<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>সিনেমা পর্যালোচনা &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/civilization/society-and-culture/movie-reviews/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Fri, 07 Aug 2026 08:17:23 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.3</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>সিনেমা পর্যালোচনা &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান; যুক্তি যেখানে গল্প, সংলাপ সেখানে নায়ক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/twelve-angry-men-movie-review/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/twelve-angry-men-movie-review/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Sep 2025 16:25:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16139</guid>

					<description><![CDATA[বিচারব্যবস্থায় জুরিসিস্টেম একটি আদি-প্রক্রিয়া। এথেন্সে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেও জুরির অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। অবশ্য আধুনিক জুরিসিস্টেমের সূচনা হয় ১২ শতকের মাঝামাঝি, তখন ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় হেনরির রাজত্ব চলছিল। এখনো পৃথিবীর অনেক জায়গায় বিচারকার্যে জুরিসিস্টেমের ব্যবহার করা হয়। সিডনি লুমেটের ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’ এমন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিচারব্যবস্থায় জুরিসিস্টেম একটি আদি-প্রক্রিয়া। এথেন্সে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেও জুরির অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। অবশ্য আধুনিক জুরিসিস্টেমের সূচনা হয় ১২ শতকের মাঝামাঝি, তখন ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় হেনরির রাজত্ব চলছিল। এখনো পৃথিবীর অনেক জায়গায় বিচারকার্যে জুরিসিস্টেমের ব্যবহার করা হয়। সিডনি লুমেটের ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যেটি আপনাকে জুরিসিস্টেম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিবে। সাদাকালো আলোকচিত্রের যুগে তৈরি  হওয়া এই সিনেমা হীরক জয়ন্তী পার করার পরও অবস্থান করছে শ্রেষ্ঠের শীর্ষ তালিকায়।</p>
<p>‘কোর্টরুম ড্রামা’ এই ধারাটি বর্তমান সিনে জগতে ব্যাপক আলোচিত। বিশেষ করে উপমহাদেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে। কিন্তু এই ধারা উদ্ভাবন হয়েছে আজ থেকে ৬৫ বছর আগে অস্কার বিজয়ী মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা সিডনি লুমেট এর হাত ধরে। লুমেট তার ক্যারিয়ার জুড়ে সৃষ্টি করেছেন অনেক কালজয়ী সিনেমা। কিন্তু ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া  তার প্রথম সিনেমা ‘১২ অ্যাংরি ম্যান’ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সিনেমা গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ‘১২ অ্যাংরি ম্যান’-এর এই অসম্ভব সফলতার পর বছর কয়েক এর মধ্যেই এই ধারায় নির্মিত হয়েছে ‘এনাটমি অফ মার্ডার’, ‘জাজমেন্ট এট নুরেমর্বাগ’-এর মতো জনপ্রিয় সব সিনেমা।</p>
<p>ছবির শুরুতে দেখা যায় ১৮ বছর বয়সের একটি ছেলে পিতৃহত্যার দায়ে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার কেসে অভিযুক্ত। আদালতে সব সাক্ষ্য-প্রমাণই তার বিপক্ষে। জাজ জুররদের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। ছেলেটির জীবন চলে যায় জুররদের হাতে। এখন জুরররা তিনটি কাজ করতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এক,</strong> ছেলেটিকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, যার ফল ইলেক্ট্রিক চেয়ারে বসিয়ে তাকে হত্যা করা হবে।</p>
<p><strong>দুই,</strong> তারা তাকে সর্বসম্মতভাবে নির্দোষ সাব্যস্ত করতে পারে।</p>
<p><strong>তিন,</strong> তারা সর্বসম্মত না হতে পারলে ‘হাঙ জুরি’ করতে পারে, যার ফলে হয়তো পরে আবার অন্য কোনো জুরি বোর্ডকে মামলাটির ফয়সালার দায়িত্ব দেওয়া হবে।</p>
<p>খুব সাদামাটাভাবে শুরু হওয়া সিনেমাটির দৃশ্যপট এরপর পদার্পণ করে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে। মুভির রান টাইম ৯৬ মিনিটের ৯৩ মিনিটই ওই চারদেয়ালের কক্ষে যেখানে ছেলেটির জীবন-মৃত্যু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং ১২ জন জুরর এর ১১ জনই শুরুতে মতামত জানিয়ে দেয় ছেলেটি তার পিতার হত্যাকারী কিন্তু নিয়ম অনুসারে ১২ জনকে এক মতে আসতে হবে তাহলেই বিচারকার্য সম্পন্ন হবে। একমাত্র ৮ নাম্বার জুরর প্রথমবারের মতো বলেন, ছেলেটি নির্দোষও হতে পারে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে বিস্তর আলোচনা করা আমাদের কর্তব্য।</p>
<p>এখান থেকেই শুরু হয় মতভেদ। যেখানে কিনা সকল প্রমাণ শুরুতে স্পষ্ট করছিল ছেলেটি দোষী, সেখানে বাস্তববাদী ও মানবিক যুক্তি স্থাপন করছিলেন ৮ নাম্বার জুরর। আর এই চরিত্রে অভিনয় করে কিংবদন্তীর আখ্যান লিখেছেন অভিনেতা ‘হেনরি ফন্ডা’।  তিনি তার বিচক্ষণ ভঙ্গিমা দিয়ে চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্য মাত্রায়। মেধা, মানবিকতা দিয়ে চিন্তা করার যোগ্যতা ছিল এই চরিত্রে। যার প্রেক্ষিতে বাকি ১১ জন কে এই ১ জন এর দেওয়া যুক্তিতে সম্মতি দিতে হয় এবং ছেলেটি নির্দোষ এই মতামতে একাত্মতা পোষণ করতে হয়। কীভাবে একজন ব্যক্তি কিছু সময়ের ব্যবধানে ১১ জন এর অভিব্যক্তি পাল্টে দিল সেটিই সিনেমার মূল আকর্ষণ।</p>
<p>মুভিতে প্রখর যুক্তিবোধসম্পন্ন ন্যায়বান মানুষও যেমন দেখা যায়, সেই সাথে চোখে পড়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন অবিবেচককে। দেখতে পাই সন্তানের ভালবাসাবঞ্চিত পিতার বুক ফাটা কান্না অথবা প্রাজ্ঞ বৃদ্ধের বুদ্ধির ঝিলিক। হুট করে রেগে যাওয়া মানুষ যেমন আছে তেমনি আছে মাথা ঠাণ্ডা করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ। আছে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্ব আবার অন্যদিকে আছে জ্ঞানপাপী! মুভিতে দেখানো হয়েছে কেমন করে গুটিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব একটু সাহায্য পেলেই জেগে উঠতে পারে, আবার আপাত দৃষ্টিতে ব্যক্তিত্ববান ও দায়িত্ববান মানুষ কীভাবে রূপান্তরিত হয় নিচুশ্রেণির অমানুষে। প্রতিটি মানুষের আবরণে লুকিয়ে থাকা এই আসল মানুষটি শুধু তখনি বেরিয়ে আসে যখন সে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়। তার মনন, তার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে এই দোষ কিংবা গুন গুলোই। আর এই ব্যপারটিই অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে মুভিটিতে।</p>
<p>টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান এ যে ১২ জন জুরর অভিনয় করেছেন, তারা সবাই দুর্দান্ত। ১২টি ব্যতিক্রমী চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে এবং চরিত্রের ভেতর রসায়ন সৃষ্টিতে সবটুকু উজাড় করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ভেতরের দ্বন্দ্বে একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একজন আরেকজনকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয়। কিন্তু এই হত্যার হুমকিই হয়ে ওঠে ছেলেটিকে বাঁচানোর একটি অস্ত্র। অতিশয় বোদ্ধা বা বাচাল লোককে মানুষ কীভাবে দেখে, তাও একটি অসাধারণ দৃশ্যে চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক সিডনি লুমেট। এককথায় একজন ফুটবল কোচ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, স্টক ব্রোকার, বেসবল ভক্ত, ঘর সজ্জাকারক, বিক্রেতা, স্থপতি, বৃদ্ধ, গ্যারেজ মালিক, ঘড়ি প্রস্তুতকারক, বিজ্ঞাপন নির্মাতা যখন একই কক্ষে একটি সিদ্ধান্ত নিতে ব্রত হয়, তখন তারা কে কী রকম আচরণ করতে পারে, তা প্রকাশিত হয়েছে খুব সূক্ষ্মভাবে।</p>
<p>মুভির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটি ছিল ‘সংলাপ’।</p>
<p>সিনেমার প্রেক্ষাপট অনুসারে সংলাপগুলো ছিল একেকটি ট্রেডমার্ক। যুক্তির ক্ষমতাকে অনন্যভাবে উপস্থাপন করার জন্য ‘সিডনি লুমেট’ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছেন।</p>
<p>পরিচালক সিনেমায় কক্ষটিকে দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন। বৈদ্যুতিক ফ্যান, জানালা, টেবিল, চেয়ার, চুরুটদানি সবকিছুই যেন সিনেমাটিতে অভিনয় করেছে। একজন পুত্রহারা বাবার ক্রোধ বার বার ফিরে এসেছে সেই কক্ষে। ব্যক্তিগত ক্রোধ ও অহমিকার পরীক্ষায় শেষপর্যন্ত সবাই উতরে যায়। কিন্তু এই উতরে যাওয়াটা সহজ ব্যপার ছিল না। এক্ষেত্রে একটি ছুরি, একটি ম্যাপ এবং বৃদ্ধটির অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।</p>
<p>অভিনয়ের ক্ষেত্রে ৮ নাম্বার জুরর হেনরি ফন্ডা ছিলেন এক কথায় অনবদ্য! গভীর সংলাপ গুলোকে তিনি বাস্তবে জীবন দিয়েছিলেন। আর ৩ নাম্বার জুরর এর চরিত্রে অভিনয় করা ‘লি জে কব্স’-এর অভিনয় ছিল সবচেয়ে ভিন্নধর্মী এবং চ্যালেঞ্জিং। নিজ সন্তানের সাথে সম্পর্কের কলহে পুড়তে থাকা মানুষটি শেষে ভেঙে পড়েছিলেন কান্নায় এবং ‘ছেলেটি দোষী নয়’ এই মতামতে সর্বশেষ ভোটটি ছিল তার।</p>
<p>৫০’শ-এর দশকে নির্মিত হওয়া টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান একটি মিথিকাল মেটাফোর, যেটি সময়ের বিবর্তনে আমাদের ভাবনাকে করেছে আরও বিস্তৃত। আজকের মুভি ওয়ার্ল্ড এ নাম্বার গেইমকে (বাজেট এবং আয়) পুঁজি করে ব্যবসা করে যাচ্ছে বড় বড় প্রোডাকশন হাউজগুলো।</p>
<p><strong>প্রভাবশালীদের সৃষ্টি করা এই নাম্বার গেইম এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় উপস্থাপন হলো ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’-এর চিত্রনাট্য, যেটি প্রমাণ করে শুধুমাত্র সংলাপ আর বাস্তববাদী স্ক্রিনপ্লে দিয়েই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মুভির তালিকায় থাকা যায় যুগের পর যুগ&#8230;.।</strong></p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 88px; top: 2054.48px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/twelve-angry-men-movie-review/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16139</post-id>	</item>
		<item>
		<title>একটি বাস্তব নাকবা নির্মাণ; ফারহা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/construction-of-a-real-naqba-farha/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/construction-of-a-real-naqba-farha/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 15:22:48 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15831</guid>

					<description><![CDATA[২০২১ সালে লাইট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফির মঞ্চোকাপানো সেই এক জোড়া পেঙ্গুইন মেলবোর্নের কোনো ভিন্ন দুটি দ্বীপে দীর্ঘদিন একলা বিচ্ছিন্ন দাঁড়িয়ে ছিল কম হলেও ছ&#8217;মাস। এ- দীর্ঘসময়ে ওই দুটি প্রাণ-ই কখনো হয়তো রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে; নিশ্চয়ই নির্ভিক অথবা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>২০২১ সালে লাইট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফির মঞ্চোকাপানো সেই এক জোড়া পেঙ্গুইন মেলবোর্নের কোনো ভিন্ন দুটি দ্বীপে দীর্ঘদিন একলা বিচ্ছিন্ন দাঁড়িয়ে ছিল কম হলেও ছ&#8217;মাস। এ- দীর্ঘসময়ে ওই দুটি প্রাণ-ই কখনো হয়তো রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে; নিশ্চয়ই নির্ভিক অথবা বিমর্ষচিত্তে ওদের বিরহের ক্ষতটা নিয়েই ঠাই দাঁড়িয়েছিল!</p>
<p>তবে চিরন্তন হলো- প্রিয়জন হারানোয় কিংবা বিচ্ছেদের বেদনায় ক্ষতবিক্ষত প্রাণদুটি যখন মাসের পর মাস ওদের ভাঙা হৃদয়খানা উজাড় করে সমূদ্র পানে চেয়ে ছিল নিষ্পলক, তখনও ওরা লোকচক্ষুর ঢের আড়ালেই! কোন এক ভর পূর্ণিমায় যখন একত্রিত হলো পেঙ্গুইন দুটি, অর্থাৎ ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফিটা ঠিক যে সময়ের, যেন তখন থেকেই আলোচনায় পাখি দুটির বিচ্ছেদ ও পুণর্মিলন।</p>
<p>গুরুভাষ্যে- কোন সংগ্রাম, বিচ্ছেদ, না পাওয়ার দহন বা অর্জনের প্রবল বাসনা, কিংবা স্বাধিকার আন্দোলনে সর্বস্ব ত্যাগ; কার্যতঃ প্রতিটির-ই স্বীকৃতি অকল্পনীয়, যদি না দীর্ঘ আরাধনার পর সেই কাঙ্ক্ষিত অধরার আলিঙ্গন মেলে।</p>
<p>বোধহয় একারণেই, নাকবার প্লাটিনাম জয়ন্তী পূর্ণ হলেও ভূমধ্যসাগরের তীরে জন্ম নেওয়া মুজাহিদ ফিলিস্তিনিরা নাকবার বিপরীতে করা তাদের শাশ্বত সংগ্রামের স্বীকৃতি পায়নি আজও।<br />
শুভ্র, সুশৃঙ্খল ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে যে পর্যায়ের</p>
<p>বিপর্যয় নেমে এলে মানুষ কোনঠাসা হয়ে তার কয়েক পুরুষের ভিটে-বাড়ি ত্যাগ করে, রোশনাইহীন কোনো সরু আইল ধরে কয়েকশো মাইল পাড়ি দেয় নিরাপদ শরনার্থী শিবিরের খোঁজে, এবং নিজভূমি ত্যাগের এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ যাত্রায় চোখে পড়ে কতশত গণকবর, লাশের মিছিল, বেয়োনেটের আঘাতে চৌচির দেহাবয়ব; প্রিয়জনের আহাজারি, মায়ের ওম ছেড়া নবজাতকের হোঁ-হোঁ কান্না; এর সবটা জুড়েই আজকের পচাত্তর নাকবা। মূলত এর প্রেক্ষিতেই ২০২১ সালে জর্দানের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সেদেশের গুণি নির্মাতা দারিন জে. সাল্লামের একটি বাস্তব নাকবা নির্মাণ- ফারহা।</p>
<p>৪৮ -এ আরব ফিলিস্তিনের কোনো সমৃদ্ধ ও প্রত্যন্ত এক শেখ শাসিত গ্রামে সিনেমাটির প্রথম দৃশ্যপট। একটি শ্যামল গ্রাম, শুভ্র জলপ্রপাত, সুশ্রী সমাজ ও মৃণ্ময়ী মানব-মানবী; ইত্যাদীর সমন্বয়ে গ্রামটিকে আরব সংস্কৃতির আলোকে বেশ জাদরেলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওসমানী আমলের দারস কিংবা মক্তব ভিত্তিক পাঠ্যরীতি খেলাফত পতনের পরও গ্রামটিতে বিদ্যমান। তবে ভূরাজনৈতিক উত্থানপতন ও ক্ষমতার বালাবদলের প্রভাবে গ্রামের এই চিরাচরিত শিক্ষারীতিতেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। গ্রামের নিয়ম ভেঙেই সামর্থ্যবান লোকেরা তাদের সন্তানদেরকে শহরের স্কুলে ভর্তি করতে আরম্ভ করেছে। গ্রাম্য সালিশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি যিনি, গ্রামটির শেখ আশরাফ বারহাম -এর ঘরের মেয়ে &#8216;ফারহা&#8217;-ও একই বায়না ধরেছে। তবে শেখ আশরাফ মেয়ের এই বেআইনি বায়নার বিড়ম্বনা অনুভব করার আগেই কপাল ঘুচিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ আরেক ব্যপার নিয়ে- গ্রামে ডজনে ডজনে ইহুদি সৈন্য প্রবেশ করছে! দাবী করছে গ্রামের কর্তৃত্বও! তবে মানুষের না, মাটির। অর্থাৎ জুড়ে বসা সেনারা স্বয়ং তাদেরই গ্রামান্তর করতে চায়! সেটিও গ্রামের মালিকানা দাবী করে! এনিয়ে গ্রামের যুবকেরা প্রতিনিয়তই আশরাফের ভিটেয় জমায়েত হচ্ছে, পশু শিকারের মুষ্টিমেয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়েই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে চাচ্ছে তারা। কিন্তু আশরাফের একটি কথায়-ই সকল প্রস্তুতি ভেস্তে যাচ্ছে তাদের- &#8220;আমি এখনো আরব নেতাদের কোনো নির্দেশ পাইনি, অস্ত্র পাইনি। তোমরা এখনই আক্রমণে যেও না! &#8221;<br />
&#8211; এভাবেই এগুতে থাকে &#8220;ফারহা&#8221;-র দৃশ্যপট!</p>
<p><strong>১৪ মে ফিলিস্তিনের ৫৫ শতাংশ ভূমির মালিকানা দাবী করে স্বঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইজরায়েল আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র ফিলিস্তিন জুড়ে দাবানলের মতো ক্ষোভে ফুসতে থাকে সাধারণ মানুষেরা।</strong> সৌদি আরব, মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও জর্দান স্বশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা দেয় ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। যার প্রেক্ষিতেই ১৫ মে থেকে দখলদার প্রশাসনের সক্রিয় আক্রমণের মুখে পড়ে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি জনগণ। শুরু হয় ১ম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ।</p>
