<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>বাংলাদেশ &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/about-bangladesh/bangladesh/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Tue, 05 May 2026 09:40:10 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>বাংলাদেশ &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>সীরাত সাহিত্যে বাংলা ভাষার অবদান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 05 May 2026 09:40:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16807</guid>

					<description><![CDATA[বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা.]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা. এর যুগেই বাংলা অঞ্চলে ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে সীরাতচর্চারও শুরুয়াত ঘটে। সেইসময় ওমর রা. একদল সাহাবীকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রেরণ করেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আগত সাহাবীগণ রাসূল স. এর তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত জীবনীও বর্ণনা করেন এখানকার জনগোষ্ঠীর মাঝে। এরপর এক শতাব্দীকালের মাঝেই উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে উপকূল অঞ্চল এবং বাংলাতেও পৌঁছে যায় ইসলামের বার্তা।</p>
<p>আরবের সাথে বণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় অন্যান্য মুসলিম বণিকদেরও আগমন ঘটে এখানে। এই সম্পর্ক যে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা হলফ করেই বলা যায়। বণিকরা একইসাথে ইসলামের আখলাক, আধ্যাত্মিকতা ও সুমহান বার্তাও বয়ে নিয়ে আসেন বদ্বীপে। নদী বিধৌত এই বঙ্গভূমিতে রাসূল (স.) এর জীবনী চর্চার অনানুষ্ঠানিক সূত্রপাতও বলা যায় এভাবে।</p>
<p>রাসূল (স.) এর সীরাত নবদীক্ষিত মুসলিমদের বেশ যুগান্তকারী প্রভাব ফেলে। অনেকের ইসলাম গ্রহণের নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এই সীরাত। চৌদ্দ শতকে লিখিত রূপে সীরাতচর্চা শুরুর আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা।</p>
<p>বাংলা ভাষার বিকাশ সাধনে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপক হলেও মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে সাহিত্য জগতে কেবল পদ্য, কবিতা বা ছন্দের হদিস পাওয়া যায়। <strong>লিখিত ভাষায় সীরাত চর্চার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় শাহ মুহাম্মদ সগীরকে (মৃ. ১৪০৯)। ১৪শ শতকে রচিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ <em>“ইউসুফ-জুলেখা”</em>য় উল্লেখযোগ্য একটা অংশ জুড়ে স্থান পেয়েছে রাসূল স. এর জীবনী।</strong> ১৫শ ও ১৬শ শতকে সীরাতচর্চায় অবদান রাখেন দুজন খ্যাতিমান কবি- যয়নুদ্দিন (মৃ. ১৪৮১) ও শাহ বাইরিদ খান (মৃ. ১৫৫০)। <em>“রসূল বিজয়”</em> নামে পৃথক দুটি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয় তাদের হাতে।</p>
<p>অপর একজন কবি সৈয়দ সুলতান (মৃ. ১৬৪৮), যিনি <em>“রসূল চরিত”</em> ও <em>“ওয়াফাত-এ-রসূল”</em> নামে দুটি সাহিত্য রচনা করেন রাসূল স. এর জীবন ও কর্মের উপর। জনশ্রুতিতে প্রচলিত বর্ণনাসমূহ লেখায় রূপদান করতে জুড়ি ছিল না সৈয়দ সুলতানের। ১৭শ শতকে বিখ্যাত কবি আলাওল তাঁর কালজয়ী কাব্য <em>“পদ্মাবতী”</em>র পুরো এক খণ্ড জুড়ে স্থান দেন সীরাতকে। সমসাময়িক আরেকজন সাহিত্যিক সৈয়দ হামজা (মৃ. ১৮১৫) রাসূল স. এর উল্লেখযোগ্য কিছু হাদীস অনুবাদ করেন বাংলা ভাষায়। এভাবে দেখা যায় ক্ল্যাসিকাল যুগ থেকেই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে সীরাত সাহিত্য।&nbsp;</p>
<p>বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে এসে সীরাতচর্চা নতুন একটি মাত্রা পায়। পূর্বতন ধারাবাহিকতায় পদ্য ও কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও শুরু হয় সীরাত সাহিত্য। বহু সংখ্যক কবি, লেখক ও সাহিত্যিকদের শৈল্পিক লেখনীতে সমৃদ্ধ হয় বাংলা ভাষায় সীরাতচর্চার ভাণ্ডার। এই সময়ে যাঁরা অবদান রাখেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন- মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, শেখ জমিরুদ্দিন, শাহাদাত হোসাইন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, বেনজীর আহমেদ, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আল মাহমুদ। রাসূল স. এর শানে তাঁরা রচনা করেন সংগীত, গীতিকাব্য, পদ্য সাহিত্য, প্রবন্ধ ও বই।</p>
<p>বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবুল খায়ের সাইফুদ্দিন <em>“ইসলামী কবিতামালা”</em> &nbsp;নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন, যেখানে বিখ্যাত সব প্রাচীন কবিদের কবিতাকে জড়ো করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বেনজীর আহমেদ সম্পাদিত এমন একটি সংকলন গ্রন্থ <em>“খাতামুন নাবিয়্যিন”</em>। এছাড়াও আরও কিছু সংকলন গ্রন্থ রয়েছে যেমন- ইশরাফ হোসাইনের <em>“রাসূলকে নিবেদিত কবিতা”</em>, মুকুল চৌধুরীর <em>“রাসূলের শানে কবিতা” </em>এবং আসাদ বিন হাফিজের <em>“নির্বাচিত নাতে রাসূল’’</em> ইত্যাদি।&nbsp;</p>
<blockquote><p>কবিতার জগতে সীরাতকে অনন্য একটি অবস্থানে নিয়ে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রাসূল স. এর স্তুতি ও শানে অন্তত শ’খানেক কবিতা ও সংগীত রচনা করেন নজরুল, যেগুলো আজও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এমনকি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছে কালের বিবর্তনে। “মরুভাস্কর” নামে সীরাত গ্রন্থ রচনা করে নবীপ্রেমে নিজেকে উৎসর্গের নজরানা যেন ষোলকলায় পূর্ণ করেন তিনি।</p></blockquote>
<p><strong>উনিশ শতকের শেষের দিকে খ্রিস্টান মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো নবী মুহাম্মদ (স.) এর জীবনীর উপর বই লিখতে শুরু করে এবং লিফলেট ছাপায়, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তাঁর জীবনীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি মুসলিম চিন্তক ও লেখদের ভাবিয়ে তুলে এবং রাসূল (স.) এর জীবনী নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার ভাবনা জাগিয়ে তুলে তাদের মাঝে।</strong> এইক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং সীরাত সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (মৃ. ১৯০৭)। সেইসময় বাংলা মুসলিম সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে সীরাত সাহিত্য। <strong>বাস্তবিকার্থে বাংলা মুসলিম সাহিত্যে গদ্যরীতির সূচনাই হয় সীরাতের মাধ্যমে।</strong> চমকপ্রদ বিষয় হলো, বাংলায় রাসূল (স.) এর সম্পূর্ণ জীবনচরিত রচনা করেন একজন হিন্দু লেখক, গিরিশচন্দ্র সেন, <strong><em>মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবন চরিত</em> (১৮৮৬)</strong> নামে। সর্বপ্রথম মুসলিম লেখক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সীরাত লিখেন শেখ আব্দুর রহীম। তাঁর রচিত সীরাত গ্রন্থের নাম <strong><em>হযরত মোহাম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি</em></strong>। যেটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। সীরাত সাহিত্যে অপর একটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম হচ্ছে <strong><em>মোস্তফা চরিত</em> (১৯২৫)</strong>। মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁ (মৃ. ১৯৬৮) রচনা করেন এটি। কবি গোলাম মোস্তফার সীরাতকর্ম <strong><em>বিশ্বনবী</em></strong>-ও বেশ সমাদৃত হয় বাংলা ভাষায়।&nbsp;</p>
<p>শুধুমাত্র বাংলা মৌলিক সাহিত্যের মাধ্যমেই নয়, অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমেও আরবী ও অন্যান্য ভাষায় রচিত ক্ল্যাসিকাল সীরাত গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলার সীরাতচর্চা। সীরাত গ্রন্থের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন আকর গ্রন্থ হিসেবে প্রসিদ্ধ ইবনে ইসহাকের সীরাতে রাসূলুল্লাহ-এর অনুবাদ নিয়ে আসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। এছাড়াও অগণিত প্রকাশনা সংস্থা থেকে সীরাতের অনুবাদকর্মসমূহ প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে অহরহ।</p>
<p>রাসূল স. এর বন্দনায় রচিত ফার্সী ভাষার কতক কবিতা ও সাহিত্যও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। এই পর্যায়ে মওলানা রুমী, মির্জা মাজহার, ওমর খৈয়াম, আব্দুর রহমান জামী, শেখ সাদী, আমীর খসরু, ফতেহ আলী ওয়াসী সহ ফার্সী ভাষার খ্যাতিমান কবিদের সীরাতকর্ম অনূদিত হয় বাংলায়।</p>
<p>উর্দূ ভাষার সীরাত গ্রন্থসমূহও বাংলায় অনুবাদ হওয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় সীরাত সাহিত্য। উর্দূ থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছে- ইদরীস কান্দল্ভীর <strong><em>মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম</em></strong>, আল্লামা শিবলী নোমানীর <strong><em>সীরাতুন্নবী</em></strong>, সোলায়মান নদভীর <strong><em>পয়গামে মোহাম্মদী</em></strong>, আশরাফ আলী থানভীর <em><strong>খাতামুল আম্বিয়া</strong></em>, আবুল কালাম আজাদের <strong><em>বেলাদাতে নববী</em></strong>, মুফতী মোহাম্মদ শফীর <strong><em>সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া</em></strong>, ক্বারী মোহাম্মদ তায়্যিবের <em><strong>আফতাবে নবুয়্যত</strong></em>, এবং সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভীর <strong><em>নবী রহমত</em></strong>। কেবলমাত্র এই সকল গ্রন্থই নয়, পাশাপাশি উর্দূ সাহিত্যের প্রসিদ্ধ অনেক ছোট ছোট প্রবন্ধ, কবিতা ও গীতিও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। বাঙালী স্কলারদের নিকট আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, মির্জা গালিব বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মওদূদীর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম <em><strong>সীরাতে সরওয়ারে আলম</strong>&#8211;</em>এর বাংলা অনুবাদও বেশ পঠিত বাংলা ভাষায়।</p>
<p>এছাড়াও ইংরেজি থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর <em><strong>রণাঙ্গণে রাসূল স.</strong></em> এবং আফজালুর রহমানের <strong><em>মোহাম্মদ: এনসাইক্লোপিডিয়া অফ সীরাত</em></strong> প্রণিধানযোগ্য।&nbsp;</p>
<p>শিশুদের উপযোগী করে সীরাতচর্চাও নেহাত কম হয়নি বাংলা ভাষায়। শিশুদের কোমল মানসে রাসূল স. এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি, আদর্শের দীক্ষা ও সচ্চরিত্রবান করে গড়ে তোলার মহান প্রয়াসকে সামনে রেখে কবি সাহিত্যিকগণ শিশুতোষ সীরাত রচনায় উদ্যত হন। এমনই একটি শিশুতোষ সীরাত হচ্ছে- <strong><em>নূরনবী</em></strong>। ইয়াকুব আলী চৌধুরী রচিত এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। সহজ ও সাবলীল ভাষায় রচিত নূরনবী শিশুসাহিত্য এবং সীরাতসাহিত্যে প্রশংসা কুড়ায় বেশ। নবীকরিম স. কে উপজীব্য করে একজন আদর্শ পুরুষ হয়ে উঠার জন্য দারুণ সহায়ক গ্রন্থটি। সেইসাথে, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর বিনির্মাণেও ভূমিকা রাখে ইয়াকুব আলী চৌধুরীর লেখনী। পরবর্তীতে তোরাব আলী রচিত <em>“</em><strong>ছোটদের মোস্তফা</strong><em>”</em> (১৯৩৬) এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর লেখা <em>“</em><strong>ছোটদের হযরত মোহাম্মদ</strong><em>”</em> (১৯৪১) – এই সকল গ্রন্থও প্রসিদ্ধি লাভ করে বিপুল পঠিত হয় বাংলার মুসলিমদের ঘরে ঘরে।</p>
<p>এভাবে বাংলা ভাষার বেশ শক্তিশালী একটি ধারা গড়ে উঠেছে রাসূল (স.) এর সীরাতকে কেন্দ্র করে। সেই ধারা অব্যহত রয়েছে এখনো। কখনো কখনো সামগ্রিক সীরাত না লিখে সীরাতের বিশেষায়িত কোনো অংশ নিয়ে কেউ লিখছেন সীরাত। আবার অনেকেই রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, দার্শনিক এবং মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তুলে ধরছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবের জীবনাচারকে। আর সেই সাহিত্য প্রভাবও ফেলেছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এবং বাঙ্গালী মুসলিম জাতিসত্তার বিনির্মাণে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হদিসঃ</strong></p>
<p>১। বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব।</p>
<p>২। বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা, মো: আবুল কাসেম ভুঁইয়া।</p>
<p>৩। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, মোহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান।</p>
<p>৪। বাংলা ভাষায় সীরাত বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি, নাসির হেলাল (সম্পাদিত)।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-bengali-language-to-seerat-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16807</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুঘল আমলে ইসলাম ও হিন্দুধর্মের সমন্বয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-coordination-of-islam-and-hinduism-during-the-mughal-period/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-coordination-of-islam-and-hinduism-during-the-mughal-period/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. এম এ রহিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 22 Oct 2025 14:53:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16260</guid>

					<description><![CDATA[মুসলমানগণ এই উপমহাদেশে এক উদারনৈতিক শক্তির সূত্রপাত করে। তাঁদের ধর্মীয় সারল্য, সামাজিক সাম্যবোধ এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গী ও সংস্কৃতি হিন্দুসমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু ও অপরাপর প্রজাসাধারণের প্রতি মুসলিম শাসকবর্গের নীতি ছিল উদার ও সহনশীল। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আলেকজান্ডার হামিলটন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মুসলমানগণ এই উপমহাদেশে এক উদারনৈতিক শক্তির সূত্রপাত করে। তাঁদের ধর্মীয় সারল্য, সামাজিক সাম্যবোধ এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গী ও সংস্কৃতি হিন্দুসমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু ও অপরাপর প্রজাসাধারণের প্রতি মুসলিম শাসকবর্গের নীতি ছিল উদার ও সহনশীল। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আলেকজান্ডার হামিলটন নামক এক পরিব্রাজক বলেন <strong>&#8220;ইসলাম বাংলার আইন স্বীকৃত ধর্ম হলেও একজন মুসলমানের অনুপাতে ভিন্নধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা হচ্ছে একশত জন। সরকারি কাজে উভয় সম্প্রদায় হতে লোক নিয়োগ করা হয়ে থাকে। প্রত্যেকে নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মাচারণ করতে পারেন এবং ধর্মের নামে নির্যাতন তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।&#8221;</strong></p>
<p>মুসলিমগণের সারল্য এবং সহিষ্ণুতা হিন্দুদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠতর করে এবং উভয়ের জন্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমান সুযোগ-সুবিধার পথ প্রশস্ত করে। ফলে ব্রাহ্মণশ্রেণির প্রাধান্য বিশেষভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। কৃষ্টিসম্পন্ন এবং প্রভাবশীল শ্রেণি হিসেবে সমাজে কায়স্থগণের অভ্যুদয় ঘটে। উচ্চশ্রেণির হিন্দুগণ মুসিলম সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-আচরণের প্রভাবে প্রভাবিত হন। সমকালীন সাহিত্যে বর্ধমান ও নবদ্বীপের জমিদারগণের রাজদরবারের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তাকে মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারে ক্ষুদে সংস্করণ বলা যেতে পারে। হিন্দু জমিদারবৃন্দ তাদের দরবারের রীতিতে নিপুণ মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন এবং যাদের দিক হতে নবাব দরবারের পদসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা হতো, যেমন বকসি, মুন্সি, রানা সঙ্গীতজ্ঞ, আমিন, পেশকার এবং এমনি আরো অনেক, বহু হিন্দু উচ্চপদস্থ কর্মচারী, সমাজ প্রধান এবং শিক্ষক খান, মুস্তফা, মহালনবশ, খান সাহেব, সরকার শিকদার, তরফদার, কানুনগো, মজুমদার ইত্যাদি মুসলিম পদবি ব্যবহার করতেন। বস্তুত এরূপ পদবি ধারণকে তাঁরা ব্যক্তি এবং পারিবারিক জীবনে বিশেষ গৌরবের বলে মনে করতেন। এমনকি বর্তমানেও বহু হিন্দু পরিবার এসব সম্মানসূচক মুসলমানি পদবি ধারণ করে থাকেন। মুসলিম শাসনামলে এই প্রদেশে হিন্দু সমাজ যে কি বিপুলভাবে মুসলিম সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এসব বিষয় তা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়।</p>
<p>সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যেতে পারে।</p>
<p>জনৈক হিন্দু জমিদারের বর্ণনা করতে গিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি জয় নারায়ণ বলেন, &#8220;রাজা (জমিদার) দরবার কক্ষের মধ্যস্থলে স্বর্ণসিংহাসনে উপবিষ্ট। তাঁর মাথার উপর রাজছত্র বিধৃত। মূল্যবান উষ্ণীষ মুক্তার মতো ঝলমল করত। উষ্ণীষের উপরিভাগে কলিকা পাখির উজ্জ্বল পালক সূর্যালোকে দোলায়মান এবং দীপ্তিমান। তিনি পরিধান করতেন সোনার ঝালর দেয়া চাপকান ও বর্ম। পরিচ্ছেদের উপর দিয়ে বৃহৎ মুক্তার একখণ্ড রজ্জু ঝুলানো। কটিদেশে বেষ্টন করে প্রশস্ত কটিবন্ধে সোনার ঝালরের সজ্জা। কবির বর্ণনা থেকে এটা সুস্পষ্ট হয় যে জমিদার মুসলমানি পোশাক চাপকান ও পাগড়িতে সুসজ্জিত হতো। <strong>নবাব আলীবর্দী খানের সময় নবদ্বীপের জমিদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার যে দৃশ্য কবি ভারতচন্দ্র বর্ণনা করেছেন তাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দু জমিদারগণ মুসলমান শাসক ও রাজন্যবর্গের আদর্শ অনুযায়ী দরবারের কার্যাবলী নিষ্পন্ন করতেন।</strong> কবি লিখেছেন &#8220;দরবার কক্ষে শাস্ত্রিগণ পরস্পর হাত ধরে শ্রেণিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। তাদের বক্ষদেশে বর্ম ও কটিবন্ধে ঝোলানো থাকত তরবারি। ঘড়িয়ালগণ (রাজকীয় সময় রক্ষক) উভয় পার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকত। চাপদার অথবা চাপরাশিগণ হাতে সুবর্ণ লাঠি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত প্রকাশ্যস্থলে আরবিজি তথা জনসাধারণের নিকট হতে আবেদন পত্র গ্রহণকারী কর্মচারী মাসাধিককাল দাঁড়িয়ে থাকত। ভাঁড় বা রাজধবি রাজস্তুতি গাইতেন। মোসাহেবরাও সভাস্থলে থাকতেন। তাদের কাজ ছিল জমিদারের মতিগতির প্রতি নজর রাখা। সেখানে মুন্সিগণ (সচিববৃন্দ), বকসি (সৈন্যদের বেতন প্রদানকারী), বৈদ্য (চিকিৎসক), কাজি (বিচারক) কানুনগো ও অপরাপর অনেকেই উপস্থিত থাকতেন। রাজকীয় বাদকবৃন্দের জন্য রাবাব, তানপুরা, বীণা, মৃঙ্গ ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র যথাযথভাবে রক্ষিত থাকত। নকিবের (রাজসভার ঘোষক)। কাজ ছিল দর্শনার্থীদের নাম ঘোষণা করা এবং তাঁদেরকে উচ্চস্বরে রাজসভার পালনীয় রীতিনীতি বিষয় অবিহিত করা। উজাক বা উনাবক্য কাজালবাস বা কিজেলবাস, লালটুপীধারী (বাহিদী), হাফসি (হাবসি) এবং জল্লাদ তাদের নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকত।&#8221;</p>
<p>আনুষ্ঠানিক রীতিনীতির দিক থেকে কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা ছিল মুসলিম দরবারের ক্ষুদ্র সংস্করণ। মুসলিম শাসকবর্গের আচরণ প্রথার অনুকরণে দর্শনার্থীরা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে তিনবার কুর্ণীশ করত। ডি. সি. সেনের মতে মুসলিম শাসনামলে হিন্দু রাজন্যবর্গ এবং জমিদারগণ সম্ভ্রান্ত মুসলমানগণের মতো পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করতেন এবং শুধু কপালে চন্দনের ফোটা এবং পবিত্র ভষ্মচিহ্ন ব্যবহার করে। নিজেদেরকে হিন্দু বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করতেন।</p>
<p>মধ্যবিত্ত হিন্দুগণ মুসলিম জীবনধারা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হতেন। স্বল্পশিক্ষিত কায়স্থ ভাড়ুদত্তকে পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় ব্যাধরাজ কালকেতুর রাজদরবারে যেতে দেখা যায়। নরসিংহ বসু মুর্শিদাবাদের নওয়াব দরবারে বীরভূমের জমিদার রাজা আসাদউল্লাহর দূত হিসেবে নিয়োগকালে জমিদারের নিকট থেকে একটি জামা ও পাগড়ি উপঢৌকনরূপে লাভ করেছিলেন। সমকালীন হিন্দু লেখকগণের লেখায় হিন্দু রমনীগণকে মুসলিম পোষাকে চিত্রিত করা হয়েছে। তাঁরা ঘাঘরা (সায়া), ওড়না, কাচলী (বক্ষবন্ধনী) ব্যবহার করতেন। মুসলমানগণের অভ্যস্ত ব্যবস্থা হিন্দুগণের নিকট ফ্যাসনে পর্যবসিত হয়েছিল। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে থমাস বাউরী নমক একজন ইংরেজ বণিকের মতে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ে নারীগণকে গৃহের চারিদেয়ালের ভিতর নপুংসক ও কুমারীগণের তত্ত্বাবধানে রাখা হতো।</p>
<p>ঘনিষ্ঠতর সামাজিক সম্পর্কের ফলে বহু হিন্দু ও মুসলমানগণের ধর্মাচারণ ও ধর্মপূজার প্রতি শ্রদ্ধাবান হয়ে পড়েন। <strong>সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, বিরচিত ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল কাব্যের একটি স্তবকে উল্লেখ আছে যে, সর্পদেবী মনসার কোপদৃষ্টি থেকে লক্ষ্মীন্দরকে বাঁচাবার জন্য যে লৌহ প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করা হয়েছিল সেখানে তান্ত্রিক অন্যবিধ ব্যবস্থাদির সঙ্গে একখণ্ড পবিত্র কোরআন শরীফ রক্ষিত ছিল। অনেক হিন্দু বণিক পুত্রলাভের জন্য প্রার্থনা করবার উদ্দেশ্যে একদল ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ করেন। ব্রাহ্মণগণ কোরআন পাঠান্তে উক্ত বণিককে আল্লাহর নাম জেকের করতে উপদেশ প্রদান করেছিলেন। শুভদিন নির্ধারণের জন্য ব্রাহ্মণগণ কোরআন আলোচনা করেন এবং বণিকগণ বাণিজ্য যাত্রার পূর্বে আল্লাহর নিকট নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতেন।</strong><script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p>হিন্দুগণ যে কোরআনকে একটি পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন এসমস্ত দৃষ্টান্ত হতে তা বিশেষ ভাবে প্রতীয়মান হয়। <strong>মুসলমানগণের ধর্মীয় উৎসবাদিতে হিন্দুরাও যোগদান করতেন। দৌলতরাও সিদ্ধিয় ও তাঁর পদস্থ কর্মচারীবৃন্দ মুলসমানদের মতো সবুজ পোশাক পরিধান করে মহরম মিছিলে যোগদান করেছিলেন। এমনকি ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দেও হ্যামিলটন বুকানম ভাগলপুরে লক্ষ্য করেছিলেন যে, হিন্দুগণ মুসলমানগণের একান্তভাবেই মহরম উৎসবে ব্যাপৃত হতেন।</strong> মুসলমান পিরের প্রতি ভক্তি জ্ঞাপন তাঁদের আর্শীবাদ কামনা ও দরগায় সিন্নি প্রদান হিন্দুগণের মধ্যে বিশষভাবে প্রচলিত ছিল। হিন্দুগণ কর্তৃক বংশপরস্পরায় শাহজামাল (শেখ জামাল সামদীর তাবরিজী) এর উদ্দেশ্যে প্রদর্শিত ভক্তির বিষয় শেষ শুভোদরায় বিশেষভাবে উল্লেখিত আছে। ইহার লেখক হলায়ুধ মিত্র লিখেছেন- &#8216;সর্বজন খ্যাত মরহুম শেখ জামাল, তোমার পদযুগলে আমি আমার অন্তরের শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করি।। আমার জীবন ও ধনসম্পদ রক্ষার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা জানাই। গৃহে প্রত্যাবর্তন করে আমি আমার সম্পত্তির অর্ধাংশ তোমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবো।&#8221; কবির কথায় আরো জানা যায় যে বহু লোক সেই পুণ্যাত্মার নিকট সন্তান লাভ কিংবা রোগ মুক্তির জন্য প্রার্থনা জানাত। তৎকালীন বহু হিন্দু কবিকে পিরের অনুরাগী ভক্তরূপে নিজের পরিচয় দিতে এবং আধ্যাত্মিক মুসলিম সাধকের স্তুতি করতে দেখা যায়। তাঁর পুস্তকের মুখবন্ধে তিনি প্রখ্যাত মুসলিম সাধক বড়খান গাজির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অপর একজন হিন্দু লেখক রূপরাম তাঁর ধর্মমঙ্গল গ্রন্থে সেলিমাবাদের পির বড়খানের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। রূপরাম বিশ্বাস করতেন যে, এই পিরের পুণ্যনাম জপের মাধ্যমে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিও বিপদমুক্ত হতে পারে। কৃষ্ণহরিদাস তাহির মামুদকে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু বলে গ্রহণ করেছিলেন। বাঙালি কবি বিদ্যাপতি তাঁর রচনায় বড়খান গাজি, জাফর খান গাজি, ইসমাইল খান গাজি প্রমুখ বহু মুসলিম পিরের স্তুতি গেয়েছেন। কৃষ্ণরাম দাসের রামায়ণ কাব্যে বাঙালি হিন্দু বণিক ও নাবিকবৃন্দের বড় খা গাজির প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার প্রকাশ রয়েছে। দুটি সম্প্রদায়ের বহু শতাব্দী ব্যাপী প্রতিবেশী হিসেবে বলিষ্ঠ অবস্থানের ফলে দৈনন্দিন জীবনে একে যে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হতো তা নিতান্তই স্বাভাবিক। পাঁচ শতাধিক বৎসর ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে বসবাস করবার ফলে বস্তুত বাংলার হিন্দু-মুসলমানগণের মধ্যে তাই ঘটেছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মুসলিম প্রভাব গভীরতর। হিন্দুগণের মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাসে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের এ প্রভাবের ফল বিশেষভাবে অনুভূত হয়। ইহা হিন্দু জীবনের ভিত্তিমূলে নাড়া দিয়েছিল। পক্ষান্তরে ধর্মীয় সারল্য ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দরুন মুসলমানগণকে জটিল হিন্দু সমাজ থেকে কিছুই গ্রহণ করতে হয় নি। এতদসত্ত্বেও বহু শতাব্দীর সহাবস্থানের ফলে মুসলিম সমাজে কিছু কিছু হিন্দু প্রভাব এসে পড়ে। এই প্রভাব আধ্যাত্মিক স্তরের। মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাসে নয় বরং বাহ্যিক আচার আচরণে এ প্রভাব সীমিত। নানাবিধ হিন্দু কুসংস্কার ও আচার আচরণ মুসলিম সমাজে অনুপ্রবিষ্ট হয়। এই ঘটনার জন্য হিন্দু সান্নিধ্য একান্তভাবে দায়ী নয়। বাঙালি মুসলমানগণের দৈনন্দিন জীবনে বহু অনৈসলামিক সংস্কার ও আচার-আচরণের জন্য ইসলাম ধর্ম নবদীক্ষিত হিন্দু ও বৌদ্ধগণের ভূমিকা সমধিক। ধর্মান্তরিত বৌদ্ধগণ মুসলিম সমাজে নাথ যোগী ও মুণ্ডিত মস্তক সন্যাসিগণের নানা বিশ্বাস ও আচরণ আমদানি করেন।</p>
<p>ভিন্ন সম্প্রদায়ের বহুল প্রচলিত ও লৌকিক বিশ্বাস ও স্থানীয় আচার-আচরণ মুসলিম সমাজে বহুকাল ধরে প্রচলিত থাকে। বিজয়গুপ্ত নামক ষোড়শ শতাব্দীর জনৈক কবির মতে হাসান ও অপরাপর মুসলমানগণ যমশত্রু সাপের আক্রমণ ভয়ে সর্পকূলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসাকে পূজা করত।</p>
<p>কবি কম্পিত মুসলমান কর্তৃক মনসাপূজার এই কাহিনী স্বীকৃত সত্যের মর্যাদা নাও পেতে পারে কিন্তু ইহা স্বীকার্য যে হিন্দুগণের বহুকিছু মুসলমান সাধারণভাবে বিশ্বাস করতেন যে একজন আদি ভৌতিক শক্তি সর্পকূলের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বহু মুসলমান হিন্দু দেবদেবী এবং পীঠস্থানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং তাদের অনুগ্রহের কার্যকারিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। কথিত আছে, মীরজাফর মৃত্যুশয্যায় তার মন্ত্রী নন্দকুমারের পরামর্শে কৃতিকাভরী মূর্তি ধোয়া কয়েক ফোটা পানি পান করেছিলেন। <strong>বহু মুসলমান কবি তাহার পুস্তকের মুখবন্ধে আল্লাহ রসুল ও পির মুর্শিদগণের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু দেবতার প্রশস্তিও গেয়েছেন। বহু মুসলিম কবি রাধাকৃষ্ণের স্তুতিমূলক গান রচনা করেছেন।</strong> &#8216;সমশের গাজির পৃথি&#8217; নামক কাব্যে উল্লেখিত আছে যে একদা রাত্রে এক দেবী স্বপ্নে কবির নিকট তিনবার আবির্ভূতা হন এবং দেবীর আদেশ অনুযায়ী অনুগত কবি পরবর্তী প্রভাতেই ব্রাহ্মণগণের সহায়তায় হিন্দু প্রথায় দেবীর পূজা সমাপণ করেন। একজন গাজি যে হিন্দু দেবীর পূজা করেছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাহোক এ ঘটনা হিন্দু দেবীর প্রতি মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ ভক্তি শ্রদ্ধার পরিচয় বহন করে।</p>
<p>মুসলমান হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবাদিতে অংশ গ্রহণ করতেন। মুর্শিদাবাদ নবাবের আমলে মুসলমান শাসক ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ, হিন্দু সম্প্রদায়ের হোলি উৎসবকে বিশেষ আনন্দের উৎসবের পরিণত করেছিলেন। সাহায্য নয়, সিরাজদ্দৌলা ও মীরজাফর মহা আনন্দের সঙ্গে এই উৎসব পালন করতেন। বহু মুসলমান হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং শুভক্ষণ নির্ধারণে হিন্দুর মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আচারাদি পালন করতেন। বিষয়টা এতই সাধারণ ছিল যে ক্রাফটনের মতে, &#8220;হিন্দু ও মুসলমানদের জ্যাতির্বিদদের সমবেত গণনার ফলে বৎসরের প্রায় অর্ধেক দিন অশুভ বলে পরিগণিত হতো। সকল পরামর্শ সভার প্রধান গণৎকারের উপস্থিতি অপরিহার্য। নতুন কোনো কাজে হাত দেবার পূর্বে তার পরামর্শ সর্বাগে গ্রহণীয় এবং তার নিষেধবাণী রোমান সিনেটের একজন ট্রিবিউনের ভক্তির মতো অপ্রতিরোধ্য। নবাব সরফরাজ খান ও আলিবর্দী খান গণৎকারগণের পরামর্শক্রমে ভ্রমণ কিংবা অভিযানের শুভলগ্ন নির্ধারণ করতেন। নবাব মীরকাসিমও জ্যোতির্বিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন। ব্রাহ্মণ জ্যোতির্বিদদের দ্বারা তিনি তার নবজাত সন্তানের ঠিকজ্জী বাকুলজী প্রণয়ন করে নিয়েছিলেন।</p>
<p>এইভাবে হিন্দু মুসলমানগণ পরস্পরের সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করেছে। সামগ্রিক অর্থে বলতে গেলে মুসলমান শাসন আমলে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সমঝোতা ও সৌহার্দ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দুগণ মনের গভীরে মুসলমান বিদ্বেষ পোষণ করতেন। বাংলার মুসলিম শাসন আমলে পরবর্তী পর্যায়ে সে অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। কিন্তু এই সম্প্রদায়ভূক্ত সাধারণ মানুষ প্রতিবেশী সুলভ পারস্পরিক সু-সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বিরূপ মনোভাবের দ্বারা তারা প্রভাবিত হন নি। ক্রাফটন বলেন, &#8220;তবু একজন ইংরেজের পক্ষে বিস্মিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না যখন তিনি দেখতে পান যে সরাকারি পর্যায়ে বিপ্লবের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কি নগণ্য। বস্তুত ইহা দরবার কক্ষের ক্ষুদ্র গণ্ডীর বাইরে আদৌ অনুভূত হয় না।</p>
<p>হিন্দু মুসলমানগণের পারস্পরিক সমঝোতা ও সৌহার্দ বহু সাধারণ সাংস্কৃতিক প্রথার প্রশস্ত করেছে। পির, পাঁচপির, সত্যপিরের সেবা বাংলা সাহিত্য এবং আধ্যাত্ম মাইজ বাউল গোষ্ঠী এই প্রদেশে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের সাধারণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যতম কয়েকটি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সত্যপির ভক্তি</h5>
<p>সত্যপির বাংলার মুসলমানগণের এক সাধারণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এতে হিন্দু মুসলমানগণের ধ্যানধারণা ও আচার প্রথার সমন্বয় ঘটেছে। উভয় সম্প্রদায়ের সামাজিক সম্পর্কের ফলশ্রুতি হিসেবে সত্যপির ভক্তি মুসলমানগণের অদ্বৈতবাদ ও সামাজিক ন্যায় বিচারের উজ্জ্বল দাগ বহন করে। ইহার উৎপত্তি বিধায় নানা গল্প প্রচলিত আছে। বিষয়বস্তুর পার্থক্য এবং নানাযুগে নানা ব্যক্তিকে সত্যপিরের উদ্ভবের সঙ্গে জড়িত করলেও গল্পগুলোতে একটি যুগ সত্য বিধৃত তা হচ্ছে সত্যপির ভক্তির উপর মুসলমানগণের একেশ্বরবাদের ধারণা এবং সামাজিক ন্যায় বিচারে প্রাধান্য। একটি গল্পে ময়মনসিংহের কানকা নামে সমাজচ্যুত এক ব্রাহ্মণ সন্তান জনৈক মুসলমান সাধককে তার ধর্মগুরু হিসেবে বরণ করেন। পিরের আদেশে কানকা বিদ্যাসুন্দর কাহিনী নামক এক মহাকাব্য রচনা করেন। সত্যপিরের মাহাত্ম্য একটি প্রচার-ই ছিল এ কাব্যের উদ্দেশ্য। ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে হোসেন শাহের শাসন আমলে ইহা রচিত হয়। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে অপর একজন মূলসমান কবি ফরিদ আন্নাহ সত্যপিরের স্তুতিমূলক কাব্য রচনা করেন। এই ধর্মীয় পদ্ধতির উপত্তি সম্বন্ধে ভারতচন্দ্রের বক্তব্য এই যে একদা এক ফকির জনৈক ব্রাহ্মণের সামনে উপস্থিত হয়ে তার উদ্দেশ্যে শিরনি দাবি করেন। ব্রাহ্মণ ইহা প্রদানে অস্বীকার করলে ফকির অদৃশ্য হয়ে যান। এই ঘটনা হতে ব্রাহ্মণ উপলব্ধি করতে পারলেন যে হিন্দুদেবতা হরি (সত্য) এবং মুসলমান ফকির মূলত এক এবং অভিন্ন। অতএব উক্ত ব্রাহ্মণ সত্যপিরের উদ্দেশ্যে শিরনি প্রদান পূর্বক তার পূজা করেন।</p>
<p>আবার এক গল্পে সত্যপিরকে সত্যনারায়ণরূপে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু এ কাহিনীটিতে উপরোক্ত ঘটনার মর্ম বিধৃত। এই কাহিনী অনুসারে এক বণিক সত্যনারায়ণের আর্শীবাদে এক কন্যা সন্তান লাভ করেন। কন্যার বিবাহের পর বণিক ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাত্রা করেন। তার জামাতাও তার অনুগামী হয়। কিন্তু সত্যনারায়ণের পূজা না করে বিদেশে তারা ভয়ানক বিপদে পড়েন। বণিক পত্নী সত্যনারায়ণের পূজা করেন, বণিক বিপদমুক্ত হন। প্রত্যাবর্তনের পথে যখন তারা গৃহের সন্নিকটে আসলেন বণিক তনয়া সত্যনারায়ণের নৈবদ্যের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে। ফলে বণিকের পণ্যবাহী জাহাজসমূহ জলমগ্ন হয়। সত্যনারায়ণের উপাসনার মাধ্যমে তারা আবার সবকিছু ফিরে পান। কাহিনীসমূহ হতে এই সত্য প্রতীয়মান হয় যে সত্যপির সংক্রান্ত ধর্মীয় পদ্ধতি মুসলিম প্রভাবিত হিন্দু সমাজ হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। সত্যপির ভক্তির উৎসে রয়েছে অসাধরণ আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পন্ন মুসলমান সাধকগণের প্রতি হিন্দু জনগণের শ্রদ্ধাবোধ। সুফি ও পীরের প্রতি হিন্দুদের স্বাভাবিক ভক্তির ফলশ্রুতিরূপে ইহাকে গণ্য করা যেতে পারে। হিন্দুগণ পীরের অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাদের কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতেন। কালক্রমে হিন্দুদের এই পিরপূজা প্রথা সত্যপির পূজা পদ্ধতিতে রূপ লাভ করে। সত্যপিরের উপাসনা দ্বারা কাম্য বস্তু লাভ করা যায় এ সাধারণ বিশ্বাসের বহু দৃষ্টান্ত সমসাময়িক সাহিত্যে চিত্রিত। কবির কাব্যে হিন্দু দেবতার সঙ্গে মুসলিম পিরের সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়। অন্য কথায় মুসলমানের পির হিন্দুগণ কর্তৃক দেবত্বমণ্ডিত হতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি বিদ্যাপতি সত্যপিরের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য নিবেদন করে বলেছেন যে পিরের স্মৃতি জগতে অমর করে রাখবার জন্য তার আদেশে তিনি কাব্য চর্চা করতেন। দুঃখী জনের দুঃখ মোচনের জন্য সত্যপিরের আবির্ভাব। বিদ্যাপতি এ সত্য প্রচার করতেন। বহু হিন্দু ও মুসলমান কবি সত্যপিরের স্তুতিমূলক কাব্য রচনা করেন। শ্রী কবি বল্লভ বিরচিত &#8216;মদন সুন্দর পাচালী&#8217;তে প্রধান যে হিন্দুদের মধ্যে সত্যপির ভক্তিপ্রথা নিতান্তই সাধারণ ছিল এবং তারা শিরনি সহযাগে উক্ত পিরের পূজা করতেন। শরিফ নামক একজন মুসলমান কবি সত্যপিরের উদ্দেশ্যে ভক্তিমূলক কাব্য রচনা করেন। অপর একজন বাঙালি কবি শঙ্করাচার্য তার কাব্য সৃষ্টির মাধ্যমে সত্যপির ভক্তি প্রচার করেন। এমনকি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে একজন হিন্দু নিজেকে সত্যপিরের ভক্ত হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকার করতেন এবং এই হিতৈষী অবতারের পূজার প্রেরণা দান করতেন। ইপ্সিত ফল তার ক্ষমতার ব্যাখ্যায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন। কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণ কোরআনশরিফ পাঠ করাকে ধর্ম বিগর্হিত কাজ বলে আখ্যায়িত করেন। তখন ব্রাহ্মণ বালকরূপে আবির্ভূত হয়ে সত্যপির একখানি পবিত্র কোরান গ্রন্থ হাতে তুলে নেন। তার অভিভাবকবৃন্দ উহাকে মানতে নিষেধ করে এবং তাকে সাবধান করে দেয়া হয় যে কোরআনশরিফ পাঠ করলে সে তার নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ বালক ঈশ্বরের একত্ব প্রচার করেন এবং দাবি করেন যে বিষ্ণু এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।</p>
<p>সত্যপিরের ভক্তি বাঙালি সামাজজীবনে বিপুল শক্তি হিসেবে বহু শতাব্দী প্রচলিত ছিল। এই ঘটনা থেকে তার প্রভাব প্রমাণিত হয় যে, সত্যপির বিষয়ে বাংলায় একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য রচিত হয়েছে এবং এই সাহিত্যকে বৈষ্ণব সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সত্যপির মতবাদ বাস্তবিকই এরূপ একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় বুদ্ধি বৃত্তিক আন্দোলন ছিল যা সে যুগের লোকের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। ইহা হিন্দুদের ধর্মীয় সামাজিক বিশ্বাসসমূহেরও আচার অনুষ্ঠানগুলোর জটিলতাসমূহ অপসারণ করে সেখানে সহজ ও সরল বিশ্বাস প্রবর্তন করেছিল এবং উদারতার ভিত্তিতে হিন্দু সমাজের উন্নতির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। সত্যপিরের উপর রচনাসমূহ বাংলা সাহিত্য ঐশ্বর্যশালী করেছিল। ইহা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার আবহাওয়া সৃষ্টি করে। তা এখনও বাংলায় কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্যমান আছে। উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গে অনেক হিন্দু ও মুসলমান এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যপিরের পূজা করে। তারা একটি তক্তার উপর সত্যপিরের আসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ইহা ফুল দ্বারা সজ্জিত করে। পূর্ণিমার দিন তারা সত্যপিরের আরাধনার শিরনী দেয়। মোল্লা মন্ত্র পাঠ করেন এবং তারপর লোকের মধ্যে শিরনি বিতরণ করা হয়। রাজশাহী জেলায় সত্যপিরের ভিটা নামক একটি স্থান আছে। এর তত্ত্বাবধায়কগণ এখনও নিষ্কর জমি ভোগ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-coordination-of-islam-and-hinduism-during-the-mughal-period/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16260</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুঘল আমলে মুসলিম বাংলায় কৃষির অবস্থা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-agriculture-in-muslim-bengal-during-the-mughal-period/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-agriculture-in-muslim-bengal-during-the-mughal-period/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. এম এ রহিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 15 Oct 2025 13:16:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16244</guid>

					<description><![CDATA[বর্তমানের ন্যায়, মুসলিম আমলেও বাংলা প্রধানত একটি কৃষিপ্রধান দেশ ছিল এবং কৃষি-সম্পদে ইহা সমৃদ্ধিশালী ছিল। কৃষি সমৃদ্ধি ছিল বাংলার মাটির উর্বরতার অবদান। আবহমান কাল ধরে এর মাটির উর্বরতার খ্যাতি ছিল। প্রকৃতি এই প্রদেশের প্রতি সদয় ছিল। অসংখ্য নদ-নদী ও স্রোত-স্বিনীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বর্তমানের ন্যায়, মুসলিম আমলেও বাংলা প্রধানত একটি কৃষিপ্রধান দেশ ছিল এবং কৃষি-সম্পদে ইহা সমৃদ্ধিশালী ছিল। কৃষি সমৃদ্ধি ছিল বাংলার মাটির উর্বরতার অবদান। আবহমান কাল ধরে এর মাটির উর্বরতার খ্যাতি ছিল। প্রকৃতি এই প্রদেশের প্রতি সদয় ছিল। অসংখ্য নদ-নদী ও স্রোত-স্বিনীর জলে বিধৌত একটি উর্বরা দেশ বাংলা স্বাভাবিক জলসেচের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে; ফলে এই প্রদেশে প্রচুর শস্য শাকসব্জি, ফল-মূল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়েছে। প্রাকৃতিক জলসেচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের আশীর্বাদ। এ সবই বাংলাকে পরিচিত করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর অঞ্চলরূপে। সমসাময়িক লেখকগণ এবং বিদেশী পর্যটকগণ এর প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য দৃষ্টে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়েছেন। ইবনে বতুতা লিখেছেন যে, তিনি মেঘনার উভয় তীরে উদ্যানরাজি, শস্যপূর্ণ মাঠ ও জনবহুল সমৃদ্ধ গ্রামসমূহ দেখতে পান। পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় আগত চৈনিক দূতগণও এর উর্বরতা শক্তি ও প্রাচুর্য লক্ষ্য করেছেন। এদের একজন মন্তব্য করেছেন, “সপ্তস্বর্গ এই রাজ্যে পৃথিবীর স্বর্ণরাজি ছড়িয়ে রেখেছে।” বাংলার উর্বরতার কাহিনী এত বেশি প্রচলিত ছিল যে, আবুল ফজল লিখেছেন যে, ধানের গাছ গুলো এক রাতেই ৬ হাত বেড়ে উঠতো এবং বাংলার মাটিতে বছরে তিনটি ফসল জন্মাতো। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে বাংলার পরিদর্শন করে বার্ণিয়ার লিখেছেন যে, তিনি সমগ্র প্রদেশব্যাপী বহু নদীনালা ও খাল-বিল দেখতে পেয়েছেন এবং এগুলোর চতুর্দিকে শস্য ও ফলে ভরা উর্বর ও সবুজ মাঠ এবং শ্রেণিবদ্ধ ঘন বসতিপূর্ণ বহু শহর ও গ্রাম সাজানো ছবির মতো শোভা পাচ্ছিল। বিদেশীরা বাঙালি জনসাধারণের বুদ্ধিমত্তা ও পরিশ্রমী প্রকৃতির উল্লেখ করেছেন। চৈনিক দূতগণ লিখেছেন যে, বাংলায় পুরুষ রমণী উভয়ে মাঠে কাজ করে, তাদের শস্যের মৌসুম শেষ হলে, অবসর সময়ে তারা কাপড় বুননের কাজে নিয়োজিত হয়। বাঙালি কৃষকদের পরিশ্রমী প্রকৃতির প্রশংসা করে আলেকজান্ডার ডোউ লিখেছেন যে, পঞ্চদশ মিলিয়ন পরিশ্রমী লোক অধ্যুষিত বাংলাকে প্রকৃতি কৃষির জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে সুবিধাজনক অঞ্চলরূপে নির্বাচিত করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>চাউল</strong></p>
<p>মাটির অসাধারণ উর্বরতা শক্তি ও অধিবাসীদের পরিশ্রমী প্রকৃতি বাংলায় শস্য, শাক-সব্জি ও ফলমূলের প্রাচুর্য সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। এগুলো এত বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হতো যে, বাংলার অধিবাসীদের চাহিদা মেটানোর পরও বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত থাকত। মিঃ ওরম বলেন যে, বঙ্গভূমি এত প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন করত যে তা&#8217; তারা এক ফার্দিং মূল্যে (সস্তা দামে) বিক্রয় করে দিত। চাউল ছিল প্রদেশের প্রধান কৃষিজ উৎপন্ন দ্রব্য। বাংলাদেশে সরু, মধ্যম ও মোটা বিভিন্ন প্রকার চাউল জন্মাতো। বিভিন্ন প্রকার চাউলের উল্লেখ করে আবুল ফজল বলেন, &#8220;যদি প্রত্যেক প্রকারের শস্যের একটি করে কণাও সংগ্রহ করা যায়, তাহলে তাতেও একটা বিরাট ভাণ্ড ভরে উঠবে।” সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে উল্লেখিত ধান্যের অসংখ্য নাম থেকে এর বৈচিত্র্যে এবং প্রদেশের কৃষিজীবনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত মিলে। এ সবের কিছু সংখ্যকের নাম ছিল আমলো, আষাঢ়ে, আশাঙ্গ, উড়াশালী, কাকচী, কনকচুর, কাঙ্গাদ, কামা, তুজনা, কালাকরিৎ, মুসুমালী, খিরাকম্বা, খেজুরসারি, খাইমরাই, গুজুরা, গুনতামপালাল, গোপালজুরী, গোপালভোগ, ছিছড়া, ঝিঙ্গাশাল মুক্তাহার, মাওকালো, লাউসালী, পর্বতীজিরা, ফেরফেরী, ভোদোলী, মইপল, শানাখারকী, সলছটি, সীতাসালী, হালিপাঞ্জর, মাউকলাস, লালকামিনী, বাঁশমতি, বোয়ালী ইত্যাদি। চাউল এত প্রচুর পরিমাণ উৎপন্ন হতো যে, এটা রপ্তানির একটি প্রধান পণ্যরূপে পরিগণিত হতো। বার্নিয়ার মন্তব্য করেছেন, &#8220;বাংলায় এত বেশি চাউল উৎপন্ন হয় যে, ইহা কেবল প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেই তাহা সরবরাহ করে না, বরং দূরবর্তী রাজ্যেও প্রেরণ করে থাকে। গঙ্গার উপর দিয়ে বহন করে চাউল পাটনায় নিয়ে আসা হয় এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে মসুলীপত্তন ও করোমণ্ডলের অন্যান্য বহু বন্দরে রপ্তানি করা হয়। বিদেশী রাজ্য প্রধানত সিংহল ও মালদ্বীপেও এই চাউল পাঠানো হতো।&#8221; মিঃ বার্থলোমিউ পাইসটেড ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন যে, বালীসোরের ইউরোপীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো মালদ্বীপের সঙ্গে চাউল ও অন্যান্য শস্যের খুব ভালো ব্যবসা চালিয়েছিল।</p>
<p>বিভিন্ন প্রকার শস্য, যেমন জনার, তিলতিষি, শিম বা বরবটি এবং নানা প্রকার শাক-সব্জি, পেয়াজ, রসুন, শসা, লাউ ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে জন্মাত। নারিকেলও প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো বলে পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে তা&#8217; রপ্তানি করা হতো। লঙ্কা, আদা ও হলুদ বিপুল পরিমাণে জন্মাতো। এবং এগুলো উপমহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে ও পশ্চিমে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এবং পূর্বদিকে ম্যানিলা ও চীন পর্যন্ত রপ্তানি করা হতো।<br />
<script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<!-- Fixed size ads --><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: inline-block; width: 728px; height: 90px;" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="3128429081"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<h5>গম</h5>
<p>মুসলিম শাসনামলে বাংলায় ভালো ধরনের গম উৎপন্ন হতো। এর গম উৎপাদন অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ডাচ পরিব্রাজক স্ট্যাভোরিনাস ১৭৬৯-১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণ করে লিখেছেন যে, বাংলায় উৎকৃষ্ট গম উৎপন্ন হতো এবং পূর্বে এসব গম বাটাভিয়ায় পর্যন্ত পাঠানো হতো। পরবর্তীকালে উত্তমাশা অন্তরীপের গম শস্যের ব্যবসায়ের জন্য অনুকূল অবস্থা সৃষ্টির জন্য ঈস্টইণ্ডিয়া কোম্পানি বাংলার গম রপ্তানি নিরুৎসাহিত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ইক্ষু</h5>
<p>ইক্ষু ছিল বাংলার আর একটি প্রধান কৃষিজ উৎপন্ন দ্রব্য। উহার উৎপাদন ছিল ব্যাপক। ষোড়শ শতকের &#8216;বেঙ্গালা&#8217; শহর পরিদর্শন করে বারবোসা এই এলাকার চিনি উৎপাদনের কথা &#8216;উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, এই শহরে ভালো ধরনের চিনি তৈরি হলেও তারা এ দিয়ে চিনির তাল তৈরি করতে জানে না। বেঙ্গালা থেকে চিনি রপ্তানির প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, &#8220;চিনি দিয়ে তারা বহু জাহাজ বোঝাই করে এবং বিক্রির জন্য অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি করে।&#8221; ইতালীয় বণিক লিউইচ বার্থেমা ১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণ করেন এবং এর চিনি উৎপাদন লক্ষ্য করেন। বাংলায় সমগ্র মুসলিম আমলব্যাপী ইক্ষু একটি সমৃদ্ধিশালী কৃষিজ পণ্য ছিল। সপ্তদশ শতকে চিনি সম্পর্কে বার্নিয়ার বলেন, &#8220;বাংলা প্রচুর চিনি উৎপাদন করে এবং তা&#8217; গোলকুণ্ডা ও কর্ণাটি রপ্তানি করে থাকে। এছাড়া মোকা ও বসোরা শহরের মাধ্যমে আরব ও মেসোপটেমিয়া প্রভৃতি রাজ্যে এবং এমন কি বন্দর আব্বাসের মধ্য দিয়ে পারস্যে চিনি রপ্তানি করা হয়ে থাকে। &#8221; ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে ডাচ বণিকদের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, &#8220;চিনির বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০,০০০ মণ; এতে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ লাভ হতো এবং সাধারণত এর মূল্য স্বর্ণ মুদ্রায় দিতে হতো।” পরবর্তীকালে এই উপমহাদেশের পশ্চিমাংশের বাজারে ডাচ ব্যবসায়ীগণ কর্তৃক আমদানিকৃত জাভা চিনির প্রতিযোগিতার ফলে বাংলার চিনি রপ্তানি বাণিজ্য হ্রাস পায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>পাট</h5>
<p>চতুর্দশ শতক থেকে বাংলা সাহিত্যে পাট ও পাটজাত বস্ত্রের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম শাসনের প্রারম্ভ কাল থেকে বাংলায় পাটের উৎপাদন বিদ্যমান ছিল। এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে এ শস্যের একটি বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।</p>
<p>আবুল ফজল ষোড়শ শতকে বাংলায় পাট উৎপাদন, যেমন পট্টবস্ত্র ইত্যাদির উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, &#8220;বাংলার গোড়াঘাট সরকারে রেশম এক প্রকার চটের কাপড়ের উৎপাদন ছিল।&#8221; পাটের তত্ত্ব দিয়ে তৈরি সেযুগো চটের থলে এবং মোটা বস্ত্র তৈরি হতো। ষোড়শ শতকের বাংলা সাহিত্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রদেশের পট্টবস্ত্র রপ্তানির প্রমাণ রয়েছে। &#8216;মনসামঙ্গল&#8217; গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, চাঁদসওদাগর পাটের শাড়ি ও ধুতি ইত্যাদি বহু পণ্য দ্রব্য নিয়ে একটি দেশে ব্যবসায় করতে যান। তিনি চাতুর্যের সঙ্গে সেই দেশের রাজার নিকট এই পট্টবস্ত্রের গুণের উচ্চ প্রশংসা করেন। অতঃপর রাজা তদীয় রাণী ও নিজের জন্য কয়েকখানা বস্ত্র ক্রয় করতে প্রলুব্ধ হন। ফরাসি ব্যবসায়ী টাভার্নিয়ার সর্বপ্রথম বাংলার পাট উৎপাদনের বিষয় ইউরোপীয়দের নজরে আনেন। এরপর থেকে চটের থলে রপ্তানির একটি প্রধান বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। ঈস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিককার দলিলপত্রে পাটের চট রপ্তানির উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ অগাস্ট তারিখের একটি পত্রে বোম্বাইয়ে কোম্পানির সভাপতি এবং পরিষদ পাটের চটের জন্য এক চুক্তিপত্রে আবদ্ধ হন। ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ২১শে জুলাই তারিখের মাদ্রাজ কাউন্সিলের অন্য একটি দলিলে পাটের চটের জন্য অনুরূপ আর একটি চুক্তি পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের পাবলিক প্রোগ্রেস ভলুমে ১,২০০ বস্তা সরু চাউল ও ২,০০০ চটের থলের জন্য আর একটি ফরমাস পত্রের উল্লেখ রয়েছে। উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে পর্যন্ত হাতে বোনা কাপড় ও পাটের তৈরি বস্তার রপ্তানি-বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। ঈস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিলপত্র থেকে জানা যায় যে, ১৮৪০-৫১ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতা থেকে রপ্তানিক্ত চটের থলে ও কাপড়ের সংখ্যা ছিল ৯০,৩৫,৭১৩ এবং এর মূল্য হয়েছিল ২১,৫৯,৭৮২ টাকা। হাতে বোনা পাটজাত পণ্যদ্রব্য পাটের কল-কারখানা স্থাপনের পর হ্রাস পেয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>নীলচাষ</h5>
<p>প্রাচীনকাল থেকে উপমহাদেশের অন্যান্য কিছু এলাকার মতো বাংলায়ও নীলের চাষ বিদ্যমান ছিল। সপ্তদশ শতকের মধ্য ভাগে এটা ইউরোপীয় বণিকদের নজরে আসে। এই সময় থেকে ইউরোপীয় বাজারে নীল রঙ প্রদেশের একটি রপ্তানিযোগ্য পণ্যদ্রব্য ছিল। ফরিদপুর, ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ ও যশোহর জেলায় নীলের চাষ হতো। ইংরেজরা আমেরিকা হারানোর পর বাংলাকেই তারা নীল রঙের প্রধান সরবরাহকারী রূপে পরিগণিত করে, ফলে এই সমস্ত জেলায় নীলের চাষ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজ নীলকররা কৃষকদেরকে অগ্রিম দাদন দিয়ে নীল চাষের অধীনে বেশি জমি আনয়ন করার জন্য বাধ্য করে। কিন্তু তারা চাষীদেরকে এরূপ মূল্য দিত যা&#8217; দিয়ে এই শস্যের চাষাবাদের খরচও সংকুলান হতো না। ইংরেজ নীলকররা তাদের নিজস্ব সরকারের অধীনে হতভাগ্য কৃষকদেরকে নীলের চাষ অব্যাহত রাখতে বাধ্য করত। তারা কৃষকদের উপর অবিচার ও উৎপীড়ন করত। এরূপে নীল চাষ প্রদেশের কৃষকদেরকে সর্বশান্ত করে ফেলে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>আফিম</h5>
<p>আফিম গাছের চাষ উত্তর বাংলা ও বিহারের কতিপয় জেলায় প্রচলিত ছিল। বহু লোক এই মাদক ঔষধের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। আফিম অন্যান্য দেশে রপ্তানির অন্যতম পণ্য ছিল। চীন বাংলার আফিমের প্রধান ক্রেতা ছিল। প্রদেশে আফিম ক্রয়ের উপর বাধা নিষেধ ছিল। কৃষকগণ কেবল সরকার অনুমোদিত ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি করতে পারত। সপ্তদশ শতক থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো আফিম ক্রয় ও রপ্তানি বাণিজ্যে একচেটিয়া মুনাফা করে। ঈস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার রাজস্ব লাভের উদ্দেশ্যে আফিম চাষীদের থেকে আফিম ক্রয়ের উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেন। প্রায় সমস্তটা আফিমই রপ্তানি করা হতো। রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত ঠিকাদাররা চাষীদের প্রতি অত্যাচার উৎপীড়ন করে মূল্য কমিয়ে দিত এবং মূল্য প্রদানেও তাদেরকে ঠকাত। কৃষকরা হয় চোরা কারবারিদের নিকট বিক্রি করত অথবা আফিমের চাষ পরিত্যাগ করত। ফলে বাংলায় আফিমের চাষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>লাক্ষা</h5>
<p>প্রাচীনকাল থেকে উত্তর বঙ্গের কয়েকটি জেলাতে লাক্ষার চাষ করা হতো। এটা গালা ও রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আঠালো লাক্ষা ছিল গালা এবং এর সঙ্গে পোকা-মাকড় অথবা এর ডিম্ব মিশ্রিত করে তা থেকে রঙ বানানো হতো। রঙ করার অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো আলাদা করা হতো এবং রঙে পরিণত করা হতো। আঠা দিয়ে পাতগালা তৈরি করা হতো। লাক্ষা রঙ উজ্জ্বল লাল রঙ্গের বস্ত্রাদি রঙ করার জন্য ব্যবহৃত হতো। লাক্ষা আবার বার্নিশরূপেও ব্যবহৃত হতো। উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে এবং বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। বাংলায় উত্তম লাক্ষা উৎপাদিত হতো এবং এই পণ্যের ক্ষেত্রে কার্যত বিদেশী বাজারের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল তাদের। ষোড়শ শতকে বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করে বার্থেমা ও বারবোসা এই প্রদেশ থেকে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লাক্ষা রপ্তানি ব্যবসায় লক্ষ্য করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>সুতা</h5>
<p>বাংলার বিশেষ কিছু এলাকায় উত্তম ধরনের সরু সুতা উৎপাদিত হতো। এই তত্ত্ব বিশ্ববিখ্যাত সূক্ষ্ম বস্তু মসলিন তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতো। জনৈক ইংরেজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি জে, বি. টেলর অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে বাংলাদেশে বিশেষত ঢাকায় বহু বছর বসবাস করেছিলেন। তিনি প্রদেশের এ অংশে উৎপাদিত তত্ত্বর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তাঁর মন্তব্য উদ্ধৃতিযোগ্য। তিনি বলেন,</p>
<p>&#8220;ঢাকার ১২ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ফিরিঙ্গি বাজার থেকে বিস্তৃত মেঘনা নদীর তীর ধরে ইদিলপুর পর্যন্ত, সাগরের ২০ মাইল উত্তরে দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ মাইল এবং প্রস্থে কোনো কোনা স্থানে তিন মাইল এবং কেদারপুর, বিক্রমপুর, রাজেন্দ্রপুর, কার্তিকপুর, শ্রীরামপুর ও ইদিলপুর পরগণায় অবস্থিত।<strong> ঢাকা প্রদেশের এই অঞ্চলে উৎকৃষ্টতম কার্পাস উৎপন্ন হয়; এবং আমি বিশ্বাস করি যে, পৃথিবীর অন্য কোথাও এরূপ উৎকৃষ্ট কার্পাস উৎপন্ন হয় না। ভারতের অন্য কোনো অঞ্চলের অথবা মরিটানিয়া দ্বীপপুঞ্জের অথবা বোর্বেনের যেখানের কার্পাসের খ্যাতি আছে এবং আমি যতটুকু খবর রাখি পৃথিবীর কোনো স্থানে উৎপন্ন কার্পাস ঢাকা অঞ্চলে উৎপন্ন কাপাসের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে না এবং গুণের ভিত্তিতে সমকক্ষ হতে পারে না।</strong> উপরোক্ত কার্পাসের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ এই যে এই অঞ্চল সমুদ্রের নিকট অবস্থিত; স্রোতের প্রবাহের সঙ্গে সমুদ্রের পানি মেঘনার পানির সঙ্গে মিশে এই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে; বছরের তিন মাস এরূপ হয়; এতে জমিতে বালি ও লবণের কণার পলিমাটির পাতলা আবরণ পড়ে এবং তা&#8217; জমি উন্নত ও উর্বর করে তোলে। এটাও মনে করা হয় যে, বিশুদ্ধ সমুদ্র-বায়ু কাপাস চারা বৃদ্ধির অনুকূলে কাজ করে। ফিরিঙ্গিবাজার থেকে ইদিলপুর, লক্ষ্যা নদীর ও ধলেশ্বরী নদীর তীরভূমি রূপগঞ্জের কিছুটা উপর পর্যন্ত ১৬ মাইল বিস্তৃত এবং ছোট ব্রহ্মপুত্রের তীরভূমির ধলেশ্বরীর উত্তর কয়েক মাইল এলাকা ঢাকা প্রদেশে (বর্তমান ঢাকা জেলা) ব্যবহৃত অধিকাংশ কার্পাস সরবরাহ করে। অবশিষ্টাংশ কার্পাস বলদাখাল (ঢাকা জেলার একটি পরগণা), ভাওয়াল ও আলেপসিংহ (ময়মনসিংহের পরগণা) এলাকায় উৎপন্ন হয় এর কতক ভূষণা (যশোহর জেলার পরগণা) এবং পার্শ্ববর্তী রাজশাহী প্রদেশ হতে সরবরাহ করা হয়।&#8221; অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে কার্পাস তুলার বীজ বপন করা হয় এবং এপ্রিল ও মে মাসে এ ফসল উঠে। গাছগুলো ৩ থেকে ৪ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। কার্পাস ফসল সংগ্রহের পর এদের চারাগুলো শিকড়সহ উপড়ে ফেলা হয়। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পরবর্তী বীজ বপনের পূর্বে, একই জমিতে ধারেন চাষ হয়ে থাকে। চতুর্থ বছরে এধরনের অনাবাদী রাখা হয়, অথবা অন্য কোনো ফসলের জন্য ব্যবহার করা হয়।</p>
<p>ইংরেজ রেসিডেন্ট জে. বেব্ব লিখেছেন যে, &#8220;বাংলার সুতা বিশেষ করে ঢাকা অঞ্চলের সুতা সমগ্র পৃথিবীর যে কোনো সুতা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ছিল। এবং এ থেকে আশ্চর্য রকমের সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো।&#8221; প্রথমে ব্রিটিশ উৎপাদকরা ভেবেছিলেন যে সুরাটের সুতাই সর্বোৎকৃষ্ট মানের। কার্যত সুরাট ও উত্তরাঞ্চলীয় সুতা সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র তৈরির জন্য অনুপযোগী ছিল। এই মসলিন বস্ত্র উপরোল্লিখিত অঞ্চলে চাষকৃত &#8216;ফটি&#8217; নামে অভিহিত একমাত্র বাংলার সুতার সাহায্যেই তৈরি হতো। &#8216;ফটি&#8217; এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে দু&#8217;বার সংগ্রহ করা হতো। সূক্ষ্ম বস্ত্রাদি যেমন মলমল আল্লাবালি, দোরিয়া, তেরিদ্দাম, তানজিব, শরবতি ও নয়নসুখ ইত্যাদি ফটি সুতার সাহায্যে তৈরি হতো। মালদাতে &#8216;বরাবুঙ্গা&#8217; &#8216;বিরেটা&#8217; ও &#8216;নূরমা&#8217; ইত্যাদি তিন প্রকারের সুতার উৎপাদন ছিল। &#8216;বরাবুঙ্গা&#8217; সুতা ছিল কমনীয় এবং সূক্ষ্ম কিন্তু এর উৎপাদনের পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। সাধারণত অপেক্ষাকৃত মোটা রকমের &#8216;নূরমা&#8217; ও &#8216;বিরেটা&#8217; বাইরে রপ্তানি করা হতো। রংপুরে &#8216;চিস্তিয়া&#8217; নামক এক প্রকার নিম্নমানের সুতা উৎপাদতি হতো। বীরভূমের সুতার উৎপাদন ছিল ব্যাপক, কিন্তু এর দ্বারা কেবলমাত্র মোটাবস্ত্র তৈরি হতো। বর্ধমানে &#8216;নূরমা&#8217; মুহরী&#8217; ও বোগ্লা এই তিন প্রকারের সুতার অস্তিত্ব ছিল। নয়নসুখ, মলমন্স, শরবতি, দোরিয়া ইত্যাদি বস্ত্র তৈরির জন্য নূরমা সুতা ব্যবহৃত হতো। গোজি ও গুররা বস্ত্রের জন্য &#8216;মুহরী&#8217; এবং &#8216;গুররা&#8217; মিশালী কাপড়ের জন্য &#8216;বোগ্‌গা&#8217; ব্যবহৃত হতো। রাধানগরে &#8216;কাউর&#8217; মুহরী ও &#8216;বোগ্‌গা&#8217; এ তিন প্রকারের সুতা প্রস্তুত হতো। &#8216;কাউরে&#8217; চমৎকার সূক্ষ্ম সুতা হতো। মেদিনীপুরে কুরেরারা ও &#8216;মুহরী&#8217; ও দুপ্রকারের সুতার উৎপাদন ছিল। কুরেরারা ছিল কোমল ও সূক্ষ্ম ধরনের এবং এ সুতা সূক্ষ্ম বস্ত্রাদি যেমন, &#8216;নয়নসুখ,&#8217; শরবতি ও অন্যান্য প্রকার মসলিন তৈরির জন্যে ব্যবহৃত হতো। &#8216;মুহরী&#8217; সুতা দিয়ে &#8216;দিমিতি&#8217; ও অপেক্ষাকৃত মোটা অন্যান্য কাপড়াদি বোনা হতো। উত্তরে ব্রহ্মপুত্র ও দক্ষিণে চলন বিলের মধ্যবর্তী হরিয়াল অঞ্চলে &#8216;দেশী&#8217; ছিল অপেক্ষাকৃত মোটা শান্তিপুর অঞ্চলের সুতা ছিল উৎকৃষ্ট মানের। এটা উল্লেখযোগ্য যে, বাংলায় উৎপন্ন কাপাস তুলা মসলিন তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। ইংরেজরা বাংলাদেশে তাদের কল-কারখানায় সাধারণ কাপড়-চোপড় তৈরির জন্যে সুরাট ও মীর্জাপুর থেকে সুতা আমদানি করত। মসলিম প্রস্তুতের জন্য সুরাটের সুতা উপযোগী ছিল না।</p>
<p>মুসলিম আমলে ভাতের সঙ্গে মাছ ছিল বাংলার মানুষের প্রধান খাদ্য। আবুল ফজল বাংলার মাছের প্রাচুর্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রদেশের নদ, নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিসমূহ মাছে ভরা ছিল। বাংলা মুল্লুকে মুগল নৌ-বাহিনীর সেনাপতি মীর্জা নাথন প্রসঙ্গত এ বিষয়ের উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন যে, মুগল নৌ-বাহিনী যখন করাতোয়া নদী দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল তখন নদীর মাছ পানি থেকে লাভ দিয়ে উঠে এবং সৈন্যদের রণবাদ্য ও কামান-গোলা ইত্যাদির কাছে বহু মাছ নৌকার মধ্যে পড়ে যায়। মীর্জা নাথন সুবাদার ইসলাম খানকে তার তাঁবুতে বড় বড় চল্লিশটি মাছ উপঢৌকন পাঠান। ইসলাম খান তাঁর খাবার জন্য বাবুর্চিকে মাছ রান্না করতে আদেশ দেন। গবাদি ও গৃহপালিত পশু যেমন, গরু উষ্ট্র, ভেড়া, বকরী, অশ্ব ও খচ্চর ইত্যাদি সম্পদে বাংলাদেশ ঐশ্বর্যশালী ছিল। প্রদেশে হাঁস-মুরগি, রাজহাঁস এবং অন্যান্য বহু পাখিও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত।</p>
<p>আবুল ফজল বাংলাদেশে নানা ফুল ও ফলের প্রাচুর্যের উল্লেখ করেছেন। সুপারির প্রাচুর্যের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, যারা সুপারি খায় তাদের মুখ লাল রঙে রঞ্জিত হয়। সুপারি ও পান বাংলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জন্মে। অন্যান্য ফল যা&#8217; বাংলায় প্রচুর জন্মাত, তাহলো আম, কাঁঠাল, কলা, ডালিম, খেজুর, কমলা, সানতারাহ ইত্যাদি। সিলেট সরকারে ঘৃত-কুমারী মাঠে সমৃদ্ধ বনভূমি ছিল; এসব কাঠ রপ্তানির জন্য মূল্যবান পণ্য ছিল। লোহা ও হীরক ছিল বাংলার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য খনিজ দ্রব্য। সরকার বাজুহাতে লৌহখনি এবং মান্দারন সরকারের হরপাতে হীরক খনি ছিল।<br />
<script async="" src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<h5>রেশমি বস্ত্র</h5>
<p>বাংলার রেশমি বস্ত্রের উৎপাদন সুবাদার, নবাব ও অভিজাত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। রেশমি ও মসলিন বস্ত্রের খুব ব্যাপক চাহিদা ছিল। উচ্চ ও অভিজাত শ্রেণির মেয়ে ও পুরুষ সকলে রেশমি ও মসলিন বস্ত্র পরিধান করত। সমসাময়িক, বাংলা সাহিত্যে অভিজাত পরিবারের মহিলাগণ কর্তৃক রেশমি শাড়ি ব্যবহারের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। বাংলায় তুঁত গাছ ও গুটি পোকার চাষ করা হতো। চৈনিক দূতগণ এটা লক্ষ্য করেছেন। হিন্দু আমলে এ উপমহাদেশে গৃহজাত ও বাণিজ্যের জন্য গুটি পোকার চাষ অজ্ঞাত ছিল। মুসলমান আমলেই সর্বপ্রথম খুব সম্ভবত চীন থেকে উহা আমদানি করা হয়। আবুল ফজল ঘোড়াঘাট অঞ্চলে রেশম উৎপাদনের বিষয় উল্লেখ করেছেন। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে টেভর্ণিয়ার কাসিমবাজার পরিদর্শন করেন। তিনি লিখেছেন যে, সে সময় কাসিমবাজার শহরে কাঁচা রেশমের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় আড়াই মিলিয়ন পাউণ্ড (২২,০০০ বেল, প্রতিটি বেলের ওজন ১০০ লিভার); এর মধ্য থেকে ৩/৪ মিলিয়ন গুজরাট ও উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে পাঠানো হতো, কিন্তু এর কিছু অংশে তাতার বণিকগণ মধ্য এশিয়ায় নিয়ে যায়। ডাচরাও প্রতিবছর কাসিম বাজারের প্রায় ৩/৪ মিলিয়ন কাঁচা রেশম জাপান ও হল্যান্ডে রপ্তানি করত এবং বাদবাকি এক মিলিয়ন পাউণ্ড বাংলার রেশমি বস্ত্র কারখানাসমূহে ব্যবহৃত হতো। বার্ণিয়ার লিখেছেন, “ডাচরা মাঝে মাঝে কাসিমবাজারে তাদের কারখানায় সাত অথবা আট শত দেশীয় লোকদের নিয়োগ করত; অনুরূপভাবে ইংরেজ&#8217; ও অন্যান্য বণিকরাও অনুরূপ সংখ্যার দেশীয় লোকজন নিয়োগ করেছিল। ডাচরা যে সুতি বস্ত্র বিশাল পরিমাণে রপ্তানি করে তাহা দেখে আমি কখনও বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়ি। কাঁচা রেশমের রপ্তানি বাণিজ্য অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এসময়ের কাঁচা রেশমের দেশীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে এই তথ্য থেকে যে, সুদূর আলিবর্দী খানের আমলে ইউরোপীয়দের বিনিয়োগ ছাড়াই প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা মূল্যের কাঁচা রেশম মুর্শিদাবাদের সুষ্ক অফিসের হিসাবে ধরা হয়েছে। ১৬৭৫-৮০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পরিভ্রমণের সময়ে স্টেশন মাস্টার কাসিমবাজারের চতুঃস্পার্শ্বস্থ গ্রামগুলো তুঁত গাছে পরিপূর্ণ দেখতে পেয়েছেন। বার বার মারাঠা আক্রমণের ফলে পশ্চিম বাংলার রেশম শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারিগররা গঙ্গার অপর তীরে পালিয়ে যায়। ঈস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানি পদ্মার পূর্বতীরে তুঁত গাছের চাষ, রেশমের গুটি বর্ধন ও রেশমের সুতা পাকানো উৎসাহিত করার নীতি অনুসরণ করে। ফলে বোয়ালিয়া, জঙ্গীপুর, কুমারখালি, মালদহ, রাধানগর, রংপুর ও রাঙ্গামাটি প্রভৃতি অঞ্চলসমূহ রেশমি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়। রিয়াজুস সালাতীনে মালদহ এলাকায় উৎকৃষ্ট মানের রেশম উৎপাদনের কথা উল্লেখিত হয়েছে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-agriculture-in-muslim-bengal-during-the-mughal-period/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16244</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের চামড়া ও ট্যানারি শিল্প</title>
		<link>https://rowyakbd.com/leather-and-tannery-industry-in-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/leather-and-tannery-industry-in-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Oct 2025 16:43:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16234</guid>

					<description><![CDATA[কোরবানি ঈদের কাঁচা চামড়ার মূল্যের ভয়াবহ নিম্নমুখীতা, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত মুনাফা লাভের বিষয়, অদক্ষতা, কাঁচা চামড়া কেনা-বেচা নিয়ে মৌসুমী ব্যাবসায়ীদের ভীতি ও সিন্ডিকেট; এবং এর দরুণ সাধারণ জনগণের ক্ষোভ মিশ্রিত হতাশা যেন প্রতিবছরের নারকীয় দৃশ্য। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>কোরবানি ঈদের কাঁচা চামড়ার মূল্যের ভয়াবহ নিম্নমুখীতা, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত মুনাফা লাভের বিষয়, অদক্ষতা, কাঁচা চামড়া কেনা-বেচা নিয়ে মৌসুমী ব্যাবসায়ীদের ভীতি ও সিন্ডিকেট; এবং এর দরুণ সাধারণ জনগণের ক্ষোভ মিশ্রিত হতাশা যেন প্রতিবছরের নারকীয় দৃশ্য। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেগুলো ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় ভাগারে, নর্দমায় অথবা নদীতে। আর সঠিক সংরক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় হাজারও মুল্যবান চামড়া। ক্ষোভে-দুঃখে কেউ কেউ চিরদিনের জন্য এ’ব্যাবসা থেকে ইস্তফা নেয়। কাউকে তার শেষ সম্বল বা পুঁজিটুকু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হয়; পথের ভিখিরি হতে হয়।</p>
<p>নাম-মাত্র মূল্যে চামড়া কিনে কেন চামরাজাত পন্যের দাম আকাশছোঁয়া ধরা হয়?</p>
<p><strong>একবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে, পতোন্মুখ গার্মেন্টস ব্যাবসার বিকল্প হিসেবে ভাবা হয়েছিল চামড়া শিল্পকে। সে জন্য সরকার চামড়া শিল্পকে ‘এমারজিং এক্সপোর্ট সেক্টর’ হিসেবে ঘোষনা (নেক্সট টু আর এম জি) দিয়ে সবচেয়ে প্রায়োরিটি দেবার পরেও বাংলাদেশের চামড়া সেক্টরের কেন এ দৈন্য দশা?</strong><script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<!-- Fixed size ads --><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: inline-block; width: 728px; height: 90px;" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="3128429081"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এই শিল্পটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত ছিল। শিল্প কর্মসংস্থান তৈরিতেও বেশ ভাল ভূমিকা পালন করেও কেন পিছিয়ে পড়ল এ খাত?</strong></p>
<p>চামড়াজাত পন্য রপ্তানীর বিপরীতে ১৫% পর্যন্ত ক্যাশ ইনসেটিভ বা প্রণোদনা ঘোষনার পরেও কেন আমাদের এই শিল্পটা দিনের পর দিন চোরাবালির গহীনে অতলে তলিয়ে যাচ্ছে? কেন এই খাতের ভয়ংকর টালমাতাল অবস্থা?</p>
<p>কেউ এই সমস্যার গভীরে যেয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা করতে চায় না। আপামর জনতা সরকার ও ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে ক্ষান্ত দেয়; যেন এদের উপরে দায় চাপালেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ঈদের পর ঈদ যায়। জনগন কথা তুলে, আবার সেই জ্বালাময়ী বক্তব্য সবাই ভুলেও যায়। কিন্তু সমস্যার সমাধান কেউ দিতে পারে না। ফলশ্রুতি, পরিস্থিতি দিনদিন আরও ভয়ঙ্কর পথে অগ্রসরমান।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে এখন প্রায় ১১৩টি ট্যানারি রয়েছে যা প্রতি বছর ১৮০ মিলিয়ন বর্গফুট হাইড এবং চামড়া উৎপাদন করে। এছাড়াও প্রায় ৩০টি আধুনিক জুতো উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে যারা উচ্চ-মানের জুতো তৈরিতে নিযুক্ত। ২৫০০ এরও বেশি ছোট কোম্পানি বা উদ্যোক্তারা এই খাতের সাথে সম্পৃক্ত। বেশিরভাগ ট্যানারিগুলিতে যথাযথ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ভিদ নেই এবং প্রতিদিন ২০০০০ লিটার ট্যানারি ফ্লুয়েন্ট এবং ২৩২ টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদন করে। ট্যানারি বর্জ্য রিসাইকেল করার জন্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তি প্রয়োজন।</strong></p>
<p>১৯৪০’র দশকে এক ব্যবসায়ী আর.পি. শাহা কর্তৃক নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশের প্রথম ট্যানারি স্থাপন করা হয়েছিল। ট্যানারিটি পরে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় ৩০টি ট্যানারি ছিল। ১৯৭০’র দশকে শিল্পটির উন্নতি ও প্রসার ঘটে।</p>
<p>যুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে, বাংলাদেশ সরকার ৩০টি ট্যানারি অধিগ্রহণ করেছিল। নতুন সরকার এই ইউনিটগুলির পরিচালনা একটি সদ্য গঠিত ট্যানারি কর্পোরেশনকে ন্যস্ত করেছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাব এবং দুর্নীতিমূলক আচরণের কারণে সরকারের উদ্দেশ্যটি সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে, সরকার ট্যানারি কর্পোরেশন ত্যাগ করে এবং বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প কর্পোরেশনকে (বিসিআইসি) এটি হস্তান্তর করে। এর মধ্যে তিনটি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে দেওয়া হয়েছিল। উভয় কর্তৃপক্ষই ট্যানারিগুলি পরিচালনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।<br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-9110084365128599" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-9110084365128599" data-ad-slot="9541971802"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>২০১০ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২০৬টি ট্যানারি ইউনিট ছিল। এর মধ্যে ১১৪ টি বৃহত্তর এবং মাঝারি ইউনিট এবং শিল্প অধিদপ্তরে নিবন্ধিত রয়েছে। কিছু রয়েছে কুটির শিল্প ধরণের এবং সরকারের অনিবন্ধিত। ট্যানারি শিল্পের সম্ভাব্য দিক বিবেচনা করে, ৩৫ টি ট্যানারিগুলি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছিল। এই ট্যানারিগুলি আমাদের কাঁচা চামড়ার ৬০% আন্তর্জাতিক মানের রূপান্তরে সক্ষম ছিল। প্রায় ১৯০টি ট্যানারি ইউনিট ঢকার হাজারীবাগে ট্যানারি এস্টেট নামে পরিচিত মাত্র একর জমিতে অবস্থিত। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের রেকর্ড অনুসারে ট্যানিং শিল্পে প্রায় ৬০০০০ শ্রমিক নিযুক্ত রয়েছে। এছাড়াও বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় শতাধিক প্রযুক্তিবিদ রয়েছেন যারা বিভিন্ন ট্যানারিতে কাজ করছেন। ট্যানারি শিল্পে এখন পর্যন্ত মোট মূলধন বিনিয়োগ করা হয়েছে ২.৫ বিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে সরকার অথবা ব্যাংক ফিনান্স প্রায় ১.২ বিলিয়ন টাকা। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ এবং ট্যানারি ইউনিটে তা পৌঁছে দেয়ার প্রক্রিয়াতে প্রায় ১৫০০ ব্যক্তি জড়িত। ট্যানারি শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রায় ১০০ টি প্রতিষ্ঠান কেমিক্যাল আমদানি করে।</strong> আমাদের দেশে চামড়া প্রসেস করার কেমিক্যাল প্রায় পুরোটা আসে অন্য দেশগুলো থেকে। আর ভারত নিজের উৎপাদিত কেমিক্যাল দিয়েই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে বড় খরচই হলো এর কেমিক্যালের। ফলে, চামড়াজাত পণ্যের দামও হয় আকাশচুম্বী। এছাড়াও ব্যাংকের দুর্বল নিয়মনীতি, অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ সাথে রাজনৈতিক প্রভাব, ট্যানারি মালিকদের লোনের টাকা আত্মসাতের প্রবণতায় এই শিল্পের অগ্রগতি থমকে যায়। যদিও ৯০’র দশক জুড়ে ছিল ট্যানারি শিল্পের স্বর্ণালী সময়! সেই সময়ের হাজারীবাগের রমরমা ট্যানারি বাণিজ্য এখন শুধুই স্মৃতি। জার্মান, ইতালি, স্পেন, কোরিয়া, জাপান,চীন, ভিয়েতনাম-সহ ইউরোপ আমেরিকার অনেক বড় বড় দেশ বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়া-জাত পণ্য কেনার জন্য ভিড় করত। কিন্তু চামড়া ব্যবসায়ীদের অসাধুতা, এলাকা ভিত্তিক ও রাজনৈতিক কোন্দল, সংগঠন গুলোর সমন্বয় হীনতা ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অভাব, পরিবেশ দূষণ, ব্যাঙ্ক লোনের নয়-ছয় সহ, আন্তর্জাতিক কন্সপিরেসি ও সর্বোপরি সরকারের ভুল নীতির ও কিছু ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ধীরে ধীরে চামড়া বাণিজ্য এখন কঙ্কালসম; ধ্বংসের মুখে পতিত প্রায়।</p>
<p>পরিবেশ দূষণ, নিম্নমানের চামড়া, বিদেশি ক্রেতাদের স্বার্থের আঘাত, অত্যাধুনিক মেশিনারিজ ও এক্সপার্টিজের অভাব, প্রতিযোগী আর প্রতিবেশী দেশের কুটচাল-সহ বিভিন্ন কারনে বিদেশী ক্রেতারা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করল। বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলো তাই এক এক করে বন্ধ হতে শুরু করল; দেউলিয়াত্ব ঘোষনা করতে থাকল।</p>
<p><strong>বর্তমানে বাংলাদেশ মানসম্পন্ন মহিষ, ভেড়া, গরু ও ছাগল উৎপাদন করছে। মানসম্পন্ন চামড়া উৎপাদন এবং রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে, বাংলাদেশ বিশ্বের ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চামড়া বাণিজ্যের মাত্র ০.৫% পূরণ করে। ২০১০’র পরে বাংলাদেশের চামড়ার বাজারের প্রায় একচ্ছত্র রাজত্ব করছে চায়নিজ বায়াররা। চাইনিজদের মনোপলি ব্যবসার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করল বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো। বিগত কয়েক বছরে ২.৬০-২.৮০ মার্কিন ডলার মূল্যের ফিনিশড লেদারের দাম নেমে এসেছে ১.৭০-১.৮ ডলার। লাইনিং আর ক্রাস্ট চামড়া যেখানে আগে বিক্রি হত ১.২০ থেকে ১.৫০ ডলার, যার মূল্য নেমে এসেছে .৭৫-.৯৫ ডলারে। এবং দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে যে, এই দাম ক্রমাগত নিম্নমুখী; বাণিজ্য এখন অন্তঃস্বারশূন্য। তবে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে হয়তো এখনও বেহাল দশার কিনারা থেকে চামড়াশিল্পকে তুলে আনা সম্ভব।</strong></p>
<p>বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বার্ষিক চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ আসে কোরবানির পশু থেকে। এই কোরবানির ঈদে সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং, দ্রুত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীরা যাতে লাভবান হতে পারেন এবং উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু চামড়া উৎপাদন নয়, বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে সম্ভাবনাময় চামড়া খাত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।</p>
<p>পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং চামড়া শিল্পোদ্যোক্তাদেরও সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করতে হবে। গৃহীত ঋণের অর্থ অন্যত্র ব্যয় বা বিনিয়োগ না করে চামড়া খাতেই বিনিয়োগ করা এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের বিষয়গুলোকে সুনিশ্চিত করতে হবে। একটি সম্ভাবনাময় খাতকে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুধু বাঁচিয়ে রাখাই নয়, জাগিয়ে তুলতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/leather-and-tannery-industry-in-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16234</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা ও ভারতীয় বাঁধ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bangladeshi-river-system-and-indian-dams/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bangladeshi-river-system-and-indian-dams/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Oct 2025 15:07:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16228</guid>

