<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>কৃষি &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/category/about-bangladesh/agriculture/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Thu, 25 Sep 2025 05:43:37 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.0.2</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>কৃষি &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>সবুজ বিপ্ল­ব : প্রত্যাশা ও ফলাফল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/green-revolution-expectations-and-results/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/green-revolution-expectations-and-results/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আশিকুর রহমান সৈকত]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 25 Sep 2025 05:43:37 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16190</guid>

					<description><![CDATA[পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কিন্তু খাদ্যের উৎপাদন কিংবা চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের যোগান সে পরিমাণে বাড়ছে না, এজন্যে আমাদের উন্নত প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে। অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প ব্যয়ে অধিক ফসল অর্জনের মাধ্যমে এ ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটানো]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কিন্তু খাদ্যের উৎপাদন কিংবা চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের যোগান সে পরিমাণে বাড়ছে না, এজন্যে আমাদের উন্নত প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে। অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প ব্যয়ে অধিক ফসল অর্জনের মাধ্যমে এ ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব, নতুবা খাদ্যের অভাবে বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা যাবে-অনেকটা এরকম শঙ্কা এবং তার প্রতিকারের লক্ষ্যেই সবুজ বিপ্লবের যাত্রা শুরু হয়। এজন্যে মানবশ্রমের মাধ্যমে প্রাচীন পদ্ধতির কৃষি ব্যবস্থাকে সরিয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো, নতুন নতুন সহনশীল জাতের উদ্ভাবন, কৃষি জমিতে ফলন বৃদ্ধির জন্যে সার ব্যবহারের আধিক্য, আগাছা নিড়ানোর জন্যে শ্রমিক নয় বরং ঔষধ দিয়ে আগাছার উৎপাদন বন্ধ করা, কীটনাশক এর ব্যপক প্রচলনসহ বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো পদক্ষেপের মাধ্যমে ৬০ এর দশকে সবার সামনে আসা সবুজ বিপ্লব সাধারণ মানুষের মনে, বিশেষ করে কৃষকদের মাঝে আশার জাগরণ ঘটিয়েছিলো। বাহ্যিকভাবে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো, তা আসলেই সাধারণ মানুষের মনে সম্ভাবনার আলো দেখাতে সমর্থ হয়েছিলো। এমনকি শিল্প বিপ্লবের যে প্রবাহ পশ্চিমে শুরু হয়েছিলো ১৮’শ শতকে, তারই ধারাবাহিকতায় যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে রাসায়নিক সারের উৎপাদন পর্যন্ত কৃষিক্ষেত্রে এক আমূল বিপ্লব অত্যাবশ্যক হয়ে গিয়েছিলো। এজন্যে এ ধরণের একটি বিপ্লব যখন সমগ্র বিশ্বের কৃষি উৎপাদনে এক ঢেউ বয়ে নিয়ে আসার কথা, কয়েক বছরের ব্যবধানেই তা ফিকে হয়ে যায় মূলত তার পরিকল্পনা এবং ফলাফলের মধ্যকার অসামঞ্জস্যের কারণে! কারণ যে সকল দেশ কিংবা যে সকল বৃহৎ কোম্পানিগুলো সবুজ বিপ্লবের ধারণা নিয়ে সকলের সামনে এগিয়ে এসেছিলো, তারা কি সত্যিই সেগুলো পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলো, নাকি মানব সভ্যতাকে কেন্দ্র করে তাদের হীন এক পরিকল্পনারই একটি অংশ ছিলো এ বিপ্লব, প্রায় অর্ধ শতক পরে এখন সে সবের হিসাব নেওয়ার সময় এসেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ইতিহাস :</h5>
<p>সবুজ বিপ্লবের জনক বলা হয় নরওয়ে বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি প্রকৌশলী ‘নরম্যান বরলোগ’কে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ব্যক্তি মালিকানাধীন ডু-পন্ট কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। ১৯৪২ এর দিকে বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত রকফেলার ফাউন্ডেশন মেক্সিকো সরকারের সাথে একটি চুক্তি করে, যার মাধ্যমে মেক্সিকোতে উচ্চ ফলনশীল গমের নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করা শুরু হয়। <strong>মূলত সে সময় মেক্সিকো তার প্রয়োজনের অর্ধেক পরিমাণ গম নিজে উৎপাদন করতো আর বাকিটা অন্য দেশ থেকে আমদানী করতো। কিন্তু বরলোগ এর গবেষণা এবং রকফেলার এর ফান্ডিংয়ে দ্রুতই উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন হয় আর ৭০ এর দশকের মধ্যেই মেক্সিকো নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার মত গম উৎপাদন করতে শুরু করে।</strong> বিষয়টি ব্যপকভাবে প্রচার পায় এবং এর ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ভারতে এসে চলতে থাকে। ভারতে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন নতুন ধানের চাষ শুরু হয় ৭০-৮০ দশকের সময়ে। এ সব ধান সে সময়কার সাধারণ ধানের চেয়ে দেখতে সুন্দর (বেশি সাদা, চিকন, অভঙ্গুর) এবং উচ্চ ফলনশীল হওয়ায় তা কৃষকদের মাঝে ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।</p>
<p>মূলত কৃষি ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির (Biotechnology) ব্যবহারের যে নতুন ধারা আমরা দেখতে পাই, তার সূচনা হয় এ সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে। মেক্সিকো ছিলো এর প্রাথমিক প্রয়োগস্থল কিন্তু সেখানে সাফল্যের পর ভারতে এসেও তা সাফল্যের মুখ দেখলে এ বিপ্লবের পরিচিতি ধীরে ধীরে বিস্তর লাভ করতে শুরু করে। এমনকি এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে বরলোগ নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>
আমরা কী পেলাম :</h5>
<p>মেক্সিকোতে বরলোগের সাফল্যের পিছনে যে অনেক শ্রম ও অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তা আমরা শুরুতে জানতে পেরেছি। কিন্তু শ্রম ব্যয় করার সামর্থ্য কম বেশি সবার থাকলেও, অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য কি সবার থাকে? উত্তরটি এক শব্দেই হবে-‘না’। বরলোগের উদ্ভাবিত জাতের গম উচ্চ ফলনশীল হলেও তাতে চাষের জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল তোলার আগ পর্যন্ত অনেক অর্থ ব্যয় করতে হতো। যেমন, জমি প্রস্তুতের পূর্বে সার দেওয়া, বপনের পর থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত নিয়মিত পানি দেওয়া, কীটনাশক ও আগাছানাশক ছিটানো থেকে শুরু করে ফসল তোলার ক্ষেত্রে ভারী অত্যাধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করা- সাধারণ কৃষকের পক্ষে এ ব্যয় বহন করা মোটেও সম্ভব নয়। মূলত যে সকল কৃষকেরা এসকল উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার করতে আগ্রহী হতো, তাদের বিভিন্নভাবে ঋণ দিয়ে সহায়তা করা হতো, কিন্তু যারা এটি করতে আগ্রহী হতো না, তাদের জন্যে কোনো ঋণের/সহায়তার ব্যবস্থা থাকতো না। এমনকি সবুজ বিপ্লব মেক্সিকো এবং পরবর্তীতে অন্যান্য দেশের সরকারের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ায় সরকারি পর্যায়ে এ সকল উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। যার ফলে, একদিকে উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহারকারী কৃষকেরা প্রচুর উৎপাদন করে মুনাফা অর্জন করতে পারতো, অন্যদিকে প্রাচীন (Classic) পদ্ধতিতে উৎপাদনকারী কৃষকেরা চাহিদা পরিমাণে কিংবা চাহিদার চেয়েও কম উৎপাদন করতে সক্ষম হতো। এ অসম প্রতিযোগিতায় উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার না করা কৃষকেরা ক্রমেই নিঃস্ব হতে থাকল। এভাবে ধীরে ধীরে স্থানীয় বীজের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকেরা কৃষিকাজ থেকে সরে যেতে বাধ্য হলো এবং বাজার নতুন জাতের বীজে সয়লাব হয়ে যেতে লাগলো।</p>
<p>এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে, উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহার করতে ক্ষতি কোথায়, যদি আমরা বেশি বেশি ফসল ঘরে তুলতে পারি? এখানে প্রথমত যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার, উচ্চ ফলনশীল জাত অবশ্যই ভালো হবে, যদি তা পরিবেশ ও মানুষের জন্যে বিপদ বয়ে না আনে। <strong>কিন্তু সবুজ বিপ্লবের পর সমগ্র দুনিয়াতে নতুন জাত উদ্ভাবনের যে হিড়িক পড়ে যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, এ সব জাতের বীজ থেকে ফসল উৎপাদন করতে অতিরিক্ত পরিমাণে সার, রাসায়নিক কীটনাশক, প্রচুর পানি ইত্যাদির দরকার। এমনকি এসকল রাসায়নিক দ্রব্য মাটির উর্বরতা ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে দেখানো হয় যে, বিশ্বের প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের উর্বর ভূমিগুলোকে বছরের পর বছর অতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করিয়ে উৎপাদনের অনুপযোগী করে তুলেছে!</strong> আমাদের সামনে আফ্রিকাকে যদিও মরুভূমি কিংবা অনুর্বর হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়ে থাকে, একটি জিনিস আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক না, আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশই আবহাওয়া এবং ভৌগলিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বেশি উর্বর। একটি উদাহরণ দেই। সোমালিয়া আমাদের মত গ্রীষ্মপ্রধান (Tropical) একটি দেশ, অথচ আমরা বাংলাদেশকে উর্বর ভাবি কিন্তু সোমালিয়াকে মনে আসলে আমাদের চিন্তায় ক্ষুধাপীড়িত একটি দেশ বলে মনে হয়। যার মাটি কিনা অতি অনুর্বর! একদিকে আমাদের মনের ভিতরে এরকম একটি চিত্র তুলে ধরানো হয়েছে, অপরদিকে সে সব দেশের মাটিগুলোকে ধীরে ধীরে চাষাবাদের অনুপযোগী করে ফেলা হচ্ছে। মূলত এ সকল উচ্চ ফলনশীল জাতের চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেক অনুন্নত দেশই খরায় আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এছাড়া গ্রামের কৃষকদের যেখানে উচ্চ মাত্রার রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করতে হচ্ছে, সেখানে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা অতি দ্রুত ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এ বীজগুলো বপনের পরে যদি পর্যাপ্ত (অন্যান্য বীজের চেয়ে বেশি) পানি বা সার না দেওয়া হয়, তাহলে তা কখনোই ভালো ফলন দিবে না। <strong>তাই কৃষকদের নিকট উচ্চ ফলনশীল জাত বিক্রি করা শুধু বীজ বিক্রি করা নয় বরং একইসাথে কীটনাশক, সার, আধুনিক যন্ত্রপাতিও বিক্রি করা।</strong> যে সব কৃষক এ অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পেরেছে তারাই প্রতিযোগিতায় টিকেছে, যারা পারেনি তারা বাধ্য হয়েছে কৃষি কাজ ছাড়তে।</p>
<p>আমরা জানি যে, একই মাটিতে একই ফসল ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন করাটা অনুচিত। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে কিংবা একটি শস্যের ফসল ঘরে তোলার পর সেখানে অন্য কোনো শস্য চাষাবাদ করা উচিত, এতে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সে সাথে পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের পরে একই ফসল বার বার বপনের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জনের যে ধারা প্রচলিত করা হয়েছে, তাতে মাটির ও পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। এমনকি বাস্তুসংস্থানের অন্যতম উপাদান যে সব উপকারী কীটপতঙ্গ আমরা জানি, কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে অপকারী কীটগুলোর সাথে সাথে উপকারী কীটগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে বাস্তুসংস্থানের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এমনকি এখন আমাদের দেশসহ সমগ্র বিশ্বে “এ অঞ্চলে এ ফসলের ব্যবসা করে কোটিপতি” বলে যে সকল খবরগুলো বের হচ্ছে, এর প্রভাব সম্পর্কে কেউ একবারও ভেবে দেখছে না। আমাদের দেশেই এর অন্যতম বড় উদাহরণ চিংড়ি চাষ। চিংড়ি চাষ একটি সময় অধিক মুনাফা এনে দেওয়ায় অনেকে ফসলি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু করে, কিন্তু এর চাহিদা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসা শুরু করায় পরবর্তীতে আর সে জমিতে শস্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। কারণ ততদিনে এ মাটি অধিক লবণাক্ত হয়ে গেছে। এভাবে ফসলি জমি কৃষি কাজের অনুপযুক্ত হালে নিয়ে আসা হয়েছে।<br />
সবুজ বিপ্লবের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অত্যাধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমবাজার দামি হওয়ায় সেখানে যন্ত্রপাতির ব্যবহার কৃষকদের জন্যে উপকারী হলেও, ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষকদের জন্যে সে সকল যন্ত্রপাতি কেনা বা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি আমাদের দেশে কৃষি শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েছে। ৩য় বিশ্বের দেশ হিসেবে যেখানে আমাদের জনসংখ্যা অনেক, সেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ তা ভেবে দেখা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। কারণ, কৃষি শিল্পে বিপ্লব ঘটানো হল্যান্ড এর দিকে যদি আমরা তাকাই, তাঁদের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৮০ লক্ষ, ইউরোপে শ্রম বাজারও অনেক ব্যয়বহুল। তাই তাদের জন্যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আমাদের দৃষ্টিতে নান্দনিক দেখালেও, আমাদের প্রেক্ষিতে এর বাস্তুবতা কতটুকু, তা আরেকবার ভেবে দেখা উচিত। আমাদের অবশ্যই কৃষিতে অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত, তবে নিজেদের পারিপার্শ্বিকতার আলোকে সব কিছু বিবেচনা করেই সে ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া অবশ্য কর্তব্য।</p>
<p>আমাদের যে বিষয়টি সবুজ বিপ্লবকে চিত্তাকর্ষক করে তুলেছে তা হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে যথেষ্ট খাদ্য উৎপাদন। কিন্তু আসলেই কি তা হচ্ছে? আজ সমগ্র বিশ্বে হাইব্রিড বীজের ছড়াছড়ি, কিন্তু বিশ্বে অনাহারে থাকা মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে! <strong>ফাও (FAO) এর মতে, বিগত বছর পৃথিবীতে ১.৩ বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় ও নষ্ট করা হয়েছে, যা কিনা মোট উৎপাদিত খাদ্যের এক তৃতীয়াংশ! যেখানে এত এত গবেষণা, এত এত নতুন জাতের উদ্ভাবন, সেখানে বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা এতটাই ভঙ্গুর যে, এক প্রান্তে অতিরিক্ত খাদ্য নষ্ট করা হচ্ছে অপরদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে।</strong> খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় দুরাবস্থা রয়ে গেলেও, বীজ ব্যবস্থাপনা ঠিকই সাধারণ কৃষকদের হাত থেকে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে। আজ আমাদের কৃষি উৎপাদন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, কেউ চাইলেও প্রাচীন বীজগুলো নিয়ে উৎপাদন করতে পারবে না। বীজের সত্যায়ন (Certification) ও মান (Standard) এর নামে কৃষকদের পরোক্ষভাবে হাইব্রিড বীজ ব্যবহারে বাধ্য করা হচ্ছে, অপরদিকে পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করে বিশেষ গোষ্ঠী মুনাফা অর্জন করে আসছে। সবুজ বিপ্লব কি আসলেই কৃষকদের জন্যে আশীর্বাদ বয়ে এনেছে? নাকি গুটিকয়েক ধনী গোষ্ঠীকে/কৃষককে আরও ধনী করে তা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে? এগুলো ভেবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে দেরি হয়ে গেলেও, সময় শেষ হয়ে যায়নি বলে আমার বিশ্বাস।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/green-revolution-expectations-and-results/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16190</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 20 Sep 2025 14:31:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16160</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও খাদ্য : ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি রচিত হওয়ার পর তৎকালীন দুনিয়ায় যে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, আল্লাহর রাসূল (স.) তার বিপরীতে নতুন এক ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন। অর্থনৈতির মূলনীতিকে গোটা জাতির সামনে তুলে ধরেন এবং তা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5>ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও খাদ্য :</h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি রচিত হওয়ার পর তৎকালীন দুনিয়ায় যে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, আল্লাহর রাসূল (স.) তার বিপরীতে নতুন এক ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন। অর্থনৈতির মূলনীতিকে গোটা জাতির সামনে তুলে ধরেন এবং তা বাস্তবায়নে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় একাধিক মূলনীতি বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহাবিগণ এ ধারা অব্যাহত রাখেন। ফলস্বরূপ তৎকালীন সমাজের দারিদ্র্যতা, অর্থনৈতিক সংকট দূরীভূত হয়ে এমন একটি সভ্যতার সূচনা হয়, যেখানে দারিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, বেকারত্বের মত সমস্যাগুলো ছিল অনুপস্থিত। যার দৃষ্টান্ত আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই। রাসূল (স.) এবং আবু বকর (রা.) এর যামানা পার হয়ে উমর (রা.) এর শাসনামলের শেষ দিকে আরবের সাড়ে ৩৮ লক্ষ বর্গমাইল অঞ্চলে যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না!</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার সময়কালে অর্থনীতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে মুফাসসিরগণ, ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানীগণ স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। কারণ, কোরআন-হাদীসসহ ইসলামী শাস্ত্রগুলোতে আলেমগণ এ বিষয়ে বেশ গুরুত্বারোপ করেছেন। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ</p>
<p>“সমৃদ্ধির জন্য কৃষিকাজ আবশ্যক। ইসলামী রাষ্ট্রে খাদ্যের পর্যাপ্ততা অর্জনের আগ পর্যন্ত চাষাবাদ, রোপণ, ও জমি আবাদের কাজ অবিরাম চালিয়ে যেতে হবে।”</p>
<p>খাদ্যের সমৃদ্ধি যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা উপোরোক্ত উক্তিতেই বুঝা যায়। ইমাম কুরতুবী একে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ, জনগণের সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সত্যিকারের স্থায়ী উন্নয়ন, সুস্থ সবল জাতি, সর্বোপরি আখলাকসম্পন্ন শক্তিশালী উম্মাহ গঠনে কৃষি ও খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।</p>
<p>খোলাফায়ে রাশেদার আমল থেকে শুরু করে প্রত্যেক যুগেই কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেমনঃ হযরত উমর (রা.) অর্থনীতিতে বৈপ্ল­বিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের জন্য তিনি যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষি। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর পরই কৃষকদের সাথে বৈঠক করেন। কৃষি সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সমস্যা, খাদ্য উৎপাদনের দিকে জোর দেয়া, খাদ্য সংকট মোকাবিলা প্রভৃতি কাজের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উমর (রা.) এক্ষেত্রে ভূমিব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তিনি ভূমির ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন-</p>
<ul>
<li>১. ভূমি মানবজাতির জন্য সর্বাধিক প্রয়োজনীয় এবং মানুষের সকল চাহিদা পূরণ করে।</li>
<li>২. ভূমির পরিমাণ সীমিত।</li>
<li>৩. ভূমি স্থায়ী।</li>
</ul>
<p>উমর (রা.) নেতত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার পরপরই মুসলিমদের সামনে কৃষি সংক্রান্ত দুটি মৌলিক সমস্যা এসে হাজির হয়।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>এক. ক্রমবর্ধমান ইসলামী অঞ্চলগুলোর খাদ্যচাহিদা মেটানো।</strong><br />
<strong>দুই. ভূমিব্যবস্থাকে এমনভাবে সুবিন্যাস করা যাতে মধ্যস্বত্বভোগী কোনো শ্রেণির উদ্ভব না ঘটে।</strong></p>
<p>এই দুটি লক্ষকে সামনে রেখে উমর (রা.) যুগান্তরী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিজিত ভূমি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে না দিয়ে কৃষকদের মাঝে সমভাবে বন্টন করেন। যার ফলে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে যায়। রোমান এবং পারস্যের সামন্ততান্ত্রিক কিংবা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে উমর (রা.) নতুন ধারা তৈরি করেন। অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার বিলোপ সাধন করে বিশ্ববসীর জন্য একটি মডেল উপস্থাপন করেন।<strong> তিনি অনাবাদি জমিকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ভূমিহীনদেরকে ভূমির মালিকানা প্রদান করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষকদের বিশেষ পুঁজি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং ঘোষণা দেন, রাষ্ট্র কতৃক প্রদেয় এ পুঁজি রাষ্ট্রকে আর ফেরত দিতে হবে না। উৎপাদিত ফসলের ৫০% কৃষকরা নিজের জন্য রাখবে বাকি ৫০% রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কল্যাাণে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য এটি ছিল বড় একটি পাওয়া।</strong> যুগান্তকারী এই পদক্ষেপের ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্রের আওতাধীন সব অনাবাদি জমি আবাদি জমিতে পরিণত হয়। উন্নয়নের চালিকাশক্তি কৃষকদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখা, রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা সাহায্য-সহযোগিতাসহ নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গনিমতের মাল আসার পর তিনি তার সবটুকু যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন না করে সে সময়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা কৃষির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন। এক্ষেত্রে নানাবিধ চিন্তাগত ও সিদ্ধান্তগত জটিলতা তৈরি হলেও তিনি তার ইজতেহাদি সিদ্ধান্তের আলোকে কৃষির উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে এর অনুকূল সিদ্ধান্ত প্রদান করেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় তাঁর এ পদক্ষেপ ছিল সময়ের সেরা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।</p>
<p>কৃষিব্যবস্থার সামগ্রীক উন্নয়নের লক্ষ্যে এগ্রিকালাচারাল টেকনোলজি অর্থাৎ, তৎকালীন সময়ের সবথেকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেন। সেচ প্রকল্প, ড্রেনেজ সিস্টেম প্রবর্তনসহ নানাবিধ উদ্যোগ করে বিদ্যমান কৃষির ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। উন্নয়ন চালিকা শক্তির মূল উপাদান কৃষক ও কৃষির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফরমান জারি করেন।</p>
<p>ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজ-এর একটি ঘটনা এখানে প্রাণিধানযোগ্য। ‘একবার মুসলিম সেনাবাহিনী ভুলক্রমে এক ব্যক্তির ফসলী ক্ষেত মাড়ালে উমর (রা.) ক্ষতির শিকার কৃষককে তাৎক্ষণিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।’ দুর্ভিক্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দীর্ঘমেয়াদি সাহায্য নিশ্চিত করেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন তার লক্ষমাত্রা অতিক্রম করে।</p>
<p>উৎপাদন বাড়াতে স্বতন্ত্র সেচ প্রকল্প চালু করা হয়। আল্লামা শিবলী নোমানী তাঁর আল ফারুক গ্রন্থে লিখেছেনঃ</p>
<blockquote><p>“সমগ্র দেশে খাল খনন, বাঁধ নির্মান পুকুর খনন, প্রয়োজনীয় স্থানে পানির ব্যবস্থা করার জন্য হযরত ওমর পৃথক এক বিভাগ (Department) প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লামা মাকরিযী লিখেছেন শুধুমাত্র মিসরেই এ কাজের জন্য দীর্ঘ কয়েক বছর ব্যাপী এক লক্ষ বিশ হাজার শ্রমিক এই কাজে নিযুক্ত ছিল। এর যাবতীয় খরচ বাইতুলমাল তহবিল থেকে বহন করা হতো। খেযিস্তান এবং আহওয়াজ এলাকায় জাযর ইবন মুয়াবিয়া হযরত উমরের অনুমতিক্রমে অনেক খাল খনন করে বহু পতিত জমি আবাদ উপযোগী করেছিলেন। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অনেক খাল খনন করা হয়েছিল বলে বড় বড় ইতিহাসবিদ্গণ উল্লেখ করেছেন।” (আল ফারুক, পৃ-১৪২)</p></blockquote>
<p>উসমান (রা.) খিলাফতে অধিষ্টিত হয়ে পূর্ববর্তী কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। হযরত আলীও (রা.) এই ধারাকে অব্যাহত রাখেন। তিনি সব অঞ্চলে কৃষি এবং খাদ্যনীতির গুরুত্ব বজায় রাখতে শাহী ফরমান জারি করেন। মিশরের গভর্নর মুসা আল-আশআরীর কাছে পাঠানো এক চিঠির শুরুটা তিনি এভাবে করেছিলেন, <strong>“হে মুসা আল-আশআর! উৎপাদন বৃদ্ধি কর এবং উৎপাদিত ফসলর সুষম বন্টন নিশ্চিত কর।” </strong>স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, খোলাফায়ে রাশেদার আমলে কৃষিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির ভিত কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল।</p>
<p>কৃষিকে মুসলিমরা উন্নতির কোন শিখরে নিয়ে গিয়ে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত এক সভ্যতার ইতিহাস বিশেষজ্ঞের নিম্নোক্ত উক্তিতে- “আমি কখনোই শুনিনি, মুসলিমরা তাদের স্থায়ী আবাসস্থলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে খাদ্য আমদানি করেছে। এর পরিবর্তে তারা নিজেরা কীভাবে সার প্রস্তুত করতে হয়, মাটির গঠন, চাষ পদ্ধতি, রোপণ, সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদির উপর তারা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করে।” (The Back of Islam, ২য় খন্ড, ড. মোহাম্মদ আমীন)</p>
<p>যেসব অঞ্চল কৃষিকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ভিত রচনা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম আন্দালুসিয়ার মুসলিম সালতানাত বা ইসলামী খেলাফত। তৎকালীন সময়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরাই সর্বপ্রথম কৃষির এনসাইক্লোপিডিয়া তৈরি করে। আজকে আমরা যে লেবু, মালটা, কমলা, বাদামসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিদায়ক ফল দেখতে পাই, সেসবের বীজ মুসলমানদের হাত ধরেই বাণিজ্যিক রোপন শুরু হয়। তারা নতুন নতুন বীজের আবিষ্কার করে। পৃথিবীর ইতিহাসে আজও আন্দালুসিয়ার কৃষি বিশ্ব কৃষিব্যবস্থার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। খলীফা আব্দুর রহমান প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করতেন। ইসলামী সভ্যতার সময়কালে স্পেনের কৃষি কোন অবস্থায় ছিল জানতে উইল ডুরান্টের নিম্নোক্ত উক্তিটিই যথেষ্ট। তিনি লিখেছেনঃ</p>
<p>“কয়েকশত কৃষিজাত পণ্য যেমনঃ শস্য, সবজি, ফলমূল, বাদাম ও ফুলের চাষ করা হয়। কমলা গাছ এবং কমলার বীজ নিয়ে দশম শতাব্দীর কিছু আগে আরবরা সিরিয়া, এশিয়া মাইনর, প্যালেস্টাইন, মিশর এবং স্পেনে প্রবেশ করে। এসব দেশ থেকে কমলা দক্ষিণ ইউরোপে প্রবেশ করে। আখের আবাদ এবং চিনির পরিশোধনও আরবদের (মুসলিমদের) থেকে ক্রুসেডাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রবেশ করে। আরবদের মাধ্যমেই ইউরোপ তুলার সাথে পরিচিত হয়। রাষ্ট্র সেচব্যবস্থা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন এবং পতিত জমি আবাদ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ সাহায্য করে। যার ফলে সেসময়ে বুখারা এবং সমরকন্দের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে পৃথিবীতে স্থাপিত স্বর্গ বলে আখ্যায়িত করা হতো।”</p>
<p>একইভাবে স্কটের মন্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। তিনি স্পেনে মুসলিম সালতানাতের কৃষিপদ্ধতি সম্বন্ধে বলেনঃ“&#8230;the most complex, the most perfect, the most scientific, even devised by the ingenuity of man.</p>
<p>মুসলিমরা বিজিত হয়ে যেসব অঞ্চলে ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতো এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতো সেখানে তারা উন্নত খাদ্যনীতি এবং কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিত। যেমনঃ আন্দালুসিয়াতে যখন মুসলিমরা দেখতে পেল স্বাস্থ্যহীনতা এবং বিনা চিকিৎসায় অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন মুসলমানরা এ অঞ্চলের জলবায়ু, ভূমিসহ সামগ্রীক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে নতুন বীজ উদ্ভাবন করে এবং অঞ্চলোপযোগী খাদ্যনীতি প্রনয়ণ করে। এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল আন্দালুসিয়াতে নয়, অন্যান্য অঞ্চলেও নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাতের উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। বাংলা অঞ্চলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর মুসলমানরা এ অঞ্চলের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার সুষ্ঠু বন্দোবস্ত করতে অঞ্চল উপযোগী নানা জাতের বীজ, কলা, আমলকিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার সর্বত্র সহজলব্য করেন। এ জাতীয় উদ্যোগের ফলে কৃষি ও খাদ্যনীতিতে বিপ্ল­ব সাধিত হয়। উন্নত কৃষি এবং সঠিক খাদ্যনীতির অভাবে আজ আমরা ভয়ংকর যুদ্ধের সম্মুখীন। যা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট।</p>
<p>বাদশা আলমগীরের সময় বাংলার কৃষি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। মীর জুমলা (১৫৯১-১৬৬৩) এবং শায়েস্তা খাঁর (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) আমলে উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছিল সর্বাধিক সস্তা। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। এ সময় বাংলা অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। ড. মোহাম্মদ মোহর আলী তাঁর <em>History of the Muslims of Bangal</em> (2 Vol. 5) এ নিয়ে তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন।</p>
<p>সীমান্ত দিয়ে কোনো ভাবেই যেন ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য প্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে উমর (রা.) এর সময়কাল থেকেই কঠিন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিটি অঞ্চলেই চেক পোস্ট বসানো হয়। আজকের যে শুল্ক সিস্টেম তার আবিষ্কারকও মুসলিমরাই। অর্থাৎ এ ব্যাপারে মুসলিমরা কতো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেছে তা আমরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।</p>
<p>বর্তমান পৃথিবীর কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরিই জায়নবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রনে। তারা একে কেন্দ্র করে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ বীজ, খাদ্য এবং কৃষির যুদ্ধ যা পারমাণবিক বোমার থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। ইসলামী সভ্যতার সূচনাকালীন সময়েই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারার ২০৫ নং আয়াতে আমাদেরকে সতর্ক করে বলে দিয়েছেন,</p>
<blockquote><p>“যখন সে শাসন কর্তৃত্ব লাভ করে, পৃথিবীতে তার সমস্ত প্রচেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত ও মানব বংশ ধ্বংস করার কাজে। অথচ আল্লাহ বিপর্যয় মোটেই পছন্দ করেন না।”</p></blockquote>
<p>এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে যা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হলো, তারা আমাদের শস্যক্ষেত্র এবং বংশ বৃদ্ধিকে থামিয়ে দিবে। আজকে সেই বিষয়টি আমরা ব্যাপক হারে লক্ষ্য করছি এবং এর ভয়াবহ ফলাফলও উপলব্ধি করছি। সূরা নিসার ১১৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,</p>
<p>“তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আশ্বাস দিব, তাদেরকে পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব, এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির আকৃতি পরিবর্তন করার আদেশ দিব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হবে।”</p>
<p>এ দুটি আয়াত থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, তারা আমাদের বীজ ব্যবস্থা, আমাদের বংশবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিবে। আমাদের সৃষ্টির আকৃতিকে পরিবর্তন করে দিবে।</p>
<p>সুষ্ঠুভাবে বর্তমান বিশ্ব খাদ্যনীতিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জায়নবাদীগোষ্ঠী কতৃক পরিচালিত মনোসান্তো, কারগিলের মতো কোম্পানিগুলো আমদানীকৃত বীজের মধ্যে ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে, যা ভয়াবহ রোগের সৃষ্টি করছে। তারা জেনেটিক্যালি মোডিফাই করে ঝুঁকিপূর্ণ এসব বীজ আমাদের নিকট প্রেরণ করছে। তারা নয়া কীটনাশক, সার সিস্টেম তৈরি করে কৃষি সেক্টরকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে যে, সার এবং কীটনাশক ছাড়া খাদ্য উৎপাদন কল্পনাও করা যায় না। জমিতে সার এবং কীটনাশক প্রয়োগের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। উ<strong>ৎপাদিত খাবার খেয়ে মানবদেহে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত ঔষধের কাঁচামালও তারা সরবরাহ করছে। এবং তাদের নিয়ন্ত্রনাধীন বড় বড় ঔষধ কোম্পানি গড়ে ওঠেছে। নিজেরা কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করে আবার নিজেরই সে রোগের ঔষধ সরবরাহ করে। মানবরূপী নিকৃষ্ট এ পশুগুলো মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সেক্টর ‘কৃষিব্যবস্থা’কে নিরব গণহত্যার মোক্ষম হাতিয়রে পরিনত হয়েছে।</strong></p>
<p>সাম্রাজ্যবাদীদের হীন এ কাজের বিপরীতে ইসলাম খাদ্যনীতি এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়কে কতটা আদালত এবং ইনসাফের দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছে তা নিচের ছোট একটি উদাহরণেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। আমাদের নবী রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মোহাম্মদ (স.) এক বেদুইনকে একটি গর্ভবতী উটনীর লালন-পালনের দায়িত্ব প্রদানকালে বলেন, “নিজ হাতের নখ ছোট করে রাখবে, যেন উটের দুধ দোহনকালে নখ বড় থাকার কারণে উটনী কষ্ট না পায়।” অত্যন্ত দুখ এবং পরিতাপের বিষয় হলো আজকালকার ডেইরি ফার্মগুলো ইনজেকশনের মাধ্যমে গর্ভধারণ এবং গর্ভপাত করছে। স্তনে মেশিন লাগিয়ে বল প্রয়োগে দুধ দোহন করছে। এ জাতীয় কাজগুলো কি আদৌ মানবতার জন্য, কৃষির জন্য কিংবা খাদ্যনীতির জন্য কল্যণ বয়ে আনতে পারে?</p>
<p>ইসলাম সব বিষয়ে আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা উপলব্ধি করতে না পারার কারণে সত্য ও সঠিক পথ হারিয়ে ভয়াবহ এক পরিণতির দিকে প্রতিনিয়ত ধাবিত হচ্ছি। এ থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে আমাদের যে সার্বিক অবস্থা সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, অন্যান্য দেশের তুলনায় মুসলিম দেশগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দারিদ্র্য দেশগুলো আরও অনেক বেশি পিছিয়ে। এ জন্য আমাদের সবার আগে পর্যালোচনা করা দরকার, পূর্বে বাংলা অঞ্চলে কি ছিল। কি ছিল তার প্রাচীন ইতিহাস। এই বাংলা অঞ্চলে প্রকৃত কৃষি বিপ্লব, উন্নত খাদ্যনীতি সম্ভব কিনা, সম্ভব কিনা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতাকে কেন এবং কীভাবে হারালাম তারও তত্ত¡ তালাশ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার কৃষি এবং খাদ্য :</h5>
<p>প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আব্দুর রহিমের ভাষায়, বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তা এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়, যে পর্যায়ে বাংলা অঞ্চলের মানুষদের শুধু রাজনৈতিক মঞ্চকে কিংবা শুধু সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনকেই উন্নত, গঠনমূলক করে না। একইসাথে অর্থনীতি ও কৃষির উন্নতি এবং সমৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করে তোলে। বাংলা অঞ্চলের ভ‚মিকে বলা হতো প্রাচুর্যে ভরা উর্বর ভূমি। এর অধিকাংশ নারী- পুরুষ সকলেই ছিলেন অনেক বেশি পরিশ্রমী। ফলশ্রুতিতে মুসলিম শাসকগণ ইসলামী সভ্যতার রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতির আলোকে এমন সব মূলনীতি প্রনয়ণ করেন যার ফলে কৃষি এবং বাণিজ্যে অভ‚তপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। গোটা অঞ্চলের মাটির উর্বরতা, কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্র এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয় যা গোটা অঞ্চলকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে।</p>
<p>নীহাররঞ্জন রায় বাংলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেন, “মুসলমানদের ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রণয়নের ফলে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা হলো গোটা উপমহাদেশের অর্থনৈতিতে অভ‚তপূর্ব এক পরিবর্তন সাধিত হয় যার অন্যতম ভিত্তি ছিল কৃষি। মুসলমানদের অর্থনৈতিক কৌশল, প্রজ্ঞাপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গোটা বাংলাকেই অর্থনৈতিক উন্নতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দেয়।”</p>
<p>মীনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তাবাকাতে নাসিরীতে’ লিখেন- মুসলমানদের এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নৈতিক মূল্যবোধের (আখলাক) ফলে শুধুমাত্র শাসকদের মূলনীতিই নয় প্রজাদের মধ্যেও এক সহমর্মী এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠে। সকলেই তাদের খাজনা দেয়া-সহ রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পুরোদমে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এর ফলে সব দিক মিলিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আয় সেসময়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছে।</p>
<p>সকল ঐতিহাসিক এ বিষয়ে একমত যে, চারটি বিষয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনীতি এতো বেশি শক্তিশালী হয়,</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>এক.</strong> কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের উন্নতি সাধন।<br />
<strong>দুই.</strong> প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা।<br />
<strong>তিন.</strong> বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানিতে জোর প্রদান।<br />
<strong>চার.</strong> খনিজ সম্পদ এবং মূল্যবান পদার্থের প্রাচুর্যতা এবং তার সঠিক ব্যবহার।</p>
<p>ঐতিহাসিকগণ এবং তৎকালীন বিশেষজ্ঞগণ এ অঞ্চলের মাটিকে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট উর্বর মাটি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের অঞ্চলে অসংখ্য নদী-নালা, সবথেকে বেশি ঋতু, প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা বিদ্যমান। সঠিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ উন্নত কৃষি অঞ্চল। মুসলমানরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে প্রয়েজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করে। <strong>ইবনে বতুতা এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে কৃষির অবস্থান, শষ্যের প্রাচুর্য ফুল-ফলের সমারোহ দেখে এতটা বিস্মিত হন যার প্রকাশ আমরা তার লেখনীতে দেখতে পাই। তিনি লিখেছেন, “নদী পথে মিশরের নীল নদের মতো ডানে-বামে ছিল অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজী এবং গ্রামের পর গ্রাম। আমরা গ্রাম ও উদ্যানরাজীর মধ্য দিয়ে ১৫ দিনের মতো চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে আমরা একটি সাজানো উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলেছি।”</strong> ইবনে বতুতার সমস্ত ভ্রমণ কাহিনী ও তার পর্যালোচনাকে যদি আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করি তাহলে দেখব, এ অঞ্চলের রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন এতোটাই সূক্ষ্ম এবং গোছালো ছিল, এ অঞ্চলের কৃষিকে অনেকটা স্বপ্নীল বাগান হিসাবে ঐতিহাসিকগণই আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<p>আবার বিশ্বভারতী এনালসের ঐতিহাসিকগণ এ অঞ্চলকে সপ্তস্বর্গ, পৃথিবীর স্বর্ণভান্ডার হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। এবং এ অঞ্চলের সম্পদ, মানুষের চারিত্রিক সততা এবং পরিকল্পিত কৃষি, নদী এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনাকে স্বর্গের সাথে তুলনা করেছেন। একজন চৈনীক দূত বাংলা সম্পর্কে বলেন, “এর অঞ্চলে ভূমি এতটাই উর্বর এবং এর উৎপাদন এতই বেশি যে, একই জমিতে প্রতি বছর দুই থেকে তিন ধরণের ফসল তারা পায়। কোনো রকম যত্ন না করেও এ অঞ্চলের ভূমি থেকে কৃষকরা তাদের চাহিদার থেকেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে।”</p>
<p>প্রখ্যাত গবেষক ও ঐতিহাসিক, আবুল ফজল বলেন, “বাংলার মাটি এতো বেশি উর্বর ছিল যে একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হতো।” মুঘল সালতানাতের বিখ্যাত ঐতিহাসিক লেখকগণ সেকালের পলিমাটির অসাধারণ উর্বরতার উল্লেখ করেছেন। বাংলার সমগ্র মুসলিম শাসনামলে ভূমির উর্বরতা এবং কৃষির প্রশংসা এত বেশি লক্ষ্য করা যায় যে, সুলতান আওরঙ্গজেবের শাসনামলে নদী-নালা, খাল-বিল, কৃষির সুন্দর পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন, সারিবদ্ধ গ্রাম এবং শহরের পরিচ্ছন্নতা, মাঠভর্তি শস্য এবং নানাবিধ ফুল- ফলের প্রশংসা করে গবেষণা পত্রও রচিত হয়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত গবেষক বার্ণিয়ারও এই কথাগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা মুসলিম বিদ্বেষী হওয়েও এ বিষয়গুলোর সত্যতা তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন।</p>
<p>অঞ্চলের সবয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদিত ফসল ছিল চাল। সরু, মোটা নানা ধরণের চাল এদেশে উৎপাদিত হতো। চালের নানা প্রকারের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবুল ফজল বলেন,</p>
<p><strong>&#8220;যদি প্রত্যেক প্রকার থেকে একটি করে শস্যকণা সংগ্রহ করা হতো তাহলে একটি বড় কলস ভরে উঠতো।&#8221;</strong> কৃষিবিদ ফরিদ আখতারের মতে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচশত’র বেশি বীজ সংরক্ষিত হত এবং সেগুলোর চাষ হত। এই নানা ধরনের বীজ এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যকণা এবং উর্বর জমি এ দুয়ের সমন্বয়ে উৎপাদিত চালের পরিমাণ এতো বেশি ছিল যে, জনসাধারণের চাহিদা মেটানোর পর পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৭০টি জায়গায় রপ্তানি হতো। চালের মতো যে সব শস্য উৎপাদিত হতো তার মধ্যে অন্যতম ছিল তুলা, মরিচ, সরিষা। এ ফসলগুলোর উৎপাদন এতো বেশি হতো যে, পৃথিবীর ৫০ টির মতো অঞ্চলে তুলা এবং তুলা থেকে উৎপাদিত সুতা, মরিচ, সরিষা ইত্যাদি রপ্তানি হতো।</p>