<p>গ্রামটিতে বসবাসরত কয়েক হাজার মানুষের কোলাহল, চিৎকার, ছুটোছুটি, পালায়ন- ইত্যাদির মাধ্যমে ১৫ মে এর ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে সিনেমাটির পরের ধাপে। যেখানে গ্রামের কর্তা হিসেবে আশরাফ বারহাম ইজরায়েলি হত্যাযজ্ঞের মাঝেও গ্রাম ছেড়ে না যাওয়ার কথা জানিয়ে দেন। ফলতঃ ফারহাও পিতাকে ছেড়ে যাওয়ায় অস্বীকৃতি জানায়। এমতবস্থায়, নিরাপত্তার খাতিরে ফারহাকে বাড়ির এক পরিত্যক্ত গুদাম কক্ষে আশ্রিত রেখে বেরিয়ে যান আশরাফ।<br />
তখন থেকে সিনেমার পুরো অংশ জুড়েই ফারহা অধ্যায়।</p>
<p>একটি জানালাবিহীন অন্ধকার ঘর, চারিদিকে বোমার শব্দ, বারুদের গন্ধ, দরজার ছিদ্র দিয়ে আসা টিয়ারগ্যাস; ইত্যাদি উপস্থাপনের মাধ্যমে কক্ষটির বাইরে সংঘটিত হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের মহাসমারহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে৷ গুদাম ঘরটিতে শুকনো খাবার ও ফলের আধিক্য থাকলেও তীব্র পানিশূন্যতা, ভয়, আতঙ্ক ও পিতার ফিরে আসার অপেক্ষায় অন্ধকার ঘরে মজে যেতে থাকে ফারহা। এই অবস্থায় দুইদিন পার হয়ে গেলেও ফারহার পিতার ফিরে না আসাকে সিনেমার সিকোয়েন্স অনুযায়ী কোথাও ইজরায়েলি সেনাদের আক্রমণে মৃত হিসেবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।</p>
<p>তৃতীয় দিন রাতে মুষলধারে বৃষ্টি! ফারহা কক্ষটির এক ছিদ্র ভেঙে হাত দিয়ে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করে। পান করে। ছিদ্র দিয়ে বাইরে যতটুকু চোখ যায়, শুধুই ধ্বংসযজ্ঞ! জনমানবহীন এক মৃত্যুপুরী! দূর আকাশের যুদ্ধ বিমান থেকে ছোড়া বোমার শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো আওয়াজ নেই! এক দিবস আগের এতো সবুজ শ্যামল ও প্রাণোচ্ছল গ্রামটি যেন আজ দখলদার গোষ্ঠির আক্রমণে মৃত্যু বরণ করেছে!<br />
ফারহা কক্ষটি থেকে বের হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকে।</p>
<p>পরদিন সকালে কক্ষটির বাইরে এক নারীর তীব্র প্রসব বেদনার কান্না ফারহাকে ঘুম ভাঙিয়ে জাগ্রত করে। বাইরে চোখ মেলে দেখে- তিন শিশু, এক গর্ভবতী নারী ও এক পুরুষের একটি পরিবার। <strong>ফারহার কক্ষটির ঠিক বাইরেই গুড়িয়ে দেওয়া এক বাড়ির ধ্বংস্তুপের উপর সন্তান প্রসব করেন সেই নারী। ফারহাও সজোড়ে চিৎকার করে তাকে কক্ষটি থেকে বের করার আকুতি জানাতে থাকে।</strong></p>
<p>ফারহার চিৎকারে সাড়া দিয়ে পরিবারটির পুরুষ সদস্য খুব করে দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। কিন্তু দরজা এতোই মজবুত ছিল যে, সেটি ভাঙার শব্দ আশেপাশে বেশ জোড়ালোভাবে শোনা যেতে থাকে। আর সেই শব্দ অনুসরণ করেই ঘটনাস্থলে এক গাড়ি ইজরায়েলি সৈন্য এসে হাজির!</p>
<p>ফারহা অবলোকন করে শতাব্দীর ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডসমূহের একটি। <strong>সবে জন্ম নেওয়া নবজাতকসহ পরিবারটির ছয় সদস্যকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে একে একে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়! তবে নবজাতক শিশুটির ক্ষেত্রে ইহুদি কমান্ডারের নির্দেশ আসে এমন- আমি এই শিশুর জন্য গুলি নষ্ট করতে সম্মত নই, বুটজোড়ার পা দিয়েই ওর মুখাবয়ব গলিয়ে দাও!</strong></p>
<p>একটি নির্জন, অন্ধকার, পানিশূন্য ও ধ্বংসপ্রায় কক্ষ। যে কক্ষটি জানেনা তার পরিচয়, ভাষা ও ভবিষ্যৎ। সামনে পড়ে থাকা ছয়টি গলিত লাশ, গুড়িয়ে দেওয়া ভবনের উপর কাক, মাছি আর বন্য শুকুনগুলো ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে ওই লাশগুলো- আর সেই কক্ষটির ভেতরেই পাঁচদিন যাবত আটকে থাকা ফারহা। স্ক্রিনপ্লে&#8217;র দারুণ এই অংশটিতে প্রকৃত নাকবার ভয়াবহতা স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে।</p>
<p>এক পর্যায়ে, গুদামঘরটির কাঁচামালের আড়াল থেকে ফারহা এক রিভলবার আবিষ্কার করে। তার ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও ভয়ার্ত চেহারায় ফুটে উঠে বাইরের ধ্বংসলীলা আলিঙ্গনের হাতছানি। দরজায় ডজনখানেক গুলি করতেই তা খুলে পড়ে যায়। ফারহা বেরিয়ে আসে নতুন ও অভিশপ্ত এক দুনিয়ায়৷</p>
<p>১৯৪৯ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ পরবর্তী সিরিয়ার এক শরনার্থী শিবির থেকে বর্ণিত হয় রাদিয়া মূলচরিত্রের এই বাস্তব গল্পটি। সম্প্রতি &#8220;ফারহা&#8221; নামে নাকবার এই বাস্তব নির্মাণটি সেসময় ফিলিস্তিনে চালানো জায়নবাদী ইজরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াবহতা অনেকাংশেই ফুটিয়ে তুলিছে। তবে গতবছর সিনেমাটির জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে ইজরায়েলের পক্ষ থেকে জর্দানের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার গুঞ্জন সরব হয়ে উঠিছিল।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/construction-of-a-real-naqba-farha/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15831</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সিনেমা; শুধুই কি বিনোদন?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/is-cinema-just-entertainment/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/is-cinema-just-entertainment/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 14 Dec 2024 07:54:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15297</guid>

					<description><![CDATA[আচ্ছা, ধরুন তো, প্রতিদিনের মতোই কাকডাকা ভোরে—শহরে থাকেন হেতু—কিচিরমিচির মধুর তানের পরিবর্তে এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো আপনার। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ত্যাগ করলেন আপনি। ঘুমজড়ানো চোখে প্রভাতের স্নিগ্ধ কোমল বাতাসে দু&#8217;কদম হাঁটলেন কি হাঁটলেন না! প্রাতরাশ সাড়লেন চিরাচরিতভাবে। বিরক্তিভরা মন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p dir="ltr">আচ্ছা, ধরুন তো, প্রতিদিনের মতোই কাকডাকা ভোরে—শহরে থাকেন হেতু—কিচিরমিচির মধুর তানের পরিবর্তে এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো আপনার। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ত্যাগ করলেন আপনি। ঘুমজড়ানো চোখে প্রভাতের স্নিগ্ধ কোমল বাতাসে দু&#8217;কদম হাঁটলেন কি হাঁটলেন না! প্রাতরাশ সাড়লেন চিরাচরিতভাবে। বিরক্তিভরা মন নিয়ে শরীরে কর্পোরেট পোশাক জড়ালেন। অফিস যাওয়ার পথে টানা দুই ঘণ্টা জ্যামে বসে ধুলাবালির স্বাদ নিলেন। বিরক্তিকর অসহ্য হর্নের কারণে কর্ণকুহরের উপর চললো নিদারুণ অত্যাচার। কর্মস্থলে গিয়ে শুনতে হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের তর্জন গর্জন আর উর্ধ্বতনের হম্বিতম্বি।</p>
<p dir="ltr">কাজের চাপে দুপুর পেরিয়ে দিন গড়িয়ে কখন যে বিকেল হয়ে এলো, তার কোনো হদিস পেলেন না। ঘণ্টা বা বেলের আওয়াজে ঘোর কাটলো আপনার। বুঝলেন, সময় হয়েছে বাড়ি ফেরার। পথিমধ্যে আহারাদির সামগ্রি কেনার জন্য যাত্রাবিরতি করলেন কোনো এক বাজারে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে ক্রয়ক্ষমতার গ্রাফচার্টে আপনার রেখা নেমে এসেছে একেবারে তলানিতে। মস্তিষ্কের নিউরনে দুশ্চিন্তার ঝড়ের প্রভাবটা ফুটে উঠলো জুলফি বেয়ে গড়িয়ে পড়া কয়েকফোটা ঘামের মাধ্যমে। দোকানীর সাথে অহেতুক দরাদরি করে কাঁচাবাজারগুলো ব্যাগে পুরে নিয়ে আবারও পথ ধরলেন বাড়ির উদ্দেশে।</p>
<p dir="ltr">বাড়িতে এসে দায়সারাভাবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নিলেন। এই দায়সারাভাবে করার কারণও আছে; অফিস বা প্রতিষ্ঠানের একগাদা কাজ বাকী আছে, বাড়িতে বসেই যেগুলো শেষ করতে হবে আপনাকে। দিনভর পরিশ্রমের পর ঘরের মানুষদের সাথে দু&#8217;দণ্ড ভালো-মন্দ গল্প করবেন, সৃষ্টিগত এই চাহিদা ও মনের প্রবল এই ইচ্ছাকেও মাটিচাপা দিতে হলো। বাড়ির কর্তা হিসেবে আপনার কাছে থেকে প্রাপ্য সময়টুকুও পেলো না আপনার পরিজনেরা।</p>
<p dir="ltr">যতটুটুই বা একসাথে বসা হয় বা গল্প করা হয়, তাও সেটা হয় রাতের খাবারের টেবিলে। খুবই সামান্য সময়ের জন্য সুযোগ পান একে অপরকে কাছে থেকে দেখার, একে অপরের চাওয়া ও পাওয়া-না পাওয়ার গল্পগুলো শোনার। সবকিছুর পর, কী যেনো একটা না পাওয়ার হতাশা নিয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলেন। প্রশান্তিময় সুখনিদ্রা&#8230;? কবে যে আপনাকে ত্যাজ্য করে হারিয়ে গিয়েছে অজানা কোথাও, সে হিসেব কষতে বসলে নিজের প্রতিই অভিশাপ দিতে ইচ্ছে করে আপনার।<br />
কোনো পরিবর্তন ছাড়াই এভাবেই বিরক্তিকর এক রুটিনমাফিক যন্ত্রমানব হয়ে আপনাকে অতিবাহিত করতে হয় আপনার প্রতিটা দিন। জীবনের প্রতি আপনার চরম অনীহা; জীবনের প্রতি আপনি মারাত্মক বিরক্ত, মাত্রাতিরিক্ত অতিষ্ঠ। কিন্তু, নিয়ম ও সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন আপনি; চাইলেও পারবেন না এখান থেকে বেরিয়ে আসতে।</p>
<p dir="ltr">
এরপর এলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সবকিছু ফেলে সরিষা-পরিমাণ সামান্য সুখের খোঁজে নেমে পড়লেন। আধুনিকতায় আপনি পরিচিত বলে মনস্থির করলেন মুভি দেখার। অতএব, জীবনের এমন একঘেয়েমি থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পেতে আপনি ঢুঁ মারলেন কোনো এক থিয়েটারে। উদ্দেশ্য, ঘন্টাদুয়েক সময় কাটাবেন সুবিশাল এক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, হারিয়ে যাবেন অজানা এক রাজ্যে; যেনো জীবনের সকল কষ্ট, ব্যথা, বেদনাকে ভুলে যেতে পারেন কয়েক মুহুর্তের জন্য, উপভোগ করতে চান অজস্র বন্ধুর পথে প্যাঁচানো দু&#8217;দিনের এই জীবনকে। কিন্তু, বিধিবাম! বিপত্তিটা ঘটলো ঠিক এখানেই।</p>
<p dir="ltr">যে মুভিটা দেখতে বসলেন, সেখানে এমন কিছুর চিত্রায়ন হয়েছে, যা আপনার সমগ্র চিন্তাকে ওলট-পালট করে দিলো। বিনোদনের পরিবর্তে আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে জীবনের সংজ্ঞাটা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করলো। জীবনটাকে সামান্য সময়ের জন্য উপভোগ করতে এসে থিয়েটার থেকে বেরিয়ে পড়লেন সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে করতে। উত্তর খুঁজে পেলেন নিজের উপর বিরক্ত, জীবনের উপর অতিষ্ঠ এবং প্রশান্তির দূরে চলে যাওয়ার কারণগুলোর।</p>
<p dir="ltr">থিয়েটারের চেয়ারে বসে বিগ-স্ক্রিনের তাকিয়ে সিনেমাটা দেখার সময় আপনার উপলব্ধি হলো, জুলুমপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থাপনার যাঁতাকলে পড়ে আপনি হয়েছেন একজন মানসিক দাস, আপনার জীবনটা হয়েছে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত একজন গোলামের মতো। যানবহনের তীব্র হর্ন ও ধুলাবালিময় সড়ক মূলত যথোপযুক্ত নগরব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ফলাফল। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি মূলত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৈরিকৃত একটা বিষয়, যার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে পশ্চিমা অর্থনৈতিক বিশ্বদর্শন। যেখানে ধনীরা হবে আরো ধনী এবং দরিদ্ররা একেবারে নিঃশেষ হয়ে তারা হবে ধনীদের গোলামে পরিণত। অফিস বা প্রতিষ্ঠানে কাজের চাপ মূলত আপনার পরিজন থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যমূলক হাতিয়ার, যেখানে আপনার মতোই আপনার প্রতিষ্ঠান প্রধান বা উর্ধ্বতনরাও নিজেদের অজান্তেই হয়ে গিয়েছে ঘৃণ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একেকটা খুঁটি।</p>
<p dir="ltr">ফলশ্রুতিতে, পরিজন থেকে দূরে থাকায় একটা সময় আপনি হয়ে পড়বেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সবাইকে বাদ রেখে ভাববেন শুধু নিজেকে নিয়ে। আপনার চিন্তা আবর্তিত হবে শুধু আপনাকে কেন্দ্র করেই। পরিবার-পরিজন একসময় বিতৃষ্ণার উপকরণ হয়ে দাড়াবে। আপনার মানসিক প্রশান্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপনার থেকে বহুদূর চলে যাবে। অতঃপর&#8230;? আপনার জীবনটা হয়ে যাবে গৎবাঁধা নিয়ম ও রুটিনে আবদ্ধ। থাকবে না কোনো নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা। আপনার অজান্তেই আপনাকে চালিয়ে নেওয়া হবে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য, আপনি নির্দ্বিধায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে পালন করবেন তাদের আদেশ। সর্বোপরি আপনি হবেন, অন্যের চিন্তার উপর ভর করে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করা সুস্থ-মস্তিষ্কহীন বিবেক বিবর্জিত এক যন্ত্রমানব!<br />
এখন একটু ভেবে দেখুন তো, আপনার জীবনের মূল্য ও জীবনবোধটা উপলব্ধি করতে পারলেন থিয়েটারে এসে।</p>
<p dir="ltr">জীবনবোধের সংজ্ঞাটা পরিবর্তন হতে শুরু করলো বিগ-স্ক্রিনের জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরিকৃত একটা চিত্রায়ন দেখে। সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থাপনাকে জানার শুরুটাও হলো ঠিক এখান থেকেই। আপনার ভেতরে জাগরিত হয়ে গেলো সমাজ পরিবর্তনের একটা সুপ্ত ইচ্ছা।</p>
<p dir="ltr">
আপনি কিন্তু বিনোদন নিতে এসে নিজের অজান্তেই এতোকিছুর সাথে পরিচিত হয়ে গেলেন। না চাইলেও আপনি এখন ভাবতে বাধ্য হবেন। কারণ, ভাবার মতো একটা মূল উপাদান আপনার ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন, কারণ, বিগ-স্ক্রিনে চিত্রায়িত সিনেমাটি আপনার জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সিনেমাটা যেনো আপনার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। আপনার জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনা থেকে শুরু করে হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, পাওয়া-না পাওয়া–সবকিছুই ঐ সিনেমায় চিত্রায়িত হয়েছে। আপনার ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি আজ পেয়ে গেলেন।</p>
<p dir="ltr">হ্যাঁ, এখানেই রয়েছে একটা সিনেমার স্বার্থকতা ও সিনেমার মূল দর্শন। অতএব, মোটাদাগে বলা চলে, &#8220;সিনেমা&#8221; শুধু বিনোদনের উৎকৃষ্ট একটা মাধ্যমই নয়, বরং এটা একটা আর্ট, একটা শিল্প, বিপ্লবের মুখপাত্র এবং সাহিত্যের মতো সামাজিক দর্পণ।</p>
<p dir="ltr">বিশ্বাস হচ্ছে না?<br />
তাহলে এখনই দেখতে বসুন চার্লি চাপলিনের <strong>মডার্ন টাইমস</strong> মুভিটি।</p>
<blockquote>
<p dir="ltr">বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকের শুরুতেই ব্ল্যাক মানডে ও ব্ল্যাক থার্সডে-র মাধ্যমে শুরু হওয়া গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহানন্দার সেই প্রেক্ষাপটেই পুঁজিবাদি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অর্থের জন্য মানুষের যন্ত্রমানবে পরিণত হবার স্বরূপ তুলে ধরে এবং বিত্তশালীদের অর্থের লোলুপতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করার মাধ্যমে একজন যুবকের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনাচরণ এবং অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হওয়া একটি পরিবারের খাবারের জন্য নিত্যদিনের খাদ্যযুদ্ধকে অসাধারণভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে ১৯৩৬ সালে নির্মিত চার্লি চ্যাপলিনের এই “মডার্ন টাইমস” মুভিটিতে। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটকেই উপজীব্য করেই গড়ে তোলা হয়েছে মুভিটির সামগ্রিক কাঠামো।</p>
</blockquote>
<p dir="ltr">(আরো বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর ষষ্ঠ সংখ্যার সিনেমা পর্যালোচনা অংশটুকু)</p>
