<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/author/ismail_razi_al_faruqi/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Sat, 28 Sep 2024 09:23:19 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>মুসলিম শিল্পের একত্ব এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীগণ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-unity-of-muslim-art-and-its-rivals/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-unity-of-muslim-art-and-its-rivals/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 26 Sep 2024 17:27:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14875</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী শিল্পকলার একত্ব নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন। যদিও, ইতিহাসবিদেরা ভৌগোলিক বা কালানুক্রমিকভাবে পৃথক বিপুলসংখ্যক বিচিত্র মোটিফসমূহ উপাদান-উপকরণ এবং রীতিপ্রকরণ লক্ষ্য করে থাকেন, তবুও সমস্ত ইসলামী শিল্পকলার প্রবল বাস্তবতা হচ্ছে এর উদ্দেশ্য ও রূপের একত্ব। কর্ডোভা থেকে মিন্দানাও পর্যন্ত দেশগুলো ইসলামে দীক্ষিত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী শিল্পকলার একত্ব নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন। যদিও, ইতিহাসবিদেরা ভৌগোলিক বা কালানুক্রমিকভাবে পৃথক বিপুলসংখ্যক বিচিত্র মোটিফসমূহ উপাদান-উপকরণ এবং রীতিপ্রকরণ লক্ষ্য করে থাকেন, <em>তবুও</em> <em>সমস্ত</em> <em>ইসলামী</em> <em>শিল্পকলার</em> <em>প্রবল</em> <em>বাস্তবতা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>এর</em> <em>উদ্দেশ্য</em> <em>ও</em> <em>রূপের</em> <em>একত্ব</em><em>।</em> <strong>কর্ডোভা</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>মিন্দানাও</strong> <strong>পর্যন্ত</strong> <strong>দেশগুলো</strong> <strong>ইসলামে</strong> <strong>দীক্ষিত</strong> <strong>হবার</strong> <strong>পরই</strong> <strong>এর</strong> <strong>শিল্পকলায়</strong> <strong>একই</strong> <strong>রকম</strong> <strong>গঠনগত</strong> <strong>বৈশিষ্ট্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>বিকাশ</strong> <strong>স্পষ্ট</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>উঠে</strong><strong>।</strong> এতে দেখা যায়, রীতি বা শৈলির অগ্রাধিকার এবং অন্তহীনতার অগ্রাধিকার। সমস্ত ইসলামী শিল্পকলায় কুরআন এবং হাদীসের অতিশয় উদ্দীপক শব্দমালা, আরবী এবং ইরানী কাব্যের অথবা ইসলামী সাহিত্যের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভিব্যক্তিগুলোর শরণ নিয়েছে এবং সেগুলো ব্যবহার করেছে, আরবী লিখন শিল্প বা ক্যালিগ্রাফিতে সেসবের রূপ দিয়েছে। একইভাবে, যুগের পর যুগ ধরে সকল মুসলমান কোরআন তেলাওয়াতে এবং আযানে সাড়া দিয়েছে গভীরতম আবেগের সঙ্গে, এমন কি সেসবের আরবী অর্থ সামান্য বুঝে বা না বুঝেই। এসব ক্ষেত্রে তাদের বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গমনকারী যুক্তি এবং বিচার বুদ্ধি, বোধশক্তি সক্রিয় না হলেও তাতে ইন্দ্রিয়জ এবং ইনটুইটিভ বৃত্তিসমূহ সম্পূর্ণ সক্রিয় হয়ে ওঠে- এসথেটিক বা নান্দনিক মূল্যগুলোর মান লাভের প্রত্যাশ্যায়। প্রকৃতপক্ষে তাদের নান্দনিক উপলব্ধি, যাদের তাত্ত্বিক উপলব্ধি পঠন এবং প্রণিধানের জন্য যথেষ্ট, তাদের এসথেটিক উপলব্ধির মতই একইরূপ প্রবল- কেননা নান্দনিক মূল্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে আশু ইনটুইশন হামেশাই অগ্রবর্তী। এক্ষেত্রে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরগামী বোধশক্তি যেন একটি গৌণভূমিকা পালন করে, কেবলমাত্র সহযোগিতার হাতই প্রসারিত করে। ইসলামের নান্দনিক মূল্যের শক্তি এবং তার শৈল্পিক একত্ব, যা চূড়ান্ত রকমে স্বতন্ত্র ও বিচিত্র সাংস্কৃতিক সমাবেশের মধ্যে থেকে এমনিতরো শৈল্পিক একত্ব সৃষ্টি করে যে, <strong>আটলান্টিকের</strong> <strong>পূর্ব</strong> <strong>উপকূল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>প্রশান্ত</strong> <strong>মহাসাগরের</strong> <strong>পশ্চিম</strong> <strong>তীর</strong> <strong>পর্যন্ত</strong><strong>, </strong><strong>যে</strong> <strong>পর্যটক</strong> <strong>সফর</strong> <strong>করে</strong> <strong>সে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>একটি</strong> <strong>অঞ্চলে</strong> <strong>ভ্রমণ</strong> <strong>করে</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>এর</strong> <strong>ইসলামিক</strong> <strong>স্থাপত্যের</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>লতাপাতার</strong> <strong>শিল্পরূপ</strong> <strong>ও</strong> <strong>আরবী</strong> <strong>লিখন</strong> <strong>ও</strong> <strong>শিল্প</strong> <strong>পদ্ধতির</strong> <strong>দ্বারা</strong> <strong>অলংকৃতকরণে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong> <strong>তার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সুপরিচিত</strong> <strong>ঠেকে</strong><strong>।</strong> <strong>ভিন্ন</strong> <strong>ভিন্ন</strong> <strong>জাতি</strong><strong>, </strong><strong>বর্ণ</strong><strong>, </strong><strong>ভাষা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>জীবন</strong> <strong>পদ্ধতির</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>দৈনন্দিন</strong> <strong>জীবনে</strong> <strong>যে</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>ইসলাম</strong> <strong>যে</strong> <strong>সাহিত্যিক</strong> <strong>দৃষ্টিকার্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>সাং</strong><strong>গী</strong><strong>তিক</strong> <strong>মূল্য</strong> <strong>সৃষ্টি</strong> <strong>করেছে</strong><strong>, </strong><strong>সে</strong> <strong>বিষয়ে</strong> <strong>সে</strong> <strong>উপলব্ধি</strong> <strong>করে</strong> <strong>একটি</strong> <strong>অভিন্ন</strong> <strong>অনুভূতি<sup>১</sup></strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&#8220;Misconceptions on the Nature of Islamic Art&#8221; শীর্ষক যে প্রবন্ধটির প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছে<sup>২</sup>, তাতে আমরা অলংকরণ, চিত্রণ, স্থাপত্য, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং শিল্পতত্ত্বের ক্ষেত্রে তথাকথিত প্রাচ্যবিদ পন্ডিতদের পান্ডিত্যের কিছু নমুনা তুলে ধরেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা একজন করে জাঁদরেল পাশ্চাত্য পন্ডিত্যের মতামত নিয়ে আলোচনা করেছি, যেমন, Richard Ettinghausen. H. G. Farmer, M. S. Dimand, T. W. Arnold, E. Herzfeld, K. A. C. Creswell, G. Von Grunebaum. এঁদের প্রত্যেকরই খ্যাতির মূলে রয়েছে অংশত বা সম্পূর্ণত অবদানের জন্য। এদের প্রত্যেকেই এই ভ্রান্ত ধারণা, বরং বলা যায়, এই পক্ষপাতদুষ্টতার শিকার হয়েছেন যে, যুগ যুগ ধরে মুসলিম জাতির শিল্পকলায় কোন অবদান রাখা তো দূরের কথা, বিপরীত পক্ষে, ইসলাম শিল্পকলাকে বাধাগ্রস্থ বা সীমিত করেছে, এবং তাতে করে, তাদের শৈল্পিক প্রবণতাগুলোকে নষ্ট করেছে। ইসলামের নন্দনতাত্ত্বিক বিকাশের একমাত্র দৃষ্টান্ত হচ্ছে আরবী, কোরআনিক আইনগুলো তর্জমার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য ভঙ্গের মধ্যে Ettinghausen সেই মনোপলির অবসানের সূচনায় কিছুটা মজার সঙ্গে উপভোগ করেছেন। প্রত্যেকেই দেখবার চেষ্টা করেছেন অন্ধগোড়ামী থেকে মুক্ত, যে শিল্পকর্মই মুসলমানরা সৃষ্টি করেছে, তা তারা করতে পেরেছে ইসলামকে ডিঙ্গিয়ে এবং ইসলামের নির্দেশমালাকে লংঘন করে। তাদের মতে মুসলিম অভিজাত বা রাজন্যবর্গ তাদের মহলে বা পাঠাগারে মানুষ এবং জীবজন্তুর চিত্রিত প্রতিকৃতি উপভোগ করেছেন এবং এসবের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, এবং তৎসহ তারা সঙ্গীতেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, ইসলামের নির্দেশ অমান্য করে যে &#8220;সঙ্গীত মাদকতা সৃষ্টি করে এবং ব্যভিচারে উৎসাহিত করে।&#8221; তারা সামান্যই উপলব্ধি করেছেন যে, নান্দনিকতার দিক দিয়ে তথাকথিত পাপাশ্রয়ী শিল্পকলা, পুরোপুরি ইসলাম সম্মতই বটে- মুসলিম বিশ্বের শিল্পকলার সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের মধ্যে অনু পরিমাণ স্থান দখল করে আছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এদের মধ্যে কেউ কেউ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যারও প্রয়াস পেয়েছেন। প্রকৃতি শূন্যতা বরদাস্ত করেনা, এই যুক্তিতে তারা দাবী করেন যে, মুসলমান আর্টিষ্টরা তাদের সকল শিল্পকর্মের সম্মুখ ভাগ নক্সার দ্বারা আচ্ছাদিত করেছে। কেউ কেউ সম্পূর্ণ বিপরীত মত পেশ করেছেন। তাদের যুক্তি এই যে, মুসলিম শিল্পীরা রঙ বা বর্ণপাগল, যারা সাদামাটাভাবে শূন্য রংয়ের উজ্জ্বল ঝলক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এবং এতে করে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিভার জন্য যে সাধনা এবং আগ্রহ আবশ্যক তা লাঘব করে কতিপয় রংয়ের নেশায় বিনষ্ট শিল্পী শিল্পকর্মকে কেবলমাত্র মোহ সৃষ্টির প্রয়াসে পর্যবসিত করেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে এদের কারোরই একথা কখনো মনে হয়নি যে, তারা পাশ্চাত্য শিল্পকলার লক্ষ্য ও মান অনুযায়ী ইসলামী শিল্পকলার বিচার করছেন, এবং কখনো কেউ এই অভিযোগটি উত্থাপন করেননি। <em>মুসলিম</em> <em>সংস্কৃতির</em> <em>প্রকাশক</em> <em>শিল্পকর্মের</em> <em>যে</em> <em>ব্যাখ্যা</em> <em>তারা</em> <em>দিয়েছেন</em> <em>তা</em> <em>বিভ্রান্তিকর</em><em>, </em><em>মানুষের</em> <em>এতে</em> <em>হাসি</em> <em>পায়</em><em>।</em> Titus Burckhardt এবং Louis Massignon এর ব্যাখ্যায় সত্যদর্শনের সাফল্যেরর ঝলক এবং ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে Earnst Kuhnel এর ঠাণ্ডা আত্মসংযমকে বাদ দিলে, ইসলামী আর্টের ইতিহাসবিদেরা একমত হয়ে পাশ্চাত্য নতুন তত্ত্বের আলোকে ইসলামী শিল্পকর্মের বিচার করেছে। এদের প্রত্যেকেই হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছেন এমন এক শিল্পকর্মে যাতে কোনো প্রতিমা, প্রতিকৃতি নেই। <em>নাটক</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>প্রকৃতিবাদ</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>গ্রন্থাদি</em> <em>পাঠ</em> <em>করে</em> <em>তাতে</em> <em>প্রত্যেকেই</em> <em>বিভ্রান্ত</em> <em>হন</em><em>, </em><em>কারণ</em> <em>তারা</em> <em>এতে</em> <em>পাশ্চাত্য</em> <em>শিল্পের</em> <em>এমন</em> <em>কিছুই</em> <em>পাননা</em> <em>যার</em> <em>সঙ্গে</em> <em>ইসলামী</em> <em>শিল্পকর্মকে</em> <em>সম্পৃক্ত</em> <em>করতে</em> <em>পারেন</em><em>।</em> <em>তারা</em> <em>বিভ্রান্ত</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আধ্যাত্মিক</em> <em>বিরূপ</em> <em>প্রতিক্রিয়ার</em> <em>সঙ্গে</em> <em>ইসলামী</em> <em>শিল্পকর্মের</em> <em>উপর</em> <em>তারা</em> <em>তাদের</em> <em>আগাম</em> <em>রায়</em> <em>দিয়ে</em> <em>বসেছেন</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আর একটি প্রবন্ধনের মাধ্যমে<sup>৩</sup> আমরা গ্রীক শিল্পের প্রকৃতি এবং আলেকজান্ডারের অভিযানের পর থেকে গ্রীক-শিল্পের প্রতি নিকটপ্রাচ্যের শিল্প ঐতিহ্যের প্রতিক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছি। গ্রীক শিল্পের সারকথা হচ্ছে প্রকৃতিবাদ, তবে একথা মনে করা ঠিক হবেনা যে গ্রীক শিল্প প্রকৃতির সরল ফটোগ্রাফিক অনুকরণমাত্র, বরং এ হচ্ছে একটি প্রাকসিদ্ধ ধারণার ইন্দ্রিয়জ সম্পদের প্রতিরূপ, যে ধারণাটিকে প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণার অংশত তাৎক্ষণিক রূপ। প্রকৃতি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টির মধ্যে স্থাপন করেছে সনাতন গ্রীক সংস্কৃতির পর্বতশীর্ষ এলাকায় দীর্ঘসরু উঁচুভূমির অনুরূপ একটি ধারণা। তার থিওরির মতে, পাথর কেঁটে মানুষের প্রতিমা নির্মাণ হচ্ছে সর্বোচ্চ শিল্প। মানুষের সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে, সে প্রকৃতির সবচেয়ে ঐশ্বর্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে জটিল entelechy। এর গভীরতা এবং অন্তর্গত বৈচিত্র্য হচ্ছে শিল্পীর অনুসন্ধান আবিষ্কার ও প্রকাশের জন্য একটি অন্তহীন খনি। এই কারণেই মানুষ হচ্ছে &#8220;সমস্ত কিছুর বিচার ও পরিমাপের মানদন্ড&#8221;। সে সৃষ্টির চূড়া সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সকল প্রকার মূল্যের বাহক ও কংক্রীট রূপদাতা। এ কারণে খোদ ঐশী সত্ত্বাকে ধারণা করা হয়েছে তার প্রতিমূর্তিতে, ধর্মকে মনে করা হয়েছে মানবতাবাদ এবং ঐশী সত্ত্বার উপাসনা হয়েছে মানুষের অন্তরতম প্রকৃতির অন্তহীন গভীরতা এবং বৈচিত্র্যের অনুধ্যান। গ্রীক বা হেলেনিক সংস্কৃতির এই সার নির্যাসের প্রতিফলনই সমগ্র হেলেনিক সভ্যতার শিল্পের জন্য আবশ্যক হয়ে উঠেছিলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>নিকটপ্রাচ্য আমাদের সামনে উপস্থাপন করে একটি সম্পূর্ণ বিপরীত ঐতিহ্য। এখানে মানুষ হচ্ছে ঐশী সত্ত্বার একটি নিমিত্তক মাত্র, যাকে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন ইবাদত করার জন্য। মানুষ কখনোই নিজেই কোন চরম লক্ষ্য নয় এবং নিশ্চয়ই কোনো কিছুর পরিমাপের মানদন্ড নয়। মানদন্ড ঐশী সত্ত্বা স্থাপন করেন। এই মানদন্ড থেকে নিষ্পন্ন বিধিবিধানসমূহ মানুষের জন্য আইন। এখানে কোনো প্রমিথিউস নেই, স্রষ্টার ভূমিতে আছে কেবল একজন দাস বা ভৃত্য, যে আদেশ পালন করলে আশীষ লাভ করে, আদেশ পালনে ভুল করলে আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় এবং আদেশ লংঘন করলে ধ্বংস হয়। অবশ্য আল্লাহর ঐশীত্ব হচ্ছে একটি mysterium, একটি tremendum এবং একটি fascinosum। একারণে আল্লাহর ঐশী হচ্ছে মানুষের একটি আবিষ্টতা, তার স্থির ধারণা, তার সার্বক্ষণিক চিন্তা হচ্ছে এই ঐশী অভিপ্রায় কি এবং তা কিভাবে কাজ করে; আল্লাহ কেন্দ্রীকতাই হচ্ছে তার ভাগ্য। এ থেকেই মানুষ অর্জন করে তার তাৎপর্যতার গৌরব এবং তার বিশ্বজাগতিক মর্যাদা। অপরিহার্যভাবেই তাই নিকটপ্রাচ্যের সভ্যতা হচ্ছে নিকটপ্রাচ্য সংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্যের একটি প্রকাশ।</p></blockquote>
<p>প্রকৃতি এবং সর্বোপরি মানব প্রকৃতি হচ্ছে ঐশী স্থান দখলের প্রবলতম প্রতিযোগী এবং প্রমিথিউস মোটেই কোন কাহিনী নয়, বরং প্রভৃত্ব অর্জনের জন্য ঐশী সত্ত্বার সঙ্গে মানুষের সংগ্রামের মিত্র কাব্যিক উপাখ্যান মাত্র। প্রথমত, নিকটবর্তী গ্রীস এবং মিশর ঐশী সত্ত্বা এবং প্রকৃতি বিষয়ে যে ধরনের প্রলোভন এবং বিভ্রান্ত সৃষ্টি করেছে তা অবশ্যই রুখতে হবে এবং চৈতন্য থেকে নির্বাসিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমস্ত চৈতন্যকে অবশ্যই নিমগ্ন করতে হবে ঐশী এলাকার অভ্যন্তরে যা হচ্ছে এর উৎস, এর আদর্শ, এর প্রভু এবং ভাগ্য। তাই আলেকজান্ডারের অনেক পূর্বে নিকটপ্রাচ্যের শিল্প প্রকৃতিবাদ থেকে বন্ধন মুক্তির জন্য ষ্টাইলাইজেসন উদ্ভাবন করে। নিশ্চয়ই নিকটপ্রাচ্য যখন গ্রীকদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং নিকটপ্রাচ্যের জনমানুষের উপর গ্রীক সভ্যতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ষ্টাইলাইজেসন বা শৈলীকরণ আরো প্রবল এবং আরো জোরদার হয়ে উঠে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইহুদীদের নিকটপ্রাচ্যের আর একটি সংস্কৃতি এবং ধর্ম ইহুদীবাদ, সাম্রাজ্যবাদী হেলেনিজমের মোকাবেলা করে সাহসিকতার সঙ্গে এবং সম্ভবত সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় দূর্ঘটনা হচ্ছে Philo। আধুনিক কালে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এবং ধর্ম দ্বারা এর সৌন্দর্যতাত্ত্বিক অভিন্দ্রিয়তা অংশত বিকৃত হয়ে পড়লে, বিশেষ করে ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের আবির্ভাবকাল থেকে সেই বেপরোয়া অযৌক্তিক এবং বৈশেষিক প্রকৃতিবাদীর আর্বিভাবের পর, জাতি, জনগোষ্ঠী, রক্ত ও বালি, মা-রাশিয়া, ঈশ্বর-রাজা- দেশ ইত্যাদির অন্ধ মোকাবেলায় ইহুদীদের বিশ্বস্ততার সঙ্গে মূল নিকটপ্রাচ্যের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তার শিল্পকলাকে অনুসরণ করেছে। <em>&#8220;</em><em>তুমি</em> <em>খোদাই</em> <em>করে</em> <em>কোন</em> <em>প্রতিমা</em> <em>বানাবেনা</em><em>&#8220;- </em><em>এই</em> <em>নির্দেশকে</em> <em>ইহুদীরা</em> <em>পৌত্তলিকতার</em> <em>বিরুদ্ধে</em> <em>কেবল</em> <em>একটি</em> <em>আত্মরক্ষার</em> <em>নির্দেশ</em> <em>হিসেবেই</em> <em>দেখেনি</em> <em>বরং</em> <em>নন্দনতত্ত্বের</em> <em>একটি</em> <em>মূলনীতি</em> <em>হিসেবে</em> <em>উপলব্ধি</em> <em>করেছে</em><em>।</em> তাদের সিনাগণগুলো শিল্পকর্মের দিক দিয়ে শূন্যই ছিল, মুসলিম বিশ্ব ছাড়া অন্য সর্বত্র, মুসলিম বিশ্বে তারা ইসলামের বিকাশমান অগ্রগতিকে অনুকরণ করেছে। পবিত্র গ্রন্থের কাব্য মাধুর্যের দ্বারা তাদের নন্দনতাত্ত্বিক চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ হয় এবং ঐশী সত্ত্বাকে প্রত্যক্ষ করার ব্যাপারে তাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সকল দাবী অস্বীকৃত হয়। তাদের বিশ্বাস দাবী করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঐশী সত্ত্বাকে এই ধরনের স্নায়বিক ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়া স্বজ্ঞার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হবে। আর তা না হলে তা ঐশী সত্ত্বাই নয়। সমস্ত সত্ত্বার আদি নীতি স্বজ্ঞার মাধ্যমে উপলব্ধির প্রয়াসে ইন্দ্রিয়ের সাহায্য যত নেয়া হবে, ততই সে স্বজ্ঞার বিষয় হবে অধিকতর ইন্দ্রিয়াতীত, ততই দৃষ্টি হবে বিশুদ্ধতর<sup>৪</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা</p>
<p>১. এই সিদ্ধান্তের প্রমাণ এই বাস্তবতা যে, মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র একই এসথেটিক মূল্যগুলোর প্রাধান্য, মূল্যন্তর বিন্যাসের শীর্ষবিন্দুতে রয়েছে সুন্দর, আরবী ক্যালিগ্রাফিক, কুরআনুল কারীম কপি করার পূণ্য; কুরআনের আয়াত দ্বারা মানুষের বাড়ি-ঘর, মসজিদ, সরকারী দালানকোঠা অলংকরণ, একটি মাত্রার স্বল্প কয়েকটি সূরের উপর ভিত্তি করে উৎপন্ন রাগিনীতে তা আবৃত্তি করা এবং এর বিশিষ্ট্যত্বক শব্দগুলোর দ্বারা সাহিত্যিক পত্র-পুস্তুকাদির অলংকরণ।</p>
<p>২. দ্র: বর্তমান গ্রন্থকারের প্রবন্ধ &#8230;. &#8220;Misconception of the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; Islam and the Modern Age, vol. I. No 2. (May 1970) পৃ. ২৯-৪৯।</p>
<p>৩. দ্র: বর্তমান গ্রন্থকারের প্রবন্ধ &#8230;. &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; Islam and the Modern Age. vol. I. No 2. (August 1970) পৃ. ৬৪-৮১।</p>
<p>৪. অতিবর্তিতা বা অতীন্দ্রিয়তার সংজ্ঞার একটি আবশ্যক শর্ত এই যে, যুক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা সরাসরি অতিবর্তী বা অতীন্দ্রিয়কে উপলব্ধি করতে হবে, অর্থাৎ প্রবর্তন প্রক্রিয়ায় ইন্দ্রিয়গুলো যদি সামান্যতম ভূমিকাও পালন করে তেমন অবস্থায় যে বস্তুটিকে উপলব্ধি করা হল তা কিছুতেই অতিবর্তী হতে পারে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-unity-of-muslim-art-and-its-rivals/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14875</post-id>	</item>
		<item>
		<title>পরিবার প্রথার মূলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principle-of-family/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principle-of-family/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 26 Sep 2024 16:39:07 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14865</guid>

					<description><![CDATA[১. পৃথিবীতে পরিবার প্রথার অবক্ষয় &#160; ক. সমতা কমিউনিষ্টগণ সমাজের উৎপত্তি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব মতবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবারের বিলোপ সাধন করে তার স্থলে কম্যুন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিল। কমিউনিষ্টরা মানব জীবনের সেই আদর্শ অবস্থাকেই চিত্রিত করেছিলো যাতে মানুষ একসঙ্গে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4>১. পৃথিবীতে পরিবার প্রথার অবক্ষয়</h4>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>সমতা</strong></p>
<p><em>কমিউনিষ্টগণ</em> <em>সমাজের</em> <em>উৎপত্তি</em> <em>সম্পর্কে</em> <em>তাদের</em> <em>নিজস্ব</em> <em>মতবাদের</em> <em>দ্বারা</em> <em>অনুপ্রাণিত</em> <em>হয়ে</em> <em>ইচ্ছাকৃতভাবে</em> <em>পরিবারের</em> <em>বিলোপ</em> <em>সাধন</em> <em>করে</em> <em>তার</em> <em>স্থলে</em> <em>কম্যুন</em> <em>প্রতিষ্ঠার</em> <em>পরিকল্পনা</em> <em>করেছিল</em><em>।</em> কমিউনিষ্টরা মানব জীবনের সেই আদর্শ অবস্থাকেই চিত্রিত করেছিলো যাতে মানুষ একসঙ্গে ডরমিটরীতে বাস করে, মেসের হলে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে এবং সন্তান সন্ততিকে রাষ্ট্রের সন্তান বলে গণ্য করে। অনেক কম্যুন সৃষ্টি হয়েছিল বটে, কিন্তু কমিউনিষ্টরা শীঘ্রই বুঝতে পারলো ব্যক্তিগত সংগঠনের এই যৌথ পদ্ধতি ব্যর্থ হতে বাধ্য, তাই চিরাচরিত পরিবারের রূপটিতে থাকলো সাধারণত বাবা মা তাদের সন্তানের প্রতি ভালবাসা, স্নেহ ও স্বাভাবিক মমতা বশে যেসব কর্তব্য পালন করে থাকেন, রাষ্ট্র তার অনেকগুলো দায়িত্ব গ্রহণ করায় পরিবারের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কেবল মাত্র তাদের শৈশবের নির্ভরশীলতা এবং সাহচর্যের স্মৃতি ছাড়া এমন আর কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যার উপর পরিবারের সদস্যরা তাদের সম্পর্ক গড়ে তুলবে<sup>১</sup>।</p>
<p>পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার জীবিকা ও চাকুরীর সন্ধানে বিশাল নগর কেন্দ্রিক জনসমষ্টির দিকে জনতার ধাবিত হওয়ার ফলে প্রত্যেকেই হয়ে পড়েছে নাম পরিচয়হীন। নারী পুরুষের মেলামেশা, শিথিল নৈতিকতা, নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা, একধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং সহজাত আত্মস্থ প্রকৃতির চিরাচরিত যথেচ্ছাচার, সব কিছু মিলে পারিবারিক বন্ধনে ধস নামাতে সাহায্য করে। বর্তমান শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যথেচ্ছাচার এবং অবাধ যৌন মেলামেশার মধ্যে পরিবার প্রথার যে কি অধঃগতি হয়েছে তার করুণ অবস্থার প্রকাশ দেখতে পাই, এই মুহূর্তে নগরীগুলিতে যে সব শিশু জন্মগ্রহণ করছে তার শতকরা পঞ্চাশ ভাগের বেশী অবৈধ সন্তান। পরিবার হয়ে উঠেছে জন্তুর পরিবার। এই অর্থে যে কেবলমাত্র ততক্ষণই এর অস্তিত্ব আবশ্যক যতক্ষণ শিশুরা দৈহিকভাবে অসহায় এবং বাবা মা&#8217;র নিরবচ্ছিন্ন যত্ন মনোযোগ প্রয়োজন। যে মুহূর্তে তারা বালেগ হয় তখনই বৈষয়িক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় এবং পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে পড়ে। কেবল তাই নয় তার চেয়েও খারাপ, গৃহের বাইরে বাবা মার কর্ম ব্যস্ততা, তাদের মনস্তাত্বিক ক্লান্তি ও অবসাদ এবং গৃহের বাইরে আবেগ পুরণের জন্য মানসিক চাপ, সন্তান সন্ততির অতি অল্প বয়সে পারিবারিক বন্ধন শিথিল করে দেয়, পরিবার বলে দীর্ঘকাল যা পরিচিত ছিল কার্যত তা এখন মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় ধুকছে<sup>২</sup>।</p>
<p>নৃতত্ত্ববিদেরাও পরিবার প্রথার পতনে সাহায্য করছে, এই শিক্ষা প্রদান করে যে, মানুষের ভিন্নতর সমাজ ও সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, যেমনটি জীবজন্তু ও আদিম নরনারীদের মধ্যে সাফল্য অর্জন করেছে। মানুষের অবস্থা বিবেচনা করতে গিয়ে তারা যে ক্রমাগতই জন্তু জগতের উল্লেখ করে থাকে তাতে মানুষের মগজ ধোলাই হবার ফলে, তারা এখন ভাবতে শুরু করছে যে, জন্তুর সংগে মানুষের পার্থক্যগুলো হচ্ছে অস্বাভাবিক, এবং ভিন্নতর মানবিক সংঘ, যেমন মাতৃতন্ত্র ও একই সংগে বহুপতি গ্রহণ প্রথার নিয়ম, ইত্যাদির কল্পনা-সর্বস্ব থিওরীর বন্যা পরিবার প্রথাকে চিরাচরিত সম্মানের স্থান থেকে বিচ্যুত করতে সাহায্য করে।</p>
<p>গোটা কমিউনিষ্ট বিশ্বে এবং পাশ্চাত্য জগতে পরিবার প্রথার এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, যা বর্তমানে সমাজের সাধারণ অবক্ষয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংশ্লিষ্ট। নৈতিকতার অবক্ষয়, সমাজ সংহতি এবং পুরুষ পরম্পরায় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার অবক্ষয়ের উপর যেমন এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলেছে, তেমনি এই পরিবর্তনকে প্রভাবিতও করছে। কোনটি কারণ কিংবা কোনটি ফল একথা ধর্তব্যের মধ্যে না এনেই সভ্যতা এবং পরিবার প্রথা মনে হয় একই সঙ্গে টিকে থাকবে, না হয় ধ্বংস হবে। যেহেতু মুসলিম বিশ্ব এবং অবশিষ্ট তৃতীয় বিশ্ব, কমিউনিজম এবং পাশ্চাত্য মতবাদের ধ্বংসকারী আঘাত থেকে তাদের আত্মপরিচয়ে নিজস্বতা রক্ষা করে চলেছে, সে কারণে এই সব সমাজে এখনো পরিবার প্রথা তার মর্যাদার আসন নিয়ে টিকে আছে। ইসলামী সংস্থার টিকে থাকার সম্ভাবনা বৃহত্তর, কারণ তা ইসলামিক আইনের দ্বারা বলবৎ এবং আত-তৌহীদের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কের দ্বারা স্থিরীকৃত, যা ইসলামী ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সারকথা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>সমাজের</strong> <strong>একটি</strong> <strong>গঠনমূলক</strong> <strong>একক</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>পরিবার</strong> <strong>প্রথা</strong></h4>
<p>মানুষের পক্ষে আল্লাহর উদ্দেশ্য পরিপূরণের জন্য প্রয়োজন এই যে, মানুষ বিয়ে-শাদি করবে এবং সন্তান জন্ম দেবে এবং একসঙ্গে বসবাস করবে এবং এভাবে মানবিক সম্পর্কের নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে মানবিক সিদ্ধান্ত এবং কর্মের মাধ্যমে ঐশী অভিপ্রায়ের নৈতিক দিকটি সার্থক হবে। <strong>এই</strong> <strong>নাট্যমঞ্চটিতে</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>চারটি</strong> <strong>স্তর</strong> <strong>যথা</strong> <strong>সে</strong> <strong>নিজে</strong><strong>, </strong><strong>পরিবার</strong><strong>, </strong><strong>গোত্র</strong> <strong>বা</strong> <strong>জাতি</strong> <strong>বা</strong> <strong>জনগোষ্ঠী</strong> <strong>এবং</strong> <strong>বিশ্বজনীন</strong> <strong>উম্মাহ্</strong><strong>।</strong> প্রথম স্তরটির আবশ্যকতা স্বতঃপ্রকাশিত, যে কোন নৈতিকতার যে কোন রকমের পরিপূরণের জন্য আবশ্যক হচ্ছে নিজের অহমের সঙ্গে কর্তার একটি নৈতিক সম্পর্কে প্রবেশ। সেই অহমকে বোঝা, তাকে রক্ষা করা ও তার বিকাশ সাধন এবং তাকে নৈতিক মূল্যের সিদ্ধান্তের অধীনে স্থাপন আবশ্যিক। কেননা, এগুলোই হচ্ছে শর্ত, যা বাদ দিলে সৃষ্টিই বাধাগ্রস্থ হবে। তৃতীয় স্তরটি অর্থাৎ গোত্র জাতি বা রেস আবশ্যক নয়, এর প্রকৃতি উম্মাহরই মত, একারণে যে গোত্র, জাতি বা রেস্ অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে যাদের সঙ্গে কোন জৈবিক সম্পর্ক নেই, কিংবা সম্পর্কটি এত দূরের যে, তা কোন তাৎক্ষণিক অনুভূতির বিষয় নয়, কল্পনার বিষয়মাত্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে গোত্র, (জাতি বা রেস) স্তরটি কেবলমাত্র নিয়ন্ত্রণপ্রবণ, কেননা উম্মাহর সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক থাকতে পারে তার সঙ্গে নতুন কিছুই যোগ না করে। এর কাজ হচ্ছে সেই সম্পর্ককে গোত্র (জাতি বা রেস) সদস্যদের মধ্যে সীমিত রাখা এবং যেন সেই সদস্যপদ আর কাউকে না দেওয়া হয় সেই বিধি নিষেধ কার্যকর করা<sup>৩</sup>। এর বিপরীতে উম্মাহ সম্পর্ক সৃষ্টি করে ধর্ম বা আদর্শের ভিত্তিতে এবং জন্ম বংশ নির্বিশেষে, ভাষা ইতিহাস বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি সদস্যপদ সম্প্রসারিত করে। উম্মাহর সম্পর্ক হচ্ছে অধিকতর মানবিক এবং তা ব্যক্তির মর্যাদা সংরক্ষণ করে, যেখানে গোত্র (জাতি বা রেস) সর্ম্পক এই মর্যাদাকে লংঘন করে, জন্মের উপর তার সংকীর্ণতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই জন্যই ইসলাম মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসাবে গোত্র, জাতি, রেসকে উন্মূলিত করে এবং তার স্থলে স্থাপন করে বিশ্বজনীন উম্মাহ<sup>৪</sup>। প্রাক ইসলামিক জাহিলিয়া ও পশ্চাৎপদতার যুগে গোত্রতন্ত্র বিদ্যমান ছিল। রোমান এবং পার্সিয়ান সাম্রাজ্যে গোত্রতন্ত্র ছিল রোমান ও পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের প্রবল মানদণ্ড। এই দুটি সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের পূর্ববর্তী, যার অবসান ঘটিয়েছিল ইসলাম। এই দুটি সাম্রাজ্য মানুষের কর্মকাণ্ডে এমন সব অপকর্মের জন্য দায়ী ছিল যার জন্যে তাদেরকে নির্মূল করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।</p>
<p>এর ফলে, কেবলমাত্র পরিবারই রয়ে গেল চূড়ান্ত সামাজিক ইউনিট হিসাবে, যার একপার্শ্ব ধারণ করে আছে ব্যক্তি এবং অন্য পার্শ্ব ধারণ করে আছে বিশ্বজনীন উম্মাহ। মহাজাগতিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্বের উপর কুরআন জোর দিয়েছে এভাবে, ইহা আল্লাহর একটি নিদর্শন, তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে পরস্পরের যুগল সৃষ্টি করেছেন, এবং তোমাদের মধ্যে প্রেম ও তারুণ্যের সৃষ্টি করেছেন<sup>৫</sup>। ইসলাম যৌনজীবনকে নিন্দা করে না বরং একে নিষ্পাপ, প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর মনে করে; এবং কেবল এর অনুমতি দেয়না, বরং এই নির্দেশ দেয় যে নর এবং নারী এ সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের সার্থকতা খুঁজে নেবে<sup>৬</sup>। যাই হউক, বিবাহের লক্ষ্য পূরণের জন্য, কেবলমাত্র যৌন সম্পর্ককে একমাত্র বিষয় বলে স্বীকার করেনা। যে বিবাহ কেবলমাত্র যৌন সম্পর্ক, যা রোমান্টিক ভালবাসার লক্ষ্য, ইসলাম তাকে ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ঘোষণা করে<sup>৭</sup>। বিয়ের ফলে সৃষ্টি হয় এক বিশাল জটিল মানবিক সম্পর্ক যেগুলো নৈতিক নির্দেশমালার একটি বড় অংশের উপকরণ। পরিবারের সদস্যদের প্রতি ব্যক্তির প্রথম কর্তব্যগুলির মধ্যে পড়ে প্রজনন, স্নেহপ্রেম, সমর্থন, সুপরামর্শ, পথনির্দেশ, শিক্ষাদান, সাহায্য এবং বন্ধুত্ব। কুরআনে সমাজ সম্পর্কিত আল্লাহ তা&#8217;লার নির্দেশগুলির মধ্যে অতিশয় প্রাধান্য পেয়েছে জুল-কোরা (খেশ, স্বগণ) শ্রেণীটি<sup>৮</sup>। <em>সংক্ষেপে</em> <em>একথা</em> <em>বলা</em> <em>যায়</em> <em>যে</em><em>, </em><em>ঐশী</em> <em>অভিপ্রায়</em> <em>বাস্তবায়নের</em> <em>জন্য</em> <em>ইসলাম</em> <em>পরিবারকে</em> <em>অপরিহার্য</em> <em>মনে</em> <em>করে</em><em>।</em> <em>এই</em> <em>ধরনের</em> <em>বাস্তবায়ন</em> <em>ব্যতিরেকে</em> <em>তৌহীদের</em> <em>কথা</em> <em>চিন্তা</em> <em>করা</em> <em>যায়না</em><em>।</em> কারণ আল্লাহকে এক এবং একমাত্র ইলাহরূপে স্বীকার করার মানেই হচ্ছে তাঁরই স্বীকৃতি যাঁর ইচ্ছা এবং আদেশ হচ্ছে মানুষের ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয়, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং মানুষের লক্ষ্য। তৌহীদকে অনুসরণ করার মানেই হচ্ছে আল্লাহর আদেশ যে বাধ্যতামূলক সে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং এই অভিজ্ঞতার মানেই হচ্ছে সব আদেশের মধ্যে যে সব মূল্য নিহিত আর, সেসব বাস্তবে অস্তিত্বশীল উপাদানের মাধ্যমে সেগুলোকে রূপায়িত করার উপায় অনুসন্ধান। এর সমস্ত কিছুই যুক্তির দিক দিয়ে পরস্পর যুক্ত এবং একে অন্য থেকে অবিচ্ছেদ্য। অন্যগুলোকে পূরণ না করে কেবল কোন একটিকে পূরণ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ যে কেবল এইসব মূল্যের বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন তা নয়, তৎসঙ্গে তা করার জন্য পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছেন এবং কি কি উপকরণ আবশ্যক তারও উল্লেখ করেছেন। এগুলো হচ্ছে পরিবার এবং পরিবার প্রথা যে সবের জন্ম দেয় সে সমুদয়। উভয়ের প্রয়োজনীয়তা যুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে। আল্লাহ যে বিশেষ, করে এসবের উল্লেখ করেছেন তাতেই এগুলোর যৌক্তিক আবশ্যকতার সমর্থন মেলে। তাই পরিবারকে বাদ দিয়ে তৌহীদের অস্তিত্ব থাকেনা<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>৩</strong><strong>. </strong><strong>সমসাময়িক</strong> <strong>সমস্যাসমূহ</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>সমতা</strong></p>
<p>আল্লাহ যে নরনারীকে তাদের ধর্মীয়, নৈতিক এবং নাগরিক অধিকারের বেলায় কর্তব্য ও দায়িত্বের দিক দিয়ে সমান করে সৃষ্টি করেছেন এতে কোন সন্দেহ নেই<sup>১০</sup>। তবে স্বল্প কয়টি ব্যতিক্রম আছে এবং সেগুলো পিতা এবং মাতা হিসাবে তাদের দায়িত্ব ও কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ধর্মীয় পর্যায়ে আল্লাহ তাদের সমতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন (৩: ১৯৫), (৯: ৭১-৭২) এবং (১৬: ৯৭) সংখ্যক আয়াতে। এই আয়াতগুলোই তাদের নৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠিত করে। নাগরিক সমতার বিষয়ে (৬০: ১২), (৫: ৩৮), (২৪: ২) এবং (৪: ৩২) সংখ্যক আয়াতগুলোতে ঘোষিত হয়েছে। (৪: ৩৪) সংখ্যক আয়াতের ভিত্তিতে ইসলাম অসাম্য সমর্থন করে, এই দাবী বিশ্লেষণ করলে বিচারে টিকেনা। প্রথমত এর সম্পর্ক কেবল পারিবারিক ঘরোয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে, একই আয়াতের বাকি অংশে এর প্রমাণ রয়েছে, যে অংশটি প্রথম অংশটি প্রয়োগের শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত- যা সমস্তটুকুই ঘরোয়া পরিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক। সাধারণত অবাঞ্ছিত সাধারণীকরণের পথ প্রশস্ত করার জন্য যুক্তি তর্ক থেকে আয়াতের এই অপর অংশটি বর্জন করা হয়ে থাকে। এই সম্পর্কের বেলায় পুরুষের নিশ্চয়ই অগ্রবর্তীতা রয়েছে কেননা পিতৃতান্ত্রিকতাই পরিবারিক জীবনের একমাত্র রূপ যা মানব জাতি নিজেই পরীক্ষা করেছে সৃষ্টির শুরু থেকে এবং পালন করে এসেছে। পরিবার হচ্ছে একটি গৃহ, যার ডিফেন্সের প্রয়োজন হয় এবং যাকে রক্ষা করার জন্য গৃহের বাইরে সার্বক্ষণিক সংগ্রামের আবশ্যক হয়। স্পষ্টতই পুরুষ এ দায়িত্ব পালনের জন্য রমনীদের চেয়ে প্রকৃতিগতভাবেই অধিকতর ক্ষমতাবান। দ্বিতীয়ত, অসাম্যের যারা ওকালতি করে তাদের ধারণায় এই আয়াতটির ব্যাখ্যা হচ্ছে উপরে উল্লেখিত যে সব আয়াত ধর্ম, নৈতিকতা ও নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলিতে নরনারীর সাম্য প্রতিষ্ঠা করে, সেগুলোর বিপরীতে তার প্রতিস্থাপন।</p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>ভূমিকার</strong> <strong>ভিন্নতা</strong></p>
<p>ইসলাম মনে করে নারী এবং পুরুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পৃথক অথচ পারস্পরিক পরিপূরক দায়িত্ব পালনের জন্য<sup>১১</sup>। মাতৃত্ব, পরিবারের যত্ন এবং ছেলেমেয়েদের লালন পালন, এসব দায়িত্ব ও কর্ম, এবং পিতৃত্ব পরিবারের রক্ষণ, জীবিকা অর্জন। আর সামগ্রিক দায়িত্বের জন্য, পুরুষ এবং নারীর মধ্যে পৃথক দৈহিক মনস্তাত্বিক এবং আবেগাত্বক গঠন আবশ্যক। ইসলাম এই ভিন্নতর পার্থক্যকে নর নারী উভয়ের অস্তিত্বের সার্থকতার জন্য আবশ্যক বলে শ্রদ্ধা করে<sup>১২</sup>। ভূমিকার স্বাতন্ত্র্য, বৈষম্য বিচ্ছিন্নকরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। উভয় ভূমিকাই একইভাবে ধর্মীয় এবং নৈতিক আদর্শের বা মানদণ্ডের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; এবং উভয়ের পক্ষে আবশ্যক, নারী কিংবা পুরুষের সাধ্যমত সকল বুদ্ধি মেধা, শক্তি ও প্রচেষ্টার প্রয়োগ। <em>একইভাবে</em> <em>ভূমিকার</em> <em>এ</em> <em>ভিন্নতা</em> <em>নারী</em> <em>এবং</em> <em>পুরুষের</em> <em>কর্মকান্ড</em> <em>যেখানে</em> <em>নিজের</em> <em>সীমা</em> <em>ডিঙ্গিয়ে</em> <em>অন্যের</em> <em>এলাকায়</em> <em>প্রবেশ</em> <em>করে</em> <em>সেই</em> <em>সব</em> <em>এলাকা</em> <em>সম্পর্কে</em> <em>কিছু</em> <em>বলেনা</em><em>, </em><em>যেমন</em> <em>বলেনা</em> <em>অন্য</em> <em>সব</em> <em>এলাকা</em> <em>সম্পর্কে</em><em>, </em><em>যেখানে</em> <em>নিজের</em> <em>এলাকা</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>এলাকায়</em> <em>প্রবেশের</em> <em>কথা</em> <em>উঠেনা</em><em>।</em> যেখানে প্রকৃতিগত মানসিক প্রবণতার কারণে তা বাঞ্ছনীয় বা প্রয়োজনে তা উপযোগী মনে হয়, সেখানে নারী এবং পুরুষের কর্মকান্ড একে অপরের এলাকায় অনুপ্রবেশ করতে পারে, আল্লাহ প্রকৃতিতে ভূমিকার যে ভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা লংঘন না করে। অন্যথায় কুরআন রমণীদেরকে যে সব নাগরিক অধিকার দিয়েছে সেগুলো দিত না, এবং এসব নাগরিক অধিকার সম্পর্কে কেউ কখনো কোন প্রশ্ন তোলেনা।</p>
<p><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>প্রদর্শনী</strong> <strong>এবং</strong> <strong>গৃহবন্দীত্ব</strong></p>
<p>এ ব্যপারে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ্ তায়ালা চাননি, মুসলিম মহিলারা পর্দার অন্তরালে অথবা হারেমের চৌদেয়ালের মধ্যে সমাজ থেকে আলাদা হয়ে গুটি পোকার খোলসের মধ্যে নিজেকে বন্দী করবে, বরং এই সাক্ষ্যই রয়েছে যে, তাদের সরকার পরিচালনায় অংশ গ্রহণের অধিকার থাকবে যেমনটি দেখতে পাই (৬০: ১২) সংখ্যক আয়াতে, অধিকার থাকবে জনজীবনে অংশ গ্রহণের, যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে (৯: ৭১-৭২) সংখ্যক আয়াতে, এমনকি যুদ্ধ বিগ্রহে, যার উল্লেখ রয়েছে (৩: ১৯৫) সংখ্যক আয়াতে। স্পষ্টতই এধরনের অংশগ্রহণ বোরকা এবং সমাজ বিচ্ছিন্নতার বিপরীত, এবং মুসলমান মহিলাদের জন্য অচিন্তনীয়। ইসলাম যা পরিহার করার জন্য সবচেয়ে যত্নবান তা হচ্ছে সেই ধরনের প্রদর্শনী যা নৈতিকতাহীনতা ও ব্যভিচারের পথে পরিচালিত করে<sup>১৩</sup>। এখানে দুটি আদেশ রয়েছে, একটি সাধারণ আদেশ যা নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য সমান গুরুত্বের সঙ্গে ব্যক্ত হয়েছে, যদিও বা পুরুষের জন্য অধিকতর গুরুত্বের সাথে আলোচিত না হয়ে থাকে, কেননা পুরুষের কথা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে<sup>১৪</sup>। দ্বিতীয় আদেশটির বিষয়, স্ত্রী লোকের যা উপরে উল্লেখিত যথা (২৪ : ৩০-৩১) সংখ্যক একই আয়াতে বিদ্যমান। একথা সত্য যে কুরআন স্ত্রীলোকদেরকে তাদের গা ঢাকতে বলেছেন। কিন্তু কুরআন প্রকাশ্যে সেই সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে তা থেকে রেহাই দিয়েছে যেগুলো মহিলারা তাদের ইসলাম-নির্দেশিত পেশা এবং ভাগ্য পরিপূরণ করতে হলে প্রথা অনুসারে অনাবৃত রাখতে বাধ্য। নারীর সৌন্দর্য ও অলংকারের ইচ্ছাকৃত প্রদর্শনী পুরুষকে প্রলুব্ধ করে এবং সে কারণে তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, তবে যারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং যে সব প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ সংশ্লিষ্ট মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনা, যেমন তার পিতা, ভ্রাতা, পুত্র অথবা চাচা, মামার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নয়<sup>১৫</sup>। ইসলামে প্রলোভন পরিহার করে চলা একটি উচ্চ নৈতিক আদর্শ। এর সঙ্গে সমাজে তার রমনীর ইসলামী দায়িত্ব পালনের কোন সম্পর্ক নেই, আসলে, মহানবীর সময় থেকে দেখা গেছে মহিলারা এই সব ইসলামী দায়িত্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে পালন করেছেন, এমনকি পবিত্র কাবাগৃহে তাদের মুখ, হাত ও পা খোলা রেখে।</p>
<p><strong>ঘ</strong><strong>. </strong><strong>শাদী</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তালাক</strong></p>
<p>সকল নারী এবং পুরুষের জন্য শাদী হচ্ছে একটি ধর্মীয় এবং নৈতিক নির্দেশ<sup>১৬</sup>। উচ্চ যৌতুকের দাবী, গৃহের অভাব, শিক্ষা এবং চাকুরী, নারী এবং পুরুষ কারোরই বিয়ের পক্ষে বাধা বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। পশ্চাত্য জগতে এগুলো প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে, কারণ পশ্চিম বৈষয়িক সাফল্যের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং পশ্চাত্যের লোকেরা যৌন পবিত্রতার উপর কোন গুরুত্বই দেয় না। যেহেতু পারিবারিক ইউনিটটি আণবিক একক, এজন্য বিয়ের পূর্বেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা দম্পতির জন্য আবশ্যক। এর বিপরীত ইসলামী পরিবার হচ্ছে একটি সম্প্রসারিত মডেল, যার মধ্যে বাবা, মা দাদা, দাদী, পুরুষ এবং তাদের পুত্র সন্তান-সন্ততিগণ সকলেই অন্তর্ভূক্ত। <em>যেহেতু</em> <em>শরীয়ার</em> <em>বিধান</em> <em>মতে</em> <em>রমণীরা</em> <em>তাদের</em> <em>স্বামীদের</em> <em>সাহায্য</em> <em>সমর্থন</em> <em>লাভের</em> <em>অধিকারী</em><em>, </em><em>অথবা</em> <em>তারা</em> <em>যাদের</em> <em>উপর</em> <em>নির্ভরশীল</em> <em>তাদের</em> <em>সাহায্য</em> <em>সহযোগিতায়</em> <em>যেহেতু</em> <em>পিতৃতান্ত্রিক</em> <em>ব্যবস্থার</em> <em>অনুসরণে</em> <em>ইসলাম</em> <em>বয়স্ক</em> <em>পুরুষের</em> <em>উপর</em> <em>রমণীদের</em> <em>ভরণ</em> <em>পোষণের</em> <em>দায়িত্ব</em> <em>অর্পণ</em> <em>করে</em> <em>সেজন্য</em> <em>বেশীর</em> <em>ভাগ</em> <em>মুসলিম</em> <em>পুরুষ</em> <em>এবং</em> <em>নারী</em> <em>তরুণ</em> <em>বয়সে</em> <em>বিয়ে</em> <em>করে</em><em>।</em> তারা বিয়ের পূর্বে পুরুষের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সামর্থ্যকে বিয়ের প্রশ্নে অপ্রাসঙ্গিক গণ্য করে। দুর্ভাগ্যক্রমে এক আশংকাজনক হারে মুসলিম তরুণরা পাশ্চাত্য ধ্যান ধারণায় দীক্ষিত হয়ে পড়েছে; এর ফল এই হয়েছে যে, ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়াস এবং এভাবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর পর্যন্ত বিবাহ স্থগিত রাখা, তাদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ একটি দুঃখজনক করুণ পরিণতি। প্রথমতঃ ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোন মন্দ জিনিস নয়, কিন্তু এর পেছনে যে মূল্য কাজ করছে তা নিশ্চয়ই মন্দ হতে পারে। এই নীতিকে গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে একটি জড়বাদী বিশ্বদৃষ্টিকে অপরিহার্য আদর্শরূপে পূর্বাহ্নে স্বীকার করে নেওয়া এবং এর অনুসরণের অর্থ হচ্ছে সম্প্রসারিত পরিবারের স্থলে আনবিক পরিবারকে শ্রেষ্ঠতর মনে করা। এটিও প্রকারান্তরে অতিরঞ্জিত ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ ও মন্ময়তার পরিণতি। ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উচ্ছৃংখলতা এবং শৃংখলা আনয়নে অসাধ্যতার পূর্বশর্ত। দ্বিতীয়ত বিয়ে স্থগিত রাখা নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রলোভনের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। বিয়ে হচ্ছে সতীত্ব ও সৎগুণের ঢালস্বরূপ। তৃতীয়ত প্রশস্ত সম্প্রসারিত পরিবারে অল্পবয়সে বিয়ের ফলে দম্পতির জন্য কোন অসম্ভব দাবী দাওয়া জন্মায় না। নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই স্কুলে যোগদান বা কর্মক্ষেত্রে যাওয়া সম্ভব, কেননা তাদের অনুপস্থিতেও সবসময়ই পরিবার চালানো এবং ছেলে মেয়ে লালন দানের জন্য ঘরে থাকবে স্নেহময় আত্মীয় স্বজন। তাই ইসলাম সকল মুসলমানকেই বিয়ে করার এবং যৌবনের প্রথম দিকে বিয়ে করার ও সবসময়ই প্রশস্ত সম্প্রসারিত পরিবারে জীবন যাপনের নির্দেশ দেয়।</p>
