<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>ইতিহাস &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/civilization/history/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Mon, 17 Aug 2026 11:49:53 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>ইতিহাস &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>আধুনিক দাস তথা শ্রমিকদের প্রতি আলী শরীয়তির চিঠি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ali-shariatis-letter-to-modern-slaves-aka-workers/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ali-shariatis-letter-to-modern-slaves-aka-workers/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. আলী শরীয়তী]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 08 Jun 2026 14:39:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16868</guid>

					<description><![CDATA[মিশর সফরে গিয়ে আমি পিরামিডগুলো পরিদর্শন করেছিলাম। পিরামিড দেখার সময় আমি গভীর আগ্রহ ও উৎসাহের সঙ্গে গাইডের কথাগুলো শুনছিলাম। গাইডটি বলছিলেন, এই পিরামিডগুলো নির্মাণের জন্য অসংখ্য দাসকে দূর-দূরান্ত থেকে কোটি কোটি পাথর পরিবহণ করতে হয়েছিলো। আর এসব পাথর বহন করা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>মিশর সফরে গিয়ে আমি পিরামিডগুলো পরিদর্শন করেছিলাম। পিরামিড দেখার সময় আমি গভীর আগ্রহ ও উৎসাহের সঙ্গে গাইডের কথাগুলো শুনছিলাম। গাইডটি বলছিলেন, এই পিরামিডগুলো নির্মাণের জন্য অসংখ্য দাসকে দূর-দূরান্ত থেকে কোটি কোটি পাথর পরিবহণ করতে হয়েছিলো। </strong><strong>আর এসব পাথর বহন করা হয়েছিলো কেবল ফেরাউনদের সমাধি নির্মাণের উদ্দেশ্যে। </strong></p>
<p>দেয়ালের মধ্যে ছোট ছোট পাথরের দানা চোখে পড়ছিল। আমি গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কী। প্রথমে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, &#8220;কিছুই না,&#8221; তবে পরে তিনি জানালেন যে, এগুলো আসলে দাসদের হাড় চাপা দেওয়ার স্থান। দাসদের এতটাই তুচ্ছ ও অবমাননা করা হতো যে, শত শত মানুষকে একসঙ্গে একটি খাদে দাফন করা হতো। আর যারা বেঁচে থাকতো, তাদেরকে পাথর বহন করতে বাধ্য করা হতো। তারপর আমি দাসদের গণকবরের সামনে দাঁড়ালাম। গাইড বললেন:</p>
<p><strong>তাদের </strong><strong>রূহগুলোকেও</strong><strong> যেন শরীরের ন্যায় দাস হিসেবে ব্যবহার করা যায়—এ কারণেই এমন করা হয়েছিলো। </strong></p>
<p><strong>এরপর আমি গাইডকে বললাম, &#8220;আমাকে একটু একা থাকতে দিন।&#8221; তারপর কবরগুলোর পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। সেই খাদগুলোতে দাফন করা মানুষের প্রতি এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো- যেন তারা আমার এত কাছে, যেন আমরা একই জাতির অংশ ছিলাম।</strong></p>
<p><strong>আমি আবার পিরামিডগুলোর দিকে তাকালাম। তাদের সমস্ত জাঁকজমক ও মহিমা সত্ত্বেও, আমার কাছে সেগুলো ছিল এক অচেনা ও দূরের বিষয়। আমার পূর্বপুরুষদের অস্থিমজ্জা ও হাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই তথাকথিত সভ্যতার বিশাল নিদর্শনগুলোর প্রতি আমার মনে এক ভয়ানক ঘৃণা জন্ম নিলো।</strong></p>
<p>আমার পূর্বে যারা এসেছিল, তারা চীনের প্রাচীরও নির্মাণ করেছিলো। যাদের পিঠে ভারী পাথর বহনের শক্তি ছিলো না, তারা সেই পাথরের নিচে পিষ্ট হয়ে দেয়ালের ভেতরেই চাপা পড়েছিলো। সভ্যতার এই নিদর্শনগুলো এমন এক নির্মম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যে বাস্তবতা আমার পূর্বপুরুষদের মাংস ও অস্থির বিনিময়ে তৈরি হয়েছে।</p>
<p>তথাকথিত এই সকল সভ্যতাকে আমি অভিশাপ দিলাম। হাজার হাজার বছর ধরে আমার পূর্বপুরুষদের ওপর চালানো অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমার ভেতরে তীব্র এক ক্রোধ জেগে উঠলো।</p>
<p>এরপর চিন্তা করলাম,</p>
<p>এই দাসরা মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু এই দাসপ্রথা তো মৃত্যুবরণ করেনি।</p>
<p>ভ্রমণ শেষ হওয়ার পর, আমি তাদের একজনকে একটি চিঠি লিখলাম। গত পাঁচ হাজার বছরে কী কী ঘটেছে, তা তাকে জানানো ছিলো আমার উদ্দেশ্য।</p>
<p style="text-align: center;">&#8212;&#8212;&#8212;-</p>
<p>প্রিয় ভাই আমার!</p>
<p>তুমি তোমার মনিবকে চিনতে। তোমার গায়ে যে চাবুক পড়তো, তার যন্ত্রণা তুমি অনুভব করতে। তুমি জানতে তুমি দাস। তুমি জানতে, কে তোমাকে দাস বানিয়েছে।</p>
<p>কিন্তু আজ আমরা তোমার চেয়েও হতভাগা।</p>
<p>আমরাও আজ তোমার মত গোলাম কিন্তু আমরা জানি না আমরা কার গোলামী করছি। আমরা এমনভাবে বেঁচে আছি যে, আমরা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, এ খবরও আমরা জানি না।</p>
<p>আমাদের সম্পদ ও শ্রম কীভাবে লুণ্ঠিত হচ্ছে, তা আমাদের বুঝতে দেওয়া হয়নি। যে ব্যবস্থাগুলো আমাদের শাসন করছে, সেগুলোকে আমরা স্বাধীনতা মনে করছি।</p>
<p>আজ পৃথিবী এক বিশাল দাসত্বের ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। মানুষ উৎপাদন করছে, কিন্তু অন্যরা লাভবান হচ্ছে। মানুষ কাজ করছে, কিন্তু অন্যরা ভোগ করছে জীবন।</p>
<p>তোমার সময়ে মনিব ও দাসের পরিচয় স্পষ্ট ছিলো। আজকের দিনে দাসত্ব একটি গোপন বিষয়। এটি আরও অলংকৃত, আরও আধুনিক এবং আরও প্রতারণামূলক।</p>
<p>তুমি চাবুকের নিচে কাজ করতে।<br />
কিন্তু আজ আমরা নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে সেই তাদেরই গোলামী করি।</p>
<p>তুমি তোমার শিকল দেখতে পেতে।<br />
আমরা আমাদের শিকলও দেখতে পাই না।</p>
<p>ভাই আমার, পাঁচ হাজার বছর পরে পৃথিবীর অবস্থা এটাই।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ali-shariatis-letter-to-modern-slaves-aka-workers/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16868</post-id>	</item>
		<item>
		<title>অবরুদ্ধ মুসলিম মানস : বিংশ শতাব্দীর যে তিনটি ঘটনা নতুন চিন্তাধারা উৎপাদনে মুসলিমদের সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছিল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-besieged-muslim-mind/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-besieged-muslim-mind/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হিশাম আল নোমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 22 May 2026 13:37:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16831</guid>

					<description><![CDATA[বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইসলামী সভ্যতা একপ্রকার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের সামষ্টিক সীমালঙ্ঘন বা সভ্যতার ঘূর্ণাবর্তের কারণে ঘটেনাই। দীর্ঘ কয়েক দশকব্যাপী চলা তীব্র সহিংসতার প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিলো এই পরিণতি। পদ্ধতিগত আঘাতে-আঁচড়ে ১৯১৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইসলামী সভ্যতার পুরো]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইসলামী সভ্যতা একপ্রকার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের সামষ্টিক সীমালঙ্ঘন বা সভ্যতার ঘূর্ণাবর্তের কারণে ঘটেনাই। দীর্ঘ কয়েক দশকব্যাপী চলা তীব্র সহিংসতার প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিলো এই পরিণতি। পদ্ধতিগত আঘাতে-আঁচড়ে ১৯১৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইসলামী সভ্যতার পুরো হুলিয়া বদলে ফেলা হয়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজ আপনি যখন মুসলিম বিশ্বের যেকোনো বড় শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, হোক তা ঢাকা, ইস্তাম্বুল, রিয়াদ বা কুয়ালালামপুর, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের এক বাহ্যিক রূপ হিসেবে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা সংস্থা, গবেষণাকেন্দ্র এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেখতে পাবেন। কিন্তু এতকিছুর পরেও কোথাও যেন একটা গলদ রয়ে গেছে। জ্ঞান উৎপাদনের আকাঙ্ক্ষার একটি বাহ্যিক রূপ হিসেবে হয়তো এসব অবকাঠামোর একটা অস্তিত্ব আছে, কিন্তু এসবের সারবস্তু নিতান্তই দুর্বল। এর প্রমাণ হচ্ছে, এসব অঞ্চলে খুব কম পরিমাণে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে, উদ্ভাবনের জন্য নোবেল পুরস্কারের অনুরূপ নামমাত্র কোনো স্বীকৃতির অস্তিত্বও নাই। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্পের জন্য উপযোগী কোনো সুদৃঢ় নগর-কাঠামোতো নাই-ই।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16843 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_12_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="735" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_12_2026-05-22_19-15-18.jpg 735w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_12_2026-05-22_19-15-18-300x180.jpg 300w" sizes="(max-width: 735px) 100vw, 735px" /></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নতুন চিন্তা তৈরি করা, জীবন-জগতের জটিল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সক্ষমতা আজ এমনভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে যে, তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। আজ মুসলিমরা এবং তাদের গর্বের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক সেই একই প্রশ্নগুলো নিয়ে, সেই একই ভাষায় বিতর্ক করে, যা আমাদের পূর্বপুরুষরা এক শতাব্দী আগে করতেন। এই ডিসকোর্স-ডিসকোর্স খেলার আসলে কোনো বিবর্তন তো হয়ই নাই; বরং বলা যায় এর আরও অবনতি ঘটেছে।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৯ শতকটা ছিল মুসলমানদের জন্য ত্বরান্বিত ধ্বংসের মাঝে বিপুল সম্ভাবনার এক যুগ, যা আজ মানুষের স্মৃতি থেকেও বিস্মৃত। আজকের প্রতিটি প্রজন্ম সেই ১৯ শতকে ওঠা বিতর্কগুলোরই কিছু সস্তা সংস্করণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বলা যায়। সেই একই শরিয়াহ, ইসলাম ও আধুনিক রাষ্ট্র বিতর্ক, সেই একই ধর্মনিরপেক্ষতা, ইউরোপীয় দর্শন এবং এর সাথে ইসলামি দর্শনের সম্পর্ক ইত্যাদি পুরাতন আলাপ ঘুরে ফিরে আসছে। আজকের দিনেও এসব বিষয়ে আলোচনাগুলো মূলত সেই যুগ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। হিসাব করলে দেখা যাবে, গত এক শতাব্দীতে এগুলোতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতিই হয়নি।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16842 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_11_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="736" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_11_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_11_2026-05-22_19-15-18-300x300.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_11_2026-05-22_19-15-18-150x150.jpg 150w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p><strong>আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে বর্ণনা করার জন্য </strong><strong>&#8216;স্থবিরতা&#8217; বা &#8216;সংকট&#8217; শব্দগুলো মোটেও মানানসই নয়। আমরা মূলত ঐতিহ্যের আবরণে এক ধরনের স্মৃতিহীনতায় ভুগছি। এটা এমন এক চূড়ান্ত সামষ্টিক বিস্মৃতি যে, আমরা কী হারিয়েছি, বা আদৌ যে আমরা কিছু হারিয়েছি কিনা, সেটাই আর আমাদের মনে নেই।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রচলিত বয়ান, ব্যাখ্যা এবং অযুহাতগুলো এই ভয়াবহ দুর্দশার সামগ্রিক চিত্রটা একদমই তুলে ধরতে পারেনা। আমরা উপনিবেশবাদ, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, নেতাদের দুর্নীতি বা জনগণের পশ্চাৎপদতা নিয়ে কথা বলি। এগুলো সবই সত্য, কিন্তু এসব এতটাই অপর্যাপ্ত ও ধোঁয়াশাপূর্ণ যে, কাউকে জিজ্ঞেস করে মুখস্ত বুলির মত এসব কথা বলবে ঠিকই, কিন্তু ব্যাপকতর এসব সমস্যার কোনো নির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরতে পারবেনা, ভাসা ভাসা উত্তর দেবে আর আফসোস করবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৯১৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইসলামী সভ্যতা তিনটি প্রলয়ংকরী ঘটনার সম্মুখীন হয়, যা একটি জটিল সভ্যতা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবকাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়। ১৯১৪ সালের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন; ১৯১৭ সালের পর রুশ সাম্রাজ্যের মুসলিম অঞ্চলগুলোতে কমিউনিজমের উত্থান এবং বলকানের মতো দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে এর অভিশপ্ত বিস্তার; এবং ১৯৪৭ সালের ভারতীয় উপমহাদেশে দেশভাগের ঘটনা বিশ্ব মুসলিম মানুষের জন্য একেকটি বিপর্যকর ধাক্কা।</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter wp-image-16841 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_10_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="680" height="626" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_10_2026-05-22_19-15-18.jpg 680w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_10_2026-05-22_19-15-18-300x276.jpg 300w" sizes="(max-width: 680px) 100vw, 680px" /></p>
<p>প্রতিটি ঘটনাই এমন সব যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ছিন্ন করে দিয়েছিল, যা গড়ে তুলতে শত শত বছর সময় লেগেছিল। এসব ঘটনা রাষ্ট্র ও সভ্যতা পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একেবারে এলোমেলো করে দেয়। উসমানীয় শাসকগোষ্ঠী, তাতার মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর মতো গোটা এক-একটি সম্প্রদায় উৎখাত বা ধ্বংস হয়ে যায় ; অথচ জ্ঞান ও সংস্কৃতির উৎপাদন এবং সংরক্ষণের জন্য তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও অংশগ্রহণ ছিল অপরিহার্য।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই প্রতিটি ঘটনার পর, চরম অস্তিত্বের সংকটে ভুগে জন্ম নিয়েছিল কিছু শরণার্থী রাষ্ট্র। শুধু টিকে থাকাই হয়ে উঠেছিল তাদের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা, প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব দেশ এখনও সার্ভাইভালের পেছনেই ছুটছে রুদ্ধশ্বাসে। এভাবেই বিশ্বের সকল অঞ্চলে আমরা একত্রে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধনে ক্রমশ অক্ষম হয়ে পড়ি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পতনের এই ক্রমধারায় সবচেয়ে কম অনুধাবিত বিষয়টি হলো, এই তিনটি ঘটনার প্রতিটিই একে অপরকে আরও ঘনীভূত করেছিল, বাড়িয়েছিল মুসলমানদের জাতিগত দুর্দশার মাত্রা। একটা সময় এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, ১৯ শতকে আমরা আমাদের নিজেদের শর্তে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের যে কাজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে শুরু করেছিলাম, তা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয় আর অবশিষ্ট ছিল না।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16840 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_9_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="613" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_9_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_9_2026-05-22_19-15-18-300x250.jpg 300w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p>এই তিনটি বিপর্যয় কেবল আলাদা আলাদা সংস্কৃতি আর দেশগুলোর ধ্বংসই ছিল না, বরং এগুলো একটা সময় একত্রে ইসলামী সভ্যতার খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত পুনর্জাগরণের দিকে প্রথম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলো এই ধ্বংসযজ্ঞকে অনুধাবন করা। কারণ, যে ভঙ্গুর শরণার্থী রাষ্ট্র ও জাতীয়তার সংগ্রাম বিংশ শতাব্দীতে সুবিধা পারেনি, তা একবিংশ শতাব্দীতেও টিকবে না। ফলে দিনশেষে কী হারিয়ে গেছে তার হিসাব-নিকাশ না করে আমরা নতুন কিছুই গড়তে পারব না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পশ্চিমা পুঁজিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিশ্ব মুসলিমের টাকায় গড়া &#8216;হেজাজ রেলওয়ে&#8217;র কথা মনে আছে? সেটা কিন্তু ছিল নিভে যাবার আগে উসমানী প্রদীপ দপ করে জ্বলে ওঠার একটা শেষ চেষ্টা।&nbsp;</p>
<p>উসমানী খেলাফতের শেষ দশকগুলো ছিল ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবার মতো। ১৮৩৮ সালের বালতা লিমান চুক্তি সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। তথাকথিত &#8220;মুক্তবাণিজ্য&#8221; চাপিয়ে দেওয়ার ফলে ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের সাথে উসমানীয় দেশীয় উৎপাদন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত ছিল ভূখণ্ডের ভাঙন, বিশেষ করে বলকানে। নিছক ভূমি হারানোর কারণে নয়, বরং সেখানকার মানুষদের ওপর যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছিল, সেটাই ছিল মূল আঘাত। ইমারত নতুন করে গড়া যায়, ফসলের ক্ষেত আবার বোনা যায়, কিন্তু একটি জনপদ একবার ছিন্নমূল হলে তাদের সংস্কৃতি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16844" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_13_2026-05-22_19-15-18-280x300.jpg" alt="" width="467" height="500" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_13_2026-05-22_19-15-18-280x300.jpg 280w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_13_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w" sizes="(max-width: 467px) 100vw, 467px" /></p>
<p><strong>বলকান যুদ্ধ এবং এর পরিণতি আধুনিক ইতিহাসের এক বিস্মৃত গণহত্যা। ১৮৭০ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত বসনিয়া</strong><strong>, বুলগেরিয়া, গ্রিসসহ পুরো বলকানে বিভিন্ন জাতিসত্তার উসমানীয় মুসলিমদের ওপর সুপরিকল্পিত জাতিগত ও ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়। লাখ লাখ মানুষ মারা পড়ে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। প্রাণে বাঁচা মানুষগুলো মুহাজির হিসেবে আনাতোলিয়ার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকা ভূখণ্ডে এসে ভিড় জমায়। ১৯২৩ সাল নাগাদ, নবগঠিত তুর্কি প্রজাতন্ত্রের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই ছিল বলকান, ককেশাস ও ক্রিমিয়া থেকে আসা এই ছিন্নমূল মুসলিমরা। চিন্তা করা যায়? প্রতি তিনজনে একজন শরণার্থী!&nbsp;</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই মহাবিপর্যয়কে আজ নিছক পরিসংখ্যানে মাপা হয়; অথচ এই মুহাজিররাই ছিলেন আলেম, কারিগর, বণিক ও জমিদার। এরাই ছিলেন সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মূল স্তম্ভ। তাদের এই বাস্তুচ্যুতির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়, পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ছিন্ন হয়, ছাপাখানাগুলো স্তব্ধ হয়ে যায়,&nbsp; পাঠাগারগুলো পড়ে থাকে পরিত্যক্ত অবস্থায়। এভাবে জ্ঞান ও অস্তিত্ত্বের পুরো একটি জগতকে সমূলে উৎপাটন করা হলো। একের পর এক ট্রমার কারণে তা আবার সামষ্টিক স্মৃতি থেকেও হারিয়ে গেল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৯ শতকে ইউরোপীয় চাপের মুখে উসমানীয়দের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়া শুরুতে ধীর হলেও শতাব্দীর শেষে এসে তা গতি পেয়েছিল। তানজিমাত সংস্কার, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং উসমানীয় তুর্কি গণমাধ্যমের বিকাশের মাধ্যমে মূলত ইসলামী শর্ত বা মূল্যবোধের ভিত্তিতেই শিল্পায়নের সাথে তাল মেলানোর এক সত্যিকার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সাঈদ হালিম পাশা ও মেহমেদ আকিফ এরসয়ের মতো চিন্তাবিদরা ‘সাবিলুর রাশাদ’-এর মতো জার্নালে ইউরোপের আধুনিকতাকে ইসলামি দর্শন, আইন ও শাসনের নিজস্ব ছাঁচে ফেলার রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই সম্ভাবনাগুলোকে ধূলিসাৎ করে দেয়। আরব প্রদেশগুলো ব্রিটিশ ও ফরাসি ম্যান্ডেটের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়। আনাতোলিয়াও প্রায় একই পরিণতির শিকার হতে বসেছিল, তবে তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য বীরদের কল্যাণে তা রক্ষা পায়। কিন্তু এই টিকে থাকার মূল্য হিসেবে তুরস্ককে তার নিজের অতীতকেই বিসর্জন দিতে হয়। কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতার ছুরি উসমানীয় অতীতের সাথে নতুন তুরস্কের নাড়ির সংযোগ কেটে দেয়। ১৯২৪ সালে খিলাফত বাতিল, ১৯২৭ সালে আরবি হরফের বদলে ল্যাটিন চালু এবং উসমানীয় সভ্যতার ধারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে দমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—অতীতের সাথে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16845" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_14_2026-05-22_19-15-18-300x221.jpg" alt="" width="500" height="368" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_14_2026-05-22_19-15-18-300x221.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_14_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w" sizes="(max-width: 500px) 100vw, 500px" /></p>
<p>এই ক্ষতি কেবল তুরস্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উসমানীয় কেন্দ্রের পতনের পর সাবেক সাম্রাজ্যের পুরো মুসলিম অভিজাত শ্রেণী দিশেহারা হয়ে পড়ে। আরব বিশ্বে ঔপনিবেশিক কাঠামো দেশীয় দালালদের ক্ষমতায় বসায় এবং ঐতিহ্যবাহী অভিজাতদের কোণঠাসা করে ফেলে। বলকানে অবশিষ্ট মুসলিমরা শত্রুভাবাপন্ন খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর অধীনে নিছক সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। কায়রো থেকে দামেস্ক, ইস্তাম্বুল থেকে সারায়েভো—রাষ্ট্রনায়ক, বণিক, বুদ্ধিজীবী ও স্কলারদের যে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ছিল, তা চিরতরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, উসমানীয় পতন ঠিক তখনই ঘটল, যখন ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদন মাত্র গতি পাচ্ছিল। ১৯ শতকের ছাপাখানা, জার্নাল আর আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কের অর্জনগুলো স্রেফ মুছে ফেলা হলো। কোনো উত্তরসূরি রাষ্ট্রই এর উত্তরাধিকার পায়নি বা এই অবকাঠামো নতুন করে গড়তেও পারেনি। কায়রো ও বৈরুতে &#8216;নাহদা&#8217; বা নবজাগরণ ক্ষীয়মাণ রূপে হয়তো টিকে ছিল, কিন্তু উসমানীয় ব্যবস্থার সেই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা ও পৃষ্ঠপোষকতা আর কখনোই ফিরে আসেনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>জ্ঞানের সাথে উসমানী খেলাফতের শেষ দিককার রাজনৈতিক ও প্রসাশনিক অবস্থাও কিছুটা আলোচনার দাবী রাখে। কারণ আদতে উসমানীয় পতন কোনো জরাজীর্ণ কাঠামোর স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না</em><em>, বরং তা ছিল পুনর্জাগরিত হতে চলা এক সম্ভাবনার অকালমৃত্যু। পতনের ঠিক আগের দশকগুলোতে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ সাম্রাজ্যকে এক অভূতপূর্ব &#8216;সিস্টেমিক&#8217; প্রতিরোধের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। জামাল উদ্দিন আফগানির মতো ক্ষুরধার চিন্তাবিদদের তাত্ত্বিক রসদকে কাজে লাগিয়ে তিনি &#8216;প্যান-ইসলামীজম&#8217;-কে নিছক আবেগের খোলস থেকে বের করে এক ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেন।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ব্রিটিশদের সামরিক আগ্রাসন ঠেকাতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ; বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ইস্তাম্বুলে হামলা হলে খেলাফতের প্রতি আনুগত্যের কারণে ভারতবর্ষসহ ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠবে। ভারত থেকে শুরু করে চীনের পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সুদূর আফ্রিকার মসজিদে মসজিদে খলিফার নামে খুতবা চালু করা ছিল সেই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধেরই অংশ। পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও ঋণের জালকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কেবল সাধারণ মুসলিমদের চাঁদাতে তিনি নির্মাণ করেন &#8216;হেজাজ রেলওয়ে&#8217;। পাশাপাশি, পুরো সাম্রাজ্যকে ৩০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টেলিগ্রাফের তারে মুড়ে দিয়ে &#8216;ইলদিজ ইন্টেলিজেন্স&#8217;-এর মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক ব্যক্তিগত স্নায়ুতন্ত্র; যার ফলে সাম্রাজ্যের প্রান্তিক সীমানায় পাতা ঝরলেও তার খবর সবার আগে খলিফার কান পর্যন্ত পৌঁছাত। বিদ্যুৎ, তথ্য প্রযুক্তিতে তার সময়ে উসমানি খেলাফত ছিল সমগ্র বিশ্বের অগ্রদূত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাহ্যিক এই প্রতিরোধের পাশাপাশি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিভেদ মেটাতে তিনি দেখিয়েছিলে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক দুরন্ত কৌশল। সামরিক অভিযানের বদলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন &#8216;আশিরেত মেকতেবি&#8217; বা ট্রাইবাল বোর্ডিং স্কুল; যেখানে বিদ্রোহী কুর্দি, আরব বা আলবেনিয়ান গোত্রপ্রধানদের সন্তানদের ইস্তাম্বুলে এনে রাজকীয় হালে পড়িয়ে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অনুগত আমলা হিসেবে গড়ে তোলা হতো।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো—সুলতানের পতন তার নিজস্ব কোনো কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঘটেনি। বরং সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে যুগোপযোগী করতে যেসব তরুণ অফিসার ও বুদ্ধিজীবীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছিল, তারাই ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষে আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসে। পশ্চিমা সেক্যুলার দীক্ষায় আচ্ছন্ন এই প্যারিস-ফেরত &#8216;ইয়াং তুর্কি&#8217;রাই ১৯০৯ সালে তার ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত করে। অর্থাৎ, ইসলামী সভ্যতার শেষ এই মহান স্থপতিকে ধ্বংস করেছিল ফরাসি সেক্যুলারিজমের গর্ভে জন্ম নেওয়া এক বুদ্ধিবৃত্তিক মহামারী, যা উসমানীয় সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে তাকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছিল। সুলতান আব্দুল হামিদ ক্ষমতায় থাকলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানদের পরিণতি নিশ্চিতরূপেই ভিন্ন হতো।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16847 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_16_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="412" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_16_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_16_2026-05-22_19-15-18-300x168.jpg 300w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p>যে সমাজতন্ত্র বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের সভ্যতা ধসিয়ে দিল, তার কাছেই আমাদের কিছু আলেম খুঁজছিলেন মুক্তির পথ!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উসমানী খেলাফত যখন বাইরের চাপ আর ভেতরের ক্লান্তিতে ধসে পড়ছিল, তখন রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা মুসলিম জনপদগুলো মুখোমুখি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিভীষিকার। তাদের উপর নেমে এসেছিল সুপরিকল্পিত এক আদর্শিক ধ্বংসযজ্ঞ। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব এমন এক সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক নিধনের সূচনা করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ক্রিমিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল অঞ্চল থেকে একটি জীবন্ত সভ্যতা হিসেবে ইসলামের নাম-নিশানা চিরতরে মুছে ফেলা। টানা সাত দশক ধরে চলেছিল এই শিকড় উপড়ে ফেলার কাজ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>১৯১৭ সালের আগে রুশ অঞ্চলের মুসলিমরা নিজেদের মতো করে এক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ক্রিমিয়ায় জন্ম নেওয়া এবং তাতার-ভাষী অঞ্চল ছাড়িয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া </strong><strong>&#8216;জাদিদ&#8217; আন্দোলন ছিল আধুনিক মুসলিম সংস্কৃতি গড়ে তোলার এক দুর্দান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। মূসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, ইসমাইল গাসপ্রালির মতো চিন্তাবিদরা ইতিহাস, ফিকহ, ধর্মতত্ত্বের পুনর্গঠন থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, ইসলামি বিদ্যালয়গুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক বিজ্ঞান চর্চা এবং স্থানীয় ভাষায় মুসলিম গণমাধ্যম গড়ে তোলার পক্ষে লড়েছিলেন।&nbsp;</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য জাদিদ মাদ্রাসা, ফুলে-ফেঁপে ওঠে তাতার ভাষার পত্রপত্রিকা। কাজান, বাখচিসারাই, সমরকন্দ আর বুখারাকে কেন্দ্র করে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের এমন এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব উসমানী এবং ইন্দো-ইসলামি পরিমণ্ডলেও গিয়ে পড়েছিল।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16848 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_17_2026-05-22_19-15-18-1024x709.jpg" alt="" width="1024" height="709" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_17_2026-05-22_19-15-18-1024x709.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_17_2026-05-22_19-15-18-300x208.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_17_2026-05-22_19-15-18-768x532.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_17_2026-05-22_19-15-18.jpg 1120w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>জাদিদরা কিন্তু পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণকারী কোনো সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ছিলেন না। তারা ছিলেন মূলত সংস্কারপন্থী মুসলিম। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে ইসলামী শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটিয়ে শিল্পযুগে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম এক মুসলিম প্রজন্ম তৈরি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তাদের এই মিশন উসমানী ও মিসরীয় সংস্কারবাদের সমান্তরালেই চলছিল, যা আদতে বৃহত্তর প্যান-ইসলামীক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণেরই একটি অংশ ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বলশেভিকদের উত্থান এই পুরো সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। শুরুতে যদিও আশার একটা ঝিলিক দেখা গিয়েছিল। মিরসাইদ সুলতান-গালিয়েভের মতো কিছু জাদিদ নেতা ভেবেছিলেন, হয়তো সমাজতন্ত্রের অধীনেই মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আধুনিকায়নের স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু খুব দ্রুতই তাদের এই ভুল ভেঙে যায়।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জোসেফ </strong><strong>স্ট্যালিন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পর মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নামিয়ে আনেন এক ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। জাদিদ স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। বাজেয়াপ্ত করা হলো ইসলামি ওয়াকফ সম্পত্তি। আরবি হরফ পাল্টে প্রথমে ল্যাটিন, এরপর সিরিলিক বর্ণমালা চাপিয়ে দেওয়া হলো, যাতে নতুন প্রজন্মের সাথে তাদের নিজস্ব সাহিত্য-ঐতিহ্যের নাড়ির টান চিরতরে কেটে যায়। মসজিদগুলো গুড়িয়ে দেওয়া হলো অথবা গুদাম বানিয়ে ফেলা হলো। জাদিদদের সংস্কারের ডাককে যে আলেম সমাজ একসময় তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, সেই আলেমদেরও হয় কারাবন্দি করা হলো, নয়তো নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>খোদ স্ট্যালিন একাই সোভিয়েত ইউনিয়নে যে ৬০ থেকে ৯০ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন</em><em>, তার প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশই, অর্থাৎ অন্তত ২০-৩০ লাখ ছিলেন মুসলিম! এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ আমাদের সেই শীতল প্রবচনটিকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়—&#8221;একজনের মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি, কিন্তু লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু নিছক একটি পরিসংখ্যান মাত্র।&#8221;&nbsp;</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>স্ট্যালিনের এই &#8216;পরিসংখ্যানের&#8217; আড়ালে নিঃশব্দে চাপা পড়ে গেছে আমাদের আস্ত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জগত। আর সভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, চরম এই স্মৃতিহীনতায় আজকের মুসলিমরা নিজেরাও জানে না তারা ঠিক কোথায়, কীভাবে এবং ঠিক কী হারিয়েছে!</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16849 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_18_2026-05-22_19-15-18-1024x594.jpg" alt="" width="1024" height="594" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_18_2026-05-22_19-15-18-1024x594.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_18_2026-05-22_19-15-18-300x174.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_18_2026-05-22_19-15-18-768x446.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_18_2026-05-22_19-15-18.jpg 1280w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p>যাইহোক, সেই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল রাজনৈতিক বা আদর্শিক নিপীড়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কমিউনিস্ট আদর্শের মূল দাবিই ছিল মানুষের জীবন থেকে ধর্মের ধারণাকেই সমূলে উৎপাটন করা। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইসলামকে অন্তত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় টিকে থাকার সুযোগ দিত, সেখানে কমিউনিজম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসটুকুও ছিনিয়ে নিতে চাইল।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শিশুদের এমন সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বড় করা হতে লাগল, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল &#8216;নাস্তিক নাগরিক&#8217; তৈরি করা। ইসলামি জ্ঞানচর্চা তো দূরে থাক, একে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হলো। ইউরেশিয়া জুড়ে তাতার মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের যে নেটওয়ার্ক ছিল, তা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ১৯৫০-এর দশক আসতে আসতে এমন এক প্রজন্মের জন্ম হলো, যারা মাত্র কয়েক দশক আগে টিকে থাকা তাদের নিজস্ব ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সম্পর্কে আক্ষরিক অর্থেই কিছুই জানত না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এর পরিণতি কেবল সোভিয়েত সীমান্তের ভেতরেই আটকে থাকেনি। উসমানী, পারসিক এবং ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে তাতার মুসলিমরা এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতেন। তাদের প্রকাশিত জার্নালগুলো ইস্তাম্বুল থেকে কলকাতা পর্যন্ত পঠিত হতো। তাদের আলেমরা কায়রো ও বুখারায় পড়াশোনা করতেন, আবার কাজান ও কাশগড়ে গিয়ে পড়াতেন। সোভিয়েতদের এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যখন ইসলামি সভ্যতার এই উত্তরের সীমান্তটিকে অবরুদ্ধ করে দিল, তখন তা বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বকেও একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। শত শত বছর ধরে চলে আসা যে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান ইসলামী সভ্যতাকে প্রাণবন্ত রেখেছিল, তাতে চরম বিচ্ছেদ ঘটে গেল।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16846 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_15_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="413" height="242" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_15_2026-05-22_19-15-18.jpg 413w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_15_2026-05-22_19-15-18-300x176.jpg 300w" sizes="(max-width: 413px) 100vw, 413px" /></p>
<p><strong>মুসলিম ইউরোপে কমিউনিস্ট ধ্বংসযজ্ঞ কতটা সর্বগ্রাসী ছিল</strong><strong>, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আলবেনিয়ার পরিণতি। মুসলিম বলকানের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই অঞ্চলটি কমিউনিস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে চরম ধর্মবিদ্বেষী অভিযানের শিকার হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে আনওয়ার হোজার সরকার আলবেনিয়াকে বিশ্বের প্রথম &#8216;নাস্তিক রাষ্ট্র&#8217; হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিটি মসজিদ ও খানকাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে মুসলিম জমিদার শ্রেণী শত শত বছর ধরে সুফি তরিকা ও ইসলামি শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিল, তাদের আক্ষরিক অর্থেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। যে সভ্যতা পাঁচ শতাব্দী ধরে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য আলেম, কবি আর রাষ্ট্রনায়ক, মাত্র দুই প্রজন্মের ব্যবধানে তা পরিণত হলো অন্ধকারে ফিসফিস করে বলা নিছক রূপকথায়!</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ইসলামী সভ্যতার যে ক্ষতি আংশিকভাবে করেছিল, কমিউনিস্টদের আঘাত তার ষোলকলা পূর্ণ করে বৈকি! ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যতই শোষণ করুক না কেন, তারা অন্তত ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো না কোনো আকারে টিকে থাকার সুযোগ দিয়েছিল। তারা হয়তো এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, এর ওপর কর বসিয়েছে বা কোণঠাসা করেছে, কিন্তু কখনোই পাইকারি হারে সব মুছে ফেলার চেষ্টা করেনি। কমিউনিজম সেই ছাড়টুকুও দেয়নি।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16832 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_1_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="536" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_1_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_1_2026-05-22_19-15-18-300x218.jpg 300w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p><em>১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল</em><em>, দীর্ঘ সাত দশক শাসিত হওয়া মুসলিম জনপদগুলো তখন বেরিয়ে এল সম্পূর্ণ ট্রমাগ্রস্ত ও শূন্য একটা খোলস নিয়ে। তাদের প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা—সবকিছু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল। আজ যা অবশিষ্ট আছে, তা কেবলই কিছু ভগ্নাংশ, আর তা পুনর্গঠনের কাজ এখনও যেন শুরুই হয়ে ওঠেনি।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কমিউনিজমের এই দু:সহ দু:স্বপ্নের সাথে আমাদের অঞ্চলের একটি চরম ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি বা প্যারাডক্স লুকায়িত আছে। যে সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট আদর্শ মধ্য এশিয়া, ক্রিমিয়া ও বলকানে পুরো ইসলামী সভ্যতাকে সমূলে ধ্বংস করে দিল, সেই একই সমাজতন্ত্রের ভেতরেই সেসময় আমাদের উপমহাদেশের আলেমরা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা খুঁজে ফিরেছেন!&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদিপুরুষ মওলানা ভাসানী কিংবা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ‘&#8217;ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানের প্রবর্তক মওলানা হাসরাত মোহানির মতো প্রাজ্ঞ আলেমরাও ভেবেছিলেন যে কমিউনিজম হলো ইসলামের সবচেয়ে কাছের আদর্শ।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মওলানা মোহানি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, &#8220;আমি একজন মুসলিম কমিউনিস্ট। আমাদের ইসলামি সাম্যবাদের সাথে মার্ক্সবাদের মূল পার্থক্য শুধু এক জায়গায়—আমাদের সাম্যবাদ আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল, আর তাদেরটা খোদাহীন।&#8221;&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একই সুরে মওলানা ভাসানীও &#8216;ইসলামী সমাজতন্ত্র&#8217; বা খোদাহীনতা-বর্জিত সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি চীনপন্থী বামদের সাথে গভীর জোট করেছিলেন এবং প্রকাশ্যেই সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সাম্যের প্রশংসা করতেন। তার বহুল প্রচলিত একটি দার্শনিক অবস্থান ছিল:</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>​&#8221;তোমরা যে সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রের কথা বল, আল্লাহর রবুবিয়াত (সৃষ্টিকুলের লালন-পালন ও সাম্য) বা ইসলামী সমাজতন্ত্রের মধ্যেই তা নিহিত আছে। শুধু এর থেকে খোদাহীনতা বাদ দিতে হবে।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তাদের এই অবস্থান হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বা জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কৌশলগত হাতিয়ার ছিল, কিন্তু এই ঘটনা আমাদের একটি ভয়াবহ সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ও চিন্তার দুর্দশা কতটা প্রকট হলে, নিজেদের মুক্তির রূপরেখা আঁকতে গিয়ে আমাদের এমন এক মতবাদের আশ্রয় নিতে হয়, যে মতবাদটি বিশ্বের অন্য প্রান্তে মুসলিমদের সর্বাত্মক ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠেছিল!</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16836" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_5_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="500" height="304"></p>
<p>৪৭শের দেশভাগে মুসলিমদের যে &#8216;শরণার্থী রাষ্ট্র&#8217; জন্ম নিল, তা কি আসলেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ছিল?&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এক ধরণের আশু আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দেশভাগ বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল একটা আস্ত সভ্যতার অপমৃত্যু।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উসমানী খেলাফতের পতন যদি ইসলামী সভ্যতার পশ্চিমা নোঙ্গর উপড়ে ফেলে থাকে, কমিউনিজম যদি এর উত্তরের সীমানাকে ছিন্নভিন্ন করে থাকে, তবে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ছিল এই সভ্যতার কফিনে মারা শেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর পেরেক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শত শত বছর ধরে ভারতবর্ষ ছিল ইসলামি সভ্যতার সবচেয়ে উৎপাদনশীল কেন্দ্রগুলোর একটি। মুঘল সাম্রাজ্য তার স্বর্ণযুগে ধন-সম্পদ ও উৎকর্ষে খোদ উসমানীদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনেও মুঘলদের উত্তরসূরি ছোট ছোট প্রিন্সলি স্টেট এবং ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণী এমন এক শক্তিশালী জ্ঞান ও পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রেখেছিল, যা পুরো উপমহাদেশের সাথে বৃহত্তর ইসলামি বিশ্বের নাড়ির টান অটুট রেখেছিল।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16834 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_3_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="735" height="490" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_3_2026-05-22_19-15-18.jpg 735w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_3_2026-05-22_19-15-18-300x200.jpg 300w" sizes="(max-width: 735px) 100vw, 735px" /></p>
<p>১৮ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা দখল এবং পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে মুঘল সালতানাতের চূড়ান্ত পতন এই জগতটাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমরা এর সাথেও দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। ইসলামী জ্ঞান ও নিজস্ব পরিচিতি অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তারা আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। উর্দু ভাষাকেন্দ্রিক এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরিতে তারা বিশাল ভূমিকা রাখে। কায়রো কিম্বা ইস্তাম্বুলে তারা নিজেদের আলেমদের পাঠাত, আবার পুরো মুসলিম বিশ্ব থেকে শিক্ষার্থীরাও এখানে আসত।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ব্রিটিশদের অধীনস্থ হওয়া সত্ত্বেও, ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণী ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণপ্রবাহে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন ও রসদ ধরে রেখেছিল। ভারতবর্ষের এই বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রবিন্দু এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর এই খেলাফতের কেন্দ্র খোদ ভারতের হৃদপিণ্ড হায়দরাবাদে স্থানান্তর করার একটি মাস্টার-প্ল্যানও করা হয়েছিল। শেষ &#8216;নামেমাত্র স্বাধীন&#8217; মুসলিম শাসক হিসেবে হায়দরাবাদের নিজাম পরিবারের সাথে উসমানী রাজপরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনকে তখন খিলাফত টিকিয়ে রাখার অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কিন্তু দিনশেষে ব্রিটিশদের নকশা অনুসারে খোদ ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিপ্রসূত দেশভাগই এই পুরো ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করে দেয়। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম দিলেও আস্ত একটি সভ্যতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে। প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়—যা আক্ষরিক অর্থেই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জোরপূর্বক দেশান্তরের ঘটনা। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নির্মমভাবে খুন হয় অন্তত ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ! চিন্তা করা যায়</strong><strong>? এই রক্তবন্যায় ভেসে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের একটি বিশাল &#8216;শরণার্থী রাষ্ট্র&#8217; হিসেবে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ভারত থেকে লাখ লাখ মুহাজির এমন এক ভূখণ্ডে আছড়ে পড়ে, যাদেরকে ধারণ করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ওই নতুন রাষ্ট্রের ছিল না। রাষ্ট্রের পুরো শক্তিই তখন ব্যয় হচ্ছিল স্রেফ টিকে থাকার লড়াইয়ে: শরণার্থীদের খাওয়ানো, একটি ন্যূনতম প্রশাসন দাঁড় করানো এবং ভারতের সাথে অবশ্যম্ভাবী এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ায়। বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রতিষ্ঠান গড়ার মতো কোনো সুযোগ বা শ্বাস ফেলার ফুরসতই তাদের ছিল না।&nbsp;</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16833 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_2_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="479" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_2_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_2_2026-05-22_19-15-18-300x195.jpg 300w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p>জন্মলগ্ন থেকেই অস্তিত্বের সংকটে ভোগা পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আজ পর্যন্ত তার নিজস্ব বৈধতা ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য নিয়ে ধুঁকছে; তারা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় আদর্শের মধ্যে এমনভাবে দুলছে যে, আজ অবধি এর কোনো কার্যকরী মডেল দাঁড় করাতে পারেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে সৃষ্ট বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত তার জাতীয় পরিচয়ই ঠিকমতো চিহ্নিত করে উঠতে পারছেনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দেশভাগের পর উপমহাদেশের বেশিরভাগ অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান ভারতের ভাগে পড়ে যায়, অন্যদিকে এর মুসলিম জনসংখ্যা হয়ে পড়ে চরম ট্রমাগ্রস্ত ও ক্ষয়িষ্ণু। যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি অভিজাত শাসক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী তৈরি করেছিলেন—সেই ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণীকে প্রায় সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। যারা ভারতে রয়ে গেলেন, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে তারা পরিণত হলেন এক চরম অরক্ষিত সংখ্যালঘুতে, ভারত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রমাণেই যাদের জীবন হলো ওষ্ঠাগত।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আর যারা পাকিস্তানে পাড়ি জমালেন, তারা পেছনে ফেলে গেলেন শত শত বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা তাদের বাড়িঘর, পাঠাগার, ওয়াকফ সম্পত্তি আর প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক। হজের সফর, জ্ঞানচর্চা আর বাণিজ্যের ওপর ভর করে ভারতীয় মুসলিমদের সাথে কায়রো, ইস্তাম্বুল ও মক্কার যে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, সেখানেই তার সলিল সমাধি ঘটল।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16835 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_4_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="460" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_4_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_4_2026-05-22_19-15-18-300x188.jpg 300w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16837 size-large" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_6_2026-05-22_19-15-18-1024x576.jpg" alt="" width="1024" height="576" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_6_2026-05-22_19-15-18-1024x576.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_6_2026-05-22_19-15-18-300x169.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_6_2026-05-22_19-15-18-768x432.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_6_2026-05-22_19-15-18.jpg 1280w" sizes="(max-width: 1024px) 100vw, 1024px" /></p>
<p><strong>এই ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি ছিল </strong><strong>&#8216;সামষ্টিক সভ্যতার স্মৃতি&#8217; হারিয়ে ফেলা। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় মুসলিমরা নিজেদেরকে প্রায় হাজার বছর আগের দিল্লি সালতানাত এবং তারও আগের এক মহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবেই বিবেচনা করে আসছিলেন। কিন্তু দেশভাগ এই পরিচিতিকে এমনভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য করল যে, পাকিস্তান একটি গভীর সভ্যতাকেন্দ্রিক ভিত্তির বদলে কেবল &#8216;ইসলাম&#8217; নামের ওপর ভর করে একটি জাতীয়তাবাদী পরিচয় দাঁড় করাতে বাধ্য হলো। ফলে এটা পরিণত হলো শেকড়হীন, স্লোগান-সর্বস্ব এক অগভীর ইসলামে, যার সাথে মুসলিম ভারতের প্রকৃত আইনি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনো সম্পর্কই ছিল না।&nbsp;</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্যদিকে, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ভেতরে থাকা মুসলিমদের প্রতিনিয়ত হিন্দু-গরিষ্ঠ রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের আনুগত্যের প্রমাণ দেওয়ার চাপে পড়ে নিজেদের ইসলামী পরিচিতিকে গুটিয়ে নিতে বা একান্তই চার দেয়ালের মাঝে লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হলো। উভয় ক্ষেত্রেই ইন্দো-ইসলামী সভ্যতার সেই সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য চরমভাবে ক্ষুণ্ন হলো; জীবন্ত অনুশীলনের বদলে তা নিছক কিছু প্রতীক আর স্লোগানে পরিণত হলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশকে বৃহত্তর ইসলামী বিশ্ব থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও দেখা যায়নি। পাকিস্তানের চিরস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা এবং সংঘাত তাদের সকল সম্পদ ও মনোযোগকে গিলে খেয়েছে, যা হয়তো সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে কাজে লাগতে পারত। অন্যদিকে, ভারতে মুসলিমদের সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার মানে হলো—যারা একসময় ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তারাই আজ পরিণত হয়েছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে। একটা সময় জাভা থেকে মরক্কো পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অন্বেষণে দিল্লি ও লখনৌতে ছুটে আসত, ইন্দো-ইসলামী জ্ঞানচর্চার সেই স্বর্ণযুগের চিরতরে অবসান ঘটল।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16838 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_7_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="424" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_7_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_7_2026-05-22_19-15-18-300x173.jpg 300w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p>যখন একটি সভ্যতার বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, তখন পড়ে থাকে কেবলই কিছু সস্তা স্লোগান আর ইতিহাস ভুলে যাওয়ার ব্যাধি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে, মাত্র ১০০ বছর আগের পরপর ধাক্কায় ইসলামী সভ্যতায় কীভাবে ঘটে গেল এক পুঞ্জীভূত মহাবিপর্যয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর ফ্রন্টিয়ারের সর্বগ্রাসী পতনগুলো আলাদা আলাদাভাবে ঘটলে হয়তো এর যেকোনো একটি বিপর্যয় সামলে ওঠা যেত। ভূখণ্ড হারানো, ভিনদেশি দখলদারিত্ব এবং জনসংখ্যার বিশাল পতনের পরও সভ্যতাগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। খোদ ইসলামী সভ্যতাই মোঙ্গল আগ্রাসন থেকে কেবল টিকেই থাকেনি, বরং আক্রমণকারীদের নিজেদের সংস্কৃতির স্রোতে মিশিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে উসমানী, সাফাভি ও মুঘল সাম্রাজ্যের মত সুবিশাল গানপাউডার পরাশক্তির ছত্রছায়ায় উৎকর্ষের নতুন এক শিখরে পৌঁছেছিল।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এমনকি ১৯ শতকেও চারপাশের আগ্রাসী উপনিবেশবাদ আর সামরিক পরাজয়ের মাঝেও এক সত্যিকারের ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক রেনেসাঁ বা নবজাগরণের উন্মেষ ঘটেছিল। ছাপাখানার বিকাশ আর প্রকাশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক তখন জানান দিচ্ছিল যে, নিজেদের নতুন করে গড়ার সক্ষমতা তখনও ফুরিয়ে যায়নি। মহীষুরের টিপু সুলতান ছিলেন আধুনিকতা ও বিক্রমের এক তেজস্বী উদাহরণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই তিনটি মহাবিপর্যয় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এগুলো একে অপরকে আরও ঘনীভূত করেছিল, প্রতিটি আঘাত ইসলামী সভ্যতার অবকাঠামোর একেকটি ভিন্ন ভিন্ন স্তম্ভকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উসমানী খেলাফতের পতনের সাথে সাথেই ভেঙে পড়ে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তির ছাদ। ফলে আরব ও তুর্কি-ভাষী অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার যে বিশাল পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ছিল, তা একেবারে মুছে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>​অন্যদিকে, কমিউনিস্টদের নিপীড়ন ইসলামী সভ্যতার উত্তরের সীমানাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব থেকে মধ্য এশিয়া ও ককেশাস পুরোপুরি আলাদা হয়ে পড়ে। এখানেই চরম আক্রোশে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয় &#8216;জাদিদ&#8217; সংস্কার আন্দোলনকে। অথচ এই আন্দোলনটিই হতে পারত ইসলাম ও আধুনিকতার মাঝে মেলবন্ধন ঘটানোর এক অসাধারণ মডেল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>​আর দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশকে আক্ষরিক অর্থেই টুকরো টুকরো করে ফেলে। জন্ম নেয় দুটি চরম ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র। মুসলিম ভারত একসময় গোটা বিশ্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতির বাতিঘর ছিল। কিন্তু অস্তিত্বের সংকটে ভোগা এই নতুন রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে সেই সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়া আর কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এসব ঘটনা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেই ধ্বংস করেনি; বরং এগুলো টিকিয়ে রাখার পেছনে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক শ্রেণীটি মূল কারিগর ছিল, তাদেরও সমূলে বিনাশ করেছিল। উসমানী শাসকগোষ্ঠী, তাতার মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণী—এরাই ছিলেন সেই পৃষ্ঠপোষক, যারা বইপত্র লেখাতেন, মাদ্রাসায় ওয়াকফ করতেন এবং আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এভাবেই তারা এমন এক নেটওয়ার্কের অংশীদার ছিলেন, যা ইসলামী সভ্যতাকে নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন বিশ্বাসীর দল থেকে এক বিশাল ক্যানভাসে পরিণত করেছিল। এই শ্রেণীটিকে ছাড়া জ্ঞান উৎপাদন ধসে পড়ল। মুসলিম সমাজ হয়তো কেবল মসজিদ আর বুনিয়াদি ধর্মীয় শিক্ষাটাই ধরে রাখতে পেরেছিল, কিন্তু ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্ভাবনের জন্য যে জটিল ও সমন্বিত ইকোসিস্টেমের দরকার ছিল, তা চিরতরে হারিয়ে গেল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই পতনের মাত্রাকে সবচেয়ে বেশি ত্বরান্বিত করেছে &#8216;শরণার্থী-সংকট&#8217;। শেষ দশকগুলোতে উসমানী সাম্রাজ্য নিজেই একটি শরণার্থী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, চারপাশ থেকে বাস্তুচ্যুত মুসলিমরা এসে আনাতোলিয়ায় ভিড় জমিয়েছিল। আর পাকিস্তান তো আক্ষরিক অর্থেই জন্ম নিয়েছিল শরণার্থীদের দ্বারা এবং শরণার্থীদের জন্য। এজন্যই ১৯৫০ সাল নাগাদ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কায়েদে আজম জিন্নাহ আর লিয়াকত আলি খানের পরপর ইন্তেকাল হয়ে গেলে বেসামরিক কোনো নেতা খুঁজে পায়নি পাকিস্তান।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>চরম ট্রমা আর সর্বস্ব হারানো এই জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক বিনিয়োগের জন্য কোনো স্থিতিশীলতা বা সম্পদ অবশিষ্ট ছিল না। অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রগুলো বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে পারে না, গবেষণায় ফান্ড দিতে পারে না, অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা দরকার, তারও জোগান দিতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো</strong><strong>, ১৯ শতকে শুরু হওয়া আধুনিকায়নের চেষ্টাগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই অকালে গলা টিপে মারা হলো। উসমানীদের তানজিমাত সংস্কার, জাদিদ আন্দোলন এবং আলীগড়—এগুলো ছিল পশ্চিমা মডেলের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ না করে, শিল্পায়িত সভ্যতার সাথে ইসলামের এক মেলবন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে নিজস্ব &#8216;ইসলামিক আধুনিকতা&#8217; গড়ার সত্যিকারের প্রচেষ্টা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হলো, বুদ্ধিজীবীদের হয় হত্যা করা হলো নয়তো মুখ বন্ধ করে দেওয়া হলো, এবং আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কগুলো ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হলো। যা কিছু অবশিষ্ট রইল, তা কেবলই কিছু ভগ্নাংশ, যা সময়ের সাথে সাথে প্রতিটি প্রজন্মের হাত ধরে কেবল আরও ক্ষয়ে গেছে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরই চূড়ান্ত ফলাফল হলো সমকালীন ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এই চরম দেউলিয়াত্ব। আমরা আজ ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের শুরুর দিকের তৈরি হওয়া ধারণাগুলোর ওপরই নির্ভর করে আছি—এই কারণে নয় যে ওই চিন্তাগুলো আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য খুব যথেষ্ট, বরং এই কারণে যে, নতুন চিন্তা উৎপাদনের সক্ষমতাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। পূর্বের সেই উদ্যোগগুলোকে সমালোচনা, পরিমার্জন এবং তার ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু গড়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগেরই আজ কোনো অস্তিত্ব নেই।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আল-আজহারের মতো একসময়ের গর্বের প্রতিষ্ঠানগুলো আজ তাদের সোনালী অতীতের নিছক নিষ্প্রাণ কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যারা চালাতেন, সেই প্রাজ্ঞ শ্রেণীটিকেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের হাতে এখন কেবল পড়ে আছে আগের ধারণাগুলোর ক্ষয়ে যাওয়া সস্তা সংস্করণ, না বুঝে আওড়ানো কিছু মুখস্ত স্লোগান, আর এমন এক চরম স্মৃতিভ্রষ্টতা—যেখানে আমরা টেরই পাই না যে, আমরা আসলে কী হারিয়েছি!</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16839 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_8_2026-05-22_19-15-18.jpg" alt="" width="736" height="1104" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_8_2026-05-22_19-15-18.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_8_2026-05-22_19-15-18-200x300.jpg 200w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2026/05/photo_8_2026-05-22_19-15-18-683x1024.jpg 683w" sizes="(max-width: 736px) 100vw, 736px" /></p>
<p>আধুনিক জাতিরাষ্ট্র আর আইডেন্টিটি নিয়ে আজ আমাদের এত দৌড়ঝাঁপ, অথচ এই পরিচয়ই ইতিহাসের বুকে মুসলিম উম্মাহর কবর রচনা করেছে।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আজকের মুসলিম দেশগুলোতে আমরা যে অসীম গহ্বরে ঢুকে গেছি, তা কি আসলে কোনোভাবেই বিশ্ব মুসলমানের শ্রম, সংগ্রাম ও স্বপ্নের মঞ্জিল হবার যোগ্য?&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইতিহাসের সঠিক বিন্দু থেকে শুরু করলে কিন্তু পালটে যায় আমাদের জয় পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আজ আমরা যাকে মুক্তি ও স্বাধীনতার রূপ দিচ্ছি, সেটা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় ছিলনা। ওর মধ্যে আমাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের কোন সম্ভাবনাই বিদ্যমান ছিলনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার সন্তান হিসেবে আমরা আমাদের পরাজয়কে ঘিরে খুব সযত্নে কিছু বয়ান দাঁড় করিয়েছি। এর মূল কেন্দ্রে থাকে উপনিবেশবাদের অবিচার আর পশ্চিমা বিশ্বাসঘাতকতার ফিরিস্তি। কেউ কেউ তো এই ডাহা পরাজয়কে এক ধরনের অদ্ভুত বিজয়ে রূপান্তর করে ফেলেন! বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী সভ্যতার এই চরম পতন নাকি আমাদের &#8216;নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের&#8217; প্রমাণ! আমরা নাকি এই কলুষিত আধুনিকতার জন্য বড্ড বেশিই পবিত্র ছিলাম; আমরা নাকি এতটাই নীতিবান ছিলাম যে, ক্ষমতার জন্য আপস করে নিজেদের কলঙ্কিত করতে চাইনি! মানে, আমরা যে হেরে গেছি, এটাই নাকি প্রমাণ করে যে আমরাই সঠিক ছিলাম!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এটা আসলে পরহেজগারির ছদ্মবেশে এক চূড়ান্ত আত্মপ্রবঞ্চনা। অতীতের নস্টালজিক রূপকথায় ডুব দিয়ে মুসলিম মানসের যে রুদ্ধদ্বার দশা, এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নিজেদের এই সর্বনাশের বিশালতাকে মেনে নেওয়ার সাহস না থাকায়, আমরা নিজেদের সব দায়ভার থেকে মুক্ত করে নিয়েছি। পরাজয়টাকে আমরা নিছক &#8216;আল্লাহর পরীক্ষা&#8217; বা &#8216;পশ্চিমা ষড়যন্ত্র&#8217; ছাড়া আর কিছুই ভাবতে রাজি নই। আর এই কাজটা করতে গিয়ে, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি যা দরকার ছিল, সেই &#8216;এজেন্সি&#8217;, খুদী, কর্তাসত্তা বা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকেই আমরা স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আচ্ছা, পরাজয়কে মেনে নেওয়া মানেই কি আত্মসমর্পণ? অথচ বাস্তবতাকে স্বীকার করা ছাড়া নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সক্ষমতা বা এজেন্সিকে পুনরুদ্ধার করা কি সম্ভব? আমার তা মনে হয়না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা যখন নির্দ্বিধায় মেনে নিতে পারব যে আমরা সর্বাত্মকভাবে মার খেয়েছি—আমাদের সামরিক শক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের শিকড় উপড়ে ফেলা হয়েছে—ঠিক তখনই আমাদের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটির দরজা খুলে যাবে যে, &#8220;কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে এমনটা আর কখনো ঘটবে না?&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কিন্তু আমরা যদি পরাজয়কে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাই</strong><strong>, যদি গোঁ ধরে বসে থাকি যে এটা আসলে অন্য কিছু (পরীক্ষা, রহমত বা আমাদের পবিত্রতার প্রমাণ), তাহলে আমরা কখনোই এই মূল প্রশ্নটি করতে পারব না। আমরা সময়ের ফাঁদে আটকা পড়ে থাকব, আর নিজেদের ঈমানি দৃঢ়তার পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে বারবার কেবল পরাজয়ের স্বাদই গ্রহণ করতে থাকব। মুসলিম মানসকে আটকে রাখা এই মেকি কাঁচের দেয়াল ভাঙতে হলে পরাজয়কে পুরোপুরি চিনতে হবে, মানতে হবে এবং তা আত্মস্থ করতে হবে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি বসে এর পুরো ভার বা যন্ত্রণাটুকু অনুভব করতে পারলেই কেবল আমরা বুঝতে পারব—কীভাবে আমরা আজকের এই দুর্দশায় এসে পৌঁছালাম, আর পুনর্গঠনের জন্য আমাদের ঠিক কী কী মূল্য চোকাতে হবে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধু বসে বসে অতীত বেদনায় হা-হুতাশ করাটা আমাদের এক জনপ্রিয় বিনোদন হয়ে উঠেছে। এভাবে কেবল হিসাব-নিকাশ কষলেই কাজ হবে না। কোনো কিছু বুঝতে হলে জ্ঞান প্রয়োজন, অথচ নিজেদের এই সাম্প্রতিক ইতিহাসটুকু বোঝার মতো জ্ঞানই আমাদের নেই। উমাইয়া, আব্বাসীয় বা অন্য যেকোনো সোনালী অতীত—যার ওপর আমরা অনায়াসে নিজেদের ফ্যান্টাসি চাপিয়ে দিতে পারি—সেগুলো নিয়ে আমরা যতটা সিরিয়াস, ১৯ ও ২০ শতকের ইতিহাসও আমাদের ঠিক একই একাডেমিক সিরিয়াসনেস দিয়ে পাঠ করতে হবে।&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইতিহাসকে কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিক্রমা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং একে দেখতে হবে বস্তুগত পরিস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং শাসকগোষ্ঠীর নেওয়া সিদ্ধান্তের ফসল হিসেবে। আমাদের ইতিহাসের এমন এক নিখুঁত তত্ত্ব দরকার, যা মানবসমাজের উত্থান-পতনের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে পারে। একইরকম অবস্থানে থাকা দুটো রাষ্ট্রের পরিণতি কেন দুই রকম হয়, কেন কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কিছু ধারণা বিকশিত হয় আর অন্য প্রেক্ষাপটে তা মরে যায়, এবং ঠিক কোন মেকানিজমের মাধ্যমে আস্ত একটি শ্রেণী বা জাতি হয়তো শীর্ষে পৌঁছায় অথবা তলিয়ে যায়—সেই ডায়নামিক্সগুলো আমাদের গভীরভাবে বুঝতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা পশ্চিমা উপনিবেশবাদের দখলদারিত্ব, শোষণ এবং সাংস্কৃতিক ঔদ্ধত্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ফোকাস করেছিলেন। সেই কাজের দরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু এর ফলে আমরা আমাদের ধ্বংসের প্রকৃত &#8216;টাইমলাইন&#8217; বা সময়কালকে ভুলভাবে নির্ণয় করেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এটা ঠিক যে উপনিবেশবাদ আমাদের দুর্বল করেছিল, কিন্তু ১৯ শতকের সেই সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারের ধীরগতির প্রক্রিয়ায় আমরা একেবারে ভেঙে পড়িনি। আমাদেরকে মূলত চুরমার করে দিয়েছে ২০ শতকের প্রথমার্ধের তিনটি সুনির্দিষ্ট মহাবিপর্যয়: উসমানী খেলাফতের পতন, উত্তরের সীমানায় কমিউনিজমের উত্থান, এবং ভারত বিভাজন। ১৮ বা ১৯ শতকের ঔপনিবেশিক চাপের চেয়েও বরং এই তিনটি ঘটনাই আমাদের সমাজব্যবস্থা, রাজনৈতিক কাঠামো এবং শত শত বছর ধরে জ্ঞান উৎপাদন টিকিয়ে রাখা আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কগুলোকে পাইকারি হারে ধ্বংস করে দিয়ে আমাদের সভ্যতার ধারাবাহিকতাকে চিরতরে ছিন্ন করে দিয়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো</em><em>, আজকে দেশে দেশে সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যেসব ‘&#8217;স্বাধীনতা” ও জাতীয়তা নিয়ে গর্বের বুলি ছুঁড়ি, মুক্তির স্বাদ নিতে চাই, সেই জাতীয়তা আর আইডেন্টিটিই ইতিহাসের বুকে মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের কবর রচনা করেছে। এই জাতিরাষ্ট্রের ধারণা, কোত্থেকে আসল আমাদের অঞ্চলে? ১৬৪৮ সালে ইউরোপের ওয়েস্টফেলিয়ায় জন্ম হলো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের, ১৯২০ শের পরে প্রায় আড়াইশো বছর পরে সেই রাষ্ট্র কেন জন্ম নিল মুসলিম অঞ্চলগুলোতে? যার জন্য এত সংগ্রাম, এত সংকল্প, একটি বারও কি প্রশ্ন করেছি আমরা?</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অথচ এই রাষ্ট্রগুলো প্রতিষ্ঠা হবার আগের চেয়ে পরের মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক দশা আরো করুন। এটা একাধারে যেমন উৎসাহব্যঞ্জক, তেমনি চরম হতাশাজনক যে—ব্রিটিশ বা রুশ সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও আলীগড় বা জাদিদ আন্দোলনের মতো সংস্কারকরা এক ধরনের সৃজনশীল সংস্কার ও মেলবন্ধনের কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। অথচ আজ উপনিবেশবাদ স্বনামে আর কোনো প্রভাবক না হওয়া সত্ত্বেও, আমরা সেই পরিমাণ বুদ্ধিবৃত্তিক তেজ দেখাতে হিমশিম খাচ্ছি। এই স্থবিরতা আসলে আমাদের নিজেদেরই ডেকে আনা এক ব্যাধি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নিজেদের ধ্বংসের এই সঠিক টাইমলাইনটা বুঝতে পারলে তবেই আমরা সঠিক প্রশ্নগুলো করতে পারব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা স্রেফ বিমূর্ত তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে এসে আমরা আমাদের কাজগুলোকে নিরেট ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ওপর দাঁড় করাতে পারব। আমাদের ঠিক ঠিক বুঝতে হবে আসলে কী ধ্বংস হয়েছিল: কোন প্রতিষ্ঠানগুলো হারিয়ে গেছে, কোন নেটওয়ার্কগুলো ছিঁড়ে গেছে, পৃষ্ঠপোষকতার কোন সিস্টেমগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক উৎপাদনকে বাঁচিয়ে রাখত, আর কোন সামাজিক ব্যবস্থা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে সচল রেখেছিল। এগুলো বুঝতে পারলেই কেবল আমরা মৃত কাঠামোগুলোকে কবর থেকে খুঁড়ে তোলার বৃথা চেষ্টার বদলে, আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানানসই নতুন কোনো সিস্টেম বা কাঠামো ডিজাইনের কথা ভাবতে পারব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নিজেদের ইতিহাসের সাথে এই সৎ হিসাব-নিকাশটুকু করার মতো, এবং আমাদের নিষ্ক্রিয়তাকে জায়েজ করার জন্য বানানো ওই স্বস্তিদায়ক রূপকথাগুলোকে ছুড়ে ফেলার মতো সাহস কি আমাদের আছে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানে কোনো শর্টকাট নেই। আকাশ থেকে কোনো গায়েবী সাহায্য এসে আমাদের হারানো অতীত ফিরিয়ে দেবে না। আমাদের সামনে এখন একটাই পথ—পরিশ্রম। আর তার শুরুটা হতে হবে সবকিছুকে একদম স্পষ্ট ও নির্মোহভাবে দেখার মধ্য দিয়ে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আমাদের শক্তিমান হয়ে উঠতে হবে। চিন্তায়, চেতনায়, মগজে, মননে। কেননা আল্লামা ইকবাল বলেছেন &#8211; সভ্যতা হলো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের রূপায়ন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-besieged-muslim-mind/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16831</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইবনে বতুতা: জ্ঞান, ভ্রমণ ও উম্মতের এক সংযোগরেখা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ibn-battuta-a-link-between-knowledge-travel-and-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ibn-battuta-a-link-between-knowledge-travel-and-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 14 Apr 2026 10:02:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16746</guid>

					<description><![CDATA[ইবনে বতুতা মাত্র ২১ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন, একটি ফরজ ইবাদত তথা হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে। তৎকালীন সময়ে হজ্জ পালন ও শেষ করে ফিরতে ১৬ মাস সময় লাগত। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এই সফর শেষ হয় ২৯ বছর পর। এই দীর্ঘ সময়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইবনে বতুতা মাত্র ২১ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন, একটি ফরজ ইবাদত তথা হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে। তৎকালীন সময়ে হজ্জ পালন ও শেষ করে ফিরতে ১৬ মাস সময় লাগত। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এই সফর শেষ হয় ২৯ বছর পর। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রায় ১,১৭,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ভ্রমণগুলোর একটি। এটি শুধু একজন মানুষের সাহসিকতার কিসসা নয়; বরং এক বিস্তৃত ও সুবিশাল ইসলামী সভ্যতার জীবন্ত প্রতিফলন।</p>
<p>১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, মরক্কোর ট্যানজিয়ারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছিলেন আইনবিদ ও বিচারকদের পরিবারে বেড়ে ওঠা এক মেধাবী মুখ। যদিও তার জীবন ছিল উম্মাহর ভূগোল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি মূলত ছিলেন একজন কাজী বা বিচারক, এবং উচুমাপের একজন ফকিহ। এই পরিচয়ই তাকে বিশ্বজুড়ে দরজা খুলে দেয়।</p>
<p>তার যাত্রা শুরু হয় একা, একটি গাধায় চড়ে। মক্কার পথে তিনি ভয়াবহ জ্বরে আক্রান্ত হন, এমনকি নিজেকে বেঁধে রাখতে হয়েছিল যাতে গাধার পিঠ থেকে পড়ে না যান। তবুও তিনি থামেননি। এই দৃঢ়তা ছিল ঈমান, দায়িত্ববোধ এবং অভিযাত্রিক মানসিকতার এক অনন্য সমন্বয়।</p>
<p><strong>মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় এক সুফি আলেম শায়েখ বুরহানউদ্দিন, তাকে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন, তিনি ভারত, সিন্ধ ও চীন সফর করবেন এবং নির্দিষ্ট কিছু আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আশ্চর্যের বিষয়, পরবর্তীতে তিনি ঠিক সেটাই করেন। এ ঘটনা থেকে ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানজগতের আন্তঃসংযোগ এবং আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতার দিকটি ফুটে উঠে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৩২৬ সালে তিনি হজ্জ সম্পন্ন করেন। এখানেই তার যাত্রা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বুঝে ফেলেন, এই ভ্রমণ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি এক উন্মুক্ত বিশ্ব, এক জ্ঞান ও সভ্যতার দরজা।</p>
<p>এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ, বহুমাত্রিক ভ্রমণ, কাফেলা থেকে কাফেলায়, শহর থেকে শহরে। কিছু কাফেলা ছিল চলমান শহরের মতো, যেখানে দরিদ্রদের জন্য বিশাল পাত্রে খাবার রান্না হতো, বাজার বসত, জ্ঞানচর্চা/দারস চলত। রাতের অন্ধকার মশালের আলোয় দিন হয়ে উঠত। সবই হত বিভিন্ন ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এর ছত্রছায়ায়। প্রতিটি অঞ্চলে ছিল মুসাফির খানা, খানকা ও দরগা; অর্থাৎ বর্তমান প্রযুক্তিগত ব্যাপার না থাকলেও ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মানবতার সবচেয়ে বড় সম্পদ।</p>
<p>এই চিত্রটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামী সভ্যতা স্থির নগরকেন্দ্রিক বা বর্তমানের আধুনিক বস্তি টাইপের ছিলোনা, বরং আমাদের শহর ছিল গতিশীল, সামাজিক ও সমন্বিত সংস্কৃতি নির্ভর, যা আধ্যাত্মিক সুমহান মাত্রা ছিল।</p>
<p>এরপর তার ভ্রমণ বিস্তৃত হয়,</p>
<p>পারস্য, ইরাক, আজারবাইজান, ইয়েমেন, আফ্রিকার শিং অঞ্চল, মোগাদিশু, কেনিয়া-তানজানিয়ার উপকূল, ক্রিমিয়া, কনস্টান্টিনোপল, মধ্য এশিয়া, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সুমাত্রা, চীন এবং মালি পর্যন্ত। তিনি সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করেন, চীনের গ্র্যান্ড ক্যানাল পাড়ি দেন, এবং বেইজিং, হাংজু ও গুয়াংজু সফর করেন।</p>
<p>তার মোট ভ্রমণ দূরত্ব ঝেং হে (৫০,০০০ কিমি) এবং মার্কো পোলো (২৪,০০০ কিমি)-এর তুলনায় অনেক বেশি। অথচ তার কোনো সাম্রাজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা নৌবাহিনী ছিল না।</p>
<p>তার আসল শক্তি ছিল, একটি বিস্তৃত ইসলামী সভ্যতার বিশ্বব্যবস্থা। তৎকালীন ইসলামি সভ্যতা মরক্কো থেকে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বিশাল ভূখণ্ডে আরবি ভাষা ছিল জ্ঞান ও প্রশাসনের সাধারণ মাধ্যম, আদালত, নিরাপত্তা, ওয়াকফ, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি ছিল একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য, এবং আলেমরা ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত।</p>
<p>এ কারণে একজন কাজী সহজেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে আতিথ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেতেন। এটিই ছিল সকল মানুষের জন্য এক ধরনের “সিভিলাইজেশনাল পাসপোর্ট”, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আগেই কার্যকর ছিল বা মানুষমুখী এক দুনিয়া ছিলো।</p>
<p>ইবন বতুতা সকল বাস্তবতাকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি বিভিন্ন রাজদরবারে কাজী হিসেবে নিযুক্ত হন, উপহার গ্রহণ করেন, জ্ঞানচর্চায় যুক্ত থাকেন, সামাজিকভাবে অবদান রাখেন এবং আবার নতুন পথে যাত্রা করেন।</p>
<p>এটি দেখায়, ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান ছিল চলাচলের মাধ্যম, আর আলেমরা ছিলেন বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত একটি শ্রেণি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তার লেখায় বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্যু ও শোকপালনের রীতি উঠে এসেছে, কোথাও ৪০ দিনের শোক, কোথাও উৎসবমুখর জানাজা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ভিন্নতা ও কুসংস্কার। তিনি এগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা তাকে এক অর্থে প্রাক-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীর পর্যায়ে নিয়ে যায়।</strong></p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে আসেন এবং দিল্লিতে তিনি প্রধান কাজী নিযুক্ত হন। তিনি আসেন অর্থনৈতিক হাব এবং জ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র বাংলা সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলে। ভ্রমণ করেন এই সবুজে ঘেরা জান্নাতাবাদে।</p>
<p>পরবর্তীতে দিল্লি থেকে তাকে চীনে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়, জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে তিনি জাহাজ মিস করেন, এবং সেই জাহাজগুলো ঝড়ে ডুবে যায়। এতে তার জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু এই ঘটনার পর তিনি দিল্লিতে ফিরে আসতে ভয় পান এবং মালদ্বীপে চলে যান।</p>
<p>মালদ্বীপে তিনি আবার কাজী হন, রাজপরিবারে বিবাহ করেন এবং রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি সুলতান হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু কিছু ঝুঁকির কারণে তিনি সরে যান।</p>
<p><img decoding="async" src="https://www.worldhistory.org/img/c/p/1600x900/18929.png"></p>
<p>তার জীবনে বিপদের শেষ ছিল না, ডাকাতি, জাহাজডুবি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। একবার ডাকাতরা সবকিছু লুট করে নেয়, শুধু তার পরনের কাপড় ছাড়া। তবুও তিনি হেঁটে কাফেলায় ফিরে যান।</p>
<p><strong>তার ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘রিহলা’ (যার পূর্ণ নাম تحفة النظار في غرائب الأمصار وعجائب الأسفار) তে ৬০ জনের বেশি সুলতান এবং ২০০০-এর বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ রয়েছে।</strong></p>
<p><strong>বিস্ময়কর বিষয় হল, তিনি কোনো ডায়েরি রাখেননি; বহু বছর পর সম্পূর্ণ স্মৃতির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল কাহিনি বর্ণনা করেন।</strong></p>
<p>যদিও কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, বিশেষ করে চীন সম্পর্কিত অংশে, তিনি হয়তো পূর্ববর্তী লেখকদের তথ্য ব্যবহার করেছেন, কারণ তার বর্ণনার সঙ্গে মার্কো পোলো-এর লেখার মিল পাওয়া যায়। তবুও তার অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি ইতিহাসে অনন্য।</p>
<p>জীবনের শেষদিকে মরক্কোর সুলতানের নির্দেশে তিনি এই কাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। এরপর তিনি আবার কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইতিহাসের আড়ালে চলে যান। ১৩৬৮ বা ১৩৬৯ সালে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তার কাজ মুসলিম বিশ্বের বাইরে অজানাই ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3><strong><span style="font-family: Kalpurush;">তৎকালীন ইসলামী সভ্যতার অবস্থান ও শ্রেষ্ঠত্ব</span></strong></h3>
<p>ইবন বতুতার ভ্রমণ আমাদের সামনে যে বাস্তবতা তুলে ধরে, তা হল, চতুর্দশ শতাব্দীর ইসলামী সভ্যতার বিশ্বব্যবস্থা ছিল একটি বিস্তৃত, সংযুক্ত এবং জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা।</p>
<ul>
<li><strong>ভাষাগত ঐক্য:</strong> আরবি ছিল জ্ঞান, ধর্ম ও প্রশাসনের সাধারণ ভাষা, যা বিভিন্ন জাতি ও অঞ্চলের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখত। ফারসি, উসমানী, বাংলা ভাষীরাও জ্ঞানগত কারণে আরবি জানতেন।</li>
<li><strong>আইনি কাঠামো:</strong> আদালত ও মারহামাত নির্ভর অভিন্ন আইনব্যবস্থা ছিল, ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিচার ও সামাজিক কাঠামো পরিচিত ছিল।</li>
<li><strong>জ্ঞান ও আলেমের মর্যাদা:</strong> আলেম, কাদি ও জ্ঞানচর্চাকারীরা সর্বত্র সম্মানিত ছিলেন, যা জ্ঞানকে বৈশ্বিকভাবে চলাচলযোগ্য করে তোলে।</li>
<li><strong>আতিথ্য ও সামাজিক অবস্থা:</strong> মাদ্রাসা, খানকাহ ও দরগা, মসজিদ ও ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ভ্রমণকারীদের আশ্রয় ও সহায়তা দিত। যা সকলের জন্যই উন্মুক্ত ছিল।</li>
<li><strong>বাণিজ্য ও যোগাযোগ:</strong> তৎকালীন ইসলামী সভ্যতার অর্থনীতি ও বাণিজ্য ছিল সবচেয়ে উন্নত, অর্থাৎ স্থল ও সমুদ্রপথে বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক পুরো সভ্যতাকে অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত রেখেছিল।</li>
<li><strong>আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য:</strong> বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক আবহ পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে যুক্ত করে রেখেছিল।</li>
</ul>
<p>এই প্রেক্ষাপটেই ইবন বতুতার ভ্রমণ সম্ভব হয়েছিল। তিনি একা ছিলেন না, বরং তার পেছনে ছিল একটি আদিল সভ্যতা।</p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<p>পরিশেষে বলা যায়,</p>
<p>ইবন বতুতা অভিযাত্রী হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হননি, তিনি বের হয়েছিলেন একটি ফরজ ইবাদত পালনের জন্য, কিন্তু এই যাত্রা তাকে এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে একটি সভ্যতা জ্ঞান, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ। যে উপলব্ধিই পরবর্তী প্রজন্মকে অনেক দলীল উপহার দিয়েছে।</p>
<p>তার ‘রিহলা’ শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়; এটি একটি সভ্যতার জীবন্ত দলিল, মুসলিম উম্মাহর সমাজ, বৈশ্বিক সংযোগ এবং আখলাকী শক্তির প্রতিচ্ছবি।</p>
<p>কেননা মার্কো পোলো-এর ছিল পৃষ্ঠপোষকতা ও বাণিজ্যপথ, ঝেং হে-এর ছিল সাম্রাজ্যিক নৌবহর। কিন্তু ইবন বতুতার ছিল, এক উম্মাহ, এক জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা, আদালতনির্ভর বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য, এবং ইস্তেকামাতের শক্তি।।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ibn-battuta-a-link-between-knowledge-travel-and-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16746</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মানব সভ্যতার প্রতি ইসলামী সভ্যতার অবদান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 Jan 2026 08:44:09 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16488</guid>

					<description><![CDATA[মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি খুব ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। বিশেষ করে &#8216;শক্তি&#8217;-র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহের নাম আলাদা হলেও তাদের মূলনীতি সমূহ ছিল এক ও অভিন্ন।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি খুব ভালো ভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। বিশেষ করে &#8216;শক্তি&#8217;-র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সমূহের নাম আলাদা হলেও তাদের মূলনীতি সমূহ ছিল এক ও অভিন্ন। তাদের সভ্যতার মূলে ছিল শোষণ ও জুলুম।।</p>
<p>কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত হল ইসলামী সভ্যতা। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল ইসলামী বিপ্লব, যা সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদ (সঃ) এর নেতৃত্বে হয়েছিল। এই বিপ্লব ছিল এমন এক বিপ্লব যা সকল নিয়ম নীতিকে পাল্টে দিয়ে সংগঠিত হয়েছিল এবং যার প্রভাবে সমগ্র পৃথিবী নতুন করে সেজেছিল।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা মানবতার জন্য কি এনেছে? কি দিয়েছে? আমি এর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করতে চাইঃ</p>
<p><strong>১। মানবাধিকার</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">সত্যিকারের মানবাধিকারের প্রবক্তা হল ইসলামী সভ্যতা। ইসলামী সভ্যতাই প্রথম মানুষকে মানবাধিকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের ধ্বজাধারীরা এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আংশিকভাবে একে গ্রহণ করলেও তাদের পন্থা ও ব্যবস্থা ফেরাউনী ব্যবস্থা তথা জুলুম তান্ত্রিক হওয়ার কারণে এই মানবাধিকারের ধারণার মধ্যকার মৌলিকত্বকে নষ্ট করে দেয় তথা degenerate করে ফেলে। আজকে সকল সমস্যার মূলে রয়েছে তাদের এই degeneration। তারা ইসলামের কাছ থেকে নেয় এবং প্রভাবিত হয় কিন্তু সেটাকে নষ্ট করে জুলুমে রূপান্তর করে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">দেখুন মানবাধিকার রক্ষা করার নামে তারা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছে কিন্তু এই জাতিসংঘে অন্যায় ভাবে &#8216;ভেটো পাওয়ার&#8217; নামে একটা ধারা যুক্ত করে দিয়েছে। আমি এটাকে বলি ফেরাউনী ধারা। এই ফেরাউনী ধারাকে ব্যবহার করে তারা যা ইচ্ছা তাই করে। তারা ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, কিন্তু Degenerate করে ফেলেছে।</p>
<p><strong>২। শোষনের বিলোপ সাধন</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার বিধান এনেছে ইসলামী সভ্যতা। এখানে থেকে ইলহাম নিয়ে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করে। মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করব এই কথার নামে তারা মানুষকে রাজনৈতিক শক্তির দাস বানিয়ে মানুষকে রাজনৈতিক শক্তির শোষণের শিকার বানিয়েছে। কারণ তাদের মূলে রয়েছে &#8216;শক্তি&#8217;। শক্তিকে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড মনে করে থাকে।</p>
<p><strong>৩। মুক্তবাজার অর্থনীতি</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">মুক্তবাজার অর্থনীতির ধরণা দিয়েছে ইসলাম। রাসূল (সঃ) সর্ব প্রথম মদিনার বাজারে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। সকলেই তার ইচ্ছামত ও মর্জিমত ক্রয় বিক্রয় করবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;">এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ (ক্যাপিটালিজম) এর প্রবর্তন করে। কিন্তু শক্তির পূজারী হওয়ার কারণে ও শক্তিকে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড মনে করার কারণে মনোপলি (একচেটিয়া), পূঁজিপতিদের শোষণের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে।</p>
<p><strong>৪। চুক্তির স্বাধীনতা</strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">ইসলাম মানুষকে ন্যায়ের ভিত্তিতে চুক্তি করার স্বাধীনতা দিয়েছে। পাশ্চাত্য ভূমি আইন, বিয়ে শাদী ইত্যাদিতে কিছু আইন প্রবর্তন করেছে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু আইন প্রবর্তন করেছে। কিন্তু এই স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে মানুষকে সামগ্রিকভাবে দিতে পারেনি। সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানুষের যে স্বাধীনতা রয়েছে সেই স্বাধীনতা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করেছে।</p>
<p>৫। <strong>ইসলামে সামাজিক কাঠামোতে আপোষ রফা রয়েছে। </strong></p>
<p style="padding-left: 40px;">পাশ্চাত্যের ধারকরা মুসলমানদের প্রভাবে তাদের প্রাচীন Feudalism এর স্থলে কোয়ালিশন গঠন করার পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কর্তৃত্বের অধীনে এবং রাষ্ট্রের সকল শক্তিকে কুক্ষিগতকারী আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসিতে রূপান্তরিত করে পুণরায় ফেরাউনিজমে (জুলুমতন্ত্রে) পরিণত করে।</p>
<p>[মিল্লি গরুশ আন্দোলনের নেতা ও তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকানের <strong>&#8216;ইসলামে জ্ঞানের ধারা ও জ্ঞানপদ্ধতি&#8217;</strong> নামক কনফারেন্স থেকে অনূদিত]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> <a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-islamic-civilization-to-human-civilizations/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16488</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতা; রাষ্ট্রের সীমা পেরিয়ে এক চিন্তার উত্তরাধিকার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 26 Jan 2026 17:39:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16484</guid>

