<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>হাসান আল ফিরদাউস &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/author/hasan_al_firdaus/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Tue, 14 Apr 2026 10:02:28 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>হাসান আল ফিরদাউস &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>ইবনে বতুতা: জ্ঞান, ভ্রমণ ও উম্মতের এক সংযোগরেখা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ibn-battuta-a-link-between-knowledge-travel-and-the-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ibn-battuta-a-link-between-knowledge-travel-and-the-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 14 Apr 2026 10:02:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16746</guid>

					<description><![CDATA[ইবনে বতুতা মাত্র ২১ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন, একটি ফরজ ইবাদত তথা হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে। তৎকালীন সময়ে হজ্জ পালন ও শেষ করে ফিরতে ১৬ মাস সময় লাগত। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এই সফর শেষ হয় ২৯ বছর পর। এই দীর্ঘ সময়ে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইবনে বতুতা মাত্র ২১ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন, একটি ফরজ ইবাদত তথা হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে। তৎকালীন সময়ে হজ্জ পালন ও শেষ করে ফিরতে ১৬ মাস সময় লাগত। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এই সফর শেষ হয় ২৯ বছর পর। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রায় ১,১৭,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ভ্রমণগুলোর একটি। এটি শুধু একজন মানুষের সাহসিকতার কিসসা নয়; বরং এক বিস্তৃত ও সুবিশাল ইসলামী সভ্যতার জীবন্ত প্রতিফলন।</p>
<p>১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, মরক্কোর ট্যানজিয়ারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছিলেন আইনবিদ ও বিচারকদের পরিবারে বেড়ে ওঠা এক মেধাবী মুখ। যদিও তার জীবন ছিল উম্মাহর ভূগোল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি মূলত ছিলেন একজন কাজী বা বিচারক, এবং উচুমাপের একজন ফকিহ। এই পরিচয়ই তাকে বিশ্বজুড়ে দরজা খুলে দেয়।</p>
<p>তার যাত্রা শুরু হয় একা, একটি গাধায় চড়ে। মক্কার পথে তিনি ভয়াবহ জ্বরে আক্রান্ত হন, এমনকি নিজেকে বেঁধে রাখতে হয়েছিল যাতে গাধার পিঠ থেকে পড়ে না যান। তবুও তিনি থামেননি। এই দৃঢ়তা ছিল ঈমান, দায়িত্ববোধ এবং অভিযাত্রিক মানসিকতার এক অনন্য সমন্বয়।</p>
<p><strong>মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় এক সুফি আলেম শায়েখ বুরহানউদ্দিন, তাকে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন, তিনি ভারত, সিন্ধ ও চীন সফর করবেন এবং নির্দিষ্ট কিছু আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আশ্চর্যের বিষয়, পরবর্তীতে তিনি ঠিক সেটাই করেন। এ ঘটনা থেকে ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানজগতের আন্তঃসংযোগ এবং আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতার দিকটি ফুটে উঠে।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৩২৬ সালে তিনি হজ্জ সম্পন্ন করেন। এখানেই তার যাত্রা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বুঝে ফেলেন, এই ভ্রমণ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি এক উন্মুক্ত বিশ্ব, এক জ্ঞান ও সভ্যতার দরজা।</p>
<p>এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ, বহুমাত্রিক ভ্রমণ, কাফেলা থেকে কাফেলায়, শহর থেকে শহরে। কিছু কাফেলা ছিল চলমান শহরের মতো, যেখানে দরিদ্রদের জন্য বিশাল পাত্রে খাবার রান্না হতো, বাজার বসত, জ্ঞানচর্চা/দারস চলত। রাতের অন্ধকার মশালের আলোয় দিন হয়ে উঠত। সবই হত বিভিন্ন ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এর ছত্রছায়ায়। প্রতিটি অঞ্চলে ছিল মুসাফির খানা, খানকা ও দরগা; অর্থাৎ বর্তমান প্রযুক্তিগত ব্যাপার না থাকলেও ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মানবতার সবচেয়ে বড় সম্পদ।</p>
<p>এই চিত্রটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামী সভ্যতা স্থির নগরকেন্দ্রিক বা বর্তমানের আধুনিক বস্তি টাইপের ছিলোনা, বরং আমাদের শহর ছিল গতিশীল, সামাজিক ও সমন্বিত সংস্কৃতি নির্ভর, যা আধ্যাত্মিক সুমহান মাত্রা ছিল।</p>
<p>এরপর তার ভ্রমণ বিস্তৃত হয়,</p>
<p>পারস্য, ইরাক, আজারবাইজান, ইয়েমেন, আফ্রিকার শিং অঞ্চল, মোগাদিশু, কেনিয়া-তানজানিয়ার উপকূল, ক্রিমিয়া, কনস্টান্টিনোপল, মধ্য এশিয়া, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সুমাত্রা, চীন এবং মালি পর্যন্ত। তিনি সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করেন, চীনের গ্র্যান্ড ক্যানাল পাড়ি দেন, এবং বেইজিং, হাংজু ও গুয়াংজু সফর করেন।</p>
<p>তার মোট ভ্রমণ দূরত্ব ঝেং হে (৫০,০০০ কিমি) এবং মার্কো পোলো (২৪,০০০ কিমি)-এর তুলনায় অনেক বেশি। অথচ তার কোনো সাম্রাজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা নৌবাহিনী ছিল না।</p>
<p>তার আসল শক্তি ছিল, একটি বিস্তৃত ইসলামী সভ্যতার বিশ্বব্যবস্থা। তৎকালীন ইসলামি সভ্যতা মরক্কো থেকে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বিশাল ভূখণ্ডে আরবি ভাষা ছিল জ্ঞান ও প্রশাসনের সাধারণ মাধ্যম, আদালত, নিরাপত্তা, ওয়াকফ, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি ছিল একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য, এবং আলেমরা ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত।</p>
<p>এ কারণে একজন কাজী সহজেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে আতিথ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেতেন। এটিই ছিল সকল মানুষের জন্য এক ধরনের “সিভিলাইজেশনাল পাসপোর্ট”, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আগেই কার্যকর ছিল বা মানুষমুখী এক দুনিয়া ছিলো।</p>
<p>ইবন বতুতা সকল বাস্তবতাকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি বিভিন্ন রাজদরবারে কাজী হিসেবে নিযুক্ত হন, উপহার গ্রহণ করেন, জ্ঞানচর্চায় যুক্ত থাকেন, সামাজিকভাবে অবদান রাখেন এবং আবার নতুন পথে যাত্রা করেন।</p>
<p>এটি দেখায়, ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান ছিল চলাচলের মাধ্যম, আর আলেমরা ছিলেন বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত একটি শ্রেণি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তার লেখায় বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্যু ও শোকপালনের রীতি উঠে এসেছে, কোথাও ৪০ দিনের শোক, কোথাও উৎসবমুখর জানাজা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ভিন্নতা ও কুসংস্কার। তিনি এগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা তাকে এক অর্থে প্রাক-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীর পর্যায়ে নিয়ে যায়।</strong></p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে আসেন এবং দিল্লিতে তিনি প্রধান কাজী নিযুক্ত হন। তিনি আসেন অর্থনৈতিক হাব এবং জ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র বাংলা সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলে। ভ্রমণ করেন এই সবুজে ঘেরা জান্নাতাবাদে।</p>
<p>পরবর্তীতে দিল্লি থেকে তাকে চীনে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়, জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে তিনি জাহাজ মিস করেন, এবং সেই জাহাজগুলো ঝড়ে ডুবে যায়। এতে তার জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু এই ঘটনার পর তিনি দিল্লিতে ফিরে আসতে ভয় পান এবং মালদ্বীপে চলে যান।</p>
<p>মালদ্বীপে তিনি আবার কাজী হন, রাজপরিবারে বিবাহ করেন এবং রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি সুলতান হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু কিছু ঝুঁকির কারণে তিনি সরে যান।</p>
<p><img decoding="async" src="https://www.worldhistory.org/img/c/p/1600x900/18929.png"></p>
<p>তার জীবনে বিপদের শেষ ছিল না, ডাকাতি, জাহাজডুবি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। একবার ডাকাতরা সবকিছু লুট করে নেয়, শুধু তার পরনের কাপড় ছাড়া। তবুও তিনি হেঁটে কাফেলায় ফিরে যান।</p>
<p><strong>তার ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘রিহলা’ (যার পূর্ণ নাম تحفة النظار في غرائب الأمصار وعجائب الأسفار) তে ৬০ জনের বেশি সুলতান এবং ২০০০-এর বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ রয়েছে।</strong></p>
<p><strong>বিস্ময়কর বিষয় হল, তিনি কোনো ডায়েরি রাখেননি; বহু বছর পর সম্পূর্ণ স্মৃতির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল কাহিনি বর্ণনা করেন।</strong></p>
<p>যদিও কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, বিশেষ করে চীন সম্পর্কিত অংশে, তিনি হয়তো পূর্ববর্তী লেখকদের তথ্য ব্যবহার করেছেন, কারণ তার বর্ণনার সঙ্গে মার্কো পোলো-এর লেখার মিল পাওয়া যায়। তবুও তার অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি ইতিহাসে অনন্য।</p>
<p>জীবনের শেষদিকে মরক্কোর সুলতানের নির্দেশে তিনি এই কাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। এরপর তিনি আবার কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইতিহাসের আড়ালে চলে যান। ১৩৬৮ বা ১৩৬৯ সালে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তার কাজ মুসলিম বিশ্বের বাইরে অজানাই ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3><strong><span style="font-family: Kalpurush;">তৎকালীন ইসলামী সভ্যতার অবস্থান ও শ্রেষ্ঠত্ব</span></strong></h3>
<p>ইবন বতুতার ভ্রমণ আমাদের সামনে যে বাস্তবতা তুলে ধরে, তা হল, চতুর্দশ শতাব্দীর ইসলামী সভ্যতার বিশ্বব্যবস্থা ছিল একটি বিস্তৃত, সংযুক্ত এবং জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা।</p>
<ul>
<li><strong>ভাষাগত ঐক্য:</strong> আরবি ছিল জ্ঞান, ধর্ম ও প্রশাসনের সাধারণ ভাষা, যা বিভিন্ন জাতি ও অঞ্চলের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখত। ফারসি, উসমানী, বাংলা ভাষীরাও জ্ঞানগত কারণে আরবি জানতেন।</li>
<li><strong>আইনি কাঠামো:</strong> আদালত ও মারহামাত নির্ভর অভিন্ন আইনব্যবস্থা ছিল, ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিচার ও সামাজিক কাঠামো পরিচিত ছিল।</li>
<li><strong>জ্ঞান ও আলেমের মর্যাদা:</strong> আলেম, কাদি ও জ্ঞানচর্চাকারীরা সর্বত্র সম্মানিত ছিলেন, যা জ্ঞানকে বৈশ্বিকভাবে চলাচলযোগ্য করে তোলে।</li>
<li><strong>আতিথ্য ও সামাজিক অবস্থা:</strong> মাদ্রাসা, খানকাহ ও দরগা, মসজিদ ও ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ভ্রমণকারীদের আশ্রয় ও সহায়তা দিত। যা সকলের জন্যই উন্মুক্ত ছিল।</li>
<li><strong>বাণিজ্য ও যোগাযোগ:</strong> তৎকালীন ইসলামী সভ্যতার অর্থনীতি ও বাণিজ্য ছিল সবচেয়ে উন্নত, অর্থাৎ স্থল ও সমুদ্রপথে বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক পুরো সভ্যতাকে অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত রেখেছিল।</li>
<li><strong>আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য:</strong> বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক আবহ পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে যুক্ত করে রেখেছিল।</li>
</ul>
<p>এই প্রেক্ষাপটেই ইবন বতুতার ভ্রমণ সম্ভব হয়েছিল। তিনি একা ছিলেন না, বরং তার পেছনে ছিল একটি আদিল সভ্যতা।</p>
<p><strong>&nbsp;</strong></p>
<p>পরিশেষে বলা যায়,</p>
<p>ইবন বতুতা অভিযাত্রী হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হননি, তিনি বের হয়েছিলেন একটি ফরজ ইবাদত পালনের জন্য, কিন্তু এই যাত্রা তাকে এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে একটি সভ্যতা জ্ঞান, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ। যে উপলব্ধিই পরবর্তী প্রজন্মকে অনেক দলীল উপহার দিয়েছে।</p>
<p>তার ‘রিহলা’ শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়; এটি একটি সভ্যতার জীবন্ত দলিল, মুসলিম উম্মাহর সমাজ, বৈশ্বিক সংযোগ এবং আখলাকী শক্তির প্রতিচ্ছবি।</p>
<p>কেননা মার্কো পোলো-এর ছিল পৃষ্ঠপোষকতা ও বাণিজ্যপথ, ঝেং হে-এর ছিল সাম্রাজ্যিক নৌবহর। কিন্তু ইবন বতুতার ছিল, এক উম্মাহ, এক জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা, আদালতনির্ভর বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য, এবং ইস্তেকামাতের শক্তি।।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ibn-battuta-a-link-between-knowledge-travel-and-the-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16746</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী সভ্যতা; রাষ্ট্রের সীমা পেরিয়ে এক চিন্তার উত্তরাধিকার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 26 Jan 2026 17:39:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16484</guid>

					<description><![CDATA[আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা যখন ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আলাপ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর পতন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, আব্বাসী খেলাফতের পতন, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন, ১৭৫৭ সালে বাংলা সালতানাতের অবসান কিংবা ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফতের বিলুপ্তি। এই রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর পতনকে সামনে রেখে আমরা ইতিহাসের যে বোঝাপড়া গড়ে তুলেছি, তাতে অনেক সময় ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের সীমাবদ্ধ ও সংকুচিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু এগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো মোটেও ইসলামী সভ্যতার পরিসমাপ্তি বা অবসানের তারিখ নয়।</p>
<p>কারণ ইসলামী সভ্যতা কখনোই কোনো একটি রাষ্ট্রনির্ভর, নিছক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড়ায়নি। রাষ্ট্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল বটে, কিন্তু তা কখনোই একমাত্র ভিত্তি ছিল না। ইসলামী সভ্যতা কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বা ক্ষমতাকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা নয়। হ্যাঁ, ক্ষমতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা ছিল বৃহত্তর এক সভ্যতাগত ব্যবস্থার অংশমাত্র। ইসলামী সভ্যতা মূলত একটি সামগ্রিক সভ্যতা; যার কেন্দ্রে ছিল এক সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি, একটি চিন্তাধারা, একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনদর্শন। সেই দর্শনের আলোকে গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চা, শহর-স্থাপত্য, শিল্পকলা, সাহিত্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক কাঠামো।</p>
<p>এ কারণেই বলা হয়, হক ও শক্তিশালী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সভ্যতার যাত্রা কখনো বিলীন হয় না। ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, সেসব অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোথাও উপনিবেশিক শোষণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা ছিল ভয়াবহ; কোথাও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এতকিছুর মধ্য দিয়েও সেই সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন, শহরচিন্তা ও জ্ঞানগত উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।</p>
<p>সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্ঞান। বইয়ের পাতায়, আলেম ও চিন্তকদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের সিলসিলার মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা আজও জীবিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যগুলি, মসজিদ, মাদরাসা, সেতু, নগর পরিকল্পনার নিদর্শন, নিজেদের নীরব ভাষায় সেই সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। পাথরে খোদাই করা হাকিকতের রূহ, কারুকার্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা দর্শন আজও আমাদের সামনে উপস্থিত।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতায় শহর পরিকল্পনা ছিল গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল। পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব নগর; যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ‘শহরের রূহ’ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই রূহ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে। এক বিন্দু পরিমাণও সে রূহ থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি।</strong></p>
<p>শিল্পকলার প্রতিটি শাখায়; গান, কাব্য, ক্যালিওগ্রাফির রেখায় রেখায় আমরা দেখি সভ্যতার রূহানি ও আধ্যাত্মিক দিক। সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্বকে বোঝার যে চিন্তা সিলসিলা, তা আজও বিদ্যমান। মানবিক মূল্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব, ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য; সবই ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।</p>
<p>রমজান থেকে ঈদ, জিয়াফত থেকে সামাজিক উৎসব সবকিছু আজও আমাদের জীবনে এক গভীর রূহানি আবেশ নিয়ে উপস্থিত।</p>
<p>রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে, কিন্তু সভ্যতা তখনই ধ্বংস হয়, যখন মানুষের চিন্তাগত, নৈতিক, জ্ঞানগত, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক স্তর থেকে সেই সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ মুছে যায়। ইসলামী সভ্যতা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজও নানা রূপে, নানা মাত্রায় আমাদের মাঝে বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা ও রাষ্ট্র: সম্পর্ক ও বুঝাপড়া</strong></p>
<p>এখানে একটি মৌলিক সভ্যতাগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি, সভ্যতা ও রাষ্ট্র কখনোই একার্থক নয়। সভ্যতা মূলত মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, আখলাক, জ্ঞান, রুচিবোধ, নান্দনিকতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সমষ্টিগত রূপ; আর রাষ্ট্র হলো, সেই সভ্যতাগত জীবনের শাসন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি সাময়িক কাঠামো। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের পেছনে থাকা সভ্যতাগত চিন্তা ও মূল্যবোধ যুগের পর যুগ ধরে বহমান থেকেছে। ইসলামী সভ্যতা এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছে।</p>
<blockquote><p>ইসলামি সভ্যতায় রাষ্ট্র কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না; রাষ্ট্র ছিল একটি উসিলা বা মাধ্যম। রাজনীতি এখানে গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র পথ নয়; বরং রাজনীতি ছিল আখলাক সমৃদ্ধ সমাজ, নৈতিক নগর, সাংস্কৃতিক ভারসাম্য এবং জ্ঞানচর্চার সহায়ক শক্তি। এই কারণেই ইসলামি সভ্যতায় রাজনীতিকে কখনোই সর্বগ্রাসী করা হয়নি; বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা ও জ্ঞান সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।</p></blockquote>
<p>ইসলামী সভ্যতা আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র একটি মাধ্যম, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রাজনীতি এখানে কখনোই গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র উপায় ছিল না; বরং রাজনীতি ছিল একটি উসিলা। রাষ্ট্র ও রাজনীতি নৈতিক সমাজ, আখলাক সমৃদ্ধ নগর, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন এবং জ্ঞান ও রুচিবোধের সেবক হিসেবে কাজ করত।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ প্রতিষ্ঠান যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আলেমদের জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব দৃঢ় হয়, মানুষ তার আত্মিক শান্তি খুঁজে পায়, রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল এসবের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা। এখানে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>ওয়াক্‌ফ ছিল ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অবকাঠামো, যা রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়েও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, মুসাফিরখানা, খাদ্য ব্যবস্থা, পানি ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছিল। আধুনিক রাষ্ট্র যে সামাজিক সেবাগুলোকে আজ ‘ওয়েলফেয়ার’ বলে চিহ্নিত করে, তার বড় অংশই ইসলামী সভ্যতায় ওয়াকফের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হলেও সমাজ ভেঙে পড়েনি; সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ রাজনীতি, শিক্ষা, ওয়াক্‌ফ, শিল্পকলা, নগর বিনির্মাণ, সবকিছুই ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।</p>
<p>এই ইবাদতসম রূপেই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়েছিল। <strong>নগরগুলো মানুষের জন্য গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়। এমনকি কোথাও ক্ষমতার প্রকাশ থাকলেও, এক পর্যায়ে তা মানুষের কল্যাণের দিকেই নিবেদিত হতে বাধ্য হতো। কারণ সমাজ, জ্ঞান ও আলেমদের ভূমিকা ছিল আখলাক বিনির্মাণে কেন্দ্রীভূত।</strong> ফলশ্রুতিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ইসলামি সভ্যতা মানবতাকে দিয়ে গিয়েছে। কারণ ইসলামি সভ্যতার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না রাষ্ট্রকে, সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রকে বা নির্দিষ্ট কিছু দ্বারা দখল করা। একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সকলের কল্যাণ।</p>
<p>ব্রিটিশ জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করতে শিখেছি যে রাষ্ট্র দখল করলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়, বা কোনো কিছুকে দখল করে নিলেই সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এটিও আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মিরাস নয়। আমাদের পূর্বপুরুষগণ একটি সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিলেন, যেখানে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, জ্ঞান ও চিন্তা, শহর, স্থাপত্য, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি থেকে পরিবেশ সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি সিভিলাইজেশনাল বা সভ্যতাগত ক্ষেত্র, রাষ্ট্র বা দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</p>
<p>এখানে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ হল, এই সভ্যতা বিনির্মাণের কাজটি সকল মানুষ করতে পারত। এই কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো সমাজ, এবং সমাজ শক্তিশালী হতো। সমাজ শক্তিশালী হলে সেখান থেকে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসত। অর্থাৎ এই চিন্তাধারা মূলত মানুষকে কনভেন্স করত, মানুষের উপর প্রভাব সৃষ্টি করত। মানুষ নিজের আকল খাটিয়ে তার সঠিক কাজের ক্ষেত্র, অবদানের জায়গা, নিজের উপকারের ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারত এবং সে অনুযায়ী অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমরা সেই জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছি।</p>
<p>পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের উপর একচ্ছত্রভাবে রাজনীতি করেছে, কিন্তু সেই রাজনীতি বহুক্ষেত্রেই আমাদের স্বাধীনতা দেয়নি। তারা চাপিয়ে দেওয়া শিখিয়েছে, জোরপূর্বক দখল, ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনীতি চাপিয়ে দেওয়া, ঋণ চাপিয়ে দেওয়া। কৃষি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে শোষণ এবং শোষণ নিয়ে কিছু বলা যাবে না, এই ধরনের চিন্তা চাপিয়ে দেওয়া; সবই তারা করেছে। অথচ ইসলামি সভ্যতার মূল পন্থা ছিল ইক্বনা অর্থাৎ কনভেন্স করা। কনভেন্স করেই এগিয়ে যাওয়া।</p>
<p>এই কনভেন্সের সবচেয়ে বড় নমুনা আমরা পাই প্রতিটি স্থাপত্যে। স্থাপত্য যখন চিন্তার ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেটিও ছিল কনভেন্সের একটি অংশ। মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিশীলতা, সর্বোচ্চ চিন্তা এবং সর্বোচ্চ হাকিকতের দিকে ধাবিত করার একটি মাধ্যম ছিল এটি। তাই ইসলামী সভ্যতায় ইস্তাম্বুল থেকে আন্দালুস, ইস্পাহান থেকে কুতুব মিনার- কোনো স্থাপত্যই শুধু ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়। এগুলো ছিল একেকটি চিন্তা ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>স্থাপত্য: চিন্তা ও আখলাকের দৃশ্যমান ভাষা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় স্থাপত্য ছিল এক ধরনের নীরব দাওয়াত। এটি কেবল ইট, পাথর কিংবা মার্বেলের সমষ্টি নয়; বরং চিন্তা, দর্শন ও হাকিকতের দৃশ্যমান রূপ। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েই মানুষকে সর্বোচ্চ রুচিবোধ, সর্বোচ্চ শালীনতা এবং তাওহিদের চিন্তার দিকে আহ্বান জানানো হতো।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার স্থাপত্য কখনোই ইট-পাথরের সমষ্টি ছিল না। কর্ডোভার মসজিদের অসংখ্য খিলান বহুত্বের ভেতর ঐক্যের- ‘ওয়াহদাত’-এর ঘোষণা দেয়। আল-হামরার দেয়ালে খোদাই করা “লা গালিবা ইল্লাল্লাহু” কোনো সামরিক বিজয়ের ঘোষণা নয়; বরং ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের স্থায়ী স্মারক। একইভাবে ঝিনাইদহের মোহাম্মাদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানা, দারসবাড়ি (ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও কিছুটা হলেও টিকে আছে), খুলনার খান-জাহানের মসজিদও একইভাবে ওয়াহদাতের ঐক্যের দর্শন ফুটিয়ে তোলে।</p>
<p>অর্থাৎ প্রতিটি জায়গায়; এই সভ্যতা ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একই সাথে হক্ব ও হাকিকতের চিন্তা, যার প্রস্ফুটিত রূপ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সকল অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেটি পেরেছিল বলেই সেই চিন্তার ভাষা আজও আমাদের আন্দোলিত করে। এর ছোট্ট নমুনা হলো- প্রতিটি মসজিদের পাথর, যা এখনও যেন ধ্যানে মগ্ন। সৌন্দর্য যেন জিকিররত, জ্ঞান যেন এখনও নূর ছড়াচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বাংলার ইসলামী সভ্যতা: আখলাক ও মূল্যবোধের সভ্যতা&#8217;</strong></p>
<p>বাংলার ইসলামী সভ্যতা এবং বাংলায় ইসলামের আগমন ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ৩০০ বছর ধরে আলেমগণ, সুফি ও ব্যবসায়ীগণ আখলাকের দাওয়াত ও বাস্তব উপমা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এর ফলে সমাজ ও ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানসহ নানাবিধ উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এর ফলেই বিনা রক্তপাতে এখানে একটি বিজয় সাধিত হয়েছিল। এই বিজয়ের মূল ধারক ও বাহক ছিলেন সুফি দরবেশ, আলেম ও আখলাকসম্পন্ন ব্যবসায়ীগণ। তাঁরা এখানে সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।</p>
<p>ফলশ্রুতিতে এই সুফি আলেমদের প্রভাবে ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের আখলাক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার ফলে যুগ যুগ ধরে সকল ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে একটি শক্তিশালী, আস্থাশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। দুনিয়ার চার ভাগের একভাগ অর্থনীতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। কৃষি, সমুদ্রাঞ্চল স্থাপনা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও শহর, নদীমাতৃক অঞ্চলে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সবকিছুই শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছিল।</p>
<p>ব্রিটিশ উপনিবেশের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও প্রায় ২০০ বছরের নিকৃষ্ট শোষণ চালানো হয়। আমরা হারিয়েছি আমাদের হাফেজা, স্থাপনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনি কাঠামো, সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক নীতি, বিশাল ওয়াক্‌ফ জমি, বনাঞ্চল ও প্রাণ প্রকৃতি। তবু এই ক্ষতির মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, পারিবারিক মূল্যবোধ আজও টিকে আছে।</p>
<p><strong>ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ষাট গম্বুজ মসজিদ আমাদের দেখায়, তাঁরা শুধু জিকিরের মজলিশে নিমজ্জিত ছিলেন না; পানির নহর, অর্থনীতি, কৃষি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কত ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন।</strong> প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা এমন সিলসিলা তৈরি করেছিলেন, যেখানে নদী, বাতাস ও আলোকে উপেক্ষা করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।</p>
<p><strong>চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্বহা খানায় আজও মানুষের খাবারের ব্যবস্থার নিদর্শন দেখা যায়।</strong> অর্থাৎ একত্রে বসা ও মানুষের সাথে মেশার সংস্কৃতি আজও রমজান, ঈদ, শবে বরাত, মিলাদ ও মিরাজের মাধ্যমে বিদ্যমান।</p>
<p>শরফুদ্দিন আবু দাওয়ামার রেখে যাওয়া ফিকহি সিলসিলা, হাদিসের দারস, দারসবাড়ির জ্ঞান; সবই আজও সুফি আলেমদের মাদরাসা ও মসজিদের মাধ্যমে নানাভাবে বিদ্যমান। মক্তব সংস্কৃতি, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, একত্রে ইফতার, সহযোগিতা, গোশত বণ্টন, একজনের দ্বারা বহু মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার সংস্কৃতি আজও জীবিত।</p>
<p>সব সংকটের মধ্য দিয়েও আমরা একদিনের জন্যও আজান বন্ধ হতে দেইনি। নবী(সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো পরাস্ত হয়নি। কারণ বাংলার ইসলামী সভ্যতা কোনো স্থান দখল করেনি, স্থানকে আপন করে নিয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকাশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকল্প, অর্থনীতি ও কৃষির পুনরুত্থান সবই তাঁদের অবদান।</p>
<p>এত শোষণের পরও যদি এত কিছু টিকে থাকে, তবে এটুকুই বলা যায়, আমরা এমন একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক, যার রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পতন হলেও চিন্তা ও আখলাকি সিলসিলা শক্তভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি সভ্যতায় প্রতিটি শহর নিরাপদ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানরা শাসন করলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করেছে।</p>
<p>এই সভ্যতা কোনো ধর্ম, জ্ঞান বা ভাষাকে নষ্ট করেনি, বরং বিকশিত করেছে। এর বড় প্রমাণ বাংলা ভাষা। মুঘলদের চারবাগ সংস্কৃতি, পানির ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনায় জান্নাতের ধারণাকে দুনিয়ার নৈতিক ও শালীন রূপে প্রকাশ করা হয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা আজও একসাথে বসবাসের অবস্থান ধরে রাখতে পারছি, এটাই ইসলামী সভ্যতার অবদান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সভ্যতা কেন বিলিন হয়নি?</strong></p>
<p>সভ্যতা তখনই বিলুপ্ত হয়, যখন মানুষের চিন্তা থেকে নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও হাকিকতের অন্বেষণ মুছে যায়। যে সভ্যতা আখলাককে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, সে সভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের ভিত নিজেই ক্ষয় করে। ইসলামী সভ্যতা কখনোই আখলাককে প্রান্তে ঠেলে দেয়নি; বরং সভ্যতা ও আখলাককে সমার্থক করে তুলেছিল। এই কারণেই রাজনৈতিক পতন, উপনিবেশিক শোষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসলামী সভ্যতা সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি।</p>
<p><strong>ইসলামী সভ্যতা কখনোই শুধু ক্ষমতা বা রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়নি। এটি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত, হাকিকত অন্বেষী এবং মানবতার কল্যাণমুখী এক সভ্যতা। মানুষকে সে দেখেছে সভ্যতা বিনির্মাণের কারিগর হিসেবে, আয়াত হিসেবে। ফলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লেও চিন্তা, আখলাক, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের সিলসিলা আজও বহমান।</strong> আন্দালুস থেকে আনাতোলিয়া, মদিনা থেকে বাগদাদ, শাম থেকে দিল্লি, ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকা; রাষ্ট্রীয় পতন সত্ত্বেও এই নগরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় জাগরণসহ নানা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের জন্য ছায়ার ভূমিকা পালন করেছে। ইবনে সিনা, ফারাবী, ফখরুদ্দিন রাজী, ইবনে খালদুনের মতো চিন্তকরা এমন জ্ঞান রেখে গেছেন, যার ওপর আজকের দুনিয়া এখনও দাঁড়িয়ে আছে।</p>
<p>এই সভ্যতা ইতিহাসকে জাদুঘরের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। আন্দালুস, বাংলা, মুঘল বা ইস্তাম্বুল; সবখানেই সুর এক, বাদ্যযন্ত্র আলাদা। রূহানি আবেশ ও আখলাকি পরশ একই। এ কারণেই ইসলামী সভ্যতা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের গভীরে প্রথিত হয়েছে, আজও যা প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক।।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/islamic-civilization-a-legacy-of-thought-that-transcends-the-boundariies-of-the-state/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16484</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের যাত্রা, কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/special-interview-on-the-journey-activities-and-future-plans-of-the-institute-of-islamic-thought-and-research/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/special-interview-on-the-journey-activities-and-future-plans-of-the-institute-of-islamic-thought-and-research/#comments</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 23 Jan 2026 16:17:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাক্ষাৎকার]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16472</guid>

					<description><![CDATA[(ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাসান আল ফিরদাউস; জ্ঞানের আন্দোলন হিসেবে ইন্সটিটিউটের যাত্রা, এর কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন জনাব সা’দ মুসান্না।)   সা’দ মুসান্না: ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী? আপনারা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>(ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাসান আল ফিরদাউস; জ্ঞানের আন্দোলন হিসেবে ইন্সটিটিউটের যাত্রা, এর কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন জনাব সা’দ মুসান্না।)</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী</strong><strong>? </strong><strong>আপনারা কী চাচ্ছেন</strong><strong>? </strong><strong>নতুন শিক্ষা আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>এক্ষেত্রে মূল ভিশন কী</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> প্রথম বিষয় হচ্ছে, ব্রিটিশদের শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলেছে প্রায় ১৯০ বছরের অধিক সময়কাল ধরে। এ শোষণ-সাম্রাজ্যবাদ পরবর্তী আমাদের বাংলাদেশ। আমরা যদি ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকের কিছু বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করি; যেমন আসাম রাজ্য বা পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কিছুটা উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, প্রস্তাবনা এসেছে।</p>
<p>এরপর ১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, এর আলোচনায় শুধু বাংলা নয়, দক্ষিণ ভারত থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে অনেক কথাবার্তা হয়েছে; হয়েছে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম। কিন্তু এখানে সকল আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে কম আলোচিত বা গুরুত্ব না পাওয়া বিষয় হলো <strong>সিলেবাস</strong> নিয়ে আলোচনা।</p>
<p>আলোচনা হয়েছে এখানকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, পূর্ববঙ্গের অবস্থা, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব কিংবা অসাম্প্রদায়িকতার বয়ান বা নিজেদের মতো করে আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, তার নিজস্ব সিলেবাস কাঠামো, নিজস্ব মেথড, নিজস্ব চিন্তা। এটা নিয়ে বড় ধরনের কোনো আলাপ আমরা লক্ষ্য করি না।</p>
<p>এর মানে হলো, আমাদের এই সিলেবাসটি মূলত ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রদত্ত একটি সিলেবাস কাঠামো। এর মাধ্যমে আমাদের জাতির চাওয়া-পাওয়া পূরণ কিংবা মুক্তি সম্ভব নয়, এটা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। সুতরাং, আমাদের <strong>নিজস্ব মেথড</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব চিন্তাধারা</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব সিলেবাস প্রয়োজন</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>যেকোনো জাতি তার শিকড়ের সন্ধান পায় অতীত থেকে। অর্থাৎ অতীতে গিয়েই একটি জাতি তার ভবিষ্যৎকে দেখতে শুরু করে। কাজ ও সমাজ গঠনের যে বয়ান</strong><strong>, </strong><strong>সেদিকে তাকালে দেখা যায় এগুলো আসে শিক্ষা ও চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকে। এবং বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যে জ্ঞানের স্রোত সমাজে প্রবাহিত হয়</strong><strong>, </strong><strong>তা-ই মূলত জাতির কাজে</strong><strong>, </strong><strong>ব্যক্তিত্ব গঠনে</strong><strong>, </strong><strong>প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে</strong><strong>।</strong></p>
<p>কিন্তু আমাদের দেশে এই জ্ঞানের ধারাটি দাঁড়িয়ে আছে উপনিবেশ কর্তৃক সৃষ্ট মূলনীতির উপর ভিত্তি করে। উপনিবেশ কর্তৃক সৃষ্ট ইতিহাসের বয়ানের উপর ভিত্তি করেই সবকিছু সাজানো হয়েছে। এগুলো আমাদের ভাঙতে হবে। এটা ভাঙতে না পারলে আমরা প্রশ্নাতীতভাবে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের মধ্যেই নিপতিত হয়ে থাকব।</p>
<p>এটিকে ভাঙতে হলে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস লাগবে, নিজস্ব মেথডলজি দাঁড় করাতে হবে। আর সেটা দেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি সব কিছুর মেথডলজি তৈরি করবে, ভবিষ্যতের প্রস্তাবনা দেবে।</p>
<p><em>এটা হওয়ার জন্য যেমন ব্যক্তিত্বের জাগরণ দরকার</em><em>, </em><em>তেমনি এসবের মধ্য দিয়েই জাতির বিবেক স্পন্দন হিসেবে প্রস্ফুটিত হবে। অর্থাৎ একটি সভ্যতার ভিত্তি</em><em>, </em><em>একটি রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি শুরু হবে শিক্ষাঙ্গন থেকে</em><em>।</em></p>
<p>আজকের দিন পর্যন্ত যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকাই, দেখা যাবে সেগুলো রাজনীতির আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং সেই এপ্রোচেই পরিচালিত হচ্ছে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পর্যন্ত রাজনীতির আতূড়ঘর হিসেবেই আছে। কিন্তু একই সাথে প্রশ্ন হলো, এই যে ব্যক্তিত্বের জাগরণ, ভবিষ্যৎ দেখানোর মতো মেথড, ইশতেহার, চিন্তা এখান থেকে উঠে আসছে কি না? কিংবা এই চিন্তা থেকে সেরকম ব্যক্তি তৈরি হচ্ছে কি না? সেই ব্যক্তিরা কি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছে? তারা কি রাষ্ট্র ও সমাজে অবদান রাখছে? এটাই মূলত আউটপুট।</p>
<p>তাই এভাবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন, সেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ এই জায়গায় আপাতদৃষ্টিতে আমরা কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করি না। কেন? আমাদের একাডেমিয়া আজ যেহেতু এ সকল নিয়ন্ত্রণাধীন, সুতরাং প্রত্যেকটি বিষয়েই সেই উপনিবেশিক কাঠামোর ছাপ রয়ে গেছে।</p>
<p>যেমন, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা, কোনোটার সঠিক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ ৪৭-এ মানুষ নেমেছিল অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য। বেকারত্ব, প্রযুক্তির ঘাটতি, কৃষির পর্যাপ্ত উৎপাদনের অসুবিধা এসব কারণে মানুষ দুর্ভোগে ছিল। অনাহার ও খাদ্য সংকট ছিল ব্যাপক। এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না।</p>
<p>৪৭-এর পরে মুসলিম লীগ এলেও, জমিদার প্রথা উঠলেও, তারা অর্থনৈতিক পরিবর্তন, কৃষি, বেকারত্ব, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কোনো ক্ষেত্রেই সঠিক সমাধান দিতে পারেনি। চেষ্টা করলেও তা হয়নি। এক পর্যায়ে তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। পরবর্তীতে অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী উঠে এসেছে।</p>
<p>এরপর ৭১ হলো। আমরা যদি দেখি, একই কারণে ৭১ সংঘটিত হয়েছে। সেই অর্থনৈতিক দুর্দশা, শিল্প প্রযুক্তির অভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতা, সামাজিক নিরাপত্তার সংকট সব মিলিয়ে একই ধরনের ক্রাইসিসের মধ্য দিয়েই ৭১ ঘটেছে। সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার না পেয়ে বারবারই কখনো অস্ত্র ধরেছে, কখনো আন্দোলনে নেমেছে।</p>
<p>আমরা যদি আজকের দিন পর্যন্ত দেখি, গত ষাট বছরে এত গণঅভ্যুত্থান হয়েছে শুধু ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার কারণে। অর্থাৎ <em>প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রকে গঠন করা</em><em>, </em><em>প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো</em><em>, </em><em>সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে জাতির অধিকার নিশ্চিত করা</em><em>।</em></p>
<blockquote><p><em>আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বই ছিল জাতিকে গড়ার প্রস্তাবনা প্রদান করা। পাশাপাশি জাতি গঠনের শিক্ষা</em><em>, </em><em>মানুষ গড়ার গুরুত্ব</em><em>, </em><em>জাতিকে ভবিষ্যৎ দেখানোর কাজটা ছিল আমাদের একাডেমিয়ার তথা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনগুলোর। কিন্তু আশানুরূপ হয়নি</em><em>।</em></p></blockquote>
<p>এরপর গিয়ে আমরা সবাই দোষারোপ করছি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বা রাজনীতিকে। কিন্তু রাজনীতিও একমাত্র মুক্তির উপায় নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার বা প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের একটি দায় রয়ে গেছে যেটা সবসময় আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।</p>
<p><strong>আমাদের ইনস্টিটিউট সেই জায়গা থেকে শিক্ষা আন্দোলনের দায়িত্ব জাতিকে উপলব্ধি করাতে চায়</strong><strong>, </strong><strong>বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনগুলোর সত্যিকারের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করতে চায়</strong><strong>।</strong></p>
<p><strong>এবং এটা কিভাবে করবে</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>শিক্ষা আন্দোলনকে নিজস্বতা দিয়ে</strong><strong>; </strong><strong>তথা নিজস্ব ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব ইতিহাসচর্চা</strong><strong>, </strong><strong>নিজস্ব মেথডলজির মাধ্যমে</strong><strong>; </strong><strong>এভাবে আমরা এমন এক ভবিষ্যতের ইশতেহার বা প্রস্তাবনা তৈরি করতে চাই</strong><strong>, </strong><strong>যেখান থেকে জাতির বিবেক এবং স্পন্দন জাগ্রত হতে পারে</strong><strong>।</strong></p>
<p>এটাই মূলত ইনস্টিটিউট প্রাসঙ্গিক করতে চায়। আর এজন্য ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সম্পূরক প্রশ্নের সাথে কিছু বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে—</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার পতন পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থান, তাদের পরিচালিত একটি বিশ্বব্যাপী কাঠামো, এরাই দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।</p>
<p>এই সময়ে সবাই অজানা অবস্থায় নিপতিত। কারণ, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যদি দেখি, সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যা কল্পনাতীত। দ্বিতীয়ত, মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, আত্মিক প্রশান্তি, রূহানী খোরাক এসব ক্ষেত্রে দুনিয়া এক ভয়াবহ শূন্যতার মধ্যে আছে। সত্যিই সারা পৃথিবী এখন অসুখী।</p>
<p>আপনি যদি প্রতিটি সেক্টরে লক্ষ্য করেন, দেখবেন সময়কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে আলেমগণ, চিন্তাবিদগণ, দার্শনিকগণ পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ এসময়কাল কে অস্বাভাবিক সময় বা ‘পোস্ট-নরমাল’ নামে অহিবিত করছেন, যেটা আমরা ইশতেহারে বলেছি; কেউ একে ‘হাকিকত-পরবর্তী সময়’ বলে অভিহিত করছেন; কেউ কেউ ইনসান পরবর্তী ‘পোস্ট হিউম্যান’ যুগ বলে উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ এমন এক সময় এসেছে যা আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করছে, হাকিকত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা তা বুঝতেও পারছি না। এতটাই অসহায়তার মধ্যে দিয়ে পৃথিবী হাঁটছে।</p>
<p>ডিজিটালাইজেশন এবং সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল রূপ, জ্ঞানার্জনের নতুন পদ্ধতিতে নানা রকম বিশৃঙ্খলা সবকিছু আমাদেরকে এক প্রকার হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করেছে। এর ফলশ্রুতিতে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যে তরুণ শ্রেণি, যাদের সবচেয়ে বেশি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি হতাশাগ্রস্ত।</p>
<p>তবে আমরা যদি পূর্বের সময়ের দিকে তাকাই, অথবা বাংলার আগের সময়কাল যেটি ছিল; তখন আমরা এক বিশাল সিভিলাইজেশনাল প্রজেক্ট এর মধ্যে দিয়ে সুবিশাল সভ্যতা দাঁড় করিয়েছিলাম, যেখানে ন্যায়ভিত্তিক আদালত ছিল, অর্থনীতি ছিল সুবিন্যস্ত, সংকট থাকলেও মানুষ ভালো ছিল, মানুষ তার ভবিষ্যৎকে খুঁজে পেত। সেই সময় সাক্ষ্য দেয় যে ওই যে মেথড-ফিকহ নির্ভর সমাজ, উসুল ও মেথডলজি নির্ভর সমাজ, যেটা মুসলমানদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল, তা ছাড়া বর্তমান দুনিয়াকে নতুনভাবে দাঁড় করানো, মুক্তির পথ দেওয়া সম্ভব নয়।</p>
<p>অর্থাৎ একমাত্র সমাধান আমরা ঘুরেফিরে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও ইসলামী সভ্যতার পুনঃনির্মাণের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সমাধানের প্রসঙ্গে চিন্তা করলেও দেখা যায়, আমাদের ফিকহ, উসুল, মেথডলজি এই চর্চা আমাদের করতেই হবে। ইসলামী সভ্যতার ধারণাকে পুনরায় চিন্তা করতে হবে, ইতিহাসকে নতুনভাবে বুঝতে হবে, এবং আমাদের সভ্যতার জ্ঞান, মেথডলজি, চিন্তাধারা ও ইতিহাসচর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।</p>
<p>পূর্ববর্তী সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই সাথে ভবিষ্যৎকে দেখতে হবে। এর জন্য অবশ্যই একটি ইনস্টিটিউশনাল উদ্যোগ নিতে হবে, শিক্ষা ও আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম থেকে; যেখানে ব্যক্তিত্ব গঠন হবে, প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, জাতিকে সচেতন করা হবে, বিষয়গুলোকে প্রাসঙ্গিক করা হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে জাতীয় মান উন্নত হবে।</p>
<p>আসলে এটাই আমাদের ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: আপনারা কী চাচ্ছেন বা আপনাদের অবদানগুলো কী</strong><strong>, </strong><strong>অথবা কী করছেন</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> যেটা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, একটি প্রতিষ্ঠান আসলে কে গড়ে? গড়ে তার শিক্ষকরা, সিলেবাসের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা যদি দেখি, আমাদের দেশে শিক্ষক বলতে যা বোঝায়, আসল অর্থে তা কতজন আছে? শিক্ষক বলতে সত্যিকারার্থে শিক্ষক, চাকরিজীবী না। শিক্ষক বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তিকে, যিনি ব্যক্তিত্ব তৈরি করার জন্য, জাতির ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করেন।</p>
<p>এই যে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক, এটা যে নেই, এমন না। অবশ্যই আছে। যদি আমরা তাদের নিয়ে কাজ করতে পারি, বা কাজ করতে চাই, তাহলে আমার মনে হয়েছে যে, সত্যিই জাতির বর্তমান যুব সম্প্রদায় একটা আশার আলো দেখতে পাবে।</p>
<p>শিক্ষক ছাড়া কখনোই কেউ উপমা খুঁজে পায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় না। এটাই যুগে যুগে হয়ে এসেছে। আপনারা যাদের বড় মনে করেন, তারা কারও না কারও ছায়ায় বেড়ে উঠেছে, এটা অনস্বীকার্য।</p>
<p>এই অবস্থান থেকে আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক, যারা রয়েছেন, দেশীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের যেসব শিক্ষক আছেন, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার। শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার, দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য কাজ করছি।</p>
<p>আমার মর্যাদা নির্ভর করে মাতৃভূমির বা দেশের জন্য আমি কী অবদান রাখলাম, সেই প্রশ্নের উত্তরে।</p>
<p>প্রজন্ম তৈরির জন্য চেষ্টা করতে হবে অর্থাৎ একটি স্থায়ী মুক্তির দিকে ধাবিত হতে হলে নিজেদেরকে অবশ্যই জাতির রূহ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং এরপর জাতির বিবেক এবং স্পন্দনে পরিণত হতে হবে। এটা ছাড়া জাতির অবস্থা আমরা বুঝব না, বা ভবিষ্যৎকে দেখাতে পারব না।</p>
<p>এর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে আসবে ভাষা-<strong>বাংলা ভাষা</strong><strong>, </strong><strong>যেটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। এই ভাষাকে জাগ্রত করা</strong><strong>, </strong><strong>নতুন পরিভাষা সৃষ্টি করা</strong><strong>, </strong><strong>এটা অপরিহার্য। কারণ আমরা সবসময় দেখেছি</strong><strong>, </strong><strong>যে কোনো গণঅভ্যুত্থান</strong><strong>, </strong><strong>বিপ্লব</strong><strong>, </strong><strong>রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে যেমন পরিভাষা প্রয়োজন</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি অন্যান্য সবক্ষেত্রেও নতুন পরিভাষার প্রয়োজন হয়</strong><strong>।</strong></p>
<p>পরিভাষাগুলোর জন্ম দেয় কারা? এই পরিভাষাগুলো কোনো ব্যক্তিত্ব নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই তৈরী করে। এটাই যুগে যুগে হয়ে আসছে। এজন্য আমরা ভাষার বিনির্মাণ এবং বাংলা ভাষাকে জাগ্রত না করতে পারলে আসলে কোনো কিছুই হবে না।</p>
<p>সেই কারণে আমরা নিরপেক্ষ জায়গা থেকে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে, ভবিষ্যতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি—সব কিছুকে একটি প্রস্তাবনা বা ভবিষ্যতের রূপরেখা হিসেবে দেখানোর মতো একটি মেথডলজি হাজির করতে চাই। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।</p>
<p><strong>সেই জায়গা থেকে আমাদের যেসব শিক্ষক বা বড় বড় আলেম আছেন</strong><strong>, </strong><strong>তাদের মধ্যে অন্যতম সম্মানিত ওস্তাদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ</strong><strong>; </strong><strong>যার দীর্ঘ দারস</strong><strong>, </strong><strong>চিন্তা ও মেথড দিয়ে আমরা উপকৃত হয়েছি। ফিলিস্তিনের প্রফেসর ড. আবদুল ফাত্তাহ আল ওয়াইসি</strong><strong>; </strong><strong>তার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির দিশা শেখার সুযোগ পেয়েছি</strong><strong>।</strong></p>
<p>আমরা পেয়েছি প্রফেসর ড. ওয়াসফি আশুর, প্রফেসর ড. জাসের আওদা, প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইজ্জেত, যারা মিশরের শ্রেষ্ঠ আলেমদের অন্যতম। তাদের কাছ থেকে আমরা দারস গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি।</p>
<p>আমরা বিখ্যাত সভ্যতাবিশারদ, দার্শনিক প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন উস্তাজকে পেয়েছি। একই সাথে মরক্কোর গাজ্জালি খ্যাত ত্বহা আবদুর রহমান-এর চিন্তা বোঝার জন্য সম্মানিত শিক্ষকের দারস পেয়েছি। আমরা মুক্তি ও সংগ্রামের অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. সামি আল আরিয়ান-কে পেয়েছি।</p>
<p>আমরা পেয়েছি বাস্তবিক বা জীবন্ত কিংবদন্তি হাজী ইব্রাহীম মুরাদ-কে। আমরা পেয়েছি প্রখ্যাত আখলাকবিদ, শহরতত্ত্ব বিশারদ প্রফেসর ড. ইউসুফ ইয়ালানিজকে। একই সাথে পেয়েছি আধুনিক অর্থনীতি এবং ইসলামের প্রাসঙ্গিকতার অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. আসাদ জামান-কে।</p>
<p>আমরা পেয়েছি জর্ডানের ওস্তাদ ড. ইউসুফ আল কুরাইশি, লেবাননের ওস্তাদ প্রফেসর ড ওয়ানিস আল মাবরুককে। এভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বড় বড় শিক্ষকের দারস গ্রহণ করার পাশাপাশি দেশীয় অঙ্গনের যেসব শিক্ষক আমাদের মুগ্ধ করেছেন, সত্যিকারার্থে গড়ে তোলার ভূমিকা রেখেছেন, তাদের আমরা পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের ওস্তাদ বুরহান উদ্দিন আজাদ-এর কথা অবশ্যই বলতে হয়। একই সাথে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় থাকা শিক্ষকগণ আমাদের প্রতিনিয়ত দারস দিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের ক্লাস নিয়েছেন।</p>
<p>আমরা চেষ্টা করেছি এই মডেল ও উপমাগুলো হাজির করতে এবং তাদের সঙ্গে শেখার একটি সুযোগ তৈরি করতে। যা আমাদের ছাত্রদেরকে জাতির রূহ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে অবশ্যই ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: আপনাদের অবদানের জায়গা কী কী বা কী কী কাজ হয়</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> এর উত্তরে বলা যায়, <strong>আমাদের যে একাডেমিক কাজ</strong><strong>, </strong><strong>তা আমাদের একাডেমি বিভাগ সম্পন্ন করে। শিক্ষকদের যেসব কথা বলা হলো</strong><strong>, </strong><strong>সেগুলো মূলত একাডেমি বিভাগের অবদান। আমরা এ পর্যন্ত এক বছর মেয়াদী কোর্সের তিনটি ব্যাচ সম্পন্ন করেছি। একটি সমাবর্তন হয়েছে</strong><strong>, </strong><strong>সামনে আরেকটি সমাবর্তন হবে। এছাড়া </strong><strong> </strong><strong>আমরা দুই বছর মেয়াদি কোর্স পরিচালনা করছি</strong><strong>, </strong><strong>যেখানে উলুমুল কোরআন</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামী চিন্তায় হাদিস মেথডলজি</strong><strong>, </strong><strong>ইলমুল কালাম</strong><strong>, </strong><strong>উসুল ও মাকাসিদ</strong><strong>, </strong><strong>বালাগাত মান্তিক</strong><strong>, </strong><strong>উসুল ও ফিকহ</strong><strong>, </strong><strong>শরিয়া</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামিক অর্থনীতি</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামী দর্শন থেকে শুরু করে লজিক ও ক্রিটিকাল থিংকিং</strong><strong>, </strong><strong>অ্যানালিটিক্যাল থিংকিং</strong><strong>, </strong><strong>ইসলামিক জ্ঞানের উসুল ও মেথডলজি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত দুটি ব্যাচ সম্পন্ন হয়েছে এবং একটি সমাপ্তির পথে রয়েছে</strong><strong>।</strong></p>
