, তা এড়িয়ে যায় এবং বলে- আমাদের জন্য আমাদের কাজ এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সাথে জড়িত হতে চাই না।&#8221; (সূরা কাসাস: ৫৫)</p></blockquote>
<p>মূলত আয়াতটি রহমানের বান্দাহদের প্রশংসায় আসা এ আয়াতের মতোই-</p>
<blockquote><p>وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا</p>
<p>&#8220;যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে- তোমাদের প্রতি সালাম।&#8221; (সূরা ফুরকান: ৬৩)</p></blockquote>
<p>যদি আমরা ধরেই নিই যে, উক্ত আয়াতের বা অনর্থক কথাবার্তা গানকেও শামিল করে; তাহলেও আমরা দেখতে পাই যে, আয়াতটি গান শোনা থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব প্রমাণ করে, ওয়াজিব প্রমাণ করে না। কারণ, لغو শব্দটি باطل শব্দের মতোই &#8216;অনর্থক&#8217; অর্থ দেয়। আর অনর্থক কিছু শোনা হারাম নয়, যতক্ষণ না কারও হক বিনষ্ট হয় বা তা কোনো ওয়াজিব কর্ম থেকে বিরত রাখে।</p>
<p>ইবনে জুরাইয থেকে বর্ণিত আছে, তিনি গান শোনা বৈধ মনে করতেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, &#8216;গান কিয়ামত দিবসে আপনার সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে, না অসৎকর্মের?&#8217; তিনি বললেন, &#8216;তা না সৎকর্মের আর না অসৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, তা তো لغو বা অনর্থক কথার মতোই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-</p>
<blockquote><p>لا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ</p>
<p>&#8220;আল্লাহ পাক তোমাদের বা অর্থহীন শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না।” (সূরা বাকারা: ২২৫, সূরা মায়িদা: ৮৯)</p></blockquote>
<p>ইমাম গাযালি বলেন, &#8220;যদি আল্লাহর নামে অর্থহীন শপথ করার কারণে (যাতে দৃঢ় প্রত্যয় ও ইচ্ছা থাকে না এবং বিরোধিতা করার চিন্তাভাবনাও থাকে না) আল্লাহ তায়ালা কাউকে পাকড়াও না করেন; তা হলে কি করে ভাবতে পারি যে, গান গাওয়ার জন্য পাকড়াও করবেন?&#8221;<sup>৪</sup></p>
<p>আমরা বলতে চাই, সব গান لغو বা অর্থহীনও নয়। গানের হুকুম হবে তার গায়ক ও শ্রোতার নিয়ত অনুযায়ী। সৎ নিয়ত খেলাধুলা ও রসিকতাকেও ইবাদত এবং সৎকর্মে পরিণত করে। আর মন্দ নিয়ত বাহ্যত ইবাদতকে ধ্বংস ও পণ্ড করে দেয়, যেমন প্রদর্শনেচ্ছাযুক্ত ইবাদত- &#8220;আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা ও বাহ্য আমলের দিকে তাকান না; তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও প্রদর্শন ইচ্ছাহীন আমলের দিকে।&#8221;<sup>৫</sup></p>
<p>আমরা এখানে ইমাম ইবনে হাযমের আল-মুহাল্লায় উল্লিখিত একটি চমৎকার উক্তি উল্লেখ করতে চাই। তিনি কথাটি যারা গান নিষেধ করেন, তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করেই বলেছেন, &#8220;তারা বলেন, গান কি হক না নাহক? তৃতীয় কোনো কিছু হওয়ার তো অবকাশ নেই! কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-</p>
<blockquote><p>فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ .</p>
<p>&#8220;হকের পর গোমরাহি ছাড়া তো আর কিছু নেই।&#8221; (সূরা ইউনুস: ৩২)</p></blockquote>
<p>এ প্রসঙ্গে আমাদের জবাব হলো- রাসূল সা. বলেছেন, &#8216;আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকেই তাই পাবে যা সে নিয়ত করে।&#8217;<sup>৬</sup> সুতরাং যে আল্লাহর নাফরমানির উদ্দেশ্যে গান শোনার নিয়ত করবে, সে ফাসিক। অন্যসব বিষয়েও একই কথা। আর যে মানসিক প্রশান্তি পেতে, আল্লাহর ইবাদত- বন্দেগির জন্য নিজেকে সতেজ করতে কিংবা ভালোকাজে নিজেকে সক্রিয় করার উদ্দেশ্যে গান শুনবে, সে আল্লাহর আনুগত্যকারী সৎকর্মশীল বলে গণ্য হবে। তার এ কর্মও সত্য ও হক বলে পরিগণিত হবে।</p>
<p>আর যে ব্যক্তি গান শোনার ক্ষেত্রে কোনো ইবাদত বা নাফরমানির নিয়ত করে না, তার সে গান শোনা হবে অর্থহীন বৈধ কর্ম। যেমন- বাগানে পয়চারি করা, বাড়ির আঙিনায় নিরিবিলি বসে থাকা, পোষাকে বিভিন্ন কালার ব্যবহার ইত্যাদি কাজ। এগুলো যেমন বৈধ, গান শোনাও ঠিক তেমনই বৈধ।&#8221;<sup>৭</sup></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ.</strong> তারা নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারাও দলিল পেশ করেন- <strong>&#8220;মুমিনের জন্য তিন ধরনের খেল-তামাশা ছাড়া বাকি সব খেল-তামাশা বাতিল। নিজ স্ত্রীর সাথে খেল-তামাশা, নিজের ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দান এবং নিজের তীর থেকে তীর নিক্ষেপ করা।&#8221;</strong><sup>৮</sup></p>
<p>গান যেহেতু এই তিনটির বাইরের বিনোদন, সুতরাং তা বাতিল ও অবৈধ।</p>
<p>যারা গান বৈধ বলে অভিমত পোষণ করেন, তারা এর জবাবে বলেন- উপর্যুক্ত হাদিসটি দুর্বল। আর হাদিসটি সহিহ হলেও তা গান হারাম হওয়ার দলিল হবে না। কারণ, হাদিসে ব্যবহৃত &#8216;বাতিল&#8217; শব্দটি হারাম বোঝায় না; বরং তা অর্থহীন কর্ম বোঝায়। আবু দারদা রা. বলেন, &#8220;আমি নিজেকে কখনও কখনও বাতিল কাজে ন্যস্ত করি- যাতে এর মাধ্যমে হক কাজ করার শক্তি পাই।&#8221;</p>
<p><strong>তা ছাড়া হাদিসটির উদ্দেশ্য কেবল এ তিনটি কাজকে সীমাবদ্ধ করাও নয়। কারণ, সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মসজিদে নববিতে হাবশিদের খেলা প্রদর্শন এবং তা থেকে আনন্দ উপভোগ করাও উপযুক্ত তিন কর্মের বাইরের একটি খেলাধুলা। তা ছাড়া বাগানে বা পার্কে ঘোরাফেরা করা, পাখ-পাখালির কাকলি শোনা অথবা খেলাধুলা করা ইত্যাদি- যা দ্বারা সাধারণত মানুষ নিষ্কলুষ আনন্দ-বিনোদন উপভোগ করে তার কিছুই হারাম নয়; যদিও এসব কাজকে বাতিল ও অনর্থক কাজ বলা যায়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঘ.</strong> তারা ইমাম বুখারি কর্তৃক আবু মালিক ও আবু আমির আশআরির বরাতে মুআল্লাক সনদে রাসূল সা. থেকে বর্ণিত হাদিস দ্বারাও দলিল দিয়ে থাকেন। সে হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, &#8220;অচিরেই আমার উম্মাহর মধ্যে এমন কিছু লোক হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ ও মাআযিফকে হালাল মনে করবে।&#8221;</p>
<p>তাদের মতে &#8216;মাআযিফ&#8217; শব্দের অর্থ হলো বাদ্যযন্ত্র ও খেলাধুলা।</p>
<p>এ হাদিসটি সহিহ বুখারিতে থাকলেও ধারাবাহিক সনদে বর্ণিত নয়; বরং মুআল্লাক তথা বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত। এ কারণেই ইমাম ইবনে হাযম এ হাদিসটি দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তা ছাড়া তিনি আরও বলেছেন, এ হাদিসটির সনদ এবং মতনও ইজতিরাব তথা বিভ্রাটমুক্ত নয়।</p>
<p>হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি হাদিসটি মুত্তাসিল (ধরাবাহিক সনদযুক্ত) প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করেছেন। কার্যতই তিনি তা নয়টি মুত্তাসিল সনদে বর্ণনাও করেছেন। তবে সব সনদেই এমন একজন রাবি আছেন, যার সম্পর্কে হাদিস যাচাই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ নানান কথা বলেছেন। তিনি হলেন হিশাম ইবনে আম্মার।<sup>৯</sup> তিনি দামেশকের একজন খতিব, আলেম, মুহাদ্দিস ও কারি ছিলেন। ইবনে মুঈন ও আল আজালি তাকে নির্ভরযোগ্য রাবি বলে মন্তব্য করলেও ইমাম আবু দাউদ তার সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন- &#8220;তিনি ভিত্তিহীন চল্লিশটি হাদিস বর্ণনা করেছেন।&#8221;</p>
<p>আবু হাতিম বলেন, &#8220;তিনি সত্যবাদী, তবে তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। তার কাছে যা কিছু দেওয়া হয়েছিল তিনি সবকিছু পড়েছিলেন, আর যা কিছু শুনানো হয়েছিল তা সবই গ্রহণ করেছিলেন।&#8221; ইবনে সাইয়ারও তার সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করেছেন।</p>