<p dir="ltr">অতএব, এটা অস্বীকার জো নেই যে, সিনেমার মাধ্যমে কোনো এক সমাজের মানুষ এবং সে সমাজের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। সিনেমার মাধ্যমে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ে আমাদের সমগ্র জীবনের সারাংশ আঁকা সম্ভব। একটা জাতির জাতীয় পরিচয় বহনের একটা মাধ্যমও হলো এই সিনেমা। কারণ, এটি এমন একটি মাধ্যম, যাকে ব্যবহার করে একটা দেশের সংস্কৃতি, জীবনাচরণ, জীবন দর্শনকে পৃথিবীব্যাপি পরিচিত করে দেওয়া যায় অতি সহজেই। কোনো সমাজ এবং সে সমাজের মানুষের জীবনাচরণ অতি দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত সময়ে বুঝতে সে সমাজকে নিয়ে নির্মিত মুভি-সিনেমাগুলো দেখাই যথেষ্ট।</p>
<p dir="ltr">সমাজ পরিবর্তন বা সামাজিক বিপ্লবের মুখপাত্র হলো সিনেমা। শুধু জনসাধারণের স্বপ্নের প্রতিফলনই নয়, বরং তাদের চিন্তাকে তৈরি করে দেওয়া, চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বা চিন্তার পরিবর্তনও সম্ভব সিনেমার মাধ্যমে। মানুষের জীবনের দুর্দশা, দুঃখ-কষ্ট ও অসংখ্য সমস্যার সমাধান দেওয়া এবং হাজারো সব প্রশ্নের উত্তর দেবার অন্যতম এক উপাদান হলো সিনেমা।</p>
<p dir="ltr">সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন, ম্যাগাজিন—এসব এমন এক মাধ্যম, যাকে ব্যবহার করে মানুষের ভেতরে থাকা আইডিয়াগুলোকে মানুষের মাঝে অতি সহজেই অতি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া যায়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায়। কাজটা সম্ভব হয় জনসাধারণের অজান্তেই; কারণ, তাদের অধিকাংশই থিয়েটারে আসে শুধুমাত্র বিনোদনের খোরাক পেতে।</p>
<p dir="ltr">সর্বোপরি, কেউ যদি ভাবে, স্ক্রিনে চিত্রায়িত বিষয়টার মাঝে ন্যূনতম কোনো দর্শন, সত্য বা কোনো বার্তা নেই, তাহলে সে ব্যক্তিটি কেনো যেনো তার জীবন থেকে ঘন্টাদুয়েক সময় অযথাই নষ্ট করলো।</p>
<p dir="ltr">মূলত, এসবই হলো সিনেমার দর্শন। তবে এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে, সকল মুভিই কি এমন দর্শনকে সামনে রেখে নির্মিত? উত্তরটা হলো, হ্যাঁ, সব মুভিই এমন দর্শনকে সামনে রেখে নির্মিত বা চিত্রায়িত। তবে মতাদর্শ এবং উদ্দেশ্যগত ভিন্নতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ,</p>
<p dir="ltr">আমেরিকান চলচ্চিত্র-হলিউড বা এই মতাদর্শের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বর্তমান সিনেমাপ্রেমী যুবসমাজকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে। যেমন,</p>
<ul>
<li dir="ltr">০১. অবসর যাপনের জন্য সিনেমাকে যারা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে। এদের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের দর্শন হলো, যুবকরা যেনো সবকিছু ফেলে তাদের তৈরিকৃত জগতের মাঝেই বিচরণ করে।</li>
<li dir="ltr">০২. যারা সিনেমাকে একটা আর্ট, বিপ্লব আর সমাজের দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করে। এদের ক্ষেত্রে তাদের দর্শন হলো, সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা দৃশ্যায়নের মাধ্যমে যুবকদের মাঝে তাদের অজান্তেই নিজেদের দর্শন ও চিন্তা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া।</li>
</ul>
<p dir="ltr">বিষয়টা অনেকটা নির্ভর করে ডিরেক্টর এবং ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানির নিজস্ব দর্শনের উপর। যে ফিল্ম প্রোডাকশন হাউস যে দর্শনকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, সে কোম্পানি তার সেই দর্শন বা সেই মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সিনেমা চিত্রায়িত করে। অতএব বলা যায়, তাদের নিজেদের মাঝে মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও তাদের উদ্দেশ্য একটাই; যেভাবেই হোক, যুবসমাজকে ফিকশোনাল একটা ওয়ার্ল্ডে বসবাস করানো। নিজেদের দর্শন ও নিজেদের চিন্তা দিয়ে তাদেরকে চিন্তা করানো।<br />
যেহেতু মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ফিল্ম প্রোডাকশন হাউসগুলোর মাঝে মতাদর্শগত ও উদ্দেশ্যমূলক ভিন্নতা রয়েছে, অতএব এটা সুনিশ্চিত যে, সবগুলো মুভি বা সিনেমা কখনও একই ক্যাটাগরির হবে না।</p>
<p dir="ltr">এখানে উল্লেখ্য যে, যে মুভিগুলো সমাজ পরিবর্তনের দর্শনকে সামনে রেখে নির্মিত হয়, কোনো এক চিন্তাকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যকে ঘিরে চিত্রায়িত হয়, সামাজিক দুঃখ-দুর্দশার পরিস্ফুটনকে কেন্দ্রে রেখে আবর্তিত হয়, চিন্তার উৎপাদন করতে পারে বা থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করে, কোনো বিপ্লবের মুখপাত্র হবার যোগ্যতা ও সক্ষমতা রাখে অথবা কোনো বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, এসব মুভিগুলোকে এই দর্শনের ছাঁচে ফেলা যায়। এই ক্যাটাগরির মুভি-সিনেমাগুলোকে “ক্ল্যাসিক্যাল” এবং “বিয়োন্ড টাইম” মুভি নামেও ডাকা হয়।</p>
<p dir="ltr">সে যাইহোক, এবার কয়েকটা উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p dir="ltr">আমি সকলেই জানি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা সত্য যে, অতীতের সোনালী ইতিহাসকে স্ক্রিনে চিত্রায়ন করাও একধরনের পলিটিকাল পলিসি। বর্তমানের বৈশ্বিক এই রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে এটা করা এখন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি, অতীতের ইতিহাসকে কাল্পনিক ঘটনার সাথে জুড়ে দিয়ে সিনেমার চিত্রায়নটাও ক্ষেত্রবিশেষে অলিখিত ও অত্যাবশ্যক একটি নিয়ম হয়ে গিয়েছে। কারণ, এতে করে সিনেমাটা দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসাসফল হয় এবং একইসাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও কূটকৌশল সফল হয়।</p>
<p dir="ltr"><strong>হলিউডের হাজারো সিনেমা থেকে মাত্র একটা সিনেমার নাম বলা যায়, যেটাতে শুধু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক স্বার্থোদ্ধার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং শত্রু মনোভাবাপন্ন দেশগুলোর বিরুদ্ধে চরম পর্যায়ের মিথ্যাচার করে বিশ্বব্যাপী ঘৃণা, বিদ্বেষ ও জনরোষ সৃষ্টি করার সকল ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।</strong></p>
<p>সেই মুভিটা হলো, বিখ্যাত সাইফাই একশন থ্রিলার ফ্র্যাঞ্চাইজি <strong>“ট্রান্সফরমার্স”</strong>-এর তৃতীয় কিস্তি <strong>“ট্রান্সফরমার্স : ডার্ক অব দ্যা মুন”</strong>। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সিনেমাটোগ্রাফিতে <strong>“ফাস্ট কাটিং”</strong> নামে পরিচিত বিখ্যাত পরিচালক মাইকেল বে। এই ভদ্রব্যক্তি সেই লোক, যিনি <strong>”থারটিন আওয়ার”</strong>-এর মতো মুভি পরিচালনা করেছেন। অতএব, এই ব্যক্তির পরিচালিত সিনেমাগুলো কেমন হবে, সেটা আর বলতে হচ্ছে না।</p>
<p>এই সিনেমায় মূলত চন্দ্রাভিযান হওয়ার উদ্দেশ্য দেখানো হয়, চন্দ্রাভিযানের ৬-৭ বছর আগে চাঁদে আননোন একটা স্পেসশিপ ক্র্যাশ করে। সেটার ব্যাপারে এখন রিসার্চ করতে হবে। কিন্তু, রাশিয়ারও এ&#8217;ব্যাপারে অবগত থাকার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় রিসার্চ করার জন্য এখন চাঁদে যাওয়া প্রয়োজন। এমনকি, সিনেমাটিতে এসব দৃশ্যগুলোয় জন এফ কেনেডি-সহ চন্দ্রাভিযানের সেই সময়ের সাদাকালো রিয়েল ফুটেজ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, সত্য ঘটনার সাথে এভাবে ফ্যান্টাসি মিশিয়ে সিনেমাটা ব্যবসাসফল ও দর্শকপ্রিয় হবার সাথে সাথে স্বার্থান্বেষী মনোভাব প্রচার করা।</p>
<p>এরপরের ঘটনাপ্রবাহে মানুষ-রোবটের এলায়েন্স হয়, প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়। এমনকি এই আমেরিকাই এখন মানুষ-মানুষে হানাহানি বন্ধ করতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার করে!</p>
<p>মুভির ভাষাতেই বলি। ট্রান্সফরমার্স-এর মূল চরিত্রগুলোর দলনেতা হচ্ছে অপটিমাস প্রাইম। পশ্চিমাদের ভাষ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের কল্পিত তাও আবার ‘নিষিদ্ধ’ নিউক্লিয়ার সাইটের উদ্দেশে মুভির প্রেক্ষাপটে ট্রান্সফরমার্স-এর মূল চরিত্রগুলো যাত্রা করে। সে সময় অপটিমাস প্রাইমকে বলতে শোনা যায়,</p>
<p>❝In the years since our arrival, our new home, Earth, has seen much change. Long-range defense systems watch the skies. Energon detectors guard its cities now. So now we assist our allies in solving human conflicts, to prevent mankind from bringing harm to itself.❞</p>
<p>অথচ, এরচেয়ে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে, জানা নেই। পৃথিবী বিধ্বংসী শক্তি স্বয়ং বলছে, তারা নাকি মানবহিতৈষী</p>
<p>সিনেমাটিতে মূলত সাই-ফাই একশন থ্রিলার জনর-এর হলেও ফ্র্যাঞ্চাইজির মুভিগুলোতে পলিটিক্স, ডিপ্লোম্যাসি আর সিক্রেট এজেন্সির উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মুভিগুলোর ব্যপ্তি ছিলো ওয়ার্ল্ডওয়াইড। রাশিয়া থেকে শুরু করে চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ হয়ে ল্যাতিন আমেরিকা পর্যন্ত।</p>
<p>এমনকি, ফ্র্যাঞ্চাইজির মুভিগুলোতে মানুষ-রোবটের এলায়েন্স হওয়ার প্রথম প্রশ্নটাই ছিলো, এই প্রযুক্তি যদি চিন-রাশিয়ার হাতে যায়, তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে?</p>
<p>মানুষ-রোবটের এলায়েন্স না হওয়ার ১০১টা যুক্তি থাকলেও এই প্রশ্নের কাছে গভর্নমেন্ট আর সিক্রেট এজেন্সির মতামত এক। অর্থাৎ, তারা চায় যেকোনো মূল্যে নেতৃত্বের সিংহাসন হাতে রাখতে।</p>
<p>আবার একজন দর্শক যখন অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি, মনোমুগ্ধকর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং স্বদেশ বিজয়ী হবার তৃপ্তিদায়ক এক হ্যাপি এন্ডিং দেখে, তখন সিনেমায় দেখানো প্রতিটি দৃশ্যই তার কাছে বাস্তবধর্মী মনে হবে এবং সিনেমায় দেওয়া বার্তাগুলো দর্শকের মগজে গেঁথে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই, এসব সিনেমা একটু সতর্ক হয়ে দেখা উচিত!</p>
<p>এখানেই শেষ নয়!<br />
আরো আছে, যেসবে তাদের দ্বিচারিতা ফুটে ওঠে।<br />
কোনো একটা জিনিসের যাচ্ছেতাই ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংস করে ঐ জিনিসটার প্রতিই আবার দরদ দেখানোটা পশ্চিমাদের অতি পরিচিত একটা স্বভাব।</p>
<p>প্রাণীদেরকে নিয়ে নিষ্ঠুর আর অমানবিক সব এক্সপেরিমেন্ট থেকে শুরু করে মানুষকে পর্যন্ত গিনিপিগ বানিয়েছে তারা। শিল্পায়নের নাম করে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে প্রকৃতির অবস্থাটা দুরবস্থা করতে এমন কোনো উপায় বাকী নেই, যেটার ব্যবহার তারা করেনি। প্রতি বছর শয়ে শয়ে পাখি মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিল্ডিংয়ের থাই গ্লাস বা কাচের জানালার সাথে ধাক্কা খেয়ে। ইনকা, মায়া, এযটেক সভ্যতাকে ধ্বংস করে সেসব জায়গায় ইট-পাথরের বস্তি বানিয়ে রেখেছে এখন তারা</p>
<p>অথচ, নেটফ্লিক্সের বিখ্যাত ডকু সিরিজ <strong>Our Planet</strong>-এর দ্বিতীয় সিজনের সম্ভবত প্রথম এপিসোডেই বিখ্যাত ন্যারেটর <strong>David Attenborough</strong> বলেন,</p>
<p>❝Across the island, chicks are dying. There is now so much plastic in our oceans, that it reaches even the most remote islands on Earth, carried here by the currents. And only now are we beginning to understand that all life on Earth depends on the freedom to move.❞</p>
<p>প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে প্রাণীদের উদ্বাস্তু করে এখন এসে তারা প্রকৃতির উপর দরদ দেখাচ্ছে। তারা বলছে, মানুষ নাকি কেবল বুঝতে শুরু করেছে প্রাণীদেরকে তাদের মতো করেই রেখে দিতে হয়।<br />
কিন্তু কোথায়? উন্নতির নাম করে শিল্পায়নের আগে তো কখনও প্রাণীরা তাদের জীবন নিয়ে এতোটা বিপাকে পড়েনি! উন্নতি কি আগে হয়নি?<strong> উসমানীয়দের সময়ে বরং প্রতিটি দালানেই নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকতো, যেখান থেকে পাখিরা বিশ্রাম নিতো আর খাবার খেতো। এমনকি, কোনো অঞ্চলে পাখিদের সুবিধার জন্য উঁচু উঁচু দালান নির্মাণ করা নিষিদ্ধ ছিলো।</strong></p>
<p>দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, পশ্চিমাদের এতোসব কাজ-কারবার যতোটা না আশ্চর্যজনক, তারচেয়েও বেশি আশ্চর্যজনক হলো, মানুষরা এসব আবার বিনা দ্বিধায় বিশ্বাসও করে থাকে।</p>
<p>এবার একটু আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটের দিকে নজর বুলিয়ে এই আলোচনার সমাপ্তি আঁকা যাক।<br />
আমাদের দেশে সিনেমা হল কেন বিলুপ্ত হলো, এর উত্তর খুঁজতে বসলে অবশ্য অনেকগুলো উত্তরই পাওয়া যাবে। তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা হলো ঝানু পরিচালক এবং অভিজ্ঞ গল্প-কথকের অভাব।</p>
<p>স্বাধীনতা উত্তর আমাদের সিনেমা অঙ্গন বেশ নামডাক অর্জন করেছিলো। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ১৯৮৯ এ মুক্তিপ্রাপ্ত “<strong>বেদের মেয়ে জোসনা</strong>” সিনেমাটি। হাল আমলের হাইপ তোলা কোনো সিনেমাই সেই পুরনো আমলের সিনেমার সফলতার ধারেকাছে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।</p>
<p>এমন উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি সিনেমার কারণে সিনেমা হলগুলোয় দর্শকের উপচেপড়া ভিড় দেখা যেতো। ছুটির দিনগুলোর বিশেষ আর্কষণই যেনো ছিলো সিনেমা হলগুলো। ইদানীং যেমন বিভিন্ন পার্ক রিসোর্টের প্রতি টান থাকে জনসাধারণের, তেমনি সে আমলে ছুটির দিনগুলোয় সিনেমা হলগুলোয় জায়গা পাওয়াটা কঠিন হয়ে যেতো।</p>
<p>এমন সফলতায় ভাটা পড়তে খুব একটা সময় লাগে না। বিনোদন ক্রমান্বয়ে ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, ভালো রুচিশীল সিনেমা নির্মাণে সময় ব্যয় হয়। কিন্তু, দর্শকদের এমন সিনেমাপ্রেম আর হলমুখিতা দেখে কয়েকজন পরিচালক ব্যবসায় নেমে পড়ে।</p>
<p>সেক্টরটা বিনোদন থেকে ব্যবসায় রূপান্তর হওয়ায় কমার্শিয়াল মুভির নামে প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমা তৈরির চল শুরু হয়। আর এসবের জন্য তো না লাগে কোনো ঝানু পরিচালক, না লাগে অভিজ্ঞ গল্প-কথক। ফলে, রুচিশীল দর্শক হারাতে শুরু করে সিনেমা হলগুলো। এক এক করে খালি হতে শুরু করে একটা পর্যায়ে এসে দর্শকশূন্য হয়ে পড়ে সিনেমা হলগুলো।</p>
<p>ফলাফল এসে দাঁড়ায়, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সারাদেশে যেখানে প্রায় সাড়ে চোদ্দোশত সিনেমা হল ছিলো, মাত্র এক যুগের ব্যবধানে সেখানে সিনেমা হলের সংখ্যা এসে দাড়ায় সাতশ&#8217;তে। কয়েকবছর আগে তা আরো নেমে এসে সংখ্যাটা হয় মাত্র একশোতে।</p>
<p>মূলত, যে বিষয়টার জন্য এতোগুলো কথা নিয়ে আসা, সেটা হলো, হুমায়ূন আহমেদ-এর “যমুনার জল দেখতে কালো” নাটকটা নিয়ে বলা।<br />
সেসময়ের সিনেমা সেক্টরের এমন দুরবস্থাকে ব্যঙ্গ করে হুমায়ূন আহমেদ এই নাটকটা পরিচালনা করেন। যেহেতু তিনি ছিলেন একজন বাম, আবার নামকরা পরিচালক, বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক “<strong>বাকের ভাই</strong>” চরিত্র যেখানে তারই সৃষ্টি, এমনকি অনেকে লেখক হুমায়ূন আহমেদ-এর চেয়ে পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ-কেই বেশি পছন্দ করে থাকে, সে হিসেবে দেশের সিনেমাঙ্গনের এমন দুরবস্থাকে কটাক্ষ করতে দেরি ন্যূনতমও কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি।</p>
<p>নাটকটার সময়কাল নিয়ে খুব একটা জানা যায় না। তবে, কলাকুশলীদের বয়স দেখলে টের পাওয়া যায়, সিনেমাঙ্গনে যেসময় এমন দুরবস্থা এবং নাটকের জয়জয়কার চলছিলো, এমন সময়ে পরিচালনা করা হয় নাটকটি।<br />
বাম ঘরানার এই সমালোচক পরিচালকের স্যাটায়ারমূলক নাটকটার কয়েকটা পয়েন্ট উল্লেখ না করলেই না। যেমন,</p>
<ul>
<li>১. অভিনেতাদের নামমাত্র অভিনয়।</li>
<li>২. যখন-তখন অভিনেতা পরিবর্তন করা।</li>