<p>গত কয়েক দশক পূর্বেও পাটকে বাংলা অঞ্চলের সোনালী আঁশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। ৭-৮ শত বছর যাবৎ সব ধরণের সাহিত্যে, কবিতায়, গ্রন্থে পাটের কথা উল্লেখ থাকতো। নানাবিধ মাধ্যমে পাট, পাট থেকে তৈরিকৃত বস্ত্র এবং বিভিন্ন পণ্যকে সাহিত্যে তুলে ধরা হতো। পাট শুধুমাত্র একটি ফসল হিসেবে উৎপাদনই হত না বরং পাটের দ্বারা তৈরি বিভিন্ন ধরণের পণ্য ও বস্ত্রসামগ্রীও তৈরি হতো। এগুলো ছিল উপমহাদেশ তথা বাংলা অঞ্চলের আয়ের অন্যতম ক্ষেত্র।</p>
<p>‘ইকোনমিক এনালস অব বেঙ্গল’ বইতে জে সি সিনহা বলেন, “বাংলায় মুসলিম শাসনামলে পাট এবং পাটজাত দ্রব্য এতো বেশি পরিমাণে উৎপাদন হতো যে, পাট এবং পাট থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন দ্রব্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো।” এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলে এসে তারা পাটবস্ত্র এবং তৎসংশ্লিষ্ট শিল্পেরে সাথেই সম্পৃক্ত হয়। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্টের একটি পত্র এখনও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে, সেখানেও পাট নিয়ে বিস্তর আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। জে সি সিংহ বলেন, সে সময়ের ঐ চিঠিতে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার চটের থলে এবং ১২ শ চালের বস্তা পাঠানোর একটি দলিল। অর্থাৎ একটি চিঠি থেকেই যদি এ ধরণের তথ্য ফুটে উঠে বুঝাই যাচ্ছে যে, পাটকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি ও পর্তুগীজদের বিশাল একটি পরিকল্পনা ছিল এবং পরবর্তীতে তারা তা বাস্তবায়ন করে। দুঃখজনক বিষয় হল সেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নকারী সেই সোনালী আঁশ এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় আজ আমাদের অর্থনীতি থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে</p>
<p>বাংলাদেশে একসময় তুঁতগাছ এবং গুটি পোকার চাষ হতো। পঞ্চদশ শতকে এ অঞ্চলে যেসকল ঐতিহাসিকগণ আসেন বা এ অঞ্চলের কথা তুলে ধরেন তাদের বর্ণনাতে দেখা যায়, গুটি পোকা মূলত মুসলিমদের পূর্ব আমলে ছিল না বললেই চলে। মুসলমানরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর গুটি পোকা আমদানি করে। সঠিক পরিচর্যা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন এতো বেশি বরকতপূর্ণ হয় যে, বার্ণিয়ার ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কাশিম বাজার পরিদর্শনকালে দেখতে পান, কাশিম বাজারে রেশমের কাঁচামালের উৎপাদন বছরে প্রায় ২৫ লক্ষ পাউন্ডের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ২২ হাজার বেল। প্রত্যেক বেলের ওজন ১০০ লিভার। উৎপাদিত এ কাঁচামালের থেকে সাড়ে সাতশত পাউন্ড গুজরাট ও ভারতের অন্যান্য অংশে পাঠানো হতো। উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও রেশমের এই কাচামাল উৎপাদন হতো এবং তা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। রপ্তানি কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল গোটা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীগণ এবং এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ অঞ্চলের ইসলামী সভ্যতা। (তথ্যসূত্র লাগবে) জে সি সিনহা ইকোনমিক এনালস অফ বেঙ্গলে লিখতে বাধ্য হয়েছেন যে, প্রতি বছর কাশিম বাজার থেকে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ পাউন্ড কাঁচা রেশম জাপান হলেন্ড অঞ্চলে রপ্তানি হতো এবং বাংলায় দশ লক্ষ পাউন্ড রেশমের সুতা তৈরী হতো।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে রেশমের কাঁচামাল এতো বেশি সস্তা ছিল যে এর ব্যবসা বিভিন্ন অঞ্চলে খুব দ্রæত সম্প্রসারিত হয়। যার ফলে খুব সহজেই এ অঞ্চল থেকে অন্যান্য অঞ্চলের বণিকগণ রেশম ক্রয় করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে তাদের ব্যবসায় উন্নতি সাধন করে। বাংলা অঞ্চলের উন্নত কৃষি, উর্বর জমি এবং যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে কৃষির স্বর্গরাজ্য।</p>
<p>বিশ্বভারতী এনালস প্রথম খন্ডের চাইনিজ একাউন্টস এ যেসব তথ্য রয়েছে এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য ঐতিহাসিকগণের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলা অঞ্চলে তার উন্নত কৃষি ও নানাবিধ উৎপাদনের ফলে এমন এক কৃষি বিপ্ল­ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয় যার মধ্য দিয়ে ভুট্টা, সরিষা, তেল, তিসি, কালাই এতো বেশি উৎপাদিত হতো যে, নিজ অঞ্চলের প্রয়োজন মিটিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৫০-৬০টি অঞ্চলে তা রপ্তানি হতো। এছাড়াও শাক-সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, শসা ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হতো এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তা পৌঁছানো হতো। পান, সুপারি, নারিকেল এসবের প্রাচুর্য এতো বেশি ছিল যে, এগুলোও প্রায় ৪০-৫০ টি অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো।</p>
<p>কলা, আম, কাঁঠাল, ডালিম, লেবু, খেজুর ইত্যাদি ছিল বাংলা অঞ্চলের সুপরিচিত ফলের মধ্যে কয়েকটি। এসব ফলের প্রতি অন্যান্য অঞ্চলের বণিকদের চাহিদা এতো বেশি ছিল যে, তারা এসব ফসল নিজ অঞ্চলে আমদানি করতেন। এ অঞ্চলের কৃষি রপ্তানিমুখী হয়ে ওঠায় অর্থনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।</p>
<p>ইবনে বতুতা ও বার্ণিয়ারের বর্ণনার পাশাপাশি ফরাসি, ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের বর্ণনা এক করলে দেখা যায় তারা বাংলা অঞ্চলের গৃহপালিত পশু যেমনঃ ঘোড়া, খচ্চর, মহিষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির কথা বেশ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। গৃহপালিত এ পশুগুলোর প্রাচুর্যতার কারণে খুবই অল্প দরে বিক্রি হতো। দাম কম হলেও কৃষকদের কোনো ক্ষতি হয়নি বরং খরচের তুলনায় তারা লাভবান হতো। গৃহপালিত এ পশুগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য হিসেবেও রপ্তানি হতো। এটিও বাংলা অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিকে ব্যাপকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।</p>
<p><strong>প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বর্ণনায় বাংলা অঞ্চলে বিভিন্ন খনিজ সম্পদের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেগুলো আজও পর্যন্ত বর্তমান। তিনি বলেন- মাহান্দা সরকারের হারবাহ নামক স্থানে মুক্তার একটি খনি ছিল। এখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর উৎপাদিত হতো। বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৫০ এরও অধিক খনিজ সম্পদ বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের অঞ্চলে এখনও ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা কেউ ই জানি না এটি আসলে কারা নিয়ন্ত্রণ করছে বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কীভাবে এই খনিজ সম্পদগুলোকে তাদের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করছে।</strong></p>
<p>ঐতিহাসিকগণ বাংলার সুতি শিল্পের অনেক প্রশংসা করেছেন। এ ব্যাপারে বিখ্যাত পন্ডিত বার্বুসা বলেন, এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত সুতা রয়েছে। তারা সূতি ও মিহি অনেক প্রকারের বস্ত্র তৈরি করে। নিজেদের ব্যবহারের জন্য রঙিন এবং ব্যবসার জন্য সাদা রাখে। এগুলো খুবই মূল্যবান কাপড় এবং এগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে মৌর, আরব, ইরান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ অনেক পছন্দ করতো যার দরুন বাংলা অঞ্চল থেকে এসকল অঞ্চলে এই কাপড়গুলো জাহাজ করে রপ্তানি হতো। কে, এম আশরাফ তার “লাইফ এন্ড কন্ডিশন অব দি পিপল অব হিন্দুস্তান” বইয়ে লিখেন, পন্ডিত বার্থেনা এ অঞ্চলের বস্ত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের সুতি বস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার মতো এতো বেশি সুতি বস্ত্রের প্রাচুর্যতা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখেননি বলে বার্থেনা মন্তব্য করেন। ঠিক একইভাবে আবুল ফজল উল্লেখ করেন, সোনারগাঁয়ে এক প্রকার মিহি মসলিন তৈরি হতো। মসলিনগুলো এতো বেশি উন্নত মানের ও দামী ছিল যে বাহরিস্থান গ্রন্থের প্রথম খন্ডে মির্যা নাথান বলেন, তিনি মালদ্বাহ থেকে তৎকালীন সময়ের চার হাজার টাকা মূল্যে এক খন্ড মসলিন বস্ত্র ক্রয় করেন। জে সি সিনহা ইকোনমিক এনালস অব বেঙ্গলেও উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলে এতো বেশি কাঁচা সুতা উৎপন্ন হতো এবং সুতা থেকে মসলিন কাপড় উৎপন্ন হতো যা বার্বুসা তার ভ্রমণকালে ব্যাপক হারে দেখতে পান। আর এটা ছিল জগৎ জুড়ে বিখ্যাত একটি সুতা শিল্প যা এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।</p>
<p>এ অঞ্চলে আখের উৎপাদন ছিল অনেক বেশি। বার্বুসা তার ভ্রমণকালে দেখা আখ চাষের কথা ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছেন। হ্যাকলুয়েথ সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ইতিহাসের ২য় খন্ডে আমরা দেখতে পাই এ অঞ্চলের আখ থেকে শুধু চিনি নয় আরও নানা ধরণের খাদ্য দ্রব্য উৎপাদিত হতো। উৎপাদিত এ খাদ্য দ্রব্যগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। তবে সব থেকে বড় আয়ের এবং রপ্তানিকারক পণ্য ছিল চিনি। এই চিনিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বাংলা সালতানাতের ঐ সময় পূর্ব-পশ্চিম উপক‚লের দেশসমূহ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে চিনিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>চিনির মূল আবিষ্কারক ছিলেন মুসলিমগণ। কিন্তু উপনিবেশিক শক্তি যখন এ অঞ্চলে হানা দেয় এবং তাদের নিকৃষ্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করে তখন আমাদের অঞ্চলের চিনির অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে আর তা আজকের বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। আমরা কিছুকাল পূর্বেও লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনির কলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ চিনি বিদেশী কোম্পানিগুলো থেকে আমদানি করতে হয়। এই চিনিকে অবশ্যই মুসলিমদের হাতে রাখতে হবে। কারণ চিনিকে কেন্দ্র করে খাদ্যের বড় একটি অংশ তৈরি হয়। আর চিনি যদি মুসলমানদের হাতে না থাকে তাহলে সেটি সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং আজকের বিশ্ব তাই-ই হচ্ছে। এ চিনিকে কেন্দ্র করে নানাবিধ রোগ, ভাইরাস এবং অর্থনৈতিক শোষণ চালান হচ্ছে। বিদেশী কোম্পানি থেকে চিনি আমদানি করার ফলে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মুসলিম সভ্যতায় এক হাজারেরও বেশি সময় ধরে গোটা মানবজাতি চিনি খেয়েছে। চিনি থেকে তৈরিকৃত বিভিন্ন খাবার খেয়েছে। কখনো এতো রোগে নিপতিত হয়নি। কিন্তু যখন থেকেই উপনিবেশিক শক্তির হাতে তথা বর্তমান যায়নবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে চিনি এবং চিনি থেকে তৈররিকৃত খাদ্যদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে তখন থেকে চিনি একটি বিষতুল্য খাদ্যদ্রব্য হিসেবে আমাদের কাছে আসছে এবং আমরা উপায়ন্তর না পেয়ে তা খেতে বাধ্য হচ্ছি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট যেমন সৃষ্টি হচ্ছে একইভাবে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যগত সংকট ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।</p>
<p>এ অঞ্চলের তৈরিকৃত বিভিন্ন শিল্প পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেই ব্যাপক সমাদৃত হয়। যেমন এখানকার তৈরি তামা, কাঁসা, কাঠ, পাথর হস্তনির্মিত জিনিসপত্র প্রভৃতি কারুকার্য এবং কারিগরি বিভিন্ন জিনিসপত্র প্রায় ৩০-৪০ টি অঞ্চলে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং এগুলোও বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতে থাকে।</p>
<p>এখনও পর্যন্ত সব থেকে বেশি মসলা উৎপাদিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশের এ অঞ্চলে। অন্যান্য দেশ মসলা শিল্পে এ অঞ্চলের উপরেই নির্ভর করে। মুসলিম সালতানাতের সময়ও প্রায় ৭০ টি অঞ্চলে মশলা এবং মশলা জাতীয় দ্রব্য রপ্তানি করা হতো। এমনকি উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার শেষ কেন্দ্র মহীশূরে ব্রিটিশ-হায়দারাবাদ-মারাঠা ত্রিশক্তির বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে শেরে মহীশূর টিপু সুলতান শুধুমাত্র এই মসলার উপর নির্ভর করে বছরের পর বছর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।<br />
এরপর আসে বাংলার মৎস সম্পদের কথা। সামুদ্রিক মাছ এবং লবণাক্ত পানি থেকে উৎপাদিত লবণ ছিল মুসলিম বাংলার অন্যতম একটি শিল্প। তখন নদীগুলোতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এমনিকি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত আয়ের ৪৫ ভাগ আসে মাছ থেকে। আমাদের অঞ্চলের মাছ অনেক বেশি সুস্বাদু এবং পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষদের খাওয়ার উপযোগী। ফলশ্রুতিতে আমাদের নদী এবং সামুদ্রিক মাছ দিয়ে এখনো বিশাল একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব</p>
<p>বাংলার মুসলিম সালতানাতের অর্থনৈতিক আয়ের অন্যতম একটি উৎস ছিল এ মৎস্যশিল্প। সামুদ্রিক মাছের সাথে যুক্ত ছিল লবণাক্ত পানি থেকে উৎপাদিত লবণ। যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। বিশেষ করে এ মৎস্যশিল্প পৃথিবীর প্রায় ৬০ টি অঞ্চলে রপ্তানি করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এজন্য মৎসশিল্পের এই দিকটি বর্তমান সময়েও খুব সম্ভবনাময়ী একটি দিক। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা এখনো যথেষ্ট উদাসীন।</p>
<p>এক্ষেত্রে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী আমাদের এসকল দ্রব্যাদি রপ্তানি করার অন্যতম মাধ্যম ছিল বন্দর। বন্দরগুলোর বর্ণনা দিতে বিভিন্ন জন যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন তন্মধ্যে কয়েকটি তথ্য তুলে ধরছি। যেমনÑ বণিক মাস্টার সিজার ফেডরিক ১৫৬৭ সালে একটি বন্দর পরিদর্শন করে লিখেছেন, প্রতি বছর এ অঞ্চল থেকে সোনারগাঁও বন্দর দিয়ে ছোট বড় ৩০-৩৫টি জাহাজে চাল, কাপড়, সংরক্ষিত হরতকি, বিভিন্ন ধরনের পণ্যদ্রব্য বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। ১৫৮৫ সালে রেলওইচ সোনারগাঁও বন্দর পরিদর্শন শেষে লিখেন- এখানে দেখতে পেলাম, প্রচুর পরিমাণে সুতি বস্ত্র অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি হচ্ছে। চালসহ বিভিন্ন ধরণের ফসল ভারত, সিংহল, মালাক্কাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত হচ্ছে।</p>
<p>বার্থেমা ও বার্বুসা ১৬ শতকের দিকে যখন ভ্রমণ করেন তখন তারা এ ব্যাপারটিকে খুব জোরের সাথেই বর্ণনা করেন। তারা বলেন, বাংলা অঞ্চল তার প্রতিটি শহরকে একেকটি শক্তিশালী বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিটি বন্দর থেকে মুসলমানগণ সুতি বস্ত্র, চিনিসহ অন্যান্য দ্রব্য যেগুলো তারা উৎপাদন পূর্বক বৈদেশিক বাণিজ্যের লক্ষ্যে বড় বড় জাহাজে ভর্তি করে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে থাকে। যা মুসলমানদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিম শাসনামলে বাকলা তথা বরিশাল, পটুয়াখালী অঞ্চলে ব্যবসায়িক দিক থেকে প্রভাবশালী একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে। এ অঞ্চল সম্পর্কে রেলঅফইচ বলেন, এখানে সুতা, সুতিবস্ত্রসহ কৃষিজাত দ্রব্যের বিপুল সমাবেশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর সব থেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমরা দেখতে পেতাম জাহাজ করে এসব দ্রব্যাদি রপ্তানি করা হচ্ছে। রেলঅফইচ একই সাথে সোনারগাঁও অঞ্চলের রপ্তানির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বিপুল পরিমাণে সুতি বস্ত্র,পাট,চাল বিভিন্ন মসলা এমনভাবে জাহাজ বোঝাই করে বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো যা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে খুবই বিরল।</p>
<p>ইবনে বতুতা যখন জলপথে বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন তখন প্রতিটি অঞ্চলের বন্দরগুলো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা দেখে তিনিও বিস্মিত হন। বিশ্বভারতী এনালসের দ্বিতীয় খন্ডে আমরা এ বিষয়টি লক্ষ করি যে, চীন, বার্মা, ইউরোপ, মালদ্বীপ, সিংহলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর এর অন্যতম ভিত্তি ছিলো এসকল বন্দরকে কেন্দ্র করে জাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের ফসলের রপ্তানি।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলের সাথে চীনের স্বর্ণ, রৌপ্য, রেশম, নীল ও সাদা চিনামাটির বাসন, তাম্র, লৌহ, কাস্তুরি, সিন্দুর, পারদ এবং মাদুর ইত্যাদির ব্যবসা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিকে অনেক বেশি তরান্বিত করে। পাশাপাশি তেল, মাখন, শুঁটকি মাছ, ফলমূল, কালাই, পান- সুপারী, পিঁয়াজ, রসুন, ঘৃতকুমারীসহ নানাবিধ ঔষধি গাছ বা ফল ব্যাপক হারে উৎপাদিত হতে থাকে। এই বিষয়টি বিভিন্ন অঞ্চলের চিকিৎসকদের কাছে এবং গবেষকদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়িকরা বিভিন্ন অঞ্চলে এসকল পণ্যসমূহ পৌঁছে দিত এবং একে কেন্দ্র করে বাংলা সালতানাতে একটি শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্যনীতির ভিত রচিত হয়। ঐতিহাসিক বার্ণিয়ারের বর্ণনায় আমরা দেখি, এ অঞ্চলের মোম, গন্ধগোগল, লম্বা মরিচ বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ ইউরোপসহ বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ গুলোতেও ব্যাপকভাবে রপ্তানি হতো। বার্ণিয়ার বলেন, বেশ কিছু মিষ্টান্ন ফলমূল আম, আনারস, হরতকি, লেবু, আদা এগুলোও পচুর পরিমানে রপ্তানি হতো। কেননা এগুলো সব অঞ্চলেই সুস্বাদু ও সুমিষ্ট ফল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলা। বর্তমান সময়ে ইউরোপের কমলা, আপেল যেমন সারা দুনিয়ায় পরিচিতি লাভ করেছে।</p>
<p>এরপর যদি আমরা দ্রব্যমূল্যের ক্রয় ক্ষমতার দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব যে সকল কিছু বিদেশে রপ্তানি হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের ফলে ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ আখলাকী উদ্যোগের ফলে প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত সস্তা দরে পাওয়া যেত। বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় লেখকগণ বিকৃতভাবে উল্লেখ করলেও দেখা যায়, দ্রব্য মূল্য ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে ছিল। যার ফলে সবাই নিজ চাহিদা মতো খাবার ক্রয় করতে পারতেন। এমনকি ক্রয় করার পরেও তাদের কাছে অর্থ উদ্ধৃত থেকে যেত। এজন্যই ইবনে বতুতা মন্তব্য করেন পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন একটি দেশ দেখেননি যেখানে জিনিসপত্র বাংলা অঞ্চলের মতো এতো সস্তায় বিক্রি হয়। তিনি দেখেন যে এ দেশ চালে পরিপূর্ণ ও ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর।</p>
<p>এ বিখ্যাত পর্যটক আফ্রিকা, মিশর ভারত এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তিনি যেসকল মন্তব্য করেছেন তা থেকে বোঝা যায়, এ অঞ্চলের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সাধ্যের মধ্যে ছিল। ১৬৪০ সালে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ভ্রমণ করে সিবাস্তিয়ান মাররিক বলেন, প্রত্যেক বাজারে বা শহরে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্য, সুতির বস্ত্র প্রভৃতির প্রাচুর্য এতো বেশি ও সস্তা ছিল যে মাত্র একটি বাজার থেকে এসকল জিনিসপত্র অল্প দামে ক্রয়পূর্বক জাহাজ বোঝাই করে নেওয়া যেতো। যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলের সাথেই ব্যবসা করতে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতো। এ অঞ্চলের মানুষ ব্যপক হারে উৎপাদন করে তাদের অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা অর্জন করতো। এছাড়াও তিনি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের শহরগুলিতে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য এতটাই সাধ্যের মধ্যে ছিল যে তিনি দিনে কয়েকবার আহার করতে প্রলুব্ধ হতেন। তিনি অনেকগুলো দ্রব্যের বর্ণনা দেন। যেমনঃ মাত্র ৮ দিরহামে ৮০ রাতল ধান পাওয়া যেত। ১ রৌপ্য দিনারে ২৫ রাতল চাল পাওয়া যেত। ১ আনা ৯ পাইয়ে বর্তমান ওজনের ১ মণ চাল পাওয়া যেত। এভাবে প্রতিটি পণ্যই এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অনেক সস্তা ছিল। যার ফলে এ অঞ্চলের মানুষ যতটুকু আয় করতেন ততটুকু দিয়ে তারা তাদের খাদ্য, বস্ত্র কেনার পরেও তাদের আয়ের একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থকত।</p>
<p>সে সময় জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক বেশি ছিল। পাশাপাশি মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বলয়ের কারণে মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী হয়ে উঠে। নারী-পুরুষ সকলেই তাদের স্ব-স্ব জায়গা থেকে সাধ্যমতো পরিশ্রম করে। যার ফলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান, কৃষির ভিত্তি, বস্ত্র বা সব ক্ষেত্রে বিশাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আখলাকী এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট একটি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর শ্রমনীতির দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতেন তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে তার বাৎসরিক অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটে যেত। যেমনঃ মুঘল সালতানাতের সময়কালে শ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারিত ছিল সেটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক মজুরি হিসেবে তৎকালীন সময়ে একজন শ্রমিক দুই দম আয় করতেন। তাহলে তার মাসে আয় হতো ৬০ দম অর্থাৎ বছরে তার আয় হতো আঠারো টাকার সমান। <strong>জীবন ধারণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতোটাই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল যে, ইবনে বতুতা বলেন তার জনৈক বন্ধু আল মাসুদী বাংলা অঞ্চলের একজন নাগরিক যিনি বছরে আয় করেন ১৮ টাকা। কিন্তু তার বছরে খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র ক্রয় করতে ব্যয় হয় ৮ দিরহাম বা ১ টাকা।</strong> পারিবারিক অন্যান্য সদস্যের চাহিদা এবং খাদ্য-বস্ত্র সব মিলিয়ে তার আয়ের তিন ভাগের দুইভাগ খরচ হতো। আর এক ভাগ থেকে যেত। কারও কারও ক্ষেত্রে ১ ভাগ ব্যয় হতো আর বাকি দুই ভাগই উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যেতো। আবার তিনি বলেন, অনেকের সারা বছর ২ বা ৩ টাকার বেশি প্রয়োজন পড়তো না। ফলে ১৫ টাকার মতো উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। <strong>এসব উদ্বৃত্ত টাকা সেই সময়ের মুসলমানদেরকে ওয়াকফ, দান, সাদাকাহ, যাকাতের দিকে ব্যপকভাবে ধাবিত করে।</strong></p>
<p>মুসলিমরা তাদের এই বাৎসরিক উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি অংশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রেরণ করতো। বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল, দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল, যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে এমন অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। রাষ্ট্র্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি বাজেট দিতে পারতো। যার কারণে বলা হয় ইসলামী সভ্যতার ১২শত বছরের শাসনামল ছিল পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনামল। গোটা দুনিয়াতে হত দরিদ্র খুঁজে পাওয়া, অনাহারী মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাত তথা ইসলামী সভ্যতা যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ৭ শত বছরে আমাদের অর্থনৈতিক জিডিপি ছিলো ২৯%। অর্থাৎ যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ইসলামী সভ্যতার এ অঞ্চলে সেই বিশাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কেমন? সে ব্যাপারে আমরা কতটুকুই বা অবগত?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>মানববিধ্বংসী ব্রিটিশ শাসনামলে কৃষি খাদ্য :</h5>
<p>উপরোক্ত বিষয়গুলোকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এ কথা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা বা মুসলিম শাসনামলে বাংলা অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি, কৃষি ও খাদ্যনীতি উন্নতির চরম শিঁখরে পৌঁছে যায় যা মানবতার ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণে পরিণত হয়। কিন্তু এর পর পরই এ অঞ্চলে যে ব্যাপকভাবে চলমান শোষণ ও নিকৃষ্টতম গণহত্যা এবং মহাপ্রলয় নেমে আসে তার তীব্রতা ও ভয়াবহতা কয়েক খন্ড বই লিখেও হয়ত উপলব্ধি করানো সম্ভব হবে না। এই মহান সভ্যতার পতন ও নিকৃষ্ট জায়নবাদীদের উত্থানের বিষয়ে মুসলিমদের ও সত্যনিষ্ঠ গবেষকদের তুলনামূলক কাজ নেই বললেই চলে।</p>
<p>১৭৭২ সালের গভর্নর জেনারেল ওয়ারিন হেসটিন্সের ইংল্যান্ডের কোম্পানির ডাইরেক্টরদের কাছে পাঠানো এক পত্রে লিখেন- প্রদেশের তথা বাংলার সমগ্র লোক সংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছে এবং তার ফলস্বরূপ চাষাবাদের অবস্থা চরম অবনতির দিকে চলে গেছে। সেখানে তিনি রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরণের পরামর্শ দেন ও চরম হতাশা প্রকাশ করেন।<br />
তাহলে চিন্তাশীল ও উৎসুক মনে প্রশ্নের সঞ্চার হতে পারে যে, এই আকাশচুম্বী অবস্থানে থাকা একটি অর্থনীতি ও কৃষি অঞ্চলে এমন কি ঘটল যার দরুন একটি দুর্ভিক্ষেই গোটা জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করল?</p>
<p>ব্রিটিশদের শোষণের ভয়াবহতা শুধু এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সঠিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, দুর্ভিক্ষের পূর্বে বাংলাদেশের রাজস্ব (১৭৬৮ সালে) ছিল ১ কোটি ৫২ লক্ষ ৪ হাজার ৮ শত ৫৬ টাকা। কিন্তু এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এ অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরও ১৭৭১ সালে রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৫ শত ৭৬ টাকায়। একটু চিন্তা করলেই আমরা এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারব। তাদের শাসনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় জনগণ এ ধরণের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।</p>
<p><strong>এ দুর্ভিক্ষ সাধারণ কোনো দুর্ভিক্ষ নয়। প্রথমত, এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর হিসাবটা সঠিক কিনা সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। কেননা হিসাবটি ব্রিটিশদের উপস্থাপিত হিসাব। দ্বিতীয়ত, তাদের রাজস্ব আয় কমে গিয়ে শূন্যের কোটায় নামার কথা থাকলেও তাদের রাজস্ব আয় উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে! শোষণের মাত্রা তো কমেইনি বরং দুর্ভিক্ষের মত এতটা কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা নির্যাতন আরও বাড়িয়েছে। চিঠিগুলো দেখলে বুঝা যায়, দুর্ভিক্ষ নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নয়। মূলত তারা তাদের রাজস্ব আয়, তাদের শোষণ এবং অর্থনৈতিক লুন্ঠন যাতে কমে না যায় সেদিকেই অধিক মনোযোগী ছিল।</strong></p>
<p>চারিদিকে যখন অর্থনীতি, কৃষি ও খাদ্যের চরম ধস নামে, মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং অন্যান্য সকল অধিকার থেকে গোটা অঞ্চলের সকল মানুষ বঞ্চিত হতে শুরু করে, মৃত্যুর পর মৃত্যু, গণহত্যার পর গণহত্যা চলে সেসবের ভিতরে তারা তাদের শাসন এবং লণ্ঠনকে পাকাপোক্ত করতে নতুন আইন প্রনয়ণ করে। যা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত। এদিকে নানাবিধ সমস্যা ধারাবাহিকভাবেই চলছিল। পূর্বের যে ব্যবস্থান্যুায়ী জমিদাররা ছিল সরকার এবং কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আদায়ের এজেন্ট। কিন্তু এই নতুন আইন অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদেরকে জমির মালিক হিসেবে স্বত্বাধিকার দেয়া হয়। এজেন্ট হিসেবে পূর্বে তারা স্বাধীন কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। কিন্তু নতুন এ আইনে পূর্বে যেভাবে রাজস্ব আদায় করতো সেক্ষেত্রে তারা নতুন মাত্রা যোগ করে। তারপর থেকে স্বাধীনভাবে এই সকল জমিদাররা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই প্রজাদের উপর নানাবিধ কর প্রয়োগ করতে শুরু করে।</p>
<p>“বাংলায় বিপ্ল­ব প্রচেষ্টা” নামক গ্রন্থে হেমাচন্দ্র কান্নগো বলেন, &#8220;এই জমিদাররা প্রতি একর এ এতো বেশি খাজনা এবং জুলুমপূর্ণ কর আরোপ করা শুরু করে যা ছিল সম্পূর্ণ বে-আইনী। কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ, সরকারকে প্রদান করা অর্থের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিল। অর্থাৎ সরকারকে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই যেধরণের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও অর্থনীতির ধস নেমে আসে, জুলুমের শিকার হতে থাকে তার থেকে ৫ গুণ বেশি খাজনা এ সকল জমিদাররা আদায় করতে শুরু করে। এদিকে ব্রিটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তাদের ভ‚মির রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত যে রাজস্ব ছিল তার থেকে আরও বৃদ্ধি করে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ৩৩ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন এক ভয়াবহ আগ্রাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।&#8221;</p>
<p>জমিদাররা তাদের প্রভুতুল্য ব্রিটিশদের মন খুশি করতে এবং ব্রিটিশ লুণ্ঠনকারীরা আরও বেশি লুণ্ঠনকে বৃদ্ধি করতে জমিদারদের যেসকল পরামর্শ দিতো তার ভিত্তিতে জমিদাররা শুধুমাত্র খাজনা আদায় বা নির্দিষ্ট কর আদায় করেই ক্ষান্ত হত না। সাথে নিত্যনতুন নানা ধরণের দাবি নিয়ে উপস্থিত হতো। এই ধরণের বে-আইনী পাওনা মেটাতে গিয়ে কৃষকরা ক্রমেই দরিদ্র হতে থাকে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পন্থা বা ব্যবস্থা ছিল না। যারা পরিপূর্ণভাবে এ দাবি মেটাতে অক্ষম হত, তাদের উপর নেমে আসত ভয়াবহ নির্যাতন। এভাবে যখন ধারাবাহিক শোষণ চলতে থাকে তখন কৃষক এবং সাধারণ পেশার জনগণ যেন পঙ্গুতে পরিণত হয় যার ভয়াবহতা বিশ্বমানবতা আগে কখনো কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।</p>
<p>১৮৮০ সালের দিকের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ব্রিটিশ যায়নবাদী পরিচালিত তীব্র শোষণের পাশাপাশি তাদের চাহিদা, তাদের আয়ের মাত্রা বাড়ানোর নেশায় উন্মত্ত হয়ে যায়। তারা শুধু লুণ্ঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং জমিদারদের ব্যবহার করে নির্যাতন, গণহত্যা ও ভয়াবহ জুলুমের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়ার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক রাধাকোমল মুখার্জী ভারতে ভূমি সমস্যা সম্পর্কে লেখা একটি পুস্তকে বলেন, আধুনিক বা তৎকালীন এ জমিদারী প্রথার মাধ্যমে ব্রিটিশরা সমাজের অধিকার এবং সবকিছুকে লুণ্ঠন করে তাদের শক্তিকে নতুনভাবে ব্যয় করেছিল কৃষক এবং সাধারণ মানুষদের দমন করার কাজে। অর্থাৎ এসকল বিষয় থেকে উপলব্ধি করা যায়, শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষের কারণেই মানুষ মারা যায়নি। অন্যান্য নানা জুলুমের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণত্যাগ করে। এরপর ১৭৫৩ সালের পর থেকে বা পূর্ব থেকেই যে ইজারা ব্যবস্থা চালু হয়, সেই ইজারা ব্যবস্থায় বিভিন্ন মাঠ, খাল, বিল পর্যন্ত ইজারা দিতে শুরু করে। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে কৃষকরা একেবারেই ভ‚মিহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের মৌলিক অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এসব ইজারা, কর নানাবিধ জুলুমের মধ্যে দিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যে ইজারার নাম শুনলেই প্রজাদের মনে কম্পন শুরু হয়ে যেতো।</p>
<p>ওইসকল জমিদাররা যখন কৃষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের উপর তাদের কর ধার্য করতো আর প্রজারা যদি তা দিতে ব্যর্থ হতো তখন তাদের উপর নেমে আসতো নানাবিধ নির্যাতনের কালো ছায়া। উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি সেকালের কয়েকটি পত্রিকার দিকে খেয়াল করলে (যেমন, তত্ত¡বোধিনীর ৮৪ তম সংখ্যায়, সাময়িক পত্রে, বাংলার সমাজ চিত্র পত্রিকার ২য় খন্ডে) দেখা যায় তখন বেত্রাঘাত, দন্ডাঘাত, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বক্ষস্থান দলন, খাপড়া দিয়ে নাসিকা কর্ণ মর্দন, মাটিতে নাসিকা ঘর্ষণ, পিঠে হাত পানিগুঢ় বদ্ধকরণ, কান ধরে দৌঁড় করানোম, ফাটা দুইখানা বাধা বাগারী দিয়ে হাত ধলন করা, গ্রীষ্মকালের প্রখর রৌদ্রে পা ফাঁক করে পিঠ বাকিয়ে পিঠের উপর ও হাতের উপর ইট চাপিয়ে দেয়া, বৃক্ষ বা অন্যত্রে বেধে লম্বা করা, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধানের গোলায় পুতে রাখা, গৃহবন্দি করে লঙ্কা মরিচের ধোঁয়া দেয়া, কারাবদ্ধ করে উপবাস রাখা প্রভৃতি শাস্তি প্রতিনিয়তই তারা কৃষকদের উপর এবং সাধারণ পেশাজীবী মানুষদের উপর প্রয়োগ করতে থাকে। কোনো দাবী আদায় না হলে হাত কেটে ফেলা, পিতার সামনে সন্তানকে হত্যা করা এবং সন্তানের সামনে পিতামাতাকে হত্যা করা। এইসকল জঘন্যতম উপায়ে তারা গণহত্যা চালাতে থাকে। এই কাজগুলো তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এই নিকৃষ্টতর কাজ তারা আমেরিকার ইনকা সভ্যতা ও মায়া সভ্যতার সাথেও করেছে। আফ্রিকায় তারা যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে, এদেশেও সেই ধারাবাহিকতা তারা অব্যাহত রাখে।</p>
<p>তত্ত্বোধিনী পত্রিকায় ১৮৫০ সালে কৃষির অবস্থা বলতে গিয়ে বিনয় ঘোষ বলেছিলেন, তত্ত্বোধিনী পত্রিকা শহরের পত্রিকা আর শহরের মধ্যবর্তীরাই এর পরিচালক। যার কারণে শহরের অর্থনীতি এবং কিছু সামাজিক বিচারের বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চল বা বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কি ভয়াবহ অবস্থা বা তাদের সামাজিক বাস্তবতাকে কতোটুকুই বা তুলে ধরতে পেরেছে। আদৌ এর কোনো সঠিক সমীক্ষা আছে কিনা তাও অজানা। তৎকালীন কোনো কোনো লেখক বলেন, পল্লী গ্রামের মধ্যে অসংখ্য ব্যক্তি উপযুক্ত অন্নের অভাবে হাজারো যন্ত্রণা ভোগ করছে। অর্থ কষ্টে, খাদ্যের অভাবে, পানির সংকটে জলাশয়ে বিভিন্ন প্রাণী যেভাবে পঁচে মারা যায় ঠিক একইভাবে মানুষগুলো মারা যাচ্ছিল। অর্থাৎ লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, ব্রিটিশরা ক্ষমতায় আসার কিছু কাল পরেই তাদের আগ্রাসন ও লুণ্ঠনের মাত্রা আকাশচুম্বী অবস্থানে পৌঁছে যায়। যা ছিল আমাদের ধারণারও অতীত।</p>
<p>মেমোরেন্টাম অন দি পার্লামেন্ট সেটেলমেন্টের ৪০ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ, তাদেরই এজেন্ট সেন্সেস কমিশনার স্যার টমাস মন্ড্রোর মতে, ১৮৪২ সালে উপমহাদেশে ভ‚মিহীন কৃষকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু ১৮৭২ সালে অর্থাৎ ৩০ বছরের ব্যবধানে আমাদের ভ‚মিহীন কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ লক্ষে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ করতে করতে ১৯৩১ সালে দেখা যায়, সেন্সেস অনুসারে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলা অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ৭০ ভাগ জনগণই ভ‚মিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছে। বাকী যে ৩০% এর ভ‚মির মালিকানা ছিল, খোঁজ করলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মালিকানা ছিল নিতান্তই হাতে গোনা কয়েকজনেরই। অধিকাংশই ছিল জমিদার কিংবা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত এজেন্ট। এরা মূলত লুণ্ঠনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে জমিদার এবং খাজনাভোগী শ্রেণির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তারা জুলুমকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে, তাদের শোষণের মাত্রা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতে তাদের এজেন্টদের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করতে থাকে যা দশ বছরের ব্যবধানে ৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>এরপর যদি আমিরা দুর্ভিক্ষের দিকে আলোকপাত করে দুর্ভিক্ষের কারণের দিকে তাকাই তাহলে দেখি, দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল তাদের শোষণ এবং তাদের গ্রহণকৃত নানাবিধ উদ্যোগ যা উপমহাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্য করি, সুপ্রকাশ রায় ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ’ বইয়ে বলেন, ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের ফল সহজপন্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতে রেলপথ নির্মাণ করে। ফলে তারা ৪ কোটি অধিবাসীর প্রায় ৬ মাসের খাদ্য এবং সকল শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণের জন্য গ্রাম শহর সব কিছু তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সাজিয়ে নেয় তথা রেলপথ নির্মাণ করে।</p>
<p>রেলপথের দ্বারা ভারতের বন্দরগুলির সহিত গ্রাম ও শহরের কেন্দ্রসমূহের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শস্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বন্দরগুলোতে অধিক পরিমাণে জাহাজ যোগে প্রেরিত হতো। এভাবে তারা এই মাত্রা দিনকে দিন বৃদ্ধি করে খাদ্যশস্যের পাচার বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ও বাংলা অঞ্চলের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে তা কৃষক এবং সাধারণ জনগণের সাধ্যের বাহিরে চলে যায়। জনসাধারণের পক্ষে তা ক্রয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ কৃষকরাই ছিল এ খাদ্যশস্যের মূল কারিগর।</p>
<p>এস. কে চ্যাটার্জীর ‘দি মিলিয়নস’ বইয়ের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতবর্ষের এই রেলপথ স্থাপনের পূর্বে ও পরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ও প্রাণহানির তুলনা করলে এ বিষয়ে অনেকখানি স্পষ্ট হওয়া যায় যে, ১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে মোট দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ছিল ১৩ এবং এইসকল দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও অধিক। কিন্তু রেলপথের স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ১৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। উপমহাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জমিজমা, বিভিন্ন সম্পদ, মাঠ, ঘর-বাড়ি নষ্ট করে তার উপর দিয়ে রেলপথ বসায় এবং দেখানো হয় তারা অনেক পরিকল্পিত, উন্নত ও সংরক্ষিত উপায়ে উন্নয়ন করছে। অথচ এই স্থাপনার ক্ষেত্রে তারা মোটেও জনগণ এবং কৃষকদের বাস্তবিক অবস্থার দিকে নজর দেয়নি। তারা নজর দিয়েছিল তাদের লুণ্ঠনের দিকেই, লুণ্ঠন তরান্বিত হওয়ার পন্থার দিকেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, তাদের তৈরিকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী যদি অফিসিয়ালি মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সংখ্যা এটা হয়, তাহলে বুঝাই যাচ্ছে তা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের। প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলির অবস্থা তাহলে কি হয়েছিলো? ২০ বছরের ব্যবধানে যদি কোটি কোটি লোক মারা যায় তাহলে সত্যিকার বাস্তবিক অবস্থা কি হয়েছিল? উপমহাদেশে যার ফল আমরা আজও ভোগ করছি।</p>
<p>বার্ণিয়ার যে মন্তব্য করেছিলেন- বাংলাদেশ বা বাংলা অঞ্চল পৃথিবীর অন্যান্য যেসকল প্রভাবশালী সভ্যতা রয়েছে তার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের নদীগুলো, সেচব্যবস্থার প্রশংসা তিনি করেছিলেন। উপমহাদেশের ইসলামী সভ্যতা তথা মুঘল সালতানাতের সময় গোটা ভারতবর্ষব্যাপী সেচ ব্যাবস্থা ব্যপক উন্নতি সাধন করে। আর এটি মূলত মুসলিমদের ধারাবাহিক একটি ঐতিহ্য। কেননা আমরা জানি উমর (রা.) এর পর থেকেই এই সেচ ব্যবস্থা, কৃষির উন্নয়ন এবং কৃষির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির প্রয়োগ করা মুসলিমদের একটা সাধারণ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। সেই বিশাল ঐতিহ্যের উপমহাদেশের মুসলমানদের গড়া কৃষি ব্যবস্থাকে যারা এমনভাবে ধ্বংস করেছিলো তাদেরই একজন গবেষক বিখ্যাত নদী বিশেষজ্ঞ স্যার ইউলিয়াম ইউলক বলেছিলেন, বাংলা অঞ্চলের যে সমৃদ্ধি ছিল তা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে লুণ্ঠনকারী ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যা এই সম্বৃদ্ধিতে ভয়াবহ আকারে ধস নামিয়ে দেয়। অথচ ব্রিটিশদের এই উন্নয়নের পিছনে মূলভিত্তি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষি জমি এবং খালবিল।</p>
<p>সুপ্রকাশ রায়ও তার বইতে বলেন, ভারতের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মূলত ব্রিটিশদেরই দান। এটি খুব স্বাভাবিক। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, এই প্রত্যেকটি ব্যক্তি ছিল ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করা এবং তাদের পক্ষে থাকা লোক অর্থাৎ সুবিধাবাদী ও ব্রিটিশদের গোলাম। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ব্যক্তিদের উত্তরসূরী যারা ব্রিটিশ শাসনের মঙ্গল কামনা করতো এবং নানা ধরণের পরামর্শ দিতো তাদের বর্ণনা অনুযায়ী-ই যদি ভয়াবহ অবস্থার চিত্রাঙ্কন এমন হয় তাহলে বাস্তবিক অবস্থা আসলে কি ছিল? ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালের দুর্ভিক্ষের পর ১৯৩৪ সালে বাংলা অঞ্চলে বিশেষ খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষের দিকেও যদি তাকাই তাহলে দেখবো, এই দুর্ভিক্ষেও প্রায় এক তৃতীয়াংশের মতো মানুষ মারা যায়। যারা জীবিত ছিল তারাও এতটা কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছিল যে, এই ব্যাপারে মেমোরেন্টামের ৫৯ নং পেইজে বলা আছে, অনেক কৃষকেরা গাছের পাতা খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে ছিল। ১৯৩৬ সালে এ দুর্ভিক্ষ আরও বিস্তার লাভ করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সেসব অঞ্চলে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ নিহত হয় এবং বিভিন্নভাবে পীড়িত হলে সরকার মাত্র ১১ লক্ষ টাকা সাহায্য করে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে ৩৬ লক্ষ টাকার ঋণ প্রদান করে। কিন্তু সত্যিকারার্থে এই দুর্ভিক্ষ থেকে মানুষের মুক্তির জন্য যে কোনো কার্যক্রম থেকে তারা বিরত থাকে।</p>
<p>ভবানী সেনের লেখা ‘ভাঙ্গনের মুখে বাংলা’তেও তিনি বলেন, সেই সময়গুলোতে অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের আগে পরের বাংলায় সাধারণ মানুষের ৬-৮ মাস কোনো কোনো অঞ্চলে দশ মাসের খাদ্যের ঘাটতি ছিল। কিন্তু যা উৎপাদিত হতো তা দিয়ে ১ বছরের উৎপাদন দিয়ে কয়েক বছর চলা সম্ভব ছিল। এর থেকেই বুঝা যাচ্ছে সকল উৎপাদিত পণ্য, ফসল লুণ্ঠিত হয়ে চলে যেতো ব্রিটিশদের কোষাগারে। একই বইয়ে লক্ষ করলে দেখা যায় সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকেও এমনভাবে লুণ্ঠন করা হতো যে মাসে কয়েক লক্ষ মণ চাল তারা সরিয়ে নিতো। ফলশ্রæতিতে খাদ্য সংকটের কারণে মানুষ অনাহারেই মারা যেত। কৃষকদের স্বাস্থ্যহীনতা, মানসিক কষ্ট ও অধিক মৃত্যুর ফলে উৎপাদন কমতে থাকে। কিন্তু এ উৎপাদনের পরেও তারা তাদের লুণ্ঠন হ্রাস পায়নি। প্রতিনিয়ত কৃষকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। না দিতে পারলে উপহার হিসেবে শাস্তি প্রয়োগ করতো!</p>
