<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>সংস্কৃতি &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/civilization/society-and-culture/culture/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Thu, 23 Apr 2026 11:55:08 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.3</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>সংস্কৃতি &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া; ঐতিহাসিক শিকড় ও জাতিসত্তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Dec 2025 18:59:32 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16417</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি</strong></h5>
<p>মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসলে সেই ভিত্তিগুলিই। কারণ, এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার, কিংবা অঞ্চলভেদে ভিন্নভাবে চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই। এগুলোই ইসলামী চিন্তাধারা ও শরীয়তের কেন্দ্র, যার বাইরে ইসলামকে কল্পনা করা যায় না।</p>
<p>তবে আমার প্রশ্নটি কিছুটা ভিন্ন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নানা ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে। আমরা দেখি, প্রতিটি জাতিসত্তার রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ, ঐতিহ্য ও মানসিক গঠন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রশ্ন আসে, ইসলামী ব্যবস্থা কীভাবে এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে?</p>
<p>ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনো অঞ্চল ইসলাম গ্রহণ করলে সেখানে শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনও ইসলামের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজ জীবনে তিনভাবে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে মূল্যায়ন করেছেন,</p>
<p><strong>প্রথমত, সরাসরি গ্রহণ।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মৌলিক নীতির বিরোধী নয় এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রেও আপত্তিকর নয়, সেগুলো তিনি গ্রহণ করতেন। সমাজের জন্য কল্যাণকর ও ক্ষতিহীন উপাদানগুলোকে তিনি অনুমোদন দিতেন।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, সংযোজন বা সংস্কার করে গ্রহণ।</strong><br />
যে প্রথাগুলোর কিছু অংশ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল, সেগুলোর নেতিবাচক দিক বাদ দিয়ে, ইতিবাচক অংশকে ইসলামী নৈতিকতা যোগ করে নতুনভাবে প্রয়োগ করতেন। এর ফলে সমাজে এক নতুন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি হতো।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত, সরাসরি প্রত্যাখ্যান।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মূলনীতির বিপরীত, শিরক বা কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে- সেগুলো তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন।</p>
<p>অতএব, ইসলামের উসুল বা আসাসুল কুল্লিয়া, অর্থাৎ মৌলিক নীতিগুলোই ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি সঠিকভাবে বোঝা ও প্রতিষ্ঠা করা না গেলে, সংস্কৃতির ধারাটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই সমাজে এই নীতিগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা আলেম ও প্রজ্ঞাবানদের দায়িত্ব।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার আলেমগণ সর্বদা এই নীতিগুলোকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করতেন। ফলে ইসলামের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় মূলনীতি টিকে থাকত, আর পরিবর্তনশীল বিষয়ে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজন ঘটত।</p>
<p>যেসব বিষয়ে সময় ও সমাজের প্রয়োজনে পরিবর্তন আসত, সেখানে ইসলাম নমনীয়তা ও প্রজ্ঞা দেখিয়েছে। তবে “বিদআত” ধারণাটি এখানে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়।<br />
অনেকে মনে করেন, নবী করিম ﷺ এর যুগে না থাকা যেকোনো নতুন কিছুই বিদআত। কিন্তু তা সঠিক নয়। বিদআত হচ্ছে সেই কাজ, যা সুন্নতের বিপরীতে, ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী, এবং কেউ সেটিকে ইবাদতের অংশ বা সওয়াবের কাজ হিসেবে মনে করে।</p>
<p>অন্যদিকে, কোনো কাজ যদি ইসলামের স্থায়ী নীতির বিপরীত না হয়, বরং আঞ্চলিক প্রয়োজনে সমাজে উপকারী ভূমিকা রাখে, তবে সেটি ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীত কিছু নয়। বরং এটি সেই সমাজের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবেই টিকে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সংস্কৃতিতে ইসলামের বিশ্বজনীনতা</strong></h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে কোনো আলেম বা সুলতান কখনোই এমন প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করেননি।<br />
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি (তুরাস ও তামাদ্দুন) সবসময়ই ছিল বিস্তৃত, গভীর ও মানবিক। মুসলমানরা যখন বিভিন্ন ভূখণ্ডে গিয়েছে, তারা সেই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। যেমন তারা মানুষের অন্তর জয় করেছে, তেমনি গড়ে তুলেছে রাজধানী ও নগর, স্থাপত্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামো, এবং সমাজজীবনের বিভিন্ন রূপ।</p>
<p>প্রশ্ন হল, তারা এটি কীভাবে করতে পেরেছিল?<br />
ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায়, মদিনা ব্যতীত প্রায় সব ইসলামী রাজধানীতেই মুসলমানদের তুলনায় অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল বেশি। তবুও তারা সেখানে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করেছে। নিজেদের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় ও ভাষা সযত্নে রক্ষা করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, তারা কখনো একে হুমকি হিসেবে দেখেনি; বরং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ছিল তাদের পূর্ণ আনুগত্য, এবং শত শত বছর তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রেখেছে।</p>
<p>এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে ছিল ইসলামী সভ্যতার সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং উৎকৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ। এ ধরনের গভীর সহাবস্থান কেবল তখনই সম্ভব, যখন সভ্যতা তার মূল নীতিতে অবিচল থেকে পারিপার্শ্বিক বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে।</p>
<p>একইভাবে, মুসলমানদের উসূলী ভিত্তি, সাংস্কৃতিক কাঠামো, ইবাদত ও শরীয়তের কোনো দিকই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা সংকটে পড়েনি। বরং তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অটুট রেখেই ইসলামী আদর্শের সীমার মধ্যে থেকে সবকিছু সুচারুভাবে পালন করতে পেরেছে। এভাবেই ইসলাম, একদিকে তার চিরন্তন নীতিতে অবিচল থেকেছে, অন্যদিকে মানবজাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে এক বিশ্বজনীন সভ্যতার রূপ ধারণ করেছে।</p>
<p>আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, <strong>৬৯ হিজরিতে লালমনিরহাটে সাহাবী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</strong> অর্থাৎ, ইসলামের আগমন এই ভূখণ্ডেও ঘটেছিল প্রাচীনকালেই। সাহাবীগণ, আলেম ও সুফিগণ এ অঞ্চলে এসে মসজিদ, খানকা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।</p>
<p>তবে এসব প্রতিষ্ঠান কেবল মুসলমানদের আকৃষ্ট করা, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি, প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা, আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। খানকা ও দরগাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতেন এবং নিরাপদ বোধ করতেন। সেখানে খাবারের ব্যবস্থা ছিল, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগও ছিল সবার জন্য। একইভাবে, মুসলমানরা যেমন নামাজ-রোজা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করেননি, তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এভাবেই ইসলামী সংস্কৃতি এখানে বিকশিত হয়েছিল এক মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহাবস্থানমূলক রূপে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বৈচিত্র্যেই ঐক্যের সৌন্দর্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা খাদ্য, পোশাক, স্থাপত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উপকারী ও নান্দনিক উপাদান গ্রহণ করেছে, কিন্তু কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে একরকম করে দেয়নি। যেমন, নোয়াখালীর বাজরা মসজিদ ও ইস্তাম্বুলের সুলতান ফাতিহ মসজিদ এক নয়,<br />
দিল্লির জুমা মসজিদ ও ইস্পাহানের মসজিদও একই কাঠামোয় নির্মিত নয়।<br />
কিন্তু সবগুলোতেই দেখা যায় এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য; উচ্চ রুচিবোধ, নান্দনিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও ভারসাম্য।</p>
<p>এই সৌন্দর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনই ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বলকান থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জীবনধারা আজও রুচিশীল, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ।</p>
<p>এর কারণ একটাই, তারা ইসলামের স্থায়ী মূলনীতির প্রতি অনুগত থেকেও, প্রতিটি সমাজে কল্যাণকর, রুচিসম্পন্ন ও উপযোগী সংস্কৃতি বিকাশ করেছে। এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মহত্ত্ব ও সাফল্যের আসল রহস্য।</p>
<p>খাদ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য ছিল। <strong>ইসলামী সভ্যতায় খাদ্যের স্থায়ী নীতি ছিল, এটি যেন হালাল, স্বাস্থ্যকর ও উপকারী হয়।</strong> বাকিগুলো অঞ্চল, জলবায়ু ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈচিত্র্যময় রূপ পেয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম একদিকে বৈশ্বিক হলেও, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে মানানসই একটি সংস্কৃতির ধারা তৈরি করতে পেরেছে— যা আজও টিকে আছে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মুসলমানরা প্রতিটি স্থানে স্থানীয় স্বতন্ত্রতা ও সংস্কৃতি রক্ষা করেই এক সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল সংস্কৃতি উপহার দিয়েছে। ইসলামের আঞ্চলিক অভিযোজন সর্বত্র সুরক্ষিত ছিল। স্থানীয় খাবার, পোশাক, স্থাপত্য, উৎসব— সবকিছুই নিজস্ব আঙ্গিকে টিকে থেকেছে, আবার ইসলামের স্থায়ী নীতি ও নৈতিক শিক্ষা একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ইসলামী সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান</strong></h5>
<p>এখানে প্রশ্ন আসে, ইসলামী সভ্যতার সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান কীভাবে কার্যকর ছিল? এটি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে ইসলামী সংস্কৃতি এবং আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।<br />
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মূলত নিয়ন্ত্রণ, ভোগবাদ এবং কিছু গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গড়ে উঠেছে। তারা সংস্কৃতিকে এক ধরনের বিনোদন বা সাময়িক খোরাক হিসেবে ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তরকে নয়, কেবল ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করে। তাদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী; তাই তা শক্তিশালী হলেও আত্মিক নয়।<br />
কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি সামষ্টিক, আত্মিক ও রুহানিকেন্দ্রিক। ইসলামী সংস্কৃতি মানুষের আত্মা, নৈতিকতা এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।</p>
<p>যেমন ঈদের সংস্কৃতিতে আমরা দেখি, সবাই একসঙ্গে মাঠে নামাজ আদায় করছি, কোলাকুলি করছি; কোরবানির ঈদে একই গোশতের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, সবাই একে অপরকে গোশত বিলিয়ে দিচ্ছি। রমজান মাসে সৃষ্টি হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শবে মেরাজ, শবে বরাত প্রতিটি উপলক্ষেই আমরা প্রতিবেশীদের, এমনকি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও খাবার দিই। এখানেই নিহিত ইসলামী সংস্কৃতির মানবিকতা ও সহাবস্থান।</p>
<p>আমাদের কবিতার আসর, মিলাদ, জিয়াফত, খানকা ও দরগার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবই ছিল উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমাজকেন্দ্রিক। <strong>এখানে সব শ্রেণি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারতেন। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজে পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে দৃঢ় করেছিল।</strong></p>
<p><strong>অন্যদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এমন নয়। তাদের চলচ্চিত্র, সংগীত বা বিনোদনমূলক উপাদানগুলো প্রায়ই অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও মূল্যবোধহীনতার দিকে ধাবিত করে।</strong> তাদের সংস্কৃতি পরিবার ভাঙে, সমাজকে বিভক্ত করে। তারা সাময়িক আনন্দ পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আত্মিক ক্ষয় ডেকে আনে। যেমন মদ্যপান বা অতিরিক্ত ভোগবিলাস সাময়িক আনন্দ দিলেও তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।</p>
<p>আবার, ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিটি অনুষ্ঠান ও ইভেন্ট সার্বজনীন ও কল্যাণমুখী। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক দিক থেকেও বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করেছে। আমাদের অঞ্চলে খানকা ও দরগাগুলো ছিল আধ্যাত্মিক বলয়, যেখানে মানুষ আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজসেবার অনুশীলন করত। এখান থেকে মানুষ রুহানী শক্তি অর্জন করত, আত্মশুদ্ধির পথ খুঁজে পেত।</p>
<p>এই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে অবদান রেখেছিল। এটাই ছিল ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক সাফল্য—যা কেবল ধর্ম নয়, মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছিল।<br />
কিন্তু আজ আমরা যদি ইতিহাসকে ছোট করে দেখি, তবে এই গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>উপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক ক্ষয়</strong></h5>
<p>পাশ্চাত্য ও ওরিয়েন্টালিস্ট অনেক লেখক ইসলামের এতোসব প্রসারকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সত্য হল, ইসলামী সংস্কৃতি সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, পরিছন্নতা, আতিথেয়তা, অপচয়ের বিরোধিতা, পারস্পরিক বন্ধন ও প্রতিবেশীর অধিকার; এই মূল্যবোধগুলোর মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<p>যেখানেই মুসলমানরা গিয়েছে, তারা পরিছন্নতা শিখিয়েছে, পারিবারিক বন্ধনকে শক্ত করেছে, সমাজবদ্ধ জীবনধারা তৈরি করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে, কুর্দ অঞ্চলে বা আফ্রিকার অনেক স্থানে দেখা যায়- মুসলমানদের সংস্পর্শে থাকা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পরিবারগুলোও পরিচ্ছন্নতা ও পারিবারিক নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত হয়েছে।<br />
যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না, সেখানে সমাজ অনেক বেশি অব্যবস্থাপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ইসলামী সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা মানবিক উন্নয়নের পথে সমাজকে পরিচালিত করেছে।</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়েছে উপনিবেশিক শাসনের কারণে। আফ্রিকার উপকূল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বলকান; সর্বত্র মুসলমান সমাজ কখনও ব্রিটিশ, কখনও ফরাসি, কখনও কমিউনিস্ট আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছে।<br />
এসব আগ্রাসনের ফলে ইসলামী সভ্যতার মূল্যবোধনির্ভর সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার অন্তর্গত মূল্যবোধগুলোই ছিল সেই সাংস্কৃতিক উপাদান, যেগুলোর মাধ্যমে মুসলমানরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিল।</p>
<p>কেবল খাবার, পোশাক বা ভাষা দিয়ে কোনো সভ্যতা গঠিত হয় না; এগুলো সভ্যতার উপাদানমাত্র। আসল সভ্যতা গঠিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামষ্টিক মানসিকতার মাধ্যমে। এই মূল্যবোধ আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এগুলো বিকশিত হয় শিক্ষা, খানকা, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে। মুসলমানরা ঠিক এইভাবেই সমাজে সভ্যতার ভিত স্থাপন করেছিল।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ, খাদ্যসংস্কৃতি আরবে এক রকম, এশিয়ায় এক রকম, তুরস্কে এক রকম, আর বাংলায় একেবারে ভিন্ন। কিন্তু মূল্যবোধ একটাই। একজন মুসলমান খাবার নষ্ট করবে না, অপরিচ্ছন্ন রাখবে না, হালাল ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করবে।<br />
একজন আফ্রিকান মুসলমান, কেরালার মুসলমান বা বাঙালি মুসলমান; সবাই একই নীতিতে বিশ্বাসী। তারা খাবার অপচয় করবে না, অতিথিকে সম্মান করবে এবং ন্যায্য বণ্টনের নীতি মেনে চলবে।</p>
<p>এই যে একই মূল্যবোধ, একই নৈতিকতা, জাতপাত বা শ্রেণিভেদ অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেতনা; এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মূল।<br />
মানুষ মানুষ হিসেবে সম্মান পায়, এই নীতিতেই সমাজে নিরাপত্তা আসে। বাংলায় ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা এত বেশি হওয়ার কারণও এটিই। এখানে কাউকে জোর করে মুসলমান বানানো হয়নি; বরং মানুষ ইসলামী সংস্কৃতির মানবিক রূপে আকৃষ্ট হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলার ইসলামী সংস্কৃতি বোঝাপড়ায় আমাদের অবস্থা এমন কেন?</strong></h5>
<p>আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রায় পাঁচশ বছরের এক অবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র কাঠামো মুসলমানরা এই উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে দেবদেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু মুসলমানরা এর বিপরীতে নামাজকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি। একইভাবে, পারস্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং সবাই যেন নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>এই প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা তৈরি করেছিলেন কমন সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে সবাই অংশ নিতে পারত। <strong>যেমন, খাবারের সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি এমন এক খাবার, যা মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাদান, আড্ডা, জিয়াফত, খানকা ও মসজিদ; এসব স্থান ছিল উন্মুক্ত সামাজিক পরিসর, যা পারস্পরিক বন্ধন ও সহাবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।</strong></p>
<p>এসব কারণেই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া আমাদের কেমন হওয়া উচিত, সেই নিয়েও ভাবনা জরুরি। মূলধারার ইসলামী সংস্কৃতি কি এদেশীয় মুসলমানের সংস্কৃতি থেকে আলাদা হবে? নাকি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই একরূপ সাংস্কৃতিক আবহ ও এজেন্ডা আমাদেরও অনুসরণ করতে হবে? নাকি বরং ইসলামের সীমারেখার ভেতর থেকেই আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা উচিত?</p>
<p>একটি রাষ্ট্র শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পারে কেবল তখনই, যখন তার সংস্কৃতি শক্তিশালী, গভীর এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তাই ইসলামী সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি, নতুন করে বিশ্লেষণ ও আলোচনা করতে হবে।<br />
পাঁচশ বছরের সেই দীর্ঘ রাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, সামাজিক সিলসিলা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শক্তি—আমরা আজ তা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। প্রশ্ন হলো—কখন এবং কীভাবে এই ক্ষয় ঘটল?</p>
<p>আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে, দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর আঘাত হেনেছিল। প্রথমত, তারা আমাদের স্মৃতি (মেমোরি) ধ্বংস করেছে। আমাদের নিজস্ব শিক্ষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিবর্তে তারা এমন এক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সম্পূর্ণভাবে ঔপনিবেশিক স্বার্থে নির্মিত।<br />
তারা ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীতে বিকল্প সাংস্কৃতিক কর্মসূচি তৈরি করেছে এবং সেগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ইসলামের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য নতুন উৎসব সৃষ্টি করেছে। আমাদের ভাষাকে বিকৃত করেছে, বিদেশি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে “আধুনিকতা”র নামে আমাদের ওপর আরোপ করেছে।</p>
<p>যখন আমরা স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করিনি, তখন তারা শক্তি ও সহিংসতার মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা পরিণত হয়েছি এক আত্মপরিচয়হীন জাতিতে। আমাদের স্মৃতি হারিয়ে গেছে, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়েছে, আমরা এক গভীর পরিচয় সংকটে নিপতিত হয়েছি।</p>
<p>আজও সেই সংকট আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না, আমাদের সংস্কৃতির মূল পদ্ধতি (মেথডোলজি) ও উপকরণ সম্পর্কে অজ্ঞ। আমরা বিশ্বজনীন সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির পার্থক্য বুঝি না; আবার আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান সীমিত।</p>
<p><strong>আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ এর রিসালাত (বার্তা)-এর মূল দায়িত্ব এবং একজন মানুষ (বাশার) হিসেবে তাঁর সাধারণ মানবিক অভ্যাসগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতেও ব্যর্থ। এই কারণেই আজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছি।</strong><br />
অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ব্রিটিশ একাডেমিয়া, কলকাতাকেন্দ্রিক এক সাংস্কৃতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের অঞ্চলের সংস্কৃতিকে প্রদর্শনমূলক ও পূজ্য রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল, আমরা যেন নিজেদের সংস্কৃতিকে কেবল বাহ্যিক সাজে উপস্থাপন করি, কিন্তু তার ভেতরের আত্মা, দর্শন ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলি।</p>
<p>ফলস্বরূপ, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে এক প্রাণহীন প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে—যেখানে রয়ে গেছে কেবল বাহ্যিকতা, কিন্তু হারিয়ে গেছে ইসলামী সংস্কৃতির সেই আত্মিক ও নৈতিক মহিমা, যা একসময় এই উপমহাদেশকে আলোকিত করেছিল।</p>
<p>তাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, আইন, পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি প্রতিরক্ষা কাঠামো— সবকিছুই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে তারা একটি ক্ষেত্রকে আঞ্চলিক আবহের ছোঁয়া দিয়েছিল, আর সেটি হলো সংস্কৃতি। কিন্তু সেটিও প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও বিকৃত করার কৌশল মাত্র ছিল। এভাবেই আমাদের ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— যা একসময় আত্মিক শক্তি, মানবিক ঐক্য ও সামাজিক সংহতির উৎস ছিল— ধীরে ধীরে পরাধীনতার মানসিক শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়ে।</p>
<p><strong>তারা সংস্কৃতিকে মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাপিয়ে দেয়। বিভিন্ন চিন্তাধারাকে জোর করে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা তৈরি করে এক কলকাতা-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক মানসিকতা।</strong> এই উদ্দেশ্যে তারা প্রচুর লেখালেখি করেছে, বড় বড় কবি ও সাহিত্যিক গড়ে তুলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, সংসদ, মিডিয়া ও সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে এই ধারাই ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব আত্মপরিচয়কে বিকৃত ও বিলুপ্ত করে দেয়।</p>
<p>এর ফলস্বরূপ আমরা এমন এক বিভ্রান্ত ধারণায় অভ্যস্ত হয়েছি যে, বাঙালি মুসলমান এক স্বতন্ত্র সত্তা, যা আরব, তুর্কি, ইরানীয়, আফ্রিকান, মালয় বা ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। অথচ এটি একটি কৃত্রিম ও কলকাতা-কেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাধারার ফল, যার ভেতরে ইসলামের প্রকৃত রূহ অনুপস্থিত।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, এই চিন্তাধারার প্রভাবে এক রূহবিহীন ইসলাম তৈরি হয়েছে, যা মুসলমানদের সংস্কৃতির আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা চেয়েছিল, মুসলমানদের পোশাক, গান, খাবার, পারিবারিক সম্পর্ক ও জীবনযাপন যেন ব্রিটিশ উপনিবেশ বা কলকাতার ধ্যানধারার আদলে গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের পাঁচ শতাব্দীর নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সিলসিলা আজ ভুলে যাওয়া হয়েছে।</p>
<p><strong>অন্যদিকে, এক শ্রেণির মুসলমান আবার ইসলামী সংস্কৃতির মূল ধারণা না বুঝে আরবদের সংস্কৃতিকেই ইসলামী সংস্কৃতি হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে।</strong> কিন্তু এই দুই প্রান্ত, কলকাতাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ও অনুলিপিকৃত আরবীয় সংস্কৃতি; কোনোটিই ইসলামের প্রকৃত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়।</p>
<p>তাই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির সঠিক বোঝাপড়া এখন অত্যন্ত জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির নমুনা</strong></h5>
<p>এই আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, ইসলামী সভ্যতা স্থানীয় সংস্কৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতো। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নিচে বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিশ্বজনীনতার কতক উদাহরণ তুলে ধরা হলো।</p>
<p><strong>০১. ভাষা ও সাহিত্য</strong></p>
<p>আমাদের এই অঞ্চলের ভাষার ধারাবাহিকতায় পাল আমলে যে বাংলা ছিলো, তা একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিলো সেনরা। বাংলার পরিবর্তে সেনরা সংস্কৃত-কে সামনে এনেছিলো। এমনকি, বাংলা ভাষাকেই তারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। মুসলিমরা এসে সে বাংলাভাষাকে আবারো গতিশীল করে দিয়েছিলো। শুধু বাংলাই নয়, মুসলিমরা এতোটা উদার ছিলো যে, বাংলা ও সংস্কৃত—দুই ভাষাকেই একইসাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।</p>
<p><strong>বাংলার সুলতানরা উদারভাবে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সুলতান জালালউদ্দীন মোহাম্মদ শাহ কবি বৃহস্পতি মিশ্রকে &#8220;রায় মুকুট&#8221; উপাধী প্রদান করেন।</strong> হোসেন শাহী বংশের সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু ও সাহিত্যিকরা বাংলায় &#8220;রামায়ণ&#8221; &#8216;মহাভারত&#8217; অনুবাদ করেন। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। মুঘল শাসনামলেও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাংলা-সংস্কৃত ভাষার উন্নতিতে মুঘলরা যথেষ্ট অবদান রাখে। এসবই বাংলায় হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রমাণ করেন। অতএব, এটা সত্য যে, মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো।</p>
<p><strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিমরা যে এভাবে বাংলা ও সংস্কৃতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এলো, তা আবার ধ্বংস হয়ে যায় পলাশীর বিপর্যয়ের পর। ইংরেজদের “ডিভাইড এন্ড রূল” পলিসির ক্ষেত্রে এই ভাষার বিনির্মাণটাকেই কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা। ম্যাক্স মুলার ভারতের হিন্দুদেরকে আর্য বলে তাদের মাঝে সেনদের সেই পুরাতন মানসিকতা তুলে এনেছিলো। যার ফলে বহমান যে বাংলা ছিলো, সেটাকে সমূলে ধ্বংস করে সংস্কৃতকে জোর করে বাংলায় প্রবেশ করানো হয়েছে, যেনো মুসলিম শাসনামলের বাংলা এবং হিন্দুদের নতুন সংস্কৃত বাংলার মাঝে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়; আর শেষমেশ এ-নিয়েও যেনো হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। এবং, হয়েছেও তাই-ই।</p>
<p><strong>নতুন এই বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইংরেজরা প্রতিষ্ঠা করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ; নিজেরাই লিখেছে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, যেসব ব্যাকরণের মাধ্যমেই নতুন বাংলার সূচনা করা হয়। কেননা, এসব ব্যাকরণে সংস্কৃতকে সামনে রেখেই বাংলার নতুন রূপ দেওয়া হয়।</strong> আর এসবকে পরিচিত করাতে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজকে কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা; এবং নতুন এই বাংলাকে লেখ্য ভাষায় রূপ দিয়েছে কলকাতার সাহিত্যিকরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখাগুলো পড়লেই এসব বুঝা যায়। ঠিক এজন্যই কবি নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ এবং কবি গোলাম মোস্তফার চেয়েও এই জেন-জি প্রজন্ম রবী-শরৎ-বঙ্কিম-বিভূতিদেরকে ভালোভাবে চিনে।</p>
<p>এখানে এই প্রশ্নও উঠে আসে যে, ৫০০ বছর আগের মহাকবি আলাওল-এর বহমান বাংলাকে আমরা যেভাবে বুঝি না, তেমনি আমরা কেন প্রায় ২৫০ বছর আগের ঈশ্বরচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝি না? ভাষা যদি বহমান হয়, তাহলে আলাওলেরও ২৫০ বছর পরের বাংলা-তো অনেকটাই বুঝতে পারার কথা। কিন্তু, তা কেন হয় না?</p>
<p>যাকগে, এখান থেকে এই সিদ্ধান্তই পাওয়া গেলো যে, ইসলামী সভ্যতায় ভাষার সংস্কৃতিকে যদি বিশ্বজনীন হিসেবে গ্রহণ করা না হতো, তাহলে হয়তো আমাদের এই বাংলাকে এভাবেই পেতাম না; অথবা হয়তো একেবারেই হারিয়ে যেতো।</p>
<p><strong>০২. উৎসব ও গ্রামীণ সংস্কৃতি</strong></p>
<p>ভারত ও বাংলার উৎসব সংস্কৃতি কতোটা শক্তিশালী ছিলো তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়।<br />
<strong>যেমন- জহির উদ্দিন বাবর, ইলতুৎমিশ ২০% মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে গোটা উপমহাদেশ চালিয়েছেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক বলয় ও তার উৎসব গুলো।</strong> ব্রিটিশরা এসে যখন দেখল কোনভাবেই জনগণ থেকে ইসলামের প্রাণসত্তাকে সরানো যাচ্ছে না, বলয়কে নষ্ট করা যাচ্ছে না, তখন তারা বুঝতে পারলো শুধু জ্ঞান, ক্ষমতা, অর্থনীতি, নষ্ট করলেই হবে না বরং বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করতে হবে। তাই তারা বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্রদের দিয়ে মিরাজ, মিলাদুন্নবী ইত্যাদির বিপরীতে স্বরস্বতী, হলি, দেওয়ালী উৎসবকে ব্যাপকভাবে হাইলাইট করতে শুরু করলো, মক্কা বিজয় দিবসের দিন থার্টি ফার্স্টনাইট জাতীয় ভোগবাদী উৎসব নিয়ে এলো।</p>
<p>মুসলিম বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে রমজান, ঈদ, জন্ম, আকিকা, শবে বরাত, শবে মেরাজ, ঈদে মীলাদুন্নবী, মহররম বেশ আয়োজনের সাথে পালিত হতো।</p>
<p>এম এ রহিমের ভাষায়,</p>
<blockquote><p>“ঈদে মীলাদুন্নবীতে নবাব মুর্শিদকুলী খান রবিউল আউয়ালের প্রথম বারোদিন ভোজের আয়োজন করতেন। পুরো মুর্শিদাবাদ আলোকমালায় সজ্জিত করতেন। সেনাবাহিনী দিয়ে তোপধ্বনি দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মুজাফফর আলেম ওলামাদরে আপ্যায়ন করতেন। পরবর্তী বছরের জীবন ধারনের খরচের জন্য আলেম ও বিজ্ঞজনদের বিশাল অঙ্কের মুদ্রা উপহার দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ প্রথম বারোদিন আলেমদের নিয়ে সীরাত চর্চা করতেন। সীরাত চর্চার পাশাপাশি উন্মুক্ত ভোজের আয়োজন করতেন। তিনিও বিদ্বান ও অতিথিদের জন্য এতোবেশি পরিমাণ উপহার দিতেন যে, যেন ওলামায়ে কেরামগণ পরবর্তী বছর স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারে।”</p></blockquote>
<p>শবে বরাত নিয়ে এম এ রহিম তার বইয়ে বলেন, “উপমহাদেশের মুসলমানগণ শবে বরাত বহু আচার অনুষ্ঠান ও আমোদ স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদ্যাপন করতো। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক চারদিনব্যাপী এই উৎসব উদ্যাপন করতেন এবং এতবেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাত্রিকালও প্রকাশ্য দিবালোকের রূপ ধারণ করত। সমসাময়িক উৎসগুলো থেকে জানা যায় যে, শের শাহের একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিশতীর সঙ্গে শব-ই-বারাতের দিন সারারাত এবাদত বন্দেগি করেন। &#8216;বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে&#8217; এই উৎসব উদযাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার নবাবগণ বিরাট জাঁকজমকের সঙ্গে &#8216;শব-ই-বারাত&#8217; উদ্যাপন করতেন। বাড়িঘর আলোকমালায় সজ্জিত করা হতো এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মসজিদে ও বাড়িতে সারারাত নামাজ অদোয় করতেন। ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।”</p>
<p>রমজান নিয়ে বলেন, “উপবাস, সংযম, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্মেলনের সময় হিসেবে সে যুগের মুসলমানগণ &#8216;রমজান&#8217; পালন করত। তারা রমজানকে পবিত্র ও মঙ্গলজনক মাসরূপে গণ্য করত এবং খুশির সঙ্গে একে স্বাগত জানাত। <strong>বাংলায় মুঘল সৈন্যদের রমজান পর্ব পালনের উল্লেখ করে মীর্জা নাথান বলেন, ‘রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষদিন পর্যন্ত ছোটবড় প্রত্যেকে প্রত্যহ তার বন্ধুর তাঁবুতে মিলিত হতো। এটা একটা স্বাভাবিক রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক দিন সকলে পর্যায়ক্রমে একজন অভিজাত বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাত।</strong> সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের দেওয়া ভোজের পালা ছিল। সকলে সেদিন তার তাঁবুতে সময় কাটায়’।”</p>
<p>ঈদুল ফিতরে নিয়ে মুসলিম বাংলার উৎসবমূখর আয়োজন নিয়ে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বইয়ে আছে, “সেই যুগে খুব আমোদ-স্ফূর্তির সঙ্গে ঈদের নতুন চাঁদকে স্বাগত জানানো হতো। মীর্জা নাথানের ভাষায় এটা বর্ণনা করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন,<strong> ‘দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠতো এবং গোলন্দাজ সেনাদলের সকল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হতো। রাত্রির শেষভাগে, কামানের অগ্নি উদগীরণ শেষ হতো এবং এর পর শোনা যেতো ভারি কামানের আওয়াজ। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প’</strong>।”</p>
<p>“এথেকে বুঝা যায়, ঈদের আগমনে মুসলমানরা কতটা খুশি হতো। ঈদের দিনে সমস্ত মুসলমান আনন্দস্ফূর্তিতে মসগুল থাকত। স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রত্যেকে নতুন এবং উৎকৃষ্ট কাপড় পরিধান করত। চমৎকার পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানগণ প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথেপথে টাকা পয়সা ও উপহার দ্রব্য ছড়িয়ে দিত এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানগণ গরিবদেরকে ভিক্ষা দিত। &#8216;নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী&#8217; গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা &#8216;ঈদগাহ&#8217; ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দস্ফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে।”</p>
<p>আর কুরবানীর ক্ষেত্রে, মুসলমানগণ ঈদুল আজহার প্রভাতে সুন্দর কাপড়-চোপড় পরিধান করে এবং &#8216;তাকবীর&#8217; উচ্চারণ করতে করতে ঈদগাহ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে গমন করতো। সেখানে জামাতে তারা নামাজ আদায় করে এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, পরস্পরকে আলিঙ্গন করতো ও সম্ভাষণ জানাতো। অতঃপর তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাদের সাধ্যানুসারে তারা কোনো পশু, যেমন, গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি করতো। তারা গরিব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে এবং গৃহে ভোজের অনুষ্ঠান করতো। প্রত্যেক গৃহ ভোজানুষ্ঠান ও আনন্দ &#8216;স্ফূর্তিতে মুখরিত হয়ে উঠতো এবং সকল গৃহে আদর আপ্যায়ন চলতো। শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হতো এবং এই মহান উৎসবে তারা সকলে একত্রে আনন্দ করতো। মীর্জা নাথান লিখেছেন যে, &#8220;নামাজান্তে খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে, লোকেরা তাকে কাপড়-চোপড় ও টাকাপয়সা উপহার দেয়। গরিব দুঃখীদের সাহায্যের জন্য তার সম্মুখে টাকাপসয়া ছড়িয়ে দেওয়া হতো। দুঃস্থ লোকদের অনেকে এর দ্বারা তাদের অভাব দূর করে সুখি হতো। এই দিনে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীগণ একে অন্যের জায়গায় গমন করতো এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানাতো।</p>
<p>এছাড়াও, বিয়ের অনুষ্ঠান হতো খুবই জাঁকজমকভাবে। হিন্দু-মুসলিম দুই জাতি তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী বিবাহের কাজ সম্পন্ন করতো। পোশাক-পরিচ্ছদেও শালীনতা বজায় থাকতো। এক্ষেত্রে মুসলিমরা হিন্দুদেরকে জোর করতো না। অতএব, মূল কথা হচ্ছে, বাংলায় অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সংস্কৃতিকে কখনই দূরে ঠেলে দেয়নি। স্থানীয় আয়োজনের ধরনের সাথে মুসলিমরাও নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো।</p>
<p><strong>০৩. খাদ্য</strong></p>
<p>ড. এম এ রহিম বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতি ইতিহাস বইয়ে এই অঞ্চলের মুসলিমদের খাদ্যের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>“মুসলমান সমাজের উচ্চশ্রেণী সম্পর্কে আলোচনায় খাদ্যদ্রব্য ও পোশাক-পরিচ্ছদে তাদের বিলাসিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সিবাস্তিয়ান মানরিক এবং চীনা দূতগণের বর্ণনা থেকে মুসলমানদের খাদ্য সম্বন্ধে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। তাদের খাবার টেবিলে মুরগী, ভেড়া, গরু প্রভৃতির মাংসের তৈরি বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য পরিবেশন করা হতো। অনেক রকমের মিষ্টি ও ফলমূল খাদ্য-তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। শসা, লেবু, মুলা, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদির তৈরি নানা জাতীয় আচার ছিল মুসলমানদের খাদ্যের বিশিষ্ট অঙ্গ।”</p></blockquote>
<p>“সিবাসতিয়ান মানরিক বলেন, এগুলো ক্ষুধা বৃদ্ধি করত এবং আবার খাবারের দিকে আকৃষ্ট করতো। হিন্দুরা এ ধরনের উপাদেয় খাদ্য প্রস্তুত করতে এবং ক্ষুধা উদ্রেকের জন্য আচারের ব্যবহার জানত না। হিন্দুদের ভোজ ও সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের বর্ণনায় কোথাও আচারের কোনো উল্লেখ দেখা যায় না।বাংলা সাহিত্যে খাদ্য সম্বন্ধে বহু উল্লেখ আছে। জানা যায় যে, বাংলার মুসলমানরা মুরগী, মেষমাংস ও অন্যান্য মাংসের উপাচার পছন্দ করতো।”</p>
<p>“বাঙ্গালি মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে রুটিরও উল্লেখ আছে। তাছাড়া মাছ ও শাক-সবজি লোকের সাধারণ খাদ্য ছিল। বাংলার নদ-নদী ও জলাশয়ে নানা জাতীয় মৎস্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। এর মাটিতে জন্মাত বিভিন্ন প্রকারের শাক-সবজি। তাতে করে, এমনকি, মুসলমানদের মধ্যে সাধারণ লোকেরা ও তাদের খাবারের জন্য রকমারি মাছ, শাক-সবজির তরকারি প্রস্তুত করতে পারতো।”</p>
<p>“খিচুড়ি (সাধারণত ঘি বা তেলের সঙ্গে চাল ও লঙ্কা দিয়ে প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য) ছিল লোকের প্রিয় খাদ্য। এমনকি, উচ্চশ্রেণীর লোকদেরও খিচুড়ির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বার্ণিয়ারের মতে, খিচুড়ি সম্রাট শাহজাহানের খুবই প্রিয় ছিল। ইউসুফ আলীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নবাব আলিবর্দী খান ও তাঁর আমির ওমরাহ প্রায়ই তৃপ্তির সহিত খিচুড়ি খেতেন।”</p>
<p>“নানা প্রকার মাংসের উপাচার ও নানা রকমের আচার মুসলমানদের খাদ্যের, বিশেষ করে, উৎসব অনুষ্ঠানে খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। উৎসবাদিতে, যেমন বিবাহ ইত্যাদি উপলক্ষে হিন্দুরা সাধারণত মাছ, শাক-সবজি ও মিষ্টান্ন তৈরি করত। হিন্দুদের ভোজে মিষ্টান্ন ও দধি ছিল খাদ্য তালিকার একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। &#8216;মনসামঙ্গল&#8217; কাব্যগুলোতে লক্ষ্মীন্দরের বিয়ের ভোজের বর্ণনা থেকে উৎসবাদি উপলক্ষে হিন্দুদের খাবার সম্বন্ধে আভাস পাওয়া যায়। সিবাসতিয়ান মানরিক ও চীনা দূতদের বর্ণনানুসারে, মুসলমানদের খাদ্য তালিকার সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে।”</p>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসনামলে যেসব খাবার আবিষ্কার, প্রচলন বা বিশেষ রূপে বিকশিত হয়েছে—তার সংখ্যা অনেক। তুর্কি, আফগান, আরব, পারসিক, মুঘল ও মধ্য এশীয় রন্ধনশৈলীর প্রভাবে উপমহাদেশের খাবারে এক বিশাল পরিবর্তন আসে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের আনিত বা উন্নত করা খাবারের মধ্যে রয়েছে,</p>
<ul>
<li>১. বিরিয়ানি (ঢাকাই/কাচ্চি)। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির মূল শিকড় মুঘল রন্ধনশৈলীতে। মুসলিম নবাবরা বিশেষভাবে এটিকে জনপ্রিয় করেন।</li>
<li>২. কাবাবের বিভিন্ন ধরন। যেমন- সিক কাবাব, বটি কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামী কাবাব, রেশমি কাবাব; এসবই তুর্কি–পারসিক উৎস থেকে এসে বাংলায় জনপ্রিয় হয়।</li>
<li>৩. নেহারি। মূলত দিল্লি–লখনউ থেকে বাংলায় আসে এবং মুসলিম শাসনকালে নবাবদের টেবিলের খাবার হিসেবে পরিবেশিত হতো।</li>
<li>৪. মোরগ পোলাও/চাপলি পোলাও। মুঘল দরবারে পোলাওয়ের বিভিন্ন রূপ ছিল। এর বাংলা রূপ হলো মোরগ পোলাও</li>
<li>৫. হালিম। আরব/পারস্যে এর উদ্ভব হয়েছে। মুসলিম শাসনকালেই বাংলায় বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে।</li>
<li>৬. কোরমা/কোর্মা। পারসিক &#8220;কুরমাহ&#8221; থেকে এসেছে। মুসলিম শাসকরা এর দুধ-বাদাম-ঘৃতসমৃদ্ধ বিলাসী রূপ প্রতিষ্ঠা করেন।</li>
<li>৭. রোস্ট (বাংলা মুসলিম স্টাইলে)। নবাবি-আওয়াধি রান্নার প্রভাবে বাংলায় রোস্টের নিজস্ব রূপ তৈরি হয়।</li>
<li>৮. শাহী টুকরা/শাহী টোস্ট। পারসিক ‘শিরমাল–ডেজার্ট’ থেকে রূপান্তরিত। এটি ছিলো মুসলিম নবাবদের প্রিয় মিষ্টি।</li>
<li>৯. ফিরনি। আরব–পারসিক দুধ-চালভিত্তিক ডেজার্ট থেকে এই অঞ্চলে অভিযোজিত।</li>
<li>১০. সেমাই/শিরখুরমা। আরবীয় সেমোলিনা ডেজার্টের মতো করে তৈরি হতো; মুসলিম শাসনামল থেকেই ঈদের প্রধান খাবার হিসেবে পরিচিত।</li>
<li>১১. বাকরখানি। ঢাকায় নবাব বংশের আমলে এটি তৈরি হয়।কাশ্মীর-লখনৌ-এর নান-বাইদের হাত ধরে পরিচিতি লাভ করে।</li>
</ul>
<p>অর্থাৎ, ইসলাম উন্নত সাংস্কৃতিক উপাদান গ্রহণ করেছে। বাংলায় বা ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো জিনিস না থাকলেও পারস্যে থাকলে, যদি তা ইসলামী নীতির বিরোধী না হয়, তবে সেটি এখানেও গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জীবনমান ও সাংস্কৃতিক মান উন্নত করা।</p>
<p><strong>মোদ্দাকথা হচ্ছে, স্থানীয় খাবার সংস্কৃতির পুরোটাই যেমন ইসলামী সভ্যতায় জারি ছিলো, তেমনি অন্যান্য অঞ্চলের স্থানীয় খাবারও এখানে এসে পরিচিত হয়ে ইসলামী সভ্যতায় খাদ্য সংস্কৃতিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তবে এখানে বলাই বাহুল্য যে, হারাম খাবারের বিষয়গুলো তো অবশ্যই পরিত্যাজ্য।</strong></p>
<p><strong>০৪. সংগীত</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনামলে বাংলা সংগীত তিনটি দিক থেকে পরিবর্তিত হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(ক) মধ্য এশীয়–পারসিক সুরের প্রভাব।</strong><br />
এর ফলে তুর্কি, পারসিক, আরবীয় সুর ও রাগ-রাগিনীর ধরণ বাংলায় প্রচলিত হতে থাকে। পারসিক মাহফিল, দরবারি সংগীত, সুফি সঙ্গীত—এসব বাংলায় নতুন রূপে গড়ে ওঠে।</li>
<li><strong>(খ) কবিতা–গান–দর্শনের সংমিশ্রণ।</strong><br />
মুসলিম শাসকেরা কবিতা, সঙ্গীত, মুশায়েরা, কীর্তন-সদৃশ কণ্ঠসঙ্গীতকে উৎসাহ দিতেন। ফলে বাংলা কবিগান, মুর্শিদী, মারফতি, বাউলধারা—এসব এক নতুন বিকাশ লাভ করে।</li>
<li><strong>(গ) সুফি সঙ্গীতের আগমন।</strong><br />
দরবেশ–সুফিদের মাধ্যমে কাসিদা, হামদ, নাত, গওয়ালিবর্ণী জিকির, এমনকি চিশতি ও সুফি দরবারের সঙ্গীতধারা বাংলায় প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলার ফোক গানের অর্ধেক সুফি-মুসলিম প্রভাবে গড়া—এটা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য। কাজী নজরুল ইসলাম, দুলাল শাহ, মজনু শাহ, কুতুবুদ্দিন, আউল শাহ—এরা কবিগান, পালাগান, মারফতি গানকে চালিত করেছেন।</li>
</ul>
<p>এরপর, মুসলমানদের সমাজে সংগীতের গুরুত্বের কারণে সংগীতপ্রীতি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) রাজদরবার ও নবাবি দরবারে সংগীত।</strong><br />
এটি ছিলো বাংলার সুলতান, মুঘল সুবেদার, নবাবদের দরবারে সংগীত ছিল রাজকীয় বিনোদনের অংশ। তারা দাদরা, ঠুমরি, গজল, কাওয়ালী, দরবারি রাগ, কিরানা, রাম্পুর–সাহাসওয়ান ঘরানা-কে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারেও সঙ্গীতজ্ঞদের বিশেষ মর্যাদা ছিল।</li>
<li><strong>(২) সুফি-দরবেশদের সমাজে সংগীত।</strong><br />
এসব সংগীত ছিল আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ। চিশতিয়া, কাদেরিয়া, সুফি দরবেশরা সংগীতকে মানুষের অন্তর জাগ্রত করার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। সুফিদের অবদানে বাংলায় মারফতি গান, মুর্শিদী গান, নবী-বন্দনা, কাওয়ালী ও ধর্মীয় জিকিরের সুরধারা ধারাগুলো বিকশিত হয়। বাংলায় মুসলমানদের বৃহৎ একটি অংশ এই গানগুলোকে ধর্মীয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করতো।</li>
</ul>
<p>বাদ্যযন্ত্রে মুসলমানদের অবদান নিয়ে বলতে গেলে তাদের কয়েকটি অবদানের কথা সামনে রাখতে হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) নতুন বাদ্যযন্ত্র উপহার বা প্রচলন।</strong><br />
শুরুতেই আসবে তবলার কথা। তবলা আজ সারা ভারত–বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র। ইতিহাস অনুযায়ী এটি মধ্য এশীয় মুসলিম বাদ্যযন্ত্র “তব্বল” থেকে এসেছে। তবলার পেছনে আমীর খসরু (১৩শ শতক)–এর অবদান সবচেয়ে আলোচিত। এরপর আসবে সর্মিন্দল বা সেতার। সেতার শব্দটি “সেহ-তার” (পারসিক: তিন তার) থেকে এসেছে। মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞদের হাত ধরেই এই যন্ত্রটি ভারতীয় রূপ পায়। তৃতীয়ত, রুদ, তানপুরা বা রুবাব। মধ্য এশীয় মুসলিম সুরে ব্যবহৃত এই যন্ত্রগুলি বাংলা-মুসলিম দরবারে জনপ্রিয় হয়।</li>
<li><strong>(২) বিদ্যমান যন্ত্রের উন্নয়ন।</strong><br />
মুঘল দরবারের উস্তাদরা সরোদ, সারেঙ্গি, তানপুরা—এসবকে পরিশীলিত করে তোলেন। তারের সংখ্যা বৃদ্ধি, টোনের গাম্ভীর্য, মৃদু সুরের পরিশুদ্ধতা—এসব উন্নয়ন মুসলিম উস্তাদদের অবদান।</li>
<li><strong>(৩) যন্ত্রসঙ্গীতে নতুন ঘরানা তৈরি।</strong><br />
মুসলিম উস্তাদরা নতুন নতুন, যেমন- গয়তরী (গায়েকী) আঙ্গ, মীন্ড-যুক্ত বাদন, মুঘলাই আলাপ, দরবারি স্টাইল ইত্যাদি বাদন-শৈলী সৃষ্টি করেন। এই শৈলীগুলোই পরবর্তীতে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মূল ভিত্তিতে স্থান পায়। আবার, দরবারি সঙ্গীতের ঘরানায় বাংলায় মুসলমান সঙ্গীতশিল্পীরা পাটিয়ালা ঘরানা ও রাম্পুর-সাহাসওয়ান ঘরানা তৈরি করেন। বিশনপুর ঘরানাতে মুসলিম উস্তাদদের প্রভাব ছিল বিশাল। এগুলোই পরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে স্থায়ী কাঠামো দেয়।</li>
<li><strong>(৪) রাগ-রাগিনীর নতুনত্ব আনয়ন।</strong><br />
বাংলায় মুসলমানরা মালকোষ, ইয়ামন, দারবারি কানাড়া, কৌশিকি, মালহার, তোড়ি ইত্যাদি রাগ উন্নত করে তোলেন। এসব রাগ মধ্য এশীয় প্রভাবে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় হয়।</li>
</ul>
<p>ইসলামী সংস্কৃতির সাথে যেহেতু সুফী ঘরানাটা বেশ ভালোভাবে জড়িত, তাই এটা নিয়ে দুয়েকটা কথা বলা প্রয়োজন। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় সুফি সাধক, দরবেশ, ফকিরদের মাধ্যমে যে সংগীতধারা গড়ে ওঠে, তাকেই সাধারণত বাংলার সুফি সঙ্গীত বলা যায়। এই সঙ্গীত মূলত পারসিক–আরবি আধ্যাত্মিক কবিতা, ইসলামি দর্শন, এবং বাংলার লোকজ সুরের এক অসাধারণ মিশ্রণ। ইশকে-মাজাজি, ইশকে-হাকিকি, নফসের পরিশুদ্ধি, মানবতার ধর্ম ইত্যাদি এসব গানের মূল প্রাণ।</p>
<p>শাহ জালাল ইয়েমেনী, শাহ নেসার বাহাদুর, শিকার সুলতান, দাতা কর্নি—এদের মতো বহু সুফি বাংলায় সুফি সঙ্গীত নিয়ে আসেন। তাঁরা জিকির, কাওয়ালী, হামদ-নাত, ফারসি মর্শিয়া, রব্বানি কবিতা–এসব সুরধারা সামনে আনেন। এরপর সময়ে সময়ে বাংলার লোকগানের সাথে সুফি দর্শনের মেলবন্ধন ঘটে। গ্রামবাংলার পালাগান, বাউল সুর, ঢোল-একতারা—এসবের সঙ্গে সুফিরা তাওহিদ, ইশক, নফস, পরকাল মুর্শিদ–ভক্তি মিশিয়ে দেন। ফলে তৈরি হয় বাংলার নিজস্ব সুফি লোকসঙ্গীত।</p>
<p>মুর্শিদী গানে সাধারণত মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা, মানবতার শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি—এসব বলা হয়। এসব গানের ক্ষেত্রে গাজী আব্দুল করিম, আব্দুল লতিফ ও হাছন রাজার নাম উল্লেখযোগ্য। মারফতি গানের ভেতরে রুহানি ইশক, আত্মজিজ্ঞাসা, দেহতত্ত্ব, নফস ও কল্পনার যুদ্ধ, মানবিকতার দীক্ষা ইত্যাদি থাকে। কেননা, এখানে ‘মারফত’-এর অর্থ পরিচয়—অন্তরের আল্লাহকে চিনে নেওয়া। এরপর সুফি প্রভাবিত বাউল সংগীত ও সুরে আরবি–ফারসি শব্দ ও  ধর্মীয় রূপক স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এছাড়াও, হামদ, নাত, কাওয়ালী তো আছেই। বাংলায় কাওয়ালী ভারতের মতো বিশাল নয়। সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদী এবং চিশতি দরবেশরা কাওয়াল দল নিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। ঢাকায় মুঘল যুগে কাওয়ালদের মর্যাদা ছিল।</p>
<p><strong>০৫. মুসলিম বাংলার সংস্কৃতিতে নারীদের অবস্থা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় মুসলমানগণ তাদের মেয়েদের ব্যাপারে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে এবং তা স্বীকারও করে। <strong>বালিকারা যাতে করে তাদের ধর্মের মূলনীতি, কোরআন পাঠ ও ধর্মের ক্রিয়া-কর্ম সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সেজন্যে পিতারা তাদের কন্যাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন। বালিকাদেরও বালকদের মতো &#8216;বিসমিল্লাহখানি&#8217; অনুষ্ঠান দ্বারা অক্ষর-পরিচয় শুরু হতো এবং তারা একই মক্তবে বালকদের সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করতো।</strong></p>
<p>গদাই মল্লিকের পুথি বা <strong>&#8216;মল্লিকার হাজার সওয়াল&#8217;</strong> (মল্লিকার হাজার প্রশ্ন) নামে অভিহিত কাব্য থেকে জানা যায় যে, মল্লিকা নাম্নী মুসলমান বালিকা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, যে পুরুষ তাকে সাহিত্য-বিষয়ক বিতর্কে পরাজিত করতে পারবে, তাকেই বিয়ে করবেন। বহু রাজপুত্র ও বিদ্বান ব্যক্তি তার সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হন, কিন্তু সকলেই মল্লিকার নিকট পরাজয় বরণ করেন। অবশেষে জনৈক সুফি পণ্ডিত আবদুল হাকিম গদা তার হাজার প্রশ্নের উত্তরদান করে তাকে বিতর্কে পরাজিত করেন। অতঃপর মল্লিকা তাঁর বিজয়ীকে বিয়ে করেন।</p>
<p>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমান রমণীগণ যুদ্ধক্ষেত্রেও স্বামীদের সহগমন করেছেন। এই উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাসে মুসলমান রমণীদের এরূপ বীরত্বব্যঞ্জক কার্যক্রম মোটেই বিরল কিছু ছিলো না। বাংলার মুসলমান শাসনামলে বহু রমণী ছিলেন যারা তাদের সাহস, শক্তি ও বীরত্বের জন্যে খ্যাতি লাভ করেন।</p>
<p>নবাব অলীবর্দী খানের বেগম শরফুন্নেসা ছিলেন একজন উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্না ও গুণান্বিতা মহিলা। তিনি তার গুণের মহিমায় সে যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি স্বামীর যুদ্ধাভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের কঠোরতা ভোগ করেন। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তিনি তার স্বামীর একজন মূল্যবান উপদেষ্টা ছিলেন।</p>
<p>নবাব আলিবর্দীর কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌলাহর মাতা আমিনা বেগম তার সুরুচি ও শিষ্টাচারের গুণে সে যুগের সমাজজীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়া মহিলা এবং অনাথ ও গরিব-দুঃখীদের আশ্রয়স্থল। কোমল হৃদয়া আমিনা বেগম অন্যায়কারীর প্রতিও কোনোরূপ কঠোরতা সহ্য করতে পারতেন না। ইংরেজদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সিরাজদ্দৌলাহ্ আলিবর্দীর পীড়িত অবস্থায় প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করেন। সে সময় তিনি রাজস্বের হিসাবে বহু অনিয়ম এবং জাহাঙ্গীরনগরে ঘষেটি বেগমের দিউয়ান রাজা রাজবল্লভ কর্তৃক বিপুল অর্থ আত্মসাতের তথ্য আবিষ্কার করেন। রাজা রাজবল্লভ সঠিক হিসাব না দেওয়ায় এবং তসরূপকৃত অর্থ রাজকোষে প্রত্যর্পণ না করায়, সিরাজদ্দৌলাহ্ তাকে মুর্শিদাবাদে কঠোর পাহারায় আবদ্ধ করে রাখেন। আমিনা বেগম পুত্রের নিকট তার পক্ষে মধ্যস্থতা করেন। মায়ের আদেশ রক্ষার্থে সিরাজদ্দৌলাহ্ রাজবল্লভকে মুক্ত করে দেন।</p>
<p>সিরাজদ্দৌলাহর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ছিলেন রমণীদের আদর্শ। কিভাবে সামান্য মর্যাদার একজন নারী স্বীয় গুণাবলীর বলে মুসলমান সমাজে খুব সম্মানিত মর্যাদায় আরোহণ করতে পারেন, তা তার জীবনে প্রতিভাত হয়েছে। সামান্য পরিচারিকার অবস্থা থেকে লুৎফুন্নেসা একজন যুবরাজের সহধর্মিণী এবং নবাবের বেগমের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়া ও উচ্চ অন্তঃকরণ সম্পন্না মহিলা।</p>
<p><strong>এছাড়াও, দারাশিকোর কন্যা ও যুবরাজ মুহম্মদ আজমের স্ত্রী জাহানজেব বানু বেগম মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। গউস খানের বিধবা স্ত্রী একদল মারাঠা লুণ্ঠনকারীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে ভাগলপুরে তার গৃহ রক্ষা করেন। আহমদনগরের চাঁদসুলতানার বীরত্বগাঁথা সুবিদিত। মহব্বত খাঁর বিরুদ্ধে নূরজাহানের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইতিহাসের একটি সুপরিচিত ঘটনা। এর বাইরে মহিলারা বিবাহ অনুষ্ঠানাদি ও শোভাযাত্রায়ও যেতেন।</strong></p>
<p><strong>এ-সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীরা গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না। তারা গৃহের বাইরেও যেতে পারতেন। কিন্তু তাদের পর্দা পালন করতে হতো এবং গৃহের বাইরে চলতে অবগুণ্ঠন ব্যবহার করতে হতো।</strong> পর্দান্তরালে বসবাস করলেও মুসলমান রমণীরা সমাজে যথেষ্ট সম্মানের অধিকারিণী ছিলেন। মুগল সমাজের রমণীগণ, তাদের পূর্ববর্তী ভগ্নীদের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।</p>
<p>মূলত, মুসলিম বাংলায় এভাবেই নারীগণ তাদের শিক্ষা, সাহিত্য চর্চা, পৈত্রিক সম্পত্তি ও রাজনীতির অধিকার পেয়েছিলো। অতএব, উপরোক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, মুসলমান শাসনযুগে বাংলার রমণীরা হারেমে সাধারণ পর্দা প্রথার মধ্যে থেকেও এবং পুরুষদের উপর নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও তারা এই প্রদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।</p>
<p><strong>০৬. হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি</strong></p>
<p>ইসলামী মূল্যবোধ ঠিক রেখেও যে ইসলামী সভ্যতা স্থানীয়দের স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলো, তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এক্ষেত্রে প্রাক-মুসলিম সময় ও মুসলিম সময়ের মাঝে তুলনা করা প্রয়োজন।</p>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এ’চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। <strong>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাবুল হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</strong></p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তঃবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো সমগ্র ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে মুসলিম বাংলায় ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ফলে, এই অঞ্চলের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো। বখতিয়ার খিলজির সেই অভিযানের পর এই অঞ্চলের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে, <strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong><br />
রোমিলা থাপার মতে, <strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>অতএব, বুঝা গেলো যে, মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো। আবার, সরকারি চাকরি করবার সুবাদে কিংবা মুসলমান শাসনকর্তাদের সভাসদ ও রাজকর্মচারী হিসেবে অথবা মুসলিম জনগণের প্রতিবেশী রূপে হিন্দুরা মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে। যার ফলে তারা মুসলমানদের মহৎ আদর্শ সংস্কৃতি এবং শিষ্টাচার ও জীবন পদ্ধতি দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবান্বিত হয়। পাশাপাশি, মুসলিম শাসক ও সুলতানদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।</p>
<p>এজন্যই, সাধারণ হিন্দুদের উপর ইসলাম ধর্ম দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অথচ, সাধারণ হিন্দুদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। সমাজে উচ্চ ধর্মের হিন্দুর সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুর মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিলো। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থও পাঠ করতে পারতো না। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরা শিক্ষা অর্জন করতো। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারনৈতিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব হয়। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাও শিক্ষা অর্জন করেন। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ঘটে। তারা সংস্কৃতের পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিক্ষা অর্জন করে উচ্চ রাজ কার্যে নিয়োজিত হয়ে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করে।</p>
<p>অন্যদিকে, হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের পরেই ছিলো কায়স্থদের স্থান। মুসলমানদের দ্বারা তারাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা শিল্প ও সাহিত্যে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেয়। মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এসব বিখ্যাত কবিদের মধ্যে ছিলেন-মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কবিন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, যশোরাজ খান, বিজয় গুপ্ত, কৃষ্ণ দাস কবিরাজ। মুসলিম শাসনামলে কায়স্থরা জমিদারি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করে। মুসলিম শাসক কর্তৃক এসব কায়স্থরাই পরবর্তীতে রায়, চৌধুরী, মজুমদার, অধিকারী উপাধী লাভ করে। এটি পরবর্তীকালে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে এবং আরো পরবর্তীতে গিয়ে দেখা যায় যে, এসব পদবী মানুষের নামের সাথেও যুক্ত হয়ে যায়।</p>
<p>আবার, বাংলার সুলতানরা ছিলেন উদার সংস্কৃতিমনা। তারা হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব মধ্যযুগে বাংলা হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আরেকটি কারণ। মূলত, এসব কারণেই যুগ যুগ ধরে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রীতি্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>এসবের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ছিলো। এটা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, যেখানে ধর্মীয় সহাবস্থান থাকে, সেখানেই অবশ্যই প্রশাসনিক সহাবস্থানও থাকবে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলমান আমলে হিন্দু শাসক ও সেনাপতি নিয়োগ।</p>
<p><strong>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মুসলমান শাসকগণ স্থানীয় হিন্দুদের শাসনকার্যে সংম্পৃক্ত করেন। শাসনকার্যে সুযোগ পেয়ে এসব হিন্দুরা যথেষ্ট যোগ্যতার ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। মুসলিম সুলতানগণ প্রতিভাবান হিন্দুদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাষ্ট্রীয় উপাধী এবং সরকারি জমি দান করেন।</strong> হিন্দুরা খুবই বিশ্বস্ততার সাথে মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করে। বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন বাংলার হিন্দুরা বাংলার সুলতানের হয়ে যুদ্ধ করেছিলো। হিন্দু সেনাপতি সহদেব এ-যুদ্ধে যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। নবাবী আমলে আমরা দেখি যে, পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজের সেনাপতি মীর মর্দন ও মোহনলাল দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুই নয়, মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হিন্দু জমিদার শ্রেণীরও উৎপত্তি হয়। দুর্গাচন্দ্র সান্যাল তার বিখ্যাত গ্রন্থ &#8220;বাঙালার সামাজিক ইতিহাসে&#8221; লিখেন যে, ইলিয়াস শাহী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী জেলায় বিখ্যাত &#8216;সান্যাল&#8217; এবং &#8220;ভাদুড়ী পরিবারের&#8221; উৎপত্তি হয়। সুলতান গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহের রাজত্বকালে ভাতুড়িয়ার জমিদার কংস (রাজা গণেশ) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।</p>
<p>আবার, এর বিপরীতে হিন্দু রাজা ও জমিদারদের অধীনে মুসলিম কর্মচারীও নিয়োগ হয়। মুসলিমদের শাসকদের মতো হিন্দু সামন্ত রাজা ও জমিদাররাও তাদের শাসনকার্যে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন। মীর্জা নাথানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভুলুয়ার (নোয়াখালি) হিন্দু জমিদার অনন্তমানিক্য মীর্জা ইউসুফ নামক এক ব্যক্তিকে উজির পদে নিয়োগ দেন। এছাড়াও, চাঁদ রায় ও কেদার রায় সোলায়মান লোহানী নামে এক মুসলিমকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা এবং &#8220;কালাপাহাড়&#8221; নামে খ্যাত শ্রীহরি ছিলো দাউদ খান কররানীর অন্যতম উপদেষ্টা ও সেনাপতি।</p>
<p>অতএব, এটাও সত্য যে, ধর্মীয় সহাবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় ছিলো। যেহেতু তৎকালীন ইতিহাসই এসব সাক্ষ্য দেয়, তাই এটা পুরোপুরি সঠিক যে, স্থানীয় সমাজ, মানুষ ও সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করেছে বিধায়ই ইসলামী সভ্যতা আজও মানুষের মনে স্থান দখল করে রয়েছে; এবং এটাও প্রমাণ হয়ে যায় যে, ইসলামী সভ্যতা প্রকৃত অর্থেই বিশ্বজনীনতাকে গ্রহণ করে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>জাতিসত্তা ও ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া</strong></h5>
<p>সবশেষে, আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তিতে ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া কেমন হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। আমাদের ঐক্য ও সম্প্রীতির সমাজ গড়তে হলে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ন্যায়, পারিবারিক ঐক্য, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p><strong>ইসলামী সংস্কৃতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা জাতিসত্তার ভেতরের মানবিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলে যাবে। আমরা বাঙালি মুসলমানদের ইসলামী সংস্কৃতির যে বোঝাপড়া গড়ে তুলতে চাই, তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান।</strong></p>
<p>এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও উপজাতির মানুষ একসাথে বসবাস করছে। তাই আমাদের উচিত, সবার প্রতি সমান দৃষ্টিতে তাকানো, সবার অধিকার ও মানুষ হিসেবে মর্যাদা স্বীকার করা। একই সঙ্গে আমাদের আহ্বান থাকবে; আমরা যারা বাঙালি মুসলমান, আমরা যেন নিজেদেরও মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে কল্পনা করি। প্রত্যেকে নিজের আঞ্চলিক পরিচয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করবে এবং নিজের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বজায় রাখবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের দায়িত্ব</strong></h5>
<p>মুসলমানদের সভ্যতার ইতিহাসে একসময় যে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সামাজিক নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা গড়ে উঠেছিল, সেগুলোকে আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনা দরকার। আমাদের দায়িত্ব হবে এই মূল্যবোধগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, সমাজে তুলে ধরা ও এর চর্চা অব্যাহত রাখা।</p>
<p>বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় কলকাতা-কেন্দ্রিক যে বয়ান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা যেন আমাদের হীনমন্য, আত্মবিশ্বাসহীন বা পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত না করে।<br />
কথিত ন্যাশনালিস্ট ইসলাম, সেকুলার ইসলাম বা লিবারেল ইসলাম; এসব নামে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আত্মঘাতী চিন্তা। এর পরিবর্তে আমাদের গড়ে তুলতে হবে মূলনীতিনির্ভর একটি নতুন বয়ান, যা ইসলামের উসূল ও মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াবে।</p>
<p>আরব, আফ্রিকা, তুরস্ক বা ভারতের সংস্কৃতি এক নয়, কিন্তু তারা সবাই ইসলামের স্থায়ী নীতির মধ্যে থেকেই টিকে আছে। তাই আমাদেরও প্রয়োজন, ইসলামী মূলনীতিগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির একটি ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া তৈরি করা। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সেই ভারসাম্যের ভিত্তিতেই চালিয়ে যেতে হবে।</p>
<p>এর বাইরে গেলে বিচ্ছেদ তৈরি হবে, যেমনটি আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ব্রিটিশ আমলের পর থেকে আমাদের সংস্কৃতিতে এক ধরনের আত্মবিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে। আমরা অন্যদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিনোদন, স্থাপত্য, শহর পরিকল্পনা, এমনকি মসজিদের ডিজাইন পর্যন্ত নকল করছি। এগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।</p>
<p>তবে একে পুরোপুরি বর্জন করাও অবাস্তব। কারণ, বিশ্ব পরিবর্তনের ঢেউকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই পাশ্চাত্যের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে, একই সঙ্গে আমাদের অঞ্চলের ভালো দিকগুলোও সংযোজন করতে হবে।</p>
<p>অর্থাৎ, ইসলামের স্থায়ী মূলনীতি বুঝে, পাশ্চাত্যের তৈরি দুনিয়াকে বুঝে, আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বয়ানই হতে হবে আমাদের পথনির্দেশ। এর বিপরীতে কোনো বিশৃঙ্খল, পক্ষপাতদুষ্ট বা বিভাজনমূলক বয়ান তৈরি করা যাবে না, যা অন্য কোনো গোষ্ঠীর শিকড় কেটে দেয়।</p>
<p>বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি কখনোই পুরনো সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ হবে না, আবার আধুনিকতার নামে মূল থেকে বিচ্ছিন্নও হবে না। ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, সামাজিক বাস্তবতার আলোকে, আমাদের সাংস্কৃতিক এজেন্ডা ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে।<br />
এর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বেড়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।</p>
<p>আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বিশ্ব কাঠামো, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, শিকড়, ইসলামের উসুল ও পদ্ধতিগত বোঝাপড়ার সমন্বয়ে। এই সবকিছু বুঝে ও ধারণ করেই আমাদের কাজ করতে হবে। এটাই হোক বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির প্রথম ধাপ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16417</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশের স্থাপত্যে জানালার বৈচিত্র্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 21 Nov 2025 16:17:26 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16288</guid>