					<description><![CDATA[আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে আমরা ইতিহাসের যে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছি, তাতে অনেক সময় ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের সীমাবদ্ধ ও সংকুচিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু এগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো মোটেও ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি বা অবসানের তারিখ নয়।</p>
<p>কারণ ইসলামী সভ্যতা কখনোই কোনো একটি রাষ্ট্রনির্ভর, নিছক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড়ায়নি। রাষ্ট্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল বটে, কিন্তু তা কখনোই একমাত্র ভিত্তি ছিল না। ইসলামী সভ্যতা কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বা ক্ষমতাকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা নয়। হ্যাঁ, ক্ষমতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা ছিল বৃহত্তর এক সভ্যতাগত ব্যবস্থার অংশমাত্র। ইসলামী সভ্যতা মূলত একটি সামগ্রিক সভ্যতা; যার কেন্দ্রে ছিল এক সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি, একটি চিন্তাধারা, একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনদর্শন। সেই দর্শনের আলোকে গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চা, শহর-স্থাপত্য, শিল্পকলা, সাহিত্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক কাঠামো।</p>
<p>এ কারণেই বলা হয়, হক ও শক্তিশালী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সভ্যতার যাত্রা কখনো বিলীন হয় না। ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, সেসব অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোথাও উপনিবেশিক শোষণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা ছিল ভয়াবহ; কোথাও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এতকিছুর মধ্য দিয়েও সেই সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন, শহরচিন্তা ও জ্ঞানগত উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।</p>
<p>সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্ঞান। বইয়ের পাতায়, আলেম ও চিন্তকদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের সিলসিলার মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা আজও জীবিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যগুলি, মসজিদ, মাদরাসা, সেতু, নগর পরিকল্পনার নিদর্শন, নিজেদের নীরব ভাষায় সেই সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। পাথরে খোদাই করা হাকিকতের রূহ, কারুকার্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা দর্শন আজও আমাদের সামনে উপস্থিত।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতায় শহর পরিকল্পনা ছিল গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল। পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব নগর; যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ‘শহরের রূহ’ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই রূহ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে। এক বিন্দু পরিমাণও সে রূহ থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি।</strong></p>
<p>শিল্পকলার প্রতিটি শাখায়; গান, কাব্য, ক্যালিওগ্রাফির রেখায় রেখায় আমরা দেখি সভ্যতার রূহানি ও আধ্যাত্মিক দিক। সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্বকে বোঝার যে চিন্তা সিলসিলা, তা আজও বিদ্যমান। মানবিক মূল্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব, ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য; সবই ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।</p>
<p>রমজান থেকে ঈদ, জিয়াফত থেকে সামাজিক উৎসব সবকিছু আজও আমাদের জীবনে এক গভীর রূহানি আবেশ নিয়ে উপস্থিত।</p>
<p>রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে, কিন্তু সভ্যতা তখনই ধ্বংস হয়, যখন মানুষের চিন্তাগত, নৈতিক, জ্ঞানগত, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক স্তর থেকে সেই সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ মুছে যায়। ইসলামী সভ্যতা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজও নানা রূপে, নানা মাত্রায় আমাদের মাঝে বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা ও রাষ্ট্র: সম্পর্ক ও বুঝাপড়া</strong></p>
<p>এখানে একটি মৌলিক সভ্যতাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি, সভ্যতা ও রাষ্ট্র কখনোই একার্থক নয়। সভ্যতা মূলত মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, আখলাক, জ্ঞান, রুচিবোধ, নান্দনিকতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সমষ্টিগত রূপ; আর রাষ্ট্র হলো, সেই সভ্যতাগত জীবনের শাসন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি সাময়িক কাঠামো। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের পেছনে থাকা সভ্যতাগত চিন্তা ও মূল্যবোধ যুগের পর যুগ ধরে বহমান থেকেছে। ইসলামী সভ্যতা এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছে।</p>
<blockquote><p>ইসলামি সভ্যতায় রাষ্ট্র কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না; রাষ্ট্র ছিল একটি উসিলা বা মাধ্যম। রাজনীতি এখানে গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র পথ নয়; বরং রাজনীতি ছিল আখলাক সমৃদ্ধ সমাজ, নৈতিক নগর, সাংস্কৃতিক ভারসাম্য এবং জ্ঞানচর্চার সহায়ক শক্তি। এই কারণেই ইসলামি সভ্যতায় রাজনীতিকে কখনোই সর্বগ্রাসী করা হয়নি; বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা ও জ্ঞান সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।</p></blockquote>
<p>ইসলামী সভ্যতা আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র একটি মাধ্যম, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রাজনীতি এখানে কখনোই গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র উপায় ছিল না; বরং রাজনীতি ছিল একটি উসিলা। রাষ্ট্র ও রাজনীতি নৈতিক সমাজ, আখলাক সমৃদ্ধ নগর, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন এবং জ্ঞান ও রুচিবোধের সেবক হিসেবে কাজ করত।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আলেমদের জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব দৃঢ় হয়, মানুষ তার আত্মিক শান্তি খুঁজে পায়, রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল এসবের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা। এখানে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ ছিল ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অবকাঠামো, যা রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়েও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, মুসাফিরখানা, খাদ্য ব্যবস্থা, পানি ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছিল। আধুনিক রাষ্ট্র যে সামাজিক সেবাগুলোকে আজ ‘ওয়েলফেয়ার’ বলে চিহ্নিত করে, তার বড় অংশই ইসলামী সভ্যতায় ওয়াকফের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হলেও সমাজ ভেঙে পড়েনি; সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ রাজনীতি, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা, নগর বিনির্মাণ, সবকিছুই ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।</p>
<p>এই ইবাদতসম রূপেই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়েছিল। <strong>নগরগুলো মানুষের জন্য গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়। এমনকি কোথাও ক্ষমতার প্রকাশ থাকলেও, এক পর্যায়ে তা মানুষের কল্যাণের দিকেই নিবেদিত হতে বাধ্য হতো। কারণ সমাজ, জ্ঞান ও আলেমদের ভূমিকা ছিল আখলাক বিনির্মাণে কেন্দ্রীভূত।</strong> ফলশ্রুতিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ইসলামি সভ্যতা মানবতাকে দিয়ে গিয়েছে। কারণ ইসলামি সভ্যতার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না রাষ্ট্রকে, সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রকে বা নির্দিষ্ট কিছু দ্বারা দখল করা। একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সকলের কল্যাণ।</p>
<p>ব্রিটিশ জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করতে শিখেছি যে রাষ্ট্র দখল করলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়, বা কোনো কিছুকে দখল করে নিলেই সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এটিও আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মিরাস নয়। আমাদের পূর্বপুরুষগণ একটি সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিলেন, যেখানে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, জ্ঞান ও চিন্তা, শহর, স্থাপত্য, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি থেকে পরিবেশ সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি সিভিলাইজেশনাল বা সভ্যতাগত ক্ষেত্র, রাষ্ট্র বা দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</p>
<p>এখানে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ হল, এই সভ্যতা বিনির্মাণের কাজটি সকল মানুষ করতে পারত। এই কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো সমাজ, এবং সমাজ শক্তিশালী হতো। সমাজ শক্তিশালী হলে সেখান থেকে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসত। অর্থাৎ এই চিন্তাধারা মূলত মানুষকে কনভেন্স করত, মানুষের উপর প্রভাব সৃষ্টি করত। মানুষ নিজের আকল খাটিয়ে তার সঠিক কাজের ক্ষেত্র, অবদানের জায়গা, নিজের উপকারের ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারত এবং সে অনুযায়ী অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমরা সেই জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছি।</p>
<p>পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের উপর একচ্ছত্রভাবে রাজনীতি করেছে, কিন্তু সেই রাজনীতি বহুক্ষেত্রেই আমাদের স্বাধীনতা দেয়নি। তারা চাপিয়ে দেওয়া শিখিয়েছে, জোরপূর্বক দখল, ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনীতি চাপিয়ে দেওয়া, ঋণ চাপিয়ে দেওয়া। কৃষি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে শোষণ এবং শোষণ নিয়ে কিছু বলা যাবে না, এই ধরনের চিন্তা চাপিয়ে দেওয়া; সবই তারা করেছে। অথচ ইসলামি সভ্যতার মূল পন্থা ছিল ইক্বনা অর্থাৎ কনভেন্স করা। কনভেন্স করেই এগিয়ে যাওয়া।</p>
<p>এই কনভেন্সের সবচেয়ে বড় নমুনা আমরা পাই প্রতিটি স্থাপত্যে। স্থাপত্য যখন চিন্তার ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেটিও ছিল কনভেন্সের একটি অংশ। মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিশীলতা, সর্বোচ্চ চিন্তা এবং সর্বোচ্চ হাকিকতের দিকে ধাবিত করার একটি মাধ্যম ছিল এটি। তাই ইসলামী সভ্যতায় ইস্তাম্বুল থেকে আন্দালুস, ইস্পাহান থেকে কুতুব মিনার- কোনো স্থাপত্যই শুধু ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়। এগুলো ছিল একেকটি চিন্তা ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>স্থাপত্য: চিন্তা ও আখলাকের দৃশ্যমান ভাষা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় স্থাপত্য ছিল এক ধরনের নীরব দাওয়াত। এটি কেবল ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়; বরং চিন্তা, দর্শন ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েই মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিবোধ, সর্বোচ্চ শালীনতা এবং তাওহিদের চিন্তার দিকে আহ্বান জানানো হতো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার স্থাপত্য কখনোই ইট-পাথরের সমষ্টি ছিল না। কর্ডোভার মসজিদের অসংখ্য খিলান বহুত্বের ভেতর ঐক্যের- ‘ওয়াহদাত’-এর ঘোষণা দেয়। আল-হামরার দেয়ালে খোদাই করা “লা গালিবা ইল্লাল্লাহু” কোনো সামরিক বিজয়ের ঘোষণা নয়; বরং ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের স্থায়ী স্মারক। একইভাবে ঝিনাইদহের মোহাম্মাদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানা, দারসবাড়ি (ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও কিছুটা হলেও টিকে আছে), খুলনার খান-জাহানের মসজিদও একইভাবে ওয়াহদাতের ঐক্যের দর্শন ফুটিয়ে তোলে।</p>
<p>অর্থাৎ প্রতিটি জায়গায়; এই সভ্যতা ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একই সাথে হক্ব ও হাকিকতের চিন্তা, যার প্রস্ফুটিত রূপ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সকল অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেটি পেরেছিল বলেই সেই চিন্তার ভাষা আজও আমাদের আন্দোলিত করে। এর ছোট্ট নমুনা হলো- প্রতিটি মসজিদের পাথর, যা এখনও যেন ধ্যানে মগ্ন। সৌন্দর্য যেন জিকিররত, জ্ঞান যেন এখনও নূর ছড়াচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বাংলার ইসলামী সভ্যতা: আখলাক ও মূল্যবোধের সভ্যতা&#8217;</strong></p>
<p>বাংলার ইসলামী সভ্যতা এবং বাংলায় ইসলামের আগমন ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ৩০০ বছর ধরে আলেমগণ, সুফি ও ব্যবসায়ীগণ আখলাকের দাওয়াত ও বাস্তব উপমা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এর ফলে সমাজ ও ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানসহ নানাবিধ উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এর ফলেই বিনা রক্তপাতে এখানে একটি বিজয় সাধিত হয়েছিল। এই বিজয়ের মূল ধারক ও বাহক ছিলেন সুফি দরবেশ, আলেম ও আখলাকসম্পন্ন ব্যবসায়ীগণ। তাঁরা এখানে সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে এই সুফি আলেমদের প্রভাবে ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের আখলাক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার ফলে যুগ যুগ ধরে সকল ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে একটি শক্তিশালী, আস্থাশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। দুনিয়ার চার ভাগের একভাগ অর্থনীতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। কৃষি, সমুদ্রাঞ্চল স্থাপনা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও শহর, নদীমাতৃক অঞ্চলে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সবকিছুই শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছিল।</p>
<p>ব্রিটিশ উপনিবেশের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও প্রায় ২০০ বছরের নিকৃষ্ট শোষণ চালানো হয়। আমরা হারিয়েছি আমাদের হাফেজা, স্থাপনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনি কাঠামো, সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক নীতি, বিশাল ওয়াক্‌ফ জমি, বনাঞ্চল ও প্রাণ প্রকৃতি। তবু এই ক্ষতির মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, পারিবারিক মূল্যবোধ আজও টিকে আছে।</p>
<p><strong>ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ষাট গম্বুজ মসজিদ আমাদের দেখায়, তাঁরা শুধু জিকিরের মজলিশে নিমজ্জিত ছিলেন না; পানির নহর, অর্থনীতি, কৃষি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কত ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন।</strong> প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা এমন সিলসিলা তৈরি করেছিলেন, যেখানে নদী, বাতাস ও আলোকে উপেক্ষা করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।</p>
<p><strong>চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানায় আজও মানুষের খাবারের ব্যবস্থার নিদর্শন দেখা যায়।</strong> অর্থাৎ একত্রে বসা ও মানুষের সাথে মেশার সংস্কৃতি আজও রমজান, ঈদ, শবে বরাত, মিলাদ ও মিরাজের মাধ্যমে বিদ্যমান।</p>
<p>শরফুদ্দিন আবু দাওয়ামার রেখে যাওয়া ফিকহি সিলসিলা, হাদিসের দারস, দারসবাড়ির জ্ঞান; সবই আজও সুফি আলেমদের মাদরাসা ও মসজিদের মাধ্যমে নানাভাবে বিদ্যমান। মক্তব সংস্কৃতি, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, একত্রে ইফতার, সহযোগিতা, গোশত বণ্টন, একজনের দ্বারা বহু মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার সংস্কৃতি আজও জীবিত।</p>
<p>সব সংকটের মধ্য দিয়েও আমরা একদিনের জন্যও আজান বন্ধ হতে দেইনি। নবী(সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো পরাস্ত হয়নি। কারণ বাংলার ইসলামী সভ্যতা কোনো স্থান দখল করেনি, স্থানকে আপন করে নিয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকাশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকল্প, অর্থনীতি ও কৃষির পুনরুত্থান সবই তাঁদের অবদান।</p>
<p>এত শোষণের পরও যদি এত কিছু টিকে থাকে, তবে এটুকুই বলা যায়, আমরা এমন একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক, যার রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পতন হলেও চিন্তা ও আখলাকি সিলসিলা শক্তভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি সভ্যতায় প্রতিটি শহর নিরাপদ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানরা শাসন করলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করেছে।</p>
<p>এই সভ্যতা কোনো ধর্ম, জ্ঞান বা ভাষাকে নষ্ট করেনি, বরং বিকশিত করেছে। এর বড় প্রমাণ বাংলা ভাষা। মুঘলদের চারবাগ সংস্কৃতি, পানির ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনায় জান্নাতের ধারণাকে দুনিয়ার নৈতিক ও শালীন রূপে প্রকাশ করা হয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা আজও একসাথে বসবাসের অবস্থান ধরে রাখতে পারছি, এটাই ইসলামী সভ্যতার অবদান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা কেন বিলিন হয়নি?</strong></p>
<p>সভ্যতা তখনই বিলুপ্ত হয়, যখন মানুষের চিন্তা থেকে নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও হাকিকতের অন্বেষণ মুছে যায়। যে সভ্যতা আখলাককে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, সে সভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের ভিত নিজেই ক্ষয় করে। ইসলামী সভ্যতা কখনোই আখলাককে প্রান্তে ঠেলে দেয়নি; বরং সভ্যতা ও আখলাককে সমার্থক করে তুলেছিল। এই কারণেই রাজনৈতিক পতন, উপনিবেশিক শোষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসলামী সভ্যতা সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতা কখনোই শুধু ক্ষমতা বা রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়নি। এটি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত, হাকিকত অন্বেষী এবং মানবতার কল্যাণমুখী এক সভ্যতা। মানুষকে সে দেখেছে সভ্যতা বিনির্মাণের কারিগর হিসেবে, আয়াত হিসেবে। ফলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লেও চিন্তা, আখলাক, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের সিলসিলা আজও বহমান।</strong> আন্দালুস থেকে আনাতোলিয়া, মদিনা থেকে বাগদাদ, শাম থেকে দিল্লি, ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকা; রাষ্ট্রীয় পতন সত্ত্বেও এই নগরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় জাগরণসহ নানা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের জন্য ছায়ার ভূমিকা পালন করেছে। ইবনে সিনা, ফারাবী, ফখরুদ্দিন রাজী, ইবনে খালদুনের মতো চিন্তকরা এমন জ্ঞান রেখে গেছেন, যার ওপর আজকের দুনিয়া এখনও দাঁড়িয়ে আছে।</p>
<p>এই সভ্যতা ইতিহাসকে জাদুঘরের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। আন্দালুস, বাংলা, মুঘল বা ইস্তাম্বুল; সবখানেই সুর এক, বাদ্যযন্ত্র আলাদা। রূহানি আবেশ ও আখলাকি পরশ একই। এ কারণেই ইসলামী সভ্যতা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের গভীরে প্রথিত হয়েছে, আজও যা প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক।।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16484</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া; ঐতিহাসিক শিকড় ও জাতিসত্তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Dec 2025 18:59:32 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16417</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি</strong></h5>
<p>মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসলে সেই ভিত্তিগুলিই। কারণ, এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার, কিংবা অঞ্চলভেদে ভিন্নভাবে চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই। এগুলোই ইসলামী চিন্তাধারা ও শরীয়তের কেন্দ্র, যার বাইরে ইসলামকে কল্পনা করা যায় না।</p>
<p>তবে আমার প্রশ্নটি কিছুটা ভিন্ন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নানা ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে। আমরা দেখি, প্রতিটি জাতিসত্তার রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ, ঐতিহ্য ও মানসিক গঠন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রশ্ন আসে, ইসলামী ব্যবস্থা কীভাবে এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে?</p>
<p>ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনো অঞ্চল ইসলাম গ্রহণ করলে সেখানে শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনও ইসলামের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজ জীবনে তিনভাবে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে মূল্যায়ন করেছেন,</p>
<p><strong>প্রথমত, সরাসরি গ্রহণ।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মৌলিক নীতির বিরোধী নয় এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রেও আপত্তিকর নয়, সেগুলো তিনি গ্রহণ করতেন। সমাজের জন্য কল্যাণকর ও ক্ষতিহীন উপাদানগুলোকে তিনি অনুমোদন দিতেন।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, সংযোজন বা সংস্কার করে গ্রহণ।</strong><br />
যে প্রথাগুলোর কিছু অংশ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল, সেগুলোর নেতিবাচক দিক বাদ দিয়ে, ইতিবাচক অংশকে ইসলামী নৈতিকতা যোগ করে নতুনভাবে প্রয়োগ করতেন। এর ফলে সমাজে এক নতুন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি হতো।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত, সরাসরি প্রত্যাখ্যান।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মূলনীতির বিপরীত, শিরক বা কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে- সেগুলো তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন।</p>
<p>অতএব, ইসলামের উসুল বা আসাসুল কুল্লিয়া, অর্থাৎ মৌলিক নীতিগুলোই ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি সঠিকভাবে বোঝা ও প্রতিষ্ঠা করা না গেলে, সংস্কৃতির ধারাটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই সমাজে এই নীতিগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা আলেম ও প্রজ্ঞাবানদের দায়িত্ব।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার আলেমগণ সর্বদা এই নীতিগুলোকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করতেন। ফলে ইসলামের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় মূলনীতি টিকে থাকত, আর পরিবর্তনশীল বিষয়ে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজন ঘটত।</p>
<p>যেসব বিষয়ে সময় ও সমাজের প্রয়োজনে পরিবর্তন আসত, সেখানে ইসলাম নমনীয়তা ও প্রজ্ঞা দেখিয়েছে। তবে “বিদআত” ধারণাটি এখানে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়।<br />
অনেকে মনে করেন, নবী করিম ﷺ এর যুগে না থাকা যেকোনো নতুন কিছুই বিদআত। কিন্তু তা সঠিক নয়। বিদআত হচ্ছে সেই কাজ, যা সুন্নতের বিপরীতে, ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী, এবং কেউ সেটিকে ইবাদতের অংশ বা সওয়াবের কাজ হিসেবে মনে করে।</p>
<p>অন্যদিকে, কোনো কাজ যদি ইসলামের স্থায়ী নীতির বিপরীত না হয়, বরং আঞ্চলিক প্রয়োজনে সমাজে উপকারী ভূমিকা রাখে, তবে সেটি ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীত কিছু নয়। বরং এটি সেই সমাজের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবেই টিকে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সংস্কৃতিতে ইসলামের বিশ্বজনীনতা</strong></h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে কোনো আলেম বা সুলতান কখনোই এমন প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করেননি।<br />
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি (তুরাস ও তামাদ্দুন) সবসময়ই ছিল বিস্তৃত, গভীর ও মানবিক। মুসলমানরা যখন বিভিন্ন ভূখণ্ডে গিয়েছে, তারা সেই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। যেমন তারা মানুষের অন্তর জয় করেছে, তেমনি গড়ে তুলেছে রাজধানী ও নগর, স্থাপত্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামো, এবং সমাজজীবনের বিভিন্ন রূপ।</p>
<p>প্রশ্ন হল, তারা এটি কীভাবে করতে পেরেছিল?<br />
ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায়, মদিনা ব্যতীত প্রায় সব ইসলামী রাজধানীতেই মুসলমানদের তুলনায় অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল বেশি। তবুও তারা সেখানে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করেছে। নিজেদের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় ও ভাষা সযত্নে রক্ষা করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, তারা কখনো একে হুমকি হিসেবে দেখেনি; বরং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ছিল তাদের পূর্ণ আনুগত্য, এবং শত শত বছর তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রেখেছে।</p>
<p>এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে ছিল ইসলামী সভ্যতার সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং উৎকৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ। এ ধরনের গভীর সহাবস্থান কেবল তখনই সম্ভব, যখন সভ্যতা তার মূল নীতিতে অবিচল থেকে পারিপার্শ্বিক বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে।</p>
<p>একইভাবে, মুসলমানদের উসূলী ভিত্তি, সাংস্কৃতিক কাঠামো, ইবাদত ও শরীয়তের কোনো দিকই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা সংকটে পড়েনি। বরং তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অটুট রেখেই ইসলামী আদর্শের সীমার মধ্যে থেকে সবকিছু সুচারুভাবে পালন করতে পেরেছে। এভাবেই ইসলাম, একদিকে তার চিরন্তন নীতিতে অবিচল থেকেছে, অন্যদিকে মানবজাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে এক বিশ্বজনীন সভ্যতার রূপ ধারণ করেছে।</p>
<p>আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, <strong>৬৯ হিজরিতে লালমনিরহাটে সাহাবী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</strong> অর্থাৎ, ইসলামের আগমন এই ভূখণ্ডেও ঘটেছিল প্রাচীনকালেই। সাহাবীগণ, আলেম ও সুফিগণ এ অঞ্চলে এসে মসজিদ, খানকা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।</p>
<p>তবে এসব প্রতিষ্ঠান কেবল মুসলমানদের আকৃষ্ট করা, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি, প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা, আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। খানকা ও দরগাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতেন এবং নিরাপদ বোধ করতেন। সেখানে খাবারের ব্যবস্থা ছিল, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগও ছিল সবার জন্য। একইভাবে, মুসলমানরা যেমন নামাজ-রোজা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করেননি, তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এভাবেই ইসলামী সংস্কৃতি এখানে বিকশিত হয়েছিল এক মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহাবস্থানমূলক রূপে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বৈচিত্র্যেই ঐক্যের সৌন্দর্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা খাদ্য, পোশাক, স্থাপত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উপকারী ও নান্দনিক উপাদান গ্রহণ করেছে, কিন্তু কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে একরকম করে দেয়নি। যেমন, নোয়াখালীর বাজরা মসজিদ ও ইস্তাম্বুলের সুলতান ফাতিহ মসজিদ এক নয়,<br />
দিল্লির জুমা মসজিদ ও ইস্পাহানের মসজিদও একই কাঠামোয় নির্মিত নয়।<br />
কিন্তু সবগুলোতেই দেখা যায় এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য; উচ্চ রুচিবোধ, নান্দনিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও ভারসাম্য।</p>
<p>এই সৌন্দর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনই ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বলকান থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জীবনধারা আজও রুচিশীল, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ।</p>
<p>এর কারণ একটাই, তারা ইসলামের স্থায়ী মূলনীতির প্রতি অনুগত থেকেও, প্রতিটি সমাজে কল্যাণকর, রুচিসম্পন্ন ও উপযোগী সংস্কৃতি বিকাশ করেছে। এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মহত্ত্ব ও সাফল্যের আসল রহস্য।</p>
<p>খাদ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য ছিল। <strong>ইসলামী সভ্যতায় খাদ্যের স্থায়ী নীতি ছিল, এটি যেন হালাল, স্বাস্থ্যকর ও উপকারী হয়।</strong> বাকিগুলো অঞ্চল, জলবায়ু ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈচিত্র্যময় রূপ পেয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম একদিকে বৈশ্বিক হলেও, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে মানানসই একটি সংস্কৃতির ধারা তৈরি করতে পেরেছে— যা আজও টিকে আছে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মুসলমানরা প্রতিটি স্থানে স্থানীয় স্বতন্ত্রতা ও সংস্কৃতি রক্ষা করেই এক সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল সংস্কৃতি উপহার দিয়েছে। ইসলামের আঞ্চলিক অভিযোজন সর্বত্র সুরক্ষিত ছিল। স্থানীয় খাবার, পোশাক, স্থাপত্য, উৎসব— সবকিছুই নিজস্ব আঙ্গিকে টিকে থেকেছে, আবার ইসলামের স্থায়ী নীতি ও নৈতিক শিক্ষা একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ইসলামী সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান</strong></h5>
<p>এখানে প্রশ্ন আসে, ইসলামী সভ্যতার সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান কীভাবে কার্যকর ছিল? এটি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে ইসলামী সংস্কৃতি এবং আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।<br />
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মূলত নিয়ন্ত্রণ, ভোগবাদ এবং কিছু গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গড়ে উঠেছে। তারা সংস্কৃতিকে এক ধরনের বিনোদন বা সাময়িক খোরাক হিসেবে ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তরকে নয়, কেবল ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করে। তাদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী; তাই তা শক্তিশালী হলেও আত্মিক নয়।<br />
কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি সামষ্টিক, আত্মিক ও রুহানিকেন্দ্রিক। ইসলামী সংস্কৃতি মানুষের আত্মা, নৈতিকতা এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।</p>
<p>যেমন ঈদের সংস্কৃতিতে আমরা দেখি, সবাই একসঙ্গে মাঠে নামাজ আদায় করছি, কোলাকুলি করছি; কোরবানির ঈদে একই গোশতের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, সবাই একে অপরকে গোশত বিলিয়ে দিচ্ছি। রমজান মাসে সৃষ্টি হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শবে মেরাজ, শবে বরাত প্রতিটি উপলক্ষেই আমরা প্রতিবেশীদের, এমনকি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও খাবার দিই। এখানেই নিহিত ইসলামী সংস্কৃতির মানবিকতা ও সহাবস্থান।</p>
<p>আমাদের কবিতার আসর, মিলাদ, জিয়াফত, খানকা ও দরগার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবই ছিল উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমাজকেন্দ্রিক। <strong>এখানে সব শ্রেণি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারতেন। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজে পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে দৃঢ় করেছিল।</strong></p>
<p><strong>অন্যদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এমন নয়। তাদের চলচ্চিত্র, সংগীত বা বিনোদনমূলক উপাদানগুলো প্রায়ই অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও মূল্যবোধহীনতার দিকে ধাবিত করে।</strong> তাদের সংস্কৃতি পরিবার ভাঙে, সমাজকে বিভক্ত করে। তারা সাময়িক আনন্দ পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আত্মিক ক্ষয় ডেকে আনে। যেমন মদ্যপান বা অতিরিক্ত ভোগবিলাস সাময়িক আনন্দ দিলেও তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।</p>
<p>আবার, ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিটি অনুষ্ঠান ও ইভেন্ট সার্বজনীন ও কল্যাণমুখী। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক দিক থেকেও বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করেছে। আমাদের অঞ্চলে খানকা ও দরগাগুলো ছিল আধ্যাত্মিক বলয়, যেখানে মানুষ আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজসেবার অনুশীলন করত। এখান থেকে মানুষ রুহানী শক্তি অর্জন করত, আত্মশুদ্ধির পথ খুঁজে পেত।</p>
<p>এই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে অবদান রেখেছিল। এটাই ছিল ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক সাফল্য—যা কেবল ধর্ম নয়, মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছিল।<br />
কিন্তু আজ আমরা যদি ইতিহাসকে ছোট করে দেখি, তবে এই গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>উপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক ক্ষয়</strong></h5>
<p>পাশ্চাত্য ও ওরিয়েন্টালিস্ট অনেক লেখক ইসলামের এতোসব প্রসারকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সত্য হল, ইসলামী সংস্কৃতি সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, পরিছন্নতা, আতিথেয়তা, অপচয়ের বিরোধিতা, পারস্পরিক বন্ধন ও প্রতিবেশীর অধিকার; এই মূল্যবোধগুলোর মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<p>যেখানেই মুসলমানরা গিয়েছে, তারা পরিছন্নতা শিখিয়েছে, পারিবারিক বন্ধনকে শক্ত করেছে, সমাজবদ্ধ জীবনধারা তৈরি করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে, কুর্দ অঞ্চলে বা আফ্রিকার অনেক স্থানে দেখা যায়- মুসলমানদের সংস্পর্শে থাকা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পরিবারগুলোও পরিচ্ছন্নতা ও পারিবারিক নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত হয়েছে।<br />
যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না, সেখানে সমাজ অনেক বেশি অব্যবস্থাপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ইসলামী সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা মানবিক উন্নয়নের পথে সমাজকে পরিচালিত করেছে।</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়েছে উপনিবেশিক শাসনের কারণে। আফ্রিকার উপকূল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বলকান; সর্বত্র মুসলমান সমাজ কখনও ব্রিটিশ, কখনও ফরাসি, কখনও কমিউনিস্ট আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছে।<br />
এসব আগ্রাসনের ফলে ইসলামী সভ্যতার মূল্যবোধনির্ভর সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার অন্তর্গত মূল্যবোধগুলোই ছিল সেই সাংস্কৃতিক উপাদান, যেগুলোর মাধ্যমে মুসলমানরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিল।</p>
<p>কেবল খাবার, পোশাক বা ভাষা দিয়ে কোনো সভ্যতা গঠিত হয় না; এগুলো সভ্যতার উপাদানমাত্র। আসল সভ্যতা গঠিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামষ্টিক মানসিকতার মাধ্যমে। এই মূল্যবোধ আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এগুলো বিকশিত হয় শিক্ষা, খানকা, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে। মুসলমানরা ঠিক এইভাবেই সমাজে সভ্যতার ভিত স্থাপন করেছিল।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ, খাদ্যসংস্কৃতি আরবে এক রকম, এশিয়ায় এক রকম, তুরস্কে এক রকম, আর বাংলায় একেবারে ভিন্ন। কিন্তু মূল্যবোধ একটাই। একজন মুসলমান খাবার নষ্ট করবে না, অপরিচ্ছন্ন রাখবে না, হালাল ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করবে।<br />
একজন আফ্রিকান মুসলমান, কেরালার মুসলমান বা বাঙালি মুসলমান; সবাই একই নীতিতে বিশ্বাসী। তারা খাবার অপচয় করবে না, অতিথিকে সম্মান করবে এবং ন্যায্য বণ্টনের নীতি মেনে চলবে।</p>
<p>এই যে একই মূল্যবোধ, একই নৈতিকতা, জাতপাত বা শ্রেণিভেদ অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেতনা; এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মূল।<br />
মানুষ মানুষ হিসেবে সম্মান পায়, এই নীতিতেই সমাজে নিরাপত্তা আসে। বাংলায় ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা এত বেশি হওয়ার কারণও এটিই। এখানে কাউকে জোর করে মুসলমান বানানো হয়নি; বরং মানুষ ইসলামী সংস্কৃতির মানবিক রূপে আকৃষ্ট হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলার ইসলামী সংস্কৃতি বোঝাপড়ায় আমাদের অবস্থা এমন কেন?</strong></h5>
<p>আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রায় পাঁচশ বছরের এক অবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র কাঠামো মুসলমানরা এই উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে দেবদেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু মুসলমানরা এর বিপরীতে নামাজকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি। একইভাবে, পারস্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং সবাই যেন নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>এই প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা তৈরি করেছিলেন কমন সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে সবাই অংশ নিতে পারত। <strong>যেমন, খাবারের সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি এমন এক খাবার, যা মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাদান, আড্ডা, জিয়াফত, খানকা ও মসজিদ; এসব স্থান ছিল উন্মুক্ত সামাজিক পরিসর, যা পারস্পরিক বন্ধন ও সহাবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।</strong></p>
<p>এসব কারণেই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া আমাদের কেমন হওয়া উচিত, সেই নিয়েও ভাবনা জরুরি। মূলধারার ইসলামী সংস্কৃতি কি এদেশীয় মুসলমানের সংস্কৃতি থেকে আলাদা হবে? নাকি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই একরূপ সাংস্কৃতিক আবহ ও এজেন্ডা আমাদেরও অনুসরণ করতে হবে? নাকি বরং ইসলামের সীমারেখার ভেতর থেকেই আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা উচিত?</p>
<p>একটি রাষ্ট্র শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পারে কেবল তখনই, যখন তার সংস্কৃতি শক্তিশালী, গভীর এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তাই ইসলামী সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি, নতুন করে বিশ্লেষণ ও আলোচনা করতে হবে।<br />
পাঁচশ বছরের সেই দীর্ঘ রাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, সামাজিক সিলসিলা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শক্তি—আমরা আজ তা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। প্রশ্ন হলো—কখন এবং কীভাবে এই ক্ষয় ঘটল?</p>
<p>আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে, দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর আঘাত হেনেছিল। প্রথমত, তারা আমাদের স্মৃতি (মেমোরি) ধ্বংস করেছে। আমাদের নিজস্ব শিক্ষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিবর্তে তারা এমন এক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সম্পূর্ণভাবে ঔপনিবেশিক স্বার্থে নির্মিত।<br />
তারা ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীতে বিকল্প সাংস্কৃতিক কর্মসূচি তৈরি করেছে এবং সেগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ইসলামের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য নতুন উৎসব সৃষ্টি করেছে। আমাদের ভাষাকে বিকৃত করেছে, বিদেশি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে “আধুনিকতা”র নামে আমাদের ওপর আরোপ করেছে।</p>
<p>যখন আমরা স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করিনি, তখন তারা শক্তি ও সহিংসতার মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা পরিণত হয়েছি এক আত্মপরিচয়হীন জাতিতে। আমাদের স্মৃতি হারিয়ে গেছে, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়েছে, আমরা এক গভীর পরিচয় সংকটে নিপতিত হয়েছি।</p>
<p>আজও সেই সংকট আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না, আমাদের সংস্কৃতির মূল পদ্ধতি (মেথডোলজি) ও উপকরণ সম্পর্কে অজ্ঞ। আমরা বিশ্বজনীন সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির পার্থক্য বুঝি না; আবার আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান সীমিত।</p>
<p><strong>আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ এর রিসালাত (বার্তা)-এর মূল দায়িত্ব এবং একজন মানুষ (বাশার) হিসেবে তাঁর সাধারণ মানবিক অভ্যাসগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতেও ব্যর্থ। এই কারণেই আজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছি।</strong><br />
অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ব্রিটিশ একাডেমিয়া, কলকাতাকেন্দ্রিক এক সাংস্কৃতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের অঞ্চলের সংস্কৃতিকে প্রদর্শনমূলক ও পূজ্য রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল, আমরা যেন নিজেদের সংস্কৃতিকে কেবল বাহ্যিক সাজে উপস্থাপন করি, কিন্তু তার ভেতরের আত্মা, দর্শন ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলি।</p>
<p>ফলস্বরূপ, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে এক প্রাণহীন প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে—যেখানে রয়ে গেছে কেবল বাহ্যিকতা, কিন্তু হারিয়ে গেছে ইসলামী সংস্কৃতির সেই আত্মিক ও নৈতিক মহিমা, যা একসময় এই উপমহাদেশকে আলোকিত করেছিল।</p>
<p>তাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, আইন, পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি প্রতিরক্ষা কাঠামো— সবকিছুই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে তারা একটি ক্ষেত্রকে আঞ্চলিক আবহের ছোঁয়া দিয়েছিল, আর সেটি হলো সংস্কৃতি। কিন্তু সেটিও প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও বিকৃত করার কৌশল মাত্র ছিল। এভাবেই আমাদের ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— যা একসময় আত্মিক শক্তি, মানবিক ঐক্য ও সামাজিক সংহতির উৎস ছিল— ধীরে ধীরে পরাধীনতার মানসিক শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়ে।</p>
<p><strong>তারা সংস্কৃতিকে মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাপিয়ে দেয়। বিভিন্ন চিন্তাধারাকে জোর করে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা তৈরি করে এক কলকাতা-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক মানসিকতা।</strong> এই উদ্দেশ্যে তারা প্রচুর লেখালেখি করেছে, বড় বড় কবি ও সাহিত্যিক গড়ে তুলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, সংসদ, মিডিয়া ও সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে এই ধারাই ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব আত্মপরিচয়কে বিকৃত ও বিলুপ্ত করে দেয়।</p>
<p>এর ফলস্বরূপ আমরা এমন এক বিভ্রান্ত ধারণায় অভ্যস্ত হয়েছি যে, বাঙালি মুসলমান এক স্বতন্ত্র সত্তা, যা আরব, তুর্কি, ইরানীয়, আফ্রিকান, মালয় বা ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। অথচ এটি একটি কৃত্রিম ও কলকাতা-কেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাধারার ফল, যার ভেতরে ইসলামের প্রকৃত রূহ অনুপস্থিত।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, এই চিন্তাধারার প্রভাবে এক রূহবিহীন ইসলাম তৈরি হয়েছে, যা মুসলমানদের সংস্কৃতির আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা চেয়েছিল, মুসলমানদের পোশাক, গান, খাবার, পারিবারিক সম্পর্ক ও জীবনযাপন যেন ব্রিটিশ উপনিবেশ বা কলকাতার ধ্যানধারার আদলে গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের পাঁচ শতাব্দীর নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সিলসিলা আজ ভুলে যাওয়া হয়েছে।</p>
<p><strong>অন্যদিকে, এক শ্রেণির মুসলমান আবার ইসলামী সংস্কৃতির মূল ধারণা না বুঝে আরবদের সংস্কৃতিকেই ইসলামী সংস্কৃতি হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে।</strong> কিন্তু এই দুই প্রান্ত, কলকাতাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ও অনুলিপিকৃত আরবীয় সংস্কৃতি; কোনোটিই ইসলামের প্রকৃত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়।</p>
<p>তাই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির সঠিক বোঝাপড়া এখন অত্যন্ত জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির নমুনা</strong></h5>
<p>এই আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, ইসলামী সভ্যতা স্থানীয় সংস্কৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতো। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নিচে বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিশ্বজনীনতার কতক উদাহরণ তুলে ধরা হলো।</p>
<p><strong>০১. ভাষা ও সাহিত্য</strong></p>
<p>আমাদের এই অঞ্চলের ভাষার ধারাবাহিকতায় পাল আমলে যে বাংলা ছিলো, তা একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিলো সেনরা। বাংলার পরিবর্তে সেনরা সংস্কৃত-কে সামনে এনেছিলো। এমনকি, বাংলা ভাষাকেই তারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। মুসলিমরা এসে সে বাংলাভাষাকে আবারো গতিশীল করে দিয়েছিলো। শুধু বাংলাই নয়, মুসলিমরা এতোটা উদার ছিলো যে, বাংলা ও সংস্কৃত—দুই ভাষাকেই একইসাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।</p>
<p><strong>বাংলার সুলতানরা উদারভাবে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সুলতান জালালউদ্দীন মোহাম্মদ শাহ কবি বৃহস্পতি মিশ্রকে &#8220;রায় মুকুট&#8221; উপাধী প্রদান করেন।</strong> হোসেন শাহী বংশের সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু ও সাহিত্যিকরা বাংলায় &#8220;রামায়ণ&#8221; &#8216;মহাভারত&#8217; অনুবাদ করেন। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। মুঘল শাসনামলেও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাংলা-সংস্কৃত ভাষার উন্নতিতে মুঘলরা যথেষ্ট অবদান রাখে। এসবই বাংলায় হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রমাণ করেন। অতএব, এটা সত্য যে, মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো।</p>
<p><strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিমরা যে এভাবে বাংলা ও সংস্কৃতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এলো, তা আবার ধ্বংস হয়ে যায় পলাশীর বিপর্যয়ের পর। ইংরেজদের “ডিভাইড এন্ড রূল” পলিসির ক্ষেত্রে এই ভাষার বিনির্মাণটাকেই কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা। ম্যাক্স মুলার ভারতের হিন্দুদেরকে আর্য বলে তাদের মাঝে সেনদের সেই পুরাতন মানসিকতা তুলে এনেছিলো। যার ফলে বহমান যে বাংলা ছিলো, সেটাকে সমূলে ধ্বংস করে সংস্কৃতকে জোর করে বাংলায় প্রবেশ করানো হয়েছে, যেনো মুসলিম শাসনামলের বাংলা এবং হিন্দুদের নতুন সংস্কৃত বাংলার মাঝে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়; আর শেষমেশ এ-নিয়েও যেনো হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। এবং, হয়েছেও তাই-ই।</p>
<p><strong>নতুন এই বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইংরেজরা প্রতিষ্ঠা করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ; নিজেরাই লিখেছে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, যেসব ব্যাকরণের মাধ্যমেই নতুন বাংলার সূচনা করা হয়। কেননা, এসব ব্যাকরণে সংস্কৃতকে সামনে রেখেই বাংলার নতুন রূপ দেওয়া হয়।</strong> আর এসবকে পরিচিত করাতে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজকে কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা; এবং নতুন এই বাংলাকে লেখ্য ভাষায় রূপ দিয়েছে কলকাতার সাহিত্যিকরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখাগুলো পড়লেই এসব বুঝা যায়। ঠিক এজন্যই কবি নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ এবং কবি গোলাম মোস্তফার চেয়েও এই জেন-জি প্রজন্ম রবী-শরৎ-বঙ্কিম-বিভূতিদেরকে ভালোভাবে চিনে।</p>
<p>এখানে এই প্রশ্নও উঠে আসে যে, ৫০০ বছর আগের মহাকবি আলাওল-এর বহমান বাংলাকে আমরা যেভাবে বুঝি না, তেমনি আমরা কেন প্রায় ২৫০ বছর আগের ঈশ্বরচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝি না? ভাষা যদি বহমান হয়, তাহলে আলাওলেরও ২৫০ বছর পরের বাংলা-তো অনেকটাই বুঝতে পারার কথা। কিন্তু, তা কেন হয় না?</p>
<p>যাকগে, এখান থেকে এই সিদ্ধান্তই পাওয়া গেলো যে, ইসলামী সভ্যতায় ভাষার সংস্কৃতিকে যদি বিশ্বজনীন হিসেবে গ্রহণ করা না হতো, তাহলে হয়তো আমাদের এই বাংলাকে এভাবেই পেতাম না; অথবা হয়তো একেবারেই হারিয়ে যেতো।</p>
<p><strong>০২. উৎসব ও গ্রামীণ সংস্কৃতি</strong></p>
<p>ভারত ও বাংলার উৎসব সংস্কৃতি কতোটা শক্তিশালী ছিলো তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়।<br />
<strong>যেমন- জহির উদ্দিন বাবর, ইলতুৎমিশ ২০% মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে গোটা উপমহাদেশ চালিয়েছেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক বলয় ও তার উৎসব গুলো।</strong> ব্রিটিশরা এসে যখন দেখল কোনভাবেই জনগণ থেকে ইসলামের প্রাণসত্তাকে সরানো যাচ্ছে না, বলয়কে নষ্ট করা যাচ্ছে না, তখন তারা বুঝতে পারলো শুধু জ্ঞান, ক্ষমতা, অর্থনীতি, নষ্ট করলেই হবে না বরং বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করতে হবে। তাই তারা বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্রদের দিয়ে মিরাজ, মিলাদুন্নবী ইত্যাদির বিপরীতে স্বরস্বতী, হলি, দেওয়ালী উৎসবকে ব্যাপকভাবে হাইলাইট করতে শুরু করলো, মক্কা বিজয় দিবসের দিন থার্টি ফার্স্টনাইট জাতীয় ভোগবাদী উৎসব নিয়ে এলো।</p>
<p>মুসলিম বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে রমজান, ঈদ, জন্ম, আকিকা, শবে বরাত, শবে মেরাজ, ঈদে মীলাদুন্নবী, মহররম বেশ আয়োজনের সাথে পালিত হতো।</p>
<p>এম এ রহিমের ভাষায়,</p>
<blockquote><p>“ঈদে মীলাদুন্নবীতে নবাব মুর্শিদকুলী খান রবিউল আউয়ালের প্রথম বারোদিন ভোজের আয়োজন করতেন। পুরো মুর্শিদাবাদ আলোকমালায় সজ্জিত করতেন। সেনাবাহিনী দিয়ে তোপধ্বনি দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মুজাফফর আলেম ওলামাদরে আপ্যায়ন করতেন। পরবর্তী বছরের জীবন ধারনের খরচের জন্য আলেম ও বিজ্ঞজনদের বিশাল অঙ্কের মুদ্রা উপহার দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ প্রথম বারোদিন আলেমদের নিয়ে সীরাত চর্চা করতেন। সীরাত চর্চার পাশাপাশি উন্মুক্ত ভোজের আয়োজন করতেন। তিনিও বিদ্বান ও অতিথিদের জন্য এতোবেশি পরিমাণ উপহার দিতেন যে, যেন ওলামায়ে কেরামগণ পরবর্তী বছর স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারে।”</p></blockquote>
<p>শবে বরাত নিয়ে এম এ রহিম তার বইয়ে বলেন, “উপমহাদেশের মুসলমানগণ শবে বরাত বহু আচার অনুষ্ঠান ও আমোদ স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদ্যাপন করতো। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক চারদিনব্যাপী এই উৎসব উদ্যাপন করতেন এবং এতবেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাত্রিকালও প্রকাশ্য দিবালোকের রূপ ধারণ করত। সমসাময়িক উৎসগুলো থেকে জানা যায় যে, শের শাহের একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিশতীর সঙ্গে শব-ই-বারাতের দিন সারারাত এবাদত বন্দেগি করেন। &#8216;বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে&#8217; এই উৎসব উদযাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার নবাবগণ বিরাট জাঁকজমকের সঙ্গে &#8216;শব-ই-বারাত&#8217; উদ্যাপন করতেন। বাড়িঘর আলোকমালায় সজ্জিত করা হতো এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মসজিদে ও বাড়িতে সারারাত নামাজ অদোয় করতেন। ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।”</p>
<p>রমজান নিয়ে বলেন, “উপবাস, সংযম, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্মেলনের সময় হিসেবে সে যুগের মুসলমানগণ &#8216;রমজান&#8217; পালন করত। তারা রমজানকে পবিত্র ও মঙ্গলজনক মাসরূপে গণ্য করত এবং খুশির সঙ্গে একে স্বাগত জানাত। <strong>বাংলায় মুঘল সৈন্যদের রমজান পর্ব পালনের উল্লেখ করে মীর্জা নাথান বলেন, ‘রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষদিন পর্যন্ত ছোটবড় প্রত্যেকে প্রত্যহ তার বন্ধুর তাঁবুতে মিলিত হতো। এটা একটা স্বাভাবিক রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক দিন সকলে পর্যায়ক্রমে একজন অভিজাত বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাত।</strong> সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের দেওয়া ভোজের পালা ছিল। সকলে সেদিন তার তাঁবুতে সময় কাটায়’।”</p>
<p>ঈদুল ফিতরে নিয়ে মুসলিম বাংলার উৎসবমূখর আয়োজন নিয়ে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বইয়ে আছে, “সেই যুগে খুব আমোদ-স্ফূর্তির সঙ্গে ঈদের নতুন চাঁদকে স্বাগত জানানো হতো। মীর্জা নাথানের ভাষায় এটা বর্ণনা করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন,<strong> ‘দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠতো এবং গোলন্দাজ সেনাদলের সকল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হতো। রাত্রির শেষভাগে, কামানের অগ্নি উদগীরণ শেষ হতো এবং এর পর শোনা যেতো ভারি কামানের আওয়াজ। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প’</strong>।”</p>
<p>“এথেকে বুঝা যায়, ঈদের আগমনে মুসলমানরা কতটা খুশি হতো। ঈদের দিনে সমস্ত মুসলমান আনন্দস্ফূর্তিতে মসগুল থাকত। স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রত্যেকে নতুন এবং উৎকৃষ্ট কাপড় পরিধান করত। চমৎকার পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানগণ প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথেপথে টাকা পয়সা ও উপহার দ্রব্য ছড়িয়ে দিত এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানগণ গরিবদেরকে ভিক্ষা দিত। &#8216;নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী&#8217; গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা &#8216;ঈদগাহ&#8217; ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দস্ফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে।”</p>
<p>আর কুরবানীর ক্ষেত্রে, মুসলমানগণ ঈদুল আজহার প্রভাতে সুন্দর কাপড়-চোপড় পরিধান করে এবং &#8216;তাকবীর&#8217; উচ্চারণ করতে করতে ঈদগাহ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে গমন করতো। সেখানে জামাতে তারা নামাজ আদায় করে এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, পরস্পরকে আলিঙ্গন করতো ও সম্ভাষণ জানাতো। অতঃপর তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাদের সাধ্যানুসারে তারা কোনো পশু, যেমন, গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি করতো। তারা গরিব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে এবং গৃহে ভোজের অনুষ্ঠান করতো। প্রত্যেক গৃহ ভোজানুষ্ঠান ও আনন্দ &#8216;স্ফূর্তিতে মুখরিত হয়ে উঠতো এবং সকল গৃহে আদর আপ্যায়ন চলতো। শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হতো এবং এই মহান উৎসবে তারা সকলে একত্রে আনন্দ করতো। মীর্জা নাথান লিখেছেন যে, &#8220;নামাজান্তে খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে, লোকেরা তাকে কাপড়-চোপড় ও টাকাপয়সা উপহার দেয়। গরিব দুঃখীদের সাহায্যের জন্য তার সম্মুখে টাকাপসয়া ছড়িয়ে দেওয়া হতো। দুঃস্থ লোকদের অনেকে এর দ্বারা তাদের অভাব দূর করে সুখি হতো। এই দিনে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীগণ একে অন্যের জায়গায় গমন করতো এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানাতো।</p>
<p>এছাড়াও, বিয়ের অনুষ্ঠান হতো খুবই জাঁকজমকভাবে। হিন্দু-মুসলিম দুই জাতি তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী বিবাহের কাজ সম্পন্ন করতো। পোশাক-পরিচ্ছদেও শালীনতা বজায় থাকতো। এক্ষেত্রে মুসলিমরা হিন্দুদেরকে জোর করতো না। অতএব, মূল কথা হচ্ছে, বাংলায় অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সংস্কৃতিকে কখনই দূরে ঠেলে দেয়নি। স্থানীয় আয়োজনের ধরনের সাথে মুসলিমরাও নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো।</p>
<p><strong>০৩. খাদ্য</strong></p>
<p>ড. এম এ রহিম বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতি ইতিহাস বইয়ে এই অঞ্চলের মুসলিমদের খাদ্যের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>“মুসলমান সমাজের উচ্চশ্রেণী সম্পর্কে আলোচনায় খাদ্যদ্রব্য ও পোশাক-পরিচ্ছদে তাদের বিলাসিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সিবাস্তিয়ান মানরিক এবং চীনা দূতগণের বর্ণনা থেকে মুসলমানদের খাদ্য সম্বন্ধে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। তাদের খাবার টেবিলে মুরগী, ভেড়া, গরু প্রভৃতির মাংসের তৈরি বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য পরিবেশন করা হতো। অনেক রকমের মিষ্টি ও ফলমূল খাদ্য-তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। শসা, লেবু, মুলা, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদির তৈরি নানা জাতীয় আচার ছিল মুসলমানদের খাদ্যের বিশিষ্ট অঙ্গ।”</p></blockquote>
<p>“সিবাসতিয়ান মানরিক বলেন, এগুলো ক্ষুধা বৃদ্ধি করত এবং আবার খাবারের দিকে আকৃষ্ট করতো। হিন্দুরা এ ধরনের উপাদেয় খাদ্য প্রস্তুত করতে এবং ক্ষুধা উদ্রেকের জন্য আচারের ব্যবহার জানত না। হিন্দুদের ভোজ ও সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের বর্ণনায় কোথাও আচারের কোনো উল্লেখ দেখা যায় না।বাংলা সাহিত্যে খাদ্য সম্বন্ধে বহু উল্লেখ আছে। জানা যায় যে, বাংলার মুসলমানরা মুরগী, মেষমাংস ও অন্যান্য মাংসের উপাচার পছন্দ করতো।”</p>
<p>“বাঙ্গালি মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে রুটিরও উল্লেখ আছে। তাছাড়া মাছ ও শাক-সবজি লোকের সাধারণ খাদ্য ছিল। বাংলার নদ-নদী ও জলাশয়ে নানা জাতীয় মৎস্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। এর মাটিতে জন্মাত বিভিন্ন প্রকারের শাক-সবজি। তাতে করে, এমনকি, মুসলমানদের মধ্যে সাধারণ লোকেরা ও তাদের খাবারের জন্য রকমারি মাছ, শাক-সবজির তরকারি প্রস্তুত করতে পারতো।”</p>
<p>“খিচুড়ি (সাধারণত ঘি বা তেলের সঙ্গে চাল ও লঙ্কা দিয়ে প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য) ছিল লোকের প্রিয় খাদ্য। এমনকি, উচ্চশ্রেণীর লোকদেরও খিচুড়ির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বার্ণিয়ারের মতে, খিচুড়ি সম্রাট শাহজাহানের খুবই প্রিয় ছিল। ইউসুফ আলীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নবাব আলিবর্দী খান ও তাঁর আমির ওমরাহ প্রায়ই তৃপ্তির সহিত খিচুড়ি খেতেন।”</p>
<p>“নানা প্রকার মাংসের উপাচার ও নানা রকমের আচার মুসলমানদের খাদ্যের, বিশেষ করে, উৎসব অনুষ্ঠানে খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। উৎসবাদিতে, যেমন বিবাহ ইত্যাদি উপলক্ষে হিন্দুরা সাধারণত মাছ, শাক-সবজি ও মিষ্টান্ন তৈরি করত। হিন্দুদের ভোজে মিষ্টান্ন ও দধি ছিল খাদ্য তালিকার একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। &#8216;মনসামঙ্গল&#8217; কাব্যগুলোতে লক্ষ্মীন্দরের বিয়ের ভোজের বর্ণনা থেকে উৎসবাদি উপলক্ষে হিন্দুদের খাবার সম্বন্ধে আভাস পাওয়া যায়। সিবাসতিয়ান মানরিক ও চীনা দূতদের বর্ণনানুসারে, মুসলমানদের খাদ্য তালিকার সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে।”</p>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসনামলে যেসব খাবার আবিষ্কার, প্রচলন বা বিশেষ রূপে বিকশিত হয়েছে—তার সংখ্যা অনেক। তুর্কি, আফগান, আরব, পারসিক, মুঘল ও মধ্য এশীয় রন্ধনশৈলীর প্রভাবে উপমহাদেশের খাবারে এক বিশাল পরিবর্তন আসে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের আনিত বা উন্নত করা খাবারের মধ্যে রয়েছে,</p>
<ul>
<li>১. বিরিয়ানি (ঢাকাই/কাচ্চি)। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির মূল শিকড় মুঘল রন্ধনশৈলীতে। মুসলিম নবাবরা বিশেষভাবে এটিকে জনপ্রিয় করেন।</li>
<li>২. কাবাবের বিভিন্ন ধরন। যেমন- সিক কাবাব, বটি কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামী কাবাব, রেশমি কাবাব; এসবই তুর্কি–পারসিক উৎস থেকে এসে বাংলায় জনপ্রিয় হয়।</li>
<li>৩. নেহারি। মূলত দিল্লি–লখনউ থেকে বাংলায় আসে এবং মুসলিম শাসনকালে নবাবদের টেবিলের খাবার হিসেবে পরিবেশিত হতো।</li>
<li>৪. মোরগ পোলাও/চাপলি পোলাও। মুঘল দরবারে পোলাওয়ের বিভিন্ন রূপ ছিল। এর বাংলা রূপ হলো মোরগ পোলাও</li>
<li>৫. হালিম। আরব/পারস্যে এর উদ্ভব হয়েছে। মুসলিম শাসনকালেই বাংলায় বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে।</li>
<li>৬. কোরমা/কোর্মা। পারসিক &#8220;কুরমাহ&#8221; থেকে এসেছে। মুসলিম শাসকরা এর দুধ-বাদাম-ঘৃতসমৃদ্ধ বিলাসী রূপ প্রতিষ্ঠা করেন।</li>
<li>৭. রোস্ট (বাংলা মুসলিম স্টাইলে)। নবাবি-আওয়াধি রান্নার প্রভাবে বাংলায় রোস্টের নিজস্ব রূপ তৈরি হয়।</li>
<li>৮. শাহী টুকরা/শাহী টোস্ট। পারসিক ‘শিরমাল–ডেজার্ট’ থেকে রূপান্তরিত। এটি ছিলো মুসলিম নবাবদের প্রিয় মিষ্টি।</li>
<li>৯. ফিরনি। আরব–পারসিক দুধ-চালভিত্তিক ডেজার্ট থেকে এই অঞ্চলে অভিযোজিত।</li>
<li>১০. সেমাই/শিরখুরমা। আরবীয় সেমোলিনা ডেজার্টের মতো করে তৈরি হতো; মুসলিম শাসনামল থেকেই ঈদের প্রধান খাবার হিসেবে পরিচিত।</li>
<li>১১. বাকরখানি। ঢাকায় নবাব বংশের আমলে এটি তৈরি হয়।কাশ্মীর-লখনৌ-এর নান-বাইদের হাত ধরে পরিচিতি লাভ করে।</li>
</ul>
<p>অর্থাৎ, ইসলাম উন্নত সাংস্কৃতিক উপাদান গ্রহণ করেছে। বাংলায় বা ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো জিনিস না থাকলেও পারস্যে থাকলে, যদি তা ইসলামী নীতির বিরোধী না হয়, তবে সেটি এখানেও গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জীবনমান ও সাংস্কৃতিক মান উন্নত করা।</p>
<p><strong>মোদ্দাকথা হচ্ছে, স্থানীয় খাবার সংস্কৃতির পুরোটাই যেমন ইসলামী সভ্যতায় জারি ছিলো, তেমনি অন্যান্য অঞ্চলের স্থানীয় খাবারও এখানে এসে পরিচিত হয়ে ইসলামী সভ্যতায় খাদ্য সংস্কৃতিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তবে এখানে বলাই বাহুল্য যে, হারাম খাবারের বিষয়গুলো তো অবশ্যই পরিত্যাজ্য।</strong></p>
<p><strong>০৪. সংগীত</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনামলে বাংলা সংগীত তিনটি দিক থেকে পরিবর্তিত হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(ক) মধ্য এশীয়–পারসিক সুরের প্রভাব।</strong><br />
এর ফলে তুর্কি, পারসিক, আরবীয় সুর ও রাগ-রাগিনীর ধরণ বাংলায় প্রচলিত হতে থাকে। পারসিক মাহফিল, দরবারি সংগীত, সুফি সঙ্গীত—এসব বাংলায় নতুন রূপে গড়ে ওঠে।</li>
<li><strong>(খ) কবিতা–গান–দর্শনের সংমিশ্রণ।</strong><br />
মুসলিম শাসকেরা কবিতা, সঙ্গীত, মুশায়েরা, কীর্তন-সদৃশ কণ্ঠসঙ্গীতকে উৎসাহ দিতেন। ফলে বাংলা কবিগান, মুর্শিদী, মারফতি, বাউলধারা—এসব এক নতুন বিকাশ লাভ করে।</li>
<li><strong>(গ) সুফি সঙ্গীতের আগমন।</strong><br />
দরবেশ–সুফিদের মাধ্যমে কাসিদা, হামদ, নাত, গওয়ালিবর্ণী জিকির, এমনকি চিশতি ও সুফি দরবারের সঙ্গীতধারা বাংলায় প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলার ফোক গানের অর্ধেক সুফি-মুসলিম প্রভাবে গড়া—এটা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য। কাজী নজরুল ইসলাম, দুলাল শাহ, মজনু শাহ, কুতুবুদ্দিন, আউল শাহ—এরা কবিগান, পালাগান, মারফতি গানকে চালিত করেছেন।</li>
</ul>
<p>এরপর, মুসলমানদের সমাজে সংগীতের গুরুত্বের কারণে সংগীতপ্রীতি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) রাজদরবার ও নবাবি দরবারে সংগীত।</strong><br />
এটি ছিলো বাংলার সুলতান, মুঘল সুবেদার, নবাবদের দরবারে সংগীত ছিল রাজকীয় বিনোদনের অংশ। তারা দাদরা, ঠুমরি, গজল, কাওয়ালী, দরবারি রাগ, কিরানা, রাম্পুর–সাহাসওয়ান ঘরানা-কে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারেও সঙ্গীতজ্ঞদের বিশেষ মর্যাদা ছিল।</li>
<li><strong>(২) সুফি-দরবেশদের সমাজে সংগীত।</strong><br />
এসব সংগীত ছিল আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ। চিশতিয়া, কাদেরিয়া, সুফি দরবেশরা সংগীতকে মানুষের অন্তর জাগ্রত করার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। সুফিদের অবদানে বাংলায় মারফতি গান, মুর্শিদী গান, নবী-বন্দনা, কাওয়ালী ও ধর্মীয় জিকিরের সুরধারা ধারাগুলো বিকশিত হয়। বাংলায় মুসলমানদের বৃহৎ একটি অংশ এই গানগুলোকে ধর্মীয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করতো।</li>
</ul>
<p>বাদ্যযন্ত্রে মুসলমানদের অবদান নিয়ে বলতে গেলে তাদের কয়েকটি অবদানের কথা সামনে রাখতে হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) নতুন বাদ্যযন্ত্র উপহার বা প্রচলন।</strong><br />
শুরুতেই আসবে তবলার কথা। তবলা আজ সারা ভারত–বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র। ইতিহাস অনুযায়ী এটি মধ্য এশীয় মুসলিম বাদ্যযন্ত্র “তব্বল” থেকে এসেছে। তবলার পেছনে আমীর খসরু (১৩শ শতক)–এর অবদান সবচেয়ে আলোচিত। এরপর আসবে সর্মিন্দল বা সেতার। সেতার শব্দটি “সেহ-তার” (পারসিক: তিন তার) থেকে এসেছে। মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞদের হাত ধরেই এই যন্ত্রটি ভারতীয় রূপ পায়। তৃতীয়ত, রুদ, তানপুরা বা রুবাব। মধ্য এশীয় মুসলিম সুরে ব্যবহৃত এই যন্ত্রগুলি বাংলা-মুসলিম দরবারে জনপ্রিয় হয়।</li>
<li><strong>(২) বিদ্যমান যন্ত্রের উন্নয়ন।</strong><br />
মুঘল দরবারের উস্তাদরা সরোদ, সারেঙ্গি, তানপুরা—এসবকে পরিশীলিত করে তোলেন। তারের সংখ্যা বৃদ্ধি, টোনের গাম্ভীর্য, মৃদু সুরের পরিশুদ্ধতা—এসব উন্নয়ন মুসলিম উস্তাদদের অবদান।</li>
<li><strong>(৩) যন্ত্রসঙ্গীতে নতুন ঘরানা তৈরি।</strong><br />
মুসলিম উস্তাদরা নতুন নতুন, যেমন- গয়তরী (গায়েকী) আঙ্গ, মীন্ড-যুক্ত বাদন, মুঘলাই আলাপ, দরবারি স্টাইল ইত্যাদি বাদন-শৈলী সৃষ্টি করেন। এই শৈলীগুলোই পরবর্তীতে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মূল ভিত্তিতে স্থান পায়। আবার, দরবারি সঙ্গীতের ঘরানায় বাংলায় মুসলমান সঙ্গীতশিল্পীরা পাটিয়ালা ঘরানা ও রাম্পুর-সাহাসওয়ান ঘরানা তৈরি করেন। বিশনপুর ঘরানাতে মুসলিম উস্তাদদের প্রভাব ছিল বিশাল। এগুলোই পরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে স্থায়ী কাঠামো দেয়।</li>
<li><strong>(৪) রাগ-রাগিনীর নতুনত্ব আনয়ন।</strong><br />
বাংলায় মুসলমানরা মালকোষ, ইয়ামন, দারবারি কানাড়া, কৌশিকি, মালহার, তোড়ি ইত্যাদি রাগ উন্নত করে তোলেন। এসব রাগ মধ্য এশীয় প্রভাবে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় হয়।</li>
</ul>
<p>ইসলামী সংস্কৃতির সাথে যেহেতু সুফী ঘরানাটা বেশ ভালোভাবে জড়িত, তাই এটা নিয়ে দুয়েকটা কথা বলা প্রয়োজন। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় সুফি সাধক, দরবেশ, ফকিরদের মাধ্যমে যে সংগীতধারা গড়ে ওঠে, তাকেই সাধারণত বাংলার সুফি সঙ্গীত বলা যায়। এই সঙ্গীত মূলত পারসিক–আরবি আধ্যাত্মিক কবিতা, ইসলামি দর্শন, এবং বাংলার লোকজ সুরের এক অসাধারণ মিশ্রণ। ইশকে-মাজাজি, ইশকে-হাকিকি, নফসের পরিশুদ্ধি, মানবতার ধর্ম ইত্যাদি এসব গানের মূল প্রাণ।</p>
<p>শাহ জালাল ইয়েমেনী, শাহ নেসার বাহাদুর, শিকার সুলতান, দাতা কর্নি—এদের মতো বহু সুফি বাংলায় সুফি সঙ্গীত নিয়ে আসেন। তাঁরা জিকির, কাওয়ালী, হামদ-নাত, ফারসি মর্শিয়া, রব্বানি কবিতা–এসব সুরধারা সামনে আনেন। এরপর সময়ে সময়ে বাংলার লোকগানের সাথে সুফি দর্শনের মেলবন্ধন ঘটে। গ্রামবাংলার পালাগান, বাউল সুর, ঢোল-একতারা—এসবের সঙ্গে সুফিরা তাওহিদ, ইশক, নফস, পরকাল মুর্শিদ–ভক্তি মিশিয়ে দেন। ফলে তৈরি হয় বাংলার নিজস্ব সুফি লোকসঙ্গীত।</p>
<p>মুর্শিদী গানে সাধারণত মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা, মানবতার শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি—এসব বলা হয়। এসব গানের ক্ষেত্রে গাজী আব্দুল করিম, আব্দুল লতিফ ও হাছন রাজার নাম উল্লেখযোগ্য। মারফতি গানের ভেতরে রুহানি ইশক, আত্মজিজ্ঞাসা, দেহতত্ত্ব, নফস ও কল্পনার যুদ্ধ, মানবিকতার দীক্ষা ইত্যাদি থাকে। কেননা, এখানে ‘মারফত’-এর অর্থ পরিচয়—অন্তরের আল্লাহকে চিনে নেওয়া। এরপর সুফি প্রভাবিত বাউল সংগীত ও সুরে আরবি–ফারসি শব্দ ও  ধর্মীয় রূপক স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এছাড়াও, হামদ, নাত, কাওয়ালী তো আছেই। বাংলায় কাওয়ালী ভারতের মতো বিশাল নয়। সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদী এবং চিশতি দরবেশরা কাওয়াল দল নিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। ঢাকায় মুঘল যুগে কাওয়ালদের মর্যাদা ছিল।</p>
<p><strong>০৫. মুসলিম বাংলার সংস্কৃতিতে নারীদের অবস্থা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় মুসলমানগণ তাদের মেয়েদের ব্যাপারে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে এবং তা স্বীকারও করে। <strong>বালিকারা যাতে করে তাদের ধর্মের মূলনীতি, কোরআন পাঠ ও ধর্মের ক্রিয়া-কর্ম সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সেজন্যে পিতারা তাদের কন্যাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন। বালিকাদেরও বালকদের মতো &#8216;বিসমিল্লাহখানি&#8217; অনুষ্ঠান দ্বারা অক্ষর-পরিচয় শুরু হতো এবং তারা একই মক্তবে বালকদের সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করতো।</strong></p>
<p>গদাই মল্লিকের পুথি বা <strong>&#8216;মল্লিকার হাজার সওয়াল&#8217;</strong> (মল্লিকার হাজার প্রশ্ন) নামে অভিহিত কাব্য থেকে জানা যায় যে, মল্লিকা নাম্নী মুসলমান বালিকা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, যে পুরুষ তাকে সাহিত্য-বিষয়ক বিতর্কে পরাজিত করতে পারবে, তাকেই বিয়ে করবেন। বহু রাজপুত্র ও বিদ্বান ব্যক্তি তার সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হন, কিন্তু সকলেই মল্লিকার নিকট পরাজয় বরণ করেন। অবশেষে জনৈক সুফি পণ্ডিত আবদুল হাকিম গদা তার হাজার প্রশ্নের উত্তরদান করে তাকে বিতর্কে পরাজিত করেন। অতঃপর মল্লিকা তাঁর বিজয়ীকে বিয়ে করেন।</p>
<p>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমান রমণীগণ যুদ্ধক্ষেত্রেও স্বামীদের সহগমন করেছেন। এই উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাসে মুসলমান রমণীদের এরূপ বীরত্বব্যঞ্জক কার্যক্রম মোটেই বিরল কিছু ছিলো না। বাংলার মুসলমান শাসনামলে বহু রমণী ছিলেন যারা তাদের সাহস, শক্তি ও বীরত্বের জন্যে খ্যাতি লাভ করেন।</p>
<p>নবাব অলীবর্দী খানের বেগম শরফুন্নেসা ছিলেন একজন উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্না ও গুণান্বিতা মহিলা। তিনি তার গুণের মহিমায় সে যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি স্বামীর যুদ্ধাভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের কঠোরতা ভোগ করেন। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তিনি তার স্বামীর একজন মূল্যবান উপদেষ্টা ছিলেন।</p>
<p>নবাব আলিবর্দীর কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌলাহর মাতা আমিনা বেগম তার সুরুচি ও শিষ্টাচারের গুণে সে যুগের সমাজজীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়া মহিলা এবং অনাথ ও গরিব-দুঃখীদের আশ্রয়স্থল। কোমল হৃদয়া আমিনা বেগম অন্যায়কারীর প্রতিও কোনোরূপ কঠোরতা সহ্য করতে পারতেন না। ইংরেজদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সিরাজদ্দৌলাহ্ আলিবর্দীর পীড়িত অবস্থায় প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করেন। সে সময় তিনি রাজস্বের হিসাবে বহু অনিয়ম এবং জাহাঙ্গীরনগরে ঘষেটি বেগমের দিউয়ান রাজা রাজবল্লভ কর্তৃক বিপুল অর্থ আত্মসাতের তথ্য আবিষ্কার করেন। রাজা রাজবল্লভ সঠিক হিসাব না দেওয়ায় এবং তসরূপকৃত অর্থ রাজকোষে প্রত্যর্পণ না করায়, সিরাজদ্দৌলাহ্ তাকে মুর্শিদাবাদে কঠোর পাহারায় আবদ্ধ করে রাখেন। আমিনা বেগম পুত্রের নিকট তার পক্ষে মধ্যস্থতা করেন। মায়ের আদেশ রক্ষার্থে সিরাজদ্দৌলাহ্ রাজবল্লভকে মুক্ত করে দেন।</p>
<p>সিরাজদ্দৌলাহর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ছিলেন রমণীদের আদর্শ। কিভাবে সামান্য মর্যাদার একজন নারী স্বীয় গুণাবলীর বলে মুসলমান সমাজে খুব সম্মানিত মর্যাদায় আরোহণ করতে পারেন, তা তার জীবনে প্রতিভাত হয়েছে। সামান্য পরিচারিকার অবস্থা থেকে লুৎফুন্নেসা একজন যুবরাজের সহধর্মিণী এবং নবাবের বেগমের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়া ও উচ্চ অন্তঃকরণ সম্পন্না মহিলা।</p>
<p><strong>এছাড়াও, দারাশিকোর কন্যা ও যুবরাজ মুহম্মদ আজমের স্ত্রী জাহানজেব বানু বেগম মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। গউস খানের বিধবা স্ত্রী একদল মারাঠা লুণ্ঠনকারীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে ভাগলপুরে তার গৃহ রক্ষা করেন। আহমদনগরের চাঁদসুলতানার বীরত্বগাঁথা সুবিদিত। মহব্বত খাঁর বিরুদ্ধে নূরজাহানের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইতিহাসের একটি সুপরিচিত ঘটনা। এর বাইরে মহিলারা বিবাহ অনুষ্ঠানাদি ও শোভাযাত্রায়ও যেতেন।</strong></p>
<p><strong>এ-সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীরা গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না। তারা গৃহের বাইরেও যেতে পারতেন। কিন্তু তাদের পর্দা পালন করতে হতো এবং গৃহের বাইরে চলতে অবগুণ্ঠন ব্যবহার করতে হতো।</strong> পর্দান্তরালে বসবাস করলেও মুসলমান রমণীরা সমাজে যথেষ্ট সম্মানের অধিকারিণী ছিলেন। মুগল সমাজের রমণীগণ, তাদের পূর্ববর্তী ভগ্নীদের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।</p>
<p>মূলত, মুসলিম বাংলায় এভাবেই নারীগণ তাদের শিক্ষা, সাহিত্য চর্চা, পৈত্রিক সম্পত্তি ও রাজনীতির অধিকার পেয়েছিলো। অতএব, উপরোক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, মুসলমান শাসনযুগে বাংলার রমণীরা হারেমে সাধারণ পর্দা প্রথার মধ্যে থেকেও এবং পুরুষদের উপর নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও তারা এই প্রদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।</p>
<p><strong>০৬. হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি</strong></p>
<p>ইসলামী মূল্যবোধ ঠিক রেখেও যে ইসলামী সভ্যতা স্থানীয়দের স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলো, তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এক্ষেত্রে প্রাক-মুসলিম সময় ও মুসলিম সময়ের মাঝে তুলনা করা প্রয়োজন।</p>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এ’চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। <strong>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাবুল হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</strong></p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তঃবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো সমগ্র ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে মুসলিম বাংলায় ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ফলে, এই অঞ্চলের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো। বখতিয়ার খিলজির সেই অভিযানের পর এই অঞ্চলের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে, <strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong><br />
রোমিলা থাপার মতে, <strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>অতএব, বুঝা গেলো যে, মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো। আবার, সরকারি চাকরি করবার সুবাদে কিংবা মুসলমান শাসনকর্তাদের সভাসদ ও রাজকর্মচারী হিসেবে অথবা মুসলিম জনগণের প্রতিবেশী রূপে হিন্দুরা মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে। যার ফলে তারা মুসলমানদের মহৎ আদর্শ সংস্কৃতি এবং শিষ্টাচার ও জীবন পদ্ধতি দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবান্বিত হয়। পাশাপাশি, মুসলিম শাসক ও সুলতানদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।</p>
<p>এজন্যই, সাধারণ হিন্দুদের উপর ইসলাম ধর্ম দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অথচ, সাধারণ হিন্দুদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। সমাজে উচ্চ ধর্মের হিন্দুর সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুর মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিলো। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থও পাঠ করতে পারতো না। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরা শিক্ষা অর্জন করতো। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারনৈতিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব হয়। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাও শিক্ষা অর্জন করেন। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ঘটে। তারা সংস্কৃতের পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিক্ষা অর্জন করে উচ্চ রাজ কার্যে নিয়োজিত হয়ে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করে।</p>
<p>অন্যদিকে, হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের পরেই ছিলো কায়স্থদের স্থান। মুসলমানদের দ্বারা তারাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা শিল্প ও সাহিত্যে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেয়। মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এসব বিখ্যাত কবিদের মধ্যে ছিলেন-মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কবিন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, যশোরাজ খান, বিজয় গুপ্ত, কৃষ্ণ দাস কবিরাজ। মুসলিম শাসনামলে কায়স্থরা জমিদারি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করে। মুসলিম শাসক কর্তৃক এসব কায়স্থরাই পরবর্তীতে রায়, চৌধুরী, মজুমদার, অধিকারী উপাধী লাভ করে। এটি পরবর্তীকালে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে এবং আরো পরবর্তীতে গিয়ে দেখা যায় যে, এসব পদবী মানুষের নামের সাথেও যুক্ত হয়ে যায়।</p>
<p>আবার, বাংলার সুলতানরা ছিলেন উদার সংস্কৃতিমনা। তারা হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব মধ্যযুগে বাংলা হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আরেকটি কারণ। মূলত, এসব কারণেই যুগ যুগ ধরে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রীতি্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>এসবের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ছিলো। এটা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, যেখানে ধর্মীয় সহাবস্থান থাকে, সেখানেই অবশ্যই প্রশাসনিক সহাবস্থানও থাকবে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলমান আমলে হিন্দু শাসক ও সেনাপতি নিয়োগ।</p>
<p><strong>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মুসলমান শাসকগণ স্থানীয় হিন্দুদের শাসনকার্যে সংম্পৃক্ত করেন। শাসনকার্যে সুযোগ পেয়ে এসব হিন্দুরা যথেষ্ট যোগ্যতার ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। মুসলিম সুলতানগণ প্রতিভাবান হিন্দুদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাষ্ট্রীয় উপাধী এবং সরকারি জমি দান করেন।</strong> হিন্দুরা খুবই বিশ্বস্ততার সাথে মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করে। বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন বাংলার হিন্দুরা বাংলার সুলতানের হয়ে যুদ্ধ করেছিলো। হিন্দু সেনাপতি সহদেব এ-যুদ্ধে যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। নবাবী আমলে আমরা দেখি যে, পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজের সেনাপতি মীর মর্দন ও মোহনলাল দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুই নয়, মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হিন্দু জমিদার শ্রেণীরও উৎপত্তি হয়। দুর্গাচন্দ্র সান্যাল তার বিখ্যাত গ্রন্থ &#8220;বাঙালার সামাজিক ইতিহাসে&#8221; লিখেন যে, ইলিয়াস শাহী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী জেলায় বিখ্যাত &#8216;সান্যাল&#8217; এবং &#8220;ভাদুড়ী পরিবারের&#8221; উৎপত্তি হয়। সুলতান গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহের রাজত্বকালে ভাতুড়িয়ার জমিদার কংস (রাজা গণেশ) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।</p>
<p>আবার, এর বিপরীতে হিন্দু রাজা ও জমিদারদের অধীনে মুসলিম কর্মচারীও নিয়োগ হয়। মুসলিমদের শাসকদের মতো হিন্দু সামন্ত রাজা ও জমিদাররাও তাদের শাসনকার্যে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন। মীর্জা নাথানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভুলুয়ার (নোয়াখালি) হিন্দু জমিদার অনন্তমানিক্য মীর্জা ইউসুফ নামক এক ব্যক্তিকে উজির পদে নিয়োগ দেন। এছাড়াও, চাঁদ রায় ও কেদার রায় সোলায়মান লোহানী নামে এক মুসলিমকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা এবং &#8220;কালাপাহাড়&#8221; নামে খ্যাত শ্রীহরি ছিলো দাউদ খান কররানীর অন্যতম উপদেষ্টা ও সেনাপতি।</p>
<p>অতএব, এটাও সত্য যে, ধর্মীয় সহাবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় ছিলো। যেহেতু তৎকালীন ইতিহাসই এসব সাক্ষ্য দেয়, তাই এটা পুরোপুরি সঠিক যে, স্থানীয় সমাজ, মানুষ ও সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করেছে বিধায়ই ইসলামী সভ্যতা আজও মানুষের মনে স্থান দখল করে রয়েছে; এবং এটাও প্রমাণ হয়ে যায় যে, ইসলামী সভ্যতা প্রকৃত অর্থেই বিশ্বজনীনতাকে গ্রহণ করে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>জাতিসত্তা ও ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া</strong></h5>
<p>সবশেষে, আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তিতে ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া কেমন হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। আমাদের ঐক্য ও সম্প্রীতির সমাজ গড়তে হলে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ন্যায়, পারিবারিক ঐক্য, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p><strong>ইসলামী সংস্কৃতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা জাতিসত্তার ভেতরের মানবিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলে যাবে। আমরা বাঙালি মুসলমানদের ইসলামী সংস্কৃতির যে বোঝাপড়া গড়ে তুলতে চাই, তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান।</strong></p>
<p>এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও উপজাতির মানুষ একসাথে বসবাস করছে। তাই আমাদের উচিত, সবার প্রতি সমান দৃষ্টিতে তাকানো, সবার অধিকার ও মানুষ হিসেবে মর্যাদা স্বীকার করা। একই সঙ্গে আমাদের আহ্বান থাকবে; আমরা যারা বাঙালি মুসলমান, আমরা যেন নিজেদেরও মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে কল্পনা করি। প্রত্যেকে নিজের আঞ্চলিক পরিচয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করবে এবং নিজের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বজায় রাখবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের দায়িত্ব</strong></h5>
<p>মুসলমানদের সভ্যতার ইতিহাসে একসময় যে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সামাজিক নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা গড়ে উঠেছিল, সেগুলোকে আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনা দরকার। আমাদের দায়িত্ব হবে এই মূল্যবোধগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, সমাজে তুলে ধরা ও এর চর্চা অব্যাহত রাখা।</p>
<p>বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় কলকাতা-কেন্দ্রিক যে বয়ান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা যেন আমাদের হীনমন্য, আত্মবিশ্বাসহীন বা পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত না করে।<br />
কথিত ন্যাশনালিস্ট ইসলাম, সেকুলার ইসলাম বা লিবারেল ইসলাম; এসব নামে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আত্মঘাতী চিন্তা। এর পরিবর্তে আমাদের গড়ে তুলতে হবে মূলনীতিনির্ভর একটি নতুন বয়ান, যা ইসলামের উসূল ও মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াবে।</p>
<p>আরব, আফ্রিকা, তুরস্ক বা ভারতের সংস্কৃতি এক নয়, কিন্তু তারা সবাই ইসলামের স্থায়ী নীতির মধ্যে থেকেই টিকে আছে। তাই আমাদেরও প্রয়োজন, ইসলামী মূলনীতিগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির একটি ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া তৈরি করা। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সেই ভারসাম্যের ভিত্তিতেই চালিয়ে যেতে হবে।</p>
<p>এর বাইরে গেলে বিচ্ছেদ তৈরি হবে, যেমনটি আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ব্রিটিশ আমলের পর থেকে আমাদের সংস্কৃতিতে এক ধরনের আত্মবিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে। আমরা অন্যদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিনোদন, স্থাপত্য, শহর পরিকল্পনা, এমনকি মসজিদের ডিজাইন পর্যন্ত নকল করছি। এগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।</p>
<p>তবে একে পুরোপুরি বর্জন করাও অবাস্তব। কারণ, বিশ্ব পরিবর্তনের ঢেউকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই পাশ্চাত্যের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে, একই সঙ্গে আমাদের অঞ্চলের ভালো দিকগুলোও সংযোজন করতে হবে।</p>
<p>অর্থাৎ, ইসলামের স্থায়ী মূলনীতি বুঝে, পাশ্চাত্যের তৈরি দুনিয়াকে বুঝে, আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বয়ানই হতে হবে আমাদের পথনির্দেশ। এর বিপরীতে কোনো বিশৃঙ্খল, পক্ষপাতদুষ্ট বা বিভাজনমূলক বয়ান তৈরি করা যাবে না, যা অন্য কোনো গোষ্ঠীর শিকড় কেটে দেয়।</p>
<p>বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি কখনোই পুরনো সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ হবে না, আবার আধুনিকতার নামে মূল থেকে বিচ্ছিন্নও হবে না। ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, সামাজিক বাস্তবতার আলোকে, আমাদের সাংস্কৃতিক এজেন্ডা ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে।<br />
এর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বেড়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।</p>
<p>আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বিশ্ব কাঠামো, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, শিকড়, ইসলামের উসুল ও পদ্ধতিগত বোঝাপড়ার সমন্বয়ে। এই সবকিছু বুঝে ও ধারণ করেই আমাদের কাজ করতে হবে। এটাই হোক বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির প্রথম ধাপ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16417</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আতিয়া মসজিদ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/atiya-mosque/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/atiya-mosque/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 25 Nov 2025 13:07:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[শহর ও স্থাপত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16405</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সুপরিচিত একটি স্থাপত্য নিদর্শন আতিয়া মসজিদ। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মুদ্রিত পুরনো দশ টাকার নোটে ছবিযুক্ত থাকা এ মসজিদের অবস্থান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে; লৌহজং নদীর পূর্বপারে। টাঙ্গাইল অঞ্চলে প্রাপ্ত মূল শিলালিপিগুলোর মধ্যে আতিয়া জামে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সুপরিচিত একটি স্থাপত্য নিদর্শন আতিয়া মসজিদ। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মুদ্রিত পুরনো দশ টাকার নোটে ছবিযুক্ত থাকা এ মসজিদের অবস্থান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে; লৌহজং নদীর পূর্বপারে। টাঙ্গাইল অঞ্চলে প্রাপ্ত মূল শিলালিপিগুলোর মধ্যে আতিয়া জামে মসজিদে পাওয়া একটি আরবি ও একটি ফারসি শিলালিপি রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে মসজিদের নির্মাতা, সময়কাল ও প্রচলিত কিছু অসঙ্গতিমূলক তথ্য সমস্যার সমাধান করা যায় । বিদায়ী সুলতানি আর নবাগত মোগল- উভয় রীতির সংমিশ্রণে অপূর্ব এক মুসলিম স্থাপত্য এটি, যা দৃষ্টিনন্দন এবং এ অঞ্চলে বিরল। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত শিলালিপি অনুসারে প্রত্মতাত্ত্বিক আতিয়া মসজিদটির নির্মাণকাল ১০১৯ হিজরি (১৬১০-১১ খ্রি.) উল্লেখ আছে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে বায়েজীদ খান পন্নীর পুত্র সাইদ খান পন্নী, শাহ বাবা কাশ্মীরির সম্মানার্থে মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। আদি শিলালিপির অনুরূপ একটি লিপি বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের শীর্ষে প্রোথিত আছে। এ থেকে জানা যায় যে, ১০১৮ হিজরিতে (১৬০৯ সাল) মসজিদটি নির্মিত। মসজিদটির নামকরণে এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। আরবি শব্দ ‘আতা’ থেকে ‘আতিয়া’ শব্দের উৎপত্তি; যার অর্থ – দানকৃত’।</p>
<p>১৫৯৮ সালে আলি শাহান শাহ্‌ বাবা আদম কাশ্মিরী (র.) কে সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ টাঙ্গাইল জেলার জায়গিরদার নিয়োগ করেন। <strong>তিনি এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার ও আন্যান্য ব্যয় নির্বাহের জন্য আফগান নিবাসী কররানী শাসক সোলাইমান কররানীর কাছ থেকে সংলগ্ন এলাকা দান বা ওয়াকফ্ হিসাবে লাভ করেন। এই এলাকাটি তাঁকে দান করায় এই অঞ্চলটির নাম হয়েছে ‘আতিয়া’ বা দানকৃত। পরবর্তীতে বাবা আদম কাশ্মিরীর পরামর্শে সুফিজির এক ভক্ত সাঈদ খান পন্নীকে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই আতিয়া পরগণার শাসন কর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেন।</strong> <strong>এই সাঈদ খান পন্নীই ১৬০৯ মতান্তরে ১৬০৮ সালে বাবা আদম কাশ্মিরীর কবরের সন্নিকটে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন।</strong> মুহাম্মদ খাঁ নামক তৎকালীন এক প্রখ্যাত স্থপতি এই মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজে যুক্ত ছিলেন।</p>
<p>মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৮.২৯ মিটার (৬৯ ফুট) , প্রস্থ ১২.১৯ মিটার (৪০ ফুট) এবং দেয়ালের পুরুত্ব ২.২৩মিটার (সাড়ে ৭ ফুট)। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা যায়, মসজিদটির কিবলাকোটা ও বারান্দাসহ সার্বিক পরিমাণ ১৭.৭০ঃ১২ মিটার। মসজিদের দেয়াল ২.২২ মিটার প্রশস্ত। বারান্দা ৩.৮২ ৭.৫ মিটার।</p>
<p>লাল ইটের তৈরি এ মসজিদটির পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। এ প্রবেশ পথগুলো চতুর্কেন্দ্রিক রীতির। বারান্দা থেকে তিনটি প্রবেশপথের মাধ্যমে প্রধান ইবাদত কক্ষে প্রবেশ করা যায়। এছাড়াও এটির উত্তর-দক্ষিণে আরও দুটি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটি একই সাথে সুলতানি ও মোগল আমল এ উভয় আমলের স্থাপত্যকলা তথা মুসলিম স্থাপত্য রুচিকে সুস্পষ্টভাবে বহন করছে। সুলতানি আমলের নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে মিহরাব, কিবলা। দক্ষিণ এশীয়দের জন্য কিবলা পশ্চিমে করা হয়েছে। একই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায় মসজিদের খিলানসমূহে। আতিয়া মসজিদের খিলানগুলো চতুর্কেন্দ্রিক অথাৎ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম- চারটি দিক দিয়েই ইবাদত কক্ষে প্রবেশ করা যায়। কিবলার দেয়ালে তিনটি অলঙ্কিত মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের পেছনে বাইরের দেয়াল কিছুটা প্রক্ষেপিত। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ব বুরুজ রয়েছে যা সমান দূরত্বে মোল্ডিং নকশায় বিভক্ত। কয়েকটি স্তরে তৈরি করা কারুকার্য দিয়ে সজ্জিত পার্শ্ব বুরুজগুলো ছাদের কার্নিশের উপর পর্যন্ত উঠে গেছে। সব শেষের বুরুজগুলো পলকাটা ছোট গম্বুজযুক্ত এবং কলস ফিনিয়ালে অলঙ্কৃত।</p>
<p>প্রধান গম্বুজটি খিলানভিত্তিক স্কুইঞ্চ পদ্ধতিতে নির্মিত। মনোমুগ্ধকর এ প্রধান গম্বুজটি মসজিদের অত্যন্ত নান্দনিক অংশ যা মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। <strong>এটি অষ্টভুজাকৃতির ড্রামের উপর স্থাপিত। গম্বুজগুলোতে কলস ফিনিয়াল এবং ভিতের চারদিকে বদ্ধ মারলোন নকশা বেষ্টিত।</strong> আতিয়া মসজিদের ধনুকবক্রাকৃতির কার্নিশ একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এ মসজিদের পশ্চিম দেয়ালের শীর্ষে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংবলিত প্রহরা দেয়াল (battlemented wall) লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>আতিয়া মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দেয়াল যে অলঙ্করণ নকশা করা হয়েছে তা এ মসজিদ প্রসঙ্গ মাত্রই উল্লেখের দাবি রাখে। এতে টেরাকোটা ও ইট খোদাই নকশাতে চমৎকারভাবে আঞ্চলিক মোটিফকে উপজীব্য করে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ফাসাদ সূক্ষ্ম, বিস্তৃত একই রকম প্যানেল নকশায় আচ্ছাদিত। এতে রয়েছে অসংখ্য ফুলের অলঙ্করণ, চক্রাকার ‘রোজেট’, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি। পূর্ব ফাসাদ অসংখ্য ক্ষুদ্র আয়তাকৃতির টেরাকোটা প্যানেল নকশায় দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। এ জাতীয় নির্মাণ কৌশল ষোলো শতকের প্রথম দিকে গৌড়ের বিভিন্ন মসজিদে লক্ষ্য করা যায়। যেমন: ঝনঝনিয়া মসজিদ (১৫৩৫ খ্রি.), কদম রসুল ইমদরত (১৫৩০ খ্রি.)।</p>
<p>আতিয়া মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি কুঁড়েঘরের কার্নিশের ন্যায় ধনুকের মতো বাঁকা আকৃতির কার্নিশ যা সম্পূর্ণভাবে বাংলার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। এ ধরনের আকৃতির উৎপত্তিতে আদি অকৃত্রিম বাংলার ছনের কুটিরের বাঁকানো চালের প্রভাব স্পষ্ট । অলঙ্করণ বিশেষ করে টেরাকোটা নকশা ও খোদাই ইটের নকশায় বাংলার ওস্তাগর-শিল্পীরা সুস্পষ্ট অবদান রেখেছেন। বাংলার গ্রামের খড়ের তৈরী কুঁড়ে ঘরের বেড়ার খোপ নকশা আতিয়া মসজিদের ফাসাদ অলঙ্করণে স্থান করে নিয়েছে। বস্তুত বাঁশের চালাঘর থেকে ইটের নির্মাণে এ ধরনের উদ্ভাবন শিল্পমানে আকর্ষণীয় এবং নির্মাণ ক্ষেত্রে নতুন ধারা হিসেবে বিবেচিত।</p>
<p>মসজিদটি টেরাকোটার ইটের তৈরি। চুন, সুরকি গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মিত। <strong>আর সুলতানি আমলে প্লাস্টার পদ্ধতি ছিল না। ফলে তারা চুন ও সুরকির গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এছাড়া সুচালো খিলান ও গম্বুজ সবই সুলতানি আমলের নিদর্শন। আতিয়া মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকের বাইরের দেয়ালে টেরাকোটার ওপর চমৎকার বৃত্তের মাঝে ফুলের নকশা করা, যেটি মোগল আমলের স্থাপত্যরীতির নিদর্শনকে বহন করে।</strong> মসজিদটি সুলতানি ও মোগল আমলের বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত বলে এটি যুগসন্ধিক্ষণের স্থাপনা হিসেবেও পরিচিত।</p>
<p>এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকৃতির মসজিদটির পূর্বদিকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকৃতির বারান্দা রয়েছে। পূর্বদিকে খিলানবিশিষ্ট তিনটি প্রবেশপথ, মাঝখানেরটি দুপাশের প্রবেশপথ থেকে সামান্য উঁচু। অসংখ্য নকশাখচিত মসজিদটির গায়ে খোদাই করা হয়েছে আরবি হরফ। মসজিদের বারান্দার ওপর ছোট তিনটি গম্বুজ বাংলা পান্দান্তিভ পদ্ধতিতে নির্মিত। পরে সংস্কারের সময় গম্বুজগুলো পলেস্তারা দিয়ে সমান করে দেওয়া হয়েছে যদিও মসজিদ নির্মাণের সময় এমনটা ছিল না। শুরুতে গম্বুজগুলো পলকাটা বা ঢেউতোলা ছিল।</p>
<p>১৮০০ সালে সংঘটিত ভূমিকম্পে আতিয়া মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরাণী এবং ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবী মসজিদটির সংস্কার করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এই মসজিদটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে অধিগ্রহণ করেন।</p>
<p>১৯৭৮ সালে ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছদে প্রথমবারের মতো আতিয়া মসজিদ স্থান পায় বলে জানা যায়। এরপর ১৯৮২ সালে পরিবর্তিত ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছদেও স্থান পায় সেটি। ফলে, প্রায় সব বাংলাদেশীর কাছে আতিয়া মসজিদ একটি অতিপরিচিত স্থাপনা। মসজিদটি শুধু ঐতিহ্যের নিদর্শনই নয়, একটি দর্শনীয় স্থানও বটে।</p>
<p>৪০০ বছরের পুরোনো এ মসজিদ বাংলাদেশ এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যরীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে আছে। সময়ের বহমান স্রোতে ভেসে আজও মুসল্লিরা প্রাচীন এই মসজিদে একত্রিত হয়ে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/atiya-mosque/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16405</post-id>	</item>
		<item>
		<title>প্রগতিবাদের ফাঁকা বুলি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Nov 2025 17:59:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16394</guid>

					<description><![CDATA[১৯৩৩ সালের জুন সংখ্যা &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় জনাব নিয়াজ ফতেহপুরী আমার সম্পাদিত &#8216;তর্জুমানুল কুরআন&#8217; সম্পর্কে এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এজন্যে আমি জনাব ফতেহপুরীর শুকরিয়া আদায় করি। সাধারণত পত্র পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে বাদানুবাদ কিংবা পাল্টা সমালোচনা করা রীতিসম্মত নয়। কিন্তু যোগ্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>১৯৩৩ সালের জুন সংখ্যা &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় জনাব নিয়াজ ফতেহপুরী আমার সম্পাদিত &#8216;তর্জুমানুল কুরআন&#8217; সম্পর্কে এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এজন্যে আমি জনাব ফতেহপুরীর শুকরিয়া আদায় করি। সাধারণত পত্র পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে বাদানুবাদ কিংবা পাল্টা সমালোচনা করা রীতিসম্মত নয়। কিন্তু যোগ্য সমালোচক তাঁর নিবন্ধটিতে এমন কতকগুলো মতামত প্রকাশ করেছেন, যা তাঁর প্রগতি-ধর্মের বিশিষ্ট মূলনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত; আর এই সমস্ত মূলনীতির সংশোধন করাই তর্জুমানুল কুরআনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণেই আমি এ সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত প্রকাশের এই প্রথম সুযোগের সদ্ব্যবহার করা একান্ত জরুরি বোধ করছি। তিনি লিখেছেন :</p>
<p>এই পত্রিকার উদ্দেশ্য এর নাম থেকেই প্রতিভাত হয় অর্থাৎ কুরআনের অর্থ, তাৎপর্য ও শিক্ষাকে সঠিকরূপে লোকদের মধ্যে প্রচার করা। নিসন্দেহে এই উদ্দেশ্যের উপযোগিতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনা। কিন্তু যোগ্য সম্পাদক নিজেই যেমন স্বীকার করেছেন, বর্তমান যুগে এই লক্ষ্য অর্জনটা মোটেই সহজসাধ্য নয়। কারণ, অতীতকালে ধর্ম বলতে শুধু পূর্ব পুরুষদের অন্ধ অনুকৃতি ও পশ্চাৎমুখী ক্রিয়াকলাপকেই বুঝাতো। তখন কারো পক্ষে ধর্ম প্রচারক বা সংস্কারক সাজা মোটেই কঠিন ব্যাপার ছিলোনা। কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নিত্য নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া মানুষের &#8216;চিন্তা ও কর্ম&#8217;কে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দান করছে &#8211; তার মনমগজকে &#8216;চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা&#8217; দ্বারা সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। কাজেই আজকে শুধু পূর্ব-পুরুষদের আচরণ, কর্মনীতি ও চিন্তাধারার প্রমাণ দেখিয়েই ধর্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পূর্বে হয়তো আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে আলোচনা বা তর্কবিতর্ক করা হতো; কিন্তু আজকে আল্লাহর অস্তিত্বকেই একেবারে অসম্ভব মনে করা হচ্ছে। আগেকার দিনে রসূল সা.-এর পথনির্দেশকে হয়তো মুজিযার সাহায্যে প্রমাণ করা যেতো, আর আজকে সেই মুজিযার ভিত্তিতেই &#8216;চুম্বক বিজ্ঞান&#8217; বেশুমার নবী ও রসূল সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়েছে। অতীতে একজন বক্তা আসমানের দিকে তাকিয়ে আরশ ও কুরসিবিশিষ্ট আল্লাহকে ডাকতে পারতো; কিন্তু আজকে আসমান নামক কোনো জিনিসেরই অস্তিত্ব নেই। এমতাবস্থায় কেউ এ ধরনের কাজ করলে তা মোটেই কল্যাণকর হতে পারেনা। ফলকথা, এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানে&#8217;র দিন নেই, এখন তো অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি ঈমানের দিন এসেছে। এমনি সঙ্কটজনক সময়ে ধর্মের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা মোটেই সহজ কাজ নয়। বিশেষত আজকে ধর্মের ধারণাই লোকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য নয় বলে কাজটা আরো কঠিন মনে হয়।</p>
<p>সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি আরো লিখেছেন:</p>
<p><em>কুরআনপাক তার অর্থের দিক থেকে তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে নৈতিক শিক্ষা প্রদত্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে বিবৃত হয়েছে আকীদা বিশ্বাস। আর তৃতীয় ভাগে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনী ও উদাহরণ। পথম ভাগ সম্পর্কে বেশিকিছু লিখবার প্রয়োজন নেই এ সম্পর্কে কোনো দলিল প্রমাণ উপস্থিত করারও আবশ্যকতা নেই। কারণ সকল ধর্মের নীতিশাস্ত্রই প্রায় এক অভিন্ন। আর প্রত্যেকেই একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, ইসলামের নীতিশাস্ত্র অন্যান্য ধর্মের নীতিশাস্ত্র থেকে ভিন্ন ও নিম্নমানের নয়। অবশ্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের প্রতি বেশি আলোকপাত করা উচিত। কারণ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া এই দু&#8217;ভাগ সম্পর্কে লোকদের মনে সন্দেহ ও দ্বৈধ্যবোধের সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর সত্য বলতে কি, এসব শোবা-সন্দেহ কেউ নিরসন করতে সক্ষম হলে তিনি বর্তমান শতকের মুজাদ্দিদ বলে সাব্যস্ত হবেন। এ কারণেই আমি এ সম্পর্কে একটি স্থায়ী বিভাগ খুলবার পরামর্শ দেবো। এই বিভাগের মাধ্যমে আকীদা বিশ্বাস ও আখ্যান সম্পর্কিত তামাম কুরআনী আয়াতের পর্যালোচনা করা উচিত। অতপর এসব আয়াতের সঠিক উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিধারণ করে আধুনিক পণ্ডিত ও গবেষকদের তরফ থেকে উত্থাপিত যাবতীয় আপত্তি ও প্রতিবাদ খণ্ডন করা আবশ্যক।</em></p>
<p>উপসংহারে তিনি লিখছেন:</p>
<p>আগামীতে আমি সর্বপ্রথম ওহী ও ইলহামের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করতে তাঁকে আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ এই জিনিসটি উপলব্ধি করার ওপরেই কালামুল্লাহর মর্মোপলব্ধি নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে আখিরাত সম্পর্কিত প্রশ্নটিও আলোচিত হওয়া উচিত। কারণ এর মীমাংসার ওপরই ধার্মিকতা ও অধার্মিকতার প্রশ্ন নির্ভর করে। তিনি কালামে ইলাহী এবং আখিরাত সম্পর্কে কি ব্যাখ্যা প্রদান করেন, তাই আমি দেখতে চাই। তারপরই আমার শোবা-সন্দেহ এবং আপত্তিগুলো উত্থাপন করবো তাঁর প্রচেষ্টায় সেগুলো দূরীভূত হলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো। কারণ বর্তমানে অনেকেই &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র নিদারুণ অভিশাপে জর্জরিত। এর একটি বিরাট কারণ হচ্ছে পরকাল বিশ্বাস।</p>
<p>এই উদ্ধৃতিতে যোগ্য সমালোচক যেসব খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, সেগুলো বাদ দিয়ে আমি শুধু মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতিই আলোকপাত করতে চাই।</p>
<p><strong>তিনি কুরআন মজিদের আলোচনাকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু আমরা তাকে অনায়াসেই দু&#8217;ভাগে বিভক্ত করতে পারি। এর প্রথম ভাগের বিষয়বস্তু হচ্ছে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত। এর কোনো একটি বিষয়কেই আমরা চূড়ান্তভাবে ভুল বা নির্ভুল আখ্যা দিতে পারিনা। তাই এগুলোর ব্যাপারে কুরআন আমাদেরকে গায়েবের প্রতি ঈমান পোষণের আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় শ্রেণীর বিষয়গুলো আমাদের জ্ঞান সীমার বহির্ভূত নয় এবং এগুলো সম্পর্কে কোনো যুক্তিসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণও আমাদের পক্ষে সম্ভবপর। এই হিসেবে আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও গুণরাজি, ফেরেশতা, ওহী, খোদায়ী কিতাব, নবুয়াতের তাৎপর্য, মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন, পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি বিষয়াদি ছাড়াও ঐতিহাসিক কাহিনী ও উদাহরণ প্রসঙ্গে বর্ণিত এবং জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত সমস্ত বিষয়ই প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলো সাধারণ মানবীয় বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত হোক কিংবা বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তির ও বৈজ্ঞানিক পর্যায়ে এগুলোর সত্যতা ও যথার্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের অক্ষমতাই হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। পক্ষান্তরে ইসলামের নীতিশিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবীয় জীবন পদ্ধতি সম্পর্কিত তামাম বিষয়ই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত।</strong></p>
<p>যোগ্য সমালোচকের মতে, দ্বিতীয় ভাগ সম্বন্ধে আলোচনা করারই কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ এ সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্মেরই অনুরূপ। অবশ্য তার মতে প্রথম ভাগটি সম্পর্কে আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর সম্পর্কেই লোকদের মনে সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কেন সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি হচ্ছে? এর জবাবে তিনি বলেছেন, অতীতকালে পশ্চাৎমুখিতা ও অজ্ঞতার কারণে লোকেরা গায়েবী বিষয়ের প্রতি ঈমান পোষণ করতো। কিন্তু আজকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার উদ্ভাবনী মানুষের চিন্তা ও কর্মকে নতুন রূপদান করেছে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দ্বারা তার মনমগজকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। এ কারণেই এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানের&#8217;র দিন নেই, বরং তার পরিবর্তে &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি ঈমান&#8217; পোষণের দিন এসেছে।&#8217;</p>
<p><strong>এই অভিমতটি কয়েকটি ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে প্রথম ভ্রান্তি হচ্ছে অতীত ও বর্তমানকালের মধ্যকার আসল পার্থক্যটা উপলব্ধি না করা। দুর্ভাগ্যবশত জনাব নিয়াজ কেবল একাই নন; বরং একটি বিরাট দল এই ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত যে, ধর্মের প্রদীপ শুধু বিগত যুগের অন্ধকারেই আলো বিকীরণ করতে পারতো; কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সূর্যোদয়ের পর তার পক্ষে আর দীপ্তিমান হওয়া সম্ভবপর নয়।</strong> অথচ যে যুক্তি বিজ্ঞানকে এরা আলোকরশ্মি বলে অভিহিত করেছেন তা এ যুগের কোনো নিজস্ব সম্পদ নয়। এসকল জ্ঞান বিজ্ঞান অতীতকালেও লোকদের দৃষ্টিশক্তিকে এভাবেই ঝলসে দিয়েছে। আর অতীতকালেও যাদের দৃষ্টি ঝলসে গিয়েছিলো, তারাও এটাই ভেবেছিলো যে, ধর্মের প্রদীপ এখন দীপ্তিমান থাকতে পারেনা। তখনকার দিনের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও তাদের মতে চিন্তা ও কর্মকে নতুন রূপদান করেছিলো এবং তা চিন্তা ও বিবেকের যুক্তি দ্বারা লোকদের মন মগজকে এমনি সুসমৃদ্ধ করে দিয়েছিলো যে, তাদের সেই আলোকজ্জল যুগে গায়েবের প্রতি ঈমান পোষণের কোনো অবকাশই ছিলোনা। হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে চতুর্থ শতক পর্যন্ত কি এই অবস্থাই বিরাজমান ছিলোনা? প্লেটো, এরিস্টটল, এপিকোরাস, জিনো, বার্কলাস, আলেকজান্ডার, * ফিরদৌসী, ক্লাটিনোস প্রমুখ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের চিন্তাধারা যখন মুসলিম দেশগুলোতে প্রচারিত হলো এবং তার ফলে দার্শনিক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষার ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা হলো, তখনো কি একদল লোক এরূপ ধারণাই পোষণ করতোনা? তখনকার দিনের চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি এবং আচরণও ধারণার নতুন রূপ কি এভাবেই লোকদের ধর্মবিশ্বাসে সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি করেনি? কিন্তু তারপর কি হয়েছিল? দার্শনিকদের যেসব মতবাদ ও আনুমানিক সিদ্ধান্তের প্রতি তখনকার লোকেরা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলো, পরবর্তীকালে তার অনেকগুলোই মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। জ্ঞান বিজ্ঞানের যে তীব্র সূর্যালোকে ধর্মের প্রদীপকে তাঁদের নিবু নিবু মনে হচ্ছিলো, যুগের একটি আবর্তনেই তা একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেলো। তাদের &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; সেকেলে বস্তুতে পরিণত হলো। তাদের নব নব &#8216;বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার&#8217; চিন্তা ও কর্মকে নবরূপ দানের শক্তি হারিয়ে ফেললো। যেসব ক্ষেত্রে তাঁরা নতুন রূপ দান করেছিলো, তা পুরনো বলে সাব্যস্ত হলো। এমনকি, সমকালীন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস ও আস্থা রেখে তারা যেসব যুক্তি প্রমাণের অবতারণা করেছিলো, এবং সেগুলোর ভিত্তিতে যেসব দার্শনিক মতবাদ দাঁড় করিয়েছিলো তার অধিকাংশকেই আজকের একজন নগণ্য ছাত্রও অর্থহীন ও অকেজো আখ্যা দিতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করবেনা।</p>
<p>এমতাবস্থায় কেউ যদি বলে, অতীতের অন্ধকার যুগেই কেবল ধর্মের প্রদীপ জ্বলতে পারতো, কিন্তু আজকের আলোকজ্জ্বল যুগে তা আর জ্বলতে সক্ষম নয়, তাহলে আমরা ভাবতে বাধ্য হবো যে, ইতিহাস নিজেই তার পুনরাবৃত্তি করছে। আজকে যেসব বিষয়কে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনী বলে অতীতের ন্যায় দাবি জানানো হবে, তার বেশির ভাগই পূর্বেকার লোকদের &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও নতুন আবিষ্ক্রিয়ার পরিণতি লাভ করবে এবং &#8216;চিন্তা ও কর্মের নব নব রূপ&#8217; ও যুগের আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ও সেকেলে হয়ে যাবে এ ব্যাপারে আমরা সুনিশ্চিত। যে সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার কারণে সমালোচক গর্ববোধ করেন, সেগুলোর প্রতি তিনি একবার গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করুন এবং ওগুলোর আসল উদ্ভাবক ও আবিষ্কারকদের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তবেই তিনি বুঝতে পারবেন যে, অতীতের জ্ঞান বিজ্ঞানের ন্যায় এগুলোর মধ্যেও নিশ্চায়ক বস্তু খুব কমই রয়েছে। এসকল জ্ঞান বিজ্ঞানের মধ্যে এমনি জিনিস প্রায় নেই বললেই চলে, যার সম্পর্কে একথা নিসংশয়চিত্তে বলা যেতে পারে যে, এটির ভ্রান্ত প্রমাণিত হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। বাকি জিনিসগুলো শুধু অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ, মতামত ও দ্বিধা সঙ্কোচের ওপর ভিত্তিশীল। এগুলো সম্পর্কে পূর্ণ দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তার সঙ্গেই বলা যেতে পারে যে, যুগের গতি যতোই তরক্কীর দিকে এগুতে থাকবে, &#8216;এসব আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;নিত্যনতুন আবিষ্ক্রিয়া&#8217; ততোই প্রাচীন ও সেকেলে বস্তুতে পরিণত হবে। এবং সেই সঙ্গে এসকল দুর্বল ও ঠুনকো জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতিগুলোও অপর কোনো নতুন পদ্ধতির জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।</p>
<p>কাজেই অবস্থা যখন এই, তখন কোনো চেতনাসম্পন্ন ও পরিণত দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের পক্ষেই ধর্মের ভবিষ্যত চিন্তায় সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনী&#8217; আজ &#8216;চিন্তা ও কর্মের নতুন ভিত্তি রচনা করেছে এবং &#8216;চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি&#8217; দ্বারা লোকদের মন মগজকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে, কাজেই ধর্মের পরিণতি কি দাঁড়াবে, খোদাই জানেন এমনি দুশ্চিন্তায় আতঙ্কিত হবারও কোনো হেতু নেই। এসব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার ওপর একবার সন্ধানী দৃষ্টি ফেললেই দেখতে পাবেন যে, ধর্মের সাথে যেসব জিনিসের বিরোধ রয়েছে, তা প্রামাণ্য ও সন্দেহাতীত কি না? তা যদি বাস্তবিকই প্রামাণ্য ও সন্দেহাতীত হয় এবং ধর্মের মৌল বিশ্বাসের সঙ্গে তার বিরোধও দেখা দেয়, তাহলে নি:সন্দেহে তার সামনে এই প্রশ্ন এসে দাঁড়াবে যে, ধর্ম এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই দু&#8217;টির কোনটির প্রতি সে ঈমান পোষণ করবে? কিন্তু তা যদি শুধু অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে নিক্ষেপকারী জিনিসই হয়, তাহলে ধর্মের সঙ্গে তার বিরোধে ঘাবড়াবার কিছু নেই। কারণ ধর্ম যদি ঈমান ও প্রত্যয়ের ওপর ভিত্তিশীল হয় তো তার মুকাবিলায় অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কোনোই গুরুত্ব নেই। পক্ষান্তরে ধর্ম যদি আনুমানিক ও কাল্পনিক জিনিস হয় তো আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতবাদগুলোও তো এই অনুমান ও কল্পনার ওপর নির্ভরশীল। কাজেই উভয়ের তারতম্য বিচারের আর কি কারণ থাকতে পারে?</p>
<p>আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নিত্য নতুন আবিষ্ক্রিয়ার দ্বারা অভিভূত হয়ে ধর্মের প্রতি সংস্কার দৃষ্টিক্ষেপ করা এমন লোকের পক্ষেই শোভা পায়, যার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে যে, প্রতিটি নতুন জিনিসই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কাজেই যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাকে গ্রহণ করা কিংবা তার প্রতি ঈমান পোষণ করা একান্ত আবশ্যক। এমনকি, তা যদি শুধু আনুমানিক ও কাল্পনিক জিনিসও হয় এবং প্রগাঢ় বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নিয়ে, নির্ভুল মানদণ্ডে তা যাচাই করা নাও হয়, তবু তা বরণ করতে হবে। বস্তুত এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন লোকদের মধ্যেই আজ &#8216;চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতি রচনা&#8217;র আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতি কিভাবে রচিত হয়, কোন্ পদ্ধতিটি যুক্তিসম্মত আর কোনটি নিছক বালকসুলভ এই কথাটি পর্যন্ত তারা জানেনা। অনুরূপভাবে চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি দ্বারা সমৃদ্ধ হবার দাবিটাও এই শ্রেণীর স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের একটা বৈশিষ্টে পরিণত হয়েছে। <strong>কিন্তু তারা এতোটুকু অবহিত নয় যে, নিছক চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি একটা ফিতনা, বরং একটা ভয়ঙ্কর জিনিস। বিশেষত, তার সঙ্গে যদি প্রশস্ত ও পরিপক্ক জ্ঞান, প্রগাঢ় ও পরিণত দৃষ্টি এবং সুষম ও স্বচ্ছ চিন্তাশক্তির সমাবেশ না ঘটে, তবে তা গুরুতর আকার ধারণ করতে বাধ্য। আর এই জিনিসগুলো সম্পর্কে আজকাল যেরূপ ধারণা পোষণ করা হয়, প্রকৃতি ততোটা অকৃপণভাবে এগুলো দান করেনি।</strong></p>
<p>প্রথমোক্ত মতবাদটি থেকে যে দ্বিতীয় মতটির সৃষ্টি হয়েছে, তাহলো এই যে, এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানে&#8217;র যুগ নেই, বরং এটা হচ্ছে &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যক্ষেণের প্রতি ঈমানে&#8217;র দিন। এই কথাগুলো দ্বারা বক্তা আসলে কি বুঝাতে চান, অনেক চিন্তা ভাবনার পরও তা আমার বোধগম্য হয়নি। একথার তাৎপর্য যদি এই হয় যে, বর্তমান যুগের গায়েব বা অদৃশ্য পদবাচ্য কোনো জিনিসকে স্বীকার করা এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো বস্তুকে গ্রহণ করাই হয়না, তবে তা নিতান্তই ভুল। অন্যকথায় এর তাৎপর্য দাঁড়ায় এই যে, বর্তমান যুগের মানুষ এমন একটি সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে সীমিত থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যেখানে কেবল অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই তাদের জন্যে জ্ঞানার্জনের উপায় হতে পারে এবং ইন্দ্রিয়নিচয়ই শুধু ক্রিয়াশীল থাকতে সক্ষম। এই পরিধির বহির্ভূত বিষয়গুলো সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করা এবং অনুমান অনুসন্ধান মারফত সে সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কাজ মানুষ পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু যিনি &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নবতর আবিষ্ক্রিয়া&#8217; সম্পর্কে মোটামুটি অধ্যয়নও করেছেন, এই ভাষণকে তিনি মোটেই স্বীকার করবেননা। দর্শন ও অতি প্রকৃতিবাদের কথা ছেড়েই দিন, কারণ এ দু&#8217;টির গোটা প্রতিপাদ্যই হচ্ছে অদৃশ্য বিষয়। খোদ জড় বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার কথাই ধরুন, কারণ এর ওপর নির্ভর করেই সমালোচকপ্রবর &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে&#8217;র প্রতি ঈমানের দোহাই পাড়ছেন। এই শাস্ত্রটির কোন বিভাগের গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান শক্তি, এনার্জি, প্রাকৃতিক বিধান, মৌলসূত্র, কার্যকারণ এবং এই ধরনের বিষয়াদির স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়? কোন পদার্থ বিজ্ঞানী এগুলোর প্রতি বিশ্বাস করেননা? কিন্তু আপনি কোনো জাঁদরেল বিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, এসবের মধ্যে কোনটির গুঢ় রহস্য তিনি জানেন? কোন্ বস্তুর কতোটুকু তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন? কোন্টির অস্তিত্ব তিনি প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হয়েছেন এবং কোন্টির সপক্ষে তিনি যথার্থ প্রমাণ পেশ করতে পারেন? বস্তুত এসব কিছুকেই গায়েবের প্রতি ঈমান ছাড়া আর কি বলা চলে?</p>
<p><strong>এ কথাগুলোর দ্বিতীয় অর্থ এই হতে পারে যে, বর্তমান যুগে কেবল এমন জিনিসই স্বীকৃত হয়ে থাকে, যা প্রতিটি মানুষের প্রত্যক্ষ করার উপযোগী এবং গোটা মানব সমাজই যা প্রত্যক্ষ ও পর্যবক্ষেণ করেছে। কিন্তু এ ধরনের কথা কোনো বুদ্ধিমান লোকের মুখ দিয়েই নিঃসৃত হতে পারেনা। কারণ, একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, কোনো মানুষই ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত মানবীয় জ্ঞানের অধিকারী নয়, বরং তার একটি বড় ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ দল ও ব্যক্তিদের বিশেষত্ব রয়েছে। এই বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডারের প্রতিটি বিভাগ কেবল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছে প্রত্যক্ষ, আর বাকি সমস্ত মানুষের কাছে অদৃশ্য। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষকে ঐ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও দলের প্রতিই গায়েবী ঈমান পোষণ করতে হয়।</strong></p>
<p>বক্তব্যটির তৃতীয় অর্থ এ-ও হতে পারে যে, এযুগের মানুষ কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ বিষয়কেই স্বীকার করে এবং নিজের কাছে অদৃশ্য কোনো জিনিসকেই তারা বিশ্বাস করেনা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর চাইতে অবাস্তব কোনো কথাই মানুষের মগজ থেকে বের হতে পারেনা। কারণ এ ধরনের মানুষ পূর্বে কখনো দুনিয়ায় পাওয়া যায়নি, আজো পাওয়া যাবেনা এবং কিয়ামত অবধি পাওয়া যাবার কোনো সম্ভাবনাও নেই। এমন লোক যদি বাস্তবিকই কোথাও থেকে থাকে তো তাকে খুঁজে বের করতে আদৌ কালবিলম্ব করা উচিত নয়। কারণ &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্ক্রিয়া&#8217;র মধ্যে এটিই হবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। ফলকথা, যে কোনো দিক থেকেই উক্তিটিকে বিচার করা যাক না কেন, এর ভেতর সত্যতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবেনা। খোদ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই একথার সাক্ষ্য বহন করে যে বর্তমান যুগটিও অতীতের ন্যায়ই অদৃশ্যে বিশ্বাসী আর এই অদৃশ্যে বিশ্বাস থেকে মানুষ কখনো নিষ্কৃতি পেতে পারেনা। প্রতিটি মানুষ হাজারে ৯৯৯ টিরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অদৃশ্যে বিশ্বাস পোষণ করতে বাধ্য। এখন সে যদি কেবল নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের উপরই ঈমান আনার সিদ্ধান্ত করে বসে তাহলে অন্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যে বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার সে সঞ্চয় করেছিলো, তা সবই তাকে বিসর্জন দিতে হবে। নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া জ্ঞানার্জনের তামাম উপায় ও সূত্রই তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। এমতাবস্থায় দুনিয়ার কোনো কাজ করা তো দূরের কথা, নিজের অস্তিত্বই সে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা। বস্তুত অদৃশ্যে বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি পুরোপুরি নির্ভরতা যেমন এযুগে সম্ভব নয়, তেমনি এর চাইতে উজ্জ্বলতর কোনো যুগেও তার সম্ভাবনা নেই। যে কোনো যুগে এবং যে কোনো অবস্থায় মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়াই শুধু অন্যের প্রতি নির্ভর করে বহুতরো বিষয় মেনে নিতে বাধ্য। কতগুলো বিষয় শুধু প্রচলিত ধারণা হিসেবেই মানতে হয়, যেমন সেঁকোবিষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এই যে, এটি খেলে মানুষ মরে যায়। অথচ এটি ব্যক্তিগতভাবে খেয়ে সবাই পরিক্ষা করে দেখেনি কিংবা কাউকে খেয়ে মরতেও দেখেনি। কতকগুলো বিষয় আবার এক বা একাধিক নির্ভরযোগ্য লোকের বর্ণনার ভিত্তিতেই মানতে হয়। যেমন আদালতের সাক্ষ্য বিশ্বাস না করলে আইনের যন্ত্রটি এক মুহূর্তের জন্যেও চলতে পারেনা। কতগুলো ক্ষেত্রে আবার নিছক একজন পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞের কথা বিশ্বাস করতে হয়। স্কুল কলেজের ছাত্রদের বেলায় তো এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যাপার। তারা যদি বিভিন্ন শাস্ত্রের পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের গবেষণা, আবিষ্কার ও মতাদর্শের প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস পোষণ না করে, তবে জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক কদমও সামনে এগোতে পারেনা। ফলে ঐ পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের ন্যায় জ্ঞান গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধানের মতো যোগ্যতাও তারা কখনো অর্জন করতে পারেনা।</p>
<p>এথেকে প্রমাণিত হলো যে, যেসকল ব্যাপারে আমরা অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা জ্ঞানার্জন করিনি, সেসব ক্ষেত্রে অন্য লোকের প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে আমরা বাধ্য। এখন কোন্ ব্যাপারে কার প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত কেবল এই প্রশ্নটিই বাকি থেকে যায় এবং এর ওপরই সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্ভর করে। নীতিগতভাবে এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, যে ব্যাপারে কোনো ব্যক্তি বা দলের ভালো জ্ঞান আছে এবং জ্ঞানার্জনের ভালো উপায়ও করায়ত্ত রয়েছে বলে আমাদের প্রতীতি জন্মাবে সে ব্যাপারে কেবল তার ওপরই বিশ্বাস পোষণ করা উচিত। এই সাধারণ রীতি অনুযায়ী একজন রুগী ডাক্তারের কাছে না গিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করেনা। মামলা-মোকাদ্দমার ব্যাপারে কেউ আইনজ্ঞ বাদ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের শরণার্থী হয়না। কিন্তু ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের প্রশ্নেই কেবল এ-ব্যাপারে মতানৈক্য লক্ষ্য করা যায়। কেবল সেখানেই প্রশ্ন ওঠে এসব ব্যাপারে দার্শনিক ও যুক্তি-বিজ্ঞানীদের মতামত গ্রহণ করা হবে, কি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুদের কথা শোনা হবে? আল্লাহ্, ফিরিস্তা, ওহী, ইলহাম, আত্মা, পুনরুজ্জীবন এবং পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাকার গায়েবী বিষয়ে কি কান্ট, স্পেনসর, আইনেস্টাইন, বেগর্সন প্রমুখের কথা মানা হবে, না ইব্রাহীম আ., মূসা আ., ঈসা আ. ও মুহাম্মদ স. প্রমুখের বক্তব্য শোনা হবে। &#8216;চিন্তা ও বুদ্ধির স্বাধীনতা&#8217;র দাবিদারদের মানসিক ঝোঁক প্রথম দলের দিকে। এরা তাদেরই সংগৃহীত মানদণ্ডে নবীদের কথা যাচাই করে চলেছে এবং এই যাচাইয়ের ফলে যে বিষয়টি উত্তীর্ণ হচ্ছে, সেটিকেই তারা গ্রহণ করছে। সেটিকে তারা নবীদের কথা বলেই স্বীকৃতি দিচ্ছেনা; বরং দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা তার গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট দিয়েছেন বলেই স্বীকার করা হচ্ছে। (দুর্ভাগ্যক্রমে, এই ধরনের বিষয় নিতান্তই কম, বরং একেবারে নেই বললেই চলে) পক্ষান্তরে যে বিষয়টি এই মানদণ্ডে অনুত্তীর্ণ হয় সেটিকে তারা অনির্ভরযোগ্য বলে নাকচ করে দিচ্ছে। অপরদিকে &#8216;প্রাচীন পন্থী&#8217; ও &#8216;গুরুবাদীদে&#8217;র বক্তব্য এই যে, প্রকৃতিবাদ ও যুক্তিবাদ সম্পর্কে ধর্মতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মাবাদীদের কাছে প্রশ্ন করোনা, কিংবা ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের কথা যুক্তিবাদী প্রকৃতিবাদীর কাছে জিজ্ঞেস করোনা। কারণ উভয়ের কর্মক্ষেত্রই সম্পূর্ণ আলাদা বিধায় একটি শাস্ত্র সম্পর্কে অন্য শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞের মতামত জিজ্ঞেস করা মূলতই ভুল। <strong>দার্শনিক ও বিজ্ঞানী তাদের নিজ নিজ শাস্ত্রে যতোই পারদর্শী হননা কেন, ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদে তাঁদের মর্যাদা একজন সাধারণ মানুষের চাইতে মোটেই বেশি নয়। কারণ এ সম্পর্কে জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহের যেটুকু উপায় তাদের করায়ত্ত, একজন সাধারণ লোকেরও ততোটুকু উপায়ই করায়ত্ত। প্রকৃতপক্ষে এ শাস্ত্রটি শুধু নবীদের জন্যেই নির্দিষ্ট। তারাই এ শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। এ সম্পর্কিত জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহের প্রকৃত উপায়ও তাঁদেরই করায়ত্ত। কাজেই এসব ব্যাপারে তাঁদের প্রতিই &#8216;অদৃশ্য বিশ্বাস&#8217; পোষণ করা উচিত। এব্যাপারে বড়জোর এইটুকু প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সত্যবাদী এবং ধর্মতত্ত্বে পূর্ণাঙ্গ দূরদৃষ্টির অধিকারী কিনা? কিন্তু যখনি এটা প্রমাণ হয়ে যাবে যে, তাঁরা বাস্তবিকই এ ব্যাপারে যোগ্যতার অধিকারী, তখন স্বকীয় দূরদৃষ্টি ও জ্ঞানানুযায়ী তারা যা কিছু করেছেন, তা সবই আপনাকে সত্য বলে মানতে হবে।</strong> তাঁদের প্রচারিত সত্যকে অস্বীকার এবং তার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রমাণ উত্থাপন করা আর অন্ধ কর্তৃক সূর্যের অস্তিত্ব অস্বীকার এবং চক্ষুষ্মান ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সূর্যের অস্তিত্ব বিরোধী দলিলপত্র পেশ করা একই কথা। এই ধরনের লোক নিজস্ব ধারণায় যতোবড় দার্শনিকই হোক না কেন, কিন্তু যে ব্যক্তি নিজ চোখে সূর্যকে প্রত্যক্ষ করছে, সে-যে এই অন্ধ সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করবে, তা বলাই নিষ্প্রয়োজন।</p>
<p>সমালোচক হয়তো বলবেন, নবীগণ অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্কার উদ্ভাবনী&#8217; দ্বারা তা সমর্থিত হয়না। এ কারণেই লোকেরা &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217; নিক্ষিপ্ত হয়ে &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র অভিশাপ ভোগ করছে। কিন্তু আমি বলবো, এসব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার মধ্যেই বা এমন কোন্ নিশ্চয়তাটা রয়েছে, যা ইসলামী নীতির পরিপন্থী? এমন কোনো বিষয় থাকলে তার উল্লেখ করুন যাতে করে আমরাও ভেবে দেখতে পারি যে, কুরআন শরীফ এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি, এর মধ্যে কোনটি আমরা মেনে চলবো! যদি তা না থাকে আর তা কিছুতেই থাকতে পারেনা, যেমন আপনার উক্তি &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধ&#8217; &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217; ইত্যাদি থেকেও প্রমাণিত হয় তবে কি আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক আবিষ্কার উদ্ভাবনীর অস্ত্রাগারে কেবল ধারণা কল্পনা ও আন্দাজ অনুমানের অস্ত্রই মওজুদ রয়েছে, যার ওপর ভরসা করে ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হচ্ছে? এবং সে অস্ত্রের ধারণা দেখে শুধু চাকচিক্য দেখেই &#8216;স্বাধীন চিন্তাধারা&#8217;র উপাসকরা এই আশা পোষণ করছেন যে, ধর্ম তার নাম শুনেই ময়দান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে? আপনি ঐ জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্কারাদিকে যতোই গুরুত্ব দিন না কেন, কিন্তু মনে রাখবেন, অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে তা মোটেই নিশ্চয়ক বস্তু নয়। তার প্রভাবে বড়জোর আপনি নিজে &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217; নিক্ষিপ্ত হতে পারেন এবং বলতে পারেন যে, ওহী, ইলহাম, পূনরুজ্জীবন, পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার, ফিরিশতাদের অস্তিত্ব এমনকি আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কেও আমরা ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারিনা। কিন্তু আপনাকে &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র অভিশাপ থেকে মুক্তি কিংবা &#8216;সানন্দে কাফির সাজা&#8217;র আশির্বাদ লাভ করবার ব্যাপারে এসব জ্ঞান বিজ্ঞানের পক্ষে কিছু মাত্র সাহায্য করা সম্ভবপর নয়। কারণ উল্লেখিত বিষয়াদিকে চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করার মতো কোনো যুক্তি প্রমাণ এসকল জ্ঞান বিজ্ঞানে উপস্থিত থাকতে পারেনা। তাছাড়া কোনো জিনিসের অনস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে শুধু এটুকু যুক্তিই যথেষ্ট নয় যে, তার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্কারাদি&#8217; আপনাকে শুধু &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217;র চরম পর্যায়ে নিয়েই পৌছিয়ে দিচ্ছে আর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে এ হচ্ছে একটি নিকৃষ্টতম স্থান। বস্তুত যে জ্ঞান বিজ্ঞান মানুষকে নিশ্চয়তা, নিশ্চিন্ততা ও প্রত্যয়শীলতা দান করতে পারেনা, যা তাকে শূন্যে দোদুল্যমান অবস্থায় নিক্ষেপ করে এবং কোথাও এতোটুকু স্থিরতা লাভের অবকাশ দেয়না, যা তাকে &#8216;কাফির হয়োনা, দায়ে ঠেকে মুসলমান হও&#8217; এর মতো ন্যাক্কারজনক অবস্থায় ফেলে দেয়, তা নিঃসন্দেহে অজ্ঞতার চাইতেও নিকৃষ্টতর।</p>
<p><em>এই সংস্কটাবস্থা থেকে একমাত্র &#8216;ঈমান বিল্ গায়েব&#8217; বা অদৃশ্যে বিশ্বাসই মানুষকে রক্ষা করতে পারে। একবার যদি আপনি কাউকে নবী বলে মেনে নেন এবং সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করেন যে, খোদায়ী জ্ঞানশাস্ত্রে তিনি পুরোপুরি ব্যুৎপত্তির অধিকারী এবং তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেননা, তবে আর অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে আপনার মনে কোনো সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের অবকাশ থাকতে পারেনা। এর ফলে আপনার ধর্মমত বিশ্বাস ও প্রত্যয় এমন এক মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় যা কোনো আধুনিক জ্ঞান বা নবাবিষ্কার, চিন্তা ও কর্মের নতুন ধারা এবং &#8216;মুক্তবুদ্ধির&#8217; কোনো প্রবল প্রতাপে আহত হয়না।</em> এই কারণেই কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই কিতাব হচ্ছে মুত্তাকী লোকদের পথপ্রদর্শক। আর মুত্তাকী লোকদের প্রথম পরিচয় হচ্ছে এই যে, তারা অদৃশ্যবিষয়ে ঈমান পোষণ করে:</p>
<blockquote><p>&nbsp;</p>
<p>هُدًى لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ . (البقرة)</p>
<p>অর্থ: এই কুরআন মুত্তাকীদের পথ প্রদর্শক, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।&#8217;</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বস্তুত &#8216;ঈমান বিল গায়েব&#8217; বা অদৃশ্যে বিশ্বাসের ওপরই ধর্মের গোটা ঈমারত প্রতিষ্ঠিত। কাজেই এই মূলভিত্তিকে একবার চুরমার করে ফেললে তারপর ধর্মের এসব বুনিয়াদী মতবিশ্বাস সম্পর্কে যে গুলোর নিগুঢ় রহস্য জানার কোনো উপায়ই আপনার কাছে নেই কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আপনি পৌছতে পারেননা। এমতাবস্থায় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তার যথার্থতা সম্পর্কে আপনার নিজেরই পুরোপুরি আস্থা হবেনা এবং তার সত্যতা সম্পর্কে অন্য লোককেও আপনি আস্থাবান করতে পারবেননা।</strong> এ ব্যাপারে সর্বশেষ প্রশ্ন হলো, এক ব্যক্তি আল্লাহর নবী এবং তিনি ধর্মতত্ত্বে পুরোপুরি বি্যুৎপত্তির অধিকারী এটা জানবার উপায় কী? তিনি এতোবড় সত্যবাদী যে, তিনি অদৃশ্য বিষয়ে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধির সীমাবহির্ভূত কথা বললেও আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস পোষণ করবো এবং তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেননা, একথা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করবো এটাই বা বুঝবো কি করে? এই প্রশ্নটির মীমাংসা দু&#8217;টি জিনিসের উপর নির্ভরশীল। প্রথম, তাঁর ব্যক্তি চরিত্র আমাদের সকল সম্ভাব্য পন্থায় এবং কঠোরতর মানদন্ডে যাচাই করে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর পেশকৃত বিষয়াদির মধ্যে যেগুলো আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচারশক্তির অন্তর্ভুক্ত, সেগুলোকে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। এই উভয় পরীক্ষায় যদি কেউ অনুপম সত্যবাদী বলে প্রমাণিত হন এবং সেই সঙ্গে মানব জীবনের চিন্তা ও কর্মের সকল দিক ও বিভাগের জন্যে প্রদত্ত তাঁর বিচক্ষণ ও কল্যাণকর ব্যবস্থার মধ্যে কোনো ত্রুটি নির্দেশ করতে সক্ষম না হয়, তবে তাকে সত্যবাদী বলে স্বীকার না করার কোনোই হেতু নেই। আর তিনি খোঁজ খবর ও জানা শোনা ছাড়াই নিছক দুনিয়াবাসীকে ধোকা দেয়ার জন্যেই আল্লাহ্, ফেরেশতা, আরশ, কুরসী, ওহী, ইলহাম, পুনরুত্থান, বেহশত ও দোযখ ইত্যাদির একটা বিরাট ষড়যন্ত্র পাকিয়েছেন (আল্লাহ মাফ করুন) বলে সন্দেহ পোষণ করারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।</p>
<p>কাজেই জনাব নিয়াজের তৃতীয় ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, তিনি কুরআনের প্রথম অংশকে (আমরা যাকে দ্বিতীয় অংশ বলে উল্লেখ করেছি) আলোচনার যোগ্যই মনে করেননা, বরঞ্চ তিনি এই ধারণা পোষণ করেন যে, &#8216;এ ব্যাপারে সমস্ত ধর্মই প্রায় একরকম এবং ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্ম থেকে ভিন্ন বা নিকৃষ্টতর নয়। পক্ষান্তরে আমাদের বক্তব্য হলো, তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী কুরআনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অংশের (কিংবা আমাদের বিশ্লেষণ অনুসারে প্রথম অংশের) সত্যতা নির্ণয় করতে হলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত্র এবং কুরআনের অদৃশ্য বহির্ভূত বিষয়াদির পর্যালোচনা করা আমাদের জন্যে অপরিহার্য। পরন্তু ইসলামী শিক্ষার এই অংশটি &#8216;অন্যান্য ধর্ম থেকে ভিন্ন বা নিকৃষ্টতর নয়&#8217; কেবল এটুকু ধারণা নিয়ে তুষ্ট থাকলেই চলবেনা; বরং সেটি তামাম অনিসলামী ধর্মের চাইতে উন্নত এবং উৎকৃষ্ট, যুক্তি প্রমাণ দ্বারা এটাও প্রতিপন্ন করা আবশ্যক। কাজেই আলোচনার এই বিষয়টি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে অন্য বিষয়ের অবতারণা করা নীতিগতভাবেই ভুল। তাছাড়া এ বিষয়টির মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য বিষয়ের মীমাংসা করাও সম্ভবপর নয়।</p>
<p>জনাব নিয়াজের ইচ্ছা হলো, আমরা যেনো &#8216;পরকাল&#8217;, &#8216;কালামে ইলাহী&#8217; এবং আকাইদ ও ইতিহাস সংক্রান্ত আয়াতগুলোর বিচার বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হই। কিন্তু আমাদের মতে, এই আলোচনার দু&#8217;টি দিক রয়েছে এবং তা দু&#8217;টি ভিন্ন দলের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রথম দলটি হলো তারা, যারা রসূলে আকরাম স.-এর নবুয়্যতের প্রতিই ঈমান পোষণ করেনা এবং এই কারণেই তারা উক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে সন্দেহ পরায়ণ। দ্বিতীয় দলটি হলো, যারা তাঁর নবুয়‍্যাতকে স্বীকার করে, কিন্তু অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে সন্দিগ্ধচিত্ত। এই দু&#8217;টি দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পদ্ধতিও ভিন্ন। কাজেই আপত্তিকারী এর কোন দলের অন্তর্ভুক্ত, তা না জানা পর্যন্ত আমরা তাঁর সঙ্গে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে পারিনা।</p>
<p>প্রথম দলটির সঙ্গে পরকাল, কালামে ইলাহী এবং অন্যান্য অদৃশ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা একেবারেই অর্থহীন। কারণ মূল বিষয়ে মতানৈক্য রেখে খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। আমরা পরকাল, কালামে ইলাহী, এমনকি আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণরাজি সম্পর্কেও যে বিষয়গুলোর প্রতি ঈমান ও প্রত্যয় পোষণ করি, তার ভিত্তি এই নয় যে, আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা আমরা কোনো চূড়ান্ত ও নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে পেরেছি এবং তার বিরুদ্ধে আর কোনো যুক্তি প্রমাণ উত্থাপন করা যেতে পারেনা। এমনটি যদি হতো, তো নিসন্দেহে নবুয়্যত সংক্রান্ত আলোচনা করা যেতো। কিন্তু এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের অটল অনড় ঈমান প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্বাসের ওপর গড়ে উঠেছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম সত্যবাদী। তিনি আপন নবুয়্যত এবং কালামে ইলাহী সম্পর্কে যাকিছু বিবৃত করেছেন, তা সবই অভ্রান্ত। এই মৌলিক কারণেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাসী ব্যক্তির সাথে এই বুনিয়াদী প্রশ্নটিকে স্বীকার না করা পর্যন্ত কোনো খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করতে আমরা সম্মত নই।</p>
<p>দ্বিতীয় দলটির এই অধিকার আমরা স্বীকার করিনা যে, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতাও স্বীকার করবে আবার অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে কুরআন মজীদ এবং মুহাম্মদ স.-এর বর্ণনার সত্যাসত্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করবে। কারণ এরূপ ভূমিকা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তারা প্রথম দলটির সামিল হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে তাদের দ্বিতীয় দলে শামিল থাকতে হলে এ সত্য স্বীকার করতে হবে যে, কুরআনের প্রতিটি শব্দ অভ্রান্ত এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকিছু পেশ করেছেন তা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমুক্ত। অবশ্য এ ব্যাপারে সে দু&#8217;টি দিক থেকে প্রশ্ন তুলতে পারে। প্রথম এই যে, কুরআন শরীফে বাস্তবিকই এ ধরনের বিষয় বর্ণিত হয়েছে কিনা? আর রসূলের করীম স. সত্যসত্যই এরূপ কথা বলেছেন কিনা। দ্বিতীয়ত, কুরআন সুন্নায় এ সম্পর্কে যাকিছু রয়েছে, তার সঠিক অর্থ এবং মর্ম কি হতে পারে?</p>
<p>পরিশেষে আমার আর একটি কথা বলতে হচ্ছে। জনাব নিয়াজ &#8216;তর্জমানুল কুরআনে&#8217; একটি বিতর্ক বিভাগ খোলার অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি এই অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছেন যে, তাঁর যাবতীয় শোবা সন্দেহ এবং প্রশ্ন ও আপত্তি তিনি উক্ত বিভাগে পেশ করবেন। কিন্তু পেশাদারি বিতর্ক ও বাদানুবাদ থেকে আমি হামেশাই আত্মরক্ষা করে এসেছি এবং এখনো রক্ষা করতে ইচ্ছুক। কারণ যে বিতর্কের উদ্দেশ্য গুরু মস্তিষ্কের ব্যায়াম আর বুদ্ধির কসরৎ দেখিয়ে বাহবা কুড়ানো তেমন বিতর্কের আমি আদৌ পক্ষপাতী নই। তবে জ্ঞানগর্ভ ও তত্ত্বপূর্ণ আলোচনার জন্যে আমি সর্বদাই প্রস্তুত, যদি সে আলোচনার উদ্দেশ্য হয় সত্যানুসন্ধান এবং তাতে উভয়পক্ষ এমনি আন্তরিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন যে, আসল সত্য প্রমাণিত হবার পর প্রত্যেকে তা স্বীকার করে নেবেন। এই হিসেবে &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় যেসব শোবা সন্দেহ ও আপত্তি প্রকাশিত হবে, তর্জমানুল কুরআনে তা পুনরুল্লেখ করা হবে এবং সেই সঙ্গে তার জবাবও দেয়া হবে। অনুরূপভাবে &#8216;তরজুমানুল কুরআনে&#8217;র জবাব সম্পর্কে জনাব নিয়াজ কোনো মন্তব্য করলে মূল জবাবটিও তার সঙ্গে উল্লেখ করবেন বলে আশা করি, যাতে করে উভয় পত্রিকার পাঠকবর্গ আলোচনার উভয় দিক সম্পর্কে অবহিত এবং সেই সম্পর্কে নিজেরাও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। পক্ষান্তরে কেবল একটি দিক উল্লেখ করা এবং অন্যদিক এড়িয়ে যাওয়াকে আপন দুর্বলতার স্বীকৃতি বলেই আমি মনে করি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16394</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আধুনিক কালের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/modern-disease-ridden-nations/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/modern-disease-ridden-nations/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Nov 2025 17:43:12 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16390</guid>