<p>ভবানী সেন তার বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৯৪০ সালের পরে যে দুর্ভিক্ষগুলো একের পর এক দেখা দেয়, গ্রাম কি শহর সকল জায়গাতেই নিরন্ন, নিঃস্ব কৃষকেরা দুমুঠো ভাতের জন্য ঘর থেকে ঘর ভিক্ষা করতে থাকে। কিন্তু ভিক্ষা দেওয়ার মানুষ-ই তখন ছিল না। গোটা জনগণের শতকরা ৭৫ জনের ঘরেই চাল ছিল না। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণেই মজুদ ছিল যুদ্দার, আড়তদার চোরাকারবারি ব্রিটিশদের এজেন্টদের কাছে, মিল মালিকদের কাছে। এই দস্যুরা মুনাফা আদায় বন্ধ তো করেইনি বরং ব্রিটিশদের কাছে যে ধরণের বার্তা পাঠাচ্ছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল আরও বেশি আয় করা সম্ভব। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে শুধু বাংলা অঞ্চলেই ১৫ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো। অথচ এই দুর্ভিক্ষ চলাকালীন অবস্থাতেই ব্রিটিশ এজেন্ট ব্যাপারীরা লাভ করে ১৫০ কোটি টাকা। ভবানী সেন এ নিয়ে আরও বলেন, সরকারি নীতির সংখ্যা অনুযায়ী ৭৫ লক্ষ হলেও অন্যান্য বেসরকারি সূত্রের হিসাব মতে দুর্ভিক্ষের বছরে অনাহারে ৩৫ লক্ষ নর-নারী মারা যায় এবং ১২-১৫ লক্ষ নর- নারী এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে যে তাদের অবস্থা পথের ভিখারির থেকেও করুণ হয়ে যায়। প্রায় কোটির কাছাকাছি সংখ্যক মানুষ নতুন করে ভিখারি হয়। খাদ্যের জন্য মানুষ স্ত্রী, পুত্র সন্তানদেরকেও বিক্রি করতে দ্বিধাবোধ করে না। নর্দমার মধ্যে কুকুরের সাথে উচ্ছিষ্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে থাকে অনাহারে ভুগতে থাকা মানুষগুলো। তিনি একই বইয়ে আরও বলেছেন, দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিটির সরকারি বিবরণ অনুসারে বাংলাদেশের ৬ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষের জীবন দুর্ভিক্ষ দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাংলার ৯০টি মহকুমার মধ্যে ২৯ টি মহকুমায় ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষের ভয়াল থাবা। বাংলাদেশের ৮২ হাজার ৯ শত ৫৫ কিলোমিটার মধ্যে অধিকাংশ অঞ্চলেই দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।</p>
<p><strong>এভাবে যখন অবস্থা আরও নিম্নগামী হতে থাকে ঠিক এ সময়ই ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করতে থাকে এ অঞ্চল থেকে চলে যাওয়ার। তাদের শোষণের, জুলুমের পন্থাকে পরিবর্তন করার। কথিত স্বাধীনতা তথা তাদের ভাষায় পাওয়ার ট্রান্সফার করার চিন্তা। সে সময়ের বগুড়া জেলার একটি গ্রামে তাঁতিদের সম্পর্কে জনযোদ্ধার একটি রিপোর্টে বলা হয়, দশটিকা গ্রামে ২০০ জন তাঁতির বসবাস। তাদের মোট সংখ্যা ১৭৩ এবং ২৫ জনের ৪-৫ বিঘা করে আবাদী জমি ছিল। দুর্ভিক্ষ সময় ৫০ জন লোককে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে বাঁচতে হয়েছে। আর বাকীরা অসুস্থ থেকেই মারা গিয়েছে।</strong> যারা বেঁচে আছে তারাই জমি বিক্রি করে দিন মজুর হয়েছে। আর বাকীরা তাদের বাড়ি- ঘর বন্ধক রেখে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছে। এটি শুধু দশটিকা গ্রামে নয় গোটা অঞ্চলের একই অবস্থা। ভবানী সেনের ভাষায় এসময় যাদেরও কিছু কিছু জমি ছিল তারাও সকল জমি হারিয়ে ফেলে। কেউ বিক্রি করে আবার কেউ বন্ধক রাখে। এর মধ্য দিয়ে অধিকাংশ কৃষক এবং সাধারণ মানুষ তাদের অবস্থান থেকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়। ভবানী সেন উক্ত গ্রন্থে আরও বলেন, দুর্ভিক্ষের সময় একটি হিসাব অনুযায়ী ৩৫ লক্ষ মানুষ মারা গেছে কিন্তু যারা বেঁচে আছে তারাই আজকের দিনে আরও সমস্যায় আছে। কেননা এলাকা গুলিতে শতকরা দশ জন লোক এতো বেশি দুস্থ ও রোগাগ্রস্থ যে তাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। প্রায় ১২ লক্ষ লোক নতুন করে ভিখারি হয়েছে। একেবারে ভিখারী না হলেও রিক্ত হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা ৬০ লক্ষ।</p>
<p>এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে, এতো বিশাল উন্নত সালতানাত ২৯% জিডিপি নিয়ন্ত্রণকারী ইসলামী সভ্যতা যেখনে মাত্র ২০% মুসলিম ছিল আর বাকী সবাই ছিল অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সেখানে মুসলিমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং কৃষি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলো যেখানে সাধারণ যাকাত নেওয়ার মতো লোক পাওয়া যেতো না। যে অর্থনৈতিক অবস্থা এতো উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো সেখানে কি এমন হলো যে, তারা তাদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এভাবে দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষ, মৃত্যুর পর মৃত্যু, শোষণের পর শোষণ শুরু হলো তা আমাদের উপলব্ধি করার সময় কি এখনো আসেনি?<br />
তারা কথিত স্বাধীনতা দেওয়ার পরেও পুরো উপমহাদেশ জুড়ে এমন এক অবস্থা বিরাজ করছিল যে, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা অঞ্চলে একটি পর একটি দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকতো যা চির দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত হয়েছিল। এসময় থেকেই শুরু হলো নতুন করে খাদ্যের অভাব এবং নানাবিধ দুর্ভিক্ষ। ব্যাপকতা, স্থায়ী প্রাণহানির দিক দিয়ে দুর্ভিক্ষ ভারতের ইতিহাসে নতুন আরেক রেকর্ড স্থাপন করল। অর্থাৎ ব্রিটিশরা থাকা অবস্থাতেই যে পরিস্থিতি ছিল তারা চলে যাওয়ার পরও সে অবস্থা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলো। অর্থাৎ এ শাসন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো সময় হয়েছে কিনা কিংবা এতো নিকৃষ্টতর শাসন পৃথিবীর ইতিহাসে আদৌ সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। পাশাপাশি তারা চলে যাওয়ার পর যে নয়া ব্যবস্থা রেখে গেলো তার ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আজও বিদ্যমান। তা পরবর্তীতে বা গত ৫০-৬০ বছরের অর্থনৈতিক অবস্থা, কৃষির দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্র্য অবস্থা দেখলেই টের পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ব্রিটিশ পরবর্তী বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্য :</h5>
<p>১৯ শতকের শেষের দিকে দুনিয়ার অবস্থা নানাভাবে পরিবর্তীত হতে থাকে। বিশেষ করে উসমানী খিলাফতের পূর্ণাঙ্গ পতনের পর দুটি বিশ্ব যুদ্ধ এবং ইয়াল্টা কনফারেন্সের মাধ্যমে পরবর্তীতে দুনিয়ায় নতুন এক রূপরেখা তথা নয়া বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর সরাসরি শাসনের পন্থা থেকে সরে এসে যায়নবাদী গোষ্ঠীরা কথিত স্বাধীনতার নাম করে শোষণ এবং নিয়ন্ত্রণের ভিন্ন এক কৌশল প্রতিষ্ঠা করে। ফলে উপমহাদেশ থেকে তারা চলে যাওয়ার পরও শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদীতা এক বিন্দুও কমে যায়নি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কৃষিক্ষেত্রে, খাদ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকট বিদ্যমান ছিল স্বাধীনতার পর যেসকল শাসক ক্ষমতায় আসীন হন তারা সেই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে মুকাবিলা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন। আর এ পরিস্থিতির উত্তোরণে তারা তাদের নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার কৌশল প্রয়োগ করে। তারা বুঝাতে শুরু করে যেহেতু অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি ভালো না সেহেতু নির্দিষ্ট কিছু শর্তের বিনিময়ে তোমরা ঋণ গ্রহণ কর। আর তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্র সে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য ছিল কেননা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর ছিল। আর এই ভংগুর অর্থনীতির উত্তোরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে পাশ্চাত্য জায়নবাদীরা গরিব শ্রেণির মানুষদের ঋণ দিতে থাকে, সামাজিক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। এসকল ত্রাণ এবং সামাজিক সংস্থাও ছিলো নয়া ষড়যন্ত্রের অংশ।</p>
<p>সেসকল সহযোগিতা ও ত্রাণের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল তাদের তৈরিকৃত বীজ এবং প্রদানকৃত খাদ্য। রাষ্ট্র এক্ষেত্রেও বীজ ও খাদ্য গ্রহণে বাধ্য ছিলো। ফলশ্রæতিতে এসকল ঋণ গ্রহণের শর্ত, ত্রাণ প্রদান, নানা সহযোগিতাসহ সব মিলিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় নয়া এক কৃষি ও খাদ্যনীতি। মূলত তারা কৃষি বিল্পবের নাম করে নতুন এক কৃষি ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে। ২০০ বছরের জুলুম ও নয়া কৌশলের মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যায় উপমহাদেশের নানা জাতের ফসল। অথচ এক সময়ে কয়েক প্রকারের ফসল এ অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল, কয়েক ধরণের বীজ এখানে উৎপন্ন হতো। তা অল্প বিস্তর শুরুতেই বলা হয়েছে। কিন্তু সেই অঞ্চলেই তারা সকল বীজ এবং ফসল কে নষ্ট করে দিয়ে স্বাদবিহীন ফার্মের ফসল তথা হাইব্রিড ফসলের দিকে নিয়ে যায় গোটা জাতিকে। এই বীজ এবং হাইব্রিড ফসলের মধ্য দিয়ে আমদানি হয় নানা ধরণের রোগব্যাধির। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি আমেরিকা, আফ্রিকা ও উপমহাদেশে তাদের শাস্তি এবং গণহত্যার অন্যতম ভিত্তি ছিল নানা ধরণের রোগ সৃষ্টি করে হত্যা করা, নিয়ন্ত্রণ করা। আবার পরিস্থিতিও এমন একটি জায়গায় চলে যায় যেখান থেকে চাইলেও বের হতে পারছিলো না রাষ্ট্র তথা কৃষিব্যবস্থা।<br />
এরই পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন অভ্যন্তরীণভাবে এমন এক কোন্দলপূর্ণ অবস্থায় গিয়ে পৌঁছায় যে জন্য এসকল বিষয়ের প্রতি কারোর দৃষ্টিপাত করার সময় হয়নি বা আজও পর্যন্ত হচ্ছে না। এভাবেই পাশ্চাত্য তার জায়নবাদ নীতি দিয়ে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কৃষি প্রযুক্তিতে বীজের ধারণা ও খাদ্যনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এটিও আন্তর্জাতিক শোষণের একটি অংশ এবং জায়ানবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের একটি হাতিয়ার। তাদের সরাসরি শাসন পরবর্তী কথিত স্বাধীন অঞ্চল গুলোতে দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট এমনভাবে বিদ্যমান ছিলো যার থেকে উত্তোরণ ঘটানো আমাদের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। আর এই সুযোগটিই তারা বিভিন্নভাবে কাজে লাগায়। তারা নতুন নতুন পন্থা, কৌশল রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরতে থাকে। ফলশ্রæতিতে ৬০ এর দশকে কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কোনো ধরণের সত্যিকার পলিসি নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু সেসময়ের সরকারি ব্যবস্থাপনায়, খাদ্যনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন সব জায়গায় রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৌশল বাস্তবায়ন করা হয়। কারণ দরিদ্র দেশ শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশসহ আফ্রিকার প্রত্যেকটি উপনিবেশিক শাসন পরবর্তী অঞ্চলে উন্নত টেকনোলজির ব্যবস্থা ছিলো না, ছিল অশিক্ষিত শ্রেণী বা শিক্ষার হার ছিল না, গৃহযুদ্ধে ভরে গিয়েছিলো অঞ্চলগুলো। দুর্ভিক্ষ প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলশ্রুতিতে এই দরিদ্র দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ নিতে বাধ্য হতো। আর এই ঋণ দেওয়ার সময়ই তারা এ সকল নীতি পরিবর্তনের শর্ত দেয়।<br />
তখনই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সব জায়গাতেই খাদ্যের সংজ্ঞায়নে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। ইসলামী সভ্যতার খাদ্যনীতি হচ্ছে,</p>
<ul>
<li>স্বাস্থ্যকর ও উপকারী,</li>
<li>পুষ্টিকর,</li>
<li>হালাল।</li>
</ul>
<p>কিন্তু তারা খাবারের সংজ্ঞায়নে তুলে ধরে,</p>
<ul>
<li>পুষ্টি নয় পরিমাণে বিশ্বাসী।</li>
<li>উপকারে নয় বরং চাকচিক্য ও স্বাদে বিশ্বাসী।</li>
</ul>
<p>তারা শুধু মাত্র শিক্ষা দিয়ে নয় মিডিয়ার মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করতে থাকে যার ফলে তাদের খাদ্যগুলো একেকটি ফ্যাশনে পরিনত হয় এবং প্রত্যেক জনগণের মাথায় চিন্তাগতভাবে এ খাদ্যের সংজ্ঞাকে, মডেলকে পুশ করা হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ নিপতিত নতুন এক আগ্রাসনের সমুদ্রে।</p>
<p>কিন্তু লক্ষ্য করুন, তারা ঋণ দিয়েছে বিপরীতে কিন্তু তারা শিক্ষাকে উন্নত, প্রযুক্তিকে উন্নত, গবেষণাগারকে উন্নত করার ব্যাপারে কোনো ধরনের জোর দেয়নি। ৮০’র দশকে ৯০’র দশকে এই নীতি চলমান অবস্থায় তারা কথিত দুর্ভিক্ষ দমনের নাম করে হাইব্রিড ধান নিয়ে আসে এবং হাইব্রিড ধান দ্রুত উৎপন্ন হওয়ার ফলে মনে করে কৃষির ক্ষেত্রে সত্যিই বিপ্ল­ব হচ্ছে। অথচ আমাদের সত্যিকারের বীজ, আমাদের উর্বর জমিতে যদি বাংলা সালতানাতের মতো করে চাষাবাদ করা যেত তাহলে সাধারণ ভাবেই অনেক বেশি ফসল উৎপন্ন হতো যার দ্বারা খাদ্য সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই ধরণের যোগ্যতা, কৌশল এবং চিন্তাধারা না থাকায় যায়নবাদীদের ফসল নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।</p>
<p><strong>এ ফসল একইসাথে প্রভাব ফেলছে আমাদের মানসিক অবস্থায়, আমাদের মনস্তত্ত্বে। মাওলানা মওদূদী তর্জমানুল কোরআনে এক প্রবন্ধে লিখেন-</strong></p>
<p><strong>“ইসলাম শূকর এবং মদ শুধুমাত্র এ কারণে নিষিদ্ধ করেনি যে তা শরীরের জন্য অপকারী। বরং তা একইসাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। খাদ্য শুধু মানুষের শরীরেই নয় বরং তাঁর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে।” </strong></p>
<p>ইসলাম খাবারের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে হালালকে, তাঁর পেছনের দর্শন মূলত এটি। কারণ খাবার শুধু বাহ্যিক প্রভাবই রাখে না একইসাথে আভ্যন্তরীণ ও নৈতিক প্রভাবও বিস্তার করে। অঞ্চলোপযোগী, উপকারী, পবিত্র ও হালাল খাবারের বিপরীতে এমন খাদ্যের মডেল যায়নবাদীরা হাজির করেছে যা মানুষকে অস্থিরমতি করে ফেলে, তাঁর নৈতিক জায়গাকে প্রভাবিত করে। সমকামিতার ন্যায় মানবপ্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজগুলো প্রসার লাভের পেছনেও খাদ্যের প্রভাব বিদ্যমান। খাদ্যের সাথে কৃষি এবং ভ‚মিব্যবস্থা আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আমরা এগুলাকে কবীরা গুনাহ বলে ফতোয়া দিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক সমাধান খোঁজায় রত থাকি। প্রশ্ন হলো- আন্তর্জাতিক বীজনীতি, আমাদের অঞ্চলে তাদের শোষণ ও ভূমিব্যবস্থা পরিবর্তন, খাদ্যের নৈতিক প্রভাব, খাদ্য রাজনীতি সর্বোপরি কৃষিব্যবস্থার ভয়াবহ সংকট এবং সমাধানের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে রাজনৈতিক এবং সামগ্রিক সমাধান না খুজে ধর্মতাত্তি¡ক সমাধান হাজির করলেই কি সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব?</p>
<p>এই হাইব্রিড ফসল যখন দেয়া হলো আর তাদের বীজের মধ্যেই যেহেতু সমস্যা সুতরাং এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য তারা নতুন করে প্রদান করল সার আর কীটনাশক সিস্টেম। অর্থাৎ একজন সুস্থ মানুষকে ইনজেকশন দিয়ে অসুস্থ করে দেয়া শুরু হলো। আমাদের জমি ছিল উর্বর। সে জমিতে সার এবং কীটনাশকগুলোকে ইনজেকশনের মতো পুশ করা শুরু হলো। সেখানে উৎপাদিত হওয়া শুরু হল হাইব্রিড ধান। ফলাফল হিসেবে সাময়িক উৎপাদন হলেও মাটি তার উর্বরতা হারাতে শুরু করলো, পানি দূষিত হতে হতে লাগল। গত ৪০ বছর যাবৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি এই জমির ফলন ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ২০০ বছর পরে কি হতে পারে তা নিয়ে কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? ৫০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন খরচ কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০০ বছর পর এই অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, তা কি আমরা একবারও ভেবেছি? কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য তো পাচ্ছেই না উপরন্তু নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।</p>
<p>গবেষকদের মতে, “খাদ্যের সংজ্ঞাতে পরিবর্তন ঘটনো হয়েছে। খাদ্যের সংজ্ঞা নির্ণয়ে দানাদার খাদ্যকে প্রধান খাদ্যের (Staple Food) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; খাদ্যের পুষ্টিগুণের চেয়ে পরিমানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মেক্সিকো সরকার ও রকফেলার ফাউন্ডেশান ১৯৪৩ সালের দিকে ‘সবুজ বিপ্ল­ব’-কে একটি কৃৎকৌশলগত প্যাকেজ হিসেবে দেখানোর জন্য ‘বিশেষ গবেষণা’র উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগ ১৯৬০ দশকে পুনর্গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (International Rice Research Institute) হিসেবে। স্থানীয় পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্য এবং চাষের জমির বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ধানের জাতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।</p>
<p>তথাকথিত অনুন্নত দেশগুলোকে রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৃৎকৌশল চাপিয়ে দেওয়া সহজ ছিল না। সেটা তারা করেছে বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার শর্ত হিসেবে। ষাটের দশকে বিশ্ব ব্যাংকের শর্ত মেনে তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুব খান সরকার উফশি বীজ প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যার মূলে শুধু উফশী বীজ নয়,একই সঙ্গে ছিল রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার। এবং তা এসেছিল সুদূর আমেরিকার ফোর্ড এবং রকফেলার ফাউন্ডেশানের আর্থিক কল্যাণে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সহযোগিতা করেছিল প্রাণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ দেশগুলোতে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কৃষিকে ‘উন্নত’ করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সকল রাসায়নিক পদার্থের বা বিষাক্ত দ্রব্যের জন্য বাজার তৈরির দরকার ছিল। ‘সবুজ বিপ্ল­ব’ বা এৎববহ জবাড়ষঁঃরড়হ আসলে নিছকই বৈজ্ঞানিক ব্যাপার ছিল না। এটি ছিল একটি কৃৎকৌশলগত প্যাকেজ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর আধুনিক বিজ্ঞানের কৌশলগত ব্যবহার। যুদ্ধে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক উদ্বৃত্তের বাজার তৈরির জন্য এমন ধানের জাত উদ্ভাবিত হল যেসব জাত চাষের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। সর্বোপরি এটা বাস্তবায়িত করতে কৃষক নয়, কৃষি ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা, ল্যাবরেটরির গবেষকদের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সব কিছুরই মিলিত প্রকল্প ছিল গ্রিন রেভুলিউশান (সবুজ বিপ্ল­ব)। অধিক উৎপাদন করে মানুষকে ক্ষুধা থেকে বাঁচাবার কথা বলা হয় বটে, আসলে সবুজ বিপ্লবের মূল কাজ ছিল ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশিল বীজের সাথে কৃত্রিম সার ও কীটনাশক এবং তার সাথে সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। কর্পোরেট কৃষির বীজ বপন এখান থেকেই শুরু।</p>
<p>গবেষকগণ বলেন, “সেই ষাটের দশক থেকে পৃথিবীতে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি চলছে। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের সরকারি দপ্তর থেকে থেকে বলা হয়, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা পেতে হলে উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত এসে দেখা গেল উফশী ধান চাষ করে মানুষ খাদ্যে নিরাপত্তা পায়নি। বিপরীতে মানুষ ব্যাপকভাবে খাদ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। উফশী জাতের ধান চাষ করতে গিয়ে যে সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে একদিকে মাটির উর্বরতা কমেছে, অপরদিকে অপকারি পোকা মারতে গিয়ে উপকারি পোকাও মারা গেছে। তাই গাছের পরাগায়নে মধুপোকা বা প্রজাপতি এখন আর ফসলের মাঠে দেখা যায় না। তাছাড়া মানুষ একবার জমি চাষ করে তিন চারবার ফসল তুলত। ধান পাকলে মাষকলাই মাঠে থাকত, একইসাথে তিলও চাষ করা হত। এতে জমির উর্বরতা কমত না, মাটির ক্ষয়ও রোধ হত। কিন্তু একই জমিতে পরপর ধান চাষ করায় প্রতিবারের জন্য নতুন করে জমি চাষ করতে হচ্ছে। তাতে যেমন মাটির ক্ষয় হচ্ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে উর্বরতা। এছাড়া ফসলের মাঠ এবং বাড়ির আঙ্গিনায় প্রকৃতিকভাবে হওয়া বিভিন্ন লতাগুল্ম পাওয়া যেত। কিন্তু নানা ধরনের কীটনাশক ও আগাছানাশক ওষুধ দেয়ায় আগাছার সাথে প্রকৃতিকভাবে হওয়া পুষ্টিগুণ-সম্পন্ন এসব লতাগুল্মও মরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল উফশী চাষ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলা হলেও তা সম্ভব হয় না।</p>
<p>৯০-এর দশক পরবর্তী সময়ে নতুন ধাচের হাইব্রিড বীজ প্রথমবার সরবরাহের পর দ্বিতীয় ধাপ থেকে বীজ দেয়া শুরু করল সরকারের সাথে সরাসরি চুক্তিতে থাকা প্রাইভেট কোম্পানিগুলো। হাইব্রিড এই বীজ থেকে যে ফসল উৎপাদিত হচ্ছে তাতে সার এবং কীটনাশক দিতে হচ্ছে। কৃষি বিশ্লেষকেরা বলছেন, হাইব্রিড বীজের একচ্ছত্র মালিকানা কোম্পানির সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে এবং গুটি কয়েক কোম্পানির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকছে। যেমন ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী মনসান্টো ৪,৯৬৪ মিলিয়ন ডলারের বীজ ব্যবসা করে এবং মালিকানাধীন বীজের বাজারের ২৩% নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরে রয়েছে ডু-পন্ট (১৫%), সিনজেনটা (৯%) । মাত্র ১০টি কোম্পানি পৃথিবীর মালিকানাধীন বীজের বাজার দখল করে আছে। তার মধ্যে উল্লেখিত তিনটি কোম্পানি ৪৭% বাজার দখল করে আছে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্ব কৃষি ব্যবস্থায় গুটিকয়েক বহুজাতিক কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>এর ফলাফল হচ্ছে চকচকে সুন্দর সবজি উৎপাদন হলেও জমির অবস্থা ক্রমেই নষ্ট হতে শুরু করছে। মানুষ ভয়াবহ দুর্বলতা ও নতুন নতুন রোগের মধ্যে নিপতিত হচ্ছে। GMO (Genetically Modified Organism) হচ্ছে, বীজের মডিফাই করণ। বিশ্বব্যাপী শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে বীজ আসতে শুরু করলো। যা গবেষক ও বিজ্ঞানীদের ভাষায় এখনো পর্যন্ত অস্পষ্ট। কিন্তু ফলাফলস্বরূপ মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে। ক্যান্সারসহ সব ধরণের ভয়াবহ রোগ যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তা আশংকাজনক। মোট মৃত্যুর ৬১ ভাগই হচ্ছে এইসকল খাদ্য, বীজ ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে। বর্তমানে ৮০ ভাগ খাদ্যে ক্যামিকেল মিশানো হয়। ৬৭ ভাগ জমিতে কীটনাশক ছিটানো হয়। যার ফলে রোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের সাথে উপযোগী পোকা গুলিও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যেমন জোনাকী পোকা আজ বিলুপ্তির পথে। বাৎসরিক কৃষি পরিসংখ্যান গ্রন্থে (Yearbook of Agricultural Statistics in Bangladesh, 2009) দেখা যায়, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কীটনাশক ব্যবহারের পরিমান ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১৯৯৩ সালে ছিল ৭৬৬০.৩৯ মেট্রিক টন, ২০০৭ সালে তা হয়েছে ৩৭৭১২.২০ মেট্রিক টন, অর্থাৎ ৩৯২% বেড়েছে। উল্লেখ্য ধান ও অন্য ফসলে হাইব্রীড বীজের ব্যবহার ১৯৯৮ সাল থেকে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।</p>
<p>সরাসরি হাতের সাহায্যে জমিতে এই কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীর ৬০ শতাংশ হচ্ছে কৃষক। কারণ এই কীটনাশক খালি হাতে তারা ব্যবহার করে।</p>
<p>পানিতে বিভিন্ন ধরণের কেমিকেল ও কারখানার ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থের দরুন পানি দূষণের কারণে জমি নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষকরা এভাবেই প্রতিদিন দারিদ্রতার কাছে হার মানছে। শুধু কি তাই, জাতিসংঘ কর্তৃক কৃষিতে ব্যবহৃত ১২টি কীটনাশক নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তা বাংলাদেশে অবলিলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এসকল কীটনাশকগুলো ব্যবহারের ফলে লিভার, কিডনী, স্তন ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, ত্বকের সমস্যাসহ নানা ধরণের সমস্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই সব কিছুর কারণ এই ধরণের সার, কীটনাশক এবং বীজ ব্যবস্থা। এতো কিছু ব্যবহারের পরেও ৮৪% কৃষক গড়ে মাত্র ৩ একর জমিতে চাষ করে। চাষ করার পরও তারা ন্যায্যমুল্য পাচ্ছে না। চড়া সুদ দিতে হচ্ছে। যার কারণে খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে আরও কমদামী হাইব্রিড বীজ, কীটনাশক, সার কিনছে। ফসল বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের ক্যামিকেল বা ঔষধ ব্যবহার করছে। কিন্তু তবুও তারা তাদের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না এবং পরিবারকে চালাতে পারছে না। কারণ এসব কিছু নির্দিষ্ট একটি চক্রের হাতে বন্দি।<br />
এই চক্রগুলোর কাছে বন্দি হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, যেসব বীজ কোম্পানি গুলো আমাদেরকে বীজ দিয়ে থাকে তারাই প্রত্যেকটি ঔষধ কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ। অর্থাৎ তারা যে রোগের ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঔষধ কোম্পানিগুলো সে রোগের ঔষধ তৈরি করছে। আমরা ভাইরাস খাচ্ছি আবার তাদেরই দেওয়া ঔষধও ভক্ষণ করছি।</p>
<p>আলোচনার শুরুতে উল্লেখিত আয়াত দুটির কথা এবারে যদি চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাচ্ছি ইয়াহুদিরা সারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রন করছে। এবং তারা আমাদের দেশে এসে কিভাবে এবং কেন শস্যক্ষেত এবং মানব বংশকে ধ্বংস করছে তার উত্তর পাচ্ছি কি?<br />
<strong>এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭০ সালে বলেছিলেন “Control oil and you control nations; control food and you control the people.” অর্থাৎ, যদি তুমি তেলকে নিয়ন্ত্রন কর তাহলে তুমি একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে আর যদি তুমি খাদ্যকে (বীজ) নিয়ন্ত্রন কর তাহলে মানুষকে অর্থাৎ সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।</strong></p>
<p>আর এটিই তারা সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করে চলেছে। যেমন, তাদের বীজ ও খাদ্য কোম্পানী সারা দুনিয়ার কৃষি ও খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃষিপণ্য এবং কীটনাশক উৎপাদনকারী নিয়ন্ত্রণকারী বৃহৎ কোম্পানিসমূহ :</p>
<ul>
<li>1| Cargill</li>
<li>2| Bayer</li>
<li>3| DuPont</li>
<li>4| Monsanto</li>
<li>5| Syngenta</li>
</ul>
<p><strong>এই কোম্পানিগুলো বীজের পাশাপাশি খাদ্যকেও নিয়ন্ত্রণ করে। গত শতকে এইডস, ডায়াবেটিস, বার্ডফ্লুসহ আরও অনেক রোগের জীবাণু ছড়ানোর পেছনে এরাই দায়ী। যেমন, চিনি, গম, চালের জিনের সাথে তারা ডায়াবেটিস-সহ আরও নানাবিধ রোগ মিশয়ে দিয়ে থাকে। তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চকলেট এবং চিনিজাত পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হল নেসলে (Netsle) আবার ডায়াবেটিকস কিংবা চিনি খাওয়ার ফলে যে সব অসুখ শরীরে দানাবাঁধে তার মেট্যাংস (Metanx) নামক ঔষধও তৈরি করে এই একই কোম্পানি!</strong></p>
<p>ভয়াবহ এই আগ্রাসনকে তুলে ধরার জন্য অনেক গবেষকগণ কাজ করে যাচ্ছেন! তন্মধ্যে F. William Engdahl এর লেখা <em>Seeds of Destruction: The Hidden Agenda of Genetic manipulation</em> নামক বইটি অন্যতম।</p>
<p>এসব সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফলাফল স্বরূপ আমাদের স্বাস্থ্য খাত, আমাদের শারীরিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা, পরিবেশের অবস্থা এতোটাই নিম্নগামী যেখানে আমাদের গড় আয়ু ছিল ৮০-৯০ বছর এখন তা কমতে কমতে ৪০ এর কোঠায় এসে নেমেছে। হঠাৎ মৃত্যু, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, নানা ধরণের ক্যান্সার, রোগ বৃদ্ধি, শতভাগ মানুষ আজ দুর্বলতার মধ্যে ভুগছে, গ্যাস্ট্রি, কিডনী ইত্যাদিতে ভুগছে। প্রতিটি ঘরের প্রত্যক ব্যক্তি আজ গণহারে অসুস্থ। সুস্থ হওয়ার কোনো পথ নেই কারণ তাদেরই দেওয়া ঔষধ খেয়ে সুস্থ হওয়া লাগবে!</p>
<p>তাই স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় তাদের দেওয়া স্বাধীনতা, ঋণ, সহযোগিতা, ত্রাণ কোনো কিছুই মানবতার জন্য না। পুরোটাই মূলত শোষণের উদ্দেশ্যে। তাদের হাতে গড়ে ওঠা কিংবা তৈরী হওয়া একটি শ্রেণির বয়ান হাজির করে কথিত উন্নয়নের কৃষি, বিজ্ঞানের বিপ্লবের। কিন্তু বাস্তবিক অবস্থা কি তা তো আমরা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি।</p>
<p>এসব বিষয় যে আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করে সচেতনতা তৈরি করব, এর থেকে মুক্তির পথ খুঁজব এর জন্য শক্তিশালী কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই কোনো কার্যকরি উদ্যোগ। প্রতিটি সেক্টর এখন পুরোপুরিই বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে বন্দি। সত্যিকারের মুক্তি জন্য নয়, স্বাধীনতার জন্য নয় দুর্ভিক্ষ কিংবা ক্ষুধা থেকে বাঁচাবার জন্য নয় এই সবকিছু একটি দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ভয়াবহ ধাপ।</p>
<p>কৃষকেরা জমিতে সার-কীটনাশক ব্যবহার করছে কৃষির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য। কিন্তু তারা কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় ঋণ পাচ্ছে না, স্থায়ী পুঁজিও নেই তাদের। তাহলে তারা কীভাবে এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? সমাধানস্বরূপ তারা বিভিন্ন এনজিও, গ্রামের মহাজনদের কাছে ঋণের জন্য হাত পাতছেন। এছাড়া আছে ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। কিন্তু এগুলোর প্রতিটিতেই রয়েছে সুদের মহা কারবার। একজন সবজি চাষীর ভাষ্যমতে তাকে ১০০ টাকায় সুদ দিতে হচ্ছে ২১ টাকা। এতে তার লাভের পরিমাণ ১০০ টাকায় ১০৫-১১০ টাকা। কুটির শিল্প, মৎস শিল্পের সাথে জড়িতদের সুদ দিতে হয় ১৭% যেখানে লাভ হয় ১৫%। বোঝাই যাচ্ছে গ্রামীণ সুদের কী ভয়াবহ অবস্থা!</p>
<p>কৃষিতে ভয়াবহ লোকসান কিংবা লাভ এত কম হওয়ার পিছনের কারণ খুঁজলে দেখবো সমগ্র বিষয়ের পেছনে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট কাজ করে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেক দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের যাতায়াত ব্যবস্থার যে করুণ দশা, তাতে নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য নিয়ে যেতে বেশ কাটখড় পোড়াতে হয়। এরপর শুরু হয় চাঁদাবাজি! নানা জাতীয় সিন্ডিকেটের কারণে রংপুরের ২ টাকার টমেটো আমাদের হাতে আসতে আসতে দাম হয়ে যায় ৪০ টাকা। কিন্তু কৃষক তো সেই উৎপাদন মূল্য দুই টাকাই পাচ্ছে! খরচ হচ্ছে ২ টাকা, বিক্রিও করছে ২ টাকায়। আর আমরা যারা ক্রেতা, তারা কিনছি ৪০ টাকায়। এই বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দূর্নীতি, আখলাকবিহীন অবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকসমাজ এবং সাধারণ মানুষ। লাভ হচ্ছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের।</p>
<p>LLRD-এর মতে বর্তমানে ৫০% পুরুষ এবং ৬০% নারী কৃষক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ, অন্যান্য চাহিদার কারণে তারা নিজেদের উৎপাদিত শাক-সবজি, নিজেদের চাষ করা মাছ নিজেরাই ভোগ করতে পারছে না। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সন্তানেরাও। আর তারা যতটুকু গ্রহণ করতে পারছে, সেটাতেও আছে কীটনাশক, সার আর ভেজালের সমাহার। তাহলে চিন্তা করে দেখুন! এই চাষী, হাওড়-নদীর জেলে, প্রান্তিক ও ভ‚মিহীন কৃষক, নারী কৃষক, কুটির-শিল্পীদের নিয়ে, তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে কি আমরা একটুও ভাবছি? রাষ্ট্রের কোনো সহযোগিতা বা উদ্যোগ কি আছে? আছে কি কোনো পরিকল্পনা, পর্যালোচনা বা প্রস্তাবনা? অর্থাৎ তারা যা-ই করছে সবটাই গ্রামের মহাজনদের কাছ থেকে সুদ নিয়ে। এতে করে তাদের দারিদ্র্য তো কোনো অংশে কমছেই না, বরং দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। তাদের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থার করুণ দশা। এমনকি শিক্ষা থেকেও তারা অনেক অনেক দূরে।</p>
<p>কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। অথচ বর্তমানে ধান ব্যতীত যাবতীয় কৃষিদ্রব্য আমদানি করতে হচ্ছে। সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ধান উৎপন্ন হচ্ছে। আর যতটুকুই উৎপাদিত হচ্ছে, তা মজুদ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই! তাহলে বাকি ফসল কোথায় যাচ্ছে? মহাজনেরা, বিভিন্ন কোম্পানি কিংবা সাধারণ ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছে। যার ফলে কৃষকরা তাদের কষ্ট, শ্রম, বিনিয়োগের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এমনকি সরকার রাষ্ট্রীয় গুদামের ধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি করছে না।</p>
<p>যারা ধান চাষ করে তাদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি, ২০০২ সালে বর্গাচাষী অর্থাৎ ভ‚মিহীন চাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা ৪৫%, ২০১৬ তে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫% এ। বর্তমানে এ সংখ্যা ৭০% ছাড়িয়ে গেছে। তাহলে ভেবে দেখার বিষয় এই ৭০% কৃষক যেখানে ভ‚মিহীন এবং তাদের চাষকৃত ফসলের ৫০% মালিককে দিয়ে দিতে হচ্ছে, সেখানে এই কৃষকরা কি আদৌ তাদের পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে?</p>
<p>বাংলাদেশে তুলার মোট চাহিদা ৭৩-৭৪ লক্ষ বেল, অথচ দেশে মাত্র ১ লক্ষ ৭১ হাজার বেল তুলা উৎপন্ন হচ্ছে। বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন বাহির থেকে তুলা আমদানিতে আমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি বা অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার যথাযথ উপযোগ থাকলে তা দিয়ে দেশেই প্রায় কয়েক কোটি বেল তুলা উৎপাদন করা সম্ভব! অথচ আমরা ৯০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি কৃষিপণ্য আমদানি করে চলছি! মজার বিষয় হলো, কোনো এক বছরে যদি ১ লাখ ৭১ হাজারের স্থলে ২ লাখ বেল তুলা উৎপন্ন হয়, তাহলে মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাতি আমলা পর্যন্ত বলতে শুরু করবে, “আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।” কিন্তু মূল যে ক্ষতির জায়গাটা, তা আমরা কেউ-ই লক্ষ্য করছি না।</p>
<p>দুধ সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য উপাদেয় একটি খাবার। কিন্তু আমরা কি দেশের মানুষের দুধের চাহিদা মেটাতে পারছি? দেশের ডেইরি ফার্মগুলোর দ্বারাও কি এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে? অথচ এই দুধকে কেন্দ্র করে ৪০-৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেই!</p>
<p>বাংলাদেশের মৎস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশে প্রায় হাজারের উপরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত; এখন হাইব্রিড পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া ছাড়া তেমন কোনো মাছ সহজলভ্য নয়। নদী দূষিত হওয়া, অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকায় আমাদের যে বিশাল রপ্তানি শিল্প তা আজ ধ্বংসের মুখে। হাইব্রিড মুরগী আর ডিমের কথা না হয় বাদই থাকলো!</p>
<p>আমরা লক্ষ্য করছি, পাটশিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আজ বেকার। পাটকলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হল। অথচ এই পাট ছিল আমাদের সোনালি আঁশ। যতটুকু ছিল, সেটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হল। চাইলেই কি এখানে লক্ষ লক্ষ কিংবা কোটির উপরে কর্মসংস্থান করা যেত না?</p>
<p>দেশের অন্যতম একটি বড় শিল্পক্ষেত্র হল চা। চা শ্রমিকদের নিয়ে কোনো আলাপ নেই, নেই কোন উদ্যোগও। তাদেরকে ন্যায্যমূল্য দিয়ে, এখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব ছিল। আমাদের ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, আমাদের মাছ, পাট, চা, তুলা, মসলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি আমরা যথাসময়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতাম, তাহলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হত না। এভাবেই চিনিকল থেকে শুরু করে আমাদের সকল ধরণের ফসল ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুধু ধান ছাড়া প্রত্যেকটি ফসল আমদানী করা হচ্ছে।</p>
<p>গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা, নারীরা এবং তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না তাদের সঠিক চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সকল ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যতটুকুই বা খাদ্য পাচ্ছে সেটুকুও ভেজাল মিশ্রিত। এগুলো খেয়ে রোগাগ্রস্থ হওয়ার পরেও পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা পেলেও যে ঔষধ আমরা ভক্ষণ করি তা সেই একই চক্রের ফসল।</p>
<p>কথিত যে নয়া ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক উপলব্ধি, সচেতনতা তৈরি ব্যতীত মুক্তির পথ খোঁজা আকাশকুসুম কল্পনা। শুধু বীজ, খাদ্য ও ওষুধ নয় প্রত্যেকটি সেক্টর-ই আজ পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দি। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকানের ভাষায়, “<strong>আমরা সবাই যায়নবাদের কারাগারে বন্দী, সেখানে আমরা কতিপয় অবাধ্য কয়েদি। কিন্তু দিন শেষে সবাই কয়েদী।”</strong></p>
<p>মুক্তি জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনার আলোকে সামনে অগ্রসর হয়ে নতুন বাংলাদেশ তথা হারানো ঐতিহ্যের বিনির্মাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বের সেই সোনালী ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা কাজ করি তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব। কেননা আগের সেই খনিজ সম্পদ, জমি, বনাঞ্চল, কৃষক, মানব সম্পদ, নদী, সমুদ্র এখনও বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 556px; top: 10867.4px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16160</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলার কৃষি; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও বর্তমান দুরবস্থার সুলুক সন্ধান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মিফতাহুর রহমান]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 01 Nov 2024 11:24:58 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15174</guid>

					<description><![CDATA[এক. মনে করুন, আপনি একজন প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার। দামী একটা ক্যামেরা নিয়ে ঢুঁ মারছেন উত্তরের কৃষিনির্ভর কোনো একটি গ্রামের মেঠোপথ ধরে। থেকে থেকে ক্লিক-ক্লিক শব্দ তুলে ভরে যাচ্ছে আপনার ক্যামেরার মেমোরি। ইতি-উতি তাকিয়ে পছন্দমাফিক কম্পোজিশন খুঁজছেন আপনি। সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>এক.</strong></h4>
<p>মনে করুন, আপনি একজন প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার। দামী একটা ক্যামেরা নিয়ে ঢুঁ মারছেন উত্তরের কৃষিনির্ভর কোনো একটি গ্রামের মেঠোপথ ধরে। থেকে থেকে ক্লিক-ক্লিক শব্দ তুলে ভরে যাচ্ছে আপনার ক্যামেরার মেমোরি। ইতি-উতি তাকিয়ে পছন্দমাফিক কম্পোজিশন খুঁজছেন আপনি।</p>
<p>সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে তখন। দূরদিগন্তে সূর্য উঁকি দিচ্ছে, গাছ বা কৃষিক্ষেত-এর পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তিম বা কমলা-রং। রক্তিম সে আলোয় ডানা মেলে ক্ষুধার্ত পেটে পাখিরা তাদের নীড় ছাড়তে শুরু করেছে, চতুর্দিকে কান-জুড়ানোর পাখির কলকাকলি। ঘাস ও পাতার ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ভোরের আলোয় মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। সূর্য-গাছ-পাখি-কৃষিক্ষেত—সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। ন্যাচার-ফোটোগ্রাফির জন্য একেবারে উপযুক্ত এক সময়। মনের আনন্দে ছবি তুলেই যাচ্ছেন আপনি। প্রতিটি ছবি যেনো পূর্বের ছবির সৌন্দর্যকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>হঠাৎ-ই আপনার চোখ পড়লো দূরের এক মেঠোপথে। একজন কৃষক তার কাঁধে করে ভার বয়ে নিয়ে চলছেন তার নিজস্ব গন্তব্যে। দু&#8217;পাশে ঝুলছে কোনো এক শস্যে পরিপূর্ণ দু&#8217;টি ডালা। আপনার এবং আপনার অবজেক্টের (কৃষক) মাঝে রয়েছে বেশ বড়সড় একটা কৃষিজমি; সে জমির পাতা ও ঘাসের উপরের তরল বিন্দুগুলো আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে। ছবির জন্য একেবারে দারুণ মুহূর্ত। ক্যামেরাটা চোখের সামনে তুলে একাধারে অনেকগুলো ছবি তুললেন। চোখ থেকে আপনার প্রিয় যন্ত্রটি নামিয়ে ছবিগুলো দেখলেন, স্যাটিসফাইড।</p>
<p>এবার তাহলে ফেরার পালা। ফিরলেন বাসায়। বেছে বেছে দুয়েকটা ছবি সযত্নে রেখে দিলেন। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কারও বাগিয়ে আনলেন কৃষকের সেই ছবিটি দিয়ে।</p>
<p>কিন্তু, আমার মনে আপনার জন্য কিছু প্রশ্ন আছে।<br />
আপনি কি একবারও সেই কৃষকের নিকট গিয়ে তার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে প্রশ্ন করেছেন?<br />
লেন্সের সহায়তায় যে মানুষটার প্রতিকৃতির জন্য আপনি পুরস্কার পর্যন্ত জয় করলেন, সেই কৃষকের মনেও কি তখন এতোটা সুখ ছিলো?<br />
সে কি তার পরিশ্রম আর ফলানো শস্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছে?<br />
আপনি যে ছবিটি দিয়ে গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, সেখানে সেই কৃষক কি আদৌ ভালো আছেন?<br />
গ্রাম-বাংলার সৌন্দর্যই যাদের জন্য, তারাই যদি ভালো না থাকে, তাহলে আপনার এই ছবি তার কী উপকারে আসবে?<br />
আপনার ছবিটা কি তাহলে বাস্তবতা-বিবর্জিত হলো না?<br />
অন্যর দুর্দশাকে সুন্দর দ্বারা পরিবর্তন করে সেটাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করাটা কি অন্যায় না?</p>
<p>উত্তরগুলো জানা খুবই জরুরি। কারণ, গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বুলি আওড়িয়ে প্রতিবছর এমন অসংখ্য ছবি তোলা হচ্ছে। ভুল বার্তা দিয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে মানুষ ও পর্যটকদের। লক্ষ লক্ষ মানুষ উত্তরের এমন এলাকাগুলোয় এসে ভ্রমণ করছে—নিজ খরচ, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে। নিজেদের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা-মনোকষ্ট প্রকৃতির কাছে ন্যস্ত করে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তার স্থানে বদল করে নিয়ে খুশিমনে তারা বাড়ি ফিরছে।</p>