					<description><![CDATA[জানালা- বাইরের কোলাহল ও অন্দরমহলের নৈঃশব্দের এক অনন্য মেলবন্ধনের সুর। যে সুরের কাব্যিক প্রহেলিকায় রচিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের বিচিত্র চিত্রপট। প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি খোদাই ,কারুকাজ এবং প্রতিটি ফ্রেম এক একটি স্থাপনার সময়ের দলিল হিসেবে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কথা বলে। যেন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>জানালা- বাইরের কোলাহল ও অন্দরমহলের নৈঃশব্দের এক অনন্য মেলবন্ধনের সুর। যে সুরের কাব্যিক প্রহেলিকায় রচিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের বিচিত্র চিত্রপট। প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি খোদাই ,কারুকাজ এবং প্রতিটি ফ্রেম এক একটি স্থাপনার সময়ের দলিল হিসেবে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কথা বলে। যেন এক একটি ক্যানভাসরুপে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে রয়ে যায়।</p>
<p>এক্ষেত্রে উপমহাদেশের স্থাপত্যে, শিল্পের অনবদ্য ছাপ জানালাগুলোতে যেন আরও বিস্তৃত বিশেষণ দেয়; স্থাপত্যের বিশেষ অংশ হিসেবেই নয় বরং  প্রকৃতি ও মানুষের অমলিন মেলবন্ধনের শ্বাশত আবহের প্রতীকরুপে। কেবল আলো-বাতাস চলাচলের জন্যই জানালাগুলো  তৈরি করা হত না বরং একদিকে বাইরের পৃথিবীকে ফ্রেম করতো অন্য দিকে অভ্যন্তরের মানুষের সুরক্ষা্য় সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দিত। বৈরী আবহাওয়ায় বা বৃষ্টির স্নিগ্ধতায়, কখনো বা রাতের নীরবতা উপেক্ষায় জানালার ওপারেই যেন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রশান্তির আশ্রয়। অর্থাৎ জানালাগুলোর কাঠামো এমনভাবেই তৈরি করা হত প্রতিকূলতায়ও আশ্রয় নেয়াই ছিলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।</p>
<p>তাপ নিয়ন্ত্রণেও একাধিক স্তরের জানালার জালি কিংবা রঙিন কাচ, সূর্যালোক ছেকে নিয়ে অন্দরমহলে মৃদু আলো্য় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করতো যেখানে আলোর পরোক্ষ প্রবেশে অভ্যন্তরের অনুভব যেন তীব্র সুর্যালোকের মনোমুগ্ধকর আভায় স্নিগ্ধ বহিঃ প্রকাশ। অপরদিকে বিশুদ্ধ বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করতেও জানালার একাধিক স্তরে জালির ভূমিকা বিশেষ।</p>
<p>এছাড়াও জানালার আদলে আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির ছাপ ছিলো স্পষ্ট। সমাজের একেকটি গল্পের একেক বাহকরুপে দৃশ্যমান হলেও প্রতিটি জানালায় শৈল্পিক দক্ষতার স্পর্শে পবিত্রতার এবং নান্দনিকতার মেলবন্ধনে এক গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলিত রুপ বিদ্যমান। বৈচিত্রময় নকশা ,কারুকাজ একদিকে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করে  এবং অন্যদিকে তাদের জীবনধারার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। <strong>দেখা যায়  জানালার এসব বৈচিত্র্যময় বিকাশ ও নান্দনিকতার মাধ্যমে মুলত স্রষ্টার একত্বের প্রকাশই মুখ্য বিষয়।</strong></p>
<p>উপমহাদেশে ইসলাম আগমনের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্য যে নতুন এক মাত্রা পেয়েছিল তা মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংলাপ। আর এই প্রেক্ষিতে জানালার ভাষা নানান কণ্ঠে রূপ পেল—কখনো পাথরের জালি, কখনো কাঠের ঝারোখা, কখনো বা পোড়ামাটির অলংকরণে।</p>
<ul>
<li><strong>জালি কাজ</strong>: ১২শ শতকের শেষভাগে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যে এক অভিনব অভিযোজন ‘জানালায় জালি কাজ’। প্রথম দেখা মেলে দিল্লির কুওয়াত-উল ইসলাম মসজিদের স্থাপত্যে। পাথর বা কাঠের উপর সূক্ষ্ম খোদাইয়ের মাধ্যমে এ ধরনের জালি তৈরি করা হত। জালির সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে জানালাগুলোর নকশায় জটিল জ্যামিতি, আরবী ক্যালিগ্রাফি এবং নিখুঁত এরাবেস্ক নকশা করা হতো। এসব কৌশল অবলম্বনে বাইরের পরিবেশ থেকে যেমন অভ্যন্তরভাগের পর্দা (হায়া) রক্ষা করা হত, তেমনি আলো ও বাতাসের পরোক্ষ প্রবাহের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ শীতলতাও বজায় থাকতো।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16289" aria-describedby="caption-attachment-16289" style="width: 721px" class="wp-caption aligncenter"><img fetchpriority="high" decoding="async" class="wp-image-16289 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1.jpg" alt="" width="721" height="738" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1.jpg 721w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1-293x300.jpg 293w" sizes="(max-width: 721px) 100vw, 721px" /><figcaption id="caption-attachment-16289" class="wp-caption-text">জালি কাজ</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>আরকুয়েট স্টাইল</strong>: উপমহাদেশে ১৩১১ সালে আলাই দরওয়াজায় প্রথম আরকুয়েট জানালার ব্যবহার শুরু হয়। বৃহৎ পরিসরে আলো-বাতাস প্রবেশের জন্যই ইসলামিক স্থাপত্যে ‘খিলানযুক্ত জানালা’ একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এছাড়াও পূর্বের ট্র্যাবেটেড (আনুভূমিক বীম আর আড়াআড়ি খুঁটির সমন্বয়ে গঠিত) পদ্ধতির বিপরীতে ভূসুয়া খিলান (স্থায়িত্বশীল) পদ্ধতির কাঠামো আবিষ্কার হয় যা উপমহাদেশীয় ইমারতের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও উচ্চতর নির্মাণশৈলীর বাহক। খিলান কখনও হয় অর্ধবৃত্ত, কখনও ওজাইভ (উপরের দিক উপবৃত্তাকার শীর্ষযুক্ত; pointed arc), আবার কখনও সূক্ষ্ম সর্পিলকৃতির—যেন জানালার জালি ও  খিলানের জ্যামিতিক নকশার পরিমিত বিন্যাসের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া এক অভিন্ন ব্যাকরণ। আলাই দরওয়াজায় ছাড়াও হুমায়ুনের সমাধি, জামে মসজিদ, আকবরের মকবরা, ফতেহপুর সিক্রি এবং তাজমহল—সবখানেই আরকুয়েট জানালা; এমনকি বাংলার আটচালা ও দোচালা গঠনেও খিলানবিশিষ্ট জানালার সংযোজন দেখা যায়।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16292" aria-describedby="caption-attachment-16292" style="width: 708px" class="wp-caption aligncenter"><img decoding="async" class="wp-image-16292 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2.jpg" alt="" width="708" height="548" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2.jpg 916w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2-300x232.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2-768x594.jpg 768w" sizes="(max-width: 708px) 100vw, 708px" /><figcaption id="caption-attachment-16292" class="wp-caption-text">আরকুয়েট স্টাইল</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>জ্যামিতিক নকশা</strong>: জানালার অলংকরণে জ্যামিতির বিন্যাস উপমহাদেশের স্থাপত্যশৈলীর এক অভিনব উৎকর্ষতা। জটিল জ্যামিতি ও এরাবেস্ক নকশা স্থাপত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে আধ্যাত্মিকতারও প্রতিফলন ঘটায়। শুধু তাই নয় উপমহাদেশের ইসলামি স্থাপত্যে জ্যামিতি স্থানীয় উপকরণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুন এক ভাষা তৈরি করে যেখানে পাথর বা কাঠের জালি কেটে জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি করা হত। <em>আগ্রার তাজমহল, দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি, লাহোর দুর্গ</em>—এখানে পাথরের জালির মাধ্যমে বহুমাত্রিক জ্যামিতিক প্যাটার্ন ব্যবহৃত হয়েছে। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁওয়ের গোয়ালদি মসজিদ— এখানে ইট ও পোড়ামাটির ফলকে জ্যামিতিক অলংকরণ করা হয়েছে।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16293" aria-describedby="caption-attachment-16293" style="width: 726px" class="wp-caption aligncenter"><img decoding="async" class="wp-image-16293 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3.jpg" alt="" width="726" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3.jpg 1164w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-300x182.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-1024x622.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-768x466.jpg 768w" sizes="(max-width: 726px) 100vw, 726px" /><figcaption id="caption-attachment-16293" class="wp-caption-text">জ্যামিতিক নকশা</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>রঙিন কাঁচের ব্যবহার</strong>: উপমহাদেশের স্থাপত্যে রঙিন কাচের ব্যবহার স্থাপত্যশৈলীতে যেমন নতুন মাত্রা যোগ করেছে তেমনি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম উপাদান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রঙিন কাঁচের ব্যবহার মোঘল স্থাপত্যের মাধ্যমে শুরু হলেও কেবল মোঘল স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; খুব দ্রুত অন্যান্য স্থাপত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। জানালার কাচ ও কাঠের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হত যেন সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে অভ্যন্তরে প্রশান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও রঙিন কাঁচের মাধ্যমে আলোর নান্দনিক প্রতিফলন অন্দরমহলে বিশেষ আবহ তৈরি হয় যার কারণে এর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সুলতান আকবরের শাসনামলে ফতেহপুর সিক্রিতে, সুলতান শাহজাহানের আমলে তাজমহলে রঙিন কাঁচের ব্যবহার দেখা যায় এবং পরবর্তীতে দিল্লির অন্যান্য মোঘল স্থাপত্যে ব্যবহারের মাধ্যমে আরও বিস্তৃতি পায়।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16295" aria-describedby="caption-attachment-16295" style="width: 706px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16295 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1.jpg" alt="" width="706" height="692" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1.jpg 729w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1-300x294.jpg 300w" sizes="(max-width: 706px) 100vw, 706px" /><figcaption id="caption-attachment-16295" class="wp-caption-text">রঙিন কাঁচ</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>ঝারোখা জানালা: </strong>ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ঝারোখা জানালা; কাঠামোগতভাবে ওরিয়েল জানালা যা ভবনের উপরিভাগ থেকে প্রসারিত হয় এবং বাইরের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে সম্মুখভাগে উন্মুক্ত হয়। ১৬শ-১৮শ শতাব্দীতে,রাজপুত এবং মোঘল স্থাপত্যের প্রভাবে, এগুলি স্থাপত্যের ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠে। কেননা এ জানালাগুলোকে ধরা হত <em>ইমারাহ</em>-র চূড়ান্ত প্রকাশরুপ—যেখানে আমির ও উম্মাহর মাঝে সম্পর্ক গড়ে উঠত সম্মান, নিকটতা ও তাকরিমের ভিত্তিতে অর্থাৎ সমাজে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় অর্থে এক প্রতীকী কাঠামো। আর সাধারণ মানুষের জন্য বাইরের জগৎ অবলোকনের স্বাধীনতা, বিশেষত নারীদের জন্য মর্যাদা ও গোপনীয়তার নিখুঁত সমন্বয়। ঝারোখার জালি-কাজ, পাথরখোদাই ও অলঙ্করণ কেবল প্রাসাদ নয়, নগরীর অলিগলির দৃশ্যপটকেও শিল্পমণ্ডিত করত। রঙিন কাঁচ, খচিত পাথর ও খোদাইকৃত কাঠের ফ্রেম—সব মিলিয়ে যেন এক ছায়াময় সংগীত।</li>
</ul>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16296 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5.jpg" alt="" width="610" height="388" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5.jpg 985w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5-300x191.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5-768x489.jpg 768w" sizes="(max-width: 610px) 100vw, 610px" /></p>
<figure id="attachment_16297" aria-describedby="caption-attachment-16297" style="width: 610px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16297" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6.jpg" alt="" width="610" height="452" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6.jpg 985w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6-768x569.jpg 768w" sizes="(max-width: 610px) 100vw, 610px" /><figcaption id="caption-attachment-16297" class="wp-caption-text">ঝারোখা</figcaption></figure>
<p>সময়ের বিবর্তনে সাধারণত এসব জানালার <strong>জালি কাজ</strong>, <strong>আরকুয়েট স্টাইল</strong>,<strong> জ্যামিতিক নকশা</strong> এবং <strong>রঙিন কাঁচের </strong>ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; একইসাথে ব্যবহারের সুবিধার্থেও আজও প্রাসঙ্গিক।নিচে উপমহাদেশের স্থাপত্যে জানালার বৈচিত্র্য ও বিবর্তন ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো। এখানে প্রাক সুলতানি আমল থেকে শুরু করে দিল্লি সালতানাত, তুঘলক, লোদী ও মোঘল আমল, এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত জানালার শিল্পরূপ ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমবিকাশ তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষত জানালার নান্দনিকতা, কার্যকারিতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রতিফলনও ধাপে ধাপে লক্ষ্যণীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কুতুব মিনার (Qutub Minar, Delhi)</strong></p>
<p>১২শ শতকের শেষভাগে তুর্কি বিজয়ের পর নির্মিত দিল্লির কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের জানালায় জালির (তারকা আকৃতির জালি) প্রথম সূচনার দেখা মেলে—যেখানে সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা পাথর-নকশার মাধ্যমে আলো ও বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়। যা ইসলামী ‘হায়া’ বা সংযমের চেতনাকে প্রতিফলিত করে।</p>
<figure id="attachment_16298" aria-describedby="caption-attachment-16298" style="width: 622px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16298" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7.jpg" alt="" width="622" height="262" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7.jpg 1242w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-300x126.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-1024x431.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-768x323.jpg 768w" sizes="(max-width: 622px) 100vw, 622px" /><figcaption id="caption-attachment-16298" class="wp-caption-text">কুতুব মিনার কমপ্লেক্স</figcaption></figure>
<p><strong>আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া </strong><strong>(১২০০ খ্রি., আজমীর, রাজস্থান)</strong></p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রারম্ভিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। এখানে পাথরে খোদাইকৃত জালি (lattice window) ব্যবহার লক্ষ্যণীয়; পাথরে ছোট ছোট ছিদ্রকাটা জালি জানালা, যা সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশায় অলঙ্কৃত এবং পরবর্তীতে খিলজী, তুঘলক ও মোঘল আমলে আরও সূক্ষ্ম রূপ নেয়।</p>
<figure id="attachment_16302" aria-describedby="caption-attachment-16302" style="width: 473px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16302" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8.jpg" alt="" width="473" height="304" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8.jpg 935w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8-300x193.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8-768x494.jpg 768w" sizes="(max-width: 473px) 100vw, 473px" /><figcaption id="caption-attachment-16302" class="wp-caption-text">আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া</figcaption></figure>
<p><strong>গিয়াসউদ্দিন বলবনের মাকবারা (১২৮৭ খ্রি., দিল্লি, মেহরৌলি) </strong></p>
<p>গিয়াসউদ্দিন বলবনের মাকবারা ভারতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখানে প্রথমবারের মতো Pointed Arch ( ওজাইভ; Ogive) খিলান ব্যবহৃত হয়, যা ভারতীয় উপমহাদেশে পরবর্তী স্থাপত্য বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। উপমহাদেশে <strong>আরকুয়েট শৈলীর (arcuate style)</strong> সূচনার আগে দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যে মূলত <strong>ট্রাবেটেড শৈলী</strong> (Trabeated) প্রচলিত ছিল। খিলানগুলোর মধ্যে <strong>জালি </strong>(perforated screen) সংযুক্ত করা হয়েছিল আলো ও বায়ু চলাচলের জন্য।</p>
<figure id="attachment_16299" aria-describedby="caption-attachment-16299" style="width: 620px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16299" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9.jpg" alt="" width="620" height="273" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9.jpg 961w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9-300x132.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9-768x338.jpg 768w" sizes="(max-width: 620px) 100vw, 620px" /><figcaption id="caption-attachment-16299" class="wp-caption-text">গিয়াসউদ্দিন বালবনের মাকবারা</figcaption></figure>
<p><strong>আলাই দরওয়াজা (১৩১১ খ্রি.)</strong></p>
<p>সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর নির্মিত একটি গেটওয়ে, যেখানে প্রথমবারের মতো True Arch ও গম্বুজ ব্যবহার হয়। জানালায় সূক্ষ্ম জালি ও pointed arch-এর ব্যবহার নিছক দৃষ্টিনন্দনতার জন্য নয়; বরং সূর্যালোক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রিত করে অভ্যন্তরীণ শীতলতা বজায় রাখাই উদ্দেশ্যে।</p>
<figure id="attachment_16300" aria-describedby="caption-attachment-16300" style="width: 600px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16300 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10.jpg" alt="" width="600" height="431" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10.jpg 846w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10-300x216.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10-768x552.jpg 768w" sizes="(max-width: 600px) 100vw, 600px" /><figcaption id="caption-attachment-16300" class="wp-caption-text">বহির্ভাগ                                                                    অভ্যন্তরভাগ</figcaption></figure>
<p><strong>খিরকী মসজিদ</strong><strong> (১৩৫১-৫৪)</strong></p>
<p>মসজিদটি ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে জুনা শাহ (ফিরোজ শাহ তুঘলকের একজন প্রধানমন্ত্রী) নির্মাণ করেন। মসজিদের দেয়ালে রয়েছে বহু জালি-জানালা (খিরকী) বা lattice window। এখান থেকেই নাম হয় “খিরকী মসজিদ”।</p>
<figure id="attachment_16301" aria-describedby="caption-attachment-16301" style="width: 519px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16301" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11.jpg" alt="" width="519" height="231" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11.jpg 1122w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-300x134.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-1024x456.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-768x342.jpg 768w" sizes="(max-width: 519px) 100vw, 519px" /><figcaption id="caption-attachment-16301" class="wp-caption-text">খিরকী মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>বড় গম্বুজ মসজিদ</strong></p>
<p>সুলতান সিকান্দার লোদীর আমলে (প্রায় ১৪৯০ খ্রি.) নির্মিত। জানালাগুলো মূলত তীক্ষ্ণ খিলানাকৃতির এবং মোটা পাথরের দেয়ালে বসানো, যা প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর ধারণা দেয়। মোঘল আমলের মতো সূক্ষ্ম ফুলেল খোদাই নেই বরং লোদী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সরল ও দৃঢ়।</p>
<figure id="attachment_16303" aria-describedby="caption-attachment-16303" style="width: 585px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16303" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12.jpg" alt="" width="585" height="255" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12.jpg 1004w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12-300x131.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12-768x335.jpg 768w" sizes="(max-width: 585px) 100vw, 585px" /><figcaption id="caption-attachment-16303" class="wp-caption-text">জানালা, বড় গম্বুজ মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>হুমায়ুনের সমাধি (Humayun’s Tomb)</strong></p>
<p>দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি স্থাপত্যে ব্যবহৃত জানালার আকৃতি অনেক সময় অর্ধবৃত্তাকার বা ঘোড়ার নাল আকৃতির হয়। ফলে খিলান যেমন কাঠামোতে দৃঢ়তা দেয় একইসাথে জ্যামিতিক অলংকরণ, তারকা, ষড়ভুজ ও আরবেস্ক শৈলীর পুনরাবৃত্ত মোটিফের জালি জানালা আলো ছেঁকে অভ্যন্তরে শীতল বাতাস প্রবাহিত করে। যা দিল্লির আবহাওয়ার জন্য  কার্যকর সমাধান।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16304 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13.jpg" alt="" width="388" height="287" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13.jpg 792w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13-768x569.jpg 768w" sizes="(max-width: 388px) 100vw, 388px" /></p>
<p>সমাধি স্থাপত্যে আরও এক ধরণের জানালার ব্যবহার দেখা যায়। লাল বেলেপাথর (red sandstone), সাদা ও কালো মার্বেল (white &amp; black marble) দিয়ে এই ধরণের জানালা ও খিলান নির্মিত এবং সূক্ষ্ম খোদাইকৃত জালি জানালা সমাধির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও জানালায় ছোট বারান্দা (jharokha-style) যুক্ত, যেগুলো সমাধির বাইরের দেয়ালে বের হয়ে এসেছে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16306 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15.jpg" alt="" width="394" height="268" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15.jpg 782w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15-300x204.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15-768x522.jpg 768w" sizes="(max-width: 394px) 100vw, 394px" /></p>
<p>নিচের জানালাটি বার্বারের টুম্ব বা নায়ি-কা-গুম্বাদ (Nai-ka-Gumbad) এর, যেটি দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ১৫৯০–৯১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল। এর স্থাপত্য শৈলী মোঘল স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ যেখানে লাল এবং সাদা বেলে পাথরের (Sandstone) সমন্বিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সরাসরি বা ভারী প্রলেপহীন বেলে পাথরের ব্যবহার , পাথরের জালিতে সূক্ষ্ম খোদাই করা জ্যামিতিক প্যাটার্ন সমাধিটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।</p>
<figure id="attachment_16341" aria-describedby="caption-attachment-16341" style="width: 551px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16341" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33.jpg" alt="" width="551" height="378" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33.jpg 1000w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33-300x206.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33-768x528.jpg 768w" sizes="(max-width: 551px) 100vw, 551px" /><figcaption id="caption-attachment-16341" class="wp-caption-text">নায়ি-কা-গুম্বাদ</figcaption></figure>
<p><strong>রানি রূপমতী মসজিদ</strong></p>
<p>সুলতান মুহম্মদ বেগড়া আনুমানিক ১৪৩০- ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে, আহমদাবাদে রানি রূপমতী মসজিদ নির্মাণ করেন। এর জানালাগুলোতে পাথরের মোটা ফ্রেমে বসানো, যেগুলোতে সূক্ষ্ম খোদাই করা অলঙ্করণ রয়েছে এবং ফ্রেমের ভেতরের জালিতে বিভিন্ন আকা্রের <strong>বৈচিত্র্যময়</strong> জটিল জ্যামিতিক নকশা ব্যবহৃত হয়েছে। জানালার দুই পাশে ছোট স্তম্ভ (miniature columns) বা পিলাস্টার (Pilaster) দেখা যায় এবং উপরিভাগে কার্নিস (cornice) বা ছোট ছাউনির মতো প্রক্ষেপণ, যা সূর্যের তাপ ও বৃষ্টির হাত থেকে জানালাকে রক্ষা করে। এছাড়াও জানালার চারপাশে পাথরে খোদাইকৃত ফুল, লতা-পাতা নকশার শৈল্পিক সৌন্দর্য এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা ও আলো-বাতাসের কার্যকারিতা স্থাপত্যশৈলীর উচ্চমাত্রার প্রকাশ।</p>
<figure id="attachment_16305" aria-describedby="caption-attachment-16305" style="width: 632px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16305" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14.jpg" alt="" width="632" height="445" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14.jpg 1045w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-300x211.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-1024x720.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-768x540.jpg 768w" sizes="(max-width: 632px) 100vw, 632px" /><figcaption id="caption-attachment-16305" class="wp-caption-text">রানি রূপমতী মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>অ্যাম্বার ফোর্ট (Amber Fort, ১৬শ শতক, জয়পুর, রাজস্থান)</strong></p>
<p>অ্যাম্বার ফোর্ট মোঘল ও রাজপুত স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি। খিলান (arch), ঝারোখা, জালি ও ফুলেল খোদাই মিলিয়ে অ্যাম্বার ফোর্টের জানালাগুলো আভিজাত্য অনন্য প্রকাশ। খোদাইকৃত মার্বেল বা লাল পাথরে তৈরি সূক্ষ্ম জালি জানালা (Stone lattice / Jaali) অন্দরমহলে আলো-ছায়ার নকশা তৈরি করে, যা প্রাসাদের অভ্যন্তরে রাজকীয় পরিবেশকে রহস্যময় ও শৈল্পিক করে তোলে।</p>
<figure id="attachment_16310" aria-describedby="caption-attachment-16310" style="width: 861px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16310" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16.jpg" alt="" width="861" height="284" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16.jpg 1470w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-300x99.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-1024x338.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-768x253.jpg 768w" sizes="(max-width: 861px) 100vw, 861px" /><figcaption id="caption-attachment-16310" class="wp-caption-text">অ্যাম্বার ফোর্ট</figcaption></figure>
<p><strong>হুশাং শাহ-এর সমাধি (</strong>Hushang Shah&#8217;s Tomb<strong>, মাণ্ডু, মধ্যপ্রদেশ, ১৪৪০ খ্রি.)</strong></p>
<p>হুশাং শাহ-এর সমাধির জানালায় উপমহাদেশে প্রথম মার্বেল পাথরের জালি দেখা যায়। যেখানে জালিগুলো সূক্ষ্মভাবে খোদাইকৃত মার্বেল জালির  ফুলেল ও জ্যামিতিক নকশায় সমৃদ্ধ এবং অর্ধবৃত্তাকার খিলানের ভেতর স্থাপিত।</p>
<figure id="attachment_16311" aria-describedby="caption-attachment-16311" style="width: 693px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16311" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17.jpg" alt="" width="693" height="274" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17.jpg 1241w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-300x119.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-1024x405.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-768x304.jpg 768w" sizes="(max-width: 693px) 100vw, 693px" /><figcaption id="caption-attachment-16311" class="wp-caption-text">হুশাং শাহ-এর সমাধি</figcaption></figure>
<p><strong>সালিম চিশতির সমাধি (Tomb of Salim Chishti, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা, ১৬শ শতক, আকবর আমল)</strong></p>
<p>সালিম চিশতির সমাধি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্বেল স্থাপত্য। জানালাগুলো সম্পূর্ণ সাদা মার্বেলে খোদাই করা এবং প্রতিটি জালিতে ভিন্ন ভিন্ন জ্যামিতিক নকশা (ষড়ভুজ, তারকা, ফুলের নকশা) করা।</p>
<figure id="attachment_16312" aria-describedby="caption-attachment-16312" style="width: 564px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16312" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18.jpg" alt="" width="564" height="263" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18.jpg 911w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18-300x140.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18-768x358.jpg 768w" sizes="(max-width: 564px) 100vw, 564px" /><figcaption id="caption-attachment-16312" class="wp-caption-text">সালিম চিশতির সমাধি</figcaption></figure>
<p><strong>ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস (রাজস্থান, ভারত)</strong></p>
<p>ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস ১৪শ শতকের দিকে রাজপুত রাজাদের দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ঝারোখা জানালাগুলো শুধু স্থাপত্য উপাদান নয়, বরং এর সূক্ষ্ম খোদাই, অলঙ্কৃত খিলান ও প্রক্ষেপিত গঠন একদিকে নান্দনিক সৌন্দর্য তৈরি করেছে, অন্যদিকে কার্যকারিতার মাধ্যমে বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। corbelled brackets বা খোদাইকৃত পাথরের cusped arch (মৃদু বাঁকানো খিলান) <strong>রাজস্থানি লাল বেলেপাথর ও সাদা পাথরের সমন্বয়</strong> দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16313" aria-describedby="caption-attachment-16313" style="width: 655px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16313" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19.jpg" alt="" width="655" height="435" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19-300x199.jpg 300w" sizes="(max-width: 655px) 100vw, 655px" /><figcaption id="caption-attachment-16313" class="wp-caption-text">ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস</figcaption></figure>
<p><strong>নওলাখা প্যাভিলিয়ন</strong></p>
<p>নওলাখা প্যাভিলিয়ন সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৬৩১–৪৩ খ্রিঃ) লাহোর ফোর্টের ভেতরে নির্মিত হয়। প্যাভিলিয়নটি প্রধানত সাদা মার্বেল পাথরদ্বারা নির্মিত এবং এর জানালাগুলো সূক্ষ্ম মার্বেল পাথরে খোদাই করা জালিতে আবৃত। জানালার শীর্ষ অংশ অর্ধবৃত্তাকার ও বহু-পাপড়ি বিশিষ্ট খিলান দ্বারা গঠিত। খিলানগুলোতে সূক্ষ্ম ইনলে কাজ এবং ফুলের মোটিফ ব্যবহৃত হয়েছে, যা মোঘল স্থাপত্যে শাহজাহানীয় যুগের শৈল্পিক পরিপূর্ণতার এক অসাধারণ নিদর্শন।</p>
<figure id="attachment_16323" aria-describedby="caption-attachment-16323" style="width: 945px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16323 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20.jpg" alt="" width="945" height="581" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20.jpg 945w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20-300x184.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20-768x472.jpg 768w" sizes="(max-width: 945px) 100vw, 945px" /><figcaption id="caption-attachment-16323" class="wp-caption-text">নওলাখা প্যাভিলিয়ন</figcaption></figure>
<p><strong>বিবি কা মাকবারা (Bibi ka Maqbara)</strong></p>
<p>১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব বিবি কা মাকবারা নির্মাণ করেন। প্রধান উপকরণ হিসেবে সাদা মার্বেল (উপরাংশ), লাল বেলেপাথর (নিচের অংশে) এবং প্লাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। জ্যামিতিক নকশায় ষড়ভুজ, তারকাকৃতি ও অষ্টভুজ দেখা যায়। জানালাগুলো বড় আকারের, উপরে তীক্ষ্ণ শীর্ষযুক্ত খিলান (pointed arch), যা দিল্লির মোঘল স্থাপত্যের প্রচলিত ধারা বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16324" aria-describedby="caption-attachment-16324" style="width: 457px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16324 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21.jpg" alt="" width="457" height="327" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21.jpg 900w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21-300x215.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21-768x550.jpg 768w" sizes="(max-width: 457px) 100vw, 457px" /><figcaption id="caption-attachment-16324" class="wp-caption-text">জানালা, বিবি কা মাকবারা</figcaption></figure>
<p>বিবি কা মকবরা মূলত তাজমহলের প্রতিরূপ হলেও এটি দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে মোঘল স্থাপত্যের শাখা বিস্তারের একটি অনন্য নিদর্শন। উঁচু খিলানযুক্ত (pointed arch) জানালা এবং জ্যামিতিক ও ফুলেল মোটিফযুক্ত খোদাই স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য । এছাড়াও জানালাগুলো অনেকটা ঝারোখা ধাঁচের বারান্দার মতো বাহিরে বেরিয়ে এসেছে। এতে ভিতর থেকে বাইরের বাগান দেখার সুযোগ রয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16325" aria-describedby="caption-attachment-16325" style="width: 569px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16325" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22.jpg" alt="" width="569" height="282" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22.jpg 1116w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-300x148.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-1024x506.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-768x380.jpg 768w" sizes="(max-width: 569px) 100vw, 569px" /><figcaption id="caption-attachment-16325" class="wp-caption-text">জানালা, বিবি কা মাকবারা</figcaption></figure>
<p><strong>মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন (Madrasa-i-Ghaziuddin)</strong></p>
<p>১৭১০ খ্রিস্টাব্দে আজমেরি গেটের বাইরে মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন নির্মাণ করা হয়। এর জানালা থেকে ধারণা করা যায় মূলত মোঘল স্থাপত্যেশৈলীতে নির্মিত এবং নির্মাণে স্থানীয় উপাদান ইট ও চুন-সুরকির ব্যবহারে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অলংকরণে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা ও ফুলের মোটিফ এর খোদাইকৃত জালি ব্যবহার করা হয়েছে যার উপরের অংশে রয়েছে উঁচু অর্ধবৃত্তাকার খিলান। মোঘল স্থাপত্যের এ জালিগুলো একইসাথে নান্দনিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠাণ্ডা রাখার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত।</p>
<figure id="attachment_16327" aria-describedby="caption-attachment-16327" style="width: 430px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16327 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23.jpg" alt="" width="430" height="505" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23.jpg 689w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23-256x300.jpg 256w" sizes="(max-width: 430px) 100vw, 430px" /><figcaption id="caption-attachment-16327" class="wp-caption-text">জানালার কারুকার্য, মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন</figcaption></figure>
<p><strong>শীশ মহল (Shish Mahal)</strong></p>
<p>মোঘল সম্রাট শাহজাহান আনুমানিক ১৬৩১–৩২ খ্রিস্টাব্দে  ব্যক্তিগত আবাসস্থল হিসেবে শীশ মহল নির্মাণ করেন। কিছু জানালায় রঙিন কাঁচ বসানো হয়েছিল, যা শীশ মহলের আয়না খচিত দেয়ালের সাথে আলো প্রতিফলনের এক জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করত। এছাড়াও রাজ পরিবারের সদস্যরা আঙিনা ও প্রাসাদের ভেতরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঝারোখা নির্মাণ করেন। নান্দনিকতার জন্য এসব জানালার চারপাশে মার্বেল ইনলে কাজ, ফুলেল খোদাই ও রঙিন টাইলস বসানো হয় যার মাধ্যমে মোঘল শিল্পের সূক্ষ্মতা ফুটে ওঠে।</p>
<figure id="attachment_16328" aria-describedby="caption-attachment-16328" style="width: 461px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16328 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24.jpg" alt="" width="461" height="525" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24-263x300.jpg 263w" sizes="(max-width: 461px) 100vw, 461px" /><figcaption id="caption-attachment-16328" class="wp-caption-text">শীশ মহল</figcaption></figure>
<p><strong>জামা</strong><strong> মসজিদ, দিল্লি (Jama Masjid, Delhi), ১৬৫০–১৬৫৬ খ্রি., শাহজাহান আমল</strong></p>
<p>জামা মসজিদ মোঘল আমলের অন্যতম বৃহৎ স্থাপত্যকীর্তি। এর জানালাগুলো বেশ বড় এবং অর্ধবৃত্তাকার ও সূচালো খিলানযুক্ত যা লাল বেলেপাথর (red sandstone) এবং সাদা মার্বেলের সংমিশ্রণে নির্মিত।এছাড়াও ঝারোখা কাঠামোর জানালায় লাল বেলেপাথরে খোদাই করা জালি কাজ (lattice work) এবং জানালার ফ্রেমে সূক্ষ্ম খোদাই, কার্নিস এবং পাশ দিয়ে পিলাস্টারের ব্যবহার দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16329" aria-describedby="caption-attachment-16329" style="width: 874px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16329 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25.jpg" alt="" width="874" height="282" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25.jpg 1559w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-300x97.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-1024x330.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-768x248.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-1536x496.jpg 1536w" sizes="(max-width: 874px) 100vw, 874px" /><figcaption id="caption-attachment-16329" class="wp-caption-text">জামা মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>জ্যায়সালমার (Jaisalmer), রাজস্থান</strong></p>
<p>নিচে দেখা যাচ্ছে জ্যায়সালমার প্রাসাদের জানালা। জ্যায়সালমার প্রাসাদের এই  জানালা শুধু স্থাপত্যের অপরিহার্য অংশই নয়, বরং এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। জানালার ফ্রেমগুলোতে cusped arches (multi-foil) এবং খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ দেখা যায়। জানালার চারপাশে সূক্ষ্ম সোনালি রঙের পাথরে floral scrolls, geometric bands এর জালি খোদাই করা।সোনালি বেলেপাথরে তৈরি হওয়ায় জানালা রাজস্থানের মরুভূমির রঙকে বহন করে ভেতরের শৈল্পিক কাজ রাজপুত অভিজাত রুচি, ও ঐতিহ্যের প্রতীক।</p>
<figure id="attachment_16333" aria-describedby="caption-attachment-16333" style="width: 528px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16333 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26.jpg" alt="" width="528" height="338" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26.jpg 1052w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-300x192.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-1024x654.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-768x491.jpg 768w" sizes="(max-width: 528px) 100vw, 528px" /><figcaption id="caption-attachment-16333" class="wp-caption-text">জ্যায়সালমার প্রাসাদের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>আগ্রা ফোর্ট</strong></p>
<p>১৫৬৫–১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল সুলতান আকবরের সময় আগ্রা ফোর্ট নির্মিত হয়। প্রাথমিকভাবে লাল বেলেপাথরে তৈরি হলেও পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান এর সময়ে সাদা মার্বেল ও জালি জানালা যুক্ত হয়। ফোর্টের স্থাপত্যে পাথরে সূক্ষ্ম খোদাই বা মার্বেল ইনলে নকশা মোঘল শিল্পের বিকাশের জীবন্ত দলিল। এসব জানালা আলো-ছায়া, বায়ুপ্রবাহ, গোপনীয়তা রক্ষায় যেমন কার্যকর তেমনি নান্দনিক খোদাই ও শিল্পকলার  উৎকর্ষের বহিঃ প্রকাশ।</p>
<figure id="attachment_16334" aria-describedby="caption-attachment-16334" style="width: 492px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16334 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27.jpg" alt="" width="492" height="272" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27.jpg 590w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27-300x166.jpg 300w" sizes="(max-width: 492px) 100vw, 492px" /><figcaption id="caption-attachment-16334" class="wp-caption-text">আগ্রা ফোর্ট</figcaption></figure>
<p><strong>সুলতান আকবরের সমাধি (Akbar’s Tomb) সিকান্দ্রা, ১৬০৫–১৬১২/১৩</strong></p>
<p>নিচের জানালাটি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় মোঘল সুলতান আকবরের সমাধিতে নির্মিত, যার প্রধান নির্মাণ উপাদান ছিলো লাল বেলেপাথর। জানালা স্থাপনায় দেখা যায় পরবর্তী মোঘল সমাধি এবং তাজমহলের জানালার জালি নকশার প্রোটোটাইপ।</p>
<figure id="attachment_16336" aria-describedby="caption-attachment-16336" style="width: 252px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16336" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28.jpg" alt="" width="252" height="380" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28.jpg 439w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28-199x300.jpg 199w" sizes="(max-width: 252px) 100vw, 252px" /><figcaption id="caption-attachment-16336" class="wp-caption-text">মোঘল সুলতান আকবরের সমাধির জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>তাজমহল</strong></p>
<p>সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরে এই জানালাগুলো ১৬৩২–১৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তাজমহলে নির্মাণ করা হয়। তাজমহল ভারতীয় স্থাপত্যকে বিশ্বের সমকক্ষ করে এবং এটি স্থাপত্যের শীর্ষ শৈল্পিক উদাহরণ এর একটি। জানালায় জ্যামিতিক প্যাটার্ন, আরবেস্ক, ফুলের মোটিফ এর মার্বেল খোদাই করে জালির নিখুঁত প্যাটার্ন এর স্থাপত্যকে আরও অনন্যতায় নিয়ে যায়।</p>
<figure id="attachment_16337" aria-describedby="caption-attachment-16337" style="width: 568px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16337 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29.jpg" alt="" width="568" height="348" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29.jpg 1054w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-300x184.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-1024x628.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-768x471.jpg 768w" sizes="(max-width: 568px) 100vw, 568px" /><figcaption id="caption-attachment-16337" class="wp-caption-text">তাজমহলের মারবেল পাথরের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধি</strong></p>
<p>১৬২২–১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধিটি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় নির্মাণ করা হয়। সাদা মার্বেল পাথরে সূক্ষ্ম খোদাইয়ের জ্যামিতিক, ফুলের মোটিফ এর জালি (jali screens) এবং অলংকরণে সাদা মার্বেল এর উপর এরাবেস্ক ও জ্যামিতিক নকশা এই জানালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ।</p>
<figure id="attachment_16338" aria-describedby="caption-attachment-16338" style="width: 531px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16338 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30.jpg" alt="" width="531" height="364" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30.jpg 977w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30-300x206.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30-768x527.jpg 768w" sizes="(max-width: 531px) 100vw, 531px" /><figcaption id="caption-attachment-16338" class="wp-caption-text">ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধির জানালার নকশা</figcaption></figure>
<p><strong>সামোদ প্যালেস (১৭শ শতক, পরে ১৮–১৯শ শতকে সম্প্রসারিত)</strong></p>
<p>রাজস্থানের সামোদ প্যালেস রাজপুত ও মোঘল শৈলীর মিলিত রূপে নির্মিত এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। জানালার শীর্ষ অংশে বহু-পাপড়ি খিলান (cusped arches) ব্যবহৃত। এগুলো মার্বেল বা বেলেপাথরে খোদাই করা সূক্ষ্ম লতাপাতা ও ফুলের নকশা দ্বারা সজ্জিত। জানালায় হস্তনির্মিত কাঠ বা পাথরের ফ্রেম, যেখানে পেইন্টিং এর মাধ্যমে পারসিয়ান আরবেস্ক  ও জ্যামিতিক নকশার কারুকাজ দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16339" aria-describedby="caption-attachment-16339" style="width: 340px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16339" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31.jpg" alt="" width="340" height="425" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31.jpg 1080w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-240x300.jpg 240w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-820x1024.jpg 820w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-768x959.jpg 768w" sizes="(max-width: 340px) 100vw, 340px" /><figcaption id="caption-attachment-16339" class="wp-caption-text">সামোদ প্যালেসের মার্বেল ও বেলেপাথরে নকশাকৃত জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>লালকেল্লা (১৭শ শতক, শাহজাহান আমল)</strong></p>
<p>লালকেল্লার জালি জানালা বা ল্যাটিস উইন্ডো মোঘল সৌধশিল্পের অন্যতম শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। এর নান্দনিকতা, রাজকীয় আভিজাত্য এবং সামাজিক প্রয়োজনের সমন্বিত প্রকাশ। জানালার শীর্ষ অংশ অর্ধবৃত্তাকার বা বহু-পাপড়ি খিলান (cusped arch) এবং সাদা মার্বেলে সূক্ষ্ম ছিদ্র বা নকশা কেটে তৈরি করা জালি জানালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অলংকরণে দেখা যায় জ্যামিতিক মোটিফ ও আরবেস্ক ইসলামী নান্দনিকতার প্রতিফলন, আর সূক্ষ্ম মার্বেল ইনলে কাজ পারসিয়ান শিল্পরীতির অনুকরণ। শুধুমাত্র কার্যকারীতার জন্য নয়, বরং জানালাগুলো শাহজাহানীয় আমলের বিলাসিতা, শিল্পপ্রেম ও সূক্ষ্ম স্থাপত্যবোধের পরিচায়ক।</p>
<figure id="attachment_16340" aria-describedby="caption-attachment-16340" style="width: 311px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16340" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32.jpg" alt="" width="311" height="416" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32.jpg 515w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32-225x300.jpg 225w" sizes="(max-width: 311px) 100vw, 311px" /><figcaption id="caption-attachment-16340" class="wp-caption-text">লালকেল্লার জালি জানালা</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16343" aria-describedby="caption-attachment-16343" style="width: 655px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16343" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34.jpg" alt="" width="655" height="369" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34.jpg 2048w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-300x169.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-1024x576.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-768x432.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-1536x864.jpg 1536w" sizes="(max-width: 655px) 100vw, 655px" /><figcaption id="caption-attachment-16343" class="wp-caption-text">রোহতাস ফোর্টের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>রোহতাস ফোর্ট (Rohtas Fort), ১৫৪১–৪৮ খ্রিঃ</strong></p>
<p>রোহতাস ফোর্ট নির্মাণ করেন শের শাহ সূরি। এর জানালাগুলো সাধারণত অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত বা আয়তাকার ফ্রেমে বসানো এবং ফ্রেমগুলো মোটা ও শক্ত, যাতে আক্রমণ প্রতিরোধে দেয়ালের দৃঢ়তা নষ্ট না হয়। খিলানগুলোতে ছোট আকারের পাথরের জালি (perforated stone screens) ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে অলঙ্করণ নয়, বরং কার্যকারিতা মুখ্য বিষয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16344" aria-describedby="caption-attachment-16344" style="width: 643px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16344" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35.jpg" alt="" width="643" height="462" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35.jpg 1920w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-300x216.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-1024x736.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-768x552.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-1536x1104.jpg 1536w" sizes="(max-width: 643px) 100vw, 643px" /><figcaption id="caption-attachment-16344" class="wp-caption-text">মারওয়ারি হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>মারওয়ারি হাভেলি</strong></p>
<p>১৮শ–১৯শ শতকে হাভেলি নির্মাণ এক বিশেষ ধারায় রূপ নেয়। ধনী মারওয়ারি ব্যবসায়ী ও জমিদার পরিবারের নির্মিত হাভেলিগুলোতে এ ধরণের জানালা দেখা যায় যেগুলো শুধু বাসগৃহ ছিল না; বরং ঐশ্বর্য, শিল্প-সংবেদন ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অলংকৃত হাভেলিগুলোর জানালায় কাঠের ফ্রেম ও শাটার এর চারপাশে সূক্ষ্ম খোদাই করা ফুলেল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার দেখা যায়; যা মোঘল খিলান, রাজপুত পাথর খোদাই, এবং স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার এক বিশেষ <strong>সংমিশ্রিত নকশা</strong> সৃষ্টির প্রয়াস। মাঝের কাঠের জানালাগুলো সাধারণত ভেতর থেকে খোলা যায় এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশে সহায়ক ভূমিকা রাখে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>উমর হায়াত মহল (Umer Hayat Mahal, Chiniot, 1930)</strong></p>
<p>চিনিওট (পাঞ্জাব, পাকিস্তান) ঐতিহ্যগতভাবে কাঠের নিপুণ খোদাই শিল্পের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার হাভেলি, মসজিদ ও প্রাসাদের ঝারোখা জানালা এক অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, যেখানে মোঘল, ফারসি শৈলীর সূক্ষ্মতা স্থানীয় পাঞ্জাবি ঐতিহ্যের সাথে মিশে স্থাপত্যকে জীবন্ত শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। এটি (নিচে) উমর হায়াত মহল এর ঝারোখা জানালা যা projecting balconies আকারে তৈরি কাঠের জানালা। পাথরের বদলে শিসম কাঠ (Sheesham wood) ব্যবহার করে সূক্ষ্ম খোদাই করা হয়েছে। জানালার ফ্রেমগুলোতে বহুস্তর বিশিষ্ট cusped arches এবং প্রতিটি স্তরে খোদাই করা floral scrolls, arabesques, এবং জ্যামিতিক নকশা।</p>
<figure id="attachment_16358" aria-describedby="caption-attachment-16358" style="width: 269px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16358 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41.jpg" alt="" width="269" height="401" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41.jpg 402w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41-201x300.jpg 201w" sizes="(max-width: 269px) 100vw, 269px" /><figcaption id="caption-attachment-16358" class="wp-caption-text">উমর হায়াত মহল এর ঝারোখা জানালা</figcaption></figure>
<p>উমর হায়াত মহল চিনিওটের কাঠের নিপুণ কারুশিল্পের জীবন্ত দলিল। এর জানালা স্থাপত্য এ প্রাসাদের শৈল্পিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ মোঘল সূক্ষ্মতা, ফারসি নকশা ও পাঞ্জাবি লোকজ অলঙ্করণের সমন্বয় জানালার প্রতিটি অংশ সূক্ষ্ম হাতে খোদাই করা, যা চিনিওটের কাঠশিল্পের সর্বোচ্চ মান প্রদর্শন করে। কাঠের সাথে কখনো ইনলে (inlay) ও আয়না শোভা যুক্ত যা সূর্যালোক ছেঁকে নরম আভা তৈরি করে।</p>
<figure id="attachment_16345" aria-describedby="caption-attachment-16345" style="width: 353px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16345 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36.jpg" alt="" width="353" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36.jpg 640w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36-240x300.jpg 240w" sizes="(max-width: 353px) 100vw, 353px" /><figcaption id="caption-attachment-16345" class="wp-caption-text">উমর হায়াত মহল এর জানালার কারুকাজ</figcaption></figure>
<p><strong>হাভেলি, শেখাওয়াতি (Shekhawati)</strong></p>
<p>শেখাওয়াতি (Shekhawati) অঞ্চলের হাভেলি স্থাপত্য মূলত ১৮শ–১৯শ শতাব্দীতে সমৃদ্ধ হয়েছিল, যখন মারওয়ারি ব্যবসায়ী সমাজ তাদের ধন-সম্পদ, রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হাভেলির জানালা, দরজা ও দেয়ালের অলঙ্করণে ফুটিয়ে তুলেছিল। অধিকাংশ জানালা অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত এবং জানালার চারপাশে জ্যামিতিক মোটিফ, ফুল-পত্র নকশা করা। কাঠ ও পাথরের খোদাই, খিলান, এবং ল্যাটিসওয়ার্কে রাজপুত ঐতিহ্য এবং মোঘল শৈল্পিকতা একত্রিত হয়েছিল।</p>
<figure id="attachment_16354" aria-describedby="caption-attachment-16354" style="width: 357px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16354" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37.jpg" alt="" width="357" height="422" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37.jpg 441w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37-254x300.jpg 254w" sizes="(max-width: 357px) 100vw, 357px" /><figcaption id="caption-attachment-16354" class="wp-caption-text">হাভেলি, শেখাওয়াতি</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16355" aria-describedby="caption-attachment-16355" style="width: 673px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16355" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38.jpg" alt="" width="673" height="341" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38.jpg 1279w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-300x152.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-1024x519.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-768x389.jpg 768w" sizes="(max-width: 673px) 100vw, 673px" /><figcaption id="caption-attachment-16355" class="wp-caption-text">সোনার কেল্লা</figcaption></figure>
<p><strong>সোনার কেল্লা (Sonar Quila / Golden Fort, 1156)</strong></p>
<p>জ্যায়সালমারের সোনার কেল্লা নির্মিত হয় ১১৫৬ খ্রিস্টাব্দে। এর জানালা স্থাপত্য মরুভূমির পরিবেশ, রাজপুত শিল্পরুচি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের এক অনন্য দলিল। স্থানীয় হলুদ স্যান্ডস্টোনে খোদাই করা সূক্ষ্ম জালি নকশা  আলো ও বাতাস প্রবাহের জন্য কার্যকর, আবার গোপনীয়তাও রক্ষা করত। জানালার চারপাশে খোদাই করা floral scrolls, geometric bands এর সূক্ষ্ম খোদাই রাজপুত স্থাপত্যের গৌরবময় নিদর্শন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাভেলি, জ্যায়সালমার</strong></p>
<p>রাজস্থানের হাভেলি স্থাপত্য মূলত রাজপুত ও মারওয়ারি ব্যবসায়ী পরিবারের সমৃদ্ধ জীবনধারা ও শিল্পরুচির বহিঃপ্রকাশ। আর এর জানালা স্থাপত্য, বিশেষ করে ঝারোখা<strong>,</strong>পুরো শহরকে “সোনার শহর” নামে পরিচিত করেছে।এর ঝারোখাগুলো স্থানীয় হলুদ বেলেপাথরে (Yellow Sandstone) খোদাই করা brackets ও সূক্ষ্ম খোদাই করা স্যান্ডস্টোনের জালি কখনো অর্ধবৃত্তাকার, কখনো জটিল বহুলতর খিলান দ্বারা সংযুক্ত।</p>
<figure id="attachment_16356" aria-describedby="caption-attachment-16356" style="width: 373px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16356" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39.jpg" alt="" width="373" height="509" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39.jpg 750w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39-220x300.jpg 220w" sizes="(max-width: 373px) 100vw, 373px" /><figcaption id="caption-attachment-16356" class="wp-caption-text">হাভেলি, জ্যায়সালমার</figcaption></figure>
<p><strong>ওয়াজির খান মসজিদ (লাহোর, পাকিস্তান)</strong></p>
<p>ওয়াজির খান মসজিদ ১৬৩৪–১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মোঘল আমলের অন্যতম সেরা স্থাপত্য নিদর্শন। ঝারোখা জানালাগুলো মসজিদের বাইরের দেওয়ালে, বিশেষ করে সামনের (façade) এবং মিনারের সংলগ্ন অংশে দেখা যায়। জানালাগুলো অর্ধবৃত্তাকার খিলান দ্বারা আবৃত এবং প্রতিটি জানালার চারপাশে টেরাকোটা ও টাইলসের অলঙ্করণ রয়েছে। জানালার নিচে corbelled brackets দেখা যায়, যা ঝারোখাকে projecting balcony-র রূপ দিয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16357" aria-describedby="caption-attachment-16357" style="width: 549px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16357 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40.jpg" alt="" width="549" height="406" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40.jpg 871w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40-768x568.jpg 768w" sizes="(max-width: 549px) 100vw, 549px" /><figcaption id="caption-attachment-16357" class="wp-caption-text">ওয়াজির খান মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>পুরনো ভবন, পেশোয়ার</strong></p>
<p>নিচে পেশোয়ারের প্রাচীরঘেরা নগরীর পুরনো ভবনের কাঠখোদাই ঝারোখা জানালা। মোঘল শিল্পকলা, পশতুন জীবনধারা এবং কারিগরদের অনন্য দক্ষতায় ঝারোখা জানালাগুলো আজও টিকে আছে। যা পশতু সমাজের শিল্প-রুচি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ইসলামি-দক্ষিণ এশীয় স্থাপত্যের মিশ্র ঐতিহ্য বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16360" aria-describedby="caption-attachment-16360" style="width: 226px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16360" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png.jpg" alt="" width="226" height="361" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png.jpg 350w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png-188x300.jpg 188w" sizes="(max-width: 226px) 100vw, 226px" /><figcaption id="caption-attachment-16360" class="wp-caption-text">পেশোয়ারের পুরনো ভবনের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>কাশ্মীরি হাভেলি (Kashmiri Haveli)</strong></p>
<p>নিচের জানালাটি কাশ্মীরি হাভেলি বা ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি বাড়ির কাঠখোদাই করা ঝারোখা জানালা। জানালার কাঠামো কাঠ দিয়ে তৈরি এবং উপরে টালিযুক্ত ছাউনি রয়েছে। নিচের অংশে আলো বাতাস প্রবাহের জন্য জালি নকশা এবং উপরের অংশে কাঠের জানালা শাটার, যেখানে ছোট কাচ বসানো যা গ্রীষ্মকালে খোলা রাখা আর শীতে বন্ধ রেখে কাচ দিয়ে আলো প্রবাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।</p>
<figure id="attachment_16359" aria-describedby="caption-attachment-16359" style="width: 297px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16359" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.jpg" alt="" width="297" height="528" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42-169x300.jpg 169w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42-576x1024.jpg 576w" sizes="(max-width: 297px) 100vw, 297px" /><figcaption id="caption-attachment-16359" class="wp-caption-text">কাশ্মীরি হাভেলির জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>মহেশ্বর দুর্গ (Maheshwar Fort)</strong></p>
<p>১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে মহেশ্বর দুর্গে এ জানালা নির্মাণ করা হয়। ১৫শ শতকে মোঘল সুলতান আকবর প্রজাদের সঙ্গে সংযোগ রাখতে “ঝারোখা-দর্শন” (Jharokha Darshan) এর প্রথা চালু করলেও ঝারোখার আলোর প্রক্ষেপণ শৈলী, সূক্ষ্ম খোদাই, গোপনীয়তা, নান্দনিকতার সমন্বয় ধীরে ধীরে একে স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত করে।</p>
<figure id="attachment_16361" aria-describedby="caption-attachment-16361" style="width: 302px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16361" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43.jpg" alt="" width="302" height="434" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43.jpg 475w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43-209x300.jpg 209w" sizes="(max-width: 302px) 100vw, 302px" /><figcaption id="caption-attachment-16361" class="wp-caption-text">মহেশ্বর দুর্গের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>আয়না মহল (Aina Mahal)</strong></p>
<p>গুজরাটের ভুজ শহরে  (১৮শ শতক, আনুমানিক ১৭৫২ খ্রি.) নির্মাণ করা হয় আয়না মহল। আয়না মহলের ঝারোখা জানালাগুলো সূক্ষ্ম পাথরে ফুল-লতা, জ্যামিতিক এবং আরবেস্ক মোটিফ খোদাই করা।</p>
<figure id="attachment_16362" aria-describedby="caption-attachment-16362" style="width: 260px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16362 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44.jpg" alt="" width="260" height="391" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44.jpg 400w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44-200x300.jpg 200w" sizes="(max-width: 260px) 100vw, 260px" /><figcaption id="caption-attachment-16362" class="wp-caption-text">আয়না মহলের ঝারোখা জানালা</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16363" aria-describedby="caption-attachment-16363" style="width: 674px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16363" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45.jpg" alt="" width="674" height="357" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45.jpg 1245w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-300x159.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-1024x543.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-768x407.jpg 768w" sizes="(max-width: 674px) 100vw, 674px" /><figcaption id="caption-attachment-16363" class="wp-caption-text">হাভেলি, গুজর খাঁ</figcaption></figure>
<p><strong>হাভেলি, গুজর খাঁ (Gujar Khan)</strong></p>
<p>এই ঝারোখা জানালাগুলো গুজর খাঁ জেলার কাউন্ত্রিলা (Kauntrila) এলাকায় এক হাভেলিতে নির্মিত। এ ধরণের জানালা সাধারণত উপরের তলায়, বাসগৃহের অভ্যন্তর থেকে রাস্তাঘাট ও জনসমাজ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও এগুলো ছিল শৈল্পিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। জানালার চারপাশে কাঠের সূক্ষ্ম খোদাই, নীচে কারুকার্যপূর্ণ করবেল (corbel) বা ব্র্যাকেট (bracket), জানালার খিলান, ছাদের কার্নিশ ও কাঠের রেলিং বা বালাস্টার (balustrade) এর স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কিস্সা খওয়ানি বাজার, পেশোয়ার (পাকিস্তান) </strong></p>
<p>কিস্সা খওয়ানি বাজারের ঝারোখাগুলো সাধারণত রঙিন কাঠ দ্বারা তৈরি , কাঠে সূক্ষ্ম খোদাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের নকশা এবং আলো বাতাস প্রবাহের জন্য জালির ব্যবহার দেখা যায়। পেশোয়ারের নগর ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের ধারক হিসেবে ঝারোখাগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16365" aria-describedby="caption-attachment-16365" style="width: 324px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16365 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46.jpg" alt="" width="324" height="361" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46-269x300.jpg 269w" sizes="(max-width: 324px) 100vw, 324px" /><figcaption id="caption-attachment-16365" class="wp-caption-text">কিস্সা খওয়ানি বাজার</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16366" aria-describedby="caption-attachment-16366" style="width: 576px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16366" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47.jpg" alt="" width="576" height="331" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47.jpg 1389w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-300x172.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-1024x588.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-768x441.jpg 768w" sizes="(max-width: 576px) 100vw, 576px" /><figcaption id="caption-attachment-16366" class="wp-caption-text">বখ্শী রাম সিংহের হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>বখ্শী রাম সিংহের হাভেলি</strong></p>
<p>১৮৮৬ সালে বখ্শী রাম সিংহের হাভেলির এই ঝারোখা জানালা নির্মাণ করা হয়। বালুকাপাথরের খোদাই করা ফ্রেম এবং কাঠের প্যানেল এটির স্থাপত্যের প্রধান আকর্ষণ। যা প্রয়োজনে খোলা এবং বন্ধ রাখার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। মোঘল স্থাপত্যের ছায়া থাকলেও ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাব (arched verandahs, decorative cornices) লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16367" aria-describedby="caption-attachment-16367" style="width: 576px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16367 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48.jpg" alt="" width="576" height="346" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48.jpg 1500w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-300x180.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-1024x614.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-768x461.jpg 768w" sizes="(max-width: 576px) 100vw, 576px" /><figcaption id="caption-attachment-16367" class="wp-caption-text">জীবন সিংহ হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>জীবন সিংহ হাভেলি</strong></p>
<p>জীবন সিংহ হাভেলির (দৌলতলা<strong>) </strong>ঝারোখা জানালা উনবিংশ শতকের শেষভাগে, আনুমানিক ১৮৮০–১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। সমসাময়িক অন্যান্য হাভেলি (যেমন বখ্শী রাম সিংহ হাভেলি, ১৮৮৬)–এর স্থাপত্যধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16368" aria-describedby="caption-attachment-16368" style="width: 530px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16368" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49.jpg" alt="" width="530" height="318" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49.jpg 1500w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-300x180.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-1024x614.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-768x461.jpg 768w" sizes="(max-width: 530px) 100vw, 530px" /><figcaption id="caption-attachment-16368" class="wp-caption-text">আতম সিং গুজরাল হাভেলি</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আতম সিং গুজরাল হাভেলি</strong></p>
<p>আতম সিং গুজরাল হাভেলি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়। জানালার অংশে কাঠ ও পাথরের খোদাইকৃত অলঙ্করণ (floral patterns) লক্ষ্যণীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16369" aria-describedby="caption-attachment-16369" style="width: 743px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16369" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50.jpg" alt="" width="743" height="404" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50.jpg 1406w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-300x163.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-1024x556.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-768x417.jpg 768w" sizes="(max-width: 743px) 100vw, 743px" /><figcaption id="caption-attachment-16369" class="wp-caption-text">নাউ নিহাল সিংহের হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>নাউ নিহাল সিংহের হাভেলি</strong></p>
<p>নাউ নিহাল সিংহের হাভেলির ঝারোখা জানালা (১৮শ শতকের শেষের দিকে বা ১৯শ শতকের শুরুতে তৈরি) পাঞ্জাবের লাহোর অঞ্চলে নির্মিত। নির্মাণ উপাদান হিসেবে কাঠ ও পাথর ব্যবহার করা হয়। অলংকরণে প্রাচীর এবং কাঠের অংশে সূক্ষ্ম রঙিন পেইন্টিং করা হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (পাকিস্তান)</strong></p>
<p>১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (Pakistan)-এর ঝারোখা জানালা। এতে খোদাই করা কাঠ, খিলানযুক্ত ফ্রেম এবং ছাদ বা ছত্রি-আকৃতির আচ্ছাদন রয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16370" aria-describedby="caption-attachment-16370" style="width: 403px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16370 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51.jpg" alt="" width="403" height="503" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51-240x300.jpg 240w" sizes="(max-width: 403px) 100vw, 403px" /><figcaption id="caption-attachment-16370" class="wp-caption-text">ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (পাকিস্তান)</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16371" aria-describedby="caption-attachment-16371" style="width: 626px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16371" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52.jpg" alt="" width="626" height="448" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52-300x214.jpg 300w" sizes="(max-width: 626px) 100vw, 626px" /><figcaption id="caption-attachment-16371" class="wp-caption-text">ওয়াল্ড সিটি</figcaption></figure>
<p><strong>ওয়াল্ড সিটি, পেশোয়ার (Walled City of Peshawar)</strong></p>
<p>ওয়াল্ড সিটি মূলত শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্যের ভাণ্ডার। মোঘল আমল থেকে পেশোয়ার ছিল একটি বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানকার ব্যবসায়ী ও ধনী পরিবারগুলো তাদের হাভেলি ও বাড়িতে ঝারোখা জানালা স্থাপন করত সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। ঝারোখাগুলোতে সেগুন বা চিরকালীন শক্ত কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে এবং খোদাইয়ে ফুললতা, জ্যামিতিক নকশা, আরবেস্ক, এবং কখনো কখনো স্থানীয় পশতুন মোটিফ পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16372" aria-describedby="caption-attachment-16372" style="width: 689px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16372" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53.jpg" alt="" width="689" height="387" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53.jpg 1430w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-300x168.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-1024x575.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-768x431.jpg 768w" sizes="(max-width: 689px) 100vw, 689px" /><figcaption id="caption-attachment-16372" class="wp-caption-text">প্রাসাদ, পেশোয়ার</figcaption></figure>
<p><strong>পেশোয়ারের প্রাসাদ </strong></p>
<p>এটি পেশোয়ারে অবস্থিত একটি প্রাসাদ যা ১৮শ–১৯শ শতাব্দীতে &#8220;সেটি ব্যবসায়ী পরিবার&#8221; নির্মাণ করেছিলেন। সেটি মহল্লার জানালা কাঠের নকশাশিল্প, খিলানাকৃতির ফ্রেম ও জালি শৈলী তাদের ঐশ্বর্য ও শিল্পরুচির প্রতিফলন। অলংকৃত কাঠের কারুকাজ মধ্য এশীয় ইসলামী নকশা থেকে অনুপ্রাণিত যাতে রঙিন কাঁচ, ফ্রেস্কো এবং স্থানীয় কারিগরির ছোঁয়া শিল্পের অনন্যতায় নিয়ে যায়। সাধারণত শিশম কাঠ ও অন্যান্য শক্ত কাঠ দিয়ে এসব কাঠামো তৈরি। কাঠের নকশায় সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা হয়—ফুল ,লতা, আরবেস্ক ও জ্যামিতিক মোটিফ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>                                    ________________________</strong></p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:Ahmed_Shah_Mosque" target="_blank" rel="noopener">https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:Ahmed_Shah_Mosque</a></p>
<p><a href="https://comedoresdepaisagem.com/mandu-india/" target="_blank" rel="noopener">https://comedoresdepaisagem.com/mandu-india/</a></p>
<p><a href="https://thearchitectsdiary.com/through-time-and-glass-exploring-10-indian-window-designs/" target="_blank" rel="noopener">https://thearchitectsdiary.com/through-time-and-glass-exploring-10-indian-window-designs/</a></p>
<p><a href="https://mohsinphotos.blogspot.com/2019/03/barbers-tomb-aka-nai-ka-gumbad.html" target="_blank" rel="noopener">https://mohsinphotos.blogspot.com/2019/03/barbers-tomb-aka-nai-ka-gumbad.html</a></p>
<p><a href="https://islamicarchitectureinindia.weebly.com/hushang-shahs-tomb.html" target="_blank" rel="noopener">https://islamicarchitectureinindia.weebly.com/hushang-shahs-tomb.html</a></p>
<p><a href="https://www.thefridaytimes.com/30-Mar-2024/exploring-the-pre-partition-havelis-of-daultala" target="_blank" rel="noopener">https://www.thefridaytimes.com/30-Mar-2024/exploring-the-pre-partition-havelis-of-daultala</a></p>
<p><a href="https://www.zameen.com/blog/rohtas-fort-jhelum-guide.html" target="_blank" rel="noopener">https://www.zameen.com/blog/rohtas-fort-jhelum-guide.html</a></p>
<p><strong> </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16288</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য চর্চা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Oct 2025 16:38:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16231</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্যের গোড়ার কথা ইসলামের নবী কেবল আরব দেশে আসেননি, দুনিয়ার সব দেশেই এসেছেন। আল্লাহর পাঠানো সবই ছিলেন ইসলামের নবী। সাহিত্যের আলোচনায় প্রথমেই নবী প্রসংগে এলাম কেন? কারণ নবীরাই মানুষের প্রথম শিক্ষক । নবীরাই সমাজ সংগঠক।নবীদের যোগ মানুষের সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকেই।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>সাহিত্যের গোড়ার কথা</strong></h5>
<p>ইসলামের নবী কেবল আরব দেশে আসেননি, দুনিয়ার সব দেশেই এসেছেন। আল্লাহর পাঠানো সবই ছিলেন ইসলামের নবী। সাহিত্যের আলোচনায় প্রথমেই নবী প্রসংগে এলাম কেন? কারণ নবীরাই মানুষের প্রথম শিক্ষক । নবীরাই সমাজ সংগঠক।নবীদের যোগ মানুষের সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকেই। মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতি সাহিত্য নবীদের  ভূমিকা ছাড়া কল্পনাই করা যেতে পারে না। নবীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের সন্ধান এনেছেন এবং সে পথ মানুষকে দেখাননি এমনটি হতে পারে না। সাহিত্য মানুষের জীবনের একটা প্রয়োজনীয় অংশ আর নবীরা এ  অংশে কোনা অবদান রাখেননি একথা কেমন করে ভাবা যেতে পারে? নবীরা যেসব সহিফা ও কিতাব এনেছেন সেগুলোও সাহিত্যরস সমৃদ্ধ। নিছক কাটখোট্টা আলোচনা কোনো কিতাবেই নেই। জীবনকে উপলব্ধি করে আলোচনাগুলো জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে জীবনরস সমৃদ্ধ করে। তবেই তা মানুষের কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে। মানুষ তার সাহায্যে উন্নতি করে উন্নত জীবন সমাজ সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে এবং তার ভিত্তিতে মানুষ করেছে সাহিত্য সাধনা। এটাই হচ্ছে মানুষের সমিতা সাবনার গোড়ার কথা।</p>
<p>আজ যেন সাহিত্য বলতে নবুওয়াতী খাতের ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত একটা স্রোত বুঝায়। এটা মানুষের জীবনের অন্যান্য খাতে ভুলের মতো একটা ভুল। ‘রাধাকৃষ্ণের লীলা’ এই ভুলেরই একটা ফসল।  সাহিত্যকেও নবুওয়াতী ধারায় সম্পৃক্ত হতে হবে। নয়তো তা মানুষের জন্য উপাদেয় ও উপযোগী হতে পারে না। সাহিত্য রস ও সাহিত্যের আস্বাদ মানুষের জীবন গঠনে সাহায়তা না করে যদি ক্ষতি সাধন করে তাহলে কে এমন মানুষ আছে যে তা গ্রহণ করবে? শেষ নবীর কিতাব আল কুরআনে জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘দুনিয়ার জীবনটা তো খেলা-তামাশা, বাহ্যিক চাকচিক্য, তোমাদের পারস্পরিক গৌরব ও অহংকার এবং অর্থ সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে  পরস্পরকে অতিক্রম করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা হলো, বৃষ্টি হয়ে গেলো এবং তার ফলে উৎপন্ন উদ্ভিদরাজি দেখে কৃষক আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তারপর সে ফসল পেকে গেলো এবং তোমরা দেখতে পেলে তা হলুদ বর্ণ ধারণ করছে এবং পরে তা ভূষিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আখেরাত এমন স্থান যেখানে রয়েছে আজাব এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থির জীবন প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।’(আল হাদীদ : ২০)</p>
<p>এ জীবনকে আমরা গ্রহণ করেছি এবং জীবনকে উৎকর্ষিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  কিন্তু জীবনের প্রতারণার জালে জড়িয়ে আমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলতে পারি না। আমাদের সামনে রয়েছে আখেরাতের জীবনের কামিয়াবী। এই আখেরাতের জীবনের জন্য দুনিয়ার জীবন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।দুনিয়াকে বলা হয়েছে আখেরাতের কৃষিক্ষেত (হাদীস)। এখানে যেমন পরিশ্রম করা ও যত্ন নেওয়া হবে তেমনি আখেরাতে তার ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু দুনিয়ার প্রতারণার জালে যদি আমরা ফেঁসে যাই, দুনিয়ার আসল কাজে জড়িত না হয়ে যদি প্রতারণামূলক খেলা-তামাশায় মেতে উঠি এবং দুনিয়ার সম্পদ আহরণ ও ভোগ বিলাসে লিপ্ত হই, তাহলে আমাদের আখেরাতের জীবন বিনষ্ট হয়ে যাবে। দুনিয়া আমাদের সামনে আছে এবং আখেরাত সামনে নেই। তবে আখেরাত আমাদের কল্পনা জগতের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সকল বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। কাজেই তাকে আমার জীবন কর্ম ও জীবন চিন্তা থেকে আলাদা করতে পারি না।</p>
<p><strong>জীবনকে খেলা তামাশা বলা হয়েছে কোন অর্থে? স্বল্পকালীন স্থায়িত্বের অর্থে। একশো বছরের জীবনের বাস্তব কঠিন কর্মক্ষেত্রে খেলা তামাশা মাত্র কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার আনন্দ বিনোদন। এই স্বল্পস্থায়ী ক্ষণটুকুর পর আবার বাস্তব কঠোর কঠীন জীবন শুরু। ঠিক তেমনি এই স্বল্পস্থায়ী জীবনটা খেলা তামাশা এবং আখেরাতটাই বাস্তব ও অনন্তকালীন জীবন। কাজেই আমাদের যা কিছু কাজ চিরস্থায়ী আখেরাতের জন্য। জীবনটা শুধু দুমুঠো খাদ্য গ্রহণ, শরীর ঢাকার জন্য বস্ত্র আহরণ এবং শারীরিক, জৈব ও যৌন চাহিদা পুরণ করার নাম নয়। বরং এই স্বল্পকালীন দুনিয়ার জীবনকে অনন্তকালীন আখেরাতের জীবনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই</strong></p>
<p><strong>জীবনটাকে আমাদের বুঝতে হবে এবং উপলব্ধি করতে হবে।</strong><br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599"
     crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle"
     style="display:block; text-align:center;"
     data-ad-layout="in-article"
     data-ad-format="fluid"
     data-ad-client="ca-pub-9110084365128599"
     data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>জীবনের সাথে সাহিত্য, জীবনকে পরিশীলিত ও বিকশিত করার জন্য সাহিত্য। জীবনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য নয়। জীবনকে বিকৃত করেও সাহিত্য নয়। সাহিত্য আমাদের জীবনেরই নির্যাস।</strong></p>
<p>সাহিত্য আমাদের সুন্দর করবে। আমাদের পরিশীলিত ও পরিশ্রুত করবে। আমাদের জীবনকে ক্লেদমুক্ত অপাপবিদ্ধ করবে। সাহিত্য আমাদের সত্য ও ন্যায়ের  অনুসারী করবে। জীবনের ঘটনাবলী থেকে আমরা সত্য ও ন্যায়ার বাছাই করে নিতে পারবো। জীবন সংগ্রামে সংহিতা কেবলমাত্র একজন দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। বরং একজন দক্ষ পর্যবেক্ষক ও দক্ষ সমালোচকের দৃষ্টি হবে সাহিত্যের দৃষ্টি। এই স্বল্পকালীন পৃথিবীর জীবনে মানুষকে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে অর্থাৎ মানুষ কিভবে যথার্থ মানবতার আধারে পরিণত হতে পারে এবং নিজের নফসের ও জীব-জড়ের কৃত্রিম শক্তির অনুগত না হয়ে  বিশ্ব জাহান ও বিশ্ব প্রাকৃতিত্ব মালিক একমাত্র আল্লাহর অনুগত হতে পারে, তাই হবে সাহিত্যের সাধনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>গাংগেয় বদ্বীপে ইসলামের ভিত</strong></h5>
<p>বাংলাদেশে ইসলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হবার পরই ইসলামী সাহিত্যের সৃষ্টি। ইসলামের নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকালেই খ্রিষ্টীয় সপ্তম ইসলামের দাওয়াত বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রাকৃতিক ও মানসিক উভয় দিক থেকে এখানকার পরিবেশ ছিল অনুকূল। এই অনুকূল পরিবেশে ইসলামের দাওয়ার সহজে বিস্তার লাভ করে। উপমহাদেশের কেন্দ্র দিল্লী থেকে বহু দুরে  থাকায় বিদেশী আক্রমণকারীদের দৃষ্টি কমই এদিকে পড়েছে এবং অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীরাও এখানে কম সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া সবুজ শ্যামল বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত ও প্রাকৃতিক বন জংগলাকীর্ণ সমতলভূমি এমন এক ধরনের নৈসর্গিক গুরু গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করেছিল যা নিরিবিলি নিশ্চিন্তে সত্য দীনের দাওয়াত ছড়াবার পথে সহায়ক হয়েছিল। ফলে স্থানীয় বৌদ্ধ, জৈন ও আর্য ধর্ম প্রভাবিত জনগোষ্ঠী ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করে। এই সংগে আর একটি বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো। কয়েক হাজার বছর থেকে এ এলাকায় বিপুল সেমেটিক জনগোষ্ঠীর সমাবেশ ঘটেছিল। তাদের ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল তৌহীদবাদী। কালের আবর্তনে তাতে মরচে পড়ে গিয়েছিল। আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী বৌদ্ধবাদী ও জৈনবাদী ধর্মীয় সংস্কার যেভাবে এ এলাকায় ব্যাপক বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল ঠিক একই ধারায় ইসলামী তৌহীদবাদ সমগ্র বাংলার অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয়েছিল অতি অল্প সময়েই। যেন এটা ছিল তাদের প্রাণের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ। সকালে হারিয়ে গিয়েছিল আবার সন্ধ্যায় তাকে ফিরে পেয়েছিল, এভাবে তারা এটাকে গ্রহণ করেছিল। তাই হিন্দুস্তানের অতি প্রাচীন মুশরিকী আবাসভূমির মধ্যে গড়ে উঠতে পেরেছিল একটি বিশাল তৌহীদবাদী জনগোষ্ঠী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আলেম উলামা ও কাজীদের জ্ঞানচর্চা</strong></h5>
<p>মুললিম বিজেতাদের পূর্বে সমুদ্র ও নদীপথে আরব বণিকদের সাহায্যে বাংলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করে ইসলামের প্রথম যুগেই। এরপর ইসলাম প্রচারকদের আগমন ঘটতে থাকে। মুসলিম বিজেতাদের ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পর এ ধারা বলিষ্ঠতা অর্জন করে। এ সময় এদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম আইনঙ্গ তথা ফকীহ ও কাজীদের আগমন ঘটতে থাকে। তারা ছিলেন ইসলামি শাস্ত্রে সুদক্ষ ও পারদর্শী। মুসলিম বিশ্বে যে বিপুল জ্ঞান চর্চা হচ্ছিল তার ঢেউ এখানেও এসে পড়ে। ফলে ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকেই এখানে গৌড়, পান্ডুয়া,মাহিসুন (মাহিসন্তোষ), সোনারগাঁও ইত্যাদি এলাকায় বড় বড় ইলমী তথা ইসলামী জ্ঞান চর্চার  কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এখানকার মাদরাসাগুলোতে ইসলামী জ্ঞান আহরণ করার জন্য সমগ্র হিন্দুস্তান থেকে ছাত্রদের আগমন ঘটতো। শায়খ তাকিউদ্দীন আরাবী, শায়খ শরফুউদ্দীন আবু তাওয়ামাহ, শায়খ ইয়াহইয়া মানেরী, শায়খ আলাউল হক, হযরত শায়খ নুর কুতবুল আলম ইত্যাদি বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্ঞানসাধকগণ এসময় এসব জ্ঞানকেন্দ্র আলোকিত করেছিলেন। তাই বলা যায়, ইসলামি শাসনের প্রথম যুগেই বাংলাদেশ ইসলামী জ্ঞানচর্চার  পীঠস্থানে পরিণয় হয়। এখানে এর পরিবেশও ছিল। তখন জ্ঞানচর্চার ভাষা ছিল আরবী ও ফারসী । ফলে বিদেশাগত মুসলমান এবং এদেশীয় শিক্ষিত, জ্ঞানী  ও পণ্ডিতদের মধ্যে মূলত এ জ্ঞানচর্চা সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের মূল কেন্দ্র দিল্লীতে শক্তিশালী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান সাধনার এই কেন্দ্র বাংলা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।</p>
<p><em>সাধারণ মুসলমানের ভাষা ছিল বাংলা। ইতিপূর্বে পাল যুগে বৌদ্ধ শাসনামলে সাহিত্যের ও রাজভাষা সংস্কৃত থাকলেও সাহিত্য ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার চর্চা যা একটু আধটু হয়েছিল সেনযুগে হিন্দু শাসনামলে এসে তা সম্পূর্ণরণে রহিত হয়ে যায়। সংস্কৃতের মাধ্যমে সাহিত্য চর্চা ও রাজকার্য চলতে থাকে। এজন্য একটা দরবারী জগাখিচুড়ি মার্কা সংস্কৃত ভাষাও গড়ে ওঠে। মুসলিম সুলতানদের শাসনামলে মূলত বাংলা ভাষার পুনরজন্ম হয়। মুসলিম শাসকগণ তাঁদের দরবারী ও রাজভাষা ফারসী এবং ইলমী ভাষা আরবী রাখলেও মুসলিম এবং এদেশটার জনসাধারণের ভাষা বাংলার ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার জন্য রাজকোষ অর্থ বরাদ্দ করেন। ফলে ধীরে ধীরে বাংলা ইলমী ভাষায় রুপান্তরিত হবার পথ প্রশস্ত হতে থাকে।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সুফী সাধকদের ইসলাম প্রচার</strong></h5>
<p>মুসলমানদের মধ্যে দিনরাত আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন এবং তাঁর ইবাদতে মশগুল একটি দল গড়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন সুফী নামে খ্যাত। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের য্যোগী, সন্ন্যাসী ও রাহেবদের মতো তাঁরা সংসার বিরাগী ছিলেন না। তাঁরা সংসার,ধর্ম, জ্ঞানচর্চা এবং এমনকি জিহাদ চর্চাও করেছেন। এই সংগে আল্লাহর ইবাদত ও মানবতার সেবাই ছিল তাঁদের ব্রত। বাংলায় ইসলাম প্রচারে এই সুফিদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশী। তাই বাংলার মুসলিম সমাজে সুফীদের জীবন চর্চার  প্রভাব বেশী অনুভুত হয়েছে। কিন্তুু সুফীগণ ইসলামী শরীয়তের বাইরে কোনো অভিনব ও কৃত্রিম জীবন যাপন করতেন না।তারা ছিলেন আদর্শ মুসলিম এবং আদর্শ ইসলামী চরিত্রের অধিকারী। তাঁরা ছিলেন কুরআনের সুরা আল কাসাসের ৭৭ নং আয়াতে ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তার মাধ্যমে আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কারা,তবে সেই সংগে দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলো না।’ মর্মবাণীর যথার্থ আধার। তাঁরা সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেছেন। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করেছেন এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করেননি।খিলাফয়ে রাশেদার চার পাঁচশো বছর পরে সৈরতান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক শাসকদের সাথে কোথাও  তাঁরা কোনো আপোশ করেন নি। বরং কবি ও দার্শনিল ইকবালের ভাষায় অনেক জায়গায় ‘সিকান্দাররা কালিন্দরদের কথায় ওঠাবসা করতেন। দিল্লীর খাজা কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী র., হযরত বু আলী কলন্দর র. আজমীরের হযরত খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতী র. এবং গৌড়ের হযরত শাহ নূর কুতুবুল আলম র. এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই সুফীরা কখনো কোনো অন্যায়, জুলুম ও শোষণের সাথে আপোশ করেননি। তাঁরা ব্যাপক হারে জনগণকে ইসলামের তালিম ও তরবীয়ত দিয়েছেন এবং তাদের ইসলামী জীবন যাপানে সাহায্য করেছেন।</p>
<p><em>এই সুফীদের হাতে এক সাথে এত বেশী সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে যে, তাদের ইসলামী তালিম ও তরবিয়ত দেয়া এবং তাদের ইসলামী চরিত্র গঠন করা এই সীমিত সংখ্যক সুফীর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। যদি পনের শতকের জৌনপুরের বিখ্যাত সুফী হযরত মীর সাইয়েদ আশরাফ জাঁহাগীর সিমনানীর একটি পত্র থেকে জানা যায় ‘মোটকথা বাংলার বড় শহরের কথা বাদ দিলেও এমন কোনো ছোট শহর বা গ্রাম নেই যেখানে খোদাভীরু সুফীগণ আগমন ও বসতি স্থাপন করেননি’। তারপরও বলা যায় কুরআন ও সুন্নাহ চর্চার অবর্তমানে বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী ইসলামের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারেনি। যার ফলে মুশরিকী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বেড়া টপকে তারা ইসলামী মিল্লাতের আওতাভুক্ত হলেও ওদিক থেকে আসার সময় নিজেদের বহিরংগে মুশরিকী সভ্যতা সংস্কৃতির অনেক কিছু সাথে করে নিয়ে আসে। কালক্রমে এগুলো মুসলিম জীবন ধারায় জেঁকে বসে।</em></p>
<p>মুলত ইসলাম এমন একটা জীবন ব্যবস্থা ও জীবনাদর্শ যা মোটেই অনুষ্ঠান নির্ভর নয়। বরং কতিপয় বিশ্বাস ও বিশ্বাসভিত্তিক কর্মের ওপরই তা নির্ভরশীল। ইসলামের উৎস হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল। তৃতীয় কোনো সত্তার সাথে ইসলাম সরাসরি জড়িত নয়। তাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রথম পর্যায়ে সুফী দরবেশ বা উলামায়ে কেরামের যারাই জড়িত থাক না কেন সেক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন ও  সুন্নাহ চর্চার যতটুকুন কমতি থেকে গেছে তা ইসলামী ভিত্তির দুর্বলতা হিসাবেই চিহ্নিত হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>স্থানীয় কুফরী উপাদান</strong></h5>
<p>বাংলায় মুসলমানদের আগমন এবং ইসলামী আদর্শবাদের প্রসারের পূর্বে যেসব ধর্মমত বিস্তার লাভ  করেছিল সেগুলির পেছনে কোনো পরিচিত ও পরীক্ষিত আসমানী কিতাবের সমর্থন ছিল না। বৌদ্ধবাদ, জৈনবাদ ও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদেরই এখানে প্রচলন ছিল বেশী। এই তিন বৃহৎ ধর্মমতের বাইরে কাল্পনিক দেবদেবীর পূজারও একটা ধারা প্রচলিত ছিল। মূলত সবগুলো ধর্মমতই ঈশ্বর আরাধনার নামে প্রকৃতি পূজা ও পুতুল পুজায় পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মমত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ, ত্রিপিটক ইত্যাদিকে অভ্রান্ত মনে করতো। কিন্তু এর পেছনে কোনো শক্তিশালী ভিত্তি উপস্থাপন করতে পারতো না। ফলে সেগুলো প্রায় গালগল্প, পুরাতন কাহিনী, নিছক নীতিকথা এবং দার্শনিক আলোচনার কচকচি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল্লাহর অস্তিত্বে বিভিন্ন জীব ও জড়কে শরীক করা এবং এতদসংক্রান্ত ব্যাপক কুসংস্কারই ছিল ধর্ম। ফলে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে নানান বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্যের সমাবেশ ঘটেছিল। প্রকৃত সত্যকে মেনে নেবার মতো মানসিকতা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।</p>
<p>আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী রীতি বর্ণবাদের ভিত্তিতে সমাজকে বিভক্ত করে ফেলেছিল। মানুষ সরাসরি মানুষের দাসে পরিণত হয়েছিল। বরং একদল মানুষ সমাজে অন্ত্যজ ও মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। বিরোধী ধর্ম মত জৈন ও বৌদ্ধবাদও ধীরে ধীরে বর্ণভেদ প্রথার হাতে নিজেদের সোপর্দ করে দিয়েছিল। অথবা কোথাও আত্মরক্ষার্থে আত্মগোপন করে সহজিয়া ও তান্ত্রিক ইত্যাদি মতবাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়েছিল। অর্থাৎ ধর্মের নামে সমগ্র বাংলাদেশে ধর্মীয় অনাচার কুসংস্কার ও চারিত্রিক নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। এই ছিল তখনকার বাংলা সাহিত্য চর্চার পটভূমি বা পরিবেশ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলমানদের সাহিত্য সাধনা<br />
</strong></h5>
<p>বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কয়েকশো বছর পূর্ব থেকে ইসলাম প্রচারকদের এদেশে আগমন শুরু হয়। ইসলামের খালেস তৌহিদবাদ ও সামাজিক সাম্য বাংলার পৌত্তলিক সমাজে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক অবিচার, জুলুম, নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী পরিবেশ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি নিরাকার সর্বশক্তিমান একক স্রষ্টার আরাধনার ধারণা সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাকালে চতুরদিকে যখন ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা বেড়ে চলছিল তখনকার সমাজে ইসলামের শক্তির একটা অস্পষ্ট প্রভাব সমসাময়িক একটি কবিতায় ফুটে উঠেছে। অজ্ঞতাবশত কদি রামাই পণ্ডিত তের শতকের শেষের দিকে লিখিত তাঁর এ কবিতায় ইসলামী আদর্শ ও সদ্যগঠিত মুসলিম সমাজের চিত্র সঠিক রূপে আঁকতে না পারলেও ইসলামের অসাধারণ ও যাদুকরী প্রভাব এর মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর কবিতাটির নাম নিরঞ্জনের রুষ্মা । এ কবিতায় মধ্যযুগীয় ইউরোপের পোপ ও যাজকদের ক্ষমতার মতো ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু পুরোহিতদের ক্ষমতার কিছু আভাস পাওয়া যায়। জাজপুর তথা ওড়িষার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সদ্ধর্মীদের নিকট কর আদায় করতে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যগোষ্ঠী গলার পৈতা কানে বেড় দিয়ে বৌদ্ধ জনসাধারণকে শাপ শাপান্ত করে তাদের বাড়ি-ঘর আগুন জালিয়ে ছারখার করে দেয়। তাদের এ জুলুম উৎপীড়ন দেখে ধর্মদেবতা বৈকুন্ঠে বসে এর প্রতিবিধানে মনোনিবেশ করলেন। ধর্মরূপী মুসলমানরা জাজপুরে প্রবেশ করলো এবং ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীরা রাতারাতি ধর্মান্তর গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলো। তারা দেউল ও দেব বিগ্রহ ভেঙে পুতুল পুজার অবসান ঘটিয়ে ব্রাহ্মণদের বিনাশ করলো। কবির কল্পনায় বিষয়টা এভাবে ধরা দিয়েছে:</p>
<p>ধর্ম হইল জবন রূপী<br />
মাথায়েত কাল টুপি<br />
হাতে শোভে ত্রিকচ কামান।<br />
চাপিয়া উত্তম হত্র<br />
ত্রিভুবনে লাগে ভ-এ<br />
খোদায়ে বলিআ এক নাম।।<br />
(নিরঞ্জন নিরাকার<br />
হৈলা ভেস্ত অবতার<br />
মুখেত বলএ দম্বদার।।<br />
জথেক দেবতাগণ<br />
সভে হৈয়‍্যা একমুন<br />
আনন্দেতে পরিলা ইজার।।)<br />
ব্রহ্মা হৈল্যা মহামদ<br />
বিষ্ণু হৈল্যা পেকাম্বর<br />
আদম্ফ হইল শূলপানি।<br />
গনেশ হইলা গাজী<br />
কার্তিক হইলা কাজী<br />
ফকির হইলা জথ মুনি।।<br />
তেজিয়া আপন ভেক,<br />
নারদ হইলা শেক,<br />
পুরন্দর হইলা মলনা।<br />
চন্দ্র, সূর্য আদি দেবে<br />
পদাতিক হয়্যা সেবে,<br />
সভে মিলে বাজাএ বাজনী।।<br />
আপনি চণ্ডিকা দেবী,<br />
তিঁহ হৈল্যা হায়া বিবি<br />
পদ্মাবতী হৈল্যা বিবি নূর।<br />
জথেক দেবতাগণ,<br />
সভে হয়া একমন,<br />
প্রবেশ করিল জাজপুর।।<br />
দেউল দেহারা ভাঙ্গে,<br />
ক্যাড়্যা ফিড়্যা খাএ রঙ্গে,<br />
পাখড় পাখড় বোলে বোল।<br />
ধরিয়া ধর্মের পাএ,<br />
রামাঞি পণ্ডিত গাএ,<br />
ই বড় বিসম গণ্ডগোল।।</p>
<p>(শব্দার্থ: দম্বদার – দম-ই-মাদার, বদরুদ্দীন মওলানা শাহ-ই মাদার, পনের শতকের লোক, এ অংশটি পরবর্তীকালে প্রক্ষিপ্ত। আদম্ফ – আদম।  পাখাড়-পাকড়াও।)</p>
<p>কবির বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে: ধর্মদেবতা মাথায় কালো টুপি পরে ত্রিকচ অর্থাৎ তীরকাশ তথা তীরধারী কামান নিয়ে উন্নত জাতের অশ্বে আরোহন করে ত্রিভূবনে ভীতি সঞ্চারকারী ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে জবন তথা মুসলিম রুপ ধারণ করলেন। (নিরঞ্জন নিরাকার বেহেশতের অবতার হয়ে মুখে দম-ই-মাদার বলতে লাগলেন। সমস্ত দেবতা একমত হয়ে আনন্দে ইজার পরে নিলেন অর্থাৎ সবাই মুসলমান রূপ ধারণ করলেন।) ব্রহ্ম মুহাম্মাদ হলেন, বিষ্ণু হলেন পয়গম্বর এবং মহাদেব হলেন আদম। পনেশ গাজী, কার্তিক কাজী এবং যত মুনি ঋষি ফকির দরবেশ সাজলেন। আপন বেশভূষা পরিত্যাগ করে নারদ শেখ ও পুরন্দর মওলানা সাজলেন। চন্দ্র সূর্য প্রভৃতি আদি দেব পদাতিক হয়ে বাজনা বাজিয়ে তাদের সেবা করতে লাগলেন। চণ্ডিকা দেবী স্বয়ং হাওয়া বিবি হলেন আর পদ্মাবতী হলেন বিবি নূর, যত দেবতা ছিলেন সবাই এভাবে মুসলমান সেজে এক সাথে জাজপুরে প্রবেশ করলেন। তারা দেবালয় ও দেবগৃহ ভাঙলেন, মনের আনন্দে লুটতরাজ করে খেতে লাগলেন এবং সংগে সংগে অপরাধীদের ‘পাকড়াও পাকড়াও’ ধধ্বনি তুললেন। এই দারুণ গণ্ডগোল দেখে রামাই পণ্ডিত ধর্মের পায়ে লুটিয়ে পড়লো এবং গান গাইলো। এতে বুঝা যাচ্ছে দেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে এবং ইসলামের ন্যায়ের দন্ড তথাকথিত বর্ণবাদী সমাজের জুলুম, অবিচার ও উৎপীড়ন নির্মূল করে সমাজে শান্তি, সমতা ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনছে। মানুষ ইসলামের হক ও সাম্যের আহবান গ্রহণ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে।</p>
<p><strong>বাংলায় তুর্কীদের হাতে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। তুর্কীরা পাঠান ও মোগলদের তুলনায় বেশি ইসলামী ভাবাপন্ন ছিলেন। ফলে বাংলায় আরব দেশের মতো না হলেও তাদের সাথে সামঞ্চস্যশীল একটা ন্যায় ইনসাফ ও সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত বাংলায় মুসলমানদের সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। সমাজে একটা ইসলামী পরিবেশ ও ইসলামী দৃষ্টিভংগী সৃষ্টি হচ্ছিল। সেটা ছিল : মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই এক আদমের সন্তান। এক আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক। একমাত্র তাঁরই ইবাদত ও আরাধনা করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই। সবাই তাঁর অনুগত। বাংলার বিশাল ভূখন্ডে (অর্থাৎ বাংলা বিহার, ওড়িষা ও বৃহত্তর আসাম) এই তৌহিদী পরিবেশ দানা বেঁধে উঠছিল। কিন্তু যেহেতু বাংলা ভাষা তখনো স্থিতিশীলতা লাভ করেনি, তখনো সৃজ্যমান ছিল  (কয়েকশো বছর আগের চর্যাপদের ভাষা দেখলে তা বোঝা যাবে) আর সৃজ্যমান ভাষায় বড় ও সৃষ্টিশীল কোনো কিছুর আশা করা যায় না, তাই এসময়কার সাহিত্যের বিক্ষিপ্ত নিদর্শন থাকলেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য মুসলিম কবির রচনার সাক্ষাত পাওয়া যায় না। পনের শতক থেকে আমরা মুসলিম কবিদের একটা ‘ধারাবাহিকতা লক্ষ করি। শাহ মুহাম্মদ সগীর, জৈনুদ্দীন, মুজাম্মিল তাদের অন্যতম। শাহ মুহাম্মদ সগীর তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘য়ুসুফ-জলিখা’ রচনা করেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের আমলে (১৩৮৯-১৪১০)। কবি জৈনুদ্দীন ছিলেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের আমলে (১৪৭৪-১৪৮১) সভাকবি। কবি মুজাম্মিল পনের শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পনের শতক থেকে উনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত যে অসংখ্য মুসলিম কবির সন্ধান পাই তাদের অন্যতম হচ্ছেন : সৈয়দ সুলতান, (১৫৫০-১৬৪৮) শেখ ফয়জুল্লাহ, শুকুর মাহমুদ, (১৬৮০-১৭৫০) সাবিরিদ খান, দোনাগাজী, বাহরাম খান, আফজাল আলী, মুহম্মদ কবীর, মুহম্মদ খান, (১৫৮০-১৬৫০) দৌলত কাজী, (১৬০০-১৬৩৮) আলাওল, (১৬০৭-১৬৮০) শেখ পরান (১৫৫০-১৬১৫) আবদুল হাকীম (১৬২০-১৬৯০) শাহ গরীবুল্লাহ, মুহম্মদ ইয়াকুব, হায়াত মাহমুদ, মুহম্মদ মুকীম (১৭০০-১৭৭৫), সায়্যিদ হামজা (১৭৫৫-১৮১৫) প্রমুখ।</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনের অবসানের পর বিশেষ করে এদেশের অমুসলিম সমাজের সহযোগিতায় বিদেশী খৃস্টান বণিক ইংরেজরা দেশের শাসন যন্ত্র দখল করে। ফলে উনিশ শতকের শুরু থেকে ইংরেজ ও হিন্দুর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বসে বাংলা ভাষার নিত্য ব্যবহৃত আরবী ফারসী শব্দগুলো দুই হাতে বাদ দিয়ে মৃত সংস্কৃত ভাষার অপ্রচলিত ও অপরিচিত কঠিন শব্দসম্ভারে ভারাক্রান্ত করে একটা নতুন বাংলা গদ্য তৈরি করা হয়। অতপর এ ভাষায় গদ্য ও পদ্য লেখার কাজ চলে। ইংরেজের সাথে সংঘাতে লিপ্ত থাকার কারণে মুসলমানরা প্রথমে এ বিষয়ে উদাসীন থাকে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পরাজয়ের পর ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাদের এক ধাপ পিছিয়ে আসতে হয়। ইংরেজের সহযোগিতা ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় উদ্দীপিত হিন্দু মনীষার কারণে হিন্দু ঐতিহ্য এই সাহিত্যে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। তবুও এই উনিশ শতকে যেসকল মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের জন্ম হয়েছে তারা এর মধ্যে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী স্বতন্ত্র পথটি তৈরি করার প্রচেষ্টা চালান। এদের মধ্য থেকে কয়েকজন শ্রেষ্ট কবি সাহিত্যিকের নাম এখানে উল্লেখ করছি – এরা হচ্ছে ঔপন্যাসিক প্রবন্ধকার মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২), মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২) প্রবন্ধকার শেখ আবদুর  রহীম (১৮৫৯-১৯৩১), কবি মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩), প্রবন্ধকার ও সংবাদিক মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), কবি প্রবন্ধকার ও ঔপন্যাসিক সৈয়্যদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী  (১৮৮০-১৯৩১), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), প্রবন্ধকার ডা. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৯৯-১৯৩৬), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), কথাশিল্পী এস, ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), ঔপন্যাসিক নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৭৮-১৯২৩), কবি শেখ ফজলুল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), কবি কথাশিল্পী ও প্রবন্ধকার বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কবি শাহাদৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), কবি ও ঔপন্যাসিক শেখ মুহম্মদ ইদরিস আলী (১৮৯৫-১৯৪৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম সাহিত্যের উপাদান</strong></h5>
<p>মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা যখনই সাহিত্য ময়দানে পদার্পণ করেছেন তাদের মধ্যে একটা স্বাতন্ত্র ও সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। তাদের একটা বিশিষ্ট অংশ নিজেদেরকে নিছক কবি সাহিত্যিক মনে করেননি। তাঁরা মনে করেছেন বাংলার এই কুফরী সমাজে যেমন তাদের একক তৌহিদবাদী হিসাবে টিকে থাকতে হবে তেমনি এখানে কুফরীর গলদ চিহ্নিত করাও তাদের দায়িত্ব। এজন্য তারা একই সংগে ভাষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। যে ভাষায় ইসলামী আদর্শ ও আচরণ প্রকাশ এবং তার বিকাশ সাধন করা যায় সে ভাষা প্রয়োগ করার কথা তারা চিন্তা করেছেন। যেমন :</p>
<p>দেশেত আলিম থাকি যদি ন জানায়।<br />
সে আলিম নরকেত যাইব সর্বথায়।।<br />
নর সবে পাপ কৈলে আলিমের ধরি।<br />
আল্লাহর সাক্ষাতে মারিবেস্ত দণ্ড বেড়ি।।<br />
তোম্মারা সবের মেলে মোর উৎপন।<br />
তেকারনে কহি আমি শাস্ত্রের বচন।।<br />
আল্লায় বলিব তোরা আলিম আছিলা।<br />
মনুষ্যে করিতে পাপ নিষেধ ন কৈলা।।<br />
আছুক আপনা পাপ আলিমে খণ্ডাইব।<br />
পরের পাপের লাগি লাঘব পাইব।।<br />
(শব-ই-মিরাজ: সৈয়্যদ সুলতান)</p>
<p>কবি সৈয়্যদ সুলতান যেমন হিন্দু ধর্ম কাহিনী ও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ইসলামী কাহিনী ও প্রস্তাব বাংলায় লিখে প্রচার করেছিলেন ঠিক তেমনি তাঁর শাগরিদ কবি মুহম্মদ খান পরবর্তীকালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘মকতুল হুসৈন’ এও এ উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। এ গ্রন্থটি রচিত হয় ১৬৪৫ খৃস্টাব্দে। এতে বলা হয়:</p>
<p>হিন্দুস্থানে লোকে সবে ন বুঝে কিতাব।<br />
ন বুঝি শুনি নিত্যি করে মহাপাপ।।<br />
তেকাজে সংক্ষেপ করি পঞ্চালী রচিলুং।<br />
ভাল মন্দ পাপ পূণ্য কিছু ন জানিলুং।।<br />
পঞ্চালী পড়িতে সবে মনে ভয় পাই।<br />
অবশ্য কিতাব কথা শুনিবেক যাই।।<br />
কিতাবে আল্লার আজ্ঞা শুনিবেন্ত যবে।<br />
দান ধর্ম পূণ্য কর্ম করিবেন্ত তবে।।<br />
অবশ্য মোহোরে সবে দিবে আশীর্বাদ।<br />
মহাজন আশীর্বাদ খণ্ডিবে প্রমাদ ॥<br />
বিশেষ পীরের আজ্ঞা ন যায় লঙ্ঘন<br />
রচিলুং পাঞ্চালিকা তাহার কারম।।</p>
<p>শেখ মুত্তালিব (১৫৯৫-১৬৬০) লিখছেন:<br />
আরবীতে সকলে ন বুঝে ভাল মন্দ।<br />
তেকারনে দেশী ভাষে রচিলু প্রবন্ধ।।<br />
মুছলমানী শাস্ত্র কথা বাঙ্গালা করলু।<br />
বহু পাপ হৈল মোর নিশ্চয় জানিলু।।<br />
কিন্তু মাত্র ভরসা আছয়া মনান্তরে।<br />
বুঝিয়া মুমিন দোয়া করিব আমারে।।<br />
মুমীনের আশীর্বাদে পূণ্য হইবেক।<br />
অবশ্য গফুর আল্লা পাপ খেমিবেক।।<br />
এসব জানিয়া যদি করয়ে রক্ষণ<br />
তবে সে মোহোরে পাপ হইবে মোচন ॥<br />
(কিফায়িতুল মুসল্লীন)</p>
<p>মধ্যযুগের মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা তাদের জীবন ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা তাদের সাহিত্যে ইহকাল ও পরকাল উভয় কালকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের কাব্যের বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত ব্যপক। কেবলমাত্র মানব মানবীর প্রেমোপাখ্যান লিখেই তারা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেননি। এইসংগে তারা ইসলামী শরীয়ত, হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনীর মোকাবিলায় মুসলিম পৌরাণিক কাহিনী, হিন্দুদের পৌরাণিক ও আজগুবি সৃষ্টিতত্ত্বের তুলনায় সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ  ইসলামী সৃষ্টিতত্ব, ইসলামী দর্শন ও সুফীতত্ব, মুসলিম ঐতিহাসিক কাব্য, রূপক সাহিত্য তথা একপ্রকার রূপকের মাধ্যমে হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরা, মর্সিয়া সাহিত্য, মারফতী ইত্যাদি ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন গান রচনা করেন। তাদের এতদসম্পর্কিত কিছু গ্রন্থের নামোল্লেখ করলে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা আরো একটু সুস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে মনে হয়। যেমন:</p>
<ul>
<li>শরীয়ত নামা-নসরুল্লাহ খান</li>
<li>নসীহত নামা-শেখ পরান</li>
<li>কিফায়িতু-ল-মুসল্লীন-শেখ মুত্তলিব</li>
<li>হিদায়িতু-ল-ইসলাম-নজরুল্লাহ খান</li>
<li>নামাজ মাহাত্ম্য- মুহাম্মদ জান</li>
<li>শিহাবুদ্দীন নামা-আবদুল হাকীম</li>
<li>হিতজ্ঞান বাণী- হায়াত মাহমুদ</li>
<li>নবী বংশ-সৈয়্যদ সুলতান</li>
<li>রসূল বিজয়-ঐ</li>
<li>শব-ই-মিরাজ- ঐ</li>
<li>ওফাৎ-ই-রসূল- ঐ</li>
<li>ইবলিস নামা ঐ</li>
<li>আম্বিয়া বাণী- হায়াত মাহমুদ</li>
<li>কিয়ামত নামা -মুহম্মদ খান</li>
<li>নূর নামা (সৃষ্টিতত্ব)- শেখ পরান</li>
<li>নূর নামা (সৃষ্টিতত্ব)- আবদুল হাকীম</li>
<li>জ্ঞান প্রদীপ (সূফীতত্ব) সৈয়্যদ সুলতান</li>
<li>কারবালা (মর্সিয়া সাহিত্য)-আবদুল হাকীম</li>
<li>জঙ্গনামা- গরীবুল্লাহ ও ইয়াকুব</li>
<li>সায়াৎনামা -(জ্যোতিষ শাস্ত্র) মীর মুহাম্মদ শফী</li>
</ul>
<p>এ ধরনের ইসলামী জ্ঞান ও মুসলিম জীবন সম্পর্কে অসংখ্য গ্রন্থ তারা রচনা করেন। তাদের লেখনীর সাহায্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চার একটা সাগর সৃষ্টি হয়।</p>
<p><strong>তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, মুসলিম কবিদের এই ইসলাম চর্চার সাথে খালেস তৌহীদের সম্পর্ক যতটুকু তার চেয়ে অনেক বেশী সম্পর্ক সুফীতাত্বিক মরমীবাদের। বাংলার কবিদের কাব্যচর্চার ওপর ইরানের প্রভাব ব্যাপকতর। সে তুলনায় আরবীয় প্রভাব অতি সামান্যই। আর ইরানী প্রভাব মানেই হচ্ছে ইরানী সাহিত্যে যে মাশশায়ী, ইশরাকী ও ইরফানী ইত্যাদি এরিস্টটলীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবাদী দর্শন এবং তাসাউফের গৃঢ় রহস্যভিত্তিক মরমীবাদের প্রসার ঘটে তারই প্রভাব বাংলার কবিদের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে।</strong></p>
<p>আব্বাসীয় আমলে হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে গ্রীক দর্শনের আলোচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালী ও ফখরুদ্দীন রাযীর আক্রমণাত্মক ভূমিকার ফলে মাশশায়ী দর্শন ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে ফেললে ইশরাকী ও ইরফান তাসাউফ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইশরাকী তাসাউফের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খ শিহাবদ্দীন ইয়াহইয়া ইবনে হাবস ইবনে আমীরাক সোহরাওয়দী (৫৪৯হি:- ৫৮৭হি:)। রেই, হামেদান, কাযভীন ইত্যাদি ইরানের বিভিন্ন শহরে তাসাউফের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা গড়ে ওঠে। ফারসী সাহিত্য মূলত তাসাউফের এই ভাবধারাগুলির মধ্যেই বিকশিত হয়। পনের শতকের কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে উনিশ শতকের বাংলার কবিদের মধ্যে এর সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। ইরানী কবিদের সাথে তারা গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন ‘ইউসুফ জুলিখা’সহ ইরানী কবিদের অনেকগুলি কাব্য তারা বাংলায় অনুবাদ করেন। এমনকি অনেকে তাদের আদলে কাব্য ও কবিতা চর্চা করেন। এখানে পীরের নির্দেশে গ্রন্থরচনার কথা অনেক কবিই বলেছেন। পনের শতকের কবি লিখেছেন:</p>
<p>শাহা বদরুদ্দীন পীর কৃপাকুল হরি।<br />
শতমুখে সে বাখান কহিতে ন পারি।।<br />
তাহান আদেশ-মালা শিরেতে ধরিয়া।<br />
রচিলেন্ত মুজাম্মিলে মনে আকলিয়া।।<br />
(সায়াৎনামা)</p>
<p>পীর শাহ দৌলার আদেশে কবি শেখ চান্দ লিখছেন:<br />
ফতে মোহাম্মদ সুত শেখ চান্দ নাম।<br />
গুরুর আজ্ঞায় পঞ্চালী রচে অনুপাম।।<br />
কাছাছুল আম্বিয়া এক বিতাবেত শুনি।<br />
পঞ্চালী বাঁধিয়া তাকে পুস্তকেত ভনি।।</p>
<p><em>মূলত মধ্যযুগের বাংলা কবিতা তাসাউফের চত্বরে ঘোরাফেরা করে। ইউরোপ ও আমেরিকায় খৃষ্টান কবিরা যখন বাইবেলের মধ্যে ডুব দেয়, বাইবেল চর্চা করে এবং বাইবেল থেকে পথ নির্দেশনা নেবার চেষ্টা করে তখন এশিয়ার মুসলিম কবিরা ডুব দেয় তাসাউফের মধ্যে। তাসাউফের মধ্যে জীবন দর্শনের চিত্র অংকন করে। তাসাউফকে কুরআনের নির্যাস বিবেচনা করে। ফলে কুরআন থেকে পথ নির্দেশনা দেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। বাংলা মধ্যযুগের কবিরা কুরআন ও ইসলামের নামে যা কিছু বলেছেন তা সরাসরি কুরআন ও হাদীসের চিন্তা থেকে নয়। বরং ইরানী সাহিত্যের মধ্যস্থতায় তাসাউফের জারক রসে সিঞ্চিত করে বলেছেন।</em> এই প্রসংগে বলা যায় মওলানা রুমীর মসনবীকে বলা হয়েছে-</p>
<p>‘হত কুরআ দর যবানে পাহলভী’<br />
মসনবী-ই-মানবী-ই মৌলভী</p>
<p>অর্থাৎ ‘পাহলবী তথা ফারসী ভাষায় মওলানা রুমীর মসনবীই হচ্ছে কুরআন মজীদ।’</p>
<p>অথচ অন্যদিকে ইমাম গাজ্জালী র. মওলানা রুমীর এই মসনবীর চিন্তা উদ্বৃত (সামা) গান ও নাচের প্রবল বিরোধিতা করেছেন। অর্থাৎ কোনো গ্রন্থই কুরআনের সমান্তরাল হতে পারে না।</p>
<p>তাসাউফের চিন্তার জটিলতার কারণে পনের ষোল শতকের বাংলার কিছু মুসলিম কবি শ্রীচৈতন্যের ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে বৈষ্ণব পদাবলীও রচনা করেন। তারা এটাকে শির্ক মিশ্রিত এবং মুসলিম জীবন ধারা থেকে বিভিন্ন মনে করতে পারেননি। আল্লাহ যে খালেস তৌহীদের কথা কুরআনে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, শিরক ছাড়া অন্য সমস্ত গুনাহ তিনি মাফ করে দেবেন, সেই শিরক থেকে আমাদের জীবনকে যেমন মুক্ত রাখতে হবে তেমনি সাহিত্যও হবে তা থেকে মুক্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আধুনিক পরিবেশ ও আধুনিক সাহিত্য</strong></h5>
<p>উনিশ শতক থেকে এদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। এ আধুনিকতার সম্পর্ক ইংরেজী সভ্যতা সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় চিন্তার সাথে কবিতার আংগিকে কাঠামোয় এবং চিন্তায় যেমন পরিবর্তন আসে তেমনি নতুন গদ্যভংগী রচিত হয়। উপন্যাস, প্রহসন, নাটক ইত্যাদি কথাসাহিত্যের একটি ধারা সৃষ্টি হয়। সমগ্র সাহিত্য জগতে যেন নতুন জোয়ার আসে। মুসলিম সমাজ ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত থাকায় মুসলিম সাহিত্যিকরা প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা ভাষার ওপর থেকে মুসলিম ঐতিহ্যের প্রভাব ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়ে তাদের নিজেদের পৌরাণিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত করে। তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ন্যায় বড় বড় প্রতিভার জন্ম হয়। যথার্থই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উন্নতির উচ্চ সোপান অতিক্রম করতে থাকে।</p>
<p>এসময় মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে এগিয়ে আসেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। তিনি নতুন ভাষার ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর পরে শক্তিশালী লেখক হিসাবে এগিয়ে আসেন মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২), শেখ আবদুর রহীম (১৮৫৯ – ১৯৩১), আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৬৯-১৯৫৩), মওলানা মনিরুজ্জামান  ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার সৈয়্যদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), প্রবন্ধকার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), প্রবন্ধকার ও ঔপন্যাসিক এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), ঔপন্যাসিক নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ব (১৮৭৮-১৯২৩), প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), কবি শাহাদত হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), কবি ও প্রবন্ধকার গোলাম মোস্তাফা (১৮৯৭-১৯৬৪), ইত্যাদি অসংখ্য শক্তিশী সাহিত্যিকবৃন্দ। তাঁরা সবাই নিজেদের সময় ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল স্বাভাবিকভাবে প্রবল। তাই সাহিত্য জগতে তাঁরা প্রতিবেশীদের তুলনামূলক উন্নতমানের সাথে সহাবস্থান করেও মুসলমানদের জন্য একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।</p>
<p>এই সময় আগমন হয় বাংলার সাহিত্যাকাশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবি নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬)। ভাষার ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক প্লাটফর্মের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি মুসলিম ঐতিহ্যে ফিরে যাবার সকল প্রচেষ্টা শুরু করেন। তাঁর প্রতিভা প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীদের হৃদয়ও স্পর্শ করে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় বিচরণ করে তিনি ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের ঝাণ্ডা সমুন্নত করেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংগীত তাঁর অমর কীর্তি। নজরুলের পরে কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৩) তাঁর সাহিত্যধারাকে আরো পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ফররুখ ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যকে পূর্ণরূপে বিকাশিত করেন।</p>
<p><strong>১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লব হবার পর এর প্রভাব সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকের জার্মান চিন্তাবিদ কার্লমার্কস ও ফেড্রারিক এঙ্গেলস ছিলেন এই বিপ্লবী চিন্তাধারার উদগাতা। তাঁরা অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে এই বিপ্লবের ডাক দেন। আসলে কমিউনিস্ট ভাবধারা একটা অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম। একে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত করেন। একদল সাহিত্যিকের মাথায় শ্রেণীসংগ্রামের চিন্তা এবং এই সংগে নিরীশ্বরবাদিতা ও ধর্ম আফিমের ন্যায় এই ধারণা বন্ধমূল করে দেন। এরই ভিত্তিতে তারা দুনিয়াব্যাপী একটি সাহিত্যের আবহ তৈরিতে মেতে ওঠেন। মাত্র সত্তর বছরের মধ্যে তারা বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও ব্যর্থ হয়ে যান। মার্কসবাদ একটা অলীক কল্পনায় পরিণত হয়। কিন্তু বিশ্ব সাহিত্যকে তারা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এখন কয়েক প্রজন্ম ধরে। তারা সাহিত্য থেকে আল্লাহকে বিদায় দিয়েছেন। সাহিত্যের পরতে পরতে শ্রেণী সংগ্রাম প্রবেশ করিয়ে একটা হিংসাত্মক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। তারা মানবতাবাদের কথা বলেন। কিন্তু তাদের সাহিত্যের মাধ্যমে সবচেয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে মানবতা। তারা মানুষকে কোনো এক পর্যায়ে নিয়ে স্থিতিশীল করতে পারেননি। মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে কার কাছে আশ্রয় নেবে? এক আল্লাহকে ত্যাগ করলে অসংখ্য আল্লাহ এসে যায়। দেশ এক আল্লাহ, পাটি এক আল্লাহ, প্রেসিডিয়াম এক আল্লাহ- এভাবে ক্ষমতাধর প্রত্যেকেই এক এক আল্লাহ। এই স্বৈরাচারী আল্লাহদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষমতা মার্কসবাদী সাহিত্যের নেই।</strong></p>
<p>বিগত শতকের শেষার্ধব্যাপী এই মার্কসবাদী সাহিত্যের দাপাদাপি বাংলার মুসলিম সাহিত্য অংগণে অশনি সম্পাতের মতো অনুভুত হচ্ছিল। মুসলিম ঘরানার বহু সাহিত্যিক ইসলামী আদর্শবাদ ত্যাগ করে এদিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। মার্কসবাদের পতনের পর তাদের পালে আর হাওয়া বইছে না। তবুও তারা মার্কসবাদের মূল ভিত্তি সেক্যুলাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। অনেকে ইসলামী আদর্শবাদের আওতায় ফিরে আসছেন।</p>
<p>তবে ইসলামী আদর্শবাদও বিশ্বাসের নতুন বলয় সৃষ্টি করে ময়দানে নতুন করে জেগে উঠছে। আমাদের পূর্বসূরীদের বিগত ছ’সাতশো বছরের প্রচেষ্টা ও কর্মপ্রবাহ এ বলয়কে শক্তিশালী ভিত্তিদান করেছে। কুরআন ও হাদীস অবিকৃত থাকার এবং তাদের সাথে আমাদের আবেগগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ গড়ে ওঠার কারণে আজ সেখান থেকে পথনির্দেশ লাভ করা আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। ইসলামী সমাজ চিন্তা যেমন নতুন করে নব উদ্যমে বলীয়ান হচ্ছে তেমনি ইসলামী সাহিত্য চিন্তাও তার সাথে সমান তালে এগিয়ে যাবে।</p>
<div id="wpdevar_comment_1"></div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/practice-of-islamic-literature-in-bangla-language/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16231</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বড়র পিরীতি বালির বাঁধ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী নজরুল ইসলাম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Jul 2025 12:16:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15968</guid>

