<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>সমাজ ও সংস্কৃতি &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/civilization/society-and-culture/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Mon, 17 Aug 2026 11:49:53 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>সমাজ ও সংস্কৃতি &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamization-of-the-art-of-words/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamization-of-the-art-of-words/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 10 Aug 2026 05:33:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=17124</guid>

					<description><![CDATA[এক। প্রয়োজনীয়তা &#160; দার্শনিক ও ধর্মীয় সাহিত্য যেমন একটি জাতির মতাদর্শের মৌখিক বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন সেই মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হয়, ঠিক তেমনি মিউজিক ও শব্দশিল্পও একটি জাতির গভীরতম বিশ্বাসের &#8220;অনুবাদ&#8221;। এগুলো একটি বৃহৎ মোজাইকের ক্ষুদ্রাংশের মতো, যা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক। প্রয়োজনীয়তা</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>দার্শনিক ও ধর্মীয় সাহিত্য যেমন একটি জাতির মতাদর্শের মৌখিক বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন সেই মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হয়, ঠিক তেমনি মিউজিক ও শব্দশিল্পও একটি জাতির গভীরতম বিশ্বাসের &#8220;অনুবাদ&#8221;। এগুলো একটি বৃহৎ মোজাইকের ক্ষুদ্রাংশের মতো, যা সংস্কৃতির সামগ্রিক কাঠামোয় মিলে যায়, প্রতিটি টুকরো সেই জাতির বিশ্বদৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে এবং সেই একই চেতনার অন্যান্য বহিঃপ্রকাশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকে। সংস্কৃতিতে এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে শব্দশিল্প একটি জাতির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি অপরিহার্য রক্ষাকবচে পরিণত হয়।</p>
<p>মতাদর্শ যখন নান্দনিক সুর ও ছন্দে রূপান্তরিত হয়, সেই ‘অনুবাদ’কে ইংরেজিতে <em>মিউজিক</em> বলা হয়। শব্দটি সাধারণত শব্দশিল্পের সব ধরনের প্রকাশকে অন্তর্ভুক্ত করে, সেগুলোর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য কিংবা পরিবেশনার প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন। কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় এমন কোনো একক শব্দ বা পরিভাষা নেই, যা সামগ্রিকভাবে শব্দশিল্পের সব ধারাকে ধারণ করে।</p>
<p>আরবি <em>মুসিকা</em> (musiqa) শব্দটি প্রায়ই ইংরেজি <em>মিউজিক</em>-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর অর্থ ইংরেজি শব্দটির মতো ব্যাপক নয়। গ্রিক ভাষা থেকে আগত এই পরিভাষাটি মূলত সেসব শব্দশিল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো, যেগুলো পরিবেশনার প্রেক্ষাপট বা নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হয়েছে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিন্দিতও হয়েছে। বিপরীতে, ইসলাম যেসব শব্দশিল্পকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ও লালন করেছে, যেমন কোরআন তেলাওয়াত, আজান, তালবিয়া পাঠ কিংবা শি‘র, সেগুলো কখনোই <em>মুসিকা</em> পরিভাষার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।</p>
<p>এই কারণেই আমি অন্যত্র একটি নতুন পরিভাষার প্রস্তাব করেছি: <em>হান্দাসাহ আল-সাউত</em> (handasah al-sawt) (আল-ফারুকী ১৯৮২: ৩০ ও পরবর্তী পৃষ্ঠা)। এই পরিভাষাটি শব্দশিল্পের সব ধারাকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম এবং সে অর্থে ইংরেজি <em>মিউজিক</em> ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় ব্যবহৃত সমতুল্য শব্দগুলোর সঙ্গে যথার্থভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পরিভাষা এবং এর ব্যাপক তাৎপর্যকে সামনে রেখেই পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে যাবে।</p>
<blockquote><p>হান্দাসাহ আল-সাউত এমন একটি সাংস্কৃতিক উপাদান, যা কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বিষয়বস্তু ও রূপ নির্বিশেষে যেকোনো শব্দশিল্পের পক্ষে এই ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। কেবল সেই শিল্পই এমন ভূমিকা রাখতে পারে, যা তার জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে উঠে আসে এবং যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার জন্ম, সেই পরিমণ্ডলের বার্তা ও মূল্যবোধকে প্রকাশ করে। এ ধরনের শব্দশিল্প বা সংগীত-ঐতিহ্যের চর্চা ও প্রসার ইতিহাসের যেকোনো সময়ে, যেকোনো জাতির জন্যই অপরিহার্য। তবে বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য এর প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। কারণ আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে প্রতিনিয়ত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির এমন মিথস্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, যার ফলে নিজস্ব ও বহিরাগত উপাদানের মধ্যকার পার্থক্য ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। হান্দাসাহ আল-সাউত সেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি ও বিলুপ্তির বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত একমাত্র কার্যকর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যভাবে বললে, এটি উম্মাহর ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।</p></blockquote>
<p>বিগত কয়েক দশক ধরে ‘ইসলামীকরণ’ মুসলিম চিন্তক ও সংস্কারকদের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। তা সত্ত্বেও হান্দাসাহ আল-সাউতের প্রভাব ও তাৎপর্য সম্পর্কে যথেষ্ট উপলব্ধি নিয়ে ইসলামীকরণের প্রশ্নে অগ্রসর হয়েছেন, এমন লেখক ও চিন্তাবিদের সংখ্যা খুবই কম। আমরা জ্ঞানের ইসলামীকরণ, অর্থনীতির ইসলামীকরণ, সমাজতত্ত্বের ইসলামীকরণ, রাজনৈতিক চিন্তার ইসলামীকরণ, মনোবিজ্ঞানের ইসলামীকরণ, এমনকি পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের ইসলামীকরণের প্রচেষ্টাও দেখতে পাই। এসব আন্দোলন ও প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য এমন একটি সুদৃঢ় ইসলামী সত্তা ও পরিচয় গড়ে তোলা, যার ভিত্তিতে তারা সমকালীন জীবনের চাপিয়ে দেওয়া প্রভাবগুলোর মোকাবিলা করতে পারবে, সেগুলো এড়িয়ে চলতে পারবে কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হবে। ইসলামীকরণ ছাড়া একটি ইতিবাচক, সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্বমঞ্চে একটি প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে।</p>
<p>সংস্কৃতির এতগুলো দিকের ইসলামীকরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সমসাময়িক মুসলিমরা নিজেদের জীবনের নান্দনিক পরিসরের ইসলামীকরণ সম্পর্কে আশ্চর্যজনকভাবে উদাসীন। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই তাদের ঘর ফরাসি আসবাব কিংবা উনিশ শতকের ইউরোপীয় ধারার চিত্রকর্মে সাজিয়ে রাখেন। তারা পশ্চিমা বা হিন্দি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের মাধ্যমে বিনোদন গ্রহণ করেন, যেগুলো বিষয়বস্তু ও রূপ উভয় দিক থেকেই ইসলামী নয়। রেডিও, ক্যাসেটসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমও অ-ইসলামী সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিপূর্ণ। একইভাবে উদ্বেগজনক হলো রক্ষণশীল শ্রেণির বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া। মিউজিক কিংবা শব্দশিল্পের ইসলামী প্রকাশ নিয়ে তাদের কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা দ্রুত আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন, যেন শুধু মিউজিক শোনাই নয়, এ নিয়ে কথা বলাও তাদের কলুষিত করে ফেলতে পারে। মিশরের নতুন একটি ধর্মীয় গানের বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করার সময় এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী বলেছিলেন, তিনি আর কোনো ধরনের মিউজিকই শুনবেন না, কারণ তা ইসলামে নিষিদ্ধ হতে পারে। এমনকি কোনো ইসলামী সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতেও মিউজিকবিষয়ক প্রসঙ্গ সাধারণত স্থান পায় না। আর কতবার যে বিভিন্ন মুসলিম আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, মিউজিক হালাল নাকি হারাম, তার কোনো হিসাব নেই।</p>
<p>এ কথা সত্য যে, মুসলিমপ্রধান কিংবা অমুসলিম যেকোনো দেশেই প্রবীণ মুসলিমদের একটি বড় অংশ টেলিভিশন, চলচ্চিত্র বা ক্যাসেটের মাধ্যমে প্রচারিত অমুসলিম উৎসের সংগীতের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। তবে এই অনীহা বা প্রত্যাখ্যানের কারণ তারা খুব কমই বিশ্লেষণ করেন। তারা কেবল অনুভব করেন, সর্বশেষ পপ তারকাদের গান হোক কিংবা ইউরোপ ও আমেরিকার আধুনিক ধ্রুপদি সংগীত, এসব প্রকাশের টার্গেট অডিয়েন্স তারা নন এবং এগুলো এমন কোনো বার্তা বহন করে না, যা তারা শুনতে আগ্রহী। ধ্রুপদি ইসলামী সংগীত-ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের পরিচয়ই সমকালীন প্রচলিত সংগীত থেকে তাদের দূরত্ব তৈরি করেছে এবং শব্দশিল্পের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র রুচিবোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেই তরুণ প্রজন্মের কী হবে, যারা এলভিস প্রেসলি, রোলিং স্টোনস ও আর্নল্ড শোয়েনবার্গের জগতে জন্মেছে এবং বেড়ে উঠেছে? শিগগিরই প্রাপ্তবয়স্ক সমাজে প্রবেশ করতে যাওয়া এই মুসলিম তরুণদের খুব কমই ইসলামী শব্দশিল্পের ঐতিহ্যে দীক্ষিত হয়ে নিজেদের পরিচয় দৃঢ় করার সুযোগ পেয়েছে। কারণ তারা যেসব শব্দশিল্পের সংস্পর্শে আসে, তার অধিকাংশই বিজাতীয় সংস্কৃতি ও মতাদর্শ থেকে উৎসারিত। ভবিষ্যতে এর গুরুতর পরিণতি অনিবার্য, কেননা এর ফলে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ক্রমেই ক্ষয় ও বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়ছে।</p>
<p><em>ইসলামের আলোকে ব্যক্তিত্ব গঠনকে যদি অপরিহার্য বলে স্বীকার করা হয়, তবে সেই গঠনপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী সংস্কৃতির এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি দিককে উপেক্ষা করা যায় না। শব্দশিল্পের প্রভাব দৃশ্যমান না হলেও তা সর্বক্ষণ সক্রিয় এবং ব্যক্তি ও সমাজের ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। এ কারণেই সাংস্কৃতিক দীক্ষা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের পাশাপাশি হান্দাসাহ আল-সাউতের অবদান এবং এর ইসলামীকরণের গুরুত্ব সম্পর্কেও মুসলিমদের গভীরভাবে সচেতন হওয়া জরুরি।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই। শব্দশিল্প সম্পর্কে আমাদের মনোভাবের পটভূমি</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>শব্দশিল্প নিয়ে এমন উদাসীনতা এবং এর ইসলামীকরণের প্রতি অনাগ্রহের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।</p>
<p><strong>ক.</strong><br />
নান্দনিকতার প্রতি এই উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টির একটি কারণ হলো মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত সেই ধারণা, যার ভিত্তিতে সংগীতকে একটি ‘নিষিদ্ধ’ আনন্দ হিসেবে দেখা হয় এবং এতে অংশগ্রহণের সঙ্গে অপরাধবোধ বা দ্বিধা জড়িয়ে থাকে। এই ধারণার মূলে রয়েছে সংগীত ও শব্দশিল্পের বিভিন্ন রূপ নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বিতর্ক, যা আজও সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। এ বিষয়ে ইসলামী সভ্যতার মহান আলেম ও মুতাফাক্কিরগণের অসংখ্য বক্তব্য ও গ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও, যেমন আল-শাফিঈ (১৯০৬), ইমাম গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়্যাহ (১৯৬৬) এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেক্টর মাহমুদ শালতুত (১৯৬০), বিতর্কটি কখনো চূড়ান্ত মীমাংসায় পৌঁছায়নি। ফলে মিউজিক কিংবা শব্দশিল্পের শরয়ী ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা নিয়ে মুসলিম মানসে আজও বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।</p>
<p><strong>খ.</strong></p>
<p>শব্দশিল্প সম্পর্কে সমসাময়িক মনোভঙ্গির সঙ্গে <em>মুজিকা</em> &nbsp;শব্দটির ভুল উপলব্ধি ও ভিন্নধাচের ব্যাখ্যাও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরিভাষাটি <em>হান্দাসাহ আল-সাউত</em>-এর কেবল নির্দিষ্ট কিছু ধারাকে বোঝায় এবং সাধারণত বাদ্যযন্ত্রনির্ভর শব্দশিল্পের সঙ্গেই অধিকতর সম্পৃক্ত। ইংরেজি <em>মিউজিক</em> শব্দের মতো এর অর্থ কখনোই এতটা ব্যাপক ছিল না যে, তারতিল আল-কোরআন বা আজানের মতো শব্দশিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। অথচ এগুলোতেও সুরের শিল্পসম্মত বিন্যাস রয়েছে, যা ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত <em>মিউজিক</em> ধারণার অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই এই পার্থক্যটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করেননি। <strong>তবে ইসলামী সংস্কৃতিতে মিউজিকের বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক গড়ে উঠেছিলো, তার উদ্দেশ্য কখনোই সব ধরনের শব্দশিল্পকে একই বিচারের আওতায় আনা ছিল না। ফকীহগণ <em>মুজিকা</em>-বহির্ভূত ধারাগুলোর বৈধতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলেননি, আবার <em>মুজিকা</em>-র অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি ধারাকেও নির্বিচারে নিন্দা করেননি। তাই শব্দশিল্পের কোনো কোনো রূপের প্রত্যাখ্যানকে সমগ্র <em>হান্দাসাহ আল-সাউত</em>-এর ওপর আরোপিত সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা যথার্থ নয়।</strong> বরং এটি ছিল নেতৃত্ব ও সমাজের পক্ষ থেকে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন ও উদ্‌যাপনের রীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল করার প্রচেষ্টা, যেন তা ইসলামের মতাদর্শ ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।</p>
<p><strong>গ.</strong></p>
<p>হান্দাসাহ আল-সাউত ধারাগুলোর ইসলামীকরণে অনাগ্রহের তৃতীয় একটি কারণ হলো এই ভয় যে, যেকোনো ধরনের মুজিকায় সম্পৃক্ততা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক পবিত্র কোরআনে নিষিদ্ধ। বিষয়টি মোটেও এমন নয়; কোরআনে এমন কোনো আয়াত নেই, যা সাধারণভাবে শব্দশিল্পকে বা মুজিকা নামে পরিচিত ধারাগুলোকেও নিন্দা করে। এমনকি এই বিষয়ে কোরআনে সরাসরি কোনো উল্লেখও নেই। শব্দশিল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একমাত্র আয়াতগুলো কোরআনের তেলাওয়াত বা কোরআনকে সুন্দর সুরে তেলাওয়াতের নির্দেশ দেয় (যেমন ২৫:৩২; ৭৩:৪)। তবে মুজিকা যারা সমর্থন করেন কিংবা বিরোধিতা করেন, উভয় পক্ষই অন্যান্য আয়াতে তাদের মতের সমর্থন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।</p>
<p><strong>ঘ.</strong></p>
<p>সমসাময়িক ইসলামীকরণের প্রবক্তাদের রচনায় শব্দশিল্পের প্রতি উদাসীনতার চতুর্থ কারণ হলো, হাদীসে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন সম্পর্কে যা আছে বলে অনেক মুসলিম মনে করেন, তার প্রতি তাদের মনোভঙ্গি। মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের বিরুদ্ধবাদীরা কিছু হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিউজিককে নিন্দা করেছেন।<sup>১</sup> অন্যদিকে, যারা মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের সমর্থন করেন, তারা অন্যান্য হাদীস উল্লেখ করেন, যা তাদের অবস্থানের সমর্থন করে বলে মনে হয়।<sup>২</sup> উভয় পক্ষই আপাত-বৈপরীত্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা না করে, নিজেদের মতকে সমর্থন করে যাওয়ার চেষ্টা করেন।</p>
<p>নিশ্চয়ই নবী (সা.) এতটা অসংগতিপূর্ণ ছিলেন না যে, একটি বিষয়কে এক সময় নিন্দা করবেন এবং অন্য সময় একই বিষয়কে অনুমোদন করবেন। সুতরাং তাঁর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার পেছনে নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ছিলো। হতে পারে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল; অর্থাৎ, সেটি কি নান্দনিক ও সঙ্গীতগতভাবে সুন্দর, যথোচিত, এবং আখলাকীভাবে উন্নয়নমূলক ছিলো কিনা? অথবা নবীর (সা.) ভিন্ন প্রতিক্রিয়াগুলো হয়তো সেই মিউজিকের পরিবেশনার পরিস্থিতির কারণে ছিলো, যা সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও সমাজের পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো?</p>
<p><strong>ঙ.</strong></p>
<p>ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় শব্দশিল্পের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করার পঞ্চম একটি কারণ হতে পারে, <strong>সমসাময়িক মুসলিমদের ইসলামীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দশিল্প এবং এর বাইরের শব্দশিল্পের মধ্যে পার্থক্য করার সাধারণ ব্যর্থতা বা অক্ষমতা।</strong> অনেক সমসাময়িক মুসলিম নির্দিষ্ট ধরনের শব্দশিল্প পছন্দ করেন এবং অন্যগুলো জ্ঞাতসারে প্রত্যাখ্যান করেন। নিজেদের কাছে প্রশ্ন না করেই যে, প্রথমটি কেন শেষেরটির চেয়ে শ্রেয়। যেখানে অ-ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রভাব অনুপস্থিত বা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে নগণ্য, সেখানে এটি হয়তো কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না। কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসবাস করলেই সেরূপ পরিবেশ এক অবাস্তব স্বপ্নমাত্র। তাই কেউ কেউ নিজেদের ও পরিবারের চারপাশে এক &#8220;লৌহ যবনিকা&#8221; টানার চেষ্টা করেছেন, ইসলামের নান্দকিতার বাইরে হতে পারে, এমন শব্দশিল্প থেকে সন্তানদের বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছেন। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার প্রতিটি শহর ও গ্রামে পৌঁছে যাওয়ায়, এই বিচ্ছিন্নতার প্রচেষ্টা খুব কমই কার্যকর হয়। অন্যরা নির্বিশেষে সব ধরনের শব্দশিল্পকে নিষিদ্ধ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে যে শিল্পশূন্যতা তৈরি হয়, তা অনিবার্যভাবে অ-ইসলামী সঙ্গীতের দ্বারা পূর্ণ হয়, যা সমাজের তরুণদের মনে অনুপ্রবেশ করে। এই মানসিক ও নান্দনিক পলায়নপরতার পরিণতি সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।</p>
<p><strong>চ.</strong></p>
<p>শব্দশিল্পের ইসলামীকরণে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে না আসার ষষ্ঠ একটি কারণ হলো, এ বিষয়ে ইসলামী তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, অনেক মুসলিম তাদের নান্দনিক জীবনে কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তারা অবশ্যই এর ধর্মীয় ও নৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, কিন্তু এটি তাদের নান্দনিক ও সঙ্গীত-বোধ গড়ে তোলায় যে ভূমিকা রাখে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বিকশিত ও পরিবেশিত শব্দশিল্পের অন্যান্য ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে এটি কতটা প্রভাব রেখেছে, সেটি সম্পর্কে তারা সচেতন নয়।</p>
<p><strong>অবশ্যই মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গীত ঐতিহ্যের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু মরোক্কো থেকে দক্ষিণ ফিলিপাইন পর্যন্ত মুসলিমদের দ্বারা পরিবেশিত ও উপভোগ করা হান্দাসাহ আল-সাউতের অনেক ধারায় কিছু মূল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান এবং সেগুলো ইসলামী শব্দশিল্পের প্রাচীনতম শিল্প কোরআন তেলাওয়াতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।</strong> এই কোরআনি প্রভাব ও নির্ধারণকে প্রতিফলিত করে, এমন শব্দশিল্পকে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একইভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করা, নান্দনিক ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কখনো সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হয়নি। এটি এমন এক বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার, সেই সমসাময়িক মুসলিমদের জন্য অপেক্ষা করছে, যারা ইতিমধ্যে তাদের ভূমিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন এবং এখন হয়তো আরও বিধ্বংসী একটি সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক আগ্রাসনের ফল ভোগ করতে চলেছেন, যে আগ্রাসন তাদের মানসের গভীরে আঘাত হানছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন। হান্দাসাহ আল-সাউতের ইসলামীকরণ করার গুরুত্ব</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>আপনারা হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, হান্দাসাহ আল-সাউত কোরআনি নীতিমালার আলোকে ইসলামীকরণে অবদান রাখতে পারে?</p>
<p><strong>ক.</strong></p>
<p>প্রথমত, ইসলামী শব্দশিল্প যেভাবে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে, তা হলো তাওহীদের বার্তাকে শব্দে &#8220;অনুবাদ&#8221; করার ভূমিকা পালনের মাধ্যমে। সেই বার্তাকে প্রতিনিধিত্বকারী শব্দশিল্পগুলোকে কখনোই নিছক বিনোদন হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো এমন সৃজনশীলতার উদাহরণ, যা শ্রোতাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলো মানুষের দিকে, পার্থিব জগৎ ও তার কার্যকলাপের দিকে, কিংবা নিছক মানবিক আবেগের চিত্রায়নের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে না। এগুলোর একটি উচ্চতর লক্ষ্য আছে, এবং এগুলোর বিমূর্ত গুণাবলি সেই লক্ষ্যের প্রমাণ দেয়।</p>
<p><em><strong>শব্দশিল্পের প্রকাশ যখনই শ্রোতাকে উচ্চতর সত্তার দিকে চিন্তায় নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, অতিমাত্রায় ইন্দ্রিয়পরায়ণ বা পার্থিব ও মানবিক গুণাবলির চিত্রবর্ণনাকারী হয়ে পড়ে, মুসলিমরা তখনই তাতে সংশোধন বা প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করেছেন। মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের ইসলামী অর্গানাইজেশন উচিত মিউজিকে এমন এক অসীম প্যাটার্ন প্রতিফলিত করা, যার মডুলার এককে (modular units), পুনরাবৃত্তিতে, জটিলতায় ও অন্তহীন গুণে- কোরআনের সাহিত্যিক প্যাটার্নের নিখুত পরিপূরক হবে এবং এর দৃশ্যমান আরাবেস্কে (arabesque) রূপান্তরিত হবে। তাওহীদের বার্তার আলোকে সজ্জিত এই শব্দশিল্প, ব্যক্তি ও সমাজের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়াকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করবে।</strong></em></p>
<p><strong>খ.</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, হান্দাসাহ আল-সাউত ইসলামীকরণে যেভাবে অবদান রাখতে পারে তা হলো মুসলিমদের জাতীয় পরিচয়, নৃতাত্ত্বিক পটভূমি, এবং বসবাসের স্থান নির্বিশেষে একটি সাধারণ ও স্বজাত নান্দনিক শব্দ-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে।</strong> উম্মাহজুড়ে ইসলামী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলা ও টিকিয়ে রাখার জন্য, ইসলামীকরণ কার্যকর ও তা ব্যাপকতর হতে হবে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভাষাগত জাতীয়তা বা নৃতাত্ত্বিক জাতি-অহংকারের মাধ্যমে কখনো এটি অর্জন করা যাবে না। এটিকে অবশ্যই কোরআনী নীতিমালার ওপর ভিত্তি করতে হবে, যা সকল মুসলিমের কল্পনাকে উদ্দীপিত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীনকালে এই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল; এবং এখনো মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মুজিকা ও হান্দাসাহ আল-সাউতের অন্যান্য ধারার অনেক পরিবেশনায় কোরআন তেলাওয়াতের প্রভাবের ছাপ রয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত, বিজাতীয় নান্দনিক প্রভাব আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক। ভিডিও ও অডিও ক্যাসেট, স্যাটেলাইট রিলে এবং ট্রানজিস্টর রেডিওর মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মুসলিম বিশ্বের সুদূরতম প্রান্তেও ভিন্ন মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত শব্দশিল্পের আগ্রাসন নিয়ে এসেছে। তাওহীদ-ভিত্তিক শিল্পের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দশিল্পগুলোকে যদি উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া না হয়, তাহলে ইসলামী অস্তিত্বে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা অবশ্যই তাওহীদ বহির্ভূত শব্দশিল্প দ্বারা পূর্ণ হবে, বরং অনেক ক্ষেত্রে এরই মধ্যে হয়েছেও!</p>
<p><strong>গ.</strong></p>
<p>তাওহীদ-অনুপ্রাণিত শব্দশিল্পগুলো শুধুমাত্র বৈশ্বিক পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বকে মিউজিক্যালি ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমেই ইসলামীকরণে অবদান রাখতে পারে না (যাকে আমরা তাদের ইসলামীকরণ গুরুত্বের অনুভূমিক মাত্রা বলতে পারি), বরং এগুলো মুসলিমদের একটি উল্লম্ব মাত্রায়ও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। এর অর্থ হলো, যেকোনো জাতি বা অঞ্চলের মুসলিম সমাজ কর্তৃক লালিত ও সমর্থিত একটি সাধারণ শব্দশিল্প বা মিউজিকের ঐতিহ্য সেই সমাজকে যেসব পরস্পর-বিচ্ছিন্ন স্তরে বিভক্ত করে রেখেছে, সেগুলোর মধ্যকার বাধাগুলো অপসারণ করতে সহায়তা করবে।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহর যে দেশেই যাওয়া যাক, বিগত শতকগুলোতে দুটি পরস্পর-বিরোধী শিক্ষাব্যবস্থা মুসলিম সমাজকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। একটি হলো ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বা প্রাথমিক/মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চতর ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালিত। অপরটি পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলে গড়া। এই শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিবিভাজন একটি মেরুকৃত সমাজের জন্ম দিয়েছে, যেখানে এক ব্যবস্থার স্নাতকদের সঙ্গে অন্য ব্যবস্থার স্নাতকদের খুব কম মিল। বোঝাপড়ার অভাব, রাজনৈতিক কলহ, হতাশা, অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা- এই দুর্ভাগ্যজনক ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল। এটি চিন্তা, জ্ঞান ও কর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করে এবং মুসলিম সমাজের দুটি অংশকে পরস্পরের সঙ্গে অর্থবহভাবে যোগাযোগ ও সহযোগিতা করতে অক্ষম করে তোলে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে সংহতির বহু অভাবের কারণের মধ্যে এটি অন্যতম, এবং এটি অনেক মুসলিম দেশে বিপর্যয়কর সংঘর্ষের সম্ভাব্য অগ্নিস্ফুলনের মত অপেক্ষা করছে। এই সম্ভাব্য সমস্যা কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস এবং বসবাস, দৃশ্যমান ও শব্দ উভয় শিল্পের প্রকাশেও পার্থক্য জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক কালপর্বে জীবন ও সংস্কৃতির এই সব দিকই পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে। এসকল কিছু (শব্দশিল্পসহ) যদি পুনরায় ইসলামীকরণ না করা হয় এবং আমাদের সমাজকে উল্লম্বভাবে পুনরায় সংযুক্ত না করা হয়, তাহলে বিভিন্নভাবে শিক্ষিত মুসলিম সমাজের দুটি অংশের মধ্যে ক্রমাগত বিভাজন এবং এই পরিস্থিতি যে পরিণতির ইঙ্গিত দেয়, তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার। সমাধান কোথায়?</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>সমসাময়িক শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার প্রেরণা কোথা থেকে আসবে? বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকারগুলোর ওপর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই নির্ভর করা যাবে না, কারণ তারা অধিকাংশই এই ইসলামীকরণ থেকে প্রাপ্ত বৈশ্বিক এই অনুভূমিক (horizontal) ঐক্য ও জাতীয় উল্লম্ব (vertical) ঐক্যের সুফল সম্পর্কে অসচেতন বা উদাসীন। এছাড়া, বর্তমান সরকারগুলোর অধিকাংশ রাজনৈতিকভাবে এতটাই অস্থিতিশীল যে, ইসলামীকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ এটি তাদের একদিকে রক্ষণশীলদের, অন্যদিকে সেক্যুলারদের আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে।</p>
<p>আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠনগুলোও রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে শব্দশিল্পের ইসলামীকরণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তারা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অগ্রগতির ধারাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করার এই প্রবণতা দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই দৃশ্যমান। নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও টিকে থাকতে এবং ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে সক্ষম শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে, আমরা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক ধ্বংসের ক্ষেত্র তৈরি করতেই যেন বেশি অভ্যস্ত। মূলনীতি ও সুসংহত ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বদলে আমরা এমন নেতৃত্ব তৈরি করি, যারা অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসে, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সাফল্য অর্জন করে এবং পরে প্রতিপক্ষের কাছে স্থান হারায়।</p>
<p>নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেই পূর্ববর্তী নেতৃত্বের অর্জনগুলো বদলে দিতে শুরু করে। ফলে ইতিপূর্বে যতটুকু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিলো, তা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা উম্মাহ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আরও পিছিয়ে পড়ে। একসময় এই নেতৃত্বও প্রতিস্থাপিত হয় এবং আবারও শুরু হয় নতুন এক দফা ‘আমূল অস্ত্রোপচার’। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবে টিকে থাকলেও উম্মাহ তার কাছ থেকে প্রাপ্য সুফল লাভ করতে পারে না।</p>
<p><em><strong>সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ সূচনা ও পরিচালনার প্রত্যাশিত উৎস না হয়, তবে এই আন্দোলন কোথা থেকে আসবে? এটি আসতে পারে কেবল সেইসব মুসলিম ব্যক্তির কাছ থেকে, যারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাওহিদের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং সেই উপলব্ধি ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কাজ করেন। ব্যক্তি ও তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ইসলামকে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। একই শক্তিই শব্দশিল্পের ইসলামীকরণকেও বাস্তবে রূপ দেবে। কেবল তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রেরণা ও ইসলামীকরণের আহ্বানই স্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।</strong></em></p>
<p><em><strong>নিঃসন্দেহে, মুসলিম হিসেবে আমাদের আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাওহীদমুখী হয়ে ওঠা। আমাদের দ্বীনকে এমনভাবে সক্রিয় করে তুলতে হবে, যেন তা আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব ও অঙ্গীকারকে ধারণ করে। এর মধ্যে সেই নান্দনিক সৃষ্টিগুলোও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, যেগুলো সৃষ্টির সামর্থ্য আল্লাহ তাঁর খলিফাকে দিয়েছেন। একইভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত জীবনের সেইসব সৌন্দর্যও, যার প্রতি সংবেদনশীলতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ দিয়ে তিনি তাঁর খলিফাকে সৃষ্টি করেছেন।<sup>৩</sup> অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের পাশাপাশি যখন আমরা এই ক্ষেত্রেও সফল হব, কেবল তখনই দ্বীন ও জীবনের সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যা বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম আবির্ভূত হয়েছে।</strong></em></p>
<p>……………………………</p>
<p>১. উদাহরণস্বরূপ, একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা.) একটি বিশেষ ধরনের মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন শ্রবণ এড়ানোর উদ্দেশ্যে তাঁর দুই কানে আঙুল প্রবেশ করিয়েছিলেন (আবু দাউদ ১৩৯৬হি./১৯৫০: কিতাবুল আদব, অধ্যায় ৫২)। পরবর্তীকালে এই ঘটনাকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেন তা <em>মুজিকার</em> সব ধারা কিংবা সামগ্রিকভাবে হান্দাসাহ আল-সাউতের প্রতি একটি সাধারণ নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞা নির্দেশ করে।<br />
অপর একটি হাদীসে আবু উমামাহ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: “কোন ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে নিজ থেকে গান গায় না, বরং আল্লাহ তার প্রতি দুটি শয়তান প্রেরণ করেন; তারা তার দুই কাঁধে অবস্থান করে এবং তাদের গোড়ালি দিয়ে তার বক্ষে আঘাত করতে থাকে এবং ততক্ষণ সে গান গাইতে থাকে।” তবে এই বর্ণনাটি সহিহ আল-বুখারি বা সহিহ মুসলিমে স্থান পায়নি। <em>মুজিকা</em> কিংবা হান্দাসাহ আল-সাউতের বিভিন্ন ধারাকে নিরুৎসাহ সংক্রান্ত হাদীসের জন্য ইবনে আল-কায়সারানী (১৩৯০ হি./১৯৭০: ৭৫–৯৫) দ্রষ্টব্য।</p>
<p>২. অন্যদিকে, মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের প্রতি নবীর (সা.) অনুমোদনমূলক প্রতিক্রিয়ার দৃষ্টান্তও হাদীসে পাওয়া যায়। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন: “আল্লাহর রাসূল (সা.) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমার কাছে দুটি বালিকা <strong>বু’আস যুদ্ধের গান</strong> গাইছিল। নবী (সা.) শয্যায় শয়ন করলেন এবং মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আবূ বকর (রা.) প্রবেশ করে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, <strong>&#8220;আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নিকট শয়তানের বাদ্যযন্ত্র!&#8221;</strong> তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, <strong>&#8220;ওদের ছেড়ে দাও।&#8221;</strong> এরপর আবূ বকর (রা.) যখন অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন, আমি ইশারায় মেয়েদুটিকে বেরিয়ে যেতে বললাম, তারা চলে গেল। সেদিন ছিল ঈদের দিন।” (আল-বুখারি ১৯৭১: ৩৭)। ‘আয়িশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত অপর একটি ঘটনায় বলা হয়েছে: “মিনার দিনগুলোতে- অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে আগমন করেন। সে সময় দুই কিশোরী দফ বাজাচ্ছিল এবং নবী (সা.) কাপড় দিয়ে নিজেকে আবৃত করে শুয়ে ছিলেন। আবু বকর (রা.) তাদের তিরস্কার করলে নবী (সা.) মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে বলেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও; কারণ এগুলো ঈদের দিন এবং মিনায় অবস্থানের দিন।’” (আল-বুখারি ১৯৭১: ৫৫–৫৬)। <em>মুজিকা</em> ও <em>সামা</em> সমর্থিত হাদীসসমূহের সংকলনের জন্য রায়চৌধুরী (১৯৫৭: ৬৬–৭০), আল-গাজ্জালী (১৯০১–১৯০২), ইবনে আল-কায়সারানী (১৩৯০ হি./১৯৭০) এবং রবসন (১৯৩৮) দ্রষ্টব্য। এ প্রসঙ্গে আল-কারযাভী-ও প্রাসঙ্গিক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>৩. হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ‌ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্য সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করেছে? আর আল্লাহর দেয়া পবিত্র জিনিসগুলো কে নিষিদ্ধ করেছে?&nbsp;বলো, দুনিয়ার জীবনেও এ সমস্ত জিনিস ঈমানদারদের জন্য, আর কিয়ামতের দিনে এগুলো তো একান্তভাবে তাদেরই জন্য হবে।&nbsp;এভাবে যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের জন্য আমার কথাগুলো আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে থাকি।&nbsp;হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ‌ যেসব জিনিস হারাম করেছেন সেগুলো হচ্ছে: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা,&nbsp;গোনাহ,&nbsp;সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি,&nbsp;আল্লাহর সাথে তোমাদের কাউকে শরীক করা, যার স্বপক্ষে তিনি কোন সনদ পাঠাননি এবং আল্লাহর নামে তোমাদের এমন কোন কথা বলা, যা মূলত তিনি বলেছেন বলে তোমাদের জানা নেই।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তথ্যসূত্র:</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p>১. আবু দাউদ। <em>সুনান</em>। ৪র্থ খণ্ড। সম্পাদনা: এম. এম. আবদুল হামিদ। কায়রো।</p>
<p>২. আল-বুখারি, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল। <em>সহিহ আল-বুখারি</em>। ২য় খণ্ড। অনুবাদ: মুহাম্মদ মুহসিন খান। মদিনা: ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, ১৯৭১।</p>
<p>৩. আল-ফারুকী, লুইস লামিয়া (ইবসেন)।</p>
<ul>
<li>“মিউজিক এবং মিউজিশিয়ানদের ব্যাপারে শরিয়ত।” <em>ইসলামিক থট অ্যান্ড কালচার</em>। সম্পাদনা: ইসমাঈল রাজি আল-ফারুকী। ওয়াশিংটন ডিসি: ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট, ১৯৮২, পৃ. ২৭–৫২।</li>
<li>“মুসলিম বিশ্বের মিউজিকের সংস্কৃতিতে ধারাবাহিকতার উপাদান।” <em>প্রোগ্রেস রিপোর্টস ইন এথনোমিউজিকোলজি</em>, ১(২), ১৯৮৩–৮৪, পৃ. ১–১৮।</li>
<li>“মিউজিক, মিউজিশিয়ান এবং মুসলিম আইন।” <em>এশিয়ান মিউজিক</em>, ১৬(১), ১৯৮৫, পৃ. ৩–৩৬।</li>
</ul>
<p>৪. আল-গাজালী, আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ।</p>
<ul>
<li><em>ইহইয়া উলুমুদ্দীন</em>। ২য় খণ্ড। কায়রো: মাতবাআত আল-ইস্তিকামাহ।</li>
<li><em>ইহইয়া উলুমুদ্দীন</em>-এর অংশবিশেষ, ডানকান বি. ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক “ইমোশনাল রিলিজিয়ন ইন ইসলাম অ্যাজ অ্যাফেক্টেড বাই মিউজিক অ্যান্ড সিঙ্গিং” শিরোনামে অনূদিত। <em>জার্নাল অব দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি</em>, ১৯০১–০২।</li>
</ul>
<p>৫. ইবনে আল-কায়সারানী, আবুল ফাদল মুহাম্মদ ইবনে তাহির ইবনে আলি ইবনে আহমদ আল-মাকদিসি আল-শায়বানি। <em>কিতাব আল-সামা</em>। সম্পাদনা: আবুল ওয়াফা আল-মারাফি। কায়রো: হাই কমিটি ফর ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স, ১৩৯০ হি./১৯৭০।</p>
<p>৬. ইবন তাইমিয়্যাহ, তাকি আদ-দিন আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে আবদুল হালিম। “কিতাব আল-সামা ওয়াল-রাকস।” <em>মাজমুআত আল-রাসাইল আল-কুবরা</em>। ২য় খণ্ড। কায়রো: মাতবাআত মুহাম্মদ আলি সুবাইহ, ১৯৬৬, পৃ. ২৯৫–৩৩০।</p>
<p>৭. আল-নাবুলুসি, আবদুল গনি। <em>ইযাহ আল-দালালাত ফি সামা আল-আলাত</em>। দামেস্ক: মাকতাবাত আল-হাফনিয়্যাহ, ১৩০২ হি./১৮৮৪।</p>
<p>৮. আল-কারযাভী, ইউসুফ। <em>ইসলামে হালাল ও হারাম</em>। অনুবাদ: কামাল এল-হেলবাওয়ি, এম. মইনউদ্দিন সিদ্দিকী ও সৈয়দ শুকরি। ইন্ডিয়ানাপোলিস: আমেরিকান ট্রাস্ট পাবলিকেশনস।</p>
<p>৯. রবসন, জেমস। <em>ট্র্যাক্টস অন লিসেনিং টু মিউজিক</em>। লন্ডন: দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৩৮।</p>
<p>রায়চৌধুরী, এম. এল। <em>মিউজিক ইন ইসলাম</em>। কলকাতা: এইচ. ভট্টাচার্য, ১৯৫৭।</p>
<p>১০. আল-শাফিঈ, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস। <em>কিতাব আল-উম্ম</em>। রিওয়ায়াত: আল-রাবি ইবনে সুলায়মান। কায়রো: বুলাক, ১৯০৬।</p>
<p>১১. শালতুত, মাহমুদ। <em>আল-ফাতাওয়া</em>। কায়রো: দার আল-শুরুক, ১৯৬০, পৃ. ৩৫৫–৩৫৯।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ সাব্বির হাসান সিফাত</strong>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamization-of-the-art-of-words/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">17124</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সভ্যতার মানদণ্ডে শহরের আদর্শ ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ideal-and-modern-urban-planning-as-a-benchmark-of-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ideal-and-modern-urban-planning-as-a-benchmark-of-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 06 Aug 2026 04:15:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[শহর ও স্থাপত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=17089</guid>

					<description><![CDATA[আজকের আধুনিক শহরগুলো সাধারণত বিশ্বব্যাপী এক রকম। দুবাই, লন্ডন, ইস্তাম্বুল—এসব শহরের চেহারা ও নগর পরিকল্পনা প্রায় একই রকম হয়ে থাকে। আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, শহরের এই একরকম চেহারা আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, ইসলামী সভ্যতার]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজকের আধুনিক শহরগুলো সাধারণত বিশ্বব্যাপী এক রকম। দুবাই, লন্ডন, ইস্তাম্বুল—এসব শহরের চেহারা ও নগর পরিকল্পনা প্রায় একই রকম হয়ে থাকে। আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, শহরের এই একরকম চেহারা আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, ইসলামী সভ্যতার আদর্শে কি শহর পরিকল্পিত হতে পারে? এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এর সাথে বাজার, রিয়েল এস্টেটের দাম, চাহিদা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ও যুক্ত থাকে।</p>
<p><strong>নগর পরিকল্পনা করার প্রথম বিষয়টি হলো “স্কেল” বা আকার। যত বড় হবে শহর, তত কম আমাদের একে অপরের সাথে সম্পর্ক থাকে।</strong> বড় শহরে বাস করলে, আপনার প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কিত হওয়া কঠিন। একটি ভবনে যদি ১৫টি ফ্ল্যাট থাকে, আপনি কী সব প্রতিবেশীর সাথে একইরকম ভাবে মিশতে পারবেন? একই ভবনে বাস করেও মানুষ একে অপরের সাথে সালাম দেয় না, একে অপরকে অদৃশ্য মনে করে। এখানে মানুষ একে অপরের সাথে সহজে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় না, কারণ তারা জানে যে সম্পর্কগুলো অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল।</p>
<p>এটি একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক সমস্যা, যা আমাদের সভ্যতার মানদণ্ড ও মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শহরে বাস করার জন্য আমাদের কি কিছু নতুন মানদণ্ড তৈরি করা উচিত। এটি শুধু আবাসন কিংবা জীবনযাত্রার মান নয়, বরং এটি আমাদের “সফলতা” এবং “সুখ” কীভাবে মাপি, তার ওপর নির্ভরশীল।</p>
<p><strong>সভ্যতাকে বিচার করা যেতে পারে দুটি বিষয় দিয়ে—একটি হলো সফলতার সংজ্ঞা, এবং অন্যটি হলো সুখের সংজ্ঞা।</strong> সফলতা কী? আমরা আজকের সমাজে সফলতা মাপি বাইরের দৃশ্যমান উপাদান দিয়ে—গাড়ি, বাড়ি, ইত্যাদি নিয়ে শো-অফ। কিন্তু, আমরা জানি যে, প্রকৃত সফলতা কোনো কিছু অর্জনে নয়, বরং একজন মানুষের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং সমাজের প্রতি তার ভালোবাসা, সদাচার ও সদাসম্ভাবনা প্রকাশে নিহিত।&nbsp;</p>
<blockquote><p>একটি শহরের প্রকৃত সফলতা এবং সুখের মাপকাঠি হতে পারে, সেই শহরের বাসিন্দারা কতটা একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছে, কতটা মানবিকভাবে একে অপরকে সহায়তা করতে পারছে। এটা একটি নতুন প্রজন্মের আদর্শ, যা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। আমাদের শহরের পরিকল্পনায় এই মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেখানে একজন মুসলিম শুধু নিজের জীবনের মধ্যে নয়, বরং তার আশপাশের মানুষের জীবনেও সুখ এবং উন্নতি নিশ্চিত করতে চায়।</p></blockquote>
<p><strong>নগর পরিকল্পকদের জন্য একটি বিশেষ পরামর্শ হলো—তাদের শুধু “অর্ডার” বা নিয়মে আটকে না থেকে “ডিজাইনিং ডিসঅর্ডার” এর দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। অর্থাৎ, শহরগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে সেখানে মানুষ একত্র হতে পারে, আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারে, এমনকি প্রতিবাদও করতে পারে।</strong></p>
<p>উদাহরণ হিসেবে তেহরির স্কয়ারের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে পুলিশ যদি আক্রমণ করত, তবে মানুষ পালানোর জন্য উপযুক্ত রাস্তা পেতো। এটি শহরের ডিজাইন সম্পর্কে এক নতুন ধারণা দেয়, যা মানুষের স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতার ক্ষেত্র তৈরি করে।</p>
<p>এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এটা কি শুধুমাত্র ইসলামী বিষয় হবে, নাকি এটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো? মূলত এটি ইসলামী হতে অথবা নাও হতে পারে, বরং এটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা অপরিহার্য। উদাহরণ হিসেবে জাহা হাদিদের কথা উল্লেখ করা যায়, যিনি নিয়ম ভেঙে নতুনভাবে ভবন ডিজাইন করতে শুরু করেছিলেন এবং পরে সেই নিয়ম তাকে খ্যাতি এনে দেয়। আমাদের উচিত ভবিষ্যতের স্থপতিদের প্রতি এমন চ্যালেঞ্জের মনোভাব গড়ে তোলা, যাতে তারা কোনো সিস্টেমের অধীনে না থেকে নিজের পথ তৈরি করতে পারে।</p>
<p><em>একটি বিশেষ বিষয় হলো, ঐতিহাসিক ক্ষত বা collective trauma নিয়ে আলোচনা। বিশেষত, মুসলিম বিশ্বের যেখানে অনেক রাজনীতি, যুদ্ধ এবং সংঘাতের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি হয়েছে, সেখানকার জনগণের মধ্যে একটি মানসিক ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের উচিত সেই ক্ষতকে মাথায় রেখে, কিন্তু তা দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করতে দিয়ে, সামনে এগিয়ে চলা। বিশেষত, আমরা যদি ইসলামী সভ্যতা এবং সমাজ গড়তে চাই, তবে আমাদের ঐতিহাসিক ক্ষতগুলোকে অতিক্রম করতে হবে, এবং সেই সঙ্গে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।</em></p>
<p>যখন আপনি স্থান পরিবর্তন করেন, আপনি নতুন কিছু শিখতে পারেন এবং নতুন কিছু করতে পারেন। তবে সেই ঐতিহাসিক ক্ষত আমাদের ভবিষ্যতের পথে বাধা হতে পারে না।”</p>
<p>জাতীয়তাবাদ ইসলামী পরিচয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধী নয়। মানুষের একটি গোষ্ঠী বা জাতির প্রতি যে বৈশিষ্ট্য এবং গর্ব রয়েছে, তা তাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। এটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য, যদি আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের মানবিক স্বার্থ এবং ঐতিহ্যকে সম্মান দিয়ে আমরা সামগ্রিকভাবে মানবতার সেবা করতে পারি।</p>
<p><em>এবং, শহর পরিকল্পনা বা ইসলামী সভ্যতার পুনর্গঠন নিয়ে গবেষণা একটি তাত্ত্বিক দিকেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বাস্তব নীতি প্রণেতাদের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। গবেষণা এবং নীতির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে এটি বাস্তবে কার্যকর হয়ে ওঠে। পলিসি মেকার, প্রকৌশলী, মিডিয়া পেশাজীবী, এবং অন্য সকল পেশাজীবী একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে ইসলামী সভ্যতার মূলনীতি বাস্তবায়িত হয়।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ: সাবিহা শুচি&nbsp;</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ideal-and-modern-urban-planning-as-a-benchmark-of-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">17089</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ঐতিহ্য, আদব ও আধ্যাত্মিকতার আলোকে মিউজিক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/music-in-the-light-of-tradition-adab-and-spirituality/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/music-in-the-light-of-tradition-adab-and-spirituality/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 04 Aug 2026 16:04:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=17079</guid>

					<description><![CDATA[বিসমিল্লাহ, আমাদের বর্তমান কালচারাল ট্রেন্ডগুলো মিউজিককে মূলত বিনোদন এবং উপভোগের একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকে। বাজনার বিট যত দ্রুত হয়, গানের কথাগুলো যত গুরুতর হয়, ততই যেনো শ্রোতারা আমোদিত হন এবং তাদের সংগীত অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন। কিন্তু সর্বাধিক জোরে উচ্চারিত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিসমিল্লাহ,</p>
<p>আমাদের বর্তমান কালচারাল ট্রেন্ডগুলো মিউজিককে মূলত বিনোদন এবং উপভোগের একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকে। বাজনার বিট যত দ্রুত হয়, গানের কথাগুলো যত গুরুতর হয়, ততই যেনো শ্রোতারা আমোদিত হন এবং তাদের সংগীত অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন। কিন্তু সর্বাধিক জোরে উচ্চারিত এই আওয়াজ আর কথার সাথে সাথে মানব রূহেও আসে গভীর শূন্যতা। একজন মুসলিম শ্রোতা তাই স্বাভাবিকভাবেই তার ঈমান ও মিউজিকের মধ্যকার সম্পর্ক আসলে কীরূপ, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন।</p>
<p><strong>আজকের দিনে ‘ইসলাম ও মিউজিক’ নিয়ে সবচেয়ে সাধারণ যেই দুটি চিন্তা আমরা দেখতে পাই, দুটিই হলো প্রান্তিক। একদল শুধু মিউজিকের অপপ্রয়োগ/ভুলপ্রয়োগ দেখতে পান এবং সম্পূর্ণরূপে মিউজিককে পরিহার করেন। আরেকদল যেকোনো ধরণের মিউজিককে অনুমোদন দেন যতক্ষণ সেটার গায়ে ‘হালাল’ ট্যাগ থাকে, দ্বীনের পরিভাষাগুলোকে এভাবে ইচ্ছেমতো কপি-পেস্ট করে যেকোনো মিউজিকের উপর বসিয়ে দিলেই সেটা হালাল হয়ে যাবে, সেই মিউজিকের ধরণ যেমনই হোক না কেনো, বিষয়টা যেনো এমন কিছু! কিন্তু তারপরেও ইসলামী সভ্যতার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা বৈচিত্র্যময় সুর ও মিউজিকের যেই প্রতিধ্বনি আজো আমরা শুনতে পাই, তা আমাদেরকে তৃতীয় আরেকটি রাস্তায় নিয়ে যায়; সেই মিউজিকের সন্ধানে, যা প্রামাণিকভাবেই ইসলামী।</strong> এই সন্ধানের উদ্যোগ মোটেও সহজ নয়। এরজন্য সিলসিলাগতভাবে যেই মিউজিক্যাল ঐতিহ্য আমাদের নিকট পৌঁছেছে, সেটার সাথে আমাদের অন্তর্নিহিত সম্পর্ককে যেমন মজবুতভাবে গড়তে হবে তেমনি মানবহৃদয়ের সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর সামনে আমাদের রূহকে উন্মোচিত করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামী সাউন্ডস্কেপের কেন্দ্রে রয়েছে ‘পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত’, যা মিউজিক হিসেবে বিবেচিত না হলেও সন্দেহাতীতভাবেই মিউজিক্যাল একটি বিষয়। আজান এবং এর সাথে সাথে পবিত্র কুরআনের সুর ও ছন্দ শতাব্দীকাল ধরেই মুসলিমদের রূহে রেখে গেছে এক অমোচনীয় ছাপ, একইসাথে এটি মিউজিক্যাল ট্র্যাডিশন এবং কবিতার ধারাগুলোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কুরআন অনেকগুলো মিউজিক্যাল ধারাতেই প্রতিধ্বনিত হয়, নবী করীম (সাঃ) এর প্রশংসাতে গাওয়া নাতে, আল্লাহর নিকট চাওয়া দোয়াতে, সমবেত যিকিরের মাহফিলে কিংবা সূফীদের দরগাহ-খানকাতে।</strong></p>
<p>যাইহোক, মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিদ্যমান এই বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য আমাদের দেখায় যে মিউজিক ইসলামী হওয়ার জন্য দৃশ্যমানভাবে সুস্পষ্ট কুরআনিক হতে হবে এমনটা জরুরী নয়। ট্র্যাডিশনাল ইসলামী মিউজিক আরবীয় মুওয়াশশাহ ও কাসীদা, ভারতীয় উপমহাদেশের কাওয়ালী ও কাফী, পারস্যের দাস্তাঘ, তুর্কির মাকাম মিউজিকসহ আরো অসংখ্য অঞ্চলের লোকঐতিহ্যকে, এগুলোর সুর এবং প্রভাবের বহুমাত্রিকতাকে পরিবেষ্টন করেই গড়ে উঠেছে। এই বহুবিধ ভিন্নতা সত্ত্বেও সকল অঞ্চলের ইসলামী মিউজিক তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদকেই প্রতিফলিত করে। <strong>ট্র্যাডিশনাল ইসলামী মিউজিক এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যা মূলত তাওহীদী; আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামগ্রিকতা, অবিনশ্বরতার সাথে যেই ফিতরাতের উপর আমরা সৃষ্টি হয়েছি সেই ঐকতানকে একত্রিত করে আমাদেরকে আবারো ফিতরাতমুখী হওয়ার ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।</strong> যদিও বিভিন্ন ধরণের ইসলামী মিউজিকে এই অনুভুতির বা ভাবের প্রকাশ এবং প্রবলতা কমবেশি হয়, তবে জান্নাতের চিরায়ত খুশবুর ন্যায় এটি সবসময়ই বিদ্যমান থাকে। স্পষ্টভাবে কোনো ধর্মীয় থিম বা উপাদানের উল্লেখ ব্যতীতই এই বৈশিষ্ট্য ইসলামী মিউজিকে থাকে, যেমনটা আমরা অনেক জায়গার ইসলামী লোকঐতিহ্যে দেখতে পাই; যেখানে প্রেমিকের হৃদয়ের ব্যাকুল কাতরতা তার প্রেমাস্পদকে প্রায় ঐশ্বরিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে এবং আমরা যারা এগুলো বুঝতে পারি তা আমাদেরকে খোদার কথা এবং সেই প্রকৃত ভালোবাসার (ইশক) কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।</p>
<p>&nbsp; &nbsp;&nbsp;</p>
<p>ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মিউজিকের যে আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক রূপ রয়েছে সেটা অনুবিদ্ধ রয়েছে সুরের মধ্যে, এমন স্কেল বা মাত্রায় যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধ্বনির উঠানামার মাধ্যমে বিপুল অভিব্যক্তিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগায় এবং এমন স্বর ব্যবহার করে যা পাশ্চাত্য সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয় না। বিভিন্ন ঐতিহ্যে অসংখ্য বিন্যাসে পাওয়া যায়, এমনকি একই ঐতিহ্যের উস্তাদগণের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়; ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মিউজিকের এই সুরেলা গঠন মানবীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক মনোভাবের যে অসীম প্রকরণ রয়েছে তার যথাযথ প্রকাশের পন্থা দেখিয়ে দেয়। তথাপি সুরের এই প্রকাশভঙ্গীর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো বোধগম্যতা কীভাবে ওস্তাদ থেকে শাগরেদে সিলসিলা হিসেবে সঞ্চারিত হয়।</p>
<p><strong>ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সঙ্গীতের শিক্ষায় একটি নির্দিষ্ট শিষ্টাচার গভীরভাবে মিশে আছে, ইসলামী পরিভাষায় যাকে আমরা ‘আদব’ বলে থাকি। আদব ধারণাটির বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে: এটি গান গাওয়ার ভঙ্গি, বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ধরন, শ্রোতার সঙ্গে যোগাযোগের রীতি, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পদ্ধতি, এমনকি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি সম্মান জানানোর নিয়ত—সব কিছুকেই নির্দেশ করতে পারে।</strong> আদব আমাদের বাহ্যিক আচরণকে সুন্দর করে তোলে, আর এর মাধ্যমে আমাদের অভ্যন্তরীণ সত্তাকেও পরিশীলিত করে। সঙ্গীত বা যেকোনো শিল্পকর্ম যখন আদবের সাথে চর্চা করা হয়, তখন তা নিছক পরিবেশনা ও শ্রোতার বিনোদনের বিষয় নয়; বরং তা নিজেকে এবং শ্রোতার প্রতিটি স্বতন্ত্র আত্মাকে শিক্ষিত করার একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়। এই অর্থে সঙ্গীতের সঙ্গে জিকিরের চর্চার গভীর সাদৃশ্য রয়েছে—জিকির হলো আধ্যাত্মিক সাধনায় আল্লাহর নামসমূহ ও কোরআনের বাণীর পুনরাবৃত্তি। <strong>নির্দিষ্ট শব্দের পুনরাবৃত্তি, শ্বাস-প্রশ্বাসের পদ্ধতি, এমনকি উচ্চারণের সময় পরিধেয় বস্ত্র—এসবই তাৎপর্যপূর্ণ, যা অনুশীলনকারীর রূহে আখলাকী গুণাবলীর ছাপ ফেলে এবং গভীরভাবে প্রোথিত করে; ঠিক যেভাবে কোনো বাদ্যযন্ত্র ধরার ভঙ্গি, বাজানো সুর এবং সঙ্গীতজ্ঞের অভ্যন্তরীণ মনোভাবও একই কাজ করে। এর লক্ষ্য রূহের কোনো ক্ষণস্থায়ী অবস্থা নয়, বরং তার একেবারে মূল সত্তায় এক স্থায়ী রূপান্তর।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>ইসলামী সংগীতে মানবকণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রসমূহকে বিবেচনা করা হয় দায়িত্ব তথা আমানত হিসেবে- যা সেই শিল্পীর হাতে ন্যস্ত থাকে যিনি বছরের পর বছর কোনো গুরুর/উস্তাদের সান্নিধ্যে শিক্ষা গ্রহণ করেন। একইসাথে নিজের নফসের পরিশুদ্ধি ও ইসলামী আদবের অনুশীলনের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এমন সুর ও ধারা হস্তান্তরিত হয় যা সিলসিলাগতভাবে সেইসকল মহান শিক্ষকগণের দ্বারা নির্মিত, যাঁদের যুগ আজকের সময়ের থেকে অনেক বেশি গভীরভাবে পবিত্রতায় পরিব্যাপ্ত ছিলো। এভাবে যখন হৃদয় থেকে হৃদয়ে যথাযথ ভক্তি ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে অন্তর্জগতকে মিউজিকের সাহায্যে নতুনভাবে তৈরী করা হয়, তখন শত শত বছরের অভিব্যক্তি ও মননকে ধারণ করার জন্য যেমন সেটি উপযুক্ত হয়ে উঠে, একইসাথে খোদাপ্রদত্ত যে অনন্য উপহারসমূহ একজন সংগীতজ্ঞকে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর রূহানী প্রকাশ করার সক্ষমতাও সেই মুহূর্তে তিনি অর্জন করেন।</p></blockquote>
<p><strong>তাওহীদের চেতনা, আদবের চর্চা এবং ফিতরাতের নিকট প্রত্যাগমন, এ সমস্তকিছুই নন-ট্র্যাডিশনাল মিউজিকে অনুপস্থিত। কিন্তু এগুলোই ইসলামী মিউজিকের সবচেয়ে মূল্যবান অংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ বিষয়গুলোকে ইসলামী সঙ্গীত ঐতিহ্যে সবসময় সংরক্ষণ করা হয়।</strong> আমরা এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করি যেখানে প্রায়শই মিউজিককে মানুষের আবেগ-অনুভূতিসমূহের ম্যানিপুলেশনের জন্য অথবা দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ সমস্যা থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়ার জন্য একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংগীতধারায়ও আবেগের গভীর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে সুরারোপিত প্রেমকাব্যের মধ্যে। তবে এই আবেগকে সর্বদাই একটি উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করা হয়, ইশকের তীব্রতাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে একমাত্র অনন্ত প্রিয়তম তথা &#8216;খোদা&#8217; হলেন আমাদের প্রকৃত গন্তব্য। <strong>ফলে বাস্তব জীবন ও জগৎ থেকে পলায়নপ্রবণতার মাধ্যমে নয় বরং অসীম শান্তি ও পরম সত্য তথা ‘হক’ এর প্রতি ভালোবাসার স্মরণই ইসলামী মিউজিকের মৌলিকত্ব।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এভাবে, বর্তমান সময়ের প্রায় সকল ধ্রুপদী কিংবা জনপ্রিয় মিউজিক হলো ‘অনুভূমিক’ (Horizontal), যেগুলো মানুষের অন্তরে কেবল অন্তহীন সাধারণ কিংবা কখনো কখনো ক্ষতিকর আবেগকে জাগ্রত করে তোলে। পক্ষান্তরে, ইসলামী মিউজিকের প্রকৃতি হলো ‘উল্লম্ব’ (Vertical)। এটি যেনো মহান আল্লাহর পবিত্র নামের ‘আলিফ’এর মতো, যার মহত্ত্ব ও বিশেষত্ত্ব নিয়ে মুসলিম সূফী ও দার্শনিকগণ শত-সহস্র বছর ধরে আলোচনা-গবেষণা করে চলেছেন। এটি আমাদেরকে সেই অত্যুৎকৃষ্ট, অতীন্দ্রিয় বাস্তবতার দিকে, পরবর্তী জীবনের দিকে নির্দেশ করে এবং অনন্ত প্রিয়তমের প্রতি আমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে, যার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা এই দুনিয়ার সফরে এসেছি। এবং কখনো কখনো এটি আমাদেরকে এমন এক বেহেশতী রিহলায় (সফরে) নিয়ে যায় যার মাধ্যমে আমরা যেনো&nbsp; খোদার সান্নিধ্যে পৌঁছে যাই।</p>
<p><strong>ইসলামী মিউজিকের যেসকল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সেগুলো নানানভাবে সকল ইসলামী শিল্পের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেঃ কুরআনের রূহানী চেতনা হতে অনুপ্রাণিত, উস্তাদ থেকে শাগরেদের নিকট আত্মগত বিকাশের ঐতিহ্যের মাধ্যমে চলে আসা ও খোদার স্মরণকে আমাদের মধ্যে জাগিয়ে তোলার জন্য কিছু সৃষ্টি করা।</strong> তবুও ইসলামী মিউজিক এমন আরেকটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে যা এটিকে মসজিদের স্থাপত্য কিংবা কুরআন তিলাওয়াতের মতো শিল্পগুলো থেকে আলাদা করে এবং আমাদের বসবাসরত বর্তমান দুনিয়ার জন্য যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বাসের পার্থক্যকে উপেক্ষা করেই মানবসভ্যতার সকল সদস্যের সাথে কথা বলার এক অনন্য ক্ষমতা ইসলামী মিউজিকের রয়েছে। এই হিকমতের উৎপত্তি এমন শব্দহীন ঐকতান হতে যা সকল মানুষের রূহের গভীরেই বিদ্যমান রয়েছে এবং মানুষের এই ‘ফিতরাতকে’ উদ্দেশ্য করেই ইসলামী মিউজিক কথা বলে। এই সাধারণ ঐকতানের কারণেই ইসলামী মিউজিক ইসলাম-পূর্ব যেসকল সংগীত ঐতিহ্য এর গভীরতর চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো, সেগুলোকে সর্বদা আত্মস্থ করেছে, সেটি ইরানে হোক আর ইন্দোনেশিয়াতে। <strong>ইসলামী সংগীত ঐতিহ্য হস্তান্তরের এই পরিপূর্ণতা এবং মূল্যবোধসমূহকে ধারণকারী উস্তাদদের জীবন্ত উপস্থিতি ও সোহবত, ইসলামী মিউজিককে আত্মিক পরিচর্যা, অতীন্দ্রিয়ের স্মরণ এবং পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের এক অসাধারণ প্রতিনিধিতে পরিণত করেছে। ক্রমশ আরো অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং খোদার স্মরণ হতে বিস্মৃত হতে যাওয়া আজকের দুনিয়ায় এই বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যতীত মানব সভ্যতা টিকে থাকতে সক্ষম হবেনা।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমার নিজের সংগীত-যাত্রা, আমাদের মিউজিককে প্রকৃত অর্থে ইসলামী করে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন ধারাক্রমিক গভীরতা ও ব্যক্তিগতভাবে এর বিকাশ ও অনুশীলনের একটি সফর ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আমি আমার ক্ষুদ্র সৃষ্টিকর্মসমূহের সকল পর্যায়ে আমার উপলব্ধির ও যোগ্যতার সবটুকু দিয়ে উপরোক্ত গুণাবলীসমূহকে ফুটিয়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু এর থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমার শ্রোতাদেরকে সেই সমস্ত উপাদানসমূহকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, কুরআনের চেতনাকে ধারণ করে সৃষ্ট এই শিল্পকর্মটির পেছনে যে চিন্তা ও মনন সাহায্য করেছে, সেগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করানোই ছিলো আমার নিয়ত। এটি নিঃসন্দেহে এমন একটি চলমান সফর যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত নতুন করে শিখছি এবং এখনও অনেক পথ বাকি রয়েছে। একাডেমিক ও শৈল্পিক, দুইক্ষেত্রেই অনেক কাজ করতে হবে- বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের নিকট আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও শিল্পকে গভীরতা দান করার জন্য এই প্রচেষ্টাকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হবে বলেই আমি আশা রাখছি।</p>
<p>আজকের তরুণ মুসলিমরা যারা এই জগতে প্রবেশ করছে, তারা যদি নিজেদের মিউজিককে সত্যিই ‘ইসলামী’ বলতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে বিনয় থাকতে হবে। তাদেরকে বুঝতে হবে যে নিয়ত যতই উত্তম থাকুকনা কেনো, আমাদের ঐতিহ্যের আন্তরিক একজন অনুশীলনকারী হওয়া ও এই চেতনাকে নিজের মধ্যে আত্মীকরণ করা নতুনত্ব ও ধর্মান্তকরণের আগে প্রাধান্য পাবে। সত্যকে কখনোই মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করা যাবেনা, কারণ এটি করলে ফিতনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। <strong>সাম্প্রতিক জনপ্রিয় কোনো মিউজিকের ‘হালাল বিকল্প’ হওয়া মিউজিককে ইসলামী করে তোলেনা। যুগের ক্ষণস্থায়ী চাহিদা মেটাতে আমাদের ঐতিহ্যকে বিকৃত করার এই প্রবণতা কেবল যা কিছু আমাদের হস্তান্তরিত হয়েছে সেগুলোরই ক্ষতি করেনা; বরং আমরা আসলে কারা, এই বোধকেও হারিয়ে ফেলে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রকৃত ইসলামী মিউজিক তার নিজস্ব রূপ ও বিষয়বস্তু হতে ভিন্নও নয়, বিচ্ছিন্নও নয়। এটি তার উৎপত্তি ও উৎস সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন, যা হলো হক এবং তাওহীদ, আল্লাহ। এই সচেতনতা সরাসরি কুরআন থেকে উদ্ধৃত আয়াত বা শব্দের মাধ্যমে প্রতিফলিত হোক অথবা আমাদের মানব অস্তিত্বের যেকোনো মাত্রা থেকে অঙ্কিত হোক, এটি সর্বদা অনুগ্রহপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন হয়ে থাকে; মিউজিকের রূপই এর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়পূর্ণ চেতনাকে প্রতিফলিত করে। এর উদ্দেশ্য হলো শ্রোতা ও সুরকারকে তাদের নিজ রূহের সেই গভীরতায় নিয়ে যাওয়া, যার কেন্দ্রে রয়েছেন স্বয়ং ‘রাহমানুর রাহীম’।</strong> ইসলামী মিউজিক আমাদের মনকে কলুষিত করে ফেলে এমন অর্থহীন লিরিক্সে যেমন সন্তুষ্ট থাকেনা, তেমনি আনন্দ ও জীবনের জন্য আমাদের গভীর পিপাসাকে জাগ্রত না করে যেসকল অন্তঃসারশূন্য সুর বর্তমানে সৃষ্টি করা হয় সেগুলোকেও সঠিক হিসেবে দেখেনা। মিউজিক হলো বেহেশত থেকে আসা একটি পবিত্র আমানত যা আমাদেরকে হকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আসুন, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের নিকট হস্তান্তরিত হিকমাহ, ইলম এবং অসাধারণ সঙ্গীত সম্ভারকে আত্মস্থ করি এবং নম্রতার সাথে সংগীতশিল্পীর খোদাপ্রদত্ত কন্ঠকে ব্যবহার করে নতুনত্ব আনয়ন করি। একমাত্র তখনই আমরা যা সৃষ্টি করবো সেটি অনন্য হবে, অকৃত্রিম এবং ইসলামীও হবে; যা আমাদেরকে পরিশেষে সমস্ত কিছুর কেন্দ্র মহান ‘আল্লাহ’র দিকেই ধাবিত করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ওয়াল্লাহু আ’লাম (আল্লাহই সর্বোত্তম অবগত)।</p>
<p>সামি ইউসুফ &nbsp;&nbsp;&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/music-in-the-light-of-tradition-adab-and-spirituality/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">17079</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বায়োফিলিক ডিজাইন: নতুন আবিষ্কার নাকি প্রাচীন ধারণার আধুনিক রূপ?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/biophilic-design-a-new-discovery-or-a-modern-take-on-ancient-concept/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/biophilic-design-a-new-discovery-or-a-modern-take-on-ancient-concept/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সুলতানা রাজিয়া]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 26 Jul 2026 16:02:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[ফিচারড]]></category>
		<category><![CDATA[শহর ও স্থাপত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16982</guid>

					<description><![CDATA[বর্তমান স্থাপত্যচর্চায় “বায়োফিলিক ডিজাইন (Biophilic Design)” একটি বহুল আলোচিত ধারণা। ১৯৮০-এর দশকে জীববিজ্ঞানী ই. ও. উইলসন (E. O. Wilson) এর মাধ্যমে এই আইডিয়া পরিচিতি লাভ করে।&#160; এর মৌলিক প্রতিপাদ্য খুবই সহজ-মানুষের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি সহজাত প্রবণতা বিদ্যমান,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বর্তমান স্থাপত্যচর্চায় <strong>“বায়োফিলিক ডিজাইন (Biophilic Design)”</strong> একটি বহুল আলোচিত ধারণা। ১৯৮০-এর দশকে জীববিজ্ঞানী ই. ও. উইলসন (E. O. Wilson) এর মাধ্যমে এই আইডিয়া পরিচিতি লাভ করে।&nbsp; এর মৌলিক প্রতিপাদ্য খুবই সহজ-মানুষের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি সহজাত প্রবণতা বিদ্যমান, আর আমাদের নির্মিত পরিবেশের নকশা এমন হওয়া উচিত যা এই সম্পর্ককে বরং লালন করে, বিচ্ছিন্ন নয়।</p>
<p>সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বায়োফিলিক ডিজাইন এক ধরনের জনপ্রিয় ধারায় পরিণত হয়েছে। স্থপতিরা এটা নিয়ে&nbsp; আলোচনা করছেন, ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা একে কেন্দ্র করে তাদের কাজের পোর্টফোলিও সাজাচ্ছেন আর রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা এটিকে ব্যবহার করছেন বিপণনের উপকরণ হিসেবে। এর মূল নীতিমালাও এখন সুপ্রতিষ্ঠিত—প্রাকৃতিক আলোর সর্বোত্তম ব্যবহার, গাছপালাকে ডিজাইনের অংশ হিসেবে সংযোজন, স্থানীয় ও প্রাকৃতিক নির্মাণ উপকরণের প্রয়োগ, বাইরের প্রকৃতির সাথে দৃশ্যমান সংযোগ তৈরি এবং অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত বায়ুপ্রবাহের সুযোগ নিশ্চিতকরণ।</p>
<p><strong>কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঐতিহাসিকভাবে এই আইডিয়া মোটেও নতুন নয়।</strong></p>
<p>আপনি যদি Alhambra-এর প্রাঙ্গণে হাঁটেন, মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী রিয়াদ বা আন্দালুসীয় ভিলার অঙ্গন অতিক্রম করেন, কিংবা Generalife-এর উদ্যানসমূহে বিচরণ করেন, তাহলে এমন স্থাপত্যের মধ্য দিয়েই চলবেন, যা বায়োফিলিক ডিজাইনের ধারণাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে থেকেই উপলব্ধি করেছিল। আর এগুলো কেবল তাত্ত্বিক নীতিমালা ছিল না; বরং স্থাপত্য কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত—সেই সম্পর্কে মৌলিক ধারণার অংশ ছিল।</p>
<p>মাগরেব এবং আন্দালুসিয়ার মানুষ একে &#8216;বায়োফিলিক ডিজাইন&#8217; (প্রকৃতিবান্ধব স্থাপত্য) নামে অভিহিত করেননি; তারা একে স্রেফ &#8216;জীবনযাপন&#8217; বলতেন।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16984 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAvGdHbEAMC7dw-768x1024.jpg" alt="" width="768" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAvGdHbEAMC7dw-768x1024.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAvGdHbEAMC7dw-225x300.jpg 225w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAvGdHbEAMC7dw-1152x1536.jpg 1152w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAvGdHbEAMC7dw.jpg 1440w" sizes="(max-width: 768px) 100vw, 768px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্রঃ <em>মারাকেশের একটি ‘রিয়াদ’</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বায়োফিলিক ডিজাইন আসলে কী বোঝায়?</strong></h4>
<p>আরও ঐতিহাসিক উদাহরণ আলোচনার আগে বায়োফিলিক ডিজাইন আসলে কী, তা স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন; কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধারণাটি ভুলভাবে বোঝা হয়।</p>
<p><strong>&#8220;বায়োফিলিক ডিজাইন মানে মানে ঘরে একটি শৌখিন গাছ রাখা কিংবা দেয়ালে গাছের ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া নয়। এটিকে স্রেফ ঘরের &#8216;সাজসজ্জা&#8217;&nbsp; বা &#8216;ডেকোরেশন&#8217; হিসেবে না দেখে, জীবনের সাথে প্রকৃতির&nbsp; সংযোগ বা &#8216;ইন্টিগ্রেশন&#8217; হিসেবে ভাবা উচিত।&#8221;</strong></p>
<p>প্রকৃত ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’ (প্রকৃতি-বান্ধব স্থাপত্যশৈলী) বলতে চারপাশের পরিবেশ এমনভাবে গড়ে তোলাকে বোঝায়, যেখানে প্রকৃতি আপনার জীবন যাপনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হয়ে ওঠে—এমন কিছু নয় যা আপনি কেবল মাঝেমধ্যে উপভোগ করবেন। অর্থাৎ এমন আলোর ব্যবস্থা; যা দিনের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়;&nbsp; বায়ুর এমন প্রবাহ যা মুক্তভাবে সম্পূর্ণ পরিসরে বয়ে বেড়ায়; এমনসব উপাদানের ব্যবহার যা সময়ের সাথে সাথে পরিপক্ব হয় ও প্রাণবন্ত থাকে; এমন সব উদ্ভিদ—যা ঋতুর আবর্তনে বাড়ে ও রূপ পরিবর্তন করে; এবং পানির এমন স্পর্শ যা পরিবেশকে শীতল ও আর্দ্র রাখে এবং ছন্দময় ধ্বনির মাধ্যমে সেই স্থানের অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে। এটি এমন এক স্থাপত্যশৈলী যা প্রকৃতিকে কেবল বাহ্যিক অনুষঙ্গ বা অলংকার হিসেবে নয়, বরং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করে।</p>
<p>আর ঠিক এই পদ্ধতিই নিখুঁতভাবে অনুকরণ করা হয়েছিল <strong>‘মুরিশ স্থাপত্যশৈলীতে’ (Moorish architecture)।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>অন্তঃপ্রাঙ্গণ উদ্যান</strong></h4>
<p>মুরিশ স্থাপত্যে প্রাঙ্গণ বা উঠানকে কেবল বাইরের খোলা স্থান হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিই ভবনের প্রাণকেন্দ্র। কক্ষ, বারান্দা, যাতায়াতের পথ, আলো ও বাতাস—সবকিছুই এই প্রাঙ্গণকে ঘিরে বিন্যস্ত হয় এবং একে কেন্দ্র করেই &nbsp;সম্পূর্ণ স্থাপত্যে গড়ে ওঠে।</p>
<p>ফেজ কিংবা মারাকেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো <strong>&#8216;রিয়াদ&#8217;-এর (ঐতিহ্যবাহী মরক্কোন বাড়ি)</strong> প্রাঙ্গণে পা রাখলেই চারপাশের সবুজে আপনি ঘেরাও হয়ে যাবেন। কমলালেবু গাছ, জুঁইফুল এবং নানা ধরনের লতানো উদ্ভিদ সেই পরিবেশকে সজীব করে তোলে। এই গাছগুলো কিন্তু নান্দনিকতা বাড়াতে কোনো সুনির্দিষ্ট মাপে টবে সাজিয়ে রাখা হয়নি; বরং সরাসরি মাটিতে রোপণ করা হয়েছে। তারা গভীরভাবে শিকড় গেড়ে স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রাঙ্গণটি <strong>প্রথমত</strong> একটি বাগান, আর <strong>দ্বিতীয়ত</strong> একটি স্থাপত্যিক পরিসর।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16985 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwJrbboAAynMD-819x1024.jpg" alt="" width="819" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwJrbboAAynMD-819x1024.jpg 819w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwJrbboAAynMD-240x300.jpg 240w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwJrbboAAynMD-768x960.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwJrbboAAynMD.jpg 1080w" sizes="(max-width: 819px) 100vw, 819px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্র: <em>মারাকেশের একটি &#8216;রিয়াদ&#8217; (ঐতিহ্যবাহী মরক্কোন বাড়ি)</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একই ধারণার (concept) প্রতিফলন দেখা যায় আলহামব্রাতেও। <strong>কোর্ট অব দ্য লায়ন্স</strong> এবং <strong>কোর্ট অব দ্য মার্টলস</strong> তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই প্রাঙ্গণগুলো ছায়া তৈরি করে এবং ভেতরের গরম বাতাসকে উপরে উঠে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। উদ্ভিদগুলো প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাতাসকে শীতল করে, আর প্রাঙ্গণের বিন্যাস ও জ্যামিতিক গঠন বাতাসের প্রবাহকে পরিচালিত করে।</p>
<p>আলহামব্রা প্রাসাদের সাথে যুক্ত গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদ <strong>&#8216;জেনারালাইফ&#8217;</strong> <strong>(Generalife)</strong>-তে এই ভাবনাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আরও উঁচুতে। সেখানে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া উদ্যান, বৃক্ষরোপিত বাগানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জলধারা আর ফলের বাগানের মধ্যে স্থাপিত ছোট ছোট প্যাভিলিয়ন; প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মধ্যে যেন এক অপূর্ব সমন্বয়।</p>
<p>এখানেই বায়োফিলিক ডিজাইন সবচেয়ে পরিপূর্ণ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ এমন এক স্থাপত্যধারা যা প্রকৃতিকে কেবল দর্শনের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং প্রকৃতির মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব গড়ে তোলে।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16986 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwXItb0AA5nm5-1024x683.jpg" alt="" width="1024" height="683" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwXItb0AA5nm5-1024x683.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwXItb0AA5nm5-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwXItb0AA5nm5-768x512.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwXItb0AA5nm5-1536x1024.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwXItb0AA5nm5.jpg 1920w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্র: <em>জেনারালাইফ, আলহামব্রা।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>জীবন্ত উপাদান হিসেবে পানি/ জীবনের স্পন্দন হিসেবে পানি</strong></h4>
<p>মুরিশ স্থাপত্যে পানি সর্বত্রই উপস্থিত। তবে তা কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং স্থাপত্যের মূল অবকাঠামোর কার্যকর ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাঙ্গণগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফোয়ারা, চলাচলের পথের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সরু জলধারা, আর স্থির জলাধারগুলো আকাশ ও আলোর প্রতিচ্ছবি ধারণ করেছে। কিন্তু এসবের ভূমিকা কেবল নান্দনিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে এগুলো বাতাসকে শীতল করে, শুষ্ক আবহাওয়ায় আর্দ্রতা বৃদ্ধি করে, চারপাশের কোলাহলকে মৃদু পানির সুরে প্রশমিত করে, দৃষ্টিকে প্রশান্তি দেয় এবং সর্বোপরি মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর ইন্দ্রিয়গত সম্পর্কে যুক্ত করে।</p>
<p>আলহামব্রার <strong>&#8216;কোর্ট অব দ্য লায়ন্স&#8217;</strong>-এ বারোটি মার্বেল পাথরের সিংহ একটি জলাধারকে পিঠে ধারণ করে আছে, যেখান থেকে চার দিকে চারটি জলধারা প্রবাহিত হয়েছে। এখানে পানি অবিরাম প্রবাহিত হতে থাকে, এবং তার শব্দ চারপাশে স্পষ্টভাবে শোনা যায়। অনেক সময় জলাধার দেখার আগেই তার উপস্থিতি অনুভূত হয় অর্থাৎ এর কলকল ধ্বনিই আগে কানে পৌঁছায়। এই শব্দটাই চারপাশের পরিবেশে এক বিশেষ আবহ সৃষ্টি করে, আর পানির এই অবিরাম প্রবাহই যেন সেখানে প্রাণস্পন্দন জাগিয়ে তোলে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16987 size-large aligncenter" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwlbTbIAA9JNQ-675x1024.jpg" alt="" width="675" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwlbTbIAA9JNQ-675x1024.jpg 675w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwlbTbIAA9JNQ-198x300.jpg 198w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwlbTbIAA9JNQ-768x1165.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwlbTbIAA9JNQ-1013x1536.jpg 1013w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAwlbTbIAA9JNQ.jpg 1266w" sizes="(max-width: 675px) 100vw, 675px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্রঃ <em>কোর্ট অব দ্য লায়ন্স, আলহামব্রা</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>গ্রানাডা কিংবা মারাকেশের মতো উষ্ণ ও শুষ্ক জলবায়ুর অঞ্চলে পানি অত্যন্ত মূল্যবান একটি&nbsp; সম্পদ। কিন্তু মুরিশ স্থাপত্য একে আড়াল করে রাখেনি বা কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেনি। বরং পানিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছে। ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত এর সংস্পর্শে আসে—এর শব্দ শোনে, &nbsp;সৌন্দর্য দেখে এবং বায়ুপ্রবাহের ফলে এর শীতল প্রভাব অনুভব করে।</p>
<p>আধুনিক স্থাপত্য পানিকে সাধারণত পাইপের ভেতরে চোখের আড়ালে রেখে পরিচালিত করা হয়; এর প্রবাহ চোখে পড়ে না এবং উপস্থিতিও অনুভূত হয় না। কিন্তু মুরিশ স্থাপত্য পানিকে দৃশ্যমান, অনুভবযোগ্য ও পরিবেশে অংশগ্রহণকারী এক উপাদানে রূপ দিয়েছে। সেখানে পানি কেবল ব্যবহারের বস্তু নয়; বরং পরিবেশের সক্রিয় উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস</strong></h4>
<p>মুরিশ স্থাপত্যে আলো কোনো অপরিবর্তনীয় বা নিষ্ক্রিয় উপাদান নয়। বরং সুপরিকল্পিতভাবে এর উপস্থিতি ও গতিপথ পরিচালনা করা হয়। এখানকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ বা আঙিনাগুলো ওপর থেকে সূর্যালোককে ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, একই সঙ্গে চারপাশের বারান্দাগুলোকেও ছায়াবৃত রাখে। মাশরাবিয়া (কাঠের তৈরি জালি পর্দা) তীব্র সূর্যালোক ছেঁকে মেঝে ও দেয়ালের ওপর সূক্ষ্ম ও জটিল নকশাময়&nbsp; আলো-ছায়ার বিন্যাস সৃষ্টি করে, যা দিনের পরিক্রমায় পরিবর্তিত ও স্থানান্তরিত হতে থাকে এবং অভ্যন্তরীণ পরিসরে এক কোমল ও&nbsp; স্নিগ্ধ আবহ তৈরি হয়। আবার কৌশলগতভাবে জানালাগুলোকে এমনভাবে স্থাপন করা; একদিকে যেমন বাইরের চমৎকার দৃশ্যকে ফ্রেমবন্দি করে, অন্যদিকে তেমনি রোদের তীব্র চোখধাঁধানো আলোকেও নিয়ন্ত্রণ করে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16988 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxXfMbEAAE7bd-1024x683.jpg" alt="" width="1024" height="683" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxXfMbEAAE7bd-1024x683.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxXfMbEAAE7bd-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxXfMbEAAE7bd-768x512.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxXfMbEAAE7bd-1536x1024.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxXfMbEAAE7bd.jpg 1920w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্রঃ <em>আলহামব্রার জালিশিল্প</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যে স্থাপত্যে দক্ষতার সাথে আলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় সেখানে বাতাসের প্রবাহকেও একইভাবে পরিচালনা করা হয়। এখানকার প্রাঙ্গণগুলো প্রাকৃতিকভাবেই বায়ু চলাচলের (ভেন্টিলেশন) অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে: শীতল বায়ু নিচের স্তরে জমা হয়, আর উষ্ণ বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে বাইরে বেরিয়ে যায়।</p>
<p><strong>পুরো ভবনের নকশার পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয় অভ্যন্তরীণ পরিসরে যেন সবসময় আড়াআড়িভাবে বাতাস (ক্রস-ব্রিজ) প্রবাহিত হতে পারে। কক্ষগুলো বারান্দার দিকে উন্মুক্ত, আর বারান্দাগুলো আবার খোলা প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত; ফলে পুরো ভবনজুড়ে বায়ুপ্রবাহের জন্য একটি ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক গতিপথ তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য কোনো জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে না। এটি মূলত জলবায়ুর সঙ্গে স্থাপত্যের এক সৃজনশীল সমন্বয়ের উদাহরণ।</strong></p>
<p>আধুনিক পরিভাষায় একে আমরা বলি প্যাসিভ কুলিং (যান্ত্রিক সাহায্য ছাড়াই ঘর ঠান্ডা রাখা), ডে-লাইটিং (দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার) এবং প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহের নিশ্চিতকরণ (ন্যাচারাল ভেন্টিলেশন)। বর্তমান যুগের টেকসই স্থাপত্যশিল্প (সাসটেইনেবল ডিজাইন) আজ যে নীতিগুলো নতুন করে শেখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, মুরিশ স্থাপত্যে তা শুরু থেকেই মিশে ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রাকৃতিক উপাদান</strong></h4>
<p>মানুষের ব্যবহৃত এসব উপকরণই মানুষকে সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করে। যেমন— খোদাইকৃত <strong>দেবদারু কাঠের</strong> (Cedar wood) বিম, যা সময়ের সাথে সাথে আরও পরিপক্ব হয়ে ওঠে।<strong> তাদেলাক্ট</strong> (Tadelakt plaster) প্লাস্টার, যা চুন থেকে প্রস্তুত এবং হাতে ঘষে মসৃণ করা হয়। <strong>জেলিজ (Zellij) টাইলস</strong>, যা মাটি থেকে তৈরি এবং মৃত্তিকাবর্ণ রঙের প্রলেপে আবৃত। পাথরের মেঝে, যা পায়ের তলায় শীতল অনুভূতি জাগায়। বোনা কাপড়, যা উদ্ভিদজাত রঙে রাঙানো হয়।</p>
<p><strong>এসব উপকরণ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। এরা শ্বাস নেয়, বয়স বাড়ার সাথে পরিণত হয়, এবং সময়ের সাথে সাথে এদের গায়ে পরিণতির স্বাভাবিক ছাপ(Patina) ফুটে ওঠে। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দেয়। এই অর্থে তারা জীবন্ত—যা কৃত্রিম উপকরণে অনুপস্থিত।</strong></p>
<p>আর যেহেতু এগুলো নষ্ট বা ক্ষয় হওয়ার বদলে সময়ের সাথে সাথে পরিপক্ব হয়, তাই দিন দিন এদের সৌন্দর্য কেবল বাড়তেই থাকে। দেবদারু কাঠের ছাদ সময়ের সাথে সাথে আরও গাঢ় ও গভীর রঙ ধারণ করে। প্লাস্টারের টেক্সচার বা গঠন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রমাগত হাঁটাচলার ফলে পাথরের মেঝে মসৃণ ও চকচকে হয়ে ওঠে।</p>
<p>এটি সেই আধুনিক উপকরণগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত—যেগুলোকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে তারা অপরিবর্তিত থাকে, পরিবর্তন প্রতিরোধ করে এবং চিরকাল ‘নতুন’ দেখায়। কিন্তু মুরিশ স্থাপত্যের উপকরণগুলো সময়ের প্রবাহে সক্রিয়ভাবে ভুমিকা রাখে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রকৃতি অনুপ্রাণিত নকশা</strong></h4>
<p>এমনকি মুরিশ স্থাপত্যের অলঙ্করণগুলোও প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত।</p>
<p><strong>আরাবেস্ক (Arabesques)</strong>—প্লাস্টারের ওপর খোদাই করা লতা-পাতা ও ফুলের জটিল, পরস্পর-সংযুক্ত নকশা। জ্যামিতিক নকশাগুলো প্রকৃতির মেনে চলা গাণিতিক নিয়মাবলীর আলোকে করা; যেমন প্রতিসাম্য (symmetry), পুনরাবৃত্তি (repetition) এবং ফ্র্যাক্টাল বিন্যাস (fractals)। একইভাবে, <strong>মুকারনাস (Muqarnas)</strong> খিলান বা ছাদগুলোর গঠন যেন স্ট্যালাক্টাইট (গুহার ছাদ থেকে ঝুলে থাকা পাথরের স্তর), মৌচাক কিংবা প্রকৃতির স্বাভাবিক জৈবিক বৃদ্ধি বা বিকাশের অণুরূপ।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16989 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxq-jbEAIpqQl-683x1024.jpg" alt="" width="683" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxq-jbEAIpqQl-683x1024.jpg 683w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxq-jbEAIpqQl-200x300.jpg 200w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxq-jbEAIpqQl-768x1152.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxq-jbEAIpqQl-1024x1536.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAxq-jbEAIpqQl.jpg 1280w" sizes="(max-width: 683px) 100vw, 683px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্রঃ <em>আলহামব্রায় জেলিজ টাইলসের ওপরের অংশে থাকা সূক্ষ্ম আরাবেস্ক নকশা ও ক্যালিগ্রাফির একটি দৃশ্য।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আলহাম্বরার জেলিজ টাইলসের ওপর খচিত সূক্ষ্ম আরাবেস্ক নকশা ও ক্যালিগ্রাফির দিকে তাকালে এই প্রকৃতি-প্রণোদিত শিল্পভাষার এক অপূর্ব প্রকাশ দেখা যায়।</p>
<p>ইসলামি ঐতিহ্যে ধর্মীয় ক্ষেত্রে মানব বা প্রাণীর অবয়বচিত্রের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হওয়ায় অলংকরণ ধীরে ধীরে বিমূর্ত রূপ নেয়। তবে এই বিমূর্ততা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতার নাম নয়। বরং এসব নকশা এখনও প্রকৃতির বিকাশ, শৃঙ্খলা এবং দৃশ্যমান কাঠামোগত বিন্যাসের প্রতিই ইঙ্গিত করে।</p>
<p>যখন দেয়াল, ছাদ ও মেঝেজুড়ে বিস্তৃত এসব নকশা দ্বারা আপনি পরিবেষ্টিত থাকেন, তখন আসলে আপনি প্রকৃতিক দৃশ্যগত রূপের প্রতিধ্বনির মধ্যেই অবস্থান করেন। প্রকৃতির প্রত্যক্ষ উপস্থিতি সেখানে না থাকলেও তার ছন্দ, বিন্যাস ও সৃষ্টির সৌন্দর্য &nbsp;সর্বত্র প্রতিফলিত হয়। এক অর্থে, এটি বায়োফিলিক ডিজাইনেরই আরেক রূপ—তবে এখানে প্রকৃতি প্রকাশিত হয়েছে জ্যামিতির ভাষায়, নকশার ছন্দে এবং প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সুশৃঙ্খল বিন্যাসের মাধ্যমে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আধুনিক বাসস্থান যা হারিয়েছে</strong></h4>
<p>এসব বৈশিষ্ট্যের সাথে একটি সাধারণ আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির তুলনা করে দেখুন।</p>
<p>বন্ধ জানালা, যান্ত্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (HVAC), কৃত্রিম আলো এবং এমন সব সিন্থেটিক বা কৃত্রিম উপাদান যা শ্বাস নিতে পারে না অর্থাৎ প্রাণহীন। আর গাছপালা থাকলেও ,সেগুলো হয়তো তাকের ওপর টবে সাজানো—কেবলই সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে, যা স্থাপত্যের মূল কাঠামোর সাথে সামগ্রিকভাবে সম্পর্কহীন বা কখনো একেবারেই বিচ্ছিন্ন।</p>
<p>এখানে ঘরের ভেতর আর বাইরের জগতের মধ্যকার এই ব্যবধানটা প্রায় চূড়ান্ত। কেননা প্রকৃতি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী নয়; এমন এক জিনিসে পরিণত হয়েছে যা মানুষ কেবল অবসরে দেখতে যায়।</p>
<p>আমরা উঠোন বা আঙিনাকে বদলে ফেলেছি লিভিং রুমে। বাগানকে রূপ দিয়েছি লন-এ (অথবা কোনো খোলা জায়গাই রাখিনি। প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ করে এনেছি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (air conditioner)। দিনের আলো ব্যবহারের পরিবর্তে এনেছি ছাদের কৃত্রিম এলইডি (LED) লাইট। আর সময়ের সাথে সাথে যে উপাদানগুলো নিজস্ব মহিমায় রূপ নেয়, সেগুলোকে বদলে আমরা ব্যবহার করছি এমন সব উপাদান যা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।</p>
<p>আর এরপর আমরা অবাক হয়ে ভাবি, আমাদের ঘরবাড়িগুলোকে কেন এত প্রাণহীন মনে হয়।</p>
<p>আজ যে <strong>বায়োফিলিক ডিজাইনকে</strong> নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে, তা মূলত আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাণবন্ততা এবং সেই জীবন্ত স্থাপত্য-দর্শনকে পুনরুদ্ধারেরই একটি প্রয়াস।</p>
<h3>&nbsp;</h3>
<h4>কীভাবে সেই হারানো সংযোগ পুনরুদ্ধার করা যায়?</h4>
<p>এই নীতিমালা গুলোকে আপনার বাসস্থানে ফিরিয়ে আনতে&nbsp; কোনো রাজপ্রাসাদের প্রয়োজন নেই। সত্যি বলতে, একটি খোলা প্রাঙ্গণ (courtyard) থাকাও অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন শুধু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—ঘরের ভেতর ও বাইরের সম্পর্ককে, স্থাপত্য ও জীবনের সম্পর্ককে নতুনভাবে চিন্তা করার মানসিকতা।</p>
<p><strong>·&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp; প্রথমে আলো দিয়ে শুরু করুন:</strong></p>
<p>পর্দা সরিয়ে দিন। দিনের আলোকে আপনার বসবাসের পরিসরে প্রবাহিত হতে দিন। সম্ভব হলে আসবাবপত্র এমনভাবে সাজান, যাতে আপনার দৈনন্দিন ব্যবহারের স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো পৌঁছায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোর এই পরিবর্তন লক্ষ্য করুন এবং তার স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হতে দিন।</p>
<p><strong>·&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp; জীবন্ত উদ্ভিদকে আপনার পরিসরের অন্তর্ভুক্ত করুন, তবে অলংকরণ হিসেবে নয়; কার্যকর উপাদান হিসেবে:</strong></p>
<p>শুধু তাকের ওপর একটি সাক্যুলেন্ট বা ক্যাকটাস গাছ রেখে<strong>ই</strong> দায়িত্ব শেষ করবেন না। ভাবুন, গাছগুলো আপনার পরিসরে<strong>র</strong> কোথায় সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে—জানালার পাশে, যেখানে তারা আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে; ঘরের কোণগুলোতে, যেখানে তারা শব্দের প্রতিফলন ও প্রতিধ্বনি প্রশমিত করে কক্ষের ধ্বনি-প্রকৃতিকে কোমল করে তুলবে। অথবা এমন কোনো দৃষ্টিসীমায়—যেখানে প্রতিদিন আপনার চোখ পড়বে। এমন গাছ নির্বাচন করুন, যা ঋতুর পরিবর্তনে সাড়া দেয়, বেড়ে ওঠে এবং আপনার যত্ন ও মনোযোগ দাবি করে।</p>
<ul>
<li><strong>বাতাস চলাচলের সুযোগ দিন:</strong></li>
</ul>
<p>যদি ঘরের জানালা খোলার সুযোগ থাকে, তবে তা খুলে দিন। এমন ব্যবস্থা করুন যেন বাতাস একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হতে পারে &nbsp;(cross-ventilation) । আপনার ঘরটিকে শ্বাস নিতে দিন। যদি আপনি কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বা চারপাশ বন্ধ ভবনে থাকেন, তবে কীভাবে কৃত্রিম উপায়ে এই আবহ তৈরি করা যায় তা ভাবুন—যেমন ফ্যান চালিয়ে বাতাস সচল রাখা, অথবা মাঝে মাঝে ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বাতাসের প্রবাহ তৈরি করা।</p>
<ul>
<li><strong>যতটুকু সম্ভব প্রকৃতিজাত উপকরণ ব্যবহার করুন:</strong></li>
</ul>
<p>কাঠ, পাথর, লিনেন, সুতি কাপড় বা পোড়ামাটি। এমন সব উপাদান বেছে নিন যা পুরনো হলেও তার সৌন্দর্য হারায় না, বরং একটি নিজস্ব আভিজাত্য পায়। যখন আপনি ঘরের কোনো জিনিস—যেমন গালিচা, কাটিং বোর্ড বা জিনিসপত্র রাখার কোনো ঝুড়ি পরিবর্তন করবেন, তখন এমন কিছু বেছে নিন যা একসময় জীবন্ত কোনো উপাদান থেকে তৈরি হয়েছিল।</p>
<ul>
<li><strong>আপনার পরিসরে</strong><strong> পানিও</strong> <strong>অন্তর্ভুক্ত করুন,</strong> <strong>এমনকি তা প্রতীকী হলেও:</strong></li>
</ul>
<p>বারান্দায় বা টেবিলের ওপর ছোট একটি পানির ফোয়ারা বা জলাধারও সুন্দর ও প্রশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। পানি শুষ্ক বাতাসকে আর্দ্র করে, বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঘরকে শীতল রাখে এবং ঘরের পরিবেশে একটা প্রাণবন্ত অনুভূতি এনে দেয়।</p>
<ul>
<li><strong>প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ তৈরি করুন:</strong></li>
</ul>
<p>আপনার যদি একটি জানালা থাকে, তবে সেটিকে একটি ছবির ফ্রেমের মতো বিবেচনা করুন। জানালার কার্নিশে একটি গাছ রাখুন, কিংবা আসবাবগুলো এমনভাবে বসান যাতে বসার পর বাইরের যতটুকু সবুজ আছে তা আপনার চোখে পড়ে। যদি একটি বারান্দা থাকে, তবে সেটিকে আপনার বসার ঘরেরই একটি অংশ বানিয়ে তুলুন, কেবল জিনিসপত্র জমিয়ে রাখার গুদাম বানাবেন না। আর আপনি যদি কোনো জানালাবিহীন ঘরে থাকেন, তবে আপনার জন্য জীবন্ত গাছপালা আরও বেশি জরুরি; কারণ এগুলোই প্রকৃতির অনুপস্থিত উপাদানকে কিছুটা পূরণ করতে পারে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16990 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h-1024x1024.jpg" alt="" width="1024" height="1024" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h-1024x1024.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h-300x300.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h-150x150.jpg 150w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h-768x768.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h-1536x1536.jpg 1536w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/07/HAAyKbUbEAM813h.jpg 1920w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p style="text-align: center;">চিত্রঃ <em>একটি সমসাময়িক বা আধুনিক অন্দরমহল (interior), যা প্রাকৃতিক আলো, উদ্ভিদ ও উপকরণের সমন্বয়ের মাধ্যমে বায়োফিলিক ডিজাইন এর নীতিগুলোকে সফলভাবে ধারণ করতে পারে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি, এর কোনোটির জন্যই বিপুল সম্পদের প্রয়োজন নেই। বড় ধরনের কোনো সংস্কারকাজও দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সামান্য মনোযোগ—আলো কীভাবে চলাচল করে, বাতাস কেমন অনুভূত হয় এবং জীবনের প্রাণস্পন্দন কিভাবে আপনার পরিসরে প্রবেশ করতে পারে, সে বিষয়ে সচেতনতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রাণস্পন্দিত আবাস</strong></h4>
<p>অনেকেই ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’ বা প্রকৃতিবান্ধব স্থাপত্যশৈলীকে হয়তো সাময়িক একটি ট্রেন্ড বা ফ্যাশন মনে করেন। কিন্তু আসলে তা নয়। এটি মূলত আমাদের এমন এক বাস্তবতার পুনঃস্বীকৃতি, যা মানুষ বরাবরই জানত, কিন্তু আধুনিক নির্মাণশৈলীর প্রভাব তা ভুলিয়ে দিয়েছে: আর তা হলো, বাসস্থানে প্রাণ থাকা উচিত।</p>
<p><strong>এখানে ‘প্রাণ’ শব্দটি কোনো রূপক অর্থে নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই সত্য। এমন এক আবাস, যেখানে উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে; বাতাস সচল থাকে; দিনের পরিক্রমায় আলোর গতিশীলতা থাকে এবং যেখানে প্রতিটি নির্মাণ-উপকরণ সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবে পরিণত ও পরিপক্ব হয়; এবং যেখানে থাকবে পানির কলতান যা চারপাশে একইসাথে শীতলতা ও আর্দ্রতার মাধ্যমে প্রাণের সঞ্চার করবে।</strong></p>
<p>বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থপতি ও নির্মাতারা এই বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন— শিল্পায়নের বহু আগে, যখন স্থাপনাগুলোকে বদ্ধ কাঠামোয় আবদ্ধ করা হয়নি এবং অন্দরমহল ও বহির্জগতের স্বাভাবিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি, তখন তারা ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে এমন স্থাপত্য নির্মাণ করতেন যা প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় সহাবস্থানের ভিত্তিতে গড়ে উঠত।</p>
<p>এই আলোচনায় আমি বারবার আলহামব্রার উদাহরণ ব্যবহার করেছি, কারণ আমার কাছে এটি বায়োফিলিক ডিজাইনের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ। তবে একটি আবাসকে প্রাণময় করে তুলতে তার প্রাসাদ হওয়া জরুরি নয়। তার জন্য একটি প্রাঙ্গণ, একটি ফোয়ারা কিংবা হাতে খোদাই করা সিডার কাঠের ছাদেরও প্রয়োজন নেই।</p>
<p>কিন্তু তার শ্বাস নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রাকৃতিক আলোর উপস্থিতি। প্রয়োজন এমন কিছু উপাদান, যার মধ্যে জীবনের স্পন্দন বিদ্যমান।</p>
<p>আর যখন আপনি একটি স্থানে এই উপাদানগুলো প্রদান করবেন, প্রকৃতিকে কেবল সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে না দেখে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করবেন। তখন সেই পরিসর সম্পূর্ণই বদলে যায়। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়, বরং মৌলিকভাবেও পরিবর্তিত হয়।</p>
<p><strong>অর্থাৎ তখন এটি এমন এক জায়গায় পরিণত হয় যেখানে জীবন যাপন করা যায়, জীবনকে কেবল বন্দি করে রাখা হয় না।</strong></p>
<p><strong>আর এই প্রাণময়তাই একটি স্থানকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর করে তোলে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/biophilic-design-a-new-discovery-or-a-modern-take-on-ancient-concept/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16982</post-id>	</item>
		<item>
		<title>একুশ শতকের বাংলাদেশে সিনেমা ও মিউজিক অঙ্গন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/cinema-and-music-in-21st-century-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/cinema-and-music-in-21st-century-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 13 May 2026 14:48:38 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16812</guid>