					<description><![CDATA[আজ প্রাচ্য পাশ্চাত্য ও মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একই বিপদে জড়িয়ে পড়েছে। তাহলো, নিরেট বস্তুতান্ত্রিকতার ক্রোড়ে লালিত এক সভ্যতা ও সংস্কৃতি এসে সবার ওপর চেপে বসেছে। তাই সভ্যতার চিন্তা-পদ্ধতি ও কর্মকৌশল উভয়েরই ইমারত গড়ে উঠেছে ভ্রান্ত বুনিয়াদের ওপর। এর দর্শন,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজ প্রাচ্য পাশ্চাত্য ও মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একই বিপদে জড়িয়ে পড়েছে। তাহলো, নিরেট বস্তুতান্ত্রিকতার ক্রোড়ে লালিত এক সভ্যতা ও সংস্কৃতি এসে সবার ওপর চেপে বসেছে। তাই সভ্যতার চিন্তা-পদ্ধতি ও কর্মকৌশল উভয়েরই ইমারত গড়ে উঠেছে ভ্রান্ত বুনিয়াদের ওপর। এর দর্শন, বিজ্ঞান, নৈতিকতা, সামাজিকতা, রাজনীতি, আইন কানুন ইত্যাদি প্রত্যেকটি জিনিসই এক ভ্রান্ত জায়গা থেকে যাত্রা করে এক ভ্রান্ত পথে উৎকর্ষ লাভ করে এসেছে। আর বর্তমানে সে এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, তার ধ্বংসের শেষ প্রান্ত খুবই নিকটবর্তী হয়ে পড়েছে।</p>
<p>এই সভ্যতার সূত্রপাত হয়েছে এমন লোকদের মধ্যে, যাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে খোদায়ী জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো স্পষ্ট ও পবিত্র উৎসই বর্তমান ছিলোনা। সেখানে ধর্মগুরু বা পুরোহিতদের অস্তিত্ব অবশ্যি ছিলো; কিন্তু তাদের কাছে বুদ্ধিমক্তা,জ্ঞান-বিজ্ঞান, খোদায়ী কানুন-এর কোনোটাই বর্তমান ছিলোনা। তাদের কাছে যে বিকৃত ধর্মীয় মতবাদটি ছিলো, তা মানবজাতিকে চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে সোজা পথ প্রদর্শন করতে চাইলেও তা করতে মোটেই সক্ষম ছিলোনা। বরং তা শুধু পারতো জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করতে। আর কার্যত সে তা-ই করলো। তার এই প্রতিবন্ধকতার ফলে যারা উন্নতি ও তরক্কীর জন্যে উৎসুক ছিলো, তারা ধর্ম ও ধার্মিকতার উপর আঘাত হেনে এক ভিন্ন পথে যাত্রা করলো। এ পথে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং অনুমান ও অন্বেষণ ছাড়া আর কোনোই দিশারী ছিলোনা। এ দিশারীটি ছিলো সম্পূর্ণ অনির্ভরযোগ্য এবং নিজেই দিশারী ও আলোর মুখাপেক্ষী। তবু এটিই তাদের প্রধান নির্ভর হয়ে দাঁড়ালো। এর সাহায্যে তারা চিন্তা ভাবনা, গবেষণা, অনুশীলন ও সংগঠন পুণর্গঠনের পথে অনেক চেষ্টা সাধনা করলো। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা ভ্রান্তির সূচনা করে বসলো এর ফলে তাদের সমস্ত উন্নতির গতিধারাই এক ভ্রান্ত লক্ষ্যস্থলের দিকে নিবদ্ধ হলো। তারা ধর্মহীনতা ও বস্তুতান্ত্রিকতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করলো। তারা বিশ্ব প্রকৃতিকে এভাবে দেখলো যে, তার কোনো স্রষ্টা ও নিয়ন্তা (খোদা) নেই। বিশ্বজগত ও প্রাণীজগতের প্রতি এভাবে তাকালো যে, সত্যতা রয়েছে শুধু পর্যবেক্ষণ ও ইন্দ্রিয়ানুভূতির। এই দৃশ্যমান পর্দার আড়ালে আর কোনো বস্তুর অস্তিত্ব নেই। এভাবে অভিজ্ঞতা ও অনুমানের সাহায্যে তারা প্রাকৃতিক নিয়মকে জানতে ও বুঝতে সক্ষম হলো বটে, কিন্তু প্রকৃতির স্রষ্টা অবধি পৌঁছাতে পারলোনা।</p>
<p>অনুরূপভাবে তারা বিশ্বের ব্যবহারযোগ্য বস্তুনিচয়কে নিজেদের কর্তৃত্বাধীনে পেলো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহারও করলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা যে ঐ গুলোর মালিক ও নিয়ামক নয়; বরং আসল মালিকের প্রতিনিধি মাত্র- এই ধারণা থেকেই তাদের মন মগজ একেবারে শূণ্য ছিলো। এই অজ্ঞতা ও অচেতনা তাদেরকে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির মৌলিক ধারণা সম্পর্কে অচেতন করে দিয়েছিলো। এর ফলে তাদের গোটা কৃষ্টি ও সভ্যতাই ভ্রান্ত ভিত্তির ওপর গড়ে উঠে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে &#8216;আত্মা&#8217;র পূজারী হয়ে দাঁড়ায় এবং &#8216;আত্মার&#8217; আল্লাহ্‌র স্থান দখল করে তাদেরকে কঠিন ফিত্না ও বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করে দেয়। সেই মিথ্যা খোদার বন্দেগীই আজ তাদেরকে চিন্তা ও কর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক মারাত্মক পথে টেনে নিয়ে চলছে। এ পথের মধ্যকার পর্যায়গুলো নেহাত ভীতিপ্রদ ও চোখ ধাঁধানো হলেও তার শেষ পরিণতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই ভূয়া খোদাই বিজ্ঞানকে মানুষের ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। নৈতিকতাকে আত্মপূজা, প্রদর্শনেচ্ছা, অবাধ্যতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার ছাঁচে ঢালাই করে নিয়েছে। অর্থ ব্যবস্থার ওপর স্বার্থপরতার ও ভ্রাতৃহত্যার শয়তান চাপিয়ে দিয়েছে। সামাজিকতার শিরা উপশিরায় আত্মপূজা, বিলাসপ্রিয়তা ও আত্মকেন্দ্রীকতার হলাহল ঢেলে দিয়েছে। রাজনীতিকে জাতীয়তাবাদ, স্বদেশিকতা, বর্ণ ও গোত্রের পার্থক্য এবং শক্তি পূজার দ্বারা দুষিত করে মানবতার পক্ষে এক নিকৃষ্টতম অভিশাপ বানিয়ে দিয়েছে। ফলকথা পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ আসলে যে বিষবৃক্ষের বীজ রোপন করে, কয়েক শতকের মধ্যেই তা কৃষ্টি ও সভ্যতার এক বিরাট মহীরূহে পরিণত হয়। সে বৃক্ষের ফল সুমিষ্ট হলেও আসলে তা বিষদুষ্ট, তার ফুল দেখতে সুন্দর ও সুদৃশ্য হলেও আদতে কাঁটাযুক্ত, তার শাখা প্রশাখায় বসন্তের শোভা খাকলেও তার থেকে প্রবাহিত বিষাক্ত বায়ু ভেতরে ভেতরে গোটা মানবতাকেই বিষাক্ত করে চলছে।</p>
<p><strong>যে পাশ্চাত্যবাসিগণ এই বিষবৃক্ষকে সহস্তে রোপন করেছিল</strong><strong>, তারা আজ নিজেরাই তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। কারণ সে বৃক্ষ জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে এমন বিভ্রান্তি, জটিলতা ও পেরেশানির সৃষ্টি করেছে যে, তার যে কোনো প্রচেষ্টাই অসংখ্য জটিলতা ডেকে নিয়ে আসে। তার যে কোনো ডালই তারা কেটে ফেলে দেয়, সেখান থেকে, অসংখ্য কাঁটাযুক্ত ডাল ফুটে বেরোয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ তারা পুঁজিবাদের ওপর করাত চালালো, সংগে সংগে কম্যুনিজমের অভ্যুদয় ঘটলো। গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানলো অমনি ডিক্টেটরবাদ আত্মপ্রকাশ করলো। সামাজিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে গেলো, সংগে সংগে নারীত্ববাদ ও জন্মনিয়ন্ত্রণের আর্বিভাব হলো। নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতার প্রতিকারের জন্যে আইন প্রয়োগের চেষ্টা করলো, তার ফলে আইন লংঘন ও অপরাধ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ফলকথা, কৃষ্টি ও সভ্যতার এই বিষবৃক্ষ থেকে বিকৃতি ও বিচ্ছৃংখলার এক অন্তহীন ধারা বেরিয়ে আসছে এবং তা পাশ্চাত্য জীবনকে আপাদমস্তক দুঃখ কষ্ট ও ক্লেশের এক বিরাট ফোঁড়ার জ্বালা-যন্ত্রণা প্রতিটি শিরা উপশিরা ও স্নায়ুকেন্দ্রে অনুভুত হচ্ছে।</strong></p>
<p>পাশ্চাত্য জাতিগুলো আজ সে ফোঁড়ার তীব্র যাতনায় আর্তনাদ করে উঠছে। তাদের হৃদয় মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। তাদের আত্মা কোনো অমৃত রসের জন্যে ছটফট করছে। কিন্তু অমৃতরস কোথায় পাওয়া যাবে, সে খবরই তাদের জানা নেই। তাদের অধিকাংশ লোক এখনো ভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে যে সমস্যার আসল উৎস হচ্ছে ঐ বিষবৃক্ষের শাখা প্রশাখা মাত্র। তাই ডালপালা কাটবার কাজেই তারা নিজেদের সমস্ত সময় ও মেহনত নিয়োজিত করছে। কিন্তু তবু তারা বুঝতে পারেনা যে, বিকৃতিটা ডাল পালায় নয়; বরং গাছের মূল শিকড়ে অবস্থিত। আর অসৎ বৃক্ষমূল থেকে সৎ ডালপালা বেরুনোর প্রত্যাশা করা নির্বুদ্ধিতা বৈ কিছুই নয়।</p>
<p>পক্ষান্তরে আপন সভ্যতা বৃক্ষের মূলগত খারাপীকে উপলব্ধি করতে পেরেছে, এমন একটি ক্ষুদ্র দলও সেখানে রয়েছে। কিন্তু যেহেতু তারা কয়েক শতক ধরে ঐ বৃক্ষের ছায়ায় প্রতিপালিত হচ্ছে এবং তারই ফল-ফলারি থেকে তাদের অস্থি-গোস্ত গঠিত হয়েছে, তাই এর মূল ছাড়া অন্য কোনো মূল থেকে সৎ ডালপালা বিস্তৃত হতে পারে, তাদের মনমানস এ কথা উপলব্ধিই করতে অক্ষম। ফলে উভয় দলেরই অবস্থা দাঁড়িয়েছে এক রকম। তারা অত্যন্ত ব্যাকুলতার সাথে তাদের যন্ত্রণা উপশমকারী কোনো জিনিস সন্ধান করে ফিরছে; কিন্তু তাদের অভীষ্ট বস্তুটি কি এবং তা কোথায় পাওয়া যাবে, এ খবরই তাদের জানা নেই।</p>
<p>বস্তুত পাশ্চাত্য জাতিগুলোর সামনে কুরআন ও মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শ ও কর্মনীতি পেশ করার এটাই উপযুক্ত সময়। আজ তাদের বলা দরকার, তোমাদের হৃদয় মন যে ইপ্সিত বস্তুটির জন্যে উদ্বেলিত, তা হচ্ছে এই। যে অমৃতরসের জন্যে তোমরা চাতকের ন্যায় পিপাসার্ত, তা হচ্ছে এই। এ হচ্ছে এমন পূত পবিত্র মহীরুহ, যার মূল কান্ড এবং ডালপালা উভয়টাই সৎ। এর ফুল যেমন খুশবুদার, তেমনি কাঁটামুক্ত। এর ফল যেমন সুস্বাদু তেমনি প্রাণসঞ্চারক। এর হাওয়া যেমন আরামদায়ক, তেমনি হৃদয়-মন শীতলকারী। এখানে তোমরা বাস্তব বিচার বুদ্ধির সন্ধান পাবে, চিন্তা ও দৃষ্টির একটি নির্ভুল কেন্দ্রবিন্দু খুঁজে পাবে এবং সর্বোত্তম মানবীয় চরিত্র গঠনের উপযোগী জ্ঞানের সাক্ষাত পাবে। তোমরা এখানে এমন আধ্যাত্মিকের সন্ধান পাবে, যা সন্যাসী ও সংসার বৈরাগীদের জন্যে নয়; বরং দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে সংগ্রামকারীদের জন্যে আত্মিক শান্তি ও মানসিক স্বস্তির একমাত্র উৎস। এখনে তোমরা নৈতিকতা ও আইন কানুনের এমন উন্নত ও সুদৃঢ় বিধি ব্যবস্থা দেখতে পাবে, যা মানব প্রকৃত সংক্রন্ত পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যা কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় বদলে যেতে পারেনা। এখানে তোমরা কৃষ্টি সভ্যতার এমন নির্ভুল মূলনীতির সন্ধান পাবে, যা অবৈধ শ্রেণী-বৈষম্যও কৃত্রিম জাতি-বিভেদকে নিশ্চিহ্ন করে মানব সমাজকে খালেস যুক্তিসম্মত ভিত্তির ওপর সংগঠিত করে। সে মূলনীতি সাম্য, সুবিচার, উদারতা, দানশীলতা ও সদাচরণের এমন এক শক্তিময় ও সুসংগত পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে ব্যক্তি, শ্রেণী ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে স্বার্থ, অধিকার ও প্রয়োজনের খাতিরে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও লড়াই বাধবার কোনোই অবকাশ নেই; বরং সবাই এখানে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ব্যক্তিক ও সামাজিক কল্যাণের জন্যে সানন্দেও সন্তুষ্ট চিত্তে কাজ করতে পারে। কাজেই তোমরা যদি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে এক প্রচন্ড আঘাত এসে তোমাদের কৃষ্টি সভ্যতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ইতিহাসের ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষ্টি সভ্যতাগুলোর শামিল করে দেবার আগেই ইসলামের বিরুদ্ধে তামাম বিদ্বেষকে তোমাদের মন থেকে মুছে ফেলে দাও। তোমরা মধ্যযুগের ধর্মীয় উন্মাদদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে বিদ্বেষ লাভ করেছ এবং সেই অন্ধকার যুগের তামাম জিনিসের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পরও যাকে তোমরা আজ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রয়েছ, তাকে পরিহার করো এবং উদার মনে কুরআন ও মুহাম্মদ সা.-এর মহান শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত হও, তাকে গ্রহণ করো।</p>
<p>মুসলিম জাতিগুলোর অবস্থা পাশ্চাত্য জাতিগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এদের রোগ যেমন আলাদা, রোগের কারণও ভিন্ন। কিন্তু তাদের চিকিৎসা পাশ্চাত্য বাসীদেরই অনুরূপ। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর শেষ কিতাব ও শেষ নবীর মাধ্যমে যে জ্ঞান ও হেদায়াত পাঠিয়েছেন, তার দিকে প্রত্যাবর্তন করাই তাদের চিকিংসা।</p>
<p><em>যে পরিস্থিতিতে ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘাত বেধেছে</em><em>, তা ইসলাম ও অন্যান্য সভ্যতার মধ্যকার পূর্ববর্তী সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। রোমক, পারসিক, ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতার সংগে যখন ইসলামের সংঘর্ষ বাধে, তখন ইসলাম তার অনুবর্তীদের চিন্তা ও কর্মশক্তির উপর পূর্ণ মাত্রায় কর্তৃত্বশীল ছিলো। তাদের ভিতরে জিহাদ ও ইজতিহাদের প্রচন্ড ভাবধারা ক্রিয়াশিল ছিলো। আধ্যাত্মিক ও বস্তুতান্ত্রিক উভয় দিক থেকেই তারা দুনিয়ায় এক বিজয়ী জাতির গৌরব অর্জন করেছিলো এবং অন্য সব জাতির উপর নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিলো। তখন দুনিয়ার কোনো কৃষ্টি সভ্যতাই তাদের কৃষ্টি সভ্যতার মোকাবিলায় দাঁড়াতে পারেনি। তারা যেদিকে এবং যে জাতির কাছেই পৌঁছেছে, তার চিন্তাদর্শ, মতাদর্শ, জ্ঞান বিজ্ঞান, স্বভাব চরিত্র ও সমাজ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। তাদের মধ্যে বাইরের প্রভাব গ্রহণের যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বিস্তারের শক্তি ছিলো অনেক বেশি। নিঃসন্দেহে তারা অন্যদের কাছ থেকেও অনেক কিছু গ্রহণ করেছে; কিন্তু তাদের সভ্যতার মেজাজ এতোখানি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী ছিলো যে, বাহির থেকে এসে যা কিছুই তাতে যুক্ত হয়েছে, তা তার প্রকৃতির সঙ্গে একেবারে খাপ খেয়ে গিয়েছে এবং বাইরের কোনো প্রভাবেই তার মেজাজে এতটুকু পার্থক্য সুচিত হয়নি। পক্ষান্তরে সে অন্যদের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করেছে, তা একেবারে বিপ্লবাত্মক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো অমুসলিম সভ্যতা তো ইসলামের মধ্যে বিলীন হয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্যই বিলিয়ে দিয়েছে। আর যেগুলোর মধ্যে জীবনী শক্তি প্রবল ছিলো, সেগুলোও ইসলামের দ্বারা এতোটা প্রভাবিত হয়েছে যে, তাদের মুলনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। কিন্তু এ হচ্ছে তখনকার কথা, যখন মুসলমানদের ভেতর আদর্শের দীপশিখা অম্লান ও অনির্বাণ ছিলো।</em></p>
<p>মুসলমানরা কয়েক শতক ধরে লেখনী ও তরবারির সাহায্যে রাজত্ব চালিয়ে শেষ পর্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়লো। তাদের জিহাদী প্রাণশক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়লো। ইজতিহাদী শক্তি নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। যে মহাগ্রন্থ তাদেরকে জ্ঞানের রৌশনি ও কর্মের শক্তি যুগিয়েছিলো, তাকে তারা নিছক একটি পবিত্র স্মৃতিশাস্ত্র বানিয়ে গেলাফবন্দী করে রেখেছে। যে মহান নায়কের অনুসৃত নীতি তাদের কৃষ্টি ও সভ্যতাকে এক পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবধর্মী জীবনাদর্শের রূপদান করেছিল, তাঁর অনুসৃতিকে তারা বর্জন করলো। তার ফলে তাদের উন্নতি ও তরক্কীর গতি স্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রবহমান স্রোতস্বিনী হঠাৎ নিশ্চল উপত্যকায় এসে গতিরুদ্ধ হয়ে ক্ষুদ্র সরোবরে পরিণত হলো। নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসন থেকে মুসলমানরা অপসারিত হলো। তাদের চিন্তাধারা জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সভ্যতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দুনিয়ার অন্যজাতির ওপর যে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো, তার বাঁধন শিথিল হয়ে গেলো। পরন্তু ইসলামের মোকাবিলায় পাশ্চাত্যে এক ভিন্ন সভ্যতার অভ্যুদয় হলো। মুসলমানেরা জিহাদ ও ইজতিহাদের যে ঝান্ডাকে দুরে নিক্ষেপ করেছিলো, পাশ্চাত্য জাতিগুলো তাকে নিজ হাতে তুলে নিলো। মুসলমানরা আরামে শুয়ে রইলো আর পাশ্চাত্যবাসী তাদের পরিত্যক্ত ঝান্ডা নিয়ে জ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে এগিয়ে চললো। এমনকি যে নেতৃত্বের আসন থেকে তারা অপসারিত হয়েছিলো সেই আসনই এরা লাভ করলো। তাদের তরবারি দুনিয়ার অধিকাংশ এলাকাই জয় করলো। তাদের চিন্তাধারা, মতাদর্শ, জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং কৃষ্টি ও সভ্যতার মূলনীতি সারা দুনিয়ার ওপর ছড়িয়ে পড়লো। তাদের শাসন কর্তৃত্ব শুধু মানুষের দেহকেই নয়, তার দিল-দেমাগকেও অধিকারভুক্ত করে নিলো। অবশেষে কয়েক শতকের নিদ্রা থেকে জেগে উঠে মুসলমানরা চোখ মেলেই দেখতে পেলো, ময়দান সম্পূর্ণই তাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে এবং অন্য লোকেরা এসে তার ওপর জেঁকে বসেছে। এখন জ্ঞান বিজ্ঞান, কৃষ্টি সভ্যতা, আইন কানুন ও রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে যা কিছুই আছে, সবই তাদের (মুসলমানদের) হাতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তাদের কাছে রয়েছে শুধু দীপ্তিহীন এক আলোক বর্তিকা।</p>
<p>আজকে ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে এক নতুন ধারায়। নিসন্দেহে পাশ্চাত্য সভ্যতা কোনো দিক দিয়েই ইসলামী সভ্যতার মোকাবিলা করতে সমর্থ নয়। এমনকি ইসলামের সঙ্গে যদি সংঘর্ষ বাধে, তবে দুনিয়ার কোনো শক্তিই তার সামনে টিকে থাকতে পারেনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলাম কোথায়? আজকের মুসলমানদের মধ্যে যেমন ইসলামী স্বভাব প্রকৃতি ও নৈতিক চরিত্রের বালাই নেই, তেমনি নেই ইসলামী চিন্তাধারা ও কর্ম প্রেরণা। তাদের মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ কোথাও সত্যিকার ইসলামী প্রাণ চেতনা নেই। তদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন ইসলামী আইন কার্যকর নয়, তেমনি নয় তাদের সামাজিক জীবনেও। তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোন একটি শাখার ব্যবস্থাপনা প্রকৃত ইসলামী প্রণালীর উপর ভিত্তিশীল নয়। এমতাবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এক প্রাণবান, গতিশীল, জ্ঞানদীপ্ত ও কর্মচঞ্চল সভ্যতার সাথে মুসলমানদের নিশ্চল, জরাজীর্ণ ও অনগ্রসর সভ্যতার। আর এমনি অসম প্রতিযোগিতার ফলাফল যা হবার কথা, তাই হচ্ছে। মুসলমানরা ক্রমাগত পিছু হটছে। তাদের সভ্যতা পরাভূত হচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা পাশ্চাত্য কৃষ্টির মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মনমগজে দিন দিন পাশ্চাত্যপনা চেপে বসছে। পাশ্চাত্য ছাঁচে তাদের মানসিক কাঠামো গড়ে উঠছে। পাশ্চাত্যনীতির প্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা ও দৃষ্টিশক্তির পরিশীলন হচ্ছে। তাদের ধ্যানধারণা, নৈতিকতা, অর্থনীতি, সামাজিকতা, রাজনীতি ইত্যাদি প্রতিটি জিনিসই পাশ্চাত্যের রঙে রঞ্জিত হচ্ছে। তাদের নব্য বংশধরগণের মনমানসে এই ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, পাশ্চাত্য থেকে প্রাপ্ত বিধানই হচ্ছে সত্যিকার জীবন বিধান। সুতরাং এ পরাজয় হচ্ছে আসলে মুসলামানদের পরাজয় ইসলামের পরাজয় নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একে ইসলামের পরাভব বলে বিবেচনা করা হচ্ছে!</p>
<p>এই কঠিন বিপদে শুধু একটি দেশই পরিবেষ্টিত নয়। কেবল একটি জাতিই এ সংকটের মুখোমুখি নয়। আজ গোটা মুসলিম জাহানই এই ভয়াবহ বিপ্লবের পর্যায় অতিক্রম করে চলছে। প্রকৃতপক্ষে এই বিপ্লবের যখন সূত্রপাত হচ্ছিল, ঠিক তখন থেকেই সচেতন ভূমিকা গ্রহণ করা, আসন্ন সভ্যতার নীতি ও ভিত্তিমূলকে উপলদ্ধি করা এবং পাশ্চাত্য দেশসমূহ পরিভ্রমণ করে এর বুনিয়াদী জ্ঞানবিজ্ঞান অধ্যয়ন করা ছিলো আলিম সমাজের কর্তব্য। তাঁদের উচিত ছিলো, যেসব কার্যকরী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও বাস্তব প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে পাশ্চাত্য জাতিগুলো উন্নতি লাভ করছে, ইজতিহাদী শক্তির দ্বারা সেগুলোকে আয়ত্বাধীন করে নিয়ে ইসলামী নীতির আলোকে মুসলমানদের শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। এতে করে যেমন শত শত বছরের নিষ্ক্রয়তাজনিত ক্ষতি পূর্ণ হয়ে যেতো, তেমনি ইসলামের গাড়ীও আবার যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হতো। কিন্তু আক্ষেপের ব্যাপার হলো, খোদ আলিম সমাজই (ব্যতিক্রম ছাড়া) তখন ইসলামের সত্যিকার প্রাণচেতনা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে না ছিলো ইজতিহাদী শক্তি, না চিন্তা গবেষণার ক্ষমতা। তাঁদের বুদ্ধিমত্তা ও কর্ম শক্তিও লোপ পেয়েছিলো। খোদার কিতাব ও রসূলে খোদার আদর্শিক ও বাস্তব হেদায়াত থেকে ইসলামের সনাতন ও গতিশীল নীতি নির্ধারণ করে যুগের পরিবর্তির্ত অবস্থায় তাকে প্রয়োগ করার কোনো যোগ্যতাই তাঁদের মধ্যে ছিলোনা। তাদের মধ্যে পূর্ব পূরুষদের অন্ধ ও অনড় তাকলিদের ব্যাধি পুরোপুরি সংক্রমিত হয়েছিল। এর ফলে প্রতিটি জিনিসই তাঁরা এমন কিতাবাদিতে খোঁজ করতেন, যা কোনো কালোত্তীর্ণ খোদায়ী কিতাব ছিলোনা। তাঁরা প্রতিটি ব্যাপারেই এমন লোকদের মুখাপেক্ষী হতেন, যাদের মধ্যে নবীদের মতো সময় ও পরিবেশের বন্ধনমুক্ত উদার দূরদৃষ্টি ছিলোনা। কাজেই সম্পূর্ণ পরিবর্তিত অবস্থায় মুসলমানদের সাফল্যজনক নেতৃত্ব দান করা তাঁদের পক্ষে কি করে সম্ভব ছিলো? তখন তো জ্ঞানবিজ্ঞান ও কর্মসাধনার ক্ষেত্রে এমন বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, যার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা কেবল খোদার পক্ষেই সম্ভবপর ছিলো। কিন্তু যুগ যুগান্তকালের আবরণ ভেদ করে সে পর্যন্ত পৌঁছবার মতো দৃষ্টিশক্তি কোন সাধারণ মানুষের ছিলোনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একথা নিসন্দেহ যে, আলিম সমাজ নয়া সভ্যতা ও সংস্কৃতির মোকাবিলা করার জন্যে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় উপায় উপকরণ ও সাজ সরঞ্জাম তাঁদের কাছে ছিলোনা। কারণ স্থবিরতার দ্বারা গতিশীলতার মোকাবিলা করা যায়না। তর্কশাস্ত্রের বলে যুগের গতিকে বদলানো যেতে পারেনা। নয়া অস্ত্রপাতির সামনে অকেজো মরচে ধরা হাতিয়ার কোনো কাজেই লাগতে পারেনা। আলিম সমাজ যেসব পন্থায় জাতির নেতৃত্ব প্রদান করতে চাইছিলেন, তাতে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনাই ছিলোনা। যে জাতি পাশ্চাত্য সভ্যতার বন্যা প্রবাহে বেষ্টিত হয়ে পড়েছিলো, সে চোখের ওপর ঠুলি বেঁধে এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে নিষ্ক্রিয় করে বন্যার অস্তিত্বকে কতোক্ষণ অস্বীকার করতে এবং তার প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকতে পারতো? যে জাতির ওপর আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রশক্তিসহ চেপে বসেছিলো, পরাভূত ও পদানত অবস্থায় সে তার বাস্তব জীবনকে ওই সভ্যতার প্রভাব প্রতিপত্তি থেকে কিভাবে রক্ষা করতে পারতো? বস্তুত এমনি পরিস্থিতিতে যা হবার শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরাজয় বরণের পর মুসলমানরা জ্ঞান বিজ্ঞান ও তাহযীব তমদ্দুনের ক্ষেত্রেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম জাহানের প্রতিটি দেশেই পাশ্চাত্যপনার তুফান মহামারীর বেগে ছড়িয়ে পড়েছে। আর তা বন্যা প্রবাহে ভাসতে ভাসতে মুসলমানদের নব্য বংশধরগণ ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূর থেকে দূরান্তরে চলে যাচ্ছে।</p>
<p><strong>দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে</strong><strong>, আমাদের আলিম সমাজ আজ পর্যন্ত তাঁদের ভ্রান্তি উপলদ্ধি করতে পারেননি। যে নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রথমদিকে আলিম সমাজ ব্যর্থতার গ্লানি বরণ করে নিয়েছিলেন, আজো প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশেই তাঁরা সেই একই দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই অবিচল রয়েছেন। কতিপয় ব্যক্তিক্রম ব্যক্তিত্বকে বাদ দিলে আলিম সমাজের সাধারণ অবস্থা হচ্ছে এই যে, যুগের বর্তমান গতি-প্রকৃতি ও মানসিকতার নতুন গড়নকে উপলদ্ধি করার কোনো চেষ্টাই তাঁরা করেননা। যেসব বিষয় মুসলমানদের নব্য বংশধরগণকে ইসলাম থেকে দুরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর প্রতি তাঁরা যতো খুশি ঘৃণা প্রকাশ করতে প্রস্তুত; কিন্তু সে হলাহলের প্রতিকার করার মতো ঝুঁকি গ্রহণ করতে তাঁরা অসমর্থ।</strong> আধুনিক পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্যে যে জটিল বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব সমস্যাবলীর সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর সমাধান করতে তারা হামেশাই অপারগ। এর কারণ হলো, ইজতিহাদ ছাড়া ঐ সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভবপর নয়। অথচ ইজতিহাদকে এঁরা নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছেন। বস্তুত আজকে আমাদের আলিম সমাজ ইসলামের শিক্ষা ও তার বিধিব্যবস্থা প্রচার করার জন্যে যে পন্থা অবলম্বন করছেন তা আধুনিক শিক্ষিত লোকদেরকে ইসলামের সাথে পরিচিত করানোর পরিবর্তে উল্টো তাদেরকে বীতশ্রদ্ধ করে দেয়। এমনকি কখনো কখনো তাদের ওয়াজ নসীহত শুনে কিংবা তাদের রচনাবলী পড়ে স্বতস্ফূর্তভাবেই মন থেকে বলে উঠে, খোদা যেনো কোনো অমুসলিম বা পথভ্রষ্ট মুসলিমের কান পর্যন্ত এইসব অর্থহীন প্রলাপ না পৌছান! মোটকথা, আমাদের আলিম সমাজ তাঁদের চারদিকে দু&#8217;শ বছরের পুরনো পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছেন। সেই পরিবেশেই তাঁরা চিন্তা ভাবনা করেন, তার ভেতরেই তারা বাস করেন এবং তার উপযোগী কথাবার্তা তাঁরা বলেন। একথা নিসন্দেহ যে, এই সম্মানিত ব্যক্তিদের কল্যাণেই আজও দুনিয়ার ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারের অমূল্য। রত্নরাজি সংরক্ষিত রয়েছে এবং তাদের প্রচেষ্টার ফলেই আজ ইসলামী শিক্ষা যা কিছু বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু তাঁরা নিজেদের এবং সমসাময়িক যুগের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তা-ই ইসলাম ও আধুনিক দুনিয়ার মধ্যে কোনোরূপ সম্পর্ক স্থাপনে বাধার সৃষ্টি করছে। এর ফলে যারা ইসলামী শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়, তারা আর দুনিয়ার কোনো কাজের উপযোগী থাকেনা। আর যে দুনিয়ার কাজের যোগ্য হতে চায়, সে ইসলামী শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত থেকে যায়। এই কারণেই আজ মুসলিম জাহানের সর্বত্র দু&#8217;টি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দলের অস্তিত্ব দেখা যায়। একদল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী সভ্যতার নিশানবর্দার, কিন্তু জীবনের সর্বত্র মুসলমানদের নেতৃত্ব দানে অক্ষম। আর দ্বিতীয় দল মুলসমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতির গাড়িকে চালিত করছে বটে কিন্তু ইসলামের নীতি ও ভিত্তি, ইসলামী সভ্যতার প্রাণবস্তু এবং ইসলামের সমাজ পদ্ধতি ও তামাদ্দুনিক বিধি ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, অপরিচিত ও অনবহিত। এদের হৃদয়ের কোণে ঈমানের কিছুটা আলো রয়েছে বটে; অন্যান্য সবদিক থেকে এদের এবং অমুসলমানের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। কিন্তু যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাস্তব কর্মশক্তি এই দলটিরই করায়ত্ব রয়েছে এবং এদের বাহুতেই গাড়ি চালানোর মতো শক্তি রয়েছে, এজন্যই তারা মিল্লাতের গোটা গাড়িটি নিয়ে ভ্রান্তি ও গুমরাহীর পথে দ্রুত এগিয়ে চলছে। সে পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে রাখা এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করার মতোও আজ আর কেউ নেই।</p>
<p>আমি এই পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি এবং এর ভয়ঙ্কর পরিণতিও নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছি। যদিও নেতৃত্ব দান করার জন্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা আমার নেই এবং এমনি বিকৃত পরিবেশে, এতো বড় একটি জাতির সংশোধন করার মতো শক্তিও আমার নেই, তবু আল্লাহ আমার হৃদয়ে একটি ব্যথা দিয়েছেন। আজ যে সামান্য জ্ঞান ও বিচক্ষণতা তিনি আমায় দান করেছেন, তার সাহায্যে মুসলমানদের ঐ দু&#8217;টি দলকে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতির আসল ও প্রকৃত উৎসের দিকে মনোযোগী হবার আহ্বান জানানো এবং সাফল্য ও ব্যর্থতার কোনো তোয়াক্কা না করে নিজের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্যে সেই ব্যথাই আমায় বাধ্য করছে। কাজের শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিজের দুর্বলতা দেখে আমার এই প্রচেষ্টাকে নিজের কাছেই তুচ্ছ বলে মনে হয়; কিন্তু সাফল্য বা ব্যর্থতা সবকিছুই হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর হাতে। আমার কাজ শুধু চেষ্টা করে যাওয়া। তাই সাধ্যানুযায়ী আমি আমার চেষ্টার পরিধিকে বিস্তৃত করতে চাই।</p>
<p>(তরজমানুল কুরআন: অক্টোবর ১৯৩৫ ইং)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/modern-disease-ridden-nations/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16390</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশের স্থাপত্যে জানালার বৈচিত্র্য</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সুলতানা রাজিয়া]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 21 Nov 2025 16:17:26 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16288</guid>

					<description><![CDATA[জানালা- বাইরের কোলাহল ও অন্দরমহলের নৈঃশব্দের এক অনন্য মেলবন্ধনের সুর। যে সুরের কাব্যিক প্রহেলিকায় রচিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের বিচিত্র চিত্রপট। প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি খোদাই ,কারুকাজ এবং প্রতিটি ফ্রেম এক একটি স্থাপনার সময়ের দলিল হিসেবে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কথা বলে। যেন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>জানালা- বাইরের কোলাহল ও অন্দরমহলের নৈঃশব্দের এক অনন্য মেলবন্ধনের সুর। যে সুরের কাব্যিক প্রহেলিকায় রচিত হয় প্রাত্যহিক জীবনের বিচিত্র চিত্রপট। প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি খোদাই ,কারুকাজ এবং প্রতিটি ফ্রেম এক একটি স্থাপনার সময়ের দলিল হিসেবে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের কথা বলে। যেন এক একটি ক্যানভাসরুপে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে রয়ে যায়।</p>
<p>এক্ষেত্রে উপমহাদেশের স্থাপত্যে, শিল্পের অনবদ্য ছাপ জানালাগুলোতে যেন আরও বিস্তৃত বিশেষণ দেয়; স্থাপত্যের বিশেষ অংশ হিসেবেই নয় বরং&nbsp; প্রকৃতি ও মানুষের অমলিন মেলবন্ধনের শ্বাশত আবহের প্রতীকরুপে। কেবল আলো-বাতাস চলাচলের জন্যই জানালাগুলো&nbsp; তৈরি করা হত না বরং একদিকে বাইরের পৃথিবীকে ফ্রেম করতো অন্য দিকে অভ্যন্তরের মানুষের সুরক্ষা্য় সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দিত। বৈরী আবহাওয়ায় বা বৃষ্টির স্নিগ্ধতায়, কখনো বা রাতের নীরবতা উপেক্ষায় জানালার ওপারেই যেন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রশান্তির আশ্রয়। অর্থাৎ জানালাগুলোর কাঠামো এমনভাবেই তৈরি করা হত প্রতিকূলতায়ও আশ্রয় নেয়াই ছিলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।</p>
<p>তাপ নিয়ন্ত্রণেও একাধিক স্তরের জানালার জালি কিংবা রঙিন কাচ, সূর্যালোক ছেকে নিয়ে অন্দরমহলে মৃদু আলো্য় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করতো যেখানে আলোর পরোক্ষ প্রবেশে অভ্যন্তরের অনুভব যেন তীব্র সুর্যালোকের মনোমুগ্ধকর আভায় স্নিগ্ধ বহিঃ প্রকাশ। অপরদিকে বিশুদ্ধ বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করতেও জানালার একাধিক স্তরে জালির ভূমিকা বিশেষ।</p>
<p>এছাড়াও জানালার আদলে আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির ছাপ ছিলো স্পষ্ট। সমাজের একেকটি গল্পের একেক বাহকরুপে দৃশ্যমান হলেও প্রতিটি জানালায় শৈল্পিক দক্ষতার স্পর্শে পবিত্রতার এবং নান্দনিকতার মেলবন্ধনে এক গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলিত রুপ বিদ্যমান। বৈচিত্রময় নকশা ,কারুকাজ একদিকে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করে&nbsp; এবং অন্যদিকে তাদের জীবনধারার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। <strong>দেখা যায়&nbsp; জানালার এসব বৈচিত্র্যময় বিকাশ ও নান্দনিকতার মাধ্যমে মুলত স্রষ্টার একত্বের প্রকাশই মুখ্য বিষয়।</strong></p>
<p>উপমহাদেশে ইসলাম আগমনের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্য যে নতুন এক মাত্রা পেয়েছিল তা মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংলাপ। আর এই প্রেক্ষিতে জানালার ভাষা নানান কণ্ঠে রূপ পেল—কখনো পাথরের জালি, কখনো কাঠের ঝারোখা, কখনো বা পোড়ামাটির অলংকরণে।</p>
<ul>
<li><strong>জালি কাজ</strong>: ১২শ শতকের শেষভাগে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যে এক অভিনব অভিযোজন ‘জানালায় জালি কাজ’। প্রথম দেখা মেলে দিল্লির কুওয়াত-উল ইসলাম মসজিদের স্থাপত্যে। পাথর বা কাঠের উপর সূক্ষ্ম খোদাইয়ের মাধ্যমে এ ধরনের জালি তৈরি করা হত। জালির সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে জানালাগুলোর নকশায় জটিল জ্যামিতি, আরবী ক্যালিগ্রাফি এবং নিখুঁত এরাবেস্ক নকশা করা হতো। এসব কৌশল অবলম্বনে বাইরের পরিবেশ থেকে যেমন অভ্যন্তরভাগের পর্দা (হায়া) রক্ষা করা হত, তেমনি আলো ও বাতাসের পরোক্ষ প্রবাহের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ শীতলতাও বজায় থাকতো।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16289" aria-describedby="caption-attachment-16289" style="width: 721px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16289 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1.jpg" alt="" width="721" height="738" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1.jpg 721w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window1-293x300.jpg 293w" sizes="(max-width: 721px) 100vw, 721px" /><figcaption id="caption-attachment-16289" class="wp-caption-text">জালি কাজ</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>আরকুয়েট স্টাইল</strong>: উপমহাদেশে ১৩১১ সালে আলাই দরওয়াজায় প্রথম আরকুয়েট জানালার ব্যবহার শুরু হয়। বৃহৎ পরিসরে আলো-বাতাস প্রবেশের জন্যই ইসলামিক স্থাপত্যে ‘খিলানযুক্ত জানালা’ একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এছাড়াও পূর্বের ট্র্যাবেটেড (আনুভূমিক বীম আর আড়াআড়ি খুঁটির সমন্বয়ে গঠিত) পদ্ধতির বিপরীতে ভূসুয়া খিলান (স্থায়িত্বশীল) পদ্ধতির কাঠামো আবিষ্কার হয় যা উপমহাদেশীয় ইমারতের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও উচ্চতর নির্মাণশৈলীর বাহক। খিলান কখনও হয় অর্ধবৃত্ত, কখনও ওজাইভ (উপরের দিক উপবৃত্তাকার শীর্ষযুক্ত; pointed arc), আবার কখনও সূক্ষ্ম সর্পিলকৃতির—যেন জানালার জালি ও &nbsp;খিলানের জ্যামিতিক নকশার পরিমিত বিন্যাসের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া এক অভিন্ন ব্যাকরণ। আলাই দরওয়াজায় ছাড়াও হুমায়ুনের সমাধি, জামে মসজিদ, আকবরের মকবরা, ফতেহপুর সিক্রি এবং তাজমহল—সবখানেই আরকুয়েট জানালা; এমনকি বাংলার আটচালা ও দোচালা গঠনেও খিলানবিশিষ্ট জানালার সংযোজন দেখা যায়।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16292" aria-describedby="caption-attachment-16292" style="width: 708px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16292 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2.jpg" alt="" width="708" height="548" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2.jpg 916w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2-300x232.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window2-768x594.jpg 768w" sizes="(max-width: 708px) 100vw, 708px" /><figcaption id="caption-attachment-16292" class="wp-caption-text">আরকুয়েট স্টাইল</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>জ্যামিতিক নকশা</strong>: জানালার অলংকরণে জ্যামিতির বিন্যাস উপমহাদেশের স্থাপত্যশৈলীর এক অভিনব উৎকর্ষতা। জটিল জ্যামিতি ও এরাবেস্ক নকশা স্থাপত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে আধ্যাত্মিকতারও প্রতিফলন ঘটায়। শুধু তাই নয় উপমহাদেশের ইসলামি স্থাপত্যে জ্যামিতি স্থানীয় উপকরণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুন এক ভাষা তৈরি করে যেখানে পাথর বা কাঠের জালি কেটে জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি করা হত। <em>আগ্রার তাজমহল, দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি, লাহোর দুর্গ</em>—এখানে পাথরের জালির মাধ্যমে বহুমাত্রিক জ্যামিতিক প্যাটার্ন ব্যবহৃত হয়েছে। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁওয়ের গোয়ালদি মসজিদ— এখানে ইট ও পোড়ামাটির ফলকে জ্যামিতিক অলংকরণ করা হয়েছে।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16293" aria-describedby="caption-attachment-16293" style="width: 726px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16293 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3.jpg" alt="" width="726" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3.jpg 1164w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-300x182.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-1024x622.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window3-768x466.jpg 768w" sizes="(max-width: 726px) 100vw, 726px" /><figcaption id="caption-attachment-16293" class="wp-caption-text">জ্যামিতিক নকশা</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>রঙিন কাঁচের ব্যবহার</strong>: উপমহাদেশের স্থাপত্যে রঙিন কাচের ব্যবহার স্থাপত্যশৈলীতে যেমন নতুন মাত্রা যোগ করেছে তেমনি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম উপাদান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রঙিন কাঁচের ব্যবহার মোঘল স্থাপত্যের মাধ্যমে শুরু হলেও কেবল মোঘল স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; খুব দ্রুত অন্যান্য স্থাপত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। জানালার কাচ ও কাঠের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হত যেন সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে অভ্যন্তরে প্রশান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও রঙিন কাঁচের মাধ্যমে আলোর নান্দনিক প্রতিফলন অন্দরমহলে বিশেষ আবহ তৈরি হয় যার কারণে এর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সুলতান আকবরের শাসনামলে ফতেহপুর সিক্রিতে, সুলতান শাহজাহানের আমলে তাজমহলে রঙিন কাঁচের ব্যবহার দেখা যায় এবং পরবর্তীতে দিল্লির অন্যান্য মোঘল স্থাপত্যে ব্যবহারের মাধ্যমে আরও বিস্তৃতি পায়।</li>
</ul>
<figure id="attachment_16295" aria-describedby="caption-attachment-16295" style="width: 706px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16295 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1.jpg" alt="" width="706" height="692" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1.jpg 729w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window4-1-300x294.jpg 300w" sizes="(max-width: 706px) 100vw, 706px" /><figcaption id="caption-attachment-16295" class="wp-caption-text">রঙিন কাঁচ</figcaption></figure>
<ul>
<li><strong>ঝারোখা জানালা: </strong>ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ঝারোখা জানালা; কাঠামোগতভাবে ওরিয়েল জানালা যা ভবনের উপরিভাগ থেকে প্রসারিত হয় এবং বাইরের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে সম্মুখভাগে উন্মুক্ত হয়। ১৬শ-১৮শ শতাব্দীতে,রাজপুত এবং মোঘল স্থাপত্যের প্রভাবে, এগুলি স্থাপত্যের ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠে। কেননা এ জানালাগুলোকে ধরা হত <em>ইমারাহ</em>-র চূড়ান্ত প্রকাশরুপ—যেখানে আমির ও উম্মাহর মাঝে সম্পর্ক গড়ে উঠত সম্মান, নিকটতা ও তাকরিমের ভিত্তিতে অর্থাৎ সমাজে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় অর্থে এক প্রতীকী কাঠামো। আর সাধারণ মানুষের জন্য বাইরের জগৎ অবলোকনের স্বাধীনতা, বিশেষত নারীদের জন্য মর্যাদা ও গোপনীয়তার নিখুঁত সমন্বয়। ঝারোখার জালি-কাজ, পাথরখোদাই ও অলঙ্করণ কেবল প্রাসাদ নয়, নগরীর অলিগলির দৃশ্যপটকেও শিল্পমণ্ডিত করত। রঙিন কাঁচ, খচিত পাথর ও খোদাইকৃত কাঠের ফ্রেম—সব মিলিয়ে যেন এক ছায়াময় সংগীত।</li>
</ul>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16296 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5.jpg" alt="" width="610" height="388" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5.jpg 985w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5-300x191.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window5-768x489.jpg 768w" sizes="(max-width: 610px) 100vw, 610px" /></p>
<figure id="attachment_16297" aria-describedby="caption-attachment-16297" style="width: 610px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16297" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6.jpg" alt="" width="610" height="452" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6.jpg 985w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window6-768x569.jpg 768w" sizes="(max-width: 610px) 100vw, 610px" /><figcaption id="caption-attachment-16297" class="wp-caption-text">ঝারোখা</figcaption></figure>
<p>সময়ের বিবর্তনে সাধারণত এসব জানালার <strong>জালি কাজ</strong>, <strong>আরকুয়েট স্টাইল</strong>,<strong> জ্যামিতিক নকশা</strong> এবং <strong>রঙিন কাঁচের </strong>ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; একইসাথে ব্যবহারের সুবিধার্থেও আজও প্রাসঙ্গিক।নিচে উপমহাদেশের স্থাপত্যে জানালার বৈচিত্র্য ও বিবর্তন ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো। এখানে প্রাক সুলতানি আমল থেকে শুরু করে দিল্লি সালতানাত, তুঘলক, লোদী ও মোঘল আমল, এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত জানালার শিল্পরূপ ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমবিকাশ তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষত জানালার নান্দনিকতা, কার্যকারিতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রতিফলনও ধাপে ধাপে লক্ষ্যণীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কুতুব মিনার (Qutub Minar, Delhi)</strong></p>
<p>১২শ শতকের শেষভাগে তুর্কি বিজয়ের পর নির্মিত দিল্লির কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের জানালায় জালির (তারকা আকৃতির জালি) প্রথম সূচনার দেখা মেলে—যেখানে সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা পাথর-নকশার মাধ্যমে আলো ও বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়। যা ইসলামী ‘হায়া’ বা সংযমের চেতনাকে প্রতিফলিত করে।</p>
<figure id="attachment_16298" aria-describedby="caption-attachment-16298" style="width: 622px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16298" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7.jpg" alt="" width="622" height="262" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7.jpg 1242w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-300x126.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-1024x431.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window7-768x323.jpg 768w" sizes="(max-width: 622px) 100vw, 622px" /><figcaption id="caption-attachment-16298" class="wp-caption-text">কুতুব মিনার কমপ্লেক্স</figcaption></figure>
<p><strong>আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া </strong><strong>(১২০০ খ্রি., আজমীর, রাজস্থান)</strong></p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রারম্ভিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। এখানে পাথরে খোদাইকৃত জালি (lattice window) ব্যবহার লক্ষ্যণীয়; পাথরে ছোট ছোট ছিদ্রকাটা জালি জানালা, যা সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশায় অলঙ্কৃত এবং পরবর্তীতে খিলজী, তুঘলক ও মোঘল আমলে আরও সূক্ষ্ম রূপ নেয়।</p>
<figure id="attachment_16302" aria-describedby="caption-attachment-16302" style="width: 473px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16302" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8.jpg" alt="" width="473" height="304" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8.jpg 935w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8-300x193.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window8-768x494.jpg 768w" sizes="(max-width: 473px) 100vw, 473px" /><figcaption id="caption-attachment-16302" class="wp-caption-text">আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া</figcaption></figure>
<p><strong>গিয়াসউদ্দিন বলবনের মাকবারা (১২৮৭ খ্রি., দিল্লি, মেহরৌলি) </strong></p>
<p>গিয়াসউদ্দিন বলবনের মাকবারা ভারতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখানে প্রথমবারের মতো Pointed Arch ( ওজাইভ; Ogive) খিলান ব্যবহৃত হয়, যা ভারতীয় উপমহাদেশে পরবর্তী স্থাপত্য বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। উপমহাদেশে <strong>আরকুয়েট শৈলীর (arcuate style)</strong> সূচনার আগে দিল্লির সুলতানি স্থাপত্যে মূলত <strong>ট্রাবেটেড শৈলী</strong> (Trabeated) প্রচলিত ছিল। খিলানগুলোর মধ্যে <strong>জালি </strong>(perforated screen) সংযুক্ত করা হয়েছিল আলো ও বায়ু চলাচলের জন্য।</p>
<figure id="attachment_16299" aria-describedby="caption-attachment-16299" style="width: 620px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16299" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9.jpg" alt="" width="620" height="273" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9.jpg 961w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9-300x132.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window9-768x338.jpg 768w" sizes="(max-width: 620px) 100vw, 620px" /><figcaption id="caption-attachment-16299" class="wp-caption-text">গিয়াসউদ্দিন বালবনের মাকবারা</figcaption></figure>
<p><strong>আলাই দরওয়াজা (১৩১১ খ্রি.)</strong></p>
<p>সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর নির্মিত একটি গেটওয়ে, যেখানে প্রথমবারের মতো True Arch ও গম্বুজ ব্যবহার হয়। জানালায় সূক্ষ্ম জালি ও pointed arch-এর ব্যবহার নিছক দৃষ্টিনন্দনতার জন্য নয়; বরং সূর্যালোক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রিত করে অভ্যন্তরীণ শীতলতা বজায় রাখাই উদ্দেশ্যে।</p>
<figure id="attachment_16300" aria-describedby="caption-attachment-16300" style="width: 600px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16300 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10.jpg" alt="" width="600" height="431" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10.jpg 846w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10-300x216.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window10-768x552.jpg 768w" sizes="(max-width: 600px) 100vw, 600px" /><figcaption id="caption-attachment-16300" class="wp-caption-text">বহির্ভাগ&nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; &nbsp; অভ্যন্তরভাগ</figcaption></figure>
<p><strong>খিরকী মসজিদ</strong><strong>&nbsp;(১৩৫১-৫৪)</strong></p>
<p>মসজিদটি ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে জুনা শাহ (ফিরোজ শাহ তুঘলকের একজন প্রধানমন্ত্রী) নির্মাণ করেন। মসজিদের দেয়ালে রয়েছে বহু জালি-জানালা (খিরকী) বা lattice window। এখান থেকেই নাম হয় “খিরকী মসজিদ”।</p>
<figure id="attachment_16301" aria-describedby="caption-attachment-16301" style="width: 519px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16301" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11.jpg" alt="" width="519" height="231" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11.jpg 1122w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-300x134.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-1024x456.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window11-768x342.jpg 768w" sizes="(max-width: 519px) 100vw, 519px" /><figcaption id="caption-attachment-16301" class="wp-caption-text">খিরকী মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>বড় গম্বুজ মসজিদ</strong></p>
<p>সুলতান সিকান্দার লোদীর আমলে (প্রায় ১৪৯০ খ্রি.) নির্মিত। জানালাগুলো মূলত তীক্ষ্ণ খিলানাকৃতির এবং মোটা পাথরের দেয়ালে বসানো, যা প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর ধারণা দেয়। মোঘল আমলের মতো সূক্ষ্ম ফুলেল খোদাই নেই বরং লোদী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সরল ও দৃঢ়।</p>
<figure id="attachment_16303" aria-describedby="caption-attachment-16303" style="width: 585px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16303" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12.jpg" alt="" width="585" height="255" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12.jpg 1004w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12-300x131.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window12-768x335.jpg 768w" sizes="(max-width: 585px) 100vw, 585px" /><figcaption id="caption-attachment-16303" class="wp-caption-text">জানালা, বড় গম্বুজ মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>হুমায়ুনের সমাধি (Humayun’s Tomb)</strong></p>
<p>দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি স্থাপত্যে ব্যবহৃত জানালার আকৃতি অনেক সময় অর্ধবৃত্তাকার বা ঘোড়ার নাল আকৃতির হয়। ফলে খিলান যেমন কাঠামোতে দৃঢ়তা দেয় একইসাথে জ্যামিতিক অলংকরণ, তারকা, ষড়ভুজ ও আরবেস্ক শৈলীর পুনরাবৃত্ত মোটিফের জালি জানালা আলো ছেঁকে অভ্যন্তরে শীতল বাতাস প্রবাহিত করে। যা দিল্লির আবহাওয়ার জন্য&nbsp; কার্যকর সমাধান।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16304 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13.jpg" alt="" width="388" height="287" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13.jpg 792w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window13-768x569.jpg 768w" sizes="(max-width: 388px) 100vw, 388px" /></p>
<p>সমাধি স্থাপত্যে আরও এক ধরণের জানালার ব্যবহার দেখা যায়। লাল বেলেপাথর (red sandstone), সাদা ও কালো মার্বেল (white &amp; black marble) দিয়ে এই ধরণের জানালা ও খিলান নির্মিত এবং সূক্ষ্ম খোদাইকৃত জালি জানালা সমাধির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও জানালায় ছোট বারান্দা (jharokha-style) যুক্ত, যেগুলো সমাধির বাইরের দেয়ালে বের হয়ে এসেছে।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter wp-image-16306 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15.jpg" alt="" width="394" height="268" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15.jpg 782w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15-300x204.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window15-768x522.jpg 768w" sizes="(max-width: 394px) 100vw, 394px" /></p>
<p>নিচের জানালাটি বার্বারের টুম্ব বা নায়ি-কা-গুম্বাদ (Nai-ka-Gumbad) এর, যেটি দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ১৫৯০–৯১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল। এর স্থাপত্য শৈলী মোঘল স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ যেখানে লাল এবং সাদা বেলে পাথরের (Sandstone) সমন্বিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সরাসরি বা ভারী প্রলেপহীন বেলে পাথরের ব্যবহার , পাথরের জালিতে সূক্ষ্ম খোদাই করা জ্যামিতিক প্যাটার্ন সমাধিটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।</p>
<figure id="attachment_16341" aria-describedby="caption-attachment-16341" style="width: 551px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16341" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33.jpg" alt="" width="551" height="378" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33.jpg 1000w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33-300x206.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window33-768x528.jpg 768w" sizes="(max-width: 551px) 100vw, 551px" /><figcaption id="caption-attachment-16341" class="wp-caption-text">নায়ি-কা-গুম্বাদ</figcaption></figure>
<p><strong>রানি রূপমতী মসজিদ</strong></p>
<p>সুলতান মুহম্মদ বেগড়া আনুমানিক ১৪৩০- ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে, আহমদাবাদে রানি রূপমতী মসজিদ নির্মাণ করেন। এর জানালাগুলোতে পাথরের মোটা ফ্রেমে বসানো, যেগুলোতে সূক্ষ্ম খোদাই করা অলঙ্করণ রয়েছে এবং ফ্রেমের ভেতরের জালিতে বিভিন্ন আকা্রের <strong>বৈচিত্র্যময়</strong> জটিল জ্যামিতিক নকশা ব্যবহৃত হয়েছে। জানালার দুই পাশে ছোট স্তম্ভ (miniature columns) বা পিলাস্টার (Pilaster) দেখা যায় এবং উপরিভাগে কার্নিস (cornice) বা ছোট ছাউনির মতো প্রক্ষেপণ, যা সূর্যের তাপ ও বৃষ্টির হাত থেকে জানালাকে রক্ষা করে। এছাড়াও জানালার চারপাশে পাথরে খোদাইকৃত ফুল, লতা-পাতা নকশার শৈল্পিক সৌন্দর্য এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা ও আলো-বাতাসের কার্যকারিতা স্থাপত্যশৈলীর উচ্চমাত্রার প্রকাশ।</p>
<figure id="attachment_16305" aria-describedby="caption-attachment-16305" style="width: 632px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16305" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14.jpg" alt="" width="632" height="445" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14.jpg 1045w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-300x211.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-1024x720.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window14-768x540.jpg 768w" sizes="(max-width: 632px) 100vw, 632px" /><figcaption id="caption-attachment-16305" class="wp-caption-text">রানি রূপমতী মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>অ্যাম্বার ফোর্ট (Amber Fort, ১৬শ শতক, জয়পুর, রাজস্থান)</strong></p>
<p>অ্যাম্বার ফোর্ট মোঘল ও রাজপুত স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি। খিলান (arch), ঝারোখা, জালি ও ফুলেল খোদাই মিলিয়ে অ্যাম্বার ফোর্টের জানালাগুলো আভিজাত্য অনন্য প্রকাশ। খোদাইকৃত মার্বেল বা লাল পাথরে তৈরি সূক্ষ্ম জালি জানালা (Stone lattice / Jaali) অন্দরমহলে আলো-ছায়ার নকশা তৈরি করে, যা প্রাসাদের অভ্যন্তরে রাজকীয় পরিবেশকে রহস্যময় ও শৈল্পিক করে তোলে।</p>
<figure id="attachment_16310" aria-describedby="caption-attachment-16310" style="width: 861px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16310" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16.jpg" alt="" width="861" height="284" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16.jpg 1470w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-300x99.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-1024x338.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window16-768x253.jpg 768w" sizes="(max-width: 861px) 100vw, 861px" /><figcaption id="caption-attachment-16310" class="wp-caption-text">অ্যাম্বার ফোর্ট</figcaption></figure>
<p><strong>হুশাং শাহ-এর সমাধি (</strong>Hushang Shah&#8217;s Tomb<strong>, মাণ্ডু, মধ্যপ্রদেশ, ১৪৪০ খ্রি.)</strong></p>
<p>হুশাং শাহ-এর সমাধির জানালায় উপমহাদেশে প্রথম মার্বেল পাথরের জালি দেখা যায়। যেখানে জালিগুলো সূক্ষ্মভাবে খোদাইকৃত মার্বেল জালির&nbsp; ফুলেল ও জ্যামিতিক নকশায় সমৃদ্ধ এবং অর্ধবৃত্তাকার খিলানের ভেতর স্থাপিত।</p>
<figure id="attachment_16311" aria-describedby="caption-attachment-16311" style="width: 693px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16311" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17.jpg" alt="" width="693" height="274" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17.jpg 1241w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-300x119.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-1024x405.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window17-768x304.jpg 768w" sizes="(max-width: 693px) 100vw, 693px" /><figcaption id="caption-attachment-16311" class="wp-caption-text">হুশাং শাহ-এর সমাধি</figcaption></figure>
<p><strong>সালিম চিশতির সমাধি (Tomb of Salim Chishti, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা, ১৬শ শতক, আকবর আমল)</strong></p>
<p>সালিম চিশতির সমাধি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্বেল স্থাপত্য। জানালাগুলো সম্পূর্ণ সাদা মার্বেলে খোদাই করা এবং প্রতিটি জালিতে ভিন্ন ভিন্ন জ্যামিতিক নকশা (ষড়ভুজ, তারকা, ফুলের নকশা) করা।</p>
<figure id="attachment_16312" aria-describedby="caption-attachment-16312" style="width: 564px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16312" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18.jpg" alt="" width="564" height="263" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18.jpg 911w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18-300x140.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window18-768x358.jpg 768w" sizes="(max-width: 564px) 100vw, 564px" /><figcaption id="caption-attachment-16312" class="wp-caption-text">সালিম চিশতির সমাধি</figcaption></figure>
<p><strong>ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস (রাজস্থান, ভারত)</strong></p>
<p>ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস ১৪শ শতকের দিকে রাজপুত রাজাদের দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ঝারোখা জানালাগুলো শুধু স্থাপত্য উপাদান নয়, বরং এর সূক্ষ্ম খোদাই, অলঙ্কৃত খিলান ও প্রক্ষেপিত গঠন একদিকে নান্দনিক সৌন্দর্য তৈরি করেছে, অন্যদিকে কার্যকারিতার মাধ্যমে বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। corbelled brackets বা খোদাইকৃত পাথরের cusped arch (মৃদু বাঁকানো খিলান) <strong>রাজস্থানি লাল বেলেপাথর ও সাদা পাথরের সমন্বয়</strong> দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16313" aria-describedby="caption-attachment-16313" style="width: 655px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16313" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19.jpg" alt="" width="655" height="435" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window19-300x199.jpg 300w" sizes="(max-width: 655px) 100vw, 655px" /><figcaption id="caption-attachment-16313" class="wp-caption-text">ক্যারৌলি রয়্যাল প্যালেস</figcaption></figure>
<p><strong>নওলাখা প্যাভিলিয়ন</strong></p>
<p>নওলাখা প্যাভিলিয়ন সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৬৩১–৪৩ খ্রিঃ) লাহোর ফোর্টের ভেতরে নির্মিত হয়। প্যাভিলিয়নটি প্রধানত সাদা মার্বেল পাথরদ্বারা নির্মিত এবং এর জানালাগুলো সূক্ষ্ম মার্বেল পাথরে খোদাই করা জালিতে আবৃত। জানালার শীর্ষ অংশ অর্ধবৃত্তাকার ও বহু-পাপড়ি বিশিষ্ট খিলান দ্বারা গঠিত। খিলানগুলোতে সূক্ষ্ম ইনলে কাজ এবং ফুলের মোটিফ ব্যবহৃত হয়েছে, যা মোঘল স্থাপত্যে শাহজাহানীয় যুগের শৈল্পিক পরিপূর্ণতার এক অসাধারণ নিদর্শন।</p>
<figure id="attachment_16323" aria-describedby="caption-attachment-16323" style="width: 945px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16323 size-full" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20.jpg" alt="" width="945" height="581" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20.jpg 945w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20-300x184.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window20-768x472.jpg 768w" sizes="(max-width: 945px) 100vw, 945px" /><figcaption id="caption-attachment-16323" class="wp-caption-text">নওলাখা প্যাভিলিয়ন</figcaption></figure>
<p><strong>বিবি কা মাকবারা (Bibi ka Maqbara)</strong></p>
<p>১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব বিবি কা মাকবারা নির্মাণ করেন। প্রধান উপকরণ হিসেবে সাদা মার্বেল (উপরাংশ), লাল বেলেপাথর (নিচের অংশে) এবং প্লাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। জ্যামিতিক নকশায় ষড়ভুজ, তারকাকৃতি ও অষ্টভুজ দেখা যায়। জানালাগুলো বড় আকারের, উপরে তীক্ষ্ণ শীর্ষযুক্ত খিলান (pointed arch), যা দিল্লির মোঘল স্থাপত্যের প্রচলিত ধারা বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16324" aria-describedby="caption-attachment-16324" style="width: 457px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16324 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21.jpg" alt="" width="457" height="327" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21.jpg 900w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21-300x215.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window21-768x550.jpg 768w" sizes="(max-width: 457px) 100vw, 457px" /><figcaption id="caption-attachment-16324" class="wp-caption-text">জানালা, বিবি কা মাকবারা</figcaption></figure>
<p>বিবি কা মকবরা মূলত তাজমহলের প্রতিরূপ হলেও এটি দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে মোঘল স্থাপত্যের শাখা বিস্তারের একটি অনন্য নিদর্শন। উঁচু খিলানযুক্ত (pointed arch) জানালা এবং জ্যামিতিক ও ফুলেল মোটিফযুক্ত খোদাই স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য । এছাড়াও জানালাগুলো অনেকটা ঝারোখা ধাঁচের বারান্দার মতো বাহিরে বেরিয়ে এসেছে। এতে ভিতর থেকে বাইরের বাগান দেখার সুযোগ রয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16325" aria-describedby="caption-attachment-16325" style="width: 569px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16325" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22.jpg" alt="" width="569" height="282" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22.jpg 1116w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-300x148.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-1024x506.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window22-768x380.jpg 768w" sizes="(max-width: 569px) 100vw, 569px" /><figcaption id="caption-attachment-16325" class="wp-caption-text">জানালা, বিবি কা মাকবারা</figcaption></figure>
<p><strong>মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন (Madrasa-i-Ghaziuddin)</strong></p>
<p>১৭১০ খ্রিস্টাব্দে আজমেরি গেটের বাইরে মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন নির্মাণ করা হয়। এর জানালা থেকে ধারণা করা যায় মূলত মোঘল স্থাপত্যেশৈলীতে নির্মিত এবং নির্মাণে স্থানীয় উপাদান ইট ও চুন-সুরকির ব্যবহারে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অলংকরণে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা ও ফুলের মোটিফ এর খোদাইকৃত জালি ব্যবহার করা হয়েছে যার উপরের অংশে রয়েছে উঁচু অর্ধবৃত্তাকার খিলান। মোঘল স্থাপত্যের এ জালিগুলো একইসাথে নান্দনিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠাণ্ডা রাখার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত।</p>
<figure id="attachment_16327" aria-describedby="caption-attachment-16327" style="width: 430px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16327 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23.jpg" alt="" width="430" height="505" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23.jpg 689w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window23-256x300.jpg 256w" sizes="(max-width: 430px) 100vw, 430px" /><figcaption id="caption-attachment-16327" class="wp-caption-text">জানালার কারুকার্য, মাদ্রাসা-ই-গাজীউদ্দিন</figcaption></figure>
<p><strong>শীশ মহল (Shish Mahal)</strong></p>
<p>মোঘল সম্রাট শাহজাহান আনুমানিক ১৬৩১–৩২ খ্রিস্টাব্দে&nbsp; ব্যক্তিগত আবাসস্থল হিসেবে শীশ মহল নির্মাণ করেন। কিছু জানালায় রঙিন কাঁচ বসানো হয়েছিল, যা শীশ মহলের আয়না খচিত দেয়ালের সাথে আলো প্রতিফলনের এক জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করত। এছাড়াও রাজ পরিবারের সদস্যরা আঙিনা ও প্রাসাদের ভেতরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঝারোখা নির্মাণ করেন। নান্দনিকতার জন্য এসব জানালার চারপাশে মার্বেল ইনলে কাজ, ফুলেল খোদাই ও রঙিন টাইলস বসানো হয় যার মাধ্যমে মোঘল শিল্পের সূক্ষ্মতা ফুটে ওঠে।</p>
<figure id="attachment_16328" aria-describedby="caption-attachment-16328" style="width: 461px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16328 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24.jpg" alt="" width="461" height="525" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window24-263x300.jpg 263w" sizes="(max-width: 461px) 100vw, 461px" /><figcaption id="caption-attachment-16328" class="wp-caption-text">শীশ মহল</figcaption></figure>
<p><strong>জামা</strong><strong> মসজিদ, দিল্লি (Jama Masjid, Delhi), ১৬৫০–১৬৫৬ খ্রি., শাহজাহান আমল</strong></p>
<p>জামা মসজিদ মোঘল আমলের অন্যতম বৃহৎ স্থাপত্যকীর্তি। এর জানালাগুলো বেশ বড় এবং অর্ধবৃত্তাকার ও সূচালো খিলানযুক্ত যা লাল বেলেপাথর (red sandstone) এবং সাদা মার্বেলের সংমিশ্রণে নির্মিত।এছাড়াও ঝারোখা কাঠামোর জানালায় লাল বেলেপাথরে খোদাই করা জালি কাজ (lattice work) এবং জানালার ফ্রেমে সূক্ষ্ম খোদাই, কার্নিস এবং পাশ দিয়ে পিলাস্টারের ব্যবহার দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16329" aria-describedby="caption-attachment-16329" style="width: 874px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16329 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25.jpg" alt="" width="874" height="282" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25.jpg 1559w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-300x97.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-1024x330.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-768x248.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window25-1536x496.jpg 1536w" sizes="(max-width: 874px) 100vw, 874px" /><figcaption id="caption-attachment-16329" class="wp-caption-text">জামা মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>জ্যায়সালমার (Jaisalmer), রাজস্থান</strong></p>
<p>নিচে দেখা যাচ্ছে জ্যায়সালমার প্রাসাদের জানালা। জ্যায়সালমার প্রাসাদের এই&nbsp; জানালা শুধু স্থাপত্যের অপরিহার্য অংশই নয়, বরং এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। জানালার ফ্রেমগুলোতে cusped arches (multi-foil) এবং খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ দেখা যায়। জানালার চারপাশে সূক্ষ্ম সোনালি রঙের পাথরে floral scrolls, geometric bands এর জালি খোদাই করা।সোনালি বেলেপাথরে তৈরি হওয়ায় জানালা রাজস্থানের মরুভূমির রঙকে বহন করে ভেতরের শৈল্পিক কাজ রাজপুত অভিজাত রুচি, ও ঐতিহ্যের প্রতীক।</p>
<figure id="attachment_16333" aria-describedby="caption-attachment-16333" style="width: 528px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16333 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26.jpg" alt="" width="528" height="338" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26.jpg 1052w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-300x192.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-1024x654.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window26-768x491.jpg 768w" sizes="(max-width: 528px) 100vw, 528px" /><figcaption id="caption-attachment-16333" class="wp-caption-text">জ্যায়সালমার প্রাসাদের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>আগ্রা ফোর্ট</strong></p>
<p>১৫৬৫–১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল সুলতান আকবরের সময় আগ্রা ফোর্ট নির্মিত হয়। প্রাথমিকভাবে লাল বেলেপাথরে তৈরি হলেও পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান এর সময়ে সাদা মার্বেল ও জালি জানালা যুক্ত হয়। ফোর্টের স্থাপত্যে পাথরে সূক্ষ্ম খোদাই বা মার্বেল ইনলে নকশা মোঘল শিল্পের বিকাশের জীবন্ত দলিল। এসব জানালা আলো-ছায়া, বায়ুপ্রবাহ, গোপনীয়তা রক্ষায় যেমন কার্যকর তেমনি নান্দনিক খোদাই ও শিল্পকলার&nbsp; উৎকর্ষের বহিঃ প্রকাশ।</p>
<figure id="attachment_16334" aria-describedby="caption-attachment-16334" style="width: 492px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16334 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27.jpg" alt="" width="492" height="272" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27.jpg 590w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window27-300x166.jpg 300w" sizes="(max-width: 492px) 100vw, 492px" /><figcaption id="caption-attachment-16334" class="wp-caption-text">আগ্রা ফোর্ট</figcaption></figure>
<p><strong>সুলতান আকবরের সমাধি (Akbar’s Tomb) সিকান্দ্রা, ১৬০৫–১৬১২/১৩</strong></p>
<p>নিচের জানালাটি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় মোঘল সুলতান আকবরের সমাধিতে নির্মিত, যার প্রধান নির্মাণ উপাদান ছিলো লাল বেলেপাথর। জানালা স্থাপনায় দেখা যায় পরবর্তী মোঘল সমাধি এবং তাজমহলের জানালার জালি নকশার প্রোটোটাইপ।</p>
<figure id="attachment_16336" aria-describedby="caption-attachment-16336" style="width: 252px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16336" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28.jpg" alt="" width="252" height="380" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28.jpg 439w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window28-199x300.jpg 199w" sizes="(max-width: 252px) 100vw, 252px" /><figcaption id="caption-attachment-16336" class="wp-caption-text">মোঘল সুলতান আকবরের সমাধির জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>তাজমহল</strong></p>
<p>সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরে এই জানালাগুলো ১৬৩২–১৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তাজমহলে নির্মাণ করা হয়। তাজমহল ভারতীয় স্থাপত্যকে বিশ্বের সমকক্ষ করে এবং এটি স্থাপত্যের শীর্ষ শৈল্পিক উদাহরণ এর একটি। জানালায় জ্যামিতিক প্যাটার্ন, আরবেস্ক, ফুলের মোটিফ এর মার্বেল খোদাই করে জালির নিখুঁত প্যাটার্ন এর স্থাপত্যকে আরও অনন্যতায় নিয়ে যায়।</p>
<figure id="attachment_16337" aria-describedby="caption-attachment-16337" style="width: 568px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16337 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29.jpg" alt="" width="568" height="348" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29.jpg 1054w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-300x184.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-1024x628.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window29-768x471.jpg 768w" sizes="(max-width: 568px) 100vw, 568px" /><figcaption id="caption-attachment-16337" class="wp-caption-text">তাজমহলের মারবেল পাথরের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধি</strong></p>
<p>১৬২২–১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধিটি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় নির্মাণ করা হয়। সাদা মার্বেল পাথরে সূক্ষ্ম খোদাইয়ের জ্যামিতিক, ফুলের মোটিফ এর জালি (jali screens) এবং অলংকরণে সাদা মার্বেল এর উপর এরাবেস্ক ও জ্যামিতিক নকশা এই জানালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ।</p>
<figure id="attachment_16338" aria-describedby="caption-attachment-16338" style="width: 531px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16338 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30.jpg" alt="" width="531" height="364" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30.jpg 977w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30-300x206.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window30-768x527.jpg 768w" sizes="(max-width: 531px) 100vw, 531px" /><figcaption id="caption-attachment-16338" class="wp-caption-text">ইতিমাদ-উদ-দৌলাহর সমাধির জানালার নকশা</figcaption></figure>
<p><strong>সামোদ প্যালেস (১৭শ শতক, পরে ১৮–১৯শ শতকে সম্প্রসারিত)</strong></p>
<p>রাজস্থানের সামোদ প্যালেস রাজপুত ও মোঘল শৈলীর মিলিত রূপে নির্মিত এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। জানালার শীর্ষ অংশে বহু-পাপড়ি খিলান (cusped arches) ব্যবহৃত। এগুলো মার্বেল বা বেলেপাথরে খোদাই করা সূক্ষ্ম লতাপাতা ও ফুলের নকশা দ্বারা সজ্জিত। জানালায় হস্তনির্মিত কাঠ বা পাথরের ফ্রেম, যেখানে পেইন্টিং এর মাধ্যমে পারসিয়ান আরবেস্ক&nbsp; ও জ্যামিতিক নকশার কারুকাজ দেখা যায়।</p>
<figure id="attachment_16339" aria-describedby="caption-attachment-16339" style="width: 340px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16339" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31.jpg" alt="" width="340" height="425" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31.jpg 1080w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-240x300.jpg 240w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-820x1024.jpg 820w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window31-768x959.jpg 768w" sizes="(max-width: 340px) 100vw, 340px" /><figcaption id="caption-attachment-16339" class="wp-caption-text">সামোদ প্যালেসের মার্বেল ও বেলেপাথরে নকশাকৃত জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>লালকেল্লা (১৭শ শতক, শাহজাহান আমল)</strong></p>
<p>লালকেল্লার জালি জানালা বা ল্যাটিস উইন্ডো মোঘল সৌধশিল্পের অন্যতম শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। এর নান্দনিকতা, রাজকীয় আভিজাত্য এবং সামাজিক প্রয়োজনের সমন্বিত প্রকাশ। জানালার শীর্ষ অংশ অর্ধবৃত্তাকার বা বহু-পাপড়ি খিলান (cusped arch) এবং সাদা মার্বেলে সূক্ষ্ম ছিদ্র বা নকশা কেটে তৈরি করা জালি জানালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অলংকরণে দেখা যায় জ্যামিতিক মোটিফ ও আরবেস্ক ইসলামী নান্দনিকতার প্রতিফলন, আর সূক্ষ্ম মার্বেল ইনলে কাজ পারসিয়ান শিল্পরীতির অনুকরণ। শুধুমাত্র কার্যকারীতার জন্য নয়, বরং জানালাগুলো শাহজাহানীয় আমলের বিলাসিতা, শিল্পপ্রেম ও সূক্ষ্ম স্থাপত্যবোধের পরিচায়ক।</p>
<figure id="attachment_16340" aria-describedby="caption-attachment-16340" style="width: 311px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16340" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32.jpg" alt="" width="311" height="416" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32.jpg 515w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window32-225x300.jpg 225w" sizes="(max-width: 311px) 100vw, 311px" /><figcaption id="caption-attachment-16340" class="wp-caption-text">লালকেল্লার জালি জানালা</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16343" aria-describedby="caption-attachment-16343" style="width: 655px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16343" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34.jpg" alt="" width="655" height="369" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34.jpg 2048w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-300x169.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-1024x576.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-768x432.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window34-1536x864.jpg 1536w" sizes="(max-width: 655px) 100vw, 655px" /><figcaption id="caption-attachment-16343" class="wp-caption-text">রোহতাস ফোর্টের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>রোহতাস ফোর্ট (Rohtas Fort), ১৫৪১–৪৮ খ্রিঃ</strong></p>
<p>রোহতাস ফোর্ট নির্মাণ করেন শের শাহ সূরি। এর জানালাগুলো সাধারণত অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত বা আয়তাকার ফ্রেমে বসানো এবং ফ্রেমগুলো মোটা ও শক্ত, যাতে আক্রমণ প্রতিরোধে দেয়ালের দৃঢ়তা নষ্ট না হয়। খিলানগুলোতে ছোট আকারের পাথরের জালি (perforated stone screens) ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে অলঙ্করণ নয়, বরং কার্যকারিতা মুখ্য বিষয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16344" aria-describedby="caption-attachment-16344" style="width: 643px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16344" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35.jpg" alt="" width="643" height="462" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35.jpg 1920w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-300x216.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-1024x736.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-768x552.jpg 768w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window35-1536x1104.jpg 1536w" sizes="(max-width: 643px) 100vw, 643px" /><figcaption id="caption-attachment-16344" class="wp-caption-text">মারওয়ারি হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>মারওয়ারি হাভেলি</strong></p>
<p>১৮শ–১৯শ শতকে হাভেলি নির্মাণ এক বিশেষ ধারায় রূপ নেয়। ধনী মারওয়ারি ব্যবসায়ী ও জমিদার পরিবারের নির্মিত হাভেলিগুলোতে এ ধরণের জানালা দেখা যায় যেগুলো শুধু বাসগৃহ ছিল না; বরং ঐশ্বর্য, শিল্প-সংবেদন ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অলংকৃত হাভেলিগুলোর জানালায় কাঠের ফ্রেম ও শাটার এর চারপাশে সূক্ষ্ম খোদাই করা ফুলেল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার দেখা যায়; যা মোঘল খিলান, রাজপুত পাথর খোদাই, এবং স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার এক বিশেষ <strong>সংমিশ্রিত নকশা</strong> সৃষ্টির প্রয়াস। মাঝের কাঠের জানালাগুলো সাধারণত ভেতর থেকে খোলা যায় এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশে সহায়ক ভূমিকা রাখে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>উমর হায়াত মহল (Umer Hayat Mahal, Chiniot, 1930)</strong></p>
<p>চিনিওট (পাঞ্জাব, পাকিস্তান) ঐতিহ্যগতভাবে কাঠের নিপুণ খোদাই শিল্পের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার হাভেলি, মসজিদ ও প্রাসাদের ঝারোখা জানালা এক অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, যেখানে মোঘল, ফারসি শৈলীর সূক্ষ্মতা স্থানীয় পাঞ্জাবি ঐতিহ্যের সাথে মিশে স্থাপত্যকে জীবন্ত শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। এটি (নিচে) উমর হায়াত মহল এর ঝারোখা জানালা যা projecting balconies আকারে তৈরি কাঠের জানালা। পাথরের বদলে শিসম কাঠ (Sheesham wood) ব্যবহার করে সূক্ষ্ম খোদাই করা হয়েছে। জানালার ফ্রেমগুলোতে বহুস্তর বিশিষ্ট cusped arches এবং প্রতিটি স্তরে খোদাই করা floral scrolls, arabesques, এবং জ্যামিতিক নকশা।</p>
<figure id="attachment_16358" aria-describedby="caption-attachment-16358" style="width: 269px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16358 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41.jpg" alt="" width="269" height="401" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41.jpg 402w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window41-201x300.jpg 201w" sizes="(max-width: 269px) 100vw, 269px" /><figcaption id="caption-attachment-16358" class="wp-caption-text">উমর হায়াত মহল&nbsp;এর ঝারোখা জানালা</figcaption></figure>
<p>উমর হায়াত মহল চিনিওটের কাঠের নিপুণ কারুশিল্পের জীবন্ত দলিল। এর জানালা স্থাপত্য এ প্রাসাদের শৈল্পিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ মোঘল সূক্ষ্মতা, ফারসি নকশা ও পাঞ্জাবি লোকজ অলঙ্করণের সমন্বয় জানালার প্রতিটি অংশ সূক্ষ্ম হাতে খোদাই করা, যা চিনিওটের কাঠশিল্পের সর্বোচ্চ মান প্রদর্শন করে। কাঠের সাথে কখনো ইনলে (inlay) ও আয়না শোভা যুক্ত যা সূর্যালোক ছেঁকে নরম আভা তৈরি করে।</p>
<figure id="attachment_16345" aria-describedby="caption-attachment-16345" style="width: 353px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16345 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36.jpg" alt="" width="353" height="441" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36.jpg 640w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window36-240x300.jpg 240w" sizes="(max-width: 353px) 100vw, 353px" /><figcaption id="caption-attachment-16345" class="wp-caption-text">উমর হায়াত মহল এর জানালার কারুকাজ</figcaption></figure>
<p><strong>হাভেলি, শেখাওয়াতি (Shekhawati)</strong></p>
<p>শেখাওয়াতি (Shekhawati) অঞ্চলের হাভেলি স্থাপত্য মূলত ১৮শ–১৯শ শতাব্দীতে সমৃদ্ধ হয়েছিল, যখন মারওয়ারি ব্যবসায়ী সমাজ তাদের ধন-সম্পদ, রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হাভেলির জানালা, দরজা ও দেয়ালের অলঙ্করণে ফুটিয়ে তুলেছিল। অধিকাংশ জানালা অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত এবং জানালার চারপাশে জ্যামিতিক মোটিফ, ফুল-পত্র নকশা করা। কাঠ ও পাথরের খোদাই, খিলান, এবং ল্যাটিসওয়ার্কে রাজপুত ঐতিহ্য এবং মোঘল শৈল্পিকতা একত্রিত হয়েছিল।</p>
<figure id="attachment_16354" aria-describedby="caption-attachment-16354" style="width: 357px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16354" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37.jpg" alt="" width="357" height="422" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37.jpg 441w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window37-254x300.jpg 254w" sizes="(max-width: 357px) 100vw, 357px" /><figcaption id="caption-attachment-16354" class="wp-caption-text">হাভেলি, শেখাওয়াতি</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16355" aria-describedby="caption-attachment-16355" style="width: 673px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16355" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38.jpg" alt="" width="673" height="341" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38.jpg 1279w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-300x152.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-1024x519.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window38-768x389.jpg 768w" sizes="(max-width: 673px) 100vw, 673px" /><figcaption id="caption-attachment-16355" class="wp-caption-text">সোনার কেল্লা</figcaption></figure>
<p><strong>সোনার কেল্লা (Sonar Quila / Golden Fort, 1156)</strong></p>
<p>জ্যায়সালমারের সোনার কেল্লা নির্মিত হয় ১১৫৬ খ্রিস্টাব্দে। এর জানালা স্থাপত্য মরুভূমির পরিবেশ, রাজপুত শিল্পরুচি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের এক অনন্য দলিল। স্থানীয় হলুদ স্যান্ডস্টোনে খোদাই করা সূক্ষ্ম জালি নকশা&nbsp; আলো ও বাতাস প্রবাহের জন্য কার্যকর, আবার গোপনীয়তাও রক্ষা করত। জানালার চারপাশে খোদাই করা floral scrolls, geometric bands এর সূক্ষ্ম খোদাই রাজপুত স্থাপত্যের গৌরবময় নিদর্শন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাভেলি, জ্যায়সালমার</strong></p>
<p>রাজস্থানের হাভেলি স্থাপত্য মূলত রাজপুত ও মারওয়ারি ব্যবসায়ী পরিবারের সমৃদ্ধ জীবনধারা ও শিল্পরুচির বহিঃপ্রকাশ। আর এর জানালা স্থাপত্য, বিশেষ করে ঝারোখা<strong>,</strong>পুরো শহরকে “সোনার শহর” নামে পরিচিত করেছে।এর ঝারোখাগুলো স্থানীয় হলুদ বেলেপাথরে (Yellow Sandstone) খোদাই করা brackets ও সূক্ষ্ম খোদাই করা স্যান্ডস্টোনের জালি কখনো অর্ধবৃত্তাকার, কখনো জটিল বহুলতর খিলান দ্বারা সংযুক্ত।</p>
<figure id="attachment_16356" aria-describedby="caption-attachment-16356" style="width: 373px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16356" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39.jpg" alt="" width="373" height="509" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39.jpg 750w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window39-220x300.jpg 220w" sizes="(max-width: 373px) 100vw, 373px" /><figcaption id="caption-attachment-16356" class="wp-caption-text">হাভেলি, জ্যায়সালমার</figcaption></figure>
<p><strong>ওয়াজির খান মসজিদ (লাহোর, পাকিস্তান)</strong></p>
<p>ওয়াজির খান মসজিদ ১৬৩৪–১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মোঘল আমলের অন্যতম সেরা স্থাপত্য নিদর্শন। ঝারোখা জানালাগুলো মসজিদের বাইরের দেওয়ালে, বিশেষ করে সামনের (façade) এবং মিনারের সংলগ্ন অংশে দেখা যায়। জানালাগুলো অর্ধবৃত্তাকার খিলান দ্বারা আবৃত এবং প্রতিটি জানালার চারপাশে টেরাকোটা ও টাইলসের অলঙ্করণ রয়েছে। জানালার নিচে corbelled brackets দেখা যায়, যা ঝারোখাকে projecting balcony-র রূপ দিয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16357" aria-describedby="caption-attachment-16357" style="width: 549px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16357 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40.jpg" alt="" width="549" height="406" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40.jpg 871w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40-300x222.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window40-768x568.jpg 768w" sizes="(max-width: 549px) 100vw, 549px" /><figcaption id="caption-attachment-16357" class="wp-caption-text">ওয়াজির খান মসজিদ</figcaption></figure>
<p><strong>পুরনো ভবন, পেশোয়ার</strong></p>
<p>নিচে পেশোয়ারের প্রাচীরঘেরা নগরীর পুরনো ভবনের কাঠখোদাই ঝারোখা জানালা। মোঘল শিল্পকলা, পশতুন জীবনধারা এবং কারিগরদের অনন্য দক্ষতায় ঝারোখা জানালাগুলো আজও টিকে আছে। যা পশতু সমাজের শিল্প-রুচি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ইসলামি-দক্ষিণ এশীয় স্থাপত্যের মিশ্র ঐতিহ্য বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16360" aria-describedby="caption-attachment-16360" style="width: 226px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16360" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png.jpg" alt="" width="226" height="361" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png.jpg 350w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.png-188x300.jpg 188w" sizes="(max-width: 226px) 100vw, 226px" /><figcaption id="caption-attachment-16360" class="wp-caption-text">পেশোয়ারের পুরনো ভবনের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>কাশ্মীরি হাভেলি (Kashmiri Haveli)</strong></p>
<p>নিচের জানালাটি কাশ্মীরি হাভেলি বা ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি বাড়ির কাঠখোদাই করা ঝারোখা জানালা। জানালার কাঠামো কাঠ দিয়ে তৈরি এবং উপরে টালিযুক্ত ছাউনি রয়েছে। নিচের অংশে আলো বাতাস প্রবাহের জন্য জালি নকশা এবং উপরের অংশে কাঠের জানালা শাটার, যেখানে ছোট কাচ বসানো যা গ্রীষ্মকালে খোলা রাখা আর শীতে বন্ধ রেখে কাচ দিয়ে আলো প্রবাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।</p>
<figure id="attachment_16359" aria-describedby="caption-attachment-16359" style="width: 297px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16359" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.jpg" alt="" width="297" height="528" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42-169x300.jpg 169w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window42-576x1024.jpg 576w" sizes="(max-width: 297px) 100vw, 297px" /><figcaption id="caption-attachment-16359" class="wp-caption-text">কাশ্মীরি হাভেলির জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>মহেশ্বর দুর্গ (Maheshwar Fort)</strong></p>
<p>১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে মহেশ্বর দুর্গে এ জানালা নির্মাণ করা হয়। ১৫শ শতকে মোঘল সুলতান আকবর প্রজাদের সঙ্গে সংযোগ রাখতে “ঝারোখা-দর্শন” (Jharokha Darshan) এর প্রথা চালু করলেও ঝারোখার আলোর প্রক্ষেপণ শৈলী, সূক্ষ্ম খোদাই, গোপনীয়তা, নান্দনিকতার সমন্বয় ধীরে ধীরে একে স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত করে।</p>
<figure id="attachment_16361" aria-describedby="caption-attachment-16361" style="width: 302px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16361" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43.jpg" alt="" width="302" height="434" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43.jpg 475w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window43-209x300.jpg 209w" sizes="(max-width: 302px) 100vw, 302px" /><figcaption id="caption-attachment-16361" class="wp-caption-text">মহেশ্বর দুর্গের জানালা</figcaption></figure>
<p><strong>আয়না মহল (Aina Mahal)</strong></p>
<p>গুজরাটের ভুজ শহরে &nbsp;(১৮শ শতক, আনুমানিক ১৭৫২ খ্রি.) নির্মাণ করা হয় আয়না মহল। আয়না মহলের ঝারোখা জানালাগুলো সূক্ষ্ম পাথরে ফুল-লতা, জ্যামিতিক এবং আরবেস্ক মোটিফ খোদাই করা।</p>
<figure id="attachment_16362" aria-describedby="caption-attachment-16362" style="width: 260px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16362 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44.jpg" alt="" width="260" height="391" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44.jpg 400w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window44-200x300.jpg 200w" sizes="(max-width: 260px) 100vw, 260px" /><figcaption id="caption-attachment-16362" class="wp-caption-text">আয়না মহলের ঝারোখা জানালা</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16363" aria-describedby="caption-attachment-16363" style="width: 674px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16363" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45.jpg" alt="" width="674" height="357" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45.jpg 1245w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-300x159.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-1024x543.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window45-768x407.jpg 768w" sizes="(max-width: 674px) 100vw, 674px" /><figcaption id="caption-attachment-16363" class="wp-caption-text">হাভেলি, গুজর খাঁ</figcaption></figure>
<p><strong>হাভেলি, গুজর খাঁ (Gujar Khan)</strong></p>
<p>এই ঝারোখা জানালাগুলো গুজর খাঁ জেলার কাউন্ত্রিলা (Kauntrila) এলাকায় এক হাভেলিতে নির্মিত। এ ধরণের জানালা সাধারণত উপরের তলায়, বাসগৃহের অভ্যন্তর থেকে রাস্তাঘাট ও জনসমাজ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও এগুলো ছিল শৈল্পিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। জানালার চারপাশে কাঠের সূক্ষ্ম খোদাই, নীচে কারুকার্যপূর্ণ করবেল (corbel) বা ব্র্যাকেট (bracket), জানালার খিলান, ছাদের কার্নিশ ও কাঠের রেলিং বা বালাস্টার (balustrade) এর স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কিস্সা খওয়ানি বাজার, পেশোয়ার (পাকিস্তান) </strong></p>
<p>কিস্সা খওয়ানি বাজারের ঝারোখাগুলো সাধারণত রঙিন কাঠ দ্বারা তৈরি , কাঠে সূক্ষ্ম খোদাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের নকশা এবং আলো বাতাস প্রবাহের জন্য জালির ব্যবহার দেখা যায়। পেশোয়ারের নগর ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের ধারক হিসেবে ঝারোখাগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।</p>
<figure id="attachment_16365" aria-describedby="caption-attachment-16365" style="width: 324px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16365 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46.jpg" alt="" width="324" height="361" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window46-269x300.jpg 269w" sizes="(max-width: 324px) 100vw, 324px" /><figcaption id="caption-attachment-16365" class="wp-caption-text">কিস্সা খওয়ানি বাজার</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16366" aria-describedby="caption-attachment-16366" style="width: 576px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16366" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47.jpg" alt="" width="576" height="331" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47.jpg 1389w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-300x172.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-1024x588.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window47-768x441.jpg 768w" sizes="(max-width: 576px) 100vw, 576px" /><figcaption id="caption-attachment-16366" class="wp-caption-text">বখ্শী রাম সিংহের হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>বখ্শী রাম সিংহের হাভেলি</strong></p>
<p>১৮৮৬ সালে বখ্শী রাম সিংহের হাভেলির এই ঝারোখা জানালা নির্মাণ করা হয়। বালুকাপাথরের খোদাই করা ফ্রেম এবং কাঠের প্যানেল এটির স্থাপত্যের প্রধান আকর্ষণ। যা প্রয়োজনে খোলা এবং বন্ধ রাখার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। মোঘল স্থাপত্যের ছায়া থাকলেও ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাব (arched verandahs, decorative cornices) লক্ষ্য করা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16367" aria-describedby="caption-attachment-16367" style="width: 576px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16367 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48.jpg" alt="" width="576" height="346" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48.jpg 1500w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-300x180.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-1024x614.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window48-768x461.jpg 768w" sizes="(max-width: 576px) 100vw, 576px" /><figcaption id="caption-attachment-16367" class="wp-caption-text">জীবন সিংহ হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>জীবন সিংহ হাভেলি</strong></p>
<p>জীবন সিংহ হাভেলির (দৌলতলা<strong>) </strong>ঝারোখা জানালা উনবিংশ শতকের শেষভাগে, আনুমানিক ১৮৮০–১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। সমসাময়িক অন্যান্য হাভেলি (যেমন বখ্শী রাম সিংহ হাভেলি, ১৮৮৬)–এর স্থাপত্যধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16368" aria-describedby="caption-attachment-16368" style="width: 530px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16368" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49.jpg" alt="" width="530" height="318" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49.jpg 1500w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-300x180.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-1024x614.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window49-768x461.jpg 768w" sizes="(max-width: 530px) 100vw, 530px" /><figcaption id="caption-attachment-16368" class="wp-caption-text">আতম সিং গুজরাল হাভেলি</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আতম সিং গুজরাল হাভেলি</strong></p>
<p>আতম সিং গুজরাল হাভেলি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়। জানালার অংশে কাঠ ও পাথরের খোদাইকৃত অলঙ্করণ (floral patterns) লক্ষ্যণীয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16369" aria-describedby="caption-attachment-16369" style="width: 743px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16369" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50.jpg" alt="" width="743" height="404" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50.jpg 1406w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-300x163.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-1024x556.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window50-768x417.jpg 768w" sizes="(max-width: 743px) 100vw, 743px" /><figcaption id="caption-attachment-16369" class="wp-caption-text">নাউ নিহাল সিংহের হাভেলি</figcaption></figure>
<p><strong>নাউ নিহাল সিংহের হাভেলি</strong></p>
<p>নাউ নিহাল সিংহের হাভেলির ঝারোখা জানালা (১৮শ শতকের শেষের দিকে বা ১৯শ শতকের শুরুতে তৈরি) পাঞ্জাবের লাহোর অঞ্চলে নির্মিত। নির্মাণ উপাদান হিসেবে কাঠ ও পাথর ব্যবহার করা হয়। অলংকরণে প্রাচীর এবং কাঠের অংশে সূক্ষ্ম রঙিন পেইন্টিং করা হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (পাকিস্তান)</strong></p>
<p>১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (Pakistan)-এর ঝারোখা জানালা। এতে খোদাই করা কাঠ, খিলানযুক্ত ফ্রেম এবং ছাদ বা ছত্রি-আকৃতির আচ্ছাদন রয়েছে।</p>
<figure id="attachment_16370" aria-describedby="caption-attachment-16370" style="width: 403px" class="wp-caption aligncenter"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16370 " src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51.jpg" alt="" width="403" height="503" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window51-240x300.jpg 240w" sizes="(max-width: 403px) 100vw, 403px" /><figcaption id="caption-attachment-16370" class="wp-caption-text">ইসলামিয়া কলেজ, পেশোয়ার (পাকিস্তান)</figcaption></figure>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16371" aria-describedby="caption-attachment-16371" style="width: 626px" class="wp-caption alignleft"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16371" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52.jpg" alt="" width="626" height="448" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52.jpg 736w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window52-300x214.jpg 300w" sizes="(max-width: 626px) 100vw, 626px" /><figcaption id="caption-attachment-16371" class="wp-caption-text">ওয়াল্ড সিটি</figcaption></figure>
<p><strong>ওয়াল্ড সিটি, পেশোয়ার (Walled City of Peshawar)</strong></p>
<p>ওয়াল্ড সিটি মূলত শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্যের ভাণ্ডার। মোঘল আমল থেকে পেশোয়ার ছিল একটি বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানকার ব্যবসায়ী ও ধনী পরিবারগুলো তাদের হাভেলি ও বাড়িতে ঝারোখা জানালা স্থাপন করত সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। ঝারোখাগুলোতে সেগুন বা চিরকালীন শক্ত কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে এবং খোদাইয়ে ফুললতা, জ্যামিতিক নকশা, আরবেস্ক, এবং কখনো কখনো স্থানীয় পশতুন মোটিফ পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<figure id="attachment_16372" aria-describedby="caption-attachment-16372" style="width: 689px" class="wp-caption alignright"><img loading="lazy" decoding="async" class="wp-image-16372" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53.jpg" alt="" width="689" height="387" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53.jpg 1430w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-300x168.jpg 300w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-1024x575.jpg 1024w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/11/window53-768x431.jpg 768w" sizes="(max-width: 689px) 100vw, 689px" /><figcaption id="caption-attachment-16372" class="wp-caption-text">প্রাসাদ, পেশোয়ার</figcaption></figure>
<p><strong>পেশোয়ারের প্রাসাদ </strong></p>
<p>এটি পেশোয়ারে অবস্থিত একটি প্রাসাদ যা ১৮শ–১৯শ শতাব্দীতে &#8220;সেটি ব্যবসায়ী পরিবার&#8221;&nbsp;নির্মাণ করেছিলেন। সেটি মহল্লার জানালা কাঠের নকশাশিল্প, খিলানাকৃতির ফ্রেম ও জালি শৈলী তাদের ঐশ্বর্য ও শিল্পরুচির প্রতিফলন। অলংকৃত কাঠের কারুকাজ মধ্য এশীয় ইসলামী নকশা থেকে অনুপ্রাণিত যাতে রঙিন কাঁচ, ফ্রেস্কো এবং স্থানীয় কারিগরির ছোঁয়া শিল্পের অনন্যতায় নিয়ে যায়। সাধারণত শিশম কাঠ ও অন্যান্য শক্ত কাঠ দিয়ে এসব কাঠামো তৈরি। কাঠের নকশায় সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা হয়—ফুল ,লতা, আরবেস্ক ও জ্যামিতিক মোটিফ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>&nbsp; &nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;&nbsp;________________________</strong></p>
<p><strong>তথ্যসূত্রঃ</strong></p>
<p><a href="https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:Ahmed_Shah_Mosque" target="_blank" rel="noopener">https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:Ahmed_Shah_Mosque</a></p>
<p><a href="https://comedoresdepaisagem.com/mandu-india/" target="_blank" rel="noopener">https://comedoresdepaisagem.com/mandu-india/</a></p>
<p><a href="https://thearchitectsdiary.com/through-time-and-glass-exploring-10-indian-window-designs/" target="_blank" rel="noopener">https://thearchitectsdiary.com/through-time-and-glass-exploring-10-indian-window-designs/</a></p>
<p><a href="https://mohsinphotos.blogspot.com/2019/03/barbers-tomb-aka-nai-ka-gumbad.html" target="_blank" rel="noopener">https://mohsinphotos.blogspot.com/2019/03/barbers-tomb-aka-nai-ka-gumbad.html</a></p>
<p><a href="https://islamicarchitectureinindia.weebly.com/hushang-shahs-tomb.html" target="_blank" rel="noopener">https://islamicarchitectureinindia.weebly.com/hushang-shahs-tomb.html</a></p>
<p><a href="https://www.thefridaytimes.com/30-Mar-2024/exploring-the-pre-partition-havelis-of-daultala" target="_blank" rel="noopener">https://www.thefridaytimes.com/30-Mar-2024/exploring-the-pre-partition-havelis-of-daultala</a></p>
<p><a href="https://www.zameen.com/blog/rohtas-fort-jhelum-guide.html" target="_blank" rel="noopener">https://www.zameen.com/blog/rohtas-fort-jhelum-guide.html</a></p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-diversity-of-windows-in-the-architecture-of-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16288</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুঘল আমলে মুসলিম বাংলার ইসলামী উৎসব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-festivals-of-muslim-bengal-during-the-mughal-period/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-festivals-of-muslim-bengal-during-the-mughal-period/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. এম এ রহিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 22 Oct 2025 15:22:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16267</guid>