					<description><![CDATA[একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। একসময় সেসব নদীকে ঘিরে কত গল্প-কল্পকাহিনী শোনা যেত দাদি-নানীদের মুখে! কী ছিল তার রূপ, কী ছিল তার স্রোত—কোনো এক অতীতে–বর্ষাকালে। এখন বর্ষাকালে পানি থাকলেও শীতকালে প্রায় পুরোটাই যেন ধানক্ষেত। নদীর পেটের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। একসময় সেসব নদীকে ঘিরে কত গল্প-কল্পকাহিনী শোনা যেত দাদি-নানীদের মুখে! কী ছিল তার রূপ, কী ছিল তার স্রোত—কোনো এক অতীতে–বর্ষাকালে। এখন বর্ষাকালে পানি থাকলেও শীতকালে প্রায় পুরোটাই যেন ধানক্ষেত। নদীর পেটের মধ্যে সামান্য এক ধার ঘেঁষে মৃদুস্রোত বয়, নৌকা চলে— যেখানে বাংলার চিরাচরিত রূপ ছিল নদীময়, জলময়, আর বনময়। বাংলার সেই আদিরূপ, নদীর সেই কলকল ধ্বনি– এখন শুধুই বিস্মৃত অতীত। বাংলার অতীতের যত সব খরস্রোতা নদ-নদী, খাল-বিল তাদের বেশিরভাগই এখন মৃতপ্রায়। সেখানে বৈশাখে নয়, বর্ষায় হাঁটুজল থাকে। বৈশাখে তারা একেবারেই মৃত।</p>
<p><strong>ভাটির এই অঞ্চলে বর্তমানে ৭০০’র মতো নদী, উপনদী ও শাখা-নদী আছে। তন্মধ্যে ২৩০টির মতো জীবিত। এই নদীগুলো সারাদেশে রক্তের শিরা-উপশিরার মতো বহমান। বাংলাদেশের ভূখন্ডকে চারটি নদী অববাহিকা তথা : গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও দক্ষিণ-পূর্ব নদীসমূহের অববাহিকায় ভাগ করা হয়। গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, সুরমা-মেঘনা এবং এদের অসংখ্য উপনদী ও শাখা-নদী বাংলাদেশে নিষ্কাশন প্রণালীর ধমনীর মতো কাজ করেছে। বাংলাদেশের বাইরে ভারত থেকে দেশের ভেতরে প্রবেশ করা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র দুটি বড় নদী। এছাড়াও প্রায় ১৫০টির অধিক নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে বাহির থেকে যেসব নদী প্রবেশ করেছে তাদের প্রবাহ উৎস ও প্রবাহপথ তথা অববাহিকা ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশসহ এর মোট এলাকা ১৭,৪৯,০০০ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশ ১,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার যা মোট এলাকার ৮.৫৭ শতাংশ মাত্র।</strong> হিমালয়ের চূড়া থেকে শুরু করে আমাদের উজানে থাকা পর্বতমালা থেকে নিঃসৃত জলধারা নদী হয়ে এদেশের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এবং মেঘনা এই নদীসমূহের মিলিত নিষ্কাশন অববাহিকার আয়তনই প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। নদীগুলো বঙ্গোসাগরে বয়ে নিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণ পলি। ব্রহ্মপুত্র-যমুনাই শুধু প্রতিদিন ১,২০০,০০০ টন পলি বহন করে আনে। প্রতিবছর গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী প্রণালীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বয়ে আনা পলির পরিমাণ প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন।</p>
<p>অতএব, নদীর পানি প্রবাহের ওপরেই যে দেশের জন্ম, নদী বিপন্ন হলে সে দেশের অস্তিত্বও কতটা হুমকির সম্মুখীন হতে পারে– তা বলা বাহুল্য। নদী হারানোর সর্বনাশ এক-দুই বছরে, এক-দুই দশকে বোঝা দায়। বর্তমানে শুষ্ক মৌশুম আসলে দেখা যায় শতকরা ৯৭ ভাগ নদীর পানির প্রবাহ ও পরিমাণ হ্রাস পায়। অতএব, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রাণ- এই নদীমালার কতটা জীবনহানি ও জীবনক্ষয় হয়েছে, তার ক্ষতির কোনো পরিসংখ্যানগত হিসাব আমাদের কাছে নেই।</p>
<p>বাংলাদেশের নদীগুলো যেভাবে “খুন” হচ্ছে; কারণ হিসেবে ভাগ করলে এর পেছনে তিনটি উৎস শনাক্ত করা যায়। এগুলো হলো– প্রথমত, ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তৎপরতা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নদীবিদ্বেষী উন্নয়ন কৌশল। এবং তৃতীয়ত, দেশের নদী দখলদারদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজশ।</p>
<p><strong>ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যে কোন ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণের প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশই ভোগ করবে। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির অজুহাতে ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝে ফারাক্কা নামক স্থানে এক মরণবাঁধ নির্মাণ করে। এই বাঁধের অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পশ্চিম সীমানা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার (১১ মাইল) উজানে গঙ্গা নদীর ওপর। ১৯৬১ সালে এর মূল নির্মাণ কাজ হাতে নেয়া হয় যা ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। ১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল থেকে ২১ মে এই ৪১ দিনের জন্য অস্থায়ী ও পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধটির সকল ফিডার ক্যানেল চালু করে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকে এটা ভারত আজ পর্যন্ত বন্ধ করেনি। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে কিছুটা সফলতা থাকলেও ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির সফলতা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ এর গ্যারান্টি ক্লজ বা অঙ্গিকার অনুচ্ছেদ না থাকায় বাস্তবে ফলাফল প্রায় শূন্য।</strong> এই শত্রুভাবাপন্ন মনোভাবের কারণে আমাদের মত একটি ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিনির্ভর দেশ আজ বিপন্ন। বিপন্ন এদেশের নদী, মাটি, কৃষি, বনজ সম্পদ, বন্যপ্রাণী, পাখি, মৎস্য ও পরিবেশ। এই জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসের প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধ। এই বাঁধের প্রভাবে দেশের মানচিত্র থেকে প্রায় ২০টি নদী মুছে গেছে এবং প্রায় ১০০টি নদীর মরণদশা (পত্রপত্রিকার তথ্য অনুযায়ী)। আর বাকিগুলোর বুকে চর জেগে ইতোমধ্যে জনবসতি শুরু হয়েছে এবং একই নদী একাধিক ক্ষুদ্র ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। স্রোত না থাকায় এদেশের নদীগুলোর তলদেশে পলি জমে এর উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও নদীসংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতি বছর অত্যধিক নদীভাঙনের কারণে শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। এর ওপর আবার ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প! ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প সম্পূর্ণরূপে চালু হলে আমাদের নদীগুলোতে প্রায় ৪০% ভাগ পানি প্রবাহ হ্রাস পাবে। কংক্রিটকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘উন্নয়ন’, তার বড় শিকার আজ বাংলাদেশের নদীমালা– ফলস্বরূপ, দুই শতাধিক নদী কোনোভাবে বেঁচে আছে।</p>
<p>একতরফা আক্রমণে বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট নদী যেন এখন একেকটি মৃতখাল। কার্যত বাংলাদেশের বৃহৎ চার নদী– পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা এখন বিপর্যস্ত এবং আরও আক্রমণের মুখে। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারতের যে নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা গত চার দশকে বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও তৎসম্পর্কিত অসংখ্য ছোট নদী, খাল-বিলকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ফলাফল, অনেক নদ-নদী পরিণতি হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুকিয়ে গেছে; চর পড়ে গেছে। ভারসাম্যহীন পানিপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি। সেচের জন্য চাপ বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল প্রতিবেশগত সংকট তৈরি করছে। শুধু তাই নয়, পদ্মা নদীর এই ক্ষয় তার সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলোকেও দুর্বল করেছে। এই প্রভাব গিয়ে পড়ছে সুন্দরবন পর্যন্ত। সুন্দরবনের কাছে নদীপ্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়েছে। একদিকে ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের জন্য অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন অবিরাম আঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে; অন্যদিকে তার সমাধান না করে ভারতীয় কোম্পানির কর্তৃত্বে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করে এই সুন্দরবনের ওপর মরণ আঘাত করা হচ্ছে। <em>বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. ইনামুল হক বলেন, “ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার আগে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ছিল ৬০ থেকে ৮০ হাজার কিউসেক। ফারাক্কায় ওদের যে ডাইভারশন ক্যানেল, ব্যারেজের মাধ্যমে তারা ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নিতে পারে। তো সেটি সরিয়ে নেয়ার পরে যেটি থাকে সেটি পায় বাংলাদেশ।”</em> গঙ্গা চুক্তিতে অন্তত ২৭ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির আগে অনেক সময় ১০ হাজার কিউসেকেরও কম পানি এসেছে বলে জানান মিস্টার হক।</p>
<p>“বিশেষ করে ইলিশ মাছ এবং চিংড়ি মাছের বিরাট ক্ষতি হয়েছে, তাদের প্রজণনে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে,সংখ্যা কমে গেছে। এছাড়া অন্যান্য মাছেরও ক্ষতি হচ্ছে। আর উপকূল এলাকায় একটা মিষ্টি পানির ওপর নির্ভরশীল যাদের জীবন, সেটা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,” বলছিলেন মিস্টার হক। ফারাক্কার বিষক্রিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়; পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশপাশেও পড়ছে। একদিকে পানিশূন্যতা; অন্যদিকে অসময়ের বন্যা ও অতিরিক্ত পলি। এমনকি বিহারের মানুষ শাবল নিয়ে মিছিল করেছে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেয়ার দাবিতে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও এই বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাও ভারতের বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন চিন্তা ও বাঁধ ব্যবসায়ীদের থামাতে পারেনি। তাছাড়া ভারতের শাসকদের চিন্তা-পদ্ধতিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের স্বার্থ ও অধিকার বিষয় একেবারেই অনুপস্থিত। মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের প্রস্তুতি পুরোটাই চলেছে একতরফা। এই বাঁধ বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ নদী– মেঘনার জন্য যে বড় হুমকি হবে, তা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন। ম্যাপ দেখলে দেখা যায়, ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর ওপর বিভিন্ন স্থানে কাঁটার মতো সব বাঁধ। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে, তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। গ্রীষ্মকালে তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল অঞ্চল পানির অভাবে খাঁ-খাঁ করে। তিস্তার প্রবাহ এখন শতকরা ১০ ভাগেরও নিচে নেমে এসেছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা ছাড়াও মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরে কোদলা নদীর ওপর বাঁধ, খোয়াই নদীর ওপর চাকমা ঘাট বাঁধ, ফুলবাড়ীতে মহানন্দা নদীর ওপর বাঁধ, গোমতী নদীর ওপর মহারানী বাঁধ, মুহুরি নদীর ওপর কলসী বাঁধসহ আরও ১৫-২০টি অস্থায়ী কাঁচা বাঁধ কার্যকর রয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্প অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি ১৪টি নতুন খননকৃত খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে প্রবাহিত করা হবে। এটি কার্যকর হলে অন্যান্য নদীর সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ নদী, যমুনা আক্রান্ত হবে। শুকিয়ে যাবে অধিকাংশ নদী-উপনদী। যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারত ও চীনই সর্বোচ্চ সংখ্যক বাঁধ তৈরির দেশ। এ দুই দেশের মোট বাঁধ পৃথিবীর সর্বমোট বাঁধের ৫৫% ভাগ। বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বাঁধ (রাবার ড্যামসহ) তৈরির মাধ্যমে যেসব নদীকে ক্ষতিগস্থ করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে– বড়াল, ধনগোদা, ফেনী, গড়াই, হালদা, কপোতাক্ষ, মনু, মেঘনা, মহুরী, তিস্তা ও গোপলা।</p>
<p>ভারত যেভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীগুলোর জীবন সংশয় ঘটাচ্ছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতের জনগণ; সর্বোপরি সমগ্র মানব সমাজের বড় ক্ষতি। দেশ চালনাকারীরা জনগণের স্বার্থ কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন নীতি সাজালে এই নদী ও খাল-বিলের জীবনও সচল করতেন এবং ভারতের এসব আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভূমিকা গ্রহণ করতেন। আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশন অবলম্বন করে সরব হতেন। না; সেসব ভূমিকা নেই। উল্টো তারা নদ-নদী, সুন্দরবন সবই ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ভারতের পণ্য-যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য তিতাস নদীর ওপর আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে পৃথিবীর একমাত্র বৃহত্তর প্রাকৃতিক এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনটি দিন দিন বিনাশ হচ্ছে। উজানে ভারত গঙ্গার ওপর ফারাক্কা বাঁধ ও অন্যান্য নদীতে বাঁধের কারণে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই অমূল্য সম্পদ আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বনটি বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ স্বাদু পানির প্রয়োজন, তা পাচ্ছে না। উজান থেকে পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় সাগর থেকে জোয়ারের সময় মাত্রাতিরিক্ত লোনাপানি বিভিন্ন নদী, খাল ও ছড়া দিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করে। এই লোনাপানি বনের ভেতর প্রবেশের কারণে সুন্দরবনের পানি ও মাটির লবণাক্ততা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের পাকা ফল মাটিতে পড়ে বীজ থেকে অঙ্কুর এবং অঙ্কুর থেকে চারাবৃক্ষ জন্মাতে পারছে না। কেননা ছোট ছোট চারাগাছের বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ স্বাদু পানির প্রয়োজন, তা না পাওয়াতে অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পানির অভাবে বৃক্ষশূন্য অঞ্চলে বাষ্পীভবন বেশি হওয়ায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। অন্য দিকে এই বৈরী পরিবেশের কারণে বনে পাখির সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে যে সব পাখি ফল খেয়ে বীজ অন্যত্র নিয়ে ফেলে, সেখানেই চারা গজায়। আর সেই চারাগাছই একদিন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়।</p>
<p><strong>প্রয়োজনীয় পানির অভাবে সুন্দরবনের সুন্দরী বৃক্ষরাজি আজ বিপন্ন। ইতোমধ্যে অত্যধিক লোনাপানি বনে প্রবেশের কারণে সুন্দরী আগা মরা রোগের (টপ ডাইং) বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক হানাহানি, মানুষের ভেতর দেশপ্রেমের অভাব ও জন-সচেতনার কারণে দেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন আজ ক্রমশ ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সুন্দরবনের প্রায় ৪০ ভাগ সুন্দরী গাছ আগা মরা রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, লোনা ও স্বাদুপানির মিশ্রণের অনুপাত সঠিক না থাকা অর্থাৎ সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে দেখা দিয়েছে লোনাপানির আধিক্য। ফলে গাছের ডগায় এবং শেকড়ে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। বনের ভেতরে নদী ও খালে পলি পড়ে নাব্যতা হ্রাস হেতু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মৃত্তিকার বিশেষ উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে মিঠাপানি প্রবাহ হ্রাস পেয়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধিই সুন্দরবন বিনাশের প্রধান কারণ বলে সর্বজনমহলে স্বীকৃত।</strong></p>
<p>সুন্দরবনের মাটি ও পানিতে মৃদু লবণাক্ততা উদ্ভিদের জন্য সহায়ক হলেও অতিরিক্ত লবনাক্ততার কারণে সুন্দরবন ও এর আশপাশের বৃক্ষশোভিত সকল বেষ্টনী বিপন্ন হতে চলেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটিতে ১ হাজার থেকে ২ হাজার মাইক্রোমস ও পানিতে ৩ হাজার মিলিমস পর্যন্ত লবণের পরিমাণ সহনীয়। সুন্দরবনের আশেপাশে ইছামতি, পশুর, রায়মঙ্গল, মালঞ্চ প্রভৃতি নদীতে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে লবণ ছিল ১৯ হাজার মিলিমস। এর পরিমাণ বেড়ে বর্তমানে ৬০ হাজার মিলিমসে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ১৯৮৬ সালে সুন্দরবনের মাটিতে লবণ ছিল ৩২ হাজার মাইক্রোমস, যা বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মাইক্রোমস এ দাঁড়িয়েছে। জোয়ারের সময় লোনাপানি সাগর থেকে সুন্দরবনের নদ-নদীতে প্রবেশ করে। নদীতে স্বাদু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে সেই প্রবাহ সাগরের লোনাপানিকে ঠেলে পুনরায় সাগরে নিয়ে যায়। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের নদীগুলোতে শুকনো মৌসুমে পানি শূন্যতা দেখা দিয়েছে, যার অনিবার্য পরিণতি লবণাক্ততা। এই লোনায় আক্রান্ত সুন্দরবনের সবুজ বন ও গাছপালা দিন দিন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সাগরের লোনাপানির আঘাতে বেশ কয়েক প্রজাতির ধান ও মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। এমনকি লোনা পানির আধিক্যের কারণে বনের বিভিন্ন এলাকা “ব্লাস্ট ও টপ ডাইং” রোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ গাছ মারা গেছে এবং যাচ্ছে।</p>
<p>মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী খুলনা অঞ্চলের প্রধান কয়েকটি নদীতে গত কয়েক বছর ধরে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বেশির ভাগ নদ-নদীতেই এখন স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ লবণাক্ততা বিরাজ করছে। খুলনা জেলার রূপসা, শিবসা, কাজীবাছা ও পশুর নদীতে ২০০২ সালের মার্চ মাসের তুলনায় ২০০৩ সালের মার্চে লবণাক্ততা গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রূপসা নদীতে গত এক বছরে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ, শিবসায় ৫৬ শতাংশ, কাজীবাছায় ২৫ শতাংশ এবং পশুর নদীতে এ হার ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।</p>
<p><em>একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ এবং অন্যান্য বাঁধ দেয়ার কারণে দেশের বৃহত্তম বন সুন্দরবন বিনাশের পথে। কারণ ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে এরকম কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। শত শত বছর ধরে সুন্দরবন প্রাকৃতিকভাবে তার আপন সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য এবং এর জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে চলছিল। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে বনটি এখন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছে। বনটি বিনাশের সাথে সাথে ধ্বংস হচ্ছে দেশের জীববৈচিত্র্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এর সাথে সংশ্লিষ্ট লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার পথ। এভাবে চলতে থাকলে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে দেশের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক খাতে। এরপর যদি ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয় তাহলে কী হবে আমাদের দেশের অবস্থা! কী হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিণতি!</em></p>
<p>দ্বিতীয়ত, নদী বিনাশের সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের ভেতরের তৎপরতা। বাংলাদেশের নদ-নদী ও খাল-বিল অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পানিপ্রবাহের ওপর ৫০ দশক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ এসেছে ‘উন্নয়ন’ নামক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে। এসব প্রকল্প করা হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বাঁধসহ নির্মাণমুখী কর্মসূচি হিসেবে। কিন্তু বন্যা তো নিয়ন্ত্রণ হয়নি, সেচ সুবিধাও কাজ করেনি; সর্বোপরি মূল লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শুধু একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট, যার ফলে বড়াল নামের একসময়ের উত্তাল নদী এখন মৃতপ্রায়।</p>
<p>বড়াল নদী বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী, পদ্মা-যমুনার সংযোগ স্থাপনকারী নদী। দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার, ১২০ মিটার প্রস্থ। এর অববাহিকা ৭৭২ বর্গকিলোমিটার। এর সঙ্গেই আছে চলনবিল। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই নদীর মুখে সুইচ গেট, ক্রস ড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিরও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ও পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি, নৌপথ সম্প্রসারণ লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম তিন বছর উৎপাদন ভালোই দেখা গেলেও এর পরে শুরু হয় বিপর্যয়। ফারাক্কার কারণে এমনিতেই পদ্মা নদীর প্রবাহ কম ছিল; উপরন্তু বড়াল নদীর মুখে সুইচ গেট বসানোতে পদ্মা থেকে আসা পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। স্রোত কমে যায়, বহু জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়। যমুনায় যেখানে বড়াল গিয়ে মেশে, সেখানে পানিপ্রবাহ খুবই নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় যমুনা নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভাঙন বিস্তৃত হয়। অববাহিকার প্রায় এক কোটি লোকের জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বড়াল শুকিয়ে যে জমি উঠেছে, তা এখন নানাজনের দখলে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন নদীর এই পরিস্থিতি সৃষ্টির সুবিধাভোগীও আছে। এদের প্রধান অংশ– সম্পদ ও ক্ষমতায় শক্তিশালী, সমাজের অভিজাত শ্রেণী। নদী দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা অনেক লাভজনক। নদী বাঁচলে তার মূল্য টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না; কিন্তু মরলে তার দাম শত বা হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সে জন্যই যারা এর ভাগীদার তারা নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতে অনেকেই আগ্রহী। তাছাড়া এসব বাঁধ বা নির্মাণ কাজ প্রধানত বিদেশি ঋণের টাকায় হয়। ফলাফল যাই হোক, ঋণদাতা, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, আমলা ও ভূমিদস্যুদের লাভ অনেক। দখলজনিত কারণে এভাবেই ১৫৮ টি প্রশস্ত নদী আজ ক্ষীণকায়, যার মধ্যে রয়েছে- বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ, বংশী (টঙ্গী), কালিগঙ্গা (মানিকগঞ্জ), ভৈরব, চিত্রা, কপোতাক্ষ ও নবগঙ্গা (যশোর), নরসুন্দা ও কলাগাছিয়া (কিশোরগঞ্জ), সুরমা (সিলেট) ও কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)। কয়েক বছর পূর্বে আশুগঞ্জে জনৈক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির ঘনিষ্ট এক আত্মীয় একটি প্লাস্টিক কারখানা নির্মাণের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী মেঘনার অভ্যন্তরে প্রায় চারশত ফুট স্থানে মাটি ভরাট করেছিল। বাপা’র আন্দোলন ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশের ফলে তা শেষ পর্যন্ত অপসারিত হয়। বর্তমানে হবিগঞ্জের সোনাই নদীর মধ্যখানে নিজস্ব জমিতে নির্মিত হয়েছে একজন রাজনৈতিক দখলদারের বহুতল বিশিষ্ট ভবন। নদীর ভিতরে জাজ্বল্যমান এই ভবনের মাথা উঁচু হচ্ছে প্রতিদিন, কিন্তু সরকারি প্রশাসন এমনকি শেষ পর্যন্ত জাতীয় নদী রক্ষা টাস্কফোর্স এই ভবনটিকে ‘নদীর বাইরে’ বলে প্রত্যায়ন করেছিল। জাতীয় নদী কমিশন গঠিত হওয়ার পর প্রথমে এই ভবনটিকে নদীর বাইরে বলে সত্যায়িত করলেও, কমিশনের বর্তমান প্রধান এটিকে নদীর দখলদার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তাতে ভবন তৈরির কাজ বন্ধ হয়নি। নদীর জমি চিহ্নিতকরণ ও নদীর পাড় সংরক্ষণে বিদ্যমান পরিষ্কার আইনি বিধানকে না মানা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্ণীতি, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বেআইনি ভোগ-দখল-সংস্কৃতি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন বহির্ভূত নদীর জমি লিজ প্রদান চর্চা প্রভৃতি নদী দখল ও বিনষ্টের প্রধান কারণ।</p>
<p>এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন এক সময়ের পদ্মার প্রধান শাখানদী প্রমত্তা গড়াই এখন শুকনো মৌসুমে থাকে প্রায় পানি শূন্য। কেবল বর্ষা মৌসুমে কিছুটা প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। রাজবাড়ি জেলার ওপর থেকে বয়ে যাওয়া সেরাজপুর হাওড় ও চন্দনা এখন মৃত নদী। ফরিদপুরের কুমার নদী দিয়ে কয়েক দশক আগেও বড় বড় স্টিমার চলাচল করত। কিন্তু সেদিনের সে কুমার এখন কঙ্কাল নদী। বৃহত্তর কুষ্টিয়া এবং যশোর অঞ্চলের প্রায় সকল নদীর মাতা-নদী ছিল মাথাভাঙ্গা। এখন শুকনো তো দূরের কথা, বর্ষা মৌসুমেও এককালের প্রমত্তা মাথাভাঙ্গা থাকে নীরব, নিথর ও প্রাণহীন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারের আইনগত ভিত্তি :</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী একটি নদী যদি দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তবে ঐ নদীর পানি সম্পদের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমনভাবে আন্তর্জাতিক নদীকে ব্যবহার করবে তাতে যেন অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের সহজাত অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়। যে দেশের ওপর দিয়ে নদী প্রবাহিত, নদীর সে অংশের পানি সে দেশের পক্ষে ইচ্ছেমত ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নয়। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ওপেনহেইম বলেন ‘‘কোন রাষ্ট্রকে নিজ ভূখন্ডের প্রাকৃতিক অবস্থা এমন করে পরিবর্তন করতে দেয়া যাবে না যার ফলে প্রতিবেশি কোন রাষ্ট্রের ভূখন্ডের প্রকৃত অবস্থায় কোন অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।’’ আন্তর্জাতিক নদীর ব্যবহার সংক্রান্ত অনুরূপ মতামত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউটও।</p>
<p><em>পৃথিবীতে প্রায় ২১৪টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে। এই নদীসমূহ একাধিক স্বাধীন দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদীর মধ্যে আমাজন, জায়ার, জাম্বেসী, দানিয়ুব, নাইজার, নীল, রাইন, মেকং, লেকচাঁদ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যে কোন আন্তর্জাতিক নদীর ওপর তীরবর্তী রাষ্ট্রের অধিকার সমঅংশীদারিত্বের নীতির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক নদী সম্পদের তীরবর্তী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সুষম বণ্টনের নীতি আজ স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক নদীর ব্যবহার সম্পর্কে ১৮১৫ সালে ভিয়েনা সম্মেলনে এবং ১৯২১ সালে আন্তর্জাতিক দানিয়ুব নদী কমিশন কর্তৃক প্রণীত আইনে এই নীতির উল্লেখ রয়েছে।</em></p>
<p>১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি সম্মেলনে গৃহীত নীতিমালার ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানি সম্পদের ব্যবহার অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। পানি সম্পদের সুষম বণ্টনের নীতি ১৯৭২ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত মানব পরিবেশ সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনফারেন্স ঘোষণাপত্রের ৫১ অনুচ্ছেদে স্থান লাভ করে।</p>
<p><strong>যে নদী একবার একাধিক দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তার ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। সেখানে নিজ দেশের আইন দ্বারা কখনোই তা নির্ধারিত হয় না। কিংবা নিজ দেশ এককভাবে সেই পানি ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশকে পানির ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। কিন্তু প্রতিবেশি দেশ ভারত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোন আইন মানছে না। শক্তির জোরে একের পর এক বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৫৪টি নদীর প্রায় সকল প্রবাহ পথে বাঁদ দিয়ে বাধার সৃষ্টি করে এর বিশাল পানিপ্রবাহ কৃত্রিম খালের সাহায্যে উঁচু অঞ্চলে প্রবাহিত করে কৃষিক্ষেত্রসহ ইচ্ছেমতো সকল ক্ষেত্রে পানি ব্যবহার করছে। আর এই প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭৫ সাল থেকে। প্রথম ১৯৭৫ সালে ৪১ দিনের (২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে) অজুহাতে বাংলাদেশ সরকারকে আই ওয়াশ বা প্রতারণার ফাঁদে ফেলে বহু বিতর্কিত ফারাক্কা বাঁধটি চালু করে। ওয়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও বাঁধটি আর বন্ধ করেনি এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সকল আন্তর্জাতিক নদীসহ ভারতের ওপর দিয়ে বয়ে আসা সকল নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সকল প্রবাহপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এদের মধ্যে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ, ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর বাঁধ, মুহুরী নদীতে বেলুনিয়া বাঁধ, পিয়াই নদীর ওপর পিয়াই বাঁধ, খোয়াই নদীর ওপর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ। এই সকল নদীতে বাঁধ, গ্রোয়েন নির্মাণ কিংবা সুইচ গেট নির্মাণসহ আরও অসংখ্য ছড়ানদীতে বাঁধ বা সুইচগেট নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহপথে বাধার সৃষ্টি করছে। এই বেআইনী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার বার প্রতিবাদ জানালেও তাতে তারা কোন কর্ণপাত করেনি।</strong> ফলে ফারাক্কাসহ ঐ সকল বিপদজনক বাঁধের প্রভাবে সারা বাংলাদেশ ক্রমশ মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নদীমাতৃক, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা এ অপরূপ বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানির অভাবে আজ দিন দিন বিরাণ ভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দরিদ্র এই দেশটির উন্নয়নের সকল ক্ষেত্র। গুরুত্বপুর্ণ এই সেক্টরের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার দেশের অর্থনৈতিক খাত। পানির সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের শিল্পকারখানা, নৌ-পরিবহন, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ, বনজসম্পদ, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ বিপর্যয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ মৃত্তিকার জলীয়তা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে দেশ এক মারাত্মক সংকটের দিকে এগুচ্ছে। প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহের অভাবে প্রায় সকল নদীর নাব্যতা ভীষণভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে প্রতিবছর অকাল বন্যা ও প্রকট নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা। তারা সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশে আশ্রয় নিচ্ছে এবং ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।</p>
<p>ফারাক্কা বাঁধের পর তিস্তা বাঁধ, টিপাই বাঁধ প্রকল্প এবং আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ইত্যাদির প্রতিক্রিয়ায় দেশ নিশ্চিত মরুকরণের পথে এগুচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ ও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ভারতের একটি সূদুর প্রসারী চক্রান্ত; বাংলাদেশ নামের এ ভূ-ভাগকে চিরতরে মরুভূমির দিকে ঠেলে দেয়ার প্রয়াসমাত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় :</strong></h5>
<p>&nbsp;</p>
<p>১. দেশের ভেতরে এবং বাইরে এ বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হবে।</p>
<p>২. শুষ্ক মৌসুমে ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ন্যায্য পানির হিস্যা দিচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে দু’দেশের চুক্তির প্রতি খেয়াল বা নজরদারী রাখতে হবে। দু’দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এ বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।</p>
<p>৩. প্রয়োজন হলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থা’র অন্য সদস্য দেশসমূহের সাহায্য নিতে হবে। আমাদের নদীর নাব্যতা বাড়াতে প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বৃহৎ নদী ও হাওড় এবং বরেন্দ্র এলাকার নদী সমূহে পরিকল্পিতভাবে জলাধার তৈরি করতে হবে, যাতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও সেচ কাজে প্রয়োজন মত ব্যবহার করা যায়।</p>
<p>৪. ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।</p>
<p>৫. বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করতে হবে।</p>
<p>৬. কুটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। সরকারের পাশাপাশি প্রবাসীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।</p>
<p>যে তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ নদীকে বিপন্ন করে, নদীর সাড়ে-সর্বনাশ করে ছাড়ে; তাতে জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও তা প্রাণিজগৎকে করে বিপন্ন। তাই এধরণের কার্যক্রম প্রতিরোধে জনগণ ও সিভিল সোসাইটি সমুহকে সক্রিয় হতে হবে।</p>
<p>এই নদী ও বন বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের অস্তিত্বের অবলম্বন। এগুলো কেবল নদী নয়; আমাদের দেশ ও মানুষের প্রাণ। তাই নদী বাঁচানোর জন্য জনমত সৃষ্টি আমাদের সবার দায়িত্ব।</p>
<div id="wpdevar_comment_1"></div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bangladeshi-river-system-and-indian-dams/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16228</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সবুজ বিপ্ল­ব : প্রত্যাশা ও ফলাফল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/green-revolution-expectations-and-results/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/green-revolution-expectations-and-results/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আশিকুর রহমান সৈকত]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 25 Sep 2025 05:43:37 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16190</guid>