<p><strong>ঙ</strong><strong>. </strong><strong>প্রশস্ত</strong> <strong>সম্প্রসারিত</strong> <strong>পরিবার</strong></p>
<p>আল্লাহ তায়ালা পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার প্রশস্ত সম্প্রসারিতরূপে। শরীয়াহ্ পরিবারকে আঁট সাঁট করে বেঁধেছে আইনের মাধ্যমে যাতে, আশ্রিতদের বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ভরণ পোষণ বাধ্যতামূলক- এবং যাদের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টন আবশ্যক<sup>১৭</sup>। সাধারণভাবে বলা যায় যে, যে কোন স্বজনই আশ্রিত, তার সম্পর্কটি যত দূরেরই হোক না কেন, যদি সে অভাবগ্রস্থ হয় এবং সংশ্লিষ্ট আত্মীয়টির চাইতে নিকটতর কোনো বয়স্ক সমর্থ পুরুষ আত্মীয় তার না থাকে। দাদা দাদী, নাতি-নাতনি, পিতৃব্য এবং তাদের সন্তান- সন্ততির অগ্রাধিকার রয়েছে। রক্ত সম্পর্কিত বা agnate স্বজনেরা জ্ঞাতি সম্পর্কিত বা cognate স্বজনের চাইতে অগ্রাধিকার পায়। কার্যত মুসলমান পরিবার কুড়িজন বা সমসংখ্যক ব্যক্তি নিয়ে গঠিত, যারা সকলে বাস করে একটি বহুকেন্দ্রিক প্রাঙ্গনে, যাদের একটি মাত্র রান্নাঘর এবং একটি মাত্র দেওয়াল থাকে, যেখানে মুরব্বীজনের চারপাশে সকল সদস্যরা জমায়েত হয় এবং মেহমানদেরকে অভ্যর্থনা জানানো হয়।</p>
<p><em>মুসলিম</em> <em>পরিবারের</em> <em>মধ্যে</em> <em>জেনারেশন</em> <em>গ্যাপ</em> <em>বলে</em> <em>কিছু</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>কারণ</em> <em>তারা</em> <em>সকলে</em> <em>একত্রে</em> <em>বাস</em> <em>করে</em><em>।</em> <em>এভাবে</em> <em>তরুণদের</em> <em>সমাজবদ্ধতা</em> <em>ও</em> <em>সাংস্কৃতিক</em> <em>অন্বয়</em> <em>সবসময়</em> <em>সম্পূর্ণ</em> <em>হয়</em><em>, </em><em>যাতে</em> <em>ঐতিহ্য</em> <em>ও</em> <em>সংস্কৃতির</em> <em>প্রবহমানতা</em> <em>নিশ্চিত</em> <em>হয়</em><em>, </em><em>সম্ভাব্য</em> <em>স্বল্পতম</em> <em>অপমিশ্রণের</em> <em>সাথে</em><em>।</em> এখানে অতীত অবিকৃতভাবে সম্পর্কিত থাকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে। সম্প্রসারিত পরিবারের আর একটি সুবিধা এই যে, এই পরিবার যখনই এর কোন সদস্যের প্রয়োজন হয তৎক্ষণাৎ তাকে সাহচর্য দিয়ে থাকে এবং বিদ্যমান মেজাজ অনুসারে সাধারণ পছন্দ ও নির্বাচনের অবকাশ থাকে প্রচুর। সবসময়ই কেউ কেউ না কেউ প্রস্তুত থাকে, সঙ্গে খেলাধুলা করার জন্য, হাসি মশকরা করার জন, আলোচনা করার জন্য, একসঙ্গে চিন্তা করার জন্য, একসঙ্গে ক্রন্দনের জন্য এবং আশা করার জন্য। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব শর্ত। একটি প্রশস্ত পরিবারে কখনো একটি শিশুর অভাব নেই। একটি বয়স্ক লোকের অভাব নেই, একটি মহিলার অভাব নেই। অন্য সকলের চেয়ে একজন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞের অভাব নেই।</p>
<p>একথা সত্য, সম্প্রসারিত পরিবার তার সাফল্যের উপর শৃংখলা, নিয়মানুবর্তিতা এবং পারস্পরিক ত্যাগ আরোপ করে। কোনো কোনো সময় তা ব্যক্তিগত গোপণীয়তাকে কমিয়ে দেয়। কিন্তু জীবন এবং এই পৃথিবী আমাদেরকে নিয়মানুবর্তিতা ও ত্যাগ ছাড়া আমাদের জীবন চালানোর অনুমতি দেয়না। ব্যক্তি মানুষের জন্য এ পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু নিশ্চয়ই নিজেকে নিয়মানুবর্তী করা এবং অন্যের জন্য, পরহিতার্থে কোরবানী করা ভাল কাজ। আমাদের জন্য সর্বোত্তম হচ্ছে গৃহে আমাদের যারা ভালবাসে এবং আমরা যাদের ভালবাসি, তাদের হাতে নিয়ম শৃংখলা শিখি, অপরিচিতদের হাতে নয়।</p>
<p><strong>চ</strong><strong>. </strong><strong>পেশাজীবি</strong> <strong>মহিলা</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>শ্রমিক</strong></p>
<p>অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জনের জন্য কোন না কোন পেশার মাধ্যমে এত বিপুল সংখ্যক মুসলমান মহিলা পাশ্চাত্যের অনুকরণে পেশার অনুসন্ধানে ব্যস্ত যে, এ সমস্যার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কি সে সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক।</p>
<p>বিপুল পরিমাণে সংখ্যাগুরু মুসলিম মহিলাদের ক্ষেত্রে অতি সামান্য সন্দেহের অবকাশ আছে, অথবা এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, তারা গৃহিনী এবং মাতা হিসাবে একটি সার্বক্ষণিক স্থায়ী পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। <em>উল্লেখ</em> <em>করা</em> <em>নিষ্প্রয়োজন</em> <em>যে</em> <em>এধরনের</em> <em>পেশার</em> <em>জন্য</em> <em>অনেক</em> <em>বেশী</em><em>: </em><em>প্রশিক্ষণের</em> <em>প্রয়োজন</em> <em>হয়</em><em>, </em><em>গৃহের</em> <em>বাইরের</em> <em>যে</em> <em>কোন</em> <em>পেশার</em> <em>চাইতে</em> <em>এই</em> <em>পেশাকে</em> <em>রান্না</em> <em>বান্না</em> <em>এবং</em> <em>গৃহস্থালীর</em> <em>টুকিটাকি</em> <em>কাজ</em> <em>বলে</em> <em>বর্ণনা</em> <em>করা</em> <em>একটি</em> <em>মহৎ</em> <em>পেশাকে</em> <em>বিকৃত</em> <em>করা</em> <em>মাত্র</em><em>।</em> এই পেশাতে বৃদ্ধ তরুণ নির্বিশেষে সকল মানুষের যত্ন নেয়া একটি স্বাভাবিক দায়িত্ব। বলা বাহুল্য পৃথিবীতে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ। এজন্য আবশ্যক পরিণত প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, শিল্প কৃশলতা, সৃজনশীলতা, সদাপ্রস্তত রসবোধ এবং অভিজ্ঞতা, যা ব্যক্তির সাধ্যায়ত্ব। অবশ্যই ব্যক্তির জন্য প্রশিক্ষণ হচ্ছে একটি সার্বক্ষণিক ব্যাপার, গৃহপরিচালনার নিয়মানুবর্তিতার ক্ষেত্রেই হোক, অথবা শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাস মনস্তত্ব এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই হোক।</p>
<p><em>পরিবার</em> <em>গঠন</em><em>, </em><em>সন্তান</em> <em>জন্মদান</em> <em>ও</em> <em>সন্তান</em> <em>লালন</em> <em>পালন</em> <em>একটি</em> <em>বিশ্বজনীন</em> <em>পেশা</em> <em>হলেও</em><em>, </em><em>এ</em> <em>সত্য</em> <em>অনস্বীকার্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>এই</em> <em>সব</em> <em>দায়িত্ব</em> <em>পালন</em> <em>করতে</em> <em>গিয়ে</em> <em>রমণীর</em> <em>সারাজীবনের</em> <em>কর্মশক্তি</em> <em>নিঃশেষ</em> <em>হয়ে</em> <em>যায়না</em><em>।</em> সম্প্রসারিত পরিবারের সদস্য হিসাবে তার নিজের দিক থেকেই হউক, অথবা তার স্বামীর দিক থেকে হউক, স্ত্রীলোক পায় তার সহকারী এবং সেই কারণে অধিক পরিমাণ অবকাশ। তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা দুই বা তিন যুগের বেশী স্থায়ী হতে পারেনা। তার জীবন হতে পারে আরো তিনযুগ দীর্ঘস্থায়ী। এটা কি যুক্তিসঙ্গত যে মুসলিম মহিলা এই মূল্যবান সময় ব্যয় করবে পারিবারিক খোশগল্প এবং পরচর্চায়, যখন ইচ্ছা করলে তারা উম্মাহকে সাহায্য করতে পারে, তাদের মেধা এবং ক্ষমতা দিয়ে? একইভাবে এও হতে পারে, এমন সব মহিলাও থাকতে পারে যাদের জীবনে বিবাহের সৌভাগ্য ঘটেনা বা যারা সন্তান ধারণ করতে পারেনা, এবং একটি সম্প্রসারিত পরিবারে জীবন যাপনও যাদের জন্য সম্ভব নয়। ইসলাম তাদের জীবন সম্পর্কে কি চিন্তা করে?</p>
<p>প্রত্যেক পুরুষের মতই প্রত্যেক রমণীকেও তার মেধা এবং সর্বোৎকৃষ্ট বৃত্তি অনুসারে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের দায়িত্ব পালন ও উম্মাহর কল্যাণ সাধন করতে হবে। আজকের দিনে এই নির্দেশ দ্বিগুণ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে, কেননা উম্মাহর অবক্ষয় হয়েছে এবং কার্যত উম্মাহ এখন সুপ্ত, ঘুমন্ত। কাউকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়না বা অব্যাহতি দেওয়া উচিত নয়। আমাদের বর্তমান অবস্থার দাবী এই যে, প্রত্যেক মহিলাকে কমপক্ষে তার জীবনের একটা অংশে হতে হবে পেশাজীবি মহিলা। এই সময়টি হতে পারে তার ছাত্রী জীবনকালে, সে যদি সম্প্রসারিত পরিবারে বাস করে, তাহলে তার মাতৃত্বের সময় অথবা তার মাতৃত্বের কাল অতিক্রান্ত হবার পর।</p>
<p>তার প্রথম কাজ হচ্ছে একজন ইসলামী কর্মী হিসাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ, ইসলামী জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি তার মন মানসকে জাগ্রত করা এবং তার দ্বারা তার মন মানসের পরিপুষ্টি, ইসলামিক ক্রিয়া কলাপের নিয়মানুবর্তিতা অর্জন করা এবং তার অনুশীলন। তদুপরি ইসলামী আন্দোলন তাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করবে তা বহনের জন্য নিজেকে প্রস্তত করা। অন্যান্য মুসলমানদেরকে জাগ্রত করা এবং শিক্ষাদানের জন্য, তাকে অর্জন করতে হবে কলা কৌশল ও দক্ষতা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মনিয়োগের জন্য তাদেরকে সংহত করা। এবং নগর ও গ্রামে সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য যে সব দক্ষতা প্রয়োজন নিজের মধ্যে সেগুলো বিকশিত করতে হবে। তার সামাজিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তাকে ইসলামী দায় দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের জন্য মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে এবং মুসলমানরা আল্লাহ এবং উম্মাহর প্রতি যে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য, শিক্ষা এবং মহৎ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাদেরকে সেই সব দায়িত্ব পালনে তৎপর করে তুলতে হবে। <strong>বাস্তবে</strong> <strong>ক্রিয়া</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কাণ্ডের</strong> <strong>প্রত্যেকটি</strong> <strong>ক্ষেত্রই</strong> <strong>নারীর</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>উন্মুক্ত</strong><strong>, </strong><strong>প্রত্যেকটি</strong> <strong>ক্ষেত্রেই</strong> <strong>তার</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>অ</strong><strong>ভি</strong><strong>সম্ভাবিত</strong><strong>।</strong> <strong>এমন</strong> <strong>সব</strong> <strong>পেশা</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>যেগুলো</strong> <strong>কেবল</strong> <strong>নারীদের</strong> <strong>দ্বারাই</strong> <strong>পরিচালিত</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>।</strong> <strong>তবে</strong> <strong>বর্তমান</strong> <strong>প্রজন্মে</strong> <strong>নারীদের</strong> <strong>ক্রিয়া</strong> <strong>কর্ম</strong> <strong>সংহত</strong> <strong>করার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>যে</strong> <strong>প্রয়াসই</strong> <strong>চালানো</strong> <strong>হউক</strong> <strong>না</strong> <strong>কেন</strong><strong>, </strong><strong>মুসলিম</strong> <strong>সমাজের</strong> <strong>তার</strong> <strong>চাইতে</strong> <strong>অনেক</strong> <strong>বেশী</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>রয়েছে</strong><strong>, </strong><strong>মুসলিম</strong> <strong>মহিলা</strong> <strong>কর্মীদের</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>টীকা</strong></p>
<p>১. দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখুন Norman W. Bell Ges Ezra F. Vogel. eds. The Family (Glencoe. Illinois: The Free Press 1960) অধ্যায়-৪।</p>
<p>২. William F. Kenkel. The Family in Perspective (New York: Meredith Corporation, 1973).</p>
<p>৩. তোমাদের এই উম্মাহ্ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমার দাসত্ব কর (২১: ৯২) তোমাদের মধ্যে হউক এমন এক উম্মাহ্ যা মানুষকে সৎ কাজের দিকে আহ্বান করে, সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কর্ম নিষেধ করে, এরাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>৪. তোমাদের এই উম্মাহ্ এক, ঐক্যবদ্ধ, অবিভাজ্য, আমি তোমাদের একমাত্র রব। আমাকে ভয় কর। তা সত্বেও মানুষ নিজেদেরকে দল উপদলে বিভক্ত করে এবং প্রত্যেকে নিজের জবস্থান নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। কিন্তু তারা তাদের বিভ্রান্তিতে ও কেবল অল্প সময়ই স্থায়ী হবে (২৩: ৫৪)। জাহিলিয়ার দিনগুলোর মত অবিশ্বাসীদের অন্তর উত্তেজনা ও বিক্ষোভে কম্পিত হয়, কিন্তু আল্লাহর নবী এবং বিশ্বাসীদের হৃদয় স্বীকৃতিতে ও আত্মপ্রত্যয়ে স্বস্তিভোগ করে। &#8220;কারণ তারা এর উপযুক্ত এবং এর জন্য নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী&#8230; আল্লাহ সবকিছু অবগত&#8221;। আল্লাহ তাদেরকে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা হচ্ছে পবিত্রতা ও সৎকর্মের দায়িত্ব (৪৮: ২৬)।</p>
<p>৫. ইহা আল্লাহর এক নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে, তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের মধ্যে আনন্দ পেতে পার এবং তিনি তোমাদের ও তাদের মধ্যে মহব্বত ও করুণা সৃষ্টি করেছেন। যারা চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য এটি নিশ্চয়ই একটি মহাসাক্ষ্য (৩০: ২১)।</p>
<p>৬. তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদেরই, যেন তোমরা পবিত্রভাবে তাদের সঙ্গে মিলিত হও, তাদের সঙ্গে যখন ইচ্ছা তোমরা মিলিত হও, কিন্তু তৎপূর্বে কিছু সৎকর্ম করে নাও; আল্লাহকে ভয় কর ও স্মরণ রাখ যে, তার সম্মুখে তোমাকে দাঁড়াতে হবে। হে নবী, বিশ্বাসীদের জন্য শুভ সংবাদ দাও (২: ২৩) এবং তারা যদি আপোষ মীমাংসা চায়, তাহলে তাদের স্বামীদের জন্য উত্তম হবে তাদেরকে আবার গ্রহণ করা। দয়া ও মমতার দিক দিয়ে রমনীদের একই অধিকার আছে পুরুষদের উপর, যেমন আছে পুরুষদের তাদের উপর (২: ২২৮)।</p>
<p>৭. তোমাদের স্ত্রীগণের সাথে ভাল ব্যবহার কর এবং তাদের প্রতি সদয় হও, কারণ তারা তোমাদের অংশীদার এবং ওয়াদাবদ্ধ সাহায্যকারিনী। স্মরণ রাখ যে, তোমরা তাদেরকে তোমাদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছো এবং কেবল আল্লাহর সম্মতি নিয়ে, আল্লাহর আমানত হিসেবে তোমরা তাদের ভোগ করেছো। (Haykal. The Life of Mohammad &#8220;Farewell Pilgrimage&#8221; p. 446)</p>
<p>৮. সাক্ষী হিসেবে দ্রষ্টব্য একমাত্র বহু সংখ্যক আয়াত যাতে &#8216;qurba&#8217; শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (২:৭৭, ৪:৭) ইত্যাদি ।</p>
<p>৯. পরিবার হচ্ছে একমাত্র এলাকা যেখানে কুরআন সাধারণ নীতিমালা ও চূড়ান্ত খুঁটিনাটি বিধি বিধানের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক গণ্য করেছে, যা আমরা দেখতে পাই বিবাহ, তালাক, ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত কুরআনের আইন কানুন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে (যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে)। কুরআন কেবল সাধারণ নীতিমালা দিয়েছে এবং অতি সামান্য খুঁটিনাটি বিধি-বিধান দিয়েছে, কিংবা মোটেই কোনো খুঁটিনাটি বিধান দেয়নি।</p>
<p>১০. পুরুষ বা নারী যে কেহ হউক, যে ঈমান আনয়ন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সৎ কাজ করে, তাকে দেওয়া হবে একটি মহৎ জীবনের মর্যাদা এবং তারা যে সব সৎকর্ম করেছে তার অনুপাতে। তাদেরকে উপকৃত করা হবে (১৬: ৯৭)।</p>
<p>১১. আল্লাহ কাউকে কাউকে যা দিয়েছেন এবং কাউকে কাউকে যা দেননি, তোমরা ঈর্ষাবশত তা কামনা করোনা। পুরুষ এবং নারী প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে যে কর্ম করেছে তার কর্মের দায়িত্ব তারই। আল্লাহর কাছে তার প্রাচুর্য থেকে প্রার্থনা কর, তিনি সবকিছু জানেন (৪: ৩২)।</p>
<p>১২. তাদের রব তাদেরকে এই উত্তর দিয়েছেন যে, তাদের কোন সৎকর্মই তিনি নষ্ট হতে দেবেন না। পুরুষই করুক কিংবা স্ত্রীলোকেই করুক, তারা একে অন্য থেকে সৃষ্ট (৩: ১৯৫)।</p>
<p>১৩. (হে রমনীগণ) প্রাক ইসলামী রমণীদের মত তোমরা নিজেদেরকে প্রকাশ করোনা (৩৩: ৩৩)। হে মোহাম্মদ, বিশ্বাসী পুরুষগণকে বল, তারা তাদের সততা রক্ষা করার জন্য যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত করে, এটি হচ্ছে তাদের জন্য শোভন পবিত্র পন্থা লক্ষ্য কর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। বিশ্বাসী মহিলাগণকেও বল, তাদের সতীত্ব রক্ষা করার জন্য, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত করে এবং তাদের অলংকার কিংবা সৌন্দর্যের, যা স্বভাবতই ব্যক্ত, তাছাড়া অন্য কিছু তারা যেন প্রদর্শন না করে (২৪: ৩০-৩১)।</p>
<p>১৪. প্রাগুক্ত।</p>
<p>১৫. রমণীগণ কেবলমাত্র তাদের স্বামী ও পিতামাতাগণ ছাড়া আর কাউকে তাদের সৌন্দর্য এবং অলংকার প্রদর্শন করবেনা (২৪: ৩১)।</p>
<p>১৬. ইহা তার একটি নির্দশন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন যেন তোমরা তাদের মধ্যে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন মহব্বত ও দয়ামায়া, যারা চিন্তাভাবনা করে, তাদের জন্য এগুলো হচ্ছে তাৎপর্যপূর্ণ ও নিদর্শন (৩০: ৩১)।</p>
<p>১৭. শরীয়াহর যে কোন কিতাব দেখুন (যেমন ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের খুঁটিনাটির জন্য আল যাজিরির আল ফিকহ আল মাযাহাব আল-আরবাসা।)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principle-of-family/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14865</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উম্মাহর মৌলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principles-of-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principles-of-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 16 Sep 2024 06:42:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14815</guid>

					<description><![CDATA[১. পরিভাষা ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা একটি একক অনন্য ব্যবস্থা; পাশ্চাত্য ভাষাগুলোতে পরিচিত কোন পরিভাষাই ইসলামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। ইংরেজী ভাষায় social order বা সমাজ ব্যবস্থা দ্বারা একটি মূল্য বা মৌলনীতি পদ্ধতি বুঝায়, যা সমাজ জীবনকে শাসন করে; মূল্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>পরিভাষা</strong></h4>
<p>ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা একটি একক অনন্য ব্যবস্থা; পাশ্চাত্য ভাষাগুলোতে পরিচিত কোন পরিভাষাই ইসলামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। ইংরেজী ভাষায় social order বা সমাজ ব্যবস্থা দ্বারা একটি মূল্য বা মৌলনীতি পদ্ধতি বুঝায়, যা সমাজ জীবনকে শাসন করে; মূল্য কিংবা নীতির যে কোন পদ্ধতির ক্ষেত্রেই এই অভিধা প্রযোজ্য। কারণ যা বিশৃংখলা বলে বর্ণিত হতে পারে তাও সামাজিক জীবনের একটি রূপ বা ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। <strong>তাই</strong> <strong>পুঁজিবাদী</strong><strong>, </strong><strong>গণসাম্যবাদী</strong><strong>, </strong><strong>গণতান্ত্রিক</strong><strong>, </strong><strong>ফ্যাসিষ্ট</strong> <strong>সমাজ</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>বলা</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>নির্ভুল</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>ইংরেজ</strong><strong>, </strong><strong>মার্কিন</strong><strong>, </strong><strong>ফরাসি</strong><strong>, </strong><strong>চীনা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ভারতীয়</strong> <strong>সমাজ</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>বলাও</strong> <strong>সঙ্গত</strong><strong>।</strong> যখন আমরা social শব্দটির প্রসঙ্গে আসি, যা society শব্দ থেকে নিম্পন্ন একটি বিশেষণ, তখন এর তাৎপর্যটি আরো সীমিত হয়ে পড়ে। society এই শব্দ বা পরিভাষাটি দ্বারা বুঝায় স্বতঃপ্রবৃত্ত কতগুলো মানুষের একটি দল, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্দিষ্ট কতিপয় লক্ষ্য অর্জন। জার্মানরা যাকে আরো সঠিকভাবে বলে সমাজ (Gesellschaft)। একে কমিউনিটি বা সম্প্রদায় অর্থে বুঝলে চলবেনা, যা কিছু-সংখ্যক মানুষের ইচ্ছা বহির্ভুত একটি দল, যারা ভাষা, জাত, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূগোলের দিক দিয়ে এক বা সদৃশ। জার্মানরা এদেরকে বলে Gesellschaft সম্প্রদায় বা সম্মিলিত সংস্থা। সোসাইটি এবং কমিউনিটি একই হতে পারে বা ভিন্নও হতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ফরাসী এবং ইংরেজদের ক্ষেত্রে এই দুয়ের অর্থ একই। কিন্তু জার্মান, শ্লাভ এবং চীনাদের ক্ষেত্রে তা এক বা অনুরূপ নয়। কমিউনিটি সদস্যত্ব স্বাভাবিক এবং অনিবার্য করে তোলে অভিবাসন ন্যাচারালাইজেসন এবং নিয়মিতভাবে সংস্কৃতির অন্তর্গতকরণের মাধ্যমে সদস্যত্ব অর্জিত হয়। বিপরীতপক্ষে, সোসাইটির সদস্যপদ তাৎক্ষণিক, কারণ এই সদস্যতা হচ্ছে একটি সিদ্ধান্তের ফল। এজন্যই প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সদস্যপদ গ্রুপের সকল সদস্য কর্তৃক সমভাবে ব্যবহৃত কোন নাম বা শ্রেণীর দ্বারা সীমিত হয়ে থাকে। এই ধরনের শ্রেণী বা নাম একটি সমবায় গৃহায়ণ সমিতির সদস্যদের আর্থিক স্বার্থ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক মূলের সমুদয় পরিসর পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে- যখন আমরা গ্রুপের অন্তর্গত কোন শ্রেণী বা গ্রুপকে বুঝাতে চাই<sup>১</sup>; রাজনৈতিক সত্ত্বা কদাচিৎ একটি সমাজ বলে গণ্য হয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পাওয়া গেলে যেমন- সুইজারল্যান্ড, যুগোশ্লোভিয়া, এবং সাবেক (USSR) এদের সকলেরই সূচনা সাম্প্রতিককালে এবং এরা বিশেষ উপাদানের ফল। প্রায় সকল রাজনৈতিক সত্ত্বাই কমিউনিটির সঙ্গে অভিন্ন। তাদের এই মিল সামগ্রিক না হলেও প্রায় সামগ্রিক। একারণে রাজনৈতিক অস্তিত্বের &#8216;জাতি&#8217; অভিধা যৌক্তিকতা লাভ করে। এ কারণে পাশ্চাত্যের রাজনীতি তত্ত্বে রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট চতুঃসীমার মধ্যে একটা অঞ্চল বলে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব, যে চতুর্সীমার মধ্যে একটা কমিউনিটি বাস করে, যার কর্মকান্ড এমন একটি সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক শাসিত হয় যে তার সিদ্ধান্ত বলবৎ করতে ক্ষমতা রাখে<sup>২</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামে কমিউনিটির অনুরূপ দুটি শব্দ হচ্ছে শা&#8217;স্ত এবং কওম। এদুটি পরিভাষার অর্থ ক্ষুন্ন না করে, অর্থাৎ অভিধায় নির্দেশিত জনগোষ্ঠীর চৈতন্যকে আঘাত না করে, এই পরিভাষা দুটোকে সোসাইটি বুঝাতে ব্যবহার করা যাবে না<sup>৩</sup>। আরব, তুর্কী এবং পার্সিয়ানরা প্রত্যেকে একটি শা&#8217;স্ত বা কওম-যদি আমরা এর দ্বারা এককে অন্য থেকে আলাদা কমিউনিটি বুঝাতে চাই, যদি ভাষা ও রীতিনীতি, ভূগোল এবং বংশ লতিকার দিক দিয়ে তাদের পার্থক্যের উপর জোর দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য হয়। <em>কিন্তু</em> <em>আলাদা</em> <em>বা</em> <em>পৃথক</em> <em>পৃথকভাবে</em> <em>এগুলো</em> <em>সোসাইটি</em> <em>নয়</em><em>, </em><em>কেননা</em> <em>এই</em> <em>শ্রেণীত্ব</em> <em>কেবল</em> <em>তাদের</em> <em>ক্ষেত্রেই</em> <em>তা</em> <em>প্রযোজ্য</em> <em>নয়</em><em>, </em><em>বরং</em> <em>একই</em> <em>সঙ্গে</em> <em>মালয়</em><em>, </em><em>ভারতীয়</em><em>, </em><em>হাউস</em><em>, </em><em>বান্টু</em> <em>এবং</em> <em>শ্লাভ</em> <em>সকলের</em> <em>ক্ষেত্রেই</em> <em>তা</em> <em>প্রযোজ্য</em><em>।</em> এই সকল সম্প্রদায় এবং আরো অনেকে, যারা ইসলামের পরিমন্ডলভুক্ত এবং এর সংস্কৃতি ও সভ্যতায় অংশীদার বলে দাবী করে তারা, ইসলামের এক এবং অভিন্ন উম্মাহ বা সোসাইটির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। উম্মাহ হচ্ছে একটি বিশ্বজনীন সোসাইটি বা সমাজ, যার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সম্ভাব্য ব্যাপকতর বৈচিত্রের জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়সমূহ<sup>৪</sup>। তবে ইসলামের প্রতি তার অঙ্গীকার, তাকে একটি বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থার বলয়ে একত্র করে। বিষয়টি এ কারণেই আরো জটিল হয়ে উঠে যে, প্রতিটি মুসলমান সম্প্রদায়ই ক্ষুদ্র আকারে একটি উম্মাহ। কেননা বিশ্ব উম্মাহ যতদিন না বিধিসম্মতভাবে এমন একটি সরকার বা সংস্থার রূপ গ্রহণ করছে, যা ইসলামী আইনকে বলবৎ করতে পারে, বিশ্ব উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, কার্যকরভাবে বা তার পক্ষে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে, ততদিন বিশ্ব উম্মাহর পক্ষে কথা বলা এবং কাজ করার জন্য প্রতিটি উম্মাহই আবশ্যকভাবে এবং আইনত দায়ী। এর কারণ, এই বাস্তবতাকে ইসলামই সংস্কৃতি ও সভ্যতার, সামাজিক পার্থক্য ও শ্রেণীকরণের, সকল ব্যক্তিগত ও প্রায় সকল সামাজিক আন্তঃসামাজিক কর্মকান্ডে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যমানগুলো সরবরাহ করে। <strong>এ</strong> <strong>কারণে</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>ভিত্তিতে</strong> <strong>এ</strong> <strong>সব</strong> <strong>চিহ্নিতকরণের</strong> <strong>যৌক্তিকতা</strong> <strong>অনেক</strong> <strong>বেশী</strong><strong>, </strong><strong>কেননা</strong> <strong>কমিউনিটি</strong> <strong>বা</strong> <strong>সম্প্রদায়ের</strong> <strong>ভিত্তিতে</strong> <strong>নয়</strong><strong>, </strong><strong>বরং</strong> <strong>বিশ্ব</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>ভ্রাতৃত্বের</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>হিসেবেই</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>এই</strong> <strong>পরিচয়</strong><strong>।</strong> তাদের নিজ নিজ কমিউনিটি যে সব উপাদানের কারণে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে সেগুলো অস্বীকৃত হয় না। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য যার ব্যবস্থা করে সেগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত গুরুত্বহীন হওয়ায়, সেগুলোকে স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং তাদের যথাযথ স্থানে সেগুলো স্থাপন করা হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><em>উম্মাহ</em> <em>শব্দটি</em> <em>অনুবাদ</em> <em>করা</em> <em>যায়না</em><em>; </em><em>এটিকে</em> <em>এর</em> <em>মূল</em> <em>ইসলামী</em> <em>আরবীর</em> <em>রূপেই</em> <em>অবশ্য</em> <em>গ্রহণ</em> <em>করতে</em> <em>হবে</em><em>।</em> <em>এটি</em><em> &#8216;</em><em>জনগোষ্ঠী</em><em>&#8216; </em><em>বা</em><em> &#8216;</em><em>জাতি</em><em>&#8216; </em><em>বা</em><em> &#8216;</em><em>রাষ্ট্রের</em><em>&#8216; </em><em>সমার্থক</em> <em>নয়</em><em>।</em> এই শব্দ ও পরিভাষাগুলো সব সময়ই নিরূপিত হয় race, ভূগোল জাতি ও ইতিহাস, অথবা এগুলোর কোন সংমিশ্রণ দ্বারা। অন্যদিকে উম্মাহ হচ্ছে দেশ বা অঞ্চল অতিক্রমী, যা মোটেই ভৌগোলিক বিবেচনার দ্বারা নির্ধারিত নয়। এর এলাকা কেবল সমগ্র পৃথিবী নয় বরং গোটা সৃষ্টি। উম্মাহ কোন নরগোষ্ঠীর দ্বারা সীমিত নয়। উম্মাহ, race বা নরগোষ্ঠীকে অতিক্রম করে যায় এবং সমগ্র মানবজাতিকে এর বাস্তব অথবা সম্ভাব্য সদস্য বলে গণ্য করে। উম্মাহ রাষ্ট্রও নয়, কারণ তা সকল রাষ্ট্রকে অতিক্রম করে বিশ্বরাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহণ করে, যার মধ্যে স্থান পেতে পারে অনেকগুলো &#8216;রাষ্ট্র&#8217;।</p></blockquote>
<p>একইভাবে উম্মাহর উপাদানগুলো নিয়েই গঠিত হয় উম্মাহ- যদিও সেগুলো কোন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের আওতায় নাও পড়ে, এমনকি ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তও না হয়। <em>উম্মাহ</em> <em>এক</em> <em>ধরনের</em> <em>জাতিসংঘ</em><em>, </em><em>যার</em> <em>থাকবে</em> <em>একটি</em> <em>দৃঢ়</em> <em>এবং</em> <em>সামগ্রিক</em> <em>স্বয়ংসম্পূর্ণ</em> <em>আদর্শ</em><em>, </em><em>একটি</em> <em>বিশ্ব</em> <em>সরকার</em><em>, </em><em>একটি</em> <em>বিশ্ব</em> <em>সামরিক</em> <em>বাহিনী</em><em>, </em><em>তার</em> <em>সিদ্ধান্ত</em> <em>সমূহ</em> <em>বলবৎ</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>।</em> <em>উম্মাহ</em> <em>হচ্ছে</em> <em>ইসলামী</em> <em>সমাজ</em> <em>ব্যবস্থা</em> <em>এবং</em> <em>যে</em><em>&#8211;</em><em>আন্দোলন</em> <em>এই</em> <em>সমাজ</em> <em>ব্যবস্থাকে</em> <em>অনুসরণ</em> <em>করে</em> <em>বা</em> <em>এর</em> <em>লক্ষ্য</em> <em>বাস্তবায়নের</em> <em>চেষ্টা</em> <em>করে</em><em>, </em><em>তা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>উম্মাহতন্ত্র<sup>৫</sup></em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>উম্মাহর</strong> <strong>প্রকৃতি</strong></h4>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>নৃতত্ত্বকেন্দ্রীয়তার</strong> <strong>বিরুদ্ধে</strong></p>
<p>ইসলামের সমাজব্যবস্থা বিশ্বজনীন, গোটা মানবজাতি এর অন্তর্গত, কেউই এর বাইরে নয়। মানুষ মানুষ বলেই এবং তার জন্মের জন্যই প্রত্যেক ব্যক্তি হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত বা সম্ভাব্য সদস্য, তাকে রিক্রুট করার দায়িত্ব হচ্ছে বাকি সকল সদস্যের<sup>৬</sup>। পরিবার, গোষ্ঠী এবং জাতিতে মানুষের স্বাভাবিক বিভাগকে, ইসলাম আল্লাহর সৃষ্টি এবং আল্লাহর নির্দেশিত ব্যবস্থা বলে স্বীকার করে<sup>৭</sup>। তবে এই ধরনের গ্রুপকে মানুষের চূড়ান্ত রূপ বলে ইসলাম স্বীকার করেনা, যে-রূপকে ভাল এবং মন্দের একটি চূড়ান্ত মানদণ্ড গণ্য করা হয়ে থাকে। ইসলামে পরিবারের কানুনী ধারণায় সকল আত্মীয়-স্বজনই অন্তর্ভূক্ত, যারা যতো দূরেরই হোক না কেন, একে অন্যের সঙ্গে কোন না কোনভাবে বংশ সূত্রে সম্পর্কিত। কেবল আইন নয়, ইসলাম তাদের পারস্পরিক উত্তরাধিকারগত সম্পর্কও নিয়ন্ত্রণ করে, এবং আইনের সমর্থন দান করে। এ যেমন সত্য, তেমনি ইসলাম গোষ্ঠী এবং জাতির বৃহত্তর গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত করে একে অপরের পরিপূরক ও সাহায্যকারী শক্তি হিসেবে সকলের কল্যাণে কাজ করার জন্য<sup>৮</sup>। ব্যক্তিবর্গ অথবা গ্রুপ হোক সকল মানুষের উপর স্থান হচ্ছে আইনের। নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা ও বৈচিত্র হচ্ছে একটি বাস্তব বিষয়, ইহা কিছুটা অতিশয় বাঞ্ছিত বিষয় বটে, আর এটুকু বাদ দিলে ইসলাম একে একটি বাস্তব বিষয় বলেই মনে করে, যার স্থান আইনের নির্দেশের এখতিয়ারে। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যখন নৃতত্ত্ব সর্বস্ব হয়ে উঠে, ইসলাম তাকে কুফর বা ধর্মত্যাগ বলে নিন্দা করে। কারণ এতে করে আইনের এবং ভাল মন্দের ভিন্নতর একটি উৎস স্থাপিত হয়, যেমন খোদ নৃতাত্ত্বিকতা; আইনতত্ত্বের দিক দিয়ে নৃতাত্ত্বিক বিবেচনা মোবাহ (অনুমোদনযোগ্য) এর আওতার মধ্যে পড়ে এবং একদিকে তা হারাম (নিষিদ্ধ) মাকরূহ বলে গণ্য, অন্য দিকে তা ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক) এবং মানদুব (সুপারিশকৃত, অনুমোদিত)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলাম নৃতত্ত্বের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নয়, যা অতোদুর অগ্রসর হতে পারে যে, এ নিজ খলিফা নির্বাচিত বা যা তার নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। আল-মাওয়ার্দীর সময় থেকে এই অবস্থান বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে<sup>৯</sup>। অনুকরণ সম্পূর্ণ শরীয়াহ সম্মত হয়, যতক্ষণ তা এইরূপ অনুসরণ একটি নৃতাত্ত্বিক সার্বভৌম সত্ত্বার উপরই কেবল নির্ভর করে, সমগ্র উম্মাহর সঙ্গে একমত হয়ে শান্তি ও যুদ্ধের দায়িত্ব পালনের কর্তব্য এবং এভাবেই তার কর্মকান্ডকে পরিচালিত করার দায়িত্ব- যাতে করে অন্যের মন্দ নিবারণ করা যেতে পারে এবং তাদের কল্যাণ সাধন সম্ভব হয়। এই পন্থাগুলো ছাড়া ইসলাম কোন বৈশেষিকতাকে বরদাশত করেনা এবং এর বিরুদ্ধে যেখানে এবং যখনই বৈশেষিকতা মাথাচড়া দিয়ে উঠে, সকল মুসলমানের উপর সকল শক্তি নিয়ে জেহাদ করার ধর্মীয় দায়িত্ব অর্পণ করে<sup>১০</sup>। ইসলামী আইনের উৎস যেহেতু ঐশীসম্ভূত অর্থাৎ আল্লাহই যেহেতু এই আইনের উৎস, তাই এই আইন সকলের জন্য সমান, ঠিক যেমন আল্লাহ একক, তিনি সকল সৃষ্টির এবং নিশ্চয়ই সকল মানুষের আল্লাহ। তাই তার আইন এক এবং অভিন্ন। কারও প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব নেই, তার আইনে কোন ব্যতিক্রম নেই। ইসলাম নৃতত্ত্বকেন্দ্রীয়কতাকে বিচ্যুতি গণ্য করে। কারণ পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে আল্লাহর অসীম সত্ত্বার উপর আক্রমণ। আল্লাহ যদি পরম সত্য চূড়ান্ত বিচারক হন, (অর্থাৎ চূড়ান্ত নীতি, মানদণ্ড ও উৎস হন) তাহলে সকল সৃষ্টির মোকাবিলায় তার অবস্থান এক এবং অভিন্ন হবে। কোন নৃতাত্ত্বিক গ্রুপ বা গোষ্ঠীকে তার প্রিয় বলে গণ্য করা, অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিন্ন গণ্য করা তার আইনের ক্ষেত্রে, তার বিশ্বব্যবস্থার ক্ষেত্রে, তার পুরস্কার ও শাস্তি দানের পদ্ধতির বেলায়, কার্যতঃ তার পরমতা বা লোকোত্তরতাকে ক্ষুন্ন করা। পরম সত্য একাধিক এ দাবী স্বতঃবিরোধী এমনি দাবী যে একটি ক্ষুদ্র মনেরও তা বিবেচনার অযোগ্য। একই কথা খাটে নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদের প্রত্যেকটি বিভিন্নতার ক্ষেত্রে, তা মানবিকই হউক, যেমন eudaemonism (এরিষ্টটলের একটি মতবাদ, সুখ হচ্ছে যুক্তিশাসিত সক্রিয় জীবনের ফল) কিংবা সংস্কৃতিকই হউক, যেমন হিতবাদ, রাজনৈতিক উদারনৈতিকতাবাদের এংলো-স্যাকশন ঐতিহ্য, এবং জাতীয়তাবাদ অথবা<sup>১১</sup> প্রোটাগরিও মতবাদ, যেমন সুখবাদ, ত্যের নতুন সনাতন ধর্মই হোক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>বিশ্বজনীনতা</strong></p>
<p>প্রবণতা বা চরিত্রের দিক দিয়ে ইসলামের সমাজব্যবস্থা বিশ্বজনীন<sup>১২</sup>, যদিও বর্তমানে তা কোন না কোন জাতি থেকে, কয়েকটি জাতির একটা গ্রুপ থেকে বা কতগুলো ব্যক্তির একটি দল থেকে এই প্রবণতা নিঃসৃত হয়ে থাকে, তবুও এটি এমন একটি চরিত্র বা প্রবণতা যা গোটা মানবজাতিকে ধারণ করতে চায়। <strong>তাই</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>মৌলনীতির</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>গেলে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>আরব</strong><strong>, </strong><strong>তুর্কী</strong><strong>, </strong><strong>পার্সিয়ান</strong><strong>, </strong><strong>পাকিস্তানী</strong> <strong>অথবা</strong> <strong>মালয়</strong> <strong>সমাজব্যবস্থা</strong> <strong>থাকতে</strong> <strong>পারেনা</strong><strong>, </strong><strong>কেবল</strong> <strong>একটি</strong> <strong>মাত্র</strong> <strong>সমাজব্যবস্থা</strong> <strong>থাকবে</strong><strong>&#8211; </strong><strong>তা</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>সমাজব্যবস্থা</strong><strong>।</strong> অবশ্য যে কোন একটি দেশ বা গ্রুপের মধ্যে ইসলামী সমাজব্যবস্থার সূচনা হতে পারে। কিন্তু তা উর্ধারোহণ করে অনৈসলামিক হয়ে পড়ে যদিনা তা সমগ্র মানব জাতিকে তার পরিমন্ডলে আনয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যায়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের আদর্শ হচ্ছে ইসলামের আদর্শ, যার অভিব্যক্তি ঘটেছে বিশ্ব উম্মাহে। ইহা সময়ের সাথে সংগতিবিহীন একটি মধ্যযুগীয় নিরংকুশ চরম আদর্শ নয়। পশ্চিমা জগতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আদর্শ দেড় হাজার বছর বলবৎ ছিল রোমানদের &#8216;ইমপেরিয়াম মুন্ডি&#8217; (বিশ্ব সরকার) থেকে রিফর্মেশন পর্যন্ত। ফরাসী বিপ্লবের এনলাইটেনমেন্টের দৃষ্টিতে আবার এর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং তার পরে আবার চেষ্টা করা হয় গণতন্ত্র এবং কমিউনিজমের বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। এই সব ঘটনার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এর আদর্শের শত্রুদের বৈশেষিক জাতীয়তাবাদী ও নৃতাত্ত্বিক নাশকতামূলক কার্যের দ্বারা আদর্শাটি বিকৃত, লংঘিত, ও নিহত হয়েছে এবং তাকে সমাধিস্থ করে রাখা হয়েছে। এই সব আন্দোলনের কোনটিই বিশ্বজনীন আদর্শের প্রতি শত্রুতা ভাবাপন্ন নয়। অথবা আদর্শ হিসেবে এগুলো যে প্রকৃতপক্ষে আদর্শের বিরোধী তেমনভাবেও এগুলোকে বর্ণনা করা যায়না। সংস্কার আন্দোলনের সময় যে সব এথনিক শক্তি, তাদের রাজা রাজড়াদের চারপাশে জনগণকে সংঘবদ্ধ করেছিল, তারা রোমান চার্চ কর্তৃক আদর্শ বিকৃতির বিরোধী ছিল, এবং জাতীয়তাবাদী যে সব শক্তি ফরাসী বিপ্লবে যুক্তি কর্তৃক আদর্শ বিকৃতির মোকাবেলা করেছিল, তারা ছিল ইস্পেরিয়াল ফ্রান্সের পচন দূষণের বিরোধী। একইভাবে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আদর্শের বিপর্যয় ঘটে ইহুদীবাদ ব্যর্থ ও নব্য উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও জোট চালের কারণে। অন্য কথায়, আদর্শটি ব্যর্থ হয়, আদর্শের প্রতি সত্যিকার আনুগত্যের অভাবে, এই আদর্শের অনুসারীদের স্নায়ুতন্ত্র অচল হয়ে যাবার কারণে। আদর্শের প্রতি পাশ্চাত্য জনগণের বিশ্বাস অবশ্য অব্যাহতই থাকে। কিন্তু সমসাময়িক কালের সংশয়বাদের হস্তে চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটেছে এই আদর্শের, কেননা এই সংশয়বাদে কোন কিছুই যে পবিত্র নয়, শুধু তাই নয়, কোন কিছুরই কোন সঠিক বা সুনির্দিষ্ট মানও নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>সমগ্রতাতত্ত্ব</strong></p>
<p>ইসলামী সমাজব্যবস্থা একটা সামষ্টিক সমাজব্যবস্থা এই অর্থে যে, মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রত্যেকটি যুগের জন্যই ইসলাম প্রাসঙ্গিক। এই সমাজব্যবস্থার বুনিয়াদ হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায়। এই অভিপ্রায় প্রত্যেকটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেই অপরিহার্যভাবে প্রাসঙ্গিক, কেননা আল্লাহ প্রতিটি সৃষ্টিকে দিয়েছেন তার গঠন, একটি কাঠামো, একটি বিশেষ কর্ম<sup>১৩</sup>। মানুষ তাদের দৈহিক, বক্তিগত সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতির দিক দিয়ে অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিধানের অধিকারী, যা পালন করা তাদের দায়িত্ব। তাদের কোন কাজই আল্লাহর অভিপ্রায়কে এড়িয়ে যেতে পারেনা, তারা তাদের চেষ্টা সাধনের কোন ক্ষেত্রেই নিজেদের জন্য এমন কোন লক্ষ্য বা প্রকল্প স্থির করতে পারে না, যা শরীয়তের ওয়াজিব ও হারাম ক্যাটাগরির আওতায় পড়েনা। অধিকন্তু, মোবাহ (অনুমোদনযোগ্য) ক্ষেত্রটি, যা ইসলামের বাঞ্চনীয় বিষয় দ্বারা যথাসম্ভব অধিকৃত, তা বিকশিত মানসিকতা এবং মার্জিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। <strong>সুস্পষ্ট</strong> <strong>বিধান</strong> <strong>ছাড়া</strong><strong> (</strong><strong>নিয়ম</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>অনুমতিযোগ্যতা</strong><strong>), </strong><strong>কোন</strong> <strong>কিছু</strong> <strong>নিষিদ্ধ</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারেনা<sup>১৪</sup></strong>। আইনের এই বিধান হচ্ছে নিষিদ্ধ বিষয়ের সীমাকে অন্যায় এবং অবৈধভাবে সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি নিবৃত্তিমূলক আইন- তবে জ্ঞাত তথ্যাদি বিচারের মাধ্যমে- এসবের অজ্ঞাত কোন কিছুর মূল্য বিচারের বিরুদ্ধে নয়। ইসলামের আইনসমূহের ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত, প্রবর্তনা, সম্প্রসারণ এবং অজ্ঞাত তথ্যের অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিদ্যমান ও অস্তিত্বশীল সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রে এসবের প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস, যেমন মূল্যবান তেমনি আবশ্যক। অন্যথায় চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীয়ত আল্লাহর অভিপ্রায়ের যে সামগ্রিক ব্যাপকতার উপর দাঁড়িয়ে আছে, তা সংশয়ের বিষয় হয়ে উঠবে। এই সত্যের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে সেই সমাজব্যবস্থাই হচ্ছে সর্বোত্তম সমাজব্যবস্থা, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য সমস্ত কিছুকে সুবিন্যস্ত করে, সম্ভাব্য কম সংখ্যক বিষয়কে নয়; এবং সেটি হচ্ছে উত্তম গভর্নমেন্ট, যা সবচেয়ে বেশী শাসন করে, সবচেয়ে কম নয়। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী সমাজব্যবস্থা কেবল একটি ক্লাব এবং শিক্ষিত সমাজ, একটি ব্যবসা বাণিজ্যের চেম্বার, একটি ট্রেড ইউনিয়ন, একটি ভোক্তা সমবায় সমিতি বা পাশ্চাত্য অর্থে একটি রাজনৈতিক দল নয়। এ সমস্তই ইসলামী সমাজব্যবস্থার অন্তর্গত এবং আরো অধিক এর এখতিয়াভুক্ত। যেমন, হাসান আল বান্না এই যুক্তিতে বলতেন যে, সমস্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর অভিপ্রায়ের প্রাসঙ্গিকতার কারণেই ইসলামী সমাজব্যবস্থার এই ব্যাপকতা<sup>১৫</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামী সমাজব্যবস্থার সমগ্রত্ব কেবলমাত্র সকল দেশ ও কালের মানুষের বর্তমান কমকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এ সব কর্মকান্ডের কর্তা যে সকল মানুষ এবং যাদেরকে ইসলাম এর অপরিহার্য সদস্য বলে গণ্য করে তাদের সকলেই এ সমাজব্যবস্থার শৃংখলার অন্তর্গত। যেখানে ইসলাম সকল মুসলমানকে তার সকল প্রোগ্রাম ও প্রকল্পের বাধ্যতামূলক সদস্য বলে দাবী করে, সেখানে এ দাবীও করে যে অমুসলমানরাও হচ্ছে এর সম্ভাব্য সদস্য, যাদেরকে ইসলামী সমাজের সদস্য হবার জন্য দাওয়াত জানাতে হবে। তাই ইসলাম সমাজব্যবস্থার কোন শেষ সীমা নেই, কেননা এ পৃথিবীতে জীবন এবং কর্মকাণ্ড হচ্ছে অন্তহীন। কাজেই দায়িত্ব এই যে, যা কিছু বিদ্যমান বা চলমান তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে-উদ্দেশ্য: অস্তিত্বশীল বা গতিশীল প্রত্যেকটি সত্ত্বা। নারী পুরুষ নির্বিশেষে, বা তাদের প্রত্যেককে আল্লাহর অভিপ্রায়ের অধিকতর এবং উৎকৃষ্টতর পূর্ণতা পালনকারী করে তোলা<sup>১৬</sup>। ফালাহ হচ্ছে এ দুনিয়াকে আল্লাহর একটি জান্নাতে প্রকৃত রূপান্তর, যা হচ্ছে কুরআনের &#8216;ইস্তিমার আল-আরদ&#8217;, (এই ধারণাটির প্রকৃত মানে-পৃথিবীর পুনর্গঠন) এবং মানবজাতিকে বীর, প্রতিভা ও আউলিয়াতে উন্নীতকরণ, যাতে করে আল্লাহর ঈস্পিত নক্সা বা নমুনা সার্থক হয়। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তা করতে গেলে তা ফালাহ হবেনা। ফালাহর দাবী এই যে, এই রূপান্তর সাধনের কর্মকান্ডগুলো আল্লাহর আইনকে পালন করে, কেননা এই কর্মকান্ডগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের মধ্যে ফালাহ্ রূপায়ন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঘ</strong><strong>. </strong><strong>স্বাধীনতা</strong></p>