					<description><![CDATA[মুসলিম শাসনামলে, বাংলার মুসলমানদের ধর্মানুরাগের খ্যাতি ছিল। তারা ঈদ ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে খুব আমোদ-স্ফূর্তি করত। আর্থিক প্রাচুর্য থাকার ফলে তারা তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহ, যেমন বিবাহ ইত্যাদি খুব জাঁকজমকের সঙ্গে সম্পন্ন করত। এটা উল্লেখযোগ্য যে, মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ সমগ্র মুসলমান শাসনামলে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মুসলিম শাসনামলে, বাংলার মুসলমানদের ধর্মানুরাগের খ্যাতি ছিল। তারা ঈদ ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে খুব আমোদ-স্ফূর্তি করত। আর্থিক প্রাচুর্য থাকার ফলে তারা তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহ, যেমন বিবাহ ইত্যাদি খুব জাঁকজমকের সঙ্গে সম্পন্ন করত। এটা উল্লেখযোগ্য যে, মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবসমূহ সমগ্র মুসলমান শাসনামলে একই রকম ছিল। তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোও শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী অপরিবর্তিত থাকে। মুসলমান সমাজে কিছু সংখ্যক নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের আবির্ভাব হয়। মুহররম, বেড়া এবং সব-ই-বরাত ইত্যাদি উৎসবগুলোতে বাংলার হিন্দু উৎসবাদির চাকচিক্য এবং সমারোহের অনেকটা প্রভাব পড়েছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রমজান</strong></p>
<p>উপবাস, সংযম, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্মেলনীর সময় হিসেবে সে যুগের মুসলমানগণ &#8216;রমজান&#8217; পালন করত। তারা রমজানকে পবিত্র ও মঙ্গলজনক মাসরূপে গণ্য করত এবং খুশির সঙ্গে একে স্বাগত জানাত। বাংলায় মুঘল সৈন্যদের রমজান পর্ব পালনের উল্লেখ করে মীর্জা নাথন বলেন, &#8220;রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষদিন পর্যন্ত ছোটবড় প্রত্যেকে প্রত্যহ তার বন্ধুর তাঁবুতে মিলিত হতো। এটা একটা স্বাভাবিক রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক দিন সকলে পর্যায়ক্রমে একজন অভিজাত বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাত। সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের দেওয়া ভোজের পালা ছিল। সকলে সেদিন তার তাঁবুতে সময় কাটায়।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঈদ</strong></p>
<p>মীর্জা নাথনের বর্ণনা থেকে সেযুগের ঈদ-উৎসব সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া যায়। খুব আমোদ-স্ফূর্তির সঙ্গে ঈদের নতুন চাঁদকে স্বাগত জানানো হয়। মীর্জা নাথনের ভাষায় এটা বর্ণনা করা যেতে পারে; তিনি লিখেছেন, &#8220;<strong>দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠে এবং গোলন্দাজ সেনাদলের সকল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হয়। রাত্রির শেষভাগে, কামানের অগ্নদগীরণ শেষ হয় এবং এর পর শোনা যায় ভারি কামানের আওয়াজ। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প। এথেকে বুঝা যায়, ঈদের আগমনে মুসলমানরা কত খুশি হতো। ঈদের দিনে সমস্ত মুসলমান আনন্দস্ফূর্তিতে মসগুল থাকত।</strong> স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রত্যেকে নতুন এবং উৎকৃষ্ট কাপড় পরিধান করত। চমৎকার পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানগণ প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথেপথে টাকা পয়সা ও উপহার দ্রব্য ছড়িয়ে দিত এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানগণ গরিবদেরকে ভিক্ষা দিত। &#8216;নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী&#8217; গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা &#8216;ঈদগাহ&#8217; ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দস্ফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন যে, প্রত্যেকেই এই দিনে উৎকৃষ্ট পোশাকে সজ্জিত হতো। নবাব আলিবর্দীর ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিশ মুহম্মদ খান তার প্রিয়জনের মৃত্যুতে &#8216;ঈদ-উল-আজহার&#8217; দিনে নিরানন্দভাবে থাকেন। বৃদ্ধ নবাব তাকে নতুন কাপড় চোপড় পরাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি হারেমের বেগম এবং মহিলাদেরকে ঈদের আনন্দ-উৎসব উপযোগী কাপড় চোপড় নিয়ে তাকে উৎফুল্ল করে তুলতে পরামর্শ দেন।</p>
<p>মুসলমানগণ ত্যাগের উৎসরূপে &#8216;ঈদ-উল-আজহা&#8217; উদ্যাপনের করে। এর উৎপত্তি হয়েছে পয়গম্বর ইব্রাহীমের সময় থেকে। আল্লাহর উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহীম প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানির আয়োজন করেছেন। মুসলমানগণ এই মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে। তারা প্রভাতে সুন্দর কাপড়-চোপড় পরিধান করে এবং &#8216;তকবীর&#8217; উচ্চারণ করতে করতে ঈদগাহ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে গমন করে। সেখানে জামাতে তারা নামাজ আদায় করে এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে, পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ও সম্ভাষণ জানায়। অতঃপর তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাদের সাধ্যানুসারে তারা কোনো পশু, যেমন, গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি করে। তারা গরিব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে এবং গৃহে ভোজের অনুষ্ঠান করে। প্রত্যেক গৃহ ভোজানুষ্ঠান ও আনন্দ স্ফূর্তিতে মুখরিত হয়ে উঠে এবং সকল গৃহে আদর আপ্যায়ন চলতে থাকে। শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয় এবং এই মহান উৎসবে তারা সকলে একত্রে আনন্দ করে। &#8216;ঈদ-উল-আজহা&#8217; উৎসব উদযাপনের কথা বলতে গিয়ে মীর্জা নাথন লিখেছেন যে, &#8220;<strong>নামাজান্তে খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে, লোকেরা তাকে কাপড়-চোপড় ও টাকাপয়সা উপহার দেয়। গরিব দুঃখীদের সাহায্যের জন্য তার সম্মুখে টাকাপসয়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দুঃস্থ লোকদের অনেকে এর দ্বারা তাদের অভাব দূর করে এবং সুখি হয়। পরস্পরের প্রতি সম্ভাষণে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে।</strong> কোরবানি সম্পন্ন হবার পর বিরাট ভোজের ব্যবস্থা হয়। সুন্দর গায়ক মোহনী নর্তকী এবং নম্র স্বভাবের গল্প কথকদের মধুর আপ্যায়নের সঙ্গে দিনরাত ভোজানুষ্ঠান চলতে&nbsp; থাকে। শিল্প কারখানার বহু শ্রমিককে উপহার সামগ্রী প্রদানে তুষ্ট করা হয়।” মীর্জা নাথন আরো লিখেছেন &#8220;উৎসবের দিনে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীগণ একে অন্যের জায়গায় গমন করেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সেনাপতি শাজাত খান আনন্দ উৎসবের এই দিনটিতে বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়নের নিমিত্ত একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।&#8221; দুতিন দিন উৎসবাদি চলতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশনের ব্যবস্থা থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>পয়গম্বরের জন্মদিন</strong></p>
<p>মুসলমানগণ একটি বিরাট ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে রসূলের জন্মদিন পালন করে। এবং শানশওকতের সঙ্গে তারা এ অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে। মীর্জা নাথন এই উৎসব উদ্যাপনের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তিনি বিস্তারিত বিবরণ দেননি। বাংলার মুসলমানগণ যে খুব আড়ম্বর ও মহা ধুমধামের সঙ্গে রসূলের জন্মদিবস উদ্যাপন করত, নবাব মুর্শিদকুলী খান কর্তৃক এই দিবস উদ্যাপনের নমুনা থেকে সে সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া যায়।<strong> নবাব এ দিনটি একটি বিরাট উৎসব আনন্দের দিনে পরিণত করেন। তিনি রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম বারো দিন লোকদেরকে আদর অভ্যর্থনা করতেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আতিথেয়তায় উপস্থিত হতেন। বিশেষ করে তিনি গরিবদেরকে অভ্যর্থনা করতে ভালবাসতেন। এই উপলক্ষে তিনি সমস্ত মুর্শিদাবাদ শহর ভগীরথী নদীর তীর পর্যন্ত আলোকমালায় সজ্জিত করে তুলতেন। বারো দিনব্যাপী এই উৎসব ও আলোকসজ্জা অব্যাহত থাকত। আলোকসজ্জার স্থানগুলোতে কুরআন শরিফের আয়াতসমূহ এবং মসজিদ, বৃক্ষ, লতাপাতা ও ফলসমূহ প্রদর্শিত হতো।</strong> সেনাপতি নাজির আহমদের অধীনে এক লক্ষ্য লোক আলোক সজ্জার কাজে নিয়োজিত হতো। কামান গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও নদী তীরের সমস্ত আলোক জ্বলে উঠত এবং সারা শহর ও ভগীরথী এক আনন্দময় রূপ ধারণ করত। মুসলমানদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত ঘোষণা করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কামানগুলো গর্জন করে উঠত। মুসলমান শাসনকর্তাগণ ও জনসাধারণ উপমহাদেশব্যাপী রসূলের পবিত্র জন্মদিন পালন করত। &#8216;মী&#8217;রাত-ই-সিকান্দরী&#8217; অনুসারে, গুজরাটের সুলতান মুজাফফর (১৫১৫-১৫২৫ খ্রিঃ) উলেমা, সৈয়দ ও বহু শেখদেরকে ভোজে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাদেরকে সংবৎসরের উপযোগী টাকা পয়সা ও কাপড়-চোপড় উপহার দিতেন। <strong>গুজরাট সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ তদীয় রাজপ্রাসাদে রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম থেকে বারো তারিখ পর্যন্ত প্রত্যেক দিন উলেমা ও শেখদের সভার আয়োজন করতেন। তারা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাদিস আলোচনা করতেন এবং অতঃপর তাদেরকে ভোজে আপ্যায়িত করা হতো।</strong> ভোজানুষ্ঠানে সুলতান, তদীয় মন্ত্রীবর্গ ও আমিরগণ উলেমা ও শেখদের সেবাযত্ন করতেন। তিনি এসব বিদ্বান ও ধার্মিক মেহমানদেরকে এরূপ পরিমাণ স্বর্ণ ও পোশাক-পরিচ্ছদ দান করতেন যাতে তারা এক বছরকাল চলতে পারেন।</p>
<p>এসব প্রমাণাদি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহানবীর জন্মদিন উপলক্ষে তার জীবনী আলোচনার জন্য মহফিল অনুষ্ঠানের প্রথা শাসক ও অবস্থাপন্ন মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ধার্মিক ও বিদ্বান ব্যক্তিদেরকে উপহার প্রদান এবং রোজা রাখা ও মুসলমানদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যেও মহানবীর জন্মোৎসব একটা বিশেষ উপলক্ষ ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শব-ই-বারাত</strong></p>
<p>শাবান মাসের চতুর্দশ দিবসে অনুষ্ঠিত মুসলমানদের একটি বিরাট উৎসব হচ্ছে শব-ই-বরাত। এটা ছিল প্রার্থনা ও ভোজানুষ্ঠানের সময়। উপমহাদেশের মুসলমানগণ এই উপলক্ষে বহু আচার অনুষ্ঠান ও আমোদ স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদ্যাপন করে। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক চারদিনব্যাপী এই উৎসব উদ্যাপন করতেন এবং এতবেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাত্রিকালও প্রকাশ্য দিবালোকের রূপ ধারণ করত। সমসাময়িক উৎসগুলো থেকে জানা যয় যে, শের শাহের একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিন্তির সঙ্গে শব-ই-বারাতের দিন সারারাত এবাদত বন্দেগি করেন। &#8216;বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে, এই উৎসব উদ্যাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার নবাবগণ বিরাট জাঁকজমকের সঙ্গে &#8216;শব-ই-বারাত উদ্যাপন করতেন। বাড়িঘর আলোকমালায় সজ্জিত করা হতো এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মসজিদে ও বাড়িতে সারারাত নামাজ অদোয় করতেন। ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।</p>
<p>মুসলমানদের মধ্যে এটি একটি প্রচলিত বিশ্বাস যে, &#8216;শব-ই-বারাত&#8217; রাত্রে আল্লাহ প্রত্যেক নর-নারীর জন্যে বৎসরের জীবিকা বরাদ্দ করেন। বিশ্বাস করা হয় যে, মহানবী মুসলমানদেরকে এই রাত্রে জেগে এবাদত বন্দেগি, কুরআন তেলাওয়াত ও পুণ্যকর্ম করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে শব-ই-বারাতের উৎসব হিন্দুদের &#8216;শিবরাত্রি&#8217; উৎসব থেকে নকল করা হয়েছে। শব-ই-বারাতের উৎপত্তি যাই হোক না কেন, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের সময় থেকে মুসলমানদেরকে এই ধর্মীয় সামাজিক উৎসব পালন করতে দেখা যায়। বাংলার মুসলমানগণ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে তাদের ভাইদের মতো এই উৎসব প্রার্থনা, ভোজানুষ্ঠান এবং আমোদ প্রমোদের উপলক্ষরূপে পালন করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মুহররম</strong></p>
<p>&#8216;মুহররম&#8217; উৎসব শিয়াদের সঙ্গে জড়িত। ইমাম হাসান হোসেনের শাহাদাত বরণের স্মরণার্থে মুহররম মাসের প্রথম দশ দিনে এটা উৎযাপন করা হয়। বাংলা উপমহাদেশের মুসলমানগণ যে মুহররম উৎসব পালন করে তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শোক প্রকাশ এবং তাজিয়া নামে অভিহিত প্রতীক সমাধি নিয়ে শোভাযাত্রা, এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণ। <strong>মুসলমান আমলে সুন্নি মুসলমানরা বর্তমানের মুসলমানদের ন্যায় কারবালায় হোসেনের করুণ মৃত্যুর জন্যে একটি নীরব শোকের উপলক্ষ হিসেবে এই অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে। তাজিয়া শোভাযাত্রায় শিয়াদের ভাবাবেগ প্রদর্শনী থেকে তারা দূরে থাকতেন। সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকেরা শোভাযাত্রার ক্রিয়াকর্মে অংশগ্রহণ করত।</strong> মুসলিম পঞ্জিকা অনুসারে, প্রথম মুহররম হচ্ছে নববর্ষের দিন। &#8216;বাহারিস্তান-ই গায়েবী&#8217; থেকে জানা যায় যে, মুসলমানগণ আনন্দ উৎসব ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে মুহররমের চাঁদকে স্বাগত জানাত।</p>
<p>এই উপমহাদেশে কখন মুহররমের তাজিয়া শোভাযাত্রা উৎসব শুরু হয় তা জানা যায় না। তাজিয়া প্রথার সূচনা সাধারণত আমির তৈমূরের নামের সঙ্গে বিজড়িত। বাগদাদের বুয়াইদ সুলতানগণ ইমাম হোসেনের শাহাদাত স্মরণে দশই মুহররম জাতীয় শোক দিবস ও সাধারণ ছুটির দিন হিসেবে উদ্যাপনের প্রথা প্রবর্তনের কৃতিত্বের অধিকারী। এটা প্রতীয়মান হয় যে, মুগল সাম্রাজ্যে প্রার্থনা ও শোক দিবসরূপে মুহররম উৎসব শুরু হয় এবং কালক্রমে তাজিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপকরণগুলো যুক্ত হয়ে পড়ে। ফাদার মনসেরাত সম্রাট আকবরের আমলের মুহররম উৎসব উদ্যাপনের বর্ণনা রেখে গেছেন।</p>
<p>তিনি লিখেছেন যে, মুহররমের সময় মূলমানগণ এ মাসের প্রথম দশ দিন রোজা রাখত, শুধু নিরামিশ খেত এবং জনসভায় উচ্চমঞ্চ থেকে ইমাম হাসান ও হোসেনের আদর্শ জীবনে এবং সত্যের জন্যে তাদের ত্যাগের ও দুঃখ কষ্ট সহ্য করার করুণ কাহিনী বর্ণনা করত। এতে সমবেত শ্রোতাদের মধ্যে শোকোচ্ছাস এবং অশ্রুপ্রবাহ বয়ে চলত। শেষের দিন (দশই মুহররম) তারা সামাধি-চিতা তৈরি করত এবং এগুলোকে একটির পর একটি করে পুড়িয়ে ফেলত। লোকেরা জলন্ত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং অতঃপর তারা তাদের পাদিয়ে নিভে যাওয়া ছাইগুলো ছড়িয়ে ফেলত। তারা হাসান হোসেনের নাম করে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠত। মানডেলসলো আগ্রায় সম্রাট শাহজাহানের আমলের মুহররম শোভাযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি বলেন, &#8220;<strong>তীর-ধনুক, পাগড়ি, ভোজালি এবং পশমি পোশাক-পরিচ্ছদে আবৃত শবাধারগুলো শোভাযাত্রা সহকারে শহরের রাস্তায় রাস্তায় বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অশ্রুসিক্ত চোখে বিলাপ করতে করতে লোকেরা তা অনুসরণ করে। তাদের কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানে নৃত্য করে। অন্যান্যরা একে অন্যের সঙ্গে তাদের তরবারির আঘাত করে&#8217;; শুধু তাই নয়, তাদের অনেকে নিজেদের দেহে এমনভাবে আঘাত করে ও ক্ষত সৃষ্টি করে যে, কয়েক জায়গা থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। সেই রক্ত দিয়ে তারা কাপড় চোপড় রঞ্জিত করে।</strong> এভাবে শোভাযাত্রা অদ্ভুত আকার ধারণ করে। রাত্রের দিকে তারা মহান শহীদদের (হাসান হোসেন) হত্যাকারীদেরকে চিহ্নিত করার জন্যে খড়কুটা দিয়ে কয়েকটি মানুষের ছবি তৈরি করে এবং এগুলোর প্রতি অসংখ্য তীর নিক্ষেপ করে পরে তারা সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় ও ভষ্মে পরিণত করে।” <strong>ষোড়শ শতকে মুগলদের বাংলা জয়ের সময় থেকে, এই প্রদেশে শিয়া প্রভাব অনুভূত হয়। শাহজাহানের রাজত্বকালে বিশেষত শাহজাদা শুজার সুবাদারির আমলে বাংলায় বহু সংখ্যক শিয়া সম্প্রদায়ের লোক বসতি স্থাপন করে। মুর্শিদাবাদের নবাবদের আমলে শিয়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়; এবং নবাবরা নিজেরা শিয়া বংশোদ্ভূত হওয়ায় রাজধানী শহর, এবং জাহাঙ্গীরনগর ও হুগলী ইত্যাদি স্থানগুলো তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।</strong> ষোড়শ শতকের বাংলা সাহিত্যে শিয়াদের ইমামবাড়িগুলোর উল্লেখ রয়েছে। কবি মুকুন্দরাম বলেন, শিকারি রাজা (কালকেতু) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নতুন শহর গুজরাটে মুসলমানগণ তাদের বসতির পশ্চিম প্রান্তে তাদের হাসানহাটি (ইমামবাড়ি অর্থাৎ মুহররম তাজিয়ার স্থান) নির্মাণ করে এবং তারা সকলে তাজিয়ার স্থানে সমবেত হয়। এতে দেখা যায় যে, যোড়শ শতকের বাংলায় মুহররমের শোভাযাত্রার প্রথা প্রচলিত ছিল। নবাবদের সময়ে অষ্টাদশ শতকে মুহররম একটি বিরাট জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত হয়। কারবালার হৃদয়-বিদারক ঘটনা জনসাধারণের অন্তরে এক বিশেষ আবেদনের সৃষ্টি করে। মকতুল হোসেন সঙ্গীত ও অন্যান্য মর্সিয়া কবিতাসমূহ এত জনপ্রিয় যে, এগুলো পাঠক ও শ্রোতাদের উভয়কে সমভাবে অশ্রু আপ্লুত করে তোলে।</p>
<p>মুহররম উৎসবের বিস্তারিত বিবরণ কোনো সমসাময়িক গ্রন্থে পাওয়া যায় না। ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও হুগলীতে ইমামবাড়িগুলোর অস্তিত্ব থেকে বুঝা যায় যে, সুবাদার ও নবাবদের আমলে এই শহরগুলাতে মুহররম উৎসব উদ্যাপিত হয়। আলম মুসাওয়ার কর্তৃক অঙ্কিত উনিশ শতকের প্রথম দিকের একটি চিত্রে এবং হাকিম আহসানের একটি বর্ণনায় ঢাকায় মুহররম উৎসব উদ্যাপনের প্রমাণ মেলে। মুহররমের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে উৎসব শুরু হতো। এবং সেই রাত্রি থেকে ইমামবাড়ির &#8216;নওবত খানা&#8217;য় নওবতের (সঙ্গীত) সুর বাজান হতো। সেই সময় থেকেই মাতমে মজলিশ শুরু হতো। ইমামবাড়ির দেয়ালে দেয়ালে মোমবাতি জ্বালান হতো। চতুর্থ দিবস থেকে মর্সিয়া (শোক সঙ্গীত) শোনার জন্যে ইমামবাড়ির লোকেরা সমাগত হতো। মার্সিয়া-গায়করা দলে দলে তাদের নিজস্ব নিশান নিয়ে আগমন করত। ষষ্ঠ ও সপ্তম দিবসে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে আতশবাজি পোড়াত। পঞ্চম দিনে পানি বাহকরা (মশক) পাজামা আচ্ছাদিত মোটা সবুজ লুঙ্গি ও সবুজ সার্ট বা আচকান, বহু রঙা ঝালরবিশিষ্ট পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় শহরে শোভাযাত্রা করে বের হতো। তারা গলায় একখণ্ড কাফনের কাপড় (কাফনি), বুকে একটি &#8216;বাদ্দী&#8217; (এক সুতার মালা), এবং এরকম অন্যান্য অলংকারাদি ধারণ করত। তারা এক হাতে গ্লাস ও এক পার্শ্বে পানির বোতল এবং অন্যহাতে একটি সুসজ্জিত লাঠি বহন করত এবং খালি পায়ে চলত। ষষ্ঠ দিনে পানি বহনকারীদের লাঠিগুলো ইমামবাড়ির ভূমির উপর আড়াআড়িভাবে রাখা হতো এবং সেখানে সমবেত লোকদের মধ্যে মিষ্টান্ন ও অন্যান্য &#8216;নিরাজ&#8217; বিতরণ করা হতো এবং অতঃপর তারা পানি বহনকারীদের পোশাকে সজ্জিত হয়ে মিছিল করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ভিক্ষার জন্য বের হতো।</p>
<p>&#8216;জুলুসে&#8217;র (মিছিলের) সপ্তমদিনে ইমামবাড়া আলোক সজ্জিত করা হতো এবং জনসাধারণ সেখানে শোকোচ্ছ্বাস দেখার জন্য ভিড় জমাত। অষ্টম দিনে মহিলাগণ অপরাহ্নে ইমামবাড়ায় সমবেত হতেন এবং শোকসংগীত পরিবেশন করতেন। এই সময় পুরুষেরা সেখান থেকে সরে যেতেন। রাত্রিতে &#8216;তুগ গোশত&#8217; (তুর্কী ভাষায় &#8216;তুগ&#8217; অর্থ পতাকা এবং গোশত্ অর্থ ভ্রাম্যমাণ) নামে অভিহিত মিছিল শুরু হতো এবং শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো অতিক্রম করা হতো। শোভাযাত্রার পুরাভাগে থাকত দু থেকে চারটি আখড়া (আখড়া ক্লাবের মতো। সেখানে একজন ওস্তাদ যুবকদেরকে লাঠিখেলা শিক্ষা দিতেন।) লোক এবং এদের সঙ্গে থাকত গ্লাসে আলোকবর্তিকা বহনকারিগণ। অতঃপর থাকত একরকম পোশাক পরিহিত একদল লোক, ওরা দু&#8217;টা বা তিনটা সারিতে পতাকা বহনকারীদের (আলম-বরদার) অনুগমন করত। অতপর আসত গাঢ় লাল রংয়ের কাপড়ে সজ্জিত হাতি এবং তুগরা পদ্ধতিতে লিখিত &#8216;ইয়া ফাতাহ&#8217; (হে বিজয়ী) এবং &#8216;ইয়া আলী&#8217; প্রতীক নিশান। এরপরে অনুগমন করত অভ্রগ্লাসসমূহে আলো বহন করে একসারিতে সুসজ্জিত অশ্বসমূহ। অতঃপর থাকত কাফেলা-মিছিলের প্রতীক ডঙ্কা (বাদ্য), বাদ্যযন্ত্র এবং শোকসঙ্গীত &#8216;নওবত&#8217; ইত্যাদি বাজিয়ে কয়েকটি সঙ্গীতকারদের দল। এবং এদের অনুগমন করত কাল কাপড়ে আবৃত দুটো পালকি (দোলা) এবং এদের অগ্রভাগে থাকত হাতে আলম (পতাকা) নিয়ে কয়েকজন অশ্বারোহী এবং আলম ও সামরিক বাদ্যযন্ত্র হাতে দুজন পদাতিক। পানিবাহকগণ পালকির উভয়পার্শ্বে শ্লোগান দিতে দিতে অগ্রসর হতো। দোলাগুলো পরে উটের পিঠে বহন করা হতো। পালকির পিছনে থাকত কালো অথবা সবুজ কাপড় পরিহিত ও হস্তে মোমবাতি নিয়ে শোককারিগণ। এই দলে ছিল &#8216;জুলজানাহ&#8217; (হোসেনের অশ্ব) এবং এর সঙ্গে অনুগমন করত রক্তরঞ্জিত জিন ও জুলফিকার (আলীর তরবারি) বহন করে দুল দুল (আলীর অশ্ব)। সর্বশেষে ছিল দুটো ঢাক নিয়ে একটি হস্তী, ঢাক দুটো মৃদুভাবে বাজান হতো এবং এতে মিছিলের শেষ চিহ্নিত হতো।</p>
<p>নবম দিনে শোভাযাত্রা বের করা হতো রাত্রিবেলা এবং তখন আখড়া-প্রদর্শনীর লাঠি খেলার ব্যবস্থা থাকত। তরবারি, চাকু এবং আগ্নেয়াস্ত্রের খেলারও ব্যবস্থা ছিল। এই ব্যবস্থাপনায় বিগত রাত্রির &#8216;তুগ গাশত&#8217; এর অনুসরণ করা হতো। &#8216;জুলজানাহ&#8217;র পেছনে আরো কিছু বিষয় সংযোজিত ছিল, যেমন কাঠের তক্তায় বসান একটি পাহাড় এবং উপরে একটি মিহরাব। এগুলোর সবটাই থাকত কাগজে মোড়া ও পার্শ্বগুলো আড়াআড়ি স্থাপিত তরাবারি এবং ঢাল দিয়ে সজ্জিত। ফলে এসব দৃশ্য প্রায় আসলাহ খানার (অস্ত্রাগার) রূপ ধারণ করত। অভ্যন্তর ভাগে থাকত কারবালায় নিহত বীরদের কাগজে তৈরি দ্বিতল বিশিষ্ট একটি প্রতীক সমাধি সৌধ।</p>
<p>দশম দিনকে বলা হতো আশুরা। প্রতীক সমাধি (জরীহমুবারক) &#8216;সহ তাজিয়া&#8217; শহরের বিভিন্ন এলাকাসমূহে ঘুরান হতো এবং অতঃপর তা পানিতে ফেলে দেওয়া হতো কিন্তু কাল কাপড়ে আবৃত পতাকাগুলো ও প্রতীক সমাধিসমূহ নীরবভাবে ইমামবাড়ায় ফেরৎ আনা হতো। এভাবে শিয়া অনুষ্ঠান সমাপ্ত হতো। অপরাহ্ণে সুন্নিরা তাজিয়া শোভাযাত্রা বের করতেন। এতে হোসেনের প্রতি এজিদের সৈন্যদের সহানুভূতি প্রদর্শিত হতো; এরা হোসেনকে যথারীতি সমাধিস্থ করার জন্য রাত্রে তার পবিত্র দেহ নিয়ে যায়। এই তাজিয়া পানিতে রেখে আসা হতো। এর দ্বারা মুহররম উৎসবের সমাপ্তি করা হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বেড়া উৎসব</strong></p>
<p>বাংলায় মুসলমান শাসনামলে উদ্যাপিত বেড়া অনুষ্ঠান ছিল একটি জনপ্রিয় উৎসব। <strong>এই উৎসব উদ্যাপিত হতো খাজা খিজিরের (পয়গম্বর ইলিয়াস) সম্মানে। তিনি হচ্ছেন সমুদয় সমুদ্র, সাগর ও নদনদীর পৃষ্ঠপোষক সাধু দরবেশ। কিংবদন্তি এর উৎপত্তির সঙ্গে সুফিবাদের আদমিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম-বিন আদমের (মৃত্যু ৭৪৩ খ্রিঃ) নাম যুক্ত করে। ভারতে তার শিষ্য সম্প্রদায় খিজিরিয়া নামে পরিচিত। কেননা, তারা খিজির বা খাওয়াজা খিজিরের অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসী-যিনি বাংলা মুল্লুকে খিজির পিররূপে জন-সাধারণ্যে পরিচিত।</strong> আজও নদীমাতৃক বাংলার লোকেরা বিশ্বাস করে যে, খিজিরপির হচ্ছেন নদনদীতে মাঝি ও নাবিকদের অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা এবং তিনি তাদেরকে নদনদী ও সাগরসমূহে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কলিকাতার খিদিরপুর এবং নারায়ণগঞ্জের সন্নিকটস্থ খিদিরপুর খুব সম্ভবত খিজির পিরের নামের স্মৃতি বহন করছে। উনিশ শতকের শেষপাদে ডক্টর ওয়াইজ লিখেছেন যে, বেড়া উৎসব স্থানীয়ভাবে খাজা খিজিরের নামের সঙ্গে বিজড়িত; তিনি &#8220;বর্তমানে জাহাজডুবি থেকে রক্ষা করতে ভারতের বহু নদনদী ও সাগরের বসবাস করেন, এবং তিনি কেবল তাদের কাছেই দৃশ্যযোগ্য যারা নদীর তীরে দীর্ঘ চল্লিশ দিনব্যাপী দৃষ্টি রাখেন।” বাংলার জনসাধারণ পৃষ্ঠপোষক দরবেশের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কলাগাছ, বাঁশ ও কাগজের তৈরি ভেলা ভাসিয়ে বেড়া ভাসান উৎসব উদ্যাপন করতেন। মুগল শাসনপর্বে প্রদেশে বেড় উৎসব সরকারিভাবে উদ্যাপিত হতো। এটা সুবিদিত যে, সুবাদার মুকাররম খান (১৬২৬-২৭ খ্রিঃ) ব্যক্তিগতভাবে বুড়ীগঙ্গা নদীতে এই বেড় ভাসান উৎসবের আয়োজন করতেন। মুর্শিদকুলী খান অত্যন্ত একটি বিরাট ভেলা তৈরি করেন এবং এর উপর তিনি কাগজের ঘর ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এগুলোকে সুন্দরভাবে সাজানো হয় ও আলোকসজ্জিত করা হয়। ভেলাটি ছিল দৈর্ঘ্যে ৩০০ কিউবিক। জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত ভেলাটি আতশবাজির প্রদর্শনী ও আমোদ প্রমোদের মধ্য দিয়ে ভাগীরথীর জলে ভাসান হয়েছিল। ভেলাটির আলোকসজ্জা বহু মাইল দূর থেকে দৃষ্টিগোচর হতো। এ উৎসব ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত হতো। বহু মুসলমান এই বেড়া উৎসবের আনন্দ স্ফূর্তিতে অংশ নিতেন। ডক্টর ওয়াইজ সিরাজদ্দৌলাহর সময়কার বেড়া উৎসবের বর্ণনা দিয়েছেন। নবাব নিজে ভাগীরথীর জলে শত শত ভেলা ভাসিয়ে এ উৎসব উপভোগ করেন এবং নদীর তীরভূমি জুড়ে মুর্শিদাবাদের অধিবাসীরা বিপুলভাবে জড়ো হয়েছিল। উৎসবের কথা বলতে গিয়ে, ডক্টর ওয়াইজ বলেন, &#8220;বেড়া সাধারণত বক্রাকৃতি বিলাস তরণীর অগ্রভাগস্থ আকৃতির অনুকরণে চাকচিক্যপূর্ণভাবে কাগজ দিয়ে তৈরি ছিল এবং পোতাগ্র ভাগ ছিল ময়ূরের ঝুটি ও বক্ষ সম্বলিত স্ত্রী জাতীয় বাজপাখি সদৃশ। কদলীবৃক্ষের গুড়ির একটি ভেলার উপর প্রতিকৃতি স্থাপন করত সূর্যাস্তকালে ভাসিয়ে দেওয়া হতো এবং রাত্রি বেলা অন্ধকারে ভরা নদীজলে আলোকচ্ছটা অপূর্ব চিত্রের মতো মনে হতো।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>নামকরণ</strong></p>
<p>জন মার্শাল ১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণে আসেন এবং শিশুসন্তানের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত অনুষ্ঠানাদির বর্ণনা রেখে যান। তিনি বলেন, <strong>&#8220;মুর বা মুসলমানগণ তাদের জন্মের দ্বিতীয় দিনে একটি নাম পায়। নবজাতকের পিতা অথবা নিকট আত্মীয় কোনো মৌলভী বা ধর্মগুরুকে আমন্ত্রণ করেন। তিনি এসে ধর্মীয় পুস্তক (বিশেষত কুরআন) বন্ধ করেন; পিতা কোনো সুচাঁলো কাঠি এই গ্রন্থের পাতার মধ্যে প্রবিষ্ট করেন, অতঃপর সূঁচবিদ্ধ পাতা খোলা হলে মৌলভী সেই পাতার প্রথম অক্ষরটি গ্রহণ করেন। এর অর্থানুসারে শিশুর নামকরণ করা হয়।&#8221;</strong> জন মার্শালের বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, বাংলার মুসলমানগণ শিশুর নামকরণে ধর্মীয় গ্রন্থের (কোরআন শরিফ) সাহায্য নিতেন। মুসলমানদের মধ্যে অদ্যাবধি এই রীতি প্রচলিত আছে। বাংলার মুসলমান সমাজে আরবি নামসমূহ প্রচলনের এটি একটি কারণ।</p>
<p><script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>আকিকা</strong></p>
<p>শিশুসন্তানের জন্মের সঙ্গে আকিকা একটি একান্ত প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান। আকিকা শব্দের অর্থ হচ্ছে নবজাতক শিশুর কেশ। কিন্তু এটা সাধারণভাবে ক্ষৌরকর্ম অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুর নামকরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। <strong>এই অনুষ্ঠানে, শিশুর নামকরণের স্মৃতি রক্ষার্থে শিশুপুত্রের ক্ষেত্রে দুটো এবং শিশুকন্যার ক্ষেত্রে একটি মহিষ অথবা ছাগল জবাই করা হতো এবং আত্মীয় স্বজন ও গরিবদের মধ্যে এই মাংস বিতরণ করা হতো। ভোজানুষ্ঠানের আয়োজন করে, অবস্থাপন্ন পিতামাতা জনসাধারণকে আপ্যায়িত করতেন।</strong></p>
<p><strong>বিসমিল্লাহখানি শিশুর সঙ্গে সম্পৃক্ত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। শিশুর চার বছর চার মাস চার দিন বয়ঃক্রমকালে এই অনুষ্ঠান উদ্যাপন করা হয়ে থাকে।</strong> প্রার্থনা, আর্শীবাদ ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে দিয়ে আল্লাহর নামে পড়াশোনা শুরু করার জন্যে শিশুকে ওস্তাদের নিকট সমর্পণ করা হয়। এভাবে শিশু শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করে। লিঙ্গাগ্রের চর্ম কর্তন করাকে বলা হয় খাতনা। এটা সুন্নত নামেও পরিচিত। এটি একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মসলমানরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই উৎসব উদ্যাপন করত। সাধারণত শিশুর সাত বছর বয়সের সময় খাতনা করা হতো এবং এই উপলক্ষে আনন্দ উৎসব করা হতো এবং ভোজ ও উপহার দেওয়া হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বিবাহ</strong></p>
<p>বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল; ধুমধাম ও ভোজানুষ্ঠানের সঙ্গে এটা সম্পন্ন হতো। বিবাহ উৎসব সম্পর্কে এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মৃতের জন্য অনুষ্ঠানাদি</strong></p>
<p>মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত কতকগুলো পবিত্র কৃত্য ছিল। মৃতদেহ একটি শবাধারে (কফিনে) রাখা হতো এবং একটি বড় ধরনের জমায়েতে প্রার্থনাপর্ব অনুষ্ঠিত হতো। অতঃপর শবাধারটি আনুষ্ঠানিকভাবে কবরে রাখা হতো। মৃতের পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবগণ দশদিনব্যাপী শোকপালন করত। বিদেহী আত্মার জন্য মঙ্গল কামনায় তারা প্রার্থনা করত।</p>
<p><strong>পরিবারের শোক-পর্ব ছয়মাসেরও অধিককাল অব্যাহত থাকত। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে ছয়মাস অন্তর মৃতের উদ্দেশ্যে ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো। কুরআন শরিফ তেলাওয়াতকারীদের কাপড়-চোপড় ইত্যাদি উপহার প্রদান করা হতো এবং লোকদেরকে সুস্বাদু খাদ্য ও ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। অতঃপর বিরাট ভোজানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শোকপর্বের সমাপ্তি ঘটত।</strong> এটা আমোদ-প্রমোদের সঙ্গে পালিত হতো। মীর্জা নাথন তদীয় মৃত পিতার জন্য শোকপর্বের সমাপ্তি ঘটান বিরাট ভোজানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। নাথন বলেন, &#8220;এই উপলক্ষে এরূপ জনসমাগম হয়েছিল যে, এটা পৃথিবীর ইতিহাসে উল্লেখের যোগ্য।&#8221;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-festivals-of-muslim-bengal-during-the-mughal-period/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16267</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুঘল আমলে ইসলাম ও হিন্দুধর্মের সমন্বয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-coordination-of-islam-and-hinduism-during-the-mughal-period/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-coordination-of-islam-and-hinduism-during-the-mughal-period/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. এম এ রহিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 22 Oct 2025 14:53:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16260</guid>

					<description><![CDATA[মুসলমানগণ এই উপমহাদেশে এক উদারনৈতিক শক্তির সূত্রপাত করে। তাঁদের ধর্মীয় সারল্য, সামাজিক সাম্যবোধ এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গী ও সংস্কৃতি হিন্দুসমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু ও অপরাপর প্রজাসাধারণের প্রতি মুসলিম শাসকবর্গের নীতি ছিল উদার ও সহনশীল। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আলেকজান্ডার হামিলটন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মুসলমানগণ এই উপমহাদেশে এক উদারনৈতিক শক্তির সূত্রপাত করে। তাঁদের ধর্মীয় সারল্য, সামাজিক সাম্যবোধ এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গী ও সংস্কৃতি হিন্দুসমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু ও অপরাপর প্রজাসাধারণের প্রতি মুসলিম শাসকবর্গের নীতি ছিল উদার ও সহনশীল। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আলেকজান্ডার হামিলটন নামক এক পরিব্রাজক বলেন <strong>&#8220;ইসলাম বাংলার আইন স্বীকৃত ধর্ম হলেও একজন মুসলমানের অনুপাতে ভিন্নধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা হচ্ছে একশত জন। সরকারি কাজে উভয় সম্প্রদায় হতে লোক নিয়োগ করা হয়ে থাকে। প্রত্যেকে নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মাচারণ করতে পারেন এবং ধর্মের নামে নির্যাতন তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।&#8221;</strong></p>
<p>মুসলিমগণের সারল্য এবং সহিষ্ণুতা হিন্দুদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠতর করে এবং উভয়ের জন্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমান সুযোগ-সুবিধার পথ প্রশস্ত করে। ফলে ব্রাহ্মণশ্রেণির প্রাধান্য বিশেষভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। কৃষ্টিসম্পন্ন এবং প্রভাবশীল শ্রেণি হিসেবে সমাজে কায়স্থগণের অভ্যুদয় ঘটে। উচ্চশ্রেণির হিন্দুগণ মুসিলম সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-আচরণের প্রভাবে প্রভাবিত হন। সমকালীন সাহিত্যে বর্ধমান ও নবদ্বীপের জমিদারগণের রাজদরবারের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তাকে মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারে ক্ষুদে সংস্করণ বলা যেতে পারে। হিন্দু জমিদারবৃন্দ তাদের দরবারের রীতিতে নিপুণ মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন এবং যাদের দিক হতে নবাব দরবারের পদসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা হতো, যেমন বকসি, মুন্সি, রানা সঙ্গীতজ্ঞ, আমিন, পেশকার এবং এমনি আরো অনেক, বহু হিন্দু উচ্চপদস্থ কর্মচারী, সমাজ প্রধান এবং শিক্ষক খান, মুস্তফা, মহালনবশ, খান সাহেব, সরকার শিকদার, তরফদার, কানুনগো, মজুমদার ইত্যাদি মুসলিম পদবি ব্যবহার করতেন। বস্তুত এরূপ পদবি ধারণকে তাঁরা ব্যক্তি এবং পারিবারিক জীবনে বিশেষ গৌরবের বলে মনে করতেন। এমনকি বর্তমানেও বহু হিন্দু পরিবার এসব সম্মানসূচক মুসলমানি পদবি ধারণ করে থাকেন। মুসলিম শাসনামলে এই প্রদেশে হিন্দু সমাজ যে কি বিপুলভাবে মুসলিম সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এসব বিষয় তা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়।</p>
<p>সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যেতে পারে।</p>
<p>জনৈক হিন্দু জমিদারের বর্ণনা করতে গিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি জয় নারায়ণ বলেন, &#8220;রাজা (জমিদার) দরবার কক্ষের মধ্যস্থলে স্বর্ণসিংহাসনে উপবিষ্ট। তাঁর মাথার উপর রাজছত্র বিধৃত। মূল্যবান উষ্ণীষ মুক্তার মতো ঝলমল করত। উষ্ণীষের উপরিভাগে কলিকা পাখির উজ্জ্বল পালক সূর্যালোকে দোলায়মান এবং দীপ্তিমান। তিনি পরিধান করতেন সোনার ঝালর দেয়া চাপকান ও বর্ম। পরিচ্ছেদের উপর দিয়ে বৃহৎ মুক্তার একখণ্ড রজ্জু ঝুলানো। কটিদেশে বেষ্টন করে প্রশস্ত কটিবন্ধে সোনার ঝালরের সজ্জা। কবির বর্ণনা থেকে এটা সুস্পষ্ট হয় যে জমিদার মুসলমানি পোশাক চাপকান ও পাগড়িতে সুসজ্জিত হতো। <strong>নবাব আলীবর্দী খানের সময় নবদ্বীপের জমিদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার যে দৃশ্য কবি ভারতচন্দ্র বর্ণনা করেছেন তাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দু জমিদারগণ মুসলমান শাসক ও রাজন্যবর্গের আদর্শ অনুযায়ী দরবারের কার্যাবলী নিষ্পন্ন করতেন।</strong> কবি লিখেছেন &#8220;দরবার কক্ষে শাস্ত্রিগণ পরস্পর হাত ধরে শ্রেণিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। তাদের বক্ষদেশে বর্ম ও কটিবন্ধে ঝোলানো থাকত তরবারি। ঘড়িয়ালগণ (রাজকীয় সময় রক্ষক) উভয় পার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকত। চাপদার অথবা চাপরাশিগণ হাতে সুবর্ণ লাঠি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত প্রকাশ্যস্থলে আরবিজি তথা জনসাধারণের নিকট হতে আবেদন পত্র গ্রহণকারী কর্মচারী মাসাধিককাল দাঁড়িয়ে থাকত। ভাঁড় বা রাজধবি রাজস্তুতি গাইতেন। মোসাহেবরাও সভাস্থলে থাকতেন। তাদের কাজ ছিল জমিদারের মতিগতির প্রতি নজর রাখা। সেখানে মুন্সিগণ (সচিববৃন্দ), বকসি (সৈন্যদের বেতন প্রদানকারী), বৈদ্য (চিকিৎসক), কাজি (বিচারক) কানুনগো ও অপরাপর অনেকেই উপস্থিত থাকতেন। রাজকীয় বাদকবৃন্দের জন্য রাবাব, তানপুরা, বীণা, মৃঙ্গ ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র যথাযথভাবে রক্ষিত থাকত। নকিবের (রাজসভার ঘোষক)। কাজ ছিল দর্শনার্থীদের নাম ঘোষণা করা এবং তাঁদেরকে উচ্চস্বরে রাজসভার পালনীয় রীতিনীতি বিষয় অবিহিত করা। উজাক বা উনাবক্য কাজালবাস বা কিজেলবাস, লালটুপীধারী (বাহিদী), হাফসি (হাবসি) এবং জল্লাদ তাদের নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকত।&#8221;</p>
<p>আনুষ্ঠানিক রীতিনীতির দিক থেকে কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা ছিল মুসলিম দরবারের ক্ষুদ্র সংস্করণ। মুসলিম শাসকবর্গের আচরণ প্রথার অনুকরণে দর্শনার্থীরা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে তিনবার কুর্ণীশ করত। ডি. সি. সেনের মতে মুসলিম শাসনামলে হিন্দু রাজন্যবর্গ এবং জমিদারগণ সম্ভ্রান্ত মুসলমানগণের মতো পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করতেন এবং শুধু কপালে চন্দনের ফোটা এবং পবিত্র ভষ্মচিহ্ন ব্যবহার করে। নিজেদেরকে হিন্দু বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করতেন।</p>
<p>মধ্যবিত্ত হিন্দুগণ মুসলিম জীবনধারা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হতেন। স্বল্পশিক্ষিত কায়স্থ ভাড়ুদত্তকে পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় ব্যাধরাজ কালকেতুর রাজদরবারে যেতে দেখা যায়। নরসিংহ বসু মুর্শিদাবাদের নওয়াব দরবারে বীরভূমের জমিদার রাজা আসাদউল্লাহর দূত হিসেবে নিয়োগকালে জমিদারের নিকট থেকে একটি জামা ও পাগড়ি উপঢৌকনরূপে লাভ করেছিলেন। সমকালীন হিন্দু লেখকগণের লেখায় হিন্দু রমনীগণকে মুসলিম পোষাকে চিত্রিত করা হয়েছে। তাঁরা ঘাঘরা (সায়া), ওড়না, কাচলী (বক্ষবন্ধনী) ব্যবহার করতেন। মুসলমানগণের অভ্যস্ত ব্যবস্থা হিন্দুগণের নিকট ফ্যাসনে পর্যবসিত হয়েছিল। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে থমাস বাউরী নমক একজন ইংরেজ বণিকের মতে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ে নারীগণকে গৃহের চারিদেয়ালের ভিতর নপুংসক ও কুমারীগণের তত্ত্বাবধানে রাখা হতো।</p>
<p>ঘনিষ্ঠতর সামাজিক সম্পর্কের ফলে বহু হিন্দু ও মুসলমানগণের ধর্মাচারণ ও ধর্মপূজার প্রতি শ্রদ্ধাবান হয়ে পড়েন। <strong>সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, বিরচিত ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল কাব্যের একটি স্তবকে উল্লেখ আছে যে, সর্পদেবী মনসার কোপদৃষ্টি থেকে লক্ষ্মীন্দরকে বাঁচাবার জন্য যে লৌহ প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করা হয়েছিল সেখানে তান্ত্রিক অন্যবিধ ব্যবস্থাদির সঙ্গে একখণ্ড পবিত্র কোরআন শরীফ রক্ষিত ছিল। অনেক হিন্দু বণিক পুত্রলাভের জন্য প্রার্থনা করবার উদ্দেশ্যে একদল ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ করেন। ব্রাহ্মণগণ কোরআন পাঠান্তে উক্ত বণিককে আল্লাহর নাম জেকের করতে উপদেশ প্রদান করেছিলেন। শুভদিন নির্ধারণের জন্য ব্রাহ্মণগণ কোরআন আলোচনা করেন এবং বণিকগণ বাণিজ্য যাত্রার পূর্বে আল্লাহর নিকট নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতেন।</strong><script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p>হিন্দুগণ যে কোরআনকে একটি পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন এসমস্ত দৃষ্টান্ত হতে তা বিশেষ ভাবে প্রতীয়মান হয়। <strong>মুসলমানগণের ধর্মীয় উৎসবাদিতে হিন্দুরাও যোগদান করতেন। দৌলতরাও সিদ্ধিয় ও তাঁর পদস্থ কর্মচারীবৃন্দ মুলসমানদের মতো সবুজ পোশাক পরিধান করে মহরম মিছিলে যোগদান করেছিলেন। এমনকি ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দেও হ্যামিলটন বুকানম ভাগলপুরে লক্ষ্য করেছিলেন যে, হিন্দুগণ মুসলমানগণের একান্তভাবেই মহরম উৎসবে ব্যাপৃত হতেন।</strong> মুসলমান পিরের প্রতি ভক্তি জ্ঞাপন তাঁদের আর্শীবাদ কামনা ও দরগায় সিন্নি প্রদান হিন্দুগণের মধ্যে বিশষভাবে প্রচলিত ছিল। হিন্দুগণ কর্তৃক বংশপরস্পরায় শাহজামাল (শেখ জামাল সামদীর তাবরিজী) এর উদ্দেশ্যে প্রদর্শিত ভক্তির বিষয় শেষ শুভোদরায় বিশেষভাবে উল্লেখিত আছে। ইহার লেখক হলায়ুধ মিত্র লিখেছেন- &#8216;সর্বজন খ্যাত মরহুম শেখ জামাল, তোমার পদযুগলে আমি আমার অন্তরের শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করি।। আমার জীবন ও ধনসম্পদ রক্ষার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা জানাই। গৃহে প্রত্যাবর্তন করে আমি আমার সম্পত্তির অর্ধাংশ তোমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবো।&#8221; কবির কথায় আরো জানা যায় যে বহু লোক সেই পুণ্যাত্মার নিকট সন্তান লাভ কিংবা রোগ মুক্তির জন্য প্রার্থনা জানাত। তৎকালীন বহু হিন্দু কবিকে পিরের অনুরাগী ভক্তরূপে নিজের পরিচয় দিতে এবং আধ্যাত্মিক মুসলিম সাধকের স্তুতি করতে দেখা যায়। তাঁর পুস্তকের মুখবন্ধে তিনি প্রখ্যাত মুসলিম সাধক বড়খান গাজির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অপর একজন হিন্দু লেখক রূপরাম তাঁর ধর্মমঙ্গল গ্রন্থে সেলিমাবাদের পির বড়খানের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। রূপরাম বিশ্বাস করতেন যে, এই পিরের পুণ্যনাম জপের মাধ্যমে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিও বিপদমুক্ত হতে পারে। কৃষ্ণহরিদাস তাহির মামুদকে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু বলে গ্রহণ করেছিলেন। বাঙালি কবি বিদ্যাপতি তাঁর রচনায় বড়খান গাজি, জাফর খান গাজি, ইসমাইল খান গাজি প্রমুখ বহু মুসলিম পিরের স্তুতি গেয়েছেন। কৃষ্ণরাম দাসের রামায়ণ কাব্যে বাঙালি হিন্দু বণিক ও নাবিকবৃন্দের বড় খা গাজির প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার প্রকাশ রয়েছে। দুটি সম্প্রদায়ের বহু শতাব্দী ব্যাপী প্রতিবেশী হিসেবে বলিষ্ঠ অবস্থানের ফলে দৈনন্দিন জীবনে একে যে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হতো তা নিতান্তই স্বাভাবিক। পাঁচ শতাধিক বৎসর ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে বসবাস করবার ফলে বস্তুত বাংলার হিন্দু-মুসলমানগণের মধ্যে তাই ঘটেছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মুসলিম প্রভাব গভীরতর। হিন্দুগণের মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাসে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের এ প্রভাবের ফল বিশেষভাবে অনুভূত হয়। ইহা হিন্দু জীবনের ভিত্তিমূলে নাড়া দিয়েছিল। পক্ষান্তরে ধর্মীয় সারল্য ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দরুন মুসলমানগণকে জটিল হিন্দু সমাজ থেকে কিছুই গ্রহণ করতে হয় নি। এতদসত্ত্বেও বহু শতাব্দীর সহাবস্থানের ফলে মুসলিম সমাজে কিছু কিছু হিন্দু প্রভাব এসে পড়ে। এই প্রভাব আধ্যাত্মিক স্তরের। মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাসে নয় বরং বাহ্যিক আচার আচরণে এ প্রভাব সীমিত। নানাবিধ হিন্দু কুসংস্কার ও আচার আচরণ মুসলিম সমাজে অনুপ্রবিষ্ট হয়। এই ঘটনার জন্য হিন্দু সান্নিধ্য একান্তভাবে দায়ী নয়। বাঙালি মুসলমানগণের দৈনন্দিন জীবনে বহু অনৈসলামিক সংস্কার ও আচার-আচরণের জন্য ইসলাম ধর্ম নবদীক্ষিত হিন্দু ও বৌদ্ধগণের ভূমিকা সমধিক। ধর্মান্তরিত বৌদ্ধগণ মুসলিম সমাজে নাথ যোগী ও মুণ্ডিত মস্তক সন্যাসিগণের নানা বিশ্বাস ও আচরণ আমদানি করেন।</p>
<p>ভিন্ন সম্প্রদায়ের বহুল প্রচলিত ও লৌকিক বিশ্বাস ও স্থানীয় আচার-আচরণ মুসলিম সমাজে বহুকাল ধরে প্রচলিত থাকে। বিজয়গুপ্ত নামক ষোড়শ শতাব্দীর জনৈক কবির মতে হাসান ও অপরাপর মুসলমানগণ যমশত্রু সাপের আক্রমণ ভয়ে সর্পকূলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসাকে পূজা করত।</p>
<p>কবি কম্পিত মুসলমান কর্তৃক মনসাপূজার এই কাহিনী স্বীকৃত সত্যের মর্যাদা নাও পেতে পারে কিন্তু ইহা স্বীকার্য যে হিন্দুগণের বহুকিছু মুসলমান সাধারণভাবে বিশ্বাস করতেন যে একজন আদি ভৌতিক শক্তি সর্পকূলের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বহু মুসলমান হিন্দু দেবদেবী এবং পীঠস্থানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং তাদের অনুগ্রহের কার্যকারিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। কথিত আছে, মীরজাফর মৃত্যুশয্যায় তার মন্ত্রী নন্দকুমারের পরামর্শে কৃতিকাভরী মূর্তি ধোয়া কয়েক ফোটা পানি পান করেছিলেন। <strong>বহু মুসলমান কবি তাহার পুস্তকের মুখবন্ধে আল্লাহ রসুল ও পির মুর্শিদগণের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু দেবতার প্রশস্তিও গেয়েছেন। বহু মুসলিম কবি রাধাকৃষ্ণের স্তুতিমূলক গান রচনা করেছেন।</strong> &#8216;সমশের গাজির পৃথি&#8217; নামক কাব্যে উল্লেখিত আছে যে একদা রাত্রে এক দেবী স্বপ্নে কবির নিকট তিনবার আবির্ভূতা হন এবং দেবীর আদেশ অনুযায়ী অনুগত কবি পরবর্তী প্রভাতেই ব্রাহ্মণগণের সহায়তায় হিন্দু প্রথায় দেবীর পূজা সমাপণ করেন। একজন গাজি যে হিন্দু দেবীর পূজা করেছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাহোক এ ঘটনা হিন্দু দেবীর প্রতি মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ ভক্তি শ্রদ্ধার পরিচয় বহন করে।</p>
<p>মুসলমান হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবাদিতে অংশ গ্রহণ করতেন। মুর্শিদাবাদ নবাবের আমলে মুসলমান শাসক ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ, হিন্দু সম্প্রদায়ের হোলি উৎসবকে বিশেষ আনন্দের উৎসবের পরিণত করেছিলেন। সাহায্য নয়, সিরাজদ্দৌলা ও মীরজাফর মহা আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করতেন। বহু মুসলমান হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং শুভক্ষণ নির্ধারণে হিন্দুর মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আচারাদি পালন করতেন। বিষয়টা এতই সাধারণ ছিল যে ক্রাফটনের মতে, &#8220;হিন্দু ও মুসলমানদের জ্যাতির্বিদদের সমবেত গণনার ফলে বৎসরের প্রায় অর্ধেক দিন অশুভ বলে পরিগণিত হতো। সকল পরামর্শ সভার প্রধান গণৎকারের উপস্থিতি অপরিহার্য। নতুন কোনো কাজে হাত দেবার পূর্বে তার পরামর্শ সর্বাগে গ্রহণীয় এবং তার নিষেধবাণী রোমান সিনেটের একজন ট্রিবিউনের ভক্তির মতো অপ্রতিরোধ্য। নবাব সরফরাজ খান ও আলিবর্দী খান গণৎকারগণের পরামর্শক্রমে ভ্রমণ কিংবা অভিযানের শুভলগ্ন নির্ধারণ করতেন। নবাব মীরকাসিমও জ্যোতির্বিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন। ব্রাহ্মণ জ্যোতির্বিদদের দ্বারা তিনি তার নবজাত সন্তানের ঠিকজ্জী বাকুলজী প্রণয়ন করে নিয়েছিলেন।</p>
<p>এইভাবে হিন্দু মুসলমানগণ পরস্পরের সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করেছে। সামগ্রিক অর্থে বলতে গেলে মুসলমান শাসন আমলে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সমঝোতা ও সৌহার্দ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দুগণ মনের গভীরে মুসলমান বিদ্বেষ পোষণ করতেন। বাংলার মুসলিম শাসন আমলে পরবর্তী পর্যায়ে সে অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। কিন্তু এই সম্প্রদায়ভূক্ত সাধারণ মানুষ প্রতিবেশী সুলভ পারস্পরিক সু-সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বিরূপ মনোভাবের দ্বারা তারা প্রভাবিত হন নি। ক্রাফটন বলেন, &#8220;তবু একজন ইংরেজের পক্ষে বিস্মিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না যখন তিনি দেখতে পান যে সরাকারি পর্যায়ে বিপ্লবের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কি নগণ্য। বস্তুত ইহা দরবার কক্ষের ক্ষুদ্র গণ্ডীর বাইরে আদৌ অনুভূত হয় না।</p>
<p>হিন্দু মুসলমানগণের পারস্পরিক সমঝোতা ও সৌহার্দ বহু সাধারণ সাংস্কৃতিক প্রথার প্রশস্ত করেছে। পির, পাঁচপির, সত্যপিরের সেবা বাংলা সাহিত্য এবং আধ্যাত্ম মাইজ বাউল গোষ্ঠী এই প্রদেশে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের সাধারণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যতম কয়েকটি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সত্যপির ভক্তি</h5>
<p>সত্যপির বাংলার মুসলমানগণের এক সাধারণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এতে হিন্দু মুসলমানগণের ধ্যানধারণা ও আচার প্রথার সমন্বয় ঘটেছে। উভয় সম্প্রদায়ের সামাজিক সম্পর্কের ফলশ্রুতি হিসেবে সত্যপির ভক্তি মুসলমানগণের অদ্বৈতবাদ ও সামাজিক ন্যায় বিচারের উজ্জ্বল দাগ বহন করে। ইহার উৎপত্তি বিধায় নানা গল্প প্রচলিত আছে। বিষয়বস্তুর পার্থক্য এবং নানাযুগে নানা ব্যক্তিকে সত্যপিরের উদ্ভবের সঙ্গে জড়িত করলেও গল্পগুলোতে একটি যুগ সত্য বিধৃত তা হচ্ছে সত্যপির ভক্তির উপর মুসলমানগণের একেশ্বরবাদের ধারণা এবং সামাজিক ন্যায় বিচারে প্রাধান্য। একটি গল্পে ময়মনসিংহের কানকা নামে সমাজচ্যুত এক ব্রাহ্মণ সন্তান জনৈক মুসলমান সাধককে তার ধর্মগুরু হিসেবে বরণ করেন। পিরের আদেশে কানকা বিদ্যাসুন্দর কাহিনী নামক এক মহাকাব্য রচনা করেন। সত্যপিরের মাহাত্ম্য একটি প্রচার-ই ছিল এ কাব্যের উদ্দেশ্য। ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে হোসেন শাহের শাসন আমলে ইহা রচিত হয়। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে অপর একজন মূলসমান কবি ফরিদ আন্নাহ সত্যপিরের স্তুতিমূলক কাব্য রচনা করেন। এই ধর্মীয় পদ্ধতির উপত্তি সম্বন্ধে ভারতচন্দ্রের বক্তব্য এই যে একদা এক ফকির জনৈক ব্রাহ্মণের সামনে উপস্থিত হয়ে তার উদ্দেশ্যে শিরনি দাবি করেন। ব্রাহ্মণ ইহা প্রদানে অস্বীকার করলে ফকির অদৃশ্য হয়ে যান। এই ঘটনা হতে ব্রাহ্মণ উপলব্ধি করতে পারলেন যে হিন্দুদেবতা হরি (সত্য) এবং মুসলমান ফকির মূলত এক এবং অভিন্ন। অতএব উক্ত ব্রাহ্মণ সত্যপিরের উদ্দেশ্যে শিরনি প্রদান পূর্বক তার পূজা করেন।</p>
<p>আবার এক গল্পে সত্যপিরকে সত্যনারায়ণরূপে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু এ কাহিনীটিতে উপরোক্ত ঘটনার মর্ম বিধৃত। এই কাহিনী অনুসারে এক বণিক সত্যনারায়ণের আর্শীবাদে এক কন্যা সন্তান লাভ করেন। কন্যার বিবাহের পর বণিক ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাত্রা করেন। তার জামাতাও তার অনুগামী হয়। কিন্তু সত্যনারায়ণের পূজা না করে বিদেশে তারা ভয়ানক বিপদে পড়েন। বণিক পত্নী সত্যনারায়ণের পূজা করেন, বণিক বিপদমুক্ত হন। প্রত্যাবর্তনের পথে যখন তারা গৃহের সন্নিকটে আসলেন বণিক তনয়া সত্যনারায়ণের নৈবদ্যের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে। ফলে বণিকের পণ্যবাহী জাহাজসমূহ জলমগ্ন হয়। সত্যনারায়ণের উপাসনার মাধ্যমে তারা আবার সবকিছু ফিরে পান। কাহিনীসমূহ হতে এই সত্য প্রতীয়মান হয় যে সত্যপির সংক্রান্ত ধর্মীয় পদ্ধতি মুসলিম প্রভাবিত হিন্দু সমাজ হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। সত্যপির ভক্তির উৎসে রয়েছে অসাধরণ আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পন্ন মুসলমান সাধকগণের প্রতি হিন্দু জনগণের শ্রদ্ধাবোধ। সুফি ও পীরের প্রতি হিন্দুদের স্বাভাবিক ভক্তির ফলশ্রুতিরূপে ইহাকে গণ্য করা যেতে পারে। হিন্দুগণ পীরের অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাদের কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতেন। কালক্রমে হিন্দুদের এই পিরপূজা প্রথা সত্যপির পূজা পদ্ধতিতে রূপ লাভ করে। সত্যপিরের উপাসনা দ্বারা কাম্য বস্তু লাভ করা যায় এ সাধারণ বিশ্বাসের বহু দৃষ্টান্ত সমসাময়িক সাহিত্যে চিত্রিত। কবির কাব্যে হিন্দু দেবতার সঙ্গে মুসলিম পিরের সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়। অন্য কথায় মুসলমানের পির হিন্দুগণ কর্তৃক দেবত্বমণ্ডিত হতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি বিদ্যাপতি সত্যপিরের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য নিবেদন করে বলেছেন যে পিরের স্মৃতি জগতে অমর করে রাখবার জন্য তার আদেশে তিনি কাব্য চর্চা করতেন। দুঃখী জনের দুঃখ মোচনের জন্য সত্যপিরের আবির্ভাব। বিদ্যাপতি এ সত্য প্রচার করতেন। বহু হিন্দু ও মুসলমান কবি সত্যপিরের স্তুতিমূলক কাব্য রচনা করেন। শ্রী কবি বল্লভ বিরচিত &#8216;মদন সুন্দর পাচালী&#8217;তে প্রধান যে হিন্দুদের মধ্যে সত্যপির ভক্তিপ্রথা নিতান্তই সাধারণ ছিল এবং তারা শিরনি সহযাগে উক্ত পিরের পূজা করতেন। শরিফ নামক একজন মুসলমান কবি সত্যপিরের উদ্দেশ্যে ভক্তিমূলক কাব্য রচনা করেন। অপর একজন বাঙালি কবি শঙ্করাচার্য তার কাব্য সৃষ্টির মাধ্যমে সত্যপির ভক্তি প্রচার করেন। এমনকি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে একজন হিন্দু নিজেকে সত্যপিরের ভক্ত হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকার করতেন এবং এই হিতৈষী অবতারের পূজার প্রেরণা দান করতেন। ইপ্সিত ফল তার ক্ষমতার ব্যাখ্যায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন। কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণ কোরআনশরিফ পাঠ করাকে ধর্ম বিগর্হিত কাজ বলে আখ্যায়িত করেন। তখন ব্রাহ্মণ বালকরূপে আবির্ভূত হয়ে সত্যপির একখানি পবিত্র কোরান গ্রন্থ হাতে তুলে নেন। তার অভিভাবকবৃন্দ উহাকে মানতে নিষেধ করে এবং তাকে সাবধান করে দেয়া হয় যে কোরআনশরিফ পাঠ করলে সে তার নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ বালক ঈশ্বরের একত্ব প্রচার করেন এবং দাবি করেন যে বিষ্ণু এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।</p>
<p>সত্যপিরের ভক্তি বাঙালি সামাজজীবনে বিপুল শক্তি হিসেবে বহু শতাব্দী প্রচলিত ছিল। এই ঘটনা থেকে তার প্রভাব প্রমাণিত হয় যে, সত্যপির বিষয়ে বাংলায় একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য রচিত হয়েছে এবং এই সাহিত্যকে বৈষ্ণব সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সত্যপির মতবাদ বাস্তবিকই এরূপ একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় বুদ্ধি বৃত্তিক আন্দোলন ছিল যা সে যুগের লোকের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। ইহা হিন্দুদের ধর্মীয় সামাজিক বিশ্বাসসমূহেরও আচার অনুষ্ঠানগুলোর জটিলতাসমূহ অপসারণ করে সেখানে সহজ ও সরল বিশ্বাস প্রবর্তন করেছিল এবং উদারতার ভিত্তিতে হিন্দু সমাজের উন্নতির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। সত্যপিরের উপর রচনাসমূহ বাংলা সাহিত্য ঐশ্বর্যশালী করেছিল। ইহা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার আবহাওয়া সৃষ্টি করে। তা এখনও বাংলায় কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্যমান আছে। উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গে অনেক হিন্দু ও মুসলমান এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যপিরের পূজা করে। তারা একটি তক্তার উপর সত্যপিরের আসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ইহা ফুল দ্বারা সজ্জিত করে। পূর্ণিমার দিন তারা সত্যপিরের আরাধনার শিরনী দেয়। মোল্লা মন্ত্র পাঠ করেন এবং তারপর লোকের মধ্যে শিরনি বিতরণ করা হয়। রাজশাহী জেলায় সত্যপিরের ভিটা নামক একটি স্থান আছে। এর তত্ত্বাবধায়কগণ এখনও নিষ্কর জমি ভোগ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-coordination-of-islam-and-hinduism-during-the-mughal-period/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16260</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুঘল আমলে মুসলিম বাংলায় কৃষির অবস্থা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-agriculture-in-muslim-bengal-during-the-mughal-period/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-agriculture-in-muslim-bengal-during-the-mughal-period/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. এম এ রহিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 15 Oct 2025 13:16:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16244</guid>

					<description><![CDATA[বর্তমানের ন্যায়, মুসলিম আমলেও বাংলা প্রধানত একটি কৃষিপ্রধান দেশ ছিল এবং কৃষি-সম্পদে ইহা সমৃদ্ধিশালী ছিল। কৃষি সমৃদ্ধি ছিল বাংলার মাটির উর্বরতার অবদান। আবহমান কাল ধরে এর মাটির উর্বরতার খ্যাতি ছিল। প্রকৃতি এই প্রদেশের প্রতি সদয় ছিল। অসংখ্য নদ-নদী ও স্রোত-স্বিনীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বর্তমানের ন্যায়, মুসলিম আমলেও বাংলা প্রধানত একটি কৃষিপ্রধান দেশ ছিল এবং কৃষি-সম্পদে ইহা সমৃদ্ধিশালী ছিল। কৃষি সমৃদ্ধি ছিল বাংলার মাটির উর্বরতার অবদান। আবহমান কাল ধরে এর মাটির উর্বরতার খ্যাতি ছিল। প্রকৃতি এই প্রদেশের প্রতি সদয় ছিল। অসংখ্য নদ-নদী ও স্রোত-স্বিনীর জলে বিধৌত একটি উর্বরা দেশ বাংলা স্বাভাবিক জলসেচের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে; ফলে এই প্রদেশে প্রচুর শস্য শাকসব্জি, ফল-মূল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়েছে। প্রাকৃতিক জলসেচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের আশীর্বাদ। এ সবই বাংলাকে পরিচিত করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর অঞ্চলরূপে। সমসাময়িক লেখকগণ এবং বিদেশী পর্যটকগণ এর প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য দৃষ্টে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়েছেন। ইবনে বতুতা লিখেছেন যে, তিনি মেঘনার উভয় তীরে উদ্যানরাজি, শস্যপূর্ণ মাঠ ও জনবহুল সমৃদ্ধ গ্রামসমূহ দেখতে পান। পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় আগত চৈনিক দূতগণও এর উর্বরতা শক্তি ও প্রাচুর্য লক্ষ্য করেছেন। এদের একজন মন্তব্য করেছেন, “সপ্তস্বর্গ এই রাজ্যে পৃথিবীর স্বর্ণরাজি ছড়িয়ে রেখেছে।” বাংলার উর্বরতার কাহিনী এত বেশি প্রচলিত ছিল যে, আবুল ফজল লিখেছেন যে, ধানের গাছ গুলো এক রাতেই ৬ হাত বেড়ে উঠতো এবং বাংলার মাটিতে বছরে তিনটি ফসল জন্মাতো। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে বাংলার পরিদর্শন করে বার্ণিয়ার লিখেছেন যে, তিনি সমগ্র প্রদেশব্যাপী বহু নদীনালা ও খাল-বিল দেখতে পেয়েছেন এবং এগুলোর চতুর্দিকে শস্য ও ফলে ভরা উর্বর ও সবুজ মাঠ এবং শ্রেণিবদ্ধ ঘন বসতিপূর্ণ বহু শহর ও গ্রাম সাজানো ছবির মতো শোভা পাচ্ছিল। বিদেশীরা বাঙালি জনসাধারণের বুদ্ধিমত্তা ও পরিশ্রমী প্রকৃতির উল্লেখ করেছেন। চৈনিক দূতগণ লিখেছেন যে, বাংলায় পুরুষ রমণী উভয়ে মাঠে কাজ করে, তাদের শস্যের মৌসুম শেষ হলে, অবসর সময়ে তারা কাপড় বুননের কাজে নিয়োজিত হয়। বাঙালি কৃষকদের পরিশ্রমী প্রকৃতির প্রশংসা করে আলেকজান্ডার ডোউ লিখেছেন যে, পঞ্চদশ মিলিয়ন পরিশ্রমী লোক অধ্যুষিত বাংলাকে প্রকৃতি কৃষির জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে সুবিধাজনক অঞ্চলরূপে নির্বাচিত করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>চাউল</strong></p>
<p>মাটির অসাধারণ উর্বরতা শক্তি ও অধিবাসীদের পরিশ্রমী প্রকৃতি বাংলায় শস্য, শাক-সব্জি ও ফলমূলের প্রাচুর্য সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। এগুলো এত বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হতো যে, বাংলার অধিবাসীদের চাহিদা মেটানোর পরও বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত থাকত। মিঃ ওরম বলেন যে, বঙ্গভূমি এত প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন করত যে তা&#8217; তারা এক ফার্দিং মূল্যে (সস্তা দামে) বিক্রয় করে দিত। চাউল ছিল প্রদেশের প্রধান কৃষিজ উৎপন্ন দ্রব্য। বাংলাদেশে সরু, মধ্যম ও মোটা বিভিন্ন প্রকার চাউল জন্মাতো। বিভিন্ন প্রকার চাউলের উল্লেখ করে আবুল ফজল বলেন, &#8220;যদি প্রত্যেক প্রকারের শস্যের একটি করে কণাও সংগ্রহ করা যায়, তাহলে তাতেও একটা বিরাট ভাণ্ড ভরে উঠবে।” সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে উল্লেখিত ধান্যের অসংখ্য নাম থেকে এর বৈচিত্র্যে এবং প্রদেশের কৃষিজীবনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত মিলে। এ সবের কিছু সংখ্যকের নাম ছিল আমলো, আষাঢ়ে, আশাঙ্গ, উড়াশালী, কাকচী, কনকচুর, কাঙ্গাদ, কামা, তুজনা, কালাকরিৎ, মুসুমালী, খিরাকম্বা, খেজুরসারি, খাইমরাই, গুজুরা, গুনতামপালাল, গোপালজুরী, গোপালভোগ, ছিছড়া, ঝিঙ্গাশাল মুক্তাহার, মাওকালো, লাউসালী, পর্বতীজিরা, ফেরফেরী, ভোদোলী, মইপল, শানাখারকী, সলছটি, সীতাসালী, হালিপাঞ্জর, মাউকলাস, লালকামিনী, বাঁশমতি, বোয়ালী ইত্যাদি। চাউল এত প্রচুর পরিমাণ উৎপন্ন হতো যে, এটা রপ্তানির একটি প্রধান পণ্যরূপে পরিগণিত হতো। বার্নিয়ার মন্তব্য করেছেন, &#8220;বাংলায় এত বেশি চাউল উৎপন্ন হয় যে, ইহা কেবল প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেই তাহা সরবরাহ করে না, বরং দূরবর্তী রাজ্যেও প্রেরণ করে থাকে। গঙ্গার উপর দিয়ে বহন করে চাউল পাটনায় নিয়ে আসা হয় এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে মসুলীপত্তন ও করোমণ্ডলের অন্যান্য বহু বন্দরে রপ্তানি করা হয়। বিদেশী রাজ্য প্রধানত সিংহল ও মালদ্বীপেও এই চাউল পাঠানো হতো।&#8221; মিঃ বার্থলোমিউ পাইসটেড ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন যে, বালীসোরের ইউরোপীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো মালদ্বীপের সঙ্গে চাউল ও অন্যান্য শস্যের খুব ভালো ব্যবসা চালিয়েছিল।</p>
<p>বিভিন্ন প্রকার শস্য, যেমন জনার, তিলতিষি, শিম বা বরবটি এবং নানা প্রকার শাক-সব্জি, পেয়াজ, রসুন, শসা, লাউ ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে জন্মাত। নারিকেলও প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো বলে পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে তা&#8217; রপ্তানি করা হতো। লঙ্কা, আদা ও হলুদ বিপুল পরিমাণে জন্মাতো। এবং এগুলো উপমহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে ও পশ্চিমে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এবং পূর্বদিকে ম্যানিলা ও চীন পর্যন্ত রপ্তানি করা হতো।<br />
<script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<!-- Fixed size ads --><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: inline-block; width: 728px; height: 90px;" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="3128429081"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<h5>গম</h5>
<p>মুসলিম শাসনামলে বাংলায় ভালো ধরনের গম উৎপন্ন হতো। এর গম উৎপাদন অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ডাচ পরিব্রাজক স্ট্যাভোরিনাস ১৭৬৯-১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণ করে লিখেছেন যে, বাংলায় উৎকৃষ্ট গম উৎপন্ন হতো এবং পূর্বে এসব গম বাটাভিয়ায় পর্যন্ত পাঠানো হতো। পরবর্তীকালে উত্তমাশা অন্তরীপের গম শস্যের ব্যবসায়ের জন্য অনুকূল অবস্থা সৃষ্টির জন্য ঈস্টইণ্ডিয়া কোম্পানি বাংলার গম রপ্তানি নিরুৎসাহিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ইক্ষু</h5>
<p>ইক্ষু ছিল বাংলার আর একটি প্রধান কৃষিজ উৎপন্ন দ্রব্য। উহার উৎপাদন ছিল ব্যাপক। ষোড়শ শতকের &#8216;বেঙ্গালা&#8217; শহর পরিদর্শন করে বারবোসা এই এলাকার চিনি উৎপাদনের কথা &#8216;উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, এই শহরে ভালো ধরনের চিনি তৈরি হলেও তারা এ দিয়ে চিনির তাল তৈরি করতে জানে না। বেঙ্গালা থেকে চিনি রপ্তানির প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, &#8220;চিনি দিয়ে তারা বহু জাহাজ বোঝাই করে এবং বিক্রির জন্য অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি করে।&#8221; ইতালীয় বণিক লিউইচ বার্থেমা ১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণ করেন এবং এর চিনি উৎপাদন লক্ষ্য করেন। বাংলায় সমগ্র মুসলিম আমলব্যাপী ইক্ষু একটি সমৃদ্ধিশালী কৃষিজ পণ্য ছিল। সপ্তদশ শতকে চিনি সম্পর্কে বার্নিয়ার বলেন, &#8220;বাংলা প্রচুর চিনি উৎপাদন করে এবং তা&#8217; গোলকুণ্ডা ও কর্ণাটি রপ্তানি করে থাকে। এছাড়া মোকা ও বসোরা শহরের মাধ্যমে আরব ও মেসোপটেমিয়া প্রভৃতি রাজ্যে এবং এমন কি বন্দর আব্বাসের মধ্য দিয়ে পারস্যে চিনি রপ্তানি করা হয়ে থাকে। &#8221; ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে ডাচ বণিকদের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, &#8220;চিনির বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০,০০০ মণ; এতে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ লাভ হতো এবং সাধারণত এর মূল্য স্বর্ণ মুদ্রায় দিতে হতো।” পরবর্তীকালে এই উপমহাদেশের পশ্চিমাংশের বাজারে ডাচ ব্যবসায়ীগণ কর্তৃক আমদানিকৃত জাভা চিনির প্রতিযোগিতার ফলে বাংলার চিনি রপ্তানি বাণিজ্য হ্রাস পায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>পাট</h5>
<p>চতুর্দশ শতক থেকে বাংলা সাহিত্যে পাট ও পাটজাত বস্ত্রের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম শাসনের প্রারম্ভ কাল থেকে বাংলায় পাটের উৎপাদন বিদ্যমান ছিল। এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে এ শস্যের একটি বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।</p>
<p>আবুল ফজল ষোড়শ শতকে বাংলায় পাট উৎপাদন, যেমন পট্টবস্ত্র ইত্যাদির উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, &#8220;বাংলার গোড়াঘাট সরকারে রেশম এক প্রকার চটের কাপড়ের উৎপাদন ছিল।&#8221; পাটের তত্ত্ব দিয়ে তৈরি সেযুগো চটের থলে এবং মোটা বস্ত্র তৈরি হতো। ষোড়শ শতকের বাংলা সাহিত্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রদেশের পট্টবস্ত্র রপ্তানির প্রমাণ রয়েছে। &#8216;মনসামঙ্গল&#8217; গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, চাঁদসওদাগর পাটের শাড়ি ও ধুতি ইত্যাদি বহু পণ্য দ্রব্য নিয়ে একটি দেশে ব্যবসায় করতে যান। তিনি চাতুর্যের সঙ্গে সেই দেশের রাজার নিকট এই পট্টবস্ত্রের গুণের উচ্চ প্রশংসা করেন। অতঃপর রাজা তদীয় রাণী ও নিজের জন্য কয়েকখানা বস্ত্র ক্রয় করতে প্রলুব্ধ হন। ফরাসি ব্যবসায়ী টাভার্নিয়ার সর্বপ্রথম বাংলার পাট উৎপাদনের বিষয় ইউরোপীয়দের নজরে আনেন। এরপর থেকে চটের থলে রপ্তানির একটি প্রধান বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। ঈস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিককার দলিলপত্রে পাটের চট রপ্তানির উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ অগাস্ট তারিখের একটি পত্রে বোম্বাইয়ে কোম্পানির সভাপতি এবং পরিষদ পাটের চটের জন্য এক চুক্তিপত্রে আবদ্ধ হন। ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ২১শে জুলাই তারিখের মাদ্রাজ কাউন্সিলের অন্য একটি দলিলে পাটের চটের জন্য অনুরূপ আর একটি চুক্তি পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের পাবলিক প্রোগ্রেস ভলুমে ১,২০০ বস্তা সরু চাউল ও ২,০০০ চটের থলের জন্য আর একটি ফরমাস পত্রের উল্লেখ রয়েছে। উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে পর্যন্ত হাতে বোনা কাপড় ও পাটের তৈরি বস্তার রপ্তানি-বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। ঈস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিলপত্র থেকে জানা যায় যে, ১৮৪০-৫১ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতা থেকে রপ্তানিক্ত চটের থলে ও কাপড়ের সংখ্যা ছিল ৯০,৩৫,৭১৩ এবং এর মূল্য হয়েছিল ২১,৫৯,৭৮২ টাকা। হাতে বোনা পাটজাত পণ্যদ্রব্য পাটের কল-কারখানা স্থাপনের পর হ্রাস পেয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>নীলচাষ</h5>
<p>প্রাচীনকাল থেকে উপমহাদেশের অন্যান্য কিছু এলাকার মতো বাংলায়ও নীলের চাষ বিদ্যমান ছিল। সপ্তদশ শতকের মধ্য ভাগে এটা ইউরোপীয় বণিকদের নজরে আসে। এই সময় থেকে ইউরোপীয় বাজারে নীল রঙ প্রদেশের একটি রপ্তানিযোগ্য পণ্যদ্রব্য ছিল। ফরিদপুর, ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ ও যশোহর জেলায় নীলের চাষ হতো। ইংরেজরা আমেরিকা হারানোর পর বাংলাকেই তারা নীল রঙের প্রধান সরবরাহকারী রূপে পরিগণিত করে, ফলে এই সমস্ত জেলায় নীলের চাষ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজ নীলকররা কৃষকদেরকে অগ্রিম দাদন দিয়ে নীল চাষের অধীনে বেশি জমি আনয়ন করার জন্য বাধ্য করে। কিন্তু তারা চাষীদেরকে এরূপ মূল্য দিত যা&#8217; দিয়ে এই শস্যের চাষাবাদের খরচও সংকুলান হতো না। ইংরেজ নীলকররা তাদের নিজস্ব সরকারের অধীনে হতভাগ্য কৃষকদেরকে নীলের চাষ অব্যাহত রাখতে বাধ্য করত। তারা কৃষকদের উপর অবিচার ও উৎপীড়ন করত। এরূপে নীল চাষ প্রদেশের কৃষকদেরকে সর্বশান্ত করে ফেলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>আফিম</h5>
<p>আফিম গাছের চাষ উত্তর বাংলা ও বিহারের কতিপয় জেলায় প্রচলিত ছিল। বহু লোক এই মাদক ঔষধের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। আফিম অন্যান্য দেশে রপ্তানির অন্যতম পণ্য ছিল। চীন বাংলার আফিমের প্রধান ক্রেতা ছিল। প্রদেশে আফিম ক্রয়ের উপর বাধা নিষেধ ছিল। কৃষকগণ কেবল সরকার অনুমোদিত ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি করতে পারত। সপ্তদশ শতক থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো আফিম ক্রয় ও রপ্তানি বাণিজ্যে একচেটিয়া মুনাফা করে। ঈস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার রাজস্ব লাভের উদ্দেশ্যে আফিম চাষীদের থেকে আফিম ক্রয়ের উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেন। প্রায় সমস্তটা আফিমই রপ্তানি করা হতো। রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত ঠিকাদাররা চাষীদের প্রতি অত্যাচার উৎপীড়ন করে মূল্য কমিয়ে দিত এবং মূল্য প্রদানেও তাদেরকে ঠকাত। কৃষকরা হয় চোরা কারবারিদের নিকট বিক্রি করত অথবা আফিমের চাষ পরিত্যাগ করত। ফলে বাংলায় আফিমের চাষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>লাক্ষা</h5>
<p>প্রাচীনকাল থেকে উত্তর বঙ্গের কয়েকটি জেলাতে লাক্ষার চাষ করা হতো। এটা গালা ও রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আঠালো লাক্ষা ছিল গালা এবং এর সঙ্গে পোকা-মাকড় অথবা এর ডিম্ব মিশ্রিত করে তা থেকে রঙ বানানো হতো। রঙ করার অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো আলাদা করা হতো এবং রঙে পরিণত করা হতো। আঠা দিয়ে পাতগালা তৈরি করা হতো। লাক্ষা রঙ উজ্জ্বল লাল রঙ্গের বস্ত্রাদি রঙ করার জন্য ব্যবহৃত হতো। লাক্ষা আবার বার্নিশরূপেও ব্যবহৃত হতো। উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে এবং বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। বাংলায় উত্তম লাক্ষা উৎপাদিত হতো এবং এই পণ্যের ক্ষেত্রে কার্যত বিদেশী বাজারের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল তাদের। ষোড়শ শতকে বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করে বার্থেমা ও বারবোসা এই প্রদেশ থেকে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লাক্ষা রপ্তানি ব্যবসায় লক্ষ্য করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সুতা</h5>
<p>বাংলার বিশেষ কিছু এলাকায় উত্তম ধরনের সরু সুতা উৎপাদিত হতো। এই তত্ত্ব বিশ্ববিখ্যাত সূক্ষ্ম বস্তু মসলিন তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতো। জনৈক ইংরেজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি জে, বি. টেলর অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে বাংলাদেশে বিশেষত ঢাকায় বহু বছর বসবাস করেছিলেন। তিনি প্রদেশের এ অংশে উৎপাদিত তত্ত্বর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তাঁর মন্তব্য উদ্ধৃতিযোগ্য। তিনি বলেন,</p>
<p>&#8220;ঢাকার ১২ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ফিরিঙ্গি বাজার থেকে বিস্তৃত মেঘনা নদীর তীর ধরে ইদিলপুর পর্যন্ত, সাগরের ২০ মাইল উত্তরে দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ মাইল এবং প্রস্থে কোনো কোনা স্থানে তিন মাইল এবং কেদারপুর, বিক্রমপুর, রাজেন্দ্রপুর, কার্তিকপুর, শ্রীরামপুর ও ইদিলপুর পরগণায় অবস্থিত।<strong> ঢাকা প্রদেশের এই অঞ্চলে উৎকৃষ্টতম কার্পাস উৎপন্ন হয়; এবং আমি বিশ্বাস করি যে, পৃথিবীর অন্য কোথাও এরূপ উৎকৃষ্ট কার্পাস উৎপন্ন হয় না। ভারতের অন্য কোনো অঞ্চলের অথবা মরিটানিয়া দ্বীপপুঞ্জের অথবা বোর্বেনের যেখানের কার্পাসের খ্যাতি আছে এবং আমি যতটুকু খবর রাখি পৃথিবীর কোনো স্থানে উৎপন্ন কার্পাস ঢাকা অঞ্চলে উৎপন্ন কাপাসের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে না এবং গুণের ভিত্তিতে সমকক্ষ হতে পারে না।</strong> উপরোক্ত কার্পাসের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ এই যে এই অঞ্চল সমুদ্রের নিকট অবস্থিত; স্রোতের প্রবাহের সঙ্গে সমুদ্রের পানি মেঘনার পানির সঙ্গে মিশে এই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে; বছরের তিন মাস এরূপ হয়; এতে জমিতে বালি ও লবণের কণার পলিমাটির পাতলা আবরণ পড়ে এবং তা&#8217; জমি উন্নত ও উর্বর করে তোলে। এটাও মনে করা হয় যে, বিশুদ্ধ সমুদ্র-বায়ু কাপাস চারা বৃদ্ধির অনুকূলে কাজ করে। ফিরিঙ্গিবাজার থেকে ইদিলপুর, লক্ষ্যা নদীর ও ধলেশ্বরী নদীর তীরভূমি রূপগঞ্জের কিছুটা উপর পর্যন্ত ১৬ মাইল বিস্তৃত এবং ছোট ব্রহ্মপুত্রের তীরভূমির ধলেশ্বরীর উত্তর কয়েক মাইল এলাকা ঢাকা প্রদেশে (বর্তমান ঢাকা জেলা) ব্যবহৃত অধিকাংশ কার্পাস সরবরাহ করে। অবশিষ্টাংশ কার্পাস বলদাখাল (ঢাকা জেলার একটি পরগণা), ভাওয়াল ও আলেপসিংহ (ময়মনসিংহের পরগণা) এলাকায় উৎপন্ন হয় এর কতক ভূষণা (যশোহর জেলার পরগণা) এবং পার্শ্ববর্তী রাজশাহী প্রদেশ হতে সরবরাহ করা হয়।&#8221; অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে কার্পাস তুলার বীজ বপন করা হয় এবং এপ্রিল ও মে মাসে এ ফসল উঠে। গাছগুলো ৩ থেকে ৪ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। কার্পাস ফসল সংগ্রহের পর এদের চারাগুলো শিকড়সহ উপড়ে ফেলা হয়। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পরবর্তী বীজ বপনের পূর্বে, একই জমিতে ধারেন চাষ হয়ে থাকে। চতুর্থ বছরে এধরনের অনাবাদী রাখা হয়, অথবা অন্য কোনো ফসলের জন্য ব্যবহার করা হয়।</p>
<p>ইংরেজ রেসিডেন্ট জে. বেব্ব লিখেছেন যে, &#8220;বাংলার সুতা বিশেষ করে ঢাকা অঞ্চলের সুতা সমগ্র পৃথিবীর যে কোনো সুতা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ছিল। এবং এ থেকে আশ্চর্য রকমের সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো।&#8221; প্রথমে ব্রিটিশ উৎপাদকরা ভেবেছিলেন যে সুরাটের সুতাই সর্বোৎকৃষ্ট মানের। কার্যত সুরাট ও উত্তরাঞ্চলীয় সুতা সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র তৈরির জন্য অনুপযোগী ছিল। এই মসলিন বস্ত্র উপরোল্লিখিত অঞ্চলে চাষকৃত &#8216;ফটি&#8217; নামে অভিহিত একমাত্র বাংলার সুতার সাহায্যেই তৈরি হতো। &#8216;ফটি&#8217; এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে দু&#8217;বার সংগ্রহ করা হতো। সূক্ষ্ম বস্ত্রাদি যেমন মলমল আল্লাবালি, দোরিয়া, তেরিদ্দাম, তানজিব, শরবতি ও নয়নসুখ ইত্যাদি ফটি সুতার সাহায্যে তৈরি হতো। মালদাতে &#8216;বরাবুঙ্গা&#8217; &#8216;বিরেটা&#8217; ও &#8216;নূরমা&#8217; ইত্যাদি তিন প্রকারের সুতার উৎপাদন ছিল। &#8216;বরাবুঙ্গা&#8217; সুতা ছিল কমনীয় এবং সূক্ষ্ম কিন্তু এর উৎপাদনের পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। সাধারণত অপেক্ষাকৃত মোটা রকমের &#8216;নূরমা&#8217; ও &#8216;বিরেটা&#8217; বাইরে রপ্তানি করা হতো। রংপুরে &#8216;চিস্তিয়া&#8217; নামক এক প্রকার নিম্নমানের সুতা উৎপাদতি হতো। বীরভূমের সুতার উৎপাদন ছিল ব্যাপক, কিন্তু এর দ্বারা কেবলমাত্র মোটাবস্ত্র তৈরি হতো। বর্ধমানে &#8216;নূরমা&#8217; মুহরী&#8217; ও বোগ্লা এই তিন প্রকারের সুতার অস্তিত্ব ছিল। নয়নসুখ, মলমন্স, শরবতি, দোরিয়া ইত্যাদি বস্ত্র তৈরির জন্য নূরমা সুতা ব্যবহৃত হতো। গোজি ও গুররা বস্ত্রের জন্য &#8216;মুহরী&#8217; এবং &#8216;গুররা&#8217; মিশালী কাপড়ের জন্য &#8216;বোগ্‌গা&#8217; ব্যবহৃত হতো। রাধানগরে &#8216;কাউর&#8217; মুহরী ও &#8216;বোগ্‌গা&#8217; এ তিন প্রকারের সুতা প্রস্তুত হতো। &#8216;কাউরে&#8217; চমৎকার সূক্ষ্ম সুতা হতো। মেদিনীপুরে কুরেরারা ও &#8216;মুহরী&#8217; ও দুপ্রকারের সুতার উৎপাদন ছিল। কুরেরারা ছিল কোমল ও সূক্ষ্ম ধরনের এবং এ সুতা সূক্ষ্ম বস্ত্রাদি যেমন, &#8216;নয়নসুখ,&#8217; শরবতি ও অন্যান্য প্রকার মসলিন তৈরির জন্যে ব্যবহৃত হতো। &#8216;মুহরী&#8217; সুতা দিয়ে &#8216;দিমিতি&#8217; ও অপেক্ষাকৃত মোটা অন্যান্য কাপড়াদি বোনা হতো। উত্তরে ব্রহ্মপুত্র ও দক্ষিণে চলন বিলের মধ্যবর্তী হরিয়াল অঞ্চলে &#8216;দেশী&#8217; ছিল অপেক্ষাকৃত মোটা শান্তিপুর অঞ্চলের সুতা ছিল উৎকৃষ্ট মানের। এটা উল্লেখযোগ্য যে, বাংলায় উৎপন্ন কাপাস তুলা মসলিন তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। ইংরেজরা বাংলাদেশে তাদের কল-কারখানায় সাধারণ কাপড়-চোপড় তৈরির জন্যে সুরাট ও মীর্জাপুর থেকে সুতা আমদানি করত। মসলিম প্রস্তুতের জন্য সুরাটের সুতা উপযোগী ছিল না।</p>
<p>মুসলিম আমলে ভাতের সঙ্গে মাছ ছিল বাংলার মানুষের প্রধান খাদ্য। আবুল ফজল বাংলার মাছের প্রাচুর্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রদেশের নদ, নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিসমূহ মাছে ভরা ছিল। বাংলা মুল্লুকে মুগল নৌ-বাহিনীর সেনাপতি মীর্জা নাথন প্রসঙ্গত এ বিষয়ের উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন যে, মুগল নৌ-বাহিনী যখন করাতোয়া নদী দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল তখন নদীর মাছ পানি থেকে লাভ দিয়ে উঠে এবং সৈন্যদের রণবাদ্য ও কামান-গোলা ইত্যাদির কাছে বহু মাছ নৌকার মধ্যে পড়ে যায়। মীর্জা নাথন সুবাদার ইসলাম খানকে তার তাঁবুতে বড় বড় চল্লিশটি মাছ উপঢৌকন পাঠান। ইসলাম খান তাঁর খাবার জন্য বাবুর্চিকে মাছ রান্না করতে আদেশ দেন। গবাদি ও গৃহপালিত পশু যেমন, গরু উষ্ট্র, ভেড়া, বকরী, অশ্ব ও খচ্চর ইত্যাদি সম্পদে বাংলাদেশ ঐশ্বর্যশালী ছিল। প্রদেশে হাঁস-মুরগি, রাজহাঁস এবং অন্যান্য বহু পাখিও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত।</p>
<p>আবুল ফজল বাংলাদেশে নানা ফুল ও ফলের প্রাচুর্যের উল্লেখ করেছেন। সুপারির প্রাচুর্যের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, যারা সুপারি খায় তাদের মুখ লাল রঙে রঞ্জিত হয়। সুপারি ও পান বাংলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জন্মে। অন্যান্য ফল যা&#8217; বাংলায় প্রচুর জন্মাত, তাহলো আম, কাঁঠাল, কলা, ডালিম, খেজুর, কমলা, সানতারাহ ইত্যাদি। সিলেট সরকারে ঘৃত-কুমারী মাঠে সমৃদ্ধ বনভূমি ছিল; এসব কাঠ রপ্তানির জন্য মূল্যবান পণ্য ছিল। লোহা ও হীরক ছিল বাংলার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য খনিজ দ্রব্য। সরকার বাজুহাতে লৌহখনি এবং মান্দারন সরকারের হরপাতে হীরক খনি ছিল।<br />
<script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<h5>রেশমি বস্ত্র</h5>
<p>বাংলার রেশমি বস্ত্রের উৎপাদন সুবাদার, নবাব ও অভিজাত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। রেশমি ও মসলিন বস্ত্রের খুব ব্যাপক চাহিদা ছিল। উচ্চ ও অভিজাত শ্রেণির মেয়ে ও পুরুষ সকলে রেশমি ও মসলিন বস্ত্র পরিধান করত। সমসাময়িক, বাংলা সাহিত্যে অভিজাত পরিবারের মহিলাগণ কর্তৃক রেশমি শাড়ি ব্যবহারের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। বাংলায় তুঁত গাছ ও গুটি পোকার চাষ করা হতো। চৈনিক দূতগণ এটা লক্ষ্য করেছেন। হিন্দু আমলে এ উপমহাদেশে গৃহজাত ও বাণিজ্যের জন্য গুটি পোকার চাষ অজ্ঞাত ছিল। মুসলমান আমলেই সর্বপ্রথম খুব সম্ভবত চীন থেকে উহা আমদানি করা হয়। আবুল ফজল ঘোড়াঘাট অঞ্চলে রেশম উৎপাদনের বিষয় উল্লেখ করেছেন। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে টেভর্ণিয়ার কাসিমবাজার পরিদর্শন করেন। তিনি লিখেছেন যে, সে সময় কাসিমবাজার শহরে কাঁচা রেশমের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় আড়াই মিলিয়ন পাউণ্ড (২২,০০০ বেল, প্রতিটি বেলের ওজন ১০০ লিভার); এর মধ্য থেকে ৩/৪ মিলিয়ন গুজরাট ও উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে পাঠানো হতো, কিন্তু এর কিছু অংশে তাতার বণিকগণ মধ্য এশিয়ায় নিয়ে যায়। ডাচরাও প্রতিবছর কাসিম বাজারের প্রায় ৩/৪ মিলিয়ন কাঁচা রেশম জাপান ও হল্যান্ডে রপ্তানি করত এবং বাদবাকি এক মিলিয়ন পাউণ্ড বাংলার রেশমি বস্ত্র কারখানাসমূহে ব্যবহৃত হতো। বার্ণিয়ার লিখেছেন, “ডাচরা মাঝে মাঝে কাসিমবাজারে তাদের কারখানায় সাত অথবা আট শত দেশীয় লোকদের নিয়োগ করত; অনুরূপভাবে ইংরেজ&#8217; ও অন্যান্য বণিকরাও অনুরূপ সংখ্যার দেশীয় লোকজন নিয়োগ করেছিল। ডাচরা যে সুতি বস্ত্র বিশাল পরিমাণে রপ্তানি করে তাহা দেখে আমি কখনও বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়ি। কাঁচা রেশমের রপ্তানি বাণিজ্য অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এসময়ের কাঁচা রেশমের দেশীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে এই তথ্য থেকে যে, সুদূর আলিবর্দী খানের আমলে ইউরোপীয়দের বিনিয়োগ ছাড়াই প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা মূল্যের কাঁচা রেশম মুর্শিদাবাদের সুষ্ক অফিসের হিসাবে ধরা হয়েছে। ১৬৭৫-৮০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণের সময়ে স্টেশন মাস্টার কাসিমবাজারের চতুঃস্পার্শ্বস্থ গ্রামগুলো তুঁত গাছে পরিপূর্ণ দেখতে পেয়েছেন। বার বার মারাঠা আক্রমণের ফলে পশ্চিম বাংলার রেশম শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারিগররা গঙ্গার অপর তীরে পালিয়ে যায়। ঈস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানি পদ্মার পূর্বতীরে তুঁত গাছের চাষ, রেশমের গুটি বর্ধন ও রেশমের সুতা পাকানো উৎসাহিত করার নীতি অনুসরণ করে। ফলে বোয়ালিয়া, জঙ্গীপুর, কুমারখালি, মালদহ, রাধানগর, রংপুর ও রাঙ্গামাটি প্রভৃতি অঞ্চলসমূহ রেশমি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়। রিয়াজুস সালাতীনে মালদহ এলাকায় উৎকৃষ্ট মানের রেশম উৎপাদনের কথা উল্লেখিত হয়েছে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-agriculture-in-muslim-bengal-during-the-mughal-period/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16244</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আগামী দিনের ইতিহাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-history-of-future/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-history-of-future/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. আলী শরীয়তী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 26 Sep 2025 05:10:54 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16195</guid>