					<description><![CDATA[এক. আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনকে বৃহদাকারে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা- সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানা এবং ইসলামী ঘরানা। এখানে ইসলামী ঘরানা বললেও ইসলামী ঘরানার মাঝেও আছে আবার কয়েকটি ভাগ; যেমন- ক্বওমী-কেন্দ্রিক ধারা, পীর-কেন্দ্রিক ধারা, ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতের ধারা ইত্যাদি। তবে এক্ষেত্রে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4 style="font-family: Kalpurush;">এক.</h4>
<p>আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনকে বৃহদাকারে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা- সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানা এবং ইসলামী ঘরানা। এখানে ইসলামী ঘরানা বললেও ইসলামী ঘরানার মাঝেও আছে আবার কয়েকটি ভাগ; যেমন- ক্বওমী-কেন্দ্রিক ধারা, পীর-কেন্দ্রিক ধারা, ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতের ধারা ইত্যাদি।</p>
<p>তবে এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই দু&#8217;টোর বাইরে যে আর কোনো ঘরানা নেই, তা নয়। যেমন, মধ্য ডানপন্থী ঘরানা-টাও আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনের বড় একটা অংশ; কিন্তু, আমরা যখন যুবমানসের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলবো, তখন আসলে এই ঘরানা ততোটা প্রভাবশালী হতে পারে না। এক পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় যে, এই চিন্তাঙ্গনে হয় সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানার প্রভাব বেশি পড়েছে আর নাহয় ইসলামী ঘরানার প্রভাব বেশি পড়েছে।</p>
<p>আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনের এভাবে দুইভাগ হওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে দেখিয়েছেন লেখক ও গবেষক ফাহমিদ-উর-রহমান। তিনি তার ‘বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ বিতর্ক’ বইয়ে এই বিষয়টা ঐতিহাসিকভাবে টেনেছেন। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও চিন্তাঙ্গনকে একত্রে টেনে নিয়ে তিনি আলাপ তোলেন যে, ১৭৫৭-এর ইংরেজ-মুসলিম দ্বন্দ্বটা ১৯৪৭-এর সময় হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে রূপ লাভ করে; এবং ১৯৭১-এর পর তা সময়ে সময়ে কলকাতা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীতার অকল্যাণে আজকের এই পর্যায়ে এসে রূপ নেয়। আর এখানে সেকুলার, বাম ও লিবারেল ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ হলেও তাদের চিন্তাগত কমন শত্রু ইসলাম হওয়ার কারণে তারা ইসলামের বিপরীতে একত্রে জোটবদ্ধ হয়েছে।</p>
<p>আর এর প্রভাবের কারণেই আমাদের দেশের বিনোদন সেক্টর এবং যুবমানসের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গেলে উপরোক্ত দুইটি ধারাকে সামনে রাখতে হবে। এজন্যই হয়তো বিগত তিন দশকের যুবমানসে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনয়নের ফ্যাক্টর বা ক্ষেত্রগুলোয় কখনও ইসলামী ঘরানা আবার কখনও সেকুলার-বাম ঘরানার পাল্লা ভারী হয়েছে; যদিও ইসলামী ঘরানার পাল্লা ভারী হওয়ার ক্ষেত্র খুবই কম।</p>
<p>যাইহোক, বিনোদন মানেই তো আর সংস্কৃতি নয়, কিন্তু আমাদের দেশে এটাই যেহেতু সংস্কৃতির বড় একটি অংশ, তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিনোদন সেক্টর নিয়ে আলাপ তোলা প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে বিনোদন সেক্টরের দিকে নজর দিলে দুইটি দিককে সামনে রাখতে হয়। যথা- সিনেমা অঙ্গন এবং সঙ্গীত অঙ্গন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">দুই.</h4>
<p>প্রথমেই আসা যাক সিনেমা অঙ্গনের ক্ষেত্রে&#8230;</p>
<p>বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস নতুন নয়। অবাক করার বিষয় হলো, পুরো ভারতবর্ষের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির হাতেখড়ি হয় বাঙালিদের হাত ধরেই। কলকাতার প্রভাব বাংলায় পড়লে নবাবদের তত্ত্বাবধানেই ঢাকায় সিনেমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এজন্য ইংরেজ আমলেই এদেশে মুভি হয়েছে এবং থিয়েটারেও চলেছে। পাকিস্তান আমলেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনকি একাত্তরের সেই যুদ্ধের সময়েও সেই বছর বাংলাদেশে ৮টি সিনেমা মুক্তি পায়। একাত্তরের পর সিনেমা অঙ্গন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। যদি সেই সময়টায় জহির রায়হান বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো আজকের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসটাই ভিন্ন হতে পারতো।</p>
<p>একাত্তরের পর থেকে আমজাদ হোসেন ও চাষী নজরুল ইসলামের হাত ধরে বাংলাদেশের সিনেমা অঙ্গন ঘুরে দাঁড়ালে তৈরি হতে থাকে অসংখ্য সিনেমা হল। আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ভালো পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। এমনকি বলিউডকে টেক্কা দেওয়ার পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। যুবসমাজ-সহ সব বয়সীই তখন সিনেমার প্রতি ভালো রকমের আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।</p>
<p>কিন্তু তারপর থেকে এটাকেই পুঁজি করে ব্যবসা করা শুরু হয়; শুরু হয় কাটপিস ও নোংরা মুভি নির্মাণ। সেজন্য নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে পড়ে যেতে বাংলার সিনেমার সুসময়। মূলত নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে সালমান শাহের মৃত্যু এই অঙ্গনে খারাপ সময়ের সূচনা করে দেয়। যাইহোক, সবমিলিয়ে মানুষ তখন হল বিমুখ হতে শুরু করে, যার প্রভাব আজও এদেশের সিনেমা অঙ্গন পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।</p>
<p>নব্বইয়ের দশকের সিনেমার সেই স্বর্ণযুগের সময়ে বছরে ৭০-৮৫টি মুভি রিলিজ হলেও ২০১৫-১৬ সালে তা ১৫-তে এসে ঠেকে; এগুলোর ভেতর আবার ৯০ভাগই ছিলো অখাদ্য। কিন্তু, বর্তমানে রায়হান রাফি, তানিম নূর, রেদওয়ান রনি, মেজবাউর রহমান সুমন, শিহাব শাহীন-এর মতো পরিচালকের হাত ধরে বিগত কয়েক বছর ধরে এই খড়া কাটতে শুরু করেছে।<br />
আবার প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে এদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিলো ১৪৩৫টি; ২০১৯ সালে এর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১৭৪-এ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">তিন.</h4>
<p>নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যখন কেবল-টিভি ও সিডি-ডিভিডি প্রচলিত হতে শুরু করে, তখন থেকে এদেশের জনসাধারণ আর সিনেমামুখী হতে চায়নি। আর সেই সময়টায় যেহেতু উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে টিভি ও সিডি-ডিভিডির প্রচলন হয়, আবার যেহেতু যুবসমাজ বরাবরই আধুনিকতাকে গ্রহণ করে থাকে, সেজন্য সেই সময় সিনেমা অঙ্গনের দিকটা যুবসমাজকে ভালোই প্রভাবিত করে। আর নয়া প্রযুক্তির সিনেমা-নাটকে তারাই বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে।</p>
<p>যখন বাংলাদেশে সিনেমার দুর্দিন চলছিলো, সেই সময় এখানে হাত দেন লেখক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ। তার হাত ধরেই বিএফডিসি-র বাইরেও ভালো ভালো সিনেমা আসতে থাকে। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ অনেককেই আবার তখন তিনি হলে টানতে শুরু করেন। এসময় হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও সামনে এগিয়ে আসেন। কিন্তু, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আসলে আর সেই অর্থে ঘুরে দাঁড়ায়নি। আশি-নব্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পীরা তখন হয় অন্যদিকে সরে যেতে শুরু করে আর নাহয় এই অঙ্গন থেকেই বেরিয়ে যায়।</p>
<p>যখন থেকে বিনোদনের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির এমন পতন হতে থাকে, তখন থেকে শুরু হয় নাটক-টেলিফিল্মের যুগ। হুমায়ূন আহমেদ একা হাতে তখন দায়িত্ব নিয়ে এই বিনোদন অঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা করেন। এক পর্বের নাটক থেকে শুরু করে ধারাবাহিক—সবখানেই তিনি পারদর্শিতা ও মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন।</p>
<p>সেই সময় হুমায়ূন-ফারুকীর পাশাপাশি আদনান আল রাজীব, রেদওয়ান রনি, ইফতেখার আহমেদ ফাহমি-এর মতো আরো অনেক পরিচালক এদিকে হাত দেন। তারা আর্বান কালচারকে সামনে তুলে আনেন; মিডল ক্লাসের সংগ্রাম ও জীবনধারাকে তুলে ধরতে শুরু করেন; সমাজে নিম্নবিত্ত পরিবারের অবস্থান নিয়ে কাজ করেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করেন। এর ফলে এই অঙ্গনটা স্বভাবতই যুবসমাজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।</p>
<p>একদিকে যে-ই সিনেমা সকল বয়সী মানুষের কাছেই পৌঁছতো, সে-ই সিনেমার দুর্দিন চলায়, দেশে টিভি-ক্যাসেট আসায় এবং সিনেমার পরিবর্তে এমনতর কন্টেন্টের প্রচলন বেশি হওয়ায় সকল বয়সী মানুষ থেকে সরে এসে এই পুরো অঙ্গনটাই যুবসমাজ-কেন্দ্রিক হয়ে যায়। আর এভাবেই যুবমানসের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারার সূচনা হয়।</p>
<p>যদি কেউ বিগত তিন দশকে বিনোদন জগতের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করেন, তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন বিনোদন জগতের এই নাটক অঙ্গনটা কীভাবে যুবসমাজের মাঝে প্রভাব বিস্তার করেছে। নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের শুরুর দশকের নাটক-টেলিফিল্মগুলো যুবসমাজকে কতোটা বুঁদ করে রেখেছিলো, তা বলার বাইরে। গত দশকের ঈদ ও বিভিন্ন উৎসব মানেই ছিলো বিভিন্ন জনরার নাটক-টেলিফিল্মের প্রচারণা। বিগত কয়েকবছর যেমন ঈদ এলেই সিনেমার একটা সাজ-সাজ রব পড়ে যায়, নাটক-টেলিফিল্ম নিয়ে ঠিক তেমনটাই হতো গত দশকে। যদিও বর্তমানে নাটক-টেলিফিল্মের মাঝেও ভালো গল্পের অভাব দেখা গেছে; তবে আবার ক্ষেত্রবিশেষে নাটকের অধঃপতন হয়েছে বললেও ভুল হবে না।</p>
<p>আর এসব দিয়েই যুবসমাজের মানসপটে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ এবং আধুনিকতার বার্তা দেওয়া হতো; আর সেই বার্তাতেই তারা প্রভাবিত হয়ে পড়তো। আধুনিক প্রযুক্তি এতোটা সহজলভ্য না হওয়ার পরেও যুবসমাজ যে তখন আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো, তার নেপথ্যে ছিলো এসব নাটক-টেলিফিল্ম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">চার.</h4>
<p>আর অন্যদিকে, এসবের বিপরীতে তখন ইসলামী ঘরানায় টেলিভিশন বিষয়টাই হারামে সীমাবদ্ধ ছিলো; যদিও এই সিদ্ধান্ত দেওয়া তাদের অনেকেই এখন নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান করে থাকে। আবার, সেই সময়ে টেলিভিশনকে হারাম করে দেওয়ার এমন সিদ্ধান্তও আসলে বৃহদাকারে যুবসমাজে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। শুধুমাত্র ইসলামী ঘরানার নির্দিষ্ট কিছু মতাদর্শের অনুসারীদের মাঝেই এমন ফতোয়া সীমাবদ্ধ ছিলো।</p>
<p><strong>সিনেমার মতো মিউজিক অঙ্গনও ইসলামী ঘরানায় নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের শুরুর দশকে হারামে সীমাবদ্ধ ছিলো; এমনকি এখনও আমাদের দেশে মিউজিককে হারাম হিসেবেই দেখা হয়। অথচ, ইসলামের দৃষ্টিতেই মিউজিক কখনই সত্তাগতভাবে হারাম নয়; এটি একটি জ্ঞানের ধারা; এটি একটি প্রাচীন শিল্প।</strong> আমাদের দেশে মিউজিককে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয় বিধায় সতর্কতা হিসেবে আলেমগণ হারাম ফতোয়া দিতেই পারেন, এতে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই; তবে এর উপর ভিত্তি করে পুরো মিউজিক শিল্পকেই হারামে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।</p>
<p>এসব কারণে আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশকে ইসলামী ঘরানার রাজনৈতিক দলের ধারা সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর বাইরে তেমন কোনো সঙ্গীতই দেখা যায়নি। বলতে গেলে এই দিকটা কবি মতিউর রহমান মল্লিক একা হাতে দেখেছিলেন। এরপর এই শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে আইনুদ্দিন আল আজাদের হাত ধরে কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা হয়। এটা অনেকটা কওমী ধারার প্রতিষ্ঠান।</p>
<p>সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং কলরব শিল্পীগোষ্ঠী এই শতকের শুরুর দশকে ইসলামী ঘরানার সঙ্গীত অঙ্গনকে প্রজ্বলিত রেখেছিলো। এসময় এবং এর পরবর্তী সময়টায় সাইফুল্লাহ মানসুর, নওশাদ মাহফুজ ও মশিউর রহমান লিটন ইসলামী ঘরানায় যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এছাড়াও, গত এক দশকে কলরবের জনপ্রিয় শিল্পীদের বাহিরে ইসলামী ঘরানায় ওবায়দুল্লাহ তারেক, মোনায়েম বিল্লাহ, গাজী আনাস, আবু ওবায়দা, ইকবাল হোসাইন জীবন, মাহমুদ হুযাইফা, মাযহারুল ইসলাম এই অঙ্গনে অবদান রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে, কলরব ও সাইমুমের সমকক্ষ পর্যায়ের আরো কিছু শিল্পীগোষ্ঠী তৈরি হওয়ায় তাদের অবস্থান আর পূর্বের মতো নেই।</p>
<p>যাইহোক, কলরব আর সাইমুমের সঙ্গীতগুলোয় মিউজিকের কোনো অংশই ছিলো না। অথচ, সেই সময়টায় কাফেলা এবং এই জাতীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোয় মিউজিক সমৃদ্ধ সঙ্গীতই ব্যবহার করা হতো; এক্ষেত্রে বিখ্যাত শিল্পী সামী ইউসুফের ‘আল-মুয়াল্লিম’ এলবামের সঙ্গীতগুলোর সাহায্য নেওয়া হতো। একদিকে ঠিকই জনমানসে পৌঁছার জন্য তৎকালীন ইসলামী টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে মিউজিক সমৃদ্ধ ইসলামী সঙ্গীতের ব্যবহার হতো, অথচ অন্যদিকে মিউজিকের সঠিক ব্যবহার না করে এটাকেই হারামে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিলো।</p>
<p>যদিও বর্তমানে এসব থেকে বেরিয়ে এসে অনেকেই এখন তাদের সঙ্গীতে মিউজিক কম্পোজ করছে, কিন্তু এসব কারণেই সঙ্গীত অঙ্গনেও ইসলামী ঘরানা বৃহদাকারে যুবমানসে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিলো। কিন্তু, এর বিপরীতে ঠিকই অন্যান্য ধারার সঙ্গীত অঙ্গন পুরো দেশের বৃহৎ যুবসমাজকে মাতিয়ে রেখেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">পাঁচ.</h4>
<p>গত তিন-সাড়ে তিন দশকে সেকুলার অঙ্গনে এই ঘরানায় এতো ধরনের কাজ হয়েছে, তার হিসেব বলার বাইরে। তবে আলোচনার সুবিধার্থে ব্যান্ড দল আর দুয়েকজন শিল্পীর কথা তুললেই আশা করি এর একটা চিত্র পাওয়া যাবে।</p>
<p>বর্তমান সময়ের অন্যতম মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডগুলোর মধ্যে আর্টসেল, ব্ল্যাক, অর্থহীন, শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ-এর নাম উল্লেখযোগ্য। বর্তমানের মিউজিক-প্রিয় তরুণ সমাজের কাছে এসব নাম খুবই পরিচিত। এখানে আর্টসেলের একটা উদাহরণই যথেষ্ট। আর্টসেল ব্যান্ড ১৯৯৯ সালে কলেজ পড়ুয়া ৪জন তরুণের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। তাদের প্রথম এলবামেই তারা বাজিমাত করে দিয়ে একেবারে মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডে পরিণত হয়েছিলো। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে একবার কনসার্ট হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেই তারিখে কনসার্টের স্থানে সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার পরেও সেখানে প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলো শুধুমাত্র তাদের জন্য। অথচ, ব্যান্ড কনসার্টে শুধুমাত্র একটি ব্যান্ডের এমন আয়োজনে, তাও আবার বৃষ্টি-বাদলের দিনে, এতো মানুষের উপস্থিতি সাধারণত অকল্পনীয় বিষয়।</p>
<p>এছাড়াও, হারিয়ে যাওয়া এই শতকের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডগুলোর মধ্যে আছে ২০০৫ সালের ‘আইকনস’, ২০০০ সালের ‘দ্যা ওয়াটসন ব্রাদার্স’, ২০০১ সালের ‘ভাইব’ ইত্যাদি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">ছয়.</h4>
<p>ব্যান্ডের পাশাপাশি কয়েকজন শিল্পীও গত তিন-সাড়ে তিন দশকে এই ঘরানার মিউজিকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছে- ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিৎ, হাবিব ওয়াহিদ, খালিদ হাসান মিলু, শায়ান চৌধুরী অর্ণব, তাহসান খান, নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, দিলশাদ নাহার কনা, প্রীতম হাসান ইত্যাদি।</p>
<p>এখানে জেমসের পরিচয়ের জন্য তার নামটাই যথেষ্ট। সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশার একটি পরিবার থেকে উঠে এসে রক-মেটাল মিউজিক শিল্পের গুরু হয়ে ওঠাটা মোটেও সহজকিছু ছিলো না। কিন্তু, তিনি তা করে দেখিয়েছেন। উপরের কয়েকটি ব্যান্ড তো এই শতকের শুরুর দিকে এসেছে, কিন্তু জেমস তার প্রতিভা দেখানো শুরু করেছে সেই নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে। তিনি গ্রাম বাংলার গানগুলোকে রক জনরায় পরিচিত করানোর চেষ্টা করেন। আবার, এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের গানকে রক জনরায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন দেখেই হয়তো তার জনপ্রিয়তা বেড়েছিলো।</p>
<p>এমনকি, চলচ্চিত্র নায়ক মান্না নিজেই একবার জেমসকে মুভির জন্য গান তৈরি করতে অনুরোধ করেছিলেন; অথচ রক জনরা আর মুভির গানের মাঝে থাকে আকাশ-পাতাল তফাত। বাংলাদেশের মুভিতে গান গাওয়ার পাশাপাশি বলিউডেও গান গেয়ে মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।</p>
<p>জেমস বিভিন্ন এলবামে কাজ করতে গিয়ে পরিচিত হন প্রিন্স মাহমুদের সাথে, যাদের কাছে থেকেই এসেছে ’মা’ ও ‘বাবা’ গান। ২০০০ সালে এই প্রিন্স মাহমুদই রক জনরার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ দুই শিল্পী জেমন ও আইয়ুব বাচ্চুকে এক এলবামে নিয়ে আসেন। এখান থেকেই এসেছে জনপ্রিয় সেই ‘বাংলাদেশ’ গানটি, যে গান এখনও যুবসমাজের ফোনে ফোনে বাজে। এজন্যই হয়তো রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে কর্পোরেট জবহোল্ডারও তাকে পছন্দ করে।</p>
<p>রক জনরায় জেমসের পাশাপাশি আইয়ুব বাচ্চুর নামও আসবে এখানে। আইয়ুব বাচ্চুর একটা ঘটনা এখানে বর্ণনা করলেই মনে হয় যথেষ্ট হবে। বাংলা সিনেমার বিখ্যাত ‘আম্মাজান’ গানটি তারই গাওয়া। যেদিন স্টুডিওতে এই গান রেকর্ড হবে, সেদিনের খবরটি কোনোভাবে চাউর হয়ে যায়, এজন্য সেদিন স্টুডিওর সামনে আমজনতার ভিড় জমে গিয়েছিলো শুধুমাত্র আইয়ুব বাচ্চুকে দেখতে। কেননা, সেই সময়টায় জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু ছিলো সঙ্গীত অঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">সাত.</h4>
<p>এই দুইজনের সাথে আরো আসবে হাবিব ওয়াহিদের নাম; যিনি বাংলার সঙ্গীত অঙ্গনকে একাই ২০-৩০ বছর সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। তৎকালীন কালচারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছিলো, সেগুলোর প্রায় সবই হাবিব ওয়াহিদ ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। তিনি একাই বাংলা মিউজিকে অসংখ্য কমার্শিয়াল খাত তৈরি করে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালের দিকে মাত্র ২০ বছর বয়সে হাবিব ওয়াহিদ উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সাথে কাজ করেছিলেন। এভাবেই তার যাত্রার সূচনা হয় অনেকটা। এরপর থেকে পরের এক দশকে তিনি তার অঙ্গনে অসাধারণ সব এলবাম বের করতে থাকেন। আর এসব এলবাম তখন থেকে শুরু করে এখনও জনপ্রিয় হয়ে আছে।</p>
<p>শাহ আব্দুল করিমের গান-সহ বাংলাদেশের অনেক লোকসঙ্গীতকে আধুনিকভাবে সামনে আনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি; যেমন- বন্দে মায়া লাগাইসে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গড়ে চলে না, আসি বলে গেলা বন্ধু আইলানা, বসন্ত বাতাসে সইগো ইত্যাদি।</p>
<p>এরপর হাবিব ওয়াহিদ সেই একুশ শতকের শুরুর দশকের বাংলার সিনেমার দুর্দিনের সময়ে বাংলায় সিনেমায় গানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ‘হৃদয়ের কথা’ এবং ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ সিনেমায় করা হাবিবের গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। বর্তমান সময়ের যুবসমাজের বড় একটা অংশ ভালো করেই জানে যে, এসব গান ছাড়া তাদের চলতো বা চলে কিনা!</p>
<p>এছাড়াও, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া গ্রামীণফোন, বাংলালিংক এবং নেসক্যাফে-র টিভিসি বিজ্ঞাপনের সেইসব গান ও কম্পজিশনগুলো যুবসমাজের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলো। নেসক্যাফের ‘চলো সবাই’, বাংলালিংকের ‘শুনতে কি পাও&#8217; বা জিপি-র ‘চলো বাংলাদেশ’ ও ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’-র মতো গান ও কম্পজিশন আজও বাংলাদেশে টিভিসির জন্য তৈরি হয়নি।</p>
<p>হাবিব ওয়াহিদই শিরিন ও ন্যান্সির মতো শিল্পীদের খুঁজে বের করেছিলেন; যেসব শিল্পীদেরকে আজকের যুবসমাজ ভালোভাবেই চেনে। প্রীতম হাসানকেও হাবিব ওয়াহিদই তুলে এনেছে; যে প্রীতম হাসান বিগত কয়েক বছরের হিট সিনেমার গানগুলো বলতে গেলে একা হাতে কম্পজিশন করেছে। এছাড়াও প্রীতম হাসানই বাংলাদেশের সেলিব্রেশন জনরার জন্য হাত দিয়েছিলেন; যার কারণে গত দশকে বিয়েবাড়ির আয়োজনের মতো বিভিন্ন আয়োজন-অনুষ্ঠানে প্রীতম হাসানের কম্পজিশন করা উল্লেখযোগ্য তিনটি গান যুবসমাজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিলো; এবং অবশ্য এখনও এসব গান বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনে বাজানো হয়ে থাকে। আবার কোক স্টুডিওর ‘দেওরা’ ও ‘মা-লো-মা’ গান দিয়ে এই ঘরানার মিউজিক অঙ্গনে প্রীতম তার প্রতিভার সাক্ষর রাখছে।</p>
<p>মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই শতকের শুরু থেকে গত দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুবসমাজের মাঝে যতগুলো গান জনপ্রিয় হয়েছে, তার অর্ধেকের সাথেই হাবিব ওয়াহিদের কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4 style="font-family: Kalpurush;">আট.</h4>
<p>এতোসব আলোচনার অর্থ এ-ই যে, এতোগুলো ব্যান্ড ও এতোগুলো শিল্পী তাদের ঘরানার মিউজিক শিল্পে যে পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন এবং এফোর্ট দিয়েছেন, তার ফলাফলও তারা পেয়েছেন। এজন্যই হয়তো, গত তিন-দশকে এই ঘরানার মিউজিক অঙ্গনের ধারেকাছেও আসতে পারেনি ইসলামী ঘরানার সঙ্গীত অঙ্গন। যার ফলে বিনোদন অঙ্গনটা দিয়ে যুবসমাজকে শক্তপোক্তভাবে আঁকড়ে ধরা গিয়েছিলো; যে কাজটা ইসলামী ঘরানা বৃহদাকারে করতে ব্যর্থ হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>(এই লেখাটি মূলত বড় একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ। মূল লেখাটি ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর দশম সংখ্যায় ‘একুশ শতকের যুবমানসে সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও বাংলাদেশ: নয়া ব্যবস্থাপনায় আমাদের ভাবনা’ শিরোনামে এসেছে। প্রবন্ধের আকার বেশ বড় হওয়ায় মূল লেখায় এই অংশটুকু সংক্ষেপ করা হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাওলা</strong></p>
<p>আর্টিকেল (রোয়াক ব্লগ)</p>
<ul>
<li>ইসলামে মিউজিক দৃষ্টিভঙ্গি &#8211; ড. ইউসুফ আল কারযাভী</li>
<li>সামি ইউসুফ: মিউজিক শিল্পে আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন – হাসান আল ফিরদাউস</li>
<li>সিনেমা; শুধুই কি বিনোদন? &#8211; মিফতাহুর রহমান</li>
</ul>
<p>লিংক</p>
<ul>
<li>https://bn.wikipedia.org/wiki/জেমস_(সঙ্গীতজ্ঞ)</li>
<li>https://m.dailyinqilab.com/article/422321/জেমস-এক-সংগ্রামী-জীবনের-উপাখ্যান</li>
<li>https://www.deshrupantor.com/540914/জেমসের-নগরবাউল-জেমস-হয়ে-ওঠার-গল্প</li>
<li>https://bn.wikipedia.org/wiki/হাবিব_ওয়াহিদ</li>
<li>https://www.bbc.com/bengali/in_depth/2010/07/100716_mb_habib_wahid</li>
<li>https://www.prothomalo.com/entertainment/song/238v0c4p1t</li>
<li>https://www.prothomalo.com/entertainment/song/1l9z4msxp9</li>
<li>https://bn.wikipedia.org/wiki/প্রীতম_হাসান</li>
<li>https://www.prothomalo.com/special-supplement/তারুণ্যের-শিল্পী-প্রীতম-হাসান</li>
<li>https://www.bbc.com/bengali/multimedia/2015/10/151007_gangolpo_pritom_hasan</li>
<li>https://samakal.com/music/article/340861/রহস্য-আর-অ্যাকশনে-প্রীতমের-নতুন-অধ্যায়</li>
<li>https://www.jagonews24.com/probash/article/940646</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/cinema-and-music-in-21st-century-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16812</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সীরাত সাহিত্যে বাংলা ভাষার অবদান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 05 May 2026 09:40:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16807</guid>

					<description><![CDATA[বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা.]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা. এর যুগেই বাংলা অঞ্চলে ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে সীরাতচর্চারও শুরুয়াত ঘটে। সেইসময় ওমর রা. একদল সাহাবীকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রেরণ করেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আগত সাহাবীগণ রাসূল স. এর তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত জীবনীও বর্ণনা করেন এখানকার জনগোষ্ঠীর মাঝে। এরপর এক শতাব্দীকালের মাঝেই উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে উপকূল অঞ্চল এবং বাংলাতেও পৌঁছে যায় ইসলামের বার্তা।</p>
<p>আরবের সাথে বণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় অন্যান্য মুসলিম বণিকদেরও আগমন ঘটে এখানে। এই সম্পর্ক যে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা হলফ করেই বলা যায়। বণিকরা একইসাথে ইসলামের আখলাক, আধ্যাত্মিকতা ও সুমহান বার্তাও বয়ে নিয়ে আসেন বদ্বীপে। নদী বিধৌত এই বঙ্গভূমিতে রাসূল (স.) এর জীবনী চর্চার অনানুষ্ঠানিক সূত্রপাতও বলা যায় এভাবে।</p>
<p>রাসূল (স.) এর সীরাত নবদীক্ষিত মুসলিমদের বেশ যুগান্তকারী প্রভাব ফেলে। অনেকের ইসলাম গ্রহণের নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এই সীরাত। চৌদ্দ শতকে লিখিত রূপে সীরাতচর্চা শুরুর আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা।</p>
<p>বাংলা ভাষার বিকাশ সাধনে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপক হলেও মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে সাহিত্য জগতে কেবল পদ্য, কবিতা বা ছন্দের হদিস পাওয়া যায়। <strong>লিখিত ভাষায় সীরাত চর্চার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় শাহ মুহাম্মদ সগীরকে (মৃ. ১৪০৯)। ১৪শ শতকে রচিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ <em>“ইউসুফ-জুলেখা”</em>য় উল্লেখযোগ্য একটা অংশ জুড়ে স্থান পেয়েছে রাসূল স. এর জীবনী।</strong> ১৫শ ও ১৬শ শতকে সীরাতচর্চায় অবদান রাখেন দুজন খ্যাতিমান কবি- যয়নুদ্দিন (মৃ. ১৪৮১) ও শাহ বাইরিদ খান (মৃ. ১৫৫০)। <em>“রসূল বিজয়”</em> নামে পৃথক দুটি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয় তাদের হাতে।</p>
<p>অপর একজন কবি সৈয়দ সুলতান (মৃ. ১৬৪৮), যিনি <em>“রসূল চরিত”</em> ও <em>“ওয়াফাত-এ-রসূল”</em> নামে দুটি সাহিত্য রচনা করেন রাসূল স. এর জীবন ও কর্মের উপর। জনশ্রুতিতে প্রচলিত বর্ণনাসমূহ লেখায় রূপদান করতে জুড়ি ছিল না সৈয়দ সুলতানের। ১৭শ শতকে বিখ্যাত কবি আলাওল তাঁর কালজয়ী কাব্য <em>“পদ্মাবতী”</em>র পুরো এক খণ্ড জুড়ে স্থান দেন সীরাতকে। সমসাময়িক আরেকজন সাহিত্যিক সৈয়দ হামজা (মৃ. ১৮১৫) রাসূল স. এর উল্লেখযোগ্য কিছু হাদীস অনুবাদ করেন বাংলা ভাষায়। এভাবে দেখা যায় ক্ল্যাসিকাল যুগ থেকেই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে সীরাত সাহিত্য।&nbsp;</p>
<p>বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে এসে সীরাতচর্চা নতুন একটি মাত্রা পায়। পূর্বতন ধারাবাহিকতায় পদ্য ও কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও শুরু হয় সীরাত সাহিত্য। বহু সংখ্যক কবি, লেখক ও সাহিত্যিকদের শৈল্পিক লেখনীতে সমৃদ্ধ হয় বাংলা ভাষায় সীরাতচর্চার ভাণ্ডার। এই সময়ে যাঁরা অবদান রাখেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন- মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, শেখ জমিরুদ্দিন, শাহাদাত হোসাইন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, বেনজীর আহমেদ, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আল মাহমুদ। রাসূল স. এর শানে তাঁরা রচনা করেন সংগীত, গীতিকাব্য, পদ্য সাহিত্য, প্রবন্ধ ও বই।</p>
<p>বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবুল খায়ের সাইফুদ্দিন <em>“ইসলামী কবিতামালা”</em> &nbsp;নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন, যেখানে বিখ্যাত সব প্রাচীন কবিদের কবিতাকে জড়ো করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বেনজীর আহমেদ সম্পাদিত এমন একটি সংকলন গ্রন্থ <em>“খাতামুন নাবিয়্যিন”</em>। এছাড়াও আরও কিছু সংকলন গ্রন্থ রয়েছে যেমন- ইশরাফ হোসাইনের <em>“রাসূলকে নিবেদিত কবিতা”</em>, মুকুল চৌধুরীর <em>“রাসূলের শানে কবিতা” </em>এবং আসাদ বিন হাফিজের <em>“নির্বাচিত নাতে রাসূল’’</em> ইত্যাদি।&nbsp;</p>
<blockquote><p>কবিতার জগতে সীরাতকে অনন্য একটি অবস্থানে নিয়ে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রাসূল স. এর স্তুতি ও শানে অন্তত শ’খানেক কবিতা ও সংগীত রচনা করেন নজরুল, যেগুলো আজও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এমনকি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছে কালের বিবর্তনে। “মরুভাস্কর” নামে সীরাত গ্রন্থ রচনা করে নবীপ্রেমে নিজেকে উৎসর্গের নজরানা যেন ষোলকলায় পূর্ণ করেন তিনি।</p></blockquote>
<p><strong>উনিশ শতকের শেষের দিকে খ্রিস্টান মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো নবী মুহাম্মদ (স.) এর জীবনীর উপর বই লিখতে শুরু করে এবং লিফলেট ছাপায়, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তাঁর জীবনীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি মুসলিম চিন্তক ও লেখদের ভাবিয়ে তুলে এবং রাসূল (স.) এর জীবনী নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার ভাবনা জাগিয়ে তুলে তাদের মাঝে।</strong> এইক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং সীরাত সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (মৃ. ১৯০৭)। সেইসময় বাংলা মুসলিম সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে সীরাত সাহিত্য। <strong>বাস্তবিকার্থে বাংলা মুসলিম সাহিত্যে গদ্যরীতির সূচনাই হয় সীরাতের মাধ্যমে।</strong> চমকপ্রদ বিষয় হলো, বাংলায় রাসূল (স.) এর সম্পূর্ণ জীবনচরিত রচনা করেন একজন হিন্দু লেখক, গিরিশচন্দ্র সেন, <strong><em>মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবন চরিত</em> (১৮৮৬)</strong> নামে। সর্বপ্রথম মুসলিম লেখক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সীরাত লিখেন শেখ আব্দুর রহীম। তাঁর রচিত সীরাত গ্রন্থের নাম <strong><em>হযরত মোহাম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি</em></strong>। যেটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। সীরাত সাহিত্যে অপর একটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম হচ্ছে <strong><em>মোস্তফা চরিত</em> (১৯২৫)</strong>। মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁ (মৃ. ১৯৬৮) রচনা করেন এটি। কবি গোলাম মোস্তফার সীরাতকর্ম <strong><em>বিশ্বনবী</em></strong>-ও বেশ সমাদৃত হয় বাংলা ভাষায়।&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র বাংলা মৌলিক সাহিত্যের মাধ্যমেই নয়, অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমেও আরবী ও অন্যান্য ভাষায় রচিত ক্ল্যাসিকাল সীরাত গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলার সীরাতচর্চা। সীরাত গ্রন্থের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন আকর গ্রন্থ হিসেবে প্রসিদ্ধ ইবনে ইসহাকের সীরাতে রাসূলুল্লাহ-এর অনুবাদ নিয়ে আসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। এছাড়াও অগণিত প্রকাশনা সংস্থা থেকে সীরাতের অনুবাদকর্মসমূহ প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে অহরহ।</p>
<p>রাসূল স. এর বন্দনায় রচিত ফার্সী ভাষার কতক কবিতা ও সাহিত্যও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। এই পর্যায়ে মওলানা রুমী, মির্জা মাজহার, ওমর খৈয়াম, আব্দুর রহমান জামী, শেখ সাদী, আমীর খসরু, ফতেহ আলী ওয়াসী সহ ফার্সী ভাষার খ্যাতিমান কবিদের সীরাতকর্ম অনূদিত হয় বাংলায়।</p>
<p>উর্দূ ভাষার সীরাত গ্রন্থসমূহও বাংলায় অনুবাদ হওয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় সীরাত সাহিত্য। উর্দূ থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছে- ইদরীস কান্দল্ভীর <strong><em>মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম</em></strong>, আল্লামা শিবলী নোমানীর <strong><em>সীরাতুন্নবী</em></strong>, সোলায়মান নদভীর <strong><em>পয়গামে মোহাম্মদী</em></strong>, আশরাফ আলী থানভীর <em><strong>খাতামুল আম্বিয়া</strong></em>, আবুল কালাম আজাদের <strong><em>বেলাদাতে নববী</em></strong>, মুফতী মোহাম্মদ শফীর <strong><em>সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া</em></strong>, ক্বারী মোহাম্মদ তায়্যিবের <em><strong>আফতাবে নবুয়্যত</strong></em>, এবং সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভীর <strong><em>নবী রহমত</em></strong>। কেবলমাত্র এই সকল গ্রন্থই নয়, পাশাপাশি উর্দূ সাহিত্যের প্রসিদ্ধ অনেক ছোট ছোট প্রবন্ধ, কবিতা ও গীতিও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। বাঙালী স্কলারদের নিকট আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, মির্জা গালিব বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মওদূদীর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম <em><strong>সীরাতে সরওয়ারে আলম</strong>&#8211;</em>এর বাংলা অনুবাদও বেশ পঠিত বাংলা ভাষায়।</p>
<p>এছাড়াও ইংরেজি থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর <em><strong>রণাঙ্গণে রাসূল স.</strong></em> এবং আফজালুর রহমানের <strong><em>মোহাম্মদ: এনসাইক্লোপিডিয়া অফ সীরাত</em></strong> প্রণিধানযোগ্য।&nbsp;</p>
<p>শিশুদের উপযোগী করে সীরাতচর্চাও নেহাত কম হয়নি বাংলা ভাষায়। শিশুদের কোমল মানসে রাসূল স. এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি, আদর্শের দীক্ষা ও সচ্চরিত্রবান করে গড়ে তোলার মহান প্রয়াসকে সামনে রেখে কবি সাহিত্যিকগণ শিশুতোষ সীরাত রচনায় উদ্যত হন। এমনই একটি শিশুতোষ সীরাত হচ্ছে- <strong><em>নূরনবী</em></strong>। ইয়াকুব আলী চৌধুরী রচিত এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। সহজ ও সাবলীল ভাষায় রচিত নূরনবী শিশুসাহিত্য এবং সীরাতসাহিত্যে প্রশংসা কুড়ায় বেশ। নবীকরিম স. কে উপজীব্য করে একজন আদর্শ পুরুষ হয়ে উঠার জন্য দারুণ সহায়ক গ্রন্থটি। সেইসাথে, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর বিনির্মাণেও ভূমিকা রাখে ইয়াকুব আলী চৌধুরীর লেখনী। পরবর্তীতে তোরাব আলী রচিত <em>“</em><strong>ছোটদের মোস্তফা</strong><em>”</em> (১৯৩৬) এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর লেখা <em>“</em><strong>ছোটদের হযরত মোহাম্মদ</strong><em>”</em> (১৯৪১) – এই সকল গ্রন্থও প্রসিদ্ধি লাভ করে বিপুল পঠিত হয় বাংলার মুসলিমদের ঘরে ঘরে।</p>
<p>এভাবে বাংলা ভাষার বেশ শক্তিশালী একটি ধারা গড়ে উঠেছে রাসূল (স.) এর সীরাতকে কেন্দ্র করে। সেই ধারা অব্যহত রয়েছে এখনো। কখনো কখনো সামগ্রিক সীরাত না লিখে সীরাতের বিশেষায়িত কোনো অংশ নিয়ে কেউ লিখছেন সীরাত। আবার অনেকেই রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, দার্শনিক এবং মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তুলে ধরছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবের জীবনাচারকে। আর সেই সাহিত্য প্রভাবও ফেলেছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এবং বাঙ্গালী মুসলিম জাতিসত্তার বিনির্মাণে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হদিসঃ</strong></p>
<p>১। বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব।</p>
<p>২। বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা, মো: আবুল কাসেম ভুঁইয়া।</p>
<p>৩। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, মোহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান।</p>
<p>৪। বাংলা ভাষায় সীরাত বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি, নাসির হেলাল (সম্পাদিত)।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16807</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতায় ইনফাকের সংস্কৃতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. খাদিজা গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 01 Mar 2026 15:03:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16655</guid>

					<description><![CDATA[রমজানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একইসাথে সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ইনফাক। আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি, এইসব সমস্যার মূলে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে ইনফাকের সংস্কৃতি উঠে যাওয়া।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>রমজানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একইসাথে সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ইনফাক। আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকি, এইসব সমস্যার মূলে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে ইনফাকের সংস্কৃতি উঠে যাওয়া। এজন্য আজকে আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।</p>
<p>সহজ ভাষায় বললে, <strong>ইনফাক বলতে বুঝায় আল্লাহর পথে ব্যয়। শাব্দিক অর্থে বলতে গেলে, অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য যেই দান বা খরচ করা হয় সেটিই হচ্ছে ইনফাক।</strong> এই সহযোগিতা কেবলমাত্র আর্থিক বিষয় নয়। অপর একজন ভাই/ বোনকে সাহায্য করার জন্য একজন মানুষ তার ধন, সম্পদ, জ্ঞান, সময় এমনকি তার জীবন পর্যন্ত দান করতে পারে। কাজেই, ইনফাক একটি সামাজিক পরিভাষা। যদিও বর্তমানে ইনফাকের কথা এলে শুরুতেই আমাদের মাথায় আসে আর্থিক সাহায্যের বিষয়টি। প্রকৃতপক্ষে, ইনফাকের একইসাথে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক, অর্থাৎ দ্বিমাত্রিক অর্থ আছে। ইনফাকের বিষয়টি একজন ব্যাক্তিকে যেমন বিকশিত করে থাকে, অনুরূপভাবে তা সামাজিক সংহতি ও বিকাশের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ইনফাকের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা, নিজের সময়-সম্পদ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া এবং ত্যাগের মানসিকতা তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ বস্তুগত ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হতে পারে। অতএব, ইনফাকের ক্ষেত্রে আর্থিক দিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ একইসাথে আধ্যাত্মিক দিকটাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে আমি ইনফাকের বিষয়টিকে ৫টি ভাগে ভাগ করে থাকিঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. কথার মাধ্যমে দান।<br />
২. ইলম ও মারেফাতের মাধ্যমে দান।<br />
৩. সময়ের মাধ্যমে দান।<br />
৪. জীবনের মাধ্যমে দান।<br />
৫. সম্পদের মাধ্যমে দান।</p>
<p><strong>১.</strong> <strong>কথার মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে কাউকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে, কাউকে ভালো উপদেশ দেয়ার মাধ্যমে, কাউকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে তার উপকার করা। এগুলো ইনফাকের গুরুত্বপূর্ণ দিক।</p>
<p><strong>২.</strong> <strong>ইলম বা মারেফাতের মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে কোনো উপকারী জ্ঞানকে শিক্ষা করে সে জ্ঞানকে সবার সামনে তুলে ধরা, অন্যকে শিক্ষা দেয়া, বিশেষ করে যুবকদের কাছে তুলে ধরা। একই সাথে সে জ্ঞানটি আমাদের বাস্তব জীবনে কিভাবে কাজে লাগতে পারব সেটিকেও সবার সামনে উপস্থাপন করা।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16657 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d.jpg" alt="" width="735" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d.jpg 735w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/011cddab2a758b24932561a5acaad38d-300x180.jpg 300w" sizes="(max-width: 735px) 100vw, 735px" /></p>
<p><strong>৩.</strong> <strong>সময়ের মাধ্যমে ইনফাক</strong>—এটি হচ্ছে, কেউ যদি আপনার কাছে আসে, এসে সাহায্য-সহযোগিতা চায়; সেটি যেকোন বিষয়ে হতে পারে, যেমনঃ আর্থিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক। এই ব্যাপারে তাকে সময় দেয়া, তার সাথে গিয়ে তার সমস্যার সমাধান করা। এছাড়া সমাজে কোনো বিষয়ে সমস্যা থাকলে সে সমস্যার সমাধানের জন্য সময় বের করা এবং সেগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া হল সময়ের মাধ্যমে ইনফাক।</p>
<p><strong>৪.</strong> <strong>জীবনের মাধ্যমে ইনফাক</strong> হচ্ছে প্রয়োজনে জীবনের মায়াকে ত্যাগ করে হলেও অন্যের কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টা চালানো; এমনকি এতে যদি নিজের জীবনও বিপদাপন্ন হয়, তবুও চেষ্টা করা।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোভিড-১৯ এর সময় অনেক ডাক্তার, নার্স এবং হাসপাতালে কর্মরত মানুষজন রোগীদের সেবা দেয়া ও সুস্থ করার জন্য নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হন। শত শত নার্স, ডাক্তার ও চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যাক্তিরা অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেই মৃত্যুবরণ করেন। এটি হচ্ছে জীবন দিয়ে ইনফাকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে আমাদের মায়েরা। তারা তাদের সন্তানকে লালন পালন করার জন্য, তাদের বড় করার জন্য নিজের স্বাস্থ্য, ঘুম থেকে শুরু করে সবধরণের ত্যাগ স্বীকার করেন। বাবারা সন্তানদের হয়তো আর্থিকভাবে লালন পালন করার জন্য, ঘর পরিচালনার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। কিন্তু একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মায়েরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। এক কথায় বলতে গেলে, তারা তাদের জীবন দিয়ে একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।</p>
<blockquote><p><strong>আমাদের সামনে ইনফাকের সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হলো, আমাদের গাজার ভাইবোনেরা। উম্মতের ইজ্জতকে রক্ষা করার জন্য, আমাদের প্রথম ক্বিবলা বায়তুল মাকদিসকে রক্ষা করার জন্য, নিজেদের জন্মভূমিকে রক্ষা করার জন্য, এককথায় বলতে গেলে গোটা উম্মতের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য তারা তাদের জীবন দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন।</strong> <strong>গাজার নারী, শিশু থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ এর মধ্যে শামিল। তাই, আমি মনে করি এটি জীবন দিয়ে ইনফাকের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।</strong></p></blockquote>
<p><strong>৫.</strong> <strong>ধন-সম্পদ বা মালের মাধ্যমে ইনফাক।</strong> এটি হচ্ছে কারো যদি আর্থিক সামর্থ্য থাকে, সে ক্ষেত্রে যারা দরিদ্র, নিপীড়িত; তাদের সাথে নিজের সম্পদ ভাগাভাগি করে নেয়া। এটিকে আবার ৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ</p>
<p>ক) এর প্রথমটি হচ্ছে <strong>তাসাদ্দুক বা সাদাকাহ বা সদকা</strong>। এটি ইনফাকের সামগ্রিক একটি পরিভাষা। এক অর্থে বলতে গেলে এটি ইনফাকের সকল বিষয়কে পরিগ্রহ করে থাকে। এই সদকা সম্পর্কে রাসুল (সা.) এর একটি হাদীস রয়েছে। এ হাদীসে তিনি সদকাকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;প্রতিটি ভালো কাজই সদকা”</p></blockquote>
<p>বর্তমানে আমরা সদকা বলতে বুঝি, কেউ যদি এসে সাহায্য চায় তাকে সাহায্য করা, গরীব লোকদের খাবার দেয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ, আমরা এটিকে খুবই সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু রাসূল (স.) এটিকে সামগ্রিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। কারো সাথে দেখা হলে মুচকি হাসি দেয়া সদকা, কাউকে পথ প্রদর্শন করা সদকা, পশুপাখিকে খাবার দেয়া, অনুবাদ করা, কোনো একটি ভালো কিছু তৈরি করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, শিশু বা বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলানোসহ সকল ভালো কাজই সদকা। এগুলো সবই হাদিসের মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16658 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-1024x720.jpg" alt="" width="1024" height="720" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-1024x720.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-300x211.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c-768x540.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/30328b9341886aadbc5258a860f7089c.jpg 1080w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>খ) সদকার আরেকটি রূপ হচ্ছে <strong>সদকায়ে ফিতর বা সদকাতুল ফিতর</strong>। এটি শুধু রমজান মাসের জন্য নির্দিষ্ট। অন্য কোনো সময়ের জন্য নয়। সদকাতুল ফিতর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সদকাতুল ফিতর হচ্ছে এই রমজানে যারা বেঁচে আছে তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহকে দেয়া একটি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহকে খুশি করার জন্য দরিদ্র ব্যাক্তিকে ফিতরা সদকা দেয়া। সদকায় ফিতর এমন একটি জিনিস, যার জন্য ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যাকাতের মতো নিসাব পরিমাণ মাল বা সম্পদের অধিকারী হতে হবে এমন নয়। এটি যে কেউ দিতে পারে। যাকাতের ক্ষেত্রে বাড়ির কর্তা বা যে সম্পদের অধিকারী সে-ই মূলত যাকাত দিয়ে থাকে। অন্যদের পক্ষ থেকে আদায় করা হয় না। কিন্তু সাদাকাতুল ফিতর জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুর জন্য তার পিতা-মাতা দিয়ে থাকে। এটি একটি অসাধারণ বিষয়।</p>
<p>গ) সদকার তৃতীয় রূপ হচ্ছে <strong>যাকাত</strong>। যাকাত হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী ব্যাক্তির সম্পদের একটি অংশকে দান করা। এটি ইসলামের ৫টি স্তম্ভের একটি। সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য যাকাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ বলেনঃ</p>
<blockquote><p>&#8220;خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ&#8221;</p>
<p>অর্থ: (হে নবী!) তুমি তাদের ধন-সম্পদ হতে সাদাকাহ গ্রহণ কর, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করে দিবে, আর তাদের জন্য দু‘আ কর। নিঃসন্দেহে তোমার দু‘আ হচ্ছে তাদের জন্য শান্তির কারণ, আর আল্লাহ খুব শোনেন, খুব জানেন।</p></blockquote>
<p>এখানে রাসুলকে (স.) নির্দেশ করা হয়েছে, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্দেশ করা হয়েছে। <strong>যাকাত দেয়ার মাধ্যমে ধনীদের ধন-সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা এর প্রধান উদ্দেশ্য। এখানে ‘তুতাহহির’ শব্দটির মাধ্যমে সম্পদ কমানো বা নেয়ার জন্য বলা হচ্ছেনা বরং তাদের পরিশুদ্ধ করো বা পবিত্র করো এটি বলা হয়েছে।</strong> যাকাতের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাকাতের মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পদ পরিশুদ্ধ হয়, ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়। এখানে যাকাত ও ‘তুযাক্কি’ একই শব্দমূল থেকে এসেছে।</p>
<p>ঘ) সদকার আরেকটি দিক হচ্ছে <strong>কর্জে হাসানা</strong>। এটি হলো কোন ধরনের বিনিময় প্রত্যাশা না করে কাউকে ঋণ দেয়া। কোন কষ্টে বা সমস্যায় নিপতিত ব্যাক্তিকে কোন সুদ বা দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ ছাড়া ঋণ দেয়াকে ইসলামের অনেক বড় ফজিলত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এটি এমন একটি বিষয়, যেমন কোনো ব্যাক্তি কোনো সমস্যার কারণে ঋণ চাচ্ছে, এমতাবস্থায় আপনি জানেন যে, এটি তার পক্ষে ফেরত দেয়াটা খুবই কঠিন। এমনকি তিনি ফেরত নাও দিতে পারেন—এটি জেনেও তাকে ঋণ দেয়া এবং মনে করা যে আপনি আল্লাহকে ঋণ দিচ্ছেন, এভাবে তাকে ঋণ দেয়া। অর্থাৎ, কোনো ধরণের বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই দিয়ে দেয়া। সে যদি তা ফেরত দেয় তো ভালো, আর যদি দিতে না পারে তাহলে আল্লাহ স্বয়ং নিজে এর বিনিময় দিবেন। কর্জে হাসানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে ঋণ নিবে সে যেনো এর অপব্যবহার না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি নিবে তাকেও অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে, সে যেনো এই নিয়তে না আসে যে, তার কাছে সম্পদ আছে, সেতো দিবেই আমি আর ফেরত দিবোনা, তাহলে এটি আল্লাহর সাথেই প্রতারণা করা হলো। এর হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এজন্য সম্ভব হলে অবশ্যই পরিশোধ করার নিয়্যত থাকতে হবে।</p>
<blockquote><p>مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَهٗ لَهٗۤ اَضۡعَافًا كَثِیۡرَۃً ؕ وَ اللّٰهُ یَقۡبِضُ وَ یَبۡصُۜطُ ۪ وَ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ</p>
<p>অর্থ: এমন ব্যক্তি কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম কর্জ প্রদান করবে? তাহলে তার সেই কর্জকে তার জন্য আল্লাহ বহু গুণ বর্ধিত করে দেবেন এবং আল্লাহই সীমিত ও প্রসারিত ক’রে থাকেন এবং তাঁর দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।</p></blockquote>
<p>কর্জে হাসানার বিষয়টি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটানো উচিত এবং কর্জে হাসানার অপব্যবহার যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। কোরআন আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, ইনফাক হচ্ছে বরকতের একটি উৎস, একইসাথে এটি আমাদের ধন-সম্পদ হ্রাস করেনা, বরং বৃদ্ধি, পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে।<br />
কর্জে হাসানা বা বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়া দান করলে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কখনো সাতগুণ, কখনো একশতগুণ, আবার চাইলে সাতশতগুণ বা অফুরন্ত নিয়ামতে একজন ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ করতে পারেন। তাই আমরা বলে থাকি— দান, সদকা, যাকাত সম্পদকে হ্রাস করেনা, বরং বৃদ্ধি করে। সম্পদের বরকতের বড় একটি উৎস এই দান-সদকা।</p>
<blockquote><p>مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ حَبَّۃٍ اَنۡۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِیۡ كُلِّ سُنۡۢبُلَۃٍ مِّائَۃُ حَبَّۃٍ ؕ وَ اللّٰهُ یُضٰعِفُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ</p>
<p>অর্থ: যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।</p></blockquote>
<p>ঙ) সদকার পঞ্চম যে শ্রেণী, তা হচ্ছে <strong>ফিদিয়া বা কাফফারা</strong>। কেউ রোযা রাখতে অক্ষম হলে তার পরিবর্তে যে দান, বা ওয়াদা রাখতে না পারলে কিংবা এরকম বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দান হলো ফিদিয়া বা কাফফারা। যদি কেউ অসুস্থতার কারণে বা অন্য কোন কারণে রোজা রাখতে না পারে তাহলে সে পরের মাসে কাযা করবে। কিন্তু তার অসুস্থতা যদি এমন হয় যে, তার পক্ষে পরেও কাজা করা সম্ভব না, স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্ভাবনা বা মৃত্যু ঝুঁকি থাকে তাহলে সে ফিদিয়া দিবে। কিন্তু অনেকে এটির অপব্যবহার করে থাকে; ক্লাস, কাজ এসব অজুহাতে রোযা রাখেনা। মনে করে, আমার সামর্থ্য আছে আমি ফিদয়া দিয়ে দিবো। এভাবে এই বিধানের অপব্যবহার করে থাকে। এটি এক অর্থে আল্লাহর সাথে প্রতারণা। আর আল্লাহর সাথে যে প্রতারণা করে, সে নিজেই প্রতারিত হয়।</p>
<p>দান-সদকা এগুলোর জন্য আন্তরিক নিয়্যত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বরকত হওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো, পবিত্র ও হালাল জিনিস দান করতে হবে। নাহলে এটি বরকতের উৎস হবে না।</p>
<blockquote><p>﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِآخِذِيهِ إِلَّا أَن تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ</p>
<p>অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করোনা। কেননা, তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। (সূরা বাকারা, ২৬৭)</p></blockquote>
<p>কোনো একটি পোশাক পুরনো হয়ে গেলে সেটি ফেলে দেয়ার আগে কাউকে দিয়ে দেওয়া বা খাবার খেয়ে কিছু রয়ে গেছে; তা ফেলে দেয়ার আগে দিয়ে দেয়াকে দান বুঝায় না। নতুন কোনো কিছু বা সবচেয়ে সুন্দর কোনো কিছু দান করা হলো উত্তম দান।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16663 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero.jpg" alt="" width="936" height="600" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero.jpg 936w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero-300x192.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/giving-money-to-poor-hero-768x492.jpg 768w" sizes="(max-width: 936px) 100vw, 936px" /></p>
<p>ইনফাক হচ্ছে বান্দাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া ও অপর ভাইয়ের প্রতি ধন্যবাদ।</p>
<p>বান্দার প্রতি ধন্যবাদ তিনভাবে হয়ে থাকেঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১. আমাদের উপর তাদের যে অধিকার সেটি আমরা পূরণ করে দিচ্ছি</strong><br />
<strong>২. তাদের দেয়ার কারণে আমাদের সম্পদ পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হচ্ছে</strong><br />
<strong>৩. যখন সমাজে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষ থাকবেনা, তখন সমাজে বিশৃংখলা ও অপরাধ কমে যাবে এবং শান্তি বিরাজ করবে। কাজেই, সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।</strong></p>
<p>ইনফাকের অন্যতম উদ্দেশ্য সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সংহতি ও সামাজিক আদালত নিশ্চিত করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এটি একটি পন্থা। যে ব্যক্তি দান করে, সে আধ্যাত্মিকভাবে প্রশান্তি লাভ করে; একই সাথে সে কৃপণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে সামাজিকভাবে শ্রদ্ধা অর্জন করে এবং দানের যে সংস্কৃতি সেটিকে বিকশিত করে।<br />
আল্লামা ত্বহা আবদুর রহমান এর ভাষায়, ইনফাক আমাদের আমানতের যে চেতনা সেটিকে জাগ্রত করে থাকে। অর্থাৎ এই পৃথিবীর যা কিছু আছে সবই আমাদের নিকট আমানত এই চেতনা জাগ্রত করে আর আমাদের নিজেদের এর মালিক ভাবার চেতনা হ্রাস করে।</p>
<p>অনেক গবেষণায় আমরা দেখতে পাই যে, যদি পৃথিবীর সব ধনী মুসলমানেরা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করতো, তাহলে পৃথিবীর কোথাও দারিদ্র‍্য ও সামাজিক বৈষম্য থাকতোনা।</p>
<p>ফরাসি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ রজার গারাউডির ভাষায়ঃ</p>
<p>&#8220;যাকাত এমন কোনো বিষয় নয় যা মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এটা আমাদের ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়। <strong>যাকাত হচ্ছে এমন একটা বিষয় যা মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা বা কৃপণতার যে প্রবণতা আছে তাকে পরাভূত বা পরাজিত করতে সাহায্য করে।</strong> মানুষের পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক একটি রূপ হচ্ছে যাকাত। এটিকে বাধ্যতামূলক ও আধ্যাত্মিক একটি কর্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যাকাত একইসাথে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সকল সম্পদের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। <strong>ব্যক্তি চাইলে তার ইচ্ছামতো এর ব্যবহার করতে পারবেনা। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবেই ব্যয় করতে হবে। এটি একটি আমানত।</strong> শুধু তাই নয়। সে যে এই সমাজের সদস্য, অন্য মানুষের সাথে তার একটি সম্পর্ক আছে, সেই সম্পর্কের প্রতি তার একটি দায়বদ্ধতা আছে; এটি তাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় যাকাত।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা যদি কোরআনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, কোরআনে নামাজ এবং যাকাতের কথা একই সাথে উল্লেখিত হয়েছে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱرْكَعُوا۟ مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ&#8221;</p>
<p style="padding-left: 40px;">১। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর। (বাকারা, ৪৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">اَلَّذٖينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقٖيمُونَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَۙ</p>
<p style="padding-left: 40px;">২। যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়েম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। (বাকারা, ৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">وَاَقٖيمُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتُوا الزَّكٰوةَؕ وَمَا تُقَدِّمُوا لِاَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللّٰهِؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصٖيرٌ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৩। এবং তোমরা নামায আদায় কর, যাকাত দাও এবং যা কিছু সৎ কার্যাবলী তোমরা স্বীয় আত্মার জন্যে আগে পাঠাবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকট পাবে। তোমরা যা কিছু করছো নিশ্চয়ই আল্লাহ তা দেখছেন। (সূরা বাকারা, ১১০)</p>
<p style="padding-left: 40px;">لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلٰٓئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيّٖنَۚ وَاٰتَى الْمَالَ عَلٰى حُبِّهٖ ذَوِي الْقُرْبٰى وَالْيَتَامٰى وَالْمَسَاكٖينَ وَابْنَ السَّبٖيلِ وَالسَّٓائِلٖينَ وَفِي الرِّقَابِۚ وَاَقَامَ الصَّلٰوةَ وَاٰتَى الزَّكٰوةَۚ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ اِذَا عَاهَدُواۚ وَالصَّابِرٖينَ فِي الْبَأْسَٓاءِ وَالضَّرَّٓاءِ وَحٖينَ الْبَأْسِؕ اُو۬لٰٓئِكَ الَّذٖينَ صَدَقُواؕ وَاُو۬لٰٓئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৪। তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে এতে কোন কল্যাণ নেই বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি এবং আল্লাহর ভালবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাকাত বন্টনকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিস্কৃতি দিতে দান করবে এবং নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিতে থাকবে, ওয়া‘দা করার পর স্বীয় ওয়া‘দা পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে— এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই মুত্তাকী। (সূরা বাকারা, ১৭৭)</p>
<p style="padding-left: 40px;">الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِى ٱلْأَرْضِ أَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُوا۟ بِٱلْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا۟ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلْأُمُورِ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৫। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি যমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে। (হজ্জ, ৪১)</p>
<p style="padding-left: 40px;">رِجَالٌۙ لَا تُلْهٖيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللّٰهِ وَاِقَامِ الصَّلٰوةِ وَاٖيتَٓاءِ الزَّكٰوةِۙ يَخَافُونَ يَوْماً تَتَقَلَّبُ فٖيهِ الْقُلُوبُ وَالْاَبْصَارُ</p>
<p style="padding-left: 40px;">৬। সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখেনা, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। (সূরা নূর, ৪৯)</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16659 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451.jpg" alt="" width="1000" height="668" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451.jpg 1000w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451-300x200.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/03/2149359451-768x513.jpg 768w" sizes="(max-width: 1000px) 100vw, 1000px" /></p>
<p>ইনফাক মানুষকে একই সাথে কিভাবে রূহগত ও সামাজিকভাবে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করে সেই ব্যাপারে হযরত পয়গাম্বর (সঃ) বলেন,</p>
<p style="padding-left: 40px;">اَلْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى<br />
দানকারীর হাত গ্রহণকারীর হাতের চেয়ে উত্তম। (বুখারী, যাকাত, ১৮)</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ&#8221;<br />
যদি কেন কোন মু’মিনের কোন একটি দুনিয়াবী সমস্যাকে দূর করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিন তার একটি সমস্যাকে দূর করে দিবেন। (মুসলিম, বিরর, ৩)</p>
<p style="padding-left: 40px;">&#8220;أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنًى&#8221;<br />
সর্বোত্তম সাদাকা হলো, প্রয়োজনের অতিরিক্তকে দান করে দেওয়া। (বুখারী, যাকাত, ১৮)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইনফাক বা দানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরিঃ</p>
<p style="padding-left: 40px;">১. <strong>দান শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা পাওয়ার জন্য করতে হবে।</strong><br />
২. সময়মতো সাহায্য করা। দেখা গেছে যে, কোনো অসুস্থতা বা প্রয়োজনের সময় দান না করে যদি পরে দান করা হয় তাহলে তার খুব বেশি উপকার হবে না। এজন্য সময়মত দান করার চেষ্টা করতে হবে।<br />
৩. <strong>গোপনে দান করা ও প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকে দূরে থাকা।</strong> তবে এটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন ফাউন্ডেশন বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এধরণের কাজকে উৎসাহ দেয়ার জন্য এটিকে দৃশ্যমান করা বা প্রচার করার মধ্যে সমস্যা নেই।<br />
৪. <strong>সম্পদের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস দান করা।</strong> অব্যবহৃত বা মূল্যহীন কিছু দেয়ার চেয়ে ব্যাক্তি যা পছন্দ করে সেখান থেকে দেয়া সবচেয়ে উত্তম।<br />
৫. দেয়ার সময় কোনো ধরনের অপচয় না করা, আবার কৃপণতা থেকেও মুক্ত থাকা। এখানে ব্যক্তি একটি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে।<br />
৬. <strong>যাদের সত্যিকার অর্থে প্রয়োজন তাদের ক্রমাগত সাহায্য করা।</strong><br />
৭. ব্যক্তির উপার্জিত সকল অর্থ দান করা যাবে না। তার পরিবার-পরিজনসহ যাদের প্রতি তার দায়িত্ব আছে তাদের প্রতিপালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রেখে বাকীটা দান করতে হবে।</p>
<p>তাকওয়ায় উপনীত হওয়ার দুটি উপায় আছেঃ</p>
<ul>
<li><strong>১. ইনফাক</strong></li>
<li><strong>২. কল্যাণকর কাজ</strong><br />
ইনফাকও এক ধরণের কল্যাণকর কাজের অংশ।</li>
</ul>
<p>ইসলামী আখলাকের দৃষ্টিকোণ থেকে ইনফাক করার সময় আমাদের দুটি বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবেঃ</p>
<ul>
<li><strong>১. ইসরাফ</strong></li>
<li><strong>২. তাবজির</strong></li>
</ul>
<p>রাসূল (স.) বলেন, <strong>&#8220;তোমরা ইসরাফ অর্থাৎ অপচয়ের দিকে ধাবিত না হয়ে, অহংকার বা নিজেকে গৌরবান্বিত করার রোগে আক্রান্ত না হয়ে খাও, পান করো ও পরিধান করো এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করো। আল্লাহ তোমাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তা যেনো দৃশ্যমান হয়।&#8221; (বুখারী)</strong></p>
<p>কারো যদি সামর্থ্য থাকে সে ভালো খাবে, ভালো পরিধান করবে, সুন্দর থাকবে এটি আল্লাহ বান্দার কাছ থেকে দেখতে চান।</p>
<p>এ ইনফাক বা ব্যয় করার ক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে একটি পরিভাষা হচ্ছে <strong>তাবজির।</strong> তাবজির হচ্ছে অযথা খরচ বা আল্লাহ যা পছন্দ করেননা, সেখানে খরচ করা। হাদিসে এসেছে, <strong>&#8220;তাবজিরকারী শয়তানের ভাই।&#8221;</strong></p>
<p>এটি ইসরাফের চেয়ে আরেকধাপ এগিয়ে। এই তাবজিরের ব্যাপারে আল্লাহ কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন।</p>
<blockquote><p>وَ اٰتِ ذَاالۡقُرۡبٰی حَقَّهٗ وَ الۡمِسۡكِیۡنَ وَ ابۡنَ السَّبِیۡلِ وَ لَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا<br />
অর্থ: আত্মীয় স্বজনকে দিবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও, এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা।</p></blockquote>
<p>আমরা যদি সম্পদকে আখলাকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে এটি আমাদের জন্য একটি নিয়ামত, আবার একইসাথে এটি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষাও। পবিত্র কোরআনের কিছু কিছু আয়াতে আমরা দেখতে পাই, ধন-সম্পদকে মুমিনদের জন্য ফিতনা ও পরীক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার সম্পদকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যয় করাকে একটি গুনাহের কাজ, একটি দায়িত্বহীন কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানদের অজুতে পানি অপচয় না করা, একেবারে উদরপূর্তি করে না খাওয়া, খাবারের টেবিলকে সাদামাটা রাখা এসব বিষয়ে রাসূলে কারীম (স.) উৎসাহিত করেছেন। আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার, পোশাক ও দামি আসবাবপত্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মুমিনের জীবন হতে হবে সাধারণ ও অনাড়ম্বর।</p>
<p>ইসরাফ ও তাবজিরের পার্থক্যের ক্ষেত্রে আলেমেরদের অনেকের বক্তব্য রয়েছে। এখানে আমি <strong>আল-মাওয়ার্দির</strong> বক্তব্যটি উল্লেখ করছি,</p>
<p>তার মতে, <strong>“ইসরাফ হচ্ছে সঠিক জায়গায় প্রয়োজনের অধিক ব্যয় করা; তাবজির হচ্ছে আল্লাহ পছন্দ করেননা এমন জায়গায় ব্যয় করা, আল্লাহর অবাধ্যতা যেখানে আছে সেখানে ব্যয় করা।”</strong></p>
<p>ইনফাক এর প্রভাব কেবল ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সমাজের ভারসাম্যকে নিশ্চিত করে থাকে। এটি একটি পবিত্র কাজ, এটি আমাদের পারস্পরিক ভাগাভাগি (শেয়ারিং) এর বিষয়টিকে বৃদ্ধি করে থাকে, একই সাথে যে দান করে ও যে দান গ্রহণ করে উভয়কে আত্মিকভাবে প্রশান্তি দিয়ে থাকে। এজন্য ইনফাককে একটি জীবনধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করা আমাদের ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এ বিষয়টি সবসময় জানা থাকতে হবে যে, ধনী হওয়া কিংবা দরিদ্র‍তা—এটি পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিক্রমায় একজন ধনী ব্যক্তিও দরিদ্র হয়ে যেতে পারে, আবার একজন দরিদ্র ব্যক্তিও ধনী হতে পারে। এজন্য ধন-সম্পদ আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়। আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হচ্ছে তাকওয়া। একজন ব্যক্তি গরীব হলে গরীব থাকা অবস্থায় যে দায়িত্বগুলো পালন করা সম্ভব, সেগুলো পালন করবে; ধনী হলে ধনী থাকা অবস্থায় যে দায়িত্বগুলো পালন করা প্রয়োজন সেগুলো পালন করবে। তাহলেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রিয় হওয়া যাবে।</p>
<p>আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে এই বিষয়ের আলোকে আমল করার তৌফিক দান করুক। আমাদের সামাজিক সংহতি তৈরি করার তৌফিক দান করুক। ইনফাককে আমাদের জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাওফিক দান করুক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-culture-of-infaq-in-islamic-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16655</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতায় শিল্পকলা ও নান্দনিকতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/art-and-aesthetics-in-islamic-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/art-and-aesthetics-in-islamic-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 24 Feb 2026 13:10:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16588</guid>

					<description><![CDATA[মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর &#8211; “আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন”[1] – এই কথার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের যে আকল সেই আকল]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর &#8211; <strong>“আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন”</strong><a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a> – এই কথার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের যে আকল সেই আকল কর্তৃক আল্লাহ তায়ালার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা সম্ভবপর নয়। তবে তাঁর যে সৌন্দর্য সেটা তাঁর জামাল সিফাতের মাধ্যমে তার সৃষ্টিতে যে অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে সেটার মাধ্যমে একটু হলেও উপলব্ধি করা যেতে পারে।</p>
<p>কেননা মহান প্রভু যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন সেটাকেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে&nbsp; তৈরি করেছেন।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a> এই মহাবিশ্ব হলো, <strong>&#8216;আহসানুল খালিকীন&#8217;</strong> মহান প্রভুর এক অপরূপ শিল্পকর্ম। এই ভাবে বিন্দু থেকে সিন্ধু পর্যন্ত সমগ্র মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সৌন্দর্য, সুর, শৃঙ্খলা, পরিমিতি, রুচি, কোমলতা ও স্বকীয়তা বিদ্যমান।</p>
<div class="image-container">
  <img loading="lazy" decoding="async" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/1.jpg" alt="" width="500" height="650"><br />
  <img loading="lazy" decoding="async" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/2.jpg" alt="" width="500" height="650">
</div>
<style>
.image-container {
  display: flex;
  gap: 20px;
  justify-content: center;
  align-items: center;
  flex-wrap: wrap;
}</p>
<p>.image-container img {
  max-width: 100%;
  height: auto;
}</p>
<p>@media (max-width: 768px) {
  .image-container {
    flex-direction: column;
    gap: 20px;
  }
}
</style>
<p>মানুষকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সৃষ্টিকারী আমাদের মহান রব, দ্বীনের প্রতি যেরূপ আবেগ দিয়েছেন&nbsp; অনুরূপভাবে নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যবোধকেও মানুষের ফিতরাতের মধ্যে বপন করে দিয়েছেন। এ কারণে মানুষ তাঁর সৃষ্টির সূচনাকাল থেকেই সঠিক, সুন্দর ও ভালোর মতই নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যের দিকেও ছুটে চলেছে। সকল পয়গাম্বর-ই মানুষকে তাওহীদের পাশাপাশি সুন্দর ও নান্দনিকতাকেও শিখিয়েছেন। এই বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হযরত পয়গাম্বর (স) – এর জীবনও সৌন্দর্য, লাবণ্য, সুষমা ও নান্দনিকতার উপমায় ভরপুর। <strong>রাসূলে আকরাম (স)- এর নেতৃত্বে প্রথম মুসলিম প্রজন্ম তথা সাহাবীগণ মদীনায় তাঁদের মসজিদ, তাঁদের কিবলা, তাঁদের আজান, তাঁদের স্থাপত্য, তাঁদের হস্তশিল্পে এবং শহরকে গড়ে তুলেছিলেন। এভাবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁরা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রথম দৃষ্টান্ত রেখে যান। &nbsp;ফলশ্রুতিতে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার প্রথম বীজ মদীনার সমাজেই রোপিত হয়েছিলো। সমগ্র ইতিহাকাল ধরে মুসলমানদের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণাকে গঠনের ক্ষেত্রে তাওহীদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং সদকায়ে জারিয়া, আমলে সালেহ করার নিয়ত ও চিন্তা, শিল্প ও চারুকলার বিভিন্ন শাখার বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।</strong> ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতার উৎস হলো, কোরআন ও সুন্নত। মূলত ‘ইহসান’ নামক মূলনীতি (সবকিছুকেই সুন্দরভাবে করা ও সর্বদা সর্বোত্তম আচরণ করার নীতি)–ই হলো এই শিল্পকলা ও নান্দনিকতার মূলভিত্তি। ইহসান যেমন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে, একইভাবে তা আত্মিক ও শারীরিক নান্দনিকতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। সাদামাটা হওয়া, যথার্থ উপযোগিতা, প্রশান্তিজ্ঞাপক হওয়া, ব্যবহারযোগ্যতা, সাশ্রয়ী হওয়া, বিনয়ভাব প্রকাশ করা, স্বাভাবিকতা এবং ইহসানের আখলাক এগুলো হলো ইসলামে শিল্পভাবনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।</p>
<div class="image-container"><img loading="lazy" decoding="async" class="" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/3.jpg" alt="" width="500" height="650"></div>
<p>&nbsp;ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতা শিল্প ও নান্দনিকতার অসংখ্য সব মহাকীর্তি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইট ও পাথরে জ্ঞান ও হিকমতকে নকশা করে নান্দনিকতার মূর্তপ্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা মসজিদসমূহ, সুর থেকে হৃদয়ে বয়ে যাওয়া সঙ্গীত, সচেতন দ্বীনদারীর মধ্য দিয়ে জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগের ফল হিসেবে গড়ে উঠা শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এবং যতটা সম্ভব সূক্ষ্ম দ্বীনদারীর ছাপ বহনকারী অসংখ্য স্থাপত্যকর্মের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প শুধু পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে শুধুমাত্র একটি শৈল্পিক অলঙ্করণের মতো সূক্ষ্মভাবে গাঁথাই হয়নি, একইসাথে তা পরকালের অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আত্মা ও হৃদয়ের আধ্যাত্মিক আবহতেও গভীর ছাপ রেখেছে।</p>
<p>এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পাথরখণ্ডগুলো মেহমেদ আগা ও খোজা সিনানের মত বিখ্যাত সব স্থাপত্যবিদের হাতে মসজিদ, ইমারত, সরাইখানা, ফোয়ারা ও সেতুতে রূপান্তরিত হয়ে একটি সৌন্দর্য ও অর্থবহতা তৈরি করেছে। সুলতান আহমেদ, সুলেইমানিয়া, সেলিমিয়া ও অন্যান্য মসজিদসমূহ লাভী, লামী ও দেদে এফেন্দি ও ইত্রি বেয়- এর রঙ, ছন্দ ও সঙ্গীতের স্পর্শে অনুরণিত হয়েছে। সুলেয়মান চেলেবি, ফুজুলী, ইউনুস এমরে ও রুমির বালাগাত ও ফাসাহাতে ভাষা ও সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা ক্যালিওগ্রাফি, জলরঙ ও মনোরম টাইলসের মাধ্যমে ইসলামী শিল্প ও নান্দনিকতার শ্রেষ্ঠ উপমাকে প্রদর্শন করেছে। ইসলামী শিল্পের এই অমূল্য নান্দনিক কর্মসমূহের সামনে মানুষ তার বিস্ময় ও মুগ্ধতা লুকাতে পারে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলামী সভ্যতা কেবলমাত্র জ্ঞান, চিন্তা ও ইরফানের সভ্যতাই নয়, একই সাথে তা নান্দনিকতা ও শিল্পের সভ্যতাও বটে।&nbsp;</p>
<div class="image-container"><img loading="lazy" decoding="async" class="" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/image_2026-02-24_15-28-45.jpg" alt="" width="500" height="650"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignleft" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/image_2026-02-24_15-31-50.jpg" alt="" width="443" height="667"></div>
<p>&nbsp;আধুনিক যুগে এসে ইসলামী সভ্যতা তাঁর নান্দনিকতা ও শিল্পমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীরতাকে হারানো শুরু করেছে। <strong>ইসলামের শিল্প ও নান্দনিকতার ধারণা আমাদের শহর, মেট্রোপলিস, মেগাপলিসগুলোতে তো নয়ই, আমাদের মসজিদ স্থাপত্য ও শিক্ষাকেন্দ্রসমূহেও প্রতিফলিত হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য ইসলামী শিল্পকলার অনেক দিক শুধুমাত্র চর্চার অভাবে আজ বিলুপ্তির পথে!</strong> এক্ষেত্রে মুসলিম&nbsp; উম্মাহ বিগত কয়েক শতক ধরে যে কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছে ইসলামী শিল্পকলা বিলুপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এর প্রভাব রয়েছে। মুসলমানগণ অতীতে শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে অসাধারণ সব উপমা সৃষ্টি করলেও, সেই উপমাসমূহের উপর ভিত্তি করে আধুনিক যুগের নান্দনিকতা ও শিল্পের দৃষ্টিকোণকে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মৌলিক ছাপ ও কাজ তৈরিতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।</p>
<p>শিল্প হলো এমন একটি বিষয়, যেখানে নির্দিষ্ট কোন একটি কাজের নান্দনিক অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেটাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবে শুধুমাত্র কিছু ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। শিল্পের অনেক মৌলিক শাখাকে উপেক্ষা করে সেটাকে শুধুমাত্র সঙ্গীত, নাটক, সিনেমার মতো ভিজুয়্যাল কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ মনে করা এবং এই ক্ষেত্রগুলোর ছায়াতলে আটকে পড়া অনেক বড় একটি সমস্যা।</p>
<div class="image-container"><img loading="lazy" decoding="async" class="" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/02/the-nasir-al-mulk-mosque-royalty-free-image-1580500453.jpg" alt="" width="760" height="508"></div>
<p>একইভাবে, শিল্প ও নান্দনিকতার ক্ষেত্রে মুসলমানরা শতাব্দীকাল ধরে যে শিল্পকর্মগুলো সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর মাধ্যমে তাঁরা শিল্প, সৌন্দর্য ও পরিশীলিত রুচিবোধকে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে মেটাফিজিক্স ও অতীন্দ্রিয়তাকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়ার যে মনোভাব, এর প্রভাবে ইসলাম ও শিল্পকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা রীতিমত ভুল একটি চিন্তা।</p>
<p>পরিশেষে বলতে হয়, শুধুমাত্র অতীতের শিল্পকর্মসমূহকে প্রদর্শন করে ইসলামী শিল্পকলা ও নান্দনিকতাকে তুলে ধরা ও পরিচিত করানো সম্ভবপর নয়। ইসলামী শিল্পকলার ধারণাকে আধুনিক যুগে আবারও সকল বৈচিত্র্যসহ মৌলিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করা এবং সমগ্র মানবজাতির প্রশংসার জন্য উপস্থাপন করা, সৌকর্যময়তার প্রতীক হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আল্লাহর সৌন্দর্যে সম্মানিত হতে ইচ্ছুক সকল মুমিনদের উপর একটি &nbsp;আবশ্যকীয় দায়িত্ব।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong>&nbsp;<a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> মুসলিম, ঈমান, ৪।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> আস-সাজদা, ৭৭।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/art-and-aesthetics-in-islamic-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16588</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জুমুয়াতুল বেদা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/jumuatul-wida/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/jumuatul-wida/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 17 Feb 2026 10:34:24 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16571</guid>

					<description><![CDATA[&#8220;আয় মাহে রমজান, আল-বেদা&#8221;-&#8220;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8221;-প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শুনেছি-তবু আজো রমজানের মাসে মাঝে মাঝে কানে বেজে উঠে আয় মাহে রমজান, আলবেদা-আয় মাহে রমজান, আলবেদা! বাড়ীর সংলগ্ন আমবাগ; সেই আমবাগে গাঁয়ের ছোট মছজিদ; রোজার মাসে তারাবীর নামাজে গাঁয়ের মুছল্লীরা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&#8220;আয় মাহে রমজান, আল-বেদা&#8221;-&#8220;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8221;-প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শুনেছি-তবু আজো রমজানের মাসে মাঝে মাঝে কানে বেজে উঠে আয় মাহে রমজান, আলবেদা-আয় মাহে রমজান, আলবেদা!</p>
<p>বাড়ীর সংলগ্ন আমবাগ; সেই আমবাগে গাঁয়ের ছোট মছজিদ; রোজার মাসে তারাবীর নামাজে গাঁয়ের মুছল্লীরা ভেঙ্গে পড়ত। ইমামতী করতেন মুনশী কছিমুদ্দীন সাহেব। অমন বিনয় নম্র ব্যবহার, অমন হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি আর কোথাও দেখি নাই; অমন ভক্তি গদগদ অমৃতবর্ষী কেরায়াত আর কোথাও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। শরীয়তের শাসনের জন্য তিনি কাউকে কখনও জামাতে আটকে দেন নাই, কারো বিবি তালাকের ফতোয়া জারি করেন নাই। কারো পীঠে কখনো দোররা মারার হুকুমের কথা ভাবেন নাই। অথচ গাঁয়ের ছোট-বড় সবাই বিনা প্রতিবাদে তাঁর কথা মেনে চলত।</p>
<p>সে আমবাগানে ছিল বহু-বহুকালের পুরানো গাছ-আম, গাব, বট। আম গাছের গায় সুরুঙ, গাব গাছের গায় গোদ, বটের জটে মছজিদের লাগ বহু স্থান রেখেছিল ছেয়ে। মছজিদের চারপাশে ছিল নতুন-পুরাতন অগণ্য কবর। আর আমার মনে ছিল তখন বাল্যের অপার বিশ্বাস: দুনিয়ার কোন বিস্ময়ই এ বিশ্বাসকে হার মানাতে পারত না। এই মায়াময় পরিবেশে অবস্থিত মছজিদে দাঁড়িয়ে যখন মুনশী সাহেব তাঁর সুন্দর গম্ভীর ছন্দোময়ী কণ্ঠে উচ্চারণ করতেন, &#8216;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8217;, &#8216;আয় মাহে রমজান, আলবেদা&#8217;, তখন বুঝতাম না কিছুই, অথচ কি একটি প্রিয় বস্তু হারানোর অজ্ঞাত বেদনায় মন টন টন করে উঠত।</p>
<p><strong>কিন্তু রমজানকে কেন এই বেদনাময়ী সম্ভাষণ? উপবাসের মাস-এই মাস চলে যাচ্ছে, এতো স্বাভাবিক অবস্থায় খুশী হওয়ারই কথা ছিল। সে খুশীর বদলে মুছলমানের কণ্ঠে এ ব্যথার বাণী কেন?</strong></p>
<p>ব্যক্তির জীবনে, প্রাচুর্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রাচুর্য সব সময়ে সম্পদ নয়; প্রাচুর্যে বিপদও আছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচুর্য হতে আসে বিলাস, বিলাস হতে আসে ব্যাসন। সে বিলাস-ব্যাসনে অবশেষে মন ভেঙ্গে পড়ে, আত্মা হাঁপিয়ে উঠে। তাই প্রাচুর্যের আপদকে শাসনে রাখার জন্য প্রয়োজন সংযমের। সাময়িক উপবাস সেই সংযম অনুশীলনের অন্যতম পথ। বেশী খেয়ে পেটের অসুখ ঘটিয়ে বসলে যে চিকিৎসক খানাপিনার ব্যাপারে লঙ্ঘন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই একই শ্রেণীর কারণে এ উপবাসের ব্যবস্থা। এ হিসাবে রমজানের রোজা মানুষের দুর্বল মনে নতুন শক্তির সঞ্চার করে, তার পীড়িত আত্মাকে দেয় শান্তি। ব্রত হিসাবে, সৎ কাজের সহায়ক হিসাবে স্বেচ্ছায় উপবাসকে বরণ করে নিলে মনে যে অপূর্ব শক্তির সৃষ্টি হয়, একথা বহু ধর্মের বহু মনীষী অকুণ্ঠ কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। সেই জন্য রমজান মাসের শেষ শুক্রবারে স্থানীয় মুছলমানেরা জুমা মছজিদে সমবেত হয়ে মাতমের সুরে তাদের বেদনা জ্ঞাপন করে:</p>
<p style="padding-left: 40px;">আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া শাহরাল কোরআন,<br />
আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া আমমারাল কুলুব<br />
আলবেদা-আলবেদা, ইয়া শাহরা রমজান।</p>
<p style="padding-left: 40px;">(হে কোরানের পবিত্র মাস, তোমায় সালাম।<br />
হে হৃদয় শক্তি সঞ্চয়কারী মাস তোমায় সালাম,<br />
বিদায়&#8230; বিদায় হে মাহে রমজান!)</p>
<p>রমজান সংযমের মাস। খাঁটি মুছলমান রমজানের প্রথমেই সংকল্প করে: আমি ষোল আনা রোজা রাখব দেহের রোজা, মনের রোজা, চোখের রোজা, মুখের রোজা। মানুষের দিলকে সাফ করবার জন্য এই যে নিয়ত, এই যে কোশেশ, এ রমজানের মাসকে এক বিরাট মর্যাদা দান করেছে। তাই রছুলুল্লাহ বলেছেন, রমজানের আগমনে বেহেস্তের দুয়ার খুলে যায়, আর দোজখের দুয়ার সব রুদ্ধ। আর এই জন্যই জুমুয়াতুল বেদার দিনে মুছল্লীরা হাজির হয়ে বার বার উচ্চারণ করে:</p>
<p>আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া শাহরাল মাগফেরাতে ওয়াল আতকে মিনান্নিরান। &#8216;হে ক্ষমা ও দোজখ হতে বাঁচার মাস, তোমায় সালাম!&#8217;</p>
<p>মানুষের জীবনে যত বড় দুঃখ ঘটতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে অনশনের দুঃখ। অনশনের জ্বালায় ধার্মিক খোদাকে অভিশাপ দেয়, জননী সন্তানকে বিক্রি করে, সতী নারী পরকে দেহদান করে, কেউ বা গলায় দড়ি দিয়ে এত প্রিয় যে জীবন তাকেও ত্যাগ করে। এত বড় যে দুঃখ তাও প্রতিবেশী ধনীরা নিজ চোখে দেখেও সব সময় বোঝে না; কারণ জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তো তারা কখনো এ দুঃখ অনুভব করে নাই। আব্রাহাম লিঙ্কন গরীবের ঘরে জন্মেছিলেন, গরীবের দুঃখ-বেদনার খবর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই দুস্থ জনগণের কল্যাণে তিনি তাঁর দেশের ধনী ও প্রতিপত্তিশালী অভিজাতদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম ঘোষণা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ধনীর ঘরে যারা জন্মলাভ করে যুগে যুগে দেশে দেশে প্রধানত তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভুত্ব শক্তি পরিচালনা করে আসছে। এরা যদি দুস্থজনগনের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন না হয়, তবে সে দুস্থদের কল্যাণমূলক কাজ এদের দিয়ে সম্যকরূপে সম্পন্ন হওয়ার তো কথা নয়। এ ধনী সন্তানেরা নিজেরা যদি অনশন করে, তবেই অনশন পীড়িতদের প্রতি এদের যথোপযুক্ত সহানুভূতি হওয়ার একটা সঙ্গত সম্ভাবনা ঘটে।</p>
<p>জঠর জ্বালা কি, এ যারা না জানে, রমজানের রোজা তাদেরে সেই শিক্ষা দেয়। জনগণের দুঃখ নিজ জীবন দিয়ে বুঝবার জন্য গান্ধীজী চলতেন রেল-স্টীমারের তৃতীয় শ্রেণীতে, কাপড় পরতেন হাঁটু পর্যন্ত। জনগণের দুঃখ বুঝবার জন্য তাদের সঙ্গে কার্যগত সহানুভূতি সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য মহানবী তাঁর মদীনা জীবনের ঐশ্বর্যের দিনেও অনেক সময়ই তাঁর ক্ষুধার্ত পেটে বেঁধে রাখতেন নিষ্করুণ পাথর। <strong>তিনি বলতেন-রোজ হাসরে আমি এই দুস্থদের সঙ্গেই উত্থান করব। দুস্থ মানবতার জন্য এই যে গভীর মহিমাময় দরদ, রমজান মানুষকে তারই মন্ত্রে দীক্ষা দিতে চেষ্টা করে।</strong></p>
<p>মানুষের দুঃখ বুঝবার জন্য রমজানের সাহায্যে এই যে প্রস্তুতি, আল্লার পথের যারা সত্যিকার পথিক, তারা এই সুযোগকে মনে করে আল্লার তরফ হতে এক পরম নেয়ামত। রমজান শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে, এ নেয়ামতের পথ হয়ে যাবে রুদ্ধ, একথা ভেবে তারা হয়ে পড়ে আকুল। তাই তারা এ মহান সুযোগের সম্ভাবিত অবসানের ব্যথায় অধীর হয়ে মছজিদে সমবেত হয়। কোন জাতীয় বিপদ ঘটলে যেমন সবাই মিলে দুঃখ করে, রোজাদারেরাও তেমনি সবাই সকরুণ স্বরে বলতে থাকে-</p>
<p style="padding-left: 40px;">বিদায়-বিদায়-হে বন্ধু রমজান, বিদায়:<br />
আলবেদা আলবেদা,<br />
আয় মাহে রমজান,<br />
আলবেদা।*</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>[*রেডিও পাকিস্তানের সৌজন্যে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত “ইব্রাহিম খাঁ রচনাবলী-১” থেকে সংগৃহীত।]</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/jumuatul-wida/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16571</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতা; রাষ্ট্রের সীমা পেরিয়ে এক চিন্তার উত্তরাধিকার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 26 Jan 2026 17:39:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16484</guid>