<p>ইসলামী সমাজব্যবস্থা একটি স্বাধীন সমাজব্যবস্থা। যদি শক্তি প্রয়োগে এই সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা জনগণের উপর জবরদস্তির মাধ্যমে তার কর্মসূচি কার্যকর করতে চায় তাহলে সেই সমাজব্যবস্থা তার ইসলামী কক্ষ থেকে বিচ্যুত হবে। রেজিমেন্টেশন তো আবশ্যক হতেই পারে; কিন্তু তা বৈধ হতে পারে যদি তা কেবল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। এর পূর্বে, ইসলামে রেজিমেন্টেশন প্রবর্তনের ক্ষেত্রেই সূরার (পরামর্শ) সিদ্ধান্ত আবশ্যক এবং রেজিমেন্টশন যে কোন অবস্থায় কেবল সাময়িক এবং বিশেষ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। যখন রেজিমেন্টেশনই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় এবং নীতিগতভাবে জোর জবরদস্তির উপর নির্ভর করা হয়, তার ফল ঐশী নমুনার সফল বাস্তবায়নও হতে পারে, কিন্তু এ এমন এক ধরনের বাস্তবায়ন যার মূল্য হচ্ছে উপযোগীতামূলক, নীতিসঙ্গত নয়; কারণ এ বাস্তবায়ন নৈতিকতাসম্পন্ন হতে হলে এই প্রয়াসে যারা অংশগ্রহণ করবে তাদেরকে তা করতে হবে স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে, মূল্যের প্রতি বা সংশ্লিষ্ট ঐশী নমুনার প্রতি ব্যক্তিগত অঙ্গীকার হেতু একটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত হিসেবে<sup>১৭</sup>। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, উপযোগীতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ উভয়েরই বাস্তবায়ন ইসলামের লক্ষ্য। কিন্তু নৈতিকতাকে বাদ দিয়ে উপযোগীতাকে ইসলাম সহ্য করেনা এবং এর প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন করেনা। ইসলামের দৃষ্টিতে দুটি একই সঙ্গে রূপায়িত হলেই তা হয় যথার্থ বাস্তবায়ন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কুরআনের এই শিক্ষা দিয়েছেন সুষ্পষ্ট ভাষায়। মানুষকে সৃষ্টি করা হচ্ছে- এই ইঙ্গিত পেয়ে ফেরেস্তারা, যারা কোন অন্যায় করতে পারেনা, কেবল আল্লাহর আদেশ পালন করে, তারা আপত্তি করে বসল, &#8216;তাহলে কি আপনি (হে আল্লাহ) এমন কোন প্রাণীকে সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন যে দুর্নীতি, ঝগড়া ফ্যাসাদ ও খুনাখুনি করবে, অথচ আমরা আপনার স্তুতি ও প্রশংসায় নিয়্যত আছি? আল্লাহ জবাবে বললেন, আমার একটি উদ্দেশ্য আছে যা তোমরা জাননা<sup>১৮</sup>। মানুষেরা যদি ফেরেশতাদের মত মন্দ কর্মে অক্ষম হত, তাদের কর্মকান্ড অবশ্যি আল্লাহর প্রত্যেকটি ইচ্ছা বা নির্দেশকে পালন করতে পারতো- কিন্তু তারা নৈতিক জীব হতোনা। নৈতিকতা হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায়ের শীর্ষবিন্দু। তাহলে নিশ্চয়ই মানুষের কাছ থেকে দাবী করা হয় তার সর্বোত্তম অংশ, কারণ যে অভিপ্রায়ের মধ্যে নৈতিকতার নির্দেশনা নেই তা ঐশী অভিপ্রায় হতে পারেনা, তা স্ববিরোধী হয়ে পড়বে। কুরআনের অন্য একটি আয়াতে একই সত্যের উপর প্রথমোক্ত আয়াতটি থেকে আরো নাটকীয়ভাবে এবং একইরূপ প্রাঞ্জল ভাষায় জোর দেওয়া হয়েছে- &#8220;আমরা আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং পর্বতসমূহের উপর আমাদের আমানত অর্পণ করেছিলাম&#8221; আল্লাহ বললেন। &#8220;কিন্তু তারা ভয়ে তাতে সম্মত হলনা, মানুষ তা বহন করল<sup>১৯</sup>।&#8221; আসমানে এবং জমিনে আল্লাহর অভিপ্রায় প্রাকৃতিক আইনের অনিবার্যতায় কার্যকর হচ্ছে, আকাশ ও পৃথিবীর কোন সৃষ্টিই তা পালন করতে বা লংঘন করতে পারেনা স্বাধীনভাবে। তাই তাদের এই রূপায়ণ নৈতিকতামন্ডিত নয়। কেবলমাত্র মানুষই নৈতিক সত্ত্বা, কারণ আল্লাহর নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সে-ই স্বাধীন, এজন্য কেবল মানুষই আল্লাহর &#8216;আমানত&#8217; বহন করে<sup>২০</sup>। মূল্যের বাস্তবায়নের জন্য মানুষকে জবরদস্তিভাবে এই রূপায়ণে বাধ্য করা না হলে, এর মানে অবশ্য এই হবে যে, মানুষ যাতে স্বেচ্ছায় এতে অংশগ্রহণ করতে পারে, তার জন্য তাদেরকে দাওয়াত করতে হবে। এর অর্থ এই যে, মূল্য বাস্তবায়ন নৈতিকতামন্ডিত হতে হলে, তার তাৎপর্য এ ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা যে, মানুষকে শিখাতে হবে এবং তার মধ্যে এ প্রত্যয় সৃষ্টি করতে হবে যে, মূল্যগুলো হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধভাবে মূল্যবান এবং ঐশী নির্দেশনাগুলো হচ্ছে বাঞ্ছিত নমুনা। এতে করে, ইসলামী সমাজব্যবস্থা বিশাল পরিসরে একটি সেমিনার বা পাঠশালা হয়ে উঠে, যেখানে গভর্নমেন্ট এবং নেতৃত্বের কাজ হচ্ছে শিক্ষাদান, শিক্ষিত করে তোলা, বিশ্বাস জন্মানো, অভীষ্ট স্থিরকরণ, জ্ঞানদান ও পরিচালনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঙ</strong><strong>. </strong><strong>মিশন</strong></p>
<p>উম্মাহ প্রকৃতির কোন আকস্মিক উদ্ভব নয়, এর অস্তিত্ব নিজের জন্য নয়, এবং সদস্যদের জন্য তো নয়ই, কেবল মাত্র আল্লাহর অভিপ্রায়ের একটি মাধ্যম হিসেবেই এর অস্তিত্ব, যা উম্মাহর মাধ্যমে দেশ ও কালের মধ্যে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে। এ হচ্ছে আল্লাহর চূড়ান্ত ওহীর ছক, তার অভিপ্রায়ের একটি মাধ্যম। এ হচ্ছে সেই বিন্দু যেখানে জগতের সঙ্গে ঐশী সত্তার মিলন ঘটে। এখানে জগতের সূচনা করা হয়েছে- ঐশী লক্ষ্য রূপায়নের পথে তার অন্তহীন অগ্রযাত্রায়। আল কুরআন যেমন স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, উম্মাহর অস্তিত্ব এই জন্যই যাতে আল্লাহর কালাম হতে পারে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ<sup>২১</sup>।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>টীকাঃ</strong></p>
<p>১. আধুনিক কালে পাশ্চাত্য জগতে এর মোকাবেলার জন্য একটি সাধারণ প্রয়োজন ও সিদ্ধান্ত বিভিন্ন সংস্থার ব্যবস্থা করেছে যেমন বাণিজ্যিক কোম্পানিসমূহ, কর্পোরেশনস এবং সকল রকমের সমবায় সমিতিস্বরূপ আর্থিক সংস্থাসমূহ (বাকিতে পণ্য বিক্রয়, ব্যয় সংকোচ, ভোক্তাগণ, গৃহায়ণ, বেচাকেনা ইত্যাদি। কিন্তু কখনো কোন রাষ্ট্রের জন্য নয়, এটি সম্পূর্ণভাবেই এখনিক বৈশিষ্ট্যেরউপর নির্ভর করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণ এবং সে কারণে চিরন্তন, দ্রঃ Robert K. Merton, Social Theory and Social Structure (Glencoe Illinois. The Free Press 1962) পৃঃ ৩৯৩।</p>
<p>২. পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে ইহাই রাষ্ট্রের চিরাচরিত এবং ক্লাসিক্যাল সংজ্ঞা। ইহা ইসলামী রাষ্ট্রের বিপরীত। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র অঞ্চল এবং এথনিক সংস্কৃতিক ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চৌহদ্দির দ্বারা সীমিত নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ: &#8216;t George H. Sabine. A History of Political Theory. (New York: Henry Holt and Co 1947) পৃষ্ঠা 746-65, Ges James B. Hastings, Encyclopedia of The Social Sciences, s.v. &#8220;The State&#8221;.</p>
<p>৩. Al Zubaydi, Taj al Arus. vol. 9 ৪. ইহাই তোমার উম্মাহ, এক, ঐক্যবদ্ধ এবং পরস্পর অন্তর্নিহিত এবং আমি তোমাদের প্রভু এবং আমারই ইবাদত কর (২১: ৯২)।</p>
<p>৪. দেখুন লেখকের On Arabism: Urubah and Religion: An Analysis of the Fundamental Ideas of Arabism and of Islam as its Highest Moment of Consciousness (Amsterdam: Djambaton 1962) অধ্যায়-৬।</p>
<p>৫. শরীয়ার বাধ্যতামূলক প্রকৃতি ঐশী নির্দেশের ক্ষেত্রে সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য, ব্যতিক্রমহীনভাবে এবং কোন বৈষম্য না রেখেই, কারণ ইসলামী মূল্যসমূহের লক্ষ্য হচ্ছে সকল মানুষ। এজন্য মুসলমান মুসলমান কর্তৃক সকল মানুষকে ইসলামে যোগ দেবার জন্য আহ্বান করা উচিত, কারণ মুসলমান ইসলামী ওহীর এই আদর্শিক উপাদানগুলো সম্পর্কে নিজেরা সচেতন। এই বিষয়টির আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, এই গ্রন্থকারের &#8220;On the Nature of Islamic Dawah,&#8221; Intenational Review of Mission, Vol. 65, No. 260 (October 1976) .</p>
<p>৭. হে মানবজাতি, আমরা তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী করে সৃষ্টি করেছি, তোমাদেরকে জাতি এবং গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ ও সদাচারী সেই-ই আল্লাহর কাছে উত্তম (৪৯: ১৩)।</p>
<p>৮. প্রাগুক্ত।</p>
<p>৯. একাধিক খেলাফতের বৈধতা আল আশআরী সমর্থন করেছিলেন এবং আল-মাওয়ার্দি নিন্দা করেছিলেন, যাই হউক, সে সময়ে ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদদের অভিমত প্রায় ঐক্যমতে উপনীত হয়েছিলো- সহনশীলতার অনুকুলে। প্রশ্নটি ছিল কর্ডোভার উম্মাইয়া খিলাফত ও মিশরের ফাতেমী খিলাফতের।</p>
<p>১০. এবং বিশ্বাসীদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাদের মধ্যে আপোষ মীমাংসার চেষ্টা কর, এর পরও যদি দু&#8217;দলের কোন একটি আগ্রাসন চালায়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তাদের বোধোদয় হয় এবং দুইয়ের মধ্যে সুবিচারের ভিত্তিতে মীমাংসা করে দাও, ন্যায় পরায়ণ হও এবং সুষম আচরণ কর, কারণ আল্লাহ ন্যায়চারীকে পছন্দ করেন (৪৯: ৯)।</p>
<p>১১. দ্রঃ এই গ্রন্থকারের প্রবন্ধ On the Metaphysical Status of Values in the Western and Islamic Tradition, Studia Islamica, Fascicle xxviii 19681, pp. 29-62.</p>
<p>১২. মুমিনেরা অবশ্যই পরস্পর পরস্পরের ভাই, তারা সবাই মিলে একই ভ্রাতৃ সমাজ (৪৯: ১০)&#8230; এই তোমাদের উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ ও অবিচ্ছেদ্য এবং আমি তোমাদের প্রভু, আমারই ইবাদত কর (২১: ৯২)।</p>
<p>১৩. (কুরআন ২৫: ২) ইসলামের বিশ্বজনীনতা এই সত্যে উদ্ভাসিত যে, মানুষ হিসেবেই সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করে ইসলামের বিধি বিধানগুলো ঘোষিত হয়েছে। এর সামগ্রিকতাও সুস্পষ্ট এই সত্যে যে, যেখানে ইসলাম মানুষের জীবনের কোন আচরণের জন্য বিশেষভাবে কোন আইন প্রণয়ন করেনি, সেক্ষেত্রে তার দায়িত্ব অর্পণ করেছে মুসলিম সমাজের উপর, মুসলমান তার প্রাত্যহিক জীবনের সকল কর্মকান্ড এবং সমস্যার ক্ষেত্রে ওহী বা প্রত্যাদেশের প্রয়োগ করতে বাধ্য। আল্লাহ যেরূপ কুরআনে ঘোষণা করেছেন (৬: ৩৮) সে মতে উজতিহাদ হচ্ছে সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক একটি বিশ্বজনীন দায়িত্ব।</p>
<p>১৪. এটি হচ্ছে আইন প্রণয়নের সাধারণ মৌলনীতির অন্যতম (Al-qawid al &#8211; kullah) Subhi al Mahmasani: Falsafat al Tashri fi al Islam (Beirut, Dar al-Ilm al Malayin, 1380/1961) পৃষ্ঠা 261 ff. আবদাল ওয়াহহাব খাল্লাফ এগুলোকে বলেছেন, &#8220;Al qawaid al usuliyah al tashriiyah&#8221; এর সাধারণ নীতিমালা, বলে থাকেন। দ্রঃ তার Ilm al Usul al Fiqh (Cairo: Dar al Qalam 1392/1972) pp 197 ff.</p>
<p>১৫. Ishaq Misa al Husayni, Al Ikhwan al Musliman (Beirut: Dar Beirut al Tibaah wa al Nashr 1955) p. 79.</p>
<p>১৬. কিভাবে আমরা কিছুই বাদ দেইনি, সমস্ত কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং বিচার দিবসে সকলকে</p>
<p>আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে বিচারের জন্য (৬: ৩৮)।</p>
<p>১৭. আমরা তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্যসহকারে, যে কেউ এ কিতাব দ্বারা চালিত হতে চায়, সেতো তা করে তার নিজের কল্যাণের জন্যই আর যে কেউ ভ্রান্ত পথে চলে তাতে তো তার নিজেরই ক্ষতি হয়। হে মোহাম্মদ, তুমি এ সত্য প্রচার ও সতর্ক করা ছাড়া অতিরিক্ত কিছু করতে পারনা (৩৯: ৪১)।</p>
<p>১৮. এবং যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদের বললেন, তিনি আদম সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন এবং পৃথিবীতে তাকে তাঁর প্রতিনিধিরূপে স্থাপন করবেন, তখন ফিরিশতারা বলল, আপনি কেন পৃথিবীতে এমন এক প্রাণীকে সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন সে রক্তপাত ঘটাবে এবং খারাপ কর্ম করবে; অথচ আমরা আপনার ইবাদত এবং নিত্য আপনার মহিমা কীর্তন করি। আল্লাহ জবাব দিলেন, আমার অন্য একটি লক্ষ্য আছে, যা তোমরা জাননা (২: ৩০)।</p>
<p>১৯. আমরা আমাদের আমানত-আকাশমন্ডল, পৃথিবী এবং পর্বতমালার উপর অর্পণ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাতে ওরা ভীত হয়ে পড়ে এবং সে আমানত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, অবশ্য মানুষ সে আমানত গ্রহণ করে এবং বহন করে (৩৩: ৭২)।</p>
<p>২০. প্রাগুক্ত।</p>
<p>২১. তোমরা যদি মোহাম্মদ (সা.) কে সাহায্য না কর, তাতে কিছু আসে যায়না, কারণ আল্লাহ তাঁকে এই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অবিশ্বাসীদেরকে অবনমিত করেন এবং আল্লাহর বাণীকে উচ্চতম মর্যাদা দান করেন, তিনি সর্ব ক্ষমতাসম্পন্ন এবং জ্ঞানময় (৯: ৪০)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principles-of-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14815</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নন্দনতত্ত্বের অতীন্দ্রিয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 15 Sep 2024 13:08:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14806</guid>

					<description><![CDATA[তৌহীদ দ্বারা বুঝায় আল্লাহতত্ত্বকে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে প্রকৃতি সমগ্র রাজ্য থেকে আলাদাকরণ, যা কিছু সৃষ্টিতে বিদ্যমান, সৃষ্টি থেকে আগত, তাই সৃষ্টি, অতীন্দ্রিয় নয় এবং দেশকালের বিধানের অধীন, কোন অর্থে এর কোন কিছু খোদা বা খোদা-সদৃশ হতে পারেনা, বিশেষ করে তত্ত্ববিজ্ঞানের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তৌহীদ দ্বারা বুঝায় আল্লাহতত্ত্বকে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে প্রকৃতি সমগ্র রাজ্য থেকে আলাদাকরণ, যা কিছু সৃষ্টিতে বিদ্যমান, সৃষ্টি থেকে আগত, তাই সৃষ্টি, অতীন্দ্রিয় নয় এবং দেশকালের বিধানের অধীন, কোন অর্থে এর কোন কিছু খোদা বা খোদা-সদৃশ হতে পারেনা, বিশেষ করে তত্ত্ববিজ্ঞানের দিক দিয়ে, যা একেশ্বরবাদের সারমর্ম হিসেবে তৌহীদ অস্বীকার করে। আল্লাহ সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র, সমগ্রভাবেই প্রকৃতি থেকে পৃথক এবং সে কারণেই ইন্দ্রিয়াতীত তিনি, একমাত্র ইন্দ্রিয়াতীত সত্ত্বা। তৌহীদ আরো দাবী করে, কোন কিছু তার মত নয়<sup>১</sup>। এবং সে কারণে সৃষ্টিতে কোন কিছু তার সদৃশ বা প্রতীক হতে পারেনা, কোন কিছুই তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে সংজ্ঞার দিক দিয়ে আল্লাহর কোন প্রতীক অসম্ভব। আল্লাহ হচ্ছেন তিনি, যার সম্পর্কে কোন নন্দনতাত্ত্বিক ইন্দ্রয়গত কোন দিব্যজ্ঞানই সম্ভব নয়।</p>
<p>নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝায় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধির সাহায্যে একটি প্রাক-সিদ্ধ এবং সে কারণে, অতীন্দ্রিয় প্রকৃতি-অতিক্রান্ত উপলব্ধি, যার সারনির্যাস দৃষ্টি-বিষয়ের নমুনা নীতি হিসেবে কাজ করে- এ হচ্ছে যা হওয়া উচিত তারই বিষয়। দৃষ্ট বস্তুটি তার সার নির্যাসের যতই নিকটবর্তী হবে ততই হবে অধিকতর সুন্দর।</p>
<p>তৃণলতা, জীবজন্তু এবং বিশেষ করে মানুষের প্রাণময় প্রকৃতির ক্ষেত্রে তাই হচ্ছে সুন্দর, যা প্রাকসিদ্ধ সারসত্ত্বার সম্ভাব্য অনুরূপ হয়, যাতে করে বিচারক্ষম প্রত্যেকেরই এ দাবীর অধিকার থাকবে যে, নান্দনিক বিষয় বা বস্তুটিতে প্রকৃতি নিজেকে ব্যক্ত করেছে তেজস্বিতার সঙ্গে, পরিষ্কারভাবে। <strong>সুন্দর</strong> <strong>বস্তু</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>তাই</strong><strong>, </strong><strong>প্রকৃতি</strong> <strong>যা</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>চায়</strong><strong>, </strong><strong>যা</strong> <strong>সে</strong> <strong>বলে</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>কদাচিৎ</strong> <strong>কখনো</strong> <strong>তার</strong> <strong>হাজারো</strong> <strong>এক</strong> <strong>ত্রুটির</strong> <strong>মধ্যে</strong><strong>।</strong> <strong>শিল্পকলা</strong> <strong>হচ্ছে</strong> <strong>প্রকৃতির</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>প্রকৃতিকে</strong> <strong>ছাড়িয়ে</strong> <strong>যাওয়া</strong><strong>, </strong><strong>সেই</strong> <strong>সারসত্ত্বাকে</strong> <strong>আবিস্কার</strong> <strong>করার</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>দৃশ্যরূপে</strong> <strong>প্রকাশ</strong> <strong>করার</strong> <strong>প্রক্রিয়া</strong><strong>।</strong> স্পষ্টতই, শিল্প সৃষ্ট- প্রকৃতির অনুকরণ নয়, যে সব বস্তুর প্রাকৃতিক-বাস্তবতা সম্পূর্ণ সেগুলোর ইন্দ্রিয়নির্ভর রূপ সৃষ্টি শিল্প নয়। পরিচয় প্রমাণ করবার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন ও ডকুমেন্টেশনের জন্য ফটোগ্রাফিক চিত্ররূপ, যা বিষয়টি যেভাবে বিদ্যমান সেভাবেই তার ছবি তোলে, তা মূল্যবান হতে পারে। শিল্প হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সেই সারসত্ত্বার পঠন, যা প্রকৃতির অতীত এবং সারসত্ত্বাটিকে তার যথাযথ একটি দৃশ্যরূপ দান করা<sup>২</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ পর্যন্ত যেভাবে সংজ্ঞা দান করা হয়েছে এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে শিল্প হচ্ছে অপরিহার্যভাবেই প্রকৃতির মধ্যে তারই ধারণা করা যা প্রকৃতির অন্তগর্ত নয়। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে যা সম্পর্কিত নয়, তা ইন্দ্রিয়াতীত এবং যা দিব্য, কেবল তাই এই মর্যাদা লাভের যোগ্য। অধিকন্ত প্রাকসিদ্ধ সারসত্ত্বা, যা নন্দনতাত্ত্বিক উপলব্ধির বিষয়, তা যেহেতু আদর্শসূলভ এবং সুন্দর, সে কারণে মানুষের আবেগ অনুভূতি এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। এ কারণেই মানুষ সুন্দরকে ভালবাসে এবং সুন্দরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যখন তারা মানুষের প্রকৃতিতে সুন্দরকে প্রত্যক্ষ করে, তখন প্রাকসিদ্ধ প্রকৃতির অতীত সারসত্ত্বা হয়ে ওঠে মানবিকতা, যা ইন্দ্রিয়াতীত, মাত্রায় আদর্শরূপ পরিগ্রহণ করে। একেই গ্রীকরা বলতো apotheosis অর্থাৎ ঐশী সত্তার মধ্যে মানবিকতার প্রতিস্থাপন। মানুষ এ ধরনের রূপান্তরিত মানুষের বিশেষ করে মান্য করে এবং তাদেরকে দেব দেবী বলে গণ্য করে। <em>আধুনিক</em> <em>পাশ্চাত্যের</em> <em>লোকেরা</em> <em>মেটাফিজিক্স</em> <em>বা</em> <em>তত্ত্বশাস্ত্রের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>সম্পর্কিত</em> <em>কোন</em> <em>উপাস্যের</em> <em>প্রতি</em> <em>অতি</em> <em>সামান্যই</em> <em>সহনশীল</em><em>।</em> <em>কিন্তু</em> <em>নীতিশাস্ত্র</em> <em>এবং</em> <em>আচরণের</em> <em>ক্ষেত্রে</em> <em>পাশ্চাত্যের</em> <em>লোকেরা</em> <em>মানুষের</em> <em>প্রবৃত্তি</em> <em>ও</em> <em>প্রবণতাগুলোকে</em> <em>আদর্শের</em> <em>রূপ</em> <em>দিতে</em> <em>গিয়ে</em> <em>যে</em> <em>সব</em> <em>দেব</em><em>&#8211;</em><em>দেবী</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করে</em> <em>সেগুলোই</em> <em>প্রকৃতপক্ষে</em> <em>তার</em> <em>কর্মকান্ড</em> <em>নিয়ন্ত্রণ</em> <em>করে<sup>৩</sup></em><em>।</em></p>
<p>এই হচ্ছে ব্যাখ্যা, কেন দৃশ্যরূপে ভাস্কর্যে এবং কল্পনায়, তার কারো ও নাটকে প্রাচীন গ্রীকরা মানবিক উপকরণসমূহ তার গুণাবলী অথবা তার প্রবৃত্তিগুলোর প্রতীক প্রাচীন গ্রীসের শিল্পকর্মে সর্বোচ্চ নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াস হিসেবে গৃহীত হয়েছিলো। তারা যে সব বিষয়ের, যেমন ঈশ্বরের প্রতিরূপ সৃষ্টি করেছিল, সেগুলো সুন্দর ছিলো একারণে যে মানব প্রকৃতি যা হওয়া উচিত, সেগুলো ছিলো তারই আদর্শরূপ। তাদের সৌন্দর্য অন্য দেবতাদের সঙ্গে তাদের অন্তর্গত বিরোধ গোপন করতোনা, সত্যিকার অর্থে এ কারণে যে, প্রত্যেকেই ছিলো প্রকৃতির একটি প্রকৃত বিষয়, যাকে তারা ঐশীরূপে তথা অতিপ্রাকৃত স্তরে চূড়ান্তরূপ দিয়েছিলো<sup>৪</sup>।</p>
<p>রোমেই কেবল গ্রীক অবক্ষয়ের নাট্যমঞ্চ, গ্রীক ভাস্কর্য শিল্পের অবনতি ঘটে রাজা বাদশাদের বাস্তববাদী অভিজ্ঞতামূলক, বাস্তভিত্তিক প্রতিকৃতিতে। অবশ্য তখনো তা সম্ভব হতোনা সম্রাটকে দেবতায় পরিণত না করে। গ্রীকে যেখানে শত শত বছর ধরে এই থিওরীটি তার বিশুদ্ধরূপে বিদ্যমান ছিল- যেখানে ভাস্কর্য শিল্পের পাশাপাশি নাট্যশিল্প বিকশিত হয় প্রকৃতপক্ষে দেবতাদের মধ্যকার শাশ্বত পারস্পরিক দ্বন্দ্ব প্রতিফলিত করার জন্য, একসারি ঘটনা উপস্থাপনের মাধ্যমে, যাতে চরিত্রগুলো ছিলা জড়িত। সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল- তাদের ব্যক্তি চরিত্রগুলো উন্মোচিত করা, দর্শকরা যাদেরকে মানবিক, অতিমাত্রায় মানুষ্যজনোচিত জানতো- অবশ্য তা ছিলো বিপুল আনন্দের উৎস। তাদের চোখের সামনে উৎঘাটিত নাটকের ঘটনাগুলো পরিণতি যদি ঘটতো ট্রাজিক সমাপ্তিতে, তা অপরিহার্য এবং তাদের চরিত্রের অন্তর্গত বলে গণ্য হত। এর অনিবার্যতায় ফুলের একটি দংশন দূর হয় এবং কেতারসিসের মাধ্যমে তারা অনৈতিক কাজকর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য তারা যে অপরাধবোধ করতো তার অবসান ঘটাতে সাহায্য করতো। এজন্যই, গ্রীকে উদ্ভাসিত পূর্ণতা-সাধিত্ব ট্রাজেডিশিল্প ছিলো সাহিত্যশিল্পের শীর্ষ বিন্দু এবং সকল মানববিদ্যারও। এক বিরল সত্যভাষণের মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ ফনগ্রুনেবোম্ বলেছেন, ইসলামে প্রতিমাধর্মী শিল্পকলা ভাস্কর্য চিত্র এবং নাটক নেই, কারণ ইসলামে প্রকৃতিতে কোন দেবদেবীর অবতারের অবকাশ নেই, অথবা প্রকৃতিতে অন্তবর্তী কোন দেবদেবীর ধারণা থেকে মুক্ত ইসলাম। যে সব দেবদেবী পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত অথবা মন্দের সঙ্গে দ্বন্দ্বেজড়িত<sup>৫</sup>, ফনগুনোবোম এটিকে ইসলামের একটি নিন্দাবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও আসলে ইহা ইসলামের একটি পরম বৈশিষ্ট্য। এ হচ্ছে ইসলামের একটি একক গৌরব যে ইসলাম পৌত্তলিকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, অর্থাৎ সৃষ্টিকে স্রষ্টারূপে গণ্য করার প্রমাণ থেকে ইসলাম মুক্ত।</p>
<p><strong>তাওহীদ</strong> <strong>শৈল্পিক</strong> <strong>সৃজনশীলতার</strong> <strong>বিরোধী</strong> <strong>নয়</strong><strong>; </strong><strong>সৌন্দর্য</strong> <strong>উপভোগেরও</strong> <strong>বিরোধী</strong> <strong>নয়</strong><strong>।</strong> <strong>পক্ষান্তরে</strong> <strong>তাওহীদ</strong> <strong>সৌন্দর্যকে</strong> <strong>পবিত্র</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>করে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তার</strong> <strong>পৃষ্ঠপোষকতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>উৎকর্ষ</strong> <strong>সাধন</strong> <strong>করে</strong><strong>।</strong> তাওহীদ কেবলমাত্র আল্লাহতে এবং ওহীর বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রকাশিত তার অভিপ্রায় বা তার শব্দের মধ্যে পরম সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই দৃষ্টিভঙ্গির উপযোগী নতুন সৃষ্টিতে তাওহীদ উম্মুখ। <em>আল্লাহ</em> <em>ছাড়া</em> <em>কোন</em> <em>ইলাহ</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>এই</em> <em>আশ্রয়বাক্য</em> <em>থেকে</em> <em>শুরু</em> <em>করে</em> <em>মুসলিম</em> <em>শিল্পী</em> <em>এ</em> <em>বিষয়ে</em> <em>প্রত্যয়দৃপ্ত</em> <em>যে</em><em>, </em><em>প্রকৃতির</em> <em>যা</em> <em>কিছুই</em> <em>রূপায়িত</em> <em>করেছে</em><em>, </em><em>তাকেই</em> <em>শৈলীবদ্ধ</em> <em>করেছে</em><em>।</em> অর্থাৎ শৈলীবদ্ধ করার মাধ্যমে তাকে সে যথাসম্ভব নিসর্গ বা প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত করেছে। বলতে কি, প্রকৃতির বিষয় বা বস্তু প্রকৃতি থেকে এতদূর বিচ্ছিন্ন করা হল যে, তা প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে উঠলো। শিল্পীর হাতে শৈলীবদ্ধতা ছিল একটি নৈতিবাচক যন্ত্র, যার মাধ্যমে সে প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক বস্তু এমনকি খোদ সৃষ্টির প্রতি ব্যক্ত করেছে তার &#8216;না&#8217; বা অস্বীকৃতি। প্রাকৃতিকতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করে মুসলিম শিল্পী দৃশ্যরূপে প্রকাশ করে শাহাদার নেতিবাচক দিকটি, অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। <strong>মুসলিম</strong> <strong>শিল্পীর</strong> <strong>এই</strong> <strong>শাহাদাই</strong> <strong>আসলে</strong> <strong>তার</strong> <strong>প্রকৃতিতে</strong> <strong>ইন্দ্রিয়াতীততার</strong> <strong>অস্বীকৃতির</strong> <strong>সমার্থক<sup>৬</sup></strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম শিল্পী এখানেই থেমে গেলেন না। তার সৃজনশীলতার মুক্তি তখনই ঘটলো, যখন তাঁর এই চৈতন্য হল যে আল্লাহকে প্রকৃতির কোন মুর্তিতে প্রকাশ করা এককথা এবং এ ধরনের মূর্তিতে তা প্রকাশ অসম্ভব, তা বলা ভিন্ন কথা। আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালাকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি হচ্ছে মানুষের জন্য মহত্তম নান্দনিক লক্ষ্য, আল্লাহ তায়ালা নিঃশর্ত চরম পরম ও মহিমাময়। সৃষ্টির কোন কিছুর দ্বারা যে তাকে প্রকাশ করা যায় না এই সিদ্ধান্তের অর্থই আল্লাহর পরমত্ব ও মহিমাময়তাকে অতিশয় গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। কল্পনায় তাকে সৃষ্টির সমস্ত কিছু থেকে পৃথকরূপে দেখার অর্থই হচ্ছে তাকে সুন্দররূপে দেখা, সুন্দর অন্য যে কোন বিষয় বা বস্তু থেকে স্বতন্ত্ররূপে দেখা। ঐশী অনির্বচনীয়তা হচ্ছে, একটি ঐশীগুণ যার অর্থ হচ্ছে অন্তহীনতা, পরমতা, চূড়ান্ততা বা নিঃশর্ততা, অপরিমেয়তা, অসীম বা অনন্ত- সকল অর্থেই অনির্বচনীয়<sup>৭</sup>।</p>
<p>ইসলামী চিন্তাধারায়, চিন্তার এই ধারা অনুসারে মুসলিমশিল্পী আবিস্কার করেছে অলংকরণ শিল্প এবং তাকে রূপান্তরিত করেছে লতাপাতা, ডালপালা, সর্পিল কারুকার্যময় নক্সায়, আর এটি এমন একটি non-devolopmental নক্সা যা সম্প্রসারিত হয়েছে সকল দিকে অনন্ত অভিমুখে। এই শিল্প যাকে বলা হয় এরাবেক্স যা টেক্সটাইল, ধাতু, পুষ্পাধার, প্রাচীন, সিলিং, স্তম্ভ, জানালা, বা বইয়ের একটি পৃষ্ঠা ইত্যাদি-প্রকৃতির যেকোন বস্তুকেই তা অলংকৃত করে, তাকেই রূপান্তরিত করে নির্ভর, স্বচ্ছ, ভাসমান প্যাটার্নে, যা অন্তহীনতার অভিমুখে সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির বিষয় প্রকৃতি নিজে নয়-বরং তা হচ্ছে &#8220;transubstantiated&#8221;, এতে কেবল একটি দৃষ্টিক্ষেত্র হয়ে উঠে। নান্দনিকতার দিক দিয়ে এরাবেক্স শিল্পরূপের মাধ্যমে নিঃসর্গের বস্তু হয়ে উঠে অনন্তের দিকে একটি জানাল। একে যখন অনন্তের ইশারা হিসেবে দেখা হয় তখন ইন্দ্রিয়াতীততার একটি মানে স্পষ্ট হয়ে উঠে- নেতিবাচকভাবে প্রদত্ত হলেও একমাত্র মানেই, যা ইন্দ্রিয়গত রূপায়ণ এবং ইনটুইশনের পক্ষে অর্জন সম্ভব<sup>৮</sup>।</p>
<p><strong><em>এতেই</em> <em>আমরা</em> <em>ব্যাখ্যা</em> <em>পাই</em> <em>কেন</em> <em>মুসলমানরা</em> <em>যে</em> <em>শিল্প</em> <em>সৃষ্টি</em> <em>করেছেন</em> <em>তার</em> <em>প্রায়</em> <em>সবটাই</em> <em>বিমূর্ত</em><em>, </em><em>এমনকি</em><em>, </em><em>যেখানে</em> <em>লতাপাতা</em><em>, </em><em>জীবজন্তু</em> <em>এবং</em> <em>মানুষের</em> <em>প্রতিকৃতি</em> <em>ব্যবহার</em> <em>করা</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেখানেও</em> <em>আর্টিষ্ট</em> <em>এগুলোকে</em> <em>যথেষ্ঠভাবে</em> <em>শৈলী</em> <em>রূপ</em> <em>দিয়েছে</em><em>, </em><em>এরা</em> <em>যে</em> <em>প্রকৃত</em> <em>কোন</em> <em>সৃষ্ট</em> <em>বস্তু</em> <em>নয়</em><em>, </em><em>তা</em> <em>প্রকাশ</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>&#8211; </em><em>একথা</em> <em>অস্বীকার</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>মধ্যে</em> <em>কোন</em> <em>অতীন্দ্রিয়</em> <em>সারসত্ত্বা</em> <em>বাস</em> <em>করছে</em><em>।</em> </strong>এই প্রয়াসে মুসলিম শিল্পী সাহায্য পেয়েছে, তার ভাষাগত এবং সাহিত্যিক উত্তরাধিকার থেকে। একই উদ্দেশ্যে সে আরবী বর্ণমালা এভাবে বিকাশ সাধন করেছে যাতে করে তা হয়ে ওঠে একটি অন্তহীন এরাবেক্স শিল্পকলা, যার প্রসার ঘটেছে ক্যালিগ্রাফারের পছন্দমত যে কোন দিকে, অপরিবর্তনীয়ভাবে; মুসলিম স্থপতিদের বেলায় একই কথা সত্য, যার ইমারত হচ্ছে তার সম্মুখভাগ, এলিভেশন, স্কাইলাইন এবং মেঝে পরিকল্পনার দিক দিয়ে একটি এরাবেক্স শিল্পকলা। ভূগোল বা নৃতত্ত্বের দিক দিয়ে মুসলিম আর্টিষ্টরা যত পৃথকই হোক, যাদের বিশ্বদৃষ্টি ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি, সেই সকল শিল্পীরই একটি সাধারণ বিভাজক হচ্ছে তাওহীদ<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>নন্দনতত্ত্বে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>বন্ধন</strong> <strong>মুক্তি</strong></h4>
<p>কোন কিছুই, যা প্রাকৃতিক বস্তু নয়, তা ঐশী সত্ত্বাকে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হতে পারে না, এর দ্বারা সাধারণত এ সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হয়না যে, প্রকৃতির একটি বস্তু সেই সত্যকে প্রকাশের একটি বাহন হতে পারে- অর্থাৎ এই সত্যটিকে যে ঐশী সত্ত্বা আসলেই অসীম এবং অনির্বচনীয়। ঐশী সত্ত্বা অনির্বচনীয় বলেই তাকে প্রকাশ না করা এক কথা এবং এই সূত্রের অন্তর্গত সত্যকে প্রকাশ করা আরেক কথা। স্বীকৃতভাবেই, আল্লাহ যে ইন্দ্রিয়ের দিক দিয়ে অনির্বচনীয় এই সত্য প্রকাশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তা যে কোন শিল্পীর কল্পনাকে বিহ্বল করে দেয়। কিন্তু ইহা অসম্ভব নয়। বস্তুত এখানেই ইসলামের শৈল্পিক প্রতিভা বিজয়ী বন্ধন- মুক্তি অর্জন করে। আমরা দেখেছি, প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য যে ষ্টাইলাইজেশন সুপরিচিত ছিলো এবং যার অনুশীলন হতো, তাকে আলেকজান্ডার এবং তাঁর উত্তরসূরীগণ কর্তৃক আরোপিত হেলেনিয় প্রকৃতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ণতার একটি নতুন স্তরে উন্নীত করে। এখন, খ্রীষ্টান ছদ্মাবরণ স্বরূপ হেলিনিজমের মোকাবেলা করতে গিয়ে ইসলামে নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়াসের ক্ষেত্রে সেমেটিক প্রক্রিয়া হল একই রকম প্রবল, যেমন প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা গেল ধর্মতাত্ত্বিক প্রয়াসের ক্ষেত্রে। হযরত ঈসার ঐশ্বরিকতা ইসলাম যে প্রবলতার সঙ্গে প্রত্যাখান করে তার তুল্য প্রত্যাখান হচ্ছে প্রকৃতির সৌন্দর্যতাত্ত্বিক রূপায়ণে প্রকৃতিবাদের অস্বীকৃতি এবং ইসলাম তা সমাধা করেছে ষ্টাইলাইজেশনকে উৎসাহিত করে। একটি শৈল্পিক লতা পাতা বা ফুল প্রকৃতির একটি বাস্তব বস্তুর বর্গের কেচার মাত্র, যাকে বলা যায় অপ্রকৃত। মনে হয় শিল্পী তা অংকন করতে গিয়ে প্রকৃতিকে অস্বীকার করে, অ-প্রকৃতিত্ব অর্থাৎ প্রকৃতিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রত্যাখান প্রকাশের এটি একটি উপযুক্ত হাতিয়ার হতে পারেনা। অবশ্য এককভাবে বিচার করলে শৈলীরূপ লতাপাতা বা ফুল প্রকৃতির বহির্ভূতকেই প্রকাশ করে। কিন্তু স্বতন্ত্ররূপে এতে এই ইঙ্গিতই মিলে যে, বস্তুটির মধ্যে প্রকৃতির মৃত্যুই একটি স্বাতন্ত্রিক রূপ পেয়েছে। প্রাকৃতিক বিষয়কে প্রকৃতিমুক্ত রূপ দিতে গিয়ে এ উচ্চাঙ্গের প্রকৃতিবাদকেও প্রকাশ করতে পারে, যা ইসলামের লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তেমনটি আমরা প্রায়ই দেখতে পাই রূগ্নতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের এবং মৃত্যুর মাধ্যমে জীবন প্রতিফলিত হয়। <em>তাই</em> <em>জুদাইজম</em> <em>যেখানে</em> <em>ব্যর্থ</em> <em>হয়েছে</em> <em>সেখানে</em> <em>সফল</em> <em>হতে</em> <em>হলে</em> <em>ইসলামের</em> <em>ঐশী</em> <em>সত্ত্বার</em> <em>অনির্বচনীয়তা</em> <em>সংরক্ষণের</em> <em>জন্য</em> <em>ভিন্ন</em> <em>কিছু</em> <em>আবশ্যক</em> <em>ছিল<sup>১০</sup></em><em>।</em></p>
<p>এখন এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম শিল্পী দন্ডায়মান হলেন। তার অনন্য সৃজনশীল এবং মৌলিক সমাধান হচ্ছে, যেন, যে কোন বা সকল স্বাতন্ত্রিকরণকে অস্বীকার করার জন্য এবং পরিণামে চৈতন্য থেকে প্রকৃতিবাদকে চিরতরে নির্বাসন দেওয়ার জন্য শিল্পগত তরুলতা ও ফুলকে অন্তহীন পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা। প্রকৃতি বহির্ভূত কোন বিষয় একইভাবে বার বার প্রকাশ করলে তা অ-প্রকৃতিত্বকেই প্রকাশ করে। এর উপরে যদি শিল্পী অ-প্রকৃত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সুন্দর তাত্ত্বিকভাবে অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তেমন অবস্থায় পরিণামে তা হয়ে উঠতে পারে এই সাক্ষ্যের সমার্থক লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, যা উচ্চারিত হয় শাব্দিক এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে। কারণ যে অনির্বচনীয়তা এবং অসীমতা শৈল্পিক প্রতিফলনের উপকরণ, তাতে এগুলো যে অ-প্রকৃতির গুণাবলী তার ইঙ্গিত মেলে। তাই ইসলামী মন এই অনুধাবন করে যে, সেমেটিক চৈতন্যের আদি প্রেরণার সঙ্গে, দৃশ্যশিল্পের সাযুজ্যের একটি পন্থা রয়েছে। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হচ্ছে, প্রকৃতির কোন বস্তু যতো শৈল্পিক রূপই তাকে দেওয়া হউক, কি করে তা অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রকাশের বাহন হতে পারে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>আরব</strong> <strong>চৈতন্য</strong><strong>: </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>ঐতিহাসিক</strong> <strong>ভিত্তিমূল</strong></h4>
<p>একটি সমাধান লাভের জন্য ইসলামী চেতনাকারণ নেয় তার নিজের ঐতিহাসিক ভিত্তিমূল, তথা আরব চৈতন্যের উপর। ইহাই সেই ঐতিহাসিক বিষয় যা ঐশী প্রত্যাদেশ অবহিত করে এবং তার সংঘটনের জন্য Sitz-im-Leben রূপে ব্যবহার করেছে। ঐশী সত্য প্রকাশের মাধ্যম ও বাহনরূপে এই চেতনাই মূর্তরূপ লাভ করে হযরত মোহাম্মদের (সা.) মধ্যে, যিনি এই প্রত্যাদেশ লাভ করেন এবং দেশকালের মানবজাতির কাছে তা প্রচার করেন নবুয়্যতের মাধ্যমে। ইসলামের পূর্বে ভাষা এবং লেখন শিল্পে এর অর্জন ছিলো প্রকৃতই একটি অলৌকিক ব্যাপার এবং এ বিষয়টিই নতুন প্রত্যাদেশের ধরন বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে তা হবে সাহিত্যের পূর্ণতা, কারণ এই প্রত্যাদেশের জন্য তা ছিলো প্রস্তুত এবং তা বহনের ক্ষতাসম্পন্ন।</p>
<p>আরব চৈতন্যের প্রথম হাতিয়ার এবং তার সকল ক্যাটেগরির অবয়ব হচ্ছে আরবী ভাষা। মূলত আরবী ভাষা হচ্ছে তিনটি মূল ব্যঞ্জন ধাতুমূল নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটি তিনশতেরও অধিক রূপে ধাতুরূপ সম্ভাব্য বাচ্যে পরিবর্তন করে উপসর্গ, অনুসর্গ বা মধ্যসর্গ যোগ করে। যে শব্দরূপই গঠন করা হউক না কেন, যে সকল শব্দের একই ধাতুরূপ রয়েছে সে সকলের একই প্রকারত্ব অর্থ রয়েছে, ধাতুমূলের ভিন্নতা সত্বেও, ধাতুর অর্থ একই থেকে যায়, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয় অন্য একটি প্রকারাত্বক অর্থ, ধাতুরূপের মাধ্যমে তা যে অর্থটি লাভ করে এবং সকল সময়, সর্বত্র যা একই থাকে<sup>১১</sup>। তখন ভাষার একটি যৌক্তিক কাঠামো গঠিত হয় যা প্রথমেই  সুস্পষ্ট, সম্পূর্ণ এবং বোধগম্য। এই কাঠামোটি বুঝতে পারলেই যে কোন ব্যক্তি ভাষাপণ্ডিত হয়ে ওঠে, যখন ধাতুমূলের অর্থ সম্পর্কে জ্ঞান হয়ে উঠে গৌণও গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য-শিল্প নিহিত রয়েছে বিভিন্ন ধারণার একটি পদ্ধতি নির্মাণে, যে ধারণাগুলো এভাবে পরস্পর সম্পর্কিত যে তাতে করে ধাতুগুলোর কনজুগেশনের মাধ্যমে সাদৃশ্য ও বৈপরীত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। <em>যখন</em> <em>বোধ</em> <em>শক্তির</em> <em>পক্ষে</em> <em>সম্ভব</em> <em>হয়</em> <em>জটিলতার</em> <em>মধ্য</em> <em>দিয়ে</em> <em>নিরবচ্ছিন্ন</em> <em>অভঙ্গুর</em> <em>রেখায়</em> <em>অগ্রসর</em> <em>হওয়া</em> <em>একটি</em> <em>এরাবেক্স</em> <em>শিল্পে</em><em>, </em><em>যার</em> <em>মধ্যে</em> <em>ত্রিভুজ</em><em>, </em><em>বর্গক্ষেত্র</em><em>, </em><em>বৃত্ত</em><em>, </em><em>পঞ্চভুজ</em><em>, </em><em>অষ্টভুজ</em> <em>ইত্যাদি</em> <em>হাজারো</em> <em>রূপ</em> <em>সবই</em> <em>ভিন্ন</em> <em>বর্ণে</em> <em>বিচিত্র</em> <em>এবং</em> <em>একে</em> <em>অপরের</em> <em>সঙ্গে</em> <em>বাড়াবাড়ি</em> <em>করে</em> <em>অবস্থান</em> <em>করে</em> <em>তা</em> <em>চোখকে</em> <em>ঝলসে</em> <em>দেয়</em><em>, </em><em>কিন্তু</em> <em>মনকে</em> <em>নয়</em><em>&#8211; </em><em>প্রত্যেকটি</em> <em>ফিগারকে</em> <em>তার</em> <em>স্বরূপে</em> <em>চিনতে</em> <em>পেরে</em> <em>বর্ণ</em> <em>বিচরণ</em> <em>করতে</em> <em>পারে</em> <em>একটি</em> <em>পঞ্চভুজ</em> <em>থেকে</em> <em>অন্য</em> <em>একটি</em> <em>পঞ্চভুজে</em><em>, </em><em>তাদের</em> <em>বর্ণের</em> <em>বৈচিত্র্য</em> <em>সত্ত্বেও</em> <em>এবং</em> <em>শিল্পকর্মটির</em> <em>এক</em> <em>প্রান্ত</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>প্রান্ত</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>এগোতে</em> <em>পারে</em><em>&#8211; </em><em>প্রত্যেক</em> <em>বিরতির</em> <em>স্থানেই</em> <em>কিছু</em> <em>আনন্দের</em> <em>অভিজ্ঞতা</em> <em>নিয়ে</em><em>, </em><em>একইরূপ</em> <em>আকুতিজাত</em> <em>সাদৃশ্য</em> <em>ও</em> <em>সামঞ্জস্য</em> <em>প্রত্যক্ষ</em> <em>করে</em><em>&#8211; </em><em>অর্থাৎ</em> <em>ধাতুমূলের</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>অর্থ</em> <em>প্রকাশের</em> <em>একইরূপ</em> <em>ধরন</em> <em>এবং</em> <em>খোদ</em> <em>শব্দমূলগুলো</em> <em>কর্তৃক</em> <em>সৃষ্ট</em> <em>বৈপরীত্ব</em> <em>অনুধাবন</em> <em>করে</em><em>।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী ভাষার গঠনমূলক প্রকৃতি তার কবিতাকেও গঠন করে। আরবী কবিতা স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ এবং স্বাধীন শ্লোক নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটি একই এবং অভিন্ন ছন্দরূপের অভিন্ন রূপায়ণ। আরবী কাব্য ঐতিহ্যে সুপরিচিত ত্রিশটি প্যাটার্নের মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নেবার স্বাধীনতা কবির আছে। কিন্তু একবার নির্বাচনের পর গোটা কবিতাটির প্রত্যেকটি অংশই এই প্যাটার্নের সঙ্গে সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আরবী কবিতা শ্রবণ এবং উপভোগের তাৎপর্যই হচ্ছে এই প্যাটার্নের সঙ্গে উপলব্ধি; কবিতা আবৃতির সঙ্গে সঙ্গে কবিতার শ্রোতা ও সমজদার এর ছন্দ প্রবাহের সঙ্গে অগ্রসর হয় এবং এই প্যাটার্ন যা প্রত্যাশা করেছে তা প্রত্যাশা ও গ্রহণ করে। অবশ্য প্রত্যেক শ্লোকে শব্দ ধারণা এবং অনুভূতি নির্মাণ পৃথক পৃথক। এতে করেই রংয়ের বৈচিত্র ফুটে ওঠে, কিন্তু তার কাঠামোগত রূপ আগাগোড়ায় এক।</p>
<p>আরবী ভাষা ও আরবী কবিতার এই বুনিয়াদি জ্যামিতির বদৌলতে আরব চৈতন্য দ্বিরায়তনের পর্যায়ে অনন্তের ধারণা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ধাতু মূলগুলো বহু, বলা যায় অনন্ত, কেননা তিনটি স্বরবর্ণের যে কোন নতুন সম্মেলনের প্রতি প্রথাগতভাবে যে কোন অর্থ আরোপ করা যেতে পারে। আরবীয় চৈতন্য বিদেশী ধাতুমূলকে অবিচলিত স্থৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং এজন্য বিদেশী শব্দমূলটিকে আরবীয় রূপদানের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার নিজস্ব ধাতুরূপের কারখানার উপর। তাদের সংখ্যার অনন্ত তার মতই তাদের ধাতুমূলও অনন্ত, ধাতুমূলের পরিচিত, প্যাটার্ন রয়েছে সীমিত সংখ্যক শব্দমূলেরই ধাতুরূপ করা হয়েছে এবং তাদের ধাতুরূপগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ওয়েবষ্টার কিংবা অক্সফোর্ডের মত আরবী ভাষার একটি অভিধান, যাতে সকল শব্দ সংকলিত এবং তালিকাবদ্ধ হবে তা একেবারেই অসম্ভব, কারণ কাল পরম পরাক্রমে পরিচিত সকল শব্দমূলের ধাতুরূপ করা হয়নি। ধাতুমূলের তালিকা কখনো বন্ধ করা হয়নি। ধাতুরূপের সব কয়টি ধরন বা রূপ ব্যবহৃত হয়নি এবং ধরনের তালিকাও সমাপ্ত হয়নি। ঐতিহ্য সচেতনবোধ দ্বারা নতুন ধরনের সম্ভাবনা অস্বীকার করেনা। তবে তারা সেই প্রতিভার অপেক্ষায় থাকেন যে যৌক্তিকতা প্রমাণ এবং নিজের সুবিধার খাতিরে ব্যবহার করা যায়। তাই আরবী ভাষা অস্তিত্বের আরবীয় প্রবাহের মতই এমন একটি পদ্ধতি যা কেন্দ্রস্থলে উজ্জ্বল (ঐতিহ্য হেতু), কিন্তু কিনারের দিকে অস্পষ্ট, যা সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে অনিশ্চিতভাবে<sup>১২</sup>।</p>
<p>এবার কবিতার কথায় আসা যাক। শ্লোকগুলোর ছন্দরূপ কবিতার অবয়র গঠন করে বলে কোনো কবিতার শ্লোকগুলোর জন্য জরুরী নয়- কবি যে ধারণায় সেগুলো রচনা করেছেন সেই ক্রম অনুসারে সেগুলো পাঠ করা, বা অন্য কোন নিয়ম অনুসারে। কবিতাটি শুরু থেকেই সমাপ্তির দিকে পাঠ করা হোক কিংবা সমাপ্তি থেকে শুরুর দিকে আবৃত্তি করা হোক, কবিতাটি বরাবরই একই রকম মাধুর্য বজায় রাখে, কারণ কবি প্রত্যেকটি শ্লোকের সঙ্গে তার প্যাটার্নের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেছেন। পুনরাবৃত্তিতে আমরা আনন্দিত হই, কারণ তাতে করে আমাদের ইনটুইটিভ ক্ষমতা স্বীকৃত হয়, অর্থ এবং বোধ কাঠামোর বাস্তবতার বৈচিত্র থেকে আমরা যা প্রত্যাশা করেছিলাম তা প্রত্যাশা ও উপলব্ধি করতে পারি। তাই সংজ্ঞা অনুসারে কোনো আরবী কবিতাই সম্পূর্ণ এবং বন্দী নয় এবং কোন অর্থেই পরিপূর্ণ নয়, যাতে করে মনে করা যেতে পারে কবিতার সঙ্গে কোন কিছু যোগ বা নিরবচ্ছিন্নতা ব্যাহত হতে বা এমন কিছু ধারণা করা যেতে পারে। বলতে কি, আরবী কবিতাকে উভয় দিকে টেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব, তার শুরুতে এবং তার অন্তে। তার সৌন্দর্যকে বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন না করে কোন মানুষ কর্তৃক, ব্যক্তিগত রচনাশৈলীর দ্বারা না হলেও কবিতাটির রচয়িতার দ্বারা তো বটেই। বস্তুত আমরা যদি উত্তম শ্রোতা হই, তাহলে একথা ধরে নেয়া হবে যে, আমরা কবির সঙ্গে তার কবিতা সৃষ্টিতে সূচনাতে অংশগ্রহণ করবো। যেমনটি করা হয় একটি জীবন্ত অভিনয়, এবং দ্বিতীয়ত আমরা তার কবিতা অনুসরণ করবো আমাদের নিজেদেরই হিতার্থে, কেননা তার আবৃত্তি যে গতি সঞ্চার করেছে তার দ্বারা আমাদেরকে বন্দী করেছে এবং আমাদেরকে এর নিজস্ব অসীম কাব্যিক পরিমন্ডলে নিক্ষেপ করেছে। আরব জগতে একজন কবির জন্য এ কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, যখন কবি মহৎ শ্রোতাদের উপস্থিতিতে সেই শ্রোতাদের মৌখিক সাহায্য লাভ করেন, তার কবিতার আবৃত্তিতে, যে কবিতা ইতিপূর্বে কখনো তিনি শোনেননি অথবা তার কবিতার সঙ্গে একই কবিতার আরো অংশ যোগ করে, তার প্রতি মন্তব্য প্রকাশ করে থাকেন<sup>১৩</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>ইসলাম</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>শিল্পকর্ম</strong><strong>: </strong><strong>আল</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কুরআনুল</strong> <strong>করীম</strong></h4>