<p><strong>কিন্তু, যারা এই প্রকৃতিকে এমন পরম যত্নে আগলে রেখেছে, যাদের সহায়তায় ফলে আত্মিক প্রশান্তির এমন অসাধারণ এক পরিবেশ উপভোগ করছে সবাই, যাদের হাড়-ভাঙা খাটুনি ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে একেবারে তাজা ও টাটকা শস্য পাচ্ছি আমরা, একবারও কি তাদের নিয়ে আমরা প্রশ্ন করেছি যে, তারা কেমন আছে? কী খাচ্ছে? দৈনন্দিন জীবন কেমন?</strong> সাধারণ খরচের ন্যূনতম অর্থও আসে কোথা থেকে? ফসল কাটার পরমুহূর্তে তাদের অনুভূতি কী? তারা কি তাদের পরিশ্রম ও ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়? তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কী কী সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? নাকি অর্থ বরাদ্দের নামে সব লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছে?</p>
<p>এগুলো গেলো কৃষক বা চাষীর ক্ষেত্রগুলোতে উদিত হওয়া কিছু প্রশ্ন। আবার শস্যের ক্ষেত্রেও এমনই কিছু প্রশ্নের উদয় হয়। যেমন, একই পেশায় নিয়োজিত থাকার পরেও পূর্বের প্রজন্মের তুলনায় এই প্রজন্মের গড়-বয়স কমছে কেন? একই জমির একই শস্য কেন আমাদেরকে পূর্বের মতো শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়ক হচ্ছে না? কেন কৃষকেরা প্রতিনিয়তই শ্বাসকষ্টের রোগী হচ্ছে এবং সে সংখ্যাটা কেন উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে? রাসায়নিক সার বা রাসায়নিক ঔষধের পরিমাণ কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত? এতো পরিমাণ রাসায়নিক সার বা রাসায়নিক ঔষধ দেবার পরেও কেন শস্যে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমে না?</p>
<p>প্রশ্নগুলো উত্তর জানা জরুরি। শুধু প্রশ্ন করে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করার কোনো অর্থই হয় না। বিপরীতে যৌক্তিক প্রতিটি প্রশ্নের জন্য প্রয়োজন যৌক্তিক ব্যাখ্যা। নতুবা বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও বড় ধরনের কোনো ঘাপলা রয়েছে। আর সেসবের সমাধানও করতে হবে।</p>
<p>চলুন, তাহলে এবার এসব সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার জগতটাকে উন্মোচন করি। একটু দেখে আসি বাংলার কৃষকেরা কেমন আছেন! জেনে আসি তাঁদের উৎপাদিত ফসলগুলো কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত!  বর্তমান এই বিশ্বব্যবস্থাপনার কাছে তাঁরা কতোটুকু জিম্মি! রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা কতোটুকু অসহায়! কতোটা দুর্বিষহ তাঁদের দৈনন্দিন জীবন!</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>দুই.</strong></h4>
<p>প্রথমেই একটু নজর দেই একজন কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে।</p>
<p>“আধুনিকতা”র বর্তমান এই সময়েও একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবনটা খুবই দুর্বিষহ। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বা ঘামে ভেজা একটা শরীর নিয়ে একদম ভোরে জেগে ওঠে সাধারণ একজন কৃষক। বাসায় থাকে না পর্যাপ্ত পরিমাণের খাবার। যতটুকু থাকে, তা দিয়ে সকাল-দুপুরের খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। অতএব, দু&#8217;মুঠো চিড়ে-গুড় খেয়ে কৃষির সরঞ্জামাদি নিয়ে সকালে বের হয় জমির উদ্দেশ্যে।</p>
<p>সকাল-দুপুর কাটে জমিতেই। মাঝে একটু দুবেলা খাওয়ার জন্য কাজ থেকে অবসর নিতে হয়। বাসা থেকেই বাটিতে করে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় জমিতেই। দুপুরে খাওয়ার পর হয়তো কোনো এক গাছের নিচে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নেয়। এভাবেই কাটে বিকেল পর্যন্ত। বিকেলের দিকে টুকটাক কিছু সবজি নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় একজন কৃষক।</p>
<p>সবজি বিক্রি শেষে যতটুকু বা আয় হয়, তা নিয়ে পরেরদিনের খাবারের জন্য চাল-ডাল কেনা হয়। আবার যেসব সবজি সকালে বিক্রি করতে হয়, সেসব সবজি দিনের শুরুতে নির্দিষ্ট বড় একটি হাটে বিক্রি করে সে অর্থ দিয়ে আগামী কিছুদিনের খাবারের জন্য বাজার করে নিয়ে আসে অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করা একজন কৃষক।</p>
<p>দিনভর একটানা হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যার পরে পরিবারের সকলের সাথে কথা বলার সুযোগ হয় একজন কৃষকের। সেসময়টাতেই খোঁজ নেয় সে পরিবারের বাকী সদস্যদের। অর্থাভাবে সন্তানদের সে দিতে পারে না পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ। আবার, বাহ্যিক বেশভূষার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও প্রতিনিয়ত সে হয় নিগৃহীতের শিকার। অর্থাভাবে বাধ্য হয়ে কৃষকরা তাদের সন্তানদেরকে ভর্তি করিয়ে দেয় সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু, এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার মান যে কতোটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার ভয়াবহ সমীকরণ আমরা পত্রিকার পাতা থেকে শুরু করে একজন শিক্ষার্থীর মুখেও শুনি।</p>
<p>এই গেলো এক অবস্থার কৃষকদের জীবন। আরেক অবস্থার কৃষকদের জীবনটাও এমন। তবে, বিভিন্ন মৌসুমে ফলিত ফসল, যেমন–চাল, গম বা আলু নিজেদের জন্যই রেখে দেয় পরের মৌসুমে পুনরায় ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত। সে সময় পর্যন্ত শুধু এই ফসলটুকুই তাদের খাবারের একমাত্র সম্বল।</p>
<p>এদের আয়ের সময়ই থাকে মাত্র তিনটে। রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২, অর্থাৎ, একমাত্র ফসল ঘরে তোলার সময়ই বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয়, সে আয় দিয়েই তাদের পরের মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চলতে হয়। এরা আবার সবজি বিক্রি না করে লম্বা সময়ের ফসলের পেছনে নজর দেয়। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের জীবনটাও পূর্বের অবস্থার কৃষকদের মতোই।</p>
<p><strong>এখানে দু&#8217;ধরনের কৃষকদের কথা তুলে ধরা হলো। একদল শুধু দীর্ঘকালীন সময়ের ফসলগুলো নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করে, আরেকদল প্রতিনিয়ত স্বল্পকালীন টাটকা সবজি বিক্রি করে। তবে, এরা যে আবার দীর্ঘকালীন ফসল ফলায় না, বিষয়টা তেমনও না। অথবা, যারা শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ফসল বিক্রি করে, তারা যে আবার একেবারেই সবজি ফলায় না, সেটাও না। কিন্তু, এখন প্রশ্ন হলো, স্বল্পকালীন হোক বা দীর্ঘকালীন, কৃষকরা কি তাদের কষ্ট, পরিশ্রম ও ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়?</strong></p>
<p>মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে গত কয়েকবছর ধরেই টেলিভিশন-পত্রিকায় কৃষকদের আন্দোলন বা বিক্ষোভের ঘটনা আমরা শুনে আসছি। ফসল কাটার পর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সড়কে ফসল ফেলে বিক্ষোভ বা অবরোধ করা গত কয়েক বছরের একেবারে সাধারণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>জমি চাষ থেকে শুরু করে বীজ ক্রয়, বীজ বপণ, পরবর্তী পরিচর্যা, সেচ প্রদান, কয়েকধাপে রাসায়নিক সার দেওয়া, আগাছা নির্মূল, ফসল কাটা ও মাড়াই করা এবং পরিশেষে বাজারজাত করা—দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন কৃষক তার ফসলের মুখ দেখতে পায়। কিন্তু, এই প্রক্রিয়ার প্রতিটা পর্যায়েই এখন যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, একজন কৃষক তার ফসল বিক্রি করে লাভ তো দূরে থাক, ব্যয়িত অর্থই সে এখন তুলতে পারে না।</p>
<p>এই ন্যায্যমূল্যটুকু না পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো মধ্যস্বত্বভোগী  একটি দল। সরকার কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তাদের জন্য কৃষকরা নির্দিষ্ট সে দামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কেননা, এতো পরিমাণ ফসল হয়তো তাকে এদামেই বিক্রি করতে হবে নতুবা তার ফসলগুলো পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে।</p>
<p>এখন, একজন কৃষক যদি ৩-৫ মাস টানা পরিশ্রমের পর তার ব্যয়িত অর্থই তুলতে না পারে, তাহলে সে কীসের উপর ভিত্তি করে কৃষিকাজ চালু রাখবে? এদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য রয়েছে, কৃষিকাজ ছেড়ে তারা ইতোমধ্যে শহরমুখী হয়ে শিল্প-কারখানার সাথে সম্পর্কিত কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের অবস্থা প্রতিনিয়তই অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমাদের সামনে প্রতিবছর দারিদ্র্যের যে হার উপস্থাপন করা হয়, তা যে পুরোটাই সাজানো একটি মিথ্যা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</p>
<p>অর্থাৎ, অর্থনৈতিক দিক থেকে গ্রাম-বাংলার প্রতিটি কৃষকই চরম দারিদ্রের মাঝে দিনাতিপাত করে। কোনো দুর্ঘটনায় যদি তাদের আকস্মিকভাবে অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তখন তাদের একমাত্র সম্বল হয় গ্রামীণ ব্যাংকগুলো। সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটি সুদের হারে টাকা তুলে এনে সে খরচ বহন করে। একারণেই গ্রামের এমন কোনো কৃষক নেই, যে এমন ঋণের জালে আবদ্ধ না, এসব সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি না।</p>
<p><strong>শোনা যায়, প্রতিবছরই রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এসব দরিদ্র কৃষকদের জন্য ভর্তুকি হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার ১০-২০%-ও যদি তাদের কাছে পৌঁছাতো, তাহলে দৈনন্দিন খাবারের ক্ষেত্রে অন্তত টানাপোড়েনে থাকতে হতো না একটি কৃষক পরিবারের।</strong> তাহলে টাকাগুলো যায় কোথায়? উত্তরটা হয়তো সকলেরই জানা, কিন্তু মুখ খোলার সামর্থ্য নেই গ্রাম্য কোনো চেয়ারম্যান বা মেম্বারেরও।</p>
<p>এমনকি, দেশের আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে যখন আইএমএফ-এর নিকট থেকে “আর্থিক সাহায্য”-এর নামে চড়া সুদে ঋণ চাওয়া হয়,  আইএমএফ তখন শর্ত দেয় যে, এই “আর্থিক সাহায্য” তখনই দেওয়া হবে, যখন দেশের কৃষি সেক্টরে ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হবে।</p>
<p>বিষয়টা অদ্ভুত না? আমরা “আর্থিক সাহায্য”-এর নামে চড়া সুদে ঋণ নিতে গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ একটা বিষয়ে কেন সে শর্ত দেবে? তাহলে কি বৈশ্বিকভাবেই কৃষিকে কোণঠাসা করা হচ্ছে? নাকি মানবসভ্যতাকে কুক্ষিগত করার একটা মাধ্যম হিসেবে কৃষিকে ব্যবহার করা হচ্ছে? বিষয়টার তাহলে শুরু ও শেষ কোথায়? মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে কি বৈদেশিক কোনো সংস্থার যোগসূত্র আছে? গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর এমন চড়া সুদে ঋণ দিয়ে পুরো একটা সমাজকে জিম্মি করার অর্থ কী তাহলে? এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য কী আসলে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>তিন.</strong></h4>
<p>এবার তাহলে কৃষিপণ্যের দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>আজ থেকে একযুগ আগেও চাষের জন্য প্রায় ৯০% কৃষক নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করতো। এতে যে ফলন খারাপ হতো, তা-ও নয়। সবসময় প্রায় একই পরিমাণের ফসল পেতো। এজন্য তারা বলে দিতে পারতো অমুক জমিতে এই বীজে এতো পরিমাণ ফলন হবে। কিন্তু, মাত্র একযুগের ব্যবধানে কৃষকের নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজের ফলন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে, <strong>বাধ্য হয়ে কৃষকদেরকে আজ প্যাকেটজাত বীজ এবং হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।</strong></p>
<p>এর অন্যতম একটি কারণ হলো, জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা। <strong>কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জমির উর্বরতা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। একপর্যায়ে গিয়ে বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজগুলো রাসায়নিক সার মিশ্রিত মাটির সাথে অভিযোজন করতে পারে না। ফলে, ফলনের পরিমাণ উত্তরোত্তর কমতে থাকে। তখন কৃষক বাধ্য হয় প্যাকেটজাত বীজ এবং হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকতে।</strong></p>
<p>তবে, প্যাকেটজাত বীজ বা হাইব্রিড বীজের পাশাপাশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করার পরেও কেন তাহলে জমির উর্বরতা কমছে? ফ<strong>সলের ফলন বেশি হলেও কেন সে ফসলকে খেয়ে পূর্বের মতো শক্তি অর্জন করা সম্ভব হয় না? গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন যুবকের কেন এখন শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা হচ্ছে?</strong> বিষয়গুলো কি তাহলে প্যাকেটজাত বীজ, হাইব্রিড বীজ বা পাশাপাশি রাসায়নিক সারের কোনোভাবে সম্পৃক্ত?</p>
<p>প্রথমেই আসি প্যাকেটজাত বীজ বা হাইব্রিড বীজের বিষয়ে। মূলত, হাইব্রিড বীজ ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে উচ্চমাত্রায় কীটনাশক, সেচ ও সার ব্যবহার করার প্রয়োজন পরে। অন্যদিকে, বাড়িতে সংরক্ষণ করা বীজগুলো পরবর্তী বছরে একই পরিমাণল ফসল এবং পণ্য উৎপাদন করে বা তারচেয়েও কম করে, তাই কৃষক প্রতি বছর নতুন বীজ কিনতে বাধ্য হয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার তাড়নায় কৃষক প্রতি বছর হাইব্রিড বীজের পিছনে টাকা খরচ করছে। এভাবেই মূলত ধ্বংসাত্মক এই বৃত্তটির উদ্ভব হয়েছে।</p>
<p>এবার আসি রাসায়নিক সারের বিষয়। মূলত, রাসায়নিক সারের পুরো অংশটাই বিষাক্ত। রাসায়নিক সারের মাধ্যমে বা কীটনাশক ব্যবহার করে ফসলের যে পরিমাণ উপকার করা হচ্ছে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষরা। কৃষকরা এসব সার বা কীটনাশক স্প্রে-র মতো ব্যবহার করার সময় তাদের নাক, মুখ ও রোমকূপে প্রবেশ করে তাদের শারীরিক ক্ষতি করছে। পাশাপাশি, এসব ফসল খেয়ে মানুষের মাঝে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং ক্যান্সারের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে।</p>
<p>কিন্তু, এসব কীটনাশক বা রাসায়নিক সার স্লো-পয়জন বা দীর্ঘস্থায়ী বিষ হওয়ায় আমরা এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না, এর প্রভাবটা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় নির্দিষ্ট একটা বয়সে গিয়ে। তবে, এসব খাবার খেয়ে শরীর দুর্বল লাগা বা শরীরে মেদ জমার বিষয়টা কিন্তু আমরা আবার ঠিকই অনুভব করতে বা বুঝতে পারি।</p>
<blockquote><p>এরচেয়েও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, <strong>যে কোম্পানিগুলো হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন করে বাজারজাত করে, তারাই আবার সেসব বীজের কীটনাশকও উৎপাদন করে। এমনকি, এসব কোম্পানিই আবার মানুষের জন্য ঔষধও উৎপাদন করে থাকে। সেসব কোম্পানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটা হলো, Cargill-কারগিল, DuPont-ডুপন্ট, Pioneer-পাইওনিয়র, Bayar-বায়ার, Monsanto-মনসান্টো, Syngenta-সিনজেনটা, BASF-বাসফ ও Hayera-হায়েরা।</strong></p></blockquote>
<p>অতএব,<strong> বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তারাই বীজের মাঝে অপ্রতিরোধ্য সব কীট এবং মানুষের বিভিন্ন রোগের ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে দেয়।</strong> ফলশ্রুতিতে, কৃষক বা চাষীরা ঐসব রোগের কীটনাশকই খুঁজে বেরায় এবং পরিশেষে, মানুষের রোগের ক্ষেত্রেও তাদের নিকটই যেতে হয়। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ একটা জাতি এসব কোম্পানির কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।</p>
<p>আবার, আশির দশকে সবুজ বিপ্লব শুরু হলে হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়া হয়। এরপর নব্বইয়ের দশকে “জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র”-এর চিন্তাভাবনা শুরু হয়। বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে বীজগুলো নিজেদের আয়ত্তে রাখার জন্যে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও তাদের সংগঠনগুলো নতুন পরিকল্পনা করে। তারা জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোর থেকে বীজ হাতিয়ে নেয়ার জন্যে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় রকেফেলার ফাউন্ডেশন, গেটস ফাউন্ডেশনসহ এরকম সাম্রাজ্যবাদী সংগঠনগুলো নরওয়ের সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়।</p>
<p>এটি সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে করার কারণ এখানে প্রচুর বরফ থাকে এবং এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত না করতে পারে। এই কারণগুলোকে প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে নিয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে কেন এরকম একটি আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রের দরকার। এভাবে বুঝিয়ে কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে চাপ প্রয়োগ করে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই তারা বীজ সংরক্ষণ করে আসছে।</p>
<p>এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা ঘটনা হলো, ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পর তাদের জাতীয় বীজ সংরক্ষণাগার থেকে অনেক বীজের নমুনা হারিয়ে যায়, যা আজও পাওয়া যায়নি! সেগুলো কোথায় গেছে, তার হদিসও কেউ দিতে পারেনি। এমনকি, সিরিয়ার সংকট তৈরি হওয়ার পর স্বয়ং সভালবার্ড থেকেও কিছু সিরিয়ান বীজ হারিয়ে যায়!</p>
<p>কৃষি ও খাদ্যের মাধ্যমে যে আমাদেরকে আমাদের অজান্তেই শোষণ করা হচ্ছে, তার একটা উদাহরণ পাওয়া যায় আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও যায়নবাদীদের অন্যতম হোতা হেনরি কিসিঞ্জারের একটি উক্তির মাঝে,<br />
<strong>❝যদি আপনি তেল নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে আপনি দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, যদি আপনি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে আপনি বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আর এই খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই আপনাকে এর মূল উপাদান বীজকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।❞</strong><br />
সে আলোকে এটা বলাই যায় যে, কোনো দেশের উপর অবরোধ আরোপ করতে হলে শুধুমাত্র বীজের উপর অবরোধ করেই তাদের সহজে কাবু করা সম্ভব হবে।</p>
<p>তাহলে আশা করি, একজন পাঠক হিসেবে হেনরি কিসিঞ্জার-এর মন্তব্য, নরওয়ের বিখ্যাত সভালবার্ড বীজ সংরক্ষণাগার আর হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন—এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় করতে পেরেছেন।</p>
<p>অতএব, আইএমএফ-এর ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষিতে ভর্তুকি কম দেওয়ার শর্ত, গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর চড়া সুদে ঋণ প্রদান করে কৃষকশ্রেণিকে জিম্মি করা বা মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া ব্যবসার পেছনের রহস্যগুলো তাহলে এবার একটু হলেও খোলাসা হয়েছে বলে আশা করি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>চার.</strong></h4>
<p>সাধারণত কোনো কিছুর সমালোচনা করলে নিশ্চায়ই কোনো কিছুর সাথে তুলনা করেই সমালোচনা করা হয়। অর্থাৎ, সমালোচনার অবশ্যই একটা ভিত্তি থাকে। বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও কৃষকের বর্তমান অবস্থাটা সমালোচনামূলকভাবে সামগ্রিক যে বিষয়টা তুলে ধরা হলো, তারও একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সেটি হলো, ইসলামী সভ্যতায় বাংলা অঞ্চলে কৃষির ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা। তাহলে বর্তমানে আমাদের অবস্থা এতোটা শোচনীয় কেন? এর উত্তর জানতে হলে আগে পশ্চিমাদের দর্শন নিয়ে একটু জানা প্রয়োজন।</p>
<p>শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের হোতা এবং জায়নবাদের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমাদের দর্শনই হলো মানুষকে মানুষ মনে না করা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় কথায়, আচরণ এবং দর্শনে। যেমন,</p>
<ul>
<li>০১. শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধারণা হলো, “আমি সাদা, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি ইউরোপীয়, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমার জন্ম আমেরিকায়, তাই আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”</li>
<li>০২. ইউরোপীয়দের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্বাস হলো, “ইউরোপীয়দের ন্যায় যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোনো জাতির অস্তিত্ব নেই।”</li>
<li>০৩. বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদের মূল দর্শনই হলো শক্তির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার। ডারউইনের &#8216;সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট&#8217; তত্ত্বও এ শক্তির আধিপত্যের ধারণারই ফলাফল। তারা ব্যতীত বাকীরা ধ্বংস হয়ে যাবে-এটিই তাদের নিয়তি।</li>
<li>০৪. আমরা সকলেই জানি, বর্তমান পৃথিবী জায়নবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই জায়নবাদী ইহুদীদের অন্যতম নাথান রথচাইল্ড একবার বলেছিলেন,<br />
❝সাম্রাজ্য পরিচালনা করার জন্য কে রাজা হলো তা আমার দেখার বিষয় নয়, আমার দেখার বিষয় হলো টাকা বা অর্থ। সত্যিকারের শাসক মূলত সে-ই, যার অর্থ আছে।❞</li>
<li>০৫. চার্চিল আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। আমাদের গম, চাল খাদ্য সঙ্কট দূর করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তারা আমাদের এ সকল খাদ্যদ্রব্য লুট করে নিয়ে যাওয়ার কারণে ৪.৩০ মিলিয়ন বাঙালী খাদ্যাভাবে মৃত্যুবরণ করে। দুর্ভিক্ষের বিষয়ে চার্চিলকে জিজ্ঞেস করা হলে চার্চিল জবাব দেন,<br />
❝তারা যদি এত সন্তান জন্ম না দিতো, তাহলে তো এত মৃত্যুবরণ করতো না!❞</li>
</ul>
<p>নিজেদেরকে এমন শ্রেষ্ঠ মনে করার কারণেই ভারত উপমহাদেশে এসে তারা শোষণ, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। নিজেদের এমন দর্শনের কারণেই পরিকল্পিতভাবে ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসনের নামে শোষণ ও আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে।</p>
<p>ব্রিটিশদের শোষণের ভয়াবহতা এতোই ছিলো যে, সঠিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, ১৭৭১ সালের দুর্ভিক্ষের পূর্বে বাংলাদেশের রাজস্ব (১৭৬৮ সালে) ছিলো ১ কোটি ৫২ লক্ষ ৪ হাজার ৮ শত ৫৬ টাকা। কিন্তু, এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এ&#8217;অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরও ১৭৭১ সালে রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৫ শত ৭৬ টাকায়। একটু চিন্তা করলেই আমরা এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারব। তাদের শাসনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় জনগণ এ ধরণের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।</p>
<p>“বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা&#8221; নামক গ্রন্থে হেমাচন্দ্র কান্নগো বলেন, <strong>এই জমিদাররা প্রতি একরে এতো বেশি খাজনা এবং জুলুমপূর্ণ কর আরোপ করা শুরু করে, যা ছিলো সম্পূর্ণ বে-আইনী। কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ, সরকারকে প্রদান করা অর্থের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিলো। অর্থাৎ সরকারকে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই যেধরণের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও অর্থনীতির ধস নেমে আসে, জুলুমের শিকার হতে থাকে তার থেকে ৫ গুণ বেশি খাজনা এ&#8217;সব জমিদাররা আদায় করতে শুরু করে। এদিকে ব্রিটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তাদের ভূমির রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত যে রাজস্ব ছিল তার থেকে আরও বৃদ্ধি করে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ৩৩ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন এক ভয়াবহ আগ্রাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।</strong></p>
<p>মেমোরেন্টাম অন দি পার্লামেন্ট সেটেলমেন্টের ৪০ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, তাদেরই এজেন্ট সেন্সেস কমিশনার স্যার টমাস মন্ড্রোর মতে, ১৮৪২ সালে উপমহাদেশে ভূমিহীন কৃষকের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। কিন্তু ১৮৭২ সালে অর্থাৎ ৩০ বছরের ব্যবধানে আমাদের ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ লক্ষে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ করতে করতে ১৯৩১ সালে দেখা যায়, সেন্সেস অনুসারে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলা অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ৭০ ভাগ জনগণই ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছে। বাকী যে ৩০% এর ভূমির মালিকানা ছিলো, খোঁজ করলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মালিকানা ছিলো নিতান্তই হাতে গোনা কয়েকজনেরই। অধিকাংশই ছিলো জমিদার কিংবা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত এজেন্ট। এরা মূলত লুণ্ঠনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে জমিদার এবং খাজনাভোগী শ্রেণির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তারা জুলুমকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে, তাদের শোষণের মাত্রা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতে তাদের এজেন্টদের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করতে থারে যা দশ বছরের ব্যবধানে ৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>এস. কে চ্যাটার্জীর বইয়ের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে মোট দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ছিল ১৩ এবং এইসব দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও অধিক। কিন্তু, ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের ফল সহজপন্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং ৪ কোটি সমপরিমাণ মানুষের প্রায় ৬ মাসের খাদ্য ও সব শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণের জন্য রেলপথের স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ১৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। উপমহাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জমিজমা, বিভিন্ন সম্পদ, মাঠ, ঘর-বাড়ি নষ্ট করে তার উপর দিয়ে রেলপথ বসায় এবং দেখানো হয় তারা অনেক পরিকল্পিত, উন্নত ও সংরক্ষিত উপায়ে উন্নয়ন করছে। অথচ এই স্থাপনার ক্ষেত্রে তারা মোটেও জনগণ এবং কৃষকদের বাস্তবিক অবস্থার দিকে নজর দেয়নি। তারা নজর দিয়েছিলো তাদের লুণ্ঠনের দিকেই, লুণ্ঠন তরান্বিত হওয়ার পন্থার দিকেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, তাদের তৈরিকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী যদি অফিসিয়ালি মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সংখ্যা এটা হয়, তাহলে বুঝাই যাচ্ছে তা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের। প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলির অবস্থা তাহলে কি হয়েছিলো? ২০ বছরের ব্যবধানে যদি কোটি কোটি লোক মারা যায়, তাহলে সত্যিকার বাস্তবিক অবস্থা কি হয়েছিলো? উপমহাদেশে যার ফল আমরা আজও ভোগ করছি।</p>
<p>যাইহোক, এভাবেই তারা ভারতের সবেচেয়ে বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি কৃষিকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তাহলে কৃষিতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল এবং তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের তুলনা করলেই বিষয়টা আরো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবন এবং কৃষিপণ্য ও কৃষির সামগ্রিক অবস্থা মাত্রই তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, পশ্চিমাদের মনোভাবটাও আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়েছে এবং এদেশের কৃষির প্রতি তাদের ‘সুমহান’ কৃতকর্মের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, তাদের নিয়ে আর বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। সেহেতু, এবার একটু ইসলামী সভ্যতায় বাংলা অঞ্চলে কৃষির ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা-দিকে নজর দেওয়া যাক।</p>
<p>দিল্লি সালতানাতের সময় যতদিন বাংলা তার অধীনস্থ ছিলো, ততোদিন সালতানাতের সবেচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থের যোগান দেওয়া হতো এই বাংলা থেকে। মুঘল আমলে এই বাংলাই সমগ্র বিশ্বের ২৫-২৯% জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। বাংলার এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণটা ছিলো কৃষির প্রাচুর্য। বাংলার মাটি ছিলো যেমন উর্বর, এর আবহাওয়াও ছিলো তেমনি উপযোগী।</p>
<p>বাংলায় যে পরিমাণ শস্য উৎপাদন হতো, প্রায় ৫০-৬০টি দেশে সেসব রপ্তানি করা হতো। মুসলিমরাই ছিলো চিনির উদ্ভাবক, কেননা এই অঞ্চলে যে পরিমাণ আখের চাষ হতো, তা আর কোথাও হতো না। এমনকি, আজকে সারা বিশ্বে প্রচলিত মশলাপাতির প্রায় ৭০-৭৫%-ই এই ভারতীয় উপমহাদেশে আবিষ্কৃত। মুঘল আমলের মশলাগুলো আজও সমানভাবে সমাদৃত।<br />
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-2983821056776451" crossorigin="anonymous"></script><br />
<ins class="adsbygoogle" style="display: block; text-align: center;" data-ad-layout="in-article" data-ad-format="fluid" data-ad-client="ca-pub-2983821056776451" data-ad-slot="6155617955"></ins><br />
<script>
     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
</script></p>
<p><strong>বাদশাহ আলমগীরের সময় বাংলার কৃষি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। মীর জুমলা (১৫৯১- ১৬৬৩) এবং শায়েস্তা খাঁর (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) আমলে উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছিল সর্বাধিক সস্তা। টাকায় আট মণ চা পাওয়া যেত। এ&#8217;সময় বাংলা অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে।</strong></p>
<p>এই বাংলা অঞ্চল নদীমাতৃক হওয়ায় বাংলার নদীর মাছগুলোর জন্য প্রায় ৫০টিরও অধিক অঞ্চল থেকে বাণিজ্য করতে আসতো। যেহেতু এই অঞ্চলের পাশেই রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র, আবার সে সময়ের বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় মাধ্যম সমুদ্রপথ হওয়ায় এই বাংলা সমগ্র বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলো। বার্থেমা ও বাবুর্সা ১৬ শতকে এই অঞ্চল ভ্রমণ করে বলেন,</p>
<blockquote><p>❝এখানকার মানুষেরা প্রতিটি শহরকেই একেকটি বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।❞</p></blockquote>
<p>এভাবেই বাংলা অঞ্চল এভাবেই সমগ্র বিশ্বের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভ্রমণপিপাসুরা বাংলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শুধু যে কৃষিতেই বাংলা অঞ্চল সমৃদ্ধশালী ছিলো, তা নয়। বরং, নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার ছিলো এই বাংলা অঞ্চল। সামগ্রিকভাবে কয়েকজনের কয়েকটি বক্তব্য শোনা যাক।</p>
<ul>
<li>০১. ইবনে বতুতা—<br />
<strong>❝নদী পথে মিশরের নীল নদের মতো ডানে-বামে ছিলো অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজী এবং গ্রামের পর গ্রাম। আমরা গ্রাম ও উদ্যানরাজীর মধ্য দিয়ে ১৫ দিনের মতো চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে আমরা একটি সাজানো উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলেছি।❞</strong></li>
<li>০২. একজন চীনা দূত—<br />
<strong>❝এর অঞ্চলে ভূমি এতটাই উর্বর এবং এর উৎপাদন এতই বেশি যে, একই জমিতে প্রতি বছর দুই থেকে তিন ধরণের ফসল তারা পায়। কোনো রকম যত্ন না করেও অঞ্চলের ভূমি থেকে কৃষকরা তাদের চাহিদার থেকেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে।❞</strong></li>
<li>০৩. আবুল ফজল—<br />
<strong>❝বাংলার মাটি এতো বেশি উর্বর ছিলো যে, একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হতো। যদি এই অঞ্চলের চালের প্রত্যেক প্রকার থেকে একটি করে শস্যকণা সংগ্রহ করা হতো তাহলে একটি কলস ভরে উঠতো।❞</strong></li>
</ul>
<p>এরপর,<br />
আমরা দ্রব্যমূল্যের ক্রয় ক্ষমতার দিকে তাকালে লক্ষ্য করি, সে সময়ের সবকিছু বিদেশে রপ্তানি হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের ফলে ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ আখলাকী উদ্যোগের ফলে প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত সস্তা দরে পাওয়া যেতো। বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় লেখকগণ বিকৃতভাবে উল্লেখ করলেও দেখা যায়, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিলো। যার ফলে সবাই নিজ চাহিদা মতো খাবার ক্রয় করতে পারতেন। এমনকি ক্রয় করার পরেও তাদের কাছে অর্থ উদ্ধৃত থেকে যেতো। এজন্যই ইবনে বতুতা মন্তব্য করেন পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন একটি দেশ দেখেননি যেখানে জিনিসপত্র বাংলা অঞ্চলের মতো এতো সস্তায় বিক্রি হয়। তিনি দেখেন যে এ দেশ চালে পরিপূর্ণ ও ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর।</p>
<p>১৬৪০ সালে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ভ্রমণ করে সিবাস্তিয়ান মাররিক বলেন, প্রত্যেক বাজারে বা শহরে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্য, সুতির বস্ত্র প্রভৃতির প্রাচুর্য এতো বেশি ও সস্তা ছিল যে মাত্র একটি বাজার থেকে এসব জিনিসপত্র অল্প দামে ক্রয়পূর্বক জাহাজ বোঝাই করে নেওয়া যেতো। যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলের সাথেই ব্যবসা করতে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতো। এ অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক হারে উৎপাদন করে তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতো।</p>
<p>এছাড়াও তিনি মন্তব্য করেন, শহরগুলিতে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য এতটাই সাধ্যের মধ্যে ছিলো যে তিনি দিনে কয়েকবার আহার করতে প্রলুব্ধ হতেন। ইবনে বতুতা অনেকগুলো দ্রব্যের বর্ণনা দেন। যেমন–মাত্র ৮ দিরহামে ৮০ রাতল ধান পাওয়া যেতো। ১ রৌপ্য দিনারে ২৫ রাতল চাল পাওয়া যেতো। ১ আনা ৯ পাইয়ে বর্তমান ওজনের ১ মণ চাল পাওয়া যেতো। এভাবে প্রতিটি পণ্যই এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অনেক সস্তা ছিলো। যার ফলে এ&#8217;অঞ্চলের মানুষ যতটুকু আয় করতেন ততটুকু দিয়ে তারা তাদের খাদ্য, বস্তু কেনার পরেও তাদের আয়ের একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থাকতো।</p>
<p>সে আমলে জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক বেশি ছিলো। পাশাপাশি মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বলয়ের কারণে মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী হয়ে উঠে। নারী-পুরুষ সকলেই তাদের স্ব-স্ব জায়গা থেকে সাধ্যমতো পরিশ্রম করে। যার ফলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান, কৃষির ভিত্তি, বস্ত্র বা সব ক্ষেত্রে বিশাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আখলাকী এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট একটি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর শ্রমনীতির দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতেন তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে তার বাৎসরিক অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটে যেতো।</p>
<p>যেমন, <strong>মুঘল সালতানাতের সময়কালে শ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারিত ছিলো সেটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক মজুরি হিসেবে তৎকালীন সময়ে একজন শ্রমিক দুই দম আয় করতেন। তাহলে তার মাসে আয় হতো ৬০ দম অর্থাৎ বছরে তার আয় হতো আঠারো টাকার সমান। জীবন ধারণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতোটাই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল যে, ইবনে বতুতা বলেন তার জনৈক বন্ধু আল মাসুদী বাংলা অঞ্চলের একজন নাগরিক যিনি বছরে আয় করেন ১৮ টাকা। কিন্তু তার বছরে খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র ক্রয় করতে ব্যয় হয় ৮ দিরহাম বা ১ টাকা। পারিবারিক অন্যান্য সদস্যের চাহিদা এবং খাদ্য-বস্ত্র সব মিলিয়ে তার আয়ের তিন ভাগের দুইভাগ খরচ হতো।</strong> আর এক ভাগ থেকে যেত। কারও কারও ক্ষেত্রে ১ ভাগ ব্যয় হতো আর বাকি দুই ভাগই উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যেতো। আবার তিনি বলেন, অনেকের সারা বছর ২ বা ৩ টাকার বেশি প্রয়োজন পড়তো না। ফলে ১৫ টাকার মতো উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। এসব উদ্বৃত্ত টাকা সেই সময়ের মুসলমানদেরকে ওয়াকফ, দান, সাদাকাহ, যাকাতের দিকে ব্যাপকভাবে ধাবিত করে।</p>
<p>মুসলিমরা তাদের এই বাৎসরিক উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি অংশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রেরণ করতো। বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল, দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল, যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে এমন অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। রাষ্ট্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি বাজেট দিতে পারতো। যার কারণে বলা হয় ইসলামী সভ্যতার ১২শত বছরের শাসনামল ছিল পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনামল। গোটা দুনিয়াতে হত দরিদ্র খুঁজে পাওয়া, অনাহারী মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাত তথা ইসলামী সভ্যতা যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ৭ শত বছরে আমাদের অর্থনৈতিক জিডিপি ছিলো ২৯%। অর্থাৎ যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ইসলামী সভ্যতার এ অঞ্চলে সেই বিশাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কেমন? সে ব্যাপারে আমরা কতটুকুই বা অবগত?</p>
<p>অথচ, বর্তমানে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। হাল আমলের গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা, নারীরা এবং তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না তাদের সঠিক চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সব ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যতটুকুই বা খাদ্য পাচ্ছে সেটুকুও ভেজাল মিশ্রিত। এগুলো খেয়ে রোগগ্রস্ত হওয়ার পরেও পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা পেলেও যে ঔষধ আমরা ভক্ষণ করি তা সেই একই চক্রের ফসল।</p>
<p>কথিত যে নয়া ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক উপলব্ধি, সচেতনতা তৈরি ব্যতীত মুক্তির পথ খোঁজা আকাশকুসুম কল্পনা। শুধু বীজ, খাদ্য ও ওষুধ নয় প্রত্যেকটি সেক্টর-ই আজ পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দি। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকানের ভাষায়, &#8220;আমরা সবাই যায়নবাদের কারাগারে বন্দী, সেখানে আমরা কতিপয় অবাধ্য কয়েদি। কিন্তু দিন শেষে সবাই কয়েদী।&#8221;</p>
<p>মুক্তি জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনার আলোকে সামনে অগ্রসর হয়ে নতুন বাংলাদেশ তথা হারানো ঐতিহ্যের বিনির্মাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বের সেই সোনালী ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা কাজ করি তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব। কেননা আগের সেই খনিজ সম্পদ, জমি, বনাঞ্চল, কৃষক, মানব সম্পদ, নদী, সমুদ্র এখনও বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>পাঁচ. অন্তিম রেখা</strong></h5>
<p>মূলত এতক্ষণ যে আলোচনা করা হলো, তা ছিলো, ইতিহাসের আলোকে বর্তমান কৃষি ও কৃষকের সরেজমিন পর্যালোচনা। সম্পূর্ণ বিষয়ের পেছনে উৎসাহ ও উদ্দীপনা জাগিয়েছে সময়ের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা—জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ <strong>“মিহওয়ার”</strong>।</p>
<p>ইতিহাসকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক সাফল্যগাঁথা এবং বর্তমান সময়ের কৃষি ও কৃষকের চরম দুরবস্থার মধ্যকার বিষয়ের অসাধারণ পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে মিহওয়ার পত্রিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায়।</p>
<p>পত্রিকাটির দ্বিতীয় সংখ্যায় এসেছে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর সম্মানিত প্রেসিডেন্ট তরুণ কৃষিবিদ শ্রদ্ধেয় <a href="https://rowyakbd.com/author/mars_bd/">আশিকুর রহমান সৈকত</a>-এর লেখা <strong>“<a href="https://rowyakbd.com/agricultural-systems-and-seeds-the-future-of-human-civilization-in-jain-hands/">কৃষিব্যবস্থা ও বীজঃ যায়নবাদীদের হাতের মুঠোয় মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ</a>”</strong> শীর্ষক প্রবন্ধটি।<br />
এবং তৃতীয় সংখ্যায় এসেছে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ত্রৈমাসিক মিহওয়ার পত্রিকার সম্পাদক তরুণ চিন্তক <a href="https://rowyakbd.com/author/hasan_al_firdaus/">হাসান আল ফিরদাউস</a>-এর লেখা <strong>“বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা : প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা”</strong> শীর্ষক প্রবন্ধটি।</p>
<p>দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় লিখিত প্রবন্ধ দু&#8217;টি অধ্যয়নের পরেই জানার আগ্রহ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্যই একেবারে সরেজমিনে যাওয়া এবং কৃষকদের সাথে সময় অতিবাহিত করে তাদের জীবন সম্পর্কে অবহিত হওয়া।<br />
এই আলোচনায় মূলত তত্ত্বের আলোকে বর্তমান সময়ের কৃষি ও কৃষকের চরম দুরবস্থার সত্যতা তুলে ধরার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। তত্ত্বের পাশাপাশি তথ্যের জন্য উক্ত প্রবন্ধ দু&#8217;টি পড়ে অনুধাবন করার অনুরোধ রইলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agriculture-of-bangla-finding-solutions-to-imperialist-aggression-and-the-current-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15174</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহর ইরতিফাকাত; আর্থ-সামাজিক বিকাশের স্বাভাবিক পদ্ধতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/imam-shah-waliullah-irtifakat/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/imam-shah-waliullah-irtifakat/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 14 Feb 2024 15:34:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[ফিচারড]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি ও অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[abdul azim islahi]]></category>