					<description><![CDATA[আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে আমরা ইতিহাসের যে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছি, তাতে অনেক সময় ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের সীমাবদ্ধ ও সংকুচিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু এগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো মোটেও ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি বা অবসানের তারিখ নয়।</p>
<p>কারণ ইসলামী সভ্যতা কখনোই কোনো একটি রাষ্ট্রনির্ভর, নিছক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড়ায়নি। রাষ্ট্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল বটে, কিন্তু তা কখনোই একমাত্র ভিত্তি ছিল না। ইসলামী সভ্যতা কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বা ক্ষমতাকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা নয়। হ্যাঁ, ক্ষমতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা ছিল বৃহত্তর এক সভ্যতাগত ব্যবস্থার অংশমাত্র। ইসলামী সভ্যতা মূলত একটি সামগ্রিক সভ্যতা; যার কেন্দ্রে ছিল এক সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি, একটি চিন্তাধারা, একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনদর্শন। সেই দর্শনের আলোকে গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চা, শহর-স্থাপত্য, শিল্পকলা, সাহিত্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক কাঠামো।</p>
<p>এ কারণেই বলা হয়, হক ও শক্তিশালী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সভ্যতার যাত্রা কখনো বিলীন হয় না। ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, সেসব অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোথাও উপনিবেশিক শোষণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা ছিল ভয়াবহ; কোথাও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এতকিছুর মধ্য দিয়েও সেই সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন, শহরচিন্তা ও জ্ঞানগত উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।</p>
<p>সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্ঞান। বইয়ের পাতায়, আলেম ও চিন্তকদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের সিলসিলার মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা আজও জীবিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যগুলি, মসজিদ, মাদরাসা, সেতু, নগর পরিকল্পনার নিদর্শন, নিজেদের নীরব ভাষায় সেই সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। পাথরে খোদাই করা হাকিকতের রূহ, কারুকার্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা দর্শন আজও আমাদের সামনে উপস্থিত।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতায় শহর পরিকল্পনা ছিল গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল। পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব নগর; যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ‘শহরের রূহ’ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই রূহ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে। এক বিন্দু পরিমাণও সে রূহ থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি।</strong></p>
<p>শিল্পকলার প্রতিটি শাখায়; গান, কাব্য, ক্যালিওগ্রাফির রেখায় রেখায় আমরা দেখি সভ্যতার রূহানি ও আধ্যাত্মিক দিক। সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্বকে বোঝার যে চিন্তা সিলসিলা, তা আজও বিদ্যমান। মানবিক মূল্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব, ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য; সবই ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।</p>
<p>রমজান থেকে ঈদ, জিয়াফত থেকে সামাজিক উৎসব সবকিছু আজও আমাদের জীবনে এক গভীর রূহানি আবেশ নিয়ে উপস্থিত।</p>
<p>রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে, কিন্তু সভ্যতা তখনই ধ্বংস হয়, যখন মানুষের চিন্তাগত, নৈতিক, জ্ঞানগত, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক স্তর থেকে সেই সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ মুছে যায়। ইসলামী সভ্যতা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজও নানা রূপে, নানা মাত্রায় আমাদের মাঝে বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা ও রাষ্ট্র: সম্পর্ক ও বুঝাপড়া</strong></p>
<p>এখানে একটি মৌলিক সভ্যতাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি, সভ্যতা ও রাষ্ট্র কখনোই একার্থক নয়। সভ্যতা মূলত মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, আখলাক, জ্ঞান, রুচিবোধ, নান্দনিকতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সমষ্টিগত রূপ; আর রাষ্ট্র হলো, সেই সভ্যতাগত জীবনের শাসন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি সাময়িক কাঠামো। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের পেছনে থাকা সভ্যতাগত চিন্তা ও মূল্যবোধ যুগের পর যুগ ধরে বহমান থেকেছে। ইসলামী সভ্যতা এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছে।</p>
<blockquote><p>ইসলামি সভ্যতায় রাষ্ট্র কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না; রাষ্ট্র ছিল একটি উসিলা বা মাধ্যম। রাজনীতি এখানে গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র পথ নয়; বরং রাজনীতি ছিল আখলাক সমৃদ্ধ সমাজ, নৈতিক নগর, সাংস্কৃতিক ভারসাম্য এবং জ্ঞানচর্চার সহায়ক শক্তি। এই কারণেই ইসলামি সভ্যতায় রাজনীতিকে কখনোই সর্বগ্রাসী করা হয়নি; বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা ও জ্ঞান সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।</p></blockquote>
<p>ইসলামী সভ্যতা আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র একটি মাধ্যম, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রাজনীতি এখানে কখনোই গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র উপায় ছিল না; বরং রাজনীতি ছিল একটি উসিলা। রাষ্ট্র ও রাজনীতি নৈতিক সমাজ, আখলাক সমৃদ্ধ নগর, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন এবং জ্ঞান ও রুচিবোধের সেবক হিসেবে কাজ করত।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আলেমদের জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব দৃঢ় হয়, মানুষ তার আত্মিক শান্তি খুঁজে পায়, রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল এসবের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা। এখানে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ ছিল ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অবকাঠামো, যা রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়েও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, মুসাফিরখানা, খাদ্য ব্যবস্থা, পানি ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছিল। আধুনিক রাষ্ট্র যে সামাজিক সেবাগুলোকে আজ ‘ওয়েলফেয়ার’ বলে চিহ্নিত করে, তার বড় অংশই ইসলামী সভ্যতায় ওয়াকফের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হলেও সমাজ ভেঙে পড়েনি; সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ রাজনীতি, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা, নগর বিনির্মাণ, সবকিছুই ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।</p>
<p>এই ইবাদতসম রূপেই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়েছিল। <strong>নগরগুলো মানুষের জন্য গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়। এমনকি কোথাও ক্ষমতার প্রকাশ থাকলেও, এক পর্যায়ে তা মানুষের কল্যাণের দিকেই নিবেদিত হতে বাধ্য হতো। কারণ সমাজ, জ্ঞান ও আলেমদের ভূমিকা ছিল আখলাক বিনির্মাণে কেন্দ্রীভূত।</strong> ফলশ্রুতিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ইসলামি সভ্যতা মানবতাকে দিয়ে গিয়েছে। কারণ ইসলামি সভ্যতার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না রাষ্ট্রকে, সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রকে বা নির্দিষ্ট কিছু দ্বারা দখল করা। একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সকলের কল্যাণ।</p>
<p>ব্রিটিশ জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করতে শিখেছি যে রাষ্ট্র দখল করলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়, বা কোনো কিছুকে দখল করে নিলেই সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এটিও আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মিরাস নয়। আমাদের পূর্বপুরুষগণ একটি সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিলেন, যেখানে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, জ্ঞান ও চিন্তা, শহর, স্থাপত্য, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি থেকে পরিবেশ সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি সিভিলাইজেশনাল বা সভ্যতাগত ক্ষেত্র, রাষ্ট্র বা দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</p>
<p>এখানে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ হল, এই সভ্যতা বিনির্মাণের কাজটি সকল মানুষ করতে পারত। এই কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো সমাজ, এবং সমাজ শক্তিশালী হতো। সমাজ শক্তিশালী হলে সেখান থেকে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসত। অর্থাৎ এই চিন্তাধারা মূলত মানুষকে কনভেন্স করত, মানুষের উপর প্রভাব সৃষ্টি করত। মানুষ নিজের আকল খাটিয়ে তার সঠিক কাজের ক্ষেত্র, অবদানের জায়গা, নিজের উপকারের ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারত এবং সে অনুযায়ী অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমরা সেই জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছি।</p>
<p>পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের উপর একচ্ছত্রভাবে রাজনীতি করেছে, কিন্তু সেই রাজনীতি বহুক্ষেত্রেই আমাদের স্বাধীনতা দেয়নি। তারা চাপিয়ে দেওয়া শিখিয়েছে, জোরপূর্বক দখল, ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনীতি চাপিয়ে দেওয়া, ঋণ চাপিয়ে দেওয়া। কৃষি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে শোষণ এবং শোষণ নিয়ে কিছু বলা যাবে না, এই ধরনের চিন্তা চাপিয়ে দেওয়া; সবই তারা করেছে। অথচ ইসলামি সভ্যতার মূল পন্থা ছিল ইক্বনা অর্থাৎ কনভেন্স করা। কনভেন্স করেই এগিয়ে যাওয়া।</p>
<p>এই কনভেন্সের সবচেয়ে বড় নমুনা আমরা পাই প্রতিটি স্থাপত্যে। স্থাপত্য যখন চিন্তার ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেটিও ছিল কনভেন্সের একটি অংশ। মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিশীলতা, সর্বোচ্চ চিন্তা এবং সর্বোচ্চ হাকিকতের দিকে ধাবিত করার একটি মাধ্যম ছিল এটি। তাই ইসলামী সভ্যতায় ইস্তাম্বুল থেকে আন্দালুস, ইস্পাহান থেকে কুতুব মিনার- কোনো স্থাপত্যই শুধু ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়। এগুলো ছিল একেকটি চিন্তা ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>স্থাপত্য: চিন্তা ও আখলাকের দৃশ্যমান ভাষা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় স্থাপত্য ছিল এক ধরনের নীরব দাওয়াত। এটি কেবল ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়; বরং চিন্তা, দর্শন ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েই মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিবোধ, সর্বোচ্চ শালীনতা এবং তাওহিদের চিন্তার দিকে আহ্বান জানানো হতো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার স্থাপত্য কখনোই ইট-পাথরের সমষ্টি ছিল না। কর্ডোভার মসজিদের অসংখ্য খিলান বহুত্বের ভেতর ঐক্যের- ‘ওয়াহদাত’-এর ঘোষণা দেয়। আল-হামরার দেয়ালে খোদাই করা “লা গালিবা ইল্লাল্লাহু” কোনো সামরিক বিজয়ের ঘোষণা নয়; বরং ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের স্থায়ী স্মারক। একইভাবে ঝিনাইদহের মোহাম্মাদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানা, দারসবাড়ি (ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও কিছুটা হলেও টিকে আছে), খুলনার খান-জাহানের মসজিদও একইভাবে ওয়াহদাতের ঐক্যের দর্শন ফুটিয়ে তোলে।</p>
<p>অর্থাৎ প্রতিটি জায়গায়; এই সভ্যতা ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একই সাথে হক্ব ও হাকিকতের চিন্তা, যার প্রস্ফুটিত রূপ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সকল অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেটি পেরেছিল বলেই সেই চিন্তার ভাষা আজও আমাদের আন্দোলিত করে। এর ছোট্ট নমুনা হলো- প্রতিটি মসজিদের পাথর, যা এখনও যেন ধ্যানে মগ্ন। সৌন্দর্য যেন জিকিররত, জ্ঞান যেন এখনও নূর ছড়াচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বাংলার ইসলামী সভ্যতা: আখলাক ও মূল্যবোধের সভ্যতা&#8217;</strong></p>
<p>বাংলার ইসলামী সভ্যতা এবং বাংলায় ইসলামের আগমন ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ৩০০ বছর ধরে আলেমগণ, সুফি ও ব্যবসায়ীগণ আখলাকের দাওয়াত ও বাস্তব উপমা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এর ফলে সমাজ ও ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানসহ নানাবিধ উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এর ফলেই বিনা রক্তপাতে এখানে একটি বিজয় সাধিত হয়েছিল। এই বিজয়ের মূল ধারক ও বাহক ছিলেন সুফি দরবেশ, আলেম ও আখলাকসম্পন্ন ব্যবসায়ীগণ। তাঁরা এখানে সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে এই সুফি আলেমদের প্রভাবে ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের আখলাক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার ফলে যুগ যুগ ধরে সকল ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে একটি শক্তিশালী, আস্থাশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। দুনিয়ার চার ভাগের একভাগ অর্থনীতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। কৃষি, সমুদ্রাঞ্চল স্থাপনা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও শহর, নদীমাতৃক অঞ্চলে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সবকিছুই শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছিল।</p>
<p>ব্রিটিশ উপনিবেশের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও প্রায় ২০০ বছরের নিকৃষ্ট শোষণ চালানো হয়। আমরা হারিয়েছি আমাদের হাফেজা, স্থাপনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনি কাঠামো, সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক নীতি, বিশাল ওয়াক্‌ফ জমি, বনাঞ্চল ও প্রাণ প্রকৃতি। তবু এই ক্ষতির মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, পারিবারিক মূল্যবোধ আজও টিকে আছে।</p>
<p><strong>ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ষাট গম্বুজ মসজিদ আমাদের দেখায়, তাঁরা শুধু জিকিরের মজলিশে নিমজ্জিত ছিলেন না; পানির নহর, অর্থনীতি, কৃষি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কত ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন।</strong> প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা এমন সিলসিলা তৈরি করেছিলেন, যেখানে নদী, বাতাস ও আলোকে উপেক্ষা করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।</p>
<p><strong>চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানায় আজও মানুষের খাবারের ব্যবস্থার নিদর্শন দেখা যায়।</strong> অর্থাৎ একত্রে বসা ও মানুষের সাথে মেশার সংস্কৃতি আজও রমজান, ঈদ, শবে বরাত, মিলাদ ও মিরাজের মাধ্যমে বিদ্যমান।</p>
<p>শরফুদ্দিন আবু দাওয়ামার রেখে যাওয়া ফিকহি সিলসিলা, হাদিসের দারস, দারসবাড়ির জ্ঞান; সবই আজও সুফি আলেমদের মাদরাসা ও মসজিদের মাধ্যমে নানাভাবে বিদ্যমান। মক্তব সংস্কৃতি, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, একত্রে ইফতার, সহযোগিতা, গোশত বণ্টন, একজনের দ্বারা বহু মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার সংস্কৃতি আজও জীবিত।</p>
<p>সব সংকটের মধ্য দিয়েও আমরা একদিনের জন্যও আজান বন্ধ হতে দেইনি। নবী(সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো পরাস্ত হয়নি। কারণ বাংলার ইসলামী সভ্যতা কোনো স্থান দখল করেনি, স্থানকে আপন করে নিয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকাশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকল্প, অর্থনীতি ও কৃষির পুনরুত্থান সবই তাঁদের অবদান।</p>
<p>এত শোষণের পরও যদি এত কিছু টিকে থাকে, তবে এটুকুই বলা যায়, আমরা এমন একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক, যার রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পতন হলেও চিন্তা ও আখলাকি সিলসিলা শক্তভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি সভ্যতায় প্রতিটি শহর নিরাপদ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানরা শাসন করলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করেছে।</p>
<p>এই সভ্যতা কোনো ধর্ম, জ্ঞান বা ভাষাকে নষ্ট করেনি, বরং বিকশিত করেছে। এর বড় প্রমাণ বাংলা ভাষা। মুঘলদের চারবাগ সংস্কৃতি, পানির ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনায় জান্নাতের ধারণাকে দুনিয়ার নৈতিক ও শালীন রূপে প্রকাশ করা হয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা আজও একসাথে বসবাসের অবস্থান ধরে রাখতে পারছি, এটাই ইসলামী সভ্যতার অবদান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা কেন বিলিন হয়নি?</strong></p>
<p>সভ্যতা তখনই বিলুপ্ত হয়, যখন মানুষের চিন্তা থেকে নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও হাকিকতের অন্বেষণ মুছে যায়। যে সভ্যতা আখলাককে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, সে সভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের ভিত নিজেই ক্ষয় করে। ইসলামী সভ্যতা কখনোই আখলাককে প্রান্তে ঠেলে দেয়নি; বরং সভ্যতা ও আখলাককে সমার্থক করে তুলেছিল। এই কারণেই রাজনৈতিক পতন, উপনিবেশিক শোষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসলামী সভ্যতা সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতা কখনোই শুধু ক্ষমতা বা রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়নি। এটি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত, হাকিকত অন্বেষী এবং মানবতার কল্যাণমুখী এক সভ্যতা। মানুষকে সে দেখেছে সভ্যতা বিনির্মাণের কারিগর হিসেবে, আয়াত হিসেবে। ফলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লেও চিন্তা, আখলাক, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের সিলসিলা আজও বহমান।</strong> আন্দালুস থেকে আনাতোলিয়া, মদিনা থেকে বাগদাদ, শাম থেকে দিল্লি, ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকা; রাষ্ট্রীয় পতন সত্ত্বেও এই নগরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় জাগরণসহ নানা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের জন্য ছায়ার ভূমিকা পালন করেছে। ইবনে সিনা, ফারাবী, ফখরুদ্দিন রাজী, ইবনে খালদুনের মতো চিন্তকরা এমন জ্ঞান রেখে গেছেন, যার ওপর আজকের দুনিয়া এখনও দাঁড়িয়ে আছে।</p>
<p>এই সভ্যতা ইতিহাসকে জাদুঘরের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। আন্দালুস, বাংলা, মুঘল বা ইস্তাম্বুল; সবখানেই সুর এক, বাদ্যযন্ত্র আলাদা। রূহানি আবেশ ও আখলাকি পরশ একই। এ কারণেই ইসলামী সভ্যতা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের গভীরে প্রথিত হয়েছে, আজও যা প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক।।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16484</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া; ঐতিহাসিক শিকড় ও জাতিসত্তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Dec 2025 18:59:32 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16417</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি</strong></h5>
<p>মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসলে সেই ভিত্তিগুলিই। কারণ, এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার, কিংবা অঞ্চলভেদে ভিন্নভাবে চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই। এগুলোই ইসলামী চিন্তাধারা ও শরীয়তের কেন্দ্র, যার বাইরে ইসলামকে কল্পনা করা যায় না।</p>
<p>তবে আমার প্রশ্নটি কিছুটা ভিন্ন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নানা ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে। আমরা দেখি, প্রতিটি জাতিসত্তার রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ, ঐতিহ্য ও মানসিক গঠন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রশ্ন আসে, ইসলামী ব্যবস্থা কীভাবে এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে?</p>
<p>ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনো অঞ্চল ইসলাম গ্রহণ করলে সেখানে শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনও ইসলামের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজ জীবনে তিনভাবে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে মূল্যায়ন করেছেন,</p>
<p><strong>প্রথমত, সরাসরি গ্রহণ।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মৌলিক নীতির বিরোধী নয় এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রেও আপত্তিকর নয়, সেগুলো তিনি গ্রহণ করতেন। সমাজের জন্য কল্যাণকর ও ক্ষতিহীন উপাদানগুলোকে তিনি অনুমোদন দিতেন।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, সংযোজন বা সংস্কার করে গ্রহণ।</strong><br />
যে প্রথাগুলোর কিছু অংশ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল, সেগুলোর নেতিবাচক দিক বাদ দিয়ে, ইতিবাচক অংশকে ইসলামী নৈতিকতা যোগ করে নতুনভাবে প্রয়োগ করতেন। এর ফলে সমাজে এক নতুন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি হতো।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত, সরাসরি প্রত্যাখ্যান।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মূলনীতির বিপরীত, শিরক বা কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে- সেগুলো তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন।</p>
<p>অতএব, ইসলামের উসুল বা আসাসুল কুল্লিয়া, অর্থাৎ মৌলিক নীতিগুলোই ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি সঠিকভাবে বোঝা ও প্রতিষ্ঠা করা না গেলে, সংস্কৃতির ধারাটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই সমাজে এই নীতিগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা আলেম ও প্রজ্ঞাবানদের দায়িত্ব।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার আলেমগণ সর্বদা এই নীতিগুলোকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করতেন। ফলে ইসলামের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় মূলনীতি টিকে থাকত, আর পরিবর্তনশীল বিষয়ে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজন ঘটত।</p>
<p>যেসব বিষয়ে সময় ও সমাজের প্রয়োজনে পরিবর্তন আসত, সেখানে ইসলাম নমনীয়তা ও প্রজ্ঞা দেখিয়েছে। তবে “বিদআত” ধারণাটি এখানে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়।<br />
অনেকে মনে করেন, নবী করিম ﷺ এর যুগে না থাকা যেকোনো নতুন কিছুই বিদআত। কিন্তু তা সঠিক নয়। বিদআত হচ্ছে সেই কাজ, যা সুন্নতের বিপরীতে, ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী, এবং কেউ সেটিকে ইবাদতের অংশ বা সওয়াবের কাজ হিসেবে মনে করে।</p>
<p>অন্যদিকে, কোনো কাজ যদি ইসলামের স্থায়ী নীতির বিপরীত না হয়, বরং আঞ্চলিক প্রয়োজনে সমাজে উপকারী ভূমিকা রাখে, তবে সেটি ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীত কিছু নয়। বরং এটি সেই সমাজের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবেই টিকে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সংস্কৃতিতে ইসলামের বিশ্বজনীনতা</strong></h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে কোনো আলেম বা সুলতান কখনোই এমন প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করেননি।<br />
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি (তুরাস ও তামাদ্দুন) সবসময়ই ছিল বিস্তৃত, গভীর ও মানবিক। মুসলমানরা যখন বিভিন্ন ভূখণ্ডে গিয়েছে, তারা সেই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। যেমন তারা মানুষের অন্তর জয় করেছে, তেমনি গড়ে তুলেছে রাজধানী ও নগর, স্থাপত্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামো, এবং সমাজজীবনের বিভিন্ন রূপ।</p>
<p>প্রশ্ন হল, তারা এটি কীভাবে করতে পেরেছিল?<br />
ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায়, মদিনা ব্যতীত প্রায় সব ইসলামী রাজধানীতেই মুসলমানদের তুলনায় অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল বেশি। তবুও তারা সেখানে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করেছে। নিজেদের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় ও ভাষা সযত্নে রক্ষা করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, তারা কখনো একে হুমকি হিসেবে দেখেনি; বরং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ছিল তাদের পূর্ণ আনুগত্য, এবং শত শত বছর তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রেখেছে।</p>
<p>এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে ছিল ইসলামী সভ্যতার সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং উৎকৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ। এ ধরনের গভীর সহাবস্থান কেবল তখনই সম্ভব, যখন সভ্যতা তার মূল নীতিতে অবিচল থেকে পারিপার্শ্বিক বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে।</p>
<p>একইভাবে, মুসলমানদের উসূলী ভিত্তি, সাংস্কৃতিক কাঠামো, ইবাদত ও শরীয়তের কোনো দিকই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা সংকটে পড়েনি। বরং তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অটুট রেখেই ইসলামী আদর্শের সীমার মধ্যে থেকে সবকিছু সুচারুভাবে পালন করতে পেরেছে। এভাবেই ইসলাম, একদিকে তার চিরন্তন নীতিতে অবিচল থেকেছে, অন্যদিকে মানবজাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে এক বিশ্বজনীন সভ্যতার রূপ ধারণ করেছে।</p>
<p>আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, <strong>৬৯ হিজরিতে লালমনিরহাটে সাহাবী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</strong> অর্থাৎ, ইসলামের আগমন এই ভূখণ্ডেও ঘটেছিল প্রাচীনকালেই। সাহাবীগণ, আলেম ও সুফিগণ এ অঞ্চলে এসে মসজিদ, খানকা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।</p>
<p>তবে এসব প্রতিষ্ঠান কেবল মুসলমানদের আকৃষ্ট করা, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি, প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা, আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। খানকা ও দরগাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতেন এবং নিরাপদ বোধ করতেন। সেখানে খাবারের ব্যবস্থা ছিল, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগও ছিল সবার জন্য। একইভাবে, মুসলমানরা যেমন নামাজ-রোজা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করেননি, তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এভাবেই ইসলামী সংস্কৃতি এখানে বিকশিত হয়েছিল এক মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহাবস্থানমূলক রূপে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বৈচিত্র্যেই ঐক্যের সৌন্দর্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা খাদ্য, পোশাক, স্থাপত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উপকারী ও নান্দনিক উপাদান গ্রহণ করেছে, কিন্তু কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে একরকম করে দেয়নি। যেমন, নোয়াখালীর বাজরা মসজিদ ও ইস্তাম্বুলের সুলতান ফাতিহ মসজিদ এক নয়,<br />
দিল্লির জুমা মসজিদ ও ইস্পাহানের মসজিদও একই কাঠামোয় নির্মিত নয়।<br />
কিন্তু সবগুলোতেই দেখা যায় এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য; উচ্চ রুচিবোধ, নান্দনিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও ভারসাম্য।</p>
<p>এই সৌন্দর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনই ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বলকান থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জীবনধারা আজও রুচিশীল, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ।</p>
<p>এর কারণ একটাই, তারা ইসলামের স্থায়ী মূলনীতির প্রতি অনুগত থেকেও, প্রতিটি সমাজে কল্যাণকর, রুচিসম্পন্ন ও উপযোগী সংস্কৃতি বিকাশ করেছে। এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মহত্ত্ব ও সাফল্যের আসল রহস্য।</p>
<p>খাদ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য ছিল। <strong>ইসলামী সভ্যতায় খাদ্যের স্থায়ী নীতি ছিল, এটি যেন হালাল, স্বাস্থ্যকর ও উপকারী হয়।</strong> বাকিগুলো অঞ্চল, জলবায়ু ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈচিত্র্যময় রূপ পেয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম একদিকে বৈশ্বিক হলেও, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে মানানসই একটি সংস্কৃতির ধারা তৈরি করতে পেরেছে— যা আজও টিকে আছে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মুসলমানরা প্রতিটি স্থানে স্থানীয় স্বতন্ত্রতা ও সংস্কৃতি রক্ষা করেই এক সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল সংস্কৃতি উপহার দিয়েছে। ইসলামের আঞ্চলিক অভিযোজন সর্বত্র সুরক্ষিত ছিল। স্থানীয় খাবার, পোশাক, স্থাপত্য, উৎসব— সবকিছুই নিজস্ব আঙ্গিকে টিকে থেকেছে, আবার ইসলামের স্থায়ী নীতি ও নৈতিক শিক্ষা একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ইসলামী সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান</strong></h5>
<p>এখানে প্রশ্ন আসে, ইসলামী সভ্যতার সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান কীভাবে কার্যকর ছিল? এটি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে ইসলামী সংস্কৃতি এবং আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।<br />
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মূলত নিয়ন্ত্রণ, ভোগবাদ এবং কিছু গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গড়ে উঠেছে। তারা সংস্কৃতিকে এক ধরনের বিনোদন বা সাময়িক খোরাক হিসেবে ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তরকে নয়, কেবল ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করে। তাদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী; তাই তা শক্তিশালী হলেও আত্মিক নয়।<br />
কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি সামষ্টিক, আত্মিক ও রুহানিকেন্দ্রিক। ইসলামী সংস্কৃতি মানুষের আত্মা, নৈতিকতা এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।</p>
<p>যেমন ঈদের সংস্কৃতিতে আমরা দেখি, সবাই একসঙ্গে মাঠে নামাজ আদায় করছি, কোলাকুলি করছি; কোরবানির ঈদে একই গোশতের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, সবাই একে অপরকে গোশত বিলিয়ে দিচ্ছি। রমজান মাসে সৃষ্টি হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শবে মেরাজ, শবে বরাত প্রতিটি উপলক্ষেই আমরা প্রতিবেশীদের, এমনকি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও খাবার দিই। এখানেই নিহিত ইসলামী সংস্কৃতির মানবিকতা ও সহাবস্থান।</p>
<p>আমাদের কবিতার আসর, মিলাদ, জিয়াফত, খানকা ও দরগার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবই ছিল উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমাজকেন্দ্রিক। <strong>এখানে সব শ্রেণি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারতেন। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজে পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে দৃঢ় করেছিল।</strong></p>
<p><strong>অন্যদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এমন নয়। তাদের চলচ্চিত্র, সংগীত বা বিনোদনমূলক উপাদানগুলো প্রায়ই অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও মূল্যবোধহীনতার দিকে ধাবিত করে।</strong> তাদের সংস্কৃতি পরিবার ভাঙে, সমাজকে বিভক্ত করে। তারা সাময়িক আনন্দ পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আত্মিক ক্ষয় ডেকে আনে। যেমন মদ্যপান বা অতিরিক্ত ভোগবিলাস সাময়িক আনন্দ দিলেও তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।</p>
<p>আবার, ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিটি অনুষ্ঠান ও ইভেন্ট সার্বজনীন ও কল্যাণমুখী। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক দিক থেকেও বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করেছে। আমাদের অঞ্চলে খানকা ও দরগাগুলো ছিল আধ্যাত্মিক বলয়, যেখানে মানুষ আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজসেবার অনুশীলন করত। এখান থেকে মানুষ রুহানী শক্তি অর্জন করত, আত্মশুদ্ধির পথ খুঁজে পেত।</p>
<p>এই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে অবদান রেখেছিল। এটাই ছিল ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক সাফল্য—যা কেবল ধর্ম নয়, মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছিল।<br />
কিন্তু আজ আমরা যদি ইতিহাসকে ছোট করে দেখি, তবে এই গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>উপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক ক্ষয়</strong></h5>
<p>পাশ্চাত্য ও ওরিয়েন্টালিস্ট অনেক লেখক ইসলামের এতোসব প্রসারকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সত্য হল, ইসলামী সংস্কৃতি সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, পরিছন্নতা, আতিথেয়তা, অপচয়ের বিরোধিতা, পারস্পরিক বন্ধন ও প্রতিবেশীর অধিকার; এই মূল্যবোধগুলোর মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<p>যেখানেই মুসলমানরা গিয়েছে, তারা পরিছন্নতা শিখিয়েছে, পারিবারিক বন্ধনকে শক্ত করেছে, সমাজবদ্ধ জীবনধারা তৈরি করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে, কুর্দ অঞ্চলে বা আফ্রিকার অনেক স্থানে দেখা যায়- মুসলমানদের সংস্পর্শে থাকা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পরিবারগুলোও পরিচ্ছন্নতা ও পারিবারিক নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত হয়েছে।<br />
যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না, সেখানে সমাজ অনেক বেশি অব্যবস্থাপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ইসলামী সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা মানবিক উন্নয়নের পথে সমাজকে পরিচালিত করেছে।</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়েছে উপনিবেশিক শাসনের কারণে। আফ্রিকার উপকূল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বলকান; সর্বত্র মুসলমান সমাজ কখনও ব্রিটিশ, কখনও ফরাসি, কখনও কমিউনিস্ট আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছে।<br />
এসব আগ্রাসনের ফলে ইসলামী সভ্যতার মূল্যবোধনির্ভর সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার অন্তর্গত মূল্যবোধগুলোই ছিল সেই সাংস্কৃতিক উপাদান, যেগুলোর মাধ্যমে মুসলমানরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিল।</p>
<p>কেবল খাবার, পোশাক বা ভাষা দিয়ে কোনো সভ্যতা গঠিত হয় না; এগুলো সভ্যতার উপাদানমাত্র। আসল সভ্যতা গঠিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামষ্টিক মানসিকতার মাধ্যমে। এই মূল্যবোধ আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এগুলো বিকশিত হয় শিক্ষা, খানকা, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে। মুসলমানরা ঠিক এইভাবেই সমাজে সভ্যতার ভিত স্থাপন করেছিল।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ, খাদ্যসংস্কৃতি আরবে এক রকম, এশিয়ায় এক রকম, তুরস্কে এক রকম, আর বাংলায় একেবারে ভিন্ন। কিন্তু মূল্যবোধ একটাই। একজন মুসলমান খাবার নষ্ট করবে না, অপরিচ্ছন্ন রাখবে না, হালাল ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করবে।<br />
একজন আফ্রিকান মুসলমান, কেরালার মুসলমান বা বাঙালি মুসলমান; সবাই একই নীতিতে বিশ্বাসী। তারা খাবার অপচয় করবে না, অতিথিকে সম্মান করবে এবং ন্যায্য বণ্টনের নীতি মেনে চলবে।</p>
<p>এই যে একই মূল্যবোধ, একই নৈতিকতা, জাতপাত বা শ্রেণিভেদ অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেতনা; এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মূল।<br />
মানুষ মানুষ হিসেবে সম্মান পায়, এই নীতিতেই সমাজে নিরাপত্তা আসে। বাংলায় ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা এত বেশি হওয়ার কারণও এটিই। এখানে কাউকে জোর করে মুসলমান বানানো হয়নি; বরং মানুষ ইসলামী সংস্কৃতির মানবিক রূপে আকৃষ্ট হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলার ইসলামী সংস্কৃতি বোঝাপড়ায় আমাদের অবস্থা এমন কেন?</strong></h5>
<p>আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রায় পাঁচশ বছরের এক অবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র কাঠামো মুসলমানরা এই উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে দেবদেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু মুসলমানরা এর বিপরীতে নামাজকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি। একইভাবে, পারস্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং সবাই যেন নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>এই প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা তৈরি করেছিলেন কমন সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে সবাই অংশ নিতে পারত। <strong>যেমন, খাবারের সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি এমন এক খাবার, যা মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাদান, আড্ডা, জিয়াফত, খানকা ও মসজিদ; এসব স্থান ছিল উন্মুক্ত সামাজিক পরিসর, যা পারস্পরিক বন্ধন ও সহাবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।</strong></p>
<p>এসব কারণেই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া আমাদের কেমন হওয়া উচিত, সেই নিয়েও ভাবনা জরুরি। মূলধারার ইসলামী সংস্কৃতি কি এদেশীয় মুসলমানের সংস্কৃতি থেকে আলাদা হবে? নাকি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই একরূপ সাংস্কৃতিক আবহ ও এজেন্ডা আমাদেরও অনুসরণ করতে হবে? নাকি বরং ইসলামের সীমারেখার ভেতর থেকেই আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা উচিত?</p>
<p>একটি রাষ্ট্র শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পারে কেবল তখনই, যখন তার সংস্কৃতি শক্তিশালী, গভীর এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তাই ইসলামী সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি, নতুন করে বিশ্লেষণ ও আলোচনা করতে হবে।<br />
পাঁচশ বছরের সেই দীর্ঘ রাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, সামাজিক সিলসিলা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শক্তি—আমরা আজ তা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। প্রশ্ন হলো—কখন এবং কীভাবে এই ক্ষয় ঘটল?</p>
<p>আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে, দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর আঘাত হেনেছিল। প্রথমত, তারা আমাদের স্মৃতি (মেমোরি) ধ্বংস করেছে। আমাদের নিজস্ব শিক্ষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিবর্তে তারা এমন এক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সম্পূর্ণভাবে ঔপনিবেশিক স্বার্থে নির্মিত।<br />
তারা ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীতে বিকল্প সাংস্কৃতিক কর্মসূচি তৈরি করেছে এবং সেগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ইসলামের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য নতুন উৎসব সৃষ্টি করেছে। আমাদের ভাষাকে বিকৃত করেছে, বিদেশি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে “আধুনিকতা”র নামে আমাদের ওপর আরোপ করেছে।</p>
<p>যখন আমরা স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করিনি, তখন তারা শক্তি ও সহিংসতার মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা পরিণত হয়েছি এক আত্মপরিচয়হীন জাতিতে। আমাদের স্মৃতি হারিয়ে গেছে, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়েছে, আমরা এক গভীর পরিচয় সংকটে নিপতিত হয়েছি।</p>
<p>আজও সেই সংকট আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না, আমাদের সংস্কৃতির মূল পদ্ধতি (মেথডোলজি) ও উপকরণ সম্পর্কে অজ্ঞ। আমরা বিশ্বজনীন সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির পার্থক্য বুঝি না; আবার আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান সীমিত।</p>
<p><strong>আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ এর রিসালাত (বার্তা)-এর মূল দায়িত্ব এবং একজন মানুষ (বাশার) হিসেবে তাঁর সাধারণ মানবিক অভ্যাসগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতেও ব্যর্থ। এই কারণেই আজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছি।</strong><br />
অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ব্রিটিশ একাডেমিয়া, কলকাতাকেন্দ্রিক এক সাংস্কৃতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের অঞ্চলের সংস্কৃতিকে প্রদর্শনমূলক ও পূজ্য রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল, আমরা যেন নিজেদের সংস্কৃতিকে কেবল বাহ্যিক সাজে উপস্থাপন করি, কিন্তু তার ভেতরের আত্মা, দর্শন ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলি।</p>
<p>ফলস্বরূপ, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে এক প্রাণহীন প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে—যেখানে রয়ে গেছে কেবল বাহ্যিকতা, কিন্তু হারিয়ে গেছে ইসলামী সংস্কৃতির সেই আত্মিক ও নৈতিক মহিমা, যা একসময় এই উপমহাদেশকে আলোকিত করেছিল।</p>
<p>তাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, আইন, পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি প্রতিরক্ষা কাঠামো— সবকিছুই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে তারা একটি ক্ষেত্রকে আঞ্চলিক আবহের ছোঁয়া দিয়েছিল, আর সেটি হলো সংস্কৃতি। কিন্তু সেটিও প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও বিকৃত করার কৌশল মাত্র ছিল। এভাবেই আমাদের ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— যা একসময় আত্মিক শক্তি, মানবিক ঐক্য ও সামাজিক সংহতির উৎস ছিল— ধীরে ধীরে পরাধীনতার মানসিক শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়ে।</p>
<p><strong>তারা সংস্কৃতিকে মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাপিয়ে দেয়। বিভিন্ন চিন্তাধারাকে জোর করে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা তৈরি করে এক কলকাতা-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক মানসিকতা।</strong> এই উদ্দেশ্যে তারা প্রচুর লেখালেখি করেছে, বড় বড় কবি ও সাহিত্যিক গড়ে তুলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, সংসদ, মিডিয়া ও সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে এই ধারাই ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব আত্মপরিচয়কে বিকৃত ও বিলুপ্ত করে দেয়।</p>
<p>এর ফলস্বরূপ আমরা এমন এক বিভ্রান্ত ধারণায় অভ্যস্ত হয়েছি যে, বাঙালি মুসলমান এক স্বতন্ত্র সত্তা, যা আরব, তুর্কি, ইরানীয়, আফ্রিকান, মালয় বা ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। অথচ এটি একটি কৃত্রিম ও কলকাতা-কেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাধারার ফল, যার ভেতরে ইসলামের প্রকৃত রূহ অনুপস্থিত।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, এই চিন্তাধারার প্রভাবে এক রূহবিহীন ইসলাম তৈরি হয়েছে, যা মুসলমানদের সংস্কৃতির আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা চেয়েছিল, মুসলমানদের পোশাক, গান, খাবার, পারিবারিক সম্পর্ক ও জীবনযাপন যেন ব্রিটিশ উপনিবেশ বা কলকাতার ধ্যানধারার আদলে গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের পাঁচ শতাব্দীর নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সিলসিলা আজ ভুলে যাওয়া হয়েছে।</p>
<p><strong>অন্যদিকে, এক শ্রেণির মুসলমান আবার ইসলামী সংস্কৃতির মূল ধারণা না বুঝে আরবদের সংস্কৃতিকেই ইসলামী সংস্কৃতি হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে।</strong> কিন্তু এই দুই প্রান্ত, কলকাতাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ও অনুলিপিকৃত আরবীয় সংস্কৃতি; কোনোটিই ইসলামের প্রকৃত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়।</p>
<p>তাই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির সঠিক বোঝাপড়া এখন অত্যন্ত জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির নমুনা</strong></h5>
<p>এই আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, ইসলামী সভ্যতা স্থানীয় সংস্কৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতো। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নিচে বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিশ্বজনীনতার কতক উদাহরণ তুলে ধরা হলো।</p>
<p><strong>০১. ভাষা ও সাহিত্য</strong></p>
<p>আমাদের এই অঞ্চলের ভাষার ধারাবাহিকতায় পাল আমলে যে বাংলা ছিলো, তা একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিলো সেনরা। বাংলার পরিবর্তে সেনরা সংস্কৃত-কে সামনে এনেছিলো। এমনকি, বাংলা ভাষাকেই তারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। মুসলিমরা এসে সে বাংলাভাষাকে আবারো গতিশীল করে দিয়েছিলো। শুধু বাংলাই নয়, মুসলিমরা এতোটা উদার ছিলো যে, বাংলা ও সংস্কৃত—দুই ভাষাকেই একইসাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।</p>
<p><strong>বাংলার সুলতানরা উদারভাবে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সুলতান জালালউদ্দীন মোহাম্মদ শাহ কবি বৃহস্পতি মিশ্রকে &#8220;রায় মুকুট&#8221; উপাধী প্রদান করেন।</strong> হোসেন শাহী বংশের সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু ও সাহিত্যিকরা বাংলায় &#8220;রামায়ণ&#8221; &#8216;মহাভারত&#8217; অনুবাদ করেন। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। মুঘল শাসনামলেও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাংলা-সংস্কৃত ভাষার উন্নতিতে মুঘলরা যথেষ্ট অবদান রাখে। এসবই বাংলায় হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রমাণ করেন। অতএব, এটা সত্য যে, মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো।</p>
<p><strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিমরা যে এভাবে বাংলা ও সংস্কৃতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এলো, তা আবার ধ্বংস হয়ে যায় পলাশীর বিপর্যয়ের পর। ইংরেজদের “ডিভাইড এন্ড রূল” পলিসির ক্ষেত্রে এই ভাষার বিনির্মাণটাকেই কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা। ম্যাক্স মুলার ভারতের হিন্দুদেরকে আর্য বলে তাদের মাঝে সেনদের সেই পুরাতন মানসিকতা তুলে এনেছিলো। যার ফলে বহমান যে বাংলা ছিলো, সেটাকে সমূলে ধ্বংস করে সংস্কৃতকে জোর করে বাংলায় প্রবেশ করানো হয়েছে, যেনো মুসলিম শাসনামলের বাংলা এবং হিন্দুদের নতুন সংস্কৃত বাংলার মাঝে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়; আর শেষমেশ এ-নিয়েও যেনো হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। এবং, হয়েছেও তাই-ই।</p>
<p><strong>নতুন এই বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইংরেজরা প্রতিষ্ঠা করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ; নিজেরাই লিখেছে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, যেসব ব্যাকরণের মাধ্যমেই নতুন বাংলার সূচনা করা হয়। কেননা, এসব ব্যাকরণে সংস্কৃতকে সামনে রেখেই বাংলার নতুন রূপ দেওয়া হয়।</strong> আর এসবকে পরিচিত করাতে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজকে কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা; এবং নতুন এই বাংলাকে লেখ্য ভাষায় রূপ দিয়েছে কলকাতার সাহিত্যিকরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখাগুলো পড়লেই এসব বুঝা যায়। ঠিক এজন্যই কবি নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ এবং কবি গোলাম মোস্তফার চেয়েও এই জেন-জি প্রজন্ম রবী-শরৎ-বঙ্কিম-বিভূতিদেরকে ভালোভাবে চিনে।</p>
<p>এখানে এই প্রশ্নও উঠে আসে যে, ৫০০ বছর আগের মহাকবি আলাওল-এর বহমান বাংলাকে আমরা যেভাবে বুঝি না, তেমনি আমরা কেন প্রায় ২৫০ বছর আগের ঈশ্বরচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝি না? ভাষা যদি বহমান হয়, তাহলে আলাওলেরও ২৫০ বছর পরের বাংলা-তো অনেকটাই বুঝতে পারার কথা। কিন্তু, তা কেন হয় না?</p>
<p>যাকগে, এখান থেকে এই সিদ্ধান্তই পাওয়া গেলো যে, ইসলামী সভ্যতায় ভাষার সংস্কৃতিকে যদি বিশ্বজনীন হিসেবে গ্রহণ করা না হতো, তাহলে হয়তো আমাদের এই বাংলাকে এভাবেই পেতাম না; অথবা হয়তো একেবারেই হারিয়ে যেতো।</p>
<p><strong>০২. উৎসব ও গ্রামীণ সংস্কৃতি</strong></p>
<p>ভারত ও বাংলার উৎসব সংস্কৃতি কতোটা শক্তিশালী ছিলো তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়।<br />
<strong>যেমন- জহির উদ্দিন বাবর, ইলতুৎমিশ ২০% মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে গোটা উপমহাদেশ চালিয়েছেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক বলয় ও তার উৎসব গুলো।</strong> ব্রিটিশরা এসে যখন দেখল কোনভাবেই জনগণ থেকে ইসলামের প্রাণসত্তাকে সরানো যাচ্ছে না, বলয়কে নষ্ট করা যাচ্ছে না, তখন তারা বুঝতে পারলো শুধু জ্ঞান, ক্ষমতা, অর্থনীতি, নষ্ট করলেই হবে না বরং বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করতে হবে। তাই তারা বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্রদের দিয়ে মিরাজ, মিলাদুন্নবী ইত্যাদির বিপরীতে স্বরস্বতী, হলি, দেওয়ালী উৎসবকে ব্যাপকভাবে হাইলাইট করতে শুরু করলো, মক্কা বিজয় দিবসের দিন থার্টি ফার্স্টনাইট জাতীয় ভোগবাদী উৎসব নিয়ে এলো।</p>
<p>মুসলিম বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে রমজান, ঈদ, জন্ম, আকিকা, শবে বরাত, শবে মেরাজ, ঈদে মীলাদুন্নবী, মহররম বেশ আয়োজনের সাথে পালিত হতো।</p>
<p>এম এ রহিমের ভাষায়,</p>
<blockquote><p>“ঈদে মীলাদুন্নবীতে নবাব মুর্শিদকুলী খান রবিউল আউয়ালের প্রথম বারোদিন ভোজের আয়োজন করতেন। পুরো মুর্শিদাবাদ আলোকমালায় সজ্জিত করতেন। সেনাবাহিনী দিয়ে তোপধ্বনি দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মুজাফফর আলেম ওলামাদরে আপ্যায়ন করতেন। পরবর্তী বছরের জীবন ধারনের খরচের জন্য আলেম ও বিজ্ঞজনদের বিশাল অঙ্কের মুদ্রা উপহার দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ প্রথম বারোদিন আলেমদের নিয়ে সীরাত চর্চা করতেন। সীরাত চর্চার পাশাপাশি উন্মুক্ত ভোজের আয়োজন করতেন। তিনিও বিদ্বান ও অতিথিদের জন্য এতোবেশি পরিমাণ উপহার দিতেন যে, যেন ওলামায়ে কেরামগণ পরবর্তী বছর স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারে।”</p></blockquote>
<p>শবে বরাত নিয়ে এম এ রহিম তার বইয়ে বলেন, “উপমহাদেশের মুসলমানগণ শবে বরাত বহু আচার অনুষ্ঠান ও আমোদ স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদ্যাপন করতো। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক চারদিনব্যাপী এই উৎসব উদ্যাপন করতেন এবং এতবেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাত্রিকালও প্রকাশ্য দিবালোকের রূপ ধারণ করত। সমসাময়িক উৎসগুলো থেকে জানা যায় যে, শের শাহের একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিশতীর সঙ্গে শব-ই-বারাতের দিন সারারাত এবাদত বন্দেগি করেন। &#8216;বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে&#8217; এই উৎসব উদযাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার নবাবগণ বিরাট জাঁকজমকের সঙ্গে &#8216;শব-ই-বারাত&#8217; উদ্যাপন করতেন। বাড়িঘর আলোকমালায় সজ্জিত করা হতো এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মসজিদে ও বাড়িতে সারারাত নামাজ অদোয় করতেন। ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।”</p>
<p>রমজান নিয়ে বলেন, “উপবাস, সংযম, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্মেলনের সময় হিসেবে সে যুগের মুসলমানগণ &#8216;রমজান&#8217; পালন করত। তারা রমজানকে পবিত্র ও মঙ্গলজনক মাসরূপে গণ্য করত এবং খুশির সঙ্গে একে স্বাগত জানাত। <strong>বাংলায় মুঘল সৈন্যদের রমজান পর্ব পালনের উল্লেখ করে মীর্জা নাথান বলেন, ‘রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষদিন পর্যন্ত ছোটবড় প্রত্যেকে প্রত্যহ তার বন্ধুর তাঁবুতে মিলিত হতো। এটা একটা স্বাভাবিক রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক দিন সকলে পর্যায়ক্রমে একজন অভিজাত বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাত।</strong> সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের দেওয়া ভোজের পালা ছিল। সকলে সেদিন তার তাঁবুতে সময় কাটায়’।”</p>
<p>ঈদুল ফিতরে নিয়ে মুসলিম বাংলার উৎসবমূখর আয়োজন নিয়ে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বইয়ে আছে, “সেই যুগে খুব আমোদ-স্ফূর্তির সঙ্গে ঈদের নতুন চাঁদকে স্বাগত জানানো হতো। মীর্জা নাথানের ভাষায় এটা বর্ণনা করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন,<strong> ‘দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠতো এবং গোলন্দাজ সেনাদলের সকল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হতো। রাত্রির শেষভাগে, কামানের অগ্নি উদগীরণ শেষ হতো এবং এর পর শোনা যেতো ভারি কামানের আওয়াজ। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প’</strong>।”</p>
<p>“এথেকে বুঝা যায়, ঈদের আগমনে মুসলমানরা কতটা খুশি হতো। ঈদের দিনে সমস্ত মুসলমান আনন্দস্ফূর্তিতে মসগুল থাকত। স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রত্যেকে নতুন এবং উৎকৃষ্ট কাপড় পরিধান করত। চমৎকার পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানগণ প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথেপথে টাকা পয়সা ও উপহার দ্রব্য ছড়িয়ে দিত এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানগণ গরিবদেরকে ভিক্ষা দিত। &#8216;নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী&#8217; গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা &#8216;ঈদগাহ&#8217; ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দস্ফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে।”</p>
<p>আর কুরবানীর ক্ষেত্রে, মুসলমানগণ ঈদুল আজহার প্রভাতে সুন্দর কাপড়-চোপড় পরিধান করে এবং &#8216;তাকবীর&#8217; উচ্চারণ করতে করতে ঈদগাহ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে গমন করতো। সেখানে জামাতে তারা নামাজ আদায় করে এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, পরস্পরকে আলিঙ্গন করতো ও সম্ভাষণ জানাতো। অতঃপর তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাদের সাধ্যানুসারে তারা কোনো পশু, যেমন, গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি করতো। তারা গরিব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে এবং গৃহে ভোজের অনুষ্ঠান করতো। প্রত্যেক গৃহ ভোজানুষ্ঠান ও আনন্দ &#8216;স্ফূর্তিতে মুখরিত হয়ে উঠতো এবং সকল গৃহে আদর আপ্যায়ন চলতো। শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হতো এবং এই মহান উৎসবে তারা সকলে একত্রে আনন্দ করতো। মীর্জা নাথান লিখেছেন যে, &#8220;নামাজান্তে খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে, লোকেরা তাকে কাপড়-চোপড় ও টাকাপয়সা উপহার দেয়। গরিব দুঃখীদের সাহায্যের জন্য তার সম্মুখে টাকাপসয়া ছড়িয়ে দেওয়া হতো। দুঃস্থ লোকদের অনেকে এর দ্বারা তাদের অভাব দূর করে সুখি হতো। এই দিনে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীগণ একে অন্যের জায়গায় গমন করতো এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানাতো।</p>
<p>এছাড়াও, বিয়ের অনুষ্ঠান হতো খুবই জাঁকজমকভাবে। হিন্দু-মুসলিম দুই জাতি তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী বিবাহের কাজ সম্পন্ন করতো। পোশাক-পরিচ্ছদেও শালীনতা বজায় থাকতো। এক্ষেত্রে মুসলিমরা হিন্দুদেরকে জোর করতো না। অতএব, মূল কথা হচ্ছে, বাংলায় অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সংস্কৃতিকে কখনই দূরে ঠেলে দেয়নি। স্থানীয় আয়োজনের ধরনের সাথে মুসলিমরাও নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো।</p>
<p><strong>০৩. খাদ্য</strong></p>
<p>ড. এম এ রহিম বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতি ইতিহাস বইয়ে এই অঞ্চলের মুসলিমদের খাদ্যের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>“মুসলমান সমাজের উচ্চশ্রেণী সম্পর্কে আলোচনায় খাদ্যদ্রব্য ও পোশাক-পরিচ্ছদে তাদের বিলাসিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সিবাস্তিয়ান মানরিক এবং চীনা দূতগণের বর্ণনা থেকে মুসলমানদের খাদ্য সম্বন্ধে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। তাদের খাবার টেবিলে মুরগী, ভেড়া, গরু প্রভৃতির মাংসের তৈরি বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য পরিবেশন করা হতো। অনেক রকমের মিষ্টি ও ফলমূল খাদ্য-তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। শসা, লেবু, মুলা, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদির তৈরি নানা জাতীয় আচার ছিল মুসলমানদের খাদ্যের বিশিষ্ট অঙ্গ।”</p></blockquote>
<p>“সিবাসতিয়ান মানরিক বলেন, এগুলো ক্ষুধা বৃদ্ধি করত এবং আবার খাবারের দিকে আকৃষ্ট করতো। হিন্দুরা এ ধরনের উপাদেয় খাদ্য প্রস্তুত করতে এবং ক্ষুধা উদ্রেকের জন্য আচারের ব্যবহার জানত না। হিন্দুদের ভোজ ও সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের বর্ণনায় কোথাও আচারের কোনো উল্লেখ দেখা যায় না।বাংলা সাহিত্যে খাদ্য সম্বন্ধে বহু উল্লেখ আছে। জানা যায় যে, বাংলার মুসলমানরা মুরগী, মেষমাংস ও অন্যান্য মাংসের উপাচার পছন্দ করতো।”</p>
<p>“বাঙ্গালি মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে রুটিরও উল্লেখ আছে। তাছাড়া মাছ ও শাক-সবজি লোকের সাধারণ খাদ্য ছিল। বাংলার নদ-নদী ও জলাশয়ে নানা জাতীয় মৎস্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। এর মাটিতে জন্মাত বিভিন্ন প্রকারের শাক-সবজি। তাতে করে, এমনকি, মুসলমানদের মধ্যে সাধারণ লোকেরা ও তাদের খাবারের জন্য রকমারি মাছ, শাক-সবজির তরকারি প্রস্তুত করতে পারতো।”</p>
<p>“খিচুড়ি (সাধারণত ঘি বা তেলের সঙ্গে চাল ও লঙ্কা দিয়ে প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য) ছিল লোকের প্রিয় খাদ্য। এমনকি, উচ্চশ্রেণীর লোকদেরও খিচুড়ির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বার্ণিয়ারের মতে, খিচুড়ি সম্রাট শাহজাহানের খুবই প্রিয় ছিল। ইউসুফ আলীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নবাব আলিবর্দী খান ও তাঁর আমির ওমরাহ প্রায়ই তৃপ্তির সহিত খিচুড়ি খেতেন।”</p>
<p>“নানা প্রকার মাংসের উপাচার ও নানা রকমের আচার মুসলমানদের খাদ্যের, বিশেষ করে, উৎসব অনুষ্ঠানে খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। উৎসবাদিতে, যেমন বিবাহ ইত্যাদি উপলক্ষে হিন্দুরা সাধারণত মাছ, শাক-সবজি ও মিষ্টান্ন তৈরি করত। হিন্দুদের ভোজে মিষ্টান্ন ও দধি ছিল খাদ্য তালিকার একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। &#8216;মনসামঙ্গল&#8217; কাব্যগুলোতে লক্ষ্মীন্দরের বিয়ের ভোজের বর্ণনা থেকে উৎসবাদি উপলক্ষে হিন্দুদের খাবার সম্বন্ধে আভাস পাওয়া যায়। সিবাসতিয়ান মানরিক ও চীনা দূতদের বর্ণনানুসারে, মুসলমানদের খাদ্য তালিকার সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে।”</p>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসনামলে যেসব খাবার আবিষ্কার, প্রচলন বা বিশেষ রূপে বিকশিত হয়েছে—তার সংখ্যা অনেক। তুর্কি, আফগান, আরব, পারসিক, মুঘল ও মধ্য এশীয় রন্ধনশৈলীর প্রভাবে উপমহাদেশের খাবারে এক বিশাল পরিবর্তন আসে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের আনিত বা উন্নত করা খাবারের মধ্যে রয়েছে,</p>
<ul>
<li>১. বিরিয়ানি (ঢাকাই/কাচ্চি)। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির মূল শিকড় মুঘল রন্ধনশৈলীতে। মুসলিম নবাবরা বিশেষভাবে এটিকে জনপ্রিয় করেন।</li>
<li>২. কাবাবের বিভিন্ন ধরন। যেমন- সিক কাবাব, বটি কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামী কাবাব, রেশমি কাবাব; এসবই তুর্কি–পারসিক উৎস থেকে এসে বাংলায় জনপ্রিয় হয়।</li>
<li>৩. নেহারি। মূলত দিল্লি–লখনউ থেকে বাংলায় আসে এবং মুসলিম শাসনকালে নবাবদের টেবিলের খাবার হিসেবে পরিবেশিত হতো।</li>
<li>৪. মোরগ পোলাও/চাপলি পোলাও। মুঘল দরবারে পোলাওয়ের বিভিন্ন রূপ ছিল। এর বাংলা রূপ হলো মোরগ পোলাও</li>
<li>৫. হালিম। আরব/পারস্যে এর উদ্ভব হয়েছে। মুসলিম শাসনকালেই বাংলায় বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে।</li>
<li>৬. কোরমা/কোর্মা। পারসিক &#8220;কুরমাহ&#8221; থেকে এসেছে। মুসলিম শাসকরা এর দুধ-বাদাম-ঘৃতসমৃদ্ধ বিলাসী রূপ প্রতিষ্ঠা করেন।</li>
<li>৭. রোস্ট (বাংলা মুসলিম স্টাইলে)। নবাবি-আওয়াধি রান্নার প্রভাবে বাংলায় রোস্টের নিজস্ব রূপ তৈরি হয়।</li>
<li>৮. শাহী টুকরা/শাহী টোস্ট। পারসিক ‘শিরমাল–ডেজার্ট’ থেকে রূপান্তরিত। এটি ছিলো মুসলিম নবাবদের প্রিয় মিষ্টি।</li>
<li>৯. ফিরনি। আরব–পারসিক দুধ-চালভিত্তিক ডেজার্ট থেকে এই অঞ্চলে অভিযোজিত।</li>
<li>১০. সেমাই/শিরখুরমা। আরবীয় সেমোলিনা ডেজার্টের মতো করে তৈরি হতো; মুসলিম শাসনামল থেকেই ঈদের প্রধান খাবার হিসেবে পরিচিত।</li>
<li>১১. বাকরখানি। ঢাকায় নবাব বংশের আমলে এটি তৈরি হয়।কাশ্মীর-লখনৌ-এর নান-বাইদের হাত ধরে পরিচিতি লাভ করে।</li>
</ul>
<p>অর্থাৎ, ইসলাম উন্নত সাংস্কৃতিক উপাদান গ্রহণ করেছে। বাংলায় বা ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো জিনিস না থাকলেও পারস্যে থাকলে, যদি তা ইসলামী নীতির বিরোধী না হয়, তবে সেটি এখানেও গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জীবনমান ও সাংস্কৃতিক মান উন্নত করা।</p>
<p><strong>মোদ্দাকথা হচ্ছে, স্থানীয় খাবার সংস্কৃতির পুরোটাই যেমন ইসলামী সভ্যতায় জারি ছিলো, তেমনি অন্যান্য অঞ্চলের স্থানীয় খাবারও এখানে এসে পরিচিত হয়ে ইসলামী সভ্যতায় খাদ্য সংস্কৃতিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তবে এখানে বলাই বাহুল্য যে, হারাম খাবারের বিষয়গুলো তো অবশ্যই পরিত্যাজ্য।</strong></p>
<p><strong>০৪. সংগীত</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনামলে বাংলা সংগীত তিনটি দিক থেকে পরিবর্তিত হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(ক) মধ্য এশীয়–পারসিক সুরের প্রভাব।</strong><br />
এর ফলে তুর্কি, পারসিক, আরবীয় সুর ও রাগ-রাগিনীর ধরণ বাংলায় প্রচলিত হতে থাকে। পারসিক মাহফিল, দরবারি সংগীত, সুফি সঙ্গীত—এসব বাংলায় নতুন রূপে গড়ে ওঠে।</li>
<li><strong>(খ) কবিতা–গান–দর্শনের সংমিশ্রণ।</strong><br />
মুসলিম শাসকেরা কবিতা, সঙ্গীত, মুশায়েরা, কীর্তন-সদৃশ কণ্ঠসঙ্গীতকে উৎসাহ দিতেন। ফলে বাংলা কবিগান, মুর্শিদী, মারফতি, বাউলধারা—এসব এক নতুন বিকাশ লাভ করে।</li>
<li><strong>(গ) সুফি সঙ্গীতের আগমন।</strong><br />
দরবেশ–সুফিদের মাধ্যমে কাসিদা, হামদ, নাত, গওয়ালিবর্ণী জিকির, এমনকি চিশতি ও সুফি দরবারের সঙ্গীতধারা বাংলায় প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলার ফোক গানের অর্ধেক সুফি-মুসলিম প্রভাবে গড়া—এটা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য। কাজী নজরুল ইসলাম, দুলাল শাহ, মজনু শাহ, কুতুবুদ্দিন, আউল শাহ—এরা কবিগান, পালাগান, মারফতি গানকে চালিত করেছেন।</li>
</ul>
<p>এরপর, মুসলমানদের সমাজে সংগীতের গুরুত্বের কারণে সংগীতপ্রীতি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) রাজদরবার ও নবাবি দরবারে সংগীত।</strong><br />
এটি ছিলো বাংলার সুলতান, মুঘল সুবেদার, নবাবদের দরবারে সংগীত ছিল রাজকীয় বিনোদনের অংশ। তারা দাদরা, ঠুমরি, গজল, কাওয়ালী, দরবারি রাগ, কিরানা, রাম্পুর–সাহাসওয়ান ঘরানা-কে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারেও সঙ্গীতজ্ঞদের বিশেষ মর্যাদা ছিল।</li>
<li><strong>(২) সুফি-দরবেশদের সমাজে সংগীত।</strong><br />
এসব সংগীত ছিল আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ। চিশতিয়া, কাদেরিয়া, সুফি দরবেশরা সংগীতকে মানুষের অন্তর জাগ্রত করার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। সুফিদের অবদানে বাংলায় মারফতি গান, মুর্শিদী গান, নবী-বন্দনা, কাওয়ালী ও ধর্মীয় জিকিরের সুরধারা ধারাগুলো বিকশিত হয়। বাংলায় মুসলমানদের বৃহৎ একটি অংশ এই গানগুলোকে ধর্মীয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করতো।</li>
</ul>
<p>বাদ্যযন্ত্রে মুসলমানদের অবদান নিয়ে বলতে গেলে তাদের কয়েকটি অবদানের কথা সামনে রাখতে হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) নতুন বাদ্যযন্ত্র উপহার বা প্রচলন।</strong><br />
শুরুতেই আসবে তবলার কথা। তবলা আজ সারা ভারত–বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র। ইতিহাস অনুযায়ী এটি মধ্য এশীয় মুসলিম বাদ্যযন্ত্র “তব্বল” থেকে এসেছে। তবলার পেছনে আমীর খসরু (১৩শ শতক)–এর অবদান সবচেয়ে আলোচিত। এরপর আসবে সর্মিন্দল বা সেতার। সেতার শব্দটি “সেহ-তার” (পারসিক: তিন তার) থেকে এসেছে। মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞদের হাত ধরেই এই যন্ত্রটি ভারতীয় রূপ পায়। তৃতীয়ত, রুদ, তানপুরা বা রুবাব। মধ্য এশীয় মুসলিম সুরে ব্যবহৃত এই যন্ত্রগুলি বাংলা-মুসলিম দরবারে জনপ্রিয় হয়।</li>
<li><strong>(২) বিদ্যমান যন্ত্রের উন্নয়ন।</strong><br />
মুঘল দরবারের উস্তাদরা সরোদ, সারেঙ্গি, তানপুরা—এসবকে পরিশীলিত করে তোলেন। তারের সংখ্যা বৃদ্ধি, টোনের গাম্ভীর্য, মৃদু সুরের পরিশুদ্ধতা—এসব উন্নয়ন মুসলিম উস্তাদদের অবদান।</li>
<li><strong>(৩) যন্ত্রসঙ্গীতে নতুন ঘরানা তৈরি।</strong><br />
মুসলিম উস্তাদরা নতুন নতুন, যেমন- গয়তরী (গায়েকী) আঙ্গ, মীন্ড-যুক্ত বাদন, মুঘলাই আলাপ, দরবারি স্টাইল ইত্যাদি বাদন-শৈলী সৃষ্টি করেন। এই শৈলীগুলোই পরবর্তীতে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মূল ভিত্তিতে স্থান পায়। আবার, দরবারি সঙ্গীতের ঘরানায় বাংলায় মুসলমান সঙ্গীতশিল্পীরা পাটিয়ালা ঘরানা ও রাম্পুর-সাহাসওয়ান ঘরানা তৈরি করেন। বিশনপুর ঘরানাতে মুসলিম উস্তাদদের প্রভাব ছিল বিশাল। এগুলোই পরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে স্থায়ী কাঠামো দেয়।</li>
<li><strong>(৪) রাগ-রাগিনীর নতুনত্ব আনয়ন।</strong><br />
বাংলায় মুসলমানরা মালকোষ, ইয়ামন, দারবারি কানাড়া, কৌশিকি, মালহার, তোড়ি ইত্যাদি রাগ উন্নত করে তোলেন। এসব রাগ মধ্য এশীয় প্রভাবে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় হয়।</li>
</ul>
<p>ইসলামী সংস্কৃতির সাথে যেহেতু সুফী ঘরানাটা বেশ ভালোভাবে জড়িত, তাই এটা নিয়ে দুয়েকটা কথা বলা প্রয়োজন। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় সুফি সাধক, দরবেশ, ফকিরদের মাধ্যমে যে সংগীতধারা গড়ে ওঠে, তাকেই সাধারণত বাংলার সুফি সঙ্গীত বলা যায়। এই সঙ্গীত মূলত পারসিক–আরবি আধ্যাত্মিক কবিতা, ইসলামি দর্শন, এবং বাংলার লোকজ সুরের এক অসাধারণ মিশ্রণ। ইশকে-মাজাজি, ইশকে-হাকিকি, নফসের পরিশুদ্ধি, মানবতার ধর্ম ইত্যাদি এসব গানের মূল প্রাণ।</p>
<p>শাহ জালাল ইয়েমেনী, শাহ নেসার বাহাদুর, শিকার সুলতান, দাতা কর্নি—এদের মতো বহু সুফি বাংলায় সুফি সঙ্গীত নিয়ে আসেন। তাঁরা জিকির, কাওয়ালী, হামদ-নাত, ফারসি মর্শিয়া, রব্বানি কবিতা–এসব সুরধারা সামনে আনেন। এরপর সময়ে সময়ে বাংলার লোকগানের সাথে সুফি দর্শনের মেলবন্ধন ঘটে। গ্রামবাংলার পালাগান, বাউল সুর, ঢোল-একতারা—এসবের সঙ্গে সুফিরা তাওহিদ, ইশক, নফস, পরকাল মুর্শিদ–ভক্তি মিশিয়ে দেন। ফলে তৈরি হয় বাংলার নিজস্ব সুফি লোকসঙ্গীত।</p>
<p>মুর্শিদী গানে সাধারণত মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা, মানবতার শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি—এসব বলা হয়। এসব গানের ক্ষেত্রে গাজী আব্দুল করিম, আব্দুল লতিফ ও হাছন রাজার নাম উল্লেখযোগ্য। মারফতি গানের ভেতরে রুহানি ইশক, আত্মজিজ্ঞাসা, দেহতত্ত্ব, নফস ও কল্পনার যুদ্ধ, মানবিকতার দীক্ষা ইত্যাদি থাকে। কেননা, এখানে ‘মারফত’-এর অর্থ পরিচয়—অন্তরের আল্লাহকে চিনে নেওয়া। এরপর সুফি প্রভাবিত বাউল সংগীত ও সুরে আরবি–ফারসি শব্দ ও  ধর্মীয় রূপক স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এছাড়াও, হামদ, নাত, কাওয়ালী তো আছেই। বাংলায় কাওয়ালী ভারতের মতো বিশাল নয়। সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদী এবং চিশতি দরবেশরা কাওয়াল দল নিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। ঢাকায় মুঘল যুগে কাওয়ালদের মর্যাদা ছিল।</p>
<p><strong>০৫. মুসলিম বাংলার সংস্কৃতিতে নারীদের অবস্থা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় মুসলমানগণ তাদের মেয়েদের ব্যাপারে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে এবং তা স্বীকারও করে। <strong>বালিকারা যাতে করে তাদের ধর্মের মূলনীতি, কোরআন পাঠ ও ধর্মের ক্রিয়া-কর্ম সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সেজন্যে পিতারা তাদের কন্যাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন। বালিকাদেরও বালকদের মতো &#8216;বিসমিল্লাহখানি&#8217; অনুষ্ঠান দ্বারা অক্ষর-পরিচয় শুরু হতো এবং তারা একই মক্তবে বালকদের সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করতো।</strong></p>
<p>গদাই মল্লিকের পুথি বা <strong>&#8216;মল্লিকার হাজার সওয়াল&#8217;</strong> (মল্লিকার হাজার প্রশ্ন) নামে অভিহিত কাব্য থেকে জানা যায় যে, মল্লিকা নাম্নী মুসলমান বালিকা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, যে পুরুষ তাকে সাহিত্য-বিষয়ক বিতর্কে পরাজিত করতে পারবে, তাকেই বিয়ে করবেন। বহু রাজপুত্র ও বিদ্বান ব্যক্তি তার সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হন, কিন্তু সকলেই মল্লিকার নিকট পরাজয় বরণ করেন। অবশেষে জনৈক সুফি পণ্ডিত আবদুল হাকিম গদা তার হাজার প্রশ্নের উত্তরদান করে তাকে বিতর্কে পরাজিত করেন। অতঃপর মল্লিকা তাঁর বিজয়ীকে বিয়ে করেন।</p>
<p>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমান রমণীগণ যুদ্ধক্ষেত্রেও স্বামীদের সহগমন করেছেন। এই উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাসে মুসলমান রমণীদের এরূপ বীরত্বব্যঞ্জক কার্যক্রম মোটেই বিরল কিছু ছিলো না। বাংলার মুসলমান শাসনামলে বহু রমণী ছিলেন যারা তাদের সাহস, শক্তি ও বীরত্বের জন্যে খ্যাতি লাভ করেন।</p>
<p>নবাব অলীবর্দী খানের বেগম শরফুন্নেসা ছিলেন একজন উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্না ও গুণান্বিতা মহিলা। তিনি তার গুণের মহিমায় সে যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি স্বামীর যুদ্ধাভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের কঠোরতা ভোগ করেন। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তিনি তার স্বামীর একজন মূল্যবান উপদেষ্টা ছিলেন।</p>
<p>নবাব আলিবর্দীর কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌলাহর মাতা আমিনা বেগম তার সুরুচি ও শিষ্টাচারের গুণে সে যুগের সমাজজীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়া মহিলা এবং অনাথ ও গরিব-দুঃখীদের আশ্রয়স্থল। কোমল হৃদয়া আমিনা বেগম অন্যায়কারীর প্রতিও কোনোরূপ কঠোরতা সহ্য করতে পারতেন না। ইংরেজদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সিরাজদ্দৌলাহ্ আলিবর্দীর পীড়িত অবস্থায় প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করেন। সে সময় তিনি রাজস্বের হিসাবে বহু অনিয়ম এবং জাহাঙ্গীরনগরে ঘষেটি বেগমের দিউয়ান রাজা রাজবল্লভ কর্তৃক বিপুল অর্থ আত্মসাতের তথ্য আবিষ্কার করেন। রাজা রাজবল্লভ সঠিক হিসাব না দেওয়ায় এবং তসরূপকৃত অর্থ রাজকোষে প্রত্যর্পণ না করায়, সিরাজদ্দৌলাহ্ তাকে মুর্শিদাবাদে কঠোর পাহারায় আবদ্ধ করে রাখেন। আমিনা বেগম পুত্রের নিকট তার পক্ষে মধ্যস্থতা করেন। মায়ের আদেশ রক্ষার্থে সিরাজদ্দৌলাহ্ রাজবল্লভকে মুক্ত করে দেন।</p>
<p>সিরাজদ্দৌলাহর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ছিলেন রমণীদের আদর্শ। কিভাবে সামান্য মর্যাদার একজন নারী স্বীয় গুণাবলীর বলে মুসলমান সমাজে খুব সম্মানিত মর্যাদায় আরোহণ করতে পারেন, তা তার জীবনে প্রতিভাত হয়েছে। সামান্য পরিচারিকার অবস্থা থেকে লুৎফুন্নেসা একজন যুবরাজের সহধর্মিণী এবং নবাবের বেগমের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়া ও উচ্চ অন্তঃকরণ সম্পন্না মহিলা।</p>
<p><strong>এছাড়াও, দারাশিকোর কন্যা ও যুবরাজ মুহম্মদ আজমের স্ত্রী জাহানজেব বানু বেগম মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। গউস খানের বিধবা স্ত্রী একদল মারাঠা লুণ্ঠনকারীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে ভাগলপুরে তার গৃহ রক্ষা করেন। আহমদনগরের চাঁদসুলতানার বীরত্বগাঁথা সুবিদিত। মহব্বত খাঁর বিরুদ্ধে নূরজাহানের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইতিহাসের একটি সুপরিচিত ঘটনা। এর বাইরে মহিলারা বিবাহ অনুষ্ঠানাদি ও শোভাযাত্রায়ও যেতেন।</strong></p>
<p><strong>এ-সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীরা গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না। তারা গৃহের বাইরেও যেতে পারতেন। কিন্তু তাদের পর্দা পালন করতে হতো এবং গৃহের বাইরে চলতে অবগুণ্ঠন ব্যবহার করতে হতো।</strong> পর্দান্তরালে বসবাস করলেও মুসলমান রমণীরা সমাজে যথেষ্ট সম্মানের অধিকারিণী ছিলেন। মুগল সমাজের রমণীগণ, তাদের পূর্ববর্তী ভগ্নীদের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।</p>
<p>মূলত, মুসলিম বাংলায় এভাবেই নারীগণ তাদের শিক্ষা, সাহিত্য চর্চা, পৈত্রিক সম্পত্তি ও রাজনীতির অধিকার পেয়েছিলো। অতএব, উপরোক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, মুসলমান শাসনযুগে বাংলার রমণীরা হারেমে সাধারণ পর্দা প্রথার মধ্যে থেকেও এবং পুরুষদের উপর নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও তারা এই প্রদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।</p>
<p><strong>০৬. হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি</strong></p>
<p>ইসলামী মূল্যবোধ ঠিক রেখেও যে ইসলামী সভ্যতা স্থানীয়দের স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলো, তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এক্ষেত্রে প্রাক-মুসলিম সময় ও মুসলিম সময়ের মাঝে তুলনা করা প্রয়োজন।</p>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এ’চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। <strong>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাবুল হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</strong></p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তঃবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো সমগ্র ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে মুসলিম বাংলায় ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ফলে, এই অঞ্চলের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো। বখতিয়ার খিলজির সেই অভিযানের পর এই অঞ্চলের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে, <strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong><br />
রোমিলা থাপার মতে, <strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>অতএব, বুঝা গেলো যে, মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো। আবার, সরকারি চাকরি করবার সুবাদে কিংবা মুসলমান শাসনকর্তাদের সভাসদ ও রাজকর্মচারী হিসেবে অথবা মুসলিম জনগণের প্রতিবেশী রূপে হিন্দুরা মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে। যার ফলে তারা মুসলমানদের মহৎ আদর্শ সংস্কৃতি এবং শিষ্টাচার ও জীবন পদ্ধতি দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবান্বিত হয়। পাশাপাশি, মুসলিম শাসক ও সুলতানদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।</p>
<p>এজন্যই, সাধারণ হিন্দুদের উপর ইসলাম ধর্ম দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অথচ, সাধারণ হিন্দুদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। সমাজে উচ্চ ধর্মের হিন্দুর সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুর মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিলো। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থও পাঠ করতে পারতো না। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরা শিক্ষা অর্জন করতো। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারনৈতিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব হয়। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাও শিক্ষা অর্জন করেন। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ঘটে। তারা সংস্কৃতের পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিক্ষা অর্জন করে উচ্চ রাজ কার্যে নিয়োজিত হয়ে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করে।</p>
<p>অন্যদিকে, হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের পরেই ছিলো কায়স্থদের স্থান। মুসলমানদের দ্বারা তারাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা শিল্প ও সাহিত্যে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেয়। মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এসব বিখ্যাত কবিদের মধ্যে ছিলেন-মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কবিন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, যশোরাজ খান, বিজয় গুপ্ত, কৃষ্ণ দাস কবিরাজ। মুসলিম শাসনামলে কায়স্থরা জমিদারি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করে। মুসলিম শাসক কর্তৃক এসব কায়স্থরাই পরবর্তীতে রায়, চৌধুরী, মজুমদার, অধিকারী উপাধী লাভ করে। এটি পরবর্তীকালে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে এবং আরো পরবর্তীতে গিয়ে দেখা যায় যে, এসব পদবী মানুষের নামের সাথেও যুক্ত হয়ে যায়।</p>
<p>আবার, বাংলার সুলতানরা ছিলেন উদার সংস্কৃতিমনা। তারা হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব মধ্যযুগে বাংলা হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আরেকটি কারণ। মূলত, এসব কারণেই যুগ যুগ ধরে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রীতি্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>এসবের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ছিলো। এটা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, যেখানে ধর্মীয় সহাবস্থান থাকে, সেখানেই অবশ্যই প্রশাসনিক সহাবস্থানও থাকবে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলমান আমলে হিন্দু শাসক ও সেনাপতি নিয়োগ।</p>
<p><strong>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মুসলমান শাসকগণ স্থানীয় হিন্দুদের শাসনকার্যে সংম্পৃক্ত করেন। শাসনকার্যে সুযোগ পেয়ে এসব হিন্দুরা যথেষ্ট যোগ্যতার ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। মুসলিম সুলতানগণ প্রতিভাবান হিন্দুদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাষ্ট্রীয় উপাধী এবং সরকারি জমি দান করেন।</strong> হিন্দুরা খুবই বিশ্বস্ততার সাথে মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করে। বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন বাংলার হিন্দুরা বাংলার সুলতানের হয়ে যুদ্ধ করেছিলো। হিন্দু সেনাপতি সহদেব এ-যুদ্ধে যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। নবাবী আমলে আমরা দেখি যে, পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজের সেনাপতি মীর মর্দন ও মোহনলাল দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুই নয়, মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হিন্দু জমিদার শ্রেণীরও উৎপত্তি হয়। দুর্গাচন্দ্র সান্যাল তার বিখ্যাত গ্রন্থ &#8220;বাঙালার সামাজিক ইতিহাসে&#8221; লিখেন যে, ইলিয়াস শাহী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী জেলায় বিখ্যাত &#8216;সান্যাল&#8217; এবং &#8220;ভাদুড়ী পরিবারের&#8221; উৎপত্তি হয়। সুলতান গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহের রাজত্বকালে ভাতুড়িয়ার জমিদার কংস (রাজা গণেশ) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।</p>
<p>আবার, এর বিপরীতে হিন্দু রাজা ও জমিদারদের অধীনে মুসলিম কর্মচারীও নিয়োগ হয়। মুসলিমদের শাসকদের মতো হিন্দু সামন্ত রাজা ও জমিদাররাও তাদের শাসনকার্যে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন। মীর্জা নাথানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভুলুয়ার (নোয়াখালি) হিন্দু জমিদার অনন্তমানিক্য মীর্জা ইউসুফ নামক এক ব্যক্তিকে উজির পদে নিয়োগ দেন। এছাড়াও, চাঁদ রায় ও কেদার রায় সোলায়মান লোহানী নামে এক মুসলিমকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা এবং &#8220;কালাপাহাড়&#8221; নামে খ্যাত শ্রীহরি ছিলো দাউদ খান কররানীর অন্যতম উপদেষ্টা ও সেনাপতি।</p>
<p>অতএব, এটাও সত্য যে, ধর্মীয় সহাবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় ছিলো। যেহেতু তৎকালীন ইতিহাসই এসব সাক্ষ্য দেয়, তাই এটা পুরোপুরি সঠিক যে, স্থানীয় সমাজ, মানুষ ও সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করেছে বিধায়ই ইসলামী সভ্যতা আজও মানুষের মনে স্থান দখল করে রয়েছে; এবং এটাও প্রমাণ হয়ে যায় যে, ইসলামী সভ্যতা প্রকৃত অর্থেই বিশ্বজনীনতাকে গ্রহণ করে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>জাতিসত্তা ও ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া</strong></h5>
<p>সবশেষে, আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তিতে ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া কেমন হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। আমাদের ঐক্য ও সম্প্রীতির সমাজ গড়তে হলে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ন্যায়, পারিবারিক ঐক্য, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p><strong>ইসলামী সংস্কৃতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা জাতিসত্তার ভেতরের মানবিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলে যাবে। আমরা বাঙালি মুসলমানদের ইসলামী সংস্কৃতির যে বোঝাপড়া গড়ে তুলতে চাই, তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান।</strong></p>
<p>এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও উপজাতির মানুষ একসাথে বসবাস করছে। তাই আমাদের উচিত, সবার প্রতি সমান দৃষ্টিতে তাকানো, সবার অধিকার ও মানুষ হিসেবে মর্যাদা স্বীকার করা। একই সঙ্গে আমাদের আহ্বান থাকবে; আমরা যারা বাঙালি মুসলমান, আমরা যেন নিজেদেরও মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে কল্পনা করি। প্রত্যেকে নিজের আঞ্চলিক পরিচয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করবে এবং নিজের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বজায় রাখবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের দায়িত্ব</strong></h5>
<p>মুসলমানদের সভ্যতার ইতিহাসে একসময় যে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সামাজিক নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা গড়ে উঠেছিল, সেগুলোকে আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনা দরকার। আমাদের দায়িত্ব হবে এই মূল্যবোধগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, সমাজে তুলে ধরা ও এর চর্চা অব্যাহত রাখা।</p>
<p>বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় কলকাতা-কেন্দ্রিক যে বয়ান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা যেন আমাদের হীনমন্য, আত্মবিশ্বাসহীন বা পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত না করে।<br />
কথিত ন্যাশনালিস্ট ইসলাম, সেকুলার ইসলাম বা লিবারেল ইসলাম; এসব নামে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আত্মঘাতী চিন্তা। এর পরিবর্তে আমাদের গড়ে তুলতে হবে মূলনীতিনির্ভর একটি নতুন বয়ান, যা ইসলামের উসূল ও মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াবে।</p>
<p>আরব, আফ্রিকা, তুরস্ক বা ভারতের সংস্কৃতি এক নয়, কিন্তু তারা সবাই ইসলামের স্থায়ী নীতির মধ্যে থেকেই টিকে আছে। তাই আমাদেরও প্রয়োজন, ইসলামী মূলনীতিগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির একটি ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া তৈরি করা। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সেই ভারসাম্যের ভিত্তিতেই চালিয়ে যেতে হবে।</p>
<p>এর বাইরে গেলে বিচ্ছেদ তৈরি হবে, যেমনটি আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ব্রিটিশ আমলের পর থেকে আমাদের সংস্কৃতিতে এক ধরনের আত্মবিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে। আমরা অন্যদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিনোদন, স্থাপত্য, শহর পরিকল্পনা, এমনকি মসজিদের ডিজাইন পর্যন্ত নকল করছি। এগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।</p>
<p>তবে একে পুরোপুরি বর্জন করাও অবাস্তব। কারণ, বিশ্ব পরিবর্তনের ঢেউকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই পাশ্চাত্যের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে, একই সঙ্গে আমাদের অঞ্চলের ভালো দিকগুলোও সংযোজন করতে হবে।</p>
<p>অর্থাৎ, ইসলামের স্থায়ী মূলনীতি বুঝে, পাশ্চাত্যের তৈরি দুনিয়াকে বুঝে, আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বয়ানই হতে হবে আমাদের পথনির্দেশ। এর বিপরীতে কোনো বিশৃঙ্খল, পক্ষপাতদুষ্ট বা বিভাজনমূলক বয়ান তৈরি করা যাবে না, যা অন্য কোনো গোষ্ঠীর শিকড় কেটে দেয়।</p>
<p>বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি কখনোই পুরনো সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ হবে না, আবার আধুনিকতার নামে মূল থেকে বিচ্ছিন্নও হবে না। ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, সামাজিক বাস্তবতার আলোকে, আমাদের সাংস্কৃতিক এজেন্ডা ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে।<br />
এর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বেড়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।</p>
<p>আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বিশ্ব কাঠামো, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, শিকড়, ইসলামের উসুল ও পদ্ধতিগত বোঝাপড়ার সমন্বয়ে। এই সবকিছু বুঝে ও ধারণ করেই আমাদের কাজ করতে হবে। এটাই হোক বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির প্রথম ধাপ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16417</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আতিয়া মসজিদ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/atiya-mosque/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/atiya-mosque/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 25 Nov 2025 13:07:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[শহর ও স্থাপত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16405</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সুপরিচিত একটি স্থাপত্য নিদর্শন আতিয়া মসজিদ। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মুদ্রিত পুরনো দশ টাকার নোটে ছবিযুক্ত থাকা এ মসজিদের অবস্থান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে; লৌহজং নদীর পূর্বপারে। টাঙ্গাইল অঞ্চলে প্রাপ্ত মূল শিলালিপিগুলোর মধ্যে আতিয়া জামে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সুপরিচিত একটি স্থাপত্য নিদর্শন আতিয়া মসজিদ। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মুদ্রিত পুরনো দশ টাকার নোটে ছবিযুক্ত থাকা এ মসজিদের অবস্থান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে; লৌহজং নদীর পূর্বপারে। টাঙ্গাইল অঞ্চলে প্রাপ্ত মূল শিলালিপিগুলোর মধ্যে আতিয়া জামে মসজিদে পাওয়া একটি আরবি ও একটি ফারসি শিলালিপি রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে মসজিদের নির্মাতা, সময়কাল ও প্রচলিত কিছু অসঙ্গতিমূলক তথ্য সমস্যার সমাধান করা যায় । বিদায়ী সুলতানি আর নবাগত মোগল- উভয় রীতির সংমিশ্রণে অপূর্ব এক মুসলিম স্থাপত্য এটি, যা দৃষ্টিনন্দন এবং এ অঞ্চলে বিরল। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত শিলালিপি অনুসারে প্রত্মতাত্ত্বিক আতিয়া মসজিদটির নির্মাণকাল ১০১৯ হিজরি (১৬১০-১১ খ্রি.) উল্লেখ আছে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে বায়েজীদ খান পন্নীর পুত্র সাইদ খান পন্নী, শাহ বাবা কাশ্মীরির সম্মানার্থে মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। আদি শিলালিপির অনুরূপ একটি লিপি বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের শীর্ষে প্রোথিত আছে। এ থেকে জানা যায় যে, ১০১৮ হিজরিতে (১৬০৯ সাল) মসজিদটি নির্মিত। মসজিদটির নামকরণে এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। আরবি শব্দ ‘আতা’ থেকে ‘আতিয়া’ শব্দের উৎপত্তি; যার অর্থ – দানকৃত’।</p>
<p>১৫৯৮ সালে আলি শাহান শাহ্‌ বাবা আদম কাশ্মিরী (র.) কে সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ টাঙ্গাইল জেলার জায়গিরদার নিয়োগ করেন। <strong>তিনি এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার ও আন্যান্য ব্যয় নির্বাহের জন্য আফগান নিবাসী কররানী শাসক সোলাইমান কররানীর কাছ থেকে সংলগ্ন এলাকা দান বা ওয়াকফ্ হিসাবে লাভ করেন। এই এলাকাটি তাঁকে দান করায় এই অঞ্চলটির নাম হয়েছে ‘আতিয়া’ বা দানকৃত। পরবর্তীতে বাবা আদম কাশ্মিরীর পরামর্শে সুফিজির এক ভক্ত সাঈদ খান পন্নীকে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই আতিয়া পরগণার শাসন কর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেন।</strong> <strong>এই সাঈদ খান পন্নীই ১৬০৯ মতান্তরে ১৬০৮ সালে বাবা আদম কাশ্মিরীর কবরের সন্নিকটে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন।</strong> মুহাম্মদ খাঁ নামক তৎকালীন এক প্রখ্যাত স্থপতি এই মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজে যুক্ত ছিলেন।</p>
<p>মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৮.২৯ মিটার (৬৯ ফুট) , প্রস্থ ১২.১৯ মিটার (৪০ ফুট) এবং দেয়ালের পুরুত্ব ২.২৩মিটার (সাড়ে ৭ ফুট)। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা যায়, মসজিদটির কিবলাকোটা ও বারান্দাসহ সার্বিক পরিমাণ ১৭.৭০ঃ১২ মিটার। মসজিদের দেয়াল ২.২২ মিটার প্রশস্ত। বারান্দা ৩.৮২ ৭.৫ মিটার।</p>
<p>লাল ইটের তৈরি এ মসজিদটির পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। এ প্রবেশ পথগুলো চতুর্কেন্দ্রিক রীতির। বারান্দা থেকে তিনটি প্রবেশপথের মাধ্যমে প্রধান ইবাদত কক্ষে প্রবেশ করা যায়। এছাড়াও এটির উত্তর-দক্ষিণে আরও দুটি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটি একই সাথে সুলতানি ও মোগল আমল এ উভয় আমলের স্থাপত্যকলা তথা মুসলিম স্থাপত্য রুচিকে সুস্পষ্টভাবে বহন করছে। সুলতানি আমলের নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে মিহরাব, কিবলা। দক্ষিণ এশীয়দের জন্য কিবলা পশ্চিমে করা হয়েছে। একই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায় মসজিদের খিলানসমূহে। আতিয়া মসজিদের খিলানগুলো চতুর্কেন্দ্রিক অথাৎ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম- চারটি দিক দিয়েই ইবাদত কক্ষে প্রবেশ করা যায়। কিবলার দেয়ালে তিনটি অলঙ্কিত মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের পেছনে বাইরের দেয়াল কিছুটা প্রক্ষেপিত। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ব বুরুজ রয়েছে যা সমান দূরত্বে মোল্ডিং নকশায় বিভক্ত। কয়েকটি স্তরে তৈরি করা কারুকার্য দিয়ে সজ্জিত পার্শ্ব বুরুজগুলো ছাদের কার্নিশের উপর পর্যন্ত উঠে গেছে। সব শেষের বুরুজগুলো পলকাটা ছোট গম্বুজযুক্ত এবং কলস ফিনিয়ালে অলঙ্কৃত।</p>
<p>প্রধান গম্বুজটি খিলানভিত্তিক স্কুইঞ্চ পদ্ধতিতে নির্মিত। মনোমুগ্ধকর এ প্রধান গম্বুজটি মসজিদের অত্যন্ত নান্দনিক অংশ যা মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। <strong>এটি অষ্টভুজাকৃতির ড্রামের উপর স্থাপিত। গম্বুজগুলোতে কলস ফিনিয়াল এবং ভিতের চারদিকে বদ্ধ মারলোন নকশা বেষ্টিত।</strong> আতিয়া মসজিদের ধনুকবক্রাকৃতির কার্নিশ একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এ মসজিদের পশ্চিম দেয়ালের শীর্ষে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংবলিত প্রহরা দেয়াল (battlemented wall) লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>আতিয়া মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দেয়াল যে অলঙ্করণ নকশা করা হয়েছে তা এ মসজিদ প্রসঙ্গ মাত্রই উল্লেখের দাবি রাখে। এতে টেরাকোটা ও ইট খোদাই নকশাতে চমৎকারভাবে আঞ্চলিক মোটিফকে উপজীব্য করে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ফাসাদ সূক্ষ্ম, বিস্তৃত একই রকম প্যানেল নকশায় আচ্ছাদিত। এতে রয়েছে অসংখ্য ফুলের অলঙ্করণ, চক্রাকার ‘রোজেট’, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি। পূর্ব ফাসাদ অসংখ্য ক্ষুদ্র আয়তাকৃতির টেরাকোটা প্যানেল নকশায় দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। এ জাতীয় নির্মাণ কৌশল ষোলো শতকের প্রথম দিকে গৌড়ের বিভিন্ন মসজিদে লক্ষ্য করা যায়। যেমন: ঝনঝনিয়া মসজিদ (১৫৩৫ খ্রি.), কদম রসুল ইমদরত (১৫৩০ খ্রি.)।</p>
<p>আতিয়া মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি কুঁড়েঘরের কার্নিশের ন্যায় ধনুকের মতো বাঁকা আকৃতির কার্নিশ যা সম্পূর্ণভাবে বাংলার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। এ ধরনের আকৃতির উৎপত্তিতে আদি অকৃত্রিম বাংলার ছনের কুটিরের বাঁকানো চালের প্রভাব স্পষ্ট । অলঙ্করণ বিশেষ করে টেরাকোটা নকশা ও খোদাই ইটের নকশায় বাংলার ওস্তাগর-শিল্পীরা সুস্পষ্ট অবদান রেখেছেন। বাংলার গ্রামের খড়ের তৈরী কুঁড়ে ঘরের বেড়ার খোপ নকশা আতিয়া মসজিদের ফাসাদ অলঙ্করণে স্থান করে নিয়েছে। বস্তুত বাঁশের চালাঘর থেকে ইটের নির্মাণে এ ধরনের উদ্ভাবন শিল্পমানে আকর্ষণীয় এবং নির্মাণ ক্ষেত্রে নতুন ধারা হিসেবে বিবেচিত।</p>
<p>মসজিদটি টেরাকোটার ইটের তৈরি। চুন, সুরকি গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মিত। <strong>আর সুলতানি আমলে প্লাস্টার পদ্ধতি ছিল না। ফলে তারা চুন ও সুরকির গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এছাড়া সুচালো খিলান ও গম্বুজ সবই সুলতানি আমলের নিদর্শন। আতিয়া মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকের বাইরের দেয়ালে টেরাকোটার ওপর চমৎকার বৃত্তের মাঝে ফুলের নকশা করা, যেটি মোগল আমলের স্থাপত্যরীতির নিদর্শনকে বহন করে।</strong> মসজিদটি সুলতানি ও মোগল আমলের বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত বলে এটি যুগসন্ধিক্ষণের স্থাপনা হিসেবেও পরিচিত।</p>
<p>এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকৃতির মসজিদটির পূর্বদিকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকৃতির বারান্দা রয়েছে। পূর্বদিকে খিলানবিশিষ্ট তিনটি প্রবেশপথ, মাঝখানেরটি দুপাশের প্রবেশপথ থেকে সামান্য উঁচু। অসংখ্য নকশাখচিত মসজিদটির গায়ে খোদাই করা হয়েছে আরবি হরফ। মসজিদের বারান্দার ওপর ছোট তিনটি গম্বুজ বাংলা পান্দান্তিভ পদ্ধতিতে নির্মিত। পরে সংস্কারের সময় গম্বুজগুলো পলেস্তারা দিয়ে সমান করে দেওয়া হয়েছে যদিও মসজিদ নির্মাণের সময় এমনটা ছিল না। শুরুতে গম্বুজগুলো পলকাটা বা ঢেউতোলা ছিল।</p>
<p>১৮০০ সালে সংঘটিত ভূমিকম্পে আতিয়া মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরাণী এবং ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবী মসজিদটির সংস্কার করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এই মসজিদটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে অধিগ্রহণ করেন।</p>
<p>১৯৭৮ সালে ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছদে প্রথমবারের মতো আতিয়া মসজিদ স্থান পায় বলে জানা যায়। এরপর ১৯৮২ সালে পরিবর্তিত ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছদেও স্থান পায় সেটি। ফলে, প্রায় সব বাংলাদেশীর কাছে আতিয়া মসজিদ একটি অতিপরিচিত স্থাপনা। মসজিদটি শুধু ঐতিহ্যের নিদর্শনই নয়, একটি দর্শনীয় স্থানও বটে।</p>
<p>৪০০ বছরের পুরোনো এ মসজিদ বাংলাদেশ এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যরীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে আছে। সময়ের বহমান স্রোতে ভেসে আজও মুসল্লিরা প্রাচীন এই মসজিদে একত্রিত হয়ে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/atiya-mosque/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16405</post-id>	</item>
		<item>
		<title>প্রগতিবাদের ফাঁকা বুলি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Nov 2025 17:59:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16394</guid>