					<description><![CDATA[পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কিন্তু খাদ্যের উৎপাদন কিংবা চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের যোগান সে পরিমাণে বাড়ছে না, এজন্যে আমাদের উন্নত প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে। অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প ব্যয়ে অধিক ফসল অর্জনের মাধ্যমে এ ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটানো]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কিন্তু খাদ্যের উৎপাদন কিংবা চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের যোগান সে পরিমাণে বাড়ছে না, এজন্যে আমাদের উন্নত প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে। অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প ব্যয়ে অধিক ফসল অর্জনের মাধ্যমে এ ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব, নতুবা খাদ্যের অভাবে বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা যাবে-অনেকটা এরকম শঙ্কা এবং তার প্রতিকারের লক্ষ্যেই সবুজ বিপ্লবের যাত্রা শুরু হয়। এজন্যে মানবশ্রমের মাধ্যমে প্রাচীন পদ্ধতির কৃষি ব্যবস্থাকে সরিয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো, নতুন নতুন সহনশীল জাতের উদ্ভাবন, কৃষি জমিতে ফলন বৃদ্ধির জন্যে সার ব্যবহারের আধিক্য, আগাছা নিড়ানোর জন্যে শ্রমিক নয় বরং ঔষধ দিয়ে আগাছার উৎপাদন বন্ধ করা, কীটনাশক এর ব্যপক প্রচলনসহ বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো পদক্ষেপের মাধ্যমে ৬০ এর দশকে সবার সামনে আসা সবুজ বিপ্লব সাধারণ মানুষের মনে, বিশেষ করে কৃষকদের মাঝে আশার জাগরণ ঘটিয়েছিলো। বাহ্যিকভাবে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো, তা আসলেই সাধারণ মানুষের মনে সম্ভাবনার আলো দেখাতে সমর্থ হয়েছিলো। এমনকি শিল্প বিপ্লবের যে প্রবাহ পশ্চিমে শুরু হয়েছিলো ১৮’শ শতকে, তারই ধারাবাহিকতায় যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে রাসায়নিক সারের উৎপাদন পর্যন্ত কৃষিক্ষেত্রে এক আমূল বিপ্লব অত্যাবশ্যক হয়ে গিয়েছিলো। এজন্যে এ ধরণের একটি বিপ্লব যখন সমগ্র বিশ্বের কৃষি উৎপাদনে এক ঢেউ বয়ে নিয়ে আসার কথা, কয়েক বছরের ব্যবধানেই তা ফিকে হয়ে যায় মূলত তার পরিকল্পনা এবং ফলাফলের মধ্যকার অসামঞ্জস্যের কারণে! কারণ যে সকল দেশ কিংবা যে সকল বৃহৎ কোম্পানিগুলো সবুজ বিপ্লবের ধারণা নিয়ে সকলের সামনে এগিয়ে এসেছিলো, তারা কি সত্যিই সেগুলো পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলো, নাকি মানব সভ্যতাকে কেন্দ্র করে তাদের হীন এক পরিকল্পনারই একটি অংশ ছিলো এ বিপ্লব, প্রায় অর্ধ শতক পরে এখন সে সবের হিসাব নেওয়ার সময় এসেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ইতিহাস :</h5>
<p>সবুজ বিপ্লবের জনক বলা হয় নরওয়ে বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি প্রকৌশলী ‘নরম্যান বরলোগ’কে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ব্যক্তি মালিকানাধীন ডু-পন্ট কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। ১৯৪২ এর দিকে বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত রকফেলার ফাউন্ডেশন মেক্সিকো সরকারের সাথে একটি চুক্তি করে, যার মাধ্যমে মেক্সিকোতে উচ্চ ফলনশীল গমের নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করা শুরু হয়। <strong>মূলত সে সময় মেক্সিকো তার প্রয়োজনের অর্ধেক পরিমাণ গম নিজে উৎপাদন করতো আর বাকিটা অন্য দেশ থেকে আমদানী করতো। কিন্তু বরলোগ এর গবেষণা এবং রকফেলার এর ফান্ডিংয়ে দ্রুতই উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন হয় আর ৭০ এর দশকের মধ্যেই মেক্সিকো নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার মত গম উৎপাদন করতে শুরু করে।</strong> বিষয়টি ব্যপকভাবে প্রচার পায় এবং এর ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ভারতে এসে চলতে থাকে। ভারতে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন নতুন ধানের চাষ শুরু হয় ৭০-৮০ দশকের সময়ে। এ সব ধান সে সময়কার সাধারণ ধানের চেয়ে দেখতে সুন্দর (বেশি সাদা, চিকন, অভঙ্গুর) এবং উচ্চ ফলনশীল হওয়ায় তা কৃষকদের মাঝে ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।</p>
<p>মূলত কৃষি ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির (Biotechnology) ব্যবহারের যে নতুন ধারা আমরা দেখতে পাই, তার সূচনা হয় এ সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে। মেক্সিকো ছিলো এর প্রাথমিক প্রয়োগস্থল কিন্তু সেখানে সাফল্যের পর ভারতে এসেও তা সাফল্যের মুখ দেখলে এ বিপ্লবের পরিচিতি ধীরে ধীরে বিস্তর লাভ করতে শুরু করে। এমনকি এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে বরলোগ নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>
আমরা কী পেলাম :</h5>
<p>মেক্সিকোতে বরলোগের সাফল্যের পিছনে যে অনেক শ্রম ও অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তা আমরা শুরুতে জানতে পেরেছি। কিন্তু শ্রম ব্যয় করার সামর্থ্য কম বেশি সবার থাকলেও, অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য কি সবার থাকে? উত্তরটি এক শব্দেই হবে-‘না’। বরলোগের উদ্ভাবিত জাতের গম উচ্চ ফলনশীল হলেও তাতে চাষের জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল তোলার আগ পর্যন্ত অনেক অর্থ ব্যয় করতে হতো। যেমন, জমি প্রস্তুতের পূর্বে সার দেওয়া, বপনের পর থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত নিয়মিত পানি দেওয়া, কীটনাশক ও আগাছানাশক ছিটানো থেকে শুরু করে ফসল তোলার ক্ষেত্রে ভারী অত্যাধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করা- সাধারণ কৃষকের পক্ষে এ ব্যয় বহন করা মোটেও সম্ভব নয়। মূলত যে সকল কৃষকেরা এসকল উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার করতে আগ্রহী হতো, তাদের বিভিন্নভাবে ঋণ দিয়ে সহায়তা করা হতো, কিন্তু যারা এটি করতে আগ্রহী হতো না, তাদের জন্যে কোনো ঋণের/সহায়তার ব্যবস্থা থাকতো না। এমনকি সবুজ বিপ্লব মেক্সিকো এবং পরবর্তীতে অন্যান্য দেশের সরকারের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ায় সরকারি পর্যায়ে এ সকল উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। যার ফলে, একদিকে উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহারকারী কৃষকেরা প্রচুর উৎপাদন করে মুনাফা অর্জন করতে পারতো, অন্যদিকে প্রাচীন (Classic) পদ্ধতিতে উৎপাদনকারী কৃষকেরা চাহিদা পরিমাণে কিংবা চাহিদার চেয়েও কম উৎপাদন করতে সক্ষম হতো। এ অসম প্রতিযোগিতায় উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার না করা কৃষকেরা ক্রমেই নিঃস্ব হতে থাকল। এভাবে ধীরে ধীরে স্থানীয় বীজের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকেরা কৃষিকাজ থেকে সরে যেতে বাধ্য হলো এবং বাজার নতুন জাতের বীজে সয়লাব হয়ে যেতে লাগলো।</p>
<p>এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে, উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার করতে ক্ষতি কোথায়, যদি আমরা বেশি বেশি ফসল ঘরে তুলতে পারি? এখানে প্রথমত যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার, উচ্চ ফলনশীল জাত অবশ্যই ভালো হবে, যদি তা পরিবেশ ও মানুষের জন্যে বিপদ বয়ে না আনে। <strong>কিন্তু সবুজ বিপ্লবের পর সমগ্র দুনিয়াতে নতুন জাত উদ্ভাবনের যে হিড়িক পড়ে যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, এ সব জাতের বীজ থেকে ফসল উৎপাদন করতে অতিরিক্ত পরিমাণে সার, রাসায়নিক কীটনাশক, প্রচুর পানি ইত্যাদির দরকার। এমনকি এসকল রাসায়নিক দ্রব্য মাটির উর্বরতা ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে দেখানো হয় যে, বিশ্বের প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের উর্বর ভূমিগুলোকে বছরের পর বছর অতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করিয়ে উৎপাদনের অনুপযোগী করে তুলেছে!</strong> আমাদের সামনে আফ্রিকাকে যদিও মরুভূমি কিংবা অনুর্বর হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়ে থাকে, একটি জিনিস আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক না, আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশই আবহাওয়া এবং ভৌগলিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বেশি উর্বর। একটি উদাহরণ দেই। সোমালিয়া আমাদের মত গ্রীষ্মপ্রধান (Tropical) একটি দেশ, অথচ আমরা বাংলাদেশকে উর্বর ভাবি কিন্তু সোমালিয়াকে মনে আসলে আমাদের চিন্তায় ক্ষুধাপীড়িত একটি দেশ বলে মনে হয়। যার মাটি কিনা অতি অনুর্বর! একদিকে আমাদের মনের ভিতরে এরকম একটি চিত্র তুলে ধরানো হয়েছে, অপরদিকে সে সব দেশের মাটিগুলোকে ধীরে ধীরে চাষাবাদের অনুপযোগী করে ফেলা হচ্ছে। মূলত এ সকল উচ্চ ফলনশীল জাতের চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেক অনুন্নত দেশই খরায় আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এছাড়া গ্রামের কৃষকদের যেখানে উচ্চ মাত্রার রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করতে হচ্ছে, সেখানে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা অতি দ্রুত ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এ বীজগুলো বপনের পরে যদি পর্যাপ্ত (অন্যান্য বীজের চেয়ে বেশি) পানি বা সার না দেওয়া হয়, তাহলে তা কখনোই ভালো ফলন দিবে না। <strong>তাই কৃষকদের নিকট উচ্চ ফলনশীল জাত বিক্রি করা শুধু বীজ বিক্রি করা নয় বরং একইসাথে কীটনাশক, সার, আধুনিক যন্ত্রপাতিও বিক্রি করা।</strong> যে সব কৃষক এ অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পেরেছে তারাই প্রতিযোগিতায় টিকেছে, যারা পারেনি তারা বাধ্য হয়েছে কৃষি কাজ ছাড়তে।</p>
<p>আমরা জানি যে, একই মাটিতে একই ফসল ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন করাটা অনুচিত। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে কিংবা একটি শস্যের ফসল ঘরে তোলার পর সেখানে অন্য কোনো শস্য চাষাবাদ করা উচিত, এতে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সে সাথে পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের পরে একই ফসল বার বার বপনের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জনের যে ধারা প্রচলিত করা হয়েছে, তাতে মাটির ও পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। এমনকি বাস্তুসংস্থানের অন্যতম উপাদান যে সব উপকারী কীটপতঙ্গ আমরা জানি, কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে অপকারী কীটগুলোর সাথে সাথে উপকারী কীটগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে বাস্তুসংস্থানের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এমনকি এখন আমাদের দেশসহ সমগ্র বিশ্বে “এ অঞ্চলে এ ফসলের ব্যবসা করে কোটিপতি” বলে যে সকল খবরগুলো বের হচ্ছে, এর প্রভাব সম্পর্কে কেউ একবারও ভেবে দেখছে না। আমাদের দেশেই এর অন্যতম বড় উদাহরণ চিংড়ি চাষ। চিংড়ি চাষ একটি সময় অধিক মুনাফা এনে দেওয়ায় অনেকে ফসলি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু করে, কিন্তু এর চাহিদা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসা শুরু করায় পরবর্তীতে আর সে জমিতে শস্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। কারণ ততদিনে এ মাটি অধিক লবণাক্ত হয়ে গেছে। এভাবে ফসলি জমি কৃষি কাজের অনুপযুক্ত হালে নিয়ে আসা হয়েছে।<br />
সবুজ বিপ্লবের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অত্যাধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমবাজার দামি হওয়ায় সেখানে যন্ত্রপাতির ব্যবহার কৃষকদের জন্যে উপকারী হলেও, ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষকদের জন্যে সে সকল যন্ত্রপাতি কেনা বা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি আমাদের দেশে কৃষি শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েছে। ৩য় বিশ্বের দেশ হিসেবে যেখানে আমাদের জনসংখ্যা অনেক, সেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ তা ভেবে দেখা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। কারণ, কৃষি শিল্পে বিপ্লব ঘটানো হল্যান্ড এর দিকে যদি আমরা তাকাই, তাঁদের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৮০ লক্ষ, ইউরোপে শ্রম বাজারও অনেক ব্যয়বহুল। তাই তাদের জন্যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আমাদের দৃষ্টিতে নান্দনিক দেখালেও, আমাদের প্রেক্ষিতে এর বাস্তুবতা কতটুকু, তা আরেকবার ভেবে দেখা উচিত। আমাদের অবশ্যই কৃষিতে অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত, তবে নিজেদের পারিপার্শ্বিকতার আলোকে সব কিছু বিবেচনা করেই সে ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া অবশ্য কর্তব্য।</p>
<p>আমাদের যে বিষয়টি সবুজ বিপ্লবকে চিত্তাকর্ষক করে তুলেছে তা হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে যথেষ্ট খাদ্য উৎপাদন। কিন্তু আসলেই কি তা হচ্ছে? আজ সমগ্র বিশ্বে হাইব্রিড বীজের ছড়াছড়ি, কিন্তু বিশ্বে অনাহারে থাকা মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে! <strong>ফাও (FAO) এর মতে, বিগত বছর পৃথিবীতে ১.৩ বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় ও নষ্ট করা হয়েছে, যা কিনা মোট উৎপাদিত খাদ্যের এক তৃতীয়াংশ! যেখানে এত এত গবেষণা, এত এত নতুন জাতের উদ্ভাবন, সেখানে বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা এতটাই ভঙ্গুর যে, এক প্রান্তে অতিরিক্ত খাদ্য নষ্ট করা হচ্ছে অপরদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে।</strong> খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় দুরাবস্থা রয়ে গেলেও, বীজ ব্যবস্থাপনা ঠিকই সাধারণ কৃষকদের হাত থেকে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে। আজ আমাদের কৃষি উৎপাদন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, কেউ চাইলেও প্রাচীন বীজগুলো নিয়ে উৎপাদন করতে পারবে না। বীজের সত্যায়ন (Certification) ও মান (Standard) এর নামে কৃষকদের পরোক্ষভাবে হাইব্রিড বীজ ব্যবহারে বাধ্য করা হচ্ছে, অপরদিকে পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করে বিশেষ গোষ্ঠী মুনাফা অর্জন করে আসছে। সবুজ বিপ্লব কি আসলেই কৃষকদের জন্যে আশীর্বাদ বয়ে এনেছে? নাকি গুটিকয়েক ধনী গোষ্ঠীকে/কৃষককে আরও ধনী করে তা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে? এগুলো ভেবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে দেরি হয়ে গেলেও, সময় শেষ হয়ে যায়নি বলে আমার বিশ্বাস।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/green-revolution-expectations-and-results/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16190</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 20 Sep 2025 14:31:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16160</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও খাদ্য : ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি রচিত হওয়ার পর তৎকালীন দুনিয়ায় যে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, আল্লাহর রাসূল (স.) তার বিপরীতে নতুন এক ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন। অর্থনৈতির মূলনীতিকে গোটা জাতির সামনে তুলে ধরেন এবং তা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5>ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও খাদ্য :</h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি রচিত হওয়ার পর তৎকালীন দুনিয়ায় যে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, আল্লাহর রাসূল (স.) তার বিপরীতে নতুন এক ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন। অর্থনৈতির মূলনীতিকে গোটা জাতির সামনে তুলে ধরেন এবং তা বাস্তবায়নে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় একাধিক মূলনীতি বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহাবিগণ এ ধারা অব্যাহত রাখেন। ফলস্বরূপ তৎকালীন সমাজের দারিদ্র্যতা, অর্থনৈতিক সংকট দূরীভূত হয়ে এমন একটি সভ্যতার সূচনা হয়, যেখানে দারিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, বেকারত্বের মত সমস্যাগুলো ছিল অনুপস্থিত। যার দৃষ্টান্ত আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই। রাসূল (স.) এবং আবু বকর (রা.) এর যামানা পার হয়ে উমর (রা.) এর শাসনামলের শেষ দিকে আরবের সাড়ে ৩৮ লক্ষ বর্গমাইল অঞ্চলে যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না!</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার সময়কালে অর্থনীতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে মুফাসসিরগণ, ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানীগণ স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। কারণ, কোরআন-হাদীসসহ ইসলামী শাস্ত্রগুলোতে আলেমগণ এ বিষয়ে বেশ গুরুত্বারোপ করেছেন। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ</p>
<p>“সমৃদ্ধির জন্য কৃষিকাজ আবশ্যক। ইসলামী রাষ্ট্রে খাদ্যের পর্যাপ্ততা অর্জনের আগ পর্যন্ত চাষাবাদ, রোপণ, ও জমি আবাদের কাজ অবিরাম চালিয়ে যেতে হবে।”</p>
<p>খাদ্যের সমৃদ্ধি যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা উপোরোক্ত উক্তিতেই বুঝা যায়। ইমাম কুরতুবী একে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ, জনগণের সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সত্যিকারের স্থায়ী উন্নয়ন, সুস্থ সবল জাতি, সর্বোপরি আখলাকসম্পন্ন শক্তিশালী উম্মাহ গঠনে কৃষি ও খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।</p>
<p>খোলাফায়ে রাশেদার আমল থেকে শুরু করে প্রত্যেক যুগেই কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেমনঃ হযরত উমর (রা.) অর্থনীতিতে বৈপ্ল­বিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের জন্য তিনি যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষি। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর পরই কৃষকদের সাথে বৈঠক করেন। কৃষি সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সমস্যা, খাদ্য উৎপাদনের দিকে জোর দেয়া, খাদ্য সংকট মোকাবিলা প্রভৃতি কাজের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উমর (রা.) এক্ষেত্রে ভূমিব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তিনি ভূমির ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন-</p>
<ul>
<li>১. ভূমি মানবজাতির জন্য সর্বাধিক প্রয়োজনীয় এবং মানুষের সকল চাহিদা পূরণ করে।</li>
<li>২. ভূমির পরিমাণ সীমিত।</li>
<li>৩. ভূমি স্থায়ী।</li>
</ul>
<p>উমর (রা.) নেতত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার পরপরই মুসলিমদের সামনে কৃষি সংক্রান্ত দুটি মৌলিক সমস্যা এসে হাজির হয়।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>এক. ক্রমবর্ধমান ইসলামী অঞ্চলগুলোর খাদ্যচাহিদা মেটানো।</strong><br />
<strong>দুই. ভূমিব্যবস্থাকে এমনভাবে সুবিন্যাস করা যাতে মধ্যস্বত্বভোগী কোনো শ্রেণির উদ্ভব না ঘটে।</strong></p>
<p>এই দুটি লক্ষকে সামনে রেখে উমর (রা.) যুগান্তরী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিজিত ভূমি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে না দিয়ে কৃষকদের মাঝে সমভাবে বন্টন করেন। যার ফলে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে যায়। রোমান এবং পারস্যের সামন্ততান্ত্রিক কিংবা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে উমর (রা.) নতুন ধারা তৈরি করেন। অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার বিলোপ সাধন করে বিশ্ববসীর জন্য একটি মডেল উপস্থাপন করেন।<strong> তিনি অনাবাদি জমিকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ভূমিহীনদেরকে ভূমির মালিকানা প্রদান করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষকদের বিশেষ পুঁজি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং ঘোষণা দেন, রাষ্ট্র কতৃক প্রদেয় এ পুঁজি রাষ্ট্রকে আর ফেরত দিতে হবে না। উৎপাদিত ফসলের ৫০% কৃষকরা নিজের জন্য রাখবে বাকি ৫০% রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কল্যাাণে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য এটি ছিল বড় একটি পাওয়া।</strong> যুগান্তকারী এই পদক্ষেপের ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্রের আওতাধীন সব অনাবাদি জমি আবাদি জমিতে পরিণত হয়। উন্নয়নের চালিকাশক্তি কৃষকদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখা, রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা সাহায্য-সহযোগিতাসহ নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গনিমতের মাল আসার পর তিনি তার সবটুকু যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন না করে সে সময়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা কৃষির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন। এক্ষেত্রে নানাবিধ চিন্তাগত ও সিদ্ধান্তগত জটিলতা তৈরি হলেও তিনি তার ইজতেহাদি সিদ্ধান্তের আলোকে কৃষির উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে এর অনুকূল সিদ্ধান্ত প্রদান করেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় তাঁর এ পদক্ষেপ ছিল সময়ের সেরা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।</p>
<p>কৃষিব্যবস্থার সামগ্রীক উন্নয়নের লক্ষ্যে এগ্রিকালাচারাল টেকনোলজি অর্থাৎ, তৎকালীন সময়ের সবথেকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেন। সেচ প্রকল্প, ড্রেনেজ সিস্টেম প্রবর্তনসহ নানাবিধ উদ্যোগ করে বিদ্যমান কৃষির ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। উন্নয়ন চালিকা শক্তির মূল উপাদান কৃষক ও কৃষির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফরমান জারি করেন।</p>
<p>ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজ-এর একটি ঘটনা এখানে প্রাণিধানযোগ্য। ‘একবার মুসলিম সেনাবাহিনী ভুলক্রমে এক ব্যক্তির ফসলী ক্ষেত মাড়ালে উমর (রা.) ক্ষতির শিকার কৃষককে তাৎক্ষণিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।’ দুর্ভিক্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দীর্ঘমেয়াদি সাহায্য নিশ্চিত করেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন তার লক্ষমাত্রা অতিক্রম করে।</p>
<p>উৎপাদন বাড়াতে স্বতন্ত্র সেচ প্রকল্প চালু করা হয়। আল্লামা শিবলী নোমানী তাঁর আল ফারুক গ্রন্থে লিখেছেনঃ</p>
<blockquote><p>“সমগ্র দেশে খাল খনন, বাঁধ নির্মান পুকুর খনন, প্রয়োজনীয় স্থানে পানির ব্যবস্থা করার জন্য হযরত ওমর পৃথক এক বিভাগ (Department) প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লামা মাকরিযী লিখেছেন শুধুমাত্র মিসরেই এ কাজের জন্য দীর্ঘ কয়েক বছর ব্যাপী এক লক্ষ বিশ হাজার শ্রমিক এই কাজে নিযুক্ত ছিল। এর যাবতীয় খরচ বাইতুলমাল তহবিল থেকে বহন করা হতো। খেযিস্তান এবং আহওয়াজ এলাকায় জাযর ইবন মুয়াবিয়া হযরত উমরের অনুমতিক্রমে অনেক খাল খনন করে বহু পতিত জমি আবাদ উপযোগী করেছিলেন। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অনেক খাল খনন করা হয়েছিল বলে বড় বড় ইতিহাসবিদ্গণ উল্লেখ করেছেন।” (আল ফারুক, পৃ-১৪২)</p></blockquote>
<p>উসমান (রা.) খিলাফতে অধিষ্টিত হয়ে পূর্ববর্তী কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। হযরত আলীও (রা.) এই ধারাকে অব্যাহত রাখেন। তিনি সব অঞ্চলে কৃষি এবং খাদ্যনীতির গুরুত্ব বজায় রাখতে শাহী ফরমান জারি করেন। মিশরের গভর্নর মুসা আল-আশআরীর কাছে পাঠানো এক চিঠির শুরুটা তিনি এভাবে করেছিলেন, <strong>“হে মুসা আল-আশআর! উৎপাদন বৃদ্ধি কর এবং উৎপাদিত ফসলর সুষম বন্টন নিশ্চিত কর।” </strong>স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, খোলাফায়ে রাশেদার আমলে কৃষিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির ভিত কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল।</p>
<p>কৃষিকে মুসলিমরা উন্নতির কোন শিখরে নিয়ে গিয়ে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত এক সভ্যতার ইতিহাস বিশেষজ্ঞের নিম্নোক্ত উক্তিতে- “আমি কখনোই শুনিনি, মুসলিমরা তাদের স্থায়ী আবাসস্থলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে খাদ্য আমদানি করেছে। এর পরিবর্তে তারা নিজেরা কীভাবে সার প্রস্তুত করতে হয়, মাটির গঠন, চাষ পদ্ধতি, রোপণ, সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদির উপর তারা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করে।” (The Back of Islam, ২য় খন্ড, ড. মোহাম্মদ আমীন)</p>
<p>যেসব অঞ্চল কৃষিকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ভিত রচনা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম আন্দালুসিয়ার মুসলিম সালতানাত বা ইসলামী খেলাফত। তৎকালীন সময়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরাই সর্বপ্রথম কৃষির এনসাইক্লোপিডিয়া তৈরি করে। আজকে আমরা যে লেবু, মালটা, কমলা, বাদামসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিদায়ক ফল দেখতে পাই, সেসবের বীজ মুসলমানদের হাত ধরেই বাণিজ্যিক রোপন শুরু হয়। তারা নতুন নতুন বীজের আবিষ্কার করে। পৃথিবীর ইতিহাসে আজও আন্দালুসিয়ার কৃষি বিশ্ব কৃষিব্যবস্থার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। খলীফা আব্দুর রহমান প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করতেন। ইসলামী সভ্যতার সময়কালে স্পেনের কৃষি কোন অবস্থায় ছিল জানতে উইল ডুরান্টের নিম্নোক্ত উক্তিটিই যথেষ্ট। তিনি লিখেছেনঃ</p>
<p>“কয়েকশত কৃষিজাত পণ্য যেমনঃ শস্য, সবজি, ফলমূল, বাদাম ও ফুলের চাষ করা হয়। কমলা গাছ এবং কমলার বীজ নিয়ে দশম শতাব্দীর কিছু আগে আরবরা সিরিয়া, এশিয়া মাইনর, প্যালেস্টাইন, মিশর এবং স্পেনে প্রবেশ করে। এসব দেশ থেকে কমলা দক্ষিণ ইউরোপে প্রবেশ করে। আখের আবাদ এবং চিনির পরিশোধনও আরবদের (মুসলিমদের) থেকে ক্রুসেডাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রবেশ করে। আরবদের মাধ্যমেই ইউরোপ তুলার সাথে পরিচিত হয়। রাষ্ট্র সেচব্যবস্থা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন এবং পতিত জমি আবাদ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ সাহায্য করে। যার ফলে সেসময়ে বুখারা এবং সমরকন্দের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে পৃথিবীতে স্থাপিত স্বর্গ বলে আখ্যায়িত করা হতো।”</p>
<p>একইভাবে স্কটের মন্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। তিনি স্পেনে মুসলিম সালতানাতের কৃষিপদ্ধতি সম্বন্ধে বলেনঃ“&#8230;the most complex, the most perfect, the most scientific, even devised by the ingenuity of man.</p>
<p>মুসলিমরা বিজিত হয়ে যেসব অঞ্চলে ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতো এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতো সেখানে তারা উন্নত খাদ্যনীতি এবং কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিত। যেমনঃ আন্দালুসিয়াতে যখন মুসলিমরা দেখতে পেল স্বাস্থ্যহীনতা এবং বিনা চিকিৎসায় অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন মুসলমানরা এ অঞ্চলের জলবায়ু, ভূমিসহ সামগ্রীক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে নতুন বীজ উদ্ভাবন করে এবং অঞ্চলোপযোগী খাদ্যনীতি প্রনয়ণ করে। এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল আন্দালুসিয়াতে নয়, অন্যান্য অঞ্চলেও নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাতের উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। বাংলা অঞ্চলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর মুসলমানরা এ অঞ্চলের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার সুষ্ঠু বন্দোবস্ত করতে অঞ্চল উপযোগী নানা জাতের বীজ, কলা, আমলকিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার সর্বত্র সহজলব্য করেন। এ জাতীয় উদ্যোগের ফলে কৃষি ও খাদ্যনীতিতে বিপ্ল­ব সাধিত হয়। উন্নত কৃষি এবং সঠিক খাদ্যনীতির অভাবে আজ আমরা ভয়ংকর যুদ্ধের সম্মুখীন। যা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট।</p>
<p>বাদশা আলমগীরের সময় বাংলার কৃষি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। মীর জুমলা (১৫৯১-১৬৬৩) এবং শায়েস্তা খাঁর (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) আমলে উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছিল সর্বাধিক সস্তা। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। এ সময় বাংলা অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। ড. মোহাম্মদ মোহর আলী তাঁর <em>History of the Muslims of Bangal</em> (2 Vol. 5) এ নিয়ে তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন।</p>
<p>সীমান্ত দিয়ে কোনো ভাবেই যেন ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য প্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে উমর (রা.) এর সময়কাল থেকেই কঠিন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিটি অঞ্চলেই চেক পোস্ট বসানো হয়। আজকের যে শুল্ক সিস্টেম তার আবিষ্কারকও মুসলিমরাই। অর্থাৎ এ ব্যাপারে মুসলিমরা কতো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেছে তা আমরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।</p>
<p>বর্তমান পৃথিবীর কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরিই জায়নবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রনে। তারা একে কেন্দ্র করে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ বীজ, খাদ্য এবং কৃষির যুদ্ধ যা পারমাণবিক বোমার থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। ইসলামী সভ্যতার সূচনাকালীন সময়েই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারার ২০৫ নং আয়াতে আমাদেরকে সতর্ক করে বলে দিয়েছেন,</p>
<blockquote><p>“যখন সে শাসন কর্তৃত্ব লাভ করে, পৃথিবীতে তার সমস্ত প্রচেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত ও মানব বংশ ধ্বংস করার কাজে। অথচ আল্লাহ বিপর্যয় মোটেই পছন্দ করেন না।”</p></blockquote>
<p>এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে যা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হলো, তারা আমাদের শস্যক্ষেত্র এবং বংশ বৃদ্ধিকে থামিয়ে দিবে। আজকে সেই বিষয়টি আমরা ব্যাপক হারে লক্ষ্য করছি এবং এর ভয়াবহ ফলাফলও উপলব্ধি করছি। সূরা নিসার ১১৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,</p>
<p>“তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আশ্বাস দিব, তাদেরকে পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব, এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির আকৃতি পরিবর্তন করার আদেশ দিব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হবে।”</p>
<p>এ দুটি আয়াত থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, তারা আমাদের বীজ ব্যবস্থা, আমাদের বংশবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিবে। আমাদের সৃষ্টির আকৃতিকে পরিবর্তন করে দিবে।</p>
<p>সুষ্ঠুভাবে বর্তমান বিশ্ব খাদ্যনীতিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জায়নবাদীগোষ্ঠী কতৃক পরিচালিত মনোসান্তো, কারগিলের মতো কোম্পানিগুলো আমদানীকৃত বীজের মধ্যে ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে, যা ভয়াবহ রোগের সৃষ্টি করছে। তারা জেনেটিক্যালি মোডিফাই করে ঝুঁকিপূর্ণ এসব বীজ আমাদের নিকট প্রেরণ করছে। তারা নয়া কীটনাশক, সার সিস্টেম তৈরি করে কৃষি সেক্টরকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে যে, সার এবং কীটনাশক ছাড়া খাদ্য উৎপাদন কল্পনাও করা যায় না। জমিতে সার এবং কীটনাশক প্রয়োগের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। উ<strong>ৎপাদিত খাবার খেয়ে মানবদেহে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত ঔষধের কাঁচামালও তারা সরবরাহ করছে। এবং তাদের নিয়ন্ত্রনাধীন বড় বড় ঔষধ কোম্পানি গড়ে ওঠেছে। নিজেরা কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করে আবার নিজেরই সে রোগের ঔষধ সরবরাহ করে। মানবরূপী নিকৃষ্ট এ পশুগুলো মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সেক্টর ‘কৃষিব্যবস্থা’কে নিরব গণহত্যার মোক্ষম হাতিয়রে পরিনত হয়েছে।</strong></p>
<p>সাম্রাজ্যবাদীদের হীন এ কাজের বিপরীতে ইসলাম খাদ্যনীতি এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়কে কতটা আদালত এবং ইনসাফের দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছে তা নিচের ছোট একটি উদাহরণেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। আমাদের নবী রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মোহাম্মদ (স.) এক বেদুইনকে একটি গর্ভবতী উটনীর লালন-পালনের দায়িত্ব প্রদানকালে বলেন, “নিজ হাতের নখ ছোট করে রাখবে, যেন উটের দুধ দোহনকালে নখ বড় থাকার কারণে উটনী কষ্ট না পায়।” অত্যন্ত দুখ এবং পরিতাপের বিষয় হলো আজকালকার ডেইরি ফার্মগুলো ইনজেকশনের মাধ্যমে গর্ভধারণ এবং গর্ভপাত করছে। স্তনে মেশিন লাগিয়ে বল প্রয়োগে দুধ দোহন করছে। এ জাতীয় কাজগুলো কি আদৌ মানবতার জন্য, কৃষির জন্য কিংবা খাদ্যনীতির জন্য কল্যণ বয়ে আনতে পারে?</p>
<p>ইসলাম সব বিষয়ে আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা উপলব্ধি করতে না পারার কারণে সত্য ও সঠিক পথ হারিয়ে ভয়াবহ এক পরিণতির দিকে প্রতিনিয়ত ধাবিত হচ্ছি। এ থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে আমাদের যে সার্বিক অবস্থা সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, অন্যান্য দেশের তুলনায় মুসলিম দেশগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দারিদ্র্য দেশগুলো আরও অনেক বেশি পিছিয়ে। এ জন্য আমাদের সবার আগে পর্যালোচনা করা দরকার, পূর্বে বাংলা অঞ্চলে কি ছিল। কি ছিল তার প্রাচীন ইতিহাস। এই বাংলা অঞ্চলে প্রকৃত কৃষি বিপ্লব, উন্নত খাদ্যনীতি সম্ভব কিনা, সম্ভব কিনা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতাকে কেন এবং কীভাবে হারালাম তারও তত্ত¡ তালাশ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার কৃষি এবং খাদ্য :</h5>
<p>প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আব্দুর রহিমের ভাষায়, বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তা এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়, যে পর্যায়ে বাংলা অঞ্চলের মানুষদের শুধু রাজনৈতিক মঞ্চকে কিংবা শুধু সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনকেই উন্নত, গঠনমূলক করে না। একইসাথে অর্থনীতি ও কৃষির উন্নতি এবং সমৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করে তোলে। বাংলা অঞ্চলের ভ‚মিকে বলা হতো প্রাচুর্যে ভরা উর্বর ভূমি। এর অধিকাংশ নারী- পুরুষ সকলেই ছিলেন অনেক বেশি পরিশ্রমী। ফলশ্রুতিতে মুসলিম শাসকগণ ইসলামী সভ্যতার রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতির আলোকে এমন সব মূলনীতি প্রনয়ণ করেন যার ফলে কৃষি এবং বাণিজ্যে অভ‚তপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। গোটা অঞ্চলের মাটির উর্বরতা, কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্র এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয় যা গোটা অঞ্চলকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে।</p>
<p>নীহাররঞ্জন রায় বাংলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেন, “মুসলমানদের ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রণয়নের ফলে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা হলো গোটা উপমহাদেশের অর্থনৈতিতে অভ‚তপূর্ব এক পরিবর্তন সাধিত হয় যার অন্যতম ভিত্তি ছিল কৃষি। মুসলমানদের অর্থনৈতিক কৌশল, প্রজ্ঞাপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গোটা বাংলাকেই অর্থনৈতিক উন্নতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দেয়।”</p>
<p>মীনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তাবাকাতে নাসিরীতে’ লিখেন- মুসলমানদের এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নৈতিক মূল্যবোধের (আখলাক) ফলে শুধুমাত্র শাসকদের মূলনীতিই নয় প্রজাদের মধ্যেও এক সহমর্মী এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠে। সকলেই তাদের খাজনা দেয়া-সহ রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পুরোদমে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এর ফলে সব দিক মিলিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আয় সেসময়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছে।</p>
<p>সকল ঐতিহাসিক এ বিষয়ে একমত যে, চারটি বিষয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনীতি এতো বেশি শক্তিশালী হয়,</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>এক.</strong> কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের উন্নতি সাধন।<br />
<strong>দুই.</strong> প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা।<br />
<strong>তিন.</strong> বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানিতে জোর প্রদান।<br />
<strong>চার.</strong> খনিজ সম্পদ এবং মূল্যবান পদার্থের প্রাচুর্যতা এবং তার সঠিক ব্যবহার।</p>
<p>ঐতিহাসিকগণ এবং তৎকালীন বিশেষজ্ঞগণ এ অঞ্চলের মাটিকে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট উর্বর মাটি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের অঞ্চলে অসংখ্য নদী-নালা, সবথেকে বেশি ঋতু, প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা বিদ্যমান। সঠিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ উন্নত কৃষি অঞ্চল। মুসলমানরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে প্রয়েজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করে। <strong>ইবনে বতুতা এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে কৃষির অবস্থান, শষ্যের প্রাচুর্য ফুল-ফলের সমারোহ দেখে এতটা বিস্মিত হন যার প্রকাশ আমরা তার লেখনীতে দেখতে পাই। তিনি লিখেছেন, “নদী পথে মিশরের নীল নদের মতো ডানে-বামে ছিল অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজী এবং গ্রামের পর গ্রাম। আমরা গ্রাম ও উদ্যানরাজীর মধ্য দিয়ে ১৫ দিনের মতো চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে আমরা একটি সাজানো উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলেছি।”</strong> ইবনে বতুতার সমস্ত ভ্রমণ কাহিনী ও তার পর্যালোচনাকে যদি আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করি তাহলে দেখব, এ অঞ্চলের রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন এতোটাই সূক্ষ্ম এবং গোছালো ছিল, এ অঞ্চলের কৃষিকে অনেকটা স্বপ্নীল বাগান হিসাবে ঐতিহাসিকগণই আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<p>আবার বিশ্বভারতী এনালসের ঐতিহাসিকগণ এ অঞ্চলকে সপ্তস্বর্গ, পৃথিবীর স্বর্ণভান্ডার হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। এবং এ অঞ্চলের সম্পদ, মানুষের চারিত্রিক সততা এবং পরিকল্পিত কৃষি, নদী এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনাকে স্বর্গের সাথে তুলনা করেছেন। একজন চৈনীক দূত বাংলা সম্পর্কে বলেন, “এর অঞ্চলে ভূমি এতটাই উর্বর এবং এর উৎপাদন এতই বেশি যে, একই জমিতে প্রতি বছর দুই থেকে তিন ধরণের ফসল তারা পায়। কোনো রকম যত্ন না করেও এ অঞ্চলের ভূমি থেকে কৃষকরা তাদের চাহিদার থেকেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে।”</p>
<p>প্রখ্যাত গবেষক ও ঐতিহাসিক, আবুল ফজল বলেন, “বাংলার মাটি এতো বেশি উর্বর ছিল যে একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হতো।” মুঘল সালতানাতের বিখ্যাত ঐতিহাসিক লেখকগণ সেকালের পলিমাটির অসাধারণ উর্বরতার উল্লেখ করেছেন। বাংলার সমগ্র মুসলিম শাসনামলে ভূমির উর্বরতা এবং কৃষির প্রশংসা এত বেশি লক্ষ্য করা যায় যে, সুলতান আওরঙ্গজেবের শাসনামলে নদী-নালা, খাল-বিল, কৃষির সুন্দর পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন, সারিবদ্ধ গ্রাম এবং শহরের পরিচ্ছন্নতা, মাঠভর্তি শস্য এবং নানাবিধ ফুল- ফলের প্রশংসা করে গবেষণা পত্রও রচিত হয়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত গবেষক বার্ণিয়ারও এই কথাগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা মুসলিম বিদ্বেষী হওয়েও এ বিষয়গুলোর সত্যতা তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন।</p>
<p>অঞ্চলের সবয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদিত ফসল ছিল চাল। সরু, মোটা নানা ধরণের চাল এদেশে উৎপাদিত হতো। চালের নানা প্রকারের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবুল ফজল বলেন,</p>
<p><strong>&#8220;যদি প্রত্যেক প্রকার থেকে একটি করে শস্যকণা সংগ্রহ করা হতো তাহলে একটি বড় কলস ভরে উঠতো।&#8221;</strong> কৃষিবিদ ফরিদ আখতারের মতে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচশত’র বেশি বীজ সংরক্ষিত হত এবং সেগুলোর চাষ হত। এই নানা ধরনের বীজ এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যকণা এবং উর্বর জমি এ দুয়ের সমন্বয়ে উৎপাদিত চালের পরিমাণ এতো বেশি ছিল যে, জনসাধারণের চাহিদা মেটানোর পর পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৭০টি জায়গায় রপ্তানি হতো। চালের মতো যে সব শস্য উৎপাদিত হতো তার মধ্যে অন্যতম ছিল তুলা, মরিচ, সরিষা। এ ফসলগুলোর উৎপাদন এতো বেশি হতো যে, পৃথিবীর ৫০ টির মতো অঞ্চলে তুলা এবং তুলা থেকে উৎপাদিত সুতা, মরিচ, সরিষা ইত্যাদি রপ্তানি হতো।</p>
<p>গত কয়েক দশক পূর্বেও পাটকে বাংলা অঞ্চলের সোনালী আঁশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। ৭-৮ শত বছর যাবৎ সব ধরণের সাহিত্যে, কবিতায়, গ্রন্থে পাটের কথা উল্লেখ থাকতো। নানাবিধ মাধ্যমে পাট, পাট থেকে তৈরিকৃত বস্ত্র এবং বিভিন্ন পণ্যকে সাহিত্যে তুলে ধরা হতো। পাট শুধুমাত্র একটি ফসল হিসেবে উৎপাদনই হত না বরং পাটের দ্বারা তৈরি বিভিন্ন ধরণের পণ্য ও বস্ত্রসামগ্রীও তৈরি হতো। এগুলো ছিল উপমহাদেশ তথা বাংলা অঞ্চলের আয়ের অন্যতম ক্ষেত্র।</p>
<p>‘ইকোনমিক এনালস অব বেঙ্গল’ বইতে জে সি সিনহা বলেন, “বাংলায় মুসলিম শাসনামলে পাট এবং পাটজাত দ্রব্য এতো বেশি পরিমাণে উৎপাদন হতো যে, পাট এবং পাট থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন দ্রব্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো।” এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলে এসে তারা পাটবস্ত্র এবং তৎসংশ্লিষ্ট শিল্পেরে সাথেই সম্পৃক্ত হয়। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্টের একটি পত্র এখনও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে, সেখানেও পাট নিয়ে বিস্তর আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। জে সি সিংহ বলেন, সে সময়ের ঐ চিঠিতে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার চটের থলে এবং ১২ শ চালের বস্তা পাঠানোর একটি দলিল। অর্থাৎ একটি চিঠি থেকেই যদি এ ধরণের তথ্য ফুটে উঠে বুঝাই যাচ্ছে যে, পাটকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি ও পর্তুগীজদের বিশাল একটি পরিকল্পনা ছিল এবং পরবর্তীতে তারা তা বাস্তবায়ন করে। দুঃখজনক বিষয় হল সেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নকারী সেই সোনালী আঁশ এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় আজ আমাদের অর্থনীতি থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে</p>
<p>বাংলাদেশে একসময় তুঁতগাছ এবং গুটি পোকার চাষ হতো। পঞ্চদশ শতকে এ অঞ্চলে যেসকল ঐতিহাসিকগণ আসেন বা এ অঞ্চলের কথা তুলে ধরেন তাদের বর্ণনাতে দেখা যায়, গুটি পোকা মূলত মুসলিমদের পূর্ব আমলে ছিল না বললেই চলে। মুসলমানরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর গুটি পোকা আমদানি করে। সঠিক পরিচর্যা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন এতো বেশি বরকতপূর্ণ হয় যে, বার্ণিয়ার ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কাশিম বাজার পরিদর্শনকালে দেখতে পান, কাশিম বাজারে রেশমের কাঁচামালের উৎপাদন বছরে প্রায় ২৫ লক্ষ পাউন্ডের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ২২ হাজার বেল। প্রত্যেক বেলের ওজন ১০০ লিভার। উৎপাদিত এ কাঁচামালের থেকে সাড়ে সাতশত পাউন্ড গুজরাট ও ভারতের অন্যান্য অংশে পাঠানো হতো। উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও রেশমের এই কাচামাল উৎপাদন হতো এবং তা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। রপ্তানি কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল গোটা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীগণ এবং এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ অঞ্চলের ইসলামী সভ্যতা। (তথ্যসূত্র লাগবে) জে সি সিনহা ইকোনমিক এনালস অফ বেঙ্গলে লিখতে বাধ্য হয়েছেন যে, প্রতি বছর কাশিম বাজার থেকে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ পাউন্ড কাঁচা রেশম জাপান হলেন্ড অঞ্চলে রপ্তানি হতো এবং বাংলায় দশ লক্ষ পাউন্ড রেশমের সুতা তৈরী হতো।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে রেশমের কাঁচামাল এতো বেশি সস্তা ছিল যে এর ব্যবসা বিভিন্ন অঞ্চলে খুব দ্রæত সম্প্রসারিত হয়। যার ফলে খুব সহজেই এ অঞ্চল থেকে অন্যান্য অঞ্চলের বণিকগণ রেশম ক্রয় করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে তাদের ব্যবসায় উন্নতি সাধন করে। বাংলা অঞ্চলের উন্নত কৃষি, উর্বর জমি এবং যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে কৃষির স্বর্গরাজ্য।</p>
<p>বিশ্বভারতী এনালস প্রথম খন্ডের চাইনিজ একাউন্টস এ যেসব তথ্য রয়েছে এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য ঐতিহাসিকগণের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলা অঞ্চলে তার উন্নত কৃষি ও নানাবিধ উৎপাদনের ফলে এমন এক কৃষি বিপ্ল­ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয় যার মধ্য দিয়ে ভুট্টা, সরিষা, তেল, তিসি, কালাই এতো বেশি উৎপাদিত হতো যে, নিজ অঞ্চলের প্রয়োজন মিটিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৫০-৬০টি অঞ্চলে তা রপ্তানি হতো। এছাড়াও শাক-সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, শসা ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হতো এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তা পৌঁছানো হতো। পান, সুপারি, নারিকেল এসবের প্রাচুর্য এতো বেশি ছিল যে, এগুলোও প্রায় ৪০-৫০ টি অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো।</p>
<p>কলা, আম, কাঁঠাল, ডালিম, লেবু, খেজুর ইত্যাদি ছিল বাংলা অঞ্চলের সুপরিচিত ফলের মধ্যে কয়েকটি। এসব ফলের প্রতি অন্যান্য অঞ্চলের বণিকদের চাহিদা এতো বেশি ছিল যে, তারা এসব ফসল নিজ অঞ্চলে আমদানি করতেন। এ অঞ্চলের কৃষি রপ্তানিমুখী হয়ে ওঠায় অর্থনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।</p>
<p>ইবনে বতুতা ও বার্ণিয়ারের বর্ণনার পাশাপাশি ফরাসি, ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের বর্ণনা এক করলে দেখা যায় তারা বাংলা অঞ্চলের গৃহপালিত পশু যেমনঃ ঘোড়া, খচ্চর, মহিষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির কথা বেশ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। গৃহপালিত এ পশুগুলোর প্রাচুর্যতার কারণে খুবই অল্প দরে বিক্রি হতো। দাম কম হলেও কৃষকদের কোনো ক্ষতি হয়নি বরং খরচের তুলনায় তারা লাভবান হতো। গৃহপালিত এ পশুগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য হিসেবেও রপ্তানি হতো। এটিও বাংলা অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিকে ব্যাপকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।</p>
<p><strong>প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বর্ণনায় বাংলা অঞ্চলে বিভিন্ন খনিজ সম্পদের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেগুলো আজও পর্যন্ত বর্তমান। তিনি বলেন- মাহান্দা সরকারের হারবাহ নামক স্থানে মুক্তার একটি খনি ছিল। এখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর উৎপাদিত হতো। বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৫০ এরও অধিক খনিজ সম্পদ বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের অঞ্চলে এখনও ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা কেউ ই জানি না এটি আসলে কারা নিয়ন্ত্রণ করছে বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কীভাবে এই খনিজ সম্পদগুলোকে তাদের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করছে।</strong></p>
<p>ঐতিহাসিকগণ বাংলার সুতি শিল্পের অনেক প্রশংসা করেছেন। এ ব্যাপারে বিখ্যাত পন্ডিত বার্বুসা বলেন, এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত সুতা রয়েছে। তারা সূতি ও মিহি অনেক প্রকারের বস্ত্র তৈরি করে। নিজেদের ব্যবহারের জন্য রঙিন এবং ব্যবসার জন্য সাদা রাখে। এগুলো খুবই মূল্যবান কাপড় এবং এগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে মৌর, আরব, ইরান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ অনেক পছন্দ করতো যার দরুন বাংলা অঞ্চল থেকে এসকল অঞ্চলে এই কাপড়গুলো জাহাজ করে রপ্তানি হতো। কে, এম আশরাফ তার “লাইফ এন্ড কন্ডিশন অব দি পিপল অব হিন্দুস্তান” বইয়ে লিখেন, পন্ডিত বার্থেনা এ অঞ্চলের বস্ত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের সুতি বস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার মতো এতো বেশি সুতি বস্ত্রের প্রাচুর্যতা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখেননি বলে বার্থেনা মন্তব্য করেন। ঠিক একইভাবে আবুল ফজল উল্লেখ করেন, সোনারগাঁয়ে এক প্রকার মিহি মসলিন তৈরি হতো। মসলিনগুলো এতো বেশি উন্নত মানের ও দামী ছিল যে বাহরিস্থান গ্রন্থের প্রথম খন্ডে মির্যা নাথান বলেন, তিনি মালদ্বাহ থেকে তৎকালীন সময়ের চার হাজার টাকা মূল্যে এক খন্ড মসলিন বস্ত্র ক্রয় করেন। জে সি সিনহা ইকোনমিক এনালস অব বেঙ্গলেও উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলে এতো বেশি কাঁচা সুতা উৎপন্ন হতো এবং সুতা থেকে মসলিন কাপড় উৎপন্ন হতো যা বার্বুসা তার ভ্রমণকালে ব্যাপক হারে দেখতে পান। আর এটা ছিল জগৎ জুড়ে বিখ্যাত একটি সুতা শিল্প যা এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।</p>
<p>এ অঞ্চলে আখের উৎপাদন ছিল অনেক বেশি। বার্বুসা তার ভ্রমণকালে দেখা আখ চাষের কথা ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছেন। হ্যাকলুয়েথ সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ইতিহাসের ২য় খন্ডে আমরা দেখতে পাই এ অঞ্চলের আখ থেকে শুধু চিনি নয় আরও নানা ধরণের খাদ্য দ্রব্য উৎপাদিত হতো। উৎপাদিত এ খাদ্য দ্রব্যগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। তবে সব থেকে বড় আয়ের এবং রপ্তানিকারক পণ্য ছিল চিনি। এই চিনিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বাংলা সালতানাতের ঐ সময় পূর্ব-পশ্চিম উপক‚লের দেশসমূহ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে চিনিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>চিনির মূল আবিষ্কারক ছিলেন মুসলিমগণ। কিন্তু উপনিবেশিক শক্তি যখন এ অঞ্চলে হানা দেয় এবং তাদের নিকৃষ্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করে তখন আমাদের অঞ্চলের চিনির অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে আর তা আজকের বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। আমরা কিছুকাল পূর্বেও লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনির কলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ চিনি বিদেশী কোম্পানিগুলো থেকে আমদানি করতে হয়। এই চিনিকে অবশ্যই মুসলিমদের হাতে রাখতে হবে। কারণ চিনিকে কেন্দ্র করে খাদ্যের বড় একটি অংশ তৈরি হয়। আর চিনি যদি মুসলমানদের হাতে না থাকে তাহলে সেটি সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং আজকের বিশ্ব তাই-ই হচ্ছে। এ চিনিকে কেন্দ্র করে নানাবিধ রোগ, ভাইরাস এবং অর্থনৈতিক শোষণ চালান হচ্ছে। বিদেশী কোম্পানি থেকে চিনি আমদানি করার ফলে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মুসলিম সভ্যতায় এক হাজারেরও বেশি সময় ধরে গোটা মানবজাতি চিনি খেয়েছে। চিনি থেকে তৈরিকৃত বিভিন্ন খাবার খেয়েছে। কখনো এতো রোগে নিপতিত হয়নি। কিন্তু যখন থেকেই উপনিবেশিক শক্তির হাতে তথা বর্তমান যায়নবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে চিনি এবং চিনি থেকে তৈররিকৃত খাদ্যদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে তখন থেকে চিনি একটি বিষতুল্য খাদ্যদ্রব্য হিসেবে আমাদের কাছে আসছে এবং আমরা উপায়ন্তর না পেয়ে তা খেতে বাধ্য হচ্ছি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট যেমন সৃষ্টি হচ্ছে একইভাবে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যগত সংকট ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।</p>
<p>এ অঞ্চলের তৈরিকৃত বিভিন্ন শিল্প পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেই ব্যাপক সমাদৃত হয়। যেমন এখানকার তৈরি তামা, কাঁসা, কাঠ, পাথর হস্তনির্মিত জিনিসপত্র প্রভৃতি কারুকার্য এবং কারিগরি বিভিন্ন জিনিসপত্র প্রায় ৩০-৪০ টি অঞ্চলে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং এগুলোও বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতে থাকে।</p>
<p>এখনও পর্যন্ত সব থেকে বেশি মসলা উৎপাদিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশের এ অঞ্চলে। অন্যান্য দেশ মসলা শিল্পে এ অঞ্চলের উপরেই নির্ভর করে। মুসলিম সালতানাতের সময়ও প্রায় ৭০ টি অঞ্চলে মশলা এবং মশলা জাতীয় দ্রব্য রপ্তানি করা হতো। এমনকি উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার শেষ কেন্দ্র মহীশূরে ব্রিটিশ-হায়দারাবাদ-মারাঠা ত্রিশক্তির বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে শেরে মহীশূর টিপু সুলতান শুধুমাত্র এই মসলার উপর নির্ভর করে বছরের পর বছর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।<br />
এরপর আসে বাংলার মৎস সম্পদের কথা। সামুদ্রিক মাছ এবং লবণাক্ত পানি থেকে উৎপাদিত লবণ ছিল মুসলিম বাংলার অন্যতম একটি শিল্প। তখন নদীগুলোতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এমনিকি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত আয়ের ৪৫ ভাগ আসে মাছ থেকে। আমাদের অঞ্চলের মাছ অনেক বেশি সুস্বাদু এবং পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষদের খাওয়ার উপযোগী। ফলশ্রুতিতে আমাদের নদী এবং সামুদ্রিক মাছ দিয়ে এখনো বিশাল একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব</p>
<p>বাংলার মুসলিম সালতানাতের অর্থনৈতিক আয়ের অন্যতম একটি উৎস ছিল এ মৎস্যশিল্প। সামুদ্রিক মাছের সাথে যুক্ত ছিল লবণাক্ত পানি থেকে উৎপাদিত লবণ। যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। বিশেষ করে এ মৎস্যশিল্প পৃথিবীর প্রায় ৬০ টি অঞ্চলে রপ্তানি করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এজন্য মৎসশিল্পের এই দিকটি বর্তমান সময়েও খুব সম্ভবনাময়ী একটি দিক। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা এখনো যথেষ্ট উদাসীন।</p>
<p>এক্ষেত্রে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী আমাদের এসকল দ্রব্যাদি রপ্তানি করার অন্যতম মাধ্যম ছিল বন্দর। বন্দরগুলোর বর্ণনা দিতে বিভিন্ন জন যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন তন্মধ্যে কয়েকটি তথ্য তুলে ধরছি। যেমনÑ বণিক মাস্টার সিজার ফেডরিক ১৫৬৭ সালে একটি বন্দর পরিদর্শন করে লিখেছেন, প্রতি বছর এ অঞ্চল থেকে সোনারগাঁও বন্দর দিয়ে ছোট বড় ৩০-৩৫টি জাহাজে চাল, কাপড়, সংরক্ষিত হরতকি, বিভিন্ন ধরনের পণ্যদ্রব্য বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। ১৫৮৫ সালে রেলওইচ সোনারগাঁও বন্দর পরিদর্শন শেষে লিখেন- এখানে দেখতে পেলাম, প্রচুর পরিমাণে সুতি বস্ত্র অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি হচ্ছে। চালসহ বিভিন্ন ধরণের ফসল ভারত, সিংহল, মালাক্কাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত হচ্ছে।</p>
<p>বার্থেমা ও বার্বুসা ১৬ শতকের দিকে যখন ভ্রমণ করেন তখন তারা এ ব্যাপারটিকে খুব জোরের সাথেই বর্ণনা করেন। তারা বলেন, বাংলা অঞ্চল তার প্রতিটি শহরকে একেকটি শক্তিশালী বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিটি বন্দর থেকে মুসলমানগণ সুতি বস্ত্র, চিনিসহ অন্যান্য দ্রব্য যেগুলো তারা উৎপাদন পূর্বক বৈদেশিক বাণিজ্যের লক্ষ্যে বড় বড় জাহাজে ভর্তি করে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে থাকে। যা মুসলমানদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিম শাসনামলে বাকলা তথা বরিশাল, পটুয়াখালী অঞ্চলে ব্যবসায়িক দিক থেকে প্রভাবশালী একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে। এ অঞ্চল সম্পর্কে রেলঅফইচ বলেন, এখানে সুতা, সুতিবস্ত্রসহ কৃষিজাত দ্রব্যের বিপুল সমাবেশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর সব থেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমরা দেখতে পেতাম জাহাজ করে এসব দ্রব্যাদি রপ্তানি করা হচ্ছে। রেলঅফইচ একই সাথে সোনারগাঁও অঞ্চলের রপ্তানির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বিপুল পরিমাণে সুতি বস্ত্র,পাট,চাল বিভিন্ন মসলা এমনভাবে জাহাজ বোঝাই করে বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো যা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে খুবই বিরল।</p>
<p>ইবনে বতুতা যখন জলপথে বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন তখন প্রতিটি অঞ্চলের বন্দরগুলো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা দেখে তিনিও বিস্মিত হন। বিশ্বভারতী এনালসের দ্বিতীয় খন্ডে আমরা এ বিষয়টি লক্ষ করি যে, চীন, বার্মা, ইউরোপ, মালদ্বীপ, সিংহলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর এর অন্যতম ভিত্তি ছিলো এসকল বন্দরকে কেন্দ্র করে জাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের ফসলের রপ্তানি।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলের সাথে চীনের স্বর্ণ, রৌপ্য, রেশম, নীল ও সাদা চিনামাটির বাসন, তাম্র, লৌহ, কাস্তুরি, সিন্দুর, পারদ এবং মাদুর ইত্যাদির ব্যবসা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিকে অনেক বেশি তরান্বিত করে। পাশাপাশি তেল, মাখন, শুঁটকি মাছ, ফলমূল, কালাই, পান- সুপারী, পিঁয়াজ, রসুন, ঘৃতকুমারীসহ নানাবিধ ঔষধি গাছ বা ফল ব্যাপক হারে উৎপাদিত হতে থাকে। এই বিষয়টি বিভিন্ন অঞ্চলের চিকিৎসকদের কাছে এবং গবেষকদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়িকরা বিভিন্ন অঞ্চলে এসকল পণ্যসমূহ পৌঁছে দিত এবং একে কেন্দ্র করে বাংলা সালতানাতে একটি শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্যনীতির ভিত রচিত হয়। ঐতিহাসিক বার্ণিয়ারের বর্ণনায় আমরা দেখি, এ অঞ্চলের মোম, গন্ধগোগল, লম্বা মরিচ বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ ইউরোপসহ বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ গুলোতেও ব্যাপকভাবে রপ্তানি হতো। বার্ণিয়ার বলেন, বেশ কিছু মিষ্টান্ন ফলমূল আম, আনারস, হরতকি, লেবু, আদা এগুলোও পচুর পরিমানে রপ্তানি হতো। কেননা এগুলো সব অঞ্চলেই সুস্বাদু ও সুমিষ্ট ফল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলা। বর্তমান সময়ে ইউরোপের কমলা, আপেল যেমন সারা দুনিয়ায় পরিচিতি লাভ করেছে।</p>
<p>এরপর যদি আমরা দ্রব্যমূল্যের ক্রয় ক্ষমতার দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব যে সকল কিছু বিদেশে রপ্তানি হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের ফলে ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ আখলাকী উদ্যোগের ফলে প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত সস্তা দরে পাওয়া যেত। বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় লেখকগণ বিকৃতভাবে উল্লেখ করলেও দেখা যায়, দ্রব্য মূল্য ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে ছিল। যার ফলে সবাই নিজ চাহিদা মতো খাবার ক্রয় করতে পারতেন। এমনকি ক্রয় করার পরেও তাদের কাছে অর্থ উদ্ধৃত থেকে যেত। এজন্যই ইবনে বতুতা মন্তব্য করেন পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন একটি দেশ দেখেননি যেখানে জিনিসপত্র বাংলা অঞ্চলের মতো এতো সস্তায় বিক্রি হয়। তিনি দেখেন যে এ দেশ চালে পরিপূর্ণ ও ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর।</p>
<p>এ বিখ্যাত পর্যটক আফ্রিকা, মিশর ভারত এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তিনি যেসকল মন্তব্য করেছেন তা থেকে বোঝা যায়, এ অঞ্চলের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সাধ্যের মধ্যে ছিল। ১৬৪০ সালে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ভ্রমণ করে সিবাস্তিয়ান মাররিক বলেন, প্রত্যেক বাজারে বা শহরে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্য, সুতির বস্ত্র প্রভৃতির প্রাচুর্য এতো বেশি ও সস্তা ছিল যে মাত্র একটি বাজার থেকে এসকল জিনিসপত্র অল্প দামে ক্রয়পূর্বক জাহাজ বোঝাই করে নেওয়া যেতো। যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলের সাথেই ব্যবসা করতে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতো। এ অঞ্চলের মানুষ ব্যপক হারে উৎপাদন করে তাদের অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা অর্জন করতো। এছাড়াও তিনি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের শহরগুলিতে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য এতটাই সাধ্যের মধ্যে ছিল যে তিনি দিনে কয়েকবার আহার করতে প্রলুব্ধ হতেন। তিনি অনেকগুলো দ্রব্যের বর্ণনা দেন। যেমনঃ মাত্র ৮ দিরহামে ৮০ রাতল ধান পাওয়া যেত। ১ রৌপ্য দিনারে ২৫ রাতল চাল পাওয়া যেত। ১ আনা ৯ পাইয়ে বর্তমান ওজনের ১ মণ চাল পাওয়া যেত। এভাবে প্রতিটি পণ্যই এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অনেক সস্তা ছিল। যার ফলে এ অঞ্চলের মানুষ যতটুকু আয় করতেন ততটুকু দিয়ে তারা তাদের খাদ্য, বস্ত্র কেনার পরেও তাদের আয়ের একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থকত।</p>
<p>সে সময় জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক বেশি ছিল। পাশাপাশি মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বলয়ের কারণে মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী হয়ে উঠে। নারী-পুরুষ সকলেই তাদের স্ব-স্ব জায়গা থেকে সাধ্যমতো পরিশ্রম করে। যার ফলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান, কৃষির ভিত্তি, বস্ত্র বা সব ক্ষেত্রে বিশাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আখলাকী এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট একটি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর শ্রমনীতির দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতেন তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে তার বাৎসরিক অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটে যেত। যেমনঃ মুঘল সালতানাতের সময়কালে শ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারিত ছিল সেটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক মজুরি হিসেবে তৎকালীন সময়ে একজন শ্রমিক দুই দম আয় করতেন। তাহলে তার মাসে আয় হতো ৬০ দম অর্থাৎ বছরে তার আয় হতো আঠারো টাকার সমান। <strong>জীবন ধারণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতোটাই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল যে, ইবনে বতুতা বলেন তার জনৈক বন্ধু আল মাসুদী বাংলা অঞ্চলের একজন নাগরিক যিনি বছরে আয় করেন ১৮ টাকা। কিন্তু তার বছরে খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র ক্রয় করতে ব্যয় হয় ৮ দিরহাম বা ১ টাকা।</strong> পারিবারিক অন্যান্য সদস্যের চাহিদা এবং খাদ্য-বস্ত্র সব মিলিয়ে তার আয়ের তিন ভাগের দুইভাগ খরচ হতো। আর এক ভাগ থেকে যেত। কারও কারও ক্ষেত্রে ১ ভাগ ব্যয় হতো আর বাকি দুই ভাগই উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যেতো। আবার তিনি বলেন, অনেকের সারা বছর ২ বা ৩ টাকার বেশি প্রয়োজন পড়তো না। ফলে ১৫ টাকার মতো উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। <strong>এসব উদ্বৃত্ত টাকা সেই সময়ের মুসলমানদেরকে ওয়াকফ, দান, সাদাকাহ, যাকাতের দিকে ব্যপকভাবে ধাবিত করে।</strong></p>
<p>মুসলিমরা তাদের এই বাৎসরিক উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি অংশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রেরণ করতো। বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল, দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল, যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে এমন অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। রাষ্ট্র্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি বাজেট দিতে পারতো। যার কারণে বলা হয় ইসলামী সভ্যতার ১২শত বছরের শাসনামল ছিল পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনামল। গোটা দুনিয়াতে হত দরিদ্র খুঁজে পাওয়া, অনাহারী মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাত তথা ইসলামী সভ্যতা যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ৭ শত বছরে আমাদের অর্থনৈতিক জিডিপি ছিলো ২৯%। অর্থাৎ যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ইসলামী সভ্যতার এ অঞ্চলে সেই বিশাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কেমন? সে ব্যাপারে আমরা কতটুকুই বা অবগত?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>মানববিধ্বংসী ব্রিটিশ শাসনামলে কৃষি খাদ্য :</h5>
<p>উপরোক্ত বিষয়গুলোকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এ কথা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা বা মুসলিম শাসনামলে বাংলা অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি, কৃষি ও খাদ্যনীতি উন্নতির চরম শিঁখরে পৌঁছে যায় যা মানবতার ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণে পরিণত হয়। কিন্তু এর পর পরই এ অঞ্চলে যে ব্যাপকভাবে চলমান শোষণ ও নিকৃষ্টতম গণহত্যা এবং মহাপ্রলয় নেমে আসে তার তীব্রতা ও ভয়াবহতা কয়েক খন্ড বই লিখেও হয়ত উপলব্ধি করানো সম্ভব হবে না। এই মহান সভ্যতার পতন ও নিকৃষ্ট জায়নবাদীদের উত্থানের বিষয়ে মুসলিমদের ও সত্যনিষ্ঠ গবেষকদের তুলনামূলক কাজ নেই বললেই চলে।</p>
<p>১৭৭২ সালের গভর্নর জেনারেল ওয়ারিন হেসটিন্সের ইংল্যান্ডের কোম্পানির ডাইরেক্টরদের কাছে পাঠানো এক পত্রে লিখেন- প্রদেশের তথা বাংলার সমগ্র লোক সংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছে এবং তার ফলস্বরূপ চাষাবাদের অবস্থা চরম অবনতির দিকে চলে গেছে। সেখানে তিনি রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরণের পরামর্শ দেন ও চরম হতাশা প্রকাশ করেন।<br />
তাহলে চিন্তাশীল ও উৎসুক মনে প্রশ্নের সঞ্চার হতে পারে যে, এই আকাশচুম্বী অবস্থানে থাকা একটি অর্থনীতি ও কৃষি অঞ্চলে এমন কি ঘটল যার দরুন একটি দুর্ভিক্ষেই গোটা জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করল?</p>
<p>ব্রিটিশদের শোষণের ভয়াবহতা শুধু এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সঠিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, দুর্ভিক্ষের পূর্বে বাংলাদেশের রাজস্ব (১৭৬৮ সালে) ছিল ১ কোটি ৫২ লক্ষ ৪ হাজার ৮ শত ৫৬ টাকা। কিন্তু এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এ অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরও ১৭৭১ সালে রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৫ শত ৭৬ টাকায়। একটু চিন্তা করলেই আমরা এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারব। তাদের শাসনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় জনগণ এ ধরণের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।</p>
<p><strong>এ দুর্ভিক্ষ সাধারণ কোনো দুর্ভিক্ষ নয়। প্রথমত, এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর হিসাবটা সঠিক কিনা সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। কেননা হিসাবটি ব্রিটিশদের উপস্থাপিত হিসাব। দ্বিতীয়ত, তাদের রাজস্ব আয় কমে গিয়ে শূন্যের কোটায় নামার কথা থাকলেও তাদের রাজস্ব আয় উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে! শোষণের মাত্রা তো কমেইনি বরং দুর্ভিক্ষের মত এতটা কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা নির্যাতন আরও বাড়িয়েছে। চিঠিগুলো দেখলে বুঝা যায়, দুর্ভিক্ষ নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নয়। মূলত তারা তাদের রাজস্ব আয়, তাদের শোষণ এবং অর্থনৈতিক লুন্ঠন যাতে কমে না যায় সেদিকেই অধিক মনোযোগী ছিল।</strong></p>
<p>চারিদিকে যখন অর্থনীতি, কৃষি ও খাদ্যের চরম ধস নামে, মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং অন্যান্য সকল অধিকার থেকে গোটা অঞ্চলের সকল মানুষ বঞ্চিত হতে শুরু করে, মৃত্যুর পর মৃত্যু, গণহত্যার পর গণহত্যা চলে সেসবের ভিতরে তারা তাদের শাসন এবং লণ্ঠনকে পাকাপোক্ত করতে নতুন আইন প্রনয়ণ করে। যা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত। এদিকে নানাবিধ সমস্যা ধারাবাহিকভাবেই চলছিল। পূর্বের যে ব্যবস্থান্যুায়ী জমিদাররা ছিল সরকার এবং কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আদায়ের এজেন্ট। কিন্তু এই নতুন আইন অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদেরকে জমির মালিক হিসেবে স্বত্বাধিকার দেয়া হয়। এজেন্ট হিসেবে পূর্বে তারা স্বাধীন কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। কিন্তু নতুন এ আইনে পূর্বে যেভাবে রাজস্ব আদায় করতো সেক্ষেত্রে তারা নতুন মাত্রা যোগ করে। তারপর থেকে স্বাধীনভাবে এই সকল জমিদাররা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই প্রজাদের উপর নানাবিধ কর প্রয়োগ করতে শুরু করে।</p>
<p>“বাংলায় বিপ্ল­ব প্রচেষ্টা” নামক গ্রন্থে হেমাচন্দ্র কান্নগো বলেন, &#8220;এই জমিদাররা প্রতি একর এ এতো বেশি খাজনা এবং জুলুমপূর্ণ কর আরোপ করা শুরু করে যা ছিল সম্পূর্ণ বে-আইনী। কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ, সরকারকে প্রদান করা অর্থের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিল। অর্থাৎ সরকারকে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই যেধরণের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও অর্থনীতির ধস নেমে আসে, জুলুমের শিকার হতে থাকে তার থেকে ৫ গুণ বেশি খাজনা এ সকল জমিদাররা আদায় করতে শুরু করে। এদিকে ব্রিটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তাদের ভ‚মির রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত যে রাজস্ব ছিল তার থেকে আরও বৃদ্ধি করে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ৩৩ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন এক ভয়াবহ আগ্রাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।&#8221;</p>
<p>জমিদাররা তাদের প্রভুতুল্য ব্রিটিশদের মন খুশি করতে এবং ব্রিটিশ লুণ্ঠনকারীরা আরও বেশি লুণ্ঠনকে বৃদ্ধি করতে জমিদারদের যেসকল পরামর্শ দিতো তার ভিত্তিতে জমিদাররা শুধুমাত্র খাজনা আদায় বা নির্দিষ্ট কর আদায় করেই ক্ষান্ত হত না। সাথে নিত্যনতুন নানা ধরণের দাবি নিয়ে উপস্থিত হতো। এই ধরণের বে-আইনী পাওনা মেটাতে গিয়ে কৃষকরা ক্রমেই দরিদ্র হতে থাকে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পন্থা বা ব্যবস্থা ছিল না। যারা পরিপূর্ণভাবে এ দাবি মেটাতে অক্ষম হত, তাদের উপর নেমে আসত ভয়াবহ নির্যাতন। এভাবে যখন ধারাবাহিক শোষণ চলতে থাকে তখন কৃষক এবং সাধারণ পেশার জনগণ যেন পঙ্গুতে পরিণত হয় যার ভয়াবহতা বিশ্বমানবতা আগে কখনো কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।</p>
<p>১৮৮০ সালের দিকের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ব্রিটিশ যায়নবাদী পরিচালিত তীব্র শোষণের পাশাপাশি তাদের চাহিদা, তাদের আয়ের মাত্রা বাড়ানোর নেশায় উন্মত্ত হয়ে যায়। তারা শুধু লুণ্ঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং জমিদারদের ব্যবহার করে নির্যাতন, গণহত্যা ও ভয়াবহ জুলুমের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়ার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক রাধাকোমল মুখার্জী ভারতে ভূমি সমস্যা সম্পর্কে লেখা একটি পুস্তকে বলেন, আধুনিক বা তৎকালীন এ জমিদারী প্রথার মাধ্যমে ব্রিটিশরা সমাজের অধিকার এবং সবকিছুকে লুণ্ঠন করে তাদের শক্তিকে নতুনভাবে ব্যয় করেছিল কৃষক এবং সাধারণ মানুষদের দমন করার কাজে। অর্থাৎ এসকল বিষয় থেকে উপলব্ধি করা যায়, শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষের কারণেই মানুষ মারা যায়নি। অন্যান্য নানা জুলুমের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণত্যাগ করে। এরপর ১৭৫৩ সালের পর থেকে বা পূর্ব থেকেই যে ইজারা ব্যবস্থা চালু হয়, সেই ইজারা ব্যবস্থায় বিভিন্ন মাঠ, খাল, বিল পর্যন্ত ইজারা দিতে শুরু করে। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে কৃষকরা একেবারেই ভ‚মিহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের মৌলিক অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এসব ইজারা, কর নানাবিধ জুলুমের মধ্যে দিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যে ইজারার নাম শুনলেই প্রজাদের মনে কম্পন শুরু হয়ে যেতো।</p>
<p>ওইসকল জমিদাররা যখন কৃষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের উপর তাদের কর ধার্য করতো আর প্রজারা যদি তা দিতে ব্যর্থ হতো তখন তাদের উপর নেমে আসতো নানাবিধ নির্যাতনের কালো ছায়া। উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি সেকালের কয়েকটি পত্রিকার দিকে খেয়াল করলে (যেমন, তত্ত¡বোধিনীর ৮৪ তম সংখ্যায়, সাময়িক পত্রে, বাংলার সমাজ চিত্র পত্রিকার ২য় খন্ডে) দেখা যায় তখন বেত্রাঘাত, দন্ডাঘাত, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বক্ষস্থান দলন, খাপড়া দিয়ে নাসিকা কর্ণ মর্দন, মাটিতে নাসিকা ঘর্ষণ, পিঠে হাত পানিগুঢ় বদ্ধকরণ, কান ধরে দৌঁড় করানোম, ফাটা দুইখানা বাধা বাগারী দিয়ে হাত ধলন করা, গ্রীষ্মকালের প্রখর রৌদ্রে পা ফাঁক করে পিঠ বাকিয়ে পিঠের উপর ও হাতের উপর ইট চাপিয়ে দেয়া, বৃক্ষ বা অন্যত্রে বেধে লম্বা করা, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধানের গোলায় পুতে রাখা, গৃহবন্দি করে লঙ্কা মরিচের ধোঁয়া দেয়া, কারাবদ্ধ করে উপবাস রাখা প্রভৃতি শাস্তি প্রতিনিয়তই তারা কৃষকদের উপর এবং সাধারণ পেশাজীবী মানুষদের উপর প্রয়োগ করতে থাকে। কোনো দাবী আদায় না হলে হাত কেটে ফেলা, পিতার সামনে সন্তানকে হত্যা করা এবং সন্তানের সামনে পিতামাতাকে হত্যা করা। এইসকল জঘন্যতম উপায়ে তারা গণহত্যা চালাতে থাকে। এই কাজগুলো তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এই নিকৃষ্টতর কাজ তারা আমেরিকার ইনকা সভ্যতা ও মায়া সভ্যতার সাথেও করেছে। আফ্রিকায় তারা যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে, এদেশেও সেই ধারাবাহিকতা তারা অব্যাহত রাখে।</p>
<p>তত্ত্বোধিনী পত্রিকায় ১৮৫০ সালে কৃষির অবস্থা বলতে গিয়ে বিনয় ঘোষ বলেছিলেন, তত্ত্বোধিনী পত্রিকা শহরের পত্রিকা আর শহরের মধ্যবর্তীরাই এর পরিচালক। যার কারণে শহরের অর্থনীতি এবং কিছু সামাজিক বিচারের বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চল বা বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কি ভয়াবহ অবস্থা বা তাদের সামাজিক বাস্তবতাকে কতোটুকুই বা তুলে ধরতে পেরেছে। আদৌ এর কোনো সঠিক সমীক্ষা আছে কিনা তাও অজানা। তৎকালীন কোনো কোনো লেখক বলেন, পল্লী গ্রামের মধ্যে অসংখ্য ব্যক্তি উপযুক্ত অন্নের অভাবে হাজারো যন্ত্রণা ভোগ করছে। অর্থ কষ্টে, খাদ্যের অভাবে, পানির সংকটে জলাশয়ে বিভিন্ন প্রাণী যেভাবে পঁচে মারা যায় ঠিক একইভাবে মানুষগুলো মারা যাচ্ছিল। অর্থাৎ লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, ব্রিটিশরা ক্ষমতায় আসার কিছু কাল পরেই তাদের আগ্রাসন ও লুণ্ঠনের মাত্রা আকাশচুম্বী অবস্থানে পৌঁছে যায়। যা ছিল আমাদের ধারণারও অতীত।</p>
<p>মেমোরেন্টাম অন দি পার্লামেন্ট সেটেলমেন্টের ৪০ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ, তাদেরই এজেন্ট সেন্সেস কমিশনার স্যার টমাস মন্ড্রোর মতে, ১৮৪২ সালে উপমহাদেশে ভ‚মিহীন কৃষকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু ১৮৭২ সালে অর্থাৎ ৩০ বছরের ব্যবধানে আমাদের ভ‚মিহীন কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ লক্ষে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ করতে করতে ১৯৩১ সালে দেখা যায়, সেন্সেস অনুসারে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলা অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ৭০ ভাগ জনগণই ভ‚মিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছে। বাকী যে ৩০% এর ভ‚মির মালিকানা ছিল, খোঁজ করলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মালিকানা ছিল নিতান্তই হাতে গোনা কয়েকজনেরই। অধিকাংশই ছিল জমিদার কিংবা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত এজেন্ট। এরা মূলত লুণ্ঠনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে জমিদার এবং খাজনাভোগী শ্রেণির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তারা জুলুমকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে, তাদের শোষণের মাত্রা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতে তাদের এজেন্টদের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করতে থাকে যা দশ বছরের ব্যবধানে ৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>এরপর যদি আমিরা দুর্ভিক্ষের দিকে আলোকপাত করে দুর্ভিক্ষের কারণের দিকে তাকাই তাহলে দেখি, দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল তাদের শোষণ এবং তাদের গ্রহণকৃত নানাবিধ উদ্যোগ যা উপমহাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্য করি, সুপ্রকাশ রায় ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ’ বইয়ে বলেন, ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের ফল সহজপন্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতে রেলপথ নির্মাণ করে। ফলে তারা ৪ কোটি অধিবাসীর প্রায় ৬ মাসের খাদ্য এবং সকল শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণের জন্য গ্রাম শহর সব কিছু তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সাজিয়ে নেয় তথা রেলপথ নির্মাণ করে।</p>
<p>রেলপথের দ্বারা ভারতের বন্দরগুলির সহিত গ্রাম ও শহরের কেন্দ্রসমূহের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শস্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বন্দরগুলোতে অধিক পরিমাণে জাহাজ যোগে প্রেরিত হতো। এভাবে তারা এই মাত্রা দিনকে দিন বৃদ্ধি করে খাদ্যশস্যের পাচার বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ও বাংলা অঞ্চলের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে তা কৃষক এবং সাধারণ জনগণের সাধ্যের বাহিরে চলে যায়। জনসাধারণের পক্ষে তা ক্রয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ কৃষকরাই ছিল এ খাদ্যশস্যের মূল কারিগর।</p>
<p>এস. কে চ্যাটার্জীর ‘দি মিলিয়নস’ বইয়ের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতবর্ষের এই রেলপথ স্থাপনের পূর্বে ও পরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ও প্রাণহানির তুলনা করলে এ বিষয়ে অনেকখানি স্পষ্ট হওয়া যায় যে, ১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে মোট দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ছিল ১৩ এবং এইসকল দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও অধিক। কিন্তু রেলপথের স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ১৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। উপমহাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জমিজমা, বিভিন্ন সম্পদ, মাঠ, ঘর-বাড়ি নষ্ট করে তার উপর দিয়ে রেলপথ বসায় এবং দেখানো হয় তারা অনেক পরিকল্পিত, উন্নত ও সংরক্ষিত উপায়ে উন্নয়ন করছে। অথচ এই স্থাপনার ক্ষেত্রে তারা মোটেও জনগণ এবং কৃষকদের বাস্তবিক অবস্থার দিকে নজর দেয়নি। তারা নজর দিয়েছিল তাদের লুণ্ঠনের দিকেই, লুণ্ঠন তরান্বিত হওয়ার পন্থার দিকেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, তাদের তৈরিকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী যদি অফিসিয়ালি মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সংখ্যা এটা হয়, তাহলে বুঝাই যাচ্ছে তা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের। প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলির অবস্থা তাহলে কি হয়েছিলো? ২০ বছরের ব্যবধানে যদি কোটি কোটি লোক মারা যায় তাহলে সত্যিকার বাস্তবিক অবস্থা কি হয়েছিল? উপমহাদেশে যার ফল আমরা আজও ভোগ করছি।</p>
<p>বার্ণিয়ার যে মন্তব্য করেছিলেন- বাংলাদেশ বা বাংলা অঞ্চল পৃথিবীর অন্যান্য যেসকল প্রভাবশালী সভ্যতা রয়েছে তার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের নদীগুলো, সেচব্যবস্থার প্রশংসা তিনি করেছিলেন। উপমহাদেশের ইসলামী সভ্যতা তথা মুঘল সালতানাতের সময় গোটা ভারতবর্ষব্যাপী সেচ ব্যাবস্থা ব্যপক উন্নতি সাধন করে। আর এটি মূলত মুসলিমদের ধারাবাহিক একটি ঐতিহ্য। কেননা আমরা জানি উমর (রা.) এর পর থেকেই এই সেচ ব্যবস্থা, কৃষির উন্নয়ন এবং কৃষির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির প্রয়োগ করা মুসলিমদের একটা সাধারণ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। সেই বিশাল ঐতিহ্যের উপমহাদেশের মুসলমানদের গড়া কৃষি ব্যবস্থাকে যারা এমনভাবে ধ্বংস করেছিলো তাদেরই একজন গবেষক বিখ্যাত নদী বিশেষজ্ঞ স্যার ইউলিয়াম ইউলক বলেছিলেন, বাংলা অঞ্চলের যে সমৃদ্ধি ছিল তা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে লুণ্ঠনকারী ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যা এই সম্বৃদ্ধিতে ভয়াবহ আকারে ধস নামিয়ে দেয়। অথচ ব্রিটিশদের এই উন্নয়নের পিছনে মূলভিত্তি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষি জমি এবং খালবিল।</p>
<p>সুপ্রকাশ রায়ও তার বইতে বলেন, ভারতের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মূলত ব্রিটিশদেরই দান। এটি খুব স্বাভাবিক। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, এই প্রত্যেকটি ব্যক্তি ছিল ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করা এবং তাদের পক্ষে থাকা লোক অর্থাৎ সুবিধাবাদী ও ব্রিটিশদের গোলাম। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ব্যক্তিদের উত্তরসূরী যারা ব্রিটিশ শাসনের মঙ্গল কামনা করতো এবং নানা ধরণের পরামর্শ দিতো তাদের বর্ণনা অনুযায়ী-ই যদি ভয়াবহ অবস্থার চিত্রাঙ্কন এমন হয় তাহলে বাস্তবিক অবস্থা আসলে কি ছিল? ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালের দুর্ভিক্ষের পর ১৯৩৪ সালে বাংলা অঞ্চলে বিশেষ খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষের দিকেও যদি তাকাই তাহলে দেখবো, এই দুর্ভিক্ষেও প্রায় এক তৃতীয়াংশের মতো মানুষ মারা যায়। যারা জীবিত ছিল তারাও এতটা কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছিল যে, এই ব্যাপারে মেমোরেন্টামের ৫৯ নং পেইজে বলা আছে, অনেক কৃষকেরা গাছের পাতা খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে ছিল। ১৯৩৬ সালে এ দুর্ভিক্ষ আরও বিস্তার লাভ করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সেসব অঞ্চলে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ নিহত হয় এবং বিভিন্নভাবে পীড়িত হলে সরকার মাত্র ১১ লক্ষ টাকা সাহায্য করে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে ৩৬ লক্ষ টাকার ঋণ প্রদান করে। কিন্তু সত্যিকারার্থে এই দুর্ভিক্ষ থেকে মানুষের মুক্তির জন্য যে কোনো কার্যক্রম থেকে তারা বিরত থাকে।</p>
<p>ভবানী সেনের লেখা ‘ভাঙ্গনের মুখে বাংলা’তেও তিনি বলেন, সেই সময়গুলোতে অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের আগে পরের বাংলায় সাধারণ মানুষের ৬-৮ মাস কোনো কোনো অঞ্চলে দশ মাসের খাদ্যের ঘাটতি ছিল। কিন্তু যা উৎপাদিত হতো তা দিয়ে ১ বছরের উৎপাদন দিয়ে কয়েক বছর চলা সম্ভব ছিল। এর থেকেই বুঝা যাচ্ছে সকল উৎপাদিত পণ্য, ফসল লুণ্ঠিত হয়ে চলে যেতো ব্রিটিশদের কোষাগারে। একই বইয়ে লক্ষ করলে দেখা যায় সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকেও এমনভাবে লুণ্ঠন করা হতো যে মাসে কয়েক লক্ষ মণ চাল তারা সরিয়ে নিতো। ফলশ্রæতিতে খাদ্য সংকটের কারণে মানুষ অনাহারেই মারা যেত। কৃষকদের স্বাস্থ্যহীনতা, মানসিক কষ্ট ও অধিক মৃত্যুর ফলে উৎপাদন কমতে থাকে। কিন্তু এ উৎপাদনের পরেও তারা তাদের লুণ্ঠন হ্রাস পায়নি। প্রতিনিয়ত কৃষকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। না দিতে পারলে উপহার হিসেবে শাস্তি প্রয়োগ করতো!</p>
<p>ভবানী সেন তার বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৯৪০ সালের পরে যে দুর্ভিক্ষগুলো একের পর এক দেখা দেয়, গ্রাম কি শহর সকল জায়গাতেই নিরন্ন, নিঃস্ব কৃষকেরা দুমুঠো ভাতের জন্য ঘর থেকে ঘর ভিক্ষা করতে থাকে। কিন্তু ভিক্ষা দেওয়ার মানুষ-ই তখন ছিল না। গোটা জনগণের শতকরা ৭৫ জনের ঘরেই চাল ছিল না। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণেই মজুদ ছিল যুদ্দার, আড়তদার চোরাকারবারি ব্রিটিশদের এজেন্টদের কাছে, মিল মালিকদের কাছে। এই দস্যুরা মুনাফা আদায় বন্ধ তো করেইনি বরং ব্রিটিশদের কাছে যে ধরণের বার্তা পাঠাচ্ছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল আরও বেশি আয় করা সম্ভব। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে শুধু বাংলা অঞ্চলেই ১৫ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো। অথচ এই দুর্ভিক্ষ চলাকালীন অবস্থাতেই ব্রিটিশ এজেন্ট ব্যাপারীরা লাভ করে ১৫০ কোটি টাকা। ভবানী সেন এ নিয়ে আরও বলেন, সরকারি নীতির সংখ্যা অনুযায়ী ৭৫ লক্ষ হলেও অন্যান্য বেসরকারি সূত্রের হিসাব মতে দুর্ভিক্ষের বছরে অনাহারে ৩৫ লক্ষ নর-নারী মারা যায় এবং ১২-১৫ লক্ষ নর- নারী এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে যে তাদের অবস্থা পথের ভিখারির থেকেও করুণ হয়ে যায়। প্রায় কোটির কাছাকাছি সংখ্যক মানুষ নতুন করে ভিখারি হয়। খাদ্যের জন্য মানুষ স্ত্রী, পুত্র সন্তানদেরকেও বিক্রি করতে দ্বিধাবোধ করে না। নর্দমার মধ্যে কুকুরের সাথে উচ্ছিষ্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে থাকে অনাহারে ভুগতে থাকা মানুষগুলো। তিনি একই বইয়ে আরও বলেছেন, দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিটির সরকারি বিবরণ অনুসারে বাংলাদেশের ৬ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষের জীবন দুর্ভিক্ষ দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাংলার ৯০টি মহকুমার মধ্যে ২৯ টি মহকুমায় ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষের ভয়াল থাবা। বাংলাদেশের ৮২ হাজার ৯ শত ৫৫ কিলোমিটার মধ্যে অধিকাংশ অঞ্চলেই দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।</p>
<p><strong>এভাবে যখন অবস্থা আরও নিম্নগামী হতে থাকে ঠিক এ সময়ই ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করতে থাকে এ অঞ্চল থেকে চলে যাওয়ার। তাদের শোষণের, জুলুমের পন্থাকে পরিবর্তন করার। কথিত স্বাধীনতা তথা তাদের ভাষায় পাওয়ার ট্রান্সফার করার চিন্তা। সে সময়ের বগুড়া জেলার একটি গ্রামে তাঁতিদের সম্পর্কে জনযোদ্ধার একটি রিপোর্টে বলা হয়, দশটিকা গ্রামে ২০০ জন তাঁতির বসবাস। তাদের মোট সংখ্যা ১৭৩ এবং ২৫ জনের ৪-৫ বিঘা করে আবাদী জমি ছিল। দুর্ভিক্ষ সময় ৫০ জন লোককে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে বাঁচতে হয়েছে। আর বাকীরা অসুস্থ থেকেই মারা গিয়েছে।</strong> যারা বেঁচে আছে তারাই জমি বিক্রি করে দিন মজুর হয়েছে। আর বাকীরা তাদের বাড়ি- ঘর বন্ধক রেখে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছে। এটি শুধু দশটিকা গ্রামে নয় গোটা অঞ্চলের একই অবস্থা। ভবানী সেনের ভাষায় এসময় যাদেরও কিছু কিছু জমি ছিল তারাও সকল জমি হারিয়ে ফেলে। কেউ বিক্রি করে আবার কেউ বন্ধক রাখে। এর মধ্য দিয়ে অধিকাংশ কৃষক এবং সাধারণ মানুষ তাদের অবস্থান থেকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়। ভবানী সেন উক্ত গ্রন্থে আরও বলেন, দুর্ভিক্ষের সময় একটি হিসাব অনুযায়ী ৩৫ লক্ষ মানুষ মারা গেছে কিন্তু যারা বেঁচে আছে তারাই আজকের দিনে আরও সমস্যায় আছে। কেননা এলাকা গুলিতে শতকরা দশ জন লোক এতো বেশি দুস্থ ও রোগাগ্রস্থ যে তাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। প্রায় ১২ লক্ষ লোক নতুন করে ভিখারি হয়েছে। একেবারে ভিখারী না হলেও রিক্ত হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা ৬০ লক্ষ।</p>
<p>এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে, এতো বিশাল উন্নত সালতানাত ২৯% জিডিপি নিয়ন্ত্রণকারী ইসলামী সভ্যতা যেখনে মাত্র ২০% মুসলিম ছিল আর বাকী সবাই ছিল অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সেখানে মুসলিমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং কৃষি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলো যেখানে সাধারণ যাকাত নেওয়ার মতো লোক পাওয়া যেতো না। যে অর্থনৈতিক অবস্থা এতো উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো সেখানে কি এমন হলো যে, তারা তাদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এভাবে দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষ, মৃত্যুর পর মৃত্যু, শোষণের পর শোষণ শুরু হলো তা আমাদের উপলব্ধি করার সময় কি এখনো আসেনি?<br />
তারা কথিত স্বাধীনতা দেওয়ার পরেও পুরো উপমহাদেশ জুড়ে এমন এক অবস্থা বিরাজ করছিল যে, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা অঞ্চলে একটি পর একটি দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকতো যা চির দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত হয়েছিল। এসময় থেকেই শুরু হলো নতুন করে খাদ্যের অভাব এবং নানাবিধ দুর্ভিক্ষ। ব্যাপকতা, স্থায়ী প্রাণহানির দিক দিয়ে দুর্ভিক্ষ ভারতের ইতিহাসে নতুন আরেক রেকর্ড স্থাপন করল। অর্থাৎ ব্রিটিশরা থাকা অবস্থাতেই যে পরিস্থিতি ছিল তারা চলে যাওয়ার পরও সে অবস্থা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলো। অর্থাৎ এ শাসন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো সময় হয়েছে কিনা কিংবা এতো নিকৃষ্টতর শাসন পৃথিবীর ইতিহাসে আদৌ সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। পাশাপাশি তারা চলে যাওয়ার পর যে নয়া ব্যবস্থা রেখে গেলো তার ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আজও বিদ্যমান। তা পরবর্তীতে বা গত ৫০-৬০ বছরের অর্থনৈতিক অবস্থা, কৃষির দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্র্য অবস্থা দেখলেই টের পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ব্রিটিশ পরবর্তী বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্য :</h5>
<p>১৯ শতকের শেষের দিকে দুনিয়ার অবস্থা নানাভাবে পরিবর্তীত হতে থাকে। বিশেষ করে উসমানী খিলাফতের পূর্ণাঙ্গ পতনের পর দুটি বিশ্ব যুদ্ধ এবং ইয়াল্টা কনফারেন্সের মাধ্যমে পরবর্তীতে দুনিয়ায় নতুন এক রূপরেখা তথা নয়া বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর সরাসরি শাসনের পন্থা থেকে সরে এসে যায়নবাদী গোষ্ঠীরা কথিত স্বাধীনতার নাম করে শোষণ এবং নিয়ন্ত্রণের ভিন্ন এক কৌশল প্রতিষ্ঠা করে। ফলে উপমহাদেশ থেকে তারা চলে যাওয়ার পরও শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদীতা এক বিন্দুও কমে যায়নি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কৃষিক্ষেত্রে, খাদ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকট বিদ্যমান ছিল স্বাধীনতার পর যেসকল শাসক ক্ষমতায় আসীন হন তারা সেই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে মুকাবিলা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন। আর এ পরিস্থিতির উত্তোরণে তারা তাদের নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার কৌশল প্রয়োগ করে। তারা বুঝাতে শুরু করে যেহেতু অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি ভালো না সেহেতু নির্দিষ্ট কিছু শর্তের বিনিময়ে তোমরা ঋণ গ্রহণ কর। আর তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্র সে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য ছিল কেননা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর ছিল। আর এই ভংগুর অর্থনীতির উত্তোরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে পাশ্চাত্য জায়নবাদীরা গরিব শ্রেণির মানুষদের ঋণ দিতে থাকে, সামাজিক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। এসকল ত্রাণ এবং সামাজিক সংস্থাও ছিলো নয়া ষড়যন্ত্রের অংশ।</p>
<p>সেসকল সহযোগিতা ও ত্রাণের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল তাদের তৈরিকৃত বীজ এবং প্রদানকৃত খাদ্য। রাষ্ট্র এক্ষেত্রেও বীজ ও খাদ্য গ্রহণে বাধ্য ছিলো। ফলশ্রæতিতে এসকল ঋণ গ্রহণের শর্ত, ত্রাণ প্রদান, নানা সহযোগিতাসহ সব মিলিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় নয়া এক কৃষি ও খাদ্যনীতি। মূলত তারা কৃষি বিল্পবের নাম করে নতুন এক কৃষি ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে। ২০০ বছরের জুলুম ও নয়া কৌশলের মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যায় উপমহাদেশের নানা জাতের ফসল। অথচ এক সময়ে কয়েক প্রকারের ফসল এ অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল, কয়েক ধরণের বীজ এখানে উৎপন্ন হতো। তা অল্প বিস্তর শুরুতেই বলা হয়েছে। কিন্তু সেই অঞ্চলেই তারা সকল বীজ এবং ফসল কে নষ্ট করে দিয়ে স্বাদবিহীন ফার্মের ফসল তথা হাইব্রিড ফসলের দিকে নিয়ে যায় গোটা জাতিকে। এই বীজ এবং হাইব্রিড ফসলের মধ্য দিয়ে আমদানি হয় নানা ধরণের রোগব্যাধির। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি আমেরিকা, আফ্রিকা ও উপমহাদেশে তাদের শাস্তি এবং গণহত্যার অন্যতম ভিত্তি ছিল নানা ধরণের রোগ সৃষ্টি করে হত্যা করা, নিয়ন্ত্রণ করা। আবার পরিস্থিতিও এমন একটি জায়গায় চলে যায় যেখান থেকে চাইলেও বের হতে পারছিলো না রাষ্ট্র তথা কৃষিব্যবস্থা।<br />
এরই পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন অভ্যন্তরীণভাবে এমন এক কোন্দলপূর্ণ অবস্থায় গিয়ে পৌঁছায় যে জন্য এসকল বিষয়ের প্রতি কারোর দৃষ্টিপাত করার সময় হয়নি বা আজও পর্যন্ত হচ্ছে না। এভাবেই পাশ্চাত্য তার জায়নবাদ নীতি দিয়ে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কৃষি প্রযুক্তিতে বীজের ধারণা ও খাদ্যনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এটিও আন্তর্জাতিক শোষণের একটি অংশ এবং জায়ানবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের একটি হাতিয়ার। তাদের সরাসরি শাসন পরবর্তী কথিত স্বাধীন অঞ্চল গুলোতে দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট এমনভাবে বিদ্যমান ছিলো যার থেকে উত্তোরণ ঘটানো আমাদের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। আর এই সুযোগটিই তারা বিভিন্নভাবে কাজে লাগায়। তারা নতুন নতুন পন্থা, কৌশল রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরতে থাকে। ফলশ্রæতিতে ৬০ এর দশকে কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কোনো ধরণের সত্যিকার পলিসি নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু সেসময়ের সরকারি ব্যবস্থাপনায়, খাদ্যনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন সব জায়গায় রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৌশল বাস্তবায়ন করা হয়। কারণ দরিদ্র দেশ শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশসহ আফ্রিকার প্রত্যেকটি উপনিবেশিক শাসন পরবর্তী অঞ্চলে উন্নত টেকনোলজির ব্যবস্থা ছিলো না, ছিল অশিক্ষিত শ্রেণী বা শিক্ষার হার ছিল না, গৃহযুদ্ধে ভরে গিয়েছিলো অঞ্চলগুলো। দুর্ভিক্ষ প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলশ্রুতিতে এই দরিদ্র দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ নিতে বাধ্য হতো। আর এই ঋণ দেওয়ার সময়ই তারা এ সকল নীতি পরিবর্তনের শর্ত দেয়।<br />
তখনই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সব জায়গাতেই খাদ্যের সংজ্ঞায়নে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। ইসলামী সভ্যতার খাদ্যনীতি হচ্ছে,</p>
<ul>
<li>স্বাস্থ্যকর ও উপকারী,</li>
<li>পুষ্টিকর,</li>
<li>হালাল।</li>
</ul>
<p>কিন্তু তারা খাবারের সংজ্ঞায়নে তুলে ধরে,</p>
<ul>
<li>পুষ্টি নয় পরিমাণে বিশ্বাসী।</li>
<li>উপকারে নয় বরং চাকচিক্য ও স্বাদে বিশ্বাসী।</li>
</ul>
<p>তারা শুধু মাত্র শিক্ষা দিয়ে নয় মিডিয়ার মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করতে থাকে যার ফলে তাদের খাদ্যগুলো একেকটি ফ্যাশনে পরিনত হয় এবং প্রত্যেক জনগণের মাথায় চিন্তাগতভাবে এ খাদ্যের সংজ্ঞাকে, মডেলকে পুশ করা হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ নিপতিত নতুন এক আগ্রাসনের সমুদ্রে।</p>
<p>কিন্তু লক্ষ্য করুন, তারা ঋণ দিয়েছে বিপরীতে কিন্তু তারা শিক্ষাকে উন্নত, প্রযুক্তিকে উন্নত, গবেষণাগারকে উন্নত করার ব্যাপারে কোনো ধরনের জোর দেয়নি। ৮০’র দশকে ৯০’র দশকে এই নীতি চলমান অবস্থায় তারা কথিত দুর্ভিক্ষ দমনের নাম করে হাইব্রিড ধান নিয়ে আসে এবং হাইব্রিড ধান দ্রুত উৎপন্ন হওয়ার ফলে মনে করে কৃষির ক্ষেত্রে সত্যিই বিপ্ল­ব হচ্ছে। অথচ আমাদের সত্যিকারের বীজ, আমাদের উর্বর জমিতে যদি বাংলা সালতানাতের মতো করে চাষাবাদ করা যেত তাহলে সাধারণ ভাবেই অনেক বেশি ফসল উৎপন্ন হতো যার দ্বারা খাদ্য সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই ধরণের যোগ্যতা, কৌশল এবং চিন্তাধারা না থাকায় যায়নবাদীদের ফসল নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।</p>
<p><strong>এ ফসল একইসাথে প্রভাব ফেলছে আমাদের মানসিক অবস্থায়, আমাদের মনস্তত্ত্বে। মাওলানা মওদূদী তর্জমানুল কোরআনে এক প্রবন্ধে লিখেন-</strong></p>
<p><strong>“ইসলাম শূকর এবং মদ শুধুমাত্র এ কারণে নিষিদ্ধ করেনি যে তা শরীরের জন্য অপকারী। বরং তা একইসাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। খাদ্য শুধু মানুষের শরীরেই নয় বরং তাঁর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে।” </strong></p>
<p>ইসলাম খাবারের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে হালালকে, তাঁর পেছনের দর্শন মূলত এটি। কারণ খাবার শুধু বাহ্যিক প্রভাবই রাখে না একইসাথে আভ্যন্তরীণ ও নৈতিক প্রভাবও বিস্তার করে। অঞ্চলোপযোগী, উপকারী, পবিত্র ও হালাল খাবারের বিপরীতে এমন খাদ্যের মডেল যায়নবাদীরা হাজির করেছে যা মানুষকে অস্থিরমতি করে ফেলে, তাঁর নৈতিক জায়গাকে প্রভাবিত করে। সমকামিতার ন্যায় মানবপ্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজগুলো প্রসার লাভের পেছনেও খাদ্যের প্রভাব বিদ্যমান। খাদ্যের সাথে কৃষি এবং ভ‚মিব্যবস্থা আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আমরা এগুলাকে কবীরা গুনাহ বলে ফতোয়া দিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক সমাধান খোঁজায় রত থাকি। প্রশ্ন হলো- আন্তর্জাতিক বীজনীতি, আমাদের অঞ্চলে তাদের শোষণ ও ভূমিব্যবস্থা পরিবর্তন, খাদ্যের নৈতিক প্রভাব, খাদ্য রাজনীতি সর্বোপরি কৃষিব্যবস্থার ভয়াবহ সংকট এবং সমাধানের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে রাজনৈতিক এবং সামগ্রিক সমাধান না খুজে ধর্মতাত্তি¡ক সমাধান হাজির করলেই কি সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব?</p>
<p>এই হাইব্রিড ফসল যখন দেয়া হলো আর তাদের বীজের মধ্যেই যেহেতু সমস্যা সুতরাং এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য তারা নতুন করে প্রদান করল সার আর কীটনাশক সিস্টেম। অর্থাৎ একজন সুস্থ মানুষকে ইনজেকশন দিয়ে অসুস্থ করে দেয়া শুরু হলো। আমাদের জমি ছিল উর্বর। সে জমিতে সার এবং কীটনাশকগুলোকে ইনজেকশনের মতো পুশ করা শুরু হলো। সেখানে উৎপাদিত হওয়া শুরু হল হাইব্রিড ধান। ফলাফল হিসেবে সাময়িক উৎপাদন হলেও মাটি তার উর্বরতা হারাতে শুরু করলো, পানি দূষিত হতে হতে লাগল। গত ৪০ বছর যাবৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি এই জমির ফলন ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ২০০ বছর পরে কি হতে পারে তা নিয়ে কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? ৫০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন খরচ কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০০ বছর পর এই অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, তা কি আমরা একবারও ভেবেছি? কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য তো পাচ্ছেই না উপরন্তু নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।</p>
<p>গবেষকদের মতে, “খাদ্যের সংজ্ঞাতে পরিবর্তন ঘটনো হয়েছে। খাদ্যের সংজ্ঞা নির্ণয়ে দানাদার খাদ্যকে প্রধান খাদ্যের (Staple Food) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; খাদ্যের পুষ্টিগুণের চেয়ে পরিমানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মেক্সিকো সরকার ও রকফেলার ফাউন্ডেশান ১৯৪৩ সালের দিকে ‘সবুজ বিপ্ল­ব’-কে একটি কৃৎকৌশলগত প্যাকেজ হিসেবে দেখানোর জন্য ‘বিশেষ গবেষণা’র উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগ ১৯৬০ দশকে পুনর্গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (International Rice Research Institute) হিসেবে। স্থানীয় পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্য এবং চাষের জমির বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ধানের জাতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।</p>
<p>তথাকথিত অনুন্নত দেশগুলোকে রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৃৎকৌশল চাপিয়ে দেওয়া সহজ ছিল না। সেটা তারা করেছে বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার শর্ত হিসেবে। ষাটের দশকে বিশ্ব ব্যাংকের শর্ত মেনে তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুব খান সরকার উফশি বীজ প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যার মূলে শুধু উফশী বীজ নয়,একই সঙ্গে ছিল রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার। এবং তা এসেছিল সুদূর আমেরিকার ফোর্ড এবং রকফেলার ফাউন্ডেশানের আর্থিক কল্যাণে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সহযোগিতা করেছিল প্রাণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ দেশগুলোতে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কৃষিকে ‘উন্নত’ করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সকল রাসায়নিক পদার্থের বা বিষাক্ত দ্রব্যের জন্য বাজার তৈরির দরকার ছিল। ‘সবুজ বিপ্ল­ব’ বা এৎববহ জবাড়ষঁঃরড়হ আসলে নিছকই বৈজ্ঞানিক ব্যাপার ছিল না। এটি ছিল একটি কৃৎকৌশলগত প্যাকেজ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর আধুনিক বিজ্ঞানের কৌশলগত ব্যবহার। যুদ্ধে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক উদ্বৃত্তের বাজার তৈরির জন্য এমন ধানের জাত উদ্ভাবিত হল যেসব জাত চাষের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। সর্বোপরি এটা বাস্তবায়িত করতে কৃষক নয়, কৃষি ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা, ল্যাবরেটরির গবেষকদের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সব কিছুরই মিলিত প্রকল্প ছিল গ্রিন রেভুলিউশান (সবুজ বিপ্ল­ব)। অধিক উৎপাদন করে মানুষকে ক্ষুধা থেকে বাঁচাবার কথা বলা হয় বটে, আসলে সবুজ বিপ্লবের মূল কাজ ছিল ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশিল বীজের সাথে কৃত্রিম সার ও কীটনাশক এবং তার সাথে সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। কর্পোরেট কৃষির বীজ বপন এখান থেকেই শুরু।</p>
<p>গবেষকগণ বলেন, “সেই ষাটের দশক থেকে পৃথিবীতে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি চলছে। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের সরকারি দপ্তর থেকে থেকে বলা হয়, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা পেতে হলে উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত এসে দেখা গেল উফশী ধান চাষ করে মানুষ খাদ্যে নিরাপত্তা পায়নি। বিপরীতে মানুষ ব্যাপকভাবে খাদ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। উফশী জাতের ধান চাষ করতে গিয়ে যে সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে একদিকে মাটির উর্বরতা কমেছে, অপরদিকে অপকারি পোকা মারতে গিয়ে উপকারি পোকাও মারা গেছে। তাই গাছের পরাগায়নে মধুপোকা বা প্রজাপতি এখন আর ফসলের মাঠে দেখা যায় না। তাছাড়া মানুষ একবার জমি চাষ করে তিন চারবার ফসল তুলত। ধান পাকলে মাষকলাই মাঠে থাকত, একইসাথে তিলও চাষ করা হত। এতে জমির উর্বরতা কমত না, মাটির ক্ষয়ও রোধ হত। কিন্তু একই জমিতে পরপর ধান চাষ করায় প্রতিবারের জন্য নতুন করে জমি চাষ করতে হচ্ছে। তাতে যেমন মাটির ক্ষয় হচ্ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে উর্বরতা। এছাড়া ফসলের মাঠ এবং বাড়ির আঙ্গিনায় প্রকৃতিকভাবে হওয়া বিভিন্ন লতাগুল্ম পাওয়া যেত। কিন্তু নানা ধরনের কীটনাশক ও আগাছানাশক ওষুধ দেয়ায় আগাছার সাথে প্রকৃতিকভাবে হওয়া পুষ্টিগুণ-সম্পন্ন এসব লতাগুল্মও মরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল উফশী চাষ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলা হলেও তা সম্ভব হয় না।</p>
<p>৯০-এর দশক পরবর্তী সময়ে নতুন ধাচের হাইব্রিড বীজ প্রথমবার সরবরাহের পর দ্বিতীয় ধাপ থেকে বীজ দেয়া শুরু করল সরকারের সাথে সরাসরি চুক্তিতে থাকা প্রাইভেট কোম্পানিগুলো। হাইব্রিড এই বীজ থেকে যে ফসল উৎপাদিত হচ্ছে তাতে সার এবং কীটনাশক দিতে হচ্ছে। কৃষি বিশ্লেষকেরা বলছেন, হাইব্রিড বীজের একচ্ছত্র মালিকানা কোম্পানির সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে এবং গুটি কয়েক কোম্পানির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকছে। যেমন ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী মনসান্টো ৪,৯৬৪ মিলিয়ন ডলারের বীজ ব্যবসা করে এবং মালিকানাধীন বীজের বাজারের ২৩% নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরে রয়েছে ডু-পন্ট (১৫%), সিনজেনটা (৯%) । মাত্র ১০টি কোম্পানি পৃথিবীর মালিকানাধীন বীজের বাজার দখল করে আছে। তার মধ্যে উল্লেখিত তিনটি কোম্পানি ৪৭% বাজার দখল করে আছে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্ব কৃষি ব্যবস্থায় গুটিকয়েক বহুজাতিক কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>এর ফলাফল হচ্ছে চকচকে সুন্দর সবজি উৎপাদন হলেও জমির অবস্থা ক্রমেই নষ্ট হতে শুরু করছে। মানুষ ভয়াবহ দুর্বলতা ও নতুন নতুন রোগের মধ্যে নিপতিত হচ্ছে। GMO (Genetically Modified Organism) হচ্ছে, বীজের মডিফাই করণ। বিশ্বব্যাপী শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে বীজ আসতে শুরু করলো। যা গবেষক ও বিজ্ঞানীদের ভাষায় এখনো পর্যন্ত অস্পষ্ট। কিন্তু ফলাফলস্বরূপ মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে। ক্যান্সারসহ সব ধরণের ভয়াবহ রোগ যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তা আশংকাজনক। মোট মৃত্যুর ৬১ ভাগই হচ্ছে এইসকল খাদ্য, বীজ ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে। বর্তমানে ৮০ ভাগ খাদ্যে ক্যামিকেল মিশানো হয়। ৬৭ ভাগ জমিতে কীটনাশক ছিটানো হয়। যার ফলে রোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের সাথে উপযোগী পোকা গুলিও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যেমন জোনাকী পোকা আজ বিলুপ্তির পথে। বাৎসরিক কৃষি পরিসংখ্যান গ্রন্থে (Yearbook of Agricultural Statistics in Bangladesh, 2009) দেখা যায়, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কীটনাশক ব্যবহারের পরিমান ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১৯৯৩ সালে ছিল ৭৬৬০.৩৯ মেট্রিক টন, ২০০৭ সালে তা হয়েছে ৩৭৭১২.২০ মেট্রিক টন, অর্থাৎ ৩৯২% বেড়েছে। উল্লেখ্য ধান ও অন্য ফসলে হাইব্রীড বীজের ব্যবহার ১৯৯৮ সাল থেকে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।</p>
<p>সরাসরি হাতের সাহায্যে জমিতে এই কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীর ৬০ শতাংশ হচ্ছে কৃষক। কারণ এই কীটনাশক খালি হাতে তারা ব্যবহার করে।</p>
<p>পানিতে বিভিন্ন ধরণের কেমিকেল ও কারখানার ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থের দরুন পানি দূষণের কারণে জমি নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষকরা এভাবেই প্রতিদিন দারিদ্রতার কাছে হার মানছে। শুধু কি তাই, জাতিসংঘ কর্তৃক কৃষিতে ব্যবহৃত ১২টি কীটনাশক নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তা বাংলাদেশে অবলিলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এসকল কীটনাশকগুলো ব্যবহারের ফলে লিভার, কিডনী, স্তন ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, ত্বকের সমস্যাসহ নানা ধরণের সমস্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই সব কিছুর কারণ এই ধরণের সার, কীটনাশক এবং বীজ ব্যবস্থা। এতো কিছু ব্যবহারের পরেও ৮৪% কৃষক গড়ে মাত্র ৩ একর জমিতে চাষ করে। চাষ করার পরও তারা ন্যায্যমুল্য পাচ্ছে না। চড়া সুদ দিতে হচ্ছে। যার কারণে খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে আরও কমদামী হাইব্রিড বীজ, কীটনাশক, সার কিনছে। ফসল বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের ক্যামিকেল বা ঔষধ ব্যবহার করছে। কিন্তু তবুও তারা তাদের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না এবং পরিবারকে চালাতে পারছে না। কারণ এসব কিছু নির্দিষ্ট একটি চক্রের হাতে বন্দি।<br />
এই চক্রগুলোর কাছে বন্দি হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, যেসব বীজ কোম্পানি গুলো আমাদেরকে বীজ দিয়ে থাকে তারাই প্রত্যেকটি ঔষধ কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ। অর্থাৎ তারা যে রোগের ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঔষধ কোম্পানিগুলো সে রোগের ঔষধ তৈরি করছে। আমরা ভাইরাস খাচ্ছি আবার তাদেরই দেওয়া ঔষধও ভক্ষণ করছি।</p>
<p>আলোচনার শুরুতে উল্লেখিত আয়াত দুটির কথা এবারে যদি চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাচ্ছি ইয়াহুদিরা সারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রন করছে। এবং তারা আমাদের দেশে এসে কিভাবে এবং কেন শস্যক্ষেত এবং মানব বংশকে ধ্বংস করছে তার উত্তর পাচ্ছি কি?<br />
<strong>এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭০ সালে বলেছিলেন “Control oil and you control nations; control food and you control the people.” অর্থাৎ, যদি তুমি তেলকে নিয়ন্ত্রন কর তাহলে তুমি একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে আর যদি তুমি খাদ্যকে (বীজ) নিয়ন্ত্রন কর তাহলে মানুষকে অর্থাৎ সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।</strong></p>
<p>আর এটিই তারা সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করে চলেছে। যেমন, তাদের বীজ ও খাদ্য কোম্পানী সারা দুনিয়ার কৃষি ও খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃষিপণ্য এবং কীটনাশক উৎপাদনকারী নিয়ন্ত্রণকারী বৃহৎ কোম্পানিসমূহ :</p>
<ul>
<li>1| Cargill</li>
<li>2| Bayer</li>
<li>3| DuPont</li>
<li>4| Monsanto</li>
<li>5| Syngenta</li>
</ul>
<p><strong>এই কোম্পানিগুলো বীজের পাশাপাশি খাদ্যকেও নিয়ন্ত্রণ করে। গত শতকে এইডস, ডায়াবেটিস, বার্ডফ্লুসহ আরও অনেক রোগের জীবাণু ছড়ানোর পেছনে এরাই দায়ী। যেমন, চিনি, গম, চালের জিনের সাথে তারা ডায়াবেটিস-সহ আরও নানাবিধ রোগ মিশয়ে দিয়ে থাকে। তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চকলেট এবং চিনিজাত পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হল নেসলে (Netsle) আবার ডায়াবেটিকস কিংবা চিনি খাওয়ার ফলে যে সব অসুখ শরীরে দানাবাঁধে তার মেট্যাংস (Metanx) নামক ঔষধও তৈরি করে এই একই কোম্পানি!</strong></p>
<p>ভয়াবহ এই আগ্রাসনকে তুলে ধরার জন্য অনেক গবেষকগণ কাজ করে যাচ্ছেন! তন্মধ্যে F. William Engdahl এর লেখা <em>Seeds of Destruction: The Hidden Agenda of Genetic manipulation</em> নামক বইটি অন্যতম।</p>
<p>এসব সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফলাফল স্বরূপ আমাদের স্বাস্থ্য খাত, আমাদের শারীরিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা, পরিবেশের অবস্থা এতোটাই নিম্নগামী যেখানে আমাদের গড় আয়ু ছিল ৮০-৯০ বছর এখন তা কমতে কমতে ৪০ এর কোঠায় এসে নেমেছে। হঠাৎ মৃত্যু, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, নানা ধরণের ক্যান্সার, রোগ বৃদ্ধি, শতভাগ মানুষ আজ দুর্বলতার মধ্যে ভুগছে, গ্যাস্ট্রি, কিডনী ইত্যাদিতে ভুগছে। প্রতিটি ঘরের প্রত্যক ব্যক্তি আজ গণহারে অসুস্থ। সুস্থ হওয়ার কোনো পথ নেই কারণ তাদেরই দেওয়া ঔষধ খেয়ে সুস্থ হওয়া লাগবে!</p>
<p>তাই স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় তাদের দেওয়া স্বাধীনতা, ঋণ, সহযোগিতা, ত্রাণ কোনো কিছুই মানবতার জন্য না। পুরোটাই মূলত শোষণের উদ্দেশ্যে। তাদের হাতে গড়ে ওঠা কিংবা তৈরী হওয়া একটি শ্রেণির বয়ান হাজির করে কথিত উন্নয়নের কৃষি, বিজ্ঞানের বিপ্লবের। কিন্তু বাস্তবিক অবস্থা কি তা তো আমরা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি।</p>
<p>এসব বিষয় যে আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করে সচেতনতা তৈরি করব, এর থেকে মুক্তির পথ খুঁজব এর জন্য শক্তিশালী কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই কোনো কার্যকরি উদ্যোগ। প্রতিটি সেক্টর এখন পুরোপুরিই বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে বন্দি। সত্যিকারের মুক্তি জন্য নয়, স্বাধীনতার জন্য নয় দুর্ভিক্ষ কিংবা ক্ষুধা থেকে বাঁচাবার জন্য নয় এই সবকিছু একটি দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ভয়াবহ ধাপ।</p>
<p>কৃষকেরা জমিতে সার-কীটনাশক ব্যবহার করছে কৃষির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য। কিন্তু তারা কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় ঋণ পাচ্ছে না, স্থায়ী পুঁজিও নেই তাদের। তাহলে তারা কীভাবে এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? সমাধানস্বরূপ তারা বিভিন্ন এনজিও, গ্রামের মহাজনদের কাছে ঋণের জন্য হাত পাতছেন। এছাড়া আছে ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। কিন্তু এগুলোর প্রতিটিতেই রয়েছে সুদের মহা কারবার। একজন সবজি চাষীর ভাষ্যমতে তাকে ১০০ টাকায় সুদ দিতে হচ্ছে ২১ টাকা। এতে তার লাভের পরিমাণ ১০০ টাকায় ১০৫-১১০ টাকা। কুটির শিল্প, মৎস শিল্পের সাথে জড়িতদের সুদ দিতে হয় ১৭% যেখানে লাভ হয় ১৫%। বোঝাই যাচ্ছে গ্রামীণ সুদের কী ভয়াবহ অবস্থা!</p>
<p>কৃষিতে ভয়াবহ লোকসান কিংবা লাভ এত কম হওয়ার পিছনের কারণ খুঁজলে দেখবো সমগ্র বিষয়ের পেছনে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট কাজ করে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেক দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের যাতায়াত ব্যবস্থার যে করুণ দশা, তাতে নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য নিয়ে যেতে বেশ কাটখড় পোড়াতে হয়। এরপর শুরু হয় চাঁদাবাজি! নানা জাতীয় সিন্ডিকেটের কারণে রংপুরের ২ টাকার টমেটো আমাদের হাতে আসতে আসতে দাম হয়ে যায় ৪০ টাকা। কিন্তু কৃষক তো সেই উৎপাদন মূল্য দুই টাকাই পাচ্ছে! খরচ হচ্ছে ২ টাকা, বিক্রিও করছে ২ টাকায়। আর আমরা যারা ক্রেতা, তারা কিনছি ৪০ টাকায়। এই বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দূর্নীতি, আখলাকবিহীন অবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকসমাজ এবং সাধারণ মানুষ। লাভ হচ্ছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের।</p>
<p>LLRD-এর মতে বর্তমানে ৫০% পুরুষ এবং ৬০% নারী কৃষক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ, অন্যান্য চাহিদার কারণে তারা নিজেদের উৎপাদিত শাক-সবজি, নিজেদের চাষ করা মাছ নিজেরাই ভোগ করতে পারছে না। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সন্তানেরাও। আর তারা যতটুকু গ্রহণ করতে পারছে, সেটাতেও আছে কীটনাশক, সার আর ভেজালের সমাহার। তাহলে চিন্তা করে দেখুন! এই চাষী, হাওড়-নদীর জেলে, প্রান্তিক ও ভ‚মিহীন কৃষক, নারী কৃষক, কুটির-শিল্পীদের নিয়ে, তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে কি আমরা একটুও ভাবছি? রাষ্ট্রের কোনো সহযোগিতা বা উদ্যোগ কি আছে? আছে কি কোনো পরিকল্পনা, পর্যালোচনা বা প্রস্তাবনা? অর্থাৎ তারা যা-ই করছে সবটাই গ্রামের মহাজনদের কাছ থেকে সুদ নিয়ে। এতে করে তাদের দারিদ্র্য তো কোনো অংশে কমছেই না, বরং দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। তাদের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থার করুণ দশা। এমনকি শিক্ষা থেকেও তারা অনেক অনেক দূরে।</p>
<p>কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। অথচ বর্তমানে ধান ব্যতীত যাবতীয় কৃষিদ্রব্য আমদানি করতে হচ্ছে। সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ধান উৎপন্ন হচ্ছে। আর যতটুকুই উৎপাদিত হচ্ছে, তা মজুদ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই! তাহলে বাকি ফসল কোথায় যাচ্ছে? মহাজনেরা, বিভিন্ন কোম্পানি কিংবা সাধারণ ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছে। যার ফলে কৃষকরা তাদের কষ্ট, শ্রম, বিনিয়োগের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এমনকি সরকার রাষ্ট্রীয় গুদামের ধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি করছে না।</p>
<p>যারা ধান চাষ করে তাদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি, ২০০২ সালে বর্গাচাষী অর্থাৎ ভ‚মিহীন চাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা ৪৫%, ২০১৬ তে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫% এ। বর্তমানে এ সংখ্যা ৭০% ছাড়িয়ে গেছে। তাহলে ভেবে দেখার বিষয় এই ৭০% কৃষক যেখানে ভ‚মিহীন এবং তাদের চাষকৃত ফসলের ৫০% মালিককে দিয়ে দিতে হচ্ছে, সেখানে এই কৃষকরা কি আদৌ তাদের পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে?</p>
<p>বাংলাদেশে তুলার মোট চাহিদা ৭৩-৭৪ লক্ষ বেল, অথচ দেশে মাত্র ১ লক্ষ ৭১ হাজার বেল তুলা উৎপন্ন হচ্ছে। বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন বাহির থেকে তুলা আমদানিতে আমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি বা অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার যথাযথ উপযোগ থাকলে তা দিয়ে দেশেই প্রায় কয়েক কোটি বেল তুলা উৎপাদন করা সম্ভব! অথচ আমরা ৯০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি কৃষিপণ্য আমদানি করে চলছি! মজার বিষয় হলো, কোনো এক বছরে যদি ১ লাখ ৭১ হাজারের স্থলে ২ লাখ বেল তুলা উৎপন্ন হয়, তাহলে মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাতি আমলা পর্যন্ত বলতে শুরু করবে, “আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।” কিন্তু মূল যে ক্ষতির জায়গাটা, তা আমরা কেউ-ই লক্ষ্য করছি না।</p>
<p>দুধ সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য উপাদেয় একটি খাবার। কিন্তু আমরা কি দেশের মানুষের দুধের চাহিদা মেটাতে পারছি? দেশের ডেইরি ফার্মগুলোর দ্বারাও কি এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে? অথচ এই দুধকে কেন্দ্র করে ৪০-৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেই!</p>
<p>বাংলাদেশের মৎস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশে প্রায় হাজারের উপরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত; এখন হাইব্রিড পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া ছাড়া তেমন কোনো মাছ সহজলভ্য নয়। নদী দূষিত হওয়া, অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকায় আমাদের যে বিশাল রপ্তানি শিল্প তা আজ ধ্বংসের মুখে। হাইব্রিড মুরগী আর ডিমের কথা না হয় বাদই থাকলো!</p>
<p>আমরা লক্ষ্য করছি, পাটশিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আজ বেকার। পাটকলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হল। অথচ এই পাট ছিল আমাদের সোনালি আঁশ। যতটুকু ছিল, সেটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হল। চাইলেই কি এখানে লক্ষ লক্ষ কিংবা কোটির উপরে কর্মসংস্থান করা যেত না?</p>
<p>দেশের অন্যতম একটি বড় শিল্পক্ষেত্র হল চা। চা শ্রমিকদের নিয়ে কোনো আলাপ নেই, নেই কোন উদ্যোগও। তাদেরকে ন্যায্যমূল্য দিয়ে, এখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব ছিল। আমাদের ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, আমাদের মাছ, পাট, চা, তুলা, মসলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি আমরা যথাসময়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতাম, তাহলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হত না। এভাবেই চিনিকল থেকে শুরু করে আমাদের সকল ধরণের ফসল ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুধু ধান ছাড়া প্রত্যেকটি ফসল আমদানী করা হচ্ছে।</p>
<p>গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা, নারীরা এবং তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না তাদের সঠিক চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সকল ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যতটুকুই বা খাদ্য পাচ্ছে সেটুকুও ভেজাল মিশ্রিত। এগুলো খেয়ে রোগাগ্রস্থ হওয়ার পরেও পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা পেলেও যে ঔষধ আমরা ভক্ষণ করি তা সেই একই চক্রের ফসল।</p>
<p>কথিত যে নয়া ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক উপলব্ধি, সচেতনতা তৈরি ব্যতীত মুক্তির পথ খোঁজা আকাশকুসুম কল্পনা। শুধু বীজ, খাদ্য ও ওষুধ নয় প্রত্যেকটি সেক্টর-ই আজ পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দি। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকানের ভাষায়, “<strong>আমরা সবাই যায়নবাদের কারাগারে বন্দী, সেখানে আমরা কতিপয় অবাধ্য কয়েদি। কিন্তু দিন শেষে সবাই কয়েদী।”</strong></p>
<p>মুক্তি জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনার আলোকে সামনে অগ্রসর হয়ে নতুন বাংলাদেশ তথা হারানো ঐতিহ্যের বিনির্মাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বের সেই সোনালী ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা কাজ করি তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব। কেননা আগের সেই খনিজ সম্পদ, জমি, বনাঞ্চল, কৃষক, মানব সম্পদ, নদী, সমুদ্র এখনও বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 556px; top: 10867.4px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16160</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সোনারগাঁও : বাংলায় ইলমী সিলসিলার অনন্য মিনার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/sonargaon-a-unique-minar-of-scholarly-tradition-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/sonargaon-a-unique-minar-of-scholarly-tradition-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Sep 2025 12:20:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16133</guid>