<p>ইমাম আহমাদ তার সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, &#8220;তিনি বাউন্ডুলে, হালকা স্বভাবের মানুষ।&#8221; ইমাম নাসায়ি বলেন, &#8220;তাকে নিয়ে তেমন সমস্যা নেই।&#8221; (তবে এ বক্তব্য তাকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ করে না)। হাফেজ যাহাবি তার পক্ষাবলম্বন করা সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, &#8220;তিনি সত্যবাদী, বেশি হাদিস বর্ণনাকারী। তবে তার বর্ণিত এমন কিছু হাদিস আছে যা মুনকার (দুর্বল) পর্যায়ের।<sup>১০</sup></p>
<p>তাঁর সম্বন্ধে আরও মন্তব্য করা হয়েছে যে, &#8220;তিনি পারিশ্রমিক ছাড়া কোনো হাদিস বর্ণনা করতেন না।&#8221;</p>
<p>এ ধরনের ব্যক্তির হাদিস বিতর্কিত বিষয়ে গ্রহণ করা যায় না। বিশেষত তা যদি হয় এমন বিষয়, যা সর্বসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত।</p>
<p>এ তো গেল হাদিসটি সহিহ হওয়ার ব্যাপারে কথা। হাদিসটির তাৎপর্য ও অর্থের ব্যাপারেও নানা কথা আছে। হাদিসে উল্লেখিত &#8216;মাআযিফ&#8217; শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী- সে ব্যাপারেও কোনো ঐকমত্য হয়নি। বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো- খেলাধুলা। এ অর্থটি অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্টবাচক। আর কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ হলো- ছয় বা আট তারের গোলাকৃতির বাদ্যযন্ত্র বিশেষ।</p>
<p>যদি ধরে নিই যে তার অর্থ বাদ্যযন্ত্র, তাহলেও বুখারির উক্ত মুআল্লাক হাদিসটির বাক্য সুস্পষ্টভাবে মাআযিফ বা বাদ্যযন্ত্রকে হারাম প্রমাণ করে না। কারণ, ইবনে আরাবির মতে, “হালালজ্ঞান করবে- বাক্যটির দুই ধরনের অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম অর্থ হলো, তারা মনে করবে এসব কর্ম হালাল। আর দ্বিতীয় অর্থটি হলো রূপক; অর্থাৎ এসব জিনিস তারা ব্যাপকহারে ব্যবহার করবে। যদি প্রথম অর্থটি অর্থাৎ &#8216;হালালজ্ঞান করবে&#8217; এটাই এ হাদিসের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তো তারা কাফির হয়ে যাবে! কারণ, ইজমা মতে নিশ্চিত হারাম জিনিসকে যথা- মদ, যিনা, ইত্যাদিকে হালাল বলে বিশ্বাস করা কুফরি।&#8221;</p>
<p>আর যদি আমরা মেনে নিই যে, তা হারাম বোঝায়, তাহলে তা থেকে কি বোঝা যায় যে, উক্ত সবকিছু যথা- যিনা, রেশম, মদ, বাদ্যযন্ত্র সম্মিলিতভাবেই হারাম? নাকি প্রত্যেকটি আলাদা আলাদাভাবেই হারাম? প্রথম অর্থটি সঠিক ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। কারণ হাদিসটি প্রকৃতপক্ষে এমন একদল মানুষের স্বভাব বোঝানোর জন্য ব্যক্ত হয়েছে, যারা লাল রজনিতে মদ্য পান করে মাতাল হয়ে থাকে। নারী, মাদকদ্রব্য, গান-বাজনা, রেশমি পোশাক ও ব্যভিচার ইত্যাদিতে মত্ত থাকে।</p>
<p>ইবনে মাজাহ হাদিসটি আবু মালেক আশআরি থেকে নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেন, &#8220;আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক মদ পান করবে, যারা একে অন্য নাম দেবে। তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকাদের গান গাওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের নিয়ে পৃথিবী ধ্বংস করবেন এবং তাদের মধ্য হতে বানর ও শূকর বানানো হবে।&#8221; হাদিসটি ইবনে হিব্বান তাঁর সহিহ-তে এবং ইমাম বুখারি তার তারিখ-এ বর্ণনা করেছেন।</p>
<p>আর যারাই হাদিসটি হিশাম ইবনে আম্মারের সূত্র ছাড়া অন্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তারা তাতে মূলত মদ্যপানের জন্য তিরস্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আর &#8216;মাআযিফ&#8217; বা বাদ্যযন্ত্রের কথা তার অনুগামী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঙ.</strong> যারা গান হারাম বলে অভিমত পোষণ করেন, তারা আয়িশা রা. এর নিন্মোক্ত হাদিস দ্বারাও দলিল দিয়ে থাকেন- &#8220;আল্লাহ তায়ালা গায়িকা দাসীর বেচাকেনা, তার মূল্য গ্রহণ এবং তাকে গান শেখানো হারাম করেছেন।&#8221;</p>
<p>এর জবাব হলো-</p>
<p><strong>প্রথমত:</strong> হাদিসটি দুর্বল, এমনকি গায়িকা দাসীর ক্রয়-বিক্রয় সম্বন্ধে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে তা সবই দুর্বল।<sup>১১</sup></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত:</strong> ইমাম গাযালি বলেন, হাদিসে যে দাসীর কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা সেসব দাসীর কথাই বোঝানো হয়েছে, যারা পানশালায় পুরুষদের গান গেয়ে শোনায়। পরনারীর জন্য ফাসিক-ফাজির যাদের ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা আছে তাদেরকে গান শোনানো হারাম। তারা ফিতনা বলতে নিষিদ্ধ কর্ম বুঝিয়ে থাকেন। এ হাদিস থেকে দাসী কর্তৃক তার মালিককে গান শোনানো হারাম সাব্যস্ত করা যায় না; বরং মালিক ছাড়া অন্য কাউকে শোনানো- যদি তাতে ফিতনার সম্ভাবনা না থাকে, তাও হারাম প্রমাণ হয় না। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা রা.-এর বাড়িতে দুই দাসীর গান করা সংক্রান্ত হাদিসটি তাই প্রমাণ করে।<sup>১২</sup></p>
<p><strong>তৃতীয়ত:</strong> ওইসব গায়িকা দাসীরা ছিল দাসপ্রথার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যে দাসপ্রথাকে ইসলাম ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল। ইসলামের এই চিন্তা-দর্শনের সাথে ইসলামি সমাজে তাদের বাকি রেখে তাদের বেচা-কেনা করা সংগতিশীল ছিল না। কাজেই হাদিসে যদি গায়িকা দাসীদের মালিক হওয়া ও বেচা-কেনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কোনো বাণী এসে থাকে, তাহলে তা এজন্য যে, ঘৃণিত দাসপ্রথা যেন বিলুপ্ত হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>চ.</strong> তারা আরও দলিল দেন নাফে কর্তৃক ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিস দ্বারা। তাতে বলা হয়েছে, &#8220;ইবনে উমর রা. একবার এক রাখালের বাঁশির শব্দ শুনতে পান, তখন তিনি তাঁর দুই কানে আঙুল দিয়ে রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য রাস্তা দিয়ে তাঁর বাহন চালিয়ে যান। তখন তিনি বলছিলেন, &#8216;নাফে, তুমি কি (বাঁশির শব্দ) শুনতে পাচ্ছ?&#8217; তখন আমি বলেছিলাম, &#8216;হ্যাঁ।&#8217; তখন তিনি আরও কিছু দূর চলে গেলেন। পরিশেষে যখন আমি বললাম, &#8216;এখন শোনা যাচ্ছে না&#8217;, তখন তিনি তাঁর দুই কান থেকে আঙুল বের করে নিলেন এবং বাহন পূর্বের রাস্তায় নিয়ে এলেন। তারপর তিনি বললেন, &#8216;আমি রাসূল সা. কে এক রাখালের বাঁশির শব্দ শুনে এরূপ করতে দেখেছিলাম&#8217;।&#8221;<sup>১৩</sup></p>
<p>ইমাম আবু দাউদ বলেন, &#8220;এ হাদিসটি মুনকার বা দুর্বল।&#8221;</p>
<p>এ হাদিসটি সহিহ হলে তা গান হারামকারীদের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তাদের পক্ষে নয়। কারণ, বাঁশির শব্দ শোনা হারাম হলে রাসূল সা. কখনও ইবনে উমর রা.-কে তা শুনতে দিতেন না। আর ইবনে উমর রা.ও তা হারাম মনে করলে নাফেকে তা শুনতে দিতেন না; বরং নবি কারিম সা. অবশ্যই এ নিষিদ্ধ কাজ বন্ধ করার জন্য আদেশ দিতেন। নবি কারিম সা. ইবনে উমর রা. কে তা শুনতে দেওয়া থেকে প্রমাণ হয় যে, তা শোনা হালাল।</p>
<p>আর রাসূল সা. এর তা না শোনার ব্যাপারটি ছিল দুনিয়ার অনেক মুবাহ বা বৈধ কাজ থেকে তাঁর বিরত থাকার মতোই। যেমন- তিনি কোনো কিছুর ওপর ঠেক লাগিয়ে পানাহার পরিহার করতেন, তাঁর কাছে দিনার ও দিরহাম রেখে ঘুমাতেন না ইত্যাদি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ছ.</strong> গান হারাম মন্তব্যকারীরা আরও দলিল দিয়েছেন সেই বর্ণনা দ্বারা- যাতে বলা হয়েছে, &#8220;গান মানুষের মনে মুনাফিকি জন্ম দেয়।&#8221; এটি রাসুল সা. -এর হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়। এটি জনৈক সাহাবি বা কোনো কোনো তাবেয়ির কথা বলে প্রমাণিত।</p>