					<description><![CDATA[১৯৩৩ সালের জুন সংখ্যা &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় জনাব নিয়াজ ফতেহপুরী আমার সম্পাদিত &#8216;তর্জুমানুল কুরআন&#8217; সম্পর্কে এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এজন্যে আমি জনাব ফতেহপুরীর শুকরিয়া আদায় করি। সাধারণত পত্র পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে বাদানুবাদ কিংবা পাল্টা সমালোচনা করা রীতিসম্মত নয়। কিন্তু যোগ্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>১৯৩৩ সালের জুন সংখ্যা &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় জনাব নিয়াজ ফতেহপুরী আমার সম্পাদিত &#8216;তর্জুমানুল কুরআন&#8217; সম্পর্কে এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এজন্যে আমি জনাব ফতেহপুরীর শুকরিয়া আদায় করি। সাধারণত পত্র পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে বাদানুবাদ কিংবা পাল্টা সমালোচনা করা রীতিসম্মত নয়। কিন্তু যোগ্য সমালোচক তাঁর নিবন্ধটিতে এমন কতকগুলো মতামত প্রকাশ করেছেন, যা তাঁর প্রগতি-ধর্মের বিশিষ্ট মূলনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত; আর এই সমস্ত মূলনীতির সংশোধন করাই তর্জুমানুল কুরআনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণেই আমি এ সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত প্রকাশের এই প্রথম সুযোগের সদ্ব্যবহার করা একান্ত জরুরি বোধ করছি। তিনি লিখেছেন :</p>
<p>এই পত্রিকার উদ্দেশ্য এর নাম থেকেই প্রতিভাত হয় অর্থাৎ কুরআনের অর্থ, তাৎপর্য ও শিক্ষাকে সঠিকরূপে লোকদের মধ্যে প্রচার করা। নিসন্দেহে এই উদ্দেশ্যের উপযোগিতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনা। কিন্তু যোগ্য সম্পাদক নিজেই যেমন স্বীকার করেছেন, বর্তমান যুগে এই লক্ষ্য অর্জনটা মোটেই সহজসাধ্য নয়। কারণ, অতীতকালে ধর্ম বলতে শুধু পূর্ব পুরুষদের অন্ধ অনুকৃতি ও পশ্চাৎমুখী ক্রিয়াকলাপকেই বুঝাতো। তখন কারো পক্ষে ধর্ম প্রচারক বা সংস্কারক সাজা মোটেই কঠিন ব্যাপার ছিলোনা। কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নিত্য নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া মানুষের &#8216;চিন্তা ও কর্ম&#8217;কে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দান করছে &#8211; তার মনমগজকে &#8216;চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা&#8217; দ্বারা সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। কাজেই আজকে শুধু পূর্ব-পুরুষদের আচরণ, কর্মনীতি ও চিন্তাধারার প্রমাণ দেখিয়েই ধর্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পূর্বে হয়তো আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে আলোচনা বা তর্কবিতর্ক করা হতো; কিন্তু আজকে আল্লাহর অস্তিত্বকেই একেবারে অসম্ভব মনে করা হচ্ছে। আগেকার দিনে রসূল সা.-এর পথনির্দেশকে হয়তো মুজিযার সাহায্যে প্রমাণ করা যেতো, আর আজকে সেই মুজিযার ভিত্তিতেই &#8216;চুম্বক বিজ্ঞান&#8217; বেশুমার নবী ও রসূল সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়েছে। অতীতে একজন বক্তা আসমানের দিকে তাকিয়ে আরশ ও কুরসিবিশিষ্ট আল্লাহকে ডাকতে পারতো; কিন্তু আজকে আসমান নামক কোনো জিনিসেরই অস্তিত্ব নেই। এমতাবস্থায় কেউ এ ধরনের কাজ করলে তা মোটেই কল্যাণকর হতে পারেনা। ফলকথা, এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানে&#8217;র দিন নেই, এখন তো অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি ঈমানের দিন এসেছে। এমনি সঙ্কটজনক সময়ে ধর্মের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা মোটেই সহজ কাজ নয়। বিশেষত আজকে ধর্মের ধারণাই লোকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য নয় বলে কাজটা আরো কঠিন মনে হয়।</p>
<p>সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি আরো লিখেছেন:</p>
<p><em>কুরআনপাক তার অর্থের দিক থেকে তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে নৈতিক শিক্ষা প্রদত্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে বিবৃত হয়েছে আকীদা বিশ্বাস। আর তৃতীয় ভাগে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনী ও উদাহরণ। পথম ভাগ সম্পর্কে বেশিকিছু লিখবার প্রয়োজন নেই এ সম্পর্কে কোনো দলিল প্রমাণ উপস্থিত করারও আবশ্যকতা নেই। কারণ সকল ধর্মের নীতিশাস্ত্রই প্রায় এক অভিন্ন। আর প্রত্যেকেই একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, ইসলামের নীতিশাস্ত্র অন্যান্য ধর্মের নীতিশাস্ত্র থেকে ভিন্ন ও নিম্নমানের নয়। অবশ্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের প্রতি বেশি আলোকপাত করা উচিত। কারণ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া এই দু&#8217;ভাগ সম্পর্কে লোকদের মনে সন্দেহ ও দ্বৈধ্যবোধের সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর সত্য বলতে কি, এসব শোবা-সন্দেহ কেউ নিরসন করতে সক্ষম হলে তিনি বর্তমান শতকের মুজাদ্দিদ বলে সাব্যস্ত হবেন। এ কারণেই আমি এ সম্পর্কে একটি স্থায়ী বিভাগ খুলবার পরামর্শ দেবো। এই বিভাগের মাধ্যমে আকীদা বিশ্বাস ও আখ্যান সম্পর্কিত তামাম কুরআনী আয়াতের পর্যালোচনা করা উচিত। অতপর এসব আয়াতের সঠিক উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিধারণ করে আধুনিক পণ্ডিত ও গবেষকদের তরফ থেকে উত্থাপিত যাবতীয় আপত্তি ও প্রতিবাদ খণ্ডন করা আবশ্যক।</em></p>
<p>উপসংহারে তিনি লিখছেন:</p>
<p>আগামীতে আমি সর্বপ্রথম ওহী ও ইলহামের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করতে তাঁকে আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ এই জিনিসটি উপলব্ধি করার ওপরেই কালামুল্লাহর মর্মোপলব্ধি নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে আখিরাত সম্পর্কিত প্রশ্নটিও আলোচিত হওয়া উচিত। কারণ এর মীমাংসার ওপরই ধার্মিকতা ও অধার্মিকতার প্রশ্ন নির্ভর করে। তিনি কালামে ইলাহী এবং আখিরাত সম্পর্কে কি ব্যাখ্যা প্রদান করেন, তাই আমি দেখতে চাই। তারপরই আমার শোবা-সন্দেহ এবং আপত্তিগুলো উত্থাপন করবো তাঁর প্রচেষ্টায় সেগুলো দূরীভূত হলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো। কারণ বর্তমানে অনেকেই &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র নিদারুণ অভিশাপে জর্জরিত। এর একটি বিরাট কারণ হচ্ছে পরকাল বিশ্বাস।</p>
<p>এই উদ্ধৃতিতে যোগ্য সমালোচক যেসব খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, সেগুলো বাদ দিয়ে আমি শুধু মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতিই আলোকপাত করতে চাই।</p>
<p><strong>তিনি কুরআন মজিদের আলোচনাকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু আমরা তাকে অনায়াসেই দু&#8217;ভাগে বিভক্ত করতে পারি। এর প্রথম ভাগের বিষয়বস্তু হচ্ছে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত। এর কোনো একটি বিষয়কেই আমরা চূড়ান্তভাবে ভুল বা নির্ভুল আখ্যা দিতে পারিনা। তাই এগুলোর ব্যাপারে কুরআন আমাদেরকে গায়েবের প্রতি ঈমান পোষণের আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় শ্রেণীর বিষয়গুলো আমাদের জ্ঞান সীমার বহির্ভূত নয় এবং এগুলো সম্পর্কে কোনো যুক্তিসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণও আমাদের পক্ষে সম্ভবপর। এই হিসেবে আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও গুণরাজি, ফেরেশতা, ওহী, খোদায়ী কিতাব, নবুয়াতের তাৎপর্য, মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন, পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি বিষয়াদি ছাড়াও ঐতিহাসিক কাহিনী ও উদাহরণ প্রসঙ্গে বর্ণিত এবং জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত সমস্ত বিষয়ই প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলো সাধারণ মানবীয় বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত হোক কিংবা বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তির ও বৈজ্ঞানিক পর্যায়ে এগুলোর সত্যতা ও যথার্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের অক্ষমতাই হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। পক্ষান্তরে ইসলামের নীতিশিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবীয় জীবন পদ্ধতি সম্পর্কিত তামাম বিষয়ই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত।</strong></p>
<p>যোগ্য সমালোচকের মতে, দ্বিতীয় ভাগ সম্বন্ধে আলোচনা করারই কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ এ সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্মেরই অনুরূপ। অবশ্য তার মতে প্রথম ভাগটি সম্পর্কে আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর সম্পর্কেই লোকদের মনে সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কেন সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি হচ্ছে? এর জবাবে তিনি বলেছেন, অতীতকালে পশ্চাৎমুখিতা ও অজ্ঞতার কারণে লোকেরা গায়েবী বিষয়ের প্রতি ঈমান পোষণ করতো। কিন্তু আজকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার উদ্ভাবনী মানুষের চিন্তা ও কর্মকে নতুন রূপদান করেছে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দ্বারা তার মনমগজকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। এ কারণেই এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানের&#8217;র দিন নেই, বরং তার পরিবর্তে &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি ঈমান&#8217; পোষণের দিন এসেছে।&#8217;</p>
<p><strong>এই অভিমতটি কয়েকটি ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে প্রথম ভ্রান্তি হচ্ছে অতীত ও বর্তমানকালের মধ্যকার আসল পার্থক্যটা উপলব্ধি না করা। দুর্ভাগ্যবশত জনাব নিয়াজ কেবল একাই নন; বরং একটি বিরাট দল এই ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত যে, ধর্মের প্রদীপ শুধু বিগত যুগের অন্ধকারেই আলো বিকীরণ করতে পারতো; কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সূর্যোদয়ের পর তার পক্ষে আর দীপ্তিমান হওয়া সম্ভবপর নয়।</strong> অথচ যে যুক্তি বিজ্ঞানকে এরা আলোকরশ্মি বলে অভিহিত করেছেন তা এ যুগের কোনো নিজস্ব সম্পদ নয়। এসকল জ্ঞান বিজ্ঞান অতীতকালেও লোকদের দৃষ্টিশক্তিকে এভাবেই ঝলসে দিয়েছে। আর অতীতকালেও যাদের দৃষ্টি ঝলসে গিয়েছিলো, তারাও এটাই ভেবেছিলো যে, ধর্মের প্রদীপ এখন দীপ্তিমান থাকতে পারেনা। তখনকার দিনের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও তাদের মতে চিন্তা ও কর্মকে নতুন রূপদান করেছিলো এবং তা চিন্তা ও বিবেকের যুক্তি দ্বারা লোকদের মন মগজকে এমনি সুসমৃদ্ধ করে দিয়েছিলো যে, তাদের সেই আলোকজ্জল যুগে গায়েবের প্রতি ঈমান পোষণের কোনো অবকাশই ছিলোনা। হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে চতুর্থ শতক পর্যন্ত কি এই অবস্থাই বিরাজমান ছিলোনা? প্লেটো, এরিস্টটল, এপিকোরাস, জিনো, বার্কলাস, আলেকজান্ডার, * ফিরদৌসী, ক্লাটিনোস প্রমুখ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের চিন্তাধারা যখন মুসলিম দেশগুলোতে প্রচারিত হলো এবং তার ফলে দার্শনিক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষার ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা হলো, তখনো কি একদল লোক এরূপ ধারণাই পোষণ করতোনা? তখনকার দিনের চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি এবং আচরণও ধারণার নতুন রূপ কি এভাবেই লোকদের ধর্মবিশ্বাসে সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি করেনি? কিন্তু তারপর কি হয়েছিল? দার্শনিকদের যেসব মতবাদ ও আনুমানিক সিদ্ধান্তের প্রতি তখনকার লোকেরা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলো, পরবর্তীকালে তার অনেকগুলোই মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। জ্ঞান বিজ্ঞানের যে তীব্র সূর্যালোকে ধর্মের প্রদীপকে তাঁদের নিবু নিবু মনে হচ্ছিলো, যুগের একটি আবর্তনেই তা একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেলো। তাদের &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; সেকেলে বস্তুতে পরিণত হলো। তাদের নব নব &#8216;বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার&#8217; চিন্তা ও কর্মকে নবরূপ দানের শক্তি হারিয়ে ফেললো। যেসব ক্ষেত্রে তাঁরা নতুন রূপ দান করেছিলো, তা পুরনো বলে সাব্যস্ত হলো। এমনকি, সমকালীন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস ও আস্থা রেখে তারা যেসব যুক্তি প্রমাণের অবতারণা করেছিলো, এবং সেগুলোর ভিত্তিতে যেসব দার্শনিক মতবাদ দাঁড় করিয়েছিলো তার অধিকাংশকেই আজকের একজন নগণ্য ছাত্রও অর্থহীন ও অকেজো আখ্যা দিতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করবেনা।</p>
<p>এমতাবস্থায় কেউ যদি বলে, অতীতের অন্ধকার যুগেই কেবল ধর্মের প্রদীপ জ্বলতে পারতো, কিন্তু আজকের আলোকজ্জ্বল যুগে তা আর জ্বলতে সক্ষম নয়, তাহলে আমরা ভাবতে বাধ্য হবো যে, ইতিহাস নিজেই তার পুনরাবৃত্তি করছে। আজকে যেসব বিষয়কে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনী বলে অতীতের ন্যায় দাবি জানানো হবে, তার বেশির ভাগই পূর্বেকার লোকদের &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও নতুন আবিষ্ক্রিয়ার পরিণতি লাভ করবে এবং &#8216;চিন্তা ও কর্মের নব নব রূপ&#8217; ও যুগের আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ও সেকেলে হয়ে যাবে এ ব্যাপারে আমরা সুনিশ্চিত। যে সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার কারণে সমালোচক গর্ববোধ করেন, সেগুলোর প্রতি তিনি একবার গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করুন এবং ওগুলোর আসল উদ্ভাবক ও আবিষ্কারকদের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তবেই তিনি বুঝতে পারবেন যে, অতীতের জ্ঞান বিজ্ঞানের ন্যায় এগুলোর মধ্যেও নিশ্চায়ক বস্তু খুব কমই রয়েছে। এসকল জ্ঞান বিজ্ঞানের মধ্যে এমনি জিনিস প্রায় নেই বললেই চলে, যার সম্পর্কে একথা নিসংশয়চিত্তে বলা যেতে পারে যে, এটির ভ্রান্ত প্রমাণিত হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। বাকি জিনিসগুলো শুধু অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ, মতামত ও দ্বিধা সঙ্কোচের ওপর ভিত্তিশীল। এগুলো সম্পর্কে পূর্ণ দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তার সঙ্গেই বলা যেতে পারে যে, যুগের গতি যতোই তরক্কীর দিকে এগুতে থাকবে, &#8216;এসব আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;নিত্যনতুন আবিষ্ক্রিয়া&#8217; ততোই প্রাচীন ও সেকেলে বস্তুতে পরিণত হবে। এবং সেই সঙ্গে এসকল দুর্বল ও ঠুনকো জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতিগুলোও অপর কোনো নতুন পদ্ধতির জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।</p>
<p>কাজেই অবস্থা যখন এই, তখন কোনো চেতনাসম্পন্ন ও পরিণত দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের পক্ষেই ধর্মের ভবিষ্যত চিন্তায় সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনী&#8217; আজ &#8216;চিন্তা ও কর্মের নতুন ভিত্তি রচনা করেছে এবং &#8216;চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি&#8217; দ্বারা লোকদের মন মগজকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে, কাজেই ধর্মের পরিণতি কি দাঁড়াবে, খোদাই জানেন এমনি দুশ্চিন্তায় আতঙ্কিত হবারও কোনো হেতু নেই। এসব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার ওপর একবার সন্ধানী দৃষ্টি ফেললেই দেখতে পাবেন যে, ধর্মের সাথে যেসব জিনিসের বিরোধ রয়েছে, তা প্রামাণ্য ও সন্দেহাতীত কি না? তা যদি বাস্তবিকই প্রামাণ্য ও সন্দেহাতীত হয় এবং ধর্মের মৌল বিশ্বাসের সঙ্গে তার বিরোধও দেখা দেয়, তাহলে নি:সন্দেহে তার সামনে এই প্রশ্ন এসে দাঁড়াবে যে, ধর্ম এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই দু&#8217;টির কোনটির প্রতি সে ঈমান পোষণ করবে? কিন্তু তা যদি শুধু অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে নিক্ষেপকারী জিনিসই হয়, তাহলে ধর্মের সঙ্গে তার বিরোধে ঘাবড়াবার কিছু নেই। কারণ ধর্ম যদি ঈমান ও প্রত্যয়ের ওপর ভিত্তিশীল হয় তো তার মুকাবিলায় অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কোনোই গুরুত্ব নেই। পক্ষান্তরে ধর্ম যদি আনুমানিক ও কাল্পনিক জিনিস হয় তো আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতবাদগুলোও তো এই অনুমান ও কল্পনার ওপর নির্ভরশীল। কাজেই উভয়ের তারতম্য বিচারের আর কি কারণ থাকতে পারে?</p>
<p>আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নিত্য নতুন আবিষ্ক্রিয়ার দ্বারা অভিভূত হয়ে ধর্মের প্রতি সংস্কার দৃষ্টিক্ষেপ করা এমন লোকের পক্ষেই শোভা পায়, যার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে যে, প্রতিটি নতুন জিনিসই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কাজেই যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাকে গ্রহণ করা কিংবা তার প্রতি ঈমান পোষণ করা একান্ত আবশ্যক। এমনকি, তা যদি শুধু আনুমানিক ও কাল্পনিক জিনিসও হয় এবং প্রগাঢ় বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নিয়ে, নির্ভুল মানদণ্ডে তা যাচাই করা নাও হয়, তবু তা বরণ করতে হবে। বস্তুত এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন লোকদের মধ্যেই আজ &#8216;চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতি রচনা&#8217;র আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতি কিভাবে রচিত হয়, কোন্ পদ্ধতিটি যুক্তিসম্মত আর কোনটি নিছক বালকসুলভ এই কথাটি পর্যন্ত তারা জানেনা। অনুরূপভাবে চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি দ্বারা সমৃদ্ধ হবার দাবিটাও এই শ্রেণীর স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের একটা বৈশিষ্টে পরিণত হয়েছে। <strong>কিন্তু তারা এতোটুকু অবহিত নয় যে, নিছক চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি একটা ফিতনা, বরং একটা ভয়ঙ্কর জিনিস। বিশেষত, তার সঙ্গে যদি প্রশস্ত ও পরিপক্ক জ্ঞান, প্রগাঢ় ও পরিণত দৃষ্টি এবং সুষম ও স্বচ্ছ চিন্তাশক্তির সমাবেশ না ঘটে, তবে তা গুরুতর আকার ধারণ করতে বাধ্য। আর এই জিনিসগুলো সম্পর্কে আজকাল যেরূপ ধারণা পোষণ করা হয়, প্রকৃতি ততোটা অকৃপণভাবে এগুলো দান করেনি।</strong></p>
<p>প্রথমোক্ত মতবাদটি থেকে যে দ্বিতীয় মতটির সৃষ্টি হয়েছে, তাহলো এই যে, এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানে&#8217;র যুগ নেই, বরং এটা হচ্ছে &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যক্ষেণের প্রতি ঈমানে&#8217;র দিন। এই কথাগুলো দ্বারা বক্তা আসলে কি বুঝাতে চান, অনেক চিন্তা ভাবনার পরও তা আমার বোধগম্য হয়নি। একথার তাৎপর্য যদি এই হয় যে, বর্তমান যুগের গায়েব বা অদৃশ্য পদবাচ্য কোনো জিনিসকে স্বীকার করা এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো বস্তুকে গ্রহণ করাই হয়না, তবে তা নিতান্তই ভুল। অন্যকথায় এর তাৎপর্য দাঁড়ায় এই যে, বর্তমান যুগের মানুষ এমন একটি সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে সীমিত থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যেখানে কেবল অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই তাদের জন্যে জ্ঞানার্জনের উপায় হতে পারে এবং ইন্দ্রিয়নিচয়ই শুধু ক্রিয়াশীল থাকতে সক্ষম। এই পরিধির বহির্ভূত বিষয়গুলো সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করা এবং অনুমান অনুসন্ধান মারফত সে সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কাজ মানুষ পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু যিনি &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নবতর আবিষ্ক্রিয়া&#8217; সম্পর্কে মোটামুটি অধ্যয়নও করেছেন, এই ভাষণকে তিনি মোটেই স্বীকার করবেননা। দর্শন ও অতি প্রকৃতিবাদের কথা ছেড়েই দিন, কারণ এ দু&#8217;টির গোটা প্রতিপাদ্যই হচ্ছে অদৃশ্য বিষয়। খোদ জড় বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার কথাই ধরুন, কারণ এর ওপর নির্ভর করেই সমালোচকপ্রবর &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে&#8217;র প্রতি ঈমানের দোহাই পাড়ছেন। এই শাস্ত্রটির কোন বিভাগের গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান শক্তি, এনার্জি, প্রাকৃতিক বিধান, মৌলসূত্র, কার্যকারণ এবং এই ধরনের বিষয়াদির স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়? কোন পদার্থ বিজ্ঞানী এগুলোর প্রতি বিশ্বাস করেননা? কিন্তু আপনি কোনো জাঁদরেল বিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, এসবের মধ্যে কোনটির গুঢ় রহস্য তিনি জানেন? কোন্ বস্তুর কতোটুকু তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন? কোন্টির অস্তিত্ব তিনি প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হয়েছেন এবং কোন্টির সপক্ষে তিনি যথার্থ প্রমাণ পেশ করতে পারেন? বস্তুত এসব কিছুকেই গায়েবের প্রতি ঈমান ছাড়া আর কি বলা চলে?</p>
<p><strong>এ কথাগুলোর দ্বিতীয় অর্থ এই হতে পারে যে, বর্তমান যুগে কেবল এমন জিনিসই স্বীকৃত হয়ে থাকে, যা প্রতিটি মানুষের প্রত্যক্ষ করার উপযোগী এবং গোটা মানব সমাজই যা প্রত্যক্ষ ও পর্যবক্ষেণ করেছে। কিন্তু এ ধরনের কথা কোনো বুদ্ধিমান লোকের মুখ দিয়েই নিঃসৃত হতে পারেনা। কারণ, একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, কোনো মানুষই ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত মানবীয় জ্ঞানের অধিকারী নয়, বরং তার একটি বড় ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ দল ও ব্যক্তিদের বিশেষত্ব রয়েছে। এই বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডারের প্রতিটি বিভাগ কেবল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছে প্রত্যক্ষ, আর বাকি সমস্ত মানুষের কাছে অদৃশ্য। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষকে ঐ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও দলের প্রতিই গায়েবী ঈমান পোষণ করতে হয়।</strong></p>
<p>বক্তব্যটির তৃতীয় অর্থ এ-ও হতে পারে যে, এযুগের মানুষ কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ বিষয়কেই স্বীকার করে এবং নিজের কাছে অদৃশ্য কোনো জিনিসকেই তারা বিশ্বাস করেনা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর চাইতে অবাস্তব কোনো কথাই মানুষের মগজ থেকে বের হতে পারেনা। কারণ এ ধরনের মানুষ পূর্বে কখনো দুনিয়ায় পাওয়া যায়নি, আজো পাওয়া যাবেনা এবং কিয়ামত অবধি পাওয়া যাবার কোনো সম্ভাবনাও নেই। এমন লোক যদি বাস্তবিকই কোথাও থেকে থাকে তো তাকে খুঁজে বের করতে আদৌ কালবিলম্ব করা উচিত নয়। কারণ &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্ক্রিয়া&#8217;র মধ্যে এটিই হবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। ফলকথা, যে কোনো দিক থেকেই উক্তিটিকে বিচার করা যাক না কেন, এর ভেতর সত্যতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবেনা। খোদ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই একথার সাক্ষ্য বহন করে যে বর্তমান যুগটিও অতীতের ন্যায়ই অদৃশ্যে বিশ্বাসী আর এই অদৃশ্যে বিশ্বাস থেকে মানুষ কখনো নিষ্কৃতি পেতে পারেনা। প্রতিটি মানুষ হাজারে ৯৯৯ টিরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অদৃশ্যে বিশ্বাস পোষণ করতে বাধ্য। এখন সে যদি কেবল নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের উপরই ঈমান আনার সিদ্ধান্ত করে বসে তাহলে অন্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যে বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার সে সঞ্চয় করেছিলো, তা সবই তাকে বিসর্জন দিতে হবে। নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া জ্ঞানার্জনের তামাম উপায় ও সূত্রই তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। এমতাবস্থায় দুনিয়ার কোনো কাজ করা তো দূরের কথা, নিজের অস্তিত্বই সে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা। বস্তুত অদৃশ্যে বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি পুরোপুরি নির্ভরতা যেমন এযুগে সম্ভব নয়, তেমনি এর চাইতে উজ্জ্বলতর কোনো যুগেও তার সম্ভাবনা নেই। যে কোনো যুগে এবং যে কোনো অবস্থায় মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়াই শুধু অন্যের প্রতি নির্ভর করে বহুতরো বিষয় মেনে নিতে বাধ্য। কতগুলো বিষয় শুধু প্রচলিত ধারণা হিসেবেই মানতে হয়, যেমন সেঁকোবিষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এই যে, এটি খেলে মানুষ মরে যায়। অথচ এটি ব্যক্তিগতভাবে খেয়ে সবাই পরিক্ষা করে দেখেনি কিংবা কাউকে খেয়ে মরতেও দেখেনি। কতকগুলো বিষয় আবার এক বা একাধিক নির্ভরযোগ্য লোকের বর্ণনার ভিত্তিতেই মানতে হয়। যেমন আদালতের সাক্ষ্য বিশ্বাস না করলে আইনের যন্ত্রটি এক মুহূর্তের জন্যেও চলতে পারেনা। কতগুলো ক্ষেত্রে আবার নিছক একজন পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞের কথা বিশ্বাস করতে হয়। স্কুল কলেজের ছাত্রদের বেলায় তো এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যাপার। তারা যদি বিভিন্ন শাস্ত্রের পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের গবেষণা, আবিষ্কার ও মতাদর্শের প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস পোষণ না করে, তবে জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক কদমও সামনে এগোতে পারেনা। ফলে ঐ পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের ন্যায় জ্ঞান গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধানের মতো যোগ্যতাও তারা কখনো অর্জন করতে পারেনা।</p>
<p>এথেকে প্রমাণিত হলো যে, যেসকল ব্যাপারে আমরা অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা জ্ঞানার্জন করিনি, সেসব ক্ষেত্রে অন্য লোকের প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে আমরা বাধ্য। এখন কোন্ ব্যাপারে কার প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত কেবল এই প্রশ্নটিই বাকি থেকে যায় এবং এর ওপরই সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্ভর করে। নীতিগতভাবে এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, যে ব্যাপারে কোনো ব্যক্তি বা দলের ভালো জ্ঞান আছে এবং জ্ঞানার্জনের ভালো উপায়ও করায়ত্ত রয়েছে বলে আমাদের প্রতীতি জন্মাবে সে ব্যাপারে কেবল তার ওপরই বিশ্বাস পোষণ করা উচিত। এই সাধারণ রীতি অনুযায়ী একজন রুগী ডাক্তারের কাছে না গিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করেনা। মামলা-মোকাদ্দমার ব্যাপারে কেউ আইনজ্ঞ বাদ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের শরণার্থী হয়না। কিন্তু ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের প্রশ্নেই কেবল এ-ব্যাপারে মতানৈক্য লক্ষ্য করা যায়। কেবল সেখানেই প্রশ্ন ওঠে এসব ব্যাপারে দার্শনিক ও যুক্তি-বিজ্ঞানীদের মতামত গ্রহণ করা হবে, কি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুদের কথা শোনা হবে? আল্লাহ্, ফিরিস্তা, ওহী, ইলহাম, আত্মা, পুনরুজ্জীবন এবং পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাকার গায়েবী বিষয়ে কি কান্ট, স্পেনসর, আইনেস্টাইন, বেগর্সন প্রমুখের কথা মানা হবে, না ইব্রাহীম আ., মূসা আ., ঈসা আ. ও মুহাম্মদ স. প্রমুখের বক্তব্য শোনা হবে। &#8216;চিন্তা ও বুদ্ধির স্বাধীনতা&#8217;র দাবিদারদের মানসিক ঝোঁক প্রথম দলের দিকে। এরা তাদেরই সংগৃহীত মানদণ্ডে নবীদের কথা যাচাই করে চলেছে এবং এই যাচাইয়ের ফলে যে বিষয়টি উত্তীর্ণ হচ্ছে, সেটিকেই তারা গ্রহণ করছে। সেটিকে তারা নবীদের কথা বলেই স্বীকৃতি দিচ্ছেনা; বরং দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা তার গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট দিয়েছেন বলেই স্বীকার করা হচ্ছে। (দুর্ভাগ্যক্রমে, এই ধরনের বিষয় নিতান্তই কম, বরং একেবারে নেই বললেই চলে) পক্ষান্তরে যে বিষয়টি এই মানদণ্ডে অনুত্তীর্ণ হয় সেটিকে তারা অনির্ভরযোগ্য বলে নাকচ করে দিচ্ছে। অপরদিকে &#8216;প্রাচীন পন্থী&#8217; ও &#8216;গুরুবাদীদে&#8217;র বক্তব্য এই যে, প্রকৃতিবাদ ও যুক্তিবাদ সম্পর্কে ধর্মতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মাবাদীদের কাছে প্রশ্ন করোনা, কিংবা ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের কথা যুক্তিবাদী প্রকৃতিবাদীর কাছে জিজ্ঞেস করোনা। কারণ উভয়ের কর্মক্ষেত্রই সম্পূর্ণ আলাদা বিধায় একটি শাস্ত্র সম্পর্কে অন্য শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞের মতামত জিজ্ঞেস করা মূলতই ভুল। <strong>দার্শনিক ও বিজ্ঞানী তাদের নিজ নিজ শাস্ত্রে যতোই পারদর্শী হননা কেন, ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদে তাঁদের মর্যাদা একজন সাধারণ মানুষের চাইতে মোটেই বেশি নয়। কারণ এ সম্পর্কে জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহের যেটুকু উপায় তাদের করায়ত্ত, একজন সাধারণ লোকেরও ততোটুকু উপায়ই করায়ত্ত। প্রকৃতপক্ষে এ শাস্ত্রটি শুধু নবীদের জন্যেই নির্দিষ্ট। তারাই এ শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। এ সম্পর্কিত জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহের প্রকৃত উপায়ও তাঁদেরই করায়ত্ত। কাজেই এসব ব্যাপারে তাঁদের প্রতিই &#8216;অদৃশ্য বিশ্বাস&#8217; পোষণ করা উচিত। এব্যাপারে বড়জোর এইটুকু প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সত্যবাদী এবং ধর্মতত্ত্বে পূর্ণাঙ্গ দূরদৃষ্টির অধিকারী কিনা? কিন্তু যখনি এটা প্রমাণ হয়ে যাবে যে, তাঁরা বাস্তবিকই এ ব্যাপারে যোগ্যতার অধিকারী, তখন স্বকীয় দূরদৃষ্টি ও জ্ঞানানুযায়ী তারা যা কিছু করেছেন, তা সবই আপনাকে সত্য বলে মানতে হবে।</strong> তাঁদের প্রচারিত সত্যকে অস্বীকার এবং তার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রমাণ উত্থাপন করা আর অন্ধ কর্তৃক সূর্যের অস্তিত্ব অস্বীকার এবং চক্ষুষ্মান ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সূর্যের অস্তিত্ব বিরোধী দলিলপত্র পেশ করা একই কথা। এই ধরনের লোক নিজস্ব ধারণায় যতোবড় দার্শনিকই হোক না কেন, কিন্তু যে ব্যক্তি নিজ চোখে সূর্যকে প্রত্যক্ষ করছে, সে-যে এই অন্ধ সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করবে, তা বলাই নিষ্প্রয়োজন।</p>
<p>সমালোচক হয়তো বলবেন, নবীগণ অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্কার উদ্ভাবনী&#8217; দ্বারা তা সমর্থিত হয়না। এ কারণেই লোকেরা &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217; নিক্ষিপ্ত হয়ে &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র অভিশাপ ভোগ করছে। কিন্তু আমি বলবো, এসব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার মধ্যেই বা এমন কোন্ নিশ্চয়তাটা রয়েছে, যা ইসলামী নীতির পরিপন্থী? এমন কোনো বিষয় থাকলে তার উল্লেখ করুন যাতে করে আমরাও ভেবে দেখতে পারি যে, কুরআন শরীফ এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি, এর মধ্যে কোনটি আমরা মেনে চলবো! যদি তা না থাকে আর তা কিছুতেই থাকতে পারেনা, যেমন আপনার উক্তি &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধ&#8217; &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217; ইত্যাদি থেকেও প্রমাণিত হয় তবে কি আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক আবিষ্কার উদ্ভাবনীর অস্ত্রাগারে কেবল ধারণা কল্পনা ও আন্দাজ অনুমানের অস্ত্রই মওজুদ রয়েছে, যার ওপর ভরসা করে ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হচ্ছে? এবং সে অস্ত্রের ধারণা দেখে শুধু চাকচিক্য দেখেই &#8216;স্বাধীন চিন্তাধারা&#8217;র উপাসকরা এই আশা পোষণ করছেন যে, ধর্ম তার নাম শুনেই ময়দান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে? আপনি ঐ জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্কারাদিকে যতোই গুরুত্ব দিন না কেন, কিন্তু মনে রাখবেন, অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে তা মোটেই নিশ্চয়ক বস্তু নয়। তার প্রভাবে বড়জোর আপনি নিজে &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217; নিক্ষিপ্ত হতে পারেন এবং বলতে পারেন যে, ওহী, ইলহাম, পূনরুজ্জীবন, পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার, ফিরিশতাদের অস্তিত্ব এমনকি আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কেও আমরা ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারিনা। কিন্তু আপনাকে &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র অভিশাপ থেকে মুক্তি কিংবা &#8216;সানন্দে কাফির সাজা&#8217;র আশির্বাদ লাভ করবার ব্যাপারে এসব জ্ঞান বিজ্ঞানের পক্ষে কিছু মাত্র সাহায্য করা সম্ভবপর নয়। কারণ উল্লেখিত বিষয়াদিকে চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করার মতো কোনো যুক্তি প্রমাণ এসকল জ্ঞান বিজ্ঞানে উপস্থিত থাকতে পারেনা। তাছাড়া কোনো জিনিসের অনস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে শুধু এটুকু যুক্তিই যথেষ্ট নয় যে, তার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্কারাদি&#8217; আপনাকে শুধু &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217;র চরম পর্যায়ে নিয়েই পৌছিয়ে দিচ্ছে আর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে এ হচ্ছে একটি নিকৃষ্টতম স্থান। বস্তুত যে জ্ঞান বিজ্ঞান মানুষকে নিশ্চয়তা, নিশ্চিন্ততা ও প্রত্যয়শীলতা দান করতে পারেনা, যা তাকে শূন্যে দোদুল্যমান অবস্থায় নিক্ষেপ করে এবং কোথাও এতোটুকু স্থিরতা লাভের অবকাশ দেয়না, যা তাকে &#8216;কাফির হয়োনা, দায়ে ঠেকে মুসলমান হও&#8217; এর মতো ন্যাক্কারজনক অবস্থায় ফেলে দেয়, তা নিঃসন্দেহে অজ্ঞতার চাইতেও নিকৃষ্টতর।</p>
<p><em>এই সংস্কটাবস্থা থেকে একমাত্র &#8216;ঈমান বিল্ গায়েব&#8217; বা অদৃশ্যে বিশ্বাসই মানুষকে রক্ষা করতে পারে। একবার যদি আপনি কাউকে নবী বলে মেনে নেন এবং সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করেন যে, খোদায়ী জ্ঞানশাস্ত্রে তিনি পুরোপুরি ব্যুৎপত্তির অধিকারী এবং তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেননা, তবে আর অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে আপনার মনে কোনো সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের অবকাশ থাকতে পারেনা। এর ফলে আপনার ধর্মমত বিশ্বাস ও প্রত্যয় এমন এক মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় যা কোনো আধুনিক জ্ঞান বা নবাবিষ্কার, চিন্তা ও কর্মের নতুন ধারা এবং &#8216;মুক্তবুদ্ধির&#8217; কোনো প্রবল প্রতাপে আহত হয়না।</em> এই কারণেই কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই কিতাব হচ্ছে মুত্তাকী লোকদের পথপ্রদর্শক। আর মুত্তাকী লোকদের প্রথম পরিচয় হচ্ছে এই যে, তারা অদৃশ্যবিষয়ে ঈমান পোষণ করে:</p>
<blockquote><p>&nbsp;</p>
<p>هُدًى لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ . (البقرة)</p>
<p>অর্থ: এই কুরআন মুত্তাকীদের পথ প্রদর্শক, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।&#8217;</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বস্তুত &#8216;ঈমান বিল গায়েব&#8217; বা অদৃশ্যে বিশ্বাসের ওপরই ধর্মের গোটা ঈমারত প্রতিষ্ঠিত। কাজেই এই মূলভিত্তিকে একবার চুরমার করে ফেললে তারপর ধর্মের এসব বুনিয়াদী মতবিশ্বাস সম্পর্কে যে গুলোর নিগুঢ় রহস্য জানার কোনো উপায়ই আপনার কাছে নেই কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আপনি পৌছতে পারেননা। এমতাবস্থায় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তার যথার্থতা সম্পর্কে আপনার নিজেরই পুরোপুরি আস্থা হবেনা এবং তার সত্যতা সম্পর্কে অন্য লোককেও আপনি আস্থাবান করতে পারবেননা।</strong> এ ব্যাপারে সর্বশেষ প্রশ্ন হলো, এক ব্যক্তি আল্লাহর নবী এবং তিনি ধর্মতত্ত্বে পুরোপুরি বি্যুৎপত্তির অধিকারী এটা জানবার উপায় কী? তিনি এতোবড় সত্যবাদী যে, তিনি অদৃশ্য বিষয়ে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধির সীমাবহির্ভূত কথা বললেও আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস পোষণ করবো এবং তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেননা, একথা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করবো এটাই বা বুঝবো কি করে? এই প্রশ্নটির মীমাংসা দু&#8217;টি জিনিসের উপর নির্ভরশীল। প্রথম, তাঁর ব্যক্তি চরিত্র আমাদের সকল সম্ভাব্য পন্থায় এবং কঠোরতর মানদন্ডে যাচাই করে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর পেশকৃত বিষয়াদির মধ্যে যেগুলো আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচারশক্তির অন্তর্ভুক্ত, সেগুলোকে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। এই উভয় পরীক্ষায় যদি কেউ অনুপম সত্যবাদী বলে প্রমাণিত হন এবং সেই সঙ্গে মানব জীবনের চিন্তা ও কর্মের সকল দিক ও বিভাগের জন্যে প্রদত্ত তাঁর বিচক্ষণ ও কল্যাণকর ব্যবস্থার মধ্যে কোনো ত্রুটি নির্দেশ করতে সক্ষম না হয়, তবে তাকে সত্যবাদী বলে স্বীকার না করার কোনোই হেতু নেই। আর তিনি খোঁজ খবর ও জানা শোনা ছাড়াই নিছক দুনিয়াবাসীকে ধোকা দেয়ার জন্যেই আল্লাহ্, ফেরেশতা, আরশ, কুরসী, ওহী, ইলহাম, পুনরুত্থান, বেহশত ও দোযখ ইত্যাদির একটা বিরাট ষড়যন্ত্র পাকিয়েছেন (আল্লাহ মাফ করুন) বলে সন্দেহ পোষণ করারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।</p>
<p>কাজেই জনাব নিয়াজের তৃতীয় ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, তিনি কুরআনের প্রথম অংশকে (আমরা যাকে দ্বিতীয় অংশ বলে উল্লেখ করেছি) আলোচনার যোগ্যই মনে করেননা, বরঞ্চ তিনি এই ধারণা পোষণ করেন যে, &#8216;এ ব্যাপারে সমস্ত ধর্মই প্রায় একরকম এবং ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্ম থেকে ভিন্ন বা নিকৃষ্টতর নয়। পক্ষান্তরে আমাদের বক্তব্য হলো, তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী কুরআনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অংশের (কিংবা আমাদের বিশ্লেষণ অনুসারে প্রথম অংশের) সত্যতা নির্ণয় করতে হলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত্র এবং কুরআনের অদৃশ্য বহির্ভূত বিষয়াদির পর্যালোচনা করা আমাদের জন্যে অপরিহার্য। পরন্তু ইসলামী শিক্ষার এই অংশটি &#8216;অন্যান্য ধর্ম থেকে ভিন্ন বা নিকৃষ্টতর নয়&#8217; কেবল এটুকু ধারণা নিয়ে তুষ্ট থাকলেই চলবেনা; বরং সেটি তামাম অনিসলামী ধর্মের চাইতে উন্নত এবং উৎকৃষ্ট, যুক্তি প্রমাণ দ্বারা এটাও প্রতিপন্ন করা আবশ্যক। কাজেই আলোচনার এই বিষয়টি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে অন্য বিষয়ের অবতারণা করা নীতিগতভাবেই ভুল। তাছাড়া এ বিষয়টির মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য বিষয়ের মীমাংসা করাও সম্ভবপর নয়।</p>
<p>জনাব নিয়াজের ইচ্ছা হলো, আমরা যেনো &#8216;পরকাল&#8217;, &#8216;কালামে ইলাহী&#8217; এবং আকাইদ ও ইতিহাস সংক্রান্ত আয়াতগুলোর বিচার বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হই। কিন্তু আমাদের মতে, এই আলোচনার দু&#8217;টি দিক রয়েছে এবং তা দু&#8217;টি ভিন্ন দলের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রথম দলটি হলো তারা, যারা রসূলে আকরাম স.-এর নবুয়্যতের প্রতিই ঈমান পোষণ করেনা এবং এই কারণেই তারা উক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে সন্দেহ পরায়ণ। দ্বিতীয় দলটি হলো, যারা তাঁর নবুয়‍্যাতকে স্বীকার করে, কিন্তু অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে সন্দিগ্ধচিত্ত। এই দু&#8217;টি দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পদ্ধতিও ভিন্ন। কাজেই আপত্তিকারী এর কোন দলের অন্তর্ভুক্ত, তা না জানা পর্যন্ত আমরা তাঁর সঙ্গে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে পারিনা।</p>
<p>প্রথম দলটির সঙ্গে পরকাল, কালামে ইলাহী এবং অন্যান্য অদৃশ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা একেবারেই অর্থহীন। কারণ মূল বিষয়ে মতানৈক্য রেখে খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। আমরা পরকাল, কালামে ইলাহী, এমনকি আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণরাজি সম্পর্কেও যে বিষয়গুলোর প্রতি ঈমান ও প্রত্যয় পোষণ করি, তার ভিত্তি এই নয় যে, আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা আমরা কোনো চূড়ান্ত ও নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে পেরেছি এবং তার বিরুদ্ধে আর কোনো যুক্তি প্রমাণ উত্থাপন করা যেতে পারেনা। এমনটি যদি হতো, তো নিসন্দেহে নবুয়্যত সংক্রান্ত আলোচনা করা যেতো। কিন্তু এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের অটল অনড় ঈমান প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্বাসের ওপর গড়ে উঠেছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম সত্যবাদী। তিনি আপন নবুয়্যত এবং কালামে ইলাহী সম্পর্কে যাকিছু বিবৃত করেছেন, তা সবই অভ্রান্ত। এই মৌলিক কারণেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাসী ব্যক্তির সাথে এই বুনিয়াদী প্রশ্নটিকে স্বীকার না করা পর্যন্ত কোনো খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করতে আমরা সম্মত নই।</p>
<p>দ্বিতীয় দলটির এই অধিকার আমরা স্বীকার করিনা যে, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতাও স্বীকার করবে আবার অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে কুরআন মজীদ এবং মুহাম্মদ স.-এর বর্ণনার সত্যাসত্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করবে। কারণ এরূপ ভূমিকা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তারা প্রথম দলটির সামিল হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে তাদের দ্বিতীয় দলে শামিল থাকতে হলে এ সত্য স্বীকার করতে হবে যে, কুরআনের প্রতিটি শব্দ অভ্রান্ত এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকিছু পেশ করেছেন তা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমুক্ত। অবশ্য এ ব্যাপারে সে দু&#8217;টি দিক থেকে প্রশ্ন তুলতে পারে। প্রথম এই যে, কুরআন শরীফে বাস্তবিকই এ ধরনের বিষয় বর্ণিত হয়েছে কিনা? আর রসূলের করীম স. সত্যসত্যই এরূপ কথা বলেছেন কিনা। দ্বিতীয়ত, কুরআন সুন্নায় এ সম্পর্কে যাকিছু রয়েছে, তার সঠিক অর্থ এবং মর্ম কি হতে পারে?</p>
<p>পরিশেষে আমার আর একটি কথা বলতে হচ্ছে। জনাব নিয়াজ &#8216;তর্জমানুল কুরআনে&#8217; একটি বিতর্ক বিভাগ খোলার অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি এই অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছেন যে, তাঁর যাবতীয় শোবা সন্দেহ এবং প্রশ্ন ও আপত্তি তিনি উক্ত বিভাগে পেশ করবেন। কিন্তু পেশাদারি বিতর্ক ও বাদানুবাদ থেকে আমি হামেশাই আত্মরক্ষা করে এসেছি এবং এখনো রক্ষা করতে ইচ্ছুক। কারণ যে বিতর্কের উদ্দেশ্য গুরু মস্তিষ্কের ব্যায়াম আর বুদ্ধির কসরৎ দেখিয়ে বাহবা কুড়ানো তেমন বিতর্কের আমি আদৌ পক্ষপাতী নই। তবে জ্ঞানগর্ভ ও তত্ত্বপূর্ণ আলোচনার জন্যে আমি সর্বদাই প্রস্তুত, যদি সে আলোচনার উদ্দেশ্য হয় সত্যানুসন্ধান এবং তাতে উভয়পক্ষ এমনি আন্তরিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন যে, আসল সত্য প্রমাণিত হবার পর প্রত্যেকে তা স্বীকার করে নেবেন। এই হিসেবে &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় যেসব শোবা সন্দেহ ও আপত্তি প্রকাশিত হবে, তর্জমানুল কুরআনে তা পুনরুল্লেখ করা হবে এবং সেই সঙ্গে তার জবাবও দেয়া হবে। অনুরূপভাবে &#8216;তরজুমানুল কুরআনে&#8217;র জবাব সম্পর্কে জনাব নিয়াজ কোনো মন্তব্য করলে মূল জবাবটিও তার সঙ্গে উল্লেখ করবেন বলে আশা করি, যাতে করে উভয় পত্রিকার পাঠকবর্গ আলোচনার উভয় দিক সম্পর্কে অবহিত এবং সেই সম্পর্কে নিজেরাও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। পক্ষান্তরে কেবল একটি দিক উল্লেখ করা এবং অন্যদিক এড়িয়ে যাওয়াকে আপন দুর্বলতার স্বীকৃতি বলেই আমি মনে করি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16394</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশের স্থাপত্যে জানালার বৈচিত্র্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সুলতানা রাজিয়া]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 21 Nov 2025 16:17:26 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16288</guid>

					<description><![CDATA[জানালা- বাইরের কোলাহল ও অন্দরমহলের নৈঃশব্দের এক অনন্য মেলবন্ধনের সুর। যে সুরের কাব্যিক প্রহেলিকায় রচিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের বিচিত্র চিত্রপট। প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি খোদাই ,কারুকাজ এবং প্রতিটি ফ্রেম এক একটি স্থাপনার সময়ের দলিল হিসেবে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কথা বলে। যেন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>জানালা- বাইরের কোলাহল ও অন্দরমহলের নৈঃশব্দের এক অনন্য মেলবন্ধনের সুর। যে সুরের কাব্যিক প্রহেলিকায় রচিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের বিচিত্র চিত্রপট। প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি খোদাই ,কারুকাজ এবং প্রতিটি ফ্রেম এক একটি স্থাপনার সময়ের দলিল হিসেবে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কথা বলে। যেন এক একটি ক্যানভাসরুপে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে রয়ে যায়।</p>
<p>এক্ষেত্রে উপমহাদেশের স্থাপত্যে, শিল্পের অনবদ্য ছাপ জানালাগুলোতে যেন আরও বিস্তৃত বিশেষণ দেয়; স্থাপত্যের বিশেষ অংশ হিসেবেই নয় বরং&nbsp; প্রকৃতি ও মানুষের অমলিন মেলবন্ধনের শ্বাশত আবহের প্রতীকরুপে। কেবল আলো-বাতাস চলাচলের জন্যই জানালাগুলো&nbsp; তৈরি করা হত না বরং একদিকে বাইরের পৃথিবীকে ফ্রেম করতো অন্য দিকে অভ্যন্তরের মানুষের সুরক্ষা্য় সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দিত। বৈরী আবহাওয়ায় বা বৃষ্টির স্নিগ্ধতায়, কখনো বা রাতের নীরবতা উপেক্ষায় জানালার ওপারেই যেন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রশান্তির আশ্রয়। অর্থাৎ জানালাগুলোর কাঠামো এমনভাবেই তৈরি করা হত প্রতিকূলতায়ও আশ্রয় নেয়াই ছিলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।</p>
<p>তাপ নিয়ন্ত্রণেও একাধিক স্তরের জানালার জালি কিংবা রঙিন কাচ, সূর্যালোক ছেকে নিয়ে অন্দরমহলে মৃদু আলো্য় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করতো যেখানে আলোর পরোক্ষ প্রবেশে অভ্যন্তরের অনুভব যেন তীব্র সুর্যালোকের মনোমুগ্ধকর আভায় স্নিগ্ধ বহিঃ প্রকাশ। অপরদিকে বিশুদ্ধ বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করতেও জানালার একাধিক স্তরে জালির ভূমিকা বিশেষ।</p>
<p>এছাড়াও জানালার আদলে আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির ছাপ ছিলো স্পষ্ট। সমাজের একেকটি গল্পের একেক বাহকরুপে দৃশ্যমান হলেও প্রতিটি জানালায় শৈল্পিক দক্ষতার স্পর্শে পবিত্রতার এবং নান্দনিকতার মেলবন্ধনে এক গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলিত রুপ বিদ্যমান। বৈচিত্রময় নকশা ,কারুকাজ একদিকে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করে&nbsp; এবং অন্যদিকে তাদের জীবনধারার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। <strong>দেখা যায়&nbsp; জানালার এসব বৈচিত্র্যময় বিকাশ ও নান্দনিকতার মাধ্যমে মুলত স্রষ্টার একত্বের প্রকাশই মুখ্য বিষয়।</strong></p>
<p>উপমহাদেশে ইসলাম আগমনের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্য যে নতুন এক মাত্রা পেয়েছিল তা মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংলাপ। আর এই প্রেক্ষিতে জানালার ভাষা নানান কণ্ঠে রূপ পেল—কখনো পাথরের জালি, কখনো কাঠের ঝারোখা, কখনো বা পোড়ামাটির অলংকরণে।</p>
<ul>
<li><strong>জালি কাজ</strong>: ১২শ শতকের শেষভাগে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যে এক অভিনব অভিযোজন ‘জানালায় জালি কাজ’। প্রথম দেখা মেলে দিল্লির কুওয়াত-উল ইসলাম মসজিদের স্থাপত্যে। পাথর বা কাঠের উপর সূক্ষ্ম খোদাইয়ের মাধ্যমে এ ধরনের জালি তৈরি করা হত। জালির সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে জানালাগুলোর নকশায় জটিল জ্যামিতি, আরবী ক্যালিগ্রাফি এবং নিখুঁত এরাবেস্ক নকশা করা হতো। এসব কৌশল অবলম্বনে বাইরের পরিবেশ থেকে যেমন অভ্যন্তরভাগের পর্দা (হায়া) রক্ষা করা হত, তেমনি আলো ও বাতাসের পরোক্ষ প্রবাহের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ শীতলতাও বজায় থাকতো।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16289" aria-describedby="caption-attachment-16289" style="width: 721px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16289 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1.jpg" alt="" width="721" height="738" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1.jpg 721w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1-293x300.jpg 293w" sizes="(max-width: 721px) 100vw, 721px" /><figcaption id="caption-attachment-16289" class="wp-caption-text">জালি কাজ</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>আরকুয়েট স্টাইল</strong>: উপমহাদেশে ১৩১১ সালে আলাই দরওয়াজায় প্রথম আরকুয়েট জানালার ব্যবহার শুরু হয়। বৃহৎ পরিসরে আলো-বাতাস প্রবেশের জন্যই ইসলামিক স্থাপত্যে ‘খিলানযুক্ত জানালা’ একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এছাড়াও পূর্বের ট্র্যাবেটেড (আনুভূমিক বীম আর আড়াআড়ি খুঁটির সমন্বয়ে গঠিত) পদ্ধতির বিপরীতে ভূসুয়া খিলান (স্থায়িত্বশীল) পদ্ধতির কাঠামো আবিষ্কার হয় যা উপমহাদেশীয় ইমারতের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও উচ্চতর নির্মাণশৈলীর বাহক। খিলান কখনও হয় অর্ধবৃত্ত, কখনও ওজাইভ (উপরের দিক উপবৃত্তাকার শীর্ষযুক্ত; pointed arc), আবার কখনও সূক্ষ্ম সর্পিলকৃতির—যেন জানালার জালি ও &nbsp;খিলানের জ্যামিতিক নকশার পরিমিত বিন্যাসের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া এক অভিন্ন ব্যাকরণ। আলাই দরওয়াজায় ছাড়াও হুমায়ুনের সমাধি, জামে মসজিদ, আকবরের মকবরা, ফতেহপুর সিক্রি এবং তাজমহল—সবখানেই আরকুয়েট জানালা; এমনকি বাংলার আটচালা ও দোচালা গঠনেও খিলানবিশিষ্ট জানালার সংযোজন দেখা যায়।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16292" aria-describedby="caption-attachment-16292" style="width: 708px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16292 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2.jpg" alt="" width="708" height="548" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2.jpg 916w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2-300x232.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2-768x594.jpg 768w" sizes="(max-width: 708px) 100vw, 708px" /><figcaption id="caption-attachment-16292" class="wp-caption-text">আরকুয়েট স্টাইল</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>জ্যামিতিক নকশা</strong>: জানালার অলংকরণে জ্যামিতির বিন্যাস উপমহাদেশের স্থাপত্যশৈলীর এক অভিনব উৎকর্ষতা। জটিল জ্যামিতি ও এরাবেস্ক নকশা স্থাপত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে আধ্যাত্মিকতারও প্রতিফলন ঘটায়। শুধু তাই নয় উপমহাদেশের ইসলামি স্থাপত্যে জ্যামিতি স্থানীয় উপকরণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুন এক ভাষা তৈরি করে যেখানে পাথর বা কাঠের জালি কেটে জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি করা হত। <em>আগ্রার তাজমহল, দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি, লাহোর দুর্গ</em>—এখানে পাথরের জালির মাধ্যমে বহুমাত্রিক জ্যামিতিক প্যাটার্ন ব্যবহৃত হয়েছে। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁওয়ের গোয়ালদি মসজিদ— এখানে ইট ও পোড়ামাটির ফলকে জ্যামিতিক অলংকরণ করা হয়েছে।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16293" aria-describedby="caption-attachment-16293" style="width: 726px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16293 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3.jpg" alt="" width="726" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3.jpg 1164w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-300x182.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-1024x622.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-768x466.jpg 768w" sizes="(max-width: 726px) 100vw, 726px" /><figcaption id="caption-attachment-16293" class="wp-caption-text">জ্যামিতিক নকশা</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>রঙিন কাঁচের ব্যবহার</strong>: উপমহাদেশের স্থাপত্যে রঙিন কাচের ব্যবহার স্থাপত্যশৈলীতে যেমন নতুন মাত্রা যোগ করেছে তেমনি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম উপাদান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রঙিন কাঁচের ব্যবহার মোঘল স্থাপত্যের মাধ্যমে শুরু হলেও কেবল মোঘল স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; খুব দ্রুত অন্যান্য স্থাপত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। জানালার কাচ ও কাঠের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হত যেন সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে অভ্যন্তরে প্রশান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও রঙিন কাঁচের মাধ্যমে আলোর নান্দনিক প্রতিফলন অন্দরমহলে বিশেষ আবহ তৈরি হয় যার কারণে এর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সুলতান আকবরের শাসনামলে ফতেহপুর সিক্রিতে, সুলতান শাহজাহানের আমলে তাজমহলে রঙিন কাঁচের ব্যবহার দেখা যায় এবং পরবর্তীতে দিল্লির অন্যান্য মোঘল স্থাপত্যে ব্যবহারের মাধ্যমে আরও বিস্তৃতি পায়।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16295" aria-describedby="caption-attachment-16295" style="width: 706px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16295 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1.jpg" alt="" width="706" height="692" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1.jpg 729w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1-300x294.jpg 300w" sizes="(max-width: 706px) 100vw, 706px" /><figcaption id="caption-attachment-16295" class="wp-caption-text">রঙিন কাঁচ</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>ঝারোখা জানালা: </strong>ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ঝারোখা জানালা; কাঠামোগতভাবে ওরিয়েল জানালা যা ভবনের উপরিভাগ থেকে প্রসারিত হয় এবং বাইরের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে সম্মুখভাগে উন্মুক্ত হয়। ১৬শ-১৮শ শতাব্দীতে,রাজপুত এবং মোঘল স্থাপত্যের প্রভাবে, এগুলি স্থাপত্যের ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠে। কেননা এ জানালাগুলোকে ধরা হত <em>ইমারাহ</em>-র চূড়ান্ত প্রকাশরুপ—যেখানে আমির ও উম্মাহর মাঝে সম্পর্ক গড়ে উঠত সম্মান, নিকটতা ও তাকরিমের ভিত্তিতে অর্থাৎ সমাজে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় অর্থে এক প্রতীকী কাঠামো। আর সাধারণ মানুষের জন্য বাইরের জগৎ অবলোকনের স্বাধীনতা, বিশেষত নারীদের জন্য মর্যাদা ও গোপনীয়তার নিখুঁত সমন্বয়। ঝারোখার জালি-কাজ, পাথরখোদাই ও অলঙ্করণ কেবল প্রাসাদ নয়, নগরীর অলিগলির দৃশ্যপটকেও শিল্পমণ্ডিত করত। রঙিন কাঁচ, খচিত পাথর ও খোদাইকৃত কাঠের ফ্রেম—সব মিলিয়ে যেন এক ছায়াময় সংগীত।</li>
</ul>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16296 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5.jpg" alt="" width="610" height="388" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5.jpg 985w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5-300x191.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5-768x489.jpg 768w" sizes="(max-width: 610px) 100vw, 610px" /></p>
<figure id="attachment_16297" aria-describedby="caption-attachment-16297" style="width: 610px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16297" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6.jpg" alt="" width="610" height="452" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6.jpg 985w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6-768x569.jpg 768w" sizes="(max-width: 610px) 100vw, 610px" /><figcaption id="caption-attachment-16297" class="wp-caption-text">ঝারোখা</figcaption></figure>
<p>সময়ের বিবর্তনে সাধারণত এসব জানালার <strong>জালি কাজ</strong>, <strong>আরকুয়েট স্টাইল</strong>,<strong> জ্যামিতিক নকশা</strong> এবং <strong>রঙিন কাঁচের </strong>ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; একইসাথে ব্যবহারের সুবিধার্থেও আজও প্রাসঙ্গিক।নিচে উপমহাদেশের স্থাপত্যে জানালার বৈচিত্র্য ও বিবর্তন ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো। এখানে প্রাক সুলতানি আমল থেকে শুরু করে দিল্লি সালতানাত, তুঘলক, লোদী ও মোঘল আমল, এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত জানালার শিল্পরূপ ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমবিকাশ তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষত জানালার নান্দনিকতা, কার্যকারিতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রতিফলনও ধাপে ধাপে লক্ষ্যণীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কুতুব মিনার (Qutub Minar, Delhi)</strong></p>
<p>১২শ শতকের শেষভাগে তুর্কি বিজয়ের পর নির্মিত দিল্লির কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের জানালায় জালির (তারকা আকৃতির জালি) প্রথম সূচনার দেখা মেলে—যেখানে সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা পাথর-নকশার মাধ্যমে আলো ও বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়। যা ইসলামী ‘হায়া’ বা সংযমের চেতনাকে প্রতিফলিত করে।</p>
<figure id="attachment_16298" aria-describedby="caption-attachment-16298" style="width: 622px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16298" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7.jpg" alt="" width="622" height="262" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7.jpg 1242w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-300x126.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-1024x431.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-768x323.jpg 768w" sizes="(max-width: 622px) 100vw, 622px" /><figcaption id="caption-attachment-16298" class="wp-caption-text">কুতুব মিনার কমপ্লেক্স</figcaption></figure>
<p><strong>আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া </strong><strong>(১২০০ খ্রি., আজমীর, রাজস্থান)</strong></p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রারম্ভিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। এখানে পাথরে খোদাইকৃত জালি (lattice window) ব্যবহার লক্ষ্যণীয়; পাথরে ছোট ছোট ছিদ্রকাটা জালি জানালা, যা সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশায় অলঙ্কৃত এবং পরবর্তীতে খিলজী, তুঘলক ও মোঘল আমলে আরও সূক্ষ্ম রূপ নেয়।</p>
<figure id="attachment_16302" aria-describedby="caption-attachment-16302" style="width: 473px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16302" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8.jpg" alt="" width="473" height="304" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8.jpg 935w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8-300x193.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8-768x494.jpg 768w" sizes="(max-width: 473px) 100vw, 473px" /><figcaption id="caption-attachment-16302" class="wp-caption-text">আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া</figcaption></figure>
<p><strong>গিয়াসউদ্দিন বলবনের মাকবারা (১২৮৭ খ্রি., দিল্লি, মেহরৌলি) </strong></p>
<p>গিয়াসউদ্দিন বলবনের মাকবারা ভারতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখানে প্রথমবারের মতো Pointed Arch ( ওজাইভ; Ogive) খিলান ব্যবহৃত হয়, যা ভারতীয় উপমহাদেশে পরবর্তী স্থাপত্য বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। উপমহাদেশে <strong>আরকুয়েট শৈলীর (arcuate style)</strong> সূচনার আগে দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যে মূলত <strong>ট্রাবেটেড শৈলী</strong> (Trabeated) প্রচলিত ছিল। খিলানগুলোর মধ্যে <strong>জালি </strong>(perforated screen) সংযুক্ত করা হয়েছিল আলো ও বায়ু চলাচলের জন্য।</p>
<figure id="attachment_16299" aria-describedby="caption-attachment-16299" style="width: 620px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16299" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9.jpg" alt="" width="620" height="273" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9.jpg 961w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9-300x132.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9-768x338.jpg 768w" sizes="(max-width: 620px) 100vw, 620px" /><figcaption id="caption-attachment-16299" class="wp-caption-text">গিয়াসউদ্দিন বালবনের মাকবারা</figcaption></figure>
<p><strong>আলাই দরওয়াজা (১৩১১ খ্রি.)</strong></p>
<p>সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর নির্মিত একটি গেটওয়ে, যেখানে প্রথমবারের মতো True Arch ও গম্বুজ ব্যবহার হয়। জানালায় সূক্ষ্ম জালি ও pointed arch-এর ব্যবহার নিছক দৃষ্টিনন্দনতার জন্য নয়; বরং সূর্যালোক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রিত করে অভ্যন্তরীণ শীতলতা বজায় রাখাই উদ্দেশ্যে।</p>
<figure id="attachment_16300" aria-describedby="caption-attachment-16300" style="width: 600px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16300 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10.jpg" alt="" width="600" height="431" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10.jpg 846w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10-300x216.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10-768x552.jpg 768w" sizes="(max-width: 600px) 100vw, 600px" /><figcaption id="caption-attachment-16300" class="wp-caption-text">বহির্ভাগ&nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; অভ্যন্তরভাগ</figcaption></figure>
<p><strong>খিরকী মসজিদ</strong><strong>&nbsp;(১৩৫১-৫৪)</strong></p>
<p>মসজিদটি ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে জুনা শাহ (ফিরোজ শাহ তুঘলকের একজন প্রধানমন্ত্রী) নির্মাণ করেন। মসজিদের দেয়ালে রয়েছে বহু জালি-জানালা (খিরকী) বা lattice window। এখান থেকেই নাম হয় “খিরকী মসজিদ”।</p>
<figure id="attachment_16301" aria-describedby="caption-attachment-16301" style="width: 519px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16301" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11.jpg" alt="" width="519" height="231" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11.jpg 1122w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-300x134.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-1024x456.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-768x342.jpg 768w" sizes="(max-width: 519px) 100vw, 519px" /><figcaption id="caption-attachment-16301" class="wp-caption-text">খিরকী মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>বড় গম্বুজ মসজিদ</strong></p>
<p>সুলতান সিকান্দার লোদীর আমলে (প্রায় ১৪৯০ খ্রি.) নির্মিত। জানালাগুলো মূলত তীক্ষ্ণ খিলানাকৃতির এবং মোটা পাথরের দেয়ালে বসানো, যা প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর ধারণা দেয়। মোঘল আমলের মতো সূক্ষ্ম ফুলেল খোদাই নেই বরং লোদী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সরল ও দৃঢ়।</p>
<figure id="attachment_16303" aria-describedby="caption-attachment-16303" style="width: 585px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16303" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12.jpg" alt="" width="585" height="255" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12.jpg 1004w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12-300x131.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12-768x335.jpg 768w" sizes="(max-width: 585px) 100vw, 585px" /><figcaption id="caption-attachment-16303" class="wp-caption-text">জানালা, বড় গম্বুজ মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>হুমায়ুনের সমাধি (Humayun’s Tomb)</strong></p>
<p>দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি স্থাপত্যে ব্যবহৃত জানালার আকৃতি অনেক সময় অর্ধবৃত্তাকার বা ঘোড়ার নাল আকৃতির হয়। ফলে খিলান যেমন কাঠামোতে দৃঢ়তা দেয় একইসাথে জ্যামিতিক অলংকরণ, তারকা, ষড়ভুজ ও আরবেস্ক শৈলীর পুনরাবৃত্ত মোটিফের জালি জানালা আলো ছেঁকে অভ্যন্তরে শীতল বাতাস প্রবাহিত করে। যা দিল্লির আবহাওয়ার জন্য&nbsp; কার্যকর সমাধান।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16304 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13.jpg" alt="" width="388" height="287" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13.jpg 792w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13-768x569.jpg 768w" sizes="(max-width: 388px) 100vw, 388px" /></p>
<p>সমাধি স্থাপত্যে আরও এক ধরণের জানালার ব্যবহার দেখা যায়। লাল বেলেপাথর (red sandstone), সাদা ও কালো মার্বেল (white &amp; black marble) দিয়ে এই ধরণের জানালা ও খিলান নির্মিত এবং সূক্ষ্ম খোদাইকৃত জালি জানালা সমাধির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও জানালায় ছোট বারান্দা (jharokha-style) যুক্ত, যেগুলো সমাধির বাইরের দেয়ালে বের হয়ে এসেছে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16306 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15.jpg" alt="" width="394" height="268" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15.jpg 782w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15-300x204.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15-768x522.jpg 768w" sizes="(max-width: 394px) 100vw, 394px" /></p>
<p>নিচের জানালাটি বার্বারের টুম্ব বা নায়ি-কা-গুম্বাদ (Nai-ka-Gumbad) এর, যেটি দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ১৫৯০–৯১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল। এর স্থাপত্য শৈলী মোঘল স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ যেখানে লাল এবং সাদা বেলে পাথরের (Sandstone) সমন্বিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সরাসরি বা ভারী প্রলেপহীন বেলে পাথরের ব্যবহার , পাথরের জালিতে সূক্ষ্ম খোদাই করা জ্যামিতিক প্যাটার্ন সমাধিটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।</p>
<figure id="attachment_16341" aria-describedby="caption-attachment-16341" style="width: 551px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16341" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33.jpg" alt="" width="551" height="378" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33.jpg 1000w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33-300x206.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33-768x528.jpg 768w" sizes="(max-width: 551px) 100vw, 551px" /><figcaption id="caption-attachment-16341" class="wp-caption-text">নায়ি-কা-গুম্বাদ</figcaption></figure>
<p><strong>রানি রূপমতী মসজিদ</strong></p>
<p>সুলতান মুহম্মদ বেগড়া আনুমানিক ১৪৩০- ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে, আহমদাবাদে রানি রূপমতী মসজিদ নির্মাণ করেন। এর জানালাগুলোতে পাথরের মোটা ফ্রেমে বসানো, যেগুলোতে সূক্ষ্ম খোদাই করা অলঙ্করণ রয়েছে এবং ফ্রেমের ভেতরের জালিতে বিভিন্ন আকা্রের <strong>বৈচিত্র্যময়</strong> জটিল জ্যামিতিক নকশা ব্যবহৃত হয়েছে। জানালার দুই পাশে ছোট স্তম্ভ (miniature columns) বা পিলাস্টার (Pilaster) দেখা যায় এবং উপরিভাগে কার্নিস (cornice) বা ছোট ছাউনির মতো প্রক্ষেপণ, যা সূর্যের তাপ ও বৃষ্টির হাত থেকে জানালাকে রক্ষা করে। এছাড়াও জানালার চারপাশে পাথরে খোদাইকৃত ফুল, লতা-পাতা নকশার শৈল্পিক সৌন্দর্য এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা ও আলো-বাতাসের কার্যকারিতা স্থাপত্যশৈলীর উচ্চমাত্রার প্রকাশ।</p>
<figure id="attachment_16305" aria-describedby="caption-attachment-16305" style="width: 632px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16305" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14.jpg" alt="" width="632" height="445" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14.jpg 1045w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-300x211.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-1024x720.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-768x540.jpg 768w" sizes="(max-width: 632px) 100vw, 632px" /><figcaption id="caption-attachment-16305" class="wp-caption-text">রানি রূপমতী মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>অ্যাম্বার ফোর্ট (Amber Fort, ১৬শ শতক, জয়পুর, রাজস্থান)</strong></p>
<p>অ্যাম্বার ফোর্ট মোঘল ও রাজপুত স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি। খিলান (arch), ঝারোখা, জালি ও ফুলেল খোদাই মিলিয়ে অ্যাম্বার ফোর্টের জানালাগুলো আভিজাত্য অনন্য প্রকাশ। খোদাইকৃত মার্বেল বা লাল পাথরে তৈরি সূক্ষ্ম জালি জানালা (Stone lattice / Jaali) অন্দরমহলে আলো-ছায়ার নকশা তৈরি করে, যা প্রাসাদের অভ্যন্তরে রাজকীয় পরিবেশকে রহস্যময় ও শৈল্পিক করে তোলে।</p>
<figure id="attachment_16310" aria-describedby="caption-attachment-16310" style="width: 861px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16310" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16.jpg" alt="" width="861" height="284" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16.jpg 1470w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-300x99.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-1024x338.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-768x253.jpg 768w" sizes="(max-width: 861px) 100vw, 861px" /><figcaption id="caption-attachment-16310" class="wp-caption-text">অ্যাম্বার ফোর্ট</figcaption></figure>
<p><strong>হুশাং শাহ-এর সমাধি (</strong>Hushang Shah&#8217;s Tomb<strong>, মাণ্ডু, মধ্যপ্রদেশ, ১৪৪০ খ্রি.)</strong></p>
<p>হুশাং শাহ-এর সমাধির জানালায় উপমহাদেশে প্রথম মার্বেল পাথরের জালি দেখা যায়। যেখানে জালিগুলো সূক্ষ্মভাবে খোদাইকৃত মার্বেল জালির&nbsp; ফুলেল ও জ্যামিতিক নকশায় সমৃদ্ধ এবং অর্ধবৃত্তাকার খিলানের ভেতর স্থাপিত।</p>
<figure id="attachment_16311" aria-describedby="caption-attachment-16311" style="width: 693px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16311" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17.jpg" alt="" width="693" height="274" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17.jpg 1241w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-300x119.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-1024x405.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-768x304.jpg 768w" sizes="(max-width: 693px) 100vw, 693px" /><figcaption id="caption-attachment-16311" class="wp-caption-text">হুশাং শাহ-এর সমাধি</figcaption></figure>
<p><strong>সালিম চিশতির সমাধি (Tomb of Salim Chishti, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা, ১৬শ শতক, আকবর আমল)</strong></p>
<p>সালিম চিশতির সমাধি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্বেল স্থাপত্য। জানালাগুলো সম্পূর্ণ সাদা মার্বেলে খোদাই করা এবং প্রতিটি জালিতে ভিন্ন ভিন্ন জ্যামিতিক নকশা (ষড়ভুজ, তারকা, ফুলের নকশা) করা।</p>
<figure id="attachment_16312" aria-describedby="caption-attachment-16312" style="width: 564px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16312" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18.jpg" alt="" width="564" height="263" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18.jpg 911w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18-300x140.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18-768x358.jpg 768w" sizes="(max-width: 564px) 100vw, 564px" /><figcaption id="caption-attachment-16312" class="wp-caption-text">সালিম চিশতির সমাধি</figcaption></figure>
<p><strong>ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস (রাজস্থান, ভারত)</strong></p>
<p>ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস ১৪শ শতকের দিকে রাজপুত রাজাদের দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ঝারোখা জানালাগুলো শুধু স্থাপত্য উপাদান নয়, বরং এর সূক্ষ্ম খোদাই, অলঙ্কৃত খিলান ও প্রক্ষেপিত গঠন একদিকে নান্দনিক সৌন্দর্য তৈরি করেছে, অন্যদিকে কার্যকারিতার মাধ্যমে বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। corbelled brackets বা খোদাইকৃত পাথরের cusped arch (মৃদু বাঁকানো খিলান) <strong>রাজস্থানি লাল বেলেপাথর ও সাদা পাথরের সমন্বয়</strong> দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16313" aria-describedby="caption-attachment-16313" style="width: 655px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16313" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19.jpg" alt="" width="655" height="435" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19-300x199.jpg 300w" sizes="(max-width: 655px) 100vw, 655px" /><figcaption id="caption-attachment-16313" class="wp-caption-text">ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস</figcaption></figure>
<p><strong>নওলাখা প্যাভিলিয়ন</strong></p>
<p>নওলাখা প্যাভিলিয়ন সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৬৩১–৪৩ খ্রিঃ) লাহোর ফোর্টের ভেতরে নির্মিত হয়। প্যাভিলিয়নটি প্রধানত সাদা মার্বেল পাথরদ্বারা নির্মিত এবং এর জানালাগুলো সূক্ষ্ম মার্বেল পাথরে খোদাই করা জালিতে আবৃত। জানালার শীর্ষ অংশ অর্ধবৃত্তাকার ও বহু-পাপড়ি বিশিষ্ট খিলান দ্বারা গঠিত। খিলানগুলোতে সূক্ষ্ম ইনলে কাজ এবং ফুলের মোটিফ ব্যবহৃত হয়েছে, যা মোঘল স্থাপত্যে শাহজাহানীয় যুগের শৈল্পিক পরিপূর্ণতার এক অসাধারণ নিদর্শন।</p>
<figure id="attachment_16323" aria-describedby="caption-attachment-16323" style="width: 945px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16323 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20.jpg" alt="" width="945" height="581" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20.jpg 945w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20-300x184.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20-768x472.jpg 768w" sizes="(max-width: 945px) 100vw, 945px" /><figcaption id="caption-attachment-16323" class="wp-caption-text">নওলাখা প্যাভিলিয়ন</figcaption></figure>
<p><strong>বিবি কা মাকবারা (Bibi ka Maqbara)</strong></p>
<p>১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব বিবি কা মাকবারা নির্মাণ করেন। প্রধান উপকরণ হিসেবে সাদা মার্বেল (উপরাংশ), লাল বেলেপাথর (নিচের অংশে) এবং প্লাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। জ্যামিতিক নকশায় ষড়ভুজ, তারকাকৃতি ও অষ্টভুজ দেখা যায়। জানালাগুলো বড় আকারের, উপরে তীক্ষ্ণ শীর্ষযুক্ত খিলান (pointed arch), যা দিল্লির মোঘল স্থাপত্যের প্রচলিত ধারা বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16324" aria-describedby="caption-attachment-16324" style="width: 457px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16324 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21.jpg" alt="" width="457" height="327" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21.jpg 900w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21-300x215.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21-768x550.jpg 768w" sizes="(max-width: 457px) 100vw, 457px" /><figcaption id="caption-attachment-16324" class="wp-caption-text">জানালা, বিবি কা মাকবারা</figcaption></figure>
<p>বিবি কা মকবরা মূলত তাজমহলের প্রতিরূপ হলেও এটি দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে মোঘল স্থাপত্যের শাখা বিস্তারের একটি অনন্য নিদর্শন। উঁচু খিলানযুক্ত (pointed arch) জানালা এবং জ্যামিতিক ও ফুলেল মোটিফযুক্ত খোদাই স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য । এছাড়াও জানালাগুলো অনেকটা ঝারোখা ধাঁচের বারান্দার মতো বাহিরে বেরিয়ে এসেছে। এতে ভিতর থেকে বাইরের বাগান দেখার সুযোগ রয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16325" aria-describedby="caption-attachment-16325" style="width: 569px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16325" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22.jpg" alt="" width="569" height="282" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22.jpg 1116w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-300x148.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-1024x506.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-768x380.jpg 768w" sizes="(max-width: 569px) 100vw, 569px" /><figcaption id="caption-attachment-16325" class="wp-caption-text">জানালা, বিবি কা মাকবারা</figcaption></figure>
<p><strong>মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন (Madrasa-i-Ghaziuddin)</strong></p>
<p>১৭১০ খ্রিস্টাব্দে আজমেরি গেটের বাইরে মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন নির্মাণ করা হয়। এর জানালা থেকে ধারণা করা যায় মূলত মোঘল স্থাপত্যেশৈলীতে নির্মিত এবং নির্মাণে স্থানীয় উপাদান ইট ও চুন-সুরকির ব্যবহারে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অলংকরণে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা ও ফুলের মোটিফ এর খোদাইকৃত জালি ব্যবহার করা হয়েছে যার উপরের অংশে রয়েছে উঁচু অর্ধবৃত্তাকার খিলান। মোঘল স্থাপত্যের এ জালিগুলো একইসাথে নান্দনিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠাণ্ডা রাখার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত।</p>
<figure id="attachment_16327" aria-describedby="caption-attachment-16327" style="width: 430px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16327 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23.jpg" alt="" width="430" height="505" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23.jpg 689w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23-256x300.jpg 256w" sizes="(max-width: 430px) 100vw, 430px" /><figcaption id="caption-attachment-16327" class="wp-caption-text">জানালার কারুকার্য, মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন</figcaption></figure>
<p><strong>শীশ মহল (Shish Mahal)</strong></p>
<p>মোঘল সম্রাট শাহজাহান আনুমানিক ১৬৩১–৩২ খ্রিস্টাব্দে&nbsp; ব্যক্তিগত আবাসস্থল হিসেবে শীশ মহল নির্মাণ করেন। কিছু জানালায় রঙিন কাঁচ বসানো হয়েছিল, যা শীশ মহলের আয়না খচিত দেয়ালের সাথে আলো প্রতিফলনের এক জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করত। এছাড়াও রাজ পরিবারের সদস্যরা আঙিনা ও প্রাসাদের ভেতরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঝারোখা নির্মাণ করেন। নান্দনিকতার জন্য এসব জানালার চারপাশে মার্বেল ইনলে কাজ, ফুলেল খোদাই ও রঙিন টাইলস বসানো হয় যার মাধ্যমে মোঘল শিল্পের সূক্ষ্মতা ফুটে ওঠে।</p>
<figure id="attachment_16328" aria-describedby="caption-attachment-16328" style="width: 461px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16328 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24.jpg" alt="" width="461" height="525" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24-263x300.jpg 263w" sizes="(max-width: 461px) 100vw, 461px" /><figcaption id="caption-attachment-16328" class="wp-caption-text">শীশ মহল</figcaption></figure>
<p><strong>জামা</strong><strong> মসজিদ, দিল্লি (Jama Masjid, Delhi), ১৬৫০–১৬৫৬ খ্রি., শাহজাহান আমল</strong></p>
<p>জামা মসজিদ মোঘল আমলের অন্যতম বৃহৎ স্থাপত্যকীর্তি। এর জানালাগুলো বেশ বড় এবং অর্ধবৃত্তাকার ও সূচালো খিলানযুক্ত যা লাল বেলেপাথর (red sandstone) এবং সাদা মার্বেলের সংমিশ্রণে নির্মিত।এছাড়াও ঝারোখা কাঠামোর জানালায় লাল বেলেপাথরে খোদাই করা জালি কাজ (lattice work) এবং জানালার ফ্রেমে সূক্ষ্ম খোদাই, কার্নিস এবং পাশ দিয়ে পিলাস্টারের ব্যবহার দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16329" aria-describedby="caption-attachment-16329" style="width: 874px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16329 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25.jpg" alt="" width="874" height="282" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25.jpg 1559w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-300x97.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-1024x330.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-768x248.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-1536x496.jpg 1536w" sizes="(max-width: 874px) 100vw, 874px" /><figcaption id="caption-attachment-16329" class="wp-caption-text">জামা মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>জ্যায়সালমার (Jaisalmer), রাজস্থান</strong></p>
<p>নিচে দেখা যাচ্ছে জ্যায়সালমার প্রাসাদের জানালা। জ্যায়সালমার প্রাসাদের এই&nbsp; জানালা শুধু স্থাপত্যের অপরিহার্য অংশই নয়, বরং এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। জানালার ফ্রেমগুলোতে cusped arches (multi-foil) এবং খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ দেখা যায়। জানালার চারপাশে সূক্ষ্ম সোনালি রঙের পাথরে floral scrolls, geometric bands এর জালি খোদাই করা।সোনালি বেলেপাথরে তৈরি হওয়ায় জানালা রাজস্থানের মরুভূমির রঙকে বহন করে ভেতরের শৈল্পিক কাজ রাজপুত অভিজাত রুচি, ও ঐতিহ্যের প্রতীক।</p>
<figure id="attachment_16333" aria-describedby="caption-attachment-16333" style="width: 528px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16333 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26.jpg" alt="" width="528" height="338" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26.jpg 1052w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-300x192.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-1024x654.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-768x491.jpg 768w" sizes="(max-width: 528px) 100vw, 528px" /><figcaption id="caption-attachment-16333" class="wp-caption-text">জ্যায়সালমার প্রাসাদের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>আগ্রা ফোর্ট</strong></p>
<p>১৫৬৫–১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল সুলতান আকবরের সময় আগ্রা ফোর্ট নির্মিত হয়। প্রাথমিকভাবে লাল বেলেপাথরে তৈরি হলেও পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান এর সময়ে সাদা মার্বেল ও জালি জানালা যুক্ত হয়। ফোর্টের স্থাপত্যে পাথরে সূক্ষ্ম খোদাই বা মার্বেল ইনলে নকশা মোঘল শিল্পের বিকাশের জীবন্ত দলিল। এসব জানালা আলো-ছায়া, বায়ুপ্রবাহ, গোপনীয়তা রক্ষায় যেমন কার্যকর তেমনি নান্দনিক খোদাই ও শিল্পকলার&nbsp; উৎকর্ষের বহিঃ প্রকাশ।</p>
<figure id="attachment_16334" aria-describedby="caption-attachment-16334" style="width: 492px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16334 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27.jpg" alt="" width="492" height="272" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27.jpg 590w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27-300x166.jpg 300w" sizes="(max-width: 492px) 100vw, 492px" /><figcaption id="caption-attachment-16334" class="wp-caption-text">আগ্রা ফোর্ট</figcaption></figure>
<p><strong>সুলতান আকবরের সমাধি (Akbar’s Tomb) সিকান্দ্রা, ১৬০৫–১৬১২/১৩</strong></p>
<p>নিচের জানালাটি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় মোঘল সুলতান আকবরের সমাধিতে নির্মিত, যার প্রধান নির্মাণ উপাদান ছিলো লাল বেলেপাথর। জানালা স্থাপনায় দেখা যায় পরবর্তী মোঘল সমাধি এবং তাজমহলের জানালার জালি নকশার প্রোটোটাইপ।</p>
<figure id="attachment_16336" aria-describedby="caption-attachment-16336" style="width: 252px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16336" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28.jpg" alt="" width="252" height="380" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28.jpg 439w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28-199x300.jpg 199w" sizes="(max-width: 252px) 100vw, 252px" /><figcaption id="caption-attachment-16336" class="wp-caption-text">মোঘল সুলতান আকবরের সমাধির জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>তাজমহল</strong></p>
<p>সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরে এই জানালাগুলো ১৬৩২–১৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তাজমহলে নির্মাণ করা হয়। তাজমহল ভারতীয় স্থাপত্যকে বিশ্বের সমকক্ষ করে এবং এটি স্থাপত্যের শীর্ষ শৈল্পিক উদাহরণ এর একটি। জানালায় জ্যামিতিক প্যাটার্ন, আরবেস্ক, ফুলের মোটিফ এর মার্বেল খোদাই করে জালির নিখুঁত প্যাটার্ন এর স্থাপত্যকে আরও অনন্যতায় নিয়ে যায়।</p>
<figure id="attachment_16337" aria-describedby="caption-attachment-16337" style="width: 568px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16337 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29.jpg" alt="" width="568" height="348" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29.jpg 1054w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-300x184.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-1024x628.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-768x471.jpg 768w" sizes="(max-width: 568px) 100vw, 568px" /><figcaption id="caption-attachment-16337" class="wp-caption-text">তাজমহলের মারবেল পাথরের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধি</strong></p>
<p>১৬২২–১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধিটি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় নির্মাণ করা হয়। সাদা মার্বেল পাথরে সূক্ষ্ম খোদাইয়ের জ্যামিতিক, ফুলের মোটিফ এর জালি (jali screens) এবং অলংকরণে সাদা মার্বেল এর উপর এরাবেস্ক ও জ্যামিতিক নকশা এই জানালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ।</p>
<figure id="attachment_16338" aria-describedby="caption-attachment-16338" style="width: 531px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16338 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30.jpg" alt="" width="531" height="364" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30.jpg 977w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30-300x206.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30-768x527.jpg 768w" sizes="(max-width: 531px) 100vw, 531px" /><figcaption id="caption-attachment-16338" class="wp-caption-text">ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধির জানালার নকশা</figcaption></figure>
<p><strong>সামোদ প্যালেস (১৭শ শতক, পরে ১৮–১৯শ শতকে সম্প্রসারিত)</strong></p>
<p>রাজস্থানের সামোদ প্যালেস রাজপুত ও মোঘল শৈলীর মিলিত রূপে নির্মিত এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। জানালার শীর্ষ অংশে বহু-পাপড়ি খিলান (cusped arches) ব্যবহৃত। এগুলো মার্বেল বা বেলেপাথরে খোদাই করা সূক্ষ্ম লতাপাতা ও ফুলের নকশা দ্বারা সজ্জিত। জানালায় হস্তনির্মিত কাঠ বা পাথরের ফ্রেম, যেখানে পেইন্টিং এর মাধ্যমে পারসিয়ান আরবেস্ক&nbsp; ও জ্যামিতিক নকশার কারুকাজ দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16339" aria-describedby="caption-attachment-16339" style="width: 340px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16339" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31.jpg" alt="" width="340" height="425" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31.jpg 1080w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-240x300.jpg 240w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-820x1024.jpg 820w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-768x959.jpg 768w" sizes="(max-width: 340px) 100vw, 340px" /><figcaption id="caption-attachment-16339" class="wp-caption-text">সামোদ প্যালেসের মার্বেল ও বেলেপাথরে নকশাকৃত জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>লালকেল্লা (১৭শ শতক, শাহজাহান আমল)</strong></p>
<p>লালকেল্লার জালি জানালা বা ল্যাটিস উইন্ডো মোঘল সৌধশিল্পের অন্যতম শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। এর নান্দনিকতা, রাজকীয় আভিজাত্য এবং সামাজিক প্রয়োজনের সমন্বিত প্রকাশ। জানালার শীর্ষ অংশ অর্ধবৃত্তাকার বা বহু-পাপড়ি খিলান (cusped arch) এবং সাদা মার্বেলে সূক্ষ্ম ছিদ্র বা নকশা কেটে তৈরি করা জালি জানালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অলংকরণে দেখা যায় জ্যামিতিক মোটিফ ও আরবেস্ক ইসলামী নান্দনিকতার প্রতিফলন, আর সূক্ষ্ম মার্বেল ইনলে কাজ পারসিয়ান শিল্পরীতির অনুকরণ। শুধুমাত্র কার্যকারীতার জন্য নয়, বরং জানালাগুলো শাহজাহানীয় আমলের বিলাসিতা, শিল্পপ্রেম ও সূক্ষ্ম স্থাপত্যবোধের পরিচায়ক।</p>
<figure id="attachment_16340" aria-describedby="caption-attachment-16340" style="width: 311px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16340" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32.jpg" alt="" width="311" height="416" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32.jpg 515w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32-225x300.jpg 225w" sizes="(max-width: 311px) 100vw, 311px" /><figcaption id="caption-attachment-16340" class="wp-caption-text">লালকেল্লার জালি জানালা</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16343" aria-describedby="caption-attachment-16343" style="width: 655px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16343" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34.jpg" alt="" width="655" height="369" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34.jpg 2048w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-300x169.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-1024x576.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-768x432.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-1536x864.jpg 1536w" sizes="(max-width: 655px) 100vw, 655px" /><figcaption id="caption-attachment-16343" class="wp-caption-text">রোহতাস ফোর্টের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>রোহতাস ফোর্ট (Rohtas Fort), ১৫৪১–৪৮ খ্রিঃ</strong></p>
<p>রোহতাস ফোর্ট নির্মাণ করেন শের শাহ সূরি। এর জানালাগুলো সাধারণত অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত বা আয়তাকার ফ্রেমে বসানো এবং ফ্রেমগুলো মোটা ও শক্ত, যাতে আক্রমণ প্রতিরোধে দেয়ালের দৃঢ়তা নষ্ট না হয়। খিলানগুলোতে ছোট আকারের পাথরের জালি (perforated stone screens) ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে অলঙ্করণ নয়, বরং কার্যকারিতা মুখ্য বিষয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16344" aria-describedby="caption-attachment-16344" style="width: 643px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16344" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35.jpg" alt="" width="643" height="462" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35.jpg 1920w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-300x216.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-1024x736.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-768x552.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-1536x1104.jpg 1536w" sizes="(max-width: 643px) 100vw, 643px" /><figcaption id="caption-attachment-16344" class="wp-caption-text">মারওয়ারি হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>মারওয়ারি হাভেলি</strong></p>
<p>১৮শ–১৯শ শতকে হাভেলি নির্মাণ এক বিশেষ ধারায় রূপ নেয়। ধনী মারওয়ারি ব্যবসায়ী ও জমিদার পরিবারের নির্মিত হাভেলিগুলোতে এ ধরণের জানালা দেখা যায় যেগুলো শুধু বাসগৃহ ছিল না; বরং ঐশ্বর্য, শিল্প-সংবেদন ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অলংকৃত হাভেলিগুলোর জানালায় কাঠের ফ্রেম ও শাটার এর চারপাশে সূক্ষ্ম খোদাই করা ফুলেল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার দেখা যায়; যা মোঘল খিলান, রাজপুত পাথর খোদাই, এবং স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার এক বিশেষ <strong>সংমিশ্রিত নকশা</strong> সৃষ্টির প্রয়াস। মাঝের কাঠের জানালাগুলো সাধারণত ভেতর থেকে খোলা যায় এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশে সহায়ক ভূমিকা রাখে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>উমর হায়াত মহল (Umer Hayat Mahal, Chiniot, 1930)</strong></p>
<p>চিনিওট (পাঞ্জাব, পাকিস্তান) ঐতিহ্যগতভাবে কাঠের নিপুণ খোদাই শিল্পের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার হাভেলি, মসজিদ ও প্রাসাদের ঝারোখা জানালা এক অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, যেখানে মোঘল, ফারসি শৈলীর সূক্ষ্মতা স্থানীয় পাঞ্জাবি ঐতিহ্যের সাথে মিশে স্থাপত্যকে জীবন্ত শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। এটি (নিচে) উমর হায়াত মহল এর ঝারোখা জানালা যা projecting balconies আকারে তৈরি কাঠের জানালা। পাথরের বদলে শিসম কাঠ (Sheesham wood) ব্যবহার করে সূক্ষ্ম খোদাই করা হয়েছে। জানালার ফ্রেমগুলোতে বহুস্তর বিশিষ্ট cusped arches এবং প্রতিটি স্তরে খোদাই করা floral scrolls, arabesques, এবং জ্যামিতিক নকশা।</p>
<figure id="attachment_16358" aria-describedby="caption-attachment-16358" style="width: 269px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16358 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41.jpg" alt="" width="269" height="401" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41.jpg 402w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41-201x300.jpg 201w" sizes="(max-width: 269px) 100vw, 269px" /><figcaption id="caption-attachment-16358" class="wp-caption-text">উমর হায়াত মহল&nbsp;এর ঝারোখা জানালা</figcaption></figure>
<p>উমর হায়াত মহল চিনিওটের কাঠের নিপুণ কারুশিল্পের জীবন্ত দলিল। এর জানালা স্থাপত্য এ প্রাসাদের শৈল্পিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ মোঘল সূক্ষ্মতা, ফারসি নকশা ও পাঞ্জাবি লোকজ অলঙ্করণের সমন্বয় জানালার প্রতিটি অংশ সূক্ষ্ম হাতে খোদাই করা, যা চিনিওটের কাঠশিল্পের সর্বোচ্চ মান প্রদর্শন করে। কাঠের সাথে কখনো ইনলে (inlay) ও আয়না শোভা যুক্ত যা সূর্যালোক ছেঁকে নরম আভা তৈরি করে।</p>
<figure id="attachment_16345" aria-describedby="caption-attachment-16345" style="width: 353px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16345 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36.jpg" alt="" width="353" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36.jpg 640w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36-240x300.jpg 240w" sizes="(max-width: 353px) 100vw, 353px" /><figcaption id="caption-attachment-16345" class="wp-caption-text">উমর হায়াত মহল এর জানালার কারুকাজ</figcaption></figure>
<p><strong>হাভেলি, শেখাওয়াতি (Shekhawati)</strong></p>
<p>শেখাওয়াতি (Shekhawati) অঞ্চলের হাভেলি স্থাপত্য মূলত ১৮শ–১৯শ শতাব্দীতে সমৃদ্ধ হয়েছিল, যখন মারওয়ারি ব্যবসায়ী সমাজ তাদের ধন-সম্পদ, রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হাভেলির জানালা, দরজা ও দেয়ালের অলঙ্করণে ফুটিয়ে তুলেছিল। অধিকাংশ জানালা অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত এবং জানালার চারপাশে জ্যামিতিক মোটিফ, ফুল-পত্র নকশা করা। কাঠ ও পাথরের খোদাই, খিলান, এবং ল্যাটিসওয়ার্কে রাজপুত ঐতিহ্য এবং মোঘল শৈল্পিকতা একত্রিত হয়েছিল।</p>
<figure id="attachment_16354" aria-describedby="caption-attachment-16354" style="width: 357px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16354" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37.jpg" alt="" width="357" height="422" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37.jpg 441w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37-254x300.jpg 254w" sizes="(max-width: 357px) 100vw, 357px" /><figcaption id="caption-attachment-16354" class="wp-caption-text">হাভেলি, শেখাওয়াতি</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16355" aria-describedby="caption-attachment-16355" style="width: 673px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16355" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38.jpg" alt="" width="673" height="341" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38.jpg 1279w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-300x152.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-1024x519.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-768x389.jpg 768w" sizes="(max-width: 673px) 100vw, 673px" /><figcaption id="caption-attachment-16355" class="wp-caption-text">সোনার কেল্লা</figcaption></figure>
<p><strong>সোনার কেল্লা (Sonar Quila / Golden Fort, 1156)</strong></p>
<p>জ্যায়সালমারের সোনার কেল্লা নির্মিত হয় ১১৫৬ খ্রিস্টাব্দে। এর জানালা স্থাপত্য মরুভূমির পরিবেশ, রাজপুত শিল্পরুচি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের এক অনন্য দলিল। স্থানীয় হলুদ স্যান্ডস্টোনে খোদাই করা সূক্ষ্ম জালি নকশা&nbsp; আলো ও বাতাস প্রবাহের জন্য কার্যকর, আবার গোপনীয়তাও রক্ষা করত। জানালার চারপাশে খোদাই করা floral scrolls, geometric bands এর সূক্ষ্ম খোদাই রাজপুত স্থাপত্যের গৌরবময় নিদর্শন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাভেলি, জ্যায়সালমার</strong></p>
<p>রাজস্থানের হাভেলি স্থাপত্য মূলত রাজপুত ও মারওয়ারি ব্যবসায়ী পরিবারের সমৃদ্ধ জীবনধারা ও শিল্পরুচির বহিঃপ্রকাশ। আর এর জানালা স্থাপত্য, বিশেষ করে ঝারোখা<strong>,</strong>পুরো শহরকে “সোনার শহর” নামে পরিচিত করেছে।এর ঝারোখাগুলো স্থানীয় হলুদ বেলেপাথরে (Yellow Sandstone) খোদাই করা brackets ও সূক্ষ্ম খোদাই করা স্যান্ডস্টোনের জালি কখনো অর্ধবৃত্তাকার, কখনো জটিল বহুলতর খিলান দ্বারা সংযুক্ত।</p>
<figure id="attachment_16356" aria-describedby="caption-attachment-16356" style="width: 373px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16356" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39.jpg" alt="" width="373" height="509" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39.jpg 750w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39-220x300.jpg 220w" sizes="(max-width: 373px) 100vw, 373px" /><figcaption id="caption-attachment-16356" class="wp-caption-text">হাভেলি, জ্যায়সালমার</figcaption></figure>
<p><strong>ওয়াজির খান মসজিদ (লাহোর, পাকিস্তান)</strong></p>
<p>ওয়াজির খান মসজিদ ১৬৩৪–১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মোঘল আমলের অন্যতম সেরা স্থাপত্য নিদর্শন। ঝারোখা জানালাগুলো মসজিদের বাইরের দেওয়ালে, বিশেষ করে সামনের (façade) এবং মিনারের সংলগ্ন অংশে দেখা যায়। জানালাগুলো অর্ধবৃত্তাকার খিলান দ্বারা আবৃত এবং প্রতিটি জানালার চারপাশে টেরাকোটা ও টাইলসের অলঙ্করণ রয়েছে। জানালার নিচে corbelled brackets দেখা যায়, যা ঝারোখাকে projecting balcony-র রূপ দিয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16357" aria-describedby="caption-attachment-16357" style="width: 549px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16357 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40.jpg" alt="" width="549" height="406" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40.jpg 871w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40-768x568.jpg 768w" sizes="(max-width: 549px) 100vw, 549px" /><figcaption id="caption-attachment-16357" class="wp-caption-text">ওয়াজির খান মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>পুরনো ভবন, পেশোয়ার</strong></p>
<p>নিচে পেশোয়ারের প্রাচীরঘেরা নগরীর পুরনো ভবনের কাঠখোদাই ঝারোখা জানালা। মোঘল শিল্পকলা, পশতুন জীবনধারা এবং কারিগরদের অনন্য দক্ষতায় ঝারোখা জানালাগুলো আজও টিকে আছে। যা পশতু সমাজের শিল্প-রুচি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ইসলামি-দক্ষিণ এশীয় স্থাপত্যের মিশ্র ঐতিহ্য বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16360" aria-describedby="caption-attachment-16360" style="width: 226px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16360" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png.jpg" alt="" width="226" height="361" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png.jpg 350w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png-188x300.jpg 188w" sizes="(max-width: 226px) 100vw, 226px" /><figcaption id="caption-attachment-16360" class="wp-caption-text">পেশোয়ারের পুরনো ভবনের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>কাশ্মীরি হাভেলি (Kashmiri Haveli)</strong></p>
<p>নিচের জানালাটি কাশ্মীরি হাভেলি বা ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি বাড়ির কাঠখোদাই করা ঝারোখা জানালা। জানালার কাঠামো কাঠ দিয়ে তৈরি এবং উপরে টালিযুক্ত ছাউনি রয়েছে। নিচের অংশে আলো বাতাস প্রবাহের জন্য জালি নকশা এবং উপরের অংশে কাঠের জানালা শাটার, যেখানে ছোট কাচ বসানো যা গ্রীষ্মকালে খোলা রাখা আর শীতে বন্ধ রেখে কাচ দিয়ে আলো প্রবাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।</p>
<figure id="attachment_16359" aria-describedby="caption-attachment-16359" style="width: 297px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16359" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.jpg" alt="" width="297" height="528" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42-169x300.jpg 169w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42-576x1024.jpg 576w" sizes="(max-width: 297px) 100vw, 297px" /><figcaption id="caption-attachment-16359" class="wp-caption-text">কাশ্মীরি হাভেলির জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>মহেশ্বর দুর্গ (Maheshwar Fort)</strong></p>
<p>১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে মহেশ্বর দুর্গে এ জানালা নির্মাণ করা হয়। ১৫শ শতকে মোঘল সুলতান আকবর প্রজাদের সঙ্গে সংযোগ রাখতে “ঝারোখা-দর্শন” (Jharokha Darshan) এর প্রথা চালু করলেও ঝারোখার আলোর প্রক্ষেপণ শৈলী, সূক্ষ্ম খোদাই, গোপনীয়তা, নান্দনিকতার সমন্বয় ধীরে ধীরে একে স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত করে।</p>
<figure id="attachment_16361" aria-describedby="caption-attachment-16361" style="width: 302px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16361" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43.jpg" alt="" width="302" height="434" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43.jpg 475w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43-209x300.jpg 209w" sizes="(max-width: 302px) 100vw, 302px" /><figcaption id="caption-attachment-16361" class="wp-caption-text">মহেশ্বর দুর্গের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>আয়না মহল (Aina Mahal)</strong></p>
<p>গুজরাটের ভুজ শহরে &nbsp;(১৮শ শতক, আনুমানিক ১৭৫২ খ্রি.) নির্মাণ করা হয় আয়না মহল। আয়না মহলের ঝারোখা জানালাগুলো সূক্ষ্ম পাথরে ফুল-লতা, জ্যামিতিক এবং আরবেস্ক মোটিফ খোদাই করা।</p>
<figure id="attachment_16362" aria-describedby="caption-attachment-16362" style="width: 260px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16362 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44.jpg" alt="" width="260" height="391" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44.jpg 400w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44-200x300.jpg 200w" sizes="(max-width: 260px) 100vw, 260px" /><figcaption id="caption-attachment-16362" class="wp-caption-text">আয়না মহলের ঝারোখা জানালা</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16363" aria-describedby="caption-attachment-16363" style="width: 674px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16363" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45.jpg" alt="" width="674" height="357" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45.jpg 1245w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-300x159.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-1024x543.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-768x407.jpg 768w" sizes="(max-width: 674px) 100vw, 674px" /><figcaption id="caption-attachment-16363" class="wp-caption-text">হাভেলি, গুজর খাঁ</figcaption></figure>
<p><strong>হাভেলি, গুজর খাঁ (Gujar Khan)</strong></p>
<p>এই ঝারোখা জানালাগুলো গুজর খাঁ জেলার কাউন্ত্রিলা (Kauntrila) এলাকায় এক হাভেলিতে নির্মিত। এ ধরণের জানালা সাধারণত উপরের তলায়, বাসগৃহের অভ্যন্তর থেকে রাস্তাঘাট ও জনসমাজ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও এগুলো ছিল শৈল্পিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। জানালার চারপাশে কাঠের সূক্ষ্ম খোদাই, নীচে কারুকার্যপূর্ণ করবেল (corbel) বা ব্র্যাকেট (bracket), জানালার খিলান, ছাদের কার্নিশ ও কাঠের রেলিং বা বালাস্টার (balustrade) এর স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কিস্সা খওয়ানি বাজার, পেশোয়ার (পাকিস্তান) </strong></p>
<p>কিস্সা খওয়ানি বাজারের ঝারোখাগুলো সাধারণত রঙিন কাঠ দ্বারা তৈরি , কাঠে সূক্ষ্ম খোদাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের নকশা এবং আলো বাতাস প্রবাহের জন্য জালির ব্যবহার দেখা যায়। পেশোয়ারের নগর ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের ধারক হিসেবে ঝারোখাগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16365" aria-describedby="caption-attachment-16365" style="width: 324px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16365 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46.jpg" alt="" width="324" height="361" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46-269x300.jpg 269w" sizes="(max-width: 324px) 100vw, 324px" /><figcaption id="caption-attachment-16365" class="wp-caption-text">কিস্সা খওয়ানি বাজার</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16366" aria-describedby="caption-attachment-16366" style="width: 576px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16366" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47.jpg" alt="" width="576" height="331" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47.jpg 1389w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-300x172.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-1024x588.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-768x441.jpg 768w" sizes="(max-width: 576px) 100vw, 576px" /><figcaption id="caption-attachment-16366" class="wp-caption-text">বখ্শী রাম সিংহের হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>বখ্শী রাম সিংহের হাভেলি</strong></p>
<p>১৮৮৬ সালে বখ্শী রাম সিংহের হাভেলির এই ঝারোখা জানালা নির্মাণ করা হয়। বালুকাপাথরের খোদাই করা ফ্রেম এবং কাঠের প্যানেল এটির স্থাপত্যের প্রধান আকর্ষণ। যা প্রয়োজনে খোলা এবং বন্ধ রাখার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। মোঘল স্থাপত্যের ছায়া থাকলেও ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাব (arched verandahs, decorative cornices) লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16367" aria-describedby="caption-attachment-16367" style="width: 576px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16367 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48.jpg" alt="" width="576" height="346" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48.jpg 1500w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-300x180.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-1024x614.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-768x461.jpg 768w" sizes="(max-width: 576px) 100vw, 576px" /><figcaption id="caption-attachment-16367" class="wp-caption-text">জীবন সিংহ হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>জীবন সিংহ হাভেলি</strong></p>
<p>জীবন সিংহ হাভেলির (দৌলতলা<strong>) </strong>ঝারোখা জানালা উনবিংশ শতকের শেষভাগে, আনুমানিক ১৮৮০–১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। সমসাময়িক অন্যান্য হাভেলি (যেমন বখ্শী রাম সিংহ হাভেলি, ১৮৮৬)–এর স্থাপত্যধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16368" aria-describedby="caption-attachment-16368" style="width: 530px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16368" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49.jpg" alt="" width="530" height="318" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49.jpg 1500w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-300x180.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-1024x614.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-768x461.jpg 768w" sizes="(max-width: 530px) 100vw, 530px" /><figcaption id="caption-attachment-16368" class="wp-caption-text">আতম সিং গুজরাল হাভেলি</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আতম সিং গুজরাল হাভেলি</strong></p>
<p>আতম সিং গুজরাল হাভেলি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়। জানালার অংশে কাঠ ও পাথরের খোদাইকৃত অলঙ্করণ (floral patterns) লক্ষ্যণীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16369" aria-describedby="caption-attachment-16369" style="width: 743px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16369" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50.jpg" alt="" width="743" height="404" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50.jpg 1406w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-300x163.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-1024x556.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-768x417.jpg 768w" sizes="(max-width: 743px) 100vw, 743px" /><figcaption id="caption-attachment-16369" class="wp-caption-text">নাউ নিহাল সিংহের হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>নাউ নিহাল সিংহের হাভেলি</strong></p>
<p>নাউ নিহাল সিংহের হাভেলির ঝারোখা জানালা (১৮শ শতকের শেষের দিকে বা ১৯শ শতকের শুরুতে তৈরি) পাঞ্জাবের লাহোর অঞ্চলে নির্মিত। নির্মাণ উপাদান হিসেবে কাঠ ও পাথর ব্যবহার করা হয়। অলংকরণে প্রাচীর এবং কাঠের অংশে সূক্ষ্ম রঙিন পেইন্টিং করা হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (পাকিস্তান)</strong></p>
<p>১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (Pakistan)-এর ঝারোখা জানালা। এতে খোদাই করা কাঠ, খিলানযুক্ত ফ্রেম এবং ছাদ বা ছত্রি-আকৃতির আচ্ছাদন রয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16370" aria-describedby="caption-attachment-16370" style="width: 403px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16370 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51.jpg" alt="" width="403" height="503" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51-240x300.jpg 240w" sizes="(max-width: 403px) 100vw, 403px" /><figcaption id="caption-attachment-16370" class="wp-caption-text">ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (পাকিস্তান)</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16371" aria-describedby="caption-attachment-16371" style="width: 626px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16371" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52.jpg" alt="" width="626" height="448" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52-300x214.jpg 300w" sizes="(max-width: 626px) 100vw, 626px" /><figcaption id="caption-attachment-16371" class="wp-caption-text">ওয়াল্ড সিটি</figcaption></figure>
<p><strong>ওয়াল্ড সিটি, পেশোয়ার (Walled City of Peshawar)</strong></p>
<p>ওয়াল্ড সিটি মূলত শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্যের ভাণ্ডার। মোঘল আমল থেকে পেশোয়ার ছিল একটি বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানকার ব্যবসায়ী ও ধনী পরিবারগুলো তাদের হাভেলি ও বাড়িতে ঝারোখা জানালা স্থাপন করত সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। ঝারোখাগুলোতে সেগুন বা চিরকালীন শক্ত কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে এবং খোদাইয়ে ফুললতা, জ্যামিতিক নকশা, আরবেস্ক, এবং কখনো কখনো স্থানীয় পশতুন মোটিফ পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16372" aria-describedby="caption-attachment-16372" style="width: 689px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16372" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53.jpg" alt="" width="689" height="387" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53.jpg 1430w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-300x168.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-1024x575.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-768x431.jpg 768w" sizes="(max-width: 689px) 100vw, 689px" /><figcaption id="caption-attachment-16372" class="wp-caption-text">প্রাসাদ, পেশোয়ার</figcaption></figure>
<p><strong>পেশোয়ারের প্রাসাদ </strong></p>
<p>এটি পেশোয়ারে অবস্থিত একটি প্রাসাদ যা ১৮শ–১৯শ শতাব্দীতে &#8220;সেটি ব্যবসায়ী পরিবার&#8221;&nbsp;নির্মাণ করেছিলেন। সেটি মহল্লার জানালা কাঠের নকশাশিল্প, খিলানাকৃতির ফ্রেম ও জালি শৈলী তাদের ঐশ্বর্য ও শিল্পরুচির প্রতিফলন। অলংকৃত কাঠের কারুকাজ মধ্য এশীয় ইসলামী নকশা থেকে অনুপ্রাণিত যাতে রঙিন কাঁচ, ফ্রেস্কো এবং স্থানীয় কারিগরির ছোঁয়া শিল্পের অনন্যতায় নিয়ে যায়। সাধারণত শিশম কাঠ ও অন্যান্য শক্ত কাঠ দিয়ে এসব কাঠামো তৈরি। কাঠের নকশায় সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা হয়—ফুল ,লতা, আরবেস্ক ও জ্যামিতিক মোটিফ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;________________________</strong></p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:Ahmed_Shah_Mosque" target="_blank" rel="noopener">https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:Ahmed_Shah_Mosque</a></p>
<p><a href="https://comedoresdepaisagem.com/mandu-india/" target="_blank" rel="noopener">https://comedoresdepaisagem.com/mandu-india/</a></p>
<p><a href="https://thearchitectsdiary.com/through-time-and-glass-exploring-10-indian-window-designs/" target="_blank" rel="noopener">https://thearchitectsdiary.com/through-time-and-glass-exploring-10-indian-window-designs/</a></p>
<p><a href="https://mohsinphotos.blogspot.com/2019/03/barbers-tomb-aka-nai-ka-gumbad.html" target="_blank" rel="noopener">https://mohsinphotos.blogspot.com/2019/03/barbers-tomb-aka-nai-ka-gumbad.html</a></p>
<p><a href="https://islamicarchitectureinindia.weebly.com/hushang-shahs-tomb.html" target="_blank" rel="noopener">https://islamicarchitectureinindia.weebly.com/hushang-shahs-tomb.html</a></p>
<p><a href="https://www.thefridaytimes.com/30-Mar-2024/exploring-the-pre-partition-havelis-of-daultala" target="_blank" rel="noopener">https://www.thefridaytimes.com/30-Mar-2024/exploring-the-pre-partition-havelis-of-daultala</a></p>
<p><a href="https://www.zameen.com/blog/rohtas-fort-jhelum-guide.html" target="_blank" rel="noopener">https://www.zameen.com/blog/rohtas-fort-jhelum-guide.html</a></p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16288</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুঘল আমলে মুসলিম বাংলার ইসলামী উৎসব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-festivals-of-muslim-bengal-during-the-mughal-period/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-festivals-of-muslim-bengal-during-the-mughal-period/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. এম এ রহিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 22 Oct 2025 15:22:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16267</guid>