					<description><![CDATA[সোনারগাঁও, যে স্থানটি ইতিহাসখ্যাত, অনেকে তার নাম দিয়েছে সুবর্ণগ্রাম১, বর্তমানে যদিও তা ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার [বর্তমানে জেলা] অধীন একটি গুরুত্বহীন গ্রাম মাত্র। অথচ স্থানটি প্রাক মোগল মুসলিম শাসন আমলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সমৃদ্ধশালী ও সৌভাগ্যসম্পন্ন নগর ছিলো। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সোনারগাঁও, যে স্থানটি ইতিহাসখ্যাত, অনেকে তার নাম দিয়েছে সুবর্ণগ্রাম<sup>১</sup>, বর্তমানে যদিও তা ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার [বর্তমানে জেলা] অধীন একটি গুরুত্বহীন গ্রাম মাত্র। অথচ স্থানটি প্রাক মোগল মুসলিম শাসন আমলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সমৃদ্ধশালী ও সৌভাগ্যসম্পন্ন নগর ছিলো। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনাকালে এই স্থানটি দিল্লীর মুসলিম সুলতানদের শাসনাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই দূর ও নিকট থেকে বিদ্বান ও উচ্চ মনীষাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এই স্থানটি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের রাজধানীতে পরিণত হওয়ার কারণে মুসলিম প্রশাসক, বীর সেনানী, সেনাধ্যক্ষ ও দুঃসাহসী দেশ বিজেতাদের চোখে তদানীন্তন পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী লক্ষ্মণাবতীর পরপরই অধিকতর গুরুত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং প্রায় দুইশ বছর পর্যন্ত এর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। শুধু তাই নয়, কয়েক জন স্বাধীন মুসলিম সুলতানের নেতৃত্বে এই স্থানটি এক সময়ে সমগ্র বঙ্গদেশের রাজধানীতে পরিণত হয়েছিলো।</p>
<p>এক কালের এতদঞ্চলীয় শাসন-কার্যের কেন্দ্রভূমি হওয়ার দরুনই শুধু নয়, <strong>বিশ্ববিখ্যাত মসলিন ও শবনম প্রভৃতি মখমল কাপড়ের সদা কর্মচঞ্চল ব্যবসায়ের কেন্দ্রও হয়েছিলো এই সোনারগাঁও। উপরন্তু বিশ্ববিশ্রুত হস্ত-লিপি, অংকন-শিল্প, মুদ্রা-বিজ্ঞান এবং ললিতকলার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বিপুল উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো এখানে। সামুদ্রিক ব্যবসার জন্যও এই স্থানটি বিশ্বের প্রায় সর্বত্র খ্যাত ছিলো।</strong> ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মিসর ও অন্যান্য এলাকার সামুদ্রিক বন্দরের সহিত পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াতের গভীর যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিলো। প্রখ্যাত ভূ-পর্যটক ইবন বতুতা— যিনি মধ্য-যুগের রাষ্ট্রসমূহে ব্যাপক পর্যটন করেছিলেন। ১৩৪৫-৪৬ সনের মধ্যবর্তী সময়ে সোনারগাঁও হয়েই বঙ্গ ও আসাম সফর করেছিলেন।<sup>২</sup> তারপর তিনি এখান থেকেই জাভা-সুমাত্রার দিকে যাত্রা করেন। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকে সহজেই বলা যায়, একটি সমুদ্র বন্দর হিসেবেও সেকালে সোনারগাঁও খুবই গুরুত্বের অধিকারী হয়েছিলো।</p>
<p>বস্তুত সোনারগাঁও-এর অতীত শুধু উপরোক্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলির কারণেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রচার ও বিকাশের দৃষ্টিকোণেও তার গুরুত্ব ছিলো সর্বাধিক এবং এদিক দিয়েই বলা যায়, সোনারগাঁও-এর অতীত ছিলো সোনালী, ছিলো অতিশয় শুভ্র-সমুজ্জ্বল। যেদিন থেকে সোনারগাঁও মুসলিম শাসনের অধীন হয়েছিলো, সেদিন থেকেই বিপুল সংখ্যক বিদ্বান মনীষী এবং আধ্যাত্মিক মহাপুরুষদের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো। তাঁরা সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে ইসলামী শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রচার কাজে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত আত্মনিয়োগ করেছিলেন।</p>
<p>সোনারগাঁও যেদিন থেকে এতদঞ্চলে মুসলিম আধিপত্যভুক্ত এলাকার রাজধানী রূপে নির্দিষ্ট হয়েছিলো, সেদিন থেকে প্রায় দুইশ বছর ধরে এখানে যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো, বিশেষ কারণে তা আজ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের পরিবেশে তার উল্লে­খ ও আলোচনা একান্তই প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে এই সংক্ষিপ্ত সন্দর্ভের অবতারণা।</p>
<p>এতদঞ্চলে প্রাচীনকালীন মুসলিম আধিপত্য প্রায় দুই শতাব্দীকাল পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারে কি অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলো, তা ব্যাপকভাবে খতিয়ে দেখা বাংলাদেশি জনগণের সোনালী ভবিষ্যতের জন্যও বিশেষ আবশ্যক। এই দীর্ঘ শাসনামলে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ অঞ্চলে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেনি বা সাংস্কৃতিক মূল্যমানের দৃষ্টিতে এই অঞ্চল একেবারে শূন্য বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো-তা আমরা মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করতে বা মেনে নিতে পারি না।</p>
<p>মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর পর উত্তরসূরি হিসেবে সুলতান গিয়াস উদ্দীন ইওয়াজ-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হিজরী ৬১০ সনের প্রারম্ভে (১২১৪ খ্রি.) তিনি বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ) দখল করার সাথে সর্বপ্রথম সোনারগাঁও- দখল করে নেন<sup>৩</sup> এবং দিল্লীর অধিপতি সুলতানদের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত থেকে এক দশকেরও অধিক কাল পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তদানীন্তন দিল্লীর সম্রাট সুলতান ইলতুতমিশের (৬২০ হি./১২২৫ খ্রি.) বঙ্গ দখল করে নেওয়ার সময় পর্যন্ত<sup>৪</sup> সুলতান গিয়াসুদ্দীনের শাসনাধীন এই অঞ্চল সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকে। ইলতুতমিশের দখল ও কর্তৃত্বাধীন হওয়ার পর সোনারগাঁও নগরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হিন্দু জমিদারদের করায়ত্ত হয় এবং তাঁর বংশধররা উত্তরাধিকারসূত্রে তিপ্পান্ন বছরের অধিককাল পর্যন্ত দিল্লীর সম্রাটের প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে শাসনকার্য চালাতে থাকেন।</p>
<p>১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তুগ্রিল বেগ সুলতান মুগীস উদ্দীন নাম ধারণ করে নিজেকে বঙ্গের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। তখন দিল্লীর সম্রাট গিয়াসউদ্দীন বলবন তুগ্রিল বেগকে দমন করার উদ্দেশ্যে বঙ্গে আগমন করেন এবং নিকটবর্তী সোনারগাঁও উপস্থিত (১২৪১ খ্রি.) হতে চাইলে সোনারগাঁও-এর জমিদার দনুজ রায় সম্রাটকে সাদর সংবর্ধনা জানানোর জন্য নগরের বাইরে বের হয়ে আসেন। <strong>তখন সোনারগাঁও ও নিকটস্থ শহর এলাকা থেকে নদীপথে তুগ্রিল বেগ যেন পালিয়ে যেতে না পারেন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা ও তাঁর গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব বিশ্বস্ত হিন্দু জমিদার দনুজ রায়ের উপর অর্পণ করেন সম্রাট।<sup>৫</sup> এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, দনুজ রায় স্বাধীন নরপতি হিসেবে নয়, দিল্লী সম্রাটের প্রত্যক্ষ নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর হিসেবে সোনারগাঁও শাসন করতেন, যদিও স্যার যদুনাথ সরকার তাঁকে সোনারগাঁও-এর স্বাধীন নরপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।<sup>৬</sup></strong> ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানী উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন মনোনীত বঙ্গের শাসনকর্তা বগরা খানের প্রতি সম্রাট বলবন দিল্লী প্রত্যাবর্তনের পূর্বে নিম্নোক্ত বক্তব্যে রাজকীয় ফরমান জারি করেছিলেন—</p>
<p>&#8220;You should not forget my word that if any Governor, be he of Hind, Sind, Malwa, Gujrat, Lakhnowti or Sonargaon, ever revolts or raises arms against the Emperor of Delhi, the chasement inflicted upon him, his wife, children, helpers, associates and followers will be the same as that befell Tughril, his children and his men.&#8221;<sup>৭</sup></p>
<p>এই রাজকীয় ফরমান অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, সম্রাট বলবনের বহু পূর্বেই সোনারগাঁও দিল্লীর সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ পরিণত হয়েছিলো। ঠিক এই কারণেই বঙ্গের বিদ্রোহী সুলতান তুগ্রিল বেগকে দমন করার লক্ষ্যে উক্ত ধরনের ফরমান জারি করা হয়েছিলো।</p>
<p>এই প্রসংগে একথা উল্লেখ্য, ইতিহাসবিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, তুগ্রিল বেগের শাসনকেন্দ্র ছিলো লক্ষণাবতী এবং সেখানেই তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো। ড. জেমস ওয়াইজ <em>&#8216;Notes on Sonargaon, Eastern Bengal&#8217;</em> শীর্ষক এক তথ্য-সমৃদ্ধ গবেষণামূলক নিবন্ধে<sup>৮</sup> মুসলিম ঐতিহাসিকদের নিকট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লিখেছিলেন—</p>
<p>&#8216;Tughril &#8230;&#8230;&#8230; was Governor of Eastern Bengal and his seat of Government was Sunargaon. Balban returned to Sunargaon and put every one of Tughril&#8217;s family and his principal adherents to death&#8217;</p>
<p>এই মন্তব্যকে সত্য বলে স্বীকার করে নিলেও এবং এর বিপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক অকাট্য প্রমাণ যখন নেই, আমাদের মূল বক্তব্যের কোনো তারতম্য ঘটে না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবনের দীর্ঘদিন পূর্বেই সোনারগাঁও দিল্লী সালতানাতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিলো। যদিও ১২১৪ থেকে ১২৮১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কালের সোনারগাঁও-এর রাজনৈতিক ইতিহাস অস্পষ্ট ও অন্ধকারাছন্ন, এই সময়ে সেখানকার প্রকৃত শাসনকর্তা কে ছিলো বা কে ছিলো না, তা নিঃসন্দেহে জানা যাচ্ছে না; তা সত্ত্বেও উপরোদ্ধৃত তথ্যের ভিত্তিতে এ কথায় কোনো সন্দেহ থাকে না যে, এই দীর্ঘ সময়ে সোনারগাঁও মুসলিম শাসনাধীন ছিলো এবং এখানে বিপুলসংখ্যক মুসলিম বিদ্বজ্জন ও মনীষীদের অব্যাহত আগমন সংঘটিত হয়েছিলো।</p>
<p><strong>বুখারার প্রখ্যাত মনীষী ও হাদীস তত্ত্বের অনন্য পারদর্শী শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্ ১২৬০ সন কিংবা কাছাকাছি সময়ে তদানীন্তন মুসলিম শাসনের কেন্দ্রস্থল দিল্লীতে আগমন করেন। তিনি একজন সুবিজ্ঞ ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হওয়া ছাড়াও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখায় বিশেষ দক্ষ বলে পরিচিত ও খ্যাত ছিলেন। রসায়ন, প্রকৃতি-বিজ্ঞান ও যাদু-বিজ্ঞানেও যথেষ্ট দক্ষতার অধিকারী ছিলেন তিনি।</strong> দিল্লীতে অবস্থানকারী মুসলিম জ্ঞানী, গুণী, ফিকহবিদ এবং ইসলামী আইনবিদগণ মুহাদ্দিস আবু তাওয়ামাহ্-এর দিল্লী আগমন বিষয়ে অনতিবিলম্বে অবহিত হয়েছিলেন। এবং তাঁরা তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁদের জ্ঞান-পিপাসা নিবৃত্ত করতে ও কাজে আত্মনিয়োগ করতে একবিন্দু কুণ্ঠিত হলেন না; সে কাজে এতটুকু বিলম্বও করলেন না।<sup>৯</sup> তাঁদের শাগরিদ ও সহচরবৃন্দ তাঁদের অনুসরণে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গেলেন। অনেক মামলার বাদীপক্ষ তাঁর নিকট মামলার বিবরণ পেশ করে তাঁকে সেজন্য পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালেন এবং তিনি যেসব বিস্ময়কর কার্য সম্পাদনের দক্ষতার অধিকারী ছিলেন, তা প্রদর্শনের জন্যও আরয করলেন। ফলে তাঁর এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখতে পেয়ে দিল্লীর সম্রাট স্তম্ভিত ও বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি তাঁর এই অস্বস্তিকর উপস্থিতির সমূহ বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে তাঁকে রাজধানী থেকে সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে সোনারগাঁও চলে যাওয়ার জন্য তাঁকে কাতর অনুরোধ জানালেন।<sup>১০</sup></p>
<p>শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ স্বরূপ সোনারগাঁও যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। তাঁর আপন সহোদর মাওলানা হাফিজ যয়নুদ্দীন তাঁর সহযাত্রী হলেন। পথিমধ্যে এই কাফেলা এখানে-সেখানে অবস্থান গ্রহণের পর বিহারের মানের গ্রামে অবস্থান করে। এখানে তিনি ‘মানের’-এর স্বনামখ্যাত সূফী মাখদুমুল মুলক শায়খ শরফুদ্দীন আহমদের পিতা শায়খ ইহইয়া কর্তৃক সাদর সম্বর্ধিত হন। তিনি শায়খ আবু তাওয়ামাহর সাথে কথাবার্তা বলে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও বৈদগ্ধের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করে খুব বেশি অভিভূত হয়ে পড়েন। শায়খ ইহইয়া সুযোগ মনে করে তাঁর প্রাণ-প্রিয় পুত্র শায়খ শরফুদ্দীনকে এই মহান পর্যটক শায়খ আবু তাওয়ামাত্র সঙ্গী হয়ে সোনারগাঁও যাওয়ার এবং তাঁর নিকট উপস্থিত থেকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা লাভে মনোনিবেশ করার জন্য নির্দেশ দিলেন।”<sup>১১</sup> <strong>শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ ৬৬৮ হিজরীতে/১২৭০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও উপস্থিত হয়েছিলেন [তার দশ বছর পূর্বে সম্রাট বলবন সোনারগাঁও-এর নিকটস্থ এলাকায় পদার্পণ করেছিলেন]। শায়খ আবূ তাওয়ামাহ্ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি এখানে জ্ঞান-পিপাসু ছাত্রদের জন্য একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন এবং তাঁর শাগরিদদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেন একটি আস্তানা। তাঁর ইন্তেকাল হয় প্রায় ৭০০ হিজরীতে এবং সেই সময় পর্যন্ত এই দুটি প্রতিষ্ঠানই বিশেষ জাঁকজমক সহকারে চলতে থাকে।</strong></p>
<p>এভাবেই ইতিহাসে সর্বপ্রথম সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার একটি বিরাট কেন্দ্র হয়ে গড়ে উঠে। এই কেন্দ্র থেকেই তাফসীর, হাদীস ও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখার শিক্ষা চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করে। ইকদালা, পাণ্ডুয়া [ফিরোজাবাদ],  সাতগাঁও [চট্টগ্রাম] এবং বংগের অন্যান্য অংশের জ্ঞান-পিপাসু লোকেরা সোনারগাঁও উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণের এর বিরাট ও ব্যাপক সুযোগ লাভ করেন।</p>
<p>শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সাহিত্যে ও মানব সমাজ সংক্রান্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের অপরাপর শাখা-প্রশাখার কতটা দক্ষ ও পারদর্শী ছিলেন, যে বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানতে না পারলেও নিম্নোদ্ধৃত তথ্য থেকে তাঁর পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান-গভীরতা সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি—</p>
<p>তাঁর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত ‘মানের’-এর মাখদুমুল মুলক শরফুদ্দীন আহমদের অনন্য অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কথা সর্বজনবিদিত। তিনি শায়খ তাওয়ামাহ্ নিকট বহু বছর পর্যন্ত অব্যাহত অবস্থানের ফলে উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে করে তাঁর একমাত্র শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যাপকতার পরিমাণ অনায়াসেই আন্দাজ করা যায়।</p>
<p>ইসলামী আইনতত্ত্ব সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ এখনো বর্তমান রয়েছে। মাখদুমুল মুলক শায়খ শরফুদ্দীন আহমদ ইহইয়া আল-মানেরী (৬৬১-৭৮২ হি.) শায়খ আবু তাওয়ামাহ্’র প্রধান ছাত্র ও অত্যন্ত সম্মানিত অনুসারী ছিলেন। তিনি সোনারগাঁও অবস্থান করেই তার উস্তাদের নিকট তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইসলামী আইনতত্ত্ব এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অপরাপর শাখা-প্রশাখায় অধ্যয়ন করেন। তাঁর এই অধ্যয়নকাল ছিলো সুদীর্ঘ ২২ বছর, ৬৬৮-৬৯০ হিজরী পর্যন্ত। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষালাভে দুনিয়ার সব কিছু থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ঐকান্তিকতা ও একাগ্রতা সহকারে মগ্ন হয়েছিলেন। এই কথার প্রমাণ স্বরূপ এখানে একটি ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ট হবে। তাঁর এই অধ্যয়নকালে তাঁর নিকট বিভিন্ন স্থান থেকে যত চিঠি তিনি পেয়েছেন, সময়ের অপচয় এবং অধ্যয়নে মনোনিবেশ বিঘ্নিত হবে মনে করে তার একটি চিঠিও তিনি পাঠ না করে সব একটি থলের মধ্যে জমা রেখেছিলেন। তাঁর অধ্যয়ন সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি চিঠিগুলো থলে থেকে বের করে পড়তে শুরু করলেন। একেকটি চিঠি পাঠ করে তিনি তাঁর নিজ সংক্রান্ত এই দুঃখজনক সংবাদ লাভ করেন যে, তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা ৬৯০ হিজরীর (১২৯১ খ্রি.) ১১ই শাবান ইহলোক ত্যাগ করে গেছেন। অতঃপর তিনি তাঁর বিধবা জননীকে দেখার জন্য তাঁর অসীম শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের নিকট ‘মানের’ গমনের অনুমতি চাইলেন।</p>
<p>শায়খ মাখদুমুল মুলক জ্ঞান আহরণে কতটা মনোযোগী হয়েছিলেন, অপর একটি ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর শিক্ষক শায়খ আবু তাওয়ামাহর পাঠদানকেন্দ্র ছিলো সকল শ্রেণির জ্ঞান-পিপাসু লোকদের জন্য সম্পূর্ণ অবাধ ও উন্মুক্ত। সকল বিদেশী পর্যটক এবং সরকারি মেহমানও তাতে উপস্থিত থাকার অবাধ সুযোগ লাভ করতেন। তাতে তাঁর মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং সময়ের অপচয় হয় মনে করে শায়খ মাখদুম সেই সার্বজনীন শিক্ষা-কেন্দ্র অনুপস্থিত থাকতে শুরু করলেন। ফলে তিনি যথাসময়ে আহার্য গ্রহণ করতে পারতেন না। শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ তা লক্ষ্য করে তাঁর জন্য স্বতন্ত্রভাবে খাবার গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এর দরুন শায়খ মাখদুম সম্পূর্ণ সময় অধ্যয়ন, জ্ঞান-চর্চা ও আধ্যাত্ম-বিদ্যায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করার অবকাশ পেয়েছিলেন।</p>
<p>৬৯০ হিজরী সনে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ) মাখদুমুল মুলক যখন &#8216;মানের&#8217;-এর উদ্দেশ্যে সোনারগাঁও ত্যাগ করলেন, তখন তিনি সকল প্রকার ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিতা ও পরিপক্কতা অর্জন করেছিলেন। সেই বছর কিংবা তার পরবর্তী বছর দিল্লীস্থ সুলতানুল মাশায়েখ নিজামুদ্দীন আওলিয়ার সাথে এক সাফল্যমণ্ডিত সাক্ষাৎকার থেকে তার নিঃসন্দেহ প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রশ্নের অকাট্য ও বিশদ জবাব দানে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তাতে সুলতানুল মাশায়েখ তাঁর প্রতি এত বেশি সন্তুষ্ট হন যে, তিনি আনন্দের আতিশয্যে শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ একথালা পান তাঁর সম্মুখে পেশ করেন। তদানীন্তন ভারতীয় সূফীবাদের ইতিহাসে এই ঘটনা নজিরবিহীন। শাগরিদী গ্রহণে আগ্রহী কোনো ব্যক্তির প্রতি উক্তরূপ সম্মান প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত সূফীবাদের ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অতঃপর সুলতানুল আওলিয়া তাঁকে লক্ষ্য করে ফার্সী ভাষায় বলে উঠেন—</p>
<p><strong>“কল্পনার ঈগল পাখী এ, এঁকে আমাদের ফাঁদে ধরে রাখা যাবে না।”</strong></p>
<p>মাখদূমুল মুলক সম্পর্কে আলহাজ্ব নিজামুদ্দীন আল-গরীব আল-ইয়ামেনী যে কথা লিখেছেন, তার চাইতে উচ্চ মানের কথা বোধ হয় বলা যায় না। তিনি লাতায়েফুল আশরাফী গ্রন্থে লিখেছেন—</p>
<p>حضرت شيخ شرف الدين بعد از تحصيل علوم شرعية و تكميل رياضت اصليه وفرعيه بشرف ملازمت حضرت سلطان المشايخ بدهلى تشريف بردند و استدعا ارادت و ارشاد کردند اشتغفار از عالم غيبس وقضائے لا ریب کردند و سر بحبب استغراق کشیده بر آوردند و فرمودند: برادر شرف نصيب ارادت و حصول ملوك از برادرم نجیب الدین فردوسی است</p>
<p>হযরত শায়খ শরফুদ্দীন ধর্মীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা উচ্চতর মানে আয়ত্ত করার পর দিল্লীতে অবস্থানকারী সুলতানুল মাশায়েখের দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে একজন আধ্যাত্মিক শাগরিদ হিসাবে গ্রহণ করার জন্য প্রার্থনা জানালেন। তখন সুলতানুল মাশায়েখ মাথা নত করে অদৃশ্য জগত থেকে ইঙ্গিত লাভ করার পর বললেন, “ভাই শরফুদ্দীন, আপনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ ও চর্চার জন্য আমাদের ভাই নজীরুদ্দীন ফেরদৌসীর নিকট যান।”</p>
<p>এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, মাখদুমুল মুলক তাঁর উচ্চতর ইসলামী ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেছিলেন সোনারগাঁও অবস্থান কালে তাঁর মহান শিক্ষক শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্-এর কাছে। দিল্লীর সুলতানুল আওলিয়ার দরবারে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষা দান করার অনুমতি লাভের উদ্দেশ্যে।</p>
<p>মাখদুমুল মুলক উপমহাদেশে হাদীসতত্ত্বের প্রচার ও বিস্তারে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁর সম্পর্কিত আলোচনায় তা অবশ্যই উল্লেখ্য। কেননা, তিনি হাদীস জ্ঞানে যথেষ্ট মাত্রায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর নিজের লিখিত মাকতুবাত ও মালফুযাত থেকেই একথা প্রমাণিত যে, তিনি হাদীস বিজ্ঞানে যে দক্ষতা লাভ করেছিলেন, তদানীন্তন ভারতে তা ছিলো বিরল ঘটনা। সহীহ্ বুখারী, সহীহ্ মুসলিম, জামে সগীর, মুসনাদে আবু ইয়ালা, মাশারিকুল আনওয়ার, শরহে সাখাবী এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ তিনি পুরোপুরি অধ্যয়ন ও সে সবের জ্ঞান আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। তাঁর হাদীস বিষয়ক জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যাপকতার প্রমাণ স্বরূপ তাঁর নিকট হাদীস শিক্ষাপ্রাপ্ত মাওলানা ইমাম মুযাফফর বলখীর নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট। মাখদুমুল মুলক হাদীসের জ্ঞান বিস্তার করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি হাদীস অনুযায়ী জীবন গঠন ও পরিচালনের উপরও খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি নিজে রাসূলে কারীম (স.)-এর সুন্নত অনুযায়ী অত্যন্ত দৃঢ়তা ও অবিচলতা সহকারে আমল করতেন। তার একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ হচ্ছে, রাসূলে করীম (স.) তরমুজ কিংবা খরবুজ খেয়েছেন কিনা, খেয়ে থাকলে তা কীভাবে খেয়েছেন, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে না পারার কারণে তিনি নিজেও তাঁর জীবনকালে কখনও তা খাননি। মাওলানা ইমাম মুযাফ্ফর বলখী এবং হুসায়ন নওয়াশায়ী তওহীদ এই দুইজন তদানীন্তন বিহারের প্রখ্যাত হাদীসবিদ তাঁরই অতি প্রিয় ছাত্র ও উত্তরাধিকারী ছিলেন। মাখদুমুল মুলক নিজে সোনারগাঁও অবস্থান করে আল্লামা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহর নিকট হাদীস অধ্যয়ন করে কতটা ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, তা এ থেকেই প্রমাণিত হয়।</p>
<p><strong>এক কথায় শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের যে আলোর শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন, তাই তাঁর প্রিয় ছাত্র মাখদুমুল মুল্ক এবং তাঁর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত ও তাঁদের ছাত্রদের মাধ্যমে প্রায় দুই শতাব্দীকাল পর্যন্ত সমগ্র পূর্ব ও উত্তর ভারতকে হাদীস ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের আলোকে সমুদ্ভাসিত করে রেখেছিলো।</strong></p>
<p>তাঁদের পরবর্তীকালে যে সব সুবিখ্যাত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সোনারগাঁও পদার্পণ করেছেন, তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, শায়খ আলাউদ্দীন আলাউল হক (মৃত্যু, ৮০০ হি.)। তিনি পাণ্ডুয়ার সুবিখ্যাত সূফী ও আলেম ছিলেন এবং ছিলেন শায়খ আখী সিরাজের উত্তরসূরি। তিনি ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগাধ ও সুগভীর পাণ্ডিত্যের সাথে সাথে বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারীও ছিলেন। দিল্লীর মাহবুবুল আওলিয়া শায়খ নিজামুদ্দীনের প্রখ্যাত ছাত্র ও মুরীদ আখী সিরাজ যখন ইসলামী শিক্ষালাভ সম্পূর্ণ করলেন, তখন তাঁকে এই ইসলামী জ্ঞান ও শিক্ষার বিস্তার, প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব পালনের জন্য বঙ্গদেশে গমন করার নির্দেশ দেন শায়খ নিজামুদ্দীন। কিন্তু শায়খ আলাউল হক এই কাজেই বঙ্গদেশে নিয়োজিত রয়েছেন বিধায় সেখানে গমন করতে রীতিমত লজ্জাবোধ করলেন। অথচ আখী সিরাজ ছিলেন শায়খ নিজামুদ্দীনের অতিশয় প্রিয় ছাত্র এবং তাঁর নিকট প্রাপ্ত ইসলামী জ্ঞানের গভীরতার দৃষ্টিতে তিনি পূর্বেই তাঁকে &#8216;ভারতের দর্পণ&#8217; উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, “বঙ্গদেশে যেতে তাঁর কোন সংকোচ থাকা উচিত নয়। কেননা, আলাউল হক তাঁকে সেখানে দেখতে পেলে শুধু খুশীই হবেন না, তিনি তাঁর যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং তাঁর খিদমতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করবেন না। অতঃপর আখী সিরাজ যখন বঙ্গদেশে আগমন করলেন, তখন শায়খ নিজামুদ্দীনের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হলো। শায়খ আলাউল হক তাঁর মুরীদ হন এবং তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই তিনি করেন।”<sup>১২</sup></p>
<p>শায়খ আলাউল হক ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখার উপর অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি এখানে নিজস্ব একটি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। এখানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য অবস্থানকারী ছাত্র এবং অল্প সময়ের জন্য আগত সাক্ষাৎপ্রার্থী ও পর্যটকদের আপ্যায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন। তদানীন্তন বঙ্গের স্বাধীন সুলতান সিকান্দর শাহ শায়খ আলাউল হকের ব্যাপক ইসলামী জ্ঞান প্রচার ও ক্রমবর্ধমান খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা দেখে তাঁর নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে খুবই আশংকাবোধ করলেন। এই কারণে তিনি তাঁকে পাণ্ডুয়া থেকে বহিষ্কার করে সোনারগাঁও যেতে বাধ্য করলেন। শায়খ আলাউল হক সোনারগাঁয়ে প্রায় দুই বছর কাল অবস্থান করেন এবং এখানে তিনি তাঁর ইসলামী জ্ঞান প্রচারের বিপ্লবী তৎপরতা পুরোপুরি অব্যাহত রাখেন।<sup>১৩</sup> এখানে তাঁর আয়ের দৃশ্যমান কোনো সূত্র না থাকলেও শিক্ষার্থী ও অভ্যাগতদের জন্য তাঁর বিপুল অর্থ ব্যয় পাণ্ডুয়ার ন্যায়ই চলতে থাকে।</p>
<p>ইসলামী শিক্ষা ও বিপুল জ্ঞান-পারদর্শিতার অধিকারী শায়খ আলাউল হকের ব্যাপক ইসলাম প্রচারের ভাবধারা ও ঐকান্তিক উৎসাহ উদ্দীপনার কারণে তিনি সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে মাত্র দুই বছর সময়ে যে কাজ করেছেন, তাতে এতদঞ্চলে সাধারণভাবে ইসলামী জ্ঞান এবং বিশেষভাবে ইসলামের ধর্মতত্ত্বের ব্যাপক প্রসার ঘটে। জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয় একটি অপূর্ব ইসলামী চেতনা ও জাগরণ। কিছুমাত্র অলীক নয়, প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্য এই যে, এতদঞ্চলের সেই সময়কালে বিরাজমান প্রশান্ত আবহাওয়ায় ইসলামী জ্ঞান-শিক্ষায় ব্যাপক ও গভীর ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন এহেন মহান ব্যক্তিদের অবিশ্রান্ত ও অব্যাহত চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলেই নিম্নস্তরের ও নির্যাতিত বঞ্চিত জনগণের মধ্যে ইসলাম অভূতপূর্ব পরিচিতি লাভ করে। বস্তুত এ ধরনের লোকেরা যখন ইসলামের তাওহীদী আকীদা, সাম্য-ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণময় জীবন বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিলো এবং প্রচারকদের চরিত্রে ও কর্মতৎপরতায় তার বাস্তব নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয়েছিলো, তখন শুধু শত শত নয়, হাজার হাজার ও লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে যে ইসলামী জ্ঞান-মশাল জ্বলে উঠেছিলো, তার আলোকচ্ছটা বঙ্গ প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এরই ফলে উত্তরকালে ত্রিবেণীর (সাতগাঁও) দ্বীনি মুজাহিদ জাফর খান সাতগাঁও অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার সুদৃঢ় প্রচার কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৬৯৮ হিজরী সনে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। আর তার ঠিক পনেরো বছর পর সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজের রাজত্বকালে (৭০৯-৭২২ হি./১৩০১-১৩২২ খ্রি.) শিহাবুদ্দীন জাফর খান খানজাহান নামক সাতগাঁও-এর জনৈক জায়গীরদার দারুল খয়রাত [কল্যাণের কেন্দ্র] নামে অপর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ড. ওয়াইজের বর্ণনানুযায়ী<sup>১৪</sup> খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা কেন্দ্র এবং সেখানে প্রথিতযশা সুধী ও বিদ্বজ্জনের বিপুল সমাবেশ হওয়ার দরুন ব্যাপক খ্যাতি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো। অধিকন্তু ৮৩৫ হিজরীতে (১৪৩১ খ্রি.) জৈতমল যখন ইসলাম গ্রহণ করে জালালুদ্দীন নাম ধারণ করেন, তখন তিনি সোনারগাঁও থেকে শায়খ আলাউল হকের পুত্র ও স্থলবর্তী শায়খ নূর কুতুবে আলমের (মৃত্যু ৮৫১ হি./১৪৪৭ খ্রি.)<sup>১৫</sup> পৌত্র শায়খ যাহিদকে সোনারগাঁও থেকে আহ্বান করেন তাকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী ধর্মীয় আচার-পদ্ধতি ও হুকুম আহকাম শিক্ষাদান এবং সেই সাথে ইসলামের প্রশাসনিক নিয়ম-বিধি অনুসরণে তাঁকে সহায়তা ও উপদেশ দানের উদ্দেশ্যে।</p>
<p>এই বিবরণ অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এই কালে তদানীন্তন বঙ্গদেশের মধ্যে সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান শিক্ষার ও ইসলামী মনীষীদের বিপুল সমাবেশের দিক দিয়ে অপরাপর অঞ্চলের তুলনায় অধিক পরিচিতি ও খ্যাতির অধিকারী ছিলো।</p>
<p>বস্তুত সোনারগাঁও তার সমৃদ্ধির দিনগুলোতে, বিশেষ করে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনাহীন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। অসংখ্য মনীষী ও ইসলামী জ্ঞানে ব্যুৎপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গ দূর ও নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। এখানে ফকীরদের ১৫০টি গদী (খানকাহ) অবস্থিত ছিলো, যেখান থেকে লোকেরা সাধারণ ইসলামী জ্ঞান ও আদর্শ জীবন যাত্রা গ্রহণের অনুপ্রেরণা লাভ করতো<sup>১৬</sup>। এই প্রেরণার দরুনই সোনারগাঁও-এ ৯২৫ হিজরী (১৫১৯ খ্রি.) ও ৯২৯ হিজরীতে (১৫২৩ খ্রি.) দুটি বড় আকারের মসজিদ নির্মিত হয়েছিলো। এ মসজিদ দুটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যথাক্রমে মোল্লা হিজাবর খান ও মোল্লা মুবারক। ইতিহাসে এই দু&#8217;জন ব্যক্তির উল্লেখ হয়েছে—</p>
<p>ملك الامراً والوزراء وقدوة الفقهاء والمحدثين</p>
<p>“রাজন্য ও মন্ত্রীবর্গের প্রধান এবং ফিকহবিদ ও হাদীস পারদর্শীদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি” বলে<sup>১৭</sup> এবং এ উপাধিটি হচ্ছে বঙ্গদেশে অতীতে ইসলামী মনীষী ও রাজন্যবর্গকে দেওয়া সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক সম্মানজনক উপাধি।</p>
<p>এ ঘটনা থেকেও বুঝা যায়, তদানীন্তন সোনারগাঁও-এর শাসকমণ্ডলী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের প্রদর্শিত সম্মান ও অনুগ্রহ কেবল দরবারের লোকেরাই ধন্য হতেন না, নিকট ও দূরবর্তী মনীষা ও সংস্কৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিগণও নানাভাবে সম্মানিত হতেন।</p>
<p>তবে সোনারগাঁও-এর সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান মূসা খান এবং বঙ্গের ইতিহাসখ্যাত বারো ভূঁইয়া ভারত সম্রাট জাহাঙ্গীর নিযুক্ত বঙ্গের শাসনকর্তা ইসলাম খানের নিকট আত্মসমর্পণ করার পর থেকেই সোনারগাঁও-এর গৌরবোজ্জ্বল মর্যাদা খুব দ্রুত হ্রাসপ্রাপ্ত হতে শুরু করে। অতঃপর শুরু হয় মোঙ্গলদের ব্যাপক লুটতরাজের নির্মম ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ। শেষ পর্যন্ত সোনারগাঁও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। এভাবে সোনারগাঁও-এর রাজনৈতিক গুরুত্ব লোপ পাওয়ার পর তার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক গুরুত্বের সূর্যও অস্তমিত হয়ে যায়।</p>
<p>ইসলাম খানের শাসনামলে সোনারগাঁও-এর পরিবর্তে ঢাকা পূর্ববঙ্গের রাজধানী ও শাসন কেন্দ্ররূপে চিহ্নিত হয়, যদিও সোনারগাঁও তার সোনালী অতীতের স্বর্ণোজ্জ্বল ঐতিহাসিক মর্যাদার স্মৃতি ধারণ করে মাত্র একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে আজও পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্যসূত্র—</strong></p>
<p>১.       সাধারণ হিন্দু ঐতিহাসিকগণ ‘সোনারগাঁও’ লিখতে সংকোচ বোধ করেছেন। তার পরিবর্তে এ স্থানের নাম লিখেছেন ‘সুবর্ণগ্রাম’ : (<em>Islamic Culture</em>, vol : xxvii, P-8).</p>
<p>২.      ইবন বতুতা রচিত আজায়িবুল আসফার-৪র্থ খণ্ড, ২২৩ পৃ. প্যারিস : স্যার যদুনাথ সরকার। (<em>History of Bengal</em>, vol:11-P-101)</p>
<p>৩.      ইয়াহ্ইয়া সারহিন্দী : তারীখ-ই-মুবারক শাহী, পৃ. ১৮।</p>
<p>৪.      তাবকাতে নাসেরী, পৃ. ১৬৩।</p>
<p>৫.      জিয়াউদ্দীন বারানী-তারীখ-ই-ফিরোজশাহী, পৃ. ৮৭; L.A. S. B. – 1874, vol-xlii-p-80,— দনুজ রায় এক সময় ধীনাজ মাধব নামে পরিচিত হতেন। তিনি সম্ভবত বল্লাল সেনের পৌত্র ছিলেন।</p>
<p>৬.     যদুনাথ সরকার : (<em>History of Bengal</em>-vol-31, P-65).</p>
<p>৭.      তারীখ-ই-ফিরোজশাহী, পৃ. ৯৩ 1. A. 5. B-vol-xliii &#8211; 1874-P-83.</p>
<p>৮.     I.A.S.B-vol-xliii-1874-p-83.</p>
<p>৯.      মাখদুম শাহ শুয়াইব : মানাকিবুল-আসফীয়া।</p>
<p>১০.    সাইয়েদ আবদুল হাই নুযহাতুল আখতার গ্রন্থে অবশ্য লিখেছেন যে, শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ সুলতান ইলতুৎমিশের রাজত্বকালেই ‘সোনারগাঁও’ উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সোনারগাঁও যাওয়ার পথে বিহারের ‘মানের’ নামক স্থানে অবস্থানের যে ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, তাতে উক্ত কথা বিশ্বাস্য নয়।</p>
<p>১১. মানাকিবুল আসফীরা مناقب الاصفيا প্রণেতা লিখেছেন, এই সময় মাখদুমুল মূলক-এর বয়স ছিলো মাত্র সাত বা আট বছর। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৬৬১ হিজরী সনে শাওয়াল মাসের কোনো এক।</p>
<p>১২.    আখবারুল আখিয়ার, পৃ. ১৩৯।</p>
<p>১৩.    <em>History of Bengal</em>. Vol: 11, p-113, আখবারুল আখিয়ার, পৃ. ১৩৯।</p>
<p>১৪.    Dr. Wise: <em>Notes on Sonargaun</em>, published in I. A. S. B. vol-xlii, P-45.</p>
<p>১৫. <em>Supra Notes</em> (1) P-125.</p>
<p>১৬.  Dr. Wise: <em>Notes on Sonargaun</em>, vide-1. A. S. B.-xliii, P-85.</p>
<p>১৭.    L.A. S. B-1873-P. 295.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/sonargaon-a-unique-minar-of-scholarly-tradition-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16133</post-id>	</item>
		<item>
		<title>স্বাধীনতার আড়ালে থেকে যাওয়া কথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Jun 2025 08:31:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15875</guid>

					<description><![CDATA[আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সাবেক পাকিস্তানের আমজনতার আর্থসামাজিক উন্নয়ন। কেবলমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কল্যাণ সাধন নয়। শেখ মুজিব তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজোরিটি পার্টির নেতা।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শেখ মুজিব নিজেকে সাবেক পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন। কেবলই পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন না। তিনি নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন সাবেক নিখিল পাকিস্তানকে; কেবলমাত্র বাংলাদেশকে নয়।</p>
<p>অনেকে বলছেন, শেখ মুজিব হলেন, আজকের বাংলাদেশের জনক। কিন্তু তিনি নিজে এ ধরনের কোনো মনোভাব পোষণ করেননি। তিনি চেয়েছেন সাবেক সমগ্র পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিতে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের অনেক রকম বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের একটি শুদ্ধ নমুনা পাওয়া যাবে ‘স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা’ নামক পুস্তিকায়। বইটি সম্পাদনা করেন, ফজলুল হক বাঙ্গালী, মেসবাহউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম। (প্রকাশনা ও প্রচার সংস্থা, মুজিবনগর, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত (১৯৭১)।)</p>
<p>এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রদত্ত Legal Framework Order (1970) মেনে। যাতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান হবে একটা প্রজাতন্ত্র ও ফেডারেশন। এর রাষ্ট্রিক মতাদর্শ (Ideology) হতে হবে ইসলাম এবং এই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হতে পারবেন না। এই মূলনীতিসমূহের সঙ্গে কোন অসঙ্গতিপূর্ণ সংবিধান রচিত হলে প্রেসিডেন্ট (ইয়াহিয়া) পারবেন তা বাতিল করে দিতে।</p>
<p>১৯৭১-এর পর পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই ভিন্ন হয়ে পড়েছে। ১৯৯৮ সালে ১১ মে ভারত রাজস্থানের মরুভূমিতে ভূগর্ভে তার নিজের তৈরি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে ভারতের চাইতে পিছিয়ে নেই। <strong>১৯৯৮ সালের ২৮ মে বেলুচিস্তানের মরুভূমির ভূগর্ভে পাকিস্তান ঘটায় তার তৈরি পাঁচটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ। এরপর ঐ একই সালে আরো শক্তিশালী পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় পাকিস্তান। যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় হইচই। কারণ, পাকিস্তান একটি ধনী রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তান বানাতে পেরেছে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বোমা।</strong></p>
<p>গুজব রটে পাকিস্তান খুব সস্তায় পরমাণু বোমা তৈরির কৌশল আবিষ্কার করতে পেরেছে। ভারত যা পারেনি। পাকিস্তান যদি সস্তায় পারমাণবিক বোমা তৈরি করে অন্য দেশে বিক্রি করে, তবে তার পরিণতি দাঁড়াতে পারে ভয়াবহ। কিন্তু পাকিস্তান এভাবে বোমা তৈরি করে বিদেশের কাছে বিক্রি করেনি। রেখেছে কেবল নিজের প্রতিরক্ষার জন্য সংরক্ষিত। পাকিস্তান এখন তৈরি করতে পারছে এমন রকেট, যার সাহায্যে তার পক্ষে সম্ভব ভারতের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ। সমর বিজ্ঞানের দিক থেকে পাকিস্তানকে অবহেলা করা যায় না।</p>
<p>পরিস্থিতি পাল্টেছে ঠিকই। কিন্তু সেটা যে ভারতের জন্য অনুকূল হয়েছে, এরকম ভাববার কোনো কারণ নেই। ভারত এখন মিত্রবিহীন দেশ। কিন্তু পাকিস্তান ঠিক তা নয়। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে চীন গড়েছে নৌঘাঁটি। কাশ্মিরের কাছে চীন গড়েছে এমন সড়ক, যার মাধ্যমে সে যে কোন সময় লাদাঘ অঞ্চলে সৈন্য পাঠাতে পারে। শ্রীলঙ্কার উত্তরে জাফলা অঞ্চলেও চীন নৌঘাঁটি গড়ে তুলেছে বলে প্রকাশ। নেপালের সাথে চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন হতে পেরেছে খুবই উন্নত। বেইজিং থেকে কাঠমান্ডু এখন সহজেই আসতে পারা সম্ভব। আমাদের দেশে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর দল ভারতকে যতটা শক্তিমান ভাবছেন, ভারত আসলে সে পর্যায়ে এখনো এসে পৌঁছাতে পেরেছে বলে মনে করবার কোনো হেতু নেই। আওয়ামী লীগ যদি মনে করেই থাকে যে, বাংলাদেশে সে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হতে পারবে, তবে মনে হয় সে ভুল হিসাবই করছে।</p>
<p>শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে ঠিক কী চেয়েছিলেন আমরা এখনও তা জানি না। ইন্দিরা গান্ধী একটি বই লিখেছেন My Truth নামে। বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন, স্কোয়াড্রন লিডার (অব:) মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম। তিনি বইটির নাম দিয়েছেন ‘আমার সত্যকথন’। এই বইতে ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে : ‘তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ভাবপ্রবণ, উষ্ণ হৃদয়ের লোক, যিনি একজন আইনপ্রণেতার চেয়ে পিতৃসুলভ ব্যক্তিত্বের বেশি অধিকারী ছিলেন। উপরন্তু তিনি সংগ্রামের বেশির ভাগ সময় দূরে অবস্থান করেছিলেন। আমি বলতে চাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় তার চিন্তাধারা, জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বতন্ত্র ছিল, যারা এ সকল বিষয়ে অংশ নিয়েছিলেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমি মনে করি না যে তিনি তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই তাঁরা যা কিছু করেছিলেন, তাঁর (মুজিব) নামে ও তাঁর জন্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি এ সকল লোকদের গুরুত্ব দেননি, বরঞ্চ তাদের গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। এতে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী ছিল।’</p>
<p>এখন আওয়ামী লীগ দাবি করছে, শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। এতে তিনি বলেন- তিনি যতদূর জানেন, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায়ের পথ এখনও রুদ্ধ হয়ে যায়নি। তিনি তার সেই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, শেখ মুজিব হলেন একজন মধ্যপন্থী নেতা। তিনি কোন বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত নন। শেখ মুজিব একজন মার্কিনবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিও নন। আসলে একসময় তার বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল যে, তিনি মার্কিন ঘেঁষা নেতা।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথায়- And he is not an extremist, he was a moderate person. In fact, if I may use the term, he used to be called by some others an American stooge at one time। ইন্দিরা গান্ধী তার এই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর। তার আগে নয়। শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশে ঘটেছে বিরাট গণহত্যা। বাংলাদেশে মানুষ তাই ভাবতে শুরু করে স্বাধীন হওয়ার কথা। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথা-……the cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as know, has not asked far independence, even now. but after he was arrested, after there was this tremendous massacre, it people should say: ` after this how can we live together? we have to be separate.’</p>
<p>বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, হাজার বছরের বাঙালির কথা। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর উপরোক্ত কথা যথার্থ হলে বলতে হবে শেখ মুজিব ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামনা করেননি। শর্মিলা বসু তার ডেড রেকনিং বইতে বলেছেন- ইন্দিরা গান্ধী সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যা বলেছিলেন, সেটা ছিল একটা ধাপ্পা। কারণ তিনি নিজে নিচ্ছিলেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করার নামে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিরাট যুদ্ধের প্রস্তুতি। কিন্তু ধাপ্পা হলেও ইন্দিরা গান্ধী যা বলেছেন, তা থেকে প্রমাণিত হয় না, শেখ মুজিব চাচ্ছিলেন পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে। শেখ মুজিবের লক্ষ্য নিয়ে তার মনেও ছিল সংশয়।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে India Speaks নামক বইতে। বইটি ভারত সরকারের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে প্রচার করা হচ্ছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। আর বলা হচ্ছে শেখ মুজিব ছিলেন, এই জাতীয়তাবাদের জনক। যার ভিত্তিতে বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভব সম্ভব হতে পেরেছে। কিন্তু ১৯৭১-এর দলিল দস্তাবেজ আমরা যা হাতের কাছে পাচ্ছি, তা সমর্থন করছে না আওয়ামী লীগের দাবিকে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বলেন যে, তিনি পাকিস্তান ভেঙে দিতে যাচ্ছেন না, তিনি চাচ্ছেন বর্তমান পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Link) বজায় রাখতে। সাংবাদিক মাসকারেনহ্যাসের এই কথার প্রতিবাদ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ করেছে বলে আমার মনে হয় না।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে তার দুইজন উপদেষ্টার ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন হলেন দুর্গাপ্রসাদ দার (ধর); আর একজন হলেন পি এন হাক্সার। এরা উভয়েই ছিলেন জন্মসূত্রে কাশ্মিরের লোক। আর এরা উভয়েই ছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। এদের দু’জনের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের ২৫ বছরের শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তিনিও ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর খুবই আপন লোক। ইন্দিরা গান্ধী হয়তো ভেবেছিলেন শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে আর কখনই ফিরবেন না। তার প্রাণদণ্ড হবে। এর ফলে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ ও তার দলের লোকদের সহায়তায় করে চলতে পারবেন।</p>
<p>কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টু জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে। ফিরে আসতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁকে বাংলাদেশে আসবার জন্য; যাতে বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি। তিনি পাকিস্তান থেকে ৮ জানুয়ারি পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে করে যান লন্ডনে। সেখানে যেয়ে দেখা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথের সঙ্গে। লন্ডন থেকে তিনি ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি বিমানে করে আসেন নায়াদিল্লি। দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে।</p>
<p>তারপর ঐ একই ব্রিটিশ বিমানে করে যাত্রা করেন ঢাকায়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আপত্তি তুলেছিল। বলেছিল, ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করে ঢাকা যাওয়া ঠিক হবে না। কেননা, গ্রেট ব্রিটেন তখনও বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেনি। কিন্তু শেখ মুজিব তাদের আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করেই এসে পৌঁছান ঢাকায়। কেন তিনি এরকম করার প্রয়োজনীয়তা দেখেছিলেন, সেটা এখনও জানা যায়নি। গ্রেট ব্রিটেন বাংলাদেশকে একটা পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে।</p>
<p>শেখ মুজিব সরাসরি পাকিস্তান থেকে নয়াদিল্লিতে না আসায়, ভারতে সৃষ্টি হতে পেরেছিল দারুণ প্রতিক্রিয়া। এ সময় আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় ট্রামে বাসে লোককে বলতে শুনেছিলাম, শেখ মুজিবুর রহমানকে ইন্দিরা গান্ধীর অতটা বিশ্বাস করা উচিত হয়নি। এ রকম কথাও কথা অনেককে বলতে শুনেছিলাম যে, ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহরলাল নেহেরু সৃষ্টি করেছিলেন একটি পাকিস্তান, তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী সেই একটি পাকিস্তানকে খন্ডিত করে সৃষ্টি করলেন দুটি পাকিস্তান। যার ফলে ভারতে পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়েই পড়ল।</p>
<p>বাংলাদেশ হওয়ার পর শেখ মুজিব চান বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে কোন বিবাদ-বিসম্বাদে না জড়াতে। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। শেখ মুজিব এর পরপর যান লাহোরে। সেখানে তিনি যোগ দেন ওআইসি সম্মেলনে। এবং বাংলাদেশকে করেন ওআইসির সদস্য। শেখ মুজিব কেবল বিশুদ্ধ বাঙালি হতে চাননি। তাঁর মধ্যে কাজ করেছে একটা মুসলিম উম্মাহ চেতনা। তিনি চাননি বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিযুক্ত করে রাখতে।</p>
<p>এরপর ১৯৭৪ সালে ২৭ জুন জুলফিকার আলী ভুট্টু ঢাকায় আসেন শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে। জেড এ ভুট্টু ঢাকায় ছিলেন তিন দিন। এ সময় মুজিব ও ভুট্টুর মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্বন্ধ নিয়ে হয়েছিল হৃদ্যতাপূর্ণ আলোচনা। শেখ মুজিবকে জুলফিকার আলী ভুট্টু আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানে যেতে। শেখ মুজিব গ্রহণ করেছিলেন সেই আমন্ত্রণ। বর্তমানে পাকিস্তানের অধিবাসীরাও চাচ্ছেন না বাংলাদেশের সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ। বর্তমানে পাকিস্তানে এখনো বাস করছেন প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ ও তাদের বংশধর। পাকিস্তান চাচ্ছে না এদের বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিতে। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ চাচ্ছে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে রাজনীতি করতে। কিন্তু শেখ মুজিব সেটা চাননি। বর্তমান আওয়ামী লীগ আর সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগকে এক করে দেখা যায় না।</p>
<p>অন্য দিকে আর একটি কথা ভুলে গেল চলে না যে, সারা ব্রিটিশ-ভারতে মোট মুসলমানের সংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ ছিলেন বাঙালি মুসলমান। আসলে তারা চেয়েছিলেন বলেই সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভায় পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। আজ কথায় কথায় বলা হয় পাকিস্তান আমাদের ওপর চেপে বসেছিল। কিন্তু ইতিহাসে এর সমর্থন মেলে না।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15875</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনৈতিক সংকটে উপজাতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ethnic-people-in-the-political-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ethnic-people-in-the-political-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 09 May 2025 15:01:29 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15829</guid>

					<description><![CDATA[ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারির আরম্ভ ১৮৭১ সাল থেকে। আদমশুমারির রিপোর্টে কেবল উপমহাদেশের লোকজনের হিসাবই থাকত না, থাকত এই উপমহাদেশের মানুষ সম্বন্ধে বহু তথ্য। যাদের আমরা সাধারণভাবে উল্লেখ করি ‘উপজাতি’ হিসেবে, তাদের আদমশুমারির রিপোর্টে প্রথম দিকে উল্লেখ করা হতো অ্যানিমিস্ট (Animist) বা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারির আরম্ভ ১৮৭১ সাল থেকে। আদমশুমারির রিপোর্টে কেবল উপমহাদেশের লোকজনের হিসাবই থাকত না, থাকত এই উপমহাদেশের মানুষ সম্বন্ধে বহু তথ্য। যাদের আমরা সাধারণভাবে উল্লেখ করি ‘উপজাতি’ হিসেবে, তাদের আদমশুমারির রিপোর্টে প্রথম দিকে উল্লেখ করা হতো অ্যানিমিস্ট (Animist) বা &#8216;আত্মা-উপাসক&#8217; হিসেবে। পরে ১৯৩১ সালের আদমশুমারির রিপোর্টে যাদের একসময় বলা হতো অ্যানিমিস্ট বা আত্মপূজারী তাদের উল্লেখ করা হয় ট্রাইব (Tribe) হিসেবে। (Kingsley Davis; The Population of India and Pakistan, Prenceton University Press. 1951)।</p>
<p><strong>‘ট্রাইব’ কথাটার বাংলা করা হয় উপজাতি। ‘উপজাতি’ বলতে বোঝানো হয় এমন জনগোষ্ঠীকে, যারা বাস করে প্রধানত অরণ্যে, যাদের জীবনধারা হয়ে আছে আদিম যুগের মতো। এরা অনেকে হলো আহার্য আহরক (Food gatherer), আবার কেউ হলো কিছুটা আহার্য উৎপাদক (Food Producer)। যারা আহার্য আহরক, তারা বনজঙ্গলে ফলমূল আহরণ ও পশুপাখি শিকার করে খায়। যারা কিছুটা আহার্য উৎপাদক তারা মাটিতে ফসল উৎপাদন করে; মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বীজ বপন করে। কিন্তু এরা প্রকৃত খাদ্য উৎপাদকদের মতো লাঙল দিয়ে চাষাবাদ করতে জানে না। তাদের চার পাশের জনসমষ্টি হলো খাদ্য উৎপাদক; যারা লাঙল দিয়ে চাষ করে এবং গবাদি পশু পালন করে, যাদের আছে একটা লিখিত ভাষা, যারা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে নগরজীবন বা সভ্যতা।</strong></p>
<p>ব্রিটিশ আমলে এ দেশের মানুষকে নিয়ে নৃতাত্ত্বিকরা যে গবেষণা করেছেন তাতে ট্রাইব কথাটার প্রয়োগ সবক্ষেত্রে হতে পারেনি সুস্পষ্ট। বর্তমানে নৃতাত্ত্বিকরা অনেকেই চাচ্ছেন না আর ‘ট্রাইব’ শব্দটা ব্যবহার করতে। কারণ শব্দটা হয়ে উঠেছে একাধিক অর্থবহ। ইংরেজি ভাষায় &#8216;Aborigines&#8217; শব্দটা এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। ল্যাটিন ভাষার অন মানে হলো প্রথম আর &#8216;origine&#8217; শব্দের অর্থ হলো আরম্ভ। Aborigine বলতে বোঝায় এমন মানুষদের, যারা কোনো দেশে আগে থেকে আছে; যেমন অস্ট্রেলিয়ার কালো মানুষেরা। ইউরোপ থেকে সাদা মানুষ ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে উপনিবিষ্ট হতে আরম্ভ করে। অস্ট্রেলিয়ার কালো মানুষকে তাই বলতে হয় অস্ট্রেলিয়ার Aborigine। অস্ট্রেলিয়ার Aborigine-রা পড়েছিল প্রাচীন প্রস্তর যুগের সংস্কৃতিতে। নিউজিল্যান্ডে অ্যাবরিজিন বলতে বোঝায় মাওরিদের। মাওরিরা পড়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির অবস্থায়। মাওরিদের বলা যায় নিউজিল্যান্ডের অ্যাবরিজিন। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান মানব সমষ্টিকে বলা যেতে পারে সেখানকার অ্যাবরিজিন।</p>
<p><strong>অ্যাবরিজিন শব্দটার বাংলা করা হয় আদিম নিবাসী অথবা আদিবাসী। এই অর্থে বাংলাদেশে বৃহত্তর জনসমাজকে ধরতে হয় আদিবাসী। কারণ তারা বাইরে থেকে ইউরোপীয়দের মতো এসে এ দেশ অধিকার করেনি। তারা এ দেশেরই ভূমিজ সন্তান। এই দাবির পেছনে এখন দেয়া চলে মাটি খুঁড়ে পাওয়া প্রভূত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। এক্ষেত্রে দু’টি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য। একটি হলো আদিম যুগ; আর একটি বিষয় হলো আদিম সংস্কৃতি। আদিম যুগে সব মানুষের পূর্বপুরুষই ব্যবহার করেছে প্রস্তর অস্ত্র। কিন্তু পরে কিছু মানুষ আরম্ভ করেছে ধাতু দিয়ে তৈরী অস্ত্র ও জিনিসপত্রের ব্যবহার। গড়ে তুলছে সভ্যতা বা নগরজীবন। কিন্তু অনেক জনসমষ্টি থেকে গেছে সংস্কৃতির দিক থেকে প্রস্তর যুগের জীবনধারায়। সংস্কৃতির দিক থেকে এদের আদিম বলা গেলেও সময়ের বিচারে এদের আদিম বলা যায় না। নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা যখন পড়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতিতে, তখন ইউরোপের মানুষ ব্যবহার করছিল লোহা দিয়ে তৈরী অস্ত্রশস্ত্র ও জিনিসপত্র। যদিও একসময় ইউরোপের মানুষও কোনো ধাতুর ব্যবহার জানত না, করত প্রস্তর অস্ত্রের ব্যবহার। ইউরোপের অনেক জায়গার মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে প্রাচীন নব্য প্রস্তর যুগের অস্ত্র। কিন্তু বাংলা ভাষায় এখন সময়ের দিক থেকে আদিম আর সংস্কৃতির দিক থেকে আদিম এই দু’টি ধারণার মধ্যে পার্থক্য করা হচ্ছে না। ফলে দেখা দিচ্ছে সমস্যা।</strong></p>
<p>বাংলাদেশের অনেক জায়গায় প্রস্তর যুগের হাতিয়ার পাওয়া গেছে। কিন্তু তাদের পাওয়া গেছে মাটির খুব উপরিভাগে। তাই বলতে হয় তাদের বয়সকাল বেশি নয়। এসব অস্ত্র যারা ব্যবহার করেছে, তারা সংস্কৃতির দিক থেকে আদিম হলেও সময়ের বিচারে আদিম নয়। কেন, কিছু মানুষ বনজঙ্গলে প্রাচীন সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকল আর অন্য মানুষ সৃষ্টি করল সভ্যতা, তার উত্তর এখনো দেয়া যায় না। তবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেসব মানুষ এখনো প্রস্তর যুগে পড়ে আছে বা কিছুদিন আগেও ছিল, তাদের মনোভাব হলো খুবই রক্ষণশীল। তারা সহজেই নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে চায় না। অনুসরণ করতে চায় গতানুগতিক জীবনকে। অর্থাৎ তাদের অনগ্রসরতার একটা কারণ, তাদের রক্ষণশীল মনোভাব। কিন্তু সবক্ষেত্রে এ কথা খাটে না।</p>
<p>বরফের দেশে মানুষ ধাতু দিয়ে অস্ত্র না বানিয়ে অস্ত্র বানিয়েছে পশুর হাড় দিয়ে। কারণ ধাতুদ্রব্য সেখানে সহজলভ্য নয়। সম্ভব নয় সেভাবে আগুন জ্বেলে ধাতু গলানো। অর্থাৎ মানুষের জীবনকে বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে তার প্রাকৃতিক পরিবেশ। সব প্রাকৃতিক পরিবেশের মানুষের সাংস্কৃতিক অগ্রগতি তাই সমভাবে হতে পারে না। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীরা পশু পালন জানত না। এর কারণ সেখানে ছিল না পালনযোগ্য কোনো পশু। একেকটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে একেকটি সময়কে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষের পূর্বপুরুষ ধান চাষ করেছে বহুদিন আগে থেকে। বাংলাদেশে খাল-বিলের ধারে যথেষ্ট বুনোধান দেখা যায়। এই বুনোধান থেকে বাছাই করে তারা করতে পেরেছে আবাদযোগ্য ধানের উদ্ভব।</p>
<p><strong>বাংলাদেশের মানুষ নৌকা বানিয়েছে। নৌকায় করে সে নানা জায়গায় নদীপথে আসা-যাওয়া করেছে। কেবল যে সে নৌকাযোগে নদীপথে যাতায়াত করেছে তা-ই নয়, বড় বড় নৌকা বানিয়ে করেছে সমুদ্রযাত্রা। করেছে বিদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য। গড়েছে সভ্যতা বা নগর সংস্কৃতি। এটা তারা করতে পেরেছে আপন চেষ্টায়। বাংলাদেশের মাটিতে তারা গড়েছে উন্নত সভ্যতা, এ দেশের ভূমিজ সন্তান হিসেবে। তারা থাকেনি প্রাচীন জীবন প্রণালীকে আঁকড়ে। কিন্তু এই ইতিহাসকে এখন যেন বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে সাঁওতাল ও চাকমাদের মতো উপজাতি হলো এ দেশের আদিবাসী, কিন্তু বাংলাদেশের মূল জনসমাজ তা নয়। সেটাকে সমর্থন করা যায় না। উপজাতি নিয়ে করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের রাজনীতি, যা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ বিভক্তির কারণ। সেটাকে আমরা দেশের স্বার্থে হতে দিতে পারি না।</strong></p>
<p>ভারতের একসময়ের পররাষ্ট্র দফতরের সেক্রেটারি ছিলেন মুচকন্দ দুবে। তিনি ভারতে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম India’s Foreign Policy। সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ (Nation; সেপ্টেম্বর, ২০১২), এই বইতে দুবে বলেছেন, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নত হতে পারেনি। শ্রীলঙ্কার সাথে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটার কারণ হলো, শ্রীলঙ্কার তামিল গেরিলাদের সাথে ভারতের যোগাযোগ। ভারত শ্রীলঙ্কার তামিল নেতা প্রভাকরণকে তার সংগ্রামে প্রণোদনা প্রদান করেছিল। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের একটা কারণ হলো, ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতাকামী চাকমাদের ভারতে আশ্রয় প্রদান। তার এই বই পড়ে উপলব্ধি করা যায়, চাকমা নেতা সন্তু লারমার প্রকৃত শক্তির উৎস হচ্ছে ভারত। ভারত ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের তথাকথিত উপজাতিদের নিয়ে করতে পারে বিশেষ রাজনীতি।</p>
<p>পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই জটিল হচ্ছে। ভারতের আসামে বোড়োদের একসময় বলা হতো উপজাতি। কিন্তু এখন তারা হতে চলেছে একটা পৃথক জাতি। এরা আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর করছে হামলা। কেন এরা এরকম হামলা করছে, তার প্রকৃত কারণ আমরা জানি না। কারণ আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলমানরা বোড়োদের দাবির বিরোধী ছিল না। সারা আসাম প্রদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ ভাগ হলো বাংলাভাষী মুসলমান। এরা সে দেশে বাস করছে বহুকাল ধরে। বরাবরই আসামের ধুবড়ি-গোয়ালপাড়া অঞ্চলের মানুষের সাধারণ ভাষা হলো বাংলা। আসামের কাছাড় (শিলচর) অঞ্চলের মানুষের সাধারণ ভাষা হলো বাংলা। যাকে বলে প্রকৃত অসমিয়া ভাষা, যা এখন হলো আসামের প্রাদেশিক সরকারের সরকারি ভাষা, তার উদ্ভব হয়েছে আসামের শিবসাগর ও ডিব্রগড় জেলায়। অসমিয়া ভাষা বাংলাভাষার খুব কাছের। বাংলাভাষা মানুষের পক্ষে শেখা মোটেই কঠিন নয়।</p>
<p>আসামের বাংলাভাষী মুসলমান অসমিয়া ভাষাকে আয়ত্ত করে নিয়েছে মাতৃভাষার মতোই। কিন্তু বোড়োদের ভাষা হলো তিব্বতি ভাষার মতো। তার সাথে অসমিয়া ও বাংলা ভাষার ব্যবধানটা যথেষ্ট বড়। তাই সম্ভবত বোরোদের সাথে সৃষ্টি হতে পারছে আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরোধ। বোড়োরা বলছে বাংলাভাষী মুসলমান আসলে হলো বাংলাদেশি। তাই আসামে বাস করার কোনো অধিকার তাদের নেই। তাদের চলে যেতে হবে বাংলাদেশে। অথচ ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছিল এ মর্মে, ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসের আগে যারা বাংলাদেশ (পূর্বপাকিস্তান) থেকে আসামে গিয়েছে তাদের ধরতে হবে ভারতের নাগরিক। এর পরে যারা বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়েছে তারা যদি সে দেশে একটানা দশ বছরের বেশি থেকে থাকে, তবে তারা পেতে পারবে ভারতের নাগরিকত্ব। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পরে যারা আসামে গিয়েছে কেবল তাদেরই ‘বাংলাদেশি’ বলে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে। (Outlook, 3 September 2012)।</p>
<p>বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে সব মুসলমান বাংলাদেশি নয়। কিন্তু ভারতে এখন মহলবিশেষের পক্ষ থেকে তাদের সবাইকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশি হিসেবে। পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষী মানুষের শতকরা ২৫ ভাগ হলো মুসলমান। তারাও নিকট ভবিষ্যতে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানের মতো পড়তে পারে বিপদে। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে বোড়োদের মতো কোনো উপজাতি নেই।</p>
<p><em>বাংলাদেশের সাঁওতাল ও চাকমাদের ভারতে কোনো দল অথবা সরকার ইন্ধন জোগাতে পারে গোলযোগ সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে আরো দুর্বল করতে। মুচকন্দ দুবে বলেছেন, ভারত একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীদের প্রশ্রয় দিয়েছিল। দুবে তার চাকরি থেকে অবসর নেন ১৯৯১ সালে। </em><br />
<em>আমরা অনেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নই। মোগল আমলে বাংলাদেশ অনেক প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত ছিল। একেকটি বিভাগকে বলা হতো সরকার। প্রতিটি সরকারকে শাসন করতেন একজন ফৌজদার। ফৌজদার শাসন করতেন কিন্তু ফৌজদারি মামলা ছাড়া আর কোনো মামলার বিচার তিনি করতেন না। সাধারণ মামলার বিচার করতেন কাজিরা। কাজির বিচার এলাকাকে বলা হতো জেলা। ইংরেজি District আর মুঘল আমলের জেলার ধারণা এক নয়। কিন্তু ইংরেজ আমলে District শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে জেলা শব্দটি গ্রহণ করা হয়।</em></p>
<p>১৭৬০ সালে বাংলার নবাব মীর কাশিম চট্টগ্রাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬০ সালে সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভক্ত করে করা হয় পাবর্ত্য চট্টগ্রাম মহাল, যা পরে পরিচিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম হিসেবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসিত হয়েছে অন্য জেলা থেকে কিছুটা স্বতন্ত্রভাবে; ১৮২২ সালের রেগুলেশন অনুসারে। এই রেগুলেশন অনুসারে সেই সব জেলাই শাসিত হয়েছে, যাদের অধিবাসীর জীবনধারা ছিল অন্য জেলার মানুষের তুলনায় খুবই অনগ্রসর। চাকমারা লাঙল দিয়ে চাষ করতে জানত না। তাদের মধ্যে ছিল না কোনো কুম্ভকার ও কর্মকার। তারা মৃৎপাত্রের জন্য নির্ভর করেছে বাঙালি কুম্ভকারের ওপর। লোহা দিয়ে তৈরি দা, কুড়াল, খন্তার জন্য নির্ভর করেছে বাঙালি কর্মকারের ওপর। চাকমারা যে তাঁতে কাপড় বুনেছে সেই তাঁত ছিল খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। এতে কেবল হাত দিয়ে কাপড় বুনা হয়। এতে পায়ের কোনো ব্যবহার করতে হয় না।</p>
<p><em>বাংলাদেশে যাদের উল্লেখ করা হয় ‘উপজাতি’ হিসেবে, তাদের বেশির ভাগের বাস পার্বত্য চট্টগ্রামে। এরা জীবনযাত্রার দিক থেকে একসময় পড়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির পর্বে। কিন্তু সময়ের দিক থেকে এদের বলা যায় না ‘আদিম’। এরা মাটিতে কষ্ট করে বীজ বুনে চাষ করত। যাকে বলে জুম চাষ। জুম চাষ করার জন্য এসব অঞ্চলে বন পুড়িয়ে চাষের জমি বের করা হয়। তারপর সেই জমিতে গর্ত করে বীজ লাগিয়ে উৎপন্ন করা হয় ফসল। কিন্তু এক জমিতে বেশি দিন জুম চাষ করা যায় না। কারণ, জমির ওপরে উর্বর মাটি পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যেতে থাকে। ফলে জমি হয়ে ওঠে অনুর্বর।</em><br />
<em>জুমচাষিরা বাধ্য হয় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে জুম চাষ করতে। জুম চাষ যে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা করে, তা নয়। উত্তর ভারতের উপজাতিরাও জুম চাষ করে থাকে। কিন্তু সেখানে এই পদ্ধতিকে বলে ‘দাহি’। মিয়ানমারের এই পদ্ধতিতে চাষ করাকে বলে ‘তুঙ্গিয়ান’ (Tong-gyan); ফিলিপাইনে বলে ‘গেইংএস’ (Gainges)। জুম চাষের বিষয়ে বলতে হচ্ছে কারণ, চাকমা নেতা সন্তু লারমার দাবি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করে গড়তে হবে জুমল্যান্ড। কিন্তু জুম পদ্ধতিতে চাষ কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামেই যে প্রচলিত তা নয়। ভারতের সুদূর কর্নাটক প্রদেশে উরালি উপজাতির মানুষও জুম চাষ করে থাকে। সেখানে একে বলা হয় ঝুম। উরালিরা দেখতে কতকটা সাঁওতালদের মতো। তাদের গায়ের রঙ কালো। চুল সাঁওতালদের মতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের সাথে তাদের চেহারার কোনো মিল নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা সবাই হলো মঙ্গোলীয় শাখাভুক্ত মানুষ। কিন্তু এরা তা নয়। সন্তু লারমা কি উরালিদের তার জুমল্যান্ডে ভারত থেকে আসতে দেবেন? কারণ তারাও তো করেন জুম পদ্ধতিতে চাষ। বিশেষ করে ধান চাষ। উরালিরা অবশ্য যথেষ্ট পরিমাণে বন্য ফলমূল আহরণ এবং পশুপাখি শিকার করে তাদের নিজেদের আহার্যের সংস্থান করে থাকে। আর যাপন করে অর্ধ যাযাবর জীবন। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ‘উপজাতি সংস্কৃতি’ সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এটা কি বাস্তবে সম্ভব?</em></p>
<p>উপজাতি সংস্কৃতি বন্য পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশে থাকছে না আর আগের মতো বন। যারা একসময় বনে বাস করত, তাদের সন্তানসন্ততিরা এখন লেখাপড়া শিখে অনেকেই চাচ্ছে শহরে বাস করতে। অর্থাৎ নগরজীবন গ্রহণ করতে। এ ছাড়া উপজাতিরা বিদেশি খ্রিষ্টান মিশনারিদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে খ্রিষ্টান ধর্ম। খ্রিষ্টান হওয়ার পর তারা অনুকরণ করতে চাচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে। অর্থাৎ উপজাতি মানুষ নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতি আর চাচ্ছে না ধরে রাখতে।</p>
<p>উপজাতি মানুষ বাংলা ভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া শিখছে। বাংলা হয়ে উঠেছে তাদের সাধারণ ভাষা। বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির পক্ষ থেকে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে (২০০৭)। এত বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। ‘আদি’ অর্থ হলো ‘মূল’ এবং ‘বাসী’ অর্থ ‘অধিবাসী’। সুতরাং আদিবাসী কথাটির অর্থ ধরা যায় দেশীয় লোক (Indigenous people)। সঙ্গত কারণে তাই প্রশ্ন উঠছে, আমরা অর্থাৎ বাংলাভাষী মুসলমান কি এ দেশে বিবেচিত হবো বহিরাগত হিসেবে? এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে একধরনের রাজনীতির প্রভাব। সেটাকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন দিতে পারি না। কারণ, সেটা হবে আমাদের জন্য আত্মঘাতী।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক উইলিয়াম ত্রুক (W Crooke) ১৯২৪ সালে &#8216;Islam In India&#8217; নামক বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বলেন, পূর্ব ও উত্তরবঙ্গে একসময় ছিল বহু বৌদ্ধের বাস। এই বৌদ্ধরা গ্রহণ করে ইসলাম। তাই বাংলা প্রদেশের উত্তর-পূর্ব ভাগে মুসলমানের সংখ্যা হতে পেরেছে এত বেশি। ত্রুকের মতকে অনেক দিক থেকে সমর্থন করা যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে মধ্য এশিয়ার তুর্কি মুসলমানরা এসে রাজ্য স্থাপন করেন। কিন্তু তাদের আসার অনেক আগেই সম্ভবত ইসলাম এ দেশে প্রচারিত হতে পেরেছিল। বাংলাদেশে দু’টি প্রাচীন জায়গা ছিল নওগাঁর পাহাড়পুর ও কুমিল্লার ময়নামতি। এই দু’টি জায়গায় আব্বাসীয় খলিফাদের মুদ্রা পাওয়া গেছে। পাহাড়পুরে পাওয়া গেছে খলিফা হারুন অর রশিদের স্বর্ণমুদ্রা। এ থেকে মনে হয়, আরব মুসলিম বণিকেরা এ দেশে আসতেন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। আর তাদের মাধ্যমেই প্রথমে হতে পেরেছিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইসলাম প্রচার।</strong></p>
<p>প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচারিত হয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে বাংলাদেশের মানুষের ছিল বাণিজ্য যোগাযোগ। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এ দেশের বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণে পেয়েছিল প্রণোদনা। তাদেরকে কেউ জোর করে মুসলমান করেনি। যেমন জোর করে ইসলাম প্রচারিত হয়নি মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মানুষের মধ্যে। তারা একসময় প্রধানত ছিল বৌদ্ধ এবং পরে গ্রহণ করে ইসলাম।</p>
<p>বাংলাদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে মানসিক দিক থেকে পার্থক্য ছিল। আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার মূলে আছে বাংলাভাষী মুসলমানের অবদান। বাংলাভাষী হিন্দু পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি। কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমান চেয়েছে। এটা সেই প্রাচীন বৌদ্ধ স্বাতন্ত্র্যবাদী মানসিকতার পরিচয়বহ। কিন্তু এই বিষয়ে আলোচনা না করে আলোচনা করতে ব্যস্ত উপজাতিদের কথা। যে আলোচনা পড়লে মনে হয় বাংলাদেশে বাংলাভাষী মুসলমান যেন একটা আগন্তুক জাতি। এই উপমহাদেশে মধ্য এশিয়া থেকে মানুষ বহুবার এসে সাম্রাজ্য গড়েছে। বাংলাদেশে কুশান সাম্রাজ্যের মুদ্রা পাওয়া গেছে। হতে পারে বাংলাদেশের উত্তর ভাগ একসময় ছিল কুশান সাম্রাজ্যেরই অংশ। মানবধারার দিক থেকে কুশানরা ছিলেন তুর্কি। ত্রয়োদশ শতাব্দীর যেসব মুসলমান বাংলাদেশ জয় করতে এসেছিলেন তারাও তুর্কি মানব ধারারই মানুষ। তুর্কি ফৌজরা স্ত্রীকে সাথে করে আনেননি। তারা এ দেশের কন্যাদের বিয়ে করে হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের মানবগোষ্ঠীরই অংশ; থাকেননি বিদেশি হয়ে। কিন্তু আজ প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাভাষী মুসলমান আসলে পরদেশি। আমরা এ ধরনের মিথ্যা ইতিহাস লেখার প্রতিবাদ না করে পারি না।</p>
<p>উপজাতি নিয়ে নানা রকম রাজনীতি হচ্ছে। খ্রিষ্টান মিশনারিরা উপজাতিদের করছে খ্রিষ্টান। তারা উদ্দীপ্ত করছে মুসলিমবিরোধী মনোভাব একটা বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। এটাকে সমর্থন করা যায় না। ব্রিটিশ শাসনামলে খ্রিষ্টান মিশনারিরা বাংলাদেশে প্রতাপশালী ছিল না। কারণ, ব্রিটিশ শাসকেরা মনে করত, মিশনারিদের প্রশ্রয় দিলে এ দেশের মানুষ এদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে পারে, যা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে এ দেশে ব্রিটিশরাজত্বের জন্য। পাকিস্তান আমলেও খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যকলাপ পরিচালিত হয়েছে অনেক সংযতভাবে। এর একটা কারণ ছিল সে সময়ের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ ছিল বিভিন্ন দেশে ইসলামী শক্তিকে সংগঠিত করে কমিউনিজম রোখা। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই।<br />
মিশনারিরা এখন বিশ্বজুড়ে ইসলামকে তাদের প্রতিপক্ষ ভাবছে। আর বিভিন্ন দেশে চাচ্ছে ধর্ম প্রচার করে ইসলামবিরোধী শিবির গড়তে। বাংলাদেশে উপজাতিদের তারা খ্রিষ্টান করছে এবং তাদের মনে গড়ে তুলছে ইসলামবিরোধী মনোভাব। এটা একটা বড় ধরনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির চক্রান্তেরই অংশ। অনেক রকম রাজনীতি হচ্ছে উপজাতিদের নিয়ে। বাংলাদেশে সাঁওতাল উপজাতি নিয়ে রাজনীতি করতে চাচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টি। তারা রাজশাহী শহরে গত মাসের ৯ আগস্ট বের করেছিল একটা বিরাট মিছিল।</p>
<p>এ অঞ্চলে বামপন্থিদের সাঁওতাল নিয়ে রাজনীতি নতুন নয়। পাকিস্তান হওয়ার পরে বাম নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানায় ঘটেছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ। সাঁওতাল রাজনীতির ফলে অনুরূপ কোনো সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটা অসম্ভব নয়। ভারতীয় অস্ত্র বাংলাদেশে যথেষ্ট অঘটন ঘটাতে পারে। ভারত চাচ্ছে আমাদের জাতিসত্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে। এর বিপক্ষে আমাদের দেশ, আমাদের জাতিসত্তার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের আত্মপরিচয় নিয়ে বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি কোনো গ্রন্থ রচনা করেছে বলে আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস নিয়ে খুব সামান্যই আলোচনা হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সব অধিবাসীকে বিবেচনা করা হবে বাঙালি হিসেবে। ১৯৭৩ সালের ৭ জুন সন্তু লারমার নেতৃত্বে চাকমারা গঠন করে শান্তিবাহিনী। ২০০১ সালের ৩১ মার্চ সন্তু লারমা গঠন করেন ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’। সংখ্যার দিক থেকে সাঁওতালরা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উপজাতি। এরপর আসে চাকমাদের নাম। সন্তু লারমা চাচ্ছেন চাকমা ও সাঁওতালদের এক করে রাজনীতি করতে। সাঁওতালরা সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে, কিন্তু এখন তারা বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া শিখছে। তারা সবাই বলতে পারে বাংলা। তা ছাড়া, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সাঁওতাল ভাষায় ঘটেছে প্রচুর বাংলা শব্দের অনুপ্রবেশ। চাকমাদের কোনো নিজস্ব ভাষা নেই। বাংলাই হয়ে উঠেছে তাদের মাতৃভাষা। কিন্তু তবুও তোলা হচ্ছে তথাকথিত আদিবাসীদের স্বতন্ত্র ভূভাগ গঠনের দাবি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ethnic-people-in-the-political-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15829</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:38:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15787</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায় জাতিসত্তা। বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। কেননা, এক জাতি চাপিয়ে দিতে চাইতে পারে, অন্য জাতির ওপর তাদের ভাষাকে। আর অন্য জাতি চাইতে পারে, এই চাপিয়ে দেয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে এর একাধিক নজির আছে।</p>
<p>ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সনের বিখ্যাত ভাষা জরিপ (Linguistic Survey of India, 1903-1928) থেকে দেখা যায়, ব্রিটিশ ভারতে তখন ভাষার সংখ্যা ছিল ১৭৯টি। আর উপভাষা বা ডায়ালেক্টের সংখ্যা ছিল ৫৪৪টি। সে সময়ে ভারতে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলত হিন্দি ভাষায়। হিন্দির পরেই স্থান ছিল বাংলা ভাষার। গ্রিয়ার্সন এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোকে প্রধানত চারটি বড় ভাষা পরিবারে বিভক্ত করেন। এরা হলো : দক্ষিণ এশীয় বা অস্ট্রিক (Austric), চীনা-তিব্বতি (Sino-Tibetan), দ্রাবিড় (Dravidian) ও ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার খুব বড়। গ্রিয়ার্সন একে এই উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তিনটি উপপরিবারে ভাগ করেন। এরা হলো ইরানীয় আর্য (Iranian-Aryan), ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryan), দরদ-আর্য (Dardic-Aryan)। তিনি বাংলা ও হিন্দি ভাষাকে স্থাপন করেন ভারতীয়-আর্য পরিবারে। বাংলা ভাষাকে গ্রিয়ার্সন যদিও হিন্দি ভাষার সাথে ভারতীয়-আর্য পরিবারে স্থাপন করেন, কিন্তু হিন্দির সাথে বাংলা ব্যাকরণের অমিল আছে অনেক। যেমন হিন্দিতে ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা যায় না, কিন্তু বাংলা ভাষায় যায়।</p>
<p><strong>এ দিক থেকে বাংলা ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায় দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষার সাথে। তামিল ভাষায় ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা চলে। দ্রাবিড় পরিবারের ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জোড়া লেগে নতুন ভাব প্রকাশকারী শব্দ গঠন। এ ক্ষেত্রে শব্দ দু’টি একত্রে মিলে যায় না। অর্থাৎ সন্ধি হয় না। এরকম জোড়ালাগা শব্দ বাংলা ভাষাতেও কিছু কিছু হতে দেখা যায়। যেমন, ছেলে এবং গুলি দু’টি পৃথক শব্দ। কিন্তু আমরা যখন বলি, ছেলেগুলি, তখন তা একটি তৃতীয় ভাবকে বোঝায়। এটাকে তুলনা করা চলে দ্রাবিড় পদ্ধতির সাথে। আমরা বাংলাতে ছেলেগুলি না বলে, বলতে পারি, ছেলেরা। এটা হলো আর্যভাষার পদ্ধতি। দ্রাবিড় ভাষায় থাকতে দেখা যায় ট ধ্বনির প্রাধান্য। বাংলা ভাষাতেও টি টা আমরা যথেষ্ট ব্যবহার করি। বাংলাদেশের পুরনো গ্রাম ও জনপদের নাম দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে অতীতে চলত দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই অভিমত প্রকাশ করেছেন তার বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা নামক বইতে। এমনিতে বস্তুগত সংস্কৃতির দিক থেকেও অনেক মিল আছে দ্রাবিড়ভাষী ও বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে। যেমন, দ্রাবিড়ভাষী মানুষ সিদ্ধ চালের ভাত খান। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত সিদ্ধ চালের ভাত খেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের মানুষ গ্রামে উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে থাকেন। তামিলভাষীরাও থাকেন একই রকম উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে। তামিলরা তরি-তরকারি কোটেন বঁটি দিয়ে। বাংলাদেশেও মানুষ একইভাবে বঁটির ব্যবহার করে। উত্তর ভারতের মানুষের মতো ছুরি দিয়ে তরি-তরকারি কাটেন না।</strong></p>
<p>এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৩৭ সালে প্রথম ভাষা নিয়ে রক্তপাত ঘটেছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। ১৯৩৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ-ভারতে ১১টি প্রদেশ ছিল। সে সময় প্রাদেশিক আইনসভার যে নির্বাচন হয়, তাতে ১১টি প্রদেশের মধ্যে আটটিতে কংগ্রেস জয় লাভ করে মন্ত্রিসভা গঠন করে। কংগ্রেস হাইকমান্ডের আদেশ অনুসারে এই আটটি প্রদেশে হিন্দি ভাষা স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়। মাদ্রাজ প্রদেশে তামিলভাষীরা করেন-এর প্রতিবাদ। তিন বছর ধরে চলেছিল প্রতিবাদ বিক্ষোভ। এ সময় একটি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ফলে নিহত হন দু’জন। এটাই এই উপমহাদেশে ভাষার কারণে প্রথম আত্মাহুতি দান। এটা ঘটেছিল ১৯৫২ সালে ঢাকায় গুলি চালাবার প্রায় ১৫ বছর আগে অখণ্ড ভারতে। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা আটটি প্রদেশেই ইস্তফা দেয়। কংগ্রেস ইস্তফা দেয়, কারণ সে চায় না ব্রিটিশ ভারতের সরকারের সাথে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সহযোগী হতে। কংগ্রেস সরকার মাদ্রাজে ইস্তফা দেয়ার পর, মাদ্রাজের গভর্নর জেনারেল Lord Erskine ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদ্রাজের স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো আইন রদ করেন। মাদ্রাজে যখন বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো শুরু হয়, তখন মাদ্রাজের আইনসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপাল আচারী। গুজব রটে, আচারী যেহেতু ব্রাহ্মণ, তাই তিনি চাচ্ছেন, সংস্কৃতবহুল হিন্দি ভাষা তামিলদের শেখাতে। আর সেই সঙ্গে চাচ্ছেন, তামিলভাষীরা ধীরে ধীরে ত্যাগ করুক তাদের মাতৃভাষাকে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে উদ্ভব হয় ব্রাহ্মণবিরোধী দ্রাবিড় মুনাত্রা কাজাগাম নামক দলের, যা পরে মাদ্রাজের রাজনীতিতে হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক দল। এ সময় তামিলভাষী মুসলমানেরা যোগ দিয়েছিলেন হিন্দিবিরোধী আন্দোলনে।</p>
<p>অন্য দিকে, যেসব মুসলিম পরিবারে উর্দু ভাষা চলত, তারা নেন হিন্দি ভাষার পক্ষ। ১৯৬৫ সালে ভারতের কংগ্রেস সরকার চায় হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করতে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে (বর্তমান নাম তামিলনাড়–) দেখা দেয় প্রচণ্ড হিন্দিবিরোধ বিক্ষোভ। একটি মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ৬৮ জন। জঙ্গি-জনতা পুলিশকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ চালায়। যার ফলে দু’জন পুলিশের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী এ সময় ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, হিন্দিকে এখনোই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে না। ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। শাস্ত্রী মারা যান ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে। তার মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী হন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট আইন পাস করে, হিন্দির সাথে ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, পাকিস্তান হয়েছিল বলেই সৃষ্টি হতে পারে ভাষা সমস্যার। কিন্তু স্বাধীন ভারতেও দেখা দিয়েছে ভাষার সমস্যা। আরেকটি দৃষ্টান্ত নেয়া যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব ছিল একটা বিরাট প্রদেশ। ১৯৪৭ সালে বাংলার মতো পাঞ্জাব প্রদেশকেও ভাগ করা হয়। পাঞ্জাবের পশ্চিম ভাগ পড়ে পাকিস্তানে আর পূর্বভাগ পড়ে ভারতে। পাঞ্জাবের যে অংশ ভারতে পড়ে, তাতে শিখ পাঞ্জাবিরা চায় পাঞ্জাবিকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করতে। কিন্তু হিন্দু পাঞ্জাবিরা তাতে রাজি হয় না। শিখদের এই আন্দোলন ১০ বছর চলার পর ১৯৬৬ সালের ১ নভেম্বর পূর্ব পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে দু’টি প্রদেশ করা হয়। উত্তর ভাগ হয় পাঞ্জাবি সুবা আর দক্ষিণ ভাগ হয় হরিয়ানা প্রদেশ। উত্তর ভাগের প্রাদেশিক সরকারের সরকারি ভাষা হয় গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা। আর হরিয়ানা প্রদেশের সরকারের প্রাদেশিক ভাষা হয় দেবনাগরী অক্ষরে লেখা হিন্দি ভাষা। পরে শিখরা চান স্বাধীন হতে। ইন্দিরা গান্ধী কঠোর হস্তে শিখ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করেন। এতে শিখরা হয়ে ওঠেন খুবই ক্ষুব্ধ। দু’জন শিখ দেহরক্ষী ইন্দিরা গান্ধীকে তার সরকারি ভবনের প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করেন (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪)। দিল্লিতে বাধে হিন্দু শিখ দাঙ্গা। দিল্লির শিখরা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর সাথে জড়িত ছিলেন না। তারা দাঙ্গার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন না। এই দাঙ্গায় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মারা যান প্রায় চার হাজার শিখ।</strong></p>
<p>ভারতে ভাষা সমস্যা ছিল এবং আছে। কেউ বলতে পারে না, আবার তা প্রবল হয়ে উঠবে কি না। সাবেক পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছে অনেকের মতে ভাষার দ্বন্দ্বের কারণে। কিন্তু সাবেক পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন একটা ব্যর্থ আন্দোলন ছিল না। উর্দুর সাথে বাংলা পেতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। কিন্তু ভারতে হিন্দির সাথে ইংরেজিকে রাখা হয়েছে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। কোনো ভারতীয় ভাষাকে করা হয়নি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের জন্য হিন্দির সাথে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এখানে থেকে গেছে একটা বড় রকমের ফাঁক।</p>
<p>এসব কথা মনে আসছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যা এখন পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলে কিছু কি কোথাও আছে, না হতে পারে? যেমন কোথাও নেই আন্তর্জাতিক দেশপ্রেমের অস্তিত্ব। আসলে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে সে সম্পর্কে ইউনেসকো কিছু বলেনি। ইউনেসকো বলেনি ভারতে ভাষা নিয়ে সঙ্ঘাত ঘটার কথা। সে কেবলই বলেছে পাকিস্তানে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ভাষার জন্য মানুষের শাহাদত বরণের কথা। যেটা আমার কাছে মনে হয় একদেশদর্শী এবং ইতিহাস না জানার ফল।<br />
আমাদের দেশে আমরা করেছিলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। আমাদের আন্দোলন ছিল না মাতৃভাষার আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর মাতৃভাষা আন্দোলন সমার্থক নয়। কিন্তু এখন যেন সেটাই করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ১৯৫২ সালের পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট জটিল। উর্দু বনাম বাংলা তখন সরাসরি উচ্চারিত হয়নি। খাজা নাজিমুদ্দিন জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন ঢাকায়। কিন্তু তার পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু তার মাতৃভাষা বাংলা ছিল না, ছিল উর্দু। ঢাকায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চলেছিল গুলি। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২৪ ফেব্রুয়ারিতে তদানীন্তন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে অবস্থিত হায়দ্রাবাদ শহরের এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে উর্দুই হওয়া উচিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব বাংলায় অনেক মানুষ ছিলেন উর্দুর পক্ষে। তবে অধিকাংশ মানুষই চেয়েছিলেন উর্দুর সাথে বাংলাকে করা হোক অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। তাই আন্দোলনের আওয়াজ ছিল উর্দু বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর সাথে বাংলা চাই।</p>
<p><strong>এখন এই ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। পাঠ্যবইতে যা লেখা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, মানুষ যেন হয়ে উঠেছিল উর্দুবিরোধী। সমগ্র পাকিস্তানের মানুষের ওপর পূর্ব বাংলার মানুষ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল বাংলা ভাষার কর্তৃত্ব। কিন্তু ১৯৫২ সালে এই মনোভাব বিরাজ করছিল না।</strong><br />
<strong>ভাষাসৈনিক বলতে ঠিক যা বোঝায়, আমি তা ছিলাম না। তবে এ সময় আমি ছিলাম ছাত্র। ছাত্ররা করেছিল ভাষা আন্দোলন। তাই সে সময়ের মনোভাব সম্পর্কে আমি নিশ্চয় কিছু বলার অধিকার রাখি। যারা ভাষাসৈনিক হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকের সাথে ছিল আমার পরিচয়। যেমন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (শেলী), এস এ বারী এটি, মুহাম্মদ সুলতান, লতিফ চৌধুরী, সাদেক খান প্রমুখ। হাবিবুর রহমান, এটি বারী, সুলতান- এদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম রাজশাহী সরকারি কলেজে। এরা তিনজনই পড়তেন রাজশাহী কলেজে। পরে এরা যান ঢাকায় এমএ পড়তে। লতিফ চৌধুরী এবং সাদেক খান ছিল আমার স্কুলজীবনের সাথী। এদের পিতারা ছিলেন একসময় রাজশাহীতে চাকরি উপলক্ষে। লতিফ চৌধুরীর কথা এখন অনেকেই জানেন না। ইনি ছিলেন খুবই ভালো ছাত্র। ইনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক হন। এরপর কোনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি পেয়ে চলে যান সে দেশে। ইনি বাংলা ভাষা আন্দোলনে জেল খাটেন। লতিফ চৌধুরী ও সাদেক খান উভয়েই ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাদেক খানও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। কিন্তু রাজনীতি করতে গিয়ে ছাড়েন পড়াশোনা। গ্রহণ করেন সাংবাদিকের বৃত্তি।</strong></p>
<p>যেসব ভাষাসৈনিককে চিনতাম, তাদের মধ্যে হাবিবুর রহমানই হলেন সবচেয়ে খ্যাতনামা। ইনিও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। জীবনের সব পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ইনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কেবল ভাষা নিয়ে রাজনীতি করেননি। করেছেন বাংলা ভাষার চর্চা। সঙ্কলন করেছেন বাংলা ভাষার প্রথম ভাব অভিধান, যথাশব্দ। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঠিক হয়েছিল ছাত্ররা আমতলা থেকে তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের গেট দিয়ে ১০ জন ১০ জন করে স্কোয়াড করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। প্রথম স্কয়াডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান শেলী। আমি তখন ঢাকায় না থাকলেও পরে অনেকের কাছেই অনেক কিছু শুনেছিলাম। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কিন্তু যারা শাহাদত বরণ করেছিলেন, তারা কেউই ছিলেন না ছাত্র মিছিলে। তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। গুলি লেগেছিল তাদের গায়ে। তবে তাদের মৃত্যু বৃথা যায়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিণত হয় বিরাট গণ-আন্দোলনে। আর এই গণ-আন্দোলন কোনো ভাষাসৈনিকের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। আন্দোলন হয়ে উঠেছিল স্বয়ং চালিত। হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল সারা দেশে পথে। আমি জীবনে অনেক আন্দোলন দেখেছি। কিন্তু এত বিরাট আন্দোলন আর প্রত্যক্ষ করিনি ইতঃপূর্বে। এই আন্দোলন গৌরব করারই মতো।<br />
কিন্তু সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্র আজ আর নেই। এখন বাংলাদেশ একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলা ভাষার উন্নয়নে আর কোনো রাষ্ট্র প্রতিবন্ধক হতে পারে না। এখন যা প্রয়োজন, তা হলো, কেবল ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের নিজের প্রচেষ্টা। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিকতাবাদী বুদ্ধিজীবীর অভাব নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিকতাবাদ যেন চাপা পড়ে যেতে চাচ্ছে জাতীয়তাবাদের নিচে। আমরা চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি ১৫টি রিপাবলিক নিয়ে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে পড়তে। দুনিয়ার সর্বহারারা এক হতে পারল না। প্রতিটি জাতি যেন এখন পৃথক পৃথকভাবে বাঁচতে চাচ্ছে। পৃথক পৃথকভাবে যেন হতে চাচ্ছে সুখী ও সমৃদ্ধ। এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদেরও হতে হবে স্বাবলম্বী।</p>
<p><em>এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিতে অনেককে অনেক কথা বলতে শুনলাম, যা আমাকে বিস্মিত করেছে। যেমন বলতে শুনলাম, আমাদের উচিত হবে না বিদেশী ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ। অথচ চীনারা তাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রচুর গ্রহণ করছেন; তাদের ভাষাকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। ইংরেজি ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে প্রচুর বিদেশী শব্দকে আপন করে নিতে পারার কারণে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা এ দেশে এসে কথা বলতে শুরু করেন মিশ্র ভাষায়। যাকে বলা হতো Hobson-Jobson। এই হবসন-জবসন ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় গৃহীত হয়েছে প্রচুর শব্দ। একটি হিসাব অনুসারে প্রায় ৭০০ এর কাছাকাছি, যা ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা যদি ইংরেজি ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করি, তবে বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারও বাড়বে। বাড়বে ভাব প্রকাশের শক্তি। </em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15787</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানাগুলোর রূপান্তর করবে কে?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:17:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15783</guid>