<p>আমরা এই কোর্সগুলোর মাধ্যমে উপরোক্ত বিষয়ের অনেকগুলোর বেসিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে বিশ্বসভ্যতা ও ইসলাম, গণিত, উসুলে সিরাত, ইসলামিক চিন্তা ও দর্শনের ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (D-8), আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব, তাসাউফ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইভিত্তিক পাঠচক্র পরিচালনা করা হয়। এই ক্লাসগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোর্স সমাপ্ত করছে।</p>
<p>সেই সঙ্গে তারা বাস্তব কাজেও সম্পৃক্ত হচ্ছে। কেউ অনুবাদক হিসেবে অবদান রাখছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গাতে গবেষণামূলক কাজে যুক্ত রয়েছে। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য বা অনুবাদ কাজে অবদান রাখার ক্ষেত্রে আমরা অনেক শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে দেখতে পাচ্ছি। এ পর্যন্ত আমাদের যেসব শিক্ষার্থী কোর্স সমাপ্ত করেছে বা সমাপ্তির পথে রয়েছে তাদের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এই দুই হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তত আমরা একটি বড় ধরনের চিন্তার সাথে, পদ্ধতিগত জ্ঞানের সাথে, সরাসরি শিক্ষকদের সংস্পর্শে আনতে পেরেছি।</p>
<p>আমি মনে করি, আমাদের জন্য এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য এটি একটি নতুন সংযোজন। কারণ, আমাদের ক্লাসগুলো অধিকাংশ নতুন সংযোজন হিসেবে বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।</p>
<p>একই সঙ্গে আমাদের গবেষণা বিভাগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অবদান রয়েছে। এখানে <strong>ষাটটির অধিক প্রকাশনা</strong> ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এবং আমাদের প্রকাশনাগুলো মানহীন বা গবেষণা বহির্ভূত নয়, এরকম কোনো লেখা আমরা প্রকাশ করি না। সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই আমরা বই প্রকাশের চেষ্টা করি।</p>
<p>এই সবকিছুই আমাদের নিজস্ব সংযোজন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে কাজ থাকলেও আমরা নতুন করে এগুলোকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ আমরা অগ্রগামী হতে পেরেছি।</p>
<p>আমাদের একই সঙ্গে <strong>রোয়াক ব্লগ</strong> রয়েছে এবং সেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রবন্ধ রয়েছে, যেগুলো অনুবাদ, মৌলিক লেখনি, সংকলিত লেখা ইত্যাদির অন্তর্ভুক্ত। আমি মনে করি, এগুলো বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় এনসাইক্লোপিডিয়াতে পরিণত হবে এবং হতে যাচ্ছে। যার প্রমাণ রোয়াক ব্লগ দেখলেই বোঝা যাবে।</p>
<p>অনুবাদের ক্ষেত্রে, এই রোয়াক ব্লগ, প্রকাশনা, পত্রিকা সবকিছুর ক্ষেত্রেই অবদান রেখে যাচ্ছে আমাদের অনুবাদ বিভাগ, যেটি গবেষণা বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয়। গবেষণা বিভাগের অন্যতম একটি বিভাগ হলো <strong>ত্রৈমাসিক মিহওয়ার</strong><strong>।</strong> এখন পর্যন্ত আমরা মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশ করেছি। এটি খুবই মৌলিক এবং বড় বড় শিক্ষকদের লেখনি, চিন্তা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। যা যুবসমাজের মাঝে একটি বড় ধরনের আশার সঞ্চার করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্ধশতাধিক পাঠচক্র পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ, এই পত্রিকা ইতোমধ্যে একটি চিন্তাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>আমরা এই সব বিষয়ের পাশাপাশি আমাদের <strong>আন্তর্জাতিক বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>ছাত্র বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>ছাত্রী বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ</strong><strong>, </strong><strong>মাদরাসা বিভাগ</strong> সবক্ষেত্রে চিন্তাগুলোকে চর্চার জন্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমাদের পাঠচক্রগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।</p>
<p>দারস বাড়ি পাঠচক্রের ব্যানারে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিমাসে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, এই পাঠচক্রগুলো একদিন একটি বড় ধরনের জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।</p>
<p>বাংলাদেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গঠন, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে সংকট আমরা লক্ষ্য করেছি, এই পাঠচক্রগুলো থেকে এবং আমাদের কোর্সগুলো থেকে যে মানুষগুলো গড়ে উঠছে, যারা নিয়মিত চিন্তাচর্চা করছে, দেশ ও জাতি নিয়ে ভাবছে, তারা অবশ্যই অবদান রাখবে।</p>
<p>এই যে অবদান রাখার মতো একটি প্রজন্ম আমরা দাঁড় করাতে পেরেছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান এবং সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন নিয়ে আপনাদের চিন্তা ও পরিকল্পনা কী</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> আসলে এক্ষেত্রে যেটা বলতে হয়, তা হলো পরিকল্পনা আছে বলেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলছি। আমাদের ইনস্টিটিউটের আওতাধীন এতগুলো বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। এখান থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক যে চিন্তাটা করছি, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এসব চিন্তা ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেন আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়, আঞ্চলিক ব্রাঞ্চগুলো যেন শক্তিশালী অবস্থানে আসে। <strong>এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠুক যেখানে আপামর সাধারণ জনগণ নিজেদের রূহের খোরাক খুঁজে পাবে</strong><strong>, </strong><strong>ছাত্ররা তাদের শিক্ষার খোরাক খুঁজে পাবে</strong><strong>, </strong><strong>চিন্তাশীল যুব সম্প্রদায় তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে। পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তারা সেই ভবিষ্যৎ ও অতীত উভয়কেই চর্চা করতে পারবে</strong><strong>, </strong><strong>বর্তমানকে বিশ্লেষণ করতে পারবে</strong><strong>।</strong></p>
<p>এটি একটি জাতিকে দাঁড় করানোর জন্য সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আমি মনে করি, এটি যদি না দাঁড়ায়, একটি জাতি কখনোই দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান বড় ধরনের একটি মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু একটি গণঅভ্যুত্থান দিয়ে আমি আমার জাতিকে গঠন করে ফেলতে পারবো না। একটি জাতির দুই শত বছরে আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি, শিক্ষা কাঠামোর নিজস্ব যে রূপায়ন, সেটি হয়নি। আমরা যদি একটি গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল সত্যিই তুলে ধরতে চাই, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের এ কাজগুলো করতে হবে। আর এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন।</p>
<p>এই বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের জন্যই আমরা আমাদের ইনস্টিটিউটের ব্রাঞ্চগুলো, বিভাগগুলো, সকল স্তরেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। এবং এই যে ব্যক্তিরা তৈরি হবে, এক একজন ব্যক্তিই তো এক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান, একটি জাতীয় স্বপ্নের প্রতীক। এজন্য তারা কিভাবে তৈরী হবে, প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি কিভাবে তৈরি করবে, কিভাবে ছাত্রদেরকে স্কলারশিপ দেবে, কিভাবে আন্তর্জাতিক স্কলারদের সাথে পরিচিত করবে, কিভাবে ক্লাসিক জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হবে, পরিভাষার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নতুন পরিভাষার সৃষ্টি করবে, কীভাবে ইলমি সিলসিলার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ইলমি সিলসিলার শুভ সূচনা করবে, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিজেদেরকে কীভাবে গড়ে তুলবে, এই প্রত্যেকটা বিষয় মূলত তারা এখান থেকে শিখছে এবং এই সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে। এটাই আমাদের অঙ্গনকে একটি বড় অবস্থানে নিয়ে যাবে। এজন্য এটাকে বলবেন আমাদের মূল পরিকল্পনা।</p>
<p>আর অন্যদের ক্ষেত্রে যদি দেখি, বিশেষ করে আমরা যাদের সবচেয়ে নিজস্ব ও কাছের মনে করি, যাদের ইলমি চর্চার বদৌলতে বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত ইলমি চর্চা যে শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষ করে দেওবন্দী ঘরানার যে মাদ্রাসাগুলো। এই সকল মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে যেন আমরা সুন্দরভাবে তাদের সাথে বসে একত্রে বিভিন্ন রিসার্চ উপহার দিতে পারি, তাদের থেকে আমরা উপকৃত হতে পারি, তাদের সাথে মিলে জাতির প্রস্তাবনা, ইসলামী জ্ঞান চর্চা, সমাজতত্ত্ব, জাতীয় সংহতির যে আলাপ, সেগুলো আমরা করতে পারি।</p>
<p>এই যে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর ক্ষেত্রে এবং একই সাথে মাদ্রাসা কাঠামোর ক্ষেত্রেও, এই পরিবেশটা যদি আমরা তৈরি করতে পারি, এখান থেকে অনেক ইন্সটিটিউশন, প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় মানের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে, যারা দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখানে যারা কাজ করছে আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যের আলোকে আমরা তাদের সাথে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করব, সহযোগিতা করার চেষ্টা করব, সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সা’দ মুসান্না: সর্বশেষ প্রশ্ন-এ ক্ষেত্রে আসলে কোন বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বা বাঁধা হিসেবে দেখছেন</strong><strong>?</strong></p>
<p><strong>হাসান আল ফিরদাউস:</strong> বাঁধা বলতে আমার কাছে এখানে যেটা মনে হয়েছে, তা হলো, ইতিপূর্বে যেটা বললাম, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মনে করি সব পরিবর্তন হয়ে যাবে, অর্থাৎ এই যে সাময়িক চিন্তা করা এবং একপেশে চিন্তা করা<strong>, </strong><strong>শুধুমাত্র রাজনীতি দিয়েই কিংবা শুধুমাত্র একটা বিষয় দিয়েই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যাবে</strong><strong>, </strong><strong>এই মনোভাবটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এটা কেন আমি একটা জাতির জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখি তার কারণ হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>অবশ্যই রাজনীতি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট</strong><strong>, </strong><strong>কিন্তু এটাকে যখন একমাত্র পয়েন্ট হিসেবে বা প্রধান পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়</strong><strong>, </strong><strong>তখন কিন্তু আমরা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ পাই না। যেমন</strong><strong>, </strong><strong>সামাজিক প্রতিষ্ঠান</strong><strong>, </strong><strong>শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান</strong><strong>, </strong><strong>সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এসব গড়ে তোলার প্রতি কারো কোনো আগ্রহ থাকে না</strong><strong>, </strong><strong>শক্তি খুঁজে পায় না</strong><strong>, </strong><strong>আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায় না। আমার কাছে মনে হয়েছে</strong><strong>, </strong><strong>বাংলাদেশে এটা সবচেয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ</strong><strong>।</strong></p>
<p>কেউ সত্যি খুঁজে পাওয়া, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার যে উৎসমূল, সেটাই শুরুতেই নিঃশেষ করে দেওয়া হয়।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি আমি দেখছি তা হলো, এই দেশকে শক্তিশালী করবে, সভ্যতাকে শক্তিশালী করবে, একটা সিভিলাইজেশনাল প্রজেক্ট দাঁড় করাবে, এ ধরণের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা কি? আমি শক্তিশালী হয়ে রাষ্ট্রকে দখল করবো, দেশকে দখল করবো, এইটাই মূল চিন্তা। যখন আমি শক্তিশালী হয়ে দেশকে দখল করবো, তখন কিন্তু আমার সাথে যাদের চিন্তার মিল নেই আমি তাদের বিরোধিতা করবো। সেটা গুপ্তভাবে হোক কিংবা প্রকাশ্যভাবে হোক। এই গুপ্ত কিংবা প্রকাশ্য বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত দেশের ক্ষতি করছে, জাতির মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করছে। এটা শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠান নয়, সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য সমানভাবে চ্যালেঞ্জ।</p>
<p>এ কারণে আমরা মনে করি, নানাবিধ বাঁধা এ পর্যন্ত এসেছে। এরপর এসেছে তীর্যক মন্তব্য, মিথ্যাচার, নানাবিধ জুলুম, মনস্তাত্ত্বিকভাবে হোক, মন্তব্যের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্যান্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে হোক; এসব এসেছে কিছু অদূরদর্শী, অপরিণামদর্শী গ্রুপের দ্বারা, যারা মনে করে যে একমাত্র আমরাই শক্তিশালী হব, আমরাই রাষ্ট্রকে দখল করবো, আমরাই ইসলামের ঠিকাদার। আর ইসলাম নিয়ে কাজেরও আমরাই ঠিকাদার। এটা যে কোনো পন্থীর জন্যই জাতীয় দিক থেকে দুঃখজনক।</p>
<p>আমরা চেষ্টা করেছি, কোনো ধরনের সংঘাতে না গিয়ে, কোনো ধরনের সংঘর্ষে না গিয়ে, শক্তিশালী দলিল, যুক্তি এবং আমাদের কাজের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে।</p>
<p>এরপরও একটা বিষয় রয়েছে, সেটা হলো, অনেকেই চেয়েছে আমাদের উপর রাজনৈতিক প্রলেপ দিয়ে দেওয়া কিংবা কোনো কোনো গুপ্ত সংগঠনের সাথে মিলিয়ে ফেলা। এক্ষত্রে আমি বলবো, ইসলামের কোনো কিছুই গোপন নয়; ইসলাম সব কিছু প্রকাশ্যে রেখেছে। আমরা এই গুপ্ত নীতির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি। এবং এই বিরোধিতার কারণেই আমরা পূর্বে যে জুলুমের কথা বললাম, তার শিকার হয়েছি। একইভাবে জাতির যে সাংস্কৃতিক বিভাজন, জাতির যে আস্থা, সেটা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই নষ্ট হয় এই গুপ্ততার কারণে।</p>
<p>এটা যখন নষ্ট হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মতো যারা নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে জাতি গঠনের কাজ করতে চায়, তাদেরকেও মানুষ এই গুপ্তদের সাথে মিলিয়ে ফেলে। এটা শুধু আমাদের ক্ষেত্রে নয়, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল এটার ভুক্তভোগী। প্রত্যেকটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও এটার ভুক্তভোগী। মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে, কার উপর আস্থা রাখবে, এটা খুঁজে পাচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য বড় ধরনের বাঁধা।</p>
<p>এজন্য আমরা এই ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা জাতির মান উন্নয়নের জন্য, নিজেদেরকে জাতির রুহ হিসেবে গঠন করার জন্য, জাতির ব্যক্তি সমাজকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে চেষ্টা চালাচ্ছি। এই চিন্তাটাকে প্রাসঙ্গিক করার জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোনো নিয়ন্ত্রণাধীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে এসব করা সম্ভব নয়; বরং উল্টো, এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান দিয়েই রাজনীতিকে গঠন করা সম্ভব, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া সম্ভব, সাংস্কৃতিক ইশতেহার দেওয়া সম্ভব।</p>
<p>সুতরাং এই ধরনের প্রতিষ্ঠান কখনো কোনো দলের আওতাধীন হয়ে, কারো সহযোগিতা নিয়ে চলতে পারে না। এই ধারণা যদি কেউ করে থাকে বা এই ধরনের ভুল প্রত্যাশা যদি কারো থাকে যে আমরা তাদের সাথে যুক্ত হব, আমরা সেটা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি ইতিপূর্বে, এবং করে যাবো।</p>
<blockquote><p>দ্বিতীয়ত, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই, শিক্ষা আন্দোলন হিসেবেই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই শিক্ষা আন্দোলনকে কোনোভাবেই বিতর্কিত করা, মিথ্যাচার করা, বিভিন্ন জুলুমের সম্মুখীন করা যাবে না। আমরা কারো বিরোধী নই, আমরা কারো বিকল্প নই। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে এতটুকু স্পষ্ট যে আমরা আমাদের নিজস্ব চিন্তায় সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ডকট্রিনের আলোকে আমাদের লক্ষ্যপানে পরিচালিত হচ্ছি।</p></blockquote>
<p>সুতরাং এটার মাধ্যমে সকলের উপকৃত হওয়ার একটি সিলসিলা তৈরি হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আমরা দৃঢ় থাকবো এবং যত বাধাই আসুক, চ্যালেঞ্জ আসুক, আমরা তা মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাবো।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/special-interview-on-the-journey-activities-and-future-plans-of-the-institute-of-islamic-thought-and-research/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>1</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16472</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া; ঐতিহাসিক শিকড় ও জাতিসত্তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 07 Dec 2025 18:59:32 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16417</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5><strong>ইসলামী সভ্যতায় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি</strong></h5>
<p>মানবমুক্তির একমাত্র জীবনব্যবস্থা দ্বীনে মুবীন ইসলামের যে মূলনীতি, মূলভিত্তি বা স্থায়ী নীতিসমূহ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা উসূল বা আসাসুল কুল্লিয়া নামে জানি, এই মূলনীতিগুলোর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ধর্মীয় বিধান, আকিদা, শরিয়াহ এবং ইবাদতের অপরিবর্তনীয় কাঠামো। আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসলে সেই ভিত্তিগুলিই। কারণ, এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার, কিংবা অঞ্চলভেদে ভিন্নভাবে চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই। এগুলোই ইসলামী চিন্তাধারা ও শরীয়তের কেন্দ্র, যার বাইরে ইসলামকে কল্পনা করা যায় না।</p>
<p>তবে আমার প্রশ্নটি কিছুটা ভিন্ন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নানা ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে। আমরা দেখি, প্রতিটি জাতিসত্তার রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ, ঐতিহ্য ও মানসিক গঠন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রশ্ন আসে, ইসলামী ব্যবস্থা কীভাবে এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে?</p>
<p>ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনো অঞ্চল ইসলাম গ্রহণ করলে সেখানে শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনও ইসলামের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজ জীবনে তিনভাবে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে মূল্যায়ন করেছেন,</p>
<p><strong>প্রথমত, সরাসরি গ্রহণ।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মৌলিক নীতির বিরোধী নয় এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রেও আপত্তিকর নয়, সেগুলো তিনি গ্রহণ করতেন। সমাজের জন্য কল্যাণকর ও ক্ষতিহীন উপাদানগুলোকে তিনি অনুমোদন দিতেন।</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত, সংযোজন বা সংস্কার করে গ্রহণ।</strong><br />
যে প্রথাগুলোর কিছু অংশ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল, সেগুলোর নেতিবাচক দিক বাদ দিয়ে, ইতিবাচক অংশকে ইসলামী নৈতিকতা যোগ করে নতুনভাবে প্রয়োগ করতেন। এর ফলে সমাজে এক নতুন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি হতো।</p>
<p><strong>তৃতীয়ত, সরাসরি প্রত্যাখ্যান।</strong><br />
যেসব প্রথা ইসলামের মূলনীতির বিপরীত, শিরক বা কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে- সেগুলো তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন।</p>
<p>অতএব, ইসলামের উসুল বা আসাসুল কুল্লিয়া, অর্থাৎ মৌলিক নীতিগুলোই ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি সঠিকভাবে বোঝা ও প্রতিষ্ঠা করা না গেলে, সংস্কৃতির ধারাটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই সমাজে এই নীতিগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা আলেম ও প্রজ্ঞাবানদের দায়িত্ব।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার আলেমগণ সর্বদা এই নীতিগুলোকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করতেন। ফলে ইসলামের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় মূলনীতি টিকে থাকত, আর পরিবর্তনশীল বিষয়ে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজন ঘটত।</p>
<p>যেসব বিষয়ে সময় ও সমাজের প্রয়োজনে পরিবর্তন আসত, সেখানে ইসলাম নমনীয়তা ও প্রজ্ঞা দেখিয়েছে। তবে “বিদআত” ধারণাটি এখানে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়।<br />
অনেকে মনে করেন, নবী করিম ﷺ এর যুগে না থাকা যেকোনো নতুন কিছুই বিদআত। কিন্তু তা সঠিক নয়। বিদআত হচ্ছে সেই কাজ, যা সুন্নতের বিপরীতে, ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী, এবং কেউ সেটিকে ইবাদতের অংশ বা সওয়াবের কাজ হিসেবে মনে করে।</p>
<p>অন্যদিকে, কোনো কাজ যদি ইসলামের স্থায়ী নীতির বিপরীত না হয়, বরং আঞ্চলিক প্রয়োজনে সমাজে উপকারী ভূমিকা রাখে, তবে সেটি ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীত কিছু নয়। বরং এটি সেই সমাজের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবেই টিকে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সংস্কৃতিতে ইসলামের বিশ্বজনীনতা</strong></h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে কোনো আলেম বা সুলতান কখনোই এমন প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করেননি।<br />
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি (তুরাস ও তামাদ্দুন) সবসময়ই ছিল বিস্তৃত, গভীর ও মানবিক। মুসলমানরা যখন বিভিন্ন ভূখণ্ডে গিয়েছে, তারা সেই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। যেমন তারা মানুষের অন্তর জয় করেছে, তেমনি গড়ে তুলেছে রাজধানী ও নগর, স্থাপত্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামো, এবং সমাজজীবনের বিভিন্ন রূপ।</p>
<p>প্রশ্ন হল, তারা এটি কীভাবে করতে পেরেছিল?<br />
ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায়, মদিনা ব্যতীত প্রায় সব ইসলামী রাজধানীতেই মুসলমানদের তুলনায় অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল বেশি। তবুও তারা সেখানে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করেছে। নিজেদের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় ও ভাষা সযত্নে রক্ষা করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, তারা কখনো একে হুমকি হিসেবে দেখেনি; বরং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ছিল তাদের পূর্ণ আনুগত্য, এবং শত শত বছর তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রেখেছে।</p>
<p>এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে ছিল ইসলামী সভ্যতার সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং উৎকৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ। এ ধরনের গভীর সহাবস্থান কেবল তখনই সম্ভব, যখন সভ্যতা তার মূল নীতিতে অবিচল থেকে পারিপার্শ্বিক বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে।</p>
<p>একইভাবে, মুসলমানদের উসূলী ভিত্তি, সাংস্কৃতিক কাঠামো, ইবাদত ও শরীয়তের কোনো দিকই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা সংকটে পড়েনি। বরং তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অটুট রেখেই ইসলামী আদর্শের সীমার মধ্যে থেকে সবকিছু সুচারুভাবে পালন করতে পেরেছে। এভাবেই ইসলাম, একদিকে তার চিরন্তন নীতিতে অবিচল থেকেছে, অন্যদিকে মানবজাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে এক বিশ্বজনীন সভ্যতার রূপ ধারণ করেছে।</p>
<p>আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, <strong>৬৯ হিজরিতে লালমনিরহাটে সাহাবী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।</strong> অর্থাৎ, ইসলামের আগমন এই ভূখণ্ডেও ঘটেছিল প্রাচীনকালেই। সাহাবীগণ, আলেম ও সুফিগণ এ অঞ্চলে এসে মসজিদ, খানকা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।</p>
<p>তবে এসব প্রতিষ্ঠান কেবল মুসলমানদের আকৃষ্ট করা, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি, প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা, আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। খানকা ও দরগাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতেন এবং নিরাপদ বোধ করতেন। সেখানে খাবারের ব্যবস্থা ছিল, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগও ছিল সবার জন্য। একইভাবে, মুসলমানরা যেমন নামাজ-রোজা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করেননি, তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এভাবেই ইসলামী সংস্কৃতি এখানে বিকশিত হয়েছিল এক মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহাবস্থানমূলক রূপে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বৈচিত্র্যেই ঐক্যের সৌন্দর্য</strong></h5>
<p>মুসলমানরা খাদ্য, পোশাক, স্থাপত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উপকারী ও নান্দনিক উপাদান গ্রহণ করেছে, কিন্তু কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে একরকম করে দেয়নি। যেমন, নোয়াখালীর বাজরা মসজিদ ও ইস্তাম্বুলের সুলতান ফাতিহ মসজিদ এক নয়,<br />
দিল্লির জুমা মসজিদ ও ইস্পাহানের মসজিদও একই কাঠামোয় নির্মিত নয়।<br />
কিন্তু সবগুলোতেই দেখা যায় এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য; উচ্চ রুচিবোধ, নান্দনিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও ভারসাম্য।</p>
<p>এই সৌন্দর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনই ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বলকান থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জীবনধারা আজও রুচিশীল, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ।</p>
<p>এর কারণ একটাই, তারা ইসলামের স্থায়ী মূলনীতির প্রতি অনুগত থেকেও, প্রতিটি সমাজে কল্যাণকর, রুচিসম্পন্ন ও উপযোগী সংস্কৃতি বিকাশ করেছে। এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মহত্ত্ব ও সাফল্যের আসল রহস্য।</p>
<p>খাদ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য ছিল। <strong>ইসলামী সভ্যতায় খাদ্যের স্থায়ী নীতি ছিল, এটি যেন হালাল, স্বাস্থ্যকর ও উপকারী হয়।</strong> বাকিগুলো অঞ্চল, জলবায়ু ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈচিত্র্যময় রূপ পেয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম একদিকে বৈশ্বিক হলেও, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে মানানসই একটি সংস্কৃতির ধারা তৈরি করতে পেরেছে— যা আজও টিকে আছে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মুসলমানরা প্রতিটি স্থানে স্থানীয় স্বতন্ত্রতা ও সংস্কৃতি রক্ষা করেই এক সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল সংস্কৃতি উপহার দিয়েছে। ইসলামের আঞ্চলিক অভিযোজন সর্বত্র সুরক্ষিত ছিল। স্থানীয় খাবার, পোশাক, স্থাপত্য, উৎসব— সবকিছুই নিজস্ব আঙ্গিকে টিকে থেকেছে, আবার ইসলামের স্থায়ী নীতি ও নৈতিক শিক্ষা একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>ইসলামী সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান</strong></h5>
<p>এখানে প্রশ্ন আসে, ইসলামী সভ্যতার সংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবস্থান কীভাবে কার্যকর ছিল? এটি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে ইসলামী সংস্কৃতি এবং আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।<br />
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মূলত নিয়ন্ত্রণ, ভোগবাদ এবং কিছু গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গড়ে উঠেছে। তারা সংস্কৃতিকে এক ধরনের বিনোদন বা সাময়িক খোরাক হিসেবে ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তরকে নয়, কেবল ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করে। তাদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী; তাই তা শক্তিশালী হলেও আত্মিক নয়।<br />
কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি সামষ্টিক, আত্মিক ও রুহানিকেন্দ্রিক। ইসলামী সংস্কৃতি মানুষের আত্মা, নৈতিকতা এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।</p>
<p>যেমন ঈদের সংস্কৃতিতে আমরা দেখি, সবাই একসঙ্গে মাঠে নামাজ আদায় করছি, কোলাকুলি করছি; কোরবানির ঈদে একই গোশতের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, সবাই একে অপরকে গোশত বিলিয়ে দিচ্ছি। রমজান মাসে সৃষ্টি হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শবে মেরাজ, শবে বরাত প্রতিটি উপলক্ষেই আমরা প্রতিবেশীদের, এমনকি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও খাবার দিই। এখানেই নিহিত ইসলামী সংস্কৃতির মানবিকতা ও সহাবস্থান।</p>
<p>আমাদের কবিতার আসর, মিলাদ, জিয়াফত, খানকা ও দরগার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবই ছিল উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমাজকেন্দ্রিক। <strong>এখানে সব শ্রেণি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারতেন। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজে পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে দৃঢ় করেছিল।</strong></p>
<p><strong>অন্যদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এমন নয়। তাদের চলচ্চিত্র, সংগীত বা বিনোদনমূলক উপাদানগুলো প্রায়ই অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও মূল্যবোধহীনতার দিকে ধাবিত করে।</strong> তাদের সংস্কৃতি পরিবার ভাঙে, সমাজকে বিভক্ত করে। তারা সাময়িক আনন্দ পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আত্মিক ক্ষয় ডেকে আনে। যেমন মদ্যপান বা অতিরিক্ত ভোগবিলাস সাময়িক আনন্দ দিলেও তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।</p>
<p>আবার, ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিটি অনুষ্ঠান ও ইভেন্ট সার্বজনীন ও কল্যাণমুখী। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক দিক থেকেও বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করেছে। আমাদের অঞ্চলে খানকা ও দরগাগুলো ছিল আধ্যাত্মিক বলয়, যেখানে মানুষ আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজসেবার অনুশীলন করত। এখান থেকে মানুষ রুহানী শক্তি অর্জন করত, আত্মশুদ্ধির পথ খুঁজে পেত।</p>
<p>এই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে অবদান রেখেছিল। এটাই ছিল ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক সাফল্য—যা কেবল ধর্ম নয়, মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছিল।<br />
কিন্তু আজ আমরা যদি ইতিহাসকে ছোট করে দেখি, তবে এই গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>উপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক ক্ষয়</strong></h5>
<p>পাশ্চাত্য ও ওরিয়েন্টালিস্ট অনেক লেখক ইসলামের এতোসব প্রসারকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সত্য হল, ইসলামী সংস্কৃতি সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, পরিছন্নতা, আতিথেয়তা, অপচয়ের বিরোধিতা, পারস্পরিক বন্ধন ও প্রতিবেশীর অধিকার; এই মূল্যবোধগুলোর মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<p>যেখানেই মুসলমানরা গিয়েছে, তারা পরিছন্নতা শিখিয়েছে, পারিবারিক বন্ধনকে শক্ত করেছে, সমাজবদ্ধ জীবনধারা তৈরি করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে, কুর্দ অঞ্চলে বা আফ্রিকার অনেক স্থানে দেখা যায়- মুসলমানদের সংস্পর্শে থাকা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পরিবারগুলোও পরিচ্ছন্নতা ও পারিবারিক নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত হয়েছে।<br />
যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না, সেখানে সমাজ অনেক বেশি অব্যবস্থাপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ইসলামী সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা মানবিক উন্নয়নের পথে সমাজকে পরিচালিত করেছে।</p>
<p>দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়েছে উপনিবেশিক শাসনের কারণে। আফ্রিকার উপকূল, মালয় অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বলকান; সর্বত্র মুসলমান সমাজ কখনও ব্রিটিশ, কখনও ফরাসি, কখনও কমিউনিস্ট আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছে।<br />
এসব আগ্রাসনের ফলে ইসলামী সভ্যতার মূল্যবোধনির্ভর সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার অন্তর্গত মূল্যবোধগুলোই ছিল সেই সাংস্কৃতিক উপাদান, যেগুলোর মাধ্যমে মুসলমানরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিল।</p>
<p>কেবল খাবার, পোশাক বা ভাষা দিয়ে কোনো সভ্যতা গঠিত হয় না; এগুলো সভ্যতার উপাদানমাত্র। আসল সভ্যতা গঠিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামষ্টিক মানসিকতার মাধ্যমে। এই মূল্যবোধ আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এগুলো বিকশিত হয় শিক্ষা, খানকা, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে। মুসলমানরা ঠিক এইভাবেই সমাজে সভ্যতার ভিত স্থাপন করেছিল।</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ, খাদ্যসংস্কৃতি আরবে এক রকম, এশিয়ায় এক রকম, তুরস্কে এক রকম, আর বাংলায় একেবারে ভিন্ন। কিন্তু মূল্যবোধ একটাই। একজন মুসলমান খাবার নষ্ট করবে না, অপরিচ্ছন্ন রাখবে না, হালাল ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করবে।<br />
একজন আফ্রিকান মুসলমান, কেরালার মুসলমান বা বাঙালি মুসলমান; সবাই একই নীতিতে বিশ্বাসী। তারা খাবার অপচয় করবে না, অতিথিকে সম্মান করবে এবং ন্যায্য বণ্টনের নীতি মেনে চলবে।</p>
<p>এই যে একই মূল্যবোধ, একই নৈতিকতা, জাতপাত বা শ্রেণিভেদ অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেতনা; এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মূল।<br />
মানুষ মানুষ হিসেবে সম্মান পায়, এই নীতিতেই সমাজে নিরাপত্তা আসে। বাংলায় ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা এত বেশি হওয়ার কারণও এটিই। এখানে কাউকে জোর করে মুসলমান বানানো হয়নি; বরং মানুষ ইসলামী সংস্কৃতির মানবিক রূপে আকৃষ্ট হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলার ইসলামী সংস্কৃতি বোঝাপড়ায় আমাদের অবস্থা এমন কেন?</strong></h5>
<p>আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রায় পাঁচশ বছরের এক অবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র কাঠামো মুসলমানরা এই উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়।</p>
<p>ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে দেবদেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু মুসলমানরা এর বিপরীতে নামাজকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি। একইভাবে, পারস্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং সবাই যেন নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>এই প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা তৈরি করেছিলেন কমন সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে সবাই অংশ নিতে পারত। <strong>যেমন, খাবারের সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি এমন এক খাবার, যা মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাদান, আড্ডা, জিয়াফত, খানকা ও মসজিদ; এসব স্থান ছিল উন্মুক্ত সামাজিক পরিসর, যা পারস্পরিক বন্ধন ও সহাবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।</strong></p>
<p>এসব কারণেই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া আমাদের কেমন হওয়া উচিত, সেই নিয়েও ভাবনা জরুরি। মূলধারার ইসলামী সংস্কৃতি কি এদেশীয় মুসলমানের সংস্কৃতি থেকে আলাদা হবে? নাকি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই একরূপ সাংস্কৃতিক আবহ ও এজেন্ডা আমাদেরও অনুসরণ করতে হবে? নাকি বরং ইসলামের সীমারেখার ভেতর থেকেই আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা উচিত?</p>
<p>একটি রাষ্ট্র শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পারে কেবল তখনই, যখন তার সংস্কৃতি শক্তিশালী, গভীর এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তাই ইসলামী সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি, নতুন করে বিশ্লেষণ ও আলোচনা করতে হবে।<br />
পাঁচশ বছরের সেই দীর্ঘ রাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, সামাজিক সিলসিলা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শক্তি—আমরা আজ তা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। প্রশ্ন হলো—কখন এবং কীভাবে এই ক্ষয় ঘটল?</p>
<p>আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে, দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর আঘাত হেনেছিল। প্রথমত, তারা আমাদের স্মৃতি (মেমোরি) ধ্বংস করেছে। আমাদের নিজস্ব শিক্ষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিবর্তে তারা এমন এক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সম্পূর্ণভাবে ঔপনিবেশিক স্বার্থে নির্মিত।<br />
তারা ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীতে বিকল্প সাংস্কৃতিক কর্মসূচি তৈরি করেছে এবং সেগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ইসলামের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য নতুন উৎসব সৃষ্টি করেছে। আমাদের ভাষাকে বিকৃত করেছে, বিদেশি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে “আধুনিকতা”র নামে আমাদের ওপর আরোপ করেছে।</p>
<p>যখন আমরা স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করিনি, তখন তারা শক্তি ও সহিংসতার মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা পরিণত হয়েছি এক আত্মপরিচয়হীন জাতিতে। আমাদের স্মৃতি হারিয়ে গেছে, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়েছে, আমরা এক গভীর পরিচয় সংকটে নিপতিত হয়েছি।</p>
<p>আজও সেই সংকট আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না, আমাদের সংস্কৃতির মূল পদ্ধতি (মেথডোলজি) ও উপকরণ সম্পর্কে অজ্ঞ। আমরা বিশ্বজনীন সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির পার্থক্য বুঝি না; আবার আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান সীমিত।</p>
<p><strong>আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ এর রিসালাত (বার্তা)-এর মূল দায়িত্ব এবং একজন মানুষ (বাশার) হিসেবে তাঁর সাধারণ মানবিক অভ্যাসগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতেও ব্যর্থ। এই কারণেই আজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছি।</strong><br />
অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ব্রিটিশ একাডেমিয়া, কলকাতাকেন্দ্রিক এক সাংস্কৃতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের অঞ্চলের সংস্কৃতিকে প্রদর্শনমূলক ও পূজ্য রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল, আমরা যেন নিজেদের সংস্কৃতিকে কেবল বাহ্যিক সাজে উপস্থাপন করি, কিন্তু তার ভেতরের আত্মা, দর্শন ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলি।</p>
<p>ফলস্বরূপ, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে এক প্রাণহীন প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে—যেখানে রয়ে গেছে কেবল বাহ্যিকতা, কিন্তু হারিয়ে গেছে ইসলামী সংস্কৃতির সেই আত্মিক ও নৈতিক মহিমা, যা একসময় এই উপমহাদেশকে আলোকিত করেছিল।</p>
<p>তাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, আইন, পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি প্রতিরক্ষা কাঠামো— সবকিছুই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে তারা একটি ক্ষেত্রকে আঞ্চলিক আবহের ছোঁয়া দিয়েছিল, আর সেটি হলো সংস্কৃতি। কিন্তু সেটিও প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও বিকৃত করার কৌশল মাত্র ছিল। এভাবেই আমাদের ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— যা একসময় আত্মিক শক্তি, মানবিক ঐক্য ও সামাজিক সংহতির উৎস ছিল— ধীরে ধীরে পরাধীনতার মানসিক শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়ে।</p>
<p><strong>তারা সংস্কৃতিকে মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাপিয়ে দেয়। বিভিন্ন চিন্তাধারাকে জোর করে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা তৈরি করে এক কলকাতা-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক মানসিকতা।</strong> এই উদ্দেশ্যে তারা প্রচুর লেখালেখি করেছে, বড় বড় কবি ও সাহিত্যিক গড়ে তুলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, সংসদ, মিডিয়া ও সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে এই ধারাই ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব আত্মপরিচয়কে বিকৃত ও বিলুপ্ত করে দেয়।</p>
<p>এর ফলস্বরূপ আমরা এমন এক বিভ্রান্ত ধারণায় অভ্যস্ত হয়েছি যে, বাঙালি মুসলমান এক স্বতন্ত্র সত্তা, যা আরব, তুর্কি, ইরানীয়, আফ্রিকান, মালয় বা ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। অথচ এটি একটি কৃত্রিম ও কলকাতা-কেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাধারার ফল, যার ভেতরে ইসলামের প্রকৃত রূহ অনুপস্থিত।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, এই চিন্তাধারার প্রভাবে এক রূহবিহীন ইসলাম তৈরি হয়েছে, যা মুসলমানদের সংস্কৃতির আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা চেয়েছিল, মুসলমানদের পোশাক, গান, খাবার, পারিবারিক সম্পর্ক ও জীবনযাপন যেন ব্রিটিশ উপনিবেশ বা কলকাতার ধ্যানধারার আদলে গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের পাঁচ শতাব্দীর নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সিলসিলা আজ ভুলে যাওয়া হয়েছে।</p>
<p><strong>অন্যদিকে, এক শ্রেণির মুসলমান আবার ইসলামী সংস্কৃতির মূল ধারণা না বুঝে আরবদের সংস্কৃতিকেই ইসলামী সংস্কৃতি হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে।</strong> কিন্তু এই দুই প্রান্ত, কলকাতাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ও অনুলিপিকৃত আরবীয় সংস্কৃতি; কোনোটিই ইসলামের প্রকৃত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়।</p>
<p>তাই বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির সঠিক বোঝাপড়া এখন অত্যন্ত জরুরি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির নমুনা</strong></h5>
<p>এই আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, ইসলামী সভ্যতা স্থানীয় সংস্কৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতো। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নিচে বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিশ্বজনীনতার কতক উদাহরণ তুলে ধরা হলো।</p>
<p><strong>০১. ভাষা ও সাহিত্য</strong></p>
<p>আমাদের এই অঞ্চলের ভাষার ধারাবাহিকতায় পাল আমলে যে বাংলা ছিলো, তা একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিলো সেনরা। বাংলার পরিবর্তে সেনরা সংস্কৃত-কে সামনে এনেছিলো। এমনকি, বাংলা ভাষাকেই তারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। মুসলিমরা এসে সে বাংলাভাষাকে আবারো গতিশীল করে দিয়েছিলো। শুধু বাংলাই নয়, মুসলিমরা এতোটা উদার ছিলো যে, বাংলা ও সংস্কৃত—দুই ভাষাকেই একইসাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।</p>
<p><strong>বাংলার সুলতানরা উদারভাবে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সুলতান জালালউদ্দীন মোহাম্মদ শাহ কবি বৃহস্পতি মিশ্রকে &#8220;রায় মুকুট&#8221; উপাধী প্রদান করেন।</strong> হোসেন শাহী বংশের সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু ও সাহিত্যিকরা বাংলায় &#8220;রামায়ণ&#8221; &#8216;মহাভারত&#8217; অনুবাদ করেন। সুলতানি আমলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যেরও অসামান্য উন্নতি হয়। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মন্ত্রী রূপগোস্বামী ২৫টি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করে সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাশ, মালাধর, পরমেশ্বর কবীন্দ্র, শ্রীকর নন্দীর রচনার দ্বারা ঐ যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। মুঘল শাসনামলেও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাংলা-সংস্কৃত ভাষার উন্নতিতে মুঘলরা যথেষ্ট অবদান রাখে। এসবই বাংলায় হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রমাণ করেন। অতএব, এটা সত্য যে, মুসলিম সুলতানদের জামানায় বাংলা ভাষার বিশেষ বিকাশ ঘটেছিলো। সুলতানদের সাহায্য ছাড়া বাংলা ভাষা আজকে সংস্কৃত ভাষার মতো একটি মৃত ভাষায় পরিণত হতো।</p>
<p><strong>বাংলা ভাষার প্রতি মুসলমান সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার প্রশংসা করতে গিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন,</strong></p>
<blockquote><p>❝ব্রাহ্মণগণ প্রথমদিকে বাংলা ভাষা গ্রহণ ও প্রচারের বিরোধী ছিলো। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তারা &#8216;সর্বনেশে&#8217; উপাধি প্রদান করেছিলো। যদি হিন্দু রাজাগণ স্বাধীন থাকতো, তাহলে কদাচিৎ বাংলা ভাষা তাদের দরবারে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতো। আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হতেই আসুক না কেনো, এ&#8217;দেশে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালি হয়েছেন।❞</p></blockquote>
<p>আর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ❝দিল্লি সাম্রাজ্যের অধীনে শান্তি ও আর্থিক উন্নতির ফলস্বরূপই দেশীয় ভাষা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটেছে।❞</p>
<p>ড. লক্ষ্মীধর বলেন,</p>
<blockquote><p>❝আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, দেশীয় ভাষা হিন্দিকে সর্বপ্রথম মুসলমানগণই সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। অথচ আমরা জানি যে, ব্রাহ্মণগণ ইতর ভাষা বলে এই ভাষাকে অবহেলা করেছেন।❞</p></blockquote>
<p>মুসলিমরা যে এভাবে বাংলা ও সংস্কৃতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এলো, তা আবার ধ্বংস হয়ে যায় পলাশীর বিপর্যয়ের পর। ইংরেজদের “ডিভাইড এন্ড রূল” পলিসির ক্ষেত্রে এই ভাষার বিনির্মাণটাকেই কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা। ম্যাক্স মুলার ভারতের হিন্দুদেরকে আর্য বলে তাদের মাঝে সেনদের সেই পুরাতন মানসিকতা তুলে এনেছিলো। যার ফলে বহমান যে বাংলা ছিলো, সেটাকে সমূলে ধ্বংস করে সংস্কৃতকে জোর করে বাংলায় প্রবেশ করানো হয়েছে, যেনো মুসলিম শাসনামলের বাংলা এবং হিন্দুদের নতুন সংস্কৃত বাংলার মাঝে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়; আর শেষমেশ এ-নিয়েও যেনো হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। এবং, হয়েছেও তাই-ই।</p>
<p><strong>নতুন এই বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইংরেজরা প্রতিষ্ঠা করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ; নিজেরাই লিখেছে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, যেসব ব্যাকরণের মাধ্যমেই নতুন বাংলার সূচনা করা হয়। কেননা, এসব ব্যাকরণে সংস্কৃতকে সামনে রেখেই বাংলার নতুন রূপ দেওয়া হয়।</strong> আর এসবকে পরিচিত করাতে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজকে কাজে লাগিয়েছে ইংরেজরা; এবং নতুন এই বাংলাকে লেখ্য ভাষায় রূপ দিয়েছে কলকাতার সাহিত্যিকরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখাগুলো পড়লেই এসব বুঝা যায়। ঠিক এজন্যই কবি নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ এবং কবি গোলাম মোস্তফার চেয়েও এই জেন-জি প্রজন্ম রবী-শরৎ-বঙ্কিম-বিভূতিদেরকে ভালোভাবে চিনে।</p>
<p>এখানে এই প্রশ্নও উঠে আসে যে, ৫০০ বছর আগের মহাকবি আলাওল-এর বহমান বাংলাকে আমরা যেভাবে বুঝি না, তেমনি আমরা কেন প্রায় ২৫০ বছর আগের ঈশ্বরচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝি না? ভাষা যদি বহমান হয়, তাহলে আলাওলেরও ২৫০ বছর পরের বাংলা-তো অনেকটাই বুঝতে পারার কথা। কিন্তু, তা কেন হয় না?</p>
<p>যাকগে, এখান থেকে এই সিদ্ধান্তই পাওয়া গেলো যে, ইসলামী সভ্যতায় ভাষার সংস্কৃতিকে যদি বিশ্বজনীন হিসেবে গ্রহণ করা না হতো, তাহলে হয়তো আমাদের এই বাংলাকে এভাবেই পেতাম না; অথবা হয়তো একেবারেই হারিয়ে যেতো।</p>
<p><strong>০২. উৎসব ও গ্রামীণ সংস্কৃতি</strong></p>
<p>ভারত ও বাংলার উৎসব সংস্কৃতি কতোটা শক্তিশালী ছিলো তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়।<br />
<strong>যেমন- জহির উদ্দিন বাবর, ইলতুৎমিশ ২০% মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে গোটা উপমহাদেশ চালিয়েছেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক বলয় ও তার উৎসব গুলো।</strong> ব্রিটিশরা এসে যখন দেখল কোনভাবেই জনগণ থেকে ইসলামের প্রাণসত্তাকে সরানো যাচ্ছে না, বলয়কে নষ্ট করা যাচ্ছে না, তখন তারা বুঝতে পারলো শুধু জ্ঞান, ক্ষমতা, অর্থনীতি, নষ্ট করলেই হবে না বরং বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করতে হবে। তাই তারা বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্রদের দিয়ে মিরাজ, মিলাদুন্নবী ইত্যাদির বিপরীতে স্বরস্বতী, হলি, দেওয়ালী উৎসবকে ব্যাপকভাবে হাইলাইট করতে শুরু করলো, মক্কা বিজয় দিবসের দিন থার্টি ফার্স্টনাইট জাতীয় ভোগবাদী উৎসব নিয়ে এলো।</p>
<p>মুসলিম বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে রমজান, ঈদ, জন্ম, আকিকা, শবে বরাত, শবে মেরাজ, ঈদে মীলাদুন্নবী, মহররম বেশ আয়োজনের সাথে পালিত হতো।</p>
<p>এম এ রহিমের ভাষায়,</p>
<blockquote><p>“ঈদে মীলাদুন্নবীতে নবাব মুর্শিদকুলী খান রবিউল আউয়ালের প্রথম বারোদিন ভোজের আয়োজন করতেন। পুরো মুর্শিদাবাদ আলোকমালায় সজ্জিত করতেন। সেনাবাহিনী দিয়ে তোপধ্বনি দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মুজাফফর আলেম ওলামাদরে আপ্যায়ন করতেন। পরবর্তী বছরের জীবন ধারনের খরচের জন্য আলেম ও বিজ্ঞজনদের বিশাল অঙ্কের মুদ্রা উপহার দিতেন। গুজরাটের সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ প্রথম বারোদিন আলেমদের নিয়ে সীরাত চর্চা করতেন। সীরাত চর্চার পাশাপাশি উন্মুক্ত ভোজের আয়োজন করতেন। তিনিও বিদ্বান ও অতিথিদের জন্য এতোবেশি পরিমাণ উপহার দিতেন যে, যেন ওলামায়ে কেরামগণ পরবর্তী বছর স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারে।”</p></blockquote>
<p>শবে বরাত নিয়ে এম এ রহিম তার বইয়ে বলেন, “উপমহাদেশের মুসলমানগণ শবে বরাত বহু আচার অনুষ্ঠান ও আমোদ স্ফূর্তির ব্যবস্থা করে এবং অসাধারণ আড়ম্বরের সঙ্গে তা উদ্যাপন করতো। আলোকসজ্জা ও আতশবাজি পোড়ানো এই উৎসবের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ছিল। শামস সিরাজ আফিফের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক চারদিনব্যাপী এই উৎসব উদ্যাপন করতেন এবং এতবেশি আতশবাজি পোড়াতেন যে, রাত্রিকালও প্রকাশ্য দিবালোকের রূপ ধারণ করত। সমসাময়িক উৎসগুলো থেকে জানা যায় যে, শের শাহের একজন বিখ্যাত সেনাপতি ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিল খানের সমর্থক খাস খান ফতেহপুর সিকরীর শেখ সলিম চিশতীর সঙ্গে শব-ই-বারাতের দিন সারারাত এবাদত বন্দেগি করেন। &#8216;বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে&#8217; এই উৎসব উদযাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলার নবাবগণ বিরাট জাঁকজমকের সঙ্গে &#8216;শব-ই-বারাত&#8217; উদ্যাপন করতেন। বাড়িঘর আলোকমালায় সজ্জিত করা হতো এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মসজিদে ও বাড়িতে সারারাত নামাজ অদোয় করতেন। ভোজানুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।”</p>
<p>রমজান নিয়ে বলেন, “উপবাস, সংযম, প্রার্থনা ও সামাজিক সম্মেলনের সময় হিসেবে সে যুগের মুসলমানগণ &#8216;রমজান&#8217; পালন করত। তারা রমজানকে পবিত্র ও মঙ্গলজনক মাসরূপে গণ্য করত এবং খুশির সঙ্গে একে স্বাগত জানাত। <strong>বাংলায় মুঘল সৈন্যদের রমজান পর্ব পালনের উল্লেখ করে মীর্জা নাথান বলেন, ‘রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষদিন পর্যন্ত ছোটবড় প্রত্যেকে প্রত্যহ তার বন্ধুর তাঁবুতে মিলিত হতো। এটা একটা স্বাভাবিক রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক দিন সকলে পর্যায়ক্রমে একজন অভিজাত বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাত।</strong> সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের দেওয়া ভোজের পালা ছিল। সকলে সেদিন তার তাঁবুতে সময় কাটায়’।”</p>
<p>ঈদুল ফিতরে নিয়ে মুসলিম বাংলার উৎসবমূখর আয়োজন নিয়ে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বইয়ে আছে, “সেই যুগে খুব আমোদ-স্ফূর্তির সঙ্গে ঈদের নতুন চাঁদকে স্বাগত জানানো হতো। মীর্জা নাথানের ভাষায় এটা বর্ণনা করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন,<strong> ‘দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠতো এবং গোলন্দাজ সেনাদলের সকল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ক্রমাগত তোপ দাগানো হতো। রাত্রির শেষভাগে, কামানের অগ্নি উদগীরণ শেষ হতো এবং এর পর শোনা যেতো ভারি কামানের আওয়াজ। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প’</strong>।”</p>
<p>“এথেকে বুঝা যায়, ঈদের আগমনে মুসলমানরা কতটা খুশি হতো। ঈদের দিনে সমস্ত মুসলমান আনন্দস্ফূর্তিতে মসগুল থাকত। স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রত্যেকে নতুন এবং উৎকৃষ্ট কাপড় পরিধান করত। চমৎকার পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানগণ প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথেপথে টাকা পয়সা ও উপহার দ্রব্য ছড়িয়ে দিত এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানগণ গরিবদেরকে ভিক্ষা দিত। &#8216;নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী&#8217; গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর বর্ণনায় এর উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন যে, নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা &#8216;ঈদগাহ&#8217; ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানগণ তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাতো। গোলাম হোসেন তাবাতাবাঈয়ের বর্ণনায় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের খুশি ও আনন্দস্ফূর্তির বিষয় প্রকাশ পেয়েছে।”</p>