<p>এই আরব চৈতন্যই ইসলামের ছাঁচ এবং বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করে। ইসলামী প্রত্যাদেশ আল-কুরআনুল করীম নাযিল হয় মহত্তম শিল্পকর্ম হিসেবে। সেই চৈতন্যের সকল আদর্শ লক্ষ্য একই মুহূর্তে চূড়ান্ত পরিপূরণের জন্য এই অনুভূতি আসে।</p>
<blockquote><p><em>কোন</em> <em>কিছু</em> <em>যদি</em> <em>শিল্পের</em> <em>দাবী</em> <em>রাখে</em><em>, </em><em>কুরআন</em> <em>নিশ্চয়ই</em> <em>শিল্প</em><em>।</em> <em>কোন</em> <em>কিছুর</em> <em>দ্বারা</em> <em>মুসলিম</em> <em>মন</em> <em>যদি</em> <em>আন্দোলিত</em> <em>ও</em> <em>প্রভাবিত</em> <em>হয়ে</em> <em>থাকে</em><em>, </em><em>নিশ্চয়ই</em> <em>কুরআন</em> <em>কর্তৃক</em> <em>প্রভাবিত</em> <em>হয়েছে</em><em>।</em> <em>এই</em> <em>প্রভাব</em> <em>যদি</em> <em>কোথাও</em> <em>ভিত্তিমূলক</em> <em>উপাদানে</em> <em>পরিণত</em> <em>হবার</em> <em>মত</em> <em>যথেষ্ট</em> <em>গভীরতা</em> <em>অর্জন</em> <em>করে</em> <em>থাকে</em><em>, </em><em>তা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>নন্দনতাত্ত্বিকতা</em><em>।</em> <em>এমন</em> <em>কোন</em> <em>মুসলমান</em> <em>নেই</em> <em>কুরআনের</em> <em>সুর</em> <em>মুর্ছনা</em><em>, </em><em>ছন্দ</em> <em>এবং</em> <em>তার</em> <em>প্রাঞ্জলতার</em> <em>বিভিন্ন</em> <em>স্তর</em><em>, </em><em>যার</em> <em>অস্তিত্বের</em> <em>গভীরতম</em> <em>মর্মমূল</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>নাড়িয়ে</em> <em>দেয়নি</em><em>।</em> <em>এমন</em> <em>কোনো</em> <em>মুসলমান</em> <em>নেই</em><em>, </em><em>যার</em> <em>আদর্শ</em> <em>ও</em> <em>সৌন্দর্যের</em> <em>মান</em> <em>কুরআন</em> <em>নতুন</em> <em>করে</em> <em>গড়েনি</em> <em>এবং</em> <em>তার</em> <em>নিজের</em> <em>আলোকে</em> <em>নির্মাণ</em> <em>করেনি</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>মুসলমানরা কুরআনের এই দিকটিকে ই&#8217;জাজ বলে উল্লেখ করেছে, যার অর্থ হচ্ছে স্তব্ধ করে দেওয়া। &#8220;ই&#8217;জাজ পাঠককে একটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় স্থাপন করে, যা মোকাবেলা করার জন্য সে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু কখনো মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়না।&#8221; বস্তুত কুরআন নিজেই সর্বোচ্চ সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী আরব শ্রোতাগণকে আহ্বান করেছে কুরআনের মত কিছু সৃষ্টি করতে (২: ২৩) এবং তাদের ব্যর্থতার জন্য তাদের তিরস্কার করেছে (১০: ৩৮), (১১: ১৩), (১৭: ১৮)। রাসূলুল্লাহর সমসাময়িকদের মধ্যে ইসলামের কতিপয় শত্রু এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলার জন্য দাঁড়িয়েছিল, তারা তাদের বিরোধী এবং তাদের আপন বন্ধুদের বিচারে অপমানিত হয়েছিল<sup>১৪</sup>। মোহাম্মদকে (সা.) বলা হল &#8220;একজন ভূতাবিষ্ট মানুষ (১৮: ২২) এবং কুরআন একটি যাদুর কিতাব&#8221; (২১: ৫৩), (২৫: ৪), কেবল মাত্র শ্রোতাদের চেতনার উপর এর ক্রিয়ার কারণে।</p>
<p>প্রত্যেকেই এ সত্যটি বুঝতে পারে যে, যদিও কুরআনের আয়াতগুলো কবিতার কোন জ্ঞাত প্যাটার্নের সঙ্গে খাপ খায়না, তবু কবিতার মত একই প্রভাব বিস্তার করে এই সব আয়াত। <em>বলতে</em> <em>কি</em> <em>চূড়ান্ত</em> <em>মাত্রায়</em><em>, </em><strong><em>প্রত্যেকটি</em> <em>আয়াতই</em> <em>সম্পূর্ণ</em> <em>এবং</em> <em>নিজস্ব</em> <em>গুণেই</em> <em>নিখুঁত</em><em>, </em><em>প্রায়ই</em> <em>তা</em> <em>পূববর্তী</em> <em>আয়াত</em> <em>বা</em> <em>আয়াতসমূহের</em> <em>সঙ্গ</em> <em>ছন্দে</em> <em>মিলে</em> <em>যায়</em> <em>এবং</em> <em>তা</em> <em>পরম</em> <em>সৌন্দর্যের</em> <em>উচ্চারণ</em> <em>বা</em> <em>সাহিত্যিক</em> <em>অভিব্যক্তির</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিহিত</em> <em>এক</em> <em>বা</em> <em>একাধিক</em> <em>ধর্মীয়</em> <em>বা</em> <em>নৈতিক</em> <em>তাৎপর্য</em> <em>বহন</em> <em>করে</em><em>।</em></strong> এর আবৃত্তি এত প্রবল গতিসঞ্চার করে যে, শ্রোতারা অনিবার্যভাবেই এ আবৃত্তির সঙ্গে অগ্রসর হতে পরবর্তী আয়াতটি আশা করতে এবং তা শ্রবণের পর গভীরতম স্বীকৃতিতে পৌছাতে বাধ্য হয়। এর পর প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হয় পরবর্তী একটি, দুটি অথবা তিনটি বা তিনের অধিক একটি গুচ্ছ আয়াতের সঙ্গে<sup>১৫</sup>।</p>
<p>মুসলিম আরবরা কি সপ্তম শতকে কোনো শিল্প নিয়ে আর্বিভূত হয়েছিলো? তারা কি বিজিত জাতিগুলোর পরবর্তীকালে বিকশিত শিল্পকলায় প্রাসঙ্গিক কোন অবদান রেখেছিলো? অজ্ঞতা বা বিদ্বেষ বশে এবং প্রায়ই এতদ উভয়ের দুঃখজনক সংমিলনে, ইসলামী শিল্পের প্রত্যেকটি পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদ জবাব দিয়েছেন, &#8216;না&#8217;। এই শাস্ত্রের পিতামহ ঘোষণা করেছেন, &#8220;প্রথম যেসব লোক নিয়ে এই সব সেনাবাহিনী গঠিত হয় (ইসলামের প্রথম আরবীয় সেনাবাহিনী) তারা ছিলো মুখ্যত বেদুইন, এমনকি যারা স্থায়ী বসতি থেকে আসে, যেমন মক্কা ও মদীনা থেকে আগত লোকেরাও স্থাপত্য শিল্পের কিছুই জানতোনা<sup>১৬</sup>।&#8221; তরুণতর প্রজন্ম অন্তহীনভাবে বার বার একথাই বলে, &#8220;মুসলিম শিল্পকলা তার আরব অতীত থেকে বলতে গেলে কিছুই অর্জন করেনি<sup>১৭</sup>।&#8221;</p>
<p>সত্য তাদের এই সব অভিযোগের কত বিপরীত। গোটা ইসলামী শিল্পকলাই অর্জিত হয় আরব অতীত থেকে- যা কিছু গঠনমূলক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ সে সবের মর্মবাণী, নিয়মকানুন এবং পদ্ধতি, এ সবের লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের পন্থা, সমস্ত কিছুই নিশ্চয়ই দৃশ্য ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামী শিল্পকলার প্রয়াসের জন্য আবশ্যক ছিলো উপকরণের এবং বিষয়বস্তুর এবং যেখানে এগুলো পেয়েছে ইসলামী শিল্পকলা সেখান থেকে এগুলো নিয়েছে। কিন্তু শিল্পের অর্থ ও তাৎপর্য, তার ইতিহাস ও তথ্যের যে কোন আলোচনায় এগুলোকে ঋণ বলে উল্লেখ করা রচিবিরুদ্ধভাবে অগভীর। একটি শিল্পকর্ম শিল্প হয়ে উঠে তার শৈলী, তার উপাদান এবং তা প্রকাশের মাধ্যমে- সে যে সব উপকরণ ব্যবহার করে, যা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভৌগোলিক অথবা সামাজিক আকস্মিকতা থেকে অর্জিত। আরব চেতনায় ইসলামের মাধ্যমে এই ভিত্তির কারণে ইসলামী শিল্পকলা একটি ঐক্য। আরব চৈতন্যের রীতিপ্রণালীগুলোর দ্বারাই সকল মুসলমানের শিল্পসৃষ্টি নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে<sup>১৮</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>দৃশ্যশিল্পের</strong> <strong>নন্দনতাত্ত্বিক</strong> <strong>রূপ</strong></h4>
<p>পাশ্চাত্য দৃষ্টিনির্ভর শিল্পকলা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করে মানব প্রকৃতির উপর- মানুষের প্রতিকৃতি, ভূ-চিত্র, স্থির জীবন, এমনকি বিমূঢ়ত্ব, নক্সা বা নক্সাহীনতার মাধ্যমে, যেভাবেই প্রকাশিত হউক। ইসলামী দৃশ্যশিল্পের আগ্রহ ছিলনা মানব প্রকৃতিতে, বরং তার আগ্রহ ছিল ঐশী প্রকৃতিতে। যেহেতু মানব প্রকৃতির নতুন নতুন দিক প্রকাশ করা এর লক্ষ্য ছিলোনা, এজন্য এ শিল্প নন্দনতাত্ত্বিকভাবে ফিগার বা প্রতিকৃতির আলোচনা করেনি, অর্থাৎ মানব প্রকৃতির যে অসংখ্য বৈচিত্রপূর্ণ রূপায়ণ ঘটে তা চিত্রিত করেনি। মানব চরিত্র যা মানুষের প্রাকসিদ্ধ এমন একটি ধারণা, যে ধারণায় মানুষকে লক্ষ লক্ষ খুঁটিনাটিরূপে বিশ্লেষণ করা যায় বলে ধরে নেয়া হয়, যে সব খুঁটিনাটিতে মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্য একটি গভীরতা বা উচ্চতা উদ্‌ঘাটিত হয়, এসবই কিন্তু মুসলিম শিল্পীর লক্ষ্যবস্তু ছিলনা। ঐশী সত্ত্বা হচ্ছে তার প্রথম প্রেম এবং তার শেষ আবিষ্টতার বিষয়। তার জন্য ঐশী সত্ত্বার সম্মুখে দাঁড়ানো হচ্ছে অস্তিত্বের এবং সমস্ত মহত্ব সৌন্দর্যের শীর্ষবিন্দু। এই লক্ষ্যে মুসলমানরা নিজেদের চারপাশে জড় করে প্রত্যেকটি অবলম্বন এবং প্রত্যেকটি উদ্দীপক যা সেই ঐশী অস্তিত্বের উপস্থিতির সম্পর্কে ইতিহাসে সহায়তা করে।</p>
<p>প্রথমে, শৈলীকরণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে যেহেতু তার প্রকৃতিত্ব থেকে মুক্ত করা হয়, সেজন্য প্রথম দিকের আরব মুসলমানরা সেই উপায়টিকে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে যান। অধিকন্তু শৈলীকরণের অর্থ হচ্ছে বৈচিত্র বা পরিবর্তনকে অস্বীকার করা- কাণ্ড থেকে শাখা প্রশাখা পত্রপল্লব পর্যন্ত বিকাশ সাধন, যেমনটি ঘটে থাকে উদ্ভিদ জগতে, অংকন শিল্পের আগাগোড়া কাণ্ড এবং শাখার গাঢ়ত্ব হয়ে উঠে এক, অভিন্ন এবং আকার অথবা রূপ হয়ে উঠে একই। পরিবর্তনের অনুপস্থিতির কারণেও ক্রমবিকাশ বাতিল হয়ে যায়। একই চিত্রের মধ্যে সকল পত্র পল্লব এবং ফুল পায় একই রূপ। পরিশেষে প্রকৃতিবাদের প্রতি মৃত্যু আঘাত হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। বৃন্ত, এবং ফুল বার বার অংকন করে এবং সেগুলো একটি অপরটি থেকে অন্তহীন পর্যায়ে এমনভবে নির্গত দেখিয়ে যা প্রকৃতিতে অসম্ভব, প্রকৃতি সম্পর্কে সকল ধারাণাকেই মুছে দেওয়া হয়। পুনরাবৃত্তি এত নিশ্চিতভাবে এবং অভ্রান্তভাবে এই পরিণতি ঘটায় যে, তা আপন শত্রুকেও পর্যন্ত সয়ে যায়- অর্থাৎ বিকাশরূপ তার আপন শত্রুকেও সে বরদাস্ত করে- অবশ্য যদি একটি শিল্প কর্মের অংশে তার বিকাশ ঘটে ও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে সমগ্র শিল্পকর্মটির মধ্যে। এভাবে চৈতন্য থেকে প্রকৃতিকে নির্মূল করা হয় এবং তা প্রকৃতিকে চিত্রিত করা হয়। যদি দর্শকের চৈতন্যে বৃন্ত পত্রপল্লব এবং ফুল তখনো প্রকৃতির কোনো চিহ্ন বা অবশেষ রেখে দেয়, সে অবস্থায় সকল ভগ্ন, বৃত্তাকার ফোয়ারার মত উৎসারিত বা বংকিম রেখা যা ফ্রীলান্স, নক্সা বা জ্যামিতিক ফিগারে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এ কাজটি সম্পন্ন হবে সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্টতররূপে। এটিকে বৃত্ত, পাতা, ফুল উপকরণের সঙ্গে যুক্ত করে দর্শককে উদ্দিষ্ট (জ্যামিতিকতা এবং তার প্রাকৃতিকতার) দিকটি তুলে ধরে পরিশেষে পুনরাবৃত্তিকে যদি সিমেট্রির নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যাতে করে তা একই দূরত্ব বজায় রেখে সকল দিকে অগ্রসর হতে পারে, সে অবস্থায় শিল্পকর্মটি মর্মের দিক দিয়ে হয় একটি অনন্ত দৃষ্টিক্ষেত্র। ঘটনাক্রমে এই অনন্তক্ষেত্রের একটি অংশই মাত্র শিল্পী নিজের খেয়াল মত বেছে নেয় এবং পৃষ্ঠা, প্রাচীর, প্যানেল অথবা ক্যানভাসের বাস্তব ফ্রেমে তাকে সীমিত করে, যেখানে মানুষের ফিগারের জান্তব দিকটি ব্যবহৃত হয়, যেমন দেখা যায় ইরানের মিনিয়েচারে; সেখানে প্রকৃতিমুক্ত অবস্থা অর্জিত হয় প্রাণীটির শৈলীরূপ সৃষ্টি করে, <em>এবং</em> <em>মানুষের</em> <em>মুখমন্ডল</em> <em>এবং</em> <em>শরীরকে</em> <em>কোন</em> <em>বিশিষ্ট</em> <em>রূপ</em><em>, </em><em>চরিত্র</em> <em>এবং</em> <em>ব্যক্তিত্ব</em> <em>অর্পণ</em> <em>না</em> <em>করে</em><em>।</em> একটি ফুলেরবমতই একজন মানুষ অ- প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করতে পারে শৈলীকরণের মাধ্যমে কিন্তু আসলে ইহাইতো ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের বিমোচন। একারণেই, পারস্যের মহত্তম মিনিয়েচারগুলোতে সব থাকে একাধিক মানুষের ফিগার। তাদের একজনকে অপরজন থেকে স্পষ্টরূপে চিহ্নিত করা যায় না<sup>১৯</sup>। আরবী কবিতার মতই মিনিয়েচারগুলো চিত্রিত হয় অনেকগুলো অংশ নিয়ে, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন, যাদের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব একটি স্বাধীন কেন্দ্রবিন্দু রয়েছে। দর্শক যেমন কবিতার নক্সা বা ছকে স্থাপিত সাহিত্যিক মনিমুক্তাগুলো নিজ চৈতন্যে প্রত্যক্ষ করে, আনন্দের স্বাদ উপভোগ করে, একইভাবে দর্শক গালিচায়, দরজা, প্রাচীর, ঘোড়ার জিন, মানুষের পাগড়ি বা পোশাক ইত্যাদিতে মিনিয়েচারের একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লতাপাতার বৃন্তে শিল্পগুলো সম্পর্কে চিন্তা করে এবং তখন তাদের মনে এই প্রত্যাশ্যাও থাকে যে, আরও সব অনন্ত কেন্দ্র রয়েছে যার দিকে সে অগ্রসর হতে পারে<sup>২০</sup>।</p>
<p>ইসলামী শিল্পকর্মের সকল অংকন এবং অলংকরণে প্রশ্নাতীতভাবে রয়েছে গতি- প্রকৃতিপক্ষে যে গতি অনিবার্য একটি নক্সার এক ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটের দিকে এবং পরে এক নক্সা থেকে অন্য নক্সায় এবং আসলে, একটি দৃষ্টিক্ষেত্র থেকে অন্য একটি দৃষ্টিক্ষেত্রের দিকে, যেমনটি আমরা দেখতে পাই বড় বড় প্রাসাদের বিশাল তোরণে, সম্মুখ ভাগে অথবা প্রাচীরগুলোতে। কিন্তু এমন কোন ইসলামী শিল্প কর্মই নেই যেখানে গতি চূড়ান্ত। দর্শকের দৃষ্টি যে চলমান থাকে তাই মূল কথা। দর্শকের মন গতিশীল হয়ে উঠে অনন্তকে প্রত্যক্ষ করার সন্ধানে। ভর, আয়তন, স্থান, বেষ্টনি, সৌন্দর্য, সামঞ্জস্য, টেনশন এসবই হচ্ছে প্রকৃতির বাস্তবতা, যেগুলোকে অস্বীকার করতে হবে যদি অ-প্রকৃতির উপলব্ধি অর্জন করতে হয় স্বজ্ঞার সাহায্যে। কেবলমাত্র তেমন একটি নক্সাই, তেমন একটি মোমেন্টাম-স্রষ্টা প্যাটার্নই মুসলিম সৌন্দর্য- প্রেমিককে ঘিরে থাকে- সকল দিকে অনন্ত পৃথিবীতে ছাড়িয়ে হয়। এতে করে তার মধ্যে সৃষ্টি হয় একটি ধ্যানী মেজাজ যা ঐশী সত্ত্বার ইনটুইশনের জন্য আবশ্যক। কেবল একটি বইয়ের প্রচ্ছদের ডিজাইন নয়, যে আলোকিত পৃষ্ঠাটি সে পড়ছে তার পায়ের নিচের গালিচা, তার বাড়ীর সিলিং এর সম্মুখ ভাগ, ভিতর ও বাইরের প্রাচীরগুলোই কেবল নয়, বাড়ীটির মেঝের পরিকল্পনাও এমন একটি এরাবেক্স তৈরী করে, যেখানে বাগিচা, বাড়ীর উঠান, প্রবেশ কক্ষ এবং প্রতিটি কক্ষই একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র, লতাপাতার নিজস্ব শিল্পরূপ সমেত যা তার নিজস্ব গতি সৃষ্টি করে।</p>
<p>কিন্তু এরাবেক্স কি? আমরা উপরে এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছি একথা ধরে নিয়ে যে পাঠক এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। যথার্থভাবেই এধারণা করেছি, কারণ অন্য যে কোন শিল্পকর্ম থেকে এরাবেক্সকে মুহূর্তে পৃথক করে চেনা যায়। সকল মুসলিম দেশে এই শিল্পরূপটি সর্বব্যাপী, এটি সকল ইসলামী শিল্পকর্মের একটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা উপাদান। যথাযথই একে বলা হয় এরাবেক্স, কেননা আরবী কাব্য এবং আরবী কুরআনের মতই এটি আরবীয়, তার নান্দনিকতার দিক দিয়ে। এর অস্তিত্ব যে কোন পরিবেশকে রূপান্তরিত করে ইসলামী আবহে, এই বৈশিষ্ট্যটিই চূড়ান্ত রকমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্পকর্মে দান করে একটি ঐক্য। এটি সঙ্গে সঙ্গে চেনা যায় এবং আসলে এতে ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। মূলত এটি অনেকগুলো ইউনিট বা ফিগারের সমন্বয়ে রচিত যা একত্রে মিলিত হয় এবং এমনি ধারা পরস্পর জড়াজড়ি করে, যার ফলে একটি ফিগার বা ইউনিট থেকে অন্য একটি ইউনিটের অভিমুখে অগ্রসর হয় সকল দিকে, যতক্ষণ না শিল্পকর্মটিকে তার বাস্তব কিনার থেকে কিনার পর্যন্ত অতিক্রম করে গেছে দৃষ্টি। ফিগার বা ইউনিটটি অবশ্যই সম্পূর্ণ এবং স্বতন্ত্র, কিন্তু তা পরবর্তী ফিগার বা ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত, দৃষ্টি বাধ্য হয় অগ্রসর হতে একটি ফিগারের আউটলাইন এবং নক্সা অনুসরণ করে পরবর্তী ফিগারটির রূপরেখা এবং নক্সার অনুসন্ধানে। এতেই সৃষ্টি হয় ছন্দ। এই গতিটি মন্থর হতে পারে যতই ফিগারগুলো পরস্পর থেকে হবে অধিকতর বিচ্ছিন্ন। যাই হোক, ফিগারগুলো যতই অধিকতর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হবে যার ফলে গতি, যতি এবং ছন্দ সৃষ্টি হয় এবং রেখাগুলোর ঘূর্ণায়মানতা এবং ভগ্নতার দ্বারা যতই গতি বাধাগ্রস্থ হয় ততই বেশী শক্তি সঞ্চারিত হয় এরাবেক্স এর গতিবেগে। গতিবেগ যত বাড়বে ততই মনের জন্য সহজ হবে যুক্তিচিন্তার জন্ম দিতে, যাতে করে শিল্পকর্মের সীমা ছাড়িয়ে কল্পনায় ঝাপ দিতে পারে, মন যা চায় তা সৃষ্টির প্রয়াসে। এই প্রক্রিয়ার জন্য পুনরাবৃত্তি আবশ্যক। একারণে যেকোন শিল্পকর্মে ভিন্ন ভিন্ন রকম অনেকগুলো এরাবেক্স এর কাজ থাকে যার প্রত্যেকটি ঢেকে দেয় একটি কাঠামোগত অংশ। উদ্দেশ্যটি সুস্পষ্টঃ এর উদ্দিষ্ট উড্ডয়নের উপর কল্পনার উৎক্ষেপণ। এটি ঘটতে পারে দ্বিতীয়, তৃতীয় অথবা দশম এরাবেক্স-এ, যদি তা না আসে প্রথমটির সঙ্গে।</p>
<p>এরাবেক্সগুলো হয়ে থাকে লতাপাতা ফুলময় বা জ্যামিতিক, শিল্প মাধ্যম হিসেবে সেগুলো যে বৃন্ত, পত্র, ফুল ব্যবহার করলো (আল-তাওরিক) অথবা যে জ্যামিতিক বসম (ফিগার) ব্যবহার করলো, তার উপর ভিত্তি করে। জ্যামিতিক ফিগারটি হতে পারে খাত (রৈখিক) সৎ, যদি তা সরল এবং ভগ্ন রেখা ব্যবহার করে অথবা তা হতে পারে বংকিম (রামী) যদি তা ব্যবহার করে বহুকেন্দ্রিক বক্ররেখা। এ সমস্তরই সম্মেলন ঘটতে পারে এবং তখন তাকে বলা হর বাড়ী। এরাবেক্সগুলো হবে প্লানার বা সমতলিক, যদি সেগুলোর থাকে দুই আয়তন, যেমনটি আমরা দেখতে পাই প্রাচীর, দরজা, সিলিং, আসবাবপত্র কাপড়, গালিচা, পুস্তকের মলাট এবং পৃষ্ঠার সকল অলংকরণের মধ্যে। এগুলো স্থান বিষয়ক অথবা ত্রিমাত্রিক হতে পারে যা নির্মিত হয় স্ব স্ব, তোরণ এবং গম্বুজের পাঁজরের সাহায্যে। এই রূপটি হচ্ছে মাগরিব এবং আন্দালুসিয়ার স্থাপত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য যার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই কর্ডোভার মহান মসজিদে এবং গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদে। আলহামরাতে দৃশ্যমান তোরণের উপর স্থাপিত পরস্পর জড়াজড়ি করা বহু তোরণ দ্বারা নির্মিত হয়েছে একটি  সম্পূর্ণ গম্বুজ যা কেবলমাত্র উদ্দীপ্ত কল্পনাই প্রত্যক্ষ করতে এবং তাদের গতিপথ অনুসরণ করতে পারে। এখানে গতিবেগটি এমনই প্রচন্ড যে ছন্দের সঙ্গে অগ্রসর হতে ইচ্ছুক যে কোন ব্যক্তিকে তা পরিচালিত ও নিক্ষেপ করতে পারে অনন্তের সরাসরি উপলব্ধির দিকে। একটি প্রকাণ্ড মসজিদের মহৎ সম্মুখভাগ, একটা বিশাল প্রাচীরে প্রবেশ কক্ষের প্যানেল, দরজার যে হাতলের উপর দৃষ্টি হুমড়ি খেয়ে পড়ে, একটি পুস্ত কের পৃষ্ঠায় একটি মিনিয়েচার, একটি গালিচার নক্সা অথবা আপন কাপড় চোপড় বা বেল্ট কিংবা বেল্টের বাকল সবই মুসলিমের কাছে ঘোষণা করে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, কেননা সে অ-প্রকৃত বা সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যাওয়া অলৌকিক জগতের অসীমতা ও অনির্বচনীয়তা প্রত্যক্ষ করে এসবের মাধ্যমে<sup>২১</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>আরবী</strong> <strong>ক্যালিগ্রাফি</strong><strong>: </strong><strong>অতিন্দ্রীয়</strong> <strong>উপলব্ধি</strong> <strong>বা</strong> <strong>চৈতন্য</strong></h4>
<p>মুসলিম চৈতন্য ইন্দ্রিয়াতীত ঐশী সত্ত্বা নিয়ে এতটাই আবিষ্ট যে, মুসলিম উপলব্ধি চেয়েছে সর্বত্রই তার প্রকাশ দেখতে এবং ঐশী উপস্থিতি ঘোষণা করার পন্থা ও উপায় খুঁজে বার করার জন্য এই চৈতন্য এতটাই ব্যগ্র ছিল যে, এই করে পরম ভাব উচ্ছাসের সঙ্গে এমন একটি প্যাটার্ন নির্মাণ যা মানবজাতির অভিজ্ঞতায় আগে কখনো ঘটেনি। এমন কি দৃশ্য শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে এর প্রতিভার জন্য এরাবেক্স-এর অনন্ত বৈচিত্রও যথেষ্ট ছিলোনা। এ প্রতিভা প্রত্যেকটি চিন্তনীয় শিল্প প্রয়াসের বিষয়কে ব্যবহার করেছে, এমন একটি দর্পণে রূপান্তরিত করেছে যাতে এর মর্ম প্রতিবিম্বিত হয়। এটি তখন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো আরো একটি অধিকতর চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রাক-ইসলামী ইতিহাস, সাহিত্যিক গদ্য এবং কবিতায় শব্দের সৌন্দর্য বা নান্দনিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। যদিও এর ধারণা ইসলামের আবির্ভাবকালে, আরবদের অনুরূপ অন্য কারো হাতে ততটুকু বিকশিত ছিলনা, তবু মেসোপটেমিয় এবং হিব্রুগণ, গ্রীক এবং রোমানগণ এবং হিন্দুরা শব্দের নান্দনিকতার সীমান্তকে যতদুর প্রসারিত করেছিল, তা সামান্য বিষয় ছিল না। লিখন শিল্প ছিল অপরিপক্ক, স্থূল এবং সারা পৃথিবীতে সৌন্দর্যের বিচারে অনাকর্ষণীয় এবং এখনো প্রায় সর্বক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান। ভারত, বাইজানটিয়ান এবং খৃষ্টান প্রতীচ্যে লেখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে এর যথোচিত ক্যাপাসিটি অনুযায়ী, অর্থাৎ যৌক্তিক প্রতীক হিসেবে। খৃষ্টান ও হিন্দুধর্মের দৃশ্য (প্রতিকৃতি মূলক) শিল্পের প্রকাশ কল্পিত হয়েছে লিখনের মাধ্যমে, অর্থাৎ বাঞ্ছিত খণ্ড খণ্ড ধারণাকে প্রকাশ করার জন্য শব্দের যৌক্তিক প্রতীকতার সাহায্যে তা ব্যক্ত হয়েছে। দৃশ্যশিল্পকে উদ্ধার করার জন্য অসংলগ্ন বিষয়ান্তরগামী চিন্তার সাহায্যের প্রয়োজন নেই, যদি না সেই শিল্প বাঞ্ছিত প্রাকসিদ্ধ ধারণাটিকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে প্রকাশ করার জন্য অক্ষম হয়। এপোলো এবং এফ্রোদিতের জন্য এধরনের কোন অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলোনা দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপে, কেবল দৃষ্টহিসেবেই ওরা দর্শকের কাছে ঐশীত্ব প্রকাশ করেছে, কারণ মানব প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকেই এবং ইন্দ্রিয়কে প্রদত্ত চরিত্র থেকেই প্রত্যক্ষভাবে ঐশীত্ব বা প্রাকসিদ্ধ ধারণা উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাইজানটাইন বা হিন্দুশিল্পের ব্যাপারে তা ছিলোনা, কারণ এই শিল্পের ফিগারগুলো ইঙ্গিতময় কোনো সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত ছিল, যেখানে এগুলোকে কেবল শৈলীরূপ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে লেখার আশ্রয় নেওয়া হয়, প্রতিচ্যে এবং ভারতীয় শিল্পে এর ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, এর প্রতীকতা ছিল সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং কেবল বুদ্ধিগ্রাহ্য, আরবী অথবা রোমান সংখ্যার থেকে যা ভিন্ন নয়। ইসলামের পূর্বে আরবী ভাষা যে লিপিতেই লেখা হউক না কেন প্রকৃত ব্যাপার ছিল এই ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এবং দৃশ্য শিল্পকর্মে ইন্দ্রিয়াতীততা অর্জনের জন্য বলিষ্ঠ উদ্যোগের ফলে, লিখন শিল্পে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবার প্রতীক্ষায় ছিলো, ইসলামী প্রতিভা সাফল্যের সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আরবী &#8216;আল্লাহ&#8217; শব্দটি নাবাতি বর্ণমালা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নসখ রীতিতে (গোটা গোটা হাতের লেখায়) লিখিত হয় অথবা সিরীয় হরফের মাধ্যমে প্রাপ্ত আরামাইক, কুফী হরফে (কৌণিক)। অন্য যে কোন ভাষার মতই আগাগোড়াই এর তাৎপর্য ছিলো বলা যায়, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরগামী সম্ভবত আরো বেশী, এ কারণে যে, নিকটপ্রাচ্যের মানুষগুলো ক্যালিগ্রাফি বলতে যা বুঝায় তেমন কিছুর সঙ্গে পরিচিতই ছিলনা। রোমানরা ক্যালিগ্রাফিতে কিছুটা সামর্থ অর্জন করলেও হরফগুলোর তাৎপর্য আগের মত উজ্জ্বল, যৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক রয়ে গেল। আয়ারল্যান্ডের কেলটিক সন্যাসীরা Book of Kells এর মতো অল্প ক&#8217;টি উদ্ভাসিত পান্ডুলিপি তৈরি করেছিলো। কিন্তু তাদের ক্যালিগ্রাফি রোমান স্তরকে অতিক্রম করেনি। তাদের অক্ষরগুলো ছিল গোল গোল এবং অলংকরণের মাধ্যমে, সৌন্দর্যমন্ডিত, কিন্তু তার পূর্ণ তাৎপর্যটি যৌক্তিকই থেকে যায়। <em>অলংকরণ</em> <em>ছিল</em> <em>একটি</em> <em>অতিরিক্ত</em> <em>ব্যাপার</em><em>।</em> <em>কারণ</em> <em>এতে</em> <em>করে</em> <em>হরফগুলোর</em> <em>চরিত্র</em> <em>পরিবর্তিত</em> <em>হয়নি</em> <em>এবং</em> <em>প্রত্যেকটি</em> <em>হরফই</em> <em>একাকী</em> <em>অবস্থান</em> <em>করে</em><em>।</em> <em>দৃষ্টি</em> <em>এক</em> <em>হরফ</em> <em>থেকে</em> <em>আরেক</em> <em>হরফে</em> <em>পৌঁছায়</em> <em>লাফ</em> <em>দিয়ে</em> <em>এবং</em> <em>বোধশক্তিকে</em> <em>একাজে</em> <em>মধ্যস্থতা</em> <em>করতে</em> <em>হত</em><em>, </em><em>যুক্তি</em> <em>এবং</em> <em>স্মৃতি</em> <em>মিলিত</em> <em>হত</em> <em>গ্রাফিক</em> <em>অক্ষরগুলোকে</em> <em>শব্দ</em> <em>বা</em> <em>মনের</em> <em>ধারণায়</em> <em>রূপান্তরিত</em> <em>করার</em> <em>জন্য</em><em>।</em> <em>লিখিত</em> <em>হরফ</em><em>, </em><em>শব্দ</em><em>, </em><em>ছত্র</em> <em>বা</em> <em>বাক্যের</em> <em>কোনো</em> <em>নান্দনিক</em> <em>ইনটুইশন</em> <em>হতনা</em><em>।</em> ক্রমে ক্রমে দুই জেনারেশনের ব্যবধানের মধ্যেই ইসলামী শিল্প আরবী শব্দকে রূপান্তরিত করলো একটি দৃশ্য শিল্পকর্মে এবং তাতে সংবেদনাত্বক ইনটুইশনকে এমন একটি নান্দনিক অর্থ দান করে যা অসংলগ্ন কর্ম ক্ষমতা ও বোধকে যে অসংলগ্ন অর্থ দান করে তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্যান্য শিল্পকলার মতই এই নতুন শিল্প ছিলো ইসলামী চৈতন্যের সামগ্রিক লক্ষের অধীন। এরদৃশ্য সামর্থগুলোর বিকাশ ঘটানো হয় একটি এরাবেক্স নির্মাণ করার জন্য গ্রীক এবং ল্যাটিন বর্ণমালার মতই নাবাতি এবং সিরীয় বর্ণমালার হরফগুলো ছিল একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং স্বতন্ত্র। আরব শিল্পী এগুলোকে একত্রে যুক্ত করে দেয়, যাতে করে একটি অক্ষর প্রত্যক্ষ না করে দর্শকের চোখ একটি মাত্র দৃষ্টিপাতে এবং একটি সংবেদনাত্মক ইনটুইশনের সাহায্যে দেখতে পেতো পুরো শব্দটিকে এবং কার্যত গোটা বাকধারা বা ছত্রটিকে। দ্বিতীয়ত আরব শিল্পী অক্ষরগুলোকে করে নমনীয় যাতে করে সে অক্ষরগুলোকে প্রসারিত, প্রলম্বিত, সংকুচিত, নমিত, বিস্তৃত, সোজা, বাঁকানো, বিভাজন, গাঢ়করণ ক্রমে সংকীর্ণ করে আনয়ন, অংশত বা পূর্ণত বর্ধিতকরণ, যা খুশী তাই করতে পারে। হরফ হয়ে উঠে বংশবদ শিল্প উপকরণ, ক্যালিগ্রাফারের যে কোন নান্দনিক পরিকল্পনা বা ধারণাকে ধারণ ও কার্যকর করার জন্য যা থাকে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, এরাবেক্স শিল্পকর্মে এপর্যন্ত যা কিছু জ্ঞানলাভ হয়েছে শিল্পী তার সমস্ত কিছুকেই কাজে লাগায় ফুল ও লতাপাতার শিল্প রূপায়ণ এবং জ্যামিতিক চিত্রণ, কেবলমাত্র লেখন শিল্পের উৎকৃষ্টতর অলংকরণের জন্যই নয়, বরং লিখনকেই তার আপন অধিকারে একটি এরাবেক্স-এ রূপদানের জন্য আরবী লিখন এভাবে হয়ে উঠে একটি মুক্ত তরঙ্গিত রেখা যা এখানে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং নিজে নিজেই সম্পূর্ণ হতে পারে। মিল রেখে বিন্যাস করেই হউক বা বৃহৎ পরিবারে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়েই হউক অক্ষর বা বর্ণের নতুন করে অর্জিত নমনীয়তার ফলে ক্যালিগ্রাফারকে লিখনের ক্ষমতা দান করে দুটির একটি পন্থায় বা উভয় পন্থায়। সে যে নান্দনিক পরিকল্পনাটির বিকাশ ঘটাতে চায়, তার অনুসরণে। পরিশেষে সে অক্ষর বা হরফের এই মুক্তি সাধন করে, কেবলমাত্র এরাবেক্স অলংকরণগুলোকে গ্রহণ করার জন্যই নয়, বরং একটি বৃহৎ এরাবেক্স নির্মান করার জন্য তার সঙ্গে হরফকে মিশিয়ে দেয়। শিল্পী এটি সম্ভব করে তোলে- লিখন থেকে যাতে অন্য এরাবেক্সটি বিকাশ লাভ করে, অথবা সেসবের মধ্য থেকে লিখনের বিকাশ ঘটে। অক্ষরের যে মৌলিক প্রকৃতি অক্ষরকে বোধগম্যতা দান করে তা রক্ষিত হয়, এবং কাব্যে ছন্দের প্যাটার্ন এবং সমতল এরাবেক্সগুলোতে গঠিত যে সব জ্যামিতিক ও লতাপাতা ফুলের রূপ ও আকৃতি, বোধগম্য আকারে সেগুলোকে প্রকাশ করার মধ্যেই সৃষ্টি হতো তাদের গতিশীলতা। এরাবেক্স হিসেবে আরবী লিখন অসংলগ্ন রোধের চূড়ান্ত বাহনস্বরূপ অক্ষর বা যৌক্তিক প্রতীকগুলোকে রূপান্তরিত করে একটি সংবেদনাত্মক শিল্প উপকরণে এবং একটি নান্দনিক মাধ্যমে, যা জন্ম দেয় একটি অনন্য নান্দনিক ইনটুইশনের। মানবিক শিল্প হিসেবেই এ ছিল তার এক বিজয়, যার সাহায্যে অসংলগ্ন যুক্তির সর্বশেষ এলাকা অতিক্রম করে মানবিক শিল্পকে সংবদনাত্মক নান্দনিকতার জগতের সঙ্গে মুক্ত ও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এটি ছিল ইসলামের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত শৈল্পিক বিজয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলাম দাবী করে, আল্লাহর বাণী বা কালাম হচ্ছে চিন্তার দিক দিয়ে তার নিকটতম ধারণা? তাঁর ইচ্ছার আশুতম প্রকাশ; যেহেতু ইন্দ্রিয়াতীত হওয়ার কারণে তিনি অনন্ত কালই অজ্ঞেয় এবং অব্যক্ত মানবের গোচরে। সে কারণে তাঁর কালাম বা শব্দের মাধ্যমে প্রত্যাদেশের আকারে তাঁর ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে। তাহলে কুরআনের শব্দ হচ্ছে God-in-Percipi বুদ্ধিগ্রাহ্য আল্লাহ এবং একারণে সম্মানের দিক দিয়ে ও সৌন্দের্যের দিক দিয়ে তাকে দেওয়া উচিত চূড়ান্ত মর্যাদা। এজন্য ইসলামে এর লিখন হচ্ছে নান্দনিকতার চরম ও পরম। একারণে আরো যুক্তিসঙ্গত যে, আরবী ক্যালিগ্রাফির বিকাশ সাধন করতে হবে ঐশী সত্ত্বার সংবেদনাত্মক ইনটুইশন বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ঘটানোর জন্য- আল্লাহকে যে প্রকাশ করা যায় না, চেতনায় ব্যক্ত করা এবং প্রতিফলিত করা যায়না, তারই পূর্ণ উপলব্ধির মাধ্যমে। যেহেতু আরবী লিখন একটি এরাবেক্স হয়ে উঠেছে, সে কারণে তা যে কোন লিপিকর্মে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখানে আইনত অবস্থান নিতে পারে তার চিন্তামূলক উপাদান যাই হোক। যে কোন শিল্পকর্মের উপরে তা চড়াও হতে পারে, এবং এর নান্দনিক গতিবেগ বা মূল্যের পরিপূরক হিসেবে, আর সেই শিল্পকে করতে পারে মহিমান্বিত, শিল্প কর্মটির সংঘা লিখন সমন্বত বা অঙ্গীভূত হোক বা না হোক, সকল মুসলমান পবিত্র কিতাবের প্রতি যে শ্রদ্ধা পোষণ করে থাকে, <em>পরে</em> <em>লিখন</em> <em>শিল্প</em> <em>দ্রুত</em> <em>বিস্তৃতি</em> <em>লাভ</em> <em>করে</em> <em>এবং</em> <em>সর্বাধিক</em> <em>সংখ্যক</em> <em>মেধাকে</em> <em>সংহত</em> <em>করে</em> <em>ও</em> <em>প্রবেশ</em> <em>করে</em> <em>মুসলিম</em> <em>জীবনের</em> <em>প্রতিটি</em> <em>মুহূর্তে</em><em>।</em> <em>প্রস্তরে</em><em>, </em><em>কাঠে</em><em>, </em><em>কাগজে</em><em>, </em><em>চর্ম</em> <em>কিংবা</em> <em>বস্ত্রে</em><em>, </em><em>গৃহে</em><em>, </em><em>অফিসে</em><em>, </em><em>দোকানে</em><em>, </em><em>মসজিদে</em> <em>প্রত্যেকটি</em> <em>প্রাচীর</em> <em>এবং</em> <em>সিলিং</em><em>&#8211;</em><em>এ</em> <em>আরবী</em> <em>লিখন</em> <em>হয়ে</em> <em>উঠলো</em> <em>ইসলামের</em> <em>সাধারণ</em> <em>শিল্পকর্ম</em><em>।</em> এর প্রভাব এবং উপস্থিতি এত ব্যাপকতা লাভ করে যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোন নগরী বা গ্রাম এই শিল্পকর্মের ডজন ডজন মহৎ স্রষ্টা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়নি। <strong>এমনকি</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামের</strong> <strong>শত্রুরাও</strong> <strong>এই</strong> <strong>প্রভাব</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>মুক্ত</strong> <strong>ছিলনা</strong><strong>।</strong> <strong>খ্রীষ্টান</strong> <strong>স্পেন</strong><strong>, </strong><strong>ফ্রান্স</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইটালীতে</strong> <strong>চিন্তার</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>অজ্ঞতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>অযোগ্যতার</strong> <strong>বশে</strong> <strong>আনাড়ীর</strong> <strong>মত</strong> <strong>আরব</strong> <strong>লিখন</strong> <strong>শিল্প</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করেছে</strong><strong>, </strong><strong>তবু</strong> <strong>সেই</strong> <strong>ব্যবহারের</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>নান্দনিকতার</strong> <strong>দিক</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>তারা</strong> <strong>প্রভূত</strong> <strong>লাভবান</strong> <strong>হয়েছে<sup>২২</sup></strong><strong>।</strong> ইহা যে নান্দনিক সংবেদনাত্মক ইনটুইশনের জন্ম দেয় তা যে কোন এরাবেক্স শিল্পকর্মের মতই কল্পনা উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম, যে কোন যুক্তি অভিমুখে তার উর্ধ অভিসারী উড্ডয়নে, হয়তোবা তার চাইতেও বেশী, কারণ একই সময়ে এর অসংলগ্ন উপাদানগুলো পাঠ করতে সক্ষম দর্শকের জন্য আরবী লিখন বুদ্ধির সক্রিয়তার মাধ্যমে জন্মাবে কল্পনার লক্ষ্যের আরো বিশিষ্ট একটি রূপ, এর গতিবেগে সে লক্ষ্যের অভিমুখে আরো অগ্রসরতা। তাহলে, এ কোন বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে, কুরআন কপি করতে গিয়ে আরবী ক্যালিগ্রাফি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পকর্ম। রাজা বাদশা এবং প্রাকৃতজন প্রত্যেকই তাদের সমগ্র জীবনের জন্য একটি পরম আশা পোষণ করতেন: একখণ্ড সমগ্র কুরআন কপি করা এবং তা সমাপনের পর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ<sup>২৩</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জামাখসারির (তাঁর আছাদ আল বালাগা, দ্রঃ &#8216;কালাম&#8217;) বিবৃতি মতে উজির মোহাম্মদ আবু আলী মুকলা লিখনকে তুলনা করেছিলেন কাজের সঙ্গে এবং দুটি শিল্পকর্মের পরিকল্পনায় ও রচনায় অর্পণ করেছিলেন একই নান্দনিক দায়িত্ব। তিনি লিখন শিল্পের মৌল গুণ পাঁচটি বলে বর্ণনা করেছিলেন; আত্ তাওফিয়া (শব্দটি যেসব অক্ষর দিয়ে নির্মিত তার প্রত্যেকটিকে তার পূর্ণ অংশ প্রদান যাতে করে সমগ্র ও অংশের মধ্যে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসামঞ্জস্য হতে পারে), আল ইলমান (প্রত্যকটি অক্ষরকে তার জন্য প্রয়োজনীয় স্থান, ক্ষমতা ও গুরুত্ব প্রদান), আল ইকমাল (প্রত্যেকটি অক্ষরকে তার দৃশ্য ব্যক্তিত্ব প্রদান, যা প্রকাশিত তার ভঙ্গিতে, সোজা, দন্ডয়মান অবস্থায়, ফ্ল্যাট অবস্থায়, শুয়ে পড়ায়, দৃঢ় ন্যূজতায়, আত্মসমর্পণ, অভিজ্ঞতালব্ধ বক্রতায়); আল্ ইশবা (প্রত্যেকটি বর্ণকে তার অন্তর্গত দৃশ্য ব্যক্তিত্ব যার প্রকাশ ঘটে সূক্ষ্মতার মাধ্যমে প্রত্যেকটি অক্ষরের যা দাবী তা দান করা); আল ইরসাল (মুক্ত গতিতে রেখার উৎসারণ যা ইতস্ততা বা কোন অন্তর্গত প্রতিনিবৃত্তির দ্বারা বাধ্যগ্রন্থ নয়, যা উচ্চ গতির বেগ সৃষ্টি করে<sup>২৪</sup>)। আবু হাইয়ান আত্ তাওহীদী তার ইলমুল কিতাবাতে বলেনঃ &#8220;সাধারণভাবে লিখন হচ্ছে জাগতিক উপকরণ দিয়ে আধ্যাত্মিক চিত্রণ<sup>২৫</sup>।&#8221; <em>যুগ</em> <em>যুগ</em> <em>ধরে</em> <em>মুসলমানরা</em> <em>অজ্ঞাতনামা</em> <em>সাধু</em> <em>দরবেশদের</em> <em>উক্তির</em> <em>আবৃত্তি</em> <em>করেছেন</em><em>, </em><em>যেমন</em><em>: </em></p>
<blockquote><p><em>&#8216;</em><em>মানুষের</em> <em>মনের</em> <em>অবস্থান</em> <em>তাদের</em> <em>কলমের</em> <em>দাঁতের</em> <em>নীচে</em><em>,&#8217; &#8220;</em><em>লিখন</em> <em>হচ্ছে</em> <em>চিন্তার</em> <em>পানি</em> <em>সেচন</em><em>,&#8221; &#8220;</em><em>সুন্দর</em> <em>লিখা</em> <em>দুর্বল</em> <em>চিন্তার</em> <em>অভাব</em> <em>পূরণ</em> <em>করে</em><em>, </em><em>আর</em> <em>ধ্বনিকে</em> <em>তা</em> <em>দান</em> <em>করে</em> <em>জীবনীশক্তি<sup>২৬</sup></em><em>।</em><em>&#8220;</em></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>মধ্যযুগের বহু পণ্ডিত মানবিক বিষয়ে মহৎ খ্যাতি অর্জন করেছেন, যেমন ইবন আবদ রাব্বী, মোহাম্মদ আমীন, ইবনুন আছীর, ইবনুল নাদী, আল কালকাসান্দী প্রমুখ। এঁরা সকলেই লিখন ক্ষেত্রে সহগামী মুসলমানের কৃতিত্বকে স্বীকার করেছেন। তাঁরা এতে গর্বিত ছিলেন যে, অন্য যে কোন লেখনী শিল্পের চেয়ে আরবী লিখন অনেক বেশী বিকশিত হয়েছে। তারা গর্বিত যে, আরবী লিখন-সৌন্দর্য শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছে, এবং এমন অভিব্যাপ্তি ও গৌরব অর্জন করেছে যা সম্পূর্ণভাবে তুলনাবিহীন, এবং পরিশেষে এতে অর্পিত হয়েছে পরমমূল্য অর্থাৎ ধর্মীয় মূল্য, ঐশী প্রজ্ঞা প্রকাশের বাহন এবং মাধ্যম হিসেবে। কুরআনুল করীম তাদের মূল্য নির্ণয়ের অভ্রান্ততার চূড়ান্ত প্রত্যয় ও সন্তোষের সঙ্গে দাবী করে যে, লিখনকে অপার্থিব মর্যাদা দান করেছে একটি আয়াতে যার সূচনা কলম এবং লেখনীর তাকিদ দিয়ে<sup>২৭</sup>।</p>
<p>যেখানে, সমস্ত শিল্পকলাই সমজদারদের উপর চিং-প্রকর্ষ ও মানবিকতা-সৃজনকারী প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে গ্রীক এবং রেনেসাঁর শিল্পকলা মানুষের কাছে মানুষের নিজের মূল্য বৃদ্ধি করে এবং তার কল্পনা এবং ইচ্ছাকে আত্মউপলব্ধির বৃহত্তর উচ্চতায় উন্নীত করার জন্য তাকে অনুপ্রাণিত করে। গ্রীক এবং রেনেসাঁ শিল্প তা সম্পাদন করে মানুষকে একটা মহত্তর ও গভীরতর মানবিকতায় শিক্ষিত করে, এমন মহৎ এক মানবিকতা যে, তার চেতনায় তা লোপ পায় ঐশ্বরিকতার মধ্যে যা কিনা আশা ও সর্চোচ্চ জীবন মানের শীর্ষবিন্দু। ইসলামে শিল্পকর্ম উৎকর্ষ মানবিকতা ও আত্মউপলব্ধিকর একই প্রয়াস দেখা যায়। কিন্তু ইসলাম তা সম্পাদন করে মানুষকে প্রতিটি মুহূর্তে ঐশী উপস্থিতির সম্মুখে স্থাপন করে। ঐশীসত্ত্বা অপৌরুষেয় এবং ইন্দ্রিয়াতীত হওয়ায় ইসলামী শিল্পকলা যে আদর্শবাদের জন্ম দেয় তা কখনো দাম্ভিক অথবা অবাধ্য প্রমিথিউসের মত ছিলনা। যেহেতু তা ছিল মানবীয়, একারণে ইসলামী শিল্পকলার আদর্শবাদ নিজেকে নিয়ম-শৃংখলার অধীনে স্থাপন করে, তার নিজের ইন্দ্রিয়াতীত চেতনার মাধ্যমে। এটি কি সীমাবদ্ধতা? নিশ্চয়ই। এই সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয় ইন্দ্রিয়াতীত মূল্যমান দ্বারা সংজ্ঞা মতে যার সূচনা অনন্ত থেকে; এই সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সেই সব মূল্যের কারণে যেগুলো, সেসব বিষয়ে &#8216;বিভ্রান্তির&#8217; মাধ্যমে নয় বরং সোজাসুজি তার সামনে দাঁড়িয়ে, উৎকৃষ্টতরভাবে নিরীক্ষণ ও উপলব্ধি করা যায়। যেহেতু মূল্যের উভয় জগতই প্রাকসিদ্ধ, সে কারণে ধারণার দিক দিয়ে সে সব বিষয়ে মানুষের বিভ্রান্তি অসম্ভব এবং প্রমিথিউস হামেশাই একজন আত্মতুষ্ট ব্যক্তি। ইসলামী শিল্পকর্মের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে খোদ ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের অনুসন্ধান এবং সর্বদা পরম ট্রান্সেন্ডেন্ট বাস্তবতা থেকে পার্থক্যের দূরত্ব বজায় রাখা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>টীকা:</p>
<p>১. (আল্লাহ) আসমান এবং জমিনের স্রষ্টা। কোন কিছুই তাঁর মতো নয়। তিনি সমস্ত কিছু শোনেন এবং দেখেন (৪২: ১১)।</p>
<p>২. Arthur Schopenhaser. The World as Will and Idea. tr. R.B. Haldane and J. Kemp London: Routledge and Kegan Paul Limited) vol i. Third Book. p. 217.</p>
<p>৩. Friedrich Nietzsche. Works. tr. and ed Walter Kaufmaan (New York The Viking Press. 1954) পৃ. 459. Walter Kaufmann. Nietzsche. Philospher. Psychologist. Antichrist (Princeton: Princeton Press. Meridian Books. 1956) পৃ.102.</p>
<p>৪. Murray, Five Stages পৃ. 57,60,63.</p>
<p>৫. দ্র: এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221;.</p>
<p>৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬।</p>
<p>৭. দেখুন এই গ্রন্থারের &#8230; &#8220;Divine Transcendence&#8221; pp. 11-19.</p>
<p>৮. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221; P. 78.</p>
<p>৯. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;Divine Transcedence&#8221;&#8230;&#8230;.p. 22.</p>
<p>১০. দ্রঃ এই গ্রন্থারের&#8230; &#8220;On the Nature of the Work of Art in Islam&#8221;.</p>
<p>১১. যে কোন ব্যাকরণমূলক পাঠ অনুসারে এই ভূমিকা প্রায় সকল সেমেটিক ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ধাতৃমূল্যের ত্রি-ব্যঞ্জনমূলক কাঠামো সেমেটিক ভাষাতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>১২. দ্রঃ এই গ্রন্থারের প্রবন্ধ, &#8220;Islam and Art.&#8221; Studia Islamica fasciculi xxxvii (1973) পৃ. 93।</p>
<p>১৩. শ্রোতা এবং আবৃত্তিকার বা পরিবেশকের মধ্যে একই ধরনের সহযোগিতামূলক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হচ্ছে গোটা মুসলিম বিশ্বের মধ্যযুগের সঙ্গীত ও কবিতার মোসায়েরাগুলোর বৈশিষ্ট্য, যা দেখা যাবে ঐ আমলের সাহিত্যের প্রয়াস (যেমন: Kitab al Aghani by al Isfahani)।</p>
<p>১৪. Abd al qaidir al Jurjani, Dalail al l&#8217;jaz: (Cairo: Al Matba&#8217;ah al Arabiyah 1351 H).</p>
<p>১৫. Abu al Faraj al Isfahani. Kitab al Aghani (Beirut: Dar al Thaqafah. 1374/1955) witnesses to a countless number of such instances.</p>
<p>১৬. K.A.C. Creswell. Early Muslim Architecture (Oxford: Clarendon Press. 1932- 1940) vol. পৃ. 40.</p>
<p>১৭. দ্র: Richard Ethinghusen. &#8220;The Character of Islamic Art &#8220;The Arab Heritage ed. N.A. Fais (Princeton: Princeton University Press 1944) পৃ. 251-67.</p>
<p>১৮. দ্র: Al Faruqi &#8220;Urubah and Religion&#8221; p. 211.</p>
<p>১৯. T.W. Arnold, Painting in Islam (Oxford: the Clarendon Press, 1928) c,. t. 133.</p>
<p>২০. Sturt Cary Welch, A Kings: The Shah-Nameh of Shah Tahmasp (New York: Metropoliton Museam of Art, 1972), পৃ. 30.</p>
<p>২১. কোনো দৃষ্টি তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না, কিন্তু তিনি সমস্ত কিছু দেখেন। তিনি দয়াময় (৬: ১০৩)।</p>
<p>২২. ইতিহাসবিদরা &#8216;মোজারাবিক&#8217; শব্দটি সৃষ্টি করেছেন, খ্রিষ্টিয়ান, ইতালী ও স্পেনিস অলংকরণের সমুদয় ঐতিহ্যটি বুজানোর জন্য, যেগুলোর সঙ্গে আরবী Motive (মুলভাব) এবং নক্সা সংশ্লিষ্ট।</p>
<p>২৩. তা বুঝা যায়, কুরআনের পাঠের কপির অনন্ত বিপুলতায়, যা বাজনাবর্গ অভিজাতগণ এবং সাধারণরা, সকল স্তরের মানুষের কপি করেছিলেন, বা যা রয়েছে সকল স্তরের মানুষের অধিকারে।</p>
<p>২৪. Naji Zayn al Din. Musawwer al Khan al Arabi. Baghdad: Al Mujam al Ilmi al Iraqi, 1288/1968). p. 372.</p>
<p>২৫. ঐ, পৃষ্ঠা ৩৯৬, যাতে জইনুদ্দিন আত তৌহীদের রিসালা ফি ইলমূল কিতাবাত একটি অংশ উদ্ধৃত করেছে। এটি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি।</p>
<p>২৬. ঐ।</p>