<li>৩. সিনেমার নামে পয়সার ব্যবসা।</li>
<li>৪. কমার্শিয়াল মুভির নামে প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমা তৈরি।</li>
<li>৫. পরিচালকদের উপর প্রোটাগোনিস্টদের আধিপত্য।</li>
<li>৬. প্রোটাগোনিস্টদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এবং সেসব নিয়ে কানাঘুষা।</li>
<li>৭. পুরো অভিনয় সেক্টরের উপর সংবাদকর্মীদের আধিপত্য।</li>
<li>৮. কমার্শিয়াল মুভির প্রতি নজর দেওয়ায় একই গল্প বারবার নিয়ে আসা।</li>
<li>৯. পরিচালকের জ্ঞানের দৈন্যতা এবং কলাকুশলীদের অযোগ্যতা।</li>
</ul>
<p>এসব দিক-সহ আরো অনেকগুলো দিককে ঝানু এই পরিচালক একেবারে হাস্যরসাত্মকভাবে কটাক্ষ করে উপস্থাপন করেছেন “যমুনার জল দেখতে কালো” নাটকটিতে।</p>
<p>অতএব, পরিশেষে এসে এটা বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, সিনেমা যেমন একদিকে একটা আর্ট, একটা শিল্প, বিপ্লবের মুখপাত্র এবং সাহিত্যের মতো সামাজিক দর্পণ; তেমনি অন্যদিকে সিনেমা শুধু সিনেমা না, এটা মানুষের চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম এবং পলিটিক্স ও ডিপ্লোমেসির অন্যতম সেরা একটি হাতিয়ার।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/is-cinema-just-entertainment/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15297</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আকালের সন্ধানে: ক্ষুধার পরম বন্ধু মৃণাল সেন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/in-search-of-famine-mrinal-sen/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/in-search-of-famine-mrinal-sen/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 29 Nov 2024 09:55:43 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15282</guid>

					<description><![CDATA[&#8220;হেই সামালো ধান হো কাস্তেটা দাও শান হো জান কবুল আর মান কবুল আর দেবনা আর দেবনা রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো। পঞ্চাশে লাখ প্রাণ দিছি মা-বোনদের মান দিছি, কালোবাজার আলো কর তুমি মা। মোরা তুলবোনা ধান পরের গোলায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&#8220;হেই সামালো ধান হো</p>
<p>কাস্তেটা দাও শান হো</p>
<p>জান কবুল আর মান কবুল</p>
<p>আর দেবনা আর দেবনা</p>
<p>রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো।</p>
<p>পঞ্চাশে লাখ প্রাণ দিছি</p>
<p>মা-বোনদের মান দিছি,</p>
<p>কালোবাজার আলো কর তুমি মা।</p>
<p>মোরা তুলবোনা ধান পরের গোলায়</p>
<p>মরবোনা আর ক্ষুধার জ্বালায় মরবোনা,</p>
<p>ধান জমিতে লাঙ্গল চালাই</p>
<p>ঢের সয়েছি আর তো মোরা সইবোনা।</p>
<p>এই লাঙ্গল ধরা কড়া হাতের শপথ ভুলবোনা।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কিংবদন্তী সংগীত পরিচালক সলীল চৌধুরীর এই গান অবিভক্ত বাংলার তেভাগা আন্দোলন এর সময় কৃষকদের করেছিলো তুমুল উজ্জীবিত। এই গান বাঙালি কৃষকদের শ্রমকে পরিণত করেছিলো শক্তিতে। &#8216;আকালের সন্ধানে&#8217; সিনেমাটি শুরুই হয় এই গান দিয়ে। পরবর্তীতে পুরো সিনেমা জুড়েই মিশে ছিলো এই গানের সুর।</p>
<p>বাংলা সিনেমার ইতিহাসে <strong>কিংবদন্তি</strong> <strong>ত্রয়ী</strong> <strong>সত্যজিত</strong> <strong>রায়</strong><strong>,</strong> <strong>হৃত্তিক</strong> <strong>কুমার</strong> <strong>ঘটক</strong> এর সাথে আরেকটি নাম অবধারিতভাবে চলে আসে, সেটি হলো <strong>&#8216;</strong><strong>মৃণাল</strong> <strong>সেন</strong><strong>&#8216;</strong><strong>।</strong> যিনি প্রায় ৫ দশক ধরে শুধুমাত্র বাংলা নয়, গোটা উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছেন। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক সচেতনতার আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তিনি। ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম মৃণাল সেনের। ফরিদপুরে হাইস্কুল পর্যন্ত পড়ে ৪৩ এ চলে যান কলকাতায়। সেখানেই বামপন্থী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তিনি সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই তার সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। <em>৬৯</em> <em>সালে</em><em> &#8216;</em><em>ভুবন</em> <em>সোম</em><em>&#8216; </em><em>সিনেমা</em> <em>দিয়ে</em> <em>আন্তর্জাতিক</em> <em>অঙ্গনে</em> <em>জনপ্রিয়</em> <em>হয়ে</em> <em>উঠেন</em><em>।</em> এরপর তার ঐতিহাসিক কলকাতা ট্রিলোজির ৩ সিনেমা তাকে নিয়ে যায় সফলতার অনন্য উচ্চতায়। বিভক্ত স্বাধীন ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জীবন ও অবিভক্ত বাংলায় ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ-আকাল-মৃত্যুর তুলনা ও দুই সময়ের পর্যবেক্ষণে ১৯৮০ সালে তৈরি করলেন &#8216;আকালের সন্ধানে&#8217;। &#8216;আকালের সন্ধানে&#8217; ছবিতে পরিচালক মৃণাল সেন ব্যবহার করেন তৎকালিন জনপ্রিয় অভিনেত্রী স্মিতা পাটিলকে। স্মিতা তখন বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তারকা। কিন্তু চরিত্রটি তার এতই পছন্দ হয় যে তিনি মৃণাল সেনের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হন। সাদা-কালো মনোক্রোমে এ ছবি আন্তর্জাতিক সিনেমাতেও অমূল্য। সিনেমায় মানুষকে বাস্তব দেখানো হয়। <em>কিন্তু</em> <em>তার</em> <em>চরিত্রায়ন</em><em>&#8211; </em><em>আলো</em> <em>নির্মাণ</em><em>, </em><em>শব্দ</em> <em>সংযোজন</em> <em>সবই</em> <em>কৃত্রিমভাবে</em> <em>তৈরি</em> <em>যা</em> <em>চলচ্চিত্র</em> <em>সৃষ্টির</em> <em>প্যারাডক্স</em><em>।</em> <em>এই</em> <em>প্যারাডক্সকে</em> <em>মৃণাল</em> <em>সেন</em> <em>দেখান</em><em>, &#8216;</em><em>ফিল্ম</em> <em>উইদিন</em> <em>ফিল্ম</em><em>&#8216; </em><em>পদ্ধতির</em> <em>মাধ্যমে</em> <em>আকালের</em> <em>সন্ধানে</em> <em>ছবিতে</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই ছবির পরিচালক হিসেবে <strong>মৃণাল</strong> <strong>সেন</strong> <strong>১৯৮১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>বার্লিন</strong> <strong>আন্তর্জাতিক</strong> <strong>চলচ্চিত্র</strong> <strong>উৎসবে</strong> <strong>জুরি</strong> <strong>বোর্ডের</strong> <strong>বিশেষ</strong> <strong>পুরস্কার</strong> <strong>পান</strong><strong>।</strong> এ ছাড়া মৃণাল সেন এ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার <strong>&#8216;</strong><strong>স্বর্ণকমল</strong><strong>&#8216;</strong> এবং শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের জন্য <strong>&#8216;</strong><strong>রজতকমল</strong><strong>&#8216;</strong> পুরস্কার লাভ করেন। এতে পরিচালকের চরিত্রে অভিনয় করেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। অভিনয় করেছেন স্মিতা পাটিল, দীপংকর দে এবং শ্রীলা মজুমদারসহ আরও অনেকেই। অভিনয় করেছেন মৃণাল সেনের স্ত্রী গীতা সেনও।</p>
<p>সিনেমার শুরুতেই দেখা যায় চিরায়ত গ্রামের ছবি। সবুজ-শ্যামলে ছেয়ে থাকা গ্রাম হাতুই। সেই সবুজের ফাঁক চিড়ে এগিয়ে যেতে থাকে এক ট্রেন। চিরায়ত সবুজের ভাণ্ডার এই হাতুই গ্রামে আবির্ভাব ঘটে এক সিনেমা দলের। তারা এসেছেন &#8216;৪৩ এর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে সিনেমা বানাতে। তারা সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলতে চান সেই মন্বন্তরের কাহিনী, ব্রিটিশের তৈরি ১৯৪৩ সালের যে মন্বন্তরে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তাদের প্রবেশের সাথে সাথেই আমরা শুনতে পাই গ্রাম্য ভাষায় এক বৃদ্ধের তিরস্কার, <strong>&#8220;</strong><strong>বাবুরা</strong> <strong>এয়েছেন</strong> <strong>আকালের</strong> <strong>ছবি</strong> <strong>তুলতে</strong><strong>।</strong> <strong>আকাল</strong> <strong>তো</strong> <strong>আমাদিগের</strong> <strong>সব্বাঙ্গে</strong><strong>।</strong><strong>&#8221; </strong></p>
<p>সিনেমার দলটি তাদের থাকার জায়গা হিসেবে বেছে নেয় এক পুরোনো বনেদি বাড়ি যেখানে আগেকার সময়ের বনেদিয়ানার ছাপ রয়েছে স্পষ্ট। পরিত্যক্ত পাঠাগার আছে। আছে ঐতিহাসিক কিছু বইয়ের কালেকশন। এরপর শুরু হয় শুটিং, <em>গ্রামের</em> <em>মানুষ</em> <em>ভীড়</em> <em>করে</em> <em>শুটিং</em> <em>স্থলে</em><em>।</em> <em>এটা</em> <em>কোনো</em> <em>নাচ</em> <em>গানের</em> <em>সিনেমা</em> <em>নয়</em> <em>তবুও</em> <em>মানুষের</em> <em>এত</em> <em>উপচে</em> <em>পড়া</em> <em>ভীড়ের</em> <em>কারণ</em> <em>হলো</em> <em>তারা</em> <em>তাদের</em> <em>জীবনকে</em> <em>দেখতে</em> <em>পাচ্ছে</em> <em>চোখের</em> <em>সামনে</em><em>।</em> আকালে সাথে তারা পরিচিত যুগ যুগ ধরে। শ্যুটিং দেখতে আসা সব শিশু কিশোর এর হাড্ডিসার দেহই বলে দেয় ক্ষুধার সাথে কত পরিচিত তারা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শ্যুটিং চলাকালীন সময় এক নারী অভিনেত্রী ডিরেক্টরের সঙ্গে গণ্ডগোল করে কাউকে না জানিয়ে কলকাতায় ফিরে যান। সমাধানে এগিয়ে আসেন গ্রামের এক মধ্যবয়স্ক। তিনি নিজে গ্রামে যাত্রাপালা, নাটক করেছেন। তাঁর বিশ্বাস গ্রামের সকলে মন্বন্তরের কাহিনী চলচ্চিত্রায়নের সৎ প্রচেষ্টায় সাহায্য করবে। চরিত্রটি এক তরুণীর, খিদের জ্বালায় সে এখন পতিতা। গ্রামের সেই মধ্যস্থতাকারীর কথায় ঠিক হয় যে স্থানীয় একটি তরুণীকে (ঘটনাচক্রে সে উচ্চবর্ণের) শিখিয়ে কাজ চালানো হবে। সমস্যার শুরু হয় এখান থেকেই। কিন্তু চরিত্রটি একজন পতিতার এটা শোনা মাত্রই গ্রামের মানুষজন প্রচন্ড বিরোধিতা করা শুরু করে। এই গ্রামের নারীদের সম্মানহানীর অভিযোগ তুলেন তারা। পরবর্তীতে পুলিশ এর সাহায্য শুটিং সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিলেও সেটি সম্ভব হয়নি। শেষে হাতুই গ্রামে শুটিং অসমাপ্ত রেখেই কলকাতায় ফিরে যেতে হয় সিনেমার দলটির।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলো গ্রামের কৃষক &#8220;হরেন&#8221;। গ্রাম ঘুরে দেখতে বের হয়ে তার সাথে পরিচয় হয় সিনেমা দল এর পরিচালক এর সাথে। হরেন পরিচালককে বলে সে কলকাতা থেকে কার্ল মার্ক্সের বই এনে সিনেমা করতে চেয়েছিলো। এটি শুনে আশ্চর্য হন পরিচালক। হরেন এর কথায় আরও চমকে যান ডিরেক্টর। <em>কারণ</em><em>, </em><em>হরেন</em> <em>বলে</em> <em>তার</em> <em>চেহারা</em> <em>নাকি</em> <em>রুশদের</em> <em>মতো</em> <em>এবং</em> <em>কার্ল</em> <em>মার্ক্সের</em> <em>সেই</em> <em>বইয়ের</em> <em>নাম</em> <em>ভূমিকায়</em> <em>নাকি</em> <em>তার</em> <em>অভিনয়</em> <em>করার</em> <em>কথা</em> <em>ছিলো</em><em>।</em> তখন পরিচালক গ্রামের মানুষের জানার অক্ষমাতা সম্পর্কে বুঝতে পারলেন এবং তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হন যখন  সেখানে বলা হয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী হচ্ছেন <strong>এন্তনিও</strong> <strong>কুইন।</strong> কুইন ছিলেন &#8216;গান্স অব ন্যাভেরন&#8217; সিনেমার একজন অভিনেতা কিন্তু তাকে বলা হচ্ছে সুন্দরী।</p>
<p>ছবির অন্য আরেকটি চরিত্র হলো &#8216;দূর্গা&#8217;। শ্যুটিং সেটে পরিচারিকার কাজ করে দুর্গা। শ্যুটিংয়ে পারিবারিক কলহের সময় যখন স্বামী রাগে তার বাচ্চাটাকে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলতে যায়, তখন সেই দুর্গা চিৎকার দিয়ে উঠে। শ্যুটিং সেট পুরোটাই চুপ হয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে যান পরিচালক নিজেই। ধীরে ধীরে শ্যুটিং স্পট থেকে বের হয়ে যায় দূর্গা।</p>
<p>দূর্গা তো তেতাল্লিশের আকাল দেখেনি। তাহলে এই অবস্থা দেখে তার আঁতকে ওঠার কারণ কী হতে পারে? তার একটি বাচ্চা রয়েছে। ঘরে তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। এ অবস্থায় তার এই প্রতিক্রিয়ার একটাই মানে হতে পারে। বর্তমানে টিকে আছে আকাল। তার মতো অনেকেই সেই আকালের ভুক্তভোগী। পরিবারকে চালাতে হয় কষ্ট করে। হয়তো ঘৃণার পথ বেছে নিতে পারেন না। কিন্তু অন্যের হয়ে গতর খেটে কাজ করে সেই আকালকে সামাল দিচ্ছেন তারা। তবে তাদের মনের ভেতরে টিকে আছে প্রচণ্ড দুঃখবোধ, যা প্রায়ই বেরিয়ে আসতে চায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আকালের</strong> <strong>সন্ধানে</strong><strong>&#8216;-</strong><strong>র</strong> <strong>সবচেয়ে</strong> <strong>শক্তিশালী</strong> <strong>দিক</strong> <strong>হলো</strong> <strong>চিত্রনাট্য</strong><strong>, </strong><strong>অভিনয়</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সম্পাদনা</strong><strong>।</strong> মৃণাল সেন বলতে চেয়েছেন মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের অন্তঃসারশূন্যতা। ছবিতে যে গ্রামে শ্যুটিংএর কথা, সে গ্রামও আকালের ভুক্তভোগী- গ্রামের উচ্চবর্ণের তরুণীর বাবা মেয়েকে চটুল বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করতে দিতে উৎসাহী, অথচ তিনি &#8216;ব্রাহ্মণ পরিবারের&#8217; মেয়েকে মন্বন্তরের শিকার এক পতিতার ভূমিকায় অভিনয় করতে দিতে ভীষণ নারাজ। আকালের তাড়নায় পতিতা হওয়া দেখানোটা তাঁর কাছে ভয়ংকর অনৈতিক ও অশ্লীল। তারপর গ্রামের সাধারণ মানুষদের সহজেই ক্ষেপিয়ে তোলা হলো শহর থেকে আসা ছবি-নির্মাতাদের বিরুদ্ধে, অশ্লীলতার দোহাই দিয়ে। <em>আমার</em> <em>মতে</em> <em>এটি</em> <em>মৃণালের</em> <em>মধ্যবিত্ত</em> <em>সমাজের</em> <em>দ্বিচারিতার</em> <em>মুখোশ</em> <em>খুলে</em> <em>দেওয়ার</em> <em>একটি</em> <em>অতি</em> <em>প্রকৃষ্ট</em> <em>উদাহরণ</em><em>।</em> একটি দৃশ্যে শুটিং সেটের ডিরেক্টর বলতে থাকে, &#8220;১৯৪৩। সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ। আর আমাদের দেশে? এই বাংলাদেশে? দেশ তখনও ভাগ হয়নি। একটা গুলি চললো না, একটা বোমাও পড়লো না। <strong>কিন্তু</strong> <strong>একটি</strong> <strong>বছরে</strong> <strong>মরে</strong> <strong>গেল</strong> <strong>৫০</strong> <strong>লক্ষ</strong> <strong>মানুষ</strong>। স্রেফ না খেতে পেয়ে। দে জাস্ট স্টার্ভড অ্যান্ড ড্রপড ডেড।&#8221; সিনেমার ইতিহাসে এমন সাহসী যুক্তি সম্পন্ন সংলাপ শুধু মাত্র মৃণাল সেন এর মতো পরিচালকরাই হয়তো ব্যাবহার করেছেন।</p>
<p>মৃণাল সেন পরিচালক হিসেবে কতটা দক্ষ সেটি তিনি প্রমাণ করেছেন বহু আগেই কিন্তু এই সিনেমায় তিনি উদ্ভাবন করেছেন নতুন এক ধারা কিংবা সিস্টেম। আকালের সন্ধানে যেহেতু ‘ফিল্ম উইদিন ফিল্ম’ তাই শট নেওয়ার সেটআপও ছিলো সত্যিকার শ্যুটিং সেটের মতো। আশির দশকের চলচ্চিত্রের ফ্রেমিংয়ে এত ডিটেইলিং ছিলো উল্লেখযোগ্য ব্যপার। প্রতিটা দৃশ্য এবং সাথে চলমান আবহ সংগীত ছিলো যথেষ্ট জীবন্ত।</p>
<p>মৃণাল সেন দেখেছিলেন অমানবিক দেশভাগে বাংলার টুকরো হয়ে যাওয়া। উপনিবেশ শাসনোত্তর এক অপদার্থ রাষ্ট্র রোধ করতে পারেনি বাংলার ভয়াবহ দাঙ্গা, আটকাতে পারেনি ক্রমশ ধ্বসে পড়া অর্থনীতি, বেকারত্ব, উদ্বাস্তু, দারিদ্র্য। এই সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে উঠে এসেছিলো বাম রাজনীতি, তৈরি হয়েছিলো যুক্তিহীন, আবেগতাড়িত &#8216;আমরা-ওরার&#8217; সাদা-কালো বিভাজন। &#8216;আমরা&#8217; অর্থাৎ শোষিত শ্রমজীবী এবং &#8216;ওরা&#8217; অর্থাৎ শোষক&#8211;বড়লোক, শিল্পপতি এবং আমলার দল। এই সরলীকরণ অতি সহজপাচ্য, তাই এতেই ভেসে গিয়েছিলো বাংলা, ভেসেছিলেন মৃণাল সেন। &#8216;বাইশে শ্রাবণ&#8217;, &#8216;কলকাতা ট্রিলজি&#8217;, &#8216;কোরাস&#8217; সৃষ্টির অন্তর্নিহিত আবেগ হয়ত এটাই ছিলো। এ ছবিগুলিতে মৃণাল সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন সামাজিক অদক্ষতা, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে, আঙুল তুলেছিলেন &#8216;ওদের&#8217; দিকে। শীঘ্রই মৃণাল সরে আসেন আবেগতাড়িত ভাবনা থেকে। শুরু হয় তাঁর আত্মবীক্ষার পর্ব, নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখা; &#8216;পদাতিক&#8217; দিয়ে যার শুরু, &#8216;একদিন প্রতিদিন&#8217;, তারপর &#8216;আকালের সন্ধানে&#8217;।</p>