					<description><![CDATA[শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্কহীনতার সমস্যা শুধু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং প্রকটভাবে উপস্থিত আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিষয়ে পড়া স্নাতকদের বেলাতেও। চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের অনেকাংশে এখন চাহিদা নেই। সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্কহীনতার সমস্যা শুধু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং প্রকটভাবে উপস্থিত আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিষয়ে পড়া স্নাতকদের বেলাতেও। চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের অনেকাংশে এখন চাহিদা নেই।</p>
<p>সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপমতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ শতাংশ স্নাতক বেকার। কী দেশ, কী শিক্ষাব্যবস্থা—অর্ধেকই বেকার!</p>
<p>বিআইডিএস জরিপে উঠে আসে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৪২ থেকে ৪৮ শতাংশই বেকার অবস্থায় রয়েছেন।</p>
<p>অন্য জরিপে দেখা গেছে, তাঁরা শিক্ষা সমাপ্তির পরে প্রায় তিন-চার বছর বেকার থাকেন। বেকার অবস্থায় থাকা তরুণর মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি বিএ পাস করেছিলেন। ২৩ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে স্নাতক অর্জন করেছেন। লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্টে পাস করেছেন প্রায় ২১ শতাংশ। বেকারদের ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পাস করেছেন ইসলামের ইতিহাস এবং বাংলায়। তবে ইংরেজি, অর্থনীতি ও হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক করা শিক্ষার্থীরা কম বেকার হয়েছেন। অর্থনীতি বা ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ের এবং হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও বেকারত্বের শিকার হয়েছেন, তবে কম।</p>
<p>এটা হাস্যকর যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পলিটিক্যাল সায়েন্সে পড়েন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর হন এমন দেশে, যেখানে দিনের ভোট রাতে হয়, সব পর্যায়ের নির্বাচনে ভোট চুরির ঘটনা ঘটে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য নেই, এমনকি নেই কোনো উপলব্ধিও।</p>
<p>নির্বাচন ও ভোটাধিকারহীন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দেশে রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়ে হাজারে হাজারে তরুণ বেকার থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সমাজ, প্রতিষ্ঠান, সরকার ও রাষ্ট্রের মৌলিক ধারণাও অনেক শিক্ষার্থীর তৈরি হয় না।</p>
<p>এ রকম বহু মানহীন বিষয়ে, নিম্নস্তরের কারিকুলামে, অযোগ্য শিক্ষকের অধীনে এবং ক্লাসহীন শিক্ষায়, চাকরি বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক না থাকা বিষয়ে পড়িয়ে আমাদের ছেলেমেয়েকে শিক্ষার নামে সস্তা সার্কাসে ঠেলে দেওয়ার মহা আয়োজন হয়েছে।</p>
<p>শিক্ষার নামে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হচ্ছে, কারা পড়াচ্ছেন, কেন পড়ানো হচ্ছে—এসবের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নেই বললেই চলে। প্রায়ই দেখা যায়, চাকরির পরীক্ষায় কেউ পাস করে না বলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল হয়।</p>
<p>বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি মতে (১১ ডিসেম্বর ২০২৩), প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কেউই কাট নম্বর পায়নি বলে (যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায়) নবম গ্রেডের সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদের নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এ রকম প্রায়ই হয়।</p>
<p>হাজারে হাজারে, লাখে লাখে চাকরির আবেদন কিন্তু দক্ষতাসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থী নেই। এটা জিপিএ-নির্ভর অসার শিক্ষাব্যবস্থার অনিবার্য ফল! এমন খবর দেখলে মনে হয়, শিক্ষাব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে গেছে।</p>
<p>সহজ প্রশ্ন, উদার মূল্যায়ন, অটো পাস, জিপিএ-৫, প্রশ্নপত্র ফাঁসের চর্চা প্রতিষ্ঠিত করে, গণিত ও বিজ্ঞানশিক্ষাকে সংকুচিত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্কস পাওয়া শিক্ষার্থী মাত্র ১০ শতাংশের আশপাশেই থেকেছে। অথচ যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নেন, তাঁদের অধিকাংশই জিপিএ-৫ বা এর খুব কাছাকাছি পাওয়া।</p>
<p>আমাদের বেসরকারি খাতে দক্ষতাকেন্দ্রিক চাকরির বাজারে বিদেশিরা এমন উচ্চ হারে ঢুকছে, যা দেশের চাকরির বাজার ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুকূল নয়।</p>
<p><strong>উচ্চশিক্ষিত বেকার দেশের জন্য বড় বোঝা। কলেজ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে গোনা বিষয় বাদে অন্য সব বিষয়ে পড়ে এসব পড়ালেখা চাকরিতে প্রয়োগ করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ চাকরি না পেয়ে নিজেদের পড়ার সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয়ে ব্যবসা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বাণিজ্য করে</strong><strong>, </strong><strong>উদ্যোক্তা হয়ে আয় করেন</strong><strong>, </strong><strong>যার জন্য আদৌ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে কি না</strong><strong>, </strong><strong>সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।</strong></p>
<p>কথা ছিল, বিদেশিরা নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির খাতে দেশের চাকরি বাজারে দু-তিন বছরের জন্য ঢুকবেন, এ সময়ে নলেজ ট্রান্সফার করে স্থানীয় রিসোর্স ডেভেলপ করা হবে। কর্মদক্ষতা এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো কার্যকর কৌশলগত পরিকল্পনা নেই।</p>
<p>বাংলাদেশে এত এত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অথচ দেশে রাজনৈতিক সমস্যার অন্ত নেই এবং মূলত প্রায় সব সমস্যাই রাজনৈতিক। দেশে এত ইতিহাসবিদ অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিথ্যার মধ্যে বড় হচ্ছে। দেশে এত সমাজবিজ্ঞান কিংবা সমাজকল্যাণ স্নাতক, অথচ সমাজে কার্যকর কোনো কল্যাণ নেই।</p>
<p>দেশে এত এত সমাজবিজ্ঞানী, সমাজে তার প্রভাবের লেশমাত্র নেই। দেশে এত আইন পড়ুয়া বিজ্ঞ আইনজীবী, অথচ আইনের শাসন নেই, জুলুমের আইনি প্রতিকার নেই। অর্থনীতিবিদের অভাব নেই, অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পায় না জনগণ। তাহলে এই পড়াশোনার ফায়দা কী?</p>
<p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোনো চাহিদা সমাজ ও রাষ্ট্রে নেই। বাস্তবতা হচ্ছে শুধু পলিটিক্যাল ক্যাডার সৃষ্টির জন্য এসব বিষয় চালু আছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করে, চাঁদাবাজি মস্তানি মারামারি করে বেড়ান। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শেষে এঁরা জাতীয় বোঝা, এঁদের প্রধান ব্যবসা হয় সরকারি তদবির, ঘুষের দালালি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি নিয়ে চুরি করা।</p>
<p>এক দল আছে যেকোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যায়, দক্ষতার সঙ্গে এদের কোনো সংযোগ ঘটে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে গণহারে বিবিএ, এমবিএ কোর্স। এসব কোর্সের আসনের সঙ্গে চাকরির বাজার বা  ইন্ডাস্ট্রি-চাহিদার কোনো ম্যাপিং নেই।</p>
<p>প্রথম আলোর ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতায় নানা সময়ে তরুণদের সফলতা ছাপানো হয়। সেখানে দেখা যায়, তরুণদের কেউ বিরিয়ানি রান্না করে পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ খাতা বানিয়ে বিক্রি করছেন, কেউ শিঙাড়া-চপের দোকান দিয়েছেন, কেউ ক্যাকটাস বিক্রি করছেন, আবার কেউ মাছ-মাংস কেটে-ধুয়ে রান্নার উপযোগী করে সরবরাহ করছেন। কেউ ভারত-পাকিস্তান থেকে কাপড় এনে, চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য এনে ফেসবুক লাইভে এসে বিক্রি করছেন।</p>
<p>কাহিনিগুলো অসংখ্য বেকার তরুণকে উৎসাহিত করবে সন্দেহ নেই।  যাঁরা এসব কাজ করছেন, তাঁদের সবাই উচ্চশিক্ষিত বেকার। সৎ থেকে করা প্রত্যেকটা কাজই সম্মানের, কর্ম তৈরির জন্য এবং সমাজের জন্য দরকারি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় কেন চাকরির চাহিদা না থাকা বিষয়ে এত বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি করছে, পাবলিক মানি নষ্ট অর্থাৎ আসন নষ্ট করবে কেন?</p>
<p>আসলে দক্ষতার বিপরীতে শিক্ষার নাম শুধু অপশিক্ষায় নামিয়ে দিয়ে ছেলেমেয়েদের বেকারত্ব উপহার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা উদ্দেশ্যহীন বিষয়ে পড়ছেন, আসলে অনেকে না পড়েই পাস করছেন।</p>
<p><strong>জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার উৎপাদনকারী বিষয়গুলোকে দেশের মাত্র কয়েকটি কলেজে সংকুচিত করে, আসনগুলোতে বাজার চাহিদানির্ভর শিক্ষা (লেখকের চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ বইতে আলোচ্য) কারিকুলামনির্ভর শিক্ষার নতুন নতুন বিষয় আনা লাগবে, চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে আসন বাড়াতে হবে—যেখানে চাকরির বাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা প্রাধান্য পাব। কারিগরি ও শিল্প দক্ষতা উৎপাদনকে সেন্টার পয়েন্ট ফোকাস করা হবে।</strong></p>
<p>এমনকি সামাজিক বিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, ইংরেজি ও বাংলার মতো বিষয়ে পড়লেও শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা তৈরি জন্য দরকারি আধুনিক কারিগরি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং ইন্ডাস্ট্রি ট্রেনিং দিতে হবে।</p>
<p>আমাদের শিক্ষা দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। অন্তত আরেকটি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি দল কি ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থার দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের প্রতিজ্ঞা করবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/who-will-transform-the-factories-of-highly-educated-unemployed-people/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15783</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বেকারদের জন্য নতুন চাকরি তৈরির দায়িত্ব কার?</title>
		<link>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 16 Apr 2025 16:33:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15768</guid>

					<description><![CDATA[চাকরির বাজারে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালকের ১৫ পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৪৫ জন। ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১৩ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮১টি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল প্রায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>চাকরির বাজারে হাহাকার চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালকের ১৫ পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭২ হাজার ৪৫ জন। ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১৩ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮১টি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল প্রায় ৩ লাখ। বেকারত্বের এমন বিপর্যয়কারী পরিস্থিতি নিয়ে সরকার দৃশ্যত নির্বিকার।</p>
<p>দেশের সবচেয়ে বড় চাকরির বিজ্ঞাপনের সাইট বিডিজবস-এর তথ্যমতে, তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থানে আগস্ট ২০২২-এর পর নেতিবাচক ধারা শুরু হয়েছে; কমছে চাকরির বিজ্ঞপ্তি, শূন্য পদ এবং বিজ্ঞাপন দানকারী কোম্পানির সংখ্যাও।</p>
<p><strong>২০২২ সালের শেষ চার মাসে, পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় চাকরির বিজ্ঞাপনের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ ও শূন্য পদ কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। এ সময় কর্মী খোঁজা কোম্পানির সংখ্যা কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালে বিডিজবস সাইটে তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ২৫৫টি কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। মোট চাকরির পদসংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৪৮, শূন্য পদ ৫ হাজার ৩৯৩। যদিও ২০২১ সালের শেষ চার মাসে বিডিজবস সাইটে তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ৩৫৮টি কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাকরির পদসংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২০০, শূন্য পদ ছিল ৬ হাজার ৮১০।</strong></p>
<p>বিডিজবসের চাকরির বিজ্ঞাপন কমার হার, পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। টানা ১৩ মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর গত সেপ্টেম্বরে দেশে রপ্তানি আয় কমে। পাশাপাশি আছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, ডলারের উচ্চমূল্যে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়া, এলসি বন্ধ ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ সংকট। তবে সরকার সবকিছুই যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মন্দার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা থাকলেও উন্নত বিশ্বে করপোরেট লভ্যাংশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং বেকারত্বের হার রেকর্ড পর্যায়ে কম। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতসহ সার্বিক বেকারত্ব পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ডলার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা, ঋণপত্র সংকটও দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দা, সরকারের উচ্চ ঋণ ও খোলা বাজারে ডলার বিক্রয়জনিত তারল্য সংকট, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ঠকিয়ে ঋণ খেলাপিদের একতরফা সুবিধা দানের কাঠামোগত সমস্যা।</p>
<p><strong>বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার, সঙ্গে শুরু হয়েছে স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমবাজারের বেকারত্ব। একদিকে কর্ম তৈরির সরকারি কৌশল নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডলার-সংকট, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ খাতে পাচার এবং কেলেঙ্কারিজনিত মন্দার থাবা। দক্ষতা তৈরিতে শিল্পে ও শিক্ষালয়ে ট্রেনিং পরিকল্পনা নেই। দেশের বেকারত্বের কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও চাকরি তৈরির মাসিক ড্যাশবোর্ডও নেই। ফলে সরকার ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে।</strong></p>
<p>বাংলাদেশের চাকরি বাজারে আগে থেকেই দক্ষ জনবলপ্রাপ্তির সমস্যা রয়েছে। বাজার চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার কোর্স-কারিকুলামের সংযোগ স্থাপিত হয়নি বলে এক পদের বিপরীতে শত শত আবেদনকারী থাকেন, কিন্তু যোগ্য ও দক্ষ রিসোর্স পাওয়া যায় না।</p>
<p>বরং আবেদনপত্র নিরীক্ষণে অপচয় হয় সময় ও অর্থ। তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রায় সব শিল্পই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। অটোমেশন বাড়ছে, নিম্ন দক্ষতার চাকরি কমছে, ঘটনাটা এখনই ঘটতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় নতুন শিল্প চাহিদার দক্ষতার ভিত্তিতে একাডেমি ও ইন্ডাস্ট্রির যৌথ সমন্বয়ে দ্রুত দক্ষ শ্রমিক তৈরির রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। একটা নিরবচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি শ্রমিকপ্রতি মাথাপিছু রেমিট্যান্সও বাড়বে। সময়ের সঙ্গে কারিগরি দক্ষ চাকরি বাড়ছে, অদক্ষ কিংবা স্বল্প দক্ষ চাকরি কমছে। দেশে ও দেশের বাইরে এই পরিস্থিতির সুবিধা নিচ্ছে বিদেশিরা। অভ্যন্তরীণ শিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিক—তিন ক্ষেত্রেই দক্ষতার চাহিদা প্রযোজ্য। বিশ্বে যুদ্ধ ও মন্দা না হলেও শ্রমবাজারে দক্ষতার এই রূপান্তর ঘটতেই থাকবে।</p>
<p>দেশের প্রায় ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ শ্রমবাজার অপ্রাতিষ্ঠানিক। ফলে চাকরি বাড়াতে বেসরকারি খাতে সত্যিকার বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ দরকার, এমন স্বচ্ছ উদ্যোগ যেখানে বিনিয়োগের নামে ঋণ নিয়ে সেটা পাচার কিংবা ভোগে ব্যয় হবে না। সরকারকে ক্ষুদ্র, এসএমই ও বৃহৎ ব্যবসা ও শিল্পের ভালো ব্যবসায়ীর ডেটাবেইস তৈরি করতে হবে, যাঁরা ঋণ নিয়ে কিস্তি ফেরত দেন ও ব্যবসা করেন। তথ্যশালার আলোকে ক্রেডিট রেটিং-ভিত্তিক আধুনিক ঋণদান ব্যবস্থা দরকার। ব্যাংক ঋণ দানের ডিজিটাল ফিনটেক সমাধান ও আর্থিক তথ্যনির্ভর নতুন ডিজিটাল কৌশল বের করাও জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, ক্ষুদ্র বা ব্যাস্টিক অর্থনীতির চাকরি বাঁচানো মন্দাকবলিত অর্থনীতির বড় কাজ। প্রশাসনের দুর্নীতি ও সরকারের অপখরচের লাগাম টেনে ধরে সামাজিক নিরাপত্তা ও চাকরি বাড়ানোর উদ্যোগ চাই।</p>
<p>বর্তমানে আমানত প্রবাহ কম ও তারল্য সংকট পরিস্থিতিতে ছয়-নয় সুদের হার কাজ করছে না বলে এটা উঠিয়ে, ব্যাংক ঋণ পাচার ও গায়েবের দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করে অর্থবহ শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। কর্মী ছাঁটাই না করার শর্তে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে হবে এবং খেলাপি ঋণ না করা ব্যবসা ও শিল্প মালিকদের সহজ শর্তের ঋণ প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। অর্থাৎ বর্ধিত বেকারত্বের ধারা থামাতে মুদ্রানীতিকে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ফ্লেক্সিবল করতে হবে।কোম্পানি গুলোতে কর্মরত জনসম্পদকে নতুন মেশিনে, রোবোটিক অপারেশন পরিচালনায় দক্ষ করার জন্য ম্যাসিভ প্রোগ্রাম দরকার। আধুনিক অটোমেশন করা উৎপাদন পরিবেশের সঙ্গে তাল মেলাতে শ্রমিকদের দক্ষতা অর্জনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা, ট্রেনিং বাজেট ও ট্রেনিং জরুরি।</p>
<p>পাশাপাশি বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে ধীরে ধীরে বিদেশি শ্রমিক কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে, দেশীয় শ্রমিক নিয়োগে গুরুত্বারোপ করা চাই। অবশ্যই নতুন কর্মদক্ষতার মানবসম্পদ বিদেশ থেকে আনতে হবে এবং সেখানেও দক্ষতা হস্তান্তরের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার মোট শ্রমবাজারের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশের নিয়োগদাতা। বর্ধিত বেকারত্বের সমস্যার মুখে সরকারি শূন্য পদে নিয়োগের হার বৃদ্ধি করা দরকার। সেবা খাতে মাথাপিছু নিয়োগের কর্মসংস্থান বান্ধব বাজেটীয় কৌশল দরকার। মাথাপিছু শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা কর্মী নিয়োগ বাড়িয়ে সরকারি কর্মসংস্থানকে অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। তবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ায়, প্রশাসন অদক্ষ ও অযোগ্য কর্মচারী ও কর্মকর্তার ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে!</p>
<p>সরকারি নিয়োগে তরুণদের দুটি দাবি উল্লেখযোগ্য। কোটার দৌরাত্ম্য ও বেকারদের কাছে চাওয়া আবেদন ফি’র অন্যায্যতা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী ও পোষ্য কোটা মিলে ছিল ৮০ শতাংশ। ২০ শতাংশ পুরুষ কোটার পরে মেধা কোটার কার্যকর হার শূন্য। এমন সমস্যা রেল, ডাক বিভাগসহ আরও কিছু খাতে। রাষ্ট্রীয় নিয়োগের নামে অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগের এমন সাক্ষাৎ প্রতারণা অর্থহীন। নারী ও পোষ্য কোটার ৮০ শতাংশের পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নাটক সাজানোর অর্থ হচ্ছে, লাখ লাখ বেকার চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে আবেদন ফি নেওয়ার ব্যবসা জারি রাখা। এই দুর্বৃত্তপনা বন্ধ হোক! চাকরিতে কয়েক দশকের নারী অগ্রাধিকার চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নারীরা এখন শিক্ষায় ও চাকরিতে এমনিতেই বেশ এগিয়ে আছে। তাই তাঁদের ২০ শতাংশের বেশি কোটা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। প্রাথমিকের শিক্ষকেরা এখন ভালো বেতন পান। তাঁদের সন্তানদের জন্য পোষ্য কোটার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই’ (২৯ ডিসেম্বর ২০২২ প্রথম আলো)। অগ্রহণযোগ্য কোটা বাতিল, সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি নেওয়ার ব্যবসা বন্ধ, সীমিত হলেও চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা চালু, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নম্বর প্রকাশসহ চাকরি প্রার্থীদের ন্যায্য দাবি মানা দরকার।</p>
<p><strong>বেকারত্বের মিছিলে নতুন সমস্যা, তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক নিয়োগ কমা। ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প মোট ৩ হাজার ৫০০টি রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনকারী কারখানার তথ্য সংগ্রহ করে দেখিয়েছে, নারী শ্রমিকদের হার ৫৮ শতাংশ ও পুরুষদের ৪২ শতাংশ। অথচ একটা সময় নারী শ্রমিক প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল। করোনাকালে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্যস্ফীতিতে শহরে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে, গরিব মানুষ শহর ছাড়ছে বলে পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক সরবরাহ কমছে। আছে কারিগরি সমস্যা। রোবট, কাটিং মেশিন, লেজার মেশিন, অটোমেটিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারীদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেওয়া হয় না বলে, নারীর তুলনায় পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের হার বাড়ছে। কমবয়সী নারীর প্রখর আলো, গরম, মাইক্রো ফাইবারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘ শ্রমঘণ্টার শ্রমঘন কাজে নারীর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ক্ষতি বাড়ছে বলে নারীরা পোশাক শিল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন। প্রান্তিক অর্থনীতির বর্ধিত নারী বেকারত্ব দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে শোচনীয় করবে। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান দরকার।</strong></p>
<p>বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার, সঙ্গে শুরু হয়েছে স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমবাজারের বেকারত্ব। একদিকে কর্ম তৈরির সরকারি কৌশল নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ডলার-সংকট, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ খাতে পাচার এবং কেলেঙ্কারিজনিত মন্দার থাবা। দক্ষতা তৈরিতে শিল্পে ও শিক্ষালয়ে ট্রেনিং পরিকল্পনা নেই। দেশের বেকারত্বের কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও চাকরি তৈরির মাসিক ড্যাশবোর্ডও নেই। ফলে সরকার ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে।</p>
<p>বেকারত্বের সরকারি সংখ্যা অযৌক্তিক, এই দিয়ে ফলপ্রসূ কৌশল তৈরিও অসম্ভব। বেকারত্বের সরকারি সংখ্যাও রেকর্ড করেছে। মধ্যবিত্ত দেশগুলোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য বেকার ভাতা, বাংলাদেশে এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। জীবিকা বাঁচাতে না পারলে অর্থনীতি কীভাবে বাঁচবে, এই প্রশ্নের উত্তর কাঠামোগতভাবে খুঁজতে হবে সরকারকে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/who-is-responsible-for-creating-new-job-sectors/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15768</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের দেশ ও সার্বভৌমত্ব ভাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 27 Feb 2025 12:01:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15554</guid>

					<description><![CDATA[ক’দিন আগে পত্রিকার একটি খবর চোখে পড়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলিম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে। তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যক্রম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ক’দিন আগে পত্রিকার একটি খবর চোখে পড়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলিম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে। তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যক্রম শহীদদের অবমাননার শামিল। হীন এই কার্যক্রমের জন্য এদের নেতা ও কর্মীদের শাস্তি দেয়া উচিত।</p>
<p>১৯৭১ সালে আমি দেশে ছিলাম না। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে আমি চলে যাই কলকাতায়। আর সেখানেই কাটে ১৯৭১ সাল। কলকাতা থেকে দেশে ফিরেছিলাম ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দেশের বহু ঘটনাই কলকাতায় বসে যথাযথভাবে অবহিত হতে পারিনি। অনেক ঘটনার কথা জেনেছি কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল একটি ভয়াবহ ও ঘৃণ্য কাজ। কিন্তু কারা কী লক্ষ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল সেটা আমার কাছে এত দিন পরেও স্বচ্ছ হতে পারেনি। যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতনামা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, সদ্য ইন্তেকাল করা জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ভাই মুনীর চৌধুরীকে। মুনীর চৌধুরীর সাথে আমার কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কাছ থেকে একবার তার বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। বক্তৃতাটি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল বিশেষভাবেই রাজনৈতিক। সে সময় আমার কিছু সহকর্মীর মুখে শুনেছিলাম মুনীর চৌধুরী চীনপন্থী কমিউনিস্ট ভাবধারায় দীক্ষিত ব্যক্তি। আমি ঠিক বলতে পারি না তাদের এই ধারণা কতটা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার চিন্তাচেতনা যে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ধারার সাথে ছিল না, সেটা অনুমান করতে পেরেছিলাম।</p>
<p><strong>১৯৭১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>এ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>চীনপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টরা</strong> <strong>সাবেক</strong> <strong>পাকিস্তানকে</strong> <strong>ভেঙে</strong> <strong>দেয়ার</strong> <strong>পক্ষে</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>না।</strong> <strong>তারা</strong> <strong>নারাজ</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>১৯৭১</strong><strong>&#8211;</strong><strong>এর</strong> <strong>যুদ্ধকে</strong> <strong>মুক্তিযুদ্ধ</strong> <strong>বলতে।</strong> <strong>আলবদর</strong> <strong>আর</strong> <strong>রাজাকারদের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সে</strong> <strong>সময়</strong> <strong>বামপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টদের</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>সঙ্ঘাত</strong> <strong>ছিল</strong> <strong>না</strong><strong>, </strong><strong>ছিল</strong> <strong>না</strong> <strong>রেষারেষি।</strong> <strong>কেন</strong> <strong>তারা</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীর</strong> <strong>মতো</strong> <strong>একজন</strong> <strong>ব্যক্তিকে</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>যাবে</strong><strong>, </strong><strong>সেটা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>মেলে</strong> <strong>না।</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীকে</strong> <strong>যদি</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>না</strong> <strong>হতো</strong> <strong>তবে</strong> <strong>এই</strong> <strong>হত্যার</strong> <strong>প্রচলিত</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>গ্রহণযোগ্য</strong> <strong>হতো।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তা</strong> <strong>এখন</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>না</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরী</strong> <strong>নিহত</strong> <strong>হওয়ার</strong> <strong>কারণে।</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীর</strong> <strong>বড়</strong> <strong>ভাই</strong> <strong>কবীর</strong> <strong>চৌধুরী</strong> <strong>যত</strong> <strong>দূর</strong> <strong>জানি</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>দক্ষিণপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্ট</strong> <strong>ঘেঁষা।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>যাদের</strong> <strong>বলা</strong> <strong>হতো</strong> <strong>মস্কোপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্ট</strong><strong>, </strong><strong>তিনি</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>তাদেরই</strong> <strong>সাথে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়নি।</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়েছে</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীকে।</strong> <strong>১৯৭১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>এ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>দক্ষিণপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টরা</strong> <strong>পুরোপুরি</strong> <strong>হাত</strong> <strong>মিলিয়েছিলেন</strong> <strong>শ্রীমতী</strong> <strong>ইন্দিরা</strong> <strong>গান্ধীর</strong> <strong>সাথে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>কেউ</strong> <strong>খুন</strong> <strong>হননি</strong> <strong>আলবদর</strong> <strong>রাজাকারদের</strong> <strong>হাতে।</strong> <strong>অন্তত</strong> <strong>আমার</strong> <strong>জানা</strong> <strong>মতে।</strong></p>
<p>১৯৭১-এর অনেক ঘটনাই তাই আমার হিসাবে মিলতে চায় না। যত দূর জানি, কবীর চৌধুরীর আরেক ভাই ছিলেন, বিশেষভাবেই পাকিস্তানপন্থী। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করার সময় তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেন বর্তমান পাকিস্তানের লক্ষ্যে। আমার মনে পড়ছে জহির রায়হানের কথা। জহির রায়হানের সাথে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না। পরিচয় হয় কলকাতায়। জহির রায়হান ছিলেন চীনপন্থী কমিউনিস্ট। কেন তিনি ১৯৭১-এ কলকাতায় গিয়েছিলেন আমি তা জানি না। কলকাতায় তার কোনো আশ্রয় ছিল না। আমি তাকে একটা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম। আমি এটা করে দিয়েছিলাম তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছায়াছবি দেখে ভালো লেগেছিল বলে; তিনি চীনপন্থী ছিলেন বলে নয়।</p>
<p><strong>জহির রায়হান ১৯৭২ সালে মারা যান রহস্যজনকভাবে। ঢাকা এই সময় ছিল ভারতীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নয়। আলবদর, রাজাকারেরা যে তাকে মেরে ফেলেনি সেটাও সুনিশ্চিত। কিন্তু তার মৃত্যু এখনো হয়ে আছে রহস্যাবৃত। জহির রায়হানকে সম্ভবত মেরে ফেলা হয় তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য। ১৯৭১-এ আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় সিপিআই (এম) সমর্থকদের বলতে শুনেছি, শেখ মুজিব হলেন মার্কিন অ্যাজেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে তিনি ধরা দিয়েছিলেন ইয়াহিয়ার হাতে। তিনি আসলে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পক্ষে নন। কলকাতায় থাকার সময় আমি পশ্চিম বাংলার গ্রামে গিয়েছি। পশ্চিম বাংলার মুসলমানেরা ছিলেন ১৯৭১-এর যুদ্ধের বিশেষ বিরোধী। তাদের বক্তব্য ছিল এটা কোনো মুক্তিযুদ্ধ নয়। ইন্দিরা গান্ধী ষড়যন্ত্র করে ভেঙে দিতে চাচ্ছেন পাকিস্তানকে। এটা আসলে হলো তার ষড়যন্ত্রেরই ফল।</strong></p>
<p>শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক কী চেয়েছিলেন আমার কাছে এখনো তা স্বচ্ছ নয়। তিনি ৭ মার্চ রমনা ময়দানে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাতে তিনি দাবি করেন, তিনি হলেন পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু দলের নেতা। তাই তার আছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অধিকার। কিন্তু ইয়াহিয়া সেটা হতে দিচ্ছেন না। তাই এবারের সংগ্রাম হয়ে উঠেছে মুক্তির সংগ্রাম। আমার মনে হয়, ইয়াহিয়া যদি আইনানুসারে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতেন তবে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে পড়ত না।</p>
<p>১৯৭১-এ যা ঘটেছে সেটা ঘটতে পেরেছে তদানীন্তন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার রাজনৈতিক ভুলের কারণেই। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পান পাকিস্তানের কারাগার থেকে। কিন্তু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেননি। তিনি ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে যান গ্রেট ব্রিটেনে। সেখানে দেখা করেন গ্রেট ব্রিটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-এর সাথে। কেন তিনি পাকিস্তান থেকে গ্রেট ব্রিটেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা এখনো রয়েছে অজ্ঞাত।</p>
<p>সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ : এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে বলেছেন, শেখ মুজিব তাকে (মাসকারেনহাস) বলেন যে, তিনি (শেখ মুজিব) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছেদ চাচ্ছেন না। রাখতে চাচ্ছেন একটা বিশেষ রকমের সংযোগ (Link)। তবে এই সম্পর্কে তিনি বিস্তারিতভাবে কিছু আলোচনা করতে ইচ্ছুক নন, যা বলার তা তিনি বলবেন বাংলাদেশে যেয়ে, তার সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করার পরে।</p>
<p><em>শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে চার দিন পাকিস্তানে ছিলেন। এই ক’দিন তার সাথে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর অনেক আলোচনা হয়েছিল। এসব আলোচনার একটা প্রভাব সম্ভবত পড়েছিল তার ওপর। ভুট্টো তাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ দখল করেছে ভারতীয় বাহিনী। একমাত্র শেখ মুজিব তার বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে পারেন। না হলে বাংলাদেশ কার্যত চলে যাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। প্রকৃত পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য শেখ মুজিব যান ব্রিটেনে। বিলাতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে অবগত হতে চান তিনি। শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফেরার পর তাজউদ্দীনের সাথে তার গুরুতর মতভেদ ঘটে। একপর্যায়ে তাজউদ্দীন বাদ পড়েন মন্ত্রিপরিষদ থেকে।</em></p>
<p>অনেক ঘটনাই নেপথ্যে ঘটেছিল। ১৯৫৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তদানীন্তন পাকিস্থানের হয়েছিল একটি গোপন চুক্তি। এই চুক্তির কারণে, ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর কয়েকটি মার্কিন রণতরী ও বিমানবাহী জাহাজ এন্টারপ্রাইজ এসে পৌঁছায় বঙ্গোপসাগরে। মার্কিন চাপে ভারত বাধ্য হয়েছিল যুদ্ধ থামাতে এবং প্রধানত মার্কিন চাপেই ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারত তার সৈন্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা ছিল ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্য ঘটতে পেরেছিল অনেক ঘটনা। ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ছিল এক অক্ষে।</p>
<p>এখন অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। কমিউনিজম এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো সমস্যা নয়। এখন তাকে পেয়ে বসেছে জঙ্গি ইসলাম আতঙ্কে। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে এই আতঙ্ক রাখছে বিশেষ প্রভাব। ইসলাম এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বরাজনীতির একটা উল্লেখযোগ্য উৎপাদক (Factor)। যেটা ১৯৭১-৭২ সালে ছিল না। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অবস্থান করছে একই অক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক দিকে যেমন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইসলাম আতঙ্ক দিয়ে, অন্য দিকে তেমনি আবার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে চীন আতঙ্ক দিয়ে। এই দুই আতঙ্ক নির্ধারণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ভারতকে দিয়ে এশিয়ায় চীনকে সংযত রাখতে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ভাবা উচিত অনেক ভিন্নভাবে। কিন্তু আমরা সেটা করতে যাচ্ছি না। আমরা এখনো থাকতে চাচ্ছি ১৯৭১-এর যুগে। আমাদের চিন্তা থেমে আছে ১৯৭১-এর জগতে। সেটাকে বলতে হবে জাতির অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক।</p>
<p>ভারতের পত্রপত্রিকার খবর অনুসারে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে নাকি প্রায় দুই কোটি লোক চলে গিয়েছেন ভারতে। যারা ভারতের জন্য হয়ে উঠেছেন বিশেষ সমস্যার কারণ। সুব্রামনিয়ান এক সময় ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট। এখন তিনি হলেন ভারতের বিজেপি দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেছেন যে, ভারতের উচিত হবে খুলনা ও সিলেট অঞ্চলের কিছু জায়গা দখল করা। এই জায়গা দখল করে সেখানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসা দুই কোটি লোকের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া। সুব্রামনিয়ান ভারতের একজন সাধারণ নাগরিক নন। তার চিন্তাধারা ভারতকে তার নীতিনির্ধারণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। আমাদের দেশে কথিত বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতরা এই ব্যাপারটি নিয়ে কোনো কিছু ভাবছেন কি না আমি সে সম্পর্কে জ্ঞাত নই। পত্রপত্রিকায় প্রচার চলছে ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি না দিলে বাংলাদেশ আবার পরিণত হবে পাকিস্তানে। ছড়ানো হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তান-বিদ্বেষ। কিন্তু পাকিস্তান-বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করা যাবে না।</p>
<p><strong>আমাদের ভাবতে হবে বর্তমান পরিস্থিতির উপযোগীভাবে। কোনো জাতির জীবনে একটি যুদ্ধই শেষ যুদ্ধ হয় না। অনেক যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয় একটা জাতিকে। আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে শেষ যুদ্ধ ভাবার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। এ দেশের মানুষ এখন আর একাত্তরের মতো ভারতপ্রেমী হয়ে নেই। দেশে ভারতবিমুখী প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির কারণে নয়। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ব্যবহার এ দেশের মানুষের মনোভাবকে করে তুলছে ভারতবিমুখী। এটা কোনো পাকিস্তান-প্রবণতার পরিচয় বহন করছে না। পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে। সে আর আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টিকারী দেশ নয়। কিন্তু ভারত আছে আমাদের তিন দিক ঘিরে। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে এ দেশের মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে এবং হয়ে উঠছে সন্দিহান। তারা চাচ্ছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে। দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে নয়। খবরে প্রকাশ, চীন পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে প্রয়োজনে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারে। ভারত বাংলাদেশকে কব্জা করতে চাইলে চীন কী নীতি গ্রহণ করবে সেটা আমাদের কাছে এখনো জল্পনারই বিষয়।</strong></p>
<p>তবে মনে হয় এই উপমহাদেশে একটা বড় রকমের যুদ্ধ হতে পারে। আর আমাদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন এই যুদ্ধের জন্য। প্রাচীন যুগে যুদ্ধ হয়েছে রাজায় রাজায়। যুদ্ধ সীমাবদ্ধ থেকেছে দু’টি রাজার সেনাবাহিনীর মধ্যে। কিন্তু এখন যুদ্ধ হয় দেশে দেশে। যুদ্ধ হয়ে ওঠে ‘টোটাল ওয়ার’ বা সামগ্রিক যুদ্ধ। এতে জড়িয়ে পড়ে একটি দেশের সমগ্র জনসমষ্টি। যুদ্ধ একটি ক্ষতিকর ভয়াবহ ঘটনা। কিন্তু এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় একটি দেশের প্রতিটি নাগরিককে। আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15554</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/short-medium-and-long-term-solutions-to-the-electricity-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/short-medium-and-long-term-solutions-to-the-electricity-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 13 Feb 2025 14:01:48 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15536</guid>

					<description><![CDATA[চলমান ভয়াবহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট জনজীবন, কর্মসংস্থান ও সার্বিক অর্থনীতিতে বিপর্যয় তৈরি করেছে। সরকার বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে খরুচে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি কমিয়েছে। গত ৯ অক্টোবর ৩৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল, ৩৬টি কেন্দ্র সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা হয় এবং ৬২টি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>চলমান ভয়াবহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট জনজীবন, কর্মসংস্থান ও সার্বিক অর্থনীতিতে বিপর্যয় তৈরি করেছে। সরকার বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে খরুচে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি কমিয়েছে।</strong></p>
<p>গত ৯ অক্টোবর ৩৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল, ৩৬টি কেন্দ্র সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা হয় এবং ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক উৎপাদনে ছিল। রাতের পিক-আওয়ারে লোডশেডিং থাকছে প্রায় পৌনে ২ হাজার মেগাওয়াট।</p>
<p>বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে সরকারের উদ্যোগ হচ্ছে, রিজার্ভ বাঁচাতে আমদানি নির্ভর প্রাথমিক জ্বালানি কম কিনে, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে পরিকল্পিত লোডশেডিং করা এবং নাগরিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো। কিন্তু &#8216;ডলার ড্রেইনের&#8217; প্রধানতম খাতগুলো খোলা রেখে এমন চেষ্টা কি আদৌ টেকসই?</p>
<p>২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ছিল প্রতি ঘণ্টায় ৫১২ কিলোওয়াট। ভারত মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের এই ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করেছে ২০ বছর আগে। ভারতের বর্তমান মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ কিলোওয়াট। বাংলাদেশের মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার ভারতের গড় ব্যবহারের ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড়ের মাত্র ১৭ শতাংশ। নিম্ন মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের দেশে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিপর্যায়ের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুযোগটা একবারেই সীমিত।</p>
<p>তাহলে উপায় কী?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি</strong></h4>
<p>স্বল্পমেয়াদে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ধনিক শ্রেণীর ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহণ বাড়াতে হবে, গণপরিবহনের টিকিট সস্তা করতে হবে, দূরপাল্লার বাসের বদলে ট্রেন বাড়তে হবে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে শহরে-নগরে ট্রাম, রেল বা মেট্রো পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্পে ও ব্যবসায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উৎসাহ ও শুল্কায়ন সুবিধা প্রয়োজন। এসি, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, ফ্রিজ, লিফট ইত্যাদিতে এনার্জি সেভিং যন্ত্র ব্যবহারে শুল্ক প্রণোদনা দিতে হবে, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারে কম বিল, বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে বেশি বিলের পরিবেশ বান্ধব পলিসি সাজাতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। পলিসি ছাড়া মৌখিক আহ্বানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় অসম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>&#8216;ডলার ড্রেনিং&#8217; ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ</strong></h4>
<p>১৪ বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা &#8216;ডলারে&#8217; গচ্ছা গেছে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে। ভর্তুকির চক্র থেকে বিদ্যুৎখাতকে বের করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। ক্যাপাসিটি চার্জ না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না বিদ্যুৎখাতে, এমন মিথ্যা থামাতে হবে। বেসরকারি উৎপাদনকারীরা স্থানভেদে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বর্ধিত দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন, সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে নূন্যতম এক-চতুর্থাংশ বা অর্ধেক (এমপিপি কাঠামো) বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা দেবে— এই ২ শর্তই যথেষ্ট। সঙ্গে সহজ ব্যাংক ঋণের বিষয়টি থাকবে।</p>
<p>ক্যাপাসিটি চার্জ লুটেরা মডেল। স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে ওভারহোলিং চার্জ। অর্থাৎ যতটুকু সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উৎপাদনে থাকতে পারবে না (সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ), সেসময়ের জন্যও একটা চার্জ দেওয়া, যাতে বিনিয়োগ সুরক্ষিত হয়। কিন্তু মাসের পর মাস উৎপাদনে অক্ষম, অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া বাজেট ড্রেনিং অপচুক্তি।</p>
<p>ডলারে পেমেন্ট করা আইপিপি চুক্তি বিদ্যুৎখাতের প্রধানতম সংকটের জায়গা। &#8216;সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি&#8217; ব্যাংক ঋণের কোলেটার‍্যাল বলে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ডলার নয় বরং টাকায় পেমেন্ট দিতে হবে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশীয়, তাদেরকে ফরেন কারেন্সি পেমেন্ট দেওয়া অযৌক্তিক। ইউনিট প্রতি উচ্চমূল্য, ক্যাপাসিটি ও ওভারহোলিং চার্জ, স্বল্পমূল্যে জ্বালানি ও জমি, সহজ ব্যাংক ঋণ, শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা ইত্যাদি &#8216;বাজেট ড্রেনিং&#8217; গ্যারান্টি বন্ধ না করলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ফান্ড সংকটের সমাধান নেই।</p>
<p>বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য মতে, গত ১২ বছরে পিডিবি লোকসান গুনেছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। বিপরীতে চলমান ও আগামী এই ২ অর্থবছরেই পিডিবি লোকসান গুনবে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত ১২ বছরে বিদ্যুৎখাতে সরকার মোট যা লোকসান করেছে, শুধুমাত্র আগামী ২ বছরেরই তারচেয়ে বেশি লোকসান করবে।</p>
<p>আগে পিডিবি বছরে যে পরিমাণ লোকসান গুনত, এখন ২ মাসেই তার কাছাকাছি পরিমাণ লোকসান হচ্ছে। ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানি আমদানি মূল্য মূলত ডলার পেমেন্ট বলে ক্যাপাসিটি চার্জের বর্তমান মডেল কোনোভাবেই টেকসই নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দায়মুক্তি আইন বিদ্যুৎখাতে রাষ্ট্রীয় বাজেট লুট, অপচুক্তি ও দুর্নীতির রক্ষাকবচ</strong></h4>
<p>২০১০ সালে &#8216;বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি&#8217; নামক বিশেষ আইন করেছে সরকার। আইনটির বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৬ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। আইনটির ৯ ধারা, &#8216;এই আইনের অধীন কৃত বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।&#8217;</p>
<p>&#8216;সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ&#8217; উপশিরোনামে ১০ ধারায় বলা হয়েছে, &#8216;এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি, সাধারণ বা বিশেষ আদেশের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোনো কার্যেও জন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো প্রকার আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।&#8217;</p>
<p>১৪ ধারায় বলা হয়েছে, &#8216;এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, এই আইনের অধীন কৃত কাজকর্ম বা গৃহীত ব্যবস্থা এমনভাবে অব্যাহত থাকিবে ও পরিচালিত হইবে যেন এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়নি।&#8217;</p>
<p>দায়মুক্তির আইনের বলে বিদ্যুৎখাতের ইউনিট প্রতি ক্রয়মূল্য ও খরচের মডেল জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জসহ হিসেবে দেখা যায়, কিছু আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট প্রতি বাৎসরিক গড় মূল্য ১০০ টাকাও ছাড়িয়েছে। ডলারে পেমেন্ট বলে এতে পিডিবির লোকসান থামানো যাচ্ছে না। এই দুর্বিত্তায়ন থামানো জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>নিম্ন জ্বালানি দক্ষতা ও নিম্ন প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরের বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ</strong></h4>
<p>কয়েক ডজন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি দক্ষতা ৩০ শতাংশের কম, অর্থাৎ অনেক বেশি জ্বালানি পুড়ে এরা খুব কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এতে আমদানি নির্ভর জ্বালানি সরবরাহের চাপ বাড়ে। বহু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্ল্যান্ট-ফ্যাক্টর কম বলে একটানা সচল থাকতে পারে না। বড় সমস্যা ক্যাপটিভের কয়েক হাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র। সার্টিফিকেট ওরিজিন নকল করে মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশ থেকে আনা মেয়াদোত্তীর্ণ ও চরম জ্বালানি অদক্ষ এসব প্ল্যান্ট বিদ্যুৎখাতের গলার ফাঁস। দেশে লোডশেডিং যত বাড়বে, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র ততবেশি চলবে, ততই জ্বালানি অপচয়ের সমস্যাও প্রকট হবে।</p>
<p>৩৮টি বন্ধ ও ৯৮টি আংশিক সচল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে যেগুলোর তাপীয় দক্ষতা ভালো, সরকারি কিংবা বেসরকারি যাইহোক, সেগুলো সচল রাখার পরিকল্পনা দরকার। ৪০ শতাংশের বেশি জ্বালানি দক্ষতা এবং ৬০ শতাংশের বেশি প্ল্যান্ট-ফ্যাক্টর রয়েছে এমন কেন্দ্রকে প্রাধান্য দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি অপচয় থামানো যাবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>শিল্প বিদ্যুতের বিল কমিয়ে জ্বালানি অবান্ধব ক্যাপটিভ থামানো</strong></h4>
<p>শিল্প বিদ্যুতের দাম বেশি বলে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে শিল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই বলে (হঠাৎ লোডশেডিং হয়, যা শিল্পের জন্য বিপর্যয়কর) ক্যাপটিভে চলে গেছে মাঝারি থেকে বড় শিল্প। শিল্প-মালিকরা দাবী করেন, নিজস্ব গ্যাস জেনারেটরে উৎপাদন খরচ সরকারি মূল্যের মাত্র ৩ ভাগের ১ ভাগ পড়ে (অবশ্য এখানে গ্যাসের মিটার ইউনিট চুরি ও ঘুষের বিষয় জড়িত আছে)। সরকারি শিল্প বিদ্যুতের উচ্চমূল্যে একদিকে শিল্প-পণ্য উৎপাদনের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ক্যাপটিভের নিম্ন দক্ষতার জেনারেটরে বেশি জ্বালানি পুড়ে কম বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় বলে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সেইসঙ্গে বেশি জ্বালানি আমদানিতে ডলার ড্রেইনও হচ্ছে। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ স্থায়ীভাবে বন্ধের জন্য সুস্পষ্ট &#8216;শিল্প বিদ্যুৎ&#8217; সঞ্চালন, বিতরণ ও শিল্প সহায়ক সাশ্রয়ী বিলিং নীতিমালা প্রয়োজন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলে সিস্টেম লস থামানো</strong></h4>
<p>২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে বিদ্যুতের সিস্টেম লস দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। কারিগরি খাত বলে দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের লস ছাড়া অপরাপর সিস্টেম লস অগ্রহণযোগ্য। ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশে লস সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ হতে পারে। ৩ শতাংশের বেশি যেকোনো সিস্টেম লস মানেই বিদ্যুৎ চুরি। এভাবে গ্যাস বিতরণ ও তেল পরিবহণ খাতেও রয়েছে অযৌক্তিক সিস্টেম লস। কাঠামোগত সিস্টেম লসের &#8216;চুরি ও দুর্নীতি&#8217; থামিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের স্বচ্ছ পরিকল্পনা কই?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সবুজ বিদ্যুৎ রোডম্যাপ বাস্তবায়ন</strong></h4>
<p>স্রেডা ও ইউএনডিপির তত্ত্বাবধানে তৈরি &#8216;ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপ ২০২১-৪১&#8217; মতে, জমি স্বল্পতা সত্ত্বেও সৌর বিদ্যুতায়নের মধ্যমানের কৌশলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ২০ হাজার মেগাওয়াট সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অন্যদিকে নদী অববাহিকা উন্নয়নের ৫ শতাংশ ভূমি, শিল্পাঞ্চলের রুফটপ ১৫ শতাংশ ভূমি প্রভৃতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সৌর স্থাপনা মডেলে এই সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানো সম্ভব।</p>
<p>জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা থেকে বের হতে চাইলে সরকারকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতি মুক্ত বাস্তবায়নে &#8216;ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপ ২০২১-৪১&#8217;কে আলোর পথে নিতে হবে। বিদ্যুতের মাস্টার প্ল্যান পিএসএমপি-২০১৬ মতে, ২০২১ সালের মধ্যেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ মোট সক্ষমতার অন্তত ১০ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল।</p>
<p>টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট এসডিজি-৭ মতে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের ১২ শতাংশ নবায়নযোগ্য করার শর্ত আছে। বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের শক্তিশালী প্রার্থী বলে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ১৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য রাখার শর্ত মানা উচিত, যা নিম্ন মধ্যআয়ের দেশের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান অবস্থান (মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ) অগ্রহণযোগ্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>&#8216;সোলার হোম&#8217; পলিসি সংস্কার করে ব্যক্তিখাতে বিদ্যুৎ বিক্রির</strong><strong> </strong><strong>বৈধতা</strong></h4>
<p>বিদ্যুৎ বিতরণকারী ডেসা-ডেসকো-পল্লী বিদ্যুতের মতো কোম্পানিকে সৌরবিদ্যুৎ বিক্রির অনুমতি ও অবকাঠামো সহযোগিতা দিতে হবে। ব্যক্তি নিজস্ব বিনিয়োগে উৎপাদিত সরকারি সৌরবিদ্যুৎ স্টোর করবেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করবেন। এ জন্য বিতরণ ব্যবস্থাকে স্মার্ট করতে হবে।</p>
<p>প্রত্যন্ত অঞ্চল ও দ্বীপ এলাকায় খরুচে সঞ্চালন প্রকল্পে বিদ্যুৎ না নিয়ে বরং সেখানে নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার ও প্রণোদনা দরকার। দরকার ব্যক্তি বিনিয়োগে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির উপযোগী কমিউনিটি গ্রিড। সবুজ বিদ্যুতের সোলার প্যানেল, ডিসি বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ব্যাটারিতে শুল্ক উঠিয়ে দেওয়া দরকার।</p>
<p>সোলার বিনিয়োগের ব্যাংক ঋণের মডেল দরকার, দরকার ব্যাটারি রিসাইকেল ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করা। সবুজ বিদ্যুৎ বাড়লে ডলার সাশ্রয় হবে। ভূমি স্বল্পতার বাংলাদেশে মানসম্পন্ন স্টোরেজসহ শহুরে ও গ্রামীণ সোলার হোমের ব্যাপক বিকাশ দরকার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>উৎপাদন ও সঞ্চালনের সঙ্গে শিল্প ও নগর বিকাশ পরিকল্পনা সমন্বিত করা</strong></h4>
<p>অনেকগুলো পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে, যেগুলো নন-ফাংশনাল, কিন্তু সেখানে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ আছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ফিজিবল না, রামপাল ও পায়রায় বিদ্যুৎকেন্দ্র করে খরুচে সঞ্চালন টানা হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আসতে বহু সময় লাগবে বলে সেখানকার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বল্প ব্যবহৃত থাকবে। রূপপুরও লোডসেন্টার থেকে বহু দূরে বলে সঞ্চালন লাইনের পেছনে বিশাল বিনিয়োগ চলে যাবে। অর্থাৎ বিশাল বিশাল বিনিয়োগের রিটার্ন নগণ্য, কারণ উৎপাদন ও সঞ্চালন পরিকল্পনার সঙ্গে শিল্প পরিকল্পনার সমন্বয় নেই। এসব ঠিক করতে হবে।</p>
<p>দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট মোকাবিলায় স্থলভাগের গ্যাসকূপ সংস্কার করে উৎপাদন বাড়াতে হবে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। স্পট মার্কেট আমদানি প্রীতি বন্ধ করে ওপেক সদস্য দেশ থেকে বড় বড় পরিসরে নিরবচ্ছিন্ন তেল-গ্যাস-কয়লা আমদানির স্থায়ী চুক্তি জন্য জোরালো কূটনীতি করতে হবে। দেশীয় কয়লা ব্যবহারের জন্য কয়লা নীতি চূড়ান্ত করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুর্নীতি বান্ধব ক্রয় প্রক্রিয়ায় সংস্কার</strong></h4>
<p>কারিগরি জ্ঞানহীন, অভিজ্ঞতাহীন একদল দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবস্থাপক (মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটি, সিপিটিইউ) ভুল ও অদূরদর্শী পিপিএ/পিপিআর নামক আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতকে অযোগ্য (মূলত চীনা ও ভারতীয়) সরবরাহকারীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছে।</p>
<p>উন্মুক্ত দরপত্রের সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার নাম করে, বিদ্যুৎখাতে যাবতীয় নিম্নমান যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ, নিশ্চয়তাহীন মেশিন ঢুকে গেছে। খুচরা যন্ত্রাংশ ও সাপোর্ট সিস্টেমের নামে ব্যালেন্স অব প্ল্যান্ট (বিওপি) খাতে খরচ হয়ে যাচ্ছে শত কোটি ডলার, বিওপি বিদ্যুৎ বাজেট অপচয়ের আরেকটা বড় খাত।</p>
<p>বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বড় সমস্যা দক্ষ জনবল এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের বদলির ভুল পলিসি। বড় সমস্যা স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম না থাকা (স্ক্যাডা)। বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোল করার জন্য অটোমেটিক জেনারেশান কন্ট্রোল (এজিসি) কিংবা ফ্রি গভর্নর মুড অপারেশন (এফজিএমও) বাস্তবায়ন নেই। রাজনৈতিক লবিং, সরকারি সিদ্ধান্তহীনতা এবং অযোগ্য ভেন্ডরের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কারণে (গ্যারান্টিহীন এফজিএমও) বড় ধরনের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণে &#8216;আন্ডার ফ্রিকোয়েন্সি রিলে&#8217; (এএফআর) বাস্তবায়ন না থাকায় ডিস্ট্রিবিউশনের লোডও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কন্ট্রোল করা সম্ভব হয় না স্বয়ংক্রিয়ভাবে।</p>
<p>পাওয়ার গ্রিড আধুনিকায়ন এবং এনএলডিসি আধুনিকায়নের ওপরে যেসব কনসাল্টিং প্রজেক্ট আছে, সেসব কনসাল্টিং পার্টির মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন: গ্রিড আধুনিকায়নের জন্য পিজিসি আইএল এবং এনএলডিসি আধুনিকায়নের জন্য মোনেন কো। এগুলোকে যোগ্য কোম্পানি বলা যাবে না। ধীরগতির সঞ্চালন নেটওয়ার্ক প্রকল্পের কাজও ব্যাহত করছে বিদ্যুৎ বিতরণকে।</p>
<p><strong>সবমিলিয়ে বিদ্যুৎখাত বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি। সমাধানে দরকার মেধাবী,  দূরদর্শী, ভবিষ্যতমুখী স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।<em> </em></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/short-medium-and-long-term-solutions-to-the-electricity-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15536</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 09 Feb 2025 13:56:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15531</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জাতিসত্তার একটি উপাদান হলো ভাষা। আর একটি উপাদান হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ২০১২ সালে প্রকাশ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতিসত্তার উপাদান দু’টি। একটি হলো বাংলা ভাষা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জাতিসত্তার একটি উপাদান হলো ভাষা। আর একটি উপাদান হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ২০১২ সালে প্রকাশ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতিসত্তার উপাদান দু’টি। একটি হলো বাংলা ভাষা আর একটি হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা। আওয়ামী লীগের জয় বাংলা আওয়াজের সাথে শেখ মুজিবের এই ধারণা মনে হচ্ছে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই বাংলা আসলে কোন বাংলা; আর বাঙালি বলতেই বা ঠিক কাদের বুঝতে হবে। কেননা বাংলাভাষী মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশ বাস করেন বাংলাদেশে আর ৪০ শতাংশ বাস করেন ভারতে। এর মূলে আছে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ১৯৪৭ সালে বাংলা প্রদেশ ভাগ হয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে।</p>
<p>যার উদ্ভব এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে হতে পেরেছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, মুসলিম লীগে দ্বিজাতিতত্ত্ববাদ ছিল সঠিক। অথচ এখন আওয়ামী লীগের কিছু তাত্ত্বিক বলছেন, ধর্মকে রাজনীতির সাথে জড়ানো ছিল প্রতিক্রিয়াশীলতা। এদের কথা মানলে শেখ মুজিবকেও বলতে হয় একজন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদ। এ উপমহাদেশে কাকে বলব জাতীয়তাবাদ আর কাকে বলব সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় মনোভাবের অভিব্যক্তি, সেটি নির্ণয় করা খুবই কঠিন। ভারতে শিখেরা এখন চাচ্ছে স্বাধীন হতে। একটা পৃথক রাষ্ট্র গড়তে, যা তারা ইতঃপূর্বে চাননি। এই শিখ জাতীয়তাবাদের মূলে আছে শিখ ধর্মবিশ্বাস। আছে গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা, যা প্রধানত শিখরাই বিশেষভাবে চর্চা করে থাকেন। ১৯৪৭ সালে ভাগ হয় ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশ; আর ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব প্রদেশ। পূর্ব পাঞ্জাব পড়ে পাকিস্তানে আর সাবেক পাঞ্জাব প্রদেশের পশ্চিম ভাগ পড়ে ভারতে।</p>
<p>ভারতের পাঞ্জাব বিভক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে দু’টি প্রদেশ। একটির নাম হচ্ছে পাঞ্জাব। যেখানে বাস করেন প্রধানত শিখরা। যার সরকারি ভাষা হলো পাঞ্জাবি। আর তা লেখা হয় গুরুমুখী অক্ষরে। অন্য দিকে সাবেক পাঞ্জাবের হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে এখন গঠিত হয়েছে ভারতের হরিয়ানা প্রদেশ, যার সরকারি ভাষা হয়েছে সংস্কৃত শব্দবহুল হিন্দি ভাষা। তা লেখা হয় দেবনাগরি অক্ষরে। ভারতে জাতিসত্তার সমস্যা এখনো মেটেনি। শিখ জাতীয়তাবাদকে কেউ বলছেন না ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা কথাটি যেন কেবল মুসলমানদের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারছে। এর মূলে আছে ভারতের একসময়ের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও পরে প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর চিন্তাচেতনা। যার একটা প্রভাব থাকতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের তাত্ত্বিকদের ওপর। এদের প্রভাবেই আওয়ামী লীগ বলছে, বিশেষভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। গ্রহণ করছে না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণাকে।</p>
<p>আমাদের বর্তমান জাতীয় নির্বাচনে দু’টি প্রধান ইস্যু হচ্ছে, বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, আর একটি হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চর্চাকে আবার ফিরিয়ে আনা। এর কোনোটাই কাম্য নয় আওয়ামী লীগের। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। যা আগে এ অঞ্চলে ছিল না। তার এই শক্তি সঞ্চয়ের মূলে কাজ করছে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা, যা হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্যতম উপাদান।</p>
<p>বাংলাদেশের মানুষের নৃ-জাতিক ইতিহাস এখনো যথাযথভাবে পরীক্ষিত হয়নি। এর বেশির ভাগই হয়ে আছে অজানা। একসময় মনে করা হতো বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে ইসলাম প্রচার প্রধানত ঘটেছিল নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে; উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে নয়। উচ্চবর্ণের হিন্দু বলতে বোঝায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের। বাংলাদেশে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে কায়স্থদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ১৯৪১ সালে জার্মান ইহুদি মহিলা গবেষক (J. W. E. Macfarlan) পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমানের রক্তের গ্রুপের হার নির্ণয় করেন। এবং দেখেন, তার মিল হচ্ছে নিম্নবর্ণের হিন্দু বলে কথিতদের রক্তের গ্রুপের সাথে। এর ফলে ভাবা আরম্ভ হয়, নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়ার ধারণা সঠিক। কিন্তু পরবর্তীকালে দিলীপ কুমার সেনের গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের হার হলো তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরেই অনুরূপ। (দ্রষ্টব্য, Indian Anthropology. Edt T. N. Madan and Gopala Sarana; Asia publishing House, London 1962)।</p>
<p>তাই আগের মতো আর বলা যায় না যে, কেবল নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই উচ্চবর্ণের ঘৃণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এখন জানা গিয়েছে, কুমিল্লা অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন প্রথমে দেব ও পরে চন্দ্র বংশের রাজারা। এরা হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন বৌদ্ধ। এদের রাজত্ব দক্ষিণবঙ্গেও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশে তাই হিন্দুরা নন, বৌদ্ধরাই সম্ভবত দলে দলে গ্রহণ করেন ইসলাম। যেমন তারা গ্রহণ করেছেন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার জনসমষ্টিকে একত্র করলে আমরা দেখতে পাই, এ অঞ্চলেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলমানের বাস। সম্ভবত আরবি ভাষার পরই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলমান কথা বলেন বাংলা ভাষায়। বাংলাদেশ টিকে থাকলে একদিন বাংলা ভাষাকে বিশ্বে মুসলমানের ভাষা হিসেবে গণ্য করা হবে। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন পড়েছে বাংলাদেশের মানুষের ওপর।</p>
<blockquote><p>বঙ্গ নামটি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। ভারতের খ্যাতনামা মহিলা নৃতাত্ত্বিক Irawati Karve (ইরাবতী কার্ভে), তার মতে, <strong>বঙ্গ শব্দটি আর্য ভাষা পরিবারের নয়। নামটি এসেছে চীনা পরিবারভুক্ত কোনো ভাষা থেকে। চীনা পরিবারভুক্ত ভাষায় ‘য়ং’ ধ্বনি সাধারণত নদীর নামের সাথে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। যেমন- ইয়াংসিকিয়ং, হোয়াংহো, সাংপো প্রভৃতি। বঙ্গ ছিল একটা নদীর নাম। আর তার তীরবর্তী মানুষদের বলা হতো বাঙালি। এরা চীনাদের মতো একই পদ্ধতিতে ধান চাষ করত। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখি, মুসলিম নৃপতিদের শাসনামলে বঙ্গ নামটি একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাস বইয়ে উল্লিখিত হতে। ফারসিতে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বলা হতো মুলুক বাঙ্গালাহ।</strong> এর মধ্যে পড়ত রাজধানী গৌড়। মুসলিম শাসনামলের আগে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতো না।</p></blockquote>
<p>মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৮৫ সালে তার ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের প্রস্তাবনায় লিখেছেন-</p>
<p><em>‘অলীক কূনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে</em><br />
<em>নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।’</em><br />
অর্থাৎ <strong>মাইকেল মধুসূদনের সময়ও সাধারণত বাংলা ভাষায় বঙ্গ বলতে বুঝাত পূর্ববঙ্গকে। আর পশ্চিমবঙ্গ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো রাঢ় নামটি।</strong> পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নামের পরিবর্তে প্রদেশটির নাম করতে চাচ্ছেন কেবলই বঙ্গ। আমার মনে হয়, এ রকম নামকরণ করলে আমাদের ইতিহাস রচনায় হতে পারবে যথেষ্ট বিভ্রান্তি। এমনকি আমাদের জাতিসত্তার রূপ নিয়ে সৃষ্টি হতে পারবে অস্পষ্টতা।</p>
<p>একসময় বলা হতো বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার হতে পেরেছে প্রধানত বল প্রয়োগের মাধ্যমে। মুসলমান নৃপতিরা জোর করে হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু এখন এই মতকে আর আগের মতো ধরে রাখা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারি শুরু হয় ১৮৭১ সাল থেকে। এ সময় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল বেশি। এরপর আদমশুমারি হয় ১৮৮১ সালে। এই আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা কমতে এবং মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে। এরপর থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ক্রমেই মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে। কেন এমন হতে পেরেছে, তার কারণ জানা যায় না।</p>
<p>তবে একটি মত হলো হিন্দুদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে বহু ব্যক্তি গ্রহণ করতে থাকেন কেরানির চাকরি। রুদ্ধঘরে কেরানিগিরি করতে গিয়ে ঘটে এদের স্বাস্থ্যহানি। কমে এদের প্রজননক্ষমতা। কিন্তু মুসলমানেরা লেখাপড়া শিখে কেরানি হতে চাননি। তারা মুক্ত প্রকৃতিতে করেছেন ক্ষেতখামারে কাজ। হয়েছেন নৌকার মাঝিমাল্লা। মুক্ত প্রকৃতিতে তাদের স্বাস্থ্য থেকেছে অটুট। কমেনি তাদের প্রজননক্ষমতা। তাই বাড়তে পেরেছে হিন্দুর তুলনায় মুসলমানের সংখ্যা।</p>
<p>এই ধারণার কিছুটা সমর্থন পাওয়া যায় এ ঘটনা থেকে, যেসব মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছেন তাদের গর্ভে অধিক সন্তানের জননী হওয়া থেকে। ইংরেজ আমলে জোর করে হিন্দুকে মুসলমান করার সুযোগ ছিল না। তাই বলা চলে না বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ হিন্দুদের বল প্রয়োগ করে মুসলমান করা।</p>
<p>সারা দেশ এখন নির্বাচনে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। মহলবিশেষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় এলে এ দেশে হিন্দুরা বাস করতে পারবেন না। কিন্তু কোনো ইসলামপন্থী দলই এ দেশ থেকে চাচ্ছে না হিন্দু বিতাড়ন করতে। কারণ, এ দেশে এখন হিন্দু আর বেশি নেই। তা ছাড়া যেসব হিন্দু আছেন, তাদের মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুর চেয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুই বেশি। যারা ভারতে চলে যেতে এমনিতেই ইচ্ছুক নন। থাকতে চান এ দেশের মাটিকে আঁকড়ে ধরে। সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছে জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনীতি করার জন্য। তাদের মারদাঙ্গা করে ক্ষমতা দখল করার ইচ্ছা থাকলে তারা কখনোই নির্বাচনে অংশ নিত না। সেই পথেই চলার জন্য সুসংগঠিত হতে থাকত।</p>
<p>গণতন্ত্রের একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবেই। ব্রিটেনে আছে একাধিক রাজনৈতিক দল। ব্রিটেনে প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র। নির্বাচন আরম্ভ হয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধি হওয়ার জন্য। আর এ জন্যই বিলাতে প্রথম সৃষ্টি হতে পারে রাজনৈতিক দল। কিন্তু বিলাতের আইনে রাজনৈতিক দলের কোনো স্বীকৃতি নেই। রাজনৈতিক দল সেখানে হলো আইনের বাইরে বাড়তি প্রতিষ্ঠান। তা আইনিও নয় আবার বেআইনিও নয়। রাজনৈতিক দলকে বলে Extra Legal Growth। বিলাতের কোনো লিখিত সংবিধান নেই। বিলাতের শাসনব্যবস্থা চলেছে বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টকৃত কতগুলো অ্যাক্টের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে লিখিত সংবিধান। তাতেও নেই কোনো রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি। সেখানেও রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে এক্সট্রা লিগ্যাল গ্রোথ হিসেবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের আইনি নিবন্ধন ব্যবস্থা কেন করা হয়েছে, আমার কাছে তা স্বচ্ছ নয়। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী একটি সংবিধানসম্মত দল নয়। তাই সে পারছে না জাতীয় নির্বাচনে দল হিসেবে অংশগ্রহণ করতে।</p>
<p>অথচ এ দেশেও সেটি পেরেছে একসময় দল হিসেবে দাঁড়াতে। কেবল তাই নয়, হতে পেরেছে মন্ত্রিসভার সদস্য। জামায়াত দল হিসেবে দাঁড়াতে না পারলেও, জামায়াতের প্রার্থীরা কম করে ২৩ জন দাঁড়িয়েছেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে। এ ছাড়া, বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়েছেন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীকে আইনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি। জামায়াতে ইসলামীকে সমালোচনা করা হচ্ছে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী দল হিসেবে। কিন্তু সে যদি জঙ্গিবাদ চাইত, তবে নির্বাচনে অংশ নিত না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা আমার বোধগম্য নয়। কেননা, যে বামপন্থী দল একদিন চেয়েছিল বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব করতে; অর্থাৎ সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করতে, তাদের কিন্তু সংবিধান পরিপন্থী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না।</p>
<p>আওয়ামী লীগ একদিন করেছিল বাকশাল প্রতিষ্ঠা। বাকশাল ছিল একটা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখনো আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থার জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ করেনি। কিন্তু তাকে পোহাতে হচ্ছে না কোনো আইন-আদালতের ঝঞ্ঝাট। ইলেকশন কমিশনার বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর যেসব সদস্য নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অথবা নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, তারা নির্বাচন করতে পারবেন। তার এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই মনে হবে গণতন্ত্রের অনুকূল।<br />
ধর্ম কেবল যে আমাদের দেশের রাজনীতিতেই সংযুক্ত হতে পারছে তা নয়। ইউরোপের বহু দেশেই আছে ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল। বিশেষ করে জার্মানিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বিভক্ত হয় পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানিতে। পশ্চিম জার্মানিতে ক্ষমতায় আসে খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল। আর তাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে গড়ে ওঠে পশ্চিম জার্মানি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। এখন পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানি একত্র হয়েছে।</p>
<p>জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তিনি হলেন একজন খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী হওয়ার কারণে কেন তাকে একটি অনিবন্ধিত দল হতে হবে, সেটি বোঝা যথেষ্ট কঠিন। ধর্ম মানুষকে একটা উৎসর্গের মনোভাব প্রদান করে, যা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে সেবামূলক রাজনীতিতে।</p>
<p>আমাদের রাজনীতির একটা বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এই রাজনীতি যতটা না সেবামূলক, তার চেয়ে অনেক বেশি হলো দাবিমূলক। যদিও দেশে সেবামূলক রাজনীতির প্রয়োজনই বেশি। রাজনীতিতে থাকতে হয়, যাকে বলে পাবলিক স্পিরিট এর প্রাধান্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15531</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের সমুদ্র আইন ও সমসাময়িক ভাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 02 Feb 2025 13:13:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15511</guid>