<p>২৭. নুন। কলমের সাক্ষ্য এবং যা, তা লিপিবদ্ধ করে তার সাক্ষ্য (৬৮: ১-২) পাঠকের&#8230;. তোমার রাব্বের নামে, যিনি দয়াময়, যিনি কলম ব্যবহার শিখিয়েছেন, মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানতো না (৯৬: ৩-৫)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -14px; top: 15394px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-mysticism-of-aesthetics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14806</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উম্মাহর অন্তর্গত প্রাণশক্তি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-vitality-of-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-vitality-of-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 03 Sep 2024 13:51:21 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14782</guid>

					<description><![CDATA[ ক. উম্মাহকে বাদ দিয়ে ইসলামের অস্তিত্ব নেই আল্লাহ তায়ালা আদেশ করছেন &#8220;তোমাদের মধ্যে এক উম্মাহ্ হোক যে আহ্বান করবে কল্যাণের দিকে, পুণ্যকর্মের নির্দেশ দেবে এবং মন্দকর্ম নিষেধ করবে। যারা তা করে তারাই সফলকাম&#8221; (পবিত্র কুরআন ৩: ১০৪)। স্পষ্টতই মুসলমানরা আদিষ্ট]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h4><strong> </strong><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>উম্মাহকে</strong> <strong>বাদ</strong> <strong>দিয়ে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>অস্তিত্ব</strong> <strong>নেই</strong></h4>
<p>আল্লাহ তায়ালা আদেশ করছেন &#8220;তোমাদের মধ্যে এক উম্মাহ্ হোক যে আহ্বান করবে কল্যাণের দিকে, পুণ্যকর্মের নির্দেশ দেবে এবং মন্দকর্ম নিষেধ করবে। যারা তা করে তারাই সফলকাম&#8221; (পবিত্র কুরআন ৩: ১০৪)। স্পষ্টতই মুসলমানরা আদিষ্ট হয়েছে নিজেদেরকে উম্মাহক্তে পরিণত করতে অর্থাৎ একটি সামাজিক সংস্থারূপে গঠিত হতে- একটি বিশেষ পন্থায়। আল কোরআনের পাঠ আমাদের দেয় এমন আদেশ নির্দেশের &#8216;ইল্লাহ&#8217; বা ইল্লাত (প্রয়োজনীয় যুক্তি), অর্থাৎ &#8216;কল্যাণের দিকে আহ্বান এবং পুণ্যকর্মের তাকিদ দিতে ও মন্দকর্ম বারণ করতে।&#8221; অবশ্য এই ইল্লাহ হচ্ছে একমাত্র চূড়ান্ত কারণ বা পরম লক্ষ্য, উম্মাহ্ যা সাধন করবে। এর চাইতে একটি নিম্নতরো চূড়ান্ত কারণ বা যুক্তি (এবং সে কারণে নিমিত্তস্বরূপ কারণ) হচ্ছে এই সত্য বা বাস্ত বতা যে, উম্মাহ্ই কল্যাণের দিকে আহ্বান এবং পুণ্যকর্মের নির্দেশ ও মন্দ কর্মের নিষেধ সম্ভব করে তোলে। উম্মাহ্ হচ্ছে মুসলিমের অধিকার ও কর্তব্যের উৎস এবং এ সংস্থার বা সংগঠনের মধ্যেই এসব অধিকার অর্জন ও কর্তব্য সম্ভব হতে পারে।</p>
<p>মহানবী (সা.) এই বিধান দিয়েছেন, &#8220;কোনো দেশে বা স্থানে তিনজন মুসলমান থাকতে পারেনা, তাদের মধ্যে একজনকে ইমাম বা নেতা নির্বাচন না করে। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে অধিকারসমূহ সংরক্ষণ, আল্লাহর নির্দেশাবলী কার্যকরকরণ, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, হুদুদ বা আইনের সীমা বাস্তবায়ন এবং এ পৃথিবীতে এ অন্যজগতের সুখ শান্তি পরিপূরণ, তাই তাদের জন্য নিজেদেরকে একটি উম্মাহ্ বা একটি সুসংবদ্ধ সমাজে সংগঠিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই- যে উম্মাহর থাকবে নিজস্ব সরকার<sup>১</sup>।</p>
<p>কেউ কেউ আপত্তি উত্থাপন করে বলতে পারেন, ব্যক্তিগত মূল্যসমূহের বাস্তবায়নের জন্য উম্মাহ্ আবশ্যক নয়। পক্ষান্তরে তারা এ দাবী প্রবলভাবে করতে পারে যে, মূল্য যেহেতু তখনই সর্বোচ্চ যখন তা গোপণ থাকে, তাই সমাজ এ ধরনের রূপায়ণকে নষ্ট করে দেয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের জবাব এই যে, এ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে একটি খৃষ্টান দৃষ্টিভঙ্গি। নিশ্চয়ই ইসলাম বক্তিগত মূল্যসমূহের তাগিদ দেয়, সমষ্টিগতভাবে যে মূল্যগুলোকে বলা হয় ইখলাস, (নিয়্যত, সিদক, ইবতিগা, ওয়াজহু আল্লাহ, তুহুর, আমানত ইত্যাদি), কিন্তু সমভাবেই ইসলাম সন্যাসব্রতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে (কুরআন ৫৬: ২৭)। এর অনন্যতা এখানেই যে, ইসলাম দাবী করে, কোনো ইখলাসই বিশ্বাসযোগ্য নয়, যদি না দেশ ও কালের মধ্যে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য কর্মরূপে প্রতিভাত হয় এবং সেই সঙ্গে সমগ্র সমাজের উপর তা ইসলামের তাগিদে রূপান্তরিত হয়। খ্রীষ্টান ধর্মে সমাজ ও রাষ্ট্র হচ্ছে সীজারের এলাকা (মসিহ ২২: ২৭, মার্ক ১২: ১৭, লুক ২০: ২৫), লিখিত সুসমাচারের শ্লোকের উপর ভিত্তি করে খৃষ্টান ধর্ম ঐতিহ্যগতভাবে এই বিশ্বাস করে এসেছে। সমাজের ক্ষেত্রে যাতে প্রাসঙ্গিক এবং ব্যবহার্য হতে পারে এজন্য খৃষ্টান নীতি-দর্শনের পরিসর বৃদ্ধির জন্য জোরে শোরে চেষ্টা শুরু হয় রিফর্মেশনের পরে থেকে এবং ক্যালভিনের মতবাদকে ধরে নেওয়া হয় আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে। কিন্তু এসবই সংখ্যাগুরু লোকজনের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং কখনো তা বিশ্বাসের অংশ হতে পারেনি, কেবলমাত্র তাদের নিজস্ব দলীয় মতবাদের অনুসারীদের দৃষ্টিতে ছাড়া। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের পর যখন মানুষের উপর শোষণ, নির্মমতা ও অধঃপতনের চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হলো, কেবল তখনি খৃষ্টান বিবেক জাগ্রত হয়, সামাজিক সম্পর্কে ও জন আইনের রূপায়ণের সঙ্গে খৃষ্টের প্রাসঙ্গিকতা সম্প্রসারিত করার জন্য। কেবলমাত্র গত বিশ, ত্রিশ বছরের মধ্যেই এবং প্রধানত রেসিজম, কম্যুনিজম এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ার ফলেই এই উদ্যোগ তখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠে। তা সত্বেও খৃষ্টান মন-মানসিকতা সরাসরি উম্মাহ্-সদৃশ একটি খৃষ্টান নীতি শাস্ত্রকে স্বীকার করে নেয়নি। যেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে খৃষ্টের আবশ্যিকতা অনুভূত হয় সেখানেও খৃষ্টের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে এ দাবী দ্ব্যর্থবোধক, কেননা, এ দাবী মতে, খৃষ্ট হচ্ছেন, পৃথিবীতে সিজারগণ যা করেন তার বিপরীত। এ কখনো সিজারগণের কি করা উচিত<sup>২</sup> সে বিষয়ে খৃষ্টকে কিছুই বলতে দেখেনা।</p>
<blockquote><p>ইসলামের সমস্ত কিছুই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং সবকিছুই ধর্মীয় নির্দেশের পরিসরের মধ্যে পড়ে। বস্তুত: উম্মাহ্ হচ্ছে সকল পুণ্যকর্ম ও নৈতিকতার অপরিহার্য শর্ত। এজন্যই আল্লাহ মুমিনদের বর্ণনা করেছেন <strong>&#8220;সেই সব নারী ও পুরুষরূপে যারা একে অন্যের রক্ষক- যারা একে অন্যকে সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দকর্মে নিষেধ করে&#8221; (পবিত্র কুরআন ৯:৭১)</strong>। আরো সরাসরি তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সৎকাজে এবং পুণ্য অর্জনে একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে (পবিত্র কুরআন ৫:৩)। অপরপক্ষে আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দেন মন্দকর্মে একমত না হতে এবং পরস্পরের বিরোধীতা করতে, অপরাধ বর্জন ও আগ্রাসন বন্ধের জন্য (পবিত্র কুরআন ৫:৩)। শিক্ষামূলকভাবে তিনি সেই সব লোককে, অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন, যারা তাদের মধ্যে, যে সব মন্দকর্ম চলছিলো একে অপরকে তা নিষেধ করেনি (কুরআন ৫:৭৯)। এজন্যই মহানবী (সা.) বলেছেন, <strong>&#8220;যেখানে মানুষ, যারা একটি মন্দকর্ম অনুষ্ঠিত হতে দেখে এবং তা পরিবর্তনের জন্য কোনো চেষ্টা করেনা- আল্লাহ তাদের উপর শাস্তি নাযিল করবেন।&#8221;</strong> এবং তিনি এ যুক্তিতে তার বিচারের ব্যাখ্যা করেছেন যে, পাপ বা মন্দ কর্ম যখন গোপনে করা হয়, তা যে মন্দকর্ম করে, কেবল তারই ক্ষতি করে, কিন্তু যখন তা প্রকাশ্যে করে এবং কেউ তা নিষেধ করে না, তখন তা সকলেরই ক্ষতি করে<sup>৩</sup>।</p></blockquote>
<p>উম্মাহর আরো যৌক্তিকতা পাওয়া যেতে পারে, নীতিশাস্ত্রীয় চেতনা এবং ব্যক্তিগত নীতিদর্শনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে। প্রথমটি থেকে এ তথ্য উদঘাটিত হয় যে, নৈতিক নির্দেশ হচ্ছে এমন একটি জিনিস যা কেবলমাত্র নৈতিকতার অধিকারী কারক বা কর্তা, প্রকৃতি ও অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের আওতার মধ্যে অবস্থান করে এবং তার নিজের জীবন যাপন করে, কেবলমাত্র তার থেকেই তা পাওয়া যেতে পারে, তার মধ্যেই ব্যবহৃত হতে পারে এবং কেবলমাত্র তার পটভূমিকাতেই তার মানে হতে পারে। আল্লাহর খেদমত হচ্ছে তাঁর ইচ্ছার বাস্তবাস্তবায়ন এবং ঐশী অভিপ্রায় যেহেতু সেই সব মূল্য বা মৌলনীতি, যা সবকিছুকে মূল্যবান করে তোলে, তাই এ থেকে এ সিদ্ধান্ত সূচিত হয় যে, মানুষকে যদি আল্লাহর বন্দেগী করতে হয় তাকে অবশ্যই আন্তঃমানবিক সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, যার মাধ্যমেই কেবল নৈতিক মূল্যগুলোর বাস্তব রূপদান সম্ভব। ঠিক যেমন উপযোগী কিছুই মূল্যসমূহের বাস্তব রূপদানের জন্য দেশকালে চৌহদ্দিভুক্ত পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি দেহ বিমুক্ত আত্মার আবশ্যকতা-অর্থহীন, ঠিক তেমনি নৈতিকতার বাস্তবায়ন মানুষের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য, বন্ধুত্ব, বিবাহ, পড়শী, জাগতিক দ্রব্যাদির উৎপাদন ও ভোগ, যুদ্ধ ও শান্তি, বিচার ও রায়, মিশন ও শিক্ষা, অবকাশ ও নান্দনিক উপভোগ ভ্রাতৃসম্পর্কের ব্যাপারে অন্য মানুষের সাথে সম্পর্কহীন একজন গৃহত্যাগী, সাধু সন্যাসীর কাছে প্রত্যশা করা যায় না। নৈতিক মূল্যগুলো হচ্ছে একটি অতিক্রমী-দিব্য অবস্থায় কতগুলো আদর্শ সার নির্যাস মাত্র, যদিনা সেগুলো এধরনের আন্তঃমানবিক সম্পর্কের মধ্যে বাস্তবে রূপায়িত হয়। নৈতিকতার পূর্বেই এসব সম্পর্ক স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং এগুলোকে বাদ দিয়ে নৈতিকতা অসম্ভব। এই সব সম্পর্কের প্রত্যেকটি অস্বীকৃতি বা প্রত্যাহারের মানে হচ্ছে এর প্রাসঙ্গিক মূল্যটি, অর্থাৎ যে মূল্যের সঙ্গে ঐ সম্পর্ক হচ্ছে ভিত্তিমূল বা বাহক, তাতেই অবাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ। একজন ব্যক্তি, সন্যাসী বা সাধু, যে নির্জন জীবন যাপন করে, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তার ভিত্তি হচ্ছে মূল্যের এলাকার অবচ্ছেদনের উপর। কেননা এ জীবন পরিচালিত হয় এ নীতির দ্বারা যে, সচেতনতা বা কর্তার খোদ-আত্মা যে মূল্যগুলোর বাহন, দৃষ্টান্তস্বরূপ তার অনন্যতা ও নির্জনতা, কেবল এগুলো নিয়েই মূল্যের জগতে গঠিত, অথবা এসবই হচ্ছে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, যার স্বার্থে অন্য সব মূল্য লংঘন করা যায়। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে অন্যান্য মূল্যের অস্তিত্ব বিষয়ে সুস্পষ্ট অন্ধতা, একটা জবরদস্তি মূল্যগত ও দ্বৈতবাদ বা বর্জনকর মতবাদ। শেষোক্তটি হচ্ছে অন্যান্য মূল্যের প্রকৃত চালিকা শক্তি সম্পর্কে সংবেদনশীলতা, তাদের স্তরবিন্যাস সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত, প্রকৃতপক্ষে যা মূল্যতাত্ত্বিক চূড়ান্ততারই অস্বীকৃতি। এতে বিষয়ের কিছু নেই যে, নিঃসঙ্গ প্রতিটি মানুষ, বিখ্যাত সাধু সন্যাসীগণ এবং ইতিহাস বিশ্রুত সন্যাসীগণ সকলেই কঠোর, অসংযমী এবং প্রায়শঃ নির্দয় জীবন যাপন করেছেন<sup>৪</sup>।</p>
<p>যখনই ব্যক্তিক অর্থে নৈতিক পরিসরের সংজ্ঞা দেওয়া হয়, এর অনিবার্য পরিণতি ঘটে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদে, যার যৌক্তিক সমাপ্তি ঘটে আত্মপ্রচারে। কারণ চূড়ান্ত বিশ্লেষণে অবশ্যই তা নির্ভর করবে নৈতিক কর্তার অভ্যন্তরীণ নির্ধারণসমূহ বা উপাদানগুলোর উপর, যার বিচারক কেবল তার নিজের বিবেকই হতে পারে। নৈতিক ব্যক্তি বা এজেন্ট কামনা করতে পারে সর্বোচ্চ এবং মহত্তম পরার্থবাদী আদর্শ। ইচ্ছা যে কারণে নৈতিক হয়ে উঠে তা ধারণার দিক দিয়ে ইচ্ছাকৃত উপাদানটির মহত্ব বা পরার্থপরতা নয়, বরং ইচ্ছা করতে গিয়ে তার নিজের বৃত্তি যেভাবে ব্যক্ত হয়েছে তার উপরই তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিগত যে অভ্যন্তরীণ প্রতিজ্ঞা নৈতিকতা গঠন করে, তার এই অগ্রাধিকার বা সংকীর্ণ বৈশিষ্ট্যই তাকে করে তোলে আত্মপ্রচারশীল, সর্বক্ষণ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। যদি এ দাবী করা হয় যে, নিজেকে নিয়ে আবিষ্টতার মূলেও রয়েছে পরার্থপরতার প্রবর্তনা, যেমন দেখা যায় আত্মঈপ্সিত দৃষ্টান্তের মধ্যে, একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, যেহেতু নৈতিক এজেন্টের আচরণ যতই প্রকৃতি এবং অন্য মানুষের সঙ্গে বেশী করে সংশ্লিষ্ট হবে, ততই তার নিজের কিংবা মানবজাতির আচরণ সম্পর্কে, যে দৃষ্টান্তের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, জড়িত না হয়ে সেই দৃষ্টান্ত অর্জনের প্রবণতা দেখা যাবে। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে সকল যুগের এবং জাতির দরবেশ এবং সংসারবিরাগী সাধুসন্তদের নৈতিক অভ্যন্তরীণ প্রতিজ্ঞার দৃষ্টিান্ত হচ্ছে এই সব দরবেশ ও সাধুসন্ত, যাদের মধ্যে দেখা যায় পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নৈতিকতার দ্বারা জগৎ বিমুখতা, জগৎ বর্জন ও দেহকে নিগ্রহর। এটি সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, ইসলাম একটি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের ধর্ম, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ধর্ম, প্রাত্যহিক এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জালের মধ্যে অবস্থান করে, একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং পরস্পর প্রভাবিত হয়, অন্য মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং অন্যেরাও তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে বাদ দিয়ে ইসলাম সম্ভব নয়। বস্তুতপক্ষে মহানবীর (সা.) মশহুর উক্তি, &#8220;ধর্ম হচ্ছে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যবহারের বিষয়&#8221;, হচ্ছে এ পৃথিবীতে অন্য মানুষদের বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবার ইসলামী প্রবণতার প্রকাশক<sup>৫</sup>। আমরা ইতিপূর্বে যেরূপ উল্লেখ করেছি, সমাজের জন্য &#8216;হাই ইবনে ইয়াকজানের&#8217; এই আকুতি প্রকাশিত হয়েছে, সত্য আবিষ্কারের পর এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে, সম্ভাব্য তার সকল সুখ ও আনন্দ লাভের পর<sup>৬</sup>।</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>এক</strong> <strong>এবং</strong> <strong>একমাত্র</strong> <strong>উম্মাহ্</strong></h4>
<p>আল্লাহ বলেছেন, <strong>&#8220;তোমাদের এই উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ্&#8221; (কুরআনুল করিম ২১: ২৯, ২৩: ৫৩)</strong>। এই ঘোষণার দ্বারা আল্লাহ বলতে চেয়েছেন, মুমিনদের থাকবে একটি মাত্র উদ্দেশ্য, একটি ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ মূল্যমান যা, তাদের সমস্ত কর্মপ্রায়াসকে স্থাপন করে একটি সর্বপরিবৃত তাৎপর্যের অধীনে, যা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত। উম্মাহ্- এক এবং সবসময়ই তা একই থাকবে, কেননা আল্লাহ এক এবং তার ইবাদত এক ও অবিভাজ্য। কুরআন এবং মহানবীর সুন্নায় লিপিবদ্ধ এবং শরীয়ায় বাস্তবরূপে প্রতিফলিত, মানব জাতির জন্য আল্লাহর অভিপ্রায় সকল স্থানে এবং সকল সময়ে এক এবং অভিন্ন। তার অভিপ্রায় হচ্ছে সকল মানুষের জন্য এবং তার দৃষ্টিতে সকল মানুষ হচ্ছে সম্পূর্ণ সমান। তিনি বিশেষ কোন ব্যক্তি বা জাতির কাছ থেকে কম বা বেশী প্রত্যাশা করেন না, যা তিনি প্রত্যাশা করেন অন্য সকলের কাছে থেকে। তাই উম্মাহর এই একত্ব হচ্ছে ধর্মীয় এবং নৈতিক; জৈবিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক নয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহুদীদেরকে একটি উম্মাহ্ বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও তারা মুসলমানদের সঙ্গে একই অঞ্চলে বসবাস করতো এবং একই রাজনৈতিক, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক গ্রুপের অন্তর্গত ছিলো। যেহেতু তাদের আদর্শ ধর্মীয় এবং নৈতিক উভয়েই পৃথক, সে কারণে তিনি তাদেরকে একটি উম্মাহ্ বলে গণ্য করতেন। ইসলাম জীববিদ্যা, ভূগোল, রাজনীতি, ভাষা অথবা সংস্কৃতির ভিত্তিতে কোন উম্মাহ্ স্বীকার করেনা, কেবল ধর্মের ভিত্তিতে উম্মাহ্ স্বীকার করে। এজন্য আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সুপরিচিত ন্যাশান, জাতিগোষ্ঠী (race) রাষ্ট্র, মহাদেশ- এই স্তরবিন্যাসগুলো ইসলামে স্বীকৃত নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একথা বলার তাৎপর্য এ নয় যে, উম্মাত্র ধর্মীয় ঐক্য এধরনের ভিন্নতর ঐক্যগুলোর দ্বারা কার্যকর করা যায় না বা এগুলো পরিপূরক হিসেবে কাজ করেনা। স্থান ও ভূগোলের ঐক্য, ভাষা এবং সংস্কৃতির ঐক্য, জৈবিক জন্ম এবং জনগোষ্ঠীর ঐক্য, ধর্মীয় ঐক্যের সহায়তা করতে পারে এবং কার্যত করেও থাকে। <strong>&#8220;ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি হচ্ছে ঘনিষ্ঠতর আত্মীয় স্বজনেরা, মানুষের সৎকর্মে অধিকতর হকদার<sup>৭</sup>।&#8221;</strong> ইসলাম বলতে চায় যে, ধর্মীয় এবং নৈতিক উপাদানকে ডিঙিয়ে ব্যক্তি মুসলমান বা মুসলিম গ্রুপের আচরণ কিছুতেই দৈহিক নৈকট্যের দ্বারা নির্ধারিত হতে দেওয়া হবেনা। আল্লাহ বলেছেন, &#8220;আমি সকলকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ এবং এক রমণী থেকে এবং তোমাদেরকে ভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে ভাই-ভাই হিসেবে মেলামেশা করতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই হবে মহত্তম যে সবচেয়ে পুণ্যবান (কুরআনুল করীম ৪০: ১৩)। স্পষ্টতই দৈহিক নৈকট্যের স্থান, সৎগুণ ও নেক কর্মের নীচে, নৈতিক যোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত মেধার তুলনায় এর স্থান গৌণ, মূখ্য নয়।</p>
<p>তাই উম্মাহ্ জন্ম, ভূগোল এবং ভাষার বিষয় নয়। এগুলো হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা- নিরপেক্ষ এবং তজ্জন্য অপরিহার্য। একটি ধর্মীয় এবং ভ্রাতৃসমাজ হিসেবে উম্মাহ্ হচ্ছে ব্যক্তিবর্গের একটি স্বাধীন জামাত, যার লক্ষ্য, তাদের নিজেদের জন্য এবং মানব জাতির মধ্যে সকল মূল্যের জগত বাস্তবায়ন, যা ঐতিহ্যিক ইসলামী পরিভাষায়, &#8220;উভয় বাসস্থানে সুখ ও শান্তি, এ জীবনে এবং পরজীবনে।&#8221; মানুষ একটি অন্ধ সুযোগে উম্মাহর মধ্যে জন্মগ্রহণ করেনা, বরং একটি বুদ্ধিমান যুক্তিবাদী সত্ত্বা হিসেবে তার উম্মাহকে সে বেছে নেয় এবং তাতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। উম্মাহ্ একটি সম্প্রদায় নয়, একটি সমাজ; প্রকৃতিগতভাবে ইহা একটি সম্প্রদায় নয়, বরং স্বেচ্ছায় গঠিত একটি সম্প্রদায়, একটি সমাজ।</p>
<p>ঠিক প্রথম হিজরার পরে ইসলামী আন্দোলন যখন শুরু হল, সে সময়ে সম্প্রদায়ের সহজ রূপ, গোত্র এবং সাম্রাজ্য, যা জাতিগোষ্ঠী, ভাষা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপর স্থাপিত একটি রাজনৈতিক সমাজ, তার অস্তিত্ব ছিল এবং এগুলোর তরক্কি হচ্ছিল, ইসলাম উভয়কেই ধাক্কা দিয়ে ধূলিসাৎ করে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করে একটি বিশুদ্ধ সমাজ, ধর্মীয় ও নৈতিক বিধানের অধীনে একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং তাতে যোগদানের জন্য গোটা মানবজাতিকে আহ্বান করে। মানুষের সামাজিক ইতিহাসে এটি ছিল, এখনো রয়েছে মহত্তম নবধারা। <strong>এটা সত্য যে, সম্পূর্ণভাবে ধর্ম এবং নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে খৃষ্টান ধর্ম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে খৃষ্টানত্বের জন্য অপরিহার্য ধর্মীয় এবং নৈতিক উপাদানকে পর্যবসিত করা হয়েছে ন্যূনতম বিন্দুতে; অর্থাৎ ধর্মের অনির্বচনীয় পরীক্ষামূলক সাধনা এবং ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ের বিশুদ্ধতম নৈতিকতায়। এ উভয়ই ব্যক্তিগত, গোপন বা অভ্যন্তরীণ এবং এর সম্পাদন, বিচার ও মূল্যায়নের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ব্যক্তির বিবেক বুদ্ধির উপর এবং যে মুহূর্তে একে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ্য, সার্বজনিক বা সমাজভিত্তিক উপাদান অর্পণ করা হল, সে মুহূর্তেই রাজত্ব ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো এবং অংশত তা ফিরে গেল, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে স্থাপিত প্রাচীনতর সামাজরূপে।</strong> খৃষ্টান ধর্মের প্রথম দিকের বিভাগগুলো, যা ঘটেছিল নাইসিয়া এবং কেলসিডনে, প্রধানতই তা সংশ্লিষ্ট ছিল উচ্চতর মাত্রায়, এক দিকে সেমেটিক অন্যদিকে সাধারণ মানুষের গ্রীক, দল উপদলবাজীর মধ্যে। একইরূপে, ১০৫৮ খ্রীষ্টিয় শতকের মহামতবিভেদ ছিল প্রাচ্য বনাম প্রতীচ্যের মধ্যে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ষোল শতকের সংস্কার আন্দোলনে জার্মান, ইংরেজ, ফরাসী, ইতালীয়, ও ডাচদের জাতিগত প্রবণতাগুলোই, ব্যক্তিগতভাবে মনস্ত ত্বের দিক দিয়ে বিব্রত ক্যাথলিক সন্যাসী লুথার তাঁর আশ্রম গুরুদের কাছে যে ৯৫টি থিসিস উপস্থাপন করেছিলেন, সেগুলোর ফল নির্ধারণ করেছিল<sup>৮</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তাই ইসলামে উম্মাহর অভ্যন্তরে কোনো ধর্মীয় বিভেদ এবং কোনো নৈতিক স্বাধীনতা বা বিভাগ বৈধ নয়। উম্মাহর ধর্ম থেকে বিছিন্নতাও বেদাআত, কারণ ধর্মীয় ও নৈতিক অর্থে উম্মাহ্ হচ্ছে সন্দেহাতীত ভাবেই একটি এক শিলায় তৈরী স্তম্ভের মত ব্যবস্থা। এর বিপরীত কিছুতে বিশ্বাসের মানেই হচ্ছে এমন সব ধর্ম পালন ও এমন সব নৈতিক নীতি অনুসরণ যা ইসলাম থেকে ভিন্ন, স্পষ্টতঃই তা অযৌক্তিক এবং হাস্যকর। অধিকন্তু ইসলামের অভ্যন্তরে ধর্মীয় নৈতিক বিভিন্নতা অনুমোদন করার মানেই হচ্ছে তাওহীদকে পরিত্যাগ করা, যে তাওহীদ হচ্ছে সকল সত্য জ্ঞানের একত্বের মূলনীতি। এ হবে সত্যের প্রতি দুটি ভিন্ন দাবীর সহাবস্থান অনুমোদন করার নামান্তর। এই বিচার মোটেই যৌক্তিক নয়, কেননা এখানে যে সমস্যাটি বিরাজ করছে তা দাবী এবং প্রতিদাবীর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেতুবন্ধের মত বুদ্ধির সাহায্যে সত্যের অধিগম্যতার সম্ভাব্যতা মেনে নেওয়া, যার অর্থে দাবী এবং প্রতিদাবীর মধ্যে বিরোধের সমাধান হতে পারে এবং বিভিন্নতা দূর করা যেতে পারে। নিশ্চিতভাবে ইসলাম পরমসত্যের বহুত্বের বিরোধী, সত্য সম্পর্কে মতের বিভিন্নতার বিরোধী নয়। ইসলামের দাবী অনুসারে মতামত হতে হবে দায়িত্বশীল। ইসলাম নিজের পথ নির্ধারণে এ দায়িত্ব পালনের জন্য ইজমার ব্যবস্থা করেছে (ঐক্যমতের ব্যবস্থা করেছে)। ইসলামী আইন শাস্ত্রে উম্মাহর প্রত্যেকটি ঐক্যমতকে সৃজনশীল উদ্ভাবনশীল ব্যাখ্যাতা কর্তৃক লংঘন করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তৎসঙ্গে ইসলাম এ বিধানও দিয়েছে যে, ব্যাখ্যাকারকে এর জন্য উম্মাহর ঐকমত্য চাইতে হবে, অন্যথায় তা বেদাআত হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবে।</p>
<p>যাহোক, ধর্মীয় নৈতিক দিক দিয়ে উম্মাহ্ এক, একথা বলার তাৎপর্য এ নয় যে, উম্মাহ্ কোনো প্রশাসনিক বিভাগ স্বীকার করেনা। বস্তুত দক্ষতার প্রয়োজনে ও স্বার্থে, উম্মাহর মধ্যে যতগুলো প্রশাসনিক বিভাগ প্রয়োজন উম্মাহর অভ্যন্তরে ততগুলো বিভাগই  সম্ভব। শাফেয়ী মাযহাব রমাজানের প্রথম দিন নির্ধারণের জন্য ঈদুল ফিতর এর দিন নির্ণয়ের জন্য, এবং যাকাত তহবিলের বিতরণের জন্য ২৪ ফার্সাখ এর ইউনিট (১৯২ কিলোমিটার) স্বীকার করে<sup>৯</sup>। আজ সংগতভাবেই এ যুক্তি উত্থাপন করা যেতে পারে যে, যোগাযোগ টেকনোলোজিতে অসাধারণ উন্নতির ফলে সারা পৃথিবী একটি মাত্র প্রদেশ হয়ে উঠেছে। যাহোক জনপ্রশাসন কেবলমাত্র যোগাযোগের একটি বিষয় নয়। বলা যেতে পারে দক্ষতা ও সেবার দাবী অনুসারে উম্মাহ্ অবশ্যই বিভাজ্য।</p>
<p>এটা লক্ষ্য করতে হবে যে, উম্মাহর একটি বিভাগের মধ্যে প্রশাসনিক স্বায়ত্বশাসন সেই বিভাগকে আইন প্রণয়নের স্বায়ত্বশাসন দান করেনা। ইসলামে আইন প্রণয়ন একটি পূর্ণাঙ্গ ফিকাহ বা শরীয়ত দ্বারা শাসিত। এই পদ্ধতিতে সাধারণ নীতিমালাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের প্রয়োগ থেকে। সাধারণ নীতিমালার মধ্যে কোন পরিবর্তন স্বীকার করা হয়না, কারণ এ নীতিমালা আল্লাহ কর্তৃক জারীকৃত এবং যুক্তিগ্রাহ্য। মানুষের সৃজনশীলতার প্রয়োজন সেখানেই হয় যেখানে একটি নীতি বা মূল্যকে আচরণের নির্দিষ্ট মূর্ত নির্দেশে রূপদানের প্রয়োজন হয়। যাকে বলা যায় আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা দানের প্রয়োজন হয়, এবং প্রয়োজন হয় সেই সব নির্দেশনা পালন ও কার্যকর করণের। কেবলমাত্র মহানবীর (সা.) প্রদত্ত নির্দেশই আদর্শ, অবশ্য পালনীয়। ঐশী নির্দেশ অনুসারে তা ঘোষিত হয়েছে, &#8220;নবীর সুন্নাহর মধ্যে যে কেউ আল্লাহর সাহায্য চায়, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর আদর্শ (৩৩: ২১)।&#8221; অন্য সকলের জন্য প্রদত্ত ব্যবস্থা নির্দেশই হচ্ছে একটি মানবিক প্রয়াস, যাকে কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ হতে হবে এবং উম্মাহর ঐক্যমতের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।</p>
<p>উম্মাহর যে কোন প্রশাসনিক বিভাগের সৃজনধর্মী প্রয়াস, তার নির্দেশনার ক্ষেত্রেই হোক অথবা কার্যকারণের বেলায়ই হোক তা ইসলামিক আইনে একটি তর্কের বিষয়; এই আইনের বৈধতা সম্পর্কে পৃথিবীর মুসলমানদের প্রত্যয়ী করে অথবা মুসলিম বিশ্বের জনমত যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে, এবং বিতর্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন তা বর্জন বা পরিবর্তন করে এই প্রয়াসকে সার্বজনীনতা দান হচ্ছে প্রশাসনিক বিভাগের দায়িত্ব<sup>১০</sup>।</p>
<p>আমাদের কালকে বাদ দিলে, উম্মাহ্ তো সমগ্র ইতিহাসকালে ছিল একটি মাত্র শিলার দ্বারা তৈরী স্তম্ভের মত একটি ঐক্য; কেননা সব সময়ই তা এক বা অভিন্ন ইসলামী আইন দ্বারা শাসিত হয়েছে। রাজনৈতিক দিক দিয়ে কেবলমাত্র খোলাফায়ে রাশেদীন এবং উমাইয়া আমলে (১০-১৩১ হিজরা/৬৩২-৭৪৯ খ্রীষ্টিয় সন) উম্মাহ্ ঐক্যবদ্ধ ছিল, একটি অধি-রাজত্বের অধীনে, এর ইতিহাসের বাকি সময়টুকুতে ১২০০ বছরেরও অধিক কালের মধ্যে উম্মাহ্ বিভক্ত হয়ে পড়েছে বহু রাজনৈতিক বিভাগে; কিন্তু আইনের একত্ব ছিল তার চেয়ে দৃঢ়তর। এই আইন মুসলিম বিশ্বকে দিয়েছে তার বিভিন্ন অনুষ্ঠান, তার নৈতিক, ভিত্তি, এর জীবনে, এবং সংস্কৃতির রীতি ও ভঙ্গি, সকল জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মুসলমানদেরকে এই আইন এক এবং অভিন্ন আদর্শে শিক্ষাদান করেছে এবং একই আদর্শে নিবেদিত একটি ভ্রাতৃ সমাজের মধ্যে তাদেরকে সংহত করেছে। ইসলামী আইনের অভিন্নতা ও একত্ব, ইসলামের ইতিহাসের চৌদ্দশ&#8217; বছরের খণ্ডন ও বিচ্ছিনতার আশংকা মোকাবেলা করেছে সাফল্যের সঙ্গে, তৎসঙ্গে বৈদেশিক শক্তির বিজয়কেও ঠেকিয়েছে। যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যেতে পারে, বিশ্বব্যাপী মুসলিম ঐক্যের সর্বাগ্রবর্তী শক্তি এবং মেরুদন্ড উভয়ই হচ্ছে শরীয়ত, এই সত্য ও বাস্তবতাই উম্মাহকে করে তুলে একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃসমাজ, যেখানে সকল মানুষই হচ্ছে তার সদস্য, মূলত জন্মগতভাবে এবং কার্যত এই আইন বিশ্ব ভ্রাতৃসমাজে প্রবেশ করার স্বাধীন ব্যক্তিগত নৈতিক সিদ্ধান্তের বদৌলতে<sup>১১</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong> </strong></p>
<h4><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>উম্মাহগত</strong> <strong>ঐক্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>সংহতির</strong> <strong>প্রকৃতি</strong></h4>
<p><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>সর্বব্যাপকত্ব</strong></p>
<p>এটা আশা করা যায় যে, ইসলাম যে জীবনের একটি সামগ্রিক সর্বব্যাপক ব্যবস্থা ও পদ্ধতি তা প্রমাণের কোন আবশ্যকতা নেই। ইসলাম পৃথিবীকে পবিত্র-অপবিত্র, পাক-নাপাক এই দুই ভাগে ভাগ করেনা, জীবনকে ধর্মীয় এবং ধর্ম নিরপেক্ষ বলে স্বতন্ত্র গণ্য করেনা। মানুষকে পৌরোহিত্য ও পৌরোহিত্য-বহির্ভূত শ্রেণীতে পৃথক গন্ডীভূক্ত করেনা। ইসলাম এ সকল বিভাগকে কৃত্রিম, অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক গণ্য করে। ইতিহাসের বিচারে এ সমস্তই অমুসলিম ট্রাডিসনের আওতাভুক্ত, খৃষ্টান ট্রাডিসনের অংশ ইস্পেরিয়াল রোমের সর্বশ্রেষ্ঠ সেবাদাস খৃষ্টান ধর্মের ট্রাডিশন। আর এই ইম্পেরিয়াল রোমেই খৃষ্টান ধর্মের জন্ম হয় ও তার অবয়ব নির্মিত হয়।</p>
<blockquote><p>বস্তুতঃ ধর্ম দর্শনের সঙ্গে ইসলাম প্রাসঙ্গিক অর্থাৎ পরাবিদ্যার সর্বোচ্চ নীতিমালার সঙ্গে যেমন ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা বিদ্যমান, তেমনি তা ব্যক্তিগত প্রাত্যহিক জীবনের ছোটখাট খুটিনাটির ক্ষেত্রেও তা প্রাসঙ্গিক। পবিত্র কুরআনেই আমরা সত্ত্বার দ্বৈতরূপের স্বীকৃতি পাঠ করি: বাস্তব সৃষ্টি এবং সীমাতিক্রমী স্রষ্টা, প্রকৃতি এবং মানবভাগ্য, মানুষের স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব সকল সৃষ্টির কারকত্ব, নিমিত্তত্ব এবং নমনীয়তা, বিশ্বজগতের নিয়ম শৃংখলাবদ্ধতা, সত্য ও মূল্যের একত্ব, এবং একই ভাবে আমরা পাঠ করি, অভিবাদনের জবাবে উৎকৃষ্টতর অভিবাদনের আদেশ (কুরআন ৪: ৮৫), কোন গৃহে প্রবেশের আগে, প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনার (কুরআন ২৪: ২৬-২৮), অন্যদের চিৎকার না করে মোলায়েম ভাষায় সম্বোধনের, (কুরআন ৩১: ১৯)।</p></blockquote>
<p>কুরআন এবং সুন্নাহ মিলিতভাবে আচার-আচরণ, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিক নীতিমালা এবং সমাজপদ্ধতির একটি পরিপূর্ণ ব্যবস্থা আমাদেরকে দিয়েছে। এটা সত্য যে, কুরআন আমাদেরকে সকল খুঁটিনাটি দেয়নি, কিন্তু দিয়েছে সকল মৌলনীতি এবং দৃষ্টান্ত হিসেবে কিছু খুঁটিনাটি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোন একটি বিষয়ে মর্মকে সুষ্পষ্ট করে তোলার জন্য, অন্য ব্যাপারের চাইতে বেশী খুঁটিনাটি দেওয়া হয়েছে এবং সুন্নাহও তাই করেছে। কিন্তু ইসলামের পবিত্র গ্রন্থের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আল্লাহ তায়ালা কিংবা তার নবী (সা.) যে সব খুঁটিনাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি, সেগুলোর বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও বিশেষ রূপদানের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মুসলমানদের উপর। নিশ্চয়ই মুসলমানরা যোগ্যতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেছে এবং সামগ্রিক আইন ব্যবস্থা বিশদরূপ তৈরী করেছে মানুষের ইতিহাসে, তেমনটি যা আর কোথাও হয়নি<sup>১২</sup>। এই সামগ্রিক ব্যাপকত্বের তাত্ত্বিক ভিত্তি এই স্বতঃসিদ্ধ যে, মানুষের প্রত্যেকটি কর্মের মধ্যেই নিহিত রয়েছে, কোন না কোন মূল্যের সম্ভাবনা, যেহেতু উম্মাহর লক্ষ্য হচ্ছে এই মূল্যের বাস্তবায়ন, তা থেকে এই সিদ্ধান্ত সূচিত হয় যে, যেখানেই এই বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে, সেখানেই উম্মাহ্ তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টিত হবে। এর তাৎপর্য এই যে, মানুষের প্রত্যেকটি কর্মকান্ডের ব্যাপারে উম্মাহর কিছু না কিছু বক্তব্য থাকবেই। যেহেতু ইসলামী আইন এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, তাই উম্মাহর কোন প্রশাসনিক বা বিচার বিষয়ক পরিসরের বাইরে কোন কার্যই পড়েনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>বৈষয়িকতা</strong> <strong>বা</strong> <strong>অন্তঃস্থিত</strong> <strong>বিষয়াদি</strong></p>
<p>যে কোন একত্বের সামগ্রিক প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিক বা বিমূর্ত হতে পারে। বস্তুত, ব্যাপকতা যত বেশী হবে, একত্ব ততই বেশী শরীরী হয়ে থাকে। এবং একটি সমগ্র ধর্ম বা বিশ্বদৃষ্টি কিংবা নীতিমালাকে কয়েকটি বিমূর্ত শব্দের মধ্যে পুরে দেওয়া যেতে পারে-যা সবকিছু বোঝাতে গিয়ে কিছুই বুঝায় না। ইসলামের সামগ্রিক ব্যাপকত্ব বৈষয়িকতা বা উপাদানকে বর্জন করে অর্জিত হয়নি। পক্ষান্তরে, এর মোকাবেলায় দাঁড় করিয়েছে নিরেট উপাদান অর্থাৎ নীতিসম্মত প্রতিটি বাঞ্ছিত বিষয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনগত ব্যবস্থা ও নির্দেশ এবং যেখানে বিষয়টি আইনের বহির্ভূত সেখানে দিয়েছে মানুষের কর্মকান্ডের প্রত্যেকটি এলাকা ও কর্মের দিশারী হিসেবে বিশেষ মূলনীতি (dicta)।</p>
<p>উপাদান বা আধেয় বর্জিত সামগ্রিকত্বের দৃষ্টান্ত বহু। হিন্দু অনুধ্যানী চিন্তাবিদ সূর্য্যের নীচে এবং সূর্য্যকে ছাড়িয়ে সমস্ত কিছুই বোঝান &#8216;ওম&#8217; শব্দ দ্বারা; আমাদের সুফী অনুধ্যানী অনুরূপভাবে &#8216;হু&#8217; শব্দ দ্বারা তা ব্যক্ত করেন। দার্শনিকদের জন্য সমস্ত কিছু বোঝায় এমন একটি ফর্মুলার দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া একটি আকর্ষণীয় ব্যাপার। অবশ্য দুঃখজনক সত্য এই যে, এ রকম এক স্বর বা ধ্বনি বিশিষ্ট মূল পরিভাষার প্রভাবে মানুষ, পুণ্যময় আধ্যাত্মিকতা থেকে শুরু করে সকল প্রকার পাপকর্ম এবং পৌত্তলিকতার পথে বিচরণ করেছে। হিন্দু এবং সুফী উভয়ই জানে এই পরিভাষা এধরনের বিচ্যুতি থামাবার শক্তি রাখে না। একইভাবে, যেখানে হযরত ঈসার প্রাথমিক লক্ষ্যই ছিল শিলীভূত নিষ্প্রাণ আইন সর্বস্বতা ভেঙ্গে ফেলা, অর্থাৎ ইহুদীদের আক্ষরিকতার উৎসাদন, সেখানে তাঁর শিষ্যরা যা স্থির করল তা মূলত নৈতিক এবং ঐশিক অন্তর্দৃষ্টিকে একটি পরম পদ্ধতিতে সঞ্চারিত করার প্রয়াস, যেখানে সমস্ত নৈতিকতাই অন্তর্গত মানসিক বিষয়। হিন্দুর পরাতাত্ত্বিক একমাত্র বুলি &#8216;ওম&#8217; স্থলে খৃষ্টানরা প্রতিষ্ঠিত করল লাভ বা প্রেম, যে নৈতিক শ্রেণীতে পড়ে সমস্ত কিছুই। অগাষ্টিনের &#8220;আল্লাহকে ভালবাস এবং তোমরা যা ইচ্ছা কর&#8221; হয়ে দাঁড়াল সকলের জন্য এক হিতোপদেশ, যা যে কোন ব্যক্তি, যে কোন উদ্দেশ্যের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য ব্যবহার করতে পারে।</p>
<p><strong>আমাদের অবশ্যই এ বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ হচ্ছেন ধর্মের একজন চমৎকার ইতিহাসবিদ, যিনি ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো জানেন এবং ধর্মের ত্রুটিগুলো প্রত্যক্ষ করেন। যার প্রমাণ মেলে কুরআনুল করিমের বহু আয়াতে। এজন্য এটা খুবই স্বাভাবিক যে, ইসলাম, যার আবির্ভাব হয়েছে ঐতিহাসিক ধর্মগুলোর সংস্কাররূপে, তাতে আল্লাহ আমাদেরকে কেবল এক বা একাধিক সাধারণ নীতি দান করেন নাই, বরং দিয়েছেন নৈতিকতার নির্দিষ্ট বিষয়স্বরূপ উপাদান বা আধেয় এবং বিশেষ আদেশ ও নিষেধ, যেখানে বিশেষ উপাদান বা আধেয় অনুপস্থিত সেখানে ইসলামের বিধান হচ্ছে অনুসন্ধান করে তা বের করা এবং প্রতিষ্ঠিত করা মানুষের কর্তব্য।</strong></p>
<p>স্পষ্টতই ইসলাম যেহেতু সামগ্রিক, এবং উপাদান বা আধেয়ের ধারক, তাই ইসলাম হচ্ছে এক শিলায় নির্মিত বিশাল স্তম্ভের মতই একক। এর লক্ষ্য হচ্ছে খুঁটিনাটি প্রত্যেকটি বিষয়ে সম্পূর্ণ একটি পদ্ধতি গড়ে তোলা, যাতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবন হবে নিয়ন্ত্রিত। অমুসলমানরা শরীয়ার সমালোচনা করেন, কারণ শরীয়াহ হচ্ছে সম্পূর্ণ (অর্থাৎ সামগ্রিক)<sup>১৩</sup>। তাঁরা ঠিকই বলে থাকেন, ইসলামের সামগ্রিকত্ব এবং আধেয়ত্ব এক সন্দেহাতীত বাস্তবতা, কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে ইসলাম ধর্মের বৈশিষ্ট্য, এর অনন্যতা ও মূল্যও।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৩</strong><strong>. </strong><strong>গতিশীলতা</strong></p>
<p>সংজ্ঞার দিক দিয়ে মনোলিথিক ব্যবস্থা হচ্ছে বর্জনধর্মী একটা ব্যবস্থা, যা চার দিক থেকে আবদ্ধ এবং বিদেশী অপরিচিত বা নতুন সকল উপাদানের ক্ষেত্রে রুদ্ধদ্বার, কোন কিছুকেই গ্রহণ করতে বা বুকে স্থান দিতে রাজী নয়। এই হচ্ছে প্রাচ্যবিদের শরীয়ার সামগ্রিকত্ব ও উপাদানের যে সমালোচনা করে থাকেন তার সারমর্ম। তারা বলে থাকেন, শরীয়াহ তার ইতিহাসের একটি একমাত্র প্রকৃত মহৎ মুহূর্তেই, অর্থাৎ যখন তা তার পূর্ণতায় পৌছেছিল তখনই, একটি পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে, তার লক্ষ্যে উপনীত হয়েছিল। যখন এই শীর্ষ বিন্দুতে সে পৌছল তখনই শুরু হয় অবক্ষয়, তার নিম্নগতি, কারণ এর মধ্যে নিজেকে বার বার পুনর্জীবিত করার যে শাশ্বত চরিত্র রয়েছে তাকে তা অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হবে। কিন্তু মনোলিথিক পদ্ধতি নতুন নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বদলাতে পারেনা এবং এজন্য তা অবশ্যই নতুন প্রবর্তনার বিরোধিতা করতে বাধ্য হবে এবং প্রত্যেকটি পরিবর্তনাই হচ্ছে &#8216;বেদায়াত&#8217;, এটিও একটি বৈধ সমালোচনা; কিন্তু সে সমালোচনা শরীয়ার সমালোচনা নয়, মুসলিম ফকীহ ও তাদের অনুসরণকারীদের সমালোচনা; যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই শরীয়ার বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। আসলে আমাদের মধ্যযুগের পূর্বপুরুষগণই ইসলামকে এই পথে তুলে দিয়েছিলেন। তারা ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দেন, এবং ঘোষণা করেন, প্রথম ইজমা হবে সালাফের ইজমা, (সালাফ মানে আদি প্রজন্ম), অর্থাৎ সাহাবাদের ইজমা, নবীর সহচরদের ইজমা, যাতে করে কোন বেদায়াত প্রবর্তিত হতে না পারে। আজ আমরা তাদের সময়ের প্রয়োজন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পারি এবং তাদেরকে ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু আজকের মুসলমানদের জন্য তাদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ হাস্যকর।</p>
<blockquote><p>ফিকাহ্-উসুলের যে সব পন্ডিত মধ্যযুগে শরীয়াহ-এর স্পষ্ট রূপদান করেছিলেন এবং তাকে উন্নীত করেছিলেন পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে তারা এর মধ্যে আইনের স্বয়ংক্রিয় নবরূপ অর্জনের সূক্ষ্মতম যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করতে যত্নবান ছিলেন<sup>১৪</sup>। তারা মুসলমানদের দিয়েছিলেন সহীহ আইন এবং তার সঙ্গে দিয়েছিলেন তাকে নতুন রূপদানের প্রতিষ্ঠান ও উপায়সমূহ, এবং তা যতোটা সহীহ ছিল তার চাইতে তাকে আরো নিখুঁত করতে অথবা সকল সময় ও সকল কালের জন্য আইনের এই সম্পূর্ণতা প্রাসঙ্গিকভাবে যাতে কার্যকর হতে পারে তা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছেন। আধুনিক কালে স্বল্প কয়েকটি প্রয়াস ছাড়া মুসলমানরা শরীয়াহ-এর নবায়নের এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটির কোন ব্যবহারই করেনি (অর্থাৎ ইজতিহাদ, কিয়াস, ইজমা, ইসতিহসান, আল মাসালিহ, আল মুরসালাহ ইত্যাদি)। সেই যন্ত্রটির বিশ্লেষণের স্থান এটি নয়, তবে যে তত্ত্বগত বুনিয়াদের উপর তা দাঁড়িয়ে আছে তা অবশ্যই বিচার করে দেখতে হবে।</p></blockquote>
<p>ইসলাম হচ্ছে সোনালী মধ্যপন্থার ধর্ম: &#8220;এবং এভাবে আমি তোমাদেরকে (মুসলমানদেরকে) করেছি উত্তম মধ্যপন্থী উম্মাহ যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য হতে পার প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের জন্য প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত&#8221; (কুরআন ২: ১৪৩)। এই নীতি বিশেষ এবং নির্বিশেষ, বিশ্বজনীন এবং নির্দিষ্ট বিশেষিতেক ও উপাদানপূর্ণ, মনোলিথিক, এবং বহুমুখী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং বিশেষাত্মক উভয়ই, এবং ইহাই এর শক্তি। ইসলাম আমাদেরকে দিয়েছে সাধারণ আইন এবং তার সঙ্গে আমাদেরকে অনুমতি দিয়েছে যেখানে প্রয়োজন সেখানে তা ভঙ্গ করতে। অর্থাৎ যখন সাধারণ আইনে বিধৃত একটি মূল্যকে অনুসরণের ফলে, একটি উচ্চতর মূল্য লংঘিত হয়, চুরি, নরহত্যা, শূকর মাংস ভক্ষণের বিরুদ্ধে কুরআনের নির্দেশমালা, সালাত, রোজা, পিতামাতার জন্য সম্মান, এমনকি হজ্জ সম্পর্কে কুরআনের বিধানসমূহ এসবই এবং আরো বেশী ক্ষেত্রে লংঘন করা যেতে পারে, যখন এই আদেশ নির্দেশের পালন একটি উচ্চতর ইসলামী মূল্যকে লংঘন করে অথবা এধরনের মূল্যের বাস্তবায়নকে বিঘ্নিত করে। <strong>কেবলমাত্র যে নীতিটির ক্ষেত্রে ইসলামে কোন ব্যতিক্রম নেই, তা হচ্ছে তাওহীদ। &#8220;আল্লাহ শিরকের অপরাধ কখনো ক্ষমা করেননা, কিন্তু যাকে ইচ্ছা তিনি এর চাইতে কম গুরুতর যে কোন পাপ ক্ষমা করে দেন&#8221; (কুরআন ৪: ৪৭)। ইসলামের আদেশ- নির্দেশের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের অবকাশের মধ্যেই রয়েছে ইসলামের গতিশীলতা। যদি বিগত শতকগুলোতে মুসলমানরা এই চাবিগুলো ব্যবহার না করে নিজেদেরকে বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করে রেখে থাকে, এ জন্য কেবল মুসলমানদেরকেই অপরাধী সাব্যস্ত করতে হবে, আর কাউকে নয়। এছাড়া আর কোনো নীতিই চূড়ান্ত ও অলংঘনীয় নয়, ইসলাম হচ্ছে ভারসাম্যের ধর্ম।</strong> যেমন তা শিল্পের ক্ষেত্রে, সাহিত্যসহ এর সকল শিল্পের বেলায় যা গড়ে উঠেছে তাওয়াজুন (ভারসাম্য) এর এই নীতির উপর, তার খোদ মূল্যতত্বই হচ্ছে পরস্পরবিরোধী দুটি মূল্যের সূক্ষ্ম মিশ্রণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য স্থাপন। ইবনে তাইমিয়া কি সুন্দর করেইনা তাঁর আল সিয়াসা আল শরীয়াতে বলেছেন &#8220;ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম, যে বেশী করে এবং যে কম করে, তাদের মধ্য স্থলে যার অবস্থান।&#8221; এই গুণটিই নিজেকে দ্বীনিউল ফিতরাত (আল্লাহর দ্বীন, স্বভাব ও যুক্তির দ্বীন, ভারসাম্যের দ্বীন এবং সোনালী মধ্যপন্থা) বলে দাবী করার যোগ্যতা দান করে ইসলামকে। ইসলামের এই তাওয়াজুন তথা ভারসাম্য সোনালী মধ্যপন্থা এবং গতিশীলতার একটি অতুলনীয় অভিব্যক্তি।</p>
<p>আমরা দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহর (সা.) জবাবে যখন, ইসলামের একটি উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কিছু সংখ্যক লোক তাঁকে বলেছিলো, &#8220;এখন থেকে আমরা আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি দিন রোজা রাখবো, সরারাত বন্দেগী করবো এবং আমরা কখনো আমাদের স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করবোনা&#8221; মহানবী তখন বললেন, &#8220;কিন্তু আমিতো বছরের কিছু সংখ্যক দিনে রোজা রাখবো, বাকি দিনগুলোতে খাওয়া দাওয়া করবো। আমি ইবাদত করবো এবং নিদ্রাও যাব, এবং আমি স্ত্রীলোকদের বিবাহ করবো, যারা আমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে চাইবে না তারা আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য হবেনা।” তালিকা করা যায়না এমন বহুসংখ্যক আয়াতে কুরআন আমাদেরকে বলেছে, সেই সব মূল্যগত উপাদানের মোকাবেলায় যুক্তিগ্রাহ্য কান্ডজ্ঞান হিসেবে ইসলামের সারমর্ম- যে উপাদানগুলোর মধ্যে কল্যাণ এবং অকল্যাণ উভয়েরই সমান সম্ভাবনা, পৃথিবীর সকল শুভ বস্তুই এর মধ্যে পড়ে<sup>১৫</sup>। কুরআন এরমাত্র কয়েকটি উল্লেখ করেছে &#8220;যেমন রমণী, শিশু, স্বর্ণ-রৌপ্য, অশ্বরাজি, গৃহপালিত জীবজন্তু এবং ক্ষেত খামার।&#8221; এবং এভাবে মানবমনে পৃথিবীর সঙ্গে যে সবের সম্পর্ক তখন ছিলো এবং এখনো সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট রয়েছে, সেগুলোকে একত্রিত করেছে (৩: ১৪)। বহু সংখ্যক আয়াতে এগুলো অমঙ্গলকর বলে ঘোষিত হয়েছে এবং মুসলমানদেরকে এসব সম্পর্কে হুশিয়ার করে দিয়েছে। অথচ (৭: ৩১) আয়াতে এগুলো ঘোষিত হয়েছে কল্যাণকররূপে এবং এসব অর্জনের জন্য মুসলামনদের প্রয়াসকে সমর্থন করা হয়েছে। মূল নিয়ামক নীতিটি দেওয়া হয়েছে (৯:২৫) আয়াতে, যেখানে তিরস্কার করা হয়েছে ভ্রান্ত শ্রেণীবিভাগকে, আল্লাহ ও তাঁর নবীর উপর এ শ্রেণীবিভাগকে, মানুষ কর্তৃক প্রাধান্য দানে আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মনিয়োগের উপরে। স্পষ্টতই সোনালী মধ্যপন্থার মানে হচ্ছে দুটি অ-মূল্যের মধ্যবর্তী পন্থা; কিন্তু তা এক এবং অভিন্ন মূল্যের অনুসরণের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্য যার মধ্যে সমন্বয় ঘটে, অন্য সকল মূল্যের নয়, যা প্রত্যেকটিকে দেয় তার যথোচিত প্রাপ্য<sup>১৬</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>৪</strong><strong>. </strong><strong>আঙ্গিকতা</strong></p>