		<category><![CDATA[imam ibn taimiah]]></category>
		<category><![CDATA[imam ibnul qaium]]></category>
		<category><![CDATA[mughol amol]]></category>
		<category><![CDATA[rowyak]]></category>
		<category><![CDATA[Shah Waliullah Dehlawi]]></category>
		<category><![CDATA[ইমাম ইবনে কাইয়্যুম]]></category>
		<category><![CDATA[তাইমিয়াহ]]></category>
		<category><![CDATA[মুঘল আমল]]></category>
		<category><![CDATA[শাহ ওয়ালিওল্লাহ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13638</guid>

					<description><![CDATA[প্রায়োগিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রাচ্যের প্রাচীন চিন্তাবিদদের ব্যপক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদগণ প্রাচ্যকে একেবারেই আলোচনার বাহিরে রেখে দিয়েছেন। এর কারণ মূলত পাশ্চাত্যে এরকম একটি প্রচারণা রয়েছে যে, ইউরোপীয় রেনেসাঁর পূর্বে অর্থাৎ দ্বাদশ শতাব্দীর আগে অর্থনীতি নিয়ে কোনো ধ্যান ধারণাই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রায়োগিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রাচ্যের প্রাচীন চিন্তাবিদদের ব্যপক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদগণ প্রাচ্যকে একেবারেই আলোচনার বাহিরে রেখে দিয়েছেন। এর কারণ মূলত পাশ্চাত্যে এরকম একটি প্রচারণা রয়েছে যে, ইউরোপীয় রেনেসাঁর পূর্বে অর্থাৎ দ্বাদশ শতাব্দীর আগে অর্থনীতি নিয়ে কোনো ধ্যান ধারণাই দুনিয়াতে ছিল না।<sup>১</sup> অন্যদিকে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদগণ যে বিষয়ে আলোচনা করেন না তা অন্য কোথাও আলোচনা হয় না, এই প্রথা ইতোমধ্যেই পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদগণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।</p>
<p>যদিও এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বর্তমানে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে।<sup>২</sup> কিন্তু সে সব গ্রন্থ এখনো অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়নের অপেক্ষায় স্থবির হয়ে পড়ে আছে। এসকল গ্রন্থে আমাদের জন্য অসংখ্য অর্থনৈতিক চিন্তা উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন সুফি, বিভিন্ন সংস্কারক ও উলামাদের দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, আখলাক কিংবা মুঘলদের জীবনী, সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্বলিত গ্রন্থাবলি কিংবা আলাউদ্দিন খিলজির অর্থনৈতিক সংস্কার, সুলতান মুহাম্মদ তুঘলকের মুদ্রানীতি, শেরশাহ সুরির ভূমি জরিপ ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয়ই কোনো না কোনো অর্থনৈতিক চিন্তার উপর গড়ে উঠেছে।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশের নেতৃত্ব স্থানীয় চিন্তাবিদ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর অর্থনৈতিক চিন্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শাহ ওয়ালীউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তার দুই একটি বিষয়ের উপর যে কয়টি প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচিত হয়েছে তা নেহায়েতই হাতেগোনা।<sup>৩</sup> কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর সকল চিন্তার সমন্বিত পাঠ ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা এখনো অনেক বাকি। তবে এই প্রবন্ধে আমরা কেবল তার ‘আল-ইরতিফাকাত’ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করবো। মূলত এই তত্ত্বটি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পর্যায়ে পড়ে। আশাকরি এই প্রবন্ধ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে গবেষক ও চিন্তাবিদদের মাঝে নতুন করে চিন্তা করার ক্ষেত্র তৈরি করবে।</p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তার বৃহৎ অংশ মূলত ক্ষয়িষ্ণু মুঘল সালতানাতের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও উত্তরণকল্পে প্রদানকৃত অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকল্পে তাঁর অভিব্যক্তিমূলক আল-ইরতিফাকাত তত্ত্বের মাঝে লুকায়িত।</p>
<p><strong>শাহ ওয়ালীউল্লাহ এবং তার সময়কাল</strong></p>
<p>২১ সেপ্টেম্বর ১৭০৩ সালে শাহ ওয়ালীউল্লাহ ভারতের মুজাফফরনগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০ আগস্ট, ১৭৬২ তে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম আহমেদ ইবনে আব্দুর রহিম। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় পাঁচ জন মুঘল সুলতানের পতন দেখেছেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ এমন সময় জন্মগ্রহণ করেন যখন মহান সম্রাট জহিরউদ্দীন বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল সালতানাত পতনের দ্বার প্রান্তে। একই সময়ে মৌলিক জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশ এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক অধঃপতনের স্বাক্ষী এই আলেম তৎকালীন সময়ের বিদ্যমান জ্ঞানের সকল শাখায় পারদর্শী ছিলেন। কোরআন ও হাদীসের মূলনীতির ব্যাখ্যা, বিচার ব্যবস্থা, ইলমুল কালাম, দর্শন, ফিকহ, হিকমত ও মাকাসিদ আশ-শরিয়াহর ক্ষেত্রে তাঁর বিশাল অবদান রয়েছে। ১৭৩০ সালে তিনি হিজাজে গমন করেন এবং সেখানে তিনি ২ বছর অবস্থান করে মক্কা এবং মদীনায় অবস্থানরত আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তখন নজদে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের (১৭০৩-১৭৯২) সংস্কারের যুগ চলছিল। যদিও তাদের দুজনের মাঝে সাক্ষাতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে শাহ ওয়ালীউল্লাহর সংস্কার কেবলমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁর সংস্কার আরো অনেক ব্যাপক-বিস্তৃত সামগ্রিক রূপ লাভ করেছিল। তিনি একইসাথে শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারে মনোযোগী ছিলেন।</p>
<p><strong>শাহ ওয়ালীউল্লাহর চিন্তায় অর্থনীতি</strong></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তাগুলো তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। যেমন ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’, ‘আল বুদুর আল বাজিগাহ’, ‘আত-তাফহিমাত আল ইলাহিয়া’র মতো গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক, গভর্নর, বিজ্ঞ আলেমদের নিকট প্রেরিত চিঠিগুলোর মাঝেও তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাগুলো ফোঁটে উঠে। বিশেষত তাঁর লেখা চিঠিগুলোয় তিনি মুঘল সালতানাতের পতনের জন্য অর্থনৈতিক পন্থাকে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর এসকল তীক্ষ্ণ সমালোচনা এখনো অনেককে গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত করে।<br />
<a href="https://rkmri.co/ypSeoeIMIR2A/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Irtifakat-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর সমসাময়িক একজন আলেম যিনি খুব কাছ থেকে তৎকালীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং একইসাথে শাহ ওয়ালীউল্লাহকেও অধ্যয়ন করেছেন, তাঁর দৃষ্টিকোণ শাহ ওয়ালীউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তাগুলো পড়ার চেষ্টা করবো। আশাকরি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা আপনাদেরকে শাহ ওয়ালীউল্লাহর চিন্তাকে বুঝতে সহায়তা করবে।</p>
<p><strong>ভারতে মুঘল শাসন অবসানের ক্ষেত্রে দুর্বল অর্থনীতি</strong></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর সময়কালে মারাঠা, জাঠ, শিখ, রোহিলা ও বিভিন্ন প্রদেশে মুঘল গভর্নরদের দূরভিসন্ধিতে সৃষ্ট নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। এসময় মুঘল সম্রাটরা কার্যত  লালকেল্লা আর পালামপুর গ্রামের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কৃষক এবং কারিগর সম্প্রদায় খুব খারাপভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ে। ঘন ঘন ক্ষমতার রদ বদলের কারণে তাদেরকে বছরে কয়েকবার করে খাজনা প্রদান করতে হতো। সেনাবাহিনী ও আমলারা মাসিক হিসেবে বেতন পেত না।<sup>৪</sup> ন্যায়পরায়ণতার মূর্তপ্রতীক মুঘল সম্রাটরা এসময় একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুঘল সালাতানের পতনের মূল কারণ উল্লেখপূর্বক এ সংকট মোকাবেলায় যে সকল প্রস্তাবনা দেন সেগুলো হলো-</p>
<p><strong>১. রাজস্ব সংকট</strong> : রাজস্ব যেকোনো রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। পর্যাপ্ত পরিমাণ রাজস্ব ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই সঠিকভাবে তার কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারে না। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে রাজস্ব আট কোটি রুপির মতো হলেও এই পরিমাণ রাজস্ব আয় করা যে সম্ভব তা উপলব্ধি করার মতো শক্তি রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় সরকার হারিয়ে ফেলেছিল।<sup>৫ </sup></p>
<p><strong>২. খালিসা জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া :</strong> খালিসা বলতে সরকারি জমিকে বুঝানো হয়ে থাকে। এই সব ভূমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়ে থাকে, অন্যদিকে জায়গীরের আওতাধীন জমির রাজস্ব জায়গীরদাররা আদায় করতো। খালিসা জমি ছিল রাজস্ব আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রত্যেক শাসক-ই খালিসা আয়তন বৃদ্ধির চেষ্টা করতেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহর খালিসা ভূমির বৃদ্ধির প্রতি জোর দেন। বিশেষত দিল্লির আশপাশের অঞ্চল, হিসার ও সিরহিন্দে এই ধরনের ভূমি বৃদ্ধিতে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত রাজস্ব আয়ের কারণে এই সম্পূর্ণ অঞ্চল অথবা এই অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশকে খালিসার আওতাধীন করার প্রস্তাবনা দেন।<sup>৬</sup></p>
<p><strong>৩. জায়গীরের সংখ্যা বৃদ্ধি :</strong> খালিসা ভূমির সংকোচনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই জায়গীরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু এসকল ছোট জায়গীরদাররা তাদের আওতাধীন এলাকা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম ছিল না। যার ফলে তারা এসব ভূমি ভাড়া দিয়ে দিতে শুরু করে যা অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে শাহ ওয়ালীউল্লাহর প্রস্তাবনা ছিল জায়গীরদারী প্রদানের ক্ষমতা কেবলমাত্র রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে সীমাবদ্ধ থাকুক। এছাড়া ছোট-খাটো জায়গীরদার থেকে আদায় নগদে হওয়া উচিত, যেমনটা সম্রাট শাহজাহানের আমলে হতো। কেননা এসকল ছোট জায়গীরদাররা তাদের আওতাধীন ভূমি ভাড়ায় প্রদান করতো এবং বেশিরভাগই অর্থকষ্টে ভুগত। ফলে তারা রাষ্ট্র কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারতো না।<sup>৭</sup></p>
<p><strong>৪. সেনাবাহিনী ও আমলাদের অনিয়মিত বেতন প্রদান :</strong> মুঘল সালতানাতের পতনের অন্যতম আরেকটি কারণ ছিল সেনাবাহিনী এবং আমলাদের বেতন প্রদানের স্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটা। এই ব্যত্যয় ঘটার কারণ যে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপর্যাপ্ততা তা আগেই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে শাহ ওয়ালীউল্লাহ সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিলম্বে বেতন প্রদানের কঠোর বিরোধিতা করেন। তিনি মনে করেন, সৈন্যদের যদি বেতন পেতে দেরি হয় তবে তারা সুদের উপর ঋণ নিতে বাধ্য হবে। আর সুদের চক্রে আবর্ত হয়ে তারা আরো বেশি দুর্ভোগের শিকার হবে, ফলে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবে না।<sup>৮</sup></p>
<p><strong>৫. করের বোঝা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাস পাওয়া :</strong> রাষ্ট্রের ব্যয় মিটাতে কৃষক ও কারিগর শ্রেণির উপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে কৃষক ও কারিগরি পেশায় লাভ কমতে থাকে, যা স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন কমিয়ে দেয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহতে এ ব্যপারে বলেন,”আরেকটি কারণ হচ্ছে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এবং কর আদায়ের নির্মম পন্থা”।<sup>৯</sup></p>
<p><strong>৬. উচ্চাভিলাষী জীবনযাত্রা :</strong> শাহ ওয়ালীউল্লাহ অর্থনৈতিক সংকটকে মুঘল সালতানাতের পতনের একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তবে একমাত্র কারণ হিসেব নয়। তিনি অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি উচ্চাভিলাষী জীবনযাত্রা, আখলাকী অধঃপতন, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতাকে মুঘল সালাতানাতের পতনের কারণ হিসেবেও উল্লেখ করেন।<sup>১০</sup> এখানে প্রত্যেকটি বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, এসকল সংকটের মূলে রয়েছে আল-ইরতিফাকাত আশ-শারিয়াহর লঙ্ঘন করা। অর্থনীতির ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালীউল্লাহর প্রস্তাবিত সকল সমাধান মূলত তাঁর আল-ইরতিফাকাত তত্ত্বে চারটি পর্যায়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এই পর্যায়ে আমরা সংক্ষেপে আল-ইরতিফাকাত তত্ত্বকে বুঝার চেষ্টা করবো।<br />
<a href="https://rkmri.co/ypSeoeIMIR2A/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Irtifakat-01.jpg" height="133" /></a><br />
<strong>আল-ইতিফাকাত তত্ত্ব</strong></p>
<p>ইরতিফাকাত একটি আরবি শব্দ, এর মূল হচ্ছে (র, ফা, ক্বফ)। যার অর্থ হচ্ছে সহনশীল হওয়া, দয়ালু, পরোপকারী, লাভজনক, সুবিধাজনক ইত্যাদি। ইরতিফাকাত শব্দটি দ্বারা সুবিধাজনক পথ, সাহায্যকারী উপাদান, লাভজনক পন্থা, কার্যকর প্রযুক্তি এবং ব্যক্তি জীবনে আদবের অধিকারী হওয়া বুঝিয়ে থাকে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ এই শব্দটিকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিশেষ একটি পন্থা বুঝাতে ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, গ্রাম্য সমাজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়। যেখানে প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক সংগ্রাম গুরুত্ব পেয়েছে এবং শেষ পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি ও আদালত প্রতিষ্ঠায় যথাযথ রাজনীতির বিকাশ গুরুত্ব পেয়েছে। শাহ ওয়ালীউল্লাহর সকল অর্থনৈতিক চিন্তা মূলত আল-ইরতিফাকাত তথা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে।</p>
<p><strong>আল-ইরতিফাকাত এর প্রথম পর্যায়</strong></p>
<p>আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রথম পর্যায়ে আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে জীবজন্তু, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক যোগাযোগ, সমাজের পরিশুদ্ধি, বুদ্ধিবৃত্তি।<sup>১১</sup> আল-ইরতিফাকাতের প্রথম পর্যায় মানুষকে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতায় নিমজ্জিত না থেকে উন্মুক্তভাবে নিজের মত প্রকাশের সক্ষমতা অর্জন করার দিকনির্দেশনা দেয়। এই পর্যায়ে মানুষ তার শরীর গঠনের জন্য উপযুক্ত খাদ্য-দ্রব্যের সাথে পরিচিত হয় এবং এই সকল খাদ্য-দ্রব্যকে খাবার উপযোগী করার পদ্ধতির সাথে অবগত হয়। এছাড়াও এ জাতীয় ফসলের চাষাবাদ, সেচ, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ থেকে শুরু করে এসকল ফসল রান্না করার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করতে হয়। সেই সাথে পশু-পালন ও গৃহপালিত পশু থেকে চামড়া, দুধ, ঘি ইত্যাদি উৎপাদনের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতিও শিখতে হয়। কেননা পশুপালন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানারোহণ ছাড়া ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে মৌলিক জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা থেকে সুরক্ষায় পশুর চামড়া থেকে তৈরি বস্ত্র কিংবা গাছের পাতার ছাউনি থেকে শুরু করে আধুনিক পোশাক ও বাসস্থান প্রণালীও এই পর্যায়ের আলোচনার বিষয়।</p>
<p>এছাড়াও পরিবাবের মৌলিক ধারণা, জৈবিক চাহিদা পূরণ ও প্রজননও এই পর্যায়ের আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু।<sup>১২</sup> এই প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ কৃষি ও বাসস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করে, পণ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে একটি আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তুলে এবং মানুষের দ্বারা সৃষ্ট এই সমাজে মানুষ সামাজিক বিচার ব্যবস্থা ও ক্ষমতার একটি সুবিন্যস্ত কাঠামো গড়ে তুলে। যেখানে তাদের মধ্যকার বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে দুষ্কৃতিকারী-অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হয়। অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে একজন বুদ্ধিজীবী ঐ সমাজের বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য ইরতিফাকাতের পন্থা খুঁজে বের করেন, যেন সমাজের বাকিরা এই পন্থার আলোকে সমাজকে সাজাতে পারেন।</p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর আল ইরতিফাকাতের প্রথম পর্যায়ের বর্ণনায় আমরা একটি আদর্শ গ্রামীণ সমাজের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাপনার উল্লেখ দেখতে পাই। যেখানে একজন মানুষ তার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান থেকে শুরু করে সকল মৌলিক চাহিদাগুলো প্রকৃতি দেওয়া সুযোগ-সুবিধা থেকে পূরণ করে। এখানে সে সমাজের মাধ্যমে আদালত প্রতিষ্ঠা করে। এই ব্যবস্থাপনায় মানুষ তার অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো সামাজিক রীতি-নীতির মাধ্যমে পূরণ করে। কিন্তু এই সামাজিক কাঠামোয় কর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না এবং এখানে আধুনিক বাজার ব্যবস্থাও অনুপস্থিত। মূলত আল-ইরতিফাকাতের প্রথম পর্যায় মানুষের সমাজকে পশুদের জীবনপ্রণালী থেকে পার্থক্য করে এবং একইসাথে এটি আল-ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়কে বুঝার প্রাথমিক শর্ত।</p>
<p><strong>আল-ইরতিফাকাত এর দ্বিতীয় পর্যায়</strong></p>
<p>মানুষ যখন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করে তখনই সে আর্থ-সামাজিক উন্নতির স্তরে প্রবেশ করে।<sup>১৪</sup> এই পর্যায়ে এসে তার আখলাক ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ প্রথম পর্যায়কে ছাড়িয়ে যায়।<sup>১৫</sup> জীবনযাত্রায় জটিলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে সমাজ পরিচালনায়, নীতি-নির্ধারণে, আদর্শ মানদ- স্থাপনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে থাকে। এই পর্যায়ে এসে তিনি ক্রমান্বয়ে ৫ টি হিকমত আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন-</p>
<p><em>১. হিকমত আল মাসিয়াহ বা জীবনযাত্রা সম্পর্কিত জ্ঞান। যা একটি নির্দিষ্ট মানদন্ডের আলোকে শিষ্টাচার</em><em>, </em><em>খাওয়া-দাওয়া</em><em>, </em><em>পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে আদব-কায়দা তথা বসবাস সম্পর্কিত সকল বিষয়কে পরিচালনা করে থাকে। </em></p>
<p><em>২. হিকমত আল মানজিলিয়াহ বা গার্হস্থ্য জীবন সম্পর্কিত জ্ঞান। যা মূলত বৈবাহিক জীবন</em><em>, </em><em>সন্তান লালন-পালন</em><em>, </em><em>আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা</em><em>, </em><em>পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার আদব সম্পর্কিত জ্ঞান।</em></p>
<p><em>৩. হিকমত আল ইকতিসাবিয়াহ বা জীবিকা উপার্জন সম্পর্কিত জ্ঞান। ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যরে জানান দেওয়ার মাধ্যম কামার</em><em>, </em><em>ছুতোর থেকে শুরু করে সমাজে বিদ্যমান সকল পেশাই আল হিকমত আল ইকতিসাবিয়াহর আলোচ্য বিষয়।</em></p>
<p><em>৪. হিকমত আত-তামুলিয়াহ বা পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কিত জ্ঞান। পণ্যের কেনা-বেচা</em><em>, </em><em>উপহার প্রদান</em><em>, </em><em>মালিক-ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক</em><em>, </em><em>ঋণ</em><em>, </em><em>সঞ্চয়</em><em>, </em><em>বন্ধক</em><em>, </em><em>ওয়াকফ ইত্যাদি এখানের আলোচ্য বিষয়। </em></p>
<p><em>৫. হিকমত আল-তাউনিয়াহ বা সহযোগিতার প্রজ্ঞা। যা স্থায়ী জামিন</em><em>, </em><em>নীরব অংশীদারিত্ব</em><em>, </em><em>বাণিজ্যিক উদ্যোগ</em><em>, </em><em>পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি এবং ভোগদখলের সাথে সম্পর্কিত।<sup>১৬</sup> </em></p>
<p>উপর্যুক্ত ৫টি হিকমতের মাঝে প্রথম দুটি হিকমত সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কিত এবং পরবর্তী তিনটি হিকমত অর্থনীতি সম্পর্কিত।<sup>১৭</sup> আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায় মূলত প্রথম পর্যায়ের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো হয়েছে। যার ফলে প্রত্যকটি ধাপ একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত। এজন্য প্রত্যেকটি বিষয় সামনে রেখে সামগ্রিক-সমন্বিত রূপে চিন্তা করতে হবে। যেমন ইরতিফাকাত এর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম দুটি বিষয়কে আমরা ইরতিফাকাত এর প্রথম পর্যায়েও খুঁজে পাই। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে ক্রমান্বয়ে পরিমার্জিত-পরিবর্ধিত ক্রমশ বিকশিত রূপের মাঝে। যেমন মানুষের উচিত তার দ্বীন নির্দেশিত পন্থায় খাদ্য, পানীয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাজসজ্জা, পোশাক, বাসস্থান, কথা বলা, চলাফেরা, ভ্রমণ, বেচাকেনা, সহবাস, চিকিৎসা এবং স্বামী-স্ত্রী-সন্তানের সাথে তাকওয়ায় উন্নত নৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপন করা।<sup>১৮</sup> শাহ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর বুদুর আল বাজিগাহতে একজন সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়ার আলোকে জীবনযাত্রার একটি মডেল দাঁড় করিয়েছেন।<sup>১৯</sup> যদিও আপাতত এটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। আমরা বরং আল ইরতিফাকাত এর দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষ তিনটি হিকমত নিয়ে আলোচনা করবো। যেখানে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনকে আরো বিকশিত এবং শক্তিশালী করার প্রচেষ্ঠা করেছেন।</p>
<p><strong>হিকমত আল-ইকতিসাবিয়াহ</strong></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর হিকমত আল-ইকতিসাবিয়াহ দ্বিতীয় ইরতিফাকাতের দিকগুলো হলো শ্রমের বিভাজন, বিশেষীকরণ, পেশাগত বৈচিত্র্য এবং অর্থের ব্যবহার।</p>
<p><strong>শ্রমের বিভাজন</strong></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে মানুষ যখন আল-ইরতিফাকাত এর প্রথম পর্যায় ছাড়িয়ে আল-ইরতিফাকাত এর দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে তখন মানুষের নানাবিধ চাহিদা ও একক ব্যক্তির পক্ষে সে সকল চাহিদার যোগান দেওয়ার সামর্থ্যহীনতার ফলে স্বাভাবিকভাবেই শ্রম বিভাজনের সৃষ্টি হয়।<sup>২০</sup> এক্ষেত্রে তিনি কৃষিকে আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে দেখান যে, শুধুমাত্র কৃষি কাজ করতেই প্রশিক্ষিত গবাদি পশু, নানান ধরণের যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের পেশার মানুষের এখানে প্রয়োজন হয়। অনুরূপভাবে তিনি পোশাক শিল্পের উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করেন যে, যদি একই পরিবারের সবাই এসকল কাজ সম্পাদন করার চেষ্টা করে তবুও তারা আল-ইরতিফাকাতের প্রথম পর্যায়ে যে অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে সেই অবস্থাকে উত্তরণ করে আল ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারবে না।<sup>২১</sup> এই আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, যখন কোনো সমাজ আল-ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে তখন সেখানে বিশেষায়িত কাজের উপর বিশেষভাবে দক্ষ শ্রেণি নানা রকম পেশার সৃষ্টি করে।</p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, মৌলিক পেশাগুলো হলো কৃষিকাজ, পশুচারণ, সমুদ্র ও ভূমি থেকে প্রকৃতি প্রদত্ত নিয়ামত আহরণ যেমন ধাতু, গাছ, পশু-পাখি এবং এসকল নিয়ামত থেকে দক্ষতার মাধ্যমে শিল্প গড়ে তোলা যেমন ছুতোর, লোহার কাজ, বয়ন ইত্যাদি। দ্বিতীয় ধাপে আসে ব্যবসা-বাণিজ্য, নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা ও পণ্যের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।<sup>২২</sup> তাঁর মতে, একটি নির্দিষ্ট পেশায় একজন ব্যক্তির জন্য বিশেষীকরণের দুটি কারণ রয়েছে-</p>
<p><em>১. উদাহরণস্বরূপ শারীরিকভাবে সক্ষম একজন শক্তিশালী মানুষ যুদ্ধের জন্য ভালো</em><em>; </em><em>অন্যদিকে তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি গণিতের জন্য উপযুক্ত</em><em>; </em><em>আবার একটি শক্তিশালী মানুষ অনেক ভারী জিনিস বহনের কাজের জন্য উপযুক্ত। </em></p>
<p><em>২. পরিবেশগত সুবিধা যেমন একজন কামারের ছেলে বা প্রতিবেশী সহজেই লোহার কাজ করতে পারে ঠিক তেমনি সমুদ্রের নিকটে বসবাসকারী ব্যক্তি মাছ ধরার সুবিধা পান যা পাহাড়ে বসবাসকারীরা পায় না।<sup>২৩</sup></em></p>
<p>পেশাগত বৈচিত্র্য একজন মানুষকে তার বিশেষ দক্ষতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে এবং এর ফলে ব্যক্তি একইসাথে সমাজের এবং নিজের প্রয়োজন পূরণ করে। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, ফরজে কিফায়ার বিধান রাখার অন্যতম একটি কারণ হলো সামাজিক কর্তব্যগুলোকে পেশাগত বৈচিত্র্যের মাধ্যমে আদায় করা এবং বিশেষ দক্ষতার জন্য ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়া। কেননা, সকলে একই কাজের উপযুক্ত নয়। প্রত্যেককে তার দক্ষতা অনুযায়ী কাজে লাগাতে হয়।<sup>২৪</sup></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, প্রত্যেকের উচিত স্রোতের তালে গা না ভাসিয়ে তার নিজস্ব সক্ষমতার আলোকে পেশা নির্বাচন করা।<sup>২৫</sup> এক্ষেত্রে তিনি সংশ্লি­ষ্টদের উপযুক্ত কাজে যথাযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনে, বেকারত্ব নিরসনে এবং বিলাসিতা পরিহারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।<sup>২৫</sup></p>
<p><strong>সুযোগের সদ্ব্যবহার</strong><br />
<a href="https://rkmri.co/ypSeoeIMIR2A/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Irtifakat-01.jpg" height="133" /></a><br />
আর্থ-সামাজিক চাহিদার কথা আলোচনা করতে গিয়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ নগরপতিদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প গ্রহণ ও সেই সকল প্রকল্পে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে। যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোক নিয়োগ না হয় এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন এসকল প্রকল্পের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের এমন সুযোগ-সুবিধা যেন প্রদান করা না হয় যাতে লোকেরা শিল্প, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো মৌলিক উৎপাদনমুখী পেশার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। কেননা এতে একইসাথে নাগরিকদের মধ্যে কিছু অংশ বিলাসিতায় নিমজ্জিত হয়, অন্যদিকে এধরণের পেশার মোহ কৃষি ও বাণিজ্যের প্রতি লোকদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়, ফলে উৎপাদন কমে যায়।<sup>২৭</sup></p>
<p><strong>মুদ্রার ব্যবহার</strong></p>
<p>শ্রমের বিভাজন এবং দক্ষতা ভিত্তিক পেশার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এমন একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় যা দ্বারা সম্পদের বিনিময় সম্ভব। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই মুদ্রার উদ্ভব ঘটে। এভাবে আল ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, মুদ্রা অবশ্যই বহনযোগ্য ও সর্বজনগ্রহণীয় বস্তু হওয়া উচিত।<sup>২৮</sup> তার আল-বুদুর আল-বাজিগা গ্রন্থে তিনি বলেছেন, মুদ্রার নিজস্ব উপযোগিতা থাকা উচিত নয়; বরং মুদ্রা হওয়ার শর্ত হচ্ছে তা বিনিময়ে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।<sup>২৯</sup> হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা-তে তিনি উল্লেখ করেছেন, সোনা এবং রুপা মুদ্রা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কারণ, এগুলো সহজেই ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত করা যায় এবং খন্ডগুলোর মাঝে সাদৃশ্য বজায় থাকে। এছাড়াও এসকল ধাতু সকল মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসকল ধাতু মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের জন্য আদর্শ।<sup>৩০</sup> এভাবে মূলত তিনি, যারা বলেন মুদ্রার নিজস্ব মূল্যমান থাকার প্রয়োজন নেই, তাদের বিরোধিতা করেছেন। তিনি মুদ্রা ব্যবস্থাকে ধাতব মুদ্রা এবং টোকেন মুদ্রা (বর্তমানে ব্যবহৃত মুদ্রা) এই দুভাগে বিভক্ত করেন এবং টোকেন মুদ্রার মানের দ্রুত পরিবর্তনশীলতার উপর ভিত্তি করে এ মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন নিয়ম-নীতি দাঁড় করান।</p>
<p><strong>হিকমত আত-তামুলিয়াহ</strong></p>
<p>হিকমত আত-তামুলিয়াহর অধীনে শাহ ওয়ালীউল্লাহ বাণিজ্য, নিয়োগ, দান, ঋণ এবং বন্ধকী নিয়ে আলোচনা করেন। শ্রম বিভাজন এবং দক্ষতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি অর্থনীতির জন্য এই ধরনের লেনদেনগুলো অপরিহার্য। কেননা এ ধরনের লেনদেনে জড়ানো ছাড়া কোনো সমাজ আল-ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না। এই সকল লেনদেনের পেছনে মূলত পারস্পরিক সহযোগিতা করা, সম্পদ ও শ্রমের বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করাই মূল উদ্দেশ্য। সেই সাথে লেনদেনের মাধ্যমে আমানতদারিতা, বিশ্বস্ততা কামালিয়্যাত লাভ করে। মানুষের সাথে মানুষের এ ধরনের বিনিময়ের মাধ্যমে গড়ে উঠা পারস্পরিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে বান্দা তার রবের কাছে মূল্যায়িত হবে। দুনিয়ার এসকল লেনদেনের ফলাফল সে আখিরাতে লাভ করে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ ফিকহের আদলে এই চুক্তিগুলোকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং বৈধতা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য শরীয়াহর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলি আরো বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।<sup>৩১</sup> তিনি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগায় পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের উপস্থাপিত বিধানগুলোর পেছনের হিকমতগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।<sup>৩২</sup> ভিন্ন একটি প্রসঙ্গে তিনি সদকাহ (দাতব্য), ওয়াসিয়্যাহ (ইচ্ছা) এবং ওয়াকফ (ধর্মীয় দান ও ট্রাস্ট) এর মতো পুণ্য ও কল্যাণের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত পারস্পরিক লেনদেনের আরো কিছু বিধানের হিকমত ব্যাখ্যা করেছেন।<sup>৩৩</sup> তাঁর মতে, ওয়াকফের ধারণা ইসলাম আসার পূর্বে মানুষের কাছে অজানা ছিল। এসকল নতুন সামাজিক প্রতিষ্ঠান হযরত মুহাম্মদ (স.) বিভিন্ন কল্যাণের বিবেচনায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ওয়াকফের মাধ্যমে দাতার আয়ের উৎস থেকে অভাবী লোকেরা উপকৃত হয়, তবে মালিকানা ওয়াকফকারীর অধীনেই থাকে।<sup>৩৪</sup></p>
<p><strong>পারস্পরিক লেনদেনে স্বচ্ছতা লঙ্ঘনের অভ্যাস</strong></p>
<p>বিবাদ এবং শোষণ দূরীভূত করতে শরীয়ত এমন সব চুক্তিকে নিষিদ্ধ করে যার মাধ্যমে অকল্যাণ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (ফিকহের পরিভাষায় সাদদুয জারিয়াহ বলা হয়ে থাকে -অনুবাদক)। যেমন অনিশ্চয়তার উপর ভিত্তি করে সম্পাদিত চুক্তি, প্রতারণা, দ্বিমুখী লেনদেন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে শাহ ওয়ালীউল্লাহ বিশেষভাবে সুদ, ঘুষ এবং জুয়া চর্চার প্রতি লক্ষ্য রাখেন।<sup>৩৫</sup> তিনি বলেন, এই সামান্য বিষয়গুলো বড় বড় বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করে। এজন্য শরীয়ত এগুলোর সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করে।<sup>৩৬</sup> তাঁর মতে, যখন সুদ সমাজে বিস্তার লাভ করে তখন তা সরাসরি কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনকে বাঁধাগ্রস্ত করে। অথচ কৃষি ও শিল্প সরাসরি মানব সমাজের জীবনধারণ ও আয়ের উৎস। প্রকৃতপক্ষে সুদ এবং জুয়া উভয়ই মদ্যপানের সমতুল্য, কারণ উভয়ই জীবিকা অর্জনের জন্য আল্লাহ যে নীতি নির্ধারণ করেছেন তার স্পষ্ট লঙ্ঘন।<sup>৩৭</sup></p>
<p><strong>রিবা আল-ফাদল এবং রিবা আল-নাসিআহ</strong></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহ ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যে সুদ(লভ্যাংশ) নেওয়া হয় সেটাকেই প্রকৃত সুদ (আর-রিবা আল-হাকীকী) হিসাবে বিবেচনা করেন।<sup>৩৮</sup> তিনি শরীয়তে রিবা আল-ফাদল এবং রিবা আল-নাসিয়াহ হিসাবে আখ্যায়িত পরিমাণ বা সময়ের ক্ষেত্রে বৈষম্যপূর্ণ বিনিময়ের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তিনি এসবকে সুদের উপমা হিসেবে গণ্য করেন।<sup>৩৯</sup> সুদের উপর এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা রাসূলুল্লাহর রেওয়ায়েত থেকে জানা যায়। রাসূল (স.) বলেছেন সোনার বদলে সোনা, রুপার বদলে রুপা, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর এবং লবণের বদলে লবণ একই পরিমাণে বিনিময় করতে হবে।</p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, এই ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করার কারণ হলো, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বস্তুবাদের প্রতি মানুষের অত্যধিক ঝোঁককে সংযত করা।<sup>৪০</sup> কারণ সমপরিমাণ পণ্যের সাথে সমপরিমাণ পণ্যের আদান-প্রদান কখনোই মানুষের অত্যধিক সম্পদ লাভের বাসনা মেটায় না; বরং সংযত হতে বাধ্য করে। যদিও এই আলাপ অনেকের কাছে যুতসই নাও ঠেকতে পারে, তবুও ন্যায্যতার মানদন্ডে বিচার করলে নিম্নমানের গমের বিনিময় কেউ-ই ভালো মানের গম দিয়ে করবে না, কিন্তু রিবা আল-ফাদল মূলত এই বৈষম্যই তৈরি করে। তবে এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী আলেমগণের মাঝে ইমাম ইবনুল কাইয়ূমের (১৩৫২ খ্রি.) মত অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, রিবা আল-ফাদলকে নিষিদ্ধ করার মূল কারণ হচ্ছে, সুদের অবাধ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালনে বাধা দান করা।</p>
<p><strong>হিকমত আত-তাউনিয়্যাহ </strong></p>
<p>আল-ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়ের পঞ্চম হিকমতটি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক সহযোগিতার সাথে সম্পর্কিত। শাহ ওয়ালীউল্লাহ এ পর্যায়ে বলেন, “আর্থ-সামাজিক সহযোগিতা প্রয়োজন সমাজের নিজের প্রয়োজনেই। কেননা সমাজের কিছু মানুষ বুদ্ধিমান আবার কিছু মানুষ হয় নির্বোধ, কিছু পুঁজিপতি তো আবার কিছু লোক একেবারে হতঃদরিদ্র কিন্তু কঠোর পরিশ্রমে সক্ষম। কিছু মানুষ ছোটখাটো কাজ করতে অপছন্দ করে আবার কিছু মানুষ স্বাচ্ছন্দেই তা করে যায়। এখান থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে মানুষের জাগতিক জীবন খুব কঠিন হয়ে উঠতো, যদি তারা একে অপরকে সহযোগিতা না করতো। মুজারাহ (শস্য বিনিময়)কে যদি উদাহরণ হিসেবে ধরি তাহলে দেখা যায়, একজন ব্যক্তির জমি আছে কিন্তু বীজ নেই, চাষ দেওয়ার জন্য বলদ নেই ফলে সেই ব্যক্তির পক্ষে কখনোই ফসল ফলানো সম্ভব নয়। অথবা আমরা যদি মুদারাবাহর থেকে উদাহরণ দেই যেমন একজন ব্যক্তির পুঁজি আছে কিন্তু সে ব্যবসা করার মতো পরিস্থিাতিতে নেই, কিন্তু অন্য আরেকজনের ব্যবসা করার মতো সক্ষমতা আছে কিন্তু পুঁজি নেই। এখানে প্রয়োজন উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতা”।<sup>৪১</sup></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহতে এরকম বিভিন্ন প্রকারের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। যা মূলত ফিকহের গ্রন্থগুলোয় বিশদভাবে ঠাঁই পেয়েছে। তিনি বলেন, এসব লেনদেনের পন্থা নবী করিম (স.) এর পূর্বেও প্রচলিত ছিল। এগুলো রাসূল (স.)-এর বিশেষ কোনো কারণবশত নিষেধ ছাড়া সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।<sup>৪২</sup></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>আল-ইরতিফাকাতের তৃতীয় পর্যায়</strong></p>
<p>দ্বিতীয় পর্যায়ের ইরতিফাকাত পূর্ণতা পেলে মানব সমাজ নগর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ খুব জোর দিয়েই বলেন নগর মানে বড় বড় বাজার, উঁচু উঁচু দালান আর প্রাচীর না। বরং শহর হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক, যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও নানা ধরনের লেনদেন।<sup>৪৩</sup> মানুষের মধ্যকার এই আন্তঃসম্পর্ক রক্ষা এবং অর্থনীতিকে বিভিন্ন দুষ্ট চক্র থেকে হেফাজত রাখার প্রয়োজনীয়তা সমাজকে আল-ইরতিফাকাতের তৃতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসে। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, নগর হচ্ছে একটা একক বা বলা যায় একটি শরীরের মতো এবং একটি শরীরের মতো এরও আভ্যন্তরীণ ও বহির্গত অনেক রোগ হতে পারে। এজন্য প্রত্যেকটি শহরের একজন দক্ষ চিকিৎসকের খুব বেশি প্রয়োজন। শহরের ইমাম বা নেতৃত্ব এই পর্যায়ে নগর চিকিৎসকের প্রতিনিধিত্ব করেন।<sup>৪৪</sup> ইমাম বা নেতৃত্ব এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে শহরের অখ-তা, স্বার্থ এবং স্বাধীনতা বজায় থাকে।<sup>৪৫</sup> আল-ইরতিফাকাতের তৃতীয় পর্যায়ে নিম্নলিখিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এর মাধ্যমে নগর-রাষ্ট্রের অগ্রগতি অব্যাহত থাকে এবং দুর্নীতি, অপব্যবহার, বিশৃঙ্খলা ও ক্ষয়-ক্ষতির মতো অসুখগুলোর যথাযথ প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা যায়।</p>
<p><strong>১. বিচার বিভাগ :</strong> কৃপণতা, হিংসা এবং অন্যের অধিকার হরণ যখন সামাজিক জীবনে প্রবেশ করে, তখন একটি নগর-রাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে বিবাদ ও মতানৈক্য তৈরি হতে বাধ্য। তাই একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে যার কাছে বিরোধের ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তির জন্য আসতে পারে।</p>
<p><strong>২. নির্বাহী বিভাগ :</strong> যখন বিকৃত স্বভাব ও ক্ষতিকর কর্মকা- মানুষের মাঝে প্রাধান্য পায় এবং মানুষ সেই অনুযায়ী কাজ করে, তখন নগর-রাষ্ট্র অপরাধপ্রবণ ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। তাই এই ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি শক্তিশালী সংস্থা থাকা উচিত।</p>
<p><strong>৩. আল-জিহাদ বা পুলিশ ও সামরিক বাহিনী :</strong> দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকৃতির লোকেরা প্রায়শই হত্যা, ডাকাতি বা বিদ্রোহের মতো হিংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে একটি শহরের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করে। এই ধরনের সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং তাদের সৃষ্ট দুর্ভোগ থেকে নগর-রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য, সাহসী যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী অপরিহার্য।</p>
<p><strong>৪. আত-তাওয়াল্লি ওয়াল-নাকাবা বা কল্যাণ ও জনসাধারণের উপকারে কাজ :</strong> শহরে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট সংস্থা থাকে যা একটি শহরকে নিখুঁত নগর-রাষ্ট্রে পরিণত করে। তবে এখানে যদি জনসাধারণের উপকারে কাজ করবে এমন প্রতিষ্ঠানের অভাব থাকে তাহলে এই নগরকে রক্ষা করা কঠিন। একটি নগর-রাষ্ট্রকে স্থায়িত্ব দিতে হলে জনসাধারণ সম্পর্কিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে, যেমন সীমান্ত রক্ষা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, বাজার নির্মাণ করা, সেতু-খাল নির্মাণ, এতিমদের বিয়ে দেওয়া এবং তাদের সম্পত্তি রক্ষা, অভাবগ্রস্তদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সাহায্য বণ্টন, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে উত্তরাধিকার বণ্টন। রাষ্ট্রের নানা বিষয়ের হাল-হাকীকত সম্পর্কে অবগত করা ও বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখা।</p>
<p><strong>৫. আল-মাওইজাহ ওয়াল-তাজকিয়াহ বা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা :</strong> যেহেতু সত্য ধর্ম কখনোই মানুষকে নৈতিক জ্ঞান প্রদান থেকে বিতাড়িত করে না যদিও বিচক্ষণ মানুষ তার বিচক্ষণতা দিয়েই ধর্মের এসব জ্ঞানকে উপলব্ধিতে নিয়ে আসে কিন্তু সমাজে এমনও অসংখ্য মানুষ রয়েছে যা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিজের নফসের প্ররোচনায় পরিচালিত হচ্ছে। এ ধরনের মানুষের একজন মহৎ ব্যক্তির সাহচর্য প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এসব মানুষকে সঠিকভাবে জীবন পরিচালনায় শিক্ষা প্রদান করতে পারেন।<sup>৪৬</sup></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহ ইমামদেরকে জনগণ এবং সেনাবাহিনীর সাথে ন্যায়পরায়ণ আচরণ করার এবং সেনাবাহিনী ও সরকারী কর্মকর্তাদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।<sup>৪৭</sup> এই পর্যায়ে সরকারের দায়িত্ব হবে বিভিন্ন শিল্প ও সেবায় কর্মসংস্থানের যথাযথ ব্যবস্থা করা। ব্যবসায়ী ও কৃষকদের তাদের স্ব স্ব পেশায় উৎসাহিত করা এবং তাদের যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থাও করা। এক্ষেত্রে শাহ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর সময়ের খারাপ অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেছেন যেখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের তৃতীয় পর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে পূরণ হয়নি। শাহ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, “আমাদের সময়ে শহরগুলোর পতনের দুটি প্রধান কারণ রয়েছে।</p>
<p><em><strong>এক. লোকেরা বাইতুল-মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) উপর বোঝা চাপিয়ে দেয়। তারা যোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কবি হওয়ার অজুহাতে এখান থেকে তাদের জীবিকা অর্জনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।</strong></em></p>
<p><em><strong>দুই. কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের উপর ভারী কর আরোপ এবং তাদের প্রতি কঠোরতা, যা অনুগত কর্মকর্তাদের মধ্যেও হতাশা সৃষ্টি করে এবং একইসাথে ভিনদেশীদের কর ফাঁকি ও বিদ্রোহ আমাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।”</strong></em></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের তৃতীয় পর্যায়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে পরিচালনা করতে হবে তার উপর বিশদ নীতি প্রণয়ন করেছেন। তিনি একজন সফল নেতার গুণাবলিও বর্ণনা করেছেন।<sup>৪৯</sup></p>
<p><strong>রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি</strong></p>