<p>মৃণাল সেন তো কেবল একজন নিছক চলচ্চিত্রকারই ছিলেন না। <strong>মৃণাল</strong> <strong>সেন</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>চলচ্চিত্র</strong> <strong>আন্দোলন</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>সাংস্কৃতিক</strong> <strong>আন্দোলন</strong><strong>, </strong><strong>সমাজ</strong> <strong>ও</strong> <strong>রাজনীতির</strong> <strong>অন্যতম</strong> <strong>শ্রেষ্ঠ</strong> <strong>পুরোধা</strong><strong>।</strong> <strong>যিনি</strong> <strong>সমাজ</strong><strong>, </strong><strong>রাজনীতি</strong><strong>, </strong><strong>সংস্কৃতি</strong><strong>, </strong><strong>গণ</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>ভাষ্য</strong> <strong>সমস্ত</strong> <strong>কিছুকে</strong> <strong>বিবেচনা</strong> <strong>করতেন</strong> <strong>চলচ্চিত্রের</strong> <strong>দলিল</strong> <strong>হিসেবে</strong><strong>।</strong> মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী যে দিক তা হলো গল্পের বাস্তবতা। <strong>কাল্পনিক</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>গল্পের</strong> <strong>স্থান</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>না</strong> <strong>মৃণাল</strong> <strong>সেনের</strong> <strong>চলচ্চিত্রে</strong><strong>।</strong> অতি সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প, পারিপার্শ্বিক অবস্থান, রাজনীতির চিরন্তন বাস্তবতা, অভাব, দৈনন্দিন চিত্র, মানুষের পরিভাষাই ছিলো মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের গল্প। যে গল্পগুলো সচেতনভাবেই বেশিরভাগ চলচ্চিত্রকাররা এড়িয়ে চলেন। তার চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি নিজেই বলেন, &#8220;আমি অন্যদের মতো কাহিনী নির্ভর ছবি তৈরি করিনি। ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার আমি নই। আমার সিনেমা <strong><em>জ্ঞান</em></strong> <strong><em>ও</em></strong> <strong><em>প্রমাণ </em></strong> দিয়ে বুঝতে হবে।&#8221;</p>
<p>“আপনি বিভিন্ন ভাষায় এত ছবি করেন কেনো?” তাঁর কাছে এমন প্রশ্ন এসেছে বারেবারে। একটাই উত্তর ছিলো &#8220;আমি দারিদ্র্য নিয়ে ছবি করি। ধেয়ে আফ্রিকাতে গিয়ে সোয়াহিলি ভাষায় ছবি করতেও আমার কোনো অসুবিধে হবে না।&#8221; ভাষা তাই তাঁর কাছে বাধা হয়নি কখনও। বরং তিনি ছুটেছেন বিষয়ের কাছে। বারবার বেছে নিয়েছেন গ্রাম্যতাকে, ক্যামেরা তাক করেছেন গরীবগুর্বো মানুষগুলোর চোখে-মুখে। &#8216;মাটির মনিষা&#8217; করার জন্যে ছুটেছেন উড়িশার গ্রামে, &#8216;ভুবন সোম&#8217; করতে গুজরাটের প্রত্যন্ত প্রান্তে, &#8216;ওকা উড়ি কথা&#8217; বা &#8216;কফন&#8217;-এর সময় তেলেঙ্গানার অজপাড়া গ্রামেও পৌঁছেছিলেন মৃণাল সেন।</p>
<p>মৃণাল সেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব ইরানের বিখ্যাত নির্মাতা জাফর পানাহি কলকাতায় এসে যাঁর খোঁজ করেন। কিংবদন্তি নির্মাতা মার্টিন স্করসেজির ব্যাক্তিগত আর্কাইভ এ যিনি থাকেন। যার বন্ধু ছিলেন নোবেল বিজয়ী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, যিনি নিজে মৃণাল সেন কে তার গল্পে সিনেমা বানানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।</p>
<p>তেতাল্লিশ এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে &#8216;অশনি সংকেত&#8217; বানিয়েছিলেন সত্যজিত রায় কিন্তু মৃণাল সেন এর আকালের সন্ধানের সাথে রয়েছে অনেক পার্থক্য। &#8216;আকালের সন্ধানে&#8217;, &#8216;অশনি সংকেত&#8217; এর মতো কাব্যিক নয় কিন্তু তার অভিঘাত বড় সাংঘাতিক।</p>
<p>মৃণাল সেন বরাবরের মতই প্রচন্ড স্পষ্টবাদী ছিলেন এই সিনেমায়। আজও বাঙালির কৃষক শ্রমিক এবং সমাজের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ক্ষুধা এবং দরিদ্রতার আঁধারে নিমজ্জিত। প্রতিনিয়তই আমরা খবরের কাগজের কোনো ক্ষুদ্র প্যারায় দেখতে পাই, ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে সন্তান অথবা বৃদ্ধ মা, বাবা। তার এই সিনেমায় তেতাল্লিশ থেকে আশির দশকের গ্রাম বাংলার মানুষের দুঃখ বেদনা মিলেমিশে একাকার হয়েছে। যে চিত্র আজও প্রতীয়মান রয়েছে স্পষ্টভাবে। এই সিনেমার ডায়ালগ গুলোর মত আজও প্রাসঙ্গিক গ্রাম বাংলার আর্থসামাজিক অবস্থা।</p>
<p><strong>&#8220;</strong><strong>আকাল</strong> <strong>এখনও</strong> <strong>আমাদের</strong> <strong>সর্বাঙ্গে</strong><strong>।</strong><strong>&#8220;</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/in-search-of-famine-mrinal-sen/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15282</post-id>	</item>
		<item>
		<title>&#8216;A Separation&#8217; তেহরান থেকে লস এঞ্জেলস; ইরানি সিনেমার শ্রেষ্ঠত্বের আখ্যান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/a-separation-from-tehran-to-los-angeles/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/a-separation-from-tehran-to-los-angeles/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 22 Nov 2024 03:30:38 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15237</guid>

					<description><![CDATA[চলচ্চিত্র একটি সৃষ্টিশীল গণমাধ্যম। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ। যে দেশে তা নির্মিত হয় সে দেশের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্রটি। বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রের হালচাল নিয়ে আলাপ করতে গেলে বলতে হয় রূপকথার জন্য বিখ্যাত পারস্যের কথা-]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>চলচ্চিত্র একটি সৃষ্টিশীল গণমাধ্যম। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ। যে দেশে তা নির্মিত হয় সে দেশের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্রটি। বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রের হালচাল নিয়ে আলাপ করতে গেলে বলতে হয় রূপকথার জন্য বিখ্যাত পারস্যের কথা- যার বর্তমান নাম ইরান। বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারসমৃদ্ধ ইরানে আনুমানিক ১৯০০ সালে আমদানিকৃত কিছু চলচ্চিত্র দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। ১৯০০ সালের ১৮ আগস্ট প্রথম একজন ইরানি ক্যামেরায় চিত্র ধারণ করেছিলেন। তবে সেদেশে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৩০ সালে-যার নাম &#8216;আবি ভা রাবি&#8217; (আবি ও রাবি), যা পরিচালনা করেন আভানেস ওহানিয়ান।</p>
<p>হলিউড-বলিউড এর বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান সময়ে ইরানি চলচ্চিত্র নিজেদের সমাজবাস্তবতা, ঐতিহ্য ও জীবনবোধের উপস্থাপনে তৈরি করে নিয়েছে স্বকীয় গ্রহণযোগ্যতা। এর সবচেয়ে উজ্জ্বলতম উদাহারণ &#8216;অ্যা সেপারেশন&#8217;।</p>
<p>&#8216;অ্যা সেপারেশন&#8217; মুভিটি ২০১২ সালে অস্কারের ৮৪তম আসরে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার জিতে নেয়। <strong>অস্কারের</strong> <strong>৮৪</strong> <strong>বছরের</strong> <strong>ইতিহাসে</strong> <strong>ওটাই</strong> <strong>ছিলো</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>প্রধান</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>ক্যাটাগরিতে</strong> <strong>অস্কার</strong> <strong>বিজয়</strong><strong>।</strong> ছবিটির নির্মাতা &#8216;আসগর ফরহাদী&#8217;। যিনি মঞ্চ নাটকের পটভূমি থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে এসে ইরানকে এনে দিয়েছেন সর্বাধিক অস্কার।</p>
<p>সিনেমায় দেখা যায়, সিমিন আর নাদের ইরানের উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী এক দম্পতি, যাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় চৌদ্দ বছর। তাদের এগারো বছরের এক মেয়েও আছে, নাম তেরমাহ। আর আছে আশি বছরের বৃদ্ধ বাবা, যিনি আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। সিমিন আমেরিকায় যাবার সুযোগ পেয়েছে, সে তার স্বামী এবং মেয়েকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে-মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। কিন্তু স্বামী নাদের তার অসুস্থ, বৃদ্ধ বাবাকে ফেলে কোথাও যেতে চাইছে না। তাই উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখা সিমিন এক পর্যায়ে আদালতে ডিভোর্সের আবেদন করে। যথার্থ কারণ নেই বলে পারিবারিক আদালত ডিভোর্সের আবেদন নাকোচ করে দেয়। হতাশ হয়ে সিমিন তার বাবার বাড়িতে চলে যায় আর তার মেয়ে তেরমাহ থাকে নাদেরের কাছে। মেয়ে তেরমাহ বাবা নাদেরের সাথে থেকে যায় এই আশায় যে, সিমিন ফিরে আসবে।</p>
<p>নাদের বৃদ্ধ বাবাকে দেখা-শোনা করার জন্য এক ধার্মিক, নিম্ন বিত্ত পরিবারের নারী রাজিয়াকে নিয়োগ দেয়। রাজিয়া তার স্বামীর অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর জন্য স্বামীকে না জানিয়েই কাজ করা শুরু করে। ঘটনাবহুল গল্পটি শেষ সিনে আবার ফিরে আসে শুরুর সেই কোর্টরুমেই এবং তখন পরিলক্ষিত হয় নাদের এবং সিমিনের বিবাহ বিচ্ছেদ অবশেষে সম্পন্ন হয়েছে। <em>বিচারক</em> <em>তাদের</em> <em>সন্তান</em> <em>তেরমাহ</em><em>&#8211;</em><em>কে</em> <em>বলে</em><em> &#8216;</em><em>বাবা</em> <em>অথবা</em> <em>মা</em> <em>কার</em> <em>কাছে</em> <em>সে</em> <em>থাকবে</em><em>&#8216; </em><em>সেই</em> <em>সিদ্ধান্ত</em> <em>জানাতে</em><em>।</em> <em>তেরমাহ</em> <em>সিদ্ধান্ত</em> <em>জানানোর</em> <em>আগেই</em> <em>শেষ</em> <em>হয়</em> <em>সিনেমা</em> <em>আর</em> <em>প্রশ্নটি</em> <em>রয়ে</em> <em>যায়</em> <em>দর্শক</em> <em>এর</em> <em>মনে</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8216;আসগর ফরহাদী&#8217; তার চলচ্চিত্রে পরিবার এবং সমাজের জটিল সম্পর্কগুলো তুলে ধরেন, <strong>কিন্তু</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>সমাধান</strong> <strong>দেন</strong> <strong>না</strong><strong>।</strong> <strong>সেটা</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>দর্শকদের</strong> <strong>বিচারের</strong> <strong>উপরেই</strong> <strong>ছেড়ে</strong> <strong>দেন</strong><strong>।</strong> যেমন সিনেমার শুরুর সিনে দেখা যায় সিমিন-কে জিজ্ঞেস করা হয়, &#8216;কেন সে দেশ ছাড়তে চায়?&#8217;-এই প্রশ্নের জবাবে সিমিন শুধু বলে &#8216;মেয়েকে এই পরিবেশে বড় করতে চায় না&#8217;। কেমন পরিবেশ? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সিমিন। ফরহাদী ততক্ষণে গল্প নিয়ে যায় অন্য কোথাও, কিন্তু দর্শক এর কাছে রেখে যায় সিমিন এর জবাব না দেওয়া প্রশ্নটি। কেমন পরিবেশে বাস করে ইরানের মেয়েরা?</p>
<p>দর্শকদেরকে পরিষ্কারভাবে ভালোমন্দ চিনিয়ে না দেওয়া, অথবা কোনো একটি চরিত্রের পক্ষে দর্শকদের সমর্থন তৈরির চেষ্টা না করা প্রসঙ্গে ফরহাদী বলেন, <strong>&#8220;</strong><strong>আমি</strong> <strong>দর্শকদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>আমার</strong> <strong>বিচারবোধ</strong> <strong>চাপিয়ে</strong> <strong>দিতে</strong> <strong>পছন্দ</strong> <strong>করি</strong> <strong>না</strong><strong>।</strong><strong>&#8220;</strong> তার মতে, বর্তমান বিশ্বে উত্তরের চেয়ে প্রশ্নের প্রয়োজন অনেক বেশি। সব কিছুর উত্তর দিয়ে দেওয়া হলে মানুষ প্রশ্ন করার, চিন্তা করার অগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। <strong>সিনেমা</strong> <strong>হলেই</strong> <strong>যদি</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>সমস্যার</strong> <strong>সমাধান</strong> <strong>দেখিয়ে</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তাহলে</strong> <strong>সিনেমাটা</strong> <strong>হলের</strong> <strong>মধ্যেই</strong> <strong>শেষ</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>যায়</strong><strong>।</strong> কিন্তু যদি দর্শকদের মনের মধ্যে প্রশ্নগুলো জাগ্রত রাখা যায়, তাহলে সিনেমাটা মূলত শুরুই হয় সেটা দেখার পর থেকে। মানুষের মনে সিনেমার কাহিনী, চরিত্রগুলোর বক্তব্য, তাদের সমস্যাগুলো আলোড়ন সৃষ্টি করতে থাকে।</p>
<p><strong>এত</strong> <strong>ঘটনাবহুল</strong> <strong>একটা</strong> <strong>সিনেমায়</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>নেগেটিভ</strong> <strong>চরিত্র</strong> <strong>বা</strong> <strong>ভিলেন</strong> <strong>বলা</strong> <strong>যায়</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কাউকে</strong> <strong>দেখা</strong> <strong>যায়নি</strong><strong>।</strong> কারণ প্রতিটি চরিত্রের কাজের পিছনেই ছিলো যুক্তিসঙ্গত কারণ। তাই পাওয়া যায়নি কাউকে অপরাধী বানানোর সুযোগ। এই ছবির চরিত্রগুলোর মধ্যে দেখা যায় সবাই নিজের অবস্থান, বাস্তবতা, অনুভূতি-জীবনবোধ ও সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গে নিয়ে ভালো এবং খারাপের মাঝখানের দাঁড়িয়ে আছে। ফরহাদী তার চলচ্চিত্রে কাউকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করে বাহবা দেওয়ার চেষ্টা করেননি, আবার কাউকে ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে ঘৃণার পাত্র বানাতে চাননি। তিনি যেটা চান সেটা হচ্ছে, চরিত্রগুলোর প্রতি সহানুভূতি তৈরি করা। <strong>এই</strong> <strong>সহানুভূতি</strong> <strong>থিমটির</strong> <strong>প্রতি</strong> <strong>ফরহাদী</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাত্রায়</strong> <strong>দুর্বল</strong><strong>।</strong> <strong>তার</strong> <strong>প্রায়</strong> <strong>সবগুলো</strong> <strong>চলচ্চিত্রের</strong> <strong>মূলভাবই</strong> <strong>হলো</strong> <strong>সহানুভূতি</strong><strong>।</strong></p>
<p>ফরহাদীর ট্রেডমার্ক হলো অসাধারণ শট মেকিং। তিনি মানুষের সঙ্কটকে দেখানোর জন্য ক্যামেরাকে নেড়েচেড়ে অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করিয়ে একটি শটকে অনেকগুলো খণ্ড খণ্ড শটে ভেঙে গল্প বলার প্রচেষ্টা করেন। তার স্বাতন্ত্র্যের পুরস্কারই হয়তো দু&#8217;বার অস্কার জয়।</p>
<p>এই মুভিতে অধিকাংশ দৃশ্যই হ্যান্ড ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে যা তার কাজে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অভিনেতারা করেছেন অসাধারণ অভিনয়। নাদেরের ভূমিকায় পেয়ম্যান মোয়াদি, সিমিন চরিত্রে লায়লা হাতামি, রাজিয়া ভূমিকায় সারেহ বায়াত, নাদের আর সিমিনের মেয়ের চরিত্রে পরিচালকের নিজের মেয়ে সারিনা ফরহাদীসহ সবার অভিনয়ই ছিলো প্রাণবন্ত এবং বাস্তবিক। যে কারণে প্রথম কোনো ইরানি ছবি হিসেবে বার্লিন ফেস্টিভ্যালের অভিনয় ক্যাটাগরি&#8217;র সবগুলো পুরস্কারই এই ছবির শিল্পীরা পেয়েছিলেন।</p>