					<description><![CDATA[আমার বন্ধুদের, অবশ্যই উচিত হবে না, আজ আমার কাছ থেকে একটা জ্ঞানগর্ভ ও সুসম্পন্ন বক্তৃতা আশা করা। কারণ, বক্তৃতার বিষয়বস্তুর উপর চিন্তা করার জন্য আমি ঘণ্টা দুয়েকের বেশি সময় পাইনি। কিন্তু ঠিক এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমার বন্ধুদের, অবশ্যই উচিত হবে না, আজ আমার কাছ থেকে একটা জ্ঞানগর্ভ ও সুসম্পন্ন বক্তৃতা আশা করা। কারণ, বক্তৃতার বিষয়বস্তুর উপর চিন্তা করার জন্য আমি ঘণ্টা দুয়েকের বেশি সময় পাইনি। কিন্তু ঠিক এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম। আশা করি সেখানে বলা কিছু কথা আজও মনে করতে পারবো এবং আপনাদের সামনে তা-ই উপস্থাপন করবো।</p>
<p>টিবর মেনডে হচ্ছেন ইদানীংকালের একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। তার গবেষণার বিষয় ছিলো ‘তৃতীয় বিশ্ব’। হাঙ্গেরীয়-ফরাসি এ বিখ্যাত পণ্ডিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ইতিহাস ও সভ্যতার উপর ব্যাপক গবেষণা করেন। তৃতীয় বিশ্ব সম্পর্কিত তার সুচিন্তিত মতামত ও রচিত গ্রন্থ অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল বলে বিবেচিত হয়। তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পর্যবেক্ষণ করে “Glance at Tomorrows’ History” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। আমি এখানে তার অনাগত ইতিহাস চেতনা বা তার গ্রন্থটি সম্পর্কে কোনো আলোচনা করবোনা; বরং আমি তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো। তার কথাগুলো ছিলো আধুনিক ও বিস্ময়কর।</p>
<p>আন্দ্রে জিদ  বলেছিলেন, কিছু কথা বা বাণী কোনো ব্যক্তিকে স্মরণীয় করে রাখার ক্ষমতা রাখে। আর স্মরণীয় করে রাখতে না পারলেও তা অন্তত একটা বোধ বা উপলব্ধির জন্ম দেয়। এমনও হয় যে, আমাদের মধ্যেই কোনো কোনো বোধ বা উপলব্ধি লুকিয়ে থাকে যার সম্পর্কে আমরা নিজেরাই ভালো বুঝি না। আবার লুকানো বোধ বা উপলব্ধিগুলো আমরা নিয়ে প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু আমরা যখন এমন একটা বক্তব্য শুনি যা আমাদের মাঝে লুকানো বোধ বা উপলব্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরিপূরক হয় তখন তা আমাদের প্রচ্ছন্ন বোধের সাথে মিলেমিশে একটা ধারণার জন্ম দেয় এবং এভাবেই আমাদের মনোজগতে কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।</p>
<p><strong>‘আগামী দিনের ইতিহাস’ ভাবনাটা মূলত একটা আধুনিক ও বিপ্লবী অভিব্যক্তি। ইতিহাস তার বিষয় ও মেজাজগত দিক থেকে সর্বদাই অতীতাশ্রয়ী। ইতিহাস হলো অতীতের প্রতিফলন। ইতিহাস বলতেই আমরা বুঝি অতীত। যা কিছু পুরোনো তা-ই অতীত। এক্ষেত্রে ‘আগামী দিনের ইতিহাস’ কথাটা একটা নতুন ভাবনার দ্যোতক। আজকের আধুনিক মানুষ কেবল অতীত ও বর্তমানকে জানতে পারলেই সুখী নয়। মানুষ তার অনাগত ভবিষ্যতকেও নিশ্চিত জানতে চায়। কারণ, আধুনিক মানুষ অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন। তাই আধুনিক মানুষকে আগামী দিন সম্পর্কে ভাবতে হয়। আর আগামী দিনের ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই হতে হবে বিজ্ঞানমনস্ক। এ ক্ষেত্রে ইতিহাসকে বিজ্ঞান হিসেবে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।</strong></p>
<p>আমরা যদি সেই অনাগত দিনের ইতিহাস লিখতে পারি তা হলেই ইতিহাস পাবে তার সত্যিকার মর্যাদা। সে ইতিহাসকে হতে হবে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নির্দেশক। যদি সে ইতিহাস ভবিষ্যৎ নির্দেশে ব্যর্থ হয়, এমনকি ন্যূনতম পক্ষে বর্তমান মানব গোষ্ঠী ও অনাগত মানব গোষ্ঠী সম্পর্কে জানতে সহায়ক না হয় তবে তা হবে অর্থহীন। কারণ মানবজাতি, ভবিষ্যৎমুখী মানুষের বহমান জীবন এবং বর্তমান ও অনাগত মানবগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ও আদর্শ নির্দেশে সামগ্রিক সহায়তা প্রদান করাই সমস্ত বিজ্ঞানের ন্যূনতম ভূমিকা হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রথমেই মানবজাতির অতীত ইতিহাস সম্পর্কে সমান ধারণা থাকা আবশ্যক- যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইতিহাস নির্মাণে সহায়ক হবে।</p>
<p>টিবর মেনডের মতো নয়; বরং আমি আমার বিশ্বাসের আলোকেই আগামী দিনের ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে চাই। আমার কথা বলার ভঙ্গি বক্তার মতো না হয়ে শিক্ষকের মতো হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ পেশায় আমি একজন শিক্ষক। এজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সৌভাগ্যবশত আমার সামনে বসা মুখগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরই যারা আমার বাচনভঙ্গি ও বক্তব্যের সাথে পরিচিত।</p>
<p>আমার বক্তব্যকে অনুধাবনের জন্য আমি আপনাদেরকে কল্পনায় একটা ‘কোণ’ ধরে নিতে বলবো। (কোনো একটা গাণিতিক কাঠামো যার ভূমি সংলগ্ন অংশটা সবচেয়ে বিস্তৃত ও বৃত্তাকার। কাঠামোটি ভূমি থেকে উপরের দিকে ক্রমশই বৃত্তাকারভাবে সরু হবে। কাঠামোর শীর্ষ বিন্দু সূক্ষ বা সুচালো -অনুবাদক।) আমার বক্তৃতা শেষ হওয়া পর্যন্ত আশা করি কোণটার কথা মনে রাখবেন। কারণ এর ভিত্তিতেই আমি আমার বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করবো।</p>
<p><strong>এ ‘কোণ’ হলো আমাদের চিন্তা, বিচার বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের কাঠামো। একটা যুগের সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাস তার পরবর্তী যুগের সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাসকে অনুসরণ করে। ব্যপারটা এমন যে, অতীতের মানবসভ্যতার কোনো একটা যুগ ক্রমশ পরবর্তী একটা সভ্যতার ঐতিহাসিক যুগে উত্তীর্ণ হয়। কোনো একটা যুগ তার শেষ পর্যায়ে এসে থেমে যায় না; বরং পরবর্তী ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করে। এর অর্থই হলো ইতিহাস বহমান। টিবর মেনডের ভাষায়, মানবসভ্যতার প্রথম সূর্যোদয় হতে আজ পর্যন্ত ৩, ৪, ৫, ১০ এমনিভাবে ২৭টি যুগ পার হয়ে গেছে।</strong></p>
<p>একটা অস্তিত্বশীল জীবন্ত সত্তার মতো প্রতিটি যুগেরই আছে ভিন্ন মেজাজ, চিন্তাধারা ও বিশেষ ধরনের ভাবপ্রবণতা। আমরা আজ ভালোভাবেই জানি অবস্থা, স্বকীয়তা, চিন্তাধারা, ঝোঁক-প্রবণতা ও লক্ষ্যের দিক থেকে প্রতিটি যুগই তার আগের যুগ হতে স্বতন্ত্র।</p>
<p>সুতরাং প্রত্যেকটি যুগকে বুঝার জন্যে আমাদের ‘কল্পিত কোণ’ খুবই প্রয়োজনীয় এবং এরই আলোকে ইতিহাসের প্রতিটি যুগকেই সূক্ষভাবে বিভক্ত করা যাবে এবং এর উপর সতর্ক অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা এমনকি ভবিষ্যত সম্পর্কেও বলতে পারব।</p>
<p>উদাহরণ হিসেবে, ‘আমরা তিনশ’ বছর আগের মধ্যযুগের ইউরোপীয় ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে পারি। এক্ষেত্রে আমাদের কল্পিত ‘কোণ’কেই আমরা মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করবো। এর ভূমি সংলগ্ন অংশ যা সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দ্বারা পূর্ণ। এই জনগণ কারা? এরা হলো সমাজের সাধারণ মানুষ। প্রত্যেকটি সমাজেরই সাধারণ মানুষ তাদের সংখ্যা ও স্তর বিবেচনায় আমাদের ‘কল্পিত কোণের’ ভূমিতেই অবস্থান করে।</p>
<p>প্রতিটি যুগের বুদ্ধিজীবি, পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের অবস্থান আমাদের ‘কোণ’টির উপরের অংশে। এরা হলো বুদ্ধিজীবী। তার মানে হলো, এদের যাবতীয় কার্যাদি মূলত বহুমুখী চিন্তার ক্ষেত্রে আবর্তিত। শরীরের কোনো অঙ্গ বা কারখানার কোনো হাতিয়ারের মতো এরা কাজ করেন না। এমনিভাবে ধর্মীয় নেতা, পণ্ডিত, কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণের অবস্থান হলো ‘কোণে’র উপরের অংশে।</p>
<p>‘কোণ’টির সবচেয়ে নিচের অংশে অবস্থান করে প্রতিটি সমাজের সাধারণ মানুষ। বুদ্ধিজীবি শ্রেণির অবস্থান হলো এর উপরের অংশে। আদিম সমাজের জন্যও এ কথা প্রযোজ্য। আদিম সমাজের গোত্রবন্ধ গণমানুষ ‘কোণে’র ভূমিতেই অবস্থান করে। তখনকার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক লোকগুলো বলতে বোঝাত জাদুকর, শ্বেতশ্মশ্রুধারী অথবা যে কোনোভাবে জনগণের নেতৃত্ব দেয় এমন ব্যক্তিবর্গ ।</p>
<p>বহু যুগ পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ‘কোণ’টি সব যুগ বিশ্লেষণে সমানভাবে প্রযোজ্য। আমার বিশ্বাস, দিন যত এগুচ্ছে ‘কোণে’র ভূমিসংলগ্ন সাধারণ মানুষের অবস্থানও ক্রমশ বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের নিকটবর্তী হচ্ছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং একই হারে তা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিটি যুগেই বিদ্বান ব্যক্তিদের সংখ্যা তার পূর্ববর্তী যুগের সংখ্যা হতে বৃহত্তর হচ্ছে। কারণ শিক্ষা ও সংস্কৃতি এখন ব্যাপক রূপ লাভ করেছে। চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। শিল্প ও বিজ্ঞানচর্চা অতি সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমান্বয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের দিকে উন্নীত হচ্ছে।</p>
<p>সাধারণ জনগণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির মধ্যে আজ আর তেমন পার্থক্যসূচক সীমারেখা নেই। আমরা আমাদের ‘কল্পিত কাঠামো’ বা ‘কোণ’ ধরে যতই উপরে উঠবো, দেখবো যে সাধারণ জনগণ ক্রমশই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির নিকটবর্তী হচ্ছে এবং উচ্চতর স্তরে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণিরই অবস্থান। আবার নিচের দিকে নামলে দেখা যাবে যে, বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণিটা সাধারণ জনগণের কাছাকাছি এসে পড়েছে। অপরদিকে ‘কোণ’টি বেয়ে উপরে যেতে যেতে এমন একটা অবস্থানে পৌঁছানো যায় (যা শীর্ষবিন্দু) যেখানে প্রতিটি যুগের বিশেষ কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব অবস্থান করেন। এ সব ব্যক্তি সমাজের শিক্ষিত মানুষের কাছে রীতিমতো মূর্তিতে পরিণত হন। এমনিভাবে প্রতিটি যুগের শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদগণ তাদের যুগের চিন্তা-চেতনার উৎস হয়ে দাঁড়ান।</p>
<p>উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জ্যা পল সার্ত্রে, বার্ট্রান্ড রাসেল, সোয়ার্জ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। আমাদের কোণ-এর শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানরত; তাদের অবস্থান হলো বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির শীর্ষে। এ শ্রেণির নিম্নতম ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন স্কুল পড়ুয়াগণ। অবস্থানের দিক দিয়ে তারা অবশ্য সাধারণ জনগণের কাছাকাছি। আমি যা বলতে চাই এটাই হলো তার ভূমিকা। এবার আমি আমার মূলবক্তব্য শুরু করবো।</p>
<p>কল্পিত ‘কোণ’টা আমরা মধ্যযুগের বেলায় প্রয়োগ করবো। মধ্যযুগের সাধারণ জনগণ কারা? তখনকার ফ্রান্স, ইতালি ও ইংল্যান্ডের জনসাধারণ গির্জায় যেত। তারা যাজকদের আদেশগুলো পালন করতো। বাইবেল, পেন্টাটুক, যীশু এবং ঈশ্বরের নামে দেয়া সরকারি পণ্ডিতদের নির্দেশগুলো বাস্তবায়িত করতো সে-সব নির্দেশ শ্রবণ, গ্রহণ ও অনুশীলন করাই ছিলো তাদের কাজ। এরা হলো মধ্যযুগের সাধারণ মানুষ।</p>
<p>এই একই অনুভূতি ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাধারণ জনগণের উপস্থিতি আজও সমাজে রয়েছে। বড়দিন উপলক্ষে সেন্ট পিটার্সের বাতায়ন পথে পোপ যখন আবির্ভূত হন তখন তার মহামূল্যবান শ্বেত শুভ্র পবিত্র পোশাক দেখে আজও লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুভূতি ও আবেগে উদ্বেল হয়ে পড়ে। তারা উচ্চস্বরে ক্রন্দন জুড়ে দেয়। এ হলো তেমন অনুভূতি ও চিন্তা যেমনটা তিন-চার শতাব্দী আগে মধ্যযুগীয় ইতালি বা ফ্রান্সের জনগোষ্ঠী ধর্মীয় আবেগে লালন করতো।</p>
<p>আমরা প্রায়ই বলি, এখন একটা নতুন যুগ চলছে। এর অর্থ কী? অর্থ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়। সুতরাং প্রতিটি যুগের এসব বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির মধ্যে কী ধরনের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা ছিলো তা আজ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।</p>
<p>এরপরেও কথা থেকে যায়। প্রতিটি যুগে সাধারণ মানুষ ও উচ্চস্তরে অবস্থানরত শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির বাইরেও হাতে গোনা ব্যতিক্রমধর্মী কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন যাদের চিন্তা ও বিশ্বাস তাদের সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির চিন্তা ও বিশ্বাসের মধ্যে বৈপরীত্যসূচক চৈতন্যের সূচনা করে। তারা সে যুগের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। সাধারণের মধ্যেও তাদেরকে গণ্য করা যায় না। তাদেরকে কোনো বিশেষ কালের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির মধ্যেও ফেলা যায় না। তাঁরা হচ্ছেন সমগ্র মানব গোষ্ঠীর সেই প্রখ্যাত প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব যাঁদের কোনো কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কারণ তারা যে কথা বলছেন বা চিন্তা করছেন বুদ্ধিজীবি শ্রেণি বলে পরিচিত গোষ্ঠী সে কথা বলেন না, তা ভাবেন না বা তা বিশ্বাসও করেন না, করার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তাদের কথাগুলো খুবই নতুন। বোমার মতোই তার বিস্ফোরণ।</p>
<p>এদের পরিচয় কী? এদেরকে তো কোনো বিশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এদের সংখ্যা খুবই নগণ্য, হাতে গোনা ক’জন মাত্র। তবে এটা ঠিক যে, এরা প্রতিভাবান। এঁরা আধুনিক চিন্তা ও চেতনার উদ্ভাবক। এদের মানস প্রবণতা সমসাময়িক সমাজের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ হতে ভিন্নতর, শিক্ষা ঐতিহ্যের পরিপন্থী, বিজ্ঞান পদ্ধতির বিপরীতে এবং যুগধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক।</p>
<p>মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। তখনকার ইউরোপের সাধারণ মানুষ বর্তমান ইউরোপের সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করত। যেমন, আজকের আধুনিক ইউরোপের সাধারণ মানুষ গির্জার আনুগত্য করে এবং সাবেক মধ্যযুগীয় ধর্মীয় পণ্ডিতদেরই তারা মেনে চলে।</p>
<p><strong>ইউরোপের শিক্ষিত সমাজের আবির্ভাব তিন শতাব্দী আগে</strong><strong>, সতের শতকে। এ শতকেই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ ক্রমশ বর্তমান অবস্থায় পরিণতি লাভ করে। আজ যারা বুদ্ধিজীবি ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত, যাঁরা নতুন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক তারা মূলত সতের শতকের বুদ্ধিজীবীদের আধুনিক সংস্করণ মাত্র। আজও তাদের ভাবধারাকে লালন করা হয়, তাদের মতোই তাঁরা চিন্তা করেন, বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও তত্ত্বের বেলায় তাদেরকেই তারা অনুকরণ করেন। এভাবে তারা সতের শতকে ইউরোপে গড়ে উঠা, শিক্ষিত সমাজ যাঁরা অদ্যাবধি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও আধুনিক জীবন ধারাকে চালিয়ে নিচ্ছে তাদের অনুগামীদের বাড়তি একটা সংযোজনে পরিণত হয়।</strong></p>
<p>মধ্যযুগের এসব শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবিদের পরিচয় কী? তারা ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও গির্জার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ। তাদের লক্ষ্য ছিলো, ধর্মীয় সত্যকে আবিষ্কার করা। সাধারণ মানুষদের আলো অভিসারে নিয়ে আসা। জনগণের নেতৃত্ব নেয়া। মূলত তাদের লক্ষ্য ছিলো একই ধর্ম আবর্তে বিপুল জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ ও একই দলভুক্ত করে তোলা।</p>
<p>এভাবে দেখা যায় যে, ‘কোণ’টি যখন আমরা মধ্য যুগ বিশ্লেষণে ব্যবহার করি তখন বুদ্ধিজীবি শ্রেণি বলতে যা বুঝাত তা মূলত খ্রিস্টান যাজক ও ধর্মীয় নেতাদের দ্বারাই পরিপূর্ণ ছিলো। তখনকার দিনের ধর্মীয় নেতাদের আপনারা ভালোভাবেই চেনেন। কিন্তু পনেরো হতে সতেরো শতকের মাঝামাঝি এই দীর্ঘ সময়ে এসব ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি আরোও কিছু প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন নতুন চিন্তার ধারক ও বাহক। কিন্তু তখনও পর্যন্ত কোনো শ্রেণিতে রূপান্তরিত হতে পারেননি।</p>
<p>এ সময়ের কতিপয় চিন্তাবিদ সাধারণ ধর্মপ্রাণ, ঈশ্বর ভক্ত খ্রিস্টান মূল্যবোধ পরিহার করে একটা নতুন চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন। তারা ষোলো হতে আঠারো শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে ‘কোণ’-এর শীর্ষে আরোহণ করেন। মধ্যযুগীয় শিক্ষিত সমাজের ধর্মবোধে অনুগত না হয়ে তারা হয়ে উঠলেন বিজ্ঞানমনস্ক। ধর্মের কথা হলো, ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর দ্বারা অনুমোদিত বিষয়গুলোকেই গ্রহণ করতে হবে আর যা উল্লেখ করা হয়নি তা সবই পরিত্যাজ্য। ঠিক তেমনিভাবে তারা ঘোষণা করলেন যে, কেবল বিজ্ঞান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত বিষয়গুলোকেই তারা বিশ্বাস করবেন। ধর্মীয় বা পবিত্র গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত থাকলেই কোনো কিছুর উপর তারা বিশ্বাস আনবেন না, যতক্ষণ না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত সত্যে পরিণত হয়।</p>
<p>এভাবেই আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগের সূচনা হলো। কেপলার ও গ্যালিলিওর মতো বিখ্যাত পণ্ডিতবর্গ বিজ্ঞান ভাবনার প্রচার ও প্রসার ঘটালেন। এভাবেই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ও প্রচার তীব্র আকার ধারণ করলো। তখন এই বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কায়েমি স্বার্থবাদী শ্রেণি সোচ্চার হয়ে উঠলো। তাদেরকে নিন্দা করলো, ধর্মের শত্রু বলে আখ্যা দিলো, কারাগারে নিক্ষেপ করলো, বিচারের কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে হাজির করলো; এমনকি আগুনে পোড়ালো। গ্যালিলিও যার জ্বলন্ত উদাহরণ। কেনো? কারণ, তারা সমাজের সনাতন শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবিদের বিরুদ্ধে নতুন ধ্যান-ধারণার প্রচার করেছিলেন।</p>
<p>মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে সাধারণ জনগণ ও শিক্ষিত শ্রেণির (ধর্ম বিষয়ে শিক্ষিত ও গির্জার সাথে সম্পর্কযুক্ত) চেয়ে উপরের স্তরের একটা স্বতন্ত্র প্রতিভাবান দলের উন্মেষ ঘটে। যারা ছিলেন সংখ্যায় অতি নগণ্য, ১০/২০ জনের মতো। এই ক্ষুদ্র দলভুক্ত প্রতিভাধর ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় মূল্যবোধের বিপরীতে নতুন চিন্তা-চেতনার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত তারা সমাজে একটা শ্রেণি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তারা ছিলেন বিচ্ছিন্ন কতিপয় ব্যক্তি মাত্র।</p>
<p>এবার আমরা আধুনিক যুগ বিশ্লেষণে আমাদের ‘কোণ’টা ব্যবহার করবো। আধুনিক যুগের কাল সতেরো থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা দেখবো যে, এ যুগের সাধারণ জনগণের মধ্যে মূলত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। শুধু আয়তনের দিক থেকে এ শ্রেণির হ্রাস ঘটেছে এবং এ শ্রেণি হতে কিছু ব্যক্তি শিক্ষিত হয়ে উপরের শ্রেণিতে যোগ দিয়েছে।</p>
<p>আধুনিক যুগের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে এবার ভাবা যাক, তাদের অবস্থান হবে আমাদের ‘কোণ’-এর শীর্ষে। আজ তাঁরা ঠিক একই কথা বলছেন যা ষোলো শতকের প্রতিভাধর বিচ্ছিন্ন কতিপয় ব্যক্তি বলতেন। যে কথাগুলো তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। এমনিভাবে দেখা যায় যে, ‘কোণ’-এর শীর্ষে সর্বদাই সমাজের এমন কিছুসংখ্যক শিক্ষিত ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের অবস্থান যারা তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের প্রচলিত চিন্তাধারার বিপরীতে নতুন চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন। এ পর্যায়ে এসে এ সব বিচ্ছিন্ন, স্বল্প পরিচিত, প্রতিভাবানদের মতবাদগুলো আগামী দিনের শিক্ষিত সমাজের জন্য একটা মননশীল চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটায় এবং সেসব চিন্তাধারা পরবর্তী যুগের মানুষদের বিশ্বাস ও চিন্তাধারার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।</p>
<p>এভাবেই আমরা দেখছি যে, আমাদের কল্পিত যে, ‘কোণ’-এর শীর্ষদেশে এমন সব প্রতিভাধর ব্যক্তিবর্গ অবস্থান করেন যাঁরা তাদের সমকালীন বুদ্ধিজীবিদের বিরোধী হন এবং তাদের বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করেন। এখানেই শুরু হয় মূল বিরোধ। প্রতিভাধর ব্যক্তিগণ সংখ্যার দিক দিয়ে যেমন নগণ্য তেমনি স্বল্প পরিচিত। ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হতে থাকে তাদের চিন্তাধারা ও আদর্শ। ক্রমে কালের প্রয়োজনে তাঁরা নিজেরাই একটা শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। এমনকি তাঁরা তাদের পূর্ববর্তী বুদ্ধিজীবিদের সামাজিক অবস্থানটা দখল করে ফেলেন।</p>
<p><strong>আজকের ইউরোপে এখনও যে যাজকরা রয়েছেন সমাজে তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে। কিন্তু এ যুগের মানস প্রবণতা শিক্ষিতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত</strong><strong>, যাঁরা বিজ্ঞানের দাস; ঈশ্বরের নয়। তবে আমরা যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক যুগকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব যে, এ যুগেও সাধারণ মানুষদের চিন্তা-চেতনা মূলত ধর্মবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এমনকি ধর্ম সংস্কৃতির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাবে যে, আজও ‘ধর্ম’ সাধারণ মানুষদের চিন্তা-চেতনার মূল ভিত্তি হয়ে টিকে আছে।</strong></p>
<p>আজ আমরা দেখছি যে, এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা বিজ্ঞানের পূজারি। আজকের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণি বিজ্ঞানের পূজা করেন ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসকে পাওয়ার জন্য নয়। সুতরাং এ নিয়ম অনুযায়ী আধুনিককালে শিক্ষিতদের কোনোভাবেই ধার্মিক হওয়া যাবে না। কেনো? কারণ, এ নতুন যুগে সাধারণ মানুষরাই কেবল ধর্মে বিশ্বাস করেন। কিন্তু এর বিপরীতে দেখা যাবে যে, মধ্যযুগের বুদ্ধিজীবিরা একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী ও ধার্মিক ছিলেন। এ যুগের নব্য শিক্ষিতদের সবাই বিজ্ঞানের পূজারি এবং বিজ্ঞানের পূজা করাই এদের আদর্শে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানের পূজারি নব্য শিক্ষিতরা ধর্মীয় নির্দেশ ও বিশ্বাসের বিপরীত মতবাদ হিসেবে এ সব আদর্শ প্রচার করেন। তাদের মতবাদ বিজ্ঞানের পূজা করা। এর বিপরীতে ধর্মের আদর্শ হচ্ছে ধর্মীয় নির্দেশ, বিশ্বাস ও রীতিনীতি; যা প্রশ্নাতীতভাবেই মেনে নিতে হবে।</p>
<p>একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মধ্যযুগের মতো আজও ‘ধর্ম’ সাধারণ মানুষের মাঝেই বিরাজমান। অন্যদিকে, বিজ্ঞানমনস্ক নব্য শিক্ষিতদের উদ্ভব হয়েছিলো সতেরো শতকে। আজ যাদের আদর্শ হচ্ছে বিজ্ঞানের পূজা করা। সতেরো শতক হতে আজ পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময়ে এ সব শিক্ষিত জনগণ বিজ্ঞান পূজার দিকে যতই ঘনিষ্ঠ হয়েছে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা হতে তারা ততই দূরত্বে চলে যাচ্ছে। আর ঠিক একই হারে সাধারণ জনগণ হতেও তারা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।</p>
<p>মধ্যযুগের শিক্ষিত শ্রেণি ও সাধারণ জনগণের মধ্যে চিন্তা ও বিশ্বাসের সাদৃশ্য ছিলো। তারা একই লক্ষ্যে একইভাবে কথা বলতো, কিন্তু আজকের শিক্ষিত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চিন্তা ও বিশ্বাসের বৈসাদৃশ্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিতরা বিজ্ঞানের পূজারি আর সাধারণ মানুষ ধর্মপ্রাণ।</p>
<p>এটা একটা চরম বাস্তবতা যা আমাদের সমগ্র চিন্তা, বিশ্বাস ও হাজারো মন্তব্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় যে, কেনো বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এতো ব্যাপক ছিলো। একটা দীর্ঘ সময়ব্যাপী ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইরান এবং বিস্তৃত এশিয়ার মানুষদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশই প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে। এমনিভাবে, সতেরো, আঠারো ও উনিশ শতকব্যাপী বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এতই ব্যাপক আকার ধারণ করে যে, মানুষের ধর্মবোধ ক্রমশই আমাদের কল্পিত কাঠামো’র শীর্ষস্থান থেকে ভূমিতে অবতরণ করেছে। ক্রমে এভাবেই বিজ্ঞান ধর্ম এবং ধর্মবোধকে ধ্বংস করে দিতে থাকে। সেই ধ্বংসের পাদপীঠে বিজ্ঞান-ভাবনা এবং বিজ্ঞানের মহিমা স্থান জুড়ে বসে।</p>
<p>আজকের সাধারণ মানুষ মধ্যযুগের সাধারণ মানুষদের মতোই ধর্মে বিশ্বাস করে। বিশ্বব্যাপী তাঁরা ধর্মেরই অনুসারী। সাবেক ধর্মবিশ্বাস এখনও তাদের মধ্যে বিরাজমান। আজকের নব্যশিক্ষিতরা বিজ্ঞান পূজার আদর্শে যতই বিশ্বস্ত হচ্ছে ততই তাঁরা তাদের ঐতিহ্যগত ও জাতীয় ধর্ম হতে বিচ্যুত হচ্ছে। ধর্ম বিশ্বাসই ছিলো তাদের পূর্ব ঐতিহ্য যা হতে তারা আজ দূরে সরে গেছে। আজকে যারা ইউরোপ-আমেরিকা প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের ধর্ম সংস্কৃতির সমাজতান্ত্রিক গবেষণায় নিয়েজিত আছেন তাঁরা সবাই এই একই সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন।</p>
<p>এর পরেও একটা সমস্যা থেকে যায়। বর্ণিত দুটো শ্রেণির বাইরে অন্য একটা দলকে আমরা খুঁজে বের করতে পারি। আমরা দেখেছি, প্রত্যেক যুগেই কতিপয় বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব থাকেন যাদেরকে ‘কোণ’-এর শীর্ষবিন্দুতে স্থান দিতে আমরা বাধ্য। প্রত্যেক যুগের শেষ পর্যায়ে এসে এসব বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তি সংখ্যার দিক থেকে বড় হতে থাকেন। ক্রমেই তারা ক্ষমতা ও শক্তিলাভে সমর্থ হন। তারা আগামী দিনের বুদ্ধিজীবিদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেপলার, আইজাক নিউটন, ফ্রান্সিস বেকন ও রজার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ তাদের নিজেদের যুগের মানব সমাজের জন্য ভবিষ্যত চিন্তা-চেতনার সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করেছিলেন। আমার বর্ণিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী বর্তমানে কল্পিত ‘কোণ’-এর শীর্ষে অবস্থানরত ব্যক্তিবর্গ আগামী দিনের বিদ্যাবিদদের চিন্তা-চেতনার নির্মাতা হয়ে থাকেন।</p>
<p>এভাবেই আমরা আগামী দিনের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারি। তা কীভাবে? যদি আমরা বর্তমান ‘কোণ’-এর শীর্ষে অবস্থানরতদের চিনতে পারি, তাদের চিন্তার পদ্ধতি সম্পর্কে আপনাদের বলতে পারি এবং দেখাতে পারি বিগত তিন শতক ধরে চলে আসা বিজ্ঞান পূজাকে তারা কীভাবে বিরোধিতা করেছেন তাহলেই আমরা সমাধানে পৌঁছে যাবো। এমনকি, আমরা এ যুগের শেষ পর্যায়ের চিন্তাবিদদের ভাবপ্রবণতা কীভাবে আগামী দিনের চিন্তাবিদদের বিশ্বাস, অনুভূতি ও ভাবপ্রবণতাকে প্রভাবিত করবে তা-ও নিশ্চিতভাবে জানতে পারবো।</p>
<p>আধুনিককালেও মানব জাতির মধ্যে কতিপয় বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের অবস্থান আমরা লক্ষ করে থাকি। শিক্ষিতদের মধ্যে এদের শীর্ষে স্থান দিতে আমরা বাধ্য। কারণ একদিকে শিক্ষিত মহল তাদেরকে অভিশিক্ষিত বলে মনে করেন, অপরদিকে তারা শিক্ষিতদের চেয়ে ভিন্ন চিন্তা করেন ও ভিন্ন কথা বলেন। এঁদেরই একজন হলেন গুইনন । সম্প্রতি তার রচিত গ্রন্থ ‘ক্রাইসিস অব দি মডার্ন ওয়ার্ল্ড’ ও ‘ধর্মীয় গবেষণা-পত্র’ ইউরোপে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিখ্যাত ফরাসি পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব হঠাৎ করেই একদিন আধুনিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান পূজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি প্রাচ্যে চলে যান। সেখান থেকে যান মিসরে। কোনো শাব্দিক অর্থে নয়; বরং সত্যিকার অর্থেই তিনি বর্তমান ইউরোপীয় সমাজ ও চিন্তাধারা হতে সরে দাঁড়ান, যাতে করে তিনি ইউরোপীয় জনগণের প্রয়োজনে ও জ্ঞানপিপাসা নিবারণে সাহায্য করতে পারেন।</p>
<p>তেমনি ইদানীংকালের অপর আর একজন প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন এলেক্সিস ক্যারেল। তার প্রখ্যাত গ্রন্থ  “Man, The Unknown” সহ বেশ কিছু লেখা ফার্সি ভাষার অনূদিত হয়েছে। তার লেখা ‘Reflections on Life’-এর দুটো সংস্করণ বের হয়েছে। অনুবাদ সুন্দর না হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে বইটি মূলপাঠ্য। এ ছাড়াও আইনস্টাইন, উইলিয়াম জেমস, বাসালার্ড প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।</p>
<p>এমনকি সাম্প্রতিককালের জ্যা পল সার্ত্রে ও বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো ব্যক্তিবর্গ যাদেরকে বিশ্ববাসী ভালোভাবেই জানেন তাঁদের চেয়েও অনেক শ্রেষ্ঠতর হচ্ছেন ফরাসি বিজ্ঞানী দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ। আরও আছেন ম্যাক্স প্ল্যাংক, জর্জ গারভিচ, প্যাট্রিক ডোনিজ ও ডা. জিভাগোর লেখক প্যাস্টারনাক। নব্যশিক্ষিতদের কাতারে এসব মহান ব্যক্তিকে টেনে আনা যাবে না। এদের অবস্থান হচ্ছে শীর্ষে। কারণ বিজ্ঞান পূজার তারা সাধারণত বিরোধিতা করেন। বিগত তিন শতাব্দী ধরে এসব শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি তথাকথিত শিক্ষিতদের পালিত বিজ্ঞান ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছেন।</p>
<p>অবশ্য এ কথাও বলা যাবে না যে, গুইনন ঠিক ম্যাক্স প্লাংকের মতো এবং ম্যাক্স প্লাংক ও ক্যারেল দু’জনেই হুবহু একই কথা বলেছেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ও ভিন্ন ভিন্ন মতামত আছে। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু ব্যপারে তাদের মিলও রয়েছে। আর সে মিলটাই হবে আমাদের বিবেচ্য বিষয়।</p>
<p>আমরা যদি তাঁদের সে সব অভিন্ন চিন্তাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারি তাহলে দেখবো যে, আজ তাঁদের মধ্যে যে সব সাধারণ প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা মূলত আজকের বুদ্ধিজীবিদের মৌলিক ঝোঁক প্রবণতায় পরিণতি লাভ করেছে এবং সেই ঝোঁক প্রবণতার মূলে রয়েছে বিজ্ঞান পূজার সম্পূর্ণ বিরোধী হয়ে ওঠা। মূলত এ প্রবণতাটাই হচ্ছে আধুনিক বুদ্ধিজীবিদের ধর্ম।</p>
<p><strong>আগামী দিনগুলোতে এ প্রবণতাই অনাগত প</strong><strong>ণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবিদের ধর্মে পরিণত হবে এবং আধুনিককালের বুদ্ধিজীবিদের এই ঝোঁক প্রবণতা ক্রমে বিজ্ঞান পূজার স্থলাভিষিক্ত হবে। এসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটা সাধারণ ধারণা ব্যতিক্রমহীনভাবে বিদ্যমান, তা হলো আধ্যাত্মিকতার মাঝে ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসকে লালন করা। (দুর্ভাগ্যবশত সময় স্বল্পতার জন্য তাদের প্রত্যেকের উদ্ধৃতি দেয়া গেল না)।</strong></p>
<p>আমরা জানি, ধর্মের প্রতি আইনস্টাইনের একটা গভীর অনুরাগ ছিলো। কিন্তু, আমরা বলেছি, ধর্ম হচ্ছে সাধারণ জনগণের বিশ্বাসের বুনিয়াদ। তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে, আইনস্টাইন সাধারণ মানুষের একজন ছিলেন! অথবা তিনি হাইস্কুল পড়ুয়া, কলেজের ডিগ্রিধারী বা আমার মতো একজন পি.এইচ.ডি ওয়ালা নব্য শিক্ষিতদের শ্রেণিভুক্ত ছিলেন। কখনো না। অথচ তিনি ছিলেন ধার্মিক।</p>
<p>এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, বিজ্ঞান পূজা ছাড়াও দুনিয়াতে চিন্তার রাজ্যে একটা নতুন ও বিশাল চিন্তা তরঙ্গের প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা কখনো বলবো না যে, আইনস্টাইন ও ক্যারেল সাধারণ মানুষের মতো একই ধরনের ধর্মবিশ্বাস পোষণ করেন। বরং আমরা বলতে পারি যে, ‘ধর্ম’ বুদ্ধিজীবিদের বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের চেয়েও ঊর্ধ্বে।</p>
<p>মূলত ধর্মে দুই ধরনের অস্তিত্ব বিদ্যমান। একটা ধর্ম কল্পিত ‘কোণ’-এর ভূমিতে অবস্থানরত জ্ঞান-বিজ্ঞানহীন সাধারণ জনগণের দ্বারা আচরিত ধর্ম। আমরা ধর্মের উঁচুস্তরের দিকে এগুলে আমাদের যুগে বৈজ্ঞানিক আস্তিকস্তরে উপনীত হবো এবং এরপর আরো উপরে প্রতিভাধর ব্যক্তিদের অবস্থান। আজকের দুনিয়াতেও এমনটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>শিক্ষিতদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। একজন মানুষ একইসঙ্গে শিক্ষিত ও ধার্মিক। কিন্তু তার সে ধর্মবোধ অত্যন্ত নিচুস্তরের। কারণ, ধর্মকে সেই ব্যক্তি তার প্রয়োজনের অতীত একটা বাড়তি সংযোজন বলে মনে করেন। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার যা-ই সে হোক না কেনো ধর্মকে সে ধরে রেখেছে, অত্যন্ত নাজুকভাবে। তাঁর এ ধর্মবোধ সাধারণ জনগণ হতে নেয়া যা সে গ্রহণ করেছে ও আঁকড়ে ধরেছে। এমনি ধর্মবোধ একেবারেই অস্বাভাবিক ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আমার ধারণা, সে যদি ধর্মহীন হয়ে যায় তবে সে বিজ্ঞান বহির্ভূত হবে এবং নাস্তিক্য ধর্মের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।</p>
<p>অন্য একজন শিক্ষিত ব্যক্তিকে যদি দেখা যায় যে, তিনিও ধার্মিক, তাহলে আমরা দেখব বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে অবস্থিত একটা ধর্মকে তিনি কীভাবে অনুসরণ করেন। তার সেই ধর্মবোধ সহজেই তার লেখনিতে প্রতিফলিত হবে। এ ধরনের ধর্মবোধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।</p>
<p>যে ধর্ম বিজ্ঞানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ তা শিক্ষিতদের চেয়েও নিম্নস্তরের। কিন্তু যে ধর্ম বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে, বিজ্ঞান যার উচ্চতায় এখনও পৌঁছতে পারেনি তা হচ্ছে এ যুগের চিন্তানায়কের ধর্ম। তারা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের চিন্তা-চেতনার অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন। এরা হলেন বর্তমান যুগের প্রতিভা।</p>
<p>ম্যাক্স প্লাংক, আইনস্টাইন বা ক্যারেলের কোনো বই বা তাঁদের কোনো অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে সহসাই আমরা এমন সব কথা বা উদ্ধৃতি লক্ষ করি যেসব কথা কোরআনে উল্লিখিত বাণীর সাথে মিলে যায়। অর্থাৎ তাদের কোনো কোনো কথা কোরআনের উল্লিখিত বাণীর সাথে সামঞ্জস্যের ইঙ্গিত বহন করে। আমাদের বর্ণিত এ সব ব্যক্তিত্বের অনেকেই বহু যুগের বহু সংকট অতিক্রম করেছিলেন। একটা যুগ গেছে চরম নাস্তিকতার যুগ। তারপর যুগের প্রয়োজনেই এসেছে সংস্কারের যুগ এবং সবশেষে এসেছে ধর্মবোধের যুগ যে ধর্ম বিজ্ঞানের চেয়েও উঁচু ও শ্রেষ্ঠ।</p>
<p>সে সব সুবিদিত ও সুশিক্ষিত মানুষ যারা প্রতিটি যুগের সংকটকে অতিক্রম করে বিজ্ঞান পূজার বিরোধিতা করেছিলেন তাদের সবাই আজ আমাদের অতি পরিচিত হয়েছেন। তাদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ও পরিবেশের দিকে ফিরে যাওয়া। ধর্ম যেহেতু সাধারণ জনগণের চিন্তা ও বিশ্বাসের বুনিয়াদ সেহেতু তা অপাঙক্তেয় এই যুক্তিতে গত তিন শতক ধরে এ সব চিন্তাবিদদের অবজ্ঞা ও নিন্দা করা হয়েছে। আজ তারা মোটেই অবজ্ঞার পাত্র নন, অপাঙক্তেয়ও নন।</p>
<p>আজ আমাদের নবতর উপলব্ধির সময় এসেছে। এতদিনে ষোলো শতকের সে সব বিজ্ঞানমনস্ক, প্রতিভাধর ব্যক্তিবর্গ ও আজকের শিক্ষিত শ্রেণির চিন্তা- চেতনার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের বক্তব্যগুলো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। এখনও তাদের চিন্তাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গৃহীত ও পরিশ্রুত হয়নি। কিন্তু তাদের কথাগুলো বা চিন্তার পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধী-সীমার ঊর্ধ্বে স্থান পাবার যোগ্য। এসব ব্যক্তির বাণী বা বক্তব্যগুলো আগামী দিনের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণির বিশ্বাস ও চৈতন্যের বুনিয়াদ তৈরি করবে এবং এসব বুদ্ধিজীবীই আগামী দিনের ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করবে।</p>
<p>সুতরাং, সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, আজকের ‘ধর্ম’ হবে সেই ধর্মের কাছে ফিরে যাওয়া, যে ধর্ম বিজ্ঞানকে অতিক্রম করছে অথবা বিজ্ঞানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত হয়েছে। এভাবে আমাদের আলোচনা অনুযায়ী আমরা বলতে পারি যে, আজকের বিজ্ঞান পূজা যা সতেরো শতক থেকে অদ্যাবধি ধর্মবিমুখ ভাবনার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে সেই বিজ্ঞান পূজা তার অন্তিম পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। কেনো? কারণ, আজকের বিশ্বে নবতর চিন্তানায়কের অবির্ভাব ঘটেছে, যাদের চিন্তা-চেতনা আধুনিক বিজ্ঞান ভাবনার ঊর্ধ্বে। যাদের বৃহৎ চিন্তা-বিশ্বাস, মেধা ও মনন দৃঢ়ভাবে মানব জাতির নবতর উপলব্ধির ঘোষণা দিয়েছে। আর তা হলো সমগ্র বিশ্বমানবের কল্যাণে বিজ্ঞান পূজার বিপরীতে ধর্মীয় বিশ্বাসকে উজ্জীবিত করে তোলা।</p>
<p><em>মাক্স প্লাংক ও কেপলার দুজনেই ছিলেন পদার্থবিদ। কেপলার সম্বন্ধে প্লাংক বলেছেন</em><em>, “পণ্ডিত কেপলার জ্ঞানের সামগ্রিকতায় বিশ্বাস করতেন। সৃষ্টির তাবৎ বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্য গভীর মনোযোগ, সতর্কতা ও সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।” অপর একজন পণ্ডিত ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, “তাকে আমরা একজন ক্ষুদে শিক্ষানবিশ পণ্ডিত হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। কারণ, বিশ্বের বহুমুখী চিন্তার সামগ্রিকতায় তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাঁকে ক্ষুদে পণ্ডিত বলা হচ্ছে সেই অর্থে যে, তিনি জ্ঞানের সাবর্জনীনতায় বিশ্বাস করতেন না। কেপলার জ্ঞানের সার্বজনীনতায় বিশ্বাস করতেন। আর এ জন্যই তিনি আধুনিক পদার্থবিদ্যারস্রষ্টা হতে পেরেছেন।”</em></p>
<p><strong>এক্ষেত্রে আইনস্টাইন আরো স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন</strong><strong>, “ধর্মীয় অনুভূতি ও সৃষ্টির গূঢ় রহস্যের উপর বিশ্বাসই হলো যে কোনো বৃহৎ বৈজ্ঞানিক গবেষণার চাবিকাঠি।” এই কথাগুলোর জন্য জনগণের গোত্রেও তাকে ফেলা যায় না। তবে, আলেক্স ক্যারেল অবশ্যই প্রথম মানব যিনি দুই বার নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভে সমর্থ হয়েছেন। লারইউজ ডিকশনারিতে তাকে এজন্য বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে তাকে বিংশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “যদি সমাজ থেকে স্রষ্টার প্রতি ভক্তের আনুগত্য ও প্রার্থনার নিয়ম তুলে দেয়া হয়, তবে তা হবে আমাদের জন্যে মৃত্যুর সনদপত্রে স্বাক্ষর করার মতো ভয়ঙ্কর।”</strong></p>
<p>সতেরো, আঠারো ও উনিশ শতকের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিরা কী কখনও এমন কথা বলতেন? সতেরো, আঠারো ও উনিশ শতকের শিক্ষিত শ্রেণির বক্তব্য ছিলো “যদি আমি আমার অস্ত্রোপচারের ছুরির নাগালের মধ্যে খোদাকে দেখতে না পাই, তবে আমি তাঁর উপর বিশ্বাস আনতে পারি না। বিজ্ঞান পূজারিদের ভাবনাই মূলত নাস্তিকতা। কিন্তু আজ নতুন চিন্তা ও চিন্তানায়কদের আবির্ভাব ঘটেছে। একজন মনোবিজ্ঞানী বলেছেন অন্যভাবে। তিনি বলেন, “জীবন ধারণের জন্য মানুষের যেমন অক্সিজেন ও খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি খোদার আনুগত্য ও তার নিকট প্রার্থনার প্রয়োজনও অপরিহার্য। কেননা, এটাই মানব জাতির নিয়তি। এগুলো মানুষের অকৃত্রিম প্রয়োজন। আমরা যদি এই আনুগত্যের প্রয়োজনকে অস্বীকার করি তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।”</p>
<p><em>এবার ক্যারেলের কথায় আসা যাক। তিনি মোটেই ধার্মিক ছিলেন না। চ</em><em>ড়ুই পাখির হৃৎপিণ্ড সংযোজন প্রক্রিয়ার উপর তিনি গবেষণা করেন। আর এ জন্যই তিনি দুইবার নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি বলেন, “শ্বাস-প্রশ্বাস ও খাদ্য গ্রহণের মতোই আমাদের প্রয়োজন রয়েছে খোদার আনুগত্য করার। এমনকি আমাদের দৈহিক, মানসিক, স্নায়ুবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রয়োজনেও তার আনুগত্য করা আবশ্যক। তিনি আরো বলেছেন, “ধর্মের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থার অভাবেই রোম সভ্যতার পতন হয়েছিলো।”</em></p>
<p>কথাগুলো আলেক্সিস ক্যারেলের। যিনি ধার্মিক নন, যাজকও নন। এমনকি আমাদের ‘কল্পিত কাঠামো’র ভূমিসংলগ্ন সাধারণ ধার্মিক আস্তিকতায়ও বিশ্বাস করেন না। গারভিচের বক্তব্য হলো, সুদীর্ঘ উনিশ শতকব্যাপী সমাজবিজ্ঞান ১৯৮ ধরনের সূত্র আবিষ্কার করেছে এবং যেগুলোতে মানুষ বিশ্বাস এনেছে, কিন্তু বিংশ শতকের সমাজবিজ্ঞান সেসবের কোনোটাতেই আজ আর বিশ্বাস আনতে পারছে না।</p>
<p>প্রখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ সোয়ার্জ বলেন, “উনিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা ছিলো, প্রতিটি জীবনসত্য আবিষ্কারে তারা সক্ষম হবেন। এমনকি কবিতারও। কিন্তু বিংশ শতকের পদার্থবিজ্ঞান বিশ্বাস করে যে, ‘বস্তু’ কি, তারা তা-ই জানে না।”</p>
<p><em>কেন বিংশ শতকের বিজ্ঞান ভাবনা হঠাৎ করেই এমন বিনয়ী মূর্তি ধারণ করেছে</em><em>? কেনোই বা ষোলো, সতেরো, আঠারো ও উনিশ শতকব্যাপী বিরাজমান বিজ্ঞানের দাম্ভিক আস্ফালন বিচূর্ণ হয়ে গেল? কারণ, ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী একটা নতুন যুগের সূচনা হয়ে গেছে। আগামী দিনের শিক্ষিতদের চিন্তা-ভাবনা হবে বর্তমানকালের শিক্ষিতদের বিপরীত। তাদের চিন্তাধারা হবে ধর্মকেন্দ্রিক। তা হবে এমন একটা ধর্ম যা অবশ্যই বিজ্ঞানের চেয়ে নিচু নয়; বরং বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক উঁচু ও শ্রেষ্ঠ।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ : মাহমুদ আব্দুল্লাহ</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-history-of-future/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16195</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সোনারগাঁও : বাংলায় ইলমী সিলসিলার অনন্য মিনার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/sonargaon-a-unique-minar-of-scholarly-tradition-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/sonargaon-a-unique-minar-of-scholarly-tradition-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Sep 2025 12:20:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16133</guid>

					<description><![CDATA[সোনারগাঁও, যে স্থানটি ইতিহাসখ্যাত, অনেকে তার নাম দিয়েছে সুবর্ণগ্রাম১, বর্তমানে যদিও তা ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার [বর্তমানে জেলা] অধীন একটি গুরুত্বহীন গ্রাম মাত্র। অথচ স্থানটি প্রাক মোগল মুসলিম শাসন আমলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সমৃদ্ধশালী ও সৌভাগ্যসম্পন্ন নগর ছিলো। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সোনারগাঁও, যে স্থানটি ইতিহাসখ্যাত, অনেকে তার নাম দিয়েছে সুবর্ণগ্রাম<sup>১</sup>, বর্তমানে যদিও তা ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার [বর্তমানে জেলা] অধীন একটি গুরুত্বহীন গ্রাম মাত্র। অথচ স্থানটি প্রাক মোগল মুসলিম শাসন আমলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সমৃদ্ধশালী ও সৌভাগ্যসম্পন্ন নগর ছিলো। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনাকালে এই স্থানটি দিল্লীর মুসলিম সুলতানদের শাসনাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই দূর ও নিকট থেকে বিদ্বান ও উচ্চ মনীষাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এই স্থানটি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের রাজধানীতে পরিণত হওয়ার কারণে মুসলিম প্রশাসক, বীর সেনানী, সেনাধ্যক্ষ ও দুঃসাহসী দেশ বিজেতাদের চোখে তদানীন্তন পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী লক্ষ্মণাবতীর পরপরই অধিকতর গুরুত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং প্রায় দুইশ বছর পর্যন্ত এর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। শুধু তাই নয়, কয়েক জন স্বাধীন মুসলিম সুলতানের নেতৃত্বে এই স্থানটি এক সময়ে সমগ্র বঙ্গদেশের রাজধানীতে পরিণত হয়েছিলো।</p>
<p>এক কালের এতদঞ্চলীয় শাসন-কার্যের কেন্দ্রভূমি হওয়ার দরুনই শুধু নয়, <strong>বিশ্ববিখ্যাত মসলিন ও শবনম প্রভৃতি মখমল কাপড়ের সদা কর্মচঞ্চল ব্যবসায়ের কেন্দ্রও হয়েছিলো এই সোনারগাঁও। উপরন্তু বিশ্ববিশ্রুত হস্ত-লিপি, অংকন-শিল্প, মুদ্রা-বিজ্ঞান এবং ললিতকলার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বিপুল উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো এখানে। সামুদ্রিক ব্যবসার জন্যও এই স্থানটি বিশ্বের প্রায় সর্বত্র খ্যাত ছিলো।</strong> ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মিসর ও অন্যান্য এলাকার সামুদ্রিক বন্দরের সহিত পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াতের গভীর যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিলো। প্রখ্যাত ভূ-পর্যটক ইবন বতুতা— যিনি মধ্য-যুগের রাষ্ট্রসমূহে ব্যাপক পর্যটন করেছিলেন। ১৩৪৫-৪৬ সনের মধ্যবর্তী সময়ে সোনারগাঁও হয়েই বঙ্গ ও আসাম সফর করেছিলেন।<sup>২</sup> তারপর তিনি এখান থেকেই জাভা-সুমাত্রার দিকে যাত্রা করেন। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকে সহজেই বলা যায়, একটি সমুদ্র বন্দর হিসেবেও সেকালে সোনারগাঁও খুবই গুরুত্বের অধিকারী হয়েছিলো।</p>
<p>বস্তুত সোনারগাঁও-এর অতীত শুধু উপরোক্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলির কারণেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রচার ও বিকাশের দৃষ্টিকোণেও তার গুরুত্ব ছিলো সর্বাধিক এবং এদিক দিয়েই বলা যায়, সোনারগাঁও-এর অতীত ছিলো সোনালী, ছিলো অতিশয় শুভ্র-সমুজ্জ্বল। যেদিন থেকে সোনারগাঁও মুসলিম শাসনের অধীন হয়েছিলো, সেদিন থেকেই বিপুল সংখ্যক বিদ্বান মনীষী এবং আধ্যাত্মিক মহাপুরুষদের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো। তাঁরা সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে ইসলামী শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রচার কাজে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত আত্মনিয়োগ করেছিলেন।</p>
<p>সোনারগাঁও যেদিন থেকে এতদঞ্চলে মুসলিম আধিপত্যভুক্ত এলাকার রাজধানী রূপে নির্দিষ্ট হয়েছিলো, সেদিন থেকে প্রায় দুইশ বছর ধরে এখানে যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো, বিশেষ কারণে তা আজ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের পরিবেশে তার উল্লে­খ ও আলোচনা একান্তই প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে এই সংক্ষিপ্ত সন্দর্ভের অবতারণা।</p>
<p>এতদঞ্চলে প্রাচীনকালীন মুসলিম আধিপত্য প্রায় দুই শতাব্দীকাল পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারে কি অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলো, তা ব্যাপকভাবে খতিয়ে দেখা বাংলাদেশি জনগণের সোনালী ভবিষ্যতের জন্যও বিশেষ আবশ্যক। এই দীর্ঘ শাসনামলে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ অঞ্চলে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেনি বা সাংস্কৃতিক মূল্যমানের দৃষ্টিতে এই অঞ্চল একেবারে শূন্য বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো-তা আমরা মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করতে বা মেনে নিতে পারি না।</p>
<p>মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর পর উত্তরসূরি হিসেবে সুলতান গিয়াস উদ্দীন ইওয়াজ-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হিজরী ৬১০ সনের প্রারম্ভে (১২১৪ খ্রি.) তিনি বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ) দখল করার সাথে সর্বপ্রথম সোনারগাঁও- দখল করে নেন<sup>৩</sup> এবং দিল্লীর অধিপতি সুলতানদের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত থেকে এক দশকেরও অধিক কাল পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তদানীন্তন দিল্লীর সম্রাট সুলতান ইলতুতমিশের (৬২০ হি./১২২৫ খ্রি.) বঙ্গ দখল করে নেওয়ার সময় পর্যন্ত<sup>৪</sup> সুলতান গিয়াসুদ্দীনের শাসনাধীন এই অঞ্চল সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকে। ইলতুতমিশের দখল ও কর্তৃত্বাধীন হওয়ার পর সোনারগাঁও নগরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হিন্দু জমিদারদের করায়ত্ত হয় এবং তাঁর বংশধররা উত্তরাধিকারসূত্রে তিপ্পান্ন বছরের অধিককাল পর্যন্ত দিল্লীর সম্রাটের প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে শাসনকার্য চালাতে থাকেন।</p>
<p>১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তুগ্রিল বেগ সুলতান মুগীস উদ্দীন নাম ধারণ করে নিজেকে বঙ্গের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। তখন দিল্লীর সম্রাট গিয়াসউদ্দীন বলবন তুগ্রিল বেগকে দমন করার উদ্দেশ্যে বঙ্গে আগমন করেন এবং নিকটবর্তী সোনারগাঁও উপস্থিত (১২৪১ খ্রি.) হতে চাইলে সোনারগাঁও-এর জমিদার দনুজ রায় সম্রাটকে সাদর সংবর্ধনা জানানোর জন্য নগরের বাইরে বের হয়ে আসেন। <strong>তখন সোনারগাঁও ও নিকটস্থ শহর এলাকা থেকে নদীপথে তুগ্রিল বেগ যেন পালিয়ে যেতে না পারেন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা ও তাঁর গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব বিশ্বস্ত হিন্দু জমিদার দনুজ রায়ের উপর অর্পণ করেন সম্রাট।<sup>৫</sup> এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, দনুজ রায় স্বাধীন নরপতি হিসেবে নয়, দিল্লী সম্রাটের প্রত্যক্ষ নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর হিসেবে সোনারগাঁও শাসন করতেন, যদিও স্যার যদুনাথ সরকার তাঁকে সোনারগাঁও-এর স্বাধীন নরপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।<sup>৬</sup></strong> ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানী উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন মনোনীত বঙ্গের শাসনকর্তা বগরা খানের প্রতি সম্রাট বলবন দিল্লী প্রত্যাবর্তনের পূর্বে নিম্নোক্ত বক্তব্যে রাজকীয় ফরমান জারি করেছিলেন—</p>
<p>&#8220;You should not forget my word that if any Governor, be he of Hind, Sind, Malwa, Gujrat, Lakhnowti or Sonargaon, ever revolts or raises arms against the Emperor of Delhi, the chasement inflicted upon him, his wife, children, helpers, associates and followers will be the same as that befell Tughril, his children and his men.&#8221;<sup>৭</sup></p>
<p>এই রাজকীয় ফরমান অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, সম্রাট বলবনের বহু পূর্বেই সোনারগাঁও দিল্লীর সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ পরিণত হয়েছিলো। ঠিক এই কারণেই বঙ্গের বিদ্রোহী সুলতান তুগ্রিল বেগকে দমন করার লক্ষ্যে উক্ত ধরনের ফরমান জারি করা হয়েছিলো।</p>
<p>এই প্রসংগে একথা উল্লেখ্য, ইতিহাসবিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, তুগ্রিল বেগের শাসনকেন্দ্র ছিলো লক্ষণাবতী এবং সেখানেই তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো। ড. জেমস ওয়াইজ <em>&#8216;Notes on Sonargaon, Eastern Bengal&#8217;</em> শীর্ষক এক তথ্য-সমৃদ্ধ গবেষণামূলক নিবন্ধে<sup>৮</sup> মুসলিম ঐতিহাসিকদের নিকট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লিখেছিলেন—</p>
<p>&#8216;Tughril &#8230;&#8230;&#8230; was Governor of Eastern Bengal and his seat of Government was Sunargaon. Balban returned to Sunargaon and put every one of Tughril&#8217;s family and his principal adherents to death&#8217;</p>
<p>এই মন্তব্যকে সত্য বলে স্বীকার করে নিলেও এবং এর বিপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক অকাট্য প্রমাণ যখন নেই, আমাদের মূল বক্তব্যের কোনো তারতম্য ঘটে না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবনের দীর্ঘদিন পূর্বেই সোনারগাঁও দিল্লী সালতানাতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিলো। যদিও ১২১৪ থেকে ১২৮১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কালের সোনারগাঁও-এর রাজনৈতিক ইতিহাস অস্পষ্ট ও অন্ধকারাছন্ন, এই সময়ে সেখানকার প্রকৃত শাসনকর্তা কে ছিলো বা কে ছিলো না, তা নিঃসন্দেহে জানা যাচ্ছে না; তা সত্ত্বেও উপরোদ্ধৃত তথ্যের ভিত্তিতে এ কথায় কোনো সন্দেহ থাকে না যে, এই দীর্ঘ সময়ে সোনারগাঁও মুসলিম শাসনাধীন ছিলো এবং এখানে বিপুলসংখ্যক মুসলিম বিদ্বজ্জন ও মনীষীদের অব্যাহত আগমন সংঘটিত হয়েছিলো।</p>
<p><strong>বুখারার প্রখ্যাত মনীষী ও হাদীস তত্ত্বের অনন্য পারদর্শী শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্ ১২৬০ সন কিংবা কাছাকাছি সময়ে তদানীন্তন মুসলিম শাসনের কেন্দ্রস্থল দিল্লীতে আগমন করেন। তিনি একজন সুবিজ্ঞ ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হওয়া ছাড়াও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখায় বিশেষ দক্ষ বলে পরিচিত ও খ্যাত ছিলেন। রসায়ন, প্রকৃতি-বিজ্ঞান ও যাদু-বিজ্ঞানেও যথেষ্ট দক্ষতার অধিকারী ছিলেন তিনি।</strong> দিল্লীতে অবস্থানকারী মুসলিম জ্ঞানী, গুণী, ফিকহবিদ এবং ইসলামী আইনবিদগণ মুহাদ্দিস আবু তাওয়ামাহ্-এর দিল্লী আগমন বিষয়ে অনতিবিলম্বে অবহিত হয়েছিলেন। এবং তাঁরা তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁদের জ্ঞান-পিপাসা নিবৃত্ত করতে ও কাজে আত্মনিয়োগ করতে একবিন্দু কুণ্ঠিত হলেন না; সে কাজে এতটুকু বিলম্বও করলেন না।<sup>৯</sup> তাঁদের শাগরিদ ও সহচরবৃন্দ তাঁদের অনুসরণে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গেলেন। অনেক মামলার বাদীপক্ষ তাঁর নিকট মামলার বিবরণ পেশ করে তাঁকে সেজন্য পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালেন এবং তিনি যেসব বিস্ময়কর কার্য সম্পাদনের দক্ষতার অধিকারী ছিলেন, তা প্রদর্শনের জন্যও আরয করলেন। ফলে তাঁর এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখতে পেয়ে দিল্লীর সম্রাট স্তম্ভিত ও বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি তাঁর এই অস্বস্তিকর উপস্থিতির সমূহ বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে তাঁকে রাজধানী থেকে সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে সোনারগাঁও চলে যাওয়ার জন্য তাঁকে কাতর অনুরোধ জানালেন।<sup>১০</sup></p>
<p>শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ স্বরূপ সোনারগাঁও যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। তাঁর আপন সহোদর মাওলানা হাফিজ যয়নুদ্দীন তাঁর সহযাত্রী হলেন। পথিমধ্যে এই কাফেলা এখানে-সেখানে অবস্থান গ্রহণের পর বিহারের মানের গ্রামে অবস্থান করে। এখানে তিনি ‘মানের’-এর স্বনামখ্যাত সূফী মাখদুমুল মুলক শায়খ শরফুদ্দীন আহমদের পিতা শায়খ ইহইয়া কর্তৃক সাদর সম্বর্ধিত হন। তিনি শায়খ আবু তাওয়ামাহর সাথে কথাবার্তা বলে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও বৈদগ্ধের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করে খুব বেশি অভিভূত হয়ে পড়েন। শায়খ ইহইয়া সুযোগ মনে করে তাঁর প্রাণ-প্রিয় পুত্র শায়খ শরফুদ্দীনকে এই মহান পর্যটক শায়খ আবু তাওয়ামাত্র সঙ্গী হয়ে সোনারগাঁও যাওয়ার এবং তাঁর নিকট উপস্থিত থেকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা লাভে মনোনিবেশ করার জন্য নির্দেশ দিলেন।”<sup>১১</sup> <strong>শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ ৬৬৮ হিজরীতে/১২৭০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও উপস্থিত হয়েছিলেন [তার দশ বছর পূর্বে সম্রাট বলবন সোনারগাঁও-এর নিকটস্থ এলাকায় পদার্পণ করেছিলেন]। শায়খ আবূ তাওয়ামাহ্ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি এখানে জ্ঞান-পিপাসু ছাত্রদের জন্য একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন এবং তাঁর শাগরিদদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেন একটি আস্তানা। তাঁর ইন্তেকাল হয় প্রায় ৭০০ হিজরীতে এবং সেই সময় পর্যন্ত এই দুটি প্রতিষ্ঠানই বিশেষ জাঁকজমক সহকারে চলতে থাকে।</strong></p>
<p>এভাবেই ইতিহাসে সর্বপ্রথম সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার একটি বিরাট কেন্দ্র হয়ে গড়ে উঠে। এই কেন্দ্র থেকেই তাফসীর, হাদীস ও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখার শিক্ষা চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করে। ইকদালা, পাণ্ডুয়া [ফিরোজাবাদ],  সাতগাঁও [চট্টগ্রাম] এবং বংগের অন্যান্য অংশের জ্ঞান-পিপাসু লোকেরা সোনারগাঁও উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণের এর বিরাট ও ব্যাপক সুযোগ লাভ করেন।</p>
<p>শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সাহিত্যে ও মানব সমাজ সংক্রান্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের অপরাপর শাখা-প্রশাখার কতটা দক্ষ ও পারদর্শী ছিলেন, যে বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানতে না পারলেও নিম্নোদ্ধৃত তথ্য থেকে তাঁর পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান-গভীরতা সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি—</p>
<p>তাঁর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত ‘মানের’-এর মাখদুমুল মুলক শরফুদ্দীন আহমদের অনন্য অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কথা সর্বজনবিদিত। তিনি শায়খ তাওয়ামাহ্ নিকট বহু বছর পর্যন্ত অব্যাহত অবস্থানের ফলে উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে করে তাঁর একমাত্র শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যাপকতার পরিমাণ অনায়াসেই আন্দাজ করা যায়।</p>
<p>ইসলামী আইনতত্ত্ব সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ এখনো বর্তমান রয়েছে। মাখদুমুল মুলক শায়খ শরফুদ্দীন আহমদ ইহইয়া আল-মানেরী (৬৬১-৭৮২ হি.) শায়খ আবু তাওয়ামাহ্’র প্রধান ছাত্র ও অত্যন্ত সম্মানিত অনুসারী ছিলেন। তিনি সোনারগাঁও অবস্থান করেই তার উস্তাদের নিকট তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইসলামী আইনতত্ত্ব এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অপরাপর শাখা-প্রশাখায় অধ্যয়ন করেন। তাঁর এই অধ্যয়নকাল ছিলো সুদীর্ঘ ২২ বছর, ৬৬৮-৬৯০ হিজরী পর্যন্ত। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষালাভে দুনিয়ার সব কিছু থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ঐকান্তিকতা ও একাগ্রতা সহকারে মগ্ন হয়েছিলেন। এই কথার প্রমাণ স্বরূপ এখানে একটি ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ট হবে। তাঁর এই অধ্যয়নকালে তাঁর নিকট বিভিন্ন স্থান থেকে যত চিঠি তিনি পেয়েছেন, সময়ের অপচয় এবং অধ্যয়নে মনোনিবেশ বিঘ্নিত হবে মনে করে তার একটি চিঠিও তিনি পাঠ না করে সব একটি থলের মধ্যে জমা রেখেছিলেন। তাঁর অধ্যয়ন সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি চিঠিগুলো থলে থেকে বের করে পড়তে শুরু করলেন। একেকটি চিঠি পাঠ করে তিনি তাঁর নিজ সংক্রান্ত এই দুঃখজনক সংবাদ লাভ করেন যে, তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা ৬৯০ হিজরীর (১২৯১ খ্রি.) ১১ই শাবান ইহলোক ত্যাগ করে গেছেন। অতঃপর তিনি তাঁর বিধবা জননীকে দেখার জন্য তাঁর অসীম শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের নিকট ‘মানের’ গমনের অনুমতি চাইলেন।</p>
<p>শায়খ মাখদুমুল মুলক জ্ঞান আহরণে কতটা মনোযোগী হয়েছিলেন, অপর একটি ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর শিক্ষক শায়খ আবু তাওয়ামাহর পাঠদানকেন্দ্র ছিলো সকল শ্রেণির জ্ঞান-পিপাসু লোকদের জন্য সম্পূর্ণ অবাধ ও উন্মুক্ত। সকল বিদেশী পর্যটক এবং সরকারি মেহমানও তাতে উপস্থিত থাকার অবাধ সুযোগ লাভ করতেন। তাতে তাঁর মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং সময়ের অপচয় হয় মনে করে শায়খ মাখদুম সেই সার্বজনীন শিক্ষা-কেন্দ্র অনুপস্থিত থাকতে শুরু করলেন। ফলে তিনি যথাসময়ে আহার্য গ্রহণ করতে পারতেন না। শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ তা লক্ষ্য করে তাঁর জন্য স্বতন্ত্রভাবে খাবার গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এর দরুন শায়খ মাখদুম সম্পূর্ণ সময় অধ্যয়ন, জ্ঞান-চর্চা ও আধ্যাত্ম-বিদ্যায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করার অবকাশ পেয়েছিলেন।</p>
<p>৬৯০ হিজরী সনে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ) মাখদুমুল মুলক যখন &#8216;মানের&#8217;-এর উদ্দেশ্যে সোনারগাঁও ত্যাগ করলেন, তখন তিনি সকল প্রকার ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিতা ও পরিপক্কতা অর্জন করেছিলেন। সেই বছর কিংবা তার পরবর্তী বছর দিল্লীস্থ সুলতানুল মাশায়েখ নিজামুদ্দীন আওলিয়ার সাথে এক সাফল্যমণ্ডিত সাক্ষাৎকার থেকে তার নিঃসন্দেহ প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রশ্নের অকাট্য ও বিশদ জবাব দানে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তাতে সুলতানুল মাশায়েখ তাঁর প্রতি এত বেশি সন্তুষ্ট হন যে, তিনি আনন্দের আতিশয্যে শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ একথালা পান তাঁর সম্মুখে পেশ করেন। তদানীন্তন ভারতীয় সূফীবাদের ইতিহাসে এই ঘটনা নজিরবিহীন। শাগরিদী গ্রহণে আগ্রহী কোনো ব্যক্তির প্রতি উক্তরূপ সম্মান প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত সূফীবাদের ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অতঃপর সুলতানুল আওলিয়া তাঁকে লক্ষ্য করে ফার্সী ভাষায় বলে উঠেন—</p>
<p><strong>“কল্পনার ঈগল পাখী এ, এঁকে আমাদের ফাঁদে ধরে রাখা যাবে না।”</strong></p>
<p>মাখদূমুল মুলক সম্পর্কে আলহাজ্ব নিজামুদ্দীন আল-গরীব আল-ইয়ামেনী যে কথা লিখেছেন, তার চাইতে উচ্চ মানের কথা বোধ হয় বলা যায় না। তিনি লাতায়েফুল আশরাফী গ্রন্থে লিখেছেন—</p>
<p>حضرت شيخ شرف الدين بعد از تحصيل علوم شرعية و تكميل رياضت اصليه وفرعيه بشرف ملازمت حضرت سلطان المشايخ بدهلى تشريف بردند و استدعا ارادت و ارشاد کردند اشتغفار از عالم غيبس وقضائے لا ریب کردند و سر بحبب استغراق کشیده بر آوردند و فرمودند: برادر شرف نصيب ارادت و حصول ملوك از برادرم نجیب الدین فردوسی است</p>
<p>হযরত শায়খ শরফুদ্দীন ধর্মীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা উচ্চতর মানে আয়ত্ত করার পর দিল্লীতে অবস্থানকারী সুলতানুল মাশায়েখের দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে একজন আধ্যাত্মিক শাগরিদ হিসাবে গ্রহণ করার জন্য প্রার্থনা জানালেন। তখন সুলতানুল মাশায়েখ মাথা নত করে অদৃশ্য জগত থেকে ইঙ্গিত লাভ করার পর বললেন, “ভাই শরফুদ্দীন, আপনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ ও চর্চার জন্য আমাদের ভাই নজীরুদ্দীন ফেরদৌসীর নিকট যান।”</p>
<p>এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, মাখদুমুল মুলক তাঁর উচ্চতর ইসলামী ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেছিলেন সোনারগাঁও অবস্থান কালে তাঁর মহান শিক্ষক শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্-এর কাছে। দিল্লীর সুলতানুল আওলিয়ার দরবারে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষা দান করার অনুমতি লাভের উদ্দেশ্যে।</p>
<p>মাখদুমুল মুলক উপমহাদেশে হাদীসতত্ত্বের প্রচার ও বিস্তারে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁর সম্পর্কিত আলোচনায় তা অবশ্যই উল্লেখ্য। কেননা, তিনি হাদীস জ্ঞানে যথেষ্ট মাত্রায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর নিজের লিখিত মাকতুবাত ও মালফুযাত থেকেই একথা প্রমাণিত যে, তিনি হাদীস বিজ্ঞানে যে দক্ষতা লাভ করেছিলেন, তদানীন্তন ভারতে তা ছিলো বিরল ঘটনা। সহীহ্ বুখারী, সহীহ্ মুসলিম, জামে সগীর, মুসনাদে আবু ইয়ালা, মাশারিকুল আনওয়ার, শরহে সাখাবী এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ তিনি পুরোপুরি অধ্যয়ন ও সে সবের জ্ঞান আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। তাঁর হাদীস বিষয়ক জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যাপকতার প্রমাণ স্বরূপ তাঁর নিকট হাদীস শিক্ষাপ্রাপ্ত মাওলানা ইমাম মুযাফফর বলখীর নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট। মাখদুমুল মুলক হাদীসের জ্ঞান বিস্তার করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি হাদীস অনুযায়ী জীবন গঠন ও পরিচালনের উপরও খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি নিজে রাসূলে কারীম (স.)-এর সুন্নত অনুযায়ী অত্যন্ত দৃঢ়তা ও অবিচলতা সহকারে আমল করতেন। তার একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ হচ্ছে, রাসূলে করীম (স.) তরমুজ কিংবা খরবুজ খেয়েছেন কিনা, খেয়ে থাকলে তা কীভাবে খেয়েছেন, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে না পারার কারণে তিনি নিজেও তাঁর জীবনকালে কখনও তা খাননি। মাওলানা ইমাম মুযাফ্ফর বলখী এবং হুসায়ন নওয়াশায়ী তওহীদ এই দুইজন তদানীন্তন বিহারের প্রখ্যাত হাদীসবিদ তাঁরই অতি প্রিয় ছাত্র ও উত্তরাধিকারী ছিলেন। মাখদুমুল মুলক নিজে সোনারগাঁও অবস্থান করে আল্লামা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহর নিকট হাদীস অধ্যয়ন করে কতটা ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, তা এ থেকেই প্রমাণিত হয়।</p>
<p><strong>এক কথায় শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের যে আলোর শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন, তাই তাঁর প্রিয় ছাত্র মাখদুমুল মুল্ক এবং তাঁর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত ও তাঁদের ছাত্রদের মাধ্যমে প্রায় দুই শতাব্দীকাল পর্যন্ত সমগ্র পূর্ব ও উত্তর ভারতকে হাদীস ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের আলোকে সমুদ্ভাসিত করে রেখেছিলো।</strong></p>
<p>তাঁদের পরবর্তীকালে যে সব সুবিখ্যাত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সোনারগাঁও পদার্পণ করেছেন, তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, শায়খ আলাউদ্দীন আলাউল হক (মৃত্যু, ৮০০ হি.)। তিনি পাণ্ডুয়ার সুবিখ্যাত সূফী ও আলেম ছিলেন এবং ছিলেন শায়খ আখী সিরাজের উত্তরসূরি। তিনি ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগাধ ও সুগভীর পাণ্ডিত্যের সাথে সাথে বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারীও ছিলেন। দিল্লীর মাহবুবুল আওলিয়া শায়খ নিজামুদ্দীনের প্রখ্যাত ছাত্র ও মুরীদ আখী সিরাজ যখন ইসলামী শিক্ষালাভ সম্পূর্ণ করলেন, তখন তাঁকে এই ইসলামী জ্ঞান ও শিক্ষার বিস্তার, প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব পালনের জন্য বঙ্গদেশে গমন করার নির্দেশ দেন শায়খ নিজামুদ্দীন। কিন্তু শায়খ আলাউল হক এই কাজেই বঙ্গদেশে নিয়োজিত রয়েছেন বিধায় সেখানে গমন করতে রীতিমত লজ্জাবোধ করলেন। অথচ আখী সিরাজ ছিলেন শায়খ নিজামুদ্দীনের অতিশয় প্রিয় ছাত্র এবং তাঁর নিকট প্রাপ্ত ইসলামী জ্ঞানের গভীরতার দৃষ্টিতে তিনি পূর্বেই তাঁকে &#8216;ভারতের দর্পণ&#8217; উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, “বঙ্গদেশে যেতে তাঁর কোন সংকোচ থাকা উচিত নয়। কেননা, আলাউল হক তাঁকে সেখানে দেখতে পেলে শুধু খুশীই হবেন না, তিনি তাঁর যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং তাঁর খিদমতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করবেন না। অতঃপর আখী সিরাজ যখন বঙ্গদেশে আগমন করলেন, তখন শায়খ নিজামুদ্দীনের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হলো। শায়খ আলাউল হক তাঁর মুরীদ হন এবং তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই তিনি করেন।”<sup>১২</sup></p>
<p>শায়খ আলাউল হক ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখার উপর অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি এখানে নিজস্ব একটি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। এখানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য অবস্থানকারী ছাত্র এবং অল্প সময়ের জন্য আগত সাক্ষাৎপ্রার্থী ও পর্যটকদের আপ্যায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন। তদানীন্তন বঙ্গের স্বাধীন সুলতান সিকান্দর শাহ শায়খ আলাউল হকের ব্যাপক ইসলামী জ্ঞান প্রচার ও ক্রমবর্ধমান খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা দেখে তাঁর নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে খুবই আশংকাবোধ করলেন। এই কারণে তিনি তাঁকে পাণ্ডুয়া থেকে বহিষ্কার করে সোনারগাঁও যেতে বাধ্য করলেন। শায়খ আলাউল হক সোনারগাঁয়ে প্রায় দুই বছর কাল অবস্থান করেন এবং এখানে তিনি তাঁর ইসলামী জ্ঞান প্রচারের বিপ্লবী তৎপরতা পুরোপুরি অব্যাহত রাখেন।<sup>১৩</sup> এখানে তাঁর আয়ের দৃশ্যমান কোনো সূত্র না থাকলেও শিক্ষার্থী ও অভ্যাগতদের জন্য তাঁর বিপুল অর্থ ব্যয় পাণ্ডুয়ার ন্যায়ই চলতে থাকে।</p>
<p>ইসলামী শিক্ষা ও বিপুল জ্ঞান-পারদর্শিতার অধিকারী শায়খ আলাউল হকের ব্যাপক ইসলাম প্রচারের ভাবধারা ও ঐকান্তিক উৎসাহ উদ্দীপনার কারণে তিনি সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে মাত্র দুই বছর সময়ে যে কাজ করেছেন, তাতে এতদঞ্চলে সাধারণভাবে ইসলামী জ্ঞান এবং বিশেষভাবে ইসলামের ধর্মতত্ত্বের ব্যাপক প্রসার ঘটে। জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয় একটি অপূর্ব ইসলামী চেতনা ও জাগরণ। কিছুমাত্র অলীক নয়, প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্য এই যে, এতদঞ্চলের সেই সময়কালে বিরাজমান প্রশান্ত আবহাওয়ায় ইসলামী জ্ঞান-শিক্ষায় ব্যাপক ও গভীর ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন এহেন মহান ব্যক্তিদের অবিশ্রান্ত ও অব্যাহত চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলেই নিম্নস্তরের ও নির্যাতিত বঞ্চিত জনগণের মধ্যে ইসলাম অভূতপূর্ব পরিচিতি লাভ করে। বস্তুত এ ধরনের লোকেরা যখন ইসলামের তাওহীদী আকীদা, সাম্য-ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণময় জীবন বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিলো এবং প্রচারকদের চরিত্রে ও কর্মতৎপরতায় তার বাস্তব নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয়েছিলো, তখন শুধু শত শত নয়, হাজার হাজার ও লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে যে ইসলামী জ্ঞান-মশাল জ্বলে উঠেছিলো, তার আলোকচ্ছটা বঙ্গ প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এরই ফলে উত্তরকালে ত্রিবেণীর (সাতগাঁও) দ্বীনি মুজাহিদ জাফর খান সাতগাঁও অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার সুদৃঢ় প্রচার কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৬৯৮ হিজরী সনে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। আর তার ঠিক পনেরো বছর পর সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজের রাজত্বকালে (৭০৯-৭২২ হি./১৩০১-১৩২২ খ্রি.) শিহাবুদ্দীন জাফর খান খানজাহান নামক সাতগাঁও-এর জনৈক জায়গীরদার দারুল খয়রাত [কল্যাণের কেন্দ্র] নামে অপর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ড. ওয়াইজের বর্ণনানুযায়ী<sup>১৪</sup> খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা কেন্দ্র এবং সেখানে প্রথিতযশা সুধী ও বিদ্বজ্জনের বিপুল সমাবেশ হওয়ার দরুন ব্যাপক খ্যাতি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো। অধিকন্তু ৮৩৫ হিজরীতে (১৪৩১ খ্রি.) জৈতমল যখন ইসলাম গ্রহণ করে জালালুদ্দীন নাম ধারণ করেন, তখন তিনি সোনারগাঁও থেকে শায়খ আলাউল হকের পুত্র ও স্থলবর্তী শায়খ নূর কুতুবে আলমের (মৃত্যু ৮৫১ হি./১৪৪৭ খ্রি.)<sup>১৫</sup> পৌত্র শায়খ যাহিদকে সোনারগাঁও থেকে আহ্বান করেন তাকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী ধর্মীয় আচার-পদ্ধতি ও হুকুম আহকাম শিক্ষাদান এবং সেই সাথে ইসলামের প্রশাসনিক নিয়ম-বিধি অনুসরণে তাঁকে সহায়তা ও উপদেশ দানের উদ্দেশ্যে।</p>
<p>এই বিবরণ অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এই কালে তদানীন্তন বঙ্গদেশের মধ্যে সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান শিক্ষার ও ইসলামী মনীষীদের বিপুল সমাবেশের দিক দিয়ে অপরাপর অঞ্চলের তুলনায় অধিক পরিচিতি ও খ্যাতির অধিকারী ছিলো।</p>
<p>বস্তুত সোনারগাঁও তার সমৃদ্ধির দিনগুলোতে, বিশেষ করে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনাহীন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। অসংখ্য মনীষী ও ইসলামী জ্ঞানে ব্যুৎপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গ দূর ও নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। এখানে ফকীরদের ১৫০টি গদী (খানকাহ) অবস্থিত ছিলো, যেখান থেকে লোকেরা সাধারণ ইসলামী জ্ঞান ও আদর্শ জীবন যাত্রা গ্রহণের অনুপ্রেরণা লাভ করতো<sup>১৬</sup>। এই প্রেরণার দরুনই সোনারগাঁও-এ ৯২৫ হিজরী (১৫১৯ খ্রি.) ও ৯২৯ হিজরীতে (১৫২৩ খ্রি.) দুটি বড় আকারের মসজিদ নির্মিত হয়েছিলো। এ মসজিদ দুটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যথাক্রমে মোল্লা হিজাবর খান ও মোল্লা মুবারক। ইতিহাসে এই দু&#8217;জন ব্যক্তির উল্লেখ হয়েছে—</p>
<p>ملك الامراً والوزراء وقدوة الفقهاء والمحدثين</p>
<p>“রাজন্য ও মন্ত্রীবর্গের প্রধান এবং ফিকহবিদ ও হাদীস পারদর্শীদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি” বলে<sup>১৭</sup> এবং এ উপাধিটি হচ্ছে বঙ্গদেশে অতীতে ইসলামী মনীষী ও রাজন্যবর্গকে দেওয়া সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক সম্মানজনক উপাধি।</p>
<p>এ ঘটনা থেকেও বুঝা যায়, তদানীন্তন সোনারগাঁও-এর শাসকমণ্ডলী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের প্রদর্শিত সম্মান ও অনুগ্রহ কেবল দরবারের লোকেরাই ধন্য হতেন না, নিকট ও দূরবর্তী মনীষা ও সংস্কৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিগণও নানাভাবে সম্মানিত হতেন।</p>
<p>তবে সোনারগাঁও-এর সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান মূসা খান এবং বঙ্গের ইতিহাসখ্যাত বারো ভূঁইয়া ভারত সম্রাট জাহাঙ্গীর নিযুক্ত বঙ্গের শাসনকর্তা ইসলাম খানের নিকট আত্মসমর্পণ করার পর থেকেই সোনারগাঁও-এর গৌরবোজ্জ্বল মর্যাদা খুব দ্রুত হ্রাসপ্রাপ্ত হতে শুরু করে। অতঃপর শুরু হয় মোঙ্গলদের ব্যাপক লুটতরাজের নির্মম ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ। শেষ পর্যন্ত সোনারগাঁও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। এভাবে সোনারগাঁও-এর রাজনৈতিক গুরুত্ব লোপ পাওয়ার পর তার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক গুরুত্বের সূর্যও অস্তমিত হয়ে যায়।</p>
<p>ইসলাম খানের শাসনামলে সোনারগাঁও-এর পরিবর্তে ঢাকা পূর্ববঙ্গের রাজধানী ও শাসন কেন্দ্ররূপে চিহ্নিত হয়, যদিও সোনারগাঁও তার সোনালী অতীতের স্বর্ণোজ্জ্বল ঐতিহাসিক মর্যাদার স্মৃতি ধারণ করে মাত্র একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে আজও পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্যসূত্র—</strong></p>
<p>১.       সাধারণ হিন্দু ঐতিহাসিকগণ ‘সোনারগাঁও’ লিখতে সংকোচ বোধ করেছেন। তার পরিবর্তে এ স্থানের নাম লিখেছেন ‘সুবর্ণগ্রাম’ : (<em>Islamic Culture</em>, vol : xxvii, P-8).</p>
<p>২.      ইবন বতুতা রচিত আজায়িবুল আসফার-৪র্থ খণ্ড, ২২৩ পৃ. প্যারিস : স্যার যদুনাথ সরকার। (<em>History of Bengal</em>, vol:11-P-101)</p>
<p>৩.      ইয়াহ্ইয়া সারহিন্দী : তারীখ-ই-মুবারক শাহী, পৃ. ১৮।</p>
<p>৪.      তাবকাতে নাসেরী, পৃ. ১৬৩।</p>
<p>৫.      জিয়াউদ্দীন বারানী-তারীখ-ই-ফিরোজশাহী, পৃ. ৮৭; L.A. S. B. – 1874, vol-xlii-p-80,— দনুজ রায় এক সময় ধীনাজ মাধব নামে পরিচিত হতেন। তিনি সম্ভবত বল্লাল সেনের পৌত্র ছিলেন।</p>
<p>৬.     যদুনাথ সরকার : (<em>History of Bengal</em>-vol-31, P-65).</p>
<p>৭.      তারীখ-ই-ফিরোজশাহী, পৃ. ৯৩ 1. A. 5. B-vol-xliii &#8211; 1874-P-83.</p>
<p>৮.     I.A.S.B-vol-xliii-1874-p-83.</p>
<p>৯.      মাখদুম শাহ শুয়াইব : মানাকিবুল-আসফীয়া।</p>
<p>১০.    সাইয়েদ আবদুল হাই নুযহাতুল আখতার গ্রন্থে অবশ্য লিখেছেন যে, শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সুলতান ইলতুৎমিশের রাজত্বকালেই ‘সোনারগাঁও’ উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সোনারগাঁও যাওয়ার পথে বিহারের ‘মানের’ নামক স্থানে অবস্থানের যে ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, তাতে উক্ত কথা বিশ্বাস্য নয়।</p>
<p>১১. মানাকিবুল আসফীরা مناقب الاصفيا প্রণেতা লিখেছেন, এই সময় মাখদুমুল মূলক-এর বয়স ছিলো মাত্র সাত বা আট বছর। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৬৬১ হিজরী সনে শাওয়াল মাসের কোনো এক।</p>
<p>১২.    আখবারুল আখিয়ার, পৃ. ১৩৯।</p>
<p>১৩.    <em>History of Bengal</em>. Vol: 11, p-113, আখবারুল আখিয়ার, পৃ. ১৩৯।</p>
<p>১৪.    Dr. Wise: <em>Notes on Sonargaun</em>, published in I. A. S. B. vol-xlii, P-45.</p>
<p>১৫. <em>Supra Notes</em> (1) P-125.</p>
<p>১৬.  Dr. Wise: <em>Notes on Sonargaun</em>, vide-1. A. S. B.-xliii, P-85.</p>
<p>১৭.    L.A. S. B-1873-P. 295.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/sonargaon-a-unique-minar-of-scholarly-tradition-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16133</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা &#8216;বাংলা&#8217;</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2025 13:55:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16044</guid>