<p>উম্মাহর ঐক্য হচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় একটি জীবদেহের ঐক্যের মত; অর্থাৎ উম্মাহ্ হচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় একটি দেহের মত যার প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে অন্যের সঙ্গে এবং সমগ্রের উপর পরস্পর ও আলাদা আলাদাভাবে নির্ভরশীল। একটি অঙ্গ যখন নিজের কাজ করে, তখন তা যেমন অন্যান্য অঙ্গের জন্যও কাজ করে, তেমনি তা নিজের প্রয়োজনে সমগ্রের জন্যও কাজ করে। উহা যখন নিজের কাজ করে, তখন ইহা বিভিন্ন অঙ্গের প্রত্যেকের জন্য কাজ করে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সফলকাম বলে বর্ণনা করেছেন,<strong> &#8220;যাদের সম্পদে তারা অভাবগ্রস্থ ও বঞ্চিতের অধিকার স্বীকার করে&#8221; (৫:১৯)</strong>। এবং মহানবীর উম্মতদের বর্ণনা করেন এভাবে যে <strong>&#8220;তারা অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে কঠোর, কিন্তু নিজেদের বেলায় একে অন্যের প্রতি কোমল ও দয়ালু; এ এমন একটি ভ্রাতৃসমাজ যাতে আল্লাহকে কেন্দ্র করে একে অন্যের প্রতি পারস্পরিক ভালবাসার দ্বারা তাদের হৃদয় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে&#8221; (৪৮:২৯)</strong>। মহানবী (সা.) মোক্ষম কথা বলেছিলেন, যখন তিনি উম্মাহকে বর্ণনা করেন <strong>&#8220;একটি সুস্থিত সংহত ইমারতরূপে, মজবুত ইমারতরূপে, যার প্রত্যেকটি অংশ অন্য সকল অংশকে ধরে রাখে, মজবুত করে এবং তাকে তুলনা করেন একটি দেহের সঙ্গে যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে সমস্ত দেহই নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে কাতর হয়।&#8221;</strong> উম্মাহকে একটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় জীবন্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, এই শেষ হাদীসটিতে, যা সম্ভবত ইসলামী সমাজের সবচেয়ে যথোচিত বর্ণনা। অঙ্গ প্রত্যঙ্গময় দেহ হচ্ছে জীবন্ত এবং বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ নিয়ে এর অস্তিত্ব হচ্ছে এর সত্যিকার জীবন। অর্থাৎ সমগ্র দেহকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যেঙ্গের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সমগ্র কর্তৃক অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোর নিরবচ্ছিন্ন লালন পালনের মধ্যেই এই জীবন্ত দেহের জীবন নিহিত। অঙ্গময়তা বা আঙ্গিকতা জীবনের কেবল একটি গুণমাত্র নয়, বরং এটিই জীবন। উম্মাহ্ যদি এই বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে অন্যকিছু হতে চায়, তাহলে তা আবার ফিরে যাবে মরুভূমির ইসলাম-পূর্ব গোত্রবাদে। এমনকি সেই ব্যবস্থাও গোত্রের অঙ্গময়তার ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত, কারণ এই অঙ্গময়তা বাদ দিয়ে এর অস্তিত্ব সম্ভব ছিলনা; গোত্রের এ ধারণাকে কেবলমাত্র সম্প্রসারিত করা হয়েছে যাতে সমগ্র মানবজাতি তার আওতায় আসতে পারে। তাই এই অঙ্গময়তাকে বা উম্মাহর প্রয়োজনকে অস্বীকার করার মানেই হচ্ছে ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বকে শুভ মনে করা। এমনভাবে তাদের পরস্পর বিচ্ছিন্ন বলে মনে করা, যার ফলে, কেবল যে ইসলামই অসম্ভব হয়ে পড়ে তা নয়, বরং সমভাবে সভ্যতা, প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষের জীবনই অসম্ভব এবং অচিন্ত্যনীয় হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে নিয়ে অতি বাড়াবাড়ি করা যেতে পারে, কারণ এই নির্ভরশীলতাকে বাড়িয়ে এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছুনো যেতে পারে, যেখানে একটি বৃহত্তর অঙ্গ বা যন্ত্রের চাকার কেবল একটি খাঁজ বা দাঁতে পরিণত করা যেতে পারে মানব ব্যক্তিকে, যাতে সেই খাঁজে, তথা ব্যক্তির নিজের বিকাশে আত্মপূর্ণতা এবং সুখের কোন অবকাশই থাকেনা। গোত্র প্রাধান্যের মানেই হউক কিংবা নগর, জাতি অথবা বিশ্বসম্প্রদায়ের জমানাই হউক, রেজিমেন্টেশন এবং যৌথখামার ও মালিকানা প্রথার অভিশাপ সব সময়ই মানুষের চেতনায় একটি দুর্বহ পাষাণ ভারের মত চেপে বসেছে। এখানেও আবার ইসলাম তাওয়াজুন অর্থাৎ সোনালী মধ্যপন্থার ব্যবস্থা দিয়েছে এবং তা ব্যক্তি ও গ্রুপ উভয়েরই সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য বলে ঘোষিত হয়েছে। খ্রীষ্টান ধর্মের চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ এবং ইহুদী ধর্ম ও ইসলাম-পূর্ব চূড়ান্ত গোত্রবাদের মধ্যে ইসলাম প্রকৃত প্রস্তাবে একটি মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সুবিস্তৃত পরিসরের মধ্যে, মধ্যবর্তী স্থলে উভয় মূল্যের অবস্থিতি ঘোষণা করে এবং সেই পরিসরের শেষ প্রান্তের অ-মূল্যকে অস্বীকার করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঘ</strong><strong>. </strong><strong>সম্ভাবনা</strong></p>
<p>উপরে বর্ণিত এধরনের একটি উম্মাহ্ যে কেবলই সম্ভব তা নয়, বলতে গেলে এই হচ্ছে ইতিহাসের সফলতার একমাত্র শর্ত। এই উম্মাহর নীতির কোন না কোনটিকে বাস্তবায়িত না করে কোন সমাজ এবং কোন ধর্মই, কোন গোত্র এবং কোন রাষ্ট্রই, কোন সাম্রাজ্য এবং কোন ইতিহাসই কখনো সৃষ্টি হয়নি, বা সফল হয়নি। উম্মাহর মৌলনীতি যত বেশী অনুসৃত হয়েছে তত বেশী এবং তত স্থায়ী হয়েছে এই বাস্তবায়ন। উম্মাহর আদর্শ যত কম অনুসৃত হয়েছে, সাফল্য হয়েছে তত বেশী সাময়িক বা ব্যর্থতা হয়েছে তত বেশী বৃহৎ। এমনকি খোদ শয়তানের সাফল্যের জন্য উম্মাহর নীতিমালা একটি নিশ্চয়তা, যদিও তা সাময়িক। যদি শয়তান এবং তার বাহিনী উম্মাহর আদর্শের প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করে সে এবং তার বাহিনী অবশ্যই সফল হবে, যদিও মানবজাতির ইতিহাসে তাদের সাফল্য চূড়ান্ত বা সিদ্ধান্তমূলক হতে পারেনা। জায়নবাদীরা যেমন সফল, ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলা, যাদের অধীনে স্পেনীয়রা আমাদেরকে বহিষ্কার করেছিল তারাও সফল, স্পেন থেকে তারা এবং ব্রিটিশ, ফরাসী, ইতালীয়, ডাচ ইত্যাদি যারা আমাদের দেশকে আমাদের ভূমিকে কলোনী বানিয়েছিল, এমনকি হিংস্র তাতাররা যারা লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল এবং আমাদের মহত্তম এবং বৃহত্তম নগরীগুলোকে ভষ্মীভূত করেছিল, তারা সকলেই সফল হয়েছিল, কারণ, তারা ছিল বা রয়েছে অধিকতর উম্মাহপন্থী, অতীতের কিংবা বর্তমান কালের মুসলমানদের থেকে অনেক বেশী। এখানেই আমাদের দুর্বলতা, আধুনিক সাহিত্যে বারবার এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, &#8220;এর কারণ কি? যখন কোন মুসলমান &#8216;ওয়া ইসলামা&#8217; বলে চিৎকার করে, কেউই সাড়া দেয়না?&#8221; এর জবাব হচ্ছে আমাদের মধ্যে উম্মাহর অনুপস্থিতি, উম্মাহ্ ব্যবস্থার ধারা এবং মৌলনীতিগুলোকে পূরণ করার ব্যাপারে আমাদের ব্যর্থতা।</p>
<p>কাজেই, অনিবার্য প্রশ্নটি হচ্ছে এই, কি করে আমরা মুসলমানদের মধ্যে উম্মাহর আদর্শ সৃষ্টি করবো? উম্মাহ্ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ধরে নিয়ে এবং উম্মাহর শিক্ষা তথা ইসলামী আদর্শ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান রয়েছে একথা স্বীকার করে নিয়ে আমরা বাস্তব প্রশ্নটির মোকাবেলা করতে পারি। উম্মাহর লক্ষ্যকে ক্রমান্বয়ে কি করে আমরা কার্যকর ও প্রসারিত করতে পারি, প্রশ্নটি যতই বাস্তব হউক, এই প্রশ্নের উপরই সুফীগণ তাদের সমস্ত প্রতিভাকে নিঃশেষ করেছিলেন চূড়ান্ত লক্ষ্য বিস্মৃত হয়ে। ইবনে বা&#8217;জা এদের এই ভুল ধরতে পেরে লিখেছিলেন গবেষণা-মূলক গ্রন্থ &#8216;রিসালাত তাদবির আল মোতাওয়াহদ&#8217; যার জন্য, চিন্তাধারার ইতিহাসবিদ হিসেবে আমরা উদ্ভাবন করতে পারি একটি পরিভাষার &#8220;সমাজভিত্তিক সুফীবাদ&#8221;। আধুনিক কালে সেনুসিয়াহ আন্দোলন এই ধরনের উম্মাহভিত্তিক সুফীবাদের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছিল।</p>
<p>দুই, মুসলমানের মধ্যে উম্মাহর সামগ্রিক একাত্মতাবোধ, কী করে আমি সৃষ্টি করতে পারি, সে প্রশ্ন তো আসলে দু&#8217;জনের মধ্যে কী করে আমি একটি রাসায়নিক মিলন সৃষ্টি করতে পারি, তা জিজ্ঞাসা করা। এধরনের রাসায়নিক সম্পর্কের ফলই হচ্ছে &#8216;তাহাবুব&#8217; (পারস্পরিক ভালবাসা) &#8216;আত্ তাওয়াসী&#8217; ওয়া আততানাহী&#8217; (পরামর্শদান) &#8216;আততায়াখী&#8217; (ভ্রাতৃসম্পর্ক স্থাপন) আততাওয়াউন (সহযোগিতা) আততায়ালুমস (শিক্ষাদান) আততাজাউয (মেলামেশা), আত্ তাওয়াসী (শান্তনাদান), আত্ তাসাদুক ওয়া তাত্তানউস (বন্ধুকরণ), কী ধরনের ক্রিয়া এবং নিষ্ক্রীয়তা, বাস্তবতা অথবা অবাস্তবতা, কর্মতৎপরতা অথবা নিষ্কর্মতা, উম্মতের এই বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে, যা একবার অস্তিত্বে এলেই, এই মূল্যগুলো সূচিত হবে এবং এভাবে উম্মাহর জন্ম হবে। সংক্ষেপে দুই বা ততোদিক ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিভাবে এই পারস্পরিক ভালবাসা সৃষ্টি করা যেতে পারে, ইহাই প্রশ্ন। মানুষের মধ্যে এ রূপান্তর সৃষ্টি করা মানুষের কাজ নয়, বরং আল্লাহর দায়িত্ব, কুরআনের শতাধিক আয়াতে যা ঘোষিত হয়েছে<sup>১৭</sup>, কারণ শ্রেয়র দিকে যে কোন রূপান্তর ও উম্মতের ধারণার দিকে যে কোন উন্মুখতার তিনিই হচ্ছেন গ্রন্থকার। এক্ষেত্রে মানুষ যা করতে পারে, তা হচ্ছে তার প্রস্তাবনার সামর্থ্য অর্থাৎ বাস্তব ও বৈষয়িক প্রেক্ষিত সৃষ্টি করা, যার মধ্যে ঐশী উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। ইহা নিশ্চয়ই সম্ভব যে, ঐশী কর্মের জন্য এধরনের মানসিক প্রস্তুতি কখনো কোন ফল উৎপাদন নাও করতে পারে। কিন্তু একথা সেক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যেখানে মানবিক উদ্যোগ হচ্ছে স্পর্ধিত, অবজ্ঞাপূর্ণ এবং নিজের সমৃন্ধে অযথাই অতি আস্থাবান, কিন্তু যখন এই উদ্যোগ মিশ্রিত হয় ঐশী ক্ষমতার বিনীত স্বীকৃতির সঙ্গে, তখন তা সফল না হয়ে পারেনা। অন্যথায় যে কোন মানবিক ক্রিয়ার জন্য ঐশী আদেশ অসার হয়ে পড়ে এবং একইভাবে তা হয়ে দাঁড়ায় অহংকৃত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা তাহলে আমাদের প্রশ্নটিকে নতুন করে গঠন করতে পারি। ঐশী উদ্যোগের জন্য কি বিশেষ কর্ম বা পরিস্থিতি, বস্তুগত প্রেক্ষিত বা পটভূমিকা হতে পারে? এখানে একমাত্র সম্ভাব্য জবাব এই যে, এই মানুষগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হবে- আল্লাহকে স্বীকার করবে এবং একত্রে তার ইবাদত করবে, যুগ্মভাবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সন্ধান করবে, একত্রে স্পর্শগ্রাহ্য সুনির্দিষ্ট ফলের জন্য কাজ করা ও তা অর্জন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে খাওয়া দাওয়া উৎসব করা, উপভোগ করা এবং নিজেদের মধ্যে বিয়ে-শাদী করা। যদি এই কাজগুলো সম্পাদিত হয় অকপটে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যতাড়িত না হয়ে, তাহলে এ বিশ্বাস নিশ্চয়ই করা যায় যে, এগুলো সৃষ্টি করবে উম্মাহর বন্ধন। অন্য কোন পন্থায়ই এ বন্ধন সৃষ্টি করবেনা। অনুমেয় যে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ে ইসলামী সমাজের বৈঠক ও জলসাগুলোর পদক্ষেপ এই লক্ষ্যেই; বিশ্বব্যাপী ইসলামী সংঘ, সমিতি ও কেন্দ্রগুলোর জুমার জামাতগুলোও তা-ই। অবশ্য এখন পর্যন্ত এসবই খন্ডিত, অনিয়মিত, বিরল, অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং অসম্পূর্ণ। আমরা এখন পর্যন্ত যা করতে পেরেছি তার চাইতে অনেক বেশী করা আমাদের জন্য আবশ্যক অর্থাৎ উম্মাহর জলসা ও জামাতগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান।</p>
<p>এই উদ্দেশ্যে এই পরামর্শ দেওয়া যাচ্ছে যে, যে কোনো মুসলিম যে নিজেকে নেতৃত্বের জন্য সম্ভাবনাপূর্ণ মনে করে, যে ইসলামের প্রতি এমন একটি অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে গণ্য করে, যা তার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক স্বার্থকে অতিক্রম করে যায়, সে একজন আমিল হবে। (একজন প্রতিষ্ঠাতা, একজন সংগঠক urwah wuhqa এর নেতা [১০ জন বয়স্ক মুসলমানের একটি জামাত, যাতে তার পরিবারের লোকজনও থাকবে।] একটি urwah wuhqa এর একটি উদ্দেশ্য এবং একটি শর্তই হচ্ছে ইসলাম। আমেল ১০ জন সদস্যকে চিহ্নিত ও আহ্বান করে, সে এই ১০ জনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একে অন্যের মধ্যে যোগাযোগের এবং নিজেদের ও উম্মাহর বৃহত্তর সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আমিল তার নিজের উরুয়াতে শুক্রবারের মাগরিবের জামাতের ব্যবস্থা করে যেখানে তিন থেকে চার ঘন্টা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের প্রশিক্ষণ চলে। অপরিহার্যভাবেই এই সান্ধ্যজামাতের অন্তর্ভুক্ত থাকে এশার সালাতের জামাত, কুরআনের কিছু অংশের পঠন, ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিষয় আলোচিত হয় এবং শেষ পর্যায়ে কিছু খাবার ব্যবস্থা করা হয় ও সামাজিক আদান প্রদান হয়। এই চারটি আইটেমই সম্পূর্ণ আবশ্যক। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে তার মধ্যে যেন কোন কাঠিন্য এবং একঘেঁয়েমী না থাকে। কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামী জ্ঞানের অনুশীলন, খাদ্য এবং সামাজিক আদান-প্রদান এই শেষোক্ত তিনটি আইটেম আনুষ্ঠানিক সালাত বাদ দিলে, হতে পারে অসংখ্য রকমে বৈচিত্র্যপূর্ণ। যত শীঘ্র সুবিধাজনক এবং সম্ভব সান্ধ্যজামাত অনুষ্ঠিত হবে অপর একজন সদস্যের গৃহে। এভাবে প্রত্যেক সদস্যের বাড়ীতে সান্ধ্যজামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় যখন একটি নির্দিষ্ট উরুয়ার প্রত্যেক সদস্যের বাড়ীতে পর্যায়ক্রমে সান্ধ্যজামাত অনুষ্ঠিত হয়।</p>
<p>উরুয়ার সদস্য নির্বাচন করতে গিয়ে আমিলকে অবশ্যই তার নিজের বাড়ী থেকে সদস্যের বাড়ীর দূরত্ব বিবেচনা করতে হবে। ইসলামে ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক মিল জাতীয় ও গোত্রগত পটভূমিকা এবং সংস্কৃতির স্তর বৈষম্যের কোন ভিত্তি হতে পারেনা। ইসলামী সমাজের একটি শক্তি ছিল এবং সবসময় শক্তি হবে এই বৈশিষ্ট্য যে, এ সমাজ একটি উন্মুক্ত সমাজ, বহুগোষ্ঠীর সমাজ, সংস্কৃতিগতভাবে বৈচিত্রমুখী, রং-কানা, এবং প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত। সান্ধ্য জামাতে বয়স্ক সদস্যদের মতই শিশুগণ এবং পিতামহ ও পিতামহীরা হবে আবশ্যিক অংশ। যেখানে অনীহা, আলস্য, অবাধ্যতা, মতবিরোধ বা বিরুদ্ধতা দেখা দেয়, তা সান্ধ্যজামাত সম্পর্কেই হউক বা নগরী, রাষ্ট্র অথবা জাতীয় পর্যায়ে মুসলিম কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে হউক, সেখানে আমিলের আপন ন্যায়বোধ, তার উৎসাহ, সান্তনা, উদ্যোগ, নেতৃত্ব ব্যক্তিগত দায়িত্বের উপরই একমাত্র নির্ভর করে।</p>
<p>উরুয়া-ভ্রাতৃসমাজগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি প্রাপ্তির সঙ্গে প্রয়োজন হবে সেগুলোকে সংগঠিত করা, তাদের প্রয়োজনগুলোর পরিকল্পনা তৈরী করা এবং সেই সব প্রয়োজন পূরণ করা। একের অভিজ্ঞতায় শরীক হবে অন্যেরা এবং মেধা, তথ্য, প্রভাব, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের সাধারণ মুসলিম ভাণ্ডারে কমবেশী সময়ের ব্যবধানে অবশ্যই গঠন করবে সমগ্রভাবে ইসলামী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। এখানে পৌছেই আন্দোলন গ্রহণ করতে পারে নেতৃত্বের বিশাল বোঝা, আমিলদের জন্য বিভিন্ন সময়ে সেমিনার সংগঠন করতে হবে যাতে করে তারা একে অন্যের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতায় শরীক হতে এবং অধিকতর সফলভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য তারা প্রশিক্ষিত হতে পারে। একটি ভৌগোলিক ইউনিটের অন্তর্গত ইসলামী নেতৃত্ব উরুয়ার জন্য দিতে পারে একটি &#8220;সপ্তাহের জন্য মুদ্রিত পাঠ&#8221;, যাতে কুরআনের অংশ থাকবে নির্দিষ্ট-যাতে করে নির্বাচিত আয়াতগুলোর মাধ্যমে ইসলামের একটি পদ্ধতিবদ্ধ রূপ প্রতিফলিত হবে এবং তৎসঙ্গে সর্বত্র মুসলমানদের জীবন যে সব ঘটনায় আক্রান্ত তার মোবাবেলার ইঙ্গিত থাকবে।</p>
<p>উরুয়ার সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে এবং আন্দোলন যতই বিস্তৃত হতে থাকে ততই নতুনতর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে। দশটি &#8216;উরুয়া&#8217; মিলে হবে একটি &#8216;উমরা&#8217;, দশটি উমরা নিয়ে গঠিত হবে একটি &#8216;জারিয়া&#8217; এবং দশটি জাবিয়া নিয়ে একটি &#8216;জামাত&#8217;। সংগঠনের এই প্রত্যেকটি পর্যায়ে একটি প্রশাসনিক অঙ্গসংগঠন প্রতিষ্ঠিত হবে সংশ্লিষ্ট উরুয়াগুলোর আঞ্চলিক প্রয়োজনসমূহ পূরণের জন্য। যা সংগঠন করতে হবে তা অস্তিত্বে আসার পরই সংগঠন এবং কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। আমাদের অলসভাবে ব্লাকবোর্ডের উপর কাঠামো তৈরি করলে চলবেনা বরং লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে করে কাঠামোগুলো গড়ে উঠে ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা থেকে। সর্বত্রই আমাদেরকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, কি করে এ বাস্ত বতাগুলো সৃষ্টি করা যায়। পুনরাবৃত্তিস্বরূপ উত্তর এই যে, প্রত্যেক মুসলমানকে তার সহযাত্রী মুসলমানদের সঙ্গে নির্দোষ কাজগুলো করতে হবে- সকলের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইবাদতের ক্রিয়াকলাপে, নিরবচ্ছিন্নভাবে ইসলামী শিক্ষার অনুশীলনে এবং কল্যাণের বিস্তারে ও মন্দের প্রতিরোধে (আল আমর বিল মারুফ ওয়া আল নাহি আন আল মুনকার)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকা:</strong></p>
<p>১. আমরা আমাদের রসূলগণকে পাঠিয়েছি, প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ। আমরা তাদের প্রতি নাযিল করেছি কিতাব এবং দিয়েছি মিজান (ন্যায় বিচারের তৌলদন্ড) যাতে করে মানুষ পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আমরা তাদেরকে দিয়েছি লৌহ যা বিশাল বিশ ক্ষমতার একটি হাতিয়ার, যাতে করে তার দ্বারা মানুষের প্রতি তার ফায়দা কার্যকর হতে পারে এবং যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সহায়তা করতে ইচ্ছুক এবং তারা রসূলগণকে তা করতে পারে। আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী (৫৭: ২৫)। হে মোহাম্মদ, আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি কিতাব, সত্য সহকারে যাতে তুমি তার প্রত্যাদিষ্ট-ন্যায়দন্ড অনুসারে মানুষের প্রতি ন্যায় বিচার করতে পার (৪৫: ১০) &#8230; এবং তাদের মধ্যে বিচার কর, যে মোহাম্মদ, তোমার প্রতি আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার সাহায্যে এবং তাদের কুসংস্কার অনুসরণ করনা (৫: ৪৯)।</p>
<p>২. Barth, Against the Stream pp. 29-31.</p>
<p>৩. Ismail ibn Kathir Tafsir al Quran al Azim (Beirut: Dar al Ma &#8216;rifah, 1388/1969) s.v Quran 5: 79, vol. 2, pp 83-84</p>
<p>৪. William James. The Variety of Religious Experience (New York: Mentor Books, New American Library, 1953) pp. 269 ff pp 276 ff.</p>
<p>৫. অথবা বরং &#8216;ধর্ম হচ্ছে অন্যকে ভাল কাজ করার পরামর্শ দান।&#8221; N. Atiyah in A Source Book in Medeval</p>
<p>৬. Ibn Tufayl, Havy ibn Yaqzan tr. Goorge Political Philosophy, ed Ralph Lerner and Muhsin Mahdi (Glenceo II: The Free Press 1936).</p>
<p>৭. Al aqrabun awla bt al ma&#8217;ruf, এটি হচ্ছে আইন প্রণয়নের একটি সাধারণ নীতি।</p>
<p>৮. Henry Bettenson -এর ডকুমেন্টস গ্রন্থটি চার্চের আইডিয়েশনাল ইতিহাসের খুটিনাটির জন্য পড়তে পারেন।</p>
<p>৯. Abd al Rahman al jaziri: Al Fiqh ala al Mahab al Arba&#8217; ah (Cairo: Al Matalaah al Tijariah al Kubra, n.v) Beginning of Remadan And Shawwal vol. 1 pp 584-85.</p>
<p>১০. ইহাই একমাত্র পথ বলে মনে হয়, যাতে করে গতিশীল এবং সৃজনধর্মীয় ইসতিহাদের সমন্বয় সাধিত হতে পারে একই রকম বাঞ্চনীয় একমত ও ঐক্যমতের লক্ষ্যের সঙ্গে। এ দুটি মূল্যমানই ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির এবং এর আদর্শ পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।</p>
<p>১১. এখানে শরীয়াহ-এর অখ ভূমিকা এবং সোলোনের আইনের মধ্যে একটি সমান্তরাল রেখা টানা যেতে পারে। সোলোনের এই আইন ঈজিয়ান সাগরের চারদিকে বসবাসকারী ছড়ানো ছিটানো গ্রীকদেরকে একই সাংস্কৃতিক ঐক্যের মধ্যে আনয়ন করেছিল।</p>
<p>১২. ইসলামী আইনের দুটি চূড়ান্ত উৎস হচ্ছে কুরআন এবং সুন্নাহ। বিশাল সুপরিসর শরীয়াহ এর বিধি ব্যবস্থার অবয়বের মধ্যে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক নৈতিকতার সকল অঞ্চলই পড়ে। স্পষ্টতই দুটি মূল উৎসের কোনটির সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ইসলামের কোন বিধি ব্যবস্থাই বৈধ বলে গণ্য হবেনা</p>
<p>১৩. William Mac Neil. The Rise of the West (Chicago University Press. 1964) s.v &#8220;The Shariah&#8221;</p>
<p>১৪. Self-renewal যন্ত্রটি খুঁটিনাটির জন্য পড়া যেতে পারে উসুল আল ফিকাহর উপর যে কোন পাঠ্য পুস্তকে, আল ইসতিহাদ, আল কিয়াস, আল ইসতিহসান, আল মাসালিহ, আল মুরসালাহ লাহ, শিরোনামের অধীনে তোমরা কৃপণ হয়োনা, বদ্ধমুষ্টি হয়োনা এবং অমিতব্যয়ী হয়োনা, যেন তোমরা তোমাদের সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে তোমরা নিজেরাই না সর্বহারা হয়ে পড় (১৭: ২৯)।</p>
<p>১৫. কৃপণতা ও অতি বদান্যতা বা আতিশৈয্যের মধ্যবর্তী সোনালী পন্থার উপর ইসলামের উচ্চকণ্ঠ গুরুত্বের ঘোষণা মেলে আল কুরআনে (১৭: ২৯)।</p>
<p>১৬. See the Phenomental nalysis of Contradictory Values in Nicolary Hartaman. Ethics Abyev Stanton Coin (New York Macxmillan 1932) vol. 2. section 2</p>
<p>১৭. উপরে উল্লেখিত শব্দগুলো যে সব আয়াতের অন্তর্গত তার জন্য পড়ুন মোহাম্মদ বারাকাত রচিত Al Murshid ila Ayat al Quran al Karim (Cairo Al Malataba al Hashimyah 1957)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুবাদঃ <strong>অধ্যাপক শাহেদ আলী</strong>।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: -5px; top: 11463.5px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-vitality-of-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14782</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 01 Sep 2024 11:25:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইলমুল কালাম]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14770</guid>

					<description><![CDATA[তৌহীদ ঘোষণা করে যে, &#8220;তোমাদের উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ, যার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। তাই তাঁর উপাসনা এবং ইবাদাত কর১।&#8221; মুমিনগণ যে একটি মাত্র ভ্রাতৃসমাজ, যার সদস্যরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে পরস্পরকে ভালবাসবে, যারা একে অপরকে ন্যায়বিচার করতে ও ধৈর্য্যশীল হতে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>তৌহীদ ঘোষণা করে যে, &#8220;তোমাদের উম্মাহ্ একটি মাত্র উম্মাহ, যার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। তাই তাঁর উপাসনা এবং ইবাদাত কর<sup>১</sup>।&#8221; মুমিনগণ যে একটি মাত্র ভ্রাতৃসমাজ, যার সদস্যরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে পরস্পরকে ভালবাসবে, যারা একে অপরকে ন্যায়বিচার করতে ও ধৈর্য্যশীল হতে পরামর্শ দেয়<sup>২</sup>, যারা ব্যতিক্রমহীনভাবে সকলে একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়না<sup>৩</sup>। যারা একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে, সৎকাজে উৎসাহ দেয় এবং মন্দকার্য নিষেধ করে<sup>৪</sup> যার পরিণতিতে আল্লাহ এবং তার রাসুলকে মেনে চলে<sup>৫</sup>-এ সমুদয়ই হচ্ছে সমাজের বিষয়ে তৌহীদের প্রাসঙ্গিকতা।</p>
<p>উম্মাহর স্বপ্ন এক, তেমনি এক হচ্ছে অনুভূতি অথবা ইচ্ছা এবং কর্ম, উম্মাহর সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মনোভঙ্গিতে, তাদের চরিত্রে ও তাদের বাহুতে, চিন্তার একটা ঐক্যমত রয়েছে। উম্মাহ হচ্ছে এমন একটি মানবিক ব্যবস্থা যা মন, হৃদয় এবং বাহু, এই তিনের ঐক্যমতে ঘটিত। এ একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃসমাজ, যা বর্ণ যেমন স্বীকার করেনা তেমনি স্বীকার করেনা নৃতাত্বিক পরিচয়। এর দৃষ্টিতে সকল মানুষই এক, কেবলমাত্র সদাচারণ ও ধার্মিকতার মানদন্ড দ্বারা যার পরিমাপ হবে<sup>৬</sup>। এর কোন সদস্য যদি জ্ঞান, ক্ষমতা, খাদ্য বা আরাম আয়েশ অর্জন করে, তার কর্তব্য হচ্ছে অন্য সবাইকে তাতে শরীক করা, যদি কোন সদস্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, সাফল্য বা সমৃদ্ধি অর্জন করে, সে অবস্থায় তার কর্তব্য হবে, অন্যেরাও যাতে প্রতিষ্ঠিত, সফল ও সমৃদ্ধশালী হতে পারে, সেজন্য সাহায্য করা<sup>৭</sup>। এটি এমন একটি মানবিক ব্যবস্থা, যার সদস্যরা উম্মাহর মূল্যায়ন ও নীতিমালা দ্বারা নিজের জীবন শাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এবং অন্য সকল মানুষের জীবন যাতে অনুরূপ নীতিমালার দ্বারা শাসিত হয় তার জন্য চেষ্টা করে। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা হতে পারে, এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সদস্য হতে পারে; তারা উম্মাহর সদস্য বলে এই সদস্যপদ সমস্ত বৈষম্য ও পার্থক্যের উপর শরীয়াকে দেয় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। উম্মাহর ভিত্তি প্রজাতির (race) উপর নয়, অঞ্চল বা ভাষার উপর নয়, রাজনীতিক এবং সামরিক সার্বভৌমত্বের উপর নয়। অতীত ইতিহাসের উপরও নয়, এর বুনিয়াদ হচ্ছে ইসলামের উপর। নর-নারী নির্বিশেষে যে কেউ ইসলামকে তার ধর্ম বলে গণ্য করে এবং চায় যে, এর আইন কানুন দ্বারা তার জীবন শাসিত হবে, সে বাস্তবে এবং কার্যত উম্মাহর একজন সদস্য, দ্বারা শাহাদার আইনগত চাহিদার এই হচ্ছে অর্থ। তাছাড়া অন্য কোন প্রয়োজনটা আবশ্যক নয়। এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে কোন ব্যক্তিই শরীয়াহ কর্তৃক স্বীকৃত সকল অধিকার সকল সুযোগ সুবিধা ভোগের অধিকারী হয়ে উঠে এবং নিজেকে শরীয়াহর সমস্ত দায়িত্বের অধীনে স্থাপন করে।</p>
<p>ব্যক্তি মুসলমান, পৃথিবীর যে কোন স্থানে বাস করতে পারে এবং সেই দেশের আইনের প্রতি আনুগত্যশীল হতে পারে, যতক্ষণ না সে সব আইন জীবনের সেই সব ক্ষেত্রে শরীয়ার বিরোধিতা করে, যার দ্বারা তার নিজের জীবন প্রভাবিত হয়। যখন যে অঞ্চলে সে বাস করে, তার আইন কানুন যদি ইসলামের বিপরীতে তার জীবনকে প্রভাবিত করে, তখন একটি ইসলামিক অঞ্চলে হিযরত করার বিকল্প তার থাকে। অথবা ইসলামিক কিংবা ভিন্নতর কোন বাহ্য উদ্দেশ্য পূরণের আশায় সে তার নিজের জীবনে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সহ্য করে যেতে পারে। তার পক্ষে উম্মাহ হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য নয়। অবশ্য প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে অন্য সকলকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত করা, নিজের অঞ্চলে উম্মাহকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। দেশের আইন হিসাবে শরীয়াহর প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে তার কর্তব্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>তৌহীদ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>খিলাফত</strong></h4>
<p>উপরে যে উম্মাহর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সে উম্মাহ হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা পূরণের জন্য বিশ্ব পুনর্গঠন বা বিশ্ব সংস্কারের বাহন। এ হচ্ছে সৃষ্টিতে আল্লাহর খিলাফত, কেননা মানুষের বিষয়ে সৃষ্টির সূচনা লগ্নে প্রদত্ত এই ভবিষ্যত বাণী অবশ্যই সম্প্রসারিত হবে উম্মাহ পর্যন্ত এবং তার যুক্তি হচ্ছে পূর্ববর্তী অংশে উল্লেখিত যুক্তিসমূহ। সমভাবে উম্মাহ একটি রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্বের অর্থে এবং সার্বভৌম শক্তির জন্য যে সব অঙ্গ ও ক্ষমতা সার্বভৌমত্বকে বলবৎ করার জন্য প্রয়োজন সে সমুদয়ের অর্থে। রাষ্ট্র হিসাবে উম্মাহর উল্লেখ করতে হবে খিলাফত হিসাবে, দাওলাত হিসাবে নয়। ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য খিলাফত হচ্ছে নিকটতর এবং তৌহীদের ঘনিষ্ঠতর, যে তৌহীদ একটি সরাসরি এবং কুরআনি সিদ্ধান্ত<sup>৮</sup>। দ্বিতীয়টি হচ্ছে &#8216;দাওলাত&#8217; একটি আধুনিক ধারণা যার অবস্থান কুরআনের প্রতিনিধিত্ব বা খিলাফতের ধারণা থেকে সবচাইতে দূরতম ব্যবধানে। আর খিলাফতের এই ধারণাটি হচ্ছে উম্মাহর মূল শর্ত। আমরা যখন খিলাফত উল্লেখ করতে রাষ্ট্রকে বুঝাই তখন উম্মাহ এবং পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্য আমাদের মনে রাখতে হবে। তাই উম্মাহর সার্বভৌমত্ব বলবৎ করার ক্ষেত্রে খিলাফতই হচ্ছে উম্মাহ। এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে না হলেও উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব এর দ্বারাই গঠিত। খিলাফতের বিশ্লেষণ দ্বারা আমরা রাষ্ট্রতত্বের ক্ষেত্রে তৌহীদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে চাইছি। খিলাফত হচ্ছে ত্রিমুখী ঐক্মত্য দৃষ্টির ঐকমত্য, ক্ষমতার ঐকমত্য এবং উৎপাদনের ঐকমত্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>ইজমা</strong> <strong>আর</strong><strong>&#8211;</strong><strong>রুইয়াহ্</strong> <strong>বা</strong> <strong>দৃষ্টির</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>ইজমা আর-রুইয়াহ্ বা দৃষ্টির ঐকমত্য হচ্ছে মানসিক ঐক্য বা চৈতন্য এবং এর রয়েছে তিনটি উপাদান। প্রথম হচ্ছে, যে সব মূল্যায়ন নিয়ে আল্লাহর ইচ্ছা ঘটিত সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান এবং তাদের বাস্তব রূপায়ণ ইতিহাসে যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে জ্ঞান। স্পষ্টতই ইহা পদ্ধতিবদ্ধ এবং ঐতিহাসিক, দৃষ্টির উপাদানগুলো প্রকৃতিগতভাবেই অপরিসীম, অন্তহীন। তাই সমস্ত কিছু সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টির প্রয়োজন নেই, কেবলমাত্র তার সার নির্যাসেরই প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রয়োজন হওয়া উচিত। এটি হচ্ছে একটি কাঠামো, একটি পদ্ধতি, স্তরে স্তরে বিন্যাস এবং সিদ্ধান্তের জন্য আবশ্যক যার পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন, যা একবার আয়ত্ব হলে এক জনের পক্ষে সমন্বিততার মধ্যে যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা আবিস্কার করা এবং প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়। মূল্যমানের পদ্ধতিবদ্ধ জ্ঞান সম্পর্কে এ হচ্ছে বিশেষ করে সত্য। আর এই জ্ঞানের উৎস হচ্ছে প্রত্যাদেশ অর্থাৎ কুরআন এবং সুন্নাহ এবং যুক্তি, বুদ্ধি এর নিজস্ব প্রক্রিয়ার উপলদ্ধির মাধ্যমে, ন্যায়শাস্ত্র ও জ্ঞানতত্ত্ব এবং সাধারণভাবে সত্য সম্পর্কে উপলব্ধি (পরাতত্ত্ব) নিসর্গ সম্পর্কে উপলব্ধি (প্রকৃতি বিজ্ঞান), মানুষের সম্পর্কে জ্ঞান (নৃতত্ব, মনস্তত্ব এবং নীতিশাস্ত্র), এবং সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান (সমাজ বিজ্ঞানসমূহ)। প্রত্যাদেশের ক্ষেত্রে যেমন নয়, তেমনি বুদ্ধির ক্ষেত্রেও দৃষ্টির একাডেমিক ফল আবশ্যক নয়, যা উপাদানের পদ্ধতিগত ধারণা নিয়ে গঠিত, বরং তা হতে হবে ইনটুইটি স্বজ্ঞালব্ধ, অর্থাৎ এমন একটি উপলব্ধির আলোর অভিজ্ঞতা হতে হবে যা, যে কোন অঞ্চলকে আলোকিত করতে পারে, দৃষ্টির জন্য ইসলামের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এমন একটি ছবি প্রতিষ্ঠিত ক&#8217;রে<sup>৯</sup>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একদিকে ইতিহাসে ইসলামী মূল্যমানসমুহ যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল, সেই আন্দোলন এবং ইসলামী মূল্যমানগুলোর বাস্তবায়ন সম্পর্কে জ্ঞান মূখ্যত একটি অভিজ্ঞতার বস্তু<sup>১০</sup>। এই জন্যই প্রথম দিকের মুসলমানরা মহানবী সম্পর্কে সকল বিবরণ এবং তাঁর সাহাবাদের জীবন থেকে আহরিত ঘটনাবলী জানার জন্য অবিরাম চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই এধরনের চাহিদা দেখা যায়, কারণ অনুসারীদের জন্য তাদের বিশ্বাসের অনুযায়ী ধারণা কি করে একটি কংক্রীট রূপে প্রকাশ পায় তার জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যমান বাস্তবায়নের বিশেষ উপাদানগুলো তাদের ছাত্রদের উপর একটি সার্থক এবং বাঞ্চনীয় শিক্ষকীয় প্রভাব বিস্তার করে। এগুলো তাদের পদ্ধতিগত অধ্যয়নের উপাদানগুলো থেকে সহজে বোঝা এবং স্মরণ রাখা যায়। যাই হোক খিলাফতের জন্য যে দৃষ্টিভঙ্গির উৎপাদন আবশ্যক তার জন্য উভয়টিই সমরূপে আবশ্যক।</p>
<p>মূল্যমানের পদ্ধতিগত উপলব্ধি এবং ইতিহাসে সেগুলোর রূপায়ণ, এ দুটি বিষয় নিয়ে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানের জ্ঞানের অভাবে এবং বর্তমান কি করে সেগুলোকে নতুন করে বাস্তবায়িত করতে পারে, সেই জ্ঞান ছাড়া প্রায় এখন অসম্পূর্ণ। <strong>যেহেতু খিলাফত পশ্চাৎমুখী হতে পারে এবং বর্তমানের মধ্যে বাস করতে পারে এবং ভবিষ্যতেও কার্যকর হবে, সেজন্য বর্তমানের সঙ্গে মূল্যমানকে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক। স্থির করতে হবে বাস্তবে অস্তিত্বশীল কোন উপাদান কোন মূল্যমানকে বাস্তবায়িত করবে, সেগুলো রূপায়ণের বেলায় কেমন করে বর্তমান অবস্থাগুলো মূল্যমানসমুহের শ্রেণীর উপর প্রভাব বিস্তার করে।</strong></p>
<p>এখানে যে ইজমা আর-রুইয়াহর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে ধর্মীয় জ্ঞানের একটি উৎস বলে ধরা হয়েছে। রাসুল্লাহর এই হাদিস, &#8220;আমার উম্মাহ অসত্য বা মিথ্যার ব্যাপারে একমত হবেনা&#8221;, উম্মাহর জনমতের উপর প্রায় একটি পবিত্রতা আরোপ করেছে। তা সত্ত্বেও এ কোন অনড় মত নয় বরং সব সময়ই উন্মুক্ত<sup>১১</sup>। এই উম্মুক্ততাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে ইজতিহাদে, যা কেবল সামর্থ নয়, বরং প্রত্যেক বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন মুসলমানের কর্তব্য, ইসলামী সত্য ও মূল্যমানের সমগ্র পরিসর বা তার কোন অংশকে নতুন করে আত্মসাৎ করে। প্রকৃতিগতভাবেই ইজতিহাদ গতিশীল এবং সৃজনধর্মী এবং তার স্বগুণেই উপলব্ধিক্ষম মনের কাছে খুবই আবেদনশীল। ইজতিহাদকেও রাসুলুল্লাহ এই হাদীসে অভিনন্দনের যোগ্য বলে গণ্য করেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;যে কেউ ইজতিহাদ করে একটি ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সেও একটা সৎ কাজ করলো। যে কেউ ইজতিহাদ করে সত্যে উপনীত হয়, সে দ্বিগুণ পূণ্য লাভ করে।&#8221;</p></blockquote>
<p>ইজতিহাদ এবং ইজমা সম্মিলিতভাবে সৃষ্টি করে একটি দ্বান্দিক গতি, যা চিন্তার রাজ্যে ইসলামী গতিশীলতা গঠন করে। কারণ ইজমা যেখানে উপলব্ধি লাভের প্রয়াসে চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় সেখানে তা ক্রমাগতই লংঘিত হয় ইজতিহাদের সৃজনধর্মী শক্তির বলে। অন্যপক্ষে, যেখানে ইজতিহাদ উপলব্ধির সর্বোচ্চ বাঞ্ছিত লক্ষ্য বলে পবিত্র বলে গণ্য হয় সেখানে তা সকল মুসলমানকে এর বৈধতা সম্পর্কে বিশ্বাসী করার প্রয়োজনে তা হয় নিয়ন্ত্রিত, সংশোধিত এবং সমালোচনা অর্থাৎ সকলের দ্বারা তা (ইজমা) তা সমর্থিত হবার প্রয়োজনে।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>ইজমা</strong> <strong>আল্</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ইরাদা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ইচ্ছার</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>ক্ষমতার ঐকমত্য হচ্ছে ইচ্ছার মিল বা ঐক্য এবং এর দুটি উপাদান আছে আল্ আসাবিয়া (সামাজিক সংহতি) যার বলে মুসলমানরা বিভিন্ন ঘটনা এবং পরিস্থিতিতে একইভাবে আল্লাহর আহবানের প্রতি সম্মিলিত আনুগত্যে সাড়া দেবার জন্য নিজেরা অঙ্গীকার করে এবং আন্- নিজাম, সিদ্ধান্তের বাস্তব রূপদানে সামর্থবান, মুসলিমদের কাছে পৌছাতে এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ করতে এবং সাংগঠনিক এবং যৌক্তিক কাঠামো মূল্যমানের ঔচিত্যকে ব্যক্তির গ্রুপ ও তাদের নেতাদের কর্তব্যের রূপদানে পারঙ্গম।</p>
<p>আল আসাবিয়া দৃষ্টিগত ঐক্যের সমান বা ফল নয়। এই ধরনের ঐকমত্যের দ্বারা আসাবিয়াকে সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ করা যেতে পারে। <strong>আসলে এই ধরনের ঐকমত্য ছাড়া আসাবিয়ার অস্তিত্ব অসম্ভব, কেননা যেখানে কোনো ব্যাপারে ঐকমত্য নেই, সেখানে কখনো সংহতি অর্জিত হতে পারে না। দৃষ্টিগত ঐকমত্যের চাইতেও আসাবিয়ার চাহিদা আরো বেশী, এর অভিব্যক্তি ঘটে আন্দোলনের সঙ্গে নিজের অভিন্নতা ঘোষণার সিদ্ধান্তে।</strong> বলতে গেলে উম্মাহর অর্ণবজানে নিজের ভাগ্য সমর্পণ করতে এবং পরে আহবানে সাড়া দিতে- অর্থাৎ আহবান বা দাওয়াতে ইতিবাচক &#8220;হ্যাঁ&#8221; বলতে এবং দাওয়াতে যা কিছু চায় তা ইতিবাচকভাবে সম্পাদন করতে।</p>
<p>খোদ্‌ এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি নির্মিত হয় একটি দীর্ঘ মনস্তাত্বিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ার উপর, যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি নিজেকে উম্মাহর সঙ্গে অভিন্ন রূপে দেখতে পায়, যার পরিশেষে তার চৈতন্য হয়ে উঠে বাস্তবায়নমুখী এবং মানুষ নিজেকে উম্মাহর ঐতিহাসিক ঘূর্ণাবর্ত ও সূচীমুখ হিসাবে খিলাফতের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই মনস্তাত্বিক প্রক্রিয়া শিক্ষা এবং অনুশীলনের বিষয়বস্তু হতে পারে। যেখানে তা হয় সেখানে এই প্রক্রিয়া হয়ে উঠে মার্জিত এবং সমৃদ্ধ। তবে জন্মের মাধ্যমেও প্রকৃতিগতভাবে এর আবির্ভাব হতে পারে এবং গোত্র বা গোষ্ঠীর বদ্ধ পরিবেশে তা লালিত পালিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে বিচার বুদ্ধিহীন। অন্ধ আরেক নিজেকে গোত্র বা জাতের সঙ্গে একাত্ম পণ্য করার এই অর্থে ইবনে খলদুন আসাবিয়াকে সমাজ সংহতির ভিত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন<sup>১২</sup>। যেহেতু ইসলামে এই বাস্তব উপাদানগুলো অতিক্রান্ত হয়েছে তৌহীদের আদর্শের দ্বারা সে কারণে ইসলামের আসাবিয়া হবে একটি নতুন প্রক্রিয়ার, একটি নতুন সংস্কৃতির ফল (আল্লাহর অভিপ্রেত আদলে  সক্রিয় ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের চেহারা বদল করা)। তাই আসাবিয়া হবে ইচ্ছাকৃত লালিত পালিত বিকশিত এবং পরিণত। কেবলমাত্র প্রকৃতিগতভাবে একটি অনৈচ্ছিক বিকাশ নাও হতে পরে, ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের জাতীয়তাবাদী অনুভূতির সঙ্গেও একে এক করে দেখা যাবেনা যা প্রায় বর্ণিত হয় অচেতন, অনৈচ্ছিক, অবর্ণনীয়রূপে অন্তর্গত এবং গূঢ় বলে, প্রকৃতপক্ষে যা গোত্র গোষ্ঠীতন্ত্রের আসাবিয়া। ইসলামী আসাবিয়া ইচ্ছাকৃত, পরিস্কারভাবে বিশ্লেষণযোগ্য একটি নৈতিক ও দায়িত্বপূর্ণ কর্ম। এ আসাবিয়া হচ্ছে তৌহীদের স্বচ্ছ আলোকে, তৌহীদের সকল তাৎপর্যের পূর্ণ প্রভায় উম্মাহর ভাগ্যের সঙ্গে, নিজেকে অভিন্ন গণ্য করার অঙ্গীকার এবং তাতে অংশগ্রহণ। এ দৃষ্টান্ত পাই আমরা এর বিশুদ্ধতমরূপে মক্কায় হজ্জ যাত্রীদের সম্মিলিত ধ্বনিতে যখন তারা কাবা ঘর তাওয়াফ করে অথবা যখন আরাফার দিকে ধাবিত হয়; &#8220;লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক&#8221;- (তোমার আহ্বানে হে প্রভু এখানে আমরা হাজির, তোমার আহবানে)। আর এ হচ্ছে বহু শতাব্দী ধরে যে ভৌগোলিক বা গোত্র গোষ্ঠী ধর্মী বা সংস্কৃতিগত বৈশেষিকতা খাস পাশ্চাত্য জাতীয়তার চরিত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী ধ&#8217;রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত<sup>১৩</sup>।</p>
<p>যেহেতু আসাবিয়া ভূমন্ডলের একটি বিস্তৃত অঞ্চলে বিস্তৃত বিশ্বজনীন উম্মাহ্-গঠনকারী একটি উপাদান সে কারণে আল আসাবিয়া মুসলমানের ব্যক্তিগত মূহুর্তের একটি সত্য মাত্র হতে পারেনা। পরিস্থিতি এবং ঘটনায় সাড়া দিতে গিয়ে মুসলমান যখনি সক্রিয় হতে ইচ্ছা করে বা বাধ্য হয় তখন তা একটি অবাধ তরঙ্গোচ্ছাস হিসাবে কাজ করতে পারেনা; এরূপ কাজ হবে জগৎব্যাপী বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির জনক। আসাবিয়া ইসলাম সম্মত এবং সে কারণে দায়িত্বশীল হতে হলে শৃংখলার অধীন, অবশ্যই হবে নিয়ম গভীরতা ও দিশার দিক দিয়ে এবং অন্য সকল মুসলমানের সঙ্গে সমবায়মূলক ক্রিয়াকান্ডের সঙ্গে নিজেকে অভিন্নভাবে যুক্ত করার জন্য শৃংখলার অধীন। এটাই হচ্ছে আন্-নিজামের রূপ, যে বিষয়ে তৌহীদের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে ইজমা-প্রথা মুসলমানদের তৈরি করেছে। এই নিজামের দিকে লক্ষ্য করে, আমাদের পিতৃপুরুষেরা ভালভাবেই জানতেন যে প্রত্যেক মুসলমানকে হতে হবে অক্ষরজ্ঞান এবং সাহিত্যের রুচীসম্পন্ন তাকে কুরআনের বৃহৎ অংশ সম্পর্কে অবশ্যই জ্ঞান রাখতে হবে, নবী চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে এবং সাহাবাদের জীবনী জানতে হবে, তার গৃহের নিকটবর্তী জামাতে এবং ইবাদতে অংশগ্রহণ করতে হবে- (অর্থাৎ অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ইবাদত করতে হবে- আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি নিকটবর্তী মসজিদে সালাতের সময় যে মুসলমানদের কাঁধ পরস্পর স্পর্শ করা উচিত, এই তাগিদের মানে এই যে, এতে করে, একের কাছে অপরের অস্তিত্ব জীবন্ত হয়ে উঠবে, একের সঙ্গে অপরের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিচয় এবং শব্দটির আক্ষরিক অর্থে বৃহত্তর উম্মাহর সঙ্গে সহযোগিতার উপলব্ধি. বাস্তব হয়ে উঠবে, যাতে করে আল্লাহ যে সকলের প্রভু এবং মালিক ইবাদতকারীর চেতনায় তা মুদ্রিত হয়ে যায়। এ সমস্তই পরিকল্পিত হয়েছে খিলাফতের আনুষ্ঠানিক সংগঠনের প্রস্তুতি হিসাবে। সেকালে মসজিদ ছিলো এবং একালেও তা হওয়া উচিত সকল ইসলামী কর্মতৎপরতার কেন্দ্র, ইসলামের আবশ্যিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু, কারণ মসজিদে মুসলমানরা দৈনিক মিলিত হত, তৌহীদের বন্ধনে তার সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে একটি জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করতো এবং লাভ করতো আধ্যাত্মিক, নৈতিক, রাজনৈতিক জীবনীশক্তির দৈনিক বরাদ্দ। এই খোরাক সরবরাহ করা যায় এবং প্রকৃতই তা সরবরাহ করা হতো যে কোন মুসলিম কর্তৃক, যার অধিকতর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছিলো তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার, যাতে খোদ খলিফাকেও বাদ দেওয়া হতোনা। আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালার দিকে আহবান কর মানুষকে প্রজ্ঞা এবং অধিকতর সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে<sup>১৪</sup>। এবং রাসুলুল্লাহর (সঃ) নসিহত প্রদানের আদর্শে স্বাধীনভাবে প্রদত্ত পরামর্শ, যে নসিহতের আদর্শকে ইজতিহাদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে<sup>১৫</sup>। সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে এই সম্পর্ক ও সংসর্গ রূপ নেবে জুম্মার সালাতে যেখানে ঈমামের খুৎবা হচ্ছে একটি গঠনমূলক স্তম্ভসদৃশ। খুৎবার বিষয়বস্তু হবে বর্তমান পরিস্থিতি, মুসলামান সমাজকে যে সব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে সেসবের উপরই খুৎবা দেবেন ইমাম। খুৎবাতে যে কুরআন এবং হাদিসের কিছু উল্লেখ থাকে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামী প্রজ্ঞার বক্তব্য পেশ করা এবং এভাবে তার প্রাসঙ্গিকতা ঘোষণা করা। আমির (শাসক) নিজেই যে জুম্মার সালাতের ইমাম হবেন, এই প্রথার উদ্দেশ্য ছিলো কার্যকর করার জন্য সপ্তাহের আলাপ আলোচনা থেকে যে ঐক্যমতের সৃষ্টি হয় তার সুস্পষ্ট রূপদান কিংবা ঐকমত্য অর্জিত না হলে নেতৃত্বকে ঘিরে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং উপস্থিত প্রশ্নের আবশ্যক বিচার ও প্রতিবাদের ব্যবস্থা করা। ইসলামের এ সমস্ত ইবাদত পৃথিবী এবং মানুষের বাস্তব রূপান্তর, যে উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে খোদ কুরআন<sup>১৬</sup>, পৃথিবীস্বরূপ আল্লাহর জমিদারীতে রায়ত এবং কৃষকের বাস্তব খিদমত, মরুভূমিকে খুটি করে উপনিষদীয় গুরুর, তথা সন্যাসীর, শারীরিক কসরত, তথা যোগ সাধন নয়, কোন ধর্মীয় ঐতিহ্যের আত্মনিঃগ্রহ, বিশ্বের অস্বীকৃতি এবং ইতিহাস প্রত্যাখ্যান নয়!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ</strong><strong>. </strong><strong>আমলের</strong> <strong>ইজমা</strong> <strong>বা</strong> <strong>কার্যের</strong> <strong>ঐকমত্য</strong></p>