					<description><![CDATA[মুসলিম শাসনামলে, বাংলার মুসলমানদের ধর্মানুরাগের খ্যাতি ছিল। তারা ঈদ ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে খুব আমোদ-স্ফূর্তি করত। আর্থিক প্রাচুর্য থাকার ফলে তারা তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহ, যেমন বিবাহ ইত্যাদি খুব জাঁকজমকের সঙ্গে সম্পন্ন করত। এটা উল্লেখযোগ্য যে, মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ সমগ্র মুসলমান শাসনামলে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মুসলিম শাসনামলে, বাংলার মুসলমানদের ধর্মানুরাগের খ্যাতি ছিল। তারা ঈদ ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে খুব আমোদ-স্ফূর্তি করত। আর্থিক প্রাচুর্য থাকার ফলে তারা তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহ, যেমন বিবাহ ইত্যাদি খুব জাঁকজমকের সঙ্গে সম্পন্ন করত। এটা উল্লেখযোগ্য যে, মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ সমগ্র মুসলমান শাসনামলে একই রকম ছিল। তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোও শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী অপরিবর্তিত থাকে। মুসলমান সমাজে কিছু সংখ্যক নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের আবির্ভাব হয়। মুহররম, বেড়া এবং সব-ই-বরাত ইত্যাদি উৎসবগুলোতে বাংলার হিন্দু উৎসবাদির চাকচিক্য এবং সমারোহের অনেকটা প্রভাব পড়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রমজান</strong></p>
<p>উপবাস, সংযম, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্মেলনীর সময় হিসেবে সে যুগের মুসলমানগণ &#8216;রমজান&#8217; পালন করত। তারা রমজানকে পবিত্র ও মঙ্গলজনক মাসরূপে গণ্য করত এবং খুশির সঙ্গে একে স্বাগত জানাত। বাংলায় মুঘল সৈন্যদের রমজান পর্ব পালনের উল্লেখ করে মীর্জা নাথন বলেন, &#8220;রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষদিন পর্যন্ত ছোটবড় প্রত্যেকে প্রত্যহ তার বন্ধুর তাঁবুতে মিলিত হতো। এটা একটা স্বাভাবিক রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক দিন সকলে পর্যায়ক্রমে একজন অভিজাত বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাত। সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের দেওয়া ভোজের পালা ছিল। সকলে সেদিন তার তাঁবুতে সময় কাটায়।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঈদ</strong></p>
<p>মীর্জা নাথনের বর্ণনা থেকে সেযুগের ঈদ-উৎসব সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া যায়। খুব আমোদ-স্ফূর্তির সঙ্গে ঈদের নতুন চাঁদকে স্বাগত জানানো হয়। মীর্জা নাথনের ভাষায় এটা বর্ণনা করা যেতে পারে; তিনি লিখেছেন, &#8220;<strong>দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠে এবং গোলন্দাজ সেনাদলের সকল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হয়। রাত্রির শেষভাগে, কামানের অগ্নদগীরণ শেষ হয় এবং এর পর শোনা যায় ভারি কামানের আওয়াজ। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প। এথেকে বুঝা যায়, ঈদের আগমনে মুসলমানরা কত খুশি হতো। ঈদের দিনে সমস্ত মুসলমান আনন্দস্ফূর্তিতে মসগুল থাকত।</strong> স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রত্যেকে নতুন এবং উৎকৃষ্ট কাপড় পরিধান করত। চমৎকার পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানগণ প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথেপথে টাকা পয়সা ও উপহার দ্রব্য ছড়িয়ে দিত এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানগণ গরিবদেরকে ভিক্ষা দিত। &#8216;নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী&#8217; গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা &#8216;ঈদগাহ&#8217; ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দস্ফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন যে, প্রত্যেকেই এই দিনে উৎকৃষ্ট পোশাকে সজ্জিত হতো। নবাব আলিবর্দীর ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিশ মুহম্মদ খান তার প্রিয়জনের মৃত্যুতে &#8216;ঈদ-উল-আজহার&#8217; দিনে নিরানন্দভাবে থাকেন। বৃদ্ধ নবাব তাকে নতুন কাপড় চোপড় পরাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি হারেমের বেগম এবং মহিলাদেরকে ঈদের আনন্দ-উৎসব উপযোগী কাপড় চোপড় নিয়ে তাকে উৎফুল্ল করে তুলতে পরামর্শ দেন।</p>
<p>মুসলমানগণ ত্যাগের উৎসরূপে &#8216;ঈদ-উল-আজহা&#8217; উদ্যাপনের করে। এর উৎপত্তি হয়েছে পয়গম্বর ইব্রাহীমের সময় থেকে। আল্লাহর উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহীম প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানির আয়োজন করেছেন। মুসলমানগণ এই মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে। তারা প্রভাতে সুন্দর কাপড়-চোপড় পরিধান করে এবং &#8216;তকবীর&#8217; উচ্চারণ করতে করতে ঈদগাহ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে গমন করে। সেখানে জামাতে তারা নামাজ আদায় করে এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে, পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ও সম্ভাষণ জানায়। অতঃপর তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাদের সাধ্যানুসারে তারা কোনো পশু, যেমন, গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি করে। তারা গরিব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে এবং গৃহে ভোজের অনুষ্ঠান করে। প্রত্যেক গৃহ ভোজানুষ্ঠান ও আনন্দ স্ফূর্তিতে মুখরিত হয়ে উঠে এবং সকল গৃহে আদর আপ্যায়ন চলতে থাকে। শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয় এবং এই মহান উৎসবে তারা সকলে একত্রে আনন্দ করে। &#8216;ঈদ-উল-আজহা&#8217; উৎসব উদযাপনের কথা বলতে গিয়ে মীর্জা নাথন লিখেছেন যে, &#8220;<strong>নামাজান্তে খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে, লোকেরা তাকে কাপড়-চোপড় ও টাকাপয়সা উপহার দেয়। গরিব দুঃখীদের সাহায্যের জন্য তার সম্মুখে টাকাপসয়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দুঃস্থ লোকদের অনেকে এর দ্বারা তাদের অভাব দূর করে এবং সুখি হয়। পরস্পরের প্রতি সম্ভাষণে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে।</strong> কোরবানি সম্পন্ন হবার পর বিরাট ভোজের ব্যবস্থা হয়। সুন্দর গায়ক মোহনী নর্তকী এবং নম্র স্বভাবের গল্প কথকদের মধুর আপ্যায়নের সঙ্গে দিনরাত ভোজানুষ্ঠান চলতে&nbsp; থাকে। শিল্প কারখানার বহু শ্রমিককে উপহার সামগ্রী প্রদানে তুষ্ট করা হয়।” মীর্জা নাথন আরো লিখেছেন &#8220;উৎসবের দিনে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীগণ একে অন্যের জায়গায় গমন করেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সেনাপতি শাজাত খান আনন্দ উৎসবের এই দিনটিতে বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়নের নিমিত্ত একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।&#8221; দুতিন দিন উৎসবাদি চলতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশনের ব্যবস্থা থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>পয়গম্বরের জন্মদিন</strong></p>
<p>মুসলমানগণ একটি বিরাট ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে রসূলের জন্মদিন পালন করে। এবং শানশওকতের সঙ্গে তারা এ অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে। মীর্জা নাথন এই উৎসব উদ্যাপনের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তিনি বিস্তারিত বিবরণ দেননি। বাংলার মুসলমানগণ যে খুব আড়ম্বর ও মহা ধুমধামের সঙ্গে রসূলের জন্মদিবস উদ্যাপন করত, নবাব মুর্শিদকুলী খান কর্তৃক এই দিবস উদ্যাপনের নমুনা থেকে সে সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া যায়।<strong> নবাব এ দিনটি একটি বিরাট উৎসব আনন্দের দিনে পরিণত করেন। তিনি রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম বারো দিন লোকদেরকে আদর অভ্যর্থনা করতেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আতিথেয়তায় উপস্থিত হতেন। বিশেষ করে তিনি গরিবদেরকে অভ্যর্থনা করতে ভালবাসতেন। এই উপলক্ষে তিনি সমস্ত মুর্শিদাবাদ শহর ভগীরথী নদীর তীর পর্যন্ত আলোকমালায় সজ্জিত করে তুলতেন। বারো দিনব্যাপী এই উৎসব ও আলোকসজ্জা অব্যাহত থাকত। আলোকসজ্জার স্থানগুলোতে কুরআন শরিফের আয়াতসমূহ এবং মসজিদ, বৃক্ষ, লতাপাতা ও ফলসমূহ প্রদর্শিত হতো।</strong> সেনাপতি নাজির আহমদের অধীনে এক লক্ষ্য লোক আলোক সজ্জার কাজে নিয়োজিত হতো। কামান গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও নদী তীরের সমস্ত আলোক জ্বলে উঠত এবং সারা শহর ও ভগীরথী এক আনন্দময় রূপ ধারণ করত। মুসলমানদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত ঘোষণা করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কামানগুলো গর্জন করে উঠত। মুসলমান শাসনকর্তাগণ ও জনসাধারণ উপমহাদেশব্যাপী রসূলের পবিত্র জন্মদিন পালন করত। &#8216;মী&#8217;রাত-ই-সিকান্দরী&#8217; অনুসারে, গুজরাটের সুলতান মুজাফফর (১৫১৫-১৫২৫ খ্রিঃ) উলেমা, সৈয়দ ও বহু শেখদেরকে ভোজে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাদেরকে সংবৎসরের উপযোগী টাকা পয়সা ও কাপড়-চোপড় উপহার দিতেন। <strong>গুজরাট সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ তদীয় রাজপ্রাসাদে রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম থেকে বারো তারিখ পর্যন্ত প্রত্যেক দিন উলেমা ও শেখদের সভার আয়োজন করতেন। তারা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাদিস আলোচনা করতেন এবং অতঃপর তাদেরকে ভোজে আপ্যায়িত করা হতো।</strong> ভোজানুষ্ঠানে সুলতান, তদীয় মন্ত্রীবর্গ ও আমিরগণ উলেমা ও শেখদের সেবাযত্ন করতেন। তিনি এসব বিদ্বান ও ধার্মিক মেহমানদেরকে এরূপ পরিমাণ স্বর্ণ ও পোশাক-পরিচ্ছদ দান করতেন যাতে তারা এক বছরকাল চলতে পারেন।</p>
<p>এসব প্রমাণাদি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহানবীর জন্মদিন উপলক্ষে তার জীবনী আলোচনার জন্য মহফিল অনুষ্ঠানের প্রথা শাসক ও অবস্থাপন্ন মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ধার্মিক ও বিদ্বান ব্যক্তিদেরকে উপহার প্রদান এবং রোজা রাখা ও মুসলমানদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যেও মহানবীর জন্মোৎসব একটা বিশেষ উপলক্ষ ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শব-ই-বারাত</strong></p>
<p>শাবান মাসের চতুর্দশ দিবসে অনুষ্ঠিত মুসলমানদের একটি বিরাট উৎসব হচ্ছে শব-ই-বরাত। এটা ছিল প্রার্থনা ও ভোজানুষ্ঠানের সময়। উপমহাদেশের মুসলমানগণ এই উপলক্ষে বহু আচার অনুষ্ঠান ও আমোদ স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদ্যাপন করে। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক চারদিনব্যাপী এই উৎসব উদ্যাপন করতেন এবং এতবেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাত্রিকালও প্রকাশ্য দিবালোকের রূপ ধারণ করত। সমসাময়িক উৎসগুলো থেকে জানা যয় যে, শের শাহের একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিন্তির সঙ্গে শব-ই-বারাতের দিন সারারাত এবাদত বন্দেগি করেন। &#8216;বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে, এই উৎসব উদ্যাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার নবাবগণ বিরাট জাঁকজমকের সঙ্গে &#8216;শব-ই-বারাত উদ্যাপন করতেন। বাড়িঘর আলোকমালায় সজ্জিত করা হতো এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মসজিদে ও বাড়িতে সারারাত নামাজ অদোয় করতেন। ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।</p>
<p>মুসলমানদের মধ্যে এটি একটি প্রচলিত বিশ্বাস যে, &#8216;শব-ই-বারাত&#8217; রাত্রে আল্লাহ প্রত্যেক নর-নারীর জন্যে বৎসরের জীবিকা বরাদ্দ করেন। বিশ্বাস করা হয় যে, মহানবী মুসলমানদেরকে এই রাত্রে জেগে এবাদত বন্দেগি, কুরআন তেলাওয়াত ও পুণ্যকর্ম করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে শব-ই-বারাতের উৎসব হিন্দুদের &#8216;শিবরাত্রি&#8217; উৎসব থেকে নকল করা হয়েছে। শব-ই-বারাতের উৎপত্তি যাই হোক না কেন, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের সময় থেকে মুসলমানদেরকে এই ধর্মীয় সামাজিক উৎসব পালন করতে দেখা যায়। বাংলার মুসলমানগণ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে তাদের ভাইদের মতো এই উৎসব প্রার্থনা, ভোজানুষ্ঠান এবং আমোদ প্রমোদের উপলক্ষরূপে পালন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মুহররম</strong></p>
<p>&#8216;মুহররম&#8217; উৎসব শিয়াদের সঙ্গে জড়িত। ইমাম হাসান হোসেনের শাহাদাত বরণের স্মরণার্থে মুহররম মাসের প্রথম দশ দিনে এটা উৎযাপন করা হয়। বাংলা উপমহাদেশের মুসলমানগণ যে মুহররম উৎসব পালন করে তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শোক প্রকাশ এবং তাজিয়া নামে অভিহিত প্রতীক সমাধি নিয়ে শোভাযাত্রা, এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণ। <strong>মুসলমান আমলে সুন্নি মুসলমানরা বর্তমানের মুসলমানদের ন্যায় কারবালায় হোসেনের করুণ মৃত্যুর জন্যে একটি নীরব শোকের উপলক্ষ হিসেবে এই অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে। তাজিয়া শোভাযাত্রায় শিয়াদের ভাবাবেগ প্রদর্শনী থেকে তারা দূরে থাকতেন। সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকেরা শোভাযাত্রার ক্রিয়াকর্মে অংশগ্রহণ করত।</strong> মুসলিম পঞ্জিকা অনুসারে, প্রথম মুহররম হচ্ছে নববর্ষের দিন। &#8216;বাহারিস্তান-ই গায়েবী&#8217; থেকে জানা যায় যে, মুসলমানগণ আনন্দ উৎসব ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে মুহররমের চাঁদকে স্বাগত জানাত।</p>
<p>এই উপমহাদেশে কখন মুহররমের তাজিয়া শোভাযাত্রা উৎসব শুরু হয় তা জানা যায় না। তাজিয়া প্রথার সূচনা সাধারণত আমির তৈমূরের নামের সঙ্গে বিজড়িত। বাগদাদের বুয়াইদ সুলতানগণ ইমাম হোসেনের শাহাদাত স্মরণে দশই মুহররম জাতীয় শোক দিবস ও সাধারণ ছুটির দিন হিসেবে উদ্যাপনের প্রথা প্রবর্তনের কৃতিত্বের অধিকারী। এটা প্রতীয়মান হয় যে, মুগল সাম্রাজ্যে প্রার্থনা ও শোক দিবসরূপে মুহররম উৎসব শুরু হয় এবং কালক্রমে তাজিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপকরণগুলো যুক্ত হয়ে পড়ে। ফাদার মনসেরাত সম্রাট আকবরের আমলের মুহররম উৎসব উদ্যাপনের বর্ণনা রেখে গেছেন।</p>
<p>তিনি লিখেছেন যে, মুহররমের সময় মূলমানগণ এ মাসের প্রথম দশ দিন রোজা রাখত, শুধু নিরামিশ খেত এবং জনসভায় উচ্চমঞ্চ থেকে ইমাম হাসান ও হোসেনের আদর্শ জীবনে এবং সত্যের জন্যে তাদের ত্যাগের ও দুঃখ কষ্ট সহ্য করার করুণ কাহিনী বর্ণনা করত। এতে সমবেত শ্রোতাদের মধ্যে শোকোচ্ছাস এবং অশ্রুপ্রবাহ বয়ে চলত। শেষের দিন (দশই মুহররম) তারা সামাধি-চিতা তৈরি করত এবং এগুলোকে একটির পর একটি করে পুড়িয়ে ফেলত। লোকেরা জলন্ত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং অতঃপর তারা তাদের পাদিয়ে নিভে যাওয়া ছাইগুলো ছড়িয়ে ফেলত। তারা হাসান হোসেনের নাম করে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠত। মানডেলসলো আগ্রায় সম্রাট শাহজাহানের আমলের মুহররম শোভাযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি বলেন, &#8220;<strong>তীর-ধনুক, পাগড়ি, ভোজালি এবং পশমি পোশাক-পরিচ্ছদে আবৃত শবাধারগুলো শোভাযাত্রা সহকারে শহরের রাস্তায় রাস্তায় বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অশ্রুসিক্ত চোখে বিলাপ করতে করতে লোকেরা তা অনুসরণ করে। তাদের কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানে নৃত্য করে। অন্যান্যরা একে অন্যের সঙ্গে তাদের তরবারির আঘাত করে&#8217;; শুধু তাই নয়, তাদের অনেকে নিজেদের দেহে এমনভাবে আঘাত করে ও ক্ষত সৃষ্টি করে যে, কয়েক জায়গা থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। সেই রক্ত দিয়ে তারা কাপড় চোপড় রঞ্জিত করে।</strong> এভাবে শোভাযাত্রা অদ্ভুত আকার ধারণ করে। রাত্রের দিকে তারা মহান শহীদদের (হাসান হোসেন) হত্যাকারীদেরকে চিহ্নিত করার জন্যে খড়কুটা দিয়ে কয়েকটি মানুষের ছবি তৈরি করে এবং এগুলোর প্রতি অসংখ্য তীর নিক্ষেপ করে পরে তারা সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় ও ভষ্মে পরিণত করে।” <strong>ষোড়শ শতকে মুগলদের বাংলা জয়ের সময় থেকে, এই প্রদেশে শিয়া প্রভাব অনুভূত হয়। শাহজাহানের রাজত্বকালে বিশেষত শাহজাদা শুজার সুবাদারির আমলে বাংলায় বহু সংখ্যক শিয়া সম্প্রদায়ের লোক বসতি স্থাপন করে। মুর্শিদাবাদের নবাবদের আমলে শিয়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়; এবং নবাবরা নিজেরা শিয়া বংশোদ্ভূত হওয়ায় রাজধানী শহর, এবং জাহাঙ্গীরনগর ও হুগলী ইত্যাদি স্থানগুলো তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।</strong> ষোড়শ শতকের বাংলা সাহিত্যে শিয়াদের ইমামবাড়িগুলোর উল্লেখ রয়েছে। কবি মুকুন্দরাম বলেন, শিকারি রাজা (কালকেতু) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নতুন শহর গুজরাটে মুসলমানগণ তাদের বসতির পশ্চিম প্রান্তে তাদের হাসানহাটি (ইমামবাড়ি অর্থাৎ মুহররম তাজিয়ার স্থান) নির্মাণ করে এবং তারা সকলে তাজিয়ার স্থানে সমবেত হয়। এতে দেখা যায় যে, যোড়শ শতকের বাংলায় মুহররমের শোভাযাত্রার প্রথা প্রচলিত ছিল। নবাবদের সময়ে অষ্টাদশ শতকে মুহররম একটি বিরাট জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত হয়। কারবালার হৃদয়-বিদারক ঘটনা জনসাধারণের অন্তরে এক বিশেষ আবেদনের সৃষ্টি করে। মকতুল হোসেন সঙ্গীত ও অন্যান্য মর্সিয়া কবিতাসমূহ এত জনপ্রিয় যে, এগুলো পাঠক ও শ্রোতাদের উভয়কে সমভাবে অশ্রু আপ্লুত করে তোলে।</p>
<p>মুহররম উৎসবের বিস্তারিত বিবরণ কোনো সমসাময়িক গ্রন্থে পাওয়া যায় না। ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও হুগলীতে ইমামবাড়িগুলোর অস্তিত্ব থেকে বুঝা যায় যে, সুবাদার ও নবাবদের আমলে এই শহরগুলাতে মুহররম উৎসব উদ্যাপিত হয়। আলম মুসাওয়ার কর্তৃক অঙ্কিত উনিশ শতকের প্রথম দিকের একটি চিত্রে এবং হাকিম আহসানের একটি বর্ণনায় ঢাকায় মুহররম উৎসব উদ্যাপনের প্রমাণ মেলে। মুহররমের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে উৎসব শুরু হতো। এবং সেই রাত্রি থেকে ইমামবাড়ির &#8216;নওবত খানা&#8217;য় নওবতের (সঙ্গীত) সুর বাজান হতো। সেই সময় থেকেই মাতমে মজলিশ শুরু হতো। ইমামবাড়ির দেয়ালে দেয়ালে মোমবাতি জ্বালান হতো। চতুর্থ দিবস থেকে মর্সিয়া (শোক সঙ্গীত) শোনার জন্যে ইমামবাড়ির লোকেরা সমাগত হতো। মার্সিয়া-গায়করা দলে দলে তাদের নিজস্ব নিশান নিয়ে আগমন করত। ষষ্ঠ ও সপ্তম দিবসে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে আতশবাজি পোড়াত। পঞ্চম দিনে পানি বাহকরা (মশক) পাজামা আচ্ছাদিত মোটা সবুজ লুঙ্গি ও সবুজ সার্ট বা আচকান, বহু রঙা ঝালরবিশিষ্ট পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় শহরে শোভাযাত্রা করে বের হতো। তারা গলায় একখণ্ড কাফনের কাপড় (কাফনি), বুকে একটি &#8216;বাদ্দী&#8217; (এক সুতার মালা), এবং এরকম অন্যান্য অলংকারাদি ধারণ করত। তারা এক হাতে গ্লাস ও এক পার্শ্বে পানির বোতল এবং অন্যহাতে একটি সুসজ্জিত লাঠি বহন করত এবং খালি পায়ে চলত। ষষ্ঠ দিনে পানি বহনকারীদের লাঠিগুলো ইমামবাড়ির ভূমির উপর আড়াআড়িভাবে রাখা হতো এবং সেখানে সমবেত লোকদের মধ্যে মিষ্টান্ন ও অন্যান্য &#8216;নিরাজ&#8217; বিতরণ করা হতো এবং অতঃপর তারা পানি বহনকারীদের পোশাকে সজ্জিত হয়ে মিছিল করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ভিক্ষার জন্য বের হতো।</p>
<p>&#8216;জুলুসে&#8217;র (মিছিলের) সপ্তমদিনে ইমামবাড়া আলোক সজ্জিত করা হতো এবং জনসাধারণ সেখানে শোকোচ্ছ্বাস দেখার জন্য ভিড় জমাত। অষ্টম দিনে মহিলাগণ অপরাহ্নে ইমামবাড়ায় সমবেত হতেন এবং শোকসংগীত পরিবেশন করতেন। এই সময় পুরুষেরা সেখান থেকে সরে যেতেন। রাত্রিতে &#8216;তুগ গোশত&#8217; (তুর্কী ভাষায় &#8216;তুগ&#8217; অর্থ পতাকা এবং গোশত্ অর্থ ভ্রাম্যমাণ) নামে অভিহিত মিছিল শুরু হতো এবং শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো অতিক্রম করা হতো। শোভাযাত্রার পুরাভাগে থাকত দু থেকে চারটি আখড়া (আখড়া ক্লাবের মতো। সেখানে একজন ওস্তাদ যুবকদেরকে লাঠিখেলা শিক্ষা দিতেন।) লোক এবং এদের সঙ্গে থাকত গ্লাসে আলোকবর্তিকা বহনকারিগণ। অতঃপর থাকত একরকম পোশাক পরিহিত একদল লোক, ওরা দু&#8217;টা বা তিনটা সারিতে পতাকা বহনকারীদের (আলম-বরদার) অনুগমন করত। অতপর আসত গাঢ় লাল রংয়ের কাপড়ে সজ্জিত হাতি এবং তুগরা পদ্ধতিতে লিখিত &#8216;ইয়া ফাতাহ&#8217; (হে বিজয়ী) এবং &#8216;ইয়া আলী&#8217; প্রতীক নিশান। এরপরে অনুগমন করত অভ্রগ্লাসসমূহে আলো বহন করে একসারিতে সুসজ্জিত অশ্বসমূহ। অতঃপর থাকত কাফেলা-মিছিলের প্রতীক ডঙ্কা (বাদ্য), বাদ্যযন্ত্র এবং শোকসঙ্গীত &#8216;নওবত&#8217; ইত্যাদি বাজিয়ে কয়েকটি সঙ্গীতকারদের দল। এবং এদের অনুগমন করত কাল কাপড়ে আবৃত দুটো পালকি (দোলা) এবং এদের অগ্রভাগে থাকত হাতে আলম (পতাকা) নিয়ে কয়েকজন অশ্বারোহী এবং আলম ও সামরিক বাদ্যযন্ত্র হাতে দুজন পদাতিক। পানিবাহকগণ পালকির উভয়পার্শ্বে শ্লোগান দিতে দিতে অগ্রসর হতো। দোলাগুলো পরে উটের পিঠে বহন করা হতো। পালকির পিছনে থাকত কালো অথবা সবুজ কাপড় পরিহিত ও হস্তে মোমবাতি নিয়ে শোককারিগণ। এই দলে ছিল &#8216;জুলজানাহ&#8217; (হোসেনের অশ্ব) এবং এর সঙ্গে অনুগমন করত রক্তরঞ্জিত জিন ও জুলফিকার (আলীর তরবারি) বহন করে দুল দুল (আলীর অশ্ব)। সর্বশেষে ছিল দুটো ঢাক নিয়ে একটি হস্তী, ঢাক দুটো মৃদুভাবে বাজান হতো এবং এতে মিছিলের শেষ চিহ্নিত হতো।</p>
<p>নবম দিনে শোভাযাত্রা বের করা হতো রাত্রিবেলা এবং তখন আখড়া-প্রদর্শনীর লাঠি খেলার ব্যবস্থা থাকত। তরবারি, চাকু এবং আগ্নেয়াস্ত্রের খেলারও ব্যবস্থা ছিল। এই ব্যবস্থাপনায় বিগত রাত্রির &#8216;তুগ গাশত&#8217; এর অনুসরণ করা হতো। &#8216;জুলজানাহ&#8217;র পেছনে আরো কিছু বিষয় সংযোজিত ছিল, যেমন কাঠের তক্তায় বসান একটি পাহাড় এবং উপরে একটি মিহরাব। এগুলোর সবটাই থাকত কাগজে মোড়া ও পার্শ্বগুলো আড়াআড়ি স্থাপিত তরাবারি এবং ঢাল দিয়ে সজ্জিত। ফলে এসব দৃশ্য প্রায় আসলাহ খানার (অস্ত্রাগার) রূপ ধারণ করত। অভ্যন্তর ভাগে থাকত কারবালায় নিহত বীরদের কাগজে তৈরি দ্বিতল বিশিষ্ট একটি প্রতীক সমাধি সৌধ।</p>
<p>দশম দিনকে বলা হতো আশুরা। প্রতীক সমাধি (জরীহমুবারক) &#8216;সহ তাজিয়া&#8217; শহরের বিভিন্ন এলাকাসমূহে ঘুরান হতো এবং অতঃপর তা পানিতে ফেলে দেওয়া হতো কিন্তু কাল কাপড়ে আবৃত পতাকাগুলো ও প্রতীক সমাধিসমূহ নীরবভাবে ইমামবাড়ায় ফেরৎ আনা হতো। এভাবে শিয়া অনুষ্ঠান সমাপ্ত হতো। অপরাহ্ণে সুন্নিরা তাজিয়া শোভাযাত্রা বের করতেন। এতে হোসেনের প্রতি এজিদের সৈন্যদের সহানুভূতি প্রদর্শিত হতো; এরা হোসেনকে যথারীতি সমাধিস্থ করার জন্য রাত্রে তার পবিত্র দেহ নিয়ে যায়। এই তাজিয়া পানিতে রেখে আসা হতো। এর দ্বারা মুহররম উৎসবের সমাপ্তি করা হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বেড়া উৎসব</strong></p>
<p>বাংলায় মুসলমান শাসনামলে উদ্যাপিত বেড়া অনুষ্ঠান ছিল একটি জনপ্রিয় উৎসব। <strong>এই উৎসব উদ্যাপিত হতো খাজা খিজিরের (পয়গম্বর ইলিয়াস) সম্মানে। তিনি হচ্ছেন সমুদয় সমুদ্র, সাগর ও নদনদীর পৃষ্ঠপোষক সাধু দরবেশ। কিংবদন্তি এর উৎপত্তির সঙ্গে সুফিবাদের আদমিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম-বিন আদমের (মৃত্যু ৭৪৩ খ্রিঃ) নাম যুক্ত করে। ভারতে তার শিষ্য সম্প্রদায় খিজিরিয়া নামে পরিচিত। কেননা, তারা খিজির বা খাওয়াজা খিজিরের অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসী-যিনি বাংলা মুল্লুকে খিজির পিররূপে জন-সাধারণ্যে পরিচিত।</strong> আজও নদীমাতৃক বাংলার লোকেরা বিশ্বাস করে যে, খিজিরপির হচ্ছেন নদনদীতে মাঝি ও নাবিকদের অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা এবং তিনি তাদেরকে নদনদী ও সাগরসমূহে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কলিকাতার খিদিরপুর এবং নারায়ণগঞ্জের সন্নিকটস্থ খিদিরপুর খুব সম্ভবত খিজির পিরের নামের স্মৃতি বহন করছে। উনিশ শতকের শেষপাদে ডক্টর ওয়াইজ লিখেছেন যে, বেড়া উৎসব স্থানীয়ভাবে খাজা খিজিরের নামের সঙ্গে বিজড়িত; তিনি &#8220;বর্তমানে জাহাজডুবি থেকে রক্ষা করতে ভারতের বহু নদনদী ও সাগরের বসবাস করেন, এবং তিনি কেবল তাদের কাছেই দৃশ্যযোগ্য যারা নদীর তীরে দীর্ঘ চল্লিশ দিনব্যাপী দৃষ্টি রাখেন।” বাংলার জনসাধারণ পৃষ্ঠপোষক দরবেশের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কলাগাছ, বাঁশ ও কাগজের তৈরি ভেলা ভাসিয়ে বেড়া ভাসান উৎসব উদ্যাপন করতেন। মুগল শাসনপর্বে প্রদেশে বেড় উৎসব সরকারিভাবে উদ্যাপিত হতো। এটা সুবিদিত যে, সুবাদার মুকাররম খান (১৬২৬-২৭ খ্রিঃ) ব্যক্তিগতভাবে বুড়ীগঙ্গা নদীতে এই বেড় ভাসান উৎসবের আয়োজন করতেন। মুর্শিদকুলী খান অত্যন্ত একটি বিরাট ভেলা তৈরি করেন এবং এর উপর তিনি কাগজের ঘর ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এগুলোকে সুন্দরভাবে সাজানো হয় ও আলোকসজ্জিত করা হয়। ভেলাটি ছিল দৈর্ঘ্যে ৩০০ কিউবিক। জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত ভেলাটি আতশবাজির প্রদর্শনী ও আমোদ প্রমোদের মধ্য দিয়ে ভাগীরথীর জলে ভাসান হয়েছিল। ভেলাটির আলোকসজ্জা বহু মাইল দূর থেকে দৃষ্টিগোচর হতো। এ উৎসব ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত হতো। বহু মুসলমান এই বেড়া উৎসবের আনন্দ স্ফূর্তিতে অংশ নিতেন। ডক্টর ওয়াইজ সিরাজদ্দৌলাহর সময়কার বেড়া উৎসবের বর্ণনা দিয়েছেন। নবাব নিজে ভাগীরথীর জলে শত শত ভেলা ভাসিয়ে এ উৎসব উপভোগ করেন এবং নদীর তীরভূমি জুড়ে মুর্শিদাবাদের অধিবাসীরা বিপুলভাবে জড়ো হয়েছিল। উৎসবের কথা বলতে গিয়ে, ডক্টর ওয়াইজ বলেন, &#8220;বেড়া সাধারণত বক্রাকৃতি বিলাস তরণীর অগ্রভাগস্থ আকৃতির অনুকরণে চাকচিক্যপূর্ণভাবে কাগজ দিয়ে তৈরি ছিল এবং পোতাগ্র ভাগ ছিল ময়ূরের ঝুটি ও বক্ষ সম্বলিত স্ত্রী জাতীয় বাজপাখি সদৃশ। কদলীবৃক্ষের গুড়ির একটি ভেলার উপর প্রতিকৃতি স্থাপন করত সূর্যাস্তকালে ভাসিয়ে দেওয়া হতো এবং রাত্রি বেলা অন্ধকারে ভরা নদীজলে আলোকচ্ছটা অপূর্ব চিত্রের মতো মনে হতো।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>নামকরণ</strong></p>
<p>জন মার্শাল ১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণে আসেন এবং শিশুসন্তানের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত অনুষ্ঠানাদির বর্ণনা রেখে যান। তিনি বলেন, <strong>&#8220;মুর বা মুসলমানগণ তাদের জন্মের দ্বিতীয় দিনে একটি নাম পায়। নবজাতকের পিতা অথবা নিকট আত্মীয় কোনো মৌলভী বা ধর্মগুরুকে আমন্ত্রণ করেন। তিনি এসে ধর্মীয় পুস্তক (বিশেষত কুরআন) বন্ধ করেন; পিতা কোনো সুচাঁলো কাঠি এই গ্রন্থের পাতার মধ্যে প্রবিষ্ট করেন, অতঃপর সূঁচবিদ্ধ পাতা খোলা হলে মৌলভী সেই পাতার প্রথম অক্ষরটি গ্রহণ করেন। এর অর্থানুসারে শিশুর নামকরণ করা হয়।&#8221;</strong> জন মার্শালের বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, বাংলার মুসলমানগণ শিশুর নামকরণে ধর্মীয় গ্রন্থের (কোরআন শরিফ) সাহায্য নিতেন। মুসলমানদের মধ্যে অদ্যাবধি এই রীতি প্রচলিত আছে। বাংলার মুসলমান সমাজে আরবি নামসমূহ প্রচলনের এটি একটি কারণ।</p>
<p><script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>আকিকা</strong></p>
<p>শিশুসন্তানের জন্মের সঙ্গে আকিকা একটি একান্ত প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান। আকিকা শব্দের অর্থ হচ্ছে নবজাতক শিশুর কেশ। কিন্তু এটা সাধারণভাবে ক্ষৌরকর্ম অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুর নামকরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। <strong>এই অনুষ্ঠানে, শিশুর নামকরণের স্মৃতি রক্ষার্থে শিশুপুত্রের ক্ষেত্রে দুটো এবং শিশুকন্যার ক্ষেত্রে একটি মহিষ অথবা ছাগল জবাই করা হতো এবং আত্মীয় স্বজন ও গরিবদের মধ্যে এই মাংস বিতরণ করা হতো। ভোজানুষ্ঠানের আয়োজন করে, অবস্থাপন্ন পিতামাতা জনসাধারণকে আপ্যায়িত করতেন।</strong></p>
<p><strong>বিসমিল্লাহখানি শিশুর সঙ্গে সম্পৃক্ত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। শিশুর চার বছর চার মাস চার দিন বয়ঃক্রমকালে এই অনুষ্ঠান উদ্যাপন করা হয়ে থাকে।</strong> প্রার্থনা, আর্শীবাদ ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে দিয়ে আল্লাহর নামে পড়াশোনা শুরু করার জন্যে শিশুকে ওস্তাদের নিকট সমর্পণ করা হয়। এভাবে শিশু শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করে। লিঙ্গাগ্রের চর্ম কর্তন করাকে বলা হয় খাতনা। এটা সুন্নত নামেও পরিচিত। এটি একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মসলমানরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই উৎসব উদ্যাপন করত। সাধারণত শিশুর সাত বছর বয়সের সময় খাতনা করা হতো এবং এই উপলক্ষে আনন্দ উৎসব করা হতো এবং ভোজ ও উপহার দেওয়া হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বিবাহ</strong></p>
<p>বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল; ধুমধাম ও ভোজানুষ্ঠানের সঙ্গে এটা সম্পন্ন হতো। বিবাহ উৎসব সম্পর্কে এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মৃতের জন্য অনুষ্ঠানাদি</strong></p>
<p>মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত কতকগুলো পবিত্র কৃত্য ছিল। মৃতদেহ একটি শবাধারে (কফিনে) রাখা হতো এবং একটি বড় ধরনের জমায়েতে প্রার্থনাপর্ব অনুষ্ঠিত হতো। অতঃপর শবাধারটি আনুষ্ঠানিকভাবে কবরে রাখা হতো। মৃতের পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবগণ দশদিনব্যাপী শোকপালন করত। বিদেহী আত্মার জন্য মঙ্গল কামনায় তারা প্রার্থনা করত।</p>
<p><strong>পরিবারের শোক-পর্ব ছয়মাসেরও অধিককাল অব্যাহত থাকত। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে ছয়মাস অন্তর মৃতের উদ্দেশ্যে ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো। কুরআন শরিফ তেলাওয়াতকারীদের কাপড়-চোপড় ইত্যাদি উপহার প্রদান করা হতো এবং লোকদেরকে সুস্বাদু খাদ্য ও ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। অতঃপর বিরাট ভোজানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শোকপর্বের সমাপ্তি ঘটত।</strong> এটা আমোদ-প্রমোদের সঙ্গে পালিত হতো। মীর্জা নাথন তদীয় মৃত পিতার জন্য শোকপর্বের সমাপ্তি ঘটান বিরাট ভোজানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। নাথন বলেন, &#8220;এই উপলক্ষে এরূপ জনসমাগম হয়েছিল যে, এটা পৃথিবীর ইতিহাসে উল্লেখের যোগ্য।&#8221;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-festivals-of-muslim-bengal-during-the-mughal-period/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16267</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য চর্চা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Oct 2025 16:38:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16231</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্যের গোড়ার কথা ইসলামের নবী কেবল আরব দেশে আসেননি, দুনিয়ার সব দেশেই এসেছেন। আল্লাহর পাঠানো সবই ছিলেন ইসলামের নবী। সাহিত্যের আলোচনায় প্রথমেই নবী প্রসংগে এলাম কেন? কারণ নবীরাই মানুষের প্রথম শিক্ষক । নবীরাই সমাজ সংগঠক।নবীদের যোগ মানুষের সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকেই।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>সাহিত্যের গোড়ার কথা</strong></h5>
<p>ইসলামের নবী কেবল আরব দেশে আসেননি, দুনিয়ার সব দেশেই এসেছেন। আল্লাহর পাঠানো সবই ছিলেন ইসলামের নবী। সাহিত্যের আলোচনায় প্রথমেই নবী প্রসংগে এলাম কেন? কারণ নবীরাই মানুষের প্রথম শিক্ষক । নবীরাই সমাজ সংগঠক।নবীদের যোগ মানুষের সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকেই। মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতি সাহিত্য নবীদের  ভূমিকা ছাড়া কল্পনাই করা যেতে পারে না। নবীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের সন্ধান এনেছেন এবং সে পথ মানুষকে দেখাননি এমনটি হতে পারে না। সাহিত্য মানুষের জীবনের একটা প্রয়োজনীয় অংশ আর নবীরা এ  অংশে কোনা অবদান রাখেননি একথা কেমন করে ভাবা যেতে পারে? নবীরা যেসব সহিফা ও কিতাব এনেছেন সেগুলোও সাহিত্যরস সমৃদ্ধ। নিছক কাটখোট্টা আলোচনা কোনো কিতাবেই নেই। জীবনকে উপলব্ধি করে আলোচনাগুলো জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে জীবনরস সমৃদ্ধ করে। তবেই তা মানুষের কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে। মানুষ তার সাহায্যে উন্নতি করে উন্নত জীবন সমাজ সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে এবং তার ভিত্তিতে মানুষ করেছে সাহিত্য সাধনা। এটাই হচ্ছে মানুষের সমিতা সাবনার গোড়ার কথা।</p>
<p>আজ যেন সাহিত্য বলতে নবুওয়াতী খাতের ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত একটা স্রোত বুঝায়। এটা মানুষের জীবনের অন্যান্য খাতে ভুলের মতো একটা ভুল। ‘রাধাকৃষ্ণের লীলা’ এই ভুলেরই একটা ফসল।  সাহিত্যকেও নবুওয়াতী ধারায় সম্পৃক্ত হতে হবে। নয়তো তা মানুষের জন্য উপাদেয় ও উপযোগী হতে পারে না। সাহিত্য রস ও সাহিত্যের আস্বাদ মানুষের জীবন গঠনে সাহায়তা না করে যদি ক্ষতি সাধন করে তাহলে কে এমন মানুষ আছে যে তা গ্রহণ করবে? শেষ নবীর কিতাব আল কুরআনে জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘দুনিয়ার জীবনটা তো খেলা-তামাশা, বাহ্যিক চাকচিক্য, তোমাদের পারস্পরিক গৌরব ও অহংকার এবং অর্থ সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে  পরস্পরকে অতিক্রম করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা হলো, বৃষ্টি হয়ে গেলো এবং তার ফলে উৎপন্ন উদ্ভিদরাজি দেখে কৃষক আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তারপর সে ফসল পেকে গেলো এবং তোমরা দেখতে পেলে তা হলুদ বর্ণ ধারণ করছে এবং পরে তা ভূষিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আখেরাত এমন স্থান যেখানে রয়েছে আজাব এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থির জীবন প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।’(আল হাদীদ : ২০)</p>
<p>এ জীবনকে আমরা গ্রহণ করেছি এবং জীবনকে উৎকর্ষিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  কিন্তু জীবনের প্রতারণার জালে জড়িয়ে আমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলতে পারি না। আমাদের সামনে রয়েছে আখেরাতের জীবনের কামিয়াবী। এই আখেরাতের জীবনের জন্য দুনিয়ার জীবন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।দুনিয়াকে বলা হয়েছে আখেরাতের কৃষিক্ষেত (হাদীস)। এখানে যেমন পরিশ্রম করা ও যত্ন নেওয়া হবে তেমনি আখেরাতে তার ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু দুনিয়ার প্রতারণার জালে যদি আমরা ফেঁসে যাই, দুনিয়ার আসল কাজে জড়িত না হয়ে যদি প্রতারণামূলক খেলা-তামাশায় মেতে উঠি এবং দুনিয়ার সম্পদ আহরণ ও ভোগ বিলাসে লিপ্ত হই, তাহলে আমাদের আখেরাতের জীবন বিনষ্ট হয়ে যাবে। দুনিয়া আমাদের সামনে আছে এবং আখেরাত সামনে নেই। তবে আখেরাত আমাদের কল্পনা জগতের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সকল বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। কাজেই তাকে আমার জীবন কর্ম ও জীবন চিন্তা থেকে আলাদা করতে পারি না।</p>
<p><strong>জীবনকে খেলা তামাশা বলা হয়েছে কোন অর্থে? স্বল্পকালীন স্থায়িত্বের অর্থে। একশো বছরের জীবনের বাস্তব কঠিন কর্মক্ষেত্রে খেলা তামাশা মাত্র কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার আনন্দ বিনোদন। এই স্বল্পস্থায়ী ক্ষণটুকুর পর আবার বাস্তব কঠোর কঠীন জীবন শুরু। ঠিক তেমনি এই স্বল্পস্থায়ী জীবনটা খেলা তামাশা এবং আখেরাতটাই বাস্তব ও অনন্তকালীন জীবন। কাজেই আমাদের যা কিছু কাজ চিরস্থায়ী আখেরাতের জন্য। জীবনটা শুধু দুমুঠো খাদ্য গ্রহণ, শরীর ঢাকার জন্য বস্ত্র আহরণ এবং শারীরিক, জৈব ও যৌন চাহিদা পুরণ করার নাম নয়। বরং এই স্বল্পকালীন দুনিয়ার জীবনকে অনন্তকালীন আখেরাতের জীবনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই</strong></p>
<p><strong>জীবনটাকে আমাদের বুঝতে হবে এবং উপলব্ধি করতে হবে।</strong><br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599"
     crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle"
     style="display:block; text-align:center;"
     data-ad-layout="in-article"
     data-ad-format="fluid"
     data-ad-client="ca-pub-9110084365128599"
     data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>জীবনের সাথে সাহিত্য, জীবনকে পরিশীলিত ও বিকশিত করার জন্য সাহিত্য। জীবনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য নয়। জীবনকে বিকৃত করেও সাহিত্য নয়। সাহিত্য আমাদের জীবনেরই নির্যাস।</strong></p>
<p>সাহিত্য আমাদের সুন্দর করবে। আমাদের পরিশীলিত ও পরিশ্রুত করবে। আমাদের জীবনকে ক্লেদমুক্ত অপাপবিদ্ধ করবে। সাহিত্য আমাদের সত্য ও ন্যায়ের  অনুসারী করবে। জীবনের ঘটনাবলী থেকে আমরা সত্য ও ন্যায়ার বাছাই করে নিতে পারবো। জীবন সংগ্রামে সংহিতা কেবলমাত্র একজন দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। বরং একজন দক্ষ পর্যবেক্ষক ও দক্ষ সমালোচকের দৃষ্টি হবে সাহিত্যের দৃষ্টি। এই স্বল্পকালীন পৃথিবীর জীবনে মানুষকে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে অর্থাৎ মানুষ কিভবে যথার্থ মানবতার আধারে পরিণত হতে পারে এবং নিজের নফসের ও জীব-জড়ের কৃত্রিম শক্তির অনুগত না হয়ে  বিশ্ব জাহান ও বিশ্ব প্রাকৃতিত্ব মালিক একমাত্র আল্লাহর অনুগত হতে পারে, তাই হবে সাহিত্যের সাধনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>গাংগেয় বদ্বীপে ইসলামের ভিত</strong></h5>
<p>বাংলাদেশে ইসলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হবার পরই ইসলামী সাহিত্যের সৃষ্টি। ইসলামের নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকালেই খ্রিষ্টীয় সপ্তম ইসলামের দাওয়াত বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রাকৃতিক ও মানসিক উভয় দিক থেকে এখানকার পরিবেশ ছিল অনুকূল। এই অনুকূল পরিবেশে ইসলামের দাওয়ার সহজে বিস্তার লাভ করে। উপমহাদেশের কেন্দ্র দিল্লী থেকে বহু দুরে  থাকায় বিদেশী আক্রমণকারীদের দৃষ্টি কমই এদিকে পড়েছে এবং অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীরাও এখানে কম সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া সবুজ শ্যামল বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত ও প্রাকৃতিক বন জংগলাকীর্ণ সমতলভূমি এমন এক ধরনের নৈসর্গিক গুরু গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করেছিল যা নিরিবিলি নিশ্চিন্তে সত্য দীনের দাওয়াত ছড়াবার পথে সহায়ক হয়েছিল। ফলে স্থানীয় বৌদ্ধ, জৈন ও আর্য ধর্ম প্রভাবিত জনগোষ্ঠী ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করে। এই সংগে আর একটি বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো। কয়েক হাজার বছর থেকে এ এলাকায় বিপুল সেমেটিক জনগোষ্ঠীর সমাবেশ ঘটেছিল। তাদের ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল তৌহীদবাদী। কালের আবর্তনে তাতে মরচে পড়ে গিয়েছিল। আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী বৌদ্ধবাদী ও জৈনবাদী ধর্মীয় সংস্কার যেভাবে এ এলাকায় ব্যাপক বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল ঠিক একই ধারায় ইসলামী তৌহীদবাদ সমগ্র বাংলার অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয়েছিল অতি অল্প সময়েই। যেন এটা ছিল তাদের প্রাণের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ। সকালে হারিয়ে গিয়েছিল আবার সন্ধ্যায় তাকে ফিরে পেয়েছিল, এভাবে তারা এটাকে গ্রহণ করেছিল। তাই হিন্দুস্তানের অতি প্রাচীন মুশরিকী আবাসভূমির মধ্যে গড়ে উঠতে পেরেছিল একটি বিশাল তৌহীদবাদী জনগোষ্ঠী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আলেম উলামা ও কাজীদের জ্ঞানচর্চা</strong></h5>
<p>মুললিম বিজেতাদের পূর্বে সমুদ্র ও নদীপথে আরব বণিকদের সাহায্যে বাংলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করে ইসলামের প্রথম যুগেই। এরপর ইসলাম প্রচারকদের আগমন ঘটতে থাকে। মুসলিম বিজেতাদের ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পর এ ধারা বলিষ্ঠতা অর্জন করে। এ সময় এদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম আইনঙ্গ তথা ফকীহ ও কাজীদের আগমন ঘটতে থাকে। তারা ছিলেন ইসলামি শাস্ত্রে সুদক্ষ ও পারদর্শী। মুসলিম বিশ্বে যে বিপুল জ্ঞান চর্চা হচ্ছিল তার ঢেউ এখানেও এসে পড়ে। ফলে ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকেই এখানে গৌড়, পান্ডুয়া,মাহিসুন (মাহিসন্তোষ), সোনারগাঁও ইত্যাদি এলাকায় বড় বড় ইলমী তথা ইসলামী জ্ঞান চর্চার  কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এখানকার মাদরাসাগুলোতে ইসলামী জ্ঞান আহরণ করার জন্য সমগ্র হিন্দুস্তান থেকে ছাত্রদের আগমন ঘটতো। শায়খ তাকিউদ্দীন আরাবী, শায়খ শরফুউদ্দীন আবু তাওয়ামাহ, শায়খ ইয়াহইয়া মানেরী, শায়খ আলাউল হক, হযরত শায়খ নুর কুতবুল আলম ইত্যাদি বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্ঞানসাধকগণ এসময় এসব জ্ঞানকেন্দ্র আলোকিত করেছিলেন। তাই বলা যায়, ইসলামি শাসনের প্রথম যুগেই বাংলাদেশ ইসলামী জ্ঞানচর্চার  পীঠস্থানে পরিণয় হয়। এখানে এর পরিবেশও ছিল। তখন জ্ঞানচর্চার ভাষা ছিল আরবী ও ফারসী । ফলে বিদেশাগত মুসলমান এবং এদেশীয় শিক্ষিত, জ্ঞানী  ও পণ্ডিতদের মধ্যে মূলত এ জ্ঞানচর্চা সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের মূল কেন্দ্র দিল্লীতে শক্তিশালী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান সাধনার এই কেন্দ্র বাংলা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।</p>
<p><em>সাধারণ মুসলমানের ভাষা ছিল বাংলা। ইতিপূর্বে পাল যুগে বৌদ্ধ শাসনামলে সাহিত্যের ও রাজভাষা সংস্কৃত থাকলেও সাহিত্য ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার চর্চা যা একটু আধটু হয়েছিল সেনযুগে হিন্দু শাসনামলে এসে তা সম্পূর্ণরণে রহিত হয়ে যায়। সংস্কৃতের মাধ্যমে সাহিত্য চর্চা ও রাজকার্য চলতে থাকে। এজন্য একটা দরবারী জগাখিচুড়ি মার্কা সংস্কৃত ভাষাও গড়ে ওঠে। মুসলিম সুলতানদের শাসনামলে মূলত বাংলা ভাষার পুনরজন্ম হয়। মুসলিম শাসকগণ তাঁদের দরবারী ও রাজভাষা ফারসী এবং ইলমী ভাষা আরবী রাখলেও মুসলিম এবং এদেশটার জনসাধারণের ভাষা বাংলার ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার জন্য রাজকোষ অর্থ বরাদ্দ করেন। ফলে ধীরে ধীরে বাংলা ইলমী ভাষায় রুপান্তরিত হবার পথ প্রশস্ত হতে থাকে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সুফী সাধকদের ইসলাম প্রচার</strong></h5>
<p>মুসলমানদের মধ্যে দিনরাত আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন এবং তাঁর ইবাদতে মশগুল একটি দল গড়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন সুফী নামে খ্যাত। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের য্যোগী, সন্ন্যাসী ও রাহেবদের মতো তাঁরা সংসার বিরাগী ছিলেন না। তাঁরা সংসার,ধর্ম, জ্ঞানচর্চা এবং এমনকি জিহাদ চর্চাও করেছেন। এই সংগে আল্লাহর ইবাদত ও মানবতার সেবাই ছিল তাঁদের ব্রত। বাংলায় ইসলাম প্রচারে এই সুফিদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশী। তাই বাংলার মুসলিম সমাজে সুফীদের জীবন চর্চার  প্রভাব বেশী অনুভুত হয়েছে। কিন্তুু সুফীগণ ইসলামী শরীয়তের বাইরে কোনো অভিনব ও কৃত্রিম জীবন যাপন করতেন না।তারা ছিলেন আদর্শ মুসলিম এবং আদর্শ ইসলামী চরিত্রের অধিকারী। তাঁরা ছিলেন কুরআনের সুরা আল কাসাসের ৭৭ নং আয়াতে ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তার মাধ্যমে আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কারা,তবে সেই সংগে দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলো না।’ মর্মবাণীর যথার্থ আধার। তাঁরা সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেছেন। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করেছেন এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করেননি।খিলাফয়ে রাশেদার চার পাঁচশো বছর পরে সৈরতান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক শাসকদের সাথে কোথাও  তাঁরা কোনো আপোশ করেন নি। বরং কবি ও দার্শনিল ইকবালের ভাষায় অনেক জায়গায় ‘সিকান্দাররা কালিন্দরদের কথায় ওঠাবসা করতেন। দিল্লীর খাজা কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী র., হযরত বু আলী কলন্দর র. আজমীরের হযরত খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতী র. এবং গৌড়ের হযরত শাহ নূর কুতুবুল আলম র. এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই সুফীরা কখনো কোনো অন্যায়, জুলুম ও শোষণের সাথে আপোশ করেননি। তাঁরা ব্যাপক হারে জনগণকে ইসলামের তালিম ও তরবীয়ত দিয়েছেন এবং তাদের ইসলামী জীবন যাপানে সাহায্য করেছেন।</p>
<p><em>এই সুফীদের হাতে এক সাথে এত বেশী সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে যে, তাদের ইসলামী তালিম ও তরবিয়ত দেয়া এবং তাদের ইসলামী চরিত্র গঠন করা এই সীমিত সংখ্যক সুফীর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। যদি পনের শতকের জৌনপুরের বিখ্যাত সুফী হযরত মীর সাইয়েদ আশরাফ জাঁহাগীর সিমনানীর একটি পত্র থেকে জানা যায় ‘মোটকথা বাংলার বড় শহরের কথা বাদ দিলেও এমন কোনো ছোট শহর বা গ্রাম নেই যেখানে খোদাভীরু সুফীগণ আগমন ও বসতি স্থাপন করেননি’। তারপরও বলা যায় কুরআন ও সুন্নাহ চর্চার অবর্তমানে বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী ইসলামের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারেনি। যার ফলে মুশরিকী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বেড়া টপকে তারা ইসলামী মিল্লাতের আওতাভুক্ত হলেও ওদিক থেকে আসার সময় নিজেদের বহিরংগে মুশরিকী সভ্যতা সংস্কৃতির অনেক কিছু সাথে করে নিয়ে আসে। কালক্রমে এগুলো মুসলিম জীবন ধারায় জেঁকে বসে।</em></p>
<p>মুলত ইসলাম এমন একটা জীবন ব্যবস্থা ও জীবনাদর্শ যা মোটেই অনুষ্ঠান নির্ভর নয়। বরং কতিপয় বিশ্বাস ও বিশ্বাসভিত্তিক কর্মের ওপরই তা নির্ভরশীল। ইসলামের উৎস হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল। তৃতীয় কোনো সত্তার সাথে ইসলাম সরাসরি জড়িত নয়। তাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রথম পর্যায়ে সুফী দরবেশ বা উলামায়ে কেরামের যারাই জড়িত থাক না কেন সেক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন ও  সুন্নাহ চর্চার যতটুকুন কমতি থেকে গেছে তা ইসলামী ভিত্তির দুর্বলতা হিসাবেই চিহ্নিত হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>স্থানীয় কুফরী উপাদান</strong></h5>
<p>বাংলায় মুসলমানদের আগমন এবং ইসলামী আদর্শবাদের প্রসারের পূর্বে যেসব ধর্মমত বিস্তার লাভ  করেছিল সেগুলির পেছনে কোনো পরিচিত ও পরীক্ষিত আসমানী কিতাবের সমর্থন ছিল না। বৌদ্ধবাদ, জৈনবাদ ও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদেরই এখানে প্রচলন ছিল বেশী। এই তিন বৃহৎ ধর্মমতের বাইরে কাল্পনিক দেবদেবীর পূজারও একটা ধারা প্রচলিত ছিল। মূলত সবগুলো ধর্মমতই ঈশ্বর আরাধনার নামে প্রকৃতি পূজা ও পুতুল পুজায় পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মমত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ, ত্রিপিটক ইত্যাদিকে অভ্রান্ত মনে করতো। কিন্তু এর পেছনে কোনো শক্তিশালী ভিত্তি উপস্থাপন করতে পারতো না। ফলে সেগুলো প্রায় গালগল্প, পুরাতন কাহিনী, নিছক নীতিকথা এবং দার্শনিক আলোচনার কচকচি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল্লাহর অস্তিত্বে বিভিন্ন জীব ও জড়কে শরীক করা এবং এতদসংক্রান্ত ব্যাপক কুসংস্কারই ছিল ধর্ম। ফলে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে নানান বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্যের সমাবেশ ঘটেছিল। প্রকৃত সত্যকে মেনে নেবার মতো মানসিকতা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।</p>
<p>আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী রীতি বর্ণবাদের ভিত্তিতে সমাজকে বিভক্ত করে ফেলেছিল। মানুষ সরাসরি মানুষের দাসে পরিণত হয়েছিল। বরং একদল মানুষ সমাজে অন্ত্যজ ও মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। বিরোধী ধর্ম মত জৈন ও বৌদ্ধবাদও ধীরে ধীরে বর্ণভেদ প্রথার হাতে নিজেদের সোপর্দ করে দিয়েছিল। অথবা কোথাও আত্মরক্ষার্থে আত্মগোপন করে সহজিয়া ও তান্ত্রিক ইত্যাদি মতবাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়েছিল। অর্থাৎ ধর্মের নামে সমগ্র বাংলাদেশে ধর্মীয় অনাচার কুসংস্কার ও চারিত্রিক নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। এই ছিল তখনকার বাংলা সাহিত্য চর্চার পটভূমি বা পরিবেশ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলমানদের সাহিত্য সাধনা<br />
</strong></h5>
<p>বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কয়েকশো বছর পূর্ব থেকে ইসলাম প্রচারকদের এদেশে আগমন শুরু হয়। ইসলামের খালেস তৌহিদবাদ ও সামাজিক সাম্য বাংলার পৌত্তলিক সমাজে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক অবিচার, জুলুম, নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী পরিবেশ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি নিরাকার সর্বশক্তিমান একক স্রষ্টার আরাধনার ধারণা সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাকালে চতুরদিকে যখন ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা বেড়ে চলছিল তখনকার সমাজে ইসলামের শক্তির একটা অস্পষ্ট প্রভাব সমসাময়িক একটি কবিতায় ফুটে উঠেছে। অজ্ঞতাবশত কদি রামাই পণ্ডিত তের শতকের শেষের দিকে লিখিত তাঁর এ কবিতায় ইসলামী আদর্শ ও সদ্যগঠিত মুসলিম সমাজের চিত্র সঠিক রূপে আঁকতে না পারলেও ইসলামের অসাধারণ ও যাদুকরী প্রভাব এর মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর কবিতাটির নাম নিরঞ্জনের রুষ্মা । এ কবিতায় মধ্যযুগীয় ইউরোপের পোপ ও যাজকদের ক্ষমতার মতো ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু পুরোহিতদের ক্ষমতার কিছু আভাস পাওয়া যায়। জাজপুর তথা ওড়িষার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সদ্ধর্মীদের নিকট কর আদায় করতে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যগোষ্ঠী গলার পৈতা কানে বেড় দিয়ে বৌদ্ধ জনসাধারণকে শাপ শাপান্ত করে তাদের বাড়ি-ঘর আগুন জালিয়ে ছারখার করে দেয়। তাদের এ জুলুম উৎপীড়ন দেখে ধর্মদেবতা বৈকুন্ঠে বসে এর প্রতিবিধানে মনোনিবেশ করলেন। ধর্মরূপী মুসলমানরা জাজপুরে প্রবেশ করলো এবং ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীরা রাতারাতি ধর্মান্তর গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলো। তারা দেউল ও দেব বিগ্রহ ভেঙে পুতুল পুজার অবসান ঘটিয়ে ব্রাহ্মণদের বিনাশ করলো। কবির কল্পনায় বিষয়টা এভাবে ধরা দিয়েছে:</p>
<p>ধর্ম হইল জবন রূপী<br />
মাথায়েত কাল টুপি<br />
হাতে শোভে ত্রিকচ কামান।<br />
চাপিয়া উত্তম হত্র<br />
ত্রিভুবনে লাগে ভ-এ<br />
খোদায়ে বলিআ এক নাম।।<br />
(নিরঞ্জন নিরাকার<br />
হৈলা ভেস্ত অবতার<br />
মুখেত বলএ দম্বদার।।<br />
জথেক দেবতাগণ<br />
সভে হৈয়‍্যা একমুন<br />
আনন্দেতে পরিলা ইজার।।)<br />
ব্রহ্মা হৈল্যা মহামদ<br />
বিষ্ণু হৈল্যা পেকাম্বর<br />
আদম্ফ হইল শূলপানি।<br />
গনেশ হইলা গাজী<br />
কার্তিক হইলা কাজী<br />
ফকির হইলা জথ মুনি।।<br />
তেজিয়া আপন ভেক,<br />
নারদ হইলা শেক,<br />
পুরন্দর হইলা মলনা।<br />
চন্দ্র, সূর্য আদি দেবে<br />
পদাতিক হয়্যা সেবে,<br />
সভে মিলে বাজাএ বাজনী।।<br />
আপনি চণ্ডিকা দেবী,<br />
তিঁহ হৈল্যা হায়া বিবি<br />
পদ্মাবতী হৈল্যা বিবি নূর।<br />
জথেক দেবতাগণ,<br />
সভে হয়া একমন,<br />
প্রবেশ করিল জাজপুর।।<br />
দেউল দেহারা ভাঙ্গে,<br />
ক্যাড়্যা ফিড়্যা খাএ রঙ্গে,<br />
পাখড় পাখড় বোলে বোল।<br />
ধরিয়া ধর্মের পাএ,<br />
রামাঞি পণ্ডিত গাএ,<br />
ই বড় বিসম গণ্ডগোল।।</p>
<p>(শব্দার্থ: দম্বদার – দম-ই-মাদার, বদরুদ্দীন মওলানা শাহ-ই মাদার, পনের শতকের লোক, এ অংশটি পরবর্তীকালে প্রক্ষিপ্ত। আদম্ফ – আদম।  পাখাড়-পাকড়াও।)</p>
<p>কবির বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে: ধর্মদেবতা মাথায় কালো টুপি পরে ত্রিকচ অর্থাৎ তীরকাশ তথা তীরধারী কামান নিয়ে উন্নত জাতের অশ্বে আরোহন করে ত্রিভূবনে ভীতি সঞ্চারকারী ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে জবন তথা মুসলিম রুপ ধারণ করলেন। (নিরঞ্জন নিরাকার বেহেশতের অবতার হয়ে মুখে দম-ই-মাদার বলতে লাগলেন। সমস্ত দেবতা একমত হয়ে আনন্দে ইজার পরে নিলেন অর্থাৎ সবাই মুসলমান রূপ ধারণ করলেন।) ব্রহ্ম মুহাম্মাদ হলেন, বিষ্ণু হলেন পয়গম্বর এবং মহাদেব হলেন আদম। পনেশ গাজী, কার্তিক কাজী এবং যত মুনি ঋষি ফকির দরবেশ সাজলেন। আপন বেশভূষা পরিত্যাগ করে নারদ শেখ ও পুরন্দর মওলানা সাজলেন। চন্দ্র সূর্য প্রভৃতি আদি দেব পদাতিক হয়ে বাজনা বাজিয়ে তাদের সেবা করতে লাগলেন। চণ্ডিকা দেবী স্বয়ং হাওয়া বিবি হলেন আর পদ্মাবতী হলেন বিবি নূর, যত দেবতা ছিলেন সবাই এভাবে মুসলমান সেজে এক সাথে জাজপুরে প্রবেশ করলেন। তারা দেবালয় ও দেবগৃহ ভাঙলেন, মনের আনন্দে লুটতরাজ করে খেতে লাগলেন এবং সংগে সংগে অপরাধীদের ‘পাকড়াও পাকড়াও’ ধধ্বনি তুললেন। এই দারুণ গণ্ডগোল দেখে রামাই পণ্ডিত ধর্মের পায়ে লুটিয়ে পড়লো এবং গান গাইলো। এতে বুঝা যাচ্ছে দেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে এবং ইসলামের ন্যায়ের দন্ড তথাকথিত বর্ণবাদী সমাজের জুলুম, অবিচার ও উৎপীড়ন নির্মূল করে সমাজে শান্তি, সমতা ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনছে। মানুষ ইসলামের হক ও সাম্যের আহবান গ্রহণ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে।</p>
<p><strong>বাংলায় তুর্কীদের হাতে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। তুর্কীরা পাঠান ও মোগলদের তুলনায় বেশি ইসলামী ভাবাপন্ন ছিলেন। ফলে বাংলায় আরব দেশের মতো না হলেও তাদের সাথে সামঞ্চস্যশীল একটা ন্যায় ইনসাফ ও সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত বাংলায় মুসলমানদের সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। সমাজে একটা ইসলামী পরিবেশ ও ইসলামী দৃষ্টিভংগী সৃষ্টি হচ্ছিল। সেটা ছিল : মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই এক আদমের সন্তান। এক আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক। একমাত্র তাঁরই ইবাদত ও আরাধনা করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই। সবাই তাঁর অনুগত। বাংলার বিশাল ভূখন্ডে (অর্থাৎ বাংলা বিহার, ওড়িষা ও বৃহত্তর আসাম) এই তৌহিদী পরিবেশ দানা বেঁধে উঠছিল। কিন্তু যেহেতু বাংলা ভাষা তখনো স্থিতিশীলতা লাভ করেনি, তখনো সৃজ্যমান ছিল  (কয়েকশো বছর আগের চর্যাপদের ভাষা দেখলে তা বোঝা যাবে) আর সৃজ্যমান ভাষায় বড় ও সৃষ্টিশীল কোনো কিছুর আশা করা যায় না, তাই এসময়কার সাহিত্যের বিক্ষিপ্ত নিদর্শন থাকলেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য মুসলিম কবির রচনার সাক্ষাত পাওয়া যায় না। পনের শতক থেকে আমরা মুসলিম কবিদের একটা ‘ধারাবাহিকতা লক্ষ করি। শাহ মুহাম্মদ সগীর, জৈনুদ্দীন, মুজাম্মিল তাদের অন্যতম। শাহ মুহাম্মদ সগীর তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘য়ুসুফ-জলিখা’ রচনা করেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের আমলে (১৩৮৯-১৪১০)। কবি জৈনুদ্দীন ছিলেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের আমলে (১৪৭৪-১৪৮১) সভাকবি। কবি মুজাম্মিল পনের শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পনের শতক থেকে উনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত যে অসংখ্য মুসলিম কবির সন্ধান পাই তাদের অন্যতম হচ্ছেন : সৈয়দ সুলতান, (১৫৫০-১৬৪৮) শেখ ফয়জুল্লাহ, শুকুর মাহমুদ, (১৬৮০-১৭৫০) সাবিরিদ খান, দোনাগাজী, বাহরাম খান, আফজাল আলী, মুহম্মদ কবীর, মুহম্মদ খান, (১৫৮০-১৬৫০) দৌলত কাজী, (১৬০০-১৬৩৮) আলাওল, (১৬০৭-১৬৮০) শেখ পরান (১৫৫০-১৬১৫) আবদুল হাকীম (১৬২০-১৬৯০) শাহ গরীবুল্লাহ, মুহম্মদ ইয়াকুব, হায়াত মাহমুদ, মুহম্মদ মুকীম (১৭০০-১৭৭৫), সায়্যিদ হামজা (১৭৫৫-১৮১৫) প্রমুখ।</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনের অবসানের পর বিশেষ করে এদেশের অমুসলিম সমাজের সহযোগিতায় বিদেশী খৃস্টান বণিক ইংরেজরা দেশের শাসন যন্ত্র দখল করে। ফলে উনিশ শতকের শুরু থেকে ইংরেজ ও হিন্দুর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বসে বাংলা ভাষার নিত্য ব্যবহৃত আরবী ফারসী শব্দগুলো দুই হাতে বাদ দিয়ে মৃত সংস্কৃত ভাষার অপ্রচলিত ও অপরিচিত কঠিন শব্দসম্ভারে ভারাক্রান্ত করে একটা নতুন বাংলা গদ্য তৈরি করা হয়। অতপর এ ভাষায় গদ্য ও পদ্য লেখার কাজ চলে। ইংরেজের সাথে সংঘাতে লিপ্ত থাকার কারণে মুসলমানরা প্রথমে এ বিষয়ে উদাসীন থাকে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পরাজয়ের পর ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাদের এক ধাপ পিছিয়ে আসতে হয়। ইংরেজের সহযোগিতা ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় উদ্দীপিত হিন্দু মনীষার কারণে হিন্দু ঐতিহ্য এই সাহিত্যে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। তবুও এই উনিশ শতকে যেসকল মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের জন্ম হয়েছে তারা এর মধ্যে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী স্বতন্ত্র পথটি তৈরি করার প্রচেষ্টা চালান। এদের মধ্য থেকে কয়েকজন শ্রেষ্ট কবি সাহিত্যিকের নাম এখানে উল্লেখ করছি – এরা হচ্ছে ঔপন্যাসিক প্রবন্ধকার মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২), মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২) প্রবন্ধকার শেখ আবদুর  রহীম (১৮৫৯-১৯৩১), কবি মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩), প্রবন্ধকার ও সংবাদিক মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), কবি প্রবন্ধকার ও ঔপন্যাসিক সৈয়্যদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী  (১৮৮০-১৯৩১), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), প্রবন্ধকার ডা. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৯৯-১৯৩৬), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), কথাশিল্পী এস, ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), ঔপন্যাসিক নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৭৮-১৯২৩), কবি শেখ ফজলুল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), কবি কথাশিল্পী ও প্রবন্ধকার বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কবি শাহাদৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), কবি ও ঔপন্যাসিক শেখ মুহম্মদ ইদরিস আলী (১৮৯৫-১৯৪৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম সাহিত্যের উপাদান</strong></h5>
<p>মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা যখনই সাহিত্য ময়দানে পদার্পণ করেছেন তাদের মধ্যে একটা স্বাতন্ত্র ও সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। তাদের একটা বিশিষ্ট অংশ নিজেদেরকে নিছক কবি সাহিত্যিক মনে করেননি। তাঁরা মনে করেছেন বাংলার এই কুফরী সমাজে যেমন তাদের একক তৌহিদবাদী হিসাবে টিকে থাকতে হবে তেমনি এখানে কুফরীর গলদ চিহ্নিত করাও তাদের দায়িত্ব। এজন্য তারা একই সংগে ভাষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। যে ভাষায় ইসলামী আদর্শ ও আচরণ প্রকাশ এবং তার বিকাশ সাধন করা যায় সে ভাষা প্রয়োগ করার কথা তারা চিন্তা করেছেন। যেমন :</p>
<p>দেশেত আলিম থাকি যদি ন জানায়।<br />
সে আলিম নরকেত যাইব সর্বথায়।।<br />
নর সবে পাপ কৈলে আলিমের ধরি।<br />
আল্লাহর সাক্ষাতে মারিবেস্ত দণ্ড বেড়ি।।<br />
তোম্মারা সবের মেলে মোর উৎপন।<br />
তেকারনে কহি আমি শাস্ত্রের বচন।।<br />
আল্লায় বলিব তোরা আলিম আছিলা।<br />
মনুষ্যে করিতে পাপ নিষেধ ন কৈলা।।<br />
আছুক আপনা পাপ আলিমে খণ্ডাইব।<br />
পরের পাপের লাগি লাঘব পাইব।।<br />
(শব-ই-মিরাজ: সৈয়্যদ সুলতান)</p>
<p>কবি সৈয়্যদ সুলতান যেমন হিন্দু ধর্ম কাহিনী ও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ইসলামী কাহিনী ও প্রস্তাব বাংলায় লিখে প্রচার করেছিলেন ঠিক তেমনি তাঁর শাগরিদ কবি মুহম্মদ খান পরবর্তীকালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘মকতুল হুসৈন’ এও এ উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। এ গ্রন্থটি রচিত হয় ১৬৪৫ খৃস্টাব্দে। এতে বলা হয়:</p>
<p>হিন্দুস্থানে লোকে সবে ন বুঝে কিতাব।<br />
ন বুঝি শুনি নিত্যি করে মহাপাপ।।<br />
তেকাজে সংক্ষেপ করি পঞ্চালী রচিলুং।<br />
ভাল মন্দ পাপ পূণ্য কিছু ন জানিলুং।।<br />
পঞ্চালী পড়িতে সবে মনে ভয় পাই।<br />
অবশ্য কিতাব কথা শুনিবেক যাই।।<br />
কিতাবে আল্লার আজ্ঞা শুনিবেন্ত যবে।<br />
দান ধর্ম পূণ্য কর্ম করিবেন্ত তবে।।<br />
অবশ্য মোহোরে সবে দিবে আশীর্বাদ।<br />
মহাজন আশীর্বাদ খণ্ডিবে প্রমাদ ॥<br />
বিশেষ পীরের আজ্ঞা ন যায় লঙ্ঘন<br />
রচিলুং পাঞ্চালিকা তাহার কারম।।</p>
<p>শেখ মুত্তালিব (১৫৯৫-১৬৬০) লিখছেন:<br />
আরবীতে সকলে ন বুঝে ভাল মন্দ।<br />
তেকারনে দেশী ভাষে রচিলু প্রবন্ধ।।<br />
মুছলমানী শাস্ত্র কথা বাঙ্গালা করলু।<br />
বহু পাপ হৈল মোর নিশ্চয় জানিলু।।<br />
কিন্তু মাত্র ভরসা আছয়া মনান্তরে।<br />
বুঝিয়া মুমিন দোয়া করিব আমারে।।<br />
মুমীনের আশীর্বাদে পূণ্য হইবেক।<br />
অবশ্য গফুর আল্লা পাপ খেমিবেক।।<br />
এসব জানিয়া যদি করয়ে রক্ষণ<br />
তবে সে মোহোরে পাপ হইবে মোচন ॥<br />
(কিফায়িতুল মুসল্লীন)</p>
<p>মধ্যযুগের মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা তাদের জীবন ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা তাদের সাহিত্যে ইহকাল ও পরকাল উভয় কালকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের কাব্যের বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত ব্যপক। কেবলমাত্র মানব মানবীর প্রেমোপাখ্যান লিখেই তারা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেননি। এইসংগে তারা ইসলামী শরীয়ত, হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনীর মোকাবিলায় মুসলিম পৌরাণিক কাহিনী, হিন্দুদের পৌরাণিক ও আজগুবি সৃষ্টিতত্ত্বের তুলনায় সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ  ইসলামী সৃষ্টিতত্ব, ইসলামী দর্শন ও সুফীতত্ব, মুসলিম ঐতিহাসিক কাব্য, রূপক সাহিত্য তথা একপ্রকার রূপকের মাধ্যমে হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরা, মর্সিয়া সাহিত্য, মারফতী ইত্যাদি ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন গান রচনা করেন। তাদের এতদসম্পর্কিত কিছু গ্রন্থের নামোল্লেখ করলে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা আরো একটু সুস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে মনে হয়। যেমন:</p>
<ul>
<li>শরীয়ত নামা-নসরুল্লাহ খান</li>
<li>নসীহত নামা-শেখ পরান</li>
<li>কিফায়িতু-ল-মুসল্লীন-শেখ মুত্তলিব</li>
<li>হিদায়িতু-ল-ইসলাম-নজরুল্লাহ খান</li>
<li>নামাজ মাহাত্ম্য- মুহাম্মদ জান</li>
<li>শিহাবুদ্দীন নামা-আবদুল হাকীম</li>
<li>হিতজ্ঞান বাণী- হায়াত মাহমুদ</li>
<li>নবী বংশ-সৈয়্যদ সুলতান</li>
<li>রসূল বিজয়-ঐ</li>
<li>শব-ই-মিরাজ- ঐ</li>
<li>ওফাৎ-ই-রসূল- ঐ</li>
<li>ইবলিস নামা ঐ</li>
<li>আম্বিয়া বাণী- হায়াত মাহমুদ</li>
<li>কিয়ামত নামা -মুহম্মদ খান</li>
<li>নূর নামা (সৃষ্টিতত্ব)- শেখ পরান</li>
<li>নূর নামা (সৃষ্টিতত্ব)- আবদুল হাকীম</li>
<li>জ্ঞান প্রদীপ (সূফীতত্ব) সৈয়্যদ সুলতান</li>
<li>কারবালা (মর্সিয়া সাহিত্য)-আবদুল হাকীম</li>
<li>জঙ্গনামা- গরীবুল্লাহ ও ইয়াকুব</li>
<li>সায়াৎনামা -(জ্যোতিষ শাস্ত্র) মীর মুহাম্মদ শফী</li>
</ul>
<p>এ ধরনের ইসলামী জ্ঞান ও মুসলিম জীবন সম্পর্কে অসংখ্য গ্রন্থ তারা রচনা করেন। তাদের লেখনীর সাহায্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চার একটা সাগর সৃষ্টি হয়।</p>
<p><strong>তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, মুসলিম কবিদের এই ইসলাম চর্চার সাথে খালেস তৌহীদের সম্পর্ক যতটুকু তার চেয়ে অনেক বেশী সম্পর্ক সুফীতাত্বিক মরমীবাদের। বাংলার কবিদের কাব্যচর্চার ওপর ইরানের প্রভাব ব্যাপকতর। সে তুলনায় আরবীয় প্রভাব অতি সামান্যই। আর ইরানী প্রভাব মানেই হচ্ছে ইরানী সাহিত্যে যে মাশশায়ী, ইশরাকী ও ইরফানী ইত্যাদি এরিস্টটলীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবাদী দর্শন এবং তাসাউফের গৃঢ় রহস্যভিত্তিক মরমীবাদের প্রসার ঘটে তারই প্রভাব বাংলার কবিদের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে।</strong></p>
<p>আব্বাসীয় আমলে হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে গ্রীক দর্শনের আলোচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালী ও ফখরুদ্দীন রাযীর আক্রমণাত্মক ভূমিকার ফলে মাশশায়ী দর্শন ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে ফেললে ইশরাকী ও ইরফান তাসাউফ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইশরাকী তাসাউফের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খ শিহাবদ্দীন ইয়াহইয়া ইবনে হাবস ইবনে আমীরাক সোহরাওয়দী (৫৪৯হি:- ৫৮৭হি:)। রেই, হামেদান, কাযভীন ইত্যাদি ইরানের বিভিন্ন শহরে তাসাউফের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা গড়ে ওঠে। ফারসী সাহিত্য মূলত তাসাউফের এই ভাবধারাগুলির মধ্যেই বিকশিত হয়। পনের শতকের কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে উনিশ শতকের বাংলার কবিদের মধ্যে এর সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। ইরানী কবিদের সাথে তারা গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন ‘ইউসুফ জুলিখা’সহ ইরানী কবিদের অনেকগুলি কাব্য তারা বাংলায় অনুবাদ করেন। এমনকি অনেকে তাদের আদলে কাব্য ও কবিতা চর্চা করেন। এখানে পীরের নির্দেশে গ্রন্থরচনার কথা অনেক কবিই বলেছেন। পনের শতকের কবি লিখেছেন:</p>
<p>শাহা বদরুদ্দীন পীর কৃপাকুল হরি।<br />
শতমুখে সে বাখান কহিতে ন পারি।।<br />
তাহান আদেশ-মালা শিরেতে ধরিয়া।<br />
রচিলেন্ত মুজাম্মিলে মনে আকলিয়া।।<br />
(সায়াৎনামা)</p>
<p>পীর শাহ দৌলার আদেশে কবি শেখ চান্দ লিখছেন:<br />
ফতে মোহাম্মদ সুত শেখ চান্দ নাম।<br />
গুরুর আজ্ঞায় পঞ্চালী রচে অনুপাম।।<br />
কাছাছুল আম্বিয়া এক বিতাবেত শুনি।<br />
পঞ্চালী বাঁধিয়া তাকে পুস্তকেত ভনি।।</p>
<p><em>মূলত মধ্যযুগের বাংলা কবিতা তাসাউফের চত্বরে ঘোরাফেরা করে। ইউরোপ ও আমেরিকায় খৃষ্টান কবিরা যখন বাইবেলের মধ্যে ডুব দেয়, বাইবেল চর্চা করে এবং বাইবেল থেকে পথ নির্দেশনা নেবার চেষ্টা করে তখন এশিয়ার মুসলিম কবিরা ডুব দেয় তাসাউফের মধ্যে। তাসাউফের মধ্যে জীবন দর্শনের চিত্র অংকন করে। তাসাউফকে কুরআনের নির্যাস বিবেচনা করে। ফলে কুরআন থেকে পথ নির্দেশনা দেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। বাংলা মধ্যযুগের কবিরা কুরআন ও ইসলামের নামে যা কিছু বলেছেন তা সরাসরি কুরআন ও হাদীসের চিন্তা থেকে নয়। বরং ইরানী সাহিত্যের মধ্যস্থতায় তাসাউফের জারক রসে সিঞ্চিত করে বলেছেন।</em> এই প্রসংগে বলা যায় মওলানা রুমীর মসনবীকে বলা হয়েছে-</p>
<p>‘হত কুরআ দর যবানে পাহলভী’<br />
মসনবী-ই-মানবী-ই মৌলভী</p>
<p>অর্থাৎ ‘পাহলবী তথা ফারসী ভাষায় মওলানা রুমীর মসনবীই হচ্ছে কুরআন মজীদ।’</p>
<p>অথচ অন্যদিকে ইমাম গাজ্জালী র. মওলানা রুমীর এই মসনবীর চিন্তা উদ্বৃত (সামা) গান ও নাচের প্রবল বিরোধিতা করেছেন। অর্থাৎ কোনো গ্রন্থই কুরআনের সমান্তরাল হতে পারে না।</p>
<p>তাসাউফের চিন্তার জটিলতার কারণে পনের ষোল শতকের বাংলার কিছু মুসলিম কবি শ্রীচৈতন্যের ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে বৈষ্ণব পদাবলীও রচনা করেন। তারা এটাকে শির্ক মিশ্রিত এবং মুসলিম জীবন ধারা থেকে বিভিন্ন মনে করতে পারেননি। আল্লাহ যে খালেস তৌহীদের কথা কুরআনে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, শিরক ছাড়া অন্য সমস্ত গুনাহ তিনি মাফ করে দেবেন, সেই শিরক থেকে আমাদের জীবনকে যেমন মুক্ত রাখতে হবে তেমনি সাহিত্যও হবে তা থেকে মুক্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আধুনিক পরিবেশ ও আধুনিক সাহিত্য</strong></h5>
<p>উনিশ শতক থেকে এদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। এ আধুনিকতার সম্পর্ক ইংরেজী সভ্যতা সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় চিন্তার সাথে কবিতার আংগিকে কাঠামোয় এবং চিন্তায় যেমন পরিবর্তন আসে তেমনি নতুন গদ্যভংগী রচিত হয়। উপন্যাস, প্রহসন, নাটক ইত্যাদি কথাসাহিত্যের একটি ধারা সৃষ্টি হয়। সমগ্র সাহিত্য জগতে যেন নতুন জোয়ার আসে। মুসলিম সমাজ ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত থাকায় মুসলিম সাহিত্যিকরা প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা ভাষার ওপর থেকে মুসলিম ঐতিহ্যের প্রভাব ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়ে তাদের নিজেদের পৌরাণিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত করে। তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ন্যায় বড় বড় প্রতিভার জন্ম হয়। যথার্থই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উন্নতির উচ্চ সোপান অতিক্রম করতে থাকে।</p>
<p>এসময় মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে এগিয়ে আসেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। তিনি নতুন ভাষার ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর পরে শক্তিশালী লেখক হিসাবে এগিয়ে আসেন মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২), শেখ আবদুর রহীম (১৮৫৯ – ১৯৩১), আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৬৯-১৯৫৩), মওলানা মনিরুজ্জামান  ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার সৈয়্যদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), প্রবন্ধকার ও ঔপন্যাসিক এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), ঔপন্যাসিক নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ব (১৮৭৮-১৯২৩), প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), কবি শাহাদত হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), কবি ও প্রবন্ধকার গোলাম মোস্তাফা (১৮৯৭-১৯৬৪), ইত্যাদি অসংখ্য শক্তিশী সাহিত্যিকবৃন্দ। তাঁরা সবাই নিজেদের সময় ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল স্বাভাবিকভাবে প্রবল। তাই সাহিত্য জগতে তাঁরা প্রতিবেশীদের তুলনামূলক উন্নতমানের সাথে সহাবস্থান করেও মুসলমানদের জন্য একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।</p>
<p>এই সময় আগমন হয় বাংলার সাহিত্যাকাশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবি নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬)। ভাষার ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক প্লাটফর্মের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি মুসলিম ঐতিহ্যে ফিরে যাবার সকল প্রচেষ্টা শুরু করেন। তাঁর প্রতিভা প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীদের হৃদয়ও স্পর্শ করে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় বিচরণ করে তিনি ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের ঝাণ্ডা সমুন্নত করেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংগীত তাঁর অমর কীর্তি। নজরুলের পরে কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৩) তাঁর সাহিত্যধারাকে আরো পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ফররুখ ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যকে পূর্ণরূপে বিকাশিত করেন।</p>
<p><strong>১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লব হবার পর এর প্রভাব সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকের জার্মান চিন্তাবিদ কার্লমার্কস ও ফেড্রারিক এঙ্গেলস ছিলেন এই বিপ্লবী চিন্তাধারার উদগাতা। তাঁরা অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে এই বিপ্লবের ডাক দেন। আসলে কমিউনিস্ট ভাবধারা একটা অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম। একে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত করেন। একদল সাহিত্যিকের মাথায় শ্রেণীসংগ্রামের চিন্তা এবং এই সংগে নিরীশ্বরবাদিতা ও ধর্ম আফিমের ন্যায় এই ধারণা বন্ধমূল করে দেন। এরই ভিত্তিতে তারা দুনিয়াব্যাপী একটি সাহিত্যের আবহ তৈরিতে মেতে ওঠেন। মাত্র সত্তর বছরের মধ্যে তারা বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও ব্যর্থ হয়ে যান। মার্কসবাদ একটা অলীক কল্পনায় পরিণত হয়। কিন্তু বিশ্ব সাহিত্যকে তারা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এখন কয়েক প্রজন্ম ধরে। তারা সাহিত্য থেকে আল্লাহকে বিদায় দিয়েছেন। সাহিত্যের পরতে পরতে শ্রেণী সংগ্রাম প্রবেশ করিয়ে একটা হিংসাত্মক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। তারা মানবতাবাদের কথা বলেন। কিন্তু তাদের সাহিত্যের মাধ্যমে সবচেয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে মানবতা। তারা মানুষকে কোনো এক পর্যায়ে নিয়ে স্থিতিশীল করতে পারেননি। মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে কার কাছে আশ্রয় নেবে? এক আল্লাহকে ত্যাগ করলে অসংখ্য আল্লাহ এসে যায়। দেশ এক আল্লাহ, পাটি এক আল্লাহ, প্রেসিডিয়াম এক আল্লাহ- এভাবে ক্ষমতাধর প্রত্যেকেই এক এক আল্লাহ। এই স্বৈরাচারী আল্লাহদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষমতা মার্কসবাদী সাহিত্যের নেই।</strong></p>
<p>বিগত শতকের শেষার্ধব্যাপী এই মার্কসবাদী সাহিত্যের দাপাদাপি বাংলার মুসলিম সাহিত্য অংগণে অশনি সম্পাতের মতো অনুভুত হচ্ছিল। মুসলিম ঘরানার বহু সাহিত্যিক ইসলামী আদর্শবাদ ত্যাগ করে এদিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। মার্কসবাদের পতনের পর তাদের পালে আর হাওয়া বইছে না। তবুও তারা মার্কসবাদের মূল ভিত্তি সেক্যুলাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। অনেকে ইসলামী আদর্শবাদের আওতায় ফিরে আসছেন।</p>
<p>তবে ইসলামী আদর্শবাদও বিশ্বাসের নতুন বলয় সৃষ্টি করে ময়দানে নতুন করে জেগে উঠছে। আমাদের পূর্বসূরীদের বিগত ছ’সাতশো বছরের প্রচেষ্টা ও কর্মপ্রবাহ এ বলয়কে শক্তিশালী ভিত্তিদান করেছে। কুরআন ও হাদীস অবিকৃত থাকার এবং তাদের সাথে আমাদের আবেগগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ গড়ে ওঠার কারণে আজ সেখান থেকে পথনির্দেশ লাভ করা আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। ইসলামী সমাজ চিন্তা যেমন নতুন করে নব উদ্যমে বলীয়ান হচ্ছে তেমনি ইসলামী সাহিত্য চিন্তাও তার সাথে সমান তালে এগিয়ে যাবে।</p>
<div id="wpdevar_comment_1"></div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16231</post-id>	</item>
		<item>
		<title>টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান; যুক্তি যেখানে গল্প, সংলাপ সেখানে নায়ক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/twelve-angry-men-movie-review/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/twelve-angry-men-movie-review/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Sep 2025 16:25:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16139</guid>

					<description><![CDATA[বিচারব্যবস্থায় জুরিসিস্টেম একটি আদি-প্রক্রিয়া। এথেন্সে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেও জুরির অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। অবশ্য আধুনিক জুরিসিস্টেমের সূচনা হয় ১২ শতকের মাঝামাঝি, তখন ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় হেনরির রাজত্ব চলছিল। এখনো পৃথিবীর অনেক জায়গায় বিচারকার্যে জুরিসিস্টেমের ব্যবহার করা হয়। সিডনি লুমেটের ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’ এমন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিচারব্যবস্থায় জুরিসিস্টেম একটি আদি-প্রক্রিয়া। এথেন্সে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেও জুরির অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। অবশ্য আধুনিক জুরিসিস্টেমের সূচনা হয় ১২ শতকের মাঝামাঝি, তখন ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় হেনরির রাজত্ব চলছিল। এখনো পৃথিবীর অনেক জায়গায় বিচারকার্যে জুরিসিস্টেমের ব্যবহার করা হয়। সিডনি লুমেটের ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যেটি আপনাকে জুরিসিস্টেম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিবে। সাদাকালো আলোকচিত্রের যুগে তৈরি  হওয়া এই সিনেমা হীরক জয়ন্তী পার করার পরও অবস্থান করছে শ্রেষ্ঠের শীর্ষ তালিকায়।</p>
<p>‘কোর্টরুম ড্রামা’ এই ধারাটি বর্তমান সিনে জগতে ব্যাপক আলোচিত। বিশেষ করে উপমহাদেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে। কিন্তু এই ধারা উদ্ভাবন হয়েছে আজ থেকে ৬৫ বছর আগে অস্কার বিজয়ী মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা সিডনি লুমেট এর হাত ধরে। লুমেট তার ক্যারিয়ার জুড়ে সৃষ্টি করেছেন অনেক কালজয়ী সিনেমা। কিন্তু ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া  তার প্রথম সিনেমা ‘১২ অ্যাংরি ম্যান’ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সিনেমা গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ‘১২ অ্যাংরি ম্যান’-এর এই অসম্ভব সফলতার পর বছর কয়েক এর মধ্যেই এই ধারায় নির্মিত হয়েছে ‘এনাটমি অফ মার্ডার’, ‘জাজমেন্ট এট নুরেমর্বাগ’-এর মতো জনপ্রিয় সব সিনেমা।</p>
<p>ছবির শুরুতে দেখা যায় ১৮ বছর বয়সের একটি ছেলে পিতৃহত্যার দায়ে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার কেসে অভিযুক্ত। আদালতে সব সাক্ষ্য-প্রমাণই তার বিপক্ষে। জাজ জুররদের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। ছেলেটির জীবন চলে যায় জুররদের হাতে। এখন জুরররা তিনটি কাজ করতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এক,</strong> ছেলেটিকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, যার ফল ইলেক্ট্রিক চেয়ারে বসিয়ে তাকে হত্যা করা হবে।</p>
<p><strong>দুই,</strong> তারা তাকে সর্বসম্মতভাবে নির্দোষ সাব্যস্ত করতে পারে।</p>
<p><strong>তিন,</strong> তারা সর্বসম্মত না হতে পারলে ‘হাঙ জুরি’ করতে পারে, যার ফলে হয়তো পরে আবার অন্য কোনো জুরি বোর্ডকে মামলাটির ফয়সালার দায়িত্ব দেওয়া হবে।</p>
<p>খুব সাদামাটাভাবে শুরু হওয়া সিনেমাটির দৃশ্যপট এরপর পদার্পণ করে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে। মুভির রান টাইম ৯৬ মিনিটের ৯৩ মিনিটই ওই চারদেয়ালের কক্ষে যেখানে ছেলেটির জীবন-মৃত্যু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং ১২ জন জুরর এর ১১ জনই শুরুতে মতামত জানিয়ে দেয় ছেলেটি তার পিতার হত্যাকারী কিন্তু নিয়ম অনুসারে ১২ জনকে এক মতে আসতে হবে তাহলেই বিচারকার্য সম্পন্ন হবে। একমাত্র ৮ নাম্বার জুরর প্রথমবারের মতো বলেন, ছেলেটি নির্দোষও হতে পারে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে বিস্তর আলোচনা করা আমাদের কর্তব্য।</p>
<p>এখান থেকেই শুরু হয় মতভেদ। যেখানে কিনা সকল প্রমাণ শুরুতে স্পষ্ট করছিল ছেলেটি দোষী, সেখানে বাস্তববাদী ও মানবিক যুক্তি স্থাপন করছিলেন ৮ নাম্বার জুরর। আর এই চরিত্রে অভিনয় করে কিংবদন্তীর আখ্যান লিখেছেন অভিনেতা ‘হেনরি ফন্ডা’।  তিনি তার বিচক্ষণ ভঙ্গিমা দিয়ে চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্য মাত্রায়। মেধা, মানবিকতা দিয়ে চিন্তা করার যোগ্যতা ছিল এই চরিত্রে। যার প্রেক্ষিতে বাকি ১১ জন কে এই ১ জন এর দেওয়া যুক্তিতে সম্মতি দিতে হয় এবং ছেলেটি নির্দোষ এই মতামতে একাত্মতা পোষণ করতে হয়। কীভাবে একজন ব্যক্তি কিছু সময়ের ব্যবধানে ১১ জন এর অভিব্যক্তি পাল্টে দিল সেটিই সিনেমার মূল আকর্ষণ।</p>
<p>মুভিতে প্রখর যুক্তিবোধসম্পন্ন ন্যায়বান মানুষও যেমন দেখা যায়, সেই সাথে চোখে পড়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন অবিবেচককে। দেখতে পাই সন্তানের ভালবাসাবঞ্চিত পিতার বুক ফাটা কান্না অথবা প্রাজ্ঞ বৃদ্ধের বুদ্ধির ঝিলিক। হুট করে রেগে যাওয়া মানুষ যেমন আছে তেমনি আছে মাথা ঠাণ্ডা করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ। আছে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্ব আবার অন্যদিকে আছে জ্ঞানপাপী! মুভিতে দেখানো হয়েছে কেমন করে গুটিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব একটু সাহায্য পেলেই জেগে উঠতে পারে, আবার আপাত দৃষ্টিতে ব্যক্তিত্ববান ও দায়িত্ববান মানুষ কীভাবে রূপান্তরিত হয় নিচুশ্রেণির অমানুষে। প্রতিটি মানুষের আবরণে লুকিয়ে থাকা এই আসল মানুষটি শুধু তখনি বেরিয়ে আসে যখন সে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়। তার মনন, তার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে এই দোষ কিংবা গুন গুলোই। আর এই ব্যপারটিই অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে মুভিটিতে।</p>
<p>টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান এ যে ১২ জন জুরর অভিনয় করেছেন, তারা সবাই দুর্দান্ত। ১২টি ব্যতিক্রমী চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে এবং চরিত্রের ভেতর রসায়ন সৃষ্টিতে সবটুকু উজাড় করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ভেতরের দ্বন্দ্বে একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একজন আরেকজনকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয়। কিন্তু এই হত্যার হুমকিই হয়ে ওঠে ছেলেটিকে বাঁচানোর একটি অস্ত্র। অতিশয় বোদ্ধা বা বাচাল লোককে মানুষ কীভাবে দেখে, তাও একটি অসাধারণ দৃশ্যে চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক সিডনি লুমেট। এককথায় একজন ফুটবল কোচ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, স্টক ব্রোকার, বেসবল ভক্ত, ঘর সজ্জাকারক, বিক্রেতা, স্থপতি, বৃদ্ধ, গ্যারেজ মালিক, ঘড়ি প্রস্তুতকারক, বিজ্ঞাপন নির্মাতা যখন একই কক্ষে একটি সিদ্ধান্ত নিতে ব্রত হয়, তখন তারা কে কী রকম আচরণ করতে পারে, তা প্রকাশিত হয়েছে খুব সূক্ষ্মভাবে।</p>
<p>মুভির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটি ছিল ‘সংলাপ’।</p>
<p>সিনেমার প্রেক্ষাপট অনুসারে সংলাপগুলো ছিল একেকটি ট্রেডমার্ক। যুক্তির ক্ষমতাকে অনন্যভাবে উপস্থাপন করার জন্য ‘সিডনি লুমেট’ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছেন।</p>
<p>পরিচালক সিনেমায় কক্ষটিকে দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন। বৈদ্যুতিক ফ্যান, জানালা, টেবিল, চেয়ার, চুরুটদানি সবকিছুই যেন সিনেমাটিতে অভিনয় করেছে। একজন পুত্রহারা বাবার ক্রোধ বার বার ফিরে এসেছে সেই কক্ষে। ব্যক্তিগত ক্রোধ ও অহমিকার পরীক্ষায় শেষপর্যন্ত সবাই উতরে যায়। কিন্তু এই উতরে যাওয়াটা সহজ ব্যপার ছিল না। এক্ষেত্রে একটি ছুরি, একটি ম্যাপ এবং বৃদ্ধটির অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।</p>
<p>অভিনয়ের ক্ষেত্রে ৮ নাম্বার জুরর হেনরি ফন্ডা ছিলেন এক কথায় অনবদ্য! গভীর সংলাপ গুলোকে তিনি বাস্তবে জীবন দিয়েছিলেন। আর ৩ নাম্বার জুরর এর চরিত্রে অভিনয় করা ‘লি জে কব্স’-এর অভিনয় ছিল সবচেয়ে ভিন্নধর্মী এবং চ্যালেঞ্জিং। নিজ সন্তানের সাথে সম্পর্কের কলহে পুড়তে থাকা মানুষটি শেষে ভেঙে পড়েছিলেন কান্নায় এবং ‘ছেলেটি দোষী নয়’ এই মতামতে সর্বশেষ ভোটটি ছিল তার।</p>
<p>৫০’শ-এর দশকে নির্মিত হওয়া টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান একটি মিথিকাল মেটাফোর, যেটি সময়ের বিবর্তনে আমাদের ভাবনাকে করেছে আরও বিস্তৃত। আজকের মুভি ওয়ার্ল্ড এ নাম্বার গেইমকে (বাজেট এবং আয়) পুঁজি করে ব্যবসা করে যাচ্ছে বড় বড় প্রোডাকশন হাউজগুলো।</p>
<p><strong>প্রভাবশালীদের সৃষ্টি করা এই নাম্বার গেইম এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় উপস্থাপন হলো ‘টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’-এর চিত্রনাট্য, যেটি প্রমাণ করে শুধুমাত্র সংলাপ আর বাস্তববাদী স্ক্রিনপ্লে দিয়েই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মুভির তালিকায় থাকা যায় যুগের পর যুগ&#8230;.।</strong></p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 88px; top: 2054.48px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/twelve-angry-men-movie-review/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16139</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা &#8216;বাংলা&#8217;</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2025 13:55:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16044</guid>