<p>আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চতুর্থ ও শেষ পর্যায় নিয়ে আলোচনা করার আগে, এখানে জাতীয় অর্থনীতি, কর আদায়ে পালনীয় নিয়মাবলি এবং রাজস্ব ব্যয় সম্পর্কে শাহ ওয়ালীউল্লাহর ধারণার সাথে পরিচিত হওয়া দরকার। তাঁর মতে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ে সফল হতে হলে জাতীয় অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থা আবশ্যক। ভারতে মুঘল শাসনের দুর্বলতা ও পতনের প্রধান কারণ হিসেবে বাইতুল-মালের অস্বচ্ছলতা এবং জনগণের উপর অতি নির্ভরশীলতা কীভাবে চিত্রায়িত করেছেন তা আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি। একই কথা পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রারাজ্যের ক্ষেত্রেও সত্য।<sup>৫০ </sup></p>
<p>করের নিয়ম সম্পর্কে শাহ ওয়ালীউল্লাহ পরামর্শ দেন যে, কর ধার্য ও আদায়ের একটি ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক যাতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং কর থেকে প্রাপ্ত আয় রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত হয়।<sup>৫১</sup> প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রতিটি পণ্যের উপর কর আরোপ করা উচিত নয়। এটি এমন লোকদের উপর হওয়া উচিত যাদের ক্রমবর্ধমান সম্পত্তি যেমন গবাদি পশুর প্রজনন, কৃষি খামার, গচ্ছিত সম্পদ এবং ব্যবসা রয়েছে। যদি আরো অর্থের প্রয়োজন হয় তবে শারীরিক শ্রমে উপার্জনকারী জনসংখ্যাকেও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।<sup>৫২</sup> তবে তাঁর প্রস্তাবনা হচ্ছে, যে রাষ্ট্রের অর্থ আয়ের নিজস্ব কিছু উপায় থাকা উচিত যেমন অনাবাদি জমি লিজ দেওয়া, গবাদি পশুর পালন ইত্যাদি উৎপাদনশীল কর্মকান্ড। এটি রাষ্ট্রকে জনগণের আয় থেকে কর্তন করার নির্ভরশীলতা থেকে স্বাধীন করবে এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক করে তুলবে।<sup>৫৩</sup> তবে এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তিনি শরীয়ত নির্ধারিত উৎসগুলো থেকে প্রাপ্ত সম্পদ যেমন গনীমত, ফাই, উশর, খারাজের উপর কর কোন হারে আদায় হবে এ সংক্রান্ত কোনো আলোচনা করেননি। শাহ ওয়ালীউল্লাহ রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎসের বর্ণনায় যাকাতকেও উল্লখ করেননি। উল্লেখ না করার কারণ, এসকল বিষয়ে শরীয়তের মানদন্ড পূর্বে নির্ধারিত হয়ে গেছে। তবে এই আলোচনা তাঁর গ্রন্থে ইসলামের অন্যান্য বিষয়ের সাথে এসেছে। আরেকটি কারণ হতে পারে যে, মুঘল আমলে সুদীর্ঘকাল থেকে সরকার কর্তৃক যাকাত আদায় ও বণ্টন বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বর্তমানে যাকাতের অর্থ সংগ্রহ এবং বিতরণ শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত কার্যকলাপে পরিণত হয়েছে। তবে ব্যয়ের বিষয়ে যতদূর আলোচনা হয়েছে তাতে এটি স্পষ্ট যে, আল-ইরতিফাকাতের তৃতীয় পর্যায়ের অধীনে উল্লিখিত সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান যথাযথ অংশ পাবে। তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত, তারপরের গুরুত্বপূর্ণ (আলহাম ফাল-আহাম্ম) এভাবে গুরুত্বের উপর ভিত্তি করে খাত নির্ধারণের নীতিতে বিবেচনা করা হবে।<sup>৫৪</sup></p>
<p>যুদ্ধের পর কাফেরদের কাছ থেকে দখলকৃত জমি সম্পর্কে তার অভিমত হলো, হয় এর বণ্টন করে দিতে হবে অথবা বিদ্যমান শাসক পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিবেন।<sup>৫৫</sup> তাঁর ইজালাতুল-খাফা গ্রন্থে তিনি দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রা.)-এর জমির মালিকানা পূর্ববর্তীদের হাতে সোপর্দ করার অনন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, পারস্যের লোকেরা যারা মুসলিম সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করেছিল তারা বিজিত জমির মালিক ছিল না; প্রকৃতপক্ষে মালিক হচ্ছে ঐসকল কৃষক যারা প্রকৃত যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ এমন কোনো ব্যক্তিকে জমি দেওয়ার বিরোধিতা করেন যাকে ব্যবসা কিংবা কৃষিতে নয় বরং সমাজের এর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজন।<sup>৫৭</sup> যাকাত এবং এর বণ্টন সম্পর্কে শাহ ওয়ালীউল্লাহ আলাদাভাবে আলোচনা করেছেন। তার মতে, যাকাত প্রদান শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। এটি প্রধানত মূল্যবান ধাতব সম্পদ, পশুসম্পদ, বাণিজ্যিক পণ্য এবং কৃষি পণ্যের উপর ধার্য করা হয়। যাকাত প্রদানকে সহজ করার জন্য একটি উপযুক্ত সময়কাল এবং একটি অব্যহতির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।<sup>৫৮</sup> তিনি যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সৃষ্ট আধ্যাত্মিক কল্যাণের কথা উল্লেখ করেছেন এবং যাকাতকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।<sup>৫৯</sup> সমুদ্র বা পাহাড়ি দ্রব্য এবং শুকনো ফল যাকাতের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কিনা তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এ ব্যপারে শাহ ওয়ালীউল্লাহর অভিমত হচ্ছে, শাসক যদি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে তিনি তা করতে পারেন।<sup>৬০</sup> তবে ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে, শাহ ওয়ালীউল্লাহর সময়ে যাকাত সরকার কর্তৃক পরিচালিত হতো না, তাই এটিকে শাহ ওয়ালীউল্লাহর কেবলমাত্র একটি একাডেমিক মতামত বা একটি পরামর্শ হিসেবেও নেওয়া যেতে পারে। তবে এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, তিনিও মনে করেন যাকাতের ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।</p>
<p><strong>আল-ইরতিফাকাতের চতুর্থ পর্যায়</strong></p>
<p>এই পর্যায়ে এসে মানব সমাজ ও সরকার আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে এবং ছোট ছোট শাসনের উপর কেন্দ্রীয় শাসনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যখন ইরতিফাকাতের তৃতীয় পর্যায় সম্পাদিত হয়ে যায় তখন বিভিন্ন স্থানের শাসকদের নিজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টি হয়, তারা সাহসী যোদ্ধাদের সমর্থন লাভ করে কিন্তু তাদের পারস্পরিক সুরক্ষা বিধান ও লোভ তাদের মধ্যে শত্রুতার জন্ম দেয় ফলে এসকল শাসকেরা পরস্পর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এতে জীবন ও জীবিকার ব্যপক প্রাণহানী ঘটে এবং পূর্বের সকল ইরতিফাকাত ধুলোয় মিশে যায়। এসকল সমস্যা একটি কেন্দ্রীয় শাসন বা খিলাফত আল খুলাফাকে প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করে।<sup>৬১</sup> এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় শাসককে সামরিক এবং বস্তুগত দিক থেকে অন্তত এতটুকু শক্তিশালী হতে হবে যেন অন্য কোনো শক্তি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়ার দুঃস্বপ্ন না দেখে।<sup>৬২</sup> জনসাধারণের জীবনের নিরাপত্তায় প্রয়োজনে খলিফা দুস্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করবেন।<sup>৬৩</sup></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহ আন্তর্জাতিক চরিত্রের এই কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনো অর্থনৈতিক দায়িত্ব অর্পণ করেননি, তবে শান্তিরক্ষা, ন্যায়বিচার প্রদান এবং শোষণ রোধ করার দায়িত্ব পালনের জন্য এই কেন্দ্রীয় শাসকের প্রচুর লোক এবং উপাদানের প্রয়োজন হবে। এসকল খরচ মেটাতে বিভিন্ন কর ধার্য করা এবং এসকল বিষয় পরিচালনা করার অর্থ প্রয়োজন পড়বে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্রোহী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আর্থিক শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু এই ধরনের শাস্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সংস্কার করা এবং সেগুলোকে শৃঙ্খলায় আনা, তহবিল সংগ্রহ নয়।<sup>৬৪</sup> শাহ ওয়ালীউল্লাহ একজন যোগ্য ও সফল খলিফার গুণাবলি বর্ণনা করেছেন এবং দায়িত্ব পালনে তাঁর ভূমিকাকে দৃঢ় ও কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন।<sup>৬৫</sup><a href="https://rkmri.co/ypSeoeIMIR2A/" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 807px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2025/08/Irtifakat-01.jpg" height="133" /></a></p>
<p><strong>ইরতিফাকাত</strong><strong>; </strong><strong>একটি স্বাভাবিক বিকাশ পদ্ধতি</strong></p>
<p>শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, ইরতিফাকাত হচ্ছে একটি স্বাভাবিক বিকাশ পদ্ধতি।<sup>৬৬</sup> তবে এক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলে সেটা মূলত মানুষের খারাপ অভ্যাস ও অসৎ প্রকৃতির কারণে সৃষ্টি হয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে নবুওয়তের উদ্দেশ্যও ছিল মানুষকে ইরতিফাকাতের মাধ্যমে বিকশিত করা এবং এই পথে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সকল বাধাকে দূরীভূত করা। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মতে, গার্হস্থ্য ও ব্যবস্থাপনা কোরআনী শরীয়তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর মতে, রাসূল (স.)-এর দায়িত্ব ছিল ইরতিফাকাতের দ্বিতীয় পর্যায়কে পরিশুদ্ধ করা এবং তৃতীয় পর্যায়ের ইরতিফাকাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া এবং এই দ্বীনকে চতুর্থ পর্যায়ের ইরতিফাকাতের মাধ্যমে দুনিয়ার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করা।<sup>৬৮</sup> এভাবে তিনি আর্থ-সামাজিক বিকাশ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে একত্রিত করে ‘ইকতিরাবাত’ নামে নতুন একটি পরিভাষার জন্ম দেন। ইকতিরাবাতের মাধ্যমে একজন মানুষ তার আত্মপরিশুদ্ধিকে আরো বিকশিত করে।<sup>৬৯</sup> যাহোক এখন আমরা আবার আমাদের পূর্বের আলোচনায় ফিরে আসি।</p>
<p>এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার, তা হচ্ছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালীউল্লাহর উল্লিখিত শ্রম বিভাজন, মুদ্রার বিনিময়, বাজার, সুদের বিকাশ রোধ, যাকাত, জাতীয় অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে শাহ ওয়ালীউল্লাহর পূর্ববর্তী আলেমগণ যেমন ইমাম আবু ইউসুফ (মৃত্যু : ৭৯৮ খ্রি.), ইমাম গাজ্জালী (মৃত্যু : ১১১১), ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (মৃত্যু : ১৩২৮), ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম (মৃত্যু : ১৩৫২), ইবনে খালদুন (মৃত্যু : ১৪০৬) সহ আরো অনেকে আলোচনা করেছেন। কিন্তু শাহ ওয়ালীউল্লাহ কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিক্ত করে ইরতিফাকাতের মূলনীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।</p>
<p>প্রথম পর্যায় একেবারেই নিখাদ ঐতিহ্যবাহী আলোচনা যেখানে মানুষ কেবল খাবার এবং মৌলিক প্রয়োজন পূরণে ব্যস্ত। কিন্তু আস্তে আস্তে শ্রমের বিভাজন, দক্ষতা ভিত্তিক শ্রেণির বিকাশ মুদ্রার বিনিময় ঘটাতে বাধ্য করে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির বিকাশ সাধন ও মানুষের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ককে কিছু মৌলিক চুক্তির উপর নিয়ে আসে। এটা আর্থ-সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এই স্তর থেকেই মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হতে শুরু করে এবং ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সদস্য হিসেবে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করে। এই স্তরেই আর্থ-সামাজিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো আর্থ-সামাজিক দুষ্টচক্রের প্রতিকার সাধন করে সমাজের জন্য একটি সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ ও অবকাঠামোর সৃষ্টি হয়। অর্থনীতি যখনই দ্বিতীয় স্তর অতিক্রম করে ফেলে তখন রাষ্ট্রের তথা শাসকের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।</p>
<p>এভাবে মানব সমাজ ইরতিফাকাতের তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে এবং নগর-রাষ্ট্র জাতিরাষ্ট্রে রূপলাভ করে। এই পর্যায়ে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি বজায় রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পিত হয়। জাতিরাষ্ট্রের মাঝে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রতিকারে জাতিরাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের জন্ম দেয়। আর এভাবে মানব সমাজ ইরতিফাকাতের চতুর্থ পর্যায়ে প্রবেশ করে।</p>
<p>তবে শাহ ওয়ালীউল্লাহ এই কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরেননি। কেন জড়িয়ে পরেননি এর উত্তরে বলা যায়, হয়ত শাহ ওয়ালীউল্লাহর সময়ে তিনি তেমনটা প্রয়োজনবোধ করেননি। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ দূর্বল রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য করে থাকে যা শাহ ওয়ালীউল্লাহ ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে পারস্পরিক বিরোধ থেকে বাঁচানো এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য করার নীতিরই বাস্তবায়ন।</p>
<p><strong>শাহ ওয়ালীউল্লাহ এমন এক সময়ে আর্থ-সামাজিক বিকাশের এই সিস্টেমটি দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেন যখন দুনিয়ায় এই বিষয়টি তখনো একটি সাবজেক্ট হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁর এমন কৃতিত্ব তাঁকে জ্ঞানের এই ক্ষেত্রে প্রধান গোড়াপত্তনকারীদের একজন হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য করে। তাঁর ইরতিফাকাতের তত্ত্ব এতবেশি সামগ্রিক যে বিংশ শতাব্দীর অসংখ্য মডেল এই তত্ত্বে অনায়াসেই ঠাঁই পেতে পারে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তথ্যসূত্র :</p>
<ol>
<li>1. Schumpeter, J. A., <em>History of Economic Analysis</em>: London, George Allen and Unwin, 1972, p.73; Mazer, A J., &#8220;<em>Economic Thought and Its Application and Methodologz in the Middle East&#8221;</em> Middle East Economic Papers, Beirut, vol. 56, pp. 66-74.</li>
<li>2. Here are a few of them: Siddiqi, M.N., Recent Works on History of Economic Thought in Islam &#8211; A Survey, Jeddah, ICRIE, 1982; Islahi, Abdul Azim, Economic Thought of Ibn al-Qazzim, Jeddah, ICRIE, 1984; Islahi, Abdul Azim, Economic Concepts of Ibn Taimizah, Leicester, The Islamic Foundation, 1988.</li>
<li>3. For example, Ahmad, B., <em>Imam Wali-Allah Dehlawi awr unka Falsafah-e- Umraniyat wa Ma`ashizat</em> (<em>Shah Wali-Allah Dehlawi and his Philosophy of Sociology and Economics</em>), Lahore, Bait al-Hikmat, 1945.</li>
<li>4. Tadhkirah Adil Khan (Manuscript), p. 34, Quoted by Nizami, K. A., in his edited work: <em>Shah Wali-Allah Ke Siyasi Maktubat</em> (Political Letters of Shah Wali-Allah), Aligarh, 1950, p. 162.</li>
<li>5. <em>Dehlawi, Shah Wali-Allah, Shah Wali-Allah Ke Siyasi Maktubat</em> (<em>Political Letters of Shah Wali-Allah</em>), Nizami, K. A. (ed.), op. cit., p. 53.</li>
<li>Ibid. p. 52.</li>
<li>Ibid. p. 42.</li>
<li>Ibid.</li>
<li>Dehlawi, Shah Wali-Allah, <em>Hujjat-Allah al-Balighah</em> (Henceforth Hujjat), Beirut, Dar</li>
</ol>
<p>al-Fikr, n.d. vol. 1, p. 45.</p>
<ol start="10">
<li>Ibid. p.l06, Siyasi Maktubat, op. cit., pp. 43, 52, 83, 84. Shah Wali-Allah addresses different sections of the society and warns them of bad consequences of their sinful behaviour, cf. Dehlawi, Shah Wali-Allah, <em>al-Tafhimat al-Ilahiyah, Dabhel, al-Majlis al-`Ilmi</em>, n.d.</li>
<li>Dehlawi, Shah Wali-Allah, <em>al-Budur al-Bazighah</em> (henceforth al-Budur), Dabhel, al-Majlis al-`Ilmi, p. 51.</li>
<li>Ibid. pp. 53-54, <em>Hujjat</em>, op. cit., vol. 2, pp. 39-40</li>
<li>Hujjat, op. cit., p. 40.</li>
<li>al-Budur, p. 50.</li>
<li>Ibid. p. 52.</li>
<li>Ibid. p. 50.</li>
<li>Ibid. p. 51.</li>
<li>Ibid. p. 55.</li>
<li>Ibid. pp. 55-60.</li>
<li>Ibid. p. 60.</li>
<li>Ibid. pp. 66-67.</li>
<li>Ibid. p. 67; <em>Hujjat</em>, vol. 1, p. 43.</li>
<li>Ibid.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 1, p. 97</li>
<li><em>al-Budur</em>, op. cit., p. 68.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2, p. 105.</li>
<li>Ibid. p. 106.</li>
<li>Ibid. vol. 1, p. 43.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 67.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2, p. 43</li>
<li><em>al-Budur</em>, pp. 68-69.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2, pp. 112-113.</li>
<li>Ibid. pp. 114-116.</li>
<li>Ibid. p. 1l6. This view is held by him although some others do not agree that the donor&#8217;s right of ownership rests with him.</li>
<li><em>al-Budur</em>, 69, 78; <em>Hujjat</em>, vol. 2, p. 106.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2, p. 106.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2. p. 106.</li>
<li>Ibid. p. 107.</li>
<li>Ibid.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 70.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2 p. 1l7.</li>
<li><em>al-Budur</em>, pp. 50-51.</li>
<li>Ibid. p. 51.</li>
<li>Ibid. p. 71.</li>
<li>Ibid. pp. 71-72.</li>
<li>Ibid. p. 73.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 1, pp. 44-45.</li>
<li>Ibid. pp. 45-47;<em> al-Budur</em>, pp. 73-85.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 1, p. 105.</li>
<li>Ibid. p. 46; <em>al-Budur</em>, p. 85.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 1, p. 46.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 85.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2, p. 174.</li>
<li>Ibid. p. l71.</li>
<li>Dehlawi, Shah Wali-Allah, <em>Izalat al-Khafa, Bareilz</em> (India), 1286 H., vol. 2, p. 264.</li>
<li><em>Hujjat</em>, vol. 2, p. 104.</li>
<li><em>al-Budu</em>r, pp. 120, 214.</li>
<li>Ibid. pp. 214-215.</li>
<li><em>Izalat al-Khafa</em>, vol. 2, p. ll7.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 51; <em>Hujjat</em>, vol. I, p. 47.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 85.</li>
<li><em>Hujjat</em>,vol. 1, p. 47.</li>
<li>Ibid. p. 48</li>
<li>Ibid.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 94; <em>Hujjat</em>, vol 2, p. 48.</li>
<li>Deh1awi, Shah Wali-Allah, <em>al-Khair al-Kathir</em>, Dabhel, <em>al-Majlis al-`Ilmi</em>, 1352 H.,</li>
<li>83.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 199; <em>al-Tafhimat al-Ilahizah</em>, op. cit., vol. 1, p. 60.</li>
<li><em>al-Budur</em>, p. 266.</li>
<li>Ibid. pp. 241-42.</li>
</ol>
<p><strong>অনুবাদঃ সায়েম মুহাইমিন </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/imam-shah-waliullah-irtifakat/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13638</post-id>	</item>
		<item>
		<title>&#8216;উন্নত কৃষি&#8217; ইসলামী সভ্যতার অনন্য উপহার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/advanced-agriculture-a-gift-towards-the-mankind/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/advanced-agriculture-a-gift-towards-the-mankind/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[রোয়াক ডেস্ক]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 06 Jun 2023 12:08:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7801</guid>

					<description><![CDATA[কৃষিতে অসামান্য উন্নয়নের মাধ্যমে হোক কিংবা আরবীতে লেখা কৃষিকাজের নির্দেশনামূলক বিরাট গ্রন্থের উপর নির্ভর করেই হোক, ইসলামি কৃষি সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিকতার ইতিহাসবিদদের নিকট ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। Dr. Jaser Abu Safieh এর লেখা আরবী থেকে অনুদিত এ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>কৃষিতে অসামান্য উন্নয়নের মাধ্যমে হোক কিংবা আরবীতে লেখা কৃষিকাজের নির্দেশনামূলক বিরাট গ্রন্থের উপর নির্ভর করেই হোক, ইসলামি কৃষি সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিকতার ইতিহাসবিদদের নিকট ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। <strong>Dr. Jaser Abu Safieh</strong> এর লেখা আরবী থেকে অনুদিত এ প্রবন্ধটিতে ইসলামী কৃষি ঐতিহ্যের কিছু লক্ষণীয় দিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং কৃষি কিভাবে ইসলামী সমাজ সংস্কৃতির সাথে জড়িত হয়ে গিয়েছিল তাও দেখানো হয়েছে। কৃষিপন্য উৎপাদনে এর বৈপ্লবিক অর্জনগুলো উল্লেখ করে আরো বলা হয়েছে, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর আগ্রহ, ভাষাগত ধরণ, ঔষধ হিসেবে উদ্ভিদের ব্যবহার, এমনকি কৃষি বিজ্ঞানের উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।</p>
<p><strong>ভূমিকা </strong></p>
<p>ইসলাম সূচনালগ্ন থেকেই কৃষি কাজকে উৎসাহিত করে আসছে। সৃষ্টি প্রক্রিয়া ও পৃথিবীর প্রাণের সাথে সম্পর্কিত কোরআনে কতিপয় আয়াত আছে যা কৃষির সাথেও সম্পর্কযুক্ত । আবার কৃষি কাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে এমন হাদিসের সংখ্যাও প্রচুর। এজন্য মুসলিম শাসকেরাও কৃষিতে বিশেষভাবে মনোযোগী ছিলেন আর এটিই  ছিলো তখনকার অর্থনৈতিক কাজের প্রধান অংশ এবং ইসলামী অর্থনীতির স্তম্ভ। তাই, চাষের জন্য ভূমি পূনর্গঠন, নদী ও খাল খনন করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যেখানেই উপযুক্ত জমি পাওয়া যেতো, কারো জমি না থাকলে সেখানে তাদেরকে চাষ করার সুযোগ দেওয়া হতো। এটি একটি নজিরবিহীন ইতিহাসে পরিণত হয়।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7802" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি১.png" alt="" width="695" height="445" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি১.png 695w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি১-300x192.png 300w" sizes="(max-width: 695px) 100vw, 695px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ১: ইবনে আল-আওয়ামের <em>‘‘কিতাব আল-ফিলাহা’’</em> এর দুটি ছবি দেওয়া হয়েছে। আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-আওয়াম আল-ইশবিলি-এর লেখা<em> ‘‘কিতাব আল-ফিলাহা আল-আন্দালুসিয়া’’</em> (আন্দালুসিয়ান কৃষি গ্রন্থ)। ৩৫টি অধ্যায় সম্বলিত এই গ্রন্থে কৃষি, গৃহপালিত পশু ও পাখি পালন, মৌমাছি পালন এবং ৫৮৫ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৫০ এর বেশি ফল চাষ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মাটি, সার, গাছ কলম করা ও উদ্ভিদের রোগ নিয়েও মূল্যবান আলোচনা রয়েছে।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এর পাশাপাশি, কৃষিকে পৃথিবীতে মানব বসতি গড়ে ওঠার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হতো। কারণ যখনই মানুষ জমিতে লাঙ্গল চাষ, বীজ বপন ও ফসলের যত্ন নেওয়া শুরু করল, তখনই তারা যাযাবরের জীবন ছেড়ে বসতি গড়তে বাধ্য হয়। হয়তো এজন্যই উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তাঁর সৈন্যদেরকে অন্যদেশে কৃষি কাজকে পেশা হিসেবে নিতে প্রথমে নিষেধ করেছিলেন, যাতে তারা সংগ্রামের জীবন ছেড়ে বিশ্রাম ও শান্ত জীবনধারায় অভ্যস্ত না হয়ে যায়। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি তাঁর সৈন্যদের অন্যদেশেও কৃষি কাজের অনুমতি দিয়েছিলেন। এ প্রবন্ধে ইসলামী ইতিহাসে উদ্ভিদের প্রতি আগ্রহের তিনটি দিকের ওপর মূলত আলোকপাত করা হবেঃ ভাষা সংক্রান্ত দিক, চিকিৎসাশাস্ত্রে উদ্ভিজ্জ পন্যের ব্যবহার ও কৃষি বিজ্ঞানের বিকাশ।</p>
<p><strong>ভাষাবিদ্যা এবং চিকিৎসায় কৃষি ও উদ্ভিদ</strong></p>
<p>ভাষাবিদগণ  বিভিন্ন উদ্ভিদ সংগ্রহ করে, সেগুলোর নাম ও কৃষি সংক্রান্ত পারিভাষিক শব্দ সংগ্রহের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেন। এই প্রচেষ্টার ফলে তাদের শব্দভান্ডার ব্যাপক সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যার প্রতিফলন বেশ কিছু বিশেষ অভিধানে পাওয়া যায়। যেমন, ইবনে সিদাহ-এর <em>&#8216;আল মুখাসসাস&#8217;</em>। এসকল ভাষাগত প্রবন্ধ অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ব্যাপক তথ্য সম্বলিত। বিশেষ করে এসব প্রবন্ধে উল্লেখিত বর্তমান সময়ের Plant Anatomy Science সম্পর্কিত বিষয়ে লেখাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে যে কেউই অবাক হবেন।</p>
<p>এ সকল প্রবন্ধে উদ্ভিদের সকল পর্যায়ের বিকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত সঠিক বিবরণ লেখা হয়েছে। এ বিষয়গুলো যে যথোপযুক্ত ছিলো, তার প্রমাণ হিসেবে নিচে উল্লেখিত <em>আল মুখাসসাস</em> গ্রন্থের প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারিঃ</p>
<p>‘‘একটি তাল গাছের বীজ রোপন করা হলে, যখন এটি বড় হতে শুরু করে, তখন এর প্রথম পর্যায়কে বলা হয় ‘আল নাকিরা’। ভাষাবিদ আবু জাইদ ব্যাখ্যা করেন, ‘আল নাকিরা’ হলো বীজের পেছনে থাকা একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র, যা থেকে তাল গাছটির চারা গজায়। এর পরের পর্যায় হলো হার্প (Herp/নাজিমা), এরপর কাঁটা, এরপর প্লেইটওয়ার্ক (Plaitwork) এবং এরপর আরও ধাপ আছে। এভাবে যখন পাম গাছটি একটি বৃক্ষে পরিণত হয় তখন তাকে মাদুর (আল ফার্শ) বলা হয়, যখন পাম গাছের প্লেইটওয়ার্ক গুলো সংখ্যায় বেড়ে আরো চওড়া হয়ে যায় তখন তাকে শার্প (Sharp/আল সাফিফি) বলা হয়, এরপর স্ট্রাইপ (Stripe/আসিব), এরপর রস (আল নাসিঘা) এবং শেষ পর্যায়কে প্রনশিয়াল (Pronchial/শাইব) বলা হয়।’’</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7803" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি২.png" alt="" width="433" height="672" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি২.png 433w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি২-193x300.png 193w" sizes="(max-width: 433px) 100vw, 433px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ০২: ইবনে লুয়ুন এর করা কৃষি চুক্তির দলিল (৭৪০ হিজরী/১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দ)]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>চিকিৎসাশাস্ত্রের ক্ষেত্রে মুসলিমগণ উদ্ভিদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদ সংরক্ষণ করার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন। উমর আল-আনতাকি বন্য থাইম (এক প্রকার সুগন্ধিপাতাযুক্ত গাছ) সম্পর্কে বলেছেনঃ</p>
<p>‘‘চিকন পাতার এক প্রকার বন্য থাইম আছে যা প্রায় কালো রঙের। এর আরেক প্রজাতি আছে যাকে ‘‘গাধা বা পাহাড়ি থাইম’’ বলে যার পাতাগুলো তুলনামূলক চওড়া এবং স্বাদ একটু কম তেতো হয়। বাগানের থাইম গাছ পুদিনাপাতার গাছের মতো করে লাগানো হয়। এটি শূল রোগ ও প্রায় সকল বিষের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এটি সকল খাবারে সুন্দর স্বাদ আনে ও রক্ত পরিশোধন করে।’’</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষিতে ইসলামী ঐতিহ্যের দিক সমূহ</strong></p>
<p>ইসলামী কৃষি ঐতিহ্যের কেন্দ্রকে বৃহদার্থে বলা যায়<em> ‘‘যিরা’আত আল-আরদ’’</em> (ভূমি চাষ)। এটি হলো এই গবেষণার প্রধান বিষয়। এখানে ইবনে আল-‘আওয়াম-এর কথা উল্লেখ করা বেশি উপযুক্ত হবে, যেহেতু তিনি এই ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেনঃ</p>
<p>‘‘জমি চাষ করা বলতে বুঝায় কোন জমিকে প্রস্তুত করা, তাতে গাছ লাগানো, শস্য ফলানো, সেগুলোর যত্ন নেওয়া, এর পাশাপাশি উর্বর, অর্ধ উর্বর ও অনুর্বর ভূমি সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখা। এছাড়াও, কোন জমিতে কোন ধরনের গাছ লাগানো যাবে, প্রত্যেক গাছের জন্য কোন ধরনের পানি, কীটনাশক ও সার কোন সময়ে কত পরিমাণে দেয়া উপযুক্ত ও জরুরি এবং কিভাবে খাদ্যশস্য মজুদ করতে হবে এসকল জ্ঞানও এর অন্তর্ভুক্ত।’’</p>
<p>এই বিস্তর কৃষি জগৎ নিয়ে আরো বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ প্রবন্ধটিতে এর কিছু সংক্ষিপ্ত রূপরেখা প্রদান করবো মাত্র।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অভিধান সংকলনে মাটি</strong></p>
<p>আন্দালুসিয়ান স্কলার ইবনে আল-‘আওয়াম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ <em>‘কিতাব আল-ফিলাহা ’</em> এ বলেন:</p>
<p>‘‘কৃষিকাজের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রথমেই জানতে হবে তা হলো মাটি, অর্থাৎ মাটি উর্বর বা ব্যবহারের উপযোগী কিনা। যে এ সম্পর্কে না জানবে, সে কৃষিকাজে সফল হতে পারবে না।’’ এই উক্তিটি থেকে এ কথা পরিষ্কার হয় যে একজন কৃষিবিদের মাটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। অর্থাৎ মাটির প্রকৃতি, ধরন, কোন গাছ কোন ধরনের মাটিতে লাগাতে হবে, মাটির শীতলতা, তাপ, আর্দ্রতা, শুষ্কতার মাত্রা এবং উদ্ভিদের ওপর এ সবগুলো ব্যাপারে প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।</p>
<p>মাটির প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মাটিকে আলোচ্য উপায়ে তালিকাভুক্ত করা যায়:  নরম মাটি, শক্ত মাটি, পাহাড়ি মাটি, বেলে মাটি, কালো মাটি, সাদা মাটি, হলদে মাটি, লাল মাটি, রুক্ষ মাটি এবং লালচে মাটি।</p>
<p>অন্য আরও বিষয়ের পাশাপাশি গাছ পঁচার কারণ সম্পর্কেও জ্ঞানার্জন করা উচিৎ, যা মাটির শ্রেণীবিন্যাসের সাথে সম্পর্কিত। এজন্য মাটি পরিবর্তন করা উচিৎ, যে পরামর্শ বর্তমানের কৃষিবিদগণ দেন। এছাড়া শোভা বর্ধক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রতি ছয় মাস অন্তর মাটি পরিবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>সেচ বিজ্ঞান</strong></p>
<p>মুসলিমরা যে সকল সেচের পদ্ধতি ব্যবহার করতেন তার মধ্যে কিছু ছিল খুবই সাদামাঠা, আবার কিছু ছিল বেশ জটিল। এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে ছিল দেশ ভেদে ভিন্নতা। আল-সাম্মান (এক বিখ্যাত পানির উৎস) সম্পর্কে ইতিহাসবিদ আল-হামদানি বলেছিলেন:</p>
<p>‘‘সেখানে পানি এতই গভীর ছিল যে ৭০ থেকে ১০০ ‘বা’ (৪ বা সমান ৩মিটার) পর্যন্ত গভীরতা ছিল। আবার পানি মজুদ করার জন্য শক্ত পাথর বেষ্টিত কৃত্রিম কূপ ও ছোট ঝিলও ছিল।’’</p>
<p>খুমারাওয়াইহ-এর সেচ প্রকৌশলগণ এক অদ্ভুত সেচ প্রক্রিয়ার নকশা করেছিলেন। তারা সোনার ন্যায় পিতল দ্বারা গাছের কান্ড আবৃত করতো। এই পিতলের আবরণ ও কান্ডের মাঝে সীসার তৈরি ছোট নল থাকতো যা দিয়ে পানি নির্গত হতো। এভাবে পুরো বাগানে পানি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হতো।</p>
<p>ভূগোলবিদ আল-ইস্তাখরি তার গ্রন্থ ‘আল-মাসালিক ওয়া-ই-মামালিক’ (রাস্তা ও রাজ্য)-এ বলেছেন:</p>
<p>‘‘মার্ভে (বর্তমান খোরাসান, ইরান) ১০,০০০ কর্মী বিশিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।’’</p>
<p><img decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7805" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৩.png" alt="" width="452" height="660" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৩.png 452w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৩-205x300.png 205w" sizes="(max-width: 452px) 100vw, 452px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৩: ‘কানজ আল-ফাওয়াইদ ফি তানভি আল-মাওয়া’ইদ’(মধ্যযুগীয় আরব-ইসলামী রন্ধন শিল্প) এটি একটি অজ্ঞাতনামা মধ্যযুগীয় আরবী ভাষায় লিখিত রান্নার বই। সম্ভবত মামলুক আমলের (১২৫০-১৫১৭) কোনো এক সময় সংকলিত। বইটিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার, মিষ্টি, পানীয়, ওষুধ ইত্যাদি তৈরির ৮০০ টিরও বেশি রেসিপি রয়েছে যার সাথে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পরামর্শও সংযুক্ত করা হয়ে হয়েছে।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত সেচের ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতিগুলো এতটাই কার্যকর ছিল যে এত সময় পরে এসেও বেশ কিছু পদ্ধতি এখনো বিদ্যমান আছে। বর্তমান স্পেনের আন্দালুসিয়ার কিছু অঞ্চলে এখনো সে সময়ের কিছু পদ্ধতি প্রচলিত আছে। আজও ভ্যালেনশিয়ার ওয়াটার কোর্টে প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক সেশন হয়, যেমনটি ইসলামী শাসনামলে হতো।</p>
<p>ইরাকের সামাররা- এর নিকটবর্তী আল-নাহরাওয়ান নদীর তীরে অবস্থিত ফৌখারা গেটে কিছু গাঠনিক নলাকার বস্তু পাওয়া যায় যা মুসলমানদের উন্নত সেচ প্রকৌশল বিজ্ঞানের প্রমাণ দেয়। একজন স্কলার এই বস্তুগুলো বিশ্লেষণ করে জানান যে, এগুলো বিশুদ্ধ কাদা মাটির তৈরি এবং এগুলোকে প্রাথমিকভাবে ১০৫০° সেলসিয়াসে গলানো হলে ক্ষয়রোধী বস্তুতে পরিণত হয়।</p>
<p>প্রত্যেকটি কৃষি বইতে পানির প্রকারভেদ এবং কোন ধরনের পানি কত পরিমাণে বিভিন্ন গাছের জন্য উপযোগী সে সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়। কিভাবে ও কি কি পরীক্ষণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি খুঁজে পাওয়া যায়, কোন ক্ষেত্রে পানি পাওয়ার জন্য মাটিতে ছিদ্র করতে হয় এসব সম্পর্কেও বিষদ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।</p>
<p>আরব বিজ্ঞানীগণ বুদবুদ ফোয়ারা থেকে সীসার নলের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা মাটির গভীরতা মেপে মাটির পৃষ্ঠের নিচ দিয়ে সেচ খাল খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা নদীর পানির স্তর মাপার যন্ত্রেরও উদ্ভাবন করেছিলেন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>সার</strong></p>
<p>ইবনে আল-হাজ্জাজ বলেন: ‘‘তোমাদের জানা প্রয়োজন যে, মাটিতে যদি সার না দেওয়া হয় তবে তা দূর্বল হয়ে যায় আবার যদি অতিরিক্ত দেয়া হয় তবে তা পুড়ে যায়।’’ এ তত্ত্বটি একটি দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচক্ষণ চিন্তার দিকে ইঙ্গিত করে। সময়ের সাথে সাথে উদ্ভিদ তার মাটিতে মজুদকৃত সব খাদ্য নিঃশেষ করে ফেলে এবং এই ঘাটতি মেটানোর প্রয়োজন কিন্তু তাই বলে অতিরিক্ত পরিমানে সার দেওয়া যাবে না। এজন্য কৃষিবিদগণ সার দেয়ার নির্দেশনাবলী যথাযথভাবে অনুসরণ করতে বলেন।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7804" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৪.png" alt="" width="588" height="714" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৪.png 588w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৪-247x300.png 247w" sizes="(max-width: 588px) 100vw, 588px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৪: আরবী ভাষায় প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি পান্ডুলিপিতে অঙ্কিত আখ গাছের চিত্র।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইবনে বাসসাল, ইবনে হাজ্জাজ ও ইবনে আল-‘আওয়াম সারের প্রকারভেদ এবং কোন ধরনের মাটি ও উদ্ভিদের জন্য কোন ধরনের সার উপযোগী তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা মাটিতে গাছের পাতা ও জৈবসারের ব্যবহার সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। ইবনে বাসসাল তাঁর পর্যবেক্ষণকে তিনভাগে ভাগ করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল শুধুমাত্র ঘাস, খড় ও ছাইয়ের মিশ্রন একটি গর্তে দিয়ে তাতে পানি দিয়ে পঁচানোর জন্য রেখে দেওয়া। সারের ব্যবহার উদ্ভিদ ও মাটির বিকাশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। ইবনে বাসসাল বলেন, মিষ্টি কুমড়া গাছ প্রথমে সারের পাত্রে লাগাতে হয়, এরপর গাছটি পোক্ত হয়ে গেলে তাকে সাধারণ মাটিতে লাগাতে হয়।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>রোপন শিল্প</strong></p>
<p>এ কথা বলা অতিরিক্ত হবে না যে, পুরোনো আরবী গ্রন্থগুলোতে রোপন শিল্প নিয়ে যে নির্দেশনাবলী আছে তা আজও যৌক্তিক। এই গ্রন্থের লেখকগণ উদ্ভিদবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যার মূলনীতি চর্চা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই নির্দেশনাগুলোর সংকলন করেন। কোন মাটির জন্য কোন ধরনের উদ্ভিদ উপযুক্ত তা অধ্যয়ন করে সে অনুযায়ী তাঁরা মাটি প্রস্তুত করতেন।</p>
<p>ইবনে বাসসাল মিষ্টিকুমড়া রোপন সম্বন্ধে বলেন, ‘‘আল-আন্দালুসের মতো শীত প্রধান দেশগুলোতে মিষ্টি কুমড়া জানুয়ারি মাসে সারের পাত্রে লাগাতে হয়। এরপর এপ্রিল মাসে তা যথেষ্ট পোক্ত হলে স্থায়ী মাটিতে স্থানান্তর করতে হয়।’’</p>
<p>সার দিয়ে রোপনের ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দেন:</p>
<p>‘‘মাটিতে সার দিয়ে সমান করে নিয়ে ২০ সেন্টিমিটার অন্তর ছোট ছোট গর্ত করতে হবে। বীজের সরু প্রান্ত যেন উপরের দিকে মুখ করে থাকে এমনভাবে প্রতিটি গর্তে চার থেকে পাঁচটি করে বীজ দিতে হবে। বীজগুলোকে পাঁচ সেন্টিমিটার পুরু করে সার দিয়ে ঢেকে জায়গাটিতে বাঁধাকপির পাতা দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দিতে হবে। বাঁধাকপির পাতা কনডেন্সার (বাষ্পকে ঘনীভূত করে জলে রূপান্তরের ব্যবস্থা) হিসেবে কাজ করে। সার থেকে তাপ উপরে উঠার পর বাঁধাকপির পাতা দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ঘনীভূত হয় এবং পানি কনা রূপে আবার উদ্ভিদে ফিরে আসে যা সেচের মতো কাজ করে। যখন গাছটি বড় হয়ে যথেষ্ট পোক্ত হবে, তখন তাকে অবশেষে বেড়া দিয়ে ঘেরা জমিতে স্থানান্তর করতে হবে।’’</p>
<p>এই জটিল প্রক্রিয়া আমাদের আধুনিক ড্রিপ সেচ ও গ্রীনহাউজের কথা মনে করিয়ে দেয়।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7806" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৫.png" alt="" width="696" height="504" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৫.png 696w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৫-300x217.png 300w" sizes="(max-width: 696px) 100vw, 696px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৫: ১৫’শ শতাব্দীতে আরবী ভাষায় লেখা উদ্ভিদবিদ্যার ওপর পান্ডুলিপি যা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল গ্রন্থাগারে রয়েছে। এটি ১৯৪২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা রবার্ট গ্যারেট কালেকশন থেকে পাওয়া যায়।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী কৃষি ঐতিহ্যে রোপন শিল্পের অগ্রগতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা পালংশাকের মতো কিছু সবজি সারা বছর চাষ করতেন। ইবনে আল-ফাকিহ আল-হামদানি বলেন, ইরাকে যে কোন জাতের ফল বা সবজি সারা বছরই পাওয়া যেত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষি রোগ নিয়ে বিতর্ক</strong></p>
<p>আরবীয় কৃষি বিশেষজ্ঞগণ উদ্ভিদের রোগ পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী ছিলেন এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। এমনকি অভিধান সংকলক, ইবনে সিদাহ্ তাঁর লেখা <em>আল-মুখাসসাস</em> গ্রন্থে উদ্ভিদের সুস্থ বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণগুলো নিয়ে সম্পূর্ণ একটি অধ্যায় লিখেছেন। তিনি পাতার ক্ষয়রোগ, অন্যান্য উদ্ভিদ, তাল গাছ ও গাছের গুড়ির রোগ নিয়েও অধ্যায় লিখেছেন।</p>
<p>কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গাছের মালিকেরা গাছগুলোকে রোগ মুক্ত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। আরবী কৃষি বইগুলো পড়লে বোঝা যায় যে, তারা তাদের উদ্ভিদকে রক্ষা করতে কঠোরভাবে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। তবে কখনো কখনো তাদের এই পদ্ধতিগুলোর তত্ত্ব বা চর্চার সাথে কুসংস্কারও মিশ্রিত থাকতো।</p>
<p>উদাহরণ স্বরূপ, ইবনে বাসসাল দ্বারা বর্ণিত পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন: মিষ্টি কুমড়া গাছের গোড়ায় ছত্রাকের আক্রমণ হয়ে গাছ শুকিয়ে গেলে, এর চিকিৎসা হিসেবে রোগাক্রান্ত অংশটিকে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয় এই আশায় যে নতুন করে গাছটি গজাবে। আবার আল-হাজ্জাজ-এর লেখা থেকে আল-আওয়াম উদ্ধৃতি দেন:</p>
<p>‘‘যদি এমন কোনো গাছ দেখা যায়, যার উৎপাদন কম ও ডালপালা দূর্বল, ফল গুলোতে পোকা ধরেছে ও ফল পড়ে যাচ্ছে এবং বছরের পর বছর একই অবস্থা চলছে, তাহলে বুঝতে হবে, সে গাছের মাটি ঠিক নেই। এর চিকিৎসার জন্য গাছের মূল কান্ড থেকে ২.৫ মিটার দূরত্বে গাছের শেকড়ের চারপাশ দিয়ে মাটি খনন করে আগের মাটি সরিয়ে নিতে হবে। খননকৃত গর্তটি অন্য জায়গা থেকে নতুন মাটি এনে ভরাট করে তার ওপর ভারী কাঠের টুকরো দিয়ে চাপা দিতে হবে। যদি গাছের শেকড়গুলো প্রায় পঁচে গিয়ে থাকে তবে সেগুলো কেটে ফেলে দিয়ে প্রাকৃতিক সার দিতে হবে। আর যদি শেকড় কেঁচোর আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায় তবে সারের সাথে ছাই মিশিয়ে সেখানে দিতে হবে। যদি মাটি বেশি আর্দ্র মনে হয় তাহলে সারের সাথে শুষ্ক লাল মাটি বা সাগর (বা নদীর) বালু মিশ্রিত মাটি দিয়ে গর্তটি ভরাট করতে হবে।’’</p>
<p>ইবনে হাজ্জাজ এভাবে আরও রোগের সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করে তা মোকাবিলা করার উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এটিও উল্লেখ্য যে ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ পঁচা সার থেকে আসা কেঁচো ও কীট দমনে ছাইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>গাছের প্রাকৃতায়ন (Naturalization)</strong></p>
<p>গাছের প্রাকৃতায়ন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ গাছের বন্য প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে গৃহজাত করণের প্রক্রিয়া উদ্দেশ্যহীনভাবে তৈরি হয়নি। এই প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে নিয়ম মেনে তৈরি করা হয়েছিল। আমরা ইবনে বাসসালের প্রাকৃতায়নের ওপর লেখা ভূমিকা থেকে এটাই জানতে পারি। তিনি বলেন:</p>
<p>‘‘প্রাকৃতায়নের ওপর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন যেহেতু, এক্ষেত্রে অগণিত ব্যর্থতার নজির আছে। অন্যদিকে, এই প্রক্রিয়া যেহেতু গাছের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় তাই বেশ সুবিধাজনক। এটি করতে গাছের প্রকৃতি ও বয়স জানতে হবে এবং প্রাকৃতায়নের সঠিক সময় বাছাই করতে হবে।’’</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="aligncenter size-full wp-image-7807" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৬.png" alt="" width="540" height="751" srcset="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৬.png 540w, https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2023/06/কৃষি৬-216x300.png 216w" sizes="(max-width: 540px) 100vw, 540px" /></p>