					<description><![CDATA[তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদী। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।… এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন- আবার কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদী। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।… এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন- আবার কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করেছেন।</p>
<p>আমার পাশেই দাঁড়য়েছিলেন আরো দু’একটি কাব্য-বাতিকগ্রস্ত রাজ-কয়েদী। আমার চেয়েও বেশী হেঁসেছিলেন সেদিন তাঁরা। আনন্দে নয়, যা নয় তাই শুনে।</p>
<p>কিন্তু ঐ আজগুবী গল্পও সত্য হয়ে গেল। বিশ্বকবি সত্যি সত্যিই আমার ললাটে ‘অলক্ষণের তিলক-রেখা’ এঁকে দিলেন।</p>
<p>অলক্ষণের তিলক-রেখাই বটে! কারণ এর পর থেকে আমার অতি অন্তরঙ্গ রাজবন্দী বন্ধুরাও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন। যাঁরা এতদিন আমার এক লেখাকে দশবার করে প্রশংসা করেছেন, তারাই পরে সেই লেখার পনের বার করে নিন্দা করলেন। আমার হয়ে গেল বরে শাপ!</p>
<p>জেলের ভিতর থেকেই শুনতে পেলাম, বাইরেও একটা বিপুল ঈর্ষা-সিন্ধু ফেনায়িত হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস হ’ল না। বিশেষ করে যখন শুনলাম, আমারি অগ্রজপ্রতিম কোন কবিবন্ধু সেই সিন্ধু-মন্থনের অসুর-পক্ষ লীড্‌ করছেন। আমার প্রতি তাঁর অফুরন্ত স্নেহ, অপরিসীম ভালবাসার কথা শুধু যে আমরা দুজনেই জানতাম তা নয়, দেশের সকলেই জানত তাঁর গদ্যে-পদ্যে কীর্তিত আমার মহিমা-গানের ঘটা দেখে।</p>
<p>সত্য-সুন্দরের পূজারী বলে যাঁরা হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে বেড়ান, তাঁদের মনও ঈর্ষায় কালো হয়ে ওঠে, শুনলে আর দুঃখ রাখবার জায়গা থাকে না।</p>
<p>এ খবর শুনে চোখের জল আমার চোখেই শুকিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম শুধু আমি- বাইরের এই লাভে অন্তরের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার। মনে মনে কেঁদে বল্‌লাম, হায় গুরুদেব! কেন আমার এত বড় ক্ষতিটা করলে!</p>
<p>বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন ক’রে ভক্ত তার ইষ্টদেবকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধুপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্রা-বিদ্রুপ করেছেন।</p>
<p>এমন কি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্র-বিদ্বেষী কোন একজনের মাথার চাঁদিতে আজও অক্ষয় হয়ে লেখা আছে এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।</p>
<p>আমার পরম শ্রদ্ধেয় কবি ও কথাশিল্পী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন কবির সামনেই এ কথা ফাঁস করে দিলেন। কবি হেঁসে বললেন, যাক, আমার আর ভয় নেই তাহলে।</p>
<p>তারপর কতদিন দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে। নিজের লেখা দু’চারটে কবিতা গানও শুনিয়েছি, অবশ্য কবির অনুরোধেই এবং আমার অতি সৌভাগ্যবশত তাঁর অতি প্রশসংসা লাভও করেছি কবির কাছ থেকে। সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় কোনদিন এতটুকু প্রাণের দৈন্য বা মন-রাখা ভাল-বলবার চেষ্টা দেখিনি।</p>
<p>সষ্কোচে দূরে গিয়ে বসলে সস্নেহে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। মনে হয়েছে, আমার পূজা সার্থক হ’ল, আমি বর পেয়ে গেলাম।</p>
<p><strong>অনেক দিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে গিয়ে থাকবার কথা বলেছেন। হতভাগা আমি, তাঁর পায়ের তলায় বসে মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না। বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।</strong></p>
<p><strong>এই নিয়ে কতদিন তিনি আমায় কতভাবে অনুযোগ করেছেন, তুমি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচ্‌ছ- তোমাকে জন-সাধারণ একবারে খানায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে- ইত্যাদি।</strong></p>
<p>আমি দেখেছি, এ গৌরবে আমার মুখ যত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কোনো কোনো নাম-করা কবির মুখে কে যেন তত কালি ঢেলে দিয়েছেন। ক্রমে ক্রমে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু শুভানুধ্যায়ীরাই এমনি করে শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন। আজ তিন চার বছর ধরে এই শুভানুধ্যায়ীরা গালি-গালাজ করেছেন আমায়, তবু তাঁদের মনের ঝাল বা প্রাণের খেদ্‌ মিটল না। বাপ রে বাপ! মানুষের গা’ল দেবার ভাষা ও তার এত কস্‌রতও থাকতে পারে, এ আমার জানা ছিল না।</p>
<p>ফি শনিবারে চিঠি! এবং তাতে সে কী গাড়োয়ানী রসিকতা, আর মেছোহাটা থেকে টুকে-আনা গালি! এই গালির গালিচাতে বোধ হয় আমি এ-কালের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ শাহানশাহ্‌।</p>
<p>বাংলায় রেকর্ড হয়ে রইল আমায় দেওয়া এই গালির স্তূপ। কোথায় লাগে ধাপার মাঠ! ফি হপ্তায় মেল (ধাপা-মেল) বোঝাই। কিন্তু এত নিন্দাও সয়েছিল। এতদিন তবু সান্ত্বনা ছিল যে, এ হচ্ছে তন্তুবায়ের বলীবর্দ ক্রয়ের অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া। বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া-রোগ-এ স্বদেশ-প্রেমের বাই উঠল। কোথায় তুই হাঁ করে খাবি গুলবদনীর গুলিস্তানে মলয় হাওয়া, দেখবি ফুলের হাই-তোলা, গাইবি ‘আয় লো অলি কুসুম-কলি’ গান, -তা না ক’রে দিতে গেলি রাজার পেছনে খোঁচা! গেলি জেলে, টানলি ঘানি, করলি প্রয়োপবেশন, পরলি শিকল-বেড়ী, ডান্ডাবেড়ী, বইগুলোকে একধার থেকে করাতে লাগলি বাজেয়াপ্ত, এ কোন্‌ রকম রসিকতা তোর? কেনই বা এ হ্যাঙ্গাম-হুজ্জুৎ!</p>
<p>হঠাৎ একদিন দেখি ঝড় উঠেছে সাহিত্যের বেণু-বনে এবং দেখতে দেখতে সুরের বাঁশী অসুরের কোঁৎকা হয়ে উঠেছে! ছুট ছুট! যত মোলায়েম ক’রেই বেণু-বন বলি না কেন, তাতে ঝড় উঠলে যে তা চিরন্তন বাঁশ-বনই হয়ে ওঠে, তা কোন্‌ পাষণ্ড অবিশ্বাস করবে!</p>
<p>বেচারী তরুণ সাহিত্য! যেন বালক অভিমন্যুকে মারতে সপ্ত মহারথীর সমাবেশ! বাইরে ছেলেমেয়ের ভিড় জমে গেল! ঘন ঘন হাততালি! বলে, ‘এই! বাঁশ-বাজি দেখতে যাবি, দৌড়ে আয়।’ কিন্তু, শুধুই কি সপ্ত মহারথীর মার! তাঁদের পেছনের পদাতিকগুলি যে আরো ভীষণ। ধূলো কাদা গোবর মাটি- কোনো রুচির বাছ-বিচার নাই, বেপরোয়া ছুঁড়ে চলেছে।</p>
<p>মহারথীদের মারে অমর্যাদা নেই, কিন্তু বাইরে থেকে আনা ঐ ভাড়াটে গুণ্ডাগুলোর নোংরামীতে সাহিত্যের বেনুবন যে পুকুর-পাড়ের বাঁশবাগান হয়ে উঠল!</p>
<p><strong>পুলিশের জুলুম আমার গা-সওয়া হয়ে গেছে। ওদের জুলুমের তবু একটা সীমারেখা আছে। কিন্তু সাহিত্যিক যদি জুলুম করতে শুরু করে, তার আর পারাপার নেই। এরা তখন হয়ে ওঠে টিক্‌টিকি পুলিশের চেয়েও ক্রূর, অভদ্র। যেন চাক-ভাঙ্গা ভীমরুল। জলে ডুবেও নিষ্কৃতি নেই, সেখানে গিয়েও দংশন করবে।</strong></p>
<p>পলিটিক্সের পাঁকের ভয়ে পালিয়ে গেলাম নাগালের বাইরে। মনে করলাম, যাক, এতদিনে একবার প্রাণ ভ’রে সাহিত্যের নির্মল বায়ু সেবন ক’রে অতীতের গ্লানি কাটিয়ে উঠব। ও বাবা! সাহিত্যের আসর যে পলিটিক্যাল আখড়ার চেয়েও নোংরা তা কে জানত!</p>
<p>কপাল, কপাল! পালিয়েও কি পার আছে? হঠাৎ একদিন সপ্ত-রথীর সপ্ত প্রহরণে চকিত হয়ে উঠলাম। ব্যাপার কি!</p>
<p>জানতে পালাম, আমার অপরাধ, আমি তরুণ! তরুণেরা নাকি আমায় ভালবাসে, তা’রা আমার লেখার ভক্ত। সভয়ে প্রশ্ন করলাম, আজ্ঞে, এতে আমার অপরাধটা কিসের হ’ল?</p>
<p>বহু কণ্ঠের হুঙ্কার উঠলো, ঐটেই তোমার অপরাধ, তুমি তরুণ এবং তরুণেরা তোমায় নিয়ে নাচে।</p>
<p>বললাম, আপাততঃ আপনাদের ভয়ে আজই তো বুড়ো হয়ে যেতে পারছিনে। ওর জন্য দু-দশ বছর মার খেয়েই অপেক্ষা করতে হবে। আর, যারা আমায় নিয়ে নাচে, আপনারাও তাদের নাচিয়ে ছেড়ে দিন। গোল চুকে যাবে। আমায় নিয়ে কেন টানাটানি!</p>
<p>আবার নেপথ্যে শোনা গেল, তুমি এই জ্যাঠা অভিমন্যুর পৃষ্ঠরক্ষী। তোমাকে মারতে পারলেই একে কতল করতে দেরী লাগবে না।</p>
<p>দেখাই যাক।…</p>
<p>এতদিন আমি উপেক্ষাবশতঃই এ ধোঁওয়া ছাড়িনি- না উনুনের, না সিগারেটের, ভেবেছিলাম, সম্রাটে সম্রাটে যুদ্ধ, দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেই ভাল। কিন্তু হাতিতে হাতিতে লড়াই হলেও নলখাগড়ার নিস্তার নাই দেখছি। কাজেই, আমাদেরও এবার আত্মরক্ষা করতে হবে। প’ড়ে প’ড়ে মার খাওয়ায় কোন পৌরুষ নেই।</p>
<p>পলিটিক্সের পাঁককে যাঁরা এতদিন ঘৃণা ক’রে এসেছেন, বেণু-বনের বাঁশের প্রতি তাঁদের এই আকস্মিক আসক্তি দেখে আমারই লজ্জা করছে- বাইরের লোক কি বলছে তা না-ই বললাম।</p>
<p>এ-বাঁশ ছোঁড়ারও তারিফ করতে হবে। কোনো বিশেষ একজনের শির লক্ষ্য করে না ছু’ড়ে এঁরা ছুঁড়ছেন একেবারে দল লক্ষ্য করে। কারণ, তাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার লজ্জা নেই। বীর বটে! এতদিন তাই পরাস্ত মেনেই চুপ ক’রে ছিলাম। কিন্তু ঐ চুপ করে থাকি বলেই ও-পক্ষ মনে করেন, আমরা জিতে গেলাম। তাই এবার মাথা বেছে বেছেই বাঁশ ছোড়া হচ্ছে- বাণ নয়।</p>
<p>অবশ্য, সে বাঁশে বাঁশীর মত গোটাকতক ফুটো ক’রে সুর ফোটাবার আয়াসেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তবু তার খোঁচা আর স্থলত্বই বলে, ও বাঁশী নয়- বাঁশ।</p>
<p>বীণাই শোভা পায় যাঁর হাতে, তাঁকেও লাঠি ঘুরাতে দেখলে দুঃখও হয়, হাঁসিও পায়। পালোয়ানী মাতামাতিতে কে যে কম যান, তা ত বলা দুষ্কর।…</p>
<p>আজকের ‘বাঙ্গলার কথা’য় দেখলাম- যিনি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের পক্ষ হয়ে পঞ্চ পাণ্ডবকে লাঞ্ছিত করবার সৈনাপত্য গ্রহণ করেছেন, আমাদের উভয় পক্ষের পূজ্য পিতামহ ভীষ্ম-সম সেই মহারথী কবি-গুরু এই অভিমন্যুবধে সায় দিয়েছেন। মহাভারতের ভীষ্ম এই অন্যায় যুদ্ধে সায় দেননি, বৃহত্তর ভারতের ভীষ্ম সায় দিয়েছেন- এইটেই এ যুগের পক্ষে সবচেয়ে পীড়াদায়ক।</p>
<p>এই অভিমন্যুর রক্ষী মনে ক’রে কবিগুরু আমায়ও বাণ নিক্ষেপ করতে ছাড়েন নি। তিনি বলেছেন, আমি কথায় কথায় ‘রক্ত’কে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি।</p>
<p>কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপী-পায়জামা পরেন, অথচ আমরা পরলেই তাঁর এত আক্রোশের কারণ হয়ে উঠি কেন, বুঝতে পারিনে।</p>
<p>এই আরবী-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।</p>
<p><strong>আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ ক’</strong><strong>রে আসছি। সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানী-টুপী ব্যবহার করেন, এমন কি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ওরিয়েন্টাল। কিন্তু ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তাঁরা হ’</strong><strong>য়ে যায় ‘</strong><strong>মিঞা সাহেব’</strong><strong>।</strong> মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুস্কিল- তবু ও নিয়ে ঠাট্রা বিদ্রূপের আর অন্ত নেই।</p>
<p>আমি ত টুপী পায়জামা শেরওয়ানী দাড়িকে বর্জন ক’রে চলেছি শুধু ঐ &#8216;মিঞা সাহেব’ বিদ্রূপের ভয়ে- তবুও নিস্তার নেই।</p>
<p>এইবার থেকে আদালতকে না হয় বিচারালয় বলব, কিন্তু নাজির পেশ্‌কার উকিল মোক্তারকে কী বলব?</p>
<p>কবি-গুরুর চিরন্তনের দোহাই নিতান্ত অচল। তিনি ইটালীকে উদ্দেশ ক’রে এক কবিতা লিখেছেন। তাতে- ‘উতারো ঘোম্‌টা’ তাঁকেও ব্যবহার করতে দেখেছি। ঘোম্‌টা-খোলা শোনাই আমাদের চিরন্তন অভ্যাস। ‘উতারো ঘোম্‌টা’ আমি লিখলে হয়ত সাহিত্যিকদের কাছে অপরাধীই হতাম। কিন্তু ‘উতারো’ কথাটা যে জাতেরই হোক, ওতে এক অপূর্ব সঙ্গীত ও শ্রীর উদ্বোধন হয়েছে ও-জায়গাটায়, তা ত কেউ অস্বীকার করবে না। ঐ একটু ভালো-শোনাবার লোভেই, ঐ একটি ভিন দেশী কথার প্রয়োগে অপূর্ব রূপ ও গতি দেওয়ার আনন্দেই আমিও আরবী-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করি। কবি-গুরুও কতদিন আলাপ-আলোচনায় এর সার্থকতার প্রশংসা করেছেন।</p>
<p><strong>আজ আমাদেরও মনে হচ্ছে, আজকের রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই চির-চেনা রবীন্দ্রনাথ নন। তাঁর পেছনের বৈয়াকরণ পণ্ডিত এসব বলাচ্ছে তাঁকে দিয়ে।</strong></p>
<p><strong>খুন্‌’ আমি ব্যবহার করি আমার কবিতায়, মুসলমানী বা বলশেভিকী রং দেওয়ার জন্য নয়। হয়ত কবি ও-দুটোর একটারও রং আজকাল পছন্দ করছেন না, তাই এত আক্ষেপ তাঁর।</strong></p>
<p>আমি শুধু ‘খুন্‌’ নয়- বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবী-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায়। আমার দিক থেকে ওর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীরও একটা মুসলমানী ঢং আছে। ও-সাজে তাঁর শ্রীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। স্বার্গীয় অজিত চক্রবর্তীও এ-ঢংএর ভূয়সী প্রশংসা ক’রে গেছেন। বাঙলা কাব্য-লক্ষ্মীকে দুটো ইরানী ‘জেওর’ পরালে তাঁর জাত যায় না, বরং তাঁকে আরও ‘খুবসুরত’ই দেখায়।</p>
<p>আজকের করা-রক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই ত মুসলমানী ঢং-এর। বাইরের এ ফর্মের প্রয়োজন ও সৌকুমার্য সকল শিল্পীই স্বীকার করেন। পণ্ডিত মালবিয়া স্বীকার করতে না পারেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথ স্বীকার করবেন।</p>
<p>তা ছাড়া যে ‘খুনে’র জন্য কবি-গুরু রাগ করেছেন, তা দিনরাত ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের কথায়, কালার বক্সে (colour box-এ) এবং তা খুন-করা, খুন-হওয়া ইত্যাদি খুনোখুনি ব্যাপারেই নয়। হৃদয়েরও ‘খুন-খারাবী’ হ’তে দেখি আজো এবং তা শুধু মুসলমান-পাড়া লেনেই হয় না। আমার একটা গানে আছে-</p>
<p><strong>‘উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’</strong></p>
<p><strong>এই গানটি সেদিন কবি-গুরুকে দুর্ভাগ্যক্রমে শুনিয়ে ফেলেছিলাম এবং এতেই হয়তো তাঁর ও কথার উল্লেখ। তিনি রক্তের পক্ষপাতী। অর্থাৎ ও লাইনটাকে ‘উদিবে সে রবি মোদেরি রক্তে রাঙিয়া পূর্নবার&#8217;ও করা চল্‌ত।</strong> চল্‌ত, কিন্তু ওতে ওর অর্ধেক ফোর্স কমে যেত। আমি যেখানে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহার করেছি, সে ঐরকম ন্যাশনাল সঙ্গীতে বা রুদ্ররসের কবিতায়। যেখানে ‘রক্তধারা’ লিখবার, সেখানে জোর করে খুনধারা লিখি নাই। তাই বলে রক্ত-খারাবীও লিখি নাই, হয় রক্তারক্তি, না হয় খুন-খারাবী লিখেছি।</p>
<p>কবিগুরু মনে করেন, রক্তের মানেটা আরো ব্যাপক। ওটা প্রেমের কবিতাতেও চলে। চলে, কিন্তু তখন ওতে রাগ মেশাতে হয়। প্রিয়ার গালে যেমন ‘খুন’ ফোটে না, তেমনি রক্তও ফোটে না- নেহাৎ দাঁত না ফুটালে। প্রিয়ার সাথে খুনা-খুনি খেলি না, কিন্তু খুন-সুড়ি হয়ত করি।</p>
<p>কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর আচকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে, ফুল-বনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুল্‌বুলির সুর।</p>
<p>এতেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল যাঁরা মনে করেন, তাঁরা সাহিত্য সভায় ভিড় না ক’রে হিন্দু-সভারই মেম্বার হন গিয়ে।</p>
<p>যে কবিগুরু অভিধান ছাড়া নূতন নূতন শব্দ সৃষ্টি করে ভাবীকালের জন্য আরো তিনটে অভিধানের সঞ্চয় রেখে গেলেন, তাঁর এই নূতন শব্দ-ভীতি দেখে আমরা বিস্মিত হই। মনে হয়, তাঁর আক্রোশের পেছনে অনেক কেহ এবং অনেক কিছু আছে। আরো মনে হয়, আমার শত্রু সাহিত্যকগণের অনেক দিনের অনেক মিথ্যা অভিযোগ জমে জমে ওঁর মনকে বিষিয়ে তুলেছে। নৈলে আরবী-ফার্সি শব্দের মোহ ত আমার আজকের নয়; এবং কবি-গুরুর সাথে আমার বা আমার কবিতার পরিচয়ও আজকের নয়। কই, এতদিন ত কোনো কথা উঠল না এ নিয়ে।</p>
<p>সবচেয়ে দুঃখ হয়, যখন দেখি কতকগুলো জোনাকিপোকা রবিলোকের বহু নিম্নে থেকেও কবিত্বের আস্ফালন করে। ভক্ত কি শুধু ঐ নোংরা লোকগুলোই, যারা রাত-দিন তাঁর কানের কাছে অন্যের কুৎসা গেয়ে তাঁর শান্ত সুন্দর মনকে নিরন্তন বিক্ষুব্ধ ক’রে তুলছে? আর, আমরা তাঁর কাছে ঘন ঘন যাইনে বলেই হয়ে গেলাম তাঁর শত্রু।</p>
<p>কবি-গুরুর কাছে প্রার্থনা, ঐ দৃতরাষ্ট্রের সেনাপতিত্ব তিনি করুন, দুঃখ নাই। কিন্তু ওদের প্ররোচনায় আমাদের প্রতি অহেতুক সন্দেহ পোষণ ক’রে যেন তাঁর মহিমাকে খর্ব না করেন।</p>
<p>সবচেয়ে কাছে যারা থাকে, দেব-মন্দিরের সেই পাণ্ডারাই দেবতার সবচেয়ে বড় ভক্ত নয়।</p>
<p>আরো একটা কথা। যেটা সম্বন্ধে কবি-গুরুর একটা খোলা কথা শুনতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য ক’রে ওঁর আজকালকার লেখাগুলোর সুর শুনে মনে হয়, আমাদের অভিশপ্ত জীবনের দারিদ্র্য নিয়েও যেন তিনি বিদ্রূপ করতে শুরু করেছেন।</p>
<p>আমাদের এই দুঃখকে কৃত্রিম বলে সন্দেহ করবার প্রচুর ঐশ্বর্য তাঁর আছে, জানি এবং এও জানি, তিনি জগতের সবচেয়ে বড় দুঃখ ঐ দারিদ্র ব্যতীত হয়ত আর সব দুঃখের সাথেই অল্প-বিস্তর পরিচিত। তাই এতে ব্যথা পেলেও রাগ করিনে।</p>
<p><strong>কি ভীষণ দারিদ্রর সঙ্গে সংগ্রাম করে অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটিয়ে আমাদের নতুন লেখকদের বেঁচে থাকতে হয়- লক্ষ্মীর কৃপায় কবি-গুরু কোনদিন আমাদের মত সাহিত্যিকের কুটীরে পদার্পণ করেন নি- হয়ত তাঁর মহিমা ক্ষুণ্ন হ’ত না তাতে- নৈলে দেখতে পেতেন, আমাদের জীবন-যাত্রার দৈন্য কত ভীষণ। এই দীন মলিন বেশ নিয়ে আমরা আছি দেশের একটেরে আত্মগোপন ক’রে। দেশে দেশে প্রোপাগাণ্ডা করা ত দূরের কথা, বাড়ী ছেড়ে পতে দাঁড়াতেও লজ্জা করে।</strong> কিছুতেই ছেঁড়া জামার তালিগুলোকে লুকাতে পারিনে। ভদ্র শিক্ষিতদের মাঝে ব’সে সর্বদাই মন খুঁত খুঁত করে, যেন কত বড় অপরাধ ক’রে ফেলেছি! বাইরের দৈন্য অভাব যত ভিতরে ভিতরে চাবকাতে থাকে, তত মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে।</p>
<p>কবি-গুরুর কাছেও শুধু ঐ দীনতার লজ্জাতেই যেতে পারিনে। ভয় হয়, এ লক্ষ্ণীছাড়া মূর্তি দেখে তাঁর দারোয়ানেরাই ঐ সুর-সভায় প্রবেশ করতে দেবে না। দীন ভক্ত তীর্থ যাত্রা করতে পারল না বলে দেবতা যদি অভিশাপ দেন, তা হ’লে এই পোড়া কপালকে দোষ দেওয়া ছাড়া কীই বা বলবার আছে!</p>
<p>তাঁর কাছে নিবেদন, তিনি যত ইচ্ছা বাণ নিক্ষেপ করুন, তা হয়ত সইবে, কিন্তু আমাদের একান্ত-আপনার এই দারিদ্র্য-যন্ত্রণাকে উপহাস করে যেন আর কাটাঘায়ে নুনের ছিটে না দেন। শুধু ঐ নির্মমতাটাই সইবে না।</p>
<p>কবি-গুরুর চরণে ভক্তের আর একটি সশ্রদ্ধ আবেদন- যদি আমাদের দোষত্রুটি হয়েই থাকে, গুরুর অধিকারে সস্নেহে তা দেখিয়ে দিন, আমরা শ্রদ্ধাবনত শিরে তাকে মেনে নিব। কিন্তু যারা শুধু কুৎসিৎ বিদ্রূপ আর গালিগালাজই করতে শিখেছে, তাঁকে তাদেরি বাহন হ’তে দেখলে আমাদের মাথা লজ্জায় বেদনায় আপনি হেঁট হয়ে যায়। বিশ্বকবি-সম্রাটের আসন-রবিলোক- কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির বহু ঊর্ধ্বে।</p>
<p>কথাসাহিত্য-সম্রাট শরৎচন্দ্র শনিবারের চিঠিওয়ালাদের কাছে আমায় গালিই দেন আর যাই করুন, (জানি না, এ সংবাদ সত্য কিনা) ঐ দারিদ্র্রটুকুর অসম্মান তিনি করতে পারেন নি। অসহায় মানুষের দুঃখ-বেদনাকে তিনি এত বড় কঁরে দেখেছেন বলেই আজ তাঁর আসন রবি-লোকের কাছাকাছি গিয়ে উঠেছে।</p>
<p>একদিন কথাশিল্পী সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম যে, শরৎচন্দ্র তাঁর বই-এর সমস্ত আয় দিয়ে পথের কুকুর’দের জন্য একটা মঠ তেরী ক’রে যাবেন। খেতে না পেয়ে পথে পথে ঘু’রে বেড়ায় যে সব হন্যে কুকুর, তারা আহার ও বাসস্থান পাবে ঐ মঠে- ফ্রি অব্ চার্জ। শরৎচন্দ্র নাকি জানতে পেরেছেন, ঐ সমস্ত পথের কুকুর পূর্বজন্মে সাহিত্যিক ছিল, ম’রে কুকুর হয়েছে। শুনলাম, ঐ মর্মে নাকি উইলও হয়ে গেছে।</p>
<p>ঐ গল্প শুনে আমি বারংবার শরৎচন্দ্রের উদ্দেশে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম ক’রে বলেছিলাম, ‘শরৎদা সত্যিই একজন মহাপুরুষ সত্যিই আমরা- সাহিত্যিকরা কুকুরের জাত। কুকুরের মতই আমরা না খেয়ে এবং কামড়া-কামড়ি ক’রে মরি। তাঁর সত্যিকার অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি আছে, তিনি সাহিত্যিকদের অবতার-রূপ দেখতে পেয়েছেন।’</p>
<p>আজ তাই একটি মাত্র প্রার্থনা, যদি পরজন্ম থাকেই, তবে আর যেন এদেশে কবি হয়ে না জন্মাই। যদি আসি, বরং শরৎচন্দ্রের মাঠের কুকুর হয়েই আসি যেন। নিশ্চিন্তে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচব।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/boror-pirity-balir-badh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15968</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে মুসলিম ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 14 Jul 2025 15:09:15 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15916</guid>

					<description><![CDATA[এক. আরবী ভাষায় একটা কথা আছে, উকুলুন না-সি আ&#8217;লা কদরি যামানিহিম। যার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতেই একজন মানুষের আকল ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়। জীবন চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন একেবারে স্বাভাবিকভাবেই এই কথাটি সত্য, সুদূর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>আরবী ভাষায় একটা কথা আছে, উকুলুন না-সি আ&#8217;লা কদরি যামানিহিম। যার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতেই একজন মানুষের আকল ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়। জীবন চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন একেবারে স্বাভাবিকভাবেই এই কথাটি সত্য, সুদূর অতীত থেকেই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তেমনি এই কথাটি সত্য। অতএব, কোনো একজন ব্যক্তি যখন অতীতকে কলমের ডগায় ফুটিয়ে তুলবেন, তখন সেই ব্যক্তির আশপাশ এবং তার চিন্তাভাবনা অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি উদার মনের হন তাহলে এক দৃষ্টিকোণ থেকে অতীতকে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করবেন, আর যদি তার পূর্বের সকল ধর্ম ও মতের উপর সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা না থাকে তাহলে তিনি একপেশে ইতিহাস চর্চা করবেন।</p>
<p>উপমহাদেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এই কথাটি একেবারে পুরোপুরি সত্য। উপমহাদেশের ইতিহাসে মুসলিমদের আগমনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। মুসলিম আগমনের পূর্বের ইতিহাসের চেয়ে পরবর্তী ইতিহাস শতগুণে সমৃদ্ধশালী। কিন্তু, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও ইতিহাস চর্চায় এই সমৃদ্ধশীল ইতিহাস বরাবরই কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে।</p>
<p>মুসলিমদের সমৃদ্ধশীল ইতিহাস হারিয়ে যাবার কারণ অন্য কোনো কিছু নয়, বরং ভারতীয় দাদাবাবুদের একপেশে ইতিহাস চর্চা, যা বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রসারের সাথেসাথে কলকাতার বর্ণহিন্দুদের ইতিহাস চর্চাও আমাদের মাঝে প্রবেশ করে। কারণ, ভারতের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে তারা ধরেই নেয় যে, ভারতের ইতিহাসের অর্থই হচ্ছে হিন্দুদের ইতিহাস, এখানে মুসলিমদের ঠাঁই দেওয়া উচিত না; কারণ মুসলিমরা বহিরাগত আর তারা আর্য। অবাক করার বিষয় হলো, বঙ্গভঙ্গ রদের বিপরীতে বাংলার মুসলিমদেরকে দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার স্বয়ং ঢাকার মাটিতে বসেই এই ধারার ইতিহাস চর্চা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>এইযে, ইতিহাস চর্চার এই ধারা, এর সূচনাটা করে দিয়েছে ইংরেজরা। ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের সবচেয়ে বহুল প্রসিদ্ধ নীতি—‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসিকে ব্রিটিশরা সমগ্র বিশ্বেই বাস্তবায়ন করেছে। আজকের ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার শুরুটা তারা এই নীতির উপর ভিত্তি করেই করেছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসন করার জন্য তারাই হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা করেছিলো। এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করেছে তাদের ব্রিটিশ বুদ্ধিকে। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা করতে তারা ব্যবহার করেছে ইতিহাসকে, ঠিক যেমনভাবে মিশরীয়দেরকে অতীতের কথা স্বরণ করিয়ে দিয়ে উসমানীয় এবং আরবদের থেকে আলাদা করেছিলো।</p>
<p>উপমহাদেশের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই কাজটা করেছে ম্যাক্স মুলার। ম্যাক্স মুলার প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ইরান থেকে আর্যদের একটি দল ইউরোপে গিয়েছিলো, যারাই সেসময় সমগ্র পৃথিবীতে বাণিজ্য করছিলো। আরেকটি দল ভারতীয় উপমহাদেশে চলে আসে, তারাই পরবর্তীতে হিন্দু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর মুসলিমরা এই ভূমির কেউ না, মাত্র কয়েকশ বছর আগে বাহির থেকে এসে হিন্দুদের উপর চেপে বসেছে। যদিও আজকের আধুনিক ইতিহাসবেত্তারা ম্যাক্স মুলারের এই তত্ত্বকে তথ্য-প্রমাণ দিয়েই খণ্ডন করেছেন।</p>
<p>ম্যাক্স মুলারের এমন তত্ত্বের পাশাপাশি ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠা করে দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি-র মতো প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই প্রকাশিত হওয়া প্রথমদিকের একটি গ্রন্থ হচ্ছে কর্নেল জেমস টড-এর অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান। এখানে রাজস্থানের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে মুসলিমদেরকে শত্রু ও বহিরাগত এবং হিন্দুদেরকে স্থানীয় ও নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছে ব্রিটিশরা। এরপর, ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে ‘হিন্দু’ পরিভাষাকে ভারতের মাটিতে একেবারে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে তারা। পরবর্তীতে, রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মীয় ছায়ার করতলে।</p>
<p>বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসগুলোতে সারাটা জীবনভর মুসলিমদেরকে শত্রু ও খলনায়ক বানিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো রবীন্দ্রনাথ মুসলিমদের উপর এতোটা কঠোর না হলেও মুসলিমদেরকে সবসময়ই তার উপন্যাসে নিচু জাতের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। জন ক্লার্ক মার্শম্যানের হিস্টোরি অব বেঙ্গল বইয়ে তিনি যতোটা না মুসলিমদের সমালোচনা করেছেন, তারচেয়ে শতগুণে বেশি মুসলিমদের অপমান করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বইয়ের অনুবাদ করতে গিয়ে। নীহাররঞ্জন রায়ের দৃষ্টিতে তো মুসলিমরা কোনো স্থানই পায়নি।</p>
<p>এরপর গত শতকে এসে বাংলার ভূমিতে বসেই বাংলার মুসলমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েও রমেশচন্দ্র মজুমদার ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করেছেন। অথচ, তিনিই ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী তৈরির পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন এবং সূর্যসেন, প্রীতিলদা এবং লীলানাগদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো উৎসাহ দিতে থাকেন। আর পরবর্তীতে গিয়ে তার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যান যদুনাথ সরকার। যদুনাথ সরকার তো পলাশীর পতনে রীতিমতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, তিনি এটাকে ভারতীয় উপমহাদেশের নতুন সূর্যোদয় বলেও অভিহিত করেছেন। এমনকি, মুসলিমদের পতনকে তিনি বাংলার রেনেসাঁ পর্যন্ত বলেছেন।</p>
<p>অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, উপমহাদেশের ভূমিতে জনসংখ্যার অনুপাতে অতি সামান্য এই মুসলিমরা দীর্ঘ ৫০০ বছর শাসন করার কারণ এটাই যে, নিম্নবর্গের হিন্দুরা গণহারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। এখানে শুধু নিম্নবর্গীয় হিন্দুরাই মুসলিম হয়েছে, উচ্চবর্গের কোনো হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। আর যদিও-বা উচ্চবর্গের কোনো হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেও থাকে, তা ছিলো খুবই কম অথবা মুসলিম শাসকরা স্থানীয় নারীদের জোরজবরদস্তি করে বিবাহ করায় তারা মুসলিম হয়েছে।</p>
<p>আর এই ইতিহাসবেত্তারা এটাও বলেন যে, যেহেতু হিন্দুরা না বুঝেই মুসলিম হয়েছে, তাই তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও ইসলামের বিধিবিধান পালনের চেয়ে পূর্বের ধর্মের সংস্কৃতিই বেশি পালন করতো। আর এভাবেই ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান একটা সময় হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং আবারো পূর্বের মতোই ভারতীয় সংস্কৃতি বা হিন্দুদের সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করতে শুরু করে। আর এই তত্ত্বের অন্যতম একজন ধ্বজাধারী হলেন অসীম রায়।</p>
<p>এখানে অবাক করার বিষয় হলো, ইসলাম ও মুসলিমদের উপর এমন অপবাদ চাপিয়ে দেওয়া এই তত্ত্বের ধ্বজাধারীরা একদিকে যেমন হিন্দু, অন্যদিকে আবার হিন্দু না হলেও তারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের একান্ত ও একনিষ্ঠ ভক্ত।</p>
<p>যাইহোক, এই ধারার ইতিহাসের আলোকে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। যেমন,</p>
<ul>
<li>১. মুসলিমরা বহিরাগত এবং স্থানীয়দের শত্রু;</li>
<li>২. হিন্দুরা স্থানীয় ও ভারতের মহানায়ক;</li>
<li>৩. ভারতের ইতিহাস বলতেই মূলত হিন্দুদের ইতিহাস;</li>
<li>৪. নিম্নবর্গের হিন্দুরাই শুধু মুসলিম হয়েছে, তা-ও না বুঝে;</li>
<li>৫. কালের গর্ভে ইসলাম হারিয়ে গিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>কিন্তু, প্রকৃত ইতিহাস কি আসলেও তাই বলে?<br />
ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের এমন বিকৃত ইতিহাস এবং হিন্দুত্ববাদের এমন একপেশে ইতিহাসের বিপরীতে মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে কলম ধরা ইতিহাসবেত্তা যে নেই, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। বরং, ডক্টর মো. মোহর আলী এবং এম. এ. রহিম মুসলিম জাতিসত্তার ক্ষেত্রে অনন্য দু&#8217;টি নাম।</p>
<p>দীর্ঘ ১০ বছরের গবেষণার ফসল হিসেবে ডক্টর মো. মোহর আলী চার খণ্ডের বৃহদাকার যে হিস্টোরি অব মুসলিম বেঙ্গল বইটি লিখেছেন, তা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সভ্যতার এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়। যদুনাথ সরকার যেমন শুধু সময়ের ধারাবাহিক ঘটনাকে তুলে ধরেছেন, ডক্টর মো. মোহর আলী তার সম্পূর্ণ উল্টোপথে হেঁটেছেন। অতীতের শিলালিপি, সরকারি সনদ, ফরমান, গেজেট এবং বাংলা, ইংরেজি আরবী ও ফারসি ভাষার সাহায্য নিয়ে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনামূলক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন তিনি। ডক্টর মো. মোহর আলী তার গ্রন্থে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, উত্তর ভারতের উপর মুসলিম বাংলার যে প্রভাব ছিলো, তা মুসলিম বাংলার অনন্য উচ্চতার পরিচয় তুলে ধরে।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলিম ইতিহাস বিলুপ্ত করণের যে প্রচেষ্টা চালানো হয় এবং ইসলামকে হিন্দু ধর্মের মাঝে হারিয়ে যাওয়া একটা ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়, ডক্টর মো. মোহর আলী সেখানেও গবেষণা ও পর্যালোচনা করে এই মতাদর্শের বিপরীতে হাঁটেন। আর এমনটা হবেই না কেন? অসীম রায়ের মতো কেউ যদি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েই এমন বিকৃত ইতিহাস লেখে যে, ইসলাম হিন্দুধর্মের মাঝে হারিয়ে গেছে অথবা হিন্দুরা মুসলিমদের আখলাকে প্রভাবিত না হয়ে বরং হুজুগের কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, তাহলে বলতেই হয় যে, সে ইতিহাসবেত্তা ইসলাম সম্পর্কে সঠিকটা না জেনেই ইসলামের ইতিহাস লেখতে কলম ধরেছে।</p>
<p>বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের পক্ষে কলম ধরা আরেকজন অগ্রসেনানী হলেন মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। বাংলার মুসলিম ইতিহাসের ক্ষেত্রে বস্তুনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী ধারার সূচনা করেন তিনি। বাংলার মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি দীর্ঘসময় গবেষণা করেন। এসব গবেষণা থেকেই তিনি মুসলিম আমলের উপর দুই খণ্ডের ‘বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস’ গ্রন্থ লেখেন, যা আজও ভারতীয় ইতিহাসের মৌলিক ধারার অন্যতম একটি গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।</p>
<p>বাংলার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, বাংলা ভাষা এবং মুসলিম ও ভারতীয় সংস্কৃতি-র বিষয়গুলোকে সামনে রেখে মুসলিমদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেন মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম একত্রিত হয়ে যাওয়া, মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য না থাকা এবং মুসলিমদের বহিরাগত হওয়া নিয়ে যে বিকৃত ইতিহাস চর্চা হয় আমাদের দেশে, ‘বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস’ বইয়ের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এই অধ্যাপক প্রমাণ সহকারে তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেন।</p>
<p>ডক্টর মো. মোহর আলী এবং এম. এ. রহিম-এর পাশাপাশি মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন হলেন আবদুল করিম এবং ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’ থেকে মোঘল আমলে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসের উপরেই পাঁচ খণ্ডের বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে অন্যতম একটি মূল কারণ এটাই ছিলো যে, যদুনাথ সরকারের সম্পাদিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হওয়া হিস্টোরি অব বেঙ্গল বইয়ের ভুলভ্রান্তির বিপরীতে স্বচ্ছ ইতিহাস তুলে ধরা।</p>
<p>আর বর্তমান সময়ে এসে আমাদের মুসলিম ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন এমন দুইজন ব্যক্তি হলেন এবনে গোলাম সামাদ এবং সরদার আবদুর রহমান। বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির অবদান এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্ট বিকৃত ইতিহাসের বিপরীতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সরদার আবদুর রহমান। অন্যদিকে, ব্রিটিশদের অর্থায়নে সৃষ্ট হিন্দুদের আর্যতত্ত্ব, মুসলিমদের বহিরাগত তত্ত্ব এবং নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের মুসলিম হবার তত্ত্বের মতো বিকৃত ইতিহাসের ধারাকে বেশ যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে খণ্ডানোর চেষ্টা করেছেন এবনে গোলাম সামাদ। এছাড়াও রয়েছেন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, ফাহমিদ-উর-রহমান এবং ফয়েজ আলম—সহ আরো অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>এইযে, সম্পূর্ণরূপে পরস্পর বিপরীতমুখী ইতিহাসের দু&#8217;টি ধারার সৃষ্টি হওয়া—এটিই আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে উপলব্ধি করায় যে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের প্রভাবে বিকৃত এবং একপেশে ইতিহাসের যে ধারাটি প্রচলিত হয়ে আছে, তার বিপরীতে কলম ধরা প্রত্যেক ইতিহাসবেত্তারই একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। ব্রিটিশরা যদি এমন বিকৃত ইতিহাস তৈরির পেছনে অর্থায়ন না-ই করতো, তাহলে হয়তো আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসটাই ভিন্নরকম হতো; অথবা বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাসটাও অনন্যমাত্রা লাভ করতো।</p>
<p>পৌনে দুইশ বছর ধরে ব্রিটিশরা যে ধারা তৈরি করে দিয়ে গেছে, তার বিপরীতে মাত্র ৫০-৬০ বছরের গবেষণামূলক কার্যক্রম সত্যিকারার্থেই খুব একটা বেশি সময় নয়। তার উপর আবার রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়া বুদ্ধিজীবী নামক একটি সমাজ, যারা বাংলার ভূমিতে বসবাস করেই মুসলিম জাতিসত্তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে সিদ্ধহস্ত।</p>
<p>আর এর পাশাপাশি রয়েছে আমাদের অসচেতনতা এবং অজ্ঞতা। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে ডক্টর মো. মোহর আলী, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, আবদুল করিম এবং ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক—এর মতো ইতিহাসবেত্তারা যে পরিশ্রম করে গিয়েছেন, তার যথাযথ মর্যাদা দিতে আমরা বরাবরই অপারগতা প্রকাশ করে আসছি। এমনকি, আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট যেনো এসব নাম একেবারেই অপরিচিত। তার বিপরীতে বরং রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার এবং অসীম রায়েরাই যেনো বহুল পরিচিত।</p>
<p>অতএব, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সময় এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করার। সময় এসেছে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজম এবং ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রভাবে সৃষ্ট বিকৃত ইতিহাসকে ছুঁড়ে ফেলার। সময় এসেছে বাংলাদেশী মুসলিম জাতিসত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পূরণ করার।</p>
<p>তাই, বাংলার মুসলিমদের মাঝে উম্মাহ চেতনাকে সমুন্নত করা এবং মুসলিম জাতিসত্তার আত্মপরিচয়কে পুনর্জাগরিত করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দেবার এখনই উপযুক্ত সময়। কেননা, কোনো একটি জাতির সঠিক ইতিহাসই সেই জাতির জাতিসত্তাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে, তাদের আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে এবং তাদের মাঝে অবিনশ্বর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15916</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম শিল্পের একত্ব এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীগণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-unity-of-muslim-art-and-its-rivals/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-unity-of-muslim-art-and-its-rivals/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 26 Sep 2024 17:27:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14875</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী শিল্পকলার একত্ব নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন। যদিও, ইতিহাসবিদেরা ভৌগোলিক বা কালানুক্রমিকভাবে পৃথক বিপুলসংখ্যক বিচিত্র মোটিফসমূহ উপাদান-উপকরণ এবং রীতিপ্রকরণ লক্ষ্য করে থাকেন, তবুও সমস্ত ইসলামী শিল্পকলার প্রবল বাস্তবতা হচ্ছে এর উদ্দেশ্য ও রূপের একত্ব। কর্ডোভা থেকে মিন্দানাও পর্যন্ত দেশগুলো ইসলামে দীক্ষিত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী শিল্পকলার একত্ব নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন। যদিও, ইতিহাসবিদেরা ভৌগোলিক বা কালানুক্রমিকভাবে পৃথক বিপুলসংখ্যক বিচিত্র মোটিফসমূহ উপাদান-উপকরণ এবং রীতিপ্রকরণ লক্ষ্য করে থাকেন, <em>তবুও</em> <em>সমস্ত</em> <em>ইসলামী</em> <em>শিল্পকলার</em> <em>প্রবল</em> <em>বাস্তবতা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>এর</em> <em>উদ্দেশ্য</em> <em>ও</em> <em>রূপের</em> <em>একত্ব</em><em>।</em> <strong>কর্ডোভা</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>মিন্দানাও</strong> <strong>পর্যন্ত</strong> <strong>দেশগুলো</strong> <strong>ইসলামে</strong> <strong>দীক্ষিত</strong> <strong>হবার</strong> <strong>পরই</strong> <strong>এর</strong> <strong>শিল্পকলায়</strong> <strong>একই</strong> <strong>রকম</strong> <strong>গঠনগত</strong> <strong>বৈশিষ্ট্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>বিকাশ</strong> <strong>স্পষ্ট</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>উঠে</strong><strong>।</strong> এতে দেখা যায়, রীতি বা শৈলির অগ্রাধিকার এবং অন্তহীনতার অগ্রাধিকার। সমস্ত ইসলামী শিল্পকলায় কুরআন এবং হাদীসের অতিশয় উদ্দীপক শব্দমালা, আরবী এবং ইরানী কাব্যের অথবা ইসলামী সাহিত্যের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভিব্যক্তিগুলোর শরণ নিয়েছে এবং সেগুলো ব্যবহার করেছে, আরবী লিখন শিল্প বা ক্যালিগ্রাফিতে সেসবের রূপ দিয়েছে। একইভাবে, যুগের পর যুগ ধরে সকল মুসলমান কোরআন তেলাওয়াতে এবং আযানে সাড়া দিয়েছে গভীরতম আবেগের সঙ্গে, এমন কি সেসবের আরবী অর্থ সামান্য বুঝে বা না বুঝেই। এসব ক্ষেত্রে তাদের বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গমনকারী যুক্তি এবং বিচার বুদ্ধি, বোধশক্তি সক্রিয় না হলেও তাতে ইন্দ্রিয়জ এবং ইনটুইটিভ বৃত্তিসমূহ সম্পূর্ণ সক্রিয় হয়ে ওঠে- এসথেটিক বা নান্দনিক মূল্যগুলোর মান লাভের প্রত্যাশ্যায়। প্রকৃতপক্ষে তাদের নান্দনিক উপলব্ধি, যাদের তাত্ত্বিক উপলব্ধি পঠন এবং প্রণিধানের জন্য যথেষ্ট, তাদের এসথেটিক উপলব্ধির মতই একইরূপ প্রবল- কেননা নান্দনিক মূল্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে আশু ইনটুইশন হামেশাই অগ্রবর্তী। এক্ষেত্রে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরগামী বোধশক্তি যেন একটি গৌণভূমিকা পালন করে, কেবলমাত্র সহযোগিতার হাতই প্রসারিত করে। ইসলামের নান্দনিক মূল্যের শক্তি এবং তার শৈল্পিক একত্ব, যা চূড়ান্ত রকমে স্বতন্ত্র ও বিচিত্র সাংস্কৃতিক সমাবেশের মধ্যে থেকে এমনিতরো শৈল্পিক একত্ব সৃষ্টি করে যে, <strong>আটলান্টিকের</strong> <strong>পূর্ব</strong> <strong>উপকূল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>প্রশান্ত</strong> <strong>মহাসাগরের</strong> <strong>পশ্চিম</strong> <strong>তীর</strong> <strong>পর্যন্ত</strong><strong>, </strong><strong>যে</strong> <strong>পর্যটক</strong> <strong>সফর</strong> <strong>করে</strong> <strong>সে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>একটি</strong> <strong>অঞ্চলে</strong> <strong>ভ্রমণ</strong> <strong>করে</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>এর</strong> <strong>ইসলামিক</strong> <strong>স্থাপত্যের</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>লতাপাতার</strong> <strong>শিল্পরূপ</strong> <strong>ও</strong> <strong>আরবী</strong> <strong>লিখন</strong> <strong>ও</strong> <strong>শিল্প</strong> <strong>পদ্ধতির</strong> <strong>দ্বারা</strong> <strong>অলংকৃতকরণে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong> <strong>তার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সুপরিচিত</strong> <strong>ঠেকে</strong><strong>।</strong> <strong>ভিন্ন</strong> <strong>ভিন্ন</strong> <strong>জাতি</strong><strong>, </strong><strong>বর্ণ</strong><strong>, </strong><strong>ভাষা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>জীবন</strong> <strong>পদ্ধতির</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>দৈনন্দিন</strong> <strong>জীবনে</strong> <strong>যে</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>ইসলাম</strong> <strong>যে</strong> <strong>সাহিত্যিক</strong> <strong>দৃষ্টিকার্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সাং</strong><strong>গী</strong><strong>তিক</strong> <strong>মূল্য</strong> <strong>সৃষ্টি</strong> <strong>করেছে</strong><strong>, </strong><strong>সে</strong> <strong>বিষয়ে</strong> <strong>সে</strong> <strong>উপলব্ধি</strong> <strong>করে</strong> <strong>একটি</strong> <strong>অভিন্ন</strong> <strong>অনুভূতি<sup>১</sup></strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8220;Misconceptions on the Nature of Islamic Art&#8221; শীর্ষক যে প্রবন্ধটির প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছে<sup>২</sup>, তাতে আমরা অলংকরণ, চিত্রণ, স্থাপত্য, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং শিল্পতত্ত্বের ক্ষেত্রে তথাকথিত প্রাচ্যবিদ পন্ডিতদের পান্ডিত্যের কিছু নমুনা তুলে ধরেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা একজন করে জাঁদরেল পাশ্চাত্য পন্ডিত্যের মতামত নিয়ে আলোচনা করেছি, যেমন, Richard Ettinghausen. H. G. Farmer, M. S. Dimand, T. W. Arnold, E. Herzfeld, K. A. C. Creswell, G. Von Grunebaum. এঁদের প্রত্যেকরই খ্যাতির মূলে রয়েছে অংশত বা সম্পূর্ণত অবদানের জন্য। এদের প্রত্যেকেই এই ভ্রান্ত ধারণা, বরং বলা যায়, এই পক্ষপাতদুষ্টতার শিকার হয়েছেন যে, যুগ যুগ ধরে মুসলিম জাতির শিল্পকলায় কোন অবদান রাখা তো দূরের কথা, বিপরীত পক্ষে, ইসলাম শিল্পকলাকে বাধাগ্রস্থ বা সীমিত করেছে, এবং তাতে করে, তাদের শৈল্পিক প্রবণতাগুলোকে নষ্ট করেছে। ইসলামের নন্দনতাত্ত্বিক বিকাশের একমাত্র দৃষ্টান্ত হচ্ছে আরবী, কোরআনিক আইনগুলো তর্জমার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য ভঙ্গের মধ্যে Ettinghausen সেই মনোপলির অবসানের সূচনায় কিছুটা মজার সঙ্গে উপভোগ করেছেন। প্রত্যেকেই দেখবার চেষ্টা করেছেন অন্ধগোড়ামী থেকে মুক্ত, যে শিল্পকর্মই মুসলমানরা সৃষ্টি করেছে, তা তারা করতে পেরেছে ইসলামকে ডিঙ্গিয়ে এবং ইসলামের নির্দেশমালাকে লংঘন করে। তাদের মতে মুসলিম অভিজাত বা রাজন্যবর্গ তাদের মহলে বা পাঠাগারে মানুষ এবং জীবজন্তুর চিত্রিত প্রতিকৃতি উপভোগ করেছেন এবং এসবের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, এবং তৎসহ তারা সঙ্গীতেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, ইসলামের নির্দেশ অমান্য করে যে &#8220;সঙ্গীত মাদকতা সৃষ্টি করে এবং ব্যভিচারে উৎসাহিত করে।&#8221; তারা সামান্যই উপলব্ধি করেছেন যে, নান্দনিকতার দিক দিয়ে তথাকথিত পাপাশ্রয়ী শিল্পকলা, পুরোপুরি ইসলাম সম্মতই বটে- মুসলিম বিশ্বের শিল্পকলার সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের মধ্যে অনু পরিমাণ স্থান দখল করে আছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এদের মধ্যে কেউ কেউ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যারও প্রয়াস পেয়েছেন। প্রকৃতি শূন্যতা বরদাস্ত করেনা, এই যুক্তিতে তারা দাবী করেন যে, মুসলমান আর্টিষ্টরা তাদের সকল শিল্পকর্মের সম্মুখ ভাগ নক্সার দ্বারা আচ্ছাদিত করেছে। কেউ কেউ সম্পূর্ণ বিপরীত মত পেশ করেছেন। তাদের যুক্তি এই যে, মুসলিম শিল্পীরা রঙ বা বর্ণপাগল, যারা সাদামাটাভাবে শূন্য রংয়ের উজ্জ্বল ঝলক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এবং এতে করে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিভার জন্য যে সাধনা এবং আগ্রহ আবশ্যক তা লাঘব করে কতিপয় রংয়ের নেশায় বিনষ্ট শিল্পী শিল্পকর্মকে কেবলমাত্র মোহ সৃষ্টির প্রয়াসে পর্যবসিত করেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে এদের কারোরই একথা কখনো মনে হয়নি যে, তারা পাশ্চাত্য শিল্পকলার লক্ষ্য ও মান অনুযায়ী ইসলামী শিল্পকলার বিচার করছেন, এবং কখনো কেউ এই অভিযোগটি উত্থাপন করেননি। <em>মুসলিম</em> <em>সংস্কৃতির</em> <em>প্রকাশক</em> <em>শিল্পকর্মের</em> <em>যে</em> <em>ব্যাখ্যা</em> <em>তারা</em> <em>দিয়েছেন</em> <em>তা</em> <em>বিভ্রান্তিকর</em><em>, </em><em>মানুষের</em> <em>এতে</em> <em>হাসি</em> <em>পায়</em><em>।</em> Titus Burckhardt এবং Louis Massignon এর ব্যাখ্যায় সত্যদর্শনের সাফল্যেরর ঝলক এবং ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে Earnst Kuhnel এর ঠাণ্ডা আত্মসংযমকে বাদ দিলে, ইসলামী আর্টের ইতিহাসবিদেরা একমত হয়ে পাশ্চাত্য নতুন তত্ত্বের আলোকে ইসলামী শিল্পকর্মের বিচার করেছে। এদের প্রত্যেকেই হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছেন এমন এক শিল্পকর্মে যাতে কোনো প্রতিমা, প্রতিকৃতি নেই। <em>নাটক</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>প্রকৃতিবাদ</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>গ্রন্থাদি</em> <em>পাঠ</em> <em>করে</em> <em>তাতে</em> <em>প্রত্যেকেই</em> <em>বিভ্রান্ত</em> <em>হন</em><em>, </em><em>কারণ</em> <em>তারা</em> <em>এতে</em> <em>পাশ্চাত্য</em> <em>শিল্পের</em> <em>এমন</em> <em>কিছুই</em> <em>পাননা</em> <em>যার</em> <em>সঙ্গে</em> <em>ইসলামী</em> <em>শিল্পকর্মকে</em> <em>সম্পৃক্ত</em> <em>করতে</em> <em>পারেন</em><em>।</em> <em>তারা</em> <em>বিভ্রান্ত</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আধ্যাত্মিক</em> <em>বিরূপ</em> <em>প্রতিক্রিয়ার</em> <em>সঙ্গে</em> <em>ইসলামী</em> <em>শিল্পকর্মের</em> <em>উপর</em> <em>তারা</em> <em>তাদের</em> <em>আগাম</em> <em>রায়</em> <em>দিয়ে</em> <em>বসেছেন</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আর একটি প্রবন্ধনের মাধ্যমে<sup>৩</sup> আমরা গ্রীক শিল্পের প্রকৃতি এবং আলেকজান্ডারের অভিযানের পর থেকে গ্রীক-শিল্পের প্রতি নিকটপ্রাচ্যের শিল্প ঐতিহ্যের প্রতিক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছি। গ্রীক শিল্পের সারকথা হচ্ছে প্রকৃতিবাদ, তবে একথা মনে করা ঠিক হবেনা যে গ্রীক শিল্প প্রকৃতির সরল ফটোগ্রাফিক অনুকরণমাত্র, বরং এ হচ্ছে একটি প্রাকসিদ্ধ ধারণার ইন্দ্রিয়জ সম্পদের প্রতিরূপ, যে ধারণাটিকে প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণার অংশত তাৎক্ষণিক রূপ। প্রকৃতি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টির মধ্যে স্থাপন করেছে সনাতন গ্রীক সংস্কৃতির পর্বতশীর্ষ এলাকায় দীর্ঘসরু উঁচুভূমির অনুরূপ একটি ধারণা। তার থিওরির মতে, পাথর কেঁটে মানুষের প্রতিমা নির্মাণ হচ্ছে সর্বোচ্চ শিল্প। মানুষের সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে, সে প্রকৃতির সবচেয়ে ঐশ্বর্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে জটিল entelechy। এর গভীরতা এবং অন্তর্গত বৈচিত্র্য হচ্ছে শিল্পীর অনুসন্ধান আবিষ্কার ও প্রকাশের জন্য একটি অন্তহীন খনি। এই কারণেই মানুষ হচ্ছে &#8220;সমস্ত কিছুর বিচার ও পরিমাপের মানদন্ড&#8221;। সে সৃষ্টির চূড়া সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সকল প্রকার মূল্যের বাহক ও কংক্রীট রূপদাতা। এ কারণে খোদ ঐশী সত্ত্বাকে ধারণা করা হয়েছে তার প্রতিমূর্তিতে, ধর্মকে মনে করা হয়েছে মানবতাবাদ এবং ঐশী সত্ত্বার উপাসনা হয়েছে মানুষের অন্তরতম প্রকৃতির অন্তহীন গভীরতা এবং বৈচিত্র্যের অনুধ্যান। গ্রীক বা হেলেনিক সংস্কৃতির এই সার নির্যাসের প্রতিফলনই সমগ্র হেলেনিক সভ্যতার শিল্পের জন্য আবশ্যক হয়ে উঠেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>নিকটপ্রাচ্য আমাদের সামনে উপস্থাপন করে একটি সম্পূর্ণ বিপরীত ঐতিহ্য। এখানে মানুষ হচ্ছে ঐশী সত্ত্বার একটি নিমিত্তক মাত্র, যাকে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন ইবাদত করার জন্য। মানুষ কখনোই নিজেই কোন চরম লক্ষ্য নয় এবং নিশ্চয়ই কোনো কিছুর পরিমাপের মানদন্ড নয়। মানদন্ড ঐশী সত্ত্বা স্থাপন করেন। এই মানদন্ড থেকে নিষ্পন্ন বিধিবিধানসমূহ মানুষের জন্য আইন। এখানে কোনো প্রমিথিউস নেই, স্রষ্টার ভূমিতে আছে কেবল একজন দাস বা ভৃত্য, যে আদেশ পালন করলে আশীষ লাভ করে, আদেশ পালনে ভুল করলে আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় এবং আদেশ লংঘন করলে ধ্বংস হয়। অবশ্য আল্লাহর ঐশীত্ব হচ্ছে একটি mysterium, একটি tremendum এবং একটি fascinosum। একারণে আল্লাহর ঐশী হচ্ছে মানুষের একটি আবিষ্টতা, তার স্থির ধারণা, তার সার্বক্ষণিক চিন্তা হচ্ছে এই ঐশী অভিপ্রায় কি এবং তা কিভাবে কাজ করে; আল্লাহ কেন্দ্রীকতাই হচ্ছে তার ভাগ্য। এ থেকেই মানুষ অর্জন করে তার তাৎপর্যতার গৌরব এবং তার বিশ্বজাগতিক মর্যাদা। অপরিহার্যভাবেই তাই নিকটপ্রাচ্যের সভ্যতা হচ্ছে নিকটপ্রাচ্য সংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্যের একটি প্রকাশ।</p></blockquote>
<p>প্রকৃতি এবং সর্বোপরি মানব প্রকৃতি হচ্ছে ঐশী স্থান দখলের প্রবলতম প্রতিযোগী এবং প্রমিথিউস মোটেই কোন কাহিনী নয়, বরং প্রভৃত্ব অর্জনের জন্য ঐশী সত্ত্বার সঙ্গে মানুষের সংগ্রামের মিত্র কাব্যিক উপাখ্যান মাত্র। প্রথমত, নিকটবর্তী গ্রীস এবং মিশর ঐশী সত্ত্বা এবং প্রকৃতি বিষয়ে যে ধরনের প্রলোভন এবং বিভ্রান্ত সৃষ্টি করেছে তা অবশ্যই রুখতে হবে এবং চৈতন্য থেকে নির্বাসিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমস্ত চৈতন্যকে অবশ্যই নিমগ্ন করতে হবে ঐশী এলাকার অভ্যন্তরে যা হচ্ছে এর উৎস, এর আদর্শ, এর প্রভু এবং ভাগ্য। তাই আলেকজান্ডারের অনেক পূর্বে নিকটপ্রাচ্যের শিল্প প্রকৃতিবাদ থেকে বন্ধন মুক্তির জন্য ষ্টাইলাইজেসন উদ্ভাবন করে। নিশ্চয়ই নিকটপ্রাচ্য যখন গ্রীকদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং নিকটপ্রাচ্যের জনমানুষের উপর গ্রীক সভ্যতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ষ্টাইলাইজেসন বা শৈলীকরণ আরো প্রবল এবং আরো জোরদার হয়ে উঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইহুদীদের নিকটপ্রাচ্যের আর একটি সংস্কৃতি এবং ধর্ম ইহুদীবাদ, সাম্রাজ্যবাদী হেলেনিজমের মোকাবেলা করে সাহসিকতার সঙ্গে এবং সম্ভবত সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় দূর্ঘটনা হচ্ছে Philo। আধুনিক কালে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এবং ধর্ম দ্বারা এর সৌন্দর্যতাত্ত্বিক অভিন্দ্রিয়তা অংশত বিকৃত হয়ে পড়লে, বিশেষ করে ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের আবির্ভাবকাল থেকে সেই বেপরোয়া অযৌক্তিক এবং বৈশেষিক প্রকৃতিবাদীর আর্বিভাবের পর, জাতি, জনগোষ্ঠী, রক্ত ও বালি, মা-রাশিয়া, ঈশ্বর-রাজা- দেশ ইত্যাদির অন্ধ মোকাবেলায় ইহুদীদের বিশ্বস্ততার সঙ্গে মূল নিকটপ্রাচ্যের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তার শিল্পকলাকে অনুসরণ করেছে। <em>&#8220;</em><em>তুমি</em> <em>খোদাই</em> <em>করে</em> <em>কোন</em> <em>প্রতিমা</em> <em>বানাবেনা</em><em>&#8220;- </em><em>এই</em> <em>নির্দেশকে</em> <em>ইহুদীরা</em> <em>পৌত্তলিকতার</em> <em>বিরুদ্ধে</em> <em>কেবল</em> <em>একটি</em> <em>আত্মরক্ষার</em> <em>নির্দেশ</em> <em>হিসেবেই</em> <em>দেখেনি</em> <em>বরং</em> <em>নন্দনতত্ত্বের</em> <em>একটি</em> <em>মূলনীতি</em> <em>হিসেবে</em> <em>উপলব্ধি</em> <em>করেছে</em><em>।</em> তাদের সিনাগণগুলো শিল্পকর্মের দিক দিয়ে শূন্যই ছিল, মুসলিম বিশ্ব ছাড়া অন্য সর্বত্র, মুসলিম বিশ্বে তারা ইসলামের বিকাশমান অগ্রগতিকে অনুকরণ করেছে। পবিত্র গ্রন্থের কাব্য মাধুর্যের দ্বারা তাদের নন্দনতাত্ত্বিক চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ হয় এবং ঐশী সত্ত্বাকে প্রত্যক্ষ করার ব্যাপারে তাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সকল দাবী অস্বীকৃত হয়। তাদের বিশ্বাস দাবী করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঐশী সত্ত্বাকে এই ধরনের স্নায়বিক ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়া স্বজ্ঞার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হবে। আর তা না হলে তা ঐশী সত্ত্বাই নয়। সমস্ত সত্ত্বার আদি নীতি স্বজ্ঞার মাধ্যমে উপলব্ধির প্রয়াসে ইন্দ্রিয়ের সাহায্য যত নেয়া হবে, ততই সে স্বজ্ঞার বিষয় হবে অধিকতর ইন্দ্রিয়াতীত, ততই দৃষ্টি হবে বিশুদ্ধতর<sup>৪</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা</p>
<p>১. এই সিদ্ধান্তের প্রমাণ এই বাস্তবতা যে, মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র একই এসথেটিক মূল্যগুলোর প্রাধান্য, মূল্যন্তর বিন্যাসের শীর্ষবিন্দুতে রয়েছে সুন্দর, আরবী ক্যালিগ্রাফিক, কুরআনুল কারীম কপি করার পূণ্য; কুরআনের আয়াত দ্বারা মানুষের বাড়ি-ঘর, মসজিদ, সরকারী দালানকোঠা অলংকরণ, একটি মাত্রার স্বল্প কয়েকটি সূরের উপর ভিত্তি করে উৎপন্ন রাগিনীতে তা আবৃত্তি করা এবং এর বিশিষ্ট্যত্বক শব্দগুলোর দ্বারা সাহিত্যিক পত্র-পুস্তুকাদির অলংকরণ।</p>
<p>২. দ্র: বর্তমান গ্রন্থকারের প্রবন্ধ &#8230;. &#8220;Misconception of the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; Islam and the Modern Age, vol. I. No 2. (May 1970) পৃ. ২৯-৪৯।</p>
<p>৩. দ্র: বর্তমান গ্রন্থকারের প্রবন্ধ &#8230;. &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; Islam and the Modern Age. vol. I. No 2. (August 1970) পৃ. ৬৪-৮১।</p>
<p>৪. অতিবর্তিতা বা অতীন্দ্রিয়তার সংজ্ঞার একটি আবশ্যক শর্ত এই যে, যুক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা সরাসরি অতিবর্তী বা অতীন্দ্রিয়কে উপলব্ধি করতে হবে, অর্থাৎ প্রবর্তন প্রক্রিয়ায় ইন্দ্রিয়গুলো যদি সামান্যতম ভূমিকাও পালন করে তেমন অবস্থায় যে বস্তুটিকে উপলব্ধি করা হল তা কিছুতেই অতিবর্তী হতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-unity-of-muslim-art-and-its-rivals/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14875</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ঈদে মিলাদুন্নবী ও পয়গাম্বর আগমনের উদ্দেশ্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/eid-e-miladunnabi-and-the-purpose-of-prophets-arrival/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/eid-e-miladunnabi-and-the-purpose-of-prophets-arrival/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 18 Sep 2024 08:22:48 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14838</guid>