					<description><![CDATA[আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ জাতির অধিকারের ব্যাপার হতে পারে না। সমুদ্রে থাকতে হবে সব জাতির জাহাজ চলাচলের সমান অধিকার। কিন্তু একটা দেশের কাছে অবস্থিত সমুদ্রে কিছু দূর পর্যন্ত থাকা উচিত সে দেশের কর্তৃত্ব। কারণ তা না থাকলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশটির নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। প্রত্যেকটি জাতি চায় তার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা চাওয়া হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। যেকোনো আইনে তাই একে নিতে হবে বিশেষ বিবেচনায়।</p>
<p><strong>গ্রোশিয়াসের এই প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা নিয়ে সূত্রপাত ঘটে সমুদ্র আইনের। ঠিক হয় একটা সমুদ্র তীরবর্তী দেশ, সেই দেশ থেকে কামানের গোলা ছুড়লে তা যত দূর গিয়ে পড়বে, সেই দূরত্বের মধ্যে সমুদ্র সীমানা হবে তার নিজের। সেখানে থাকবে তার কর্তৃত্ব। সে সময় কামানের গোলা খুব বেশি দূর যেত না। সাধারণত কামানের পাল্লা ছিল পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু ক্রমেই কামানের পাল্লা বাড়তে থাকে। আর সমুদ্র আইনে দেখা দেয় জটিলতা। এখন একটা দেশের সমুদ্র নিয়ে হয়েছে অনেক সুস্পষ্ট আইন।</strong> আইন না বলে একে আসলে বলা উচিত কনভেনশন বা প্রথা। গঠিত হয়েছে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল &#8220;International Tribunal for the Law of the Sea&#8221;, সংক্ষেপে (ITLOS)। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই এই ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত। এই দুই দেশই মেনে নিয়েছে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের অধিকার।</p>
<p>বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার জন্য এই ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল মিয়ানমারের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবরে। মামলার রায় এখন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বিরোধ ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার। আর মিয়ানমার পেয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। এই রায়ে এই দুই দেশের কেউ-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হারজিত হয়নি কারো। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে বলছে, এই রায়ে বাংলাদেশ জিতেছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।<br />
সমুদ্রতীরবর্তী একটা দেশের ভূমির কিছুটা অংশ থাকে সমুদ্রের পানির মধ্যে। এখানে সমুদ্রের গভীরতা সাধারণত থাকে ১৮০ মিটারের কাছাকাছি। সমুদ্রের পানির মধ্যে একটা দেশের ডুবে থাকা এই অংশকে বলে মহীসোপান (Continental Shelf)।</p>
<p>মহীসোপান ঢালুভাবে নেমে যায় সমুদ্রের মধ্যে। এই ঢালু জায়গাকে বলা হয় মহীঢাল (Continental Slope)। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে দু’ভাবে। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়। বিশেষ করে ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ ডাঙার যে অংশে এসে আছড়ে পড়ে সেই অংশে। কারণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ডাঙার এই অংশ ক্ষয় হয়। এখানে এসে জমতে পারে সমুদ্রের পানি অগভীরভাবে। আবার মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে জমে। <strong>আমাদের দেশে সমুদ্র উপকূলে মহীসোপান বেড়ে চলেছে। এটা হতে পারছে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে এসে জমার ফলে। পলিমাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে সমুদ্র। ফলে বাড়ছে বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ। বাংলাদেশ সমুদ্রের যে অংশ পেল, নদীবাহিত পলিমাটি জমে সমুদ্র ভরাট হয়ে একদিন সেখানে জেগে উঠবে মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি। সেটা হবে বাংলাদেশেরই অংশ।</strong> আপাতত সমুদ্রের যে এলাকা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ পেতে পারল, সেখানে বাংলাদেশের জেলেরা গিয়ে অবাধে মাছ ধরতে পারবে, যা অনেক পরিমাণে পূরণ করবে বাংলাদেশের মৎস্যের চাহিদা। সমুদ্রের পানির নিচে এখন যে অংশ আছে, সেখানে পাওয়া যেতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল, যা উঠাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে পারবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ।</p>
<p>ভারতের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেনি। কারণ ভারত চায়নি এই ট্রাইব্যুনালে যেতে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হেগে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। এই আদালত যে রায় দেবে ভারত তা না-ও মানতে পারে। কারণ কোনো দেশ এই আদালতের সালিশ মানতে সেভাবে বাধ্য নয়। বাংলাদেশ তাই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার সমুদ্রের ওপর অধিকার যেভাবে পেতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে তা পেতে পারবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে গিয়ে ভুল কাজ করেনি। কারণ তার নৌবহর এমন শক্তিশালী নয় যে, সে সামরিক শক্তিবলে ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের তাই নির্ভর করতে হবে আন্তর্জাতিক সালিস আদালতেরই ওপর।</p>
<p>মিয়ানমার ও ভারতের ইতিহাস ভিন্ন। মিয়ানমার বা বার্মা একসময় ছিল ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। যেমন প্রদেশ ছিল বাংলা। মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ-ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কিন্তু মিয়ানমার ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। থাকে না আর ব্রিটিশ-ভারতের একটি প্রদেশ হয়ে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ-ভারত থেকে হতে পেরেছিল পৃথক। যদি সে এভাবে পৃথক হতে না পারত তবে ভারত হয়তো এখন দাবি করত মিয়ানমারকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। যেমন সে দাবি করছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে।</p>
<p>মিয়ানমারের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমানা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশকে যেমন ভারত তিন দিক থেকে ঘিরে আছে, মিয়ানমার সেভাবে ঘিরে নেই। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ নেই। কিন্তু ভারতের সাথে বাংলাদেশের আছে ঐতিহাসিক বিরোধ। মিয়ানমারের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের চার গুণের বেশি। কিন্তু মিয়ানমার তা বলে চাচ্ছে না বাংলাদেশকে দখল করে তাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু ভারত স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। তাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে উঠছে কঠিন। ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা হওয়াও তাই যে সহজ হবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। সেখানেও দু’টি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ বাধার সৃষ্টি করতে পারে।</p>
<p>মিয়ানমারের যে প্রদেশকে আমরা বলি আরাকান, আর মিয়ানমার এখন বলে রাখাইন, তার সাথে আমাদের আছে সাধারণ সীমানা। কিন্তু এই সীমানা নিয়ে এখন আর কোনো বিরোধ নেই। এটা নিষ্পত্তি হতে পেরেছে পাকিস্তান আমলে। আরাকানি মুসলমানদের সাধারণভাবে বলা হয় রোহিঙ্গা। সাধারণ বৌদ্ধ আরাকানি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের ফলে ১৯৯১ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, যাদের অনেকে এখনো আরাকানে ফিরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে এদের যাপন করতে হচ্ছে খুবই করুণ জীবন। তবে বার্মার সাথে এ নিয়ে বাংলাদেশ জড়াতে চাচ্ছে না বিবাদে। <strong>ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের দোহাজারী রেলস্টেশন থেকে আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ স্থাপনের একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান মিয়ানমারকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে। আরাকানসহ সমস্ত মিয়ানমার ১৯৪২ সালে চলে যায় জাপানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকেছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। এরপর বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের।</strong> এ রকম রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে ভৌগোলিক কারণে বাড়বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমাণ। আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।</p>
<p><strong>আরাকানের সাথে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এখনো সহজ হতে পারেনি। বাংলাদেশের সাথে আরাকানের রেল যোগাযোগ হলে আরাকানে ব্যবসায়-বাণিজ্য তাই বাংলাদেশের সাথে বেড়ে যেতেই চাইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য সৃষ্টি করবে উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর বিশেষ পরিবেশ। ভারত সম্ভবত চাচ্ছে না এ রকম মৈত্রীর বন্ধন গড়ে ওঠা। তাই বাংলাদেশে ভারতঘেঁষা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিল, মিয়ানমার মানতে ইচ্ছুক নয় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়।</strong> মিয়ানমার সৈন্যসমাবেশ করছে আরাকান-বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন্তু আরাকানে এ রকম সৈন্যসমাবেশ মিয়ানমার ঘটায়নি। এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমরা মিয়ানমারের সাথে কোনো সংঘাত চাই না। আমরা কোনো সংঘাত চাই না ভারতেরও সাথে।</p>
<p>তাই আমরা মামলা করেছি আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। আইনের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আসতে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন আসলে কোনো আইন কি না তা নিয়ে আছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক। কারণ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারী দেশকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শাস্তি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আইনের পক্ষে শক্তির সমর্থন না থাকলে আইনের বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হতে বাধ্য। সমুদ্র আইন আছে, কিন্তু সমুদ্র আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তি প্রদানের কোনো ব্যবস্থা এখনো নেই।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15511</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আজকের ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/communal-harmony-in-muslim-bengal-and-todays-inclusive-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/communal-harmony-in-muslim-bengal-and-todays-inclusive-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 07 Jan 2025 13:50:13 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15335</guid>

					<description><![CDATA[এক. গত জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই “ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ” পরিভাষাটা বেশ অনেকবারই সামনে এসেছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও যখন এদেশের জনসাধারণ এমন একটি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে, এরপর আবার “স্বাধীন বাংলাদেশ ২.০” পরিভাষারও উৎপত্তি করে, তখন আসলেই উপলব্ধি হয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>গত জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই “ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ” পরিভাষাটা বেশ অনেকবারই সামনে এসেছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও যখন এদেশের জনসাধারণ এমন একটি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে, এরপর আবার “স্বাধীন বাংলাদেশ ২.০” পরিভাষারও উৎপত্তি করে, তখন আসলেই উপলব্ধি হয় যে, এমন একটি গণঅভ্যুত্থান আমাদের জন্য কেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো! স্বাধীন বাংলাদেশ ২.০-এর শুরুতেই বাংলাদেশ কেমন হবে, তা নিয়ে প্রতিটি মতাদর্শ থেকেই আলোচনা আসতে থাকে। এমন সময়ই “ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ” পরিভাষাটা বারংবার শোনা যায়।</p>
<p>সহজ ভাষায়, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ হচ্ছে এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে থাকবে না কোনো ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণিগত ভেদাভেদ। সকল ধর্মের, সকল গোত্রের এবং সকল শ্রেণিপেশার মানুষই দেশের যেকোনো নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে; এবং রাষ্ট্রের তরফ থেকেও প্রত্যেককেই সমান অধিকার দেওয়া হবে। গত ৩৬ জুলাইয়ের পর যখন রাষ্ট্রীয় ও সমাজ সংস্কার নিয়ে কথা উঠেছিলো, মূলত সেসময়টাতেই এই পরিভাষাটা শোনা গিয়েছে। আর এই পরিভাষাটা এমনভাবে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছিলো, যেনো ইতোপূর্বে কখনই এদেশের কোনো ব্যক্তিরই এই বিষয়ের উপর ধারণা ছিলো না। কিন্তু, আসলেই কি তাই? ইতিহাস কী বলে এ-নিয়ে?</p>
<p>ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ-এর সংজ্ঞায়নের একেবারে মৌলিক বিষয় হচ্ছে, ধর্ম, বর্ণ ও মতাদর্শ নির্বিশেষে দেশের সকল জনগণই রাষ্ট্রের কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারবে এবং রাষ্ট্র থেকে কখনই কোনো ব্যক্তিকে পৃথক করে দেখা হবে না। এখন, আমরা যদি অতীত ইতিহাসের আলোকে আমাদের বর্তমানকে পর্যালোচনা করতে এবং সে অনুযায়ী ভবিষ্যতকে সাজিয়ে নিতে চাই, তাহলে মুসলিম বাংলার ইতিহাসকে সামনে রেখে এসব বিষয়াবলিকে পর্যালোচনা করতে হবে এবং দেখতে হবে যে, আজকের “ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ” বলতে আমাদের সামনে যে ধারণা উপস্থাপিত হচ্ছে, তা আদৌ আনকোড়া নতুন নাকি অতি পুরাতন, যা আমরা আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেই আমাদের থেকে আড়াল হয়ে রয়েছে।</p>
<p>যেহেতু বাংলা অঞ্চলের অতীত ইতিহাসের সোনালী সময় নিয়ে কথা হবে, তাই মুসলিম বাংলার সময়কালটা অতি সংক্ষেপে বলা প্রয়োজন। ১২০৩ মতান্তরে ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজি লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করেন। এরপর বাংলায় শুরু হয় খিলজী শাসন, চলে ১২২৭ সাল পর্যন্ত। খিলজী শাসনের পর শুরু হয় দিল্লি সালতানাত বা সুলতানী আমলের শাসন, যা চলে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত। এরপরেই শুরু হয় স্বাধীন সার্বভৌম সালতানাতে বাঙ্গালা, প্রায় ২০০ বছর ধরে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত সমগ্র বাংলা শাসন করে স্বাধীন সুলতানরা। এরপর শুরু হয় আফগান শাসন। মাত্র কিছুদিনের আফগান শাসনের পর সম্রাট আকবর আবারো বাংলা জয় করেন। শুরু হয় সুবা বাংলার আমল। এরপর ১৭১৭ সালে নবাব মুর্শিদকুলী খানের মাধ্যমে শুরু হয় নবাবী আমল, যার শেষটা হয় ১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয়ের মাধ্যমে। পলাশীর বিপর্যয়ের পর মুসলিম সমাজের উপর নেমে পরাধীনতার খরগ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>ইতিহাসের পাতায় খাতায়-কলমে ২০০ বছরের সালতানাতে বাঙ্গালা হলেও আলোচনার ক্ষেত্রে পুরো মুসলিম শাসনামলকেই কেন্দ্রে রাখা হবে। তাহলে শুরুটা করা যাক প্রায় সাড়ে পাঁচ শতকের মুসলিম বাংলায় ধর্মীয় সম্প্রীতি কেমন ছিলো, তা নিয়ে।</p>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এ’চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাবুল হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</p>
<p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো সমগ্র ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে মুসলিম বাংলায় ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। <strong>মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ফলে, এই অঞ্চলের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো। বখতিয়ার খিলজির সেই অভিযানের পর এই অঞ্চলের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে।</strong></p>
<p><strong>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে, ❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong></p>
<p>রোমিলা থাপার মতে, ❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</p>
<p>অতএব, বুঝা গেলো যে, মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো। আবার, সরকারি চাকরি করবার সুবাদে কিংবা মুসলমান শাসনকর্তাদের সভাসদ ও রাজকর্মচারী হিসেবে অথবা মুসলিম জনগণের প্রতিবেশী রূপে হিন্দুরা মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে। যার ফলে তারা মুসলমানদের মহৎ আদর্শ সংস্কৃতি এবং শিষ্টাচার ও জীবন পদ্ধতি দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবান্বিত হয়। পাশাপাশি, মুসলিম শাসক ও সুলতানদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।</p>
<p>এজন্যই, সাধারণ হিন্দুদের উপর ইসলাম ধর্ম দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অথচ, সাধারণ হিন্দুদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। সমাজে উচ্চ ধর্মের হিন্দুর সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুর মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিলো। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থও পাঠ করতে পারতো না। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরা শিক্ষা অর্জন করতো। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারনৈতিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব হয়। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাও শিক্ষা অর্জন করেন। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ঘটে। তারা সংস্কৃত পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিক্ষা অর্জন করে উচ্চ রাজ কার্যে নিয়োজিত হয়ে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করে।</p>
<p>অন্যদিকে, হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের পরেই ছিলো কায়স্থদের স্থান। মুসলমানদের দ্বারা তারাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা শিল্প ও সাহিত্যে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেয়। মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এসব বিখ্যাত কবিদের মধ্যে ছিলেন-মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কবিন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, যশোরাজ খান, বিজয় গুপ্ত, কৃষ্ণ দাস কবিরাজ। মুসলিম শাসনামলে কায়স্থরা জমিদারি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করে। মুসলিম শাসক কর্তৃক এসব কায়স্থরাই পরবর্তীতে রায়, চৌধুরী, মজুমদার, অধিকারী উপাধী লাভ করে। এটি পরবর্তীকালে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে এবং আরো পরবর্তীতে গিয়ে দেখা যায় যে, এসব পদবী মানুষের নামের সাথেও যুক্ত হয়ে যায়।</p>
<p>আবার, বাংলার সুলতানরা ছিলেন উদার সংস্কৃতিমনা। তারা হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব মধ্যযুগে বাংলা হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আরেকটি কারণ। মূলত, এসব কারণেই যুগ যুগ ধরে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রীতি্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>এবার তাহলে দেখা যাক প্রশাসনিক ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় কেমন ছিলো। এটা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, যেখানে ধর্মীয় সহাবস্থান থাকে, সেখানেই অবশ্যই প্রশাসনিক সহাবস্থানও থাকবে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলমান আমলে হিন্দু শাসক ও সেনাপতি নিয়োগ।</p>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মুসলমান শাসকগণ স্থানীয় হিন্দুদের শাসনকার্যে সংম্পৃক্ত করেন। শাসনকার্যে সুযোগ পেয়ে এসব হিন্দুরা যথেষ্ট যোগ্যতার ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। মুসলিম সুলতানগণ প্রতিভাবান হিন্দুদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাষ্ট্রীয় উপাধী এবং সরকারি জমি দান করেন। হিন্দুরা খুবই বিশ্বস্ততার সাথে মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করে। বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন বাংলার হিন্দুরা বাংলার সুলতানের হয়ে যুদ্ধ করেছিলো। হিন্দু সেনাপতি সহদেব এ-যুদ্ধে যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। নবাবী আমলে আমরা দেখি যে, পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজের সেনাপতি মীর মর্দন ও মোহনলাল দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুই নয়, মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হিন্দু জমিদার শ্রেণীরও উৎপত্তি হয়। দুর্গাচন্দ্র সান্যাল তার বিখ্যাত গ্রন্থ &#8220;বাঙালার সামাজিক ইতিহাসে&#8221; লিখেন যে, ইলিয়াস শাহী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী জেলায় বিখ্যাত &#8216;সান্যাল&#8217; এবং &#8220;ভাদুড়ী পরিবারের&#8221; উৎপত্তি হয়। সুলতান গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহের রাজত্বকালে ভাতুড়িয়ার জমিদার কংস (রাজা গণেশ) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।</p>
<p>আবার, এর বিপরীতে হিন্দু রাজা ও জমিদারদের অধীনে মুসলিম কর্মচারীও নিয়োগ হয়। মুসলিমদের শাসকদের মতো হিন্দু সামন্ত রাজা ও জমিদাররাও তাদের শাসনকার্যে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন। মীর্জা নাথানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভুলুয়ার (নোয়াখালি) হিন্দু জমিদার অনন্তমানিক্য মীর্জা ইউসুফ নামক এক ব্যক্তিকে উজির পদে নিয়োগ দেন। এছাড়াও, চাঁদ রায় ও কেদার রায় সোলায়মান লোহানী নামে এক মুসলিমকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা এবং &#8220;কালাপাহাড়&#8221; নামে খ্যাত শ্রীহরি ছিলো দাউদ খান কররানীর অন্যতম উপদেষ্টা ও সেনাপতি।</p>
<p>অতএব, এটাও সত্য যে, ধর্মীয় সহাবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় ছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>এই ছিলো মুসলিম বাংলায় হিন্দু-মুসলিম প্রশাসনিক সমন্বয়। এখান থেকে আবার এটাও বলা যায় যে, যে সমাজে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সহাবস্থান থাকে, সেখানে তো বিচারব্যবস্থায় আদালত থাকবে, এটাই সত্য ও স্বাভাবিক। তবে এটা যে শুধু মুখে বললেই হবে, তা নয়। বরং অসংখ্য মুসলিম বিচারব্যবস্থার ঘটনা থেকে একটামাত্র উদাহরণ দেখা যাক।</p>
<p>সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সুলতান। সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহ একজন ন্যায়বিচারক শাসক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতিনে সুলতানের ন্যায়বিচারের একটি কাহিনী রয়েছে। তিনি একবার তীর ছুঁড়তে গিয়ে এক বিধবা মহিলার পুত্রকে হত্যা করে ফেলেন। বিধবা মহিলা তৎকালিন প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজ উদ্দিনের কাছে বিচারপ্রার্থী হলেন। প্রধান বিচারপতি নির্ভয়ে সুলতানের নামে সমন জারী করলেন। সুলতান বিচারপতির আদালতে হাজির হলে বিচারপতি কোনো রকম সম্মান প্রদর্শন না করে তাঁর বিরুদ্ধে বিধবার আনীত অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বিধবাকে ক্ষতিপূরণ দানে সন্তুষ্ট করতে না পারলে শরীয়ত মতে সুলতান দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সুলতান বিধবাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং বিধবা অভিযোগের সন্তোষজনক মিমাংসার কথা বিচারপতিকে অবহিত করেন।</p>
<p>সুলতান তখন শাহী আসন থেকে উঠে এসে বিচারপতিকে সালাম দিয়ে বলেন, ❝আমার রাজ্যে এমন একজন ন্যায় বিচারক আছেন এজন্য দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। বিচারপতি, আপনি আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে আমার তরবারি দিয়েই আমি আপনার মস্তক ছেদ করতাম।❞</p>
<p>প্রতি উত্তরে বিচারপতি বলেন, ❝আমার নির্দেশ আপনি অমান্য করলে আমিও আপনাকে বেত্রাঘাত করতাম।❞</p>
<p>পরবর্তীতে, সুলতান বিচারপতিকে ন্যায়বিচারের জন্য পুরষ্কৃত করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>পাঁচ.</strong></h4>
<p>এবার তাহলে ভাষা-সাহিত্যের উদাহরণও দেখা যাক। প্রশ্ন আসতে পারে যে, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে ভাষা-সাহিত্যের বিষয় কেন আসবে? ভাষা তো বহমান, কালের আবর্তে ভাষা পরিবর্তন হবে এটাই স্বাভাবিক! হ্যাঁ, কালের আবর্তে ভাষা পরিবর্তন হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, নতুন করে যদি ভাষাকে সংস্কার করা হয় বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভাষাকে বিকৃত করা হয় অথবা কোনো ভাষাকে সমূলে বিনাস করা হয়, তাহলে তখনও কি একথা প্রযোজ্য হবে? অবশ্যই না। কিন্তু, ইতিহাসে সেটাই হয়েছে।</p>
<p>ভাষার ধারাবাহিকতায় পাল আমলে যে বাংলা ছিলো, তা একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিলো সেনরা। বাংলার পরিবর্তে সেনরা সংস্কৃত-কে সামনে এনেছিলো। এমনকি, বাংলা ভাষাকেই তারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। মুসলিমরা এসে সে বাংলাভাষাকে আবারো গতিশীল করে দিয়েছিলো। শুধু বাংলাই নয়, মুসলিমরা এতোটা উদার ছিলো যে, বাংলা ও সংস্কৃত—দুই ভাষাকেই একইসাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। এক্ষেত্রেও, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিই হয়েছে।</p>
<p>কেননা, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সু-সম্পর্ক স্থাপনে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের অবদান ছিলো অপরিসীম। বাংলার সুলতানরা উদারভাবে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সুলতান জালালউদ্দীন মোহাম্মদ শাহ কবি বৃহস্পতি মিশ্রকে &#8220;রায় মুকুট&#8221; উপাধী প্রদান করেন। হোসেন শাহী বংশের সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু ও সাহিত্যিকরা বাংলায় &#8220;রামায়ণ&#8221; &#8216;মহাভারত&#8217; অনুবাদ করেন। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। মুঘল শাসনামলেও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাংলা-সংস্কৃত ভাষার উন্নতিতে মুঘলরা যথেষ্ট অবদান রাখে। এসবই বাংলায় হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রমাণ করেন। অতএব, এটা সত্য যে, মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো।</p>
<p>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন, ❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</p>
<p>মুসলিমরা যে এভাবে বাংলা ও সংস্কৃতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এলো, তা আবার ধ্বংস হয়ে যায় পলাশীর বিপর্যয়ের পর। ইংরেজদের “ডিভাইড এন্ড রূল” পলিসির ক্ষেত্রে এই ভাষার বিনির্মাণটাকেই কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা। ম্যাক্স মুলার ভারতের হিন্দুদেরকে আর্য বলে তাদের মাঝে সেনদের সেই পুরাতন মানসিকতা তুলে এনেছিলো। যার ফলে বহমান যে বাংলা ছিলো, সেটাকে সমূলে ধ্বংস করে সংস্কৃতকে জোর করে বাংলায় প্রবেশ করানো হয়েছে, যেনো মুসলিম শাসনামলের বাংলা এবং হিন্দুদের নতুন সংস্কৃত বাংলার মাঝে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়; আর শেষমেশ এ-নিয়েও যেনো হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। এবং, হয়েছেও তাই-ই।</p>
<p>নতুন এই বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইংরেজরা নিজেরাই লিখেছে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, যেসব ব্যাকরণের মাধ্যমেই নতুন বাংলার সূচনা করা হয়। কেননা, এসব ব্যাকরণে সংস্কৃতকে সামনে রেখেই বাংলার নতুন রূপ দেওয়া হয়। আর এসবকে পরিচিত করাতে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজকে কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা; এবং নতুন এই বাংলাকে লেখ্য ভাষায় রূপ দিয়েছে কলকাতার সাহিত্যিকরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখাগুলো পড়লেই এসব বুঝা যায়। ঠিক এজন্যই কবি নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ এবং কবি গোলাম মোস্তফার চেয়েও এই জেন-জি প্রজন্ম রবী-শরৎ-বঙ্কিম-বিভূতিদেরকে ভালোভাবে চিনে।</p>
<p>এখানে এই প্রশ্নও উঠে আসে যে, ৫০০ বছর আগের মহাকবি আলাওল-এর বহমান বাংলাকে আমরা যেভাবে বুঝি না, তেমনি আমরা কেন প্রায় ২৫০ বছর আগের ঈশ্বরচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝি না? ভাষা যদি বহমান হয়, তাহলে আলাওলেরও ২৫০ বছর পরের বাংলা-তো অনেকটাই বুঝতে পারার কথা। কিন্তু, তা কেন হয় না?</p>
<p>মূলত, এসব কারণেই ভাষা-সাহিত্যের বিষয়টিও এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ছয়.</strong></h4>
<p>এবার সর্বশেষে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করা যাক।</p>
<p>মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতবর্ষের সমাজে নারীদের অবস্থা ছিলো বড়ই করুণ। নারীদের অধিকার ছিলো খুবই সীমিত। নারীদের সাধারণত ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সমাজে পুরুষেরা বহু বিবাহ করতো। কিন্তু, নারীদের দ্বিতীয় বিবাহের কোনো নিয়ম ছিলো না। বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে নারীর অপমানের বিষয়টি উঠে আসে সতীদাহ প্রথা থেকে। নারীরা সে সমাজে ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সমাজে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না।</p>
<p>ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিম বিজয়ের আগে ভারতীয় সমাজে অনেক কু-প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিলো। অনেক কু-প্রথাকে সমাজে ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হতো। কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা, নরবলি এবং গঙ্গীয় শিশু কন্যা বিসর্জন ইত্যাদি কাজকে হিন্দুরা ধর্মীয় পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। এমনকি, ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসকরা পর্যন্ত নারীদের রক্ষা করতে আসতো না। এছাড়াও তখন দেবদাসী প্রথাও প্রচলিত ছিলো।</p>
<p>বিপরীতে মুসলিম শাসনে নারীরা পূর্বের সকল ধরনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর্থিক সঙ্গতি, উচ্চশ্রেণির লোকদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ও অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সে বিবাহের ফলে সমাজে মুসলমান মেয়েরা হিন্দু মেয়েদের ন্যায় অতটা অসহায় ও পুরুষের উপর নির্ভরশীলা ছিলো না।</p>
<p><strong>শুরুতেই সতীদাহ প্রথা নিয়ে বলতে গেলে ইবনে বতুতার মুহম্মাদ বিন তুঘলককে নিয়ে একটা মন্তব্য তুলে ধরতে হয়, তিনি বলেন, ❝সুলতান সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সাধনে সর্বদা ছিলেন তৎপর।❞</strong></p>
<p><strong>শুধু মুহাম্মাদ বিন তুঘলকই না, বরং সম্রাট বাবর, আকবর এবং আওরঙ্গজেবও সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে ভূমিকা পালন করেন। সম্রাট আকবর একবার নিজে গিয়ে এমন হিংস্র কর্মকাণ্ডে বাধা দেন এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে আইন পর্যন্ত প্রণয়ন করেন।</strong></p>
<p>অতএব, সতীদাহ প্রথা নিয়ে মাত্র তিনশ বছর আগে নয়, বরং তারও পাঁচশ বছর পূর্বে মুসলিম শাসকরাই সর্বপ্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। সেহেতু, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তকরণে রাজা রামমোহন রায় যেভাবে ইতিহাসে মর্যাদাবান হয়ে আছেন, সেটা আদতে মুসলিম শাসকদের অবদান ভুলিয়ে দেবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।</p>
<p>মুসলমানগণ তাদের মেয়েদের ব্যাপারে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে এবং স্বীকারও করে। যাতে করে বালিকারা তাদের ধর্মের মূলনীতি, কোরআন পাঠ ও ধর্মের ক্রিয়া-কর্ম সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সেজন্যে পিতারা তাদের কন্যাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন। বালিকাদেরও বালকদের মতো &#8216;সিমিল্লাহখানি&#8217; অনুষ্ঠান দ্বারা অক্ষর-পরিচয় শুরু হতো এবং তারা একই মক্তবে বালকদের সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করতো।</p>
<p>গদাই মল্লিকের পুথি বা &#8216;মল্লিকার হাজার সওয়াল&#8217; (মল্লিকার হাজার প্রশ্ন) নামে অভিহিত কাব্য থেকে জানা যায় যে, মল্লিকা নাম্নী মুসলমান বালিকা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, যে পুরুষ তাকে সাহিত্য-বিষয়ক বিতর্কে পরাজিত করতে পারবে, তাকেই বিয়ে করবেন। বহু রাজপুত্র ও বিদ্বান ব্যক্তি তার সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হন, কিন্তু সকলেই মল্লিকার নিকট পরাজয় বরণ করেন। অবশেষে জনৈক সুফি পণ্ডিত আবদুল হাকিম গদা তার হাজার প্রশ্নের উত্তরদান করে তাকে বিতর্কে পরাজিত করেন। অতঃপর মল্লিকা তাঁর বিজয়ীকে বিয়ে করেন।</p>
<p>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমান রমণীগণ যুদ্ধক্ষেত্রেও স্বামীদের সহগমন করেছেন। এই উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাসে মুসলমান রমণীদের এরূপ বীরত্বব্যঞ্জক কার্যক্রম মোটেই বিরল কিছু ছিলো না। বাংলার মুসলমান শাসনামলে বহু রমণী ছিলেন যারা তাদের সাহস, শক্তি ও বীরত্বের জন্যে খ্যাতি লাভ করেন।</p>
<p>নবাব অলীবর্দী খানের বেগম শরফুন্নেসা ছিলেন একজন উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্না ও গুণান্বিতা মহিলা। তিনি তার গুণের মহিমায় সে যুগের রাজনৈতিক ও সমাজিক জীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি স্বামীর যুদ্ধাভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের কঠোরতা ভোগ করেন। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তিনি তার স্বামীর একজন মূল্যবান উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি সর্বদা একজন অন্তরঙ্গ সঙ্গিনী ও বন্ধুরূপে নবাবকে সাহায্য করেন। আলিবর্দী স্বয়ং বিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং অসাধারণ মানসিক শক্তির অধিকারী ছিলেন; তবুও স্ত্রীর উপদেশের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিলো। সঙ্কটের সময়ে শরফুন্নেসা ছিলেন স্বামীর জন্যে আশা ও উৎসাহের উৎস স্বরূপ। মারাঠারা কয়েক বছর আলিবর্দীর মহাবিপদ ও দুশ্চিন্তার কারণ ছিলো। এমন সময় তিনি তার স্বামীর পাশে থেকে তাকে সাহস জুগিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। বাস্তবিকই নবাব আলিবর্দী খানের প্রশাসনের উপর শরফুন্নেসার গভীর প্রভাব ছিলো। গোলাম হোসেন নবাবের আত্মীয় ছিলেন; তিনি লিখেছেন, “নবাব আলিবর্দী খান তার স্ত্রীর উপদেশের প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং তাঁর ইচ্ছার প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।”</p>
<p>নবাব আলিবর্দীর কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌলাহর মাতা আমিনা বেগম তার সুরুচি ও শিষ্টাচারের গুণে সে যুগের সমাজজীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়া মহিলা এবং অনাথ ও গরিব-দুঃখীদের আশ্রয়স্থল। এটা উল্লেখযোগ্য যে, তিনি রাজকানয়ার নাম্নী ক্রীতদাসীকে শিক্ষিতা করে তোলেন এবং পরে তাকে লুৎফুন্নেসা নাম দিয়ে স্বীয় পুত্র সিরাজের সঙ্গে বিয়ে দেন। আমিনা বেগম ও জৈনুদ্দিন ‘মুহম্মদী বেগ’ নামক এক গরিব বালককে লালন-পালন করেন এবং সে বড় হয়ে উঠলে তারা বিয়ের বন্দোবস্ত করেন শরফুন্নেসার প্রাসাদে লালিতা-পালিতা এক মেয়ের সঙ্গে। এভাবে তিনি তার ভবিষ্যৎ পুত্র হন্তা মুহম্মদী বেগকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেন।</p>
<p>কোমল হৃদয়া আমিনা বেগম অন্যায়কারীর প্রতিও কোনোরূপ কঠোরতা সহ্য করতে পারতেন না। ইংরেজদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সিরাজদ্দৌলাহ্ আলিবর্দীর পীড়িত অবস্থায় প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করেন। সে সময় তিনি রাজস্বের হিসাবে বহু অনিয়ম এবং জাহাঙ্গীরনগরে ঘষেটি বেগমের দিউয়ান রাজা রাজবল্লভ কর্তৃক বিপুল অর্থ আত্মসাতের তথ্য আবিষ্কার করেন। রাজা রাজবল্লভ সঠিক হিসাব না দেওয়ায় এবং তসরূপকৃত অর্থ রাজকোষে প্রত্যর্পণ না করায়, সিরাজদ্দৌলাহ্ তাকে মুর্শিদাবাদে কঠোর পাহারায় আবদ্ধ করে রাখেন। আমিনা বেগম পুত্রের নিকট তার পক্ষে মধ্যস্থতা করেন। মায়ের আদেশ রক্ষার্থে সিরাজদ্দৌলাহ্ রাজবল্লভকে মুক্ত করে দেন।</p>
<p>সিরাজদ্দৌলাহর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ছিলেন রমণীদের আদর্শ। কিভাবে সামান্য মর্যাদার একজন নারী স্বীয় গুণাবলীর বলে মুসলমান সমাজে খুব সম্মানিত মর্যাদায় আরোহণ করতে পারেন, তা তার জীবনে প্রতিভাত হয়েছে। সামান্য পরিচারিকার অবস্থা থেকে লুৎফুন্নেসা একজন যুবরাজের সহধর্মিণী এবং নবাবের বেগমের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়া ও উচ্চ অন্তঃকরণ সম্পন্না মহিলা।</p>
<p>এছাড়াও, দারাশিকোর কন্যা ও যুবরাজ মুহম্মদ আজমের স্ত্রী জাহানজেব বানু বেগম মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। গউস খানের বিধবা স্ত্রী একদল মারাঠা লুণ্ঠনকারীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে ভাগলপুরে তার গৃহ রক্ষা করেন। আহমদনগরের চাঁদসুলতানার বীরত্বগাঁথা সুবিদিত। মহব্বত খাঁর বিরুদ্ধে নূরজাহানের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইতিহাসের একটি সুপরিচিত ঘটনা। এর বাইরে মহিলারা বিবাহ অনুষ্ঠানাদি ও শোভাযাত্রায়ও যেতেন।</p>
<p>এ-সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীরা গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না। তারা গৃহের বাইরেও যেতে পারতেন। কিন্তু তাদের পর্দা পালন করতে হতো এবং গৃহের বাইরে চলতে অবগুণ্ঠন ব্যবহার করতে হতো। পর্দান্তরালে বসবাস করলেও মুসলমান রমণীরা সমাজে যথেষ্ট সম্মানের অধিকারিণী ছিলেন। মুগল সমাজের রমণীগণ, তাদের পূর্ববর্তী ভগ্নীদের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।</p>
<blockquote><p>নারীদের জন্য পর্দা, বা আবরু প্রথা সমাজে আভিজাত্য ও সামাজিক শালীনতা বলে গণ্য করা হতো। সে যুগের হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায় নারীদের মুখে ও মাথায় আবরণহীন অবস্থায় বের হওয়া অসম্মানজনক বিবেচনা করতো। পঞ্চদশ শতকের ইউরোপীয় পর্যটক বারবোসা বাঙ্গালা শহরে মুসলমান সমাজ সম্বন্ধে বলেন যে, উচ্চশ্রেনির লোকেরা তাদের নারীদেরকে অন্দরমহলে থাকতে বলতো। মেয়েদের উল্লেখ করে তিনি আরো লিখেছেন যে, তারা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিতা এবং স্বর্ণখচিত রেশমি কাপড় এবং হিরা বসানো স্বর্ণ অলংকারে ভূষিতা। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ লেখক ভেরেলস্ট লিখেছেন, নারীদেরকে অবরোধ অবস্থায় রাখা এরূপ একটি আইন, যা&#8217; অপরিবর্তনীয়। সমগ্র ভারতব্যাপী এই রীতি প্রচলিত ছিল এবং এটা লোকদের ধর্ম ও শিষ্টাচারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলো। স্ত্রীর বে-আবরু হওয়া হিন্দু-মুসলমান উভয়ের চোখেই অমর্যাদাজনক ছিলো।</p></blockquote>
<p><strong>নারীদের পর্দা সম্বন্ধে ইউরোপীয় লেখকদের এসব বর্ণনা থেকে এই ধারণা হয় যে, বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের রমণীরা গৃহের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলো- এই অভিমত প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়। বারবোসা একদিকে মুসলমান রমণীদের অবরোধের কথা বলেছেন, আবার তিনি তাদের সৌন্দর্য, পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকার ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। মুসলমান মহিলারা যদি সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ থাকতেন, তাহলে কিভাবে এই সমস্ত বিদেশীরা তাদেরকে দেখতে পান এবং তাদের সৌন্দর্য ও পোশাক-আশাকের বিষয় জানতে পারেন!?</strong></p>
<p>মুসলমান আমলে হিন্দুসমাজেও কিছুসংখ্যক প্রতিভাময়ী-রমণীর জন্ম হয়। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের নায়িকা বিদ্যার ঘটনা থেকে জানা যায় যে, উচ্চশ্রেণির হিন্দুদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতা রমণী ছিলেন। এরা সাহিত্য বিষয়ে পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন। নাটোরের জমিদার পরিবারের রানি ভবানী একজন খ্যাতনামা মহিলা ছিলেন। জমিদারি শাসনে তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা এবং জনসাধারণের হিতার্থে তার বদান্যতার জন্য তিনি সে যুগের সমাজে উচ্চ আসন লাভ করেন। জনৈকা স্ত্রী জমিদার জয়দুর্গা চৌধুরাণী রংপুরের একজন অত্যাচারী জমিদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব করেন। অন্য একজন উল্লেখযোগ্য রমণী দেবী চৌধুরাণী ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে অধিবাসীদের বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।</p>
<p>মূলত, মুসলিম বাংলায় এভাবেই নারীগণ তাদের শিক্ষা, সাহিত্য চর্চা, পৈত্রিক সম্পত্তি ও রাজনীতির অধিকার পেয়েছিলো। অতএব, উপরোক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, মুসলমান শাসনযুগে বাংলার রমণীরা হারেমে সাধারণ পর্দা প্রথার মধ্যে থেকেও এবং পুরুষদের উপর নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও তারা এই প্রদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে হিসেবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলে মোটেও ভুল হবে না যে, বর্তমান সমাজ শুধু পর্দার কথা বলে এটা প্রমাণের চেষ্টা করে যে, মুসলিম বাংলায় নারীরা ছিলো চার দেয়ালে আবদ্ধ, যা সম্পূর্ণরূপে উদ্দেশ্য প্রণোদিত একটি ইতিহাস।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>সাত.</strong></h4>
<p>সার্বিক আলোচনার পর এবং সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাংলার পুরো ইতিহাসে একমাত্র মুসলিম শাসনামল বা ইসলামী সভ্যতাই বাংলা অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ-এর অনন্য উপমা পেশ করেছিলো। ধর্ম, সংস্কৃতি, নারী, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা-সহ সমাজ নামক বিষয়টির সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রতিটি বিষয়েই ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নিশ্চিত করেছিলো।</p>
<p>তবে এখানে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সেটি হলো, <strong>ইসলামী সভ্যতা হচ্ছে সামগ্রিক, সেজন্য ইসলামী সমাজ বিনির্মাণও হয় সামগ্রিক। কখনও এভাবে দু&#8217;টি, তিনটি বা চারটি ধর্মের জন্য কাজ করে না ইসলামী সভ্যতা। বরং, সমাজের সকলকে একসাথে নিয়ে আদালত ও মারহামাতপূর্ণ একটি সমাজ গড়ে তোলা হয় ইসলামী সভ্যতায়। অতএব, বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে মুসলিম বাংলায় শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বলে আলাদা কোনোকিছু ছিলো না। কেননা, এখানে হিন্দুদের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও বড় একটা অংশ বসবাস করতো।</strong> এমনকি, এই বৌদ্ধ জনসাধারণই মুসলিমদেরকে ভারত অভিযানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো।</p>
<p>আবার, হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সহাবস্থান বজায় রাখা বা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি সেক্টরে হিন্দু-মুসলিম একত্রে কাজ করাটাই শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের উদাহরণ নয়, বরং মুসলিম সমাজের মাঝেও যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগে থাকে, সে সমাজকেও সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটা সমাজ বলা যায় না। অতএব, এখানে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান বলে আদতে কিছুই নেই। যা আছে তা হলো, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষকে নিয়ে আদালত, আখলাক ও মারহামাতপূর্ণ একটি সমাজ বিনির্মাণ করা; যা ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘকালব্যাপী সমগ্র বাংলা অঞ্চলে প্রমাণ করে দেখিয়ে এসেছে।</p>
<p>তাহলে উপরের আলোচনা থেকে এটাই বুঝা গেলো যে, “ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ” পরিভাষাটা হয়তো নতুন করে আমাদের সামনে এসেছে, কিন্তু, এমন পরিভাষাটা মুসলিম বাংলায় পরিভাষা হিসেবে না থাকলেও এমন ধারণাটা ঠিকই বিদ্যমান ছিলো এবং তা থেকে ভালোভাবেই সকল জনগণ উপকৃত হতে পারতো।</p>
<p>মূলত, ইতিহাস থেকে তখনই উপকৃত হওয়া সম্ভব, যখন সে ইতিহাসটি সঠিক ধারার হয়ে থাকে, যে ইতিহাস নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে এবং সে জাতির আত্মপরিচয়কে সামনে এনে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করতে পারে।</p>
<p>অতএব, আমাদের বাংলাদেশ ২.০-এ তখনই ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে, যখন অতীত ইতিহাস থেকে এই ধারার সবটুকু জেনে নিয়ে পূর্বের ভুলগুলোকে পর্যালোচনা করবো এবং বর্তমানকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করবো। তবেই তাহলে আমরা সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দে পরিপূর্ণ একটি বাংলাদেশ পাবো এবং পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন ভারতের যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, আর কোথাও থেকে হোক বা না হোক, যে বাংলার ভূমি থেকেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, সেই বাংলার উর্বর জমিন থেকেই আবারো স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় হবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong> হাওলা:</strong></h4>
<p>০১. বাংলার ইতিহাস &#8211; আবদুল করিম</p>
<p>০২. বাংলার ইতিহাস &#8211; মাহবুবুর রহমান</p>
<p>০৩. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস &#8211; আব্বাস আলী খান</p>
<p>০৪. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস &#8211; ড. এম. এ. রহিম</p>
<p>০৫. বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস &#8211; মাহবুবুর রহমান</p>
<p>০৬. বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস; মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা &#8211; হাসান আল ফিরদাউস (ত্রৈমাসিক মিহওয়ার, চতুর্থ সংখ্যা)</p>
<p>০৭ জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ভাষা ‘বাংলা’ &#8211; হাসান আল ফিরদাউস (ত্রৈমাসিক মিহওয়ার, পঞ্চম সংখ্যা)</p>
<p>০৮. ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা: সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের অনন্য উপমা &#8211; মিফতাহুল জান্নাত (ষাণ্মাসিক শিউলিমালা, চতুর্থ সংখ্যা)</p>
<p>০৯. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস &#8211; ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক</p>
<p>১০. আলিম ইসলামের ইতিহাস &#8211; আলিম শ্রেণি &#8211; লেকচার পাবলিকেশন্স</p>
<p>১১. মুসলিম শাসনে ন্যায়বিচার – তোফাজ্জল বিন আমীন</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/communal-harmony-in-muslim-bengal-and-todays-inclusive-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15335</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলার কৃষি; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও বর্তমান দুরবস্থার সুলুক সন্ধান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 01 Nov 2024 11:24:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15174</guid>

					<description><![CDATA[এক. মনে করুন, আপনি একজন প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার। দামী একটা ক্যামেরা নিয়ে ঢুঁ মারছেন উত্তরের কৃষিনির্ভর কোনো একটি গ্রামের মেঠোপথ ধরে। থেকে থেকে ক্লিক-ক্লিক শব্দ তুলে ভরে যাচ্ছে আপনার ক্যামেরার মেমোরি। ইতি-উতি তাকিয়ে পছন্দমাফিক কম্পোজিশন খুঁজছেন আপনি। সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>মনে করুন, আপনি একজন প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার। দামী একটা ক্যামেরা নিয়ে ঢুঁ মারছেন উত্তরের কৃষিনির্ভর কোনো একটি গ্রামের মেঠোপথ ধরে। থেকে থেকে ক্লিক-ক্লিক শব্দ তুলে ভরে যাচ্ছে আপনার ক্যামেরার মেমোরি। ইতি-উতি তাকিয়ে পছন্দমাফিক কম্পোজিশন খুঁজছেন আপনি।</p>
<p>সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে তখন। দূরদিগন্তে সূর্য উঁকি দিচ্ছে, গাছ বা কৃষিক্ষেত-এর পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তিম বা কমলা-রং। রক্তিম সে আলোয় ডানা মেলে ক্ষুধার্ত পেটে পাখিরা তাদের নীড় ছাড়তে শুরু করেছে, চতুর্দিকে কান-জুড়ানোর পাখির কলকাকলি। ঘাস ও পাতার ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ভোরের আলোয় মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। সূর্য-গাছ-পাখি-কৃষিক্ষেত—সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। ন্যাচার-ফোটোগ্রাফির জন্য একেবারে উপযুক্ত এক সময়। মনের আনন্দে ছবি তুলেই যাচ্ছেন আপনি। প্রতিটি ছবি যেনো পূর্বের ছবির সৌন্দর্যকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>হঠাৎ-ই আপনার চোখ পড়লো দূরের এক মেঠোপথে। একজন কৃষক তার কাঁধে করে ভার বয়ে নিয়ে চলছেন তার নিজস্ব গন্তব্যে। দু&#8217;পাশে ঝুলছে কোনো এক শস্যে পরিপূর্ণ দু&#8217;টি ডালা। আপনার এবং আপনার অবজেক্টের (কৃষক) মাঝে রয়েছে বেশ বড়সড় একটা কৃষিজমি; সে জমির পাতা ও ঘাসের উপরের তরল বিন্দুগুলো আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে। ছবির জন্য একেবারে দারুণ মুহূর্ত। ক্যামেরাটা চোখের সামনে তুলে একাধারে অনেকগুলো ছবি তুললেন। চোখ থেকে আপনার প্রিয় যন্ত্রটি নামিয়ে ছবিগুলো দেখলেন, স্যাটিসফাইড।</p>
<p>এবার তাহলে ফেরার পালা। ফিরলেন বাসায়। বেছে বেছে দুয়েকটা ছবি সযত্নে রেখে দিলেন। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কারও বাগিয়ে আনলেন কৃষকের সেই ছবিটি দিয়ে।</p>
<p>কিন্তু, আমার মনে আপনার জন্য কিছু প্রশ্ন আছে।<br />
আপনি কি একবারও সেই কৃষকের নিকট গিয়ে তার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে প্রশ্ন করেছেন?<br />
লেন্সের সহায়তায় যে মানুষটার প্রতিকৃতির জন্য আপনি পুরস্কার পর্যন্ত জয় করলেন, সেই কৃষকের মনেও কি তখন এতোটা সুখ ছিলো?<br />
সে কি তার পরিশ্রম আর ফলানো শস্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছে?<br />
আপনি যে ছবিটি দিয়ে গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, সেখানে সেই কৃষক কি আদৌ ভালো আছেন?<br />
গ্রাম-বাংলার সৌন্দর্যই যাদের জন্য, তারাই যদি ভালো না থাকে, তাহলে আপনার এই ছবি তার কী উপকারে আসবে?<br />
আপনার ছবিটা কি তাহলে বাস্তবতা-বিবর্জিত হলো না?<br />
অন্যর দুর্দশাকে সুন্দর দ্বারা পরিবর্তন করে সেটাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করাটা কি অন্যায় না?</p>
<p>উত্তরগুলো জানা খুবই জরুরি। কারণ, গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বুলি আওড়িয়ে প্রতিবছর এমন অসংখ্য ছবি তোলা হচ্ছে। ভুল বার্তা দিয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে মানুষ ও পর্যটকদের। লক্ষ লক্ষ মানুষ উত্তরের এমন এলাকাগুলোয় এসে ভ্রমণ করছে—নিজ খরচ, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে। নিজেদের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা-মনোকষ্ট প্রকৃতির কাছে ন্যস্ত করে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তার স্থানে বদল করে নিয়ে খুশিমনে তারা বাড়ি ফিরছে।</p>
<p><strong>কিন্তু, যারা এই প্রকৃতিকে এমন পরম যত্নে আগলে রেখেছে, যাদের সহায়তায় ফলে আত্মিক প্রশান্তির এমন অসাধারণ এক পরিবেশ উপভোগ করছে সবাই, যাদের হাড়-ভাঙা খাটুনি ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে একেবারে তাজা ও টাটকা শস্য পাচ্ছি আমরা, একবারও কি তাদের নিয়ে আমরা প্রশ্ন করেছি যে, তারা কেমন আছে? কী খাচ্ছে? দৈনন্দিন জীবন কেমন?</strong> সাধারণ খরচের ন্যূনতম অর্থও আসে কোথা থেকে? ফসল কাটার পরমুহূর্তে তাদের অনুভূতি কী? তারা কি তাদের পরিশ্রম ও ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়? তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কী কী সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? নাকি অর্থ বরাদ্দের নামে সব লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছে?</p>
<p>এগুলো গেলো কৃষক বা চাষীর ক্ষেত্রগুলোতে উদিত হওয়া কিছু প্রশ্ন। আবার শস্যের ক্ষেত্রেও এমনই কিছু প্রশ্নের উদয় হয়। যেমন, একই পেশায় নিয়োজিত থাকার পরেও পূর্বের প্রজন্মের তুলনায় এই প্রজন্মের গড়-বয়স কমছে কেন? একই জমির একই শস্য কেন আমাদেরকে পূর্বের মতো শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়ক হচ্ছে না? কেন কৃষকেরা প্রতিনিয়তই শ্বাসকষ্টের রোগী হচ্ছে এবং সে সংখ্যাটা কেন উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে? রাসায়নিক সার বা রাসায়নিক ঔষধের পরিমাণ কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত? এতো পরিমাণ রাসায়নিক সার বা রাসায়নিক ঔষধ দেবার পরেও কেন শস্যে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমে না?</p>
<p>প্রশ্নগুলো উত্তর জানা জরুরি। শুধু প্রশ্ন করে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করার কোনো অর্থই হয় না। বিপরীতে যৌক্তিক প্রতিটি প্রশ্নের জন্য প্রয়োজন যৌক্তিক ব্যাখ্যা। নতুবা বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও বড় ধরনের কোনো ঘাপলা রয়েছে। আর সেসবের সমাধানও করতে হবে।</p>
<p>চলুন, তাহলে এবার এসব সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার জগতটাকে উন্মোচন করি। একটু দেখে আসি বাংলার কৃষকেরা কেমন আছেন! জেনে আসি তাঁদের উৎপাদিত ফসলগুলো কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত!  বর্তমান এই বিশ্বব্যবস্থাপনার কাছে তাঁরা কতোটুকু জিম্মি! রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা কতোটুকু অসহায়! কতোটা দুর্বিষহ তাঁদের দৈনন্দিন জীবন!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>প্রথমেই একটু নজর দেই একজন কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে।</p>
<p>“আধুনিকতা”র বর্তমান এই সময়েও একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবনটা খুবই দুর্বিষহ। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বা ঘামে ভেজা একটা শরীর নিয়ে একদম ভোরে জেগে ওঠে সাধারণ একজন কৃষক। বাসায় থাকে না পর্যাপ্ত পরিমাণের খাবার। যতটুকু থাকে, তা দিয়ে সকাল-দুপুরের খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। অতএব, দু&#8217;মুঠো চিড়ে-গুড় খেয়ে কৃষির সরঞ্জামাদি নিয়ে সকালে বের হয় জমির উদ্দেশ্যে।</p>
<p>সকাল-দুপুর কাটে জমিতেই। মাঝে একটু দুবেলা খাওয়ার জন্য কাজ থেকে অবসর নিতে হয়। বাসা থেকেই বাটিতে করে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় জমিতেই। দুপুরে খাওয়ার পর হয়তো কোনো এক গাছের নিচে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নেয়। এভাবেই কাটে বিকেল পর্যন্ত। বিকেলের দিকে টুকটাক কিছু সবজি নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় একজন কৃষক।</p>
<p>সবজি বিক্রি শেষে যতটুকু বা আয় হয়, তা নিয়ে পরেরদিনের খাবারের জন্য চাল-ডাল কেনা হয়। আবার যেসব সবজি সকালে বিক্রি করতে হয়, সেসব সবজি দিনের শুরুতে নির্দিষ্ট বড় একটি হাটে বিক্রি করে সে অর্থ দিয়ে আগামী কিছুদিনের খাবারের জন্য বাজার করে নিয়ে আসে অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করা একজন কৃষক।</p>
<p>দিনভর একটানা হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যার পরে পরিবারের সকলের সাথে কথা বলার সুযোগ হয় একজন কৃষকের। সেসময়টাতেই খোঁজ নেয় সে পরিবারের বাকী সদস্যদের। অর্থাভাবে সন্তানদের সে দিতে পারে না পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ। আবার, বাহ্যিক বেশভূষার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও প্রতিনিয়ত সে হয় নিগৃহীতের শিকার। অর্থাভাবে বাধ্য হয়ে কৃষকরা তাদের সন্তানদেরকে ভর্তি করিয়ে দেয় সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু, এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার মান যে কতোটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার ভয়াবহ সমীকরণ আমরা পত্রিকার পাতা থেকে শুরু করে একজন শিক্ষার্থীর মুখেও শুনি।</p>
<p>এই গেলো এক অবস্থার কৃষকদের জীবন। আরেক অবস্থার কৃষকদের জীবনটাও এমন। তবে, বিভিন্ন মৌসুমে ফলিত ফসল, যেমন–চাল, গম বা আলু নিজেদের জন্যই রেখে দেয় পরের মৌসুমে পুনরায় ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত। সে সময় পর্যন্ত শুধু এই ফসলটুকুই তাদের খাবারের একমাত্র সম্বল।</p>
<p>এদের আয়ের সময়ই থাকে মাত্র তিনটে। রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২, অর্থাৎ, একমাত্র ফসল ঘরে তোলার সময়ই বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয়, সে আয় দিয়েই তাদের পরের মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চলতে হয়। এরা আবার সবজি বিক্রি না করে লম্বা সময়ের ফসলের পেছনে নজর দেয়। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের জীবনটাও পূর্বের অবস্থার কৃষকদের মতোই।</p>
<p><strong>এখানে দু&#8217;ধরনের কৃষকদের কথা তুলে ধরা হলো। একদল শুধু দীর্ঘকালীন সময়ের ফসলগুলো নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করে, আরেকদল প্রতিনিয়ত স্বল্পকালীন টাটকা সবজি বিক্রি করে। তবে, এরা যে আবার দীর্ঘকালীন ফসল ফলায় না, বিষয়টা তেমনও না। অথবা, যারা শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ফসল বিক্রি করে, তারা যে আবার একেবারেই সবজি ফলায় না, সেটাও না। কিন্তু, এখন প্রশ্ন হলো, স্বল্পকালীন হোক বা দীর্ঘকালীন, কৃষকরা কি তাদের কষ্ট, পরিশ্রম ও ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়?</strong></p>
<p>মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে গত কয়েকবছর ধরেই টেলিভিশন-পত্রিকায় কৃষকদের আন্দোলন বা বিক্ষোভের ঘটনা আমরা শুনে আসছি। ফসল কাটার পর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সড়কে ফসল ফেলে বিক্ষোভ বা অবরোধ করা গত কয়েক বছরের একেবারে সাধারণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>জমি চাষ থেকে শুরু করে বীজ ক্রয়, বীজ বপণ, পরবর্তী পরিচর্যা, সেচ প্রদান, কয়েকধাপে রাসায়নিক সার দেওয়া, আগাছা নির্মূল, ফসল কাটা ও মাড়াই করা এবং পরিশেষে বাজারজাত করা—দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন কৃষক তার ফসলের মুখ দেখতে পায়। কিন্তু, এই প্রক্রিয়ার প্রতিটা পর্যায়েই এখন যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, একজন কৃষক তার ফসল বিক্রি করে লাভ তো দূরে থাক, ব্যয়িত অর্থই সে এখন তুলতে পারে না।</p>
<p>এই ন্যায্যমূল্যটুকু না পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো মধ্যস্বত্বভোগী  একটি দল। সরকার কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তাদের জন্য কৃষকরা নির্দিষ্ট সে দামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কেননা, এতো পরিমাণ ফসল হয়তো তাকে এদামেই বিক্রি করতে হবে নতুবা তার ফসলগুলো পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে।</p>
<p>এখন, একজন কৃষক যদি ৩-৫ মাস টানা পরিশ্রমের পর তার ব্যয়িত অর্থই তুলতে না পারে, তাহলে সে কীসের উপর ভিত্তি করে কৃষিকাজ চালু রাখবে? এদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য রয়েছে, কৃষিকাজ ছেড়ে তারা ইতোমধ্যে শহরমুখী হয়ে শিল্প-কারখানার সাথে সম্পর্কিত কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের অবস্থা প্রতিনিয়তই অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমাদের সামনে প্রতিবছর দারিদ্র্যের যে হার উপস্থাপন করা হয়, তা যে পুরোটাই সাজানো একটি মিথ্যা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>অর্থাৎ, অর্থনৈতিক দিক থেকে গ্রাম-বাংলার প্রতিটি কৃষকই চরম দারিদ্রের মাঝে দিনাতিপাত করে। কোনো দুর্ঘটনায় যদি তাদের আকস্মিকভাবে অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তখন তাদের একমাত্র সম্বল হয় গ্রামীণ ব্যাংকগুলো। সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটি সুদের হারে টাকা তুলে এনে সে খরচ বহন করে। একারণেই গ্রামের এমন কোনো কৃষক নেই, যে এমন ঋণের জালে আবদ্ধ না, এসব সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি না।</p>
<p><strong>শোনা যায়, প্রতিবছরই রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এসব দরিদ্র কৃষকদের জন্য ভর্তুকি হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার ১০-২০%-ও যদি তাদের কাছে পৌঁছাতো, তাহলে দৈনন্দিন খাবারের ক্ষেত্রে অন্তত টানাপোড়েনে থাকতে হতো না একটি কৃষক পরিবারের।</strong> তাহলে টাকাগুলো যায় কোথায়? উত্তরটা হয়তো সকলেরই জানা, কিন্তু মুখ খোলার সামর্থ্য নেই গ্রাম্য কোনো চেয়ারম্যান বা মেম্বারেরও।</p>
<p>এমনকি, দেশের আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে যখন আইএমএফ-এর নিকট থেকে “আর্থিক সাহায্য”-এর নামে চড়া সুদে ঋণ চাওয়া হয়,  আইএমএফ তখন শর্ত দেয় যে, এই “আর্থিক সাহায্য” তখনই দেওয়া হবে, যখন দেশের কৃষি সেক্টরে ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হবে।</p>
<p>বিষয়টা অদ্ভুত না? আমরা “আর্থিক সাহায্য”-এর নামে চড়া সুদে ঋণ নিতে গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ একটা বিষয়ে কেন সে শর্ত দেবে? তাহলে কি বৈশ্বিকভাবেই কৃষিকে কোণঠাসা করা হচ্ছে? নাকি মানবসভ্যতাকে কুক্ষিগত করার একটা মাধ্যম হিসেবে কৃষিকে ব্যবহার করা হচ্ছে? বিষয়টার তাহলে শুরু ও শেষ কোথায়? মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে কি বৈদেশিক কোনো সংস্থার যোগসূত্র আছে? গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর এমন চড়া সুদে ঋণ দিয়ে পুরো একটা সমাজকে জিম্মি করার অর্থ কী তাহলে? এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য কী আসলে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>এবার তাহলে কৃষিপণ্যের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>আজ থেকে একযুগ আগেও চাষের জন্য প্রায় ৯০% কৃষক নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করতো। এতে যে ফলন খারাপ হতো, তা-ও নয়। সবসময় প্রায় একই পরিমাণের ফসল পেতো। এজন্য তারা বলে দিতে পারতো অমুক জমিতে এই বীজে এতো পরিমাণ ফলন হবে। কিন্তু, মাত্র একযুগের ব্যবধানে কৃষকের নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজের ফলন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে, <strong>বাধ্য হয়ে কৃষকদেরকে আজ প্যাকেটজাত বীজ এবং হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।</strong></p>
<p>এর অন্যতম একটি কারণ হলো, জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা। <strong>কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জমির উর্বরতা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। একপর্যায়ে গিয়ে বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজগুলো রাসায়নিক সার মিশ্রিত মাটির সাথে অভিযোজন করতে পারে না। ফলে, ফলনের পরিমাণ উত্তরোত্তর কমতে থাকে। তখন কৃষক বাধ্য হয় প্যাকেটজাত বীজ এবং হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকতে।</strong></p>
<p>তবে, প্যাকেটজাত বীজ বা হাইব্রিড বীজের পাশাপাশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করার পরেও কেন তাহলে জমির উর্বরতা কমছে? ফ<strong>সলের ফলন বেশি হলেও কেন সে ফসলকে খেয়ে পূর্বের মতো শক্তি অর্জন করা সম্ভব হয় না? গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন যুবকের কেন এখন শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা হচ্ছে?</strong> বিষয়গুলো কি তাহলে প্যাকেটজাত বীজ, হাইব্রিড বীজ বা পাশাপাশি রাসায়নিক সারের কোনোভাবে সম্পৃক্ত?</p>
<p>প্রথমেই আসি প্যাকেটজাত বীজ বা হাইব্রিড বীজের বিষয়ে। মূলত, হাইব্রিড বীজ ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে উচ্চমাত্রায় কীটনাশক, সেচ ও সার ব্যবহার করার প্রয়োজন পরে। অন্যদিকে, বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজগুলো পরবর্তী বছরে একই পরিমাণল ফসল এবং পণ্য উৎপাদন করে বা তারচেয়েও কম করে, তাই কৃষক প্রতি বছর নতুন বীজ কিনতে বাধ্য হয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার তাড়নায় কৃষক প্রতি বছর হাইব্রিড বীজের পিছনে টাকা খরচ করছে। এভাবেই মূলত ধ্বংসাত্মক এই বৃত্তটির উদ্ভব হয়েছে।</p>
<p>এবার আসি রাসায়নিক সারের বিষয়। মূলত, রাসায়নিক সারের পুরো অংশটাই বিষাক্ত। রাসায়নিক সারের মাধ্যমে বা কীটনাশক ব্যবহার করে ফসলের যে পরিমাণ উপকার করা হচ্ছে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষরা। কৃষকরা এসব সার বা কীটনাশক স্প্রে-র মতো ব্যবহার করার সময় তাদের নাক, মুখ ও রোমকূপে প্রবেশ করে তাদের শারীরিক ক্ষতি করছে। পাশাপাশি, এসব ফসল খেয়ে মানুষের মাঝে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং ক্যান্সারের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে।</p>
<p>কিন্তু, এসব কীটনাশক বা রাসায়নিক সার স্লো-পয়জন বা দীর্ঘস্থায়ী বিষ হওয়ায় আমরা এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না, এর প্রভাবটা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় নির্দিষ্ট একটা বয়সে গিয়ে। তবে, এসব খাবার খেয়ে শরীর দুর্বল লাগা বা শরীরে মেদ জমার বিষয়টা কিন্তু আমরা আবার ঠিকই অনুভব করতে বা বুঝতে পারি।</p>
<blockquote><p>এরচেয়েও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, <strong>যে কোম্পানিগুলো হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন করে বাজারজাত করে, তারাই আবার সেসব বীজের কীটনাশকও উৎপাদন করে। এমনকি, এসব কোম্পানিই আবার মানুষের জন্য ঔষধও উৎপাদন করে থাকে। সেসব কোম্পানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটা হলো, Cargill-কারগিল, DuPont-ডুপন্ট, Pioneer-পাইওনিয়র, Bayar-বায়ার, Monsanto-মনসান্টো, Syngenta-সিনজেনটা, BASF-বাসফ ও Hayera-হায়েরা।</strong></p></blockquote>
<p>অতএব,<strong> বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তারাই বীজের মাঝে অপ্রতিরোধ্য সব কীট এবং মানুষের বিভিন্ন রোগের ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে দেয়।</strong> ফলশ্রুতিতে, কৃষক বা চাষীরা ঐসব রোগের কীটনাশকই খুঁজে বেরায় এবং পরিশেষে, মানুষের রোগের ক্ষেত্রেও তাদের নিকটই যেতে হয়। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ একটা জাতি এসব কোম্পানির কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।</p>
<p>আবার, আশির দশকে সবুজ বিপ্লব শুরু হলে হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়া হয়। এরপর নব্বইয়ের দশকে “জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র”-এর চিন্তাভাবনা শুরু হয়। বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে বীজগুলো নিজেদের আয়ত্তে রাখার জন্যে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও তাদের সংগঠনগুলো নতুন পরিকল্পনা করে। তারা জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোর থেকে বীজ হাতিয়ে নেয়ার জন্যে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় রকেফেলার ফাউন্ডেশন, গেটস ফাউন্ডেশনসহ এরকম সাম্রাজ্যবাদী সংগঠনগুলো নরওয়ের সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়।</p>
<p>এটি সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে করার কারণ এখানে প্রচুর বরফ থাকে এবং এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত না করতে পারে। এই কারণগুলোকে প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে নিয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে কেন এরকম একটি আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রের দরকার। এভাবে বুঝিয়ে কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে চাপ প্রয়োগ করে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই তারা বীজ সংরক্ষণ করে আসছে।</p>
<p>এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা ঘটনা হলো, ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পর তাদের জাতীয় বীজ সংরক্ষণাগার থেকে অনেক বীজের নমুনা হারিয়ে যায়, যা আজও পাওয়া যায়নি! সেগুলো কোথায় গেছে, তার হদিসও কেউ দিতে পারেনি। এমনকি, সিরিয়ার সংকট তৈরি হওয়ার পর স্বয়ং সভালবার্ড থেকেও কিছু সিরিয়ান বীজ হারিয়ে যায়!</p>
<p>কৃষি ও খাদ্যের মাধ্যমে যে আমাদেরকে আমাদের অজান্তেই শোষণ করা হচ্ছে, তার একটা উদাহরণ পাওয়া যায় আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও যায়নবাদীদের অন্যতম হোতা হেনরি কিসিঞ্জারের একটি উক্তির মাঝে,<br />
<strong>❝যদি আপনি তেল নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে আপনি দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, যদি আপনি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে আপনি বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আর এই খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই আপনাকে এর মূল উপাদান বীজকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।❞</strong><br />
সে আলোকে এটা বলাই যায় যে, কোনো দেশের উপর অবরোধ আরোপ করতে হলে শুধুমাত্র বীজের উপর অবরোধ করেই তাদের সহজে কাবু করা সম্ভব হবে।</p>
<p>তাহলে আশা করি, একজন পাঠক হিসেবে হেনরি কিসিঞ্জার-এর মন্তব্য, নরওয়ের বিখ্যাত সভালবার্ড বীজ সংরক্ষণাগার আর হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন—এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় করতে পেরেছেন।</p>
<p>অতএব, আইএমএফ-এর ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষিতে ভর্তুকি কম দেওয়ার শর্ত, গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর চড়া সুদে ঋণ প্রদান করে কৃষকশ্রেণিকে জিম্মি করা বা মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া ব্যবসার পেছনের রহস্যগুলো তাহলে এবার একটু হলেও খোলাসা হয়েছে বলে আশা করি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>সাধারণত কোনো কিছুর সমালোচনা করলে নিশ্চায়ই কোনো কিছুর সাথে তুলনা করেই সমালোচনা করা হয়। অর্থাৎ, সমালোচনার অবশ্যই একটা ভিত্তি থাকে। বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও কৃষকের বর্তমান অবস্থাটা সমালোচনামূলকভাবে সামগ্রিক যে বিষয়টা তুলে ধরা হলো, তারও একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সেটি হলো, ইসলামী সভ্যতায় বাংলা অঞ্চলে কৃষির ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা। তাহলে বর্তমানে আমাদের অবস্থা এতোটা শোচনীয় কেন? এর উত্তর জানতে হলে আগে পশ্চিমাদের দর্শন নিয়ে একটু জানা প্রয়োজন।</p>
<p>শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের হোতা এবং জায়নবাদের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমাদের দর্শনই হলো মানুষকে মানুষ মনে না করা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় কথায়, আচরণ এবং দর্শনে। যেমন,</p>
<ul>
<li>০১. শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধারণা হলো, “আমি সাদা, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি ইউরোপীয়, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমার জন্ম আমেরিকায়, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”</li>
<li>০২. ইউরোপীয়দের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্বাস হলো, “ইউরোপীয়দের ন্যায় যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোনো জাতির অস্তিত্ব নেই।”</li>
<li>০৩. বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদের মূল দর্শনই হলো শক্তির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার। ডারউইনের &#8216;সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট&#8217; তত্ত্বও এ শক্তির আধিপত্যের ধারণারই ফলাফল। তারা ব্যতীত বাকীরা ধ্বংস হয়ে যাবে-এটিই তাদের নিয়তি।</li>
<li>০৪. আমরা সকলেই জানি, বর্তমান পৃথিবী জায়নবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই জায়নবাদী ইহুদীদের অন্যতম নাথান রথচাইল্ড একবার বলেছিলেন,<br />
❝সাম্রাজ্য পরিচালনা করার জন্য কে রাজা হলো তা আমার দেখার বিষয় নয়, আমার দেখার বিষয় হলো টাকা বা অর্থ। সত্যিকারের শাসক মূলত সে-ই, যার অর্থ আছে।❞</li>
<li>০৫. চার্চিল আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। আমাদের গম, চাল খাদ্য সঙ্কট দূর করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তারা আমাদের এ সকল খাদ্যদ্রব্য লুট করে নিয়ে যাওয়ার কারণে ৪.৩০ মিলিয়ন বাঙালী খাদ্যাভাবে মৃত্যুবরণ করে। দুর্ভিক্ষের বিষয়ে চার্চিলকে জিজ্ঞেস করা হলে চার্চিল জবাব দেন,<br />
❝তারা যদি এত সন্তান জন্ম না দিতো, তাহলে তো এত মৃত্যুবরণ করতো না!❞</li>
</ul>
<p>নিজেদেরকে এমন শ্রেষ্ঠ মনে করার কারণেই ভারত উপমহাদেশে এসে তারা শোষণ, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। নিজেদের এমন দর্শনের কারণেই পরিকল্পিতভাবে ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসনের নামে শোষণ ও আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে।</p>
<p>ব্রিটিশদের শোষণের ভয়াবহতা এতোই ছিলো যে, সঠিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, ১৭৭১ সালের দুর্ভিক্ষের পূর্বে বাংলাদেশের রাজস্ব (১৭৬৮ সালে) ছিলো ১ কোটি ৫২ লক্ষ ৪ হাজার ৮ শত ৫৬ টাকা। কিন্তু, এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এ&#8217;অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরও ১৭৭১ সালে রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৫ শত ৭৬ টাকায়। একটু চিন্তা করলেই আমরা এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারব। তাদের শাসনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় জনগণ এ ধরণের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।</p>
<p>“বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা&#8221; নামক গ্রন্থে হেমাচন্দ্র কান্নগো বলেন, <strong>এই জমিদাররা প্রতি একরে এতো বেশি খাজনা এবং জুলুমপূর্ণ কর আরোপ করা শুরু করে, যা ছিলো সম্পূর্ণ বে-আইনী। কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ, সরকারকে প্রদান করা অর্থের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিলো। অর্থাৎ সরকারকে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই যেধরণের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও অর্থনীতির ধস নেমে আসে, জুলুমের শিকার হতে থাকে তার থেকে ৫ গুণ বেশি খাজনা এ&#8217;সব জমিদাররা আদায় করতে শুরু করে। এদিকে ব্রিটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তাদের ভূমির রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত যে রাজস্ব ছিল তার থেকে আরও বৃদ্ধি করে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ৩৩ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন এক ভয়াবহ আগ্রাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।</strong></p>
<p>মেমোরেন্টাম অন দি পার্লামেন্ট সেটেলমেন্টের ৪০ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তাদেরই এজেন্ট সেন্সেস কমিশনার স্যার টমাস মন্ড্রোর মতে, ১৮৪২ সালে উপমহাদেশে ভূমিহীন কৃষকের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। কিন্তু ১৮৭২ সালে অর্থাৎ ৩০ বছরের ব্যবধানে আমাদের ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ লক্ষে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ করতে করতে ১৯৩১ সালে দেখা যায়, সেন্সেস অনুসারে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলা অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ৭০ ভাগ জনগণই ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছে। বাকী যে ৩০% এর ভূমির মালিকানা ছিলো, খোঁজ করলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মালিকানা ছিলো নিতান্তই হাতে গোনা কয়েকজনেরই। অধিকাংশই ছিলো জমিদার কিংবা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত এজেন্ট। এরা মূলত লুণ্ঠনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে জমিদার এবং খাজনাভোগী শ্রেণির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তারা জুলুমকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে, তাদের শোষণের মাত্রা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতে তাদের এজেন্টদের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করতে থারে যা দশ বছরের ব্যবধানে ৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>এস. কে চ্যাটার্জীর বইয়ের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে মোট দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ছিল ১৩ এবং এইসব দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও অধিক। কিন্তু, ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের ফল সহজপন্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং ৪ কোটি সমপরিমাণ মানুষের প্রায় ৬ মাসের খাদ্য ও সব শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণের জন্য রেলপথের স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ১৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। উপমহাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জমিজমা, বিভিন্ন সম্পদ, মাঠ, ঘর-বাড়ি নষ্ট করে তার উপর দিয়ে রেলপথ বসায় এবং দেখানো হয় তারা অনেক পরিকল্পিত, উন্নত ও সংরক্ষিত উপায়ে উন্নয়ন করছে। অথচ এই স্থাপনার ক্ষেত্রে তারা মোটেও জনগণ এবং কৃষকদের বাস্তবিক অবস্থার দিকে নজর দেয়নি। তারা নজর দিয়েছিলো তাদের লুণ্ঠনের দিকেই, লুণ্ঠন তরান্বিত হওয়ার পন্থার দিকেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, তাদের তৈরিকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী যদি অফিসিয়ালি মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সংখ্যা এটা হয়, তাহলে বুঝাই যাচ্ছে তা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের। প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলির অবস্থা তাহলে কি হয়েছিলো? ২০ বছরের ব্যবধানে যদি কোটি কোটি লোক মারা যায়, তাহলে সত্যিকার বাস্তবিক অবস্থা কি হয়েছিলো? উপমহাদেশে যার ফল আমরা আজও ভোগ করছি।</p>
<p>যাইহোক, এভাবেই তারা ভারতের সবেচেয়ে বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি কৃষিকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তাহলে কৃষিতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল এবং তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের তুলনা করলেই বিষয়টা আরো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবন এবং কৃষিপণ্য ও কৃষির সামগ্রিক অবস্থা মাত্রই তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, পশ্চিমাদের মনোভাবটাও আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়েছে এবং এদেশের কৃষির প্রতি তাদের ‘সুমহান’ কৃতকর্মের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, তাদের নিয়ে আর বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। সেহেতু, এবার একটু ইসলামী সভ্যতায় বাংলা অঞ্চলে কৃষির ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা-দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের সময় যতদিন বাংলা তার অধীনস্থ ছিলো, ততোদিন সালতানাতের সবেচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থের যোগান দেওয়া হতো এই বাংলা থেকে। মুঘল আমলে এই বাংলাই সমগ্র বিশ্বের ২৫-২৯% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। বাংলার এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণটা ছিলো কৃষির প্রাচুর্য। বাংলার মাটি ছিলো যেমন উর্বর, এর আবহাওয়াও ছিলো তেমনি উপযোগী।</p>
<p>বাংলায় যে পরিমাণ শস্য উৎপাদন হতো, প্রায় ৫০-৬০টি দেশে সেসব রপ্তানি করা হতো। মুসলিমরাই ছিলো চিনির উদ্ভাবক, কেননা এই অঞ্চলে যে পরিমাণ আখের চাষ হতো, তা আর কোথাও হতো না। এমনকি, আজকে সারা বিশ্বে প্রচলিত মশলাপাতির প্রায় ৭০-৭৫%-ই এই ভারতীয় উপমহাদেশে আবিষ্কৃত। মুঘল আমলের মশলাগুলো আজও সমানভাবে সমাদৃত।<br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-2983821056776451" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-2983821056776451" data-ad-slot="6155617955"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>বাদশাহ আলমগীরের সময় বাংলার কৃষি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। মীর জুমলা (১৫৯১- ১৬৬৩) এবং শায়েস্তা খাঁর (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) আমলে উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছিল সর্বাধিক সস্তা। টাকায় আট মণ চা পাওয়া যেত। এ&#8217;সময় বাংলা অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে।</strong></p>
<p>এই বাংলা অঞ্চল নদীমাতৃক হওয়ায় বাংলার নদীর মাছগুলোর জন্য প্রায় ৫০টিরও অধিক অঞ্চল থেকে বাণিজ্য করতে আসতো। যেহেতু এই অঞ্চলের পাশেই রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র, আবার সে সময়ের বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় মাধ্যম সমুদ্রপথ হওয়ায় এই বাংলা সমগ্র বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলো। বার্থেমা ও বাবুর্সা ১৬ শতকে এই অঞ্চল ভ্রমণ করে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝এখানকার মানুষেরা প্রতিটি শহরকেই একেকটি বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।❞</p></blockquote>
<p>এভাবেই বাংলা অঞ্চল এভাবেই সমগ্র বিশ্বের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভ্রমণপিপাসুরা বাংলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শুধু যে কৃষিতেই বাংলা অঞ্চল সমৃদ্ধশালী ছিলো, তা নয়। বরং, নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার ছিলো এই বাংলা অঞ্চল। সামগ্রিকভাবে কয়েকজনের কয়েকটি বক্তব্য শোনা যাক।</p>
<ul>
<li>০১. ইবনে বতুতা—<br />
<strong>❝নদী পথে মিশরের নীল নদের মতো ডানে-বামে ছিলো অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজী এবং গ্রামের পর গ্রাম। আমরা গ্রাম ও উদ্যানরাজীর মধ্য দিয়ে ১৫ দিনের মতো চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে আমরা একটি সাজানো উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলেছি।❞</strong></li>
<li>০২. একজন চীনা দূত—<br />
<strong>❝এর অঞ্চলে ভূমি এতটাই উর্বর এবং এর উৎপাদন এতই বেশি যে, একই জমিতে প্রতি বছর দুই থেকে তিন ধরণের ফসল তারা পায়। কোনো রকম যত্ন না করেও অঞ্চলের ভূমি থেকে কৃষকরা তাদের চাহিদার থেকেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে।❞</strong></li>
<li>০৩. আবুল ফজল—<br />
<strong>❝বাংলার মাটি এতো বেশি উর্বর ছিলো যে, একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হতো। যদি এই অঞ্চলের চালের প্রত্যেক প্রকার থেকে একটি করে শস্যকণা সংগ্রহ করা হতো তাহলে একটি কলস ভরে উঠতো।❞</strong></li>
</ul>
<p>এরপর,<br />
আমরা দ্রব্যমূল্যের ক্রয় ক্ষমতার দিকে তাকালে লক্ষ্য করি, সে সময়ের সবকিছু বিদেশে রপ্তানি হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের ফলে ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ আখলাকী উদ্যোগের ফলে প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত সস্তা দরে পাওয়া যেতো। বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় লেখকগণ বিকৃতভাবে উল্লেখ করলেও দেখা যায়, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিলো। যার ফলে সবাই নিজ চাহিদা মতো খাবার ক্রয় করতে পারতেন। এমনকি ক্রয় করার পরেও তাদের কাছে অর্থ উদ্ধৃত থেকে যেতো। এজন্যই ইবনে বতুতা মন্তব্য করেন পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন একটি দেশ দেখেননি যেখানে জিনিসপত্র বাংলা অঞ্চলের মতো এতো সস্তায় বিক্রি হয়। তিনি দেখেন যে এ দেশ চালে পরিপূর্ণ ও ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর।</p>
<p>১৬৪০ সালে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ভ্রমণ করে সিবাস্তিয়ান মাররিক বলেন, প্রত্যেক বাজারে বা শহরে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্য, সুতির বস্ত্র প্রভৃতির প্রাচুর্য এতো বেশি ও সস্তা ছিল যে মাত্র একটি বাজার থেকে এসব জিনিসপত্র অল্প দামে ক্রয়পূর্বক জাহাজ বোঝাই করে নেওয়া যেতো। যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলের সাথেই ব্যবসা করতে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতো। এ অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক হারে উৎপাদন করে তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতো।</p>
<p>এছাড়াও তিনি মন্তব্য করেন, শহরগুলিতে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য এতটাই সাধ্যের মধ্যে ছিলো যে তিনি দিনে কয়েকবার আহার করতে প্রলুব্ধ হতেন। ইবনে বতুতা অনেকগুলো দ্রব্যের বর্ণনা দেন। যেমন–মাত্র ৮ দিরহামে ৮০ রাতল ধান পাওয়া যেতো। ১ রৌপ্য দিনারে ২৫ রাতল চাল পাওয়া যেতো। ১ আনা ৯ পাইয়ে বর্তমান ওজনের ১ মণ চাল পাওয়া যেতো। এভাবে প্রতিটি পণ্যই এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অনেক সস্তা ছিলো। যার ফলে এ&#8217;অঞ্চলের মানুষ যতটুকু আয় করতেন ততটুকু দিয়ে তারা তাদের খাদ্য, বস্তু কেনার পরেও তাদের আয়ের একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থাকতো।</p>
<p>সে আমলে জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক বেশি ছিলো। পাশাপাশি মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বলয়ের কারণে মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী হয়ে উঠে। নারী-পুরুষ সকলেই তাদের স্ব-স্ব জায়গা থেকে সাধ্যমতো পরিশ্রম করে। যার ফলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান, কৃষির ভিত্তি, বস্ত্র বা সব ক্ষেত্রে বিশাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আখলাকী এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট একটি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর শ্রমনীতির দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতেন তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে তার বাৎসরিক অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটে যেতো।</p>
<p>যেমন, <strong>মুঘল সালতানাতের সময়কালে শ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারিত ছিলো সেটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক মজুরি হিসেবে তৎকালীন সময়ে একজন শ্রমিক দুই দম আয় করতেন। তাহলে তার মাসে আয় হতো ৬০ দম অর্থাৎ বছরে তার আয় হতো আঠারো টাকার সমান। জীবন ধারণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতোটাই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল যে, ইবনে বতুতা বলেন তার জনৈক বন্ধু আল মাসুদী বাংলা অঞ্চলের একজন নাগরিক যিনি বছরে আয় করেন ১৮ টাকা। কিন্তু তার বছরে খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র ক্রয় করতে ব্যয় হয় ৮ দিরহাম বা ১ টাকা। পারিবারিক অন্যান্য সদস্যের চাহিদা এবং খাদ্য-বস্ত্র সব মিলিয়ে তার আয়ের তিন ভাগের দুইভাগ খরচ হতো।</strong> আর এক ভাগ থেকে যেত। কারও কারও ক্ষেত্রে ১ ভাগ ব্যয় হতো আর বাকি দুই ভাগই উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যেতো। আবার তিনি বলেন, অনেকের সারা বছর ২ বা ৩ টাকার বেশি প্রয়োজন পড়তো না। ফলে ১৫ টাকার মতো উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। এসব উদ্বৃত্ত টাকা সেই সময়ের মুসলমানদেরকে ওয়াকফ, দান, সাদাকাহ, যাকাতের দিকে ব্যাপকভাবে ধাবিত করে।</p>
<p>মুসলিমরা তাদের এই বাৎসরিক উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি অংশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রেরণ করতো। বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল, দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল, যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে এমন অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। রাষ্ট্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি বাজেট দিতে পারতো। যার কারণে বলা হয় ইসলামী সভ্যতার ১২শত বছরের শাসনামল ছিল পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনামল। গোটা দুনিয়াতে হত দরিদ্র খুঁজে পাওয়া, অনাহারী মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাত তথা ইসলামী সভ্যতা যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ৭ শত বছরে আমাদের অর্থনৈতিক জিডিপি ছিলো ২৯%। অর্থাৎ যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ইসলামী সভ্যতার এ অঞ্চলে সেই বিশাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কেমন? সে ব্যাপারে আমরা কতটুকুই বা অবগত?</p>
<p>অথচ, বর্তমানে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। হাল আমলের গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা, নারীরা এবং তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না তাদের সঠিক চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সব ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যতটুকুই বা খাদ্য পাচ্ছে সেটুকুও ভেজাল মিশ্রিত। এগুলো খেয়ে রোগগ্রস্ত হওয়ার পরেও পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা পেলেও যে ঔষধ আমরা ভক্ষণ করি তা সেই একই চক্রের ফসল।</p>
<p>কথিত যে নয়া ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক উপলব্ধি, সচেতনতা তৈরি ব্যতীত মুক্তির পথ খোঁজা আকাশকুসুম কল্পনা। শুধু বীজ, খাদ্য ও ওষুধ নয় প্রত্যেকটি সেক্টর-ই আজ পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দি। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকানের ভাষায়, &#8220;আমরা সবাই যায়নবাদের কারাগারে বন্দী, সেখানে আমরা কতিপয় অবাধ্য কয়েদি। কিন্তু দিন শেষে সবাই কয়েদী।&#8221;</p>
<p>মুক্তি জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনার আলোকে সামনে অগ্রসর হয়ে নতুন বাংলাদেশ তথা হারানো ঐতিহ্যের বিনির্মাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বের সেই সোনালী ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা কাজ করি তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব। কেননা আগের সেই খনিজ সম্পদ, জমি, বনাঞ্চল, কৃষক, মানব সম্পদ, নদী, সমুদ্র এখনও বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>পাঁচ. অন্তিম রেখা</strong></h5>
<p>মূলত এতক্ষণ যে আলোচনা করা হলো, তা ছিলো, ইতিহাসের আলোকে বর্তমান কৃষি ও কৃষকের সরেজমিন পর্যালোচনা। সম্পূর্ণ বিষয়ের পেছনে উৎসাহ ও উদ্দীপনা জাগিয়েছে সময়ের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা—জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ <strong>“মিহওয়ার”</strong>।</p>
<p>ইতিহাসকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা এবং বর্তমান সময়ের কৃষি ও কৃষকের চরম দুরবস্থার মধ্যকার বিষয়ের অসাধারণ পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে মিহওয়ার পত্রিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায়।</p>
<p>পত্রিকাটির দ্বিতীয় সংখ্যায় এসেছে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর সম্মানিত প্রেসিডেন্ট তরুণ কৃষিবিদ শ্রদ্ধেয় <a href="https://rowyakbd.com/author/mars_bd/">আশিকুর রহমান সৈকত</a>-এর লেখা <strong>“<a href="https://rowyakbd.com/agricultural-systems-and-seeds-the-future-of-human-civilization-in-jain-hands/">কৃষিব্যবস্থা ও বীজঃ যায়নবাদীদের হাতের মুঠোয় মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ</a>”</strong> শীর্ষক প্রবন্ধটি।<br />
এবং তৃতীয় সংখ্যায় এসেছে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ত্রৈমাসিক মিহওয়ার পত্রিকার সম্পাদক তরুণ চিন্তক <a href="https://rowyakbd.com/author/hasan_al_firdaus/">হাসান আল ফিরদাউস</a>-এর লেখা <strong>“বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা : প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা”</strong> শীর্ষক প্রবন্ধটি।</p>
<p>দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় লিখিত প্রবন্ধ দু&#8217;টি অধ্যয়নের পরেই জানার আগ্রহ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্যই একেবারে সরেজমিনে যাওয়া এবং কৃষকদের সাথে সময় অতিবাহিত করে তাদের জীবন সম্পর্কে অবহিত হওয়া।<br />
এই আলোচনায় মূলত তত্ত্বের আলোকে বর্তমান সময়ের কৃষি ও কৃষকের চরম দুরবস্থার সত্যতা তুলে ধরার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। তত্ত্বের পাশাপাশি তথ্যের জন্য উক্ত প্রবন্ধ দু&#8217;টি পড়ে অনুধাবন করার অনুরোধ রইলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15174</post-id>	</item>
		<item>
		<title>স্বৈরাচারী শাসকের পতন : বাংলার জনবিপ্লবে আরব নেতৃবৃন্দের পরামর্শ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-fall-of-the-autocrat-advice-from-arab-leaders-in-the-bengal-revolution/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-fall-of-the-autocrat-advice-from-arab-leaders-in-the-bengal-revolution/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. জাসের আল আওদাহ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 08 Aug 2024 11:49:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14645</guid>