<p>এটি এমন কিছু মানুষের বক্তব্য যারা মাসুম নন; আর এ বক্তব্যের সাথে দ্বিমত করেছেন এমনই আরও কিছু মানুষ। কিছু মানুষ বিশেষ করে সুফিদের কেউ কেউ বলেছেন- গান মানুষের হৃদয়কে নম্র করে। আল্লাহর নাফরমানির জন্য মনের মধ্যে বিবেকের দংশন সৃষ্টি করে। মানুষকে লজ্জিত করে। আল্লাহর ভালোবাসা লাভের জন্য উৎসাহিত করে।</p>
<p>এ কারণে তারা নতুন প্রেরণা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি, প্রত্যয়কে শাণিত করা এবং অন্তরের আগ্রহকে মজবুত করার জন্য গানকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তারা আরও বলেছেন, এটি এমন একটি বিষয়- যা বাস্তব জ্ঞান অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। যারাই তা শোনেন, শুধু তারাই তা বোঝেন। কারণ, বাস্তব চাক্ষুস অভিজ্ঞতা আর কারও কাছ থেকে শোনা কথা এক নয়।</p>
<p>ইমাম গাযালি বলেন, &#8220;হাদিসের &#8216;মুনাফিকি জন্ম দেয়&#8217; বাক্যটি শ্রোতার ক্ষেত্রে নয়; বরং গায়কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে জানিয়েছেন। যদি গায়কের উদ্দেশ্য হয় অন্যের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করা এবং তার নিজের গান মানুষের মাঝে জনপ্রিয় করা, তবে গান তার হৃদয়ে নিফাকি সৃষ্টি করে। সে যদি মানুষকে তার গানের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য মুনাফিকি করতে থাকে, তবে গান তার হৃদয়ে তা জন্ম দেয়।&#8221;</p>
<p>ইমাম গাযালি আরও বলেন, &#8220;এ যুক্তিতে গানকে হারাম সাব্যস্ত করা যায় না। কারণ, ভালো ও সুন্দর পোশাক পরিধান, চমৎকার ঘোড়ায় আরোহণ, সৌন্দর্য উপকরণ ব্যবহার ইত্যাদিকে হারাম বলা যায় না। অথচ এগুলোতেও রিয়া থাকে। হৃদয়ে মুনাফিকি কেবল আল্লাহর নাফরমানি থেকে সৃষ্টি হয় এমন নয়; বরং অনেক মুবাহ ও বৈধ কাজও যার ওপর সাধারণত মানুষের দৃষ্টি পড়ে- তা অনেক সময় নিফাকি সৃষ্টির ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাব রাখে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>জ.</strong> গান হারাম বলে মন্তব্যকারীরা নারীদের গানকে হারাম বলে প্রমাণ করতে বহুল প্রচলিত এ কথাটিও বলেন যে, &#8220;নারীর কণ্ঠস্বরও সতরের অন্তর্ভুক্ত।&#8221; নারীরা রাসূল সা. কে বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবাদের সামনেই নানা প্রশ্ন করতেন। সাহাবারাও উম্মুল মুমিনিনদের কাছে বিভিন্ন ফতোয়া জিজ্ঞাসা করার জন্য যেতেন, আর তাঁরাও ফতোয়া দিতেন, তাদের সাথে কথাও বলতেন। কিন্তু কেউ কখনও বলেননি যে, মা আয়িশা রা. ও অন্যান্যদের এ কর্ম পর্দা লঙ্ঘন, যা ওয়াজিব ছিল। অথচ নবি কারিম সা.  এর স্ত্রীদের প্রতি পর্দা অবলম্বনের ব্যাপারে বিশেষ ধরনের কড়া নির্দেশ ছিল- যা অন্যদের প্রতি অত কঠোর ছিল না। আল্লাহ তায়ালা তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন-</p>
<blockquote><p>يَانِسَاءِ النَّبِيِّ لَسْتُنَ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاء إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ</p>
<p>مرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا .</p>
<p>&#8220;নবির স্ত্রীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও। সুতরাং পরপুরুষের সাথে কোমল স্বরে কথা বলো না, যেন যার অন্তরে রোগ আছে সে প্রলুব্ধ না হয়; বরং প্রথামত ন্যায়সংগত কথা বলবে।&#8221; (সূরা আহযাব: ৩২)</p></blockquote>
<p>যদি বলা হয়, এ এটি সাধারণ কথা-বার্তা প্রসঙ্গে প্রযোজ্য, গানের ক্ষেত্রে নয়, তাহলে আমরা বলব- বুখারি মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবি কারিম সা. দুই দাসীর গান শুনেছিলেন, তাদের গান করতে নিষেধ করেননি। আবু বকর রা. যখন তাদের নিষেধ করলেন, তখন বলেছিলেন, &#8220;তাদের গাইতে দাও।&#8221; ইবনে জাফর ও অন্যান্য সাহাবি এবং তাবেয়িগণও দাসীদের গান শুনেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঝ.</strong> তারা তিরমিযিতে আলী রা. থেকে মারফু সনদে বর্ণিত একটি হাদিস দ্বারাও দলিল দিয়ে থাকেন। সে হাদিসে আছে- &#8220;আমার উম্মত যখন পনেরোটি কাজ করতে থাকবে তখন তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসবে।&#8221; তার মধ্যে উল্লেখ আছে- &#8220;যখন তারা গায়িকা দাসী গ্রহণ করবে এবং বাদ্যযন্ত্র তৈরি করবে।&#8221; এ হাদিসটি সকল মুহাদ্দিসের ঐকমত্যে একটি দুর্বল হাদিস। সুতরাং তা দলিল দানের উপযোগী নয়।</p>
<p>মোদ্দা কথা, যেসব নস দ্বারা গান হারাম হওয়ার দলিল দেওয়া হয়, সেসবের কোনোটি হয়তো সহিহ, কিন্তু সুস্পষ্ট নয়। অথবা কোনো কোনোটি স্পষ্ট, কিন্তু সহিহ নয়। গান সুস্পষ্টভাবে হারাম বলার মতো রাসূলে কারিম সা. থেকে একটি মারফু হাদিসও সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি। তাদের বর্ণিত সকল হাদিসকে জাহেরি, মালেকি, হাম্বলি ও শাফেয়ি মাযহাবের এক দল আলিম দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন।</p>
<p>কাজী আবু বকর ইবনে আরাবি তাঁর আল-আহকাম গ্রন্থে বলেন, &#8220;এ ক্ষেত্রে হারাম বলার মতো কোনো হাদিস সহিহ বলে প্রমাণিত হয়নি।&#8221; ইমাম গাযালি ও ইবনে নাহাবিও উমদা নামক গ্রন্থে অনুরূপ কথা বলেছেন। ইবনে তাহির তাঁর আস-সিমা নামক গ্রন্থে বলেন, &#8220;এর (গানের হাদিসের) একটি বর্ণও সহিহ বলে প্রমাণিত হয়নি।&#8221;</p>
<p>ইমাম ইবনে হাযম বলেন, &#8220;এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসও সহিহ বলে প্রমাণিত নয়। বরং এর সব কিছুই জাল ও বানোয়াট। আল্লাহর কসম! যদি এর সবগুলো হাদিস বা একটি হাদিস কিংবা একাধিক হাদিস রাসুলে কারিম সা. থেকে নির্ভরযোগ্য রাবিদের বর্ণনা মতে সহিহ বলে প্রমাণিত হতো, তাহলে আমরা তা গ্রহণ করতে মোটেও দ্বিধা করতাম না।&#8221;<sup>১৪</sup></p>
<p><sup> </sup></p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> ড. মাহফুজুর রহমান।</p>
<h4 style="text-align: right;"><strong><sup> <a href="https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-second-part/">দ্বিতীয় পর্ব &gt;&gt;</a></sup></strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকা:</strong></p>
<p>১. হাকিম আবু দারদা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন এবং সহিহ বলে মন্তব্য করেছেন। হাদিসটি বাযযারও বর্ণনা করেছেন। আর আয়াতাংশটির সূত্র- (সূরা মারইয়াম: ৬৪)।</p>
<p>২. দারে কুতনি কর্তৃক আবু সালাবা আল খশনি থেকে বর্ণিত। হাফেজ আবু বকর মুসআলি তাঁর আমানি নামক গ্রন্থে আর ইমাম নববি তাঁর আরবাঈন গ্রন্থে হাদিসটি হাসান বলে মন্তব্য করেছেন।</p>
<p>৩. ইবনে হাযম, আল মুহাল্লা, (মুনিরিয়া) ৯, পৃ. ৬০।</p>
<p>৪. গাযালি, এহইয়াউ উলুমুদ্দিন, (মিশর দারুশ শাবাব), কিতাবুস সিমা, পৃ. ১১৪৭।</p>
<p>৫. আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত। মুসলিম কিতাবুল বির ওয়াছিলা ওয়াল আদাব, বাবু তাহরিমু যুলমিল মুসলিম।</p>
<p>৬. বুখারি, মুসলিম। উমর ইবনে খাত্তাব রা. বর্ণিত।</p>
<p>৭. ইবনে হাযম, আল মুহাল্লা, খণ্ড ৯, পৃ. ৬০।</p>
<p>৮. হাদিসটি চার সুনানে বর্ণিত হয়েছে। এর সনদে ইজতিরাব বা বিভ্রাট রয়েছে। হাফেজ ইরাকি এ কথা বলেন এহইয়াউ উলুমুদ্দিন-এর তাখরিজে।</p>
<p>৯. ইবনে হাজার, তাগলিকুত তালিক, খণ্ড ৫. পৃষ্ঠা ১৭-২২, বৈরুত: মাকতাবাতুল ইসলামি থেকে প্রকাশিত।</p>
<p>১০. যাহাবি, মিযানুল ইতিদাল, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০২। ইবনে হাজার, তাহযিবুত তাহযিব, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫১-৫৪।</p>
<p>১১. দেখুন, ইবনে হাযমের আল মুহাল্লা-র গান সম্বন্ধে আলোচনায় এসব হাদিস নিয়ে তাঁর পর্যালোচনা- খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৫৯।</p>
<p>১২. গাযালি, এহইয়াউ উলুমুদ্দিন, পৃষ্ঠা ১১৪৮।</p>