					<description><![CDATA[রবিউল আউয়ালের বরকত ও কল্যাণ সম্মানিত উপস্থিতি! রবিউল আউয়াল মাসের আগমন আমাদের সকলের জন্য উৎসব ও খুশীর বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। কেননা তখন আমাদের মনে পড়ে যায় যে, এই মাসেরই প্রাথমিক সপ্তাহগুলোতে &#8216;আল্লাহর সর্বব্যাপী রহমত&#8216; দুনিয়ায় প্রকাশ লাভ করেছিলো। আর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>রবিউল</strong> <strong>আউয়ালের</strong> <strong>বরকত</strong> <strong>ও</strong> <strong>কল্যাণ</strong></h4>
<p>সম্মানিত উপস্থিতি! রবিউল আউয়াল মাসের আগমন আমাদের সকলের জন্য উৎসব ও খুশীর বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। কেননা তখন আমাদের মনে পড়ে যায় যে, এই মাসেরই প্রাথমিক সপ্তাহগুলোতে <strong>&#8216;</strong><strong>আল্লাহর</strong> <strong>সর্বব্যাপী</strong> <strong>রহমত</strong><strong>&#8216;</strong> দুনিয়ায় প্রকাশ লাভ করেছিলো। আর ইসলামের সত্য আহবায়কের আবির্ভাবের কারণে দুনিয়ার যাবতীয় দুঃখ-ব্যথা ও জ্বালা-যন্ত্রণার অবসান ঘটেছিল।</p>
<p>তোমরা আনন্দ ও খুশীতে আত্মহারা হয়ে উঠো। তোমাদের অন্তরে আল্লাহর সত্য নবীর প্রেম-ভালবাসা এক অভাবিত আগ্রহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। তোমরা তোমাদের অধিক থেকে অধিকতর সময় তাঁকে স্মরণ করে এবং তাঁরই ভালোবাসার খুশীতে কাটিয়ে দিতে চাও।</p>
<p><strong>তোমরা</strong> <strong>তাঁর</strong> <strong>আলোচনা</strong> <strong>ও</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>মজলিসসমূহের</strong> <strong>আয়োজন</strong> <strong>কর</strong><strong>।</strong> <strong>ঐ</strong> <strong>মজলিসের</strong> <strong>সাজসজ্জার</strong> <strong>কাজে</strong><strong>, </strong><strong>আপন</strong> <strong>কায়িক</strong> <strong>শ্রমের</strong> <strong>বদলে</strong> <strong>প্রাপ্ত</strong> <strong>অর্থসম্পদ</strong> <strong>বিনা</strong> <strong>দ্বিধায়</strong> <strong>খরচ</strong> <strong>কর</strong><strong>।</strong> <strong>সুগন্ধিযুক্ত</strong> <strong>তরতাজা</strong> <strong>ফুলের</strong> <strong>তোড়া</strong> <strong>তৈরী</strong> <strong>কর</strong><strong>, </strong><strong>কাফুর</strong> <strong>মিশ্রিত</strong> <strong>সুন্দর</strong> <strong>প্রদীপমালা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>বিজলী</strong> <strong>বাতির</strong> <strong>আকর্ষণীয়</strong> <strong>ঝাড়</strong> <strong>প্রজ্জ্বলিত</strong> <strong>কর</strong><strong>।</strong> <strong>আতর</strong> <strong>ও</strong> <strong>গোলাপের</strong> <strong>মিষ্টি</strong> <strong>গন্ধে</strong> <strong>যখন</strong> <strong>তোমাদের</strong> <strong>মজলিস</strong> <strong>ভরপুর</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>উঠে</strong> <strong>তখন</strong> <strong>তোমরা</strong> <strong>আল্লাহর</strong> <strong>প্রশংসা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্রশস্তি</strong> <strong>এবং</strong> <strong>দরূদ</strong> <strong>ও</strong> <strong>সালামের</strong> <strong>সুমধুর</strong> <strong>সুর</strong> <strong>ধ্বনির</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>আপন</strong> <strong>মাহবুব</strong> <strong>ও</strong> <strong>একান্ত</strong> <strong>প্রিয়</strong> <strong>জনের</strong><strong> (</strong><strong>প্রিয়</strong> <strong>নবীর</strong><strong>) </strong><strong>সন্ধান</strong> <strong>কর</strong><strong>।</strong> <strong>আর</strong> <strong>এই</strong> <strong>মুহূর্তগুলোতে</strong> <strong>তোমাদের</strong> <strong>চোখের</strong> <strong>অশ্রু</strong> <strong>ও</strong> <strong>তোমাদের</strong> <strong>প্রেমাসক্ত</strong> <strong>অন্তরের</strong> <strong>আকুতি</strong> <strong>তাঁর</strong> <strong>পবিত্র</strong> <strong>নাম</strong><strong>, </strong><strong>তাঁর</strong> <strong>অপরিসীম</strong> <strong>ভালবাসা</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>রূহানী</strong> <strong>জীবন</strong> <strong>লাভ</strong> <strong>করে</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অতএব কত মহান ঐসব ব্যক্তির অন্তর, যারা আপন প্রেম-ভালবাসার জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের মাহবুব (প্রিয়জন)-কে নির্বাচন করেছে এবং কত পাকপবিত্র ঐ জিহ্বাগুলো, যেগুলো রাসূলগণের সর্দার ও সমগ্র বিশ্বের রহমতের প্রশস্তিগীতিতে সুরে ভরে উঠে।</p>
<p>তারা তাদের প্রেম-ভালবাসার জন্য সেই সত্তাকেই বেছে নিয়েছে, খোদ আল্লাহ্ তা&#8217;আলা যার প্রশংসা করেছেন। আর তাঁর সুর সুরে মিলিয়েছে ফিরিশতারা, সৃষ্টিজগতের পবিত্র আত্মারা এবং পুণ্যবান বান্দারা।</p>
<p>إِنَّ اللَّهَ وَمَلَئِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِي طيايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.</p>
<p>&#8220;আল্লাহ্ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তার ফেরেশতারাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।&#8221; (৩৩:৫৬)</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>সৃষ্টি</strong> <strong>জগতের</strong> <strong>সর্বশ্রেষ্ঠ</strong> <strong>প্রেমাস্পদ</strong></h4>
<p>এতে কোন সন্দেহ নেই যে, নবীর প্রেম-ভালবাসার পবিত্র জোয়ার এবং এর পবিত্রতম আগ্রহ-উদ্দীপনা তোমাদের জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ। আর তোমরা নিজেদের এই পবিত্র প্রেরণার, যত বেশী হিফাযত করবে তা কম বলে মনে হবে। তোমাদের এই আল্লাহ্ প্রেম, তোমাদের প্রভু পরওয়ারদিগারের ভালবাসার প্রতীক, তোমাদের এই প্রেমাসক্ততা তোমাদের মানবিক সৌভাগ্য ও সরল পথ অবলম্বনের উৎসমূল। তোমরা সেই পাক-পবিত্র সত্তাকে ভালবাসো, যাকে আল্লাহ্ তা&#8217;আলা সমগ্র মানব সৃষ্টির মধ্য থেকে প্রিয়জন ও প্রশংসিতজন হিসাবে বেছে নিয়েছেন এবং বিশ্বের প্রিয়জনের পবিত্র পরিচ্ছদ তাঁরই পবিত্র দেহে এঁটে দিয়েছেন। ভূপৃষ্ঠে মানুষের জন্য বৃহৎ থেকে বৃহত্তর যে কথা লেখা যেতে পারে, মানুষের প্রতি যতটুকু অধিক থেকে অধিকতর ভালবাসা নিবেদন করা যেতে পারে, মানুষের জন্য সর্বাধিক প্রশংসা-প্রশস্তি, যা ভাষায় ব্যক্ত করা যেতে পারে- মোটকথা, মানুষের ভাষা মানুষের জন্য যা কিছু বলতে পারে এবং যা কিছু করতে পারে, তার সব কিছুই এই পরিপূর্ণ ও পরিপূর্ণতম মানুষের জন্য। আর এগুলো পাবার যোগ্য তিনি ছাড়া আর কেউ নন। একজন ফারসী কবি কী সুন্দর না বলেছেন!</p>
<p>&#8220;হারাম শরীফ আমার ইবাদতগাহ</p>
<p>আর দু&#8217;জাহানের হাবিব আমার লক্ষ্যবস্তু।</p>
<p>আমি যেখানে সিজদা করি না কেন,</p>
<p>তা করি আল্লাহর দরবারের উদ্দেশ্যে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী কবি কত সুন্দরই বলেছেন-</p>
<p>عبارتنا شتى وحسنك واحد &#8211; وكل الى ذالك الجمال يشير .</p>
<p>&#8220;আমাদের বাক্য বিভিন্ন; কিন্তু তোমার সৌন্দর্য এক, প্রত্যেকটি বস্তুই তোমার এই সৌন্দর্যের দিকে ইঙ্গিত করে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সর্বোত্তম</strong> <strong>বান্দা</strong></h4>
<p>ইলাহ্ ও রব হিসাবে আল্লাহ্ তা&#8217;আলা যেমন এক ও অংশহীন; অনুরূপভাবে পরিপূর্ণ মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দেগীর গুণও এক ও অবিভাজ্য। তাঁর মানবতা ও বন্দেগীতে কেউই তাঁর সমান নয়। আর তাঁর একক সৌন্দর্যেও কেউ শরীক নয়।</p>
<p>منزه عن شريك في محاسنه فجوهر الحسن فيه غير منقسم</p>
<p>&#8220;তিনি তার সৌন্দর্যাবলির ক্ষেত্রে শরীক থেকে পবিত্র। অর্থাৎ তার এই সৌন্দর্যাবলির মধ্যে কোন শরীক নেই। তার সৌন্দর্যগুণের মধ্যে কোন ভাগ-বাটোয়ারা হয় নি। তাই অন্য কেউ এ থেকে কোন অংশ পায় নি।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ কারণেই কোরআন মজীদে আমরা দেখি যে, সমগ্র আম্বিয়া কিরামের উল্লেখ যেখানে করা হয়েছে, সেখানে তাঁদেরকে তাঁদের নাম ধরে আহবান করা হয়েছে এবং যেখানে তাঁদের ঘটনাবলি উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও তাঁদের নামসহ তা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিপূর্ণ মানুষ, এই পরিপূর্ণ সত্তা এবং বান্দা হিসাবে যাবতীয় গুণাবলির ক্ষেত্রে শরীকহীন একক এর উল্লেখ বিভিন্ন জায়গায় এভাবে করা হয়েছে যে, না তাঁর নাম নেওয়া হয়েছে, আর না অন্য কোন গুণে তাঁর নামকরণ করা হয়েছে। বরং শুধু &#8216;আবদ&#8217; (বান্দা) শব্দ দ্বারা তাঁর প্রভু তাঁকে স্মরণ করেছেন। যেমন-</p>
<p>سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى</p>
<p>&#8220;পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাত্রে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসায়।&#8221; (১৭: ৪১)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সূরা জিনে আল্লাহ্ বলেন,</p>
<p>يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا . وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللهِ يَدْعُوهُ كَادُوا</p>
<p>&#8220;আর এই যে, যখন আল্লাহর বান্দা (মুহাম্মদ) তাঁকে ডাকার জন্য দন্ডায়মান হলেন তখন তারা তাঁর কাছে ভিড় জমালো।&#8221; (৭২: ১৯)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ আয়াত দ্বারা সূরা কাহফ শুরু করা হয়েছে-</p>
<p>الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتٰبَ وَلَمْ يَجْعَلْ لَهُ عِوَجًا</p>
<p>&#8220;প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে বক্রতা রাখেন নি।&#8221;-(১৮: ৪১)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সূরা ফুরকানের প্রথম আয়াত হচ্ছে-</p>
<p>تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعُلَمِينَ نَذِيرًا.</p>
<p>&#8220;কত মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান নাযিল করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সর্তকারী হতে পারে।&#8221; -(২৫: ৪১)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এভাবে সূরা নাজম এ আল্লাহ বলেন-</p>
<p>فَاوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى</p>
<p>&#8220;তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন।&#8221; (৫৩: ১০)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সূরা হাদীদে বলা হয়েছে-</p>
<p>هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ أَيْتِ بينت</p>
<p>&#8220;তিনিই তার বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেন।&#8221; -(৫৭: ৪৯)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উপরোক্ত স্থানগুলোতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নাম নেওয়া হয়নি; বরং নামের পরিবর্তে আবদ বা বান্দা বলা হয়েছে। অথচ অন্যান্য নবীদের ক্ষেত্রে আবদ শব্দ ব্যবহার করা হলেও সেই সাথে তাঁদের নামও পরিষ্কার উল্লেখ করা হয়েছে।</p>
<p>সূরা মারইয়ামে হযরত যাকারিয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে-</p>
<p>ذكر رحمتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا</p>
<p>&#8220;এই আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তার বান্দা যাকারিয়ার প্রতি।&#8221; -(১৯: ৪২)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সূরা সোয়াদে হযরত দাউদ সম্পর্কে বলা হয়েছে-</p>
<p>وَاذْكُرْ عَبْدَنَا دَاود</p>
<p>&#8220;এবং স্মরণ করুন আমার বান্দা দাউদের।&#8221; (৩৮: ১৭)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ঐ সূরাতেই হযরত আইয়ুব (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে-</p>
<p>وَاذْكُرْ عَبْدَنَا أَيُّوب</p>
<p>&#8220;স্মরণ করুন, আমার বান্দা আইয়ুবকে।&#8221; (৩৮: ৪১)</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>রাসূলুল্লাহ</strong><strong> (</strong><strong>সা</strong><strong>) </strong><strong>এর</strong> <strong>বৈশিষ্ট্য</strong></h4>
<p>এই বৈশিষ্ট্য দ্বারা এ তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করা আল্লাহর উদ্দেশ্য ছিলো যে, এই মহান সত্তার (রাসূলুল্লাহর) আবদিয়াত ও বন্দেগী সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা মনুষ্যত্বের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায় এবং সে পর্যায় কোন বান্দাই এই কামিল বান্দার শরীক ও অংশীদার নয়। <strong>অতএব</strong> <strong>বান্দা</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>হচ্ছেন</strong> <strong>পরিপূর্ণ</strong> <strong>সত্তা</strong><strong>।</strong> সুতরাং কোনরূপ সম্বন্ধ-সম্পর্ক যুক্ত না করেই শুধুমাত্র &#8216;আবদ্‌&#8217; বা বান্দা উপাধি দ্বারাই তাঁকে চেনা যায়। কেননা সমস্ত সৃষ্টি জগতের মধ্যে তাঁর মত আবদু বা বান্দা দ্বিতীয় নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বান্দা হিসাবে যেমন তিনি অতুলনীয়, তেমনি আল্লাহর মাহবুব হিসাবেও তিনি অদ্বিতীয়। আল্লাহ তা&#8217;আলা তাঁর রহমতকে সমগ্র বিশ্বের উপর পরিব্যাপ্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা&#8217;আলা যেমন নিজেকে &#8216;আর রাহমান আর রাহীম&#8217; বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করেছেন, তেমনি মুহাম্মদ (সা) কে <strong>&#8216;</strong><strong>বিল</strong> <strong>মুমিনীনা</strong> <strong>রাউফুর</strong> <strong>রাহীম</strong><strong>&#8216;</strong> বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করেছেন। <em>কুরআন</em> <em>মজীদের</em> <em>কোথাও</em> <em>তাঁকে</em> <em>নাম</em> <em>ধরে</em> <em>সম্বোধন</em> <em>করেননি</em><em>, </em><em>বরং</em> <em>তাঁকে</em> <em>কখনো</em><em> &#8216;</em><em>ইয়া</em> <em>আইয়ুহার</em> <em>রাসূল</em><em>&#8216; </em><em>কখনো</em><em> &#8216;</em><em>ইয়া</em> <em>আইয়ুহাল</em> <em>মুযযামমিল</em><em>&#8216; </em><em>কখনো</em><em> &#8216;</em><em>ইয়া</em> <em>আইয়ুহাল</em> <em>মুদ্</em><em>‌</em><em>দাসসির</em><em>&#8216; </em><em>প্রভৃতি</em> <em>সম্মানিত</em> <em>উপাধিতে</em> <em>সম্বোধন</em> <em>করেছেন</em><em>।</em> <strong>আল্লাহ্</strong> <strong>তা</strong><strong>&#8216;</strong><strong>আলা</strong> <strong>তাঁর</strong> <strong>প্রতি</strong> <strong>সম্মানপ্রদর্শনকে</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>বান্দাদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>ফরয</strong> <strong>করেছেন</strong> <strong>তেমনি</strong> <strong>তাঁদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>ফরয</strong> <strong>করেছেন</strong> <strong>রাসূলের</strong> <strong>প্রতি</strong> <strong>সম্মান</strong> <strong>প্রদর্শন</strong> <strong>করাকে</strong><strong>।</strong> রাসূলের ভালোবাসা প্রদর্শনের অবস্থা এই যে, তিনি যে লোকালয়ে বসবাস করেছেন, যে শহরের গলি দিয়ে চলাফেরা করেছেন, সে লোকালয় এবং সে শহরের সম্মানও আল্লাহ তা&#8217;আলা সমগ্র বিশ্বের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। যেমন-</p>
<p>لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ ، وَأَنْتَ حِلٌّ بِهَذَا الْبَلَدِ</p>
<p>&#8220;শপথ করছি এই নগরের, আর আপনি এই নগরের অধিবাসী।&#8221; (৯০: ১-২)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অতএব যার পবিত্রতা ও একক বৈশিষ্ট্যের এই অবস্থা, তাঁর স্মরণে যতগুলো মহূর্ত ব্যয় করা হোক, তাঁর প্রেমে যত অশ্রু ভাসানো হোক, তাঁর ভালবাসায় যত দীর্ঘশ্বাস ফেলা হোক, তাঁর প্রশংসা-প্রশস্তিতে জবান যত আন্দোলিত হোক, ততই মনুষ্যত্বের মর্যাদা, আত্মার সৌভাগ্য ও অন্তরের পবিত্রতা লাভ করা যাবে। একজন ফারসী কবি কী সুন্দরই না বলেছেন।</p>
<p>&#8220;যে পদযুগল দ্বারা তোমার পথ অতিক্রম করি তা উত্তম,</p>
<p>যে উসীলা বা মাধ্যম দ্বারা তোমার মিলনের</p>
<p>সন্ধান করি তাও উত্তম,</p>
<p>যে চোখ দ্বারা তোমার চেহারা দেখি তাও উত্তম,</p>
<p>যে যবান দ্বারা তোমার নাম উচ্চারণ করি</p>
<p>তাও উত্তম।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পাওয়ার</strong> <strong>উৎসব</strong> <strong>ও</strong> <strong>হারানোর</strong> <strong>শোক</strong></h4>
<p>কিন্তু যখন তোমরা এই পবিত্র মাসে এসব কিছু কর এবং এই মাসে জন্মের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণে আনন্দ-উল্লাস করো, তখন এই আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে তোমাদের কি ঐ মাতমের কথাও স্মরণ পড়ে, যা ছাড়া তোমাদের কোন খুশী হতে পারে না? কখনো তোমরা কি এই হাকীকতের প্রতি লক্ষ্য করেছ- এটা কার জন্মোৎসব, যার স্মরণে তোমরা নানা উদ্যোগ-আয়োজন কর? তিনি কে ছিলেন, যার জন্মের স্মরণে তোমরা এই আনন্দ-উৎসবের পয়গাম লাভ করেছ?</p>
<p>এতে সন্দেহ নেই যে, এই মাসের আগমন তোমাদের জন্য আনন্দের পয়গামবাহী। কেননা এই মাসে সেই সত্ত্বার আগমন হয়েছে, যিনি আমাদের সবকিছু দিয়েছেন। অতএব আমাদের জন্য এর চাইতে অধিক মাতম করার আর কোন মাস নেই। কেননা এই মাসে জন্মগ্রহণকারী সত্তা আমাদেরকে যা কিছু দিয়েছিলেন, তার সবকিছু আমরা হারিয়ে ফেলেছি। অতএব এই মাস একদিকে যেমন দাতার স্মরণকে সঞ্জীবিত করে, অন্যদিকে তেমনি যারা এই দাতার দানকে খুইয়ে বসেছে, তাদের ক্ষতস্থান পুনরায় দগদগে হয়ে উঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মজলিসসমূহ</strong> <strong>আলোকিত</strong><strong>, </strong><strong>কিন্তু</strong> <strong>অন্তর</strong> <strong>অন্ধকার</strong></h4>
<p>তোমরা মজলিস অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে তোমাদের ঘরসমূহ আবাদ করো, কিন্তু তোমাদের অন্তরের উজাড় বসতির কোন খোঁজ কি তোমরা রাখো? তোমরা কাফুর মিশ্রিত প্রদীপে ঝাড়বাতি প্রজ্জ্বলিত কর, কিন্তু তোমাদের অন্তরের অন্ধকার দূর করার জন্য কি কোন প্রদীপের সন্ধান কর? তোমরা ফুলের তোড়া সাজাও, কিন্তু হায়। তোমাদের সুকর্মের ফুল যে শুকিয়ে ঝরে পড়েছে। তোমরা গোলাপ জল ছিটিয়ে তোমাদের রুমাল ও জামা সুগন্ধিযুক্ত কর, কিন্তু হায়! ইসলামের মাহাত্ম্যের প্রতি লক্ষ্য করার সুবাস থেকে সকাল-সন্ধ্যা তোমরা যে বঞ্চিত। হায়। তোমাদের এই সব মজলিস যদি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকত, তোমাদের ইট চুনের তৈরী ঘরগুলোতে সাজ সজ্জার একটুখানি পরশও না লাগত, তোমাদের চোখগুলি এই মজলিসে সারারাত জেগে না থাকত এবং তোমাদের যবানসমূহ থেকে রবিউল আউয়াল মাসের জন্মোৎসব সম্পর্কে দুনিয়াবাসী কিছুই না শুনতো- আর এগুলোর পরিবর্তে তোমাদের আত্মা আবাদ ও সঞ্জীবিত থাকত, তোমাদের যবানসমূহ থেকে নয়, বরং তোমাদের আমল ও কাজকর্ম থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুপম চরিত্রের প্রশংসা ও প্রশস্তি গীতির সুরলহরী ভেসে উঠত তাহলে কতই না ভাল হত।</p>
<p>পবিত্র কোরআনের ভাষায়-</p>
<p>فَإِنَّهَا لا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ</p>
<p>&#8220;বস্তুতঃ চক্ষুতো অন্ধ নয়, বরং, অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত হৃদয়।&#8221;-(২২: ৪৬)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জনৈক কবির ভাষায়-</p>
<p>&#8220;আমার ভয়, জীবন্ত হৃদয় তুমি যেন মরে না যাও,</p>
<p>কেননা তোমার জীবিত থাকার নামই তো জীবন।&#8221;</p>
<p>অতএব আক্ষেপ, হাজার আক্ষেপ ঐ জাতির অন্যমনস্কতা ও অজ্ঞতার জন্য, যাদের প্রত্যেকটি অনুষ্ঠান ও প্রত্যেকটি মজলিস দুঃখের পয়গাম বয়ে নিয়ে আসে, কিন্তু না তারা তাদের অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা থেকে কোন উপদেশ গ্রহণ করে, আর না ভবিষ্যতের অন্ধকারের মধ্যে নিজেদের জীবন পথে কোন আলো প্রজ্জ্বলিত করে। তারা তাদের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ডুবে থাকে, এদিক-সেদিক তাকাবার মোটেই অবসর পায় না, অথচ তাদের এই অনুষ্ঠানের প্রত্যেকটি দরূদে ও প্রত্যেকটি বাক্য মাতমের ও উপদেশ গ্রহণের একটি উদাত্ত পয়গাম ও শিক্ষা গ্রহণের একটি মরমী আকুতি নিহিত থাকে। কিন্তু এগুলো উপলব্ধি করার পূর্বশর্ত হলো, যেন চোখ খোলা থাকে, যেন কান শুনে এবং যেন অন্তর সতর্ক ও সাবধান হয়।</p>
<p>إِنَّ فِي ذَلِكَ لِذِكْرِى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلب أو القى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ</p>
<p>&#8220;এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার আছে অন্তঃকরণ অথবা যে শ্রবণ করে নিবিষ্ট চিত্তে।&#8221; (৫০: ৩৭)</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পয়গম্বরের</strong> <strong>আবির্ভাব</strong> <strong>ও</strong> <strong>আবির্ভাবের</strong> <strong>উদ্দেশ্য</strong></h4>
<p>রবিউল আউয়াল মাসের স্মরণে আমাদের জন্য খুশীর পয়গাম ছিলো এজন্য যে, এই মাসে আল্লাহ্ তা&#8217;আলার সেই রহমতের ফরমান দুনিয়ায় এসেছিল, যার আত্মপ্রকাশ দুনিয়ার দুর্ভাগ্য ও বঞ্চনার ধারা বদলে দিয়েছিল। মিটে গিয়েছিল জুলুম, বাড়াবাড়ি, ফিতনা-ফাসাদ ও নাফরমানীর অন্ধকার। আল্লাহ্ এবং তার বান্দাদের বিচ্ছিন্ন সম্বন্ধ জোড়া লেগেছিলো, মানুষের ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের আহবান শত্রুতা হিংসা-বিদ্বেষকে মুছে ফেলেছিলো এবং কুফর ও পথভ্রষ্টতার স্থলে ন্যায় ও সত্যের বাদশাহীর সাধারণ ঘোষণা প্রদান করা হয়েছিলো।</p>
<p>قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورُ وَكِتَبُ مُّبِينٌ يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مِنَ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلْمِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ.</p>
<p>&#8220;আল্লাহর নিকট হতে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং ওদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন।&#8221;(৫: ১৫-১৬)</p>
<p>কিন্তু দুনিয়া দুর্ভাগ্য ও বঞ্চনার ব্যথায় পুনরায় ব্যথিত হয়ে উঠেছে। মানুষের ফিতনা ফাসাদ, অত্যাচার ও বাড়াবাড়ির অন্ধকার আল্লাহর আলোর উপর প্রাধান্য লাভের জন্য পুনরায় চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ন্যায় ও সত্যের খ্যাতি উজাড় হয়ে গেছে এবং বিক্ষিপ্ত মানবগোষ্ঠীকে রক্ষা করার মত কেউ নেই। আল্লাহর যমীন, যা শুধু আল্লাহর জন্যই ছিল, তা অপরকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং যারা হক ও আদালতের পক্ষপাতী, যমীনের উপর আজ তাদের কোন অস্তিত্ব নেই।</p>
<blockquote><p>ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ .</p>
<p>&#8220;মানুষের কৃতকার্মের দরুণ সমুদ্রে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে।&#8221; (৩০: ৪১)</p></blockquote>
<p>দুঃখের বিষয়, তোমরা তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে আনন্দোৎসব করো, কিন্তু তাঁর আগমনের লক্ষ্যের কথা ভুলে যাও। যে উদ্দেশ্যে তাঁর আবির্ভাব হয়েছিলো, সেদিকে তোমাদের কোন দৃষ্টি নেই।</p>
<p>এই রবিউল আউয়াল মাস যদি তোমাদের জন্য খুশীর মাস হয়, তাহলে তা শুধু এজন্য যে, এই মাসে বিশ্বের পথভ্রষ্টতার অবসান হয়েছে এবং কালিমায়ে হক প্রচারের সূচনা হয়েছে। অতএব আজ যদি বিশ্বের ন্যায়-সতা পথ-ভ্রষ্টতার চাপে মৃতপ্রায় হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আলস্যের পূজারীরা, তোমাদের কি হয়ে গেলো যে, তোমরা আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠান পালন করো, কিন্তু যে ন্যায় ও সত্যের আবির্ভাবের জন্য এই আনন্দোৎসব, সে মৃতপ্রায় আদালত ও হককে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তোমাদের অন্তরে কোন উদ্যোগ নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> মাওলানা আব্দুল মতীন জালালাবাদী।</p>
<p>[মাওলানা লিখিত বক্তৃতা প্রদানে অভ্যস্ত ছিলেন না। তিনি একদা বলেছিলেন, যা বলার তা চিন্তায় রেখে দাঁড়িয়ে যাই। রবিউল আউয়াল হিজরী ১৩৩৫ সনের (মুতাবিক জানুযারী, ইং ১৯১৬ সনের) কথা। কোলকাতার কোন এক সভায় মাওলানা সীরাতের উপর একটি ভাষণ দেন। ঐ সময়ে &#8216;আল বালাগ&#8217; প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি এর একটি সংখ্যা (১৪, ২১ ও ২৮ জানুয়ারী, ইং ১৯১৬ সন) শুধু &#8216;বিলাদতে নবভী&#8217; এর জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। খুব সম্ভবতঃ এই ভাষণটিও তিনি ঐ সংখ্যায় প্রকাশ করেন। এর দ্বারা সীরাতের কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ দিক যে অত্যন্ত আলোকিত হয়ে উঠে, তা কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই ভাষণের মধ্যে সীরাতে তাইয়িবার মৌলিক দিকগুলো যে অপরূপ ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে, সেরূপ ভঙ্গিতে কেউ আজ পর্যন্ত পেশ করতে পারেন নি।]</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/eid-e-miladunnabi-and-the-purpose-of-prophets-arrival/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14838</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কালচারের মর্মকথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-essence-of-culture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-essence-of-culture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 02 May 2024 14:09:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[Bangla]]></category>
		<category><![CDATA[bengal]]></category>
		<category><![CDATA[civilization]]></category>
		<category><![CDATA[literature]]></category>
		<category><![CDATA[কালচার]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14062</guid>

					<description><![CDATA[দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের ফলে এ দুনিয়ার অনেক বিষয়ের সংজ্ঞাতেই কোনো একতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্য অনেক বিষয়ের মতোই কালচার সম্বন্ধেও হয়েছে নানাবিধ ধারণার উৎপত্তি। বাধ্য হয়েই কালচারের তুলনামূলক আলোচনা করে কালচারের বিবরণ দিতে হয়, তবুও তার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবপর হয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের ফলে এ দুনিয়ার অনেক বিষয়ের সংজ্ঞাতেই কোনো একতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্য অনেক বিষয়ের মতোই কালচার সম্বন্ধেও হয়েছে নানাবিধ ধারণার উৎপত্তি। বাধ্য হয়েই কালচারের তুলনামূলক আলোচনা করে কালচারের বিবরণ দিতে হয়, তবুও তার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবপর হয় না। সত্যতা ও কালচারের আলোচনা প্রসঙ্গে প্রতীয়মান হয় যে, একটি বিষয়েরই উহ্যরূপ হচ্ছে সভ্যতা এবং তার বাহ্যরূপ হচ্ছে কালচার। সভ্যতার বিচার হয় কালচারের প্রকাশ-ভঙ্গিমায় বা তার বিষয়বস্তুর উৎকর্ষের মানদণ্ডের মাধ্যমে। যেকোনো সভ্যতার উন্নতি বা অবনতি প্রকাশিত হয় তার কালচারের মধ্যে। সভ্যতাকে একটা বিমূর্ত ধারণা বলা যায়, তার মূর্ত ক্রিয়া হচ্ছে কালচার এবং মূর্ত রূপ হচ্ছে কালচার দ্বারা সৃষ্ট বিষয়বস্তু।</p>
<p>সাধারণত উভয় অর্থেই কালচার শব্দটা ব্যবহৃত হয়। কোনো কোনো বিষয়ের রূপায়ণের ভঙ্গিমাকে যেমন বলা হয় কালচার, তেমনি রূপায়িত বিষয়কেও বলা হয় কালচার। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প, সাহিত্য বা অন্যান্য চারু ও কারুশিল্প প্রকাশের পদ্ধতিকে যেমন বলা হয় কালচার, তেমনি সে-পদ্ধতির মাধ্যমে রূপায়িত বিষয়বস্তুকেও বলা হয় কালচার। তাজমহলের গঠন-নৈপুণ্যও যেমন কালচার, তেমনি তাদের বিশিষ্ট আকার ও প্রকারকেও বলা হয় কালচার। প্রকৃতপক্ষে একটি উপায়, অপরটি লক্ষ্য। যেহেতু কোনো একটি বিষয়বস্তু কলাকৌশলের মাধ্যমেই রূপায়িত হয়, অতএব কলাকৌশলকেই প্রথমে কালচার বলা হয়। তবে কলাকৌশল অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এ কারণে তাদের রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ। মানসিক দিক থেকে অবশ্য একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করে দেখা যেতে পারে, তবে বাস্তব জীবনে তাদের মধ্যে রয়েছে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ।</p>
<p>এ কালচার শব্দটি আবার সংস্কৃতি-সহ বিভিন্ন নামে ব্যবহৃত হয়, এমন ভিন্নতার সঙ্গত কারণও রয়েছে। সংস্কৃতি বলতে কোনো বিষয়কে সংস্কৃত (refine) করা বুঝায়। তাকে ইংরাজিতে তরজমা করলে refinement হয়ে দাড়ায়। পূর্বে যা ছিল অসংস্কৃত বা অশোভন তারই পরবর্তী পরিণীত ব্যবস্থাকে বলা হয় সংস্কৃত। যে পদ্ধতির মাধ্যমে তা রূপায়িত হয়, তাকে বলা হয় সংস্কৃতি। এতে কালচাবের উপায় বা রূপায়ণের পদ্ধতিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্কৃতের ভেতরে বিষয়বস্তুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। একটি নিছক ক্রিয়ামূলক পদ অপরটি বিষয়বস্তুমূলক শব্দ।</p>
<p>অন্য আরও একটি দিক থেকে কালচারকে সংস্কৃতি বলাতে রয়েছে ত্রুটি। যেকোনো কালচারের ইতিহাসের আলোচনা করলে দেখা যার তার মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিকতা। কালের দিক থেকে বিচার করলে কালচারের অন্তর্গত বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অধ্যায়কে বলতে হয় অসংস্কৃত, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পরবর্তী অধ্যায়কে বলতে হয় অসংস্কৃত। ঠিক কোন পর্যায়ে এসে একটা বিশিষ্ট পদ্ধতি সংস্কৃত হচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে সে আবার বর্বরতার স্তরে চলে যাচ্ছে, তা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে পরিবর্তন তো নিত্যই হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনটা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী হলেই কেবল তা দৃষ্টিগোচর হয়। কাজেই সংস্কৃতি শব্দের পরিবর্তে ব্যাপক অর্থে কালচার শব্দটির প্রয়োগই বাঞ্ছনীয়। কৃষ্টিও সংস্কৃতির মতোই ক্রিয়ামূলক শব্দ, একারণেই তা অপরিসর গতির জন্য পরিত্যাজ্য।</p>
<p>এ কালচারের উৎপত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করতে হলে মানবজীবনের আলোচনাতেই ফিরে যেতে হয়। কারণ মানবজীবনই কালচারের মূল উৎস। কালের আবর্তে মানবজীবন এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এ পরিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রহণ ও দানের ফলেই গড়ে ওঠে মানুষের কালচার। পৃথিবী থেকে অপরিসীম সম্পদ আহরণ করে মানুষ হয়েছে ধনী আর তার মূল্য হিসাবে পৃথিবীকে সে যা দান করে, তারই স্বাক্ষর রয়েছে মানুষের কালচারের। কালচারের উৎপত্তি তাই ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াজাতের ভেতরেই রয়েছ এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের সঙ্গে তার রয়েছে সংযোগ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্য দশটি প্রাণীর মতো মানুষকে আহারের সংস্থান করতে হয়। কেবল আহার নয়, তার পক্ষে পোশাক-পরিচ্ছদ বা আচ্ছাদনেরও প্রয়োজন পড়ে। নানা প্রবৃত্তির দাবি রয়েছে তার জীবনে। সেগুলো অবসান করা তার পক্ষে সহজ নয়। প্রেম বা কাম দ্বারা চালিত হয়ে মানুষ বাধ্য হয়েই আত্মকেন্দ্রিক জীবনের ক্ষুদ্র পরিসর ত্যাগ করে বৃহত্তর পারিবারিক জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা শ্বাপদ হিংস্র অন্তরের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাকে সমাজের অন্য দশজনের সাহায্য নিতে হয়। মূলত জৈবিক প্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হলে পরিশেষে তাকে পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে সুস্বভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিছক আত্মসুখ বর্জন করতে হয়। আবার তার মানসজাত ভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে বেঁচে থাকার পদ্ধতি সে আবিষ্কার করে এবং তাকে রূপদান করে নিজেকে সার্থক মনে করে। আদর্শের প্রতি আস্থা ও তার আকর্ষণ যেমন একদিকে তাকে এ পৃথিবী থেকে নানাভাবে বিষয়বস্তু আহরণের জন্য প্রেরণা দান করে, তেমনি এই দুনিয়াকে তার পছন্দমতো সাজানো গোছানোর দায়িত্বও সে গ্রহণ করে। এ গ্রহণ ও দানের বাহ্যিক রূপই তার কালচার।</p>
<p>নানা ক্রিয়া প্রকাশিত হয় বলে তার মধ্যে রয়েছে নানা বিষয়বস্তু। মানুষের এ গ্রহণ ও দান আবার নানাবিধ কারণ বা ফ্যাক্টরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। খাদ্য নির্বাচনের ব্যাপার, আহার করার পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদের প্রয়োজনীয়তা ও নানাবিধ শিল্পসমূহ অনেকটা পরিবেশের উপর নির্ভর করে, ভারতের কোনো এক প্রদেশের খাদ্য নির্বাচন বা গ্রহণ করার পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশবাসী লোকদের আহার্য বা তার গ্রহণ করার কায়দা থেকে ভিন্ন। অত্যন্ত শীতপ্রধান বলে সে অঞ্চনের পোশাক-পরিচ্ছদের স্টাইল গ্রীষ্মপ্রধান আফ্রিকার লোকদের পোশাক-পরিচছদ থেকে অনিবার্য কারণে ভিন্ন হয়েছে। মেরু অঞ্চলে সহজলভ্য ভল্লুকের লোম থেকে সে-দেশবাসীর বস্ত্রাদি যে তৈরি হবে তাতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঝড়-ঝঞ্জা বা তুষারপাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাদের তুষারেই ঘর তৈরী করতে হয়। মরুভূমিতে বিচরণশীল বেদুঈনের জন্য বৃক্ষপত্রহীন বালুকারাশিতে চামড়ার শিবিরের মধ্যেই আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। বৈচিত্র্যময় জীবনের নানাবিধ প্রয়োজনে এভাবেই মানুষের কালচারে বৈচিত্র্য দেখা দেয় এবং এই বৈচিত্র্য থেকে প্রথমে স্বাদেশিকতা এবং পরবর্তীকালে প্রাদেশিকতার উৎপত্তি হয়। জাতীয় চরিত্র গঠনে পরিবেশের প্রভাব তাই অত্যন্ত শক্তিশালী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পরিবেশ ব্যতীত কালচারের বিবর্তনের মূলে অর্থনৈতিক কারণও ক্রিয়াশীল। আবার অর্থনীতির মানসজাত নানাবিধ মানেরও (value) রয়েছে সম্বন্ধ। এসব মান (value) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে থাকে ক্রিয়াশীল এবং উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গুহামানব প্রথমে তার নিজের প্রয়োজনের জন্য বন্য পশু শিকার করতো। যৌন-জীবনের তাগিদে নারীর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রচণ্ডভাবে স্বীকৃত হওয়ার ফলে সে তার লক্ষ্য পরিবর্তনে বাধ্য হয়। তখন শুধু নিজের জন্য নয়, তার নিজের ও যৌন-সঙ্গীর জন্য শিকার করা তার পক্ষে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পশুচারিক পর্যায়ে কেবল যৌন-সাথী নয়, দলের অপরাপর লোকের সুখ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখাও তার পক্ষে কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে জীবনের নানা দাবির ফলে বিভিন্ন মানের উৎপত্তি ও পরিবর্তনের ফলে মানুষ তার উৎপাদন-ব্যবস্থা ও তার লক্ষ্য পরিবর্তন করে। অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণগুলোর মধ্যে যে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ রয়েছে, সে সত্য অনস্বীকার্য।</p>
<p>তবুও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে মানুষের মৌলিক ঐক্য থাকে বলেই বিভিন্ন মানুষের জীবনে ও তার প্রকাশ-ভঙ্গিমায় রয়েছে সাদৃশ্য। যূথচারী প্রবৃত্তি (Gregarious instinct) আছে বলেই মানুষ কাজে ও অকাজে একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয় এবং একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে স্বীকার করে। মাতৃ স্নেহ, পিতৃ-স্নেহ বা অপত্য স্নেহ, প্রেমিক-প্রেমিকার আসক্তি সকল দেশেই একই ভাবে প্রকাশিত। প্রেম, স্নেহ, মমতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো সকল দেশের মানুষকেই সমানভাবে আকর্ষণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব মানের (value) উৎপত্তি হয়, তাদের দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বণ্টনের পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন দেখা দেয়, মানবজীবনে আদর্শের উৎপত্তির পরে তা আরও প্রকট হয়ে পড়ে। আদর্শের পার্থক্যের ফলে কোনো একটি আদর্শের রূপায়ণকে যদিও বা একদল মানুষ অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করে, সেই আদর্শকেই অপর একদল মানুষ অবশ্য পরিত্যাজ্য বলেই গণ্য করে।</p>
<p>এ দুনিয়ায় সাধারণভাবে নানা আদর্শ প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, সর্বোপরি কেউ না কেউ নানা আদর্শ প্রচার করেছেন এবং যে সব আদশের রূপায়নের জন্য আজীবন সাধনা করেছেন। মহামতি সক্রেটিস আদর্শ প্রচার করেছেন বলেই হেমলক পান করতে বাধ্য হয়েছেন। স্পিনোজা রক্ষপতির সন্তান হয়েও অম্লানবদনে পিতৃস্বত্ব পরিত্যাগ করেছেন। মুডি উলটের সত্যের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করে সর্বস্ব ত্যাগ করে আত্মীয়-স্বজন ও পুত্র-কন্যার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করেছেন। এসব আদর্শের কার্যকারিতা মানবজীবনের পটভূমিতে পরোক্ষভাবে ক্রিয়াশীল। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে এরা তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করেনি।</p>
<p>ধর্মের প্রবর্তনও এক হিসেবে আদর্শেরই অভিনব পদ্ধতির রূপায়ণ। তবে ধর্মাশ্রিত আদর্শের রূপায়ণের জন্য মহামানবেরা অমানুষিক দুঃখ কষ্ট ও অভূতপূর্ব নির্যাতন সহ্য করেছেন। মুখ্যত মানবজীবনের মুক্তির জন্য সিংহাসন ত্যাগ করে বুদ্ধদেব যে বাণী প্রচার করেছিলেন, তার আদর্শিক প্রেরণার উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল মানুষ অভিনব জীবন-পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে পাক-ভারতের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন বৌদ্ধবিহার। সংগ্রাম-উৎসাহী জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সম্রাট অশোক সহিংস নীতি পরিত্যাগ করে অহিংসার প্রচারকরূপে এজগতে স্থায়ী শ্রদ্ধার আসন লাভ করেন। সে আদর্শের প্রেরণাই তাঁকে নানা স্থানে বাণী প্রচারের জন্য ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করেছে।</p>
<p>তেমনি সহায় সম্বলহীন নিরীহ মেষপালক যীশুর বাণী শুনে অপর একদল মানুষের জীবনে দেখা দিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদ অর্থাৎ সোজা কথায় মানব-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে দেখা দেয় অভূতপূর্ব কালচার। সে কালচার যেমন ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি ও ম্যাডোনা চিত্রে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি রোমান ক্যাথরিকদের গলায় ঝুলানো ক্রসের প্রতীক বা চার্চের গঠনশিল্পেও প্রকাশ পেয়েছে। এ দুনিয়ার সন-তারিখ গণনার ক্ষেত্রেও সে কালচারের রয়েছে ছাপ। আজও খৃষ্ট-পরবর্তীতে এসে এ&#8217;দুনিয়ার কাল-কে যেমন বিভক্ত করা হয়েছে, তেমনি খৃষ্ট-পূর্ব সে কালের গণনাও চলেছে যীশুখ্রীষ্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে। সে কালচার নানা দেশে নানারূপ পরিগ্রহ করলেও তার রয়েছে এক সাধারণ পরিচয়।</p>
<p>ইসলাম ধর্ম আরবের বুকে প্রচারিত হয়েছে অশিক্ষিত মূর্তি-পূজক, কলহপরায়ণ, গোত্র-সর্বস্ব, নানাদলের মানবের মধ্যে। অল্প সংখ্যক নগরবাসী ব্যবসায়ী ও নানাবিধ গোত্রের লোকের মধ্যে প্রচারিত হলেও, এ ধর্ম-ভিত্তিক আদর্শ আলোর মতো পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আরববাসী সাধারণ মানুষের আহার্যের বস্তু বা পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদ এ দুনিয়ার সকল ইসলামপন্থী মানুষ গ্রহণ করেনি, করতেও পারবে না। তবে আদর্শের ক্ষেত্রে এ দুনিয়ার সকল মুসলিমের মধ্যে রয়েছে ঐক্য-সূত্র। তাদের জীবনের মুল্যমানগুলোও সে আদর্শের আলোকেই বিবর্তিত হয়েছে।</p>
<p><strong>সুদূর</strong> <strong>স্পেনের</strong> <strong>পুরাতন</strong> <strong>স্মৃতিবিজড়িত</strong> <strong>কর্ডোভার</strong> <strong>মসজিদ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ঢাকার</strong> <strong>যেকোনো</strong> <strong>মসজিদ</strong> <strong>একই</strong> <strong>আল্লাহর</strong> <strong>উপাসনার</strong> <strong>উদ্দেশ্যে</strong> <strong>নির্মিত</strong> <strong>বলে</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>বোঝা</strong> <strong>যায়।</strong> <strong>এদের</strong> <strong>গঠন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>নৈপুণ্যের</strong> <strong>এবং</strong> <strong>কলা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কৌশলে</strong> <strong>যথেষ্ট</strong> <strong>পার্থক্য</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>সত্যি</strong><strong>, </strong><strong>তবুও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>সাধারণ</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>লাভে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কষ্ট</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>লুঙ্গি</strong> <strong>পরিহিত</strong> <strong>সুমাত্রা</strong> <strong>বা</strong> <strong>জাভার</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>ও</strong> <strong>কোট</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্যান্ট</strong><strong>&#8211;</strong><strong>টাই</strong> <strong>পরিহিত</strong> <strong>ইংল্যাণ্ডের</strong> <strong>নব্য</strong><strong>&#8211;</strong><strong>দীক্ষিত</strong> <strong>মুসলিমের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বেশভূষা</strong> <strong>বা</strong> <strong>চালচলনে</strong> <strong>পার্থক্য</strong> <strong>থাকতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>তবে</strong> <strong>জীবনের</strong> <strong>উদ্দেশ্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>সম্বন্ধে</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>ধারণায়</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>ঐক্য।</strong> <strong>এখানেই</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>ধর্মীয়</strong> <strong>আদর্শের</strong> <strong>ভিত্তিতে</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>কালচারের</strong> <strong>সঙ্গে</strong> <strong>অন্যান্য</strong> <strong>আদর্শের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong> <strong>কালচারের</strong> <strong>প্রভেদ।</strong></p>
<p>মানবজীবনের ঐক্য-সূত্রের আবিষ্কার ও তার প্রচারণা কেবল দার্শনিকেরা করেননি। সাহিত্যিকদের দ্বারাও সে-সত্য প্রচারিত হয়েছে। মানবজীবনের কৃতকার্যের ফল ভোগের জন্য পরলোকের অপেক্ষা করতে হয় না, ইহলোকেও সে বিচার হয় এবং এ-বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে তারা তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ এ-জীবনেই করে, যার প্রচারণা মহাকবি হোমার বা বাল্মীকিও করে গেছেন। ট্রয়-ধ্বংস বা রাবণের পুরী নাশ এ নিয়মেই হয়েছে বলে হোমার-বাল্মীকি সুললিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। সুদূর অতীতের সাহিত্য ছাড়াও ঐতিহাসিক সাহিত্যেও তার প্রমাণ রয়েছে। কালিদাসের শকুন্তলা বা শেক্সপীয়রের নাটকাদিতেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। এতে মানবজীবনের সাধারণ পরিণতি সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।</p>
<p>দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ফলে পরবর্তীকালে কোথাও অমোঘ নিয়তি কর্তৃক মানবজীবনের লাঞ্ছনা, কোথাও মানুষের দ্বারা মানুষের বিড়ম্বনার ইতিহাস চিত্রায়ণের মধ্যেও সেই একই মানুষের পরিণতি দৃষ্টিগোচর হয়। তাতে একদিকে যেমন মানবতাবোধের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছে, তেমনি মানবতাবাদেরও উদ্ভব হয়েছে। তবে ধর্মীয় জগতের আলোড়নের মতো এসব মতবাদ মানুষের জীবনকে তেমন প্রচণ্ডভাবে পরিবর্তন করতে সমর্থ হয়নি।</p>
<p>তার কারণও সুস্পষ্ট। <strong>ধর্মের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>সামগ্রিকতা।</strong> <strong>ধর্ম</strong> <strong>শুধুমাত্র</strong> <strong>প্রত্যয়শীলতার</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>সীমাবদ্ধ</strong> <strong>নয়।</strong> <strong>ধর্মের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>মননশীলতা</strong><strong>, </strong><strong>আবেগ</strong><strong> (emotion) </strong><strong>ও</strong> <strong>ইচ্ছাশক্তির</strong><strong> (will) </strong><strong>পরিস্ফুটন</strong> <strong>ও</strong> <strong>বিকাশের</strong> <strong>উপাদান</strong> <strong>রয়েছে।</strong> <strong>দর্শন</strong> <strong>বা</strong> <strong>সাহিত্য</strong> <strong>যেভাবে</strong> <strong>মানবজীবনের</strong> <strong>চিন্তাশীলতা</strong> <strong>বা</strong> <strong>আবেগ</strong> <strong>নিয়ন্ত্রণে</strong> <strong>সমর্থ</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>সেভাবে</strong> <strong>মানবজীবন</strong> <strong>নিয়ন্ত্রণের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>রীতিনীতি</strong> <strong>মানব</strong><strong>&#8211;</strong><strong>মানসে</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong> <strong>করতে</strong> <strong>সামর্থ্য</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>এজন্যই</strong> <strong>বর্ষ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্রবর্তনের</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>মানবজীবনে</strong> <strong>দেখা</strong> <strong>দেয়</strong> <strong>প্রচণ্ড</strong> <strong>বিপ্লব</strong>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানবজীবনের সামগ্রিক বৃত্তিসমূহের সন্তোষবিধানে সক্ষম বলেই ধর্ম থেকে প্রচারিত আদর্শ জীবনের নানাক্ষেত্রে নানাভাবে প্রকাশিত হয়। চিত্রশিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি নানাক্ষেত্রে সে আদর্শ রূপায়ণের মাধ্যম মাত্র। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক কারণগুলো আদর্শিক কারণের তুলনায় হীন ও দুর্বল এবং ধর্মীয় আদর্শিক কারণের তুলনায় আরও ক্ষীণ বলেই স্থান, কাল, জাতি, বর্ণ প্রভৃতির গণ্ডি পেরিয়ে ধর্মীয় আদর্শের প্রেরণায় মানুষ ঐক্যসূত্রে নিজেদের গর্বিত করতে এতো আগ্রহ প্রকাশ করে।</p>
<p>অপরদিকে বিভিন্ন ধর্মের দ্বন্দ্ব এবং সংজ্ঞা নিয়ে যে বিবাদ রয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তিকামী মানবতাবাদীদের একান্ত সাধনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বিভিন্ন ধর্মের আচারগত রূপ পরিত্যাগ করে তাদের অন্তর্নিহিত মানবতাবাদের মৌলিক রূপটি সর্বসাধারণ মানুঘের সামনে তুলে ধরাতে। অন্যদিকে বর্ণের, ভাষার বা ভৌগোলিক পরিবেশের অবস্থা অস্বীকার করে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভিত্তিতে মানবগোষ্ঠীকে ভাগের কারণে সৃষ্ট এ বৈষম্য নিরসনের জন্য নানাদিক থেকেও আসছে আহ্বান।</p>
<p>একেও মানবতাবাদের অন্য সংস্করণ বলা যায়। তবে ভেবে দেখবার বিষয় যে, উভয় মানবতাবাদই মানুষের মৌলিক ঐক্য আবিষ্কারে সক্ষম হলেও সে মানবতাবাদকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতির উত্তরে তারা একমত হতে পারেনি। এ-কথা অবশ্য অনস্বীকার্য যে পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্য ব্যতীতও এ দুনিয়ার জীব হিসাবে মানুষের রয়েছে সাধারণ পরিচয়। জীবনের নানাক্ষেত্রে কীভাবে জীবন পরিচালনা করলে দুনিয়ার সকল মানুষই সন্তোষ লাভে সামর্থ হবে, সে পদ্ধতি আবিষ্কারই বর্তমান জগতের একমাত্র কার্য। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্য মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানে সক্ষম হলেও মানুষের সামগ্রিক জীবনের বিধানারোপের ক্ষেত্রে সমর্থ হবে কিনা তাই প্রণিধানযোগ্য বিষয়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-essence-of-culture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14062</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কালচার কী</title>
		<link>https://rowyakbd.com/what-is-culture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/what-is-culture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 31 Mar 2024 11:28:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[কালচার]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[গ্রাম]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[জাতি]]></category>
		<category><![CDATA[জ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[নদী]]></category>
		<category><![CDATA[প্রকৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলা]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম]]></category>
		<category><![CDATA[শল্প]]></category>
		<category><![CDATA[শহর]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13947</guid>