					<description><![CDATA[ভাষা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বাহক। এজন্য একটা ভাষার ভাণ্ডার যতবেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, ওই ভাষার সংস্কৃতি ও সমাজ ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একইসাথে ভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির বাহন হিসেবেই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ভাষা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বাহক। এজন্য একটা ভাষার ভাণ্ডার যতবেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, ওই ভাষার সংস্কৃতি ও সমাজ ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একইসাথে ভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির বাহন হিসেবেই নয়, একটি স্বাধীন জাতির মূল প্রাণসত্তাও বটে। বাংলা ভাষা জনসংখ্যার দিক থেকে, ইতিহাসের দিক থেকে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা, আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। এজন্য ঢাকাও শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজধানী নয়, একটি দেশের প্রধান শহর নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা &#8216;বাংলা ভাষা&#8217;র রাজধানী। এই অঞ্চলে মানুষের আশা, জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, গৌরবগাঁথার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সামনে সর্বদাই দীপ্তিমান। নদীমাতৃক বাংলায় চিরসবুজ প্রান্তর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম উম্মাহর অধ্যুষিত বিভিন্ন দেশে এই বাংলা ভাষা সগৌরবে এই অঞ্চলের প্রাণসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>পশ্চিমের বিখ্যাত ভাবুক ও বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কির ভাষায়-</p>
<blockquote><p>&#8220;ভাষা কতিপয় শব্দের সমষ্টি নয়, এটা একইসাথে একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য, একটি জাতিসত্তার একীকরণ, একটি সামগ্রিক ইতিহাস যা একটি সমাজকে তৈরি করে। এর সবকিছুই একটি ভাষার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।&#8221;</p></blockquote>
<p>যেহেতু আমরা সকলেই জানি যে, সংস্কৃতির ভিত্তি হচ্ছে ভাষা। তাই ভাষার ভিত্তিকে শক্তিশালী না করে সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ অসম্ভব। যার কারণে আমাদের এ অঞ্চলে মুসলিম সালতানাতের সময়কালে কবি, সাহিত্যিক, বড় বড় চিন্তাবিদগণ এই ভাষাতেই তারা তাদের কাজগুলোকে সম্পাদন করেছেন। যেমন- বাংলা ভাষায় মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাংলা ভাষার সার্বিক বিকাশে মুসলিম কবি ও চিন্তাবিদদের অবদানের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো শাহ মোহাম্মদ সগীর লিখিত অমর সাহিত্যকর্ম &#8216;ইউসুফ জোলেখা&#8217;। &#8216;ইউসুফ জোলেখা&#8217; সাহিত্যিক উৎকর্ষ, ভাষার ব্যবহার, শব্দের বৈচিত্র্য, নানামুখী রূপক ব্যবহার এককথায় একটি অনন্য সাধারণ এবং পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যকর্ম হিসেবে গৃহীত। তাঁর এই অনন্য সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিপ্লবের সূচনা করে।</p>
<p>বাংলা ভাষার মহাকবি আলাওল ছিলেন তার সময়ের সবথেকে বড় ঔপন্যাসিক ও কালজয়ী কাব্যের স্রষ্টা। পক্ষান্তরে, ওই সময়ের আরেক কবি শেক্সপিয়র, যিনি একই সময়ে ইংরেজি ভাষাকে এক অর্থে জীবন দান করেছেন, তিনিও কিন্তু বিকশিত হয়েছেন আলাওলের পরে। এমনকি শেক্সপিয়ার মারা যাওয়ার দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে সে অর্থে আবিষ্কার করা হয়নি। অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার বহু পূর্বেই বাংলা ভাষা আলাওলদের হাত ধরে উৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং তার সে সমৃদ্ধশালী অবস্থান ধরে রেখেই নিরবচ্ছিন্নভাবে তৎকালীন সমাজ এবং রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে যাচ্ছিল। এবং গড়ে তুলেছিল এক বৈচিত্রময় অথচ শক্তিশালী সাংস্কৃ তিক ভিত্তি। পাশাপাশি কবি ফয়জুল্লাহর &#8216;গোরক্ষ বিজয়&#8217;, &#8216;গাজী বিজয়&#8217;, কবি আফজাল আলীর &#8216;নসিহতনামা&#8217;, কবি জৈনুদ্দিনের &#8216;রসুল বিজয়&#8217;, কবি মুজাম্মিলের &#8216;সায়ৎনামা&#8217;, দৌলত উজিরের &#8216;লায়লী মজনু&#8217;, মুহম্মদ কবীরের &#8216;মনোহর মধুমালতী&#8217; ইত্যাদির ন্যায় অজস্র সাহিত্য বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে। আর এ সাহিত্যরাজির অধিকাংশই ১৫ শতাব্দীর আগে লিখিত। শেক্সপিয়রের হাত ধরেই ইংরেজি ভাষা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কিন্তু শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে এসকল বড় বড় কবিদের সাহিত্য পড়লেই বুঝা যায়, ইংরেজি ভাষা যখন কেবল গঠনকালীন পর্যায়ে বিদ্যমান, বাংলা ভাষা তখন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে গনগনে সূর্য হয়ে বিরাজ করছে।</p>
<p>সে জায়গা থেকে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির পেছনে মুসলমানদের অবদান, তাদের ঐতিহাসিক ভিত্তিস্থাপনের বর্ণনা দু-চার লাইনে ব্যাখ্যা করলে তা অসমাপ্ত রয়ে যাবে এবং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধশালী ইতিহাস ও উপাখ্যানের প্রতিও অবিচার করা হবে। ভাষার সমৃদ্ধির বিবেচনায় চিন্তা করতে গেলে অন্যান্য সব অঞ্চল বাদ দিয়ে যদি আফ্রিকার দিকে তাকাই; সবথেকে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো আফ্রিকার মত বিশাল দেশে কোনো নিজস্ব ভাষা নেই বললেই চলে। মরক্কো, আলজেরিয়ায় ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যবাদীতায় তাদের নিজস্ব ভাষা যেন আজ বিলুপ্ত। সেখানে,</p>
<p>দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের শিকার হয়েও আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সগৌরবে টিকে আছে।</p>
<p>লিপি থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ প্যাটার্ন আমাদের নিজস্ব।</p>
<p>আমাদের মৌখিক এবং লিখিত ভাষায় পার্থক্য নেই। একটি ভাষাকে বিচার করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূচক এগুলো। এর আলোকে দেখলেও বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক, চৈন্তিক ও সাহিত্যগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী বিচার করা যায়। আর এতে আমরা দেখতে পাই, বাংলা ভাষার ভিত্তি আসলে কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, উপমহাদেশ এবং সমগ্র বিশ্ব ইতিহাসে বাংলা অঞ্চল অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্ববহ একটি অঞ্চল। আর এ গুরুত্বের একটি বৃহদাংশই জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য। প্রাক-মুসলিম আমলে বাংলা ভাষা অত্যন্ত দুর্বল একটি অবস্থানে ছিল। বিশেষতঃ সেন এবং ব্রাহ্মণেরা ং ব্রাহ্মণেরা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করার ফলে বাংলা ভাষা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গদেশ জয় করলে, মুসলিম শাসনের সৌভাগ্যে বাংলা ভাষার নবজন্ম এবং সমৃদ্ধি ঘটে। মুসলিম সুলতানেরা যেমনি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাকে বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ডে পরিণত করেছিলেন তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে বাংলাকে সমৃদ্ধ ভাষায় উন্নীত করেন। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের জন্ম ও বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকদের নাম নিবিড়ভাবে প্রাসঙ্গিক। অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, &#8220;মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ সাহিত্যের একরূপ জন্মদাতা বলিলে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গ-ভাষা বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষা।&#8221;</p>
<p>ভাষা সমৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলা অঞ্চলে বয়ে আনা মুসলমানদের নানা মূল্যবোধ সাহিত্য ভাবনার প্রসার ঘটায়। বাংলা সাহিত্যের পূর্বতন দেবতা নির্ভরতাকে অতিক্রম করে মুসলমানদের আনীত মানবতাবাদ, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব প্রভৃতি ভাবনা মানবিকতায় উন্নীত করে। মুসলিম আগমনের ফলে নির্দিষ্ট গণ্ডিবদ্ধ বাঙালির দৃষ্টি বিশ্বময় প্রসারিত হয় এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়। মহান আল্লাহর একত্ববাদী অস্তিত্বে ঈমান আনয়নের ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মধ্যেও তৈরি হওয়া আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে হরহামেশাই পাওয়া যায়। এসবে অনেক নিম্নবর্গের চরিত্রও পাওয়া যায়, যারা এক অদৃশ্য শক্তির প্রশ্রয়ে শোষকদের মোকাবেলা করেছেন। এ চিত্র কেবল মুসলিম লেখকদের কলমেই অঙ্কিত হয়নি; বরং অমুসলিম লেখকেরাও একই চিত্র এঁকেছেন।</p>
<p>মুসলমানদের হাত ধরে শুধুমাত্র বাংলা ভাষার শব্দগত সমৃদ্ধি, কিংবা সাহিত্যিক উৎকর্ষতা, অথবা বিভিন্ন ভাষার সম্মিলনে সার্বিক বিকাশই সাধিত হয়নি, বরং একইসাথে মুসলমানদের হাত তাদের আনীত নতুন চিন্তা ও দর্শনের আলোকে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি, বিষয়বস্তু এককথায় সমাজের চিন্তামানসের দিক সম্পূর্ণত বিবর্তিত হয়ে যায়। এর শক্তিশালী প্রভাব পড়ে তৎকালীন সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজেও।</p>
<p>প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. এম এ রহিমের ভাষায়-</p>
<blockquote><p>&#8220;মুসলমানরা বঙ্গদেশে যে নতুন চিন্তাধারা ও আদর্শের আমদানি করেন, তারই কল্যাণস্পর্শে হিন্দুসমাজে বিরাট জাগরণ আসে। ফলে শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণবধর্ম, ধর্মঠাকুরের পূজা ও সত্যপীর পূজা প্রভৃতি বহু ধর্মমতের উদ্ভব হয়। মুসলমানদের উদারনৈতিক ভাবধারার প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ, ধর্মঠাকুরের পূজা বিষয়ক সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ও সত্যপীরের পাঁচালী রচিত হয় এবং বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়। এভাবে বাংলার সমাজ জীবনে ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি সঞ্চার করে বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধিতে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য মুসলিম শাসন কৃতিত্বের অংশীদার।&#8221;</p></blockquote>
<p>আরোও উল্লেখযোগ্য ব্যপার হলো, মুঘল-পাঠান কিংবা বাংলা সালতানাতের শাসকগণের বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন। যেমন- পাঠানদের ভাষা ছিল প্রস্ত (পশতু), মুঘল সালতানাতের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। মুঘল থেকে শুরু করে সকল সালতানাতের শাসকরাই বিভিন্ন ভাষাকে ধারণ করলেও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের স্ব-স্ব ভাষাকে তারা জন্মভূমির ভাষা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং ঐসকল ভাষাকে চর্চার জন্য উৎসাহিত করেছেন।</p>
<p>বিশেষ করে সেনরা যখন কর্নাটক থেকে এসে গণহত্যা চালিয়ে রাজ্য দখল করে আইন চালু করেছিল, অষ্টাদশ পুরাণ ও রামের চরিত বাংলায় পাঠ করা নিষিদ্ধ, শোনা নিষিদ্ধ, কেউ তা অমান্য করলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারপরেই তারা বৌদ্ধধর্মের ও বাংলা ভাষাভাষী পন্ডিতদের গণহারে হত্যা করে।</p>
<p>কিন্তু পরবর্তীতে মুসলিম সুলতানেরা হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেন যার ফলে হিন্দু কবিরা সাহিত্য চর্চার পূর্ণ পরিবেশ পান। ইসলামী সভ্যতার অসাধারণ উদার মনোভাব, বহুত্ববাদী পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলশ্রুতিতে সকল ধর্মাবলম্বী চিন্তক, সাহিত্যিক, কবিরা তাদের সাহিত্য চর্চার সর্বোত্তম পরিবেশ পায়। ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্য পরিগঠন ও বিকাশের শ্রেষ্ঠ পরিবেশ পায়। মুসলমানদের উদারনৈতিক ভাবধারার ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ দেখার ও নিজ ভাষায় পড়ার সুযোগ পায়। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনকালে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়া তো দূরে থাক দেখা কিংবা এর পাঠ শোনাও নিষিদ্ধ ছিল। কেউ যদি ধর্মগ্রন্থ দেখত বা শুনতো, শাসকবর্গ চোখ-কানে গরম শিসা ঢেলে তাকে হত্যা করত। মুসলিম সুলতানদের হাত ধরে এই নিকৃষ্ট শোষণমূলক প্রথা ও ভয়াবহ জুলুমের অবসান ঘটে। অনেক মুসলিম শাসক স্বয়ং যেমন সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ, আলাউদ্দীন হোসেন শাহ, শাহজাদা নুসরত শাহের মতো শাসকেরা সরাসরি হিন্দু কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, সুযোগ দিয়েছেন। সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু &#8216;ভগবতে&#8217;র অনুবাদ সম্পন্ন করেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর &#8216;মহাভরত&#8217; অনুবাদকালে শাহজাদা নুসরত শাহ তাকে সরাসরি সহায়তা করেন।</p>
<p>সেই জায়গা থেকে এসকল মানুষের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। জনসাধারণের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন মুসলমানরাই।</p>
<p>যেমন- তৎকালীন পণ্ডিতেরা কৃত্রিম সংস্কৃতি ভাষা জানতো এবং সেগুলো পড়ে জাতপ্রথার মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রক্ষা করে চলতো। যার কারণে সাধারণ মানুষ মূলধারা থেকে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু মুসলমান খলিফাগণ এইসকল পণ্ডিতদের বিরুদ্ধাচরণ করে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য, সাধারণ মানুষের পিপাসাকে নিবারণ করার জন্য সকল ধরনের গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত করেন এবং বাংলা ভাষার দিকে এত বেশি উৎসাহিত করেন। তৎকালীন দেশীয় সংস্কৃতির ধারা রক্ষার জন্য এবং দেশবাসীর শিক্ষা-নৈতিকতা এসকল বিষয়কে শক্তিশালী করার জন্য মূলত বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচতা ও শিক্ষার দিকে এতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যার কারণে তৎকালীন সময়ের একজন সাধারণ কৃষকও তৎকালীন পাশ্চাত্য সভ্যতার জ্ঞানীদের তুলনায় বেশি জানতো। এমনকি তাদের তুলনায় আমাদের দেশের কৃষকদের দার্শনিক বললেও ভুল হবে না। অতঃপর ড. কাজী মোতাহার হোসেনের ভাষায়, &#8216;তৎকালীন শাসকদের এত বেশী উৎসাহ পেয়েছিল বিধায় বাঙালিরা নিজেদের ভাষাকে এতবেশি আত্মস্থ করতে পেরেছিল।&#8221; এভাবে ইসলামী সভ্যতা থেকে এসকল বিষয়গুলোকে গ্রহণ করে এ অঞ্চলেও নিজেদের জীবন এবং সভ্যতাকে এত বেশি উন্নত করতে পেরেছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা এ অঞ্চলে এসেও এ অঞ্চলে ঐতিহ্যের সাথে এমনভাবে নিজেদেরকে মেলে ধরেছিল এবং ইসলামের নব-নব বিকাশ সাধনের ক্ষেত্রগুলোকে এটার সাথে সমন্বয় সাধন করে তার উদারতা ও সর্বসহযোগিতাকে এমনভাবে তুলে ধরেছিল যে এর দ্বারা সকলেই অর্থাৎ এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষ উপকৃত হয়েছে। কোনো ধর্মও নষ্ট হয়নি, ইসলামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এভাবে করেই অঞ্চলের ভিত্তি এবং ভাষার শক্তিশালী একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাংলা ভাষার জন্য তৎকালীন দুনিয়ায় সবচেয়ে নজিরবিহীন সম্মাননা হচ্ছে-</p>
<p><strong>সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি রচনা করেন। রাজনৈতিক ভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রের নামকরণ করেন- শাহী বাংগালাহ।</strong></p>
<p><strong>পরবর্তীতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির শিখরে পৌঁছিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় অনুমোদন দেন, যা বাংলাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।</strong></p>
<p>এসব ক্ষেত্রে আরো উদাহরণ হলো: মুঘল সালতানাতের সময়ে আরাকান রাজ্যসভায় অমার্ত্যগণ বাংলা ভাষার শ্রী বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচুর পরিমাণ তহবিল পেতেন, ফলশ্রুতিতে দৌলত কাজী, মহাকবি আলাওলরা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে অমর কীর্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। আমরা যদি লক্ষ্য করি, তখনও সংস্কৃত ভাষা ছিল, আরবি ভাষার জয়গান ছিল, ফারসি ভাষা ছিল দরবারের ভাষা, উর্দু ভাষা ছিল প্রভাবশালী ভাষাগুলোর একটি। এতগুলো শক্তিশালী ভাষার মধ্যে থেকে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলো শিক্ষা লাভ করতেন, এসকল ভাষার মৌলিক গ্রন্থগুলো পাঠ করে করে সমৃদ্ধি অর্জন করতেন, কারণ এসকল ভাষা ইসলামের ভাষা। কিন্তু এতকিছুর পরেও তাদের নিজস্ব ভাষা- বাংলা ভাষাকে তারা চর্চা করেছেন। এবং আলাওল তাঁর সাহিত্যগুলো উপহার দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ভাষাকে চতুর্মুখী করে বিকাশ করেছেন।</p>
<p>মাটি ও জাতির রূহকে উপলব্ধি করে এ ভাষাকে ধারণ করেছেন। তারা কখনোই বিদেশি সংস্কৃতির সাথে নিজেদের বিলিয়েও দেননি আবার ইসলামের মূল যে রূহ তাকেও দূরে ঠেলে দেননি। সমন্বয় সাধন করেছেন এবং সে আলোকেই তাদের কর্মগুলো সম্পাদন করেছেন। এক্ষেত্রে কাজী মোতাহারের আরেকটি লাইন হচ্ছে, &#8220;মুঘল সালতানাতের মুসলিম শাসকেরা অনেকেই উসমানী-আব্বাসী বা আন্দালুসের ওই অঞ্চলের তথা বিদেশি বংশোদ্ভূত হলেও এই দেশকে তারা স্বদেশ হিসেবেই গড়ে তুলেছিলেন।&#8221; এই অঞ্চলের কোনো আদর্শকে, স্বতন্ত্রতাকে ও এদেশের ভাষাকে গ্রাস করা তো দূরের কথা বরঞ্চ তারা এগুলো রক্ষার ব্যপারে উৎসাহ দিয়ে তৎকালীন সুলতানগণ, তৎকালীন সুবেদাররা অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলগুলোর সাথে যোগসূত্র সাধন করে রাষ্ট্রীয় ভাষাগুলো শিক্ষাদান করেও বাংলা ভাষা তথা আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে শক্তিশালী করেছেন।</p>
<p>এ বিষয়টি ড. এম এ রহিমের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে এভাবে-</p>
<p>&#8220;মুসলমানগণ অন্য জাতির শিক্ষা ও জ্ঞানের মর্যাদা দিয়েছেন এবং সর্বত্র প্রজাসাধারণের সংস্কৃতি ও আদর্শ রক্ষা করেছেন। মুসলিম শাসকবর্গ ও হাজার হাজার বহিরাগত মুসলমান বঙ্গদেশে বসতি স্থাপন করেন। তারা বাংলাদেশকে নিজেদের দেশরূপেই গ্রহণ করেন, এবং নিজেদেরকে বাংলা ভাষার সন্তান হিসেবেই পরিচয় দেন। এ দেশের আদি অধিবাসীগণের মতোই বাংলা তাদেরও ভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়।&#8221;</p>
<p>বাংলা সাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন &#8216;জীবাত্মা-পরমাত্মা&#8217; এটিরও বাংলা সাহিত্যে আমদানি ঘটেছে মুসলমানদের সুফিবাদ থেকে। বাংলা ভাষায় পুঁথি সাহিত্যের যাত্রাও শুরু হয় মুসলিম কবিদের মাধ্যমে।</p>
<p>সর্বোপরি, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে বাংলা ভাষায় বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অধিকার করে।</p>
<p>এখন কথা হচ্ছে, বাংলা ভাষা কি মুসলমানদের ভাষা হিসেবে বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হয়েছিল? অবশ্যই হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে শুরুর দিকটায় প্রভাবশালী ভাষা না হলেও মুসলমানদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় এই ভাষাটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষায় পরিণত হয়। আর এটি কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী, বৃটিশদের আজ্ঞাবহ ও হিন্দু সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহনের উক্তি থেকে আমরা জানতে পারি। তার কথার আলোকে, যখন ব্রিটিশরা আসে ওই সময়ের সমাজকাঠামোতেও মুসলমানগণই তাদের চিন্তা-ভাবনা, ভদ্রতা, বিচার-বুদ্ধিতে, কার্য পরিচালনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। এটা সে নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছে। মুসলিম সালতানাতের খলিফাগণ, সিপাহসালার উজির-নাজির থেকে শুরু করে সকল কাঠামো থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি জোরদান, পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদির মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ ছিলেন না। একইসাথে তারা রাষ্ট্রীয়ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং সরকারিভাবে তার ব্যবহারকেও নিশ্চিত করেছিলেন। এক্ষেত্রে তারা দরবারে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল কবিদেরকে বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় কাব্যানুবাদের উৎসাহ প্রদান করেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় জীবনেও বাংলা ভাষার ব্যবহারকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দেন। একদিকে যেমন আরবি ও ফারসি ভাষার ব্যবহার ছিল, একইসাথে বাংলা ভাষাকেও এগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুসলিম শাসকগণ এ অঞ্চলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই মসজিদের মুদ্রালিপি থেকে শুরু করে সকল স্থানেই আরবি, ফারসিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, বাংলা ভাষাকেও একইভাবে ব্যবহার করেছেন। তাদের সীলমোহর, স্বাক্ষর, বিভিন্ন অংশ জুড়েই থাকত বাংলা ভাষার সরকারি ব্যবহার। অফিস-আদালত, প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিচারালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রিকরণ, ব্যক্তিগত কাজকর্ম, প্রজার সাথে সুলতানের কথোপকথন, নবাব, সুবেদার বা দেওয়ানদের দরবারেও বাংলা ভাষায় সকল কিছু পেশ করা যেত। এই ব্যপারে ড. এস এম লুৎফর রহমান চমৎকার কিছু প্রমাণাদি তুলে ধরেছেন। যেমন- তিনি শায়েস্তা খানের আমলে তৎকালীন সময়ে কর্মরত ছিলেন দেওয়ান বদিউজ্জামান খান, তার মোহরযুক্ত চিঠি ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন লিখিত দলিলপত্র সামনে হাজির করেন। অমুসলিমদের সাথে লিখিত চুক্তিপত্র যেমন নবাব শায়েস্তা খানের সাথে অধীন শাহ ওজিউল এবং পরগণা রাজ্যের দেওয়ান সাহেবের স্বাক্ষর দ্বারা অনুমোদিত বিভিন্ন দলিলপত্র তিনি তুলে ধরেছেন। আর এই প্রত্যেকটি দলিলপত্রের ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি সেগুলো বাংলা ভাষায় লিখিত এবং আদানপ্রদানকৃত হয়েছে।</p>
<p>বর্তমান সময়ে এসে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, এত শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সেই জৌলুসপূর্ণ ভাষা এভাবে মুসলমানদের হাতছাড়া হবার কারণই বা কী ছিল?</p>
<p>আমরা জানি যে, ব্রিটিশ শাসনের সময়কালে মূলত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, ১৭৫৭সালের বিপর্যয়, ১৮৩০-১৮৪০ সালের আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের যে সংগ্রাম- এই সংগ্রামের ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা মুসলমানরা ছাড়া অন্য কেউ সে অর্থে পালন করেনি। পরবর্তী সময়ে হিন্দু এবং শিখরা আসলেও অধিকাংশ ব্রাহ্মণ, হিন্দু সুবিধাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ব্রিটিশদের সবকিছুকে গ্রহণ করে সেভাবেই এ অঞ্চলকে পরিচালনা করার এবং বৃটিশদেরকে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে। ফলস্বরূপ তারা তাদের ভাষাকে, তাদের সব কালচারকে গ্রহণ করে তাদের নিজেদের সুবিধাটুকু অর্জন করেছে। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের ক্ষেত্রে কিন্তু ইংরেজি ভাষা শিখেও যেমন কোনো উপকার হচ্ছিলো না, একইভাবে এ ভাষার বিরোধীতা করেও কোনো লাভ হচ্ছিলো না। কারণ, সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই সময়টাতে ইংরেজি ভাষা গোটা ভারতব্যাপী শিক্ষার ভাষা, রাষ্ট্রসহ সকল কিছুর ভাষায় পরিণত হয়। হিন্দু থেকে শুরু করে অন্যান্যরা গ্রহণ করলে মুসলমানদের এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিতে হয় জাতির সামগ্রিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করেই। কারণ, আমাদের সংগ্রাম ব্রিটিশ একাডেমিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তাদের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সেসময়ে যখন মুসলমানরা সকল দিক থেকে শোষণের কারণে পিছিয়ে পড়লো আর্থিকভাবে, শিক্ষার দিক থেকে। সে সময়টাতে বাংলা ভাষাও চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে, বৃটিশদের আজ্ঞাবহদের হাতে। বাংলা ভাষা এক কথায় পঙ্গুত্ব বরণ করে। আজ অবধি সেই বাংলা ভাষা আমাদের হাতে নেই।</p>
<p>প্রশ্ন আসতে পারে, আমাদের অঞ্চলে ব্রিটিশরা কেনো এই বাংলা ভাষাকেই সর্বপ্রথম আক্রমণ করলো? তখনও তো বাংলায় ভাষায় প্রচুর পরিমাণে বই ছিল না, সিনেমা ছিল না। তবু কেনো এই আক্রমণ? তৎকালীন অর্থনীতি, কৃষিসহ সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে যে আগ্রাসন তারা পরিচালনা করেছে। সমপর্যায়ের আগ্রাসনের পরিমাণকে বৃদ্ধি করে বাংলা ভাষাকে তাদের নিজস্ব রূপে রূপায়ণ করেছে, অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং যখন তারা দেখল এতকিছুর পরেও তারা তাদের খ্রিস্টানধর্ম, ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে সমবেত করে (উল্লেখ্য ইতোপূর্বে হিন্দুধর্ম এত বেশি সমাবিষ্ট ছিল না) ব্রাহ্মণশ্রেণির হাতে বাংলা ভাষাকে তুলে দেয়। নতুন যে ব্রাহ্মণ্যবাদের জন্ম তারা দিয়েছে, এটির ভিত্তি যারা সর্বপ্রথম নির্মাণ করেছে সেই প্রাণসত্তা তারা বাংলা ভাষাতেই রচনা করে এই আগ্রাসন পরিচালনা করেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা বাংলাকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বারবারই ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।</p>
<p><strong>আমরা পড়ে থাকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা লিপির জনক, অথচ ঈশ্বরচন্দ্র বাংলা লিপির আবিষ্কর্তা নন। বাংলায় হাজারো লিপি শিক্ষার বই আর উদ্যমের মধ্যে বর্ণপরিচয় একটি মাধ্যম। বই লিখতে তিনি লিপি সংস্কার করেন। তিনি সিভিলিয়ানদের প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হিন্দির স্রষ্টা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেড পণ্ডিত ছিলেন পাঁচ বছর।</strong> গত কয়েক দশকে হিন্দি থেকে আরবি ও ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন যে নতুনভাবে চলছে তাঁর বীজ, ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তাঁর গুরু জয়গোপাল তর্কালঙ্কার বপন করে যান। তারা বাংলা ভাষায় এই কাজটা করে দেখান পারসিক অভিধান প্রণয়ন করে। বিদ্যাসাগর মশাই গুরুর পথে বাংলায় অযাচিত ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে সংস্কৃত শব্দ ঢুকিয়ে, তার আগের দীর্ঘকালের ভাষার বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গী রুদ্ধ করেন। এর ফলে যে ভাষাটার জন্ম হয় তা আর যাই হোক বাংলা নয়। একে নাম দেয়া হয় &#8216;অভিজাত প্রমিত বাংলা&#8217;। সমস্যাটা হচ্ছে এই মান ভাষার সঙ্গে পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষাগুলোর দূরত্বটা অনেক, এখানে সংস্কৃত শব্দ চাপিয়ে দেয়ার বিষয় আছে। এমন সব শব্দ অভিজাতদের সাহিত্যে ও কর্মে ব্যবহার করা হয়; যা প্রায় শত বছর পরেও পূর্ব বাংলার মানুষের মুখে উঠে আসেনি। এসব শব্দ রয়ে গেছে গুরুগম্ভীর কিংবা ভাবগম্ভীর। সহজাতভাবে প্রবেশ করেনি বলে শব্দগুল সাধারণের মুখে শোভা পায় না। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এই নিয়ে যা বলেছেন তার ভাবার্থ এরকম-পূর্ব বাংলার মানুষের লোকায়ত ভাষা থেকে কলকাতার অভিজাতদের চাপিয়ে দেয়া ভাষার দূরত্বটা এতই বেশি যে, সাধারণের মুখে ভাষাটা আসে না। সাধারণকে ভাষাটা শিখতে হয় বরং লেখাপড়া করে &#8216;লায়েক&#8217; হওয়ার পরই কেবল এ ভাষায় কথা বলা যায়, শুধু তখনই এটা মুখে আসে!</p>
<p>বাংলা ভাষার এই নেতিবাচক বিবর্তন কিংবা বাংলা ভাষার প্রায় হাজার বছরের বেশি সময়ের স্বাভাবিক বিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে প্রমিত বাংলা ভাষা, লেখ্য লিপিকে ঔপনিবেশিক কাঠামো অর্জন করানোর উদ্যমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের অবদান প্রচুর। কারণ মূল পরিবর্তন বা সোজাকথায় আগ্রাসনের সূচনাটা তখন থেকেই।</p>
<p>কিন্তু এই আগ্রাসনের মূল কারণ কী? এর কারণ হলো- একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একটি জাতির চিন্তাধারা, সংস্কৃতির ধারাকে ব্যাঘাত ঘটাতে, সোশিও-কালচারকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের নিজস্ব ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটি সাম্রাজ্যবাদী, যায়নবাদী ব্রিটিশরা খুব সফলতার সাথেই সম্পাদন করেছে।</p>
<p>কিন্তু পরবর্তীতে আমরা অন্যান্য ভাষা চর্চা করতেও পারিনি, আরবি-ফারসিকেও ভালোভাবে ধারণ করতে পারিনি, উর্দুকেও কাজে লাগাতে পারিনি। একইভাবে এসকল ভাষাকে কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদেরকে শক্তিশালী করার প্রধান বাহন বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করবো সেটাও পারিনি। এজন্য কাজী মোতাহার হোসেন বলেছিলেন, &#8220;বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার প্রতি উদাসীনতায় বাঙালি মুসলমানের অন্যতম অধঃপতনের কারণ।&#8221; সত্যিকারার্থে এর বাস্তবতা রয়েছে। কেননা, জাতির রূহকে উপলব্ধি করতে হলে, ভূমিকে ধারণ করে সে আলোকে নতুন ইশতেহার প্রদান করতে হলে জাতির নাড়ি-নক্ষত্রের সাথে যোগসূত্র থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, বাংলা ভাষা। কিন্তু আমরা সেটাকে আমাদের মত করে ধারণ করতে পারিনি। সর্বোচ্চ কিছু চেষ্টা করেছি আরবি দিয়ে, উর্দু সাহিত্য দিয়ে কিছু ধর্মীয় ব্যপার আয়ত্ত করতে; কিন্তু সেটা দিয়ে তো আমাদের এ অঞ্চলের রূহকে বুঝা সম্ভব না। ভাসাভাসা দু&#8217;চারটি লাইন মুখস্থ করে বা মূলনীতি পড়ে আমরা কখনোই এই অঞ্চলের সামাজিক সংস্কৃতিকে, নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের ইশতেহারকে সামনে আনতে পারবো না। এজন্য ইসলামের মূল জ্ঞান যেসকল ভাষায় রয়েছে সেটার সাথে অবশ্যই আমাদের মাতৃভাষার সমন্বয় সাধন করে সকলকিছুকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।</p>
<p>আবার বাংলা সাহিত্য যতটুকুই বা ছিল তা পুঁথি সাহিত্য সৃষ্টি করে বাংলাদেশের- এ অঞ্চলের চাষী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কিছুটা খোরাক দিলেও শিক্ষার প্রধান ভাষা হিসেবে সমাজবিজ্ঞান তথা জাতির মূল রূহ-এর মূলনীতি প্রণয়নের ভাষা হিসেবে সেভাবে দাঁড় করাতে পারিনি। বাস্তবতা হলো এই ধরণের ভাষা চর্চা দিয়ে কখনোই বাঙালি মুসলমানের পক্ষে সভ্যতা বিনির্মাণ করা সম্ভব না, বরং সাম্রাজ্যবাদীদের শেখানো বুলি, ধার করা চিন্তা দিয়েই চলতে হবে। এছাড়া আমাদের হাতে নিজস্ব কোনো সম্পদ নেই!</p>
<p>আবার আমরা অধিকাংশ সময় নিজেদের অলসতাকে ঢাকতে গিয়ে এককেন্দ্রিক দোষারোপ করি, যেমন- হিন্দুরা বা অন্যান্যরা সকল কিছুকে দখল করে নিয়েছে। পরিভাষা, শব্দভাণ্ডার, সাহিত্য, কবিতা, জ্ঞানের ভাষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির ভাষা সকল কিছুই অন্যদের পরিভাষা দিয়ে, চিন্তা দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে। বাস্তবতা হলো অভিযোগ করে কখনোই মুক্তি মিলে না।</p>
<p>ইদানীং আবার বাংলাভাষাকে নিয়ে উদ্ভুত সকল সমস্যার মূলে একমাত্র পাকিস্তানি শাসনামল এবং পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক উর্দু ভাষার আধিপত্যকেই দায়ী করা হয়। এমনকি স্বাধীনতার পরে যেসব লেখনী প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো পড়লেও আমরা ভাষাকেন্দ্রিক মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে &#8216;৫২ এর ভাষা আন্দোলনকেই বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা কি আদতে সেটাই বলে?</p>
<p>বাংলা ভাষাকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরিকৃত।</p>
<p>সুতরাং বুঝা যায়, এ সকল আলাপ উপেক্ষিত থাকার কারণও আমাদের কাছে অস্পষ্ট নয়। আর এই উপেক্ষা থেকেই সমস্যার সূচনা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে এই উপমহাদেশকে রক্ষা করা হয়, যাদের কাফনবিহীন দাফন হয়েছিল এ বাংলায়। এরপর হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ রক্তার্জিত স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এই বাংলাকে। আমরা পেয়েছি আমাদের নিজস্ব মাতৃভূমি &#8216;বাংলাদেশ&#8217;। সেই দেশকে সার্বজনীন করে তুলতে এদেশের ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবীগণ সকল স্তরের মানুষকে বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরা উচিত। যাতে করে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই বাংলা ভাষায় জ্ঞানার্জন করতে পারবে। বাংলা ভাষাতেই খুলে যাবে মানুষের সার্বিক বিকাশের এক অবরুদ্ধ দ্বার। কিন্তু আমাদের সমাজ, রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা গণিত সকল বিষয়ের পাঠদানই হচ্ছে ইংরেজিতে, যেগুলোর বাংলা পাঠ্যবই সকলের সামনে হাজির করার প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি।</p>
<p>আমাদের এই ভাষাকে, আমাদের সাহিত্যকে আমাদের নিজেদেরকেই বহন করার দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আমাদের সুবিশাল ইসলামী সভ্যতা, আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতির মুক্তির সাথে সংযোগ স্থাপণ করে আমাদের মাটি, আমাদের মানুষ ও আমাদের বাংলা ভাষার সাথে সমন্বয় করে এমন একটি সুবিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার, জ্ঞানের ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, এমন সকল চিন্তা ও মূলনীতি সামনে হাজির করতে হবে, এমনসব কাব্য ও ইশতেহার আনতে হবে যেগুলো দিয়ে আমরা আবার বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরতে পারবো। এটি ব্যতীত কখনো আমাদের জাতির কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কীভাবে পৌঁছাবো! আমরা তো মাতৃভাষাকেই ধারণ করতে পারছি না। মাতৃভাষাকে দিয়ে সভ্যতার কথা, সাংস্কৃ তির কথা ফুটিয়ে তুলতেই পারছিনা। তাহলে মানুষ কি করে বুঝবে এর গুরুত্ব? আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচের ভাষায়, &#8220;যেকোনো চিন্তাকে যদি আমরা ঐ মানুষের সাথে, ঐ মাটির সাথে সমন্বিত করতে না পারি, তাহলে তা কখনোই সফলতার মুখ দেখবে না। এজন্য আমাদের চেতনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে বাংলা ভাষাকে নিজস্ব ধারায় ইসলামী সভ্যতার আদলে তৈরি করার কোনোই বিকল্প নেই।&#8221;</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্যণীয়- শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রেই বর্তমানে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম একটি সমৃদ্ধশালী দেশ চীনেও ১৯৫০ সালের পূর্বে চায়না ভাষার সাথে সাথে অন্যান্য ভাষারও বেশ আধিপত্য ছিল। কিন্তু চীন তাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সামাজিক শক্তিকে যথোপযুক্ত কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুকে বন্ধ করে দিয়ে হলেও অধ্যাপক, সাহিত্যিক, অনুবাদক নিযুক্ত করে বই-পুস্তক, লেখনী সকল কিছুকে নিজস্ব ভাষায় অনুদিত করার, প্রকাশ করার। প্রথম কয়েক বছরেই হাজার হাজার চীনা সাহিত্য অনুদিত হয়, নিজস্ব ভাষায় লিখিত হয়। ফলশ্রুতিতে তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে চাইনিজ ভাষায়, নিজেদের রূপরেখার আলোকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে।</p>
<p>উসমানী খিলাফত পরবর্তী সময়ে, উসমানীয় ভাষাকে পরিবর্তন করে যখন ল্যাটিন ভাষায় নিয়ে যাওয়া হয়, আধুনিক তার্কিশ ভাষাকেও এভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আজ সকল ধরনের জ্ঞানভাণ্ডার, সাহিত্য, চিন্তা তার্কিশরা তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ করতে পারে, চর্চা করতে পারে। তাহলে আমরা কেনো পারবো না?</p>
<p>যেখানে বর্তমানে মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্ব-ভাষা তালিকায় বাংলার অবস্থান পঞ্চম এবং বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে এর অবস্থান সপ্তম। বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও অধিক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এদের মধ্যে ২৬ কোটিরও বেশি বাংলা ভাষাভাষীর বসবাস বাংলাদেশ ও ভারতে। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী বাকি ৪ কোটিরও বেশি মানুষ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবুও কেনো আমরা পারবো না?</p>
<p>আমরা জানি যে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংঙ্গীত রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাতেই।</p>
<p>বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা এবং এদেশের ৯৮.৯% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন। এবং ১৯৮৭ সালের &#8216;বাংলা ভাষা প্রচলন আইন&#8217; অনুযায়ী, &#8220;বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব ও অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে এবং যদি কোন ব্যক্তি বাংলাভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তা হলে সে আবেদন বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের জন্য ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়।</p>
<p>পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাংলাভাষী অসংখ্য মানুষ। যেমন- ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:</p>
<ul>
<li>১. পশ্চিমবঙ্গ : যার জনসংখ্যা প্রায় ৭,৮৬,৯৮,৮৫২ জন। এ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৬.২২% বাংলায় কথা বলে, অধিকাংশ অধিবাসীও মাতৃভাষা হিসেবে বাংলায় কথা বলে থাকেন।</li>
<li>২. ত্রিপুরা: এ রাজ্যের অ-উপজাতি জনসংখ্যার বেশিরভাগই বাংলাভাষী হিন্দু এবং মুসলমান। যা রাজ্যের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।</li>
<li>৩. আসাম: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, আসামে প্রায় ৩,১২,০৫৫৭৬ জন লোক বাস করে। &#8216;১১-র আদমশুমারি রিপোর্ট অনুসারে, আসাম একটি বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। প্রকৃত বাঙালি জনসংখ্যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪%।</li>
<li>৪. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি রয়েছে, যার আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ১,০০,০০০ জন এবং মোট জনসংখ্যার ২৬% -২৮%। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বাংলা সর্বাধিক প্রচলিত একটি ভাষা, যদিও সেখানে এর সরকারী কোন স্বীকৃতি নেই।</li>
<li>৫. ঝাড়খণ্ড ২০১১ সালে বাংলা ভাষাকে তাদের দ্বিতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেয়।</li>
</ul>
<p>উপরের রাজ্যগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী অঞ্চল। তবে এগুলো বাদে অন্যান্য যে রাজ্যগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন সেসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে-নয়াদিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, বিহার, ভাগলপুর, পাটনা, চেন্নাই এবং জয়পুর।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাকিস্তানের করাচিতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন এবং করাচি সিটি করপোরেশনের অন্যতম দাফতরিক ভাষাও বাংলা।</p>
<p>যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর অভিবাসীদের স্বীকৃত পঞ্চম মাতৃভাষা বাংলা। সেখানে প্রায় ৮ লাখ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।</p>
<p>মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রেও প্রচুর পরিমাণ বাঙালি অভিবাসীর বসবাস রয়েছে। উপরোক্ত দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে নিম্নলিখিত বহু দেশেই বর্তমানে বহু বাংলাভাষী মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।</p>
<p>সিয়েরা লিওনে ২০০২ সাল থেকে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।</p>
<p>এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দুবাই, জাপানের টোকিও, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, অ্যাডিলেড, পার্থ, ভিক্টোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (এই অঞ্চলে সংখ্যালঘু বাঙালি অভিবাসীরা বাংলায় কথা বলে) নিউইয়র্ক, পেনিসিলভেনিয়া, নিউজার্সি, সান জোসে, ওয়াশিংটন, ক্যালিফোর্নিয়া, কানাডার টরন্টো, মিসিসাগা, ব্র্যাম্পটন, ফ্রান্সের প্যারিস, ইংল্যান্ডের লন্ডন, ওমান, মালয়েশিয়া, স্পেন এবং জার্মানিতে প্রচুর সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী রয়েছেন।</p>
<p>এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আরো প্রায় ৪ কোটি জনগণ এরকম আছে যারা বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা বা Second language হিসাবে ব্যবহার করে।</p>
<p>সব মিলিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা জনগণের সংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি।</p>
<p>বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার চর্চা ক্রমে বিস্তার লাভ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৌরভ সিকদারের গবেষণা মতে, &#8216;ইংরেজি ও চীনা ভাষার পরই বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।&#8217;</p>
<p><strong>পৃথিবীর ৪টি মহাদেশের ৩০ টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও চর্চা হচ্ছে। এ ভাষা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়ে থাকে। এর বাইরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, পোল্যান্ড, রাশিয়া, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের মোট ত্রিশটি দেশে বাংলা ভাষার গবেষণা হচ্ছে।</strong></p>
<p>যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে উনিশ শতক থেকেই প্রাচ্যবিদ্যা ও ভাষাচর্চা বিভাগের অধীনে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ১০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও এশীয় গবেষণা কেন্দ্রে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক, শিকাগো, মিনেসটা, ফ্লোরিডা, মেরিল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, ভার্জিনিয়া, উইসকনসিন ও হাভার্ড উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>জাপানে বাংলা ভাষার অভিধান চালু করা হয়েছে।</p>
<p>সম্প্রতি ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিষয়ে গবেষণার জন্য বেঙ্গল স্টাডি সেন্টার খোলা হচ্ছে। বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে খোলা হয়েছে বাংলা বিভাগ। প্রায় প্রতিবছরই বিশ্বের নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ খোলা হচ্ছে এবং একাডেমিক কোর্স চালু হচ্ছে।</p>
<p>বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহের কারণে বিশ্বের কমপক্ষে ছয়টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল রয়েছে। আরো ১০টি দেশের রেডিওতে নিয়মিত বাংলা ভাষার আলাদা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ৬টি, যুক্তরাষ্ট্রে ১০ টি বাংলাদেশী মালিকানাধীন ও বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে।</p>
<p>বাংলা ভাষায় যুক্তরাজ্য থেকে নিয়মিত মোট ১২ টি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হচ্ছে। বেতার বাংলা নামে সেখানে একটি রেডিও স্টেশন রয়েছে। ধূমকেতু, জন্মভূমি, প্রতিদিন, স্বদেশ, বিদেশ নামে পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাও নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।</p>
<p>নিউইয়র্কে বাংলা ভাষার পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয় ১৯৮৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। বর্তমানে প্রায় ১৮ টি সাপ্তাহিক এবং ৭ টি অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।</p>
<p>ইউরোপের ইতালিতে বর্তমানে পাঁচটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা এবং রোম ও ভেনিস শহর থেকে তিনটি বাংলা রেডিও স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে। ইতালি থেকে ছয়টি অনলাইন টেলিভিশন বাংলায় পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ডেনমার্ক, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের আটটি দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে বাংলা ভাষায় মুদ্রিত ও অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে।</p>
<p>বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত প্রচার ও প্রসারের কারণেই এর শব্দ ও সাহিত্য ভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ। সেই সাথে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ভাষাও এটি। ইউনেস্কো ২০১০ সালে &#8216;পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা&#8217; হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাকে। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যের প্রায় সবকটি শাখাতেই বাংলা ভাষা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলার বৈচিত্র্যময় উপভাষা বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত ও গতিশীলতা দান করেছে। একইসাথে বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত পরিসর এর সমৃদ্ধি ও ও সর্বব্যাপী গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। পুরো পৃথিবীতে ৪৫ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে এবং বাংলা বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম একটি প্রভাবশালী ভাষা। তাই, বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে অন্যান্য ভাষার সামনে হীনমন্যতায় ভোগার কোন সুযোগই নেই। অতীতের সোনালী প্রেরণাকে সামনে রেখে, বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে অগ্রসর হলে নতুনভাবে একটি সমৃদ্ধ অবস্থানে পৌঁছা সম্ভব। কেননা, বাংলা অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জায়গা। একইসাথে তা আমাদের অগ্রসরতার সবচেয়ে বড় সোপানও বটে। মুসলমানিত্ব মজবুত করতে বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চলে নয়; বরং আঁকড়ে ধরাই যৌক্তিক।</p>
<p>যেহেতু ছোট্ট হিব্রু ভাষার গত ৬ হাজার বছরে কোন অস্তিত্ব ছিল না তারা নিজেদেরকে নতুন করে জাগরিত করে আন্তর্জাতিক ভাষাতে পরিণত করতে পেরেছে। আজ থেকে কয়েক শ বছর আগেও চাষীদের বা গ্রাম্যদের ভাষা ছিল উর্দু, তা এখন বড় দেশের রাষ্ট্র ভাষা। আজ থেকে দেড়শ বছর আগেও হিন্দি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেই হিন্দি ভাষা কি উপমহাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে না? শেক্সপিয়ার একাই যেহেতু ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করাতে পেরেছেন। সুতরাং আমরাও পারব ইনশাআল্লাহ্।</p>
<p>যে বাংলা ভাষার সুবিস্তৃত, দিগন্তব্যাপী ঔজ্জ্বল্য, সুখ্যাতি ও সমৃদ্ধি প্রথিত আছে তারই শেকড়ে তথা সুলতানী আমলে। তাঁর উত্থান ও নব জাগরণ অবশ্যম্ভাবী। এজন্যই সতের শতকের মুসলিম কবি আব্দুল হাকিম বাংলা ভাষার কদর বুঝাতে বলেছেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী</p>
<p>সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমাদের ভাষাকে বিনির্মাণের মূল লক্ষ্য কি তবে?</p>
<p>একটি ভাষা দাঁড়ায় রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে, আদালতের ভাষা হিসেবে, প্রতিষ্ঠানের ভাষা হিসবে, শিক্ষাব্যবস্থার ভাষা হিসেবে, এই সবগুলোর মূলেই রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা। আর যখন ভাষাটি শিক্ষা ও গবেষণার ভাষা হয়, তখনই মূলতে সে ভাষাটি একটি শক্তিশালী ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই শক্তিশালী আত্মপ্রকাশ মূলত ঘটাতে সক্ষম হয়ে ঐ ভাষা থেকে উঠে আসা বড় বড় ব্যক্তিবর্গের প্রভাবের ফলশ্রুতিতে। কেননা তারা যখন সে ভাষায় মৌলিক জ্ঞান চর্চা করেন, শক্তিশালী চিন্তার বিকাশ ঘটান তার প্রভাব গিয়ে সরাসরি পরে ওই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর উপরে। কেননা তখন তাদের উদ্ভাবিত পরিভাষাগুলোই হয়ে ওঠে ঐ জাতির শিক্ষা ও গবেষণার মূল হাতিয়ার। এভাবেই ঐ জাতির চিন্তা, মনস্তত্ব, আভিজাত্য, ব্যবহারিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপ প্রভাবিত হয় এবং সে ভাষাটি আদালতের ভাষায় পরিণত হয়। সুতরাং এক্ষেত্রে ভাষাকে গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সে ভাষায় জ্ঞান তৈরি, চিন্তা তৈরি এবং সে ভাষাভাষী শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব উঠিয়ে নিয়ে আসা। কেননা এটাই হচ্ছে ভাষার মূল পরিচয়।</p>
<p>এক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৪৫ সালে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্পূর্ণ দায়ভার যখন জার্মানির ওপর বর্তায়, তখন মিত্রশক্তি জার্মানির শাস্তি নির্ণয়ের জন্য আলোচনার টেবিলে বসে। আলোচনায় বসা মারমুখী যুদ্ধবাজ নেতারা প্রস্তাবনা দিতে থাকে যে জার্মানিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হোক, কিংবা ইউরোপের শষ্য ক্ষেতে পরিণত করা হয়। তখন ঐ টেবিলে বসা একজন বলেন, মানলাম আপনারা জার্মানিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন, কিন্তু কার্ল মার্ক্সকে কোথায় রাখবেন? ফ্রেডরিখ নিটশে-কে কোথায় রাখবেন? ফ্রেডরিখ এ্যাঙ্গেলসকে কোথায় রাখবেন? (অর্থাৎ জার্মানিকে ধূলিস্যাৎ করে দিলেও ওইসকল প্রভাবশালী চিন্তকদের চিন্তাভাবনাকে তো বিনাশ করতে পারবেন না। তাদের ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবেন না।)</p>
<p>তখন সবার বোধোদয় হয় এবং অপার সম্ভাবনাময় জার্মানিকে ধ্বংস না করে ইউরোপের করদ রাজ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, হিটলারের নেতৃত্বে সমগ্র বিশ্বজয় করার বাসনা ও শক্তিমত্তা যখন পরাজিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়, তখন ঐ বিপন্ন দশা থেকে পরিত্রাণের উপায় হয়েছিল মৌলিক চিন্তা ও জ্ঞানের অধিকারী জার্মানভাষী দার্শনিকগণ। ঐতিহাসিক এ ঘটনার তাৎপর্য থেকে আমাদের কি কিছুই শিক্ষা নেবার মত নেই?</p>
<p>অবশ্যই এটি আমাদের সামনে অপার সম্ভাবনা এবং গৌরবোজ্জ্বল একটি ভবিষ্যতের লক্ষ্যে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের খোরাক জোগানের মত একটি উৎস। অতএব আমাদের দ্বারাও বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করা সম্ভব এবং তা দিয়ে নতুন একটি ভবিষ্যতের পানে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। আমরা যদি এই আত্মবিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে, বাংলা ভাষায় গোটা মানবতার উৎকর্ষ ও মুক্তির ভাবনায় মুখরিত হয়ে উঠতে পারি, মানবতার কল্যাণে জ্ঞান ও চিন্তার সমৃদ্ধ ইমারত গড়ে তুলতে পারি- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাঙ্গণের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় বিবেক, মন ও মানস একটি দায়িত্বশীল চরিত্র লাভ করবে, আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতি অসাধারণ শক্তিমত্তার অধিকারী হয়ে উঠবে তখন গোটা মানবতার মুক্তির ইশতেহার বাংলা ভাষায়ই রচনা করে বিশ্ববাসীকে উপহার দেয়া সম্ভবপর হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য পরিশেষে বলতে চাই,</p>
<p>আজ আমরা এমন এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছি, যখন আমাদের জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। আমাদের ভাষা- সাহিত্য- সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এগুলো আমাদের জাতীয়তার মূল ভিত্তি ও আত্মপরিচয়ের গৌরবময় উপাদান। এজন্য এই সকল কিছুর বাহন বাংলা ভাষা। যদি আমরা এই ভাষার বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন করতে পারি তাহলে আমাদের জাতীয় গৌরব বৃদ্ধি পাবে, জাতির অস্তিত্ব দৃঢ় ভিত্তি ধারণ করবে। পরমুখাপেক্ষীতা, হীনমন্যতা ও পরনির্ভরতার দ্বারা যেমন কোনোদিন কেউ টিকতে পারে না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকেও আমরা সেভাবে বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। এজন্য আমাদের অবদানের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণাঙ্গ ও গৌরবদীপ্ত হয়ে উঠবে আবারো। বাংলা ভাষার গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব শুধু সাহিত্য রচনা ও চিন্তা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে নয়। বরং এটা পারিপার্শ্বিক বহু ঘটনার সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। চিন্তায় ও সৃজনে বাংলাকে যত্নের সঙ্গে এগিয়ে নেয়ার এ দায়িত্ব আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে।</p>
<p>তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে নজরুল, ফররুখ, আল মাহমুদের রচিত ভাষা ও সাহিত্যের দুর্জয় প্রকাশ। তাদের প্রদর্শিত পথেই আমাদের ভাষা সাহিত্যের গৌরব ও সমৃদ্ধি আগামীতে আরো বেশি এগিয়ে নিতে পারব।</p>
<p>আবারো আমরা সেই হারানো সভ্যতার মত করেই বাংলা সাহিত্যের গৌরব ও ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবো এবং আমাদের আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান ঢাকা কেন্দ্রিক, মসজিদের শহরের রূহকেন্দ্রিক বাংলা ভাষা সাহিত্যের অগ্রযাত্রা নতুন আকারে দীপ্তমান হবে। কারণ আমরা সেই আত্মবিশ্বাসী ও আত্মজাগৃতির এক মহান জাতিসত্তা ধারণকারী মুসলিম উম্মাহ। এজন্য আমাদের এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশাল পথ পাড়ি দিতে হবে, এবং এ লক্ষ্যপানে যাত্রা শুরু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। যে যাত্রার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের পুনরুত্থান কাব্যের পরিভাষাগুলো বর্ণনা করবো। যে বর্ণনার মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র বাংলাদেশের বিস্তৃত জনপদেই নয়, সমগ্র বাংলাভাষী সকল মানুষ তাদের আন্তর্জাতিক দিগন্তরেখায় নতুন এক সূর্যকে উদিত করতে পারবে। এবং আমাদের এই জাগরণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা নিখিল ভারত আবার সেই ইসলামি সভ্যতার, ইসলামী সংস্কৃতির দিকে নতুন করে এগিয়ে যাবে যার মধ্যে দিয়ে আমরা বলতে পারব, মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা &#8216;বাংলা ভাষার&#8217; মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সভ্যতার পুনর্জাগরণের জয়গান রচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তথ্যসূত্র:</p>
<p>১. বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী, ফাহমিদ উর রহমান, মক্তব প্রকাশন, নভেম্বর ২০২১।</p>
<p>২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম এ রহিম, অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, জুন ২০০৮।</p>
<p>৩. প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, দীনেশচন্দ্র সেন, দিব্যপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫।</p>
<p>৪. বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, মুহাম্মদ মতিউর রহমান, ইসলামিক সেন্টার, ফেব্রুয়ারি ২০০২।</p>
<p>৫. বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, মোহাম্মদ আজম, আদর্শ প্রকাশন, মে ২০১৪।</p>
<p>৬.<a href="https://www.rowyakbd.com/bengali-language-in-spreading-islam"> ইসলাম প্রচারে বাংলা ভাষা, সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী, অনুবাদ: মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, রোয়াক ব্লগ।</a></p>
<p>৭. বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নেয়ার ভাবনা, ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16044</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আহমদ ছফার “বাঙালি মুসলমান” চরিত্রের ক্রিটিক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/criticism-of-ahmed-safas-bengali-muslim-character/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/criticism-of-ahmed-safas-bengali-muslim-character/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 08 Aug 2025 07:06:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16023</guid>

					<description><![CDATA[[পন্ডিত আহমদ ছফা’ প্রণীত  ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক  দীর্ঘ-প্রবন্ধটি প্রকাশের পর সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল, বৈশাখ ১৩৮৩ (এপ্রিল ১৯৭৬), অষ্টাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রফেসর ড. এবনে গোলাম সামাদ একটি  প্রতিক্রিয়া হাজির করেন।] সমকালে (ফাল্গুন ১৩৮২ সংখ্যায়) আহমদ ছফার একটি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>[পন্ডিত আহমদ ছফা’ প্রণীত  ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক  দীর্ঘ-প্রবন্ধটি প্রকাশের পর সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল, বৈশাখ ১৩৮৩ (এপ্রিল ১৯৭৬), অষ্টাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রফেসর ড. এবনে গোলাম সামাদ একটি  প্রতিক্রিয়া হাজির করেন।]</p>
<p>সমকালে (ফাল্গুন ১৩৮২ সংখ্যায়) আহমদ ছফার একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি বাঙালি মুসলমানের মানসিকতা বিশ্লেষণ করে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রবন্ধটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, তথ্য ও তত্ত্বের বেশ কিছু অসঙ্গতি আছে। তাই এই আলোচনায় অবতীর্ণ হচ্ছি। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি খোলা মন নিয়ে এ প্রসঙ্গে সমকালে আরো আলোচনা হবে। আমাদের সংশয় ঘুচবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আর্য ও অনার্য</strong></h4>
<p>ছফা সাহেবের মতে বাঙালি মুসলমানের একটি বিরাট অংশই নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে উদ্ভূত। এরা সকলেই ছিলেন অনার্য। তার মতে ‘যেহেতু নবদীক্ষিত মুসলমানদের বেশির ভাগই ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু, তাই আর্য সংস্কৃতিরও যে একটা বিশ্বদৃষ্টি এবং জীবন ও জগত সম্বন্ধে যে একটা প্রসারিত বোধ ছিল, বর্ণাশ্রম ধর্মের কড়াকড়ির দরুন ইসলাম কিংবা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষাগ্রহণের পূর্বে সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোন ধারণা জন্মাতে পারেনি।’ ছফা সাহেবের এই উক্তির সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক গবেষণালব্ধ ফলের বিন্দুমাত্র যোগাযোগ নেই।</p>
<p>এই উপমহাদেশে দৈহিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রপাত হয় স্যার হার্বার্ট রিজলে নামক ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিকের চেষ্টায়। স্যার রিজলে ব্রিটিশ-ভারতের নানা প্রদেশ থেকে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের দৈহিক মাপ সংক্রান্ত যেসব তথ্য সংগ্রহ করেন আজও তা বিশেষভাবে আলোচ্য। বাঙালিদের দৈহিক মাপজোক সম্পর্কে সংগৃহীত রিজলের তথ্য এখনো খুবই মূল্যবান। রিজলের মাপ অনুসারে কোনো বাঙালিকেই আর্য বিভাগভুক্ত করা চলে না। তাই ছফা সাহেবের আর্যের যুক্তিটা বিশেষভাবেই অচল।</p>
<p>রিজলে সাধারণভাবে বাঙালিদের স্থাপন করেছেন মোঙ্গল-দ্রাবিড় মানবধারায় (Racial type)। রিজলের মোঙ্গল-দ্রাবিড় তত্ত্ব এখন অনেক নৃতাত্ত্বিকই স্বীকার করেন না। কারণ রিজলে যাদের দ্রাবিড় বলে চিহ্নিত করেছিলেন, এখন প্রমাণিত হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে একাধিক মানবধারা। ‘দ্রাবিড়’ শব্দটিকে বিশেষভাবেই গ্রহণ করতে হয় ভাষা পরিবারবাচক হিসেবে। বাঙালি ঠিক কোনো একটি বিশেষ মানবধারায় পড়ে না। পর্ব বাংলার অনেক বাঙালির মধ্যে মঙ্গোলীয় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু মোটের উপর বাঙালিকে কেউ মঙ্গোলীয় বিভাগভুক্তও বলতে পারে না। কারণ বাঙালির চোখের পাতায় মঙ্গোলীয়দের মতো ভাঁজ নেই, বাঙালিদের মুখে যথেষ্ট দাড়ি-গোঁফ থাকে।</p>
<p>বাঙালিদের রঙ কালো। কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে তথাকথিত আর্যদের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। তাদের মাথার আকৃতি গোল (মধ্যমাকৃতি হবার দিকে প্রবণতা আছে), আর্যদের মতো লম্বা নয়। এমনকি বাঙালি উচ্চবর্ণের মানুষদেরও (ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য) আর্য বলে চিহ্নিত করা চলে না। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের মধ্যেই গোলমাথা, সরু থেকে মধ্যমাকৃতি নাকওয়ালা মানষের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি আর্য নয়, আবার তথাকথিত অনার্যও নয়। তাই ছফা সাহেবের যুক্তি অচল।</p>
<p>অন্যদিক থেকে বলা যায়, বাঙালি অনার্য হলেও কোনো ক্ষতি নেই। আর্য মানেই উন্নত আর অনার্য মানেই হীন- এ ধরনের কোনো যুক্তি এখন আর দেয়া চলে না। কারণ বাংলাদেশে আর্যরা আসবার আগেই একটি উন্নত সভ্যতা ছিল, এ-কথা ভাববার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখন আমাদের হাতে এসেছে। বাঙালির প্রাক-ইতিহাস সম্বন্ধে বহু কিছু এখন নতুন করে লিখতে হচ্ছে, মাটি খুঁড়ে আবিষ্কৃত হওয়া নানা নতুন নিদর্শনের জন্য। বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে মাটি খুঁড়ে খুব প্রাচীনকালের নিদর্শন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে খুব বেশি দূরে অবস্থিত নয় এরকম জায়গায়- পশ্চিমবঙ্গে- এমন অনেক নিদর্শন মাটি খুঁড়ে আবিষ্কৃত হয়েছে যার ফলে বাঙালির ইতিহাস নতুন করে লিখতে হচ্ছে।</p>
<p>বোঝা যাচ্ছে, আর্যদের চাইতে অনার্যরা কিছুমাত্র কম সভ্য ছিল না। বরং আর্যদের চাইতে অনার্যরা ছিল বহুদিক থেকেই অনেক উন্নত। ছফা সাহেব বলেছেন, বাঙালি মুসলমানের উদ্ভব আর্যদের থেকে হয় নি, হয়েছে নিম্নশ্রেণির হিন্দু থেকে। কিন্তু এখন মাটি খুঁড়ে আমরা যে অতীত ইতিহাসের পরিচয় পাচ্ছি তাতে আর্যবাদের কোনো গৌরবই থাকছে না। পশ্চিম বাংলায় অজয় নদীর দক্ষিণে পাণ্ডুরাজার ঢিবি নামক স্থানে ১৯৬২-৬৩ সালে ব্যাপক খননকার্য চালানো হয়। এর ফলে সেখানে তাম্র-প্রস্তর (মেসোলিথিক) যুগের বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তামার বড়শি, নানা আকৃতির ও বিভিন্ন প্রকার নকশাযুক্ত মাটির পাত্র ও অন্যান্য প্রাচীন সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।</p>
<p>আর্যতত্ত্ব নিয়ে তাই আজ আর বড়াই করবার কোনো যুক্তি নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারে ‘আর্যবাদ’ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ছফা সাহেবের লেখা পড়ে মনে হলো তিনি এসব কথা জানেন না; অথবা জানলেও আলোচনার যোগ্য বলে স্বীকার করেন না। তার কাছে বাঙালি মুসলমানরা হীন। কারণ তাদের নেই আর্যদের মতো বিস্তারিত চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইতিহাসের অজ্ঞতা</strong></h4>
<p>কেবল প্রাক-ইতিহাস নয়, ইতিহাসের কাল সম্পর্কেও মনে হয় ছফা সাহেবের জ্ঞান খুব বেশি নয়। ছফা সাহেব বোঝাতে চেয়েছেন, বাঙালি মুসলমান নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত সম্প্রদায়। আর তাই তাদের মনে সব সময় থেকেছে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতি ভয় ও সম্ভ্রম। কিন্তু এ-দেশের মুসলিম যুগের ইতিহাস ভালোভাবে পাঠ করলে অন্য ধারণারই সৃষ্টি হয়। মধ্যযুগের ইতিহাসে দেখতে পাই, বাংলাদেশে মুসলমানরা হিন্দু ক্রীতদাস রাখতে পারতেন, কিন্তু হিন্দুরা কোনো মুসলিম ক্রীতদাস রাখার অধিকারী ছিলেন না।</p>
<p>&#8216;চৈতন্যভাগবত&#8217; পাঠে অবগত হওয়া যায়, মুসলমানরা হিন্দুদের ছোট জাত বলে মনে করতেন। কোনো মুসলমান (হরিদাস) ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করলে ‘মুলকের পতি’ তাকে বলেছেন :</p>
<p>কত ভাগ্য দেখ তুমি হঞাছ যবন।</p>
<p>তবে কেন হিন্দুর আচারে দেহ মন।</p>
<p>আমরা হিন্দুরে দেখি নাহি খাই ভাত।</p>
<p>তাহা তুমি ছাড় হই মহাবংশ-জাত।</p>
<p><strong>তাই এ-দেশের মুসলমানরা নিজেদের সব সময় হীন ভেবেছেন এ রকম কথা ধোপে টেকে না। বরং এর উল্টোটাই সত্য, তারা নিজেদের ভেবেছেন অন্যদের চাইতে অনেক উচ্চজাতি হিসেবে।</strong></p>
<p>বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি সম্পর্কে একাধিক ঐতিহাসিক একাধিক মন্তব্য করেছেন। কারো কারো মতে :</p>
<p>ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গলরাজ চেঙ্গিস খাঁ সমগ্র মধ্য এশিয়ার তুর্কী মুসলমানদের রাজ্য এবং বোখারা, সমরখন্দ প্রভৃতি ইসলামী সংস্কৃতির প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করেন। ইহার ফলে এই অঞ্চল হইতে গৃহহীন পলাতকেরা দলে দলে ভারতে তুর্কী মুসলমান রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরে তাহাদের অনেকে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করিল …। (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলার ইতিহাস : মধ্যযুগ, পৃ. ২৩৩)</p>
<p>কিন্তু ছফা সাহেব তার আলোচনায় এসব মুসলমানদের কথা আলোচনা করেন নি। কেবল বলতে চেয়েছেন, বাঙালি মুসলমান আসলে হিন্দু নিম্নবর্ণের থেকেই বিশেষভাবে উদ্ভূত। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তুর্কীদের মাথার খুলিও গোলাকৃতি। সম্ভবত তুর্কীরা বাংলাদেশে গোলাকৃতি মাথাওয়ালা লোকের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিয়েছে।</p>
<p>মধ্যযুগের বিখ্যাত মুসলমান কবি আলাওল একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। বাঙলা, ফারসি, আরবি ও হিন্দি ভাষায় তার জ্ঞান ছিল। মুসলমানদের মধ্যে যারা শিক্ষিত হতেন তারা প্রায় সকলেই একাধিক ভাষায় জ্ঞান রাখতেন। তাদের শিক্ষা সে যুগের মাপকাঠিতে নিম্নমানের ছিল না। কিন্তু ছফা সাহেবের আলোচনা পড়লে মনে হয়, সব মুসলমানই ছিলেন ‘গ্রাম্য চাষা’, বড় জোর নিছক লোকসাহিত্যের সাধক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইতিহাস নয়</strong><strong>, </strong><strong>গল্পকথা</strong></h4>
<p>ছফা সাহেবে বাঙালি মুসলমান সম্বন্ধে এমন অনেক কথা বলেছেন যা নিছক বানানো বলে মনে হয়। ছফা সাহেবের মতে, ‘বাঙালি মুসলমানরা শুরু থেকেই তাদের আর্থিক ও সামাজিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্রমাগত ধর্মমত পরিবর্তন করে আসছিল। … বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের লোক। তাদের মানসিকতার মধ্যেও আদিম সমাজের চিরন্তন লক্ষণসমূহই প্রকট। বারবার ধর্ম পরিবর্তন করার পরও বাইরের দিক ছাড়া তাদের মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে নি।’ তার এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমরা একমত হতে পারি না। কারণ, প্রথমত, ছফা সাহেব যে ধরনের আদিম কৌমসমাজের কথা বলেছেন এ-দেশে সুলতানি আমলের আগেই তার বিলুপ্তি ঘটেছিল। ভূমিব্যবস্থা ও কৃষিকৌশল- উভয়দিক থেকে বিচার করলেও বাংলাদেশের কৃষকদের আদিম কৌমসমাজের অন্তর্ভুক্ত করা চলে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বাঙালি মুসলমানের জাগরণ</strong></h4>
<p>ছফা সাহেব স্বীকার করেছেন, বাঙালি মুসলমান ঊনবিংশ শতকে দু’টি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন করেছেন। একটি হলো ওয়াহাবি ও অপরটি হলো ফরায়েজি। কিন্তু তিনি আক্ষেপ করেছেন, এ দু’টি আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে। তিনি এ দু’টি আন্দোলনকে মন খুলে প্রশংসা করতে পারেন নি। কারণ এ দু’টির মূলে ছিল ধর্মীয় প্রেরণা, কোনো আধুনিক সমাজ দর্শন নয়। কিন্তু প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, কেন এই অবজ্ঞা? ধর্মীয় অনুভূতি থাকলেই কি কোনো আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছোট হয়ে যায়? অন্য অনেক দেশেও ধর্মীয় চেতনা রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। কিন্তু আমরা এসব আন্দোলনকে অবজ্ঞার চোখে দেখি না। বাংলাদেশের বেলাতেই বা আমরা এর ব্যতিক্রম করতে যাব কেন?</p>
<p>প্রবলপ্রতাপ ক্রমওয়েল বিলাতের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন খ্রিষ্টান পিউরিটানিজমের প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু তা বলে আমরা তার সমালোচনা করি না। বরং বলি, তিনি দিয়েছিলেন বিলাতের ইতিহাসকে বদলে, দিয়েছিলেন রাজতন্ত্রকে দুর্বল করে। ফলে ব্রিটেনে সৃষ্টি হতে পারে বর্তমান গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। বিলাতের দু’টি গণআন্দোলনও- ‘ডিগারস’ ও ‘লেভেলারস’ ছিল বিশেষভাবে ধর্ম-চেতনা অনুপ্রাণিত। কিন্তু বিলাতের ইতিহাসে এখনো এদের কথা শ্রদ্ধাভরেই স্মরণ করা হয়। অথচ আমাদের দেশে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী মনে করেন, ধর্মীয় অনুপ্রেরণাযুক্ত সব আন্দোলনই প্রতিক্রিয়াশীল। আর তাই তা বিরূপ সমালোচনার যোগ্য। বিশেষ করে কোনো আন্দোলনের মূলে যদি কাজ করে থাকে ইসলাম ধর্মের অনুপ্রেরণা তবে তা কখনোই জনসাধারণের পক্ষে কল্যাণকর হতে পারে না।</p>
<p>কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যায়, ধর্ম নানা জাতির ইতিহাসেই পালন করেছে বিশেষ গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা- যাকে বাদ দিয়ে ইতিহাস বোঝা যায় না। আধুনিক সমাজতাত্ত্বিকরা নানাভাবে ধর্মের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিখ্যাত ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক এমিল দরকেইমের মতে ধর্মকে বাদ দিয়ে কোনো সমাজ-জীবনের ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ধর্ম সমাজ-জীবনের বাস্তব ভিত্তি। বিখ্যাত জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাকস বেবরের মতে, মানুষ ইতিহাস গড়তে চায় তার আপন মূল-চেতনার উপর ভিত্তি করে। আর মূল-চেতনার উৎস হিসেবে ইতিহাসে ধর্ম পালন করে প্রধান ভূমিকা। কিন্তু ছফা সাহেবের কাছে ধর্ম একটি বিচার্য বিষয়ই নয়। তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে তাই তিনি খোলামনে গ্রহণ করতে অক্ষম।</p>
<p>ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয় ভাবধারার প্রভাবে হিন্দু সমাজে নানা সংস্কারবাদী আন্দোলন আরম্ভ হয়। রামমোহন চান সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে। বিদ্যাসাগর চান বিধবা বিবাহ চালু করতে। কিন্তু মুসলমান সমাজের এসব সমস্যা ছিল না। মুসলমান সমাজে জাগরণ পরিগ্রহ করে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ। মুসলমানরা বিদ্রোহ করেন বিদেশি শাসনের বিপক্ষে। তারা গ্রহণ করেন ওয়াহাবি মতবাদ। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মহাশয় লিখেছেন :</p>
<p>“ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলার মুসলমানদের দুইটি বিপ্লব জনসাধারণের মনে বিশেষ ভীতি ও উদ্বেগের সঞ্চার করিয়াছিল। আরবে আবদুল ওয়াহাব নামক এক ব্যক্তি (১৭০৩-১৭৮৭ খ্রি.) মুসলমান ধর্ম সংস্কারের জন্য এক আন্দোলন উপস্থিত করেন। তাহার সম্প্রদায় ‘ওয়াহাবি’ নামে প্রসিদ্ধ। ভারতেও ওয়াহাবি ধর্মমত প্রচারিত হইয়াছিল (১৮২০-১৮৭০ খ্রি.) এবং প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল খুব প্রসার লাভ করিয়ছিল।… সমস্ত উত্তর ভারতে এই আন্দোলন শক্তিশালী হইবার পূর্বেই বাংলাদেশে দুইজন মুসলমান ইহার অনুরূপ আন্দোলন আরম্ভ করেন। ধর্মসংস্কারের জন্য আরম্ভ হইলেও ক্রমে ইহা ইংরাজ ও জমিদারদিগের বিরুদ্ধে প্রজাদিগকে উত্তেজিত করে।” (বাংলার ইতিহাস : আধুনিক যুগ, পৃ. ৫৬-৫৭)।</p>
<p>ফরায়েজি আন্দোলন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মজুমদার মহাশয় লিখেছেন :</p>
<p>শরিয়ত উল্লার সম্প্রদায়ের নাম ছিল ফরাজি। ইহাদের অধিকাংশই ছিল জমিদার কর্তৃক উৎপীড়িত প্রজা এবং বাংলার শিল্প ধ্বংস হওয়ার ফলে বেকার শ্রমিক দল। (ঐ, পৃ. ৫৮)</p>
<p>শরিয়ত উল্লার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহম্মদ মুহসিন (১৮১৯-১৮৬০ খ্রি.) ফরায়েজি আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেন। তিনি তার ডাকনাম ‘দুদু মিয়া’ হিসেবে বিশেষ প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন। দুদু মিয়া কার্যত পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শাসকে পরিণত হন। তাকে দমন করতে ইংরেজদের বিশেষ বেগ পেতে হয়।</p>
<p>দুদু মিয়া সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মজুমদার মহাশয় লিখেছেন :</p>
<p>তিনি (দুদু মিয়া) ঘোষণা করেন যে জমি ভগবানের, সুতরাং জমিদারদের খাজনা আদায় করিবার কোন অধিকার নাই। বিংশ শতাব্দীর অসহযোগ আন্দোলনের অনেক পূর্বাভাস দুদু মিয়ার আন্দোলনে পাওয়া যায়। জমিদার ও নীলকরেরা তাঁহার এই সমুদয় প্রচারের ফলে ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়া তাঁহার নামে লুটপাট, অনধিকার প্রবেশ প্রভৃতি বহু অত্যাচারের জন্য বহুবার আদালতে অভিযোগ করে, কিন্তু তাঁহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবার লোক না থাকায় তিনি প্রতিবারই খালাস পান।(ঐ, পৃ. ৬০)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উপরের কথাগুলি থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কত গভীর ও ব্যাপক ছিল বাঙালি মুসলমানের জাগরণ। বাঙালি মুসলমান কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে চায় নি। আর চায় নি বলেই সম্ভব হয়েছে আজকের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। যারা উইলিয়াম হান্টার লিখিত বিখ্যাত বই ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ পড়েছেন, তারা জানেন কী রকম দুর্জয় সাহস নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বাঙালি মুসলমান ওয়াহাবি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে যেত দূর পাঞ্জাবে ও সীমান্ত প্রদেশের মতো অঞ্চলে যুদ্ধ করতে। কিন্তু ছফা সাহেবের লেখায় বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের এসব দিকের কোনো পরিচয় নেই।</p>
<p>ছফা সাহেব ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে মুসলিম জাগরণ দেখা দেয় সে সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। অথচ এই জাগরণের কথা বাদ দিয়ে আজকের বাঙালি মুসলমানের মনোধারার ব্যাখ্যাই সম্ভব নয়- ভাবাই যায় না, বাংলাদেশ উদ্ভবের কথা।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/criticism-of-ahmed-safas-bengali-muslim-character/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16023</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে মুসলিম ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 14 Jul 2025 15:09:15 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15916</guid>

					<description><![CDATA[এক. আরবী ভাষায় একটা কথা আছে, উকুলুন না-সি আ&#8217;লা কদরি যামানিহিম। যার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতেই একজন মানুষের আকল ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়। জীবন চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন একেবারে স্বাভাবিকভাবেই এই কথাটি সত্য, সুদূর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>আরবী ভাষায় একটা কথা আছে, উকুলুন না-সি আ&#8217;লা কদরি যামানিহিম। যার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতেই একজন মানুষের আকল ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়। জীবন চলার পথের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন একেবারে স্বাভাবিকভাবেই এই কথাটি সত্য, সুদূর অতীত থেকেই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তেমনি এই কথাটি সত্য। অতএব, কোনো একজন ব্যক্তি যখন অতীতকে কলমের ডগায় ফুটিয়ে তুলবেন, তখন সেই ব্যক্তির আশপাশ এবং তার চিন্তাভাবনা অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি উদার মনের হন তাহলে এক দৃষ্টিকোণ থেকে অতীতকে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করবেন, আর যদি তার পূর্বের সকল ধর্ম ও মতের উপর সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা না থাকে তাহলে তিনি একপেশে ইতিহাস চর্চা করবেন।</p>
<p>উপমহাদেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এই কথাটি একেবারে পুরোপুরি সত্য। উপমহাদেশের ইতিহাসে মুসলিমদের আগমনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। মুসলিম আগমনের পূর্বের ইতিহাসের চেয়ে পরবর্তী ইতিহাস শতগুণে সমৃদ্ধশালী। কিন্তু, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও ইতিহাস চর্চায় এই সমৃদ্ধশীল ইতিহাস বরাবরই কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে।</p>
<p>মুসলিমদের সমৃদ্ধশীল ইতিহাস হারিয়ে যাবার কারণ অন্য কোনো কিছু নয়, বরং ভারতীয় দাদাবাবুদের একপেশে ইতিহাস চর্চা, যা বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রসারের সাথেসাথে কলকাতার বর্ণহিন্দুদের ইতিহাস চর্চাও আমাদের মাঝে প্রবেশ করে। কারণ, ভারতের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে তারা ধরেই নেয় যে, ভারতের ইতিহাসের অর্থই হচ্ছে হিন্দুদের ইতিহাস, এখানে মুসলিমদের ঠাঁই দেওয়া উচিত না; কারণ মুসলিমরা বহিরাগত আর তারা আর্য। অবাক করার বিষয় হলো, বঙ্গভঙ্গ রদের বিপরীতে বাংলার মুসলিমদেরকে দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার স্বয়ং ঢাকার মাটিতে বসেই এই ধারার ইতিহাস চর্চা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>এইযে, ইতিহাস চর্চার এই ধারা, এর সূচনাটা করে দিয়েছে ইংরেজরা। ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের সবচেয়ে বহুল প্রসিদ্ধ নীতি—‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসিকে ব্রিটিশরা সমগ্র বিশ্বেই বাস্তবায়ন করেছে। আজকের ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার শুরুটা তারা এই নীতির উপর ভিত্তি করেই করেছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসন করার জন্য তারাই হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা করেছিলো। এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করেছে তাদের ব্রিটিশ বুদ্ধিকে। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা করতে তারা ব্যবহার করেছে ইতিহাসকে, ঠিক যেমনভাবে মিশরীয়দেরকে অতীতের কথা স্বরণ করিয়ে দিয়ে উসমানীয় এবং আরবদের থেকে আলাদা করেছিলো।</p>
<p>উপমহাদেশের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই কাজটা করেছে ম্যাক্স মুলার। ম্যাক্স মুলার প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ইরান থেকে আর্যদের একটি দল ইউরোপে গিয়েছিলো, যারাই সেসময় সমগ্র পৃথিবীতে বাণিজ্য করছিলো। আরেকটি দল ভারতীয় উপমহাদেশে চলে আসে, তারাই পরবর্তীতে হিন্দু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর মুসলিমরা এই ভূমির কেউ না, মাত্র কয়েকশ বছর আগে বাহির থেকে এসে হিন্দুদের উপর চেপে বসেছে। যদিও আজকের আধুনিক ইতিহাসবেত্তারা ম্যাক্স মুলারের এই তত্ত্বকে তথ্য-প্রমাণ দিয়েই খণ্ডন করেছেন।</p>
<p>ম্যাক্স মুলারের এমন তত্ত্বের পাশাপাশি ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠা করে দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি-র মতো প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই প্রকাশিত হওয়া প্রথমদিকের একটি গ্রন্থ হচ্ছে কর্নেল জেমস টড-এর অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান। এখানে রাজস্থানের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে মুসলিমদেরকে শত্রু ও বহিরাগত এবং হিন্দুদেরকে স্থানীয় ও নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছে ব্রিটিশরা। এরপর, ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে ‘হিন্দু’ পরিভাষাকে ভারতের মাটিতে একেবারে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে তারা। পরবর্তীতে, রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মীয় ছায়ার করতলে।</p>
<p>বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসগুলোতে সারাটা জীবনভর মুসলিমদেরকে শত্রু ও খলনায়ক বানিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো রবীন্দ্রনাথ মুসলিমদের উপর এতোটা কঠোর না হলেও মুসলিমদেরকে সবসময়ই তার উপন্যাসে নিচু জাতের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। জন ক্লার্ক মার্শম্যানের হিস্টোরি অব বেঙ্গল বইয়ে তিনি যতোটা না মুসলিমদের সমালোচনা করেছেন, তারচেয়ে শতগুণে বেশি মুসলিমদের অপমান করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বইয়ের অনুবাদ করতে গিয়ে। নীহাররঞ্জন রায়ের দৃষ্টিতে তো মুসলিমরা কোনো স্থানই পায়নি।</p>
<p>এরপর গত শতকে এসে বাংলার ভূমিতে বসেই বাংলার মুসলমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েও রমেশচন্দ্র মজুমদার ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করেছেন। অথচ, তিনিই ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী তৈরির পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন এবং সূর্যসেন, প্রীতিলদা এবং লীলানাগদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো উৎসাহ দিতে থাকেন। আর পরবর্তীতে গিয়ে তার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যান যদুনাথ সরকার। যদুনাথ সরকার তো পলাশীর পতনে রীতিমতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, তিনি এটাকে ভারতীয় উপমহাদেশের নতুন সূর্যোদয় বলেও অভিহিত করেছেন। এমনকি, মুসলিমদের পতনকে তিনি বাংলার রেনেসাঁ পর্যন্ত বলেছেন।</p>
<p>অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, উপমহাদেশের ভূমিতে জনসংখ্যার অনুপাতে অতি সামান্য এই মুসলিমরা দীর্ঘ ৫০০ বছর শাসন করার কারণ এটাই যে, নিম্নবর্গের হিন্দুরা গণহারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। এখানে শুধু নিম্নবর্গীয় হিন্দুরাই মুসলিম হয়েছে, উচ্চবর্গের কোনো হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। আর যদিও-বা উচ্চবর্গের কোনো হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেও থাকে, তা ছিলো খুবই কম অথবা মুসলিম শাসকরা স্থানীয় নারীদের জোরজবরদস্তি করে বিবাহ করায় তারা মুসলিম হয়েছে।</p>
<p>আর এই ইতিহাসবেত্তারা এটাও বলেন যে, যেহেতু হিন্দুরা না বুঝেই মুসলিম হয়েছে, তাই তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও ইসলামের বিধিবিধান পালনের চেয়ে পূর্বের ধর্মের সংস্কৃতিই বেশি পালন করতো। আর এভাবেই ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান একটা সময় হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং আবারো পূর্বের মতোই ভারতীয় সংস্কৃতি বা হিন্দুদের সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করতে শুরু করে। আর এই তত্ত্বের অন্যতম একজন ধ্বজাধারী হলেন অসীম রায়।</p>
<p>এখানে অবাক করার বিষয় হলো, ইসলাম ও মুসলিমদের উপর এমন অপবাদ চাপিয়ে দেওয়া এই তত্ত্বের ধ্বজাধারীরা একদিকে যেমন হিন্দু, অন্যদিকে আবার হিন্দু না হলেও তারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের একান্ত ও একনিষ্ঠ ভক্ত।</p>
<p>যাইহোক, এই ধারার ইতিহাসের আলোকে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। যেমন,</p>
<ul>
<li>১. মুসলিমরা বহিরাগত এবং স্থানীয়দের শত্রু;</li>
<li>২. হিন্দুরা স্থানীয় ও ভারতের মহানায়ক;</li>
<li>৩. ভারতের ইতিহাস বলতেই মূলত হিন্দুদের ইতিহাস;</li>
<li>৪. নিম্নবর্গের হিন্দুরাই শুধু মুসলিম হয়েছে, তা-ও না বুঝে;</li>
<li>৫. কালের গর্ভে ইসলাম হারিয়ে গিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে।</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>কিন্তু, প্রকৃত ইতিহাস কি আসলেও তাই বলে?<br />
ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের এমন বিকৃত ইতিহাস এবং হিন্দুত্ববাদের এমন একপেশে ইতিহাসের বিপরীতে মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে কলম ধরা ইতিহাসবেত্তা যে নেই, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। বরং, ডক্টর মো. মোহর আলী এবং এম. এ. রহিম মুসলিম জাতিসত্তার ক্ষেত্রে অনন্য দু&#8217;টি নাম।</p>
<p>দীর্ঘ ১০ বছরের গবেষণার ফসল হিসেবে ডক্টর মো. মোহর আলী চার খণ্ডের বৃহদাকার যে হিস্টোরি অব মুসলিম বেঙ্গল বইটি লিখেছেন, তা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সভ্যতার এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়। যদুনাথ সরকার যেমন শুধু সময়ের ধারাবাহিক ঘটনাকে তুলে ধরেছেন, ডক্টর মো. মোহর আলী তার সম্পূর্ণ উল্টোপথে হেঁটেছেন। অতীতের শিলালিপি, সরকারি সনদ, ফরমান, গেজেট এবং বাংলা, ইংরেজি আরবী ও ফারসি ভাষার সাহায্য নিয়ে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনামূলক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন তিনি। ডক্টর মো. মোহর আলী তার গ্রন্থে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, উত্তর ভারতের উপর মুসলিম বাংলার যে প্রভাব ছিলো, তা মুসলিম বাংলার অনন্য উচ্চতার পরিচয় তুলে ধরে।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলিম ইতিহাস বিলুপ্ত করণের যে প্রচেষ্টা চালানো হয় এবং ইসলামকে হিন্দু ধর্মের মাঝে হারিয়ে যাওয়া একটা ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়, ডক্টর মো. মোহর আলী সেখানেও গবেষণা ও পর্যালোচনা করে এই মতাদর্শের বিপরীতে হাঁটেন। আর এমনটা হবেই না কেন? অসীম রায়ের মতো কেউ যদি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েই এমন বিকৃত ইতিহাস লেখে যে, ইসলাম হিন্দুধর্মের মাঝে হারিয়ে গেছে অথবা হিন্দুরা মুসলিমদের আখলাকে প্রভাবিত না হয়ে বরং হুজুগের কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, তাহলে বলতেই হয় যে, সে ইতিহাসবেত্তা ইসলাম সম্পর্কে সঠিকটা না জেনেই ইসলামের ইতিহাস লেখতে কলম ধরেছে।</p>
<p>বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের পক্ষে কলম ধরা আরেকজন অগ্রসেনানী হলেন মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। বাংলার মুসলিম ইতিহাসের ক্ষেত্রে বস্তুনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী ধারার সূচনা করেন তিনি। বাংলার মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি দীর্ঘসময় গবেষণা করেন। এসব গবেষণা থেকেই তিনি মুসলিম আমলের উপর দুই খণ্ডের ‘বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস’ গ্রন্থ লেখেন, যা আজও ভারতীয় ইতিহাসের মৌলিক ধারার অন্যতম একটি গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।</p>
<p>বাংলার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, বাংলা ভাষা এবং মুসলিম ও ভারতীয় সংস্কৃতি-র বিষয়গুলোকে সামনে রেখে মুসলিমদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেন মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম একত্রিত হয়ে যাওয়া, মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য না থাকা এবং মুসলিমদের বহিরাগত হওয়া নিয়ে যে বিকৃত ইতিহাস চর্চা হয় আমাদের দেশে, ‘বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস’ বইয়ের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এই অধ্যাপক প্রমাণ সহকারে তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেন।</p>
<p>ডক্টর মো. মোহর আলী এবং এম. এ. রহিম-এর পাশাপাশি মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন হলেন আবদুল করিম এবং ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’ থেকে মোঘল আমলে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসের উপরেই পাঁচ খণ্ডের বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে অন্যতম একটি মূল কারণ এটাই ছিলো যে, যদুনাথ সরকারের সম্পাদিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হওয়া হিস্টোরি অব বেঙ্গল বইয়ের ভুলভ্রান্তির বিপরীতে স্বচ্ছ ইতিহাস তুলে ধরা।</p>
<p>আর বর্তমান সময়ে এসে আমাদের মুসলিম ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন এমন দুইজন ব্যক্তি হলেন এবনে গোলাম সামাদ এবং সরদার আবদুর রহমান। বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির অবদান এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্ট বিকৃত ইতিহাসের বিপরীতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সরদার আবদুর রহমান। অন্যদিকে, ব্রিটিশদের অর্থায়নে সৃষ্ট হিন্দুদের আর্যতত্ত্ব, মুসলিমদের বহিরাগত তত্ত্ব এবং নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের মুসলিম হবার তত্ত্বের মতো বিকৃত ইতিহাসের ধারাকে বেশ যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে খণ্ডানোর চেষ্টা করেছেন এবনে গোলাম সামাদ। এছাড়াও রয়েছেন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, ফাহমিদ-উর-রহমান এবং ফয়েজ আলম—সহ আরো অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>এইযে, সম্পূর্ণরূপে পরস্পর বিপরীতমুখী ইতিহাসের দু&#8217;টি ধারার সৃষ্টি হওয়া—এটিই আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে উপলব্ধি করায় যে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের প্রভাবে বিকৃত এবং একপেশে ইতিহাসের যে ধারাটি প্রচলিত হয়ে আছে, তার বিপরীতে কলম ধরা প্রত্যেক ইতিহাসবেত্তারই একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। ব্রিটিশরা যদি এমন বিকৃত ইতিহাস তৈরির পেছনে অর্থায়ন না-ই করতো, তাহলে হয়তো আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসটাই ভিন্নরকম হতো; অথবা বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাসটাও অনন্যমাত্রা লাভ করতো।</p>
<p>পৌনে দুইশ বছর ধরে ব্রিটিশরা যে ধারা তৈরি করে দিয়ে গেছে, তার বিপরীতে মাত্র ৫০-৬০ বছরের গবেষণামূলক কার্যক্রম সত্যিকারার্থেই খুব একটা বেশি সময় নয়। তার উপর আবার রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়া বুদ্ধিজীবী নামক একটি সমাজ, যারা বাংলার ভূমিতে বসবাস করেই মুসলিম জাতিসত্তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে সিদ্ধহস্ত।</p>
<p>আর এর পাশাপাশি রয়েছে আমাদের অসচেতনতা এবং অজ্ঞতা। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে ডক্টর মো. মোহর আলী, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, আবদুল করিম এবং ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক—এর মতো ইতিহাসবেত্তারা যে পরিশ্রম করে গিয়েছেন, তার যথাযথ মর্যাদা দিতে আমরা বরাবরই অপারগতা প্রকাশ করে আসছি। এমনকি, আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট যেনো এসব নাম একেবারেই অপরিচিত। তার বিপরীতে বরং রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার এবং অসীম রায়েরাই যেনো বহুল পরিচিত।</p>
<p>অতএব, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সময় এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করার। সময় এসেছে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজম এবং ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রভাবে সৃষ্ট বিকৃত ইতিহাসকে ছুঁড়ে ফেলার। সময় এসেছে বাংলাদেশী মুসলিম জাতিসত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পূরণ করার।</p>
<p>তাই, বাংলার মুসলিমদের মাঝে উম্মাহ চেতনাকে সমুন্নত করা এবং মুসলিম জাতিসত্তার আত্মপরিচয়কে পুনর্জাগরিত করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দেবার এখনই উপযুক্ত সময়। কেননা, কোনো একটি জাতির সঠিক ইতিহাসই সেই জাতির জাতিসত্তাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে, তাদের আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে এবং তাদের মাঝে অবিনশ্বর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-need-to-reevaluate-muslim-history-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15916</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা; সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের অনন্য উপমা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 07 Jul 2025 15:00:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15906</guid>