<p>আর কুরবানীর ক্ষেত্রে, মুসলমানগণ ঈদুল আজহার প্রভাতে সুন্দর কাপড়-চোপড় পরিধান করে এবং &#8216;তাকবীর&#8217; উচ্চারণ করতে করতে ঈদগাহ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে গমন করতো। সেখানে জামাতে তারা নামাজ আদায় করে এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, পরস্পরকে আলিঙ্গন করতো ও সম্ভাষণ জানাতো। অতঃপর তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাদের সাধ্যানুসারে তারা কোনো পশু, যেমন, গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি করতো। তারা গরিব-দুঃখী, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে এবং গৃহে ভোজের অনুষ্ঠান করতো। প্রত্যেক গৃহ ভোজানুষ্ঠান ও আনন্দ &#8216;স্ফূর্তিতে মুখরিত হয়ে উঠতো এবং সকল গৃহে আদর আপ্যায়ন চলতো। শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হতো এবং এই মহান উৎসবে তারা সকলে একত্রে আনন্দ করতো। মীর্জা নাথান লিখেছেন যে, &#8220;নামাজান্তে খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে, লোকেরা তাকে কাপড়-চোপড় ও টাকাপয়সা উপহার দেয়। গরিব দুঃখীদের সাহায্যের জন্য তার সম্মুখে টাকাপসয়া ছড়িয়ে দেওয়া হতো। দুঃস্থ লোকদের অনেকে এর দ্বারা তাদের অভাব দূর করে সুখি হতো। এই দিনে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীগণ একে অন্যের জায়গায় গমন করতো এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানাতো।</p>
<p>এছাড়াও, বিয়ের অনুষ্ঠান হতো খুবই জাঁকজমকভাবে। হিন্দু-মুসলিম দুই জাতি তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী বিবাহের কাজ সম্পন্ন করতো। পোশাক-পরিচ্ছদেও শালীনতা বজায় থাকতো। এক্ষেত্রে মুসলিমরা হিন্দুদেরকে জোর করতো না। অতএব, মূল কথা হচ্ছে, বাংলায় অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সংস্কৃতিকে কখনই দূরে ঠেলে দেয়নি। স্থানীয় আয়োজনের ধরনের সাথে মুসলিমরাও নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো।</p>
<p><strong>০৩. খাদ্য</strong></p>
<p>ড. এম এ রহিম বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতি ইতিহাস বইয়ে এই অঞ্চলের মুসলিমদের খাদ্যের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,</p>
<blockquote><p>“মুসলমান সমাজের উচ্চশ্রেণী সম্পর্কে আলোচনায় খাদ্যদ্রব্য ও পোশাক-পরিচ্ছদে তাদের বিলাসিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সিবাস্তিয়ান মানরিক এবং চীনা দূতগণের বর্ণনা থেকে মুসলমানদের খাদ্য সম্বন্ধে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। তাদের খাবার টেবিলে মুরগী, ভেড়া, গরু প্রভৃতির মাংসের তৈরি বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য পরিবেশন করা হতো। অনেক রকমের মিষ্টি ও ফলমূল খাদ্য-তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। শসা, লেবু, মুলা, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদির তৈরি নানা জাতীয় আচার ছিল মুসলমানদের খাদ্যের বিশিষ্ট অঙ্গ।”</p></blockquote>
<p>“সিবাসতিয়ান মানরিক বলেন, এগুলো ক্ষুধা বৃদ্ধি করত এবং আবার খাবারের দিকে আকৃষ্ট করতো। হিন্দুরা এ ধরনের উপাদেয় খাদ্য প্রস্তুত করতে এবং ক্ষুধা উদ্রেকের জন্য আচারের ব্যবহার জানত না। হিন্দুদের ভোজ ও সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের বর্ণনায় কোথাও আচারের কোনো উল্লেখ দেখা যায় না।বাংলা সাহিত্যে খাদ্য সম্বন্ধে বহু উল্লেখ আছে। জানা যায় যে, বাংলার মুসলমানরা মুরগী, মেষমাংস ও অন্যান্য মাংসের উপাচার পছন্দ করতো।”</p>
<p>“বাঙ্গালি মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে রুটিরও উল্লেখ আছে। তাছাড়া মাছ ও শাক-সবজি লোকের সাধারণ খাদ্য ছিল। বাংলার নদ-নদী ও জলাশয়ে নানা জাতীয় মৎস্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। এর মাটিতে জন্মাত বিভিন্ন প্রকারের শাক-সবজি। তাতে করে, এমনকি, মুসলমানদের মধ্যে সাধারণ লোকেরা ও তাদের খাবারের জন্য রকমারি মাছ, শাক-সবজির তরকারি প্রস্তুত করতে পারতো।”</p>
<p>“খিচুড়ি (সাধারণত ঘি বা তেলের সঙ্গে চাল ও লঙ্কা দিয়ে প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য) ছিল লোকের প্রিয় খাদ্য। এমনকি, উচ্চশ্রেণীর লোকদেরও খিচুড়ির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বার্ণিয়ারের মতে, খিচুড়ি সম্রাট শাহজাহানের খুবই প্রিয় ছিল। ইউসুফ আলীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নবাব আলিবর্দী খান ও তাঁর আমির ওমরাহ প্রায়ই তৃপ্তির সহিত খিচুড়ি খেতেন।”</p>
<p>“নানা প্রকার মাংসের উপাচার ও নানা রকমের আচার মুসলমানদের খাদ্যের, বিশেষ করে, উৎসব অনুষ্ঠানে খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। উৎসবাদিতে, যেমন বিবাহ ইত্যাদি উপলক্ষে হিন্দুরা সাধারণত মাছ, শাক-সবজি ও মিষ্টান্ন তৈরি করত। হিন্দুদের ভোজে মিষ্টান্ন ও দধি ছিল খাদ্য তালিকার একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। &#8216;মনসামঙ্গল&#8217; কাব্যগুলোতে লক্ষ্মীন্দরের বিয়ের ভোজের বর্ণনা থেকে উৎসবাদি উপলক্ষে হিন্দুদের খাবার সম্বন্ধে আভাস পাওয়া যায়। সিবাসতিয়ান মানরিক ও চীনা দূতদের বর্ণনানুসারে, মুসলমানদের খাদ্য তালিকার সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে।”</p>
<p>বাংলায় মুসলিম শাসনামলে যেসব খাবার আবিষ্কার, প্রচলন বা বিশেষ রূপে বিকশিত হয়েছে—তার সংখ্যা অনেক। তুর্কি, আফগান, আরব, পারসিক, মুঘল ও মধ্য এশীয় রন্ধনশৈলীর প্রভাবে উপমহাদেশের খাবারে এক বিশাল পরিবর্তন আসে।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের আনিত বা উন্নত করা খাবারের মধ্যে রয়েছে,</p>
<ul>
<li>১. বিরিয়ানি (ঢাকাই/কাচ্চি)। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির মূল শিকড় মুঘল রন্ধনশৈলীতে। মুসলিম নবাবরা বিশেষভাবে এটিকে জনপ্রিয় করেন।</li>
<li>২. কাবাবের বিভিন্ন ধরন। যেমন- সিক কাবাব, বটি কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামী কাবাব, রেশমি কাবাব; এসবই তুর্কি–পারসিক উৎস থেকে এসে বাংলায় জনপ্রিয় হয়।</li>
<li>৩. নেহারি। মূলত দিল্লি–লখনউ থেকে বাংলায় আসে এবং মুসলিম শাসনকালে নবাবদের টেবিলের খাবার হিসেবে পরিবেশিত হতো।</li>
<li>৪. মোরগ পোলাও/চাপলি পোলাও। মুঘল দরবারে পোলাওয়ের বিভিন্ন রূপ ছিল। এর বাংলা রূপ হলো মোরগ পোলাও</li>
<li>৫. হালিম। আরব/পারস্যে এর উদ্ভব হয়েছে। মুসলিম শাসনকালেই বাংলায় বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে।</li>
<li>৬. কোরমা/কোর্মা। পারসিক &#8220;কুরমাহ&#8221; থেকে এসেছে। মুসলিম শাসকরা এর দুধ-বাদাম-ঘৃতসমৃদ্ধ বিলাসী রূপ প্রতিষ্ঠা করেন।</li>
<li>৭. রোস্ট (বাংলা মুসলিম স্টাইলে)। নবাবি-আওয়াধি রান্নার প্রভাবে বাংলায় রোস্টের নিজস্ব রূপ তৈরি হয়।</li>
<li>৮. শাহী টুকরা/শাহী টোস্ট। পারসিক ‘শিরমাল–ডেজার্ট’ থেকে রূপান্তরিত। এটি ছিলো মুসলিম নবাবদের প্রিয় মিষ্টি।</li>
<li>৯. ফিরনি। আরব–পারসিক দুধ-চালভিত্তিক ডেজার্ট থেকে এই অঞ্চলে অভিযোজিত।</li>
<li>১০. সেমাই/শিরখুরমা। আরবীয় সেমোলিনা ডেজার্টের মতো করে তৈরি হতো; মুসলিম শাসনামল থেকেই ঈদের প্রধান খাবার হিসেবে পরিচিত।</li>
<li>১১. বাকরখানি। ঢাকায় নবাব বংশের আমলে এটি তৈরি হয়।কাশ্মীর-লখনৌ-এর নান-বাইদের হাত ধরে পরিচিতি লাভ করে।</li>
</ul>
<p>অর্থাৎ, ইসলাম উন্নত সাংস্কৃতিক উপাদান গ্রহণ করেছে। বাংলায় বা ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো জিনিস না থাকলেও পারস্যে থাকলে, যদি তা ইসলামী নীতির বিরোধী না হয়, তবে সেটি এখানেও গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জীবনমান ও সাংস্কৃতিক মান উন্নত করা।</p>
<p><strong>মোদ্দাকথা হচ্ছে, স্থানীয় খাবার সংস্কৃতির পুরোটাই যেমন ইসলামী সভ্যতায় জারি ছিলো, তেমনি অন্যান্য অঞ্চলের স্থানীয় খাবারও এখানে এসে পরিচিত হয়ে ইসলামী সভ্যতায় খাদ্য সংস্কৃতিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তবে এখানে বলাই বাহুল্য যে, হারাম খাবারের বিষয়গুলো তো অবশ্যই পরিত্যাজ্য।</strong></p>
<p><strong>০৪. সংগীত</strong></p>
<p>মুসলিম শাসনামলে বাংলা সংগীত তিনটি দিক থেকে পরিবর্তিত হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(ক) মধ্য এশীয়–পারসিক সুরের প্রভাব।</strong><br />
এর ফলে তুর্কি, পারসিক, আরবীয় সুর ও রাগ-রাগিনীর ধরণ বাংলায় প্রচলিত হতে থাকে। পারসিক মাহফিল, দরবারি সংগীত, সুফি সঙ্গীত—এসব বাংলায় নতুন রূপে গড়ে ওঠে।</li>
<li><strong>(খ) কবিতা–গান–দর্শনের সংমিশ্রণ।</strong><br />
মুসলিম শাসকেরা কবিতা, সঙ্গীত, মুশায়েরা, কীর্তন-সদৃশ কণ্ঠসঙ্গীতকে উৎসাহ দিতেন। ফলে বাংলা কবিগান, মুর্শিদী, মারফতি, বাউলধারা—এসব এক নতুন বিকাশ লাভ করে।</li>
<li><strong>(গ) সুফি সঙ্গীতের আগমন।</strong><br />
দরবেশ–সুফিদের মাধ্যমে কাসিদা, হামদ, নাত, গওয়ালিবর্ণী জিকির, এমনকি চিশতি ও সুফি দরবারের সঙ্গীতধারা বাংলায় প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলার ফোক গানের অর্ধেক সুফি-মুসলিম প্রভাবে গড়া—এটা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য। কাজী নজরুল ইসলাম, দুলাল শাহ, মজনু শাহ, কুতুবুদ্দিন, আউল শাহ—এরা কবিগান, পালাগান, মারফতি গানকে চালিত করেছেন।</li>
</ul>
<p>এরপর, মুসলমানদের সমাজে সংগীতের গুরুত্বের কারণে সংগীতপ্রীতি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) রাজদরবার ও নবাবি দরবারে সংগীত।</strong><br />
এটি ছিলো বাংলার সুলতান, মুঘল সুবেদার, নবাবদের দরবারে সংগীত ছিল রাজকীয় বিনোদনের অংশ। তারা দাদরা, ঠুমরি, গজল, কাওয়ালী, দরবারি রাগ, কিরানা, রাম্পুর–সাহাসওয়ান ঘরানা-কে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারেও সঙ্গীতজ্ঞদের বিশেষ মর্যাদা ছিল।</li>
<li><strong>(২) সুফি-দরবেশদের সমাজে সংগীত।</strong><br />
এসব সংগীত ছিল আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ। চিশতিয়া, কাদেরিয়া, সুফি দরবেশরা সংগীতকে মানুষের অন্তর জাগ্রত করার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। সুফিদের অবদানে বাংলায় মারফতি গান, মুর্শিদী গান, নবী-বন্দনা, কাওয়ালী ও ধর্মীয় জিকিরের সুরধারা ধারাগুলো বিকশিত হয়। বাংলায় মুসলমানদের বৃহৎ একটি অংশ এই গানগুলোকে ধর্মীয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করতো।</li>
</ul>
<p>বাদ্যযন্ত্রে মুসলমানদের অবদান নিয়ে বলতে গেলে তাদের কয়েকটি অবদানের কথা সামনে রাখতে হয়। যথা,</p>
<ul>
<li><strong>(১) নতুন বাদ্যযন্ত্র উপহার বা প্রচলন।</strong><br />
শুরুতেই আসবে তবলার কথা। তবলা আজ সারা ভারত–বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র। ইতিহাস অনুযায়ী এটি মধ্য এশীয় মুসলিম বাদ্যযন্ত্র “তব্বল” থেকে এসেছে। তবলার পেছনে আমীর খসরু (১৩শ শতক)–এর অবদান সবচেয়ে আলোচিত। এরপর আসবে সর্মিন্দল বা সেতার। সেতার শব্দটি “সেহ-তার” (পারসিক: তিন তার) থেকে এসেছে। মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞদের হাত ধরেই এই যন্ত্রটি ভারতীয় রূপ পায়। তৃতীয়ত, রুদ, তানপুরা বা রুবাব। মধ্য এশীয় মুসলিম সুরে ব্যবহৃত এই যন্ত্রগুলি বাংলা-মুসলিম দরবারে জনপ্রিয় হয়।</li>
<li><strong>(২) বিদ্যমান যন্ত্রের উন্নয়ন।</strong><br />
মুঘল দরবারের উস্তাদরা সরোদ, সারেঙ্গি, তানপুরা—এসবকে পরিশীলিত করে তোলেন। তারের সংখ্যা বৃদ্ধি, টোনের গাম্ভীর্য, মৃদু সুরের পরিশুদ্ধতা—এসব উন্নয়ন মুসলিম উস্তাদদের অবদান।</li>
<li><strong>(৩) যন্ত্রসঙ্গীতে নতুন ঘরানা তৈরি।</strong><br />
মুসলিম উস্তাদরা নতুন নতুন, যেমন- গয়তরী (গায়েকী) আঙ্গ, মীন্ড-যুক্ত বাদন, মুঘলাই আলাপ, দরবারি স্টাইল ইত্যাদি বাদন-শৈলী সৃষ্টি করেন। এই শৈলীগুলোই পরবর্তীতে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মূল ভিত্তিতে স্থান পায়। আবার, দরবারি সঙ্গীতের ঘরানায় বাংলায় মুসলমান সঙ্গীতশিল্পীরা পাটিয়ালা ঘরানা ও রাম্পুর-সাহাসওয়ান ঘরানা তৈরি করেন। বিশনপুর ঘরানাতে মুসলিম উস্তাদদের প্রভাব ছিল বিশাল। এগুলোই পরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে স্থায়ী কাঠামো দেয়।</li>
<li><strong>(৪) রাগ-রাগিনীর নতুনত্ব আনয়ন।</strong><br />
বাংলায় মুসলমানরা মালকোষ, ইয়ামন, দারবারি কানাড়া, কৌশিকি, মালহার, তোড়ি ইত্যাদি রাগ উন্নত করে তোলেন। এসব রাগ মধ্য এশীয় প্রভাবে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় হয়।</li>
</ul>
<p>ইসলামী সংস্কৃতির সাথে যেহেতু সুফী ঘরানাটা বেশ ভালোভাবে জড়িত, তাই এটা নিয়ে দুয়েকটা কথা বলা প্রয়োজন। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় সুফি সাধক, দরবেশ, ফকিরদের মাধ্যমে যে সংগীতধারা গড়ে ওঠে, তাকেই সাধারণত বাংলার সুফি সঙ্গীত বলা যায়। এই সঙ্গীত মূলত পারসিক–আরবি আধ্যাত্মিক কবিতা, ইসলামি দর্শন, এবং বাংলার লোকজ সুরের এক অসাধারণ মিশ্রণ। ইশকে-মাজাজি, ইশকে-হাকিকি, নফসের পরিশুদ্ধি, মানবতার ধর্ম ইত্যাদি এসব গানের মূল প্রাণ।</p>
<p>শাহ জালাল ইয়েমেনী, শাহ নেসার বাহাদুর, শিকার সুলতান, দাতা কর্নি—এদের মতো বহু সুফি বাংলায় সুফি সঙ্গীত নিয়ে আসেন। তাঁরা জিকির, কাওয়ালী, হামদ-নাত, ফারসি মর্শিয়া, রব্বানি কবিতা–এসব সুরধারা সামনে আনেন। এরপর সময়ে সময়ে বাংলার লোকগানের সাথে সুফি দর্শনের মেলবন্ধন ঘটে। গ্রামবাংলার পালাগান, বাউল সুর, ঢোল-একতারা—এসবের সঙ্গে সুফিরা তাওহিদ, ইশক, নফস, পরকাল মুর্শিদ–ভক্তি মিশিয়ে দেন। ফলে তৈরি হয় বাংলার নিজস্ব সুফি লোকসঙ্গীত।</p>
<p>মুর্শিদী গানে সাধারণত মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা, মানবতার শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি—এসব বলা হয়। এসব গানের ক্ষেত্রে গাজী আব্দুল করিম, আব্দুল লতিফ ও হাছন রাজার নাম উল্লেখযোগ্য। মারফতি গানের ভেতরে রুহানি ইশক, আত্মজিজ্ঞাসা, দেহতত্ত্ব, নফস ও কল্পনার যুদ্ধ, মানবিকতার দীক্ষা ইত্যাদি থাকে। কেননা, এখানে ‘মারফত’-এর অর্থ পরিচয়—অন্তরের আল্লাহকে চিনে নেওয়া। এরপর সুফি প্রভাবিত বাউল সংগীত ও সুরে আরবি–ফারসি শব্দ ও  ধর্মীয় রূপক স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এছাড়াও, হামদ, নাত, কাওয়ালী তো আছেই। বাংলায় কাওয়ালী ভারতের মতো বিশাল নয়। সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদী এবং চিশতি দরবেশরা কাওয়াল দল নিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। ঢাকায় মুঘল যুগে কাওয়ালদের মর্যাদা ছিল।</p>
<p><strong>০৫. মুসলিম বাংলার সংস্কৃতিতে নারীদের অবস্থা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতায় মুসলমানগণ তাদের মেয়েদের ব্যাপারে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে এবং তা স্বীকারও করে। <strong>বালিকারা যাতে করে তাদের ধর্মের মূলনীতি, কোরআন পাঠ ও ধর্মের ক্রিয়া-কর্ম সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সেজন্যে পিতারা তাদের কন্যাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন। বালিকাদেরও বালকদের মতো &#8216;বিসমিল্লাহখানি&#8217; অনুষ্ঠান দ্বারা অক্ষর-পরিচয় শুরু হতো এবং তারা একই মক্তবে বালকদের সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করতো।</strong></p>
<p>গদাই মল্লিকের পুথি বা <strong>&#8216;মল্লিকার হাজার সওয়াল&#8217;</strong> (মল্লিকার হাজার প্রশ্ন) নামে অভিহিত কাব্য থেকে জানা যায় যে, মল্লিকা নাম্নী মুসলমান বালিকা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, যে পুরুষ তাকে সাহিত্য-বিষয়ক বিতর্কে পরাজিত করতে পারবে, তাকেই বিয়ে করবেন। বহু রাজপুত্র ও বিদ্বান ব্যক্তি তার সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হন, কিন্তু সকলেই মল্লিকার নিকট পরাজয় বরণ করেন। অবশেষে জনৈক সুফি পণ্ডিত আবদুল হাকিম গদা তার হাজার প্রশ্নের উত্তরদান করে তাকে বিতর্কে পরাজিত করেন। অতঃপর মল্লিকা তাঁর বিজয়ীকে বিয়ে করেন।</p>
<p>ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমান রমণীগণ যুদ্ধক্ষেত্রেও স্বামীদের সহগমন করেছেন। এই উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাসে মুসলমান রমণীদের এরূপ বীরত্বব্যঞ্জক কার্যক্রম মোটেই বিরল কিছু ছিলো না। বাংলার মুসলমান শাসনামলে বহু রমণী ছিলেন যারা তাদের সাহস, শক্তি ও বীরত্বের জন্যে খ্যাতি লাভ করেন।</p>
<p>নবাব অলীবর্দী খানের বেগম শরফুন্নেসা ছিলেন একজন উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্না ও গুণান্বিতা মহিলা। তিনি তার গুণের মহিমায় সে যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি স্বামীর যুদ্ধাভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের কঠোরতা ভোগ করেন। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তিনি তার স্বামীর একজন মূল্যবান উপদেষ্টা ছিলেন।</p>
<p>নবাব আলিবর্দীর কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌলাহর মাতা আমিনা বেগম তার সুরুচি ও শিষ্টাচারের গুণে সে যুগের সমাজজীবনের উপর গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়া মহিলা এবং অনাথ ও গরিব-দুঃখীদের আশ্রয়স্থল। কোমল হৃদয়া আমিনা বেগম অন্যায়কারীর প্রতিও কোনোরূপ কঠোরতা সহ্য করতে পারতেন না। ইংরেজদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সিরাজদ্দৌলাহ্ আলিবর্দীর পীড়িত অবস্থায় প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করেন। সে সময় তিনি রাজস্বের হিসাবে বহু অনিয়ম এবং জাহাঙ্গীরনগরে ঘষেটি বেগমের দিউয়ান রাজা রাজবল্লভ কর্তৃক বিপুল অর্থ আত্মসাতের তথ্য আবিষ্কার করেন। রাজা রাজবল্লভ সঠিক হিসাব না দেওয়ায় এবং তসরূপকৃত অর্থ রাজকোষে প্রত্যর্পণ না করায়, সিরাজদ্দৌলাহ্ তাকে মুর্শিদাবাদে কঠোর পাহারায় আবদ্ধ করে রাখেন। আমিনা বেগম পুত্রের নিকট তার পক্ষে মধ্যস্থতা করেন। মায়ের আদেশ রক্ষার্থে সিরাজদ্দৌলাহ্ রাজবল্লভকে মুক্ত করে দেন।</p>
<p>সিরাজদ্দৌলাহর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ছিলেন রমণীদের আদর্শ। কিভাবে সামান্য মর্যাদার একজন নারী স্বীয় গুণাবলীর বলে মুসলমান সমাজে খুব সম্মানিত মর্যাদায় আরোহণ করতে পারেন, তা তার জীবনে প্রতিভাত হয়েছে। সামান্য পরিচারিকার অবস্থা থেকে লুৎফুন্নেসা একজন যুবরাজের সহধর্মিণী এবং নবাবের বেগমের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়া ও উচ্চ অন্তঃকরণ সম্পন্না মহিলা।</p>
<p><strong>এছাড়াও, দারাশিকোর কন্যা ও যুবরাজ মুহম্মদ আজমের স্ত্রী জাহানজেব বানু বেগম মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। গউস খানের বিধবা স্ত্রী একদল মারাঠা লুণ্ঠনকারীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে ভাগলপুরে তার গৃহ রক্ষা করেন। আহমদনগরের চাঁদসুলতানার বীরত্বগাঁথা সুবিদিত। মহব্বত খাঁর বিরুদ্ধে নূরজাহানের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইতিহাসের একটি সুপরিচিত ঘটনা। এর বাইরে মহিলারা বিবাহ অনুষ্ঠানাদি ও শোভাযাত্রায়ও যেতেন।</strong></p>
<p><strong>এ-সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীরা গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না। তারা গৃহের বাইরেও যেতে পারতেন। কিন্তু তাদের পর্দা পালন করতে হতো এবং গৃহের বাইরে চলতে অবগুণ্ঠন ব্যবহার করতে হতো।</strong> পর্দান্তরালে বসবাস করলেও মুসলমান রমণীরা সমাজে যথেষ্ট সম্মানের অধিকারিণী ছিলেন। মুগল সমাজের রমণীগণ, তাদের পূর্ববর্তী ভগ্নীদের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।</p>
<p>মূলত, মুসলিম বাংলায় এভাবেই নারীগণ তাদের শিক্ষা, সাহিত্য চর্চা, পৈত্রিক সম্পত্তি ও রাজনীতির অধিকার পেয়েছিলো। অতএব, উপরোক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, মুসলমান শাসনযুগে বাংলার রমণীরা হারেমে সাধারণ পর্দা প্রথার মধ্যে থেকেও এবং পুরুষদের উপর নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও তারা এই প্রদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।</p>
<p><strong>০৬. হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি</strong></p>
<p>ইসলামী মূল্যবোধ ঠিক রেখেও যে ইসলামী সভ্যতা স্থানীয়দের স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলো, তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এক্ষেত্রে প্রাক-মুসলিম সময় ও মুসলিম সময়ের মাঝে তুলনা করা প্রয়োজন।</p>
<p>প্রাক মুসলিম ভারতীয় সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলো খুবই ভয়ংকর। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ৮ম শতাব্দীতে হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এ’চার শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজে নিম্ন শ্রেণির লোকদের বিশেষ করে শূদ্রদের দুরাবস্থার কোনো সীমা ছিলো না। শূদ্ররা সমাজে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হতো। এমন কি ধর্ম-কর্ম পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। <strong>ঐতিহাসিক আল বেরুনী তার &#8220;কিতাবুল হিন্দ&#8221; নামক গ্রন্থে বলেন যে,</strong></p>
<blockquote><p>❝কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ-গীতা পাঠ করলে, এমনকি বেদবাক্য শুনলেও শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা কেটে দেওয়া হতো। ভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে অন্তঃবিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি শূদ্রদের স্পর্শও অপবিত্র ছিলো। সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিলো। জাতিচ্যুতদের ভাগ্য আরও খারাপ ছিলো। বেদ শ্রবণ করলে কর্ণে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়া হতো।❞</p></blockquote>
<p>প্রাক মুসলিম আমলে এই ছিলো সমগ্র ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের নমুনা। বিপরীতে মুসলিম বাংলায় ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলিম শাসকরা উদার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। মুসলিম শাসনামলে ভারতের হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। তাদেরকে দেওয়া হয় ধর্মীয় স্বাধীনতা। ফলে, এই অঞ্চলের অমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারতো। বখতিয়ার খিলজির সেই অভিযানের পর এই অঞ্চলের প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতির উপর ইসলামের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই খাদ্য, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সামাজিক রীতি-নীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে।</p>
<p>হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এস. এ. এ. রিজভী বলেন যে, <strong>❝ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক স্থাপনে অনেক সুযোগ-সুবিধাকে উন্মোচিত করেছিলো।❞</strong><br />
রোমিলা থাপার মতে, <strong>❝ব্রাহ্মণরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হলেও হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্রোত ক্রমশ গতিশীল হয়ে ওঠে।❞</strong></p>
<p>অতএব, বুঝা গেলো যে, মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো। আবার, সরকারি চাকরি করবার সুবাদে কিংবা মুসলমান শাসনকর্তাদের সভাসদ ও রাজকর্মচারী হিসেবে অথবা মুসলিম জনগণের প্রতিবেশী রূপে হিন্দুরা মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে। যার ফলে তারা মুসলমানদের মহৎ আদর্শ সংস্কৃতি এবং শিষ্টাচার ও জীবন পদ্ধতি দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবান্বিত হয়। পাশাপাশি, মুসলিম শাসক ও সুলতানদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।</p>
<p>এজন্যই, সাধারণ হিন্দুদের উপর ইসলাম ধর্ম দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অথচ, সাধারণ হিন্দুদের কোনো মর্যাদাই ছিলো না। সমাজে উচ্চ ধর্মের হিন্দুর সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুর মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিলো। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থও পাঠ করতে পারতো না। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরা শিক্ষা অর্জন করতো। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকরা উদারনৈতিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব হয়। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাও শিক্ষা অর্জন করেন। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ঘটে। তারা সংস্কৃতের পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিক্ষা অর্জন করে উচ্চ রাজ কার্যে নিয়োজিত হয়ে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ লাভ করে।</p>
<p>অন্যদিকে, হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের পরেই ছিলো কায়স্থদের স্থান। মুসলমানদের দ্বারা তারাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা শিল্প ও সাহিত্যে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেয়। মুসলিম শাসকরা উদারভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এসব বিখ্যাত কবিদের মধ্যে ছিলেন-মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কবিন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, যশোরাজ খান, বিজয় গুপ্ত, কৃষ্ণ দাস কবিরাজ। মুসলিম শাসনামলে কায়স্থরা জমিদারি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করে। মুসলিম শাসক কর্তৃক এসব কায়স্থরাই পরবর্তীতে রায়, চৌধুরী, মজুমদার, অধিকারী উপাধী লাভ করে। এটি পরবর্তীকালে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে এবং আরো পরবর্তীতে গিয়ে দেখা যায় যে, এসব পদবী মানুষের নামের সাথেও যুক্ত হয়ে যায়।</p>
<p>আবার, বাংলার সুলতানরা ছিলেন উদার সংস্কৃতিমনা। তারা হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব মধ্যযুগে বাংলা হিন্দু মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আরেকটি কারণ। মূলত, এসব কারণেই যুগ যুগ ধরে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রীতি্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>এসবের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় ছিলো। এটা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, যেখানে ধর্মীয় সহাবস্থান থাকে, সেখানেই অবশ্যই প্রশাসনিক সহাবস্থানও থাকবে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলমান আমলে হিন্দু শাসক ও সেনাপতি নিয়োগ।</p>
<p><strong>বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মুসলমান শাসকগণ স্থানীয় হিন্দুদের শাসনকার্যে সংম্পৃক্ত করেন। শাসনকার্যে সুযোগ পেয়ে এসব হিন্দুরা যথেষ্ট যোগ্যতার ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। মুসলিম সুলতানগণ প্রতিভাবান হিন্দুদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাষ্ট্রীয় উপাধী এবং সরকারি জমি দান করেন।</strong> হিন্দুরা খুবই বিশ্বস্ততার সাথে মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করে। বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন বাংলার হিন্দুরা বাংলার সুলতানের হয়ে যুদ্ধ করেছিলো। হিন্দু সেনাপতি সহদেব এ-যুদ্ধে যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। নবাবী আমলে আমরা দেখি যে, পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজের সেনাপতি মীর মর্দন ও মোহনলাল দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করে।</p>
<p>শুধু এতোটুকুই নয়, মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হিন্দু জমিদার শ্রেণীরও উৎপত্তি হয়। দুর্গাচন্দ্র সান্যাল তার বিখ্যাত গ্রন্থ &#8220;বাঙালার সামাজিক ইতিহাসে&#8221; লিখেন যে, ইলিয়াস শাহী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী জেলায় বিখ্যাত &#8216;সান্যাল&#8217; এবং &#8220;ভাদুড়ী পরিবারের&#8221; উৎপত্তি হয়। সুলতান গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহের রাজত্বকালে ভাতুড়িয়ার জমিদার কংস (রাজা গণেশ) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।</p>
<p>আবার, এর বিপরীতে হিন্দু রাজা ও জমিদারদের অধীনে মুসলিম কর্মচারীও নিয়োগ হয়। মুসলিমদের শাসকদের মতো হিন্দু সামন্ত রাজা ও জমিদাররাও তাদের শাসনকার্যে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন। মীর্জা নাথানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভুলুয়ার (নোয়াখালি) হিন্দু জমিদার অনন্তমানিক্য মীর্জা ইউসুফ নামক এক ব্যক্তিকে উজির পদে নিয়োগ দেন। এছাড়াও, চাঁদ রায় ও কেদার রায় সোলায়মান লোহানী নামে এক মুসলিমকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা এবং &#8220;কালাপাহাড়&#8221; নামে খ্যাত শ্রীহরি ছিলো দাউদ খান কররানীর অন্যতম উপদেষ্টা ও সেনাপতি।</p>
<p>অতএব, এটাও সত্য যে, ধর্মীয় সহাবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় ছিলো। যেহেতু তৎকালীন ইতিহাসই এসব সাক্ষ্য দেয়, তাই এটা পুরোপুরি সঠিক যে, স্থানীয় সমাজ, মানুষ ও সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করেছে বিধায়ই ইসলামী সভ্যতা আজও মানুষের মনে স্থান দখল করে রয়েছে; এবং এটাও প্রমাণ হয়ে যায় যে, ইসলামী সভ্যতা প্রকৃত অর্থেই বিশ্বজনীনতাকে গ্রহণ করে থাকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>জাতিসত্তা ও ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া</strong></h5>
<p>সবশেষে, আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তিতে ইসলামী সংস্কৃতির বোঝাপড়া কেমন হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। আমাদের ঐক্য ও সম্প্রীতির সমাজ গড়তে হলে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ন্যায়, পারিবারিক ঐক্য, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p><strong>ইসলামী সংস্কৃতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা জাতিসত্তার ভেতরের মানবিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলে যাবে। আমরা বাঙালি মুসলমানদের ইসলামী সংস্কৃতির যে বোঝাপড়া গড়ে তুলতে চাই, তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান।</strong></p>
<p>এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও উপজাতির মানুষ একসাথে বসবাস করছে। তাই আমাদের উচিত, সবার প্রতি সমান দৃষ্টিতে তাকানো, সবার অধিকার ও মানুষ হিসেবে মর্যাদা স্বীকার করা। একই সঙ্গে আমাদের আহ্বান থাকবে; আমরা যারা বাঙালি মুসলমান, আমরা যেন নিজেদেরও মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে কল্পনা করি। প্রত্যেকে নিজের আঞ্চলিক পরিচয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করবে এবং নিজের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বজায় রাখবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5><strong>সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের দায়িত্ব</strong></h5>
<p>মুসলমানদের সভ্যতার ইতিহাসে একসময় যে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সামাজিক নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা গড়ে উঠেছিল, সেগুলোকে আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনা দরকার। আমাদের দায়িত্ব হবে এই মূল্যবোধগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, সমাজে তুলে ধরা ও এর চর্চা অব্যাহত রাখা।</p>
<p>বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় কলকাতা-কেন্দ্রিক যে বয়ান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা যেন আমাদের হীনমন্য, আত্মবিশ্বাসহীন বা পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত না করে।<br />
কথিত ন্যাশনালিস্ট ইসলাম, সেকুলার ইসলাম বা লিবারেল ইসলাম; এসব নামে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আত্মঘাতী চিন্তা। এর পরিবর্তে আমাদের গড়ে তুলতে হবে মূলনীতিনির্ভর একটি নতুন বয়ান, যা ইসলামের উসূল ও মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াবে।</p>
<p>আরব, আফ্রিকা, তুরস্ক বা ভারতের সংস্কৃতি এক নয়, কিন্তু তারা সবাই ইসলামের স্থায়ী নীতির মধ্যে থেকেই টিকে আছে। তাই আমাদেরও প্রয়োজন, ইসলামী মূলনীতিগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির একটি ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া তৈরি করা। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সেই ভারসাম্যের ভিত্তিতেই চালিয়ে যেতে হবে।</p>
<p>এর বাইরে গেলে বিচ্ছেদ তৈরি হবে, যেমনটি আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ব্রিটিশ আমলের পর থেকে আমাদের সংস্কৃতিতে এক ধরনের আত্মবিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে। আমরা অন্যদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিনোদন, স্থাপত্য, শহর পরিকল্পনা, এমনকি মসজিদের ডিজাইন পর্যন্ত নকল করছি। এগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।</p>
<p>তবে একে পুরোপুরি বর্জন করাও অবাস্তব। কারণ, বিশ্ব পরিবর্তনের ঢেউকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই পাশ্চাত্যের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে, একই সঙ্গে আমাদের অঞ্চলের ভালো দিকগুলোও সংযোজন করতে হবে।</p>
<p>অর্থাৎ, ইসলামের স্থায়ী মূলনীতি বুঝে, পাশ্চাত্যের তৈরি দুনিয়াকে বুঝে, আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বয়ানই হতে হবে আমাদের পথনির্দেশ। এর বিপরীতে কোনো বিশৃঙ্খল, পক্ষপাতদুষ্ট বা বিভাজনমূলক বয়ান তৈরি করা যাবে না, যা অন্য কোনো গোষ্ঠীর শিকড় কেটে দেয়।</p>
<p>বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি কখনোই পুরনো সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ হবে না, আবার আধুনিকতার নামে মূল থেকে বিচ্ছিন্নও হবে না। ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, সামাজিক বাস্তবতার আলোকে, আমাদের সাংস্কৃতিক এজেন্ডা ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে।<br />
এর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বেড়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।</p>
<p>আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বিশ্ব কাঠামো, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, শিকড়, ইসলামের উসুল ও পদ্ধতিগত বোঝাপড়ার সমন্বয়ে। এই সবকিছু বুঝে ও ধারণ করেই আমাদের কাজ করতে হবে। এটাই হোক বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির প্রথম ধাপ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/understanding-islamic-culture-in-bengal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16417</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা; প্রেক্ষিতে ইসলামী সভ্যতা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 20 Sep 2025 14:31:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16160</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও খাদ্য : ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি রচিত হওয়ার পর তৎকালীন দুনিয়ায় যে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, আল্লাহর রাসূল (স.) তার বিপরীতে নতুন এক ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন। অর্থনৈতির মূলনীতিকে গোটা জাতির সামনে তুলে ধরেন এবং তা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h5>ইসলামী সভ্যতায় কৃষি ও খাদ্য :</h5>
<p>ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি রচিত হওয়ার পর তৎকালীন দুনিয়ায় যে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, আল্লাহর রাসূল (স.) তার বিপরীতে নতুন এক ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন। অর্থনৈতির মূলনীতিকে গোটা জাতির সামনে তুলে ধরেন এবং তা বাস্তবায়নে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় একাধিক মূলনীতি বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহাবিগণ এ ধারা অব্যাহত রাখেন। ফলস্বরূপ তৎকালীন সমাজের দারিদ্র্যতা, অর্থনৈতিক সংকট দূরীভূত হয়ে এমন একটি সভ্যতার সূচনা হয়, যেখানে দারিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, বেকারত্বের মত সমস্যাগুলো ছিল অনুপস্থিত। যার দৃষ্টান্ত আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই। রাসূল (স.) এবং আবু বকর (রা.) এর যামানা পার হয়ে উমর (রা.) এর শাসনামলের শেষ দিকে আরবের সাড়ে ৩৮ লক্ষ বর্গমাইল অঞ্চলে যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না!</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার সময়কালে অর্থনীতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে মুফাসসিরগণ, ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানীগণ স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। কারণ, কোরআন-হাদীসসহ ইসলামী শাস্ত্রগুলোতে আলেমগণ এ বিষয়ে বেশ গুরুত্বারোপ করেছেন। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ</p>
<p>“সমৃদ্ধির জন্য কৃষিকাজ আবশ্যক। ইসলামী রাষ্ট্রে খাদ্যের পর্যাপ্ততা অর্জনের আগ পর্যন্ত চাষাবাদ, রোপণ, ও জমি আবাদের কাজ অবিরাম চালিয়ে যেতে হবে।”</p>
<p>খাদ্যের সমৃদ্ধি যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা উপোরোক্ত উক্তিতেই বুঝা যায়। ইমাম কুরতুবী একে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ, জনগণের সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সত্যিকারের স্থায়ী উন্নয়ন, সুস্থ সবল জাতি, সর্বোপরি আখলাকসম্পন্ন শক্তিশালী উম্মাহ গঠনে কৃষি ও খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।</p>
<p>খোলাফায়ে রাশেদার আমল থেকে শুরু করে প্রত্যেক যুগেই কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেমনঃ হযরত উমর (রা.) অর্থনীতিতে বৈপ্ল­বিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের জন্য তিনি যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষি। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর পরই কৃষকদের সাথে বৈঠক করেন। কৃষি সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সমস্যা, খাদ্য উৎপাদনের দিকে জোর দেয়া, খাদ্য সংকট মোকাবিলা প্রভৃতি কাজের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উমর (রা.) এক্ষেত্রে ভূমিব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তিনি ভূমির ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন-</p>
<ul>
<li>১. ভূমি মানবজাতির জন্য সর্বাধিক প্রয়োজনীয় এবং মানুষের সকল চাহিদা পূরণ করে।</li>
<li>২. ভূমির পরিমাণ সীমিত।</li>
<li>৩. ভূমি স্থায়ী।</li>
</ul>
<p>উমর (রা.) নেতত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার পরপরই মুসলিমদের সামনে কৃষি সংক্রান্ত দুটি মৌলিক সমস্যা এসে হাজির হয়।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>এক. ক্রমবর্ধমান ইসলামী অঞ্চলগুলোর খাদ্যচাহিদা মেটানো।</strong><br />
<strong>দুই. ভূমিব্যবস্থাকে এমনভাবে সুবিন্যাস করা যাতে মধ্যস্বত্বভোগী কোনো শ্রেণির উদ্ভব না ঘটে।</strong></p>
<p>এই দুটি লক্ষকে সামনে রেখে উমর (রা.) যুগান্তরী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিজিত ভূমি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে না দিয়ে কৃষকদের মাঝে সমভাবে বন্টন করেন। যার ফলে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে যায়। রোমান এবং পারস্যের সামন্ততান্ত্রিক কিংবা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে উমর (রা.) নতুন ধারা তৈরি করেন। অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার বিলোপ সাধন করে বিশ্ববসীর জন্য একটি মডেল উপস্থাপন করেন।<strong> তিনি অনাবাদি জমিকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ভূমিহীনদেরকে ভূমির মালিকানা প্রদান করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষকদের বিশেষ পুঁজি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং ঘোষণা দেন, রাষ্ট্র কতৃক প্রদেয় এ পুঁজি রাষ্ট্রকে আর ফেরত দিতে হবে না। উৎপাদিত ফসলের ৫০% কৃষকরা নিজের জন্য রাখবে বাকি ৫০% রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কল্যাাণে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য এটি ছিল বড় একটি পাওয়া।</strong> যুগান্তকারী এই পদক্ষেপের ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্রের আওতাধীন সব অনাবাদি জমি আবাদি জমিতে পরিণত হয়। উন্নয়নের চালিকাশক্তি কৃষকদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখা, রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা সাহায্য-সহযোগিতাসহ নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গনিমতের মাল আসার পর তিনি তার সবটুকু যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন না করে সে সময়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা কৃষির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন। এক্ষেত্রে নানাবিধ চিন্তাগত ও সিদ্ধান্তগত জটিলতা তৈরি হলেও তিনি তার ইজতেহাদি সিদ্ধান্তের আলোকে কৃষির উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে এর অনুকূল সিদ্ধান্ত প্রদান করেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় তাঁর এ পদক্ষেপ ছিল সময়ের সেরা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।</p>
<p>কৃষিব্যবস্থার সামগ্রীক উন্নয়নের লক্ষ্যে এগ্রিকালাচারাল টেকনোলজি অর্থাৎ, তৎকালীন সময়ের সবথেকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেন। সেচ প্রকল্প, ড্রেনেজ সিস্টেম প্রবর্তনসহ নানাবিধ উদ্যোগ করে বিদ্যমান কৃষির ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। উন্নয়ন চালিকা শক্তির মূল উপাদান কৃষক ও কৃষির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফরমান জারি করেন।</p>
<p>ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজ-এর একটি ঘটনা এখানে প্রাণিধানযোগ্য। ‘একবার মুসলিম সেনাবাহিনী ভুলক্রমে এক ব্যক্তির ফসলী ক্ষেত মাড়ালে উমর (রা.) ক্ষতির শিকার কৃষককে তাৎক্ষণিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।’ দুর্ভিক্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দীর্ঘমেয়াদি সাহায্য নিশ্চিত করেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন তার লক্ষমাত্রা অতিক্রম করে।</p>
<p>উৎপাদন বাড়াতে স্বতন্ত্র সেচ প্রকল্প চালু করা হয়। আল্লামা শিবলী নোমানী তাঁর আল ফারুক গ্রন্থে লিখেছেনঃ</p>
<blockquote><p>“সমগ্র দেশে খাল খনন, বাঁধ নির্মান পুকুর খনন, প্রয়োজনীয় স্থানে পানির ব্যবস্থা করার জন্য হযরত ওমর পৃথক এক বিভাগ (Department) প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লামা মাকরিযী লিখেছেন শুধুমাত্র মিসরেই এ কাজের জন্য দীর্ঘ কয়েক বছর ব্যাপী এক লক্ষ বিশ হাজার শ্রমিক এই কাজে নিযুক্ত ছিল। এর যাবতীয় খরচ বাইতুলমাল তহবিল থেকে বহন করা হতো। খেযিস্তান এবং আহওয়াজ এলাকায় জাযর ইবন মুয়াবিয়া হযরত উমরের অনুমতিক্রমে অনেক খাল খনন করে বহু পতিত জমি আবাদ উপযোগী করেছিলেন। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অনেক খাল খনন করা হয়েছিল বলে বড় বড় ইতিহাসবিদ্গণ উল্লেখ করেছেন।” (আল ফারুক, পৃ-১৪২)</p></blockquote>
<p>উসমান (রা.) খিলাফতে অধিষ্টিত হয়ে পূর্ববর্তী কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। হযরত আলীও (রা.) এই ধারাকে অব্যাহত রাখেন। তিনি সব অঞ্চলে কৃষি এবং খাদ্যনীতির গুরুত্ব বজায় রাখতে শাহী ফরমান জারি করেন। মিশরের গভর্নর মুসা আল-আশআরীর কাছে পাঠানো এক চিঠির শুরুটা তিনি এভাবে করেছিলেন, <strong>“হে মুসা আল-আশআর! উৎপাদন বৃদ্ধি কর এবং উৎপাদিত ফসলর সুষম বন্টন নিশ্চিত কর।” </strong>স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, খোলাফায়ে রাশেদার আমলে কৃষিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির ভিত কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল।</p>
<p>কৃষিকে মুসলিমরা উন্নতির কোন শিখরে নিয়ে গিয়ে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত এক সভ্যতার ইতিহাস বিশেষজ্ঞের নিম্নোক্ত উক্তিতে- “আমি কখনোই শুনিনি, মুসলিমরা তাদের স্থায়ী আবাসস্থলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে খাদ্য আমদানি করেছে। এর পরিবর্তে তারা নিজেরা কীভাবে সার প্রস্তুত করতে হয়, মাটির গঠন, চাষ পদ্ধতি, রোপণ, সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদির উপর তারা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করে।” (The Back of Islam, ২য় খন্ড, ড. মোহাম্মদ আমীন)</p>
<p>যেসব অঞ্চল কৃষিকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ভিত রচনা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম আন্দালুসিয়ার মুসলিম সালতানাত বা ইসলামী খেলাফত। তৎকালীন সময়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরাই সর্বপ্রথম কৃষির এনসাইক্লোপিডিয়া তৈরি করে। আজকে আমরা যে লেবু, মালটা, কমলা, বাদামসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিদায়ক ফল দেখতে পাই, সেসবের বীজ মুসলমানদের হাত ধরেই বাণিজ্যিক রোপন শুরু হয়। তারা নতুন নতুন বীজের আবিষ্কার করে। পৃথিবীর ইতিহাসে আজও আন্দালুসিয়ার কৃষি বিশ্ব কৃষিব্যবস্থার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। খলীফা আব্দুর রহমান প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করতেন। ইসলামী সভ্যতার সময়কালে স্পেনের কৃষি কোন অবস্থায় ছিল জানতে উইল ডুরান্টের নিম্নোক্ত উক্তিটিই যথেষ্ট। তিনি লিখেছেনঃ</p>
<p>“কয়েকশত কৃষিজাত পণ্য যেমনঃ শস্য, সবজি, ফলমূল, বাদাম ও ফুলের চাষ করা হয়। কমলা গাছ এবং কমলার বীজ নিয়ে দশম শতাব্দীর কিছু আগে আরবরা সিরিয়া, এশিয়া মাইনর, প্যালেস্টাইন, মিশর এবং স্পেনে প্রবেশ করে। এসব দেশ থেকে কমলা দক্ষিণ ইউরোপে প্রবেশ করে। আখের আবাদ এবং চিনির পরিশোধনও আরবদের (মুসলিমদের) থেকে ক্রুসেডাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রবেশ করে। আরবদের মাধ্যমেই ইউরোপ তুলার সাথে পরিচিত হয়। রাষ্ট্র সেচব্যবস্থা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন এবং পতিত জমি আবাদ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ সাহায্য করে। যার ফলে সেসময়ে বুখারা এবং সমরকন্দের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে পৃথিবীতে স্থাপিত স্বর্গ বলে আখ্যায়িত করা হতো।”</p>
<p>একইভাবে স্কটের মন্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। তিনি স্পেনে মুসলিম সালতানাতের কৃষিপদ্ধতি সম্বন্ধে বলেনঃ“&#8230;the most complex, the most perfect, the most scientific, even devised by the ingenuity of man.</p>
<p>মুসলিমরা বিজিত হয়ে যেসব অঞ্চলে ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতো এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতো সেখানে তারা উন্নত খাদ্যনীতি এবং কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিত। যেমনঃ আন্দালুসিয়াতে যখন মুসলিমরা দেখতে পেল স্বাস্থ্যহীনতা এবং বিনা চিকিৎসায় অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন মুসলমানরা এ অঞ্চলের জলবায়ু, ভূমিসহ সামগ্রীক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে নতুন বীজ উদ্ভাবন করে এবং অঞ্চলোপযোগী খাদ্যনীতি প্রনয়ণ করে। এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল আন্দালুসিয়াতে নয়, অন্যান্য অঞ্চলেও নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাতের উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। বাংলা অঞ্চলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর মুসলমানরা এ অঞ্চলের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার সুষ্ঠু বন্দোবস্ত করতে অঞ্চল উপযোগী নানা জাতের বীজ, কলা, আমলকিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার সর্বত্র সহজলব্য করেন। এ জাতীয় উদ্যোগের ফলে কৃষি ও খাদ্যনীতিতে বিপ্ল­ব সাধিত হয়। উন্নত কৃষি এবং সঠিক খাদ্যনীতির অভাবে আজ আমরা ভয়ংকর যুদ্ধের সম্মুখীন। যা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট।</p>
<p>বাদশা আলমগীরের সময় বাংলার কৃষি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। মীর জুমলা (১৫৯১-১৬৬৩) এবং শায়েস্তা খাঁর (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) আমলে উৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছিল সর্বাধিক সস্তা। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। এ সময় বাংলা অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। ড. মোহাম্মদ মোহর আলী তাঁর <em>History of the Muslims of Bangal</em> (2 Vol. 5) এ নিয়ে তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন।</p>
<p>সীমান্ত দিয়ে কোনো ভাবেই যেন ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য প্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে উমর (রা.) এর সময়কাল থেকেই কঠিন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিটি অঞ্চলেই চেক পোস্ট বসানো হয়। আজকের যে শুল্ক সিস্টেম তার আবিষ্কারকও মুসলিমরাই। অর্থাৎ এ ব্যাপারে মুসলিমরা কতো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেছে তা আমরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।</p>
<p>বর্তমান পৃথিবীর কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরিই জায়নবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রনে। তারা একে কেন্দ্র করে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ বীজ, খাদ্য এবং কৃষির যুদ্ধ যা পারমাণবিক বোমার থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। ইসলামী সভ্যতার সূচনাকালীন সময়েই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারার ২০৫ নং আয়াতে আমাদেরকে সতর্ক করে বলে দিয়েছেন,</p>
<blockquote><p>“যখন সে শাসন কর্তৃত্ব লাভ করে, পৃথিবীতে তার সমস্ত প্রচেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত ও মানব বংশ ধ্বংস করার কাজে। অথচ আল্লাহ বিপর্যয় মোটেই পছন্দ করেন না।”</p></blockquote>
<p>এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে যা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হলো, তারা আমাদের শস্যক্ষেত্র এবং বংশ বৃদ্ধিকে থামিয়ে দিবে। আজকে সেই বিষয়টি আমরা ব্যাপক হারে লক্ষ্য করছি এবং এর ভয়াবহ ফলাফলও উপলব্ধি করছি। সূরা নিসার ১১৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,</p>
<p>“তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আশ্বাস দিব, তাদেরকে পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব, এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির আকৃতি পরিবর্তন করার আদেশ দিব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হবে।”</p>
<p>এ দুটি আয়াত থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, তারা আমাদের বীজ ব্যবস্থা, আমাদের বংশবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিবে। আমাদের সৃষ্টির আকৃতিকে পরিবর্তন করে দিবে।</p>
<p>সুষ্ঠুভাবে বর্তমান বিশ্ব খাদ্যনীতিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জায়নবাদীগোষ্ঠী কতৃক পরিচালিত মনোসান্তো, কারগিলের মতো কোম্পানিগুলো আমদানীকৃত বীজের মধ্যে ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে, যা ভয়াবহ রোগের সৃষ্টি করছে। তারা জেনেটিক্যালি মোডিফাই করে ঝুঁকিপূর্ণ এসব বীজ আমাদের নিকট প্রেরণ করছে। তারা নয়া কীটনাশক, সার সিস্টেম তৈরি করে কৃষি সেক্টরকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে যে, সার এবং কীটনাশক ছাড়া খাদ্য উৎপাদন কল্পনাও করা যায় না। জমিতে সার এবং কীটনাশক প্রয়োগের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। উ<strong>ৎপাদিত খাবার খেয়ে মানবদেহে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত ঔষধের কাঁচামালও তারা সরবরাহ করছে। এবং তাদের নিয়ন্ত্রনাধীন বড় বড় ঔষধ কোম্পানি গড়ে ওঠেছে। নিজেরা কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করে আবার নিজেরই সে রোগের ঔষধ সরবরাহ করে। মানবরূপী নিকৃষ্ট এ পশুগুলো মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সেক্টর ‘কৃষিব্যবস্থা’কে নিরব গণহত্যার মোক্ষম হাতিয়রে পরিনত হয়েছে।</strong></p>
<p>সাম্রাজ্যবাদীদের হীন এ কাজের বিপরীতে ইসলাম খাদ্যনীতি এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়কে কতটা আদালত এবং ইনসাফের দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছে তা নিচের ছোট একটি উদাহরণেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। আমাদের নবী রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মোহাম্মদ (স.) এক বেদুইনকে একটি গর্ভবতী উটনীর লালন-পালনের দায়িত্ব প্রদানকালে বলেন, “নিজ হাতের নখ ছোট করে রাখবে, যেন উটের দুধ দোহনকালে নখ বড় থাকার কারণে উটনী কষ্ট না পায়।” অত্যন্ত দুখ এবং পরিতাপের বিষয় হলো আজকালকার ডেইরি ফার্মগুলো ইনজেকশনের মাধ্যমে গর্ভধারণ এবং গর্ভপাত করছে। স্তনে মেশিন লাগিয়ে বল প্রয়োগে দুধ দোহন করছে। এ জাতীয় কাজগুলো কি আদৌ মানবতার জন্য, কৃষির জন্য কিংবা খাদ্যনীতির জন্য কল্যণ বয়ে আনতে পারে?</p>
<p>ইসলাম সব বিষয়ে আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা উপলব্ধি করতে না পারার কারণে সত্য ও সঠিক পথ হারিয়ে ভয়াবহ এক পরিণতির দিকে প্রতিনিয়ত ধাবিত হচ্ছি। এ থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে আমাদের যে সার্বিক অবস্থা সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, অন্যান্য দেশের তুলনায় মুসলিম দেশগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দারিদ্র্য দেশগুলো আরও অনেক বেশি পিছিয়ে। এ জন্য আমাদের সবার আগে পর্যালোচনা করা দরকার, পূর্বে বাংলা অঞ্চলে কি ছিল। কি ছিল তার প্রাচীন ইতিহাস। এই বাংলা অঞ্চলে প্রকৃত কৃষি বিপ্লব, উন্নত খাদ্যনীতি সম্ভব কিনা, সম্ভব কিনা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতাকে কেন এবং কীভাবে হারালাম তারও তত্ত¡ তালাশ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার কৃষি এবং খাদ্য :</h5>
<p>প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আব্দুর রহিমের ভাষায়, বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তা এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়, যে পর্যায়ে বাংলা অঞ্চলের মানুষদের শুধু রাজনৈতিক মঞ্চকে কিংবা শুধু সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনকেই উন্নত, গঠনমূলক করে না। একইসাথে অর্থনীতি ও কৃষির উন্নতি এবং সমৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করে তোলে। বাংলা অঞ্চলের ভ‚মিকে বলা হতো প্রাচুর্যে ভরা উর্বর ভূমি। এর অধিকাংশ নারী- পুরুষ সকলেই ছিলেন অনেক বেশি পরিশ্রমী। ফলশ্রুতিতে মুসলিম শাসকগণ ইসলামী সভ্যতার রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতির আলোকে এমন সব মূলনীতি প্রনয়ণ করেন যার ফলে কৃষি এবং বাণিজ্যে অভ‚তপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। গোটা অঞ্চলের মাটির উর্বরতা, কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্র এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয় যা গোটা অঞ্চলকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে।</p>
<p>নীহাররঞ্জন রায় বাংলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেন, “মুসলমানদের ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রণয়নের ফলে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা হলো গোটা উপমহাদেশের অর্থনৈতিতে অভ‚তপূর্ব এক পরিবর্তন সাধিত হয় যার অন্যতম ভিত্তি ছিল কৃষি। মুসলমানদের অর্থনৈতিক কৌশল, প্রজ্ঞাপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গোটা বাংলাকেই অর্থনৈতিক উন্নতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দেয়।”</p>