<p>সিমিনের চরিত্রটা দিয়ে পাশ্চাত্যের জীবনের দিকে উন্মুখ তাকিয়ে থাকা ইরানি মধ্যবিত্তদের মানসিকতা নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে বলে কেউ কেউ ফরহাদীকে বাহবা দিয়েছে, আবার আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের সামনে রাজিয়ার মতো ধার্মিকদের অসহায়তাকে সঙ্কট রূপে ব্যাখ্যা দেওয়ায় ইরানের সাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী ফরহাদীকে শুনিয়েছেন নিন্দার বাণী।</p>
<p>শুধুমাত্র দর্শক এর দৃষ্টিতে তাকালে আমাদের চোখে ভাসে নাদেরের কান্নার দৃশ্যটা, গৃহকর্মীর সাথে রূঢ় ব্যবহার করার পর নিজেই ভুগছেন অনুশোচনায়। এই দৃশ্যের পাশাপাশি দর্শক বোধ করে কি অসহনীয় আর বিপরীতমুখী সব অনুভূতির মাঝ দিয়ে আমাদের হেঁটে যেতে হয় প্রতিদিনের জীবনে।</p>
<p>মানুষের ঔচিত্যবোধের অনুভূতিকে এমন আশ্চর্য বৈপরীত্যে দোলাতে পারার ক্ষমতা দেখিয়েছেন আসগর ফরহাদী। ইরানি সিনেমার ইতিহাস শতবছরের। কিন্তু এখনও ব্যাপক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় নির্মাতাদের কারণ তারা কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের রুক্ষ ও দুঃখদায়ক বাস্তবতাকে নিয়ে। তাদের মূল বিষয় থাকে &#8216;মানুষ&#8217;। প্রভাবশালীদের অপকর্মের প্রভাবে সাধারণ মানুষের করুণ জীবনকে সিনেমায় দেখানোর কারণে জাফর পানাহির মতো চলচ্চিত্রকাররা গ্রেফতার হয় বারবার। কিয়ারোস্তমি, মাজিদি কিংবা মাখমালবেফ যারা ইরানি চলচ্চিত্রের সুদৃঢ় ভিত গড়ে দিয়েছেন, তারা নির্মাণভঙ্গি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কাব্যময়তাকে কিন্তু ফরহাদী হাঁটলেন না সে পথে। তিনি রুক্ষতাকে দেখাচ্ছেন রুক্ষভাবেই। &#8216;অ্যা সেপারেশন&#8217; তেমনই একটি ছবি যেখানে সম্পর্কের ভাঙন ও পারিবারিক টানাপোড়েন এর সাথে তুলে এনেছেন ইরানের সমাজে শ্রেণি বিভাজনে নারীদের অবস্থান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/a-separation-from-tehran-to-los-angeles/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15237</post-id>	</item>
		<item>
		<title>দ্যা &#8216;চিলড্রেন অব হ্যাভেন&#8217;</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-children-of-heaven/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-children-of-heaven/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 18 Dec 2023 13:00:23 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<category><![CDATA[দ্যা 'চিলড্রেন অব হ্যাভেন']]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4079</guid>

					<description><![CDATA[১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানে সমাজ সংস্কারের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে তার বড় একটা প্রভাব ইরানের শিল্প সাহিত্যে দেখা যায়। আজ বিশ্বে ইরানি সংস্কৃতির এতো নাম ডাক তাই-ই প্রমাণ করে। একটা বিষয় অকপটে স্বীকার করতেই হবে “রাজনৈতিক]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানে সমাজ সংস্কারের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে তার বড় একটা প্রভাব ইরানের শিল্প সাহিত্যে দেখা যায়। আজ বিশ্বে ইরানি সংস্কৃতির এতো নাম ডাক তাই-ই প্রমাণ করে। একটা বিষয় অকপটে স্বীকার করতেই হবে “রাজনৈতিক বিপ্লবের অপর নাম সাংস্কৃতিক বিপ্লব”</p>
<p>ইরান তাদের সিনেমা দিয়ে সাংস্কৃতিক জগতে বড় একটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে; আব্বাস খিয়োরোস্তামি, জাফর পানাহি, মাজিদ মাজিদি, বাহ্রাম  বেজাই, দারিয়স মেহেরজুই, মহসেন মাখমালবাফ, পারভেজ কিনাইভি, সামিরা মাখমালবাফ সহ এমন আরও একঝাঁক মেধাবী কঠোর পরিশ্রমী সিনেমাকারদের মাধ্যমে। রাষ্ট্রপক্ষ সিনেমার জন্য যে নীতিমালার বিধান করে রেখেছেন তা মুক্ত সিনেমার জন্য বাধা, তারপরও এই সিনেমাকাররা যেভাবে কৌশলে, ইশারা-ইঙ্গিতে সিনেমার শারীরিক বাচনভঙ্গি উপস্থাপন করে চলেছেন, তা পুরো সিনওয়ার্ল্ডের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতো বাঁধা বিপত্তির মাঝেও ইরানি সিনেমা সারাবিশ্বে যেভাবে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেটা সকল সুস্থ সংস্কৃতির চিন্তাধারার  সিনেপ্রেমিকদের জন্য অবশ্যই আনন্দদায়ক একইসাথে সুসংবাদও বটে।</p>
<blockquote><p>‘দ্যা চিলড্রেন অব হ্যাভেন’ ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র। মাজিদ মাজিদি কর্তৃক পরিচালিত একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির পরিচালক একইসাথে প্রযোজক, অভিনেতা এবং চিত্রনাট্যকার। যা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট দুই ভাই বোনের জুতা হারানোর কাহিনী দিয়েই সাজানো হয়েছে। আলী ও জারা ভাইবোন। স্বল্প আয়ের পরিবার। পাশাপাশি মা বিছানায় শয্যাশায়ী।</p></blockquote>
<p>সিনেমায় দেখানো হয় আলী তার বোন জারার ময়লায় মলিন ছেড়া জুতা জোড়া বাজারে ঠিক করতে এনে হারিয়ে ফেলে। এমনিতেই অভাবের সংসার। অসহায় নির্বাক মনে বাড়ি ফিরে বোনকে নতুন জুতা দেবার আশ্বাস দেয় এবং বাবা মা থেকে জুতা হারানোর বিষয় গোপন রাখতে অনুরোধ করে! বোনের বেদনা কিছুটা লাঘব করার প্রচেষ্টায় আলী তার নিজের পেন্সিল এবং ক্লাসে দ্বিতীয় হওয়ার পুরস্কার নীল কলম দিয়ে দেয়।</p>
<p>জারা নতুন জুতা পাবার আশায় আলীর বেমানান জুতা পায়ে মর্নিং শিফটে ক্লাস করে এবং স্কুল ছুটির পর দৌড়ে এসে আলীর স্কুলে যাবার পথে জুতা বদল করে তার দেওয়া কথা অনুযায়ী বাবা মা থেকে জুতা হারানোর কথা গোপন রাখে।</p>
<p>অসহায়ত্ব যখন মানুষের দ্বার প্রান্তে এসে হানা দেয়, কঠিন বাস্তবতার সম্মুখে বেদনাগুলোও তখন অনেক আনন্দের বস্তুতে পরিনত হয়। ভাই বোনের ভালোবাসা আর একে অপরের প্রতি সহানুভূতির দৃশ্যটা  আসলেই চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে উক্ত সিনেমায়।</p>
<p>এদিকে আলীর স্কুলে নিয়মিত অনিয়ম এবং দেরিতে গমন প্রধান শিক্ষকের নজর এড়াতে পারেনি। এর দরুন আলীকে কঠোর শৃঙ্খলার কথা শুনতে হয়। অন্যদিকে জারাও বিরক্ত প্রতিনিয়ত ভাইয়ের বেমানান জুতা পরে স্কুলে যাওয়া নিয়ে! আবার নিজেরই হারানো জুতা জারার নিজেরই ক্লাসমেট রয়া’র পায়ে দেখে অবাক হয়।</p>
<p>অবশেষে সুযোগ আসে আলীর! শহরের দৌঁড় প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার প্রতিযোগীর মাঝে আলীর লক্ষ্য ৩য় স্থান। কিন্তু অনাকাক্ষিত আলী হয়ে যায় ১ম। বিবর্ণ মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরে জারার সামনে আসতেই জারা আলীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়!</p>
<p>সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের হক তো আর থেমে থাকে না! সিনেমার শেষ অংশে দেখা যায়, আলীর বাবা নতুন সাইকেল সাথে দুই জোড়া নতুন জুতা নিয়ে বাজার থেকে বাড়ির পথে রওনা  হয়েছেন।</p>
<blockquote><p>কাহিনী নাকি সিনেমার প্রাণ। মাজিদ মাজিদি এই সিনেমায় একজোড়া ময়লায় মলিন ছেড়া জুতা হারানোর সাদামাটা কাহিনী দিয়ে যেভাবে কৌশলে, ইশারা -ইঙ্গিতে এই সিনেমাকে একটা রাজনৈতিক ভাষ্যে রূপান্তরিত করেছেন, তা সারা সিনওয়ার্ল্ডের জন্য একটা চ্যালেঞ্জিং কর্ম সাধনের নামান্তর।</p></blockquote>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-children-of-heaven/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4079</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সিনেমার দর্শন এবং সিনেমায় দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/philosophy-of-cinema-and-philosophy-in-cinema/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/philosophy-of-cinema-and-philosophy-in-cinema/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 16 May 2023 12:40:46 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14453</guid>

					<description><![CDATA[সিনেমা কি দর্শনের অংশ কিংবা &#8216;মত&#8217; হতে পারে? সিনেমার মতো &#8216;ছায়া বাস্তব&#8217; মাধ্যমে দর্শনের মতো বিষয়কে কি কোনোভাবে উপস্থাপন করা যায়? এ দুটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে আজকের আলাপ। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন চর্চার কোন চল নেই আর সিনেমার মত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সিনেমা কি দর্শনের অংশ কিংবা &#8216;মত&#8217; হতে পারে? সিনেমার মতো &#8216;ছায়া বাস্তব&#8217; মাধ্যমে দর্শনের মতো বিষয়কে কি কোনোভাবে উপস্থাপন করা যায়? এ দুটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে আজকের আলাপ। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন চর্চার কোন চল নেই আর সিনেমার মত &#8220;বিনোদন মাধ্যমে দর্শন অনুসন্ধান তো খুব দূরের কথা। কিন্তু এ আলাপ জরুরি। সিনেমা কিভাবে দর্শনের সাথে সাদৃশ্য বজায় রেখেছে এবং দর্শনের বিভিন্ন অনুষঙ্গকে আত্মীকৃত করে নিয়েছে কিংবা একটা জনঘনিষ্ঠ মাধ্যমে কিভাবে দর্শন কাজ করে, কিভাবে সিনেমার অন্তর্ভুক্ত দর্শন, দর্শকের মন ও আচরণে প্রভাব ফেলে এবং কিভাবে এ মাধ্যমটিকে দর্শকের নতুন রুচি নির্মাণে কাজে লাগানো যায় এ বিষয়ক বিবিধ নিরীক্ষা শুরু করার জন্যই প্রয়োজন এই আলাপ। খুব সংহতভাবে এ আলোচনা করা হয়নি। কেবল এ বিষয়ে আগ্রহ উসকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।</p>
<h3><strong>সিনেমার দর্শন: খুচরা কথায়</strong></h3>
<p><strong>•প্লেটোর গুহা রূপক এবং ছায়া-বাস্তবতা</strong></p>
<p>রিপাবলিকের সপ্তম পুস্তকে সক্রেটিস একটি গুহার রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে গুহার শৃঙ্খলিত মানুষের সামনে উপস্থাপিত (আরোপিত?) ছায়া-বাস্তবতা, সত্যের সন্ধান, সত্য গ্রহণে ক্রমশ অভ্যস্ত হওয়া ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ রূপক প্লেটোর &#8216;আইডিয়া&#8217; এবং &#8216;ফর্ম&#8217; এর ভালো উদাহরণ। আমাদের দেখা সত্যের বাইরে একটা ভাব-সত্য&#8217; আছে। আমরা কেবল ছায়া-সত্য দেখতে পাই। মূল সত্য দেখতে পাইনা । সত্যকে খুঁজতে হয়। সিনেমাকেও প্লেটোর এ গুহা রূপকের সাথে তুলনা করা যায়। রিপাবলিক থেকে- “আমি বললাম &#8230;&#8230; গ্লকন, কল্পনা করো, সমগ্র মনুষ্যজাতি মাটির নিচে একটা গুহার মধ্যে বাস করছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের আলোর দিকে গুহার একটি মুখ আছে। মুখটি ভূপৃষ্ঠ থেকে গুহা পর্যন্ত দীর্ঘ। এই গুহার মধ্যে সব মানুষ তাদের শৈশব কাল থেকেই রয়েছে। তাদের পা এবং গলা শেকল দিয়ে আবদ্ধ। ডানে, বাঁয়ে কিংবা পেছনে মুখ ফেরাতে তারা অক্ষম। শেকল তাদের মাথার এরূপ সঞ্চালনকে আটকে রাখে। গুহার দেয়ালের দিকেই তাদের মুখ ঘোরানো। তাদের সম্মুখের দেয়ালটিই কেবল তারা দেখতে পায়।</p>
<p>এবার কল্পনা করো, তাদের পশ্চাতে মাটির উপরে গুহার বাইরে কিছুদূর আগুন জ্বলছে। বন্দি মানুষ এবং বাইরের আগুন- এ দুয়ের মধ্যভাগে রয়েছে উঁচু একটি পথ। তুমি খেয়াল করলে দেখতে পাবে যে এই পথ ধরে তৈরি হয়েছে একটি নিচু দেয়াল, একটি পর্দার মতো। যেমন- ছায়ানৃত্যের নৃত্যশিল্পীরা সামনে থাকে, যে পর্দার উপর শিল্পীরা তাদের পুতুলদের নাচ দেখায়। ছবিটি তুমি দেখতে পাচ্ছ গ্লকন?</p>
<p>-হ্যাঁ, আমি দেখছি।</p>
<p>-এবার তুমি খেয়াল কর। দেখবে নিচু দেয়ালটির পথ ধরে একদল লোক চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে বিভিন্ন রকম বস্তু আছে; পাথর, কাঠ কিংবা অন্য কিছুতে তৈরি নানা পাত্র, মূর্তি, পশুর প্রতিকৃতি। এরা কেউ কেউ কথা বলছে। কেউ নীরবে অগ্রসর হচ্ছে। আর এ শোভাযাত্রার ছবিটি আগুনের আলোতে গুহার ভেতরে তার দেয়ালে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।</p>
<p>-এটা এক অদ্ভুত ছবি তৈরি করেছ, সক্রেটিস। তোমার বন্দিরাও অদ্ভুত ধরনের বন্দি।<br />
-আমি বললাম, বন্দিরা আমাদের মতোই তাদের মুখ দেয়ালগাত্রে ফেরানো। আলোর প্রতিভাসে তারা কেবল তাদের কিংবা একে অপরের ছায়াই দেখতে পায়।</p>
<p>-একথা সত্য। তাদের মাথা যদি আদৌ সঞ্চালন করতে না পারে তাহলে ছায়া বৈ অপর কিছু তারা কেমন করে দেখবে?</p>
<p>-এখন ধরো, বন্দিরা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করছে। এই আলাপে তারা তাদেরসম্মুখে দেয়ালের ছায়াকেই কি সত্য বস্তু বলে পরস্পরের নিকট উল্লেখ করবে না?</p>
<p>-অবশ্যই তারা তা-ই করবে।</p>
<p>-তাছাড়া মনে করো, গুহার মধ্যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তাহলে বাইরের মিছিলের যে-শব্দ গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হবে, সে-শব্দকে কি তারা তাদের সম্মুখের ছায়াদের উচ্চারিত শব্দ বলেই মনে করবে না?</p>
<p>-নিঃসন্দেহে ।</p>
<p>-তা হলে তাদের কাছে সত্য হচ্ছে প্রতিকৃতির ছায়ামাত্র।</p>
<p>-অবশ্যই তা-ই।</p>
<p>বেশ, এবার দ্যাখো, বন্দিরা যদি মুক্তি পায় এবং তাদের ভুল ভাঙে তা হলে কী ঘটে।” (সপ্তম পুস্তক, ৩৩৩-৩৩৫ পৃ.)</p>
<p>সিনেমা যে দর্শনের &#8216;মত&#8217; হতে পারে, দর্শনের নানা বিষয়কে ফলপ্রসু উপায়ে তুলে ধরতে পারে এ বিষয়ে গত শতাব্দিতে অনেক সিনে-তাত্ত্বিকগণ আলাপ করেছেন। তাদের আলোচনা-সমালোচনা-সিদ্ধান্তের সারকথা এখানে উপস্থাপিত হয়েছে।</p>
<p>প্লেটোর &#8216;ছায়া দর্শন&#8217; এর প্রভাবে সিনেমাকে ছায়া-সত্য বা ছায়া-বাস্তবতা হিসেবে দেখা হয়েছে। দর্শন যেখানে বাস্তব বা সত্য কে নিয়ে কাজ করে, সিনেমা কাজ করে কাল্পনিক বা অলীক বিষয়াদি নিয়ে। দর্শনের কাজ সর্বজনীন, কিন্তু সিনেমার কাজ &#8216;সীমাবদ্ধ&#8217; এবং এটা বিশেষ কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করে। আর দর্শনের কাজ সত্যানুসন্ধান, বিপরীতে সিনেমার কাজ বিনোদন। দর্শন হলো দেখা সত্য থেকে বেরিয়ে ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গি সহযোগে ক্রমাগত আসল সত্যানুসন্ধান। কিন্তু সিনেমা অলীক প্রদর্শন মাত্র, যেখানে বাস্তবতা নেই কিংবা বাস্তবতা অনুসন্ধানের চেষ্টাও নেই। কিন্তু এসব যুক্তি সত্ত্বেও সিনেমা-দর্শন এগিয়ে গেছে।</p>
<p>কারণ, সিনেমা বাস্তবের উপস্থাপনে সক্রিয় হয়েছে। কেবল অলীক কল্পনাশ্রয়ী ও &#8216;বুর্জোয়া&#8217; মাধ্যমে থাকেনি। সিনেমা ভেরিতে, নিও-রিয়ালিস্ট আন্দোলন ইত্যাদি পর্যায় পার হয়ে সিনেমা এখন বাস্তবের উপস্থাপনও বটে। সিনেমায় ইতিহাস, যুদ্ধ, সত্য ঘটনার উপস্থাপন ঘটেছে। কিন্তু পরিচালকের &#8216;আরোপ&#8217; বা শেকল থেকে কি সিনেমা বের হতে পারে?</p>
<p>এ ক্ষেত্রেই যুক্তি দেখানো হয়, সিনেমা দর্শন হতে পারে না কেননা এটা দেখা সত্য বা অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দেয়। কারো একপাক্ষিক &#8216;চাপানো&#8217; প্রদর্শনকে মেনে নেয়, দর্শক এখানে পরিচালকের &#8216;আরোপিত শৃঙ্খল&#8217; দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর দর্শন মানে হল এ &#8216;গুহা” ও ছায়া&#8217;র শৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল প্লেটোর এ ধারণাকেও সিনেমা ব্যবহার করে সিনেমাটিক উপায়ে, দর্শনের বিমূর্ত রূপের বিপরীতে মূর্ত বাস্তব হিসেবে। যেমন, ট্রুম্যান শো।</p>
<h3><strong>এবার সিনেমায় দর্শন &#8211;</strong></h3>
<p>সিনেমা দর্শন ব্যবহার করতে পারে, &#8216;চিন্তন পরীক্ষণ হিসেবে তথা চলমান চিন্তাধারাকে প্রশ্ন করা, চিন্তা-প্রতিচিন্তা উপস্থাপনের মাধ্যমে। কোনো তত্ত্বের নতুন বিবেচনা হাজির করার মাধ্যমে। চিন্তন পরীক্ষণের কিছু কিছু অন্তর্নিহিতভাবেই সিনেমাটিক। এর প্রমাণ দেখা যাবে দেকার্তের &#8216;ড্রিম হাইপোথেসিস&#8217; প্রভাবিত &#8216;ম্যাট্রিক্স&#8217; সিনেমায়। দর্শন নিয়ে সিনেমার কাজ বিবিধ হতে পারে। দার্শনিক নিয়ে- ডেরেক জার্মান এর ভিটগেনস্টাইন (১৯৯৩)। চরিত্র কর্তৃক দর্শনের আলোচনা- রিচার্ড লিঙ্কলেটারের ওয়েকিং লাইফ (২০০১)। কিংবা দার্শনিক গ্রন্থের সিনেমাটিক উপস্থাপন- জ্যা জ্যাক আনাউদের &#8216;দ্য নেম অব রোজ (১৯৮৬)।</p>