<p>১৩. আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ।</p>
<p>১৪. ইবনে হাযম, আল মুহাল্লা, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৫৯।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 805px; top: 10504.5px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/perspectives-on-music-in-islam-first-part/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14756</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিমারিস্তান তথা প্রাচীন ইসলামিক হাসপাতাল: আই সার্জারি ও মিউজিক থেরাপির মতো অধুনা চিকিৎসা কৌশলের অগ্রদূত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bimaristan-ancient-islamic-hospital-pioneer-of-eye-surgery-and-music-therapy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bimaristan-ancient-islamic-hospital-pioneer-of-eye-surgery-and-music-therapy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 Aug 2024 11:48:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14714</guid>

					<description><![CDATA[চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন গ্রীক, ফার্সি ও ভারতীয় সভ্যতায় রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত পদ্ধতির প্রচলন খুজে পাওয়া যায়। এতদসত্ত্বেও, বর্তমানে একটি আধুনিক হাসপাতাল বলতে যা বুঝায় আর এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর রয়েছে এক স্বতন্ত্র ইতিহাস, যেটি সাধারণ মানুষদের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন গ্রীক, ফার্সি ও ভারতীয় সভ্যতায় রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত পদ্ধতির প্রচলন খুজে পাওয়া যায়। এতদসত্ত্বেও, বর্তমানে একটি আধুনিক হাসপাতাল বলতে যা বুঝায় আর এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর রয়েছে এক স্বতন্ত্র ইতিহাস, যেটি সাধারণ মানুষদের কাছে অজানাই রয়ে গেছে।</p>
<p>গ্রীকদের অ্যাসক্লেপিয়া বা নিরাময় মন্দির আর রোমানদের ভ্যালেটুডিনারিয়া বা সামরিক হাসপাতাল থেকে থাকলেও বর্তমানের আধুনিক হাসপাতালগুলোর সাথে সামঞ্জস্য পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে উঠা মধ্যযুগীয় হাসপাতালগুলোর।</p>
<p>পারস্য আর আরবদের &#8216;বিমারিস্তান&#8217; কিংবা তুর্কিদের &#8216;দারুশশিফা&#8217;, মূলত ছিল একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি মতবাদের প্রবর্তা যা পরবর্তীতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বিমারিস্তান শব্দটি এসেছে  ফার্সি ভাষা থেকে। &#8216;বিমার&#8217; বলতে বুঝায় &#8216;অসুস্থ ব্যক্তি&#8217; আর &#8216;স্তান&#8217; হচ্ছে &#8216;স্থান&#8217;; এ থেকে &#8216;বিমারিস্তান&#8217; এর অর্থ দাঁড়ায় &#8216;অসুস্থদের স্থান&#8217;।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইউরোপে  খ্রিস্টানদের  গীর্জাগুলিতে অসুস্থদের চিকিৎসা করার সুবিধা থাকলেও চিকিৎসা পদ্ধতি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পেরেছিল না। এ দিক থেকে মধ্যযুগীয় ইসলামী সভ্যতায় ছিল চিকিৎসা সেবার একটি বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা যা আধুনিক হাসপাতালগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। <strong>বিমারিস্তানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ইসলামের প্রাচীনতম উদাহরণ দেখা যায় রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সময়ে ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে খন্দক যুদ্ধের সময়। সেসময় রুফাইদা আল আসলামিয়া নামক একজন মহিলা সাহাবী একটি তাবুতে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন।</strong></p>
<p>পরবর্তীতে, ভ্রাম্যমাণ বিমারিস্তানের এই ধারণাটি অনেক বিস্তৃত হয়। ইসলামি সভ্যতার শহরের কেন্দ্রগুলিতে থাকতো স্বেচ্ছাসেবীরা, পাশাপাশি থাকতো সার্বক্ষণিক ভেষজ ঔষধের সরবরাহ, ফার্মেসি এবং চিকিৎসকগণ। সব রোগীকেই তার জাতি, ধর্ম, পুরুষ-নারী বা অসুস্থতা নির্বিশেষে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হতো, কাউকেই ফিরিয়ে দেওয়া হতো না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সর্বপ্রথম সবচেয়ে বড় বিমারিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে এবং পরবর্তী শতাব্দীতে আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশীদের সময়কালে গ্রানাডা, কায়রো এবং বাগদাদের শহরগুলিতে আরও বেশ কয়েকটি বিমারিস্তান স্থাপিত হয়। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে, শুধুমাত্র মুসলিম কর্ডোভায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটির মতো হাসপাতাল ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিনামূল্যে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা</strong></h4>
<p>যে বিষয়টি এই স্থাপনাগুলিকে এত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য করে তোলে তা হল, এগুলি এমন সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যখন সাধারণ হাসপাতালের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিমারিস্তানগুলো সেই সময়ে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করত এবং রোগীকে কোনো ধরনের সেবামূল্য পরিশোধ করতে হতো না। মানসিক রোগ এবং সংক্রামক রোগ সহ সকল ধরনের অসুস্থতায় জাতি, ধর্ম, পুরুষ-নারী কিংবা অসুস্থতার ধরণ নির্বিশেষে কোনও রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হতো না।</p>
<p>ভিন্ন ভিন্ন রোগের জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকার পাশাপাশি উদ্বেগ কিংবা মানসিক অস্থিরতাগ্রস্ত রোগীদেরকেও শারীরিক অসুস্থতাগ্রস্ত রোগীদের মতো সমান গুরুত্ব সহকারে চিকিত্সা সেবা প্রদান করা হতো, যেখানে পাশ্চাত্য এই সাম্প্রতিককালে এসে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্বের সাথে দেখছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_14715" aria-describedby="caption-attachment-14715" style="width: 866px" class="wp-caption aligncenter"><img fetchpriority="high" decoding="async" class="wp-image-14715 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture2.jpg" alt="" width="866" height="488" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture2.jpg 602w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture2-300x169.jpg 300w" sizes="(max-width: 866px) 100vw, 866px" /><figcaption id="caption-attachment-14715" class="wp-caption-text">দামেস্কের নূর আল-দিন জেঙ্গির বিমারস্তানের মাঝের দিকে ছিল একটি পানির ফোয়ারা এবং একটি বাগান আর এর পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের চিকিংসার জন্য ছিল আলাদা আলাদা কক্ষ ( যা বর্তমান হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ড সিস্টেমের মতো)। (যিরার আলী)</figcaption></figure>
<p>বিমারিস্তানের রোগী এমনকি শিক্ষানবিশরাও হতো মুসলিম, ইহুদি কিংবা খ্রিস্টানদের মধ্য থেকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আটাশ জন পর্যন্ত চিকিৎসক কর্মরত থাকতেন। বেশিরভাগ হাসপাতালে ফার্মাসি থাকতো যেগুলোতে অনেক দূর-দূরান্ত, যেমন, ভারত থেকে আমদানিকৃত ঔষধও পাওয়া যেতো। বেশির ভাগ হাসপাতাল দান বা ওয়াকফ-অনুদানের অর্থায়নে পরিচালিত হতো। ওয়াকফ গ্রহণের সময় একটি আইনী চুক্তি করা হতো যাতে বিমারিস্তান পরিচালনার জন্য নির্ধারিত শর্তাবলী থাকতো। মূলত এই চুক্তির নথিগুলিই ছিল বিমারিস্তানের দ্বার এবং পরিষেবাগুলি সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখার নিশ্চয়তাস্বরূপ।</p>