					<description><![CDATA[হে বাংলার প্রিয় উম্মাহ এবং সম্মানিত জনসাধারণ, সমগ্র আরববিশ্বে বিগত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে চলমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতির আলোকে বিগত একদশকে আরব জনসাধারণ যেসব বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছে আপনাদের সাথে সেসব পরামর্শমূলক আলোচনাই করতে চাই। এমনকি, ইতোমধ্যেই আপনাদের দেশের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>হে বাংলার প্রিয় উম্মাহ এবং সম্মানিত জনসাধারণ,</strong><br />
সমগ্র আরববিশ্বে বিগত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে চলমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতির আলোকে বিগত একদশকে আরব জনসাধারণ যেসব বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছে আপনাদের সাথে সেসব পরামর্শমূলক আলোচনাই করতে চাই। এমনকি, ইতোমধ্যেই আপনাদের দেশের চলমান এই পরিস্থিতিতেও একই বিষয়াদি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই আলোচনার কারণ এটাই যে, বাংলায় বসবাসরত প্রিয় জনসাধারণ যেনো পূর্বে আরববিশ্বে ঘটে যাওয়া সেসব পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারে। মুসলিম উম্মাহর প্রধান শত্রুরা-সহ দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা দেশদ্রোহী শত্রুরাও আপনাদের এই বিপ্লবের হাওয়া অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চায় বাংলার জনবিপ্লবকে বাতিল করতে, তারা চায় বাংলার জনসাধারণকে পরাধীন করতে, তারা চায় বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের উপরে আরো হিংস্রভাবে নিপীড়ন চালিয়ে যেতে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে, যেনো আরবের মতো তারা একই পরিবেশ বাংলার ভূমিতেও তৈরি করতে না পারে।</p>
<p>আপনাদের প্রতি অনুরোধ রইলো,<br />
এখনই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা আন্দোলনের সূতিকাগার স্থানগুলোকে ফেলে রেখে ঘরে ফিরে যাবেন না। এমনকি, একমুহুর্তের জন্যও ফাঁকা রাখবেন না। সরকারের অবর্তমানে আগত সেনাবাহিনীদের সকলেই কিন্তু দেশের কল্যাণ চায় না; আবার, তাদের মধ্য থেকে যারা দেশের কল্যাণ চায়, তাদেরকেও কিন্তু সকলে চিনে না; ফলে তারা যা-ই বলুক না কেনো, তাদের বক্তব্যকে চূড়ান্তভাবে মেনে নিবেন না। <strong>মনে রাখবেন, এদেরই একাংশের হাতে কিন্তু বিগত কিছুদিনে ছোটো-বড়ো অসংখ্য ছাত্র ও জনসাধারণ নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। যারা নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করেছে, যাদের হাতে উদীয়মান মেধাবী তরুণদের তাজা রক্ত লেগে আছে এবং রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার-বিভাগীয় যেসব নেতৃবৃন্দের হাত বাংলার আপামর জনসাধারণের রক্তে রঞ্জিত, একমাত্র মৃত্যুদণ্ড ব্যতিত আর কোনো বিচারই তাদের ক্ষেত্রে আপনাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়।</strong> মানবতা রক্ষার তথাকথিত এসব আইনের নামে যারা আপনাদের উপর দীর্ঘ একটা সময় ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জুলুম করে এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার ছাড় দেবেন না; হোক সে যুবক, প্রৌঢ় বা বয়োবৃদ্ধ! বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই অতিসত্বর একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দাবী করবেন না, চাই সে নির্বাচন সুষ্ঠু হোক বা অন্যায্য হোক। এমনকি, চলমান এই পরিস্থিতিতে পূর্বের মতোই সর্বজনীন, সাধারণ ও বেসামরিক সরকারের দাবী করে বসবেন না।</p>
<p><strong>এসবের কারণগুলো হলো,</strong></p>
<p><strong>০১.</strong><br />
আপনাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমার চেয়ে কিন্তু আপনারাই ভালো বুঝবেন যে, বর্তমানে যারা সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদেরকে বিগত স্বৈরাচারী শাসকই নিযুক্ত করেছেন। সেহেতু, তাদের অনেকের ভেতরেই বিগত শাসকের অন্যায়, অবিচার, জুলুমের পরোক্ষ মতামত রয়েছে এবং স্বভাবগতভাবে একই হবে। মনে রাখবেন, মাত্র এক ঘণ্টার জন্য হলেও সমগ্র সেনাবাহিনীর উপর বিশ্বাস রাখবেন না। কারণটাও শক্তিশালী যে, যেহেতু বর্তমান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ বিগত স্বৈরাচারী শাসকই নিযুক্ত করেছেন, সেহেতু দুর্নীতি রোধ করার বিপরীতে সেটাকে আরো রক্ষা করা এবং জনসাধারণের উপর অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে জুলুম করার ক্ষেত্রে বিগত স্বৈরাচারী শাসকের পাশাপাশি তারাও কিন্তু সমভাবে অপরাধী।</p>
<p><strong>০২.</strong><br />
<strong>ইসলামী শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সর্বজনীন সরকার-কে সামরিক শাসনের বিকল্প হিসেবে দেখা হয় না। কেননা, ন্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি ও আদালতপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা-র জন্য ইসলাম যেকোনো ধরনের সরকারকে সাধুবাদ জানায়।</strong> মূল কথা, নেতৃত্বে যারই আগমন ঘটুক না কেন, তাকে আদালত, মারহামাত ও বিশ্বাস-কে প্রাধান্য দিতে হবে; নতুবা তাকেও গ্রহণ করা হবে না। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হলো, বিগত স্বৈরাচারী শাসকের পরে আগত সেনাবাহিনীর মধ্যে এমন সংখ্যক চিন্তা লালনকারী এবং দেশ ও জাতির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গকারী সৈন্য-সংখ্যা খুবই কম রয়েছে।</p>
<p>আপনাদের এখন মূল কাজ হলো, জাতির জন্য উৎসর্গকৃত সেসব প্রাণ খুঁজে খুঁজে বের করে দেশের নেতৃত্বের ভার তাদের হাতে অর্পণ করা, যাতে করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক ও বিচার-বিভাগীয়-সহ বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরেই যেনো আদালত, মারহামাত ও বিশ্বাস প্রতিস্থাপিত হয় এবং বসবাসযোগ্য একটি বাংলাদেশ পুনঃগঠিত হয়। এমনকি, তারা যদি চলমান এই গনহত্যার হত্যকারীদের কঠিন বিচার করে, তবুও তাদেরকেই সমর্থন করুন।</p>
<p><strong>০৩.</strong><br />
বর্তমান এই পরিস্থিতিতে কখনই আপনারা আপনাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে এসে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন না বা সেসব বিষয়গুলোকে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু বানাবেন না। যদিও সেসব বিষয়গুলো বর্তমান পরিস্থিতির মাত্রাতিরিক্ত বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা নিয়ে হোক না কেনো। এছাড়াও, নিহতদের নিয়ে মাতামাতি করা, সাম্প্রদায়িকতা-সহ যতো ধরনের মনোযোগ-বিশৃঙ্খলকারী বিষয় আছে, সেসবকে দূরে রাখতে হবে। নতুবা, এতে করে দেশ ও জাতির শত্রুরা আপনাদেরকে বিশৃঙ্খল করে দিতে সক্ষম হবে এবং আপনাদের অভ্যন্তরেই বিভাজন সৃষ্টি করে দেবে। তবে, এসব নিয়ে ততটুকু আলোচনাই করবেন, যতটুকু আন্দোলন ও বিপ্লবের জন্য উপকারী হবে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে ব্যবহৃত হবে।</p>
<p><strong>০৪.</strong><br />
<strong>আপনাদের লক্ষ্য কিন্তু তথাকথিত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা বা আপনাদের দেশে ইউরোপীয় কৃষ্টিকালচার প্রতিষ্ঠা করা নয়। আপনাদের লক্ষ্য হলো দেশ ও জাতির কল্যাণে ন্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি ও আদালতপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা-র সূচনা করা।</strong> আর এসব সম্ভব হবে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে থাকা জীবন উৎসর্গকারী সেই হাতেগোনা কয়েকজন-এর দ্বারাই, যারা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং আপনাদের বিপ্লবকে বিপথে পরিচালনাকারী ও প্রোপাগাণ্ডা সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত মিডিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে, বা প্রয়োজনে সেগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে।</p>
<p><strong>০৫.</strong><br />
মনে রাখবেন, বিগত বিপ্লবে নৃশংসভাবে হত্যার পেছনে—এমনকি বিগত এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে তাদের অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণে তারা যেসব আইনগুলোকে সামনে রাখে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোর কিন্তু কোনো অস্তিত্ব নেই; অথবা থাকলেও সেসব আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য গণহত্যায় সমর্থন নয়। খেয়াল করলে দেখবেন, বিগত এক যুগে তারা যে আইনগুলোই প্রণয়ন করেছে, সেগুলো দিয়েই কিন্তু দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের ক্ষতি করে গিয়েছে। অর্থাৎ, তাদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্যই তারা এসব আইন প্রণয়ন করেছে। ফলে, এগুলোর প্রতিটি আইনই অবৈধ; কেননা এসব আইন দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের কোনো কল্যাণে আসেনি। অতএব, অতিসত্বর এসব আইন বিলুপ্ত করে দিবেন এবং এমন আইন প্রণয়নে সর্বদা বাধা হয়ে দাঁড়াবেন।</p>
<p><strong>০৬.</strong><br />
আপনাদের দেশের চলমান এই পরিস্থিতি কখনই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়, চাই সে নির্বাচন সুষ্ঠু হোক বা অন্যায্য। দেশের ইসলামী দলগুলোর প্রতি অনুরোধ রইলো, <strong>দীর্ঘ সময়ের জুলুমের পর মরিচীকাতুল্য এই ক্ষমতা পাওয়ার সুযোগের ফাঁদে পা দিবেন না। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক পন্থায় আপনারা রাজনীতিতে পদার্পণ করেন না। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, জনসাধারণকে আপনাদের যতোই প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকুক না কেনো, রাজনৈতিকভাবে বা রাজনীতির শক্তিতে বাকী রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আপনারাই কিন্তু অনেক পিছিয়ে।</strong> এটা মেনে নিয়ে নিজেদেরকে গুছিয়ে নিন, সংঘবদ্ধ করুন। বাকী দলগুলো দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে ব্যয় করেছে, কমবেশি তারা রাজনীতির অলি-গলিতে চলাচল করেছে; কিন্তু আপনারা তাদের মতো করে রাজনীতিতে সময় দেননি। মাঠে-ময়দানে আপনাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া বা রাজনীতিতে আপনাদেরকে বিশৃঙ্খল করে দেওয়া বাকী দলগুলোর চেয়ে সহজ হবে। এটাও কিন্তু সত্য যে, জনসাধারণকে আপনাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকলেও রাষ্ট্র বা বর্তমান সেনাবাহিনীর উপরে আপনাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা কম। সাথে এটাও সত্য যে, দেশের আপামত জনতাকে যারা নৃশংসভাবে খুন করেছে এবং যারা দেশের সম্পদ নষ্ট করেছে, তারা কিন্তু আপনাদের পেছনেই লেগে রয়েছে; এমনকি তারা আপনাদের সর্বশেষ কর্মীকে পর্যন্ত হত্যা করতে পিছপা হবে না। কারণ, জনসাধারণের মাঝে তাদের চেয়ে আপনারা দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এখন, আপনাদের প্রতি অনুরোধ রইলো, নিজেদের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির অলি-গলি ও পথ-ঘাট ভালোভাবে চিনে নিয়ে নিজেদেরকে সংঘবদ্ধ করুন এবং গুছিয়ে নিন।</p>
<p><strong>০৭.</strong><br />
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে আমার অনুরোধ হলো, স্বল্পমেয়াদে নিজেদের আন্দোলনের স্বার্থকতা রক্ষার জন্য মিডিয়াগুলোকে প্রভাবিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের আন্দোলনের স্বার্থকতা রক্ষার জন্য প্রচুর পরিমাণে অধ্যয়ন করতে হবে। দুর্নীতিবাজ ও প্রোপাগাণ্ডা সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত মিডিয়াগুলোকে শক্তহাতে দমন করতে হবে এবং তাদের ভুবন-ভোলানো বক্তব্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে না; এক্ষেত্রে নিজেও সতর্ক থাকতে হবে এবং অপরকেও সতর্ক করতে হবে। সত্যিকারার্থে, প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যে কোথাও ‘স্বাধীন মিডিয়া’ বলে কিছুই নেই। ফলে এই মুহূর্তে লক্ষ্য রাখা উচিত, কারা সত্য ও সঠিক খবরাখবর প্রকাশ করে। আর যারাই মিথ্যা ও প্রোপাগাণ্ডা-মূলক খবর প্রচার করে, এখনই তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান এই আন্দোলনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং এর স্বার্থকতা রক্ষা করতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মনোযোগী হতে হবে। কেননা, এই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শিক্ষিত একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা এই আন্দোলনের স্বার্থকতাকে বয়ে নিয়ে বেড়াবে এবং ন্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি ও আদালতপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা-কে দীর্ঘায়িত করবে।</p>
<p><strong>পরিশেষে আপনাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই,</strong><br />
এসবই আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল, যেসব অভিজ্ঞতার সূচনা হয়েছিলো আরব বসন্তের মাধ্যমে। আরব বসন্তের সেই সময়ে আমাদেরকেও এমন কথাগুলোই বলেছিলেন উম্মাহর মহান মুজাহিদগণ। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য যে, আমরা সেসব কথাগুলোকে খুব একটা প্রাধান্য দেইনি। যার ফলে আজ আমরা এই অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছি। দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ রইলো, আপনারা একই ভুল দুইবার করবেন না, একই গর্তে দু&#8217;বার পা দেবেন না। সতর্ক থাকুন, চোখ-কান খোলা রাখুন। মহান রব সাক্ষী, আমরা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ মৌলিক বিষয়গুলোই বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের প্রচেষ্টাকে কবুল করুক।<br />
<strong>আল্লাহুম্মা আমীন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদ: মিফতাহুর রহমান। </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-fall-of-the-autocrat-advice-from-arab-leaders-in-the-bengal-revolution/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14645</post-id>	</item>
		<item>
		<title>১৩ জুলাই ২০২৪; আমাদের দেশ, মাটি ও মানুষ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 13 Jul 2024 11:53:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14551</guid>

					<description><![CDATA[আজকের দিনে বাংলাদেশের যুব সমাজের চোখে চোখ রাখলে, সহজেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা যাচ্ছে- জাতীয় এক হতাশা আমাদের মাঝে নিমজ্জিত হয়েছে। চতুর্দিকে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, সংকট ও দুর্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনসহ হতাশাজনক ভবিষ্যৎ যখন বিভিন্ন ইস্যু হয়ে যুবসমাজের সামনে আসছে, তখন সে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজকের দিনে বাংলাদেশের যুব সমাজের চোখে চোখ রাখলে, সহজেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা যাচ্ছে- জাতীয় এক হতাশা আমাদের মাঝে নিমজ্জিত হয়েছে। চতুর্দিকে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, সংকট ও দুর্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনসহ হতাশাজনক ভবিষ্যৎ যখন বিভিন্ন ইস্যু হয়ে যুবসমাজের সামনে আসছে, তখন সে যুবসমাজের হতাশ না হওয়ার কোনো কারণ অবশিষ্ট থাকেনা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কাজ করা এবং কর্ম-ভাবনার বহু বিষয় রয়েছে। যেমন- নানাবিধ ইস্যু জারি থাকলেও, জাতীয় সংকট বহুমুখী। এই বহুমুখী সংকটকালের বেশ কিছু বিষয়কে যদি আমরা সামনে নিয়ে আসি তাহলে আমরা দেখতে পাই-</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> সিলেট বিভাগসহ আরও ১৭ টি জেলা ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত হয়েছে৷ এর অন্যতম একটি কারণ- আমরা আমাদের শহরগুলোকে, পানি ও নদী ব্যবস্থাপনাকে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আলোকেই গড়ে তুলেছি, সে আলোকেই পরিকল্পনা সাজাই এবং উন্নয়ন খুঁজে বেড়ায়। যেমন, আমাদের শহরগুলোতে পানি নিষ্কাশনের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই না; কিছুদিন আগে মাত্র দু&#8217;দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পুরো শহর ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো। শহরকে সুরক্ষা করার নাম দিয়ে আমরা নদীগুলোতে বাঁধ দিলেও, শহরে পানি নিষ্কাশনের জন্য নদীর সাথে সুন্দর সংযোগ স্থাপন করে বিভিন্ন ধরনের নগরায়ণ করা সম্ভব, এ বিষয়গুলো কখনো চিন্তা ও মানসপটে নেই না। ফলশ্রুতিতে, একটু বৃষ্টি হলেই শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়; আর শহরের এই জলাবদ্ধতায়, পানি যাওয়ার রাস্তা না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পানি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়, পরবর্তীতে দুর্গন্ধ নগরীতে পরিণত হয় এবং এসবের প্রভাব গ্রামাঞ্চলে গিয়ে পড়ছে।</p>
<p>অপরদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কোনো কারণ ছাড়াই বাঁধ ছেড়ে দেওয়া, তাদের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন নীতির কারণে মারাত্নক সংকট ও দূর্ভোগ নিয়মিত আমাদের পোহাতে হচ্ছে৷</p>
<p>আমাদের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকা যেমন সমস্যা; তেমনি একই সাথে যখন আমরা এসব পরিস্থিতিতে পড়ছি, সেই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সঙ্কটকাল মোকাবেলা করার যে উদ্যোগ, সেখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়-</p>
<p>গত কয়েক বছরে বন্যা হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে। এই জেলাগুলোতে যে হারে বন্যা হচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসের অধিক সময় ঐ অঞ্চলের বড় একটি অংশ তথা জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ বেকারত্বের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে; দিনের পর দিন পানিবন্দি! ভয়াবহ অবস্থায় সরকার, প্রশাসন, কোন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠীর দেখা নেই; উদ্যোগ নেই, প্রতিবাদ নেই! এগুলো নিয়ে আজ পর্যন্ত তেমন কোনো কাজ, জাতীয় উদ্যোগ লক্ষ্য করিনি৷ এমনকি কোনো ইস্যুও লক্ষ্য করবেন না৷ <strong>অথচ, বন্যা হলেই আমাদের একটাই কাজ তা হলো- বিভিন্ন দল, ধর্মীয় জনগোষ্ঠী, সেলেব্রিটি ব্যক্তিদের ত্রাণ নিয়ে দৌড়ানোর হিড়িক পড়ে যায়; যাতে লোকসম্মুখে জনপ্রিয় হওয়া যায়। এভাবে প্রতিবছর ত্রাণের মাধ্যমে কি আদৌ এ সমস্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব? এ সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কোন দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তাবনা কিংবা উদ্যোগ নাই। এটি জাতির জন্য বড় আশংকা এবং হতাশার বিষয়৷</strong></p>
<p>ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি দিলিপ দা কুনহা, উনার একটা গবেষণায় দেখিয়েছেন, বন্যা বলতে আমরা যা বুঝি এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। তিনি তার অঙ্কিত ছক-এ দেখিয়েছেন, পানি যখন এসকল বিষয়কে অতিক্রম করে, কিছু শর্ত পূরণ করে, তখন এটাকে আমরা বন্যা বলি। কিন্তু পানি সেসকল শর্তগুলোকে অতিক্রম করছে না, অর্থাৎ মানুষের অব্যাবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট এই দুর্দশা, এগুলোকে বন্যা বলা যায় না। এমনকি প্রকৃতিকেও দোষারোপ করা যায় না।</p>
<p>আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করলে বুঝা যায়, ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নদীর নিয়ন্ত্রণ এ বিষয়টি যুগযুগ ধরে চলে আসা একটি শোষণ৷ আর ঔপনিবেশিক আমলে এ ধরনের বাঁধ দেওয়া, এগুলোকে বিভিন্ন দাতা সংস্থার মাধ্যমে শক্ত অবস্থানে নেওয়া, দেশীয় বিভিন্ন সম্পদ নষ্ট করা, দেশের নদীগুলোকে মৃত করে ফেলা, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে দুর্ভোগে ফেলে, শহর রক্ষার নাম দিয়ে শহরকেও আরেকটি বড় ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে নিপতিত করা, এগুলো ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের কাজ ছিলো। এ কাজগুলো এখনো পর্যন্ত চরম মাত্রায় বিদ্যমান। অর্থাৎ এখনও আমরা মন-মানসে ব্রিটিশ জায়োনিজমের দাসত্ব করে যাই।</p>
<p>আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, সিভিল সোসাইটি কিংবা নাগরিক সমাজ; এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কেউ কিন্তু এগুলোকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করছে না। এখান থেকে উত্তরণের উপায় বাতলে দিচ্ছে না। অথচ এ নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা দেশের অন্যতম আয়ের উৎস, অর্থনীতিকে সচল রাখার বড় এক মাধ্যম। কিন্তু সে মাধ্যমকে আজকে উল্টো অর্থনৈতিক সংকট, ধ্বংস ও মানুষকে মহাদুর্দশায় নিপতিত করার অস্ত্রে পরিণত করেছি। বরাবরের ন্যায় আবারও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত হলো উপকূল অঞ্চলের লোকজন।</p>
<p>এ সকল পানি ব্যবস্থাপনা, নগর ব্যবস্থাপনা, নদী ব্যবস্থাপনা, সঙ্কট বা দুর্যোগগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাকারী, পানি বিশেষজ্ঞ, ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গ, বিজ্ঞানী, স্থপতিগণ সকলকে সাথে নিয়ে ও সকলের চিন্তাগুলোকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করা এবং জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করা আবশ্যক ছিল। এ কাজগুলোকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আমরা কোনো ইস্যু লক্ষ্য করলাম না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> প্রথম আলো কিংবা বণিক বার্তা-র মত পত্রিকাগুলোতে প্রায়শই দেখা যায় যে, গরিবরা মহাসংকটে, মধ্যবিত্তরা দুর্দশায়, এ ধরনের নানাবিধ প্রবন্ধ। টিসিবির পণ্যের জন্য হুমড়ি খেয়ে ঝাপিয়ে পড়ে কিংবা পরিচিত কাউকে দেখলেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবিত্তরা মুখ লুকাচ্ছেন কিংবা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না টিসিবির থেকে কাঙ্ক্ষিত পণ্য, এজাতীয় খবর! বারবার একই অভিযোগ করা হচ্ছে, মানুষের যে চাহিদা এর ৫ শতাংশও সরকারি টিসিবি থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মানুষের আয়ের উৎসের সংকটের কারণে দেশ এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, গরীব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা সত্যিই কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে তাদের দিন অতিবাহিত করছে।</p>
<p><strong>এখন</strong>, আমরা এখন যদি পর্যালোচনা করি, যে শর্করা জাতীয় খাবার বাজার থেকে কিনতে হয়, যেমন- চাল, আলু ইত্যাদি। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আলুর দাম ছিল পনেরো টাকা কেজি। ২০২২ বা ২৩ সালেও ছিল তা ২৮ টাকা বা ৩০ টাকা কেজি। এবছর বা আজকের দিনে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজিতে গিয়ে সেটা পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা যদি একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন লক্ষ্য করি, ২০১৮ সালে তাদের বেতন সর্বনিম্ন যে মজুরি ছিল একজন শ্রমিক ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বেতন পেতো। <strong>বর্তমানে তার বেতন সর্বসাকুল্যে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা হয়েছে। বেতন অনুপাত অনুযায়ী ডাবল হওয়া তো দূরের কথা, একদমই বাড়েনি। কিন্তু ১৫ টাকার আলু ৬০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিক্সাচালক বা এ ধরনের বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই, তারা দুপুরের খাবার না খেয়ে হয়তো গার্মেন্টস এর আশেপাশে এলাকায় টং দোকানে রুটি বা বনরুটি ইত্যাদি খাবার খায়, তারাও সংকটে! কারণ এগুলোর মূল্যও প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।</strong></p>
<p>অপরদিকে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তো আরো ভয়াবহ অবস্থা। নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ গার্মেন্টস সেক্টরেও বেশি। তারা টাকা বাঁচানোর জন্য সন্ধ্যায় টিফিন হিসেবে বা দুপুরের খাবার হিসেবে ঘর থেকে বিভিন্ন খাবার বানিয়ে নিয়ে আসে। কখনো চাল ভাজা, সস্তায় বিস্কুট, চানাচুর, কেউ আটা দিয়ে চাপটি, কেউ বা ডাল-ভাত কিংবা শুটকি তরকারী-ভাত। এই নারী শ্রমিকদের আয় যেখানে বৃদ্ধি পায়নি, যারা টাকা বাঁচানোর জন্য বাহিরে পর্যন্ত খান না, তাদের কাছে আলু বা চালের দাম কমেনি বরং কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের জন্য এই ধরনের খাবার বহন করা অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে গিয়েছে‌। আমিষ জাতীয় যে খাদ্য দ্রব্যগুলো রয়েছে, সবগুলোরই কিন্তু ব্যাপক আকারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় আয়ের যে উৎস, তা খুবই নগন্য।</p>
<p>বাংলাদেশ গার্মেন্টস পেশা থেকে অন্যান্য যেসব শ্রম পেশা আছে, সে তুলনায় শুধুমাত্র গার্মেন্টস সেক্টরে করোনাকালীন সময়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য যে শ্রেণী পেশার শ্রমিকগণ রয়েছে, তাদের কাজের যে ভয়াবহ অবস্থা অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয়ভার অনেক বেশি। একটা পরিবারের মানুষের খাবার খরচ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু যদি এক পরিবারে একজন মানুষ চাকরি করে তাহলে তাদের আয় ১২ হাজার টাকার বেশি না। সেক্ষেত্রে ক্ষুদে বিক্রেতা, ঠেলাগাড়ি টানা কিংবা পুরনো কাগজ সংগ্রহকারী লোকজন, দিনমজুর, বেসরকারি বা আধা সরকারি অফিসের কর্মচারী, যারা বিভিন্ন গাড়ির চালক, শিল্প শ্রমিক, হোটেল বয়, নারীদের ক্ষেত্রে গৃহকর্মী, ঝাড়ু দেওয়া কর্মী, পানি আনা, ক্যান্টিনে কাজ করা, কারখানায় নিম্ন স্তরের কাজ করা বা সেলাই করা মানুষ রয়েছে তাদের কি অবস্থা?</p>
<p>একটি জরিপ বলছে, <strong>৪৯ ভাগ শ্রমিক একদম রুগ্ন এবং পুষ্টিহীন</strong>, যাদের গড় আয়ু কমে আসছে। বিশিষ্ট লেখক মাহমুদ শফিক তাঁর ঢাকা নগরের বিপন্ন পরিবেশ গ্রন্থের ‘অবধারিত মৃত্যু’ অধ্যায়ে লিখছেন, বকুল (তালাকপ্রাপ্ত একজন নারী যার রিকশাচালক স্বামী তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন) বলেন: ‘আমার স্বামীর ছিল দানবের মতো দেহ। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। এখন বুঝতে পারি, রিকশা চালানো কত কষ্টের কাজ। কাজের শেষে দেহটা বিছানার সঙ্গে লেগে যেত। তার পাশে যে একজন মেয়েমানুষ শুয়ে আছে, সে তা মোটেও ভাবত না’। বিষয়টা ভাবতেও কেমন জানি গাঁ শিউরে উঠে…!</p>
<p>এরপর আমরা আরেকটি জরিপ যদি দেখি, <strong>প্রতি ১০ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের মাঝে অধিকাংশই তিন বেলা খায় না।</strong> অথবা খেলেও পুষ্টিহীন খাবার খায়। এদের ৯৮ ভাগ পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে থাকে এবং এর মূল কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে তারা ন্যায্য মজুরি পায় না। বাংলাদেশের ৮৭ ভাগ শ্রমিক; যারা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ কোম্পানি থেকে ঋণ নেয় এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে সুদের ঋণ গ্রহণ করে। <strong>৮৭ ভাগ শ্রমিক সারা বছর ঋণগ্রস্ত থাকে এবং ৬৩ ভাগ শ্রমিক বাকিতে চাল-ডাল কিনে।</strong> এসব নিয়ে তাদেরকেও বিভিন্ন ধরনের অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে হয়।</p>
<p>একইসাথে তাদের খাদ্য যোগানের সাথে সাথে তাদের বড় একটি যোগানের ক্ষেত্র হচ্ছে চিকিৎসা। তাদের পুষ্টির যে অবস্থা এক্ষেত্রে আমরা যদি বিভিন্ন জরিপগুলো দেখি তাহলে দেখা যায়, প্রতিটি শিশু, প্রত্যেকটি ব্যক্তি অপুষ্টির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা শহর কিংবা চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ সকল শহরের কিছু জরিপ যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি; দারোয়ান, পিয়ন, ঝাড়ুদার, মেথর, কুলি, মালি ও বর্জ্য কাগজ সংগ্রহক, বিভিন্ন মেকানিক, দর্জি বা কারখানার শ্রমিক, বাইন্ডিং প্রেসে কিংবা মেটাল সংক্রান্ত কারখানায় কর্মরত যে শ্রমিকরা অর্থাৎ নিম্নশ্রেণীর কর্মচারী যারা রয়েছে, তাদের অধিকাংশই কিন্তু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর মূল কারণ হচ্ছে তাদের ক্যালরি গ্রহণের অভাব অর্থাৎ এক্ষেত্রে একটা নীরব হাহাকার চলছে!</p>
<p>প্রথমত, তাদের ওজন কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, তাদের অসুস্থতা বেড়ে যায় এবং বৃদ্ধ শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মারা যাচ্ছে।</p>
<p>যে কোনো একজন শ্রমিক বিল্ডিংয়ে কর্মরত অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে, তাকে পরিচর্যা করার কেউ নেই, হাড় ভেঙে যাচ্ছে কিংবা মারা গেলেও তার দায়ভারকে গ্রহণ করবে কে? এ নিয়ে কোনো নীতিমালা আমরা আজ পর্যন্ত লক্ষ্য করিনি। এভাবে শত শত শ্রমিক বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, যার জরিপ আজ পর্যন্ত কখনও হয়নি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরপর আসা যাক গার্মেন্টস শ্রমিকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে; যাদেরকে শিক্ষিত বানানোর স্বপ্ন তাদের বাবা-মা দেখে। কিন্তু তাদের ব্যয়ভার বহন করে উঠতে পারে না; তাই তাঁদের বড় একটি অংশ তাদের সন্তানদেরকে এখন কর্মমুখী করার চেষ্টা করছে অর্থাৎ তাদের সন্তানরাও শ্রমিক হিসেবে গড়ে উঠছে। একইসাথে এই সন্তানরাও পুষ্টিহীন অবস্থায় বেড়ে উঠছে, কারণ পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা এতটাই ব্যয়বহুল, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয়না। ফলশ্রুতিতে তারা সুস্বাস্থ্যহীন প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠছে, দিনাতিপাত করছে। ‌</p>
<p>কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ কী আদৌ এরকম একটা দেশ?</p>
<p>যেখানে এরকম দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের কোটি কোটি জনগণের পথ চলতে হচ্ছে। যেখানে আমরা কয়েকদিন আগে দেখলাম চট্টগ্রামের ইসলামী ব্যাংকের একটি শাখায় দেড়শ ভরির অধিক স্বর্ণ উধাও হয়ে গিয়েছে। অমুক ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে। <strong>অপরদিকে ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ এ ধরনের লোকেরা কোটি টাকা বাহিরে পাচার করে নিশ্চিন্তে তাঁদের দিন পার করছে।</strong> কিন্তু সে পাচারের ক্ষেত্রে আমরা সুষ্ঠু সমাধান না দিয়ে চিন্তা করছি, কালো টাকা দেশে কেন ভোগ করতে পারে না, যার কারণে বাহিরে দেশে পাঠাচ্ছে। আবার কালো টাকা ভোগ করার সুবিধা যদি দেশে দেওয়া হয়, তাহলে সবাই এটি অর্জন করতে শুরু করবে। এসব নিয়েই তর্ক বিতর্ক শুরু হয়। এ বছর বাজেটে ১৫ % ভ্যাটের মাধ্যমে কালো টাকা বৈধ করার সিস্টেমেটিক ওয়েও দেখা যায়।</p>
<p>অথচ এসবের বিরুদ্ধে গণমুখী ব্যবস্থা নেওয়া কত বেশি জরুরি ছিল, সেসব নিয়ে কিন্তু আমাদের কোনো মাথাব্যথা কিংবা উদ্যোগ নেই।</p>
<ul>
<li>অপরদিকে হাজার হাজার শ্রমিক যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে রেমিটেন্স পাঠায়, তারাও নানাবিধ কষ্টের মধ্য দিয়ে উপার্জন করে। তাদের পরিবারেরও শহর অঞ্চলে সকলেরই বাড়ি ভাড়া করে থাকা সম্ভব নয়, সন্তানের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো সম্ভব হয়না। তবে, তারা তুলনামূলকভাবে সচ্ছল। মূল বিষয় হলো, তাদের এই কষ্টের টাকা বাংলাদেশে আসছে, তাদের অর্থ উপার্জনের চেয়েও বড় বিষয় তারা পরিবার থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকে। কেউ বাংলাদেশে এসে হয়তো বিয়ে করে, তাকে আবার ফিরে যেতে হয়। আবার যারা বিবাহিত অবস্থায় গিয়েছে, বছরের পর বছর পরিবার সন্তান থেকে দূরে, মা-বাবা থেকে দূরে পড়ে থাকে। এত সকল ত্যাগের মধ্য দিয়ে তাদের পাঠানো রেমিটেন্সগুলো দেশে আসে। হয়তোবা এরচেয়ে বেশি পাঠানো সম্ভব ছিল, যদি তারা দক্ষ হতো। কিন্তু তাদের অধিকাংশ মানুষই অদক্ষ, এ ধরনের মানুষরাই বিদেশে যায়, এটাও আরেক জাতীয় দুর্বলতা।</li>
</ul>
<p><strong>আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি ও আয়ের অন্যতম উৎস বিদেশে থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো আয়।</strong> <strong>সবমিলিয়ে যখন তাদের পাঠানো কষ্টের টাকাগুলো/রেমিটেন্সগুলো দেশে আসে এবং নানাভাবে বাইরেই পাচার হয়ে যাচ্ছে, গোটা জাতি শোষিত হচ্ছে! এরচেয়ে বড় জাতীয় লজ্জা আর কি হতে পারে আমাদের জন্য!? </strong></p>
<p>গত কয়েকবছরে প্রায় ২৫ লক্ষ শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে খালি হাতে! কিন্তু কেউ কি খবর রেখেছে তাদের? বা তাদের কোনো মৌলিক দাবির? তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে? তাদের পারিবারিক অসহায়ত্বের কোনো সমাধান কি হয়েছে? জমি বিক্রি করে আমাদের টগবগে যুবকরা বিদেশে গিয়ে অসহায় চেহারা নিয়ে রাতদিন খেটে যায়, নির্যাতিত হয়; তাদেরকেই যখন খালি হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তখন একটা লাইনও আমরা উচ্চারণ করি না! কোনো উদ্যোগ ও কর্মসূচি তো বহুদূর! আদৌ এর কোন সমাধান হয়েছে কি?</p>
<ul>
<li>এরপর যদি আসা যাক নারী শ্রমিকদের আলোচনায়, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা। নিয়মিতই দেশে প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের লাশ ফেরত আসছে। <strong>এক বছরে সবমিলিয়ে লাশ এসেছে ৪ হাজার ৮৮১ টি।</strong> এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও অনেক। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় <strong>সাড়ে তিনশ</strong>। তাঁদের মধ্যে <strong>৫৩ জনই আত্মহত্যা</strong> করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে! কোনটা আত্মহত্যা আর কোনটা হত্যা, তাইবা কে বলবে? কেনইবা পরিবারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আমাদের মায়েরা আত্নহত্যা করে? কেউ আছে আমাদের? আছে কোনো পররাষ্ট্রনীতি, কোনো বৈদেশিক শ্রম ও অধিকার মন্ত্রণালয়?</li>
</ul>
<p>এ সকল পরিস্থিতিতে সত্যিকার সমাধান বা উত্তরণের উপায় বের করতে এগুলোকেই জাতীয় অর্থনৈতিক ইস্যু কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা বিভিন্ন ধরনের অহেতুক ইস্যুতে ব্যস্ত। ফলশ্রুতিতে যুবকরা কেন-ই-বা হতাশ হবেনা?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> আমরা যদি লক্ষ্য করি, বাংলাদেশ আজ ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নিমজ্জিত। অপরদিকে এসকল জ্বালানি সংকট নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই, থিসিস বা রিসার্চ পেপার নাই, কোনো প্রস্তাবনা নেই কিংবা সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে কর্মসূচি নেই। কিছুদিন আগেও আমরা দেখতে পেয়েছি, সেন্টমার্টিন নিয়ে এত কথা ও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অথচ, সেন্টমার্টিন নিয়ে কোনো ধরনের থিসিস বা প্রস্তাবনা নেই। আসলে সেখানে কী হয়েছিল? এখানে কী আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা অথবা সুশীল সমাজের দুর্বলতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না? এগুলো কেন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয় না?</p>
<ul>
<li>এরপর যদি আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের পার্বত্য অঞ্চল এখনো পর্যন্ত একটি ধোঁয়াশায় নিপতিত হয়ে আছে। সেটি নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই, বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ কারো কোনো গঠিত প্রস্তাবনা নেই কিংবা এ বিষয়ে আমাদের কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নাই।</li>
</ul>
<p>আমরা কিছুদিন আগে মেতে উঠলাম ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে। এখানে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, আমাদের সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি নেই কেন? পররাষ্ট্রনীতি থাকলেও সেটা আদৌ কী? অর্থাৎ সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি যদি থাকতো, তাহলে এই নীতির উপর ভিত্তি করে ভিন্ন দেশের সাথে আমরা চুক্তি করতে পারতাম। সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতিই যেখানে নেই, সেখানে ছোটখাটো দুই-একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস কিংবা ছোট দুই-একটি খবর দেশের পলিসির কিই-বা পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ স্থায়ী মুক্তির জন্য কোনো ইশতেহার সামনে হাজির নেই, কোনো গবেষণা নেই, সুশীল সমাজের কাজ নেই, সেখানে যুব সমাজ কেন-ই-বা হতাশ হবে না?</p>
<ul>
<li>বাংলাদেশের দারিদ্র্য কিংবা যুব সমাজের হতাশা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দেশের মৌলিক আলাপের বিষয় হওয়া দরকার ছিল; শিক্ষাব্যবস্থা। আর এই সেক্টর দক্ষ যুব সম্প্রদায়ের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হবে, পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন খাতসমূহকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। এ ধরনের কোনোকিছুই কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি না অর্থাৎ আজকের এই যে ভয়াবহ বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে, এর পেছনের অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।</li>
</ul>
<p>জাতীয় সংকট পূরণে এ শিক্ষাব্যবস্থা কোনো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারছেনা। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে সকল বিষয়ে কোন প্রস্তাবনা নেই, কর্মপরিকল্পনা নেই।</p>
<p>সার্টিফিকেট ছাড়া ভিন্ন কোন অর্জনও নেই, বিবেকবোধ পর্যন্ত জাগ্রত হচ্ছেনা! বর্তমানে আমাদের এমন অবস্থা যে, রাস্তার পাশে বৃদ্ধ অসহায় নারীদের পড়ে থাকা, কিংবা যুবতী নারীরা শিশুসন্তান নিয়ে ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে, বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করছে, শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাসহ সকল কিছু থেকে বঞ্চিতরা পথে ঘুমাচ্ছে, সেসকল মানুষজনের দিকে তাকানোর পরেও শিক্ষার্থী সমাজের ভবিষ্যৎ ভাবনা, দেশকে গঠন করার ভাবনা, কাজ করার মানসিকতা তৈরি হচ্ছেনা। অর্থাৎ এক ভয়াবহ মানসিক দাসত্বের মধ্যে দিয়ে বড় হচ্ছি কিংবা দিন পার করছি। তার মূল কারণও আখলাক ও আধ্যাত্মিকতাহীন এই শিক্ষাব্যবস্থা। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যদি হাজির থাকে, কেন-ই-বা আমাদের যুব সম্প্রদায় হতাশ হবেনা?</p>
<ul>
<li>গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়ে আমাদের নজর দেওয়া আবশ্যক।</li>
</ul>
<p>কিছুদিন আগে ঈদ গেল! শুধুমাত্র গত এক বছরে- প্রায় ০৭ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু পরিসংখ্যান আমাদের আড়ালেই থাকে তা হচ্ছে- মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যারা নিহত হয়। রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, নদীপথেও দুর্ঘটনা ঘটছে; এগুলোকে শক্তিশালী করে সুন্দর একটি বিকল্প মাধ্যম বানানো যেত, কিন্তু নদীগুলোকেও আমরা হত্যা করছি।</p>
<p>অপরদিকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল সাইটে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কয়েক লক্ষ ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লক্ষ-লক্ষ ভুয়া চালক এখন বিদ্যমান। <strong>বিশেষ করে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মনির মারা যাওয়ার পর বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডক্টর শামসুল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাস্তার বাঁকগুলো অবৈজ্ঞানিক। যে ধরনের প্রশস্ততা থাকা দরকার সে ধরনের প্রশস্ততা নেই। রাস্তাগুলো যেখানে যে ধরনের বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা দরকার ছিল সেগুলো নেই।</strong></p>
<p>গাড়ির যে অবস্থা সেখানকার যে তদারকিসহ সকল জায়গাতেই একটা ব্যর্থতার পরিচয় আমরা দিয়ে যাচ্ছি। এগুলোকে জাতীয় ইস্যু, সংস্কার করা, সমাধান করা নিয়ে সে অর্থে দাবী উত্থাপন করতে দেখা যায়না, এমনকি জাতীয় রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুতে এ সকল বিষয়গুলোকে আমরা হরহামেশা অনুপস্থিত রেখে দিচ্ছি। অথচ দূর্ঘটনা আমাদের জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।</p>
<ul>
<li>সম্প্রতি হঠাৎ ব্যাপকভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে! দ্যা ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর ২০২৩ সালে ২৭৬২৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দৈনিক ৭৭টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মিডিয়া সেল থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সারা দেশে এই অগ্নিকাণ্ডে ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য ঘটনা মিডিয়া কভারেজের বাইরে ছিল।</li>
</ul>
<p>বিভিন্ন গ্যাস ফিল্ড, বিভিন্ন কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি বিষ্ফোরণ হয়ে বিভিন্ন বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। এসব কিন্তু সিস্টেমেটিক বিষয়ের সাথে জড়িত। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো চাইলেই সমাধান করা সম্ভব। যখন মারা যাচ্ছে, তখন কিছু কথাবার্তা হচ্ছে, কিছু গ্রুপ ত্রাণ দিচ্ছে, কোন কোন সংগঠন আবার সমবেদনা জানিয়ে প্রেস ব্রিফিং করছে কিন্তু তারপরে কেউ এ ব্যাপারে এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন থেকে শুরু করে কেউ কথা বলছে না, কেউ কোনো ভূমিকা রাখছে না। এ সকল ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যখন দেশ আগাচ্ছে, তখন যুব সম্প্রদায়ের মনে হতাশা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।</p>
<p><strong>কারণ এই সময়ে বসে আমরা দেখতে পাচ্ছি,</strong> সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে। সামগ্রিকভাবে আইনের শাসনে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। ঋণ খেলাপের দিক থেকেও বাংলাদেশ প্রথম সারিতে অবস্থান করে। এভাবে করে বাংলাদেশে ধর্ষণ সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে, গত দুই বছরে ১৭ হাজারের অধিক নারী-শিশু ধর্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ আইন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। এ সকল সহিংসতার দিক থেকে বাংলাদেশের ঢাকার অবস্থান চতুর্থ। ২০০২ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ ও গণধর্ষণের পর হত্যা, এছাড়াও বিভিন্ন যে হত্যাগুলো হয়েছে অর্থাৎ বিনা অপরাধে কিংবা হত্যা সংশ্লিষ্ট যে মামলাগুলো হয়েছে, তার ৯৭ ভাগেরই সাজা হয়নি। নাগরিক নিরাপত্তার বেলায়ও আমরা দেখতে পাই, ১১৩ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২ বা ১০৩ এ থাকছে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা, যানবাহন নির্মাণ-শিল্প, পাহাড়কাটা, জাহাজের কিংবা ট্রেনের নিচে অবহেলার জন্য দুর্ঘটনা, নানাবিধ কারণে শত শত হাজার হাজার মানুষ মরছে। বৈদ্যুতিক শক কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে, উচু জায়গা থেকে পড়ে গিয়ে একইভাবে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হচ্ছে। এর থেকেও বেশি নিহত হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিনা অপরাধে হত্যার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা সুষ্ঠু কোন সমাধান পাচ্ছিনা। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমাধান হচ্ছে না অর্থাৎ ৯৭ ভাগ অপরাধী এ পর্যন্ত সাজারই বাইরে থেকে গেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এ সকল পরিস্থিতিতে দেশের যুব সম্প্রদায়ের মূল অংশটি কিন্তু দেশ ছাড়ার জন্য উন্মুখ।</strong></p>
<p>যে দেশে বেকারত্ব, যে দেশের কৃষি সংকট, যে দেশে সুস্থ শিক্ষার সংকট, যে দেশে এরকম অনিরাপত্তা! এই ধরনের সৃষ্ট সমস্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত করা, সেখানে গোটা প্রজন্মই যেন বড় হচ্ছে দেশ ছাড়ার স্বপ্ন নিয়ে।</p>
<p>তবে সেখানে একটি বড় অবদান রাখতে পারতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহ। ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধী দল, তাঁদের কোন দল ক্ষমতায় আসার পরে প্রথমে কিছু ইনোভেটিভ, ভালো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিগত ছয় মাসে বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে সেটিও কিন্তু আমরা লক্ষ্য করিনি। একইভাবে এই সকল জায়গাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারতো বিরোধী দলগুলো, তারা কোনো ভূমিকা রাখছে না। মূল কথা হচ্ছে জাতীয় রাজনীতি চরম হাহাকারে নির্মিত হচ্ছে।</p>
<p>এ হাহাকারটা কিসের?</p>
<p>এ হাহাকার নেতৃত্বের হাহাকার, যুবক সমাজের প্রস্ফুটিত হওয়ার হাহাকার। কারণ শক্তিশালী যুববান্ধব নেতৃত্ব নেই, কিছু কথাবার্তা হলেও সেগুলো ফেসবুকের কিছু লেখালেখি, কিছু ইউটিউবের ভিডিও! অর্থাৎ কোনো ভিশনারি দলের পক্ষ থেকে শক্ত লিডারশিপ এবং জাতির সংকট উত্তরণের জন্য তাদের পক্ষ থেকে কোন যৌক্তিক আহ্বান করছেনা। <strong>যুব সমাজকেও গড়ে তোলার কোনো প্রচেষ্টা করছে না। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে এর ভয়াবহ যে শূন্যতা, তার বড় প্রমাণ হচ্ছে তরুণ নেতৃত্ব তুলে আনার জন্য কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক কোনো উদ্যোগ বর্তমানে আমরা লক্ষ্য করি না।</strong> বরঞ্চ নানাবিধ ইস্যুর ভীড়ে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। অথচ এই যুবসমাজকে গড়ে তোলার চেয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক যে উদ্যোগগুলো প্রয়োজন ছিল; এই প্রয়োজন সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বেকারত্ব, শিক্ষা কাঠামো, দেশের অব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়গুলোকে নিয়েই কিন্তু ইস্যু হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো কেউ করতে পারছে না। মূলত এই প্রত্যেকটি কাজ ছিল বড় বড় রাজনৈতিক দল, সংগঠন, অর্থনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর। অথচ কেউ এক্ষেত্রে স্বার্থক কিংবা সফল হতে পারেনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আবার সকলের একটি মুখস্ত দোষ দেওয়ার জায়গা তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে, তারা কিছু করতে দিচ্ছেনা। আসলে কি আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে? নাকি বাহ্যিকভাবে কোনো নেতৃবৃন্দ দেখা গেলেও তাদের হাতে আসলে দেশ নেই। মাফিয়া সিন্ডিকেট কিংবা ডিপ স্টেটগুলো দেশ চালাচ্ছে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের মত করে সমস্ত কিছুকে শোষণ করে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। আমরা সম্পূর্ণ একটি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছি।</p>
<p>আমরা যদি বিএনপি-জামাতের দিকে লক্ষ্য করি, তারা নির্বাচনের আগে একটু একটিভ হলেও বাকি সময়গুলোতে জাতীয় ইস্যু তারা নির্ধারণ করতে পারছে না। গণমুখী আহবান তাদের করতে হবে। এটা তাদেরকে করতে হবে, যদি তারা সামনে কিছু করতে চায়। তারা আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, তারাই দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ সংগ্রামকে এগিয়ে নেবে; এ ধরনের দৃঢ়তা তাদের জন্য আবশ্যক।</p>
<p>অর্থাৎ এই যে সংকট, এ সংকটগুলো কেন-ই-বা তৈরি হচ্ছে? এ প্রশ্ন কিন্তু আমরা করছি না। কারণ এ অবস্থা একদিনে হয়নি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। কেন জাতীয় ব্যর্থতা?</p>
<ul>
<li><strong><em>সমাজ গতিশীলতা হারিয়ে ফেলছে, আমরা ব্যক্তি পর্যায় থেকে কেউ কাজ করি না। কেউ দেশকে শক্তিশালী করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছি না।</em></strong></li>
<li><strong><em>সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তি চেপে বসা।</em></strong></li>
<li><strong><em>ডিপ-স্টেটগুলির নিয়ন্ত্রণ। </em></strong></li>
<li><strong><em>আমাদের সামাজিক সচেতনতাকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলা। এ সকল কারণগুলোর মধ্য দিয়ে একটা অজানা দাসত্ব ব্রিটিশ আমলের ন্যায় চেপে বসে আছে। </em></strong></li>
</ul>
<p>ফলশ্রুতিতে জ্বালানি খাতের মতো এতো বড় খাত কিংবা সাধারণ একটি খাতের কোনো সুষ্ঠু নীতি তৈরি করতে পারি না। যেমন- জ্বালানি খাতের ভুল নীতির কারণে আজকে বিদ্যুৎ সংকটে পড়তে হচ্ছে। সত্যিকারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নেই, থাকলেও তাদের নীতি সর্বদাই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় তৈরি হয় এবং সে আলোকেই প্রস্তাবনা দেয়। আমদানি নির্ভর জ্বালানি খাত বানানোর মতো অন্যতম কারণও এটি। খাদ্যের ক্ষেত্রে একই ভাবে এটি আমদানি নির্ভর করে রেখেছে। খাদ্য বিশেষজ্ঞ আমাদের নেই? সে ধরনের নেতৃত্ব কি নেই? সত্যিই তো নেই। যেখানে বড় বড় গোষ্ঠীর দলগুলি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সেখানে যুবকদের অবস্থা কিইবা হবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য বলতে চাই,</p>
<p>জাতীয় ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে, সমাজকে গতিশীল করতে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে মুক্ত করতে, সামাজিক সচেতনতা এবং দাসত্ব থেকে মুক্ত একটি যুব সম্প্রদায়কে গড়ে তুলতে; <strong>সর্বপ্রথম যুবকদেরকে একটি জাতীয় ভিশন দেখাতে হবে।</strong> প্রত্যেকটি ব্যক্তি যেনো তার ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে, নিজ ফিল্ডে জানা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারে, উপমা তুলে ধরতে পারে। সংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা শিক্ষা বা অন্য কোনো মাধ্যমে যুবকদের গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। ভিশনারী এই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলেই আজকের এই দিনের হতাশা যুব সম্প্রদায়ের মাঝে আত্মবিশ্বাস আকারে ফিরে পাবে।</p>
<p>কারণ আমরা সংগ্রামী জাতি, যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করেই আমাদের আজানকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, জাতীয় সত্তাকে টিকিয়ে রেখেছি, ঈমানকে টিকিয়ে রেখেছি, আমাদের মাটি ও মানুষের মৌলিক যে চেতনা সেটিকে টিকিয়ে রেখেছি। অতএব এ সকল বিষয়কে যেহেতু আমরা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, অর্থনীতি, পানি, নগর, গার্মেন্টস, জ্বালানি সকল ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে পারবো এবং জাতীয় নেতৃত্ব আমাদের যুব সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই দিতে পারবো, এ বিশ্বাস লালন করতে হবে এবং এটার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার ওয়াদা অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যোগ্য করে তুলবেন, ইনশাআল্লাহ।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 66px; top: 2202.93px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14551</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান; জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫</title>
		<link>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 30 Jun 2024 13:53:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি খাত]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫]]></category>
		<category><![CDATA[সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান;]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14504</guid>