<p>মীনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তাবাকাতে নাসিরীতে’ লিখেন- মুসলমানদের এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নৈতিক মূল্যবোধের (আখলাক) ফলে শুধুমাত্র শাসকদের মূলনীতিই নয় প্রজাদের মধ্যেও এক সহমর্মী এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠে। সকলেই তাদের খাজনা দেয়া-সহ রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পুরোদমে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এর ফলে সব দিক মিলিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আয় সেসময়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছে।</p>
<p>সকল ঐতিহাসিক এ বিষয়ে একমত যে, চারটি বিষয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনীতি এতো বেশি শক্তিশালী হয়,</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>এক.</strong> কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের উন্নতি সাধন।<br />
<strong>দুই.</strong> প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা।<br />
<strong>তিন.</strong> বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানিতে জোর প্রদান।<br />
<strong>চার.</strong> খনিজ সম্পদ এবং মূল্যবান পদার্থের প্রাচুর্যতা এবং তার সঠিক ব্যবহার।</p>
<p>ঐতিহাসিকগণ এবং তৎকালীন বিশেষজ্ঞগণ এ অঞ্চলের মাটিকে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট উর্বর মাটি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের অঞ্চলে অসংখ্য নদী-নালা, সবথেকে বেশি ঋতু, প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা বিদ্যমান। সঠিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ উন্নত কৃষি অঞ্চল। মুসলমানরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে প্রয়েজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করে। <strong>ইবনে বতুতা এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে কৃষির অবস্থান, শষ্যের প্রাচুর্য ফুল-ফলের সমারোহ দেখে এতটা বিস্মিত হন যার প্রকাশ আমরা তার লেখনীতে দেখতে পাই। তিনি লিখেছেন, “নদী পথে মিশরের নীল নদের মতো ডানে-বামে ছিল অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজী এবং গ্রামের পর গ্রাম। আমরা গ্রাম ও উদ্যানরাজীর মধ্য দিয়ে ১৫ দিনের মতো চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে আমরা একটি সাজানো উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলেছি।”</strong> ইবনে বতুতার সমস্ত ভ্রমণ কাহিনী ও তার পর্যালোচনাকে যদি আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করি তাহলে দেখব, এ অঞ্চলের রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন এতোটাই সূক্ষ্ম এবং গোছালো ছিল, এ অঞ্চলের কৃষিকে অনেকটা স্বপ্নীল বাগান হিসাবে ঐতিহাসিকগণই আখ্যায়িত করেছেন।</p>
<p>আবার বিশ্বভারতী এনালসের ঐতিহাসিকগণ এ অঞ্চলকে সপ্তস্বর্গ, পৃথিবীর স্বর্ণভান্ডার হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। এবং এ অঞ্চলের সম্পদ, মানুষের চারিত্রিক সততা এবং পরিকল্পিত কৃষি, নদী এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনাকে স্বর্গের সাথে তুলনা করেছেন। একজন চৈনীক দূত বাংলা সম্পর্কে বলেন, “এর অঞ্চলে ভূমি এতটাই উর্বর এবং এর উৎপাদন এতই বেশি যে, একই জমিতে প্রতি বছর দুই থেকে তিন ধরণের ফসল তারা পায়। কোনো রকম যত্ন না করেও এ অঞ্চলের ভূমি থেকে কৃষকরা তাদের চাহিদার থেকেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে।”</p>
<p>প্রখ্যাত গবেষক ও ঐতিহাসিক, আবুল ফজল বলেন, “বাংলার মাটি এতো বেশি উর্বর ছিল যে একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হতো।” মুঘল সালতানাতের বিখ্যাত ঐতিহাসিক লেখকগণ সেকালের পলিমাটির অসাধারণ উর্বরতার উল্লেখ করেছেন। বাংলার সমগ্র মুসলিম শাসনামলে ভূমির উর্বরতা এবং কৃষির প্রশংসা এত বেশি লক্ষ্য করা যায় যে, সুলতান আওরঙ্গজেবের শাসনামলে নদী-নালা, খাল-বিল, কৃষির সুন্দর পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন, সারিবদ্ধ গ্রাম এবং শহরের পরিচ্ছন্নতা, মাঠভর্তি শস্য এবং নানাবিধ ফুল- ফলের প্রশংসা করে গবেষণা পত্রও রচিত হয়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত গবেষক বার্ণিয়ারও এই কথাগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা মুসলিম বিদ্বেষী হওয়েও এ বিষয়গুলোর সত্যতা তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন।</p>
<p>অঞ্চলের সবয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদিত ফসল ছিল চাল। সরু, মোটা নানা ধরণের চাল এদেশে উৎপাদিত হতো। চালের নানা প্রকারের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবুল ফজল বলেন,</p>
<p><strong>&#8220;যদি প্রত্যেক প্রকার থেকে একটি করে শস্যকণা সংগ্রহ করা হতো তাহলে একটি বড় কলস ভরে উঠতো।&#8221;</strong> কৃষিবিদ ফরিদ আখতারের মতে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচশত’র বেশি বীজ সংরক্ষিত হত এবং সেগুলোর চাষ হত। এই নানা ধরনের বীজ এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যকণা এবং উর্বর জমি এ দুয়ের সমন্বয়ে উৎপাদিত চালের পরিমাণ এতো বেশি ছিল যে, জনসাধারণের চাহিদা মেটানোর পর পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৭০টি জায়গায় রপ্তানি হতো। চালের মতো যে সব শস্য উৎপাদিত হতো তার মধ্যে অন্যতম ছিল তুলা, মরিচ, সরিষা। এ ফসলগুলোর উৎপাদন এতো বেশি হতো যে, পৃথিবীর ৫০ টির মতো অঞ্চলে তুলা এবং তুলা থেকে উৎপাদিত সুতা, মরিচ, সরিষা ইত্যাদি রপ্তানি হতো।</p>
<p>গত কয়েক দশক পূর্বেও পাটকে বাংলা অঞ্চলের সোনালী আঁশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। ৭-৮ শত বছর যাবৎ সব ধরণের সাহিত্যে, কবিতায়, গ্রন্থে পাটের কথা উল্লেখ থাকতো। নানাবিধ মাধ্যমে পাট, পাট থেকে তৈরিকৃত বস্ত্র এবং বিভিন্ন পণ্যকে সাহিত্যে তুলে ধরা হতো। পাট শুধুমাত্র একটি ফসল হিসেবে উৎপাদনই হত না বরং পাটের দ্বারা তৈরি বিভিন্ন ধরণের পণ্য ও বস্ত্রসামগ্রীও তৈরি হতো। এগুলো ছিল উপমহাদেশ তথা বাংলা অঞ্চলের আয়ের অন্যতম ক্ষেত্র।</p>
<p>‘ইকোনমিক এনালস অব বেঙ্গল’ বইতে জে সি সিনহা বলেন, “বাংলায় মুসলিম শাসনামলে পাট এবং পাটজাত দ্রব্য এতো বেশি পরিমাণে উৎপাদন হতো যে, পাট এবং পাট থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন দ্রব্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো।” এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলে এসে তারা পাটবস্ত্র এবং তৎসংশ্লিষ্ট শিল্পেরে সাথেই সম্পৃক্ত হয়। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্টের একটি পত্র এখনও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে, সেখানেও পাট নিয়ে বিস্তর আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। জে সি সিংহ বলেন, সে সময়ের ঐ চিঠিতে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার চটের থলে এবং ১২ শ চালের বস্তা পাঠানোর একটি দলিল। অর্থাৎ একটি চিঠি থেকেই যদি এ ধরণের তথ্য ফুটে উঠে বুঝাই যাচ্ছে যে, পাটকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি ও পর্তুগীজদের বিশাল একটি পরিকল্পনা ছিল এবং পরবর্তীতে তারা তা বাস্তবায়ন করে। দুঃখজনক বিষয় হল সেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নকারী সেই সোনালী আঁশ এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় আজ আমাদের অর্থনীতি থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে</p>
<p>বাংলাদেশে একসময় তুঁতগাছ এবং গুটি পোকার চাষ হতো। পঞ্চদশ শতকে এ অঞ্চলে যেসকল ঐতিহাসিকগণ আসেন বা এ অঞ্চলের কথা তুলে ধরেন তাদের বর্ণনাতে দেখা যায়, গুটি পোকা মূলত মুসলিমদের পূর্ব আমলে ছিল না বললেই চলে। মুসলমানরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর গুটি পোকা আমদানি করে। সঠিক পরিচর্যা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন এতো বেশি বরকতপূর্ণ হয় যে, বার্ণিয়ার ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কাশিম বাজার পরিদর্শনকালে দেখতে পান, কাশিম বাজারে রেশমের কাঁচামালের উৎপাদন বছরে প্রায় ২৫ লক্ষ পাউন্ডের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ২২ হাজার বেল। প্রত্যেক বেলের ওজন ১০০ লিভার। উৎপাদিত এ কাঁচামালের থেকে সাড়ে সাতশত পাউন্ড গুজরাট ও ভারতের অন্যান্য অংশে পাঠানো হতো। উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও রেশমের এই কাচামাল উৎপাদন হতো এবং তা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। রপ্তানি কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল গোটা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীগণ এবং এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ অঞ্চলের ইসলামী সভ্যতা। (তথ্যসূত্র লাগবে) জে সি সিনহা ইকোনমিক এনালস অফ বেঙ্গলে লিখতে বাধ্য হয়েছেন যে, প্রতি বছর কাশিম বাজার থেকে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ পাউন্ড কাঁচা রেশম জাপান হলেন্ড অঞ্চলে রপ্তানি হতো এবং বাংলায় দশ লক্ষ পাউন্ড রেশমের সুতা তৈরী হতো।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে রেশমের কাঁচামাল এতো বেশি সস্তা ছিল যে এর ব্যবসা বিভিন্ন অঞ্চলে খুব দ্রæত সম্প্রসারিত হয়। যার ফলে খুব সহজেই এ অঞ্চল থেকে অন্যান্য অঞ্চলের বণিকগণ রেশম ক্রয় করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে তাদের ব্যবসায় উন্নতি সাধন করে। বাংলা অঞ্চলের উন্নত কৃষি, উর্বর জমি এবং যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে কৃষির স্বর্গরাজ্য।</p>
<p>বিশ্বভারতী এনালস প্রথম খন্ডের চাইনিজ একাউন্টস এ যেসব তথ্য রয়েছে এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য ঐতিহাসিকগণের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলা অঞ্চলে তার উন্নত কৃষি ও নানাবিধ উৎপাদনের ফলে এমন এক কৃষি বিপ্ল­ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয় যার মধ্য দিয়ে ভুট্টা, সরিষা, তেল, তিসি, কালাই এতো বেশি উৎপাদিত হতো যে, নিজ অঞ্চলের প্রয়োজন মিটিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৫০-৬০টি অঞ্চলে তা রপ্তানি হতো। এছাড়াও শাক-সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, শসা ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হতো এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তা পৌঁছানো হতো। পান, সুপারি, নারিকেল এসবের প্রাচুর্য এতো বেশি ছিল যে, এগুলোও প্রায় ৪০-৫০ টি অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো।</p>
<p>কলা, আম, কাঁঠাল, ডালিম, লেবু, খেজুর ইত্যাদি ছিল বাংলা অঞ্চলের সুপরিচিত ফলের মধ্যে কয়েকটি। এসব ফলের প্রতি অন্যান্য অঞ্চলের বণিকদের চাহিদা এতো বেশি ছিল যে, তারা এসব ফসল নিজ অঞ্চলে আমদানি করতেন। এ অঞ্চলের কৃষি রপ্তানিমুখী হয়ে ওঠায় অর্থনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।</p>
<p>ইবনে বতুতা ও বার্ণিয়ারের বর্ণনার পাশাপাশি ফরাসি, ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের বর্ণনা এক করলে দেখা যায় তারা বাংলা অঞ্চলের গৃহপালিত পশু যেমনঃ ঘোড়া, খচ্চর, মহিষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির কথা বেশ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। গৃহপালিত এ পশুগুলোর প্রাচুর্যতার কারণে খুবই অল্প দরে বিক্রি হতো। দাম কম হলেও কৃষকদের কোনো ক্ষতি হয়নি বরং খরচের তুলনায় তারা লাভবান হতো। গৃহপালিত এ পশুগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য হিসেবেও রপ্তানি হতো। এটিও বাংলা অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিকে ব্যাপকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।</p>
<p><strong>প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বর্ণনায় বাংলা অঞ্চলে বিভিন্ন খনিজ সম্পদের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেগুলো আজও পর্যন্ত বর্তমান। তিনি বলেন- মাহান্দা সরকারের হারবাহ নামক স্থানে মুক্তার একটি খনি ছিল। এখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর উৎপাদিত হতো। বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৫০ এরও অধিক খনিজ সম্পদ বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের অঞ্চলে এখনও ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা কেউ ই জানি না এটি আসলে কারা নিয়ন্ত্রণ করছে বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কীভাবে এই খনিজ সম্পদগুলোকে তাদের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করছে।</strong></p>
<p>ঐতিহাসিকগণ বাংলার সুতি শিল্পের অনেক প্রশংসা করেছেন। এ ব্যাপারে বিখ্যাত পন্ডিত বার্বুসা বলেন, এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত সুতা রয়েছে। তারা সূতি ও মিহি অনেক প্রকারের বস্ত্র তৈরি করে। নিজেদের ব্যবহারের জন্য রঙিন এবং ব্যবসার জন্য সাদা রাখে। এগুলো খুবই মূল্যবান কাপড় এবং এগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে মৌর, আরব, ইরান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ অনেক পছন্দ করতো যার দরুন বাংলা অঞ্চল থেকে এসকল অঞ্চলে এই কাপড়গুলো জাহাজ করে রপ্তানি হতো। কে, এম আশরাফ তার “লাইফ এন্ড কন্ডিশন অব দি পিপল অব হিন্দুস্তান” বইয়ে লিখেন, পন্ডিত বার্থেনা এ অঞ্চলের বস্ত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের সুতি বস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার মতো এতো বেশি সুতি বস্ত্রের প্রাচুর্যতা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখেননি বলে বার্থেনা মন্তব্য করেন। ঠিক একইভাবে আবুল ফজল উল্লেখ করেন, সোনারগাঁয়ে এক প্রকার মিহি মসলিন তৈরি হতো। মসলিনগুলো এতো বেশি উন্নত মানের ও দামী ছিল যে বাহরিস্থান গ্রন্থের প্রথম খন্ডে মির্যা নাথান বলেন, তিনি মালদ্বাহ থেকে তৎকালীন সময়ের চার হাজার টাকা মূল্যে এক খন্ড মসলিন বস্ত্র ক্রয় করেন। জে সি সিনহা ইকোনমিক এনালস অব বেঙ্গলেও উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলে এতো বেশি কাঁচা সুতা উৎপন্ন হতো এবং সুতা থেকে মসলিন কাপড় উৎপন্ন হতো যা বার্বুসা তার ভ্রমণকালে ব্যাপক হারে দেখতে পান। আর এটা ছিল জগৎ জুড়ে বিখ্যাত একটি সুতা শিল্প যা এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।</p>
<p>এ অঞ্চলে আখের উৎপাদন ছিল অনেক বেশি। বার্বুসা তার ভ্রমণকালে দেখা আখ চাষের কথা ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছেন। হ্যাকলুয়েথ সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ইতিহাসের ২য় খন্ডে আমরা দেখতে পাই এ অঞ্চলের আখ থেকে শুধু চিনি নয় আরও নানা ধরণের খাদ্য দ্রব্য উৎপাদিত হতো। উৎপাদিত এ খাদ্য দ্রব্যগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। তবে সব থেকে বড় আয়ের এবং রপ্তানিকারক পণ্য ছিল চিনি। এই চিনিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বাংলা সালতানাতের ঐ সময় পূর্ব-পশ্চিম উপক‚লের দেশসমূহ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে চিনিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।</p>
<p>চিনির মূল আবিষ্কারক ছিলেন মুসলিমগণ। কিন্তু উপনিবেশিক শক্তি যখন এ অঞ্চলে হানা দেয় এবং তাদের নিকৃষ্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করে তখন আমাদের অঞ্চলের চিনির অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে আর তা আজকের বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। আমরা কিছুকাল পূর্বেও লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনির কলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ চিনি বিদেশী কোম্পানিগুলো থেকে আমদানি করতে হয়। এই চিনিকে অবশ্যই মুসলিমদের হাতে রাখতে হবে। কারণ চিনিকে কেন্দ্র করে খাদ্যের বড় একটি অংশ তৈরি হয়। আর চিনি যদি মুসলমানদের হাতে না থাকে তাহলে সেটি সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং আজকের বিশ্ব তাই-ই হচ্ছে। এ চিনিকে কেন্দ্র করে নানাবিধ রোগ, ভাইরাস এবং অর্থনৈতিক শোষণ চালান হচ্ছে। বিদেশী কোম্পানি থেকে চিনি আমদানি করার ফলে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মুসলিম সভ্যতায় এক হাজারেরও বেশি সময় ধরে গোটা মানবজাতি চিনি খেয়েছে। চিনি থেকে তৈরিকৃত বিভিন্ন খাবার খেয়েছে। কখনো এতো রোগে নিপতিত হয়নি। কিন্তু যখন থেকেই উপনিবেশিক শক্তির হাতে তথা বর্তমান যায়নবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে চিনি এবং চিনি থেকে তৈররিকৃত খাদ্যদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে তখন থেকে চিনি একটি বিষতুল্য খাদ্যদ্রব্য হিসেবে আমাদের কাছে আসছে এবং আমরা উপায়ন্তর না পেয়ে তা খেতে বাধ্য হচ্ছি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট যেমন সৃষ্টি হচ্ছে একইভাবে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যগত সংকট ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।</p>
<p>এ অঞ্চলের তৈরিকৃত বিভিন্ন শিল্প পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেই ব্যাপক সমাদৃত হয়। যেমন এখানকার তৈরি তামা, কাঁসা, কাঠ, পাথর হস্তনির্মিত জিনিসপত্র প্রভৃতি কারুকার্য এবং কারিগরি বিভিন্ন জিনিসপত্র প্রায় ৩০-৪০ টি অঞ্চলে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং এগুলোও বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতে থাকে।</p>
<p>এখনও পর্যন্ত সব থেকে বেশি মসলা উৎপাদিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশের এ অঞ্চলে। অন্যান্য দেশ মসলা শিল্পে এ অঞ্চলের উপরেই নির্ভর করে। মুসলিম সালতানাতের সময়ও প্রায় ৭০ টি অঞ্চলে মশলা এবং মশলা জাতীয় দ্রব্য রপ্তানি করা হতো। এমনকি উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার শেষ কেন্দ্র মহীশূরে ব্রিটিশ-হায়দারাবাদ-মারাঠা ত্রিশক্তির বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে শেরে মহীশূর টিপু সুলতান শুধুমাত্র এই মসলার উপর নির্ভর করে বছরের পর বছর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।<br />
এরপর আসে বাংলার মৎস সম্পদের কথা। সামুদ্রিক মাছ এবং লবণাক্ত পানি থেকে উৎপাদিত লবণ ছিল মুসলিম বাংলার অন্যতম একটি শিল্প। তখন নদীগুলোতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এমনিকি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত আয়ের ৪৫ ভাগ আসে মাছ থেকে। আমাদের অঞ্চলের মাছ অনেক বেশি সুস্বাদু এবং পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষদের খাওয়ার উপযোগী। ফলশ্রুতিতে আমাদের নদী এবং সামুদ্রিক মাছ দিয়ে এখনো বিশাল একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব</p>
<p>বাংলার মুসলিম সালতানাতের অর্থনৈতিক আয়ের অন্যতম একটি উৎস ছিল এ মৎস্যশিল্প। সামুদ্রিক মাছের সাথে যুক্ত ছিল লবণাক্ত পানি থেকে উৎপাদিত লবণ। যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। বিশেষ করে এ মৎস্যশিল্প পৃথিবীর প্রায় ৬০ টি অঞ্চলে রপ্তানি করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এজন্য মৎসশিল্পের এই দিকটি বর্তমান সময়েও খুব সম্ভবনাময়ী একটি দিক। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা এখনো যথেষ্ট উদাসীন।</p>
<p>এক্ষেত্রে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী আমাদের এসকল দ্রব্যাদি রপ্তানি করার অন্যতম মাধ্যম ছিল বন্দর। বন্দরগুলোর বর্ণনা দিতে বিভিন্ন জন যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন তন্মধ্যে কয়েকটি তথ্য তুলে ধরছি। যেমনÑ বণিক মাস্টার সিজার ফেডরিক ১৫৬৭ সালে একটি বন্দর পরিদর্শন করে লিখেছেন, প্রতি বছর এ অঞ্চল থেকে সোনারগাঁও বন্দর দিয়ে ছোট বড় ৩০-৩৫টি জাহাজে চাল, কাপড়, সংরক্ষিত হরতকি, বিভিন্ন ধরনের পণ্যদ্রব্য বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। ১৫৮৫ সালে রেলওইচ সোনারগাঁও বন্দর পরিদর্শন শেষে লিখেন- এখানে দেখতে পেলাম, প্রচুর পরিমাণে সুতি বস্ত্র অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি হচ্ছে। চালসহ বিভিন্ন ধরণের ফসল ভারত, সিংহল, মালাক্কাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত হচ্ছে।</p>
<p>বার্থেমা ও বার্বুসা ১৬ শতকের দিকে যখন ভ্রমণ করেন তখন তারা এ ব্যাপারটিকে খুব জোরের সাথেই বর্ণনা করেন। তারা বলেন, বাংলা অঞ্চল তার প্রতিটি শহরকে একেকটি শক্তিশালী বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিটি বন্দর থেকে মুসলমানগণ সুতি বস্ত্র, চিনিসহ অন্যান্য দ্রব্য যেগুলো তারা উৎপাদন পূর্বক বৈদেশিক বাণিজ্যের লক্ষ্যে বড় বড় জাহাজে ভর্তি করে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে থাকে। যা মুসলমানদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলে মুসলিম শাসনামলে বাকলা তথা বরিশাল, পটুয়াখালী অঞ্চলে ব্যবসায়িক দিক থেকে প্রভাবশালী একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে। এ অঞ্চল সম্পর্কে রেলঅফইচ বলেন, এখানে সুতা, সুতিবস্ত্রসহ কৃষিজাত দ্রব্যের বিপুল সমাবেশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর সব থেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমরা দেখতে পেতাম জাহাজ করে এসব দ্রব্যাদি রপ্তানি করা হচ্ছে। রেলঅফইচ একই সাথে সোনারগাঁও অঞ্চলের রপ্তানির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বিপুল পরিমাণে সুতি বস্ত্র,পাট,চাল বিভিন্ন মসলা এমনভাবে জাহাজ বোঝাই করে বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হতো যা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে খুবই বিরল।</p>
<p>ইবনে বতুতা যখন জলপথে বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন তখন প্রতিটি অঞ্চলের বন্দরগুলো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা দেখে তিনিও বিস্মিত হন। বিশ্বভারতী এনালসের দ্বিতীয় খন্ডে আমরা এ বিষয়টি লক্ষ করি যে, চীন, বার্মা, ইউরোপ, মালদ্বীপ, সিংহলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর এর অন্যতম ভিত্তি ছিলো এসকল বন্দরকে কেন্দ্র করে জাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের ফসলের রপ্তানি।</p>
<p>বাংলা অঞ্চলের সাথে চীনের স্বর্ণ, রৌপ্য, রেশম, নীল ও সাদা চিনামাটির বাসন, তাম্র, লৌহ, কাস্তুরি, সিন্দুর, পারদ এবং মাদুর ইত্যাদির ব্যবসা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিকে অনেক বেশি তরান্বিত করে। পাশাপাশি তেল, মাখন, শুঁটকি মাছ, ফলমূল, কালাই, পান- সুপারী, পিঁয়াজ, রসুন, ঘৃতকুমারীসহ নানাবিধ ঔষধি গাছ বা ফল ব্যাপক হারে উৎপাদিত হতে থাকে। এই বিষয়টি বিভিন্ন অঞ্চলের চিকিৎসকদের কাছে এবং গবেষকদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়িকরা বিভিন্ন অঞ্চলে এসকল পণ্যসমূহ পৌঁছে দিত এবং একে কেন্দ্র করে বাংলা সালতানাতে একটি শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্যনীতির ভিত রচিত হয়। ঐতিহাসিক বার্ণিয়ারের বর্ণনায় আমরা দেখি, এ অঞ্চলের মোম, গন্ধগোগল, লম্বা মরিচ বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ ইউরোপসহ বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ গুলোতেও ব্যাপকভাবে রপ্তানি হতো। বার্ণিয়ার বলেন, বেশ কিছু মিষ্টান্ন ফলমূল আম, আনারস, হরতকি, লেবু, আদা এগুলোও পচুর পরিমানে রপ্তানি হতো। কেননা এগুলো সব অঞ্চলেই সুস্বাদু ও সুমিষ্ট ফল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলা। বর্তমান সময়ে ইউরোপের কমলা, আপেল যেমন সারা দুনিয়ায় পরিচিতি লাভ করেছে।</p>
<p>এরপর যদি আমরা দ্রব্যমূল্যের ক্রয় ক্ষমতার দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব যে সকল কিছু বিদেশে রপ্তানি হওয়া এবং বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের ফলে ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ আখলাকী উদ্যোগের ফলে প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত সস্তা দরে পাওয়া যেত। বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় লেখকগণ বিকৃতভাবে উল্লেখ করলেও দেখা যায়, দ্রব্য মূল্য ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে ছিল। যার ফলে সবাই নিজ চাহিদা মতো খাবার ক্রয় করতে পারতেন। এমনকি ক্রয় করার পরেও তাদের কাছে অর্থ উদ্ধৃত থেকে যেত। এজন্যই ইবনে বতুতা মন্তব্য করেন পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন একটি দেশ দেখেননি যেখানে জিনিসপত্র বাংলা অঞ্চলের মতো এতো সস্তায় বিক্রি হয়। তিনি দেখেন যে এ দেশ চালে পরিপূর্ণ ও ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর।</p>
<p>এ বিখ্যাত পর্যটক আফ্রিকা, মিশর ভারত এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তিনি যেসকল মন্তব্য করেছেন তা থেকে বোঝা যায়, এ অঞ্চলের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সাধ্যের মধ্যে ছিল। ১৬৪০ সালে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ভ্রমণ করে সিবাস্তিয়ান মাররিক বলেন, প্রত্যেক বাজারে বা শহরে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্য, সুতির বস্ত্র প্রভৃতির প্রাচুর্য এতো বেশি ও সস্তা ছিল যে মাত্র একটি বাজার থেকে এসকল জিনিসপত্র অল্প দামে ক্রয়পূর্বক জাহাজ বোঝাই করে নেওয়া যেতো। যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলের সাথেই ব্যবসা করতে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতো। এ অঞ্চলের মানুষ ব্যপক হারে উৎপাদন করে তাদের অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা অর্জন করতো। এছাড়াও তিনি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের শহরগুলিতে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য এতটাই সাধ্যের মধ্যে ছিল যে তিনি দিনে কয়েকবার আহার করতে প্রলুব্ধ হতেন। তিনি অনেকগুলো দ্রব্যের বর্ণনা দেন। যেমনঃ মাত্র ৮ দিরহামে ৮০ রাতল ধান পাওয়া যেত। ১ রৌপ্য দিনারে ২৫ রাতল চাল পাওয়া যেত। ১ আনা ৯ পাইয়ে বর্তমান ওজনের ১ মণ চাল পাওয়া যেত। এভাবে প্রতিটি পণ্যই এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অনেক সস্তা ছিল। যার ফলে এ অঞ্চলের মানুষ যতটুকু আয় করতেন ততটুকু দিয়ে তারা তাদের খাদ্য, বস্ত্র কেনার পরেও তাদের আয়ের একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থকত।</p>
<p>সে সময় জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক বেশি ছিল। পাশাপাশি মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বলয়ের কারণে মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী হয়ে উঠে। নারী-পুরুষ সকলেই তাদের স্ব-স্ব জায়গা থেকে সাধ্যমতো পরিশ্রম করে। যার ফলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান, কৃষির ভিত্তি, বস্ত্র বা সব ক্ষেত্রে বিশাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আখলাকী এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট একটি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর শ্রমনীতির দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতেন তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে তার বাৎসরিক অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটে যেত। যেমনঃ মুঘল সালতানাতের সময়কালে শ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারিত ছিল সেটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দৈনিক মজুরি হিসেবে তৎকালীন সময়ে একজন শ্রমিক দুই দম আয় করতেন। তাহলে তার মাসে আয় হতো ৬০ দম অর্থাৎ বছরে তার আয় হতো আঠারো টাকার সমান। <strong>জীবন ধারণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতোটাই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল যে, ইবনে বতুতা বলেন তার জনৈক বন্ধু আল মাসুদী বাংলা অঞ্চলের একজন নাগরিক যিনি বছরে আয় করেন ১৮ টাকা। কিন্তু তার বছরে খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র ক্রয় করতে ব্যয় হয় ৮ দিরহাম বা ১ টাকা।</strong> পারিবারিক অন্যান্য সদস্যের চাহিদা এবং খাদ্য-বস্ত্র সব মিলিয়ে তার আয়ের তিন ভাগের দুইভাগ খরচ হতো। আর এক ভাগ থেকে যেত। কারও কারও ক্ষেত্রে ১ ভাগ ব্যয় হতো আর বাকি দুই ভাগই উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যেতো। আবার তিনি বলেন, অনেকের সারা বছর ২ বা ৩ টাকার বেশি প্রয়োজন পড়তো না। ফলে ১৫ টাকার মতো উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। <strong>এসব উদ্বৃত্ত টাকা সেই সময়ের মুসলমানদেরকে ওয়াকফ, দান, সাদাকাহ, যাকাতের দিকে ব্যপকভাবে ধাবিত করে।</strong></p>
<p>মুসলিমরা তাদের এই বাৎসরিক উদ্বৃত্ত সম্পদের একটি অংশ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রেরণ করতো। বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল, দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চল, যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে এমন অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। রাষ্ট্র্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি বাজেট দিতে পারতো। যার কারণে বলা হয় ইসলামী সভ্যতার ১২শত বছরের শাসনামল ছিল পুরো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনামল। গোটা দুনিয়াতে হত দরিদ্র খুঁজে পাওয়া, অনাহারী মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাত তথা ইসলামী সভ্যতা যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ৭ শত বছরে আমাদের অর্থনৈতিক জিডিপি ছিলো ২৯%। অর্থাৎ যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ইসলামী সভ্যতার এ অঞ্চলে সেই বিশাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কেমন? সে ব্যাপারে আমরা কতটুকুই বা অবগত?</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>মানববিধ্বংসী ব্রিটিশ শাসনামলে কৃষি খাদ্য :</h5>
<p>উপরোক্ত বিষয়গুলোকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এ কথা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা বা মুসলিম শাসনামলে বাংলা অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি, কৃষি ও খাদ্যনীতি উন্নতির চরম শিঁখরে পৌঁছে যায় যা মানবতার ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণে পরিণত হয়। কিন্তু এর পর পরই এ অঞ্চলে যে ব্যাপকভাবে চলমান শোষণ ও নিকৃষ্টতম গণহত্যা এবং মহাপ্রলয় নেমে আসে তার তীব্রতা ও ভয়াবহতা কয়েক খন্ড বই লিখেও হয়ত উপলব্ধি করানো সম্ভব হবে না। এই মহান সভ্যতার পতন ও নিকৃষ্ট জায়নবাদীদের উত্থানের বিষয়ে মুসলিমদের ও সত্যনিষ্ঠ গবেষকদের তুলনামূলক কাজ নেই বললেই চলে।</p>
<p>১৭৭২ সালের গভর্নর জেনারেল ওয়ারিন হেসটিন্সের ইংল্যান্ডের কোম্পানির ডাইরেক্টরদের কাছে পাঠানো এক পত্রে লিখেন- প্রদেশের তথা বাংলার সমগ্র লোক সংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছে এবং তার ফলস্বরূপ চাষাবাদের অবস্থা চরম অবনতির দিকে চলে গেছে। সেখানে তিনি রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরণের পরামর্শ দেন ও চরম হতাশা প্রকাশ করেন।<br />
তাহলে চিন্তাশীল ও উৎসুক মনে প্রশ্নের সঞ্চার হতে পারে যে, এই আকাশচুম্বী অবস্থানে থাকা একটি অর্থনীতি ও কৃষি অঞ্চলে এমন কি ঘটল যার দরুন একটি দুর্ভিক্ষেই গোটা জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করল?</p>
<p>ব্রিটিশদের শোষণের ভয়াবহতা শুধু এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সঠিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, দুর্ভিক্ষের পূর্বে বাংলাদেশের রাজস্ব (১৭৬৮ সালে) ছিল ১ কোটি ৫২ লক্ষ ৪ হাজার ৮ শত ৫৬ টাকা। কিন্তু এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে এ অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরও ১৭৭১ সালে রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৫ শত ৭৬ টাকায়। একটু চিন্তা করলেই আমরা এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারব। তাদের শাসনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় জনগণ এ ধরণের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।</p>
<p><strong>এ দুর্ভিক্ষ সাধারণ কোনো দুর্ভিক্ষ নয়। প্রথমত, এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর হিসাবটা সঠিক কিনা সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। কেননা হিসাবটি ব্রিটিশদের উপস্থাপিত হিসাব। দ্বিতীয়ত, তাদের রাজস্ব আয় কমে গিয়ে শূন্যের কোটায় নামার কথা থাকলেও তাদের রাজস্ব আয় উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে! শোষণের মাত্রা তো কমেইনি বরং দুর্ভিক্ষের মত এতটা কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা নির্যাতন আরও বাড়িয়েছে। চিঠিগুলো দেখলে বুঝা যায়, দুর্ভিক্ষ নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নয়। মূলত তারা তাদের রাজস্ব আয়, তাদের শোষণ এবং অর্থনৈতিক লুন্ঠন যাতে কমে না যায় সেদিকেই অধিক মনোযোগী ছিল।</strong></p>
<p>চারিদিকে যখন অর্থনীতি, কৃষি ও খাদ্যের চরম ধস নামে, মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং অন্যান্য সকল অধিকার থেকে গোটা অঞ্চলের সকল মানুষ বঞ্চিত হতে শুরু করে, মৃত্যুর পর মৃত্যু, গণহত্যার পর গণহত্যা চলে সেসবের ভিতরে তারা তাদের শাসন এবং লণ্ঠনকে পাকাপোক্ত করতে নতুন আইন প্রনয়ণ করে। যা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত। এদিকে নানাবিধ সমস্যা ধারাবাহিকভাবেই চলছিল। পূর্বের যে ব্যবস্থান্যুায়ী জমিদাররা ছিল সরকার এবং কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আদায়ের এজেন্ট। কিন্তু এই নতুন আইন অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদেরকে জমির মালিক হিসেবে স্বত্বাধিকার দেয়া হয়। এজেন্ট হিসেবে পূর্বে তারা স্বাধীন কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। কিন্তু নতুন এ আইনে পূর্বে যেভাবে রাজস্ব আদায় করতো সেক্ষেত্রে তারা নতুন মাত্রা যোগ করে। তারপর থেকে স্বাধীনভাবে এই সকল জমিদাররা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই প্রজাদের উপর নানাবিধ কর প্রয়োগ করতে শুরু করে।</p>
<p>“বাংলায় বিপ্ল­ব প্রচেষ্টা” নামক গ্রন্থে হেমাচন্দ্র কান্নগো বলেন, &#8220;এই জমিদাররা প্রতি একর এ এতো বেশি খাজনা এবং জুলুমপূর্ণ কর আরোপ করা শুরু করে যা ছিল সম্পূর্ণ বে-আইনী। কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ, সরকারকে প্রদান করা অর্থের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিল। অর্থাৎ সরকারকে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই যেধরণের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও অর্থনীতির ধস নেমে আসে, জুলুমের শিকার হতে থাকে তার থেকে ৫ গুণ বেশি খাজনা এ সকল জমিদাররা আদায় করতে শুরু করে। এদিকে ব্রিটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তাদের ভ‚মির রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত যে রাজস্ব ছিল তার থেকে আরও বৃদ্ধি করে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ৩৩ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন এক ভয়াবহ আগ্রাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।&#8221;</p>
<p>জমিদাররা তাদের প্রভুতুল্য ব্রিটিশদের মন খুশি করতে এবং ব্রিটিশ লুণ্ঠনকারীরা আরও বেশি লুণ্ঠনকে বৃদ্ধি করতে জমিদারদের যেসকল পরামর্শ দিতো তার ভিত্তিতে জমিদাররা শুধুমাত্র খাজনা আদায় বা নির্দিষ্ট কর আদায় করেই ক্ষান্ত হত না। সাথে নিত্যনতুন নানা ধরণের দাবি নিয়ে উপস্থিত হতো। এই ধরণের বে-আইনী পাওনা মেটাতে গিয়ে কৃষকরা ক্রমেই দরিদ্র হতে থাকে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পন্থা বা ব্যবস্থা ছিল না। যারা পরিপূর্ণভাবে এ দাবি মেটাতে অক্ষম হত, তাদের উপর নেমে আসত ভয়াবহ নির্যাতন। এভাবে যখন ধারাবাহিক শোষণ চলতে থাকে তখন কৃষক এবং সাধারণ পেশার জনগণ যেন পঙ্গুতে পরিণত হয় যার ভয়াবহতা বিশ্বমানবতা আগে কখনো কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।</p>
<p>১৮৮০ সালের দিকের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ব্রিটিশ যায়নবাদী পরিচালিত তীব্র শোষণের পাশাপাশি তাদের চাহিদা, তাদের আয়ের মাত্রা বাড়ানোর নেশায় উন্মত্ত হয়ে যায়। তারা শুধু লুণ্ঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং জমিদারদের ব্যবহার করে নির্যাতন, গণহত্যা ও ভয়াবহ জুলুমের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়ার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক রাধাকোমল মুখার্জী ভারতে ভূমি সমস্যা সম্পর্কে লেখা একটি পুস্তকে বলেন, আধুনিক বা তৎকালীন এ জমিদারী প্রথার মাধ্যমে ব্রিটিশরা সমাজের অধিকার এবং সবকিছুকে লুণ্ঠন করে তাদের শক্তিকে নতুনভাবে ব্যয় করেছিল কৃষক এবং সাধারণ মানুষদের দমন করার কাজে। অর্থাৎ এসকল বিষয় থেকে উপলব্ধি করা যায়, শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষের কারণেই মানুষ মারা যায়নি। অন্যান্য নানা জুলুমের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণত্যাগ করে। এরপর ১৭৫৩ সালের পর থেকে বা পূর্ব থেকেই যে ইজারা ব্যবস্থা চালু হয়, সেই ইজারা ব্যবস্থায় বিভিন্ন মাঠ, খাল, বিল পর্যন্ত ইজারা দিতে শুরু করে। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে কৃষকরা একেবারেই ভ‚মিহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের মৌলিক অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এসব ইজারা, কর নানাবিধ জুলুমের মধ্যে দিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যে ইজারার নাম শুনলেই প্রজাদের মনে কম্পন শুরু হয়ে যেতো।</p>
<p>ওইসকল জমিদাররা যখন কৃষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের উপর তাদের কর ধার্য করতো আর প্রজারা যদি তা দিতে ব্যর্থ হতো তখন তাদের উপর নেমে আসতো নানাবিধ নির্যাতনের কালো ছায়া। উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি সেকালের কয়েকটি পত্রিকার দিকে খেয়াল করলে (যেমন, তত্ত¡বোধিনীর ৮৪ তম সংখ্যায়, সাময়িক পত্রে, বাংলার সমাজ চিত্র পত্রিকার ২য় খন্ডে) দেখা যায় তখন বেত্রাঘাত, দন্ডাঘাত, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বক্ষস্থান দলন, খাপড়া দিয়ে নাসিকা কর্ণ মর্দন, মাটিতে নাসিকা ঘর্ষণ, পিঠে হাত পানিগুঢ় বদ্ধকরণ, কান ধরে দৌঁড় করানোম, ফাটা দুইখানা বাধা বাগারী দিয়ে হাত ধলন করা, গ্রীষ্মকালের প্রখর রৌদ্রে পা ফাঁক করে পিঠ বাকিয়ে পিঠের উপর ও হাতের উপর ইট চাপিয়ে দেয়া, বৃক্ষ বা অন্যত্রে বেধে লম্বা করা, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধানের গোলায় পুতে রাখা, গৃহবন্দি করে লঙ্কা মরিচের ধোঁয়া দেয়া, কারাবদ্ধ করে উপবাস রাখা প্রভৃতি শাস্তি প্রতিনিয়তই তারা কৃষকদের উপর এবং সাধারণ পেশাজীবী মানুষদের উপর প্রয়োগ করতে থাকে। কোনো দাবী আদায় না হলে হাত কেটে ফেলা, পিতার সামনে সন্তানকে হত্যা করা এবং সন্তানের সামনে পিতামাতাকে হত্যা করা। এইসকল জঘন্যতম উপায়ে তারা গণহত্যা চালাতে থাকে। এই কাজগুলো তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এই নিকৃষ্টতর কাজ তারা আমেরিকার ইনকা সভ্যতা ও মায়া সভ্যতার সাথেও করেছে। আফ্রিকায় তারা যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে, এদেশেও সেই ধারাবাহিকতা তারা অব্যাহত রাখে।</p>
<p>তত্ত্বোধিনী পত্রিকায় ১৮৫০ সালে কৃষির অবস্থা বলতে গিয়ে বিনয় ঘোষ বলেছিলেন, তত্ত্বোধিনী পত্রিকা শহরের পত্রিকা আর শহরের মধ্যবর্তীরাই এর পরিচালক। যার কারণে শহরের অর্থনীতি এবং কিছু সামাজিক বিচারের বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চল বা বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কি ভয়াবহ অবস্থা বা তাদের সামাজিক বাস্তবতাকে কতোটুকুই বা তুলে ধরতে পেরেছে। আদৌ এর কোনো সঠিক সমীক্ষা আছে কিনা তাও অজানা। তৎকালীন কোনো কোনো লেখক বলেন, পল্লী গ্রামের মধ্যে অসংখ্য ব্যক্তি উপযুক্ত অন্নের অভাবে হাজারো যন্ত্রণা ভোগ করছে। অর্থ কষ্টে, খাদ্যের অভাবে, পানির সংকটে জলাশয়ে বিভিন্ন প্রাণী যেভাবে পঁচে মারা যায় ঠিক একইভাবে মানুষগুলো মারা যাচ্ছিল। অর্থাৎ লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, ব্রিটিশরা ক্ষমতায় আসার কিছু কাল পরেই তাদের আগ্রাসন ও লুণ্ঠনের মাত্রা আকাশচুম্বী অবস্থানে পৌঁছে যায়। যা ছিল আমাদের ধারণারও অতীত।</p>
<p>মেমোরেন্টাম অন দি পার্লামেন্ট সেটেলমেন্টের ৪০ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ, তাদেরই এজেন্ট সেন্সেস কমিশনার স্যার টমাস মন্ড্রোর মতে, ১৮৪২ সালে উপমহাদেশে ভ‚মিহীন কৃষকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু ১৮৭২ সালে অর্থাৎ ৩০ বছরের ব্যবধানে আমাদের ভ‚মিহীন কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ লক্ষে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ করতে করতে ১৯৩১ সালে দেখা যায়, সেন্সেস অনুসারে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলা অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ৭০ ভাগ জনগণই ভ‚মিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছে। বাকী যে ৩০% এর ভ‚মির মালিকানা ছিল, খোঁজ করলে দেখা যাবে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মালিকানা ছিল নিতান্তই হাতে গোনা কয়েকজনেরই। অধিকাংশই ছিল জমিদার কিংবা ব্রিটিশদের তৈরিকৃত এজেন্ট। এরা মূলত লুণ্ঠনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে জমিদার এবং খাজনাভোগী শ্রেণির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তারা জুলুমকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করতে, তাদের শোষণের মাত্রা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতে তাদের এজেন্টদের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করতে থাকে যা দশ বছরের ব্যবধানে ৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>এরপর যদি আমিরা দুর্ভিক্ষের দিকে আলোকপাত করে দুর্ভিক্ষের কারণের দিকে তাকাই তাহলে দেখি, দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল তাদের শোষণ এবং তাদের গ্রহণকৃত নানাবিধ উদ্যোগ যা উপমহাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্য করি, সুপ্রকাশ রায় ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ’ বইয়ে বলেন, ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের ফল সহজপন্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতে রেলপথ নির্মাণ করে। ফলে তারা ৪ কোটি অধিবাসীর প্রায় ৬ মাসের খাদ্য এবং সকল শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণের জন্য গ্রাম শহর সব কিছু তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সাজিয়ে নেয় তথা রেলপথ নির্মাণ করে।</p>
<p>রেলপথের দ্বারা ভারতের বন্দরগুলির সহিত গ্রাম ও শহরের কেন্দ্রসমূহের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শস্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বন্দরগুলোতে অধিক পরিমাণে জাহাজ যোগে প্রেরিত হতো। এভাবে তারা এই মাত্রা দিনকে দিন বৃদ্ধি করে খাদ্যশস্যের পাচার বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ও বাংলা অঞ্চলের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে তা কৃষক এবং সাধারণ জনগণের সাধ্যের বাহিরে চলে যায়। জনসাধারণের পক্ষে তা ক্রয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ কৃষকরাই ছিল এ খাদ্যশস্যের মূল কারিগর।</p>
<p>এস. কে চ্যাটার্জীর ‘দি মিলিয়নস’ বইয়ের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতবর্ষের এই রেলপথ স্থাপনের পূর্বে ও পরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ও প্রাণহানির তুলনা করলে এ বিষয়ে অনেকখানি স্পষ্ট হওয়া যায় যে, ১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ৫৩ বছরে মোট দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ছিল ১৩ এবং এইসকল দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও অধিক। কিন্তু রেলপথের স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ১৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। উপমহাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জমিজমা, বিভিন্ন সম্পদ, মাঠ, ঘর-বাড়ি নষ্ট করে তার উপর দিয়ে রেলপথ বসায় এবং দেখানো হয় তারা অনেক পরিকল্পিত, উন্নত ও সংরক্ষিত উপায়ে উন্নয়ন করছে। অথচ এই স্থাপনার ক্ষেত্রে তারা মোটেও জনগণ এবং কৃষকদের বাস্তবিক অবস্থার দিকে নজর দেয়নি। তারা নজর দিয়েছিল তাদের লুণ্ঠনের দিকেই, লুণ্ঠন তরান্বিত হওয়ার পন্থার দিকেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, তাদের তৈরিকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী যদি অফিসিয়ালি মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সংখ্যা এটা হয়, তাহলে বুঝাই যাচ্ছে তা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের। প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলির অবস্থা তাহলে কি হয়েছিলো? ২০ বছরের ব্যবধানে যদি কোটি কোটি লোক মারা যায় তাহলে সত্যিকার বাস্তবিক অবস্থা কি হয়েছিল? উপমহাদেশে যার ফল আমরা আজও ভোগ করছি।</p>
<p>বার্ণিয়ার যে মন্তব্য করেছিলেন- বাংলাদেশ বা বাংলা অঞ্চল পৃথিবীর অন্যান্য যেসকল প্রভাবশালী সভ্যতা রয়েছে তার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের নদীগুলো, সেচব্যবস্থার প্রশংসা তিনি করেছিলেন। উপমহাদেশের ইসলামী সভ্যতা তথা মুঘল সালতানাতের সময় গোটা ভারতবর্ষব্যাপী সেচ ব্যাবস্থা ব্যপক উন্নতি সাধন করে। আর এটি মূলত মুসলিমদের ধারাবাহিক একটি ঐতিহ্য। কেননা আমরা জানি উমর (রা.) এর পর থেকেই এই সেচ ব্যবস্থা, কৃষির উন্নয়ন এবং কৃষির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির প্রয়োগ করা মুসলিমদের একটা সাধারণ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। সেই বিশাল ঐতিহ্যের উপমহাদেশের মুসলমানদের গড়া কৃষি ব্যবস্থাকে যারা এমনভাবে ধ্বংস করেছিলো তাদেরই একজন গবেষক বিখ্যাত নদী বিশেষজ্ঞ স্যার ইউলিয়াম ইউলক বলেছিলেন, বাংলা অঞ্চলের যে সমৃদ্ধি ছিল তা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে লুণ্ঠনকারী ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যা এই সম্বৃদ্ধিতে ভয়াবহ আকারে ধস নামিয়ে দেয়। অথচ ব্রিটিশদের এই উন্নয়নের পিছনে মূলভিত্তি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষি জমি এবং খালবিল।</p>
<p>সুপ্রকাশ রায়ও তার বইতে বলেন, ভারতের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মূলত ব্রিটিশদেরই দান। এটি খুব স্বাভাবিক। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, এই প্রত্যেকটি ব্যক্তি ছিল ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করা এবং তাদের পক্ষে থাকা লোক অর্থাৎ সুবিধাবাদী ও ব্রিটিশদের গোলাম। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ব্যক্তিদের উত্তরসূরী যারা ব্রিটিশ শাসনের মঙ্গল কামনা করতো এবং নানা ধরণের পরামর্শ দিতো তাদের বর্ণনা অনুযায়ী-ই যদি ভয়াবহ অবস্থার চিত্রাঙ্কন এমন হয় তাহলে বাস্তবিক অবস্থা আসলে কি ছিল? ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালের দুর্ভিক্ষের পর ১৯৩৪ সালে বাংলা অঞ্চলে বিশেষ খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষের দিকেও যদি তাকাই তাহলে দেখবো, এই দুর্ভিক্ষেও প্রায় এক তৃতীয়াংশের মতো মানুষ মারা যায়। যারা জীবিত ছিল তারাও এতটা কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছিল যে, এই ব্যাপারে মেমোরেন্টামের ৫৯ নং পেইজে বলা আছে, অনেক কৃষকেরা গাছের পাতা খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে ছিল। ১৯৩৬ সালে এ দুর্ভিক্ষ আরও বিস্তার লাভ করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সেসব অঞ্চলে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ নিহত হয় এবং বিভিন্নভাবে পীড়িত হলে সরকার মাত্র ১১ লক্ষ টাকা সাহায্য করে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে ৩৬ লক্ষ টাকার ঋণ প্রদান করে। কিন্তু সত্যিকারার্থে এই দুর্ভিক্ষ থেকে মানুষের মুক্তির জন্য যে কোনো কার্যক্রম থেকে তারা বিরত থাকে।</p>
<p>ভবানী সেনের লেখা ‘ভাঙ্গনের মুখে বাংলা’তেও তিনি বলেন, সেই সময়গুলোতে অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের আগে পরের বাংলায় সাধারণ মানুষের ৬-৮ মাস কোনো কোনো অঞ্চলে দশ মাসের খাদ্যের ঘাটতি ছিল। কিন্তু যা উৎপাদিত হতো তা দিয়ে ১ বছরের উৎপাদন দিয়ে কয়েক বছর চলা সম্ভব ছিল। এর থেকেই বুঝা যাচ্ছে সকল উৎপাদিত পণ্য, ফসল লুণ্ঠিত হয়ে চলে যেতো ব্রিটিশদের কোষাগারে। একই বইয়ে লক্ষ করলে দেখা যায় সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকেও এমনভাবে লুণ্ঠন করা হতো যে মাসে কয়েক লক্ষ মণ চাল তারা সরিয়ে নিতো। ফলশ্রæতিতে খাদ্য সংকটের কারণে মানুষ অনাহারেই মারা যেত। কৃষকদের স্বাস্থ্যহীনতা, মানসিক কষ্ট ও অধিক মৃত্যুর ফলে উৎপাদন কমতে থাকে। কিন্তু এ উৎপাদনের পরেও তারা তাদের লুণ্ঠন হ্রাস পায়নি। প্রতিনিয়ত কৃষকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। না দিতে পারলে উপহার হিসেবে শাস্তি প্রয়োগ করতো!</p>
<p>ভবানী সেন তার বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৯৪০ সালের পরে যে দুর্ভিক্ষগুলো একের পর এক দেখা দেয়, গ্রাম কি শহর সকল জায়গাতেই নিরন্ন, নিঃস্ব কৃষকেরা দুমুঠো ভাতের জন্য ঘর থেকে ঘর ভিক্ষা করতে থাকে। কিন্তু ভিক্ষা দেওয়ার মানুষ-ই তখন ছিল না। গোটা জনগণের শতকরা ৭৫ জনের ঘরেই চাল ছিল না। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণেই মজুদ ছিল যুদ্দার, আড়তদার চোরাকারবারি ব্রিটিশদের এজেন্টদের কাছে, মিল মালিকদের কাছে। এই দস্যুরা মুনাফা আদায় বন্ধ তো করেইনি বরং ব্রিটিশদের কাছে যে ধরণের বার্তা পাঠাচ্ছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল আরও বেশি আয় করা সম্ভব। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে শুধু বাংলা অঞ্চলেই ১৫ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো। অথচ এই দুর্ভিক্ষ চলাকালীন অবস্থাতেই ব্রিটিশ এজেন্ট ব্যাপারীরা লাভ করে ১৫০ কোটি টাকা। ভবানী সেন এ নিয়ে আরও বলেন, সরকারি নীতির সংখ্যা অনুযায়ী ৭৫ লক্ষ হলেও অন্যান্য বেসরকারি সূত্রের হিসাব মতে দুর্ভিক্ষের বছরে অনাহারে ৩৫ লক্ষ নর-নারী মারা যায় এবং ১২-১৫ লক্ষ নর- নারী এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে যে তাদের অবস্থা পথের ভিখারির থেকেও করুণ হয়ে যায়। প্রায় কোটির কাছাকাছি সংখ্যক মানুষ নতুন করে ভিখারি হয়। খাদ্যের জন্য মানুষ স্ত্রী, পুত্র সন্তানদেরকেও বিক্রি করতে দ্বিধাবোধ করে না। নর্দমার মধ্যে কুকুরের সাথে উচ্ছিষ্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে থাকে অনাহারে ভুগতে থাকা মানুষগুলো। তিনি একই বইয়ে আরও বলেছেন, দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিটির সরকারি বিবরণ অনুসারে বাংলাদেশের ৬ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষের জীবন দুর্ভিক্ষ দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাংলার ৯০টি মহকুমার মধ্যে ২৯ টি মহকুমায় ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষের ভয়াল থাবা। বাংলাদেশের ৮২ হাজার ৯ শত ৫৫ কিলোমিটার মধ্যে অধিকাংশ অঞ্চলেই দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।</p>
<p><strong>এভাবে যখন অবস্থা আরও নিম্নগামী হতে থাকে ঠিক এ সময়ই ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করতে থাকে এ অঞ্চল থেকে চলে যাওয়ার। তাদের শোষণের, জুলুমের পন্থাকে পরিবর্তন করার। কথিত স্বাধীনতা তথা তাদের ভাষায় পাওয়ার ট্রান্সফার করার চিন্তা। সে সময়ের বগুড়া জেলার একটি গ্রামে তাঁতিদের সম্পর্কে জনযোদ্ধার একটি রিপোর্টে বলা হয়, দশটিকা গ্রামে ২০০ জন তাঁতির বসবাস। তাদের মোট সংখ্যা ১৭৩ এবং ২৫ জনের ৪-৫ বিঘা করে আবাদী জমি ছিল। দুর্ভিক্ষ সময় ৫০ জন লোককে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে বাঁচতে হয়েছে। আর বাকীরা অসুস্থ থেকেই মারা গিয়েছে।</strong> যারা বেঁচে আছে তারাই জমি বিক্রি করে দিন মজুর হয়েছে। আর বাকীরা তাদের বাড়ি- ঘর বন্ধক রেখে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছে। এটি শুধু দশটিকা গ্রামে নয় গোটা অঞ্চলের একই অবস্থা। ভবানী সেনের ভাষায় এসময় যাদেরও কিছু কিছু জমি ছিল তারাও সকল জমি হারিয়ে ফেলে। কেউ বিক্রি করে আবার কেউ বন্ধক রাখে। এর মধ্য দিয়ে অধিকাংশ কৃষক এবং সাধারণ মানুষ তাদের অবস্থান থেকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়। ভবানী সেন উক্ত গ্রন্থে আরও বলেন, দুর্ভিক্ষের সময় একটি হিসাব অনুযায়ী ৩৫ লক্ষ মানুষ মারা গেছে কিন্তু যারা বেঁচে আছে তারাই আজকের দিনে আরও সমস্যায় আছে। কেননা এলাকা গুলিতে শতকরা দশ জন লোক এতো বেশি দুস্থ ও রোগাগ্রস্থ যে তাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। প্রায় ১২ লক্ষ লোক নতুন করে ভিখারি হয়েছে। একেবারে ভিখারী না হলেও রিক্ত হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা ৬০ লক্ষ।</p>
<p>এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে, এতো বিশাল উন্নত সালতানাত ২৯% জিডিপি নিয়ন্ত্রণকারী ইসলামী সভ্যতা যেখনে মাত্র ২০% মুসলিম ছিল আর বাকী সবাই ছিল অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সেখানে মুসলিমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং কৃষি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলো যেখানে সাধারণ যাকাত নেওয়ার মতো লোক পাওয়া যেতো না। যে অর্থনৈতিক অবস্থা এতো উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো সেখানে কি এমন হলো যে, তারা তাদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এভাবে দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষ, মৃত্যুর পর মৃত্যু, শোষণের পর শোষণ শুরু হলো তা আমাদের উপলব্ধি করার সময় কি এখনো আসেনি?<br />
তারা কথিত স্বাধীনতা দেওয়ার পরেও পুরো উপমহাদেশ জুড়ে এমন এক অবস্থা বিরাজ করছিল যে, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা অঞ্চলে একটি পর একটি দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকতো যা চির দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত হয়েছিল। এসময় থেকেই শুরু হলো নতুন করে খাদ্যের অভাব এবং নানাবিধ দুর্ভিক্ষ। ব্যাপকতা, স্থায়ী প্রাণহানির দিক দিয়ে দুর্ভিক্ষ ভারতের ইতিহাসে নতুন আরেক রেকর্ড স্থাপন করল। অর্থাৎ ব্রিটিশরা থাকা অবস্থাতেই যে পরিস্থিতি ছিল তারা চলে যাওয়ার পরও সে অবস্থা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলো। অর্থাৎ এ শাসন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো সময় হয়েছে কিনা কিংবা এতো নিকৃষ্টতর শাসন পৃথিবীর ইতিহাসে আদৌ সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। পাশাপাশি তারা চলে যাওয়ার পর যে নয়া ব্যবস্থা রেখে গেলো তার ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আজও বিদ্যমান। তা পরবর্তীতে বা গত ৫০-৬০ বছরের অর্থনৈতিক অবস্থা, কৃষির দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্র্য অবস্থা দেখলেই টের পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h5>ব্রিটিশ পরবর্তী বাংলা অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্য :</h5>