<p>কার্যক্ষেত্রে পূর্বে উল্লেখিত সমস্ত প্রস্তুতির চূড়ান্ত শীর্ষ হচ্ছে ইজমা আল-আমাল। এ হচ্ছে ইজমা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠা ঔচিত্যের রূপ। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা ইজমা-ইজতিহাদ দ্বন্দের চিরন্তন গতিশীলতার মতই কখনো নিঃশেষ হতে পারেনা। মানুষকে তার বেহেস্তের অধিকার অর্জনের প্রয়াসে, দেশকালের মধ্যে আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তাবায়িত করা এমন একটি প্রয়াস কেবল বিচার দিবসই যাতে যতি টানতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উম্মাহর বৈষয়িক চাহিদাগুলো পুরণের ব্যবস্থা, এর প্রত্যেক সদস্যকে এমন একটি শিক্ষাদান যাতে করে তার পূর্ণ আত্মপরিচয় সম্ভব হবে; আরো রয়েছে উম্মাহর সফল প্রতিরক্ষার জন্য বৈদেশিক শত্রুর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার বৈষয়িক ও নৈতিক উপায়ের ব্যবস্থা করা এবং তৎসহ সারা পৃথিবীতে আল্লাহর অভিপ্রায় রূপায়ণের জন্য নৈতিক ও বৈষয়িক উপায়ের ব্যবস্থা।</p>
<p>আল্লাহর অভিপ্রায়ের সার নির্যাস হচ্ছে, উম্মাহর বৈষয়িক চাহিদা পুরণ এবং সে কারণে তা ধর্মেরও মর্মকথা। যেহেতু তার খিদমত করার জন্য আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন<sup>১৭</sup> এবং আল্লাহর জমিনে রায়ত-কৃষকের মত এই দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন<sup>১৮</sup>&#8211; তাতে করে ইহা অনিবার্য হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ চান মানুষ জমি চাষ করবে, প্রকৃতির উপাদান এবং শক্তিগুলোকে ব্যবহার করবে এবং তার খুশীমত সভ্যতার বিকাশ ঘটাবে<sup>১৯</sup>। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করতে গিয়ে কুরআন দারিদ্রকে শয়তানের অঙ্গীকার বলে বর্ণনা করেছে<sup>২০</sup>। এবং ধর্মের সঙ্গে ক্ষুধার্তের খাদ্য দান এবং দুর্বলের রক্ষণকে অভিন্ন গণ্য করেছে<sup>২১</sup>। বিশেষ করে মানুষ যখন আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন করে<sup>২২</sup>, তখন মানুষের খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের স্বাভাবিক প্রতিফল এই যে, সে সৃষ্টির মাধুর্য এবং আনন্দ উপভোগ করবে। মেসোপটেমীয় দৃষ্টিতে মানুষের সৃজনের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আল্লাহর জমিনে স্থাপন করা হয়েছে, তাঁর ভৃত্য হিসাবে। কিন্তু মানুষের এই সৃজন কর্মই হচ্ছে সংঘবদ্ধ কৃষিকর্ম, বাঁধ তৈরী, সেচ এবং পানি নিষ্কাশন, খাল খনন, শষ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য, পিরামিড, মন্দির নির্মাণ, লিখন ও হিসাব রক্ষণ পদ্ধতি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রাম-সরকার, নগরী, প্রদেশ, জাতি এবং বিশ্ব পর্যায়ে সরকার প্রতিষ্ঠার সূচনা। সংক্ষেপে আল্লাহর এই সৃজন কর্মই হচ্ছে বিশৃংখলা থেকে সৃষ্টিকে শৃংখলার অধীনে আনয়ন এবং শৃংখলাবদ্ধ জগতের সৃষ্টি<sup>২৩</sup>।</p>
<p>সেমিটিক মন কখনো সংসারত্যাগীর সংসার বর্জন বা আত্মনিগ্রহের অর্থ বুঝতে সক্ষম নয়, ইহা কখনো কাম ও প্রজনন, খাদ্য ও আরাম আয়েশকে স্বাভাবিক পাপ বলে গণ্য করেনা। এর দৃষ্টিতে পাপ হচ্ছে এসবের অপব্যবহার, কখনো প্রকৃতির বিষয় হিসাবে এগুলো পাপ নয়। খ্রীষ্টান ধর্ম বস্তুর সকল ভীতিসহ যে গ্নষ্টিক (gnostic) ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকারস্বরূপ গ্রহণ করে, তাই খ্রীষ্টান আন্দোলনে সংসার বর্জন ও আত্মনিগ্রহরে বীজ বপন করে। ইসলাম অবশ্যই শ্রম বা উপবাসের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটিঃ আত্মসংযমের অনুশীলন এবং অভাবগ্রন্থের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি। একই আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর খাদ্য, পানীয় এবং আনন্দের মাধ্যমে অবশ্যই ভাঙতে হবে রোজা।</p>
<p>খলিফাকে যদি মানুষের বৈষয়িক চাহিদা অবশ্যই পূরণ করতে হয় যা প্রত্যাশা করা হয় খলিফার কাছ থেকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে মানুষের এই বৈষয়িক চাহিদা কি পরিমাণ হলে যথেষ্ট হবে। ন্যূনতম চাহিদা সহজেই নির্ণয় করা যায়; সে চাহিদা হচ্ছে সকল মানুষের জন্য দুর্ভিক্ষ, ব্যাধি এবং শিশু মৃত্যুর প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন তাই হচ্ছে ন্যূনতম চাহিদা, কিন্তু সর্বোচ্চ চাহিদা নির্ণয় করা অসম্ভব, কেননা প্রকৃতির ব্যবহারের সীমা অথবা প্রকৃতির খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা নির্ণয় করা যায়না। এদুটিই হচ্ছে মানুষের কল্যাণের জন্য, আল্লাহ তায়ালা প্রকৃতি বা তার পদ্ধতির মধ্যে যে নিয়ম প্রবর্তন করেছেন সেগুলোর উপর মানুষের কর্ম প্রসারণশীল কর্তৃত্বের বিষয়<sup>২৪</sup>। কুরআন আমাদেরকে জানাচ্ছে আসমানে এবং জমিনে যা কিছু আছে সমস্তই আমাদের কল্যাণের জন্য। রাসুল্লাহ (সঃ) বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8220;যে কেউ রাত্রে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে যখন তার একদিনের পথে কোথাও একটি মাত্র মানুষও ক্ষুধার্ত থাকে, সে আল্লাহকে কষ্ট দিয়েছে।&#8221;</p></blockquote>
<p>এবং দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রাঃ) ঘোষণা করেছিলেন</p>
<blockquote><p>&#8220;আমি ভয় করি যে, বিচার দিবসে নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে দায়ী করবেন, প্রত্যেকটি খচ্ছরের জন্য যা হোচট খায় বা পড়ে যায়, খিলাফতের সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মেরামতহীন ভাঙ্গাচুড়া রাস্তায়<sup>২৫</sup>।&#8221;</p></blockquote>
<p>নিশ্চয়ই ইসলাম অন্য সকল ধর্মের মতই দান খয়রাতের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম দান খয়রাতকে বলে সাদাকা (শাব্দিক ভাবে যার অর্থ হচ্ছে সত্যপরায়ণতার একটি খন্ড) যার দ্বারা ইসলাম একে একজনের ঈমানের সত্যতার অভিব্যক্তি এবং সূচক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু সকল ধর্মের চাইতে স্বতন্ত্রভাবে ইসলাম ব্যবস্থা করেছে যাকাতের, যা বার্ষিক শতকরা আড়াই ভাগ হিসাবে একটি সম্পদ কর এবং তা আদায় করা হয় রাষ্ট্রীয় আইনের অনুমোদনক্রমে। ইসলাম যে একে যাকাত বলে (মাধুর্য বা মিষ্টতা) এর দ্বারা ইসলাম বোঝাতে চায় যে, আমরা যদি আমাদের সম্পদে আমাদের সঙ্গী সাথীদের অংশীদার না করি, তাহলে বছরে সে সম্পদ হয়ে উঠে তেতো। অধিকন্তু ইসলাম বঞ্চিতদেরকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে, তাদের জন্য ভিক্ষা, দান বা অপমানজনকভাবে ছুঁড়ে মারা কোনো রুটীর টুকরো নয়, বরং এ হচ্ছে বিত্তবানের সম্পদ তাদের হক, তাদের অধিকার<sup>২৬</sup>। ইসলাম একচেটিয়া ব্যবসা যেমন নিষিদ্ধ করেছে, তেমনি নিষিদ্ধ করেছে মজুতদারী এবং মানুষের উপর মানুষের শোষণের প্রধান হাতিয়ারস্বরূপ সুদকে উচ্ছেদ করেছে<sup>২৭</sup>। পক্ষান্তরে যেখানে ইচ্ছা এবং সর্বত্র আল্লাহের অনুগ্রহ সন্ধানের জন্য মানুষকে নির্দেশ দিয়েছে<sup>২৮</sup>। এদেরকে সেই প্রকৃতপক্ষে অনুগ্রহ প্রাচুর্যের সন্ধানে দেশ দেশান্তরে যেতে বলেছে, তলে আল্লাহর নৈতিক বিধানের আওতায়- বিশ্বাসঘাতকতা, প্রবঞ্চনা, চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন বা লুটপাট না করে এবং এভাবে একবার প্রাচুর্য অর্জনের পর সেই বিপুল সম্পদের কোন অংশ কিংবা তার বহুগুণ বৃদ্ধিতে যাকাত প্রদান করে তিক্ততা দূর ক&#8217;রে মধুর করে তুলতে হবে। এবং এভাবে সাদাকাত দ্বারা এই বৃত্তির অধিকারীর সত্যবাদিতা প্রমাণ করতে হবে<sup>২৯</sup>।</p>
<p>উম্মাহর প্রত্যেকটি সদস্য যাতে পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়ামত অর্জন ও ভোগ করতে পারে তার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করাই অবশ্য খিলাফতের দায়িত্ব। কিন্তু এই লক্ষ্য, মহৎ এবং আবশ্যক হলেও যে মুহুর্তে একে মানব জীবনের একমাত্র বা চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে গণ্য করা হয় তখনই তা পর্যবসিত হয় তাহা পাশবিকতায় এবং অধঃপতনে, যাতে মানুষের ব্যক্তিত্বের ঘটে বিকৃতি এবং গোটা ঐশী অভিপ্রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা<sup>৩০</sup>। মানুষের বৈষয়িক প্রয়োজনগুলো নির্দোষ এবং বস্তুতই উত্তম; সম্ভাব্য উচ্চতম মাত্রায় এগুলোর পরিপূরণ আবশ্যক। কিন্তু জীবনের গোটা বৈষয়িক দিকটি যেগুলো রক্ষা করবে, সেগুলো ব্যক্তি বা সমগ্রভাবে উম্মাহর আধ্যাত্মিক মর্মের উপায় বা বাহন মাত্র। বৈষয়িক অর্জনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে গণ্য করার মানে হচ্ছে আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।</p>
<p>এ হচ্ছে এরূপ দাবীরই নামান্তর যে, আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে একটি শূন্য বিষয়, আচার অনুষ্ঠান ও মনস্তাত্বিক আত্মরূপান্তরের দেহ বিযুক্ত জীবন, যা বস্তুগত জীবন অনুসন্ধানের বিকল্প ইসলামে আধ্যাত্মিক জীবন হচ্ছে তিনটি পর্যায়ের, যা একই সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে। এর প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, উম্মাহর সাধারণ বৈষয়িক কাজকর্মে ব্যক্তির অংশগ্রহণ। এর মাধ্যমে মানুষের নিজের বৈষয়িক প্রয়োজনকে উম্মাহর কাজকর্মের প্রয়োজনের অধীনে স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে দুটি পর্যায়ে নিজের এবং অন্যদের শিক্ষার জন্য প্রয়াস; যেমন প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব মানুষের জন্য প্রকৃতির ব্যবহারকে অধিকতর সম্ভব এবং সহজসাধ্য করে তোলে; এবং ইজমা ইজতিহাদের দ্বান্দ্বিকতা হয়ে উঠতে পারে গতিশীল, সৃজনধর্মী এবং ঐশী অভিপ্রায়ের আরো উঁচু হতে উঁচুতর ক্ষমতার স্তর পর্যন্ত পৌছুতে পারে। তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে নন্দনতাত্বিক সৃষ্টি, যাতে উম্মাহর আকুতি এবং জীবনরূপ পায়- কারণ উম্মাহ মূল্যবান বা ঐশী অভিপ্রায়কে বাস্তব এবং রূপায়িত করে তুলে ইতিহাসের পরিক্রমায়।</p>
<p>ইজমা ইজতিহাদের (উৎপাদনের মতৈক্য) দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যের জন্য এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করা যার বদৌলতে পূর্ণ আত্মপরিচয় অর্জন সম্ভব হয়<sup>৩১</sup>। আল্লাহর বান্দা হিসাবে কোনো ব্যক্তি তার পেশাকে উপলদ্ধি করেনা, যদিনা তার ব্যক্তিগত সম্ভাবনা ও ক্ষমতার চূড়ান্ত বিকাশ ও সম্ভাব্য পূর্ণতম ব্যবহার হয়। এধরনের ব্যক্তি নিজেকে অসুখী বলে মনে করবেনা এবং এধরনের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি ব্যর্থ সমাজ হবেনা, কিন্তু মেধার পূর্ণ ব্যবহার না হলে, শক্তি অব্যবহৃত থাকলে এবং উৎসাহ উদ্দীপনা অপূর্ণ থাকলে, উম্মাহর গন্ডীর বাইরে আত্মউপলব্ধির প্রলোভন অথবা খিলাফতকে ক্ষতিগ্রস্থ এবং ব্যর্থ করার প্রবণতা থেকেই যাবে। খিলাফতকে দুটিই করতে হবে: &#8220;প্রয়োজন সৃষ্টি করা অর্থাৎ সদস্যদের মধ্যে সত্য সম্ভাবনা জাগ্রত করা এবং সেগুলোর পরিপূরণের উপায়ের ব্যবস্থা করা।&#8221; যদি পূর্বোক্ত ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হয় সে পাবে এমন একটি উম্মাহ যা অজ্ঞ এবং অজাগ্রত ও অর্বাচীন লোকদের নিয়ে গঠিত, যদি দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দেশ ত্যাগের মাধ্যমে নিজেকে শূন্য ও ধ্বংস করার পথ উম্মুক্ত করে দেবে, অথবা অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক কাজের মাধ্যমে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং বিদেশীদের শোষণের মাধ্যমে আত্মবিনাসের পথ উন্মুক্ত করে দেবে।</p>
<p>উৎপাদনের ঐকমত্য চরিতার্থ করার জন্য খেলাফত অবশ্যই উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করবে, শত্রুর আক্রমণ থেকে উম্মাহর কার্যকর প্রতিরক্ষার জন্য, প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করবে<sup>৩২</sup>। কোনো সদস্যই স্বেচ্ছাসেবী নয়। বরং সকলেই বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাবদ্ধ সৈনিক, যখন উম্মাহর মূল অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে, অথবা যখন পৃথিবীতে আল্লাহর বাণীকে সবার উপরে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য তাদের সার্ভিস প্রয়োজন।</p>
<p>চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ইজমা আল-আমালের এই দিকটির দ্বারাই উম্মাহর সর্বোচ্চ সাফল্য স্থিরীকৃত হয়, অর্থাৎ পৃথিবীকে ইসলামের জীবন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করায় এর অবদান নির্ণিত হয়। পেশা বা বৃত্তির এই দিকটি উম্মাহকে সেই স্তরে উন্নীত করে যেখানে পৌঁছানোর পর সে মানুষের ইতিহাসের এবং বিশ্ব ইতিহাসের মোকাবেলা করতে পারে। এই পর্যায়ে উম্মাহর সাফল্য হচ্ছে আল্লাহর দৃষ্টিতে উম্মাহর চূড়ান্ত যৌক্তিকতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>তৌহীদ</strong> <strong>এবং</strong> <strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>ক্ষমতা</strong></h4>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক</strong><strong>. </strong><strong>ইসলাম</strong> <strong>ও</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>বিশ্ব</strong><strong>: </strong><strong>দুঃখজনক</strong> <strong>কতগুলো</strong> <strong>বাস্তবতা</strong></p>
<p>মুসলিম বিশ্ব আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর কালামকে সবার উপরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি মহাসম্ভাবনাপূর্ণ শক্তি, কেননা এই মুহুর্তে মুসলিম বিশ্বে বাস করছে আটলান্টিক থেকে পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে, একশত কোটির বেশী মানুষ এবং তা এখন ইউরোপ এবং আমেরিকাতে শিকড় গাড়তে ও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। তার নিজের জন্য এবং পৃথিবীর জন্য এটি একটি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আল্লাহর অভিপ্রেত লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্ব এখনো তার ক্ষমতার বিকাশ ও ব্যবহার থেকে দূরে। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিশ্ব তার নিজের ক্ষমতা, নিজের বিকাশের জন্য প্রয়োগ, স্বদেশে তার ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যর্থ প্রয়াস ও অমুসলমানদের স্বার্থে গঠনমূলক প্রচেষ্টায় সেই সব শক্তির অপচয়ের মধ্যে একটি অনিশ্চিত ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।</p>
<p>মুসলিম দেশগুলোর সংবিধানের অধিকসংখ্যকই ঘোষণা করে যে, রাষ্ট্রের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। কেবলমাত্র একটি দেশই, সৌদি আরব, এই ঘোষণাকে গুরুত্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছে, যার লক্ষণ হচ্ছে রাষ্ট্রে শরীয়াহর কার্যকরণ। অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো কিছু সংখ্যকের, যেমন- পাকিস্তান ও কুয়েতের স্থান এর পরেই, কারণ এই সব দেশের সংবিধান ঘোষণা করেছে, ইসলাম হচ্ছে রাষ্ট্রের এবং উম্মাহর মূল শর্ত, তবে এর সঙ্গে তারা যোগ করেছে পাশ্চাত্য বর্ণনামূলক এসব ধারণা যে, তারা যে জাতি বা রাষ্ট্র এর কারণ তারা একটি জাতি গোষ্ঠী, একটি অঞ্চল এবং সার্বভৌমত্ব সমবায়ে তাদের জাতি বা রাষ্ট্র গঠিত, এটি এমন একটি বিবেচনা যাতে অপরিহার্য শর্ত হিসাবে ইসলাম অসম্পূর্ণ বলে গণ্য। তৃতীয় শ্রেণীর রাষ্ট্রগুলো যেমন মিশর, মরক্কো এবং সুদান ইত্যাদি। যারা ইসলামকে কেকের উপর বরফের একটি আবশ্যক আস্তর বলে গণ্য করে, যে কেকটির অন্তর্গত কাঠামো এবং বিন্যাস গঠিত পাশ্চাত্যের ধ্যান ধারণার দ্বারা, ইসলামী ধ্যান ধারণার দ্বারা নয়। জাতীয়তাবাদ নামক এক নতুন শুউবীয়া বা গোত্রবাদ পাশ্চাত্য ধরনের (রক্ত এবং মাংসের) রোমান্টিসিজম দ্বারা নির্ধারিত হয় অভিবাসন, এবং ন্যাচারালাইজেসনের আইন কানুন, নেতাদের সক্রিয় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও অন্যান্য শিক্ষিত শ্রেণীর জীবন আচরণের রূপ এবং নিজেদের সামাজিক প্রতিকৃতি যা জনগণের শিক্ষা এবং প্রেরণার জন্য পরিকল্পিত ও প্রচারিত হচ্ছে। এমন কোন মুসলমান দেশই নেই যা মদীনায় রাসুল্লাহর সমগ্র সময়ে মহানবীর সমাজ যে নিরবিচ্ছিন্ন মবিলাইজেশন ও সতর্ক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে সেই মবিলাইজেশন ও সর্তকতার মধ্যে নিজেকে পরিচালিত করেছে। এবং সম্ভবত মুসলিম বিশ্বের সবচাইতে নিকৃষ্ট দিক হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে তার দেউলিয়াপনা। এমন কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব কোথাও নেই যা পাঁচ বছর বয়স্ক মুসলিম শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তার সম্ভাবনাপূর্ণ বিকাশে তাকে উম্মাহর নিকট প্রত্যর্পণ করে। পৃথিবীকে রূপান্তরিত করার জন্য মুসলিমদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণের কোন সুযোগ সুবিধা আমাদের নেই- সে সুযোগ সুবিধা নেই ঐশী নক্সার আদলে উপাদান উপকরণকে রূপ দেওয়ার এই চেতনায় যে, সেই ঐশী নক্সাই হচ্ছে তার ব্যক্তিগত জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। পি. এইচ. ডি অথবা এম. ডি. গ্রাজুয়েটদের মোট সংখ্যার অনুপাতে শিক্ষিত ইমিগ্রান্ট এবং হতাশ বসবাসকারীদের হার ভয়ংকরভাবে অনেক উচ্চে, এর পরিসরের অন্যপ্রান্তে শিক্ষিতদের সঙ্গে অশিক্ষিতদের সর্বোচ্চ হার আতংকজনক।</p>
<p>মুসলমানরা যে দীর্ঘদিনের নিদ্রা থেকে জেগে উঠতে শুরু করেছে তাতে বিচলিত হবার কিছু নেই, তাদের সমাজগুলো আর্থিক সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে যে দুর্বল অথবা তাদের রাষ্ট্রগুলো যে নিষ্ক্রীয়তা ও আলস্য থেকে পৃথক ধ্বনি তুলে এলোমোলোভাবে পা ফেলে দাঁড়াচ্ছে তাতেও বিচলিত হবার কিছু নেই। বিচলিত হবার বিষয় হচ্ছে উম্মাহর এই মুহূর্তে বর্তমান ও ভবিষ্যতের এই সন্ধিকালে মুসলিম নেতাদের উম্মাহ সম্পর্কে দূরদৃষ্টির অভাব। আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হচ্ছে এই দূরদৃষ্টির অভাবের ফল এবং ইসলামী নাগরিকদের গড়ে তোলার চেষ্টার সম্পূর্ণ অভাব, যে নাগরিকেরা ইসলামী আদর্শের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কারণ সে একবিংশ শতাব্দীতে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সজাগ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ</strong><strong>. </strong><strong>রাজনৈতিক</strong> <strong>ক্ষমতার</strong> <strong>প্রতিশ্রুতি</strong></p>
<p>কোনো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মুসলিমই এই শতাব্দীতে উম্মাহর দুঃখজনক ব্যর্থতাগুলো সম্পর্কে মুসলিম রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত যে সব কৈফিয়ত দিয়ে থাকেন, সেগুলো বোঝেনা বা গ্রহণ করেনা এবং কেউ এ যুক্তি গ্রহণ করেনা যে, খিলাফতের নেতাদের উদ্যোগ গ্রহণের পূর্বেই জনতার মধ্যে থেকেই আসতে হবে। যে এলিট শ্রেণীর এ বিষয়ে উৎকৃষ্টতর জ্ঞান আছে নিশ্চয়ই তাদের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তারা সংখ্যায় প্রচুর। ইতিহাসের এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন মুসলিম উম্মায় ইচ্ছা-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তাকে গতিশীল করে তোলা। এবং কেবল তখনই তা সম্ভবপর হতে পারে, যখন নেতারা প্রস্ততি গ্রহণ করবেন, কর্তা হিসাবে ইতিহাসের গতিধারায় হস্তক্ষেপের বিপজ্জনক ভূমিকায়, এর বোগী বা কর্ম (object) হিসাবে নয়<sup>৩৩</sup>।</p>
<p>মুসলিম উম্মাহ কর্তৃক ইতিহাসে হস্তক্ষেপের সূচনা হয় গৃহেই, খিলাফতকে নির্মাণ করার ধৈর্য্যপূর্ণ অবিচলিত প্রয়াসের মাধ্যমে যা বর্তমান কোন মুসলিম রাষ্ট্রেই বিদ্যমান রয়েছে বলে মনে হয়না। যেখানে নোঙ্গর ফেলতে হবে তার একটি সাময়িক বুনিয়াদ সম্পর্কে নিশ্চিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই খিলাফতকে অবশ্যই সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে মবিলাইজ করার জন্য চেষ্টিত হতে হবে, এবং মার্চ করে অগ্রসর হবার জন্য ডাক দিতে হবে। এই উদ্দেশ্য পুরণের জন্য খোদ খিলাফতের বিলুপ্তি ছাড়া আর কোন প্রয়াসই বাহুল্য বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। খিলাফতের কর্মচারী ও পরিচালকদেরকে কোরবান করা যেতে পারে বা কোরবানী করা উচিত, যদি কোরবানী ছাড়া অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রগতি সম্ভব না হয়। যে মুহূর্তে উম্মাহ প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াবে সেই মুহূর্তে আবু বকরের খিলাফত আবার আয়ত্বে এসে যাবে আর তা হবে সর্বকালের মহত্তম মুহূর্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকা:</strong></p>
<p>১. তোমাদের এই উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য এবং আমি তোমাদের রাব্ব, তোমরা আমার বন্দেগী কর (২১: ৯২)।</p>
<p>২. (মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্থ) তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, একে অপরকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং ধৈর্য্যশীল হতে আদেশ করেছে (১০৩: ৩)- যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং ধৈর্য্য ও দয়া দাক্ষিণ্যের নির্দেশ দেয় (৯০: ১৭)।</p>
<p>৩. আল্লাহ রজ্জু দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়োনা, স্মরণ কর তার অনুগ্রহের কথা, তোমাদের মিলনের কথা, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু এবং তোমরা হয়ে উঠলে পরস্পরের ভাই এবং যখন তোমরা ধ্বংসের অতল গহ্বরে কিনারে উপনীত হয়েছিলে এবং তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছিলেন, এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে দেখান তার নির্দশন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার (৩: ১০৩)।</p>
<p>৪. তোমাদের মধ্য থেকে একটি উম্মাহ্ হউক, যে সৎকাজের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে, মন্দ কাজ নিষেধ করবে। প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>৫. আল্লাহ এবং তাঁর নবীকে মেনে চল, যদি তোমরা প্রকৃতই মুমিন হও (৮: ১)।</p>
<p>৬. আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই মহত্তম তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে পুণ্যব্রতী, সবচেয়ে সদাচারী (৪৯: ১৩)।</p>
<p>৭. তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর সৎকর্মে ও পুণ্যকাজে, মন্দকর্মে ও সীমা লংঘনে নয় (৫: ২)।</p>
<p>৮. খিলাফাহ, খুলাফাহ, খালায়েফ, ইয়াস্তাখলিফুকুম প্রভৃতি শব্দগুলোর দ্বারা কুরআনের আয়াতে এর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>৯. তোমাদের মধ্য থেকে একটি উম্মাহ্ হউক যে সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কর্ম বারণ করে, প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম (৩: ১০৪)।</p>
<p>১০. ইসলামী আইন-কানুনের কংক্রীট রূপদান ও বাস্তবায়নের এই ত্যাগীদের ইসলামে এবং ইউটোপিয়াবাদী ধর্মগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীতে, একটি বাস্তব ধর্ম হিসেবে ইসলাম খ্যাতি অর্জন করে।</p>
<p>১১. ইসলামে জনকণ্ঠ বা জনমতকে কখনো আল্লার কণ্ঠের সমান গণ্য করা হয়নি, বরং জনকণ্ঠ বা জনমত সবসময়ই আল্লাহর নির্দেশের অনুবর্তি ও অধীনে রয়েছে, জনমত যখন আল্লাহর আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তখনই তা বাধ্যতামূলক এবং যখন আল্লাহর বাণী থেকে ভিন্নপথ অবলম্বন করে তখনই তা নিন্দনীয় হয়।</p>
<p>১২. Abd al Rahman ibn Khaldun. Al Muqaddimah (Cairo: Matbaut Mustafa. Muhammad n.) pp. 127 if.</p>
<p>১৩. দেখুন এই গ্রন্থকারের (Christion Ethics Chap 1 VII Urubah and Religion pp. ff</p>
<p>১৪. তোমরা রবের পথের দিকে আহ্বান কর, প্রজ্ঞা ও শোভন প্রচারের মাধ্যমে, অবিশ্বাসীদের সঙ্গে সংলাপে সবসময় শ্রেষ্ঠতর এবং শোভনতর যুক্তি উত্থাপন কর (১৬: ১২৫)।</p>
<p>১৫. শাসকের বৈধ সমালোচনাকে উৎসাহিত করার জন্য মহানবী বলেছেন, &#8220;যে কেউ শাসকের জবাবদিহি বাধ্য করার প্রয়াসে মারা যায়, সে শহীদের মৃত্যুবরণ করে&#8221; এবং কোন জাতি যখন দেখে একটি শাসক জবরদাস্ত স্বৈরশাসন চালাচ্ছে এবং তাকে থামাবার জন্য চেষ্টা করছেনা তখন সে জাতি এমন একটি অপরাধ করে যার জন্য সে আল্লাহর কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়ে।</p>
<p>১৬. আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা করে (১৩: ১১), তারাই সদাচারী যারা পৃথিবীতে তাদেরকে ক্ষমতা দেওয়া হলে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং মন্দকর্ম নিষেধ করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে সমস্ত কিছুর প্রত্যাবর্তন আল্লাহর নিকট (১২: ৪১)।</p>
<p>১৭. আমি জ্বীন এবং মানবজাতিকে আমার ইবাদত ছাড়া জন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি (৫১: (৫১:৫৬)। ৫৬)।</p>
<p>১৮. হে জনগোষ্ঠী, আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে তোমাদেরকে স্থাপন করেছেন যাতে তোরা পৃথিবীতে বাস করতে পার। অতএব তার ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁর নিকট অনতাপ কর, তিনি হচ্ছেন প্রভু, তিনি নিকটেই আছেন এবং তিনি দয়ালু (১১: ৬১)।</p>
<p>১৯. যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে রাজত্ব দান করবেন যেমন তিনি দিয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে তিনি তাদের নিকট থেকে যা গ্রহণ করেছিলেন তাদের সেই ধর্মকে শক্তিশালী করবার জন্য তিনি কথা দিয়েছিলেন এবং তাদের আতংক ও নিরাপত্তহীনতাকে আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তায় পরিণত করতে। তদের কাজ হচ্ছে তাঁর ইবাদত করা এবং কোনো কিছুতেই তাঁর শরীক না করা, যারা ঈমান আনেনা তারা অন্যায়চারী (২৪: ৫৫)।</p>
<p>২০. দারিদ্র হচ্ছে শয়তানের প্রতিশ্রুতি, শয়তান তোমাদেরকে অশ্লীল ও পাপকর্ম করতে নির্দেশ দেয়, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন, তার দয়া ক্ষমা ও অনুগ্রহের, তিনি সবকিছু জানেন। তিনি প্রাচুর্যময় (২: ২৬৮)।</p>
<p>২১. তুমি কি দ্বীনের অস্বীকারকারীেেদর দেখেছো, সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তি সে এতিমকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়, যে মিসকিনকে খাদ্য দানে নির্দেশ দেয়না (১০৭: ১-৩)।</p>
<p>২২. বল হে মোহাম্মদ, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যে সব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা দিয়েছেন, কে তা নিষিদ্ধ করেছে? বল, এই পৃথিবীতে এগুলো মুমিনদেরই জন্য এবং পরকালে তারা এগুলো উপভোগ করবে। এরূপে আল্লাহ জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন (৭: ৩২)।</p>
<p>২৩. Pritchard. Ancient Near Eastern. Tests 60.</p>
<p>২৪. আসমানে এবং জমিনে যা কিছু আছে সমস্ত কিছুই তোমাদের অধীন করেছেন। যারা চিন্তা করে এবং বিচার করে, তাদের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন (৪৫: ১৩) আল্লাহই তোমাদের জন্য ধরিত্রীকে করেছেন বশীভূত, তোমাদের উদ্দেশ্য সাধন ও কর্মের জন্য তাই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে ভক্ষণ কর এবং স্মরণ রাখ যে তার কাছেই তোমাদের ফিরতে হবে (৬৭:১৫)।</p>
<p>২৫. Mohammad Husayn Haykal-Al Faruq Umar (Cairo Matbaat Misr 1364) Vol. 2 p. 200.</p>
<p>২৬. এবং তারা তাদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতের অধিকার স্বীকার করে (৫১: ১৬)।</p>
<p>২৭. (দুর্ভাগ্য তাদের) যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে এবং মনে করে যে, তাদের সম্পদ অমরতা দান করবে (১০৪: ২-৩) আল্লাহ ক্রয় বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন (২০২: ২৭৫) ২৮. যখন সালাত সম্পন্ন হয়, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান কর এবং</p>
<p>আল্লাহকে বার বার স্মরণ কর যাতে তোমরা প্রকৃতই সফলকাম হতে পার (৬২: ১০)। (হে মোহাম্মদ) তাদের থেকে একটি অংশ গ্রহণ কর অভাবগ্রস্থকে দেবার জন্য। এবং তাতে তাদের অন্তরের সৎকর্মশীলতা দৃঢ় হবে। তাদের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা কর, তাদের জন্য তোমার প্রার্থনা, তাদের জন্য সৃষ্টি করবে আত্মবিশ্বাস, কারণ আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৯: ১০৩)।</p>
<p>২৯. যাকাতের আদেশ বিষয়ক কুরআনের আয়াত অসংখ্য। দেখুন Barakat. Al Murshid&#8230; Zakah. বিশেষ করে কুরআন ৯: ১০৩)।</p>
<p>৩০. প্রকৃতপক্ষে অন্য মূল্যগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো একটি মূল্যের অনুসরণ হচ্ছে সেই মূল্যের উপর একটি জুলুম। একচ্ছত্র শাসন এই ধরনের কোনো একটি মূল্যের অনুসরণে বাড়াবাড়ি যা মূল্য অনুসরণের প্রয়াস এবং তার উদ্দেশ্য দুটিকেই দুষিত করে এবং সেগুলোকে মূল্যহীন করে তোলে।</p>
<p>৩১. পাঠ কর তোমার রবের নামে যিনি স্রষ্টা (৯৬: ১)&#8230; পাঠ কর তোমার প্রভু মহিমান্বিত, তিনি লিখতে শিখিয়েছেন, তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে আগে কখনো জানতনা (৯৬: ৩-৫)। মুমিনগণের একসঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়, তাদের কিছু সংখ্যকের উচিত ধর্মের অনুসরণের জন্য এবং এর নিয়ম কানুন আদেশ নিষেধের চর্চার জন্য গৃহে অবস্থান করা কারণ তাদের সাথীরা যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তাদেরকে শিক্ষাদানের জন্য তদের প্রয়োজন হবে, যেন তারা পাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে (ধর্মের নির্দেশ মত) (১: ১২২)।</p>
<p>৩২. তোমাদের সর্বশক্তি নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবার জন্য তৈরী হও। তোমাদের অশ্বারোহী যোদ্ধাগণকে এভাবে বিন্যস্ত কর, যাতে আল্লাহর শত্রুগণ এবং তোমাদের শত্রুগণ ভীত হয় এবং অন্যেরাও ভীত হ্যা, যাদের তোমরা হয়তো জাননা, কিন্তু আল্লাহ জানেন। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে যা কিছু ব্যয় কর, সমস্ত কিছুই তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তোমাদের পুরস্কারসহ এবং তোমাদের প্রতি অবিচার করা হবেনা (৮:৬০)।</p>
<p>৩৩. (হে বিশ্বাসীগণ) আল্লাহ যা ইতিহাসেই নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া আর কিছুই তোমাদের উপর আপতিত হবেনা, তিনি আমাদের রব, আমরা মুমিনগণ সবসময়ই তার উপর নির্ভর করবো। বল তোমরা কি আমাদের জন্য দুটি মঙ্গলের একটির প্রতীক্ষা করছো (শাহাদাত এবং জান্নাত, অথবা যুদ্ধে বেঁচে থাকা এবং শত্রুর উপর বিজয়) এবং আমরা প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদের শান্তি দিবেন সরাসরি নিজ পক্ষ হতে অথবা আমাদের হস্তের দ্বারা (৯: ৫১-৫২)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ</strong> অধ্যাপক শাহেদ আলী।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principles-of-political-system/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14770</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামের অনন্যতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/uniqueness-of-islam/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/uniqueness-of-islam/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 10 Jun 2024 14:37:01 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14401</guid>

					<description><![CDATA[সামাজিক আয়তন ও পরিসরের দিক দিয়ে, পৃথিবীতে যত ধর্ম ও সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে ইসলাম সে সবের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে একক ও অনন্য। ইসলাম দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদাভাবে দ্বীনকে জীবনের মূল বিষয় বলে গণ্য করে। দেশকালের মূল বিষয়বস্তু ইতিহাসের মূল প্রক্রিয়া]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সামাজিক আয়তন ও পরিসরের দিক দিয়ে, পৃথিবীতে যত ধর্ম ও সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে ইসলাম সে সবের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে একক ও অনন্য। ইসলাম দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম থেকে আলাদাভাবে দ্বীনকে জীবনের মূল বিষয় বলে গণ্য করে। দেশকালের মূল বিষয়বস্তু ইতিহাসের মূল প্রক্রিয়া বলে গণ্য করে ইসলাম তাকে নির্দোষ, কল্যাণকর এবং নিজ গুণেই বাঞ্ছনীয় ঘোষণা করে- যদি তা সুন্দর ও উৎকৃষ্টভাবে করা হয়, তবে এসবই হচ্ছে নেক কাজ ও সৎকর্মপরায়ণতা; এবং এসবই অপবিত্র, অন্যায়, অসদাচরণ, যদি তা করা হয় বিপরীতভাবে। এ কারণে ইসলাম নিজেকে দেশকালের সমস্ত কিছুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক মনে করে এবং সমগ্র মানবজাতিসহ গোটা ইতিহাসকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। প্রকৃতি থেকে আগত বা তার সঙ্গে যা সম্পর্কিত তা নির্দোষ, কল্যাণকর এবং আপনাতে বাঞ্ছনীয়। প্রকৃতি বা জগতের নিন্দার উপর নেককাজ বা নৈতিকতার ভিত্তি হতে পারে না।</p>
<p>ইসলাম চায় প্রকৃতি থেকে লভ্য সমস্ত কিছুই মানুষ অর্জনের চেষ্টা করবে, সে খাবে, পান করবে, সে গৃহবাস করবে, আরাম-আয়েশ ভোগ করবে, পৃথিবীকে একটা উদ্যানে পরিণত করবে, দাম্পত্য মিলন উপভোগ করবে। জীবনের সমস্ত উত্তম জিনিস উপভোগ করবে। বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাবে। শিখবে, জ্ঞান অর্জন করবে, প্রকৃতিকে ব্যবহার করবে, পরস্পর সহযোগিতা করবে। সংক্ষেপে এই সমস্ত কাজই সে করবে, কিন্তু করবে ন্যায়সঙ্গতভাবে, মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় না নিয়ে, চুরি ও অন্যকে শোষণ না করে; নিজের প্রতি, প্রতিবেশীর প্রতি, প্রকৃতির প্রতি এবং ইতিহাসের প্রতি অবিচার না করে। প্রকৃতপক্ষে এ কারণেই ইসলাম মানুষকে খলিফা বলে। এ সমস্ত কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায়ের পরিপূরণ ও রূপায়ণ।</p>
<p>এর পরিণাম স্বরূপ আমরা দেখতে পাব ইসলাম উপরে উল্লেখিত লক্ষ্যগুলোকে সকল মানুষের সাধারণ লক্ষ্য, তাদের মৌলিক মানবাধিকার বলে গণ্য করে এবং এগুলোর নিশ্চয়তা বিধান করতে চায়। এই লক্ষ্যের উপর ইসলাম তার সমাজতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে। কেবল এই লক্ষ্য, আদৌ বাস্তবায়িত হলেই, ইসলামের মত সমাজব্যবস্থা আবশ্যক। যদি স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, মানুষের সংঘ বা সমাজ হচ্ছে প্রকৃতিগত, ইসলাম তার সঙ্গে যুক্ত করে আবশ্যকতার গুণ। দেশকালের পরিসরে ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থা এবং তার পরিতৃপ্তি, উম্মাহ বা দারুস সালাম (শান্তিনিকেতন) এর সঙ্গে দ্বীন ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা কেবল অতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, চূড়ান্তও বটে। ইসলামী আইনের একটি ক্ষুদ্র অংশই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং উপাসনা ও নেহাত ব্যক্তিগত নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।&#8217; ইসলামী আইনের বৃহত্তর অংশের সম্পর্ক হচ্ছে সমাজব্যবস্থার সঙ্গে। এমন কি, আইনের ব্যক্তিগত দিকগুলো, যার বিষয়বস্তু উপাসনার আচার অনুষ্ঠান এবং খোদ আচার অনুষ্ঠানসমূহ ইসলামে এতটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আয়তন অর্জন করে যে, সেই পরিসরের অস্বীকৃতি বা দুর্বলতা সেগুলোকেই কার্যত অসিদ্ধ করে দেয়। <strong>যাকাত এবং হজ্জের মত কোন কোন রীতি বা আচার-অনুষ্ঠান তাদের প্রকৃতি এবং পরিণামের দিক দিয়ে স্পষ্টতই সামাজিক ধরনের। সালাত এবং সাওমের মত অন্য প্রথাগুলোর সমাজমুখীতা এর চেয়ে সামান্য কম। কিন্তু সকল মুসলমান একথা স্বীকার করেন, যে প্রার্থনার দ্বারা উপাসকের &#8216;মন্দ প্রবণতার নিবৃত্তি&#8217; বুঝায়না, তা অসিদ্ধ। এবং হজ্জযাত্রীর জন্য, যে হজ্জ সামাজিক কল্যাণ বহন করেনা, তা অসম্পূর্ণ।</strong> <strong>ইসলামের হৃদপিন্ড হচ্ছে সমাজব্যবস্থা এবং তার স্থান, ব্যক্তিগত জীবনের পূর্বে বা অগ্রে। আসলে ইসলাম ব্যক্তিগত অবস্থানকে সামাজিক অবস্থানের প্রাক শর্ত মনে করে এবং মনে করে মানব চরিত্র অবগুন্ঠিতই থেকে যায়, যদি তা সীমিত থাকে ব্যক্তিগতের উপর এবং ব্যক্তিত্বের গন্ডি অতিক্রম করে, সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ না হয়।</strong> যে সকল ধর্ম ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুণাবলি কর্ষণ করে, ইসলাম সেগুলোর সঙ্গে একমত এবং মনে করে, এ সব গুণাবলি (আল্লাহর ভীতি, ঈমান, হৃদয়ের পবিত্রতা, নম্রতা, কল্যাণ বদান্যতার প্রকাশ করে, প্রেম ও অঙ্গীকার) সম্পূর্ণই আবশ্যক; আসলে ইসলাম এ সকল সৎগুণ ও ন্যায়নিষ্ঠ সৎকর্মকে ধর্মপরায়ণতার অপরিহার্য শর্ত বলে গণ্য করে, কিন্তু এ সমস্তকে এবং এগুলোর অনুসরণকে শূন্য গর্ব বলে জ্ঞান করে, যদি না এ সবের চর্চা যারা করে তারা সমাজের অন্য মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণ বৃদ্ধি করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ক. ভারতীয় ধর্মগুলো থেকে স্বতন্ত্র</strong><br />
কতকগুলো ধর্মে, বিশেষ করে, উপনষিদীয় হিন্দু ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম জগতকে পাপ গণ্য করে এবং জগতের অস্বীকৃতিকেই পরিত্রাণ বা পরম সুখ বলে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ জগত থেকে মুক্ত হতে পারলেই পরিত্রাণ লাভ ও মহাসুখ ঘটে। অধিকন্তু এই ধর্মগুলো পরিত্রাণকে একটি ব্যক্তিক বা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে দাবি করে। কারণ তারা পরিত্রাণের সংজ্ঞা দেয়, চৈতন্যের বা উপলব্ধির পরিভাষায়, যা কেবল ব্যক্তিগতভাবেই অর্জিত হতে পারে। জগতের উন্নয়ন এবং সে কারণে তার সম্প্রসারণ, জগতে অন্তর্নিহিত বস্তুকেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকে গভীরতর করার জন্য জগতের সঙ্গে নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়া হচ্ছে পাপ। উদ্দেশ্য যখন এর সম্পূর্ণ বিপরীত, কেবল তখনই<br />
জগতের সঙ্গে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ককে স্বীকার করা হয়, অর্থাৎ পৃথিবীর কবল থেকে এবং এর &#8216;কর্ম&#8217; থেকে পূর্ণ মুক্তি অর্জন ঘটে, তাই (নিজেকে বিলুপ্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখার আইন বা বিধান) হিন্দু ধর্মে কেবল মাত্র কর্তার ক্ষেত্রে, অথবা বৌদ্ধ মতবাদে কর্তা ও অন্যদের জন্য এবং সে কারণে মিশনারী কর্মতৎপর ব্যক্তিদের বেলায়-উভয় ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আয়তনটি কেবল আদি ব্যাপারই নয়, বরং নৈতিকতা ও পরিত্রাণের সমগ্র প্রক্রিয়াটি এ নিয়েই গঠিত। পক্ষান্তরে, মানুষের সামাজিক কর্মকান্ড একটা রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই হউক, মূলত পাপ বা মন্দ, কেননা প্রকৃতিগতভাবে তা জগতের স্থায়িত্ব বা সমৃদ্ধি চায়। অর্থাৎ জৈবতাত্ত্বিক, বৈষয়িক,<br />
অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবন- সংক্ষেপে জগতের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধি তার লক্ষ্য। হিন্দুরা যদি একটা সমাজব্যবস্থার বিকাশ সাধন করে থাকে, একটা রাষ্ট্র, একটা সাম্রাজ্য, একটা সভ্যতা এবং এখন পর্যন্ত বিদ্যমান একটা বিশিষ্ট মানবসম্প্রদায় সৃষ্টি করে থাকে, তা তারা করেছে উপনিষদীয় দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করে। যদি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে তাদের সমাজব্যবস্থা স্বীকৃতি পেয়ে থাকে, তা পেয়েছে যা অনিবার্যতার সঙ্গে আপোস করে। ইহা এমন একটি স্বীকৃতি যা না মানা বা গ্রহণ না করাই বরং ব্রাহ্মণের পক্ষে শ্রেয়।</p>
<p>পক্ষান্তরে, দৃষ্টান্তস্বরূপ বৌদ্ধরা অশোকের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও প্রয়াস মেনে নিতে ও তার প্রতি ইতিবাচক সমর্থন দিতে পেরেছে। পৃথিবী থেকে বাঞ্ছিত সুখ অর্জনে অন্যদের সাহায্য করার জন্য এক্ষেত্রে বুদ্ধসংঘ নামে একটা সমাজব্যবস্থা গঠন করেছে, যা হচ্ছে পরিত্রাণকামী সন্ন্যাসী বা<br />
ব্যক্তিদের প্রথম সম্প্রদায়।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>খ. ইহুদী মতবাদ থেকে ভিন্নতা</strong><br />
এই দৃশ্য বা পরিসরের অন্য প্রান্তে, যা ভারতীয় ধর্মবোধ থেকে সম্পূর্ণ বৈপরীত্যের দিক থেকে কম নয়, রয়েছে হিব্রুদের বিষয়টি, তারা নিজেদেরকে যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছে এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে তাদের স্বপ্ন যেভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে তাতে করে, মানবজাতি থেকে তারা হচ্ছে একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠী। <strong>তারা হচ্ছে খোদার &#8216;পুত্র এবং কন্যা&#8217;, স্রষ্টার সঙ্গে তাদের বিশেষ সম্পর্কের কারণে বাকি সকলের থেকে তারা স্বতন্ত্র। ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত আইন কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্যদের নয়; এই বিধান আদেশ নিষেধের মাধ্যমে যে সমাজব্যবস্থাকে তুলে ধরে, তার অধিকারী কেবল ইহুদীরাই।</strong> তাদের ধর্ম ছিল একটি ট্রাইব (Tribe) কেন্দ্রিক ধর্ম, যাতে ভাল-মন্দ পাপ-পুণ্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে একটি ট্রাইব বা জনগোষ্ঠীর হিত এবং ক্ষতির পরিভাষায়। তাদের সমাজব্যবস্থার ছিল একটি জৈবতাত্বিক ভিত্তি।</p>
<p>কেবল জন্মগত ইহুদীরাই ইহুদী এবং ইহুদী ধর্মে ধর্মান্তর গ্রহণ কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং তা রাখতে হবে একটি ন্যূনতম পর্যায়ে। এ হচ্ছে জাহিলিয়ার রেসিজম, বংশ বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ, যার মধ্যে মূল্যের কোন চর্চা নেই, মুরুয়াহ (সাহস, বীরত্ব, মহানুভবতা) নেই, যা এর মূলগত মন্দ প্রকৃতি বা পাপকে লাঘব করতে পারে। কারণ হিব্রু ইতিহাস, যা তাওরাত কর্তৃক আদর্শায়িত বা সহজ কথায় পবিত্রিকৃত, প্রত্যাদেশ দ্বারা এবং অন্যান্য সেসব সাহিত্য যা নিয়ে ওল্ড টেস্টামেন্ট গঠিত, এবং যেভাবে তা সাধারণভাবে জ্ঞাত, তা হচ্ছে ঐসব মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত মূল্যবোধে পরিপূর্ণ। এক্ষেত্রে হিব্রু এবং তাদের বংশধর ইহুদীদের বেলায়, সম্মান অথবা ন্যায়বিচারের যে কোন মূল্যে, ট্রাইবের উর্ধ্বতন বা অব্যাহত অস্তিত্বই হচ্ছে লক্ষ্য। <strong>নেক কর্ম বা নৈতিকতার যে কোন মূল্যে রেস বা বংশের উর্ধ্বতন বা অব্যাহত অস্তিত্বই হচ্ছে বাঞ্ছনীয়। এমনকি, ইসরাইলের নিজ সামাজিক আইনের মধ্যে তা পবিত্রতম, যেমন অগত্যা নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে যৌন সংসর্গ এবং ব্যভিচারও অলংঘনীয় নয়, যখন <em>&#8216;ইব্রাহীমের বংশধারার নিরবচ্ছিন্নতা বিপন্ন হওয়ার প্রশ্ন উঠে।&#8217;</em></strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>গ. খ্রিষ্টানধর্ম থেকে পার্থক্য </strong></p>