<p>কিন্তু সিনেমা চিন্তন পরীক্ষণ তুলে ধরলেও তো এটা সর্বাত্মকভাবে দর্শন কেন্দ্রিক হবে না; বরং এটা হবে শৈল্পিক। শিল্পের কাজ হল কাল্পনিক তাই সত্য থেকে যোজন যোজন দূরে- এ প্লেটোনিক চিন্তা থেকেই এ আপত্তি। যদিও সিনেমা গাঠনিক দিক থেকে শৈল্পিক এ অভিযোগে সিনেমার বাস্তব উপস্থাপনের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।</p>
<p>আর সিনেমার মাঝে অস্পষ্টতা আছে, সুনির্দিষ্টতা নেই, তাই দর্শনের মতো সুনির্দিষ্টতার উপস্থাপন সিনেমায় সম্ভব না। সিনেমা প্রকাশের জায়গা থেকেও দর্শনের মতো স্পষ্ট নয়। বিপরীতে বলা যায়, সিনেমা তো সবসময় দার্শনিক বিষয়াদি স্পষ্টভাবে বুঝাবে না। বিচিত্র উপস্থাপনে দর্শনের নানা অনুষঙ্গ উপস্থিত করা হবে। আর সিনেমা সর্বদা দ্ব্যর্থক ও অনির্দিষ্ট নয়।</p>
<p>যারা সিনেমায় দর্শনের উপস্থাপনে আগ্রহী তাদের চিন্তা হলো, স্বাধীনভাবে যেন দর্শনের উপস্থাপন ঘটে, কেবল কথোপকথনে কিংবা দৃশ্যায়নে নয়; বরং সিনেমার অন্তর্নিহিত অর্থ যেন দর্শন-সঞ্জাত হয়। সিনেমায় যেন কেবল দার্শনিকের দর্শনের বয়ান না থাকে, সেখানে যেন যুক্ত হয় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তির যাচাই-বাছাই, সিরিয়াস চিন্তন। সেখানে দার্শনিক চিন্তা এবং সক্রিয় দর্শন উপস্থাপন থাকবে।</p>
<p>আর সিনেমায় প্রচলিত কথ্য ও লেখনী মাধ্যমের দর্শন চর্চার চাইতে সক্রিয় এবং ফলপ্রসূ দর্শন চর্চা সম্ভব। বিমূর্ত চিন্তার মূর্ত এবং জীবন্ত উপস্থাপনে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শন চর্চা করা যায় সিনেমায়। মজার বিষয় হলো, প্লেটোর গুহা থেকে বের হওয়ার সাহস দেখানো হচ্ছে এখন সিনেমায়, ট্রুম্যান শো। মূলত, সিনেমায় দর্শন হবে বিদ্যমান চিন্তার উপস্থাপন, নতুন চিন্তার উদ্বোধন, আমাদের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত চিন্তায় ধাক্কা দেওয়া, নতুন অভিজ্ঞতা প্রদর্শন। বাহ্য সত্য ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব প্রদর্শনে সত্যের পথে যাত্রা যেমন ডেভিড লিঞ্চের &#8216;মুলহোল্যান্ড ড্রাইভ&#8217;। সিনেমা কেবল দর্শন বুঝার উৎসই হবে না কিংবা বিদ্যমান দার্শনিক চিন্তাধারার প্রতিফলন হবে না; বরং স্বাধীন ও সক্রিয় চিন্তার উৎসে পরিণত হবে।</p>
<p>কিন্তু আলোচনা চলল। বলা হলো সিনেমা তো আর নিজে নিজে দর্শন বলে না। বলেন নির্মাতা বা দার্শনিক। আবারো শৃঙ্খল ও আরোপ। পরিচালক এখানে &#8216;বিশেষ&#8217; বিষয়। উপস্থাপন করেন, সর্বজনীন নয়। কিন্তু দর্শকেরও তো একটা &#8216;নেওয়া&#8217;র মতো বিষয় রয়েছে। দর্শক কিভাবে বিষয়টাকে নিবে তার উপরও নির্ভর করে সিনেমাটি সত্যিই &#8216;দর্শন&#8217; কিনা। এখানেই প্যারাডক্স। দর্শকের সামনে উপস্থাপিত ছায়া-বাস্তবতা কিংবা বাস্তব থেকে বের হওয়ার স্বাধীনতা কি তার আছে? এ স্বাধীনতা অর্জনই দর্শন। দর্শনের ভেতর দর্শন।</p>
<p>শুরু হলো দর্শকের স্বাধীনতা এবং আরোপ বিতর্ক। যদি সিনেমাকে পরিচালক- কেন্দ্রিকই ধরে নেওয়া হয়, তবে পরিচালকের আগ্রহ, ইচ্ছা, ব্যাখ্যাকে কে ঠিক করবে? আর সবসময় পরিচালকের দার্শনিক মন থাকে না। হয়তো কোনো আইডিয়াকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি গড়ে উঠেছে, দর্শক-সমালোচক পরবর্তীতে দর্শন আবিষ্কার করে নিল। দর্শক এক্ষেত্রে স্বাধীনতা লাভ করে। কখনো কখনো পরিচালকের শৈল্পিক উপস্থাপনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে। এটাই হল দর্শক-কেন্দ্রিক ব্যাখার মূলকথা এবং ‘আরোপে&#8217;র শৃঙ্খল ছুঁড়ে ফেলে স্বাধীন হওয়া। আমরা যখন কোনো গল্প-উপন্যাস পড়ি, তখন কেবল লেখক আমাদের সামনে থাকে না, থাকে আমাদের বাস্তবতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা। এর ফল হয় মিশ্র কিংবা একটা আলাদা সত্যে উপনয়ন। সময়ের আবর্তনে ওই গল্পের অর্থ- ব্যাখ্যা বদলে যায়। এখানেই দর্শকের স্বাধীনতা। তাই, সিনেমাটিক ‘আরোপের যুক্তি ধোপে টিকে না। এখানেই দর্শককে &#8216;ট্রুম্যান&#8217; হয়ে উঠতে হয়। আর না হতে পারলে তিনি গুহাবাসীই থেকে যান। আসলে সিনেমা ও দর্শনের অবস্থান কাছাকাছি। উভয়ের মাঝে অনেক মিলের জায়গা রয়েছে। পার্থক্য ঘটে কেবল সত্য উপস্থাপনের মাত্রায় এবং উপস্থাপন প্রক্রিয়ায়।</p>
<p><strong>• রাষ্ট্রদর্শন আর সিনেমার মোকাবেলা</strong></p>
<p>দর্শনের মূল প্রশ্নগুলো যেমন, মানুষ কী ও কেন, হক ও হাকীকত কি, মানুষ ও খোদার মধ্যকার সম্পর্ক কী ইত্যাদির একটি যৌক্তিক পরিণতি ঘটে রাষ্ট্রদর্শনে এসে। এ আলোচনায় তাই রাষ্ট্রদর্শনের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সাপেক্ষে সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা হলো-</p>
<p>চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস (১৯৩৬) নিয়ে গৌতম ভদ্র লিখেছেন, &#8216;মডার্ন টাইমস ছবির দুটি ধারা। একটা যন্ত্র সভ্যতার সমস্যা এবং অন্যটা ক্ষুদে মানুষ বা ভবঘুরের স্বপ্ন। এই ছবিতে দুটি বিপরীতমুখী ধারার সংঘাত দেখা যায়। একদিকে ছবির প্রথমে ও কয়েকটা জায়গায় যন্ত্রসভ্যতার কাছে ব্যক্তিসত্তার অবলোপ, অন্যদিকে বেশির ভাগ দৃশ্য সিটি লাইটের প্রণয় ভাবালুতা এবং ভবঘুরের স্বপ্ন। চ্যাপলিন মূলত নিজের দেখা অভিজ্ঞতার বয়ানই চিরচেনা ভবঘুরে ভঙ্গিতে এ সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছেন। “ started from an abstract idea, an impulse to say something about the way life is standardized and channelized, and men turned into Machines- And the way I felt about it” (গৌতম ভদ্র, চার্লি চ্যাপলিন ও মার্কিন সমাজ, ৭৮-৮০ পৃ.)</p>
<p>মার্ক্স তার Economic and Philosophical Manuscripts of 1844 এ পুঁজিবাদী সিস্টেমে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে চার ধরণের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। উৎপাদিত পণ্য, (মানসিকভাবে) উৎপাদনের কাজ, মানবপ্রকৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ, অন্যান্য শ্রমিকদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।</p>
<p>গৌতম যেন মার্ক্সের শ্রমিক শ্রেণির বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বের তাফসীর করছেন- কাজের মধ্য দিয়েই মানুষের সত্তার বিকাশ হয়। কিন্তু যন্ত্রের আধিপত্যে কাজ তার সব ছন্দ হারিয়ে ফেলে। কাজের ফল ও সময়ের উপর কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সব কিছুই অন্যের ইচ্ছাধীন, মানুষ শুধু একঘেঁয়েভাবে কাজ করে। কাজের গতির পরেও নিয়ন্ত্রণ অন্যের। ইচ্ছামত তাকে বাড়ানো কমানো হয়। মানুষকে তাতে সাড়া দিতে হয় মাত্র। মানুষের ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে তার কাজের বিচ্ছিন্নতাই গোটা ছবির প্রথম দৃশ্যের মূল বিষয়। (ভদ্র, ঐ, ৮০ পৃ.)। মার্ক্সের মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অবশ্য শর্ত হলো শ্রমিক শ্রেণি সমূহের ক্রমবর্ধমান দুর্দশায়নের সূত্র (Law of immiserization of the working classes), যা এ সিনেমায় দেখানো হয়।</p>
<p><strong>• কনফুসিয়ানিজম এবং এশিয়ান ভ্যালুজ</strong></p>
<p>অমর্ত্য সেন বলছেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ায় কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ন্যায্যতা দেয়ার প্রয়োজনে প্রায়ই এশিয়ান ভ্যালুজের মতো বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। আর এটা স্বাধীন ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে আসেনি, এসেছে ঐসব কর্তৃপক্ষ তথা সরকারি আমলা ও মুখপাত্র কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রের আশেপাশে থাকা লোকদের পক্ষ থেকে।” মূলত এশিয়ান ভ্যালুজের পক্ষভুক্ত লোকেরা কনফুসিয়াসের &#8216;আনুগত্য&#8217; তত্ত্বকে ধার করে তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে জায়েয করে। যদিও অমর্ত্যের মতে, “কনফুসিয়াস কখনো রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্যেকে সমর্থন করেননি।” ঘিলু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কিভাবে রাজপুত্রের সেবা করতে হবে? কনফুসিয়াসের উত্তর ছিল, “তাকে সত্য বল, যদিও সে আহতবোধ করে।” বেইজিং ও সিঙ্গাপুরের সেন্সরশীপের দায়িত্ব অধিকারীরা অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। কনফুসিয়াস বাস্তব সতর্কতা এবং কৌশলের বিরুদ্ধে নন, কিন্তু খারাপ সরকারের বিরোধিতা করার পরামর্শ দিতেও ভুল করেননি। “যখন রাষ্ট্রে ভালো পথ (ইয়াঙ) বজায় থাকে, তখন বলিষ্ট কণ্ঠে বল এবং সাহসের সাথে কাজ করে যাও, কিন্তু রাষ্ট্র যখন পথ হারায় (ইন), সাহসের সাথে কাজ চালিয়ে যাও এবং নম্রভাবে কথা বল।” বস্তুতঃ কনফুসিয়াস এ বাস্তবতা দেখিয়ে। দিয়েছেন যে কল্পিত এশিয়ান ভ্যালুজের গঠনের দুটি স্তম্ভ তথা পরিবারের প্রতি ভক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, পরস্পরের মাঝে তুমুল সংঘাত ঘটতে পারে। এশিয়ান ভ্যালুজের অনেক প্রবক্তাই পরিবারের ভূমিকার প্রসারণের অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রের ভূমিকার কথা বলেন, কিন্তু কনফুসিয়াসের দর্শন মতে দুটির মাঝে সংঘাত থেকেই যাবে। (অমর্ত্য সেন : Development as Freedom, PP, ২৩১-২৩৫ )</p>
<p><strong>•দুটি সিনেমায় নজর</strong></p>
<p>এবার এশিয়ান ভ্যালুজ রক্ষাকারী &#8216;দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ান&#8217; (লি কুয়ান ইউ এর কথামতে) দুটি সিনেমায় নজর দিই।</p>
<p>হিরো (২০০২)- &#8216;তিনজন আততায়ীর একীভূত চীনের প্রথম রাজাকে (চিন শি হুয়াও) হত্যার ইচ্ছা, হত্যার ব্যাপারে দ্বিধা (কারণ, একীভূত চীনের জন্য রাজাই যোগ্য), অন্তর্দ্বন্দ্ব, সবার মৃত্যু। এ সিনেমায় বারবার ব্যবহৃত থিয়ানসিয়া তথা ‘আকাশের নিচের সকলে বলতে প্রাচীন চীনে বুঝাত, আসমান জমীন যা স্বর্গীয়ভাবে সম্রাটকে শাশ্বত বিধানমতে প্রদান করা হয়েছে। আর এ শব্দটিই একীভূত চীনের স্বপ্নকে সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।</p>
<p>এ সিনেমায় রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্রের &#8216;আনুগত্য&#8217; পূর্বক যে আত্মত্যাগ এবং চিন্তার প্রদর্শনী ঘটে, তা কর্তৃত্ববাদী সরকারকেই কেবল শক্তিশালী করে এবং করবে এবং সকল স্বৈরাচারীই জনগণকে এ ধারণা দিতে চেষ্টা করেন যে, দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতি রক্ষার জন্য তিনিই কেবল যোগ্য। হিটলার এরকমই করেছেন আর ট্রাইয়ুম্প অব উইল -এ লেনি রেইফেন্সটাল এই জিনিসই দেখিয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>• সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও &#8216;অপর&#8217; পক্ষ-</strong></p>
<p>নাইন ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে আমেরিকা সারা বিশ্বব্যাপী &#8216;সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ঠিক প্রচলিত যুদ্ধ নয়; বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের সহায়তাকারী সরকারকে সর্বোতভাবে প্রতিরোধ, আক্রমণ। &#8216;অপর&#8217; ধারণা একসময় প্রাচ্যে তথা পাশ্চাত্যের অপর যেকোনো অঞ্চলে পাশ্চাত্যের উপনিবেশকে বৈধতা দিয়েছিল, আবার তা এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাশ্চাত্যের &#8216;নয়া-উপনিবেশায়নে&#8217; ভূমিকা রাখছে। মূলত ইসলাম ও মুসলিম &#8216;অপর&#8217;কে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে সন্ত্রাসী হিসেবে, আধুনিকতা ও সভ্যতার শত্রু হিসেবে। “বুশ যখন বলেন, তারা কেন আমাদের ঘৃণা করে?&#8221; তখন এটা সে দার্শনিক বিভাজনকেই স্পষ্ট করে তোলে যেখানে পাশ্চাত্যের বাইরের লোকদের সাথে সভ্য পাশ্চাত্যের সম্পর্ক হলো, &#8216;নিজ&#8217; পাশ্চাত্য ও &#8216;অপর&#8217; প্রাচ্য। আর এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যকেই ধরা হয়েছে &#8216;অপর&#8217; হিসেবে। যেখানে ইসলামের যেকোনো উপস্থিতিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। জন্ম নেয় ইসলামাতঙ্ক। আর এ &#8216;দেখা&#8217; এবং &#8216;দেখানো&#8217; তে ভূমিকা রেখেছে পাশ্চাত্যে নির্মিত সিনেমা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশীদার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সিনেমা। (এডোয়ার্ড সাঈদ এর কাভারিং ইসলাম দ্রষ্টব্য)। যুক্তরাষ্ট্র-বনাম তারা এ চিন্তার একটা ধারণাগত কাঠামো নির্মাণ, সত্যিকার অর্থে এ ভান করা যে, মূল বিবেচনা হল জ্ঞানতাত্ত্বিক ও স্বাভাবিক- আমাদের সভ্যতা পরিচিত এবং সর্বজন গৃহীত, তাদেরটা ভিন্ন এবং অদ্ভুত- অথচ আসলে আমাদেরকে যে কাঠামো তাদের থেকে ভিন্ন করে তোলে তা যুদ্ধমান, কৃত্রিমভাবে গঠিত এবং পরিস্থিতি সাপেক্ষ&#8217;- বলেছেন সাঈদ।</p>
<p>মূলত সাম্রাজ্যবাদের শত্রু যে যখন, তখন সে আঙ্গিকেই সিনেমা সাম্রাজ্যবাদের দোসর হিসেবে নির্মিত হয়েছে। গৌতম ভদ্রের বইতে দেখা যাবে গত শতাব্দীর প্রথম অর্ধশতকে তারা কম্যুনিজম বিরোধী সিনেমা বানিয়েছে। আবার বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে আরব বিরোধী, প্রো-জায়নিস্ট সিনেমা কিংবা এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সিনেমা ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভিন্ন ধারাও আছে যেমন লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সিনেমা কিংবা আফ্রিকায় ওসমান সেমবেনের সিনেমাকে যদি ওই হিসেবে ধরা যায়। সিনেমায় আইডেন্টিটি পলিটিক্স এবং বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের প্রভাব সমাজে পড়ছে।</p>
<p>জোগাড় যন্তর :</p>
<p>১. Shadow Philosophy: Plato&#8217;s Cave and Cinema, Nathan Andersen, Routledge, 2014<br />
২. রিপাবলিক (সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, বাংলা একাডেমি, ১৯৭৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/philosophy-of-cinema-and-philosophy-in-cinema/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14453</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সূর্য দীঘল বাড়ি – এক কালজয়ী চিত্রনাট্য যা আজও প্রাসঙ্গিক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/surya-dighal-bari-a-timeless-screenplay-that-is-relevant-even-today/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/surya-dighal-bari-a-timeless-screenplay-that-is-relevant-even-today/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Dec 2021 17:59:00 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6445</guid>

					<description><![CDATA[&#8220;ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।&#8221; সুকান্ত ভট্টাচার্যের চরণ দুখানির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217;। একটি চিত্রনাট্য তখনই শ্রেষ্ঠ হয় যখন তা সমাজের অসুখগুলোকে স্বার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে সিনেমার পর্দায়। &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217; সেরকমই এক চলচ্চিত্র]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">&#8220;ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়<br />
পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।&#8221;</p>
<p>সুকান্ত ভট্টাচার্যের চরণ দুখানির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217;। একটি চিত্রনাট্য তখনই শ্রেষ্ঠ হয় যখন তা সমাজের অসুখগুলোকে স্বার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে সিনেমার পর্দায়। &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217; সেরকমই এক চলচ্চিত্র যা তৎকালীন সময়ের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থা এবং অভাব-অনটনে ভুগতে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে তুলে ধরে। ক্ষুধার যন্ত্রণা কোনো আইন মানে না, চেনে না কোনো ধর্মজাতের হিসাবনিকাশ, মানুষকে টেনে নিয়ে আসে বাস্তবতার এক কঠিন কর্মযজ্ঞের দরজায়। কুসংস্কার, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ও ক্ষমতাশীল ধনিক শ্রেণীর শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট এক নারীর জীবন সংগ্রামের অনবদ্য দলিল ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’।</p>