					<description><![CDATA[এক ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক</strong></h4>
<p>ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি—আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত কয়েকটি পরিভাষা। সমগ্র মানবেতিহাসকে সংজ্ঞায়ন করা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দাবলি আজ ভিন্ন অর্থ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। কারণ অনুসন্ধানে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আমাদের সামনে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, তা হলো প্যারাডাইম ওয়ার বা পারিভাষিক যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময় যখন এসব শব্দসমূহ সামগ্রিকতাকে পরিমণ্ডল করে ব্যাপৃত হতো, সেসব শব্দগুলোর প্রতিটিই আজ নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠীর স্বার্থান্বেষণের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।</p>
<p>নির্দিষ্ট কিছু শোষকগোষ্ঠী বলতে যে শোষণ ও স্বার্থপরতার বিষবাষ্প নিঃসরণকারী মানবতার এক পরম শত্রু এবং সেকিউলারিজমের নামে রব বা সৃষ্টিকর্তাবিহীন তথাকথিত আধুনিক পরজীবী পাশ্চাত্য সভ্যতা-কে বুঝানো হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো সভ্যতায় যদি লিবারেলিজমের জনক জন লক, বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন, আখলাক বিবর্জিত মনস্তত্ত্বের জনক সিগমুণ্ড ফ্রয়েড-সহ ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্তে, থমাস হবস, ইমানুয়েল কান্ট, বার্ট্রান্ড রাসেল-এর মতো দার্শনিকদের মৌলিক ভিত্তি রোপিত থাকে—যারা দর্শন চর্চার নামে মূলত মানবজাতির রূহ থেকে মানবতা, নৈতিকতা, আখলাক, মারহামাত, আদালত দূরীকরণে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত ছিলো—তাহলে বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, এমন একটি সভ্যতার নিকট থেকে মানবতা আশা করা সত্যিকারার্থেই অমাবস্যার রজনীতে চন্দ্রালোক খোঁজার মতোই ব্যর্থ প্রচেষ্টার নামান্তর।</p>
<p>উল্লেখ্য, এখানে অনেকে হয়তো আক্ষরিক অর্থের দৃষ্টিকোণে ক্যাপিটালিজম এবং সোশালিজম ও তার আপডেট ভার্সন কমিউনিজম-এর মাঝে মরিচীকা-সদৃশ কিছু তফাত পেয়ে তাদের মধ্যকার বিস্তর ফারাক প্রমাণের প্রচেষ্টায় নত হবেন, তবে বাস্তবিকপক্ষে জায়োনিজম, লেবারেলিজম, ডায়ালেকটিজম, ক্যাপিটালিজম, সোশালিজম ও কমিউনিজম—সহ এমন সকল ইজম (ism) আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। মূলত, মানবজাতিকে নিকৃষ্টতর পদ্ধতিতে শোষণ করার নিমিত্তে সময়ে সময়ে তারা মুদ্রার পৃষ্ঠতল পরিবর্তন করে থাকে, এব্যতীত আর অন্যকিছু নয়।</p>
<p>মানবসভ্যতার শোষক স্বার্থান্বেষী পশ্চিমা দার্শনিকদের অন্যতম একজন হলেন রেনে দেকার্তে। দেকার্তিয়ান/কার্তেসিয়ান ফিলোসফি বা রেনে দেকার্তের দর্শনসমূহের প্রথম রূলস ছিলো, “I think, therefore I am” অর্থাৎ, “আমি চিন্তা করতে পারি, তাই আমার অস্তিত্ব রয়েছে”, যা তিনি ১৬৩৭ সালে তাঁর গ্রন্থ “Discourse on the Method”-এ তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ, তারা যতটুকু চিন্তা করে বা তারা যেভাবে চিন্তা করে, ততটুকুতেই তাদের অবস্থান সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে এই দর্শনটি পশ্চিমাদের দর্শনে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে, তারা তাদের মতো করেই ইতিহাসের বলয় তৈরি করে। এই দর্শনটি যেহেতু সমগ্র পশ্চিমের মৌলিক দর্শনে রূপ লাভ করেছিলো, সেহেতু তাদের অতীত ইতিহাস লিপিবদ্ধের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। এমনকি,  তাদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য সম্পূর্ণ বানোয়াট ও বিকৃত ইতিহাস লেখতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেনি।</p>
<p>এসবের উদাহরণ পাওয়া যায় তাদের ইতিহাস চর্চায়। ইতিহাসের পর্যায়ক্রম বা সময়কাল বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা তাদের সময়কালকে নিজেদের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে। তাদের পর্যায়কালকে যদি সহজভাবে উত্থাপন করা যায়, তাহলে বিষয়টা এমন হয় যে,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০২. ঐতিহাসিক যুগ,</li>
<li>০৩. ভবিষ্যৎ যুগ।</li>
</ul>
<p>এখানে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলতে সহজ ভাষায় মানবজাতির পূর্ববর্তী যুগ বা ডাইনোসর যুগকে বোঝানো হয়। মানবজাতির ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে তারা ঐতিহাসিক যুগকে তিনভাগে আবার ভাগ করে। অর্থাৎ,</p>
<ul>
<li>০১. প্রাচীন যুগ,</li>
<li>০২. মধ্য যুগ,</li>
<li>০৩. আধুনিক যুগ।</li>
</ul>
<p>এসবের মধ্যে প্রাচীন যুগকে তারা আবার তিনভাগে ভাগ করেছে। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. প্রস্তর যুগ,</li>
<li>০২. ব্রোঞ্জ যুগ,</li>
<li>০৩. লৌহ যুগ।</li>
</ul>
<p>এরপর, তাদের ইতিহাস অনুযায়ী মধ্যযুগের সময়সীমা ছিলো তথাকথিত ইউরোপীয় রেনেসাঁ পর্যন্ত। <strong>অথচ, তারা কাদের নিকট থেকে কীভাবে সভ্য হতে শুরু করলো, তা তারা বরাবরই লুকিয়ে রাখে। যে মধ্যযুগকে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে, সে অন্ধকার যুগ থেকেই তারা কোন পরশ পাথরের স্পর্শে রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ ঘটালো, সে বর্ণনার ক্ষেত্রেও তারা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। সে যাইহোক, তাদের তথাকথিত রেনেসাঁ-র পর থেকে তারা নিজেদেরকে দুনিয়াব্যাপী সভ্য বলে পরিচিত করতে থাকে। “প্রথমবার কীভাবে সম্পদ অর্জিত হয়, তা ধর্তব্য নয়, বরং সেসব সম্পদকে তখন সংরক্ষণ করা দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়ে”—দার্শনিক জন লক-এর এমন দর্শন ইউরোপীয়দের আরো স্বেচ্ছাচারী ও নৃশংস বানিয়ে ফেলে</strong>। মানবজাতিকে সভ্য বানানোর বুলি আওড়িয়ে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তারা সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে বর্ণনাতীত যে শোষণ ও নিষ্পেষণ চালিয়েছে, তা আজ আর কারও অজানা নয়।</p>
<p>এই হলো তাদের ইতিহাস বর্ণনার পন্থা। কিন্তু, এর বিপরীতে গিয়ে তাদেরই কথিত অন্ধকার মধ্যযুগের সময় ইসলামী সভ্যতা মানবেতিহাসের পাতায় যে ইতিহাস রচনা করেছে; সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, মারহামাত ও আখলাকের সাথে যে সমগ্র বিশ্ব পরিচালনা করেছে এবং ইসলামী সভ্যতার দর্শনসমূহ যে উপমা উপস্থাপন করেছে, তা পশ্চিমাদের স্বার্থাভিলাষের মূলে কুঠারাঘাত করে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের যে সময়কে গোল্ডেন এজ বা স্বর্ণালী সময় বলা হয়, সেসময়কে তারা অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করে থাকে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুতেই শেষ নয়, আমরা মুসলিম উম্মাহ যেনো পুনরায় ঘুরে দাড়াতে না পারি, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” বিষয়টি নিয়ে পর্যন্ত অসংখ্য পুস্তক রচনা করেছে। অথচ, রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে স্পষ্ট বর্ণনা পাই যে, আমরা যদি জেনেও থাকি, আগামীকাল কেয়ামত সংঘটিত হবে, তবুও যেনো আমরা গাছ রোপণ করতে পিছপা না হই। এখানে, গাছ রোপণের বিষয়টি এসেছে মূলত রূপকার্থে; এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানবজাতির জন্য সকল ধরনের কল্যাণকর কাজ জারি রাখা।</p>
<p>মহান রবের একজন খলিফা হিসেবে পৃথিবী বিনির্মাণ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য; এবং আমরা তা বাস্তবায়ন করে এসেছি সুদীর্ঘ বারোশত বছরেরও বেশি সময় ধরে। মূলত, তাদের শোষণের ধারা বজায় রাখতে এবং আমাদের এই বিশ্বজনীন ও সামগ্রিক চিন্তাধারার বিরোধিতা করতে গিয়েই তারা “এন্ড অব দ্যা হিস্টোরি” বা “ইতিহাস ও পৃথিবীর শেষ সময়” মতবাদের উত্থান করেছে। আবার, এটাও অস্বীকার করার জো নেই যে, এই বিষয়টি থেকেই মূলত আমাদের মুসলিম উম্মাহর ভেতরে “কেয়ামত নিকটবর্তী”-এর মতো অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী একটি তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে; যা সরাসরি রাসূল (সা.)-এর হাদীস পরিপন্থী একটা চিন্তাধারা।</p>
<p>অতএব এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পশ্চিমাদের দর্শন ও তাদের ইতিহাসের সাথে আমাদের দর্শন ও ইতিহাস চর্চার মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সেহেতু, আমাদেরকে পশুসমতুল্য করা পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত থেকে মনোযোগী হতে হবে আমাদেরই রেফারেন্স, তথ্যসূত্র ও পুস্তকাদির দিকে। মোটাদাগে বলে যায়, আমাদের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে থাকতে হবে সদা-সতর্ক। আমাদের শাসন ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো বিশাল কলেবরে উপস্থাপন করে আদিল ও ন্যয়পরায়ণ শাসকদেরকে তারা যে নিকৃষ্টতর করে উপস্থাপন করে থাকে, সেদিকে আমাদের যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে। এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে এটাও আমাদের বিশেষ নজরে রাখতে হবে যে, আমাদের ইতিহাস নিয়ে তাদের প্রশংসামূলক পর্যালোচনার পেছনেও থাকতে পারে অন্যকোনো দুরভিসন্ধি; উদাহরণস্বরূপ ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ-এর কথাও ধর্তব্য হতে পারে।</p>
<p>এই বিষয়টিকে কেন্দ্রে রেখেই এবার একটু ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই</strong></h4>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র এবং সাংস্কৃতিক নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ স্রষ্টার বিশেষ মহিমাধন্য অপার এক লীলাভূমি। মহান রব যেনো এই অঞ্চল এবং তার মানুষের উপর নিজ হাতে রহমত প্রেরণ করেছেন; প্রকৃতিগত বিচিত্রতা, উর্বর ভূমি এবং জনসাধারণের কর্মঠ মানসিকতা-র মাধ্যমে এই অঞ্চলকে নেয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। ফলশ্রুতিতে, সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলের উপর শ্রেষ্ঠ সব বিজেতাদের নজর পড়েছিলো। অতএব, এটাও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বিশ্ব মানচিত্র অঙ্কনের সূচনা থেকেই এই অঞ্চলটি তার ব্যতিক্রমী প্রভাব প্রস্ফুটিত করতে থাকে।</p>
<p>ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রস্তর যুগে খ্রিস্টপূর্ব ৭০-৫০ হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে ভারতে মানবজাতির আগমন ঘটে। এরপর ১২ হাজার বছর পূর্বে ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা সুফলাচন্দ্রিকা নামক একটি অঞ্চলে কৃষির উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর থেকে কৃষি ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে থাকে। এই সময়টায় ইরানের ওদিক থেকে বিশাল জনগোষ্ঠী ভারতের এদিকে অভিবাসন করে। ভারতের স্থানীয় অধিবাসী ও অভিবাসন করে আসা জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে যে জাতির উদ্ভব হয়, তাদের হাতেই গড়ে ওঠে সুবিশাল হরোপ্পা মহেঞ্জোদারো-র বিখ্যাত সেই সিন্ধু সভ্যতা। সময়টা ছিলো তখন ব্রোঞ্জ যুগ।</p>
<p>সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তীতে যে যুগ শুরু হয়, তা হলো বৈদিক যুগ। বৈদিক যুগ মূলত ব্রোঞ্জ যুগকে অতিক্রম করে লৌহ যুগের প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলমান ছিলো। বৈদিক যুগের পরে যথাক্রমে জনপদ, পুরু জাতি, কুরু সাম্রাজ্য, ষোড়শ মহাজনপদ, নন্দ সাম্রাজ্য ও মৌর্য্য বংশ এই অঞ্চল শাসন করেছিলো। পরবর্তীতে যারা ভারত শাসন করে, তারা হলো যথাক্রমে— শুঙ্গ রাজবংশ, সাতবাহানা সাম্রাজ্য, কুষাণ সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য, কামরূপ সাম্রাজ্য, পল্লব রাজবংশ, কদম্ব রাজবংশ, চালুক্য রাজবংশ, রাষ্ট্রকূট রাজবংশ এবং পাল সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে যেসব রাজবংশ বা সাম্রাজ্যের নাম উল্লেখ করা হলো, তারা যে সমগ্র ভারতের মূল শাসক ছিলো, বিষয়টা মোটেও তেমন না। বরং, সমগ্র ভারত তখন বিশাল বিশাল সব বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ছিলো, সেহেতু পরবর্তীতে উল্লেখ করা রাজবংশ বা সাম্রাজ্যগুলো বলতে গেলে একই সময়েই তারা তাদের অঞ্চলগুলো শাসন করেছে। আর এসবের সমাপ্তি ঘটতে শুরু করে ত্রয়োদশ শতকের একেবারে উষালগ্নে, অর্থাৎ, মুসলমান কর্তৃক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর থেকে। সূচনা হয় তখন ভারত ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়, ভারতবাসী উপলব্ধি করতে শুরু করে জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা এবং অবলোকন করতে শুরু করে সমগ্র ভারতজুড়ে একই শাসকের শাসন।</p>
<p>ভারতে মুসলিম শাসনকে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. সুলতানী আমল (১২০৬-১৫২৬),</li>
<li>০২. মুঘল আমল (১৫২৬-১৭৫৭)।</li>
</ul>
<p>সুলতানী আমলকে দিল্লি সালতানাত নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সময় মুসলিমদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্য। দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলে কয়েকটি রাজবংশ ভারতকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে। তারা হলো,</p>
<ul>
<li>০১. মামলুক রাজবংশ (১২০৬-১২৯০),</li>
<li>০২. খিলজী রাজবংশ (১২৯০-১৩২০),</li>
<li>০৩. তুঘলক রাজবংশ (১৩২০-১৪১৪),</li>
<li>০৪. সৈয়দ রাজবংশ (১৪১৪-১৪৫১),</li>
<li>০৫. লোদী রাজবংশ (১৪৫১-১৫২৬)।</li>
</ul>
<p>দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলের পরে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনভার গ্রহণ করে মুঘলরা। লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল শাসনের সূচনা করেন ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কামান ব্যবহারকারী মুঘল সালতানাতের প্রথম শাসক সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর। এই সময় মুঘলদের বিপরীতে যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য টিকে ছিলো, সেটি হলো মারাঠা সাম্রাজ্য।</p>
<p>এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আসবে, তা হলো, ১২০৬ সালে যে মুসলিমরা দিল্লি সালতানাতের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসনের পুনঃসূচনা করে বটে, তবে এসবের ভিত্তিপ্রস্তর কিন্তু একদিনে স্থাপিত হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রায় কয়েকশত বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। বিগত পাঁচ শতাব্দী যাবত এই শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিলো। এই সময়ের ইতিহাসকে তিনটি ভাগে বা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম অভিযানের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়।</p>
<p><strong>প্রথম পর্যায় শুরু হয় ৭১২ সালে তরুণ বিজেতা মুহাম্মাদ বিন কাসেম-এর সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের মাধ্যমে। এই বিজয়ের পর থেকে ভারতবর্ষে মুসলিমরা গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীর পর্যায় পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। জনসাধারণও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবেই সমগ্র ভারতবর্ষজুড়ে পরিচিত হতে শুরু করে।</strong></p>
<p>এই ধারাবাহিকতায় হাওয়া লাগে দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে, অর্থাৎ, দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের মাধ্যমে। তিনি একাধারে সতেরোবার ভারত অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত ইরানের গজনভী বংশের শাসক। তিনি তাঁর অঞ্চলে যে প্রায় ত্রিশ বছর যাবত শাসন করেছিলেন, তা ছিলো ভারতের তৎকালীন স্বর্ণালী সময়। বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আবু রায়হান আল-বেরুনী ছিলেন সুলতান মাহমুদের দরবারের অন্যতম একজন সদস্য, যিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এছাড়াও সুলতান মাহমুদের সাথে সখ্যতা ছিলো মহাকবি ফেরদৌসীর, যার শাহনামা এখনও বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। উল্লেখ্য যে, শাহনামা নিয়ে সুলতান মাহমুদের বিষয়ে যা ছড়ানো হয়, তার সুস্পষ্ট কোনো দলিল বা ভিত্তি নেই।</p>
<p>এরপর, তৃতীয় পর্যায়ে এসে চিরস্থায়ীভাবে ভারতে মুসলিম শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, যার শুরুটা হয় মুইযুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরীর ভারত অভিযানের কল্যাণে। ১১৭৫ সালে মুলতান বিজয়, ১১৭৮ সালে আনহিলওয়ারা বিজয়, ১১৮২ সালে সিন্ধু বিজয় এবং ১১৮৬ সালে ত্বরাইনের প্রথম যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলেও ১১৯২ সালে ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ার্জনের মাধ্যমে ভারতে ঘুরী রাজবংশ নিজেদের শক্তিমত্তার অস্তিত্বের জানান দেয়। প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে শুরু হয় মুসলিমদের চিরস্থায়ী শাসনের উপমা নিদর্শন। এরপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেই তাঁর একজন চৌকস সেনাপতি কুুতুবউদ্দিন আইবেক-এর হাতেই স্থাপিত হয় দিল্লি সালতানাতের ভিত্তিপ্রস্তর। দিল্লি সালতানাতের সময় যে যে রাজবংশ ভারতবর্ষকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করতে শুরু করে, তাদের নাম তো পূর্বে উল্লেখিত হয়েছেই।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের পর শুরু হয় মুঘল আমল। মুঘল আমলের ছয়জন শাসক  সবচেয়ে পরিচিত। যথাক্রমে তাঁরা হলেন,</p>
<ul>
<li>০১. জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০),</li>
<li>০২. নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ হুমায়ুন ১৫৩০-১৫৪০, ১৫৫৫-৫৬),</li>
<li>০৩. জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫),</li>
<li>০৪. নূরুদ্দুন মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭),</li>
<li>০৫. শিহাবুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহজাহান (১৬২৭-১৬৫৮),</li>
<li>০৬. মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদ আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬৫৮-১৭০৭)।</li>
</ul>
<p>তাঁদের মাঝে সম্রাট আকবর এবং আলমগীর—দু&#8217;জন মিলেই শাসন করেছেন শতবছরেরও বেশি সময় ধরে। এরপর, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে শুধু বাংলার নয়, বরং সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়, যা অদ্যাবধি উদিত হয়নি।</p>
<p>যেকোনো অঞ্চলের ইতিহাসেরই উত্থান-পতন থাকে, থাকে সে সময়ের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। সে হিসেবে মুসলিম শাসনামাল বলা হোক বা ভারতের সমগ্র ইতিহাসই ধরা হোক—উভয়ক্ষেত্রেই মুঘল আমলই ছিলো ভারতবর্ষের সফলতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়া। আখলাক, আদালত ও মারহামাতে পরিপূর্ণ একটি সমাজ তুলে ধরেছিলো সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা, যা হতভম্ব করে দিয়েছিলো সমগ্র ভারতবাসীকে।</p>
<p>তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, মুসলিম শাসনামল যে একেবারে “ধোয়া তুলসী পাতা” বা শতভাগ নিখুঁত ছিলো, তা কোনো মুসলিম ইতিহাসবেত্তা-ই স্বীকার করেন না। এমনকি, আদালত ও আখলাকবিহীন কাজকর্মের জন্য তারাই সর্বপ্রথম শাসক বা অপরাধীদের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু, প্রতিটি রাজবংশ বা শাসকের সময়ের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফুলে ফেঁপে তুলে ইতিহাস বর্ণনা করেছে ইংরেজ ইতিহাসবীদ ও তাদের দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। এমনকি, আমরা মুসলিমরাও এখন আমাদেরই ইতিহাস অধ্যয়ন করি ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিহাস লেখকদের তথ্যসূত্রকে কেন্দ্রে রেখে। ফলশ্রুতিতে, বর্তমান ভারতে মুঘল শাসকগণ আজ নেতিবাচকভাবে পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘ দেড়-দুইশত বছর যাবত। অথচ, প্রকৃত ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।</p>
<p>এবার তাহলে সে ইতিহাসের দিকেই একটু নজর বুলানো যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>তিন</strong></h4>
<p>একেবারে শুরুতেই “ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি”—চারটি পরিভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস বর্ণনা করা হয় সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি-র। অন্যদিকে, সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, একটা ব্যতিত আরেকটা অসম্পূর্ণ। আবার এ&#8217;দুয়ে মিলে হয় সভ্যতা, আর সর্বশেষে এই সভ্যতারই ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। অতএব, এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, এসব পরিভাষা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু এসবের মাঝে রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা, সেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টি এলে অবশ্যই অন্য বিষয়গুলোও অবধারিতভাবে চলে আসবে।</p>
<p>ইতোপূর্বে মুসলিম শাসনামলের সময়কালটা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে বলা যায়, সভ্যতার ইতিহাসের কিঞ্চিৎ ফুটে উঠেছে এখানে। কিন্তু, ইতিহাস তো শুধু এভাবে বর্ণনা করলে হয় না, সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়টিও ফুটিয়ে তুলতে হয়। অতএব, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বিষয়টার প্রতিও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>সহজ ভাষায় বলা হয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ হলো, সমাজের সকলে মিলে একত্রে শান্তিতে বসবাস বা সহাবস্থান করা; আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর সংজ্ঞায়ন এভাবেই করা হয়। অথচ, শুধুমাত্র সমাজের ভেতরে পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করা বা সহাবস্থান করাই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নয়, বরং ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্য এবং প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা-সহ “সমাজ”-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ই এখানে অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি এসবের প্রতিটিতেই আদালত বিরাজমান থাকে, মূলত তখনই একটি সমাজে প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>এখানেই শেষ নয়, একটি সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর ইতিহাস তখনই জানতে ও বুঝতে পারা যায়, যখন সে সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে পূর্বাপর বা সমসাময়িক অন্যান্য সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসের সাথে তুলনা করা হয়, চাই সে সমাজ-সভ্যতা স্থানীয় হোক বা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সমাজ-সভ্যতা হোক। তবে এটা সত্য যে, স্থানীয় পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার সাথে তুলনা করলেই বরং তখন পার্থক্যটা আরো বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতএব, ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামল বা সমাজ-সভ্যতার সাথে তার পূর্বাপর সমাজ-সভ্যতার তুলনা করলে মুসলিম সমাজ-সভ্যতার প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যাবে।</p>
<p>যেহেতু তুলনামূলক আলোচনাকেই কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে, সেহেতু গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ এবং আদালতের মধ্যকার পার্থক্য জানাটা সকলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বুঝার স্বার্থে আদালতকে বলা যেতে পারে ন্যায় অধিকার এবং গতানুগতিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ-কে বলা যেতে পারে সমান অধিকার। সকলের নিকট এটা সুস্পষ্ট হতে হবে যে, ন্যায় অধিকার আর সমান অধিকার কখনও এক বিষয় নয়। ন্যায় অধিকার হলো, যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দেওয়া। বিপরীতে, সমান অধিকার হলো, সবার মাঝে সমবণ্টন করা। সমান অধিকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, কেউ হয়তো প্রয়োজন অনুপাতেও সম্পদ পায় না আবার কেউ প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পায়। কিন্তু, ন্যায় অধিকারে কখনও তা হয় না, সবাই সবার প্রাপ্যটুকুই পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সমান অধিকারটা ন্যায় অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহর নিকট এই ন্যায় অধিকারই হলো আদালত। তবে এটা স্মর্তব্য যে, “আদালত” শব্দটি যতোটা সামগ্রিকতা ও বিস্তৃত অর্থ ধারণ করতে পারে, “ন্যায় অধিকার” শব্দটি কখনও তা পারবে না।</p>
<p>সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান বলতে যে সামাজিক একটা পরিবেশে শুধুমাত্র সহাবস্থান করাকে বুঝানো হচ্ছে না, তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, সমাজ বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত সকল দৃষ্টিকোণকে বিবেচনা করেই যেহেতু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিষয়টি ফুটে ওঠে, সেহেতু সমাজ-এর সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় থেকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>💠</strong><strong>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p><span style="font-size: 16px;">ভারতবর্ষে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় অবদান হলো, ধর্মীয় বৈষম্য বিদূরিত করা। কেননা, ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের ধর্মীয় অবস্থা অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক অবস্থায় ছিলো। তখন ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম প্রচলিত ছিলো। মহাবীর নামে এক ক্ষত্রীয় সন্ন্যাসী ভারতে জৈন ধর্ম প্রবর্তন করেন। গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম প্রবর্তন করেন, তিনি সিদ্ধার্থ নামেও পরিচিত ছিলেন। মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের সময় বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। গুপ্ত শাসনামল থেকে বৌদ্ধ ধর্মের পতন শুরু হয়। এ সময় থেকে ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনজাগরণ সূচিত হয়।</span></p>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে ভারতে হিন্দু ধর্মই ছিলো প্রধান ধর্ম। ভারতের বেশিরভাগ রাজাই ছিলেন হিন্দু। তারা হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সমাজের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিলো সবচেয়ে বেশি। বৈশ্য ও শূদ্ররা নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত ছিলো। তাদের ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করা এমনকি শোনাও নিষিদ্ধ ছিলো। দুর্নীতিপরায়ণ ব্রাহ্মণরা জনসাধারণের দুর্বলতা ভীতির সুযোগ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ব্রাহ্মণদের আক্রমণাত্মক মনোভাব বৌদ্ধদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করে। ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্যাতিত বৌদ্ধরা ভারতে আক্রমণ করতে মুসলমানদেরকে আমন্ত্রণ জানায় এবং আরবদেরকে স্বাগত জানায়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক হাবীব বলেন, <strong>❝ব্রাহ্মণগণ ইচ্ছাপূর্বক জনগণকে অজ্ঞ করে রাখতেন এবং সমাজে এভাবে তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেন।❞</strong></p>
<p><strong>ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন, ❝পণ্ডিত ব্রাহ্মণগণ ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে অত্যাচারীর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।❞</strong></p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে দিল্লির সুলতানি আমলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ভারতের মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ভারতের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো।</p>
<p>ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময় ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিলো না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে এবং ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে তোলে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p><strong>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দিল্লির সুলতানরা হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব পালনে কোনোদিন বাধা দেননি। দিল্লির সমগ্র সুলতানি আমলে অমুসলিম নাগরিকদের অর্থাৎ &#8220;জিম্মিদের” উপর কোনো ধরনের কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়নি।</strong> কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে, “দিল্লির সুলতানি আমলে অমুসলিম প্রজারা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের মন্দির ধ্বংস করা হয়। তাদেরকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়।”</p>
<p>তাদের এ বক্তব্য মোটেও সত্য নয়। কারণ, দিল্লির সুলতানি আমলে কোনো হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়নি; যদি ধ্বংস করা হতো, তাহলে প্রাক মুসলিম এবং মুসলিম আমলের মন্দির আজ আর দেখা যেতো না।</p>
<p>এটাও জানা যায় যে, কোনো কোনো সুলতান হিন্দুদের উৎসবেও যোগদান করতেন। যেমন সুলতান মুহম্মদ-বিন-তুঘলক হিন্দুদের “হোলি” উৎসবে যোগদান করতেন। সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী জৈন আচার্য মহাসেনকে ধর্ম আলোচনার জন্য কর্নাট থেকে আহ্বান করেন। এছাড়া দিগম্বর জৈন পূর্ণচন্দ্র ও শ্বেতাম্বর জৈন রামচন্দ্র সুরী প্রভৃতি জৈন আচার্যরা সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর আতিথ্য গ্রহণ করেন।</p>
<p>ইবনে বতুতা বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মুহম্মাদ-বিন তুঘলকের শাসনামলে অনেক হিন্দু কর্মচারী সুলতানী রাষ্ট্রের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি জনৈক হিন্দু কর্মচারীকে সিন্ধুর শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত করেন। সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে ছিলেন যথেষ্ট তৎপর।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>দিল্লির সুলতানী আমলের ধর্মীয় এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দের ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো মুঘল আমলেও; এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে তা আরো জোড়ালোভাবে। সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দের দৃষ্টিকোণে সুলতান আওরঙ্গজেব ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ, এই সুলতানকেই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কলুষিত করা হয়েছে। তাঁর নামেই আজ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে যে, তিনি নির্বিচারে গণহারে হিন্দুবধ করেছেন, অথচ, তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।</p>
<p>মহান এই সুলতানের বিরুদ্ধে আনীত ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো,</p>
<ul>
<li>০১. হিন্দু মন্দির ও টোল ধ্বংস,</li>
<li>০২. হিন্দু কর্মচারীদের পদচ্যুতি,</li>
<li>০৩. হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন।</li>
</ul>
<p>কিন্তু, সুলতান আওরঙ্গজেব রাজ্যশাসন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, তিনি কখনই বিধর্মীদের প্রতি অন্যায়, অবিচার এবং জোর জবরদস্তি করেননি। বরং তিনি ভারতের সকল ধর্মের জনগণের প্রতি তার সহিষ্ণুতার মনোভাব প্রদর্শন করেছেন।</p>
<p><strong>প্রথমত, </strong>এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ইতিহাস যে, আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং হিন্দুমন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর সময়ে নির্মিত দিল্লি, আগ্রা, বেনারস, মথুরাপুর, গুজরাট প্রভৃতি স্থানে নির্মিত বহু মন্দির আজও বর্তমান রয়েছে। সম্রাট কর্তৃক বেনারসের গভর্নরের নিকট লিখিত ফরমানে জানা যায় যে, তিনি বৈধ উপায়ে নির্মিত মন্দির বিনষ্ট না করার নির্দেশ দেন। প্রধানত যেসব মন্দির রাজদ্রোহ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর যে সমস্ত মন্দির গড়ে উঠেছিলো, বরং সেগুলো তিনি ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষভাগে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে এসে সম্রাটের সহিষ্ণু মনোভাবের পরিচয় পেয়েছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন,<strong> “Everyone is free to serve and worship God in his own way”.</strong></p>
<p><strong>ঐতিহাসিক শর্মাও স্বীকার করেন যে, আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে হিন্দুগণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতো। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজপুত সেনাপতি ভীমসিংহ আহমেদাবাদে প্রায় ৩০০ মসজিদ ভেঙেছিলেন। কিন্তু, আওরঙ্গজেব তাকে কোনো ধরনের শাস্তি না দিয়ে তাকে মারাঠাদের দমন করতে পাঠান।</strong></p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, </strong>আওরঙ্গজেব হিন্দু কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করে সে জায়গায় মুসলমানদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন বলে যে অভিযোগ করা হয়, তা সত্য নয়। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি কতিপয় হিন্দু কেরানি, দেওয়ান ও রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি হিন্দুদের প্রতি বৈরী ও রুষ্ট হয়ে তাদেরকে পাইকারি-হারে চাকরি হতে বরখাস্ত করেন। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক দফতরে একজন করে হিন্দু-মুসলমান নিয়োগ দেন। কিছু হিন্দু কর্মচারী সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করলেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করে পূর্বপদে বহাল রাখেন। চরম বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব যশোবন্ত সিংহকে শুধু ক্ষমাই করেননি বরং তাকে যথাযচিত সম্মান প্রদর্শন করেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আওরঙ্গজেব হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন এবং বিনা অপরাধে হিন্দু কর্মচারীদেরকে পদচ্যুত করেছিলেন—এ কথা চিন্তাই করা যায় না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> অমুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য সামরিক কার্যের পরিবর্তে তাদের উপর আওরঙ্গজেব জিজিয়া কর ধার্য করেন। হিন্দুদের উপর থেকে প্রায় ৮০ প্রকার কর উঠিয়ে নেয়ার ফলে রাষ্ট্রের অর্থভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়ে। তারপরও হিন্দুরা অনুগত না হয়ে আক্রমণ-ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। কাজেই দীর্ঘ ২০ বছর পরে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও শত্রুভাবাপন্ন হিন্দুদেরকে নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার উদ্দেশে সম্রাট হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর পুনরায় ধার্য করেন। ভি.ডি. মহাজন স্বীকার করেন যে,</p>
<blockquote><p>❝এই কর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার উপর ধার্য হয়নি। বস্তুত, দরিদ্র, স্ত্রীলোক, খোড়া, নাবালক ও উন্মাদগ্রস্ত ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই তিনি জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন।❞</p></blockquote>
<p>অতএব, হিন্দুদের ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে এমন একজন মহান শাসকের উপর এমন সব অভিযোগ পেশ যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেহেতু বলা যায়, এমন সব মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন মূলত ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ইতিহাসবীদদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের মনোভাবকেই বরং আরো স্পষ্ট করে তোলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<p>সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর আলোচনার পূর্বে আমাদেরকে এটা বরং আগে বুঝতে হবে যে, বিনোদন ও সংস্কৃতি এক বিষয় নয়। বিনোদন মূলত সংস্কৃতিরই একটা অংশ। কেননা, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজই কোনো না কোনো সংস্কৃতির আলোকে করে থাকি। অর্থাৎ, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরের কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাতে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষ যা করে, তাই সংস্কৃতি। অতএব, সংস্কৃতির আলোচনায় শুধু বিনোদন অন্তর্ভূক্ত হবে না; বরং সমাজের সামগ্রিক বিষয়গুলোই সংস্কৃতিতে আলোচনা হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। প্রাথমিক অবস্থায় হিন্দু সমাজে উদারতা বিদ্যমান ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রাবিড়, আর্য, শক, হুন, কুষাণ প্রভৃতি জাতীয় লোকজন আসে এবং হিন্দু সমাজের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের আলাদা সত্তা হারিয়ে হিন্দু সমাজের সাথে এক হয়ে যায়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এ চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।</p>
<p>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাব উল-হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতবর্ষের সমাজে নারীদের অবস্থা ছিলো বড়ই করুণ। নারীদের অধিকার ছিলো খুবই সীমিত। নারীদের সাধারণত ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সমাজে পুরুষেরা বহু বিবাহ করতো। কিন্তু, নারীদের দ্বিতীয় বিবাহের কোনো নিয়ম ছিলো না। গ্রিকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্য যুগে সমাজে নারীদের মর্যাদা ছিলো এবং তারা সাহিত্য দর্শনে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী ছিলো। আল বেরুনী তার “কিতাব-উল-হিন্দ” নামক গ্রন্থে বৈদিক যুগের নারী জাতির উচ্চ মর্যাদার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আল-বেরুনী আরও বলেন যে,</p>
<p>❝সে সময় নারীদেরকে শিক্ষা প্রদান করা হতো এবং শাসন-ক্ষেত্রে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলো।❞</p>
<p>তবে এটা যে বৈদিক সমাজের সামগ্রিক চিত্র ছিলো না, তা আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে নারীর অপমানের বিষয়টি উঠে আসে সতীদাহ প্রথা থেকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতীয় সমাজে অনেক কু-প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিলো। অনেক কু-প্রথাকে সমাজে ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হতো। কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা, নরবলি এবং গঙ্গীয় শিশু কন্যা বিসর্জন ইত্যাদি কাজকে হিন্দুরা ধর্মীয় পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। এছাড়াও তখন দেবদাসী প্রথাও প্রচলিত ছিলো।</p>
<p>আবার ভারতের হিন্দু সমাজে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিলো। দাস-দাসী কেনা-বেচা হতো এবং প্রাসাদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এটি তখন সামাজিক অনুশাসনে পরিণত হয়।</p>
<p>মোদ্দাকথা, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিলো। সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ছিলো। জাতিভেদ প্রথা সমাজকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিলো। নারীরা ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সমাজে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। এমনকি, ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসকরা সমাজের কোনো উন্নয়নে পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি।</p>
<h5></h5>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>বিপরীতে ভারতের মুসলিম সমাজের অন্য এক চিত্র দেখা যায়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আসার আগে গ্রিক, শক, হুন, পারসিক প্রভৃতি জাতির লোকজন আসে। তারা তাদের নিজস্ব কোনো সভ্যতা ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসেনি। তারা হিন্দু সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এরপর, ৭১২ সালে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর মুসলিম বিজেতারা এদেশে এক উন্নত সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে আসেন। তারা দীর্ঘদিন ভারতবর্ষে অবস্থান করেন। মুসলমানরা হিন্দুদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়নি এবং মুসলমানরা তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এন. সি. মেহতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝ইসলাম যেখানে এসেছে, সেখানেই মার্জিত রুচি এবং মর্যাদাবোধের প্রকাশ ঘটেছে। এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রত্যেক মুসলমান প্রধানত একটি সামাজিক, সহজ ও মুক্ত জীবন-যাপন করে।❞</p></blockquote>
<p>মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর ভারতের সমাজ-কাঠামোর উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ইসলামের উদার, সহনশীল নীতি ও হিন্দু সমাজের কঠোরতা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর প্রবল প্রভাব পড়ে। এর ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাছাড়া ইসলামের প্রভাবে বর্ণভিত্তিক ভারতীয় সমাজে আরও অনেক নতুন নতুন উপবর্ণ ও গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।</p>
<p>বিন কাসিমের এই অভিযানের পর ভারতবর্ষের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপা বলেন যে,</p>
<p>❝তুর্কিরা বাহ্যত স্থানীয় খাদ্য ও পোশাক গ্রহণ করে। কিন্তু, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ইসলামের কোনো কোনো সামাজিক চিন্তা ভারতীয় জীবনের অংশ হয়ে যায়। ইসলামের প্রভাবে ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু মহিলাদের মধ্যে পর্দার প্রচলন ঘটে। প্রাচীন ইরানে (পারস্য) এ প্রথার প্রচলন হলেও ভারতে আরবীয় ও তুর্কিরা এ প্রথা আমদানি করে।❞</p>
<p>এই পর্যায়ে পূর্বের একটি কথা আবারো উল্লেখ করতে হয় যে, মুসলিম শাসনামলে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। ভারতে প্রাথমিক মুসলিম শাসনের সময়ে ভারতীয়দের কাছে ইসলাম একেবারে অপরিচিত ছিোল না। কারণ, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে সিন্ধু ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ভারতে বৌদ্ধ রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণার প্রভাবে সুফিবাদের উন্মেষ ঘটে। ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সুফিদের প্রেম এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে লাভ করার তত্ত্ব ভারতীয় সমাজজীবনকে আলোড়িত করে। যার ফলে ভারতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের সমন্বয় সাধনের পথ সুগম হয়।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে,</p>
<p><strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong></p>
<p>ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র-এর মতে,</p>
<p><strong>❝ভারতীয়দের সুগভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্য সম্পর্কে সমুন্নত ধ্যান-ধারণার সাথে তুর্কি ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণে শেষ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>রোমিলা থাপার মতে,</p>
<p><strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>সতীদাহ প্রথা নিয়ে বলতে গেলে ইবনে বতুতার মুহম্মাদ-বিন তুঘলককে নিয়ে একটা মন্তব্য তুলে ধরতে হয়, তিনি বলেন,</p>
<p><strong>❝সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে সর্বদা ছিলেন তৎপর।❞</strong></p>
<p>শুধু মুহাম্মাদ বিন তুঘলকই না, বরং সম্রাট বাবর, আকবর এবং আওরঙ্গজেবও সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে ভূমিকা পালন করেন। সম্রাট আকবর একবার নিজে গিয়ে এমন হিংস্র কর্মকাণ্ডে বাধা দেন এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে আইন পর্যন্ত প্রণয়ন করেন।</p>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>মোদ্দাকথা, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। মুসলমানরা ভারতে এসে এখানে শ্রেণিহীন সমাজ গঠনে ভারতীয়দেরকে উদ্বুদ্ধ করে। দিল্লির সুলতানি আমলে ভারতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর, এমনকি মুঘল আমলেও, ইসলামী ভাবধারা ভারতের সমাজ, আচার-আচরণ, ধর্ম, স্থাপত্য, শিল্প, ভাষা-সাহিত্য, সঙ্গীত ও বিজ্ঞানকে প্রভাবান্বিত করে। এভাবেই, ইসলামী ভাবধারা অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>শিক্ষা</strong><strong>, </strong><strong>সাহিত্য ও স্থাপত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম পূর্ব ভারতের অবস্থা খুবই নাজুক ও হ-য-ব-র-ল হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তারা বেশ এগিয়ে ছিলো। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সভ্যতার যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছিলো। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনামলে দেশের সর্বত্র শিক্ষায়তন গড়ে উঠেছিলো। মঠ, টোল, পাঠশালা, কলেজ এমনকি কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। বিহারে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও পশ্চিম ভারতের বালভী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ। এছাড়াও উদন্তপুর, বারানসী, বিক্রমশীলা প্রভৃতি স্থানে উচ্চশিক্ষার সু-ব্যবস্থা ছিলো। মালব ও আজমীরে সংস্কৃতি কলেজ স্থাপিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মশাস্ত্র ও বেদান্ত ছাড়াও দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হতো।</p>
<p>প্রাক-মুসলিম আমলে ভারতবর্ষে হিন্দু কাব্য, নাটক, উপন্যাস ও গদ্য সাহিত্যের বিকাশ লাভ করে। সাহিত্যিক হিসেবে ভগবতি, বাহমান, জয়দেব, রাজ শেখর, শ্রীহর্ষ, কালিদাস প্রমুখ খ্যাতি লাভ করেন। আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত ও নাগার্জুন জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত-শাস্ত্র ও চিকিৎসা-বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পে ভারতীয়রা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে। কৈলাশ মন্দির, ভুবনেশ্বর ও কোনারকের মন্দির ছাড়াও ইলোরা, অজন্তা, খাজুরাহ, গান্ধার ও সাঁচির চিত্র ও স্থাপত্য কীর্তি ভারতীয়দের উচ্চমানের শিল্প নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। এ সময় ভারতীয়রা সঙ্গীত চর্চায়ও ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে।</p>
<h4></h4>
<h4><strong>মুসলিম ভারত</strong></h4>
<p>এখন তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, তবে তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান নেই? এক্ষেত্রে উত্তর হলো, শিক্ষা-সাহিত্যে মুসলামদের অবদানের অনস্বীকার্য। পূর্বের এমন একটা ভঙ্গুর সমাজকে যে ইসলামী সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে তারা যে শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>দিল্লির সুলতানি আমলে ভাষা ও সাহিত্যের উপর ইসলামী ভাবধারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ভারতে তুর্কিদের আগমনের সাথে সাথে এদেশে ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু হয়। ফার্সি ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ফার্সি ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পারস্যের অনুকরণে ভারতেও তখন সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। পরবর্তী ফার্সি সাহিত্য ভারতীয় বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত হতে থাকে। এ&#8217;ক্ষেত্রে ভারতের তোতা পাখি হিসেবে খ্যাত আমীর খসরুর ভূমিকা ছিলো সর্বাগ্রে।</p>
<p>ভারতে মুসলিম আগমনের সাথে সাথে বই লেখা ও তাতে চিত্রাঙ্কনে যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতে প্রাচীন যুগে জৈন ধর্মশাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য সেগুলোর অনেক অনুলিপি তৈরি করা হতো অথবা পুরনো বইয়ের ভিত্তিতে নতুন বই তৈরি করা হতো। পুথিগুলো ছিলো মূলত তালপাতার। চিকন ও লম্বা তালপাতার উপরে আলঙ্কারিক চিত্রাঙ্কনের কোনো ধরনের সুযোগ ছিলো না। ভারতে মুসলিম শাসনামলে এসব গ্রন্থ রচনা ও চিত্রাঙ্কনের রীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আরব বণিকরা পশ্চিম ভারতে সর্বপ্রথম কাগজ ব্যবহারের প্রচলন ঘটায়। এর ফলে জৈন ধর্মের পুথিগুলো তখন থেকে কাগজে লেখা শুরু হয় এবং তাতে চিত্রাঙ্কনের ব্যাপক সুযোগ হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা প্রভৃতি থেকে ভারতীয় ও ইসলামের সমন্বয় ঘটে। এই মুসলিমদের মাধ্যমেই আরবীয় ইউনানি (ভেষজ) চিকিৎসা ভারতে আসে। আবার ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি পশ্চিম এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4></h4>
<h4><strong>শিক্ষাকেন্দ্র</strong></h4>
<p>শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের বিষয়টি সামনে চলে আসে। সে হিসেবে মুসলিম ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিন্তু, পুরো ভারতবর্ষের সবগুলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আমাদের বুঝার সুবিধার্থে শুধু বাংলার আশেপাশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করা হলো,</p>
<h5>লক্ষ্মণাবতী গৌড় :</h5>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (১২০৪) লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়। সমসাময়িক দিল্লি দরবারের ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ ১২৪৪ সালে বাংলায় আগমন করে বাংলায় অনেক মসজিদ-মাদরাসা দেখতে পান এবং তিনি মন্তব্য করেন যে, বখতিয়ার খিলজীই বাংলায় অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করেন। বাংলায় মুসলিম অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র ছিলো লক্ষ্মণাবতী (গৌড়)। এখানে সুলতানি যুগের অনেক মসজিদ, মাদরাসা, শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, গৌড় ছিল মধ্যযুগে মুসলিম বাংলার অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র। গৌড়ের বিখ্যাত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন কাজী রুকনদ্দীন সমরকন্দী। এছাড়াও, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ দুই বছর গৌড়ে বসবাস করেন। প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ জালালুদ্দীন গজনবী এ শহরে কয়েক বছর অবস্থান করেন। এছাড়াও তিনি বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন ইওয়াজ খলজীর (১২১৩-১২২৭) সভাকক্ষে ভাষণ দেন। বিশিষ্ট কবি ও পণ্ডিত ব্যক্তি শামসুদ্দীন দবীর ও কাজী আসির বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দীন বুগরা খানের রাজসভা অলঙ্কৃত করেন।</p>
<h5>সোনারগাঁও :</h5>
<p>সোনারগাঁও ছিলো বাংলায় ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। আর এ কেন্দ্রের মধ্যবিন্দু ছিলেন বিখ্যাত পীর মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা। তিনি বোখারায় জন্মগ্রহণ করেন, খোরাসানে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দিল্লিতে আসেন। দিল্লি থেকে সরাসরি সুলতান গিয়াস-উদ্দীন বাংলায় আসেন। সোনারগাঁওয়ে এসে তিনি খানকা স্থাপন করেন। এখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলো সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাকেন্দ্র বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব ছিলো। তাঁর খ্যাতনামা শিষ্য ছিলেন পীর শরফুদ্দীন ইহইয়া মানেরী। বিখ্যাত পীর ও পণ্ডিত শেখ আলাউল হক যখন সোনারগাঁওয়ে নির্বাসনে আসেন, তখন তিনি তাঁর সংস্পর্শে আসেন এবং দু&#8217;বছর এখানে কাটান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ছিলো “মাকামাত” ও “নাম-ই-হক”। তিনি ইসলামী শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। এ মহামানব ও মহান শিক্ষক, বাংলা অঞ্চলে শিক্ষার আলোর দিশারী ৭০০ হিজরি মতান্তরে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সোনারগাঁয়ে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।</p>
<h5>সাতগাঁও :</h5>
<p>মধ্যযুগে আরেকটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো সাতগাঁও। এখান থেকে বেশ কয়েকটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, এখানে মাদরাসা তৈরি করা হয়, যার একটি ছিলো বাংলার সুলতান রুকনুদ্দীন কায়কাউসের সময়ে; যেটি ছিলো ১২৯৩ সালে কাজী আল-নাসির মুহাম্মদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি আল-নাসির মাদরাসা নির্মাণে অনেক অর্থ সাহায্য করেন এবং ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ব্যয় নির্বাহের জন্য অনেক অর্থ সাহায্য করেন। আবার বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের ১৩১৩ সালে আরেকটি মসজিদ নির্মাণের প্রমাণও পাওয়া যায়।</p>
<h5>পান্ডুয়া :</h5>
<p>পাণ্ডুয়া ছিল বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র। এটি ছিলো ধর্মীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। কারণ, শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজী, শেখ আখী সিরাজুদ্দীন উসমান, শেখ আলাউল হক, নূর কুতুব-উল-আলম, শেখ জাহিদসহ অসংখ্য পীর-আউলিয়াদের শিক্ষায় পাণ্ডুয়া ধন্য হয়েছে। মুসলিম শাসকদের রাজধানীও ছিলো পাণ্ডুয়া। বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। ফলে, পাণ্ডুয়া ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্রের পাদপীঠের মর্যাদা লাভ করে। আবার বিখ্যাত পীর হযরত নূর কুতুব-উল-আলম (র.) পাণ্ডুয়ায় একটি বড় মাদরাসা ও চিকিৎসালয় নির্মাণ করেন। পাণ্ডুয়া মূলত বহু বিদ্বান পণ্ডিতদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে কয়েকজন বিখ্যাত পণ্ডিতের আবির্ভাব হয়, যারা পান্ডুয়ার বুকে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হন।</p>
<p>এ-তো গেলো শুধু বাংলা ও তার আশপাশের অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র। দিল্লি থেকে সুদূর বাংলারই যদি শিক্ষার এই অবস্থা হয়, তাহলে দিল্লি-সহ সমগ্র ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ রচনার প্রয়োজন পড়বে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পাঠ্যক্রম</strong></h4>
<p>এবার একটু পাঠ্য তালিকার দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাত হোক বা মুঘল আমল হোক, মুসলিম ভারতের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো কুরআন, হাদিস, ধর্ম ও আইনশাস্ত্র এবং অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহ। এছাড়াও, যুক্তিবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয়ও মাদরাসায় গুরুত্ব সহকারে পাঠদান করা হতো। এই পাঠ্য তালিকার কথা বলতে গিয়ে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক আবুল ফজল বলেন,</p>
<blockquote><p>❝প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নীতিশাস্ত্র, গণিত, কৃষি, পরিমাপ-শাস্ত্র, জ্যামিতি, জ্যোতিশাস্ত্র, চরিত্র নির্ণয়বিদ্যা, গার্হস্থ্য বিদ্যা, সরকারি আইন-কানুন, চিকিৎসা বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, উচ্চতর অংক শাস্ত্র, বিজ্ঞানসমূহ, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করা উচিত।❞</p></blockquote>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা বাগদাদের আব্বাসীয় আমলের (৭৫০-১২৫৮) প্রচলিত শিক্ষানীতি ও পাঠ্য তালিকা অনুসরণ করেন। পাশাপাশি, বাংলা অঞ্চলেও তা অনুসরণ করা হয়। বাংলায় আগত মুঘল কর্মচারীরা বাংলার অনেক চিকিৎসক ও তাদের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলেছেন। বাংলার নবাবী আমলের দরবারী ঐতিহাসিকরাও তা উল্লেখ করেছেন। যেমন, “বাহারিস্তান-ই-গায়বী”-র লেখক মীর্জা নাথান এবং ”সিয়ার-উল-মুতাখখেরিন”-এর লেখক গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মতে, বাংলায় অনেক দক্ষ চিকিৎসক, হাকিম ও কবিরাজ ছিলেন। ফরাসি পর্যটক ও মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক বার্নিয়ার বাংলায় এসে বাংলার চিকিৎসক ও তাদের চিকিৎসা পদ্ধতির সম্পর্কে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ দেশের মুসলিম চিকিৎসকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। পক্ষান্তরে, শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় হিন্দুদের অজ্ঞতার কথাও তিনি স্পষ্ট করে তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ভাষা সাহিত্য </strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভাষা ও সাহিত্যের পেছনে উদারতার সাথে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁরা আরবি ও ফারসি ভাষা ছাড়াও হিন্দি, সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষারও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ যুগে উল্লিখিত ভাষাগুলো ছাড়াও বাংলা, মারাঠি প্রভৃতি প্রাদেশিক ভাষাসমূহেরও যথেষ্ট বিকাশ লাভ ঘটেছিলো। মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো। <strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন, <strong>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</strong></p>
<p>বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন।</p>
<p>এই যুগে এদেশের সাধারণ প্রচলিত কথ্য ভাষার সাথে আরবি ও ফারসি শব্দ মিশ্রিত হয়ে উর্দু নামক একটি নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়। মুঘল আমলে উর্দু ভাষা যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। উর্দু-সাহিত্য চর্চা প্রথম শুরু করেন আমীর খসরু। সুলতানি আমলে আরেকজন বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক ছিলেন আমীর খসরু। ইতিহাসে তিনি “ভারতবর্ষের তোতাপাখি” নামে আজও অমর হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক নোমানী বলেন, ❝বিগত ছয়শত বছরের মধ্যে ভারতবর্ষে তাঁর ন্যায় সর্বতোমুখী প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেনি।❞</p>
<p>“খাজায়নুল ফতুহ”, “তারিখ-ই-আলাই”, “তুঘলক নামা” প্রভৃতি তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ। আমীর হাসান দেহলবী ছিলেন মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের সভাকবি ও শিল্পী। তিনি “দিউয়ান” নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। বদরুদ্দীন নামক আরেকজন উঁচুদরের কবি মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের দরবার অলঙ্কৃত করেন। এছাড়াও, সাহিত্যিক হিসেবে মালিক মুহাম্মদ যায়সী, দৌলত কাজী প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ&#8217;যুগে শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে জৌনপুর ছিলো বিখ্যাত। সেখানে বহু জ্ঞানী-গুণী, কবি ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো।</p>
<p>আবার, সুলতানি আমলে অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিকের আবির্ভাব ঘটেছিলো। তাঁদের মধ্যে মিনহাজ-ই-সিরাজের “তাবাকাত-ই-নাসিরী”, জিয়াউদ্দীন বারানীর “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, শামস-ই-সিরাজ আফিফের “তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী”, ইয়াহিয়া বিন-আহমদের “তারিখ-ই-মুবারক শাহী”, হাসান নিজামীর “তাজুল মা&#8217;সীর” এবং ইসামীর “ফুতুহ-উস-সালাতিন” ছিলো সেই যুগের কয়েকটি বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ। এসব ইতিহাস পাঠে সুলতানি আমলের ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক বিবরণ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।</p>
<p><strong>এছাড়াও, মুঘল আমলের ঐতিহাসিক বাদাউনী, আবুল ফজল, ফিরিস্তা, কাফিখান, আব্দুল হামিদ লাহোরী, নিজামুদ্দীন আহমদ বখশী প্রমুখ ইতিহাস লেখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। মুঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং বাবর ছিলেন একজন পণ্ডিত ও কবি। তিনি “তুযক-ই-বাবুর” লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।</strong> তাঁর আত্মচরিত ইতিহাস সাহিত্যের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তাঁর আত্মচরিত রচনা করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। হুমায়ুনের ভগ্নি গুলবদন বেগম রচিত “হুমায়ুননামা”, ফিরিস্তার “তারিখ-ই-ফিরিস্তা”, আবুল ফজলের “আকবরনামা” ও “আইন-ই-আকবরী” নিযামুদ্দীনের “তাবাকাত ই-আকবরী”, আব্বাস শিরওয়ানীর “তারিখ-ই-শেরশাহী” প্রভৃতি গ্রন্থের ঐতিহাসিক মান ছিলো অত্যন্ত উঁচুস্তরের। সাহিত্যে জাহানারা ও জেবুন্নেছা সে যুগে সুনাম অর্জন করেন। মুঘল আমলে কবি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন ফৈজী, রামদাস, সুরদাস, তুকারাম ও রামপ্রসাদ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong> স্থাপত্য শিল্প</strong></h4>
<p>দিল্লির সুলতানরা ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রকার নতুন স্থাপত্য শিল্পের প্রবর্তন করেন। এগুলো সাধারণত মক্কা, দামেস্ক, মিসর, বাইজান্টাইন এবং ইরানের স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে ও আদর্শে নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক ফারগুসন একে “ইন্দো-সারাসিন” বা পাঠান স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক হ্যাভেল একে ভুল করে অন্তরঙ্গে ও বহিরঙ্গে হিন্দু স্থাপত্য বলে উল্লেখ করেছেন। সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্পরীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক স্যার জন মার্শাল বলেন,</p>
<p>❝ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য কেবলমাত্র বৈচিত্র্যময় স্থানীয় (আরবীয়) স্থাপত্য কিংবা শুধুমাত্র হিন্দু স্থাপত্যের সংশোধিত রীতি নয়। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য সমানভাবে না হলেও এটা উভয় উৎসের সংমিশ্রণে উদ্ভূত হয়েছে।❞</p>
<p>প্রাথমিক যুগের সুলতানরা তাঁদের ইমারত নির্মাণে স্থানীয় হিন্দু কারিগরদের নিযুক্ত করতেন। ফলে ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যে হিন্দু প্রভাব দেখা যায়। কাজেই ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য শিল্পে বিশেষ কতকগুলো হিন্দু শিল্পরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। পরবর্তীকালে এদেশে বিপুলসংখ্যক মুসলিম কারিগর ও শিল্পী আগমন করলে সুলতানি আমলের ইমারতগুলো নির্মাণে স্থাপত্য শিল্পে হিন্দু-প্রভাব লোপ পেতে থাকে।</p>
<p><strong>দিল্লিতে মুসলমানদের প্রথম “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটি নির্মাণে কুতুবুদ্দীন আইবেক ২৭টি মন্দিরের উপাদান ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। তাঁর নির্মিত “কুতুব মিনারটি” মূলত আজান দেওয়ার জন্য নির্মিত একটি গম্বুজ-বিশেষ। “কুওয়াতুল ইসলাম” মসজিদটির অনুকরণে কুতুবুদ্দীন আইবেক আজমীরে “আড়াই দিনকা ঝোপড়া” নির্মাণ করেন। এ যুগের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে ইলতুৎমিশ কর্তৃক বদাউনে নির্মিত মসজিদ, হাউজে শামশী, শামস-ই-ঈদগাহ প্রভৃতি ছিলো সমধিক প্রসিদ্ধ।</strong> এ&#8217;আমলে অনেক প্রাদেশিক শাসকও স্থাপত্য শিল্পের পেছনে উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। জৌনপুরী শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের স্বাক্ষর হিসেবে জৌনপুরের “অটলা মসজিদ”, “জাম-ই-মসজিদ” ও “লাল দরওয়াজা” প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিলো।</p>
<p>বাংলার স্বাধীন সুলতানগণের দ্বারা নির্মিত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, দরবেশ খানজাহান আলীর মাজার, গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, কদম রসুল মসজিদ, হুসেন শাহের সমাধি ইত্যাদি বাংলার স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়াও মালবের রাজধানী মণ্ডুতে নির্মিত জামে মসজিদ, হিন্দু মহল, জাহাজ মহল, হুসাং শাহের সমাধি, বাহাদুর শাহের প্রাসাদ, গুলবর্গার জামে মসজিদ, ফিরোজ শাহ বাহমনীর সমাধি সৌধ, মাহমুদ গাওয়ানের মাদরাসা ভবন, আহমেদাবাদের জামে মসজিদ ইত্যাদি সেই যুগের স্থাপত্য শিল্পের এক অক্ষয় স্বাক্ষর বহন করে আছে।</p>
<p>মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে ভারতীয়, মিসরীয়, ইরানি, সিরীয়, বাইজান্টাইন রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে। এ রীতির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে মুঘল আমলে।</p>
<p>মুঘল আমলের স্থাপত্যশিল্পে ভারত বিশ্ববিখ্যাত ছিলো। উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যশিল্পসমূহ হলো, তাজমহল, লালকেল্লা, ফতেপুর সিক্রি, হুমায়ুনের সমাধি ভবন এবং ইতমাদ্দৌলার সমাধি। মুঘলদের এই বিরাট কর্মযজ্ঞে অসংখ্য দক্ষ শ্রমিক আত্মনিয়োগ করেছিলো। তাদের দক্ষতায় ভারতীয় ও পারসিক শিল্পের সমন্বয়ে এক নতুন শিল্পধারা ভারতে প্রবর্তিত হয়েছিলো। এই স্থাপত্যশিল্পের মূল উপাদান ছিলো ইট, পাথর ও চুন। শ্বেতপাথর ও লালপাথরের নিখুঁত ব্যবহারে স্থাপত্য শিল্প এক অভাবনীয় মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলো।</p>
<p>এই স্থাপত্য শিল্পের সঙ্গে যেমন মুঘল রাজমিস্ত্রি জড়িত ছিলো, তেমনি এসব উপাদান সরবরাহের কাজে হাজার হাজার মানুষও ছিলো জড়িত। ইট, বালি ও পাথর শিল্প ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এ&#8217;যুগে সৌধশিল্প উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ&#8217;ধরনের উৎকর্ষ লাভ কখনই সম্ভব ছিলো না। গ্রামে ও শহরে গৃহনির্মাণকারী, খাল খননকারী, পাথর কাটার কারিগর, ইট প্রস্তুতকারী, রাজমিস্ত্রি, কাঠচেরাইকারী, খোদাইশিল্পী, পালিশের কারিগর, ছাদপেটাই মিস্ত্রি, চুন প্রস্তুতকারক, কুয়োখননকারী ইত্যাদি অসংখ্য কারিগর সহজলভ্য ছিলো। পাশাপাশি, দুর্গ, প্রাসাদ, বাড়ি, মন্দির, সেতু, রাস্তা জাহাজ ইত্যাদি নির্মাণে অনেক শ্রমিক নিয়োজিত ছিলো।</p>
<p>এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাজমহল নিয়ে সম্রাট শাহজাহান-এর নামে চরম যে মিথ্যাচার করা হয়, ইতিহাসে আদতে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনকি, ভারত সরকার পর্যন্ত এমন মিথ্যাচারিতার বিপরীত মন্তব্য পোষণ করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সঙ্গীত</strong></h4>
<p>ইসলামের প্রভাবে ভারতে সঙ্গীতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কবি, সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু সঙ্গীতের তত্ত্বগত ও ব্যবহারগত দিক দিয়ে বিশেষ দক্ষ ছিলেন। তিনি অনেক পারসিক রাগ যেমন—ইমন, ঘোর, খানম প্রভৃতি ব্যবহার ভারতে করেন। ভারতে তবলা, সেতার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রে ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব ছিল‌ো। উত্তর ভারতের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে এক বিশিষ্ট উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুসলমানদের যথেষ্ট অবদান অনস্বীকার্য। দিল্লির সুলতানি আমলে সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ঘটে। জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহীম শাহ শর্কীর পৃষ্ঠপোষকতায় উভয় ধারার সমন্বয় ঘটে। দিল্লির তুঘলক বংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটান। তাঁর সময়ে ভারতীয় ক্লাসিক গ্রন্থ &#8220;রাগদর্শন” ফার্সি ভাষায় অনূদিত হয়।</p>
<p>সম্রাট বাবর, হুমায়ুন, আকবর সঙ্গীতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, এমনকি সকলেই সঙ্গীত শাস্ত্রের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিলাস খান, লালাখান, তানসেন প্রমুখ গায়ক ছিলেন মুঘল দরবারের অলংকারস্বরূপ। তানসেনের জামাতা লালাখান, জনার্দন ভাট, মহাপট্টক, জগন্নাথ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ। আবুল ফজলের মতে,</p>
<blockquote><p>❝আকবরের দরবারে প্রায় ৩৬ জন গায়ক সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন। তানসেন-এর ন্যায় গায়ক গত দু&#8217;শ&#8217; বছরেও ভারতবর্ষে দেখতে পাওয়া যায়নি।❞</p></blockquote>
<p>মালবের বাজ বাহাদুর ছিলেন আরেকজন হিন্দি গায়ক। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে সাধক রামাদাস বিখ্যাত ছিলেন। জৌনপুরের হুসেন শাহ শরকী, বিজাপুরের আদিল শাহ এবং লখনৌর নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ মুঘল আমলের শেষের দিকে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের অকাতরে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করতেন। এসময় কলকাতায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সঙ্গীতের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে ঐতিহাসিক মোহাম্মদ শালীহ এবং তার ভাইও সঙ্গীতে বিখ্যাত ছিলেন। জাহাঙ্গীর স্বয়ং একজন সুদক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি অসংখ্য হিন্দি সঙ্গীত রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। সঙ্গীতানুরাগী বাদশাহ হিসেবে সর্বজনবিদিত শাহজাহান দিল্লির দিওয়ান-ই-খাসে প্রতি সন্ধ্যায় সঙ্গীতের আসর বসাতেন।  ঐতিহাসিক জে. এন. সরকার বলেন,</p>
<blockquote><p>❝শাহজাহানের সুমধুর কণ্ঠস্বর এতই আকর্ষণীয় ছিলো যে, বহু সুফি দুনিয়ার সকল মোহমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সান্ধ্য আসরে এসে যোগদান করতেন এবং গান শুনতে শুনতে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন।❞</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>💠</strong><strong>রাজনীতি</strong><strong>, </strong><strong>প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতাপূর্ণ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। এ রাজ্যগুলোর মধ্যে ছিলো না কোনো একতা। অধিকন্তু, তাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় স্থায়িত্ব ছিলো না। আর সামাজিক দিক দিয়ে সংকীর্ণতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, বর্ণপ্রথা সমাজকে একেবারে কলুষিত করে দিয়েছিলো।</p>
<p>মৌর্য সম্রাট অশোক উত্তরে হিমালয় ও উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ পর্বতমালা হতে দক্ষিণে মহীশূর এবং পশ্চিমে পারস্যের সীমানা ও আরব সাগর হতে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে একক রাজনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করতে সক্ষম হন। খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে তার মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন উত্তর ভারতে এবং চাণক্য সম্রাট পুলকেশিন মোটামুটিভাবে ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু, তাদের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। সমগ্র ভারতবর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V.A. Smith (ভিনসেন্ট স্মিথ) বলেন, ❝ভারতবর্ষের ইতিহাসের আংশিক ঐক্য হর্ষের সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছিলো।❞</p>
<p>পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, প্রজাদের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা, গোত্রীয় বিরোধ, বিভিন্ন রাজ্যগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ-সহ ইত্যকার নানা কারণে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা একেবারে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিলো। ফলশ্রুতিতে, শাসকদের অত্যাচারে একপ্রকার অতীষ্ঠ হয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণ মুসলিম শাসকদের নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করে। অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, ভারত বিজয়ের পথ উন্মোচন হয় মূলত স্থানীয়দেরই সাহায্যের মাধ্যমে।</p>
<p>এই যদি হয় মুসলিম পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, তাহলে প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থার কথা জ্ঞানীমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। রাজনৈতিক এমন বিশৃঙ্খলার সময় যে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর প্রশাসনিক কার্যক্রমই যখন এমন হয়ে পড়ে, তখন সমগ্র বিচারব্যবস্থাই যে ডুমুরের ফুলের মতো অস্পৃশ্য হয়ে পড়বে, সেটাও আর কলমের ডগায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন মনে হয় না। অধিকন্তু, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টাই যেখানে উপেক্ষিত এবং স্বার্থান্বেষণ ও স্বার্থসিদ্ধিই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে পড়ে, সেখানে বিচারব্যবস্থা যে চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর একনায়কতন্ত্রে রূপ লাভ করবে, এই বিষয়টাও সহসাই উপলব্ধি করা যায়। আবার যেখানে জাতপ্রথার নিরিখেই সমাজের ভালোমন্দের তারতম্য হয়, সেখানে আদতে বিচারব্যবস্থার নাম নেওয়াটাই বিলাসিতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>পক্ষান্তরে, মুসলিম ভারতে এর উল্টোচিত্র দেখা যায়।</p>
<p>এই প্রবন্ধের একেবারে শুরুতেই মুসলিম ভারতের ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক ধারার সফলতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এরপর একাধারে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্যে মুসলিম শাসনামলের এতোসব উৎকর্ষতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রমের শক্তিমত্তা ও সমৃদ্ধশালিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তথাপি, আরেকটু আলোচনা করা যাক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>প্রশাসন</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে প্রত্যেক শাসকই ভারতের প্রশাসন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ক্রমান্বয়ে যুগোপযোগী করে তোলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত থাকতেন। মুসলিম পূর্ব ভারতে যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ছিলো সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এবং হ-য-ব-র-ল, সেখানে মুসলিম শাসনামলে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে শাসন ব্যবস্থা জারি রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো দাড় করানো হয়েছিলো। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকেই স্বতন্ত্র মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। আইন, শাসন, বিচারবিভাগ-সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ প্রতিনিয়তই শাসক তদারকি করতেন। এমনকি, এগুলোর প্রতিটিরই আবার অসংখ্য সাব-ডিপার্টমেন্ট ছিলো। এছাড়াও, কৃষি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র বিভাগ বা মন্ত্রণালয় ছিলো।</p>
<p>এর বাইরেও জনসাধারণের সুবিধার্থে স্থানীয় প্রতিনিধিও নিয়োগ করা হতো। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্য-প্রধান সে রাজ্যটিকে একজন স্বাধীন শাসকের মতোই শাসন করতো। তবে, তাঁরা শাসক বা উজির/মন্ত্রীর নিকট জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ থাকতো; তাঁদের নিকট নিয়মিত জবাবদিহি করতো হতো।</p>
<p><strong>প্রশাসনিক কার্যক্রমে কখনও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়নি ভারতের মুসলিম শাসনামলে। সবসময় যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রশাসনিক কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজন কখনই প্রশ্রয় পায়নি। এমনকি এটা পর্যন্ত শোনা যায় যে, দিল্লির সুলতানি আমলে দেশীয় মুসলমানদের বিপরীতে ভিন্নধর্মী স্থানীয়দেরকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়া হতো।</strong> সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক থেকে শুরু করে ইব্রাহীম লোদী পর্যন্ত এই ৩২০ বছরে দরবারে উজির বা প্রধান সেনাপতির (সিপাহসালার) পদ কোনো ভারতীয় মুসলমান পায়নি। সেসময় অমুসলিম নাগরিকদের প্রতিই উদারতা প্রদর্শন করা হয়।</p>
<p>আবার, মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের মনসবদারি প্রথা এবং রাজপুতনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কতোটা উদার ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের ক্ষেত্রে ডক্টর বেনী প্রসাদের মন্তব্য হলো, ❝তাদের ধর্মীয় নীতি ছিলো পরধর্মে সহিষ্ণুতার উপর প্রতিষ্ঠিত।❞</p>
<p>মুঘল আমলে মনসবদারি পদ্ধতিতে সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এই মনসবদারি প্রথা মুঘলদের নতুন উদ্ভাবন নয়। মুঘলদের আগে সম্ভবত মধ্য এশিয়ায় এই প্রথা প্রচলিত ছিলো। মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং-এর শাসনামলে মনসবদারি প্রথা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো। সৈন্যবাহিনীকে বিভিন্ন পদমর্যাদার রীতি সুলতানি আমলেও চলে আসছিলো। শেরশাহ এবং তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ সেনাবাহিনীর নতুন সংস্কার সাধন করেন। বাবর ও হুমায়ুন সময় ও সুযোগের অভাবে সেনা বিভাগের তেমন কোনো সংস্কার করে যেতে পারেননি। সিংহাসনে আরোহণ করে আকবর সেনাবাহিনীর শোচনীয় অবস্থা লক্ষ্য করলে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার খাতিরে সেনাবাহিনীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শাহবাজ খানের মাধ্যমে মনসবদারি প্রথার উপর ভিত্তি করে এক অভিনব সামরিক সংগঠন সৃষ্টি করেন। তাঁর এই প্রথার মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সেনাবাহিনীর পুনঃগঠন করা। আকবর এই মনসবদারি প্রথা প্রবর্তন করে মুঘলদের সামরিক ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিচারব্যবস্থা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসকগণ আইনের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য আইন ছিলো সমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সুলতানরা বদ্ধপরিকর ছিলেন। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দিল্লির সব সুলতান আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন একটি শিকল বাঁধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতেন, যেনো যেকোনো বিচারপ্রার্থী খুব সহজেই সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বলেন,</p>
<blockquote><p>❝জনসাধারণের অভিযোগ শ্রবণের জন্য তাঁর প্রাসাদে শিকলে বাঁধা একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং অভিযোগকারীরা তা বাজিয়ে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো।❞</p></blockquote>
<p>তাছাড়া, বিচার কার্যের জন্য আইন হিসেবে কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস ব্যবহার করা হতো। সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এতো বেশি কঠোর ছিলেন যে, অপরাধীরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতো। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন,</p>
<blockquote><p>❝সুলতানের (বলবন) ন্যায়বিচারের জন্য লোকে এতই ভীতসন্ত্রস্ত থাকতো যে, কেউ কখনো ভৃত্য এবং ক্রীতদাসদের প্রতি অসদাচরণ করতে সাহস পেতো না।&#8221;</p></blockquote>
<p>মুঘল আমলে সাম্রাজ্যের বিচার বিভাগীয় প্রধানকে বলা হতো “কাজী-আল-কুজ্জাত” বা “প্রধান বিচারপতি”। তাঁকে হতে হতো আইনজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ, সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ও নিষ্ঠাবান মুসলমান। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার করতেন। তাছাড়া প্রাদেশিক কাজী, সরকার কাজী, পরগণা কাজী ও কাজী-ই-আসকার (সেনাবাহিনীর সঙ্গের কাজী) বিচারকার্য সমাধান করতেন।</p>
<p>বিচারব্যবস্থায় মুফতীদের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। তাঁরা বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন না। তবে প্রয়োজনে কাজী তাঁদের ধর্মীয় বিষয়ে মতামত গ্রহণ করতেন। তারা শরিয়ত অনুযায়ী &#8220;ফতোয়া&#8221; দিতেন। যখন কাজী কোনো কারণে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারতেন না, তখন &#8220;মীর আদিল&#8221; তাঁর কার্য-সম্পাদন করতেন। তিনি কাজীর তুলনায় ঊর্ধ্বতন কর্মচারী ছিলেন।</p>
<p>মুঘল আমল ছিলো একনায়কতান্ত্রিক শাসন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস ছিলো সম্রাটের হাতে। তারপরও মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, তাঁকে যেমন শরিয়ত মোতাবেক চলতে হতো, আবার তেমনি শরিয়তের পাশাপাশি সম্রাটকে রাষ্ট্রের অভিজাত সম্প্রদায়, সেনাবাহিনী, উলামা ও আইন বিশারদদের সমর্থন লাভ করতে হতো। তাঁরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। দোষী যেই হোক না কেনো, শাস্তি তাকে পেতেই হতো। <strong>সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহানের অপরাধের বিরুদ্ধে রায় দেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধেও শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। সম্রাট আকবর বলতেন, ❝আমি স্বয়ং কোনো অপরাধ করলেও নিজের বিরুদ্ধে রায় দিবো।❞</strong></p>
<p>কাজেই বলা যায় যে, মুঘল সম্রাটরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মুঘলদের অবদান ছিলো অপরিসীম। প্রত্যেক মুঘল সম্রাটই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন, তা ইতিহাসের পরতে পরতে প্রমাণ বহন করে চলেছে। ইসলামী আইনের চোখে সবাই ছিলো সমান। ইবনে হাসান বলেন, ❝এটা নিশ্চিত যে, মুঘল বিচার পদ্ধতি ছিলো যুগের ও সমাজের জন্য উপযোগী।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>মুসলিম শাসনামলে বিচারব্যবস্থার নমুনা</strong></h4>
<p>মুসলিম শাসনামলে বিচার ব্যবস্থা কেমন ছিলো, তার তিনটি উপমা নিচে উপস্থাপন করা হলো।</p>
<h5><strong>প্রথম</strong></h5>
<p>সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সুলতান। সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহ একজন ন্যায়বিচারক শাসক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতিনে সুলতানের ন্যায়বিচারের একটি কাহিনী রয়েছে। তিনি একদা তীর ছুঁড়তে গিয়ে এক বিধবা মহিলার পুত্রকে হত্যা করে ফেলেন। বিধবা মহিলা তৎকালিন প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজ উদ্দিনের কাছে বিচারপ্রার্থী হলেন। প্রধান বিচারপতি নির্ভয়ে সুলতানের নামে সমন জারী করলেন। সুলতান বিচারপতির আদালতে হাজির হলে বিচারপতি কোনো রকম সম্মান প্রদর্শন না করে তাঁর বিরুদ্ধে বিধবার আনীত অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বিধবাকে ক্ষতিপূরণ দানে সন্তুষ্ট করতে না পারলে শরীয়ত মতে সুলতান দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সুলতান বিধবাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং বিধবা অভিযোগের সন্তোষজনক মিমাংসার কথা বিচারপতিকে অবহিত করেন।</p>
<p>সুলতান তখন শাহী আসন থেকে উঠে এসে বিচারপতিকে সালাম দিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার রাজ্যে এমন একজন ন্যায় বিচারক আছেন এজন্য দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। বিচারপতি, আপনি আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে আমার তরবারি দিয়েই আমি আপনার মস্তক ছেদ করতাম।❞</p></blockquote>
<p>প্রতি উত্তরে বিচারপতি বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমার নির্দেশ আপনি অমান্য করলে আমিও আপনাকে বেত্রাঘাত করতাম।❞</p></blockquote>
<p>পরবর্তীতে, সুলতান বিচারপতিকে ন্যায়বিচারের জন্য পুরষ্কৃত করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>দ্বিতীয়</strong></h5>
<p>একবার সম্রাট আলমগীরের সৈন্যবাহিনী এক মুসলিম সেনাপতির অধীনে পাঞ্জাবের এক পল্লীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ পথিমধ্যে জনৈক ব্রাক্ষণের এক অপরূপ সুন্দরী কন্যার প্রস্ফুটিত গোলাপের মত মুখশ্রী দেখে লোভাতুর সেনাপতি তার পিতার নিকট মেয়েটিকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসে এবং সিদ্ধান্ত জারি করে যে, আজ থেকে এক মাস পরেই সে তার বাড়ীতে বর-বেশে উপস্থিত হবে। কন্যার পিতা নিজে সম্রাট আলমগীরের নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে বাদশার সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সম্রাট তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। সাথে এ-ও জানালেন যে, নিদিষ্ট দিনে তিনি ব্রাহ্মণের বাড়িতে উপস্থিত থাকবে। ব্রাহ্মণ নানা চিন্তার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এরপর, বিবাহের আগের দিন সম্রাট আলমগীর একাই এসে উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণের বাড়িতে। ব্রাহ্মণ হতবাক!</p>
<p><strong>সম্রাট সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণের এক পুরাতন জীর্ণ কামরায় সারা রাত এবাদত  বন্দেগী ও মোনাজাত-প্রার্থনায় অশ্রুবিসর্জন করে কাটালেন। ব্রাহ্মণের পরিবারবর্গ এ দৃশ্য দেখার পর আবারও অবাক হলেন। পরদিন মুঘল সেনাপতি বর-বেশে ব্রাহ্মণের ঘরে উপস্থিতি হলো। বিবাহের পূর্বে কন্যাকে একবার দেখা উত্তম। সেজন্য, সেনাপতি কন্যাকে দেখতে চাইলো। প্রত্যুত্তরে ব্রাহ্মণ সম্রাটের শেখানো অনুযায়ী সম্রাটের কামরার দিকেই ইশারা করলেন। সেনাপতি ঘরে প্রবেশ করেই দেখলো খোলা তরবারি হাতে সম্রাট আলমগীর বসে রয়েছেন।</strong></p>
<p>যৌবনের বুকভরা আবেগ আর মুখভরা হাসি নিমিষেই সম্রাটকে দেখার পর অদৃশ্য হয়ে গেলো। যে সেনাপতির দাপটে শত্রু সৈন্যরা থরথর করে কাঁপে, যার মাঝে ভয়-ভীতি অথবা দুর্বলতা কখনও স্থান পায় না, আজ সেই মহাবীর কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ভীষণ শব্দে যেনো কেঁপে উঠলো। নিজেকে সামলে নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করলেও দুঃখ, লজ্জা, শাস্তি আর অপমানের আশংকায় সেনাপতি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কন্যার পিতা সম্রাট আলমগীরের সুবিচার, দায়িত্ববোধ আর অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা দেখে আনন্দে বললেন,</p>
<p>❝আপনি আমার, বিশেষ করে আমার কন্যার ইজ্জত রক্ষা করেছেন। আপনার এই ঋণ অপরিশোধ্য।❞</p>
<p>সম্রাট আলমগীর ব্রাহ্মণকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করে বললেন,</p>
<p>❝এই মহান দায়িত্ব আমার। আমি যে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি এতেই আমি ধন্য।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>তৃতীয়</strong></h5>
<p>মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ছিলেন আঠারো শতকের ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল নারীদের একজন। জন্মের সময় তার নাম দেয়া হয়েছিলো মিহরুন নিসা। কিন্তু স্বামী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর পরে তার নাম পাল্টে রেখেছিলেন নূরজাহান (জগতের আলো)। নূরজাহান কবি, স্থপতি ও দক্ষ শিকারি ছিলেন। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে প্রিয়তম স্ত্রীতে পরিণত হন। সারাটি দিন তিনি নুরজাহানকে নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকতেন। নিজ স্ত্রীর বিচার করার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল হলেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ন্যায়বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।</p>
<p>সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেই সময়ে সাধারণ প্রজাদের সরাসরি সাক্ষাতের কোনো অনুমতি ছিলো না। তিনি তখন মুজাদ্দিদে আলফেসানীর পরামর্শে দরবারের বাইরের ফটকে একটি শিকল রাখেন, যেটি একেবারে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শয়নকক্ষ পর্যন্ত সংযুক্ত ছিলো, যার সঙ্গে একটা ঘণ্টাও বাঁধা ছিলো। যেকোনো অত্যাচারিত, উপবাসী, অবহেলিত কেউ অথবা রাজকর্মচারীদের দ্বারা যার কাজ সমাধান হয়নি, এমন মুসলিম-অমুসলিম প্রজা সেই শিকল টানলেই বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কক্ষে ডাকতেন এবং তাঁর সন্তোষজনক সমাধান করেই তবে ক্ষান্ত হতেন।</p>
<p>একদিন রূপ লাবণ্যের জীবন্ত প্রতীক নুরজাহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রূপচর্চা করছিলেন। এমন সময় এক বিকৃত মস্তিষ্ক হিন্দু প্রজা বিনা অনুমতিতেই নুরজাহানের কক্ষে উপস্থিত হয়ে পড়েন। নুরজাহান সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু প্রজাকে গুলি করে মেরে ফেলেন। নিহত হিন্দু প্রজার আত্মীয় শিকল টানলেন এবং জাহাঙ্গীরের নিকট নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী হলেন। <strong>বিচারকের আসনে তখন জাহাঙ্গীর এবং আসামীর কাঠগড়ায় তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহান। কঠিন এই মুর্হুতেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ভুললেন না ইসলামের বিধান। জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রীর ব্যাপারে রায় ঘোষণা করলেন মৃত্যুদন্ড। রায় ঘোষণার সাথে সাথে সকলেই হতবাক হয়ে গেলেন। স্বয়ং নূরজাহান তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এমন সময় সম্রাট জাহাঙ্গীরের মন্তব্য ছিলো,</strong></p>
<blockquote><p>❝ইসলামের আইনে তুমি তাকে হত্যা করতে পারতে কারোর প্রাণনাশের বা ব্যাভিচারের অপরাধে। কিন্তু সে দোষ তো তার ছিলো না। সে ছিলো বিকৃত মস্তিষ্ক। অতএব, আমি আবার বলছি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তোমার মৃত্যুদন্ড।❞</p></blockquote>
<p>একজন মহান শাসক কর্তৃক ইসলামের এই ইনসাফ-ভিত্তিক ন্যায়বিচার দেখে বিচারপ্রার্থী হিন্দু প্রজারা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেছিলো,</p>
<blockquote><p>❝হে ন্যায়পরায়ণ বাদশা! আমরা প্রাণদন্ড চাই না। নূরজাহানকে আমরা ক্ষমা করে দিলাম। কারণ, তিনি তো আর ইচ্ছে করে খুন করেননি। তিনি যা করেছেন তা তো নিজের আত্মরক্ষার জন্যই করেছেন।❞</p></blockquote>
<h4><strong>💠</strong><strong>অর্থনৈতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ</strong></h4>
<h5><strong>মুসলিম পূর্ব ভারত</strong></h5>
<p>পূর্বেই বলা হয়েছে, সমগ্র ভারতবর্ষ হলো মহান রবের নেয়ামতধন্য অপার এক লীলাভূমি। কিন্তু, এতো নেয়ামত সত্ত্বেও মুসলিমপূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ ভঙ্গুর। দু&#8217;বেলা দু&#8217;মুঠো আহারের জন্য জনসাধারণের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো। এসব বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ ছিলো, অর্থনীতির সুষমবণ্টন না থাকা এবং যোগ্য অর্থনীতিবীদ না থাকা। অবশ্য, যেখানে ধর্মের নামে অধর্ম চর্চা করা হতো, শাসনের নামে জনগণকে শোষণ করা হতো, জাতিভেদ ও জাতপ্রথা যেখানে সমাজকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিলো—সর্বোপরি, ভারতের সামগ্রিক অবস্থাই ছিলো যেখানে বিশৃঙ্খল, সেখানে অর্থনৈতিক সুদিনের বিষয় কল্পনা করাটাই ছিলো অতিরঞ্জন। বর্তমান সময়ের মতোই সেসময়েও ধনীরা হয়ে যেতো আরো ধনী এবং দরিদ্ররা হয়ে যেতো একেবারে নিঃশেষ; ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কিছুদিনের মাথায় স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে যেতো কোনো একজনের কৃতদাস। কিছুদিন পূর্বে একই ঘরে বসবাস করা একই পরিবারের সদস্যদের ঠিকানা হতো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।</p>
<p>ভারতবর্ষ ছিলো একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের এক ষষ্ঠাংশ (৬ ভাগের ১ ভাগ) রাষ্ট্রকে কর হিসেবে দিতে হতো। এ করকে &#8220;ভাগ&#8221; বলা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, মৌর্য ও গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলো। এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়। খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীতে বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতে আসেন। তিনি গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিবরণ দেন। তার মতে মগধের লোক সমৃদ্ধশালী ও ধনী ছিলো এবং তাদের মধ্যে সৎ কাজ করার প্রবণতাও ছিলো। এ সময়ে বাংলার তাম্রলিপ্তি বন্দর একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। এখান থেকে বঙ্গদেশের বণিকরা বড় বড় জাহাজে সিংহল, মালয়, যবদ্বীপ প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। ভারতবর্ষে শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। কার্পাস বস্ত্র উৎপাদন এবং রপ্তানির জন্য গুজরাট এবং বাংলাদেশ খ্যাতি লাভ করে। ঢাকার মসলিন ছিলো সেসময় পৃথিবী বিখ্যাত।</p>
<p>সে যাইহোক, ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী থাকলেও সম্পদ বণ্টন ও ভোগের ক্ষেত্রে ছিলো চরম বৈষম্য ও অব্যবস্থা। অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ লোকের জীবনযাত্রার মধ্যে ছিলো ব্যাপক ব্যবধান। সমাজের সাধারণ মানুষ যেমন—কামার, কুমার, ছুতার, স্বর্ণকার এবং কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত‌ো। কিন্তু, সুফল ভোগ করতো অভিজাত শ্রেণির লোকেরা; তারা অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>মুসলিম ভারত</strong></h5>
<p>সমগ্র ভারতের ইতিহাসে চরম অর্থনৈতিক উৎকর্ষতার যুগ হচ্ছে মুসলিম শাসনামল। মুসলিমরা এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে সফলতা লাভ করেনি। মুঘলামলে এই ভারতবর্ষ সমগ্র পৃথিবীর ২৮-৩০% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। আজকের ইউরোপীয়দেরকে এই ভারতবর্ষ থেকেই স্কলারশিপ বা বৃত্তি প্রদান করা হতো। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে রাজ্য পরিচালনার জন্য নামেমাত্র কর নেওয়া হতো। কর নেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম কোনো বৈষম্য করা হতো না। যার জন্য যেটা ন্যায্য, তার জন্য সেটাই ধার্য করা হতো। মুসলিমদের জন্য যাকাত, ওশর, সদকা ও ফেতরার মতো বিষয়গুলো সেভাবেই ধার্য করা হতো। পাশাপাশি, অন্যদের জন্য অবস্থা অনুযায়ী জিযিয়া ও খারাজ গ্রহণ করা হতো। মুসলিম শাসনামলে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য আলাদা দফতর বা মন্ত্রণালয় দক্ষ হাতে পরিচালনা করা হতো। এমনকি, মুসলিম শাসকদের প্রতিটি পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং সেসব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না, তা স্বয়ং শাসক নিয়মিত তদারকি করতেন। পণ্যসমূহের বাজারমূল্য নির্ধারণ করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি শাসকগণ, বরং মুদ্রাব্যবস্থাতেও এনেছিলেন অভূতপূর্ব বিবর্তন; বিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে নিত্য নতুন মুদ্রার প্রচলনও শুরু করতেন শাসকগণ।</p>
<p>মুসলিম শাসনামলে আমলে বস্ত্রশিল্পে চরম উন্নতি লাভ করে। গুজরাট ও বাংলা ছিলো বস্ত্রশিল্পের প্রধান ঘাটি। এমনকি, এই অঞ্চলে এমনসব পোশাক তৈরি করা হতো, যেসব পোশাক তৈরিতে আবহাওয়াকে পর্যন্ত কাজে লাগানো হতো। সিল্ক, মসলিন, সুসতরি ভিরাইন, কিংখাব ছিলো সে সময়ের জগদ্বিখ্যাত সব পোশাকের নাম। শুধু পোশাকেই নয়; বরং তুলা শিল্প, পশম শিল্প, ধাতু শিল্প, জুয়েলারি শিল্প, পাথর শিল্প, কাঠ শিল্প, কাগজ শিল্প, কাঁচ শিল্প এবং চিনি শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিলো মুসলিম শাসকগণ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ব্যবসা বাণিজ্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা ভারতে আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাত্রা আসে। দিল্লির সুলতানি আমল-সহ মুঘল আমলেও কেন্দ্রীয় শাসন, কৃষি-শিল্পের উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নগরায়ন ও মুদ্রা ব্যবস্থার বিকাশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। এ সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রসার ঘটে। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর সময়ে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এ সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li>০১. অভ্যন্তরীণ বা আন্তঃবাণিজ্য,</li>
<li>০২. বৈদেশিক বা বহিঃবাণিজ্য।</li>
</ul>
<p>মুসলিম শাসনামলে ভারতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিলো। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিলো প্রাদেশিক রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলো। যেমন—মুলতান, দিল্লি, আমরোহা, মীরাট, মালবের ধর, অযোধ্যা, দেবগিরি, লক্ষণাবতী, কাশ্মীর, গুজরাট, বিজয়নগর; এসব শহর ও বন্দরগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে। সেসময় বিভিন্ন ধরনের পণ্য-দ্রব্য আমদানি-রপ্তানি করা হতো। গ্রাম থেকে খাদ্যশস্য এসব বাণিজ্যকেন্দ্রে আসতো। এসব কেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি করা হতো। গুজরাটের সুরাট ও ম্যাংগ্রল হতে ঘোড়া, গম, চাল, তুলা, কাপড় এবং আরও বহু জিনিসপত্র ভারতের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার এখানে নিয়ে আসা হতো নারকেল, পালিশের শক্ত গুঁড়ো, খনিজ পদার্থ, মোম, এলাচ ও মসলা। ব্যবসায়ীরা উপকূল বাণিজ্যে দিউ, মালাবার, ভাতকল, গোয়া, চাল ও দাভোলের সঙ্গে ভালোই লাভ করতো। বারবোসা বলেছেন যে,</p>
<blockquote><p>❝মালাবারের জাহাজে করে লোহা, ভাতকলের চিনি, গোলমরিচ, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, চন্দনকাঠ, সিল্ক &#8216;দিউ&#8217; বন্দরে যেতো এবং আসার সময় মালাক্কা ও চীন হতে এখানে বিশেষ করে সিল্কের কাপড়, দেশীয় বস্ত্র, ঘোড়া, গম ও আফিম নিয়ে আসতো। আবার বাংলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে করে চিনি ও কাপড় নিয়ে ক্যাম্বের ও মালাবার যেতো কমোরিন অন্তরীপ হয়ে।❞</p></blockquote>
<p>ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বরাবরই চলতো জলপথে ও স্থলপথে। ইসলামের অভ্যুত্থান ও মূর জাতির আধিপত্য হেতু ইউরোপের সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের পণ্য যাওয়ার পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। কারণ, আরব বণিকরা ভারতীয় পণ্য লোহিত সাগরে বয়ে নিয়ে যেতো; সেখান থেকে যেতো দামাস্কাস ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। তারপর, সেখান থেকে ভারতীয় পণ্য বিভিন্ন অঞ্চলে বাগদাদ ও ইউরোপে ছড়িয়ে যেতো। মূর বণিকদের দ্বারাও ভারতীয় পণ্য বিদেশের বাজারে পৌঁছে যেতো। বিশেষ করে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, সুদূর পূর্বাঞ্চলের মালয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যেতো। স্থলপথে ভারতীয় পণ্য প্রধানত চারটে দেশে যেতো, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, পারস্য ও ইরাক। মুলতান-কোয়েটা সড়ক, খাইবার গিরিপথ ও কাশ্মীর যাওয়ার রাস্তাগুলোই ঐসব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো; এই পথেই আবার বাণিজ্য হতো। বিদেশি বাজার থেকে ভারতে বিলাসদ্রব্য ও অন্যান্য দ্রব্য চলে আসতো এবং সাধারণভাবে সব রকমের প্রয়োজনীয় পণ্যের এদেশে ভালো বাজার ছিলো। আবার পারস্য উপকূলের কোনো কোনো দেশ ভারতের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল ছিলো। বারবোসার বক্তব্য অনুসারে বাংলার সাদা চিনি বিদেশে প্রচুর রপ্তানি হতো।</p>
<p>সমুদ্র বাণিজ্যে প্রধানত বাংলা ও গুজরাট বন্দরের মাধ্যমেই এই রপ্তানি বাণিজা চলতো। গুজরাটের প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো বহুমূল্য পাথর, নীল, তুলো, পশুর চামড়া এবং আরও বহু জিনিস। সুতি ও অন্যান্য বস্ত্রই ছিলো প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। গৌণ রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে ছিলো বহুমূল্য রক্তিম পাথর, তিল তেল, চন্দন কাঠ, সুবাসিত তেল, দস্তা, আফিম, নীল এবং মালাক্কা ও চীন দেশে থেকে নিয়ে আসা কিছু ঔষধপত্র। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রপ্তানি হতো গম, জোয়ার, চাল, ডাল, তৈলবীজ, সেন্ট এবং আরও অনেক দ্রব্য। বার্থেমার মতে কৃষিপণ্যর জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ ছিলো। বারবোসার মতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিলো চিনি। বাংলার ঐশ্বর্য ছিলো তখন গুজরাট ও বিজয়নগরের মিলিত সম্পদের সমপরিমাণ।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h5><strong>রাজস্ব ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>মুঘল শাসনামলে ভারতের রাজস্বব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী ছিলো। বাবর ও হুমায়ুনের আমলে সুলতানি আমলের প্রশাসন কাঠামোর উপরই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো। তবে আকবরের রাজত্বকালে মুঘলদের রাজস্ব ব্যবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন আনয়ন করা হয়। এ আমলে সুষ্ঠু নিয়ম-নীতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হতো। রাজকোষও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে বিরাট সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ, শিল্প-স্থাপত্যের উৎকর্ষ সাধন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তাদের প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন হতো।</p>
<p>সম্রাট আকবরের শাসনামলে সরকারের আয়ের উৎস ছিলো কয়েকটি। যথা,</p>
<ul>
<li>(১) ভূমি রাজস্ব,</li>
<li>(২) বাণিজ্য শুল্ক,</li>
<li>(৩) টাকশাল,</li>
<li>(৪) উত্তরাধিকার স্বত্ব</li>
<li>(৫) উপঢৌকন,</li>
<li>(৬) ক্ষতি পূরণের অর্থ।</li>
</ul>
<p>এগুলোর মধ্যে ভূমি রাজস্ব ছিলো সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। সম্রাট আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। শের শাহের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যা পরবর্তী সময়ে লোপ পায়, তা আকবর পুনরায় শুরু করেন। সম্রাট আকবর পর পর একাধিক দেওয়ানের প্রচেষ্টা পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমলকে “দিওয়ান-ই-আশরাফ” বা “প্রধান রাজস্ব সচিব” নিযুক্ত করেন এবং রাজস্ব সংস্কারের নির্দেশ দেন। সম্রাট আকবর শেরশাহের রাজস্ব ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন করেন, তা তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব ও মেধার পরিচায়ক।</p>
<p>মুঘল সম্রাট আকবরের রাজস্ব নীতির সুফল সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এসবের ফলে রাজকর সুনির্দিষ্ট হয়। রাজস্ব কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধ হয়। সম্রাটের আয় বৃদ্ধি পায়। সম্রাট বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অধিক অর্থ ব্যয় করতে পারেন। এর ফলে কৃষককুল সমৃদ্ধশালী হয়। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর আগে বার্ষিক খাজনার পরিমাণ ছিল ১৭, ৪৫,০০,০০০ টাকা। এছাড়াও,</p>
<ul>
<li>ক. কৃষকদের আর্থিক উন্নতি হয়।</li>
<li>খ. অনাবৃষ্টি ও খরাজনিত কারণে কর মওকুফ হয়।</li>
<li>গ. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।</li>
<li>ঘ. দৈনন্দিন ব্যবহারের দ্রব্যাদির মূল্য হ্রাস,</li>
<li>ঙ. জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়,</li>
<li>চ. গরু, ষাঁড়, লবণ প্রভৃতির উপর নির্ধারিত কর বাতিল।</li>
</ul>
<p>এসব প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক V. A. Smith বলেন,</p>
<p>❝সংক্ষেপে বলতে গেলে, আকবরের রাজস্ব শাসন ছিলো প্রশংসনীয়। নিয়ম-কানুন ছিলো বিজ্ঞচিত এবং কর্মচারীবৃন্দকে জনগণের প্রতি সদয় হতে বাস্তব নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।❞</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>কৃষি-ব্যবস্থা</strong></h5>
<p>ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরদিনই ছিলো কৃষিনির্ভর। ভারতের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ লোকের জীবিকাই ছিলো কৃষি। মুঘল সম্রাটরা কৃষির প্রতি বিশেষ নজর দেন। মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থা যে খুব খারাপ ছিলো তা বলা যায় না। যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা সে যুগে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মুঘল আমলে মুঘল প্রশাসন ও অভিজাতবর্গ ছিলো কৃষিজাত আয়ের উপর নির্ভরশীল। মুঘল আমলের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অপেক্ষা যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। প্রাক-মুঘল যুগের কৃষি ব্যবস্থার পরিচয় বিখ্যাত আফ্রিকার শাসক ইবন বতুতার বিবরণ থেকে জানা যায়। বারবোসা, মাহুয়ান ও বার্থেমার বিবরণ থেকেও ভারতের কৃষি ও শিল্পের অনেক তথ্য পাওয়া যায়।</p>
<p>পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতীয় কৃষকরা অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করতেন। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে মোট ৪১ রকমের রবি ও খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। তিনি আগ্রা অঞ্চলে ১৬টি রবি শস্য ও ২৫টি খরিপ শস্য উৎপাদনের কথা বলেছেন। শূন্য পুরাণ থেকে জানা যায় যে, ৫০ রকমের চাল বাংলায় উৎপাদন হতো। ভারতীয় কৃষকরা অন্যান্য দেশ থেকে আনা নতুন শস্যও উৎপাদন করতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার ২টি নতুন পণ্য—তামাক ও ভুট্টা এদেশে উৎপাদিত হতে থাকে। নদীমাতৃক ভারতবর্ষের মাটি পলিমাটি দ্বারা গঠিত হওয়ায় জমি ছিলো খুবই উর্বর। বছরে ২ থেকে ৩ বার ফসল উৎপাদন হতো। সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী “বাবরনামা” থেকে জানা যায় যে, বৈচিত্র্যের জন্য উৎপাদন ছিলো ভারতীয় কৃষকদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের পশ্চিম উপকূলে তামাকের চাষ শুরু হয় এবং পরবর্তী ৫০ বছরের মধ্যে সমগ্র মুঘল-ভারতে তামাকের চাষ সম্প্রসারিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রে ভুট্টা চাষ হতো। মরিচ চাষ মুঘল-ভারতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃদ্ধি পায়। আলু ইউরোপীয় বণিকরা আমেরিকা হতে এদেশে আনেন। কফি দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে সামান্য উৎপাদিত হতো, কিন্তু তা চাষ ভারতীয় কৃষকদের অজানা ছিলো।</p>
<p>ধান, পাট, গম, কার্পাস, তৈলবীজ, আদা, মরিচ, রেশম এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল, বার্লি এবং আরও অসংখ্য রকমের রবিশস্য ও ইক্ষু ভারতের মাটিতে ভালো ফলতো। মুঘল নথিপথে অর্থকরী ফসলকে “জিনিস-এ-কামিল” বলা হয়েছে। কার্পাসের পাশাপাশি ইক্ষু ছিলো এই ধরনের অর্থকরী ফসল। নানাবিধ ফল-মূল ও শাক-সবজির চাষ মুঘল যুগে হতো। বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন শস্যের ভিত্তিতে আজকের মতো সেসময়ও শস্য উৎপাদনে খ্যাতি অর্জন করেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার</strong></h4>
<p>এখন এতোসব আলোচনার পরিসমাপ্তিতে একটা প্রশ্ন বা মন্তব্য আসতে পারে যে, ভারতের মুসলিম শাসনামলের সাথে পূর্বের শাসনামলের তুলনামূূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর প্রমাণ পাওয়া গেলেও শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে তো হিন্দু-মুসলিম তুলনা করা হয়নি, বরং এই দু&#8217;টি সেক্টরে পূর্বের সাথে তুলনা করে উন্নতি ও উৎকর্ষতা দেখানো হয়েছে।</p>
<p>এর উত্তরে এখানে দু&#8217;টি বিষয় আসবে। যথা,</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সামগ্রিক, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণও সেজন্য হয় সামগ্রিক। কখনও এভাবে দু&#8217;টি ধর্মের জন্য কাজ করে না ইসলামী সভ্যতা। বরং, মুসলিমদের নিজেদের ভেতরে মারহামাতপূর্ণ একটা সমাজ বিনির্মাণ করে তারপর সমাজের সকলকে একসাথে নিয়ে আদালত ও মারহামাতপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী সভ্যতায় হিন্দু-মুসলিম বলে আলাদা কোনোকিছু ছিলো না। কেননা, এখানে হিন্দুদের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও বড় একটা অংশ বসবাস করতো। এমনকি, এই বৌদ্ধ জনসাধারণই মুসলিমদেরকে ভারত অভিযানে আমন্ত্রণ জানায়।</p>
<p>আবার, হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সহাবস্থান বজায় রাখা বা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি সেক্টরে হিন্দু-মুসলিম একত্রে কাজ করাটাই শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের উদাহরণ নয়, বরং মুসলিম সমাজের মাঝেও যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগে থাকে, সে সমাজকেও সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটা সমাজ বলা যায় না। অতএব, এখানে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান বলে আদতে কিছুই নেই। যা আছে তা হলো, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষকে নিয়ে আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূর্ণ একটি সমাজ বিনির্মাণ করা; যা ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী ভারতীয় উপমহাদেশে প্রমাণ করে দেখিয়ে এসেছে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong></p>
<p>হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় যেভাবে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর উপমা পেশ করা হয়েছে, সেটার সাথে তুলনা করে অবশ্য শিক্ষা-ক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে সে উপমা পাওয়া যায় না; বরং এখানে উন্নতি ও অগ্রগতির বিষয়টাই তুলনামূলকভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু, এখানে আরেকটা বিষয় উঠে আসে যে, প্রাক-মুসলিম ভারতে যেসব সেক্টরে সুস্পষ্টরূপে অসামাজিকতা বা সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর বিপরীত কার্যক্রম লক্ষ্য করা যেতো, সেসব সেক্টরগুলোকে ধরে ধরে মুসলিম ভারতের সময়কার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে।</p>
<p>আবার যেখানে রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-বিষয়টা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে অর্থনীতিতে যে স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তখনই সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নমুনা পাওয়া যায়, যখন শিক্ষা-সাহিত্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ বজায় থাকে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সমানভাবে শিক্ষা অর্জন করতে পারে। কেননা, সঠিক শিক্ষা ব্যতীত কখনই ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর নিদর্শন পাওয়া যায় না। সে হিসেবে, যেখানে তুলনামূলক পার্থক্য দেখানোর প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেটাই করা হয়েছে; এবং যেখানে মুসলিম শাসনামলের উন্নতি ও সমৃদ্ধি উপস্থাপনের প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেসব বিষয়ই উপস্থাপন করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অতএব, পরিসমাপ্তিতে বলা যায় যে,</strong></p>
<p>সার্বিক আলোচনায় এবং সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র ইতিহাসে মুসলিম শাসনামল বা ইসলামী সভ্যতাই একমাত্র সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা পেশ করেছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, নারী, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতি-সহ সমাজ নামক বিষয়টির সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রতিটি বিষয়েই ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নিশ্চিত করেছিলো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূ্র্ণ যে সমাজের নিদর্শন উপস্থাপন করেছিলো, তাবত ভারতীয় ইতিহাসের আর কোনো সভ্যতাই সে নিদর্শন পেশ করতে সক্ষম হয়নি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানই নয় শুধু, বরং খোদ ভারতের ১০০কোটি মানুষও এখন আবারও ইসলামী সভ্যতার সামাজিক অবকাঠামো অর্থাৎ নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটি সমাজের জন্য মুখিয়ে আছে। পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন ভারতের যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, আর কোথাও থেকে হোক বা না হোক, যে বাংলার ভূমি থেকেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, সেই বাংলার উর্বর জমিন থেকেই আবারো স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হাওলাঃ</strong></p>
<p>১. ইসলাম ও জ্ঞান, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
২. আন্তর্জাতিক শোষণ ও মুক্তির পন্থা, হাসান আল ফিরদাউস।<br />
৩. সাম্রাজ্যবাদ, ফাহমিদ-উর-রহমান।<br />
৪. দাওয়াম, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।<br />
৫. পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম।<br />
৬. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক।<br />
৭. আলিম ইসলামের ইতিহাস, লেকচার পাবলিকেশন্স।<br />
৮. মুসলিম ভারতের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।<br />
৯. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (মুঘল আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১০. ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস (সুলতানি আমল), মাহবুবুর রহমান।<br />
১১. মুসলিম প্রশাসনব্যবস্থা, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।<br />
১২. মুসলিম প্রশাসন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ, ড. মুহম্মদ আলী আসগর খান, শেখ মুহম্মদ লুৎফর রহমান, মোখলেছুর রহমান।<br />
১৩. সোনারগাঁও: বাংলায় ইলমী সিলসিলার অনন্য মিনার, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম।<br />
১৪. সুলতানী আমলে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার উৎপত্তি ও বিকাশ, ড. আব্দুল করিম।<br />
১৫. মুসলিম শাসনে ন্যায়বিচার, তোফাজ্জল বিন আমীন।<br />
১৬. বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা হাসান আল ফিরদাউস (মিহওয়ার ৪র্থ সংখ্যা)<br />
১৭. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ডক্টর এম. এ রহিম।<br />
১৮. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খান।<br />
১৯. আমাদের জাতিসত্ত্বার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।<br />
২০. বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মাহবুবুর রহমান।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-in-the-indian-subcontinent-a-unique-example-of-social-harmony/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15906</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইতিহাসের ধারায় আরাকান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 03 May 2025 11:46:29 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রোহিঙ্গা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15811</guid>