					<description><![CDATA[কালচার কি আমাদের কালচারের কথা জানিতে হইলে আগে বুঝিতে হইবে কালচারটা কি? কালচারের প্রতিশব্দরূপে আমরা সাধারণত &#8216;কৃষ্টি&#8217;, &#8216;সংস্কৃতি&#8217;, &#8216;তহযিব&#8217; ও &#8216;তমদ্দুন&#8217; শব্দগুলি ব্যবহার করিয়া থাকি। ধাতুগত অর্থের দিক হইতে বিচার করিলে কিন্তু এর একটাও কালচারের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে না।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>কালচার কি</strong></p>
<p>আমাদের কালচারের কথা জানিতে হইলে আগে বুঝিতে হইবে কালচারটা কি? কালচারের প্রতিশব্দরূপে আমরা সাধারণত &#8216;কৃষ্টি&#8217;, &#8216;সংস্কৃতি&#8217;, &#8216;তহযিব&#8217; ও &#8216;তমদ্দুন&#8217; শব্দগুলি ব্যবহার করিয়া থাকি। ধাতুগত অর্থের দিক হইতে বিচার করিলে কিন্তু এর একটাও কালচারের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে না। তবে &#8216;কৃষ্টি&#8217; শব্দটা কর্ষণ, কালটিভেশন বা চাষ অর্থে কালচারের পরিভাষারূপে ব্যবহার করা হয় বলিয়া অন্য দুইটি শব্দের চেয়ে এইটাই কালচারের বেশি কাছাকাছি-ইংরেজীতে যাকে বলা হয় রিফাইনমেন্ট, আরবীতে যাকে তাহযিব বলা হয়, সংস্কৃতি শব্দটা সেই অর্থে ব্যবহার করা যাইতে পারে। তমদ্দুন শব্দটা নাগরিক অর্থে কালচার অপেক্ষা সিভিলিযেশনের প্রতিশব্দ-রূপেই অধিকতর উপযোগী।</p>
<p>কিন্তু এসব বিতণ্ডা নিরর্থক। কারণ, খোদ কালচারের অর্থ লইয়াই ইংরাজী সাহিত্য এবং ইউরোপ ও আমেরিকার পণ্ডিতদের মধ্যে ঘোরতর মত-বিরোধ রহিয়াছে। সে মত-বিরোধ এত তীব্র যে বাংলায় আমরা ঐ তিনটি শব্দের যে-কোনও একটিকে স্বচ্ছন্দে কালচারের প্রতিশব্দরূপেই বেদেরেগ ব্যবহার করিতে পারি।</p>
<p>কালচারের সংজ্ঞা দেওয়া খুবই কঠিন। এত কঠিন যে উনিশ শতকের মধ্যভাগ হইতে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পুরা একশ বছরের দীর্ঘ মুদ্দতে ইউরোপ- আমেরিকার দুইজন পণ্ডিতও এ ব্যাপারে একমত হইতে পারেন নাই। তার উপর অনেকেই আবার কালচার ও সিভিলিযেশনকে একই অর্থে ব্যবহার করিয়া বিষয়টাকে আরও জটিল ও সমস্যাটাকে আরও ঘোরালো করিয়া ফেলিয়াছেন। ফলে অবস্থা এই দাঁড়াইয়াছে যে, কালচারকে ডিফাইন করার আর কোনও উপায় নাই; বিশ্লেষণ দ্বারাই উহাকে বুঝিতে হইবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইংরাজী সাহিত্যে কালচার শব্দটা প্রথম আমদানি করেন ফ্রান্সিস্ বেকন ষোল শতকের শেষদিকে। উহাকে ডিফাইন করার চেষ্টা করেন সর্বপ্রথম ম্যাথু আর্নন্ড ইংলণ্ডে এবং ওয়ান্ডু ইমার্সন আমেরিকায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি; কিন্তু কালচার শব্দের যে অর্থে তাঁরা উহার সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলেন শব্দটা বেশিদিন সে অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। বিশ শতকের মাঝামাঝি রবার্ট এযরা পার্ক ও টেইলার প্রভৃতি মার্কিন পণ্ডিত এবং টার্নার ও লাঞ্ছি প্রভৃতি ইংরাজ পণ্ডিতগণের লেখায় কালচার শব্দটা অনেক ব্যাপক ও গভীর অর্থে ব্যবহৃত হইতে শুরু করে।</strong> এর ফলে শব্দটা নতুন তাৎপর্য গ্রহণ করে। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটে নাই। বরঞ্চ শব্দটা ব্যাপকতর ও গভীর হইয়াছে। সম্প্রতি পশ্চিমা সাহিত্যে &#8216;কালচার&#8217; শব্দটা আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হইতে শুরু করিয়াছে। সেখানে &#8216;পলিটিক্যাল কালচার&#8217;, &#8216;এথিক্যাল কালচার&#8217;, এস্থেটিক কালচার&#8217;, &#8216;রিলিজিয়াস কালচার&#8217; ইত্যাদি কথার প্রচলন হইয়াছে। এসব কথা কিন্তু &#8216;এগ্রিকালচার&#8217;, &#8216;হটি কালচার&#8217; বা &#8216;ব্লাড কালচার&#8217; ইত্যাদি টার্মের মত অকৃষ্টিক কোন বিশেষ বিষয় বা বস্তু-জ্ঞাপক নয়। বরঞ্চ মানুষের মন ও মস্তিষ্ক বিকাশের বিশেষ স্তর-বোধক। <strong>তার মানে, কোনও সমাজ বা জাতির মনে কোনও এক ব্যাপারে একটা স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার-বিধি, মোটামুটি সার্বজনীন চরিত্র, ক্যারেক্টার, আচরণ বা আখলাকের রূপ ধারণ করিলেই সেটাকে ঐ ব্যাপারে ঐ মানবগোষ্ঠীর কালচার বলা হইয়া থাকে।</strong> এ অবস্থায় আজিকার পরিবেশে কালচার সিভিলিযেশনের সীমা-সরহদ্দ ঠিক রাখা এখন খুবই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। তবু কালচার ও সিভিলিযেশন যে এক নয়, সেটা আমাদের বুঝিতে হইবে। সভ্য জগতের মনীষীরাও সে চেষ্টা করিতেছেন। কারণ এটা যুগের দাবি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারের দ্বারা দুনিয়াটা যতই ছোট হইতেছে, কালচারের অটনমির প্রয়োজনীয়তা ততই তীব্রভাবে অনুভূত হইতেছে। ফলে কালচার ও সিভিলিযেশনের সীমা নির্ধারণ অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। এ সীমা নির্ধারণ ডেফিনিশন দ্বারা সম্ভব নয়-বিশ্লেষণ দ্বারাই তা করিতে হইবে। এখানে সে চেষ্টাই আমি করিতেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালচার বনাম সিভিলিযেশন</strong></p>
<p><strong>সহজ কথায় ব্যষ্টি বা ইন্ডিভিজুয়্যালের যা ব্যক্তিত্ব বা পার্সন্যালিটি, সমষ্টি বা কমিউনিটির তা-ই কালচার।</strong> আমরা যখন কোন একজন লোক সম্বন্ধে বলি: &#8216;লোকটার পার্সন্যালিটি আছে&#8217;, তখন আমরা সেই লোকটির এমন কতকগুলি গুণ- সমষ্টির দিকে ইশারা করি, যেগুলি ঐকান্তিকভাবে তার নিজস্ব এবং যারা দ্বারা সে অপর সাধারণ হইতে পৃথক। অথচ ঐ গুণ-সমষ্টি বা পার্সন্যালিটি ঐ লোকটির বিশেষত্ব নয়। কারণ পার্সন্যালিটি আরও অনেক লোকের আছে। পার্থক্য শুধু এই যে, সকলের পার্সন্যালিটি রূপে-গুণে এক নয়। ব্যক্তিত্বে-ব্যক্তিত্বে সুস্পষ্ট পার্থক্য রহিয়াছে। এ পার্থক্যের দ্বারাই তাদেরে চিনা যায়। ঐ পার্থক্যটুকুই তাদের নিজস্বতা। নিজস্বতাই ঐ পার্থক্যের প্রাণ। ঐটুকুই ব্যক্তিত্ব।</p>
<p>ঠিক তেমনি, সকল লোক-সমষ্টিরই অর্থাৎ সব কমিউনিটি সমাজ বা জাতিরই একটা নিজস্ব সমবেত ব্যক্তিত্ব বা কর্পোরেট পার্সন্যালিটি আছে। তারই নাম ঐ লোক- সমষ্টি বা কমিউনিটির কালচার। এই লোক-সমষ্টি বা কমিউনিটিকে আমরা অবস্থা- ভেদে জাতি বা ন্যাশন, উপজাতি বা ন্যাশন্যালিটি, সমাজ বা সোসাইটি, এমন কি পরিবার বা ফ্যামিলি বলিতে পারি, বলিয়া থাকি।</p>
<p>জাতি বা ন্যাশন শব্দটা ইদানিং বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় অর্থেই ব্যবহৃত হইয়া থাকে। নৃতাত্ত্বিক এথনিক্যাল বা র‍্যাশিয়াল অর্থে ততটা নয়। ধর্মীয় অর্থে ত নয়ই। একটি রাষ্ট্রের সব নাগরিক মিলিয়াই ন্যাশন বা রাষ্ট্রীয় জাতি, নৃতত্ত্ব, ধর্ম ও ভাষার দিক দিয়া এক না হইলেও। যেমন আমরা বাংলাদেশীরা এক রাষ্ট্রীয় জাতি বা ন্যাশন, যদিও নৃতত্ত্ব ধর্ম ও ভাষার দিক হইতে আমরা এক নই। অপর দিকে, রাষ্ট্রের নাগরিক না হইলে নৃতত্ত্ব ধর্ম ও ভাষার দিক হইতে এক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের লোক হইয়াও এক ন্যাশন হয় না। যেমন পশ্চিম বাংলার লোকেরা ভাষা ও নৃতত্ত্বের দিক হইতে আমাদের গোষ্ঠী ও সমাজের লোক হইয়াও আমাদের সাথে এক জাতি বা ন্যাশন নয় এবং ভারতীয় মুসলমানেরা ধর্ম, নৃতত্ত্ব ও ভাষার দিক হইতে এক গোষ্ঠী এক সমাজের লোক হইয়াও আমাদের ন্যাশনের লোক নয়।</p>
<p>কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় জাতির পার্সন্যালিটি অর্থাৎ কালচার এক নাও হইতে পারে। একই ন্যাশনের ভিতরে একাধিক ন্যাশনালিটি থাকিতে পারে। তৎকালীন যেমন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা একই রাষ্ট্রীয় ন্যাশনের অন্তর্ভুক্ত হইয়াও পৃথক ও স্বতন্ত্র ন্যাশনালিটি এবং পৃথক ও স্বতন্ত্র কর্পোরেট পার্সন্যালিটির অধিকারী ছিল। দুই অঞ্চলের কালচারও তাই স্বতন্ত্র ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালচার ও সিভিলিযেশনের পার্থক্য</strong></p>
<p>এইখানেই আমরা সভ্যতা বা সিভিলেয়েশন হইতে কৃষ্টি বা কালচারকে আলাদা করিয়া দেখিবার মতো আলোর সন্ধান পাই। আগেই বলিয়াছি, কালচার আমাদের কর্পোরেট পার্সন্যালিটি বা সমবেত ব্যক্তিত্ব। এইবার আরেকটু সহজ করিয়া বলি- কালচার আমাদের সামাজিক আমিত্ব। আমরা যা আছি তা-ই কালচার। পক্ষান্তরে সভ্যতাটা কি? <strong>কালচারকে মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে তুলনা করিলে সিভিলিযেশনকে মানুষের সম্পদের সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ আমাদের যা আছে, তাই আমাদের সিভিলিযেশন।</strong> কথাটার আরও একটু তফসির করা দরকার। <em>&#8216;আমরা যা আছি&#8217;</em> ও <em>&#8216;আমাদের যা আছে&#8217;</em> কথা দুইটির মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদ আছে, সেদিকে আমাদের নযর দেওয়া উচিত। কাজটা বেশি কঠিন নয়। আমার আমিত্ব ও আমার সম্পত্তির মধ্যে যে পার্থক্য সুস্পষ্ট, তা মনে রাখিলেই কালচারটা বোঝার কাজ সহজ হইবে। এই দিক হইতে একটু তলাইয়া বিচার করিলে এটাও স্পষ্ট হইয়া আসিবে যে, এই কারণেই এক জাতির একাধিক কালচার থাকিতে পারে বটে, কিন্তু একাধিক সিভিলিযেশন থাকিতে পারে না। অপর দিকে তেমনি বহু জাতির এক সিভিলিযেশন থাকিতে পারে বটে, কিন্তু এক কালচার থাকিতে পারে না। কারণ কালচারের নিজস্বতা বা জাতীয় বা জাতীয় রূপ থাকিতেই হইবে; পক্ষান্তরে সিভিলিযেশনের কোন জাতীয় রূপ থাকিতে পারে না। একটা দৃষ্টান্ত দিয়া কথাটা বুঝাইবার চেষ্টা করিব:</p>
<p>আমরা যখন মিসরীয়, আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, আর্য, গ্রীক, রোমান আরব বা চীনা সভ্যতার কথা বলি, তখন কোন ভৌগোলিক দেশের বা রাষ্ট্রীয় জাতির সভ্যতার কথা বুঝাই না-বুঝাই একটা যুগের সভ্যতা। শিক্ষা-দীক্ষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে, দর্শন-সাহিত্যে, শিল্প-বাণিজ্যে, কলা-কারিগরিতে মানুষের সামগ্রিক অগ্রগতির নামই সভ্যতা। মানবমনের ক্রমবিকাশের ইহা নিদর্শন। সে কারণে গভীরতা ও ব্যাপ্তিতে প্রসার লাভ সভ্যতার স্বভাব। বনের আগুনের মতো নিজের আলোকে ও দাহিকা শক্তিতে বিস্তার লাভই ইহার অন্তর্নিহিত জীবনীশক্তি। আগুন যেমন ইন্ধন হইতে ইন্ধনান্তরে ছড়াইয়া পড়ে, সভ্যতাও তেমনি জাতি হইতে জাত্যন্তরে ছড়াইয়া পড়ে। জ্ঞান যেমন শিক্ষক হইতে আরও বড় হইয়া ছাত্রের মধ্যে বিকশিত হয়, সভ্যতাও তেমনি শিক্ষক-জাতি হইতে শিষ্য-জাতিতে অধিকতর উন্নত ও প্রসারিত হয়। সভ্যতা ক্রমবিকাশমান। জ্ঞানের মতোই সে অক্ষয়, আগুনের মতই সে অনির্বাণ। কাজেই অতীতের ঐ সব সভ্যতার সাথে কোন একটা বিশেষ মানব-গোষ্ঠীর নাম সংযুক্ত  থাকার অর্থ এই নয় যে, ঐ ঐ সভ্যতা শুধু ঐ ঐ মানব-গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বস্তুত ঐ সব সভ্যতার ফল ঐ ঐ মানব-গোষ্ঠীর বাহিরের লোকেরাও ভোগ করিয়াছিল। প্রদীপ যার আংগিনাতেই জ্বলুক, পথচারীও সে আলোকের সুবিধা ভোগ করিবে।</p>
<p>একেবারে ঘরের কাছের নযির লওয়া যাক। বর্তমান যুগের সভ্যতাকে আমরা কিছুদিন আগে পর্যন্ত ইউরোপীয় সভ্যতা বলিতাম। ঐ সভ্যতার নেতৃত্ব এখন আমেরিকার হাতে চলিয়া যাওয়ায় উহাকে আমরা এখন ওয়েস্টার্ন সিভিলিযেশন বা পশ্চিমা সভ্যতা বলিয়া থাকি। মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে এই সভ্যতা অচিন্তনীয় উন্নতি বিধান করিয়াছে। পাকা রাস্তা, মোটরগাড়ী, রেলগাড়ী, হাওয়াই জাহাজ, পোস্ট-টেলিগ্রাম, টেলিফোন, রেডিও-টেলিভিশন ইত্যাদি যোগাযোগ ব্যবস্থায়, ক্যামেরা, মুভি ক্যামেরা, টেক্সিকালার, থ্রি ডাইমেনশন, মঞ্চ ও পর্দা ইত্যাদি চারুশিল্পে, রোটারি মেশিন, লাইনোটাইপ, মনোটাইপ ইত্যাদি। জ্ঞান ও শিক্ষা বিস্তারের সাজ-সরঞ্জামের আবিষ্কারে, শিল্প-সাহিত্যের উন্নতিতে, ইঞ্জেকশন- অপারেশন, রেডিওলজি, কার্ডিওলজি প্রভৃতি চিকিৎসা প্রণালীতে, স্টিলফ্রেমের শতাধিক তলার আকাশ-চুম্বী ইমারতে উঠানামার জন্য লিফট-এস্কেলেটার স্থাপনায়, বিদ্যুৎ ও এটম শক্তিকে মানবের সেবায় নিযুক্তিতে, শূন্যলোকে গ্রহ-উপগ্রহ পরিভ্রমণের বাস্তব আয়োজনের সাফল্যে মানব-মনের যে অভাবনীয় বিকাশ লাভ ঘটিয়াছে এবং ফলে মানুষের বৈষয়িক জীবনে যে সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং তাদের নৈতিক জীবনে যে উন্নতি (অথবা যদি বলিতে চান অবনতি) হইয়াছে, তার সামগ্রিক নামই বর্তমান যুগের সভ্যতা। পশ্চিমা জাতিসমূহ এই সভ্যতার স্রষ্টা বলিয়া এর নাম পশ্চিমা সভ্যতা। কিন্তু তাই বলিয়া এই সভ্যতার ফল কি আমরা পূরবীরাও ভোগ করিতেছি না? পশ্চিমাদের আবিষ্কৃত যন্ত্রাদি ও তাদের তৈরী জিনিস-পত্র ব্যবহার করিয়াই শুধু আমরা সন্তুষ্ট থাকিতেছি না। নিজেরাও সে সব তৈরী করিতেছি। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, আর্টে-সাহিত্যে, শিল্প-বাণিজ্যে, আমরা পশ্চিমাদের সমান ও মতন হইবার চেষ্টা করিতেছি। স্বয়ং পশ্চিমারাও আমাদের সব শিখাইবার ও আমাদের মান উন্নত করিবার জন্য সযত্নে ও সাগ্রহে চেষ্টা করিতেছে। ফলে এই সভ্যতার সুযোগ ও সুবিধা পশ্চিমাদের মতোই আমরাও ভোগ ও ব্যবহার করিতে পারিতেছি। যে যেই পরিমাণে তা পারিতেছে, তার জীবনের মান ও মনের দিগন্ত সেই পরিমাণে উন্নত ও প্রসারিত হইতেছে। সেই হেতু ও সেই পরিমাণে দেশ ও জাতি-নির্বিশেষে গোটা দুনিয়ার মানুষ বর্তমান সভ্যতার অংশীদার। কাজেই পশ্চিমা সভ্যতাটা নামে পশ্চিমা ও অবদানে ইউরোপ-মার্কিন হইলেও আসলে এটা কোন এক জাতির বা জাতি-সমষ্টির সভ্যতা নয়, বর্তমান যুগের সভ্যতা। এইভাবে সভ্যতাটা আসলে যুগেরই বৈশিষ্ট্য, কোন জাতি বা দেশের বৈশিষ্ট্য নয়। বর্তমান যুগের সভ্যতা সম্বন্ধে যা সত্য, অতীতের সভ্যতা সমূহ সম্বন্ধেও তা-ই সত্য ছিল।</p>
<p>কালচারের ধারক পাড়াগাঁ কিন্তু কৃষ্টি সম্বন্ধে এ কথা বলা যাইতে পারে না। আগেই বলিয়াছি, কৃষ্টি সামাজিক ব্যক্তিত্ব। সামাজিকতা পল্লী-জীবনের বৈশিষ্ট্য। এই দিক হইতে কালচারের ধারক ও বাহক পল্লীগ্রাম। শহরে সামাজিক জীবনের অভাব। সেখানে প্রতিবেশিত্ব গড়িয়া উঠিতে পারে না। শহরের বাসিন্দাদের অধিকাংশই ভাসমান জনতা। আজ এ এখানে, কাল ও ওখানে। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরির সমাবেশ হইতেই শহরের পত্তন ও প্রসার। তাতে নিত্য-নূতন লোকের আমদানি। পুরাতনের রফতানি। ওদের মধ্যে প্রতিবেশিত্ব গড়িয়া উঠিবার সময়ই হয় না। শহরের বুনিয়াদী বাশিন্দাদের মধ্যে মহল্লায়-মহল্লায় যে একটা প্রতিবেশিত্ব চালু ছিল, তাও ভাংগিয়া গিয়াছে বা যাইতেছে। শহরের উন্নতি শ্রীবৃদ্ধি ও পুননির্মাণের বন্যায় ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের থ্রাস্ট বা ধাক্কায় ঐ সব যে কোথায় ভাসিয়া যাইতেছে, তার ঠিক-ঠিকানা নাই। পক্ষান্তরে পাড়াগাঁয়ে এই প্রতিবেশিত্ব স্বাভাবিক। সেখানে এক বাড়িতে একজনের অসুখ হইলে সারা গ্রামে রটিয়া যায়। শহরে পাশের বাড়িতে লোক মরিয়া গেলেও কেউ খবর রাখে না। পাশের বাড়িতে কে বা কারা থাকে, তাদের পরিবারে লোক কত, কে কি করে, অনেক সময় তাও আমরা জানি না। জানিতে পারি না। জানিবার অবসর নাই। শহরের সবাই আমরা কাজের লোক। অতিমাত্রায় ব্যস্ত।</p>
<p>পারতপক্ষে কেউ পায়ে হাঁটিয়া চলে না। রিক্সা-ট্যাক্সি-মোটরে ছুটাছুটি। দৌড় ছাড়া গতি নাই। নষ্ট করিবার সময় নাই। এই পরিবেশে প্রতিবেশিত্ব বা আত্মীয়তা গড়িয়া উঠিতে পারে না। পরিচয় যা ঘটে, তা নিতান্ত বৈষয়িক সংক্ষিপ্ত, দুই দণ্ড বসিয়া আলাপ করিবার সময় নাই। যাদের আছে তারা ক্লাবে যায়। ক্লাব প্রতিবেশিত্ব নয়। কাজেই শহরবাসীর চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্র, ভাব গতিক এক হইতে পারে না। ফলে শহরের বাশিন্দারা হয় মাল্টিকালার; শতরংগা; রং-বেরং এর লোক। পক্ষান্তরে পল্লীর লোকেরা হয় ইউনিকালার বা একরংগা। শহরের জনতার পরিবর্তন ঘটিতেছে প্রতিদিন, প্রতি ঘন্টায়, প্রতি মিনিটে। পল্লীর লোক দাদা-পরদাদার আমল হইতে চৌদ্দ পুরুষ ধরিয়া একই জায়গায় একই ধরনে বসবাস করিতেছে। এই কারণেই পল্লী-গ্রামের লোকদের মধ্যে সুখে দুঃখে হাসি-কান্নায় একটা আন্তরিক সমবেদনা ও আত্মীয়তা গড়িয়া উঠিয়াছে। এই আত্মীয়তা হইতে তাদের আনন্দে-উল্লাসে, আমোদ-প্রমোদে, শোকে-মাতমে, অভাবে-অনটনে, আচারে-ব্যবহারে, পোশাকে-পরিচ্ছেদে, চিন্তায়-ভাবনায়, প্রথায়-সংস্কারে, কাহিনী-কিংবদন্তিতে, এমন কি ভূত-প্রেত দর্শনে-শ্রবণে, একটা একাকারত্ব বা ইউনিফর্মিটি দানা বাঁধিয়া উঠিয়াছে। পল্লী-জীবনের অচঞ্চলতার মতই এই ইউনিফর্মিটি অচঞ্চল ও স্থায়ী। উপরে বর্ণিত সামাজিক আচারের সমাবেশ ও সমষ্টিই জাতির কালচার।</p>
<p><strong>পল্লী-জীবনের ঐ ইউনিফর্মিটিই কালচারের</strong> <strong>বুনিয়াদ। এই জন্যই কালচারটা মূলত এবং প্রধানত পল্লীর সম্পদ। পল্লী জীবনই সে সম্পদের ধারক ও রক্ষক।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শহর কালচারের স্রষ্টা</strong></p>
<p>অপর দিকে শহর শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা-সাহিত্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার কর্ম-কেন্দ্র। ঐ সব কাজ কর্ম উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশের হরেক রকমের লোকের সেখানে সমাবেশ। তাদের ধর্ম-ঈমান, আচার-অনুষ্ঠান, চিন্তা ভাবনা, খোরাক-পোশাক, চাল-চলন, বিদ্যা-বুদ্ধি এক নয়। এদের আলাপ-পরিচয় মিলামিশাও স্থায়ী নয়। এমন পরিবেশ ইউনিফর্মিটি ঐক্য ও আত্মীয়তা, এক কথায় কালচার, গড়িয়া উঠার অনুকূল নয়-সে কথা একটু আগেই বলিয়াছি। কিন্তু এর একটা ভাল দিকও আছে।</p>
<p>নিত্য-নতুন লোকের আসা যাওয়া, কাজ- কর্মে তাদের আলাপ-পরিচয় ও পরস্পরের ভাবের আদান-প্রদান হয় শহরে। তাতে নিত্য-নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ হয় তাদের। তাদের সকলের দৃষ্টিভংগিতেই আসে একটা উদারতা। এক জায়গায় বসিয়া বায়স্কোপে বিদেশে দেখার মতোই শহরের লোকেরা ঘরে বসিয়া দুনিয়া দেখে। নিত্য-নতুন সমস্যার সৃষ্টি ও সমাধান দেখে তারা চোখের সামনে। এইভাবে আসে তাদের মধ্যে নতুন চিন্তাধারা। তাতে বিচার-বুদ্ধিতে তাদের আসে উদারতা। মনে আসে প্রসারতা। তারা লাভ করে বিদেশীর ভাল জিনিস গ্রহণ করিবার ক্ষমতা, আর নিজেদের খারাপ জিনিস বর্জন করিবার সাহস। পল্লী- জীবনে যেসব বিশ্বাস থাকে তাদের ঈমানের অংগ, শহর-জীবনে বিজ্ঞান-প্রভাবিত মুক্তবুদ্ধির বিচারে সে সবই হইয়া পড়ে নির্বোধ কুসংস্কার। তাই পাড়াগাঁয়ে যারা সন্ধ্যা বেলায়ই বাড়ির পাশের ছোট শেওড়া গাছটিতে ভূত-প্রেত দেখে, তারাই শহরে আসিয়া বড় বড় বটগাছে অমাবস্যার রাত্রেও ভূত-প্রেত দেখে না।</p>
<p><strong>বহুদর্শনের ফলে শহরবাসীর এই যে মনের বিকাশ ও দৃষ্টির প্রসারতা, এটা তারা লাগাইতে চায় নিজের সমাজের ও দেশের কাজে। অপরের দেখাদেখি নিজের লোককে ভাল করিয়া তুলিবার প্রবল ইচ্ছা জাগে তাদের অন্তরে। তারা হইয়া উঠে রিফর্মিস্ট।</strong> তারা নিজেদের চাল-চলনে, আচার-ব্যবহারে, ঈদে-পার্বণে, এমনকি ধর্ম-বিশ্বাসে, এক কথায় নিজেদের কালচারে, সংস্কার প্রবর্তন করিয়া সেটাকে করিতে চায় অধিকতর ভব্য, শালীন সুন্দর। শিক্ষা-কেন্দ্র, সাহিত্য-সংঘ সংবাদপত্র-পত্রিকার অফিস, রংগমঞ্চ, ক্লাব-রেস্তরাঁ, মসজিদ-মন্দির, গির্জায় প্রাচুর্য থাকে শহরেই। এই সব জায়গা হইতেই নতুন নতুন ভাব চিন্তা জন্ম ও প্রসার লাভ করে। রাস্তাঘাট, টেন, মোটরবাস, ডাক-তার ইত্যাদি যানবাহনের ক্রমবর্ধমান বিস্তারে ঐ সব নতুন চিন্তাধারা ছড়াইয়া পড়ে মফস্বলে। মফস্বলের লোকেরা সকল চিন্তা ও কাজে অনুকরণ ও অনুসরণ করে শহরবাসীকে। এইভাবে শহরে কালচার সৃষ্টি হইয়া বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছুরিত হয় পল্লী-জীবনে। শহরে করে যা সৃষ্টি, পল্লীকরে তা ধারণ ও পালন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>কালচার ও সিভিলিযেশনের সীমারখা</strong></p>
<p>অতএব দেখা গেল, শহর সভ্যতা-ভিত্তিক এবং পল্লী কৃষ্টি-ভিত্তিক-এ কথাও যেমন নিরাধারা বলা যায় না, সভ্যতা শহরবাসী এবং কৃষ্টি পল্লীবাসী-একথাও তেমনি চোখ বুজিয়া কওয়া যায় না। এই কারণেই সিভিলিযেশন ও কালচারে সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা এত কঠিন। এ ছাড়াও আরেকটা অসুবিধা আছে। এমন অনেক ব্যাপার আছে, যার খানিকটা কালচার, আর খানিকটা সিভিলিযেশন। উদাহরণস্বরূপ বিয়ার কথাটাই ধরা যাউক। বিয়া-প্রথাটা সভ্যতা। যে দেশ ও সমাজে বিবাহ প্রথা চালু নাই, সে দেশ ও সমাজকে সভ্য বলা যায় না। সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্ররা জানেন যে, আদিকালে মানুষের মধ্যে বিবাহ-প্রথা ছিল না। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংগ হিসাবে একরূপ আইনে পরিণত হইয়াছে। কাজেই বিবাহটা সভ্যতা। কিন্তু বিবাহের রসুম বা প্রণালী সভ্যতা নয়, কালচার মাত্র।</p>
<p>বিয়ার রসুমের খুঁটিনাটি এক-এক দেশে এক-এক জাতিতে এক-এক রকম। এক দেশে দুলা-দুলহান নিজেরা দেখাশোনা ও কোর্টশিপ করিয়া বিয়া করে, আরেক দেশে দুলা-দুলহানের দেখাশোনা হয় না। তাদের বাপ-ভাই মুরুব্বিরাই বিয়া ঠিক করেন। এক দেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে বিয়া হয়, আরেক দেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিয়া হয়। এক দেশে বা এক জাতিতে বরপক্ষ দেয় কাবিন ও দেনমোহর, আরেক জাতিতে কন্যাপক্ষ দেয় পণ ও যৌতুক। এক দেশে পুরুষ-নারীকে বিয়া করে, আরেক দেশে নারী করে পুরুষকে। এক দেশে একই সময়ে একাধিক বিয়া করা বেআইনী, আরেক দেশে এক সঙ্গে চার বা তারও বেশি বিয়া করা যায়। এক দেশে তালাক বা বিবাহ-বিচ্ছেদের দস্তুর আছে, আরেক দেশে তা নাই। এক দেশে বিধবারা বিয়া করতে পারে, আরেক দেশে পারে না। এক দেশে আত্মীয়-অনাত্মীয় নির্বিশেষে যে কেউকে বিয়া করা যায়, আরেক দেশে তা চলে না-এই সব নিয়ম-কানুনের একটা সিভিলিযেশনের প্রশ্ন নয়, কালচারের প্রশ্ন মাত্র। তার মানে এই সব নিয়ম কানুনের পার্থক্যের দরুন কোন জাতি সভ্য বা অসভ্য বিবেচিত হয় না, বরং এ সবই বিভিন্ন সত্য জাতির নিজ নিজ বিশেষ সামাজিক বা ধর্মীয় ব্যবস্থা; সুতরাং তাদের কালচারের অংগ।</p>
<p>যৌন-সমতার প্রশ্নটাও তাই। নারীকে নরের অধীন দাসী-বান্দী গৃহপালিত জীব বা পণ্য মনে করা অসভ্যতা। কি পারিবারিক সামাজিক জীবনে উভয়ের কর্তব্যের পৃথকীকরণটা অসভ্যতা নয়, কালচারের পার্থক্য মাত্র।</p>
<p>বিয়ার বেলা যেমন, জন্মের বেলায়ও তেমনি। সন্তান জন্মের সময় বিভিন্ন দেশে ও ভিন্ন-ভিন্ন জাতিতে বিভিন্ন প্রথা চালু আছে। কোনও দেশে ও জাতিতে সন্তানের জন্মে আকিকা দেওয়া হয় এবং আকিকা দেওয়ার সময়েই নাম রাখা হয়। আরেক দেশে সন্তানকে ধর্মস্থানে ধর্মযাজকের কাছে লইয়া যাওয়া হয় এবং সেখানেই তার নামকরণ হয়। এক দেশে প্রতিবছর সন্তানের জন্মবার্ষিকী পালন করা হয় এবং আত্মীয়-স্বজন তাকে উপহার-উপঢৌকন দেয়, আরেক দেশে সন্তানের জন্ম-তারিখটি আলগোছে ভুলিয়া যাওয়া হয়। এক দেশে ছেলেদের খৎনা করান হয়, আর এক দেশে হয় না।-এ সবই কালচারের অংগ, সিভিলিযেশনের অংগ নয়। কিন্তু সন্তান জন্মের সময় ছেলে- সন্তান রাখিয়া মেয়ে সন্তানকে নদীতে ভাসাইয়া দেওয়া হইলে তাকে আর কৃষ্টি- অকৃষ্টির প্রশ্ন বলা যায় না। -তা হইয়া পড়ে সভ্যতা-অসভ্যতার প্রশ্ন।</p>
<p>জন্মের সময় যা, মৃত্যুর সময়েও তাই। এর খানিকটা সভ্যতা, খানিকটা কৃষ্টি। যেমন ধরুন, মৃত্যুর পর লাশটার গোশত খাইয়া ফেলিলে বা শিয়াল-কুত্তার ও চিল-শকুনের খাওয়ার জন্য ফেলিয়া দিলে সেটা হইবে অসভ্যতা। আর সযত্বে সাড়ম্বরে সে লাশটারে সৎকার করাটা হইবে সভ্যতা। এই সৎকারেরও আবার বিভিন্ন রূপ হইয়া, থাকে। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন-ভিন্ন জাতিতে বিভিন্ন প্রণালীতে তা করা হয়। সে প্রণালীগুলি হইবে ঐ ঐ দেশ বা জাতির কালচার। এই ধরুন, কোন দেশে বা জাতিতে লাশ পুড়াইয়া ফেলা হয়; কোন দেশে বা জাতিতে তা মাটিতে পুঁতিয়া ফেলা হয়। পুড়াইয়া ফেলা ও পুঁতিয়া ফেলাও আবার ভিন্ন-ভিন্ন রকমের হইতে পারে। কেউ কাঠ-লাকড়িতে পুড়ায়, কেউ বিজলির তাপে পুড়ায়। পুঁতিবার বেলাও তেমনি এক জাতি লাশ সযত্বে ধুইয়া-মুছিয়া নয়া কাপড় পরাইয়া খুশবু লাগাইয়া দাফন করে; আরেক জাতি লাশটি কাঠের বাক্সে ভরিয়া মাটিতে চাপা দেয়। এক জাতি তাদের মৃত ব্যক্তিদেরে বিশালায়তনের ফুল-বাগিচাওয়ালা গোরস্থানে পৃথক পৃথক সমাধি দখল করিতে দিতেছে; আর এক জাতি তাদের মৃত ব্যক্তিদে&#8217;র স্বল্পায়তনের শ্মশানঘাটের ছাই হইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে বাধ্য করিতেছে। এ সবই বিভিন্ন জাতির বা মানব-গোষ্ঠীর কালচারের অংশ। সিভিলিযেশনের সংগে এ সবের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু এই কালচারই একদিন সিভিলিযেশনের প্রশ্ন হইয়া উঠিতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যদি ভবিষ্যতে প্রমাণিত হয় যে, এই দুই প্রথার কোনও একটি বা উভয়টি মানব-স্বাস্থ্যের পক্ষে অকল্যাণকর, তখন উহা আর কালচারের প্রশ্ন থাকিবে না; হইয়া উঠিবে উহা সিভিলিযেশনের প্রশ্ন। দৃষ্টান্তস্বরূপ সতীদাহের কথা বলা যায়। মৃত স্বামীর চিতায় বিধবা পত্নীকে পুড়াইয়া ফেলা একদা কোন কোন জাতির কালচারের অংগ ছিল। কিন্তু উহা সিভিলিযেশনের পরিপন্থী বিবেচিত হওয়ায় এখন পরিত্যক্ত হইয়াছে। কাজেই দেখা গেল, এই সব ব্যাপারের খানিকটা কালচার আর খানিকটা সিভিলিযেশন।</p>
<p><strong>মানুষের ভাষা, উপাসনা-প্রণালী এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিরও খানিকটা কালচার, আর খানিকটা সিভিলিযেশন।</strong> বর্ণমালাযুক্ত ভাষা মানুষের সভ্যতার নিদর্শন; কিন্তু হরফের আকৃতি ও ডাইনে-বামে উপরে নিচে লেখার প্রণালী কালচারের নিদর্শন। গির্জা-মন্দির-মসজিদে প্রার্থনা-উপাসনা করা, রোযা-নামায পড়া, সন্ধ্যা-আহ্নিক করা, বুকে ক্রস ঝুলান, ধর্মস্থানে গমন, কবর যিয়ারত, এমনকি পীরের দরগায় শিরনী ও কালীবাড়িতে কবুতর মানত করা ইত্যাদি ইত্যাদি সবই মানুষের কালচারের অংগ। সিভিলিযেশনের সংগে এর কোন সম্পর্ক নাই; অর্থাৎ এই সব ক্রিয়া-কলাপ এইরূপে করিলে সভ্যতা হইবে, আর ঐ ধরনে করিলে তা অসভ্যতা হইবে, এমন কোন কথা নাই। কিন্তু এই সব কালচারের প্রতিপালনে পূজা-অর্চনা বা ইবাদত-বন্দেগি করিতে গিয়া উপাস্য দেবতার ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য প্রাণী বলি দিলে উহা আর কালচারের প্রশ্ন থাকে না, হইয়া পড়ে তা সিভিলিযেশনের প্রশ্ন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ধর্ম ও কৃষ্টির সীমারেখা</strong></p>
<p>এইখানে ধর্ম ও কৃষ্টির সীমারেখা সম্বন্ধে দুই একটা কথা নিতান্ত প্রাসংগিক হইয়া পড়িতেছে। কারণ উপরে যে সব ক্রিয়া-কলাপের দিকে ইশারা করা হইল, তার অনেকগুলিই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংগ। রিলিজিয়ান ও কালচারের বাউন্ডারি নির্দেশ এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। কালচার ও সিভিলিযেশনের সীমা নির্ধারণই ইহার প্রতিপাদ্য। তবু কালচারের কথা বলিতে গেলে ধর্মের কথা স্বতঃই আসিয়া পড়ে বলিয়া এখানে অতি সংক্ষেপে ধর্ম ও কালচারের সীমা নির্দেশের চেষ্টা করিতেছি।</p>
<p><strong>ধর্ম ও কৃষ্টির সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়; কিন্তু তা হইলেও দুইটা এক বস্তু নয়। এক কথায় বলা যায় ধর্ম কালচারের নির্যাস; পোটেনটাইড্ কালচার দার্শনিক ম্যালিনস্কির ভাষায় &#8216;মাস্টার ফোর্স অব হিউম্যান কালচার&#8217;। কাজেই ধর্মের সবটুকুই কালচার, কিন্তু কালচারের সবটুকুই ধর্ম নয়। </strong>সহজে বুঝিবার জন্য কালচারকে গাছের সংগে তুলনা করিলে ধর্মকে গাছের ফলের সঙ্গে তুলনা করিতে হয়। গাছ হইতে রিলিজিয়ান ও রিলিজিয়ান হইতে কালচারের উৎপত্তি। গাছ কিন্তু ফলের মত নিটোল ও অনাবিল নয়। তেমনি ভাল-মন্দ ও ফুল-কাঁটা লইয়াই কালচার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালচারের ব্যাপকতা</strong></p>
<p>এমনিভাবে মানুষের গৃহনির্মাণ পোশাক-পাতি, রান্না-বান্না, খেলা-ধূলা, নাচ-গান, মায় ওয়ারিসী আইন-কানুন পর্যন্ত সব ব্যবস্থার মধ্যেই খানিকটা কালচার ও খানিকটা সিভিলিযেশন রহিয়াছে। মানুষ আদিকালে বনে-জংগলে-গুহায় বাস করিত। স্থায়ী বাসগৃহ নির্মাণ করিয়া তারা সভ্য হইয়াছে। স্থপতি বিদ্যার উৎকর্ষ সাধন করিয়া অধিকতর সভ্য হইয়াছে। কাজেই আবাসগৃহ নির্মাণ সভ্যতা। কিন্তু স্থাপত্যের রূপ কি হইবে, দালান-ইমারত চূড়াওয়ালা বা গম্বুজওয়ালা হইবে, না চৌকোণা বা চ্যাপ্টা হইবে, ইট-পাথরের হইবে, না কাঠ বাঁশের হইবে- এ সব কালচারের ব্যাপার। কাপড় পরা-না-পরাটা সভ্যতার প্রশ্ন। কিন্তু কি ধরনের পোশাক পরা হইবে, প্যান্ট না পাজামা, কোট না কোর্তা, শাড়ি-সেলওয়ার, না স্কার্ট-গাউন সেটা কালচারের প্রশ্ন। মাছ-গোশত-তরকারি রাঁধিয়া খাইবে, না কাঁচা খাইবে-এটা হইবে সভ্যতার প্রশ্ন। কিন্তু কি প্রণালীতে রান্না করিবে, কোন্টা খাইবে, আর কোল্টা খাইবে না, কোন্টা হালাল, কোল্টা হারাম, কি ধরনের পাক-প্রণালী পছন্দের, পেস্টিপ্যাটিস ভাল, না রসগোল্লা-সন্দেশ ভাল-এ সব কালচারের প্রশ্ন। খেলা-ধূলাকে মানুষের কর্মজীবনের স্বাভাবিক অংগ স্বীকার করা সভ্যতা। কিন্তু খেলার বিভিন্ন রূপ ফুটবল না রাগবি, ক্রিকেট না বেসবল, পলো না ঘোড়দৌড়, হকি না ডাংগুলি-এসব সভ্যতার প্রশ্ন নয়, কালচারের প্রশ্ন মাত্র। সংগীত ও নৃত্যকে চারুশিল্পের অন্তর্গত করা সভ্যতা। কিন্তু নাচ-গানের বিষয়বস্তু, ধরন ও প্রণালীটা কালচারের ব্যাপার। সম্পত্তির মালিকানার স্বীকৃতি সভ্যতার নিদর্শন। কিন্তু সে সম্পত্তির ওয়ারিস নির্ধারণ ও বণ্টন-প্রণালীটা কালচার মাত্র।</p>
<p><strong>কালচারের উৎস</strong></p>
<p>উপরের আলোচনা হইতে ইহা প্রমাণিত হইতেছে যে, <strong>যে মন ও মস্তিষ্ক মানুষকে অন্যান্য জীব-জন্তু হইতে পৃথক করিয়াছে, সেই মনের বিকাশের নাম কালচার, মস্তিষ্কের বিকাশের নাম সিভিলিযেশন।</strong> আগের আলোচনা হইতে এটাও স্পষ্ট হইয়াছে যে, এই নির্ধারণও নিক্তির ওজনে নিখুঁত নয়, মাত্র মোটামুটিভাবে সত্য। সভ্যতা বুদ্ধির বস্তু বলিয়াই সে নিজের জোরে রাজ্য জয় করে। প্রসার ও বিস্তার লাভ করে। হৃদয়ের সাথে সভ্যতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য নয়। তাই গ্রহণকারীকে অন্তর দিয়া সভ্যতা গ্রহণ করিতে হয় না। তার কোনও দরকারও নাই। এ্যারোপ্লনকে শয়তানের কল বলিয়াও অনেকে হাওয়াই জাহাজে চড়িয়া হজ করিতে যাইতেছেন। অন্যান্য সব সম্পদের মতোই সভ্যতার সাফল্য তার প্রয়োজনে।</p>
<p>আজিকার যান্ত্রিক সভ্যতাই তার প্রমাণ। প্রয়োজনের তাকিদেই সারা দুনিয়া এই পশ্চিমা সভ্যতা গ্রহণ করিয়াছে। মস্তিষ্কের ব্যাপার বলিয়া ইহা গ্রহণ করিতে কারও কোন অসুবিধা হয় নাই। দুনিয়ার সব দেশেই ইহা খাপ খাইয়া গিয়াছে। প্রকৃতির বিধানেই ইহা ঘটিয়াছে। কথাটা সহজে বুঝিবার জন্য আমরা সভ্যতাকে ইমারতের সংগে তুলনা করিতে পারি। আর কালচারকে তুলনা করিতে পারি এবং আগেই করিয়াছি, গাছের সংগে। ইমারত মাটি হইতে রস গ্রহণ করে না। কাজেই যে-কোন সরঞ্জামের যে-কোনও প্লানের ইমারত যে-কোনও দেশে নির্মিত হইতে পারে। কিন্তু গাছকে মাটি হইতে রস সংগ্রহ করিয়া বাঁচিতে হয়। সেজন্য যে-কোনও গাছ দুনিয়ায় যে কোনও দেশে লাগান যায় না। মাটি রস সংগ্রহের উপযোগী না হইলে চারা লাগাইলেও তা বাঁচে না।</p>
<p>কালচার সম্বন্ধেও এই কথা। <strong>যে-কোন দেশের কালচার, তা যতই সুন্দর হউক না কেন, অন্য যে-কোন দেশে চালান যাইবে না। স্থানীয় রসের অভাবে তা মারা যাইবে। কারণ আগেই বলিয়াছি কালচারটা মনের বস্তু, মস্তিষ্কের বস্তু নয়। এই দিক হইতে বিচার করিয়া বলা যায় সিভিলিযেশন একটা র‍্যাশনাল কনস্ট্রাকশন; আর কালচার একটা ইমোশন্যাল গ্রোথ।</strong></p>
<p>ঠিক এই কারণেই দুনিয়ার লোককে যত সহজে পশ্চিমা সভ্যতা গ্রহণ করান গিয়াছে, তত সহজে পশ্চিমা কৃষ্টি গ্রহণ করান যায় নাই। সভ্যতা প্রসার লাভ করে বিজয়ীর বেশে। পশ্চিমা জাতিসমূহ রাজ্য বিস্তারে ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে তিনশ&#8217; বছর ধরিয়া সারা দুনিয়ায় প্রভুত্ব করিয়াছে। এই উপলক্ষে তারা জগতবাসীর কাছে নিজেদের সভ্যতা প্রচার করিয়াছে। বিশ্ববাসী তা গ্রহণও করিয়াছে।</p>
<p>নিজেদের সভ্যতার সাথে সাথে পশ্চিমারা নিজেদের কালচার প্রচারে চেষ্টাও কম করে নাই। কিন্তু শহরের মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া সাধারণভাবে দুনিয়ার সব দেশের জনগণ পশ্চিমা কালচার গ্রহণ করে নাই। শাসক জাতির কালচারের প্রবল স্রোতের মুখেও তারা নিজেদের কালচার মজবুত হাতে ধরিয়া রাখিয়াছে। এটা মানুষের দর্প নয়, প্রকৃতির দর্প। সব দেশের মাটি পশ্চিমা কালচারের চারা গাছের রস যোগাইতে পারে নাই বলিয়াই এইরূপ ঘটিয়াছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈচিত্র্য অপরিহার্য</strong></p>
<p>এটা কি অন্যায় হইয়াছে? পশ্চিমা কালচার গ্রহণ না করিয়া পূরবীরা কি ভুল করিয়াছে? এটা কি তাদের কুসংস্কারী মনোভাবের জন্য হইয়াছে? এটা কি তাদের সংস্কার-বিরোধী নস্টালজিয়া? তারা কি জানে না, কি জিনিস তারা হারাইতেছে? না, প্রকৃত অবস্থা তা নয়। মানব জাতির কল্যাণের খাতিরেই তা ঘটিয়াছে। যে বৈচিত্র্যে বিশ্বের সৌন্দর্য নিহিত, স্রষ্টার কারিগরির অসাধারণত্বের যা নিদর্শন, তারই খাতিরে প্রকৃতি এরূপ ঘটাইয়াছে।</p>
<p>ধরুন, এমন যদি না হইত, দুনিয়ার সব জাতি যদি পশ্চিমা কালচার গ্রহণ করিত, তবে অবস্থা কি দাঁড়াইত? সভ্যতার দিক হইতে দুনিয়া যেমন একাকার হইয়া গিয়াছে, কালচারের দিক হইতেও তেমনি সব জাতি একরংগা হইয়া যাইত। দেহের রং অবশ্য এক হইত না। কিন্তু মনের রং এক হইয়া যাইত। তাতেও কার কি লোকসান হইত?</p>
<p>মানবতার লোকসান হইত দুই দিক হইতে। প্রথমত, দুনিয়ার বৈচিত্র্য নষ্ট হইত। বিভিন্ন জাতির জাতীয় বৈশিষ্ট্যের অবসান ঘটিত। হাজার ফুলের বাগিচা যে দুনিয়া, সেটা পরিণত হইত এক রংগা গেন্দা ফুলের ক্ষেত্রে। দুনিয়ার সব জাতি নকল পশ্চিমা জাতিতে পরিণত হইত। লাখ লোকের সমাজের মধ্যে দুই-চারজন মাত্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন থাকিয়া বাকী সব লোক ব্যক্তিত্বহীন হইলে সমাজের অবস্থা যা দাঁড়াইবে, দুনিয়ার সব জাতি নিজ নিজ কালচারের স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়া পশ্চিমা কালচার গ্রহণ করিলে বিশ্ববাসীর অবস্থা দাঁড়াইবে ঠিক তাই।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, দুইচারজন লোক বা শ্রেণীবিশেষ বাদে সমাজের আর সব লোক ব্যক্তিত্বহীন হইলে সে সমাজ সচেতন সমবেত গণ-জীবন থাকিবে না, হইয়া যাইবে রাখালের পরিচালনায় একপাল গরু। স্বকীয় কালচার বা ব্যক্তিত্বহীন জাতিসমূহ ঠিক তেমনি পশ্চিমা রাখালের অধীনে গরুর পাল হইয়া যাইত। ফলে পশ্চিমা জাতিসমূহ ছাড়া আর সব জাতি হারাইত স্বাধীন চিন্তা, কর্মোদ্যম ও সৃষ্টির অভিলাষ। বিশ্ব সভ্যতায় তাদের কোনও অবদান থাকিত না। কার্যত তারা পরিণত হইত প্রাণহীন যন্ত্রে।</p>
<p>কাজেই দেখা গেল, লোক-সমাজে আদর-কদর, মান-ইয্যৎ পাইতে হইলে যেমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হইতে হয়, তেমনি বিশ্ব-সমাজে আদর-কদর ও মান-মর্যাদা পাইতে হইলে আমাদের জাতিকেও হইতে হইবে সমবেত ব্যক্তিত্বের, মানে নিজস্ব কালচারের অধিকারী। নিজস্ব কালচারের প্রয়োজন এইখানেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈচিত্র্য স্বাভাবিক</strong></p>
<p>মনে রাখা দরকার, ব্যষ্টির ব্যক্তিত্ব যেমন, জাতির ব্যক্তিত্বও তেমনি, কদাচ নিখুঁত, ত্রুটিহীন হইতে পারে না। মারিয়া-পিটিয়া যেমন ব্যক্তিত্ব হয় না, ছাঁচে ঢালিয়া তেমনি কালচার হয় না। আগেই বলিয়াছি, কালচারটা ডিযাইন করা কনস্ট্রাকশন নয়। ওটা গাছের মতই ন্যাচারেল গ্রোথ। বলা যায় ওটা প্রকৃতির তৈরী নদী। মানুষের হাতে-কাটা খাল নয়। দুই কূল ছাপিয়া দুই পাড় ভাংগিয়া ইচ্ছামতো চলাই নদীর ব্যক্তিত্ব। কৃত্রিম খালের মতো তার দুই পাড় শানে-বাঁধা নয়। এই জন্যই দোষে-গুণে যেমন ব্যক্তিত্ব, ভাল-মন্দেই তেমনি কালচার। দুনিয়ার সব কালচারের শুধু গুণগুলি বাছিয়া লইয়া একটা নিখুঁত সুন্দর কালচার গড়িবার চেষ্টা করিয়া দেখুন, পারিবেন না। সেটা কালচার হইবে না, হইবে বড় জোর কালচারের ল্যাবরেটরি। মিউযিয়াম হইবার সম্ভাবনাই বেশি।</p>
<p>এর কারণও সুস্পষ্ট। মানুষ ফেরেশতা নয়। দোষে-গুণেই তারা মানুষ। তাদের এ দোষ-গুণের বিশেষত্ব এই যে এক দিক হইতে যেটা দোষ, আর এক দিক হইতে সেটাই সবলতা। ধরুন, মানুষের রাগের কথা। এক সময়ে এটা দোষ। কিন্তু সময়ান্তরে এটাই গুণ। নিষ্ঠুরতারই আর এক নাম বীরত্ব। কাপুরুষতাকেই সময়বিশেষে সহিঞ্চুতা বলা হয়। আহাম্মকির সাধু নাম সরলতা।</p>
<p>কালচারের বেলাও তাই। একের জন্য যা দোষ, অপরের জন্য তাই গুণ। এটাই তাদের পার্থক্য। এই পার্থক্যটুকুই যার তার বৈশিষ্ট্য। হুবহু ব্যষ্টির ব্যক্তিত্বের মতোই। একটা দৃষ্টান্ত লওয়া যাউক। হাত-পা, চোখ-মুখ, নাক-কান, খানা-পিনা, হাগা-মুতা এবং জন্ম-মৃত্যু কোনও ব্যাপারেই জানোয়ার ও মানুষের মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই। মন ও মস্তিষ্কের দোহাই দিয়া তাহাদের মধ্যে যে পার্থক্য করি, তাও বড় ক্ষীণ। বানরের বেলায় সে পার্থক্যের সীমা কোথায়। শুধু মন-মস্তিষ্কের নয়, তাদের অন্তরও আছে। তাহারা ও হাসে-কাঁদে। ভাষাও তাদের একটা আছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈশিষ্ট্য কি?</strong></p>
<p>তথাপি মন-মস্তিষ্ক ও অন্তরের এক স্তরে জানোয়ার ও মানুষের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। সে পার্থক্য স্থূল দৃষ্টিতে যতই ক্ষীণ হউক না কেন ঐ পার্থক্যটুকুই মানুষের নিজস্বতা। ঐ টুকুই তার বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>ব্যক্তিত্ব ও কালচারের বেলাও অবিকল তাই সত্য। হাজার বিষয়ে এক ও সদৃশ হইয়াও সামান্য দুই-এক বিষয়ে তারা পৃথক স্বতন্ত্র ও অসদৃশ। দেখা যাইবে সবই ত এক। তবে আর পার্থক্যটা কি? হাঁ, আছে। ঐ যে মানুষের ভিড়ের মধ্যে মাত্র এক ইঞ্চি বেশি লম্বা একটা লোক দেখা যাইতেছে, ঐ দৈর্ঘ্যটুকুই তার বিশেষত্ব। হাতে পায়ে রং চেহারায় কথাবার্তায় সব ব্যাপারেই আর সবার সাথে তার মিল আছে। কারণ সেও মানুষ। মানুষ না হইয়া সে যদি একটা খুঁটি বা উট হইত, তবে তার উচ্চতা তার বৈশিষ্ট্য হইত না।</p>
<p>তেমনি আগে কালচার হইতে হইবে। তারপর আসিবে কালচারের বৈশিষ্ট্য। সব কালচারের মধ্যে ঐক্য মিল ও সাদৃশ্য থাকিবে হাজার। আর পার্থক্য থাকিবে মাত্র দুই একটি। ঐ পার্থক্যটুকুই তাদের বৈশিষ্ট্য। অপরের চোখে বা বিজ্ঞানের বিচারে সে পার্থক্যটুকু তুচ্ছ হইতে পারে। কিন্তু ঐ কালচারের জন্য তুচ্ছ নয়। খুব ছোট দৃষ্টান্ত দিয়াই বিচার করা যাউক। মুসলমানের নূরের দাম হিন্দু-খৃস্টানের কাছে যা, হিন্দুর টিকির দাম মুসলিম-খৃস্টানের কাছে তাই। আবার খৃস্টানের ক্রসের দামও হিন্দু-মুসলমানের কাছে তুচ্ছ। ইহুদি-মুসলমানরা তাদেরা ছেলেদের কেন খৎনা করায় এটা হিন্দু-খৃস্টানরা বুঝিতে না পারিলেও ইহুদি মুসলমানরা কিন্তু কাজটাকে তাদের কালচারের ফান্ডামেন্টাল মনে করে। বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ পোশাকে অত বাবু ও চেহারায় তাত সুন্দর হইয়াও মোচ দিয়া তাঁর অমন সুন্দর মুখখানা ঢাকিয়া রাখিতেন। সে জন্য আমরা তাঁর মুসলমান-খৃস্টান ভক্তদের অন্তরে দুঃখের অন্ত ছিল না। সম্রাট শাহজাহান ও স্যার সৈয়দ আহমদের মতো না হউক, মার্কস-এংগেলের মতো মোচ তিনি রাখিলেন না কেন? কারণ ওটা কালচার।</p>
<p>ঠিক তেমনি দাড়ি-গোঁফের বেলা হিন্দু-খৃস্টানেরা এত বিলাসী ক্লিনশেভার হইয়াও বগলতলা ও নাভির নিচে সম্বন্ধে অত সঞ্চয়ী কেন, মুসলমানরা তা বুঝে না। পোশাক-পাতিতে অত টাকা-পয়সা খরচ করিয়াও পশ্চিমা মেয়েরা পিঠ ও হাঁটুর নিচ ঢাকিবার কাপড়ের পয়সা জুটাইতে পারে না কেন, আমরা পূরবীরা তার কারণ খুঁজিয়া পাই না।</p>
<p>পক্ষান্তরে আমরা আমাদের মেয়েদের অত-অত কাপড়ে আপাদমস্তক ঢাকিয়া রাখি কেন, তা বুঝাও পশ্চিমাদের পক্ষে কম কঠিন নয়। পশ্চিমাদের ক্লাব-লাইফ ও ঢিলা-ঢালা দাম্পত্য জীবন দেখিয়া তাদের মেয়েদের জন্য আমরা কত আফসোস করি। কিন্তু আমাদের এক সংগে একাধিক বিবি লইয়া ঘর করিতে দেখিয়া পশ্চিমারাও আমাদের নারীজাতির জন্য কম আফসোস করে না। আমরা মুসলমানরা আরবী-ফারসীতে সুন্দর-সুন্দর অর্থপূর্ণ নাম রাখি। হিন্দুরা সংস্কৃত-হিন্দীতে সুন্দর অর্থজ্ঞাপক নাম রাখে। কিন্তু পশ্চিমা খৃস্টানরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও সভ্যতা-ভব্যতায় অত উন্নত হইয়া যা তা অর্থহীন ও কদর্য নাম রাখিতে লজ্জা পায় না। আমরা যাকে অখাদ্য মনে করি, অনেক সভ্যজাতি তাই খায় পরম লযযতের সাথে। বিজ্ঞানী দার্শনিকের কাছে এ সব ব্যাপারে যতই ছোট হউক না কেন, এ সবের মধ্যেই নিহিত কালচারের পার্থক্য। আসলে এ সবের সমষ্টির নামই কালচার। এই সব ব্যাপার দিয়াই আমাদের কালচারের বিচার করিতে হইবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>[‘বাংলাদেশের কালচার’ থেকে গৃহীত] </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/what-is-culture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13947</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ধর্মানুষ্ঠান ও আর্ট</title>
		<link>https://rowyakbd.com/religious-festivals-art/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/religious-festivals-art/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 27 Mar 2024 14:32:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13923</guid>

					<description><![CDATA[কালচারেল অনুষ্ঠানের আনন্দোৎসবের মধ্যে দিয়াই জাতির সমবেত মন বিকশিত হয়। মানুষের আনন্দ-পিপাসু অতৃপ্ত মন আনন্দরসের আবেহায়াতের তালাশে অজানা স্বপ্নের দেশে উড়িয়া যায় কল্পনার বোরাকের ডানায় চড়িয়া। মন-পবনের নাওয়ে চড়িয়া মাশুক শাহযাদীর তালাশে সে পার হইয়া যায় সাত সমুদ্দুর তের নদী।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>কালচারেল অনুষ্ঠানের আনন্দোৎসবের মধ্যে দিয়াই জাতির সমবেত মন বিকশিত হয়। মানুষের আনন্দ-পিপাসু অতৃপ্ত মন আনন্দরসের আবেহায়াতের তালাশে অজানা স্বপ্নের দেশে উড়িয়া যায় কল্পনার বোরাকের ডানায় চড়িয়া। মন-পবনের নাওয়ে চড়িয়া মাশুক শাহযাদীর তালাশে সে পার হইয়া যায় সাত সমুদ্দুর তের নদী।</p>
<p>এই মানসিক এ্যাডভেনচারেই মানুষ সাক্ষাৎ পায় নিত্য-নতুন সত্য-সুন্দরের। তাকেই তারা বাঁধিয়া রাখিতে চায় আর্টে-সাহিত্যে। সুরতের সংগে সিরতের, বহিরাকৃতির সাথে অন্তর-প্রকৃতির, ব্যক্তের সাথে সত্যের এপিয়ারেন্সের সাথে রিয়্যালিটির সার্থক সমন্বয় ঘটানই আর্টের কাজ। এই সমন্বয়ের সার্থকতা রসসৃষ্টিতে। তার সাফল্য সত্য ও সুন্দর লাভে। উভয়ের সমন্বয়ে যা, হয় তাই সত্য-সুন্দর। এটাই সুফী ধর্মের সাফল্য। সমস্ত কৃষ্টি-সংস্কৃতির চরম উৎকর্ষ। কারণ সত্য ছাড়া সুন্দর নাই। সুন্দর ছাড়া সত্য নাই। সত্যহীন সুন্দর নিম্নস্তরের রস মাত্র। আর সুন্দরহীন সত্য অকিঞ্চিৎকর ঘটনা মাত্র। এই সত্য সুন্দরের অস্তিত্ব গোড়াতে থাকে মানুষের কল্পনায়। আজিকার কল্পনাই আগামীকালের বাস্তব। আজ যা সত্য, গতকাল তাই ছিল অসত্য। আজিকার ধর্ম, গতকাল ছিল অধর্ম, দণ্ডনীয় পাপ। সমস্ত ধর্ম-প্রবর্তক ও সত্য-আবিষ্কারকের জীবনই এর প্রমাণ। সত্য ও সুন্দর লাভের চিরন্তন ইতিহাসই এই। বর্তমানে অতৃপ্তিই মানসিক এ্যাডভেনচারের বুনিয়াদ। বাস্তবের বাইরে যাওয়ার নামই কল্পনা। এ যেন শূন্যে আসমানে স্পেসে লাফ দেওয়া। একমাত্র অতৃপ্ত ক্ষিধাই এমন সাংঘাতিক ঝুঁকি নিতে পারে। কাজেই যে জাতির এ ক্ষিধা নাই, সে অসুস্থ। যে জাতির কল্পনা নাই সে মৃত। দুনিয়াকে দিবার কিছু নাই তার।</p>
<p>এই স্বপ্ন কল্পনাকে গণ-জীবনে প্রয়োগ সার্থক ও সফল করার প্রধান, এমন কি প্রায় একমাত্র পথ ধর্মোৎসবের আনন্দোল্লাস। হিন্দুর দুর্গোৎসব জন্মাষ্টমীর, বৌদ্ধের মাঘী-পূর্ণিমার, খৃস্টানের বড়দিনের আনন্দোৎসবের জীবন-প্রাচুর্যে তা সুস্পষ্ট। কিন্তু পাক-বাংলার [১] গণ জীবনে সে আনন্দোল্লাস কই? কোথায় ঈদ? কোথায় মোহররম। এ সব উৎসব-পরবে পাক-বাংলার মনের আকাশে জীবন-প্রাচুর্যের লক্ষ তারকা জ্বলিয়া উঠে কি? আমাদের জীবন-সাগরে কর্ম-চঞ্চল্যের ঝড় উঠে কি? আমাদের দেহের শিরায়-শিরার নবজীবনের দ্যোতনার বিদ্যুৎ-প্রবাহ ছুটে কি? প্রাণ-রসের উচ্ছলতায় আমরা ফাটিয়া পড়ি কি? প্রাণের প্রাচুর্য ত  কোথাও দেখি না। যা কিছু প্রাচুর্য সবইত দেখি খানা-পিনায়। শুধু পোলাও-কোর্মা আর সিমাই-যর্দা এই আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি? আমাদের কালচার কি শেষে খানা-পিনায় সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িল?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঈদুল</strong><strong>-ফিতরের নযির</strong></p>
<p>ঈদুল-ফিতরের কথাটাই ধরা যাক। এই ঈদ আসে ত্রিশ দিন রোযার পরে। রোযার ত্রিশ দিনকে যদি সংযম কৃচ্ছ্র সাধনার মুদ্দত ধরা যায়, তবে রোযা-শেষের ঈদের দিনে প্রাণ-প্রাচুর্যের বাঁধ-ভাংগা বন্যায় আমাদের জীবনের দুকূল ছাপাইয়া পড়া উচিত।</p>
<p>ঈদ অর্থ আনন্দোৎসব। কিন্তু আমাদের ঈদ আর তা নাই। ধর্মোৎসবের ধর্মটুকু উৎসবের উল্লাসের নিচে চাপা পড়ার নযির আছে দুনিয়ায় অনেক। কিন্তু ধর্মের নিচে উৎসব চাপা পড়ার নযির দুনিয়াতে মাত্র একটি। তা আমাদের ঈদ। আনন্দ-উল্লাসের উন্মত্ততায় আমরা খোদাকে ভুলিয়া না যাই-এই উদ্দেশেই ঈদ উৎসবের শুরুতে দুই রাকাত সুন্নত নামাযের বিধান করা হইয়াছিল।</p>
<p>তার কারণ ছিল। উল্লাসের উন্মত্ততায় সব উৎসবই আখেরে পাপাচারের ভৈরবীচক্রে পরিণত হয়। ইতিহাসের শিক্ষা এই। তাই ঈদে এই সাবধানতা অবলম্বন করা হইয়াছিল। ঈদের সমাবেশকে ইবাদতের জামাতে পরিণত করার উদ্দেশ্য তাতে ছিল না।</p>
<p>সেইজন্যই এতে নমাযের অনেক আহকাম ও আরকান-যথা: অযু, আযান একামত ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয় নাই। হায়েযওয়ালী মেয়েদেরেও ঈদের জমাতে শামিল হওয়ার তাকিদ এই কারণেই করা হইয়াছে। গৌরবের যুগে মুসলমানরা ঈদের উৎসবকে ঈদরূপেই পালন করিয়াছে। স্বাধীন ও প্রগতিশীল মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে আজো তাই করা হইতেছে। বাংলা ও ভারতে মুসলিম আমলে আমরাও ঈদকে জাতীয় আনন্দোৎসব হিসাবেই পালন করিতাম।</p>
<p>এই আনন্দোৎসবকে আমরা প্রার্থনা-সভায় পরিণত করিয়াছি আমাদের পতনের যুগে। স্বভাবতই এটা ঘটিয়াছে। সাময়িক বিপদেও মানুষ তার আনন্দোৎসবকে সংক্ষিপ্ত ও সঙ্কুচিত করে। স্থায়ী বিপদে ত কথাই নাই। দুর্দিন দীর্ঘস্থায়ী হইলে মানুষ অদৃষ্টবাদী ও অতিরিক্ত ধার্মিক হইয়া পড়ে আমরাও তাই হইলাম। প্রায় দুই-দুইশ&#8217; বছর কি বিপদটাই না গেল আমাদের উপর দিয়া। জান-মাল, মান-ইযযত কিচ্ছু ছিল না। সর্বাত্মক যুলুমে প্রাণ রাখিতেই আমাদের প্রাণান্ত। আনন্দোৎসব করিব কখন? তাই ঈদের দিনের ধর্মের যে বিধানটুকু না করিলেই নয়, সেইটুকু শুধু করিলাম, পারিলে ময়দানে গিয়া নয় ত মসজিদেই। আর বেশির ভাগ ঘরের কোণে বসিয়া বিপদ-তারণ আল্লাহ দরগায় কান্নাকাটি করিয়া কাটাইলাম দুই-দুইশ&#8217; বছর। এই সময়েই আমাদের জীবন হইতে গেল স্বাচ্ছন্দ্য, সমাজ হইতে গেল উৎসব, ঘর হইতে গেল আনন্দ। সেই সঙ্গে গেল আর্ট ও সাহিত্য। আর্ট-সাহিত্য-সংস্কৃতি কাকে বলে, তা যেন আমরা ভুলিয়াই গেলাম। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সর্বাপেক্ষা উর্বর ক্ষেত্র ‘ঈদ-পর্ব’ সৃজনীশক্তির দিক দিয়া হইয়া গেল বন্ধ্যা। আমাদের আর্টে-সাহিত্যে নামিয়া আসিল সন্ধ্যা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>নিরানন্দের পরিণতি</strong></p>
<p>ফলে, আজ আমাদের ঈদে আনন্দ নাই, আছে বেদনা। সংস্কৃতি নাই, আছে বিকৃতি। উল্লাস নাই, আছে আর্তনাদ। আনন্দের ক্ষিধা মানুষের পেটের ক্ষিধা ও যৌন ক্ষিধার মতোই তীব্র। সুস্থ ও স্বাভাবিক পথে নির্মল আনন্দ না পাইলে মানুষ পাপের পথে গিয়াই আনন্দ উপভোগ করে। তার উপর পরবাদিতে মানুষের আনন্দ-ক্ষুধায় আসে জোয়ার। এই সময় সাংস্কৃতিক আনন্দ-অনুষ্ঠানে সে ক্ষুধার তৃপ্তি না ঘটাইলে মানুষ কুপথে গিয়া সে পিপাসা মিটাইবেই। আমাদের জীবনে তাই হইতেছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নির্মল আনন্দের অভাবে ঈদের দিনের প্রাণের জোয়ার থামাইতেছি আমরা সিনেমা দেখিয়া, কুস্থানে গিয়া এবং ক্লাবে &#8216;ঈদবল&#8217; নাচিয়া। এটা বেদনার ও বিকৃতির নযির।</p>
<p>আর্তনাদের নযিরটা আরও প্রত্যক্ষ। মুসলমানদের মধ্যে কত যে বিকলাংগ, কুষ্ঠরোগী ও বেকার ভিক্ষুক ছেলে-বুড়া, নারী-পুরুষ আছে, তার প্রদর্শনী করি আমরা ঈদের দিনে, সদর রাস্তায় ঈদের ময়দানে। বিকলাংগ, কুষ্ঠরোগী, ভিক্ষাজীবী কমবেশী অপরাপর জাতির মধ্যেও আছে। ধর্মস্থানে দান-খয়রাত উপলক্ষে তাদের ভিড়ও হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু জাতীয় আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠানে এদের বিভৎস ভিড় হওয়ার ব্যবস্থা বোধ হয় আর কোনও জাতিতে নাই। সমাজ-দেহে ঘা-পাঁচড়া অল্পবিস্তর সব জাতিতেই আছে। বিশেষত শোষণবাদী ধনতন্ত্রী সমাজ দেহে তা বেশি করিয়াই থাকে। কিন্তু জাতীয় আনন্দোৎসবের দিনে ঘটা করিয়া তার প্রদর্শনী খুলে না কেউ। সভ্য মানুষ শরীরের খোস-পাঁচড়া মলম-পট্টি দিয়া ঢাকিয়াই রাস্তায় বাহির হয়। দেহের ঘা বড় ও বিদকুটে করিয়া, গুপ্তস্থানের ঘা কপালে ছড়াইয়া ক্ষতের ডিমনস্ট্রেশন করে শুধু তারাই, পরের দয়ার উদ্রেক করিয়া ভিক্ষা করিয়া খাওয়া যাদের পেশা। যে জাতি ভিক্ষাকে কালচারে সমুন্নত করিয়াছে, তারা ছাড়া আর কেউ এটা পারে না। আমরা পারি, পারি বলিয়াই আমাদের কচি শিশু ছেলে-মেয়েরা ভিক্ষাকে পেশা করিয়াছে। ঈদের দিনে এইসব বিকলাংগ ভিক্ষুকের যে সমবেত আর্তনাদের জবাবে আমরা দুহাতে ফেরা-যাকাতের পাই-পয়সা বিলাইয়া কড়ির মূল্যে বেহেশত কিনিতেছি, সেটা আসলে ভিখারির আর্তনাদ নয়, আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিরই আর্তনাদ।</p>
<p>আমাদের তরুণরা এটা তীব্রভাবে অনুভব করে বলিয়াই তারা সম্প্রতি ঈদ রিইউনিয়নের আয়োজন করিতেছে। এটা শুভ সূচনা। কিন্তু এখনও এ অনুষ্ঠান খানা-পিনাতেই সীমাবদ্ধ। একে সাংস্কৃতিক অলংকার পরাইয়া আমাদের প্রমাণ করিতে হইবে যে, মুসলমানের কালচারের চৌহদ্দি পেট নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মোহররমের জীবন</strong><strong>-প্রাচুর্য</strong></p>
<p>একমাত্র মোহররম পর্বেই মুসলমানেরা অন্যান্য কালচার গ্রুপের সাথে খানিকটা প্রতিযোগিতা করিয়াছে। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে ঢাকার জন্মাষ্টমী ও কলিকাতার বড়দিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিত একমাত্র কলিকাতার মোহররম। দশ লক্ষ মুসলমানের এই উৎসব পঞ্চাশ লক্ষ বাশিন্দার কলিকাতা নগরীকে পায়ের বুড়া আংগুলে খাড়া রাখিত দশ-দশটা দিন।</p>
<p>তৎকালে বাংলার শহরে-বন্দরে পাড়াগাঁয়ে দশ দিন ধরিয়া ঢাকঢোল-সানাই ও কাড়া-নাকাড়া-দামামার গুরু-গম্ভীর আওয়ায আসমান-ফাটাইয়া পাতাল কাঁপাইয়া ঘোষণা করিত: এই আসিয়াছে মুসলমানের উৎসব মোহররম। প্রতি গাঁ-মহল্লা হইতে এক বা একাধিক আখড়া বাহির হইত। লাঠি-তলোয়ার, সড়কি-বল্লম ও ছুরি-রামদাও ইত্যাদি খেলার বুক কাঁপানো সাংঘাতিক প্রতিযোগিতা করিত তারা। হাজার-হাজার লোক অবাক-বিস্ময়ে দেখিত সে অস্ত্রের খেল্।</p>
<p>কাতল্-মনযিলেরা দিন যতই ঘনাইয়া আসিত খেলোয়াড় ও দর্শকদের উত্তেজনা-উদ্দীপনা ততই বাড়িয়া যাইত। যেন &#8216;দিকে দিকে চলে কুচকাওয়াজ&#8217; সত্য-সত্যই। এ যেন &#8216;শহিদী সেনারা&#8217; সত্য-সত্যই সাজিয়াছে। যেন নিজ কানে শুনিতেছি ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণী তল।&#8217; কাজেই &#8216;চন্দ্রে চল্&#8217; না বলিয়া যেন উপায় নাই। খেলা-রত চলমান আখড়ার পিছনে পিছনে চলিত উদ্দীপিত জনতা।</p>
<p>আখড়াগুলি ক্রমে জমায়েত হইত শহরে-বন্দরে। কাতলের দিনে সমবেত আখড়াসমূহের বাছাই করা খেলোয়াড়দের মধ্যে হইতে দ্বন্দ্বযুদ্ধ প্রতিযোগিতা। সে কি রোমাঞ্চকর লড়াই! মুগ্ধ বিপুল জনতা দেখিত সে অস্ত্র চালনার উস্তাদি। দর্শকরা চাঁদা করিয়া শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের দিত খেলাত-পুরস্কার।</p>
<p>বড়দের এই প্রাণ-মাতানো সাহসিকতার খেলা দেখিয়া ছোট ছোট ছেলেরাও কাঠের তলোয়ার, তালপাতার ঢাল ও টিনের ঢোল বানাইয়া এযিদ-ইমামের লড়াই করিত। আখড়ার লাঠিখেলা ছাড়াও আগের দিনে বিভিন্ন পর্ব উপলক্ষে পাড়াগাঁয়ে ঘোড়দৌড়, নৌকা-বাইচ, ডন-কুস্তি-কসরত ও হরেক রকম বীরত্বপূর্ণ খেলা হইত। পর্বোপলক্ষ্যেই সমবেতভাবে এইসব খেলা হইত বটে, কিন্তু এ সবের প্রস্তুতি চলিত প্রায় সারা বছরই।</p>
<p>তাতে আমাদের মধ্যে একটা জংগী ঐতিহ্য ও সামরিক কালচারও গড়িয়া উঠিয়াছিল। এইসব অনুষ্ঠানে মুসলিম-বাংলার আকাশ-বাতাস জীবন-প্রাচুর্যে মুখরিত হইয়া উঠিত। শুধু স্বদেশবাসী ভিন্ন সমাজের লোকেরাই নয়, বিদেশী আগন্তুক ও পরিব্রাজকেরাও বুঝিত মুসলিম-বাংলার গণ-জীবনে কৃষ্টির প্রাণ-প্রাচুর্য রহিয়াছে এবং সেটা জীবন্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আজ আর তা নাই।</p>
<p><strong>[‘বাংলাদেশের কালচার’ বই থেকে গৃহীত]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকাঃ </strong></p>
<p>১. স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে লেখা হওয়ায় লেখক বাংলাদেশ বুঝাতে পাক-বাংলা শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। এর ব্যাখ্যা তিনি ভূমিকাতেও দিয়েছেন। লেখার রূপ অক্ষুণ্ণ রাখতে এখানেও হুবহু পাক-বাংলা রাখা হলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/religious-festivals-art/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13923</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাঙলার আবহমান সংস্কৃতিতে ঈদ: ভ্রাতৃত্ব ও মুক্তির পয়গাম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/eid-in-the-prevailing-culture-of-bengal-a-message-of-brotherhood-and-freedom/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/eid-in-the-prevailing-culture-of-bengal-a-message-of-brotherhood-and-freedom/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[নাজিয়া তাসনিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 21 Apr 2023 09:50:17 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7729</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ রক্ত-মাংসে গড়া একটি শরীর মাত্র নয়। তাই শুধু খেয়ে-পরে বাঁচলেই তার চলেনা। তার আবেগ-অনুভূতি আছে, আকল আছে, রুহ আছে। এগুলোরও চাহিদা আছে। সব মিলিয়েই মানুষ। মানুষের জীবনে তাই আনন্দ-বিনোদনের প্রয়োজন হয়। সৌন্দর্য ও রুচিশীলতার প্রয়োজন হয়। আধ্যাত্মিক প্রশান্তির প্রয়োজন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মানুষ রক্ত-মাংসে গড়া একটি শরীর মাত্র নয়। তাই শুধু খেয়ে-পরে বাঁচলেই তার চলেনা। তার আবেগ-অনুভূতি আছে, আকল আছে, রুহ আছে। এগুলোরও চাহিদা আছে। সব মিলিয়েই মানুষ। মানুষের জীবনে তাই আনন্দ-বিনোদনের প্রয়োজন হয়। সৌন্দর্য ও রুচিশীলতার প্রয়োজন হয়। আধ্যাত্মিক প্রশান্তির প্রয়োজন হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">রমজান মাস মানুষের জীবনে আসে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির পরশ নিয়ে। দীর্ঘ একমাস রোজায় মানুষ এই প্রশান্তির পাশাপাশি সংযমের সাধনা করে। ক্ষুধার কষ্টকে অনুভব করে। তাকওয়ার চর্চা করে। তারপর আসে ঈদ। মুমিন জীবনের একমাসের সংযম, আর রুহানী শান্তিকে পূর্ণতা দেয় ঈদ। রমজানের একমাস ধরে যে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়, তা পূর্ণতা পায় ঈদের মাধ্যমে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<div dir="auto">‘‘যখন ঈদুল ফিতরের দিন আসে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যারা রোজা পালন করেছে; তাদের সম্পর্কে ফিরিশতাদের নিকট গৌরব করে বলেন- ‘হে আমার ফিরিশতাগণ, তোমরা বলতো! যে শ্রমিক তার কাজ পুরোপুরি সম্পাদন করে তার প্রাপ্য কি হওয়া উচিত? উত্তরে ফিরিশতাগণ বললেন, হে মাবুদ! পুরোপুরি পারিশ্রমিকই তার প্রাপ্য। ফিরিশতাগণ, আমার বান্দা-বান্দীগণ তাদের প্রতি নির্দেশিত ফরজ আদায় করেছে, এমনকি দোয়া করতে করতে ঈদের (ওয়াজিব) নামাজের জন্য বের হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় আমার মহিমা, গরিমা, উচ্চ মর্যাদা ও উচ্চাসনের শপথ, আমি অবশ্যই তাদের প্রার্থনায় সাড়া দেব। এরপর নিজ বান্দাগণকে লক্ষ্য করে আল্লাহ পাক ঘোষণা দেন; তোমরা ফিরে যাও, ‘‘আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমাদের সাধারণ পাপরাশিকে পুণ্যে পরিণত করে দিলাম।&#8221;</div>
</blockquote>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তবে আজকে আমরা ঈদের ধর্মীয় তাৎপর্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। <strong>জ্ঞানসম্রাট আলিয়া ইজ্জতবেগভিচ এর ভাষায়, &#8220;সংস্কৃতি ধর্মের চেয়ে শক্তিশালী।</strong>&#8220;</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সংস্কৃতি কি ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক? এর জবাবে বাংলাদেশের প্রখ্যাত স্কলার প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ তার ইসলাম ও সংস্কৃতি প্রবন্ধে স্পষ্টভাষায় বলেন,<strong> &#8220;ইসলামের সাথে সংস্কৃতির বিরোধ নাই, বন্ধুত্ব আছে।&#8221;</strong> মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক জীবনে ঈদের তাৎপর্য অপরিসীম।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ঈদ শব্দের আভিধানিক অর্থ &#8216;আনন্দ&#8217;, &#8216;উৎসব&#8217;, &#8216;প্রত্যাবর্তন&#8217;। এটি মুসলমানদের জন্য স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করে দেয়া উৎসব। আসমান-জমিনের রব যে দিনটিকে আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, নিঃসন্দেহে এ দিনটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন। তবে ঈদ কেবল উৎসবমাত্র নয়। এটি একই সাথে আমাদের আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে জাগরণকারী, উম্মাহর চেতনাকে জাগ্রতকারী একটি দিন। সারা বিশ্বের মানুষ একইসাথে ছয় তাকবীরের নামায আদায়ের মাধ্যমে এই দিনটি শুরু করে, যা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা এক উম্মাহ। আমরা সবাই একই আল্লাহর দরবারে সিজদা করি। এটি আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধকে মজবুত করার দেয়। আমাদের পুরনো দিনের সব হিংসা-দ্বেষ, মনোমালিন্যকে পেছনে ফেলে কাঁধে -কাঁধ মিলিয়ে, বুকে -বুক মিলিয়ে আমরা নতুন করে ভ্রাতৃত্বের মজবুত বন্ধনে আবদ্ধ হই ৷ এই ঈদ আমাদেরকে পৃথিবীর প্রতি মানুষ হিসেবে, আমাদের কর্তব্যগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ফিতরা-যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আমরা একে অন্যের পাশে দাঁড়াই। আল্লাহ চাননা তার কোন বান্দাহ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হোক। তাই তিনি ঈদের জামায়াতের আগেই ফিতরা যাকাত আদায় করার জন্য বারবার তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়াও রমজান মাসে বেশি বেশি দান-সাদকাহ করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। ফলে ঈদের আনন্দ ধনী-দরিদ্র সবাই মিলেমিশে ভাগাভাগি করার সুযোগ পায়। আমাদের হৃদয়গুলো কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়। এজন্য ঈদ আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ঈদ কবে পালিত হয়েছিলো সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য আমি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এতটুকু জানা যায় যে, পূর্ববর্তী নবীদের যুগেও ঈদ মুসলমানদের জন্য উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারিত ছিলো। নবী মুহাম্মদ (স.) এর সময়ে হিজরতের পরের বছর থেকে মদীনায় ঈদ পালন শুরু হয়। আর মক্কায় শুরু হয় মক্কা বিজয়ের পর।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বাংলা অঞ্চলে প্রথম ঈদ পালনের ইতিহাস ও বেশ পুরনো। ইসলামের প্রাথমিক যুগেই ইসলামের আলো এ উপমহাদেশের ভূমিকে স্পর্শ করেছে। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, ৬৪০ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের দশ বছর পরে উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। পীর, আলেম, ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই মূলত এখানে ইসলামের অমীয় বাণী পৌঁছেছিলো। যেহেতু মুসলমানরা এখানে ছিলো, তাই স্বাভাবিকভাবেই নামাজ-রোজার মতো ঈদ ও তখন থেকেই এখানে পালিত হয়ে আসছিলো। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদ উদযাপন শুরু হয়, মুসলমান শাসকরা এখানে আসার পর। সে হিসেবে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পর থেকেই বাংলা অঞ্চলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। মোঘল এবং সুলতানী আমলে বাংলা অঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বেশ আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে ঈদ উদযাপিত হতো।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong><span class="x3nfvp2 x1j61x8r x1fcty0u xdj266r xhhsvwb xat24cr xgzva0m xxymvpz xlup9mm x1kky2od"><img loading="lazy" decoding="async" src="https://static.xx.fbcdn.net/images/emoji.php/v9/t6b/1/16/25fe.png" alt="◾" width="16" height="16" /></span>মুঘল ও সুলতানী আমলে বাংলায় ঈদ</strong></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">মুঘল আমলে ভারতে ঈদের দিনের ইতিহাস সম্পর্কে লেখা পাওয়া গেছে বিভিন্ন বইপত্রে। সেসময় সরকারি ভাবে ঈদ ও ঈদের অনুষ্ঠানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। মুঘল সালতানাতে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেসব অনুষ্ঠানের আবার চিত্রাঙ্কনও করা হতো। সে আমলের বিভিন্ন চিত্রে ফুটে ওঠে সে সময়ের উৎসবের আড়ম্বরতা। এমনই একটি চিত্রে প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তারা রাজ দরবারের সভাসদকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়। প্রায় সব মুঘল সম্রাটকেই ঈদের নানা উৎসব পালন করতে দেখা গেছে। এসব তথ্য ইতিহাসে যেমন আছে, তেমনি আছে শিল্পীদের আঁকা চিত্রেও। ঈদের দিন নানা আয়োজনের মধ্যে মেলামেশা, ঘুড়ি উড়ানো, পায়রার খেলা, মোরগ লড়াই, মেলার কথা জানা যায় মুঘল ঢাকার ইতিহাসে। বাংলাদেশে ঈদের সবচেয়ে পুরনো বর্ণনা পাওয়া যায় মির্জা নাথানের লেখায়। ঈদুল ফিতরের সময় তিনি ছিলেন বোকাই নগরে। তার লেখার ভিত্তিতে জানা যায়, শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে মোমবাতির আলোয় সারা শহর আলোকিত হয়ে উঠতো। যখন নতুন চাঁদ দেখা যেত, তখন শিবিরে বেজে উঠত শাহী তুর্য অর্থাৎ রণশিঙ্গা এবং একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী আতশবাজির মতো গুলি ছুড়তে থাকতো। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চলত এ আতশবাজি। শেষ রাতের দিকে বড় কামান দাগানো হতো। কামানের তীব্র শব্দে ভূকম্প অনুভূত হতো।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অধ্যাপক আবদুর রহিম বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মুসলমান ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে সেসময়ের ঈদ উৎসবের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি যা লিখেছেন তা অনুযায়ী বলা যায় বাংলাদেশে মুঘল সৈন্যদের ছাউনি থেকে ঈদের আনন্দবার্তা ঘোষণা করা হতো। এতে প্রকাশ পায় কীভাবে মুসলমানরা ঈদ উৎসবকে স্বাগত জানাতো এবং এই আনন্দ-উৎসবে আমোদ-প্রমোদ করত এবং এর জন্য শুকরিয়া আদায় করত। ঈদের দিন মুসলমানরা সব বয়সের নারী-পুরুষ ও ছেলে-মেয়েরা সুন্দর নতুন কাপড় পরিধান করতো, আতর ব্যবহার করতো। বাহারী খাবার-দাবারের আয়োজন হতো সবার বাড়িতে। মুসলমানরা সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা করে ঈদগাহে যেত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা উৎসবের সময়ে মুক্তহস্তে অর্থ ও উপহারাদি পথে ছড়িয়ে দিতেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তাই তখন মুঘলরা রমজানের প্রথম থেকেই চেষ্টায় থাকত ঈদের খুশিকে আয়ত্ত করে নিতে। কিন্তু এসব আনন্দ শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলোনা। নিম্নবিত্ত মুসলমানদের জন্যও আনন্দ-উৎসবের সুব্যবস্থা করেছিলেন তখনকার মুঘল অধিপতিরা।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মুঘল আমলে ঈদ উদযাপন হতো দু-তিন দিন ধরে। চলতো সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন। আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন নিয়ে একরকম মেলাই বসে যেত। তখনকার ঈদ উদযাপনের চিত্র পাওয়া যায় সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথানের বর্ণনা অনুযায়ী, সুবেদার ইসলাম খান ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচের ব্যবস্থা করতেন। এ সময় স্বয়ং সুবেদার ইসলাম খান উপস্থিত থাকতেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বাদশাহ শাহজানের পুত্র শাহ সুজা এখানে এলে তার পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিকভাবে ঢাকা আরো মার্জিত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ধরে নেওয়া যায় ঈদ উদযাপনেও আরো চাকচিক্যের সংযোজন ঘটে। সব উৎসবে ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতি না থাকলেও, সবাই নিজ নিজ জায়গা থকে উৎসবমুখর পরিবেশেই ঈদ উদযাপন করতো।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মুঘল আমলের সবচেয়ে বড় ঈদগাহের নিদর্শন এখনো দৃশ্যমান। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম ধানমন্ডির শাহী ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকায় অবস্থিত মুঘল স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর অন্যতম এই ঈদগাহ। ৪ ফুট উঁচু করে ভূমির ওপরে এটি নির্মিত হয়, যাতে বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ঈদগাহের উত্তর পাশে রয়েছে, তিন ধাপের মিম্বার। এখানে দাঁড়িয়ে ইমামরা নামাজ পড়ান। ঈদগাহটি চারদিকে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রথমদিকে এখানে শুধু সুবেদার, নায়েবে নাজিম ও অভিজাত মুঘল কর্মকর্তা এবং তাদের স্বজন-বান্ধবরাই নামাজ পড়তে পারতেন, সাধারণ নগরবাসীরা এতে প্রবেশ করার তেমন একটা সুযোগ পেতেন না। পরে ঈদগাহটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং তাতে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা আসতেন। ঈদগাহটি বর্তমানেও ঈদের নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এছাড়াও দিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হতো। ঈদের নামাজ পড়ানোর জন্য সুলতানরা ইমাম নিয়োগ করতেন। শহরের বাইরের বিরাট উন্মুক্ত জায়গায় অথবা গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব স্থানকে ঈদগাহ বলা হতো।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">স্যার টমাস মেটকাফে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্ট ছিলেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কোর্টে কাজ করার কারণে মেটকাফে সম্রাটের প্রিয়ভাজন হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। বাহাদুর শাহ জাফর স্যার টমাস মেটকাফেকে দিয়ে ভারতের শিল্প-সংস্কৃতির ওপর জরিপ করান এবং সেগুলোর ওপর চিত্রাঙ্কন করার দায়িত্ব দেন। চমৎকার এই দায়িত্ব পেয়ে মেটকাফে অতি উৎসাহের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তিনি ভারতের শিল্পীদের সহযোগিতায় মুসলিম আর্কিটেকচারের ওপর গবেষণা ও চিত্রাঙ্কনের কাজ শুরু করেন। একে একে গুরুত্বপূর্ণ ইমারতগুলোর চিত্র অঙ্কন করেন। এরপর মুঘল আমলে ঈদকে কেন্দ্র করে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেই অনুষ্ঠানেরও চিত্র অঙ্কনে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। এমনই একটি চিত্রের নাম ‘ঈদের শোভাযাত্রা’। কাগজে আঁকা এই চিত্রটির মাধ্যম ছিল কালি, তুলি এবং রঙ। ১২ ফোল্ডের দীর্ঘ এই স্ক্রল চিত্রে বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর, তার ছেলে এবং আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত রয়েছেন। উপস্থিত রয়েছেন স্যার টমাস মেটকাফে ও অন্য সভাসদরা। ঈদ শোভাযাত্রার চিত্রের সর্বত্র রয়েছে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। সম্রাট, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সম্রাটের ছেলে ও আত্মীয়-স্বজনরা সুসজ্জিত হাতির পিঠে অবস্থান করছেন। ঘোড়ার পিঠেও রয়েছেন কেউ কেউ। যার সরাসরি উদ্যোগে এ চিত্র সৃষ্টি হয়েছে, সেই টমাস মেটকাফে অবস্থান করছেন সুসজ্জিত হাতির পিঠে। যেসব শিল্পী চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে মেটকাফেকে সাহায্য করেছেন, তাদের মধ্যে দিল্লির চিত্রশিল্পী মাজহার আলী খানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার অঙ্কিত চিত্রটি কাল্পনিক নয়। বাস্তব দৃশ্য অবলম্বনেই ঈদুল ফিতরের এ চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষ যাতে মুঘল সম্রাট, সভাসদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সান্নিধ্যলাভে উৎসাহ বোধ করেন সে জন্য শোভাযাত্রার সর্বপরিকল্পিতভাবে তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে। এটাই এ চিত্রের বিশেষত্ব।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মুঘল আমলে ঢাকায় ঈদ মিছিল বলে একটা কথা ছিল। সে মিছিলে শামিল হতেন রাজধানীর অভিজাত থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ। উনিশ শতকের প্রথমদিকে আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পী ঢাকার ঈদ ও মহরমের মিছিলের ছবি এঁকেছিলেন। মোট ৩৯টি ছবি আঁকেন তিনি। চিত্রগুলোতে দেখা যায় ঈদের মিছিলগুলো নায়েব-নাযিমদের নিমতলী প্রাসাদ, চকবাজার, হোসেনি দালান প্রভৃতি স্থাপনার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। ঈদের দিন নায়েব-নাযিমদের বাসস্থান নিমতলী প্রাসাদের ফটক থেকে বিভিন্ন পথ ঘুরে, চকবাজার, হোসেনি দালান হয়ে মিছিল আবার শেষ হতো মূল জায়গায় এসে। মিছিলে থাকত জমকালো হাওদায় সজ্জিত হাতি, উট, পালকি। সামনের হাতিতে থাকতেন নায়েব-নাযিম। কিংখাবের ছাতি হাতে ছাতি বরদার, বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ছিল কাড়া-নাকাড়া শিঙা। রঙ-বেরঙের নিশান দিয়ে মিছিলকে আরো জাঁকজমকপূর্ণ করা হতো। দর্শকরা সারি বেঁধে থাকতেন রাস্তার দু’পাশে। সুবেদারেরা ‘ঝরোকা’ মঞ্চে প্রজাদের দর্শন দিতেন। বিকেলে কাঞ্চনিদের নৃত্য ছিল রাজদরবারে। মুঘল আমলে গ্রামীণ মানুষের ঈদ উৎসবের ধারা একই ছিল।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অনুমান করে নেয়া হয় মুঘল আমলে বাদশাহী বাজারে অর্থাৎ বর্তমান চকবাজারে ঈদ মেলার আয়োজন হতো। বিশেষ করে তখনকার প্রশাসনিক সদর দফতর ঢাকা কেল্লার আশপাশের এলাকা ঈদের সময়টায় থাকতো জমজমাট। চকবাজার এবং রমনা ময়দানের সেই ঈদ মেলায় বিভিন্ন রকমের বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসতো। বিভিন্ন কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসতো সুন্দর করে সাজিয়ে আর বিকেল বেলা হতো কাবলির নাচ। চকবাজার, কমলাপুরে এখনো সেই মেলার রেশ ধরে মেলা বসে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদের দিন ছোট-বড় মেলা বসে। মেলায় এখনো অনেকেই গিয়ে থাকে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে। বিশেষ করে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা ঈদের দিন মেলায় যায় আনন্দ উপভোগ করতে। ঈদ মেলায় বিভিন্ন খেলা, পুতুল নাচ আরো অনেক বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। হরেকরকম মিষ্টান্ন বানিয়ে বিক্রি করতো ব্যবসায়ীরা এই ঈদ মেলায়।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ঈদের খুশি যেন পরিপূর্ণ হয় না ঘরে শাহী খাবারের আয়োজন না হলে। মুঘল আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি ঈদের দিন সব মুসলমানদের ঘরে ঘরেই রান্না হয় মুখরোচক সব শাহী রান্না। মুঘলদের রাজত্বকালে ঈদের দিন তৈরি হতো বিভিন্ন ধরনের শাহী খাবার। সকালের নাশতায় খাওয়া হতো বাকরখানি, পরোটা, মাংস আর কয়েক পদে রান্না করা সেমাই। দুপুরের খাবারে থাকত মোরগ পোলাও, কোরমা, পরোটা, কালিয়া, জর্দা। রাতেও এমন সব খাবারের আয়োজন করা হতো। মুঘলদের ঈদের সব রান্নায় মালাই ব্যবহার করা হতো। এসব খাবার-দাবার মুঘল যুগে অভিজাত পরিবারদের মধ্যে ব্যাপক প্রচলিত ছিল। এছাড়া সেই আমলে মুসাফিরদের জন্য ঈদের খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করা হতো।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><span class="x3nfvp2 x1j61x8r x1fcty0u xdj266r xhhsvwb xat24cr xgzva0m xxymvpz xlup9mm x1kky2od"><img loading="lazy" decoding="async" src="https://static.xx.fbcdn.net/images/emoji.php/v9/t6b/1/16/25fe.png" alt="◾" width="16" height="16" /></span><strong>ঔপনিবেশিক সময়ের ঈদ</strong></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এইযে, বাঙালির আবহমান উৎসবের দিন ঈদ, কবে কখন কীভাবে উৎসবহীন হয়ে গেলো?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">কারা আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিলো? উত্তরে বলতে হয় সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের কথা। তারা এখানে এসে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদ উদযাপন বন্ধ করে দেয়। ঈদের ছুটি কমিয়ে আনে। তারপর আসে অর্থনৈতিক দুর্দশা। তাদের শোষণের ফলে এখানকার মুসলমানরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে, জাঁকজমপূর্ণ আয়োজনে ঈদ উদযাপনের সামর্থ খুব কম মুসলমান পরিবারেরই ছিলো। তাই ধীরে ধীরে ঈদের জৌলুশ কমে আসতে থাকে। ফিকে হয়ে আসতে থাকে এর বর্ণিল উৎসবমুখরতা।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, ব্রিটিশরা এখানে এসে হাজার হাজার মক্তব-মাদরাসা ধ্বংস করে। আলেমদের হত্যা করে, নির্বাসন দেয়। হঠাৎ করে ইংরেজি শিক্ষা চালু করে। এভাবে মুসলমানদের অজ্ঞানতার অন্ধকারে আবৃত করে ফেলে। ইসলাম সম্পর্কেও তারা ধীরে ধীরে অজ্ঞ হতে থাকে। এজন্য রমজান-ঈদ এর শান-মান সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকেও এগুলো উদযাপনে উদাসীনতার শুরু হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><span class="x3nfvp2 x1j61x8r x1fcty0u xdj266r xhhsvwb xat24cr xgzva0m xxymvpz xlup9mm x1kky2od"><img loading="lazy" decoding="async" src="https://static.xx.fbcdn.net/images/emoji.php/v9/t6b/1/16/25fe.png" alt="◾" width="16" height="16" /></span><strong>ঢাকার নবার পরিবারের ভূমিকা</strong></div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ঔপনেবশিক সময়ে বিংশ শতাব্দীর দিকে এসে মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চেতনা জোরদার হতে থাকে। এসময় মুসলমানদের জ্ঞান এবং সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের জন্য ঢাকার নবাব পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা আবারও ঢাকায় জমকালো ঈদের আয়োজন করার চেষ্টা করেন। আহসান মঞ্জিল থেকে তখন কামান দেগে শহরবাসীকে ঈদের চাঁদের আগমনী জানান দেয়া হতো। ঢাকায় আবার ঈদ মিছিলও শুরু হয়। নবাব পরিবার অর্থ ও সাহস দিয়ে ঈদ মিছিলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। নবাব বাড়ির খাজা শাহাবুদ্দীন ও খাজা ইসমাইল মিছিলে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কাদের সরদার, আব্দুল আজিজ, জুম্মন ব্যাপারী কোনো কোনো বছর মিছিলে অগ্রভাগে থাকতেন। মিছিলে থাকতো কাসিদার দল। ঈদ মিছিলে তখনকার দিনের বড় আকর্ষণ মোটরগাড়ি, মোটর বাস ও ট্রাকগুলোকে ময়ূর, প্লেন, নৌকা, জাহাজ, বিভিন্নভাবে সাজিয়ে বের করা হতো। এই মিছিল চকবাজার থেকে শুরু হয়ে ইসলামপুর, পাটুয়াটুলি, নবাবপুর, বংশাল হয়ে পুনরায় চকে এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তবে কোনো কোনো বছর এর ব্যতিক্রম হতো। এখান থেকেই পুরস্কার বিতরণের কাজ সমাধা করা হতো।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এই মিছিলে উর্দু গান ও কাওয়ালী গাওয়া হতো এবং সকল মুসলমানরাই এতে অংশ নিত। ঢাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সরদাররা চারটি স্পটে যেমন দাঁড়িয়ে মিছিলকারীদের উৎসাহিত করে চা নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। আহসান মঞ্জিলের প্রধান ফটকের উপর নবাব পরিবারের মহিলারা দাঁড়িয়ে পর্দার আড়াল থেকে মিছিল দেখতেন। শুধু নবাব বাড়ির মহিলা নয়, বিভিন্ন মহল্লা থেকে মহিলারা আসতেন মিছিল দেখার জন্য। ছাদের উপর কাপড় দিয়ে পর্দা ঘেরাও করে দেয়া হতো, যাতে বেপর্দা না হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বিভিন্ন এলাকার যুব সম্প্রদায় শরবতের গাড়ি নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন। মিছিলে শরবত পান করানো নিয়ে ছিল প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা। মানে ভালো শরবত পানাহারকারীকে পুরস্কৃত করা হতো। এ মিছিলে সৌন্দর্য্য জৌলুস বৃদ্ধি করতে একাধিক হাতি সুন্দর সাজে সাজিয়ে রাজপথে সারি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হতো। হাতির সংখ্যা যে বছর কম দেখা যেতো, সে বছর ট্রাক দেখা যেতো বেশি। উন্নতমানের রেসের ঘোড়া সুন্দর সাজে সাজিয়ে মিছিলে আনা হতো। মিছিল চলাকালীন সময়ে ঘোড়াগুলো বাদ্যের তালে ছন্দে ছন্দে এগিয়ে যেতো এবং বিভিন্ন ভঙ্গিমার নাচ দেখিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতো। রহমতগঞ্জ এলাকার যুবক সম্প্রদায় একবার বখতিয়ার খিলজি ও তার সপ্তদশ অশ্বারোহীর বিজয়ের চমৎকার চিত্র মিছিলে প্রদর্শন করেছিলো। এছাড়াও ঘোড়ার গাড়ি ও গরুর গাড়ির বহর ও মিছিলে দেখা যেতো। পরবর্তীতে বিভিন্ন দাঙ্গা-হাঙ্গামায় দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এ মিছিল আবারও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ঈদ ধীরে ধীরে বর্তমানের রূপ লাভ করে।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অপসংস্কৃতির এ জামানায় এসে সাংস্কৃতিক জাগরণের আলাপ আজকে খুব বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কেননা সংস্কৃতি সমুদ্রের জোয়ারের মতো। এর প্রবল বেগের সামনে যুক্তি-তর্ক-বয়ান সবকিছু ভেসে যায়। এটিকে মোকাবেলা করতে পারে কেবল এর চেয়েও প্রবল বেগের কোন স্রোত। তাই একটি প্রবল বেগে বেগমান সাংস্কৃতিক জোয়ার সৃষ্টি করা আজ সময়ের দাবী। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা এক গৌরবময় সভ্যতার সন্তান। আমাদের আছে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পাটাতন। সে পাটাতনের উপর আজকের সময়ের বাস্তবতার আলোকে আমাদেরকে নতুন এক সাংস্কৃতিক জোয়ার সৃষ্টি করতে হবে। সে ধারাবাহিকতায় আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় ঈদের জৌলুশ ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের সামনে এখনও বিপুল সম্ভাবনা বিদ্যমান।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">দুইশ বছরের শোষণ আমাদের ছয় তাকবীরের ঈদের জামায়াত কোনদিন বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি আমাদের সেহরি-ইফতার আর তারাবীর সংস্কৃতি। হয়তো তার জৌলুশ কমেছে, কিন্তু হারিয়ে যায়নি। আমাদের মিনারগুলো আজও আমাদের এক কাতারে দাঁড়াবার আহবান জানায়। এক দস্তরে বসবার আহবান জানায়। আমরা এখনো সে আহবানে সাড়া দিয়ে আমাদের ঈদের রুহকে ফিরিয়ে আনতে পারি। যেন ঈদ হয়ে ওঠে আমাদের আধ্যাত্মিক বলয় ও উম্মাহর চেতনাকে জাগ্রতকারী একটি দিন। ঈদ যেন হয়ে ওঠে আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে মজবুত করে নেয়ার দিন। ঈদ যেন হয়ে ওঠে পড়শির খবর নেয়ার দিন, আত্মীয়তার বন্ধনগুলোকে দৃঢ় করার দিন। ঈদ যেন হয়ে ওঠে মজলুমের মুখে হাসি-ফোটাবার দিন, আমাদের শপথগুলোকে ঝালাই করে নেয়ার দিন, আমাদের স্বপ্নগুলোতে আরেকটু রঙ ছোঁয়াবার দিন। ঈদ যেন হয় কাশ্মীরের সংগ্রামী ভাই-বোনদের জন্য দোয়া করার, কুদসের মায়েদের জন্য সালাম পাঠাবার দিন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অমানুষিক জীবন কাটানো পরিবারগুলোর জন্য দোয়া করার দিন। সর্বোপরি মেহেদীর রঙে, সেমাই-পায়েশের স্বাদে, আতরের গন্ধে ঈদ হয়ে উঠুক আমাদের জন্য একটি সত্যিকারের উৎসবের দিন।</div>
</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"><strong>তথ্যসূত্র:</strong></div>
<div dir="auto">উৎসবের ঢাকা- সাদ উর রহমান।</div>
<div dir="auto">বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে</div>
<div dir="auto">বাংলাদেশের কালচার-আবুল মনসুর আহমদ</div>
<div dir="auto">‘ঈদ উৎসবের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’-অনুপম হায়াৎ।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/eid-in-the-prevailing-culture-of-bengal-a-message-of-brotherhood-and-freedom/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7729</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সামি ইউসুফ: মিউজিক শিল্পে আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/sami-yusuf-the-combination-of-spirituality-in-the-art-of-music/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/sami-yusuf-the-combination-of-spirituality-in-the-art-of-music/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 16 Dec 2022 03:56:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[মিউজিক]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7567</guid>