<p>বড় বড় সভ্যতার রাজধানীসমূহ, যেখানে থাকতো বহু জাতি ও সম্প্রদায়ের বাস ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ, যেমন বাগদাদ, দামেস্ক বা ফেজের মতো শহর গুলোর শাসক ও অভিজাত শ্রেণীর ব্যাক্তিগণ জনসাধারণের উপকারের জন্য এই ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করার একটা বাধ্যবাধকতা অনুভব করতেন।</p>
<p>বিমারিস্তান, মাদ্রাসা কিংবা হাম্মাম (গোসলখানা) কেবলমাত্র সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান-ই বৃদ্ধি করতো না, বরং এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ দাতব্য কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা সে-সময়কার শাসকদের আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিলো।</p>
<p>জেঙ্গি সুলতান নূর-আল-দিন জেঙ্গি দ্বারা নির্মিত দামেস্কের &#8216;নূর-আল-দিন&#8217; হাসপাতাল দ্বাদশ শতাব্দীর বিমারিস্তানের একটি চমৎকার উদাহরণ যা জনসাধারণের প্রতি সুলতানের বিশাল প্রচেষ্টার নিদর্শন।</p>
<figure id="attachment_14716" aria-describedby="caption-attachment-14716" style="width: 778px" class="wp-caption aligncenter"><img decoding="async" class="wp-image-14716" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture3.jpg" alt="" width="778" height="438" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture3.jpg 602w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture3-300x169.jpg 300w" sizes="(max-width: 778px) 100vw, 778px" /><figcaption id="caption-attachment-14716" class="wp-caption-text">সিদি ফ্রেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১২৮৬ সালে এবং ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত নিঃস্ব ও মানসিকভাবে অসুস্থদের জন্য একটি এতিমখানা হিসেবে কার্যকর ছিল। (যিরার আলী)</figcaption></figure>
<p>আরও পশ্চিমে, মরক্কোর পুরনো শহর ফেজে, আরেকটি অনন্য ধরনের বিমারিস্তানের নিদর্শন পাওয়া যায়। মারিনি রাজা ইউসেফ ইবনে ইয়াকুব ১২৮৬ সালে সিদি ফ্রেজে বিমারিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল নিঃস্ব এবং মানসিকভাবে অসুস্থদের জন্য আশ্রয়স্হল; যেটি ১৯৪৪  সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল এবং ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।</p>
<p>এটি কেবল মাত্র অসুস্থ মানুষদেরই সেবা দিতো না। এটি ছিল একটি &#8216;স্টোর্ক হসপিটাল&#8217; যা অসুস্থ ও আহত পাখিদেরও সেবা প্রদান করতো। মানুষ এবং প্রাণীর প্রতি এই ধরনের সেবা কার্যক্রম সম্পদশালী ও ক্ষমতাশীল ব্যাক্তিদের বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ ব্যতিত সম্ভব ছিলো না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দক্ষিণ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিমারিস্তান গুলো এতটাই অগ্রগামী ও জনপ্রিয় ছিলো যে এসব স্থানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেবা গ্রহণ ও শিক্ষাদানের জন্য রোগী এবং স্কলারগণ আসতেন। যেমন, আন্দালুসিয় স্কলার &#8216;ইবনে রুশদ&#8217; একটি বিমারিস্তানে শিক্ষাদানের জন্য কর্ডোভা ছেড়ে মরক্কোতে গিয়েছিলেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চিকিৎসার ধরণ</strong></h4>
<p>বিমারিস্তান ছিল মধ্যযুগীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগান্তকারী পরিবর্তন গুলোর মধ্যে অগ্রগামী যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলো সার্জারী, এনাটমি ও ডিজিজ স্ট্যাডি; একই সাথে এটি মানসিক সমস্যার মতো অপ্রতীয়মান বিষয়ের প্রতিও যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছিলো।</p>
<p>আই সার্জারী বা চোখের অস্ত্রপচার  (বিশেষ করে ক্যাটার‍্যাক্ট বা ছানি অপারেশন) ছিল ইসলামী চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সফলতার গল্পগুলোর মধ্যে একটি। আধুনিক অস্ত্রপচারের জনক আন্দালুসীয় স্কলার আবু আল কাশিম আল জাহরাভী (আলবুকাসিস) চিকিৎসা পদ্ধতির উপর ত্রিশ খন্ডের এনসাক্লোপিডিয়া রচনা করেন, যা অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে ব্যবহৃত হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আলো, বাদ্যযন্ত্র ও প্রবাহমান পানির ধ্বনির দ্বারা চিকিৎসা</strong></h4>
<p>মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের নতুন এক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হতো। তাদেরকে সাধারণ রোগীদের থেকে ভিন্ন জায়গায় রাখা হতো, তাদের চিকিৎসায় ঔষধ ব্যবহার করা হতো না, বরং আবসস্হলের বিশেষ পরিবেশই ছিল তাদের নিরাময়ের মাধ্যম। প্রতিকার হিসেবে ব্যবহৃত হতো পর্যাপ্ত আলো, সুমধুর ধ্বনি (বাদ্যযন্ত্র কিংবা প্রবাহমান পানির শব্দ), পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ বাতাস নয়তোবা আলাপচারিতা।</p>
<p>বিমারিস্তানের নিয়ম অনুযায়ী কোনো রোগী পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগে বিমারিস্তান ছেড়ে যেতে পারতো না।</p>
<p>চিকিৎসা পদ্ধতির মূলে ছিলো বিমারিস্তানগুলোর স্থাপনাশৈলী ও অবস্থান। উদাহরণ স্বরুপ সেলজুক সালতানাতের সময়কার দারুশশিফাগুলোর কথা বলা যায়, যেগুলো বাগানের মধ্যে কিংবা আশেপাশে তৈরি করা হতো। প্রকৃতির নির্মলতাই সুস্থতার নিয়ামক হিসেবে কাজ করতো।</p>
<figure id="attachment_14718" aria-describedby="caption-attachment-14718" style="width: 780px" class="wp-caption aligncenter"><img decoding="async" class="wp-image-14718" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture4.jpg" alt="" width="780" height="439" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture4.jpg 602w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture4-300x169.jpg 300w" sizes="(max-width: 780px) 100vw, 780px" /><figcaption id="caption-attachment-14718" class="wp-caption-text">রোগীদের জন্য শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিমারিস্তানগুলো প্রায়শই মূল শহরের বাইরে তৈরি করা হতো, যার উদাহরণ হিসেবে এখনো টিকে আছে পঞ্চাদশ শতাব্দীতে তৈরীকৃত তুরস্কের এদিরনের এই বিমারিস্তানটি। (যিরার আলী)</figcaption></figure>
<p>সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ কর্তৃক নির্মিত একটি প্রখ্যাত দারুশশিফা ছিল তুরস্কের উত্তর-পশ্চিম অংশের শহর এদিরনেতে। যদিও এটি এখন আর চলমান নেই, কিন্তু এর বিশাল আকৃতি ও স্থাপত্যশৈলীই ইঙ্গিত করে মানসিক চিকিৎসাকে এখানে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হতো।</p>
<p>এর অবস্থান ছিলো শহরের সীমানার বাইরে। কেননা এর চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকাংশেই ছিল সুর ও সুগন্ধি নির্ভর। যে কারণে এর অবস্থান অটোম্যান রাজধানীর ব্যস্ত শহরের যানজট ও কোলাহল থেকে দূরে থাকাই সমীচীন ছিল। বলা বাহুল্য যে, নান্দনিকতা ছিলো দারুশশীফা ও বিমারিস্তানগুলোর স্থাপনাশৈলীর অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানসিক রোগের সঠিক চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা। দশম শতাব্দীতে পারস্যের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও দার্শনিক &#8216;ইবনে সীনা&#8217; তৎকালীন উপেক্ষিত অদৃশ্য রোগ তথা মানসিক রোগ (যেমন, ভালোবাসা কেন্দ্রিক কষ্ট) নিয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা প্রদান শুরু করেন। তিনি &#8216;সাইকোসিস&#8217; কে অন্যান্য মানসিক রোগ থেকে আলাদা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।</p>