					<description><![CDATA[যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন–ই–আকবরীতে আরাকান সম্পর্কে লিখেছেন : সুবে বাঙ্গালাহ–ও দক্ষিণ–পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন–ই–আকবরীতে আরাকান সম্পর্কে লিখেছেন : <strong>সুবে বাঙ্গালাহ–ও দক্ষিণ–পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ। গাধা ও উট এখানে চড়া দামে বিক্রি হয়। এই রাজ্যে গরু ও মহিষ দেখা যায় না। এখানে মানুষ গাভি জাতীয় একপ্রকার প্রাণীর দুধ পান করে। এই দেশে মানুষ না হিন্দু, না মুসলমান। যমজ ভাতা ভগ্নীর মধ্যে এই দেশে বিবাহ প্রচলিত আছে। মাতা–পুত্র ব্যতীত আর সবার মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। এই দেশে লোকে তাদের পুরোহিতের (ওয়ালির) সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ। এখানে রাজপ্রাসাদে স্ত্রী লোক প্রহরীর কাজ করে। পুরুষ মানুষের মুখে দাড়ি হয় না।</strong></p>
<p><em>ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকান ছিল বার্মার একটি বিভাগ (Division)। এই বিভাগের ছিল চারটি জেলা। যথা : ১. আরাকান হিলট্রাক্টস, ২. আকিয়াব, ৩. সান্ডওয়ে ও ৪. কাউকপিউ। বর্তমানে আরাকান বা রাখাইন হলো মিয়ানমারের একটা প্রদেশ; বিভাগ আর নয়; কিন্তু বর্তমান আরাকান প্রদেশের আয়তন হলো আগের আরাকান বিভাগের চাইতে ছোট। এই ছোট হওয়ার কারণ, আরাকান হিলট্রাক্টসকে জুড়ে দেয়া হয়েছে মিয়ানমারের আরেকটা প্রদেশের সাথে। মিয়ানমার বর্তমানে সাতটা প্রদেশ (Constituent stats) এবং সাতটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি বিভাগে বাস করেন খাঁটি বর্মিভাষী জনসমষ্টি; কিন্তু আর সাতটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টির জনসমষ্টির মাতৃভাষা বর্মি বা ম্রনমা নয়। আরাকান হলো এমন একটি প্রদেশ, যার মানুষের মাতৃভাষা খাঁটি বর্মি নয়; কিন্তু বর্মি ভাষার খুবই কাছাকাছি। একে বলতে হয় প্রাচীন বর্মি ভাষার অনুরূপ। অর্থাৎ আরাকান প্রদেশের অবস্থান ভাষাগত দিক থেকে বর্মি পরিবারভুক্ত হলেও বেশ কিছুটা ভিন্ন।</em></p>
<p><em>আরাকানের সব লোক মঙ্গল মানবধারার নয়। এখানে অনেক মানুষের চেহারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অনুরূপ। তাদের চোখ আয়ত, নাক সরল ও উন্নত, মাথার চুল মসৃণ। তাদের পুরুষের মুখে দাড়ি গোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায়। এদের মাথা প্রধানত মধ্যমাকৃতির; কিন্তু যাদের মনে করা হয় একান্তভাবেই আরাকানীয় তাদের মাথার আকৃতি গোল, চুল ঋজু, চোখের ওপর পাতায় থাকে বিশেষ ধরনের ভাঁজ। যে কারণে তাদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট এবং বাঁকা। এদের গণ্ডের হাড় হয় উঁচু, যে কারণে এদের মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। পুরুষের মুখে দাড়িগোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায় না। এরা অনেক খর্বাকৃতির। মানবধারার দিক থেকে এদের বলা চলে, দক্ষিণ চীনের মঙ্গলধারার।</em></p>
<p><strong>ভূগোলের দিক থেকে আরাকান বার্মার (ব্রহ্ম) মূল ভূখণ্ড থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। বার্মা ও আরাকান পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণি দ্বারা। এই পর্বতশ্রেণিকে বলে আরাকান ওমা। এর মধ্য দিয়ে আছে তিনটি গিরিপথ। এই তিনটি গিরিপথের মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র একটি দিয়ে বছরে সব সময় যাতায়াত করা চলে। অন্য দু’টির মধ্য দিয়ে বর্ষাকালে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বার্মার মূল ভূ–খণ্ডের সাথে আরাকানের যোগাযোগ ছিল সমুদ্রপথে। জাপান বার্মার মূল ভূখণ্ড দখল করে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে। বার্মার মূল ভূখণ্ড থেকে জাপানিরা ১৯৪২ সালে সমুদ্রপথে স্পিডবোটে এসে করেছিল সম্পূর্ণ আরাকান দখল। আরাকান থেকে স্থলপথে এসে পৌঁছেছিল চট্টগ্রামের মহেশখালী পর্যন্ত। তবে তারা মহেশখালী দখলে রাখতে পেরেছিল না। আরাকানসহ বার্মা জাপানের দখলে ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে আরাকানে যাওয়া ছিল সহজ। বাংলাদেশ থেকে মানুষ গিয়েছে আরাকানে। আবার আরাকান থেকে মানুষ এসেছে বাংলাদেশে। এটা ঘটেছে বহু যুগ ধরেই।</strong></p>
<p>রোহিঙ্গা নামটির একটি বিশেষ ইতিহাস আছে। সংক্ষেপে তা হলো এই রকম : খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগে (১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি) নিম্ন ব্রহ্মের রাজা মেং–শো–আই আরাকান জয় করেন। আরাকানের রাজা মেং–শো-আ মউন যুদ্ধে হেরে পালিয়ে যান গৌড়ের সুলতান জালাল–আল–দীন শাহ–এর কাছে। তিনি আরাকানের পরাজিত রাজাকে অনেক সৈন্য প্রদান করেন গৌড়ের এক সেনাপতির অধীনে, যাতে করে আরাকানের রাজা মেং–শোআ মউন বার্মা রাজাকে পরাজিত করে আবার আরাকানের রাজা হতে পারেন; কিন্তু গৌড়ের এই সেনাপতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। মেং–শোআ মউন আবার বন্দী হন বার্মার রাজার কাছে। অনেক কষ্টে আরাকানের পরাজিত রাজা আবার গৌড়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এবার গৌড়ের সুলতান তাকে আর একজন সেনাপতির অধীনে আরো অনেক সৈন্য প্রদান করেন। এই সেনাপতি ও সৈন্যের সহযোগিতায় মেং–শোআ মউন যুদ্ধে জয়ী হন। তিনি আরাকানের নতুন রাজধানী গড়েন বাংলার সীমানার কাছে। এই রাজধানীর নাম দেন রোহং অথবা ম্রোহং। আরাকানের রাজা চান না গৌড়ের সৈন্য ফিরে যাক। গৌড়ের এসব মুসলমান সৈন্য থেকে যায় রাজধানী রোহং শহরে। এদেরই বংশধররা হলো রোহিঙ্গা। রোহং শহরকে বাংলা ভাষায় বলা হতে থাকে রোসাঙ্গ। একসময় রোসাঙ্গ আর আরাকানকে ডাকা হতে থাকে একই রোসাঙ্গ নামে। দৌলত কাজী তার <em>&#8216;সতী ময়নামতীতে&#8217;</em> লিখেছেন–</p>
<blockquote><p>কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী।<br />
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।।<br />
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধাচার।<br />
নাম শ্রীসুধর্ম্মা রাজা ধর্ম্ম অবতার।।<br />
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন।<br />
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।</p></blockquote>
<p>আরাকানের রাজারা গৌড়ের সাথে যোগাযোগ রেখে চলতেন। তারা তাই বাংলা ভাষা শিখতেন। আরাকানের রাজসভায় এই জন্য হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের চর্চা। <strong>দৌলত কাজী ছিলেন আরাকানের রাজসভার একজন খুবই খ্যাতনামা কবি।</strong> তিনি জন্মে ছিলেন চট্টগ্রামের অন্তর্গত বর্তমান রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে। সেখান থেকে প্রথম যৌবনে তিনি চলে যান আরাকানে। এ সময় আরাকানের রাজা ছিলেন থিরি থুধর্মা (১৬২২–১৬৩৫ খ্রি. রাজত্বকাল)। যার বাংলা নাম দাঁড়ায়, শ্রীসুধর্ম্মা। শ্রীসুধর্ম্মার লস্কর উজির (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) ছিলেন আশরাফ খান। আশরাফ খান ছিলেন চট্টগ্রামের বর্তমান উপজেলা হাটহাজারীর অন্তর্গত চারিয়া গ্রামের অধিবাসী। তিনি সেখান থেকে যান আরাকানে। তার সহায়তায় দৌলত কাজী আরাকানের রাজসভায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। দৌলত কাজী খ্যাত হয়ে আছেন <strong><em>&#8216;সতী ময়নামতী&#8217;</em></strong> নামক কাব্যগ্রন্থ রচনার জন্য। এটা তিনি রচনা করেন সাধন নামে উত্তর ভারতের একজন কবির লেখা কাব্য ময়না সৎ নামক কাব্যগ্রন্থের অনুসরণে। ময়না সৎ কাব্যগ্রন্থ লিখিত হয়েছে পূর্বী হিন্দিতে। <em>দৌলত কাজী তার কাব্য শেষ করার আগেই হঠাৎ ইন্তেকাল করেন। তার এই কাব্য সমাপ্ত করেন কবি আলাওল বেশ কিছু দিন পরে</em>। কবি আলাওলের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম <strong>&#8216;পদ্মাবতী।&#8217;</strong> এটি তিনি রচনা করেন মালিক মুহম্মদ জয়সি নামে উত্তর ভারতের একজন সুফি কবির লেখা <strong>&#8216;পাদুমাবৎ&#8217;</strong> নামক কাব্যগ্রন্থের ওপর নির্ভর করে। পাদুমাবৎও লিখিত হয়েছিল পূর্বী হিন্দিতে।<br />
বাংলা সাহিত্যের ওপর ফারসি সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাব বহুদিন আগে থেকেই পড়তে আরম্ভ করে। তবে নতুন করে আবার পড়ে সম্রাট শাজাহানের পুত্র বাংলার সুবেদার সুজার আমলে। সুজা বাংলার সুবেদার ছিলেন প্রায় ২০ বছর (১৬৩৯–১৬৬০)। সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার হাতে পরাজিত হয়ে আরাকানে প্রস্থান করেন। সুজার সময় সুবে বাংলার রাজধানী ছিল রাজমহল, যা এখন পড়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশে। আলাওল চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না। ছিলেন ফরিদপুর অঞ্চলের (ফাতেহাবাদ) লোক। তিনি তার পিতার সাথে নৌপথে কোথাও যাওয়ার সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে পড়েন। আলাওলের পিতা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় মারা যান। আলাওলকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা ধরে এনে বিক্রি করেন আরাকানে।</p>
<p><em>আলাওল অনেকগুলো ভাষা জানতেন। বাংলা, উড়িয়া, ফারসি, আরবি, পূর্বী হিন্দি ও সংস্কৃত। আলাওল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন &#8216;হফত পয়কর&#8217; ও &#8216;সিকান্দর নামা।&#8217; আলাওলের যেসব পুঁথি পাওয়া গিয়েছে, তা বাংলা অক্ষরে লিখিত নয়। সবই লিখিত আরবি–ফারসি অক্ষরে। আরাকানে সুজার সাথে আলাওলের বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। আরাকানের রাজা সুজাকে হত্যা করেন। এই হত্যার একটি কারণ ছিল আরাকানের রাজা সুজার এক কন্যাকে বিবাহ করতে চান; কিন্তু সুজা রাজি হন না। সুজার সাথে সখ্যতার জন্য আলাওলকে পড়তে হয় আরাকানের রাজার কোপে। সুজার মৃত্যুর পর তার সৈন্যসামন্ত ও লোকজন সবাই থেকে যায় আরাকানে। রবীন্দ্রনাথ ডালিয়া বলে একটি ছোট গল্প লিখেছেন। যার বিষয়বস্তু হলো– সুজার কন্যার সাথে আরাকান রাজার প্রেম। তবে এটা ইতিহাসের নিরিখে সত্য নয়; কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আরাকান রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আর কোনো লেখক আরাকান নিয়ে তার সময়ে এ রকম কিছু লিখেননি।</em></p>
<p><strong>মগ বলতে ঠিক কাদের বোঝাত, তা জানা যায় না। চট্টগ্রামে মগ বলতে একদল বাংলাভাষীকেও বোঝায়। যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই মগরা বলেন, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছিল বিহারের মগধ থেকে। দৌলত কাজী বলেছেন, সুধর্ম্মার পূর্বপুরুষও ছিলেন মগধ থেকে আগত। সম্ভবত এরা পূর্বী হিন্দি সম্বন্ধেও ছিলেন অবগত। তাই আরাকানের রাজসভায় কাব্যচর্চা করতে যেয়ে পূর্বী হিন্দিতে লিখিত বইয়ের অনুবাদ করতে হয়েছেন সচেষ্ট। সাধারণভাবে বাংলাদেশে এখনো মগের মুল্লুক বলতে, লোকে বোঝে চরম অরাজক রাজত্ব। সম্ভবত মগদের একাংশ পর্তুগিজ জলদস্যুদের সংশ্রবে এসে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর প্রকৃতির দস্যু। এই দস্যুদের সমূলে ধ্বংস করতে সক্ষম হন আওরঙ্গজেব কর্তৃক নিযুক্ত সুবেদার শায়েস্তা খান।</strong><br />
<strong>আরাকান আগে বার্মার অংশ ছিল না। আরাকান বার্মার বিশেষ অংশ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনামলে। যখন একে ব্রহ্মদেশের সাথে একটি বিভাগ হিসেবে যুক্ত করা হয়; কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলেও চট্টগ্রাম থেকে বহু মানুষ গিয়েছেন আরাকানে চাকরি করতে। বিশেষ করে পুলিশ ও শিক্ষা বিভাগে। এ ছাড়া হয়েছেন নৌপথে চলাচলকারী মোটর–বোটের সারেং ও মাঝি–মাল্লা। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আরাকানের আকিয়াব বন্দর পর্যন্ত রেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেটা সম্ভব হয়েছিল না।</strong></p>
<p>দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু ঘটনা আজকের রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্লেষণে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। <strong>জাপান বার্মাকে খুব সহজেই দখল করতে পেরেছিল। এর কারণ, কেবলই সামরিক কৌশল ছিল না। জাপান এ সময় বলেছিল, এশিয়া শাসিত হতে হবে এশীয়বাসীর দ্বারা।</strong> জাপান এশীয়। জাপানিরা ছিলেন ধর্মের দিক থেকে অনেকেই বৌদ্ধ। জাপান বলে, এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে তারা সহযোগিতা সৃষ্টি করতে চায়, যা এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রকে করে তুলবে সমসমৃদ্ধ। এর একটা প্রভাব পড়েছিল বার্মার মানুষের ওপর। তারা সহযোগিতা করেছিল জাপানের। বার্মার প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল দোবামা আসিওরে। এরা প্রথমে নেয় জাপানের পক্ষ। এরা আওয়াজ তোলে বার্মা হতে হবে বর্মিদের জন্য। এরা ছিল বিশেষভাবেই বর্মি জাতীয়তাবাদী।<br />
<strong>ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রায় দশ লাখ মানুষ সমুদ্রপথে বার্মায় গিয়েছিলেন, ব্যবসা–বাণিজ্য করতে। এরা অনেকেই বার্মায় নিয়োজিত হয়েছিলেন অসাধু ব্যবসা–বাণিজ্যে, ঠকিয়েছিলেন বর্মিদের। বর্মি জাতীয়তাবাদ তাই কেবল ব্রিটিশবিরোধী ছিল না, ভারতবিরোধীও ছিল।</strong> যুদ্ধের সময় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল এইসব ভারতীয়দের। আরাকানে এ সময় মুসলমানরা জাপানের পক্ষ নিতে চাননি। জাপানিরা বৌদ্ধ। জাপানিরা আরাকানি বৌদ্ধদের যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করবে, তারা মনে করেন মুসলমানদের জাপানিরা সে রকম করবে না। এ সময় ব্রিটিশ শাসকেরা প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তারা উত্তর আরাকানকে একটা আলাদা প্রদেশ করবে।<br />
<strong>উত্তর আরাকান মুসলিম প্রধান। কেবল তাই নয়, উত্তর আরাকানের বেশির ভাগ লোক দেখতে বাংলাদেশের অধিবাসীর মতো। উত্তর আরাকানে হাটেবাজারে চলতো চট্টগ্রামের বাংলাভাষা, আরাকানি ভাষা নয়।</strong> ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় আরাকান মুসলিম লীগ। এরা তোলে আরাকানকে বিভক্ত করার দাবি; কিন্তু আরাকান মুসলিম লীগের এই দাবি জিন্নাহ সাহেব সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, বার্মা এখন একটা পৃথক দেশ। আরাকানে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুললে ভারতে পাকিস্তান আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। <strong>আসলে আরাকান মুসলিম লীগ কখনই আরাকানভিত্তিক একটি দল ছিল না। ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক একটা দল, যাতে নেতৃত্ব দিতেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। যিনি ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের লোক। আরাকানি মুসলিম লীগ কোনো দিনই আরাকানে সাড়া জাগাতে পারে না।</strong></p>
<p>১৯৪৮ সালে বর্মা স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপর আরাকানি মুসলমানদের একাংশ কাশেম রাজার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন; কিন্তু এদের সংখ্যা খুব উল্লেখযোগ্য ছিল না। কাশেম রাজা পেশায় ছিলেন ধীবর। তিনি এক সময় সমুদ্রে মৎস্য শিকার করতেন; কিন্তু তিনি ছিলেন ভালো সংগঠক ও নেতৃত্ব গুণে গুণান্বিত। ফলে হয়ে উঠতে পারেন একজন বিশিষ্ট নেতা। তিনি গড়ে তোলেন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী। কাশেম রাজা পাকিস্তানের কাছে সাহায্য চান; কিন্তু পান না। কাশেম রাজা ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসে ধরা পড়েন ও কারারুদ্ধ হন। আরাকানে মুসলিম মুজাহিদরা হয়ে পড়েন শক্তিহীন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব চান না বার্মার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হোক। নাফ নদীর ওপারে ৫ মাইল জায়গা নিয়ে বর্মার সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। আইউব সেটা বার্মাকে ছেড়ে দিয়ে সীমান্ত সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসেন।<br />
বার্মা স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে আরাকানিরা স্বাধীন হতে চেয়েছিল; কেবলই আরাকানের মুসলমানরাই নয়। কিন্তু আরাকানের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ হলো মুসলমান। জেনারেল নে উইন ১৯৫৮ সালে বর্মায় ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন কঠোর বর্মি জাতীয়তাবাদী। তিনি মনে করেন আরাকানে রোহিঙ্গাদের প্রভাব প্রতিপত্তি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরাকান একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে। তার সময় থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গা নির্যাতন। যাতে করে রোহিঙ্গারা আরাকান ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসতে চায়। আজ যে সমস্যা আরাকানে সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ। রোহিঙ্গাদের ওপর আজ যে জঘন্য নির্যাতন হচ্ছে সেটা করছে মিয়ানমার মূল ভূখণ্ড থেকে আসা বর্মি সৈন্যরা। এর মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ, যার উদ্ভব হয়েছে বর্মার মূল ভূখণ্ডে, আরাকানে নয়।</p>
<p><strong>আরাকানে যা ঘটছে, তা ঘটতে পারার একটা কারণ হলো বাংলাদেশ একটা যথেষ্ট সবল রাষ্ট্র নয়। সবল রাষ্ট্র হলে বার্মার সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের ওপর এ রকম অত্যাচার করতে কখনো এতটা সাহসী হতো না। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের কাছে আবেদন জানাচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বহু মুসলমানের বাস। আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত এই দু’টি দেশের জনমতকে বিশেষভাবে পক্ষে পাওয়া। কেননা, এই দু’টি দেশ যদি বার্মার ওপর রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করে তবে তা কার্যকর হবে সবচেয়ে বেশি।</strong> তবে একান্তই যদি দেখা যায় যে, রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হচ্ছে না, তবে মনে হয় শেষ পর্যন্ত উচিত হবে রোহিঙ্গাদের স্বাধিকারের জন্য সব ধরণের সাহায্য প্রদান করা। রোহিঙ্গারা যদি হাতে অস্ত্র পান, তবে লড়াই করে তারা তাদের নিজেদের দাবি–দাবাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বলে মনে করার কারণ আছে। কেননা, মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে কারেন, শান, কাচিন প্রভৃতি জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। বর্মি বাহিনী খুব যে সুবিধার মধ্যে আছে, তা কিন্তু নয়। রোহিঙ্গাদের দমন করার জন্য মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার যদি অধিক সৈন্য পাঠাতে বাধ্য হয়, তবে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে অন্য জাতিসত্তাদের সংগ্রাম আরো জোরালো হবে। ফলে মিয়ানমারের সরকারকে পড়তে হবে যথেষ্ট জটিলতায়। মিয়ানমারের সাতটি প্রদেশেই আছে কম বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী তথা স্বাধীনতাকামী প্রবণতা। আজকের মিয়ানমার হলো ব্রিটিশ শাসনের ফল। কোনো খাঁটি বর্মি রাজা এত বড় অঞ্চলকে কখনো শাসন করতে পারেননি।</p>
<p><strong>০২ ডিসেম্বর ২০১৬</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15811</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পাশ্চাত্য চিন্তার ভিত্তি ও তার সমালোচনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 27 Apr 2025 15:38:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15793</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিজের অস্তিত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছে। আর এ বিষয়টি মানুষের স্বভাবতাড়িত। সে অপর জনগোষ্ঠীর আচরণকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তবে এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় নিষ্কলুষ কিংবা নিষ্পাপ ছিলো না। যার কারণে এ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিজের অস্তিত্ব, চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছে। আর এ বিষয়টি মানুষের স্বভাবতাড়িত। সে অপর জনগোষ্ঠীর আচরণকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তবে এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় নিষ্কলুষ কিংবা নিষ্পাপ ছিলো না। যার কারণে এ জানাশোনার সূত্রেই বিভিন্ন চিন্তার বিনির্মাণ ও উৎপত্তি ঘটেছে। চিন্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান দুনিয়া দুটি ভাগে বিভক্ত; আর তা হলো- প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য। তবে এই আলোচনায় মূল বিষয়বস্তু হলো <strong>‘</strong><strong>পাশ্চাত্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>তার</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>ভিত্তি</strong><strong>’</strong><strong>।</strong> আধুনিক যুগে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা হলো পাশ্চাত্য চিন্তাধারা। যা আমাদের অস্তিত্ব এবং চিন্তার মাঝে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, যার দরুন আমাদের দ্বীন, সমাজ-সংস্কৃতি এবং জীবনাদর্শের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে নড়বড় করে দিয়েছে। যা কেবল মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানবতার জন্য চরম অধঃপতন, জুলুম এবং শোষণের দিকে ধাবিত করছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা কিংবা ধর্মহীন যে পাশ্চাত্য তা নিয়ে আলোচনার শুরুতেই কয়েকটি প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির হয়। সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>পাশ্চাত্য বলতে আসলে কী বুঝায়?</li>
<li>পাশ্চাত্য চিন্তার অভিন্ন বা কমন বিষয়সমূহ কি কি?</li>
<li>পাশ্চাত্য চিন্তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ (Hypothesis)।</li>
</ul>
<p>যে সকল বিষয়সমূহের উপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য চিন্তা গড়ে উঠে-</p>
<ul>
<li>মানুষ হলো পরিত্যক্ত একটি সৃষ্টি, যা ইলাহী সমর্থন ও সাহায্য থেকে মাহরুম/বঞ্চিত।</li>
<li>মানুষকে একাকী ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তার কাজে হস্তক্ষেপ করার মতো কেউ নাই।</li>
<li>সকল কিছুই সময় তথা নির্দিষ্ট কিছু শর্তের আলোকে নির্ধারিত হয়ে থাকে।</li>
<li>সকল কিছুই মানুষ তৈরি করে, এমনকি দ্বীনও মানুষ তৈরি করে থাকে।</li>
<li>সকল কিছুই সম্ভব। যা কিছু মওজুদ (বিদ্যমান) আছে সকল কিছুই মুমকিন মওজুদ<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a> থেকে সৃষ্টি হয়।</li>
<li>মুমকিন মওজুদের বাইরে অন্য কোনো সৃষ্টি নেই।</li>
<li>মানুষ তার নিজের জন্য নিজেই যথেষ্ট।</li>
</ul>
<p>পাশ্চাত্য বলতে মূলত পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান ধর্মকে বুঝিয়ে থাকে। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ক্যাথলিক ধর্ম পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, পরবর্তীতে ১৭ শতাব্দীতে এসে (মার্টিন লুথার কিং এঁর মাধ্যমে) প্রটেস্ট্যান্টরা যুক্ত হয়। পাশ্চাত্যের একটি সংজ্ঞা আছে; তা হচ্ছে- we and the rest অর্থাৎ, আমরা এবং অন্যরা। এখানে “আমরা” বলতে বুঝায় মূলত পাশ্চাত্য বসবাসকারী খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে। তবে ল্যাটিন অ্যামেরিকা বা ব্রাজিল কিংবা উরুগুয়ের খ্রিস্টানরা পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত নয়; পাশাপাশি অর্থডক্স খ্রিস্টান অর্থাৎ রাশিয়ান খ্রিস্টানরাও পাশ্চাত্যের অর্ন্তভুক্ত নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্পেনের ক্যাথলিকরা পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত কিনা, সেটা নিয়েও তাঁদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যার ফলে পাশ্চাত্য চিন্তার প্রতিনিধিত্বকারী মূলত ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, হল্যান্ড এবং আংশিকভাবে ইতালির চিন্তাকে বুঝানো হয়ে থাকে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে এসে অ্যামেরিকা ও কানাডার চিন্তাও এর সাথে (we বা আমরা) যুক্ত হয়।</p>
<p>সপ্তদশ শতাব্দীর পরে এসে আধুনিক পাশ্চাত্য গঠিত হয়। আমাদের সামনে যে পাশ্চাত্য বিদ্যমান তা মূলত ষোড়শ শতাব্দী পরবর্তী পাশ্চাত্য। এ সময়ে ইউরোপে জ্ঞানের যে বিভিন্ন ধারা তৈরি হয়, সেটাই পরবর্তীতে সুগঠিত হয়ে নতুন পাশ্চাত্য গঠন করা হয়। আর সপ্তদশ শতাব্দীতে গঠিত পাশ্চাত্য যে মূলনীতিকে তার movement point হিসেবে গ্রহণ করে &#8211;</p>
<blockquote><p>من عرف نفسه فقد عرف ربه<strong>&#8211;</strong></p>
<p>অর্থাৎ, “যে নিজেকে চিনে সে তাঁর রবকেও চিনতে পারে।”</p></blockquote>
<p>কারণ, এ মূলনীতি ক্যাথলিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, যদি আমরা মানুষ ও প্রকৃতিকে জানতে পারি তাহলে স্রষ্টাকেও চিনতে পারবো। মারেফাতুল্লাহ (স্রষ্টাকে চিনা)-ই উপনীত হওয়ার জন্য ক্যাথলিক চার্চের প্রয়োজন নেই। মুসলমানদের মতো আমরাও প্রকৃতি এবং মানুষকে বিশ্লেষণ করে মারেফাতুল্লাহ-ই উপনীত হতে পারবো। আর এক্ষেত্রে সঠিক পন্থা হলো, মানব সত্ত্বা ও প্রকৃতিকে আকলের মাধ্যমে গবেষণা করা। আকলের মাধ্যমে গবেষণা করার বিষয়টা ক্যাথলিক চিন্তাধারায় ছিলো না। তাই ঐ সময়ের প্রভাবশালী চিন্তা ইসলামী সভ্যতার চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রভাবিত ছিলো। তাদের এ চিন্তা ঊনবিংশ শতাব্দী অর্থাৎ ২০০ বছর পর্যন্ত জারি ছিলো। পরবর্তীতে তারা এটাকে পরিত্যাগ করে।</p>
<p>আর এটা পরিবর্তন করার কারণ হলো- ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তারা একটি চিন্তায় পৌঁছায় সেটা হলো, আকলের মাধ্যমে রবকে জানা সম্ভব নয়। এখানে জ্ঞানের বিষয়বস্তু পরিবর্তন হয়ে যায় এবং মারেফাতুল্লাহকে জ্ঞানের বিষয় থেকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ষোড়শ শতাব্দী পরবর্তী সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য চিন্তায় মূল বিষয়সমূহ ছিলো-</p>
<ul>
<li>প্রাকৃতিক দ্বীন (Natural religion)</li>
<li>প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব (Natural theology)</li>
<li>প্রাকৃতিক আইন (Natural law)</li>
<li>তাবিয়াত দর্শন বা প্রাকৃতিক দর্শন (Natural philosophy)</li>
</ul>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক দ্বীন হলো,</strong> মানুষের ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বীন। তারা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দ্বীনের অনুসন্ধান করতো। কারণ তাঁরা ক্যাথলিক চিন্তার মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি কিংবা তাঁদের চিন্তাকে সমাজে প্রভাবশালী করতে পারছিলো না। তারা যে পিছিয়ে ছিলো বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো, তা থেকে বের হওয়ার জন্য একটি প্রাকৃতিক দ্বীনের অনুসন্ধান করছিলো। পরবর্তীতে তারা পরিকল্পনা করে, যেহেতু এই দ্বীনের মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব নয় এবং এর মধ্য থেকে আমরা নতুন কিছু তৈরি করতে পারবো না, এজন্য আমাদের এমন একটা দ্বীন প্রয়োজন যেটা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা প্রাকৃতিক দ্বীন। ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যতা খোঁজার পেছনে অন্যতম কারণ হল, ইসলামী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব হলো,</strong> প্রকৃতির মধ্যকার বিধান নিয়ে গবেষণা করে তথা “আসার’ (পৃথিবীতে যা কিছু আছে বা সৃষ্টি) থেকে “মুয়াসসির” তথা স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সিফাতসমূহকে নির্ণয় করার প্রচেষ্টা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের খালক বা মহান সৃষ্টির মধ্যে যে বিধি-বিধান আছে সেটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। তারই প্রকৃতির মধ্যে যে বিধান দিয়ে দিয়েছেন সেটা গবেষণা করে আল্লাহর অস্তিত্ব এবং সিফাতসমুহকে নির্ণয় করা। এজন্য তারা একটি থিওলজি দাঁড় করায়। তবে সৃষ্টি যার আইন তার, এই বিধান অর্থে না। এমনকি নিউটনের ‘Principia mathematica physics’ বইয়ে এরকম একটা লাইন হুবহু আছে, “সৃষ্টিকে দেখে স্রষ্টাকে খুঁজে বের করা তথা ‘আসার’ দেখে ‘মুয়াসসির’কে খুঁজে বের করা।” এটা ছিলো তাদের ন্যাচারাল থিওলজি। নিউটনের এ বইটি ফিজিক্স, একই সাথে কালামের সাথে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব মূলত ইলমুল কালাম দ্বারা প্রভাবিত, বিশেষ করে ইবনে সিনার থিওরী/তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।</p>
<p>&#8211; <strong>প্রাকৃতিক আইন হলো,</strong> মানুষের প্রকৃতির মধ্যে মওজুদ (বিদ্যমান) এবং আকলের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব, এমন মূলনীতিসমূহকে খুঁজে বের করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিধানকে মওজুদিয়্যাত ও আকলের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া বিধানের উপর প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ যে ব্যবস্থাপনা হবে সেটা আকল কর্তৃক নির্ধারিত হবে এবং মানুষের প্রকৃতির মধ্যে যে সকল বিষয় আছে সে সকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। প্রত্যেকটা বিষয়েই তারা ব্যাপকভাবে ইসলামী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো।</p>
<p>&#8211; <strong>ন্যাচারাল ফিলোসফি বা প্রাকৃতিক দর্শন হলো,</strong> এস্ট্রোনমি, ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি ও বায়োলজির মতো জ্ঞানসমূহ। ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলমানগণ এ সকল বিষয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিলো। পাশ্চাত্য চিন্তার গঠনগত পর্যায়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা ইসলামী চিন্তা থেকে অনেক বেশী প্রভাবিত এবং উপকৃত হয়েছে। এমনকি ইসলামী সভ্যতার অসংখ্য বই পাশ্চাত্য নিজেদের মতো ভাবার্থ করে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছে। সে সময়ের বইগুলোতে এক পাশে ইংরেজি আর অন্যপাশে আরবী, এভাবে অনুবাদ করা হতো।</p>
<p>যেমন &#8211; জন লক ও গ্রটিউস আরবী ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। <strong>Hugo Grotius </strong><strong>এর</strong><strong> On the law of War and Peace </strong><strong>গ্রন্থটি</strong> <strong>ইমাম</strong> <strong>সারাখসীর</strong> <strong>শারহু</strong> <strong>সিয়ারুল</strong> <strong>কাবির</strong> <strong>গ্রন্থের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>অনেক</strong> <strong>মিল</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>অর্থাৎ</strong> <strong>এই</strong> <strong>বই</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>নকল</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong></p>
<p>তবে এক্ষেত্রে একটা বিষয়ে ঘাটতি আছে। সেটা হল- তারা এসব বিষয় আমাদের কাছ থেকে নিলেও, আমাদের কাছ থেকে যেটা গ্রহণ করেনি তা হলো- নবুয়ত। তারা যা কিছু নিয়েছে, সুন্নতকে একপাশ রেখে, বাইরে রেখে যেভাবে নেওয়া যায়; সেভাবে নিয়েছে। তাই, আমরা এখন তাদের কাছ থেকে যে চিন্তাই গ্রহণ করি না কেন, তা সুন্নতের বাইরে যায়, আমাদের সমাজ বা মন-মানসের সাথে মিলে না। যা আমাদের জন্য মোটেই উপযোগী নয়।</p>
<p>সপ্তাদশ শতাব্দীতে উসমানী খেলাফতের (শুধু উসমানী না, সাফাভী, মুঘল এবং উসমানী)  প্রভাবের কারণে তারা আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করে, মানুষ তার প্রতিষ্ঠিত দুনিয়াতে বসবাস করে। অর্থাৎ আমরা যে শহরে বাস করি সেটা আমাদের পূর্বপুরুষ বা আমাদের তৈরি করা। এটাকে ইমাম মাওয়ার্দী বা ইসলামী সভ্যতার ভাষায় বলে العقل المكتسب বা মুকতাসাব আকল, যা এক অর্থে সমগ্র মানবতার আর্কাইভ [এখানে মানুষের সকল কিছু রয়েছে]। এটা তারা মুসলমানদের চিন্তাধারা থেকে জানতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইবনে</strong> <strong>খালদুনের</strong> <strong>শ্রেণিবিন্যাস</strong> <strong>অনুযায়ী</strong> <strong>মওজুদাতকে</strong> <strong>দুইভাগে</strong> <strong>বিভক্ত</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়</strong><strong> &#8211; </strong></p>
<ul>
<li>তাবিয়াত বা প্রকৃতি (যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই)।</li>
<li>সংস্কৃতি বা সভ্যতা বা উমরান অথবা কাসবি (যা মানুষের নিজের তৈরি)। এটাকে দুনিয়া বা দুনিয়ার জীবন বলা হয়ে থাকে।</li>
</ul>
<p>ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে &#8216;কাসব&#8217; পরিভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আমরা আমাদের অর্জিত বা কাসবী দুনিয়ায় বসবাস করি। এসব চিন্তা দ্বারা তারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।</p>
<p>সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে যখন তারা ক্যাথলিক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো, তাদের মধ্যে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল সেটা হলো- এ দুনিয়ায় মানুষের খুব বেশী কিছু করা সম্ভব নয়। এই দুনিয়া রুহুল কুদস বা পবিত্র আত্মা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আর এই পবিত্র আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে গির্জা বা গির্জা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুনিয়া। এখানে যা কিছু ঘটছে তা আমাদের চিন্তার বাইরে। ফলে মানুষের কিছু করার নেই বা মানুষ সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এটাই ছিলো তাদের প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু দুনিয়া, সভ্যতা বা সংস্কৃতি বিনির্মাণ করার ক্ষেত্রে ‘ইমারত’ সম্পূর্ণভাবে মানুষের উপর নির্ভরশীল৷ মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা দায়িত্বের অংশ হিসেবে কিংবা আখেরাতে সে যে পরিণতি পাবে, দুনিয়াতে ইমারতের দাবি হিসেবে আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন। “তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা পৃথিবীকে বিনির্মাণ করো।” বিনির্মাণের এই চিন্তা পরবর্তীতে ইলমুল উমরান হিসেবে আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো। এই মূলনীতির কারণে এর উপর ভিত্তি করে আমরা সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি।</p>
<p>কিন্তু, ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাদের চিন্তার মূল বিষয়সমূহ পরিবর্তন হয়ে যায়। এই সময়ে তাদের কিছু নতুন চিন্তা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সেগুলো হলো-</p>
<ul>
<li>ইমানুয়েল কান্ট (Critique of pure reason নামক গ্রন্থে) এর মতে, মানুষ শুধুমাত্র তার আকল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে-ই জানতে পারে।</li>
<li>সংজ্ঞাগত কারণেই মানুষের পক্ষে তার আকল দ্বারা স্রষ্টাকে (ইনশা ও ইহাতা) বুঝতে পারা সম্ভব না। অর্থাৎ, রবকে আকলের মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়; মারেফাতুল্লাহ জ্ঞানের বিষয় নয়; এই বিষয়ে কান্ট সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন।</li>
<li>স্রষ্টা জ্ঞানের কোনো বিষয় নয়। অর্থাৎ, মারেফাতুল্লাহ সম্ভব নয়।</li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে কান্টের সিস্টেমের মধ্যে দ্বৈত একটি বিভাজন রয়েছে–</p>
<ul>
<li>Numen (নুমেন)- ইলাহী বিষয় এবং যা মানুষ জানতে পারবে না।</li>
<li>Phenomen- মানুষের মস্তিস্ক কর্তৃক তৈরিকৃত বিষয়কে জানতে পারবে; অর্থাৎ মানুষের মস্তিস্ক কর্তৃক তৈরিকৃত বিষয়কে জানতে পারবে। সকল ধরনের বিষয়কে মানুষ তৈরি করে; যেমন- পাথর, গাছপালা, সূর্য, মহাকাশ, নিহারিকা, খাবার-দাবার ইত্যাদি।</li>
</ul>
<p>কান্টের চিন্তাধারা Will and Representation (ইরাদা এবং তাসাউর) এবং ফরাসি বিপ্লব- সকল কিছুকে পরিবর্তন করে নতুন একটা বিশ্বব্যবস্থার পথে যাত্রা শুরু করে। এ বিষয়ের ক্ষেত্রে কান্টের পাশাপাশি ফরাসি বিপ্লবও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি বিপ্লবের মূল কথা হলো- <strong>মানুষ</strong> <strong>তার</strong> <strong>পছন্দনীয়</strong> <strong>ও</strong> <strong>ইচ্ছাকৃত</strong> <strong>ব্যবস্থাকে</strong> <strong>নিজের</strong> <strong>মতো</strong> <strong>প্রতিষ্ঠা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>; </strong><strong>একইসাথে</strong> <strong>তা</strong> <strong>ব্যক্তিগত</strong> <strong>ও</strong> <strong>সামাজিক</strong> <strong>ক্ষেত্রেও</strong><strong>।</strong> পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সব-ই মানুষ তৈরি করছে, একই সাথে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তাও মানুষ তৈরি করেছে। কান্টের চিন্তার ভিত্তি হলো, যে নিজেকে চিনতে পারবে, সে নিজেকে চিনতে পারবে। জগতে যা কিছু আছে, তা মানুষ তার নিজের আকলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাই রব এখানে Out of subject অর্থাৎ এ সকল কিছুর বাইরে। তারা আকলের মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা (خلق) পরিবর্তন করে দিলো। আরেকটা হলো امر (পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা &#8211; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিজামে আলাম)-কে পরিবর্তন করলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীতে আরেকটি চিন্তা ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে উঠে, তা হলো- <strong>কান্টের</strong> <strong>আখলাকী</strong> <strong>অটনমি</strong> <strong>চিন্তা</strong><strong>।</strong></p>
<p>অটনমি শব্দটি এসেছে, nomos- অর্থ হলো বিধান। Autonomy অর্থ হলো, যে নিজের আইন নিজেই প্রণয়ন করতে পারে। সুতরাং আখলাকী অটনমি হলো, নিজের আখলাককে নিজেই তৈরি করার যোগ্যতা। অর্থাৎ মানুষ তার নিজের আখলাকী বিধানকে নিজেই প্রণয়ন করে। এই ক্ষেত্রে নিজের বিবেক-ই মূল। বিবেক সম্মতি দিলে সে যা ইচ্ছা করতে পারবে। ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে ভালো ও খারাপ নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে। এটাকে তিনি এই বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন- Volenti non fit injura, অর্থাৎ মানুষ তার নিজের ব্যাপারে নিজের ইচ্ছায় যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাকে জুলুম বলা যাবে না। এতে সে আত্মহত্যা বা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। তার সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানুষ তার নিজের উপর জুলুম করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে মানুষ তার নিজের সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাকে আখলাকী দিক থেকে ভুল বলে অভিহিত করা যাবে না।</p>
<p>কিন্তু কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষ নিজের উপর জুলুম করতে পারে, এবং তার নিজের সম্পর্কে অজ্ঞও হতে পারে। যার পরবর্তী ধাপ-ই হলো ইস্তিগনার চিন্তা অর্থাৎ মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করে। মানুষ যখনই তার নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করবে তখনই সে ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে।</p>
<blockquote><p>إن الإنسان ليطغى أن رآه استغنى</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অপর একটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়, রোমান্টিক তথা কল্পনাপ্রবণ আন্দোলন (Romantic Movement)। যার মূল কথা,</p>
<ul>
<li>মানুষ সকল কিছুকে তার নিজের মত বিনির্মাণ করতে পারে; আর এক্ষেত্রে কোন সীমারেখা নাই।</li>
<li>এ বিষয়ে হেগেলের একটি মৌলিক চিন্তা হলো, ‘স্রষ্টা আছে’। এখানে স্রষ্টা আছে এর অর্থ, মওজুদ আছে।</li>
</ul>
<p>আর যেহেতু মওজুদ (বিদ্যমান বিষয়) তাদের হাতে আছে, এজন্য আল্লাহ বা স্রষ্টার প্রয়োজন নাই। স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শুধু মওজুদের উপর ভিত্তি করে তারা সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। পরবর্তীতে হেগেল এই অন্টোলজির মাধ্যমে বা মওজুদিয়াতের উপর ভিত্তি করে সবকিছুকে দাঁড় করায়।</p>
<ul>
<li>স্রষ্টা নামক শব্দকে ব্যবহার না করেও “মওজুদ” নামক পরিভাষা উপর ভিত্তি করে সকল কিছুকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।</li>
<li>হেগেলের পরবর্তী সময়ে এমন একটি ধারণা প্রভাবশালী হয়ে উঠে, স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সমগ্র মওজুদাতকে বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা ও জ্ঞান উৎপাদন করা সম্ভব। [এরই মাধ্যমে হিস্টোরিক্যাল ম্যাটেরিয়ালিজমের বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের জন্ম হয়।]</li>
</ul>
<p>রোমান্টিক আন্দোলন (Romantic Movement)-এর অন্যতম একজন দার্শনিক শিলায়েমাখার (Schleiermacher) নামে একজন জার্মান দার্শনিক (মৃত্যুঃ ১৮৩৪ ) ছিলেন। যিনি একইসাথে একজন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ। তার মতে, মানুষ পরিপূর্ণভাবে তার রবকে ইহাতা বা পরিগ্রহ করতে পারবে না। তবে এর সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে মানুষ স্রষ্টা (মুতলাক বা absolute) সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে। পরবর্তীতে এই সকল অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে দ্বীনকে (ইনশা) বিনির্মাণ করতে পারে। এক্ষেত্রে এ দার্শনিক দু’টি বিষয় উল্লেখ করেন-</p>
<ul>
<li>অনুরূপভাবে স্রষ্টা সম্পর্কে তাসাউর (ধারণা), এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।</li>
<li>যেহেতু স্রষ্টাকে ইহাতা বা পরিগ্রহ করা যাবে না, এজন্য দ্বীনের ভিত্তি হলো ইর‍্যাশনাল বা অযৌক্তিক।</li>
</ul>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা মুসলমানদের দ্বীনকে হক্ব দ্বীন হিসেবে বিবেচনা করে না, কারণ এই দ্বীন আকলের সাথে অনেক বেশী সঙ্গতিপূর্ণ। যেহেতু এই দ্বীন আকল কর্তৃক গঠন করা সম্ভব। তাই এটা হক দ্বীন হতে পারে না। কারণ ইলাহ বা স্রষ্টাকে ইহাতা করা সম্ভব নয়। এজন্য সে পরবর্তীতে সেই মানুষ কর্তৃক একটি দ্বীন এবং ধর্মীয় ভাষা প্রবর্তিত হবে। শিলায়েমাখার এটাকে মানুষের তৈরি বলেন, যার ভিত্তি হলো যুক্তিহীন। এটা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এবং এ অভিজ্ঞতা যেহেতু একজন মানুষ করে, এটা কোন ভাষায় কীভাবে করেছে সেটা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না; একইসাথে এটাকে অবশ্যই যুক্তিহীন হতে হবে। এই সময় একটা বিষয় পরিলক্ষিত হয়, যে দ্বীন যত বেশি অযৌক্তিক হবে, সে দ্বীন তত বেশি হক দ্বীন বলে বিবেচিত হবে। যেমন- খ্রিস্টান ধর্মের যত অযৌক্তিক বিষয় আছে সকল অযৌক্তিক বিষয়কে সে এমন ভাবে সামনে নিয়ে আসছে যেন সেটাই একমাত্র হক্ব দ্বীন। এভাবে শিলায়েমাখার এর এই চিন্তার উপর ভিত্তি করে দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞানকে বিকশিত করা হয়।</p>
<p>এই শতাব্দীতে প্রভাবশালী আরেকটি বিষয় হলো, তারা ইসলামী জ্ঞান ও সভ্যতার দ্বারা উপকৃত হলেও নবুয়তকে গ্রহণ না করার কারণে ধীরে ধীরে নববী হিকমত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এতে তারা শুধু নিজেরাই নয় সমগ্র মানবতাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আধুনিক</strong> <strong>পাশ্চাত্যের</strong> <strong>মূলনীতিসমূহ</strong><strong>&#8211;</strong></p>
<p>পাশ্চাত্য চিন্তা বলতে শুধুমাত্র একটি বিষয় নয়; একইসাথে positivism, historicism, idealism, empiricism, rationalism, existentialism, constructivism, marxisim এই সবগুলো বিষয়ই পাশ্চাত্য চিন্তা। এ সকল বিষয়ের অভিন্ন বিষয়সমূহ আলোচনা করা যাক! এই সকল চিন্তাধারার অভিন্ন কিছু দিক রয়েছে।</p>
<ul>
<li><strong>প্রথম</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong><strong> (</strong><strong>স্রষ্টার</strong> <strong>পক্ষ</strong> <strong>থেকে</strong><strong>) </strong><strong>পরিত্যক্ত</strong> <strong>একটি</strong> <strong>জীব</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>এক্ষেত্রে পরিত্যাগের বিষয়টি দুইভাবে হতে পারে- একটি <strong>আধ্যাত্মিক</strong> এবং অপরটি <strong>জাগতিক</strong> দৃষ্টিকোণ থেকে। এখানে পরিত্যক্ত বিষয়টা হচ্ছে passive তথা নিষ্ক্রিয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; যাতে কর্তা নির্দিষ্ট না। তবে খ্রিস্টান ধর্ম অনুযায়ী মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক পরিত্যক্ত। খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীদের মতে, স্রষ্টা মানুষকে পরিত্যাগ করেছে। <em>জন</em> <em>পল</em> <em>সার্ত্রে</em> বলেন, মানুষকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই সে নিজের মত করে জীবন গঠন করতে বাধ্য অর্থাৎ সে আকলের ওপর নির্ভরশীল।</p>
<p>তবে খ্রিস্টান থিওলজিস্টদের মতে,</p>
<ul>
<li>মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক পরিত্যক্ত একটি জীব।</li>
<li>মানুষের একার পক্ষে তার আমল দ্বারা মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। Original sin বা আদিপাপের কারণে আধ্যাত্মিক বা জাগতিকভাবে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। এই জন্য স্বয়ং স্রষ্টাকে এসে এই অরিজিনাল সিন বা আদি পাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করার প্রয়োজন।</li>
<li>এক্ষেত্রে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুলুম, তারা একজন পয়গম্বরকে স্রষ্টা বানিয়েছে আবার ইলাহকে তার মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ত্রিত্ববাদ তথা পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।</li>
</ul>
<p>আবার, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর সময়কালে ডেইস্টরা (যারা নবুয়তকে অস্বীকার করে) বলে থাকে যে, আল্লাহ (স্রষ্টা) দুনিয়াকে সৃষ্টি করেছেন এবং এটাকে পরিচালনা করছেন। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ মানুষকে জাগতিক ভাবে পরিত্যাগ করেননি, একই ভাবে আধ্যাত্মিকভাবেও পরিত্যাগ করেননি। তিনি মানুষকে আকল দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে তারা জাগতিক বা ফিজিক্যাল দুনিয়াকে এবং মানুষের আধ্যাত্মিক জগতকে বিশ্লেষণ করে স্রষ্টা সন্তুষ্ট হবেন এমন একটি জীবন ধারা তৈরি করতে পারবে। এটা ইসলামী সভ্যতার প্রভাবে করলেও তারা এটা কখনো স্বীকার না করার কারণে মনে হত, তারা আকলের মাধ্যমে এটাকে খুঁজে পেয়েছে।</p>
<p>[তবে, এখানে মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহ যদি আধ্যাত্মিক বা জাগতিকভাবে পরিত্যাগ করেন তাহলে কি মানুষের টিকে থাকা সম্ভব? মোটেও সম্ভব না। বরং মহান আল্লাহ মানুষকে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রত্যেক যুগে যুগে নবী প্রেরণ করেছেন। শুধু তাই নয়, হযরত পয়গম্বর (স) এর মাধ্যমে বিশ্বজনীন সুন্নত তথা আল্লাহর রাসূলের ওফাত বা মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর সুন্নত বা সুন্নতের মাধ্যমে তিনি সবসময় আমাদের সাথে আছেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুন্নত ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ জাগতিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে পরিত্যাগ করেছেন এ কথাটা মোটেও ইসলামী চিন্তাধারার আলোকে সঠিক নয়। আমরা যদি পয়গম্বরদের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে পড়ি তাহলে আমরা বুঝতে পারবো এটা একটা বানোয়াট চিন্তাধারা। তবে উনবিংশ শতাব্দীর পরে এরকম কোন চিন্তা আর পরিলক্ষিত হয়নি।]</p>
<ul>
<li><strong>তাদের</strong> <strong>দ্বিতীয়</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষকে</strong> <strong>একাকী</strong> <strong>ছেড়ে</strong> <strong>দেয়া</strong> <strong>হয়েছে</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>যেমন ফিটশের মতে, কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হচ্ছে, সেই কাজ করার সক্ষমতা। আর সক্ষম হলে সেটা গ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়।মানুষকে যেহেতু একাকী ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাই তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।</p>
<p>লাগামহীন ভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তাঁদের সীমারেখা কে নির্ধারণ করবে? মানুষের সীমারেখা নির্ধারণ করবে অন্যরা। মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে তাহলে এই সমঝোতা সকল কিছুর মূলভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে। মূলত থমাস হবস, জন লক এবং জ্ জ্যাক রুশোর সোসাল কনট্রাক্টের ভিত্তি মাধ্যমেই এই মূলনীতির উৎপত্তি।</p>
<p>তাদের মতে, মানুষের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত-ই সঠিক। এ ক্ষেত্রে মুতলাক হাকীকত বা প্রকৃত সত্য বলতে কোনো বিষয় নেই। কারণ তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন, উদাহরণস্বরূপ সমকামিতা এবং মদকে বৈধকরণের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করতে পারি। [এ সকল কিছু তাদের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সঠিক। আজকে এটা সঠিক, কালকে এটা ভুলও হতে পারে। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধ্রুব সত্য বলতে কিছু নেই।] তাই তাদের নীতি &#8211; by the people, of the people, for the people. সার্বভৌমত্ব জনগণের, কথাটার উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এভাবেই তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার উৎপত্তি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ফলশ্রুতিতে আল্লাহ কিংবা কোন শক্তির সামনে তারা কোনো ধরণের জবাবদিহিতা করতে বাধ্য নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>পাশ্চাত্যের</strong> <strong>তৃতীয়</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>সময়</strong><strong>।</strong> <strong>সকল</strong> <strong>কিছুই</strong> <strong>সময়</strong> <strong>কর্তৃক</strong> <strong>নির্ধারিত</strong><strong>।</strong> এই ক্ষেত্রে কোরআনের এই আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য &#8211;</li>
</ul>
<blockquote><p>وَ قَالُوْا مَا هِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنْیَا نَمُوْتُ و نَحْیَا وَ مَا یُهْلِكُنَاۤ اِلَّا الدَّهْرُ-</p>
<p>অর্থাৎ, আমাদেরকে কোনো কিছুই ধ্বংস বা বিনাশ করতে পারবে না একমাত্র দাহর বা সময় ছাড়া।</p></blockquote>
<p>এখানে সময় বা যামান হলো, প্রদত্ত অবস্থা ও শর্তসমূহ। ফলশ্রুতিতে সত্য হলো, শর্তভিত্তিক বা অবস্থাভিত্তিক। অবস্থা ও শর্তের দাবী যা, সেটাই সঠিক। ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। মূলত Historicism তথা ঐতিহাসিকতাবাদ এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।</p>
<p>সময়ের সাথে এবং শর্তের সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি বিষয় হলো, মানুষের চাওয়া এবং দাবি। তাদের মতে, এটাও সঠিক। যেহেতু এটা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। যাকে নিহিলিজম (Nihilism) বলা হয়ে থাকে।</p>
<p>নিহিলিজম হলো- Universal law of ethics বা বিশ্বজনীন আখলাকী বিধান বলতে কিছু নেই। মূলত মানুষ তার চিন্তার আলোকে সকল কিছুর অর্থবহতা দান করে। অর্থাৎ বিশ্বজনীন কিছু নেই, যা আছে তা টার্ম (শর্ত) এবং কন্ডিশনের (অবস্থা) আলোকে পরিবর্তিত হতে পারে।</p>
<p>[হক এবং সঠিক এর মধ্যে পার্থক্য কী? হক হচ্ছে অপরিবর্তনীয়, ধ্রুব এবং কনস্ট্যান্ট। আর হকের পারিভাষিক অর্থ হলো, সকল অবস্থায় এবং সকল পরিবেশে যা সঠিক। তাদের মতে সঠিক হলো, টার্মস (শর্ত) এবং কন্ডিশন (অবস্থা)। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযীর মতে, মানুষের আকল যখন যে অবস্থায় থাকুক না কেনো, যেভাবে চিন্তা করুক না কেনো যে সময় এবং শর্ত যাই থাকুক না কেনো, সর্বাবস্থায় যা চিরন্তন বলে দাবি করে সেটা হক এবং হাকিকত। যা হক এবং সঠিকের মাঝে মৌলিক পার্থক্য।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>চতুর্থ</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>দ্বীন</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>তৈরি</strong><strong>।</strong></li>
</ul>
<p>শিলায়েমাখেরের মতে, মানুষ মুতলাককে ইহাতা করতে পারবে না। আর ক্ষেত্রে তিনি কান্টের চিন্তার সাথে সমন্বয় করে বিকশিত করেছেন।</p>
<p>তার মতে মানুষ মহাজগত ও প্রকৃতিকে নিয়ে গবেষণা করতে করতে এমন এক পর্যায়ে এসে উপনীত হয়, যেখানে সে সৃষ্টির সীমারেখাকে খুঁজে পায়। এটা আকলের সর্বোচ্চ চূড়া। আকল তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সে এমন এক সীমানায় এসে উপনীত হয় যেটা সে অতিক্রম করতে পারে না। এই অবস্থায় সে মুতলাকের মুখোমুখি হয়, আর যখন যে এই মুতলাকের অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন তার জীবনধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তবে মুতলাককে আকলের মাধ্যমে ইহাতা করে, পাশাপাশি তাকে বুঝে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না সে কারণে শুধুমাত্র সে নিজে সেই অভিজ্ঞতাকে লাভ করে৷ সেই বিষয়কেও ভাষায় প্রকার করার মত কোন ভাষা না থাকায় সে সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন একটি ভাষাকে তৈরি করে।</p>
<p>আর এটাকে দ্বীনি অভিজ্ঞতা (Religious Experience) এবং দ্বীনি ভাষা (Religious Language) বলা হয় । এটা মানুষের তৈরি, যা সে গবেষণা করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে আকল আর ইহাতা করতে পারে না। সে যা অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং সেটা মানুষের মাঝে প্রকাশ করে। যেহেতু এটা সে মানুষের সামনে তাদের ভাষায় তুলে ধরতে পারবে না, সে এটাকে অযৌক্তিকভাবে তুলে ধরবে।</p>
<p>আর এই সকল অভিজ্ঞতা ও ভাষা মানুষ কর্তৃক বর্ণিত হওয়ায় সেখান থেকে দ্বীন তৈরি হয়।ফলে দ্বীন হলো মানুষের তৈরি।</p>
<p>তাদের মতে, সবচেয়ে হাকীকী দ্বীন হলো এমন দ্বীন যেটা আকল কর্তৃক সাব্যস্ত নয়। যে দ্বীন আকল থেকে যতবেশী দূরে, সেটা ততবেশী হক। এই জন্য খ্রিস্টান ধর্ম হল হাকিকি দ্বীন।</p>
<p>তাদের এই চিন্তা মতে, বাতিল দ্বীন হলো, যে দ্বীনের সাথে আকলের কোনো সমস্যা নেই; অর্থাৎ, ইসলাম। এজন্য পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরা ইসলামকে মুতলাকের সাথে সম্পর্কিত দ্বীন হিসেবে দেখে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>পঞ্চম</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>সকল</strong> <strong>কিছুই</strong> <strong>সম্ভব</strong><strong>।</strong> এটাকে তারা Contingency বলে থাকে।</li>
</ul>
<p>Contingency এর অর্থ হলো, বর্তমানে যা কিছু মওজুদ (বিদ্যমান) আছে, সেগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে জীবন ধারাকে পরিচালনা করা। আমাদের কালামী ধারায় যে শ্রেণীবিন্যাস তথা <strong>ওয়াজিবুল</strong> <strong>উজুদ</strong> ও <strong>মুমকিনুল</strong> <strong>উজুদ</strong> আছে। <strong>ওয়াজিবুল</strong> <strong>উজুদ</strong> হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি হওয়া আমরা কল্পনা করতে পারি না। আর আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে সবকিছু <strong>মুমকিনুল</strong> <strong>উজুদ</strong>। তারা ওয়াজিবুল উজুদকে অস্বীকার করে। তাদের মতে গ্রহনযোগ্য হলো, মুমকিনুল উজুদ। যেমন &#8211; ঢাকা, আগে ছিলো না, এখন আছে। এর অর্থ এটার অস্তিত্ব বা উজুদ সম্ভবপর। যেমন &#8211; সংখ্যা, যা মানুষের যিহিনে থাকে। যদি যিহিন না থাকে, তাহলেও সংখ্যা হবে। সুতরাং যিহিনও মুমকিনুল উজুদ।</p>
<p>তাদের মতে, ওয়াজিবুল উজুদ<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a> আমাদেরকে মেটাফিজিক্সের দিকে ধাবিত করবে। তাই আমরা এই মওজুদকে পরিত্যাগ করেছি। এটা পাশ্চাত্য চিন্তার মৌলিক একটি বিষয়। ওয়াজিবুল উজুদ ইলাহী জ্ঞান হওয়ার কারণে এর প্রয়োজন নেই। পাশ্চাত্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেটাফিজিক্স পড়ানো হয় না।</p>
<p>তাদের মতে, ওয়াজিবুল উজুদ বা যারুরী, এটা মানতিকের (চিন্তা) সাথে সম্পর্কিত একটি ক্যাটাগরি, উজুদের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়। যা চিন্তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়। এর উপর ভিত্তি করে কোনো জ্ঞান দাঁড় করানো যাবে না। এজন্য তারা এটা গ্রহণ করে না। যেগুলো উজুদের সাথে সম্পর্কিত, অস্তিত্বের (ম্যাটেরিয়ালস্টিক) সাথে সম্পর্কিত সেগুলোর সাথে যারুরিয়্যাত বা আবশ্যিকতাকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। যেমন &#8211; ঢাকা আগে ছিলো না, এখন আছে।</p>
<p>কোনো কিছুর যারুরিয়্যাত আমরা শুধুমাত্র চিন্তা করতে পারি। অন্যথায় যেগুলো মওজুদ আছে, সেগুলার সাথে যারুরিয়্যাতকে সম্পৃক্ত করা যাবে না।</p>
<p>ফলে যা কিছু বাস্তবে আছে, সেগুলা থেকে নতুন নতুন জিনিশ তৈরি করা। আমাদের দুনিয়াতে মুমকিন উজুদ বা সম্ভাব্য সৃষ্টিগুলো সেগুলোকে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করে একটি জীবন ধারা পরিচালিত করতে পারি।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে আমাদের জন্য স্থায়ী অপরিবর্তনীয় কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। যাকে দার্শনিক ভাষায় বলা হয় post truth (হাকীকত পরবর্তী অবস্থা)। ফলে অপরিবর্তনীয় বা সাবিত বলতে কোনো মূলনীতিকে তারা গ্রহণ করে না।</p>
<p>[কন্টেনজেন্সি আজকে আছে, কালকে নাও থাকতে পারে। এই যে বিভিন্ন নতুন নতুন আবিষ্কার, সকল বিষয়ে পরিবর্তনশীলতা এবং এর উপর ভিত্তি করে যা ইচ্ছা তা করতে পারা; এ চিন্তা থেকে তারা আমাদের যে পতনের দিকে ধাবিত করছে, মানুষ বলতে যে জিনস, ইনসান বলতে যে প্রজাতি এই পৃথিবীতে আছে, তা মুমকিন উজুদ বা সম্ভাব্য সৃষ্টি৷ অর্থাৎ, মানুষ না থাকলেও কোনো সমস্যা নাই। তারা রোবটিক টেকনোলজির মাধ্যমে অথবা বায়োলজিকাল টেকনলোজির মাধ্যমে নারী-পুরুষ বা জিনস থাকবে না, এ ধরনের বা আরও উন্নত সৃষ্টি তৈরি করতে পারে। তাদের এখানে কন্টেনজেন্সি মূল বিষয়।</p>
<p>যে সভ্যতা পৃথিবী থেকে আশরাফুল মাখলুকাতের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে চায়; তাঁরাই মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু। যা তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রমাণিত। তারা মানুষকে হোমো-সেপিয়েন্স বা একটি প্রজাতি হিসেবে দেখে। যেমন – মানুষ বানর থেকে বিবর্তিত হয়েছে। মানুষ হলো বিবর্তনের সর্বোচ্চ চূড়া। তার নিচের সকল সৃষ্টি সেকেন্ডারি বা গৌণ সৃষ্টি। যা থাকা বা না থাকায় কিছু যায় আসে না। তাদের মতে, মানুষের চেয়ে উন্নত সৃষ্টি তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষের অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই। এই পৃথিবীতে মানুষ টিকে থাকবে কিনা এ দায়িত্ব মুসলমানদের। আমাদের আন্দোলন মানুষ রক্ষার আন্দোলন। মানুষ রক্ষা হলে ঈমান রক্ষা হবে। এই কারণে এটা বলা যায় যে পাশ্চাত্য সভ্যতা সমগ্র মানবতার শত্রু। কেননা সে মানুষকে তার অবস্থা থেকে সরানোর জন্য সকল প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<ul>
<li><strong>ষষ্ঠ</strong> <strong>মূলনীতি</strong> <strong>হলো</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong> <strong>নিজে</strong> <strong>নিজেই</strong> <strong>স্বয়ংসম্পূর্ণ</strong><strong>।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong><strong>, </strong><strong>মানুষ</strong> <strong>হলো</strong> <strong>মুসতাগনি</strong><strong>।</strong> সূরা আলাক্ব-এ বলা হয়েছে &#8211;</li>
</ul>
<blockquote><p>كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ-  أَن رَّآهُ اسْتَغْنَىٰ-</p></blockquote>
<p>মানুষ নিজেকে যখন মুসতাগনি হিসেবে দেখে, তখন সে তুগইয়ান তথা ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। সীমানাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। যখন এই অবস্থায় উপনীত হয় তখন কি হয়? ইন্না ইলা রাব্বিকা রুজয়া। মানুষ যখন নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে তখন সে ফাসাদ সৃষ্টি করে বা সীমালঙ্ঘন করে। তাই মানুষকে এই চিন্তা থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আগেই মুক্তির উপায় দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, রবের কাছে ফিরে আসতে হবে যেহেতু সীমালঙ্ঘন করেছে।</p>
<ul>
<li>মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন যেহেতু সে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারবে না। এই জন্য তাকে তার রবের কাছে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে।</li>
<li>মানুষ কেন মুসতাগনি নয়? মানুষ মানুষের মুখাপেক্ষী, প্রকৃতির মুখাপেক্ষী, একই ভাবে পয়গম্বর ও আল্লাহর প্রতিও মুখাপেক্ষী। যা আমাদের ভ্রাতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা মুসতাগনি নই। তখন নিজে মুসতাগনির চিন্তায় নিপতিত হবো না।</li>
<li>ইবাদত আমাদের ইহসানের এর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই ক্ষেত্রে যে উবুদিয়্যাত এটা হল মূলত মানুষ যে অমুখাপেক্ষী নয় এটার সর্বোচ্চ চূড়া এবং প্রতিটি ইবাদত বার বার আমাদেরকে এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমি মুসতাগনি নই।</li>
</ul>
<p>এর উপর ভিত্তি করে রিসালাত, আমানত এবং শাহাদাতের মিসাক এ বিষয়গুলোকে পরিপূর্ণভাবে পড়তে পারলে মুসতাগনি বা স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তাধারা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।</p>
<p><strong>আর</strong> <strong>সকল</strong> <strong>পরিবর্তন</strong> <strong>এবং</strong> <strong>পরিবর্ধনের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>একটা</strong> <strong>বিষয়</strong><strong>ই</strong> <strong>মানুষকে</strong> <strong>রক্ষা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>;</strong> <strong>তা</strong> <strong>হলো</strong> <strong>ইসলাম</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>মূল্যবোধ</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ ও সংকলনঃ </strong><a href="https://rowyakbd.com/author/burhan_uddin_azad/">বুরহান উদ্দিন আজাদ</a>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1">[1]</a> এই পরিভাষাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ইবনে সিনা। মহান আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টিজগতের সকল কিছুকে বুঝানোর জন্য এই পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।</p>
<p><a href="#_ftnref2" name="_ftn2">[2]</a> ওয়াজিবুল উজুদ ইসলামী দর্শন ও কালামে বহুল পরিচিত একটি পরিভাষা। এই পরিভাষার উদ্ভাবন করেন ইবনে সিনা। কালাম ও ইসলামী দর্শনে ওয়াজিবুল উজুদ বলতে আল্লাহ রাবুল আলামিনকে বুঝানো হয়ে থাকে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-foundations-of-western-thought-n-its-vanity/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15793</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:38:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15787</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায় জাতিসত্তা। বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। কেননা, এক জাতি চাপিয়ে দিতে চাইতে পারে, অন্য জাতির ওপর তাদের ভাষাকে। আর অন্য জাতি চাইতে পারে, এই চাপিয়ে দেয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে এর একাধিক নজির আছে।</p>
<p>ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সনের বিখ্যাত ভাষা জরিপ (Linguistic Survey of India, 1903-1928) থেকে দেখা যায়, ব্রিটিশ ভারতে তখন ভাষার সংখ্যা ছিল ১৭৯টি। আর উপভাষা বা ডায়ালেক্টের সংখ্যা ছিল ৫৪৪টি। সে সময়ে ভারতে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলত হিন্দি ভাষায়। হিন্দির পরেই স্থান ছিল বাংলা ভাষার। গ্রিয়ার্সন এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোকে প্রধানত চারটি বড় ভাষা পরিবারে বিভক্ত করেন। এরা হলো : দক্ষিণ এশীয় বা অস্ট্রিক (Austric), চীনা-তিব্বতি (Sino-Tibetan), দ্রাবিড় (Dravidian) ও ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার খুব বড়। গ্রিয়ার্সন একে এই উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তিনটি উপপরিবারে ভাগ করেন। এরা হলো ইরানীয় আর্য (Iranian-Aryan), ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryan), দরদ-আর্য (Dardic-Aryan)। তিনি বাংলা ও হিন্দি ভাষাকে স্থাপন করেন ভারতীয়-আর্য পরিবারে। বাংলা ভাষাকে গ্রিয়ার্সন যদিও হিন্দি ভাষার সাথে ভারতীয়-আর্য পরিবারে স্থাপন করেন, কিন্তু হিন্দির সাথে বাংলা ব্যাকরণের অমিল আছে অনেক। যেমন হিন্দিতে ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা যায় না, কিন্তু বাংলা ভাষায় যায়।</p>
<p><strong>এ দিক থেকে বাংলা ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায় দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষার সাথে। তামিল ভাষায় ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা চলে। দ্রাবিড় পরিবারের ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জোড়া লেগে নতুন ভাব প্রকাশকারী শব্দ গঠন। এ ক্ষেত্রে শব্দ দু’টি একত্রে মিলে যায় না। অর্থাৎ সন্ধি হয় না। এরকম জোড়ালাগা শব্দ বাংলা ভাষাতেও কিছু কিছু হতে দেখা যায়। যেমন, ছেলে এবং গুলি দু’টি পৃথক শব্দ। কিন্তু আমরা যখন বলি, ছেলেগুলি, তখন তা একটি তৃতীয় ভাবকে বোঝায়। এটাকে তুলনা করা চলে দ্রাবিড় পদ্ধতির সাথে। আমরা বাংলাতে ছেলেগুলি না বলে, বলতে পারি, ছেলেরা। এটা হলো আর্যভাষার পদ্ধতি। দ্রাবিড় ভাষায় থাকতে দেখা যায় ট ধ্বনির প্রাধান্য। বাংলা ভাষাতেও টি টা আমরা যথেষ্ট ব্যবহার করি। বাংলাদেশের পুরনো গ্রাম ও জনপদের নাম দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে অতীতে চলত দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই অভিমত প্রকাশ করেছেন তার বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা নামক বইতে। এমনিতে বস্তুগত সংস্কৃতির দিক থেকেও অনেক মিল আছে দ্রাবিড়ভাষী ও বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে। যেমন, দ্রাবিড়ভাষী মানুষ সিদ্ধ চালের ভাত খান। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত সিদ্ধ চালের ভাত খেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের মানুষ গ্রামে উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে থাকেন। তামিলভাষীরাও থাকেন একই রকম উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে। তামিলরা তরি-তরকারি কোটেন বঁটি দিয়ে। বাংলাদেশেও মানুষ একইভাবে বঁটির ব্যবহার করে। উত্তর ভারতের মানুষের মতো ছুরি দিয়ে তরি-তরকারি কাটেন না।</strong></p>
<p>এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৩৭ সালে প্রথম ভাষা নিয়ে রক্তপাত ঘটেছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। ১৯৩৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ-ভারতে ১১টি প্রদেশ ছিল। সে সময় প্রাদেশিক আইনসভার যে নির্বাচন হয়, তাতে ১১টি প্রদেশের মধ্যে আটটিতে কংগ্রেস জয় লাভ করে মন্ত্রিসভা গঠন করে। কংগ্রেস হাইকমান্ডের আদেশ অনুসারে এই আটটি প্রদেশে হিন্দি ভাষা স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়। মাদ্রাজ প্রদেশে তামিলভাষীরা করেন-এর প্রতিবাদ। তিন বছর ধরে চলেছিল প্রতিবাদ বিক্ষোভ। এ সময় একটি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ফলে নিহত হন দু’জন। এটাই এই উপমহাদেশে ভাষার কারণে প্রথম আত্মাহুতি দান। এটা ঘটেছিল ১৯৫২ সালে ঢাকায় গুলি চালাবার প্রায় ১৫ বছর আগে অখণ্ড ভারতে। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা আটটি প্রদেশেই ইস্তফা দেয়। কংগ্রেস ইস্তফা দেয়, কারণ সে চায় না ব্রিটিশ ভারতের সরকারের সাথে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সহযোগী হতে। কংগ্রেস সরকার মাদ্রাজে ইস্তফা দেয়ার পর, মাদ্রাজের গভর্নর জেনারেল Lord Erskine ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদ্রাজের স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো আইন রদ করেন। মাদ্রাজে যখন বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো শুরু হয়, তখন মাদ্রাজের আইনসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপাল আচারী। গুজব রটে, আচারী যেহেতু ব্রাহ্মণ, তাই তিনি চাচ্ছেন, সংস্কৃতবহুল হিন্দি ভাষা তামিলদের শেখাতে। আর সেই সঙ্গে চাচ্ছেন, তামিলভাষীরা ধীরে ধীরে ত্যাগ করুক তাদের মাতৃভাষাকে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে উদ্ভব হয় ব্রাহ্মণবিরোধী দ্রাবিড় মুনাত্রা কাজাগাম নামক দলের, যা পরে মাদ্রাজের রাজনীতিতে হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক দল। এ সময় তামিলভাষী মুসলমানেরা যোগ দিয়েছিলেন হিন্দিবিরোধী আন্দোলনে।</p>
<p>অন্য দিকে, যেসব মুসলিম পরিবারে উর্দু ভাষা চলত, তারা নেন হিন্দি ভাষার পক্ষ। ১৯৬৫ সালে ভারতের কংগ্রেস সরকার চায় হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করতে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে (বর্তমান নাম তামিলনাড়–) দেখা দেয় প্রচণ্ড হিন্দিবিরোধ বিক্ষোভ। একটি মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ৬৮ জন। জঙ্গি-জনতা পুলিশকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ চালায়। যার ফলে দু’জন পুলিশের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী এ সময় ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, হিন্দিকে এখনোই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে না। ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। শাস্ত্রী মারা যান ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে। তার মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী হন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট আইন পাস করে, হিন্দির সাথে ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, পাকিস্তান হয়েছিল বলেই সৃষ্টি হতে পারে ভাষা সমস্যার। কিন্তু স্বাধীন ভারতেও দেখা দিয়েছে ভাষার সমস্যা। আরেকটি দৃষ্টান্ত নেয়া যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব ছিল একটা বিরাট প্রদেশ। ১৯৪৭ সালে বাংলার মতো পাঞ্জাব প্রদেশকেও ভাগ করা হয়। পাঞ্জাবের পশ্চিম ভাগ পড়ে পাকিস্তানে আর পূর্বভাগ পড়ে ভারতে। পাঞ্জাবের যে অংশ ভারতে পড়ে, তাতে শিখ পাঞ্জাবিরা চায় পাঞ্জাবিকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করতে। কিন্তু হিন্দু পাঞ্জাবিরা তাতে রাজি হয় না। শিখদের এই আন্দোলন ১০ বছর চলার পর ১৯৬৬ সালের ১ নভেম্বর পূর্ব পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে দু’টি প্রদেশ করা হয়। উত্তর ভাগ হয় পাঞ্জাবি সুবা আর দক্ষিণ ভাগ হয় হরিয়ানা প্রদেশ। উত্তর ভাগের প্রাদেশিক সরকারের সরকারি ভাষা হয় গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা। আর হরিয়ানা প্রদেশের সরকারের প্রাদেশিক ভাষা হয় দেবনাগরী অক্ষরে লেখা হিন্দি ভাষা। পরে শিখরা চান স্বাধীন হতে। ইন্দিরা গান্ধী কঠোর হস্তে শিখ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করেন। এতে শিখরা হয়ে ওঠেন খুবই ক্ষুব্ধ। দু’জন শিখ দেহরক্ষী ইন্দিরা গান্ধীকে তার সরকারি ভবনের প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করেন (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪)। দিল্লিতে বাধে হিন্দু শিখ দাঙ্গা। দিল্লির শিখরা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর সাথে জড়িত ছিলেন না। তারা দাঙ্গার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন না। এই দাঙ্গায় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মারা যান প্রায় চার হাজার শিখ।</strong></p>
<p>ভারতে ভাষা সমস্যা ছিল এবং আছে। কেউ বলতে পারে না, আবার তা প্রবল হয়ে উঠবে কি না। সাবেক পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছে অনেকের মতে ভাষার দ্বন্দ্বের কারণে। কিন্তু সাবেক পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন একটা ব্যর্থ আন্দোলন ছিল না। উর্দুর সাথে বাংলা পেতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। কিন্তু ভারতে হিন্দির সাথে ইংরেজিকে রাখা হয়েছে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। কোনো ভারতীয় ভাষাকে করা হয়নি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের জন্য হিন্দির সাথে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এখানে থেকে গেছে একটা বড় রকমের ফাঁক।</p>
<p>এসব কথা মনে আসছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যা এখন পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলে কিছু কি কোথাও আছে, না হতে পারে? যেমন কোথাও নেই আন্তর্জাতিক দেশপ্রেমের অস্তিত্ব। আসলে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে সে সম্পর্কে ইউনেসকো কিছু বলেনি। ইউনেসকো বলেনি ভারতে ভাষা নিয়ে সঙ্ঘাত ঘটার কথা। সে কেবলই বলেছে পাকিস্তানে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ভাষার জন্য মানুষের শাহাদত বরণের কথা। যেটা আমার কাছে মনে হয় একদেশদর্শী এবং ইতিহাস না জানার ফল।<br />
আমাদের দেশে আমরা করেছিলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। আমাদের আন্দোলন ছিল না মাতৃভাষার আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর মাতৃভাষা আন্দোলন সমার্থক নয়। কিন্তু এখন যেন সেটাই করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ১৯৫২ সালের পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট জটিল। উর্দু বনাম বাংলা তখন সরাসরি উচ্চারিত হয়নি। খাজা নাজিমুদ্দিন জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন ঢাকায়। কিন্তু তার পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু তার মাতৃভাষা বাংলা ছিল না, ছিল উর্দু। ঢাকায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চলেছিল গুলি। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২৪ ফেব্রুয়ারিতে তদানীন্তন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে অবস্থিত হায়দ্রাবাদ শহরের এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে উর্দুই হওয়া উচিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব বাংলায় অনেক মানুষ ছিলেন উর্দুর পক্ষে। তবে অধিকাংশ মানুষই চেয়েছিলেন উর্দুর সাথে বাংলাকে করা হোক অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। তাই আন্দোলনের আওয়াজ ছিল উর্দু বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর সাথে বাংলা চাই।</p>
<p><strong>এখন এই ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। পাঠ্যবইতে যা লেখা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, মানুষ যেন হয়ে উঠেছিল উর্দুবিরোধী। সমগ্র পাকিস্তানের মানুষের ওপর পূর্ব বাংলার মানুষ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল বাংলা ভাষার কর্তৃত্ব। কিন্তু ১৯৫২ সালে এই মনোভাব বিরাজ করছিল না।</strong><br />
<strong>ভাষাসৈনিক বলতে ঠিক যা বোঝায়, আমি তা ছিলাম না। তবে এ সময় আমি ছিলাম ছাত্র। ছাত্ররা করেছিল ভাষা আন্দোলন। তাই সে সময়ের মনোভাব সম্পর্কে আমি নিশ্চয় কিছু বলার অধিকার রাখি। যারা ভাষাসৈনিক হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকের সাথে ছিল আমার পরিচয়। যেমন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (শেলী), এস এ বারী এটি, মুহাম্মদ সুলতান, লতিফ চৌধুরী, সাদেক খান প্রমুখ। হাবিবুর রহমান, এটি বারী, সুলতান- এদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম রাজশাহী সরকারি কলেজে। এরা তিনজনই পড়তেন রাজশাহী কলেজে। পরে এরা যান ঢাকায় এমএ পড়তে। লতিফ চৌধুরী এবং সাদেক খান ছিল আমার স্কুলজীবনের সাথী। এদের পিতারা ছিলেন একসময় রাজশাহীতে চাকরি উপলক্ষে। লতিফ চৌধুরীর কথা এখন অনেকেই জানেন না। ইনি ছিলেন খুবই ভালো ছাত্র। ইনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক হন। এরপর কোনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি পেয়ে চলে যান সে দেশে। ইনি বাংলা ভাষা আন্দোলনে জেল খাটেন। লতিফ চৌধুরী ও সাদেক খান উভয়েই ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাদেক খানও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। কিন্তু রাজনীতি করতে গিয়ে ছাড়েন পড়াশোনা। গ্রহণ করেন সাংবাদিকের বৃত্তি।</strong></p>
<p>যেসব ভাষাসৈনিককে চিনতাম, তাদের মধ্যে হাবিবুর রহমানই হলেন সবচেয়ে খ্যাতনামা। ইনিও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। জীবনের সব পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ইনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কেবল ভাষা নিয়ে রাজনীতি করেননি। করেছেন বাংলা ভাষার চর্চা। সঙ্কলন করেছেন বাংলা ভাষার প্রথম ভাব অভিধান, যথাশব্দ। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঠিক হয়েছিল ছাত্ররা আমতলা থেকে তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের গেট দিয়ে ১০ জন ১০ জন করে স্কোয়াড করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। প্রথম স্কয়াডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান শেলী। আমি তখন ঢাকায় না থাকলেও পরে অনেকের কাছেই অনেক কিছু শুনেছিলাম। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কিন্তু যারা শাহাদত বরণ করেছিলেন, তারা কেউই ছিলেন না ছাত্র মিছিলে। তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। গুলি লেগেছিল তাদের গায়ে। তবে তাদের মৃত্যু বৃথা যায়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিণত হয় বিরাট গণ-আন্দোলনে। আর এই গণ-আন্দোলন কোনো ভাষাসৈনিকের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। আন্দোলন হয়ে উঠেছিল স্বয়ং চালিত। হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল সারা দেশে পথে। আমি জীবনে অনেক আন্দোলন দেখেছি। কিন্তু এত বিরাট আন্দোলন আর প্রত্যক্ষ করিনি ইতঃপূর্বে। এই আন্দোলন গৌরব করারই মতো।<br />
কিন্তু সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্র আজ আর নেই। এখন বাংলাদেশ একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলা ভাষার উন্নয়নে আর কোনো রাষ্ট্র প্রতিবন্ধক হতে পারে না। এখন যা প্রয়োজন, তা হলো, কেবল ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের নিজের প্রচেষ্টা। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিকতাবাদী বুদ্ধিজীবীর অভাব নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিকতাবাদ যেন চাপা পড়ে যেতে চাচ্ছে জাতীয়তাবাদের নিচে। আমরা চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি ১৫টি রিপাবলিক নিয়ে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে পড়তে। দুনিয়ার সর্বহারারা এক হতে পারল না। প্রতিটি জাতি যেন এখন পৃথক পৃথকভাবে বাঁচতে চাচ্ছে। পৃথক পৃথকভাবে যেন হতে চাচ্ছে সুখী ও সমৃদ্ধ। এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদেরও হতে হবে স্বাবলম্বী।</p>
<p><em>এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিতে অনেককে অনেক কথা বলতে শুনলাম, যা আমাকে বিস্মিত করেছে। যেমন বলতে শুনলাম, আমাদের উচিত হবে না বিদেশী ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ। অথচ চীনারা তাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রচুর গ্রহণ করছেন; তাদের ভাষাকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। ইংরেজি ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে প্রচুর বিদেশী শব্দকে আপন করে নিতে পারার কারণে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা এ দেশে এসে কথা বলতে শুরু করেন মিশ্র ভাষায়। যাকে বলা হতো Hobson-Jobson। এই হবসন-জবসন ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় গৃহীত হয়েছে প্রচুর শব্দ। একটি হিসাব অনুসারে প্রায় ৭০০ এর কাছাকাছি, যা ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা যদি ইংরেজি ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করি, তবে বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারও বাড়বে। বাড়বে ভাব প্রকাশের শক্তি। </em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15787</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম দার্শনিকদের দৃষ্টিতে ইতিহাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/history-from-the-pov-of-muslim-philosophers/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/history-from-the-pov-of-muslim-philosophers/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[বুরহান উদ্দিন আজাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 04 Apr 2025 15:26:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15688</guid>

					<description><![CDATA[মহাগ্রন্থ আল-কোরআন যে সকল মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে, ইতিহাস তার মধ্যে অন্যতম। এই অর্থে কোরআনের মৌলিক বিষয় সমূহের একটি হল ‘ইতিহাস’।মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ইতিহাসের কোন বই না হওয়া সত্ত্বেও এর দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ শুরু]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহাগ্রন্থ আল-কোরআন যে সকল মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে, ইতিহাস তার মধ্যে অন্যতম। এই অর্থে কোরআনের মৌলিক বিষয় সমূহের একটি হল ‘ইতিহাস’।<br class="html-br" /><br class="html-br" />মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ইতিহাসের কোন বই না হওয়া সত্ত্বেও এর দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ শুরু থেকেই ইতিহাসের ব্যাপারে জোর দিয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে মুসলিমগণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে পাঠ করেছেন ও বিশ্লেষণ করেছেন। আর সেটা হল, তারা ইতিহাসকে দেখেছেন &#8216;ইবরাত&#8217; হিসেবে।<br class="html-br" /><br class="html-br" />এই কারণে মুসলিম চিন্তাবিদগণ &#8216;তারিখ (ইতিহাস)&#8217; ও &#8216;ইবরাত&#8217; নামক পরিভাষাদ্বয় একত্রে ব্যবহার করেছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />যেমন ইবনে খালদুন তাঁর লেখা ইতিহাস গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, &#8216; কিতাবুল ইবার&#8217; তথা ইবরাতের গ্রন্থ। কেননা, ইবরাত (عبرة) হল; মহাবিশ্ব নিয়ে এবং একই সাথে আল্লাহ তার এই সৃষ্টির উপর যে বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো নিয়ে এবং সর্বোপরি সুন্নাতুল্লাহ নিয়ে চিন্তা করা। কঠিন অভিজ্ঞতা সমূহকে আকল দিয়ে চিন্তা (তাফাক্কুর) করে দূরদৃষ্টি দিয়ে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ খুঁজে বের করা।<br class="html-br" /><br class="html-br" />ইবরাত (عبرة) এর শাব্দিক অর্থ, ঘটনা সমূহের কারণ এবং ফলাফলের উপরে দূরদৃষ্টি দেওয়া, গভীর ভাবে চিন্তা করা এবং দেখা থেকে শিক্ষা খুঁজে বের করা। মূলত ইবরাত (عبرة) হল; শব্দবিহীন এবং উচ্চারণবিহীন ইলাহী একটি ওয়াজ।<br class="html-br" /><br class="html-br" />একই ভাবে ধর্মের ইতিহাসবিদ নামে খ্যাতি অর্জনকারী প্রখ্যাত শাহরাস্তানী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ , &#8216; মিলাল ওয়ান নিহাল&#8217; কেও একই দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন ধর্ম, মাজহাব ও চিন্তাগত ধারাসমূহকে নিয়ে আলোচনা করেছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" />এই সকল বিষয়কে নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, &#8216;যারা চিন্তা করতে পারে তাঁদের জন্য শিক্ষা (ইবরাত) আর যারা শিক্ষা নিতে পারে তাঁদের জন্য চিন্তার উসিলা হয়&#8217;।<br class="html-br" /><br class="html-br" />অনুরূপভাবে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর সময়কালের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উসামা ইবনে মুনকিযও তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, &#8216;কিতাবুল ই&#8217;তিবার&#8217;। এই গ্রন্থেও ইতিহাসকে তিনি ইতিবারের সিলসিলা হিসেবে দেখেছেন ও দেখিয়েছেন।<br class="html-br" /><br class="html-br" /><strong>ইতিহাসকে পাঠ করার ক্ষেত্রে মুসলিম ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদগণের &#8216;ইতিবারমূলক&#8217; এই দৃষ্টিভঙ্গীকে যদি সামনে রাখি তাহলে দেখতে পাই যে, ইতিহাসকে তারা অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহের বিস্তারিত বিবরণকে তুলে ধরার জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি। কিংবা তারা অতীত বিতর্ককে উস্কে দেওয়ার জন্যও ইতিহাস রচনা করেননি।</strong><br class="html-br" /><br class="html-br" />বরঞ্চ তারা ইতিহাস রচনা করেছেন,</p>
<ul>
<li>১। এমন একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যা আমাদেরকে এমন এক চেতনার প্রদীপ দান করবে যেটার উপর ভিত্তি করে আমরা সঠিকভাবে আমাদের দুনিয়াবী অভিযাত্রাকে পরিসমাপ্ত করতে পারব।</li>
<li>২। ইতিহাস শুধুমাত্র অতীত ঘটনা প্রবাহের সমষ্টি নয় বরং ইতিহাস হল এমন একটি গতিশীল প্রক্রিয়ার নাম যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গীর (তাসাউউর) &#8211; সাথে প্রতি মুহূর্তে জীবন্ত থাকে।</li>
<li>৩। ইতিহাস সময়ের কোলে অবস্থান করলেও সময়ের উর্দ্ধে উঠে শাশ্বত একটি বিশ্বাস, মূলনীতি ও মূলবোধের প্রতিফলন করে থাকে।</li>
</ul>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/history-from-the-pov-of-muslim-philosophers/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15688</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মক্কা বিজয়; হাল আমলের প্রেক্ষিতে রাসূলের (সা.) বিজয়ী ভাষণের গুরুত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-conquest-of-mecca-the-importance-of-the-prophets-victory-speech-in-the-context-of-modern-times/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-conquest-of-mecca-the-importance-of-the-prophets-victory-speech-in-the-context-of-modern-times/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 22 Mar 2025 14:18:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15676</guid>

					<description><![CDATA[০১. সারাটা জীবন রাসূলের সীরাত পড়ার পরেও আমরা রাসূল (সা.)-কে কতটুকু চিনতে পেরেছি, সেটা বিরাট একটা প্রশ্ন আমাদের সামনে। বেশ আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিবেচনার বিষয়ও বটে। তারচেয়েও বড় কথা, রাসূলের জীবনীকে আমরা কেনো যেনো সেই ১৪০০ বছর পূর্বের ঘটনাবলি হিসেবে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4>০১.</h4>
<p>সারাটা জীবন রাসূলের সীরাত পড়ার পরেও আমরা রাসূল (সা.)-কে কতটুকু চিনতে পেরেছি, সেটা বিরাট একটা প্রশ্ন আমাদের সামনে। বেশ আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিবেচনার বিষয়ও বটে।</p>
<p>তারচেয়েও বড় কথা, রাসূলের জীবনীকে আমরা কেনো যেনো সেই ১৪০০ বছর পূর্বের ঘটনাবলি হিসেবে বিবেচনা করেই ক্ষান্ত হই। দুঃখের বিষয় হলো, রাসূলের সীরাত বর্তমান সময়ের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত আর সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়টা নিয়ে আমাদের মাঝে কোনোপ্রকার আলাপ হয় না বললেই চলে।</p>
<p>আমাদের দেশের একটা রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশই রাসূলের সীরাত পড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে। তাই, রাসূলের সীরাতটা পড়া থাকলেও রাসূলের জীবনকে সেই সময়ের আলোকেই বুঝি আমরা; বর্তমানের সাথে খুব একটা সম্পৃক্ত করতে পারি না।</p>
<p>রাসূলের মাক্কী জীবন, মাদানী জীবন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক মূলনীতি, কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক ব্যবস্থাপনা বা দৈনন্দিন জীবনাচরণ—এসব বিষয় যে সামগ্রিক, এগুলো যে আমাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত একেকটা বিষয় আর এই বিষয়গুলো যে কেয়ামতাব্দি উসূল হিসেবে আমাদের সামনে সংরক্ষিত থাকবে, এই বুঝটা যেনো আমাদের মাঝে পয়দাই হয় না।</p>
<p>রাসূলের জীবনকে শুধু নস্টালজিক ইতিহাসের পাতাতেই রাখতে পছন্দ করি আমরা। রাসূলের দুঃখী সময়কে স্মরণ করে ওয়াজের ময়দানে বেদনা-বিধুর সেসব বয়ান শুনে কান্নাকাটি করি। কিন্তু, শিক্ষা নেওয়ার সময় আমাদের উপলব্ধির আকলটা কেনো যেনো অকার্যকর হয়ে যায় তখন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>০২.</strong></h4>
<p>কথাগুলো বলার কারণ হলো, আজ ২০ রমজান, মক্কা বিজয় দিবস।<br />
তবে ইংরেজি তারিখ নিয়ে একটু মতভেদ আছে। হয় ৩১ ডিসেম্বর রাসূল (সা.) মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্য মদীনা হতে রওয়ানা দিয়ে ১১ জানুয়ারি মক্কায় বিজয় করেছিলেন। অথবা, সে তারিখেরও ১১দিন পূর্বে রওয়ানা দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর রাসূল (সা.) মক্কায় পৌঁছেছিলেন।</p>
<p>সে যাই হোক, রাসূলের (সা.) মক্কা বিজয়টা রাসূলের (সা.) জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটা বিজয় বললেও ভুল হবে না। রক্তপাতহীন সুমহান সেই বিজয়টা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য এক স্থান দখল করে আছে। শুধু অনন্য নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে এমন রক্তপাতহীন বিজয় আর দ্বিতীয়টি নেই।</p>
<p>আজকের কথিত এই আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার বর্তমান শাসনপদ্ধতিতে ট্রিটি অব ওয়েস্টফেলিয়াকে আধুনিক শান্তি ও নিরাপত্তার ম্যাগনাম ওপাস হিসেবে অভিহিত করা হয়। অথচ, মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.) যে শান্তি ও নিরাপত্তার বিধান ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং যে মডেল উপস্থাপন করেছিলেন, তা সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এবং এক ও অদ্বিতীয়।</p>
<p>যে ভূমি থেকেই রাসূল (সা.)-কে বিতাড়িত করা হয়েছিলো, সেই অঞ্চলটাই তিনি বিজয় করলেন—মাত্র এক দশকের মাথায়; তাও আবার কোনো প্রকার যু্দ্ধ ও রক্তপাত ছাড়াই, একেবারে নির্বিঘ্নে।</p>
<p>হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সাহাবীরা মক্কা গমনের যে সুযোগটা পেয়েছিলেন, সেই সুযোগেই পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়েছিলো মুসলিমদের আখলাকী সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক নান্দনিকতা। নচেৎ মাত্র কয়েক বছরের মাথায় হু-হু করে বহু-সংখ্যক আরব ও অনারব ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতো না।</p>
<p>এখানে সংস্কৃতির বিষয়টা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।<br />
মক্কা বিজয়ের পেছনে যে সাংস্কৃতিক একটা প্রভাবও বিদ্যমান ছিলো, এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু, এই বিষয়টা বরাবরই আমাদের পর্যালোচনার আড়ালে থেকে যায়। এর পেছনে হয়তো সংস্কৃতির সংজ্ঞায়নটাই বড় একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সংস্কৃতিকে আমরা শুধুমাত্র বিনোদন আর নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।</p>
<p>সান জু-র আর্ট অব ওয়ার থেকে শুরু করে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হয়ে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা, যে সময়ই হোক না কেনো, কোনো অঞ্চল বিজয়ের ক্ষেত্রে একটা সুপ্রসিদ্ধ দর্শন হচ্ছে, কেউ যদি কোনো অঞ্চলকে বিনা যুদ্ধে জয় করতে চায়, তাহলে সেই অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির চেয়ে সেই বিজেতাদের সংস্কৃতিকে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। ফলাফলস্বরূপ, মাত্র কয়েকবছরের মাথায় সেই অঞ্চলের অধীবাসীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবেই পরাজিত হয়ে পড়বে; এবং তখন অতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের উপর করায়ত্ত করা সম্ভব হবে।</p>
<p>কারণ, সাংস্কৃতিক দিক থেকে কেউ অনুগত হলে তাকে জয় করা খুবই সহজ হয়ে পড়ে। আর সংস্কৃতি আমাদের জীবনাচরণে কতোটা প্রভাব ফেলে, তা একজন আকলবান ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে পারবেন। তাহলে মনে হয়, এটা বললে খুব একটা ভুল হবে না যে, সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে যেকোনো রাজনৈতিক বিপ্লবের পূর্বশর্ত বলা যায়।</p>
<p>এসব দিক বিবেচনায় মাত্র চার বছরের মাথায় মক্কার মতো একটি অঞ্চলকে বিজয় করা, তাও আবার বিনা যুদ্ধে ও বিনা রক্তপাতে, এখানে আসলে আখলাকী আর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণকে কখনই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>০৩.</strong></h4>
<p>মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে রাসূলের দেওয়া সেই ভাষণের কয়েকটা পয়েন্ট তুলে ধরা যাক,</p>
<ul>
<li>ক. নিজ ঘরে থাকলে নিরাপদ;</li>
<li>খ. আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকলে নিরাপদ:</li>
<li>গ. অস্ত্র ত্যাগ করলে নিরাপদ;</li>
<li>ঘ. পশু হত্যা করা যাবে না;</li>
<li>ঙ. গাছপালা, ঘাস কাটা যাবে না;</li>
<li>চ. সকল জাত্যাভিমান বাতিল করা হলো;</li>
<li>ছ. মক্কাকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হলো;</li>
<li>জ. মক্কার সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো।</li>
</ul>
<p>এখান থেকে কয়েকটা নির্দেশ নিয়ে বর্তমানের আলোকে পর্যালোচনা করা যাক।</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong><br />
দীর্ঘ তেরোটা বছরের অত্যাচার, নির্যাতন, বন্দিত্ব; আবার বদর, উহুদ, খন্দক-এর পরেও রাসূল (সা.) একেবারে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন; শুধু হাতেগোনা কয়েকজন বাদ দিয়ে। ইসলামের বিশেষত্বটা ঠিক এখানেই।</p>
<p>বিষয়গুলোকে এখন একটু আধুনিক সময়ে কনভার্ট করা যাক!<br />
আমাদের প্রযুক্তির এই সময়ে সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বুঝি!? তার কতটুকু আমাদের মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে? আমরা যদি কোথাও পাশ্চাত্যের বিপরীতে ইসলামকে দাঁড় করাইতে চাই, তাহলে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা কতটুকু আছে আমাদের!?<br />
এরপর না-হয় আমরা সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবো বা ক্ষমা করার সেই বিষয়টা আমাদের সামনে আসবে। পুরো দুনিয়ায় এতোগুলো মুসলিম দেশ থাকার পরেও গাজায় এক বোতল পানি পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারি না আমরা, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিকভাবে সবাইকে নিরাপদ ঘোষণাই করবোই বা কখন?</p>
<p>তবে আবার, সে যুগের সাধারণ ক্ষমা আর বর্তমানের সাধারণ ক্ষমার ধরন কস্মিনকালেও যে এক হবে না, এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। সবার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, ট্যাক্স নিয়ন্ত্রণ, মারহামাতপূর্ণ বিচারব্যবস্থা, আদালতপূর্ণ অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ ইত্যাদির মাঝেই রাসূলের সাধারণ ক্ষমার মর্মার্থ বিদ্যমান। অন্তত উপরের আটটা পয়েন্টের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যথার্থ ব্যাখ্যা এমনটা না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।</p>
<p>তাই, মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে এতোবছরের নির্যাতন, নিপীড়ন ও অত্যাচার সহ্য করেও রাসূলের ক্ষমা করার বিষয়টা আমাদের স্বতন্ত্র গবেষণার দাবি রাখে।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong><br />
মানুষের জানের নিরাপত্তা দেওয়ার পর, রাসূল দিলেন মানুষের মালের নিরাপত্তা। আবার নির্দেশ দিলেন রবের দেওয়া প্রাকৃতিক নেয়ামতগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্বের ঘোষণা; অর্থাৎ, রাসূল দিলেন গাছপালা ও পশুপাখির নিরাপত্তা।</p>
<p>এই বিষয়গুলোকেও এবার বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দেখা যাক।<br />
আমরা মুসলিমরাই কতটুকু স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চায়ন করতে পারছি? আবার পরিবেশবাদী আন্দোলন যেগুলো রয়েছে বর্তমান বিশ্বে, তার কতগুলো সংস্থাই বা মূলত পরিবেশ সংরক্ষণের জন্যই কাজ করে যাচ্ছে?</p>
<p>আবার খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়টাও আমাদের বিবেচনা করা প্রয়োজন!<br />
আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা কতটুকু নিরাপদ? মধ্যস্বত্বভোগী লোকদের জন্য কৃষক তার ন্যায্য মূল্য পায় না, দরিদ্ররা খাবার ক্রয় করতে পারে না আর বর্গাচাষীরা একবেলা পেটপুরে খাবারের চিন্তায় দিনাতিপাত করে। বিষয়গুলোকে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা আর সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে পড়ে না!?</p>
<p>এবার একটু বীজ ব্যবস্থাপনার দিকে খেয়াল করেন তো!<br />
কয়েক বছর আগেও তো খাদ্যে এতো বিষ আর ভেজাল ছিলো না। ক্ষেতে ক্ষেতে এতোটা পোকা মাকড়ের উপদ্রব ছিলো না। শুধু এক জৈবসার ব্যবহার করেই যে পরিমাণ নিরাপদ খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হতো, তা দিয়ে মানুষের সময়টা এমনেই পার হয়ে যেতো।</p>
<p>কিন্তু, প্রশ্ন হলো, তার কতটুকু এখন হয়? মানুষ কেন আজ ৫০-এ পা রাখলেই বুড়িয়ে যেতে থাকে? ৪০-এ পা দিতেই কেন মানুষের হাড়-গোড়ে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে? যুবকদের শারীরিক অবস্থার আজ এতো অবনতি কেন? একজন যুবককে কেন লো-প্রেশার নিয়ে চলাফেরা করতে হয়? এগুলোর পেছনে কি খাদ্য ব্যবস্থাপনা দায়ী নয়?<br />
এগুলো কি রাসূলের বলা প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ সময়োপযোগী আধুনিক বিষয় নয়?</p>
<p>চোখের উপর থেকে অদৃশ্য পর্দাটা একটু সরালেই দেখা যায়, যারাই বীজ উৎপাদন করছে, তারাই আবার বীজের প্রতিষেধক তৈরি করছে। অতএব, এতোটুকু বুঝতে আর দেরি হয় না যে, বীজে বিষ মেশানোটা পরিকল্পিত একটা প্রজেক্ট। হেনরি কিসিঞ্জারের কথাটাই না-হয় তুলে ধরি,<br />
❝তেল নিয়ন্ত্রণ করলে আপনি দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আপনাকে বীজ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।❞</p>
<p>আরেকটু গভীরে গেলে আমাদের এটাও বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, এসব কিছুর মূল হোতা হাতেগোনা কয়েকজনই। আমেরিকার রকফেলার পরিবার, ইংল্যান্ডের রথাচাইল্ড পরিবার আর ইতালির এগনেল্লি পরিবার। রাজনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি আর হলিউডি নোংরা সংস্কৃতির পেছনে তাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong><br />
রাসূল (সা.) শস্যের পাশাপাশি দিলেন পশুপাখির নিরাপত্তা।<br />
কিন্তু আজকের ডেইরি ফার্মগুলোর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। গাভীর দুধগুলো মেশিনের সাহায্যে একপ্রকার জোর করে দুধ দোহন করা হয়। বাছুরগুলো তাদের প্রধান খাদ্য মায়ের দুধ পর্যাপ্তভাবে পায় না। অথচ, রাসূলের সুস্পষ্ট বিধান আছে যে, মা পশুকে কষ্ট দিয়ে এবং বাচ্চাকে ক্ষুধার্ত রেখে দুধ দোহন করা যাবে না। মুরগির ফার্মগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।</p>
<p>আবার, প্রাণীদেরকে নিয়ে নিষ্ঠুর আর অমানবিক সব এক্সপেরিমেন্ট থেকে শুরু করে মানুষকে পর্যন্ত গিনিপিগ বানিয়েছে পশ্চিমারা। শিল্পায়নের নাম করে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে প্রকৃতির অবস্থাটা দুরবস্থা করতে এমন কোনো উপায় বাকী নেই, যেটার ব্যবহার তারা করেনি। প্রতি বছর শয়ে শয়ে পাখি মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিল্ডিংয়ের থাই গ্লাস বা কাচের জানালার সাথে ধাক্কা খেয়ে। ইনকা, মায়া, এযটেক সভ্যতাকে ধ্বংস করে সেসব জায়গায় ইট-পাথরের বস্তি বানিয়ে রেখেছে এখন তারা।</p>
<p>অথচ, নেটফ্লিক্সের বিখ্যাত ডকু সিরিজ Our Planet-এর দ্বিতীয় সিজনের সম্ভবত প্রথম এপিসোডেই বিখ্যাত ন্যারেটর David Attenborough বলেন,<br />
&#8220;Across the island, chicks are dying. There is now so much plastic in our oceans, that it reaches even the most remote islands on Earth, carried here by the currents. And only now are we beginning to understand that all life on Earth depends on the freedom to move.&#8221;</p>
<p>প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে প্রাণীদের উদ্বাস্তু করে এখন এসে তারা প্রকৃতির উপর দরদ দেখাচ্ছে। তারা বলছে, মানুষ নাকি কেবল বুঝতে শুরু করেছে প্রাণীদেরকে তাদের মতো করেই রেখে দিতে হয়। কিন্তু কোথায়? উন্নতির নাম করে শিল্পায়নের আগে তো কখনও প্রাণীরা তাদের জীবন নিয়ে এতোটা বিপাকে পড়েনি!</p>
<p>উন্নতি কি আগে হয়নি? উসমানীয়দের সময়ে বরং প্রতিটি দালানেই নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকতো, যেখান থেকে পাখিরা বিশ্রাম নিতো আর খাবার খেতো। এমনকি, কোনো অঞ্চলে পাখিদের সুবিধার জন্য উঁচু উঁচু দালান নির্মাণ করা নিষিদ্ধ ছিলো। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, পশ্চিমাদের এতোসব কাজ-কারবার যতোটা না আশ্চর্যজনক, তারচেয়েও বেশি আশ্চর্যজনক হলো, মানুষরা এসব আবার বিনা দ্বিধায় বিশ্বাসও করে থাকে।</p>
<p><strong>চতুর্থত,</strong><br />
কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.) চিরতরে নিষিদ্ধ করলেন জাতপ্রথা, জাত্যাভিমান ও জাতিগগ শ্রেষ্ঠত্বকে; এবং মক্কাকে সকল দিক থেকে বালাদুল আমীন বা নিরাপদ শহর হিসেবে ঘোষণা করলেন।</p>
<p>কিন্তু আজকে? বর্তমান সভ্যতার কথিত স্বাধীন পৃথিবীতে?<br />
কোথাও কি শান্তি ও নিরাপত্তার নামে কোনোকিছু আছে? নাকি সমগ্র দুনিয়ায় আজকে যুদ্ধাবস্থা আর অস্থিতীশীলতা বিরাজ করছে? পৃথিবীর কোন প্রান্তে আজ মুসলিমরা প্রশান্ত মনে রাতের নিদ্রায় আচ্ছন্ন হতে পারছে? বিষয়টা কি সম্পূর্ণ বিপরীত না?</p>
<p>অথচ, আজকের পৃথিবীতে শান্তি বিনষ্টকারী হিসেবেই তুলে ধরা হয় ইসলামকে। সমগ্র দুনিয়াজুড়েই আজকে মুসলিম দেশগুলোকে যুদ্ধবিধ্বস্ত, জঙ্গী আর শান্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিচিত করানো হয়েছে। এক্ষেত্রে গত শতকে দেওয়া মার্গারেট থ্যাচারের সেই বক্তব্যকে তুলে না ধরলেই নয়। তিনি বলেন,<br />
“আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে। তাই ন্যাটোর সামনে কোনো শত্রু নেই। কিন্তু, কোনো মতাদর্শ এবং কোনো আন্দোলন শত্রু ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না। আর বর্তমান দুনিয়ায় ইসলামই একমাত্র সকল সমস্যার মূল। তাই আজ থেকে ন্যাটোর প্রধান শত্রু হচ্ছে ইসলাম।”</p>
<p>যে শান্তি ও নিরাপত্তার কথা বলে তারা, যে শান্তি ও নিরাপত্তার মডেল উপস্থাপন করে তারা আর যার উপর ভিত্তি করে সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি রক্ষাকারী বনে গিয়েছে তারা, তার বয়স মাত্র কয়েকশ বছর; আর সেটি হলো ট্রিটি অব ওয়েস্টফেলিয়া। অথচ, সেই চোদ্দোশো বছর আগেই রাসূল (সা.) শান্তি ও নিরাপত্তার যে বিধান দিয়েছিলেন, তা আজও পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এবং এক ও অনন্য।</p>
<p>আর আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার ধ্বজাধারীরা, যারা শান্তি ও নিরাপত্তার বুলি আওড়িয়ে ভুবন ভোলানো বক্তব্য দেয়, তারা কি আদৌ পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করতে পেরেছে? নাকি আজকের এই শান্তি ও নিরাপত্তার বিধান ও কথিত ডেমোক্রেসি শুধু তাদের স্বার্থের জন্যই ব্যবহৃত হয়?</p>
<p>তাদের ডেমোক্রেসি ততক্ষণ পর্যন্ত ডেমোক্রেসি থাকে, যতক্ষণ না আপনার আমার মন্তব্য তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার মডেল ততক্ষণ পর্যন্ত বজায় থাকে, যতক্ষণ না আপনার আমার নিরাপত্তা ইস্যু তাদের নিরাপত্তার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>যার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের অবস্থান এবং অপারেশন আকসা তুফানের পর গাজাবাসী নিয়ে তাদের অবস্থানের দিকে খেয়াল করলে। এটাই হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রেসক্রিপশনে তৈরি আজকের সভ্য দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার আসল চরিত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>০৪.</strong></h4>
<p>তাই, পরিশেষে মনে হয় এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে,<br />
আমাদের এখন আত্মসমালোচনা করা খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে! কেননা, আমরা আজকে বর্তমান বিশ্বের এনাটমিটা বুঝি না আর এর ব্যবস্থাপনাটা বুঝার চেষ্টাও করি না।</p>
<p>অথচ, দুনিয়াব্যাপী ইসলামের ঝাণ্ডা উড়ানোর ব্যাপারে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ! তাহলে কোথায় গেলো সূরা আনফাল আর সূরা নিসায় বলা কাফেরদের বিরুদ্ধে সর্বদিক থেকে নেওয়া আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির বিষয়টা? তাহলে কোথায় গেলো সূরা নাহলে বলা সেই হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে ইসলাম ছড়িয়ে দেওয়ার কথা?</p>
<p>বর্তমান বিশ্বকে না বুঝা, আমাদের পর্যাপ্ত সামর্থ অর্জন না করা, বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতি, সংস্কৃতি না বুঝাই কি তাহলে আমাদের আল্লাহর বলা সেই হিকমত ও প্রজ্ঞা অর্জন করা? কোনো কিছুর প্রস্তুতি না নেওয়া বা কোনো সেক্টরেই সম্পূর্ণরূপে দক্ষতা অর্জন না করাই কি তাহলে কাফেরদের বিরুদ্ধে নেওয়া আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির নমুনা?</p>
<p>প্রশ্নগুলো তাদের নিকট রইলো, যারা ইসলাম নিয়ে চিন্তা করেন, ভাবেন, ইসলাম নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।</p>
<p>মক্কা বিজয়ের পর কাবার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে রাসূলের সেই ভাষণটি আমাদের আকল ও বিবেকের জন্য চক্ষু উন্মোচনকারী হোক এবং আগামীর নতুন দুনিয়া বিনির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের সকলকেই একেকজন মুজাহিদ হিসেবে মহান রব কবুল করে নিক, এই দোয়া ও কামনা করি। আল্লাহুম্মা আমীন।</p>
<p>প্রচেষ্টা ও জিহাদ আমাদের, সফলতা দেবার দায়িত্ব মহান রবের।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-conquest-of-mecca-the-importance-of-the-prophets-victory-speech-in-the-context-of-modern-times/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15676</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের দেশ ও সার্বভৌমত্ব ভাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 27 Feb 2025 12:01:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15554</guid>

					<description><![CDATA[ক’দিন আগে পত্রিকার একটি খবর চোখে পড়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলিম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে। তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যক্রম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ক’দিন আগে পত্রিকার একটি খবর চোখে পড়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলিম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে। তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যক্রম শহীদদের অবমাননার শামিল। হীন এই কার্যক্রমের জন্য এদের নেতা ও কর্মীদের শাস্তি দেয়া উচিত।</p>
<p>১৯৭১ সালে আমি দেশে ছিলাম না। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে আমি চলে যাই কলকাতায়। আর সেখানেই কাটে ১৯৭১ সাল। কলকাতা থেকে দেশে ফিরেছিলাম ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দেশের বহু ঘটনাই কলকাতায় বসে যথাযথভাবে অবহিত হতে পারিনি। অনেক ঘটনার কথা জেনেছি কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল একটি ভয়াবহ ও ঘৃণ্য কাজ। কিন্তু কারা কী লক্ষ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল সেটা আমার কাছে এত দিন পরেও স্বচ্ছ হতে পারেনি। যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতনামা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, সদ্য ইন্তেকাল করা জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ভাই মুনীর চৌধুরীকে। মুনীর চৌধুরীর সাথে আমার কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কাছ থেকে একবার তার বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। বক্তৃতাটি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল বিশেষভাবেই রাজনৈতিক। সে সময় আমার কিছু সহকর্মীর মুখে শুনেছিলাম মুনীর চৌধুরী চীনপন্থী কমিউনিস্ট ভাবধারায় দীক্ষিত ব্যক্তি। আমি ঠিক বলতে পারি না তাদের এই ধারণা কতটা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার চিন্তাচেতনা যে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ধারার সাথে ছিল না, সেটা অনুমান করতে পেরেছিলাম।</p>
<p><strong>১৯৭১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>এ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>চীনপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টরা</strong> <strong>সাবেক</strong> <strong>পাকিস্তানকে</strong> <strong>ভেঙে</strong> <strong>দেয়ার</strong> <strong>পক্ষে</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>না।</strong> <strong>তারা</strong> <strong>নারাজ</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>১৯৭১</strong><strong>&#8211;</strong><strong>এর</strong> <strong>যুদ্ধকে</strong> <strong>মুক্তিযুদ্ধ</strong> <strong>বলতে।</strong> <strong>আলবদর</strong> <strong>আর</strong> <strong>রাজাকারদের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সে</strong> <strong>সময়</strong> <strong>বামপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টদের</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>সঙ্ঘাত</strong> <strong>ছিল</strong> <strong>না</strong><strong>, </strong><strong>ছিল</strong> <strong>না</strong> <strong>রেষারেষি।</strong> <strong>কেন</strong> <strong>তারা</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীর</strong> <strong>মতো</strong> <strong>একজন</strong> <strong>ব্যক্তিকে</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>যাবে</strong><strong>, </strong><strong>সেটা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>মেলে</strong> <strong>না।</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীকে</strong> <strong>যদি</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>না</strong> <strong>হতো</strong> <strong>তবে</strong> <strong>এই</strong> <strong>হত্যার</strong> <strong>প্রচলিত</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>গ্রহণযোগ্য</strong> <strong>হতো।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তা</strong> <strong>এখন</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>না</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরী</strong> <strong>নিহত</strong> <strong>হওয়ার</strong> <strong>কারণে।</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীর</strong> <strong>বড়</strong> <strong>ভাই</strong> <strong>কবীর</strong> <strong>চৌধুরী</strong> <strong>যত</strong> <strong>দূর</strong> <strong>জানি</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>দক্ষিণপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্ট</strong> <strong>ঘেঁষা।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>যাদের</strong> <strong>বলা</strong> <strong>হতো</strong> <strong>মস্কোপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্ট</strong><strong>, </strong><strong>তিনি</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>তাদেরই</strong> <strong>সাথে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়নি।</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়েছে</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীকে।</strong> <strong>১৯৭১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>এ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>দক্ষিণপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টরা</strong> <strong>পুরোপুরি</strong> <strong>হাত</strong> <strong>মিলিয়েছিলেন</strong> <strong>শ্রীমতী</strong> <strong>ইন্দিরা</strong> <strong>গান্ধীর</strong> <strong>সাথে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>কেউ</strong> <strong>খুন</strong> <strong>হননি</strong> <strong>আলবদর</strong> <strong>রাজাকারদের</strong> <strong>হাতে।</strong> <strong>অন্তত</strong> <strong>আমার</strong> <strong>জানা</strong> <strong>মতে।</strong></p>
<p>১৯৭১-এর অনেক ঘটনাই তাই আমার হিসাবে মিলতে চায় না। যত দূর জানি, কবীর চৌধুরীর আরেক ভাই ছিলেন, বিশেষভাবেই পাকিস্তানপন্থী। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করার সময় তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেন বর্তমান পাকিস্তানের লক্ষ্যে। আমার মনে পড়ছে জহির রায়হানের কথা। জহির রায়হানের সাথে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না। পরিচয় হয় কলকাতায়। জহির রায়হান ছিলেন চীনপন্থী কমিউনিস্ট। কেন তিনি ১৯৭১-এ কলকাতায় গিয়েছিলেন আমি তা জানি না। কলকাতায় তার কোনো আশ্রয় ছিল না। আমি তাকে একটা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম। আমি এটা করে দিয়েছিলাম তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছায়াছবি দেখে ভালো লেগেছিল বলে; তিনি চীনপন্থী ছিলেন বলে নয়।</p>
<p><strong>জহির রায়হান ১৯৭২ সালে মারা যান রহস্যজনকভাবে। ঢাকা এই সময় ছিল ভারতীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নয়। আলবদর, রাজাকারেরা যে তাকে মেরে ফেলেনি সেটাও সুনিশ্চিত। কিন্তু তার মৃত্যু এখনো হয়ে আছে রহস্যাবৃত। জহির রায়হানকে সম্ভবত মেরে ফেলা হয় তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য। ১৯৭১-এ আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় সিপিআই (এম) সমর্থকদের বলতে শুনেছি, শেখ মুজিব হলেন মার্কিন অ্যাজেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে তিনি ধরা দিয়েছিলেন ইয়াহিয়ার হাতে। তিনি আসলে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পক্ষে নন। কলকাতায় থাকার সময় আমি পশ্চিম বাংলার গ্রামে গিয়েছি। পশ্চিম বাংলার মুসলমানেরা ছিলেন ১৯৭১-এর যুদ্ধের বিশেষ বিরোধী। তাদের বক্তব্য ছিল এটা কোনো মুক্তিযুদ্ধ নয়। ইন্দিরা গান্ধী ষড়যন্ত্র করে ভেঙে দিতে চাচ্ছেন পাকিস্তানকে। এটা আসলে হলো তার ষড়যন্ত্রেরই ফল।</strong></p>
<p>শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক কী চেয়েছিলেন আমার কাছে এখনো তা স্বচ্ছ নয়। তিনি ৭ মার্চ রমনা ময়দানে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাতে তিনি দাবি করেন, তিনি হলেন পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু দলের নেতা। তাই তার আছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অধিকার। কিন্তু ইয়াহিয়া সেটা হতে দিচ্ছেন না। তাই এবারের সংগ্রাম হয়ে উঠেছে মুক্তির সংগ্রাম। আমার মনে হয়, ইয়াহিয়া যদি আইনানুসারে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতেন তবে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে পড়ত না।</p>
<p>১৯৭১-এ যা ঘটেছে সেটা ঘটতে পেরেছে তদানীন্তন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার রাজনৈতিক ভুলের কারণেই। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পান পাকিস্তানের কারাগার থেকে। কিন্তু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেননি। তিনি ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে যান গ্রেট ব্রিটেনে। সেখানে দেখা করেন গ্রেট ব্রিটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-এর সাথে। কেন তিনি পাকিস্তান থেকে গ্রেট ব্রিটেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা এখনো রয়েছে অজ্ঞাত।</p>
<p>সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ : এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে বলেছেন, শেখ মুজিব তাকে (মাসকারেনহাস) বলেন যে, তিনি (শেখ মুজিব) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছেদ চাচ্ছেন না। রাখতে চাচ্ছেন একটা বিশেষ রকমের সংযোগ (Link)। তবে এই সম্পর্কে তিনি বিস্তারিতভাবে কিছু আলোচনা করতে ইচ্ছুক নন, যা বলার তা তিনি বলবেন বাংলাদেশে যেয়ে, তার সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করার পরে।</p>
<p><em>শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে চার দিন পাকিস্তানে ছিলেন। এই ক’দিন তার সাথে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর অনেক আলোচনা হয়েছিল। এসব আলোচনার একটা প্রভাব সম্ভবত পড়েছিল তার ওপর। ভুট্টো তাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ দখল করেছে ভারতীয় বাহিনী। একমাত্র শেখ মুজিব তার বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে পারেন। না হলে বাংলাদেশ কার্যত চলে যাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। প্রকৃত পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য শেখ মুজিব যান ব্রিটেনে। বিলাতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে অবগত হতে চান তিনি। শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফেরার পর তাজউদ্দীনের সাথে তার গুরুতর মতভেদ ঘটে। একপর্যায়ে তাজউদ্দীন বাদ পড়েন মন্ত্রিপরিষদ থেকে।</em></p>
<p>অনেক ঘটনাই নেপথ্যে ঘটেছিল। ১৯৫৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তদানীন্তন পাকিস্থানের হয়েছিল একটি গোপন চুক্তি। এই চুক্তির কারণে, ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর কয়েকটি মার্কিন রণতরী ও বিমানবাহী জাহাজ এন্টারপ্রাইজ এসে পৌঁছায় বঙ্গোপসাগরে। মার্কিন চাপে ভারত বাধ্য হয়েছিল যুদ্ধ থামাতে এবং প্রধানত মার্কিন চাপেই ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারত তার সৈন্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা ছিল ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্য ঘটতে পেরেছিল অনেক ঘটনা। ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ছিল এক অক্ষে।</p>
<p>এখন অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। কমিউনিজম এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো সমস্যা নয়। এখন তাকে পেয়ে বসেছে জঙ্গি ইসলাম আতঙ্কে। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে এই আতঙ্ক রাখছে বিশেষ প্রভাব। ইসলাম এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বরাজনীতির একটা উল্লেখযোগ্য উৎপাদক (Factor)। যেটা ১৯৭১-৭২ সালে ছিল না। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অবস্থান করছে একই অক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক দিকে যেমন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইসলাম আতঙ্ক দিয়ে, অন্য দিকে তেমনি আবার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে চীন আতঙ্ক দিয়ে। এই দুই আতঙ্ক নির্ধারণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ভারতকে দিয়ে এশিয়ায় চীনকে সংযত রাখতে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ভাবা উচিত অনেক ভিন্নভাবে। কিন্তু আমরা সেটা করতে যাচ্ছি না। আমরা এখনো থাকতে চাচ্ছি ১৯৭১-এর যুগে। আমাদের চিন্তা থেমে আছে ১৯৭১-এর জগতে। সেটাকে বলতে হবে জাতির অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক।</p>
<p>ভারতের পত্রপত্রিকার খবর অনুসারে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে নাকি প্রায় দুই কোটি লোক চলে গিয়েছেন ভারতে। যারা ভারতের জন্য হয়ে উঠেছেন বিশেষ সমস্যার কারণ। সুব্রামনিয়ান এক সময় ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট। এখন তিনি হলেন ভারতের বিজেপি দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেছেন যে, ভারতের উচিত হবে খুলনা ও সিলেট অঞ্চলের কিছু জায়গা দখল করা। এই জায়গা দখল করে সেখানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসা দুই কোটি লোকের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া। সুব্রামনিয়ান ভারতের একজন সাধারণ নাগরিক নন। তার চিন্তাধারা ভারতকে তার নীতিনির্ধারণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। আমাদের দেশে কথিত বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতরা এই ব্যাপারটি নিয়ে কোনো কিছু ভাবছেন কি না আমি সে সম্পর্কে জ্ঞাত নই। পত্রপত্রিকায় প্রচার চলছে ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি না দিলে বাংলাদেশ আবার পরিণত হবে পাকিস্তানে। ছড়ানো হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তান-বিদ্বেষ। কিন্তু পাকিস্তান-বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করা যাবে না।</p>
<p><strong>আমাদের ভাবতে হবে বর্তমান পরিস্থিতির উপযোগীভাবে। কোনো জাতির জীবনে একটি যুদ্ধই শেষ যুদ্ধ হয় না। অনেক যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয় একটা জাতিকে। আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে শেষ যুদ্ধ ভাবার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। এ দেশের মানুষ এখন আর একাত্তরের মতো ভারতপ্রেমী হয়ে নেই। দেশে ভারতবিমুখী প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির কারণে নয়। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ব্যবহার এ দেশের মানুষের মনোভাবকে করে তুলছে ভারতবিমুখী। এটা কোনো পাকিস্তান-প্রবণতার পরিচয় বহন করছে না। পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে। সে আর আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টিকারী দেশ নয়। কিন্তু ভারত আছে আমাদের তিন দিক ঘিরে। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে এ দেশের মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে এবং হয়ে উঠছে সন্দিহান। তারা চাচ্ছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে। দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে নয়। খবরে প্রকাশ, চীন পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে প্রয়োজনে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারে। ভারত বাংলাদেশকে কব্জা করতে চাইলে চীন কী নীতি গ্রহণ করবে সেটা আমাদের কাছে এখনো জল্পনারই বিষয়।</strong></p>
<p>তবে মনে হয় এই উপমহাদেশে একটা বড় রকমের যুদ্ধ হতে পারে। আর আমাদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন এই যুদ্ধের জন্য। প্রাচীন যুগে যুদ্ধ হয়েছে রাজায় রাজায়। যুদ্ধ সীমাবদ্ধ থেকেছে দু’টি রাজার সেনাবাহিনীর মধ্যে। কিন্তু এখন যুদ্ধ হয় দেশে দেশে। যুদ্ধ হয়ে ওঠে ‘টোটাল ওয়ার’ বা সামগ্রিক যুদ্ধ। এতে জড়িয়ে পড়ে একটি দেশের সমগ্র জনসমষ্টি। যুদ্ধ একটি ক্ষতিকর ভয়াবহ ঘটনা। কিন্তু এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় একটি দেশের প্রতিটি নাগরিককে। আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15554</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