					<description><![CDATA[একজন কিংবদন্তি, যিনি যশ-খ্যাতির চাইতে আল্লাহর স্মরণেই বেশি সময় কাটাতে চান। একজন সংগীত শিল্পী, যিনি শান্তি ও সহনশীলতা প্রচারের জন্য তার সংগীত ব্যবহার করেন। একজন মুসলমান, যিনি তার খ্যাতি ও অর্জন বিশ্বের অভাবী লোকদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিলিয়ে দেন। একজন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একজন কিংবদন্তি, যিনি যশ-খ্যাতির চাইতে আল্লাহর স্মরণেই বেশি সময় কাটাতে চান। একজন সংগীত শিল্পী, যিনি শান্তি ও সহনশীলতা প্রচারের জন্য তার সংগীত ব্যবহার করেন। একজন মুসলমান, যিনি তার খ্যাতি ও অর্জন বিশ্বের অভাবী লোকদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিলিয়ে দেন। একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি দৃঢ়ভাবে আস্থা রাখেন ইসলামী সভ্যতার সমৃদ্ধশালী আধ্যাত্মিক ধারা ও কার্যক্রমের উপর যা মানুষের হৃদয়কে ইলাহী নূরে আলোকিত করে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি পথ পাড়ি দিতে চান এবং এ পথে তিনি মিউজিককে নিজের সফরের উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।</p>
<p>বিশ্বের নামকরা পত্রিকাগুলো তাকে বিভিন্ন শিরোনামে ভূষিত করেছে। যেমন– টাইম ম্যাগাজিন তাকে বলেছে ‘Islam’s biggest rock star’, দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে তিনি ‘Biggest Star in the Middle East’, আল জাজিরা তাকে উপমা দিয়েছে ‘King of Islamic Pop’!</p>
<p>তিনি সামি ইউসুফ। একটি নাম, একটি ব্র‍্যান্ড। এ নাম শুনলেই আমাদের মনে উঁকি দেয় ইরফানী ধারার মাহাত্ম্য ও ঐশ্বর্য্যের সাংস্কৃতিক রূপ দানকারী এবং বর্তমান সময়ের সর্বাধুনিক উপায়ে ইসলামের মর্মশাসকে উপস্থাপনকারী এক ব্যক্তিত্বের মুখচ্ছবি। তিনি মিউজিকের মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, মারেফত, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, রহমতের বার্তা চিত্রায়ণ করে যাচ্ছেন। ২০০৩ সালে প্রথম এলবাম প্রকাশের মাধ্যমে তার গানের যাত্রা শুরু হয়। এ এলবামের নাম ছিলো “আল মুয়াল্লিম”। হয়তো তিনি রাসূলের ‘আনা বুইসতু মুয়াল্লিমান’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই এ নাম পছন্দ করেছিলেন! তার জীবনের প্রথম দিকের সময় থেকেই ইসলামকে তিনি কতখানি ধারণ করেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়।</p>
<p>তার বাবা ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ, কবি, গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী এবং বহু বাদ্যযন্ত্র বাদক, কিন্তু তার সন্তানরা সংগীত চর্চায় আসুক এটি তিনি চাননি। অন্যদিকে সামি ইউসুফের ৬৪ জন চাচাতো-মামাতো ভাইবোনের মধ্যে ৫০ জন গায়ক আর অন্যরা শিল্পী! বাবা সম্পর্কে সামি ইউসুফ বলেন, “আমার বাবা খুবই রক্ষণশীল মানুষ এবং তিনি পরিবেশ বুঝেন।”</p>
<p>৬ বছর বয়সে সামি ইউসুফ তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি অন্য ছেলেদের সংগীত শেখান, কিন্তু তাকে শেখান না। তার অনুযোগ শোনার পর একদিন তার বাবা তাকে পারস্যের মিউজিকের উপর একটি বই পড়তে দেন। আধা ঘন্টা পরে এসে দেখেন সামি ইউসুফ সে বই পড়ে ফেলেছে। তখন তিনি তাকে সেটির প্রমাণ দেওয়ার জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দেখাতে বলেন। সামি ইউসুফ তখন বাজিয়ে দেখান। এটিই ছিলো তার সংগীত চর্চার শুরু। তারপর তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শিখেন। যেমন– দফ, তার, সানতোর, উড, ভায়োলিন, পিয়ানো ইত্যাদি।</p>
<p>তখন থেকেই তিনি বাবার সহায়তায় সংগীতের সাথে জড়িয়ে যান। তিনি বড় বড় শিক্ষকদের কাছে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেন, পরবর্তীতে লন্ডনে Royal Academy of Music-এও পড়াশোনা করেন। অতঃপর তিনি মিউজিক কম্পোজার হওয়ার কথা ভাবেন।</p>
<p>অল্প বয়সেই তার গায়কী প্রতিভা উন্মোচিত হয়। ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রবল আধ্যাত্মিক অনুভূতির দরুণ সংগীত জগত ছেড়ে আইন শাস্ত্র পড়ার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার বন্ধু তাকে এলবাম করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন, যে এলবামে থাকবে আল্লাহ ও রাসূলের জন্য ত্যাগ তিতীক্ষার গল্প।</p>
<p>বন্ধুর কথা মতো তিনি কাজ শুরু করেন। ২০০৩ সালে ২৩ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম এলবাম ‘আল-মুয়াল্লিম’ এর গানগুলো রেকর্ড করেন। এলবামটির ৭০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়, যা তাকে রাতারাতি স্টার বানিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি ছিলো ভাগ্য এবং লিখিত।” অতঃপর তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে ধাঁচের সংগীত তিনি নির্মাণ করছেন, তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, বিশেষত নাইন ইলেভেন পরবর্তী সময়ে এটি অতি জরুরী।</p>
<p>মুসলমানরা বিশেষ করে মুসলমান যুবকরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে গর্ব বোধ করার উপায় খুঁজছিল বহুদিন ধরেই, তার সংগীত এ প্রয়োজনীয়তা মেটায়। বলা যায়, তার সংগীত কিছুটা হলেও তাদের সেই দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানের রূপরেখা হয়েছে, কারণ তার সংগীতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলে এমন কিছুই পাওয়া যায়।</p>
<p>সামি ইউসুফের জন্মস্থান ইরানে (তার পরিবার আজারবাইজানী) ছিলো বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। সে সূত্রে তিনি বিভিন্ন ভাষায় গান গাওয়া এবং গানে ইরান ও পাশ্চাত্যের মিউজিকের ব্যবহার শুরু করেন। তার গানে প্রকাশ পায় ইসলামী ঐতিহ্যের ভাবধারা, সংহতি, সহানুভূতি, উদারতা, সততা, যা তার শ্রোতাদের মানসিকতা ও রুচিবোধকে উন্নত করে তোলে।</p>
<blockquote><p>তিনি বলেন, “সংগীত হলো আমার অস্তিত্বের এক বিস্তৃত রূপ। সংগীত হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং মহান ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগেরই এক বহিঃপ্রকাশ।”</p></blockquote>
<p>অনেকে সামি ইউসুফের সংগীতকে নাশীদের তালিকায় রাখেন, যা তিনি মানতে নারাজ। আবার অনেকে তার গানকে ইসলামী পপ ঘরানার বলে আখ্যায়িত করেন, এতেও তিনি স্বস্তিবোধ করেননি। তিনি তার গানের ধরণকে বলেন ‘স্পিরিটিক’।</p>
<p>এ ব্যাপারটি সামি ইউসুফের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনার একটি বড় প্রমাণ। তিনি তার গানে জ্ঞান ও সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, যা বুল্লেল শাহ, মাওলানা রুমী, এরিস্টটল এবং অন্যান্য গ্রিক দার্শনিকের কাজে পাওয়া যায়। তার মতে সংগীত হলো মানুষকে কাছে আনার, একত্রিত করার, জমিয়ে রাখার অন্যতম মাধ্যম।</p>
<blockquote><p>তিনি বলেন, “আমি নেহায়েত সংগীতের জন্যই সংগীত চর্চা করি না। আমার সংগীত চর্চার মধ্যে আছে উচ্চতর একটি উদ্দেশ্য। সংগীতের মধ্য দিয়ে যখন আমরা কাছাকাছি আসি, তখন আমরা নিজেদেরকে আরো ভালোভাবে জানতে পারি। আর যখন আমরা নিজেদেরকে ভালোভাবে জানতে পারি, তখন আমরা আধ্যাত্মিক অনুভূতিমালার দিকে ধাবিত হতে থাকি।” তার ভাষ্যে, “যিনি নিজেকে চিনেন, তিনি আল্লাহকেও চিনেন।”</p></blockquote>
<p>তার অভিব্যক্তিতেও রয়েছে তার চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। নান্দনিক এক অবয়ব নিয়ে তিনি স্টেজে উঠেন। মুখে মুচকি হাসির পরশ লেগেই থাকে। পোশাকেও যথেষ্ট মুনশিয়ানা চোখে পড়ে।</p>
<p>তিনি তার গানে হাজারো ঐতিহ্যকে ধারণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার অনেক গানেই একাধিক ভাষার ব্যবহার ক্রমাগত চোখে পড়ে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আরবি, ফারসি, আজেরী (আজারবাইজানী), তুর্কি, উর্দু, মালয়।</p>
<blockquote><p>এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “আমি অনেককে চিনি, যারা জনপ্রিয়তার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই এটি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি। আমি এমন একটি জীবন অতিবাহিত করতে চাই, যা আল্লাহর কাছাকাছি। আধ্যাত্মিক একটি জীবন আমার চাওয়া।”</p></blockquote>
<p>তার গানের কথাগুলো পড়লেই আমরা তার এ মনোভাবের প্রমাণ পাই। এর অন্যতম উদাহরণ তার <em>Forgotten Promises</em> গানটি৷ ২০১২ সালে রিলিজ হওয়া এ গানের কথায় বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক আবহ ফুটে উঠেছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো এ গানের মিউজিকও এমনভাবে তৈরি করা, যা শুনলে যে কেউ মিউজিকের তালে তালে আন্দোলিত হতে বাধ্য। গানটি মুসলিম আত্মপরিচয়কে নবতর পন্থায় হাজির করার এক অন্যতম উপাদান হতে পারে।</p>
<p>তার গানের এলবামগুলোর নাম যদি দেখি, প্রতিটি নামেই মুসলিম উম্মাহর আহবান মিশে আছে। যেমন–</p>
<ul>
<li>Al-Mu&#8217;allim (2003)</li>
<li>My Ummah (2005)</li>
<li>Without You (2009)</li>
<li>Wherever You Are (2010)</li>
<li>Salam (2012)</li>
<li>The Centre (2014)</li>
<li>Songs of the way (2015)</li>
<li>Barakah (2016)</li>
</ul>
<p>এগুলোর মাধ্যমে কখনো তিনি আল্লাহর কাছাকাছি যেতে চেয়েছেন, কখনো সে পথে সবাইকে আহ্বান করেছেন, কখনো সবাইকে অভিবাদন করে গেছেন, কখনো রাসূলের শিক্ষা তুলে ধরেছেন।</p>
<p>২০১৫ সাল থেকে তিনি লাইভ এলবাম শুরু করেন এবং ২০১৮ সালের পরে তিনি স্টুডিও এলবাম থেকে লাইভ এলবামে চলে আসেন। এখনো তিনি লাইভ এলবামেই গান রচনা করে যাচ্ছেন।</p>
<p>গত বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালে দুবাই এক্সপোতে তিনি ১ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে একটি নতুন এলবামের গান রিলিজ করেন, যে গানগুলো আমাদেরকে বিভিন্ন ধারার সুরের কাছে নিয়ে যায়, বিভিন্ন ইতিহাস-ঐতিহ্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এ গানগুলো শুনে অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যার প্রমাণ প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়।</p>
<p>২০১৭ সালে রিলিজ হওয়া The Dawn গানটি অসংখ্য সংস্কৃতির সুরকে একত্রিত করে আমাদেরকে নতুন এক মোহনীয়তার দিকে নিয়ে যায়। এ গানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিউজিককে একত্রিত করেন, যে মিউজিক শ্রোতাদের পাখির মতো উড়িয়ে নিয়ে যায় পারস্য, উসমানী, মিশরী, সিরিয়, চায়না, গ্রীক, আন্দালুসিয় মুসলিম ঐতিহ্যের কাছে। এ একটি গানই মুসলমানদের দেশের সীমানার কাঁটাতার ছাড়িয়ে এক উম্মাহ হয়ে বসবাস করতে বলে, কাজ করতে বলে, সব ধরনের মানুষকে নিয়ে একটি বহুত্ববাদী সমাজে বসবাস করার দিকে ধাবিত করে।</p>
<p>তার মধ্যে জালালুদ্দিন রুমীর প্রভাব কতটা ছিলো তা তার ২০১৯ সালে প্রকাশিত A Dancing Heart শুনলে বুঝা যায়। জালালুদ্দিন রুমীর প্রভাব পৃথিবীর কোথায় নেই? ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ‘আমাদের রুমী’। কথা ছাড়া, শুধু সুরের মুর্ছনায় সামি ইউসুফ তাঁকে ধারণ করেছেন এ গানে। হয়তো তিনি রুমীর এ কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন, ‘Silence is language of God, all others are poor translation’! তাই কোনো কথা ছাড়াই শুধু সুরের মূর্ছনা দিয়ে বিশ্বসভায় এক হয়ে যেতে চেয়েছেন তিনি।</p>
<p>এ রকম অসংখ্য গানেই সামি ইউসুফকে আবিষ্কার করা যাবে মুসলিম ঐতিহ্যের কোনো না কোনো পাতায়, স্বর্ণলতিকায়, আবহমান কাল ধরে চলে আসা ইসলামী ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ প্রকাশের ধারাবাহিকতায়।</p>
<p>প্রতিটি গানেই দেখা যাবে, তিনি আল্লাহর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কখনো আন্দালুসিয়ার রাস্তায় হাঁটছেন, কখনো ইরাক-ইরানের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কখনো দক্ষিন এশিয়ার কাওয়ালী দরবারে এসে হাজির হয়েছেন, কখনো প্রাকৃতিক সুরে ভেসে বেড়াচ্ছেন ইকুয়েডরের আকাশে, কখনো আছেন চীনের হাজার বছরের মুসলিম অস্তিত্ব আবিষ্কারের যুদ্ধে!</p>
<p>২০১৮ সালে সামি ইউসুফ <em>My Song</em> নামে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, যাতে তিনি তার গানের ব্যাখ্যা দেন। এটি শুনলেই বোঝা যায়, সামি ইউসুফ আমাদের মতো সাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মী নন, বরং তিনি বিশ্ব মুসলিম ঐতিহ্যের মহান এক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।</p>
<p>তার কাজের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তার অসাধারণ দক্ষতায় ইসলামের অতীত ঐতিহ্য আর বর্তমান আধুনিকতার মধ্যে একটি অন্বয় সৃষ্টি করেছেন। সেই সাথে রয়েছে পূর্বীয় ও পশ্চিমী মিউজিকের অসাধারণ মিথস্ক্রিয়া। সামি ইউসুফের এ অসাধারণ কর্মকে সমালোচকরা তার সৃষ্টির অনন্যতা হিসেবেই স্বীকৃতি দেন। অরিয়েন্ট আর অক্সিডেন্টের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর দুর্দান্ত প্রবহমানতায় তার কাজগুলো নিঃসন্দেহে বিশেষায়িত। সীমান্তের ব্যবধান থাকলেও সামি ইউসুফের এ অসাধারণ সৃষ্টি যে ইসলামী সভ্যতার সকল অঞ্চলের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টি করেছে, তা বলাই বাহুল্য।</p>
<p>ইসলামের সুমহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উপজীব্য করে আধ্যাত্মিকতা ও ইনসানিয়াতের উপর ভিত্তি করে সামি ইউসুফের সফর নিঃসন্দেহে এ বস্তুবাদী সভ্যতার বিপরীতে এক অনন্য সৃষ্টি। সামি ইউসুফ যতটা তার মাটিকে ধারণ করেন, ঠিক ততটাই ধারণ করেন ইসলামের বৈশ্বিক চরিত্রকে। এর ফলশ্রুতিতে তার সৃষ্টিকর্মের রূপ আঞ্চলিক হলেও আবেদন বিশ্বজনীন।</p>
<p>স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের মাটিতেও বাংলা অঞ্চলের রূহকে ধারণ করে এ অঞ্চলের সামি ইউসুফরা উঠে আসবেন, যারা হয়ে উঠবেন এ অঞ্চলের হৃদয়ের স্পন্দন ও মাটির আওয়াজ, ইনশাআল্লাহ!</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/sami-yusuf-the-combination-of-spirituality-in-the-art-of-music/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7567</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সংস্কৃতি চিন্তা দেশ ও জাতিসত্তার ভিত্তিতে</title>
		<link>https://rowyakbd.com/thinking-about-culture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/thinking-about-culture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 30 Sep 2022 07:17:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7420</guid>

					<description><![CDATA[ল্যাটিন শব্দ Cultura থেকে এবং এই শব্দ থেকে  Culture শব্দটি উদ্ভূত যার অর্থ কর্ষণ বা Cultivation তথা চাষ বা ভূমিকর্ষণের মাধ্যমে ফসল বোনার উপযুক্ততা অর্জন করে জমি তেমনি কৰ্ষিত মনের ফলিত রূপই সংস্কৃতি। Culture শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ সংস্কৃতি বা বৃষ্টি।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ল্যাটিন শব্দ Cultura থেকে এবং এই শব্দ থেকে  Culture শব্দটি উদ্ভূত যার অর্থ কর্ষণ বা Cultivation তথা চাষ বা ভূমিকর্ষণের মাধ্যমে ফসল বোনার উপযুক্ততা অর্জন করে জমি তেমনি কৰ্ষিত মনের ফলিত রূপই সংস্কৃতি। Culture শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ সংস্কৃতি বা বৃষ্টি। সংস্কৃতি শব্দের সম+কৃ+ক্তি-এ ব্যুৎপত্তির মধ্যে খুঁজে পাই সংস্কার প্রচেষ্টা। আবার বৃষ্টি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে কর্ষণ বা উৎকর্ষের ভাব। সংস্কৃতির আরবি প্রতিশব্দ হিসেবে তাহযীব ও তমদ্দুন বা তামাদ্দুন শব্দ দু&#8217;টি বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মুদন বা মাদানুন থেকে এসেছে মাদানিয়াত। মাদানিয়াত থেকে এসেছে তমদ্দুন বা তামাদ্দুন। মাদানিয়াত শব্দের অর্থ হচ্ছে নাগরিক বোধ-নগর জীবনের মার্জিত বা পরিচ্ছন্ন সভ্যতা। আবার &#8216;তাহযীব&#8217; শব্দের মূল খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় &#8216;হযব&#8217;, হাযাবা বা হাযযবা যার অর্থ হচ্ছে কেটে সমান করা। বাগানের সারিবদ্ধ গাছ বা ঘাসের বাড়তি সবকিছুকে মালি যেমন মেশিন দিয়ে কেটে-ছেঁটে সুদৃশ্য করে রাখে ঠিক তেমনিভাবে মানব জীবনের অসদাচরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডকে বাদ দিলে মানুষের সমষ্টি &#8216;জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। সুন্দর সব সময় সুদৃশ্য ও কাঙ্ক্ষিত। আর দেখতে যা সুন্দর তাই পরিচ্ছন্ন, তাই পরিশীলিত; তাই তাহযীব। এ অর্থে মানুষের পরিশীলিত জীবন ধারাই সংস্কৃতি।</p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong><em>উপরোক্ত বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শুধু নাচ গান ও বিচিত্রানুষ্ঠানের বিশেষ কর্মকাণ্ডকে সংস্কৃতি বলে না। বরং মানব জীবনের সমগ্র কর্মকাণ্ডের ফলিত রূপকে বলা হয় সংস্কৃতি। তবে মানব জীবনের সব কাজই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয় না। এই মুহূর্তে রানা প্লাজার পাশে অথবা ঝিগাতলতার মোড়ে একটি ছিনতাই হয়ে গেল অথবা একটি হত্যাকাণ্ড-এটি সংস্কৃতির অংশ হবে না। বছর তিনেক আগে থার্টিফার্স্ট নাইটে সেই মেয়েটির যে দুরবস্থা, দুর্যোগ ও জিল্লতী কোনো রুচিশীল মানুষই তা পছন্দ করতে পারে না। এটি মানব কর্মকাণ্ডের দুষ্টক্ষত। এটিও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত নয়। আর তাছাড়া থার্টিফার্স্ট নাইটের সংস্কৃতি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নয়। এটি বিজাতীয় সংস্কৃতি। অনেকে সংস্কৃতিকে ফুলের সৌন্দর্য ও সৌরভের সাথে তুলনা করেছেন। আসলে মনুষ্যত্বের বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি মানব সমাজে যে সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় তার সমষ্টিগত ফলিত রূপকেই সংস্কৃতি বলে। সংস্কৃতিকে মুদ্রণ কাজের সাথে তুলনা করা যায়। কোনো পাণ্ডুলিপি কম্পোজ করার পর তিন থেকে পাঁচ বার প্রুফ দেখে যখন পেটি মুদ্রণের জন্য প্লেটে রূপান্তরিত হয় তখন আর তাতে ভুল থাকে না। এভাবে মানৰ জীবনের ভুল-প্রাপ্তি, দুষ্টক্ষত প্রভৃতিকে বাদ দিলে যা থাকে তা হচ্ছে মানুষের সাজানো গোছানো বা পরিশীলিত ও পরিশ্রুত জীবন ধারা। এরই নাম সংস্কৃতি।</em></strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> ১৯৮২ সালের ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সম্মেলন সংস্কৃতির যে ব্যাখ্যা দেয় তা নিম্নরূপ :</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">&#8220;ব্যাপকতর অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির অথবা সামাজিক গোত্রের বিশিষ্টার্থক আত্মিক, বস্তুগত, বুদ্ধিগত এবং আবেগগত চিন্তা এবং কর্মধারার প্রকাশ। শিল্প ও সাহিত্যই একটি মাত্র সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত বস্তু নয়, মানুষের জীবন ধারাও সংস্কৃতির অঙ্গ। মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসও সংস্কৃতির অঙ্গ।</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতি মানুষকে নিজের সম্পর্কে চিন্তা করার অধিকার এবং ক্ষমতা প্রদান করে। আমরা যে বিশেষভাবে যুক্তিবাদী মানুষ যে মানুষের বিচারবুদ্ধি আছে এবং ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য আছে তা আমরা অনুভব করতে পারি সংস্কৃতির মাধ্যমে । সংস্কৃতির মাধ্যমেই আমরা মূল্য নিরূপণ করি এবং ভালো-মন্দের মধ্যে নির্বাচন করতে শিখি। সংস্কৃতির মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে, আত্মসচেতন হয়, নিজের অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে বোধ জন্মে, নিজের কর্মকান্ড সম্পর্কে বোধ জন্মে, নিজের কর্মকান্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখে, অনবরত নিজের সীমা অতিক্রম করে দক্ষতা অর্জন করে।&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের সমাজ, সভ্যতা এবং সংস্কৃতি একই সঙ্গে বিকশিত হয়। মানুষের শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি শিক্ষা ও সভ্যতাকে সূর্য মনে করা যায় তা হলে তার কিরণকে বলতে হয় সংস্কৃতি। একটি ডায়মন্ড বা হীরক খণ্ডকে যদি সভ্যতা বলা যায় তা হলে তার দ্যুতিকে বলতে হবে সংস্কৃতি। মানুষ নিজেকে অনবরত সৃষ্টি করে চলেছে। এই সৃষ্টির কাজে মানবিকতা সম্পৃক্ত পাশবিকতা পরিত্যাজ্য। এখানে মানুষের জীবনাদর্শ অত্যন্ত এর ভূমিকায় অবতীর্ণ। <em><strong>মানুষের জীবনাদর্শ অর্থাৎ ধর্ম মানুষের জীবনের অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করে আর বাদবাকি অংশে ভৌগোলিক</strong> <strong>বা স্থানীয় পরিবেশ এবং ভাষা প্রভাব বিস্তার করে থাকে</strong></em>।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়, একটি হচ্ছে ব্যষ্টি বা ব্যক্তিগত জীবন আর অন্যটি হচ্ছে সামষ্টিক বা সমষ্টিগত জীবন। গতিশীল মানব জীবনে ব্যক্তি সমাজের উপর আবার সমাজ ব্যক্তির উপর অবিরত প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। সমষ্টিগত জীবনের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক- পরিবার, সমাজ, পাড়া, মহল্লা, অঞ্চল, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা বিস্তৃত। মানুষের অনবরত সৃষ্টি কর্মের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে থাকে- এ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন, পরিবর্ধনও সম্পৃক্ত। মানুষের শিক্ষা, সভ্যতা, জীবন ও সংস্কৃতির বিকাশে তার জীবন দর্শনই তাকে অনবরত গতিশীল করে রেখেছে। এই গতিশীলতা মানেই হচ্ছে অনবরত সৃষ্টি করে চলা। এখানে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত প্রবল। শিক্ষা মানুষকে সচেতন করে, সঠিকভাবে জীবনাদর্শের ধারণা দেয়, বহুবিধ জ্ঞান ও দক্ষতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা দান করে, দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করে এবং মানুষের জীবন গঠনে সার্বিকভাবে সহযোগিতা দান করে জীবনের আলো ও অন্ধকারের পরিচয় স্পষ্টতর করে। এখানেই জীবনাদর্শ মানুষকে জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধের দ্বারা সত্যিকারের মানুষে পরিণত করে। আর এই মানুষই যখন অনবরত সৃষ্টি কর্মে ব্যাপৃত হয় তখনই হয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্য।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বা স্থানীয় পরিবেশ ও ভাষা এবং জীবনাদর্শ মানবজীবনে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ প্রভাব জীবনাদর্শের। ভৌগোলিক কারণে আমাদের প্রধান খাদ্য মাছ, ভাত ও ডাল, অধিকাংশ মানুষের পোশাক লুঙ্গি বা তহবন্দ, শার্ট ও পাঞ্জাবী। আমাদের গ্রামবাংলায় অধিকাংশ ঘর-বাড়ি ছনের বা মাটির তৈরি। জীবিকার প্রধান কাজ কৃষি-মাটির সোঁদা গন্ধ; ফসল বোনা ও তোলার আনন্দে আমাদের জীবন ভরপুর। জারি, সারি ও ভাটিয়ালী গানে আমরা কখনো আনন্দে বিভোর আবার কখনো বেদনামন্ডিত হয়ে উঠি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একটি দেশ বা জাতির জীবনে ভাষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভাষা মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনার বাহন। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও এই দুই ভূখণ্ডের ভাষায় শব্দ চয়ন ও ভাষার বাণীভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তারা বলে প্রয়াত, আমরা বলি মরহুম । তারা বলে জলযোগ, আমরা বলি নাস্তা। তারা বলে পূজা-অর্চনা, আমরা বলি এবাদত-বন্দেগী। আমরা বলি বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, তারা বলে বন্দেমাতরম। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি আদান-প্রদান, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে, দেশে-দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিব্যাপ্ত। এই আদান-প্রদান থেকে কেউই মুক্ত থাকতে পারে না। তবে এই আদান প্রদানের ক্ষেত্রে জীবনাদর্শই মানুষকে সচেতন করে দেয় কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি গ্রহণযোগ্য নয়। হিন্দুসম্প্রদায়ের তরল খাবার কাসুন্দি মুসলিম সম্প্রদায় গ্রহণ করেছে কিন্তু কচ্ছপ বা কাছিম মুসলমানদের জন্য হালাল নয়, তাই বর্জনীয়। আবার মুসলিম সম্প্রদায়ের মোরগ মোসাল্লাম, কোর্মা-পোলাও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা গ্রহণ করেছে। তাই বলে তাদের ধর্মে কেষ্টর জীব গরু খাদ্য হিসেবে তাদের জন্য বৈধ নয়, বিধায় বর্জনীয়। হিন্দু মহিলা মাথায় সিঁদুর পরে হাতে শাখা পরে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানাদি শুরু করে। মুসলমানরা এটা কখনো করতে পারে না। এভাবে সংস্কৃতির বিকাশে ও সংরক্ষণে গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">উপরোক্ত আলোচনায় সাধারণভাবে সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায় তা খানিকটা স্পষ্ট হয়েছে বলা যায়। প্রসঙ্গত এখন ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইসলামকে সংজ্ঞায়িত করে বলা যায় : Islam is not mere a relegion, it is only the complete and comprehansive code of life. অর্থাৎ ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়, এটা একমাত্র পরিপূর্ণ ও ব্যাপক জীবনবিধান।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মরহুম সাইয়েদ আবুল আ&#8217;লা মওদূদী বলেন :</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">“ইসলামী সংস্কৃতি পৃথিবীতে একটি নির্ভুল সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় । গড়ে ভুলতে চায় একটি সৎ পবিত্র জনসমাজ (Society)&#8230; সে চায় সমাজের লোকদের মধ্যে সততা, বিশ্বস্ততা, সচ্চরিত্র, আত্মানুশীলন, সত্যপ্রীতি, আত্মসংযম, সংগঠন, বদান্যতা, উদার দৃষ্টি, আত্মসম্ভ্রম, নম্রতা, উচ্চাভিলাস, সৎসাহস, আত্মত্যাগ, কর্তব্যবোধ, দৃঢ়চিত্ততা, বীর্যবত্তা, আত্মতৃপ্তি, আনুগত্য, আইনানুবর্তিতা প্রভৃতি উৎকৃষ্ট গুণরাজি সৃষ্টি করতে। &#8220;</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার ইসলামী সংস্কৃতি মুসলিম শাসক হলেই বিকশিত হয় না। শুধুমাত্র মহানবী (সা.) প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রই হলো ইসলামী সংস্কৃতির মডেল। এর সাথে চার খলিফার খিলাফতকাল এবং পঞ্চম খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনকালকে ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি বলা যায়। সে কাল থেকে আজ পর্যন্ত বহু মুসলিম রাজা বাদশাহ এবং বর্তমানের গণতান্ত্রিক অনেক রাষ্ট্র প্রধান মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাদের শাসনামলে ইসলামী সংস্কৃতির যথাযথ বিকাশ ঘটেনি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীর কবরের উপর নির্মাণ করলেন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম সুদৃশ্য তাজমহল। সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করতে হয়, তবে জনগণের টাকায় শুধুমাত্র মুগ্ধ করে এমন একটি ইমারত নির্মাণ না করে তিনি যদি মমতাজ বেগমের ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ তার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতেন এবং সেখানে যদি সাধারণ জ্ঞান বিজ্ঞানের সমন্বয়ে ইসলামী জ্ঞানচর্চা করা হতো তাহলে সেটি হতো ইসলামী সংস্কৃতির নিদর্শন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাজমহল নিছক মুসলিম সংস্কৃতি হয়ে মুখথুবড়ে পড়ে আছে যা মানব কল্যাণের কোনো কাজেই আসছে না। ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে ঈমান, যাকে বৃক্ষের বীজের সাথে তুলনা করা যায়। একজন মানুষ যখন আল্লাহ এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঈমান আনে এবং সে অনুযায়ী চিন্তা ও কর্মে তৎপরতা চালায়, তখনি ইসলামরূপ বিকাশমান বৃক্ষটি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে। তাকওয়া বা খোদাভীতি এটিকে অনবরত আত্মসমীক্ষা ও আত্মমূল্যায়নের দ্বারা পরিশীলিত ও পরিশুদ্ধ করে। ইহসানের পর্যায়ে মানুষ ও তার সমাজ এক উচ্চতর পর্যায়ে সমাসীন হয় যাকে হযরত রাবেয়া বসরীর প্রার্থনা থেকে অনুধাবন করা সম্ভব। হযরত রাবেয়া বসরী মোনাজাত করছেন, হে আল্লাহ, আমি যদি তোমাকে দোজখের ভয়ে স্মরণ করে থাকি তাহলে তুমি আমাকে দোজখেই নিক্ষেপ করো। আর যদি বেহেশতের লোভে তোমার এবাদত করে থাকি তাহলে তুমি আমাকে বেহেশত থেকে বঞ্চিত করো। সুগভীর ভালাবাসা ও একনিষ্ঠতার মধ্যদিয়ে কোনো কাজে পাগল পারা হওয়ার নামই ইহসানের পর্যায়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহান আল্লাহ মানুষের জন্য ইসলামী জীবনাদর্শকে মনোনীত করেছেন। আর এই জীবনাদর্শের অনুশীলনে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। ঈমান, তাকওয়া ও ইহসানের এক একটি পর্যায় অতিক্রম করে মানুষ ইনসানে কামিলে পরিণত হয় তখন ইসলামী সংস্কৃতির সুফল উপলব্ধি করা যায় । একটি মুসলিম প্রধান দেশে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশই স্বাভাবিক। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক নীতিমালা এবং ১৯৮৮ সালে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয় সংস্কৃতি কমিশন-এর রিপোর্ট দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, একটি দেশের সংস্কৃতি চিহ্নিত করার জন্য জাতিসত্তা, ধর্ম বা জীবনাদর্শ, ভাষা ও ভৌগোলিক বা স্থানীয় পরিবেশকে গুরুত্ব দেয়া অত্যাবশ্যক। আমাদের জাতিসত্তার প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল হলেও এর সমাধান জটিল নয়। ব্যক্তি সম্পর্কে একজন মানুষ বিভিন্ন সম্বন্ধে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। তেমনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক ভাষার দিক থেকে বাঙালি, ধর্মের দিক থেকে মুসলমান বা হিন্দু বা খ্রিস্টান অথবা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ভুক্ত। আর রাষ্ট্রের দিক থেকে আমরা বাংলাদেশী। তারপরও বলা যায়, এদেশের জনসংখ্যার ৯০ ভাগ মুসলমান বাদ-বাকি ১০ ভাগ অমুসলিম। কাজেই এদেশের জাতিসত্তা গণতান্ত্রিক রায়ে মুসলিম জাতিসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। এতে আশঙ্কা ও উদ্বেগের কিছু নেই। মহানবী (সা.) মদীনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন তাতে অংশগ্রহণ করেছিল ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক পূজারী ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ। এই সংবিধান ছিল পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র যা মানবিক আদর্শে রচিত ও সুবিন্যস্ত। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে মদীনা রাষ্ট্রে অমুসলিমগণ সমস্ত অধিকার যেভাবে ভোগ করেছে নিজ জীবনাদর্শের রাষ্ট্রে তার অধিক ভোগ করার দৃষ্টাস্ত আজ পর্যন্ত দেখা যায় না। অতএব, বাংলাদেশের জাতিসত্তার ক্ষেত্রে মুসলিম জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠা ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর। এমন রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন হিন্দু শিক্ষার্থীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় একজন হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষকের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে পঞ্চাশ জন মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য ওই একই ব্যবস্থা । মাত্র একজন শিক্ষার্থী এই অজুহাতে তাকে ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা অমানবিক। এ ধরনের অমানবিকতা ইসলামী রাষ্ট্রে থাকতে পারে না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এদেশে বাঙালি সংস্কৃতির নামে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায় তা তো অনেকটা সম্রাট আকবরের দীন-ই-ইলাহীর মতো মিশ্র ধর্মাদর্শ- যাকে মানব রচিত বলা যায় । ভাষা সংস্কৃতির একটি বড় উপাদান হলেও ভাষার ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয় না। এর প্রমাণ, ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গে মোট বাংলাভাষীর শতকরা চল্লিশ ভাগ বসবাস করে। তারা কিন্তু বাঙালি হতে চায় না, ভারতীয় পরিচয়ে তারা স্বস্তিবোধ করে। বঙ্কিমচন্দ্র তার &#8216;বাঙালির উৎপত্তি&#8217; শিরোনামের প্রবন্ধে বাংলাভাষী মানুষকে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। তা হচ্ছে আর্য হিন্দু, অনার্য হিন্দু, আর্য-অনার্য মিশ্রিত হিন্দু এবং বাংলাভাষী মুসলমান। পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী হিন্দুরা যেমন বাংলাদেশী হতে চায় না তেমনি বাংলাদেশের মানুষেরাও ভারতীয় হতে ইচ্ছুক নয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">শুধুমাত্র ভাষার ভিত্তিতে পৃথিবীর কোথাও জাতি গঠন হয়নি। জাতি গঠনে ভাষা, ধর্ম ও দেশ মিলিতভাবে যে মানসিকতা সৃষ্টি করেছে তার ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশী। গণতান্ত্রিক রায়ে এদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিধায় মুসলিম জাতিসত্তাই এদেশের সবকিছুর নিয়ামক।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি আমাদের দেশে উপ-সংস্কৃতির মর্যাদায় বিকশিত হয়ে মূল সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে সহ অবস্থান করবে। </span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/thinking-about-culture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7420</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শিশুসাহিত্যে মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/shisu-shahitha/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/shisu-shahitha/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 29 Sep 2022 13:59:18 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7415</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশের ভূ-ভাগ ও রাষ্ট্র সত্তার বিকাশ ঘটেছে এ এলাকার জনগণের শতশত বছরের বা অব্যাহত সংগ্রাম ও সাধনার মাধ্যমে। বাংলার শত বর্ষব্যাপী মুসলিম সংস্কৃতির জাগরণ ও দীর্ঘ সংগ্রামের গতিধারা থেকেই আজকের বাংলাদেশ। শুরু থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ একটি স্বাতন্ত্র্য সংস্কৃতিকে লালন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশের ভূ-ভাগ ও রাষ্ট্র সত্তার বিকাশ ঘটেছে এ এলাকার জনগণের শতশত বছরের বা অব্যাহত সংগ্রাম ও সাধনার মাধ্যমে। বাংলার শত বর্ষব্যাপী মুসলিম সংস্কৃতির জাগরণ ও দীর্ঘ সংগ্রামের গতিধারা থেকেই আজকের বাংলাদেশ। শুরু থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ একটি স্বাতন্ত্র্য সংস্কৃতিকে লালন করে আসছে। অথচ আমাদের এ লালিত সংস্কৃতিকে গলাটিপে হত্যা করতে চায় এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী। তারা প্রগতির নামে অপসংস্কৃতিকে চালিয়ে দিতে চায় আমাদের সমাজে। তাদের আচার-আচরণে মনে হয় মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য বলতে কিছুই নেই। নেই কোনো আলাদা সংস্কৃতি। তারা কোরআনের ভাষা পর্যন্ত বদলে দিতে চায়। যেমন আল্লাহ না বলে সৃষ্টিকর্তা, ‘বিসমিল্লাহ’-এর অনুবাদ প্রভুর নামে শুরু করলাম। এ সব আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুসলমানদের ধর্ম, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে অপসংস্কৃতির দিকে টেনে নেয়ার এক বিরাট ষড়যন্ত্র। কোনো মুসলমান নিজের সংস্কৃতি কি তা বুঝার পর বি-জাতীয় সংস্কৃতির দিকে নজর দিতে পারে না। মানুষের বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, মন-মানসকিতা এবং জীবন লক্ষ্যের চেতনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জীবন বোধ এবং তারই প্রকাশ সংস্কৃতি। কেবল মাত্র সাহিত্য বা শিল্পকলার মধ্যেই সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ নয়। সংস্কৃতি গোটা জীবন পরিব্যাপ্ত। প্রকৃত প্রস্তাবে আদর্শিক চেতনাই সংস্কৃতি। কারণ সংস্কার, সংশোধন, বিশ্বাস, পরিশীলন, পরিমার্জন, ভদ্রতা, শিষ্টতা, রুচিশীলতা, সভ্যতা, মানসিক বিকাশ, জীবনধারা, রীতিনীতি, শিক্ষা, উন্নতি, উৎকর্ষতা, এ সবই আদর্শিক চেতনা এবং আদর্শিক জীবনবোধ থেকে সৃষ্টি হয়। এগুলো সবই সংস্কার। আদর্শিক চেতনা থেকেই সংস্কৃতির প্রেরণা আসে। সংস্কারের প্রেরণা যদি হয় কুসংস্কার, তবে সে সংস্কারটা সংস্কৃতি নয় বাংলাদেশের জনসাধারণ ভাষার পরিচয়ে বাঙালী, ভৌগলিক পরিচয়ে বাংলাদেশী। সংস্কৃতি ভৌগলিক সীমানায় সব সময়ই আবদ্ধ থাকে না । ভাষাকে কেন্দ্র করেও এ সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। তবে বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরিত্যের কারণে একই ভাষাভাষী লোকদের মধ্যে থেকে সংস্কৃতির বিভেদ বিভাজন হতে পারে। বাঙালী হিন্দু ও মুসলমান একই ভাষায় কথা বললেও তাদের সংস্কৃতি এক নয়। যেমন মুসলমানদের ঈদের উৎসব উদযাপন রীতিনীতি নিয়ম-পদ্ধতি হিন্দুদের পূজার উৎসব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মুসলমান মুসলমানে দেখা হলে আস্সালামু আলাইকুম এবং ওয়া আলাইকুমুসসালাম কথা উচ্চারিত হয়। হিন্দুদের সাক্ষাতে উচ্চারিত হয় নমস্কার, আদাব। দৈনন্দিন জীবনে মুসলমানদের খাদ্য তালিকায় গরুর গোশত স্থান পেলেও হিন্দুদের তালিকায় এর স্থান পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। ধর্মীয় জীবনে মুসলমানরা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, দোয়া-দরুদ তাসবীহ করে থাকে। হিন্দুরা পূজা ও অর্চনা ইত্যাদি করে থাকে। পাশাপাশি বাস করেও একই পদার্থকে হিন্দুরা অল বলে, মুসলমানরা পানি বলে। এ বিষয়গুলো আলোচনা করতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। আমার আলোচনার মূল বিষয় হলো, <em><strong>“শিশুসাহিত্যে মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ&#8221;</strong></em>। বাংলা শিশুভোগ্য সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের কণ্ঠ প্রথম শোনা যায় ষোড়শ শতকে। ধর্মাশ্রয়ী সাহিত্যের কোলাহলের মধ্যে মানুষকেন্দ্রিক রচনার আবির্ভাবের সূচনায়। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের শুরু ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে। যখন এখানকার বৌদ্ধ সমাজের কাছে পরাভূত এবং হিন্দু সমাজ বেদপুরানের অভয়াশ্রমে থাকা সত্ত্বেও নানা লৌকিক মতের চোরা আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত। ক্রমে হিন্দু ধর্ম অবক্ষয় রোধের উচ্চাশায় নিত্য-নতুন দেবদেবীর অনুগত ঠিক তখনই মুসলমানরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশে নতুন করে যাত্রা পথের সূচনা করল। যদিও এ উপমহাদেশে বাঙালী মুসলমানদের সংস্কৃতি অনেক পুরনো। তা অনুসন্ধানে বিলম্ব হওয়ায় মুসলমানরা নিজ গৃহে ঘরজামাইয়ের মতোই বসবাস করে। ফলে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিশুসাহিত্যেও মুসলমানদের সাধনা হয় বিলম্বিত। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতগণ সর্বপ্রথম মিশনারী ও দেশীয় ছাত্রদের জন্যে পাঠ্যপুস্তক রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমেই মূলত শিশুসাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়। তখন মুসলমান লেখকরা নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার জন্য শিশুসাহিত্যকে ভালোভাবে আকড়িয়ে ধরলেন। বাংলায় শিশুসাহিত্যের সাধনায় শিশুদের মনমেজাজ যাচাই, মনোবিশ্লেষণ, শিশুচিত্তের বিচিত্র প্রয়াস নিরুপণ, নীতি ধর্মের প্রতি লক্ষ্য, জীবন গঠনোপযোগী উপকরণ সংগ্রহ এবং শিশু আনন্দের খোরাক বিতরণ প্রয়াসী হয়ে এসব পাঠ্যপুস্তক শিশুসাহিত্যের প্রথম যুগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।</p>
<p>একদিকে পাঠ্যপুস্তক রচনা অন্যদিকে বিবিধ শিশু-কিশোর পাঠ্য পত্রিকায় ছোটদের জন্য রচনা প্রকাশ আদিযুগের শিশুসাহিত্যের ধারা উন্নয়নে সহায়তা করে।</p>
<p>প্রথম দিকে এককভাবে শিশুসাহিত্য রচিত হয়নি। এতে ছোটবড় সবার জন্য একই সাহিত্য রচিত হতো । যেমন সায়ফুল মুলক-বদিউজ্জামানের মতো কিছু উপাখ্যান ছিলো তখন মুসলিম সাহিত্য। এসব কাহিনীর দু&#8217;একটি আজো পুঁথির আকারে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে আছে। পুঁথিপাঠকালে শিশু শ্রোতার উপস্থিতি দেশের গ্রামে-গঞ্জে দুর্লভ দৃশ্য নয়।</p>
<p>নবী-কাহিনী আর জঙ্গনামার কাল থেকেই আমদানি হতে থাকে আরো কিছু শিশুলোভন বিষয়। জাতিতে আরবীয় বা ইরানীয়, এই বিষয়গুলির কোনো-টি এসেছে অনুবাদের মাধ্যমে, কোনো-টি বা মৌলিক রচনার রূপ নিয়ে। চরিত্রে এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই রূপকথাধর্মী। সুতরাং শিশু-ভোগ্যতায় নিঃসন্দেহে নবীকাহিনী আর জঙ্গনামার তুলনায় কল্পনার আকর্ষণে অধিকতর বলবান। হাতেম তাইয়ের কিস্সা এবং লায়লী-মজনু, শিরী-ফরহাদ আর ইউসুফ জোলেয়খার প্রেমকথা এই শ্রেণীরই আমদানি। এমনকি, গুলে বকাউলি জাতীয় রূপকথাও। এর সাথে এসেছে- আরব্য, পারস্য আর তুর্কী উপন্যাস এবং সা&#8217;দীর &#8216;বুস্তা&#8217; আর গুলিস্তার গল্প। এসব গল্প শিশুদের খুবই উপভোগ্য।</p>
<p>পাকিস্তান যুগে মুসলিম শিশু-সাহিত্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা, মেঘ, বৃষ্টি, ঝড়ের প্রকোপ অনেকটা স্তিমিত, আবহাওয়া শাস্ত, উজ্জ্বল। বাংলার মুসলিম লেখকরা বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্য সৃষ্টির নতুন সমৃদ্ধ এক রৌদ্রলোকিত প্রসন্ন সাহিত্যাকাশের পানে ফেরালেন। তাদের হাত পেকেছিল যে পাঠ্যবই রচনায় তা-ই সাবলীল, সুন্দর, মধুর শিশুসাহিত্যের সৃষ্টি করল।</p>
<p>কুরআন, হাদিস, ইসলামের চার খলিফা, ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমাজব্যবস্থা, মুসলিম বিশ্বের বিবিধ গৌরবজনক প্রতিষ্ঠান, মুসলিম বীর-পীর-গাজী-শহীদ-মহাপুরুষ ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি শিশুসাহিত্যের প্রবন্ধ শাখার লেখকগণ লেখনী চালনা করলেন।</p>
<blockquote><p>গল্প সাহিত্যে ইরান-তুরানের গল্প, আরব্য উপন্যাস, পারস্য উপন্যাস, শাহনামা, কুরআন, হাদিস মসনভী, গুলিস্তা, বুস্তা, নবী, আউলিয়া, পীর-দরবেশের জীবনের বিচিত্র উল্লেখযোগ্য অংশ যা শিশুচিত্তে দাগ কাটে, তাদের চরিত্র গঠের সহায়তা করতে পারে, এমন বিষয়বস্তু আনা হলো ।উপন্যাস-নাটকের বেলায়ও আদর্শ জীবনভিত্তিক কাহিনী রচনা শুরু হলো। ঐতিহাসিক বিষয়াদি নির্বাচিত হলো, মুসলিম বিশ্বের হাস্যরসাত্মক গল্প কৌতুক কথার সঙ্গে পরিবেশিত হলো গ্রাম বাংলার লোক-কাহিনী রসকথা। দেশ-বিদেশের রূপকথাগুলো বাংলায় অনূদিত হলো- মুসলিম উপকথা নতুন করে পরিবেশিত হলো। মুসলমান শিশুসাহিত্যিকগণ মুসলিম সংস্কৃতি বিকাশে আরো এগিয়ে গিয়ে ধর্ম ও ইতিহাস ঐতিহ্যের পরিবেশনায় মূল লক্ষ্য জ্ঞান ঠিক রেখে ছড়া-কবিতার জগতে প্রকৃতি, মানুষ, ঋতুপরিক্রমা, মুসলিম অনুষ্ঠান পর্ব ইত্যাদি যোগ করলেন। মহাপুরুষ জীবনী, মুসলিম জাগরণ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা ভাবের দ্যোতনা করলেন। তারা গল্প-উপন্যাস, ছড়া কবিতা, প্রবন্ধের বিচিত্র শাখায় নিজেদের কথা নিজেদের মত করে বলার প্রয়াস পান। ফলে বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসের স্রোতধারায় আর একটি নতুন ফল্গুধারার সৃষ্টি হলো। মুসলমান খোকা-খুকুর বদল সে ধারায় স্নাত হয়ে আদর্শ নাগরিকরূপে দেশবরেণ্য সন্তানের গৌরব অর্জনে সক্ষম ।</p></blockquote>
<p>১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত অজস্র শিশু পত্রিকার প্রকাশ ঘটেছে। আর এ সমস্ত পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলমানদের সংস্কৃতি বিকাশে শিশুসাহিত্য যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। যেসব লেখক এতদিন কেবল বড়দের জন্য লিখেছেন, তারা পত্রিকার পাতায় শিশুদের জন্যে শিশুসাহিত্যের সম্ভার নিয়ে এগিয়ে এলেন। বস্তুত শিশু পত্রিকাগুলোই এই মহৎ ধর্মকে ত্বরান্বিত করে। সাথে সাথে প্রকাশিত হয়ে আসছে শিশুসাহিত্যের নতুন নতুন সংকলন। রাজধানী ঢাকার বাইরে মফস্বল শহর থেকেও এসব সংকলন প্রকাশিত হয়ে আসছে।</p>
<p>এক সময় হিন্দু সম্পাদিত পত্র-পত্রিকায় মুসলমান লেখকদের রচনা প্রকাশ ছিল খুবই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত; ইচ্ছা করলেই নিজেদের সংস্কৃতি বিকাশে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে কোনো লেখা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। ফলে মুসলমানগণ নিজেদের মনমতো পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনার প্রয়োজন প্রকটভাবে অনুভব করেন। আর এরই ফলশ্রুতিতে মুসলিম সম্পাদিত সুন্দর মনোলোভা যুগোপযোগী শিশু-পত্রিকা প্রকাশ পায়। যার মাধ্যমে বাংলা শিশুসাহিত্যের জগতে মুসলমানদের নতুন পথ নির্দেশ করে। ইতোপূর্বে শিশু-কিশোরদের জন্য যা রচিত হয়েছে তার সাথে বিজ্ঞানের কোনো যোগসূত্র ও আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি বিকাশের উপকরণ খুবই কম ছিল। বিশেষ করে তথাকথিত প্রগতিবাদী লেখকদের হাতে যা রচিত হয়েছে তার অধিকাংশই আমাদের সংস্কৃতি বর্জিত। যার অধিকাংশই অবাস্তব আষাঢ়ে গল্পে ভরা। মিথ্যার পাঁচালী দিয়ে সত্যকে ঢাকার অপপ্রয়াস মাত্র। এ জন্য যেমন দায়ী আমাদের রাষ্ট্রায় ব্যবস্থা তেমনি দায়ী তথাকথিত প্রগতিবাদী লেখকরা। তারা তাদের সামাজিক দায়িত্বটুকু ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে এসব অপকর্মের সাথে নিজেদের একাত্বতা ঘোষণা করে ব্যক্তি সুবিধা লুটেছে মাত্র। তারা যেসব সাহিত্য রচনা করেছে সেখানে আমাদের দেশ, দেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি-বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদেরকে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা থেকেও দূরে রেখেছে।</p>
<p>গল্প, উপন্যাস, ছড়া-কবিতার ক্ষেত্রে কথাটি যেমন সত্য, নাটকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি তেমন সত্য । ফলে আজকের লেখকদের ভুল ভেঙেছে। তারা নিজেদের সংস্কৃতির ধারা বুঝতে পেরে মুসলিম সংস্কৃতি বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন শিশুসাহিত্যে।</p>
<p><em><strong>শিশুসাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি উজ্জ্বল ব্যতিক্রমধর্মী সৃষ্টি প্রসূন প্রস্ফূটিত হয়েছে। তার সৌরভে আমাদের শিশুদের মনোজগত ও কোমলচিত্ত মৌ মৌ গন্ধে সুরভিত, আন্দোলিত। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা অবদান তা দরিদ্র নয়। নয় অক্ষম বোবার আস্ফালন । বর্তমানে যে সব শিশুসাহিত্য রচিত হচ্ছে তাতে নিত্য নতুন শিশু-মনোরঞ্জনী সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে । তাতে অজস্র কালজয়ী শিশু-উপভোগ্য ঐশ্বর্যের শিক্ষা উদ্দীপ্ত হচ্ছে। যা আমাদের কাছে পরম গৌরব ও আনন্দের সম্পদ।</strong></em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/shisu-shahitha/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7415</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলাম ও সংস্কৃতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islam-and-culture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islam-and-culture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 15 Sep 2022 17:45:42 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7385</guid>

					<description><![CDATA[ইসলাম ও সংস্কৃতি- এ দুটি শব্দ পাশাপাশি উচ্চারণের মধ্যে সন্দেহ সংঘাতের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের সন্ধান পাওয়া যায়। ভাবটা এই রকমঃ ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যে তো হামেশা সামঞ্জস্য দেখা যায় না; এখন বল তো, ইসলাম আর সংস্কৃতির মধ্যে সম্বন্ধটা কেমন? এমন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলাম ও সংস্কৃতি- এ দুটি শব্দ পাশাপাশি উচ্চারণের মধ্যে সন্দেহ সংঘাতের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের সন্ধান পাওয়া যায়। ভাবটা এই রকমঃ ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যে তো হামেশা সামঞ্জস্য দেখা যায় না; এখন বল তো, ইসলাম আর সংস্কৃতির মধ্যে সম্বন্ধটা কেমন?</p>
<p>এমন সন্দেহের সঙ্গত কারণ আছে। অতীতের কোন ধর্ম সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে চলে নাই। ইংল্যান্ডে কোন কোন বিশিষ্ট শিক্ষিত ব্যক্তি ধর্মীয় জীবন-যাপন করতে গিয়ে গায় চাম উকুনের চাষ করেছেন। হয়তো-বা সকালে-বিকালে নিজ হাতে গায়ে বেত মেরে মেরে রক্ত সঞ্চার করেছেন। স্পেনের ইতিহাস লেখক লেইনপুল তাঁর &#8216;মুস ইন-স্পেন&#8217; নামক বইয়ে লিখেছেনঃ তৎকালীন স্পেনে এমন খ্রিস্টান-সাধিকা ছিলেন, যাঁরা গর্ব করে বলতেন: &#8216;আমার বয়স সত্তর পার হয়ে গেছে; এর মধ্যে জর্দন নদীর পানি ছাড়া আর কোন পানিতে আমার আঙ্গুলের ডগা ডুবাই নাই।&#8217; এঁদের সমসাময়িক সমাজ এঁদের অকাতরে শ্রদ্ধা অর্ঘ্য দান করেছে; কিন্তু সংস্কৃতি এঁদের জীবন থেকে সভয়ে দূর-দূরান্তে পালিয়ে গেছে।</p>
<p>অথচ মানুষের দেহ, মন ও সমাজের সংস্কারের জন্যই ধর্মের উত্তর। দেহে যাতে ময়লা জমে না থাকতে পারে, তার জন্য ব্যবস্থা হল- ওজু-গোসলের। দেহ সাফ থাকলে মনের পক্ষে সাফ থাকা সহজ হয়। তাই ওজু-গোসল দেহ-মন উভয়ই সাফ রাখার সহায়ক। দেহ-মন সাফ থাকলে দেহ মনের স্বাস্থ্য অটুট থাকে- ভালো ভাবনা-চিন্তার দিকে দিল সহজে রুজু হয়। এ জন্য আরবরা বলত: &#8216;সাফ সাফাই খোদায়ী গুণের শামিল।&#8217; ইসলামের এই কথাই &#8216;Cleanliness is next to Godliness&#8217; প্রবাদরূপে সেকালে ইউরোপময় ছড়িয়ে পড়েছিল।</p>
<p>ওজু-গোছল ধর্মের অঙ্গ। আর Cleanliness is next to Godliness- ধর্ম ও সংস্কৃতি উভয়ের অঙ্গ। অতএব, এখানে ইসলামের সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধ নাই, বন্ধুত্ব আছে। সংস্কৃতি সংস্কারের ফল। কোন বস্তু বা মনোভাবকে ঘসে মেজে সুন্দর করার কাজকে আমরা সংস্কৃতায়ন বলতে পারি। সংস্কৃতিকে আরবীতে বলে &#8216;তমাদ্দুন&#8217;। তমাদ্দুন শব্দ &#8216;মদীনা&#8217; শব্দ থেকে উন্নত; মদীনা মানে শহর। তমাদ্দুন মানে শহর সুলভ সুন্দর মার্জিত রূপায়ণ। সেকালে শিক্ষা-সভ্যতা শহরে আবদ্ধ থাকত; পল্লী সাধারণত থাকত সে শিক্ষা-সভ্যতার প্রভাবের বাইরে। কাজেই পল্লীবাসীদের পক্ষে অমার্জিত থাকা স্বাভাবিক ছিল। শহুরে লোকেরা তাই গাঁয়ের মানুষকে অবজ্ঞার চোখে বলত, &#8216;ওরা গাওয়ার&#8217;- আমরা বলি গোঁয়ার। গোঁয়ারের আচার-ব্যবহার, চিন্তা-ভাবনার সংস্কার বা সংস্কৃতি সমিতির যেমন কাজ, ধর্মেরও তেমনি কাজ। দুনিয়ার সকল ধর্ম মূলত মানুষের কল্যাণ বিধানের জন্যই এসেছে। সে কল্যাণের দুয়ার সকল ধর্ম সমানভাবে খুলে দিতে পেরেছে- এ আমরা বলি না। কোন কোন ধর্ম মানুষের কল্যাণ যত করেছে, আখেরে অকল্যাণ করেছে তার চেয়ে বেশী। অবশ্য তা ইচ্ছাকৃত নয়, বুঝবার ভুল। মোট কথা, নীতিগতভাবে ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধ থাকার কথা নয়; অথচ কার্যক্ষেত্রের কোন কোন অঙ্গনে এমন বিরোধ অতীতে ঘটেছে এবং বর্তমানেও ঘটছে।</p>
<p>এ বিরোধের কারণ সম্বন্ধে আমাদের যা মনে হয়েছে, তা বলি।</p>
<p>(ধর্ম সুনির্দিষ্ট আইন-কানুনের কাঠামোতে আবদ্ধ। সংস্কৃতির এমন বাঁধা-ধরা আইন-কানুন নাই) অজু-গোসল ধর্মের অঙ্গ। ওজু-গোসল করার সুনির্দিষ্ট তরতীব আছে। নাকে ময়লা না থাকলেও অজুর সময় তিনবার নাকে পানি দিতে হয়; দুইবার পানি দিলে মনে হয়, ওজু ঠিক মত করা হল না। সংস্কৃতিবাদীরা বলবেন, অত বাঁধা ধরা নিয়মের বেড়ী কেন? নাকে ময়লা না থাকলে দুইবার পানি দিলেই তো যথেষ্ট। আর গোসলের সময় শরীরের সমস্ত অঙ্গই যখন ধোয়া হয়, তখন গোসলের পর নামাজের জন্য ফের আলাদা ওজু করার দরকার কি?</p>
<p>সনাতন শাস্ত্রবাদী বলেন: না, সংস্কৃতিবাদীকে এতো স্বাধীনতা দেওয়া চলে না। ওজুর উদ্দেশ্য দেহের ‘তাহারাত’- মানে শূচিতা বিধান। বেশী স্বাধীনতা দিলে শেষ পর্যন্ত ওরা বলে বসবে, আমার দেহে অপবিত্রজনক কোন ক্লেদ-গলিজ নাই; কাজেই আমার ওজু-গোসলের দরকার কি? ক্রমে ক্রমে ওজু-গোসল উঠে যাবে। এমনিভাবে ধর্ম ও সংস্কৃতিতে বিরোধ বেঁধে ওঠে। মাটির কোন কোন স্তরের হাড় হাজার হাজার বছর থেকে তা অবশেষে পাথরের মত শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজীতে একে বলে ফসিল। ফসিলের গায়ে জোর আছে, কিন্তু ভিতরে মজ্জা প্রাণ কিছুই নাই। কোন কোন ধর্মের ব্যাপারেও যেন এমনটি ঘটে থাকে। ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পুরান হতে হতে ফসিল হয়ে দাঁড়ায়। সে আচার-অনুষ্ঠানের বেড়া ভাঙ্গা অত্যন্ত কঠিন, অথচ তা পালন করেও বিশেষ ফায়দা নাই। এমন অবস্থায় সংস্কৃতি অমন আচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে ।</p>
<p>ইসলামে আচার-অনুষ্ঠান যাতে ফসিলের মত অনমনীয় না হয়ে ওঠে, তার জন্য ইসলামেই ব্যবস্থা আছে। যা ফরজ না, তাকে ফরজ মনে করা ইসলামে নিষিদ্ধ। যা কোন নির্দিষ্ট তারিখে করণীয় নয়, তাকে নির্দিষ্ট করণীয় বা মনে করা নিষিদ্ধ। মিলাদ-শরীফ পড়ানো ধর্মের কাজ; কিন্তু মিলাদ ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়। কাজেই মিলাদ কেবল রবিউল আউয়ালের চাঁদে পড়ানো চলে। রবিউল আউয়ালের চাঁদেই মিলাদ পড়াতে হবে, অথবা ওই চাঁদে মিলাদ পড়ালে বেশী সওয়াব এমন মনে করা ধর্মের নীতি মোতাবেক নিষিদ্ধ।</p>
<p>কোরবানী করা সম্পদশালী মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। কিন্তু কোরবানী যাতে প্রাণহীন আচারে অথবা ঐশ্বর্যের প্রদর্শনীতে পরিণত না হয়, সে জন্য হুঁশিয়ার করে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>আল্লাহর কাছে কোরবানীর পশুর রক্তও পৌঁছে না; গোশতও পৌঁছে না- তিনি দেখেন তোমাদের ঈমান।</p></blockquote>
<p>নামাজ ইসলামে ফরজ; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে, &#8216;কেবল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মাথা নত করলে কোন ফায়দা নাই, যদি না তার পেছনে থাকে উপাসনা উন্মুখ সত্য সরল মন। অন্য কথায়, ইসলামের আচারগত পীড়নে বুদ্ধি-বিবেকের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরার আশংকা নাই । ভালো খাদ্য, ভালো পোশাক ব্যবহার সংগতিসম্পন্ন মানুষের লক্ষণ। কোন কোন ধর্মে এমন বিধান আছে যে, না খেয়ে খেয়ে শরীরকে কষ্ট দেওয়া ধর্মের পরিপোষক। ইসলাম বলে, খাও, দাও, পান কর- শুধু অপচয় করো না। মানুষ পেট ভরে ভালো জিনিস খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, ইসলামে তাও এক রকম ইবাদত।</p>
<p>ভালো পোশাক সম্বন্ধেও একই কথা। উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ থেকে সাধু-সন্ন্যাসী হওয়ার বিধান ইসলামে নাই; বরং মসজিদে মজলিসে ভালো পোশাকে যাওয়ার তাকীদ আছে। মুসলমানদের কেউ কেউ চোখে সুরমা দিয়ে, দাড়িতে মেহেদী মেখে পোশাকে আতর গোলাপ লাগিয়ে মাথায় পাগড়ী পরে মসজিদে যাওয়া সওয়াবের কাজ মনে করেন। এসব কে বিলাসীর জঅলুস বলে কেউ তাকে নিন্দা করে না।</p>
<p>ইছলাম তার অনুসারীকে মুখভার করে থাকতে উৎসাহ দেয় না। অন্যের সঙ্গে হেসে কথা বলা ইছলামে ছওয়াবের কাজ। অন্যের সাথে ব্যবহারে এই মনোরম ঔদার্যের উপর ইছলাম বার বার তাকিদ দিয়েছে। অন্যের উপাস্য দেব-দেবীর নিন্দা ইছলামে নিষিদ্ধ। কোন মানুষকে ছোট বলে ঘৃণা করা ইছলামে পাপ। অন্যকে ভাই বলে আহবান ইছলামে পুণ্য। ইছলামের এই উদার বিশ্বভ্রাতৃত্ব তার সংস্কৃতির এক মস্ত স্তম্ভ।</p>
<p>পশুদের মধ্যে যারা শক্তিমান, তারা দুর্বলদের তাড়িয়ে দিয়ে একা খেতে চায় । মানুষের মধ্যে পশুর পর্যায় থেকে যারা বেশী উপরে উঠতে পারে নাই, তারা প্রতিবেশীর সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু ইছলাম বলে, প্রতিবেশী মুছলমান অমুছলমান যাই হোক, জানা সত্ত্বেও তাকে ভুখা রেখে যে পেট ভরে খায়, সে মুছলমান নয়।</p>
<p>সংস্কৃতি অর্জনের এক বড় পথ হচ্ছে বিদ্যা শিক্ষা। বিদ্যা শিক্ষা সম্বন্ধে ইছলাম যে গভীর অনুপ্রেরণা দান করেছে, জগতের ধর্মের ইতিহাসে তা কেবল দুর্লভ নয়, অনুপম। ৬০/৭০ বছর আগেও কোন কোন ধর্মের অনুসারী বিদ্যাশিক্ষার জন্য সাগর পার হয়ে ম্লেচ্ছ দেশে গিয়েছে বলে দেশে ফিরে এসে আপন সমাজে ঠাঁই পায় নাই। অমন ধর্মে কেবল ম্লেচ্ছ দেশে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল না, ম্লেচ্ছ জ্ঞান অর্জনও নিষেধ ছিল। এদিকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে ইছলামের পয়গম্বর বলে গেছেন, বিদ্যার জন্য দরকার হলে সুদূর চীন দেশেও যেয়ো। অথচ ভাষা, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্য, পোশাক সর্ব বিষয়েই চীন আরব থেকে আলাদা ছিল। সেখানে যেতে হত সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে। জ্ঞান অর্জন ব্যাপারে দুনিয়ার কোন রকম বাধা-বিপত্তিকেই ইছলাম সামনে দাঁড়াতে দেয় নাই। ইছলাম বলে জ্ঞান মুছলমানের হারানো মানিক- যেখানে পাও সেখান থেকে তুলে নাও ।</p>
<p>নারীর আত্মা আছে কি-না, সে সম্বন্ধে মধ্যযুগীয় ইউরোপের কোন কোন ধর্ম-ধ্বজের দল মাঝে মাঝে গভীরভাবে আলোচনা করত। তাদের মধ্যে কেউ বলত, &#8216;না, নারীর আত্মা নাই। কাজেই পরপারের প্রস্তুতির জন্য তাদের পক্ষে ধর্মাচরণ ও বিদ্যা অর্জনের কোন দরকার নাই।&#8217;<strong> ইসলাম বিদ্যা অর্জনকে নর-নারী উভয়ের জন্য ফরজ করেছে।</strong> সংস্কৃতি অর্জনের দুয়ারে সে জামানায় এমন উদার অবারিতভাবে উন্মুক্ত আর কোথাও ছিল না। সংস্কৃতির একটা বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে দুনিয়ার প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে যথাসম্ভব পরিচয়। নিউটন &#8216;প্যারাডাইস লস্ট&#8217; পড়ে নাকি বলেছিলেন, বইটি ভালো; কিন্তু ওতে মধ্যাকর্ষণ সম্বন্ধে কোন আলোচনা নাই । মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত, বহুকাল পর কার্যস্থল থেকে বাড়ী চলেছেন। পথে একজন বলল: বড় দুঃসংবাদ কর্তা, আপনার স্ত্রী বিধবা হয়েছেন। এমনি তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। সংস্কৃতিবাদীরা এমন একরোখা পাণ্ডিত্যকে যথেষ্ট দাম দিতে নারাজ। মুসলমান পণ্ডিতেরা তাঁদের জ্ঞানকে কেবল কোরাআন-হাদীসে আবদ্ধ রাখেন নাই। তাঁরা আরো বেশী জ্ঞানলাভের জন্য গ্রীস, মিসর, সিরিয়া, ইরানে ছুটে গিয়েছেন; ভারত থেকে বড় বড় পণ্ডিতকে ইসলামী সভ্যতার খলিফারা দাওয়াত করে নিয়ে তাঁদের জ্ঞান নিজ সমাজে প্রচারের ব্যবস্থা করেছেন। বিশ্লেষক সন্ন্যাসীর মত মুসলমান পণ্ডিত সাধকেরা জীবনের প্রতি মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ান নাই । বার মাসের মধ্যে দশ মাস রোজা রাখেন, সংসারের কর্মসূচীর বাইরের সময়টুকুর বেশীরভাগ তসবী-তাহলীল নিয়ে থাকেন, এমন সূফীও পাপের মহিমা কীর্তনে লিখেছেন :</p>
<blockquote><p>বেগুনাহী কা মরজ থা যব না আদম খোলদ- ছে</p>
<p>আয়ে ঘাবরাকার ছুয়ে দারুশশাফায়ে মা&#8217;ছিয়াত</p></blockquote>
<blockquote><p>পাপহীনতার আধি-ব্যাধি ভুগি অধীর আদম হায়,</p>
<p>পাপের পরম ঔষধ লাগি মর্ত্য পানে বেকারার ধায়।</p></blockquote>
<p>ইনি আবার বলেন:</p>
<blockquote><p>মুঝকো এসিয়া কি বদৌলত দৌলতে তওবা মিলী</p>
<p>কেঁউ না ম্যায় দিলসে বনো মাদহাত হারায়ে ম’ছিয়াত।</p></blockquote>
<blockquote><p>হে পাপ, তুমিই মোরে দানিয়াছ তওবার গৌরব,</p>
<p>আজিকে মুখর কণ্ঠে তাই তব মহিমার স্তব।</p></blockquote>
<p>নামাজ, রোজা ইত্যাদি খুব উপকারী- খুব মূল্যবান বস্তু; কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত তা আচার-অনুষ্ঠান। এই কথাটার জোর দিয়ে মীর্জা গালিব বলেছেন, কেয়ামতের দিন সকলে তাদের নামাজ রোজা প্রভৃতি ধর্ম কাজের ফিরিস্তি নিয়ে আল্লাহর কাছে হাজির হবেন কিন্তু আমি কি করব?</p>
<blockquote><p>রোজে কিয়ামত হর কছে দরদস্ত গিরূদ নামা, মন নিজু হাজের মিশত্তম, তছবীর-এ জানা দর্ বগল</p>
<p>রোজ হাশরে সবাই হাতে রাখবে আমলনামা মোর বগলে থাকবে শুধু বঁধুর ছবিখানা সত্যিকার মুসলমান দুনিয়ায় সংস্কৃতিময়, দরদময়, প্রেমময় জীবন যাপন করতে চায়।</p></blockquote>
<p>আল্লামা ইকবাল বলেন:</p>
<blockquote><p>দিলে আশেকী বেমিরদ ব-বেহেশতে জাবেদানী, না নাওয়ায়ে দরদমন্দী না গমে, না গমসারী।</p>
<p>বেহেশত অনস্ত হোক, তবু তায় মরে যায় আশিকের দিল সেথায় দরদ নাই, প্রেম নাই, শোক নাই, নাহি দুঃখ এক তিল।</p></blockquote>
<p>উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ইসলাম ও সংস্কৃতিতে মূলত কোন বিরোধ নাই; বরং ইসলাম সংস্কৃতির অনুশীলন ও উৎকর্ষ বিধানের যথেষ্ট প্রেরণা দান করেছে। এসব সত্ত্বেও ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে গান, বাজনা ও চিত্র অঙ্গনে ইসলামের নামে যথেষ্ট বিরোধিতা হয়েছে। এ বিরোধিতার ফলে মুসলিম জগতে চিত্র-শিল্পের যথেষ্ট বিকাশ ঘটতে পারে নাই। ইসলাম প্রচারের আগে জগতের বিভিন্ন স্থানে মানুষ গরু, বাঘ, সাপ ইত্যাদি প্রাণীর পূজার চলন ছিল। প্রাণীর চিত্র অবলম্বনে ফের প্রাণী পূজার চলন না হয়, এই ছিল প্রাণীর চিত্র অঙ্কনে বাধা দেওয়ার মূল কারণ। সেইজন্যে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিকে চিত্র শিল্পের প্রেরণা লিপি শিল্পে পুষ্টিলাভ করে। নানা রকম লতা ও ফুলের মাঝে মাঝে লীলায়িত আরবী হরফের সে কালের চিত্রশিল্পে প্রায়শ দেখা যায়।</p>
<p>এর পরের জামানায় মানুষ ভাবতে শুরু করল- মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীর ছবি দেখলেই তার পূজা শুরু হয়ে যাবে, এমন আশঙ্কার যুগ চলে গেছে। কাজেই তখন থেকে প্রাণীর ছবি আঁকায় আগের মত আর বাধা রইল না।</p>
<p>সঙ্গীতের অবিচ্ছিন্ন চর্চায় মনপ্রাণ ষোল আনা ঢেলে দেওয়ার ফলে জাতি কম জোর হয়ে পড়েছে, ইতিহাসে তার নজির আছে। শক্তিমান মুসলমান জাতিও বা ফের সঙ্গীতের ফেরেবে পড়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রধানত এই আশঙ্কায় কোন কোন আলেম সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ বলে ফতোয়া দেন। অর্থাৎ সঙ্গীত-অভিসারীরা যখন উত্তর মেরুতে গিয়ে বসল, সঙ্গীত বিরোধীরা তখন দক্ষিণ মেরুতে ঘাঁটি গাড়ল। মাঝখানে দুনিয়ায় সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত চলতে লাগল । <strong>আরব জাতির উন্নতির যুগে সঙ্গীত সম্বন্ধে জগতের শ্রেষ্ঠতম বই লেখা হল আরবী ভাষায়।</strong> ইমাম গাজ্জালী তাঁর সুবিখ্যাত &#8216;এহীয়া উল-উলুম&#8217; বা &#8216;জ্ঞানের পুনর্জাগরণ&#8217; নামক গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ে একটি মস্ত অধ্যায় যোগ করলেন। তাতে কোরাআন, হাদীস, ফিকাহ, উসূল ও ইতিহাসের নানা যুক্তি ও নজীর দিয়ে তিনি ফতোয়া দিলেন যে, সদ্ভাবমূলক সঙ্গীত জায়েজ। বিভাগ-পূর্ব ভারতে সঙ্গীত চর্চায় সবচেয়ে বেশী উৎসাহ ও সাহায্য এসেছে মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে। পাক-ভারতের সঙ্গীত সাধনায় আজও মুসলমান ওস্তাদরাই সর্বশ্রেষ্ঠ আসনগুলির অধিকাংশ অধিকার করে আছেন।</p>
<p>মাওলানা রুমী কেবল কবি ছিলেন না- মস্ত বড় সূফীও ছিলেন। এহেন ধর্মগতপ্রাণ সূফী একদিন দেখেন, পথ দিয়ে একটা লোক বীণা বাজিয়ে যাচ্ছে। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন:</p>
<blockquote><p>আয় মোতরেব, আল্লা আল্লা, মন বেরাহম তুবর রাহ্ বর গীর চড় ও মীজন বর তার তওবা করদম।</p>
<p>&#8216;হে বীণা বাদক, আল্লার কসম করে বলছি, আমি পথ-ভ্রান্ত, তুমিই ঠিক পথে আছ। তোমার বীণাটি হাতে নিয়ে তারে আঘাত কর; ওরই ঝঙ্কারের মূর্ছনার সাথে আমার তওবা উপরে উঠবে।&#8217;</p></blockquote>
<p>যেন সূফীর তওবা উপরে যেতে না পেরে তার হুজরার আশপাশে কেঁদে ফিরছে; ওই বীণার ঝঙ্কারের রথে ছুফী তাঁর তওবাকে আল্লাহর আরশ পানে পাঠাতে চান । কেউ এর আক্ষরিক মানে করে এমন না বোঝেন যে, সঙ্গীত ছাড়া ইবাদত সম্ভব নয়; সঙ্গীত ছাড়া ইবাদত নিশ্চয়ই সম্ভব। তবে কোন কোন স্থলে সঙ্গীত যে উপাসনার সহায়ক, উদ্ধৃত &#8211; কবিতার তাৎপর্য তাই।</p>
<p>উপরের আলোচনা থেকে এ কথাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইছলামের কোন কোন আলেম সঙ্গীত ও চিত্র শিল্পকে অবাঞ্ছিত বলে বাধা দেওয়া সত্ত্বেও আলেমদের মধ্যেই অনেকে এ দুটিকে জায়েজ মনে করেছেন এবং সংস্কৃতির এ দুটি বাহন বাধা পেলেও অগ্রগমনের পথ রুদ্ধ হয় নাই।</p>
<p><strong>[বাংলা একাডেমী প্রকাশিত “ইবরাহীম খাঁ রচনাবলী- ১&#8221; থেকে সংকলিত।]</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islam-and-culture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7385</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/songskritir-bivinno-dik/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/songskritir-bivinno-dik/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 09 Sep 2022 17:50:32 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[শাহ্‌ আব্দুল হান্নান]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7363</guid>