<p>তার সবচেয়ে বিখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়া &#8220;The Canon of Medicine&#8221;  সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে ছিল অপ্রতিদ্বন্দী ও অতুলনীয়, যা অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সারা বিশ্বের মেডিকেল ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_14719" aria-describedby="caption-attachment-14719" style="width: 726px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14719" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture5.jpg" alt="" width="726" height="409" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture5.jpg 602w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture5-300x169.jpg 300w" sizes="(max-width: 726px) 100vw, 726px" /><figcaption id="caption-attachment-14719" class="wp-caption-text">এদিরনের এই দারুশশীফার মতোই দারুশশীফাগুলো মসজিদের সাথে সংযুক্ত থাকতো; এ যেন নিরাময়ের সাথে আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন। (যিরার আলী)</figcaption></figure>
<p>এক্ষেত্রে পারস্যের আরো একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন &#8216;আবু জায়েদ আল-বালখি&#8217; যার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো নবম শতাব্দীতে রচিত ‘Sustenance of the Soul’। গ্রন্থটির প্রায় অর্ধেক অংশেই তিনি মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটিতে তিনি যৌক্তিকভাবে দেখিয়েছেন যে, মানসিক অসুস্হতার চিকিৎসা শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এতে বালখি (Bulkhy) ডিপ্রেশন, এনজাইটি (anxiety) এবং ওসিডি (obsessive Compulsive disorder)  বা সূচিবাই রোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে এগুলোকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি ডিপ্রেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন- পরিবেশগত ও জীনগত, এবং এদের চিকিৎসার জন্য ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন৷।</p>
<p>এরপর থেকে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া শুরু হয় এবং লোকেদের যে একটি বিশ্বাস ছিল যে রোগ বা অসুস্থতা পাপের কারনে হয়- এ থেকে মানুষ বেরিয়ে আসে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>মিউজিক থেরাপি (</strong><strong>Music Therapy)</strong></h4>
<p>ইসলামী চিন্তাধারার অনেক গুলো ধারায় বিশেষ করে সুফিবাদে মিউজিককে আধ্যাত্নিকতার সম্মিলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দার্শনিক ও সঙ্গীত তাত্ত্বিক &#8216;আবু নাসর আল-ফারাবি&#8217; নবম শতাব্দীতে মিউজিকের উপর একটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। এতে তিনি মিউজিকের  সৃষ্টিতাত্ত্বিক গুণাবলী উপস্থাপন এবং আত্মা ও শরীরের উপর এর থেরাপিউটিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।</p>
<p>তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, মিউজিক কিভাবে তালের ছন্দ-লয়ের তারতম্যের সাথে সাথে অনুভূতির পুনর্জ্জীবন বা সতেজতা দান করে; যা যেকোনো ধরনের সমস্যাকে দুরীভূত করতে পারে। এমনকি রোগীর শরীর, মন ও আত্মার যেকোনো ধরনের ভারসাম্যহীন অবস্থাকে নিরাময় করতে পারে (গ্রিক-রোমান মেডিসিনের এর মূলনীতির উপর ভিত্তি করে)।</p>
<p>প্রতিটি সুর ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, যেমন, আনন্দ, তৃপ্তি, স্বাচ্ছন্দ্য, দুঃখ, ভয়, তন্দ্রা ইত্যাদি।</p>
<figure id="attachment_14720" aria-describedby="caption-attachment-14720" style="width: 741px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14720" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture6.jpg" alt="" width="741" height="417" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture6.jpg 602w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture6-300x169.jpg 300w" sizes="(max-width: 741px) 100vw, 741px" /><figcaption id="caption-attachment-14720" class="wp-caption-text">আল &#8211; মানসুরী, কায়রো; এটি ১২৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যার মূল পানির ফোয়ারা নীল নদের সাথে সংযুক্ত ছিলো। (যিরার আলী)</figcaption></figure>
<p>ফারাবি তার গ্রন্থ , কিতাব আল-মুসিকা আল-কাবির (<em>Kitab al-Musiqa al-Kabir)</em>  এ এক সূক্ষ্ণ গাণিতিক সূত্র প্রণয়ন করেন যা আরব এবং অটোমান মিউজিক থেরাপির মূল ভিত্তি তৈরী করে এবং একইসাথে বর্তমান ইউরোপের মিউজিক থেরাপির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।</p>
<p>পরবর্তীতে ওসমানীয়রা নির্দিষ্ট কিছু রোগের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধরণের মিউজিকের শ্রেণীবিভাগ করেন। যেমন, কিছু সুর যেগুলো প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য উপকারী ছিল, কিছু ছিল অনিদ্রার জন্য, কিছু পায়ের পাতার ব্যাথা কিংবা ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন (মূত্রনালীর সংক্রমণ) এর ক্ষেত্রে উপকারী ছিল। সুর ও বিভিন্ন সুমধুর শব্দ কিভাবে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার প্রতিকারে আসে, তারা তার উদাহরণ স্থাপন করে।</p>
<p>বিমারিস্তানগুলো ছিল চিকিৎসার পাশাপাশি মাদরাসা ও ইবাদতের স্থান। অনেক বিমারিস্তানের সাথেই মাদরাসা, লাইব্রেরি ও মসজিদ সংযুক্ত থাকতো কিংবা এগুলো একত্রে বড় কমপ্লেক্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হতো।</p>
<figure id="attachment_14721" aria-describedby="caption-attachment-14721" style="width: 752px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-14721 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture7.jpg" alt="" width="752" height="423" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture7.jpg 602w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/08/Picture7-300x169.jpg 300w" sizes="(max-width: 752px) 100vw, 752px" /><figcaption id="caption-attachment-14721" class="wp-caption-text">কায়রোর আল-মানসুরি বিমারস্তানের সাথে সংযুক্ত মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ প্রাঙ্গন (যিরার আলী)</figcaption></figure>
<p>এই ধরনের স্থাপনাগুলো নিরাময়ের অন্তর্নিহিত প্রকৃতিকে তুলে ধরে যেমনটি ইসলামি সভ্যতায় দেখা যায়ঃ জ্ঞান ও দর্শনের প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে শারীরিক অসুস্থতা নির্ণয় ও নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল, কিন্তু আধ্যাত্নিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন স্রষ্টার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও স্রষ্টার স্মরণ।</p>
<p>অসুস্থদের প্রতিকার ও স্বস্তি প্রদানের জন্য বিমারিস্তানগুলোতে ব্যবহৃত নকশা ও স্থাপত্যশৈলী যা শহরের বাড়ি-ঘর নির্মাণেও ব্যবহৃত হতো। উদাহরণস্বরুপ আরব, পারস্য ও ভারতীয় বাড়িগুলোর অভ্যন্তরীন প্রাঙ্গনে থাকতো বাগান, আর তাতে থাকতো প্রশান্তিময় শীতল হাওয়ার বিভিন্ন গাছপালা।</p>
<p>মাঝের দিকে থাকতো একটি পানির ফোয়ারা এবং বাড়ির প্রতিটি অংশে থাকতো পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, যার উদাহরণ এখনো টিকে আছে দামেস্কে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বিমারিস্তানগুলোর প্রভাব আজও পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতিতে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃতি পেলেও, বিমারিস্তানগুলোর বিশেষ স্থাপত্যশৈলী, পরিচালনার পন্থা ও মানবতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মিউজিক থেরাপির মতো শিল্প পুরোটাই আজ বিলুপ্তপ্রায়।</p>