<p>১৯ শতকের শেষের দিকে দুনিয়ার অবস্থা নানাভাবে পরিবর্তীত হতে থাকে। বিশেষ করে উসমানী খিলাফতের পূর্ণাঙ্গ পতনের পর দুটি বিশ্ব যুদ্ধ এবং ইয়াল্টা কনফারেন্সের মাধ্যমে পরবর্তীতে দুনিয়ায় নতুন এক রূপরেখা তথা নয়া বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর সরাসরি শাসনের পন্থা থেকে সরে এসে যায়নবাদী গোষ্ঠীরা কথিত স্বাধীনতার নাম করে শোষণ এবং নিয়ন্ত্রণের ভিন্ন এক কৌশল প্রতিষ্ঠা করে। ফলে উপমহাদেশ থেকে তারা চলে যাওয়ার পরও শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদীতা এক বিন্দুও কমে যায়নি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কৃষিক্ষেত্রে, খাদ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকট বিদ্যমান ছিল স্বাধীনতার পর যেসকল শাসক ক্ষমতায় আসীন হন তারা সেই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে মুকাবিলা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন। আর এ পরিস্থিতির উত্তোরণে তারা তাদের নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার কৌশল প্রয়োগ করে। তারা বুঝাতে শুরু করে যেহেতু অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি ভালো না সেহেতু নির্দিষ্ট কিছু শর্তের বিনিময়ে তোমরা ঋণ গ্রহণ কর। আর তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্র সে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য ছিল কেননা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর ছিল। আর এই ভংগুর অর্থনীতির উত্তোরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে পাশ্চাত্য জায়নবাদীরা গরিব শ্রেণির মানুষদের ঋণ দিতে থাকে, সামাজিক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। এসকল ত্রাণ এবং সামাজিক সংস্থাও ছিলো নয়া ষড়যন্ত্রের অংশ।</p>
<p>সেসকল সহযোগিতা ও ত্রাণের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল তাদের তৈরিকৃত বীজ এবং প্রদানকৃত খাদ্য। রাষ্ট্র এক্ষেত্রেও বীজ ও খাদ্য গ্রহণে বাধ্য ছিলো। ফলশ্রæতিতে এসকল ঋণ গ্রহণের শর্ত, ত্রাণ প্রদান, নানা সহযোগিতাসহ সব মিলিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় নয়া এক কৃষি ও খাদ্যনীতি। মূলত তারা কৃষি বিল্পবের নাম করে নতুন এক কৃষি ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে। ২০০ বছরের জুলুম ও নয়া কৌশলের মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যায় উপমহাদেশের নানা জাতের ফসল। অথচ এক সময়ে কয়েক প্রকারের ফসল এ অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল, কয়েক ধরণের বীজ এখানে উৎপন্ন হতো। তা অল্প বিস্তর শুরুতেই বলা হয়েছে। কিন্তু সেই অঞ্চলেই তারা সকল বীজ এবং ফসল কে নষ্ট করে দিয়ে স্বাদবিহীন ফার্মের ফসল তথা হাইব্রিড ফসলের দিকে নিয়ে যায় গোটা জাতিকে। এই বীজ এবং হাইব্রিড ফসলের মধ্য দিয়ে আমদানি হয় নানা ধরণের রোগব্যাধির। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি আমেরিকা, আফ্রিকা ও উপমহাদেশে তাদের শাস্তি এবং গণহত্যার অন্যতম ভিত্তি ছিল নানা ধরণের রোগ সৃষ্টি করে হত্যা করা, নিয়ন্ত্রণ করা। আবার পরিস্থিতিও এমন একটি জায়গায় চলে যায় যেখান থেকে চাইলেও বের হতে পারছিলো না রাষ্ট্র তথা কৃষিব্যবস্থা।<br />
এরই পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন অভ্যন্তরীণভাবে এমন এক কোন্দলপূর্ণ অবস্থায় গিয়ে পৌঁছায় যে জন্য এসকল বিষয়ের প্রতি কারোর দৃষ্টিপাত করার সময় হয়নি বা আজও পর্যন্ত হচ্ছে না। এভাবেই পাশ্চাত্য তার জায়নবাদ নীতি দিয়ে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কৃষি প্রযুক্তিতে বীজের ধারণা ও খাদ্যনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এটিও আন্তর্জাতিক শোষণের একটি অংশ এবং জায়ানবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের একটি হাতিয়ার। তাদের সরাসরি শাসন পরবর্তী কথিত স্বাধীন অঞ্চল গুলোতে দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট এমনভাবে বিদ্যমান ছিলো যার থেকে উত্তোরণ ঘটানো আমাদের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। আর এই সুযোগটিই তারা বিভিন্নভাবে কাজে লাগায়। তারা নতুন নতুন পন্থা, কৌশল রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরতে থাকে। ফলশ্রæতিতে ৬০ এর দশকে কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কোনো ধরণের সত্যিকার পলিসি নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু সেসময়ের সরকারি ব্যবস্থাপনায়, খাদ্যনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন সব জায়গায় রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৌশল বাস্তবায়ন করা হয়। কারণ দরিদ্র দেশ শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশসহ আফ্রিকার প্রত্যেকটি উপনিবেশিক শাসন পরবর্তী অঞ্চলে উন্নত টেকনোলজির ব্যবস্থা ছিলো না, ছিল অশিক্ষিত শ্রেণী বা শিক্ষার হার ছিল না, গৃহযুদ্ধে ভরে গিয়েছিলো অঞ্চলগুলো। দুর্ভিক্ষ প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলশ্রুতিতে এই দরিদ্র দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ নিতে বাধ্য হতো। আর এই ঋণ দেওয়ার সময়ই তারা এ সকল নীতি পরিবর্তনের শর্ত দেয়।<br />
তখনই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সব জায়গাতেই খাদ্যের সংজ্ঞায়নে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। ইসলামী সভ্যতার খাদ্যনীতি হচ্ছে,</p>
<ul>
<li>স্বাস্থ্যকর ও উপকারী,</li>
<li>পুষ্টিকর,</li>
<li>হালাল।</li>
</ul>
<p>কিন্তু তারা খাবারের সংজ্ঞায়নে তুলে ধরে,</p>
<ul>
<li>পুষ্টি নয় পরিমাণে বিশ্বাসী।</li>
<li>উপকারে নয় বরং চাকচিক্য ও স্বাদে বিশ্বাসী।</li>
</ul>
<p>তারা শুধু মাত্র শিক্ষা দিয়ে নয় মিডিয়ার মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করতে থাকে যার ফলে তাদের খাদ্যগুলো একেকটি ফ্যাশনে পরিনত হয় এবং প্রত্যেক জনগণের মাথায় চিন্তাগতভাবে এ খাদ্যের সংজ্ঞাকে, মডেলকে পুশ করা হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ নিপতিত নতুন এক আগ্রাসনের সমুদ্রে।</p>
<p>কিন্তু লক্ষ্য করুন, তারা ঋণ দিয়েছে বিপরীতে কিন্তু তারা শিক্ষাকে উন্নত, প্রযুক্তিকে উন্নত, গবেষণাগারকে উন্নত করার ব্যাপারে কোনো ধরনের জোর দেয়নি। ৮০’র দশকে ৯০’র দশকে এই নীতি চলমান অবস্থায় তারা কথিত দুর্ভিক্ষ দমনের নাম করে হাইব্রিড ধান নিয়ে আসে এবং হাইব্রিড ধান দ্রুত উৎপন্ন হওয়ার ফলে মনে করে কৃষির ক্ষেত্রে সত্যিই বিপ্ল­ব হচ্ছে। অথচ আমাদের সত্যিকারের বীজ, আমাদের উর্বর জমিতে যদি বাংলা সালতানাতের মতো করে চাষাবাদ করা যেত তাহলে সাধারণ ভাবেই অনেক বেশি ফসল উৎপন্ন হতো যার দ্বারা খাদ্য সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই ধরণের যোগ্যতা, কৌশল এবং চিন্তাধারা না থাকায় যায়নবাদীদের ফসল নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।</p>
<p><strong>এ ফসল একইসাথে প্রভাব ফেলছে আমাদের মানসিক অবস্থায়, আমাদের মনস্তত্ত্বে। মাওলানা মওদূদী তর্জমানুল কোরআনে এক প্রবন্ধে লিখেন-</strong></p>
<p><strong>“ইসলাম শূকর এবং মদ শুধুমাত্র এ কারণে নিষিদ্ধ করেনি যে তা শরীরের জন্য অপকারী। বরং তা একইসাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। খাদ্য শুধু মানুষের শরীরেই নয় বরং তাঁর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে।” </strong></p>
<p>ইসলাম খাবারের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে হালালকে, তাঁর পেছনের দর্শন মূলত এটি। কারণ খাবার শুধু বাহ্যিক প্রভাবই রাখে না একইসাথে আভ্যন্তরীণ ও নৈতিক প্রভাবও বিস্তার করে। অঞ্চলোপযোগী, উপকারী, পবিত্র ও হালাল খাবারের বিপরীতে এমন খাদ্যের মডেল যায়নবাদীরা হাজির করেছে যা মানুষকে অস্থিরমতি করে ফেলে, তাঁর নৈতিক জায়গাকে প্রভাবিত করে। সমকামিতার ন্যায় মানবপ্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজগুলো প্রসার লাভের পেছনেও খাদ্যের প্রভাব বিদ্যমান। খাদ্যের সাথে কৃষি এবং ভ‚মিব্যবস্থা আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আমরা এগুলাকে কবীরা গুনাহ বলে ফতোয়া দিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক সমাধান খোঁজায় রত থাকি। প্রশ্ন হলো- আন্তর্জাতিক বীজনীতি, আমাদের অঞ্চলে তাদের শোষণ ও ভূমিব্যবস্থা পরিবর্তন, খাদ্যের নৈতিক প্রভাব, খাদ্য রাজনীতি সর্বোপরি কৃষিব্যবস্থার ভয়াবহ সংকট এবং সমাধানের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে রাজনৈতিক এবং সামগ্রিক সমাধান না খুজে ধর্মতাত্তি¡ক সমাধান হাজির করলেই কি সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব?</p>
<p>এই হাইব্রিড ফসল যখন দেয়া হলো আর তাদের বীজের মধ্যেই যেহেতু সমস্যা সুতরাং এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য তারা নতুন করে প্রদান করল সার আর কীটনাশক সিস্টেম। অর্থাৎ একজন সুস্থ মানুষকে ইনজেকশন দিয়ে অসুস্থ করে দেয়া শুরু হলো। আমাদের জমি ছিল উর্বর। সে জমিতে সার এবং কীটনাশকগুলোকে ইনজেকশনের মতো পুশ করা শুরু হলো। সেখানে উৎপাদিত হওয়া শুরু হল হাইব্রিড ধান। ফলাফল হিসেবে সাময়িক উৎপাদন হলেও মাটি তার উর্বরতা হারাতে শুরু করলো, পানি দূষিত হতে হতে লাগল। গত ৪০ বছর যাবৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি এই জমির ফলন ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ২০০ বছর পরে কি হতে পারে তা নিয়ে কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? ৫০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন খরচ কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০০ বছর পর এই অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, তা কি আমরা একবারও ভেবেছি? কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য তো পাচ্ছেই না উপরন্তু নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।</p>
<p>গবেষকদের মতে, “খাদ্যের সংজ্ঞাতে পরিবর্তন ঘটনো হয়েছে। খাদ্যের সংজ্ঞা নির্ণয়ে দানাদার খাদ্যকে প্রধান খাদ্যের (Staple Food) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; খাদ্যের পুষ্টিগুণের চেয়ে পরিমানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মেক্সিকো সরকার ও রকফেলার ফাউন্ডেশান ১৯৪৩ সালের দিকে ‘সবুজ বিপ্ল­ব’-কে একটি কৃৎকৌশলগত প্যাকেজ হিসেবে দেখানোর জন্য ‘বিশেষ গবেষণা’র উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগ ১৯৬০ দশকে পুনর্গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (International Rice Research Institute) হিসেবে। স্থানীয় পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্য এবং চাষের জমির বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ধানের জাতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।</p>
<p>তথাকথিত অনুন্নত দেশগুলোকে রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৃৎকৌশল চাপিয়ে দেওয়া সহজ ছিল না। সেটা তারা করেছে বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার শর্ত হিসেবে। ষাটের দশকে বিশ্ব ব্যাংকের শর্ত মেনে তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুব খান সরকার উফশি বীজ প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যার মূলে শুধু উফশী বীজ নয়,একই সঙ্গে ছিল রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার। এবং তা এসেছিল সুদূর আমেরিকার ফোর্ড এবং রকফেলার ফাউন্ডেশানের আর্থিক কল্যাণে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সহযোগিতা করেছিল প্রাণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ দেশগুলোতে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কৃষিকে ‘উন্নত’ করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সকল রাসায়নিক পদার্থের বা বিষাক্ত দ্রব্যের জন্য বাজার তৈরির দরকার ছিল। ‘সবুজ বিপ্ল­ব’ বা এৎববহ জবাড়ষঁঃরড়হ আসলে নিছকই বৈজ্ঞানিক ব্যাপার ছিল না। এটি ছিল একটি কৃৎকৌশলগত প্যাকেজ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর আধুনিক বিজ্ঞানের কৌশলগত ব্যবহার। যুদ্ধে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক উদ্বৃত্তের বাজার তৈরির জন্য এমন ধানের জাত উদ্ভাবিত হল যেসব জাত চাষের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। সর্বোপরি এটা বাস্তবায়িত করতে কৃষক নয়, কৃষি ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা, ল্যাবরেটরির গবেষকদের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সব কিছুরই মিলিত প্রকল্প ছিল গ্রিন রেভুলিউশান (সবুজ বিপ্ল­ব)। অধিক উৎপাদন করে মানুষকে ক্ষুধা থেকে বাঁচাবার কথা বলা হয় বটে, আসলে সবুজ বিপ্লবের মূল কাজ ছিল ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশিল বীজের সাথে কৃত্রিম সার ও কীটনাশক এবং তার সাথে সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। কর্পোরেট কৃষির বীজ বপন এখান থেকেই শুরু।</p>
<p>গবেষকগণ বলেন, “সেই ষাটের দশক থেকে পৃথিবীতে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি চলছে। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের সরকারি দপ্তর থেকে থেকে বলা হয়, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা পেতে হলে উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত এসে দেখা গেল উফশী ধান চাষ করে মানুষ খাদ্যে নিরাপত্তা পায়নি। বিপরীতে মানুষ ব্যাপকভাবে খাদ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। উফশী জাতের ধান চাষ করতে গিয়ে যে সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে একদিকে মাটির উর্বরতা কমেছে, অপরদিকে অপকারি পোকা মারতে গিয়ে উপকারি পোকাও মারা গেছে। তাই গাছের পরাগায়নে মধুপোকা বা প্রজাপতি এখন আর ফসলের মাঠে দেখা যায় না। তাছাড়া মানুষ একবার জমি চাষ করে তিন চারবার ফসল তুলত। ধান পাকলে মাষকলাই মাঠে থাকত, একইসাথে তিলও চাষ করা হত। এতে জমির উর্বরতা কমত না, মাটির ক্ষয়ও রোধ হত। কিন্তু একই জমিতে পরপর ধান চাষ করায় প্রতিবারের জন্য নতুন করে জমি চাষ করতে হচ্ছে। তাতে যেমন মাটির ক্ষয় হচ্ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে উর্বরতা। এছাড়া ফসলের মাঠ এবং বাড়ির আঙ্গিনায় প্রকৃতিকভাবে হওয়া বিভিন্ন লতাগুল্ম পাওয়া যেত। কিন্তু নানা ধরনের কীটনাশক ও আগাছানাশক ওষুধ দেয়ায় আগাছার সাথে প্রকৃতিকভাবে হওয়া পুষ্টিগুণ-সম্পন্ন এসব লতাগুল্মও মরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল উফশী চাষ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলা হলেও তা সম্ভব হয় না।</p>
<p>৯০-এর দশক পরবর্তী সময়ে নতুন ধাচের হাইব্রিড বীজ প্রথমবার সরবরাহের পর দ্বিতীয় ধাপ থেকে বীজ দেয়া শুরু করল সরকারের সাথে সরাসরি চুক্তিতে থাকা প্রাইভেট কোম্পানিগুলো। হাইব্রিড এই বীজ থেকে যে ফসল উৎপাদিত হচ্ছে তাতে সার এবং কীটনাশক দিতে হচ্ছে। কৃষি বিশ্লেষকেরা বলছেন, হাইব্রিড বীজের একচ্ছত্র মালিকানা কোম্পানির সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে এবং গুটি কয়েক কোম্পানির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকছে। যেমন ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী মনসান্টো ৪,৯৬৪ মিলিয়ন ডলারের বীজ ব্যবসা করে এবং মালিকানাধীন বীজের বাজারের ২৩% নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরে রয়েছে ডু-পন্ট (১৫%), সিনজেনটা (৯%) । মাত্র ১০টি কোম্পানি পৃথিবীর মালিকানাধীন বীজের বাজার দখল করে আছে। তার মধ্যে উল্লেখিত তিনটি কোম্পানি ৪৭% বাজার দখল করে আছে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্ব কৃষি ব্যবস্থায় গুটিকয়েক বহুজাতিক কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।</p>
<p>এর ফলাফল হচ্ছে চকচকে সুন্দর সবজি উৎপাদন হলেও জমির অবস্থা ক্রমেই নষ্ট হতে শুরু করছে। মানুষ ভয়াবহ দুর্বলতা ও নতুন নতুন রোগের মধ্যে নিপতিত হচ্ছে। GMO (Genetically Modified Organism) হচ্ছে, বীজের মডিফাই করণ। বিশ্বব্যাপী শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে বীজ আসতে শুরু করলো। যা গবেষক ও বিজ্ঞানীদের ভাষায় এখনো পর্যন্ত অস্পষ্ট। কিন্তু ফলাফলস্বরূপ মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে। ক্যান্সারসহ সব ধরণের ভয়াবহ রোগ যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তা আশংকাজনক। মোট মৃত্যুর ৬১ ভাগই হচ্ছে এইসকল খাদ্য, বীজ ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে। বর্তমানে ৮০ ভাগ খাদ্যে ক্যামিকেল মিশানো হয়। ৬৭ ভাগ জমিতে কীটনাশক ছিটানো হয়। যার ফলে রোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের সাথে উপযোগী পোকা গুলিও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যেমন জোনাকী পোকা আজ বিলুপ্তির পথে। বাৎসরিক কৃষি পরিসংখ্যান গ্রন্থে (Yearbook of Agricultural Statistics in Bangladesh, 2009) দেখা যায়, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কীটনাশক ব্যবহারের পরিমান ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১৯৯৩ সালে ছিল ৭৬৬০.৩৯ মেট্রিক টন, ২০০৭ সালে তা হয়েছে ৩৭৭১২.২০ মেট্রিক টন, অর্থাৎ ৩৯২% বেড়েছে। উল্লেখ্য ধান ও অন্য ফসলে হাইব্রীড বীজের ব্যবহার ১৯৯৮ সাল থেকে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।</p>
<p>সরাসরি হাতের সাহায্যে জমিতে এই কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীর ৬০ শতাংশ হচ্ছে কৃষক। কারণ এই কীটনাশক খালি হাতে তারা ব্যবহার করে।</p>
<p>পানিতে বিভিন্ন ধরণের কেমিকেল ও কারখানার ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থের দরুন পানি দূষণের কারণে জমি নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষকরা এভাবেই প্রতিদিন দারিদ্রতার কাছে হার মানছে। শুধু কি তাই, জাতিসংঘ কর্তৃক কৃষিতে ব্যবহৃত ১২টি কীটনাশক নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তা বাংলাদেশে অবলিলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এসকল কীটনাশকগুলো ব্যবহারের ফলে লিভার, কিডনী, স্তন ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, ত্বকের সমস্যাসহ নানা ধরণের সমস্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই সব কিছুর কারণ এই ধরণের সার, কীটনাশক এবং বীজ ব্যবস্থা। এতো কিছু ব্যবহারের পরেও ৮৪% কৃষক গড়ে মাত্র ৩ একর জমিতে চাষ করে। চাষ করার পরও তারা ন্যায্যমুল্য পাচ্ছে না। চড়া সুদ দিতে হচ্ছে। যার কারণে খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে আরও কমদামী হাইব্রিড বীজ, কীটনাশক, সার কিনছে। ফসল বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের ক্যামিকেল বা ঔষধ ব্যবহার করছে। কিন্তু তবুও তারা তাদের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না এবং পরিবারকে চালাতে পারছে না। কারণ এসব কিছু নির্দিষ্ট একটি চক্রের হাতে বন্দি।<br />
এই চক্রগুলোর কাছে বন্দি হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, যেসব বীজ কোম্পানি গুলো আমাদেরকে বীজ দিয়ে থাকে তারাই প্রত্যেকটি ঔষধ কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ। অর্থাৎ তারা যে রোগের ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঔষধ কোম্পানিগুলো সে রোগের ঔষধ তৈরি করছে। আমরা ভাইরাস খাচ্ছি আবার তাদেরই দেওয়া ঔষধও ভক্ষণ করছি।</p>
<p>আলোচনার শুরুতে উল্লেখিত আয়াত দুটির কথা এবারে যদি চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাচ্ছি ইয়াহুদিরা সারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রন করছে। এবং তারা আমাদের দেশে এসে কিভাবে এবং কেন শস্যক্ষেত এবং মানব বংশকে ধ্বংস করছে তার উত্তর পাচ্ছি কি?<br />
<strong>এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭০ সালে বলেছিলেন “Control oil and you control nations; control food and you control the people.” অর্থাৎ, যদি তুমি তেলকে নিয়ন্ত্রন কর তাহলে তুমি একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে আর যদি তুমি খাদ্যকে (বীজ) নিয়ন্ত্রন কর তাহলে মানুষকে অর্থাৎ সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।</strong></p>
<p>আর এটিই তারা সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করে চলেছে। যেমন, তাদের বীজ ও খাদ্য কোম্পানী সারা দুনিয়ার কৃষি ও খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃষিপণ্য এবং কীটনাশক উৎপাদনকারী নিয়ন্ত্রণকারী বৃহৎ কোম্পানিসমূহ :</p>
<ul>
<li>1| Cargill</li>
<li>2| Bayer</li>
<li>3| DuPont</li>
<li>4| Monsanto</li>
<li>5| Syngenta</li>
</ul>
<p><strong>এই কোম্পানিগুলো বীজের পাশাপাশি খাদ্যকেও নিয়ন্ত্রণ করে। গত শতকে এইডস, ডায়াবেটিস, বার্ডফ্লুসহ আরও অনেক রোগের জীবাণু ছড়ানোর পেছনে এরাই দায়ী। যেমন, চিনি, গম, চালের জিনের সাথে তারা ডায়াবেটিস-সহ আরও নানাবিধ রোগ মিশয়ে দিয়ে থাকে। তার অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চকলেট এবং চিনিজাত পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হল নেসলে (Netsle) আবার ডায়াবেটিকস কিংবা চিনি খাওয়ার ফলে যে সব অসুখ শরীরে দানাবাঁধে তার মেট্যাংস (Metanx) নামক ঔষধও তৈরি করে এই একই কোম্পানি!</strong></p>
<p>ভয়াবহ এই আগ্রাসনকে তুলে ধরার জন্য অনেক গবেষকগণ কাজ করে যাচ্ছেন! তন্মধ্যে F. William Engdahl এর লেখা <em>Seeds of Destruction: The Hidden Agenda of Genetic manipulation</em> নামক বইটি অন্যতম।</p>
<p>এসব সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফলাফল স্বরূপ আমাদের স্বাস্থ্য খাত, আমাদের শারীরিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা, পরিবেশের অবস্থা এতোটাই নিম্নগামী যেখানে আমাদের গড় আয়ু ছিল ৮০-৯০ বছর এখন তা কমতে কমতে ৪০ এর কোঠায় এসে নেমেছে। হঠাৎ মৃত্যু, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, নানা ধরণের ক্যান্সার, রোগ বৃদ্ধি, শতভাগ মানুষ আজ দুর্বলতার মধ্যে ভুগছে, গ্যাস্ট্রি, কিডনী ইত্যাদিতে ভুগছে। প্রতিটি ঘরের প্রত্যক ব্যক্তি আজ গণহারে অসুস্থ। সুস্থ হওয়ার কোনো পথ নেই কারণ তাদেরই দেওয়া ঔষধ খেয়ে সুস্থ হওয়া লাগবে!</p>
<p>তাই স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় তাদের দেওয়া স্বাধীনতা, ঋণ, সহযোগিতা, ত্রাণ কোনো কিছুই মানবতার জন্য না। পুরোটাই মূলত শোষণের উদ্দেশ্যে। তাদের হাতে গড়ে ওঠা কিংবা তৈরী হওয়া একটি শ্রেণির বয়ান হাজির করে কথিত উন্নয়নের কৃষি, বিজ্ঞানের বিপ্লবের। কিন্তু বাস্তবিক অবস্থা কি তা তো আমরা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি।</p>
<p>এসব বিষয় যে আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করে সচেতনতা তৈরি করব, এর থেকে মুক্তির পথ খুঁজব এর জন্য শক্তিশালী কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই কোনো কার্যকরি উদ্যোগ। প্রতিটি সেক্টর এখন পুরোপুরিই বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে বন্দি। সত্যিকারের মুক্তি জন্য নয়, স্বাধীনতার জন্য নয় দুর্ভিক্ষ কিংবা ক্ষুধা থেকে বাঁচাবার জন্য নয় এই সবকিছু একটি দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ভয়াবহ ধাপ।</p>
<p>কৃষকেরা জমিতে সার-কীটনাশক ব্যবহার করছে কৃষির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য। কিন্তু তারা কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় ঋণ পাচ্ছে না, স্থায়ী পুঁজিও নেই তাদের। তাহলে তারা কীভাবে এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? সমাধানস্বরূপ তারা বিভিন্ন এনজিও, গ্রামের মহাজনদের কাছে ঋণের জন্য হাত পাতছেন। এছাড়া আছে ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। কিন্তু এগুলোর প্রতিটিতেই রয়েছে সুদের মহা কারবার। একজন সবজি চাষীর ভাষ্যমতে তাকে ১০০ টাকায় সুদ দিতে হচ্ছে ২১ টাকা। এতে তার লাভের পরিমাণ ১০০ টাকায় ১০৫-১১০ টাকা। কুটির শিল্প, মৎস শিল্পের সাথে জড়িতদের সুদ দিতে হয় ১৭% যেখানে লাভ হয় ১৫%। বোঝাই যাচ্ছে গ্রামীণ সুদের কী ভয়াবহ অবস্থা!</p>
<p>কৃষিতে ভয়াবহ লোকসান কিংবা লাভ এত কম হওয়ার পিছনের কারণ খুঁজলে দেখবো সমগ্র বিষয়ের পেছনে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট কাজ করে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেক দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের যাতায়াত ব্যবস্থার যে করুণ দশা, তাতে নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য নিয়ে যেতে বেশ কাটখড় পোড়াতে হয়। এরপর শুরু হয় চাঁদাবাজি! নানা জাতীয় সিন্ডিকেটের কারণে রংপুরের ২ টাকার টমেটো আমাদের হাতে আসতে আসতে দাম হয়ে যায় ৪০ টাকা। কিন্তু কৃষক তো সেই উৎপাদন মূল্য দুই টাকাই পাচ্ছে! খরচ হচ্ছে ২ টাকা, বিক্রিও করছে ২ টাকায়। আর আমরা যারা ক্রেতা, তারা কিনছি ৪০ টাকায়। এই বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দূর্নীতি, আখলাকবিহীন অবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকসমাজ এবং সাধারণ মানুষ। লাভ হচ্ছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের।</p>
<p>LLRD-এর মতে বর্তমানে ৫০% পুরুষ এবং ৬০% নারী কৃষক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ, অন্যান্য চাহিদার কারণে তারা নিজেদের উৎপাদিত শাক-সবজি, নিজেদের চাষ করা মাছ নিজেরাই ভোগ করতে পারছে না। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সন্তানেরাও। আর তারা যতটুকু গ্রহণ করতে পারছে, সেটাতেও আছে কীটনাশক, সার আর ভেজালের সমাহার। তাহলে চিন্তা করে দেখুন! এই চাষী, হাওড়-নদীর জেলে, প্রান্তিক ও ভ‚মিহীন কৃষক, নারী কৃষক, কুটির-শিল্পীদের নিয়ে, তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে কি আমরা একটুও ভাবছি? রাষ্ট্রের কোনো সহযোগিতা বা উদ্যোগ কি আছে? আছে কি কোনো পরিকল্পনা, পর্যালোচনা বা প্রস্তাবনা? অর্থাৎ তারা যা-ই করছে সবটাই গ্রামের মহাজনদের কাছ থেকে সুদ নিয়ে। এতে করে তাদের দারিদ্র্য তো কোনো অংশে কমছেই না, বরং দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। তাদের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থার করুণ দশা। এমনকি শিক্ষা থেকেও তারা অনেক অনেক দূরে।</p>
<p>কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। অথচ বর্তমানে ধান ব্যতীত যাবতীয় কৃষিদ্রব্য আমদানি করতে হচ্ছে। সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ধান উৎপন্ন হচ্ছে। আর যতটুকুই উৎপাদিত হচ্ছে, তা মজুদ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই! তাহলে বাকি ফসল কোথায় যাচ্ছে? মহাজনেরা, বিভিন্ন কোম্পানি কিংবা সাধারণ ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছে। যার ফলে কৃষকরা তাদের কষ্ট, শ্রম, বিনিয়োগের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এমনকি সরকার রাষ্ট্রীয় গুদামের ধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি করছে না।</p>
<p>যারা ধান চাষ করে তাদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি, ২০০২ সালে বর্গাচাষী অর্থাৎ ভ‚মিহীন চাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা ৪৫%, ২০১৬ তে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫% এ। বর্তমানে এ সংখ্যা ৭০% ছাড়িয়ে গেছে। তাহলে ভেবে দেখার বিষয় এই ৭০% কৃষক যেখানে ভ‚মিহীন এবং তাদের চাষকৃত ফসলের ৫০% মালিককে দিয়ে দিতে হচ্ছে, সেখানে এই কৃষকরা কি আদৌ তাদের পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে?</p>
<p>বাংলাদেশে তুলার মোট চাহিদা ৭৩-৭৪ লক্ষ বেল, অথচ দেশে মাত্র ১ লক্ষ ৭১ হাজার বেল তুলা উৎপন্ন হচ্ছে। বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন বাহির থেকে তুলা আমদানিতে আমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি বা অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার যথাযথ উপযোগ থাকলে তা দিয়ে দেশেই প্রায় কয়েক কোটি বেল তুলা উৎপাদন করা সম্ভব! অথচ আমরা ৯০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি কৃষিপণ্য আমদানি করে চলছি! মজার বিষয় হলো, কোনো এক বছরে যদি ১ লাখ ৭১ হাজারের স্থলে ২ লাখ বেল তুলা উৎপন্ন হয়, তাহলে মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাতি আমলা পর্যন্ত বলতে শুরু করবে, “আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।” কিন্তু মূল যে ক্ষতির জায়গাটা, তা আমরা কেউ-ই লক্ষ্য করছি না।</p>
<p>দুধ সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য উপাদেয় একটি খাবার। কিন্তু আমরা কি দেশের মানুষের দুধের চাহিদা মেটাতে পারছি? দেশের ডেইরি ফার্মগুলোর দ্বারাও কি এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে? অথচ এই দুধকে কেন্দ্র করে ৪০-৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেই!</p>
<p>বাংলাদেশের মৎস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশে প্রায় হাজারের উপরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত; এখন হাইব্রিড পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া ছাড়া তেমন কোনো মাছ সহজলভ্য নয়। নদী দূষিত হওয়া, অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকায় আমাদের যে বিশাল রপ্তানি শিল্প তা আজ ধ্বংসের মুখে। হাইব্রিড মুরগী আর ডিমের কথা না হয় বাদই থাকলো!</p>
<p>আমরা লক্ষ্য করছি, পাটশিল্পের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আজ বেকার। পাটকলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হল। অথচ এই পাট ছিল আমাদের সোনালি আঁশ। যতটুকু ছিল, সেটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হল। চাইলেই কি এখানে লক্ষ লক্ষ কিংবা কোটির উপরে কর্মসংস্থান করা যেত না?</p>
<p>দেশের অন্যতম একটি বড় শিল্পক্ষেত্র হল চা। চা শ্রমিকদের নিয়ে কোনো আলাপ নেই, নেই কোন উদ্যোগও। তাদেরকে ন্যায্যমূল্য দিয়ে, এখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব ছিল। আমাদের ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, আমাদের মাছ, পাট, চা, তুলা, মসলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি আমরা যথাসময়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতাম, তাহলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হত না। এভাবেই চিনিকল থেকে শুরু করে আমাদের সকল ধরণের ফসল ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুধু ধান ছাড়া প্রত্যেকটি ফসল আমদানী করা হচ্ছে।</p>
<p>গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা, নারীরা এবং তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না তাদের সঠিক চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সকল ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যতটুকুই বা খাদ্য পাচ্ছে সেটুকুও ভেজাল মিশ্রিত। এগুলো খেয়ে রোগাগ্রস্থ হওয়ার পরেও পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা পেলেও যে ঔষধ আমরা ভক্ষণ করি তা সেই একই চক্রের ফসল।</p>
<p>কথিত যে নয়া ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক উপলব্ধি, সচেতনতা তৈরি ব্যতীত মুক্তির পথ খোঁজা আকাশকুসুম কল্পনা। শুধু বীজ, খাদ্য ও ওষুধ নয় প্রত্যেকটি সেক্টর-ই আজ পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দি। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এরবাকানের ভাষায়, “<strong>আমরা সবাই যায়নবাদের কারাগারে বন্দী, সেখানে আমরা কতিপয় অবাধ্য কয়েদি। কিন্তু দিন শেষে সবাই কয়েদী।”</strong></p>
<p>মুক্তি জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাবনার আলোকে সামনে অগ্রসর হয়ে নতুন বাংলাদেশ তথা হারানো ঐতিহ্যের বিনির্মাণ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বের সেই সোনালী ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা কাজ করি তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব। কেননা আগের সেই খনিজ সম্পদ, জমি, বনাঞ্চল, কৃষক, মানব সম্পদ, নদী, সমুদ্র এখনও বিদ্যমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 556px; top: 10867.4px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/agriculture-and-food-system-in-the-bengal-region-islamic-civilization-in-context/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16160</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা &#8216;বাংলা&#8217;</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2025 13:55:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16044</guid>

					<description><![CDATA[ভাষা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বাহক। এজন্য একটা ভাষার ভাণ্ডার যতবেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, ওই ভাষার সংস্কৃতি ও সমাজ ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একইসাথে ভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির বাহন হিসেবেই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ভাষা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং বাহক। এজন্য একটা ভাষার ভাণ্ডার যতবেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, ওই ভাষার সংস্কৃতি ও সমাজ ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একইসাথে ভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির বাহন হিসেবেই নয়, একটি স্বাধীন জাতির মূল প্রাণসত্তাও বটে। বাংলা ভাষা জনসংখ্যার দিক থেকে, ইতিহাসের দিক থেকে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা, আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। এজন্য ঢাকাও শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজধানী নয়, একটি দেশের প্রধান শহর নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা &#8216;বাংলা ভাষা&#8217;র রাজধানী। এই অঞ্চলে মানুষের আশা, জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, গৌরবগাঁথার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সামনে সর্বদাই দীপ্তিমান। নদীমাতৃক বাংলায় চিরসবুজ প্রান্তর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম উম্মাহর অধ্যুষিত বিভিন্ন দেশে এই বাংলা ভাষা সগৌরবে এই অঞ্চলের প্রাণসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>পশ্চিমের বিখ্যাত ভাবুক ও বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কির ভাষায়-</p>
<blockquote><p>&#8220;ভাষা কতিপয় শব্দের সমষ্টি নয়, এটা একইসাথে একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য, একটি জাতিসত্তার একীকরণ, একটি সামগ্রিক ইতিহাস যা একটি সমাজকে তৈরি করে। এর সবকিছুই একটি ভাষার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।&#8221;</p></blockquote>
<p>যেহেতু আমরা সকলেই জানি যে, সংস্কৃতির ভিত্তি হচ্ছে ভাষা। তাই ভাষার ভিত্তিকে শক্তিশালী না করে সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ অসম্ভব। যার কারণে আমাদের এ অঞ্চলে মুসলিম সালতানাতের সময়কালে কবি, সাহিত্যিক, বড় বড় চিন্তাবিদগণ এই ভাষাতেই তারা তাদের কাজগুলোকে সম্পাদন করেছেন। যেমন- বাংলা ভাষায় মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাংলা ভাষার সার্বিক বিকাশে মুসলিম কবি ও চিন্তাবিদদের অবদানের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো শাহ মোহাম্মদ সগীর লিখিত অমর সাহিত্যকর্ম &#8216;ইউসুফ জোলেখা&#8217;। &#8216;ইউসুফ জোলেখা&#8217; সাহিত্যিক উৎকর্ষ, ভাষার ব্যবহার, শব্দের বৈচিত্র্য, নানামুখী রূপক ব্যবহার এককথায় একটি অনন্য সাধারণ এবং পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যকর্ম হিসেবে গৃহীত। তাঁর এই অনন্য সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিপ্লবের সূচনা করে।</p>
<p>বাংলা ভাষার মহাকবি আলাওল ছিলেন তার সময়ের সবথেকে বড় ঔপন্যাসিক ও কালজয়ী কাব্যের স্রষ্টা। পক্ষান্তরে, ওই সময়ের আরেক কবি শেক্সপিয়র, যিনি একই সময়ে ইংরেজি ভাষাকে এক অর্থে জীবন দান করেছেন, তিনিও কিন্তু বিকশিত হয়েছেন আলাওলের পরে। এমনকি শেক্সপিয়ার মারা যাওয়ার দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে সে অর্থে আবিষ্কার করা হয়নি। অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার বহু পূর্বেই বাংলা ভাষা আলাওলদের হাত ধরে উৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং তার সে সমৃদ্ধশালী অবস্থান ধরে রেখেই নিরবচ্ছিন্নভাবে তৎকালীন সমাজ এবং রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে যাচ্ছিল। এবং গড়ে তুলেছিল এক বৈচিত্রময় অথচ শক্তিশালী সাংস্কৃ তিক ভিত্তি। পাশাপাশি কবি ফয়জুল্লাহর &#8216;গোরক্ষ বিজয়&#8217;, &#8216;গাজী বিজয়&#8217;, কবি আফজাল আলীর &#8216;নসিহতনামা&#8217;, কবি জৈনুদ্দিনের &#8216;রসুল বিজয়&#8217;, কবি মুজাম্মিলের &#8216;সায়ৎনামা&#8217;, দৌলত উজিরের &#8216;লায়লী মজনু&#8217;, মুহম্মদ কবীরের &#8216;মনোহর মধুমালতী&#8217; ইত্যাদির ন্যায় অজস্র সাহিত্য বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে। আর এ সাহিত্যরাজির অধিকাংশই ১৫ শতাব্দীর আগে লিখিত। শেক্সপিয়রের হাত ধরেই ইংরেজি ভাষা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কিন্তু শাহ মোহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে এসকল বড় বড় কবিদের সাহিত্য পড়লেই বুঝা যায়, ইংরেজি ভাষা যখন কেবল গঠনকালীন পর্যায়ে বিদ্যমান, বাংলা ভাষা তখন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে গনগনে সূর্য হয়ে বিরাজ করছে।</p>
<p>সে জায়গা থেকে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির পেছনে মুসলমানদের অবদান, তাদের ঐতিহাসিক ভিত্তিস্থাপনের বর্ণনা দু-চার লাইনে ব্যাখ্যা করলে তা অসমাপ্ত রয়ে যাবে এবং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধশালী ইতিহাস ও উপাখ্যানের প্রতিও অবিচার করা হবে। ভাষার সমৃদ্ধির বিবেচনায় চিন্তা করতে গেলে অন্যান্য সব অঞ্চল বাদ দিয়ে যদি আফ্রিকার দিকে তাকাই; সবথেকে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো আফ্রিকার মত বিশাল দেশে কোনো নিজস্ব ভাষা নেই বললেই চলে। মরক্কো, আলজেরিয়ায় ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যবাদীতায় তাদের নিজস্ব ভাষা যেন আজ বিলুপ্ত। সেখানে,</p>
<p>দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের শিকার হয়েও আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সগৌরবে টিকে আছে।</p>
<p>লিপি থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ প্যাটার্ন আমাদের নিজস্ব।</p>
<p>আমাদের মৌখিক এবং লিখিত ভাষায় পার্থক্য নেই। একটি ভাষাকে বিচার করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূচক এগুলো। এর আলোকে দেখলেও বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক, চৈন্তিক ও সাহিত্যগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী বিচার করা যায়। আর এতে আমরা দেখতে পাই, বাংলা ভাষার ভিত্তি আসলে কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, উপমহাদেশ এবং সমগ্র বিশ্ব ইতিহাসে বাংলা অঞ্চল অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্ববহ একটি অঞ্চল। আর এ গুরুত্বের একটি বৃহদাংশই জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য। প্রাক-মুসলিম আমলে বাংলা ভাষা অত্যন্ত দুর্বল একটি অবস্থানে ছিল। বিশেষতঃ সেন এবং ব্রাহ্মণেরা ং ব্রাহ্মণেরা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করার ফলে বাংলা ভাষা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গদেশ জয় করলে, মুসলিম শাসনের সৌভাগ্যে বাংলা ভাষার নবজন্ম এবং সমৃদ্ধি ঘটে। মুসলিম সুলতানেরা যেমনি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাকে বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ডে পরিণত করেছিলেন তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে বাংলাকে সমৃদ্ধ ভাষায় উন্নীত করেন। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের জন্ম ও বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকদের নাম নিবিড়ভাবে প্রাসঙ্গিক। অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, &#8220;মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ সাহিত্যের একরূপ জন্মদাতা বলিলে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গ-ভাষা বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষা।&#8221;</p>
<p>ভাষা সমৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলা অঞ্চলে বয়ে আনা মুসলমানদের নানা মূল্যবোধ সাহিত্য ভাবনার প্রসার ঘটায়। বাংলা সাহিত্যের পূর্বতন দেবতা নির্ভরতাকে অতিক্রম করে মুসলমানদের আনীত মানবতাবাদ, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব প্রভৃতি ভাবনা মানবিকতায় উন্নীত করে। মুসলিম আগমনের ফলে নির্দিষ্ট গণ্ডিবদ্ধ বাঙালির দৃষ্টি বিশ্বময় প্রসারিত হয় এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়। মহান আল্লাহর একত্ববাদী অস্তিত্বে ঈমান আনয়নের ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মধ্যেও তৈরি হওয়া আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে হরহামেশাই পাওয়া যায়। এসবে অনেক নিম্নবর্গের চরিত্রও পাওয়া যায়, যারা এক অদৃশ্য শক্তির প্রশ্রয়ে শোষকদের মোকাবেলা করেছেন। এ চিত্র কেবল মুসলিম লেখকদের কলমেই অঙ্কিত হয়নি; বরং অমুসলিম লেখকেরাও একই চিত্র এঁকেছেন।</p>
<p>মুসলমানদের হাত ধরে শুধুমাত্র বাংলা ভাষার শব্দগত সমৃদ্ধি, কিংবা সাহিত্যিক উৎকর্ষতা, অথবা বিভিন্ন ভাষার সম্মিলনে সার্বিক বিকাশই সাধিত হয়নি, বরং একইসাথে মুসলমানদের হাত তাদের আনীত নতুন চিন্তা ও দর্শনের আলোকে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি, বিষয়বস্তু এককথায় সমাজের চিন্তামানসের দিক সম্পূর্ণত বিবর্তিত হয়ে যায়। এর শক্তিশালী প্রভাব পড়ে তৎকালীন সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজেও।</p>
<p>প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. এম এ রহিমের ভাষায়-</p>
<blockquote><p>&#8220;মুসলমানরা বঙ্গদেশে যে নতুন চিন্তাধারা ও আদর্শের আমদানি করেন, তারই কল্যাণস্পর্শে হিন্দুসমাজে বিরাট জাগরণ আসে। ফলে শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণবধর্ম, ধর্মঠাকুরের পূজা ও সত্যপীর পূজা প্রভৃতি বহু ধর্মমতের উদ্ভব হয়। মুসলমানদের উদারনৈতিক ভাবধারার প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ, ধর্মঠাকুরের পূজা বিষয়ক সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ও সত্যপীরের পাঁচালী রচিত হয় এবং বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়। এভাবে বাংলার সমাজ জীবনে ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি সঞ্চার করে বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধিতে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য মুসলিম শাসন কৃতিত্বের অংশীদার।&#8221;</p></blockquote>
<p>আরোও উল্লেখযোগ্য ব্যপার হলো, মুঘল-পাঠান কিংবা বাংলা সালতানাতের শাসকগণের বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন। যেমন- পাঠানদের ভাষা ছিল প্রস্ত (পশতু), মুঘল সালতানাতের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। মুঘল থেকে শুরু করে সকল সালতানাতের শাসকরাই বিভিন্ন ভাষাকে ধারণ করলেও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের স্ব-স্ব ভাষাকে তারা জন্মভূমির ভাষা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং ঐসকল ভাষাকে চর্চার জন্য উৎসাহিত করেছেন।</p>
<p>বিশেষ করে সেনরা যখন কর্নাটক থেকে এসে গণহত্যা চালিয়ে রাজ্য দখল করে আইন চালু করেছিল, অষ্টাদশ পুরাণ ও রামের চরিত বাংলায় পাঠ করা নিষিদ্ধ, শোনা নিষিদ্ধ, কেউ তা অমান্য করলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারপরেই তারা বৌদ্ধধর্মের ও বাংলা ভাষাভাষী পন্ডিতদের গণহারে হত্যা করে।</p>
<p>কিন্তু পরবর্তীতে মুসলিম সুলতানেরা হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেন যার ফলে হিন্দু কবিরা সাহিত্য চর্চার পূর্ণ পরিবেশ পান। ইসলামী সভ্যতার অসাধারণ উদার মনোভাব, বহুত্ববাদী পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলশ্রুতিতে সকল ধর্মাবলম্বী চিন্তক, সাহিত্যিক, কবিরা তাদের সাহিত্য চর্চার সর্বোত্তম পরিবেশ পায়। ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্য পরিগঠন ও বিকাশের শ্রেষ্ঠ পরিবেশ পায়। মুসলমানদের উদারনৈতিক ভাবধারার ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ দেখার ও নিজ ভাষায় পড়ার সুযোগ পায়। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনকালে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়া তো দূরে থাক দেখা কিংবা এর পাঠ শোনাও নিষিদ্ধ ছিল। কেউ যদি ধর্মগ্রন্থ দেখত বা শুনতো, শাসকবর্গ চোখ-কানে গরম শিসা ঢেলে তাকে হত্যা করত। মুসলিম সুলতানদের হাত ধরে এই নিকৃষ্ট শোষণমূলক প্রথা ও ভয়াবহ জুলুমের অবসান ঘটে। অনেক মুসলিম শাসক স্বয়ং যেমন সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ, আলাউদ্দীন হোসেন শাহ, শাহজাদা নুসরত শাহের মতো শাসকেরা সরাসরি হিন্দু কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, সুযোগ দিয়েছেন। সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু &#8216;ভগবতে&#8217;র অনুবাদ সম্পন্ন করেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর &#8216;মহাভরত&#8217; অনুবাদকালে শাহজাদা নুসরত শাহ তাকে সরাসরি সহায়তা করেন।</p>
<p>সেই জায়গা থেকে এসকল মানুষের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। জনসাধারণের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন মুসলমানরাই।</p>
<p>যেমন- তৎকালীন পণ্ডিতেরা কৃত্রিম সংস্কৃতি ভাষা জানতো এবং সেগুলো পড়ে জাতপ্রথার মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রক্ষা করে চলতো। যার কারণে সাধারণ মানুষ মূলধারা থেকে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু মুসলমান খলিফাগণ এইসকল পণ্ডিতদের বিরুদ্ধাচরণ করে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য, সাধারণ মানুষের পিপাসাকে নিবারণ করার জন্য সকল ধরনের গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত করেন এবং বাংলা ভাষার দিকে এত বেশি উৎসাহিত করেন। তৎকালীন দেশীয় সংস্কৃতির ধারা রক্ষার জন্য এবং দেশবাসীর শিক্ষা-নৈতিকতা এসকল বিষয়কে শক্তিশালী করার জন্য মূলত বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচতা ও শিক্ষার দিকে এতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যার কারণে তৎকালীন সময়ের একজন সাধারণ কৃষকও তৎকালীন পাশ্চাত্য সভ্যতার জ্ঞানীদের তুলনায় বেশি জানতো। এমনকি তাদের তুলনায় আমাদের দেশের কৃষকদের দার্শনিক বললেও ভুল হবে না। অতঃপর ড. কাজী মোতাহার হোসেনের ভাষায়, &#8216;তৎকালীন শাসকদের এত বেশী উৎসাহ পেয়েছিল বিধায় বাঙালিরা নিজেদের ভাষাকে এতবেশি আত্মস্থ করতে পেরেছিল।&#8221; এভাবে ইসলামী সভ্যতা থেকে এসকল বিষয়গুলোকে গ্রহণ করে এ অঞ্চলেও নিজেদের জীবন এবং সভ্যতাকে এত বেশি উন্নত করতে পেরেছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা এ অঞ্চলে এসেও এ অঞ্চলে ঐতিহ্যের সাথে এমনভাবে নিজেদেরকে মেলে ধরেছিল এবং ইসলামের নব-নব বিকাশ সাধনের ক্ষেত্রগুলোকে এটার সাথে সমন্বয় সাধন করে তার উদারতা ও সর্বসহযোগিতাকে এমনভাবে তুলে ধরেছিল যে এর দ্বারা সকলেই অর্থাৎ এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষ উপকৃত হয়েছে। কোনো ধর্মও নষ্ট হয়নি, ইসলামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এভাবে করেই অঞ্চলের ভিত্তি এবং ভাষার শক্তিশালী একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাংলা ভাষার জন্য তৎকালীন দুনিয়ায় সবচেয়ে নজিরবিহীন সম্মাননা হচ্ছে-</p>
<p><strong>সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি রচনা করেন। রাজনৈতিক ভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রের নামকরণ করেন- শাহী বাংগালাহ।</strong></p>
<p><strong>পরবর্তীতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির শিখরে পৌঁছিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় অনুমোদন দেন, যা বাংলাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।</strong></p>
<p>এসব ক্ষেত্রে আরো উদাহরণ হলো: মুঘল সালতানাতের সময়ে আরাকান রাজ্যসভায় অমার্ত্যগণ বাংলা ভাষার শ্রী বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচুর পরিমাণ তহবিল পেতেন, ফলশ্রুতিতে দৌলত কাজী, মহাকবি আলাওলরা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে অমর কীর্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। আমরা যদি লক্ষ্য করি, তখনও সংস্কৃত ভাষা ছিল, আরবি ভাষার জয়গান ছিল, ফারসি ভাষা ছিল দরবারের ভাষা, উর্দু ভাষা ছিল প্রভাবশালী ভাষাগুলোর একটি। এতগুলো শক্তিশালী ভাষার মধ্যে থেকে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলো শিক্ষা লাভ করতেন, এসকল ভাষার মৌলিক গ্রন্থগুলো পাঠ করে করে সমৃদ্ধি অর্জন করতেন, কারণ এসকল ভাষা ইসলামের ভাষা। কিন্তু এতকিছুর পরেও তাদের নিজস্ব ভাষা- বাংলা ভাষাকে তারা চর্চা করেছেন। এবং আলাওল তাঁর সাহিত্যগুলো উপহার দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ভাষাকে চতুর্মুখী করে বিকাশ করেছেন।</p>
<p>মাটি ও জাতির রূহকে উপলব্ধি করে এ ভাষাকে ধারণ করেছেন। তারা কখনোই বিদেশি সংস্কৃতির সাথে নিজেদের বিলিয়েও দেননি আবার ইসলামের মূল যে রূহ তাকেও দূরে ঠেলে দেননি। সমন্বয় সাধন করেছেন এবং সে আলোকেই তাদের কর্মগুলো সম্পাদন করেছেন। এক্ষেত্রে কাজী মোতাহারের আরেকটি লাইন হচ্ছে, &#8220;মুঘল সালতানাতের মুসলিম শাসকেরা অনেকেই উসমানী-আব্বাসী বা আন্দালুসের ওই অঞ্চলের তথা বিদেশি বংশোদ্ভূত হলেও এই দেশকে তারা স্বদেশ হিসেবেই গড়ে তুলেছিলেন।&#8221; এই অঞ্চলের কোনো আদর্শকে, স্বতন্ত্রতাকে ও এদেশের ভাষাকে গ্রাস করা তো দূরের কথা বরঞ্চ তারা এগুলো রক্ষার ব্যপারে উৎসাহ দিয়ে তৎকালীন সুলতানগণ, তৎকালীন সুবেদাররা অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলগুলোর সাথে যোগসূত্র সাধন করে রাষ্ট্রীয় ভাষাগুলো শিক্ষাদান করেও বাংলা ভাষা তথা আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে শক্তিশালী করেছেন।</p>
<p>এ বিষয়টি ড. এম এ রহিমের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে এভাবে-</p>
<p>&#8220;মুসলমানগণ অন্য জাতির শিক্ষা ও জ্ঞানের মর্যাদা দিয়েছেন এবং সর্বত্র প্রজাসাধারণের সংস্কৃতি ও আদর্শ রক্ষা করেছেন। মুসলিম শাসকবর্গ ও হাজার হাজার বহিরাগত মুসলমান বঙ্গদেশে বসতি স্থাপন করেন। তারা বাংলাদেশকে নিজেদের দেশরূপেই গ্রহণ করেন, এবং নিজেদেরকে বাংলা ভাষার সন্তান হিসেবেই পরিচয় দেন। এ দেশের আদি অধিবাসীগণের মতোই বাংলা তাদেরও ভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়।&#8221;</p>
<p>বাংলা সাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন &#8216;জীবাত্মা-পরমাত্মা&#8217; এটিরও বাংলা সাহিত্যে আমদানি ঘটেছে মুসলমানদের সুফিবাদ থেকে। বাংলা ভাষায় পুঁথি সাহিত্যের যাত্রাও শুরু হয় মুসলিম কবিদের মাধ্যমে।</p>
<p>সর্বোপরি, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে বাংলা ভাষায় বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অধিকার করে।</p>
<p>এখন কথা হচ্ছে, বাংলা ভাষা কি মুসলমানদের ভাষা হিসেবে বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হয়েছিল? অবশ্যই হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে শুরুর দিকটায় প্রভাবশালী ভাষা না হলেও মুসলমানদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় এই ভাষাটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষায় পরিণত হয়। আর এটি কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী, বৃটিশদের আজ্ঞাবহ ও হিন্দু সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহনের উক্তি থেকে আমরা জানতে পারি। তার কথার আলোকে, যখন ব্রিটিশরা আসে ওই সময়ের সমাজকাঠামোতেও মুসলমানগণই তাদের চিন্তা-ভাবনা, ভদ্রতা, বিচার-বুদ্ধিতে, কার্য পরিচালনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। এটা সে নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছে। মুসলিম সালতানাতের খলিফাগণ, সিপাহসালার উজির-নাজির থেকে শুরু করে সকল কাঠামো থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি জোরদান, পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদির মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ ছিলেন না। একইসাথে তারা রাষ্ট্রীয়ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং সরকারিভাবে তার ব্যবহারকেও নিশ্চিত করেছিলেন। এক্ষেত্রে তারা দরবারে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল কবিদেরকে বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় কাব্যানুবাদের উৎসাহ প্রদান করেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় জীবনেও বাংলা ভাষার ব্যবহারকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দেন। একদিকে যেমন আরবি ও ফারসি ভাষার ব্যবহার ছিল, একইসাথে বাংলা ভাষাকেও এগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুসলিম শাসকগণ এ অঞ্চলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই মসজিদের মুদ্রালিপি থেকে শুরু করে সকল স্থানেই আরবি, ফারসিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, বাংলা ভাষাকেও একইভাবে ব্যবহার করেছেন। তাদের সীলমোহর, স্বাক্ষর, বিভিন্ন অংশ জুড়েই থাকত বাংলা ভাষার সরকারি ব্যবহার। অফিস-আদালত, প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিচারালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রিকরণ, ব্যক্তিগত কাজকর্ম, প্রজার সাথে সুলতানের কথোপকথন, নবাব, সুবেদার বা দেওয়ানদের দরবারেও বাংলা ভাষায় সকল কিছু পেশ করা যেত। এই ব্যপারে ড. এস এম লুৎফর রহমান চমৎকার কিছু প্রমাণাদি তুলে ধরেছেন। যেমন- তিনি শায়েস্তা খানের আমলে তৎকালীন সময়ে কর্মরত ছিলেন দেওয়ান বদিউজ্জামান খান, তার মোহরযুক্ত চিঠি ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন লিখিত দলিলপত্র সামনে হাজির করেন। অমুসলিমদের সাথে লিখিত চুক্তিপত্র যেমন নবাব শায়েস্তা খানের সাথে অধীন শাহ ওজিউল এবং পরগণা রাজ্যের দেওয়ান সাহেবের স্বাক্ষর দ্বারা অনুমোদিত বিভিন্ন দলিলপত্র তিনি তুলে ধরেছেন। আর এই প্রত্যেকটি দলিলপত্রের ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি সেগুলো বাংলা ভাষায় লিখিত এবং আদানপ্রদানকৃত হয়েছে।</p>
<p>বর্তমান সময়ে এসে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, এত শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সেই জৌলুসপূর্ণ ভাষা এভাবে মুসলমানদের হাতছাড়া হবার কারণই বা কী ছিল?</p>
<p>আমরা জানি যে, ব্রিটিশ শাসনের সময়কালে মূলত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, ১৭৫৭সালের বিপর্যয়, ১৮৩০-১৮৪০ সালের আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের যে সংগ্রাম- এই সংগ্রামের ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা মুসলমানরা ছাড়া অন্য কেউ সে অর্থে পালন করেনি। পরবর্তী সময়ে হিন্দু এবং শিখরা আসলেও অধিকাংশ ব্রাহ্মণ, হিন্দু সুবিধাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ব্রিটিশদের সবকিছুকে গ্রহণ করে সেভাবেই এ অঞ্চলকে পরিচালনা করার এবং বৃটিশদেরকে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে। ফলস্বরূপ তারা তাদের ভাষাকে, তাদের সব কালচারকে গ্রহণ করে তাদের নিজেদের সুবিধাটুকু অর্জন করেছে। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের ক্ষেত্রে কিন্তু ইংরেজি ভাষা শিখেও যেমন কোনো উপকার হচ্ছিলো না, একইভাবে এ ভাষার বিরোধীতা করেও কোনো লাভ হচ্ছিলো না। কারণ, সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই সময়টাতে ইংরেজি ভাষা গোটা ভারতব্যাপী শিক্ষার ভাষা, রাষ্ট্রসহ সকল কিছুর ভাষায় পরিণত হয়। হিন্দু থেকে শুরু করে অন্যান্যরা গ্রহণ করলে মুসলমানদের এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিতে হয় জাতির সামগ্রিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করেই। কারণ, আমাদের সংগ্রাম ব্রিটিশ একাডেমিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তাদের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সেসময়ে যখন মুসলমানরা সকল দিক থেকে শোষণের কারণে পিছিয়ে পড়লো আর্থিকভাবে, শিক্ষার দিক থেকে। সে সময়টাতে বাংলা ভাষাও চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে, বৃটিশদের আজ্ঞাবহদের হাতে। বাংলা ভাষা এক কথায় পঙ্গুত্ব বরণ করে। আজ অবধি সেই বাংলা ভাষা আমাদের হাতে নেই।</p>