					<description><![CDATA[সংস্কৃতি কী সংস্কৃতি কী এবং কী নয় এ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে গত একশ বছর ধরে। এ বিতর্ক বৃদ্ধি পায় মার্কসিজমের উত্থানের পরে। মার্কসিজমের উত্থানের পর একটি নতুন দর্শন আসে Art for life sake নামে। এ নিয়ে একটি বিতর্ক দেখা দেয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<ul>
<li><strong>সংস্কৃতি কী</strong></li>
</ul>
<p>সংস্কৃতি কী এবং কী নয় এ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে গত একশ বছর ধরে। এ বিতর্ক বৃদ্ধি পায় মার্কসিজমের উত্থানের পরে। মার্কসিজমের উত্থানের পর একটি নতুন দর্শন আসে Art for life sake নামে। এ নিয়ে একটি বিতর্ক দেখা দেয় যে Art for Art sake or Art for life sake। এ বিতর্ক আগে ছিল না। কমিউনিস্টরা এ বিতর্ক তুলে ধরে। এটা করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করেন। আর্ট এখানে সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কৃতির ভিতর যে একটা সৌন্দর্য থাকতে হবে, তা তারা হাইলাইট করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। তারা সম্পূর্ণভাবে এটাকে উপেক্ষা করে।</p>
<p>অন্যদিকে যারা &#8220;আর্ট ফর আর্ট সেক&#8217;-এর পক্ষে তারাও এ ইস্যুকে রাজনীতিকরণ করে। তারা বলেন, আর্ট আর্টের জন্য। অর্থাৎ এর মধ্যে সৌন্দর্য থাকতে হবে। সৌন্দর্যের চেতনা থাকতে হবে। যা কিছুই সুন্দর করে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করে জীবনের বিভিন্ন দিককে, সাহিত্যকলায় তাই সংস্কৃতি।</p>
<p>সংস্কৃতির প্রশ্নে যদি আমরা সুবিচার করতে চাই তাহলে সেখানে আর্ট বা সংস্কৃতিতে দুটো দিকই থাকতে হবে। জীবনের জন্য তা প্রয়োজনীয় হতে হবে। জীবনের জন্যেই হবে। জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। জীবনকেই সার্ভ করতে হবে। এটাই সত্য কথা। অন্যদিকে এটাও সত্য যে যা কিছু সুন্দর নয়, তা আর্ট বা সংস্কৃতি হবে না, তা জীবনের জন্য হলেও। কাজেই দুটো উপাদানই প্রয়োজন। দুটোই সত্য। এই বিতর্কের পরিসমাপ্তির প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমার মনে হয় বর্তমানে তার পরিসমাপ্তি কিছুটা হয়েও গেছে। মার্কসিজমের পতনের পর এই বিতর্ক আর খুব একটা আছে বলে মনে হয় না।</p>
<p>যে কোনো আদর্শভিত্তিক দলও একথা ভুলতে পারে যে আর্ট ফর লাইফ সেক। এটা তারাও নিয়ে নিতে পারে। এটা কেউ কেউ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়েও নিয়েছে। কিন্তু এটা প্রয়োজনীয় নয়। এ তর্ক ইসলামিস্টদেরও দরকার নেই। ইসলামপন্থীদের সংস্কৃতির মধ্যে এ দুটি জিনিসের সমন্বয় ঘটাতে হবে।</p>
<p><strong>এই তাত্ত্বিক কথার বাইরে বলা যায় সংস্কৃতির বহুদিক রয়েছে। বহু ডাইমেনশন রয়েছে। সাহিত্য, শিল্প, সিনেমা, নাটক, সবই সংস্কৃতির অংশ। সংস্কৃতির ডাইমেনশনের কথা বলতে গিয়ে তার বিভিন্ন ডাইমেনশন কথা আসে। গান, সংগীত, সাহিত্য থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা সবকিছুই সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে। আরেকটি দিক থেকে বলতে গেলে বলা যায় মানুষের জীবনাচারই সংস্কৃতি, মানুষের গোটা জীবনপদ্ধতিই সংস্কৃতি। সেই অর্থে সংস্কৃতি আরো ব্যাপক অর্থে দাঁড়ায়। সংস্কৃতির সংজ্ঞার মধ্যে আমাদের কিছুটা মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মৌলিকভাবে আমরা স্বীকার করি সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। সংস্কৃতি গোটা জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তার অনেক দিক বা ডাইমেনশন রয়েছে। এবং সর্বোপরি এটা জীবনকে সার্ভ করতে হবে। সৌন্দর্যকেও সার্ভ করতে হবে। আবারও বলি এটাকে সুন্দরও হতে হবে এবং জীবনের জন্যেও হতে হবে।</strong></p>
<ul>
<li><strong>সংস্কৃতি ও মানুষ</strong></li>
</ul>
<p>সংস্কৃতি ও মানুষকে আলাদা করা যায় না। তবে এভাবে বলা যায় সংস্কৃতির জন্য মানুষ নয়। মানুষের জন্য সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সমাজ কল্পনা করা যায় না। মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি রয়েছে। ব্যক্তির স্বতন্ত্র সংস্কৃতিও একটি রয়েছে। তার চালচলন আর স্বভাবের মধ্যে সেসব পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। প্রত্যেক পরিবারের একটি সংস্কৃতি রয়েছে। তার মধ্যেও একটি স্বাতন্ত্র্য থাকতে পারে। তার ধরনে, বলনে, কথনে, বক্তব্যে, চলনে সেটা থাকতে পারে। সমাজের থাকতে পারে। একটা জাতির থাকতে পারে। সুতরাং সংস্কৃতির বাইরে মানুষ নয়। আবার মানুষের বাইরেও সংস্কৃতি নয়।</p>
<ul>
<li><strong>সংস্কৃতির ভিত্তি</strong></li>
</ul>
<p>সংস্কৃতিকে কয়েকটি ভিত্তির উপর দাঁড়াতে হবে। সুস্থ বিশ্বাসের ওপর সংস্কৃতিকে দাঁড়াতে হবে। যদি দুর্নীতির চিন্তার (Corrupt thought) উপর সংস্কৃতি দাড়ায় সে সংস্কৃতিও দুর্নীতিপ্রাপ্ত হবে। কারণ বিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতি হচ্ছে আচরণ। তার পেছনে রয়েছে বিশ্বাস। এই বিশ্বাস দুর্নীতিগ্রস্ত হলে আচরণও তাই হবে। বিশ্বাস সুস্থ হলে সেটাও সুস্থ হবে।</p>
<p>এখানে মুসলিম জাতির কথা বললে তার ভিত্তি অবশ্যই তৌহিদ হতে হবে। তৌহিদ বলতে আমরা বুঝি একজন স্রষ্টা রয়েছেন। সব সৃষ্টির একটা উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা মানুষ। আমরা আল্লাহর প্রতিনিধি। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার মিশনকে এই বিশ্ব, আকাশ সর্বত্র কার্যকরী করা। এর জন্য মুসলিম সংস্কৃতিকে সব সময়ই শিরকমুক্ত হতে হবে। মুসলিম সংস্কৃতি এমন হতে হবে যেন খলিফার মর্যাদা রক্ষা পায়। তার যে প্রতিনিধি মানুষ তার সঙ্গে খাপ খায়। অর্থাৎ যন্ত্র হতে হবে। সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে হবে। মার্জিত হতে হবে। অমার্জিত হলে চলবে না। এটা অশ্লীলতামুক্ত হবে।</p>
<p>কাজেই সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি হচ্ছে সুস্থ বিশ্বাস। ইসলামের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে তৌহিদ। তৌহিদ বিভিন্ন দিকের কারণে সংস্কৃতিও এরকম হয়। তেমনি যদি আমরা ইসলামের বাইরে গিয়ে দেখি অর্থাৎ অমুসলিমদের মধ্যেও সুস্থ বিশ্বাস থাকতে হবে। সেটা তৌহিদ নাও হতে পারে। সেটা আমার দৃষ্টিতে সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে যাই হোক না কেন তুমি তার এটার ওপর বিশ্বাস থাকে, ভালো হয়, মানবতাবাদী হয় তাহলে তার উপরেও যে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে সেটাও ভালো হবে। মানবতার একটা অংশ মুসলিম। বাকি অংশ অমুসলিম। তাদের সংস্কৃতি ভালো হবে যদি তা সুস্থ বিশ্বাসের উপর হয়। তাদের ক্ষেত্রে সেটা প্রচার হতে হবে। যদি নাস্তিকতার উপর হয় তাহলে ক্ষতি হবে। যদি স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর ভিত্তিশীল হয় তাহলে তা নাস্তিকতার চেয়ে অনেক ভালো হবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই। সেটা যদি মানবতাবাদী হয় তাহলে অবশ্যই ভালো হবে। কিন্তু সেটা যদি জাতিপূজা বা গোত্রপূজা হয় তাহলে কী হবে? অসুস্থ সংস্কৃতি হবে। সুতরাং ইসলামের ক্ষেত্রে তৌহিদ বলব। কিন্তু মানবতারও যে অন্য অংশ রয়েছে, তারা তৌহিদ মানছে না। তাদের ক্ষেত্রে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার ভিত্তির জন্য অবশ্যই একটি সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। সেটা হতে পারে মানবতাবাদ এবং স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস। কিন্তু নাস্তিকতার ওপর হতে পারে না। যদি হয় তাহলে তা মারাত্মক হবে। যদি রেসিজম বা গোত্রবাদ হয়, বংশ পূজা হয়, অতিপূজা হয় তাহলে সেটা মারাত্মক হবে।</p>
<p>তাহলে আমরা বলতে পারি সংস্কৃতির জন্য প্রথমত সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। দ্বিতীয়ত অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। যদিও এটা প্রথমটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যদি সংস্কৃতি সুস্থ বিশ্বাসের উপর হয় তাহলে তা অশ্লীলতা মুক্ত হবেই। কারণ কোনো সুস্থ বিশ্বাসই বলে না অশ্লীলতা ভালো। এটা অবশ্যই মানবজাতির জন্য হতে হবে। সংস্কৃতিকে মানবজাতিকে সার্ভ করতে হবে। মানবতাবাদী হতে হবে। কল্যাণধর্মী হতে হবে।</p>
<p>সংস্কৃতির আরেকটি ভিত্তি হচ্ছে সৌন্দর্য চেতনা। সুন্দর চেতনা থাকতে হবে। কোনো কিছুই অসুন্দর করা যাবে না। কাজেই সার্বিকভাবে বলা যায় সংস্কৃতির ভিত্তির জন্য একটি সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। মানবতাবাদী হতে হবে। মানুষের প্রয়োজনে হতে হবে, অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। কল্যাণধর্মী হতে হবে এবং সৌন্দর্য চেতনামণ্ডিত ও সৌন্দর্যবুদ্ধিমতি হতে হবে।</p>
<p>এর জন্য আমার মনে কাজ করছে বিভিন্ন পার্থক্যকে (pluralism) মেনে নেয়া। বিশ্ব এক রকম নয়। বিশ্ব এক জাতি মিলে হয়নি। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলছেন, আমি যদি চাইতাম, সবাই ইসলামের অনুসারী হয়ে যেত। সবাই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে থাকত। কিন্তু আমি তো এরকম পরিকল্পনা করিনি। আমি মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছি। অর্থাৎ সবাই এক পথে আসবে না আমার এই দেয়া স্বাধীনতার কারণে।</p>
<p>এটাকে সামনে রেখে বলা যায় এই বাস্তবতা আজকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। মানুষ বিভিন্ন মতের হবে, বিভিন্ন ধরনের হবে। সেটাকে সামনে রেখে আমি বলেছি সুস্থ বিশ্বাস ইসলামের ক্ষেত্রে তৌহিদ। অন্যদের ক্ষেত্রে মানবিকতা হতে হবে। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস হতে হবে যদি তা তৌহিদ নাও হয়। তা হলে সেটা সুস্থ সংস্কৃতি হবে। সেটা নাস্তিকতার চেয়ে অনেকগুণ ভালো নাস্তিকতার উপরে, রেসিজমের উপরে কোনো ভালো সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে না।</p>
<ul>
<li><strong>সংস্কৃতিতে নিয়ন্ত্রণ</strong></li>
</ul>
<p>সংস্কৃতি কি মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ? নিয়ন্ত্রিত হলে কতটুকু? এটা আসলে ইয়েস ও নো (yes and no) প্রশ্ন। এটা ঠিক যে সংস্কৃতিকে মানুষ নির্মাণ করে। একা এক ব্যক্তিই করে না। অনেকে মিলে, অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সংস্কৃতি শত বছরে হাজার বছরে গড়ে ওঠে। তাই যদি হয় তাহলে এটা কে গড়ল? মানুষ গড়ল। কিন্তু কোনো এক ব্যক্তি বা একজনের বা এক বংশের এর উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই অর্থে বলা যায় এটা মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। কিন্তু আবার এটাও তো সত্য যে সংস্কৃতি মানুষই তৈরি করেছে। সকল মানুষ মিলে তৈরি করেছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি সংস্কৃতি প্রকৃতপক্ষে মানুষ তৈরি করে এবং এই অর্থে মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এই অর্থে নিয়ন্ত্রিত নয় যে কোনো একটি জাতি, কোনো একটি জেনারেশন (generation) এই সংস্কৃতি নির্মাণ করেনি। অথচ আমরা তো জেনারেশন ধরে চিন্তা করি, আমরা তো ঐতিহাসিকভাবে একত্রে অবস্থান (exist) করছি না- সুতরাং এই অর্থে বলা যায় সংস্কৃতি মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। এটা একটা ঐতিহাসিক বিকাশ (Historical Identify)। এই জন্যই আমি বিভিন্ন জায়গায় বলে থাকি যে সংস্কৃতিকে নিয়ে খেলা চলবে না । সংস্কৃতি মানুষের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত। এটা খুব স্পর্শকাতর। এই জন্য আমি সবখানে একথাই বলি সংস্কৃতি নিয়ে সাবধানে এগুতে হবে। যেহেতু আমি একজন ইসলামপন্থী একথা সেজন্য ইসলামপন্থীদেরও বেশি করে বলি। আমার অনেক কিছুই পছন্দ হবে না। কিন্তু সেটাকে সরাতে হবে আস্তে আস্তে। ধৈর্য ধরে সরাতে হবে। যেটা রাখলে চলে সেটা রাখতে হবে। কারণ ইসলামের শুরুতেই রাসূল (সা) সরাসরি ইসলাম বিরোধী না এমন স্থানীয় রীতিনীতি, আচার আচরণকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরব রীতিনীতি গ্রহণ করে নিয়েছেন। ইবনে তাইমিয়ার একটি বিখ্যাত ফতোয়া আছে, যেকোনো দেশের স্থানীয় কাস্টমস (রীতি প্রথা) তা যদি সরাসরি ইসলাম বিরোধী না হয়, একেবারে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে সেটা থাকবে।</p>
<p>আমরা এ ব্যাপারে অনেক সময় কিছুটা হঠকারিতা করে বসি। কিছুটা বাড়াবাড়ি করে বসি। এগুলো থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। আমাদের ইসলামের যে মহত্ত্ব, সামগ্রিকতা, ব্যাপকতা এবং ইসলামের মধ্যে যে বহু মত ও পথের সুযোগ আছে সে সুযোগের বিষয়টি মনে রাখতে হবে। যদি এই মত ও পথের সুযোগ না থাকত তাহলে এতগুলো মাজহাব হলো কিভাবে? সুন্নীদের চারটি মাজহাব হলো কিভাবে? শিয়াদের মধ্যে কয়েকটি মাজহাব হলো কী কারণে? এটা হয়েছে এই কারণে যে ইসলামে এই অপশনটা আছে।</p>
<p>সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন মতামতকে মানতে হবে। এইখানে বিভিন্ন মত-পথের স্বীকৃতি আমাদের দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের যে সংস্কৃতি তার তো একেক দেশের একেক সংস্করণ। ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী সংস্কৃতি রূপে রসে রঙে একই সাথে ইসলামীও হবে, ইন্দোনেশিয়ানও হবে এবং তার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। সংস্কৃতির ভিতর যদি সুস্পষ্ট ইসলাম বিরোধী কোনো মূল উপাদান না থাকে তাহলে তা ইসলামী সংস্কৃতি হতে বাধা নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তেমনিভাবে তা মরোক্কো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। প্রত্যেকটার নিজের রঙ হবে। আমার মনে হয় এটা অনেকটা এরকম হবে যে একই বাগানে ইসলাম তার মধ্যে একশটি ফুল গাছ। এই বিষয়গুলো ইসলামী সংস্কৃতি কর্মীদের ভেবে দেখা দরকার। এই বিষয়টি বিচার করে দেখা দরকার।</p>
<p>সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংস্কৃতিই তার অন্যতম পরিচয়। নতুন পরিচয় গড়ে তোলা কঠিন। মানুষ পরিচয় ছাড়া চলতে পারে না। তাই হঠাৎ করে নতুন আইডেন্টিটি সে গড়ে তুলবে কিভাবে? তার পুরাতন পরিচয় রাখতে হবে। শুধু ততটুকু বাদ দিতে হবে যতটুকু মানবতার জন্য ভালো নয়। যেটুকু সৌন্দর্যের বাইরে, অশ্লীলতায় ভরা এবং ইসলামের ক্ষেত্রে শিরক রয়েছে অথবা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী, সেটুকু বাদ দিয়ে বাকিটুকু রাখাটাই তার দায়বদ্ধতা।</p>
<ul>
<li><strong>বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য</strong></li>
</ul>
<p>বিশ্বায়ন বর্তমান বিশ্বে একটি মেজর ঘটনা। সেটা মূলত ঘটেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে। একথা ঠিক যে আজ ভ্রমণ সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু ভ্রমণ সহজ হলেও কত লোকই বা ভ্রমণ করে। বড়জোর পাঁচ ভাগ। আমেরিকার কথা বলি, বছরে কতজন তারা বাইরে ভ্রমণে যায়? খুবই কম। এই যদি হয় তাহলে বিশ্বায়ন যেটা হচ্ছে তা ভ্রমণের কারণে নয়। এটা হচ্ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ডেভেলপমেন্টের কারণে। সারা বিশ্বেই আমরা ভ্রমণ করছি, কিন্তু শারীরিকভাবে ভ্রমণ করছি না। আমরা মন, চোখ, কান দ্বারা ভ্রমণ করছি। আমরা তার গন্ধ পাচ্ছি। এই নতুন ভ্রমণের কারণে বিশ্বে একটা নীরব যোগাযোগ ও লেনদেন চলছে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কল্যাণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। অকল্যাণও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে উভয় দিকের সম্ভাবনাই রয়েছে।</p>
<p>এ অবস্থায় আগামী দিনগুলোতে সংস্কৃতি কতটা ভিন্ন থাকবে বলা মুশকিল। আমার মনে হয় সংস্কৃতির অনেক কিছু এক হয়ে যাবে। যেমন পোশাক-আশাক বিশ্বব্যাপী ক্রমেই কাছাকাছি চলে আসতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। স্বীকার করতে হবে ইতোমধ্যেই পুরুষ পোশাকের ক্ষেত্রে শার্ট প্যান্ট প্রায় এক হয়ে গেছে। যদিও নারী পোশাকের ক্ষেত্রে ঠিক অন্যরকম হয়েছে। মুসলিম বিশ্বে তো নারীর পোশাক নানাভাবে অন্যরকমই রয়ে গেছে। ফলে আমি মনে করি অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি আসলেও যে সব ক্ষেত্রে এক হবে না সেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন থেকে যাবে। যেমন খাওয়া দাওয়ার উপকরণাদি একেক জায়গায় একেক রকম থেকে যাবে। আবার প্রত্যেক এলাকার নিজস্ব গানের সুর আলাদা থেকে যাবে। প্রত্যেক এলাকার নিজস্ব প্রকৃতি, নদী, সমুদ্র, বন, ফসল, মাঠ আছে। তার আলাদা একরকম সুর আছে। সুতরাং গানে, সংগীতে এ পার্থক্য থেকে যাবে। প্রত্যেক এলাকার জনগোষ্ঠীর নিজস্বতার জন্য এবং অন্য জনগোষ্ঠী ও এলাকার ভিন্নতার জন্য সাহিত্যেও একটা পার্থক্য থেকে যাবে।</p>
<p>সংস্কৃতির একটি নিয়ামক হলো ধর্ম বা বিশ্বাস। এটা এক অর্থে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে নিয়ামকের আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্য সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য থেকেই যাবে। হতে পারে, শত সংস্কৃতি না থাকতে পারে, কিন্তু অন্তত পাঁচ-দশটি সংস্কৃতি বিশ্বে থেকে যাবে। তবে ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কিন্তু অনেক দিকেই ঐক্য বাড়বে। সাংস্কৃতিক ঐক্য বাড়বে। অনেক বেশি পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়বে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই পার্থক্যও থেকে যাবে। এখানে আগ্রাসন (aggression) ও ইন্টারাকশনকে (interaction) যদি এক না করে পার্থক্য করতে পারি তাহলে ভালো হবে। ইন্টারাকশনকে আমরা পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বা লেনদেন বলি, আর আগ্রাসন হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়া। আমাদেরকে অবশ্যই পরিকল্পিত চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে। &#8216;লা ইকরাহা ফিদ দিন&#8217;-এ ভিতরও এ তাৎপর্য রয়ে গেছে। রাসূলও (স.) ইহুদীদের সাথে প্রথম চুক্তিতেই সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা দিয়ে দিলেন। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিয়ে দিলেন। এটা এই প্রমাণ করে যে সংস্কৃতিকে জোর করে বদলে দেয়া ইসলামও নয় মানবতাও নয়। এখানে আমাদের আগ্রাসনের ব্যাপারেও এ দিকটি খেয়াল রাখতে হবে।</p>
<p>পাশ্চাত্যের কালচার দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও বস্তুবাদের উপর ভিত্তিশীল। বস্তুবাদ হলো ভোগবাদ এবং স্বার্থপরতা। তার কারণেই কালচার খুব নোংরা হয়ে গেছে। কালচার নারী কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নারীর অপব্যবহার কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এটাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার যে প্রবণতা তা রুখতে হবে। এটাকে রুখতে পশ্চিমাদের মধ্যে যারা ভালো তাদেরকেও উৎসাহিত করতে হবে। পশ্চিমা বস্তুবাদ নাস্তিকতা না হলেও নাস্তিকতার কাছাকাছি। এটার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এই বস্তুবাদ মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়।</p>
<ul>
<li><strong>বিনোদনের সংস্কৃতি</strong></li>
</ul>
<p>সংস্কৃতির বাইরে কোনো মানুষ হতে পারে না। সমাজ হতে পারে না। তাই তার পক্ষে সংস্কৃতি বিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। তবে সুশিক্ষার অভাবে দারিদ্র্যের কারণে কিছু লোক যদি অপরাধী হয়ে যায়, তাহলে তার সংস্কৃতি হয়ে যাচ্ছে কুসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি। আবার প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত একটি সংস্কৃতি আছে। কেউ দেশের গান পছন্দ করে, কেউ হামদ-নাত পছন্দ করে। এটা হলো একটি দিক। আর গান-বাজনা হলো কালচারের বাইরের একটি দিক। যদিও এগুলোই বেশি, তারপরও এসব কিছু কালচারের মূল দিক নয়। কালচারের মূল দিক হচ্ছে জীবনাচার, পুরো জীবন। প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি উচ্চারণ, প্রত্যেকটি বক্তব্য, প্রত্যেকটি চলাচল, ভ্রমণ, কখন সবকিছু হচ্ছে তার কালচার। আমরা খুব গভীরভাবে না দেখার কারণে গান, নাচকেই বড় ভেবে এসব বিষয়কে ছোট ভাবি। কিন্তু এগুলো না থাকলেও একটি জাতির পক্ষে সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব। এগুলো বাদ দিয়েও জাতি সংস্কৃতিবান হতে পারে। অনেক জাতিই আছে যাদের গান খুব পপুলার নয়, নাচ নেই- তাতে কিছু আসে যায় না।</p>
<p>আমরা বিনোদনের নামে যা খুশি তাই করতে পারি না। জীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিনোদন। বিনোদন প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বে বিনোদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের দৈনিক জীবনের একটা বড় অংশ রাস্তায় চলে যায়। তার সাথে অফিসের সময়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ ব্যস্ত। এ অবস্থায় তার জন্য অবশ্যই একটা সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিনোদনকে সুস্থ হতে হবে। অসুস্থ হওয়া যাবে না। অশ্লীল হওয়া যাবে না। কু-স্বভাব সৃষ্টি করে, ক্রাইম ছড়ায় এমন কিছু করা যাবে না। খারাপ যা খুব কম ঘটে তাকে নাটকে এনে জাতিকে জানাতেই হবে তা আসলে জরুরি নয়। সাহিত্যের নামে যেটা করা হয়- একটি পরিবারের দুর্ঘটনাকে গোটা জাতিকে জানানো হয়। তা যদি সুন্দর কিছু হতো তাও কথা ছিল।</p>
<p>আসলে বিনোদনের মধ্যে একটা সীমা থাকতেই হবে। আইনের মাধ্যমে এবং কাস্টমসের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে স্বাধীনতার নামে আমরা কদাচারকে অনুমোদন করতে পারি না। আমরা এমন স্বাধীনতা চাই না যে স্বাধীনতা মানুষকে অমানুষ করে দেয়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/songskritir-bivinno-dik/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7363</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের সংস্কৃতি: প্রেক্ষিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম</title>
		<link>https://rowyakbd.com/amader-songskriti-prekkhite-jatiyo-kobi/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/amader-songskriti-prekkhite-jatiyo-kobi/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 04 Sep 2022 17:36:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আমাদের সংস্কৃতি: প্রেক্ষিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7350</guid>

					<description><![CDATA[এক, &#8216;আমাদের সংস্কৃতি&#8217; সম্পর্কে দু&#8217;টি কথা বলবার আগে শুধু সংস্কৃতি নিয়ে একটু পর্যালোচনার দরকার আছে। দরকার আছে এই জন্যে যে, কেবল সংস্কৃতি&#8217;র-ই বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে &#8216;আমাদের সংস্কৃতি&#8217;র একটি অবকাঠামো আপনা-আপনিই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। &#8216;সংস্কৃতি&#8217; শব্দটি &#8216;সংস্করণ&#8217; না হয় &#8216;সংস্কার&#8217; এই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>এক, &#8216;আমাদের সংস্কৃতি&#8217; সম্পর্কে দু&#8217;টি কথা বলবার আগে শুধু সংস্কৃতি নিয়ে একটু পর্যালোচনার দরকার আছে। দরকার আছে এই জন্যে যে, কেবল সংস্কৃতি&#8217;র-ই বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে &#8216;আমাদের সংস্কৃতি&#8217;র একটি অবকাঠামো আপনা-আপনিই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। &#8216;সংস্কৃতি&#8217; শব্দটি &#8216;সংস্করণ&#8217; না হয় &#8216;সংস্কার&#8217; এই বিশেষ্য পদ থেকে সংগঠিত। আর &#8216;সংস্কার&#8217; অর্থ হচ্ছে- শুদ্ধিকরণ, শাস্ত্রীয় নীতিমালা এবং অনুষ্ঠানাদি দ্বারা পবিত্রকরণ, শোধনকরণ অথবা পতিত অবস্থা থেকে উদ্ধারকরণ, নির্মলকরণ, অলংকরণ, প্রসাধন, উৎকর্ষ সাধন, উন্নতি বিধান, মেরামতকরণ ইত্যাদি।</p>
<p>সংস্কৃতির ইংরেজি পরিভাষা হচ্ছে- Culture কালচারের সোজাসুজি অর্থ চাষ করা, কর্ষণ করা। সেই জন্য চাষকৃত জমিকে বলা হয় Cultured Land আবার পরিমার্জিত মানুষকে বলা হয় Cultured man.</p>
<p>&#8216;সাকাফাহ&#8217; সংস্কৃতির আরবি পরিভাষা। সফল হওয়া, শিক্ষা পাওয়া, প্রশিক্ষণ পাওয়া ইত্যাদি হচ্ছে সাকাফাহর বাংলা অর্থ ।</p>
<p>দুই, উপরের বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে অন্তত এতটুকু পরিষ্কার হলো- <strong>সংস্কৃতি একটি বিশুদ্ধ বিষয় বরং একটি শুদ্ধতম তাৎপর্যকে মান্য করে। সে আরো মান্য করে একটি বহিঃপ্রকাশের এবং একটি অন্তঃপ্রকাশের প্রগাঢ়তাকে- যা মানুষের যথার্থ পরিচিতি। আর মানুষ হিসেবে মানুষের আসল পরিচয়ই তার সংস্কৃতি।&#8217;</strong></p>
<blockquote><p>সেই জন্যই বলা হয়েছে যে, ব্যক্তি বা সমষ্টি আপন চিন্তা-চেতনা ও জীবনধারার মধ্য দিয়ে নিজেকে সজ্জিত, নন্দিত, পরিশীলিত ও সমাদৃত করতে পারে- তাকে বলা হয় সংস্কৃতিবান ও সত্য। সৃষ্টির সেরা মানুষ। তার এ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা বজায় রাখা ও এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজন সংস্কৃতির।</p></blockquote>
<p>Culture is the development of inner characteristics of a nation that differentiate it from other nations. আবার, Culture is that process through which the inner qualities develop. তেমনিভাবে Culture starts from faith &amp; a particular faith creates special qualities.</p>
<p>অবশ্যই শিল্প এবং সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য আছে: Art is not Culture, art is the expression of ideas in various forms- poetry. music, dance, architecture, painting, etc. এক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে: To call dance and music Culture is to give a good name to bad things এইচ. জে. লাস্কির এই মন্তব্যটি খুব অর্থবহ। Culture is that what we are.</p>
<p>সংস্কৃতি সম্পর্কে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ভাবনাকে সামনে রাখতে পারি। তিনি বলেন</p>
<p>১. নিজেকে বাঁচাও, নিজেকে মহান করো, সুন্দর করো, বিচিত্র করো- এই কালচারে আদেশ&#8230;..</p>
<p>২. সংস্কৃতি মানেই আত্মনিয়ন্ত্রণ- নিজের আইনে নিজেকে বাঁধা ।&#8217;</p>
<p>সংস্কৃতির পরিচয় দিতে গিয়ে বদরুদ্দীন ওমর বলেন- জীবন চর্চারই অন্য নাম সংস্কৃতি। মানুষের জীবিকা তার আহার-বিহার, চলাফেরা, তার শোকতাপ, আনন্দ-বেদনার অভিব্যক্তি, তার শিক্ষা-সাহিত্য-ভাষা, তার দিন-রাত্রির হাজারো কাজকর্ম, সবকিছুর মধ্যেই তার সংস্কৃতির পরিচয়।</p>
<p>ইউনেস্কো সম্মেলনে জাতিসংঘ একটি চমৎকার সংজ্ঞা গ্রহণ করেছিল,</p>
<p>ব্যাপকতর অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির অথবা সামাজিক গোত্রের বিশিষ্টার্থক,আত্মিক, বস্তুগত এবং আবেগগত চিন্তা এবং কর্মধারার প্রকাশ। শিল্প ও সাহিত্য-ই একমাত্র সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত নয়, মানুষের জীবনধারাও সংস্কৃতির অঙ্গ। মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অঙ্গ। সংস্কৃতি মানুষকে নিজের সম্পর্কে চিন্তা করার অধিকার এবং ক্ষমতা প্রদান করে। আমরা যে বিশেষভাবে যুক্তিবাদী মানুষ, যে মানুষের বিচারবুদ্ধি আছে এবং ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য আছে তা আমরা অনুভব করতে পারি সংস্কৃতির মাধ্যমে। সংস্কৃতির মাধ্যমেই আমরা মূল্য নিরূপণ করি এবং ভাল-মন্দের মধ্যে নির্বাচন করতে শিখি। সংস্কৃতির মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে, আত্মসচেতন হয়ে নিজের অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে বোধসম্পন্ন, নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখে, অনবরত নিজের সীমা অতিক্রম করে দক্ষতা অর্জন করে।</p>
<p>তিন, সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি তাৎক্ষণিক রেখাচিত্র আঁকার জন্যে আমরা কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের সংস্কৃতি বোঝবার জন্যে হলেও কবি কাজী নজরুল ইসলামেরই দ্বারস্থ হওয়া উচিত। দ্বারস্থ হওয়া উচিত তাঁর রচনার; তাঁর ভাষণ অভিভাষণের।</p>
<blockquote><p>ইসলামের সত্যিকার প্রাণশক্তি গণতন্ত্র, সার্বজনীন ও সমানাধিকারবাদ। ইসলামের এই অভিনবত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব আমি স্বীকার করি, যাঁরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী নন, তাঁরাও স্বীকার করেন, ইসলামের এই মহান সত্যকে কেন্দ্র করে কাব্য কেন, মহাকাব্য সৃষ্টি করা যেতে পারে। &#8211; (কাজী নজরুল ইসলামের পত্র। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁকে লেখা)।</p></blockquote>
<p>সংস্কৃতি কি আর কবি নজরুলের সংস্কৃতিই বা কি; তা বোঝবার জন্যে ঐ একটি  উদ্ধৃতিই আমাদের জন্য যথেষ্ট ।</p>
<p>একজন পাকা রাধুনীর জন্যে যেমন সারা হাড়ির ভাত টিপে টিপে সিদ্ধ হয়েছে কি না তা বারবার পরখ করার দরকার হয় না; তেমনি একজন বোদ্ধা পাঠকের ক্ষেত্রেও উল্লিখিত তথ্যসূত্রটি তেমনি কোনো কাজে লাগতে পারে। তবুও কবি কাজী নজরুল ইসলামের আরো কিছু বক্তব্য আমরা তুলে ধরলাম:</p>
<p>১. আমি চাই, এই পর্বতের বিভোর থেকে বেরিয়ে আসুক তাজা তরুণ মুসলিম, যেমন করে শীতের শেষে বেরিয়ে আসে জরার খোলস ছেড়ে দল। বিশ্বের এই নব অভ্যুদয়-দিনে সকলের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে চলুক আমার নিদ্রাথিত ভাইয়েরা। (মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা)।</p>
<p>২. আমাদের ইসলামাবাদ হোক ওরিয়েন্টাল কালচারের পীঠস্থান- আরাফাত ময়দান। দেশ-বিদেশের তীর্থযাত্রী এসে এখানে ভীড় করুক। আজ নব জাগ্রত বিশ্বের কাছে বহু ঋণী আমরা, সে ঋণ আজ শুধু শোধই করব না- ঋণ দানও করব, আমরা আমাদের দানে জগত কে ঋণী করব- এই হোক আপনাদের চরম সাধনা। হাতের তালু আমাদের শূন্য পানে তুলে ধরেছি এতদিন, সে লজ্জা আজ আমরা পরিশোধ করব। আজ আমাদের হাত উপুড় করবার দিন এসেছে। তা যদি না পারি সমুদ্র বেশি দূরে নয়, আমাদের এ লজ্জার পরিসমাপ্তি যেন তারি অতল জলে হারিয়ে যায় চিরদিনের তরে। আমি বলি, রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের মত আমাদেরও কালচারের, সভ্যতার, জ্ঞানের সেন্টার বা কেন্দ্রভূমির ভিত্তি স্থাপনের মহৎ ভার আপনারা গ্রহণ করুন। আমাদের মত শত-শত তরুণ খাদেম তাদের সকল শক্তি আশা-আকাঙ্ক্ষা জীবন অঞ্জলির মত করে আপনাদের সে উদ্যমের পায়ে অর্থ দেবে। (মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা)।</p>
<p>জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু স্বপ্নই দেখেননি, বরং শান্তিনিকেতনের মত আরেকটি সংস্কৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ করেছেন। যে কেন্দ্রটি হবে আমাদের কেন্দ্র অর্থাৎ যেখানে চর্চা হবে আমাদের ঐতিহ্যের, আমাদের স্বাতন্ত্র্যের। সেই কারণে তিনি নিজের জাতিকে সতর্ক করেছিলেন এইভাবে</p>
<blockquote><p>&#8216;বাঙলার মুসলমানেরা হিন্দুর কালচার, শাস্ত্র, সভ্যতা প্রভৃতির সঙ্গে পরিচিত, তার শতাংশের একাংশও পরিচিত নয় সে তার নিজের ধর্ম, সভ্যতা ইত্যাদির সাথে।</p></blockquote>
<p>&#8212;- মতিউর রহমান মল্লিক</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/amader-songskriti-prekkhite-jatiyo-kobi/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7350</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রমজান হোক পুনর্জাগরণের মাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/may-ramadan-be-the-month-of-renaissance/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/may-ramadan-be-the-month-of-renaissance/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Mar 2022 18:00:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[রমজান হোক পুনর্জাগরণের মাস]]></category>
		<category><![CDATA[রমজান হো্‌ পুনর্জাগরণের মাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6098</guid>

					<description><![CDATA[প্রচন্ড খরা শেষে বৃষ্টির আহ্বান নিয়ে ছুটে আসা শীতল বাতাস যেমন, রমজানের আহ্বানও যেন ঠিক তেমন। অথবা রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটার ছোঁয়ায় সৃষ্টি হওয়া সোঁদা ঘ্রাণের মতো। রমজান এমন এক আধ্যাত্মিক সময়কাল, যে সময়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে রুহানি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রচন্ড খরা শেষে বৃষ্টির আহ্বান নিয়ে ছুটে আসা শীতল বাতাস যেমন, রমজানের আহ্বানও যেন ঠিক তেমন। অথবা রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটার ছোঁয়ায় সৃষ্টি হওয়া সোঁদা ঘ্রাণের মতো। রমজান এমন এক আধ্যাত্মিক সময়কাল, যে সময়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে রুহানি বাতাস বইতে থাকে। সেহরি-ইফতারের আমেজ, তারাবিহ, ইফতারির ঘ্রাণ, রহমত-বরকত-মাগফিরাতের সওগাত, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির নতুন খুশবু মিলেমিশে জান্নাতি এক অনুভূতি প্রবাহিত হতে থাকে প্রতিটি মুসলিমের অন্তরে, যা শুধুই অনুভবের। আর এ অনুভূতির দাবিতেই কেবল সকল বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি রুহানি অন্তর পারে আরেকটি অন্তরের কাছে ‘পুনর্জাগরণ’ এর অনুভূতিকে পৌঁছে দিতে। সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার পূর্বপুরুষগণ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। আমরা যদি সে শিক্ষার ইতিহাসকে পর্যালোচনা করি, তবে সুস্পষ্ট দেখতে পাই–</p>
<p>•<strong> রমজান ‘انشاء الأخلاق’ এর মাসঃ</strong></p>
<p>মুসলিম উম্মাহর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ‘আখলাকী পতন’। রাষ্ট্রীয় আখলাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আখলাক পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই এ সংকট ফুটে উঠেছে প্রবলভাবে। রমজান বিশ্বজনীন এ সংকট মোকাবেলার শিক্ষাই দিয়ে যায় আমাদের।</p>
<p>• <strong>রমজান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির মাসঃ</strong></p>
<p>সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি জ্ঞান ও বাণিজ্য। বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকালে মুসলিম উম্মাহর এ কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা উচিত। কেননা এ রমজানেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কোরআন নাযিল করে আমাদের সাবধান করেছিলেন,</p>
<p>ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﺑَﻌْﻀُﻬُﻢْ ﺃَﻭْﻟِﻴَﺎﺀُ ﺑَﻌْﺾٍ ۚ ﺇِﻟَّﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮﻩُ ﺗَﻜُﻦ ﻓِﺘْﻨَﺔٌ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﻓَﺴَﺎﺩٌ ﻛَﺒِﻴﺮ<br />
যারা সত্য অস্বীকার করেছে, তারা পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে৷ যদি তোমরা এটা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি হবে ও বড় বিপর্যয় দেখা দেবে৷ (সূরা আনফাল: ৭৩)<br />
এ আয়াত স্পষ্টই দিকনির্দেশনা দিচ্ছে কোন কোন ব্যাপারে আমাদের পারস্পারিক সাহায্য করা আবশ্যক। সেগুলো হলোঃ</p>
<p>১) জ্ঞানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা<br />
২) অর্থনৈতিক সহযোগিতা</p>
<p>অথচ আজ মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়েই প্রচণ্ড রকম ঘাটতি! তাই রমজানকে কেন্দ্র করে সকল বিভেদ ভুলে গড়ে উঠতে পারে ‘ইসলামিক ইউনিয়ন’ বাস্তবায়নের নতুন দুয়ার। রমজানে সকল হৃদয়ে আধ্যাত্মিক ছোঁয়া ও রুহানি পরশের সম্মিলনে সে সম্পর্ক সৃষ্টির আবেশ থাকে; শুধু প্রয়োজন আমাদের প্রচেষ্টার।</p>
<p><strong>• রমজান আকলের সত্যিকার ব্যবহার ও গুরুত্বারোপের মাসঃ</strong></p>
<p>ওহী এবং আকলের সমন্বয় ঘটিয়ে ইমাম মাতুরিদীর মতো আলেম, ইমাম গাজ্জালীর মতো মুতাকাল্লিম, মিমার সিনানের মতো বিজ্ঞানী গড়ে তোলার উদ্যোগ ও শপথ নেওয়ার মাস এ রমজান।</p>
<p><strong>• রমজান ক্বলবকে পরিচ্ছন্ন করার ও তাকওয়া অর্জনের মাসঃ</strong></p>
<p>মহান প্রভুর সাথে একান্ত আলাপন, জিকির, তিলাওয়াত, নফল ইবাদতের মধ্য দিয়ে ক্বলব পরিছন্ন করার উৎকৃষ্ঠ সময় রমজান। তাকওয়ার কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন,</p>
<p>ﻭَﻟَﻮْ ﺃَﻥَّ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟْﻘُﺮَﻯ ﺁﻣَﻨُﻮﺍْ ﻭَﺍﺗَّﻘَﻮﺍْ ﻟَﻔَﺘَﺤْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢ<br />
ﺑَﺮَﻛَﺎﺕٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ</p>
<p>আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান<br />
আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে<br />
আমি তাদের প্রতি আসমান ও জমিনের সমস্ত বরকতসমূহের দরজা খুলে দিবো। (সূরা আরাফ: ৯৬)<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<p><strong>• রমজান জিহাদ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাসঃ</strong></p>
<p>জুলুম উৎখাতের আন্দোলন, আদালত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং দ্বীনের জন্য না খেয়ে থেকে জীবন দান করার ‘বদর যুদ্ধ’ এ মাসেই হয়েছে। ইখতিয়ার উদ্দিনের বঙ্গবিজয়ও এ মাসেই। তাই রমজানকে কেন্দ্র করে সকল যুবকের চিন্তারাজ্যে উপলব্ধি হওয়া উচিৎ যে, প্রতিটি যুদ্ধ-সংগ্রামই হক্ব প্রতিষ্ঠার, জুলুমের প্রতিবাদে আন্দোলনের নাম। আর সকল আন্দোলন, মুক্তির জন্য প্রধান শর্ত যোগ্য নেতৃত্ব। ইসলামী সভ্যতার পতনের কারণ ও বর্তমান মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংকটও এ যোগ্য নেতৃত্ব! সুতরাং রমজান থেকেই হাজারো সুলতান ফাতিহ, জহির উদ্দিন বাবর গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা গ্রহন করতে হবে।</p>
<p><strong>• রমজান আল-কোরআন নাযিলের মাসঃ</strong></p>
<p>ﺷَﻬْﺮُ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﺍﻟَّﺬِﻱَ ﺃُﻧﺰِﻝَ ﻓِﻴﻪِ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥُ ﻫُﺪًﻯ ﻟِّﻠﻨَّﺎﺱِ<br />
ﻭَﺑَﻴِّﻨَﺎﺕٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ ﻭَﺍﻟْﻔُﺮْﻗَﺎﻥِ ﻓَﻤَﻦ ﺷَﻬِﺪَ ﻣِﻨﻜُﻢُ ﺍﻟﺸَّﻬْﺮَ<br />
ﻓَﻠْﻴَﺼُﻤْﻪ</p>
<p>রমজান মাস হলো সে মাস, যে মাসে মানবজাতির পথপ্রদর্শক, পথ প্রদর্শনের উজ্জল নিদর্শনসমূহ এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী কোরআন নাযিল করা হয়েছে। অতএব যে এ মাস পেল, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। (সূরা বাকারা: ১৮৫)</p>
<p>তাই কোরআনকে কেন্দ্র করেই আমরা আবার ঐক্যবদ্ধ হবো, মানবতার মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাবো।</p>
<p><strong>• রমজান জ্ঞানের পুনর্জাগরণের মাসঃ</strong></p>
<p>احياء العلوم , تجديد الفكر , الإصلاح في المنهج</p>
<p><strong>জ্ঞানের পুনর্জাগরণ, চিন্তার আধুনিকায়ন, পন্থার সংশোধন– এ তিনটি ছাড়া নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ অসম্ভব।</strong> তাই রমজান প্রত্যেকটি বিষয়কে আলাদা আলাদা ভাবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। যেমন- রমজান আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি দিচ্ছে, কিন্তু জ্ঞানের মৃত্যুবরণের কারণে সেটিও আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না! সুতরাং ভয়াবহ এ ঘাটতিগুলো পূরণের সুস্পষ্ট হিকমাহ-ই তুলে ধরছে রমজান। প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজের ভাষায় ‘ইসলামী সভ্যতার বিজয়ের প্রধান শর্ত জ্ঞানের পুনর্জাগরণ’।</p>
<p><strong>• রমজান সামাজিক সৌহার্দ্যের মাসঃ</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা রমজানকে কেন্দ্র করে যুব-বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করতো, উৎসবের আয়োজন করতো, যা গোটা সমাজের সকলকেই একত্রিত করে একটি রুহানি প্লাটফর্ম দিতো এবং সাথে থাকতো ইসলামের প্রাণসত্তা, সুদূরপ্রসারী চিন্তা, উম্মাহ কেন্দ্রিক চেতনা। রমজানকে কেন্দ্র করে যে পরিবেশ সৃষ্টি হতো, রাষ্ট্রীয় উদ্দীপনা শুরু হতো, তাতে সবাই স্বজন হারানো গরীবদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেতো, নিজে গোপনে উপকার করা ও অন্যান্য যুবক, শিশুদের উৎসাহ প্রদান করা, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আনন্দ বঞ্চিত সব বন্ধুদের জন্য দোয়া করা, মুজাহিদদের জন্য দোয়া করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সাদকা করার শিক্ষা পেতো ও তা বাস্তবায়ন করতো। প্রতিবেশী, গরীবদের পাশে থাকা তো মুসলমানদের ঈমানের অংশ হিসেবেই গণ্য হতো। পাঞ্জাবী, জুব্বা, লুঙ্গি পরে সবাই মিলে তারবীহ পড়তে যাওয়া; নকশি টুপি পরা, গায়ে আতর মাখা, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে সবাইকে নিয়ে ইফতার করা আর এ উৎসবমুখরতায় অন্যান্য ধর্মের সকলকে নিয়েই একাকার হয়ে যেত মুসলিম উম্মাহ।<br />
রমজান এ শিক্ষা নিয়ে আবারও হাজির হয়েছে।</p>
<p><strong>• রমজান পারস্পরিক সম্পর্ক ও শিশু-কিশোরদের উজ্জীবিত করার মাসঃ</strong></p>
<p>চারদিক ইফতারের ঘ্রাণ, সবাইকে দাওয়াত দেওয়া, দাওয়াত খাওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে অন্য রকম সম্প্রীতি। আর তাকে কেন্দ্র করে নানা ক্যালিগ্রাফি, আর্ট, শিল্পচর্চা দিয়ে ভরে উঠুক প্রতিটি রাস্তা, বাড়ির দেয়াল। বাচ্চাদেরকে নিয়ে এসব সাজানো, নানাবিধ গান, তাকবীর, জিকিরে ভরে উঠুক চারপাশ।রমজান বিশ্ববাসীর মুক্তির সংস্কৃতি, সামাজিক আন্দোলনের নাম। রমজান এক বিশ্বজনীন উৎসবের নাম। রমজান আধ্যাত্মিক বলয় সৃষ্টিকারী প্রশান্তির নাম। রমজান গোটা উম্মাহকে রুহানি বন্ধনে আবদ্ধকারী মহান অনুভূতির নাম। রমজান বিশ্ব মানবতার মুক্তির শপথ নেওয়ার নাম।</p>
<p>হৃদ মাঝারে আজ এক রুহানি বাতাস বইতে শুরু করেছে, সে শীতল বাতাসের উপলব্ধি থেকে প্রখ্যাত কবি সেজাই কারাকোচের ভাষায় বলতে চাই, <em>“মুসলিম উম্মাহ যদি এখনও জীবিত থাকে, মূলত রমজানের কারণেই জীবিত আছে। আর একদিন যদি পরিপূর্ণভাবে জেগে ওঠে, তাহলে রমজানের মাধ্যমে জেগে উঠবে। আর সে জাগরণ শুরুও হবে রমজানের মাধ্যমেই।”</em></p>
<p>“আহলান, সাহলান, মাহে রমজান!”</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/may-ramadan-be-the-month-of-renaissance/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6098</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বয়ান তৈরিতে বাংলা অঞ্চলের সংকট ও প্রস্তাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/historyculture-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/historyculture-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 24 Oct 2021 17:06:32 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6338</guid>

					<description><![CDATA[&#160; মানব সভ্যতার ইতিহাসে আখলাক ও আদালত প্রতিষ্ঠাকারী, গোটা মানবতাকে ন্যায়ভিত্তিকভাবে পরিচালনাকারী একমাত্র সভ্যতা ‘ইসলামী সভ্যতা’। ইসলামী সভ্যতা আমাদের এ উপমহাদেশেও পরিচালনা করেছে দীর্ঘ ৭শ বছরের সালতানাত। এ সভ্যতার পতন পরবর্তী ২শ বছর যাবত ব্রিটিশ শোষণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>&nbsp;</p>
<p>মানব সভ্যতার ইতিহাসে আখলাক ও আদালত প্রতিষ্ঠাকারী, গোটা মানবতাকে ন্যায়ভিত্তিকভাবে পরিচালনাকারী একমাত্র সভ্যতা ‘ইসলামী সভ্যতা’। ইসলামী সভ্যতা আমাদের এ উপমহাদেশেও পরিচালনা করেছে দীর্ঘ ৭শ বছরের সালতানাত। এ সভ্যতার পতন পরবর্তী ২শ বছর যাবত ব্রিটিশ শোষণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক হীনমন্য ইতিহাসের বয়ান; যে বয়ানের প্রভাবে আমাদের সামনে আসছে নানাবিধ অযৌক্তিক প্রশ্ন!</p>
<p>যে প্রশ্নগুলো সর্বাগ্রে আসে, তা হলো ইসলামী সভ্যতার অন্যান্য অঞ্চলগুলোর (বাগদাদ, আন্দালুস) মতো আমরা প্রভাবশালী কোনো শক্তি ছিলাম না, আমাদের সমৃদ্ধ কোনো ইতিহাস ছিলো না, তাহলে আমাদের দ্বারা কীভাবে নতুন সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?<br />
আমাদের শক্তিশালী কোনো সাংস্কৃতিক ভিত্তি ছিলো না, তাহলে আমাদের দ্বারা কীভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন ধারা তৈরি করা সম্ভব?<br />
কীভাবে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নতুন বয়ান ও আলাপ তৈরি করা সম্ভব?</p>
<p>এসব প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নেই– এমন মনোভাব সৃষ্টি হওয়ার পেছনের ঐতিহাসিক যোগসূত্রের অনুসন্ধান করতে হবে। এক্ষেত্রে উপনিবেশবাদী বা জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির সাথে আমাদের সংগ্রামের ঐতিহাসিক মাত্রা নির্ণয় আজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ববহ। আজ আমাদের কীভাবে ইতিহাসবিহীন, হীনমন্য ও আত্মবিশ্বাসহীন জাতিতে পরিণত করা হচ্ছে সেটির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে হবে, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কীভাবে এটি বিষ ছড়াচ্ছে সে সম্পর্কে জানতে হবে। জানতে হবে কেনই বা তারা আমাদের সভ্যতার আগুনকে (জ্ঞানদর্শন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ইত্যাদি) অস্বীকার করছে। অথচ তারাই বলছে, উপমহাদেশে ৭শ বছর আগুনের ধোঁয়া (রাষ্ট্র, অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসন ইত্যাদি) ছিলো! অর্থাৎ ধোঁয়া ছিলো কিন্তু আগুন ছিলো না– এ জাতীয় একটি হীনমন্য যুক্তি! এ যুক্তি, লিখা ও ইতিহাসকে আমরাই কেন বৈধতা দিচ্ছি তা নিয়েও ভাবতে হবে।</p>
<p><strong>সেই সাথে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘শত্রু চেনা’। রাজনৈতিক সচেতনতার অন্যতম শর্ত এটি। এক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে আমাদের মূল শত্রু কে?</strong></p>
<p>মুসলিম উম্মাহর মুজতাহিদ, মুজাহিদদের সার্বজনীন স্বীকৃত মত অনুসারে মূল শত্রু হলো ‘ব্রিটিশ জায়নবাদী সভ্যতা’ এবং আমাদের উপমহাদেশের ক্ষেত্রে মুসলমানদের আরেকটি শত্রু হলো ব্রিটিশ জায়নবাদীদের ছত্রছায়ায় নতুন রূপে বেড়ে উঠা ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যবাদ’। (এ অঞ্চলের সেক্যুলার গোষ্ঠী মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যবাদের দোসর এবং বাঙালী জাতীয়তাবাদ হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতীয়তাবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার কমিউনিস্টরাও কমিউনিজমের মুখোশে ‘লাল সাম্প্রদায়িকতা’র ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতিই চালায়!)</p>
<p>ব্রিটিশ জায়নবাদী সভ্যতার ন্যায় এই ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যবাদের নিজস্ব প্রজেক্ট আছে, সাংস্কৃতিক দর্শন আছে। এ প্রেক্ষিতে ‘শত্রু চেনা’ বা রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টি বুঝতে হলে শুধুমাত্র একটি দিকে তাকালেই যথেষ্ট হবে, তা হলো বর্তমান বাংলাদেশের গণমানুষের মনস্তত্ত্ব কোন অবস্থায় আছে এবং যুব ও শিশু মননের ক্ষেত্রে আমরা কোন ইতিহাস ও চরিত্রগুলোর প্রভাব দেখতে পাই? এর উত্তর হিসেবে যা আসবে, তা হলো ব্রিটিশ জায়নবাদী সভ্যতার পরে ব্রাহ্মণ্যবাদী/হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের পুরো জাতিকে নিজের আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দিচ্ছে; যুবক থেকে শিশু সবার কাছে ইসলামী সংস্কৃতি একেবারেই অচেনা হয়ে উঠছে। ইসলামের ধর্মীয় চিন্তার ভুল ব্যাখ্যা সবার চিন্তারাজ্যে প্রবেশ করছে। আমাদের প্রাত্যহিক ও প্রভাবশালী বয়ানে ইসলামী সভ্যতার ধারণা আজ গরহাজির!</p>
<blockquote><p>অথচ ইসলামী সভ্যতা বাংলাকে উপহার দিয়েছিলো এক স্বর্ণালী সালতানাত! মুসলিম শাসনামলের ৭শ বছরে ‘ভারতীয় উপমহাদেশ’ সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলো। গোটা উপমহাদেশ আদালত, ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, সর্বোচ্চ উৎপাদন ও সহমর্মিতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতই ছিলো সমৃদ্ধ। সুবা-বাংলা/সুলতানী বাংলা আমাদের গৌরবময় অতীত; বর্তমান বাংলাদেশও এ শক্তিশালী মুসলিম সভ্যতার অংশ।</p></blockquote>
<p>অর্থনীতিতে বাংলা অঞ্চল ছিলো মুসলমানদের গর্বের অঞ্চল, সামাজিকব্যবস্থা ছিলো উন্নত, কৃষিব্যবস্থা ছিলো নতুন ধারা সৃষ্টিকারী পথপ্রদর্শক। এ অঞ্চলে তিনশোর অধিক পণ্য ও খাদ্যদ্রব্য উৎপন্ন হতো এবং নিজস্ব জাহাজে পৌঁছে যেতো দুনিয়ার ৮০ টি অঞ্চলে।<br />
প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ছিলো শক্তিশালী; <strong>ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির</strong> সৃষ্ট ধারার ধারাবাহিকতায় বুজুর্গ <strong>উমেদ খাঁ</strong> এর মতো সেনাপতি, <strong>ইবনে হোসেনের</strong> মতো নৌ-সেনাপতি, <strong>দেওয়ান মুনাওয়ার খানের</strong> মতো বীর যোদ্ধা, অত্যাচারী রাজা <strong>আচক নারায়ণের</strong> বিরুদ্ধে বিজয় অভিজান পরিচালনাকারী বারো আউলিয়া সিপাহসালার <strong>সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ও বদর পীর, গৌড় গোবিন্দের</strong> বিরুদ্ধে বিজয় অভিযান পরিচালনাকারী <strong>শাহ জালাল</strong> যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।<br />
শিক্ষা খাতে আলোড়ন তুলেছিলো আমাদের হারিয়ে যাওয়া দারসবাড়িগুলো। তখনকার শ্রেষ্ঠ আলেমদের সাথে আমরা স্মরণ করতে বাধ্য হই <strong>আগা বাকের খাঁ, শায়েস্তা খাঁ, সেকান্দার গাজীদেরকে।</strong></p>
<p><em>বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্য ছিলো স্ব মহিমায় ভাস্বর। রুমি, জামি, হাফিজ, গাঞ্জেশকর, বুল্লে শাহ, আমীর খসরু, আলাওলদের কাব্য-গান কিংবা গিয়াস উদ্দিনের দরগার নাশিদ, আজান, যিকির ইত্যাদি ছিলো সাংস্কৃতিক তারুণ্যে দীপ্তিমান বাংলার ছোট একটি উদাহরণ।</em></p>
<p>অথচ আজ আমরা এসব মনে রেখে ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে ইসলামের কেন্দ্রীয় ভূমিকা এবং আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে আত্মস্থ করে অগ্রসর হতে পারি না! যদি পারতাম, তবেই বোঝা যেতো, উপমহাদেশের মুসলমানদের এ হীনমন্যতাগুলো মূলত জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পূর্ব পরিকল্পনার ফসল। বাস্তবিকভাবে আমাদের নিজেদের এ সকল অভিযোগ ও প্রশ্ন যে অমূলক এবং অবান্তর তা আমাদের ৭০০ বছরের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস অধ্যয়ন করলেই বোঝা যায়। আমাদের সুসমৃদ্ধ ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতির অসাধারণ ঐতিহ্য এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, যোগ্য ব্যক্তিত্ব, ইস্তেকামাত ও ইখলাসের সাথে কাজ করে গেলে অবশ্যই আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নতুন বয়ান উঠিয়ে আনা সম্ভব।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের এ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আমরা শিকড়চ্যুত ও ইতিহাসহীন জাতিতে পরিণত হলাম?<br />
এক্ষেত্রে জবাব হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ধারক-বাহক জায়নবাদীরা ও তাদেরই মানসসন্তান ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণেই এটি হয়েছে।</p>
<p>আগ্রাসনের এ ক্ষেত্রকে মোটা দাগে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়–</p>
<p><strong>• সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং ইতিহাসের বিকল্প বয়ান তৈরি</strong><br />
<strong>• মিডিয়া আগ্রাসন</strong><br />
<strong>• ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ</strong></p>
<p>সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং ইতিহাসের বিকল্প বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শক্তি, অঞ্চল কিংবা রাষ্ট্র তার নিজস্ব সংস্কৃতি অধীনস্থদের উপর চাপিয়ে দেয় এবং অধীনস্থদের সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্র ধরে নিজেদের সংস্কৃতির আদলে বিকল্প চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটায়। যার ফলে অধীনস্থরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বিস্মৃত হয়ে যায়। এর মাধ্যমে অধীনস্থ বা শোষিত জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা এ কাজটিই করেছে। এর মাধ্যমে প্রথমেই তারা বাংলায় ইসলামী সভ্যতার স্মারকচিহ্নগুলো ধ্বংস করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলারের হিসাব অনুযায়ী ব্রিটিশরা বাংলা দখল করার পরও ৭০,০০০ প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিলো। অথচ আজ তার একটিও আমরা খুঁজে পাই না! আজ আমরা সোনারগাঁওয়ের মাদ্রাসাতুশ শরফ, দারসবাড়িগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত নই!</p>
<p>স্মারক ধ্বংসের পাশাপাশি তারা গ্রন্থ পাচার এবং পরবর্তীতে স্যার যদুনাথ সরকারসহ অন্যান্য আজ্ঞাবহ ইতিহাসবিদদের মাধ্যমে জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের যৌথ উদ্যোগে বাংলার ইতিহাসের বয়ান বদলে ফেলে; আর উগ্র সাম্প্রদায়িক সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্ররা তা মানুষের মন ও মননে গল্পাকারে তুলে ধরেন! পরবর্তীতে আহমদ ছফা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অন্যান্য বামপন্থী ও বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের (যেটা মূলত হিন্দুত্ববাদের একটি পরিমার্জিত সংস্করণ) সম্মিলিত প্রভাবের ফলশ্রুতিতে আমাদের ৭শ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে আমাদের যোগসূত্র হারিয়ে যায়, আমাদের ইতিহাস চর্চায় তাদের বয়ানই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এভাবে ব্রিটিশ জায়নবাদীরা তাদের শাসন গুটিয়ে নেওয়ার পরও তাদের তৈরি, তাদের আজ্ঞাবহ, তাদের পরিকল্পনার ফসল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ শোষণ এখনো অব্যাহত রেখেছে। ফলশ্রুতিতে তাদের তৈরি ব্যবস্থার অনুগত হিসেবে বেড়ে উঠার পাশাপাশি তাদের কারণেই সৃষ্ট হীনমন্যতার শিকার হয়ে শোষিত জনগোষ্ঠী আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেছে।<br />
মালিক বিন নবী তাঁর সভ্যতার বয়ানে মূলত এ বিষয়টিকেই চিহ্নিত করেছেন, অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শক্তি কীভাবে কোনো অঞ্চল ত্যাগ করেও তার প্রভাব বজায় রাখে তা বলেছেন।</p>
<p>চীনা জেনারেল সান জু তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ “<strong>দ্য আর্ট অব ওয়ার</strong>” এ বলেছিলেন,</p>
<blockquote><p>“কোন জাতিকে যদি যুদ্ধ ছাড়াই পরাজিত করে দিতে চাও, তাহলে তাদের ভালো বিষয়গুলোকে খারাপভাবে উপস্থাপন করো, তাদের ইতিহাস ও মূল্যবোধকে হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করো।”</p></blockquote>
<p>ভালোভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখবো, আমাদের অঞ্চলে ব্রিটিশরা এ পন্থাই অনুসরণ করেছে! ফলে আমরা আমাদের ইতিহাসের অসাধারণ দিকগুলো জানি না, আমাদের ইতিহাস আমাদের আত্মবিশ্বাসের উৎস না হয়ে হীনমন্যতার কারণে পরিণত হয়েছে!</p>
<p>এমন অবস্থা সৃষ্টিতে আমরাও দায়মুক্ত নই, কারণ যেখানে বিকল্প হিসেবে নিজস্ব ইতিহাসের বয়ান ও আলাপ তুলে ধরা ছিলো সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি, সেখানে আমরা হাত গুটিয়েই বসে আছি। ইবনে খালদুন এবং ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস দর্শনের সামগ্রিক ধারণার আলোকে আজও আমাদের ইতিহাসগত ভিত্তি তৈরি হয়নি। আমরা পক্ষপাতদুষ্ট ও একপেশে বয়ানের বিপরীতে নতুন আলাপ তুলে ধরা দূরে থাক, ইসলামের ঐতিহাসিক ক্ষেত্রগুলো পর্যন্ত তুলে ধরতে পারিনি! এটি অবশ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।</p>
<p>সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো ইতিহাসের বয়ান তৈরির বিশাল যুদ্ধের প্রশ্নগুলোর যথাযথ আলাপ তুলে না ধরে আমরা ইসলামকে শুধুমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি! এক্ষেত্রে মূল ত্রুটিপূর্ণ বয়ান হলো শুধু রাসূল (সা.) এর সীরাত ও খোলাফায়ে রাশেদার মধ্যেই ইসলামের ইতিহাসকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। সন্দেহাতীতভাবেই সে সময়টা আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অবশ্যই তা আমাদের ১২শ বছরের ইতিহাসকে অস্বীকার করে নয়! এক্ষেত্রে আমাদের আন্দোলনকে সফল করার জন্য জরুরী জরুরি হলো এই ১২শ বছর, বিশেষত উপমহাদেশের ৭শ বছরের স্বর্ণালি ইতিহাসের সাথেও নিজেদের যোগসূত্র তৈরি করা; সেই সাথে ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আত্মপরিচয় নির্মাণ ও সংস্কৃতির প্রশ্নে যুগের প্রেক্ষিতে সর্বাধিক যৌক্তিক জবাব হাজির করা। মানুষের সামনে যদি আমাদের ১২শ বছরের বিশ্ব পরিচালনা, বাংলায় ৭শ বছরের ইসলামী সভ্যতার চিত্রটুকু তুলে ধরতে পারি, তাহলে অবশ্যই হীনমন্যতা কেটে যাবে এবং হারানো চেতনা ফিরে আসবে। <strong><em>আল ফারাবী বলেছিলে, “ঐতিহ্যবিহীন জ্ঞান মূলত মুর্খতা।</em></strong>” তাই জ্ঞানচর্চা ও নিজস্ব ভিত্তি নির্মাণে ইতিহাসের যোগসূত্র স্থাপনের গুরুত্ব কত বেশি তা সহজেই অনুভব করা যায়।</p>
<p>সার্বিকভাবে আমাদের করণীয় হলো–</p>
<p>• আমাদের স্বর্ণোজ্জ্বল সভ্যতার শক্তিশালী ইতিহাসের বয়ান তৈরি ও তা তুলে ধরার মাধ্যমে সবাইকে হীনমন্যতা ও পরিচয় সংকট থেকে বের করে আনা এবং ইবনে খালদুনের ন্যায় মহান আলেম দার্শনিকদের মূলনীতি ও ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস, দর্শনের বয়ানের আলোকে সামগ্রিক ইতিহাস রচনার মাধ্যমে ইতিহাসের সাথে আমাদের যোগসূত্র স্থাপন করা, নিজেদের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে যা আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।<br />
• উপমহাদেশের ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসকে সঠিকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি ভূখন্ডগত দিক থেকেও যে আমরা প্রতারিত হচ্ছি সেই বোধ তৈরি করা, আমরা যে সব হারিয়ে বসেছি সে বোধও উপলব্ধি করানো।<br />
• মুসলমানগণ কীভাবে এই বাংলার ভূখন্ড, সমাজ, সংস্কৃতি সুনিপুনভাবে তৈরি করেছে এবং সাজিয়েছে তার সত্যিকার বয়ান তৈরি।<br />
• এ অঞ্চলের পীর-সুফি, মুজাহিদ (পুরুষ ও নারী), দরবেশ, আলেমদের বয়ান তৈরি।<br />
• স্থাপত্যশৈলী, সংস্কৃতিসহ সব ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদের ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এবং বিরাজমান থাকার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা।<br />
• বাঙালী পরিচয় কীভাবে এলো এবং এটি যে ভারতীয় আধিপত্যবাদেরই একটি অংশ তা এবং এই পরিচয় নিয়ে (বর্তমানে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত) কেন ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ মোকাবেলা করা যাবে না তার যৌক্তিক জবাব ও নতুন বয়ান হাজির করা।<br />
• এই বাঙালীত্ব, হিন্দু জমিদার ও মুসলমান প্রজার সম্পর্ক ও কলোনিয়াল ঐতিহাসিক জন্মসূত্র অনুসন্ধান করা।<br />
• বাঙালী সংস্কৃতির সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতা তুলে ধরা।<br />
• এ অঞ্চলের মুসলমানদের প্রতি আগ্রাসন যেহেতু ভারতীয় উপমহাদেশের অনান্য অঞ্চলের মুসলমানদের আগ্রাসনের থেকে অবিচ্ছিন্ন; তাই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের ইতিহাসে গ্রোথিত লড়াইকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে ধারণ করা। মুজাহিদ বখতিয়ার খিলজী, নূর কুতুব আলম, তিতুমীর, আল্লামা ইকবালসহ অজস্র বীর মুজাহিদের সংগ্রামকে স্মরণে রেখে এগিয়ে যাওয়া।</p>
<p>সর্বোপরি যুগের আলোকে যথোপযুক্ত ও বহুমুখী সমাধানের মাধ্যমেই এ অবস্থান থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।</p>
<p>মিডিয়া আগ্রাসনের আলাপে যদি আমরা আসি, তাহলে দেখবো, আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি আর প্রযুক্তি।</p>
<p>আমরা জানি, রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম শর্ত হলো সাংস্কৃতিক লড়াই। আর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ মিডিয়া ও প্রযুক্তি; অর্থাৎ নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ বা ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি নিয়ে পর্যাপ্ত কাজ এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে মিডিয়ার মাধ্যমে গণ পরিসরে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক চিহ্ন নিয়ে হাজির হওয়া।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষিতে আমাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান দুটি প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী দর্শনের সাথে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে আমাদের নিজস্ব ভিত্তি নির্মাণ করে গণ পরিসরে প্রভাব বিস্তার ব্যতীত কখনোই সফল হওয়া সম্ভব নয়, আর এ বৃহৎ ক্ষেত্র ছাড়া সম্ভব নয় আগামীর ইসলামী সভ্যতা বিনির্মাণও। আমাদের ঐতিহাসিক যোগসূত্র ও সাংস্কৃতিক নতুন বয়ান হাজির করাও একই সূত্রে গাঁথা। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি দাঁড় করানোর আগে সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী হওয়াটা আকাশকুসুম কল্পনারই শামিল।</p>
<p><em>মুহাম্মাদ আসাদ সেই ১৯৩০ সালেই স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “মুসলিমদের ঐক্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি যতদিন না দাঁড়াবে, সে পর্যন্ত পাশ্চাত্যের জন্য ইসলাম কখনোই হুমকি নয়!”</em><br />
অথচ এর প্রায় একশো বছর পরে বর্তমানে হলিউড, বলিউড, অত্যাধুনিক মুভি, সিরিয়ালের দুনিয়ায় আমাদের অঙ্গন থেকে বিকল্প কোনো যাত্রা শুরুই হয়নি!</p>
<p>জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনের সমালোচনা করে ও তা থেকে শুধুই ক্রমাগত আত্মরক্ষা করে কোনো লাভ নেই, কারণ আত্মরক্ষা করে কখনো নিজেদের ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব নয়। আবার নিজেরা দুর্বল হলে আত্মরক্ষাও করা যায় না। প্রথম কাজই হলো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি করা, অর্থাৎ মিডিয়া জগতে বিকল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা।</p>
<p>তাই আবশ্যকীয় কর্ম হলো–</p>
<p>• এই অঞ্চলের (ভারতের) মিউজিকসহ শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান তুলে ধরা। নাট্যদল থেকে সিনেমা পর্যন্ত, সেই সাথে স্থাপত্যেশৈলীতেও পাশ্চাত্যের কথিত আধুনিকতা বিরোধী আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটানো।<br />
• মুসলিম সংস্কৃতির নিজস্ব দিবসসমূহ উদযাপন করা। সাপ্তাহিক ঈদ জুম’আ, রমজান, শাবান, মিলাদুন্নবী ইত্যাদি ঘটা করে উদযাপন করা। বিয়েসহ সকল সামাজিক অনুষ্ঠানে ইসলামী সংস্কৃতির সর্বোচ্চ পরিস্ফুটন ঘটানো। এক্ষেত্রে গতানুগতিক বিদয়াতি ফতোয়া দেওয়ার পরিবর্তে উসূল ও মেথডোলজি, উসূলে ফিকহ, হিউম্যান সাইকোলজি, সোশ্যাল সাইন্স বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংস্কৃতিকে কখনো গতানুগতিক ফতোয়া দিয়ে মোকাবেলা করা যায় না।<br />
• স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নতুন ধারা তৈরি করা।<br />
• প্রযুক্তির বয়ান, সাহিত্যের ধারা, খাদ্য সংস্কৃতিতে আগ্রাসন ও বিকল্প খাদ্য সংস্কৃতি চালু।<br />
• সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শাহ জালাল, নূর কুতুবুল আলম, তিতুমীর, দুদু মিয়া, হাজী শরীয়তুল্লাহসহ আমাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মহান মুজাহিদগণ, ব্যক্তিত্ব, পীর, সুফি, দরবেশ, আলেমদের জীবন কাহিনী তুলে ধরা। তাদের জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা, যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের মডেল হিসেবে তাদেরই পরিচয় দেয়।<br />
• ইসলামী সংস্কৃতির মূলনীতির উপর পাণ্ডিত্য অর্জনকারীদের কর্তৃক বর্তমান দুনিয়া, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভিত্তি ভালোভাবে বুঝে পর্যাপ্ত গ্রন্থ, গবেষক, সাংস্কৃতিক জগতে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা।<br />
• সেমিনার, কনফারেন্স, প্রেজেন্টেশন এর আয়োজন করা।<br />
• বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। এর মাধ্যমেই মূলত বর্তমান যুগের সাথে সর্বোত্তম বোঝাপড়ার ফলশ্রুতিতে যুগের প্রেক্ষিতে সবচেয়ে বেশি স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া সম্ভবপর হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই সামগ্রিক উদ্যোগকে প্রাধান্য দিতে হবে। মাথায় রাখতে হবে শুধুমাত্র কতিপয় শিল্পীগোষ্ঠী, ব্যক্তিগত-সামাজিক উদ্যোগ দিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা অসম্ভব। একইসাথে ২০ বছর আগের মডেলে কাজ করে গেলেও তা প্রভাব বিস্তারকারী হবে না। যুগের প্রেক্ষিতে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বোত্তম ও সর্বোন্নত পন্থায় আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে যুব সমাজের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।</p>
<p>সর্বোপরি এসব চিন্তা ও কাজের মধ্য দিয়েই ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নিজস্ব ধারা তৈরি হবে।</p>
<p>তৃতীয় বা সর্বশেষ আলাপ, ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে যদি আমরা আসি, প্রথমেই বলতে হয় ভাষাগত বিষয়টি প্রতিটি সভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, একইসাথে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী।</p>
<p><em><strong>সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ভাষা।</strong></em> ভাষা হলো একটি জাতিসত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান। এ উপাদানকে যদি বিকৃত বা বিধ্বস্ত করা যায়, বা বদলে ফেলা যায় একটি তাহলে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সে জাতিকে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পরমুখাপেক্ষী ও হীনমন্য করে দেওয়া সম্ভব! বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের যে নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ভাষা কয়েক শতাব্দীব্যাপী ধরে বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছিলো, তা ১৮৫৭ সালে ইসলামী সভ্যতার পতনের পর বিরাট ধাক্কা খায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা সে ভাষাকে আগাগোড়া পালটে দেন। ফলশ্রুতিতে ইসলামী সভ্যতার বাংলার বদলে তা পরিণত হয় হিন্দুয়ানি বা সংস্কৃতায়িত বাংলায়! (এ কথা বলে রাখা ভালো, বাংলা অঞ্চলের যে ভাষাকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্যিক আর পণ্ডিতেরা বদলে দিয়েছিলেন, তা ছিলো বাংলার মানুষজনের সাধারণ ভাষা। সকলেই এ ভাষায় কথা বলতেন, এমনকি হিন্দুরাও। সুতরাং মুসলমানরা যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন তারা এর সাহায্যে হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর জুলুম করেছেন এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আর মুসলিমরা আসার পূর্বে বাংলা ভাষার কী করুণ অবস্থা ছিলো এবং মুসলিম সুলতানরা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে কীভাবে সত্যিকারার্থে বাংলা ভাষাকে নবজন্ম দিয়েছেন তার বিশ্বস্ত বয়ান পাওয়া যায় দীনেশচন্দ্র সেনের “প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান” গ্রন্থে।)</p>
<p>ভাষা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হওয়ার কারণেই ব্রিটিশরা ক্ষমতায় এসেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহাসিকগণ ও ভাষাতাত্ত্বিকদের মাধ্যমে সুবা বাংলা/বাংলা সালতানাতের বাংলা ভাষায় আগ্রাসন চালায়, সংস্কৃতায়ন করে ইসলামী শব্দ ও পরিভাষাগুলোকে মুছে দেয় এবং বিকল্প পরিভাষা সৃষ্টি করে। আবার এ পরিভাষাগুলোকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রদের মতো প্রভাবশালী সাহিত্যিকদের মাধ্যমে মানুষের মন ও মননে পৌঁছে দেয়। আজ তাই জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির বোঝাপড়া আমরা বুঝতে পারি না, ব্রাহ্মণদের লাল সাম্প্রদায়িকতার মানেও জানি না।</p>
<p>আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট বিকল্প ও পরিবর্তিত পরিভাষা দিয়ে এ আগ্রাসনেরই মোকাবেলা করা কি আদৌ সম্ভব? এ অনেকটা কেরোসিন ঢেলে আগুন নেভানোর মত বিষয়!</p>
<p>এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে <em>ভাষা মূলত চিন্তার বাহন, আর ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ হলো মানুষের চিন্তাকাঠামোর জগতটাকেই নিয়ন্ত্রণ করা।</em> এ কারণেই ব্রিটিশরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা থেকে সড়িয়ে দেয়। আর পরবর্তীতে কিভাবে তাদের আজ্ঞাবহ চিন্তক, সাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যকরণবিদদের দ্বারা ভাষার খোলনলচে পালটে দেয়, সে ইতিহাস তো আমাদের সামনে হাজির!</p>
<p>এক্ষেত্রে সমাধান কী?</p>
<p>প্রথমটি হলো বাংলাদেশে অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ, পরিবারসহ সব ক্ষেত্রেই যে সংকট বিদ্যমান, তা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তাই সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগের বহুবিধ গুরুত্ব থাকলেও সামগ্রিক সমাধান রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমেই করতে হবে।</p>
<p>একে কেন্দ্র করে বহু আলাপ, বহু দিক থেকে তর্ক থাকলেও মোদ্দাকথা এটিই যে, রাজনৈতিক প্রশ্নকে এড়িয়ে সংকটের সমাধান নিতান্তই অপরিণামদর্শীতা এবং এটি অবাস্তবও। একেবারে ক্ষুদ্রতর ইস্যু থেকে শুরু করে বৃহৎ সমস্যাগুলো দিনশেষে রাজনীতি ও ব্যবস্থাগত অবস্থানের সাথেই সম্পৃক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন মানুষের আখলাকবিহীন আচরণ কিংবা পারিবারিক সমস্যাও রাষ্ট্র ব্যতীত সামগ্রিকভাবে সমাধান করা যায় না। সে জায়গাতে সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বয়ান নির্মাণের সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে তার আবশ্যকীয়তা কতটুকু তা খুব সহজেই অনুমেয়। প্রফেসর ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকান তাই বলেছিলেন, “আমরা ছোট নল দিয়ে আলো ছড়াচ্ছি, আর ওরা বড় পাইপ দিয়ে জাহেলিয়াত ছড়াচ্ছে।” তাই সমাধান বাস্তবায়নের জন্যও আমাদের বড় পাইপ দরকার, ব্যবস্থাগত অবস্থান ও সামগ্রিক উদ্যোগ দরকার।</p>
<p>তাই সময়ের এ সন্ধিক্ষণে এসে আমাদের করণীয় হলো–</p>
<p>• ইসলামী সংস্কৃতির উসূল তথা নিজস্ব ভিত্তিসমূহ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করা। ভাষা শেখা, তারপর ইসলামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের বড় বড় শিক্ষকদের থেকে জ্ঞান অর্জন করা।<br />
• নিজেরা শক্তিশালী হওয়া। যে কোনো সভ্যতা-ই প্রভাবশালী ও বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হওয়ার আগে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী হওয়ার দিকে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এসব নিজস্ব উপকরণের মধ্য দিয়েই নিজেদের আত্মবিশ্বাস, কর্মতৎপরতা, নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সভ্যতা বিনির্মাণের কাজ করার বিশাল প্রজন্ম গড়ে ওঠে।<br />
প্রখ্যাত দার্শনিক ও মুজতাহিদ <strong>আল্লামা ইকবালের ভাষায়, “সমাজের অধঃপতন রোধের একমাত্র কার্যকরী পন্থা হলো আত্মশক্তি প্রবুদ্ধ মানুষ গড়ে তোলা। কেবল তারাই পারেন জীবনের গভীরতার উদ্দেশ্য দিতে।”</strong><br />
ইকবালের এই আত্মশক্তি প্রবুদ্ধ মানুষের প্রয়োজন সবখানেই। সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকেও ইকবাল উঠে আসতে হবে, তথা আত্মশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি উঠে আসতে হবে।</p>
<p>এ চ্যালেঞ্জটি সবচেয়ে বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী। তাই ধৈর্যের সাথে অবিচল থেকে কাজ করে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। একইসাথে আমাদের বিবিধ চ্যালঞ্জের কথা মাথায় রেখে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষগণ তথা নবীগণ, সাহাবা ও আমাদের ১২০০ বছরের সভ্যতার মুজাহিদদের আদলে আমরণ সংগ্রাম করে যেতে হবে।</p>
<p>সময়ের সংকট মোকাবেলায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, আল্লামা শিবলী নোমানী, মুজতাহিদ আল্লামা ইকবালদের মতো কর্মবীর হতে হবে, ইখলাস ও ইস্তেকামাতের সাথে এসব ক্ষেত্রে আমৃত্যু সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হবে। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ইকবাল, হামিদুল্লাহ উঠে আসার আগ পর্যন্ত আমাদের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না, কারণ সফলতার প্রথম শর্ত হলো শক্তিশালী ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা।<br />
আমাদের সফলতার সূর্য এই ইখলাসের ভেতর দিয়েই উদিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না কোনোভাবেই। একজন মুমিনের জন্য হতাশ হওয়া হারাম! এ কথা মনে রাখতে হবে, আল্লামা ইকবাল, আল্লামা শিবলী নোমানী, মাওলানা মওদূদী, মুহাম্মদ হামিদুল্লাহরা কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়েই উঠে এসেছেন। আজকের ব্রিটিশ জায়নবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শেকল ভেঙেও এ শোষিত জমিন থেকে মুক্তির পতাকা হাতে ইকবাল, শিবলী নোমানী, মওদূদী, হামিদুল্লাহরা উঠে আসবেন, ইনশাআল্লাহ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/historyculture-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6338</post-id>	</item>
		<item>
		<title>হাল যামানায় আমাদের সংস্কৃতি ও উৎসব; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/our-contemporary-culture-and-festivals-islamic-civilization-in-context/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/our-contemporary-culture-and-festivals-islamic-civilization-in-context/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Sep 2021 10:50:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[হাল যামানায় আমাদের সংস্কৃতি ও উৎসব; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6080</guid>