<p>খ্রীষ্টধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে এই মারাত্মক নৃতত্ত্বকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যা হযরত ঈসার সময়ে নিষ্প্রাণ আইনসর্বস্বতায় ফসিলিকৃত হয়ে উঠেছিল। অপরিহার্যভাবেই হযরত ঈসার আহ্বান ছিল বিশ্বমুখী এবং ব্যক্তি অভিমুখী বা অন্তমুখী। ইহুদীদের জাতিগত কুল-গৌরবের মন্দ পরিণাম সম্পর্কে ঈসা এতটাই সচেতন ছিলেন যে, তাঁর আত্মীয়রা, ‘যেহেতু তাঁরই আত্মীয়, এজন্য অধিক পাবার দাবিদার’ এমন ইঙ্গিত মাত্রেই তিনি ক্রুদ্ধ হতেন। ঈসার এই আহ্বান যা সারবত্তার দিক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে নৈতিকতাভিত্তিক (কেননা তার খোদা এবং কিতাব আর ইহুদীদের খোদা এবং কিতাব মূলতই অভিন্ন); তা পরিণত হতে পারতো একটি স্থায়ী আন্দোলনে যাতে ইহুদীদের বাড়াবাড়িগুলো সংশোধন হতে পারতো, যদি এর অনুসারীরা সেমিটিক অর্থাৎ ফিলিস্তিনী এবং তাদের পড়শীদের মধ্যে সীমিত থাকতো। কিন্তু গ্রীকদের দ্বারা গৃহীত হবার ফলে ঈসার এই দাওয়াত নতুন একটি &#8216;রহস্য ধর্মে রূপান্তরিত হয়। সেমাইটদের লোকোত্তর খোদা হয়ে উঠলেন ত্রিত্ববাদের মধ্যে এক &#8216;পিতা&#8217;, যে ত্রয়ীর দ্বিতীয় জনকে নির্মাণ করা হয়েছে মিত্র এবং এডোনিসের প্রতিকৃতিতে, যে মৃত্যুবরণ করে আবার বেঁচে উঠে, আবেগ মুক্তি বা মোক্ষণের মাধ্যমে পরিত্রাণ এনে দেবার জন্য।</p>
<p>যীশুর অন্তর্মুখীনতার পরিণয় বন্ধন ছিল বস্তুর প্রতি অসুস্থ ঘৃণার সঙ্গে যা বুদ্ধিসর্বস্ব জ্ঞানতত্ত্বের একটি বৈশিষ্ট্য, পরিণয় বন্ধন ছিল সমগ্র রাজনৈতিক জীবন তথা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সামগ্রিক নিন্দাবাদে ইহুদী ট্রাইবেলিস্ট রাজনীতির প্রতি তার সংশয়ী দৃষ্টিভঙ্গির সহিত। মুক্ত নাগরিকদের দাস সমাজ থেকে পৃথকীকরণ এবং মুক্ত নাগরিকদের সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক নপুংসকতা ছিল চর্চা বা ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের সূচনা। খ্রিষ্টান চার্চ বা ধর্ম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে, এবং এক সময়ে দুই তরবারীর তত্ত্ব সাধারণভাবে গৃহীত হয় একটি রাজনৈতিক থিওরী হিসেবে, কিন্তু তা ছিল আদি খ্রিষ্টানবিবেকের পরিপন্থী। এই বিবেকের বিদ্রোহ ঘটে লুথারের মাধ্যমে এবং চার্চকে আবার নিয়ে বন্দী করা হয় সেই খাঁচার মধ্যে, যা চার্চের প্রথম দিকের মতবাদ নির্মাণ করেছিল তার চারপাশে। আজ কদাচিৎই কোন খ্রিষ্টানধর্মানুসারী মধ্যযুগের থিওরিকে গ্রহণ করে। কদাচিৎ কোন খ্রিষ্টানরাজী হবে রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মকে একটি অংশ দিতে, দূর থেকে সমালোচনা করার অধিকার দেওয়া ছাড়া।<br />
বর্তমানে খ্রিষ্টানধর্মের কোন সমাজ বিষয়ক থিওরী নেই। দেশকাল এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নিন্দা, প্রত্যেকটি জাগতিক কর্মকান্ড, এমনকি খোদ সমাজ ব্যবস্থাকে অসার এবং পরিত্রাণ লাভের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক গণ্য করায় খ্রিষ্টানধর্মে কোন থিওরীর অবকাশ নেই। সমাজব্যবস্থাকে অপরিহার্য পাপ বলে গণ্য করা ছাড়া, কল্যাণ-বিধানের বাইরে দাঁড়িয়ে, এমনকি তার জাগতিক অস্তিত্বে খ্রিষ্টানধর্ম যতটুকু সংশ্লিষ্ট (ঈসার শরীর হিসেবে এর বাহ্য অস্তিত্ব যা এই পৃথিবীর নয়, কিংবা এ পৃথিবীতে নেই) তাতে করে খ্রিষ্টানধর্ম হচ্ছে একটি অস্থায়ী প্রতিষেধক, যেখানে দান- দক্ষিণা এবং বিশ্বাস হচ্ছে দৈনন্দিন বিধান। কিন্তু এতে প্রোগ্রাম ভিত্তিক কর্মকান্ড অথবা আইন কানুনের জন্য প্রয়াসের কোন মূল্য নেই, যেখানে ইতিহাস নিজেই অপ্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বহীন। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, শিল্প বিল্পবের সময় থেকে ইউরোপে এবং উত্তর আমেরিকায় খ্রিষ্টানচিন্তাবিদরা খ্রিষ্টানধর্মের নামে ক্রমবর্ধমান হারে সামাজিক ন্যায়বিচারের উচ্চতর ব্যবস্থার জন্য পরিকল্পনা আহ্বান করেছেন এবং তা কার্যকর করেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের এ সমস্ত কর্ম,  জগতবিমুখতা থেকে খ্রিষ্টানধর্মকে নড়াতে পারেনি। দারিদ্র বিমোচনের জন্য আবশ্যক এবং অত্যন্ত হিতকর হলেও, কিংবা বুদ্ধিভিত্তিক দিক দিয়ে একটি নৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতাবোধ সঞ্চারিত করার প্রয়াস সত্বেও তাদের কর্মকান্ড অসার প্রমাণিত হয়েছে। যা বিশ্বাসে মৌলিক সূত্রগুলোর সংস্কারের জন্য প্রয়োজন, তা সাধনের জন্য আজ পর্যন্ত কদাচিৎ কেউ দুঃসাহস করেছে- যেমন আল্লাহর প্রকৃতি, সৃষ্টির লক্ষ্য, মানুষের প্রকৃতি ও গন্তব্য। যত দিন না তা করা হয়েছে ততদিন খ্রিষ্টান চিন্তাধারা স্ববিরোধীই থেকে যাবে, সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নীলনকশা নিয়ে তারা যতই অগ্রসর হোক-না-কেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঘ. আধুনিক সেক্যুলারিজম থেকে ভিন্নতা</strong><br />
স্পষ্টতই ইসলামী সমাজব্যবস্থা হচ্ছে আধুনিক সেক্যুলারিজমের (ধর্মহীন নিরপেক্ষতা) সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান ধর্ম নিরপেক্ষতা চায় ধর্মের সম্ভাব্য সকল নিয়ন্ত্রণ থেকে সমাজের পাবলিক বা রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকান্ডকে দূরে রাখতে। পাশ্চাত্য জগতে সেক্যুলারিজমের ইতিহাসে যা দেখা যায়, তার প্রধান যুক্তি হচ্ছে ধর্ম অন্য সকলের উপর সমাজের একটি অংশ বা চার্চের একটি কায়েমী স্বার্থ, যেহেতু চার্চের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কর্তৃত্ববাদী, যাতে ব্যক্তিস্বাধীনতা উপেক্ষিত, এবং যেহেতু তাতে সমগ্র সমাজের প্রতিনিধিত্ব নেই, তাই চার্চ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ অত্যাচারের সামিল, একটি গ্রুপ বা দল কর্তৃক জাতির শোষণ এবং দমনের একটি প্রকার। পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে যুক্তিটি নিশ্চয়ই সত্য, যেখানে প্রাথমিক চার্চ জনসংখ্যার কেবল একটি অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে, সেখানে ক্যাথলিক খ্রিষ্টান মতবাদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিরোধী কর্তৃত্ববাদী শক্তিরূপে এবং জনগণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় গড়ে তুলে কায়েমী স্বার্থ। বহু শতাব্দী ধরে ক্যাথলিক চার্চ যেহেতু ইউরোপে সবচেয়ে বেশী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী ছিল সেকারণে সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির যে কোন আন্দোলন স্বভাবতই চার্চের বিরুদ্ধে একটি সংগ্রামের রূপ নেয়।</p>
<p>অধিকতর সাম্প্রতিককালে, সেক্যুলারিজম বলছে, ধর্ম থেকে উদ্ভূত মূল্যবোধসমূহের দ্বারা রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের বিরোধীতা তার লক্ষ্য। কেননা, উৎস হিসেবে পাশ্চাত্য ধর্মকে বিশ্বাসের অযোগ্য বলে গণ্য করে।&#8221; দাবি করা হয়, এই উৎস হচ্ছে অযৌক্তিক কৃসংস্কারপূর্ণ এবং নির্বিচারী। বলাবাহুল্য, এই সব অভিযোগের প্রতি মানুষ সহানুভূতিশীল তখনই হতে পারে, যখন অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয় খ্রিষ্টানধর্ম এবং সেই সব ধর্মের বিরুদ্ধে যেসব মতবাদের ভিত্তি হচ্ছে অন্ধবিশ্বাস অথবা সেই সব ধর্মের বিরুদ্ধে ইতিহাসের নির্দিষ্ট কোন কোন যুগে যাদের অবক্ষয় ঘটেছে। কিন্তু এসব অভিযোগ সেই সব ধর্মের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক, যেগুলো স্বভাবসংগত অর্থাৎ যৌক্তিক ধর্ম, তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার অধিকারী যা যুক্তি বিচারের মানদন্ডের সার্বজনীন বৈধতা স্বীকার করে। অথবা সেই সব ধর্মের ক্ষেত্রেও তা অপ্রসাঙ্গিক যেগুলো তাদের স্থবিরতা ও অবক্ষয়ের যুগ অতিক্রম করার প্রয়াস পায় সব প্রস্তাবনাবাক্যের প্রতি সমালোচনার আলোকে যৌক্তিক আবেদন জানিয়ে, সকল প্রকৃত মানবিক মূল্যবোধ যে সব প্রেমিসের অন্তর্গত। অবশ্য বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেক্যুলারিজমের অনুসরণ করা হয় অগভীর যুক্তিতে। তাদের যুক্তি এই যে, বিজ্ঞানের যুগ সেক্যুলারিজমের বাস্তবতাবাদ ও প্রগতির সঙ্গে অভিন্ন মনে করে। অথচ ধর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ এই যে, ধর্ম সেক্যুলারিজমের বিপরীত মূল্যবোধসমূহ জারি করে, আর এটি এমন একটা দাবী যার অবস্থান সত্য থেকে চূড়ান্ত দূরত্বে। প্রকৃতপক্ষে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এই দাবীটি হচ্ছে কপটতামূলক, কেননা কোন সমাজ দাবী করতে পারেনা যে, কোন মূল্যবোধের সাহায্য ছাড়াই তার ক্রিয়াকান্ড নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়, বা এমন সব মূল্যবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যা তার নিজ ধর্মের উত্তরাধিকার থেকে মোটেই অর্জিত নয়।</p>
<p><strong>অনুবাদঃ অধ্যাপক শাহেদ আলী। </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/uniqueness-of-islam/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14401</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্বব্যবস্থার মৌলনীতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/principles-of-world-order/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/principles-of-world-order/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[ড. ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 24 May 2024 11:57:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14315</guid>

					<description><![CDATA[আল্লাহ যেহেতু এক এবং একক, সে কারণে তার সকল আদেশই সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এই বিশ্বজনীনতা কর্তা হিসেবে অর্থাৎ আদেশ পালনকর্তা হিসেবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আবার কর্ম হিসেবেও মানুষের বেলায় প্রযোজ্য যাদের মধ্যে আল্লাহর আদেশগুলো পূরণ হয়। এর পূর্বে মানুষ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল্লাহ যেহেতু এক এবং একক, সে কারণে তার সকল আদেশই সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এই বিশ্বজনীনতা কর্তা হিসেবে অর্থাৎ আদেশ পালনকর্তা হিসেবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আবার কর্ম হিসেবেও মানুষের বেলায় প্রযোজ্য যাদের মধ্যে আল্লাহর আদেশগুলো পূরণ হয়। এর পূর্বে মানুষ একত্র হয়েছে রেস্ (নরগোষ্ঠী) অথবা সংস্কৃতির ভিত্তিতে কিংবা উভয়ের ভিত্তিতে। ইসলাম মানবিক মিলনের এক অভিনব ভিত্তি স্থাপন করেছে, উম্মাহ হচ্ছে সেই ভিত্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি দৃষ্টি, ইচ্ছা এবং কর্মের ত্রয়ী ঐকমত্য হচ্ছে উম্মাহ, যাতে কেবল মুসলমানরাই একমত হবে বলে আশা করা হয়। তাওহীদ যে বিশ্বজনীনতা বুঝায় তা একটি নতুন বিন্যাস দাবী করে। যেহেতু মুসলিম উম্মাহ একটি নতুন সমাজ, যার ভিত্তি গোত্র বা রেস নয় বরং ধর্ম, তাই আশা করা হয় অমুসলমানরাও এই নীতিই অনুসরণ করবে, অর্থাৎ তারা গোত্র এবং রেসের বন্ধন অতিক্রম করে ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদেরকে সংগঠিত করবে। আধুনিক পাশ্চাত্য প্রচার মাধ্যম ধর্মকে মনে করে পশ্চাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানব সংহতির অচল বিভেদমূলক ও সংকীর্ণ নীতি। কিন্তু ধর্ম মোটেই তা নয়। এখনো পৃথিবীতে মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ধর্ম। ধর্মেই আমরা পাই মানুষের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংজ্ঞা। খ্রীষ্টিয়ান চার্চের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য জাতিগুলোর দীর্ঘ এবং তিক্ত সংগ্রাম ধর্মের এই অপখ্যাতির জন্য দায়ী&#8217; [১] যেহেতু চার্চের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করেছে রাজার প্রতি আনুগত্য, নৃতত্ত্বকেন্দ্রীকতা এবং জাতীয়তাবাদের শক্তিসমূহ। [২]</p>
<p>তাই মিলনের ভিত্তি হিসেবে এবং ধর্মের উদ্দিষ্ট বিশ্বজনীন সমাজের বুনিয়াদ হিসেবে ধর্ম পরিত্যক্ত হয়েছে এবং চার্চের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের জন্য নিন্দিত হয়েছে। তাই পাশ্চাত্য মন এনলাইটেনমেন্টের আদর্শে মুখ ফিরিয়েছে। বিশ্বজনীন সম্প্রদায়ের আদর্শের দিকে যেখানে চার্চের একই আদর্শ অনুসৃত হল কেবল যুক্তির ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়। পরে আবার সে আদর্শ পরিত্যক্ত হয়, কারণ বৈপ্লবিক ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদী -সাম্রাজ্যবাদীদের মোকাবেলায় পশ্চিমা জগৎ তা সমর্থন করতে গিয়ে স্নায়ুর শক্তি হারিয়ে ফেলে।</p>
<p>ইসলাম পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছে বাস্তবতা সম্পর্কে তার নিজের ধারণা, তার নিজের আদর্শ, তার স্বজন ও বংশধরদের ও মানব জাতির চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে, আর এ সমুদয় নিয়েই গঠিত ইসলাম। ইসলাম অমুসলমানদের কাছ থেকে এ ধরনের একটি সত্যকে প্রত্যাহার করবেনা যা দ্বীনের উপর ভিত্তি করে নিজেদের সংগঠিত করে পালন করে থাকে। পক্ষান্তরে, ইসলাম এ তাগিদ দেয় যে তারা একইরূপ সম্মান ও মর্যাদা ভোগ করবে অন্য কোন ভিত্তির উপর নিজেদের পরিচয় দিতে বা সমাজ গঠনে অস্বীকৃতি জানিয়ে; বস্তুত এটা ইসলামের জন্য আরো সম্মাজনক যে, যারা ইসলাম অনুসরণ করবেনা তাদের পার্থিব জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে প্রতিযোগী হিসেবে দেখে এবং তাদের কেবল এই সব প্রশ্নের জবাবকে কেন্দ্র করে গঠিত সমাজ বলেই গণ্য করে। [৩]</p>
<p>হিযরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদেরকে দ্বীনের ভিত্তিতে একটি সংগঠনরূপে সংগঠিত করেন। তিনি &#8216;আওস&#8217; এবং &#8216;খাযরাজ&#8217; গোত্র দুটিকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ করেন, কোরাইশের সেই সব গোত্রীয় লোকদের সাথে, যাদেরকে তিনি মদীনায় পাঠাতে শুরু করেছিলেন। তদুপরি তিনি আযাদ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন দাসদের সঙ্গে, প্রভুকে তার প্রজার সঙ্গে, তাদের সকলের জন্য সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে আল্লাহর আইনকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় কায়েম করেছিলেন। সমভাবেই তিনি তাদের উপর নিজেকে স্থাপন করেছিলেন রাজনৈতিক ও বিচার বিষয়ক প্রধান হিসেবে। কিন্তু <strong>৬২২ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে মদীনায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি মুসলমান ও ইহুদীদের জন্য একটি সনদ ঘোষণা করেন, যে চুক্তিতে মুসলমান ও ইহুদীরা আবদ্ধ হবে এবং তদনুসারে তাদের জীবনকে গঠন করবে। এই সনদটি ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান এবং বিশ্বব্যবস্থার গঠনতন্ত্র, মানবজাতির জন্য যে ব্যবস্থার নির্মাণ হচ্ছে ইসলামের লক্ষ্য। এই সংবিধান বলবৎ করার মানেই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবর্তন এবং তৎসহ বিশ্ব ইতিহাসে একটি প্রতিযোগী আন্দোলন হিসেবে ইসলামের ঘোষণা। এই শেষোক্ত বিবেচনায় উদ্দীপিত হয়ে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ঘোষণা করেন যে, এই দিবসটি হচ্ছে ইসলামী ইতিহাসের সূচনা, ইসলামের সময়কে হিসেব করার শুরু।</strong> মূলত [৪] সংবিধানটি ছিলো একটি সনদ যার বলে সৃষ্টি হল ইসলামী রাষ্ট্র, এই সনদ বা চুক্তি হল রাসূলুল্লাহ (সা.), মুসলিমগণ এবং মদীনার ইহুদী ও বিভিন্ন গোত্রের লোকদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি। এই সনদের গ্যারান্টার হচ্ছেন আল্লাহ নিজে যার নামে তা প্রবর্তিত হল, এই সনদ প্রথমে গোত্রীয় আনুগত্যের পরিচয়ে দল গঠনের পদ্ধতিকে উচ্ছেদ করে এবং কর্তব্য, অধিকার ও দায়িত্বকে গোত্রের প্রতি আনুগত্য হিসেবে প্রকাশ করার নিয়ম রহিত করে। গোত্রবাদের স্থানে এই সনদ দ্বীনকে প্রথম নীতি হিসেবে স্থাপন করে এবং তার অধীনে বিভিন্ন গোত্র সামাজিক মর্যাদার এবং নানা জাতের লোকদের সংঘবদ্ধ করে। তখন থেকে সকল মুসলমান হল একটি মুক্ত, পরস্পর সম্পর্কযুক্ত উম্মাহর সদস্য, যার সামাজিক ঐক্যবন্ধন হচ্ছে ইসলাম। [৫] মুসলমানদের উম্মাহর পাশাপাশি ছিল আর একটি উম্মাহ-ইহুদী উম্মাহ। মুসলমানদের মত তারাও নিজেদেরকে গঠন করবে একটিমাত্র পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত সত্তায় তাদের গোত্রীয় আনুগত্য উপেক্ষা করে। তাদের উম্মাহ শাসিত হবে ইহুদী (তাওরাত) আইন দ্বারা এবং এর সদস্যদের জীবন পরিচালিত হবে রাব্বিগণ কর্তৃক ব্যাখ্যাত ইহুদী ধর্মের বিধিবিধান দ্বারা। ইসলামে রাষ্ট্রের কর্তব্য হচ্ছে ইহুদী উম্মাহর সুরক্ষা, রাব্বিনিক আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা, এবং এর কল্যাণ ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, শান্তি ও পরিবেশের ব্যবস্থা করা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ছয় বছর পরে দক্ষিণ আরবের নাজরানের খ্রীষ্টানরা মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে সাক্ষাত করে ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করার জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে অভিনন্দিত করে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান, তাদের মধ্যে যারা ইসলাম কবুল করলো, তারা মুসলিম উম্মাহর ভেতর সামিল হয়ে গেল, কিন্তু যারা খ্রীষ্ট ধর্ম ত্যাগ করলনা রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ইহুদীদের মত আর একটি উম্মায় সংগঠিত করলেন, তাদের জন্য একই অগ্রাধিকার এবং কর্তব্যের নিশ্চয়তাসহ। পরবর্তীকালে খলিফারা একের পর এক একই মর্যাদা দিয়েছেন জরথুস্ত্রীয়, হিন্দু এবং বৌদ্ধগণকে। ইসলামী রাষ্ট্র সম্প্রসারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে নওমুসলিমরা মুসলিম উম্মাহর পরিসর স্ফীত করে তোলে, এবং যারা ইসলাম কবুল করলোনা তারা ইহুদী, খ্রীষ্টান ও অন্যান্য উম্মাহর সদস্য রয়ে যায়। প্রথমোক্তগণ ইসলামী রাষ্ট্রের পদাংক অনুসরণ করে, ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে নওমুসলিম লোকদের অন্তর্ভুক্ত ও অঙ্গীভূত করে নেয় এবং নতুন ব্যবস্থার নাগরিক হিসেবে তাদেরকে পুনর্বাসিত করে। প্রথম দিকের কয়েক যুগ পর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাথমিক আঞ্চলিক সম্প্রসারণের পর ইসলামী রাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণে সংখ্যাগুরু ছিলো অমুসলিমরা। রাষ্ট্রের সেবাযত্নের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের বিষয়বস্তু ছিলো এইসব অমুসলিমের ভবিষ্যত এবং নিশ্চয়তা, তাদের কল্যাণ এবং প্রতিষ্ঠাসমূহ।</p>
<p>আজকের দিনে জাতি অর্থে যাকে &#8216;স্টেট&#8217; বলা হয়, সেই অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র একটি রাষ্ট্র নয়। ইসলামী রাষ্ট্র একটি সমজাতিক সমগ্র নয়, একটি জাতীয়তামূলে সংহত একক নয়। সম্প্রদায় শব্দটির সংজ্ঞাবদ্ধ সদস্যদের একটি সম্প্রদায় নয়, যার একমাত্র যৌক্তিকতা হচ্ছে সকল বিষয়ের মানদণ্ড হিসেবে এর প্রতিরক্ষা ও খিদমত। ইসলামে রাষ্ট্র ছিল একটি সুদৃঢ় কেন্দ্র, যার প্রতিরক্ষার পেছনে ছিলো একটি প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি এবং একটি মুসলিম উম্মাহর সমর্থন ও স্বায়ত্তশাসিত ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহের একটি ফেডারেশনের সহযোগিতা, যে সম্প্রদায়গুলোর প্রত্যেকটিরই ছিলো নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তাদের সকলের উপর ছিলো ইসলামী রাষ্ট্র, তবে তার ক্ষমতা ছিলো কেবল নির্বাহী ক্ষমতা। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিলোনা। রাষ্ট্র নিজেকে যে আইনের অধীন মনে করতো তা হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত, তার অভিপ্রায়কে কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, পৃথিবীতে রাষ্ট্রের মিশন হচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র তার সম্প্রসারণ এবং তাতে করে সকল মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বের ভিত্তিতে একত্রীকরণ, কেননা আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন গোত্র, জাতিতে বিভক্ত করেছেন, পরিচয়ের সুবিধা এবং সহযোগিতার জন্য। [৬] ইসলামী রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব হচ্ছে আইনের, রাষ্ট্র তার সকল প্রতিষ্ঠানসহ এই আইনের নির্বাহী শক্তিমাত্র। এই ঐশী আইন রাষ্ট্রের মিশন হিসেবে বিধান দিয়েছে এই পৃথিবীকে এবং মানবজাতিকে আল্লাহ তাঁর প্রত্যাদেশ মারফত যে নমুনা দিয়েছেন সেই নমুনার আদলে রূপান্তরিত করতে।</p>
<p>ইসলামী রাষ্ট্র খ্রীষ্টান, ইহুদী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রের গঠনকারী উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতেই কেবল বাধ্য নয় বরং সমগ্র মানবজাতিকেই ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্গত করা তার দায়িত্ব। তাই অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানে এমন একটা জীবন ব্যবস্থার সুযোগ থাকবে যেখানে সকল সম্প্রদায় শান্তিতে বসবাস করবে পুরো ন্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে এবং একে অপরের সঙ্গে নানা কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সাথে। ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানে এ সকলেরই ব্যবস্থা করা হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ক. ইসলামে শান্তি</strong></h4>
<p>ইসলাম যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা পেশ করেছে তা হচ্ছে শান্তির ব্যবস্থা, পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্য যুদ্ধ এবং শত্রুতার চির অবসান ঘটাতে হবে। এই শান্তি সকলের জন্য, এবং ব্যক্তি ও গ্রুপ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য এই শান্তির দ্বার অবারিত। আল্লাহ মুসলমানদেরকে আদেশ করেছেন, &#8220;হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা শান্তিতে প্রবেশ কর সম্পূর্ণভাবে এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করোনা।&#8221; [৭] তিনি তাদেরকে আদেশ করেছেন সকল মানুষকে শান্তির দিকে আহ্বান করতে। &#8220;যদি তারা (বিরোধীগণ) শান্তির প্রতি আগ্রহশীল হয়, তোমরাও শান্তি অনুসরণ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন কর। [৮]&#8221; শান্তির ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে সকল মানুষকে এবং প্রত্যশা করা হয় যে, সকলেই তা গ্রহণ করবে এবং সর্বান্তকরণে সকলে শান্তিতে প্রবেশ করবে, শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যাবেনা। যদি কেউ প্রত্যাখ্যান করে তবে বুঝতে হবে সে দল শান্তি চায়না এবং তা যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল। নিদেনপক্ষে অবস্থা এই হতে পারে যে, শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান দ্বারা বুঝাতে পারে, যে দল শান্তির প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক স্থাপনে অনিচ্ছুক। কিন্তু এ তো &#8216;আইসোলেশনিজম&#8217; বা অন্যদের থেকে দূরে সরে থাকা; এই বিকল্প কিন্তু যুদ্ধের মতই নিন্দনীয় যদিও তা হিংসাত্মক নয়। কারণ এতে শান্তির দাবির প্রতি তাচ্ছিল্য বুঝায়। যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অথবা এর দ্বারা বুঝায় ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আদান প্রদানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জনগণকে নিরাপদ রাখার বাসনা। <strong>ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দুই বিকল্পের জন্যই শান্তি হচ্ছে জবরদস্তিমূলক জবাব; প্রথমত, যে কোন জনের পক্ষ থেকে শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা অমানবিক কাজ এবং দ্বিতীয়ত, যে লোকগুলোকে এ ধরনের আদান প্রদানের জন্য আহ্বান করা হয়েছে তাদের মর্যাদার জন্য তা অপমানজনক।</strong> বস্তুত নর-নারী নির্বিশেষে কেউ যাতে অন্যদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কোন মানুষকে একটা নিরেট পর্দার অন্তরালে আড়াল করা তার সততার বিশ্বাসযোগ্যতার উপর আক্রমণ এবং সে কারণে এরূপ কর্ম সেই লোকের বিরুদ্ধে একটি আগ্রাসী কার্য। ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে প্রকল্পিত আদান প্রদান হতে পারে ব্যবসায়িক এবং সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে, যা অন্য রাষ্ট্র আপত্তিকর মনে করতে পারে, কিন্তু তাতে সম্ভাব্য ভবিষ্যত সম্পর্কগুলোর সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায় না। সকল আর্থক এবং সামাজিক আদান প্রদানের পরও রয়েছে ইসলামের এই আদর্শগত দাবি যে, বিশ্বশন্তির একটি নতুন ব্যবস্থা হচ্ছে মানব জাতির অধিকার, যোগাযোগের এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষ আদান প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীন। অন্যের কথা শুনতে ও অন্যকে তার কথা শোনাতে, অন্যকে সত্যের ব্যাপারে বিশ্বাসী করতে এবং অন্যের দ্বারা নিজে বিশ্বাসী হবার বেলায় সে বাধাহীন, তার সামনে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবেনা। ইসলামী রাষ্ট্র তার সনদ দ্বারা বাধ্য আল্লাহর কালাম ঘোষণা করতে, এর দাবি এই যে, তার কথা শুনতে হবে। বাণীটি গৃহীত হলো কি, না হলো, তা একটি স্বতন্ত্র ব্যাপার, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পছন্দের ব্যাপারে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন, কিন্তু অন্যের কথা না শোনার ব্যাপারে মানুষ স্বাধীন নয়। এধরনের প্রত্যাখ্যান যখন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসে, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় তাদের নেতাগণ কর্তৃক জনগণের অবমাননা এবং ইসলামের বিচার সম্মত দাবীর প্রতি একটি অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়া।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>খ. জাতি সম্পর্কিত ইসলামী বিধান</strong></h4>
<p>যদি ইসলামী রাষ্ট্রের সনদের শান্তির প্রস্তাবের উত্তরে কোন একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র ইসলামের শান্তিতে বা নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে সদস্যপদের জন্য নির্ধারিত সকল অধিকার এবং প্রাধিকার লাভের অধিকারী হয়ে উঠে। এভাবে যে সদস্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রবেশ করল তার রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ অক্ষুন্ন থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, এ এগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের সুরক্ষার দাবিদার। এখন থেকে হিংসা বা বিপ্লবের মাধ্যমে কিংবা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সম্মতি ছাড়া এগুলো পরিবর্তন করা যাবেনা। এই সব প্রতিষ্ঠানের রায় ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধতা, সর্বোপরি আইন আদালতের রায় ও সিদ্ধান্ত লঙ্ঘনের পরিণামে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষমতা সঙ্গে সঙ্গে বলবৎ হবে। সেই জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারসমূহ তাদের নিজেদের আইন দ্বারা শাসিত হবে। জনগণ তাদের নিজেদের ধর্মের নীতিমালার আলোকে তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কিংবা যথাবিধি গঠিত ও নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যাখ্যার আলোকে তাদের নিজেদের জীবন অবাধে যাপন করবে। সকল মানুষকে আল্লাহর দিকে, তার দ্বীন ইসলামের দিকে আহ্বান করা মুসলমানের কর্তব্য বলে, এইসব নতুন নাগরিকের সঙ্গে মুসলমানরা সম্পর্ক স্থাপনে চেষ্টা করবে তাদের সঙ্গে ইসলামের বিষয়ে আলাপ আলোচনার আহ্বান জানাবে। অবশ্য নতুন নাগরিকদের প্রতি এবং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আল্লাহ মুসলমানদের আদেশ করেছেন দয়া ও সহানুভূতির সঙ্গে অমুসলমানদের কাছে ইসলামকে পেশ করতেঃ <strong>“মানুষকে তোমার প্রভুর দিকে আহ্বান কর হিকমত ও সৎ উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সৎভাবে।</strong>[৯] যদি তারা ইসলামের এই দাওয়াত গ্রহণ করে, তারা হবে মুসলমানদের ভ্রাতা ও ভগ্নী। আর যদি গ্রহণ না করে, তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে হবে এবং কোন অবস্থাই তাদের উপর পীড়ন করা যাবেনা। সর্বোপরি তাদেরকে ইসলামে দীক্ষিত করার প্রয়াসে জবরদস্তি, প্রতারণা, প্রলোভন বা ঘুষের আশ্রয় নেয়া চলবেনা। <strong>আল্লাহর আদেশ সম্পূর্ণই স্পষ্টঃ &#8220;দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই।&#8221; (কুরআন ২:২৫৬)</strong>। কোনো ব্যক্তিকে দ্বীনে দীক্ষিত করার জন্য জবরদস্তি, বা উৎকোচের আশ্রয় নিলে আল্লাহর গযব নেমে আসবে। অধিকন্তু ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে এর কোন বাধ্যবাধকতাই নেই। যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকদের সংঘর্ষ বাধে পুরনো নাগরিকদের সঙ্গে, সেখানে বাদী এবং বিবাদী প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ উম্মাহর আশ্রয় নিতে পারে। আদালত শুনানীর পর এই নীতিকে সম্মান করতে এবং তদনুসারে বিচার করতে বাধ্য হবে। যেখানে বিবাদের কারণটি সুস্পষ্ট নয় সেখানে উভয় পক্ষের সর্বোত্তম স্বার্থের খাতিরে এবং তাদের নিজ নিজ উম্মাহর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে একই আদালত বা উচ্চতর আদালতে এর মীমাংসা করতে হবে। আইনের প্রক্রিয়ার সুযোগ গ্রহণের জন্য শরীয়াহ প্রত্যেকের অধিকারই স্বীকার করে। ব্যক্তি হোক কিংবা গ্রুপ হোক, নতুন নাগরিকেরা আইনের সাহায্য নিতে পারে। অভিযোগটি অন্য কোনো মুসলিম ব্যক্তি, গ্রুপ, এমনকি খোদ ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হলেও তাতে কিছু আসে যায়না। অমুসলিম উম্মাহর যে কোন সদস্য খলিফা, ইসলামী রাষ্ট্র, মুসলিম উম্মাহ বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। ইসলামী আদালত স্বভাবতই এই অভিযোগ গ্রহণ করতে এবং আইন অনুসারে তা বিচার করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে কোনো ইসলামী আদালতে অভিযোগ পেশ করার জন্য বাদীর ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া মোটেই আবশ্যক নয়। পৃথিবীর সকল মানুষ, মুসলিম এবং অনাগরিকসহ সকলে ইসলামী বিচারালয়ে অভিযোগ পেশ করতে পারে। ইসলামী আন্তর্জাতিক আইনের এটি একটি মহৎ শ্রেষ্ঠত্ব যে, এ আইন কেবল সার্বভৌম জাতিসমূহের অধিকারই স্বীকার করেনা, একইভাবে ব্যক্তিবর্গের অধিকারও স্বীকার করে। এর ব্যাখ্যা এই যে, ইসলামী আইন তার লক্ষ্য হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তির স্বার্থে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছে, অথচ পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক আইন বিভিন্ন সার্বভৌম গ্রুপের মধ্যে সংগতি বিধানের চেষ্টা করে। গ্রুপের স্বার্থ যে ব্যক্তির স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে, সেকথা বিবেচনা না করেই- একথা প্রায়শই ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রবলের স্বার্থে। অসঙ্গত মনে হতে পারে যে, ইসলামী আইন অন্য রাষ্ট্রের কোনো নিঃস্ব নাগরিককে বা রাষ্ট্রপরিচয়হীন একজন নাগরিককেও গোটা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযুক্ত করার অধিকার দেয় এবং তার খলিফাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। কিন্তু <strong>ইসলামে আদালত কর্তৃক নির্দোষ ঘোষিত ব্যক্তির জন্য ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে- আদালতের ব্যয় সব সময় বহন করে অপরাধী। প্রবলপরাক্রান্ত খলিফার সম্মান এবং আরাম আয়েশের চাইতে এই নিঃস্বের সুবিচার আইনের দৃষ্টিতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যেমন খলিফার দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলেছিলেন: &#8220;আমি যতক্ষণ না প্রবলের কাছ থেকে দুর্বলের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পেরেছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার দৃষ্টিতে শক্তিশালী পক্ষ হবে তুচ্ছ। দুর্বল আমার দৃষ্টিতে হবে শক্তিশালী যতক্ষণ না আমি তাদেরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পেরেছি”। </strong>[১০]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সমভাবে ইসলামী আন্তর্জাতিক আইন আন্তর্জাতিক যুদ্ধে বন্দীদের পুনর্বাসনের জন্য প্রভূত যত্ন নিয়েছে। সাধারণত দেখা যায়, যুদ্ধোত্তর মীমাংসায় আলোচনার ক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দীরা বিভিন্ন গ্রুপের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাদের জীবন এবং ভাগ্য নির্ধারিত হয় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর গৃহীত স্বেচ্ছাচারী কনভেনশনের আওতায়। ইসলামিক আইনে এটা স্বীকৃত যে যুদ্ধবন্দীদের নিজেকে মুক্ত করার অধিকার আছে।</p>
<p>সে নিজে এবং নিজের উদ্যোগেই মুক্তি অর্জন করতে পারে- তার নিজের আত্মীয়- স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব মুক্তিপণস্বরূপ যা দিতে পারে তার সাহায্যে অথবা বিষয় সম্পদ বা খেদমতের বিনিময়ে সে ব্যক্তিগতভাবে যা উৎপাদন করতে পারে তার বিনিময়ে। ইসলামী রাষ্ট্র যুদ্ধবন্দীর নিজের প্রদত্ত অথবা তার পক্ষে প্রদত্ত উপযুক্ত মুক্তিপণ প্রত্যাখ্যান করতে পারেনা; ইসলামী আদালত এ ব্যাপারে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারে। <strong>ইসলামে বিধান রয়েছে সকল মুসলমান ব্যক্তি এবং গ্রুপ নির্বিশেষে তাদের যাকাতের এক সপ্তমাংশ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তপণ স্বরূপ ব্যয় করবে, যুদ্ধবন্দীরা মুসলমান হউক বা না হউক। ইসলাম একদিকে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিদান মহাপুণ্যের কর্ম বলে ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিদানকে মহাপাপের কাফফারা বলে ইসলাম ধর্মীয় নির্দেশ ঘোষণা করেছে।</strong> যখন কোনো মহিলা যুদ্ধবন্দী গর্ভবতী হয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে তার বন্দীত্বের অবসান হয় এবং আমৃত্যু সে তার বন্দীকর্তার স্বাধীন স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা ভোগ করে। ব্যক্তির জন্য এই সুবিচারের আগ্রহের ইসলামী আন্তর্জাতিক আইন ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সম্ভাবনার পথ খুলে দেয়। ইসলামী রাষ্ট্রে ক্রয় বিক্রয়ের অধিকার তার এলাকার ভেতর দিয়ে লোক চলাচল, পণ্য ও তহবিল চলাচলের অধিকার? ইসলামী রাষ্ট্র এবং আগ্রহী পরদেশী ব্যক্তির মধ্যে বিশেষ চুক্তির বিষয় হতে পারে, যাকে বলা হয় আল-ইস্তিমান। এসবের মধ্যেই ইসলামী আন্তর্জাতিক আইনের প্রধান বিবেচনার বিষয়ের ইঙ্গিত মেলে। যেমন, ন্যায়বিচার ও সুবিচার তৎসহ মুসলিম নাগরিক অথবা অনাগরিক নির্বিশেষে প্রত্যেকের নিজের কল্যাণ, নিজের শুভ ও সমৃদ্ধি অনুসন্ধানের স্বাধীনতা- সংক্ষেপে গ্রুপ বা দলের স্বার্থের আগে ব্যক্তি মানুষের স্বার্থের স্থান। কিন্তু পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক আইনে গ্রুপ বা সমষ্টির স্বার্থকেই সম্মান করা হয়। [১১]</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>গ. যুদ্ধ বিগ্রহ</strong></h4>
<p>ব্যক্তি এবং গ্রুপের জন্য ইসলামী শান্তিতে প্রবেশের ফলে যে সব সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা হয় সে সমুদয়ের বিপরীতে, নতুন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য ছাড়া কেবল বাধ্যবাধকতাই রয়েছে। সেই বাধ্যবাধকতাটি হচ্ছে, বৎসরে একবার করে সকল অমুসলিমের উপর ধার্যকৃত একটি কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, এ করকে বলা হয় জিজিয়া। এই কর সকল অমুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক, যাকাতের চেয়ে অনেক কম। <strong>জিজিয়া সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের উপর ধার্য করা হয় এবং কেবলমাত্র এই শর্তে যে, এই লোকগুলো এই কর পরিশোধের জন্য আর্থিক দিক দিয়ে সমর্থ। যাজকমন্ডলী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকজন, রমনীগণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ, এই করের আওতায় পড়েনা। তারা মুসলমান হলে তা পরিশোধ করতে তারা বাধ্য থাকতো।</strong> ইসলামী আদালতসমূহ এই আইন ঘোষণা করছে যে, খ্রীষ্টান এবং ইহুদীদের কাছ থেকে একই বৎসরে সংগৃহীত অর্থ ইসলামী রাষ্ট্র অবশ্যই ফেরত দেবে, যদি রাষ্ট্র তাদের সীমান্ত গ্রামগুলোকে বাইজানটাইন শক্তি বা কোন অজ্ঞাত শত্রুর আক্রমণের হয়রানি থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। [১২]</p>
<p>অধিকন্তু, একটি ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে কাজ করার জন্য অমুসলিমদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ করা যাবেনা। রাষ্ট্র যেহেতু আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত, তাই অমুসলমানরা সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবে এবং প্রয়োজনবোধে তার জন্য প্রাণ দেবে, ন্যায়ের দিক থেকে তা প্রত্যাশা করা যায়না। নিশ্চয়ই সে স্বেচ্ছাসেবী হতে পারে এবং যদি সে স্বেচ্ছাসেবী হয়, তাকে মুসলিম বলে গণ্য করা হয় এবং সে মুসলমানদের উপর ধার্যকৃত যাকাত এবং তার সঙ্গে জিজিয়া- এই উভয় কর থেকেই অব্যাহতি পায়। এমন লোককে ইসলামী রাষ্ট্রে নিয়োগ দিতে পারে এবং সে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদে উন্নীত হতে পারে এবং অনেক ইহুদী এবং খ্রীষ্টান প্রধানমন্ত্রী এমনকি</p>
<p>উজিরে আজম পদে নিযুক্ত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্বিতীয় আব্দুর রহমানের দরবারে হাসদাই বিন সারপুত এবং উমাইয়াদের আমলে সারজিউদের নিয়োগ উল্লেখ করা যায়। [১৩]</p>
<p>যুদ্ধ ঘোষণা ও পরিচালনার জন্য ইসলামী আইন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার নির্বাহী কর্তৃপক্ষের হস্তে ন্যস্ত হয়, এ অধিকার হচ্ছে আদালতের, যা সাক্ষ্য তলব করবে যখন ইসলামী রাষ্ট্র বা তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বা অবিচার সংগঠিত হয়। <strong>নির্বিচারে হত্যা বা সম্পত্তি বিনাশ, যাজক, স্ত্রীলোক ও শিশুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে; অর্থাৎ আদালত এবং আল্লাহ কর্তৃক দণ্ডনীয় বলে ঘোষিত হয়েছে যদি না যাজক, রমনী ও শিশুগণ যুদ্ধক্ষেত্রে সশরীরে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। সবচেয়ে বড় কথা, ইসলাম আগ্রাসনকে নিষিদ্ধ করেছে এবং সে কারণে আত্মসম্প্রসারণ, যুদ্ধলব্ধ মাল অথবা ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।</strong> একই দৃষ্টান্ত দ্বারা ইসলামে মুসলমানদের নিজেদের জান বিনা দ্বিধায় কোরবান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যখন ন্যায়বিচার লংঘিত হয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কোরবানী কর্তব্য হয়ে ওঠে। ইসলাম এই শিক্ষা দেয় যে, একটি ন্যায় যুদ্ধে কোনো মুসলমান মারা গেলে সে স্বতঃই একজন শহীদ বলে গণ্য হয়, যার জন্য বেহেশতে স্থান নির্ধারিত। শাহাদাত হচ্ছে সর্বোচ্চ এবং মহত্তম মুকুট, যার দ্বারা কোন মানুষের জীবনকে ভূষিত করা যায়। &#8220;আল্লাহর উদ্দেশ্যে যারা জান দেয়, তাদেরকে মৃত বলোনা, তারা জীবিত যদিও তোমরা দেখনা&#8230;।&#8221; [১৪]</p>
<p>&#8220;যারা ঈমান এনেছে এবং মহানবীর সঙ্গে জেহাদ করেছে তাদের জান ও মাল দিয়ে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার এবং তারা মহাভাগ্যবান। আল্লাহ তাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন জান্নাত যার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদী, ওখানেই তাদের চিরস্থায়ী আবাস।&#8221; [১৫]</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>অনুবাদঃ অধ্যাপক শাহেদ আলী</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকাঃ </strong></p>
<p>১. এর প্রধান কারণ হচ্ছে, রোমান ক্যাথলিক চার্চের দূর্নীতি, যাদের যাজক নেতৃত্ব তাদের ইউরোপীয় প্রজাদের শাসন করতো। তাদের কাছ থেকে জবরদস্তি ধন-সম্পদ আদায় করতো এবং তা ব্যয় করতো তাদের নিজেদের স্বার্থে ও রোমের নান্দনিক পুনর্গঠনের জন্য।</p>
<p>২. Reinhold Niebuhr. An Interpretation of Christian Ethics (New York Harper. 1935) c,ov. 91. 235-244</p>
<p>৩. এ হচ্ছে জিম্মি শ্রেণী সম্পর্কে শরীয়াহর বক্তব্যের তাৎপর্য। ইসলাম মানুষের সংজ্ঞা দিয়েছে তাদের ধর্মীয় আনুগত্যের বিচারে, যারা মুসলিম ছিলোনা, তাদেরকে শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে, যে সম্প্রদায়গুলো নিয়ে গঠিত ছিলো যৌথ অস্তিত্ব। ইসলামী আইনের অর্থে পূর্ণ আইনগত ব্যক্তিত্বসহ।</p>
<p>৪. একাজ করে, ইসলাম একটি নতুনত্বের অবতারণা করে যা কিছু পূর্ববর্তী সকল ধর্ম থেকে পৃথক। যে সব ধর্মের জন্য ধর্মপ্রবর্তকের জন্ম অথবা মৃত্যু কিংবা তাঁর নবুয়তের &#8216;সূচনাকেই, তাদের কালের সূচনা গণ্য করা হতো&#8217; ইহা ইহুদী ধর্ম থেকে ছিলো একইভাবে ভিন্ন, কেননা ইহুদী ধর্ম নির্বিচারে সৃষ্টির একটি তারিখ নির্ধারিত করে এবং সেই বিন্দু থেকে সকল সময়ের হিসাব করে।</p>
<p>৫. এই তোমাদের উম্মাহ এক, ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য এবং আমি তোমাদের রব রাব্ব, আমার ইবাদত কর (২১:৯২)।</p>
<p>৬. আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সেই হচ্ছে সবচেয়ে মহৎ যে সবচেয়ে ন্যায়নিষ্ঠ (৪৯: ১৩)।</p>
<p>৭. যে মুমিনগণ, তোমরা শাস্তিতে প্রবেশ করো পূর্ণভাবে এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে শয়তানের আদর্শ অনুসরণ করোনা, সে তোমাদের প্রকাশ শত্রু (২:২০৮)</p>
<p>৮. এবং শত্রু যদি শান্তির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে তোমরাও শান্তি অনুসরণ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৮:৬১)।</p>
<p>৯. তোমাদের প্রভুর প্রতি আহ্বান করো হিকমত এবং সুন্দর শোভন প্রচারের মাধ্যমে। অবিশ্বাসীদের</p>
<p>সঙ্গে উত্তম যুক্তি তর্কসহ কথা বলো (১৬:১২৫)।</p>
<p>১০. Ibn Hisham. The life of Muhammad Abyt A Guillaume (London Oxford University Press 1955) 687</p>
<p>১১. দ্র: জাতিপুঞ্জ সনদ ১৯৪৫, একই ব্যাপার ঘটেছিলো, জাতিসংঘের ক্ষেত্রে, যা স্থান গ্রহণ করে জাতিপুঞ্জের এবং হেগের আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে, যা আজও টিকে আছে।</p>
<p>১২. দেখুন: T. W. Arnold, The Preaching of Islam (Lahore: Sh Muhammad Asraf Publisher 1961) পৃ. ৬১।</p>
<p>১৩. Phillip K. Hitti. History of the Arabs (London Macmillan Co. 1963) পৃ. 195. 524</p>
<p>১৪. যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে মৃত গণ্য করোনা। তারা আল্লাহর কাছে জীবিত এবং তিনি তাঁদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেন (৩:১৬৯)।</p>
<p>১৫. কিন্তু নবী এবং তাঁর সঙ্গীগণ, তাঁদের অর্থবিত্ত এবং জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছেন তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কল্যাণ এবং তারাই সফলকাম (৯:৮৮)।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/principles-of-world-order/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14315</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