					<description><![CDATA[ভাষা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বাহক। এজন্য একটা ভাষার ভাণ্ডার যতবেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, ওই ভাষার সংস্কৃতি ও সমাজ ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একইসাথে ভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির বাহন হিসেবেই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ভাষা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বাহক। এজন্য একটা ভাষার ভাণ্ডার যতবেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, ওই ভাষার সংস্কৃতি ও সমাজ ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একইসাথে ভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির বাহন হিসেবেই নয়, একটি স্বাধীন জাতির মূল প্রাণসত্তাও বটে। বাংলা ভাষা জনসংখ্যার দিক থেকে, ইতিহাসের দিক থেকে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা, আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। এজন্য ঢাকাও শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজধানী নয়, একটি দেশের প্রধান শহর নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা &#8216;বাংলা ভাষা&#8217;র রাজধানী। এই অঞ্চলে মানুষের আশা, জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, গৌরবগাঁথার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সামনে সর্বদাই দীপ্তিমান। নদীমাতৃক বাংলায় চিরসবুজ প্রান্তর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম উম্মাহর অধ্যুষিত বিভিন্ন দেশে এই বাংলা ভাষা সগৌরবে এই অঞ্চলের প্রাণসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>পশ্চিমের বিখ্যাত ভাবুক ও বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কির ভাষায়-</p>
<blockquote><p>&#8220;ভাষা কতিপয় শব্দের সমষ্টি নয়, এটা একইসাথে একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য, একটি জাতিসত্তার একীকরণ, একটি সামগ্রিক ইতিহাস যা একটি সমাজকে তৈরি করে। এর সবকিছুই একটি ভাষার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।&#8221;</p></blockquote>
<p>যেহেতু আমরা সকলেই জানি যে, সংস্কৃতির ভিত্তি হচ্ছে ভাষা। তাই ভাষার ভিত্তিকে শক্তিশালী না করে সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ অসম্ভব। যার কারণে আমাদের এ অঞ্চলে মুসলিম সালতানাতের সময়কালে কবি, সাহিত্যিক, বড় বড় চিন্তাবিদগণ এই ভাষাতেই তারা তাদের কাজগুলোকে সম্পাদন করেছেন। যেমন- বাংলা ভাষায় মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাংলা ভাষার সার্বিক বিকাশে মুসলিম কবি ও চিন্তাবিদদের অবদানের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো শাহ মোহাম্মদ সগীর লিখিত অমর সাহিত্যকর্ম &#8216;ইউসুফ জোলেখা&#8217;। &#8216;ইউসুফ জোলেখা&#8217; সাহিত্যিক উৎকর্ষ, ভাষার ব্যবহার, শব্দের বৈচিত্র্য, নানামুখী রূপক ব্যবহার এককথায় একটি অনন্য সাধারণ এবং পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যকর্ম হিসেবে গৃহীত। তাঁর এই অনন্য সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিপ্লবের সূচনা করে।</p>
<p>বাংলা ভাষার মহাকবি আলাওল ছিলেন তার সময়ের সবথেকে বড় ঔপন্যাসিক ও কালজয়ী কাব্যের স্রষ্টা। পক্ষান্তরে, ওই সময়ের আরেক কবি শেক্সপিয়র, যিনি একই সময়ে ইংরেজি ভাষাকে এক অর্থে জীবন দান করেছেন, তিনিও কিন্তু বিকশিত হয়েছেন আলাওলের পরে। এমনকি শেক্সপিয়ার মারা যাওয়ার দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে সে অর্থে আবিষ্কার করা হয়নি। অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার বহু পূর্বেই বাংলা ভাষা আলাওলদের হাত ধরে উৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং তার সে সমৃদ্ধশালী অবস্থান ধরে রেখেই নিরবচ্ছিন্নভাবে তৎকালীন সমাজ এবং রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে যাচ্ছিল। এবং গড়ে তুলেছিল এক বৈচিত্রময় অথচ শক্তিশালী সাংস্কৃ তিক ভিত্তি। পাশাপাশি কবি ফয়জুল্লাহর &#8216;গোরক্ষ বিজয়&#8217;, &#8216;গাজী বিজয়&#8217;, কবি আফজাল আলীর &#8216;নসিহতনামা&#8217;, কবি জৈনুদ্দিনের &#8216;রসুল বিজয়&#8217;, কবি মুজাম্মিলের &#8216;সায়ৎনামা&#8217;, দৌলত উজিরের &#8216;লায়লী মজনু&#8217;, মুহম্মদ কবীরের &#8216;মনোহর মধুমালতী&#8217; ইত্যাদির ন্যায় অজস্র সাহিত্য বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে। আর এ সাহিত্যরাজির অধিকাংশই ১৫ শতাব্দীর আগে লিখিত। শেক্সপিয়রের হাত ধরেই ইংরেজি ভাষা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কিন্তু শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে এসকল বড় বড় কবিদের সাহিত্য পড়লেই বুঝা যায়, ইংরেজি ভাষা যখন কেবল গঠনকালীন পর্যায়ে বিদ্যমান, বাংলা ভাষা তখন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে গনগনে সূর্য হয়ে বিরাজ করছে।</p>
<p>সে জায়গা থেকে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির পেছনে মুসলমানদের অবদান, তাদের ঐতিহাসিক ভিত্তিস্থাপনের বর্ণনা দু-চার লাইনে ব্যাখ্যা করলে তা অসমাপ্ত রয়ে যাবে এবং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধশালী ইতিহাস ও উপাখ্যানের প্রতিও অবিচার করা হবে। ভাষার সমৃদ্ধির বিবেচনায় চিন্তা করতে গেলে অন্যান্য সব অঞ্চল বাদ দিয়ে যদি আফ্রিকার দিকে তাকাই; সবথেকে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো আফ্রিকার মত বিশাল দেশে কোনো নিজস্ব ভাষা নেই বললেই চলে। মরক্কো, আলজেরিয়ায় ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যবাদীতায় তাদের নিজস্ব ভাষা যেন আজ বিলুপ্ত। সেখানে,</p>
<p>দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের শিকার হয়েও আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সগৌরবে টিকে আছে।</p>
<p>লিপি থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ প্যাটার্ন আমাদের নিজস্ব।</p>
<p>আমাদের মৌখিক এবং লিখিত ভাষায় পার্থক্য নেই। একটি ভাষাকে বিচার করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূচক এগুলো। এর আলোকে দেখলেও বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক, চৈন্তিক ও সাহিত্যগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী বিচার করা যায়। আর এতে আমরা দেখতে পাই, বাংলা ভাষার ভিত্তি আসলে কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, উপমহাদেশ এবং সমগ্র বিশ্ব ইতিহাসে বাংলা অঞ্চল অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্ববহ একটি অঞ্চল। আর এ গুরুত্বের একটি বৃহদাংশই জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য। প্রাক-মুসলিম আমলে বাংলা ভাষা অত্যন্ত দুর্বল একটি অবস্থানে ছিল। বিশেষতঃ সেন এবং ব্রাহ্মণেরা ং ব্রাহ্মণেরা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করার ফলে বাংলা ভাষা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গদেশ জয় করলে, মুসলিম শাসনের সৌভাগ্যে বাংলা ভাষার নবজন্ম এবং সমৃদ্ধি ঘটে। মুসলিম সুলতানেরা যেমনি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাকে বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ডে পরিণত করেছিলেন তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে বাংলাকে সমৃদ্ধ ভাষায় উন্নীত করেন। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের জন্ম ও বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকদের নাম নিবিড়ভাবে প্রাসঙ্গিক। অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, &#8220;মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ সাহিত্যের একরূপ জন্মদাতা বলিলে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গ-ভাষা বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষা।&#8221;</p>
<p>ভাষা সমৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলা অঞ্চলে বয়ে আনা মুসলমানদের নানা মূল্যবোধ সাহিত্য ভাবনার প্রসার ঘটায়। বাংলা সাহিত্যের পূর্বতন দেবতা নির্ভরতাকে অতিক্রম করে মুসলমানদের আনীত মানবতাবাদ, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব প্রভৃতি ভাবনা মানবিকতায় উন্নীত করে। মুসলিম আগমনের ফলে নির্দিষ্ট গণ্ডিবদ্ধ বাঙালির দৃষ্টি বিশ্বময় প্রসারিত হয় এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়। মহান আল্লাহর একত্ববাদী অস্তিত্বে ঈমান আনয়নের ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মধ্যেও তৈরি হওয়া আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে হরহামেশাই পাওয়া যায়। এসবে অনেক নিম্নবর্গের চরিত্রও পাওয়া যায়, যারা এক অদৃশ্য শক্তির প্রশ্রয়ে শোষকদের মোকাবেলা করেছেন। এ চিত্র কেবল মুসলিম লেখকদের কলমেই অঙ্কিত হয়নি; বরং অমুসলিম লেখকেরাও একই চিত্র এঁকেছেন।</p>
<p>মুসলমানদের হাত ধরে শুধুমাত্র বাংলা ভাষার শব্দগত সমৃদ্ধি, কিংবা সাহিত্যিক উৎকর্ষতা, অথবা বিভিন্ন ভাষার সম্মিলনে সার্বিক বিকাশই সাধিত হয়নি, বরং একইসাথে মুসলমানদের হাত তাদের আনীত নতুন চিন্তা ও দর্শনের আলোকে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি, বিষয়বস্তু এককথায় সমাজের চিন্তামানসের দিক সম্পূর্ণত বিবর্তিত হয়ে যায়। এর শক্তিশালী প্রভাব পড়ে তৎকালীন সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজেও।</p>
<p>প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. এম এ রহিমের ভাষায়-</p>
<blockquote><p>&#8220;মুসলমানরা বঙ্গদেশে যে নতুন চিন্তাধারা ও আদর্শের আমদানি করেন, তারই কল্যাণস্পর্শে হিন্দুসমাজে বিরাট জাগরণ আসে। ফলে শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণবধর্ম, ধর্মঠাকুরের পূজা ও সত্যপীর পূজা প্রভৃতি বহু ধর্মমতের উদ্ভব হয়। মুসলমানদের উদারনৈতিক ভাবধারার প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ, ধর্মঠাকুরের পূজা বিষয়ক সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ও সত্যপীরের পাঁচালী রচিত হয় এবং বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়। এভাবে বাংলার সমাজ জীবনে ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি সঞ্চার করে বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধিতে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য মুসলিম শাসন কৃতিত্বের অংশীদার।&#8221;</p></blockquote>
<p>আরোও উল্লেখযোগ্য ব্যপার হলো, মুঘল-পাঠান কিংবা বাংলা সালতানাতের শাসকগণের বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন। যেমন- পাঠানদের ভাষা ছিল প্রস্ত (পশতু), মুঘল সালতানাতের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। মুঘল থেকে শুরু করে সকল সালতানাতের শাসকরাই বিভিন্ন ভাষাকে ধারণ করলেও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের স্ব-স্ব ভাষাকে তারা জন্মভূমির ভাষা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং ঐসকল ভাষাকে চর্চার জন্য উৎসাহিত করেছেন।</p>
<p>বিশেষ করে সেনরা যখন কর্নাটক থেকে এসে গণহত্যা চালিয়ে রাজ্য দখল করে আইন চালু করেছিল, অষ্টাদশ পুরাণ ও রামের চরিত বাংলায় পাঠ করা নিষিদ্ধ, শোনা নিষিদ্ধ, কেউ তা অমান্য করলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারপরেই তারা বৌদ্ধধর্মের ও বাংলা ভাষাভাষী পন্ডিতদের গণহারে হত্যা করে।</p>
<p>কিন্তু পরবর্তীতে মুসলিম সুলতানেরা হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেন যার ফলে হিন্দু কবিরা সাহিত্য চর্চার পূর্ণ পরিবেশ পান। ইসলামী সভ্যতার অসাধারণ উদার মনোভাব, বহুত্ববাদী পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলশ্রুতিতে সকল ধর্মাবলম্বী চিন্তক, সাহিত্যিক, কবিরা তাদের সাহিত্য চর্চার সর্বোত্তম পরিবেশ পায়। ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্য পরিগঠন ও বিকাশের শ্রেষ্ঠ পরিবেশ পায়। মুসলমানদের উদারনৈতিক ভাবধারার ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ দেখার ও নিজ ভাষায় পড়ার সুযোগ পায়। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনকালে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়া তো দূরে থাক দেখা কিংবা এর পাঠ শোনাও নিষিদ্ধ ছিল। কেউ যদি ধর্মগ্রন্থ দেখত বা শুনতো, শাসকবর্গ চোখ-কানে গরম শিসা ঢেলে তাকে হত্যা করত। মুসলিম সুলতানদের হাত ধরে এই নিকৃষ্ট শোষণমূলক প্রথা ও ভয়াবহ জুলুমের অবসান ঘটে। অনেক মুসলিম শাসক স্বয়ং যেমন সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ, আলাউদ্দীন হোসেন শাহ, শাহজাদা নুসরত শাহের মতো শাসকেরা সরাসরি হিন্দু কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, সুযোগ দিয়েছেন। সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু &#8216;ভগবতে&#8217;র অনুবাদ সম্পন্ন করেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর &#8216;মহাভরত&#8217; অনুবাদকালে শাহজাদা নুসরত শাহ তাকে সরাসরি সহায়তা করেন।</p>
<p>সেই জায়গা থেকে এসকল মানুষের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। জনসাধারণের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন মুসলমানরাই।</p>
<p>যেমন- তৎকালীন পণ্ডিতেরা কৃত্রিম সংস্কৃতি ভাষা জানতো এবং সেগুলো পড়ে জাতপ্রথার মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রক্ষা করে চলতো। যার কারণে সাধারণ মানুষ মূলধারা থেকে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু মুসলমান খলিফাগণ এইসকল পণ্ডিতদের বিরুদ্ধাচরণ করে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য, সাধারণ মানুষের পিপাসাকে নিবারণ করার জন্য সকল ধরনের গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত করেন এবং বাংলা ভাষার দিকে এত বেশি উৎসাহিত করেন। তৎকালীন দেশীয় সংস্কৃতির ধারা রক্ষার জন্য এবং দেশবাসীর শিক্ষা-নৈতিকতা এসকল বিষয়কে শক্তিশালী করার জন্য মূলত বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচতা ও শিক্ষার দিকে এতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যার কারণে তৎকালীন সময়ের একজন সাধারণ কৃষকও তৎকালীন পাশ্চাত্য সভ্যতার জ্ঞানীদের তুলনায় বেশি জানতো। এমনকি তাদের তুলনায় আমাদের দেশের কৃষকদের দার্শনিক বললেও ভুল হবে না। অতঃপর ড. কাজী মোতাহার হোসেনের ভাষায়, &#8216;তৎকালীন শাসকদের এত বেশী উৎসাহ পেয়েছিল বিধায় বাঙালিরা নিজেদের ভাষাকে এতবেশি আত্মস্থ করতে পেরেছিল।&#8221; এভাবে ইসলামী সভ্যতা থেকে এসকল বিষয়গুলোকে গ্রহণ করে এ অঞ্চলেও নিজেদের জীবন এবং সভ্যতাকে এত বেশি উন্নত করতে পেরেছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা এ অঞ্চলে এসেও এ অঞ্চলে ঐতিহ্যের সাথে এমনভাবে নিজেদেরকে মেলে ধরেছিল এবং ইসলামের নব-নব বিকাশ সাধনের ক্ষেত্রগুলোকে এটার সাথে সমন্বয় সাধন করে তার উদারতা ও সর্বসহযোগিতাকে এমনভাবে তুলে ধরেছিল যে এর দ্বারা সকলেই অর্থাৎ এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষ উপকৃত হয়েছে। কোনো ধর্মও নষ্ট হয়নি, ইসলামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এভাবে করেই অঞ্চলের ভিত্তি এবং ভাষার শক্তিশালী একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাংলা ভাষার জন্য তৎকালীন দুনিয়ায় সবচেয়ে নজিরবিহীন সম্মাননা হচ্ছে-</p>
<p><strong>সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি রচনা করেন। রাজনৈতিক ভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রের নামকরণ করেন- শাহী বাংগালাহ।</strong></p>
<p><strong>পরবর্তীতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির শিখরে পৌঁছিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় অনুমোদন দেন, যা বাংলাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।</strong></p>
<p>এসব ক্ষেত্রে আরো উদাহরণ হলো: মুঘল সালতানাতের সময়ে আরাকান রাজ্যসভায় অমার্ত্যগণ বাংলা ভাষার শ্রী বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচুর পরিমাণ তহবিল পেতেন, ফলশ্রুতিতে দৌলত কাজী, মহাকবি আলাওলরা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে অমর কীর্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। আমরা যদি লক্ষ্য করি, তখনও সংস্কৃত ভাষা ছিল, আরবি ভাষার জয়গান ছিল, ফারসি ভাষা ছিল দরবারের ভাষা, উর্দু ভাষা ছিল প্রভাবশালী ভাষাগুলোর একটি। এতগুলো শক্তিশালী ভাষার মধ্যে থেকে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলো শিক্ষা লাভ করতেন, এসকল ভাষার মৌলিক গ্রন্থগুলো পাঠ করে করে সমৃদ্ধি অর্জন করতেন, কারণ এসকল ভাষা ইসলামের ভাষা। কিন্তু এতকিছুর পরেও তাদের নিজস্ব ভাষা- বাংলা ভাষাকে তারা চর্চা করেছেন। এবং আলাওল তাঁর সাহিত্যগুলো উপহার দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ভাষাকে চতুর্মুখী করে বিকাশ করেছেন।</p>
<p>মাটি ও জাতির রূহকে উপলব্ধি করে এ ভাষাকে ধারণ করেছেন। তারা কখনোই বিদেশি সংস্কৃতির সাথে নিজেদের বিলিয়েও দেননি আবার ইসলামের মূল যে রূহ তাকেও দূরে ঠেলে দেননি। সমন্বয় সাধন করেছেন এবং সে আলোকেই তাদের কর্মগুলো সম্পাদন করেছেন। এক্ষেত্রে কাজী মোতাহারের আরেকটি লাইন হচ্ছে, &#8220;মুঘল সালতানাতের মুসলিম শাসকেরা অনেকেই উসমানী-আব্বাসী বা আন্দালুসের ওই অঞ্চলের তথা বিদেশি বংশোদ্ভূত হলেও এই দেশকে তারা স্বদেশ হিসেবেই গড়ে তুলেছিলেন।&#8221; এই অঞ্চলের কোনো আদর্শকে, স্বতন্ত্রতাকে ও এদেশের ভাষাকে গ্রাস করা তো দূরের কথা বরঞ্চ তারা এগুলো রক্ষার ব্যপারে উৎসাহ দিয়ে তৎকালীন সুলতানগণ, তৎকালীন সুবেদাররা অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলগুলোর সাথে যোগসূত্র সাধন করে রাষ্ট্রীয় ভাষাগুলো শিক্ষাদান করেও বাংলা ভাষা তথা আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে শক্তিশালী করেছেন।</p>
<p>এ বিষয়টি ড. এম এ রহিমের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে এভাবে-</p>
<p>&#8220;মুসলমানগণ অন্য জাতির শিক্ষা ও জ্ঞানের মর্যাদা দিয়েছেন এবং সর্বত্র প্রজাসাধারণের সংস্কৃতি ও আদর্শ রক্ষা করেছেন। মুসলিম শাসকবর্গ ও হাজার হাজার বহিরাগত মুসলমান বঙ্গদেশে বসতি স্থাপন করেন। তারা বাংলাদেশকে নিজেদের দেশরূপেই গ্রহণ করেন, এবং নিজেদেরকে বাংলা ভাষার সন্তান হিসেবেই পরিচয় দেন। এ দেশের আদি অধিবাসীগণের মতোই বাংলা তাদেরও ভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়।&#8221;</p>
<p>বাংলা সাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন &#8216;জীবাত্মা-পরমাত্মা&#8217; এটিরও বাংলা সাহিত্যে আমদানি ঘটেছে মুসলমানদের সুফিবাদ থেকে। বাংলা ভাষায় পুঁথি সাহিত্যের যাত্রাও শুরু হয় মুসলিম কবিদের মাধ্যমে।</p>
<p>সর্বোপরি, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে বাংলা ভাষায় বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অধিকার করে।</p>
<p>এখন কথা হচ্ছে, বাংলা ভাষা কি মুসলমানদের ভাষা হিসেবে বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হয়েছিল? অবশ্যই হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে শুরুর দিকটায় প্রভাবশালী ভাষা না হলেও মুসলমানদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় এই ভাষাটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষায় পরিণত হয়। আর এটি কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী, বৃটিশদের আজ্ঞাবহ ও হিন্দু সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহনের উক্তি থেকে আমরা জানতে পারি। তার কথার আলোকে, যখন ব্রিটিশরা আসে ওই সময়ের সমাজকাঠামোতেও মুসলমানগণই তাদের চিন্তা-ভাবনা, ভদ্রতা, বিচার-বুদ্ধিতে, কার্য পরিচালনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। এটা সে নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছে। মুসলিম সালতানাতের খলিফাগণ, সিপাহসালার উজির-নাজির থেকে শুরু করে সকল কাঠামো থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি জোরদান, পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদির মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ ছিলেন না। একইসাথে তারা রাষ্ট্রীয়ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং সরকারিভাবে তার ব্যবহারকেও নিশ্চিত করেছিলেন। এক্ষেত্রে তারা দরবারে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল কবিদেরকে বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় কাব্যানুবাদের উৎসাহ প্রদান করেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় জীবনেও বাংলা ভাষার ব্যবহারকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দেন। একদিকে যেমন আরবি ও ফারসি ভাষার ব্যবহার ছিল, একইসাথে বাংলা ভাষাকেও এগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুসলিম শাসকগণ এ অঞ্চলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই মসজিদের মুদ্রালিপি থেকে শুরু করে সকল স্থানেই আরবি, ফারসিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, বাংলা ভাষাকেও একইভাবে ব্যবহার করেছেন। তাদের সীলমোহর, স্বাক্ষর, বিভিন্ন অংশ জুড়েই থাকত বাংলা ভাষার সরকারি ব্যবহার। অফিস-আদালত, প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিচারালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রিকরণ, ব্যক্তিগত কাজকর্ম, প্রজার সাথে সুলতানের কথোপকথন, নবাব, সুবেদার বা দেওয়ানদের দরবারেও বাংলা ভাষায় সকল কিছু পেশ করা যেত। এই ব্যপারে ড. এস এম লুৎফর রহমান চমৎকার কিছু প্রমাণাদি তুলে ধরেছেন। যেমন- তিনি শায়েস্তা খানের আমলে তৎকালীন সময়ে কর্মরত ছিলেন দেওয়ান বদিউজ্জামান খান, তার মোহরযুক্ত চিঠি ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন লিখিত দলিলপত্র সামনে হাজির করেন। অমুসলিমদের সাথে লিখিত চুক্তিপত্র যেমন নবাব শায়েস্তা খানের সাথে অধীন শাহ ওজিউল এবং পরগণা রাজ্যের দেওয়ান সাহেবের স্বাক্ষর দ্বারা অনুমোদিত বিভিন্ন দলিলপত্র তিনি তুলে ধরেছেন। আর এই প্রত্যেকটি দলিলপত্রের ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি সেগুলো বাংলা ভাষায় লিখিত এবং আদানপ্রদানকৃত হয়েছে।</p>
<p>বর্তমান সময়ে এসে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, এত শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সেই জৌলুসপূর্ণ ভাষা এভাবে মুসলমানদের হাতছাড়া হবার কারণই বা কী ছিল?</p>
<p>আমরা জানি যে, ব্রিটিশ শাসনের সময়কালে মূলত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, ১৭৫৭সালের বিপর্যয়, ১৮৩০-১৮৪০ সালের আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের যে সংগ্রাম- এই সংগ্রামের ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা মুসলমানরা ছাড়া অন্য কেউ সে অর্থে পালন করেনি। পরবর্তী সময়ে হিন্দু এবং শিখরা আসলেও অধিকাংশ ব্রাহ্মণ, হিন্দু সুবিধাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ব্রিটিশদের সবকিছুকে গ্রহণ করে সেভাবেই এ অঞ্চলকে পরিচালনা করার এবং বৃটিশদেরকে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে। ফলস্বরূপ তারা তাদের ভাষাকে, তাদের সব কালচারকে গ্রহণ করে তাদের নিজেদের সুবিধাটুকু অর্জন করেছে। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের ক্ষেত্রে কিন্তু ইংরেজি ভাষা শিখেও যেমন কোনো উপকার হচ্ছিলো না, একইভাবে এ ভাষার বিরোধীতা করেও কোনো লাভ হচ্ছিলো না। কারণ, সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই সময়টাতে ইংরেজি ভাষা গোটা ভারতব্যাপী শিক্ষার ভাষা, রাষ্ট্রসহ সকল কিছুর ভাষায় পরিণত হয়। হিন্দু থেকে শুরু করে অন্যান্যরা গ্রহণ করলে মুসলমানদের এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিতে হয় জাতির সামগ্রিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করেই। কারণ, আমাদের সংগ্রাম ব্রিটিশ একাডেমিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তাদের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সেসময়ে যখন মুসলমানরা সকল দিক থেকে শোষণের কারণে পিছিয়ে পড়লো আর্থিকভাবে, শিক্ষার দিক থেকে। সে সময়টাতে বাংলা ভাষাও চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে, বৃটিশদের আজ্ঞাবহদের হাতে। বাংলা ভাষা এক কথায় পঙ্গুত্ব বরণ করে। আজ অবধি সেই বাংলা ভাষা আমাদের হাতে নেই।</p>
<p>প্রশ্ন আসতে পারে, আমাদের অঞ্চলে ব্রিটিশরা কেনো এই বাংলা ভাষাকেই সর্বপ্রথম আক্রমণ করলো? তখনও তো বাংলায় ভাষায় প্রচুর পরিমাণে বই ছিল না, সিনেমা ছিল না। তবু কেনো এই আক্রমণ? তৎকালীন অর্থনীতি, কৃষিসহ সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে যে আগ্রাসন তারা পরিচালনা করেছে। সমপর্যায়ের আগ্রাসনের পরিমাণকে বৃদ্ধি করে বাংলা ভাষাকে তাদের নিজস্ব রূপে রূপায়ণ করেছে, অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং যখন তারা দেখল এতকিছুর পরেও তারা তাদের খ্রিস্টানধর্ম, ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে সমবেত করে (উল্লেখ্য ইতোপূর্বে হিন্দুধর্ম এত বেশি সমাবিষ্ট ছিল না) ব্রাহ্মণশ্রেণির হাতে বাংলা ভাষাকে তুলে দেয়। নতুন যে ব্রাহ্মণ্যবাদের জন্ম তারা দিয়েছে, এটির ভিত্তি যারা সর্বপ্রথম নির্মাণ করেছে সেই প্রাণসত্তা তারা বাংলা ভাষাতেই রচনা করে এই আগ্রাসন পরিচালনা করেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা বাংলাকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বারবারই ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।</p>
<p><strong>আমরা পড়ে থাকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা লিপির জনক, অথচ ঈশ্বরচন্দ্র বাংলা লিপির আবিষ্কর্তা নন। বাংলায় হাজারো লিপি শিক্ষার বই আর উদ্যমের মধ্যে বর্ণপরিচয় একটি মাধ্যম। বই লিখতে তিনি লিপি সংস্কার করেন। তিনি সিভিলিয়ানদের প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হিন্দির স্রষ্টা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেড পণ্ডিত ছিলেন পাঁচ বছর।</strong> গত কয়েক দশকে হিন্দি থেকে আরবি ও ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন যে নতুনভাবে চলছে তাঁর বীজ, ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তাঁর গুরু জয়গোপাল তর্কালঙ্কার বপন করে যান। তারা বাংলা ভাষায় এই কাজটা করে দেখান পারসিক অভিধান প্রণয়ন করে। বিদ্যাসাগর মশাই গুরুর পথে বাংলায় অযাচিত ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে সংস্কৃত শব্দ ঢুকিয়ে, তার আগের দীর্ঘকালের ভাষার বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গী রুদ্ধ করেন। এর ফলে যে ভাষাটার জন্ম হয় তা আর যাই হোক বাংলা নয়। একে নাম দেয়া হয় &#8216;অভিজাত প্রমিত বাংলা&#8217;। সমস্যাটা হচ্ছে এই মান ভাষার সঙ্গে পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষাগুলোর দূরত্বটা অনেক, এখানে সংস্কৃত শব্দ চাপিয়ে দেয়ার বিষয় আছে। এমন সব শব্দ অভিজাতদের সাহিত্যে ও কর্মে ব্যবহার করা হয়; যা প্রায় শত বছর পরেও পূর্ব বাংলার মানুষের মুখে উঠে আসেনি। এসব শব্দ রয়ে গেছে গুরুগম্ভীর কিংবা ভাবগম্ভীর। সহজাতভাবে প্রবেশ করেনি বলে শব্দগুল সাধারণের মুখে শোভা পায় না। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এই নিয়ে যা বলেছেন তার ভাবার্থ এরকম-পূর্ব বাংলার মানুষের লোকায়ত ভাষা থেকে কলকাতার অভিজাতদের চাপিয়ে দেয়া ভাষার দূরত্বটা এতই বেশি যে, সাধারণের মুখে ভাষাটা আসে না। সাধারণকে ভাষাটা শিখতে হয় বরং লেখাপড়া করে &#8216;লায়েক&#8217; হওয়ার পরই কেবল এ ভাষায় কথা বলা যায়, শুধু তখনই এটা মুখে আসে!</p>
<p>বাংলা ভাষার এই নেতিবাচক বিবর্তন কিংবা বাংলা ভাষার প্রায় হাজার বছরের বেশি সময়ের স্বাভাবিক বিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে প্রমিত বাংলা ভাষা, লেখ্য লিপিকে ঔপনিবেশিক কাঠামো অর্জন করানোর উদ্যমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের অবদান প্রচুর। কারণ মূল পরিবর্তন বা সোজাকথায় আগ্রাসনের সূচনাটা তখন থেকেই।</p>
<p>কিন্তু এই আগ্রাসনের মূল কারণ কী? এর কারণ হলো- একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একটি জাতির চিন্তাধারা, সংস্কৃতির ধারাকে ব্যাঘাত ঘটাতে, সোশিও-কালচারকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের নিজস্ব ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটি সাম্রাজ্যবাদী, যায়নবাদী ব্রিটিশরা খুব সফলতার সাথেই সম্পাদন করেছে।</p>
<p>কিন্তু পরবর্তীতে আমরা অন্যান্য ভাষা চর্চা করতেও পারিনি, আরবি-ফারসিকেও ভালোভাবে ধারণ করতে পারিনি, উর্দুকেও কাজে লাগাতে পারিনি। একইভাবে এসকল ভাষাকে কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদেরকে শক্তিশালী করার প্রধান বাহন বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করবো সেটাও পারিনি। এজন্য কাজী মোতাহার হোসেন বলেছিলেন, &#8220;বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার প্রতি উদাসীনতায় বাঙালি মুসলমানের অন্যতম অধঃপতনের কারণ।&#8221; সত্যিকারার্থে এর বাস্তবতা রয়েছে। কেননা, জাতির রূহকে উপলব্ধি করতে হলে, ভূমিকে ধারণ করে সে আলোকে নতুন ইশতেহার প্রদান করতে হলে জাতির নাড়ি-নক্ষত্রের সাথে যোগসূত্র থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, বাংলা ভাষা। কিন্তু আমরা সেটাকে আমাদের মত করে ধারণ করতে পারিনি। সর্বোচ্চ কিছু চেষ্টা করেছি আরবি দিয়ে, উর্দু সাহিত্য দিয়ে কিছু ধর্মীয় ব্যপার আয়ত্ত করতে; কিন্তু সেটা দিয়ে তো আমাদের এ অঞ্চলের রূহকে বুঝা সম্ভব না। ভাসাভাসা দু&#8217;চারটি লাইন মুখস্থ করে বা মূলনীতি পড়ে আমরা কখনোই এই অঞ্চলের সামাজিক সংস্কৃতিকে, নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের ইশতেহারকে সামনে আনতে পারবো না। এজন্য ইসলামের মূল জ্ঞান যেসকল ভাষায় রয়েছে সেটার সাথে অবশ্যই আমাদের মাতৃভাষার সমন্বয় সাধন করে সকলকিছুকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।</p>
<p>আবার বাংলা সাহিত্য যতটুকুই বা ছিল তা পুঁথি সাহিত্য সৃষ্টি করে বাংলাদেশের- এ অঞ্চলের চাষী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কিছুটা খোরাক দিলেও শিক্ষার প্রধান ভাষা হিসেবে সমাজবিজ্ঞান তথা জাতির মূল রূহ-এর মূলনীতি প্রণয়নের ভাষা হিসেবে সেভাবে দাঁড় করাতে পারিনি। বাস্তবতা হলো এই ধরণের ভাষা চর্চা দিয়ে কখনোই বাঙালি মুসলমানের পক্ষে সভ্যতা বিনির্মাণ করা সম্ভব না, বরং সাম্রাজ্যবাদীদের শেখানো বুলি, ধার করা চিন্তা দিয়েই চলতে হবে। এছাড়া আমাদের হাতে নিজস্ব কোনো সম্পদ নেই!</p>
<p>আবার আমরা অধিকাংশ সময় নিজেদের অলসতাকে ঢাকতে গিয়ে এককেন্দ্রিক দোষারোপ করি, যেমন- হিন্দুরা বা অন্যান্যরা সকল কিছুকে দখল করে নিয়েছে। পরিভাষা, শব্দভাণ্ডার, সাহিত্য, কবিতা, জ্ঞানের ভাষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির ভাষা সকল কিছুই অন্যদের পরিভাষা দিয়ে, চিন্তা দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে। বাস্তবতা হলো অভিযোগ করে কখনোই মুক্তি মিলে না।</p>
<p>ইদানীং আবার বাংলাভাষাকে নিয়ে উদ্ভুত সকল সমস্যার মূলে একমাত্র পাকিস্তানি শাসনামল এবং পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক উর্দু ভাষার আধিপত্যকেই দায়ী করা হয়। এমনকি স্বাধীনতার পরে যেসব লেখনী প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো পড়লেও আমরা ভাষাকেন্দ্রিক মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে &#8216;৫২ এর ভাষা আন্দোলনকেই বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা কি আদতে সেটাই বলে?</p>
<p>বাংলা ভাষাকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরিকৃত।</p>
<p>সুতরাং বুঝা যায়, এ সকল আলাপ উপেক্ষিত থাকার কারণও আমাদের কাছে অস্পষ্ট নয়। আর এই উপেক্ষা থেকেই সমস্যার সূচনা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে এই উপমহাদেশকে রক্ষা করা হয়, যাদের কাফনবিহীন দাফন হয়েছিল এ বাংলায়। এরপর হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ রক্তার্জিত স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এই বাংলাকে। আমরা পেয়েছি আমাদের নিজস্ব মাতৃভূমি &#8216;বাংলাদেশ&#8217;। সেই দেশকে সার্বজনীন করে তুলতে এদেশের ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবীগণ সকল স্তরের মানুষকে বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরা উচিত। যাতে করে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই বাংলা ভাষায় জ্ঞানার্জন করতে পারবে। বাংলা ভাষাতেই খুলে যাবে মানুষের সার্বিক বিকাশের এক অবরুদ্ধ দ্বার। কিন্তু আমাদের সমাজ, রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা গণিত সকল বিষয়ের পাঠদানই হচ্ছে ইংরেজিতে, যেগুলোর বাংলা পাঠ্যবই সকলের সামনে হাজির করার প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি।</p>
<p>আমাদের এই ভাষাকে, আমাদের সাহিত্যকে আমাদের নিজেদেরকেই বহন করার দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আমাদের সুবিশাল ইসলামী সভ্যতা, আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতির মুক্তির সাথে সংযোগ স্থাপণ করে আমাদের মাটি, আমাদের মানুষ ও আমাদের বাংলা ভাষার সাথে সমন্বয় করে এমন একটি সুবিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার, জ্ঞানের ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, এমন সকল চিন্তা ও মূলনীতি সামনে হাজির করতে হবে, এমনসব কাব্য ও ইশতেহার আনতে হবে যেগুলো দিয়ে আমরা আবার বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরতে পারবো। এটি ব্যতীত কখনো আমাদের জাতির কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কীভাবে পৌঁছাবো! আমরা তো মাতৃভাষাকেই ধারণ করতে পারছি না। মাতৃভাষাকে দিয়ে সভ্যতার কথা, সাংস্কৃ তির কথা ফুটিয়ে তুলতেই পারছিনা। তাহলে মানুষ কি করে বুঝবে এর গুরুত্ব? আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচের ভাষায়, &#8220;যেকোনো চিন্তাকে যদি আমরা ঐ মানুষের সাথে, ঐ মাটির সাথে সমন্বিত করতে না পারি, তাহলে তা কখনোই সফলতার মুখ দেখবে না। এজন্য আমাদের চেতনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে বাংলা ভাষাকে নিজস্ব ধারায় ইসলামী সভ্যতার আদলে তৈরি করার কোনোই বিকল্প নেই।&#8221;</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্যণীয়- শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রেই বর্তমানে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম একটি সমৃদ্ধশালী দেশ চীনেও ১৯৫০ সালের পূর্বে চায়না ভাষার সাথে সাথে অন্যান্য ভাষারও বেশ আধিপত্য ছিল। কিন্তু চীন তাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সামাজিক শক্তিকে যথোপযুক্ত কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুকে বন্ধ করে দিয়ে হলেও অধ্যাপক, সাহিত্যিক, অনুবাদক নিযুক্ত করে বই-পুস্তক, লেখনী সকল কিছুকে নিজস্ব ভাষায় অনুদিত করার, প্রকাশ করার। প্রথম কয়েক বছরেই হাজার হাজার চীনা সাহিত্য অনুদিত হয়, নিজস্ব ভাষায় লিখিত হয়। ফলশ্রুতিতে তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে চাইনিজ ভাষায়, নিজেদের রূপরেখার আলোকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে।</p>
<p>উসমানী খিলাফত পরবর্তী সময়ে, উসমানীয় ভাষাকে পরিবর্তন করে যখন ল্যাটিন ভাষায় নিয়ে যাওয়া হয়, আধুনিক তার্কিশ ভাষাকেও এভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আজ সকল ধরনের জ্ঞানভাণ্ডার, সাহিত্য, চিন্তা তার্কিশরা তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ করতে পারে, চর্চা করতে পারে। তাহলে আমরা কেনো পারবো না?</p>
<p>যেখানে বর্তমানে মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্ব-ভাষা তালিকায় বাংলার অবস্থান পঞ্চম এবং বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে এর অবস্থান সপ্তম। বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও অধিক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এদের মধ্যে ২৬ কোটিরও বেশি বাংলা ভাষাভাষীর বসবাস বাংলাদেশ ও ভারতে। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী বাকি ৪ কোটিরও বেশি মানুষ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবুও কেনো আমরা পারবো না?</p>
<p>আমরা জানি যে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংঙ্গীত রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাতেই।</p>
<p>বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা এবং এদেশের ৯৮.৯% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন। এবং ১৯৮৭ সালের &#8216;বাংলা ভাষা প্রচলন আইন&#8217; অনুযায়ী, &#8220;বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব ও অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে এবং যদি কোন ব্যক্তি বাংলাভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তা হলে সে আবেদন বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের জন্য ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়।</p>
<p>পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাংলাভাষী অসংখ্য মানুষ। যেমন- ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:</p>
<ul>
<li>১. পশ্চিমবঙ্গ : যার জনসংখ্যা প্রায় ৭,৮৬,৯৮,৮৫২ জন। এ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৬.২২% বাংলায় কথা বলে, অধিকাংশ অধিবাসীও মাতৃভাষা হিসেবে বাংলায় কথা বলে থাকেন।</li>
<li>২. ত্রিপুরা: এ রাজ্যের অ-উপজাতি জনসংখ্যার বেশিরভাগই বাংলাভাষী হিন্দু এবং মুসলমান। যা রাজ্যের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।</li>
<li>৩. আসাম: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, আসামে প্রায় ৩,১২,০৫৫৭৬ জন লোক বাস করে। &#8216;১১-র আদমশুমারি রিপোর্ট অনুসারে, আসাম একটি বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। প্রকৃত বাঙালি জনসংখ্যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪%।</li>
<li>৪. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি রয়েছে, যার আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ১,০০,০০০ জন এবং মোট জনসংখ্যার ২৬% -২৮%। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বাংলা সর্বাধিক প্রচলিত একটি ভাষা, যদিও সেখানে এর সরকারী কোন স্বীকৃতি নেই।</li>
<li>৫. ঝাড়খণ্ড ২০১১ সালে বাংলা ভাষাকে তাদের দ্বিতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেয়।</li>
</ul>
<p>উপরের রাজ্যগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী অঞ্চল। তবে এগুলো বাদে অন্যান্য যে রাজ্যগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন সেসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে-নয়াদিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, বিহার, ভাগলপুর, পাটনা, চেন্নাই এবং জয়পুর।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাকিস্তানের করাচিতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন এবং করাচি সিটি করপোরেশনের অন্যতম দাফতরিক ভাষাও বাংলা।</p>
<p>যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর অভিবাসীদের স্বীকৃত পঞ্চম মাতৃভাষা বাংলা। সেখানে প্রায় ৮ লাখ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।</p>
<p>মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রেও প্রচুর পরিমাণ বাঙালি অভিবাসীর বসবাস রয়েছে। উপরোক্ত দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে নিম্নলিখিত বহু দেশেই বর্তমানে বহু বাংলাভাষী মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।</p>
<p>সিয়েরা লিওনে ২০০২ সাল থেকে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।</p>
<p>এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দুবাই, জাপানের টোকিও, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, অ্যাডিলেড, পার্থ, ভিক্টোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (এই অঞ্চলে সংখ্যালঘু বাঙালি অভিবাসীরা বাংলায় কথা বলে) নিউইয়র্ক, পেনিসিলভেনিয়া, নিউজার্সি, সান জোসে, ওয়াশিংটন, ক্যালিফোর্নিয়া, কানাডার টরন্টো, মিসিসাগা, ব্র্যাম্পটন, ফ্রান্সের প্যারিস, ইংল্যান্ডের লন্ডন, ওমান, মালয়েশিয়া, স্পেন এবং জার্মানিতে প্রচুর সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী রয়েছেন।</p>
<p>এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আরো প্রায় ৪ কোটি জনগণ এরকম আছে যারা বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা বা Second language হিসাবে ব্যবহার করে।</p>
<p>সব মিলিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা জনগণের সংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি।</p>
<p>বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার চর্চা ক্রমে বিস্তার লাভ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৌরভ সিকদারের গবেষণা মতে, &#8216;ইংরেজি ও চীনা ভাষার পরই বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।&#8217;</p>
<p><strong>পৃথিবীর ৪টি মহাদেশের ৩০ টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও চর্চা হচ্ছে। এ ভাষা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়ে থাকে। এর বাইরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, পোল্যান্ড, রাশিয়া, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের মোট ত্রিশটি দেশে বাংলা ভাষার গবেষণা হচ্ছে।</strong></p>
<p>যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে উনিশ শতক থেকেই প্রাচ্যবিদ্যা ও ভাষাচর্চা বিভাগের অধীনে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ১০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও এশীয় গবেষণা কেন্দ্রে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক, শিকাগো, মিনেসটা, ফ্লোরিডা, মেরিল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, ভার্জিনিয়া, উইসকনসিন ও হাভার্ড উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>জাপানে বাংলা ভাষার অভিধান চালু করা হয়েছে।</p>
<p>সম্প্রতি ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিষয়ে গবেষণার জন্য বেঙ্গল স্টাডি সেন্টার খোলা হচ্ছে। বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে খোলা হয়েছে বাংলা বিভাগ। প্রায় প্রতিবছরই বিশ্বের নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ খোলা হচ্ছে এবং একাডেমিক কোর্স চালু হচ্ছে।</p>
<p>বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহের কারণে বিশ্বের কমপক্ষে ছয়টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল রয়েছে। আরো ১০টি দেশের রেডিওতে নিয়মিত বাংলা ভাষার আলাদা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ৬টি, যুক্তরাষ্ট্রে ১০ টি বাংলাদেশী মালিকানাধীন ও বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে।</p>
<p>বাংলা ভাষায় যুক্তরাজ্য থেকে নিয়মিত মোট ১২ টি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হচ্ছে। বেতার বাংলা নামে সেখানে একটি রেডিও স্টেশন রয়েছে। ধূমকেতু, জন্মভূমি, প্রতিদিন, স্বদেশ, বিদেশ নামে পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাও নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।</p>
<p>নিউইয়র্কে বাংলা ভাষার পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয় ১৯৮৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। বর্তমানে প্রায় ১৮ টি সাপ্তাহিক এবং ৭ টি অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।</p>
<p>ইউরোপের ইতালিতে বর্তমানে পাঁচটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা এবং রোম ও ভেনিস শহর থেকে তিনটি বাংলা রেডিও স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে। ইতালি থেকে ছয়টি অনলাইন টেলিভিশন বাংলায় পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ডেনমার্ক, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের আটটি দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে বাংলা ভাষায় মুদ্রিত ও অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে।</p>
<p>বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত প্রচার ও প্রসারের কারণেই এর শব্দ ও সাহিত্য ভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ। সেই সাথে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ভাষাও এটি। ইউনেস্কো ২০১০ সালে &#8216;পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা&#8217; হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাকে। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যের প্রায় সবকটি শাখাতেই বাংলা ভাষা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলার বৈচিত্র্যময় উপভাষা বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত ও গতিশীলতা দান করেছে। একইসাথে বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত পরিসর এর সমৃদ্ধি ও ও সর্বব্যাপী গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। পুরো পৃথিবীতে ৪৫ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে এবং বাংলা বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম একটি প্রভাবশালী ভাষা। তাই, বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে অন্যান্য ভাষার সামনে হীনমন্যতায় ভোগার কোন সুযোগই নেই। অতীতের সোনালী প্রেরণাকে সামনে রেখে, বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে অগ্রসর হলে নতুনভাবে একটি সমৃদ্ধ অবস্থানে পৌঁছা সম্ভব। কেননা, বাংলা অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জায়গা। একইসাথে তা আমাদের অগ্রসরতার সবচেয়ে বড় সোপানও বটে। মুসলমানিত্ব মজবুত করতে বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চলে নয়; বরং আঁকড়ে ধরাই যৌক্তিক।</p>
<p>যেহেতু ছোট্ট হিব্রু ভাষার গত ৬ হাজার বছরে কোন অস্তিত্ব ছিল না তারা নিজেদেরকে নতুন করে জাগরিত করে আন্তর্জাতিক ভাষাতে পরিণত করতে পেরেছে। আজ থেকে কয়েক শ বছর আগেও চাষীদের বা গ্রাম্যদের ভাষা ছিল উর্দু, তা এখন বড় দেশের রাষ্ট্র ভাষা। আজ থেকে দেড়শ বছর আগেও হিন্দি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেই হিন্দি ভাষা কি উপমহাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে না? শেক্সপিয়ার একাই যেহেতু ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করাতে পেরেছেন। সুতরাং আমরাও পারব ইনশাআল্লাহ্।</p>
<p>যে বাংলা ভাষার সুবিস্তৃত, দিগন্তব্যাপী ঔজ্জ্বল্য, সুখ্যাতি ও সমৃদ্ধি প্রথিত আছে তারই শেকড়ে তথা সুলতানী আমলে। তাঁর উত্থান ও নব জাগরণ অবশ্যম্ভাবী। এজন্যই সতের শতকের মুসলিম কবি আব্দুল হাকিম বাংলা ভাষার কদর বুঝাতে বলেছেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী</p>
<p>সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমাদের ভাষাকে বিনির্মাণের মূল লক্ষ্য কি তবে?</p>
<p>একটি ভাষা দাঁড়ায় রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে, আদালতের ভাষা হিসেবে, প্রতিষ্ঠানের ভাষা হিসবে, শিক্ষাব্যবস্থার ভাষা হিসেবে, এই সবগুলোর মূলেই রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা। আর যখন ভাষাটি শিক্ষা ও গবেষণার ভাষা হয়, তখনই মূলতে সে ভাষাটি একটি শক্তিশালী ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই শক্তিশালী আত্মপ্রকাশ মূলত ঘটাতে সক্ষম হয়ে ঐ ভাষা থেকে উঠে আসা বড় বড় ব্যক্তিবর্গের প্রভাবের ফলশ্রুতিতে। কেননা তারা যখন সে ভাষায় মৌলিক জ্ঞান চর্চা করেন, শক্তিশালী চিন্তার বিকাশ ঘটান তার প্রভাব গিয়ে সরাসরি পরে ওই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর উপরে। কেননা তখন তাদের উদ্ভাবিত পরিভাষাগুলোই হয়ে ওঠে ঐ জাতির শিক্ষা ও গবেষণার মূল হাতিয়ার। এভাবেই ঐ জাতির চিন্তা, মনস্তত্ব, আভিজাত্য, ব্যবহারিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপ প্রভাবিত হয় এবং সে ভাষাটি আদালতের ভাষায় পরিণত হয়। সুতরাং এক্ষেত্রে ভাষাকে গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সে ভাষায় জ্ঞান তৈরি, চিন্তা তৈরি এবং সে ভাষাভাষী শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব উঠিয়ে নিয়ে আসা। কেননা এটাই হচ্ছে ভাষার মূল পরিচয়।</p>
<p>এক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৪৫ সালে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্পূর্ণ দায়ভার যখন জার্মানির ওপর বর্তায়, তখন মিত্রশক্তি জার্মানির শাস্তি নির্ণয়ের জন্য আলোচনার টেবিলে বসে। আলোচনায় বসা মারমুখী যুদ্ধবাজ নেতারা প্রস্তাবনা দিতে থাকে যে জার্মানিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হোক, কিংবা ইউরোপের শষ্য ক্ষেতে পরিণত করা হয়। তখন ঐ টেবিলে বসা একজন বলেন, মানলাম আপনারা জার্মানিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন, কিন্তু কার্ল মার্ক্সকে কোথায় রাখবেন? ফ্রেডরিখ নিটশে-কে কোথায় রাখবেন? ফ্রেডরিখ এ্যাঙ্গেলসকে কোথায় রাখবেন? (অর্থাৎ জার্মানিকে ধূলিস্যাৎ করে দিলেও ওইসকল প্রভাবশালী চিন্তকদের চিন্তাভাবনাকে তো বিনাশ করতে পারবেন না। তাদের ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবেন না।)</p>
<p>তখন সবার বোধোদয় হয় এবং অপার সম্ভাবনাময় জার্মানিকে ধ্বংস না করে ইউরোপের করদ রাজ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, হিটলারের নেতৃত্বে সমগ্র বিশ্বজয় করার বাসনা ও শক্তিমত্তা যখন পরাজিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়, তখন ঐ বিপন্ন দশা থেকে পরিত্রাণের উপায় হয়েছিল মৌলিক চিন্তা ও জ্ঞানের অধিকারী জার্মানভাষী দার্শনিকগণ। ঐতিহাসিক এ ঘটনার তাৎপর্য থেকে আমাদের কি কিছুই শিক্ষা নেবার মত নেই?</p>
<p>অবশ্যই এটি আমাদের সামনে অপার সম্ভাবনা এবং গৌরবোজ্জ্বল একটি ভবিষ্যতের লক্ষ্যে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের খোরাক জোগানের মত একটি উৎস। অতএব আমাদের দ্বারাও বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করা সম্ভব এবং তা দিয়ে নতুন একটি ভবিষ্যতের পানে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। আমরা যদি এই আত্মবিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে, বাংলা ভাষায় গোটা মানবতার উৎকর্ষ ও মুক্তির ভাবনায় মুখরিত হয়ে উঠতে পারি, মানবতার কল্যাণে জ্ঞান ও চিন্তার সমৃদ্ধ ইমারত গড়ে তুলতে পারি- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাঙ্গণের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় বিবেক, মন ও মানস একটি দায়িত্বশীল চরিত্র লাভ করবে, আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতি অসাধারণ শক্তিমত্তার অধিকারী হয়ে উঠবে তখন গোটা মানবতার মুক্তির ইশতেহার বাংলা ভাষায়ই রচনা করে বিশ্ববাসীকে উপহার দেয়া সম্ভবপর হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য পরিশেষে বলতে চাই,</p>
<p>আজ আমরা এমন এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছি, যখন আমাদের জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। আমাদের ভাষা- সাহিত্য- সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এগুলো আমাদের জাতীয়তার মূল ভিত্তি ও আত্মপরিচয়ের গৌরবময় উপাদান। এজন্য এই সকল কিছুর বাহন বাংলা ভাষা। যদি আমরা এই ভাষার বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন করতে পারি তাহলে আমাদের জাতীয় গৌরব বৃদ্ধি পাবে, জাতির অস্তিত্ব দৃঢ় ভিত্তি ধারণ করবে। পরমুখাপেক্ষীতা, হীনমন্যতা ও পরনির্ভরতার দ্বারা যেমন কোনোদিন কেউ টিকতে পারে না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকেও আমরা সেভাবে বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। এজন্য আমাদের অবদানের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণাঙ্গ ও গৌরবদীপ্ত হয়ে উঠবে আবারো। বাংলা ভাষার গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব শুধু সাহিত্য রচনা ও চিন্তা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে নয়। বরং এটা পারিপার্শ্বিক বহু ঘটনার সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। চিন্তায় ও সৃজনে বাংলাকে যত্নের সঙ্গে এগিয়ে নেয়ার এ দায়িত্ব আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে।</p>
<p>তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে নজরুল, ফররুখ, আল মাহমুদের রচিত ভাষা ও সাহিত্যের দুর্জয় প্রকাশ। তাদের প্রদর্শিত পথেই আমাদের ভাষা সাহিত্যের গৌরব ও সমৃদ্ধি আগামীতে আরো বেশি এগিয়ে নিতে পারব।</p>
<p>আবারো আমরা সেই হারানো সভ্যতার মত করেই বাংলা সাহিত্যের গৌরব ও ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবো এবং আমাদের আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান ঢাকা কেন্দ্রিক, মসজিদের শহরের রূহকেন্দ্রিক বাংলা ভাষা সাহিত্যের অগ্রযাত্রা নতুন আকারে দীপ্তমান হবে। কারণ আমরা সেই আত্মবিশ্বাসী ও আত্মজাগৃতির এক মহান জাতিসত্তা ধারণকারী মুসলিম উম্মাহ। এজন্য আমাদের এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশাল পথ পাড়ি দিতে হবে, এবং এ লক্ষ্যপানে যাত্রা শুরু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। যে যাত্রার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের পুনরুত্থান কাব্যের পরিভাষাগুলো বর্ণনা করবো। যে বর্ণনার মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র বাংলাদেশের বিস্তৃত জনপদেই নয়, সমগ্র বাংলাভাষী সকল মানুষ তাদের আন্তর্জাতিক দিগন্তরেখায় নতুন এক সূর্যকে উদিত করতে পারবে। এবং আমাদের এই জাগরণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা নিখিল ভারত আবার সেই ইসলামি সভ্যতার, ইসলামী সংস্কৃতির দিকে নতুন করে এগিয়ে যাবে যার মধ্যে দিয়ে আমরা বলতে পারব, মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা &#8216;বাংলা ভাষার&#8217; মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সভ্যতার পুনর্জাগরণের জয়গান রচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তথ্যসূত্র:</p>
<p>১. বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী, ফাহমিদ উর রহমান, মক্তব প্রকাশন, নভেম্বর ২০২১।</p>
<p>২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম এ রহিম, অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, জুন ২০০৮।</p>
<p>৩. প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, দীনেশচন্দ্র সেন, দিব্যপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫।</p>
<p>৪. বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, মুহাম্মদ মতিউর রহমান, ইসলামিক সেন্টার, ফেব্রুয়ারি ২০০২।</p>
<p>৫. বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, মোহাম্মদ আজম, আদর্শ প্রকাশন, মে ২০১৪।</p>
<p>৬.<a href="https://www.rowyakbd.com/bengali-language-in-spreading-islam"> ইসলাম প্রচারে বাংলা ভাষা, সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী, অনুবাদ: মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, রোয়াক ব্লগ।</a></p>
<p>৭. বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নেয়ার ভাবনা, ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16044</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করে</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-society-islam-establishes/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-society-islam-establishes/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইউসুফ আল কারযাভী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 08 Aug 2025 07:47:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16026</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম মানবজাতিকে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি এবং ধর্মপরায়ণ পরিবারের পাশাপাশি ধর্মপরায়ণ সমাজের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সমাজ ঈমান ও পুণ্যের সমাজ, এ সমাজ পরিপূর্ণ ঈমানদারদের সমাজ, যারা বস্তুবাদের বলয় থেকে মুক্ত থাকে, প্রভুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে, একে অপরের সাথে সদাচরণ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম মানবজাতিকে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি এবং ধর্মপরায়ণ পরিবারের পাশাপাশি ধর্মপরায়ণ সমাজের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সমাজ ঈমান ও পুণ্যের সমাজ, এ সমাজ পরিপূর্ণ ঈমানদারদের সমাজ, যারা বস্তুবাদের বলয় থেকে মুক্ত থাকে, প্রভুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে, একে অপরের সাথে সদাচরণ করে এবং আদালত ও পারস্পরিক পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে একে অপরকে উপদেশ দেয়, যেভাবে তাদের পালনকর্তা কোরআনে বর্ণনা করেছেন,</p>
<blockquote><p>فَمَآ أُوتِيتُم مِّن شَىْءٍۢ فَمَتَـٰعُ ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا ۖ وَمَا عِندَ ٱللَّهِ خَيْرٌۭ وَأَبْقَىٰ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ. وَٱلَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَـٰٓئِرَ ٱلْإِثْمِ وَٱلْفَوَٰحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا۟ هُمْ يَغْفِرُونَ. وَٱلَّذِينَ ٱسْتَجَابُوا۟ لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَـٰهُمْ يُنفِقُونَ</p>
<p>“যা-ই তোমাদের দেয়া হয়েছে, তা কেবল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের উপকরণ মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা যেমন উত্তম, তেমনি চিরস্থায়ী। তা সেই সব লোকের জন্য, যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের রবের উপর নির্ভর করে, যারা বড় বড় গুনাহ এবং লজ্জাহীনতার কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ক্রোধ উৎপত্তি হলে ক্ষমা করে, যারা তাদের রবের নির্দেশ মেনে চলে, নামাজ কায়েম করে এবং নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে চালায়, আমি তাদের যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।” (সূরা শুরা : ৩৬-৩৮)</p></blockquote>
<p><strong>ঈমান ও ইবাদতের পরে এ ইসলামী সমাজ যে স্তম্ভগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত, তা হলো,</strong></p>
<p><strong>১. ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা :</strong></p>
<p>ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা মূলত ঈমান বা বিশ্বাসের স্বাভাবিক ফল, যা বিশ্বাসীদেরকে দৃঢ় বিশ্বাসবোধের সাথে পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং ফলশ্রুতিতে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। আল্লাহ বলেন,</p>
<p>إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌۭ</p>
<p>“মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই।” (সূরা হুজুরাত : ১০)</p>
<p>ইতিহাস ও বাস্তবতা উভয়ই প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীতে দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে উঠা ঐক্য বা বন্ধনের মতো সুদৃঢ় কোনো ঐক্যের অস্তিত্ব নেই এবং এক্ষেত্রে ইসলামের মতো কার্যকর কোনো ধর্মবিশ্বাস নেই।</p>
<p>ভ্রাতৃত্বের সবচেয়ে নিচের স্তর হলো নিজের হৃদয়কে হিংসা ও ঘৃণা থেকে মুক্ত রাখা, যে হিংসা ও ঘৃণাকে ‘জাতির রোগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্য কথায় হিংসা ও ঘৃণা হলো চাঁছার যন্ত্র, তবে তা চুলের নয়, বরং ধর্মের! বিশ্বাসের শিকড় যত গভীর হবে, সত্তা, জীবন ও ভ্রাতৃত্বের পাতা, ছায়া ও ফল তত বেশি হবে এবং হৃদয়ও তত বেশি অহংকার থেকে মুক্ত হবে, কারণ এর ফলে মানুষ নেওয়ার চেয়ে দেওয়া এবং অর্জন করার চেয়ে ত্যাগ করতে বেশি আগ্রহী হবে।</p>
<p>হাদীসে এসেছে,<strong>“</strong>তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার মুসলমান ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে।” (আল লুলু ওয়াল মারজান : ২৮১)<br />
<a href=" https://rkmri.co/yTyNMMMpTAey//"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Muslim-zubokder-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত বিকশিত হয়, যতক্ষণ না এটি ব্যক্তিকে পরোপকারের স্তরে উন্নীত করে। সাহাবীদের সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি ছিলো ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা। আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন,</p>
<blockquote><p>وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلْإِيمَـٰنَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِى صُدُورِهِمْ حَاجَةًۭ مِّمَّآ أُوتُوا۟ وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌۭ ۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِۦ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ</p>
<p>“তারা (আনসারগণ) ভালোবাসে সেই সব লোকদের, যারা হিজরত করে তাদের কাছে এসেছে। যা কিছুই তাদের দেয়া হোক না কেন এরা নিজেদের মনে তার কোনো প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করে না এবং যত অভাবগ্রস্তই হোক না কেন নিজেদের চেয়ে অন্যদের অগ্রাধিকার দান করে। মূলত যেসব লোককে তার মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম।” (সূরা হাশর : ০৯)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-size: 1.2em; font-weight: bold;">২. সহানুভূতি এবং অনুগ্রহ :</span></p>
<p>প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের অন্যতম ফলাফল হলো সহানুভূতি এবং অনুগ্রহ। রাসূল (স.) বলেছেন,</p>
<p>“পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ জ্বর ও নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয়।” (বুখারী : ৬০১১)</p>
<p>অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে,</p>
<p>“দয়াশীল ব্যতীত কেউই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ দয়া পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, বরং সকল ক্ষেত্রেই।” (বায়হাকী, জামি আস সাগীর : ৯৯৬১)</p>
<p>দুর্বল, এতিম, অভাবী ও মুসাফিরদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যক। আল কোরআনে এ ধরনের মানুষদের প্রতি রূঢ় আচরণকে অবিশ্বাসী বা ঈমানহীন এবং ধর্মত্যাগীদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>أَرَءَيْتَ ٱلَّذِى يُكَذِّبُ بِٱلدِّينِ. فَذَٰلِكَ ٱلَّذِى يَدُعُّ ٱلْيَتِيمَ. وَلَا يَحُضُّ عَلَىٰ طَعَامِ ٱلْمِسْكِينِ</p>
<p>“তুমি কি তাকে দেখেছো, যে আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তিকে মিথ্যা বলছে? সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয়, এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না।” (সূরা মাউন : ১-৩)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><span style="font-size: 1.2em; font-weight: bold;">৩. সমর্থন এবং সহযোগিতা :</span></p>
<p>সমর্থন এবং সহযোগিতা হলো ভ্রাতৃত্ব এবং সহানুভূতি ও অনুগ্রহের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। ইসলামী সহযোগিতার মানে হলো উদারতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা; অপুণ্য ও শত্রুতা নয়।</p>
<p>আল্লাহ বলেন,</p>
<blockquote><p>وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْبِرِّ وَٱلتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَٰنِ</p>
<p>“নেকী ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদাহ : ০২)</p></blockquote>
<p>এরই ধারাবাহিকতায় ইসলাম সুদ ও একাধিপত্যকে নিষিদ্ধ করেছে, কারণ এসবের মাধ্যমে শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে শোষণ করে।</p>
<p>অধিকন্তু নবী (স.) এ সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরেছেন এই বলে যে,</p>
<p>একজন মুমিন ব্যক্তি অপর মুমিনের জন্য একটি অট্টালিকা সদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে। (আল লুলু ওয়াল মারজান : ১৬৭)</p>
<p>এছাড়াও সমাজের ব্যক্তিদের পারস্পরিক সহযোগিতা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মধ্যকার সহযোগিতা, শাসক ও প্রজাদের মধ্যকার সহযোগিতাও ইসলামী সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে যুলকারনাইন এবং ইয়াজুজ-মাজুজ কর্তৃক হুমকিগ্রস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>قَالُوا۟ يَـٰذَا ٱلْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِى ٱلْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَىٰٓ أَن تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّۭا. قَالَ مَا مَكَّنِّى فِيهِ رَبِّى خَيْرٌۭ فَأَعِينُونِى بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا</p>
<p>“তারা বললো, ‘হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। আমরা কি তোমাকে এ কাজের জন্য কোনো কর দেবো, তুমি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবে?’ সে বললো, ‘আমার রব আমাকে যা কিছু দিয়ে রেখেছেন তাই যথেষ্ট। তোমরা শুধু শ্রম দিয়ে আমাকে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে প্রাচীর নির্মাণ করে দিচ্ছি’।” (সূরা কাহফ : ৯৪-৯৫)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৪. পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সংহতি :</strong></p>
<p>পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং পারস্পরিক সংহতি সে সমাজেই বিদ্যমান, যে সমাজে সামর্থ্যবানরা দুর্বলদেরকে, ধনীরা গরীবদেরকে সাহায্য করে, যে সমাজে অক্ষম ও অভাবীরা অসহায় বোধ করে না। এ সংহতির নূন্যতম মাত্রা হলো ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ যাকাত। যাকাতের তত্ত্বাবধানে আছে বিশ্বাস, মুসলিম জনমত এবং আইন ও সার্বভৌমত্ব। বিশ্বাসের উৎপত্তি হয় একজন মুসলিম ব্যক্তির বিবেক থেকে, মুসলিম জনমতের উৎপত্তি হয় সমাজ থেকে, আইন এবং সার্বভৌমত্বের উৎপত্তি হয় রাষ্ট্র থেকে।</p>
<blockquote><p>خُذْ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ صَدَقَةًۭ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَوٰتَكَ سَكَنٌۭ لَّهُمْ ۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ</p>
<p>“হে নবী! তাদের ধন-সম্পদ থেকে সদকা নিয়ে তাদেরকে পাক পবিত্র করো, (নেকীর পথে) তাদেরকে এগিয়ে দাও এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করো। তোমার দোয়া তাদের সান্ত্বনার কারণ হবে। আল্লাহ‌ সবকিছু শুনেন ও জানেন।” (সূরা তাওবা : ১০৩)</p></blockquote>
<p>যাকাত ছাড়াও একের সম্পত্তির উপর অন্যের আরও কিছু অধিকার রয়েছে, বিশেষ করে প্রতিবেশীর অধিকার। কারণ সমাজের কোনো এক সদস্যের সুসময় ও দুঃসময় উভয় ক্ষেত্রেই গোটা সমাজকে পাশে থাকতে হয়। রাসূল (স.) বলেছেন,</p>
<p>“সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট ভরে খায় আর পাশেই তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।” (আদাবুল মুফরাদ)</p>
<p>ইসলামী সংহতি জীবনের সকল দিককে অন্তর্ভুক্ত করে, হোক তা বস্তুগত বা নৈতিক। অন্য কথায়, এটি একটি জীবন্ত, বৈজ্ঞানিক, পুঁথিগত এবং সামরিক সংহতি। এটি অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যেগুলো সম্পর্কে ড. মুস্তফা আস সিবায়ী এর Socialism of Islam বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৫. পারস্পরিক আলোচনা এবং পরামর্শ :</strong></p>
<p>পারস্পরিক আলোচনা এবং পরামর্শ হলো আক্ষরিক অর্থে সংহতির বৈশিষ্ট্য। এটি প্রত্যেক মুসলমানকে দায়িত্বশীল করে তোলে। মুসলমানরা একে অপরের সাথে পরামর্শ করে, একে অন্যকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয় এবং নিজেরাও অন্যের উপদেশ গ্রহণ করে। আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ সম্পাদনকারী মুসলমানরা কখনোই অন্যায়ভাবে নিজের মতো প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। এটি ইসলামের অন্যতম নীতি, নাজাতের শর্ত।</p>
<p>কোরআনে বলা হয়েছে,</p>
<p>وَٱلْعَصْرِ. إِنَّ ٱلْإِنسَـٰنَ لَفِى خُسْرٍ. إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلْحَقِّ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلصَّبْرِ</p>
<p>“সময়ের কসম। মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে।” (সূরা আসর : ১-৩)</p>
<blockquote><p>وَٱلْمُؤْمِنُونَ وَٱلْمُؤْمِنَـٰتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍۢ ۚ يَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ</p>
<p>“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। এরা ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা তাওবা : ৭১)</p></blockquote>
<p>হাদিসে বলা হয়েছে,</p>
<p>&#8220;কল্যাণ কামনা করাই ধর্ম।&#8221; (মুসলিম)</p>
<p>অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে,</p>
<p>“মুমিনরা পরস্পরের আয়না স্বরূপ।” (জামিউস সগীর)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৬. ইসলাহ এবং উন্নয়ন :</strong></p>
<p>মুসলিম সমাজ একটি মুসলিহ সমাজ যা তার ব্যক্তিদেরকে সংস্কার, শালীনতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যতা, পবিত্রতা সম্পর্কে শিক্ষা দেয় এবং গোপন বা প্রকাশ্য সকল প্রকার জঘন্য কাজকে নিষিদ্ধ করে। এটি মদ এবং জুয়াকে শয়তানের কাজ এবং নিষিদ্ধ হিসেবে অভিহিত করে। ইসলাম আরও নির্দেশ দেয় যে, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং গোপনাঙ্গের হেফাজত করে। ইসলাম কথা বলার ক্ষেত্রে, হাঁটা বা চলাফেরায় ক্ষেত্রে নগ্নতা পরিহার করার নির্দেশ দেয়।</p>
<p>যাই হোক, মুসলিম সমাজ ফেরেশতাদের সমাজ নয়, মানুষের সমাজ। আর মানুষের ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ইসলাম বলে, কেউ যদি পাপ করে, তবে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে, প্রদর্শন না করে বা তা নিয়ে অহংকার না করে। এটি করলে তার পাপের প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে এবং অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে যাবে না। অতঃপর সে যেন তাওবা করে।</p>
<p>إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلْمُتَطَهِّرِينَ</p>
<p>“আল্লাহ‌ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে ও পবিত্রতা অবলম্বন করে।” (সূরা বাকারা : ২২২)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৭. আদালত :</strong></p>
<p>আদালত তথা ন্যায়বিচার মানুষের জীবনের সকল বিষয়ের সাথে জড়িত, তাই আদালত বাধ্যতামূলক এবং অন্যায় নিষিদ্ধ।<br />
<a href="https://rkmri.co/Ayo3AM0NemMe/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Agami-diner-sovvota-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>হাদীসে এসেছে,</p>
<p>“হে আমার বান্দাগণ, আমি নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের উপরেও হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না।” (মুসলিম)</p>
<p>আদালত এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারও অন্তর্ভুক্ত, যা সেসব প্রভাবশালীদের বিরোধিতা করে, যারা গরীবের রক্ত চুষে খায়। আদালত ধনীদের অন্যায় আধিপত্যের অবসান ঘটায় এবং যাকাতের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তিতে দরিদ্রদের অধিকার প্রদান করে দরিদ্রদের মান বৃদ্ধি করে। এটি আইন ও বিচারকার্যের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে, এমনকি খলিফা বা তার সন্তানরা অন্যায় করলে তাদেরকেও সমানভাবে শাস্তি দেওয়া হয়।</p>
<p>রাসূল (স.) বলেছেন,</p>
<p><strong>“আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করতো, আমি তাঁর হাত কেটে দিতাম!” (মুসলিম)</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৮. প্রগতিশীল সমাজ :</strong></p>
<p>ইসলাম যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি প্রগতিশীল সমাজ এবং কোনো অনুন্নত সমাজ নয়। এ বিষয়টির কিছু ব্যাখ্যা প্রয়োজন, কারণ ‘প্রগতি’ শব্দটি অনেক ব্যাখ্যার দাবিদার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে দাবি করে। তারা আরও অভিযোগ করে যে, মুসলিম সমাজ, যেটিকে তারা ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে অভিহিত করে, তা অনুন্নত। তদুপরি, চাটুকারিতার ছলে তারা মুসলিম দেশগুলোকে ‘অনুন্নত’ না বলে ‘উন্নয়নশীল’ হিসেবে অভিহিত করে। সত্যি বলতে, আমাদের প্রগতিশীলতার ব্যাপারে আমাদের মনোভাব, অন্য কথায়, এ ব্যাপারে ইসলামের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত। এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদেরকে প্রথমে প্রগতির ধারণাটি সংজ্ঞায়িত করতে হবে, কারণ কেউ কখনো কোনো বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দিতে পারে না, যদি না সে এটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা রাখে। সহজ কথায়, প্রগতি বা অগ্রগতি মানে অন্যের আগে বা সামনে থাকা। এটির বিপরীত হলো অনগ্রসরতা বা অনুন্নয়ন, যার অর্থ অন্যদের থেকে পিছিয়ে থাকা। অগ্রগতি বা পশ্চাৎপদতা আপেক্ষিক, কারণ পিছিয়ে থাকা বা বিপরীতে থাকা ব্যক্তির প্রেক্ষিতেই আপনাকে এগিয়ে হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> কাজী সালমা বিনতে সলিম।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-society-islam-establishes/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16026</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বড়র পিরীতি বালির বাঁধ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী নজরুল ইসলাম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Jul 2025 12:16:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15968</guid>

					<description><![CDATA[তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদী। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।… এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন- আবার কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদী। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।… এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন- আবার কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করেছেন।</p>
<p>আমার পাশেই দাঁড়য়েছিলেন আরো দু’একটি কাব্য-বাতিকগ্রস্ত রাজ-কয়েদী। আমার চেয়েও বেশী হেঁসেছিলেন সেদিন তাঁরা। আনন্দে নয়, যা নয় তাই শুনে।</p>
<p>কিন্তু ঐ আজগুবী গল্পও সত্য হয়ে গেল। বিশ্বকবি সত্যি সত্যিই আমার ললাটে ‘অলক্ষণের তিলক-রেখা’ এঁকে দিলেন।</p>
<p>অলক্ষণের তিলক-রেখাই বটে! কারণ এর পর থেকে আমার অতি অন্তরঙ্গ রাজবন্দী বন্ধুরাও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন। যাঁরা এতদিন আমার এক লেখাকে দশবার করে প্রশংসা করেছেন, তারাই পরে সেই লেখার পনের বার করে নিন্দা করলেন। আমার হয়ে গেল বরে শাপ!</p>
<p>জেলের ভিতর থেকেই শুনতে পেলাম, বাইরেও একটা বিপুল ঈর্ষা-সিন্ধু ফেনায়িত হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস হ’ল না। বিশেষ করে যখন শুনলাম, আমারি অগ্রজপ্রতিম কোন কবিবন্ধু সেই সিন্ধু-মন্থনের অসুর-পক্ষ লীড্‌ করছেন। আমার প্রতি তাঁর অফুরন্ত স্নেহ, অপরিসীম ভালবাসার কথা শুধু যে আমরা দুজনেই জানতাম তা নয়, দেশের সকলেই জানত তাঁর গদ্যে-পদ্যে কীর্তিত আমার মহিমা-গানের ঘটা দেখে।</p>
<p>সত্য-সুন্দরের পূজারী বলে যাঁরা হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে বেড়ান, তাঁদের মনও ঈর্ষায় কালো হয়ে ওঠে, শুনলে আর দুঃখ রাখবার জায়গা থাকে না।</p>
<p>এ খবর শুনে চোখের জল আমার চোখেই শুকিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম শুধু আমি- বাইরের এই লাভে অন্তরের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার। মনে মনে কেঁদে বল্‌লাম, হায় গুরুদেব! কেন আমার এত বড় ক্ষতিটা করলে!</p>
<p>বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন ক’রে ভক্ত তার ইষ্টদেবকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধুপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্রা-বিদ্রুপ করেছেন।</p>
<p>এমন কি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্র-বিদ্বেষী কোন একজনের মাথার চাঁদিতে আজও অক্ষয় হয়ে লেখা আছে এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।</p>
<p>আমার পরম শ্রদ্ধেয় কবি ও কথাশিল্পী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন কবির সামনেই এ কথা ফাঁস করে দিলেন। কবি হেঁসে বললেন, যাক, আমার আর ভয় নেই তাহলে।</p>
<p>তারপর কতদিন দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে। নিজের লেখা দু’চারটে কবিতা গানও শুনিয়েছি, অবশ্য কবির অনুরোধেই এবং আমার অতি সৌভাগ্যবশত তাঁর অতি প্রশসংসা লাভও করেছি কবির কাছ থেকে। সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় কোনদিন এতটুকু প্রাণের দৈন্য বা মন-রাখা ভাল-বলবার চেষ্টা দেখিনি।</p>
<p>সষ্কোচে দূরে গিয়ে বসলে সস্নেহে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। মনে হয়েছে, আমার পূজা সার্থক হ’ল, আমি বর পেয়ে গেলাম।</p>
<p><strong>অনেক দিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে গিয়ে থাকবার কথা বলেছেন। হতভাগা আমি, তাঁর পায়ের তলায় বসে মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না। বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।</strong></p>
<p><strong>এই নিয়ে কতদিন তিনি আমায় কতভাবে অনুযোগ করেছেন, তুমি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচ্‌ছ- তোমাকে জন-সাধারণ একবারে খানায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে- ইত্যাদি।</strong></p>
<p>আমি দেখেছি, এ গৌরবে আমার মুখ যত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কোনো কোনো নাম-করা কবির মুখে কে যেন তত কালি ঢেলে দিয়েছেন। ক্রমে ক্রমে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু শুভানুধ্যায়ীরাই এমনি করে শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন। আজ তিন চার বছর ধরে এই শুভানুধ্যায়ীরা গালি-গালাজ করেছেন আমায়, তবু তাঁদের মনের ঝাল বা প্রাণের খেদ্‌ মিটল না। বাপ রে বাপ! মানুষের গা’ল দেবার ভাষা ও তার এত কস্‌রতও থাকতে পারে, এ আমার জানা ছিল না।</p>
<p>ফি শনিবারে চিঠি! এবং তাতে সে কী গাড়োয়ানী রসিকতা, আর মেছোহাটা থেকে টুকে-আনা গালি! এই গালির গালিচাতে বোধ হয় আমি এ-কালের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ শাহানশাহ্‌।</p>
<p>বাংলায় রেকর্ড হয়ে রইল আমায় দেওয়া এই গালির স্তূপ। কোথায় লাগে ধাপার মাঠ! ফি হপ্তায় মেল (ধাপা-মেল) বোঝাই। কিন্তু এত নিন্দাও সয়েছিল। এতদিন তবু সান্ত্বনা ছিল যে, এ হচ্ছে তন্তুবায়ের বলীবর্দ ক্রয়ের অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া। বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া-রোগ-এ স্বদেশ-প্রেমের বাই উঠল। কোথায় তুই হাঁ করে খাবি গুলবদনীর গুলিস্তানে মলয় হাওয়া, দেখবি ফুলের হাই-তোলা, গাইবি ‘আয় লো অলি কুসুম-কলি’ গান, -তা না ক’রে দিতে গেলি রাজার পেছনে খোঁচা! গেলি জেলে, টানলি ঘানি, করলি প্রয়োপবেশন, পরলি শিকল-বেড়ী, ডান্ডাবেড়ী, বইগুলোকে একধার থেকে করাতে লাগলি বাজেয়াপ্ত, এ কোন্‌ রকম রসিকতা তোর? কেনই বা এ হ্যাঙ্গাম-হুজ্জুৎ!</p>
<p>হঠাৎ একদিন দেখি ঝড় উঠেছে সাহিত্যের বেণু-বনে এবং দেখতে দেখতে সুরের বাঁশী অসুরের কোঁৎকা হয়ে উঠেছে! ছুট ছুট! যত মোলায়েম ক’রেই বেণু-বন বলি না কেন, তাতে ঝড় উঠলে যে তা চিরন্তন বাঁশ-বনই হয়ে ওঠে, তা কোন্‌ পাষণ্ড অবিশ্বাস করবে!</p>
<p>বেচারী তরুণ সাহিত্য! যেন বালক অভিমন্যুকে মারতে সপ্ত মহারথীর সমাবেশ! বাইরে ছেলেমেয়ের ভিড় জমে গেল! ঘন ঘন হাততালি! বলে, ‘এই! বাঁশ-বাজি দেখতে যাবি, দৌড়ে আয়।’ কিন্তু, শুধুই কি সপ্ত মহারথীর মার! তাঁদের পেছনের পদাতিকগুলি যে আরো ভীষণ। ধূলো কাদা গোবর মাটি- কোনো রুচির বাছ-বিচার নাই, বেপরোয়া ছুঁড়ে চলেছে।</p>
<p>মহারথীদের মারে অমর্যাদা নেই, কিন্তু বাইরে থেকে আনা ঐ ভাড়াটে গুণ্ডাগুলোর নোংরামীতে সাহিত্যের বেনুবন যে পুকুর-পাড়ের বাঁশবাগান হয়ে উঠল!</p>
<p><strong>পুলিশের জুলুম আমার গা-সওয়া হয়ে গেছে। ওদের জুলুমের তবু একটা সীমারেখা আছে। কিন্তু সাহিত্যিক যদি জুলুম করতে শুরু করে, তার আর পারাপার নেই। এরা তখন হয়ে ওঠে টিক্‌টিকি পুলিশের চেয়েও ক্রূর, অভদ্র। যেন চাক-ভাঙ্গা ভীমরুল। জলে ডুবেও নিষ্কৃতি নেই, সেখানে গিয়েও দংশন করবে।</strong></p>
<p>পলিটিক্সের পাঁকের ভয়ে পালিয়ে গেলাম নাগালের বাইরে। মনে করলাম, যাক, এতদিনে একবার প্রাণ ভ’রে সাহিত্যের নির্মল বায়ু সেবন ক’রে অতীতের গ্লানি কাটিয়ে উঠব। ও বাবা! সাহিত্যের আসর যে পলিটিক্যাল আখড়ার চেয়েও নোংরা তা কে জানত!</p>
<p>কপাল, কপাল! পালিয়েও কি পার আছে? হঠাৎ একদিন সপ্ত-রথীর সপ্ত প্রহরণে চকিত হয়ে উঠলাম। ব্যাপার কি!</p>
<p>জানতে পালাম, আমার অপরাধ, আমি তরুণ! তরুণেরা নাকি আমায় ভালবাসে, তা’রা আমার লেখার ভক্ত। সভয়ে প্রশ্ন করলাম, আজ্ঞে, এতে আমার অপরাধটা কিসের হ’ল?</p>
<p>বহু কণ্ঠের হুঙ্কার উঠলো, ঐটেই তোমার অপরাধ, তুমি তরুণ এবং তরুণেরা তোমায় নিয়ে নাচে।</p>
<p>বললাম, আপাততঃ আপনাদের ভয়ে আজই তো বুড়ো হয়ে যেতে পারছিনে। ওর জন্য দু-দশ বছর মার খেয়েই অপেক্ষা করতে হবে। আর, যারা আমায় নিয়ে নাচে, আপনারাও তাদের নাচিয়ে ছেড়ে দিন। গোল চুকে যাবে। আমায় নিয়ে কেন টানাটানি!</p>
<p>আবার নেপথ্যে শোনা গেল, তুমি এই জ্যাঠা অভিমন্যুর পৃষ্ঠরক্ষী। তোমাকে মারতে পারলেই একে কতল করতে দেরী লাগবে না।</p>
<p>দেখাই যাক।…</p>
<p>এতদিন আমি উপেক্ষাবশতঃই এ ধোঁওয়া ছাড়িনি- না উনুনের, না সিগারেটের, ভেবেছিলাম, সম্রাটে সম্রাটে যুদ্ধ, দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেই ভাল। কিন্তু হাতিতে হাতিতে লড়াই হলেও নলখাগড়ার নিস্তার নাই দেখছি। কাজেই, আমাদেরও এবার আত্মরক্ষা করতে হবে। প’ড়ে প’ড়ে মার খাওয়ায় কোন পৌরুষ নেই।</p>
<p>পলিটিক্সের পাঁককে যাঁরা এতদিন ঘৃণা ক’রে এসেছেন, বেণু-বনের বাঁশের প্রতি তাঁদের এই আকস্মিক আসক্তি দেখে আমারই লজ্জা করছে- বাইরের লোক কি বলছে তা না-ই বললাম।</p>
<p>এ-বাঁশ ছোঁড়ারও তারিফ করতে হবে। কোনো বিশেষ একজনের শির লক্ষ্য করে না ছু’ড়ে এঁরা ছুঁড়ছেন একেবারে দল লক্ষ্য করে। কারণ, তাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার লজ্জা নেই। বীর বটে! এতদিন তাই পরাস্ত মেনেই চুপ ক’রে ছিলাম। কিন্তু ঐ চুপ করে থাকি বলেই ও-পক্ষ মনে করেন, আমরা জিতে গেলাম। তাই এবার মাথা বেছে বেছেই বাঁশ ছোড়া হচ্ছে- বাণ নয়।</p>
<p>অবশ্য, সে বাঁশে বাঁশীর মত গোটাকতক ফুটো ক’রে সুর ফোটাবার আয়াসেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তবু তার খোঁচা আর স্থলত্বই বলে, ও বাঁশী নয়- বাঁশ।</p>
<p>বীণাই শোভা পায় যাঁর হাতে, তাঁকেও লাঠি ঘুরাতে দেখলে দুঃখও হয়, হাঁসিও পায়। পালোয়ানী মাতামাতিতে কে যে কম যান, তা ত বলা দুষ্কর।…</p>
<p>আজকের ‘বাঙ্গলার কথা’য় দেখলাম- যিনি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের পক্ষ হয়ে পঞ্চ পাণ্ডবকে লাঞ্ছিত করবার সৈনাপত্য গ্রহণ করেছেন, আমাদের উভয় পক্ষের পূজ্য পিতামহ ভীষ্ম-সম সেই মহারথী কবি-গুরু এই অভিমন্যুবধে সায় দিয়েছেন। মহাভারতের ভীষ্ম এই অন্যায় যুদ্ধে সায় দেননি, বৃহত্তর ভারতের ভীষ্ম সায় দিয়েছেন- এইটেই এ যুগের পক্ষে সবচেয়ে পীড়াদায়ক।</p>
<p>এই অভিমন্যুর রক্ষী মনে ক’রে কবিগুরু আমায়ও বাণ নিক্ষেপ করতে ছাড়েন নি। তিনি বলেছেন, আমি কথায় কথায় ‘রক্ত’কে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি।</p>
<p>কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপী-পায়জামা পরেন, অথচ আমরা পরলেই তাঁর এত আক্রোশের কারণ হয়ে উঠি কেন, বুঝতে পারিনে।</p>
<p>এই আরবী-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।</p>
<p><strong>আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ ক’</strong><strong>রে আসছি। সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানী-টুপী ব্যবহার করেন, এমন কি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ওরিয়েন্টাল। কিন্তু ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তাঁরা হ’</strong><strong>য়ে যায় ‘</strong><strong>মিঞা সাহেব’</strong><strong>।</strong> মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুস্কিল- তবু ও নিয়ে ঠাট্রা বিদ্রূপের আর অন্ত নেই।</p>
<p>আমি ত টুপী পায়জামা শেরওয়ানী দাড়িকে বর্জন ক’রে চলেছি শুধু ঐ &#8216;মিঞা সাহেব’ বিদ্রূপের ভয়ে- তবুও নিস্তার নেই।</p>
<p>এইবার থেকে আদালতকে না হয় বিচারালয় বলব, কিন্তু নাজির পেশ্‌কার উকিল মোক্তারকে কী বলব?</p>
<p>কবি-গুরুর চিরন্তনের দোহাই নিতান্ত অচল। তিনি ইটালীকে উদ্দেশ ক’রে এক কবিতা লিখেছেন। তাতে- ‘উতারো ঘোম্‌টা’ তাঁকেও ব্যবহার করতে দেখেছি। ঘোম্‌টা-খোলা শোনাই আমাদের চিরন্তন অভ্যাস। ‘উতারো ঘোম্‌টা’ আমি লিখলে হয়ত সাহিত্যিকদের কাছে অপরাধীই হতাম। কিন্তু ‘উতারো’ কথাটা যে জাতেরই হোক, ওতে এক অপূর্ব সঙ্গীত ও শ্রীর উদ্বোধন হয়েছে ও-জায়গাটায়, তা ত কেউ অস্বীকার করবে না। ঐ একটু ভালো-শোনাবার লোভেই, ঐ একটি ভিন দেশী কথার প্রয়োগে অপূর্ব রূপ ও গতি দেওয়ার আনন্দেই আমিও আরবী-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করি। কবি-গুরুও কতদিন আলাপ-আলোচনায় এর সার্থকতার প্রশংসা করেছেন।</p>
<p><strong>আজ আমাদেরও মনে হচ্ছে, আজকের রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই চির-চেনা রবীন্দ্রনাথ নন। তাঁর পেছনের বৈয়াকরণ পণ্ডিত এসব বলাচ্ছে তাঁকে দিয়ে।</strong></p>
<p><strong>খুন্‌’ আমি ব্যবহার করি আমার কবিতায়, মুসলমানী বা বলশেভিকী রং দেওয়ার জন্য নয়। হয়ত কবি ও-দুটোর একটারও রং আজকাল পছন্দ করছেন না, তাই এত আক্ষেপ তাঁর।</strong></p>
<p>আমি শুধু ‘খুন্‌’ নয়- বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবী-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায়। আমার দিক থেকে ওর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীরও একটা মুসলমানী ঢং আছে। ও-সাজে তাঁর শ্রীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। স্বার্গীয় অজিত চক্রবর্তীও এ-ঢংএর ভূয়সী প্রশংসা ক’রে গেছেন। বাঙলা কাব্য-লক্ষ্মীকে দুটো ইরানী ‘জেওর’ পরালে তাঁর জাত যায় না, বরং তাঁকে আরও ‘খুবসুরত’ই দেখায়।</p>
<p>আজকের করা-রক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই ত মুসলমানী ঢং-এর। বাইরের এ ফর্মের প্রয়োজন ও সৌকুমার্য সকল শিল্পীই স্বীকার করেন। পণ্ডিত মালবিয়া স্বীকার করতে না পারেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথ স্বীকার করবেন।</p>
<p>তা ছাড়া যে ‘খুনে’র জন্য কবি-গুরু রাগ করেছেন, তা দিনরাত ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের কথায়, কালার বক্সে (colour box-এ) এবং তা খুন-করা, খুন-হওয়া ইত্যাদি খুনোখুনি ব্যাপারেই নয়। হৃদয়েরও ‘খুন-খারাবী’ হ’তে দেখি আজো এবং তা শুধু মুসলমান-পাড়া লেনেই হয় না। আমার একটা গানে আছে-</p>
<p><strong>‘উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’</strong></p>
<p><strong>এই গানটি সেদিন কবি-গুরুকে দুর্ভাগ্যক্রমে শুনিয়ে ফেলেছিলাম এবং এতেই হয়তো তাঁর ও কথার উল্লেখ। তিনি রক্তের পক্ষপাতী। অর্থাৎ ও লাইনটাকে ‘উদিবে সে রবি মোদেরি রক্তে রাঙিয়া পূর্নবার&#8217;ও করা চল্‌ত।</strong> চল্‌ত, কিন্তু ওতে ওর অর্ধেক ফোর্স কমে যেত। আমি যেখানে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহার করেছি, সে ঐরকম ন্যাশনাল সঙ্গীতে বা রুদ্ররসের কবিতায়। যেখানে ‘রক্তধারা’ লিখবার, সেখানে জোর করে খুনধারা লিখি নাই। তাই বলে রক্ত-খারাবীও লিখি নাই, হয় রক্তারক্তি, না হয় খুন-খারাবী লিখেছি।</p>
<p>কবিগুরু মনে করেন, রক্তের মানেটা আরো ব্যাপক। ওটা প্রেমের কবিতাতেও চলে। চলে, কিন্তু তখন ওতে রাগ মেশাতে হয়। প্রিয়ার গালে যেমন ‘খুন’ ফোটে না, তেমনি রক্তও ফোটে না- নেহাৎ দাঁত না ফুটালে। প্রিয়ার সাথে খুনা-খুনি খেলি না, কিন্তু খুন-সুড়ি হয়ত করি।</p>
<p>কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর আচকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে, ফুল-বনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুল্‌বুলির সুর।</p>
<p>এতেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল যাঁরা মনে করেন, তাঁরা সাহিত্য সভায় ভিড় না ক’রে হিন্দু-সভারই মেম্বার হন গিয়ে।</p>
<p>যে কবিগুরু অভিধান ছাড়া নূতন নূতন শব্দ সৃষ্টি করে ভাবীকালের জন্য আরো তিনটে অভিধানের সঞ্চয় রেখে গেলেন, তাঁর এই নূতন শব্দ-ভীতি দেখে আমরা বিস্মিত হই। মনে হয়, তাঁর আক্রোশের পেছনে অনেক কেহ এবং অনেক কিছু আছে। আরো মনে হয়, আমার শত্রু সাহিত্যকগণের অনেক দিনের অনেক মিথ্যা অভিযোগ জমে জমে ওঁর মনকে বিষিয়ে তুলেছে। নৈলে আরবী-ফার্সি শব্দের মোহ ত আমার আজকের নয়; এবং কবি-গুরুর সাথে আমার বা আমার কবিতার পরিচয়ও আজকের নয়। কই, এতদিন ত কোনো কথা উঠল না এ নিয়ে।</p>
<p>সবচেয়ে দুঃখ হয়, যখন দেখি কতকগুলো জোনাকিপোকা রবিলোকের বহু নিম্নে থেকেও কবিত্বের আস্ফালন করে। ভক্ত কি শুধু ঐ নোংরা লোকগুলোই, যারা রাত-দিন তাঁর কানের কাছে অন্যের কুৎসা গেয়ে তাঁর শান্ত সুন্দর মনকে নিরন্তন বিক্ষুব্ধ ক’রে তুলছে? আর, আমরা তাঁর কাছে ঘন ঘন যাইনে বলেই হয়ে গেলাম তাঁর শত্রু।</p>
<p>কবি-গুরুর কাছে প্রার্থনা, ঐ দৃতরাষ্ট্রের সেনাপতিত্ব তিনি করুন, দুঃখ নাই। কিন্তু ওদের প্ররোচনায় আমাদের প্রতি অহেতুক সন্দেহ পোষণ ক’রে যেন তাঁর মহিমাকে খর্ব না করেন।</p>
<p>সবচেয়ে কাছে যারা থাকে, দেব-মন্দিরের সেই পাণ্ডারাই দেবতার সবচেয়ে বড় ভক্ত নয়।</p>
<p>আরো একটা কথা। যেটা সম্বন্ধে কবি-গুরুর একটা খোলা কথা শুনতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য ক’রে ওঁর আজকালকার লেখাগুলোর সুর শুনে মনে হয়, আমাদের অভিশপ্ত জীবনের দারিদ্র্য নিয়েও যেন তিনি বিদ্রূপ করতে শুরু করেছেন।</p>
<p>আমাদের এই দুঃখকে কৃত্রিম বলে সন্দেহ করবার প্রচুর ঐশ্বর্য তাঁর আছে, জানি এবং এও জানি, তিনি জগতের সবচেয়ে বড় দুঃখ ঐ দারিদ্র ব্যতীত হয়ত আর সব দুঃখের সাথেই অল্প-বিস্তর পরিচিত। তাই এতে ব্যথা পেলেও রাগ করিনে।</p>
<p><strong>কি ভীষণ দারিদ্রর সঙ্গে সংগ্রাম করে অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটিয়ে আমাদের নতুন লেখকদের বেঁচে থাকতে হয়- লক্ষ্মীর কৃপায় কবি-গুরু কোনদিন আমাদের মত সাহিত্যিকের কুটীরে পদার্পণ করেন নি- হয়ত তাঁর মহিমা ক্ষুণ্ন হ’ত না তাতে- নৈলে দেখতে পেতেন, আমাদের জীবন-যাত্রার দৈন্য কত ভীষণ। এই দীন মলিন বেশ নিয়ে আমরা আছি দেশের একটেরে আত্মগোপন ক’রে। দেশে দেশে প্রোপাগাণ্ডা করা ত দূরের কথা, বাড়ী ছেড়ে পতে দাঁড়াতেও লজ্জা করে।</strong> কিছুতেই ছেঁড়া জামার তালিগুলোকে লুকাতে পারিনে। ভদ্র শিক্ষিতদের মাঝে ব’সে সর্বদাই মন খুঁত খুঁত করে, যেন কত বড় অপরাধ ক’রে ফেলেছি! বাইরের দৈন্য অভাব যত ভিতরে ভিতরে চাবকাতে থাকে, তত মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে।</p>
<p>কবি-গুরুর কাছেও শুধু ঐ দীনতার লজ্জাতেই যেতে পারিনে। ভয় হয়, এ লক্ষ্ণীছাড়া মূর্তি দেখে তাঁর দারোয়ানেরাই ঐ সুর-সভায় প্রবেশ করতে দেবে না। দীন ভক্ত তীর্থ যাত্রা করতে পারল না বলে দেবতা যদি অভিশাপ দেন, তা হ’লে এই পোড়া কপালকে দোষ দেওয়া ছাড়া কীই বা বলবার আছে!</p>
<p>তাঁর কাছে নিবেদন, তিনি যত ইচ্ছা বাণ নিক্ষেপ করুন, তা হয়ত সইবে, কিন্তু আমাদের একান্ত-আপনার এই দারিদ্র্য-যন্ত্রণাকে উপহাস করে যেন আর কাটাঘায়ে নুনের ছিটে না দেন। শুধু ঐ নির্মমতাটাই সইবে না।</p>
<p>কবি-গুরুর চরণে ভক্তের আর একটি সশ্রদ্ধ আবেদন- যদি আমাদের দোষত্রুটি হয়েই থাকে, গুরুর অধিকারে সস্নেহে তা দেখিয়ে দিন, আমরা শ্রদ্ধাবনত শিরে তাকে মেনে নিব। কিন্তু যারা শুধু কুৎসিৎ বিদ্রূপ আর গালিগালাজই করতে শিখেছে, তাঁকে তাদেরি বাহন হ’তে দেখলে আমাদের মাথা লজ্জায় বেদনায় আপনি হেঁট হয়ে যায়। বিশ্বকবি-সম্রাটের আসন-রবিলোক- কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির বহু ঊর্ধ্বে।</p>
<p>কথাসাহিত্য-সম্রাট শরৎচন্দ্র শনিবারের চিঠিওয়ালাদের কাছে আমায় গালিই দেন আর যাই করুন, (জানি না, এ সংবাদ সত্য কিনা) ঐ দারিদ্র্রটুকুর অসম্মান তিনি করতে পারেন নি। অসহায় মানুষের দুঃখ-বেদনাকে তিনি এত বড় কঁরে দেখেছেন বলেই আজ তাঁর আসন রবি-লোকের কাছাকাছি গিয়ে উঠেছে।</p>
<p>একদিন কথাশিল্পী সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম যে, শরৎচন্দ্র তাঁর বই-এর সমস্ত আয় দিয়ে পথের কুকুর’দের জন্য একটা মঠ তেরী ক’রে যাবেন। খেতে না পেয়ে পথে পথে ঘু’রে বেড়ায় যে সব হন্যে কুকুর, তারা আহার ও বাসস্থান পাবে ঐ মঠে- ফ্রি অব্ চার্জ। শরৎচন্দ্র নাকি জানতে পেরেছেন, ঐ সমস্ত পথের কুকুর পূর্বজন্মে সাহিত্যিক ছিল, ম’রে কুকুর হয়েছে। শুনলাম, ঐ মর্মে নাকি উইলও হয়ে গেছে।</p>
<p>ঐ গল্প শুনে আমি বারংবার শরৎচন্দ্রের উদ্দেশে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম ক’রে বলেছিলাম, ‘শরৎদা সত্যিই একজন মহাপুরুষ সত্যিই আমরা- সাহিত্যিকরা কুকুরের জাত। কুকুরের মতই আমরা না খেয়ে এবং কামড়া-কামড়ি ক’রে মরি। তাঁর সত্যিকার অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি আছে, তিনি সাহিত্যিকদের অবতার-রূপ দেখতে পেয়েছেন।’</p>
<p>আজ তাই একটি মাত্র প্রার্থনা, যদি পরজন্ম থাকেই, তবে আর যেন এদেশে কবি হয়ে না জন্মাই। যদি আসি, বরং শরৎচন্দ্রের মাঠের কুকুর হয়েই আসি যেন। নিশ্চিন্তে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচব।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15968</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে মুসলিম ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 14 Jul 2025 15:09:15 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15916</guid>