<p>সাম্প্রতিক কালে পাশ্চাত্য চিকিৎসা ব্যবস্থায় থেরাপি হিসেবে শব্দ ও মিউজিকের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর একটি চিন্তাধারা গড়ে উঠছে যারা ড্রাগ কিংবা মেডিসিনের চেয়ে প্রাকৃতিক নিরাময় পদ্ধতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।</p>
<p>সবশেষে বলা যায়, এই বিমারিস্তানের ধারণাই মূলত আজকের আধুনিক হাসপাতাল ও মানসিক চিকিৎসা পদ্ধতির পথিকৃৎ।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>ডাঃ সুমাইয়া তাবাসসুম, সেক্রেটারি জেনারেল শিউলিমালা একাডেমি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bimaristan-ancient-islamic-hospital-pioneer-of-eye-surgery-and-music-therapy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14714</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সামি ইউসুফ: মিউজিক শিল্পে আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/sami-yusuf-the-combination-of-spirituality-in-the-art-of-music/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/sami-yusuf-the-combination-of-spirituality-in-the-art-of-music/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 16 Dec 2022 03:56:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7567</guid>

					<description><![CDATA[একজন কিংবদন্তি, যিনি যশ-খ্যাতির চাইতে আল্লাহর স্মরণেই বেশি সময় কাটাতে চান। একজন সংগীত শিল্পী, যিনি শান্তি ও সহনশীলতা প্রচারের জন্য তার সংগীত ব্যবহার করেন। একজন মুসলমান, যিনি তার খ্যাতি ও অর্জন বিশ্বের অভাবী লোকদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিলিয়ে দেন। একজন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একজন কিংবদন্তি, যিনি যশ-খ্যাতির চাইতে আল্লাহর স্মরণেই বেশি সময় কাটাতে চান। একজন সংগীত শিল্পী, যিনি শান্তি ও সহনশীলতা প্রচারের জন্য তার সংগীত ব্যবহার করেন। একজন মুসলমান, যিনি তার খ্যাতি ও অর্জন বিশ্বের অভাবী লোকদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিলিয়ে দেন। একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি দৃঢ়ভাবে আস্থা রাখেন ইসলামী সভ্যতার সমৃদ্ধশালী আধ্যাত্মিক ধারা ও কার্যক্রমের উপর যা মানুষের হৃদয়কে ইলাহী নূরে আলোকিত করে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি পথ পাড়ি দিতে চান এবং এ পথে তিনি মিউজিককে নিজের সফরের উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।</p>
<p>বিশ্বের নামকরা পত্রিকাগুলো তাকে বিভিন্ন শিরোনামে ভূষিত করেছে। যেমন– টাইম ম্যাগাজিন তাকে বলেছে ‘Islam’s biggest rock star’, দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে তিনি ‘Biggest Star in the Middle East’, আল জাজিরা তাকে উপমা দিয়েছে ‘King of Islamic Pop’!</p>
<p>তিনি সামি ইউসুফ। একটি নাম, একটি ব্র‍্যান্ড। এ নাম শুনলেই আমাদের মনে উঁকি দেয় ইরফানী ধারার মাহাত্ম্য ও ঐশ্বর্য্যের সাংস্কৃতিক রূপ দানকারী এবং বর্তমান সময়ের সর্বাধুনিক উপায়ে ইসলামের মর্মশাসকে উপস্থাপনকারী এক ব্যক্তিত্বের মুখচ্ছবি। তিনি মিউজিকের মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, মারেফত, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, রহমতের বার্তা চিত্রায়ণ করে যাচ্ছেন। ২০০৩ সালে প্রথম এলবাম প্রকাশের মাধ্যমে তার গানের যাত্রা শুরু হয়। এ এলবামের নাম ছিলো “আল মুয়াল্লিম”। হয়তো তিনি রাসূলের ‘আনা বুইসতু মুয়াল্লিমান’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই এ নাম পছন্দ করেছিলেন! তার জীবনের প্রথম দিকের সময় থেকেই ইসলামকে তিনি কতখানি ধারণ করেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়।</p>
<p>তার বাবা ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ, কবি, গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী এবং বহু বাদ্যযন্ত্র বাদক, কিন্তু তার সন্তানরা সংগীত চর্চায় আসুক এটি তিনি চাননি। অন্যদিকে সামি ইউসুফের ৬৪ জন চাচাতো-মামাতো ভাইবোনের মধ্যে ৫০ জন গায়ক আর অন্যরা শিল্পী! বাবা সম্পর্কে সামি ইউসুফ বলেন, “আমার বাবা খুবই রক্ষণশীল মানুষ এবং তিনি পরিবেশ বুঝেন।”</p>
<p>৬ বছর বয়সে সামি ইউসুফ তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি অন্য ছেলেদের সংগীত শেখান, কিন্তু তাকে শেখান না। তার অনুযোগ শোনার পর একদিন তার বাবা তাকে পারস্যের মিউজিকের উপর একটি বই পড়তে দেন। আধা ঘন্টা পরে এসে দেখেন সামি ইউসুফ সে বই পড়ে ফেলেছে। তখন তিনি তাকে সেটির প্রমাণ দেওয়ার জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দেখাতে বলেন। সামি ইউসুফ তখন বাজিয়ে দেখান। এটিই ছিলো তার সংগীত চর্চার শুরু। তারপর তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শিখেন। যেমন– দফ, তার, সানতোর, উড, ভায়োলিন, পিয়ানো ইত্যাদি।</p>
<p>তখন থেকেই তিনি বাবার সহায়তায় সংগীতের সাথে জড়িয়ে যান। তিনি বড় বড় শিক্ষকদের কাছে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেন, পরবর্তীতে লন্ডনে Royal Academy of Music-এও পড়াশোনা করেন। অতঃপর তিনি মিউজিক কম্পোজার হওয়ার কথা ভাবেন।</p>
<p>অল্প বয়সেই তার গায়কী প্রতিভা উন্মোচিত হয়। ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রবল আধ্যাত্মিক অনুভূতির দরুণ সংগীত জগত ছেড়ে আইন শাস্ত্র পড়ার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার বন্ধু তাকে এলবাম করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন, যে এলবামে থাকবে আল্লাহ ও রাসূলের জন্য ত্যাগ তিতীক্ষার গল্প।</p>
<p>বন্ধুর কথা মতো তিনি কাজ শুরু করেন। ২০০৩ সালে ২৩ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম এলবাম ‘আল-মুয়াল্লিম’ এর গানগুলো রেকর্ড করেন। এলবামটির ৭০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়, যা তাকে রাতারাতি স্টার বানিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি ছিলো ভাগ্য এবং লিখিত।” অতঃপর তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে ধাঁচের সংগীত তিনি নির্মাণ করছেন, তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, বিশেষত নাইন ইলেভেন পরবর্তী সময়ে এটি অতি জরুরী।</p>
<p>মুসলমানরা বিশেষ করে মুসলমান যুবকরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে গর্ব বোধ করার উপায় খুঁজছিল বহুদিন ধরেই, তার সংগীত এ প্রয়োজনীয়তা মেটায়। বলা যায়, তার সংগীত কিছুটা হলেও তাদের সেই দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানের রূপরেখা হয়েছে, কারণ তার সংগীতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলে এমন কিছুই পাওয়া যায়।</p>
<p>সামি ইউসুফের জন্মস্থান ইরানে (তার পরিবার আজারবাইজানী) ছিলো বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। সে সূত্রে তিনি বিভিন্ন ভাষায় গান গাওয়া এবং গানে ইরান ও পাশ্চাত্যের মিউজিকের ব্যবহার শুরু করেন। তার গানে প্রকাশ পায় ইসলামী ঐতিহ্যের ভাবধারা, সংহতি, সহানুভূতি, উদারতা, সততা, যা তার শ্রোতাদের মানসিকতা ও রুচিবোধকে উন্নত করে তোলে।</p>
<blockquote><p>তিনি বলেন, “সংগীত হলো আমার অস্তিত্বের এক বিস্তৃত রূপ। সংগীত হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং মহান ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগেরই এক বহিঃপ্রকাশ।”</p></blockquote>
<p>অনেকে সামি ইউসুফের সংগীতকে নাশীদের তালিকায় রাখেন, যা তিনি মানতে নারাজ। আবার অনেকে তার গানকে ইসলামী পপ ঘরানার বলে আখ্যায়িত করেন, এতেও তিনি স্বস্তিবোধ করেননি। তিনি তার গানের ধরণকে বলেন ‘স্পিরিটিক’।</p>