<p>প্রশ্ন আসতে পারে, আমাদের অঞ্চলে ব্রিটিশরা কেনো এই বাংলা ভাষাকেই সর্বপ্রথম আক্রমণ করলো? তখনও তো বাংলায় ভাষায় প্রচুর পরিমাণে বই ছিল না, সিনেমা ছিল না। তবু কেনো এই আক্রমণ? তৎকালীন অর্থনীতি, কৃষিসহ সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে যে আগ্রাসন তারা পরিচালনা করেছে। সমপর্যায়ের আগ্রাসনের পরিমাণকে বৃদ্ধি করে বাংলা ভাষাকে তাদের নিজস্ব রূপে রূপায়ণ করেছে, অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং যখন তারা দেখল এতকিছুর পরেও তারা তাদের খ্রিস্টানধর্ম, ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে সমবেত করে (উল্লেখ্য ইতোপূর্বে হিন্দুধর্ম এত বেশি সমাবিষ্ট ছিল না) ব্রাহ্মণশ্রেণির হাতে বাংলা ভাষাকে তুলে দেয়। নতুন যে ব্রাহ্মণ্যবাদের জন্ম তারা দিয়েছে, এটির ভিত্তি যারা সর্বপ্রথম নির্মাণ করেছে সেই প্রাণসত্তা তারা বাংলা ভাষাতেই রচনা করে এই আগ্রাসন পরিচালনা করেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা বাংলাকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বারবারই ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।</p>
<p><strong>আমরা পড়ে থাকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা লিপির জনক, অথচ ঈশ্বরচন্দ্র বাংলা লিপির আবিষ্কর্তা নন। বাংলায় হাজারো লিপি শিক্ষার বই আর উদ্যমের মধ্যে বর্ণপরিচয় একটি মাধ্যম। বই লিখতে তিনি লিপি সংস্কার করেন। তিনি সিভিলিয়ানদের প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হিন্দির স্রষ্টা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেড পণ্ডিত ছিলেন পাঁচ বছর।</strong> গত কয়েক দশকে হিন্দি থেকে আরবি ও ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন যে নতুনভাবে চলছে তাঁর বীজ, ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তাঁর গুরু জয়গোপাল তর্কালঙ্কার বপন করে যান। তারা বাংলা ভাষায় এই কাজটা করে দেখান পারসিক অভিধান প্রণয়ন করে। বিদ্যাসাগর মশাই গুরুর পথে বাংলায় অযাচিত ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে সংস্কৃত শব্দ ঢুকিয়ে, তার আগের দীর্ঘকালের ভাষার বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গী রুদ্ধ করেন। এর ফলে যে ভাষাটার জন্ম হয় তা আর যাই হোক বাংলা নয়। একে নাম দেয়া হয় &#8216;অভিজাত প্রমিত বাংলা&#8217;। সমস্যাটা হচ্ছে এই মান ভাষার সঙ্গে পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষাগুলোর দূরত্বটা অনেক, এখানে সংস্কৃত শব্দ চাপিয়ে দেয়ার বিষয় আছে। এমন সব শব্দ অভিজাতদের সাহিত্যে ও কর্মে ব্যবহার করা হয়; যা প্রায় শত বছর পরেও পূর্ব বাংলার মানুষের মুখে উঠে আসেনি। এসব শব্দ রয়ে গেছে গুরুগম্ভীর কিংবা ভাবগম্ভীর। সহজাতভাবে প্রবেশ করেনি বলে শব্দগুল সাধারণের মুখে শোভা পায় না। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এই নিয়ে যা বলেছেন তার ভাবার্থ এরকম-পূর্ব বাংলার মানুষের লোকায়ত ভাষা থেকে কলকাতার অভিজাতদের চাপিয়ে দেয়া ভাষার দূরত্বটা এতই বেশি যে, সাধারণের মুখে ভাষাটা আসে না। সাধারণকে ভাষাটা শিখতে হয় বরং লেখাপড়া করে &#8216;লায়েক&#8217; হওয়ার পরই কেবল এ ভাষায় কথা বলা যায়, শুধু তখনই এটা মুখে আসে!</p>
<p>বাংলা ভাষার এই নেতিবাচক বিবর্তন কিংবা বাংলা ভাষার প্রায় হাজার বছরের বেশি সময়ের স্বাভাবিক বিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে প্রমিত বাংলা ভাষা, লেখ্য লিপিকে ঔপনিবেশিক কাঠামো অর্জন করানোর উদ্যমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের অবদান প্রচুর। কারণ মূল পরিবর্তন বা সোজাকথায় আগ্রাসনের সূচনাটা তখন থেকেই।</p>
<p>কিন্তু এই আগ্রাসনের মূল কারণ কী? এর কারণ হলো- একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একটি জাতির চিন্তাধারা, সংস্কৃতির ধারাকে ব্যাঘাত ঘটাতে, সোশিও-কালচারকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের নিজস্ব ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটি সাম্রাজ্যবাদী, যায়নবাদী ব্রিটিশরা খুব সফলতার সাথেই সম্পাদন করেছে।</p>
<p>কিন্তু পরবর্তীতে আমরা অন্যান্য ভাষা চর্চা করতেও পারিনি, আরবি-ফারসিকেও ভালোভাবে ধারণ করতে পারিনি, উর্দুকেও কাজে লাগাতে পারিনি। একইভাবে এসকল ভাষাকে কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদেরকে শক্তিশালী করার প্রধান বাহন বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করবো সেটাও পারিনি। এজন্য কাজী মোতাহার হোসেন বলেছিলেন, &#8220;বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার প্রতি উদাসীনতায় বাঙালি মুসলমানের অন্যতম অধঃপতনের কারণ।&#8221; সত্যিকারার্থে এর বাস্তবতা রয়েছে। কেননা, জাতির রূহকে উপলব্ধি করতে হলে, ভূমিকে ধারণ করে সে আলোকে নতুন ইশতেহার প্রদান করতে হলে জাতির নাড়ি-নক্ষত্রের সাথে যোগসূত্র থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, বাংলা ভাষা। কিন্তু আমরা সেটাকে আমাদের মত করে ধারণ করতে পারিনি। সর্বোচ্চ কিছু চেষ্টা করেছি আরবি দিয়ে, উর্দু সাহিত্য দিয়ে কিছু ধর্মীয় ব্যপার আয়ত্ত করতে; কিন্তু সেটা দিয়ে তো আমাদের এ অঞ্চলের রূহকে বুঝা সম্ভব না। ভাসাভাসা দু&#8217;চারটি লাইন মুখস্থ করে বা মূলনীতি পড়ে আমরা কখনোই এই অঞ্চলের সামাজিক সংস্কৃতিকে, নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের ইশতেহারকে সামনে আনতে পারবো না। এজন্য ইসলামের মূল জ্ঞান যেসকল ভাষায় রয়েছে সেটার সাথে অবশ্যই আমাদের মাতৃভাষার সমন্বয় সাধন করে সকলকিছুকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।</p>
<p>আবার বাংলা সাহিত্য যতটুকুই বা ছিল তা পুঁথি সাহিত্য সৃষ্টি করে বাংলাদেশের- এ অঞ্চলের চাষী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কিছুটা খোরাক দিলেও শিক্ষার প্রধান ভাষা হিসেবে সমাজবিজ্ঞান তথা জাতির মূল রূহ-এর মূলনীতি প্রণয়নের ভাষা হিসেবে সেভাবে দাঁড় করাতে পারিনি। বাস্তবতা হলো এই ধরণের ভাষা চর্চা দিয়ে কখনোই বাঙালি মুসলমানের পক্ষে সভ্যতা বিনির্মাণ করা সম্ভব না, বরং সাম্রাজ্যবাদীদের শেখানো বুলি, ধার করা চিন্তা দিয়েই চলতে হবে। এছাড়া আমাদের হাতে নিজস্ব কোনো সম্পদ নেই!</p>
<p>আবার আমরা অধিকাংশ সময় নিজেদের অলসতাকে ঢাকতে গিয়ে এককেন্দ্রিক দোষারোপ করি, যেমন- হিন্দুরা বা অন্যান্যরা সকল কিছুকে দখল করে নিয়েছে। পরিভাষা, শব্দভাণ্ডার, সাহিত্য, কবিতা, জ্ঞানের ভাষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির ভাষা সকল কিছুই অন্যদের পরিভাষা দিয়ে, চিন্তা দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে। বাস্তবতা হলো অভিযোগ করে কখনোই মুক্তি মিলে না।</p>
<p>ইদানীং আবার বাংলাভাষাকে নিয়ে উদ্ভুত সকল সমস্যার মূলে একমাত্র পাকিস্তানি শাসনামল এবং পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক উর্দু ভাষার আধিপত্যকেই দায়ী করা হয়। এমনকি স্বাধীনতার পরে যেসব লেখনী প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো পড়লেও আমরা ভাষাকেন্দ্রিক মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে &#8216;৫২ এর ভাষা আন্দোলনকেই বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা কি আদতে সেটাই বলে?</p>
<p>বাংলা ভাষাকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরিকৃত।</p>
<p>সুতরাং বুঝা যায়, এ সকল আলাপ উপেক্ষিত থাকার কারণও আমাদের কাছে অস্পষ্ট নয়। আর এই উপেক্ষা থেকেই সমস্যার সূচনা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে এই উপমহাদেশকে রক্ষা করা হয়, যাদের কাফনবিহীন দাফন হয়েছিল এ বাংলায়। এরপর হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ রক্তার্জিত স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এই বাংলাকে। আমরা পেয়েছি আমাদের নিজস্ব মাতৃভূমি &#8216;বাংলাদেশ&#8217;। সেই দেশকে সার্বজনীন করে তুলতে এদেশের ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবীগণ সকল স্তরের মানুষকে বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরা উচিত। যাতে করে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই বাংলা ভাষায় জ্ঞানার্জন করতে পারবে। বাংলা ভাষাতেই খুলে যাবে মানুষের সার্বিক বিকাশের এক অবরুদ্ধ দ্বার। কিন্তু আমাদের সমাজ, রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা গণিত সকল বিষয়ের পাঠদানই হচ্ছে ইংরেজিতে, যেগুলোর বাংলা পাঠ্যবই সকলের সামনে হাজির করার প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি।</p>
<p>আমাদের এই ভাষাকে, আমাদের সাহিত্যকে আমাদের নিজেদেরকেই বহন করার দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আমাদের সুবিশাল ইসলামী সভ্যতা, আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতির মুক্তির সাথে সংযোগ স্থাপণ করে আমাদের মাটি, আমাদের মানুষ ও আমাদের বাংলা ভাষার সাথে সমন্বয় করে এমন একটি সুবিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার, জ্ঞানের ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, এমন সকল চিন্তা ও মূলনীতি সামনে হাজির করতে হবে, এমনসব কাব্য ও ইশতেহার আনতে হবে যেগুলো দিয়ে আমরা আবার বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরতে পারবো। এটি ব্যতীত কখনো আমাদের জাতির কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কীভাবে পৌঁছাবো! আমরা তো মাতৃভাষাকেই ধারণ করতে পারছি না। মাতৃভাষাকে দিয়ে সভ্যতার কথা, সাংস্কৃ তির কথা ফুটিয়ে তুলতেই পারছিনা। তাহলে মানুষ কি করে বুঝবে এর গুরুত্ব? আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচের ভাষায়, &#8220;যেকোনো চিন্তাকে যদি আমরা ঐ মানুষের সাথে, ঐ মাটির সাথে সমন্বিত করতে না পারি, তাহলে তা কখনোই সফলতার মুখ দেখবে না। এজন্য আমাদের চেতনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে বাংলা ভাষাকে নিজস্ব ধারায় ইসলামী সভ্যতার আদলে তৈরি করার কোনোই বিকল্প নেই।&#8221;</p>
<p>উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্যণীয়- শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রেই বর্তমানে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম একটি সমৃদ্ধশালী দেশ চীনেও ১৯৫০ সালের পূর্বে চায়না ভাষার সাথে সাথে অন্যান্য ভাষারও বেশ আধিপত্য ছিল। কিন্তু চীন তাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সামাজিক শক্তিকে যথোপযুক্ত কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুকে বন্ধ করে দিয়ে হলেও অধ্যাপক, সাহিত্যিক, অনুবাদক নিযুক্ত করে বই-পুস্তক, লেখনী সকল কিছুকে নিজস্ব ভাষায় অনুদিত করার, প্রকাশ করার। প্রথম কয়েক বছরেই হাজার হাজার চীনা সাহিত্য অনুদিত হয়, নিজস্ব ভাষায় লিখিত হয়। ফলশ্রুতিতে তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে চাইনিজ ভাষায়, নিজেদের রূপরেখার আলোকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে।</p>
<p>উসমানী খিলাফত পরবর্তী সময়ে, উসমানীয় ভাষাকে পরিবর্তন করে যখন ল্যাটিন ভাষায় নিয়ে যাওয়া হয়, আধুনিক তার্কিশ ভাষাকেও এভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আজ সকল ধরনের জ্ঞানভাণ্ডার, সাহিত্য, চিন্তা তার্কিশরা তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ করতে পারে, চর্চা করতে পারে। তাহলে আমরা কেনো পারবো না?</p>
<p>যেখানে বর্তমানে মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্ব-ভাষা তালিকায় বাংলার অবস্থান পঞ্চম এবং বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে এর অবস্থান সপ্তম। বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও অধিক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এদের মধ্যে ২৬ কোটিরও বেশি বাংলা ভাষাভাষীর বসবাস বাংলাদেশ ও ভারতে। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী বাকি ৪ কোটিরও বেশি মানুষ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবুও কেনো আমরা পারবো না?</p>
<p>আমরা জানি যে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংঙ্গীত রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাতেই।</p>
<p>বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা এবং এদেশের ৯৮.৯% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন। এবং ১৯৮৭ সালের &#8216;বাংলা ভাষা প্রচলন আইন&#8217; অনুযায়ী, &#8220;বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব ও অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে এবং যদি কোন ব্যক্তি বাংলাভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তা হলে সে আবেদন বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের জন্য ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়।</p>
<p>পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাংলাভাষী অসংখ্য মানুষ। যেমন- ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:</p>
<ul>
<li>১. পশ্চিমবঙ্গ : যার জনসংখ্যা প্রায় ৭,৮৬,৯৮,৮৫২ জন। এ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৬.২২% বাংলায় কথা বলে, অধিকাংশ অধিবাসীও মাতৃভাষা হিসেবে বাংলায় কথা বলে থাকেন।</li>
<li>২. ত্রিপুরা: এ রাজ্যের অ-উপজাতি জনসংখ্যার বেশিরভাগই বাংলাভাষী হিন্দু এবং মুসলমান। যা রাজ্যের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।</li>
<li>৩. আসাম: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, আসামে প্রায় ৩,১২,০৫৫৭৬ জন লোক বাস করে। &#8216;১১-র আদমশুমারি রিপোর্ট অনুসারে, আসাম একটি বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। প্রকৃত বাঙালি জনসংখ্যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪%।</li>
<li>৪. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি রয়েছে, যার আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ১,০০,০০০ জন এবং মোট জনসংখ্যার ২৬% -২৮%। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বাংলা সর্বাধিক প্রচলিত একটি ভাষা, যদিও সেখানে এর সরকারী কোন স্বীকৃতি নেই।</li>
<li>৫. ঝাড়খণ্ড ২০১১ সালে বাংলা ভাষাকে তাদের দ্বিতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেয়।</li>
</ul>
<p>উপরের রাজ্যগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী অঞ্চল। তবে এগুলো বাদে অন্যান্য যে রাজ্যগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন সেসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে-নয়াদিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, বিহার, ভাগলপুর, পাটনা, চেন্নাই এবং জয়পুর।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাকিস্তানের করাচিতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন এবং করাচি সিটি করপোরেশনের অন্যতম দাফতরিক ভাষাও বাংলা।</p>
<p>যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর অভিবাসীদের স্বীকৃত পঞ্চম মাতৃভাষা বাংলা। সেখানে প্রায় ৮ লাখ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।</p>
<p>মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রেও প্রচুর পরিমাণ বাঙালি অভিবাসীর বসবাস রয়েছে। উপরোক্ত দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে নিম্নলিখিত বহু দেশেই বর্তমানে বহু বাংলাভাষী মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।</p>
<p>সিয়েরা লিওনে ২০০২ সাল থেকে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।</p>
<p>এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দুবাই, জাপানের টোকিও, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, অ্যাডিলেড, পার্থ, ভিক্টোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (এই অঞ্চলে সংখ্যালঘু বাঙালি অভিবাসীরা বাংলায় কথা বলে) নিউইয়র্ক, পেনিসিলভেনিয়া, নিউজার্সি, সান জোসে, ওয়াশিংটন, ক্যালিফোর্নিয়া, কানাডার টরন্টো, মিসিসাগা, ব্র্যাম্পটন, ফ্রান্সের প্যারিস, ইংল্যান্ডের লন্ডন, ওমান, মালয়েশিয়া, স্পেন এবং জার্মানিতে প্রচুর সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী রয়েছেন।</p>
<p>এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আরো প্রায় ৪ কোটি জনগণ এরকম আছে যারা বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা বা Second language হিসাবে ব্যবহার করে।</p>
<p>সব মিলিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা জনগণের সংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি।</p>
<p>বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার চর্চা ক্রমে বিস্তার লাভ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৌরভ সিকদারের গবেষণা মতে, &#8216;ইংরেজি ও চীনা ভাষার পরই বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।&#8217;</p>
<p><strong>পৃথিবীর ৪টি মহাদেশের ৩০ টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও চর্চা হচ্ছে। এ ভাষা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়ে থাকে। এর বাইরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, পোল্যান্ড, রাশিয়া, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের মোট ত্রিশটি দেশে বাংলা ভাষার গবেষণা হচ্ছে।</strong></p>
<p>যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে উনিশ শতক থেকেই প্রাচ্যবিদ্যা ও ভাষাচর্চা বিভাগের অধীনে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ১০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও এশীয় গবেষণা কেন্দ্রে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক, শিকাগো, মিনেসটা, ফ্লোরিডা, মেরিল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, ভার্জিনিয়া, উইসকনসিন ও হাভার্ড উল্লেখযোগ্য।</p>
<p>জাপানে বাংলা ভাষার অভিধান চালু করা হয়েছে।</p>
<p>সম্প্রতি ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিষয়ে গবেষণার জন্য বেঙ্গল স্টাডি সেন্টার খোলা হচ্ছে। বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে খোলা হয়েছে বাংলা বিভাগ। প্রায় প্রতিবছরই বিশ্বের নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ খোলা হচ্ছে এবং একাডেমিক কোর্স চালু হচ্ছে।</p>
<p>বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহের কারণে বিশ্বের কমপক্ষে ছয়টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল রয়েছে। আরো ১০টি দেশের রেডিওতে নিয়মিত বাংলা ভাষার আলাদা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ৬টি, যুক্তরাষ্ট্রে ১০ টি বাংলাদেশী মালিকানাধীন ও বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে।</p>
<p>বাংলা ভাষায় যুক্তরাজ্য থেকে নিয়মিত মোট ১২ টি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হচ্ছে। বেতার বাংলা নামে সেখানে একটি রেডিও স্টেশন রয়েছে। ধূমকেতু, জন্মভূমি, প্রতিদিন, স্বদেশ, বিদেশ নামে পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাও নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।</p>
<p>নিউইয়র্কে বাংলা ভাষার পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয় ১৯৮৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। বর্তমানে প্রায় ১৮ টি সাপ্তাহিক এবং ৭ টি অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।</p>
<p>ইউরোপের ইতালিতে বর্তমানে পাঁচটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা এবং রোম ও ভেনিস শহর থেকে তিনটি বাংলা রেডিও স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে। ইতালি থেকে ছয়টি অনলাইন টেলিভিশন বাংলায় পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ডেনমার্ক, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের আটটি দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে বাংলা ভাষায় মুদ্রিত ও অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে।</p>
<p>বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত প্রচার ও প্রসারের কারণেই এর শব্দ ও সাহিত্য ভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ। সেই সাথে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ভাষাও এটি। ইউনেস্কো ২০১০ সালে &#8216;পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা&#8217; হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাকে। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যের প্রায় সবকটি শাখাতেই বাংলা ভাষা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলার বৈচিত্র্যময় উপভাষা বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত ও গতিশীলতা দান করেছে। একইসাথে বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত পরিসর এর সমৃদ্ধি ও ও সর্বব্যাপী গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। পুরো পৃথিবীতে ৪৫ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে এবং বাংলা বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম একটি প্রভাবশালী ভাষা। তাই, বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে অন্যান্য ভাষার সামনে হীনমন্যতায় ভোগার কোন সুযোগই নেই। অতীতের সোনালী প্রেরণাকে সামনে রেখে, বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে অগ্রসর হলে নতুনভাবে একটি সমৃদ্ধ অবস্থানে পৌঁছা সম্ভব। কেননা, বাংলা অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জায়গা। একইসাথে তা আমাদের অগ্রসরতার সবচেয়ে বড় সোপানও বটে। মুসলমানিত্ব মজবুত করতে বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চলে নয়; বরং আঁকড়ে ধরাই যৌক্তিক।</p>
<p>যেহেতু ছোট্ট হিব্রু ভাষার গত ৬ হাজার বছরে কোন অস্তিত্ব ছিল না তারা নিজেদেরকে নতুন করে জাগরিত করে আন্তর্জাতিক ভাষাতে পরিণত করতে পেরেছে। আজ থেকে কয়েক শ বছর আগেও চাষীদের বা গ্রাম্যদের ভাষা ছিল উর্দু, তা এখন বড় দেশের রাষ্ট্র ভাষা। আজ থেকে দেড়শ বছর আগেও হিন্দি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেই হিন্দি ভাষা কি উপমহাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে না? শেক্সপিয়ার একাই যেহেতু ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করাতে পেরেছেন। সুতরাং আমরাও পারব ইনশাআল্লাহ্।</p>
<p>যে বাংলা ভাষার সুবিস্তৃত, দিগন্তব্যাপী ঔজ্জ্বল্য, সুখ্যাতি ও সমৃদ্ধি প্রথিত আছে তারই শেকড়ে তথা সুলতানী আমলে। তাঁর উত্থান ও নব জাগরণ অবশ্যম্ভাবী। এজন্যই সতের শতকের মুসলিম কবি আব্দুল হাকিম বাংলা ভাষার কদর বুঝাতে বলেছেন-</p>
<blockquote><p>&#8220;যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী</p>
<p>সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।&#8221;</p></blockquote>
<p>আমাদের ভাষাকে বিনির্মাণের মূল লক্ষ্য কি তবে?</p>
<p>একটি ভাষা দাঁড়ায় রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে, আদালতের ভাষা হিসেবে, প্রতিষ্ঠানের ভাষা হিসবে, শিক্ষাব্যবস্থার ভাষা হিসেবে, এই সবগুলোর মূলেই রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা। আর যখন ভাষাটি শিক্ষা ও গবেষণার ভাষা হয়, তখনই মূলতে সে ভাষাটি একটি শক্তিশালী ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই শক্তিশালী আত্মপ্রকাশ মূলত ঘটাতে সক্ষম হয়ে ঐ ভাষা থেকে উঠে আসা বড় বড় ব্যক্তিবর্গের প্রভাবের ফলশ্রুতিতে। কেননা তারা যখন সে ভাষায় মৌলিক জ্ঞান চর্চা করেন, শক্তিশালী চিন্তার বিকাশ ঘটান তার প্রভাব গিয়ে সরাসরি পরে ওই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর উপরে। কেননা তখন তাদের উদ্ভাবিত পরিভাষাগুলোই হয়ে ওঠে ঐ জাতির শিক্ষা ও গবেষণার মূল হাতিয়ার। এভাবেই ঐ জাতির চিন্তা, মনস্তত্ব, আভিজাত্য, ব্যবহারিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপ প্রভাবিত হয় এবং সে ভাষাটি আদালতের ভাষায় পরিণত হয়। সুতরাং এক্ষেত্রে ভাষাকে গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সে ভাষায় জ্ঞান তৈরি, চিন্তা তৈরি এবং সে ভাষাভাষী শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব উঠিয়ে নিয়ে আসা। কেননা এটাই হচ্ছে ভাষার মূল পরিচয়।</p>
<p>এক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৪৫ সালে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্পূর্ণ দায়ভার যখন জার্মানির ওপর বর্তায়, তখন মিত্রশক্তি জার্মানির শাস্তি নির্ণয়ের জন্য আলোচনার টেবিলে বসে। আলোচনায় বসা মারমুখী যুদ্ধবাজ নেতারা প্রস্তাবনা দিতে থাকে যে জার্মানিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হোক, কিংবা ইউরোপের শষ্য ক্ষেতে পরিণত করা হয়। তখন ঐ টেবিলে বসা একজন বলেন, মানলাম আপনারা জার্মানিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন, কিন্তু কার্ল মার্ক্সকে কোথায় রাখবেন? ফ্রেডরিখ নিটশে-কে কোথায় রাখবেন? ফ্রেডরিখ এ্যাঙ্গেলসকে কোথায় রাখবেন? (অর্থাৎ জার্মানিকে ধূলিস্যাৎ করে দিলেও ওইসকল প্রভাবশালী চিন্তকদের চিন্তাভাবনাকে তো বিনাশ করতে পারবেন না। তাদের ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবেন না।)</p>
<p>তখন সবার বোধোদয় হয় এবং অপার সম্ভাবনাময় জার্মানিকে ধ্বংস না করে ইউরোপের করদ রাজ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, হিটলারের নেতৃত্বে সমগ্র বিশ্বজয় করার বাসনা ও শক্তিমত্তা যখন পরাজিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়, তখন ঐ বিপন্ন দশা থেকে পরিত্রাণের উপায় হয়েছিল মৌলিক চিন্তা ও জ্ঞানের অধিকারী জার্মানভাষী দার্শনিকগণ। ঐতিহাসিক এ ঘটনার তাৎপর্য থেকে আমাদের কি কিছুই শিক্ষা নেবার মত নেই?</p>
<p>অবশ্যই এটি আমাদের সামনে অপার সম্ভাবনা এবং গৌরবোজ্জ্বল একটি ভবিষ্যতের লক্ষ্যে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের খোরাক জোগানের মত একটি উৎস। অতএব আমাদের দ্বারাও বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করা সম্ভব এবং তা দিয়ে নতুন একটি ভবিষ্যতের পানে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। আমরা যদি এই আত্মবিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে, বাংলা ভাষায় গোটা মানবতার উৎকর্ষ ও মুক্তির ভাবনায় মুখরিত হয়ে উঠতে পারি, মানবতার কল্যাণে জ্ঞান ও চিন্তার সমৃদ্ধ ইমারত গড়ে তুলতে পারি- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাঙ্গণের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় বিবেক, মন ও মানস একটি দায়িত্বশীল চরিত্র লাভ করবে, আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতি অসাধারণ শক্তিমত্তার অধিকারী হয়ে উঠবে তখন গোটা মানবতার মুক্তির ইশতেহার বাংলা ভাষায়ই রচনা করে বিশ্ববাসীকে উপহার দেয়া সম্ভবপর হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য পরিশেষে বলতে চাই,</p>
<p>আজ আমরা এমন এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছি, যখন আমাদের জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। আমাদের ভাষা- সাহিত্য- সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এগুলো আমাদের জাতীয়তার মূল ভিত্তি ও আত্মপরিচয়ের গৌরবময় উপাদান। এজন্য এই সকল কিছুর বাহন বাংলা ভাষা। যদি আমরা এই ভাষার বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন করতে পারি তাহলে আমাদের জাতীয় গৌরব বৃদ্ধি পাবে, জাতির অস্তিত্ব দৃঢ় ভিত্তি ধারণ করবে। পরমুখাপেক্ষীতা, হীনমন্যতা ও পরনির্ভরতার দ্বারা যেমন কোনোদিন কেউ টিকতে পারে না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকেও আমরা সেভাবে বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। এজন্য আমাদের অবদানের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণাঙ্গ ও গৌরবদীপ্ত হয়ে উঠবে আবারো। বাংলা ভাষার গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব শুধু সাহিত্য রচনা ও চিন্তা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে নয়। বরং এটা পারিপার্শ্বিক বহু ঘটনার সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। চিন্তায় ও সৃজনে বাংলাকে যত্নের সঙ্গে এগিয়ে নেয়ার এ দায়িত্ব আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে।</p>
<p>তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে নজরুল, ফররুখ, আল মাহমুদের রচিত ভাষা ও সাহিত্যের দুর্জয় প্রকাশ। তাদের প্রদর্শিত পথেই আমাদের ভাষা সাহিত্যের গৌরব ও সমৃদ্ধি আগামীতে আরো বেশি এগিয়ে নিতে পারব।</p>
<p>আবারো আমরা সেই হারানো সভ্যতার মত করেই বাংলা সাহিত্যের গৌরব ও ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবো এবং আমাদের আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান ঢাকা কেন্দ্রিক, মসজিদের শহরের রূহকেন্দ্রিক বাংলা ভাষা সাহিত্যের অগ্রযাত্রা নতুন আকারে দীপ্তমান হবে। কারণ আমরা সেই আত্মবিশ্বাসী ও আত্মজাগৃতির এক মহান জাতিসত্তা ধারণকারী মুসলিম উম্মাহ। এজন্য আমাদের এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশাল পথ পাড়ি দিতে হবে, এবং এ লক্ষ্যপানে যাত্রা শুরু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। যে যাত্রার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের পুনরুত্থান কাব্যের পরিভাষাগুলো বর্ণনা করবো। যে বর্ণনার মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র বাংলাদেশের বিস্তৃত জনপদেই নয়, সমগ্র বাংলাভাষী সকল মানুষ তাদের আন্তর্জাতিক দিগন্তরেখায় নতুন এক সূর্যকে উদিত করতে পারবে। এবং আমাদের এই জাগরণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা নিখিল ভারত আবার সেই ইসলামি সভ্যতার, ইসলামী সংস্কৃতির দিকে নতুন করে এগিয়ে যাবে যার মধ্যে দিয়ে আমরা বলতে পারব, মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা &#8216;বাংলা ভাষার&#8217; মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সভ্যতার পুনর্জাগরণের জয়গান রচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তথ্যসূত্র:</p>
<p>১. বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী, ফাহমিদ উর রহমান, মক্তব প্রকাশন, নভেম্বর ২০২১।</p>
<p>২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম এ রহিম, অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, জুন ২০০৮।</p>
<p>৩. প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, দীনেশচন্দ্র সেন, দিব্যপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫।</p>
<p>৪. বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, মুহাম্মদ মতিউর রহমান, ইসলামিক সেন্টার, ফেব্রুয়ারি ২০০২।</p>
<p>৫. বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, মোহাম্মদ আজম, আদর্শ প্রকাশন, মে ২০১৪।</p>
<p>৬.<a href="https://www.rowyakbd.com/bengali-language-in-spreading-islam"> ইসলাম প্রচারে বাংলা ভাষা, সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী, অনুবাদ: মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, রোয়াক ব্লগ।</a></p>
<p>৭. বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নেয়ার ভাবনা, ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bangla-the-second-largest-language-of-the-muslim-ummah/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16044</post-id>	</item>
		<item>
		<title>১৩ জুলাই ২০২৪; আমাদের দেশ, মাটি ও মানুষ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 13 Jul 2024 11:53:25 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14551</guid>

					<description><![CDATA[আজকের দিনে বাংলাদেশের যুব সমাজের চোখে চোখ রাখলে, সহজেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা যাচ্ছে- জাতীয় এক হতাশা আমাদের মাঝে নিমজ্জিত হয়েছে। চতুর্দিকে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, সংকট ও দুর্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনসহ হতাশাজনক ভবিষ্যৎ যখন বিভিন্ন ইস্যু হয়ে যুবসমাজের সামনে আসছে, তখন সে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজকের দিনে বাংলাদেশের যুব সমাজের চোখে চোখ রাখলে, সহজেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা যাচ্ছে- জাতীয় এক হতাশা আমাদের মাঝে নিমজ্জিত হয়েছে। চতুর্দিকে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, সংকট ও দুর্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনসহ হতাশাজনক ভবিষ্যৎ যখন বিভিন্ন ইস্যু হয়ে যুবসমাজের সামনে আসছে, তখন সে যুবসমাজের হতাশ না হওয়ার কোনো কারণ অবশিষ্ট থাকেনা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কাজ করা এবং কর্ম-ভাবনার বহু বিষয় রয়েছে। যেমন- নানাবিধ ইস্যু জারি থাকলেও, জাতীয় সংকট বহুমুখী। এই বহুমুখী সংকটকালের বেশ কিছু বিষয়কে যদি আমরা সামনে নিয়ে আসি তাহলে আমরা দেখতে পাই-</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>প্রথমত,</strong> সিলেট বিভাগসহ আরও ১৭ টি জেলা ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত হয়েছে৷ এর অন্যতম একটি কারণ- আমরা আমাদের শহরগুলোকে, পানি ও নদী ব্যবস্থাপনাকে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আলোকেই গড়ে তুলেছি, সে আলোকেই পরিকল্পনা সাজাই এবং উন্নয়ন খুঁজে বেড়ায়। যেমন, আমাদের শহরগুলোতে পানি নিষ্কাশনের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই না; কিছুদিন আগে মাত্র দু&#8217;দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পুরো শহর ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো। শহরকে সুরক্ষা করার নাম দিয়ে আমরা নদীগুলোতে বাঁধ দিলেও, শহরে পানি নিষ্কাশনের জন্য নদীর সাথে সুন্দর সংযোগ স্থাপন করে বিভিন্ন ধরনের নগরায়ণ করা সম্ভব, এ বিষয়গুলো কখনো চিন্তা ও মানসপটে নেই না। ফলশ্রুতিতে, একটু বৃষ্টি হলেই শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়; আর শহরের এই জলাবদ্ধতায়, পানি যাওয়ার রাস্তা না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পানি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়, পরবর্তীতে দুর্গন্ধ নগরীতে পরিণত হয় এবং এসবের প্রভাব গ্রামাঞ্চলে গিয়ে পড়ছে।</p>
<p>অপরদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কোনো কারণ ছাড়াই বাঁধ ছেড়ে দেওয়া, তাদের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন নীতির কারণে মারাত্নক সংকট ও দূর্ভোগ নিয়মিত আমাদের পোহাতে হচ্ছে৷</p>
<p>আমাদের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকা যেমন সমস্যা; তেমনি একই সাথে যখন আমরা এসব পরিস্থিতিতে পড়ছি, সেই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সঙ্কটকাল মোকাবেলা করার যে উদ্যোগ, সেখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়-</p>
<p>গত কয়েক বছরে বন্যা হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে। এই জেলাগুলোতে যে হারে বন্যা হচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসের অধিক সময় ঐ অঞ্চলের বড় একটি অংশ তথা জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ বেকারত্বের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে; দিনের পর দিন পানিবন্দি! ভয়াবহ অবস্থায় সরকার, প্রশাসন, কোন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠীর দেখা নেই; উদ্যোগ নেই, প্রতিবাদ নেই! এগুলো নিয়ে আজ পর্যন্ত তেমন কোনো কাজ, জাতীয় উদ্যোগ লক্ষ্য করিনি৷ এমনকি কোনো ইস্যুও লক্ষ্য করবেন না৷ <strong>অথচ, বন্যা হলেই আমাদের একটাই কাজ তা হলো- বিভিন্ন দল, ধর্মীয় জনগোষ্ঠী, সেলেব্রিটি ব্যক্তিদের ত্রাণ নিয়ে দৌড়ানোর হিড়িক পড়ে যায়; যাতে লোকসম্মুখে জনপ্রিয় হওয়া যায়। এভাবে প্রতিবছর ত্রাণের মাধ্যমে কি আদৌ এ সমস্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব? এ সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কোন দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তাবনা কিংবা উদ্যোগ নাই। এটি জাতির জন্য বড় আশংকা এবং হতাশার বিষয়৷</strong></p>
<p>ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি দিলিপ দা কুনহা, উনার একটা গবেষণায় দেখিয়েছেন, বন্যা বলতে আমরা যা বুঝি এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। তিনি তার অঙ্কিত ছক-এ দেখিয়েছেন, পানি যখন এসকল বিষয়কে অতিক্রম করে, কিছু শর্ত পূরণ করে, তখন এটাকে আমরা বন্যা বলি। কিন্তু পানি সেসকল শর্তগুলোকে অতিক্রম করছে না, অর্থাৎ মানুষের অব্যাবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট এই দুর্দশা, এগুলোকে বন্যা বলা যায় না। এমনকি প্রকৃতিকেও দোষারোপ করা যায় না।</p>
<p>আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করলে বুঝা যায়, ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নদীর নিয়ন্ত্রণ এ বিষয়টি যুগযুগ ধরে চলে আসা একটি শোষণ৷ আর ঔপনিবেশিক আমলে এ ধরনের বাঁধ দেওয়া, এগুলোকে বিভিন্ন দাতা সংস্থার মাধ্যমে শক্ত অবস্থানে নেওয়া, দেশীয় বিভিন্ন সম্পদ নষ্ট করা, দেশের নদীগুলোকে মৃত করে ফেলা, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে দুর্ভোগে ফেলে, শহর রক্ষার নাম দিয়ে শহরকেও আরেকটি বড় ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে নিপতিত করা, এগুলো ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের কাজ ছিলো। এ কাজগুলো এখনো পর্যন্ত চরম মাত্রায় বিদ্যমান। অর্থাৎ এখনও আমরা মন-মানসে ব্রিটিশ জায়োনিজমের দাসত্ব করে যাই।</p>
<p>আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, সিভিল সোসাইটি কিংবা নাগরিক সমাজ; এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কেউ কিন্তু এগুলোকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করছে না। এখান থেকে উত্তরণের উপায় বাতলে দিচ্ছে না। অথচ এ নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা দেশের অন্যতম আয়ের উৎস, অর্থনীতিকে সচল রাখার বড় এক মাধ্যম। কিন্তু সে মাধ্যমকে আজকে উল্টো অর্থনৈতিক সংকট, ধ্বংস ও মানুষকে মহাদুর্দশায় নিপতিত করার অস্ত্রে পরিণত করেছি। বরাবরের ন্যায় আবারও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত হলো উপকূল অঞ্চলের লোকজন।</p>
<p>এ সকল পানি ব্যবস্থাপনা, নগর ব্যবস্থাপনা, নদী ব্যবস্থাপনা, সঙ্কট বা দুর্যোগগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাকারী, পানি বিশেষজ্ঞ, ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গ, বিজ্ঞানী, স্থপতিগণ সকলকে সাথে নিয়ে ও সকলের চিন্তাগুলোকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি ইশতেহার প্রণয়ন করা এবং জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করা আবশ্যক ছিল। এ কাজগুলোকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আমরা কোনো ইস্যু লক্ষ্য করলাম না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> প্রথম আলো কিংবা বণিক বার্তা-র মত পত্রিকাগুলোতে প্রায়শই দেখা যায় যে, গরিবরা মহাসংকটে, মধ্যবিত্তরা দুর্দশায়, এ ধরনের নানাবিধ প্রবন্ধ। টিসিবির পণ্যের জন্য হুমড়ি খেয়ে ঝাপিয়ে পড়ে কিংবা পরিচিত কাউকে দেখলেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবিত্তরা মুখ লুকাচ্ছেন কিংবা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না টিসিবির থেকে কাঙ্ক্ষিত পণ্য, এজাতীয় খবর! বারবার একই অভিযোগ করা হচ্ছে, মানুষের যে চাহিদা এর ৫ শতাংশও সরকারি টিসিবি থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মানুষের আয়ের উৎসের সংকটের কারণে দেশ এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, গরীব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা সত্যিই কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে তাদের দিন অতিবাহিত করছে।</p>
<p><strong>এখন</strong>, আমরা এখন যদি পর্যালোচনা করি, যে শর্করা জাতীয় খাবার বাজার থেকে কিনতে হয়, যেমন- চাল, আলু ইত্যাদি। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আলুর দাম ছিল পনেরো টাকা কেজি। ২০২২ বা ২৩ সালেও ছিল তা ২৮ টাকা বা ৩০ টাকা কেজি। এবছর বা আজকের দিনে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজিতে গিয়ে সেটা পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা যদি একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন লক্ষ্য করি, ২০১৮ সালে তাদের বেতন সর্বনিম্ন যে মজুরি ছিল একজন শ্রমিক ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বেতন পেতো। <strong>বর্তমানে তার বেতন সর্বসাকুল্যে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা হয়েছে। বেতন অনুপাত অনুযায়ী ডাবল হওয়া তো দূরের কথা, একদমই বাড়েনি। কিন্তু ১৫ টাকার আলু ৬০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিক্সাচালক বা এ ধরনের বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষদের ক্ষেত্রে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই, তারা দুপুরের খাবার না খেয়ে হয়তো গার্মেন্টস এর আশেপাশে এলাকায় টং দোকানে রুটি বা বনরুটি ইত্যাদি খাবার খায়, তারাও সংকটে! কারণ এগুলোর মূল্যও প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।</strong></p>
<p>অপরদিকে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তো আরো ভয়াবহ অবস্থা। নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ গার্মেন্টস সেক্টরেও বেশি। তারা টাকা বাঁচানোর জন্য সন্ধ্যায় টিফিন হিসেবে বা দুপুরের খাবার হিসেবে ঘর থেকে বিভিন্ন খাবার বানিয়ে নিয়ে আসে। কখনো চাল ভাজা, সস্তায় বিস্কুট, চানাচুর, কেউ আটা দিয়ে চাপটি, কেউ বা ডাল-ভাত কিংবা শুটকি তরকারী-ভাত। এই নারী শ্রমিকদের আয় যেখানে বৃদ্ধি পায়নি, যারা টাকা বাঁচানোর জন্য বাহিরে পর্যন্ত খান না, তাদের কাছে আলু বা চালের দাম কমেনি বরং কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের জন্য এই ধরনের খাবার বহন করা অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে গিয়েছে‌। আমিষ জাতীয় যে খাদ্য দ্রব্যগুলো রয়েছে, সবগুলোরই কিন্তু ব্যাপক আকারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় আয়ের যে উৎস, তা খুবই নগন্য।</p>
<p>বাংলাদেশ গার্মেন্টস পেশা থেকে অন্যান্য যেসব শ্রম পেশা আছে, সে তুলনায় শুধুমাত্র গার্মেন্টস সেক্টরে করোনাকালীন সময়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য যে শ্রেণী পেশার শ্রমিকগণ রয়েছে, তাদের কাজের যে ভয়াবহ অবস্থা অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয়ভার অনেক বেশি। একটা পরিবারের মানুষের খাবার খরচ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু যদি এক পরিবারে একজন মানুষ চাকরি করে তাহলে তাদের আয় ১২ হাজার টাকার বেশি না। সেক্ষেত্রে ক্ষুদে বিক্রেতা, ঠেলাগাড়ি টানা কিংবা পুরনো কাগজ সংগ্রহকারী লোকজন, দিনমজুর, বেসরকারি বা আধা সরকারি অফিসের কর্মচারী, যারা বিভিন্ন গাড়ির চালক, শিল্প শ্রমিক, হোটেল বয়, নারীদের ক্ষেত্রে গৃহকর্মী, ঝাড়ু দেওয়া কর্মী, পানি আনা, ক্যান্টিনে কাজ করা, কারখানায় নিম্ন স্তরের কাজ করা বা সেলাই করা মানুষ রয়েছে তাদের কি অবস্থা?</p>
<p>একটি জরিপ বলছে, <strong>৪৯ ভাগ শ্রমিক একদম রুগ্ন এবং পুষ্টিহীন</strong>, যাদের গড় আয়ু কমে আসছে। বিশিষ্ট লেখক মাহমুদ শফিক তাঁর ঢাকা নগরের বিপন্ন পরিবেশ গ্রন্থের ‘অবধারিত মৃত্যু’ অধ্যায়ে লিখছেন, বকুল (তালাকপ্রাপ্ত একজন নারী যার রিকশাচালক স্বামী তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন) বলেন: ‘আমার স্বামীর ছিল দানবের মতো দেহ। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। এখন বুঝতে পারি, রিকশা চালানো কত কষ্টের কাজ। কাজের শেষে দেহটা বিছানার সঙ্গে লেগে যেত। তার পাশে যে একজন মেয়েমানুষ শুয়ে আছে, সে তা মোটেও ভাবত না’। বিষয়টা ভাবতেও কেমন জানি গাঁ শিউরে উঠে…!</p>
<p>এরপর আমরা আরেকটি জরিপ যদি দেখি, <strong>প্রতি ১০ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের মাঝে অধিকাংশই তিন বেলা খায় না।</strong> অথবা খেলেও পুষ্টিহীন খাবার খায়। এদের ৯৮ ভাগ পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে থাকে এবং এর মূল কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে তারা ন্যায্য মজুরি পায় না। বাংলাদেশের ৮৭ ভাগ শ্রমিক; যারা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ কোম্পানি থেকে ঋণ নেয় এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে সুদের ঋণ গ্রহণ করে। <strong>৮৭ ভাগ শ্রমিক সারা বছর ঋণগ্রস্ত থাকে এবং ৬৩ ভাগ শ্রমিক বাকিতে চাল-ডাল কিনে।</strong> এসব নিয়ে তাদেরকেও বিভিন্ন ধরনের অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে হয়।</p>
<p>একইসাথে তাদের খাদ্য যোগানের সাথে সাথে তাদের বড় একটি যোগানের ক্ষেত্র হচ্ছে চিকিৎসা। তাদের পুষ্টির যে অবস্থা এক্ষেত্রে আমরা যদি বিভিন্ন জরিপগুলো দেখি তাহলে দেখা যায়, প্রতিটি শিশু, প্রত্যেকটি ব্যক্তি অপুষ্টির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা শহর কিংবা চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ সকল শহরের কিছু জরিপ যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি; দারোয়ান, পিয়ন, ঝাড়ুদার, মেথর, কুলি, মালি ও বর্জ্য কাগজ সংগ্রহক, বিভিন্ন মেকানিক, দর্জি বা কারখানার শ্রমিক, বাইন্ডিং প্রেসে কিংবা মেটাল সংক্রান্ত কারখানায় কর্মরত যে শ্রমিকরা অর্থাৎ নিম্নশ্রেণীর কর্মচারী যারা রয়েছে, তাদের অধিকাংশই কিন্তু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর মূল কারণ হচ্ছে তাদের ক্যালরি গ্রহণের অভাব অর্থাৎ এক্ষেত্রে একটা নীরব হাহাকার চলছে!</p>
<p>প্রথমত, তাদের ওজন কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, তাদের অসুস্থতা বেড়ে যায় এবং বৃদ্ধ শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মারা যাচ্ছে।</p>
<p>যে কোনো একজন শ্রমিক বিল্ডিংয়ে কর্মরত অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে, তাকে পরিচর্যা করার কেউ নেই, হাড় ভেঙে যাচ্ছে কিংবা মারা গেলেও তার দায়ভারকে গ্রহণ করবে কে? এ নিয়ে কোনো নীতিমালা আমরা আজ পর্যন্ত লক্ষ্য করিনি। এভাবে শত শত শ্রমিক বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, যার জরিপ আজ পর্যন্ত কখনও হয়নি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরপর আসা যাক গার্মেন্টস শ্রমিকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে; যাদেরকে শিক্ষিত বানানোর স্বপ্ন তাদের বাবা-মা দেখে। কিন্তু তাদের ব্যয়ভার বহন করে উঠতে পারে না; তাই তাঁদের বড় একটি অংশ তাদের সন্তানদেরকে এখন কর্মমুখী করার চেষ্টা করছে অর্থাৎ তাদের সন্তানরাও শ্রমিক হিসেবে গড়ে উঠছে। একইসাথে এই সন্তানরাও পুষ্টিহীন অবস্থায় বেড়ে উঠছে, কারণ পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা এতটাই ব্যয়বহুল, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয়না। ফলশ্রুতিতে তারা সুস্বাস্থ্যহীন প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠছে, দিনাতিপাত করছে। ‌</p>
<p>কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ কী আদৌ এরকম একটা দেশ?</p>
<p>যেখানে এরকম দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের কোটি কোটি জনগণের পথ চলতে হচ্ছে। যেখানে আমরা কয়েকদিন আগে দেখলাম চট্টগ্রামের ইসলামী ব্যাংকের একটি শাখায় দেড়শ ভরির অধিক স্বর্ণ উধাও হয়ে গিয়েছে। অমুক ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে। <strong>অপরদিকে ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ এ ধরনের লোকেরা কোটি টাকা বাহিরে পাচার করে নিশ্চিন্তে তাঁদের দিন পার করছে।</strong> কিন্তু সে পাচারের ক্ষেত্রে আমরা সুষ্ঠু সমাধান না দিয়ে চিন্তা করছি, কালো টাকা দেশে কেন ভোগ করতে পারে না, যার কারণে বাহিরে দেশে পাঠাচ্ছে। আবার কালো টাকা ভোগ করার সুবিধা যদি দেশে দেওয়া হয়, তাহলে সবাই এটি অর্জন করতে শুরু করবে। এসব নিয়েই তর্ক বিতর্ক শুরু হয়। এ বছর বাজেটে ১৫ % ভ্যাটের মাধ্যমে কালো টাকা বৈধ করার সিস্টেমেটিক ওয়েও দেখা যায়।</p>
<p>অথচ এসবের বিরুদ্ধে গণমুখী ব্যবস্থা নেওয়া কত বেশি জরুরি ছিল, সেসব নিয়ে কিন্তু আমাদের কোনো মাথাব্যথা কিংবা উদ্যোগ নেই।</p>
<ul>
<li>অপরদিকে হাজার হাজার শ্রমিক যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে রেমিটেন্স পাঠায়, তারাও নানাবিধ কষ্টের মধ্য দিয়ে উপার্জন করে। তাদের পরিবারেরও শহর অঞ্চলে সকলেরই বাড়ি ভাড়া করে থাকা সম্ভব নয়, সন্তানের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো সম্ভব হয়না। তবে, তারা তুলনামূলকভাবে সচ্ছল। মূল বিষয় হলো, তাদের এই কষ্টের টাকা বাংলাদেশে আসছে, তাদের অর্থ উপার্জনের চেয়েও বড় বিষয় তারা পরিবার থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকে। কেউ বাংলাদেশে এসে হয়তো বিয়ে করে, তাকে আবার ফিরে যেতে হয়। আবার যারা বিবাহিত অবস্থায় গিয়েছে, বছরের পর বছর পরিবার সন্তান থেকে দূরে, মা-বাবা থেকে দূরে পড়ে থাকে। এত সকল ত্যাগের মধ্য দিয়ে তাদের পাঠানো রেমিটেন্সগুলো দেশে আসে। হয়তোবা এরচেয়ে বেশি পাঠানো সম্ভব ছিল, যদি তারা দক্ষ হতো। কিন্তু তাদের অধিকাংশ মানুষই অদক্ষ, এ ধরনের মানুষরাই বিদেশে যায়, এটাও আরেক জাতীয় দুর্বলতা।</li>
</ul>
<p><strong>আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি ও আয়ের অন্যতম উৎস বিদেশে থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো আয়।</strong> <strong>সবমিলিয়ে যখন তাদের পাঠানো কষ্টের টাকাগুলো/রেমিটেন্সগুলো দেশে আসে এবং নানাভাবে বাইরেই পাচার হয়ে যাচ্ছে, গোটা জাতি শোষিত হচ্ছে! এরচেয়ে বড় জাতীয় লজ্জা আর কি হতে পারে আমাদের জন্য!? </strong></p>
<p>গত কয়েকবছরে প্রায় ২৫ লক্ষ শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে খালি হাতে! কিন্তু কেউ কি খবর রেখেছে তাদের? বা তাদের কোনো মৌলিক দাবির? তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে? তাদের পারিবারিক অসহায়ত্বের কোনো সমাধান কি হয়েছে? জমি বিক্রি করে আমাদের টগবগে যুবকরা বিদেশে গিয়ে অসহায় চেহারা নিয়ে রাতদিন খেটে যায়, নির্যাতিত হয়; তাদেরকেই যখন খালি হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তখন একটা লাইনও আমরা উচ্চারণ করি না! কোনো উদ্যোগ ও কর্মসূচি তো বহুদূর! আদৌ এর কোন সমাধান হয়েছে কি?</p>
<ul>
<li>এরপর যদি আসা যাক নারী শ্রমিকদের আলোচনায়, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা। নিয়মিতই দেশে প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের লাশ ফেরত আসছে। <strong>এক বছরে সবমিলিয়ে লাশ এসেছে ৪ হাজার ৮৮১ টি।</strong> এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও অনেক। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় <strong>সাড়ে তিনশ</strong>। তাঁদের মধ্যে <strong>৫৩ জনই আত্মহত্যা</strong> করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে! কোনটা আত্মহত্যা আর কোনটা হত্যা, তাইবা কে বলবে? কেনইবা পরিবারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আমাদের মায়েরা আত্নহত্যা করে? কেউ আছে আমাদের? আছে কোনো পররাষ্ট্রনীতি, কোনো বৈদেশিক শ্রম ও অধিকার মন্ত্রণালয়?</li>
</ul>
<p>এ সকল পরিস্থিতিতে সত্যিকার সমাধান বা উত্তরণের উপায় বের করতে এগুলোকেই জাতীয় অর্থনৈতিক ইস্যু কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা বিভিন্ন ধরনের অহেতুক ইস্যুতে ব্যস্ত। ফলশ্রুতিতে যুবকরা কেন-ই-বা হতাশ হবেনা?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তৃতীয়ত,</strong> আমরা যদি লক্ষ্য করি, বাংলাদেশ আজ ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নিমজ্জিত। অপরদিকে এসকল জ্বালানি সংকট নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই, থিসিস বা রিসার্চ পেপার নাই, কোনো প্রস্তাবনা নেই কিংবা সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে কর্মসূচি নেই। কিছুদিন আগেও আমরা দেখতে পেয়েছি, সেন্টমার্টিন নিয়ে এত কথা ও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অথচ, সেন্টমার্টিন নিয়ে কোনো ধরনের থিসিস বা প্রস্তাবনা নেই। আসলে সেখানে কী হয়েছিল? এখানে কী আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা অথবা সুশীল সমাজের দুর্বলতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না? এগুলো কেন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয় না?</p>
<ul>
<li>এরপর যদি আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের পার্বত্য অঞ্চল এখনো পর্যন্ত একটি ধোঁয়াশায় নিপতিত হয়ে আছে। সেটি নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই, বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ কারো কোনো গঠিত প্রস্তাবনা নেই কিংবা এ বিষয়ে আমাদের কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নাই।</li>
</ul>
<p>আমরা কিছুদিন আগে মেতে উঠলাম ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে। এখানে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, আমাদের সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি নেই কেন? পররাষ্ট্রনীতি থাকলেও সেটা আদৌ কী? অর্থাৎ সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি যদি থাকতো, তাহলে এই নীতির উপর ভিত্তি করে ভিন্ন দেশের সাথে আমরা চুক্তি করতে পারতাম। সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতিই যেখানে নেই, সেখানে ছোটখাটো দুই-একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস কিংবা ছোট দুই-একটি খবর দেশের পলিসির কিই-বা পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ স্থায়ী মুক্তির জন্য কোনো ইশতেহার সামনে হাজির নেই, কোনো গবেষণা নেই, সুশীল সমাজের কাজ নেই, সেখানে যুব সমাজ কেন-ই-বা হতাশ হবে না?</p>
<ul>
<li>বাংলাদেশের দারিদ্র্য কিংবা যুব সমাজের হতাশা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দেশের মৌলিক আলাপের বিষয় হওয়া দরকার ছিল; শিক্ষাব্যবস্থা। আর এই সেক্টর দক্ষ যুব সম্প্রদায়ের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হবে, পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন খাতসমূহকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। এ ধরনের কোনোকিছুই কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি না অর্থাৎ আজকের এই যে ভয়াবহ বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে, এর পেছনের অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।</li>
</ul>
<p>জাতীয় সংকট পূরণে এ শিক্ষাব্যবস্থা কোনো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারছেনা। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে সকল বিষয়ে কোন প্রস্তাবনা নেই, কর্মপরিকল্পনা নেই।</p>