<p>বাংলা কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আবু ইসহাক (১৯৩৬-২০০৩)। তিনি ঐ সকল লেখকদের একজন, যাদের রচনাসম্ভার সংখ্যার বিবেচনায় খুব বেশি না হলেও সৃজনীশক্তি এবং মননশীলতার গুণে মহিমান্বিত। তিনি মোট তিনটি উপন্যাস লিখেছিলেন, বলা হয় &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217; তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কর্মী মসিহউদ্দিন শাকের এবং শেখ নিয়ামত আলী যৌথভাবে এই উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।এই সিনেমা ১৯৭৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর মুক্তি পায় । সূর্য দীঘল বাড়ি স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে প্রথম সরকারি অনুদানে নির্মিত সিনেমা।</p>
<blockquote><p><strong>একটি স্বার্থক উপন্যাসের যেসকল বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, তার সবগুলোই আছে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ সিনেমাতে। একেবারে সাধারণ ঘটনার বর্ণনা কিংবা প্রকৃতির একটি সাধারণ দৃশ্যকেও স্বার্থকভাবে উপস্থাপন করতে ভুল করেননি আবু ইসহাক।</strong></p></blockquote>
<p>গ্রাম্য বধূ জয়গুন। প্রথমপক্ষের পুত্র হাসু আর দ্বিতীয়পক্ষের কন্যা মায়মুনকে নিয়ে তার ঘর। প্রথম স্বামী জব্বার মুন্সী মারা যাওয়ার পর, করিম বকশ নামের এক বদমেজাজী কৃষকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় আপন শিশুপুত্র কাসুকে রেখে কন্যা মায়মুনসহ জয়গুনকে তাড়িয়ে দেয় করিম। ক্ষুধার তাড়নায় স্বামী পরিত্যক্তা জয়গুন একটুখানি ভালো থাকার আশায় পাড়ি জমায় শহরে। কিন্তু শহুরে নির্মম বাস্তবতায় খানখান হয়ে যায় ভাগ্যদেবীর বরপ্রাপ্তির আশা। একদম নিঃস্ব হয়ে তাকে ফিরে আসতে হয় গ্রামে। কঙ্কালসার দেহ আর অপুষ্টিতে ভোগা সন্তানদের নিয়ে ভিটেমাটিহীন উদ্বাস্তু জয়গুন আশ্রয় নেয় গ্রামের পরিত্যক্ত অপয়া ভিটে ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’তে। গ্রামীণ লোকদের বিশ্বাসে সূর্যের উদয়াস্তের দিক, অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিম বিস্তারী সূর্যদীঘল বাড়িকে অপয়া মনে করা হয়। বলা হয়, বহু বাসিন্দার অপঘাত মৃত্যু, ভূত-প্রেতের উপদ্রবের সাক্ষী এ বিরান বাড়িতে বাস করলে নির্বংশ হতে হবে।<strong> কিন্তু <em>&#8216;নুন আনতে পান্তা ফুরোয়&#8217; শ্রেণীর হতদরিদ্র মানুষের কি আর ভূতের ভয় করলে চলে</em>?</strong> অসীম সাহসী জয়গুন তার ভ্রাতৃপত্নী, ভাতিজা এবং সন্তানদের নিয়ে সেখানে ঘর তোলে। শুরু হয় আত্মবিশ্বাসী জয়গুনের নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। পেটের তাগিদে পর্দা ঠেলে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে চাল এনে আশেপাশের গ্রামে ব্যবসা শুরু করে সে। পাশাপাশি ধান ভানা,বাড়ির শাকসবজি বিক্রিসহ নানা কাজের মাধ্যমে চলে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা।</p>
<p>দারিদ্র্যের কষাঘাতে ছেলে-মেয়েরাও অল্প বয়সে অর্জন করে সংযম আর পরিশ্রমের শিক্ষা। হাসুর ছোট্ট কাঁধ মায়ের সাথে ভাগ করে নেয় জীবিকা নির্বাহের বোঝা, স্টেশনে, লঞ্চ-স্টিমার ঘাটে কুলিগিরি এবং অন্যান্য ছোটখাট কাজ করে সংসারের চাকা সচল রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে সে। আর দশ বছরের শীর্ণকায় মায়মুন তার অপুষ্ট হাতে সামলায় ঘর-গৃহস্থলির কাজ। সমাজের শোষণ নিপীড়নকে পায়ে দলে অজ্ঞতা আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের হীন সমাজপতিদের তৈরি করা হীনতর নিয়ম ভেঙে এগিয়ে যায় জয়গুন।</p>
<p>দরিদ্র এবং নারী- এ দুই পরিচয় যেন তাকে প্রতিকারহীন শোষণের দুটি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় রক্ষণশীল সমাজ। জয়গুনের স্বাধীন চলাফেরাকে মেনে নেয় না সমাজপতিরা। গ্রামের মোড়ল গদু প্রধানের লালসার দৃষ্টি পড়ে জয়গুনের উপর। তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে জয়গুণকে বিয়ে করতে চাইলে সে দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করে গদু প্রধানকে। নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে জয়গুনের জীবিকার পথ বন্ধ করে তাকে বশে আনবার চেষ্টা করে সে।</p>
<p>একটা সময়, সন্তানকে সুস্থ করে দেওয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জয়গুনকে আবার বিয়ের প্রস্তাব দেয় প্রাক্তন স্বামী করিম বকশ। এতে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ভিটা থেকে জয়গুনদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করে গদু। সিনেমার শেষাংশে তার নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে ভেঙে যায় কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চলা গরিবের সংসার- প্রাণ যায় করিম বকশের, শেষ আশ্রয়টুকু ত্যাগ করে কেবল দূর্ভাগ্যকে পুঁজি করে অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা করতে বাধ্য হয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধ সমাজের নির্মম বলি জয়গুন ও তার পরিবার।</p>
<p>সিনেমায় দেখা যায়, <em>জয়গুন তার নিজের পালিত হাঁসের ডিম, পুত্রকে দিয়ে মসজিদে দান করে, কিন্তু ইমাম সাহেব &#8216;হারাম&#8217; আখ্যা দিয়ে তা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।</em> কেননা &#8216;বেগানা-বেপর্দা&#8217; জয়গুন অন্যের বাড়িতে ও ভিন্ন গ্রামে কাজ করে খায়। মেয়ের বিয়েতে তাকে এই মর্মে ‘তওবা’ করতে হয় যে, বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করা বাদ দিতে হবে। পরিবারের প্রধান আয়ক্ষম মানুষটির ঘরে হাতগুটিয়ে বসে থাকার দরুণ তীব্র অভাব, অনাহার দেখা গেলেও, খোদার প্রতি অটল শ্রদ্ধাশীল জয়গুণ তার তওবা ভঙ্গ করেনি।</p>
<p>এ অংশে সাধারণ মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার সাথে আমরা প্রত্যক্ষ করি আধিপত্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কী করে শোষণের কৌশল হিসেবে চিরকালের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক প্রতিপত্তিকে অস্ত্র বানিয়ে রাখে। <strong><em>ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা জয়গুনকে তওবা করিয়ে চার দেয়ালে বন্দি করে রাখে, কিন্তু তার বাড়িতে একবেলা খাবারের ব্যবস্থাও করেনি, করেনি কোনো বিকল্প হালাল আয়ের ব্যবস্থা, কোন সামাজিক সহযোগিতা, এমনকি তার মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বের করে দেয়ার পরও কেউ পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেনি।</em></strong> উপরন্তু সমাজপতিদের কুদৃষ্টি পতিত হয় নিঃস্ব জয়গুনের ওপর। এর চূড়ান্ত কদাকার রূপ দেখি জয়গুন ও তার পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার মধ্য দিয়ে।</p>
<p>কুসংস্কার এবং সামাজিক কূপমণ্ডুকতার এরূপ জীবন্ত চিত্র সমসাময়িক &#8216;জননী&#8217;, &#8216;লালসালু&#8217; কিংবা &#8216;হাজার বছর ধরে&#8217; সিনেমাগুলোর মতো &#8216;সূর্য-দীঘল বাড়ি&#8217;তেও সার্থকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও অনেকেই এই চিত্রনাট্যগুলোকে ধর্মবিরোধী হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের দুঃখ কষ্টকে পুঁজি করে নিজ স্বার্থের ধর্মীয়কৃত ব্যাখ্যায়ন নতুন কিছুনা। আবু ইসহাক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহদের লেখায় সে চিত্রই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।</p>
<p>তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ এবং তৎকালীন সামাজিক ও অর্থনীতির করুণ অবস্থা, দেশভাগ, নবগঠিত পাকিস্তান নিয়ে বাংলার মানুষের আশাভঙ্গ হওয়া, তৎকালীন পশ্চাৎপদ গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, অভাব-অনটন, ধর্মভীরু সমাজে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার চাদরে আশ্রয় নিয়ে মোড়ল শ্রেণীর মানুষের অত্যাচার, দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র, পুরুষতন্ত্রের নির্যাতন ও শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট গ্রামীণ বাংলাদেশের এক নারীর জীবন সংগ্রামের অনুপুঙ্খ ছবিতে চিত্রিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’।</p>
<blockquote><p><strong>এই কাহিনীর বিচিত্রতার মধ্যে মূল বিষয় একটিই; তা হচ্ছে কুসংস্কার, সম্পদ, ধর্ম, প্রতিপত্তি, সামাজিক বাধা-নিষেধ, এমনকি জাতীয়তাবোধ- এসব কিছুকে শ্রমজীবি মানুষের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।</strong></p></blockquote>
<p>একটি সাধারণ আর্টকে কিভাবে সিনেমাতে কাজে লাগানো যায়, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার অভাব পুষিয়ে নেয়া যায়, পরিচালক তাঁর শক্তিশালী স্বাক্ষর রেখেছেন এ সিনেমায়। সিনেমার দৃশ্যধারণে জয়নুল আবেদীনের “চিত্রকলাকে” সিনেমার অংশে পরিণত করে, দুর্ভিক্ষের যে সার্থক চিত্রায়ন, তা অবশ্যই পরিচালকের অসাধারণত্বের জায়গা। নিতান্তই সাধারণ কিছু উপাদান ব্যবহার করে, সীমাবদ্ধতাগুলোকে উৎরে গিয়েছেন পরিচালক, যা সিনেমাটির অনন্যতার অন্যতম ক্ষেত্র।</p>
<p>একইসাথে পরিবেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ গ্রামীণ ভাষার ব্যবহার, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসহ সবকিছুতেই গ্রামীণ আবহ সিনেমাটিকে বিশেষায়িত করেছে। সমালোচকেরা সিনেমাটির বাস্তববাদীতার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন এটিকে।</p>
<p>সিনেমার শেষভাগে দগ্ধগৃহ পেছনে ফেলে বাস্তুহারা মানুষের গৃহত্যাগের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। নতুন বাড়ির খোঁজে তাদের এই যাত্রা বাঁচার জন্য মানুষের অব্যাহত জীবন-সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই বোধটিকে দর্শকের চিত্তে ভালোভাবে গেঁথে দেওয়ার জন্য দরকার ছিল আরেকটু সময়, আরেকটু স্পেসের। এই দৃশ্য বড় সংক্ষিপ্ত, ফলে অস্পষ্টতাটা স্পষ্ট। গোটা সিনেমাতে মানুষের ব্যক্তিগত ও সংঘবদ্ধ জীবনযাপনের যে সংগ্রাম, অপমান, পরাজয় দেখি, আকস্মিকভাবে তার সমাপ্তি ঘটায় বিষয়টি দর্শকদের চেতনায় দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে না। চিরকালের একটি মহৎ শিল্পকর্ম ঋত্বিক ঘটকের ‘<strong>তিতাস একটি নদীর নাম’</strong> সিনেমাতে দেখা যায়, নদীর বুক রুদ্ধ হওয়ায় একটি গোটা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেও মানুষের অব্যাহত জীবনযাত্রার সংগ্রামমুখরতার কথা ঘোষিত হয় একটি নারীর বাঁশি বাজানো ও শিশুকে স্বপ্নে দেখার মধ্যে। দৃশ্যটি দর্শকের চেতনাকে ব্যথায়, বেদনায়, ক্ষোভে এবং একইসঙ্গে আশায় পরিপূর্ণ করে তোলে। তার সমস্ত অগোছালো উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে একটি সুসংহত আবেগে এবং দর্শক আগের চেয়ে পরিণত মানুষে রূপান্তরিত হন। কিন্তু &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217; সিনেমাটি দর্শকের মধ্যে এরকম কোনো আবেগসঞ্চার করতে পারেনি।</p>
<blockquote><p>বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অভিঘাত আমাদের সমাজ জীবনে কি পরিমাণ স্পষ্ট ছাপ রেখে গেছে, &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217;তে সে চিত্র স্পষ্ট। জয়গুন, আর তাঁর সংগ্রামকে শুধুমাত্র একজন স্বামীহীনা গ্রাম্য বধূর সংগ্রাম, কিংবা একজন নারীর একক পথচলা হিসেবে দেখলে সম্ভবত একে খণ্ডিত ও এককেন্দ্রিক হিসেবে দেখা হবে। একে দেখতে হবে, ব্রিটিশ শোষণের ফলে সৃষ্ট মন্বন্তর ও তৎপরবর্তী ভয়াবহ অবস্থায় একজন সহায় সম্বলহীন মানুষের জীবনসংগ্রাম হিসেবে।</p></blockquote>
<p>ব্রিটিশ শোষণকে যারা জায়েজীকরণ করতে চান, পরোক্ষভাবে হলেও ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ তাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জুলুমকে অনেকেই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, &#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217;র সংলাপ ধারণা, তাদের চিন্তাভঙ্গিতে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনবে, এ প্রত্যাশা অবান্তর হবেনা।</p>
<blockquote><p>ইবনে বতুতা আর হিউয়েন সাঙদের পরখ করা বাংলা, যেখানে দরিদ্র-অনাহারী খুঁজে পাওয়া রীতিমত দুরূহ ছিলো, আদালত, জ্ঞান আর অর্থনৈতিক দিক থেকে যে অঞ্চলে অবস্থান করতো সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ চূড়ায়, সে অঞ্চলেই মানুষ ক্ষুধা, অনাহার, জুলুম আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়ছে, একজন সার্থক শিল্পী হিসেবে কলমে আবু ইসহাক, আর ক্যামেরায় মসিহউদ্দীন শাকের এবং শেখ নিয়ামত আলী তাঁর নকশা একেছেন সার্থকভাবেই।</p></blockquote>
<p>সিনেমাতে জয়গুন চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার (ইব্রাহিম)। করিম বকশ চরিত্রে ছিলেন কেরামত মাওলা। গদু প্রধানের চরিত্রে অভিনয় করেন জহিরুল হক। ভায়ের স্ত্রী শফির মা চরিত্রে ছিলেন রওশন জামিল। ফকির চরিত্রে ছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। আরো অভিনয় করেন আরিফুল হক, ইলোরা গহর, হাসান ইমাম, ফখরুল হাসান বৈরাগী, নাজমুল হুদা বাচ্চু, লেনিন প্রমুখ।। সিনেমাটির প্রযোজক ছিলেন মসিহউদ্দিন শাকের। সংলাপও তার তৈরি। সংগীত পরিচালক ছিলেন আলাউদ্দিন আলী।</p>
<p>সিনেমাটি সমালোচকদের প্রশংসায় সিক্ত হয়। ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। শেখ নিয়ামত আলী শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন। অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান ডলি আনোয়ার। ১৯৮০ সালে সিনেমাটি জার্মানির ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে তিনটি পুরস্কার লাভ করে। পর্তুগালের ফিগুয়েরা দ্য ফোজ চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে অর্জন করে আরও একটি পুরস্কার। সিনেমাটি ডন কিহটে পুরস্কারও পায়। বাংলাদেশ সিনে জার্নাল অ্যাসোসিয়েশন ছয়টি বিভাগে সিনেমাটিকে পুরস্কৃত করে।</p>
<p>সিনেমাটির মন্তাজ ছিলো অসাধারণ। দৃশ্য ধারণ, অভিনয়, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, পরিচালনা আর সংলাপের শক্তির জোরে সিনেমাটি স্থান করে নিয়েছে ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের কাতারে।</p>
<p>&#8216;সূর্য দীঘল বাড়ি&#8217; ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে বহুবছর আগে কিন্তু এতবছর পরে এসেও ক্ষুধা, শোষণ, নির্যাতন থেকে মুক্তি পায়নি বাংলার সাধারণ মানুষ। প্রশ্নে জর্জরিত করা যায় পুরো ইতিহাসটাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কেউ কি বলতে পারবে, কবে নিরসন হবে এই দরিদ্র্যতার? এখনও এ দেশে ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে অন্নবস্ত্র-সহায়-সম্বলহীন হতদরিদ্র মানুষেরা। <strong>‘শোষণের মঞ্চে জীবনের জয়গান’</strong> ছিলো এ সিনেমাটির মূল প্রতিপাদ্য, যার ফলে সময়ের অবগাহনেও ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ &#8211; চিত্রনাট্যটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি আজও।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/surya-dighal-bari-a-timeless-screenplay-that-is-relevant-even-today/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6445</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