<p>এ ব্যাপারটি সামি ইউসুফের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনার একটি বড় প্রমাণ। তিনি তার গানে জ্ঞান ও সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, যা বুল্লে শাহ, মাওলানা রুমী, এরিস্টটল এবং অন্যান্য গ্রিক দার্শনিকের কাজে পাওয়া যায়। তার মতে সংগীত হলো মানুষকে কাছে আনার, একত্রিত করার, জমিয়ে রাখার অন্যতম মাধ্যম।</p>
<blockquote><p>তিনি বলেন, “আমি নেহায়েত সংগীতের জন্যই সংগীত চর্চা করি না। আমার সংগীত চর্চার মধ্যে আছে উচ্চতর একটি উদ্দেশ্য। সংগীতের মধ্য দিয়ে যখন আমরা কাছাকাছি আসি, তখন আমরা নিজেদেরকে আরো ভালোভাবে জানতে পারি। আর যখন আমরা নিজেদেরকে ভালোভাবে জানতে পারি, তখন আমরা আধ্যাত্মিক অনুভূতিমালার দিকে ধাবিত হতে থাকি।” তার ভাষ্যে, “যিনি নিজেকে চিনেন, তিনি আল্লাহকেও চিনেন।”</p></blockquote>
<p>তার অভিব্যক্তিতেও রয়েছে তার চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। নান্দনিক এক অবয়ব নিয়ে তিনি স্টেজে উঠেন। মুখে মুচকি হাসির পরশ লেগেই থাকে। পোশাকেও যথেষ্ট মুনশিয়ানা চোখে পড়ে।</p>
<p>তিনি তার গানে হাজারো ঐতিহ্যকে ধারণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার অনেক গানেই একাধিক ভাষার ব্যবহার ক্রমাগত চোখে পড়ে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আরবি, ফারসি, আজেরী (আজারবাইজানী), তুর্কি, উর্দু, মালয়।</p>
<blockquote><p>এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “আমি অনেককে চিনি, যারা জনপ্রিয়তার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই এটি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি। আমি এমন একটি জীবন অতিবাহিত করতে চাই, যা আল্লাহর কাছাকাছি। আধ্যাত্মিক একটি জীবন আমার চাওয়া।”</p></blockquote>
<p>তার গানের কথাগুলো পড়লেই আমরা তার এ মনোভাবের প্রমাণ পাই। এর অন্যতম উদাহরণ তার <em>Forgotten Promises</em> গানটি৷ ২০১২ সালে রিলিজ হওয়া এ গানের কথায় বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক আবহ ফুটে উঠেছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো এ গানের মিউজিকও এমনভাবে তৈরি করা, যা শুনলে যে কেউ মিউজিকের তালে তালে আন্দোলিত হতে বাধ্য। গানটি মুসলিম আত্মপরিচয়কে নবতর পন্থায় হাজির করার এক অন্যতম উপাদান হতে পারে।</p>
<p>তার গানের এলবামগুলোর নাম যদি দেখি, প্রতিটি নামেই মুসলিম উম্মাহর আহবান মিশে আছে। যেমন–</p>
<ul>
<li>Al-Mu&#8217;allim (2003)</li>
<li>My Ummah (2005)</li>
<li>Without You (2009)</li>
<li>Wherever You Are (2010)</li>
<li>Salam (2012)</li>
<li>The Centre (2014)</li>
<li>Songs of the way (2015)</li>
<li>Barakah (2016)</li>
</ul>
<p>এগুলোর মাধ্যমে কখনো তিনি আল্লাহর কাছাকাছি যেতে চেয়েছেন, কখনো সে পথে সবাইকে আহ্বান করেছেন, কখনো সবাইকে অভিবাদন করে গেছেন, কখনো রাসূলের শিক্ষা তুলে ধরেছেন।</p>
<p>২০১৫ সাল থেকে তিনি লাইভ এলবাম শুরু করেন এবং ২০১৮ সালের পরে তিনি স্টুডিও এলবাম থেকে লাইভ এলবামে চলে আসেন। এখনো তিনি লাইভ এলবামেই গান রচনা করে যাচ্ছেন।</p>
<p>গত বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালে দুবাই এক্সপোতে তিনি ১ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে একটি নতুন এলবামের গান রিলিজ করেন, যে গানগুলো আমাদেরকে বিভিন্ন ধারার সুরের কাছে নিয়ে যায়, বিভিন্ন ইতিহাস-ঐতিহ্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এ গানগুলো শুনে অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যার প্রমাণ প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়।</p>
<p>২০১৭ সালে রিলিজ হওয়া The Dawn গানটি অসংখ্য সংস্কৃতির সুরকে একত্রিত করে আমাদেরকে নতুন এক মোহনীয়তার দিকে নিয়ে যায়। এ গানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিউজিককে একত্রিত করেন, যে মিউজিক শ্রোতাদের পাখির মতো উড়িয়ে নিয়ে যায় পারস্য, উসমানী, মিশরী, সিরিয়, চায়না, গ্রীক, আন্দালুসিয় মুসলিম ঐতিহ্যের কাছে। এ একটি গানই মুসলমানদের দেশের সীমানার কাঁটাতার ছাড়িয়ে এক উম্মাহ হয়ে বসবাস করতে বলে, কাজ করতে বলে, সব ধরনের মানুষকে নিয়ে একটি বহুত্ববাদী সমাজে বসবাস করার দিকে ধাবিত করে।</p>
<p>তার মধ্যে জালালুদ্দিন রুমীর প্রভাব কতটা ছিলো তা তার ২০১৯ সালে প্রকাশিত A Dancing Heart শুনলে বুঝা যায়। জালালুদ্দিন রুমীর প্রভাব পৃথিবীর কোথায় নেই? ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ‘আমাদের রুমী’। কথা ছাড়া, শুধু সুরের মুর্ছনায় সামি ইউসুফ তাঁকে ধারণ করেছেন এ গানে। হয়তো তিনি রুমীর এ কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন, ‘Silence is language of God, all others are poor translation’! তাই কোনো কথা ছাড়াই শুধু সুরের মূর্ছনা দিয়ে বিশ্বসভায় এক হয়ে যেতে চেয়েছেন তিনি।</p>
<p>এ রকম অসংখ্য গানেই সামি ইউসুফকে আবিষ্কার করা যাবে মুসলিম ঐতিহ্যের কোনো না কোনো পাতায়, স্বর্ণলতিকায়, আবহমান কাল ধরে চলে আসা ইসলামী ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ প্রকাশের ধারাবাহিকতায়।</p>
<p>প্রতিটি গানেই দেখা যাবে, তিনি আল্লাহর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কখনো আন্দালুসিয়ার রাস্তায় হাঁটছেন, কখনো ইরাক-ইরানের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কখনো দক্ষিন এশিয়ার কাওয়ালী দরবারে এসে হাজির হয়েছেন, কখনো প্রাকৃতিক সুরে ভেসে বেড়াচ্ছেন ইকুয়েডরের আকাশে, কখনো আছেন চীনের হাজার বছরের মুসলিম অস্তিত্ব আবিষ্কারের যুদ্ধে!</p>
<p>২০১৮ সালে সামি ইউসুফ <em>My Song</em> নামে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, যাতে তিনি তার গানের ব্যাখ্যা দেন। এটি শুনলেই বোঝা যায়, সামি ইউসুফ আমাদের মতো সাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মী নন, বরং তিনি বিশ্ব মুসলিম ঐতিহ্যের মহান এক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।</p>
<p>তার কাজের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তার অসাধারণ দক্ষতায় ইসলামের অতীত ঐতিহ্য আর বর্তমান আধুনিকতার মধ্যে একটি অন্বয় সৃষ্টি করেছেন। সেই সাথে রয়েছে পূর্বীয় ও পশ্চিমী মিউজিকের অসাধারণ মিথস্ক্রিয়া। সামি ইউসুফের এ অসাধারণ কর্মকে সমালোচকরা তার সৃষ্টির অনন্যতা হিসেবেই স্বীকৃতি দেন। অরিয়েন্ট আর অক্সিডেন্টের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর দুর্দান্ত প্রবহমানতায় তার কাজগুলো নিঃসন্দেহে বিশেষায়িত। সীমান্তের ব্যবধান থাকলেও সামি ইউসুফের এ অসাধারণ সৃষ্টি যে ইসলামী সভ্যতার সকল অঞ্চলের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টি করেছে, তা বলাই বাহুল্য।</p>
<p>ইসলামের সুমহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উপজীব্য করে আধ্যাত্মিকতা ও ইনসানিয়াতের উপর ভিত্তি করে সামি ইউসুফের সফর নিঃসন্দেহে এ বস্তুবাদী সভ্যতার বিপরীতে এক অনন্য সৃষ্টি। সামি ইউসুফ যতটা তার মাটিকে ধারণ করেন, ঠিক ততটাই ধারণ করেন ইসলামের বৈশ্বিক চরিত্রকে। এর ফলশ্রুতিতে তার সৃষ্টিকর্মের রূপ আঞ্চলিক হলেও আবেদন বিশ্বজনীন।</p>
<p>স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের মাটিতেও বাংলা অঞ্চলের রূহকে ধারণ করে এ অঞ্চলের সামি ইউসুফরা উঠে আসবেন, যারা হয়ে উঠবেন এ অঞ্চলের হৃদয়ের স্পন্দন ও মাটির আওয়াজ, ইনশাআল্লাহ!</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/sami-yusuf-the-combination-of-spirituality-in-the-art-of-music/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7567</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