<p style="text-align: center;"><strong>[চিত্র ৬: আবদেল-গনি ইবনে ইসমাইল আল-নাবলুসি, একজন সিরিয়ান লেখকের লেখা কৃষি বিষয়ক বই ‘ইলম আল-মিলাহা ফি ‘ইলম আল-ফিলাহা’র সূচীপত্র।]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলমান বিজ্ঞানীগণ শুধু প্রাকৃতায়নের নিয়ম, প্রকারভেদ ও কৌশল  সম্পর্কেই বলেননি, বরং যে সব গাছে সাধারণত প্রাকৃতায়ন হয় না সেগুলোরও প্রাকৃতায়ন করিয়ে দেখিয়েছেন। যেমন, ডুমুর গাছের সাথে জলপাই গাছের এবং গোলাপ গাছের সাথে আঙ্গুর, আপেল ও কাঠবাদাম গাছের বিশেষ প্রাকৃতায়ন (naturalization) করানো হয়েছিল। এই বিশেষ প্রাকৃতায়ন শিল্প টোলেডো-তে এত উন্নত ছিল যে ইতিহাসবিদ ইবনে সা’ইদ বলেন যে তিনি এক গাছে কয়েক রকমের ফল দেখেছেন।</p>
<p>[**এখানে প্রাকৃতায়ন শব্দটি বেশ কিছু জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। মূল শব্দটি হলো Naturalization, একে আমরা প্রাকৃতায়ন শব্দে অনুবাদ করেছি। প্রাকৃতায়ন বলতে বন্য প্রকৃতির বৃক্ষকে গৃহজাত করার উপায় হিসেবে ধরা যায়, পাশাপাশি গাছে কলমের ন্যায় কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে এক গাছে একাধিক রকমের ফল ফলানোর প্রক্রিয়ার জন্যও শব্দটি ব্যবহার করা যায়।]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ফল ও কৃষি পণ্য সংরক্ষণ</strong></p>
<p>ফল এবং কৃষি পণ্য সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায় আছে। আমরা এখানে অপ্রচলিত কিছু উপায় উল্লেখ করব। ইবনে হাজ্জাজ বলেন, আপেল, ডালিম, কুইন্স (Quince), নাসপাতি, জামির (Citron) এবং আঙ্গুর বিশেষ ধরনের কাঁচের পাত্র দ্বারা গাছেই সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এই বিশেষ কাঁচের পাত্রের মুখটি সরু ও ভিতরটা প্রশস্ত হয়। তাঁর মতে, এই পাত্রে পাঁকা ফলও সংরক্ষণ করা যায়। ফুল থাকাতেই এই কাঁচের পাত্রে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পাত্রটিকে শক্ত করে গাছের শাখার সাথে বেঁধে দেওয়া হয়। যদি কাঁচের পাত্রে ফল দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণের উদ্দেশ্য থাকে তবে পাত্রে বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়।</p>
<p>আবার মধুতে ফল ডুবিয়ে রেখেও দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়, এতে ফলের কোন পরিবর্তন হয় না। ইবনে বাসসাল বলেন, লিনেন কাপড়ের টুকরো জড়ানো বিশেষ মাটির পাত্রে আপেল সংরক্ষণ করা যায়। পাত্রের ভিতর এক সারি আপেল সাজিয়ে রেখে তার ওপর লিনেন কাপড় দিয়ে, তার ওপর আবার আরেক সারি আপেল রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে পুরো পাত্রটি পূর্ণ করে পাত্রটির মুখ মাটি দিয়ে সীল করে শীতল জায়গায় রেখে দেওয়া হয়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এটি রেফ্রিজারেটরে আপেল সংরক্ষণের পেছনের মূল ধারণা নয় তো?</p>
<p>ইবনে আল-হাজ্জাজ আরও বলেছেন যে গম, ডালিমের পাতা, গল (Galls, পরজীবির আক্রমণের ফলে গাছের পাতায় সৃষ্ট গুটি যা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়) ও ওক (Oak) কাঠের ছাই মিশিয়ে রাখলে গমকে ঘুন পোকা থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষি পণ্যের শিল্পায়ন</strong></p>
<p>আরবী কৃষি গ্রন্থ সমূহের ক্ষেত্রে একটি বহুল প্রচলিত নিয়ম ছিল যে, সকল কৃষি বইয়ে সংক্ষেপে হলেও কৃষি পণ্যের শিল্পায়ন নিয়ে কিছু বর্ণনা লেখা থাকবে। যেমন: কিসমিস, শুকনো ডুমুর, ভিনেগার, আচার, জ্যাম, চিনি, তুলা, তেল ও সুগন্ধি প্রস্তুত করণের বর্ণনা।</p>
<p>কিভাবে কিসমিস তৈরি করা হয় সে ব্যাপারেও ইবনে হাজ্জাজ বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বাগান মালিকদের পাঁকা আঙ্গুরের গুচ্ছের বোটা পর পর দুই থেকে তিন রাত মোচড় দিয়ে শুকানোর জন্য রেখে দেওয়ার নির্দেশনা দেন। কেউ যদি কিসমিস সংরক্ষণ করতে চান তবে ইবনে হাজ্জাজ মাটি দিয়ে লেপা বিশেষ জগ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী শুকনো আঙ্গুরের গুচ্ছ গুলোকে আঙ্গুরের শুকনো পাতার সাথে এই জগে রাখতে হবে এবং জগটি ভর্তি হয়ে গেলে তার উপর শুকনো আঙ্গুরের পাতার  আরেকটি পরত  দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। অবশেষে, জগগুলো ধোয়া ও আর্দ্রতা মুক্ত শীতল জায়গায় যেন রাখা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।</p>
<p>ইয়েমেন গাজর, জামির, মিষ্টি কুমড়া ও পীচ (জাম জাতীয়) ফল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। কঠিন হাদৌরি (Hadouri) মধু ছিল ইয়েমেনের বিশেষত্ব এবং একে মক্কা ও ইরাকের একটি মূল্যবান উপহার হিসেবে দেখা হতো। ইয়েমেনে এই বিশেষ মধু প্রস্তুত করতে মধুকে রোদে শুকানোর পর যত দিন না শক্ত হয়ে আসে তত দিন ক্যানে (ধাতুর তৈরি পাত্র বিশেষ) রেখে দেওয়া হতো। সবশেষে ক্যানগুলো সীল করা হতো।</p>
<p>মার্ভে (খোরাসান, ইরান) তরমুজ কাটা অবস্থায় ইরাকে রপ্তানি করা হতো। এ স্থানের মানুষ খাবারে স্বাদ বাড়াতে জলপাইয়ের আচারের সাথে মধু, তেল, থাইম (এক ধরনের সুগন্ধিপাতা) ও ধনিয়া মিশিয়ে ব্যবহার করতো।</p>
<p>আরবীয় ঐতিহ্যের শাস্ত্রীয় কৃষিবিদগণ বিভিন্ন ফুল, বিশেষ করে গোলাপের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় তাদের সুগন্ধি শিল্প সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। জুর শহর বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য বিখ্যাত ছিল। আল-নুওয়াইরি তাঁর গ্রন্থ, <em>‘নেহায়াতুল-আরব’</em> এর দ্বাদশ অধ্যায়ে পাতন পদ্ধতিতে সুগন্ধি ও আতর তৈরির বহু প্রণালী উপস্থাপন করেন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>বাগান এবং অন্যান্য শিল্প</strong></p>
<p>ইসলামী সংস্কৃতি কখনো উদ্ভিদের নান্দনিক দিককে অবজ্ঞা করেনি; বরং প্রকৃতির বিস্ময়কর সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষকে সৃষ্টিকর্তার মহিমা স্মরণ করিয়েছে। তাই বিভিন্ন রকম গোলাপ সহ অন্যান্য উদ্ভিদ ও অন্যান্য ফুল গাছ সমৃদ্ধ বাগান করার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া হতো। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-মাকরিযি ‘খুমারাওয়াইহ’-এর বাগানের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ</p>
<p>‘‘তিনি তার বাগানে বহু ধরনের উদ্ভিদ রোপন করেছেন। বিভিন্ন উচ্চতার পাম গাছ লাগিয়েছেন। কোনো গাছের ফল দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নাগাল পাওয়া যায় আবার কোনো গাছের ফল বসে থাকা অবস্থাতেই নাগাল পাওয়া যায়। আবার ফলগুলোর স্বাদও ভিন্ন। গোলাপ ও জাফরানের গাছও লাগানো হতো। এছাড়াও ভালভাবে বাগানের যত্ন নেয়ার জন্য মালি নিয়োগ করা হতো।’’</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার বিজ্ঞানীগণ আরবীয় ঐতিহ্যের অন্যান্য কৃষি শিল্পের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরনের কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। যেমন: বীজহীন আঙ্গুর, বারমাসি গোলাপ ইত্যাদি। এমনকি তাঁরা গোলাপ সহ কিছু ফুলের রঙও নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। তাঁরা ফুলের রঙ বাছাই করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। এছাড়া তাঁরা পানির ট্যাংক ঘেরা বেসিনে কমলা রেখে দিতেন, যাতে দেখে মনে হয় যে জলাধার থেকে কমলার গাছ উঠে এসেছে।</p>
<p>ইসলামী স্কলারর্সগণ তাদের আরও অনেক গৌরবময় সাফল্যের কথা লিখে গিয়েছেন। জলবায়ুর অবস্থা ও মাটির ধরন বিবেচনা করে তারা বহু বন্য উদ্ভিদকে নিয়ন্ত্রণে এনে সযত্নে বাগানে প্রতিপালন করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথমে এই নতুন উদ্ভিদ সমূহকে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মাটি দিয়ে, বিভিন্ন রকম বিশেষ পাত্রে লাগানো হতো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কৃষিজ পণ্যের প্রসার</strong></p>
<p>১৯৭৪ সাল থেকে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের Andrew M. Watson এর উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এই ফলাফলে Watson ইসলামী বিশ্বে কৃষির আমূল পরিবর্তন এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে ভৌগোলিকভাবে সারা বিশ্বে কৃষির প্রসারের ইতিহাস সংকলন করেন। তিনি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ সমূহকে মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে মুসলিমদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেছেন। এভাবেই উষ্ণ জলবায়ুতে উপযুক্ত নতুন ধরনের শস্য ও লেবু জাতীয় ফলের বিকাশ হয়েছিল। তিনি ৭২৬ টি প্রজাতির উদ্ভিদকে তালিকাভুক্ত করেছেন যেগুলোকে আরবি উৎস থেকে ল্যাটিন নাম দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>১৩’শ শতাব্দী পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে ধরে তিনটি মহাদেশে (এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ) দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন আসার পেছনে ইসলামী কৃষির যে বাস্তবিক প্রভাব আছে তা দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল ওয়াটসনের অনুসন্ধান। তিনি এই পরিবর্তনের নাম দেন মধ্যযুগীয় সবুজ বিপ্লব (পরবর্তীতে এই নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘মুসলিম কৃষি বিপ্লব’, ‘ইসলামী কৃষি বিপ্লব’ ও ‘ইসলামী সবুজ বিপ্লব’)। এই সকল শব্দসমষ্টি একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, তা হলো ৮ম থেকে ১৩দশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম ভূখণ্ডে কৃষির আমূল পরিবর্তন।</p>
<p>ওয়াটসন যুক্তি দেখান, মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বের ব্যবসায়ীগণ পৃথিবী জুড়ে অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির ফলেই ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অংশের মাঝে অনেক ফসল এবং কৃষিকাজের বিস্তার সম্ভব হয়েছিল। এর সাথে আরও যুক্ত ছিল ইসলামী বিশ্ব ও এর বাহিরের অঞ্চলে ফসলের অভিযোজন এবং বিভিন্ন কৌশলের আয়ত্তকরণ। আফ্রিকার ফসল যেমন- শিম, চীনের ফসল যেমন- লেবু জাতীয় (Citrus) ফল এবং ভারত থেকে অসংখ্য ফসল যেমন- আম, ধান, তুলা এবং আখ প্রভৃতি ইসলামী ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওয়াটসনের মতে, আগে কখনও এই ফসলগুলো এই ভূখণ্ডে চাষ করা হয়নি। ইসলামী আমলে বিস্তার লাভ করা এমন আঠারোটি ফসলের তালিকা তৈরি করেছিলেন ওয়াটসন। কিছু লেখক এই সময়ে অসংখ্য ফসলের এমন বিস্তারকে ‘‘ফসলের বিশ্বায়ন’’ বলে আখ্যায়িত করেন। ওয়াটসন বলেন, ইসলামী বিশ্বে অর্থনীতি, জনসংখ্যা বন্টন, গাছপালার পরিমাণ, কৃষি উৎপাদন ও আয়, জনসংখ্যার মাত্রা, শহরাঞ্চলের বৃদ্ধি, শ্রমশক্তির বন্টন, যুক্ত শিল্প-কারখানা, রান্না, খাদ্য, এবং পোশাক প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই প্রবর্তনগুলো এবং সেই সাথে কৃষিক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পথপ্রদর্শনকারী ভূমিকা পালন করেছিল।</p>
<p>আমরা ইউরোপে আরবীয়দের আনা ফুলগুলো থেকেও কিছু উল্লেখ করতে পারি। যেমনঃ জুঁই, হলুদ গোলাপ, লাল ও সাদা ক্যামেলিয়া ইত্যাদি। উদ্ভিদের এই বিস্তারে আরবদের প্রভাবের প্রমাণ হিসাবে মোস্তফা আল-শেহাবী ফরাসি ভাষায় বেশ কয়েকটি গোলাপ এবং উদ্ভিদের নামের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন।</p>
<p>পরিশেষে, একটি মজার কথা উল্লেখ করা যায় যে, কিছু চীনা প্রাচীন নথিতে আমরা যে গল্প পাই তা ১৩’শ শতাব্দীর। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক হুই-লিন কিছু নথি উদ্ঘাটন করেছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল যে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগে ইসলামী বিশ্বের নাবিকেরা আমেরিকা পৌঁছেছিলেন এবং সেখান থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নিয়ে এসেছিলেন। এই তত্ত্বটি ছিল ড. ‘লি’ এর ৯ বছরের গবেষণার ফল। ড. লি দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে একাধিক স্থানে অনুসন্ধান ও গবেষণা পরিচালনার কাজে নিবেদিত ছিলেন। তাঁর নথিসমূহ নিশ্চিত করে যে, মুসলিমগণ ‘‘মোলান-পাই’’ নামে একটি অঞ্চলে পেঁপে, আনারস, কুমড়া এবং ভারতীয় ভুট্টা নিয়ে গিয়েছিলো, যা সম্ভবত আমেরিকার কোন অংশ।</p>
<p><strong>তথ্যসূত্র: </strong>Gleanings from the Islamic Contribution in Agriculture by Dr. Abu Jaser Safieh</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>অনুবাদঃ নওরীন নবী </strong></p>
<p><strong> </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/advanced-agriculture-a-gift-towards-the-mankind/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7801</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কৃষির উন্নয়ন হয়েছে কৃষকের হয়নি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/krishir-unnoyon-hoyeche-krishoker-hoyni/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/krishir-unnoyon-hoyeche-krishoker-hoyni/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ফয়েজ আহমদ তৈয়ব]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 16 Feb 2022 15:34:59 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6801</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশের শহুরে নিম্নবিত্তের আয়ের প্রায় শতভাগই খাদ্যসংক্রান্ত খাতে ব্যয় হয়ে যায়। মধ্যবিত্তের সিংহভাগ উপার্জনও বাসা ভাড়া ও খাদ্যপণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়। জলাশয়ের পানির স্বল্পতা, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের উচ্চ খরচ কিংবা দুষ্প্রাপ্যতা, ঋতু পরিবর্তন, খরা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার জঞ্জাল, উচ্চ সুদের কৃষিঋণ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশের শহুরে নিম্নবিত্তের আয়ের প্রায় শতভাগই খাদ্যসংক্রান্ত খাতে ব্যয় হয়ে যায়। মধ্যবিত্তের সিংহভাগ উপার্জনও বাসা ভাড়া ও খাদ্যপণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়। জলাশয়ের পানির স্বল্পতা, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের উচ্চ খরচ কিংবা দুষ্প্রাপ্যতা, ঋতু পরিবর্তন, খরা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার জঞ্জাল, উচ্চ সুদের কৃষিঋণ এবং কৃষি উপকরণের কোম্পানি নির্ভরতার প্রত্যক্ষ কারণে দিন দিন বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়। মূল্যবৃদ্ধির কিছু পরোক্ষ কারণও রয়েছে।</p>
<p><strong>চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বাম্পার ফলন</strong></p>
<p>বাংলাদেশে বিশেষ এলাকায় বিশেষ ফলন বেশি হয়। সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় বাম্পার ফলন হলেই দাম পড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। উৎপাদন মূল্যের বিপরীতে বাজারমূল্য কম হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি স্বাধীনতার ৫০ বছরেও চালু করতে পারেনি বাংলাদেশ। সারে সরকারের দেওয়া ভর্তুকিতেও পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে। জমির পরিমাণ ও ফসলের চাহিদামাফিক সারের ডিজিটাল সরবরাহব্যবস্থা নেই, ফলে নিবন্ধনের বিপরীতে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভর্তুকি দেওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত লাভবান হয় দলীয় ডিলার। সরকার–নির্ধারিত মূল্যে কখনোই সার বিক্রি করে না ডিলার, কৃষকের কাছ থেকে আদায় করে ঘুষ ও অতিরিক্ত মূল্য। কৃষিভর্তুকির আমূল ডিজিটাল সংস্কার জরুরি। জাতীয় পরিচয়পত্র, চাষাবাদের জমি ও পেশাভিত্তিক ফলন নিবন্ধন, সার সরবরাহ, ঋণ-প্রণোদনা-ভর্তুকি প্রদানের ডিজিটাল ব্যবস্থায় যেতে হবে। দালালদের পাশ কাটিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় সরাসরি কৃষক থেকে ধান কেনার মডেলে যেতে হবে।</p>
<p>বৈচিত্র্যহীন চাষের একচেটিয়া মডেলে একটি এলাকায় সবাই ধান করলে চাইলেও অন্য ফলন করা যায় না। ফলন বৈচিত্র্য ও বাজার চাহিদামাফিক নিবন্ধন কৃষি প্রশাসনের কাজ। দেশীয় জাতের ফলন থেকে চাষি একবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়া বিশেষ জাত দু-তিন বছরে নাই হয়ে যায়। কৃষক জিএমও বীজ ও চারা নির্ভর হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই এরা রোগবালাই এবং পতঙ্গ–প্রতিরোধী নয় বলে অতিরিক্ত সার, কীট-ছত্রাক ব্যবহার করতে হয়। এগুলোর ব্যবহারে উপকারী পোকার প্রজাতি নষ্ট হচ্ছে, শক্তিশালী হয়ে উঠছে ক্ষতিকারক পোকামাকড়-ছত্রাক। ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক নির্ভরতার বিপরীতে জৈব-রাসায়নিক সমন্বিত চাষাবাদের দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প বানানো দরকার।</p>
<p>এক দিকে মুলা, ফুলকপির অতিরিক্ত ফলন হচ্ছে অথচ অন্য ফসলের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদনই হচ্ছে না। প্রতিবছর আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।নিরানন্দ কৃষিশ্রম উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন কৃষি অফিসগুলোকে আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে কৃষক সস্তায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ভাড়া নিতে পারতেন। কায়িক শ্রম, উচ্চ মূল্য থেকে মুক্তি পেলে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কৃষিকে পেশা হিসেবে নিতে উৎসাহিত হবেন। কৃষি সরঞ্জাম ক্রয়ে সরকার ভর্তুকি দেয়, কিন্তু নষ্ট যন্ত্র মেরামত ও সংরক্ষণের কারিগরি সেবা নেই বলে এই ভর্তুকি কাজে আসে না।</p>
<p><strong>পাইকারি বাজারে কৃষকের অধিকার</strong></p>
<p>কারওয়ান বাজারসহ কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক বাজারগুলো পাইকারদের দখলে থাকে, দালালদের মাধ্যমে প্রভাবশালীরা বাজারসংলগ্ন রাস্তা পর্যন্ত ভাড়া দেয়। ব্যক্তি কৃষকের এখানে ফসল নিয়ে আসার সুযোগ নেই। এতে কৃষিপণ্য উৎপাদনের পেছনে যে মান, পরিশ্রম, পরিবেশ ও বৈচিত্র্যগত বহু গল্প থাকে, ক্রেতার তা অজানাই থাকে। নেই মূল কৃষক ও দালালদের মধ্যে মূল্য প্রতিযোগিতাও।</p>
<p><em><strong>মানহীন কৃষিপণ্য পরিবহন শাকসবজি, ফল, খাদ্যশস্য, মাছ প্রায় সবই খোলা ট্রাকে, বাসের ছাদে কিংবা বাক্সে অত্যন্ত গরমের মধ্যে, অত্যধিক বাতাসে, রোদে পরিবহন করা হয়। শ্রেণীকৃত, হিমায়িত, তাপানুকূল ‘ফুডগ্রেড’ পরিবহন ব্যবস্থা নেই। মহাসড়কের পাশে, ফেরিঘাটে, যানজটে মাইলের পর মাইল দাঁড়িয়ে থাকে কৃষি পণ্যবাহী ট্রাক। এতে শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে, পণ্য নষ্ট হয়, দামও বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৫ শতাংশ পণ্য শুধু পরিবহনে নষ্ট হয়।</strong></em></p>
<p>দাম বাড়াচ্ছে চাঁদাবাজি রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের মহাস্থান হাট থেকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে আসতেই সব ধরনের সবজির দর বেড়ে যাচ্ছে ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত। পথে পথে চাঁদাবাজি। পণ্যবাহী ১০ টনের একটি ট্রাককে চাঁদা দিতে হয় প্রায় সাড়ে ২২ হাজার টাকা। হাইওয়ে পুলিশের পণ্য পরিবহনে সব ধরনের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, অথচ তারাই বেশি চাঁদাবাজি করে। যেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীই চাঁদাবাজি করে, সেখানে কৃষিপণ্যের দাম কীভাবে কমবে! এর সঙ্গে যোগ হয় স্থানীয় সমিতির চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, পাইকারি বাজারের স্থান ও দালালের খরচ। দালালেরা স্থানীয় বাজারে সিন্ডিকেট নির্ধারিত পাইকারি মূল্যে পণ্য বিক্রিতে কৃষককে বাধ্য করে। কৃষিপণ্যের জন্য বিশেষ সুবিধার সড়ক পরিবহনের চিন্তা সরকারের নেই। দেশের সবজি ও কৃষি উৎপাদনের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোকে বিভাগীয় শহরের সঙ্গে ট্রেন সংযুক্ত করার কাজ এখনো বাকি। বগুড়া-সিরাজগঞ্জের মতো দরকারি কৃষি রেল রুট কিংবা কৃষিপণ্য পরিবহনবান্ধব বিশেষ রেল কোচ এখনো চালু করা যায়নি। কৃষি হাবগুলো থেকে মহানগরে পণ্য পরিবহনের জন্য শ্রেণীকৃত তাপানুকূল, হিমায়িত ট্রেন কোচ বা বিশেষ সড়ক পরিবহনের ব্যবস্থা থাকলে বহুস্তরের চাঁদাবাজির লাগাম টানা যেত। তরমুজের দাম বাড়ার পর জেলা প্রশাসনকে কম দামে তরমুজ বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ ধরনের লোকদেখানো সস্তা কাজ না করে পুলিশের উচিত বহুস্তরের চাঁদাবাজি থামানো। বাজারব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে দালাল ও পাইকার গোষ্ঠী সাময়িকভাবে ক্রয় বন্ধ করে পচনশীল কৃষিপণ্যের সমূহ ক্ষতি করতে সক্ষম।</p>
<p><strong>চাই টেকসই স্টোরেজ অবকাঠামো</strong></p>
<p>ঋণের কারণে ফসল সংরক্ষণ করতে পারেন না কৃষক, উৎপাদনের অব্যবহিত পরেই বিক্রি করে ঋণের কিস্তি কিংবা দেনা শোধ করতে হয়। তার উপর উচ্চ আর্দ্রতার এবং উচ্চ তাপমাত্রায় পচনশীল সবজিজাতীয় কৃষিপণ্য সংরক্ষণের কোনো উপায়ই দেশে নেই, নেই অঞ্চল ও পণ্যভিত্তিক অবকাঠামো। ভিন্ন ভিন্ন ফসলের চাহিদা মোতাবেক আমাদের কোল্ডস্টোরেজ শ্রেণীকৃত নয়, দেখা যায় পুরোটাই আলুর উপযোগী নয়! ফলে কৃষকেরা অ্যান্টি ক্লোরিনেটেড ওয়াটার, কার্বাইড কিংবা ফরমালিন ব্যবহার করছেন! উৎপাদিত পচনশীল শাকসবজি, ফল-ফুল সংরক্ষণের ব্যবস্থা না–থাকায় মৌসুমের বাইরে ফলনের কোনো বাজার নেই। এতে কৃষক বেশি উৎপাদিত পণ্য মৌসুমেই কম দামে বাজারে ছাড়তে বাধ্য হন। ভিন্ন ভিন্ন জাতের আম পাড়ার মধ্যে ফারাক তিন-চার সপ্তাহ, লিচুর মাত্র দুই সপ্তাহ, কাঁঠালের তিন-চার সপ্তাহ, সবজি ও ফুলের ক্ষেত্রেও দু-তিন সপ্তাহ। সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই কৃষককে বাজারজাত করতে হয়। তাই সমন্বিত বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে বাড়তি পচনশীল পণ্য পানির দরে বিক্রি হয়। অথচ মৌসুমের পরেই কিন্তু বাজারে এগুলোর ভালো দাম থাকে। এতে বিষ মিশিয়ে সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ে। উপরন্তু বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বিক্রির বড় কোন আন্তর্জাতিক বাজারও তৈরি হয়নি। এর প্রধান কারণ হতে পারে, মানসম্পন্ন বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফুডগ্রেড সংরক্ষণ, মানসম্পন্ন প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় সংযুক্ত হওয়ার বিপণন ব্যর্থতা।</p>
<p>স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলাদেশের যত অর্জন, তার মধ্যে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম কৃষি উৎপাদনকারী দেশ। এই অর্জনকে নিবন্ধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের অবকাঠামোগত উৎকর্ষে সঞ্চারিত করে প্রকৃত কৃষকদের ধনী করা গেলে সেটাই হবে টেকসই উন্নয়ন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/krishir-unnoyon-hoyeche-krishoker-hoyni/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6801</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বর্তমান বাংলাদেশ ও কৃষি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/current-bangladesh-and-agriculture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/current-bangladesh-and-agriculture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Sep 2021 10:46:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বর্তমান বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বর্তমান বাংলাদেশ ও কৃষি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6077</guid>

					<description><![CDATA[প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলাপমেন্টের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকাসহ নানা কারণে শুধুমাত্র কৃষি মাধ্যমকেই প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলশ্রুতিতে আমরা এখনো কৃষি নির্ভর দেশ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা ও অভ্যন্তরীণ উন্নতির ক্ষেত্রে কৃষির বর্তমান অবস্থা কী? অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকটকালে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলাপমেন্টের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকাসহ নানা কারণে শুধুমাত্র কৃষি মাধ্যমকেই প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলশ্রুতিতে আমরা এখনো কৃষি নির্ভর দেশ হিসেবেই পরিচিত।</p>
<p><em><strong>কিন্তু অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা ও অভ্যন্তরীণ উন্নতির ক্ষেত্রে কৃষির বর্তমান অবস্থা কী?</strong></em></p>
<blockquote><p>অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকটকালে যা ভূমিকা রাখতে পারত তার কতটুকু রাখতে পেরেছে? বর্তমানে এই খাতটির সত্যিকারের অবস্থা কী? আমাদের কৃষি আদৌ কি অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, নাকি কিছু মুখস্ত বয়ান তথা সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ কিংবা চাল উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে থাকার সংবাদ দিয়ে প্রায় ভেঙ্গে পড়া কৃষি-অর্থনীতিকে মিথ্যে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে ?</p></blockquote>
<p><strong>করোনাকালীন সময়ে কৃষির অবস্থা কেমন, যেখানে পরিস্থিতি-সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধ্বস থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য কৃষির উন্নয়ন ছিলো অন্যতম একটি সমাধান। এ সময়ে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রনালয়, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয় কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে? রাষ্ট্রীয় খাদ্য গুদামগুলোতে ২০-২৫ লাখ মেট্রিক টন চাল-ডাল মজুদ থাকাসহ ভয়াবহ অব্যবস্থাপনায় ৫০ লাখের অধিক পরিবহণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, রিক্সাচালক, হোটেলবয়, ভ্যানচালক, ফুটপাথের ক্ষুদ্র পরিসরে প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতাদের মতো দুই কোটির অধিক মানুষ বর্তমানে কীভাবে দিনাতিপাত করছে? তাদের অন্ন-বস্ত্র সংস্থানের অবস্থা কী? রাষ্ট্রের বা মন্ত্রণালয় কি তা জানে!</strong></p>
<p>আমরা যদি গত কয়েক মাসের রিপোর্ট লক্ষ্য করি তাহলে দেখব-<br />
• এই করোনাকালীন সময়ে কিংবা তার পূর্বের অর্থনৈতিক অবস্থা, ইনডাস্ট্রিয়াল বা কৃষির যে সামগ্রিক অবস্থা ছিল, সেই আলোকে আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০% মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করার অবস্থায় চলে গিয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা যেমন, প্রথম আলো, দ্যা ডেইলি স্টার, নয়া দিগন্ত, বণিক বার্তার কয়েক মাসের রিপোর্টের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাব শুধু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামের শহরগুলোতে যে ফ্যাক্টরিগুলো আছে, <em><strong>সেখানে কর্মরত ৫ লাখের অধিক মানুষ চাকরিচ্যুত হয়েছে গত ৩-৪ মাসে। এছাড়া ব্র‍্যাক আর ডেইলি স্টারের হিসাবে বলছে প্রায় ৪৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক বেতন পাচ্ছে না</strong></em>। ছোট ছোট উদ্যোক্তা যারা ছোটখাটো ফ্যাক্টরি বা পুঁজিকে কেন্দ্র করে কাজ শুরু করেছিলো, সেগুলোর প্রায় ৭০-৮০% ই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন নগর শ্রমিক যেমন হোটেলে কর্মরত অথবা স্থাপনা নির্মানের কাজে যুক্ত মানুষদের অবস্থাও অভিন্ন। সকলেই এই কয়েক মাসে তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।<br />
বিদেশে কর্মরত রেমিটেন্স যোদ্ধারাও দেশে ফিরে আসছেন, যার সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। এমনকি ধারণা করা হচ্ছে এই সংখ্যা বেড়ে ১৪-১৫ লাখে পৌঁছাবে। সব মিলিয়ে যদি গণনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যাবে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ লাখের মত শ্রমিক এখন চাকরিচ্যুত, বেকার হয়ে পড়েছে ৫ লাখের মত নগর শ্রমিক এবং প্রবাস থেকে দেশে ফিরে আসা লাখ লাখ মানুষ। এই বিপুল পরিমাণ মানুষ যারা চাকরিচ্যুত হচ্ছে, কর্মসংস্থান হারাচ্ছে, প্রবাস থেকে দেশে ফিরছে তারা এখন গ্রামাঞ্চলে ফিরে যাচ্ছে।<strong> কিন্তু প্রশ্ন হলো গ্রামীণ যে কর্মক্ষেত্র, যে কৃষি ব্যবস্থা তা কি আদৌ এই কর্মসংস্থানহীন মানুষগুলোকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে সক্ষম?</strong></p>
<blockquote><p><strong>• কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষিকাজের সাথে জড়িত আছেন প্রায় ৬০% পুরুষ এবং ৪০% নারী। কৃষির ক্ষেত্রে বণিক বার্তায় প্রকাশিত যে সবচেয়ে ভয়াবহ রিপোর্ট আমরা দেখেছি তা হলো– ধান ব্যতীত সকল প্রকার কৃষিদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে আমাদের।</strong></p></blockquote>
<p>একটি উদাহরণ লক্ষ্য করা যাক। বাংলাদেশে তুলার মোট চাহিদা ৭৩-৭৪ লক্ষ বেল, অথচ দেশে মাত্র ১ লক্ষ ৭১ হাজার বেল তুলা উৎপন্ন হচ্ছে। বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন বাহির থেকে তুলা আমদানিতে আমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি বা অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার যথাযথ উপযোগ থাকলে তা দিয়ে দেশেই প্রায় কয়েক কোটি বেল তুলা উৎপাদন করা সম্ভব! অথচ এদিকে আমরা ৯০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি কৃষিপণ্য আমদানি করে চলছি!<br />
হাস্যকর বিষয় হল, কোনো এক বছরে যদি ১ লাখ ৭১ হাজারের স্থলে ২ লাখ বেল তুলা দেশে উৎপন্ন হয়, তাহলে মন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই বলতে শুরু করবে, &#8220;আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।&#8221; কিন্তু মূল যে ক্ষতির জায়গাটা, সেটা আমরা কেউ-ই লক্ষ্য করছি না।</p>
<p>• একইভাবে যদি দেশে উৎপাদিত ফসল অর্থাৎ ধানের কথায় আসি, তাহলেও দেখতে পাব উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ধান উৎপন্ন হচ্ছে।<br />
আর যতটুকুই উৎপাদিত হচ্ছে, তা মজুদ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই! তাহলে বাকি ফসল কোথায় যাচ্ছে? মহাজনেরা, বিভিন্ন কোম্পানি কিংবা সাধারণ ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছে। একটা বড় অংশই চলে যাচ্ছে এদের কাছে, যার ফলে কৃষকরা তাদের কষ্ট, শ্রম, বিনিয়োগের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এমনকি সরকার রাষ্ট্রীয় গুদামজাতকরণের ধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি করছে না।</p>
<blockquote><p>যারা ধান চাষ করে তাদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি, ২০০২ সালে বর্গাচাষী অর্থাৎ ভূমিহীন চাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা ৪৫%, ২০১৬ তে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫% এ। বর্তমানে এ সংখ্যা ৭০% ছাড়িয়ে গেছে। তাহলে ভেবে দেখার বিষয় এই ৭০% কৃষক যেখানে ভূমিহীন এবং তাদের চাষকৃত ফসলের ৫০% মালিককে দিয়ে দিতে হচ্ছে, সেখানে এই কৃষকরা কি আদৌ তাদের পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে? অসম্ভব!</p></blockquote>
<p>• এদিকে সারা দেশব্যাপী বেকারত্বের ভয়াবহ কালো ছায়া বিরাজমান। এই বেকার, চাকুরিহীন মানুষগুলো কোথায় যাচ্ছে? তাদের সন্তান, পরিবার সব কিছুই তো গ্রাম-কেন্দ্রিক, তাই তারা স্বাভাবিকভাবেই গ্রামমুখী হচ্ছে। কিন্তু গ্রামের যে সার্বিক অবস্থা তা দ্বারা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও সম্ভবপর নয়। এমনকি সরকার থেকেও তারা কোনো সহযোগিতা, ভর্তুকি পাচ্ছে না।<br />
অথচ <strong>এ বছর সরকার থেকে কৃষি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা!</strong> এই বড় অঙ্কের অর্থ আসলে কোথায় যাচ্ছে, যেখানে ৭০% মানুষই ভূমিহীন চাষী! তারা তো সরকারের তালিকারই বাইরে, সরকার থেকে কোনো ঋণ পাচ্ছে না। আবার প্রত্যেক বারই ঘাটতি দেওয়া হচ্ছে। এই ঘাটতির টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে যেখানে ধান ছাড়া সব ফসলই আমাদেরকে বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে? এটা সহজেই অনুমেয়– এ জায়গাতেও বড় ধরণের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অযোগ্য নেতৃত্ব কাজ করছে।</p>
<p>♦ ব্রিটিশ পূর্ববর্তী সময় বা বাংলা সালতানাতের সময়ে আমাদের দেশে উৎপাদিত ২৫০ টির বেশি (কারো কারো মতে ৪০০টি) ফসল আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতাম; যে ফসলগুলো অধিকাংশই এখন বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। শীতের মৌসুমে আমাদের দেশে ফুলকপি, বাধাকপি, গাজর, টমেটো এ জাতীয় সকল সবজি উৎপাদন শুরু হবে; কিন্তু এই ফসলগুলোর বীজ সেই বিদেশি কোম্পানিগুলো থেকেই আমদানি করা!</p>
<p><strong>এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো যে মারাত্মক কাজটি করে থাকে তা হলো-</strong></p>
<blockquote><p>&#8211; তারা প্রথমেই বীজগুলোকে প্রচন্ডমাত্রায় বিষাক্ত করে তৈরি করে অর্থাৎ বীজকে জেনেটিকালি মোডিফাই করা হয়। জেনেটিকালি মোডিফাইড বীজে এমন কিছু কৃত্রিম পরিবর্তন আনা হয় যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক। তারা বীজের আংশিক বিষাক্ত করে মূলত, যার ফলে সেখানে পোকা তৈরী হয়।</p></blockquote>
<blockquote><p>&#8211; আবার ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বীজে ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ ও বিস্তার রোধে আমরা ব্যবহার করি তাদেরই তৈরি মারাত্মক বিষক্রিয়াযুক্ত কীটনাশক। এই কীটনাশকগুলো পোকার প্রজনন ক্ষমতা বিনষ্ট করে; আর বিষক্রিয়ার ফলস্বরূপ বীজ থেকে প্রাপ্ত ফসল, ফল-ফলাদি, শাকসবজি গ্রহণ করে আমাদের দেশের যুবকরাও তাদের যৌবন হারিয়ে ফেলছে।এ প্রসঙ্গে সূরা বাক্বারার ২০৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তা&#8217;আলা বহু আগেই আমাদের সতর্ক করেছেন। কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ফসলের সত্যিকার স্বাদও নষ্ট হয়ে যায়।</p></blockquote>
<blockquote><p>&#8211; অতঃপর আসে ফসলি জমি প্রস্তুত করতে তাদের তৈরি সার প্রয়োগ, যা সুস্থ শরীরে অকারণে ইনজেকশন পুশ করে করে রোগাক্রান্ত বানানোর বিশেষ প্রক্রিয়ারই নামান্তর। সার প্রয়োগের উদ্দেশ্য হল উৎপাদন বৃদ্ধি করা। অথচ এ প্রয়োগের কারণে ফসল বেশি হলেও খড় ভালো হচ্ছে না, যার ফলে পশুপাখিদের খাবারের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কীটনাশক-সার প্রয়োগের কারণে পশু-পাখির খাবার বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। বিষাক্ত খাবার বা খাবারের অভাবে অনেক প্রজাতির পাখির সংখ্যাও দিনে দিনে কমে যাচ্ছে।<br />
জমিতে প্রয়োগকৃত সার বা কীটনাশক বৃষ্টির পানির মাধ্যমে পুকুর-নদীতে মিশছে, ফলে মাছেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।</p></blockquote>
<p>• কৃষকেরা জমিতে সার-কীটনাশক ব্যবহার করছে কৃষির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য। কিন্তু তারা কোনো ধরণের রাষ্ট্রীয় ঋণ পাচ্ছে না, স্থায়ী পুঁজিও নেই তাদের। তাহলে তারা কিভাবে এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? সমাধানস্বরূপ তারা বিভিন্ন এনজিও, গ্রামীণ মহাজন, গ্রামের কিছু অঞ্চলভিত্তিক সাহেব যারা পুঁজি ঋণ দিয়ে থাকেন তাদের দ্বারগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া আছে ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। কিন্তু এগুলোর প্রতিটিতেই রয়েছে সুদের মহা কারবার। একজন সবজি চাষীর ভাষ্যমতে তাকে ১০০ টাকায় সুদ দিতে হচ্ছে ২১ টাকা। এতে তার লাভের পরিমাণ ১০০ টাকায় ১০৫-১১০ টাকা। অর্থাৎ এখানেও সুদের পরিমাণ বেশি। কুটির শিল্প, মৎস শিল্পের সাথে যারা জড়িতদের সুদ দিতে হয় ১৭% আর লাভ হয় ১৫%। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে গ্রামীণ সুদের কী ভয়াবহ অবস্থা!</p>
<p>• কৃষিতে ভয়াবহ লোকসান কিংবা লাভ এত কম হওয়ার কারণের কথা যদি চিন্তা করি, তাহলে লক্ষ্য করব সমগ্র বিষয়ের পেছনে কিছু সিন্ডিকেট কাজ করে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেক দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের রাস্তাঘাটের যে করুণ দশা, তাতে যাতায়াত করে নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য নিয়ে যেতে অনেক বড় পরিমাণ যাতায়াত খরচ, কষ্ট এবং শ্রম ব্যয় হচ্ছে। তারপর থাকে বাজার চাঁদাবাজি। এখানেই একটা অংশ চলে যায়। আবার ক্রেতার ক্ষেত্রে বাড়তি পাওনা হিসেবে থাকে রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি। এ নানা ধরণের <strong><em>সিন্ডিকেটের কারণে রংপুরের ২ টাকার টমেটো আমাদের হাতে আসতে আসতে তার দাম হয়ে যায় ৪০ টাকা। কিন্তু কৃষক তো সেই বিক্রয়মূল্য দুই টাকাই পাচ্ছে! খরচ হচ্ছে দুই টাকা, বিক্রিও করছে দুই টাকায়। আর আমরা যারা ক্রেতা, তারা কিনছি ৪০ টাকায়।</em></strong> এই বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দূর্নীতি, আখলাকবিহীন অবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকসমাজ এবং সাধারণ মানুষ, লাভ হচ্ছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের।</p>
<p>• LLRD এর মতে বর্তমানে ৫০% পুরুষ এবং ৬০% নারী কৃষক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ, অন্যান্য চাহিদার কারণে তারা নিজেদের উৎপাদিত ফসল, শাক-সবজি, নিজেদের চাষ করা মাছ নিজেরাই গ্রহণ করতে পারছে না। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সন্তানেরাও। এমনকি অনেক বছর আগেও তাদের অবস্থা এ রকমই ছিল। আর তারা যতটুকু গ্রহণ করতে পারছে, সেটাতেও আছে কীটনাশক, সার আর ভেজালের সমাহার। তাহলে চিন্তা করে দেখুন, এই চাষী, হাওড়-নদীর জেলে, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক, নারী কৃষক, কুটির-শিল্পীদের নিয়ে, তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে আমরা একটুও ভাবছি? রাষ্ট্রের কোন সহযোগিতা বা উদ্যোগ আছে? আছে কি কোন পরিকল্পনা, পর্যালোচনা, প্রস্তাবনা? না, নেই। তারমানে প্রথমেই যেটা উল্লেখ করা হয়েছে, তারা যা-ই করছে সবটাই গ্রামের মহাজনদের কাছ থেকে সুদ নিয়ে৷ এতে করে তাদের দারিদ্র্য তো কোন অংশে কমছেই না, বরং দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। তাদের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা সবকিছুরই করুণ অবস্থা। এমনকি শিক্ষা থেকেও তারা অনেক অনেক দূরে।</p>
<p>• করোনাকালীন সময়ে শহরাঞ্চলের যে ২ কোটি পুরুষ কর্মসংস্থানহীন হয়ে পড়েছে তারা সবাই কিন্তু গ্রামেই ফিরে যাচ্ছে। ফলে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্বটা অনেকাংশে তাদের স্ত্রী অর্থাৎ নারীদের উপর চলে গেছে। গ্রামের নারীরা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করে কিছু টাকা আয় করে। এই আয়ের পরিমাণ-ই বা কতটুকু? তারা আদৌ ন্যায্যমূল্যটা পাচ্ছে? তাদের স্বাস্থ্যের কী অবস্থা, চিকিৎসার কী অবস্থা? আর যতটুকুই বা পাচ্ছে তা দিয়ে কি সংসার, একটি পরিবার চালানো সম্ভব? সবমিলিয়ে এই প্রশ্নগুলো কিন্তু থেকেই যায়!</p>
<blockquote><p><strong>• রাষ্ট্রীয় হিসাবমতে এবং বিভিন্ন গবেষণা সেলগুলোর বলছে, এই করোনাকালীন সময়ে দেশের প্রায় ৬ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে। আরো ৬ কোটি মানুষ দিন আনে দিন খায়। এছাড়া কোনো উপায়ন্তর নেই। এভাবে চাকুরিচ্যুত হওয়া এক বিরাট সংখ্যক মানুষ তাদের চাহিদা মেটাতে পারছে না।</strong></p></blockquote>
<p><strong>♦ প্রশ্ন আসতে পারে– তাহলে কি আগে আমাদের কর্মসংস্থান ছিল না?</strong></p>
<blockquote><p>প্রথমেই বলা হয়েছে আমাদের ২৫০ এর মত ফসল ছিল, যা আমরা রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারতাম; সেখানে আজ ধান ব্যতীত বাকি সব ফসল আমাদের বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এ নিয়ে রাষ্ট্রের কোন চিন্তা-ভাবনা নেই, নেই কোন পরিকল্পনা, প্রস্তাবনা, উদ্যোগ।</p></blockquote>
<blockquote><p>&#8211; দুধ সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য উপাদেয় একটি খাবার। কিন্তু আমরা কি দেশের মানুষের দুধের চাহিদা মেটাতে পারছি? দেশের ডেইরি ফার্মগুলোর দ্বারাও কি এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে? অথচ এই দুধকে কেন্দ্র করে ৪০-৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও কোন উদ্যোগ নেই!</p>
<p><span style="font-size: 16px;">&#8211; তারপর আছে মৎস শিল্প। বাংলাদেশের মৎস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ এ নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশে প্রায় হাজারের উপরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত; এখন পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া ছাড়া তেমন কোন মাছই সহজলভ্য নয়। নদী দূষিত হওয়া, অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকায় আমাদের যে বিশাল রপ্তানি শিল্প তা আজ ধ্বংসের মুখে।</span></p></blockquote>
<blockquote><p>&#8211; তারপর রয়েছে পাটশিল্প। আমরা লক্ষ্য করেছি, পাটশিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আজ নতুন করে বেকার হল। পাটকলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হল। অথচ এই পাট ছিল আমাদের সোনালি আঁশ। যতটুকু ছিল, সেটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হল। চাইলেই কি এখানে লক্ষ লক্ষ কিংবা কোটির উপরে কর্মসংস্থান করা যেত না?</p></blockquote>
<p><strong>আমাদের বন্দরকে ঘিরে যে অপব্যবস্থাপনা আছে, সেগুলো বন্ধের কোন উদ্যোগ নাই।</strong></p>
<blockquote><p>&#8211; এরপর রয়েছে চা শ্রমিকেরা। তাদের নিয়ে কোন আলাপ নেই, নেই কোন উদ্যোগ। অথচ আমাদের দেশের অন্যতম একটি বড় শিল্পক্ষেত্র হল চা শিল্প। ন্যায্যমূল্য দিয়ে, সঠিক বেতন দিয়ে এখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব ছিল।</p></blockquote>
<p>আমাদের ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, আমাদের মাছ, পাট, চা, তুলা, মসলা– প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি আমরা যথাসময়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতাম, তাহলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হতনা।</p>
<p>• সর্বশেষ যে বিষয়টি তুলে ধরব তা হল সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি। বন্যার ফলে ৭০-৮০ লক্ষের (কোন কোন রিপোর্ট বলছে কোটির উপরে) উপর কৃষক এবং অন্যান্য কর্মসংস্থানে যুক্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হল। তাদেরকে নিয়ে কোন উদ্যোগ নাই। তাদেরকে নিয়ে কি আদৌ ভাবছি আমরা? কিছু কিছু জেলায় ৬ মাসের অধিক সময় যুবকেরা বেকার জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সেটা নিয়েও কোন কথা হয়নি।</p>
<p>সব মিলিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি কৃষির ক্ষেত্রে আমাদের যে বিশাল সম্ভাবনা ছিল, সে সম্ভাবনা দিয়ে বেকারত্ব তো দূরের কথা, প্রায় ৭০-৮০ টি অঞ্চলে আমাদের পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ২০ কোটির উপরে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেত, উল্টো বিদেশ থেকে শ্রমিক এনেও কাজ করানো যেত। সেই কৃষি নিয়ে আমরা ভাবছি না, বরঞ্চ এই কৃষিই আজ আমাদের শেষ করে দিচ্ছে! আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ছি, স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ছি। চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আবার সেই চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থাও বেহাল।</p>