<p>সার্টিফিকেট ছাড়া ভিন্ন কোন অর্জনও নেই, বিবেকবোধ পর্যন্ত জাগ্রত হচ্ছেনা! বর্তমানে আমাদের এমন অবস্থা যে, রাস্তার পাশে বৃদ্ধ অসহায় নারীদের পড়ে থাকা, কিংবা যুবতী নারীরা শিশুসন্তান নিয়ে ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে, বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করছে, শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাসহ সকল কিছু থেকে বঞ্চিতরা পথে ঘুমাচ্ছে, সেসকল মানুষজনের দিকে তাকানোর পরেও শিক্ষার্থী সমাজের ভবিষ্যৎ ভাবনা, দেশকে গঠন করার ভাবনা, কাজ করার মানসিকতা তৈরি হচ্ছেনা। অর্থাৎ এক ভয়াবহ মানসিক দাসত্বের মধ্যে দিয়ে বড় হচ্ছি কিংবা দিন পার করছি। তার মূল কারণও আখলাক ও আধ্যাত্মিকতাহীন এই শিক্ষাব্যবস্থা। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যদি হাজির থাকে, কেন-ই-বা আমাদের যুব সম্প্রদায় হতাশ হবেনা?</p>
<ul>
<li>গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়ে আমাদের নজর দেওয়া আবশ্যক।</li>
</ul>
<p>কিছুদিন আগে ঈদ গেল! শুধুমাত্র গত এক বছরে- প্রায় ০৭ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু পরিসংখ্যান আমাদের আড়ালেই থাকে তা হচ্ছে- মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যারা নিহত হয়। রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, নদীপথেও দুর্ঘটনা ঘটছে; এগুলোকে শক্তিশালী করে সুন্দর একটি বিকল্প মাধ্যম বানানো যেত, কিন্তু নদীগুলোকেও আমরা হত্যা করছি।</p>
<p>অপরদিকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল সাইটে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কয়েক লক্ষ ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লক্ষ-লক্ষ ভুয়া চালক এখন বিদ্যমান। <strong>বিশেষ করে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মনির মারা যাওয়ার পর বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডক্টর শামসুল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাস্তার বাঁকগুলো অবৈজ্ঞানিক। যে ধরনের প্রশস্ততা থাকা দরকার সে ধরনের প্রশস্ততা নেই। রাস্তাগুলো যেখানে যে ধরনের বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা দরকার ছিল সেগুলো নেই।</strong></p>
<p>গাড়ির যে অবস্থা সেখানকার যে তদারকিসহ সকল জায়গাতেই একটা ব্যর্থতার পরিচয় আমরা দিয়ে যাচ্ছি। এগুলোকে জাতীয় ইস্যু, সংস্কার করা, সমাধান করা নিয়ে সে অর্থে দাবী উত্থাপন করতে দেখা যায়না, এমনকি জাতীয় রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুতে এ সকল বিষয়গুলোকে আমরা হরহামেশা অনুপস্থিত রেখে দিচ্ছি। অথচ দূর্ঘটনা আমাদের জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।</p>
<ul>
<li>সম্প্রতি হঠাৎ ব্যাপকভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে! দ্যা ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর ২০২৩ সালে ২৭৬২৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দৈনিক ৭৭টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মিডিয়া সেল থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সারা দেশে এই অগ্নিকাণ্ডে ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য ঘটনা মিডিয়া কভারেজের বাইরে ছিল।</li>
</ul>
<p>বিভিন্ন গ্যাস ফিল্ড, বিভিন্ন কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি বিষ্ফোরণ হয়ে বিভিন্ন বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। এসব কিন্তু সিস্টেমেটিক বিষয়ের সাথে জড়িত। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো চাইলেই সমাধান করা সম্ভব। যখন মারা যাচ্ছে, তখন কিছু কথাবার্তা হচ্ছে, কিছু গ্রুপ ত্রাণ দিচ্ছে, কোন কোন সংগঠন আবার সমবেদনা জানিয়ে প্রেস ব্রিফিং করছে কিন্তু তারপরে কেউ এ ব্যাপারে এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন থেকে শুরু করে কেউ কথা বলছে না, কেউ কোনো ভূমিকা রাখছে না। এ সকল ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যখন দেশ আগাচ্ছে, তখন যুব সম্প্রদায়ের মনে হতাশা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।</p>
<p><strong>কারণ এই সময়ে বসে আমরা দেখতে পাচ্ছি,</strong> সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে। সামগ্রিকভাবে আইনের শাসনে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। ঋণ খেলাপের দিক থেকেও বাংলাদেশ প্রথম সারিতে অবস্থান করে। এভাবে করে বাংলাদেশে ধর্ষণ সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে, গত দুই বছরে ১৭ হাজারের অধিক নারী-শিশু ধর্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ আইন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। এ সকল সহিংসতার দিক থেকে বাংলাদেশের ঢাকার অবস্থান চতুর্থ। ২০০২ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ ও গণধর্ষণের পর হত্যা, এছাড়াও বিভিন্ন যে হত্যাগুলো হয়েছে অর্থাৎ বিনা অপরাধে কিংবা হত্যা সংশ্লিষ্ট যে মামলাগুলো হয়েছে, তার ৯৭ ভাগেরই সাজা হয়নি। নাগরিক নিরাপত্তার বেলায়ও আমরা দেখতে পাই, ১১৩ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২ বা ১০৩ এ থাকছে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা, যানবাহন নির্মাণ-শিল্প, পাহাড়কাটা, জাহাজের কিংবা ট্রেনের নিচে অবহেলার জন্য দুর্ঘটনা, নানাবিধ কারণে শত শত হাজার হাজার মানুষ মরছে। বৈদ্যুতিক শক কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে, উচু জায়গা থেকে পড়ে গিয়ে একইভাবে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হচ্ছে। এর থেকেও বেশি নিহত হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিনা অপরাধে হত্যার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা সুষ্ঠু কোন সমাধান পাচ্ছিনা। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমাধান হচ্ছে না অর্থাৎ ৯৭ ভাগ অপরাধী এ পর্যন্ত সাজারই বাইরে থেকে গেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এ সকল পরিস্থিতিতে দেশের যুব সম্প্রদায়ের মূল অংশটি কিন্তু দেশ ছাড়ার জন্য উন্মুখ।</strong></p>
<p>যে দেশে বেকারত্ব, যে দেশের কৃষি সংকট, যে দেশে সুস্থ শিক্ষার সংকট, যে দেশে এরকম অনিরাপত্তা! এই ধরনের সৃষ্ট সমস্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত করা, সেখানে গোটা প্রজন্মই যেন বড় হচ্ছে দেশ ছাড়ার স্বপ্ন নিয়ে।</p>
<p>তবে সেখানে একটি বড় অবদান রাখতে পারতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহ। ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধী দল, তাঁদের কোন দল ক্ষমতায় আসার পরে প্রথমে কিছু ইনোভেটিভ, ভালো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিগত ছয় মাসে বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে সেটিও কিন্তু আমরা লক্ষ্য করিনি। একইভাবে এই সকল জায়গাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারতো বিরোধী দলগুলো, তারা কোনো ভূমিকা রাখছে না। মূল কথা হচ্ছে জাতীয় রাজনীতি চরম হাহাকারে নির্মিত হচ্ছে।</p>
<p>এ হাহাকারটা কিসের?</p>
<p>এ হাহাকার নেতৃত্বের হাহাকার, যুবক সমাজের প্রস্ফুটিত হওয়ার হাহাকার। কারণ শক্তিশালী যুববান্ধব নেতৃত্ব নেই, কিছু কথাবার্তা হলেও সেগুলো ফেসবুকের কিছু লেখালেখি, কিছু ইউটিউবের ভিডিও! অর্থাৎ কোনো ভিশনারি দলের পক্ষ থেকে শক্ত লিডারশিপ এবং জাতির সংকট উত্তরণের জন্য তাদের পক্ষ থেকে কোন যৌক্তিক আহ্বান করছেনা। <strong>যুব সমাজকেও গড়ে তোলার কোনো প্রচেষ্টা করছে না। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে এর ভয়াবহ যে শূন্যতা, তার বড় প্রমাণ হচ্ছে তরুণ নেতৃত্ব তুলে আনার জন্য কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক কোনো উদ্যোগ বর্তমানে আমরা লক্ষ্য করি না।</strong> বরঞ্চ নানাবিধ ইস্যুর ভীড়ে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। অথচ এই যুবসমাজকে গড়ে তোলার চেয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক যে উদ্যোগগুলো প্রয়োজন ছিল; এই প্রয়োজন সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বেকারত্ব, শিক্ষা কাঠামো, দেশের অব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়গুলোকে নিয়েই কিন্তু ইস্যু হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো কেউ করতে পারছে না। মূলত এই প্রত্যেকটি কাজ ছিল বড় বড় রাজনৈতিক দল, সংগঠন, অর্থনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর। অথচ কেউ এক্ষেত্রে স্বার্থক কিংবা সফল হতে পারেনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আবার সকলের একটি মুখস্ত দোষ দেওয়ার জায়গা তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে, তারা কিছু করতে দিচ্ছেনা। আসলে কি আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে? নাকি বাহ্যিকভাবে কোনো নেতৃবৃন্দ দেখা গেলেও তাদের হাতে আসলে দেশ নেই। মাফিয়া সিন্ডিকেট কিংবা ডিপ স্টেটগুলো দেশ চালাচ্ছে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের মত করে সমস্ত কিছুকে শোষণ করে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। আমরা সম্পূর্ণ একটি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছি।</p>
<p>আমরা যদি বিএনপি-জামাতের দিকে লক্ষ্য করি, তারা নির্বাচনের আগে একটু একটিভ হলেও বাকি সময়গুলোতে জাতীয় ইস্যু তারা নির্ধারণ করতে পারছে না। গণমুখী আহবান তাদের করতে হবে। এটা তাদেরকে করতে হবে, যদি তারা সামনে কিছু করতে চায়। তারা আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, তারাই দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ সংগ্রামকে এগিয়ে নেবে; এ ধরনের দৃঢ়তা তাদের জন্য আবশ্যক।</p>
<p>অর্থাৎ এই যে সংকট, এ সংকটগুলো কেন-ই-বা তৈরি হচ্ছে? এ প্রশ্ন কিন্তু আমরা করছি না। কারণ এ অবস্থা একদিনে হয়নি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। কেন জাতীয় ব্যর্থতা?</p>
<ul>
<li><strong><em>সমাজ গতিশীলতা হারিয়ে ফেলছে, আমরা ব্যক্তি পর্যায় থেকে কেউ কাজ করি না। কেউ দেশকে শক্তিশালী করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছি না।</em></strong></li>
<li><strong><em>সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তি চেপে বসা।</em></strong></li>
<li><strong><em>ডিপ-স্টেটগুলির নিয়ন্ত্রণ। </em></strong></li>
<li><strong><em>আমাদের সামাজিক সচেতনতাকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলা। এ সকল কারণগুলোর মধ্য দিয়ে একটা অজানা দাসত্ব ব্রিটিশ আমলের ন্যায় চেপে বসে আছে। </em></strong></li>
</ul>
<p>ফলশ্রুতিতে জ্বালানি খাতের মতো এতো বড় খাত কিংবা সাধারণ একটি খাতের কোনো সুষ্ঠু নীতি তৈরি করতে পারি না। যেমন- জ্বালানি খাতের ভুল নীতির কারণে আজকে বিদ্যুৎ সংকটে পড়তে হচ্ছে। সত্যিকারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নেই, থাকলেও তাদের নীতি সর্বদাই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় তৈরি হয় এবং সে আলোকেই প্রস্তাবনা দেয়। আমদানি নির্ভর জ্বালানি খাত বানানোর মতো অন্যতম কারণও এটি। খাদ্যের ক্ষেত্রে একই ভাবে এটি আমদানি নির্ভর করে রেখেছে। খাদ্য বিশেষজ্ঞ আমাদের নেই? সে ধরনের নেতৃত্ব কি নেই? সত্যিই তো নেই। যেখানে বড় বড় গোষ্ঠীর দলগুলি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সেখানে যুবকদের অবস্থা কিইবা হবে?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্য বলতে চাই,</p>
<p>জাতীয় ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে, সমাজকে গতিশীল করতে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে মুক্ত করতে, সামাজিক সচেতনতা এবং দাসত্ব থেকে মুক্ত একটি যুব সম্প্রদায়কে গড়ে তুলতে; <strong>সর্বপ্রথম যুবকদেরকে একটি জাতীয় ভিশন দেখাতে হবে।</strong> প্রত্যেকটি ব্যক্তি যেনো তার ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে, নিজ ফিল্ডে জানা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারে, উপমা তুলে ধরতে পারে। সংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা শিক্ষা বা অন্য কোনো মাধ্যমে যুবকদের গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। ভিশনারী এই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলেই আজকের এই দিনের হতাশা যুব সম্প্রদায়ের মাঝে আত্মবিশ্বাস আকারে ফিরে পাবে।</p>
<p>কারণ আমরা সংগ্রামী জাতি, যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করেই আমাদের আজানকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, জাতীয় সত্তাকে টিকিয়ে রেখেছি, ঈমানকে টিকিয়ে রেখেছি, আমাদের মাটি ও মানুষের মৌলিক যে চেতনা সেটিকে টিকিয়ে রেখেছি। অতএব এ সকল বিষয়কে যেহেতু আমরা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, অর্থনীতি, পানি, নগর, গার্মেন্টস, জ্বালানি সকল ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে পারবো এবং জাতীয় নেতৃত্ব আমাদের যুব সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই দিতে পারবো, এ বিশ্বাস লালন করতে হবে এবং এটার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার ওয়াদা অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যোগ্য করে তুলবেন, ইনশাআল্লাহ।</p>
<div id="gtx-trans" style="position: absolute; left: 66px; top: 2202.93px;">
<div class="gtx-trans-icon"></div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/13-july-2024-our-country-soil-and-people/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14551</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান; জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫</title>
		<link>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 30 Jun 2024 13:53:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি খাত]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট]]></category>
		<category><![CDATA[জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫]]></category>
		<category><![CDATA[সুদ ও জনস্বার্থবিরোধী ভাগ্যলিপির আখ্যান;]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14504</guid>

					<description><![CDATA[একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>একটি দেশের উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় বাজেট। বাজেট শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের পেছনে কত টাকা আয়-ব্যয় হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একইসাথে এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা ও ভাগ্যনামা। আগামী এক বছরে একটি পরিবার কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে, সেই অর্থবছরে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি কী হবে, ঢাকার একজন শিক্ষার্থী নিত্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কতটা সহজে সংগ্রহ করতে পারবে অথবা রাজশাহীর একজন কৃষক তার উৎপাদিত আমের ন্যায্যমূল্য পাবেন কি-না– এগুলোর প্রতিটিই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এক কথায়, কোনো একটি দেশের ব্যক্তি পরিসর থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় বিষয়াদি; এমনকি আন্তর্জাতিক বিশ্বে সেই দেশটির কূটনৈতিক পন্থা নির্ধারণ কেমন হবে– এ সবকিছুই বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। এজন্য বাজেটকে এক অর্থে একটি জাতির ভাগ্যলিপি হিসেবেও উল্লেখ করা যায়।</p>
<p>প্রতি বছরের ন্যায় ‘সুখি, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে এবারও জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৪.২ শতাংশ এবং চলতি বাজেটের তুলনায় ৪.৬ শতাংশ বেশি। প্রতি বছর বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও কেন দেশের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। পাশাপাশি বাজেটের কলেবর বৃদ্ধি আদৌ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য সহায়ক নাকি বোঝা স্বরূপ, তাও আলোচনা করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে বাজেটের খাতগুলোও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের পর্যালোচনা</h3>
<p>একটি দেশের বাজেটের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো হলো শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য। কারণ দেশের সকলেই এ খাতগুলোর উপর সরাসরি নির্ভরশীল এবং এগুলোর উপরেই দেশের অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন ছিলো এ খাতগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বরাবরের মতোই অবহেলিত রয়েছে এ খাতগুলো। বর্তমান অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রেক্ষিতে যদি আমরা বিস্তারিত আলাপ করি, সেক্ষেত্রে দেখা যায়–</p>
<p>★<strong> শিক্ষা খাত</strong></p>
<p>আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষার হার এখনো আশানুরূপ পরিমাণে বাড়েনি। ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এর সুবাদে প্রাথমিকে ধীরে ধীরে প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও এসব শিক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশি মাধ্যমিক স্তর পার হতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর ২০২৩ সালের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলো ৯২ লাখের বেশি। ২০২৪ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৬৬ হাজারে।</p>
<p>পারিবারিক দরিদ্রতা, শিক্ষার ব্যয়ভার মেটানোর অক্ষমতা এবং চাকরি নির্ভর পড়াশোনাকেই শিক্ষা হারের এ দুর্দশার কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি হিসাব মতে দারিদ্র‍্যের হার ১৮.৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তব সংখ্যা এরচেয়ে দ্বিগুণ বেশি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর জরিপ অনুসারে, ২০২০ সালের শেষে দারিদ্যের হার ছিলো ৪২ শতাংশ। এর মাঝে দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বাস করছে ২৮.৫ শতাংশ নাগরিক। এদিকে ভর্তি ফি, টিউশন ফি, শিক্ষার উপকরণ খরচ, প্রাইভেট-কোচিং বাবদ ইত্যাদি সবই এ বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে।</p>
<p>এর পাশাপাশি, গ্লোবালাইজেশনের সময়ে এসে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল, সেখানে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সকল কিছুরই ব্যয়ভার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইটি পণ্যগুলোর দাম দিনদিন বাড়ছেই। ডিজিটালাইজেশনের সময়ে এসে এমন লাগামহীন অবস্থা শিক্ষাব্যবস্থায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।</p>
<p>অথচ এতসব কিছু বিচার বিবেচনায় না নিয়ে প্রতি বছর শিক্ষা খাতে বাজেটের হার কমছেই। শিক্ষাখাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে বরাদ্দ ছিলো জিডিপির ১.৮৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১.৭৬ শতাংশে নেমে আসে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১.৬৯ শতাংশে, যা মোট বাজেটের ১১.৮৮ শতাংশ। অঙ্কের হিসেবে ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।</p>
<p>একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ইন্ডিপেনডেন্ট এর সূত্রানুযায়ী এ বছরের বাজেটে ৫৬ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মতো। এবং বণিকবার্তার সূত্রানুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি। সেক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের পেছনে গবেষণা বাবদ অর্থ বরাদ্দ মাত্র ১ লক্ষ টাকার কিছু বেশি। একজন শিক্ষক মাত্র এই কয় টাকার উপর নির্ভর করে গবেষণায় কতটা মনোনিবেশ করতে পারবে বলে মনে হয়? তাহলে কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার প্রতি অনীহা বা অনাস্থা প্রদর্শন করবে না?</p>
<p>আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও বর্তমান শিক্ষার মান হিসেবে এই খাতে বাজেটের পরিমাণ নিতান্তই কম। আইএলও এবং ইউনেস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মান মোট বাজেটের ২০ শতাংশ আর জিডিপির ৬ শতাংশ। এর তুলনায় যে নগণ্য বরাদ্দ আমাদের বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কীভাবে একটি দেশের শিক্ষার মানের উন্নতি আশা করা যায়? এছাড়া, গবেষণার জন্য তো আলাদা বাজেট নেই-ই। উচ্চশিক্ষার জন্য গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না পারছে একটি শিক্ষিত ও জ্ঞাননির্ভর জাতি গঠন করতে, না পারছে জাতীয় শিক্ষার মান উন্নত করতে। তারচেয়েও দুর্ভাগ্যজনক হলো এ বরাদ্দের ক্ষুদ্র একটি অংশই শিক্ষাখাতে সত্যিকারার্থে ব্যয় হয়, সিংহভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগী দুর্নীতিবাজ শ্রেণির পকেটে।</p>
<p>স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরোলেও শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের মান, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের আবাসান সংকট, গবেষণার দৈন্যদশা, জ্ঞানচর্চার সুষ্ঠু আবহ– এসবের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন নেই। সব মিলিয়ে অবস্থার চরম করুণ পরিপ্রেক্ষিতে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষাখাতে যতটুকু বাজেট দেওয়া হচ্ছে, তার সম্পূর্ণটাই কি এ খাতে ব্যয় হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে স্বল্প পরিমাণ বাজেটের অংশটুকুও? এই প্রশ্ন জাতির প্রতিটি সচেতন বিবেকের। <a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hasan-vai-1.jpg" height="123" /></a>★<strong> কৃষি খাত</strong></p>
<p>শত শত নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত কৃষি। শুধু আমাদের দেশেরই নয়, বরং যে কোনো দেশেরই উন্নতি-অগ্রগতির প্রধান বাহন এ কৃষি খাত। আমরা দেখি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন ও রাশিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পখাতে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃষিকে কখনোই অবহেলা করেনি। যার ফলে, সারা বিশ্বে গম, ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনেও শীর্ষস্থানে রয়েছে এ দেশগুলোই।</p>
<p>এদিকে বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদেও কৃষির সাথে যুক্ত (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩)। অথচ এ দেশের কৃষি খাতের অবস্থা দিনদিন ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হচ্ছে। রপ্তানির পরিমাণ তো বৃদ্ধি পাচ্ছেই না, উল্টো যত দিন যাচ্ছে, আমদানির পরিসংখ্যান যেন তরতর করে বাড়ছে। যেখানে ইলিশ, পাট, চালসহ আরও নানান কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে ছিলো, সেখানে বর্তমান সময়ে এসে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ভুট্টা, ডাল, মসলা, ফল, নারকেল, নারকেলের শাঁস, সারসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি আমদানি করতে হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাতীয় অর্থ।</p>
<p>বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপাত্ত অনুসারে, কৃষি পণ্য আমদানিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার কোটি ডলার) বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সূত্র অনু্যায়ী, একই অর্থবছরে সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে বিলিয়ন ডলারের (৫০০ কোটি) বেশি। ফলে দেখা যাচ্ছে, কৃষি পণ্য ও সার আমদানিতে বাংলাদেশকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ বছরে মূল্যস্ফীতি ও চাহিদা বাড়ার কারণে কৃষিতে আমদানির এ পরিমাণ বেড়ে তিনগুণও হতে পারে।</p>
<p>রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দামও। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কৃষি বাজার। যে সবজি পূর্বে ৩০/৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত, তা এখন ১০০ টাকা ছুঁয়েছে। বেড়েছে চালের দাম, মাছের দাম, মুরগীর দামও। তেলের দামও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে এ দাম বাড়ানো হয়, অথচ যখন বিশ্ববাজারে দাম আবার কমে, তখন স্থানীয় বাজারে দাম কমার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।</p>
<p>এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক বাজেটের মাত্র ৪.৭ (বণিকবার্তা) শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কৃষি খাতে। যদিও গতবারের তুলনায় এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বেশি, তবু বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশের জন্য এমন বরাদ্দ খুবই আশঙ্কাজনক। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক জরিপে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে; সেই জরিপে দেখা যায়, খাবার কিনতে হিমশিম খাওয়া মানুষের হার ৬৮ শতাংশ। দেশের জনগণের এই দুর্দশা ঘোচাতে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিলো এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু নতুন বাজেট আবারও হতাশ করেছে জনগণকে। কেননা, সেই পদক্ষেপের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না বাজেটে। তার মানে আগামীতেও সহজে পরিবর্তন হচ্ছে না চলমান পরিস্থিতি। বাজেট আসছে যাচ্ছে, কিন্তু সেই পুরনো ভুত কাঁধে নিয়েই এগোচ্ছে গোটা জাতি।</p>
<p>★<strong> স্বাস্থ্য খাত</strong></p>
<p>বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত। কিন্তু, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।</p>
<p>সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে জনপ্রতি চিকিৎসা-ব্যয় গড়ে ৫৪ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় পাঁচ হাজার ৯৯৪ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা নিতে বহির্গমনকারী রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ। বিডার হিসাবে, এ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর আস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশে বিগত বছরগুলোয় সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বাড়লেও চিকিৎসকের মান ও সেবার পরিধি প্রসারিত হয়নি। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরেই যেতে হয় সামর্থ্যবানদের।</p>
<p>কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কী অবস্থা? এখন পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে বিশেষায়িত সেবা পৌঁছায়নি। নির্ভুল রোগ নিরীক্ষা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব সংকটের কারণে রোগীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে বেসরকারি হাসপাতালে যায়। যখন সেখানেও প্রয়োজনীয় সেবা মেলে না, তখন যাদের সক্ষমতা রয়েছে, তারা বিদেশে চলে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তারা? তারা তাদের সমস্যাবলি শরীরে নিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে থাকে।</p>
<p>স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য হাসপাতাল রয়েছে মাত্র ৮,৪৯৪। যার সবগুলো মিলিয়ে শয্যাসংখ্যা মাত্র ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৩০১ টি। জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা যে অতি নগণ্য, তা পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।</p>
<p>চিকিৎসা ব্যবস্থার এহেন করুণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট মাত্র ৫.১৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। একটি দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের সকল জনগণের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার জন্য এই ক্ষুদ্র অংশ কোনোমতেই যথেষ্ট নয়।</p>
<p>★ <strong>অন্যান্য</strong></p>
<p>এ তো মাত্র কয়েকটি খাতের পর্যালোচনা। অন্য সবকটি খাতই পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় খাতগুলোতে যথাযথ বাজেট নেই। এমন সব খাতে বরাদ্দ বেশি দিয়ে রাখা হয়েছে, যেগুলো আদতে মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোনো পরিবর্তন আনছে না, দেশের সামগ্রিক উন্নতিতেও অবদান রাখছে না। পাশাপাশি কোনো খাতেই সঠিক ব্যয় হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ শ্রেণি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বরাদ্দকৃত এ প্রয়োজনের তুলনায় ক্ষুদ্রাংশও ঠিকঠাক পৌঁছাচ্ছে না জনগণের দোরগোড়ায়।</p>
<p><strong>বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ৩.৮%, পরিবহন ও যোগাযোগে ১০.৪০% বরাদ্দ রেখে বাজেট করা হলেও তা কি আদৌ বাস্তবায়ন করা হয়? এ খাত দুইটির সাথে প্রক্রিয়াধীন ও প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট জড়িত, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ছেই। কখনো কখনো তা একই ধরনের প্রকল্পে উন্নত রাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।</strong> প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কাঁচামালের যোগান সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। এক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা ও তা উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা মোটেও নেই। প্রযুক্তিও ব্যবহার হচ্ছে বিদেশীদের। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও কোনো দেশী কোম্পানির কাছে নেই। প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই বিদেশী। আর শ্রমিকদের মধ্যে দেশীয় যারা, তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাও নিতান্তই সামান্য। তাহলে কার পেছনে ব্যয় হচ্ছে এত অর্থ?</p>
<p>বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছোট-বড় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াট হলেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৭৮২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তার উপর এ অংশ থেকেই বিতরণ ক্ষতি হয়েছে ৮.৪৮%। যার ফলস্বরুপ এখনো ২১% বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে।</p>
<p>পরিবহন ও যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত নগরজীবনে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। যানজটের ফলে দীর্ঘ একটি সময় অপচয় হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সময়। নগরবাসীদের অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তো দিন দিন বাড়ছেই। কেবল ২০২১ সালেই সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮৫১৬ জন। একটা প্রতিবেদনে এ রকম দেখালেও মূলত বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।</p>
<p>বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে রেল ও নৌপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিলো। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নৌ-পথ অর্ধেকের বেশি কমেছে। রেলপথ গুরুত্ব পায়নি, বরং রেলযাত্রার উপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সড়কপথ বাড়লেও এসবের মান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।<br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<h3>📌 সুদভিত্তিক বাজেট</h3>
<p>সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো প্রতিবারের মতো এবারের বাজেটও একটি সুদভিত্তিক বাজেট। আমরা যেখানে দেখতে পেলাম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বাজেটের যথেষ্ট বরাদ্দ নেই, সেখানে সুদের মতো একটি সম্পূর্ণ অযাচিত খাতেই ব্যয় হচ্ছে বাজেটের ১৪.২৪%। অর্থাৎ, মোট বাজেটের ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুধু সুদ হিসেবেই দিতে হবে আগামী এক বছরে।</p>
<p>অথচ, এই সুদ কেবল ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, একইসাথে অর্থনৈতিক দিকে থেকে একটি ভয়াবহ বিষয়। ৯২% মুসলমানের দেশে ১৪.২৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই; অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতিরাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দরিদ্রতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার, সামাজিক নিরাপত্তা খাত এর মতো যে সকল খাতে দুর্নীতি বেশি, সে সকল খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিলো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্দকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি! আর মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কীভাবে পরিশোধ করবো? অথচ</p>
<p>আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সা.) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সব সময়ই সুদের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ, এই সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও এই অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সা.)। এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি</h3>
<p>অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদের ভয়াবহ আরেকটি কুফল হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। বর্তমানে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার চলছে ৯.৮%। এই অবস্থার মাঝেও প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ৬.৫%। অথচ আমরা দেখেছি গত অর্থবছরে ৬% লক্ষ্যমাত্রা ধরেও তার লাগাম টেনে ধরতে পারেনি সরকার। বরং আকাঙ্ক্ষিত অঙ্কের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে ৩.৮% বেড়ে গেছে এই সংখ্যাটা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 ঘাটতি নির্ভর বাজেট</h3>
<p>অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারের বাজেটও সম্পূর্ণ ঘাটতি বাজেট। মোট বাজেটের পরিমাণ ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাকী ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা পুরোটাই ঘাটতি থাকছে। যা মোট বাজেটের ৩২.১২ শতাংশ।</p>
<p>অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েই এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ঋণ নেয়ার ধারাবাহিকতা আজ নতুন নয়। প্রতিবছরই ঋণের বোঝা বাড়ছে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭৪ ডলারে। টাকার হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজারের বেশি টাকা। সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুটির উপরও এই ঋণের ভার বর্তাবে।</p>
<p>বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি নিরাপদ সীমার মাঝে পড়ে। অথচ ২৩-২৪ অর্থবছরেরই ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫.৫ শতাংশের বেশি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে চার দশমিক ছয় শতাংশ (ডেইলি স্টার)। এই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ঋণ ও প্রতিবছর যে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে, এ নিয়ে বাজেট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তো লক্ষ্যণীয় নয়ই, বরং নামেমাত্র যেনো বাজেট পেশ করতে হবে, এজন্যই বাজেট পেশ করা হচ্ছে।</p>
<p>কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, “আর্থিক বিবৃতি প্রদান একপ্রকার ধর্মীয় আচার হয়ে দাড়িয়েছে, যা পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে এবং তার সম্ভাব্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রভূত বাকচাতুরীর দ্বারা উচ্চকিত রূপে পাঠ করা হয় (যা কখনোই পাঁচ ঘণ্টার নিচে সম্পন্ন হওয়ার নয়) অর্থাৎ নানাবিধ নর্তন, কুর্দন, ভাব ও ভঙ্গিমার সঙ্গে চার ঘণ্টার একটি বক্তৃতা প্রদান করা হয়।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 কালো টাকা সাদা করার জঘন্য নীতি</h3>
<p>এদিকে এ বাজেট যেনো কালোবাজারি ও দুর্নীতিবাজদের জন্য নিদারুণ খুশির সংবাদ নিয়ে এসেছে। মাত্র ১৫% কর দিয়েই অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা হবে আইনানুগভাবে বৈধ। পঞ্চাশ লাখ টাকা ইনকাম করলে ৩০% টাকা কর দিতে হবে, কিন্তু কালো টাকা সাদা করতে ১৫% কর দিতে হবে। এখন যারা কালো টাকা সাদা করবে, তারা তো আর পঞ্চাশ লাখ টাকার মতো নামেমাত্র টাকা সাদা করবে না। তাদের টাকার অঙ্কই তো হবে কমপক্ষে কয়েকশ&#8217; কোটি টাকা, তাহলে সেখানে কীভাবে এতো কম করহারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়!?</p>
<p>এই ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থনীতি বিশ্লেষকগণও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, “মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার এই ব্যবস্থা সৎ ও বৈধ আয়ের ব্যক্তি করদাতাকে নিরুৎসাহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে”। ঘোষিত অর্থ ও সম্পদের ব্যাপারে কোনো কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন করার সুযোগ না রাখা দেশে দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে টিআইবি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h3>📌 বেকারত্বের অভিশাপ</h3>
<p>আমরা ইতঃপূর্বেই দেখেছি দেশের বর্তমান বেকারত্বের হার যেভাবে বাড়ছে, তা সত্যিই একটি জাতির জন্য উদ্বেগজনক। কেননা, বেকারত্ব একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভঙ্গুর করে দেয়, দেশজ উৎপাদন কমে যায় এবং অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত করে। শুধু তাই নয়, বেকারত্বকে একটি জাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, যারা হতে পারতো দেশের উন্নয়নের সোপান, একটি দেশকে সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী কারিগর, সেই বিপুল মানবসম্পদ নিদারুণভাবে অপচয় হচ্ছে। আবার, বেকার যুবসমাজ সহজেই নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। যার ফলে জাতির মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় ঘটে চরম অধঃপতন। আর এই অবক্ষয় সামগ্রিকভাবে বিনষ্ট করে সামাজিক নিরাপত্তা।</p>
<p>এহেন পরিস্থিতিতেও, ৪ লক্ষ কর্মক্ষম যুবক বেকার থাকা সত্ত্বেও, এমনকি তাদের বিশাল একটি সংখ্যা শিক্ষার বিবেচনা সর্বোচ্চ স্তর তথা অনার্স-মাস্টার্স পাড়ি দেয়ার পরেও, তাদের বেকারত্ব নিরসনে বাজেটে নেই কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা বা নির্দেশনা। ভাসা-ভাসা সুরে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ যেসব বিষয়ে বলা হচ্ছে, সেগুলোকেও যথেষ্ট মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। তবে তাহলে কোথায় সেই উদ্বেগ কাটানোর প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ? কেনই বা এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না নীতি-নির্ধারকগণ? কী সেই অজানা কারণ যা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে আমাদের মনে? প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে বের করা আমাদের সবারই একান্ত দায়িত্ব।</p>
<p>কেননা, এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা; সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো; চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সা:) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।<br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 746px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hhhhhhhhhhhhhhhhh.jpg" height="123" /></a>সবশেষে এটাই বলতে চাই,<br />
লক্ষ্য করুন– এতো এতো জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বাজেট, যার উপর গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়, সেটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই, যৌক্তিক প্রস্তাবনাও নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা! অনলাইনে যতটুকুই দেখা যায় বা কাজ আছে, তার সবই তথ্যনির্ভর পত্রিকালাপ! কেননা ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা ও সমালোচনা অসম্ভব; যদি না নিম্নোক্ত বিষয়ে পারদর্শী হয়-</p>
<ul>
<li> Philosophy of Politics.</li>
<li>International Economics.</li>
<li>Political Economy.</li>
<li>Philosophy of Economics.</li>
<li>General Economy.</li>
<li> Economic System of Islam.</li>
<li>মাকাসিদ আশ-শারিয়িয়্যাহ।</li>
</ul>
<p>এসব বিষয়ে কোনো পারদর্শীতা কিংবা জ্ঞান আমার নেই। তবুও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এতটুকু বুঝি যে, এব্যাপারে সঠিক পর্যালোচনা এবং জাতীয় প্রস্তাবনা আমাদের দিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সব ধরনের সিভিল সোসাইটির এব্যাপারে এগিয়ে আসার কোনই বিকল্প নেই।</p>
<p>সম্মিলিত উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতেই; ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে এবং কথিত উন্নয়নের স্লোগান বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রশিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎসশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে এগিয়ে যেতে হবে।</p>
<ul>
<li>কেননা আমাদের রয়েছে–• ১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ</li>
<li>তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত</li>
<li>ইন্ডাস্ট্রি-কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা</li>
<li>দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)</li>
<li>গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর</li>
<li>বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ</li>
<li>বনাঞ্চল</li>
<li>মৎসশিল্প ইত্যাদি</li>
</ul>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট-সহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জনবিরোধী এই দুর্ভাগ্যের উপাখ্যান ঘোষণার এই ক্ষণে এখন প্রয়োজন, দেশ ও জাতির স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন মুক্তিকামী যুবজনতার পক্ষ থেকে এক নয়া ন্যায়ভিত্তিক ইশতেহার ঘোষণা করার। সে প্রত্যাশায়…</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/narrative-of-usury-and-destiny-against-public-interest-national-budget-2024-25/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14504</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনীতির ভেতরে নয়, বরং রাজনীতির উপরিভাগে আমাদের অবস্থান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/our-position-is-not-inside-politics-but-at-the-upper-side-of-politics/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/our-position-is-not-inside-politics-but-at-the-upper-side-of-politics/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 03 Mar 2024 11:45:03 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বরং রাজনীতির উপরিভাগে আমাদের অবস্থান]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতির ভেতরে নয়]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13734</guid>

					<description><![CDATA[ব্রিটিশ উপনিবেশ-পূর্ব বাংলাদেশ প্রায় দীর্ঘ দুইশত বছর ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন জুলুম, গণহত্যা ও নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে। এই দীর্ঘ সময়ের পর ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর যে স্বাধীনতা আমরা লাভ করি, এবং ১৯৭১ সালে নতুন]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ব্রিটিশ উপনিবেশ-পূর্ব বাংলাদেশ প্রায় দীর্ঘ দুইশত বছর ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন জুলুম, গণহত্যা ও নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে। এই দীর্ঘ সময়ের পর ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর যে স্বাধীনতা আমরা লাভ করি, এবং ১৯৭১ সালে নতুন করে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়, এসব বৃহৎ স্বাধীনতার পরও উপনিবেশ নানা রূপে আমাদের মধ্যে রয়ে গিয়েছেছে। একে আমরা নয়া উপনিবেশ বলে আখ্যায়িত করে থাকি। এ অঞ্চলে মুক্তির জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যতগুলো সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, ফকির মজনু শাহর আন্দোলন, কারামত আলী জৈনপুরীর আন্দোলন, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীরের সংগ্রাম, তরিকতে মুহাম্মাদিয়া, মাদরাসায়ে রহীমিয়া; প্রতিটি উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। এর বাইরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ, নানা ধরনের ওয়াকফ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ সংগ্রাম আজকের দিন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে।</p>
<p>কিন্তু ১৯৪৭-এর পর নয়া উপনিবেশের মাধ্যমে বহু বিষয় আমাদের মধ্যে স্থায়ীভাবে বিদ্যমান হয়ে গেছে। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া আইন ও প্রশাসন, তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতি তথা ব্রিটিশ একাডেমির প্রতিটি School of Thought এখনো আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। উদারপন্থার স্লোগানের আড়ালে তারা লিবারেলিজম নামক এক ধরনের ‘ধর্ম’ আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। পুঁজিবাদী দাসত্বের এক নতুন শৃঙ্খলে আমাদের আবদ্ধ করা হয়েছে, ফ্রি মার্কেটের নামে কৃষি, সব ধরনের পণ্য, পরিবেশ ও খনিজ সম্পদে লাগামহীন শোষণ চলছে।</p>
<p>লিবারেলিজম এমন এক ধর্ম, যার গণ্ডি থেকে বাংলাদেশে আমরা কোন অর্থেই বের হয়ে আসতে পারছি না। পুঁজিবাদ এমন এক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মানুষ ক্রমাগত নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছে। তাদের প্রতিটি School of Thought; যেমন- অ্যাংলো-সেকশন ধারা, ওরিয়েন্টালিস্ট ধারা, মিশনারি ইভাঞ্জেলিক্যাল ধারা, লিবারেল ইউটিলিটারিয়ান ধারা, জাতীয়তাবাদী ও সংস্কারবাদী কিছু ধারাসহ তাদের একাডেমিয়া আমাদের চিন্তার জগৎ ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলশ্রুতিতে উপনিবেশিক মানসিকতার এই চিন্তাধারার মধ্য দিয়েই অধিকাংশ মিডিয়া তাদের সংস্কৃতিক ও প্রচারকার্য অব্যাহত রেখেছে।</p>
<p>প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও একই চিত্র বিদ্যমান। যে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল, সেই প্রযুক্তিই আজ অর্থনৈতিক শোষণ, চিন্তা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই নয়া উপনিবেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম সমাজ। আমাদের সাংস্কৃতিক আবহ পাশ্চাত্যের আকাশছোঁয়া সংস্কৃতির কাছে পরাজিত হচ্ছে। মিলাদ, আমাদের উৎসবসমূহ, রুহানি দিবস, আধ্যাত্মিক মিলনমেলাগুলো ক্রমে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে।</p>
<p>অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ওয়াকফভিত্তিক সমাজকাঠামো, ন্যায়ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা, উৎপাদন ও সুষ্ঠু বণ্টননীতির ভয়াবহ সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এর ফল হিসেবে বেকারত্ব, অনিরাপত্তা, হতাশা, পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা, জমি নিয়ে বিরোধ এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ভেঙে পড়ার মতো সংকট প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় বড় মার্কেট, কোম্পানি ও হাসপাতাল গড়ে উঠলেও মাত্র ৫–৬ শতাংশ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারছে। অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না।</p>
<p>ধর্মীয় অঙ্গনেও পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্যের তৈরি রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে গত একশ বছর ধরে বিশেষ করে ওরিয়েন্টালিজম ও ব্রিটিশ সালাফিজমের প্রভাবে এমন পরিস্থিতি হয়েছে, যার ফলে আমাদের ধর্মীয় আধ্যাত্মিক প্রভাব, আখলাকি দৃষ্টিভঙ্গি, উসূল ও মাকাসিদভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো, সুফি ও আলেমদের সামাজিক কর্মসূচি এবং ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের সিলসিলাসমূহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।</p>
<p>এর বিপরীতেও বহু আন্দোলন, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বহু ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগ মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু একটি সূক্ষ্ম বিষয় আমাদের নতুন করে অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় আমাদের সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতা না দিলেও, স্বাধীনতার সংজ্ঞা আমাদের শিখিয়ে গেছে তাদের মতো করে। তারা বোঝাতে চেয়েছে, স্বাধীনতা মানেই রাজনৈতিক কিছু কর্মকাণ্ডের সফলতা। কিন্তু অর্থনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও চিন্তার ধারায় উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ তারা রেখে গেছে।</p>
<p>ফলস্বরূপ আমরা ভুলে গেছি প্রকৃত স্বাধীনতা কী। উপনিবেশ আমলে অর্থনৈতিক শত্রু, শিক্ষা ও ধর্মীয় সংকট, আইন ও প্রশাসনের প্রকাশ্য শত্রু চিহ্নিত করা যেত। কিন্তু নয়া উপনিবেশে শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন, কৃষি, প্রতিরক্ষা; সব ক্ষেত্রে শত্রুকে আড়াল করা হয়েছে ব্রিটিশ-জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মাধ্যমে। ফলে আমরা ধরে নিয়েছি, শুধু রাজনৈতিক কিছু কর্মসূচির সফলতাই মুক্তির পথ- যা আমাদের বারবার ভুল পথে চালিত করেছে।</p>
<p>এই অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত ও সমাজনির্ভর। আমাদের সমাজ, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের রাষ্ট্রকাঠামোতে সে অর্থে সমাজ নেই, তাদের আছে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাই তাদের সাংস্কৃতিক এজেন্ডা সমাজবিচ্ছিন্ন ও অশ্লীলতায় ভরপুর। <strong>অথচ আমাদের সংস্কৃতি মানুষকে কাছে টানে, ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে, আখলাক, আদব, ইনসানিয়াত, পারিবারিক বন্ধন ও আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এবং এসব কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পও নয়।</strong></p>
<p>মানুষকে আদব শেখানো, ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এসব কাজ রাজনীতি দিয়ে সম্ভব নয়। এগুলো ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান, আলেম, শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। রাজনীতির বাইরেও আমাদের বিশাল দায়িত্ব ও কর্মযজ্ঞ রয়েছে, যা মুসলিম সমাজের জন্য অপরিহার্য। সুতরাং কেবল রাজনৈতিক পরিসরে সব পরিবর্তন সম্ভব; এই ধারণা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ জায়োনিস্ট শক্তি।</p>
<p>তবু প্রশ্ন থাকে, রাজনৈতিক আত্মপরিচয় কি থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। রাজনীতি আবশ্যকীয় এবং রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও যুগযুগ ধরে চলে আসা গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। তবে আমরা রাজনীতি করব ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী, পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী নয়। এরিস্টটল বলেছিলেন এবং যা আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার মূলনীতি! তাহল, Homo est animal politicum (মানুষ স্বভাবগতভাবেই রাজনৈতিক প্রাণী)। জন পিলিটকন ভাষ্যমতে, Man is essentially a political being (মানুষ মূলত একটি রাজনৈতিক সত্তা)।</p>
<p><strong>কিন্তু ইসলামী সভ্যতার দার্শনিক আলেমগণের কথা হল, &#8220;</strong><strong>الإنسانُ</strong> <strong>مَدَنِيٌّ</strong> <strong>بِالطَّبْعِ&#8221;</strong><strong> (মানুষ স্বভাবগতভাবেই সভ্যতা-নির্ভর, অর্থাৎ সভ্যতা গড়ে তুলে চায়) মানুষ মাত্রই সভ্যতা নির্মাণকারী। রাজনীতি সেই সভ্যতার একটি অংশ মাত্র; পরিবার, সমাজ ও ভ্রাতৃত্বও তার অংশ। সুতরাং সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজনীতিকে আমরা একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করি, রাজনীতিকেই ইসলাম বা সম্পূর্ণ সভ্যতা মনে করা ইসলামের চিন্তাধারায় কখনোই ছিল না। </strong></p>
<p>এখন আমাদের লক্ষ্য এই সভ্যতার জাগরণ। জ্ঞান ও চিন্তা, আখলাক, পরিবার, সমাজ, আইন, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতি সবই এই জাগরণের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের পথে আমাদের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা কতটুকু এবং কীভাবে হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। তাই রাজনীতির সংজ্ঞায়নের শুরুতেই যে বিষয়টি আসে—</p>
<ul>
<li><strong>রাজনীতি হল, জাতির আত্মবিশ্বাস গঠনের একটি প্রক্রিয়া এবং জাতীয় স্বপ্নকে সকল মানুষের নিকটে পৌঁছানোর মাধ্যম। এগুলো মূলত রাজনৈতিক সচেতনতার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে, তবে এ জাতীয় স্বপ্নের পাঠাতন তৈরি হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতিক ভিত্তিমূল থেকে।</strong></li>
<li><strong>একইভাবে মুক্তি সংগ্রাম, অর্থাৎ জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সংগ্রামও রাজনীতি। জাতীয় সংকট নিরসন, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও রাজনীতি।</strong></li>
<li><strong>রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনাকারী নেতৃত্বের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাকেও রাজনীতি বলা হয়।</strong></li>
</ul>
<p>আর উপরোক্ত বিষয়সমূহ দুনিয়ার সকল স্থানে, সকল সংস্কৃতিতে একইভাবে প্রযোজ্য। রাজনৈতিক পন্থা অঞ্চলভেদে, দেশভেদে, প্রেক্ষাপট ও বয়ানভেদে ভিন্ন হলেও মূলনীতি ও লক্ষ্যসমূহ একই।</p>
<p>উপনিবেশ উত্তর দেশগুলি কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ মূলনীতিগুলো যেভাবে প্রযোজ্য, সৌদি-আরবের মতো রাজতান্ত্রিক দেশেও এ মূলনীতিগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। আবার কমিউনিজম দ্বারা প্রভাবিত চীনের ক্ষেত্রে এই মূলনীতি যেমন প্রযোজ্য, তেমনি দারিদ্র্য পীড়িত বিভিন্ন দেশেও এই একই মূলনীতিগুলো প্রযোজ্য।</p>
<p>আবার যদি আমরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড অথবা ভারতের কোনো সাধারণ রাজ্যের কথা বলি, সকল জায়গাতে একই মূলনীতি প্রয়োগ করে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখন এ মূলনীতিগুলো যদি নির্ধারণ করতে পারি, তাহলে প্রেক্ষাপটগত কারণেই বাংলাদেশের পরিস্থিতির আলোকে আমাদের সামনে প্রশ্ন আসবে, এ দেশের ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা কী হবে? বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে আমার মুক্তি সংগ্রামের পন্থা কী হবে? আমাদের করণীয় দিকসমূহই-বা কী? ইত্যাদি।</p>
<p>আমরা যুগ-যুগ ধরে চলে আসা সংগ্রামের প্রেক্ষিতে একটি সংগ্রামী জাতি, অর্থাৎ বাংলা অঞ্চলের মানুষ, বাংলার ভূখণ্ড মূলত একটি মুক্তি সংগ্রামের ফসল। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় যাবৎ এ অঞ্চলের মানুষ স্ব-স্ব সংকট ও পরাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরে প্রতিটা সময়েই এ সংগ্রাম অব্যাহত ছিলো।</p>
<p>আবার যখন ইসলামী সভ্যতার পতন হয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীর শোষনের উত্থান হয়, তখনও সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ এ বাংলা অঞ্চল থেকেই গড়ে উঠেছিলো। এ বাংলা অঞ্চলের মাটি সে মাটি, যে মাটির এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে কাফন বিহীন শহীদেরা ঘুমায় না! পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, পাকিস্তান আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন– প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা মুক্তির জন্য রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে লড়াকু সৈনিক হিসেবে আত্মবিশ্বাসের সাথে সংগ্রাম পরিচালনা করেছি।</p>
<p>তাই এ সময়ে এসে আমাদেরকে ঠিক করতে হবে যে, আমরা মূলত কিসের মুক্তি চাচ্ছি এবং কিসের ভিত্তিতে মুক্তি চাচ্ছি!</p>