					<description><![CDATA[একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে একটি পরিবার কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে, সেই অর্থবছরে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি কী হবে, ঢাকার একজন শিক্ষার্থী নিত্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কতটা সহজে সংগ্রহ করতে পারবে অথবা রাজশাহীর একজন কৃষক তার উৎপাদিত আমের ন্যায্যমূল্য পাবেন কি-না– এগুলোর প্রতিটিই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এক কথায়, কোনো একটি দেশের ব্যক্তি পরিসর থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় বিষয়াদি; এমনকি আন্তর্জাতিক বিশ্বে সেই দেশটির কূটনৈতিক পন্থা নির্ধারণ কেমন হবে– এ সবকিছুই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এজন্য বাজেটকে এক অর্থে একটি জাতির ভাগ্যলিপি হিসেবেও উল্লেখ করা যায়।</p>
<p>প্রতি বছরের ন্যায় ‘সুখি, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে এবারও জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৪.২ শতাংশ এবং চলতি বাজেটের তুলনায় ৪.৬ শতাংশ বেশি। প্রতি বছর বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও কেন দেশের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। পাশাপাশি বাজেটের কলেবর বৃদ্ধি আদৌ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য সহায়ক নাকি বোঝা স্বরূপ, তাও আলোচনা করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে বাজেটের খাতগুলোও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের পর্যালোচনা</h3>
<p>একটি দেশের বাজেটের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো হলো শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য। কারণ দেশের সকলেই এ খাতগুলোর উপর সরাসরি নির্ভরশীল এবং এগুলোর উপরেই দেশের অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন ছিলো এ খাতগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বরাবরের মতোই অবহেলিত রয়েছে এ খাতগুলো। বর্তমান অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রেক্ষিতে যদি আমরা বিস্তারিত আলাপ করি, সেক্ষেত্রে দেখা যায়–</p>
<p>★<strong> শিক্ষা খাত</strong></p>
<p>আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষার হার এখনো আশানুরূপ পরিমাণে বাড়েনি। ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এর সুবাদে প্রাথমিকে ধীরে ধীরে প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও এসব শিক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশি মাধ্যমিক স্তর পার হতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর ২০২৩ সালের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলো ৯২ লাখের বেশি। ২০২৪ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৬৬ হাজারে।</p>
<p>পারিবারিক দরিদ্রতা, শিক্ষার ব্যয়ভার মেটানোর অক্ষমতা এবং চাকরি নির্ভর পড়াশোনাকেই শিক্ষা হারের এ দুর্দশার কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি হিসাব মতে দারিদ্র‍্যের হার ১৮.৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তব সংখ্যা এরচেয়ে দ্বিগুণ বেশি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর জরিপ অনুসারে, ২০২০ সালের শেষে দারিদ্যের হার ছিলো ৪২ শতাংশ। এর মাঝে দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বাস করছে ২৮.৫ শতাংশ নাগরিক। এদিকে ভর্তি ফি, টিউশন ফি, শিক্ষার উপকরণ খরচ, প্রাইভেট-কোচিং বাবদ ইত্যাদি সবই এ বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে।</p>
<p>এর পাশাপাশি, গ্লোবালাইজেশনের সময়ে এসে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল, সেখানে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সকল কিছুরই ব্যয়ভার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইটি পণ্যগুলোর দাম দিনদিন বাড়ছেই। ডিজিটালাইজেশনের সময়ে এসে এমন লাগামহীন অবস্থা শিক্ষাব্যবস্থায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।</p>
<p>অথচ এতসব কিছু বিচার বিবেচনায় না নিয়ে প্রতি বছর শিক্ষা খাতে বাজেটের হার কমছেই। শিক্ষাখাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে বরাদ্দ ছিলো জিডিপির ১.৮৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১.৭৬ শতাংশে নেমে আসে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১.৬৯ শতাংশে, যা মোট বাজেটের ১১.৮৮ শতাংশ। অঙ্কের হিসেবে ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।</p>
<p>একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ইন্ডিপেনডেন্ট এর সূত্রানুযায়ী এ বছরের বাজেটে ৫৬ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মতো। এবং বণিকবার্তার সূত্রানুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি। সেক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের পেছনে গবেষণা বাবদ অর্থ বরাদ্দ মাত্র ১ লক্ষ টাকার কিছু বেশি। একজন শিক্ষক মাত্র এই কয় টাকার উপর নির্ভর করে গবেষণায় কতটা মনোনিবেশ করতে পারবে বলে মনে হয়? তাহলে কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার প্রতি অনীহা বা অনাস্থা প্রদর্শন করবে না?</p>
<p>আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও বর্তমান শিক্ষার মান হিসেবে এই খাতে বাজেটের পরিমাণ নিতান্তই কম। আইএলও এবং ইউনেস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মান মোট বাজেটের ২০ শতাংশ আর জিডিপির ৬ শতাংশ। এর তুলনায় যে নগণ্য বরাদ্দ আমাদের বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কীভাবে একটি দেশের শিক্ষার মানের উন্নতি আশা করা যায়? এছাড়া, গবেষণার জন্য তো আলাদা বাজেট নেই-ই। উচ্চশিক্ষার জন্য গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না পারছে একটি শিক্ষিত ও জ্ঞাননির্ভর জাতি গঠন করতে, না পারছে জাতীয় শিক্ষার মান উন্নত করতে। তারচেয়েও দুর্ভাগ্যজনক হলো এ বরাদ্দের ক্ষুদ্র একটি অংশই শিক্ষাখাতে সত্যিকারার্থে ব্যয় হয়, সিংহভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগী দুর্নীতিবাজ শ্রেণির পকেটে।</p>
<p>স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরোলেও শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের মান, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের আবাসান সংকট, গবেষণার দৈন্যদশা, জ্ঞানচর্চার সুষ্ঠু আবহ– এসবের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন নেই। সব মিলিয়ে অবস্থার চরম করুণ পরিপ্রেক্ষিতে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষাখাতে যতটুকু বাজেট দেওয়া হচ্ছে, তার সম্পূর্ণটাই কি এ খাতে ব্যয় হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে স্বল্প পরিমাণ বাজেটের অংশটুকুও? এই প্রশ্ন জাতির প্রতিটি সচেতন বিবেকের। <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hasan-vai-1.jpg" height="123" /></a>★<strong> কৃষি খাত</strong></p>
<p>শত শত নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত কৃষি। শুধু আমাদের দেশেরই নয়, বরং যে কোনো দেশেরই উন্নতি-অগ্রগতির প্রধান বাহন এ কৃষি খাত। আমরা দেখি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন ও রাশিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পখাতে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃষিকে কখনোই অবহেলা করেনি। যার ফলে, সারা বিশ্বে গম, ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনেও শীর্ষস্থানে রয়েছে এ দেশগুলোই।</p>
<p>এদিকে বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদেও কৃষির সাথে যুক্ত (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩)। অথচ এ দেশের কৃষি খাতের অবস্থা দিনদিন ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হচ্ছে। রপ্তানির পরিমাণ তো বৃদ্ধি পাচ্ছেই না, উল্টো যত দিন যাচ্ছে, আমদানির পরিসংখ্যান যেন তরতর করে বাড়ছে। যেখানে ইলিশ, পাট, চালসহ আরও নানান কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে ছিলো, সেখানে বর্তমান সময়ে এসে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ভুট্টা, ডাল, মসলা, ফল, নারকেল, নারকেলের শাঁস, সারসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি আমদানি করতে হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাতীয় অর্থ।</p>
<p>বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপাত্ত অনুসারে, কৃষি পণ্য আমদানিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার কোটি ডলার) বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সূত্র অনু্যায়ী, একই অর্থবছরে সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে বিলিয়ন ডলারের (৫০০ কোটি) বেশি। ফলে দেখা যাচ্ছে, কৃষি পণ্য ও সার আমদানিতে বাংলাদেশকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ বছরে মূল্যস্ফীতি ও চাহিদা বাড়ার কারণে কৃষিতে আমদানির এ পরিমাণ বেড়ে তিনগুণও হতে পারে।</p>
<p>রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দামও। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কৃষি বাজার। যে সবজি পূর্বে ৩০/৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত, তা এখন ১০০ টাকা ছুঁয়েছে। বেড়েছে চালের দাম, মাছের দাম, মুরগীর দামও। তেলের দামও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে এ দাম বাড়ানো হয়, অথচ যখন বিশ্ববাজারে দাম আবার কমে, তখন স্থানীয় বাজারে দাম কমার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।</p>
<p>এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক বাজেটের মাত্র ৪.৭ (বণিকবার্তা) শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কৃষি খাতে। যদিও গতবারের তুলনায় এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বেশি, তবু বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশের জন্য এমন বরাদ্দ খুবই আশঙ্কাজনক। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক জরিপে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে; সেই জরিপে দেখা যায়, খাবার কিনতে হিমশিম খাওয়া মানুষের হার ৬৮ শতাংশ। দেশের জনগণের এই দুর্দশা ঘোচাতে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিলো এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু নতুন বাজেট আবারও হতাশ করেছে জনগণকে। কেননা, সেই পদক্ষেপের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না বাজেটে। তার মানে আগামীতেও সহজে পরিবর্তন হচ্ছে না চলমান পরিস্থিতি। বাজেট আসছে যাচ্ছে, কিন্তু সেই পুরনো ভুত কাঁধে নিয়েই এগোচ্ছে গোটা জাতি।</p>
<p>★<strong> স্বাস্থ্য খাত</strong></p>
<p>বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত। কিন্তু, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।</p>
<p>সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে জনপ্রতি চিকিৎসা-ব্যয় গড়ে ৫৪ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় পাঁচ হাজার ৯৯৪ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা নিতে বহির্গমনকারী রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ। বিডার হিসাবে, এ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর আস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশে বিগত বছরগুলোয় সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বাড়লেও চিকিৎসকের মান ও সেবার পরিধি প্রসারিত হয়নি। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরেই যেতে হয় সামর্থ্যবানদের।</p>
<p>কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কী অবস্থা? এখন পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে বিশেষায়িত সেবা পৌঁছায়নি। নির্ভুল রোগ নিরীক্ষা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব সংকটের কারণে রোগীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে বেসরকারি হাসপাতালে যায়। যখন সেখানেও প্রয়োজনীয় সেবা মেলে না, তখন যাদের সক্ষমতা রয়েছে, তারা বিদেশে চলে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তারা? তারা তাদের সমস্যাবলি শরীরে নিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে থাকে।</p>
<p>স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য হাসপাতাল রয়েছে মাত্র ৮,৪৯৪। যার সবগুলো মিলিয়ে শয্যাসংখ্যা মাত্র ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৩০১ টি। জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা যে অতি নগণ্য, তা পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।</p>
<p>চিকিৎসা ব্যবস্থার এহেন করুণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট মাত্র ৫.১৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। একটি দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের সকল জনগণের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার জন্য এই ক্ষুদ্র অংশ কোনোমতেই যথেষ্ট নয়।</p>
<p>★ <strong>অন্যান্য</strong></p>
<p>এ তো মাত্র কয়েকটি খাতের পর্যালোচনা। অন্য সবকটি খাতই পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় খাতগুলোতে যথাযথ বাজেট নেই। এমন সব খাতে বরাদ্দ বেশি দিয়ে রাখা হয়েছে, যেগুলো আদতে মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোনো পরিবর্তন আনছে না, দেশের সামগ্রিক উন্নতিতেও অবদান রাখছে না। পাশাপাশি কোনো খাতেই সঠিক ব্যয় হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ শ্রেণি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বরাদ্দকৃত এ প্রয়োজনের তুলনায় ক্ষুদ্রাংশও ঠিকঠাক পৌঁছাচ্ছে না জনগণের দোরগোড়ায়।</p>
<p><strong>বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ৩.৮%, পরিবহন ও যোগাযোগে ১০.৪০% বরাদ্দ রেখে বাজেট করা হলেও তা কি আদৌ বাস্তবায়ন করা হয়? এ খাত দুইটির সাথে প্রক্রিয়াধীন ও প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট জড়িত, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ছেই। কখনো কখনো তা একই ধরনের প্রকল্পে উন্নত রাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।</strong> প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কাঁচামালের যোগান সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। এক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা ও তা উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা মোটেও নেই। প্রযুক্তিও ব্যবহার হচ্ছে বিদেশীদের। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও কোনো দেশী কোম্পানির কাছে নেই। প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই বিদেশী। আর শ্রমিকদের মধ্যে দেশীয় যারা, তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাও নিতান্তই সামান্য। তাহলে কার পেছনে ব্যয় হচ্ছে এত অর্থ?</p>
<p>বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছোট-বড় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াট হলেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৭৮২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তার উপর এ অংশ থেকেই বিতরণ ক্ষতি হয়েছে ৮.৪৮%। যার ফলস্বরুপ এখনো ২১% বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে।</p>
<p>পরিবহন ও যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত নগরজীবনে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। যানজটের ফলে দীর্ঘ একটি সময় অপচয় হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সময়। নগরবাসীদের অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তো দিন দিন বাড়ছেই। কেবল ২০২১ সালেই সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮৫১৬ জন। একটা প্রতিবেদনে এ রকম দেখালেও মূলত বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।</p>
<p>বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে রেল ও নৌপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিলো। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নৌ-পথ অর্ধেকের বেশি কমেছে। রেলপথ গুরুত্ব পায়নি, বরং রেলযাত্রার উপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সড়কপথ বাড়লেও এসবের মান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।<br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<h3>📌 সুদভিত্তিক বাজেট</h3>
<p>সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো প্রতিবারের মতো এবারের বাজেটও একটি সুদভিত্তিক বাজেট। আমরা যেখানে দেখতে পেলাম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বাজেটের যথেষ্ট বরাদ্দ নেই, সেখানে সুদের মতো একটি সম্পূর্ণ অযাচিত খাতেই ব্যয় হচ্ছে বাজেটের ১৪.২৪%। অর্থাৎ, মোট বাজেটের ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুধু সুদ হিসেবেই দিতে হবে আগামী এক বছরে।</p>
<p>অথচ, এই সুদ কেবল ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, একইসাথে অর্থনৈতিক দিকে থেকে একটি ভয়াবহ বিষয়। ৯২% মুসলমানের দেশে ১৪.২৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই; অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতিরাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দরিদ্রতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার, সামাজিক নিরাপত্তা খাত এর মতো যে সকল খাতে দুর্নীতি বেশি, সে সকল খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিলো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্দকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি! আর মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কীভাবে পরিশোধ করবো? অথচ</p>
<p>আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সা.) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সব সময়ই সুদের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ, এই সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও এই অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সা.)। এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি</h3>
<p>অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদের ভয়াবহ আরেকটি কুফল হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। বর্তমানে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার চলছে ৯.৮%। এই অবস্থার মাঝেও প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ৬.৫%। অথচ আমরা দেখেছি গত অর্থবছরে ৬% লক্ষ্যমাত্রা ধরেও তার লাগাম টেনে ধরতে পারেনি সরকার। বরং আকাঙ্ক্ষিত অঙ্কের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে ৩.৮% বেড়ে গেছে এই সংখ্যাটা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 ঘাটতি নির্ভর বাজেট</h3>
<p>অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারের বাজেটও সম্পূর্ণ ঘাটতি বাজেট। মোট বাজেটের পরিমাণ ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাকী ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা পুরোটাই ঘাটতি থাকছে। যা মোট বাজেটের ৩২.১২ শতাংশ।</p>
<p>অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েই এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ঋণ নেয়ার ধারাবাহিকতা আজ নতুন নয়। প্রতিবছরই ঋণের বোঝা বাড়ছে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭৪ ডলারে। টাকার হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজারের বেশি টাকা। সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুটির উপরও এই ঋণের ভার বর্তাবে।</p>
<p>বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি নিরাপদ সীমার মাঝে পড়ে। অথচ ২৩-২৪ অর্থবছরেরই ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫.৫ শতাংশের বেশি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে চার দশমিক ছয় শতাংশ (ডেইলি স্টার)। এই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ঋণ ও প্রতিবছর যে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে, এ নিয়ে বাজেট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তো লক্ষ্যণীয় নয়ই, বরং নামেমাত্র যেনো বাজেট পেশ করতে হবে, এজন্যই বাজেট পেশ করা হচ্ছে।</p>
<p>কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, “আর্থিক বিবৃতি প্রদান একপ্রকার ধর্মীয় আচার হয়ে দাড়িয়েছে, যা পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে এবং তার সম্ভাব্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রভূত বাকচাতুরীর দ্বারা উচ্চকিত রূপে পাঠ করা হয় (যা কখনোই পাঁচ ঘণ্টার নিচে সম্পন্ন হওয়ার নয়) অর্থাৎ নানাবিধ নর্তন, কুর্দন, ভাব ও ভঙ্গিমার সঙ্গে চার ঘণ্টার একটি বক্তৃতা প্রদান করা হয়।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 কালো টাকা সাদা করার জঘন্য নীতি</h3>
<p>এদিকে এ বাজেট যেনো কালোবাজারি ও দুর্নীতিবাজদের জন্য নিদারুণ খুশির সংবাদ নিয়ে এসেছে। মাত্র ১৫% কর দিয়েই অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা হবে আইনানুগভাবে বৈধ। পঞ্চাশ লাখ টাকা ইনকাম করলে ৩০% টাকা কর দিতে হবে, কিন্তু কালো টাকা সাদা করতে ১৫% কর দিতে হবে। এখন যারা কালো টাকা সাদা করবে, তারা তো আর পঞ্চাশ লাখ টাকার মতো নামেমাত্র টাকা সাদা করবে না। তাদের টাকার অঙ্কই তো হবে কমপক্ষে কয়েকশ&#8217; কোটি টাকা, তাহলে সেখানে কীভাবে এতো কম করহারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়!?</p>
<p>এই ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থনীতি বিশ্লেষকগণও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, “মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার এই ব্যবস্থা সৎ ও বৈধ আয়ের ব্যক্তি করদাতাকে নিরুৎসাহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে”। ঘোষিত অর্থ ও সম্পদের ব্যাপারে কোনো কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন করার সুযোগ না রাখা দেশে দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে টিআইবি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 বেকারত্বের অভিশাপ</h3>
<p>আমরা ইতঃপূর্বেই দেখেছি দেশের বর্তমান বেকারত্বের হার যেভাবে বাড়ছে, তা সত্যিই একটি জাতির জন্য উদ্বেগজনক। কেননা, বেকারত্ব একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভঙ্গুর করে দেয়, দেশজ উৎপাদন কমে যায় এবং অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত করে। শুধু তাই নয়, বেকারত্বকে একটি জাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, যারা হতে পারতো দেশের উন্নয়নের সোপান, একটি দেশকে সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী কারিগর, সেই বিপুল মানবসম্পদ নিদারুণভাবে অপচয় হচ্ছে। আবার, বেকার যুবসমাজ সহজেই নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। যার ফলে জাতির মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় ঘটে চরম অধঃপতন। আর এই অবক্ষয় সামগ্রিকভাবে বিনষ্ট করে সামাজিক নিরাপত্তা।</p>
<p>এহেন পরিস্থিতিতেও, ৪ লক্ষ কর্মক্ষম যুবক বেকার থাকা সত্ত্বেও, এমনকি তাদের বিশাল একটি সংখ্যা শিক্ষার বিবেচনা সর্বোচ্চ স্তর তথা অনার্স-মাস্টার্স পাড়ি দেয়ার পরেও, তাদের বেকারত্ব নিরসনে বাজেটে নেই কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা বা নির্দেশনা। ভাসা-ভাসা সুরে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ যেসব বিষয়ে বলা হচ্ছে, সেগুলোকেও যথেষ্ট মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। তবে তাহলে কোথায় সেই উদ্বেগ কাটানোর প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ? কেনই বা এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না নীতি-নির্ধারকগণ? কী সেই অজানা কারণ যা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে আমাদের মনে? প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে বের করা আমাদের সবারই একান্ত দায়িত্ব।</p>
<p>কেননা, এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা; সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো; চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সা:) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।<br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hhhhhhhhhhhhhhhhh.jpg" height="123" /></a>সবশেষে এটাই বলতে চাই,<br />
লক্ষ্য করুন– এতো এতো জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বাজেট, যার উপর গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়, সেটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই, যৌক্তিক প্রস্তাবনাও নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা! অনলাইনে যতটুকুই দেখা যায় বা কাজ আছে, তার সবই তথ্যনির্ভর পত্রিকালাপ! কেননা ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা ও সমালোচনা অসম্ভব; যদি না নিম্নোক্ত বিষয়ে পারদর্শী হয়-</p>
<ul>
<li> Philosophy of Politics.</li>
<li>International Economics.</li>
<li>Political Economy.</li>
<li>Philosophy of Economics.</li>
<li>General Economy.</li>
<li> Economic System of Islam.</li>
<li>মাকাসিদ আশ-শারিয়িয়্যাহ।</li>
</ul>
<p>এসব বিষয়ে কোনো পারদর্শীতা কিংবা জ্ঞান আমার নেই। তবুও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এতটুকু বুঝি যে, এব্যাপারে সঠিক পর্যালোচনা এবং জাতীয় প্রস্তাবনা আমাদের দিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সব ধরনের সিভিল সোসাইটির এব্যাপারে এগিয়ে আসার কোনই বিকল্প নেই।</p>
<p>সম্মিলিত উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতেই; ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে এবং কথিত উন্নয়নের স্লোগান বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রশিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎসশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে এগিয়ে যেতে হবে।</p>
<ul>
<li>কেননা আমাদের রয়েছে–• ১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ</li>
<li>তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত</li>
<li>ইন্ডাস্ট্রি-কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা</li>
<li>দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)</li>
<li>গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর</li>
<li>বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ</li>
<li>বনাঞ্চল</li>
<li>মৎসশিল্প ইত্যাদি</li>
</ul>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট-সহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জনবিরোধী এই দুর্ভাগ্যের উপাখ্যান ঘোষণার এই ক্ষণে এখন প্রয়োজন, দেশ ও জাতির স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন মুক্তিকামী যুবজনতার পক্ষ থেকে এক নয়া ন্যায়ভিত্তিক ইশতেহার ঘোষণা করার। সে প্রত্যাশায়…</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14504</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বেকারত্ব: বাংলাদেশের এক প্রকট অনৈতিক সমস্যা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/unemployment-a-glaringly-immoral-problem-in-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/unemployment-a-glaringly-immoral-problem-in-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী সালমা বিনতে সলিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 08 May 2024 09:42:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14153</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশের বেকার সমস্যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়কাল থেকেই প্রকট একটি সমস্যা। এ সমস্যা হুট করেই সৃষ্টি হয়নি, বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার পতন পরবর্তী ঔপনিবেশিক শোষণের ফলেই মূলত এটি সৃষ্টি হয়। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর বয়সে এসেও দেশের অঘোষিত প্রধান সমস্যা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশের বেকার সমস্যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়কাল থেকেই প্রকট একটি সমস্যা। এ সমস্যা হুট করেই সৃষ্টি হয়নি, বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার পতন পরবর্তী ঔপনিবেশিক শোষণের ফলেই মূলত এটি সৃষ্টি হয়। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর বয়সে এসেও দেশের অঘোষিত প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হচ্ছে যুব সম্প্রদায় ও কর্মক্ষম মানুষের এ বেকারত্বকে। বর্তমানে এটি এমন এক বিস্ফোরণ উন্মুখ আগ্নেয়গিরি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সমাধান না করতে পারলে তার অগ্নুৎপাত হয়তো আমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে। অথচ স্বাধীনতা উত্তর এ যাবৎকালের সরকারি পরিসংখ্যানগুলো এবং বেকারত্ব নিরসনের পদক্ষেপগুলো দেখলে মনে হবে, আগ্নেয়গিরি কিংবা জ্বালামুখের অস্তিত্বও নেই, অগ্নুৎপাত তো সেখানে অযাচিত আলাপ!</p>
<p>বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে কত তা নিয়ে সব সময়ই একটি ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। এটি কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়, মূলত পরিকল্পিতভাবেই বেকারের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যানগুলো কখনোই, কোনোদিনই বেকারের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করেনি; বরং পরিসংখ্যানগুলোর তথ্য অনুযায়ী মনে হয়, বাংলাদেশ আরো শত বছর আগেই উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে গেছে!</p>
<p>বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ, ২০১৬-১৭ অনুসারে দেশে বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ ৮০ হাজার বা প্রায় ২৭ লাখ! এক্ষেত্রে শ্রমশক্তির বাইরে আছে, কিন্তু কর্মক্ষম এমন মানুষদের বেকারের আওতায়ই নিয়ে আসা হয়নি।</p>
<p>২০১৯ সালে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ছিলো ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০২০ সালের করোনাকালীন ভগ্ন পরিস্থিতিতে কাগজে-কলমে বেকারত্বের হার ছাপানো হয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এ সময়ে করোনা পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বেই মন্দার সৃষ্টি হয় এবং উন্নত দেশগুলোতেও বেকারত্ব ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এ হার কানাডায় ছিলো প্রায় ১০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৮ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৭ শতাংশ। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলো ৩০ শতাংশ, জর্জিয়ায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ, গ্রিসে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, স্পেনে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ, কলম্বিয়ায় ১৫ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৪ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ! অর্থাৎ বাংলাদেশ মন্দা রোখার সক্ষমতায় এবং বেকারত্বের হার কম রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াকেও ছাড়িয়ে গেছে! <strong>২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী বেকারত্বের হার আরো কমে ৫ দশমিক ২৩ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ হার বেকারত্বের স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক হারের আশেপাশেই। অধিকাংশ মত অনুযায়ী বেকারত্বের স্বাভাবিক হার ৪-৫ শতাংশ। তার মানে বাংলাদেশে বেকারত্ব এখনো স্বাভাবিকতার পর্যায় উতরে যায়নি! কিন্তু সত্যিকার অবস্থা কী? চর্মচক্ষুর বিচারও তার বিপরীতটাই বলছে, চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ তো আরো পরের ব্যাপার!</strong> মিল্টন ফ্রিডম্যান ও এডমন্ড ফেল্পস বাংলাদেশের এ অবস্থা দেখলে হয়তো বিস্মিত হতেও ভুলে যেতেন!</p>
<p>এ হলো সরকারি পরিসংখ্যানের তথ্য। এ তথ্যকে নিদেনপক্ষে সঠিক বা পক্ষপাতহীনতার মানদণ্ডে দশে আট দেওয়া যেতো, যদি দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যের সাথে তার খুব একটা পার্থক্য না থাকতো; কারণ বেকারের সংখ্যা কাঁটায় কাঁটায় হিসাব করা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভবপর নয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও আকাশ-পাতাল তফাৎ! অবস্থা এমন, কোন তথ্য যে সঠিক, সেটিই বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।</p>
<p>আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশে ১৫-২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ৭ কোটি ৫০ লাখ এবং কয়েক বছরে তা দ্বিগুণ হবে, যা হবে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধ শতাংশ। <strong>এ সংস্থার আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮ টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।</strong> সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে, ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পর্যবেক্ষকরা এ সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশিত সংখ্যাকেই বাংলাদেশের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা বলে মনে করেন। দৈনিক প্রথম আলোর একটি নিবন্ধ অনুযায়ী দেশে প্রকৃত বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশের উপরে। এছাড়াও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এর জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রচ্ছন্ন বেকারের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ, যাদের ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ সেবা খাতে, ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি খাতে ও ২৪ দশমিক ১ শতাংশ শিল্প খাতে নিয়োজিত আছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, কোনো ব্যক্তির প্রান্তিক উৎপাদনক্ষমতা শূন্য অথবা ঋণাত্মক হলে তাকে প্রচ্ছন্ন বেকার বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে সে কর্মরত থাকলেও বা উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হলেও মোট উৎপাদনের পরিবর্তন ঘটে না।</p>
<p>মূলত বাংলাদেশে বেকারের সত্যিকার সংখ্যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিরূপিত সংখ্যা থেকে আরো অনেক বেশি এবং বেকারত্বের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।</p>
<p>বেকারত্ব নিয়ে এ প্রহসনের মূল কারণগুলোর প্রধান একটি হলো বেকারত্ব মাপার অযৌক্তিক পদ্ধতি। এটির কারণেই মূলত বেকারের সংখ্যা হাস্যরসের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>বাংলাদেশের শ্রমশক্তি সম্পর্কিত জরিপ ২০০২ অনুযায়ী ১৫ বছরের অধিক বয়সী কর্মক্ষম, কিন্তু কর্মের অভাবে ভোগা ব্যক্তিকে বেকার বলা হয়। আর দেশের মোট বেকারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞার একটি অংশ অনুসারে। এ অনুসারে কোনো ব্যক্তি কর্মপ্রত্যাশী হওয়া সত্ত্বেও সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজের সুযোগ না পেলে তাকে বেকার হিসেবে ধরা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মজুরি পরিশোধ হচ্ছে কি হচ্ছে না তা ধর্তব্যের বিষয় নয়। এটি কি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ? মূলত এ কারণেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা এত কম। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার, এর মধ্যে কর্মক্ষম, কিন্তু শ্রমশক্তির বাইরে আছে এমন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৬ লাখ। শ্রমশক্তির বাইরে থাকা মানুষদের বেকারই বলা হচ্ছে না, বেকার বলা হচ্ছে শুধুমাত্র শ্রমশক্তির সাথে যুক্ত হতে চাওয়া, কিন্তু কর্মহীন ২৬ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে!</p>
<p>আবার কেউ সেই এক ঘন্টা কাজ থেকে প্রাপ্ত মুজুরি দিয়ে জীবনধারণ করতে পারছে কিনা তাও এক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে একজন কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি গড়ে ৩৬৬ টাকা, অর্থাৎ তিনি ঘণ্টায় ৪৮ টাকা মজুরি পান। তাই কোনো কৃষিশ্রমিক যদি সপ্তাহে শুধুমাত্র এক দিনে এক ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পান, তাহলে তার সপ্তাহিক আয় হবে মাত্র ৪৮ টাকা। আর এ পরিমাণ টাকা আয় করার মানে তিনি বেকার নন! কী নির্মম পরিহাস!</p>
<p>যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো বিএলএস এর নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি কমপক্ষে চার সপ্তাহ ধরে কর্মের সন্ধানে থাকলে তাকে বেকার বলা হয়। সেখানে প্রতি মাসে পর্যাপ্ত জরিপের মাধ্যমে বেকারের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়, যাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। এছাড়া প্রতি মাসে সৃষ্ট কর্মসংস্থানের তথ্যও প্রকাশিত হয়।
<picture><source media="(min-width: 650px)" /></picture> <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon2.0" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 813px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/agami-diner-sovvota.jpg" height="134" /></a></p>
<p>এই যে দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সমস্যা নিরূপণের মানদণ্ড নির্ধারণ, তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয় না! বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকাংশেই ভিন্ন, সেই সাথে বাংলাদেশের সম্ভাবনার জায়গা অনেক বেশি। তাই দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে যদি বেকারের সংখ্যা নিরূপণ করা না হয়, তবে কখনোই বেকারের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা কম হওয়ায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো আরেকটি নতুন মানদণ্ড ঠিক করেছে, তা হলো যারা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পান না, তারা সম্ভাবনাময়, কিন্তু তাদেরকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তারা প্রচ্ছন্ন বা ছদ্ম বেকার। দেশে এখন এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ। তারা পছন্দমতো কাজ না পেয়ে টিউশনি, ফাস্টফুডের দোকানের বিক্রয়কর্মী, রাইড শেয়ারিং, কল সেন্টারের কর্মীসহ বিভিন্ন ধরনের খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত আছেন। আর তাদের এসব কাজ থেকে অর্জিত আয়ও তাদের জীবনমান বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট নয়। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে সচেষ্ট নয়। অথচ প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা না হলে আমরা কখনোই সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে পারবো না, কারণ সমস্যা সমাধানের পূর্বশর্তই হলো সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা।</p>
<p><strong>অর্থনীতিবিদদের মতে এ যাবতকালের সরকারের এহেন প্রকাশ্য লুকোচুরির কারণ হলো রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারানোর ভয়। এ ভয়েই সরকার, পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং অন্যান্য জরিপ সংস্থা বরাবরই বেকারের প্রকৃত সংখ্যা অস্বীকার করেছে এবং জনগনকে অসত্য তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে।</strong> স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হওয়ার পরও এ সমস্যা মোকাবেলার জন্য সঠিক প্রস্তাবনা এবং কর্মোদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।</p>
<p>বেকার যুবকদের চিত্র যদি পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে ভয়াবহ সংকটে নিমজ্জিত এক বাংলাদেশের চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠবে। বেকারত্ব নিরসনে প্রচেষ্টারত যুবকদের অবস্থা বর্ণনাতীত। শিক্ষিত বেকাররা যেন শোষণের অন্যতম ক্ষেত্র। আবার যারা বেকার নন, তাদের অধিকাংশও মানসম্মত জীবন যাপনে সক্ষম নন।</p>
<p>বাংলাদেশের সত্যিকার অবস্থা বোঝা যায় শহরের অলিগলি, মফস্বল ও গ্রাম-গঞ্জের পথঘাট, দোকানপাট দেখলে। এসব জায়গায় যুবকরা দলে দলে বসে থাকে, আড্ডা দেয়, অলস সময় পার করে। একাকীত্ব কাটাতে বা সময় পার করতে তারা মোবাইল, ভিডিও গেইম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। হতাশাগ্রস্থ এ যুবকদের অনেকেই মাদক, নানাবিধ সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, সামাজিক অস্থিতিশীলতা, নৈতিক বিকৃতি, ধর্ষণ, খুন, আত্মহত্যা, চাঁদাবাজি, পর্ণোগ্রাফি, চুরি-ডাকাতি, ইভটিজিং থেকে শুরু করে নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আর এসব অপরাধের হার ফি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছরই পূর্বের বছরের রেকর্ড ভাঙছে, নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে।</p>
<p>বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্মরত অথবা বেকার কর্মক্ষম জনশক্তি (১৫ থেকে ৬৪ বছর) ৫৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে শ্রমবাজারের বাইরে থাকা বাকি ৪১ দশমিক ৭৭ শতাংশ! এর অধিকাংশই নারী। উন্নত দেশগুলোতে কর্মরত অথবা বেকার কর্মক্ষম জনশক্তি গড়ে ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রমবাজারের বাইরে আছে গড়ে ২৭ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণা অনুযায়ী দেশে বছরে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, এদের মধ্যে কাজ পাচ্ছে মাত্র ৭ লাখ। এদের অনেকেই ডিগ্রীধারী, ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউরোপীয় ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪৭ শতাংশ স্নাতক হয় বেকার, না হয় তিনি যে কর্মে নিযুক্ত, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রিধারী হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো না! এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন হলো মোট শিক্ষার্থীর কত শতাংশ স্নাতক পাশ করে? এদের বড় একটি অংশই তো স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ঝরে পড়ে। ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে নারীদের হার প্রায় ৫০ শতাংশ, যার মধ্যে ১৩-২০ শতাংশ বাল্য বিবাহের কারণে স্কুল-কলেজের গন্ডিও পার হতে পারেন না। আরো ২০ শতাংশ পড়াশোনা শেষে চাকুরিতে ঢোকেন না।</p>
<p>প্রতি বছরই শিক্ষিত জনশক্তি বের হচ্ছে, তাদের সংখ্যার তুলনায় কাজের ক্ষেত্র কিন্তু বাড়ছে না। কাজের বাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষাব্যবস্থার বিরাট অসংগতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সাথে অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার ফলে এ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কর্মসংস্থান এবং যোগ্যতার অভাবে তারা বেকারত্ব বয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতি বছর সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ ৫ ধারীদের উল্লাস, শতকরা সর্বোচ্চ সংখ্যক পাশের খবর পাওয়া যায়। অতঃপর তারা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসায় ভর্তি হন এবং তাদের অনেকেই ফার্স্ট ক্লাস লাভ করে শিক্ষাজীবন শেষ করেন। কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস লাভের পরেও তাদের অধিকাংশকেই কোনো চাকরী না পেয়ে গৃহশিক্ষকতা করে কোনোমতে দুই বেলার খাবার জোগাড় করতে হয়। আর এ সংখ্যা তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছেলেদের, মেয়েদের অবস্থা আরো করুণ। দৈনিক ইনকিলাবের সেপ্টেম্বর, ২০২২ এর একটি নিবন্ধের বরাত অনুযায়ী দুই বছর আগে এক ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকার প্রায় পৌনে ১ কোটি। এদের মধ্যে যারা চাকরির জন্য চেষ্টা করছে, তাদের সংখ্যাও অনেক। <strong>২০১৮ সালের বিসিএসে পদের চেয়ে দুইশো গুণ বেশি প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। মাত্র ছয়টি সরকারি খাতের চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন করেন মোট ৫০ লক্ষেরও বেশি প্রার্থী। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিলো পদের তুলনায় ৮৯৭ গুণ বেশি। খাদ্য অধিদপ্তরে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিলো পদের তুলনায় ১৩৬৪ গুণ বেশি। কয়েকটি বিসিএস উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি মেলেনি প্রায় ৩২ হাজার প্রার্থীর।</strong> বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী এসএসসি উত্তীর্ণদের ২৮ শতাংশ, এইচএসসি উত্তীর্ণদের ৩০ শতাংশ, স্নাতকদের ৩৬ শতাংশ, স্নাতকোত্তরদের ৩৪ শতাংশ, সার্বিকভাবে এ জাতীয় শিক্ষিতদের ৩৩ দশমিক ১৯ শতাংশ বেকার। এ শিক্ষিত বেকার শ্রেণি চাইলেই যে কোনো পেশার সাথে জড়িত হতে পারে না। একজন দিনমজুরের একদিনের আয় ৬০০-১০০০ টাকা। শিক্ষিত বেকার শ্রেণি তো দিনমজুরও হতে পারছে না! বেকারত্ব নেই বলে প্রচারণা চালানো সুবিধাবাদীরা বলেন, দেশে ধান কাটার জন্য কৃষিশ্রমিকও পাওয়া যায় না। অথচ এ না পাওয়ার কারণও সেই শিক্ষিত শ্রেণির দ্বিধা! এ কাজ তাদের জন্য সম্মান হানির কারণ। আবার এ শ্রেণির অনেকেই ভালো রোজগারের আশায় জায়গা-জমি, বসতভিটা বিক্রি করে প্রবাসে পাড়ি জমান। অমানুষিক শ্রম আর হেয় দৃষ্টি সহ্যের বিনিময়ে তারা দেশে টাকা পাঠান, অর্থনীতির ভাষায় যাকে আদর করে নাম দেওয়া হয়েছে রেমিটেন্স। এ রেমিটেন্সই দেশের রিজার্ভের যোগান দেয়। প্রতিবারই রিজার্ভ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উচ্ছসিত ঘোষণা আসে সরকারের পক্ষ থেকে, অথচ তাদের প্রবাস গমন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণে সরকারের কোনো ভূমিকাই নেই। উপরন্তু তাদের মধ্যে যারা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যান কিংবা বিদেশে জেল-জরিমানার শিকার হন, নির্যাতন বা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে লাশ হয়ে বা পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরেন, তখন সরকার ক্ষতিপূরণ বা সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায় না। অন্যদিকে যারা অর্থের অভাবে প্রবাসেও যেতে পারছেন না, দেশেও কাজ করতে পারছেন না, তাদের অনেকেই হতাশায় নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, লোকলজ্জার ভয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথও। প্রতিদিন খবরের কাগজ কিংবা মিডিয়ায় এসব খবর দেখতে দেখতে তা আমাদের কাছে ডালভাতের মতো হয়ে গেছে।</p>
<p>প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শ্রম বাজারে আসা শিক্ষার্থীদের অর্ধেকই বেকার থাকছেন বা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এ সমস্যার সমাধান করা তো হচ্ছেই না, বরং তাদের থেকে শুষে নেওয়া হচ্ছে। তাদের বেকারত্বের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চুটিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। শিক্ষিত বেকার যুবকদের নিয়োগ, চাকরির পরীক্ষায় আবেদন করানোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করা হচ্ছে। মাত্র দুই বা তিনটি পদের জন্য আবেদন ফি নেওয়া হয় কয়েক হাজার জন থেকে। সম্প্রতি একটি ব্যাংকে ৮০ টি পদের বিপরীতে আবেদন করে প্রায় ১ লক্ষ প্রাথী! আবার অনেক ক্ষেত্রেই কিছু পদ খালি রেখে সার্কুলার দেওয়া হয়, প্রথম বার বাছাইয়ের পরবর্তীতে আবার খালি পদের জন্য সার্কুলার দেওয়া হয়৷ এভাবে বার বার সার্কুলার দিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করা হয়। এসব নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রতি সপ্তাহে লক্ষ লক্ষ যুবক গ্রাম থেকে যাতায়াত ভাড়া দিয়ে শহরে আসছেন। থাকা-খাওয়ার খরচ, সময় ও শক্তির বিপুল অপচয় হয় তাদের। চাকরি প্রার্থীদের এ বিড়ম্বনা, দুর্ভোগ, মানসিক যন্ত্রণা কি আমাদের হৃদয়ে একটুও নাড়া দেয়? যে যুবকরা আজ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের জন্য, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ঢেলে সাজানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিলো, সে যুবকরাই আজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে দৌড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হওয়ার পরেও বাংলাদেশের বেকার যুবকদের শুধুমাত্র একটি নিয়োগ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য টেকনাফ, তেতুলিয়াসহ দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় আসতে হয়, নিজ জেলায় বসে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাটাও নেই। আবার প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা ধরনের জালিয়াতির কারণে একই পরীক্ষা তাদেরকে দুই-তিনবার করেও দিতে হচ্ছে, তবু তাদের মুক্তি মিলছে না! চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বহু সংখ্যক প্রার্থী শহরগুলোতে মেস, হোস্টেলে থেকে পরীক্ষার প্রস্তুতির গাইড-নোটে মুখ বুজে আছেন খেয়ে না খেয়ে। প্রচন্ড স্থবির এ শহরগুলোর এ যুবকদের ভার কীভাবে বইবে বাংলাদেশ?</p>
<p>আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত হয়ে বের হওয়া যুবকদের কতজন সত্যিকার যোগ্যতা অর্জন করেছেন সেটিও আলোচনার দাবি রাখে। জনশুমারি ও গৃহগণনা, ২০২২ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আদতে এ এক অন্তঃসার শূন্য বিপ্লব। উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ ও অতি দক্ষ জনশক্তির পরিমান ৫০ শতাংশেরও বেশি। যেমন– জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ, জাপানে ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়াতে ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪৬ শতাংশ মানুষ দক্ষ। বাংলাদেশের সার্বিক জরিপ অনুসারে দেশে দক্ষ এবং মধ্যম মানের জনশক্তি মাত্র ১৪ শতাংশ! বাস্তবে এ সংখ্যা আরো কম। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী এটি মাত্র ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ!</p>
<p>বাংলাদেশে সাধারণ, প্রকৌশল, মেডিকেল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি বিজ্ঞান, ভেটেনারি, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইসলামী, ধর্মতত্ত্ব, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট ৫৮ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৭ টি। রয়েছে ৪৯ টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এবং কয়েক হাজার মাদ্রাসা। সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮২ হাজার ৯৮১ টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫৩ হাজার ৫৮৯ টি, নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩ হাজার ৪৯৪ টি। এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না! শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীরা জাতির জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বোঝা হয়ে উঠছে। অর্জিত শিক্ষার মান নিয়ে দেশের বাইরে গিয়ে তারা অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের মতো সম্মান পাচ্ছে না। দৈনিক প্রথম আলোর মে, ২০২২ এর একটি নিবন্ধের বরাত অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া পিএইচডি ডিগ্রির বেশির ভাগ বাংলা সাহিত্য ও ধর্মশিক্ষায়, যার সত্যিকার অর্থে বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনা খুবই কম। মৌলিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ মূল মূল ক্ষেত্রগুলোর কোথাও বাংলাদেশের কোনো অবদান নেই, এক্ষেত্রে শুধু কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদানের কথা উল্লেখ করা যায়। আগে মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতেন, এখন ঘটছে উল্টোটা।</p>
<p>এ ব্যর্থতার দায়ভার কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার। শিক্ষার গুণগত মান ঠিক নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার সুবিধা নেই। রয়েছে যোগ্য শিক্ষকের প্রবল সংকট, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সহযোগিতার ঘাটতি ইত্যাদি। সঠিকভাবে উচ্চ শিক্ষা অর্জনে যে ব্যর্থতা, তা নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন উঠছে না! শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দিক থেকে শুরু করে কারিগরি দক্ষতা অর্জন করানোর কোনো জোর প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় না! বাংলাদেশের জনপ্রসাশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার প্রশিক্ষণের জন্য ভালো মানের কোনো আয়োজন করছে না, ফান্ড দিচ্ছে না। অথচ বেকারত্বের সাথে এ বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসবের সমাধান না করলে আমরা কখনই বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবো না।</p>
<p>এ গেলো শুধু শিক্ষিত যুবকদের কথা। তাদের পাশাপাশি যে বিশাল সংখ্যক মানুষ অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে, কিংবা যাদের যোগ্যতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, তাদের অবস্থা তো কল্পনাতীত!</p>
<p>আবার বেকারত্বে জর্জরিত বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানিসহ মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচুর সংখ্যক বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারি কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থানকারী মোট বৈধ বিদেশির সংখ্যা ১ লাখ ১১ হাজার ৫৭৫ জন। অথচ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদনে অনুযায়ী এ সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ! দৈনিক ইনকিলাবের সেপ্টেম্বর, ২০২২ এর একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, একেকজন বিদেশি কর্মকর্তার বেতন পাঁচজন বাংলাদেশি কর্মকর্তার মোট বেতনের চেয়েও বেশি! অর্থাৎ একজন বিদেশি কর্মকর্তা পাঁচজন দেশীয় কর্মপ্রত্যাশীর জায়গা দখল করে নিয়েছেন এবং এ হিসেবে বিদেশি কর্মকর্তা নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশিকে বেকারত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে! তাদের নিয়োগকৃত এ কর্মকর্তাদের অধিকাংশ ভারতীয়। বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) এক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় কাজ করছে, যারা বছরে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের পঞ্চম রেমিট্যান্স প্রদানকারী দেশ বাংলাদেশ! এভাবেই বেকারত্ব জর্জরিত বাংলাদেশের এ দৈন্যদশার মধ্যেও হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশিদের নিয়োগ দিচ্ছে, এমনকি এজন্য তারা বাংলাদেশি কর্মীদের ছাঁটাইও করছে। এক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগ বোর্ডের নীতিমালাকেও তোয়াক্কা করছে না। এ নীতিমালা অনুযায়ী একজন বিদেশি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগ দিতে হলে তার বিনিময়ে পাঁচজন বাংলাদেশিও নিয়োগ দিতে হবে। সেই সাথে নিযুক্ত বিদেশি নাগরিকের কাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে, অতঃপর বিদেশিকে বিদায় দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন এ নীতিমালা মানছে না, তেমনি বিনিয়োগ বোর্ডও পরখ করে দেখছে না যে প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালা মানছে কিনা! ফলশ্রুতিতে দেশের বেকার যুবকদের হতাশাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দেশের টাকা, দেশের সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে অন্য দেশ, যা এ বেকারত্বকে আরো প্রকট করে তুলছে।</p>
<p>এক্ষেত্রে কথা হলো বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও বেকারত্ব রয়েছে। কিন্তু এসব দেশের বেকারত্বের ধরনের সাথে আমাদের দেশের বেকারত্বের ধরনের মিল নেই। উন্নত দেশগুলোতে বেকারদের সরকারি ভাতা প্রদান করা হয়। আবার এ দেশগুলোর অধিকাংশেরই জনসংখ্যা কম হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়ার মতো জনশক্তির অভাব রয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জনশক্তি আমদানি করে। এসব দেশের শ্রমবাজারের কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার কারণে তারা চাকুরিরতদের পর্যাপ্ত বেতন দিতে পারে, যা তাদের জীবনমান উন্নত করার জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে আমাদের দেশে রয়েছে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম জনশক্তি। কিন্তু আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের অভাব যেমন প্রকট, তেমনি এ বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার উপর্যুক্ত প্রচেষ্টার অভাবও প্রকট। আবার দেশের কর্মক্ষেত্রগুলোর বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক এবং বেতনভাতাও নির্দিষ্ট নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা চাকুরিরতদের জীবনমান উন্নত করতে পারে না।</p>
<p>অথচ মুসলিম সালতানাতে এ বাংলা ছিলো অর্থনৈতিকভাবে বিপুল শক্তিমত্তার অধিকারী। ২৩ শতাংশ জিডিপির সমৃদ্ধ বাংলা অঞ্চলে বেকারত্ব ছিলোই না, বরং কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লোকবলের অভাব ছিলো। জাহাজের ফ্যাক্টরিগুলোতে পর্যাপ্ত লোক নিয়োগ করতে না পারার কারণে উন্নতির কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও জাহাজ শিল্প বিশ্বে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে নিতে পারেনি। কৃষি, মৎস খাতেরও একই অবস্থা, বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তুলনামূলকভাবে কর্মদক্ষ লোকের অভাব ছিলো। রেশম, মসলিন, কাঠের কাজ, তুলোজাত পণ্য সামগ্রি, ধান, গম, পাট, তেলবিজ, আখ, মসলাসহ কৃষি ও শিল্পে সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির পথে হাঁটতে থাকা বাংলাকে শুষে নিয়ে শিল্পায়ন ঘটানো সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তি রেখে গেছে শুধু তাদের রচিত ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থার অন্যতম ফসল এ ভয়াবহ বেকারত্ব এবং দৈন্যদশা।</p>
<p>আমরা যদি বেকারত্ব মোকাবেলা করতে না পারি, তাহলে তা বাড়তেই থাকবে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কল্পনাতীত। বেকারের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে কথা বলছেন না দেশের কর্ণধাররা, নেতারা; বেকারত্ব নিরসনের আলাপও উঠে আসছে না তাদের ভাষণে। উপরন্তু তারা দেশীয় বেসরকারি সংস্থাগুলো আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জরিপে যখন সত্যিকার অবস্থা ফুটে উঠতে দেখছেন, তখন এ জরিপগুলোকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র কাতারে ফেলতেও দ্বিধা বোধ করছেন না! অথচ এ সমস্যা নিরসনে তাদেরই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করা উচিত ছিলো।</p>
<p>এখন এ সার্বিক পরিস্থিতির সমাধানের প্রশ্নে যদি আসি, সমাধানকল্পে কিছু প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামনে রাখতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী? শিক্ষায় ঝরে পড়া যুবকরাসহ বিশাল এ বেকার শ্রেণি নিয়ে আমাদের ভাবনা কী?</p>
<p>এক্ষেত্রে প্রথমতই বেকারের প্রকৃত সংখ্যা এবং সার্বিক অবস্থা নিরূপণের জন্য বাংলাদেশের উপযোগী পদ্ধতিতে জরিপ পরিচালনা করতে হবে এবং এজন্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি কয়েকটি স্বাধীন, পক্ষপাতহীন বেসরকারি সংস্থা চালু করতে হবে।</p>
<p><strong>সকল ধরনের দুর্নীতি থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বেকারত্ব নিরসণে এটিই সবচেয়ে জরুরী। এক্ষেত্রে আমাদের শিল্প খাত, কৃষি খাত, খনিজ খাতসহ সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময়ী জনশক্তিকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী ২০ বছরে ২০ কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। </strong></p>
<p>গত কয়েক বছরে শিল্প খাতে বিনিয়োগ এবং এ খাতের সার্বিক অবস্থা নিম্নমুখীই হয়েছে। বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হচ্ছে না এবং সরকারি খাতে বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না। নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠার সংখ্যা হাতে গোনা, অন্যদিকে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস, বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানা নতুন করে চালু কর সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় পাঁচশত পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, বেকার হয়েছেন পনেরো লাখেরও বেশি কর্মজীবী। এ খাতকে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে। সেই সাথে দেশের ভারী শিল্পগুলো সরকারি খাতে রেখে অন্যান্য হালকা শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।</p>
<p>বাংলার আবহমানকালের ঐতিহ্য কৃষিকে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির সমন্বয়ে সর্বোচ্চ সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। অবহেলা আর সুবিধাভোগী শ্রেণির শিকার হওয়ার দরুণ এক কালের সমৃদ্ধ পাট শিল্প হারিয়ে গেছে। কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে ধান, চা, পাটসহ উল্লেখযোগ্য ফসলগুলো সংরক্ষণ এবং ফলনের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এখন পর্যন্ত দেশের চাষযোগ্য জমির ৩০ শতাংশ সেচ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। পতিত জমি আবাদ ও আরো অধিক পরিমাণে জমি সেচের আওতায় আনা হলে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। পাহাড়ি ও হাওড় এলাকাসহ বেশ কিছু এলাকায় এখনো চাষযোগ্য অনেক জমি পতিত পড়ে আছে, এ জমিগুলো চাষের আওতায় আনতে হবে। কৃষি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও পর্যাপ্ত গবেষণার ব্যবস্থা করতে হবে এবং উচ্চতর গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রয়োগ করতে হবে। মাছ চাষের নদীগুলোকে পুনরায় দূষণমুক্ত করে চাষের পরিধি বাড়াতে হবে। কৃষি খাতে সরকারি অনুদান ও ব্যবস্থাপনাসহ সর্বোপরি সামগ্রিক উদ্যোগের বাস্তবায়ন বেকারত্বের হার অনেকাংশেই কমিয়ে আনবে।</p>
<p>আমাদের দেশের রয়েছে ৫০ এর উপরে খনিজ সম্পদ, যার সবই বিদেশীদের হাতে ইজারা দেওয়া। ইউরেনিয়ামের মতো দামী সম্পদও আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের বিনা পয়সায় দিয়ে যাচ্ছি! এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র আমাদের, সেটিরও সুবিধা ভোগ করছে সাম্রাজ্যবাদীরা। এসব সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেশে মানসম্মত কোনো উদ্যোগ নেই, পরিসংখ্যানও নেই, সেই সাথে এ খাতে নিয়োগ করার মতো সুদক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টাও নেই। অথচ শুধুমাত্র খনিজ সম্পদের মাধ্যমেই অনেক বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব, যা বেকারত্ব নিরসনে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।</p>
<p>যুবকদের নতুন উদ্যমে জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময়ী খাত এ যুবশক্তি। দেশের জনসংখ্যার একটি বৃহদাংশ যুবক, যা মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। যুবক জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারলে এবং তাদেরকে বোঝায় পরিণত করলে এ সম্পদ চোখের পলকেই হারিয়ে যাবে। আর তাই স্বর্নালী আদিল সভ্যতার উত্তরসূরি যুবকদের মনে সভ্যতার চেতনার সুপ্ত বীজকে জাগিয়ে তুলে বৃক্ষে রূপান্তর করা, তাদের সামনে সুদমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতার ভিশন তুলে ধরা এবং সে আলোকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা অত্যাবশ্যক। ভিশন এবং অর্থবহ জীবনের মানেই দক্ষ হওয়া– এ কথা তাদেরকে খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করাতে হবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং তাদেরকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করা ছাড়া অভ্যন্তরীন উন্নয়ন অসম্ভব এবং বেকারত্ব দূরীকরণও অসম্ভব।</p>
<p>শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে ঔপনিবেশিক গোলামীর নিগড় থেকে মুক্ত করতে হবে, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন করতে হবে। শুধুমাত্র এ পদ্ধতিতেই ফাঁপা মস্তিষ্কের প্রজন্ম হয়ে বৃটিশ আজ্ঞাবহ কেরাণিতে পরিণত হওয়া এবং যুবক শ্রেণির তারুণ্যদীপ্ত পুনর্জাগরণ রোধে তাদের কর্মস্পৃহা, উদ্ভাবন কৌশল ও চিন্তা-চেতনা লোপ করার চক্রান্ত থেকে যুবক শ্রেণি মুক্তি পাবে। আর যখন তারা আত্মশক্তিপ্রবুদ্ধ ব্যক্তিতে পরিণত হবে, তখনই তারা হবে দেশ ও জাতির জন্য সুদক্ষ জনসম্পদ।</p>
<p>বর্তমানে নানা ক্ষেত্রে কর্মরতদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।</p>
<p>সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বেকারের প্রকৃত হার যে কোনো কৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টোটা। দেশের মন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি ৭ ভাগ, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবি বলে ৬ ভাগ! জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে অবশ্যই কর্মসংস্থানের সমন্বয় ঘটাতে হবে, কারণ প্রবৃদ্ধি যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলা হচ্ছে, সে হারে কিন্তু কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। যার কারণে এ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান তৈরিতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না।</p>
<p>আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি খুব জরুরী৷ বর্তমানে যুবকদের বেশিরভাগই উচ্চ মাধ্যমিকের পরে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী, কারিগরি বা কর্মদক্ষতা বাড়ানোর শিক্ষায় তেমন আগ্রহী নয়। আবার প্রায় সবাই-ই চাকরির প্রত্যাশা করে, প্রয়োজনে ঘুষ দিয়ে, চামচামি করে চাকরি জুটাবে, তবু কেউ চাকরি সৃষ্টির কথা চিন্তা করে না। খুব কম সংখ্যক শিক্ষিতই উদ্যোক্তা হতে চায়। সরকারের উচিত প্রতি বছর নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী না হয়ে দক্ষ জনসম্পদ ও উদ্যোক্তা তৈরির সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো। এতে আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি গতিশীলতা পাবে। এছাড়াও বিশেষত গ্রামীন যুবকরা বাড়ির আঙ্গিনায় গবাদি পশু পালন, হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন, মাছ চাষ প্রভৃতির মাধ্যমে সহজেই আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, এক্ষেত্রেও সহায়তার জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ থেকে শুরু করে নানাবিধ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে কর্জে হাসানা, সরকারি প্রণোদনা প্রদান করতে হবে এবং আইনী ও নিরাপত্তা সুবিধা প্রদান করতে হবে।</p>
<p>ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে। যেমন– মৎস শিল্পের ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার কমতি, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অভাব, প্রশিক্ষণের অভাব, উৎসাহ ও পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনার অভাব লক্ষণীয়। এ অভাব দূর করতে হবে।</p>
<p>বেসরকারি খাতগুলো উন্মুক্ত করতে হবে, বিদেশীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলাদেশীদের জন্য বিশাল বাজার সৃষ্টি করতে হবে।</p>
<p>মুক্তির দাবি এবং পর্যালোচনা করে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে আল্লাহর রাসূলের (স.) দেখিয়ে যাওয়া মুক্তির পথ অনুযায়ী আমাদের আর্থ-সামাজিকব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।</p>
<p>ঋণ ও সুদ নির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে, উন্নয়নের ঔপনিবেশিক মূলনীতি বাদ দিয়ে আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে।</p>
<p>বন্দর, প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয়সহ সবকিছু নিয়েই কথা বলতে হবে। সমাধানকল্পে সকল অবস্থান থেকে সংগ্রাম করে যেতে হবে৷</p>
<p>জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটির জন্য সরকারকে চাপ দেওয়া, নিজেদের অবস্থান থেকে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দাবী পেশ করা, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর কমিটি এবং উন্নয়ন কমিটি গঠন করে সমাজ ও রাষ্ট্র মিলেমিশে আগানোর কোনো বিকল্প নেই। আর এ প্রত্যেকটি প্রস্তাবনা প্রতিটি ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক দলের জন্যই জরুরী। এগুলো কোনোভাবেই নির্দিষ্ট কোনো দলের দাবী নয়, নির্দিষ্ট কোনো দলের বিরোধিতাও নয়, বরং প্রতিটি মানুষের জন্য প্রয়োজন।</p>
<p>সর্বোপরি বেকারত্বকে প্রধান সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এ সমস্যা নিরসনে সকল পর্যায় থেকে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে ‘বেকারত্ব’ শুধুমাত্র একটি শব্দ হয়ে বাংলা রচনার পাতায় আর স্বপ্নালু চোখের যুবকদের তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত মুখাবয়ব ও অধোগামী জীবনমানেই ঘুরপাক খাবে; আর একের পর এক স্পষ্ট হবে পাঁচশত বছরের মুসলিম সালতানাতের সমৃদ্ধ ইতিহাসের স্বাক্ষী বাংলার পশ্চাৎপদতার লজ্জিত পদচিহ্ন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/unemployment-a-glaringly-immoral-problem-in-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14153</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলার ইতিহাসে সুলতানী ও বাদশাহী আমল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/sultanate-and-badshah-period-in-the-history-of-bangla/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/sultanate-and-badshah-period-in-the-history-of-bangla/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 18 Apr 2024 05:50:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[Badsah]]></category>
		<category><![CDATA[Badshah]]></category>
		<category><![CDATA[Bangla]]></category>
		<category><![CDATA[bengal]]></category>
		<category><![CDATA[History]]></category>
		<category><![CDATA[Sultan]]></category>
		<category><![CDATA[Sultanate]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[খিলাফত]]></category>
		<category><![CDATA[বাদশাহ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলা]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[মোগল]]></category>
		<category><![CDATA[রাজত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[রাজ্য]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সম্রাট]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সাম্রাজ্য]]></category>
		<category><![CDATA[সুলতান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13986</guid>

					<description><![CDATA[দিল্লির সালতানাত চলেছিল ১১৮৬ থেকে ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কিন্তু দিল্লির সালতানাত এতদিন টিকলেও তা ভেঙে একাধিক অঞ্চলে সৃষ্টি হতে পেরেছিল আরও কয়েকটি বিভিন্ন স্বাধীন সালতানাত। এদের মধ্যে বাংলা, মালব, গুজরাট ও কাশ্মির হলো উল্লেখ্য। এদের মধ্যে আবার বাংলার সালতানাত (১৩৩৮-১৫৩৮]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দিল্লির সালতানাত চলেছিল ১১৮৬ থেকে ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কিন্তু দিল্লির সালতানাত এতদিন টিকলেও তা ভেঙে একাধিক অঞ্চলে সৃষ্টি হতে পেরেছিল আরও কয়েকটি বিভিন্ন স্বাধীন সালতানাত। এদের মধ্যে বাংলা, মালব, গুজরাট ও কাশ্মির হলো উল্লেখ্য। এদের মধ্যে আবার বাংলার সালতানাত (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রি.) হয়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ। আজকের বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য বুঝতে হলে স্বাধীন সুলতানী আমলের ইতিহাসকে নিতে হয় বিশেষ বিবেচনায়। কারণ, এ সময় বাংলার একটি নিজস্ব স্থাপত্যরীতির উদ্ভব ঘটে। ঘটে বাংলা ভাষা সাহিত্যের বিশেষ বিকাশ। সুলতানী আমলের আগের কোনো প্রকৃত বাংলাভাষার পুঁথি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। এর একটি কারণ হলো বাংলাদেশের হিন্দুরা বাংলা ভাষার চর্চা সেভাবে করতেন না। করতেন সংস্কৃত ভাষার চর্চা। সংস্কৃততেই তাই সাহিত্য রচিত হতো; বাংলাভাষায় নয়। কৃত্তিবাস প্রথম সংস্কৃত রামায়ণ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। এজন্য তাঁকে গোড়া হিন্দুদের কোপানলে পড়তে হয়। তারা চান কৃত্তিবাসকে হত্যা করতে। কিন্তু সুলতান রোকন-উদ-দীন বারবাক শাহ বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন কৃত্তিবাসের জন্য। রোকন-উদ-দীন বারবাক শাহ ২১ বছর রাজত্ব করেছিলেন (১৪৫৫-১৪৭৬ খ্রি.)। এ সময়ের মধ্যে কৃত্তিবাস সংস্কৃত থেকে বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন বলে ধরা হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সুলতানী আমল</strong></p>
<p>সুলতানী আমলে বাংলার শাসনব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট মজবুত। দেশে ছিল মোটামুটিভাবে শান্তি-শৃঙ্খলা। আর তাই ঘটতে পেরেছিল আর্থ-সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি। উর্বর ভূমি ছিল বাংলার সম্পদ। এখানে সহজেই কৃষিকাজ করা যেত। প্রচুর ধান উৎপাদন করা যেত অনেক সহজেই। <strong>সুলতানী আমলে আখের চাষ হতো। আখের রস থেকে প্রস্তুত হতো গুড় ও চিনি। যা বিদেশে রফতানি হতো। বাংলাদেশে তৈরি হতো বড় বড় সমুদ্রগামী কাঠের নৌকা এবং জাহাজ। যাতে করে বাংলাদেশ থেকে মানুষ যেতে পারত অনেক দূরদেশে সওদা নিয়ে বাণিজ্য করতে।</strong> বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল সওদাগরের দেশ। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে রেশম উৎপন্ন হতো। রেশমী বস্ত্র বিক্রি হতো বিদেশি বাজারে। সুলতানী আমলে এক পর্যায়ে চীন থেকে এসেছিলেন মা হুয়াং নামে একজন চীনা মুসলিম পর্যটক। তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন যে, রেশম উৎপাদনের জন্য এদেশে যত্ন করে তুতগাছ লাগানো হয়।</p>
<p>বাংলাদেশের রাজ্য ব্যবস্থায় সুলতানের ছেলে সাধারণত সুলতান হতেন। কিন্তু কাউকে সুলতান হতে গেলে প্রয়োজন হতো আমির ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের সমর্থন। তাদের সমর্থন ছাড়া কেউ সুলতান হতে পারতেন না। <strong>সুলতানের ছেলে না হয়েও বাংলাদেশে সুলতান হবার দৃষ্টান্ত আছে। বাংলার বিখ্যাত সুলতান আলা-উদ-দীন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৮খ্রি.) ছিলেন উচ্চ রাজকর্মচারী কর্তৃক নির্বাচিত সুলতান।</strong> তিনি সুলতানের পুত্র হিসেবে সুলতান হননি। তার পুত্র নাসির-উদ-দীন নূসরত শাহ (১৫১৮-১৫৩২ খ্রি.) সুলতান হবার সময় উচ্চ রাজকর্মচারীদের সাধারণ অনুমোদন লেগেছিল। অর্থাৎ সুলতানী আমলের বাংলায় এক ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা অনুসরণ করা হতো। কাউকে সুলতান হতে গেলে লাগতো সে সময়ের উচ্চ রাজকর্মচারীদের অনুমোদন বা ভোট। সুলতানী আমল একেবারেই স্বেচ্ছাতন্ত্র বা স্বৈরশাসন ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সুলতানের মৃত্যু হবার আগে তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র তাঁর সঙ্গে সহসুলতান হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করছেন। এভাবে বাংলায় একজন সুলতান চাইতেন তার পুত্রকে রাজ্য পরিচালনায় দক্ষ করে যেতে।</p>
<p>সুলতানী আমলে সেনাবাহিনী ছিল চার ভাগে বিভক্ত: অশ্বারহী, গজারহী, পদাতিক এবং নৌবহর। পদাতিক সৈন্যদের বলা হতো &#8216;পাইক&#8217;। দশজন অশ্বারহী নিয়ে একটি করে দল গঠিত হতো। যাকে বলা হতো &#8216;খেল&#8217;। খেলের নায়ককে বলা হতো &#8216;সর-ই-খেল&#8217;। বাংলার নৌবহরের অধিনায়ককে বলা হতো &#8216;মির বহর&#8217;। বাংলার গজবাহিনী খুব বিখ্যাত ছিল। বাংলার সৈন্যরা নিয়মিত বেতন পেতেন। সৈন্যবাহিনীর বেতনদাতার উপাধি ছিল &#8216;উজির-ই-লস্কর&#8217;। বাংলার সৈন্যরা অনেক আগেই পর্তুগিজদের কাছ থেকে কামান চালাতে শিখেছিলেন। তারা বাবরের সাথে যুদ্ধের সময় কামান ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। বাবর বাংলা জয় করতে পারেননি। নূসরত শাহ&#8217;র সঙ্গে সম্মানজনক সন্ধি করেছিলেন। বাবর তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীতে নূসরত শাহ&#8217;র খুব প্রশংসা করেছেন। নূসরত শাহ&#8217;র ছিল ১৮ টি পুত্র সন্তান। নূসরত শাহ তার প্রত্যেকটি ভাইকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বাবর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, এরকম ভাতৃপ্রেম রাজাদের মধ্যে দেখা যায় না। বাবরের অন্যতম পূর্বপুরুষ তৈমুর লং বলেছেন, রাজাদের কোনো বন্ধু থাকে না। রাজাদের একমাত্র সম্বল তাঁদের নিজ বাহুবল। বাবরও এরকম নীতিতেই ছিলেন আস্থাবান। বাবর নূসরত শাহকে বলেছেন, “বাঙালি”। এর আগে কোন সুলতানের নামের পরে কেউ বাঙালি কথাটা যোগ করেননি।</p>
<p><strong>খাজনা আদায়ের অঞ্চলকে বলা হতো মহল। কয়েকটি মহল নিয়ে গঠিত হত একটি শিক। শিকের কর্তাকে বলা হতো শিকদার। এ থেকেই বাংলা ভাষায় শিকদার উপাধির উদ্ভব হতে পেরেছে।</strong> যা এখনও চলে আসছে (যেমন শিরাজ শিকদার, দেবেন শিকদার)। সুলতানী আমলে অনেক মহল ছিল। সুলতানী আমলে ঘটেছিল বেশকিছুটা নগর বিপ্লব। গড়ে উঠেছিল শহর। দুর্গযুক্ত শহরকে বলা হতো &#8216;খিটাহ্&#8217;। আর দুর্গবিহীন শহরকে বলা হতো &#8216;কসবাহ্&#8217;। সীমান্ত ঘাঁটি শহরকে বলা হতো থানা।</p>
<p>সুলতানী আমলে বহু হিন্দু উচ্চ রাজ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। চাকরির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ছিল বিশেষ মাপকাঠি। অনেক হিন্দু চাকরি করেছেন মুসলমান রাজকর্মচারীর উপরে। করেছেন তাদের নিয়ন্ত্রিত। সুলতানী আমলে ধর্মীয় গোঁড়ামি সেভাবে ছিল না। বহু প্রমাণ আমরা পেতে পারি তাঁর এ সময়ের ইতিহাস অনুশীলন করলে। হিন্দুরা সুলতানী আমলে দুর্গাপূজা করতে পারতেন অবাধে। তাদের দুর্গাপূজায় কোনো বাধা ছিল না। আসলে দুর্গাপুজার উদ্ভব হয়েছে সুলতানী শাসনামলে, বর্তমান রাজশাহী জেলার তাহেরপুর নামক স্থানে। গৌড়ের সুলতানের এক সামন্ত রাজা কংস নারায়ণ প্রথম, এখন যেভাবে দুর্গাপুজা হয়, প্রচুর অর্থ ব্যয়ে তা প্রবর্তন করেন। তাঁর প্রবর্তিত দুর্গাপুজার রীতি এখনও চলে আসছে। বাংলায় যেভাবে দুর্গাপুজা হয়, অন্যত্র সেভাবে হয় না। কংস নারায়ণ অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা তাঁকে বলেন, যেহেতু তিনি সামন্ত রাজা তাই তিনি অশ্বমেধযজ্ঞ করবার অধিকারী নন।</p>
<p>বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় গোড়ামি সেভাবে না থাকলেও, তারা হিন্দু রাজার অধীনে থাকতে চাননি। গণেশ ছিলেন একজন আমির। তিনি পরে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু মুসলমানরা তাঁর অধীনে থাকতে চাননি। গণেশের পুত্র যদু, ইসলাম গ্রহণ করেন, এবং হন সুলতান জালাল- উদ-দীন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৪-১৪৩১ খ্রি.)। তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী সুলতান। আরাকানের (রাখাইন) এক রাজা (মেং সোআন) মধ্যব্রহ্মের (মিয়ানমার) রাজার কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসে জালালউদ্দিন-এর কাছে আশ্রয় নেন। জালাল-উদ-দীন তাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন। তিনি দখল করতে পারেন আরাকান। আরাকানের এই রাজা কৃতজ্ঞতাবশে হন জালাল-উদ-দীনের সামন্ত। যেসব সৈন্যরা এসময় গৌড় থেকে গিয়ে আরাকানে বসতি স্থাপন করেন, তাদের বংশধরকে বলা হয় রোহিঙ্গা। কারণ এসময় আরাকানের রাজধানী ছিল রোহং। বাংলা ভাষায় একসময় আরাকানকে বলা হতো রোসাঙ্গ। রোহং থেকেই হতে পেরেছিল রোসাঙ্গ নামের উদ্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বাদশাহী আমল </strong></p>
<p>বাংলায় যার আরম্ভ হতে পারে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এবং যা চলেছিল বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হওয়া পর্যন্ত, তা বাংলার মানুষের কাছে কখনই খুব প্রিয় ছিল না। মোগল শাসনকে বাংলার মানুষের কাছে মোটামুটি মনে হয়েছে বিদেশি শাসন। বাংলায় এবং বিহারে আকবরের ধর্মীয় উদারতার বিপক্ষে হয়েছে প্রতিবাদ। পরে বাংলাদেশে আবির্ভাব হয়েছে বারো ভূঁইয়ার। যারা মানতে চাননি মোগল শাসনকে। এরা অনেকেই পেয়েছেন জনসমর্থন। মোগল আমলে বাংলা শাসিত হয়েছে দিল্লি থেকে। মোগল শাসনব্যবস্থায় সুবে বাংলার মানুষ বিশেষ কেউ পায়নি উচ্চ সরকারি পদ। কেউ পায়নি ১০০০ সৈন্যর বেশি সৈন্য পরিচালনার ভার। যে দুই একজন ১০০০ সৈন্য পরিচালনার ভার পেতেন তাদের বলা হত হাজারি। বাংলায় হাজারি ছিলেন হাতে গোনা। মোগল আমলে বাংলাদেশে ফারসি ভাষার প্রভাব আগের তুলনায় বেশি বাড়ে। শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা সুজা প্রায় ২১ বছর (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রি.) বাংলার সুবেদার ছিলেন। এ সময় বাংলা ভাষা সাহিত্যের ওপর পড়তে পারে ফারসি সাহিত্যের বর্ধিত প্রভাব। এ সময়ের কবি আলাওল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ কারেন &#8216;সিকান্দার নামা&#8217; ও &#8216;হস্ত পয়কর&#8217;। সুলতানী আমলেও সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসিই চলত। বাংলার বিখ্যাত সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তার রাজসভায় অতিথি হতে। হাফিজ তাকে একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন। দুঃখ করেছিলেন আসতে না পারবার জন্য। মোগল শাসনের আগেও এদেশে ফারসি ভাষা সাহিত্যের কদর ছিল। কিন্তু শাহজাদা সুজার সময় ফারসি ভাষার কদর হতে পেরেছিল আরও বেশি। সরকারি ভাষা ফারসি হবার জন্যে হিন্দুরাও ফারসি শিখতেন। কিন্তু তাদের ওপর ফারসি ভাষার প্রভাব মুসলমানদের মতো পড়েনি। কারণ, হিন্দুরা ধর্ম চর্চা করেছেন সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলার মুসলমানরা তাদের ধর্ম চর্চাও করেছেন প্রধানত ফারসি ভাষার মাধ্যমে। একসময় আল্লাহর চাইতে খোদা শব্দটির প্রচলন বাংলার মুসলমান সমাজে ছিল বেশি। আমরা বলেছি, নামজ, বেহেস্ত, দোজখ শব্দগুলো আরবি ভাষার নয়। এই শব্দগুলো বাংলা ভাষায় এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। দরবেশ শব্দটিও ফারসি ভাষার। সুলতান শব্দটি আরবি। শব্দগত অর্থে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। <strong>সুলতানরা সকলেই বাগদাদের খলিফাকে মানতেন। তারা বলতেন, তারা ক্ষমতা লাভ করেছেন বাগদাদের খলিফার সম্মতির মাধ্যমে। দিল্লি এবং বাংলার অনেক সুলতানের মুদ্রায় তাই সুলতানের নামের সঙ্গে মুদ্রিত থাকতে দেখা যায় বাগদাদের খলিফার নাম।</strong> কিন্তু মোগল বাদশারা খলিফা মানতেন না। তারা বলতেন, সব ক্ষমতার শেষ উৎস হচ্ছেন আল্লাহ। যিনি বাদশা হন তিনি সেটা হতে পারেন আল্লাহর সম্মতিতে। বাদশা বহন করেন আল্লাহর ছায়া। মোগল বাদশারা তাদের এই ধারণাটি অবশ্য লাভ করেছিলেন ইরানের প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তা থেকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মোগল আমলের প্রায় শেষভাগে বাংলার দেওয়ান হয়ে আসেন মুর্শিদকুলী খাঁ। মুর্শিদকুলী খাঁর জীবন ইতিহাস খুবই বিচিত্র। তিনি জন্মেছিলেন এক তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাকে ক্রয় করেন একজন শিয়া মুসলিম ইরানী সওদাগর। এবং নিয়ে যান ইরানে। তিনি তাকে মানুষ করেন নিজের পুত্র সন্তানের মতো। মুর্শিদকুলী খাঁ ইরানে লেখাপড়া শিখে মোগল দরবারে আসেন চাকরির খোঁজে। তিনি উচ্চ সরকারি পদ পান তার দক্ষতার গুণে। এক পর্যায়ে বাদশা আওরঙ্গজেব তাকে বাংলায় পাঠান দেওয়ান হিসেবে (১৭০১ খ্রি.)। আওরঙ্গজেব মারা যান ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে। মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলায় দেওয়ান হয়ে এসে তিনি বেশকিছু সংখ্যক হিন্দু ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন খাজনা আদায়ের অধিকার। যারা পরে হয়ে ওঠেন জমিদার। সাধারণত মনে করা হয়, ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দুরা বাংলায় হয়ে উঠতে থাকেন জমিদার। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। মুর্শিদকুলী খাঁর আমল থেকেই উদ্ভব হতে শুরু করে হিন্দু জমিদারদের। হিন্দু জমিদারদের সেরেস্তায় কাজ করতেন অনেক হিন্দু কর্মচারী। যাদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠে একটি হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এদের সঙ্গে পরে বিবাদ বাধে বাংলার মুসলিম কৃষক প্রজাদের (রায়ত)। কেবল অর্থনৈতিক কারণে নয়, ধর্মীয় কারণেও ঘটেছিল বিরোধ। <strong>ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু জমিদাররা মুসলমান প্রজাদের বাধ্য করতেন দুর্গাপুজার চাঁদা দিতে। যেটা দিতে চান না মুসলমান প্রজারা (রায়ত)। এই বিরোধ খুব প্রবল হয়ে ওঠে ফরায়েজি আন্দোলনের সময়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মোগল ও পাঠান</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাঠান বলতে বোঝাত পশতু ভাষাভাষী মানুষকে। পাঠান ও আফগান শব্দ দুটি সমার্থক। বাংলাদেশে আফগান বংশের একাধিক রাজা রাজত্ব করেছেন। এদের মধ্যে শেরশাহ্ শুর ও দাউদ করানী (করলানী) বিশেষভাবে খ্যাত হয়ে আছে। বাংলাদেশে মোগল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হতে সময় নেয়। এদেশের বড় বড় ভূস্বামী বা ভূঁইয়ারা মোগল শাসন মানতে চাননি। এই সমস্ত ভূঁইয়াদের অনেকেই নিজেদের দাবি করতেন পাঠন বংশোদ্ভূত হিসেবে। যেমন ইশা খাঁ, মুসা খাঁ, বাহাদুর গাজী প্রমুখ। মোগল শাসনকে বাংলার মানুষের কাছে মনে হয়েছে বিদেশি আগ্রাসন। বার ভূঁইয়ারা মোগল শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই পেয়েছেন বিশেষ সমর্থন। অনেকে মনে করেন, দূর সীমান্ত প্রদেশের সঙ্গে (বর্তমানে পাখতুনিয়া) বাংলার মানুষের সম্পর্ক কতটুকু।</p>
<p>কিন্তু একসময় বাংলাদেশের মুসলমানদের একটা বড় অংশ নিজেদের ভেবেছেন পাঠান হিসেবে; মোগল হিসাবে নয়। আমার আত্মপরিচয়ের সন্ধানে একথাটিও মনে রাখতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/sultanate-and-badshah-period-in-the-history-of-bangla/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13986</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাঙলার মুসলিম ও যুব আহ্বান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bengali-muslim-and-youth-call/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bengali-muslim-and-youth-call/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[কাজী নজরুল ইসলাম]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 04 Mar 2024 12:54:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13747</guid>

					<description><![CDATA[[১৩৪৩ বঙ্গাব্দে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ] &#160; আপনারা আমাকে আপনাদের ফরিদপুর মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীর সভাপতিত্বে বরণ করে যে গৌরব দান করেছেন, তার জন্য আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। আমি বর্তমানে সাহিত্যের সেবা,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;">[১৩৪৩ বঙ্গাব্দে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আপনারা আমাকে আপনাদের ফরিদপুর মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীর সভাপতিত্বে বরণ করে যে গৌরব দান করেছেন, তার জন্য আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। আমি বর্তমানে সাহিত্যের সেবা, দেশের সেবা এবং উম্মাহর পরিচায়ক থেকে অবসর গ্রহণ করে সঙ্গীতের প্রশান্ত সাগর দ্বীপে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দণ্ড গ্রহণ করেছি। সেই সাথীহীন নির্জন দ্বীপ ঘিরে দিবারাত্রি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটানা জলকল্লোল সঙ্গীত; আর সেই শব্দায়মান সুর ঊর্মির মুখরতার মাঝে বসে আছি বন্ধুহীন একা। এই বিশ্ব জুড়ে নেই মহামৌনীর স্তবগান নিঃশব্দ ঝঙ্কারে রণিত হচ্ছে, যদিও আমি সেই ধ্যানীর মৌন-মহিমার উৎসুক দর্শক, তবু একথা স্বীকার করতে আমার লজ্জা নেই নেই, আমার নির্জনতার বক্ষ জুড়ে শুনছি অবিরাম বিষাদিত রোদনধ্বনি, শান্তিহীন বিলাপ। মৃত্যুর পরে অশান্ত আত্মা যদি কেঁদে বেড়ায় তার কান্না বুঝি এমনি নীরব, এমনি মর্মন্তুদ! কত বিপুল বিরাট ভিত্তির উপর আমি আমার ভবিষ্যতকে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম; কী অপরিণাম আশা, দুর্জয় সাহস নিয়েই না আমি নতুন জাতি নতুন মানুষের কল্পনা করেছিলাম। আমার সেই ভিত্তিকে জানি না করে অভিশাপে ধরণীতল গ্রাস করেছে, সেই স্বপ্নকে নিষ্ঠুর বস্তুর জগত অভাবের সংসার ভেঙে দিয়েছে। পরাজয় স্বীকার আমি আজও করি, কিন্তু ধৈর্যের দুর্গম দুর্গে আর কতদিন আত্মরক্ষা করব?</p>
<p>বেশি দিনের কথা নয়, সেদিনও আমার আশা ছিল, এই ছাত্র সমাজকে অগ্রদূত করে নব বিজয় অভিযানের আমি হব তূর্যবাদক, নকীব, সৃষ্টি করব সুন্দরের জগত কল্যাণী পৃথ্বী, ধরণীর পঙ্কিল বক্ষ ভেদ করে আনব পবিত্র আবে জমজম ধারা। সে আশা আমার আজও ফললো না। বুঝি মুকুলেই তা পড়ল ধূলায় ঝরে। আমি তাই এতদিন নিজেকে দেশের কাছে, জাতির কাছে মনে করেছি মৃত। কতদিন মনে করেছি আমার জানাজা পড়া হয়ে গেছে। তাই যারা কোলাহল করে আমায় নিতে আসে, মনে হয় তারা নিতে এসেছে আমায় গোরস্থানে। প্রাণের বুলবুলির স্থানে নয়। কত দিক থেকে কত আহ্বান আসে আজও; যত সাদর আহ্বান আসে, তত নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলি, ওরে হতভাগ্য! তোর দাফনের আর দেরি কত? কত দিন আর ফাঁকি দিয়ে জয়ের মালা কুড়িয়ে বেড়াবি? উম্মাহর জন্য, জাতির জন্য, দেশের জন্য কতটুকু আমি করেছি! তবু তার প্রতিদানে অতি কৃতজ্ঞ জাতি যেই শিরোপা আনে, তাতে শির আমার লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চায়। তাই আপনাদের দাওয়াত পেয়ে যখন ধন্য হলাম, তখন দ্বিধাভরে অসঙ্কোচে তা কবুল করতে পারিনি। নেই ভাগ্যহীন নির্জনতার অন্ধ কারায় অভাবের শৃঙ্খলে বন্দি, সে কোথায় পাবে মুক্তির বাঁশি? শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি আমার অক্ষমতা নিবেদন করেছি আপনাদের কাসেদের কাছে, দূতের কাছে। কিন্তু তাঁরা আমার আর্জি মঞ্জুর করেননি। একদিন যারা ছিল আমার প্রাণাধিক প্রিয়তম, আত্মার আত্মীয়, তারা যখন তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার দোহাই দিল তখন আর থাকতে পারলাম না। জীবন-যুদ্ধে ক্লান্ত, অবসন্ন, দুঃখ-শোকের শত জিঞ্জিরে বন্দি হয়েও আসতে হলো আমাকে আপনাদের পুরোভাগে এসে দাঁড়াতে। ফরিদপুরের তরুণ ফরিদ দলের নেতৃত্ব করার অধিকার নেই। । সংসারের চিড়িয়াখানায় বন্দি সিংহ, সিংহ আজ তার মাস্টার্স ভয়েসের ট্রেডমার্কের সাথে এক গলাবন্ধে বাঁধা পড়েছে। আমার এক নির্ভীক বন্ধু আমাকে উল্লেখ করে একদিন বলেছিলেন, ‘যাকে বিলিতি কুকুরে কামড়েছে তাকে আমাদের মাঝে নিতে ভয় হয়।’ সত্যি! ভয় হবারই কথা। তবু কুকুরে কামড়ালে লোকে নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যকে কামড়াবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, আমার কিন্তু সে শক্তিও নেই, আমি হয়ে গেছি বিষ-জর্জরিত নির্জীব!</p>
<p>কিন্তু এ শোনাতে তো আমায় আপনারা আহ্বান করে আনেননি। আপনারা শামাদানে এনে বসিয়েছেন সেই প্রদীপকে যা একদিন হয়তো বা অত্যুগ্র আলোক দান করেছিল। আপনাদের এ আদরের অসম্মান আমি করব না, নিভবার আগে আমি আমার শেষ শিখাটুকু জ্বালিয়ে যাব। তাতে আপনাদেরে পথের হদিস মিলবে কি না! সকল পথের দিশারী খোদাই জানেন। আমি নিভবার আগে এই সান্ত্বনা নিয়েই নিভব নেই, আমি আমার শেষ স্নেহবিন্দুটুকু পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছি।</p>
<p>তোমরা আমার সেই প্রিয়তম চিন্তাশীল যুবকসমাজ, যাদের দেখলে মনে হয়, আমি যেন কোটি বার কাবা শরিফ জিয়ারত করলাম; যাদের চোখে দেখেছি তৌহিদের রশ্নি, যাদের মুখে দেখেছি খালেদ, তারেক, মুসার ছবি, যাদের মক্তব, মাদ্রাসা স্কুল-কলেজকে মনে হয়েছে মসজিদের চেয়েও পবিত্র। যাদের বাহুতে দেখেছি আলি হায়দার উহুদের বেদেরেগ ত্যাগের শান ও শওকত, কণ্ঠে শুনেছি বেলালের আজানধ্বনি। তোমরা আমার সেই ধ্যানের মহামানবগোষ্ঠী। এ আমার এতটুকু অত্যুক্তি কল্পনা নয়। তোমাদেরে আমি দেখেছি, তোমাদের অতিক্রম করে সহস্রাধিক বৎসর দূরে যুদ্ধে বদরের ময়দানে, খায়বারের জঙ্গে। দেখেছি ওমর ফারুকের বিশ্ববিজয়ী বাহিনীর অগ্রসৈনিকরূপে, দেখেছি দূর আফ্রিকার মুসা-তারিকের দক্ষিণে, দেখেছি মিসরের পিরামিডের পার্শ্বে পিরামিড ছাড়িয়ে গেছে তোমাদের উন্নত শির। দেখেছি ইরানের বিরান মুলুক আবাদ করতে, তার আলবোর্জের চূড়া গুঁড়া করে দিতে। দেখেছি জাবালুত তারেকের জিব্রাল্টারের অকুল জলরাশির মধ্যে নাঙ্গা শমশের হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে। দেখেছি সেই জলরাশি সাঁতরে পার হয়ে স্পেনের কর্ডোভার বিজয়চিহ্ন অঙ্কিত করতে। দেখেছি ক্রুসেডের রণে, জেহাদের জঙ্গে সুলতান সালাউদ্দিনের সেনাদলের মাঝে দেখেছি কুরূপা ইউরোপকে সুরূপা করতে। সেদিনও দেখেছি রিফ সর্দার আবদুল করিমের সাথে, বিশ্বত্রাস কামালের পাশে, পহলভির দক্ষিণে, ইবনে সউদের সম্মুখে। যুগে যুগে তোমরা এসেছ ভাবী নেশনের নিশানবরদার হয়ে। তোমরা যে পথ দিয়ে চলে গেছ, মনে হয়েছে-আমি যদি ঐ পথের ধূলি হতাম! আমি প্রাণমন পেতে দিয়েছি তোমাদের অভিযানের ঐ পায়ে চলা পথে। আমি যেন তোমাদেরই সেই পায়ে চলা পথের ধূলিসমষ্টি, মূর্তি ধরে এসেছি তোমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিতে, তোমাদের আর একবার তেমনি করে আমার বুকের উপর দিয়ে চলে যেতে।</p>
<p>কোথায় সে শমশের, কোথায় সে বাজু, সেই দরাজ দস্ত? বাঁধো আমামা, দামামায় আঘাত হানো আর একবার তেমনি করে। যে উম্মাহ যে জাতি চলেছে গোরস্থানের পথে, ফেরাও তাকে সেই পথে যে পথে চলে তারা একদিন পারস্য সাম্রাজ্য রোম সাম্রাজ্য জয় করেছিল, আঁধার বিশ্বে তৌহিদের বাণী শুনিয়েছিল। তোমাদেরই মাঝে থেকে বেরিয়ে আসুক, তোমাদের ইমাম দাঁড়াও তাঁর পতাকাতলে তাহরিমা বেঁধে। বলো, আল্লাহু আকবর, হাঁকো হায়দারি হাঁক, সপ্ত আসমান চাক হয়ে ঝরে পড়ুক খোদার রহমত, নবির দোয়া। চাঁদ সেতারা গলে পড়ুক কল্যাণের পাগল ঝোরা।</p>
<p>আর্ত-পীড়িত কোটি কোটি মজলুম ফরিয়াদ করছে, কে করবে এদের ত্রাণ? তোমাদের চর্বি জ্বালিয়ে জ্বালাও আবার দ্বীনের চেরাগ, এই অন্ধ পথহারা জাতিকে আলো দেখাও? তোমাদের অস্থিপঞ্জর দিয়ে গড়ে তোল পুলসেরাত। সেই পুলের উপর দিয়ে জয়যাত্রা করুক নূতন জাতি। তোমাদের শিক্ষা, তোমাদের জ্ঞান অর্জন, যদি তোমাদের মাঝেই নিঃশেষিত হয়ে যায়, তবে ভুলে যাও এ শিক্ষা, বর্জন করো এ জ্ঞানার্জন। নওকরির জন্য, দাসখত লিখার কায়দা-কানুন শেখার জন্য যদি তোমরা শিক্ষার ব্রত গ্রহণ কর, তবে জাহান্নামে যাক তোমাদের এই শিক্ষাপদ্ধতি, এই শিক্ষালয়।</p>
<p><strong><em>তোমাদের শিক্ষায়তন তা স্কুলই হোক, আর কলেজই হোক, আর মাদ্রাসাই, হোক পীরের দরগার চেয়েও পবিত্র, মসজিদের মতোই পাক। এর অঙ্গনে যে দীক্ষা গ্রহণ কর, যে নিয়ত কর, জীবনে যদি সে ব্রত ফলপ্রসূ না হয় তবে কাজ কি এই জীবনের এক-তৃতীয়াংশ বাজে খরচ করে?</em></strong></p>
<p>জরাগ্রস্ত পুরাতন পৃথিবী চেয়ে থাকে যুগে যুগে তোমাদের এই কিশোরদের এই তরুণদের মুখের পানে। তোমরা শোনাও তাকে তাজা তাজার গান, আর তোমাদের সেই প্রাণচঞ্চল সঙ্গীতের জাদুতে সে পাক নব-যৌবনের কান্তিশ্রী! তোমাদের বরণ করে দুলহিনের সাজে সেজে ষড়ঋতুর ডালা শিরে ধরে আজো সে চেয়ে আছে উন্মুখ প্রতীক্ষায় তোমাদের পানে। তোমাদের দক্ষিণ হস্তের দানে তার প্রতীক্ষার শূন্যতা কি পূর্ণ হবে না? কত কাজ তোমাদের ধরণীর দশদিক ভরে কত ধূলি, কত আবর্জনা, কত পাপ, কত বেদনা! তোমরা ছাড়া কে তার প্রতিকার করবে? কে তার এলাজ করবে? তোমাদের আত্মদানে, তোমাদের আয়ুর বিনিময়ে হবে তার মুক্তি। শত বিধি-নিষেধের, অনাচারের জিঞ্জির বন্দিনী এই পৃথিবী আজাদির আশায় ফরিয়াদ করছে তোমাদের প্রাণের দরবারে, তার এ আর্জি কি বিফল হবে? এই বাংলার না কি শতকরা পঞ্চান্ন জন মুসলমান। কিন্তু গুনতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাড়া এই পঞ্চান্ন জনকে নিয়ে বাঙলার সত্যকার গৌরব করবার কতটুকু আছে, তা হিসাব করতে গেলে মনে হয় আমরা শতকরা পাঁচজন হলেই এ লজ্জার হাত থেকে বেঁচে যেতাম। বড় দুঃখে তাই বলেছিলাম,</p>
<blockquote><p>“ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত</p>
<p>গুনতিতে মোরা বাড়িয়া চলেছি গরু-ছাগলের মত।”</p></blockquote>
<p>এ লজ্জা, এই অপমানের গ্লানি থেকে তোমরা তরুণ যুবক বাঙলার মুসলিমকে বাঁচাও। সমাজের স্তরে স্তরে, তার গোপনতম কোণে কোণে, বোরকার অন্তরালে, আবরুর মিথ্যা আবরণে যে আবর্জনা পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে, তার নিরাকরণ করো।</p>
<p><strong>ইসলামের প্রথম ঊষার ক্ষণে, সুবহে সাদিকের কালে যে কল্যাণী নারীশক্তি রূপে আমাদের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থান করে আমাদের শুধু সহধর্মিণী নয়, সহকর্মিণী হয়েছিলেন যে নারী সর্বপ্রথম স্বীকার করলেন আল্লাহকে, তাঁর রসুলকে। তাঁকেই আমরা রেখেছি দুঃখের দূরতম দুর্গে বন্দিনী করে সকল আনন্দের, সকল খুশির হিসসায় মাহরুম করে। তাই আমাদের সকল শুভ-কাজ, কল্যাণ-উৎসব আজ শ্রীহীন, রূপহীন, প্রাণহীন। তোমরা অনাগত যুগের মশালবর্দার তোমাদের অর্ধেক আসন ছেড়ে দাও কল্যাণী নারীকে। দূর করে দাও তাঁদের সামনের ঐ অসুন্দর চটের পর্দা। যে পর্দার কুশ্রীতা ইসলাম জগতের, মুসলিম জাহানের আর কোথাও নেই।</strong> দেখবে তোমাদের কর্তব্যের কঠোরতা, জীবন পথের দূরধিগম্যতা হয়ে উঠবে সুন্দরের স্পর্শে পুষ্প পেলব। কর্মে পাবে প্রেরণা, মনে পাবে সুন্দরের স্পর্শ, কল্যাণের ইঙ্গিত। সম্মান দেওয়ার নামে এতদিন আমরা আমাদের মাতা, ভগিনী, কন্যা, জায়াদের যে অপমান করেছি আজও তার প্রায়শ্চিত্ত যদি না করি তবে কোনো জন্মেও এ জাতির আর মুক্তি হবে না।</p>
<p>তারও আগে তোমাদের কর্তব্য সম্মিলিত হওয়া, সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া। যে ইখওয়ান সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, যে একতা ছিল মুসলিম উম্মাহর আদর্শ, যার জোরে মুসলিম জাতি এক শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবী জয় করেছিলো, আজ আমাদের সে একতা নেই হিংসায়, ঈর্ষায়, কলহে, ঐক্যহীন হয়ে বিচ্ছিন্ন। দেয়ালের পর দেয়াল তুলে আমরা ভেদ-বিভেদের জিন্দানখানার সৃষ্টি করেছি; কত তার নাম শিয়া, সুন্নি, শেখ, সৈয়দ, মুঘল, পাঠান, হানাফি, শাফি, হাম্বলি, মালেকি, লা-মাজহাবি, ওয়াহাবী ও আরো</p>
<p>কত শত দল। এই শত দলকে একটি বোটায়, একটি মৃণালের বন্ধনে বাঁধতে পার তোমরাই। শতধাবিচ্ছিন্ন এই শতদলকে এক সামিল করো, এক জামাত করো সকল ভেদ-বিভেদের প্রাচীর নিষ্ঠুর আঘাতে ভেঙে ফেল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বুলবুল</p>
<p>অগ্রহায়ণ, ১৩৪৪</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bengali-muslim-and-youth-call/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13747</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