					<description><![CDATA[জ্ঞানসম্রাট &#8216;আলিয়া ইজ্জেতবেগভিচ&#8216; বলেছিলেন- &#8220;সংস্কৃতি ধর্মের চেয়েও বেশী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম, সংস্কৃতির ক্ষমতা একটি সভ্যতার চেয়েও বেশী ক্ষমতাবান।&#8221; এরইসাথে আরোও একটি বিষয় হচ্ছে, ধর্ম ও সংস্কৃতি একে অপরের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, একে অপরের প্রভাবে উন্নত হয়। কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>জ্ঞানসম্রাট &#8216;<strong>আলিয়া ইজ্জেতবেগভিচ</strong>&#8216; বলেছিলেন-<br />
<em><strong>&#8220;সংস্কৃতি ধর্মের চেয়েও বেশী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম, সংস্কৃতির ক্ষমতা একটি সভ্যতার চেয়েও বেশী ক্ষমতাবান।&#8221;</strong></em></p>
<p>এরইসাথে আরোও একটি বিষয় হচ্ছে, <strong>ধর্ম ও সংস্কৃতি একে অপরের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, একে অপরের প্রভাবে উন্নত হয়।</strong><br />
কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হচ্ছে,</p>
<blockquote><p><strong> পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং তাদের চিন্তার উপমহাদেশীয় ফসল ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যখন নিজেদের ধর্মকে ব্যাখ্যা করে তখন ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে পাশাপাশি রেখেই তাদের চিন্তাকে তুলে ধরে, কিন্তু তারা যখন ইসলাম ব্যাখ্যা করে তখন মুসলিমদের সামনে সংস্কৃতিকে ধর্ম থেকে আলাদা ভাবে অর্থাৎ শুধুমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক একটি বয়ান হাজির করে। </strong></p></blockquote>
<p>যেমন &#8220;উৎসব&#8221; এমন একটি ব্যাপার যা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সকলের জন্যই আবশ্যকীয় একটি বিষয়। কেননা হিউম্যান সাইকোলজি কে ব্যাখ্যা করলে, মানুষের/মানবজাতির ইতিহাসকে ভালোভাবে পড়লে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে স্পষ্ট হয় তা হচ্ছে- যুব সমাজের আত্মিক পরিশুদ্ধি, নৈতিক পরিশুদ্ধি, চেতনা ও ভিশনারি জীবন কখনোই শুধুমাত্র বই, লেকচার দিয়ে গড়ে তোলা যায়না, এসকল কর্মসূচির সাথে সাংস্কৃতিক বলয় তৈরী করতে হয়, এর মাধ্যমেই মূলত যুব সমাজ উজ্জীবিত হয়ে থাকে এবং যুগে যুগে এভাবেই উজ্জীবিত হতো। এই <strong>সাংস্কৃতিক বলয় তৈরির অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে উৎসব</strong>।</p>
<p>একটি সভ্যতার সংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ করতে, ইতিহাসের বয়ান তৈরিতে, ইসলামের মতাদর্শকে ছড়াতে, প্রশ্নহীন করতে, সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পেতে এবং স্বর্ণালী ইতিহাস, স্মৃতিসমূহ কে জীবন্ত রাখতে ধর্ম ও সাংস্কৃতির সম্মিলিত কর্মসূচি বয়ান তৈরি করতেও উৎসবের বিকল্প নেই।<br />
আবার, <strong>ধর্মীয় উৎসব গুলির সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফল হচ্ছে আধ্যাত্মিক বলয় সৃষ্টি করা</strong>।সাথেসাথে, উল্টো দিকে প্রতিটি ধর্ম, ভাষা, অঞ্চলভিত্তিক যে সংস্কৃতিক কর্মসূচি, উৎসব রয়েছে তার পেছনেও থাকে নির্দিষ্ট মতাদর্শগত উদ্দেশ্য ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি। তাই প্রতিটি উৎসবের পেছনেই লুকিয়ে থাকে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা!</p>
<blockquote><p><strong>এজন্য আগে বুঝতে হবে পাশ্চাত্যে ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের এক্ষেত্রে এত সফলতা ও প্রচারণা কেন! মুসলিমরাও বা কেন এর থেকে এত দূরে অবস্থান করছে! সবকিছু কেই কেন ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানের মাঝেই সীমাবদ্ধ করছে। </strong></p></blockquote>
<p>এক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি একটি আরেকটির পরিপূরক। তাই এই তিনটি বিষয়কে একসাথে মিলিয়ে পাঠ করতে না পারলে, কর্মসূচি না দিতে পারলে শুধুমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেই ইসলামকে দেখতে হবে! আর যেটি হবে একটি কাঠখোট্টা মার্কা অসহায় ইসলাম!<br />
আর পাশ্চাত্যের মূল সফলতা এখানেই&#8230;</p>
<p>যাইহোক আমরা যদি পাশ্চাত্যের কৌশল বুঝে, তারপর ইসলামী সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে, আরবের হিজাজ অঞ্চল, ধর্মীয় ধরার দিক থেকে শক্তিশালী এবং সমগ্র আরবের কেন্দ্র ছিল। তবে আরব অঞ্চল সভ্যতা ও সাংস্কৃতিকভাবে দুনিয়ার অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল।<br />
ইসলামের বিজয় পতাকা যখন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল ইসলামী সভ্যতা তখন গ্রীক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা সহ আরও বড় বড় সভ্যতা ও তাদের প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতির মুখোমুখী হয়।<br />
কিন্তু প্রশ্ন হলো ইসলাম এই চেলেঞ্জকে কিভাবে গ্রহণ, মোকাবিলা করেছে এবং ইসলামীকরণ করার মাধ্যমে সমাধান করেছে?</p>
<p><em><strong>এক্ষেত্রে ইসলামের সবথেকে বড় সফলতা হচ্ছে ইসলাম তার প্রাথমিক সময়েই সংস্কৃতির শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ ও স্থায়ী মূলনীতি প্রণয়ন করে।</strong></em><br />
<em><strong>এই শক্তিশালী ভিত্তি, মূলনীতির আলোকে ইসলাম প্রতিটি অঞ্চলে তার উপরই ভিত্তি করে এক বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক বলয় সৃষ্টি করে। দুনিয়ার কোন অঞ্চলের কোন সংস্কৃতিকেই ইসলাম অবহেলা করেনি বরং অঞ্চলের অনৈতিক, কুসংস্কারচ্ছন্ন বিষয়গুলিকে দূর করে সে অঞ্চলের নৈতিক ও সুস্থ সংস্কৃতির সাথে ইসলামের মূলনীতির সাথে মিলিয়ে নতুনভাবে স্থায়ী সাংস্কৃতিক ভিত্তি রচনা করে, ধারা সৃষ্টি করে।</strong></em><br />
(এক্ষেত্রে একটি বিষয় হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতি আর আরব সংস্কৃতি এক বিষয় নয় । ইসলামী সংস্কৃতির বিশ্বজনীন ও স্থায়ী মূলনীতি রয়েছে, তবে মডেল হয় আঞ্চলিকতার ভিত্তিতেই।)</p>
<p>ইসলাম প্রতিটি বিজিত হওয়া অঞ্চলে সামগ্রিক ঐক্য ও সামাজিক বলয় সৃষ্টি করতে সেই সমাজের মাটি ও মানুষের সাথে মিল রেখে অসাধারণ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং ব্যাপকহারে সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। আবার প্রতিটি উৎসব, বয়ান-ই যুবসমাজকে উম্মাহ কেন্দ্রিক চেতনায় উদ্ভাসিত করে রাখে।<br />
আধ্যাত্মিক ছোঁয়া, সাংস্কৃতিক বলয়, মৌলিক চাহিদা(সামাজিক কমিউনিটি, ক্লান্তির পর প্রশান্তির ছোঁয়া, বিনোদন, মানসিক চার্জ, অবসরে প্রশান্তি পূর্ণ সময় যাপন) এসব বিষয়কে সামনে রেখে ইসলাম নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতো। যেমন কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়,</p>
<p><strong>• ইসলামী সভ্যতায় মসজিদের স্থাপত্য থাকতো অত্যন্ত কারুকার্যপূর্ণ, অসাধারণ সৌন্দর্য্যমণ্ডিত। আর সাথেই থাকতো আড্ডা দেওয়ার জায়গা ও লাইব্রেরি, নামাজের জোরপূর্বক না নেওয়া হলেও সমস্ত যুবসমাজের আড্ডা, লাইব্রেরি ছিলো মসজিদ কেন্দ্রিক, যা এক রোহানি সংস্কৃতিক বলয় সৃষ্টি করত। যাকে কেন্দ্র করে যুবক, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ একটা সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকত।</strong><br />
<strong>• ইসলামী সভ্যতা দুটি ঈদ, রমজান সহ গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিকে কেন্দ্র করে যুব বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করত, উৎসবের আয়োজন করত। যা গোটা সমাজের সকলকেই একত্রিত করে একটি রুহানি প্লাটফর্ম দিতো এবং এর সাথে থাকতো ইসলামের প্রাণসত্তা, সুদূরপ্রসারি চিন্তা, উম্মাহ কেন্দ্রিক চেতনা।</strong> সে ক্ষেত্রে কিছু দিবসের কথা উল্লেখ না করলেই নয়,</p>
<blockquote><p> ১) ঈদ ও রমজান কে কেন্দ্র করে যে পরিবেশ সৃষ্টি হতো, রাষ্ট্রীয় উদ্দীপনা শুরু হতো তাতে যুবকেরা- স্বজন হারানো গরিবদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেতো, নিজে গোপনে উপকার করা ও অনান্য যুবক, শিশুদের উৎসাহ প্রদান করা, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বঞ্চিত সব বন্ধুদের জন্য দোয়া করা, মুজাহিদদের জন্য দোয়া করা, সকালে বের হয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা, তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করে ঈদগাহে যাওয়া। পাঞ্জাবী, জুব্বা, লুঙ্গি পড়ে সবাই মিলে ঈদগাহে যাওয়া। নকশি টুপি পড়া, গায়ে আতর মাখা, পিচ্চিদের সালামী দেওয়া, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে সবাইকে নিয়ে খাওয়া আর এই অংশগ্রহণের মাঝে অন্যান্য ধর্মের সকলকে নিয়েই একাকার হয়ে যেত মুসলিম সম্প্রদায়।</p></blockquote>
<blockquote><p>২) সকল উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা ক্যালিগ্রাফি, আর্টশিল্প দিয়ে ভরে যেত প্রতিটি রাস্তা, বাড়ির দেয়াল। বাচ্চাদেরকে নিয়ে এসব সাজানো হতো, নানাবিধ গান, তাকবীর, জিকিরে ভরে উঠত চারপাশ।</p></blockquote>
<blockquote><p>৩)  বদর দিবসে শেখানো হতো, জুলুম উৎখাতের শিক্ষা। বাণী ছড়ানো হতো, আদালত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও দ্বীনের জন্য না খেয়ে থেকে রক্ত ও জীবন দান করার। সকল যুবকদের চিন্তারাজ্যে উপলব্ধি হতো, প্রতিটি যুদ্ধ-সংগ্রাম হচ্ছে হক্ব প্রতিষ্ঠার, জুলুমের প্রতিবাদী আন্দোলনের নাম। বদর হচ্ছে বিশ্ববাসীকে মুক্তির সংস্কৃতি, সামাজিক আন্দোলনের নাম। নাশিদ, সাফিনা দিয়েও ভরে উঠত এই দিনটি।</p></blockquote>
<blockquote><p>৪)  মক্কা বিজয় দিবস একইভাবে কর্মসূচিতে আবৃত হত গোটা বিশ্বব্যাপী। মাস ব্যাপী পালিত হতো সিরাতুন্নবী, মিলাদুন্নবী।</p></blockquote>
<blockquote><p>৫)  কারবালা দিবস ছিলো, প্রতিবাদের সংস্কৃতি, আহলে বায়াতের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের দিবস। সাহাবাদের মত আশুরা ছিলো নতুন বছরের পরিকল্পনা করা ও রোজা রাখার দিবস।</p></blockquote>
<blockquote><p>৬)  শবে মেরাজ&#8217;কে কেন্দ্র করে গোটা দুনিয়ার মুক্তির জন্য বাইতুল মুকাদ্দাস বা কুদুসের চেতনা, কুদুসের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব কতবেশী তা গোটা জাতির সামনে তুলে ধরা হতো। শবেবরাত&#8217;কেও একইভাবে রুহানিয়্যাতের বলয় সৃষ্টিকারী দিবস হিসেবে সামনে আনা হতো।</p></blockquote>
<p>এসবের মধ্য দিয়ে ইসলামের স্বর্ণালী অতীতকে স্মরণ করা..<br />
পূর্ববর্তী মহান বীর আমর ইবনুল আস, মুহাম্মদ বিন কাসিম, সুলতান ফাতিহদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতো। স্মরণ করা হতো প্রজ্ঞাবান আলেমদেরকে, তাদের জ্ঞানের বিশাল সফরে কীভাবে তারা পথপাড়ি দিয়েছে তা শুনানো হতো ছাত্রসমাজ কে।<br />
<em><strong>ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের উপর পাড়ায় পাড়ায় দারসের আয়োজন হতো, শিশুদের শোনানো হত অলি-আউলিয়া মুজাহিদের গল্প।</strong></em></p>
<p><em>• সকল সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, উৎসব হত সার্বজনীন। এমনভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পালন হতো, সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হতো যার ফলশ্রুতিতে সকল ধর্ম, গোত্র সকলে অংশগ্রহণ করতে পারতো। বিশেষ করে সকল শ্রেণীর যুবসমাজ একে কেন্দ্র করে মেতে উঠতো&#8230; </em><br />
<em>আনন্দঘন পরিবেশ ফুটে উঠতো গোটা সমাজের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সর্বশ্রেষ্ঠ নজির এই &#8216;ইসলামী সভ্যতা&#8217;র সাংস্কৃতিক কর্মসূচি।</em></p>
<p><em>• একইভাবে বাংলা সালতানাত, সুবে বাংলা আমলেও গোটা অঞ্চল এভাবেই উজ্জীবিত হত। সীরাতুন্নবী উপলক্ষে মাসজুড়েই শোকরানা মাহফিল, জিকির ও কাসিদা পাঠ হতো, খতমে সীরাত অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন দিবসে মসজিদগুলোতে নানাবিধ আয়োজন থাকতো, শিশু ও মহিলাদের জন্য থাকতো আলাদা জলসা, মিষ্টি খাওয়া এবং খাওয়ানো, বিকেলে মাঠে &#8216;নাতে রাসূল সন্ধ্যা&#8217;।</em></p>
<p><strong>চারদিক হতেই ভেসে আসতো সুবাসিত খুশবু ও আতরের ঘ্রাণ। যেমন, রমজানে বাংলার ঐতিহ্য-ই ছিল মহল্লায় মহল্লায় দফ বাজানো, উচ্চস্বরে জিকির, নাশিদ গাওয়া, সেহেরীর সময় যুবকরা ঘুরে ঘুরে জাগানোর সংস্কৃতি চালু ছিল ব্যাপকভাবে, আর মোমবাতি, বিভিন্ন লাইটিং ইত্যাদির সমন্বয়ে অসাধারণ সংস্কৃতির ছোঁয়া বয়ে যেতো গোটা মানবসমাজের মাঝেই।</strong></p>
<p><em>• এমনকি ব্রিটিশ শোষণকালীন কঠিন পরিস্থিতিতেও সাংস্কৃতিক বলয় তৈরির জন্য মুসলিমরা উঠোনে বসে নারিকেলবাড়িয়ার জঙ্গগাথা শোনা, তিতুমীরের শাহাদাতের বিদ্রোহী কথামালা বলা এবং পুথি, গানের মাধ্যমে মুক্তির কথাগুলো তুলে ধরা হতো। কন্ঠ জুড়ে থাকতো সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়ঙ্কর জুলুমীর শাসন, আমাদের সংগ্রাম, শাহাদাত। তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহর ত্যাগ, ফকির মজনু শাহ বিদ্রোহের গল্প দিয়েই তৈরি হতো নতুন বিদ্রোহের বয়ান।</em><br />
অনান্য সকল উৎসবের ন্যায় ফাতেহা ইয়াজদাহম, দোয়াজদহম, মিলাদুন্নবী, শবে মেরাজ, নারিকেলবাড়িয়া দিবস, বঙ্গ বিজয় দিবস ইত্যাদি ব্যাপকভাবে পালন ও পালনে উৎসাহিত করা হতো সকল সম্প্রদায়কে।</p>
<p><strong>এখন প্রশ্ন হলো বর্তমান সময়ে এসে এই অবস্থা কেন হল? কেন আলেম সমাজ, ইনস্টিটিউট সমূহ এ ব্যাপারে চুপ থাকেন অথবা ধর্মতাত্ত্বিক সমাধান খুঁজেন? কেন চারকোটি যুবক-যুবতী, তিনকোটি শিশুর তথা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কোন চিন্তা পরিকল্পনা কি নেই আমাদের? সবাই কি মাদ্রাসায় পড়ুয়া বা বাস্তবতা বর্জিত কথিত পীরসাহেব হবে! এটা কি আদৌও সম্ভব?</strong></p>
<p>♦ সবথেকে বড় বিষয় হচ্ছে BYLC, JAGO এর মতো হাজারো সংগঠন যুবকদের রাজনৈতিকভাবে নির্জীব করে দিচ্ছে! চাকচিক্যতা দিয়ে মাকালফল মার্কা লীডারশীপ তৈরির সামাজিক সংগঠনের চিন্তায় ভরে যাচ্ছে! রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চিন্তার জায়গায় ধ্বজভঙ্গ করে দিচ্ছে! (সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবতায়কারী এজাতীয় সংগঠন গুলিকে তাদেরই মিডিয়া যেভাবে তুলে ধরছে, তাতে গোটা সমাজ তাদেরই আইডল ভাবছে!)<br />
<strong><em>আমরা কোনো কর্মসূচি না দিতে পারলে তারা ওদিকেই দৌড়াবে, এটাই তো স্বাভাবিক।</em></strong></p>
<p><strong>♦ আমাদের সংস্কৃতি, রমজান, ঈদের মতো দিবসগুলোতেও যুবকরা মুসলিম সালতানাতের সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে পারছেনা, সে সময় তারা পাশ্চাত্যের চোখ দিয়ে সমাধান খুঁজছে!</strong></p>
<blockquote><p>ঈদের দিনসহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিবস গুলোতেও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী/ভোগবাদী কালচারের প্রভাবে যুবক শ্রেণী মুভি দেখে, ঘরের কোণে বসে থাকে, ফেসবুক চালায়! হাসিগুলোও থাকে সেল্ফির জন্য! কনসার্ট, ঘোরাফেরাগুলোও যেনো হয় ছবি তোলার জন্য!<br />
আনন্দের পন্থাই যুবকরা কেউ জানিনা! জানিনা আমাদের উৎসব কতটা সামাজিক, কতোটা যুববান্ধব। আর তাই কষ্টকর বিষয় হচ্ছে, যুবসমাজ ঈদের দিনের আনন্দটাও পাশ্চাত্যের মতো করে করছে এবং সেটাকেই কি সফলতা ভাবছে!</p></blockquote>
<p><strong>কিন্তু কেন?</strong></p>
<p><strong>♦শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে ইসলামী সভ্যতার ন্যূনতম ধারণাটুকুও পাচ্ছেনা! বরং উল্টো বয়ান দ্বারা আবৃত হচ্ছে! আজ যুবক শিশুরা জানেনা ফররুখ আহমেদ কে! কাদের নেওয়াজ কে! তাদের কবিতাগুলো পর্যন্ত উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে!</strong><br />
মুসলিম চেতনাদীপ্ত পরিচয় কে নাই করে দেওয়া হচ্ছে! হিন্দুত্ববাদী, সেকুলার, আওয়ামীকরণ যেভাবে পাবলিক মেমোরিতে ধাক্কা দিচ্ছে আজ মনে হচ্ছে একাত্তর এর পূর্বে কোন ইতিহাস-ই নাই! (এ বয়ানটির অধিকাংশ বিষয় সাংস্কৃতিক ভাবেই সামনে এনেছে, তুলে ধরেছে এবং আজ ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। উপন্যাস, সিনেমা, নাটক, বছরে বহু দিবস উদযাপন, কনসার্ট, স্থাপত্য ইত্যাদির মাধ্যমে।)</p>
<blockquote><p>♦ ইন্ডিয়ার প্রোপাগান্ডার বাহিরে, মিডিয়ার পরিকল্পিত প্রচারণার বাহিরে আজ কেউ কিছুই চিন্তা করতে পারে না! যান্ত্রিক নগরবাস, প্রাণহীন গ্রাম সবমিলিয়ে যুবক শিশুমন জানেনা তাদের সত্যিকারের পরিচয় কী! তাদের সংস্কৃতি কী!</p></blockquote>
<p><strong>আর এভাবে চলতে থাকলে আত্মপরিচয় সংকট সাংস্কৃতিক সংকট আরো বাড়তেই থাকবে এবং বাড়তেই থাকবে। </strong></p>
<blockquote><p>চিন্তা করুন তো গোটা মুসলিম যুব সম্প্রদায়ের এই অবস্থা এর পিছনে কোন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রপাগান্ডা বা উদ্দেশ্য কি নেই?<br />
কতটা ভয়াবহ ভাবে শেষ করা হচ্ছে &#8216;আগামী প্রজন্মের প্রাণসত্তাকে&#8217; সেটা কি আমরা ভাবতে পারছি?</p></blockquote>
<p>তাই, উপরের উৎসবের নাম্বার এর আলোকে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাইছি,</p>
<p><em><strong>• ১নং উৎসবের আলোকে যদি ঈদ ও রমজানের রুহানিয়্যাতের হাওয়া যদি সেই মুসলিম সভ্যতার আলোকে যদি এখনো বয়ে যেতো, সেভাবেই চতুর্মুখী সামাজিক সুঘ্রাণ ছড়াতো, সেভাবেই সাংস্কৃতিক বলয় সৃষ্টি হতো। তাহলে শিশু, যুব ও নারীসম্প্রদায় কি আদৌও পাশ্চাত্যের ন্যায় ফেসবুকীয় সেল্ফিত্বের আনন্দ খুঁজে বেড়াতো?</strong></em></p>
<p><em><strong>• ২নং উৎসবের ন্যায় শহরজুড়ে যদি এভাবেই গুছালো, পরিছন্ন ও আধ্যাত্মিক ডেকোরেশন হতো তাহলে হিন্দুত্ববাদী বৈশাখী প্যাঁচা ও বস্তুবাদী ধারায় নিজেদের বিলিয়ে দিতাম? আকল, দৃষ্টি, মনন কি আমাদের ভোগবাদীতার দিকে ধাবিত করতো?</strong></em></p>
<p><em><strong>• ৩নং উৎসবের আলোকে মুক্তির জন্য দিবসটিকে ব্যাপকভাবে সামনে আনা হতো, চিন্তাকে তুলে ধরা হতো, তাহলে আমাদের সংগ্রামী চেতনার বলয় কতটা অগ্রসর হতো চিন্তা করতে পারেন?</strong></em></p>
<p><strong><em>• ৪নং উৎসবের আলোকে মক্কার সত্যিকার চেতনাদীপ্ত শ্লোগান, উৎসবমুখর পরিবেশ, বিজয়দীপ্ত কবিতা ও গানের কনসার্ট যদি সারাদেশে ব্যাপকভাবে পালন হতো, তাহলে কি থার্টি ফাস্ট নাইটে গোটা সমাজ বিলীন হতো? বিজয়ের এই কর্মসূচি গুলো যুবকদের আত্নবিশ্বাসকে কতটা পাহাড়সম করতো তা কখনো ভেবে দেখেছি কি?</em></strong></p>
<p>• <em><strong>৬নং উৎসবের আলোকে যদি কুদুস ব্যাতীত মুসলিম জনপদগুলো মুক্তি অসম্ভব ও মানবতার মুক্তির চিন্তা, কুদুসকে কেন্দ্র করে মেরাজের রাতে যেভাবে সকল নবীরা একত্রিত হয়েছিলেন আমরাও এই কুদুসকে কেন্দ্র করে গোটা উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হবো। এসকল চিন্তা নিয়ে, গুরুত্ব নিয়ে সেমিনার, কনফারেন্স করলে, রাতে দারসের আয়োজন করলে যুবসমাজের চিন্তার পর্যায় কোথায় পৌছাতো, তা একটু অনুভব করলেই বুঝা যায়।</strong></em></p>
<p>• <em><strong>সিরাতুন্নবী, মিলাদুন্নবী এসকল কর্মসূচির গুরুত্ব, যুবমননে এর ইফেক্ট সম্পর্কে আমরা সবাই কি অবগত নই?</strong></em></p>
<blockquote><p>(এসব বিষয় নিয়ে অনেক গ্রুপ ভণ্ডামি করে! তাই কথিত সালাফিরা সেই ভণ্ডামি হাইলাইট করে সব হারাম বানিয়ে দেয়! প্রশ্ন হলো ভন্ডরা তো আক্বিদা নিয়ে, সুন্নাত নিয়েও বাড়াবাড়ি, ভন্ডামি করে! তখন কি আক্বিদা, সুন্নতকে আপনারা ছেড়ে দেন?<br />
শুধু ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখে যদি সংস্কৃতিক বিশাল অংগনকে, উৎসবকে হারাম বানিয়ে তা বাদ দিয়ে দেন! সেটা কি বাড়াবাড়ি নয়?)</p></blockquote>
<p>আবারো তাই প্রশ্ন করছি <strong>উপরোক্ত বিষয়গুলি থাকলে কি মানুষ, যুবকরা তাদের চাহিদায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতি খুঁজতো?</strong><br />
<em>রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যক্তিরা থার্টি ফার্স্টনাইট, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, বার্থডে, অনৈতিক কনসার্টের মধ্য দিয়ে যুব সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতো বা এসবকেই নিয়ন্ত্রণের পন্থা মনে করতো?</em><br />
অথবা আমাদের আলেমদের ফাতোয়া দিয়ে এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরোধীতা কর‍তে হতো?</p>
<p>কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করতে না পারলে, ভিত্তি সম্পর্কে না জানলে, বিকল্প না দিতে পারলে, সত্যিকারের ইতিহাস না জানানো হলে কখনোই সমাধান সম্ভব না।<br />
ব্রিটিশরা কিন্তু আমাদের অঞ্চলে এই কাজটাই করেছিল।</p>
<p><em><strong>যেমন- জহির উদ্দিন বাবর, ইলতুৎমিশ ২০% মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে গোটা উপমহাদেশ চালিয়েছেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল এই সাংস্কৃতিক বলয়, এই উৎসব গুলো। ব্রিটিশরা এসে যখন দেখল কোনভাবেই জনগণ থেকে ইসলামের প্রাণসত্তাকে সরানো যাচ্ছেনা, বলয়কে নষ্ট করা যাচ্ছেনা, তখন তারা বুঝতে পারলো শুধু জ্ঞান, ক্ষমতা, অর্থনীতি, নষ্ট করলেই হবেনা বরং বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করতে হবে। তাই তারা বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্রদের দিয়ে মিরাজ, মিলাদুন্নবী ইত্যাদির বিপরীতে স্বরস্বতী, হলি, দেওয়ালী উৎসবকে ব্যাপকভাবে হাইলাইট করতে শুরু করলো, মক্কা বিজয় দিবসের দিন থার্টি ফার্স্টনাইট জাতীয় ভোগবাদী উৎসব নিয়ে আসে..</strong></em></p>
<p>আজও সেই ধারা শক্তিশালী ভাবে বিদ্যমান রয়েছে আমাদের সমাজে! আর এতে কি বৃটিশদের ফতোয়ায় প্রয়োজন হয়েছে?</p>
<p>এজন্য দৃঢ়ভাবে বারবার বলা যায়, <em><strong>এ ধরনের ধারা তৈরি তথা ইসলামী সংস্কৃতিক ভিত্তির উপর ভিত্তি করে বিকল্প না দিতে পারলে, শুধুমাত্র ফতোয়া দিয়ে কখনোই পাশ্চাত্যকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এজন্য ফতোয়া বা বিদাআতী বিধান পড়ার আগে আমাদের ইতিহাস, হিউম্যান সাইকোলজি, সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করা বেশি জরুরি।</strong></em></p>
<blockquote><p>সবচেয়ে বড় কথা হল সবকিছু হারাম/বিদায়াত বানিয়ে, ফতোয়া দিয়েই কি দায়িত্ব শেষ? হালাল উৎসব পালনের উদ্ভাবনী শক্তি কি আমাদের আছে, কিংবা তার জন্য কখনো প্রচেষ্টা চালাই?</p></blockquote>
<p>মুসলিম সংস্কৃতি কি বুঝবোনা! নিজস্ব ভিত্তি বিনির্মানের চিন্তাও করবোনা! পাশ্চাত্য হিন্দুত্ববাদের মোকাবেলায় বিকল্প তৈরি করবোনা!<br />
তখন যুবকদের কি করণীয় থাকবে আকল দিয়ে একটু ভেবে দেখি তো।<br />
নিজস্ব ভিত্তি উপস্থাপন এবং আমাদের নিজস্ব ক্ষেত্র তৈরি, আমাদের করণীয় এসব না দিলে <strong>শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়া দিয়ে কখনোই সংস্কৃতি চলেনা।</strong></p>
<p>এসবের মধ্যে দিয়ে তাই স্পষ্টতর হয়, এই ধারা সৃষ্টি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মধ্যেই একটা জাতির ঐতিহ্যগত বয়ান তৈরি হয়, এসবের মধ্যেই জাতির ভবিষ্যৎ পথযাত্রা, নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি চেতনা, সবই ফুটে ওঠে।</p>
<blockquote><p><strong>(লিখিত ইতিহাস যেমন শক্তিশালী, তেমনিভাবে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শক্তিশালী। লিখিত, চর্চিত, চিত্রিত, মুদ্রিত, কথিত, ঘটিত সকল কিছুই ফুটে উঠে এই উৎসব-আয়োজনে। দেখা, কাহিনী শুনা, পড়া সবকিছুই থাকে এই উৎসব গু্লোতে, যা সবার হৃদয়ে সামগ্রিকভাবে গেঁথে যায়।)</strong></p></blockquote>
<p>তাই সামগ্রিক অবস্থান থেকে আমাদের সবথেকে জরুরি বিষয় হচ্ছে,</p>
<p><strong>• ইসলামী সংস্কৃতির উসূল তথা নিজস্ব ভিত্তি সমুহ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা। ভাষা শিক্ষা করা, তারপর ইসলামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের বড়বড় শিক্ষকদের নিকটে পড়া.</strong>.<br />
এরপরে ইসলামী সংস্কৃতির মুলনীতির উপর পাণ্ডিত্য অর্জনকারীরা বর্তমান দুনিয়া, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভিত্তিকে ভালভাবে বুঝে পর্যাপ্ত গ্রন্থ, ছাত্র তৈরি করা। সেমিনার, কনফারেন্স, প্রেজেন্টেশন দেওয়া। এসব মুলনীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিটি সময়ের আলোকেই ভিত্তি রচিত হবে।<br />
ধারাবাহিতা রক্ষার জন্য ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা, ইসলামী সংগঠনের মাধ্যমে এই কর্মসূচিগুলোকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা, সকল পর্যায় হতে প্রচারণা চালানো।<br />
আর এসব চিন্তা ও কাজের মধ্যে দিয়েই ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড (উৎসব, মুভি, মিউজিক ইত্যাদি) ও নিজস্ব ধারা তৈরি হতে থাকে; ইহাই প্রাকৃতিক নীতি।<br />
•<strong> নিজেরা শক্তিশালী হওয়া। যেকোন সভ্যতা-ই প্রভাবশালী শক্তি ও বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হওয়ার আগে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী হওয়ার দিকে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।</strong> তার সবথেকে বড় উদাহরণ হচ্ছে, ইসলামী সভ্যতা। একইভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতাও যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, তারাও ইন্ড অফ দ্যা হিস্ট্রির(ইতিহাসের সমাপ্তি, আমরাই স্থায়ীভাবে দুনিয়ার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলাম) মতো শতশত গ্রন্থ প্রণয়ন করেছে! নিজেরা উজ্জিবিত হয়েছে।<br />
<em><strong>এসব নিজস্ব উপকরণের মধ্য দিয়েই নিজেদের আত্মবিশ্বাস, কর্মতৎপরতা, নিবেদিত হয়ে সভ্যতা বিনির্মাণের কাজ করার বিশাল প্রজন্ম গড়ে ওঠে।</strong></em><br />
<em><strong>এভাবে নিজেদের শক্তিশালী দেয়াল গড়ে উঠে, এবং স্বাভাবিকভাবেই জাহিলিয়্যাতের মোকাবেলা হয়ে যায়।</strong></em></p>
<p>এসকল মূলনীতির আলোকেই আবার সেই স্বর্নালী সভ্যতার সূর্যোদয় হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/our-contemporary-culture-and-festivals-islamic-civilization-in-context/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6080</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আল কোরআনের আলোকে কথা বলার আখলাক </title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-manners-of-speaking-in-the-light-of-the-quran/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-manners-of-speaking-in-the-light-of-the-quran/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 23 Apr 2021 12:22:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আল কোরআনের আলোকে কথা বলার আখলাক]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4836</guid>

					<description><![CDATA[মহাগ্রন্থ আল কোরআন আমাদেরকে কথা বলার আখলাক, কথার মাধুর্যতা সম্পর্কে খুব সুন্দর একটি ফ্রেম এঁকে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সেটাকে ভুলে গিয়ে ডিজিটাল দুর্গ বানিয়েছি এবং সেটা নিজেদের জন্য আত্মরক্ষার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে, সোস্যাল মিডিয়ার একাউন্ট সমূহ থেকে আমাদের কি-বোর্ডের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহাগ্রন্থ আল কোরআন আমাদেরকে কথা বলার আখলাক, কথার মাধুর্যতা সম্পর্কে খুব সুন্দর একটি ফ্রেম এঁকে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সেটাকে ভুলে গিয়ে ডিজিটাল দুর্গ বানিয়েছি এবং সেটা নিজেদের জন্য আত্মরক্ষার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে, সোস্যাল মিডিয়ার একাউন্ট সমূহ থেকে আমাদের কি-বোর্ডের বাটন সমূহকে একে অপরের কালবে গুলি ছোঁড়ার মত করে ব্যবহার করছি।</p>
<p><strong>আমরা আমদের কালবকে এবং পেটকে হয়ত রোজা রাখাতে পেরেছি, কিন্তু আমাদের মুখকে এবং হাতের নখকে রোজা রাখাতে পারিনি। এই বিষয়কে সামনে রেখে আজকে আমি কথা বলার আদব বা আখলাক নিয়ে আলোচনা করতে চাই। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কোরআনে মূলত কথা বলার আখলাক আমাদেরকে বুঝানোর জন্য; &#8216;আখলাক&#8217; নামক একটি সূরা রয়েছে, যার নাম সূরা-হুজুরাত । সূরা-হুজুরাত, আমাদের প্রিয় নবীর সামনে, বিখ্যাত আরব গোত্র বনী তামিমের সাথে সাহাবাদের মধ্য থেকে কয়েকজন কবি ও বক্তা সাহাবীর মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি বিতর্ককে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছিল। রাসূলে করীমের সেই বিখ্যাত বাণী,  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কোন কোন কথা কতই না যাদুকরী। ( বুখারী, নিকাহ, ৪৭; তিব্ব, ৫১; তিরমিজি, বিরর, ৮১; আবু দাউদ, আদব, ৯৬) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই কথা বলে যে আশ্চর্যতা প্রকাশ করেছিলেন, সেটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই সূরা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> সূরা হুজুরাত, আমাদেরকে কথা বলার আখলাককে শেখানোর জন্য নাযিল হয়েছে। এই সূরা একই সাথে সকল মানুষের একই মূল থেকে, একই মাটি থেকে, একই মা-বাবা, একই সৃষ্টি থেকে আসা সকলের জন্য বিশ্বজনীন এক ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দেয়। আবার একই সাথে ঈমানী ভ্রাতৃত্বের কথাও ঘোষণা দেয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সূরার ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি৷ তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো৷ একে অপরের অধিকারকে যেন চিনতে পারো। একে অপরের সাথে যেন মারেফত এবং জ্ঞানের আদান প্রদান করতে পারো এই জন্য। ( সূরা হুজুরাত, ১৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই সুরায় বর্ণিত অপর একটি ভ্রাতৃত্ব হল, ঈমানের ভ্রাতৃত্ব।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">اِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ اِخْوَةٌ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মু&#8217;মিনগণ হল পরস্পর ভাই ভাই। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَاَصْلِحُوا بَيْنَ اَخَوَيْكُمْ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যদি তাই হয়, তাহলে তোমাদের সকলের কর্তব্য হল, মু&#8217;মিনদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বকে ঠিক করে দেওয়া, মু&#8217;মিনদের মধ্যকার সম্পর্ককে জোড়া লাগিয়ে দেওয়া। (সূরা হুজুরাত, ১০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই আয়াতটিও এই একই সুরার।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এই সূরা একই সাথে সৃষ্টিগত দিক থেকে সৃষ্ট হওয়া ভ্রাতৃত্ব এবং একই সাথে আমাদেরকে ভাইয়ে পরিণতকারী ঈমানী ভ্রাতৃত্বকে বিনষ্টকারী সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি  সেই মূল বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে। এই কারণে এই সূরাকে সূরাতুল আখলাক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই অর্থে এই অধিকারকে বিনষ্টকারী ৭ টি  জঘন্য খারাপ  বিষয়কে কোরআন খুবই গুরুত্বের সাথে এই সূরায় উল্লেখ করেছে। সেগুলো হল, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong> ১।</strong> لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ  তথা একে অপরকে বিদ্রুপ করো না, সাবধান এক গোষ্ঠী যেন অপর কোন গোষ্ঠীকে বিদ্রুপ না করে। (হুজুরাত, ১১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম৷ </span></p>
<p><strong>২। </strong><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">تَلْمِزُٓوا</span> <span style="font-weight: 400;">اَنْفُسَكُمْ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একে অপরকে অপমানিত করবে না। ( হুজুরাত, ১১)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একে অপরকে ছোট করে দেখবে না। একে অপরকে নিচু করে দেখবে না। </span></p>
<p><strong>৩। </strong><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">تَنَابَزُوا</span> <span style="font-weight: 400;">بِالْاَلْقَابِۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পরস্পরকে খারাপ উপাধি ধরে ডেকো না। (হুজুরাত, ১১) পছন্দ করবে না এমন নামে ডেকো না। </span></p>
<p><strong>৪। </strong><span style="font-weight: 400;">اجْتَنِبُوا</span> <span style="font-weight: 400;">كَث۪يراً مِنَ الظَّنِّۘ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে খারাপ ধারণা করো না, খারাপ ধারণা থেকে বিরত থাকো। (হুজুরাত, ১২) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>৫।</strong> </span><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">تَجَسَّسُوا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একজন আরেক জনের দোষ অন্বেষণ করো না। একে অপরের বিরুদ্ধে  গোয়েন্দাগিরি করো না। (হুজুরাত, ১২) </span></p>
<p><strong>৬। </strong><span style="font-weight: 400;">وَلَا</span> <span style="font-weight: 400;">يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضاً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একে অপরের গীবত করো না। (হুজুরাত, ১২) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এবং গীবতের আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মত খারাপ একটি বিষয়ের সাথে তুলনা করেছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>৭।</strong> </span><span style="font-weight: 400;">اِنْ جَٓاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُٓوا</span><span style="font-weight: 400;"> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে সেটাকে ভালোভাবে যাচাই না করে গ্রহণ করো না। তা না করলে; পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে৷ এই কথা বলা হয়েছে। (হুজুরাত, ৬) </span></p>
<p><strong>কোরআনে কথা বলার আখলাক সম্পর্কিত আয়াত সমূহ শুধুমাত্র সূরা হুজুরাতেই আলোচিত হয়নি। সমগ্র কোরআনেই উল্লেখিত রয়েছে এবং কোরআনে কথার আখলাক সম্পর্কিত  আয়াত সমূহকে যদি একত্রিত করি তাহলে অসাধারণ একটি চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠে। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>১। &#8220;কাওলুল হাসান&#8221; তথা সুন্দর কথা।</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মু&#8217;মিন সুন্দর কথার অধিকারী। যখন কথা বলবে উত্তম কথা বলবে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলো। (সূরা বাকারা, ৮৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এমনকি এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন বনী ইসরাইলের নিকট থেকে অঙ্গীকার নেওয়ার সময় ঈমানের, ইবাদতের এবং আখলাকের মূলনীতির সাথে একত্রে উল্লেখ করেছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলবে। (বাকারা, ৮৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি আয়াতে খারাপ কথা বা &#8216;কাওল-উ সু&#8217; উল্লেখ বলা হয়েছে। কাওল-উ হাসানার বিপরীত হল কাওলু সু&#8217;উ বা খারাপ কথা যা আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় কথা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">لَا يُحِبُّ اللّٰهُ الْجَهْرَ بِالسُّٓوءِ مِنَ الْقَوْلِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বলা হয়েছে, আল্লাহ খারাপ কথাকে পছন্দ করেন না। </span></p>
<p><strong>২। &#8220;কাওলু আদল&#8221; তথা আদালত পূর্ণ কথা। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَاِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যখন কথা বলবে তখন আদালতপূর্ণ তথা ন্যায্য কথা বলো। (আনআম, ১৫২) </span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">যখন কথা বলবে তখন তোমাদের কথা যেন আদালত পূর্ণ হয়। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, <em>কথার আদালত হল, ভারসাম্যপূর্ণ কথা। সকল ধরণের চরমপন্থা থেকে বিরত থাকা।</em> আদালত পূর্ণ কথার বিপরীতে পরিত্যাজ্য এক প্রকারের কথা রয়েছে; আর সেটাই হলঃ &#8220;কাওলু যুর&#8221;। কাওলু যুর হল, হাকিকত-বিহীন কথা বার্তা। গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বলা সকল কথার অপর নাম হল কাওলু যুর। </span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِۙ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এমনকি তাগুত থেকে, মূর্তি থেকে বিরত থাকার মত গুজব ও মিথ্যা থেকে কাওলু যুর থেকে দূরে থাকো। আল্লাহ আমাদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা হজ্জ, ৩০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>৩। &#8220;কাওলু সাদিদ&#8221; ভারসাম্যপূর্ণ, সঠিক কথা বলা।</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا قَوْلاً سَد۪يداًۙ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমরা সঠিক কথা বলো (আহযাব, ৭০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমাদের কথা যেন হক্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। তোমাদের কথা যেন সঠিক হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ভারসাম্যপূর্ণ, সত্য এবং ইনসাফপূর্ণ কথা বলার নাম হল কাওলু সাদিদ। অন্যদের সম্পর্কে সকল প্রকারের ইশারাপূর্ণ এবং গোপন অর্থ থেকে, সন্দেহ থেকে মুক্ত ভাবে কথা বলা হল কাওলু সাদিদের অধিকারী হওয়া। সত্যকে অতিরঞ্চিত না করে আবার কোন ধরণের কমতি না রেখে যে রকম আছে সেভাবেই পৌঁছে দেওয়া। এর বিপরীতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন অন্য আয়াত সমূহে, বক্রতাপূর্ণ কথা থেকে দূরে থাকার জন্য আদেশ দিয়েছেন এবং সেটাকে কাওলু লাহন বলা হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আর <strong>কাওলু লাহন</strong> হল, নিফাকের মধ্যে নিমজ্জিত মানুষদের কথা বার্তা সমূহ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ ف۪ي لَحْنِ الْقَوْلِۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হয়েছে, তুমি তাদের বক্রতা পূর্ণ কথা থেকেই বুঝতে পারবে। (মুহাম্মদ, ৩০) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য এক প্রকারের কথার ধরণ হল, কাওলু যুখরুফ, অন্যদেরকে শুধুমাত্র প্রভাবিত করার জন্য বলা চমকপ্রদ কথা-বার্তাকে কাওলু যুখরুফ বলা হয়েছে। কাওলু যুখরুফ এবং কাওলু লাহন বলতে বক্রতাপূর্ণ কথা বার্তা এবং চমকপ্রদ কথা সমূহ থেকে দূরে থেকে বিশেষ করে কাওলু সাদিদ এবং সঠিক কথা বলার নির্দেশ দেয়, মহাগ্রন্থ আল কোরআন। </span></p>
<p><strong>৪। &#8220;কাওলু লায়্যিন&#8221; তথা কোমল কথা। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;"> কাওলু লায়্যিনের আয়াত, বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে আল্লাহর দ্বীনের মালিকের (নাউযুবিল্লাহ) মত আচরন করেন এবং এই সকল পয়েন্টে চরমপন্থায় নিপতিত হয়ে থাকেন এই ধরণের মানুষদেরকে আশ্চর্যাবস্থায় ফেলে দেওয়ার মত একটি আয়াত। কারণ এই আয়াত দুইজন বড় নবী, হযরত মুসা এবং হযরত হারুন (আঃ) কে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জালেম ফেরাউনের নিকটে পাঠানোর সময় আমাদের রব তাদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَقُولَا لَهُ قَوْلاً لَيِّناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হচ্ছে, তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো। (তাহা, ৪৪)</span></p>
<blockquote><p><span style="font-weight: 400;">বিখ্যাত জালেম শাসক, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ একদিন খুতবা দেয়। সে খুতবা দেওয়ার সময় এক আলেম উঠে দাঁড়ান এবং তাকে খুব কঠিন ভাষায় সমালোচনা করেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সে যে কত বড় জালেম এই কথা বলতে গিয়ে ঐ আলেম একটু গালি দেওয়ার মত করে কথা বলেন। বর্ণিত হয়েছে, জালিম হাজ্জাজ সেই আলেমকে লক্ষ্য করে বলেনঃ এই ভাই! আমি তো আর ফেরাউনের চেয়ে বেশী খারাপ না। আর তুমিও মুসা এবং হারুনের চেয়েও বড় না। আল্লাহ মুসা এবং হারুনকে পর্যন্ত ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় বলে দেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَقُولَا لَهُ قَوْلاً لَيِّناً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তোমরা তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো </span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">তাই, কোমল কথা, এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। </span></p>
<p><strong>৫। &#8220;</strong><span style="font-weight: 400;"><strong>কাওলু কারিম&#8221; হল মন জয় করার মত করে কথা বলা। সম্মানজনক কথা। বীরত্বপূর্ণ কথা।</strong> </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাওলু কারিম হল, সন্তানগণ যখন তাদের পিতা-মাতার সাথে কথা বলবে তখন কিভাবে কথা বলবে সেটার পন্থা সম্পর্কিত। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَر۪يماً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পিতা-মাতার সাথে কথা বলার সময় মর্যাদা সহকারে কথা বলো। তাদের মন জয় করার মত করে কথা বলো, সম্মান জনক ভাবে কথা বলো। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">فَلَا تَقُلْ لَهُمَٓا اُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাহলে তাদেরকে “উহ্‌” পর্যন্তও বলো না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না। </span></p>
<p><strong>৬। &#8220;কাওলু মারুফ&#8221; হল জ্ঞান ভিত্তিক, ইতিবাচক, উপকারী, গঠনমূলক, মাকবুল এবং যথোপযুক্ত কথার নাম। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَعْرُوفاً</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, তাদের সাথে উত্তমভাবে কথা বলো। (সূরা নিসা, ৫)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এর বিপরীতে অন্যান্য আয়াতেও মারুফ কথার বিপরীত মুনকার কথা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অশ্রাব্য, খারাপ কথা বুঝানোর জন্য কাওলু মুনকার ব্যবহার করা হয়েছে । আর সেটা হল হাকিকতের পাল্লায় যার কোন মূল্য নেই এমন খারাপ কথা এবং বিশেষ করে যারা নিফাকির মধ্যে রয়েছে তাদের কথা বলা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে আমি একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কাওলু মারুফ বিশেষ করে পরিবারের ব্যাপারে স্বামীগণ তাদের স্ত্রী গণের প্রতি এবং স্ত্রীগণ তাদের স্বামীদের প্রতি ব্যবহার করবেন। এটার নাম হল কাওলু মারুফ এবং কথা বলার সময় মুনকার থেকে দূরে থাকবে। কারণ, এই আয়াত সমূহ জাহেলি যুগে মহিলাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কথা ও আচরণ সমূহকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য আমাদেরকে পথ প্রদর্শনকারী আয়াত সমূহে এই সকল কথা উল্লেখ করা হয়েছে। </span></p>
<p><strong>৭। কাওলু মাইসুর; </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাওলু মাইসুর হল, নরম সুরে বলা স্বস্তিদায়ক কথাকে কাওলু মাইসুর বলা হয়। বিশেষ করে কাওলু মাইসুর, ধনী ও বিত্তশালী লোকদের দরিদ্র মানুষের প্রতি, ঋণ গ্রহীতার সাথে ঋণ দাতা যেভাবে কথা বলবেন তার নাম হল কাওলু মাইসুরা। তারা যদি কোন আবেদন নিয়ে আসে তাহলে তাদের সাথে নরমভাবে কথা বলবে। তাদের উপর জোর জবরদস্তি করবে না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">قُلْ لَهُمْ قَوْلاً مَيْسُور</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হয়েছে, অন্তত তাদের সাথে নরম সুরে কিছু বলো। (সূরা বনী ইসরাইল ২৮) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই আয়াতটি, সূরা বাকারায়ও মহান আল্লাহ বলেনঃ হে ইমানদারগণ! দরিদ্রদেরকে কষ্ট দিয়ে ও খোঁটা দিয়ে তোমাদের সাদাকাকে নষ্ট করো না। (বাকারা, ২৬৪) এই কথা বলার পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন কাওলু মারুফকে এখানেও ব্যবহার করেছেন, কাওলু মাইসুরের সাথে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ হয়েছে, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">قَوْلٌ مَعْرُوفٌ وَمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِنْ صَدَقَةٍ يَتْبَعُهَٓا اَذًىۜ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মারুফ, মন জয়কারী একটি কথা এবং কোন অপ্রীতিকর ব্যাপারে সামান্য উদারতা ও ক্ষমা প্রদর্শন এমনি দানের চেয়ে ভালো, যার পেছনে আসে দুঃখ ও মর্মজ্বালা ৷ (সূরা বাকারা, ২৬৩) </span></p>
<p><strong>৮। কাওলু তায়্যিবঃ পবিত্র কথা । </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কালিমায়ে তায়্যিবা, যদিও কালেমায়ে তাওহীদের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবুও এই আয়াতের অর্থ অনেক ব্যাপক। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আয়াতেও উত্তম কথা বলাকে এমন একটি গাছের সাথে তুলনা করেছেন যার মূল মাটির গভীরে প্রোথিত, এবং শাখা প্রশাখা সমূহ আকাশে পৌঁছে গেছে, এবং যার ফল সমূহ সব সময় ভক্ষণ করা যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ &#8211; تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا ۗ  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">(সূরা ইব্রাহিম ২৪-২৫) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু খারাপ কথার উদাহরণও এমন যার কোন ফল নেই, কোন উপকার নেই, পাতা এমন কি কোন মূলও নেই, গন্ধহীন এবং মাটির উপরে নিক্ষিপ্ত একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَب۪يثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَب۪يثَةٍۨ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْاَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَار</span></p>
<p><strong>অন্যদিকে মন্দ কথার উপমা হচ্ছে, একটি মন্দ গাছ, যাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে দূরে নিক্ষেপ করা হয়, যার কোন স্থায়িত্ব নেই৷ (সূরা ইব্রাহিম- ২৬)</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এরকম একটি পয়েন্টে, বিশেষ করে যারা মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের রহমতের দিকে আহবান করেন, আল্লাহর দ্বীনকে মানুষের নিকট প্রচারকারী, নিজেদেরকে মুরশিদ হিসেবে পরিচয় দানকারী, নিজেকে উস্তাদ হিসেবে উপস্থাপনকারী ভাইদের কাছে, আমি নিজেকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বিশেষ করে যারা আমর বিল মারুফের দায়িত্ব পালন করেন, </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের নিকটে এবং যুবকদেরকে কাছে যারা দ্বীনকে তুলে ধরে থাকেন তারা যেন সবচেয়ে সুন্দর ভাষা ব্যবহার করেন, সবচেয়ে সুন্দর পন্থা যেন অবলম্বন করেন। সবচেয়ে সুন্দর কথা হল, সবচেয়ে ন্যায্য কথা, সবচেয়ে নরম কথা, কাওলু লায়্যিন, কাওলু আদল, কাওলু সাদিদ। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ভাষা, সম্মানজনক কথা, মন জয়কারী কথা, জ্ঞানভিত্তিক বাণী, মারুফ কথা, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কথা, সহজবোধ্য কথা এবং সবচেয়ে দয়াদ্রপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা মানুষকে শুধুমাত্র হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দান করতে বাধ্য। মহান আল্লাহ রাব্বুল আ&#8217;লামিন কতই না সুন্দর করে বলেছেন,  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَمَنْ اَحْسَنُ قَوْلاً مِمَّنْ دَعَٓا اِلَى اللّٰهِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করে তার কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে? (সূরা ফুসসিলাত, ৩৩) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইরশাদ, দাওয়াত এবং তাবলীগ কখনো দাম্ভিকতা পূর্ণ কথা দিয়ে হয় না। চিল্লা-পাল্লা করে মানুষকে কখনো দ্বীনের পথে ডাকা যায় না। মানুষকে ছোট করে ও নিচু করে দেখে তো মোটেই না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞাপন ও প্রোপাগান্ডার ভাষা, ইরশাদের (দাওয়াতের) ভাষা এক হতে পারে না। দাওয়াতের ভাষা হল দয়ার ভাষা, মারহামাতের ভাষা, ভালোবাসার ভাষা। আজ কোন আলেম উলামা যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় কথা না বলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বন্দপূর্ণ ভাষা দিয়ে মানুষকে কিভাবে আল্লাহর দিকে আহবান করা যেতে পারে? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ভাইয়েরা, আমর বিল মারুফের ভাষা কেবল মারুফই। মুনকার ভাষা দিয়ে কাওলু মুনকার কখনো আমর বিল মারুফ হতে পারে না। কাওলু লায়্যিনের অধিকারী হওয়া আবশ্যকীয়, যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুঝিয়ে থাকেন। মাটিতে পর্যন্ত আমাদেরকে আস্তে আস্তে পা রাখতে বলা হয়েছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَلَا تَمْشِ فِي الْاَرْضِ مَرَحاًۚ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একই ভাবে সুন্দর এবং সঠিক কথার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করতে আমরা বাধ্য। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">দৃঢ় চিত্তে হাঁটা, নরম ও ভদ্র ভাষায় কথা বলা বীরত্ব। নম্রতা কোন দুর্বলতা নয়, কোন খারাপ বিষয় নয় বরং গর্ব অহংকার মানুষকে নীচে নামিয়ে দেয়, নম্রতা মানুষকে মর্যাদাবান করে তুলে। মু&#8217;মিন তার মারহামাতপূর্ণ হৃদয়কে সকলের জন্য উম্মুক্ত করে দিতে বাধ্য। এটা আমাদের রবের আদেশ তার প্রিয় রাসূলের প্রতি। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যে কোরআনে কারীম কথা বলার আদবের দিকে এত গুরুত্ব দিয়েছে তা কি শুধুমাত্র মানুষের সাধারণ কোন আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে? </span></p>
<p><em><span style="font-weight: 400;">মূলত এগুলো হল মানুষের ব্যক্তিত্ত্বের বহিঃপ্রকাশের জন্য। কারণ কথা বলার পূর্বে নিয়ত রয়েছে। নিয়ত হল আমলের বীজ। কথার পূর্বে ইচ্ছা রয়েছে। কথার পূর্বে একটি চিন্তা রয়েছে। এরপরে রয়েছে কাজ, আমল এবং আচরণ। কথা একই সাথে নিয়ত এবং কাজের বহিঃপ্রকাশ। </span></em></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাসূল সঃ বলেছেনঃ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রত্যেক কাজের ফলাফল তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল। ( বুখারী, বাদাউল ওহী, ১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মূলত এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে, কথা নিজেই একটি আমল। যে সকল মানুষের কথার মধ্যে কোন মাধুর্যতা নেই তাদের কাজের মধ্যেও আখলাক এবং এসথেটিকস খুঁজে বেড়ানো বেহুদা কাজ। আল্লাহ যে সকল কালেমা ও নাম শিক্ষা দিয়েছে সেগুলো তার শিক্ষা দেওয়া বয়ানের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَعَلَّمَ اٰدَمَ الْاَسْمَٓاءَ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল্লাহ আদমকে সকল নাম শিখিয়েছেন। (বাকারা, ৩১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">اَلرَّحْمٰنُۙ ﴿١﴾ عَلَّمَ الْقُرْاٰنَۜ ﴿٢﴾ خَلَقَ الْاِنْسَانَۙ ﴿٣﴾ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ ﴿٤﴾</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বায়ানও তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন। ( রাহমান, ১-৫) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষ এমন ভাবে কথা বলবে তা যেন তার রবের শিক্ষা দেওয়া নামের তাজাল্লি গাহে পরিণত হয়। সুন্দর কথা হল; সুন্দর আচরণের ফলাফল।  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমি একটু আগে যে আয়াত পাঠ করেছি সেই আয়াতের ধারাবাহিকতায় তা রয়েছেঃ </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">وَقُولُوا قَوْلاً سَد۪يداًۙ يُصْلِحْ لَكُمْ اَعْمَالَكُمْ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সঠিক কথা বলো। আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ ঠিকঠাক করে দিবেন। (আহযাব, ৭০-৭১) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এগুলো একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। সুন্দর করে কথা বলুন, যেন আপনাদের আমল সালিহ হয়। আপনাদের আমল যেন সুন্দর হয় তাহলে কথাও সুন্দর হবে। শুধুমাত্র আমাদের হাত এবং পায়ের কাজ কর্ম সমূহকেই আমাদের আমলনামা সমূহে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে না। আমাদের মুখ যে কাজ করছে সেটাও কিন্তু একটা আমল। আমাদের আঙ্গুল সমূহ আমাদের কি-বোর্ডের উপর যা করে সেটাও কিন্তু একটি আমল। আমাদের মুখ থেকে নিঃসৃত প্রতিটি কথাকেই হাকিকতের পাল্লায় অবশ্যই মাপা হবে এবং ইলাহী রেকর্ডে রেকর্ড করে রাখা হচ্ছে। আমাদের মহান প্রভু বলেনঃ  </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَق۪يبٌ عَت۪يدٌ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ এবং কালেমা, আল্লাহর পাহারাদার ফেরেশতাদের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে ঐ সকল লিপিবদ্ধকৃত বিষয় সমূহকে আমল হিসেবে আমল নামায় লিপিবদ্ধ করা হয়। (ক্বাফ, ১৮) </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা একই বিশ্বাসের উত্তরাধিকারী, একই কিতাবে বিশ্বাসী মু&#8217;মিন, একই পয়গাম্বরের উম্মত, একই জাতি এবং একই ইতিহাসের সন্তান। তাই আসুন সকল ধরণের বিভাজনকে এক পাশে রেখে দিয়ে কথার আখলাককে সুন্দর করে নতুন একটি জীবন শুরু করি। এমন একটি বিপদপূর্ণ সময়ে অন্যান্য সময়ের মত এই সময়কেও রহমতে পরিণত করি। আমি বলেছিলাম যে, আসুন আমরা দুঃখকে আনন্দে, বঞ্চনাকে রহমতে পরিণত করি, মুহাসারাকে মুহাসাবাতে রূপান্তরিত করি। </span></p>
<p>অনুবাদঃ <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-manners-of-speaking-in-the-light-of-the-quran/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4836</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম সংস্কৃতিঃ বৈশিষ্ট্য ও ভিত্তি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/muslim-culture-characteristics-and-foundations/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/muslim-culture-characteristics-and-foundations/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[শাহ আব্দুল হান্নান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 05 Mar 2021 10:11:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4354</guid>

					<description><![CDATA[সংস্কৃতি ও অবক্ষয় এখন নতুন করে আলােচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এ নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তির কারণে বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি কী এবং এ দেশের সংস্কৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য কী, তা নিয়ে তর্ক ওঠে। ফলে সংস্কৃতির মূল বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা দূর করা বিশেষভাবে প্রয়ােজন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতি ও অবক্ষয় এখন নতুন করে আলােচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এ নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তির কারণে বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি কী এবং এ দেশের সংস্কৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য কী, তা নিয়ে তর্ক ওঠে। ফলে সংস্কৃতির মূল বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা দূর করা বিশেষভাবে প্রয়ােজন । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতি কী এবং কী নয়, এ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে ১০০ বছরের। এ বিতর্ক বেড়ে যায় মার্কসিজমের উত্থানের পর। মার্কসিজমের উত্থানের পর একটি নতুন দর্শন আসে Art for Life&#8217;s Sake নামে । তখন এ নিয়ে একটি বিতর্ক দেখা দেয় যে, Art for Art&#8217;s sake না Art for Life&#8217;s Sake? এ বিতর্ক আগে ছিল না। কমিউনিস্টরা এ বিতর্ক তুলে ধরেন । এটি করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করেছেন । আর্ট এখানে সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কৃতির ভেতর যে একটি সৌন্দর্য থাকতে হবে, তা তারা হাইলাইট করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন । তারা এটিকে পুরােপুরি উপেক্ষা করেছেন । অন্যদিকে, যারা &#8216;আর্ট ফর আর্টস সেক’-এর পক্ষে, তারাও এ ইস্যুকে রাজনীতিকায়ন করেছেন। তারা বলেন, আর্ট আর্টের জন্য। অর্থাৎ, এর মধ্যে সৌন্দর্য থাকতে হবে; সৌন্দর্যের চেতনা থাকতে হবে, যা কিছুই সুন্দর করে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করে জীবনের বিভিন্ন দিক, সাহিত্য ও শিল্পকলায়, তা-ই সংস্কৃতি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতির প্রশ্ন যদি আমরা বিচার করতে চাই তাহলে সেখানে দুটো দিকই থাকতে হবে। জীবনের জন্য তা প্রয়ােজনীয় হতে হবে। জীবনের জন্য হবে, জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। এর মাধ্যমে জীবনকেই ধারণ করতে হবে। এটিই সত্য কথা। অন্য দিকে এটি সত্য, যা কিছু সুন্দর নয় তা আর্ট বা সংস্কৃতি হবে না, তা জীবনের জন্য হলেও। কাজেই দুটি উপাদানই প্রয়ােজন: দু&#8217;টিই সত্য। এ বিতর্কের পরিসমাপ্তি প্রয়ােজন। তবে আমার মনে হয় বর্তমানে এর পরিসমাপ্তি কিছুটা হয়ে গেছে । মার্কসিজমের পতনের পর এ বিতর্ক আর খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। এ বিতর্ক ইসলামপন্থীদেরও দরকার নেই । ইসলামপন্থীদেরকেও সংস্কৃতির মধ্যে দু&#8217;টি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতির বিভিন্ন ডাইমেনশন আছে । যেমন- সঙ্গীত, সাহিত্য থেকে শুরু করে নাটক সিনেমা সব কিছুই সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে। আরেক দিক থেকে বলতে গেলে বলা যায়, মানুষের জীবনাচারই সংস্কৃতি। মানুষের পুরাে জীবনপদ্ধতিই সংস্কৃতি । সে হিসেবে, সংস্কৃতির অর্থ আরাে ব্যাপক।</span></p>
<p><strong>সংস্কৃতির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মৌলিকভাবে আমরা স্বীকার করি, সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। সংস্কৃতি পুরাে জীবনব্যবস্থার সাথেই সংশ্লিষ্ট। সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর যেমন অনেক দিক বা ডাইমেনশন রয়েছে, তেমনি সর্বোপরি, এটি জীবনকে সার্ভ করতে হবে। সৌন্দর্যকেও সার্ভ করতে হবে। আবারাে বলি, এটিকে সুন্দরও হতে হবে এবং জীবনের জন্যও হতে হবে। সংস্কৃতিকে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে।</strong></p>
<p>সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি <span style="font-weight: 400;">হচ্ছে <strong>বিশ্বাস</strong>। সুস্থ বিশ্বাসের ওপর সংস্কৃতিকে দাঁড়াতে হবে। যদি দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার (Corrupt Thought) ওপর সংস্কৃতি দাঁড়ায়, সে সংস্কৃতিও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। কারণ, বিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে । সংস্কৃতি হচ্ছে আচরণ । তার পেছনে রয়েছে বিশ্বাস । এ বিশ্বাস দুর্নীতিগ্রস্ত হলে আচরণও সে রকমই হবে। বিশ্বাস সুস্থ হলে সেটিও সুস্থ হবে।</span></p>
<p><strong>এখানে মুসলিম জাতির কথা বললে তার ভিত্তি অবশ্যই তাওহীদ হতে হবে। তাওহীদ বলতে আমরা বুঝি একজন স্রষ্টা রয়েছেন । সব সৃষ্টির একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা মানুষ; আল্লাহর প্রতিনিধি । আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার মিশনকে এ বিশ্ব, মহাকাশ সর্বত্র কার্যকর করা । এ জন্য মুসলিম সংস্কৃতিকে সবসময়ই শিরকমুক্ত হতে হবে। মুসলিম সংস্কৃতি এমন হতে হবে, যেন খলিফার মর্যাদা রক্ষা পায় । আল্লাহর যে প্রতিনিধি মানুষ, তার সাথে খাপ খায়। ইসলামের ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে তাওহীদ। তেমনি যদি আমরা ইসলামের বাইরে গিয়ে দেখি, তাহলে অমুসলিমদের মধ্যেও সুস্থ বিশ্বাস থাকতে হবে। </strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সেটি তাওহীদ না-ও হতে পারে। সেটি আমার দৃষ্টিতে সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে যা-ই হোক না কেন, যদি স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস থাকে, মানবতাবাদী হয়, তার ওপরেও যে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে সেটিও ভালাে হবে। মানবতার একটি অংশ মুসলিম। বাকি অংশ অমুসলিম। তাদের সংস্কৃতি ভাল হবে যদি তা সুস্থ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হয়। তাদের ক্ষেত্রে সেটি স্রষ্টার ওপর হতে হবে । যদি নাস্তিকতার ওপর হয়, তাহলে ক্ষতি হবে । যদি স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর ভিত্তিশীল হয়, তাহলে তা নাস্তিকতার চেয়ে অনেক ভালাে হবে, এতে কোনাে সন্দেহ নেই । সেটি যদি মানবতাবাদী হয়, তাহলে অবশ্যই ভালাে হবে । কিন্তু সেটি যদি জাতিপূজা বা গােত্রপূজা হয়, তাহলে সেটি হবে অসুস্থ সংস্কৃতি। তাহলে আমরা বলতে পারি, সংস্কৃতির জন্য সুস্থ বিশ্বাস লাগবে।</span></p>
<p><strong>সংস্কৃতির দ্বিতীয় ভিত্তি</strong><span style="font-weight: 400;"><strong> হলাে শালীনতা যা অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে</strong>। অবশ্য এটি প্রথমটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যদি সংস্কৃতি সুস্থ বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠে, তাহলে তা অশ্লীলতামুক্ত হবেই। কারণ কোনাে সুস্থ বিশ্বাসই বলে না, অশ্লীলতা ভালাে । এ সংস্কৃতি অবশ্যই মানবজাতির জন্য হতে হবে। সংস্কৃতিকে মানবজাতির মহৎ উদ্দেশ্য পূরণ করতে হবে। মার্জিত হতে হবে, মানবতাবাদী হতে হবে; কল্যাণধর্মী হতে হবে ।</span></p>
<p><strong>সংস্কৃতির তৃতীয় ভিত্তি</strong><span style="font-weight: 400;"><strong> হচ্ছে- সৌন্দর্য চেতনা।</strong> এখানে সুন্দরের চেতনা থাকতে হবে । কোনাে কিছুই অসুন্দর করা যাবে না। সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাজেই সার্বিকভাবে বলা যায়, </span></p>
<blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতির ভিত্তির জন্য একটি সুস্থ বিশ্বাস থাকতে হবে । মানবতাবাদীও মানুষের প্রয়ােজনে হতে হবে । অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে । কল্যাণধর্মী এবং সৌন্দর্য-চেতনামণ্ডিত ও সৌন্দর্য-বুদ্ধিমণ্ডিত হতে হবে।</span></p>
</blockquote>
<p><a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 577px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/01/Islami-orthoniti.jpg" height="95" /></a></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতি কি মানুষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত? নিয়ন্ত্রিত হলে কতটুকু? এটি আসলে ইয়েস ও নাে’র প্রশ্ন। এটি ঠিক যে, সংস্কৃতিকে মানুষ নির্মাণ করে। একা এক ব্যক্তিই সংস্কৃতি নির্মাণ করে না। অনেকে মিলে, অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সংস্কৃতি শত বছরে, হাজার বছরে গড়ে ওঠে। তাই যদি হয়, তাহলে এটি কে গড়ল? মানুষ গড়ল। কিন্তু কোনাে এক ব্যক্তি বা এক প্রজন্মের বা এক বংশের ওপর এর কোনাে নিয়ন্ত্রণ নেই। এ জন্যই আমি বিভিন্ন সময় বলে থাকি, সংস্কৃতি নিয়ে খেলা চলবে না। সংস্কৃতি মানুষের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত। এটি খুব স্পর্শকাতর বিষয়। সংস্কৃতি নিয়ে সতর্কতার সাথে এগােতে হবে। ইসলামপন্থীদের এ ব্যাপারটি ভালোভাবে বুঝতে হবে, আমার অনেক কিছু পছন্দ হবে না; কিন্তু সেটিকে সরাতে হবে ধীরে ধীরে। ধৈর্য ধরে সরাতে হবে। যেটি রাখলে চলে, সেটি রাখতে হবে। কারণ, ইসলামের শুরুতেই রাসূল (সা,), সরাসরি ইসলামবিরােধী নয় এমন স্থানীয় রাতিনীতি, আচার-আচরণকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরব আচার প্রথাকে মেনে নিয়েছিলেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইবনে তাইমিয়ার একটি বিখ্যাত ফতােয়া আছে, </span></p>
<blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">“যেকোনাে দেশের স্থানীয় কাস্টমস (রীতিপ্রথা) যদি সরাসরি ইসলামবিরােধী না হয়, একেবারে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে সেটি থাকবে”। </span></p>
</blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা এ ব্যাপারে অনেক সময় কিছুটা হঠকারিতা করে বসি; কিছুটা বাড়াবাড়ি করে বসি। এগুলাে থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। ইসলামের যে মহত্ত্ব, সামগ্রিকতা, ব্যাপকতা এবং বহু মত ও পথের সুযােগ আছে, সে বিষয়টি মনে রাখতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন মতামতকে মানতে হবে । এখানে বিভিন্ন মত ও পথের স্বীকৃতি আমাদের দিতে হবে । বিশ্বব্যাপী ইসলামের যে সংস্কৃতি, তার তাে একেক দেশে একেক সংস্করণ । ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী সংস্কৃতি রূপে রসে রঙ্গে একই সাথে ইসলামিক হবে, ইন্দোনেশিয়ানও হবে এবং এই দুইয়ের মধ্যে কোনাে দ্বন্দ্ব থাকবে না। সংস্কৃতির ভেতর যদি সুস্পষ্টভাবে ইসলামবিরােধী কোনাে মৌল উপাদান না থাকে তাহলে তা ইসলামী সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধা নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযােজ্য। তেমনিভাবে তা প্রযােজ্য মরক্কো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে। প্রত্যেকের নিজস্ব রঙ হবে। আমার মনে হয় এটি অনেকটা এ রকম হবে যে, একই বাগানে ১০০টি ফুলগাছ। এ বিষয়গুলাে ইসলামি সংস্কৃতি কর্মীদের ভেবে দেখা দরকার। এ বিষয়টি বিচার করে দেখা দরকার ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ অবস্থায় আগামী দিনগুলােতে সংস্কৃতি কতটুকু ভিন্ন থাকবে, বলা মুশকিল । আমার মনে হয়, সংস্কৃতির অনেক কিছু এক হয়ে যাবে। যেমন- পােশাক-পরিচ্ছদ বিশ্বব্যাপী ক্রমেই কাছাকাছি চলে আসতে পারে। এটি অসম্ভব নয় । স্বীকার করতে হবে, ইতােমধ্যেই পুরুষ পােশাকের ক্ষেত্রে শার্ট-প্যান্ট প্রায় এক হয়ে গেছে। যদিও নারী পােশাকের ক্ষেত্রে ঠিক অন্য রকম হয়েছে। মুসলিম বিশ্বে তাে নারীর পােশাক নানা-ভাবে অন্য রকমই রয়ে গেছে। ফলে আমি মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি এলেও যেসব ক্ষেত্রে এক হবে না, সেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন থেকে যাবে। যেমন- খাওয়া- দাওয়া, এর উপকরণাদি একেক জায়গায় একেক রকম থেকে যাবে। আবার প্রতিটি এলাকার নিজস্ব গানের সুর আলাদা থেকে যাবে। প্রতিটি এলাকার নিজস্ব প্রকৃতি, নদী, সমুদ্র, বন, ফসল ও মাঠ আছে । এর এক ধরনের আলাদা সুর আছে। সুতরাং গানে, সঙ্গীতে পার্থক্য থেকে যাবে। প্রতিটি এলাকার জনগোষ্ঠীর নিজস্বতার জন্য এবং অন্য জনগােষ্ঠী ও এলাকার ভিন্নতার জন্য সাহিত্যেও একটি পার্থক্য থেকে যাবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের অবশ্যই পরিকল্পিত সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে। &#8216;লা ইকরাহা ফিদ্দীন’-এর ভেতরও এ তাৎপর্য রয়ে গেছে। রাসূল (সা.) ইহুদীদের সাথে প্রথম চুক্তিতেই তাদের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা দিয়ে দিলেন। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিলেন । এটি প্রমাণ করে, সংস্কৃতিকে জোর করে বদলে দেয়া ইসলামও নয়, মানবতাও নয়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এখানে আগ্রাসনের ব্যাপারেও আমাদের এ দিকটি খেয়াল রাখতে হবে। পাশ্চাত্যের কালচার দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও বস্তুবাদের ওপর ভিত্তিশীল। বস্তুবাদ হলাে, ভােগবাদ ও স্বার্থপরতা। এ কারণেই কালচার খুব নােংরা হয়ে গেছে । কালচার নিছক নারী কেন্দ্রিক-ই শুধু নয়, নারীর অপব্যবহার কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার যে প্রবণতা, তা রুখতে হবে। এ জন্য পশ্চিমাদের মধ্যে যারা ভালাে তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে। পশ্চিমা বস্তুবাদ নাস্তিকতা না হলেও নাস্তিকতার কাছাকাছি। এর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এ বস্তুবাদ মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কৃতির বাইরে কোনাে মানুষ থাকতে পারে না। সমাজ হতে পারে না তাই মানুষের পক্ষে সংস্কৃতি বিমুখ হওয়াও সম্ভব নয় । কালচারের মূল দিক হচ্ছে জীবনাচার, পুরাে জীবন। প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি উচ্চারণ, বক্তব্য, চলাচল, ভ্রমণ, কথন সব কিছু হচ্ছে তার কালচার । আমরা খুব গভীরভাবে না দেখার কারণে গান-নাচকেই বড় ভেবে এসব বিষয়কে ছােট ভাবি । কিন্তু এগুলাে না থাকলেও একটি জাতির পক্ষে সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব। এগুলাে বাদ দিয়েও জাতি সংস্কৃতিবান হতে পারে অনেক জাতিই আছে, যাদের গান খুব পপুলার নয়, যাদের নাচ নেই, তাতে কিছু আসে-যায় না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা বিনােদনের নামে যা খুশি তাই করতে পারি না। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বিনােদন। এর প্রয়ােজন আছে। আধুনিক বিশ্বে বিনােদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের দৈনিক জীবনের একটি বড় অংশ রাস্তায় চলে যায়। তার সাথে অফিসের সময়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ ব্যস্ত। এ অবস্থায় তার জন্য অবশ্যই সুস্থ বিনােদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিনােদনকে সুস্থ হতে হবে; অসুস্থ হওয়া যাবে না। অশ্লীল হওয়া যাবে না। কু-স্বভাব সৃষ্টি করে, অপরাধ ছড়ায়, এমন কিছু করা যাবে না। খারাপ যা খুব কম ঘটে, তাকে নাটকে এনে জাতিকে জানাতেই হবে- তা আসলে জরুরি নয়। সাহিত্যের নামে যেটি করা হয় তা হলাে একটি পরিবারের দুর্ঘটনা পুরাে জাতিকে জানানাে হয় । কিন্তু তা যদি সুন্দর কিছু হতাে, তাও কথা ছিল ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আসলে বিনােদনের মধ্যে একটি সীমা থাকতেই হবে। সে সীমা থাকতে হবে আইন ও প্রথার মাধ্যমে। এ ব্যাপারে স্বাধীনতার নামে আমরা কদাচারকে অনুমােদন করতে পারি না। আমরা এমন স্বাধীনতা চাইনা, যে স্বাধীনতা মানুষকে অমানুষ বানায়।</span></p>
<p><strong>সূত্রঃ</strong> বিআইআইটি কর্তৃক প্রকাশিত <em>&#8220;উন্নত চিন্তা, মহৎ জীবন, আদর্শ সমাজ&#8221;</em> গ্রন্থ।</p>

<p class="wp-block-paragraph">&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/muslim-culture-characteristics-and-foundations/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4354</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