<p><strong>আমাদের দেশে যে ভয়াবহ বেকারত্ব, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধ্বস, তা থেকে উত্তরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশের এই মহাসম্ভাবনাময়ী কৃষি খাত। কৃষির প্রতিটি অভ্যন্তরীণ বিভাগকে নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে, প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। বিরোধী দল, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন সবাইকে এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে, রাষ্ট্রকে চাপ এবং সঠিক পরামর্শ দিয়ে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য চেষ্টা করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/current-bangladesh-and-agriculture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6077</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জিএমও (GMO), আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/gmo-blessing-or-curse/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/gmo-blessing-or-curse/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আশিকুর রহমান সৈকত]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 26 Jul 2021 05:00:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=5689</guid>

					<description><![CDATA[Genetically Modified Organism (GMO) বর্তমান বিশ্বে কৃষি ও খাদ্য খাতে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। কোথাও বলা হচ্ছে  হাইব্রিড খাদ্য গ্রহণ করে আমরা ধীরে ধীরে আমাদের মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতাগুলো হারাচ্ছি, দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি; কোথাও আবার বলা হচ্ছে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;"><strong>Genetically Modified Organism (GMO)</strong> বর্তমান বিশ্বে কৃষি ও খাদ্য খাতে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। কোথাও বলা হচ্ছে  হাইব্রিড খাদ্য গ্রহণ করে আমরা ধীরে ধীরে আমাদের মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতাগুলো হারাচ্ছি, দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি; কোথাও আবার বলা হচ্ছে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সাথে খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ বৃদ্ধি না হওয়ায় GMO এর বিকল্প নেই ! বিগত এক দশক আগের সাথে বর্তমান সময়ে মানুষের অসুস্থতা বৃদ্ধির হার দেখলে মূলত প্রথম কথাটাকে ফেলে দেওয়া যাবে না, আবার পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখলে মনে হবে আসলেই কি তাহলে আমরা GMO ছাড়া অন্য কোন পথ খুঁজে পাব না ?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>Genetically Modified Organism (GMO)</strong> নামটি শুনলেই বোঝা যায় জিনের কোন পরিবর্তন বা রূপান্তর করা হয়েছে। আসলেই তাই, এখানে জিনকে রূপান্তরিত করেই শঙ্কর জাতের নতুন জিনের আবিষ্কার করা হয়। আধুনিক বায়োটেকনোলজি পদ্ধতির মাধ্যমে একটি জিন থেকে নির্দিষ্ট বাছাইকৃত অংশ নিয়ে অন্য কোন জিনের ভিতরে প্রবেশ করিয়ে নতুন একটি জিনের উদ্ভাবনের মাধ্যমেই রিকম্বিনেশন (সমন্বয়) এর কাজটি সম্পন্ন করা হয়। একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিস্কার হবে, আমরা যে টমেটো খাই তার আদি রূপ সবুজাভ লাল এবং অনেক ছোট । কিন্তু কালের বিবর্তনে প্রাকৃতিক অথবা কৃষিবিদদের নানাবিধ হাইব্রিড কার্যক্রমের ফলে আজ সেটি আরও বড় ও লালে পরিণত হয়েছে। জেনেটিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, বর্তমানে বাজারে পাওয়া টমেটো ও আদি টমেটো এর জেনেটিক কোডিং এ বিশাল তফাৎ! এখন একজন জিন প্রকৌশলী চাইলেন যে টমেটো আরও বেশি চকচকে করতে হবে এবং এজন্যে তিনি মাছ কে বেছে নিলেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তিনি গবেষণাগারে মাছের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ধারক জিনকে কেটে (এনজাইম দিয়ে বিভক্ত করা হয় ) এনে টমেটো এর জিনে যদি রিকম্বিনেশন করতে পারেন, তবে ঐ টমেটো থেকে আসা পরবর্তী জাতগুলো আগের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখাবে। এই যে মাছ থেকে সরাসরি ঐ জিন এনে টমেটো এর জিনে ঢুকিয়ে দেওয়া, এটিই জিন রিকম্বিনেশন আর এই জিন রিকম্বিনেশন-ই GMO এর একটি প্রক্রিয়া। বাহ্যিকভাবে এটি খুবই আকর্ষণীয় একটি বিষয়। এ কাজটিই বর্তমান প্রযুক্তির মাধ্যমে করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। আজ এই রিকম্বিনেশন-এর প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল হলেও সম্ভব, একটা সময় আসবে এর খরচ কমবে এবং সবাই অহরহ এই কাজটি করতে সক্ষম হবে। তবে এই বিষয়টি কেন এত ঘোলাটে ? কেনই বা কিছু মানুষ এর পক্ষে আর অধিকাংশ মানুষ এর বিপক্ষে? কেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এত আন্দোলন চলছে এটি নিয়ে ? এবার তাহলে এ বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;"><strong>প্রথমত</strong>, GMO এর পক্ষে যারা বলছেন তাদের বড় একটি যুক্তি হচ্ছে, পৃথিবীর জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কিন্তু আবাদি জমির পরিমাণ সেই অনুপাতে বাড়ছে না, বরং অধিক মানুষের বসবাসের জন্যে তা আরও কমে আসছে। এজন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। প্রাচীন প্রজনন পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের কারণে স্বল্প জমিতে অধিক ফলন পাওয়া অসম্ভব প্রায়। কিন্তু আধুনিক চাষাবাদের পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে অল্প জমিতে/ জমি ছাড়াই ফসল ফলানো সম্ভব। এছাড়া চাহিদামতো ফলনের জন্যে আধুনিক প্রজনন পদ্ধতির বিকল্প নেই। এ কারণে তারা আধুনিক প্রজনন পদ্ধতিগুলোর মধ্যে GMO এর প্রচলন ঘটানোর চেষ্টায় ব্রত রয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি আসলেই যৌক্তিক এবং একজন কৃষিবিদের জন্যে এটি খুবই বাস্তবসম্মত একটি চিন্তা বলে মনে হবে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">উচ্চফলনে সহায়ক জিনগুলো যদি সকল ফসলের ভিতরেই ঢুকিয়ে বেশি ফলন পাওয়া যায় আর সেই সাথে জিনগুলোতে যদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকে, তাহলে তো কোন কথাই থাকে না।<strong> কিন্তু হ্যাঁ, এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যে থাকবে না, এই নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবে?</strong> জিন প্রতিস্থাপনের পদ্ধতিগুলো কৃষিক্ষেত্রে খুব একটা পুরনো নয়। খুব একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় পদ্ধতিগুলো ব্যাবহারের মাঝে ১০০% সফলতা পাওয়া যাবে, তার<strong> নিশ্চয়তা</strong> কেউ দিতে পারবে না। সেই সাথে যদি জিন রিকম্বিনেশনের সময় অনিচ্ছাকৃত জিনগুলো ডিএনএ তে ঢুকে যায় আর সেগুলো যদি মানব/পশু শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তাহলে? পশুর শরীরে গেলে সে পশুর গোশত ভক্ষনের মাধ্যমে সেই ক্ষতিকর প্রভাব মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, ঠিক যে কারণে আমরা হরমোন দিয়ে ফুলানো গরু/মুরগি খেতে চাই না। যদি জিন রিকম্বিনেশনের সময় নিশ্চয়তা দেওয়া যায় যে যেটুকু জিন কেটে অন্য ডিএনএ তে দেওয়া হবে সেটুকুর বাইরে অন্য কোন জিন ঢুকতে পারবে না, তাহলে বলা যাবে যে বিষয়টি নির্ভরযোগ্য।</span></p>
<p><strong>এখন এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন আমাদের মাথায় কাজ করতে পারে, এই যে বায়োটেকনোলজির কাজগুলো করে এই সফল জিন ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হবে, এটি কারা করবে? মূলত যত বিরোধিতা সবকিছুর শুরু এখানেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে যত GMO বিরোধী আন্দোলন ঘটছে তার মূল কারণ হল এই কাজগুলো কারা করছে তার উপর। আমরা জানি যে, বিশ্বের খাদ্য ও ঔষধ সেক্টর মূলত একই কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ যেসকল কোম্পানিগুলো ঔষধ উৎপাদন করে, তারাই আবার বীজ উৎপাদন করে বিশ্বে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, এ দুটির মাঝে যোগসূত্র কি! বিষয়টি একটু  পরেই আরও পরিস্কারভাবে বোঝা যাবে।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রথমত ভাবার বিষয় যেটি, আসলেই কি মানুষ বাড়ার সাথে সাথে কৃষিজমির পরিমাণ কমে আসছে? শুধু খাদ্য উৎপাদনের অভাবেই কি পৃথিবীতে এত এত মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে? নাকি পৃথিবীর সকলের জন্যে প্রয়োজনীয় খাবারের উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের কাছে আরও বেশি নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো হচ্ছে ? জাতিসংঘ কৃষি ও খাদ্য সংস্থা এর মতে, <strong><em>বিশ্বে প্রতিবছর ৯৯০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের খাবার কোন না কোন ভাবে নষ্ট হচ্ছে, যা দিয়ে কিনা মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশকে খাওয়ানো সম্ভব। এর শতকরা ৬৮ শতাংশ শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকেই হচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, খাদ্যের যদি সুষম বণ্টন থাকত, তাহলে এই কৃত্রিম সংকট কোনভাবেই হালে পানি পেত না।</em></strong> একদিকে খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাব, আরেকদিকে কৃত্রিম সংকট; এদুটি বিষয় সমন্বয় করেই মূলত জায়নবাদী গোষ্ঠী তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আরেকটি বিষয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে,  বিশ্বে বীজ নিয়ে যারা কাজ করছে সেগুলো সবই জায়নবাদী কোম্পানি। বীজ নিয়ে বড় গবেষণা করার জন্যে যে পরিমাণ মূলধন/ক্ষেত্র দরকার সেগুলো সাধারণ কোন কোম্পানিগুলোর পক্ষে থাকা সম্ভব না। বড় জায়নবাদী কোম্পানিগুলো নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে এসব নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পায় আর তারা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো বিশ্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তাদের অনুমতি ছাড়া কোন দেশ/বিশ্ববিদ্যালয়/প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিজে থেকে কিছু করা অসম্ভব। এসব কোম্পানি নিজেরা অধিক উৎপাদনশীল বীজ বের করছে কিন্তু কিভাবে তা করছে সেগুলো কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তারা এমন বীজ বের করছে যেগুলো থেকে প্রাপ্ত ফল মানুষের জন্যে ক্ষতিকর হবে, নানা রোগ সৃষ্টি করবে। আবার সেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ যখন ঔষধ খুঁজবে তখন তারা নিজেদের তৈরি ঔষধ বিক্রি করবে। বিষয়টি অনেকটা<strong> ‘সাপ হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়া’। </strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তারা বীজ বিক্রি করে লাভ করবে আবার এদিকে ঔষধ বিক্রি করেও লাভ করবে। এদিকে ক্রমাগত মানববিধ্বংসী GMO এর মাধ্যমে উৎপাদিত খাবার খেয়ে মানুষ তার নিজস্ব স্বকীয়তাও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলবে। পৃথিবীতে বিকলাঙ্গ মানুষের হার বৃদ্ধির অন্যতম একটি উদাহরণ এটি। মূলত এসব কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে GMO এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে পরিবেশ সচেতন গোষ্ঠীরা। <strong>বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৬ টি দেশে GMO সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে</strong> । কিছু দেশে উৎপাদন নিষিদ্ধ করলেও আমদানি বহাল রেখেছে। আমেরিকা, ব্রাজিল, ইন্ডিয়া সহ কৃষিক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখা বেশির ভাগ দেশগুলোতে GMO বহাল রয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">GMO বলতেই যে খারাপ কিছু, বিষয়টিকে এভাবে ভাবা ঠিক নয়, পৃথিবীতে এমন অনেক জিনিসই আছে যেগুলো দিয়ে ভালো খারাপ ২ ধরণের কাজ-ই করা যায়। রসায়ন যেমন অনেকের জন্যে মরণব্যাধি রোগ থেকে আরোগ্য লাভের ঔষধের আবিষ্কারক হিসেবে আবশ্যক, তেমনি এই রসায়ন দিয়েই মরণঘাতী বোমা বানানোও সম্ভব। এখানে দেখার বিষয় একটাই যে, রসায়ন কাদের দ্বারা বিকশিত হচ্ছে। তেমনি সময়ের সাথে সাথে কৃষিবিজ্ঞানের এই উৎকর্ষতা কাদের দ্বারা বিকশিত হচ্ছে এবং তাদের উদ্দেশ্যই বা কি, সেটি না জানলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ দিনকে দিন আরও হুমকির মুখে পড়ে যাবে। তাই সময় হল এখন মানববিধ্বংসী এসব চক্রান্তের ব্যাপারে সচেতন হওয়ার, না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর একটি পৃথিবীতে রেখে যাওয়া আমাদের পক্ষে আরও কঠিন হয়ে পড়বে।</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/gmo-blessing-or-curse/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">5689</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কৃষিব্যবস্থা ও বীজঃ যায়নবাদিদের হাতের মুঠোয় মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agricultural-systems-and-seeds-the-future-of-human-civilization-in-jain-hands/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agricultural-systems-and-seeds-the-future-of-human-civilization-in-jain-hands/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আশিকুর রহমান সৈকত]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 25 Jul 2021 07:26:37 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=5685</guid>

					<description><![CDATA[আমরা  জানি যে, বীজ হল খাদ্যের প্রধান উপাদান। হাজার হাজার বছর ধরে বীজ প্রকৃতিতে স্ব-উত্থিত হয়েছে এবং ১০,০০০ বছর আগে ফসল রোপণ করে উৎপাদন করা শুরু হয়েছে। বীজ আল্লাহর এমন একটি নেয়ামত যে, মাটিতে পুঁতে দিলে নিজে নিজেই চারা দেওয়া]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">আমরা  জানি যে, বীজ হল খাদ্যের প্রধান উপাদান। হাজার হাজার বছর ধরে বীজ প্রকৃতিতে স্ব-উত্থিত হয়েছে এবং ১০,০০০ বছর আগে ফসল রোপণ করে উৎপাদন করা শুরু হয়েছে। বীজ আল্লাহর এমন একটি নেয়ামত যে, মাটিতে পুঁতে দিলে নিজে নিজেই চারা দেওয়া শুরু করে । আর ভালভাবে দেখভাল করলে তা থেকে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া সম্ভব । এ বীজের উপর একজন কৃষকের জীবিকা থেকে শুরু করে একটি দেশের অর্থনীতি পর্যন্ত নির্ভরশীল । </span></p>
<p><strong>বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ২ টি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ – প্রযুক্তি ও খাদ্য । এই ২ টি বিষয় যে দেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে তারা নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবে আর সেইসাথে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও ধারণ করবে ।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানবসভ্যতার জন্যে সর্বদাই হুমকিস্বরূপ জায়নবাদী গোষ্ঠী এ বিষয়টি আগেই ধরতে পেরেছিল । নিজেদেরকে সকল মানবজাতির উপর শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করার অসুস্থ চিন্তা বরাবরই তাদের হিংস্র থেকে হিংস্রতর করে দিয়েছে । <strong>এরই অংশ হিসেবে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে তৈরি হয় রকফেলার ফাউন্ডেশন ( রকফেলার পরিবারের গড়া ), যারা পরবর্তীতে কার্নেগী, হ্যারিমান, গেট্‌স ও অন্যান্য ক্ষমতাধর পরিবারগুলোকে নিয়ে একত্র হয়ে বিশ্বকে নিজ ক্ষমতায় নেওয়ার চেষ্টা করার পরিকল্পনা করে এবং তারই অংশ হিসেবে পৃথিবীতে অপ্রয়োজনীয় (তাদের মতে) বংশগুলোকে (অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতিকে) চিরতরে মুছে ফেলার জন্যে পদক্ষেপ নিয়ে এগোনোর চিন্তা মাথায় নেয় । এর জন্যে তারা সকল ধরণের ক্ষমতাধর ব্যাক্তিদের হাত করে নেওয়ার চেষ্টা করে, প্রতিপত্তির লোভ দেখিয়ে কিংবা ভয় দেখিয়ে, তা যেভাবেই হোক না কেন !</strong> তারা সমগ্র দুনিয়াতে নিজেদের শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা শুরু করে নিজেদের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই । এমনকি হিটলার  যখন চরম জনপ্রিয় তখন হিটলারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে নিজেদের অনেক কাজ করিয়ে নেয় । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সমগ্র বিশ্বের শাসন করার চেষ্টায় রকফেলার ও সহঘরানার অন্যান্য ফাউন্ডেশনগুলো  জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে নিজেদের অনুকূলে বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ নিতে থাকে । তাদের শোষণের হাতিয়ার বড় বড় কল-কারখানাগুলোর জন্যে সেসময় অনেক শ্রমিকের দরকার পরে । শহরে অবস্থিত পুঁজিবাদীদের সেসকল কল-কারখানাগুলোর জন্য সস্তা শ্রম সরবরাহের নিমিত্তে কৃষক ও গ্রামে বসবাসকারীদের গ্রাম থেকে শহরগুলিতে স্থানান্তরিত করার বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নিতে থাকে। অল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোতে মূলত সিংহভাগ মানুষের পেশা কৃষি আর এই কৃষির উপর সরকারের সহযোগিতা কমানোর জন্যে অব্যাহত চাপ দেওয়া, বিভিন্ন রোগ জীবাণু ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উৎপাত বাড়াতে পরোক্ষভাবে চেষ্টা করা,  নিজেদের কোম্পানিগুলোর সার, বীজ, কীটনাশক প্রভৃতির জন্যে বাজার সৃষ্টি করার মত প্ল্যানগুলো এসবের অন্যতম । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একই সাথে তারা নিজেদের পণ্যের জন্যে সেসব দেশে বাজার উন্মুক্ত করছে, নিজেদের বীজের উপর এসকল দেশকে নির্ভরশীল করছে আর পাশাপাশি সেসব দেশের মাটি পরবর্তীতে কৃষির জন্যে ধীরে ধীরে অনুপযোগী করে গড়ে তুলছে, যার ফলে কৃষক কৃষি কাজের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে । শহরগুলোর আলিশান জীবনযাত্রা ও সুযোগ সুবিধাগুলো এমন চিত্তাকর্ষী করে গড়ে তোলা হয়েছে যে, গ্রাম ছেড়ে শহরেই যেন প্রকৃত সুখ এমনটি ভেবে শহর নামক মরিচিকার পিছনে ছুটতে বাধ্য হয়েছে লাখ লাখ কৃষক পরিবার। </span></p>
<blockquote><p><strong>রকফেলার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় কারগিল(Cargill) কোম্পানি ও পরবর্তীতে নব্য প্রতিষ্ঠিত ডুপন্ট/পাইওনিয়ার(DuPont/pioneer),  বায়ার (Bayar), মনসান্টো(Monsanto,বর্তমানে বায়ার কর্তৃক ক্রয়কৃত) এবং  সিনজেনটা (Syngenta) 1980 সালের পর থেকে হাইব্রিড বীজ এর উপর গবেষণা ও উৎপাদন জোরদার করছে। এগুলো ছাড়াও বাসফ (BASF) হাজেরা (Hazera) প্রমুখ কোম্পানিগুলো হাইব্রীড বীজ ও কীটনাশক তৈরিতে এবং পৃথিবীতে বাজারজাতকরণে সামনের সারির স্থানগুলো দখল করে বসে আছে । তারচেয়েও বড় বিষয় হল, এসকল বীজ ও কীটনাশক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আবার মানুষের জন্যে ঔষধ ও তৈরি করছে ! উপরল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিভাগই একই কিংবা ভিন্ন নামে ঔষধ উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে সমগ্র পৃথিবীতে । এমনকি বীজ, কীটনাশক ও ঔষধ তৈরিতে তারা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছে যে, তাদের অগোচরে কেউ এগুলো তৈরি ও করতে পারবে না । করলেও সেগুলো বাজারজাত করা অসম্ভবপ্রায় । </strong></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">আফ্রিকা সহ ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে জমির উর্বরতা নষ্টের পিছনেও মানববিধ্বংসী এসব বড় কোম্পানিগুলোর হাত রয়েছে । এক সময় অতিউর্বর আফ্রিকার মাটি এখন স্বকীয়তা হারাবার পথে, অপরদিকে অশিক্ষা, বাহ্যিক চাকচিক্যময় ইউরোপীয় প্রভাব, লুটপাট এসব আফ্রিকানদের অন্য দেশে পাড়ি জমাবার পথে ধাবিত করছে উন্নত জীবনযাত্রার সোনার হরিণ বধ করার নিমিত্তে । কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, সেসব দেশে গিয়েও তারা শ্রমিক হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীদের জন্যেই হাঁড় ভাঙ্গা শ্রম দিচ্ছে। এভাবেই তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধ আফ্রিকার কৃষি ও মানুষেরা । শুধু আফ্রিকাই নয়, এশিয়ার ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই এই মরিচিকার পিছে ছুটে নিজেদের শেষ করে দিচ্ছে।</span></p>
<p><strong>সবুজ বিপ্লব(Green revolution) এর সময়ে ও ৮০&#8217;র দশকের পর পৃথিবীতে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্যে হাইব্রিড বীজ ব্যাবহারের প্রতি গুরুত্ব বাড়ানো হয় । আসলে হাইব্রিড বীজ ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে উচ্চ মাত্রায় কীটনাশক, সেচ ও সার ব্যাবহার করার প্রয়োজন পরে । অন্যদিকে, এই বীজগুলি পরবর্তী বছরে একই ফল এবং পণ্য উৎপাদন করে না, তাই তারা প্রতি বছর বীজ কিনতে বাধ্য হয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কৃষক প্রতি বছর  হাইব্রিড বীজের পিছনে টাকা খরচ করছে, অর্থাৎ কোম্পানিগুলির কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করছে।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু সেই তুলনায় কৃষি জমি বাড়ছে না, এই অজুহাতে কৃষকদের হাইব্রিড বীজ ব্যাবহারে বেশী বেশী উদ্বুদ্ধ করা হয় দিনকে দিন । সেই সাথে স্থানীয় জাতের বীজে যে ফলন পাওয়া যায় সেগুলো দেখতেও হাইব্রিড জাতের মত হৃষ্ট পুষ্ট হয় না । এজন্যে মানুষ কেনার সময় হাইব্রিড জাতের প্রতি বেশী ঝুঁকে পরেছে । কৃষকেরাও তাই বেশী বেশী হাইব্রিড জাত উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছে ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হাইব্রিড বীজগুলো নিজেদের মধ্যে শঙ্করের মাধ্যমে উৎপন্ন করা হলেও পরবর্তীতে জেনেটিকালি মডিফাইড অর্গানিজম (GMO)  বীজের উৎপাদন শুরু করা হয়েছে । GMO এর বৈশিষ্ট্য হল, এর জিনের ভিতরে অন্য কোন জিনের (হতে পারে অন্য কোন উদ্ভিদের কিংবা প্রাণীর) প্রবেশ করানোর মাধ্যমে ঐ বীজের কোন একটি ক্ষমতা বৃদ্ধি করা । যেমন, ধানের পোকার আক্রমন থেকে রক্ষার জন্যে ঐ পোকার জন্যে ক্ষতিকর এমন কোন কিছুর জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বীজের ভিতরে ঢুকানো যাতে করে ফসলের অঙ্কুরোদ্গম থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত ঐ পোকা আক্রমণ না করতে পারে । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এটি আপাতদৃষ্টিতে কার্যকরী মনে হলেও এক্ষেত্রে পরবর্তীতে ঐ পোকার বদলে অন্য কোন ক্ষতি যে দেখা দিবে না তার কোন নিশ্চয়তা কেও দিতে পারবে না ।  তার উপর ডিএনএ রিকম্বিনেশনের (জিন প্রবেশ করানোর পদ্ধতি) সময় যে অন্য কোন জেনেটিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জিন ও যে প্রবেশ করবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না কখনই । হতে পারে সেই জিন মানুষের জন্যে আরও ভয়ানক! আর যাদের চিন্তাই হল মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করা, তারা যে GMO এর মাধ্যমে মানুষের জন্যে ভালো কিছু নিয়ে আসবে সেধরনের চিন্তা করাটাও বোকামি বলা চলে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">১৯০০ এর শুরুর দিকে  বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের বীজগুলো সংরক্ষণের জন্যে নিজস্ব জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজস্ব জাতগুলো সেখানে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোতে থাকে । বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে বীজগুলো নিজেদের আয়ত্তে রাখার জন্যে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও তাদের সংগঠনগুলো নতুন পরিকল্পনা করে । তারা জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র গুলোর থেকে বীজ নেওয়ার জন্যে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা করে এবং তারই নিমিত্তে রকফেলার ফাউন্ডেশন, গেটস ফাউন্ডেশন সহ এরকম সাম্রাজ্যবাদী সংগঠনগুলো নরওয়ের সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে আন্তর্জাতিক বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয় । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপে এটি করার কারণ এখানে প্রচুর বরফ থাকে এবং এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত না করতে পারে । এই কারণগুলোকে প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে নিয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে কেন এরকম একটি আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ কেন্দ্রের দরকার। এভাবে বুঝিয়ে কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে চাপ প্রয়োগ করে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই তারা বীজ সংরক্ষণ করে আসছে । ২০০৮ সালে এই কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এবং বাংলাদেশ সহ প্রায় সকল দেশের বীজই এখানে সংরক্ষিত (!) রয়েছে । </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এসকল বীজগুলো মূলত আমরাই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি, জেনে কিংবা না জেনে । ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর তাদের জাতীয় বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকে অনেক বীজের নমুনা হারিয়ে যায় । সেগুলো পরে কোথায় গেছে কেও ই জানে না। এমনকি সিরিয়া সঙ্কট শুরু হওয়ার পর সিরিয়ার যে বীজের নমুনাসমূহ সভালবার্ড (Svalbard)  এ ছিল, সেগুলোর সঠিক কোন হদিস পাওয়া যায়নি । এগুলোর বেশিভাগ ই জায়নবাদি শক্তিদের হাতে চলে গেছে বলে ধারণা করা হয় । উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের আশায় হাইব্রিড ও জিএমও এর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলা হলেও মূলত এসবের পিছনে মূল উদ্দেশ্য মানুষকে নিজেদের জিম্মায় রেখে তাদের শোষণ করা । আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জায়নবাদীদের অন্যতম হোতা হেনরি কিসিঞ্জারের একটি উক্তি রয়েছে, </span></p>
<blockquote><p><strong>“যদি আপনি তেল নিয়ন্ত্রণ করেন তবে দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, যদি আপনি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করেন তবে  আপনি বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন আর এই খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই এর মূল উপাদান বীজকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে”।</strong></p></blockquote>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agricultural-systems-and-seeds-the-future-of-human-civilization-in-jain-hands/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">5685</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও বর্তমান বাংলাদেশ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islami-sobhyotay-krishi-o-bortoman-bangladesh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islami-sobhyotay-krishi-o-bortoman-bangladesh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[মুহসিনা বিনতি মুসলিম]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 16:52:17 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও বর্তমান বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলা কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[মুহসিনা বিনতি মুসলিম]]></category>
		<category><![CDATA[রাসূলের (সাঃ) ইসলামী অর্থনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4144</guid>

					<description><![CDATA[রাসূল (সাঃ) মদীনায় হিজরতের পর যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দেন এবং বাস্তবায়ন করেন সেগুলো হলঃ মসজিদ প্রতিষ্ঠা ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা বাজার প্রতিষ্ঠা  এক্ষেত্রে তিনি ইহুদীদের বাজার ব্যবস্থার বিপরীতে নতুন ও বিকল্প বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যার মূলমন্ত্র ছিল “সুদ ও শোষণের অর্থনীতির সাথে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">রাসূল (সাঃ) মদীনায় হিজরতের পর যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দেন এবং বাস্তবায়ন করেন সেগুলো হলঃ</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> মসজিদ প্রতিষ্ঠা</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> বাজার প্রতিষ্ঠা </span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এক্ষেত্রে তিনি ইহুদীদের বাজার ব্যবস্থার বিপরীতে নতুন ও বিকল্প বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যার মূলমন্ত্র ছিল </span><b>“সুদ ও শোষণের অর্থনীতির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।”</b><span style="font-weight: 400;"> তারই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন খোলাফায়ে রাশেদা ও পরবর্তী মুসলিম শাসকগণ। সকল ধরণের অভাব, দরিদ্র্যতা ও অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে উমর (রাঃ) আলাদাভাবে গুরুত্ব দেন কৃষির উপর। তিনি প্রায় তিনশো’র কাছাকাছি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও সংস্কার করেন। তন্মধ্যে অন্যতম হলঃ</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> সকল অনাবাদী জমিতে চাষাবাদ করানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষকদের পুঁজি প্রদান করেন এবং বহুজনকে জমির মালিকানা প্রদান করেন। এক্ষেত্রে নির্দেশনা দেওয়া হয়– উৎপাদিত ফসলের ৫০% রাষ্ট্র পাবে, বাকি ৫০% কৃষকের থাকবে (পুঁজি ও জমি কিন্তু রাষ্ট্রই প্রদান করেছে), সেখান থেকে অবস্থা অনুযায়ী যাকাতও দিতে হবে।</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> গণিমতের মাল আসার পর যোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ না করে সে সময়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা কৃষির উন্নয়নে ব্যয় করেন।</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> সুয়েজ খাল, যার মাধ্যমে পৃথিবীর ৭০% অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়, সে খালের রূপরেখা অঙ্কন করেন।</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> সেচ প্রকল্প ও ড্রেনেজ সিস্টেম প্রবর্তন করেন।</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> সমুদ্র ব্যবস্থার রূপরেখা অংকন করেন।</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">একইভাবে আমরা দেখতে পাই, হযরত আলী (রাঃ) মিশরের গভর্নর মুসা আল আশকারের কাছে চিঠি পাঠান। তিনি বলেন,</span><b> “হে মুসা আল আশকার, সুষম উৎপাদন বৃদ্ধি করো, সুষম বণ্টন নিশ্চিত করো।”</b></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যেখানে এক সময় রাষ্ট্রপ্রধান পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন, একটি খেজুর খেয়ে দিনাতিপাত করতেন। বাচ্চাদের মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হাড়িতে শুধু পানি ফোটানো হতো। </span><b>ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) ইসলামী অর্থনীতি কায়েমের পরবর্তী ৮ বছরের জীবনকাল, আবু বকরের (রাঃ) ২ বছর ও উমরের (রাঃ) ১০ বছরের শাসনামল– মোট ২০ বছরের ব্যবধানে পুরো জাযিরাতুল আরবের ৩৮ লক্ষ বর্গমাইলে যাকাত নেওয়ার জন্য একজন লোকও খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হয়ে গিয়েছিল। </b></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাসূল (সাঃ), খোলাফায়ে রাশেদাগণ ও পরবর্তী শাসকদের শাসনামলে ঊষর মরুবেষ্টিত অঞ্চলেই কৃষি অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছিল। যে অঞ্চল কৃষিপ্রধান নয় সে অঞ্চলই যদি কৃষিতে এতো উন্নতি সাধন করে, তাহলে কৃষিপ্রধান অঞ্চলসূমহে কত ব্যাপক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল তা নিয়ে বিস্তর আলোচনার প্রয়োজন। ইসলাম যেসব অঞ্চলেই গিয়েছে, উন্নত কৃষি, উন্নত খাদ্যনীতির উপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং সাফল্যও অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোর মধ্যে প্রাচীন বাংলা উৎকৃষ্ট উদাহরণ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বৃটিশ পূর্ববর্তী সময় অর্থাৎ বাংলা সালতানাত ও মুঘল শাসনামলে আমাদের অঞ্চলের অন্যতম ভিত্তি ছিল কৃষি। সে সময় কৃষি ব্যবস্থা এতটাই উন্নত ছিল যে, ২৫০টিরও বেশি ফসল আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করতাম।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বাংলা অঞ্চলে রয়েছে সম্ভাবনার অকুল আধার। যেমন:</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> ছোট-বড় অসংখ্য নদী</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> অধিক ঋতু</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> বৃহৎ বনাঞ্চল</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, কয়লা, চুনাপাথর, কঠিন শিলা, চিনামাটিসহ অসংখ্য খনিজ সম্পদ</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">বাংলার কৃষি অর্থনীতির ইতিহাস উন্নত কৃষিব্যবস্থার স্বর্ণালী অধ্যায়। বাংলার প্রকৃতি-পরিবেশও কৃষির জন্য যথেষ্ট অনুকূল।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ প্রেক্ষিতে বর্তমানে আমাদের অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা কেমন? বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতি কারোরই অজানা নয়, অর্থাৎ নিদারুণ শোচনীয়। কিন্ত এর মূল কারণ কী? </span>
<picture><source media="(min-width: 650px)" /></picture> <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon2.0" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 970px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/agami-diner-sovvota.jpg" height="160" /></a></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমানে সমগ্র পৃথিবী পরিচালনা করছে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি ‘জায়নবাদী গোষ্ঠী’, যারা নিজেদের সমগ্র মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করার অসুস্থ মানসিকতা লালন করে থাকে। ব্রিটেনের রথচাইল্ড, জাপানের মিটসুবিশি, আমেরিকার রকফেলাররাই আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, ৭ টি বড় বড় হোল্ডিংয়ের ব্যাংক জায়নবাদীদের। বিশ্বের সর্ববৃহৎ তিনটি credit rating agencies ও তাদেরই। অর্থনীতিবিদগণ বলে থাকেন, ১৯৩০, ১৯৭০ এবং ২০০৮ সালে সংঘটিত সর্ববৃহৎ ৩টি বড় অর্থনৈতিক সঙ্কটের পেছনে দায়ী ছিল এ ইহুদীরা। শুধু অর্থনীতি নয়, বর্তমান দুনিয়ার প্রায় সকল সেক্টর আজ জায়নবাদীদের দখলে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বীজ, কৃষিপণ্য এবং কীটনাশক উৎপাদনকারী নিয়ন্ত্রণকারী বৃহৎ কোম্পানিসমূহ হলঃ</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> Cargill </span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> Bayer </span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> DuPont </span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> Monsanto </span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> Syngenta</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এ সকল কোম্পানিও তাদের পরিচালিত। বীজ উৎপাদনকারী কোম্পানিসূমহ বীজগুলোকে প্রচন্ডমাত্রায় বিষাক্ত করে তৈরি করে, অর্থাৎ বীজকে জেনেটিকালি মোডিফাই করা হয়। জেনেটিকালি মোডিফাইড বীজে এমন কিছু কৃত্রিম পরিবর্তন আনা হয় যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক। তারা বীজের আংশিক বিষাক্ত করে মূলত, যার ফলে সেখানে পোকা তৈরী হয়। আবার ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বীজে ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ ও বিস্তার রোধে আমরা ব্যবহার করি তাদেরই তৈরি মারাত্মক বিষক্রিয়াযুক্ত কীটনাশক। এ কীটনাশকগুলো পোকার প্রজনন ক্ষমতা বিনষ্ট করে; আর বিষক্রিয়ার ফলস্বরূপ বীজ থেকে প্রাপ্ত ফসল, ফল-ফলাদি, শাকসবজি গ্রহণ করে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মও তাদের বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ প্রসঙ্গে সূরা বাক্বারার ২০৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তা&#8217;আলা বহু আগেই আমাদের সতর্ক করেছেন। পবিত্র কোরআনের সূরা আল বাকারার ২০৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,</span></p>
<p><b>وَإِذَا تَوَلَّىٰ سَعَىٰ فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ</b> <b>وَالنَّسْلَ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ </b></p>
<p><span style="font-weight: 400;">“</span><b>যখন সে কর্তৃত্ব লাভ করে, পৃথিবীতে তার সমস্ত প্রচেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত ও মানব বংশ ধ্বংস করার কাজে ৷ অথচ আল্লাহ (যাকে সে সাক্ষী মেনেছিল) বিপর্যয়কারীকে মোটেই পছন্দ করেন না</b><span style="font-weight: 400;"> ৷”</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ কোম্পানিগুলো বীজের পাশাপাশি খাদ্য ব্যবস্থাকেও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে এইডস, ডায়াবেটিকস, বার্ড-ফ্লু সহ আরো অনেক রোগের জীবাণু ছড়ানোর পেছনে এরাই দায়ী। যেমনঃ গম ও চালের জিনের সাথে তারা ডায়াবেটিকস সহ আরও নানাবিধ রোগের জীবানু মিশিয়ে থাকে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আশা করি আরও বেশি স্পষ্ট হবে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চকলেট এবং চিনিজাত পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হল নেসলে (Nestle); আবার ডায়াবেটিকস কিংবা চিনি খাওয়ার ফলে যে সকল অসুখ শরীরে দানা বাঁধে, তার মেন্টাংস (metanx) নামক ঔষধও তৈরি করে এ একই কোম্পানি! </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭০ সালে বলেছিলেন,</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">“</span><b>Control oil and you control nations; control food and you control the people</b><span style="font-weight: 400;">.”</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থাৎ, “</span><b>যদি তুমি তেলকে নিয়ন্ত্রণ কর, তাহলে তুমি একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আর যদি তুমি খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ কর, তাহলে মানুষকে অর্থাৎ সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।</b><span style="font-weight: 400;">”</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের কৃষি, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের শরীরকে অসুস্থ, দুর্বল, নষ্ট চিন্তার অধিকারী, অলস, বিলাসী, শক্তি ও চেতনাহীন বানানোই বর্তমানে তাদের বিকৃত উদ্দেশ্য সাধনের এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট সফলতার মুখও দেখেছে, উপমহাদেশের ভঙ্গুর কৃষি ব্যবস্থা যার প্রমাণ। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">দুর্বল কৃষি অর্থনীতির অবস্থা বর্তমান করোনাকালীন সময়ে আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ চাকরিচ্যুত হয়ে কর্মসংস্থান হারিয়েছে, রেমিটেন্স যোদ্ধারা প্রবাস থেকে ফিরে গ্রামমুখী হয়েছে। বিপুল পরিমাণ মানুষ এখন গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। গ্রামে ফিরে আসা মানুষদের কর্মক্ষেত্রের জন্য অবশিষ্ট যে খাত বাকি থাকে, তা হল কৃষি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু প্রশ্ন হল গ্রামীণ যে কর্মক্ষেত্র, যে কৃষি ব্যবস্থা, তা কি আদৌ এ কর্মসংস্থানহীন মানুষদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যেখানে প্রায় ৭০% কৃষক ভূমিহীন; বর্গা চাষ করে ফসলের ৫০% মালিককে দিয়ে দিতে হয়। তারা তো সরকারের তালিকারই বাইরে, সরকার থেকে কোনো ঋণ পাচ্ছে না। এ বছর সরকার কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; অথচ ধান ছাড়া সব ফসলই আমাদেরকে বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে! এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নতুন করে কৃষি কর্মসংস্থানের আশা করা নিতান্তই অমূলক। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">LLRD এর মতে বর্তমানে ৫০% পুরুষ এবং ৬০% নারী কৃষক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেটের দরুন কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মৎস্য খাতের কথাও কী-বা বলার আছে! আমেরিকান একটি সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে চাষকৃত মাছের ৪৫ শতাংশ রপ্তানি হয় অথচ কোন ইন্ডাস্ট্রি নেই। এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাজেট নেই। যদি থাকতো, তবে ১০ টাকার জায়গায় আয় হতো ৭০০০ টাকা।  </span><span style="font-weight: 400;">এ সকল ক্ষেত্রগুলো ছাড়াও আরো অনেক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র দিন দিন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে না আছে কোন গবেষণা, না আছে কোন প্রস্তাবনা! নীরবেই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে আমাদের অপার সম্ভাবনার এ ক্ষেত্রগুলো! </span><span style="font-weight: 400;">ফলশ্রুতিতে ২৫০ অঞ্চলে রপ্তানি করা বাংলা অঞ্চল এখন ধান ব্যতীত সব ফসল বিদেশী কোম্পানি থেকে আমদানি করে!</span></p>
<p><b>ভয়াবহ বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য বেড়ে গিয়ে</b> <b>এখন ৪২ ভাগ মানুষ দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বসবাস</b> <b>করে</b><span style="font-weight: 400;">!</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">(সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এভাবে চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা কি আমরা ভাবতে পারছি? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা, কৃষি ও অর্থনীতির রাজনীতিকে বুঝে ইসলামী মূলনীতির আলোকে কর্মসূূচি গ্রহন, সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন, কৃষকদের সঠিক নির্দেশনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবী। তাই আমি মনে করি কৃষিকে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে আমাদের সোচ্চার হতে হবে, কৃষক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর নানাবিধ এজেন্ডাসহ প্রচুর উদ্যোগের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। অন্যথায় এ দেশের ভাগ্যাকাশে ভয়াবহ দুর্দিন অপেক্ষা করছে। </span><span style="font-weight: 400;">আর এ উদ্যোগগুলো আমাদের জন্য অনেক কঠিন কিছুও না, বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসই তার সাক্ষী। উপমহাদেশীয় ৭০০ বছরের মুসলিম সালতানাতের অভিজ্ঞতা ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে কৃষি হয়ে উঠুক মুক্তির অন্যতম হাতিয়ার।</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islami-sobhyotay-krishi-o-bortoman-bangladesh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4144</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