					<description><![CDATA[এক. আরবী ভাষায় একটা কথা আছে, উকুলুন না-সি আ&#8217;লা কদরি যামানিহিম। যার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতেই একজন মানুষের আকল ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়। জীবন চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন একেবারে স্বাভাবিকভাবেই এই কথাটি সত্য, সুদূর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>আরবী ভাষায় একটা কথা আছে, উকুলুন না-সি আ&#8217;লা কদরি যামানিহিম। যার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতেই একজন মানুষের আকল ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়। জীবন চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন একেবারে স্বাভাবিকভাবেই এই কথাটি সত্য, সুদূর অতীত থেকেই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তেমনি এই কথাটি সত্য। অতএব, কোনো একজন ব্যক্তি যখন অতীতকে কলমের ডগায় ফুটিয়ে তুলবেন, তখন সেই ব্যক্তির আশপাশ এবং তার চিন্তাভাবনা অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি উদার মনের হন তাহলে এক দৃষ্টিকোণ থেকে অতীতকে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করবেন, আর যদি তার পূর্বের সকল ধর্ম ও মতের উপর সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা না থাকে তাহলে তিনি একপেশে ইতিহাস চর্চা করবেন।</p>
<p>উপমহাদেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এই কথাটি একেবারে পুরোপুরি সত্য। উপমহাদেশের ইতিহাসে মুসলিমদের আগমনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। মুসলিম আগমনের পূর্বের ইতিহাসের চেয়ে পরবর্তী ইতিহাস শতগুণে সমৃদ্ধশালী। কিন্তু, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও ইতিহাস চর্চায় এই সমৃদ্ধশীল ইতিহাস বরাবরই কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে।</p>
<p>মুসলিমদের সমৃদ্ধশীল ইতিহাস হারিয়ে যাবার কারণ অন্য কোনো কিছু নয়, বরং ভারতীয় দাদাবাবুদের একপেশে ইতিহাস চর্চা, যা বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রসারের সাথেসাথে কলকাতার বর্ণহিন্দুদের ইতিহাস চর্চাও আমাদের মাঝে প্রবেশ করে। কারণ, ভারতের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে তারা ধরেই নেয় যে, ভারতের ইতিহাসের অর্থই হচ্ছে হিন্দুদের ইতিহাস, এখানে মুসলিমদের ঠাঁই দেওয়া উচিত না; কারণ মুসলিমরা বহিরাগত আর তারা আর্য। অবাক করার বিষয় হলো, বঙ্গভঙ্গ রদের বিপরীতে বাংলার মুসলিমদেরকে দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার স্বয়ং ঢাকার মাটিতে বসেই এই ধারার ইতিহাস চর্চা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>এইযে, ইতিহাস চর্চার এই ধারা, এর সূচনাটা করে দিয়েছে ইংরেজরা। ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের সবচেয়ে বহুল প্রসিদ্ধ নীতি—‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসিকে ব্রিটিশরা সমগ্র বিশ্বেই বাস্তবায়ন করেছে। আজকের ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার শুরুটা তারা এই নীতির উপর ভিত্তি করেই করেছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসন করার জন্য তারাই হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা করেছিলো। এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করেছে তাদের ব্রিটিশ বুদ্ধিকে। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা করতে তারা ব্যবহার করেছে ইতিহাসকে, ঠিক যেমনভাবে মিশরীয়দেরকে অতীতের কথা স্বরণ করিয়ে দিয়ে উসমানীয় এবং আরবদের থেকে আলাদা করেছিলো।</p>
<p>উপমহাদেশের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই কাজটা করেছে ম্যাক্স মুলার। ম্যাক্স মুলার প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ইরান থেকে আর্যদের একটি দল ইউরোপে গিয়েছিলো, যারাই সেসময় সমগ্র পৃথিবীতে বাণিজ্য করছিলো। আরেকটি দল ভারতীয় উপমহাদেশে চলে আসে, তারাই পরবর্তীতে হিন্দু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর মুসলিমরা এই ভূমির কেউ না, মাত্র কয়েকশ বছর আগে বাহির থেকে এসে হিন্দুদের উপর চেপে বসেছে। যদিও আজকের আধুনিক ইতিহাসবেত্তারা ম্যাক্স মুলারের এই তত্ত্বকে তথ্য-প্রমাণ দিয়েই খণ্ডন করেছেন।</p>
<p>ম্যাক্স মুলারের এমন তত্ত্বের পাশাপাশি ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠা করে দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি-র মতো প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই প্রকাশিত হওয়া প্রথমদিকের একটি গ্রন্থ হচ্ছে কর্নেল জেমস টড-এর অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান। এখানে রাজস্থানের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে মুসলিমদেরকে শত্রু ও বহিরাগত এবং হিন্দুদেরকে স্থানীয় ও নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছে ব্রিটিশরা। এরপর, ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে ‘হিন্দু’ পরিভাষাকে ভারতের মাটিতে একেবারে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে তারা। পরবর্তীতে, রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মীয় ছায়ার করতলে।</p>
<p>বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসগুলোতে সারাটা জীবনভর মুসলিমদেরকে শত্রু ও খলনায়ক বানিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো রবীন্দ্রনাথ মুসলিমদের উপর এতোটা কঠোর না হলেও মুসলিমদেরকে সবসময়ই তার উপন্যাসে নিচু জাতের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। জন ক্লার্ক মার্শম্যানের হিস্টোরি অব বেঙ্গল বইয়ে তিনি যতোটা না মুসলিমদের সমালোচনা করেছেন, তারচেয়ে শতগুণে বেশি মুসলিমদের অপমান করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বইয়ের অনুবাদ করতে গিয়ে। নীহাররঞ্জন রায়ের দৃষ্টিতে তো মুসলিমরা কোনো স্থানই পায়নি।</p>
<p>এরপর গত শতকে এসে বাংলার ভূমিতে বসেই বাংলার মুসলমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েও রমেশচন্দ্র মজুমদার ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করেছেন। অথচ, তিনিই ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী তৈরির পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন এবং সূর্যসেন, প্রীতিলদা এবং লীলানাগদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো উৎসাহ দিতে থাকেন। আর পরবর্তীতে গিয়ে তার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যান যদুনাথ সরকার। যদুনাথ সরকার তো পলাশীর পতনে রীতিমতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, তিনি এটাকে ভারতীয় উপমহাদেশের নতুন সূর্যোদয় বলেও অভিহিত করেছেন। এমনকি, মুসলিমদের পতনকে তিনি বাংলার রেনেসাঁ পর্যন্ত বলেছেন।</p>
<p>অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, উপমহাদেশের ভূমিতে জনসংখ্যার অনুপাতে অতি সামান্য এই মুসলিমরা দীর্ঘ ৫০০ বছর শাসন করার কারণ এটাই যে, নিম্নবর্গের হিন্দুরা গণহারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। এখানে শুধু নিম্নবর্গীয় হিন্দুরাই মুসলিম হয়েছে, উচ্চবর্গের কোনো হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। আর যদিও-বা উচ্চবর্গের কোনো হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেও থাকে, তা ছিলো খুবই কম অথবা মুসলিম শাসকরা স্থানীয় নারীদের জোরজবরদস্তি করে বিবাহ করায় তারা মুসলিম হয়েছে।</p>
<p>আর এই ইতিহাসবেত্তারা এটাও বলেন যে, যেহেতু হিন্দুরা না বুঝেই মুসলিম হয়েছে, তাই তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও ইসলামের বিধিবিধান পালনের চেয়ে পূর্বের ধর্মের সংস্কৃতিই বেশি পালন করতো। আর এভাবেই ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান একটা সময় হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং আবারো পূর্বের মতোই ভারতীয় সংস্কৃতি বা হিন্দুদের সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করতে শুরু করে। আর এই তত্ত্বের অন্যতম একজন ধ্বজাধারী হলেন অসীম রায়।</p>
<p>এখানে অবাক করার বিষয় হলো, ইসলাম ও মুসলিমদের উপর এমন অপবাদ চাপিয়ে দেওয়া এই তত্ত্বের ধ্বজাধারীরা একদিকে যেমন হিন্দু, অন্যদিকে আবার হিন্দু না হলেও তারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের একান্ত ও একনিষ্ঠ ভক্ত।</p>
<p>যাইহোক, এই ধারার ইতিহাসের আলোকে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। যেমন,</p>
<ul>
<li>১. মুসলিমরা বহিরাগত এবং স্থানীয়দের শত্রু;</li>
<li>২. হিন্দুরা স্থানীয় ও ভারতের মহানায়ক;</li>
<li>৩. ভারতের ইতিহাস বলতেই মূলত হিন্দুদের ইতিহাস;</li>
<li>৪. নিম্নবর্গের হিন্দুরাই শুধু মুসলিম হয়েছে, তা-ও না বুঝে;</li>
<li>৫. কালের গর্ভে ইসলাম হারিয়ে গিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>কিন্তু, প্রকৃত ইতিহাস কি আসলেও তাই বলে?<br />
ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের এমন বিকৃত ইতিহাস এবং হিন্দুত্ববাদের এমন একপেশে ইতিহাসের বিপরীতে মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে কলম ধরা ইতিহাসবেত্তা যে নেই, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। বরং, ডক্টর মো. মোহর আলী এবং এম. এ. রহিম মুসলিম জাতিসত্তার ক্ষেত্রে অনন্য দু&#8217;টি নাম।</p>
<p>দীর্ঘ ১০ বছরের গবেষণার ফসল হিসেবে ডক্টর মো. মোহর আলী চার খণ্ডের বৃহদাকার যে হিস্টোরি অব মুসলিম বেঙ্গল বইটি লিখেছেন, তা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সভ্যতার এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়। যদুনাথ সরকার যেমন শুধু সময়ের ধারাবাহিক ঘটনাকে তুলে ধরেছেন, ডক্টর মো. মোহর আলী তার সম্পূর্ণ উল্টোপথে হেঁটেছেন। অতীতের শিলালিপি, সরকারি সনদ, ফরমান, গেজেট এবং বাংলা, ইংরেজি আরবী ও ফারসি ভাষার সাহায্য নিয়ে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনামূলক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন তিনি। ডক্টর মো. মোহর আলী তার গ্রন্থে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, উত্তর ভারতের উপর মুসলিম বাংলার যে প্রভাব ছিলো, তা মুসলিম বাংলার অনন্য উচ্চতার পরিচয় তুলে ধরে।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলিম ইতিহাস বিলুপ্ত করণের যে প্রচেষ্টা চালানো হয় এবং ইসলামকে হিন্দু ধর্মের মাঝে হারিয়ে যাওয়া একটা ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়, ডক্টর মো. মোহর আলী সেখানেও গবেষণা ও পর্যালোচনা করে এই মতাদর্শের বিপরীতে হাঁটেন। আর এমনটা হবেই না কেন? অসীম রায়ের মতো কেউ যদি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েই এমন বিকৃত ইতিহাস লেখে যে, ইসলাম হিন্দুধর্মের মাঝে হারিয়ে গেছে অথবা হিন্দুরা মুসলিমদের আখলাকে প্রভাবিত না হয়ে বরং হুজুগের কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, তাহলে বলতেই হয় যে, সে ইতিহাসবেত্তা ইসলাম সম্পর্কে সঠিকটা না জেনেই ইসলামের ইতিহাস লেখতে কলম ধরেছে।</p>
<p>বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের পক্ষে কলম ধরা আরেকজন অগ্রসেনানী হলেন মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। বাংলার মুসলিম ইতিহাসের ক্ষেত্রে বস্তুনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী ধারার সূচনা করেন তিনি। বাংলার মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি দীর্ঘসময় গবেষণা করেন। এসব গবেষণা থেকেই তিনি মুসলিম আমলের উপর দুই খণ্ডের ‘বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস’ গ্রন্থ লেখেন, যা আজও ভারতীয় ইতিহাসের মৌলিক ধারার অন্যতম একটি গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।</p>
<p>বাংলার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, বাংলা ভাষা এবং মুসলিম ও ভারতীয় সংস্কৃতি-র বিষয়গুলোকে সামনে রেখে মুসলিমদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেন মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম একত্রিত হয়ে যাওয়া, মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য না থাকা এবং মুসলিমদের বহিরাগত হওয়া নিয়ে যে বিকৃত ইতিহাস চর্চা হয় আমাদের দেশে, ‘বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস’ বইয়ের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এই অধ্যাপক প্রমাণ সহকারে তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেন।</p>
<p>ডক্টর মো. মোহর আলী এবং এম. এ. রহিম-এর পাশাপাশি মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন হলেন আবদুল করিম এবং ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’ থেকে মোঘল আমলে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসের উপরেই পাঁচ খণ্ডের বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে অন্যতম একটি মূল কারণ এটাই ছিলো যে, যদুনাথ সরকারের সম্পাদিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হওয়া হিস্টোরি অব বেঙ্গল বইয়ের ভুলভ্রান্তির বিপরীতে স্বচ্ছ ইতিহাস তুলে ধরা।</p>
<p>আর বর্তমান সময়ে এসে আমাদের মুসলিম ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন এমন দুইজন ব্যক্তি হলেন এবনে গোলাম সামাদ এবং সরদার আবদুর রহমান। বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির অবদান এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্ট বিকৃত ইতিহাসের বিপরীতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সরদার আবদুর রহমান। অন্যদিকে, ব্রিটিশদের অর্থায়নে সৃষ্ট হিন্দুদের আর্যতত্ত্ব, মুসলিমদের বহিরাগত তত্ত্ব এবং নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের মুসলিম হবার তত্ত্বের মতো বিকৃত ইতিহাসের ধারাকে বেশ যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে খণ্ডানোর চেষ্টা করেছেন এবনে গোলাম সামাদ। এছাড়াও রয়েছেন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, ফাহমিদ-উর-রহমান এবং ফয়েজ আলম—সহ আরো অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>এইযে, সম্পূর্ণরূপে পরস্পর বিপরীতমুখী ইতিহাসের দু&#8217;টি ধারার সৃষ্টি হওয়া—এটিই আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে উপলব্ধি করায় যে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের প্রভাবে বিকৃত এবং একপেশে ইতিহাসের যে ধারাটি প্রচলিত হয়ে আছে, তার বিপরীতে কলম ধরা প্রত্যেক ইতিহাসবেত্তারই একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। ব্রিটিশরা যদি এমন বিকৃত ইতিহাস তৈরির পেছনে অর্থায়ন না-ই করতো, তাহলে হয়তো আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসটাই ভিন্নরকম হতো; অথবা বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাসটাও অনন্যমাত্রা লাভ করতো।</p>
<p>পৌনে দুইশ বছর ধরে ব্রিটিশরা যে ধারা তৈরি করে দিয়ে গেছে, তার বিপরীতে মাত্র ৫০-৬০ বছরের গবেষণামূলক কার্যক্রম সত্যিকারার্থেই খুব একটা বেশি সময় নয়। তার উপর আবার রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়া বুদ্ধিজীবী নামক একটি সমাজ, যারা বাংলার ভূমিতে বসবাস করেই মুসলিম জাতিসত্তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে সিদ্ধহস্ত।</p>
<p>আর এর পাশাপাশি রয়েছে আমাদের অসচেতনতা এবং অজ্ঞতা। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে ডক্টর মো. মোহর আলী, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, আবদুল করিম এবং ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক—এর মতো ইতিহাসবেত্তারা যে পরিশ্রম করে গিয়েছেন, তার যথাযথ মর্যাদা দিতে আমরা বরাবরই অপারগতা প্রকাশ করে আসছি। এমনকি, আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট যেনো এসব নাম একেবারেই অপরিচিত। তার বিপরীতে বরং রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার এবং অসীম রায়েরাই যেনো বহুল পরিচিত।</p>
<p>অতএব, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সময় এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করার। সময় এসেছে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজম এবং ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রভাবে সৃষ্ট বিকৃত ইতিহাসকে ছুঁড়ে ফেলার। সময় এসেছে বাংলাদেশী মুসলিম জাতিসত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পূরণ করার।</p>
<p>তাই, বাংলার মুসলিমদের মাঝে উম্মাহ চেতনাকে সমুন্নত করা এবং মুসলিম জাতিসত্তার আত্মপরিচয়কে পুনর্জাগরিত করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দেবার এখনই উপযুক্ত সময়। কেননা, কোনো একটি জাতির সঠিক ইতিহাসই সেই জাতির জাতিসত্তাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে, তাদের আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে এবং তাদের মাঝে অবিনশ্বর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15916</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা; সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের অনন্য উপমা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 07 Jul 2025 15:00:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15906</guid>

					<description><![CDATA[এক ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক</strong></h4>
<p>ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময় যখন এসব শব্দসমূহ সামগ্রিকতাকে পরিমণ্ডল করে ব্যাপৃত হতো, সেসব শব্দগুলোর প্রতিটিই আজ নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠীর স্বার্থান্বেষণের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।</p>
<p>নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠী বলতে যে শোষণ ও স্বার্থপরতার বিষবাষ্প নিঃসরণকারী মানবতার এক পরম শত্রু এবং সেকিউলারিজমের নামে রব বা সৃষ্টিকর্তাবিহীন তথাকথিত আধুনিক পরজীবী পাশ্চাত্য সভ্যতা-কে বুঝানো হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো সভ্যতায় যদি লিবারেলিজমের জনক জন লক, বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন, আখলাক বিবর্জিত মনস্তত্ত্বের জনক সিগমুণ্ড ফ্রয়েড-সহ ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্তে, থমাস হবস, ইমানুয়েল কান্ট, বার্ট্রান্ড রাসেল-এর মতো দার্শনিকদের মৌলিক ভিত্তি রোপিত থাকে—যারা দর্শন চর্চার নামে মূলত মানবজাতির রূহ থেকে মানবতা, নৈতিকতা, আখলাক, মারহামাত, আদালত দূরীকরণে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত ছিলো—তাহলে বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, এমন একটি সভ্যতার নিকট থেকে মানবতা আশা করা সত্যিকারার্থেই অমাবস্যার রজনীতে চন্দ্রালোক খোঁজার মতোই ব্যর্থ প্রচেষ্টার নামান্তর।</p>
<p>উল্লেখ্য, এখানে অনেকে হয়তো আক্ষরিক অর্থের দৃষ্টিকোণে ক্যাপিটালিজম এবং সোশালিজম ও তার আপডেট ভার্সন কমিউনিজম-এর মাঝে মরিচীকা-সদৃশ কিছু তফাত পেয়ে তাদের মধ্যকার বিস্তর ফারাক প্রমাণের প্রচেষ্টায় নত হবেন, তবে বাস্তবিকপক্ষে জায়োনিজম, লেবারেলিজম, ডায়ালেকটিজম, ক্যাপিটালিজম, সোশালিজম ও কমিউনিজম—সহ এমন সকল ইজম (ism) আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। মূলত, মানবজাতিকে নিকৃষ্টতর পদ্ধতিতে শোষণ করার নিমিত্তে সময়ে সময়ে তারা মুদ্রার পৃষ্ঠতল পরিবর্তন করে থাকে, এব্যতীত আর অন্যকিছু নয়।</p>
<p>মানবসভ্যতার শোষক স্বার্থান্বেষী পশ্চিমা দার্শনিকদের অন্যতম একজন হলেন রেনে দেকার্তে। দেকার্তিয়ান/কার্তেসিয়ান ফিলোসফি বা রেনে দেকার্তের দর্শনসমূহের প্রথম রূলস ছিলো, “I think, therefore I am” অর্থাৎ, “আমি চিন্তা করতে পারি, তাই আমার অস্তিত্ব রয়েছে”, যা তিনি ১৬৩৭ সালে তাঁর গ্রন্থ “Discourse on the Method”-এ তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ, তারা যতটুকু চিন্তা করে বা তারা যেভাবে চিন্তা করে, ততটুকুতেই তাদের অবস্থান সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে এই দর্শনটি পশ্চিমাদের দর্শনে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে, তারা তাদের মতো করেই ইতিহাসের বলয় তৈরি করে। এই দর্শনটি যেহেতু সমগ্র পশ্চিমের মৌলিক দর্শনে রূপ লাভ করেছিলো, সেহেতু তাদের অতীত ইতিহাস লিপিবদ্ধের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। এমনকি,  তাদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য সম্পূর্ণ বানোয়াট ও বিকৃত ইতিহাস লেখতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেনি।</p>
<p>এসবের উদাহরণ পাওয়া যায় তাদের ইতিহাস চর্চায়। ইতিহাসের পর্যায়ক্রম বা সময়কাল বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা তাদের সময়কালকে নিজেদের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে। তাদের পর্যায়কালকে যদি সহজভাবে উত্থাপন করা যায়, তাহলে বিষয়টা এমন হয় যে,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০২. ঐতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০৩. ভবিষ্যৎ যুগ।</li>
</ul>
<p>এখানে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলতে সহজ ভাষায় মানবজাতির পূর্ববর্তী যুগ বা ডাইনোসর যুগকে বোঝানো হয়। মানবজাতির ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে তারা ঐতিহাসিক যুগকে তিনভাগে আবার ভাগ করে। অর্থাৎ,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাচীন যুগ,</li>
<li>০২. মধ্য যুগ,</li>
<li>০৩. আধুনিক যুগ।</li>
</ul>
<p>এসবের মধ্যে প্রাচীন যুগকে তারা আবার তিনভাগে ভাগ করেছে। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. প্রস্তর যুগ,</li>
<li>০২. ব্রোঞ্জ যুগ,</li>
<li>০৩. লৌহ যুগ।</li>
</ul>
<p>এরপর, তাদের ইতিহাস অনুযায়ী মধ্যযুগের সময়সীমা ছিলো তথাকথিত ইউরোপীয় রেনেসাঁ পর্যন্ত। <strong>অথচ, তারা কাদের নিকট থেকে কীভাবে সভ্য হতে শুরু করলো, তা তারা বরাবরই লুকিয়ে রাখে। যে মধ্যযুগকে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে, সে অন্ধকার যুগ থেকেই তারা কোন পরশ পাথরের স্পর্শে রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ ঘটালো, সে বর্ণনার ক্ষেত্রেও তারা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। সে যাইহোক, তাদের তথাকথিত রেনেসাঁ-র পর থেকে তারা নিজেদেরকে দুনিয়াব্যাপী সভ্য বলে পরিচিত করতে থাকে। “প্রথমবার কীভাবে সম্পদ অর্জিত হয়, তা ধর্তব্য নয়, বরং সেসব সম্পদকে তখন সংরক্ষণ করা দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়ে”—দার্শনিক জন লক-এর এমন দর্শন ইউরোপীয়দের আরো স্বেচ্ছাচারী ও নৃশংস বানিয়ে ফেলে</strong>। মানবজাতিকে সভ্য বানানোর বুলি আওড়িয়ে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তারা সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে বর্ণনাতীত যে শোষণ ও নিষ্পেষণ চালিয়েছে, তা আজ আর কারও অজানা নয়।</p>
<p>এই হলো তাদের ইতিহাস বর্ণনার পন্থা। কিন্তু, এর বিপরীতে গিয়ে তাদেরই কথিত অন্ধকার মধ্যযুগের সময় ইসলামী সভ্যতা মানবেতিহাসের পাতায় যে ইতিহাস রচনা করেছে; সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, মারহামাত ও আখলাকের সাথে যে সমগ্র বিশ্ব পরিচালনা করেছে এবং ইসলামী সভ্যতার দর্শনসমূহ যে উপমা উপস্থাপন করেছে, তা পশ্চিমাদের স্বার্থাভিলাষের মূলে কুঠারাঘাত করে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের যে সময়কে গোল্ডেন এজ বা স্বর্ণালী সময় বলা হয়, সেসময়কে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুতেই শেষ নয়, আমরা মুসলিম উম্মাহ যেনো পুনরায় ঘুরে দাড়াতে না পারি, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” বিষয়টি নিয়ে পর্যন্ত অসংখ্য পুস্তক রচনা করেছে। অথচ, রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে স্পষ্ট বর্ণনা পাই যে, আমরা যদি জেনেও থাকি, আগামীকাল কেয়ামত সংঘটিত হবে, তবুও যেনো আমরা গাছ রোপণ করতে পিছপা না হই। এখানে, গাছ রোপণের বিষয়টি এসেছে মূলত রূপকার্থে; এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানবজাতির জন্য সকল ধরনের কল্যাণকর কাজ জারি রাখা।</p>
<p>মহান রবের একজন খলিফা হিসেবে পৃথিবী বিনির্মাণ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য; এবং আমরা তা বাস্তবায়ন করে এসেছি সুদীর্ঘ বারোশত বছরেরও বেশি সময় ধরে। মূলত, তাদের শোষণের ধারা বজায় রাখতে এবং আমাদের এই বিশ্বজনীন ও সামগ্রিক চিন্তাধারার বিরোধিতা করতে গিয়েই তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” মতবাদের উত্থান করেছে। আবার, এটাও অস্বীকার করার জো নেই যে, এই বিষয়টি থেকেই মূলত আমাদের মুসলিম উম্মাহর ভেতরে “কেয়ামত নিকটবর্তী”-এর মতো অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী একটি তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে; যা সরাসরি রাসূল (সা.)-এর হাদীস পরিপন্থী একটা চিন্তাধারা।</p>
<p>অতএব এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পশ্চিমাদের দর্শন ও তাদের ইতিহাসের সাথে আমাদের দর্শন ও ইতিহাস চর্চার মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সেহেতু, আমাদেরকে পশুসমতুল্য করা পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত থেকে মনোযোগী হতে হবে আমাদেরই রেফারেন্স, তথ্যসূত্র ও পুস্তকাদির দিকে। মোটাদাগে বলে যায়, আমাদের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে থাকতে হবে সদা-সতর্ক। আমাদের শাসন ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো বিশাল কলেবরে উপস্থাপন করে আদিল ও ন্যয়পরায়ণ শাসকদেরকে তারা যে নিকৃষ্টতর করে উপস্থাপন করে থাকে, সেদিকে আমাদের যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে। এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে এটাও আমাদের বিশেষ নজরে রাখতে হবে যে, আমাদের ইতিহাস নিয়ে তাদের প্রশংসামূলক পর্যালোচনার পেছনেও থাকতে পারে অন্যকোনো দুরভিসন্ধি; উদাহরণস্বরূপ ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ-এর কথাও ধর্তব্য হতে পারে।</p>
<p>এই বিষয়টিকে কেন্দ্রে রেখেই এবার একটু ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই</strong></h4>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র এবং সাংস্কৃতিক নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ স্রষ্টার বিশেষ মহিমাধন্য অপার এক লীলাভূমি। মহান রব যেনো এই অঞ্চল এবং তার মানুষের উপর নিজ হাতে রহমত প্রেরণ করেছেন; প্রকৃতিগত বিচিত্রতা, উর্বর ভূমি এবং জনসাধারণের কর্মঠ মানসিকতা-র মাধ্যমে এই অঞ্চলকে নেয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। ফলশ্রুতিতে, সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলের উপর শ্রেষ্ঠ সব বিজেতাদের নজর পড়েছিলো। অতএব, এটাও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বিশ্ব মানচিত্র অঙ্কনের সূচনা থেকেই এই অঞ্চলটি তার ব্যতিক্রমী প্রভাব প্রস্ফুটিত করতে থাকে।</p>
<p>ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রস্তর যুগে খ্রিস্টপূর্ব ৭০-৫০ হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে ভারতে মানবজাতির আগমন ঘটে। এরপর ১২ হাজার বছর পূর্বে ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা সুফলাচন্দ্রিকা নামক একটি অঞ্চলে কৃষির উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর থেকে কৃষি ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে থাকে। এই সময়টায় ইরানের ওদিক থেকে বিশাল জনগোষ্ঠী ভারতের এদিকে অভিবাসন করে। ভারতের স্থানীয় অধিবাসী ও অভিবাসন করে আসা জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে যে জাতির উদ্ভব হয়, তাদের হাতেই গড়ে ওঠে সুবিশাল হরোপ্পা মহেঞ্জোদারো-র বিখ্যাত সেই সিন্ধু সভ্যতা। সময়টা ছিলো তখন ব্রোঞ্জ যুগ।</p>
<p>সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তীতে যে যুগ শুরু হয়, তা হলো বৈদিক যুগ। বৈদিক যুগ মূলত ব্রোঞ্জ যুগকে অতিক্রম করে লৌহ যুগের প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলমান ছিলো। বৈদিক যুগের পরে যথাক্রমে জনপদ, পুরু জাতি, কুরু সাম্রাজ্য, ষোড়শ মহাজনপদ, নন্দ সাম্রাজ্য ও মৌর্য্য বংশ এই অঞ্চল শাসন করেছিলো। পরবর্তীতে যারা ভারত শাসন করে, তারা হলো যথাক্রমে— শুঙ্গ রাজবংশ, সাতবাহানা সাম্রাজ্য, কুষাণ সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য, কামরূপ সাম্রাজ্য, পল্লব রাজবংশ, কদম্ব রাজবংশ, চালুক্য রাজবংশ, রাষ্ট্রকূট রাজবংশ এবং পাল সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে যেসব রাজবংশ বা সাম্রাজ্যের নাম উল্লেখ করা হলো, তারা যে সমগ্র ভারতের মূল শাসক ছিলো, বিষয়টা মোটেও তেমন না। বরং, সমগ্র ভারত তখন বিশাল বিশাল সব বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ছিলো, সেহেতু পরবর্তীতে উল্লেখ করা রাজবংশ বা সাম্রাজ্যগুলো বলতে গেলে একই সময়েই তারা তাদের অঞ্চলগুলো শাসন করেছে। আর এসবের সমাপ্তি ঘটতে শুরু করে ত্রয়োদশ শতকের একেবারে উষালগ্নে, অর্থাৎ, মুসলমান কর্তৃক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর থেকে। সূচনা হয় তখন ভারত ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়, ভারতবাসী উপলব্ধি করতে শুরু করে জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা এবং অবলোকন করতে শুরু করে সমগ্র ভারতজুড়ে একই শাসকের শাসন।</p>
<p>ভারতে মুসলিম শাসনকে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. সুলতানী আমল (১২০৬-১৫২৬),</li>
<li>০২. মুঘল আমল (১৫২৬-১৭৫৭)।</li>
</ul>
<p>সুলতানী আমলকে দিল্লি সালতানাত নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সময় মুসলিমদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্য। দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলে কয়েকটি রাজবংশ ভারতকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে। তারা হলো,</p>
<ul>
<li>০১. মামলুক রাজবংশ (১২০৬-১২৯০),</li>
<li>০২. খিলজী রাজবংশ (১২৯০-১৩২০),</li>
<li>০৩. তুঘলক রাজবংশ (১৩২০-১৪১৪),</li>
<li>০৪. সৈয়দ রাজবংশ (১৪১৪-১৪৫১),</li>
<li>০৫. লোদী রাজবংশ (১৪৫১-১৫২৬)।</li>
</ul>
<p>দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলের পরে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনভার গ্রহণ করে মুঘলরা। লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল শাসনের সূচনা করেন ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কামান ব্যবহারকারী মুঘল সালতানাতের প্রথম শাসক সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর। এই সময় মুঘলদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো মারাঠা সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আসবে, তা হলো, ১২০৬ সালে যে মুসলিমরা দিল্লি সালতানাতের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসনের পুনঃসূচনা করে বটে, তবে এসবের ভিত্তিপ্রস্তর কিন্তু একদিনে স্থাপিত হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রায় কয়েকশত বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। বিগত পাঁচ শতাব্দী যাবত এই শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিলো। এই সময়ের ইতিহাসকে তিনটি ভাগে বা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম অভিযানের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়।</p>
<p><strong>প্রথম পর্যায় শুরু হয় ৭১২ সালে তরুণ বিজেতা মুহাম্মাদ বিন কাসেম-এর সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের মাধ্যমে। এই বিজয়ের পর থেকে ভারতবর্ষে মুসলিমরা গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীর পর্যায় পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। জনসাধারণও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবেই সমগ্র ভারতবর্ষজুড়ে পরিচিত হতে শুরু করে।</strong></p>
<p>এই ধারাবাহিকতায় হাওয়া লাগে দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে, অর্থাৎ, দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের মাধ্যমে। তিনি একাধারে সতেরোবার ভারত অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত ইরানের গজনভী বংশের শাসক। তিনি তাঁর অঞ্চলে যে প্রায় ত্রিশ বছর যাবত শাসন করেছিলেন, তা ছিলো ভারতের তৎকালীন স্বর্ণালী সময়। বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আবু রায়হান আল-বেরুনী ছিলেন সুলতান মাহমুদের দরবারের অন্যতম একজন সদস্য, যিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এছাড়াও সুলতান মাহমুদের সাথে সখ্যতা ছিলো মহাকবি ফেরদৌসীর, যার শাহনামা এখনও বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। উল্লেখ্য যে, শাহনামা নিয়ে সুলতান মাহমুদের বিষয়ে যা ছড়ানো হয়, তার সুস্পষ্ট কোনো দলিল বা ভিত্তি নেই।</p>
<p>এরপর, তৃতীয় পর্যায়ে এসে চিরস্থায়ীভাবে ভারতে মুসলিম শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, যার শুরুটা হয় মুইযুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরীর ভারত অভিযানের কল্যাণে। ১১৭৫ সালে মুলতান বিজয়, ১১৭৮ সালে আনহিলওয়ারা বিজয়, ১১৮২ সালে সিন্ধু বিজয় এবং ১১৮৬ সালে ত্বরাইনের প্রথম যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলেও ১১৯২ সালে ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ার্জনের মাধ্যমে ভারতে ঘুরী রাজবংশ নিজেদের শক্তিমত্তার অস্তিত্বের জানান দেয়। প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে শুরু হয় মুসলিমদের চিরস্থায়ী শাসনের উপমা নিদর্শন। এরপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেই তাঁর একজন চৌকস সেনাপতি কুুতুবউদ্দিন আইবেক-এর হাতেই স্থাপিত হয় দিল্লি সালতানাতের ভিত্তিপ্রস্তর। দিল্লি সালতানাতের সময় যে যে রাজবংশ ভারতবর্ষকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে, তাদের নাম তো পূর্বে উল্লেখিত হয়েছেই।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের পর শুরু হয় মুঘল আমল। মুঘল আমলের ছয়জন শাসক  সবচেয়ে পরিচিত। যথাক্রমে তাঁরা হলেন,</p>
<ul>
<li>০১. জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০),</li>
<li>০২. নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ হুমায়ুন ১৫৩০-১৫৪০, ১৫৫৫-৫৬),</li>
<li>০৩. জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫),</li>
<li>০৪. নূরুদ্দুন মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭),</li>
<li>০৫. শিহাবুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহজাহান (১৬২৭-১৬৫৮),</li>
<li>০৬. মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদ আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬৫৮-১৭০৭)।</li>
</ul>
<p>তাঁদের মাঝে সম্রাট আকবর এবং আলমগীর—দু&#8217;জন মিলেই শাসন করেছেন শতবছরেরও বেশি সময় ধরে। এরপর, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে শুধু বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়, যা অদ্যাবধি উদিত হয়নি।</p>
<p>যেকোনো অঞ্চলের ইতিহাসেরই উত্থান-পতন থাকে, থাকে সে সময়ের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। সে হিসেবে মুসলিম শাসনামাল বলা হোক বা ভারতের সমগ্র ইতিহাসই ধরা হোক—উভয়ক্ষেত্রেই মুঘল আমলই ছিলো ভারতবর্ষের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। আখলাক, আদালত ও মারহামাতে পরিপূর্ণ একটি সমাজ তুলে ধরেছিলো সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা, যা হতভম্ব করে দিয়েছিলো সমগ্র ভারতবাসীকে।</p>
<p>তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, মুসলিম শাসনামল যে একেবারে “ধোয়া তুলসী পাতা” বা শতভাগ নিখুঁত ছিলো, তা কোনো মুসলিম ইতিহাসবেত্তা-ই স্বীকার করেন না। এমনকি, আদালত ও আখলাকবিহীন কাজকর্মের জন্য তারাই সর্বপ্রথম শাসক বা অপরাধীদের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু, প্রতিটি রাজবংশ বা শাসকের সময়ের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফুলে ফেঁপে তুলে ইতিহাস বর্ণনা করেছে ইংরেজ ইতিহাসবীদ ও তাদের দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। এমনকি, আমরা মুসলিমরাও এখন আমাদেরই ইতিহাস অধ্যয়ন করি ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিহাস লেখকদের তথ্যসূত্রকে কেন্দ্রে রেখে। ফলশ্রুতিতে, বর্তমান ভারতে মুঘল শাসকগণ আজ নেতিবাচকভাবে পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘ দেড়-দুইশত বছর যাবত। অথচ, প্রকৃত ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।</p>
<p>এবার তাহলে সে ইতিহাসের দিকেই একটু নজর বুলানো যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>তিন</strong></h4>
<p>একেবারে শুরুতেই “ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি”—চারটি পরিভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস বর্ণনা করা হয় সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি-র। অন্যদিকে, সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, একটা ব্যতিত আরেকটা অসম্পূর্ণ। আবার এ&#8217;দুয়ে মিলে হয় সভ্যতা, আর সর্বশেষে এই সভ্যতারই ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। অতএব, এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, এসব পরিভাষা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু এসবের মাঝে রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা, সেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টি এলে অবশ্যই অন্য বিষয়গুলোও অবধারিতভাবে চলে আসবে।</p>
<p>ইতোপূর্বে মুসলিম শাসনামলের সময়কালটা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে বলা যায়, সভ্যতার ইতিহাসের কিঞ্চিৎ ফুটে উঠেছে এখানে। কিন্তু, ইতিহাস তো শুধু এভাবে বর্ণনা করলে হয় না, সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়টিও ফুটিয়ে তুলতে হয়। অতএব, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টার প্রতিও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>সহজ ভাষায় বলা হয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ হলো, সমাজের সকলে মিলে একত্রে শান্তিতে বসবাস বা সহাবস্থান করা; আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর সংজ্ঞায়ন এভাবেই করা হয়। অথচ, শুধুমাত্র সমাজের ভেতরে পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করা বা সহাবস্থান করাই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নয়, বরং ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্য এবং প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা-সহ “সমাজ”-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ই এখানে অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি এসবের প্রতিটিতেই আদালত বিরাজমান থাকে, মূলত তখনই একটি সমাজে প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>এখানেই শেষ নয়, একটি সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর ইতিহাস তখনই জানতে ও বুঝতে পারা যায়, যখন সে সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে পূর্বাপর বা সমসাময়িক অন্যান্য সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে তুলনা করা হয়, চাই সে সমাজ-সভ্যতা স্থানীয় হোক বা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সমাজ-সভ্যতা হোক। তবে এটা সত্য যে, স্থানীয় পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার সাথে তুলনা করলেই বরং তখন পার্থক্যটা আরো বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতএব, ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামল বা সমাজ-সভ্যতার সাথে তার পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার তুলনা করলে মুসলিম সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যাবে।</p>
<p>যেহেতু তুলনামূলক আলোচনাকেই কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে, সেহেতু গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ এবং আদালতের মধ্যকার পার্থক্য জানাটা সকলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বুঝার স্বার্থে আদালতকে বলা যেতে পারে ন্যায় অধিকার এবং গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ-কে বলা যেতে পারে সমান অধিকার। সকলের নিকট এটা সুস্পষ্ট হতে হবে যে, ন্যায় অধিকার আর সমান অধিকার কখনও এক বিষয় নয়। ন্যায় অধিকার হলো, যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দেওয়া। বিপরীতে, সমান অধিকার হলো, সবার মাঝে সমবণ্টন করা। সমান অধিকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, কেউ হয়তো প্রয়োজন অনুপাতেও সম্পদ পায় না আবার কেউ প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পায়। কিন্তু, ন্যায় অধিকারে কখনও তা হয় না, সবাই সবার প্রাপ্যটুকুই পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সমান অধিকারটা ন্যায় অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহর নিকট এই ন্যায় অধিকারই হলো আদালত। তবে এটা স্মর্তব্য যে, “আদালত” শব্দটি যতোটা সামগ্রিকতা ও বিস্তৃত অর্থ ধারণ করতে পারে, “ন্যায় অধিকার” শব্দটি কখনও তা পারবে না।</p>
<p>সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান বলতে যে সামাজিক একটা পরিবেশে শুধুমাত্র সহাবস্থান করাকে বুঝানো হচ্ছে না, তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, সমাজ বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত সকল দৃষ্টিকোণকে বিবেচনা করেই যেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিষয়টি ফুটে ওঠে, সেহেতু সমাজ-এর সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় থেকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>💠</strong><strong>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p><span style="font-size: 16px;">ভারতবর্ষে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় অবদান হলো, ধর্মীয় বৈষম্য বিদূরিত করা। কেননা, ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের ধর্মীয় অবস্থা অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক অবস্থায় ছিলো। তখন ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম প্রচলিত ছিলো। মহাবীর নামে এক ক্ষত্রীয় সন্ন্যাসী ভারতে জৈন ধর্ম প্রবর্তন করেন। গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম প্রবর্তন করেন, তিনি সিদ্ধার্থ নামেও পরিচিত ছিলেন। মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের সময় বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। গুপ্ত শাসনামল থেকে বৌদ্ধ ধর্মের পতন শুরু হয়। এ সময় থেকে ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনজাগরণ সূচিত হয়।</span></p>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে ভারতে হিন্দু ধর্মই ছিলো প্রধান ধর্ম। ভারতের বেশিরভাগ রাজাই ছিলেন হিন্দু। তারা হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সমাজের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিলো সবচেয়ে বেশি। বৈশ্য ও শূদ্ররা নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত ছিলো। তাদের ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করা এমনকি শোনাও নিষিদ্ধ ছিলো। দুর্নীতিপরায়ণ ব্রাহ্মণরা জনসাধারণের দুর্বলতা ভীতির সুযোগ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ব্রাহ্মণদের আক্রমণাত্মক মনোভাব বৌদ্ধদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করে। ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্যাতিত বৌদ্ধরা ভারতে আক্রমণ করতে মুসলমানদেরকে আমন্ত্রণ জানায় এবং আরবদেরকে স্বাগত জানায়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক হাবীব বলেন, <strong>❝ব্রাহ্মণগণ ইচ্ছাপূর্বক জনগণকে অজ্ঞ করে রাখতেন এবং সমাজে এভাবে তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেন।❞</strong></p>
<p><strong>ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন, ❝পণ্ডিত ব্রাহ্মণগণ ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে অত্যাচারীর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।❞</strong></p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে দিল্লির সুলতানি আমলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ভারতের মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ভারতের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো।</p>
<p>ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময় ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিলো না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে এবং ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে তোলে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p><strong>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দিল্লির সুলতানরা হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব পালনে কোনোদিন বাধা দেননি। দিল্লির সমগ্র সুলতানি আমলে অমুসলিম নাগরিকদের অর্থাৎ &#8220;জিম্মিদের” উপর কোনো ধরনের কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়নি।</strong> কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে, “দিল্লির সুলতানি আমলে অমুসলিম প্রজারা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের মন্দির ধ্বংস করা হয়। তাদেরকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়।”</p>
<p>তাদের এ বক্তব্য মোটেও সত্য নয়। কারণ, দিল্লির সুলতানি আমলে কোনো হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়নি; যদি ধ্বংস করা হতো, তাহলে প্রাক মুসলিম এবং মুসলিম আমলের মন্দির আজ আর দেখা যেতো না।</p>
<p>এটাও জানা যায় যে, কোনো কোনো সুলতান হিন্দুদের উৎসবেও যোগদান করতেন। যেমন সুলতান মুহম্মদ-বিন-তুঘলক হিন্দুদের “হোলি” উৎসবে যোগদান করতেন। সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী জৈন আচার্য মহাসেনকে ধর্ম আলোচনার জন্য কর্নাট থেকে আহ্বান করেন। এছাড়া দিগম্বর জৈন পূর্ণচন্দ্র ও শ্বেতাম্বর জৈন রামচন্দ্র সুরী প্রভৃতি জৈন আচার্যরা সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর আতিথ্য গ্রহণ করেন।</p>
<p>ইবনে বতুতা বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মুহম্মাদ-বিন তুঘলকের শাসনামলে অনেক হিন্দু কর্মচারী সুলতানী রাষ্ট্রের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি জনৈক হিন্দু কর্মচারীকে সিন্ধুর শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত করেন। সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে ছিলেন যথেষ্ট তৎপর।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>দিল্লির সুলতানী আমলের ধর্মীয় এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দের ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো মুঘল আমলেও; এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে তা আরো জোড়ালোভাবে। সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দের দৃষ্টিকোণে সুলতান আওরঙ্গজেব ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ, এই সুলতানকেই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কলুষিত করা হয়েছে। তাঁর নামেই আজ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে যে, তিনি নির্বিচারে গণহারে হিন্দুবধ করেছেন, অথচ, তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।</p>
<p>মহান এই সুলতানের বিরুদ্ধে আনীত ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো,</p>
<ul>
<li>০১. হিন্দু মন্দির ও টোল ধ্বংস,</li>
<li>০২. হিন্দু কর্মচারীদের পদচ্যুতি,</li>
<li>০৩. হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন।</li>
</ul>
<p>কিন্তু, সুলতান আওরঙ্গজেব রাজ্যশাসন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, তিনি কখনই বিধর্মীদের প্রতি অন্যায়, অবিচার এবং জোর জবরদস্তি করেননি। বরং তিনি ভারতের সকল ধর্মের জনগণের প্রতি তার সহিষ্ণুতার মনোভাব প্রদর্শন করেছেন।</p>
<p><strong>প্রথমত, </strong>এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ইতিহাস যে, আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং হিন্দুমন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর সময়ে নির্মিত দিল্লি, আগ্রা, বেনারস, মথুরাপুর, গুজরাট প্রভৃতি স্থানে নির্মিত বহু মন্দির আজও বর্তমান রয়েছে। সম্রাট কর্তৃক বেনারসের গভর্নরের নিকট লিখিত ফরমানে জানা যায় যে, তিনি বৈধ উপায়ে নির্মিত মন্দির বিনষ্ট না করার নির্দেশ দেন। প্রধানত যেসব মন্দির রাজদ্রোহ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর যে সমস্ত মন্দির গড়ে উঠেছিলো, বরং সেগুলো তিনি ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষভাগে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে এসে সম্রাটের সহিষ্ণু মনোভাবের পরিচয় পেয়েছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন,<strong> “Everyone is free to serve and worship God in his own way”.</strong></p>
<p><strong>ঐতিহাসিক শর্মাও স্বীকার করেন যে, আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে হিন্দুগণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতো। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজপুত সেনাপতি ভীমসিংহ আহমেদাবাদে প্রায় ৩০০ মসজিদ ভেঙেছিলেন। কিন্তু, আওরঙ্গজেব তাকে কোনো ধরনের শাস্তি না দিয়ে তাকে মারাঠাদের দমন করতে পাঠান।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, </strong>আওরঙ্গজেব হিন্দু কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করে সে জায়গায় মুসলমানদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন বলে যে অভিযোগ করা হয়, তা সত্য নয়। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি কতিপয় হিন্দু কেরানি, দেওয়ান ও রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি হিন্দুদের প্রতি বৈরী ও রুষ্ট হয়ে তাদেরকে পাইকারি-হারে চাকরি হতে বরখাস্ত করেন। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক দফতরে একজন করে হিন্দু-মুসলমান নিয়োগ দেন। কিছু হিন্দু কর্মচারী সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করলেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করে পূর্বপদে বহাল রাখেন। চরম বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব যশোবন্ত সিংহকে শুধু ক্ষমাই করেননি বরং তাকে যথাযচিত সম্মান প্রদর্শন করেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং বিনা অপরাধে হিন্দু কর্মচারীদেরকে পদচ্যুত করেছিলেন—এ কথা চিন্তাই করা যায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> অমুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য সামরিক কার্যের পরিবর্তে তাদের উপর আওরঙ্গজেব জিজিয়া কর ধার্য করেন। হিন্দুদের উপর থেকে প্রায় ৮০ প্রকার কর উঠিয়ে নেয়ার ফলে রাষ্ট্রের অর্থভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়ে। তারপরও হিন্দুরা অনুগত না হয়ে আক্রমণ-ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। কাজেই দীর্ঘ ২০ বছর পরে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও শত্রুভাবাপন্ন হিন্দুদেরকে নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার উদ্দেশে সম্রাট হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনরায় ধার্য করেন। ভি.ডি. মহাজন স্বীকার করেন যে,</p>
<blockquote><p>❝এই কর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার উপর ধার্য হয়নি। বস্তুত, দরিদ্র, স্ত্রীলোক, খোড়া, নাবালক ও উন্মাদগ্রস্ত ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই তিনি জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, হিন্দুদের ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে এমন একজন মহান শাসকের উপর এমন সব অভিযোগ পেশ যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেহেতু বলা যায়, এমন সব মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন মূলত ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ইতিহাসবীদদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের মনোভাবকেই বরং আরো স্পষ্ট করে তোলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<p>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর আলোচনার পূর্বে আমাদেরকে এটা বরং আগে বুঝতে হবে যে, বিনোদন ও সংস্কৃতি এক বিষয় নয়। বিনোদন মূলত সংস্কৃতিরই একটা অংশ। কেননা, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজই কোনো না কোনো সংস্কৃতির আলোকে করে থাকি। অর্থাৎ, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরের কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাতে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষ যা করে, তাই সংস্কৃতি। অতএব, সংস্কৃতির আলোচনায় শুধু বিনোদন অন্তর্ভূক্ত হবে না; বরং সমাজের সামগ্রিক বিষয়গুলোই সংস্কৃতিতে আলোচনা হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। প্রাথমিক অবস্থায় হিন্দু সমাজে উদারতা বিদ্যমান ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রাবিড়, আর্য, শক, হুন, কুষাণ প্রভৃতি জাতীয় লোকজন আসে এবং হিন্দু সমাজের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের আলাদা সত্তা হারিয়ে হিন্দু সমাজের সাথে এক হয়ে যায়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এ চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।</p>
<p>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাব উল-হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতবর্ষের সমাজে নারীদের অবস্থা ছিলো বড়ই করুণ। নারীদের অধিকার ছিলো খুবই সীমিত। নারীদের সাধারণত ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সমাজে পুরুষেরা বহু বিবাহ করতো। কিন্তু, নারীদের দ্বিতীয় বিবাহের কোনো নিয়ম ছিলো না। গ্রিকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্য যুগে সমাজে নারীদের মর্যাদা ছিলো এবং তারা সাহিত্য দর্শনে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী ছিলো। আল বেরুনী তার “কিতাব-উল-হিন্দ” নামক গ্রন্থে বৈদিক যুগের নারী জাতির উচ্চ মর্যাদার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আল-বেরুনী আরও বলেন যে,</p>
<p>❝সে সময় নারীদেরকে শিক্ষা প্রদান করা হতো এবং শাসন-ক্ষেত্রে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলো।❞</p>
<p>তবে এটা যে বৈদিক সমাজের সামগ্রিক চিত্র ছিলো না, তা আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে নারীর অপমানের বিষয়টি উঠে আসে সতীদাহ প্রথা থেকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতীয় সমাজে অনেক কু-প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিলো। অনেক কু-প্রথাকে সমাজে ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হতো। কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা, নরবলি এবং গঙ্গীয় শিশু কন্যা বিসর্জন ইত্যাদি কাজকে হিন্দুরা ধর্মীয় পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। এছাড়াও তখন দেবদাসী প্রথাও প্রচলিত ছিলো।</p>
<p>আবার ভারতের হিন্দু সমাজে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিলো। দাস-দাসী কেনা-বেচা হতো এবং প্রাসাদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এটি তখন সামাজিক অনুশাসনে পরিণত হয়।</p>
<p>মোদ্দাকথা, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিলো। সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ছিলো। জাতিভেদ প্রথা সমাজকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিলো। নারীরা ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সমাজে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। এমনকি, ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসকরা সমাজের কোনো উন্নয়নে পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি।</p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>বিপরীতে ভারতের মুসলিম সমাজের অন্য এক চিত্র দেখা যায়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আসার আগে গ্রিক, শক, হুন, পারসিক প্রভৃতি জাতির লোকজন আসে। তারা তাদের নিজস্ব কোনো সভ্যতা ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসেনি। তারা হিন্দু সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এরপর, ৭১২ সালে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর মুসলিম বিজেতারা এদেশে এক উন্নত সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে আসেন। তারা দীর্ঘদিন ভারতবর্ষে অবস্থান করেন। মুসলমানরা হিন্দুদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়নি এবং মুসলমানরা তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এন. সি. মেহতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝ইসলাম যেখানে এসেছে, সেখানেই মার্জিত রুচি এবং মর্যাদাবোধের প্রকাশ ঘটেছে। এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রত্যেক মুসলমান প্রধানত একটি সামাজিক, সহজ ও মুক্ত জীবন-যাপন করে।❞</p></blockquote>
<p>মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর ভারতের সমাজ-কাঠামোর উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ইসলামের উদার, সহনশীল নীতি ও হিন্দু সমাজের কঠোরতা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর প্রবল প্রভাব পড়ে। এর ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাছাড়া ইসলামের প্রভাবে বর্ণভিত্তিক ভারতীয় সমাজে আরও অনেক নতুন নতুন উপবর্ণ ও গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।</p>
<p>বিন কাসিমের এই অভিযানের পর ভারতবর্ষের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপা বলেন যে,</p>
<p>❝তুর্কিরা বাহ্যত স্থানীয় খাদ্য ও পোশাক গ্রহণ করে। কিন্তু, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ইসলামের কোনো কোনো সামাজিক চিন্তা ভারতীয় জীবনের অংশ হয়ে যায়। ইসলামের প্রভাবে ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু মহিলাদের মধ্যে পর্দার প্রচলন ঘটে। প্রাচীন ইরানে (পারস্য) এ প্রথার প্রচলন হলেও ভারতে আরবীয় ও তুর্কিরা এ প্রথা আমদানি করে।❞</p>
<p>এই পর্যায়ে পূর্বের একটি কথা আবারো উল্লেখ করতে হয় যে, মুসলিম শাসনামলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময়ে ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিোল না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে,</p>
<p><strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong></p>
<p>ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র-এর মতে,</p>
<p><strong>❝ভারতীয়দের সুগভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্য সম্পর্কে সমুন্নত ধ্যান-ধারণার সাথে তুর্কি ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণে শেষ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>রোমিলা থাপার মতে,</p>
<p><strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>সতীদাহ প্রথা নিয়ে বলতে গেলে ইবনে বতুতার মুহম্মাদ-বিন তুঘলককে নিয়ে একটা মন্তব্য তুলে ধরতে হয়, তিনি বলেন,</p>
<p><strong>❝সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে সর্বদা ছিলেন তৎপর।❞</strong></p>
<p>শুধু মুহাম্মাদ বিন তুঘলকই না, বরং সম্রাট বাবর, আকবর এবং আওরঙ্গজেবও সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে ভূমিকা পালন করেন। সম্রাট আকবর একবার নিজে গিয়ে এমন হিংস্র কর্মকাণ্ডে বাধা দেন এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে আইন পর্যন্ত প্রণয়ন করেন।</p>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>মোদ্দাকথা, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। মুসলমানরা ভারতে এসে এখানে শ্রেণিহীন সমাজ গঠনে ভারতীয়দেরকে উদ্বুদ্ধ করে। দিল্লির সুলতানি আমলে ভারতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর, এমনকি মুঘল আমলেও, ইসলামী ভাবধারা ভারতের সমাজ, আচার-আচরণ, ধর্ম, স্থাপত্য, শিল্প, ভাষা-সাহিত্য, সঙ্গীত ও বিজ্ঞানকে প্রভাবান্বিত করে। এভাবেই, ইসলামী ভাবধারা অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>শিক্ষা</strong><strong>, </strong><strong>সাহিত্য ও স্থাপত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম পূর্ব ভারতের অবস্থা খুবই নাজুক ও হ-য-ব-র-ল হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তারা বেশ এগিয়ে ছিলো। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সভ্যতার যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছিলো। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনামলে দেশের সর্বত্র শিক্ষায়তন গড়ে উঠেছিলো। মঠ, টোল, পাঠশালা, কলেজ এমনকি কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। বিহারে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও পশ্চিম ভারতের বালভী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ। এছাড়াও উদন্তপুর, বারানসী, বিক্রমশীলা প্রভৃতি স্থানে উচ্চশিক্ষার সু-ব্যবস্থা ছিলো। মালব ও আজমীরে সংস্কৃতি কলেজ স্থাপিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মশাস্ত্র ও বেদান্ত ছাড়াও দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হতো।</p>
<p>প্রাক-মুসলিম আমলে ভারতবর্ষে হিন্দু কাব্য, নাটক, উপন্যাস ও গদ্য সাহিত্যের বিকাশ লাভ করে। সাহিত্যিক হিসেবে ভগবতি, বাহমান, জয়দেব, রাজ শেখর, শ্রীহর্ষ, কালিদাস প্রমুখ খ্যাতি লাভ করেন। আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত ও নাগার্জুন জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত-শাস্ত্র ও চিকিৎসা-বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পে ভারতীয়রা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে। কৈলাশ মন্দির, ভুবনেশ্বর ও কোনারকের মন্দির ছাড়াও ইলোরা, অজন্তা, খাজুরাহ, গান্ধার ও সাঁচির চিত্র ও স্থাপত্য কীর্তি ভারতীয়দের উচ্চমানের শিল্প নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। এ সময় ভারতীয়রা সঙ্গীত চর্চায়ও ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে।</p>
<h4></h4>
<h4><strong>মুসলিম ভারত</strong></h4>
<p>এখন তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, তবে তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান নেই? এক্ষেত্রে উত্তর হলো, শিক্ষা-সাহিত্যে মুসলামদের অবদানের অনস্বীকার্য। পূর্বের এমন একটা ভঙ্গুর সমাজকে যে ইসলামী সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে তারা যে শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>দিল্লির সুলতানি আমলে ভাষা ও সাহিত্যের উপর ইসলামী ভাবধারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ভারতে তুর্কিদের আগমনের সাথে সাথে এদেশে ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু হয়। ফার্সি ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ফার্সি ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পারস্যের অনুকরণে ভারতেও তখন সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পরবর্তী ফার্সি সাহিত্য ভারতীয় বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত হতে থাকে। এ&#8217;ক্ষেত্রে ভারতের তোতা পাখি হিসেবে খ্যাত আমীর খসরুর ভূমিকা ছিলো সর্বাগ্রে।</p>
<p>ভারতে মুসলিম আগমনের সাথে সাথে বই লেখা ও তাতে চিত্রাঙ্কনে যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতে প্রাচীন যুগে জৈন ধর্মশাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য সেগুলোর অনেক অনুলিপি তৈরি করা হতো অথবা পুরনো বইয়ের ভিত্তিতে নতুন বই তৈরি করা হতো। পুথিগুলো ছিলো মূলত তালপাতার। চিকন ও লম্বা তালপাতার উপরে আলঙ্কারিক চিত্রাঙ্কনের কোনো ধরনের সুযোগ ছিলো না। ভারতে মুসলিম শাসনামলে এসব গ্রন্থ রচনা ও চিত্রাঙ্কনের রীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আরব বণিকরা পশ্চিম ভারতে সর্বপ্রথম কাগজ ব্যবহারের প্রচলন ঘটায়। এর ফলে জৈন ধর্মের পুথিগুলো তখন থেকে কাগজে লেখা শুরু হয় এবং তাতে চিত্রাঙ্কনের ব্যাপক সুযোগ হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা প্রভৃতি থেকে ভারতীয় ও ইসলামের সমন্বয় ঘটে। এই মুসলিমদের মাধ্যমেই আরবীয় ইউনানি (ভেষজ) চিকিৎসা ভারতে আসে। আবার ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি পশ্চিম এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>শিক্ষাকেন্দ্র</strong></h4>
<p>শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের বিষয়টি সামনে চলে আসে। সে হিসেবে মুসলিম ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিন্তু, পুরো ভারতবর্ষের সবগুলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আমাদের বুঝার সুবিধার্থে শুধু বাংলার আশেপাশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করা হলো,</p>
<h5>লক্ষ্মণাবতী গৌড় :</h5>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (১২০৪) লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়। সমসাময়িক দিল্লি দরবারের ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ ১২৪৪ সালে বাংলায় আগমন করে বাংলায় অনেক মসজিদ-মাদরাসা দেখতে পান এবং তিনি মন্তব্য করেন যে, বখতিয়ার খিলজীই বাংলায় অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করেন। বাংলায় মুসলিম অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র ছিলো লক্ষ্মণাবতী (গৌড়)। এখানে সুলতানি যুগের অনেক মসজিদ, মাদরাসা, শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, গৌড় ছিল মধ্যযুগে মুসলিম বাংলার অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র। গৌড়ের বিখ্যাত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন কাজী রুকনদ্দীন সমরকন্দী। এছাড়াও, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ দুই বছর গৌড়ে বসবাস করেন। প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ জালালুদ্দীন গজনবী এ শহরে কয়েক বছর অবস্থান করেন। এছাড়াও তিনি বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন ইওয়াজ খলজীর (১২১৩-১২২৭) সভাকক্ষে ভাষণ দেন। বিশিষ্ট কবি ও পণ্ডিত ব্যক্তি শামসুদ্দীন দবীর ও কাজী আসির বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দীন বুগরা খানের রাজসভা অলঙ্কৃত করেন।</p>
<h5>সোনারগাঁও :</h5>
<p>সোনারগাঁও ছিলো বাংলায় ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। আর এ কেন্দ্রের মধ্যবিন্দু ছিলেন বিখ্যাত পীর মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা। তিনি বোখারায় জন্মগ্রহণ করেন, খোরাসানে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দিল্লিতে আসেন। দিল্লি থেকে সরাসরি সুলতান গিয়াস-উদ্দীন বাংলায় আসেন। সোনারগাঁওয়ে এসে তিনি খানকা স্থাপন করেন। এখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলো সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাকেন্দ্র বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব ছিলো। তাঁর খ্যাতনামা শিষ্য ছিলেন পীর শরফুদ্দীন ইহইয়া মানেরী। বিখ্যাত পীর ও পণ্ডিত শেখ আলাউল হক যখন সোনারগাঁওয়ে নির্বাসনে আসেন, তখন তিনি তাঁর সংস্পর্শে আসেন এবং দু&#8217;বছর এখানে কাটান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ছিলো “মাকামাত” ও “নাম-ই-হক”। তিনি ইসলামী শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। এ মহামানব ও মহান শিক্ষক, বাংলা অঞ্চলে শিক্ষার আলোর দিশারী ৭০০ হিজরি মতান্তরে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সোনারগাঁয়ে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।</p>
<h5>সাতগাঁও :</h5>
<p>মধ্যযুগে আরেকটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো সাতগাঁও। এখান থেকে বেশ কয়েকটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, এখানে মাদরাসা তৈরি করা হয়, যার একটি ছিলো বাংলার সুলতান রুকনুদ্দীন কায়কাউসের সময়ে; যেটি ছিলো ১২৯৩ সালে কাজী আল-নাসির মুহাম্মদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি আল-নাসির মাদরাসা নির্মাণে অনেক অর্থ সাহায্য করেন এবং ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ব্যয় নির্বাহের জন্য অনেক অর্থ সাহায্য করেন। আবার বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের ১৩১৩ সালে আরেকটি মসজিদ নির্মাণের প্রমাণও পাওয়া যায়।</p>
<h5>পান্ডুয়া :</h5>
<p>পাণ্ডুয়া ছিল বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র। এটি ছিলো ধর্মীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। কারণ, শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজী, শেখ আখী সিরাজুদ্দীন উসমান, শেখ আলাউল হক, নূর কুতুব-উল-আলম, শেখ জাহিদসহ অসংখ্য পীর-আউলিয়াদের শিক্ষায় পাণ্ডুয়া ধন্য হয়েছে। মুসলিম শাসকদের রাজধানীও ছিলো পাণ্ডুয়া। বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। ফলে, পাণ্ডুয়া ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্রের পাদপীঠের মর্যাদা লাভ করে। আবার বিখ্যাত পীর হযরত নূর কুতুব-উল-আলম (র.) পাণ্ডুয়ায় একটি বড় মাদরাসা ও চিকিৎসালয় নির্মাণ করেন। পাণ্ডুয়া মূলত বহু বিদ্বান পণ্ডিতদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে কয়েকজন বিখ্যাত পণ্ডিতের আবির্ভাব হয়, যারা পান্ডুয়ার বুকে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হন।</p>
<p>এ-তো গেলো শুধু বাংলা ও তার আশপাশের অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র। দিল্লি থেকে সুদূর বাংলারই যদি শিক্ষার এই অবস্থা হয়, তাহলে দিল্লি-সহ সমগ্র ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ রচনার প্রয়োজন পড়বে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পাঠ্যক্রম</strong></h4>
<p>এবার একটু পাঠ্য তালিকার দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাত হোক বা মুঘল আমল হোক, মুসলিম ভারতের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো কুরআন, হাদিস, ধর্ম ও আইনশাস্ত্র এবং অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহ। এছাড়াও, যুক্তিবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয়ও মাদরাসায় গুরুত্ব সহকারে পাঠদান করা হতো। এই পাঠ্য তালিকার কথা বলতে গিয়ে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক আবুল ফজল বলেন,</p>
<blockquote><p>❝প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নীতিশাস্ত্র, গণিত, কৃষি, পরিমাপ-শাস্ত্র, জ্যামিতি, জ্যোতিশাস্ত্র, চরিত্র নির্ণয়বিদ্যা, গার্হস্থ্য বিদ্যা, সরকারি আইন-কানুন, চিকিৎসা বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, উচ্চতর অংক শাস্ত্র, বিজ্ঞানসমূহ, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করা উচিত।❞</p></blockquote>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা বাগদাদের আব্বাসীয় আমলের (৭৫০-১২৫৮) প্রচলিত শিক্ষানীতি ও পাঠ্য তালিকা অনুসরণ করেন। পাশাপাশি, বাংলা অঞ্চলেও তা অনুসরণ করা হয়। বাংলায় আগত মুঘল কর্মচারীরা বাংলার অনেক চিকিৎসক ও তাদের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলেছেন। বাংলার নবাবী আমলের দরবারী ঐতিহাসিকরাও তা উল্লেখ করেছেন। যেমন, “বাহারিস্তান-ই-গায়বী”-র লেখক মীর্জা নাথান এবং ”সিয়ার-উল-মুতাখখেরিন”-এর লেখক গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মতে, বাংলায় অনেক দক্ষ চিকিৎসক, হাকিম ও কবিরাজ ছিলেন। ফরাসি পর্যটক ও মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক বার্নিয়ার বাংলায় এসে বাংলার চিকিৎসক ও তাদের চিকিৎসা পদ্ধতির সম্পর্কে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ দেশের মুসলিম চিকিৎসকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। পক্ষান্তরে, শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় হিন্দুদের অজ্ঞতার কথাও তিনি স্পষ্ট করে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ভাষা সাহিত্য </strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভাষা ও সাহিত্যের পেছনে উদারতার সাথে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁরা আরবি ও ফারসি ভাষা ছাড়াও হিন্দি, সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষারও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ যুগে উল্লিখিত ভাষাগুলো ছাড়াও বাংলা, মারাঠি প্রভৃতি প্রাদেশিক ভাষাসমূহেরও যথেষ্ট বিকাশ লাভ ঘটেছিলো। মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো। <strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন, <strong>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</strong></p>
<p>বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন।</p>
<p>এই যুগে এদেশের সাধারণ প্রচলিত কথ্য ভাষার সাথে আরবি ও ফারসি শব্দ মিশ্রিত হয়ে উর্দু নামক একটি নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়। মুঘল আমলে উর্দু ভাষা যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। উর্দু-সাহিত্য চর্চা প্রথম শুরু করেন আমীর খসরু। সুলতানি আমলে আরেকজন বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক ছিলেন আমীর খসরু। ইতিহাসে তিনি “ভারতবর্ষের তোতাপাখি” নামে আজও অমর হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক নোমানী বলেন, ❝বিগত ছয়শত বছরের মধ্যে ভারতবর্ষে তাঁর ন্যায় সর্বতোমুখী প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেনি।❞</p>
<p>“খাজায়নুল ফতুহ”, “তারিখ-ই-আলাই”, “তুঘলক নামা” প্রভৃতি তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ। আমীর হাসান দেহলবী ছিলেন মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের সভাকবি ও শিল্পী। তিনি “দিউয়ান” নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। বদরুদ্দীন নামক আরেকজন উঁচুদরের কবি মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের দরবার অলঙ্কৃত করেন। এছাড়াও, সাহিত্যিক হিসেবে মালিক মুহাম্মদ যায়সী, দৌলত কাজী প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ&#8217;যুগে শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে জৌনপুর ছিলো বিখ্যাত। সেখানে বহু জ্ঞানী-গুণী, কবি ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো।</p>
<p>আবার, সুলতানি আমলে অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো। তাঁদের মধ্যে মিনহাজ-ই-সিরাজের “তাবাকাত-ই-নাসিরী”, জিয়াউদ্দীন বারানীর “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, শামস-ই-সিরাজ আফিফের “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, ইয়াহিয়া বিন-আহমদের “তারিখ-ই-মুবারক শাহী”, হাসান নিজামীর “তাজুল মা&#8217;সীর” এবং ইসামীর “ফুতুহ-উস-সালাতিন” ছিলো সেই যুগের কয়েকটি বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ। এসব ইতিহাস পাঠে সুলতানি আমলের ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক বিবরণ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।</p>
<p><strong>এছাড়াও, মুঘল আমলের ঐতিহাসিক বাদাউনী, আবুল ফজল, ফিরিস্তা, কাফিখান, আব্দুল হামিদ লাহোরী, নিজামুদ্দীন আহমদ বখশী প্রমুখ ইতিহাস লেখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। মুঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং বাবর ছিলেন একজন পণ্ডিত ও কবি। তিনি “তুযক-ই-বাবুর” লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।</strong> তাঁর আত্মচরিত ইতিহাস সাহিত্যের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তাঁর আত্মচরিত রচনা করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। হুমায়ুনের ভগ্নি গুলবদন বেগম রচিত “হুমায়ুননামা”, ফিরিস্তার “তারিখ-ই-ফিরিস্তা”, আবুল ফজলের “আকবরনামা” ও “আইন-ই-আকবরী” নিযামুদ্দীনের “তাবাকাত ই-আকবরী”, আব্বাস শিরওয়ানীর “তারিখ-ই-শেরশাহী” প্রভৃতি গ্রন্থের ঐতিহাসিক মান ছিলো অত্যন্ত উঁচুস্তরের। সাহিত্যে জাহানারা ও জেবুন্নেছা সে যুগে সুনাম অর্জন করেন। মুঘল আমলে কবি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন ফৈজী, রামদাস, সুরদাস, তুকারাম ও রামপ্রসাদ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong> স্থাপত্য শিল্প</strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রকার নতুন স্থাপত্য শিল্পের প্রবর্তন করেন। এগুলো সাধারণত মক্কা, দামেস্ক, মিসর, বাইজান্টাইন এবং ইরানের স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে ও আদর্শে নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক ফারগুসন একে “ইন্দো-সারাসিন” বা পাঠান স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক হ্যাভেল একে ভুল করে অন্তরঙ্গে ও বহিরঙ্গে হিন্দু স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্পরীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক স্যার জন মার্শাল বলেন,</p>
<p>❝ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য কেবলমাত্র বৈচিত্র্যময় স্থানীয় (আরবীয়) স্থাপত্য কিংবা শুধুমাত্র হিন্দু স্থাপত্যের সংশোধিত রীতি নয়। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য সমানভাবে না হলেও এটা উভয় উৎসের সংমিশ্রণে উদ্ভূত হয়েছে।❞</p>
<p>প্রাথমিক যুগের সুলতানরা তাঁদের ইমারত নির্মাণে স্থানীয় হিন্দু কারিগরদের নিযুক্ত করতেন। ফলে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে হিন্দু প্রভাব দেখা যায়। কাজেই ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য শিল্পে বিশেষ কতকগুলো হিন্দু শিল্পরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। পরবর্তীকালে এদেশে বিপুলসংখ্যক মুসলিম কারিগর ও শিল্পী আগমন করলে সুলতানি আমলের ইমারতগুলো নির্মাণে স্থাপত্য শিল্পে হিন্দু-প্রভাব লোপ পেতে থাকে।</p>
<p><strong>দিল্লিতে মুসলমানদের প্রথম “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটি নির্মাণে কুতুবুদ্দীন আইবেক ২৭টি মন্দিরের উপাদান ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। তাঁর নির্মিত “কুতুব মিনারটি” মূলত আজান দেওয়ার জন্য নির্মিত একটি গম্বুজ-বিশেষ। “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটির অনুকরণে কুতুবুদ্দীন আইবেক আজমীরে “আড়াই দিনকা ঝোপড়া” নির্মাণ করেন। এ যুগের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে ইলতুৎমিশ কর্তৃক বদাউনে নির্মিত মসজিদ, হাউজে শামশী, শামস-ই-ঈদগাহ প্রভৃতি ছিলো সমধিক প্রসিদ্ধ।</strong> এ&#8217;আমলে অনেক প্রাদেশিক শাসকও স্থাপত্য শিল্পের পেছনে উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। জৌনপুরী শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের স্বাক্ষর হিসেবে জৌনপুরের “অটলা মসজিদ”, “জাম-ই-মসজিদ” ও “লাল দরওয়াজা” প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিলো।</p>
<p>বাংলার স্বাধীন সুলতানগণের দ্বারা নির্মিত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, দরবেশ খানজাহান আলীর মাজার, গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, কদম রসুল মসজিদ, হুসেন শাহের সমাধি ইত্যাদি বাংলার স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়াও মালবের রাজধানী মণ্ডুতে নির্মিত জামে মসজিদ, হিন্দু মহল, জাহাজ মহল, হুসাং শাহের সমাধি, বাহাদুর শাহের প্রাসাদ, গুলবর্গার জামে মসজিদ, ফিরোজ শাহ বাহমনীর সমাধি সৌধ, মাহমুদ গাওয়ানের মাদরাসা ভবন, আহমেদাবাদের জামে মসজিদ ইত্যাদি সেই যুগের স্থাপত্য শিল্পের এক অক্ষয় স্বাক্ষর বহন করে আছে।</p>
<p>মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে ভারতীয়, মিসরীয়, ইরানি, সিরীয়, বাইজান্টাইন রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে। এ রীতির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে মুঘল আমলে।</p>
<p>মুঘল আমলের স্থাপত্যশিল্পে ভারত বিশ্ববিখ্যাত ছিলো। উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যশিল্পসমূহ হলো, তাজমহল, লালকেল্লা, ফতেপুর সিক্রি, হুমায়ুনের সমাধি ভবন এবং ইতমাদ্দৌলার সমাধি। মুঘলদের এই বিরাট কর্মযজ্ঞে অসংখ্য দক্ষ শ্রমিক আত্মনিয়োগ করেছিলো। তাদের দক্ষতায় ভারতীয় ও পারসিক শিল্পের সমন্বয়ে এক নতুন শিল্পধারা ভারতে প্রবর্তিত হয়েছিলো। এই স্থাপত্যশিল্পের মূল উপাদান ছিলো ইট, পাথর ও চুন। শ্বেতপাথর ও লালপাথরের নিখুঁত ব্যবহারে স্থাপত্য শিল্প এক অভাবনীয় মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলো।</p>
<p>এই স্থাপত্য শিল্পের সঙ্গে যেমন মুঘল রাজমিস্ত্রি জড়িত ছিলো, তেমনি এসব উপাদান সরবরাহের কাজে হাজার হাজার মানুষও ছিলো জড়িত। ইট, বালি ও পাথর শিল্প ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এ&#8217;যুগে সৌধশিল্প উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ&#8217;ধরনের উৎকর্ষ লাভ কখনই সম্ভব ছিলো না। গ্রামে ও শহরে গৃহনির্মাণকারী, খাল খননকারী, পাথর কাটার কারিগর, ইট প্রস্তুতকারী, রাজমিস্ত্রি, কাঠচেরাইকারী, খোদাইশিল্পী, পালিশের কারিগর, ছাদপেটাই মিস্ত্রি, চুন প্রস্তুতকারক, কুয়োখননকারী ইত্যাদি অসংখ্য কারিগর সহজলভ্য ছিলো। পাশাপাশি, দুর্গ, প্রাসাদ, বাড়ি, মন্দির, সেতু, রাস্তা জাহাজ ইত্যাদি নির্মাণে অনেক শ্রমিক নিয়োজিত ছিলো।</p>
<p>এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাজমহল নিয়ে সম্রাট শাহজাহান-এর নামে চরম যে মিথ্যাচার করা হয়, ইতিহাসে আদতে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনকি, ভারত সরকার পর্যন্ত এমন মিথ্যাচারিতার বিপরীত মন্তব্য পোষণ করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সঙ্গীত</strong></h4>
<p>ইসলামের প্রভাবে ভারতে সঙ্গীতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কবি, সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু সঙ্গীতের তত্ত্বগত ও ব্যবহারগত দিক দিয়ে বিশেষ দক্ষ ছিলেন। তিনি অনেক পারসিক রাগ যেমন—ইমন, ঘোর, খানম প্রভৃতি ব্যবহার ভারতে করেন। ভারতে তবলা, সেতার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব ছিল‌ো। উত্তর ভারতের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে এক বিশিষ্ট উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুসলমানদের যথেষ্ট অবদান অনস্বীকার্য। দিল্লির সুলতানি আমলে সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ঘটে। জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহীম শাহ শর্কীর পৃষ্ঠপোষকতায় উভয় ধারার সমন্বয় ঘটে। দিল্লির তুঘলক বংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটান। তাঁর সময়ে ভারতীয় ক্লাসিক গ্রন্থ &#8220;রাগদর্শন” ফার্সি ভাষায় অনূদিত হয়।</p>
<p>সম্রাট বাবর, হুমায়ুন, আকবর সঙ্গীতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, এমনকি সকলেই সঙ্গীত শাস্ত্রের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিলাস খান, লালাখান, তানসেন প্রমুখ গায়ক ছিলেন মুঘল দরবারের অলংকারস্বরূপ। তানসেনের জামাতা লালাখান, জনার্দন ভাট, মহাপট্টক, জগন্নাথ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ। আবুল ফজলের মতে,</p>
<blockquote><p>❝আকবরের দরবারে প্রায় ৩৬ জন গায়ক সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন। তানসেন-এর ন্যায় গায়ক গত দু&#8217;শ&#8217; বছরেও ভারতবর্ষে দেখতে পাওয়া যায়নি।❞</p></blockquote>
<p>মালবের বাজ বাহাদুর ছিলেন আরেকজন হিন্দি গায়ক। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে সাধক রামাদাস বিখ্যাত ছিলেন। জৌনপুরের হুসেন শাহ শরকী, বিজাপুরের আদিল শাহ এবং লখনৌর নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ মুঘল আমলের শেষের দিকে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের অকাতরে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করতেন। এসময় কলকাতায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সঙ্গীতের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে ঐতিহাসিক মোহাম্মদ শালীহ এবং তার ভাইও সঙ্গীতে বিখ্যাত ছিলেন। জাহাঙ্গীর স্বয়ং একজন সুদক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি অসংখ্য হিন্দি সঙ্গীত রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। সঙ্গীতানুরাগী বাদশাহ হিসেবে সর্বজনবিদিত শাহজাহান দিল্লির দিওয়ান-ই-খাসে প্রতি সন্ধ্যায় সঙ্গীতের আসর বসাতেন।  ঐতিহাসিক জে. এন. সরকার বলেন,</p>
<blockquote><p>❝শাহজাহানের সুমধুর কণ্ঠস্বর এতই আকর্ষণীয় ছিলো যে, বহু সুফি দুনিয়ার সকল মোহমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সান্ধ্য আসরে এসে যোগদান করতেন এবং গান শুনতে শুনতে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন।❞</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>রাজনীতি</strong><strong>, </strong><strong>প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতাপূর্ণ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। এ রাজ্যগুলোর মধ্যে ছিলো না কোনো একতা। অধিকন্তু, তাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় স্থায়িত্ব ছিলো না। আর সামাজিক দিক দিয়ে সংকীর্ণতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, বর্ণপ্রথা সমাজকে একেবারে কলুষিত করে দিয়েছিলো।</p>
<p>মৌর্য সম্রাট অশোক উত্তরে হিমালয় ও উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ পর্বতমালা হতে দক্ষিণে মহীশূর এবং পশ্চিমে পারস্যের সীমানা ও আরব সাগর হতে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে একক রাজনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করতে সক্ষম হন। খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে তার মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন উত্তর ভারতে এবং চাণক্য সম্রাট পুলকেশিন মোটামুটিভাবে ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু, তাদের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। সমগ্র ভারতবর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V.A. Smith (ভিনসেন্ট স্মিথ) বলেন, ❝ভারতবর্ষের ইতিহাসের আংশিক ঐক্য হর্ষের সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছিলো।❞</p>
<p>পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, প্রজাদের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা, গোত্রীয় বিরোধ, বিভিন্ন রাজ্যগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ-সহ ইত্যকার নানা কারণে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা একেবারে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিলো। ফলশ্রুতিতে, শাসকদের অত্যাচারে একপ্রকার অতীষ্ঠ হয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণ মুসলিম শাসকদের নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করে। অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, ভারত বিজয়ের পথ উন্মোচন হয় মূলত স্থানীয়দেরই সাহায্যের মাধ্যমে।</p>
<p>এই যদি হয় মুসলিম পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, তাহলে প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার কথা জ্ঞানীমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। রাজনৈতিক এমন বিশৃঙ্খলার সময় যে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর প্রশাসনিক কার্যক্রমই যখন এমন হয়ে পড়ে, তখন সমগ্র বিচারব্যবস্থাই যে ডুমুরের ফুলের মতো অস্পৃশ্য হয়ে পড়বে, সেটাও আর কলমের ডগায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন মনে হয় না। অধিকন্তু, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টাই যেখানে উপেক্ষিত এবং স্বার্থান্বেষণ ও স্বার্থসিদ্ধিই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে পড়ে, সেখানে বিচারব্যবস্থা যে চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর একনায়কতন্ত্রে রূপ লাভ করবে, এই বিষয়টাও সহসাই উপলব্ধি করা যায়। আবার যেখানে জাতপ্রথার নিরিখেই সমাজের ভালোমন্দের তারতম্য হয়, সেখানে আদতে বিচারব্যবস্থার নাম নেওয়াটাই বিলাসিতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>পক্ষান্তরে, মুসলিম ভারতে এর উল্টোচিত্র দেখা যায়।</p>
<p>এই প্রবন্ধের একেবারে শুরুতেই মুসলিম ভারতের ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক ধারার সফলতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এরপর একাধারে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্যে মুসলিম শাসনামলের এতোসব উৎকর্ষতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রমের শক্তিমত্তা ও সমৃদ্ধশালিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তথাপি, আরেকটু আলোচনা করা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রশাসন</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে প্রত্যেক শাসকই ভারতের প্রশাসন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ক্রমান্বয়ে যুগোপযোগী করে তোলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত থাকতেন। মুসলিম পূর্ব ভারতে যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ছিলো সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এবং হ-য-ব-র-ল, সেখানে মুসলিম শাসনামলে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে শাসন ব্যবস্থা জারি রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো দাড় করানো হয়েছিলো। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকেই স্বতন্ত্র মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। আইন, শাসন, বিচারবিভাগ-সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ প্রতিনিয়তই শাসক তদারকি করতেন। এমনকি, এগুলোর প্রতিটিরই আবার অসংখ্য সাব-ডিপার্টমেন্ট ছিলো। এছাড়াও, কৃষি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র বিভাগ বা মন্ত্রণালয় ছিলো।</p>
<p>এর বাইরেও জনসাধারণের সুবিধার্থে স্থানীয় প্রতিনিধিও নিয়োগ করা হতো। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্য-প্রধান সে রাজ্যটিকে একজন স্বাধীন শাসকের মতোই শাসন করতো। তবে, তাঁরা শাসক বা উজির/মন্ত্রীর নিকট জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ থাকতো; তাঁদের নিকট নিয়মিত জবাবদিহি করতো হতো।</p>
<p><strong>প্রশাসনিক কার্যক্রমে কখনও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়নি ভারতের মুসলিম শাসনামলে। সবসময় যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রশাসনিক কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজন কখনই প্রশ্রয় পায়নি। এমনকি এটা পর্যন্ত শোনা যায় যে, দিল্লির সুলতানি আমলে দেশীয় মুসলমানদের বিপরীতে ভিন্নধর্মী স্থানীয়দেরকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়া হতো।</strong> সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক থেকে শুরু করে ইব্রাহীম লোদী পর্যন্ত এই ৩২০ বছরে দরবারে উজির বা প্রধান সেনাপতির (সিপাহসালার) পদ কোনো ভারতীয় মুসলমান পায়নি। সেসময় অমুসলিম নাগরিকদের প্রতিই উদারতা প্রদর্শন করা হয়।</p>
<p>আবার, মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>মুঘল আমলে মনসবদারি পদ্ধতিতে সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এই মনসবদারি প্রথা মুঘলদের নতুন উদ্ভাবন নয়। মুঘলদের আগে সম্ভবত মধ্য এশিয়ায় এই প্রথা প্রচলিত ছিলো। মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং-এর শাসনামলে মনসবদারি প্রথা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো। সৈন্যবাহিনীকে বিভিন্ন পদমর্যাদার রীতি সুলতানি আমলেও চলে আসছিলো। শেরশাহ এবং তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ সেনাবাহিনীর নতুন সংস্কার সাধন করেন। বাবর ও হুমায়ুন সময় ও সুযোগের অভাবে সেনা বিভাগের তেমন কোনো সংস্কার করে যেতে পারেননি। সিংহাসনে আরোহণ করে আকবর সেনাবাহিনীর শোচনীয় অবস্থা লক্ষ্য করলে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার খাতিরে সেনাবাহিনীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শাহবাজ খানের মাধ্যমে মনসবদারি প্রথার উপর ভিত্তি করে এক অভিনব সামরিক সংগঠন সৃষ্টি করেন। তাঁর এই প্রথার মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সেনাবাহিনীর পুনঃগঠন করা। আকবর এই মনসবদারি প্রথা প্রবর্তন করে মুঘলদের সামরিক ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিচারব্যবস্থা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসকগণ আইনের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য আইন ছিলো সমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সুলতানরা বদ্ধপরিকর ছিলেন। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সব সুলতান আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন একটি শিকল বাঁধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতেন, যেনো যেকোনো বিচারপ্রার্থী খুব সহজেই সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝জনসাধারণের অভিযোগ শ্রবণের জন্য তাঁর প্রাসাদে শিকলে বাঁধা একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং অভিযোগকারীরা তা বাজিয়ে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো।❞</p></blockquote>
<p>তাছাড়া, বিচার কার্যের জন্য আইন হিসেবে কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস ব্যবহার করা হতো। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এতো বেশি কঠোর ছিলেন যে, অপরাধীরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতো। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন,</p>
<blockquote><p>❝সুলতানের (বলবন) ন্যায়বিচারের জন্য লোকে এতই ভীতসন্ত্রস্ত থাকতো যে, কেউ কখনো ভৃত্য এবং ক্রীতদাসদের প্রতি অসদাচরণ করতে সাহস পেতো না।&#8221;</p></blockquote>
<p>মুঘল আমলে সাম্রাজ্যের বিচার বিভাগীয় প্রধানকে বলা হতো “কাজী-আল-কুজ্জাত” বা “প্রধান বিচারপতি”। তাঁকে হতে হতো আইনজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ, সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ও নিষ্ঠাবান মুসলমান। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার করতেন। তাছাড়া প্রাদেশিক কাজী, সরকার কাজী, পরগণা কাজী ও কাজী-ই-আসকার (সেনাবাহিনীর সঙ্গের কাজী) বিচারকার্য সমাধান করতেন।</p>
<p>বিচারব্যবস্থায় মুফতীদের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। তাঁরা বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন না। তবে প্রয়োজনে কাজী তাঁদের ধর্মীয় বিষয়ে মতামত গ্রহণ করতেন। তারা শরিয়ত অনুযায়ী &#8220;ফতোয়া&#8221; দিতেন। যখন কাজী কোনো কারণে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারতেন না, তখন &#8220;মীর আদিল&#8221; তাঁর কার্য-সম্পাদন করতেন। তিনি কাজীর তুলনায় ঊর্ধ্বতন কর্মচারী ছিলেন।</p>
<p>মুঘল আমল ছিলো একনায়কতান্ত্রিক শাসন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস ছিলো সম্রাটের হাতে। তারপরও মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, তাঁকে যেমন শরিয়ত মোতাবেক চলতে হতো, আবার তেমনি শরিয়তের পাশাপাশি সম্রাটকে রাষ্ট্রের অভিজাত সম্প্রদায়, সেনাবাহিনী, উলামা ও আইন বিশারদদের সমর্থন লাভ করতে হতো। তাঁরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। দোষী যেই হোক না কেনো, শাস্তি তাকে পেতেই হতো। <strong>সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহানের অপরাধের বিরুদ্ধে রায় দেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধেও শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। সম্রাট আকবর বলতেন, ❝আমি স্বয়ং কোনো অপরাধ করলেও নিজের বিরুদ্ধে রায় দিবো।❞</strong></p>
<p>কাজেই বলা যায় যে, মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মুঘলদের অবদান ছিলো অপরিসীম। প্রত্যেক মুঘল সম্রাটই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন, তা ইতিহাসের পরতে পরতে প্রমাণ বহন করে চলেছে। ইসলামী আইনের চোখে সবাই ছিলো সমান। ইবনে হাসান বলেন, ❝এটা নিশ্চিত যে, মুঘল বিচার পদ্ধতি ছিলো যুগের ও সমাজের জন্য উপযোগী।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মুসলিম শাসনামলে বিচারব্যবস্থার নমুনা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে বিচার ব্যবস্থা কেমন ছিলো, তার তিনটি উপমা নিচে উপস্থাপন করা হলো।</p>
<h5><strong>প্রথম</strong></h5>
<p>সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সুলতান। সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহ একজন ন্যায়বিচারক শাসক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতিনে সুলতানের ন্যায়বিচারের একটি কাহিনী রয়েছে। তিনি একদা তীর ছুঁড়তে গিয়ে এক বিধবা মহিলার পুত্রকে হত্যা করে ফেলেন। বিধবা মহিলা তৎকালিন প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজ উদ্দিনের কাছে বিচারপ্রার্থী হলেন। প্রধান বিচারপতি নির্ভয়ে সুলতানের নামে সমন জারী করলেন। সুলতান বিচারপতির আদালতে হাজির হলে বিচারপতি কোনো রকম সম্মান প্রদর্শন না করে তাঁর বিরুদ্ধে বিধবার আনীত অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বিধবাকে ক্ষতিপূরণ দানে সন্তুষ্ট করতে না পারলে শরীয়ত মতে সুলতান দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সুলতান বিধবাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং বিধবা অভিযোগের সন্তোষজনক মিমাংসার কথা বিচারপতিকে অবহিত করেন।</p>
<p>সুলতান তখন শাহী আসন থেকে উঠে এসে বিচারপতিকে সালাম দিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার রাজ্যে এমন একজন ন্যায় বিচারক আছেন এজন্য দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। বিচারপতি, আপনি আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে আমার তরবারি দিয়েই আমি আপনার মস্তক ছেদ করতাম।❞</p></blockquote>
<p>প্রতি উত্তরে বিচারপতি বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার নির্দেশ আপনি অমান্য করলে আমিও আপনাকে বেত্রাঘাত করতাম।❞</p></blockquote>
<p>পরবর্তীতে, সুলতান বিচারপতিকে ন্যায়বিচারের জন্য পুরষ্কৃত করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>দ্বিতীয়</strong></h5>
<p>একবার সম্রাট আলমগীরের সৈন্যবাহিনী এক মুসলিম সেনাপতির অধীনে পাঞ্জাবের এক পল্লীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ পথিমধ্যে জনৈক ব্রাক্ষণের এক অপরূপ সুন্দরী কন্যার প্রস্ফুটিত গোলাপের মত মুখশ্রী দেখে লোভাতুর সেনাপতি তার পিতার নিকট মেয়েটিকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসে এবং সিদ্ধান্ত জারি করে যে, আজ থেকে এক মাস পরেই সে তার বাড়ীতে বর-বেশে উপস্থিত হবে। কন্যার পিতা নিজে সম্রাট আলমগীরের নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে বাদশার সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সম্রাট তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। সাথে এ-ও জানালেন যে, নিদিষ্ট দিনে তিনি ব্রাহ্মণের বাড়িতে উপস্থিত থাকবে। ব্রাহ্মণ নানা চিন্তার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এরপর, বিবাহের আগের দিন সম্রাট আলমগীর একাই এসে উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণের বাড়িতে। ব্রাহ্মণ হতবাক!</p>
<p><strong>সম্রাট সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণের এক পুরাতন জীর্ণ কামরায় সারা রাত এবাদত  বন্দেগী ও মোনাজাত-প্রার্থনায় অশ্রুবিসর্জন করে কাটালেন। ব্রাহ্মণের পরিবারবর্গ এ দৃশ্য দেখার পর আবারও অবাক হলেন। পরদিন মুঘল সেনাপতি বর-বেশে ব্রাহ্মণের ঘরে উপস্থিতি হলো। বিবাহের পূর্বে কন্যাকে একবার দেখা উত্তম। সেজন্য, সেনাপতি কন্যাকে দেখতে চাইলো। প্রত্যুত্তরে ব্রাহ্মণ সম্রাটের শেখানো অনুযায়ী সম্রাটের কামরার দিকেই ইশারা করলেন। সেনাপতি ঘরে প্রবেশ করেই দেখলো খোলা তরবারি হাতে সম্রাট আলমগীর বসে রয়েছেন।</strong></p>
<p>যৌবনের বুকভরা আবেগ আর মুখভরা হাসি নিমিষেই সম্রাটকে দেখার পর অদৃশ্য হয়ে গেলো। যে সেনাপতির দাপটে শত্রু সৈন্যরা থরথর করে কাঁপে, যার মাঝে ভয়-ভীতি অথবা দুর্বলতা কখনও স্থান পায় না, আজ সেই মহাবীর কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ভীষণ শব্দে যেনো কেঁপে উঠলো। নিজেকে সামলে নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করলেও দুঃখ, লজ্জা, শাস্তি আর অপমানের আশংকায় সেনাপতি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কন্যার পিতা সম্রাট আলমগীরের সুবিচার, দায়িত্ববোধ আর অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা দেখে আনন্দে বললেন,</p>
<p>❝আপনি আমার, বিশেষ করে আমার কন্যার ইজ্জত রক্ষা করেছেন। আপনার এই ঋণ অপরিশোধ্য।❞</p>
<p>সম্রাট আলমগীর ব্রাহ্মণকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করে বললেন,</p>
<p>❝এই মহান দায়িত্ব আমার। আমি যে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি এতেই আমি ধন্য।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>তৃতীয়</strong></h5>
<p>মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ছিলেন আঠারো শতকের ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল নারীদের একজন। জন্মের সময় তার নাম দেয়া হয়েছিলো মিহরুন নিসা। কিন্তু স্বামী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর পরে তার নাম পাল্টে রেখেছিলেন নূরজাহান (জগতের আলো)। নূরজাহান কবি, স্থপতি ও দক্ষ শিকারি ছিলেন। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে প্রিয়তম স্ত্রীতে পরিণত হন। সারাটি দিন তিনি নুরজাহানকে নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকতেন। নিজ স্ত্রীর বিচার করার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল হলেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ন্যায়বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।</p>
<p>সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেই সময়ে সাধারণ প্রজাদের সরাসরি সাক্ষাতের কোনো অনুমতি ছিলো না। তিনি তখন মুজাদ্দিদে আলফেসানীর পরামর্শে দরবারের বাইরের ফটকে একটি শিকল রাখেন, যেটি একেবারে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শয়নকক্ষ পর্যন্ত সংযুক্ত ছিলো, যার সঙ্গে একটা ঘণ্টাও বাঁধা ছিলো। যেকোনো অত্যাচারিত, উপবাসী, অবহেলিত কেউ অথবা রাজকর্মচারীদের দ্বারা যার কাজ সমাধান হয়নি, এমন মুসলিম-অমুসলিম প্রজা সেই শিকল টানলেই বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কক্ষে ডাকতেন এবং তাঁর সন্তোষজনক সমাধান করেই তবে ক্ষান্ত হতেন।</p>
<p>একদিন রূপ লাবণ্যের জীবন্ত প্রতীক নুরজাহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রূপচর্চা করছিলেন। এমন সময় এক বিকৃত মস্তিষ্ক হিন্দু প্রজা বিনা অনুমতিতেই নুরজাহানের কক্ষে উপস্থিত হয়ে পড়েন। নুরজাহান সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু প্রজাকে গুলি করে মেরে ফেলেন। নিহত হিন্দু প্রজার আত্মীয় শিকল টানলেন এবং জাহাঙ্গীরের নিকট নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী হলেন। <strong>বিচারকের আসনে তখন জাহাঙ্গীর এবং আসামীর কাঠগড়ায় তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহান। কঠিন এই মুর্হুতেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ভুললেন না ইসলামের বিধান। জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রীর ব্যাপারে রায় ঘোষণা করলেন মৃত্যুদন্ড। রায় ঘোষণার সাথে সাথে সকলেই হতবাক হয়ে গেলেন। স্বয়ং নূরজাহান তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এমন সময় সম্রাট জাহাঙ্গীরের মন্তব্য ছিলো,</strong></p>
<blockquote><p>❝ইসলামের আইনে তুমি তাকে হত্যা করতে পারতে কারোর প্রাণনাশের বা ব্যাভিচারের অপরাধে। কিন্তু সে দোষ তো তার ছিলো না। সে ছিলো বিকৃত মস্তিষ্ক। অতএব, আমি আবার বলছি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তোমার মৃত্যুদন্ড।❞</p></blockquote>
<p>একজন মহান শাসক কর্তৃক ইসলামের এই ইনসাফ-ভিত্তিক ন্যায়বিচার দেখে বিচারপ্রার্থী হিন্দু প্রজারা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেছিলো,</p>
<blockquote><p>❝হে ন্যায়পরায়ণ বাদশা! আমরা প্রাণদন্ড চাই না। নূরজাহানকে আমরা ক্ষমা করে দিলাম। কারণ, তিনি তো আর ইচ্ছে করে খুন করেননি। তিনি যা করেছেন তা তো নিজের আত্মরক্ষার জন্যই করেছেন।❞</p></blockquote>
<h4><strong>💠</strong><strong>অর্থনৈতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>পূর্বেই বলা হয়েছে, সমগ্র ভারতবর্ষ হলো মহান রবের নেয়ামতধন্য অপার এক লীলাভূমি। কিন্তু, এতো নেয়ামত সত্ত্বেও মুসলিমপূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ ভঙ্গুর। দু&#8217;বেলা দু&#8217;মুঠো আহারের জন্য জনসাধারণের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো। এসব বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ ছিলো, অর্থনীতির সুষমবণ্টন না থাকা এবং যোগ্য অর্থনীতিবীদ না থাকা। অবশ্য, যেখানে ধর্মের নামে অধর্ম চর্চা করা হতো, শাসনের নামে জনগণকে শোষণ করা হতো, জাতিভেদ ও জাতপ্রথা যেখানে সমাজকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিলো—সর্বোপরি, ভারতের সামগ্রিক অবস্থাই ছিলো যেখানে বিশৃঙ্খল, সেখানে অর্থনৈতিক সুদিনের বিষয় কল্পনা করাটাই ছিলো অতিরঞ্জন। বর্তমান সময়ের মতোই সেসময়েও ধনীরা হয়ে যেতো আরো ধনী এবং দরিদ্ররা হয়ে যেতো একেবারে নিঃশেষ; ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কিছুদিনের মাথায় স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে যেতো কোনো একজনের কৃতদাস। কিছুদিন পূর্বে একই ঘরে বসবাস করা একই পরিবারের সদস্যদের ঠিকানা হতো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।</p>
<p>ভারতবর্ষ ছিলো একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের এক ষষ্ঠাংশ (৬ ভাগের ১ ভাগ) রাষ্ট্রকে কর হিসেবে দিতে হতো। এ করকে &#8220;ভাগ&#8221; বলা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, মৌর্য ও গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলো। এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়। খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীতে বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতে আসেন। তিনি গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিবরণ দেন। তার মতে মগধের লোক সমৃদ্ধশালী ও ধনী ছিলো এবং তাদের মধ্যে সৎ কাজ করার প্রবণতাও ছিলো। এ সময়ে বাংলার তাম্রলিপ্তি বন্দর একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। এখান থেকে বঙ্গদেশের বণিকরা বড় বড় জাহাজে সিংহল, মালয়, যবদ্বীপ প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। ভারতবর্ষে শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। কার্পাস বস্ত্র উৎপাদন এবং রপ্তানির জন্য গুজরাট এবং বাংলাদেশ খ্যাতি লাভ করে। ঢাকার মসলিন ছিলো সেসময় পৃথিবী বিখ্যাত।</p>
<p>সে যাইহোক, ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী থাকলেও সম্পদ বণ্টন ও ভোগের ক্ষেত্রে ছিলো চরম বৈষম্য ও অব্যবস্থা। অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ লোকের জীবনযাত্রার মধ্যে ছিলো ব্যাপক ব্যবধান। সমাজের সাধারণ মানুষ যেমন—কামার, কুমার, ছুতার, স্বর্ণকার এবং কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত‌ো। কিন্তু, সুফল ভোগ করতো অভিজাত শ্রেণির লোকেরা; তারা অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>সমগ্র ভারতের ইতিহাসে চরম অর্থনৈতিক উৎকর্ষতার যুগ হচ্ছে মুসলিম শাসনামল। মুসলিমরা এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে সফলতা লাভ করেনি। মুঘলামলে এই ভারতবর্ষ সমগ্র পৃথিবীর ২৮-৩০% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। আজকের ইউরোপীয়দেরকে এই ভারতবর্ষ থেকেই স্কলারশিপ বা বৃত্তি প্রদান করা হতো। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে রাজ্য পরিচালনার জন্য নামেমাত্র কর নেওয়া হতো। কর নেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম কোনো বৈষম্য করা হতো না। যার জন্য যেটা ন্যায্য, তার জন্য সেটাই ধার্য করা হতো। মুসলিমদের জন্য যাকাত, ওশর, সদকা ও ফেতরার মতো বিষয়গুলো সেভাবেই ধার্য করা হতো। পাশাপাশি, অন্যদের জন্য অবস্থা অনুযায়ী জিযিয়া ও খারাজ গ্রহণ করা হতো। মুসলিম শাসনামলে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য আলাদা দফতর বা মন্ত্রণালয় দক্ষ হাতে পরিচালনা করা হতো। এমনকি, মুসলিম শাসকদের প্রতিটি পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং সেসব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না, তা স্বয়ং শাসক নিয়মিত তদারকি করতেন। পণ্যসমূহের বাজারমূল্য নির্ধারণ করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি শাসকগণ, বরং মুদ্রাব্যবস্থাতেও এনেছিলেন অভূতপূর্ব বিবর্তন; বিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে নিত্য নতুন মুদ্রার প্রচলনও শুরু করতেন শাসকগণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে আমলে বস্ত্রশিল্পে চরম উন্নতি লাভ করে। গুজরাট ও বাংলা ছিলো বস্ত্রশিল্পের প্রধান ঘাটি। এমনকি, এই অঞ্চলে এমনসব পোশাক তৈরি করা হতো, যেসব পোশাক তৈরিতে আবহাওয়াকে পর্যন্ত কাজে লাগানো হতো। সিল্ক, মসলিন, সুসতরি ভিরাইন, কিংখাব ছিলো সে সময়ের জগদ্বিখ্যাত সব পোশাকের নাম। শুধু পোশাকেই নয়; বরং তুলা শিল্প, পশম শিল্প, ধাতু শিল্প, জুয়েলারি শিল্প, পাথর শিল্প, কাঠ শিল্প, কাগজ শিল্প, কাঁচ শিল্প এবং চিনি শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিলো মুসলিম শাসকগণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ব্যবসা বাণিজ্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা ভারতে আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাত্রা আসে। দিল্লির সুলতানি আমল-সহ মুঘল আমলেও কেন্দ্রীয় শাসন, কৃষি-শিল্পের উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নগরায়ন ও মুদ্রা ব্যবস্থার বিকাশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। এ সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রসার ঘটে। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর সময়ে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এ সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. অভ্যন্তরীণ বা আন্তঃবাণিজ্য,</li>
<li>০২. বৈদেশিক বা বহিঃবাণিজ্য।</li>
</ul>
<p>মুসলিম শাসনামলে ভারতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিলো। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিলো প্রাদেশিক রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলো। যেমন—মুলতান, দিল্লি, আমরোহা, মীরাট, মালবের ধর, অযোধ্যা, দেবগিরি, লক্ষণাবতী, কাশ্মীর, গুজরাট, বিজয়নগর; এসব শহর ও বন্দরগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে। সেসময় বিভিন্ন ধরনের পণ্য-দ্রব্য আমদানি-রপ্তানি করা হতো। গ্রাম থেকে খাদ্যশস্য এসব বাণিজ্যকেন্দ্রে আসতো। এসব কেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি করা হতো। গুজরাটের সুরাট ও ম্যাংগ্রল হতে ঘোড়া, গম, চাল, তুলা, কাপড় এবং আরও বহু জিনিসপত্র ভারতের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার এখানে নিয়ে আসা হতো নারকেল, পালিশের শক্ত গুঁড়ো, খনিজ পদার্থ, মোম, এলাচ ও মসলা। ব্যবসায়ীরা উপকূল বাণিজ্যে দিউ, মালাবার, ভাতকল, গোয়া, চাল ও দাভোলের সঙ্গে ভালোই লাভ করতো। বারবোসা বলেছেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মালাবারের জাহাজে করে লোহা, ভাতকলের চিনি, গোলমরিচ, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, চন্দনকাঠ, সিল্ক &#8216;দিউ&#8217; বন্দরে যেতো এবং আসার সময় মালাক্কা ও চীন হতে এখানে বিশেষ করে সিল্কের কাপড়, দেশীয় বস্ত্র, ঘোড়া, গম ও আফিম নিয়ে আসতো। আবার বাংলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে করে চিনি ও কাপড় নিয়ে ক্যাম্বের ও মালাবার যেতো কমোরিন অন্তরীপ হয়ে।❞</p></blockquote>
<p>ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বরাবরই চলতো জলপথে ও স্থলপথে। ইসলামের অভ্যুত্থান ও মূর জাতির আধিপত্য হেতু ইউরোপের সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের পণ্য যাওয়ার পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। কারণ, আরব বণিকরা ভারতীয় পণ্য লোহিত সাগরে বয়ে নিয়ে যেতো; সেখান থেকে যেতো দামাস্কাস ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। তারপর, সেখান থেকে ভারতীয় পণ্য বিভিন্ন অঞ্চলে বাগদাদ ও ইউরোপে ছড়িয়ে যেতো। মূর বণিকদের দ্বারাও ভারতীয় পণ্য বিদেশের বাজারে পৌঁছে যেতো। বিশেষ করে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, সুদূর পূর্বাঞ্চলের মালয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যেতো। স্থলপথে ভারতীয় পণ্য প্রধানত চারটে দেশে যেতো, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, পারস্য ও ইরাক। মুলতান-কোয়েটা সড়ক, খাইবার গিরিপথ ও কাশ্মীর যাওয়ার রাস্তাগুলোই ঐসব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো; এই পথেই আবার বাণিজ্য হতো। বিদেশি বাজার থেকে ভারতে বিলাসদ্রব্য ও অন্যান্য দ্রব্য চলে আসতো এবং সাধারণভাবে সব রকমের প্রয়োজনীয় পণ্যের এদেশে ভালো বাজার ছিলো। আবার পারস্য উপকূলের কোনো কোনো দেশ ভারতের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল ছিলো। বারবোসার বক্তব্য অনুসারে বাংলার সাদা চিনি বিদেশে প্রচুর রপ্তানি হতো।</p>
<p>সমুদ্র বাণিজ্যে প্রধানত বাংলা ও গুজরাট বন্দরের মাধ্যমেই এই রপ্তানি বাণিজা চলতো। গুজরাটের প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো বহুমূল্য পাথর, নীল, তুলো, পশুর চামড়া এবং আরও বহু জিনিস। সুতি ও অন্যান্য বস্ত্রই ছিলো প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। গৌণ রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে ছিলো বহুমূল্য রক্তিম পাথর, তিল তেল, চন্দন কাঠ, সুবাসিত তেল, দস্তা, আফিম, নীল এবং মালাক্কা ও চীন দেশে থেকে নিয়ে আসা কিছু ঔষধপত্র। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রপ্তানি হতো গম, জোয়ার, চাল, ডাল, তৈলবীজ, সেন্ট এবং আরও অনেক দ্রব্য। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বারবোসার মতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো চিনি। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h5><strong>রাজস্ব ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>মুঘল শাসনামলে ভারতের রাজস্বব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী ছিলো। বাবর ও হুমায়ুনের আমলে সুলতানি আমলের প্রশাসন কাঠামোর উপরই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো। তবে আকবরের রাজত্বকালে মুঘলদের রাজস্ব ব্যবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন আনয়ন করা হয়। এ আমলে সুষ্ঠু নিয়ম-নীতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হতো। রাজকোষও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে বিরাট সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ, শিল্প-স্থাপত্যের উৎকর্ষ সাধন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তাদের প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন হতো।</p>
<p>সম্রাট আকবরের শাসনামলে সরকারের আয়ের উৎস ছিলো কয়েকটি। যথা,</p>
<ul>
<li>(১) ভূমি রাজস্ব,</li>
<li>(২) বাণিজ্য শুল্ক,</li>
<li>(৩) টাকশাল,</li>
<li>(৪) উত্তরাধিকার স্বত্ব</li>
<li>(৫) উপঢৌকন,</li>
<li>(৬) ক্ষতি পূরণের অর্থ।</li>
</ul>
<p>এগুলোর মধ্যে ভূমি রাজস্ব ছিলো সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। সম্রাট আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। শের শাহের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যা পরবর্তী সময়ে লোপ পায়, তা আকবর পুনরায় শুরু করেন। সম্রাট আকবর পর পর একাধিক দেওয়ানের প্রচেষ্টা পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমলকে “দিওয়ান-ই-আশরাফ” বা “প্রধান রাজস্ব সচিব” নিযুক্ত করেন এবং রাজস্ব সংস্কারের নির্দেশ দেন। সম্রাট আকবর শেরশাহের রাজস্ব ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন করেন, তা তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব ও মেধার পরিচায়ক।</p>
<p>মুঘল সম্রাট আকবরের রাজস্ব নীতির সুফল সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এসবের ফলে রাজকর সুনির্দিষ্ট হয়। রাজস্ব কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধ হয়। সম্রাটের আয় বৃদ্ধি পায়। সম্রাট বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অধিক অর্থ ব্যয় করতে পারেন। এর ফলে কৃষককুল সমৃদ্ধশালী হয়। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর আগে বার্ষিক খাজনার পরিমাণ ছিল ১৭, ৪৫,০০,০০০ টাকা। এছাড়াও,</p>
<ul>
<li>ক. কৃষকদের আর্থিক উন্নতি হয়।</li>
<li>খ. অনাবৃষ্টি ও খরাজনিত কারণে কর মওকুফ হয়।</li>
<li>গ. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।</li>
<li>ঘ. দৈনন্দিন ব্যবহারের দ্রব্যাদির মূল্য হ্রাস,</li>
<li>ঙ. জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়,</li>
<li>চ. গরু, ষাঁড়, লবণ প্রভৃতির উপর নির্ধারিত কর বাতিল।</li>
</ul>
<p>এসব প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V. A. Smith বলেন,</p>
<p>❝সংক্ষেপে বলতে গেলে, আকবরের রাজস্ব শাসন ছিলো প্রশংসনীয়। নিয়ম-কানুন ছিলো বিজ্ঞচিত এবং কর্মচারীবৃন্দকে জনগণের প্রতি সদয় হতে বাস্তব নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>কৃষি-ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরদিনই ছিলো কৃষিনির্ভর। ভারতের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ লোকের জীবিকাই ছিলো কৃষি। মুঘল সম্রাটরা কৃষির প্রতি বিশেষ নজর দেন। মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থা যে খুব খারাপ ছিলো তা বলা যায় না। যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা সে যুগে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মুঘল আমলে মুঘল প্রশাসন ও অভিজাতবর্গ ছিলো কৃষিজাত আয়ের উপর নির্ভরশীল। মুঘল আমলের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অপেক্ষা যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থার পরিচয় বিখ্যাত আফ্রিকার শাসক ইবন বতুতার বিবরণ থেকে জানা যায়। বারবোসা, মাহুয়ান ও বার্থেমার বিবরণ থেকেও ভারতের কৃষি ও শিল্পের অনেক তথ্য পাওয়া যায়।</p>
<p>পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতীয় কৃষকরা অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করতেন। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে মোট ৪১ রকমের রবি ও খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। তিনি আগ্রা অঞ্চলে ১৬টি রবি শস্য ও ২৫টি খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। শূন্য পুরাণ থেকে জানা যায় যে, ৫০ রকমের চাল বাংলায় উৎপাদন হতো। ভারতীয় কৃষকরা অন্যান্য দেশ থেকে আনা নতুন শস্যও উৎপাদন করতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার ২টি নতুন পণ্য—তামাক ও ভুট্টা এদেশে উৎপাদিত হতে থাকে। নদীমাতৃক ভারতবর্ষের মাটি পলিমাটি দ্বারা গঠিত হওয়ায় জমি ছিলো খুবই উর্বর। বছরে ২ থেকে ৩ বার ফসল উৎপাদন হতো। সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী “বাবরনামা” থেকে জানা যায় যে, বৈচিত্র্যের জন্য উৎপাদন ছিলো ভারতীয় কৃষকদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের পশ্চিম উপকূলে তামাকের চাষ শুরু হয় এবং পরবর্তী ৫০ বছরের মধ্যে সমগ্র মুঘল-ভারতে তামাকের চাষ সম্প্রসারিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রে ভুট্টা চাষ হতো। মরিচ চাষ মুঘল-ভারতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃদ্ধি পায়। আলু ইউরোপীয় বণিকরা আমেরিকা হতে এদেশে আনেন। কফি দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে সামান্য উৎপাদিত হতো, কিন্তু তা চাষ ভারতীয় কৃষকদের অজানা ছিলো।</p>
<p>ধান, পাট, গম, কার্পাস, তৈলবীজ, আদা, মরিচ, রেশম এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল, বার্লি এবং আরও অসংখ্য রকমের রবিশস্য ও ইক্ষু ভারতের মাটিতে ভালো ফলতো। মুঘল নথিপথে অর্থকরী ফসলকে “জিনিস-এ-কামিল” বলা হয়েছে। কার্পাসের পাশাপাশি ইক্ষু ছিলো এই ধরনের অর্থকরী ফসল। নানাবিধ ফল-মূল ও শাক-সবজির চাষ মুঘল যুগে হতো। বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন শস্যের ভিত্তিতে আজকের মতো সেসময়ও শস্য উৎপাদনে খ্যাতি অর্জন করেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার</strong></h4>
<p>এখন এতোসব আলোচনার পরিসমাপ্তিতে একটা প্রশ্ন বা মন্তব্য আসতে পারে যে, ভারতের মুসলিম শাসনামলের সাথে পূর্বের শাসনামলের তুলনামূূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ পাওয়া গেলেও শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে তো হিন্দু-মুসলিম তুলনা করা হয়নি, বরং এই দু&#8217;টি সেক্টরে পূর্বের সাথে তুলনা করে উন্নতি ও উৎকর্ষতা দেখানো হয়েছে।</p>
<p>এর উত্তরে এখানে দু&#8217;টি বিষয় আসবে। যথা,</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সামগ্রিক, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণও সেজন্য হয় সামগ্রিক। কখনও এভাবে দু&#8217;টি ধর্মের জন্য কাজ করে না ইসলামী সভ্যতা। বরং, মুসলিমদের নিজেদের ভেতরে মারহামাতপূর্ণ একটা সমাজ বিনির্মাণ করে তারপর সমাজের সকলকে একসাথে নিয়ে আদালত ও মারহামাতপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী সভ্যতায় হিন্দু-মুসলিম বলে আলাদা কোনোকিছু ছিলো না। কেননা, এখানে হিন্দুদের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও বড় একটা অংশ বসবাস করতো। এমনকি, এই বৌদ্ধ জনসাধারণই মুসলিমদেরকে ভারত অভিযানে আমন্ত্রণ জানায়।</p>
<p>আবার, হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সহাবস্থান বজায় রাখা বা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি সেক্টরে হিন্দু-মুসলিম একত্রে কাজ করাটাই শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের উদাহরণ নয়, বরং মুসলিম সমাজের মাঝেও যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগে থাকে, সে সমাজকেও সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটা সমাজ বলা যায় না। অতএব, এখানে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান বলে আদতে কিছুই নেই। যা আছে তা হলো, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষকে নিয়ে আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূর্ণ একটি সমাজ বিনির্মাণ করা; যা ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী ভারতীয় উপমহাদেশে প্রমাণ করে দেখিয়ে এসেছে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong></p>
<p>হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় যেভাবে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উপমা পেশ করা হয়েছে, সেটার সাথে তুলনা করে অবশ্য শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে সে উপমা পাওয়া যায় না; বরং এখানে উন্নতি ও অগ্রগতির বিষয়টাই তুলনামূলকভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু, এখানে আরেকটা বিষয় উঠে আসে যে, প্রাক-মুসলিম ভারতে যেসব সেক্টরে সুস্পষ্টরূপে অসামাজিকতা বা সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিপরীত কার্যক্রম লক্ষ্য করা যেতো, সেসব সেক্টরগুলোকে ধরে ধরে মুসলিম ভারতের সময়কার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>আবার যেখানে রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-বিষয়টা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে অর্থনীতিতে যে স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তখনই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যায়, যখন শিক্ষা-সাহিত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সমানভাবে শিক্ষা অর্জন করতে পারে। কেননা, সঠিক শিক্ষা ব্যতীত কখনই ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নিদর্শন পাওয়া যায় না। সে হিসেবে, যেখানে তুলনামূলক পার্থক্য দেখানোর প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেটাই করা হয়েছে; এবং যেখানে মুসলিম শাসনামলের উন্নতি ও সমৃদ্ধি উপস্থাপনের প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেসব বিষয়ই উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অতএব, পরিসমাপ্তিতে বলা যায় যে,</strong></p>
<p>সার্বিক আলোচনায় এবং সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসে মুসলিম শাসনামল বা ইসলামী সভ্যতাই একমাত্র সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা পেশ করেছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, নারী, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতি-সহ সমাজ নামক বিষয়টির সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রতিটি বিষয়েই ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নিশ্চিত করেছিলো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূ্র্ণ যে সমাজের নিদর্শন উপস্থাপন করেছিলো, তাবত ভারতীয় ইতিহাসের আর কোনো সভ্যতাই সে নিদর্শন পেশ করতে সক্ষম হয়নি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানই নয় শুধু, বরং খোদ ভারতের ১০০কোটি মানুষও এখন আবারও ইসলামী সভ্যতার সামাজিক অবকাঠামো অর্থাৎ নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটি সমাজের জন্য মুখিয়ে আছে। পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন ভারতের যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, আর কোথাও থেকে হোক বা না হোক, যে বাংলার ভূমি থেকেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, সেই বাংলার উর্বর জমিন থেকেই আবারো স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাওলাঃ</strong></p>
<p>১. ইসলাম ও জ্ঞান, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
২. আন্তর্জাতিক শোষণ ও মুক্তির পন্থা, হাসান আল ফিরদাউস।<br />
৩. সাম্রাজ্যবাদ, ফাহমিদ-উর-রহমান।<br />
৪. দাওয়াম, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
৫. পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম।<br />
৬. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক।<br />
৭. আলিম ইসলামের ইতিহাস, লেকচার পাবলিকেশন্স।<br />
৮. মুসলিম ভারতের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।<br />
৯. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (মুঘল আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১০. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (সুলতানি আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১১. মুসলিম প্রশাসনব্যবস্থা, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।<br />
১২. মুসলিম প্রশাসন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ, ড. মুহম্মদ আলী আসগর খান, শেখ মুহম্মদ লুৎফর রহমান, মোখলেছুর রহমান।<br />
১৩. সোনারগাঁও: বাংলায় ইলমী সিলসিলার অনন্য মিনার, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম।<br />
১৪. সুলতানী আমলে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার উৎপত্তি ও বিকাশ, ড. আব্দুল করিম।<br />
১৫. মুসলিম শাসনে ন্যায়বিচার, তোফাজ্জল বিন আমীন।<br />
১৬. বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা হাসান আল ফিরদাউস (মিহওয়ার ৪র্থ সংখ্যা)<br />
১৭. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ডক্টর এম. এ রহিম।<br />
১৮. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খান।<br />
১৯. আমাদের জাতিসত্ত্বার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।<br />
২০. বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15906</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 May 2025 07:18:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15855</guid>

					<description><![CDATA[যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা মূল ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা মূল ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না কুরআনের দৃশ্যায়নের পুরো বৈশিষ্ট্যসমূহ সামনে চলে আসে। সত্যি কথা বলতে কি, চিত্রায়ণ, কল্পনা ও রূপায়ণ ছাড়াও কুরআনে বহু আলংকারিক দিক রয়েছে। যতোক্ষণ সে অরণ্যে প্রবেশ করা না যাবে ততোক্ষণ কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের কথা বলা যেতে পারে, যা দৃশ্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>শৈল্পিক বিন্যাসের ধরন</strong></h5>
<p>শৈল্পিক বিন্যাসের কয়েকটি স্তর আছে। বিন্যাসের শৈল্পিক এবং আলংকারিক কতিপয় দিক এমন আছে, যে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ বিশ্লেষণ করেছেন। আবার এমন কিছু দিকও আছে যে সবের মধ্যে তাদের স্পর্শ পর্যন্ত পড়েনি।</p>
<p>১. বিন্যাসের একটি ধরন, যার সম্পর্ক ইবাদতের বিন্যাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- উপযোগী কিছু শব্দচয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিন্যাস করায়। যার বদৌলতে সে বাক্য কথা বা পরিশীলনে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ বিষয়ে এতো বেশি আলোচনা হয়েছে যে, নতুন করে আর কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা নেই।</p>
<p>২. বিন্যাসের আরেকটি সম্পর্ক হচ্ছে, সুর ও ছন্দের সাথে। যা শব্দের সঠিক চয়ন এবং তাকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে বিন্যাসের দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটি আল-কুরআনে পুরো মাত্রায় দৃষ্টিগোচর হয় এবং কুরআনের শৈল্পিক ভিত্তিতে তা একাকার হয়ে আছে। তবু আগের মনীষীগণের দৃষ্টি বাহ্যিক সুর ও ছন্দ ছাড়িয়ে আগে বাড়তে পারেনি। এমনকি তারা এটিও জানতেন না যে সঙ্গীতের সুর, তাল ও মাত্রার সংখ্যা কতো এবং তা কোন ঢংয়ে কোথায় ব্যবহৃত হয়।</p>
<p>৩. অলংকার শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ আল-কুরআনের বিন্যাসের আলংকারিক যেসব দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তার একটি হচ্ছে, আল-কুরআনের আয়াতের শেষ অথবা বক্তব্যের শেষ করা হয়েছে বক্তব্যের সাথে সংগতি রেখে। যেমন- যেসব আয়াতে আল্লাহ তা’আলার যাত ও সিফাতের বর্ণনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْئً قدير বাক্য দ্বারা। আবার যেখানে কোন গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: ان الله عَلَيْمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ বাক্যটি দ্বারা। আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে ইসমে মাওসুল (সংযোজিত পদ) নিয়ে তারপর ছিলাহ বা সংযোজক পদ) ছাড়াই বাক্যকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া। তারপর জাযা বা প্রতিফল বর্ণনা করা। যেমন:</p>
<blockquote><p>إِنَّ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِأَيْتِنَا وَاسْتَكْبَرُوا عَنْهَا لَا تُفَتِّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى بَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ</p>
<p>যারা আমার আয়াতে মিথ্যা বলেছে এবং অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং জান্নাতেও যেতে পারবে না, যতক্ষণ সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করতে না পারবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪০)</p></blockquote>
<p>তেমিনভাবে যেখানে তা’লীম ও তারবিয়াতের আলোচনা এসেছে সেখানে ‘রব্ব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:</p>
<blockquote><p>اقرأ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ &#8211; خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ &#8211; أَقْرَا وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَمَ بِالقَلم &#8211; عَلَّمَ الْإِنْسَنُ مَا لَمْ يَعْلَمْ</p>
<p>পড় তোমার রব্ব-এর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়, তোমার রব্ব অত্যন্ত দয়ালু যিনি কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আল-আলাক: ১-৫)</p></blockquote>
<p>যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সম্মান প্রতিপত্তির আলোচনা এসেছে সেখানে اللَّهَ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:</p>
<p>إِنَّ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ ، وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ، وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ</p>
<p>নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। (সূরা লুকমান: ৩৪)</p>
<p>এমনিভাবে اللَّهَ শব্দটি স্থান ও কালভেদে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো আল্লাহ শব্দটি একবার বলে পরবর্তী আয়াতসমূহে শুধুমাত্র সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও বাক্যের প্রথমে, আবার শেষে, আবার কোথাও আল্লাহ শব্দ এবং তার সর্বনাম যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় প্রশ্নের অবতারণার জন্য আবার অনেক জায়গায় ইতিবাচক বর্ণনার জন্য নেয়া হয়েছে। এটি অনেক অলংকার শাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিকট আলংকারিক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত।</p>
<p>৪. কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যের অর্থগত ধারাবকাহিকতা থাকে। অতপর একটির উদ্দেশ্যকে অন্যটির উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করার ফলে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাও এক ধরনের শৈল্পিক বিন্যাসের নমুনা। অবশ্য অলংকার শাস্ত্রবিদগণ শৈল্পিক বিন্যাস সম্পর্কে যে নীতির কথা বলেন আল-কুরআন তা থেকে মুক্ত।</p>
<p>৫. সম্ভবত শৈল্পিক বিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর যে সম্পর্কে অলংকার শাস্ত্রবিদগণ এ পর্যন্ত পরিচিতি লাভ করেছেন তা হচ্ছে আল-কুরআনের স্বভাবজাত বিন্যাস, যা কাতিপয় আয়াতের বর্ণনা পরম্পরায় পাওয়া যায়। যেমন সূরা আল-ফাতিহা প্রসঙ্গে আমরা আল্লাম যামাখশারীর লেখা থেকে ‘আল-কুরআনের গবেষণা ও তাফসীর’ অধ্যায়ে উদ্ধৃতি দিয়েছি। অলংকার শাস্ত্রবিগদগণ যে বৈশিষ্ট্যসমূহ নিরূপণ করেছেন, কুরআনী বালাগাতের গবেষক আলিমগণ আজ পর্যন্ত তাকে শৈল্পিক বিন্যাসের উত্তম প্রকাশ বলে ঘোষণা দিয়ে আসছেন। আশ্চর্যের কথা এই যে, তারা শৈল্পিক বিন্যাসের অন্য দিকটির নাগালও পাননি। তারা বেশি অগ্রসর হয়ে করার মধ্যে এই করেছেন, আল-কুরআনের সুর ও ছন্দ নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত তাদের নিকট মনে হয়েছে কুরআনের অন্য কোন বৈশিষ্ট্যই আর নেই। প্রকৃতপক্ষে কুরআনী বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য মাত্র। কিন্তু এখানেই তারা পরিতৃপ্ত হয়ে বসে পড়েছেন।</p>
<p>কেননা বালাগাতের আলিমগণ এর মর্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না যে, চিত্রায়ণ ও দৃশ্যাঙ্কনের মাধ্যমে আল-কুরআনে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তা মুল বা ভিত্তির মর্যাদা রাখে। তাই তারা শৈল্পিক বিন্যাসের ব্যাপারটি ভালভাবে আলোকপাত করতে পারেননি। এ বিষয়ে আমরা আমাদের নতুন চিন্তা-গবেষণা পেশ করবো বলেই এ পুস্তকটি লিখা হয়েছে। পুরোনো বিষয় নিয়ে বিবাদ বা তর্ক-বিতর্ক করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাচ্ছি কুরআনের আলংকারিক দিক সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয়েছে তা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার চেষ্টা করা। আমাদের পূর্বসূরীরা যেখানে পৌঁছে থেমে গেছেন তা থেকে আরো সামনে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। কেননা তার প্রচুর অবকাশ আছে। এ বিষয়ে আমরা ঐ সমস্ত উদাহরণকে যথেষ্ট মনে করি, যা আমরা প্রথমদিকে ‘সূরা আল-আলাক’ –এর ব্যাখ্যায় এবং ‘আল কুরআনের সম্মোহনী শক্তির উৎস’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। ঐসব উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল-কুরআনে চিন্তার যোগসূত্রতা এবং বাহ্যিক বিন্যাস প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ ও অবকাশ আছে।</p>
<p>আমরা শুধু একথাটি ইঙ্গিত দিতে চাই, আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী এবং ঐ সমস্ত স্থান, যা ঘটনার সাথে জড়িত এ দু’য়ের মধ্যে এক অদৃশ্য আত্মিক বন্ধন রয়েছে। সেই সাথে কুরআন সেসব ঘটনার দ্বীনি উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং শৈল্পিক দিকের প্রতিও দৃষ্টি রাখে।  এছাড়াও কিয়ামতের দৃশ্য, শান্তি ও শাস্তির দৃশ্য, জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কথপোকথনের দৃশ্যাবলীতেও এ ধরনের মিল পাওয়া যায়, যা আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীতে বিদ্যমান। এ সমস্ত বিষয় বর্ণনার সময় একটি ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্রের প্রতিও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তাই বলে মূল উদ্দেশ্যটাকেও সরাসরি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়নি, যে উদ্দেশ্যে ঐ ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে।</p>
<p>মূল কথা হচ্ছে কুরআনে কারীমের অর্থ ও তাৎপর্য এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং অতি উন্নত। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার নিগুঢ় যে সৌন্দর্য, দৃশ্যায়ন থেকে তার বিস্তৃতি অনেক বেশি। আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় যে, আলোচনার সহজ ও সমতল পথ ছেড়ে অগ্রসর হয়ে এক ঝটকায় কলমের গতি সেই বিষয়বস্তুর সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে উপনীত করবো। এজন্য আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে সেই চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করবো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>১</h4>
<p>কুরআনুল কারীমে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে চিত্রায়ণ পদ্ধতে তার বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, সেখানে বক্তব্য এবং অবস্থার মধ্যে পুরোপুরি মিল পাওয়া যায়। যেমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বর্ণনার এ ঢং অথবা আভিধানিক অর্থ ছবির লক্ষণসমূহ পরিপূল্ণ করতে সহায়ক প্রমাণিত হয়্ এটি এমন একটি বাঁক যা বর্ণনার জন্য ব্যাখ্যা এবং ছবির মধ্যে যোগসূত্রের মর্যাদা রাখে। যেখান থকে হাল্কা ঢংয়ের বর্ণা এবং উঁচু মানের নির্মাণ শৈলীর রাস্তা পৃথক হয়ে যায়। যেমন পরবর্তী আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:</p>
<p>إِنْ شَرِّ الدَّوابِ عِنْدَ اللهِ الصُّمُّ البُكُمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ</p>
<p>নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় নিকৃষ্ট সেইসব মুক ও বধির- যারা উপলব্ধি করে না। (সূরা আল-আনফাল: ২২)</p>
<p>الدواب শব্দটি সাধারণ জীবজন্তুর বেলায় ব্যবহৃত হয়। অবশ্য অনেক সময় এ শব্দটি দিয়ে মানুষকে বুঝানো হয়। কেননা دابة শব্দ দিয়ে ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল প্রাণীকেই বুঝায় যেহেতু মানুষও ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করে তাই মানুষের বেলায়ও এ শব্দটি প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু دابة শব্দটি মানুষ অর্থে গ্রহণ করতে বিবেক বাধ্য নয়। এটি স্বাভাবিকতার বিপরীত। এখানে মানুষের জন্য الدواب শব্দটি ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে তাদের চরিত্র ও আচার আচরণে পশু সুলভ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়, যা তাদের হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধক। এ থেকেই তাদের গাফলতি ও পশুত্বের ছবি পরিপূর্ণ হয়ে যায় لَا يَعْقِلُونَ (তারা উপলব্ধি করে না) শব্দ দিয়ে একথাটিকে আরো পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে।</p>
<p>অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:</p>
<p>وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُوْنَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَهُمْ</p>
<p>আর যারা কাফির তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো আহার করে, তাদের বাসস্থান জাহান্নাম। (সূরা মুহাম্মদ : ১২)</p>
<p>এ আয়াতে কাফিরদেরকে জন্তু-জানোয়ারের সাথে তুলনা করে এক চমৎকার চিত্র অংকন করা হয়েছে। কারণ তারা অল্প ক’দিনের দুনিয়ায় খুব আনন্দ ফূর্তি করছে এং বিভিন্নবাবে তারা দুনিয়ার রং-তামাসাকে উপভোগ করার প্রয়াস পাচ্ছে। কিন্তু পরকালের শাস্তি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন যা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যে আচরণ একমাত্র জন্তু-জানোয়ারের দ্বারাই শোভা পায়। সেগুলো খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ ফূর্তিতে মশগুল থাকে কিন্তু একবারও ভেবে দেখে না, কসাইয়ের ছুরি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেগুলোর একমাত্র কাজই যেন শুধু খাওয়া- দাওয়া ও আনন্দ-ফুর্তি করা।</p>
<p>আরো একটি উদাহরণ দেখুন:</p>
<p>نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَكُمْ وَ فَاتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ</p>
<p>তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ। নিজেদের ক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছে যাও। (সূরা আল-বাকারা: ২২৩)</p>
<p>এ আয়অতে কয়েক প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য মিল পাওয়া যায়। এখানে স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শকাতর সম্পর্ককে বড় সূক্ষ্ম ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপমা হচ্ছে স্বামসী-স্ত্রীর সম্পর্কে একজন কৃষক ও তার জমির সাথে তুলনা করা হয়েছে। জমি যেমন ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র তদ্রূপ স্ত্রীও সন্তান উৎপাদনে ক্ষেত্র। জমির ফসল দিয়ে যেমন গোলা পরিপূর্ণ করা হয়, তেমনি স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করে বংশধারাকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে গোটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সঠিক ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>২</h4>
<p>অনেক সময় শুধুমাত্র একটি শব্দ-পুরো বাক্য নয়- ছবির আংশিক পূর্ণতার স্বাক্ষর বহন না করে বরং পুরো ছবিটিকেই উদ্ভাসিত করে তোলে। চিত্রায়ণ পদ্ধতিতে এ মিল পূর্বের চেয়েও জোরালো। এটি পূর্ণতার কাছাকাছি প্রায়। এর গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণ পূর্ণবাক্য ব্যতিরেকে শুধুমাত্র একটি শব্দই একটি চিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। সেই শব্দটি কর্ণগোচর হওয়া মাত্র মনের মুকুরে ভেসে উঠে একটি পরিপূর্ণ চিত্র।</p>
<p>يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَالَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّا قَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ</p>
<p>হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হয়েছে, যখন আল্লহর পথে তোমাদেরকে বের হওয়ার জন্য বলা হয়, তখন তোমরা জমিন আঁকড়ে পড়ে থাক। (সূরা আত-তাওবা: ৩৮)</p>
<p>এ আয়াত পাঠকালে যখন إِنَّا قَلْتُمْ শব্দটি কর্ণগোচর হয় তখনই চিন্তার জগতে একটি ভারী বস্তুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। মনে হয় কোন ব্যক্তি যেন ভারী কোন বস্তুকে উঠানোর জন্য বারবার চেষ্টা করছে কিন্তু তা ভারী হওয়ার কারণে উঠাতে পারছে না। মনে হয় শব্দটি ওজনে কয়েক টন। যদি আয়াতে تثا قلتم বলা হতো (মূলত দুটো শব্দের অর্থ একই) তবে পূর্বের শব্দের মতো এতো ভারী বুঝাত না। উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেত। কিন্তু ব্যবহৃত শব্দটির এতো যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে যে, শ্রোতা শোনামাত্র দুঃসাধ্য এক ভারী বোঝার চিত্র তার কল্পনার চোখে ভেসে উঠে।</p>
<p>এ ধরনের আরেকটি আয়াত হচ্ছে:</p>
<p>وَإِنَّ مِنْكُمْ لَمَنْ لَيُبَطِئَنُ</p>
<p>আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে যারা (ইচ্ছেকৃত) বিলম্ব করবে। (সূরা আন-নিসা: ৭২)</p>
<p>এ আয়াতটি পড়া মাত্র বিলম্বের একটি ধারণা সৃষ্টি হয় বিশেষ করে لِيُبَطِن শব্দটি পাঠ কিংবা শ্রবণ করা মাত্র চোখের সামনে এক চিত্র ভেসে উঠে। তা হচ্ছে সেই কথা বলতে তাদের জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যায়। বহু কষ্টে এবং অনেক বিলম্বৈ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে।</p>
<p>আল-কুরআনে হযরত নূহ (আ)-এর কথাটি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>قَالَ يَقَوْمَ أَرَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةِ مِنْ رَبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ ، أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَرِهُونَ</p>
<p>(নূহ বললেন: ) হে আার জাতি। দেখ তো আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলিলের ওপর থাকি, তিনি যদি তার পক্ষ থেকে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তার পরেও যদি তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তবে আমি কি তা তোমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি, তোমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে? (সূরা হুদ: ২৮)</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে لز مُكْمُومًا শব্দটি পাঠ করা মাত্র অপছন্দ ও পীড়াপীড়ির এক চিত্র ভেসে উঠে মনের মুকুরে। তার সমস্ত চেতনা ও বাকশক্তি পরস্পর এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যেমন كَرَهُونَ বা ঘৃণাকারী সেই জিনিসের সাথে আচরণ করে যা সে ঘৃণা করে। এ আয়াতে শব্দ ও অর্থের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক প্রতিভাত হয় তা বালাগাত ও ফাসাহাতের এক বলিষ্ঠতম প্রয়োগ। যাকে পূর্ব যুগের ও বর্তমান যুগের মুফাসসিরগণ আল-কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে অভিহিত করেছেন।</p>
<p>অন্যত্র বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ ، لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِّنْ عَذَابِهَا ، كَذَالِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ &#8211; وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيْهَا ، رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ</p>
<p>আর যারা কাফির,তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশ দেয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি অকৃতজ্ঞদেরকে এভাবেই শাস্তি প্রদান করি। সেখানে তারা আর্ত চীৎকার করে বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান থেকে বের করে দিন, আমরা সৎকাজ করবো, পূর্বে যা করেছি তেমনটি আর করবো না। (সূরা ফাতির: ৩৬-৩৭)</p></blockquote>
<p>এ আয়াতে يَصْطَرخُون শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, জাহান্নামীরা চীৎকার করছে, সে আওয়াজ চতুর্দিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেই সাথে আরেকটিচিত্র ভেসে উঠে- তাদের এ মর্মান্তিক চীৎকার কেউ শুনছে আর না এর কোন প্রতিকার করার জন্য কেউ এগিয়ে আসছে সেই প্রাণান্তকর চীৎকারের কারণে। এ চিত্র থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে, শাস্তির তীব্রতা কতো ভয়াবহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন একটি মাত্র শব্দ সমস্ত বাক্যের বক্তব্যকে প্রস্ফুটিত করে তোলে তখন তা হয় تَنَاسُ বা (শৈল্পিক) বিন্যাসের চূড়ান্ত রূপ। যেমন:</p>
<p>عُتُلِ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيْم কঠোর স্বভাব তদুপরি কুখ্যাত। (সূরা ক্বলম: ১৩)</p>
<p>এ আয়াতে عُتُلِ শব্দটি কঠোর স্বভাব ও নির্মমতার পূর্ণ চিত্র অংকন করার জন্য যথেষ্ট।</p>
<p>এ রকম আরেকটি আয়াতে কারীমা :</p>
<p>وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمِّرَ কিন্তু এতো দীর্ঘজীবন তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। (সূরা আল-বাকারা: ৯৬)</p>
<p>এ আয়াতে بِمُزَحْزِحِهِ এর কর্তা হচ্ছে نْ يُعْمَرَ। যা পরিপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত একটি চিত্র অংকন করেছে। কথা ক’টি মুখে উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই চিত্র।</p>
<p>পরবর্তী আয়াতটিও একটি উত্তম উদাহরণ:</p>
<p>فَكُبْكِبُوا فِيهَا هُمْ وَالْغَاوَّنَ &#8211; وَجُنُودُ ابْلِيْسَ اجْمَعُونَ</p>
<p>অতপর তাদেরকে এবং পথভ্রণ্টতের (অর্থাৎ মূর্তি এবং মূর্তিপূজকদের অধোমুকি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং ইবলিস বাহিনীর সকলকেও। ( সূরা আশ-শুআরা: ৯৪-৯৫)</p>
<p>এ আয়াতে فَكُبْكِبُوا শব্দটি জাহান্নামে পতিত হওয়ার যে আওয়াজ তার প্রতিনিধিত্ব করছে।</p>
<p>উল্লেখ্য যে, আয়াত দুটোতে بِمُزَحْزِحِهِ এবং فَكُبْكِبُوا শব্দদ্বয়ের আক্ষরিক অর্থই গোটা ছবিটিকে চোখের সামনে উদ্ভাসিত করে তোলে। কথা এটি নয় যে, কুরআনের বিশেষ ব্যবহারে তার মধ্যে এ ধরনের ধারণা সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মাত্র যে শব্দগুলো স্মরণ করা হলো তা কুরআনের বিশেষ এক প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে এবং একবার মাত্র তা বর্ণিত হয়েছে। অবশ্যই একথা বলা যায় যে, উল্লেখিত শ্বদ্বয় যে স্থানে প্রয়োগ করা হয়েছে নিঃসন্দেহে তা আলংকরিক বর্ণনাসমূহের মধ্যে উৎকৃষ্ট বর্ণনা হিসেবে গণ্য।</p>
<p>কুরআনে কারীমে কিয়ামতের বিশেষণমূলক যে কটি প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার মধ্যে الصاخة (বধিরকারিণী) এবং الظلمة (সকল কিচুর ওপর বিস্তার লাভকারী) শব্দ দুটোও আছে। الصاخة শব্দের মধ্যে এমন পরিমাণে গর্জন ও কাঠিন্য পাওয়া যায়, শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, সে গর্জনে কান ফেটে যাবে। এ শব্দটি বাতাস ভেত করে কর্ণকুহরে গিয়ে আঘাত করে এবং বধির করে দেয়। তেমনিভাবে الطامة শব্দটিও মনে হয় তীব্রবেগে চলমান। এটি ঝড়েরর গতিতে সকল কিছুতে ছেয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলছে। এ রকম আরেকটি আয়াত:</p>
<p>وَالصُّبْحِ إِذَا تَنَفْسَ সকাল বেলার শপথ, যখন সে শ্বাস গ্রহণ করে (অর্থাৎ উদ্ভাসিত হয়) । (সূরা তাকবীর: ১৮)</p>
<p>আমি تَنَفْسَ এর মতো সূক্ষ্ম ও মনোরম শব্দ চয়ন দেখে এবং এর বিকল্প প্রতিশব্দের কথা চিন্তা করে ‘থ’ খেয়ে গেলাম। আপনিও কুরআনের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে অবাক হয়ে যাবেন এবং একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দটি নির্বাচনে আল-কুরআনের সৌন্দর্য ও অলৌকিকত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে:</p>
<p>إِذْ يُغَشَيْكُمُ النُّعَاسَ آمَنَةً مِّنْهُ</p>
<p>যখন তিনি তোমাদের প্রশান্তির জন্য নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর নিদ্রার চাদর বিছিয়ে দিলেন। (সূরা আল-আনফাল: ১১)</p>
<p>এ আয়অতে নিদ্রাকে النُّعَاسَ (তন্দ্রাবেশ) শব্দ দিয়ে প্রচণ্ড প্রভাবের কথা বুঝানো হয়েছে। মনে হয় নিদ্রা এক ধরনের পাতলা ও সূক্ষ্ম চাদর যা খুব আরাম ও মসৃণতার সাথে ঢেকে দেয়। آمَنَةً مِّنْهُ শব্দ থেকে মনে হয় গোটা পৃথিবীব্যাপী প্রশান্তি ও নিরাপত্তা ছেয়ে আছে।</p>
<p>শব্দ ও উচ্চারণ থেকে চিত্রায়ণ আমরা আল-কুরআনের সর্বশেষ সূরা- সূরা আন- নাসেও দেখতে পাই। চিন্তা করে দেখুন:</p>
<p>قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ &#8211; مَلِكِ النَّاسِ &#8211; إِلَهِ النَّاسِ &#8211; مِنْ شَرِّ الوسوَاسِ الْخَنَّاسِ &#8211; الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ – مِنَ الجنة والناس &#8211;</p>
<p>বলে দাও, আমি মানুষের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। (আশ্রয় চাচ্ছি) লোকদের প্রকৃত বাদশাহরে নিকট। মানুষের ইলাহ্‌র নিকট। শয়তানের খারাপ ওয়াসওয়াসা থেকে (যে আল্লাহর নাম শুনে ভেগে যায়), যে লোকদের অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। চাই সে মানুষের থেকে হোক কিংবা জ্বিনদের মধ্য থেকে। (সূরা আন-নাস: ১-৬)</p>
<p>এ সূলাটিকে বার বার পড়ুন এবং দেখুন আপনার আওয়াজ একটি পরিপূরণ ওয়াসওয়াসার সৃষ্টি করবে যা অবিকল সূরায় বর্ণিত ওয়াসওয়াসার মতো। বিশেষ করে নিম্নোক্ত আয়াত পাঠে সৃষ্টি হয়।</p>
<p>مِنْ شَرِّ الْوَسْوَسِ الْخَنَّاسِ &#8211; الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورُ النَّاسِ</p>
<p>আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন। ইরশাদ হচ্ছে:</p>
<p>كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ ، إِنْ يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا</p>
<p>কতো কঠিন তাদের মুখের কথা, তারা যা বলে তাতো সবই মিথ্যে। (সূরা কাহাফ: ৫)</p>
<p>এ আয়াতটিও আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। তবে সামান্য পার্থক্য আছে। এ আয়াতে একটি দোষের কথা বলা হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তান আছে। এ আয়াতে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এ চরম মিথ্যে কথাটিকে খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন প্রথমে كَبُرَتْ কথাটি বলে কর্তকে গোপন রাখা হয়েছে। আবার كَلِمَةً শব্দটি তমীয ও নাকারা (অনির্দিষ্ট) হিসেবে নিয়ে জঘণ্যতার মাত্রাধিক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর مِنْ أَفْوَاهِهِمْ বলে বুঝান হয়েছে, কথাগুলো মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃত এবং অজ্ঞতা প্রসূত বের হয়েছে। أَفْوَاهِهِمْ এর মাধ্যমে যে ঘৃণা ও নীচতা সৃষ্টি হয় তাকে বলবৎ রাখা হয়েছে। এ শব্দটি উচ্চারণের সময় মুখকে সামান্য ফাঁক করা হয় কিন্তু শেষ মীম টি উচ্চারণের সাথে সাথে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তখনও কণ্ঠনালী থেকে বাতাস বেরিয়ে মুখ ভর্তি থাকে।</p>
<p>এক ধরনের শব্দ আছে, যা বিষয়বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে ঠিকই কিন্তু নিজের বক্তব্য ও আওয়াজকে কানে প্রবেশ করিয়ে নয়। তার চিত্রের পরিধি শুধুমাত্র ঐ ছায়ার মতো যা চিন্তার জগতে সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য যে, শব্দ এবং বাকের নিজস্বএক ছায়া বা প্রতিবিম্ব থাকে, যখন মানুষের দৃষ্টি পড়ে তখন তা দৃষ্টিগোচর হয়। এর উদাহরণ হচ্ছে নিচের এ আয়াতটি:</p>
<p>وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَا الَّذِي أَتَيْنُهُ أَيْتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا</p>
<p>তাদেরকে ঐ ব্যক্তির অবস্থা শুনিয়ে দাও যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। (সূরা আরাফ: ১৭৫)</p>
<p>এ আয়াতে ‘ফানসালাখা’ শব্দটি দ্বারা অনুমিত হয়, ঐ ব্যক্তিকে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিল সে তা থেকে কিভাবে বেরিয়ে গেছে। নিচের আয়াতটিও আরেকটি উত্তম উদাহরণ:</p>
<p>فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَيْفًا يَتَرَقُبُ</p>
<p>অতপর তিনি প্রভাতে শঞরে ভীত শংকিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। (সূরা কিসাস: ১৮)</p>
<p>এ আয়াতে يُتَرَ قُتُ শব্দে হযরত মূসা (আ)-এর ভীত ও শংকিত হবার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সামনে রাখতে হবে যে, হযরত মূসা (আ) ভয়ের প্রকাশ স্থল ‘ফিল মাদীনাতি’ অর্থা শহরকে মনে করেছেন যা সাধারণ শান্তি ও নিরাপত্তার হয়ে থাকে। যদিও ‘ইয়াত্তারাক্কাবু’ ঐ সমস্ত জায়গাকেই বলা হয় যেখানে ভয়-ভীতি লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে শান্তি নিরাপত্তার জায়গাকে ভীতিকর চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>আমরা ইতোপূর্বে ‘কল্পনা ও রূপায়ণ’ অধ্যায়ে এ ধরনের উদাহরণ পেশ করেছি, সেগুলোও এর সাথে পূর্ণ সঙ্গতি রাখে।</p>
<p>কখনো কখনো একই শব্দে আওয়াজ এবং প্রভাব একত্রিত হয়ে থাকে। যেমন:</p>
<p>يَوْمَ يُدَعُونَ إِلَى نَارِ جَهَنَّمَ دَعا</p>
<p>যেদিন তাদেরকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ধাক্কিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (সূরা আত-তুর: ১৩)</p>
<p>এ আয়াতে دَعا শব্দটি আওয়াজ ও প্রভাবের সাথে সাথে তার তাৎপর্যের চিত্র সৃষ্টি করে। এখানে চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে دَعا শব্দের অর্থ জোরের সাথে ধাক্কা দেয়া। যখন খুব জোরে কাউকে ধাক্কা দেয়া হয় তখন তার মুখ থেকে তার অজান্তে عُو শব্দটি বেরিয়ে যায়। এ শব্দটি دَعا শব্দের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যশীল। নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:</p>
<p>خَذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ</p>
<p>একে ধরো এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। (সূরা দুখান: ৪৭)</p>
<p>এ আয়াতে فَاعْتِلُوهُ শব্দটির আওয়াজ কানে প্রবেশ করা মাত্র ভাবজগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং একটি জীবন্ত ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে।</p>
<p>এ অধ্যায়ে আমরা সেইসব শব্দের উল্লেখ করতে পারি, যে সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম, আওয়াজটাই তার আক্ষরিক অর্থের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন النُّعَاسَ (তন্দ্রা), التَّنَفْسُ (শ্বাস গ্রহণ করা), الطامة (কিয়ামত)। এসব শব্দ আওয়াজের সাথে সাথে একটি ছায়াও সৃষ্টি করে। কিন্তু এর আওয়াজ ও ছায়ার মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান তার সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। যখন শব্দ তার অর্থ ও ভাবের ছবি অংকন করে তার ধ্বনি ও ভাব একত্রিত হয়ে যায়। তা শুধু অর্থগত দিকে নয় বরং চিন্তা ও চিত্রের দিকেও ধাবিত হয়। আর ঐ জায়গাটিই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্যস্থল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>৩</h4>
<p>আল-কুরআন তার বক্তব্য তুলে ধরার জন্য দৃশ্যায়নের যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তার মধ্যে তাকাবুল বা বৈপরিত্যও একটি। কুরআন যেখানে শব্দের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চিত্র অংকন করতে চায় সেখানে অধিকাংশ সময় তাকাবুল পদ্ধতির অনুসরণ করে থাকে। যেমন :</p>
<p>وَمِنْ أَيْتِهِ خَلْقُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ ، وَهُوَ علَى جَمْعِهِمْ إِذَا يَشَاءُ قَدِيرٌ</p>
<p>তার এক নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব প্রাণী ছড়িযে দিয়েছেন। তিনি তখন ইচ্ছে এগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম। (সূরা আশ শুরা: ২৯)</p>
<p>এ আয়াতে بَثَّ (বিক্ষিপ্ত) এবং جَمْعِهِمْ (একত্রিত করা) শব্দদ্বয় তাকাবুল বা বৈপরিত্যের। বিপরীতমুখী এ শব্দ দুটোকে একই আয়অতে একত্রে প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা হয়েছে। যা চিন্তার জগতে একের পর এক ছবির মতো আবির্ভূত হয়। যদিও শব্দ দুটো বিপরীতার্থক তবু তা সুন্দরভাবে মিলে গেছে।</p>
<p>নিচের আয়াতটিতে জীবন ও মৃত্যু বিপরীতধর্মী দুটো চিত্রকে একত্রিত দেয়া হয়েছে।</p>
<blockquote><p>أَوَلَمْ يَهْدِ لَهُمْ كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْقُرُونِ يَمْشُونَ فِي مَسْكِنِهِمْ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ الْأيْت أَفَلَا يَسْمَعُونَ &#8211; أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَسُوقُ المَاءَ إِلَى الْأَرْضِ الجُرُزِ فُنُخْرِجُ بِهِ زَوْعًا تَأْكُلُ مِنْهُ أَنْعَامُهُمْ وَأَنْفُسُهُمْ ، أَفَلَا يُبْصِرُونَ &#8211;</p>
<p>এতে কি তাদের চোখ খুলেনি, আমি তাদের পূর্বে অনেক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যাদের বাড়ি-ঘরে এরা বিচরণ করে। অবশ্যই এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে। তারা কি শোনে না? তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি উষর ভূমিতে পানি প্রবাহিত করে শস্য উৎপন্ন করি। যা তারা এবং তাদের পশুগুলো খেয়ে থাকে। তারা কেন এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে না? (সূরা সাজদা: ২৬-২৭)</p></blockquote>
<p>দেখুন, এ আয়াতে জীবন মৃত্যুর মধ্যে কতো পার্থক্য। প্রথমে ঐ সমস্ত লোকের কথা বলা হয়েছে যার একদিন জমিনের ওপর চলাফেলা করতো। আজ তারা মৃত, তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তাদের আবাসভূমি বিরাণ। আবর পলকের মধ্যে অন্য রকম এক চিত্রের অবতারণা। মৃত জমিনকে সবুজ-শ্যামল করে সুশোভিত করার চিত্র। এখানে তাকাবুল বা বৈপরিত্ব মূলত এক অবস্থার সাথে আরেক অবস্থার মধ্যে নয় বরং জীবন ও মৃত্যুর সাথে।</p>
<p>এ ধরনের ‘তাকাবুল’ (বৈপরিত্য)-এর চিত্র পরকালীন জীবনের শান্তি ও শাস্তি প্রসঙ্গে যেসব জায়গায় বলা হয়েছে সেখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ধরনের কতিপয় উদাহরণ আমরা নিচে বর্ণনা করলাম।</p>
<p>كَلَّا إِذَا ذُكت الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا &#8211; وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجَايْءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ، يَوْمَئِذٍ يُتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذكرى &#8211; يَقُولُ يُلَيْتَنِي قَدَّمَتْ لِحَيَاتِي &#8211; فَيَوْمَئِذٍ الْايُعَذِّبُ عَذَابَةٌ أَحَدٌ &#8211; ولا يُؤْثِقُ وثَاقَةٌ أَحَدٌ &#8211; يَايْتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ &#8211; ارْجِعِي إِلى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةٌ &#8211; فَادْخُلِي فِي عِبْدِي &#8211; وَادْخُلِي جَنَّتِي &#8211;</p>
<p>এটি অনুচিত। যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং তোমার প্রতিপালক আবির্ভূত হবেন। ফেরেশতাগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িযে যাবে এবং জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে। কিন্তু এ স্মরণ তার কী কাজে আসবে? সে বলবে : হায় আমিযদি এ জীবনের জন্য আগেই কিছু পাঠিয়ে দিতাম। সেদিন তার শাস্তির মতো শাস্তি কেউ দেবে না এবং সে বাঁধনের মতো বাঁধনও কেউ দেবে না। (সূরা ফজর: ২১-৩০)</p>
<p>চিন্তা করে দেখুন, একদিকে জাহান্নাম ভয়াবহ রূপে উপস্থিত এবং অপরদিকে ফেরেশতাগণ সেনাবাহিনীর মতো ঘিরে দাঁড়ানো। জাহান্নাম অত্যন্ত ভয়াল মূর্তিতে আবির্ভূত। তার শাস্তি এতো ভয়ঙ্কর যার কোন উপমা নেই।</p>
<p>এমন বিপদ এবং বিপর্যয়ের মুহূর্তেও ঈমানদারদেরকে ডেকে বলা হবে:</p>
<blockquote><p>بايْتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مُرْضِيَّةً &#8211; فَادْخُلِي فِي عِبْدِي &#8211; وَادْخُلِي جَنَّتِي</p>
<p>হে প্রশান্ত মন! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরা ফজর: ৩০)</p></blockquote>
<p>এমন বিভিষিকাময় অবস্থায়ও একজন মু’মিনকে দরদ ও স্নেহমাখা বাক্যে আহ্বান করা হবে- ‘হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার রব্ব-এর দিকে ফিরে যাও।’ আর এ ফিরে যাওয়ার মধ্যে ঐ বান্দা এবঙ প্রতিপালকের সাথে গভীর ভালবাসা ও সন্তোষের প্রমাণ পাওয়া যায়। رَاضِيَةً مُرْضِيَّةً অর্থাৎ উভয়ে উভয়ের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন। এসব শব্দে প্রেম-ভালবাসার যে নিদর্শন পাওয়া যায় মনে হয় পুরো পরিবেশটাই প্রীতিডোরে বাধা। তারপর বলা হয়েছে: فَادْخُلِي فِي عِبْدِي আমার বিশেষ বান্দাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং তাদের তাদের সাথে হৃদ্যতা সৃষ্টি করো। وَادْخُلِي جَنَّتِي তারপর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। জাহান্নামের বর্ণনা পুরো পরিবেশটিকে ভয় ও পেরেশানীর এক চিত্রে ঘিরে রেখেছিল। এখানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র পাওয়া যায়। যা প্রেম-প্রীতিতে পরিপূর্ণ।</p>
<p>ওপরের উদাহরণটি ছিল কাফির ও মু’মিনের মধ্যে বিপরীতধর্মী এক চিত্র। একন আমি জাহান্নামীদের আযাব ও জান্নাতীদের নিয়ামতের বিপরীতধর্মী এক চিত্র পেশ করছি।</p>
<blockquote><p>هَلْ أَنَّكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ &#8211; وَجُوهٌ يَوْمَئِذٍ خَاشِعَةٌ &#8211; عَامِلَةٌ ناصِبَةٌ &#8211; تَصْلَى نَاراً حَامِيَة &#8211; تُسْقَى مِنْ عَيْنِ أَنِيَةٍ &#8211; لَيْسَ لَهُمْ طعامُ الْآمِنْ ضَرِيع &#8211; لا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُوعٍ &#8211; وُجُوهٌ يَوْمَئِدْ نَّاعِمَةٌ لِسَعِيْهَا رَاضِيَةٌ &#8211; فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ &#8211; لا تَسْمَعُ فِيهَا لاغية &#8211; فِيهَا عَيْنُ جَارِيَةٌ &#8211; فِيهَا سُرُرُ مُرْفُوعَةٌ &#8211; وَأَكْوَابٌ مُوْ ضُوعَةٌ &#8211; وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ &#8211; وَزَرَبِّي مَبْثُونَةٌ &#8211;</p>
<p>তোমার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? অনেক মুখমণ্ডলণ সেদিন হবে লাঞ্ছিত, ক্লিষ্ট-ক্লান্ত। তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে। তাদেরকে ফুটন্ত নহর থেকে পান করানো হবে, আর কাঁটাযুক্ত ঝাড় ছাড়া তাদের জন্য কোন খাদ্য নেই। এতে তাদের দেহের পুষ্টি সাধন কিংবা ক্ষুধা নিবারণ হবে না। আবার অনেক ‍মুখমণ্ডল সেদিন হবে সজীব। তাদের কর্মের কারণে সন্তুষ্ট। তারা থাকবে সুউচ্চ জান্নাতে। সেখানে কোন অসার কথাবার্তা তারা শুনবে না। সেথায় থাকবে প্রবাহিত ঝর্ণা, উন্নত সুসজ্জিত আসন এবঙ সংরক্ষিত পানপাত্র ও সারি সারি গালিচা এবং বিস্তৃত বিছানো কার্পেট।</p></blockquote>
<p>আযাব ও নিয়ামতের বিপরীতধর্মী একটি সুন্দর চিত্র পূর্বের আয়াত কটি। এ ধরনের উদাহরণ আল-কুরআনে অনেক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4>৪</h4>
<p>ওপরের উদাহরণগুলো ছিল দু’টো বিপরীতধর্মী চিত্র। কিন্তু এবার আমরা এমন কিছু উদাহরণ পেশ করবো যা বিপরীতধর্মী বটে কিন্তু তার একটি অতীতের এবং অপরটি বর্তমানকালের। অতীতকে কল্পনায় বর্তমানে নিয়ে এসে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী ছবি আঁকা হয়েছে। যেমন:</p>
<p>خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ</p>
<p>তিনি মানুষকে এক ফোটা বীর্য দিয়ে সৃষ্টি করেচেন। তা সত্ত্বেও সে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। (সূরা আন-নাহল: ৪)</p>
<p>যে অবস্থা বর্তমানে আমাদের সামনে উপস্থিত তা একজন প্রকাশ্য ঝগড়াটে خَصِيمٌ مُّبِينٌ ব্যক্তির, কিন্তু অতীতে সে ছিল সামান্য এক ফোটা বীর্য মাত্র। এ দু’ অবস্থার মধ্যে যে ব্যাপক ব্যবধান তাই এখানে বুঝান উদ্দেশ্য। এজন্র দুটো অবস্থার মধ্যবর্তী অবস্থাকে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন একথা প্রকাশ করা যায় যে, মানুষের শুরু যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে তার ঝগড়া করা সাজে না। অনুরূপ আরেকটি উদাহরণ:</p>
<p>وَذَرْنِي وَالْمُكَذِّبِينَ أُولِي انْعْمَةِ وَمَهْلَهُمْ قَلِيْلًا &#8211; إِنَّ لَدَيْنَا انْكَالًا وَجَحِيمًا &#8211; وطَعَامًا ذَاغُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا</p>
<p>বিত্তবৈভবের অধিকারী মিথ্যারোপকারীদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কিছু অবকাশ দাও। নিশ্চয়ই আমার কাছে আছে শিকল, অগ্নিকুণ্ড, গলগ্রহ হয়ে যায় এমন খাদ্য এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা মুজাম্মিল: ১১-১৩)</p>
<p>এখানেও দুটো অবস্থার মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়। এক অবস্থাতো বর্তমানে উপস্থিত অর্থাৎ বিত্তবৈভবের অহংকার। আরেক অবস্থা বর্তমান অনুপস্থিত ‍শুধু কল্পনার রাজ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। এ উদাহরণ থেকে শৈল্পিক ও দ্বীনি গুরুত্বই প্রকাশ পাচ্ছে। নিচের আয়াতগুলো লক্ষ্য করুন:</p>
<blockquote><p>وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لمَزَةٍ وَ الَّذِي جَمَعَ مَالاً وَعَدَدَهُ &#8211; يَحْسَبُ أَنَّ مَالَةٌ أخْلدَهُ &#8211; كَلَّا لِيُنْتَبَذَنْ فِي الحُطَمَة &#8211; وَمَا أَدْرَاكَ مَالْحُطَمَةُ &#8211; نَارُ</p>
<p>পশ্চাতে ও সম্মুখে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ; যে ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে এবং গুণে গুণে হিসেব রাখে। সে মনে করে, তার সম্পদ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কক্ষণ নয়্ সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে ‘হুতামায়’। তুমি কি জান, ‘হুতামাহ’ কি? তা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছুবে। এতে তাদেরকে বেঁধে দেয়া হবে, লম্বালম্বি খুঁটিতে। (সূরা হুমাজাহ: ১-৯)</p></blockquote>
<p>এ সূরাটিতে বিপরীতধর্মী দুটো অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। একটি দুনিয়ার অবস্থা এবং অপরটি আখিরাতের। কিছু দাম্ভিক ও অহংকারী আছে যারা দুনিয়ার বিত্ত বেসাতে মত্ত হয়ে আখিরাতকে ভুলে গেছে এবং দুনিয়ার রঙ-তামাশায় লিপ্ত আছে। কিন্তু তাদের এ চলার পথের অপর প্রান্তে অপেক্ষা করছে জাহান্নাম। এমন জাহান্নাম যা সবকিছুকে পিষ্ট করে দেয় এবং তার আগুন হৃদয় পর্যন্ত স্পর্শ করে। ঐ হৃদয় যা আজ অহংকার ও দাম্ভিকতায় উন্মাতাল। তাদেরক সেখানে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হবে, যেখান থেকে তারা স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসতে পারবে না ‍কিংবা অন্য কেউ বের করে আনতেও সক্ষম হবে না।</p>
<p>নিচের আয়াতে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>واصحب الشَّمَالِ : مَا أَصْحَبُ الشِّمَالِ &#8211; فِي سَمُومٍ وَحَمِيمٍ &#8211; وظل مِنْ يُحْمُوم &#8211; لا بارد ولا كَرِيم &#8211; إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُشْرِفِينَ .</p>
<p>বামপন্থী লোক, (হায়!) বামপন্থী লোকেরা কী আযাবে থাকবে। তারা থাকবে প্রখর বাষ্প ও উত্তপ্ত পানিতে এবং ধুম্রকুঞ্জের ছায়ায়। যা শীতল নয় এবং আরামদায়কও নয়। তারা ইতোপূর্বে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। (সূরা আল-ওয়াকিয়া: ৪১-৪৫)</p></blockquote>
<p>এখানে দুটো অবস্থাকে মুখোমুখি পেশ করা হয়েছে। এক অবস্থা হচ্ছে জাহান্নামীদের বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ গরম বাষ্প, গরম পানি, ধুয়ার ছায়া যা শুধু নামেমাত্র ছায়া। এ কঠিন অবস্থাকে তাদের পূর্বের অবস্থার (অর্থাৎ সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের) সাথে মুখোমুখি করে পেশ করা হয়েছে।</p>
<p>ওপরে বর্ণিত অবস্থা এবং তার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অবস্থার মধ্যে এক সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যাপার আছে। এ আয়াতে যেসব লোকের কথা বলা হচ্ছে তারা রীতিমতো জীবিত এবং দুনিয়ায় বিচরণত। দুনিয়ার সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের করায়ত্ব্ এ অবস্থাটি বর্তমানে বিদ্যমান। আখিরাতে তাদের জন্য য দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে তা পরের কথা। কিন্তু সেই পরের অবস্থাকে কুরআন বর্তমান অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। পাঠক মনে করেন দুনিয়ার লেনদেন চুকিয়ে ঐ অবস্থায় তারা ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে, যে অবস্থা তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। তাদের পেছনের সমস্ত সুখ-সম্ভোগ শেষ হয়ে গেছে। তারা তীব্র আযাবের সম্মুখীন। এমতাবস্থায় তাদের পেছনের কথা, সেই সুখের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে।</p>
<p>মনে হতে পারে, এটি আশ্চরয ধরনের চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু তাতে কি? কুরআন বহু জায়গায় এ ধরনর স্টাইলে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। কুরআনের এ বর্ণনা শৈল্পিক এবং দ্বীনি দুটোরই আবেদন রাখে। শিল্পের অনুসন্ধানী মনে করে- এ শুধু উপমা উৎক্ষেপণ নয় বরং এটি অনুভব ও বোধের সীমানা ছাড়িযে চোখের সামনেই সংঘটিত একটি ঘটনা, যা ঘটে চলছে।</p>
<p>দ্বীনি অনুসন্ধানীদের অনুভূতি হচ্ছে জাহান্নামে সংঘটিতব্য ঘটনাবলীর ওপর এমন দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন) করা উচিত, যেন তা এখনই সংঘটিত হচ্ছে। তার সম্পর্ক উপলব্ধির সাথে। আর এ দৃঢ় বিশ্বাস মানুষকে ঈমানের দাওয়াত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করে।</p>
<p>নিচের আয়াতটিও ওপরের উদাহরণের সাথে সম্পর্ক রাখে।</p>
<blockquote><p>خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الجَحِيمِ &#8211; ثُمَّ صُبُوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ &#8211; ذُنْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ</p>
<p>একে ধরো এবং টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে যাওদ। (এখন) মজা বুঝ। তুমিতো সম্মানত সম্ভ্রানত। (সূরা আদ-দুখান: ৪৭-৪৯)</p></blockquote>
<p>নিচের আয়াতটিও বিপরীত ধর্মী এক চিত্র পেশ করে:</p>
<blockquote><p>كَلَّا إِذا بلغت الشراقي &#8211; قَبْلَ مَنْ رَاق &#8211; وظنَّ أَنَّهُ الفِراق &#8211; &#8211; التفت الله بالساة &#8211; الى رَبِّكَ يَوْمَندَ الْمَسَاقُ &#8211; فَلَا صَدَقَ</p>
<p>কখনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে ঝাড়-ফুঁক করবে? আর সে মনে করবে, বিদায়ের মুহূর্তটি এসে গেছে এবং পায়ের গোছা অপর গোছার সাথে জড়িয়ে যাবে। সেদিন তোমার রব্ব-এর কাছে সবকিছু উপস্থিত করা হবে। সে বিশ্বাস করেনি এবঙ নামায পড়েনি। পড়ন্তু মিথ্যা মনে করেছে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। তারপর সে দম্ভভরে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গেছে। (সূরা কিয়ামাহ: ২৬-৩৩)</p></blockquote>
<p>উক্ত আয়াতগুলোতে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী চিত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এক, অতীতে যা অতিবাহিত হয়েছে। মন হয় যেন, গোটা সৃষ্টি জগৎ তার সমস্ত সৌন্দর্য হারিয়ে ম্রিয়মান হয়ে গেছে। এমন একটি সময় ছিল- যখন মৃত ব্যক্তি নামায আদায় করেনি, কুরআনের সত্যতা মেনে নেয়নি। এক অবস্থা (অর্থাৎ মৃত্যুর সময়) চোখের সামনে উপস্থিত। আর সে নির্বিকার। মৃত্যুর সময় উপস্থিত, ভয়ে এতোটা বিহ্বল যে, দু’ পা ঠক্‌ঠক করে কাঁপছে। আত্মা গলা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে্ প্রশ্নকারী প্রশ্ন করছে, কোন ঝাড় ফুঁককারী নেই? যে এ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। যেভাবে জ্বিন-প্রেতের আসর থেকে মুক্তির জন্য ঝাড়-ফুঁকের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।</p>
<p>মুমূর্ষ ব্যক্তি মনে করে, আজ আমার পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দিন। বিগত দিনের স্মৃতি তার হৃদয়পটে ভেসে উঠে। নবী করীম (স)-এর দাওয়াত থেকে দাম্ভিকতার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিজের পরিজনের কাছে চলে আসা, তাঁর দাওয়াতকে মিথ্যে মনে করা। দুটো ছবিই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। কিন্তু তাতে কোন কল্যাণ হবে না। কারণ পা তো একটির সাথে আরেকটি পেঁচিয়ে রয়েছে। এখন আর সময় নেই। এখন তো রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য যাত্রা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ </strong>মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/artistic-arrangement-of-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15855</post-id>	</item>
		<item>
		<title>একটি বাস্তব নাকবা নির্মাণ; ফারহা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/construction-of-a-real-naqba-farha/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/construction-of-a-real-naqba-farha/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 13 May 2025 15:22:48 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সিনেমা পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15831</guid>

					<description><![CDATA[২০২১ সালে লাইট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফির মঞ্চোকাপানো সেই এক জোড়া পেঙ্গুইন মেলবোর্নের কোনো ভিন্ন দুটি দ্বীপে দীর্ঘদিন একলা বিচ্ছিন্ন দাঁড়িয়ে ছিল কম হলেও ছ&#8217;মাস। এ- দীর্ঘসময়ে ওই দুটি প্রাণ-ই কখনো হয়তো রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে; নিশ্চয়ই নির্ভিক অথবা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>২০২১ সালে লাইট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফির মঞ্চোকাপানো সেই এক জোড়া পেঙ্গুইন মেলবোর্নের কোনো ভিন্ন দুটি দ্বীপে দীর্ঘদিন একলা বিচ্ছিন্ন দাঁড়িয়ে ছিল কম হলেও ছ&#8217;মাস। এ- দীর্ঘসময়ে ওই দুটি প্রাণ-ই কখনো হয়তো রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে; নিশ্চয়ই নির্ভিক অথবা বিমর্ষচিত্তে ওদের বিরহের ক্ষতটা নিয়েই ঠাই দাঁড়িয়েছিল!</p>
<p>তবে চিরন্তন হলো- প্রিয়জন হারানোয় কিংবা বিচ্ছেদের বেদনায় ক্ষতবিক্ষত প্রাণদুটি যখন মাসের পর মাস ওদের ভাঙা হৃদয়খানা উজাড় করে সমূদ্র পানে চেয়ে ছিল নিষ্পলক, তখনও ওরা লোকচক্ষুর ঢের আড়ালেই! কোন এক ভর পূর্ণিমায় যখন একত্রিত হলো পেঙ্গুইন দুটি, অর্থাৎ ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফিটা ঠিক যে সময়ের, যেন তখন থেকেই আলোচনায় পাখি দুটির বিচ্ছেদ ও পুণর্মিলন।</p>
<p>গুরুভাষ্যে- কোন সংগ্রাম, বিচ্ছেদ, না পাওয়ার দহন বা অর্জনের প্রবল বাসনা, কিংবা স্বাধিকার আন্দোলনে সর্বস্ব ত্যাগ; কার্যতঃ প্রতিটির-ই স্বীকৃতি অকল্পনীয়, যদি না দীর্ঘ আরাধনার পর সেই কাঙ্ক্ষিত অধরার আলিঙ্গন মেলে।</p>
<p>বোধহয় একারণেই, নাকবার প্লাটিনাম জয়ন্তী পূর্ণ হলেও ভূমধ্যসাগরের তীরে জন্ম নেওয়া মুজাহিদ ফিলিস্তিনিরা নাকবার বিপরীতে করা তাদের শাশ্বত সংগ্রামের স্বীকৃতি পায়নি আজও।<br />
শুভ্র, সুশৃঙ্খল ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে যে পর্যায়ের</p>
<p>বিপর্যয় নেমে এলে মানুষ কোনঠাসা হয়ে তার কয়েক পুরুষের ভিটে-বাড়ি ত্যাগ করে, রোশনাইহীন কোনো সরু আইল ধরে কয়েকশো মাইল পাড়ি দেয় নিরাপদ শরনার্থী শিবিরের খোঁজে, এবং নিজভূমি ত্যাগের এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ যাত্রায় চোখে পড়ে কতশত গণকবর, লাশের মিছিল, বেয়োনেটের আঘাতে চৌচির দেহাবয়ব; প্রিয়জনের আহাজারি, মায়ের ওম ছেড়া নবজাতকের হোঁ-হোঁ কান্না; এর সবটা জুড়েই আজকের পচাত্তর নাকবা। মূলত এর প্রেক্ষিতেই ২০২১ সালে জর্দানের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সেদেশের গুণি নির্মাতা দারিন জে. সাল্লামের একটি বাস্তব নাকবা নির্মাণ- ফারহা।</p>
<p>৪৮ -এ আরব ফিলিস্তিনের কোনো সমৃদ্ধ ও প্রত্যন্ত এক শেখ শাসিত গ্রামে সিনেমাটির প্রথম দৃশ্যপট। একটি শ্যামল গ্রাম, শুভ্র জলপ্রপাত, সুশ্রী সমাজ ও মৃণ্ময়ী মানব-মানবী; ইত্যাদীর সমন্বয়ে গ্রামটিকে আরব সংস্কৃতির আলোকে বেশ জাদরেলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওসমানী আমলের দারস কিংবা মক্তব ভিত্তিক পাঠ্যরীতি খেলাফত পতনের পরও গ্রামটিতে বিদ্যমান। তবে ভূরাজনৈতিক উত্থানপতন ও ক্ষমতার বালাবদলের প্রভাবে গ্রামের এই চিরাচরিত শিক্ষারীতিতেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। গ্রামের নিয়ম ভেঙেই সামর্থ্যবান লোকেরা তাদের সন্তানদেরকে শহরের স্কুলে ভর্তি করতে আরম্ভ করেছে। গ্রাম্য সালিশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি যিনি, গ্রামটির শেখ আশরাফ বারহাম -এর ঘরের মেয়ে &#8216;ফারহা&#8217;-ও একই বায়না ধরেছে। তবে শেখ আশরাফ মেয়ের এই বেআইনি বায়নার বিড়ম্বনা অনুভব করার আগেই কপাল ঘুচিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ আরেক ব্যপার নিয়ে- গ্রামে ডজনে ডজনে ইহুদি সৈন্য প্রবেশ করছে! দাবী করছে গ্রামের কর্তৃত্বও! তবে মানুষের না, মাটির। অর্থাৎ জুড়ে বসা সেনারা স্বয়ং তাদেরই গ্রামান্তর করতে চায়! সেটিও গ্রামের মালিকানা দাবী করে! এনিয়ে গ্রামের যুবকেরা প্রতিনিয়তই আশরাফের ভিটেয় জমায়েত হচ্ছে, পশু শিকারের মুষ্টিমেয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়েই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে চাচ্ছে তারা। কিন্তু আশরাফের একটি কথায়-ই সকল প্রস্তুতি ভেস্তে যাচ্ছে তাদের- &#8220;আমি এখনো আরব নেতাদের কোনো নির্দেশ পাইনি, অস্ত্র পাইনি। তোমরা এখনই আক্রমণে যেও না! &#8221;<br />
&#8211; এভাবেই এগুতে থাকে &#8220;ফারহা&#8221;-র দৃশ্যপট!</p>
<p><strong>১৪ মে ফিলিস্তিনের ৫৫ শতাংশ ভূমির মালিকানা দাবী করে স্বঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইজরায়েল আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র ফিলিস্তিন জুড়ে দাবানলের মতো ক্ষোভে ফুসতে থাকে সাধারণ মানুষেরা।</strong> সৌদি আরব, মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও জর্দান স্বশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা দেয় ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। যার প্রেক্ষিতেই ১৫ মে থেকে দখলদার প্রশাসনের সক্রিয় আক্রমণের মুখে পড়ে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি জনগণ। শুরু হয় ১ম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ।</p>
<p>গ্রামটিতে বসবাসরত কয়েক হাজার মানুষের কোলাহল, চিৎকার, ছুটোছুটি, পালায়ন- ইত্যাদির মাধ্যমে ১৫ মে এর ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে সিনেমাটির পরের ধাপে। যেখানে গ্রামের কর্তা হিসেবে আশরাফ বারহাম ইজরায়েলি হত্যাযজ্ঞের মাঝেও গ্রাম ছেড়ে না যাওয়ার কথা জানিয়ে দেন। ফলতঃ ফারহাও পিতাকে ছেড়ে যাওয়ায় অস্বীকৃতি জানায়। এমতবস্থায়, নিরাপত্তার খাতিরে ফারহাকে বাড়ির এক পরিত্যক্ত গুদাম কক্ষে আশ্রিত রেখে বেরিয়ে যান আশরাফ।<br />
তখন থেকে সিনেমার পুরো অংশ জুড়েই ফারহা অধ্যায়।</p>
<p>একটি জানালাবিহীন অন্ধকার ঘর, চারিদিকে বোমার শব্দ, বারুদের গন্ধ, দরজার ছিদ্র দিয়ে আসা টিয়ারগ্যাস; ইত্যাদি উপস্থাপনের মাধ্যমে কক্ষটির বাইরে সংঘটিত হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের মহাসমারহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে৷ গুদাম ঘরটিতে শুকনো খাবার ও ফলের আধিক্য থাকলেও তীব্র পানিশূন্যতা, ভয়, আতঙ্ক ও পিতার ফিরে আসার অপেক্ষায় অন্ধকার ঘরে মজে যেতে থাকে ফারহা। এই অবস্থায় দুইদিন পার হয়ে গেলেও ফারহার পিতার ফিরে না আসাকে সিনেমার সিকোয়েন্স অনুযায়ী কোথাও ইজরায়েলি সেনাদের আক্রমণে মৃত হিসেবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।</p>
<p>তৃতীয় দিন রাতে মুষলধারে বৃষ্টি! ফারহা কক্ষটির এক ছিদ্র ভেঙে হাত দিয়ে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করে। পান করে। ছিদ্র দিয়ে বাইরে যতটুকু চোখ যায়, শুধুই ধ্বংসযজ্ঞ! জনমানবহীন এক মৃত্যুপুরী! দূর আকাশের যুদ্ধ বিমান থেকে ছোড়া বোমার শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো আওয়াজ নেই! এক দিবস আগের এতো সবুজ শ্যামল ও প্রাণোচ্ছল গ্রামটি যেন আজ দখলদার গোষ্ঠির আক্রমণে মৃত্যু বরণ করেছে!<br />
ফারহা কক্ষটি থেকে বের হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকে।</p>
<p>পরদিন সকালে কক্ষটির বাইরে এক নারীর তীব্র প্রসব বেদনার কান্না ফারহাকে ঘুম ভাঙিয়ে জাগ্রত করে। বাইরে চোখ মেলে দেখে- তিন শিশু, এক গর্ভবতী নারী ও এক পুরুষের একটি পরিবার। <strong>ফারহার কক্ষটির ঠিক বাইরেই গুড়িয়ে দেওয়া এক বাড়ির ধ্বংস্তুপের উপর সন্তান প্রসব করেন সেই নারী। ফারহাও সজোড়ে চিৎকার করে তাকে কক্ষটি থেকে বের করার আকুতি জানাতে থাকে।</strong></p>
<p>ফারহার চিৎকারে সাড়া দিয়ে পরিবারটির পুরুষ সদস্য খুব করে দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। কিন্তু দরজা এতোই মজবুত ছিল যে, সেটি ভাঙার শব্দ আশেপাশে বেশ জোড়ালোভাবে শোনা যেতে থাকে। আর সেই শব্দ অনুসরণ করেই ঘটনাস্থলে এক গাড়ি ইজরায়েলি সৈন্য এসে হাজির!</p>
<p>ফারহা অবলোকন করে শতাব্দীর ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডসমূহের একটি। <strong>সবে জন্ম নেওয়া নবজাতকসহ পরিবারটির ছয় সদস্যকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে একে একে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়! তবে নবজাতক শিশুটির ক্ষেত্রে ইহুদি কমান্ডারের নির্দেশ আসে এমন- আমি এই শিশুর জন্য গুলি নষ্ট করতে সম্মত নই, বুটজোড়ার পা দিয়েই ওর মুখাবয়ব গলিয়ে দাও!</strong></p>
<p>একটি নির্জন, অন্ধকার, পানিশূন্য ও ধ্বংসপ্রায় কক্ষ। যে কক্ষটি জানেনা তার পরিচয়, ভাষা ও ভবিষ্যৎ। সামনে পড়ে থাকা ছয়টি গলিত লাশ, গুড়িয়ে দেওয়া ভবনের উপর কাক, মাছি আর বন্য শুকুনগুলো ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে ওই লাশগুলো- আর সেই কক্ষটির ভেতরেই পাঁচদিন যাবত আটকে থাকা ফারহা। স্ক্রিনপ্লে&#8217;র দারুণ এই অংশটিতে প্রকৃত নাকবার ভয়াবহতা স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে।</p>
<p>এক পর্যায়ে, গুদামঘরটির কাঁচামালের আড়াল থেকে ফারহা এক রিভলবার আবিষ্কার করে। তার ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও ভয়ার্ত চেহারায় ফুটে উঠে বাইরের ধ্বংসলীলা আলিঙ্গনের হাতছানি। দরজায় ডজনখানেক গুলি করতেই তা খুলে পড়ে যায়। ফারহা বেরিয়ে আসে নতুন ও অভিশপ্ত এক দুনিয়ায়৷</p>
<p>১৯৪৯ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ পরবর্তী সিরিয়ার এক শরনার্থী শিবির থেকে বর্ণিত হয় রাদিয়া মূলচরিত্রের এই বাস্তব গল্পটি। সম্প্রতি &#8220;ফারহা&#8221; নামে নাকবার এই বাস্তব নির্মাণটি সেসময় ফিলিস্তিনে চালানো জায়নবাদী ইজরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াবহতা অনেকাংশেই ফুটিয়ে তুলিছে। তবে গতবছর সিনেমাটির জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে ইজরায়েলের পক্ষ থেকে জর্দানের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার গুঞ্জন সরব হয়ে উঠিছিল।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/construction-of-a-real-naqba-farha/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15831</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:38:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15787</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায় জাতিসত্তা। বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। কেননা, এক জাতি চাপিয়ে দিতে চাইতে পারে, অন্য জাতির ওপর তাদের ভাষাকে। আর অন্য জাতি চাইতে পারে, এই চাপিয়ে দেয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে এর একাধিক নজির আছে।</p>
<p>ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সনের বিখ্যাত ভাষা জরিপ (Linguistic Survey of India, 1903-1928) থেকে দেখা যায়, ব্রিটিশ ভারতে তখন ভাষার সংখ্যা ছিল ১৭৯টি। আর উপভাষা বা ডায়ালেক্টের সংখ্যা ছিল ৫৪৪টি। সে সময়ে ভারতে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলত হিন্দি ভাষায়। হিন্দির পরেই স্থান ছিল বাংলা ভাষার। গ্রিয়ার্সন এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোকে প্রধানত চারটি বড় ভাষা পরিবারে বিভক্ত করেন। এরা হলো : দক্ষিণ এশীয় বা অস্ট্রিক (Austric), চীনা-তিব্বতি (Sino-Tibetan), দ্রাবিড় (Dravidian) ও ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার খুব বড়। গ্রিয়ার্সন একে এই উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তিনটি উপপরিবারে ভাগ করেন। এরা হলো ইরানীয় আর্য (Iranian-Aryan), ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryan), দরদ-আর্য (Dardic-Aryan)। তিনি বাংলা ও হিন্দি ভাষাকে স্থাপন করেন ভারতীয়-আর্য পরিবারে। বাংলা ভাষাকে গ্রিয়ার্সন যদিও হিন্দি ভাষার সাথে ভারতীয়-আর্য পরিবারে স্থাপন করেন, কিন্তু হিন্দির সাথে বাংলা ব্যাকরণের অমিল আছে অনেক। যেমন হিন্দিতে ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা যায় না, কিন্তু বাংলা ভাষায় যায়।</p>
<p><strong>এ দিক থেকে বাংলা ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায় দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষার সাথে। তামিল ভাষায় ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা চলে। দ্রাবিড় পরিবারের ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জোড়া লেগে নতুন ভাব প্রকাশকারী শব্দ গঠন। এ ক্ষেত্রে শব্দ দু’টি একত্রে মিলে যায় না। অর্থাৎ সন্ধি হয় না। এরকম জোড়ালাগা শব্দ বাংলা ভাষাতেও কিছু কিছু হতে দেখা যায়। যেমন, ছেলে এবং গুলি দু’টি পৃথক শব্দ। কিন্তু আমরা যখন বলি, ছেলেগুলি, তখন তা একটি তৃতীয় ভাবকে বোঝায়। এটাকে তুলনা করা চলে দ্রাবিড় পদ্ধতির সাথে। আমরা বাংলাতে ছেলেগুলি না বলে, বলতে পারি, ছেলেরা। এটা হলো আর্যভাষার পদ্ধতি। দ্রাবিড় ভাষায় থাকতে দেখা যায় ট ধ্বনির প্রাধান্য। বাংলা ভাষাতেও টি টা আমরা যথেষ্ট ব্যবহার করি। বাংলাদেশের পুরনো গ্রাম ও জনপদের নাম দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে অতীতে চলত দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই অভিমত প্রকাশ করেছেন তার বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা নামক বইতে। এমনিতে বস্তুগত সংস্কৃতির দিক থেকেও অনেক মিল আছে দ্রাবিড়ভাষী ও বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে। যেমন, দ্রাবিড়ভাষী মানুষ সিদ্ধ চালের ভাত খান। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত সিদ্ধ চালের ভাত খেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের মানুষ গ্রামে উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে থাকেন। তামিলভাষীরাও থাকেন একই রকম উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে। তামিলরা তরি-তরকারি কোটেন বঁটি দিয়ে। বাংলাদেশেও মানুষ একইভাবে বঁটির ব্যবহার করে। উত্তর ভারতের মানুষের মতো ছুরি দিয়ে তরি-তরকারি কাটেন না।</strong></p>
<p>এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৩৭ সালে প্রথম ভাষা নিয়ে রক্তপাত ঘটেছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। ১৯৩৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ-ভারতে ১১টি প্রদেশ ছিল। সে সময় প্রাদেশিক আইনসভার যে নির্বাচন হয়, তাতে ১১টি প্রদেশের মধ্যে আটটিতে কংগ্রেস জয় লাভ করে মন্ত্রিসভা গঠন করে। কংগ্রেস হাইকমান্ডের আদেশ অনুসারে এই আটটি প্রদেশে হিন্দি ভাষা স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়। মাদ্রাজ প্রদেশে তামিলভাষীরা করেন-এর প্রতিবাদ। তিন বছর ধরে চলেছিল প্রতিবাদ বিক্ষোভ। এ সময় একটি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ফলে নিহত হন দু’জন। এটাই এই উপমহাদেশে ভাষার কারণে প্রথম আত্মাহুতি দান। এটা ঘটেছিল ১৯৫২ সালে ঢাকায় গুলি চালাবার প্রায় ১৫ বছর আগে অখণ্ড ভারতে। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা আটটি প্রদেশেই ইস্তফা দেয়। কংগ্রেস ইস্তফা দেয়, কারণ সে চায় না ব্রিটিশ ভারতের সরকারের সাথে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সহযোগী হতে। কংগ্রেস সরকার মাদ্রাজে ইস্তফা দেয়ার পর, মাদ্রাজের গভর্নর জেনারেল Lord Erskine ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদ্রাজের স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো আইন রদ করেন। মাদ্রাজে যখন বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো শুরু হয়, তখন মাদ্রাজের আইনসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপাল আচারী। গুজব রটে, আচারী যেহেতু ব্রাহ্মণ, তাই তিনি চাচ্ছেন, সংস্কৃতবহুল হিন্দি ভাষা তামিলদের শেখাতে। আর সেই সঙ্গে চাচ্ছেন, তামিলভাষীরা ধীরে ধীরে ত্যাগ করুক তাদের মাতৃভাষাকে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে উদ্ভব হয় ব্রাহ্মণবিরোধী দ্রাবিড় মুনাত্রা কাজাগাম নামক দলের, যা পরে মাদ্রাজের রাজনীতিতে হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক দল। এ সময় তামিলভাষী মুসলমানেরা যোগ দিয়েছিলেন হিন্দিবিরোধী আন্দোলনে।</p>
<p>অন্য দিকে, যেসব মুসলিম পরিবারে উর্দু ভাষা চলত, তারা নেন হিন্দি ভাষার পক্ষ। ১৯৬৫ সালে ভারতের কংগ্রেস সরকার চায় হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করতে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে (বর্তমান নাম তামিলনাড়–) দেখা দেয় প্রচণ্ড হিন্দিবিরোধ বিক্ষোভ। একটি মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ৬৮ জন। জঙ্গি-জনতা পুলিশকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ চালায়। যার ফলে দু’জন পুলিশের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী এ সময় ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, হিন্দিকে এখনোই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে না। ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। শাস্ত্রী মারা যান ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে। তার মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী হন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট আইন পাস করে, হিন্দির সাথে ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, পাকিস্তান হয়েছিল বলেই সৃষ্টি হতে পারে ভাষা সমস্যার। কিন্তু স্বাধীন ভারতেও দেখা দিয়েছে ভাষার সমস্যা। আরেকটি দৃষ্টান্ত নেয়া যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব ছিল একটা বিরাট প্রদেশ। ১৯৪৭ সালে বাংলার মতো পাঞ্জাব প্রদেশকেও ভাগ করা হয়। পাঞ্জাবের পশ্চিম ভাগ পড়ে পাকিস্তানে আর পূর্বভাগ পড়ে ভারতে। পাঞ্জাবের যে অংশ ভারতে পড়ে, তাতে শিখ পাঞ্জাবিরা চায় পাঞ্জাবিকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করতে। কিন্তু হিন্দু পাঞ্জাবিরা তাতে রাজি হয় না। শিখদের এই আন্দোলন ১০ বছর চলার পর ১৯৬৬ সালের ১ নভেম্বর পূর্ব পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে দু’টি প্রদেশ করা হয়। উত্তর ভাগ হয় পাঞ্জাবি সুবা আর দক্ষিণ ভাগ হয় হরিয়ানা প্রদেশ। উত্তর ভাগের প্রাদেশিক সরকারের সরকারি ভাষা হয় গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা। আর হরিয়ানা প্রদেশের সরকারের প্রাদেশিক ভাষা হয় দেবনাগরী অক্ষরে লেখা হিন্দি ভাষা। পরে শিখরা চান স্বাধীন হতে। ইন্দিরা গান্ধী কঠোর হস্তে শিখ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করেন। এতে শিখরা হয়ে ওঠেন খুবই ক্ষুব্ধ। দু’জন শিখ দেহরক্ষী ইন্দিরা গান্ধীকে তার সরকারি ভবনের প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করেন (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪)। দিল্লিতে বাধে হিন্দু শিখ দাঙ্গা। দিল্লির শিখরা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর সাথে জড়িত ছিলেন না। তারা দাঙ্গার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন না। এই দাঙ্গায় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মারা যান প্রায় চার হাজার শিখ।</strong></p>
<p>ভারতে ভাষা সমস্যা ছিল এবং আছে। কেউ বলতে পারে না, আবার তা প্রবল হয়ে উঠবে কি না। সাবেক পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছে অনেকের মতে ভাষার দ্বন্দ্বের কারণে। কিন্তু সাবেক পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন একটা ব্যর্থ আন্দোলন ছিল না। উর্দুর সাথে বাংলা পেতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। কিন্তু ভারতে হিন্দির সাথে ইংরেজিকে রাখা হয়েছে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। কোনো ভারতীয় ভাষাকে করা হয়নি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের জন্য হিন্দির সাথে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এখানে থেকে গেছে একটা বড় রকমের ফাঁক।</p>
<p>এসব কথা মনে আসছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যা এখন পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলে কিছু কি কোথাও আছে, না হতে পারে? যেমন কোথাও নেই আন্তর্জাতিক দেশপ্রেমের অস্তিত্ব। আসলে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে সে সম্পর্কে ইউনেসকো কিছু বলেনি। ইউনেসকো বলেনি ভারতে ভাষা নিয়ে সঙ্ঘাত ঘটার কথা। সে কেবলই বলেছে পাকিস্তানে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ভাষার জন্য মানুষের শাহাদত বরণের কথা। যেটা আমার কাছে মনে হয় একদেশদর্শী এবং ইতিহাস না জানার ফল।<br />
আমাদের দেশে আমরা করেছিলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। আমাদের আন্দোলন ছিল না মাতৃভাষার আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর মাতৃভাষা আন্দোলন সমার্থক নয়। কিন্তু এখন যেন সেটাই করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ১৯৫২ সালের পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট জটিল। উর্দু বনাম বাংলা তখন সরাসরি উচ্চারিত হয়নি। খাজা নাজিমুদ্দিন জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন ঢাকায়। কিন্তু তার পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু তার মাতৃভাষা বাংলা ছিল না, ছিল উর্দু। ঢাকায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চলেছিল গুলি। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২৪ ফেব্রুয়ারিতে তদানীন্তন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে অবস্থিত হায়দ্রাবাদ শহরের এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে উর্দুই হওয়া উচিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব বাংলায় অনেক মানুষ ছিলেন উর্দুর পক্ষে। তবে অধিকাংশ মানুষই চেয়েছিলেন উর্দুর সাথে বাংলাকে করা হোক অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। তাই আন্দোলনের আওয়াজ ছিল উর্দু বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর সাথে বাংলা চাই।</p>
<p><strong>এখন এই ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। পাঠ্যবইতে যা লেখা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, মানুষ যেন হয়ে উঠেছিল উর্দুবিরোধী। সমগ্র পাকিস্তানের মানুষের ওপর পূর্ব বাংলার মানুষ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল বাংলা ভাষার কর্তৃত্ব। কিন্তু ১৯৫২ সালে এই মনোভাব বিরাজ করছিল না।</strong><br />
<strong>ভাষাসৈনিক বলতে ঠিক যা বোঝায়, আমি তা ছিলাম না। তবে এ সময় আমি ছিলাম ছাত্র। ছাত্ররা করেছিল ভাষা আন্দোলন। তাই সে সময়ের মনোভাব সম্পর্কে আমি নিশ্চয় কিছু বলার অধিকার রাখি। যারা ভাষাসৈনিক হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকের সাথে ছিল আমার পরিচয়। যেমন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (শেলী), এস এ বারী এটি, মুহাম্মদ সুলতান, লতিফ চৌধুরী, সাদেক খান প্রমুখ। হাবিবুর রহমান, এটি বারী, সুলতান- এদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম রাজশাহী সরকারি কলেজে। এরা তিনজনই পড়তেন রাজশাহী কলেজে। পরে এরা যান ঢাকায় এমএ পড়তে। লতিফ চৌধুরী এবং সাদেক খান ছিল আমার স্কুলজীবনের সাথী। এদের পিতারা ছিলেন একসময় রাজশাহীতে চাকরি উপলক্ষে। লতিফ চৌধুরীর কথা এখন অনেকেই জানেন না। ইনি ছিলেন খুবই ভালো ছাত্র। ইনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক হন। এরপর কোনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি পেয়ে চলে যান সে দেশে। ইনি বাংলা ভাষা আন্দোলনে জেল খাটেন। লতিফ চৌধুরী ও সাদেক খান উভয়েই ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাদেক খানও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। কিন্তু রাজনীতি করতে গিয়ে ছাড়েন পড়াশোনা। গ্রহণ করেন সাংবাদিকের বৃত্তি।</strong></p>
<p>যেসব ভাষাসৈনিককে চিনতাম, তাদের মধ্যে হাবিবুর রহমানই হলেন সবচেয়ে খ্যাতনামা। ইনিও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। জীবনের সব পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ইনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কেবল ভাষা নিয়ে রাজনীতি করেননি। করেছেন বাংলা ভাষার চর্চা। সঙ্কলন করেছেন বাংলা ভাষার প্রথম ভাব অভিধান, যথাশব্দ। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঠিক হয়েছিল ছাত্ররা আমতলা থেকে তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের গেট দিয়ে ১০ জন ১০ জন করে স্কোয়াড করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। প্রথম স্কয়াডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান শেলী। আমি তখন ঢাকায় না থাকলেও পরে অনেকের কাছেই অনেক কিছু শুনেছিলাম। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কিন্তু যারা শাহাদত বরণ করেছিলেন, তারা কেউই ছিলেন না ছাত্র মিছিলে। তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। গুলি লেগেছিল তাদের গায়ে। তবে তাদের মৃত্যু বৃথা যায়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিণত হয় বিরাট গণ-আন্দোলনে। আর এই গণ-আন্দোলন কোনো ভাষাসৈনিকের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। আন্দোলন হয়ে উঠেছিল স্বয়ং চালিত। হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল সারা দেশে পথে। আমি জীবনে অনেক আন্দোলন দেখেছি। কিন্তু এত বিরাট আন্দোলন আর প্রত্যক্ষ করিনি ইতঃপূর্বে। এই আন্দোলন গৌরব করারই মতো।<br />
কিন্তু সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্র আজ আর নেই। এখন বাংলাদেশ একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলা ভাষার উন্নয়নে আর কোনো রাষ্ট্র প্রতিবন্ধক হতে পারে না। এখন যা প্রয়োজন, তা হলো, কেবল ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের নিজের প্রচেষ্টা। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিকতাবাদী বুদ্ধিজীবীর অভাব নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিকতাবাদ যেন চাপা পড়ে যেতে চাচ্ছে জাতীয়তাবাদের নিচে। আমরা চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি ১৫টি রিপাবলিক নিয়ে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে পড়তে। দুনিয়ার সর্বহারারা এক হতে পারল না। প্রতিটি জাতি যেন এখন পৃথক পৃথকভাবে বাঁচতে চাচ্ছে। পৃথক পৃথকভাবে যেন হতে চাচ্ছে সুখী ও সমৃদ্ধ। এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদেরও হতে হবে স্বাবলম্বী।</p>
<p><em>এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিতে অনেককে অনেক কথা বলতে শুনলাম, যা আমাকে বিস্মিত করেছে। যেমন বলতে শুনলাম, আমাদের উচিত হবে না বিদেশী ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ। অথচ চীনারা তাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রচুর গ্রহণ করছেন; তাদের ভাষাকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। ইংরেজি ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে প্রচুর বিদেশী শব্দকে আপন করে নিতে পারার কারণে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা এ দেশে এসে কথা বলতে শুরু করেন মিশ্র ভাষায়। যাকে বলা হতো Hobson-Jobson। এই হবসন-জবসন ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় গৃহীত হয়েছে প্রচুর শব্দ। একটি হিসাব অনুসারে প্রায় ৭০০ এর কাছাকাছি, যা ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা যদি ইংরেজি ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করি, তবে বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারও বাড়বে। বাড়বে ভাব প্রকাশের শক্তি। </em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15787</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