<p>মুক্তির এ সুনির্দিষ্ট বয়ান হাজির করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আবশ্যকীয় কাজ।</p>
<p>আর এটি নির্ধারণ করতে গেলেই প্রশ্ন এসে যায়, মুক্তির বয়ানকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তুত করবো?</p>
<p>তা হল, আমাদের দেশ ও জাতিকে পর্যালোচনা করে নতুন একটি ইশতেহার নিয়ে আসতে হবে, যা গোটা জাতির ভিশন হিসেবে প্রস্ফুটিত হবে। এবং সে অনুযায়ী কর্মপন্থা তুলে ধরতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>এক্ষেত্রে প্রথম কাজই হলো–</strong></p>
<p>এ বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান ও চিন্তা থাকতে হবে, আর এ জ্ঞান ও চিন্তা হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, অর্থাৎ ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত। কারণ এ স্বাধীনতা যদি না থাকে, আমরা মূল আলাপের দিকে অগ্রসর হতে পারবো না।</p>
<p>আর আমরা ইসলামী সভ্যতার সন্তান হিসেবে জ্ঞানকে কখনো অব্জেক্টিভ কোনো বিষয় হিসেবে চর্চা ও প্রয়োগ করবো না, বরং জ্ঞানকে অনেকগুলো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চর্চা ও প্রয়োগ করবো। যেমন– মা’রেফাতুল্লাহ, তাযক্বিয়াতুন নাফস, আমলে সালেহ ইত্যাদি।</p>
<p>পাশ্চাত্য যেভাবে রাজনীতির উদ্দেশ্যে, বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জ্ঞানকে ব্যবহার করে এবং বিশ্ববাসীর উপরে নিজেদের সুবিধার্থে রচিত জ্ঞানের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেয় ও সে আলোকে চিন্তা করতে বাধ্য করে, তা করা যাবে না। আমাদের জ্ঞানকে কোনোভাবেই নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সম্পদের পরিণত করা যাবে না। যেমন– কেউ যদি তাসাউফ অর্জন করতে চায় বা তাসাউফের মাধ্যমেই নাফসের তাড়না থেকে মুক্তি পেতে চায়, তাহলেও সে জ্ঞান আর পন্থা অবলম্বন করতে হবে, যে জ্ঞান আর পন্থা মুক্তি লাভের জন্য আবশ্যক।</p>
<p>আবার একইভাবে বলা যায়, মাযহাব ইসলামী সভ্যতার অন্যতম একটি বিষয়। মাযহাব হল, দ্বীনের বসবাসকৃত একটি রূপ। অর্থাৎ, আমি দ্বীনকে কীভাবে বাস্তবে রূপান্তরিত করবো তার একটি লিখিত ভাষাই মাযহাব। এক্ষেত্রে ফিকাহ, কালাম, উসূল ইত্যাদি জ্ঞান এর অন্তর্ভূক্ত। জ্ঞান এসব ক্ষেত্রে উপরিভাগে থেকে মুক্তির দিশা দিচ্ছে, সেদিকে সঞ্চালিত করছে, সমাজকে বসবাস উপযোগী করার রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং যুগোপযোগী যথেষ্ট জ্ঞান ও চিন্তা আমাদের সামনে হাজির থাকা আবশ্যক।</p>
<p>এবং এ আবশ্যকীয়তার সাথে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, আমরা মুক্তি আন্দোলন বলতে যা বুঝে থাকি, তা এককেন্দ্রিক কোনো বয়ান দিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, বরং জ্ঞান, আখলাক, রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ এ জাতীয় সকল বিষয়ে মুক্তির বয়ান হাজির করতে হবে।</p>
<p>সুতরাং এ মুক্তি আন্দোলন বিষয়টির ব্যাখ্যা মূলত আপেক্ষিক। কারো কাছে স্বাধীনতা আন্দোলন মানে মুক্তি, কারো কাছে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা মানে মুক্তি, কারো কাছে তার দলকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় আনাটাই মুক্তি, কারো কাছে সবাই ইবাদাত করবে– এটিই মুক্তির একমাত্র মূলমন্ত্র, কারো কাছে সহীহ আকিদা প্রচারই মুক্তি। <strong>আবার শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে, ১৯০০-এর দিকে ব্রিটিশ আমলে যে প্রভাবশালী ধারাগুলো ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল- অ্যাংলো-সেকশন ধারা, ওরিয়েন্টালিস্ট ধারা, মিশনারি ইভাঞ্জেলিক্যাল ধারা, তথা লিবারেল ইউটিলিটারিয়ান ধারা, অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ও সংস্কারবাদী কিছু ধারা; এই প্রত্যেকটি ধারাই কিন্তু ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের সৃষ্ট ধারা এবং এসবের আলোকেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশ একাডেমিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে ইসলামী সভ্যতার মিরাসের আলোকে গড়ে উঠবে, উসূল ও মাকাসিদের আলোকে একটি মুক্তি নিয়ে আসবে, এটিও একটি মুক্তি আন্দোলন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>দ্বিতীয় কাজ হলো–</strong></p>
<p>কিছু প্রশ্নের ব্যাখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।</p>
<p>এ মুক্তি আন্দোলন বিষয়টির আপেক্ষিক তত্ত্বের সাথে রাজনৈতিক আইডেন্টিটির সম্পর্ক কী? এবং রাজনীতি করার মাধ্যমে যে মুক্তি চাওয়া হচ্ছে, এটিই কি একমাত্র মুক্তি? ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলাই কি মুক্তির একমাত্র উপায়? তাহলে সমাজসহ অনান্য ক্ষেত্রে মুক্তি কিভাবে আসবে? রাজনীতি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থা নেই? যদি থাকে, সে পন্থাটা কী?</p>
<p>এক্ষেত্রে প্রথম কথা হল, মুক্তির অনেক পন্থা রয়েছে এবং সবগুলিই স্বতন্ত্র ও আবশ্যক, একেকজনকে একেকটি নিয়ে সংগ্রাম চালাতে হবে, রাজনীতি তার একটি। আবার এ রাজনীতি প্রচলিত ধারার রাজনীতি নয়, বরং পূর্বে উল্লেখিত স্থায়ী মূলনীতির আলোকে পরিচালিত রাজনীতি। এক্ষত্রেও প্রশ্ন আসে, আমাদের দেশে আমরা যারা রাজনীতি করছি, তারা কি সত্যিই স্থায়ী মূলনীতির আলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি? আমাদের অর্থনীতি, গার্মেন্টস, কৃষি, বেকারত্ব, খনিজ সম্পদ, নগর, বন্দর থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগনের রাজনৈতিক দলের কাছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে যে চাহিদা, সেটি কি আমরা পূরণ করতে পারছি? নাকি শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতি কিংবা দলীয় কিছু কার্যক্রমকেই আমরা রাজনীতি মনে করছি? তাহলে কি অবস্থা এ রকম নয় যে, রাজনীতিতে সবই আছে, শুধু রাজনীতিই নেই! রাজনীতি অন্তঃসারবিহীন একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এক্ষেত্রে কয়েকটি আলাপ প্রাসঙ্গিক এবং জরুরী।</p>
<ul>
<li>নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলে না থেকেও স্থায়ী মূলনীতির আলোকে পরিচালিত রাজনৈতিক কার্যক্রম ভালোভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে এবং অনেকে তা করছেও।</li>
</ul>
<p style="padding-left: 40px;">তাই কেউ তা করতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া যাবে না, বরং সবার জন্য এ পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। কারণ চিন্তা করার বহু ক্ষেত্র রয়েছে, মুক্তি সংগ্রামের কাজের জন্য বহু ক্ষেত্র রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের কোনো বিষয় অথবা ভাষাকেন্দ্রিক কোনো বিষয়ে কাজ করেও একজন ব্যক্তি মুক্তির উছিলা খুঁজে পেতে পারে ও সমাজে বহু অবদান রাখতে পারে, এবং সে আলোকে যদি সে বহু ব্যক্তি তৈরি করে, প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, একটি প্রজন্ম তৈরি করে, তাহলে সেটিও অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং মুক্তির সংগ্রামের কাজের ক্ষেত্রে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় বলে আমি মনে করি।</p>
<ul>
<li>রাজনীতি মানেই শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতি কিংবা বিপ্লব বা সশস্ত্র যুদ্ধ; এগুলো আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে না। স্থায়ী মূলনীতির আলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে শুরুতে যে আলাপ করেছি, সেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য একটি মাধ্যম হতে পারে– ভোট, বিপ্লব বা সশস্ত্র আন্দোলন। <strong>কিন্তু এগুলোকে একমাত্র পন্থা হিসেবে দাঁড় করালে তা মূলত জাতির চিন্তাধারাকেই গুলিয়ে ফেলা হয়। রাজনীতির বাইরের বিশাল অংশকে অলস, কাজহীন ও সংগ্রামহীন করে তুলে; এক ধরনের আধুনিক বৈরাগী গোষ্ঠী তৈরি হয়। একই সঙ্গে সকল দায়িত্ব ও দায়ভার রাজনৈতিক নেতাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এক ধরনের অবাস্তব মানসিক তৃপ্তি খুঁজে ফেরে! এবং নিজেকে রিলাক্স করে নিজের কাজ খুজে পায়না। অথচ এসকল মানসিকতাই এ অঞ্চলের আধ্যাত্মিকতা, ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ আন্দোলন এবং শক্তিশালী সমাজ গঠনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।</strong></li>
<li>রাজনীতি মূলত একটি উপায়, একটি পন্থা এবং সমাজের অনান্য ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল।</li>
</ul>
<p style="padding-left: 40px;">এটিই জাতির একমাত্র ও সামগ্রিক উদ্দেশ্য বা ভিশন নয়। কেউ যদি মনে করে, আমি একটি দলের নেতা, আমার দল ক্ষমতায় আসীন হলেই দেশ আমূল পরিবর্তন হয়ে যাবে, সব কিছু সংস্কার হয়ে যাবে, তা মূলত চিন্তার বাতুলতা ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়! কারণ এ-ই বইরে বিশাল সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান, যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।</p>
<p style="padding-left: 40px;">রাজনৈতিক ভুল ব্যাখ্যা ও চিন্তার বাতুলতার জন্মই হয়েছে ব্রিটিশ আমলে, এরপূর্বে সুলতানী আমলে আমরা সবকিছুই সমান গুরুত্ব দিয়েছি। ব্রিটিশরাও আমাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে স্বাধীনতা মানে হচ্ছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আর, এই বিষয়টিকে আত্মস্থ করার কারণে ৪৭, ৭১, ৯০ এবং ২৪ সালে একই রকম ভুল করেছি যে, রাজনীতির বাইরে গিয়ে যে বিষয়গুলো প্রয়োজন, জাতির ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করবে, সে বিষয়ে আলাপ করতে পারিনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৯৪৭ এর স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ০৬ টি অভ্যুত্থান ঘটেছে, ভাষা আন্দোলন হয়েছে, এবং নানাবিধ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শিক্ষা; বাংলা ভাষার জাগরণ ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণের যে আহ্বান, তা আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণের সংগ্রামও আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাকিস্তান আমলের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে কিছুটা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা একাত্তরের পরেও বৃটিশদের মেথড অনুযায়ী একই ধরনের প্রশাসন, আইন ও অর্থনৈতিক কাঠামো বহাল থাকায় বিষয়গুলো নিয়ে কোনো মৌলিক সংস্কার বা পুনর্গঠন হয়নি। এর ফলেই আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো ক্রমশ দুর্বল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।</p>
<blockquote><p><em>যেমন, সমাজের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল</em><em>–</em><em> ব্যক্তির গঠন; এটা সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির উর্ধ্বে। এবং এ গঠন প্রক্রিয়া, এটি ব্যতীত কিন্তু কখনো একটি রাষ্ট্র বা একটা সমাজ দাঁড়াতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শিক্ষকদের ভূমিকা, আলেম এবং সমাজ চিন্তকদের ভূমিকা। এসব ভূমিকা রাখার জন্য প্রয়োজন প্রচুর প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষ গঠনের জন্য কাজ করবে, পেট্রোনাইজ করবে, উদ্যোগ গ্রহণ করবে, নানাভাবে কর্মসূচি দিবে। এর মধ্যদিয়ে আলেমগণ, শিক্ষকগণ, চিন্তাবিদগণ মানুষকে গড়ার জন্য, প্রজন্মকে একটি আলোকদীপ্ত রাস্তার দিকে এগিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাবে। আর, এখান থেকেই মূলত সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, আখলাকের বিনির্মাণ হয়। সুন্দর সংস্কৃতির জন্ম দেয়।</em></p>
<p><em>এ প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ কখনোই দাঁড়াতে পারে না। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শিক্ষকদের ভূমিকা, আলেম ও সমাজচিন্তকদের ভূমিকা অপরিহার্য।</em></p></blockquote>
<p><strong><em>তাহলে এটাই স্পষ্ট যে- জ্ঞান, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির গঠন; এই তিনটি বিষয় পরস্পরের পরিপূরক। রাজনীতি এখানে সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু এসব রাজনীতির মুখাপেক্ষী নয়, বরং রাজনৈতিক সকলকিছুই জ্ঞান, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির গঠন এর উপর নির্ভরশীল।। </em></strong></p>
<p>কিন্তু বৈশ্বিক বাস্তবতা ও এককেন্দ্রিক দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে, দুনিয়া জোড়া সমাজ পরিবর্তন করার জন্য যে রাজনীতি ছাড়া অন্য কোনো পন্থা নেই– এটি একটি ধ্রুব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা৷ মানুষকে আজ বোঝানোই যাচ্ছে না যে, রাজনীতি ছাড়া অন্য পন্থায়ও সমাজ পরিবর্তন করা যেতে পারে, আরো অনেক অনেক পন্থা রয়েছে যা মুক্তির দিকে, জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দিকে ধাবিত করে। এ অর্থে ইসলামী সভ্যতার মহান দার্শনিক আলেমদের ভাষ্যানুযায়ী আমাদের উপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো বর্তমান মুসলিম সমাজকে এই চিন্তা থেকে বের করে নিয়ে আসা, অর্থাৎ পাশ্চাত্য সভ্যতার শোষণ থেকে যদি আমরা মুক্তি পেতে চাই, তাহলে শুধুমাত্র ছোট এবং খণ্ডিত আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের চিন্তাগত আখলাকী আন্দোলনকে সঠিকভাবে সকল স্তরে পৌঁছে দিতে হবে এবং এর কোনোই বিকল্প নেই। এ এক বিষয়ের মধ্য থেকেই মূলত অন্যান্য বিষয় উৎসারিত হয়। এজন্য উস্তাজ ত্বহা আব্দুর রহমান মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক জাগরণ চিন্তাগত ও আখলাকী আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। এবং তিনি বলেছেন, <strong>“আমরা যদি বর্তমান মুসলিম উম্মাহর দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই যে, ইসলাহ বা শোষণের বিরুদ্ধে যে সংগ্রামগুলো রয়েছে, সেগুলোকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।”</strong></p>
<p>সেই সাথে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহকে সামগ্রিক বয়ান হাজির করা, মৌলিক চিন্তাসমূহ ও আখলাকী আন্দোলনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা এবং এসবের প্রসার ঘটানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বর্তমান বাংলাদেশের চিত্র যদি দেখি, বিদ্যমান আন্দোলনগুলোর বা ব্যক্তিদের কেউ সেক্যুলার পন্থায়, কেউ জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যে এগুচ্ছে। আবার কেউ সকল সমস্যার সমাধান শাসক গোষ্ঠীর মধ্যেই দেখে, অর্থাৎ তার বা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হল, নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন ঘটানো এবং তাদের বিশ্বাস, এটি হলেই সব পরিবর্তন হয়ে যাবে! আবার কেউ-বা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে “খেলাফত আসছে, বাতিল কাঁপছে” ধরনের স্লোগান দিয়ে সব মুক্তি আন্দোলনকে এককেন্দ্রিক করে ফেলছে! কেউ-বা আবার পাশ্চাত্যের আদলে চিন্তা করে সেটিকে মডেল হিসেবে নিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে! আবার কেউ কেউ শক্তি প্রয়োগ করে, জোরপূর্বক তথা অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে– এ ধরনের চিন্তা লালন করে চরমপন্থাকে ধারণ করছে।</p>
<p>সার্বিক প্রেক্ষিতে আমাদের কাজ হলো আমরা চিন্তাগত আখলাকী একটি আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তি সংগ্রামের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবো, যার মাধ্যমে নিজস্ব জাতিসত্তার আলোকে জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতিসহ সকল কিছুর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মেথড জাতিকে উপহার দিতে পারবো।</p>
<p>আমরা যখন চিন্তা ও শিক্ষা আন্দোলনের কথা তুলে ধরছি, তখন আমাদের সামনে পাশ্চাত্যের মডার্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার আদলে গড়ে উঠা নানাবিধ ধর্মীয় চিন্তাগুলোও নানাভাবে ব্যাঘাত ঘটানোর মাধ্যমে আমাদেরকে বাধাগ্রস্থ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।</p>
<p>পাশ্চাত্যের এই মডার্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মূলত তাদের লালিত চিন্তাকেই একমাত্র মেথড হিসেবে আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, তাদের আইডিওলজি এবং পরিভাষা আমাদেরকে গিলতে বাধ্য করে। পাশ্চাত্যের এমন মনোভাব আমাদের কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় কায়েমী গোষ্ঠীসহ অনেকের মধ্যেই বিরাজমান। তারা যা বুঝছে, তাই অন্যদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এমন করতে গিয়ে তারা ভুলে যায় যে, ইসলামী সভ্যতায় শত শত মাজহাব আর ধারা গড়ে উঠেছিলো! তারা যে দল করছে, যে চিন্তা লালন করছে, যে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করছে, যে ধারা লালন করছে, সেটিকেই একমাত্র ভাবে। আর তাদের চেয়ে ভিন্ন চিন্তা লালন করলেই তাকে খারিজ হয়ে গেছে, দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে, তা&#8217;গুতে হয়ে গেছে– এ ধরনের তকমা দেয়। এ ধরনের মানসিকতা ব্রিটিশ সালাফিজমের মাধ্যমে এসে আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আমাদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সৃষ্টি করছে৷ আর এর গোড়া হলো পাশ্চাত্যের এই মডার্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।  যেমন– পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় দর্শন বলতে বুঝায় গ্রিক দর্শনকে। ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্যের সকল দার্শনিক উঠে এসেছেন।  আপনি হেগেল, দেকার্তে, বার্ট্রান্ড রাসেলকে পড়াকেই দর্শন চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা যদি আমাদের ইলমুল-কালাম পড়ি, ইমাম মাতুরীদিকে পড়ি, ইমাম গাজ্জালীকে পড়ি, সেটি কি দর্শন চর্চা নয়? এ দর্শনের উপর ভিত্তি করেই তো ইসলামী সভ্যতা বারশত বছর গোটা দুনিয়াকে আলোকিত করেছিলো! পাশ্চাত্য এটিকে সমস্ত সিলেবাস থেকে আলাদা করে দিচ্ছে এবং শুধুমাত্র গ্রিক দর্শন ও তার আলোকে গড়ে উঠা কিছু চিন্তাধারাকেই আমাদের সামনে বারবার জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করছে। অর্থাৎ তাদের যে ফরমেট, পরিভাষা, একাডেমিক পদ্ধতি, এর বাহিরে গিয়ে যদি আমরা কাজ করি, সে কাজকে তারা কাজ হিসেবেই গণ্য করবে না। তাহলে আমাদের আল্লামা ইকবাল যে পাশ্চাত্যের চিন্তাধারাকে খণ্ডন করেছেন, এটিকে আমরা কীভাবে দেখবো? একইভাবে ইমাম শাতিবী যে স্বতন্ত্র জ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা, এটিকে আমরা কীভাবে দেখবো?</p>
<p>আবার এখানে যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অথবা মুক্তি সংগ্রামের দিক থেকে প্রশ্ন করি, তাহলে প্রশ্ন আসছে, ইমাম শাতিবী, আল্লামা ইকবাল যে জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করলেন, তা কি তাদের মুক্তি সংগ্রাম নয়? জিহাদের অংশ নয়? এটি আমরা কয়জন পারছি অথবা মানবসভ্যতায় কয়জন-ই বা পেরেছে?  এর থেকে বড় সংগ্রাম আর কী হতে পারে?</p>
<p>এ মহামানবগণ পাশ্চাত্যের আদলে চিন্তা না করার কারণে, তাঁদের কাজ জ্ঞানের উৎস হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে না। কিন্তু আমরা মুসলমানরাও কেন এটিকে মর্যাদা দিচ্ছি না? কেন আমরা এটিকেও একটি শ্রেষ্ঠ সংগ্রাম হিসেবে এবং তাদের প্রত্যেকটি ধারাকে আমাদের সামনে মডেল হিসেবে গ্রহণ করছি না? যদি আমরা গ্রহণ করতে পারতাম, তাহলে আমাদের মধ্যে সংকীর্ণ চিন্তা, এককেন্দ্রিক মানসিকতার যে বীজ রোপিত হয়েছে, তা আদৌ জায়গা পেতো না। যদি আমরা তখনি এই বলে প্রশ্ন করতাম যে, পাশ্চাত্যের দর্শন মানে যদি স্বাধীনতা হয়, তাহলে ইমাম আল-মাওয়ার্দী, ইমাম ইবনে সিনা এবং ইমাম ইবনে খালদুনকে পড়লেও কেন স্বাধীনতা হবে না? বরঞ্চ এগুলোই মানবতার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাধীনতম জ্ঞান। এ প্রশ্ন যেমন রাখতাম, একইভাবে ব্যক্তিকে, ধারাকে আলাদা আলাদাভাবে দেখে সকলকে উম্মাহর সম্পদ মনে করতাম, তারই প্রেক্ষিতে বর্তমানে যারা ইসলামের জন্য কাজ করছে, তাদের প্রত্যেককেও ইসলামের সম্পদ মনে করতাম। কিন্তু আজ আমরা এক্ষেত্রে ব্যর্থ!</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এবার আসি আমরা কেন স্বতন্ত্র আন্দোলনের কথা বলছি? এ মুক্তি আসলে কিসের মুক্তি?</p>
<p>মুক্তির ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে আসতে পারে। আমি যদি বাঙ্গালী হই, বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে মুক্তির কথাই তুলে ধরি, তাহলে আমার নেতার কেমন হওয়া উচিত? এক্ষেত্রে যদি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি, জহির-উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের কথা ধরি, তারা তো বাঙ্গালী ছিলেন না। আবার গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ, তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহ থেকে শুরু করে অনেকে বাংলাতেই গড়ে উঠেছেন। তাই নেতার জাতীয়তা বা বংশ এখানে মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো–</p>
<ul>
<li>স্থায়ী মূলনীতি তথা আদালত ঠিক আছে কিনা।</li>
<li>জাতির ভবিষ্যৎ মর্যাদা এবং ইজ্জত সম্পন্ন বিষয়াদি গড়ে উঠছে কিনা।</li>
<li>মাদ্রাসা বা স্কুল যেখানেই পড়ি না কেন, ব্রিটিশ একাডেমিয়ার চিন্তাগত দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামী সভ্যতার চিন্তার মিরাসকে ধারণ করতে পারছি কিনা।</li>
</ul>
<p>এ সকল বিষয়কে যদি আমরা সামনে রাখি, তাহলে আমাদের মুক্তির সংজ্ঞাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর এ আলোকে চিন্তা করলেই আমরা এতটুকু অর্থবহতা খুঁজে পাই যে–</p>
<ul>
<li>আমাদেরকে স্বতন্ত্র জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের বয়ান হাজির করতে হবে।</li>
<li>চিন্তাগত ও আখলাকী আন্দোলনের বয়ান হাজির করতে হবে।</li>
<li>সামগ্রিকভাবে একটি শিক্ষাগত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, সে আন্দোলনকে গ্রহণযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হবে এবং এ গ্রহনযোগ্য চিন্তা, পরিভাষা এবং মেথডকে যেন সকলপন্থী মানুষ আপন করে নিতে পারে, এমন একটি বয়ানের ক্ষেত্র আমাদেরকে হাজির করতে হবে।</li>
</ul>
<p>এ আলোকে জ্ঞান এবং চিন্তা যদি দিতে পারি, তাহলেই কেবল মানুষ, যে কোনো প্রতিষ্ঠান ও ধারাগুলো বুঝতে পারবে, জাতির কল্যাণে সামাজিক পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত। আর তখন আদর্শিক দ্বন্দ্বসমূহ, ইতিহাসের বিভিন্ন পরিভাষা, সমাজকে বুঝার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় ইত্যাদি নীতিনির্ধারক ব্যক্তিত্বদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।</p>
<p>এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো আমরা কি এত বড় দায়িত্ব পালন করতে পারবো?</p>
<p>হ্যাঁ, এটি আসলেই অনেক বড় দায়িত্ব যা আমাদের একার পক্ষে পালন করা কখনোই সম্ভবপর নয়। এ দায়িত্ব বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে, স্ব স্ব অবস্থান থেকে বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখার মতো একটি বিষয়। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? করণীয়র প্রেক্ষিতে জ্ঞানের বিষয় নিয়ে যদি উদাহরণ দিই–</p>
<p>আমরা যদি জ্ঞানের বেসিক বিষয়গুলো, ভাষা ও পরিভাষাগুলো, মৌলিক গ্রন্থসমূহ বুঝতে পারি, ক্লাসের মাধ্যমে উসূল ও মেথোডলজি অনুধাবন করতে পারি, শিখতে পারি, তাহলে পরবর্তীতে যে ব্যক্তিত্বগণ উঠে আসবেন এবং তারা এ মেথোডলজিকে ফাংশনাল করার কার্যকরী ও প্রায়োগিক জ্ঞান হিসেবে যখন প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করবেন, সেই সাথে পরবর্তীতে মানুষের সাথে ইন্টারেকশন এর জায়গাগুলোতে কাজ করতে পারবেন, তখন সমাজে একটি প্রভাব সৃষ্টি হবে এবং আত্মবিশ্বাসের একটি জায়গা তৈরি হবে, সেই সাথে চাহিদার জায়গাও তৈরি হবে। আত্মবিশ্বাস এবং চাহিদার জায়গা তৈরি হলে সেখান থেকে এমন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি হবে, যারা ঠিকই আমাদের জাতিকে শক্তিশালী করার জন্য স্বাধীনভাবে একটি লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে।</p>
<p>আর এই জ্ঞান, চিন্তা, আখলাক যখন কারো হৃদয়-মননে প্রবেশ করে, তখন সে আগুনের মতো হয়ে যায়। আগুনের ধর্ম যেমন আলোকজ্জ্বল করা, ঠিক সেভাবে এ চিন্তাবিদ, আখলাক সম্পন্ন মানুষদের কাজই হলো সমাজকে আলোকিত করা, কার্যকরী জ্ঞান সমাজে প্রয়োগ করা। সর্বোপরি এই দীর্ঘমেয়াদি কাজের প্রভাব সমাজে পড়তেই থাকবে।</p>
<p>আর এ জ্ঞানের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ার কারণ হলো আমরা মূলত শিকড়ে হাত দিয়েছি।</p>
<p>এ শিকড় যদি মাটিতে শক্তভাবে গেঁড়ে বসে, তাহলে পুষ্ট গাছ  থেকে ফুল, ফল এবং পাতা ছড়াবেই। আর এ মূল বা শিকড় হলো হাকীক্বত অন্বেষী এক জ্ঞানের বিনির্মাণ, চিন্তা ও ভাষার বিনির্মাণ। আমরা এ হাকীকত সম্পন্ন জ্ঞানের দিকে ধাবিত হওয়ার পাশাপাশি তা নিজেদের সমাজ ও আশেপাশে সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করাচ্ছি। চিন্তাবাদী আন্দোলনের কাজই হলো চিন্তা প্রবেশ করানো। চিন্তা একবার প্রবেশ করানো হলে তা পরবর্তীতে প্রভাব ছড়াবেই। এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ পর্যায়ে আলোচ্য বিষয় হলো আমাদের, তথা যুবসমাজের রাজনীতির উপরিভাগে অবস্থানের মানে কী। এর মানে হলো আমরা, তথা যুবসমাজ রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজ পরিচালনা, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে প্রভাব রাখাসহ সকল স্তরে প্রভাব রাখতে সক্ষম, আমরাই সে যুবসমাজ, যারা সকল কিছুর উপরিভাগে থেকে ভবিষ্যত বিনির্মাণ, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত হতে পারি, জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের জন্য এগিয়ে যেতে পারি। সেই সাথে যুবক শ্রেণি থেকে এ ধরনের কাজে ব্যক্তিত্ব উঠিয়ে আনতে পারি। প্রশ্ন আসে, এক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক  লক্ষ্যসমূহ কী কী?</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১। চিন্তাকে ইঞ্জেক্ট করা</strong></p>
<p>আল্লামা ইকবালের “ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন” গ্রন্থটি ১০০ বছর আগে লেখা কয়েকটি বক্তব্যের সংকলন, কিন্তু সেটি আজও গোটা দুনিয়াকে আলোকিত করছে। তার মানে হলো সঠিক চিন্তাকে সঠিকভাবে প্রচার-প্রসার করতে পারলে তা প্রভাব সৃষ্টি করতে বাধ্য, তা হাজার মাইল দূরে হোক বা হাজার বছর পরে হোক। আমাদের সমাজ যদি মার্ক্সিজম দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, লেলিনের মত দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, এডাম স্মিথ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, তাহলে তাদের থেকে অনেক গুণ শক্তিশালী আল-মাওয়ার্দী, ইবনে খালদুন, আল্লামা ইকবালকে যদি আমরা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, সেসব চিন্তাকে ইঞ্জেক্ট করতে পারি, এটি নিশ্চিত যে আমাদের সমাজও তা গ্রহণ করবেই। কারণ আমরা এখনো একই কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি, একই আজান প্রতিদিন পাঁচবার এই জাতিকে আহ্বান করে, আলো ছড়ায়। আর এই চিন্তা শুধু জ্ঞান নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ সংস্কৃতি মানুষ দেখে দেখেই গ্রহণ করে। বারবার বলতে বলতে, লিখতে লিখতে, ক্লাস করতে করতে, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অতীত পর্যালোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যত ইশতেহার দেওয়ার মাধ্যমেই সমাজে সিম্বল হিসেবে এ চিন্তাগুলো ছড়িয়ে পড়বে। আর তার দ্বারা সমাজ, রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা প্রভাবিত হতে বাধ্য; কারণ এর বাহিরে তখন ভিন্ন কোনো মেথড দ্বারা এই সমাজকে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>২। শিক্ষা দানের সিলসিলা</strong></p>
<p>ইমাম আবু হানিফা হলেন এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নববী মেথড এর অনন্য সৌন্দর্য হলো মানুষ গড়ে তোলা। সেই সাথে আমরা আমাদের সভ্যতার জন্য কতটুকু অবদান রাখছি তার অন্যতম মানদন্ডও হলো আমরা কতজন মানুষকে গড়ে তোলার জন্য কতটুকু চেষ্টা চালাচ্ছি তা। এই শিক্ষাদানের যে সিলসিলা এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্ম গড়ে উঠবে, গড়ে তুলবে; মূলত এই সিলসিলাটা আমরা জারি করতে চাই। এটি করতে পারলে রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রেই বড় ব্যক্তিত্বগণ নিজেরা শিক্ষক হয়ে যার যার ক্ষেত্রের লোকজনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। আর শিক্ষকগণ যদি সংকট, সংকট থেকে মুক্তির জন্য যুবমননের যে হৃদয়ের কথা– সেটি বলতে পারেন, ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বলতে পারেন, যুবমননে লুকায়িত যে হাজারো প্রশ্ন, সেগুলোর আদলে জবাব দিতে পারেন, তাহলে অবশ্যই তাদের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠবে। একইসাথে শিক্ষকগণ যখন কাজের পর্যালোচনাগুলোর মূল্যায়ন করবেন, এই মূল্যায়নগুলোকে হতাশার দলিল হিসেবে না দেখিয়ে আত্মবিশ্বাস এবং ভিশনারী সংগ্রামের দিকে ধাবিত করার জন্য উৎসাহিত করবেন। এই শিক্ষকদের ছাত্ররাই পরবর্তী সভ্যতাকে বিনির্মাণ করবে। আমরা এই শিক্ষা দানের সিলসিলাই তৈরি করতে চাই।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৩। ব্রিটিশ একাডেমীয়া থেকে মুক্ত একটি শ্রেণি</strong></p>
<p>আমরা যদি আমাদের সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণিত (ম্যাথমেটিক্স), ফিলোসোফিসহ প্রত্যেকটি বিষয়কে এভাবে পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখবো, আমাদের একাডেমীয়া মূলত ব্রিটিশ একাডেমীয়ার আবদ্ধ একটি শিক্ষাব্যবস্থা। এটির বিপরীতে একটি স্বাধীন রূহ সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৪। যুবকদের রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা</strong></p>
<p>আমরা যুবকদের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে চাই, অর্থাৎ একটি সচেতন নাগরিক শ্রেণি তৈরি করতে চাই। এই সচেতন নাগরিক শ্রেণি মূলত সমাজের প্রতিটি বিষয় নিয়ে কাজ করে তাদের স্ব-স্ব অঙ্গন থেকে সমাজকে গতিশীল করবে, নিজস্ব কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করবে, নিজস্ব কিছু প্রতিবাদ, প্রস্তাবনা হাজির করবে, হোক তা ছোট একটি পত্রিকা বা ছোট একটি ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে। যুবকরা এ জাতির রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে ভাবলে তার মাধ্যমেই মূলত একটি সমাজ গতিশীল হয়। নির্দিষ্ট একটি দল, একটি প্রতিষ্ঠান সমাজকে গতিশীল করতে পারে না। যুবসমাজের মধ্যে এ সকল বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করে ফ্যাশন আকারে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের অন্যতম একটি লক্ষ্য এটি, অর্থাৎ ইতিহাসের মেলবন্ধন ও যুগের আবু বকর তৈরি করার চেষ্টা করা।</p>
<p>যেমন– আবু বকর (রা.)। আল্লাহর রাসূল (সা.) মারা যাওয়ার পরে তিনি সে ঘোষণা দিয়েছেন এবং দৃঢ়তার সহিত নেতৃত্ব দিয়ে আবার উম্মতকে গোছালো একটি অবস্থায় নিয়ে এসেছেন।</p>
<p>আজ আমাদের মাঝে এ দুই শতাব্দীর বড় বড় ব্যক্তিগণ, ইমাম শাহ ওয়ালী-উল্লাহ দেহলভী, আল্লামা ইকবাল, শাইখুল হিন্দ, আল্লামা শিবলী নোমানী, আবুল হাসান আলী নাদভীরা জীবিত নেই। তাদের অবর্তমানে আমাদেরকেও আবু বকর (রা.) এর মতো হাল ধরতে হবে এবং যুগের আল্লামা ইকবাল তৈরির জন্য নিজেদেরকে হাজির করতে হবে। এভাবে সমাজের সাথে পূর্বের মিরাসকে সম্পৃক্ত করে, পূর্বের সভ্যতার সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে হবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৫। ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটানো ও একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করা</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতার গৌরবোজ্জল ইতিহাসের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমরা মূলত যুবসমাজের মাঝে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চাই। আর এর মাধ্যমে মূলত একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে উঠবে। এই আত্মবিশ্বাসী প্রজন্মের কাজ হলো তারা যুগের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে সকল চিন্তাবিদদের মেথডকে, চিন্তাকে হাজির করবে।</p>
<p>আমাদের সকল কথা, ডায়লগ, ইতিহাস নিয়ে কাজ, চিন্তা নিয়ে কাজ, বড় বড় মনীষীদের আহ্বানকে যুবক সম্প্রদায়ের মাঝে হাজির করার মিশন– এ রকম যত ধরনের কাজ রয়েছে, সবই মূলত একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করার জন্য। কারণ উম্মাহর সামনে যদি আমরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস ও শ্রেষ্ঠত্বকে, বর্তমান মুক্তির দিশা ইসলামকে বারবার উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। চিন্তাবিদ ও শিক্ষক শ্রেণি তৈরি করলেও আমাদের মূল লক্ষ্য সর্বাগ্রে আখলাক এবং আধ্যাত্মিকতা। এটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়েই আমাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ফল স্বরূপ, যে দল বা যে পন্থীরাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সর্বাগ্রে আখলাক এবং আধ্যাত্মিকতার ধারণা যদি তাদের এক-দুইজন যোগ্য নেতাও গ্রহণ করে নেন, তবে তিনি বা তারাই গোটা জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারবেন।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৬। উম্মতের ঐক্য</strong></p>
<p>এমনভাবে আমাদের কাজ, চিন্তা, আহ্বান তুলে ধরতে হবে এবং প্রতিটি কার্যক্রমের মধ্যে এগুলোকে স্থাপন করতে হবে, যাতে সকল ধারার লোকজন নিজস্ব খোরাক, উপকরণ খুঁজে পায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে কাজ করতে হবে, যেমন– সুদ থেকে মুক্তির জন্য কাজ করা, সুদমুক্ত অর্থনীতির উপর কার্যক্রম পরিচালনা করা। উম্মতের আখলাকের আন্দোলনের উপর কাজ করতে হবে, মুসলিম উম্মাহর ক্রাইসিস জোন আরাকান, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন নিয়ে কাজ করতে হবে। ঠিক মেথোডলজির ক্ষেত্রেও আমাদের এমনভাবে সব কিছুকে হাজির করা, যেখানে উম্মত তার ঐক্যের একটি ক্ষেত্র খুঁজে পাবে, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নানাবিধ চিন্তার খোরাক খুঁজে পাবে।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৭। ভাষাকে বিনির্মাণ</strong></p>
<p>আমাদের সমস্যাগুলোর একটি হলো ভাষাগত সমস্যা। কারণ আমরা আমাদের ভাষায় চিন্তা করতে পারি না, আমাদের ভাষা আমাদের জ্ঞানের উৎস না। আমাদের চিন্তা ও শেখার ভাষা হলো ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া একটি ভাষা। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসকরা যে অঞ্চলেই গিয়েছে, সে অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উপর তাদের ভাষাকে চাপিয়ে দিয়ে সে ভাষার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান এবং চিন্তা, জাতীয় মুভমেন্টকে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে।</p>
<p>আরবী আমাদের দ্বীনের ভাষা এবং বাংলা আমাদের মাতৃভাষা ও মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা। এ ভাষাগুলোকে বিশ্বজনীনভাবে মুসলমানদের ভাষা হিসেবে তুলে ধরতে হবে এবং সকল পরিভাষাকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করার মতো যোগ্যতা অর্জনের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মাতৃভাষায় আমরা কীভাবে আমাদের জ্ঞানকে হাজির করবো, ফিলোসোফিকে (দর্শন) হাজির করবো সে ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। আমাদের জ্ঞানের উৎস হিসেবে বাংলা ভাষাকে হাজির করার চেষ্টা যেমন চালাবো, একইসাথে অনুবাদ, পরিভাষার রূপান্তরসহ সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বারোপ করবো। কারণ ভাষাই হলো ধর্ম ও সংস্কৃতির অন্যতম বাহন। তাই বাংলা ভাষা বিনির্মাণ আমাদের মূল দায়িত্বগুলোর একটি।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>৮। ইসলামের কাজকেই মূলধারার কাজ হিসেবে প্রস্তুত করা</strong></p>
<p>বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশ একাডেমীয়ার অধীনস্থ থাকার কারণে ইসলামের কোনো কাজই মূলধারার কাজ হিসেবে বিবেচিত হয় না। আমাদের বইমেলা, আমাদের রাজনৈতিক দল সবক্ষেত্রেই ইসলামপন্থীগণ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে থাকেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে যেসকল গবেষণা, কার্যক্রম, সেমিনার, প্রতিষ্ঠানিকতা ইত্যাদি, যেগুলিকে আমরা দেশের মূলধারার কার্যক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি, আর এসকল মূলধারার কার্যক্রমে ইসলামী ঘরণার কোন কাজই মূল্যায়ন পায়না। এক্ষেত্রে আমরা যদি নিজস্ব চিন্তা ও প্রভাবের মাধ্যমে মূলধারায় পরিণত হতে পারি, তাহলে এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আত্মবিশ্বাসের জায়গা হিসেবে কাজ করবে।</p>
<p>আর, এজন্য হৃদয়ের কথা, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি সকল বিষয়গুলোর মৌলিক দিকগুলো জনগণের ভাষায় তুলে ধরে রাষ্ট্র এবং সংবিধানসহ নানাবিধ কার্যপ্রণালী, এজেন্ডাগুলোকে যদি আমরা বারবার হাজির করতে পারি, তাহলে রাষ্ট্র এবং সাংবিধানিক দিক থেকেও আমরা একটি মূলধারার আন্দোলন হিসেবে ইসলামী সভ্যতার জাগরণী চিন্তাকে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>০৯। জাতিকে বা উম্মতকে শক্তিশালী করা</strong></p>
<p>আমাদের কেউ প্রশাসনে যাবে, কেউ রাজনীতিবিদ হবে, কেউ শিক্ষক হবে, কেউ সৃংস্কৃতিবিদ হবে ইত্যাদি। পেশাগত অবস্থানে যাওয়ার প্রচেষ্টার পাশাপাশি আমরা আমাদের পড়াশোনা, লেখালেখি, ক্লাস সবই যদি সমানভাবে পরিচালনা করতে পারি, তাহলে পেশাগত অবস্থানে গিয়ে আমর স্ব স্ব অঙ্গন থেকে মূলনূতির আলোকে কাজ করে আমাদের জাতিকে, উম্মতকে শক্তিশালী করতে পারবো। নির্দিষ্ট কোনো দলকে নয়, নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে নয়, বরং গোটা জাতিকে শক্তিশালী করার জন্য আমরা ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও আমৃত্যু চেষ্টা চালাবো।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১০। স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে উঠে আসা</strong></p>
<p>আমাদোর মধ্য থেকে বড় বড় চিন্তাবিদ, আখলাক সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, যদি উঠে আসতে পারে, অর্থাৎ শক্তিশালী চিন্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বে যদি আমরা উঠে আসতে পারি, তাহলে এটি স্বতন্ত্র একটি ধারায় পরিণত হবে। এর উদাহরণ উপমহাদেশে দেওবন্দী ধারা, আলীগড় আন্দোলন। দেওবন্দী ধারা নির্দিষ্ট কারো উপর হস্তক্ষেপ করেনি, এখান থেকে অনেক বড় রাজনীতিবিদ উঠে এসেছেন, এখান থেকে উঠে এসে অনেকে শুধুমাত্র হাদিস নিয়ে কাজ করেছে, অনেকে বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন, অর্থাৎ নানাবিধ কার্যক্রমের সাথে জড়িত হয়েছেন, কিন্তু দেওবন্দী ধারা একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে এখনো আলো ছড়াচ্ছে। আমরাও যদি নিজেদেরকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে আমরাও উসূল ও মাকাসিদী ধারা হিসেবে জাতির সামনে নিজেদেরকে প্রস্ফুটিত করতে পারবো।</p>
<p style="padding-left: 40px;"><strong>১১। যুব চিন্তায় জাতীয় স্বপ্নকে তুলে ধরা, সেদিকে ধাবিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখা</strong></p>
<p>আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সংকটের একটি হল, আমাদের কোনো জাতীয় স্বপ্ন নেই। যে কোনো সফল বা শক্তিশালী সভ্যতার ভিত্তিমূলে সবসময়  জাতীয় স্বপ্ন বিদ্যমান থাকে।  আমরা যদি বর্তমানে ইরানের দিকে তাকাই, দেখব তাদের কাছে এই ধরনের স্পষ্ট স্বপ্ন রয়েছে। আমেরিকার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, তারা লিবারেলিজমকে ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাদের জাতীয় স্বপ্ন– বিশ্বশাসনের দিকে পরিচালিত। ব্রিটিশরাও একইভাবে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে। তার্কিশরাও মধ্য এশিয়া ও ককেশাসে তাদের প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন দেখে। চীনও তাদের জাতীয় স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আমরা পারছিনা!</p>
<p>তাই আমাদের যুব চিন্তায় জাতীয় স্বপ্নকে তুলে ধরা, সেদিকে ধাবিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে। আর সেটি হল, দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সফট পাওয়ারে এবং জ্ঞানের রাজধানী হিসেবে আমরা প্রস্তুত করব, এটাই আমাদের জাতীয় ভিশন।</p>
<p>বৃহৎ বাংলাদেশের জাতীয় স্বপ্ন, অর্থাৎ বাংলাদেশকে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সভ্যতানির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নকে সামগ্রিকভাবে যুবসমাজের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করব। কেননা এগুলিই আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় স্বপ্ন।।</p>
<p>এই ১১ টি বিষয়কে সামনে রেখে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি, অল্প পরিসরে হলেও কাজ করতে পারি, তাহলে এ বিষয় কি প্রমাণিত হয় না যে, আমরা রাজনীতির ভেতরে নয়, বরং রাজনীতির উপরিভাগে থেকে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রভাব রাখতে পারবো, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকে প্রভাবিত করতে পারবো এবং এখান থেকেই বড় বড় ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব উঠে আসবেন? ইনশাআল্লাহ! কারণ আমাদের রাজনৈতিক আইডেন্টিটিই হলো রাজনীতির উপরিভাগে থেকে জাতিকে, দেশকে, বাংলা অঞ্চলকে শক্তিশালী করার আইডেন্টিটি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই,</strong> আমরা আমাদের জায়গা থেকে  নিজেদেরকে এমন মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যেন আমরা আমাদের আলামিয়্যাত এবং সকল কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারি। কারন এ ধরনের ব্যক্তিরাই মূলত দুনিয়া ইমারত ও মানবতার ভবিষ্যৎ বিনির্মানের জন্য কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে আল্লামা ইকবাল খুব সুন্দর একটি পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি হলো ‘আল্লাহর সহকর্মী’। তিনি তার কবিতাতেও তুলে ধরেছেন,</p>
<p style="padding-left: 80px;">“তুমি তৈরি করেছো রাত্রি</p>
<p style="padding-left: 80px;">আমি তো জ্বেলেছি আলোক,</p>
<p style="padding-left: 80px;">মাটি তোমার, তাই দিয়ে রচলাম পান পাত্র।</p>
<p style="padding-left: 80px;">তোমার ছিলো মরুভূমি, পর্বত, অরণ্য,</p>
<p style="padding-left: 80px;">আমার তৈরি ফুলের কানন।</p>
<p style="padding-left: 80px;">আমি সে, যে পাথরকে করে আয়না,</p>
<p style="padding-left: 80px;">বিষ হতে যে বানায় মধু।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই ইমারতের ধারণার ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে বলেছেন,</p>
<p><strong>واستعمركم فيها</strong></p>
<p>আর এ ইস্তেমার শব্দ থেকেই মূলত ইবনে খালদুন তার উমরান তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, যা তিনি তার আল-মুকাদ্দিমাতে আলোচনা করেছেন। সমাজের ক্ষেত্রে আমাদের উমরান কেমন হবে তা ইবনে খালদুন তুলে ধরেছেন। আল্লামা রাগেব আল ইস্পাহানি ‘উমরানুন নাস’ পরিভাষা তুলে ধরেছেন, অর্থাৎ সমাজকে বিনির্মাণের জন্য নিজেকে তুলে ধরা, নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্নের কথা বলা। এক কথায় এই শোষণের বিপরীতে এমন এক ব্যবস্থা তুলে ধরা, যা জোরপূর্বক নয়, বরং সত্যিকারের মানবধর্ম হিসেবে ইসলামী সভ্যতাকে তুলে ধরতে পারবে। যেখানে ধনী-গরীবের মর্যাদাহীনতা, অধিকারহীনতা থাকবে না, যেখানে শোষণের  ত্রাসের প্রাসাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়ে নতুন সভ্যতার দুয়ার উন্মোচন করে দিতে হবে। আল্লামা ইকবালের এই পরিভাষার আলোকে আমরা যদি আল্লাহর সহকর্মী হই, তাহলে আমরা দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকি না কেন, শুরুতেই রাজনীতির যে মূলনীতি উল্লেখ রয়েছে, সেই মূলনীতির আলোকেই কাজ করবো। আমরা এখন বাংলাদেশে আছি, এই মুহুর্তে আমাদের পন্থা যাই হোক না কেন, আমরা সেই মূলনীতির আলোকেই কাজ করবো। তখন একক কোন পন্থীদের পন্থাই একমাত্র মুক্তির পন্থা, একটা গোষ্ঠীই সঠিক– এসব চিন্তা কার্যকরী থাকবে না। আমরাও তখন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী ও শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে পারবো, দারুল আরকাম, দারুল হিকমাহ, নিজামিয়া মাদ্রাসা, দারসবাড়ির কি তখন কোনো পলিটিক্যাল ভিউ দরকার ছিলো? এসবের রাজনৈতিক আইডেন্টিটি কী ছিলো?</p>
<p>বাস্তবতা হলো এগুলো রাজনীতির উপরিভাগে থেকে সভ্যতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। কারণ এগুলো ছিলো জ্ঞান এবং আখলাকী আন্দোলন।  আব্বাসীদের আটশো বছর, উসমানী খেলাফতের ছয়শো বছর, উপমহাদেশীয় ৭০০ বছরসহ সামগ্রিকভাবে গোটা মুসলিম সালতানাতে চিন্তার চর্চা ছিলো, বড় বড় শিক্ষা আন্দোলন, ধারা ও প্রতিষ্ঠান ছিলো। সে সকল পরিপ্রেক্ষিতেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো, ধারাগুলো মূলত উপরিভাগে থেকেই সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে, যোগ্য যোগ্য ব্যক্তি উপহার দিয়েছে। আর এভাবেই মূলত ইসলামী সভ্যতা ১২০০ বছর আলো ছড়িয়েছে।</p>
<p>এজন্য আমরা আমাদের মূলনীতির আলোকে মূল ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে একটি চিন্তা ও আখলাকের আন্দোলন, একটি জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের আন্দোলনের ইশতেহার দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে আমরা মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পরিসর থেকে হলেও কিছু কাজ করে যেতে পারবো, ইনশাআল্লাহ। আর এটিই হলো আমাদের মূল আত্মপরিচয়।।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/our-position-is-not-inside-politics-but-at-the-upper-side-of-politics/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13734</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের ইতিহাস ও সভ্যতার বিজয়ঃ প্রেক্ষিতে বাংলা অঞ্চল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/our-history-and-victory-of-civilization-bangla-region-in-perspective/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/our-history-and-victory-of-civilization-bangla-region-in-perspective/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 15 Dec 2023 19:40:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4028</guid>

					<description><![CDATA[আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি যে, আমরা (বাংলা অঞ্চল) কোন বিশ্বজনীন শক্তি ছিলাম না, বড় কোন অঞ্চল শাসন করিনি; যুগের পর যুগ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বড় বড় গোষ্ঠীগুলো আমাদের শাসন করেছে, গত দুইশো বছর যাবত আমাদের কোন নেতৃত্বও গড়ে উঠেনি,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি যে, আমরা (বাংলা অঞ্চল) কোন বিশ্বজনীন শক্তি ছিলাম না, বড় কোন অঞ্চল শাসন করিনি; যুগের পর যুগ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বড় বড় গোষ্ঠীগুলো আমাদের শাসন করেছে, গত দুইশো বছর যাবত আমাদের কোন নেতৃত্বও গড়ে উঠেনি, এমনকি পূর্বে আদৌ কোন যোগ্য নেতৃত্ব ছিল কিনা সেটাও জানা নেই, তাহলে আমাদের দ্বারা কিভাবে সভ্যতার পুনর্জাগরণ সম্ভব? এমন অবস্থা থেকে আদৌ কোন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব? আবার ইসলামী রাষ্ট্র বা সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করলেও তা কি টিকিয়ে রাখতে পারব?</p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা সবাই জানি যে, বর্তমানে বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তি বা বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির অন্যতম উদাহরণ ইউরোপ। কিন্তু ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা কী? তারা আশা ও স্বপ্নের জায়গায় যে বিষয়টিকে শক্তিশালী বয়ান আকারে হাজির করেছে তা হল &#8220;ইউরোপীয় রেনেসাঁ&#8221;। রেনেসাঁ বলতে কী বোঝায়? রেনেসাঁ বলতে বোঝায় যা পূর্বে ছিল, আবার নতুন করে জাগ্রত হয়েছে; অর্থাৎ পুনর্জাগরণ হয়েছে। এক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করা যাক-</span></p>
<ul>
<li><em><span style="font-weight: 400;"> তাদের রেনেসাঁর প্রেক্ষাপট নিয়ে যদি প্রশ্ন করি, ১৮শ শতাব্দীর পূর্বে জার্মানিদের কী এমন ছিল যার উপর ভিত্তি করে তারা রেনেসাঁর সৃষ্টি করেছিল? ব্রিটিশদের ইতিহাসই-বা এমন কী ছিল? ১৭শ শতাব্দীর আগে তাদের এমন কী ছিল যেটার পুনর্জাগরণের কথা তারা বলছে!</span></em></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">১৭শ শতাব্দীর আগে ফ্রান্সের এমন কোন ইতিহাস বা সভ্যতা কি ছিল, যার কারণে তারা বিশ্বব্যাপী তাদের পুনর্জাগরণের দাবী করছে?</span></p>
<p><strong>আদতে এমন কিছু তাদের ছিল না। তাহলে এ রেনেসাঁর দাবী কতটা যৌক্তিক? তাহলে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় যে এটা তাদের তৈরিকৃত বয়ান, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু সেটি তাহলে কিভাবে?</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সেটিও তাদের দর্শন এবং চিন্তাগত ভিত্তির দিকে তাকালেই বুঝা যায়। তারা হাকীকতকে মানে না বা তাদের ভাষ্যমতে তারা নিজেরাই হাকীকত তৈরি করতে পারে, অতীতকে সৃষ্টি করতে পারে। আর সে আলোকেই তারা একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এ বানোয়াট ইতিহাসের সাথেই আজকের বিশ্ববাসী পরিচিত।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কেননা রেনেসাঁ বলার মতো তো তাদের নিজস্ব কিছুই ছিল না; বাস্তবিকভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে তারা মূলত গ্রীক সভ্যতার সাথে নিজেদের একীভূত করে একটি রেনেসাঁর কথা বলে আসছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">উপরন্তু ১৬শ শতকের দিকে পাশ্চাত্য দর্শনের দার্শনিকগণ একটি বিষয় লক্ষ্য করেন– তৎকালীন ইতিহাসে ইউরোপের কোন ঠাঁই নেই, কেননা তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থায় <strong>আধুনিক যুগের শুরু ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে, অর্থাৎ রাসূলের (সাঃ) জন্মসাল থেকে।</strong> আর এ ব্যাপারটি পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের ব্যাপক পীড়া দিত। তাই তারা <strong>ইমানুয়েল কান্টের &#8216;Critique of Pure Reason&#8217;</strong> এবং তার পূর্বের বিখ্যাত দার্শনিক দেকার্তের কার্তেসিয়ান তত্ত্বের আলোকে এক নতুন থিওরী দাঁড় করান (যদিও তাদের তত্ত্বগত অনেক পার্থক্য রয়েছে), তা হল &#8216;আমরা সময়ও সৃষ্টি করতে পারি, আমরা ইতিহাসও সৃষ্টি করতে পারি&#8217;। তাদের অনুসরণে পরবর্তী দার্শনিকরাও এ জাতীয় কথা-ই বলেছেন!</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তারপর-ই ইতিহাস থেকে মুসলিমদের মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকরা ইতিহাস দর্শনকে নতুনভাবে দাঁড় করায়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তারা ১৪ শতকের পর থেকে ১৬ শতক পর্যন্ত ও ১৬শতক থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত সময়ের নাম দেয় রেনেসাঁর যুগ ও এনলাইটেনমেন্টের যুগ। ১৪ শতক পর্যন্ত সময়কে মধ্যযুগ এবং ১৮ শতকের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কে আধুনিক যুগ হিসেবে নামকরণ করে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">জন্ম দেয় &#8216;ইউরোপীয় রেনেসাঁ&#8217; শব্দের, যেখানে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্সের ছিল না কোন নিজস্ব ইতিহাস, সভ্যতা (এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ইতালি এ দাবী করতে পারে, কারণ রোমান সভ্যতার সবকিছু ইতালিতে ছিল, সে অনুযায়ী তারা বলতে পারে &#8216;আমরা পুনর্জীবিত করবো&#8217;)।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">গোটা পাশ্চাত্য চতুর্দশ, পঞ্চদশ এবং ষষ্ঠদশ শতাব্দীকে রেনেসাঁ পিরিয়ড হিসেবে দাবী করলেও অষ্টাদশ শতকের আগে মূলত রেনেসাঁ বলতে কিছু ছিল না। শেক্সপিয়ার, দেকার্তেরা যখন কাজ করেছেন, তারা কখনোই কি বলেছেন, &#8220;রেনেসাঁ করব&#8221;? কেনই-বা বলবেন! পূর্বে তো কিছু ছিল না! হাজারো রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল ইউরোপ। সভ্যতার নিকৃষ্ট রূপ ছিল তারা। ইতিহাস সাক্ষী, স্পেনের মুসলমানদের সালতানাত ও উসমানীদের বদৌলতে তারা সভ্যতার ছোঁয়া পেয়েছিল। শেক্সপিয়ার, দেকার্তেরা মূলত কাজ করে গিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন। পরবর্তীতে তাদের কাজের বদৌলতে বড় একটি পরিবর্তন এসেছিল ইউরোপে। সেই পরিবর্তনকেই ১৮ শতকের পাশ্চাত্যের দার্শনিকরা বলতে শুরু করলেন রেনেসাঁ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এর ধারাবাহিতায় ইমানুয়েল কান্টরা তাদের সেই কথার ব্যাপক প্রচলন করলো, &#8220;আমরা সময়ও সৃষ্টি করতে পারি, আমরা ইতিহাসও সৃষ্টি করতে পারি। তাই আমরা অতীতও সৃষ্টি করতে পারি, আমরা ভবিষ্যত সৃষ্টি করতে পারি।&#8221;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একই সাথে আরেকটি থিওরী তারা দাঁড় করালো, তা হল </span>&#8216;হাকীকত&#8217; তথা নিশ্চিত সত্য বলতে আসলেই কিছু আছে কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে তারা নতুন বয়ান দাঁড় করায়। তথা সত্যিকারার্থে হাকীকত বলতে কিছু নেই। আমাদের জ্ঞানের বাইরে হাকীকত বলে কিছু নেই। আমরা যতটুকু বুঝতে পারি, ধারণ করতে পারি সেটিই হাকীকত।&#8217;</p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাদের উদাহরণগুলো ছিল এ ধরণের– আমি লিখছি, আপনারা পড়ছেন, আমি কিন্তু বাস্তবে নেই, তবে আপনি আমাকে বুঝতে পারছেন বা আপনার মাথায় বিষয়টা ধারণ করতে পারছেন, তাই আপনি আমাকেই বুঝতে পারছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ অনুযায়ী ততটুকুরই অস্তিত্ব আছে, যতটুকু আমরা ধারণ করতে পারি বা বুঝতে পারি। সুতরাং হাকীকত বলতে কিছুই নেই। আর যেখানে হাকীকতের মূল্য নেই, সুতরাং ইতিহাস সৃষ্টি করা যায়। [এই থিওরীর প্রভাব পাশ্চাত্যে এত বিস্তার লাভ করেছিল যে গীর্জার পোপরাও এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। তবে পাশ্চাত্যের দার্শনিকরা হাকীকতবিহীন চিন্তার দৌড়ের এক পর্যায়ে এসে খেই হারিয়ে ফেলেন। তাদেরই বিখ্যাত থিওরী &#8216;God is dead&#8217; দাঁড় করালেও তারাই আবার বলেছিল, &#8220;গড/ঈশ্বর যদি নাও থাকে, তবু গড/ঈশ্বরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যেভাবেই হোক। নতুবা প্রয়োজনের আলোকে একটি গড/ঈশ্বর বানিয়ে নিতে হবে। এটি আমাদের ব্যবসার কাজে লাগবে (এখানে সাধারণ বাণিজ্য বুঝাচ্ছে না)। এর উপরে ভিত্তি করে বহু ফায়দা আনা যায়।&#8221; (এটা সম্ভবত ম্যাক্স ওয়েবারের কথা)</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আর এভাবেই &#8216;আমরা অতীতও সৃষ্টি করতে পারি। আমরা ভবিষ্যতও সৃষ্টি করতে পারি&#8217; বয়ানটি বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হল। এ দার্শনিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই তারা মুসলমানদের ১২০০ বছরের ইতিহাসকে অস্বীকার করে! তারপরেই বয়ান আকারে হাজির করে কথিত &#8216;ইউরোপীয় রেনেসাঁ&#8217;-কে। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এবার যদি আমাদের ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করি,</span></p>
<ul>
<li><strong><em> গোটা মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা হল ইসলামী সভ্যতা। মারওয়া-উন-নাহার থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পর্যন্ত, ভারতীয় উপমহাদেশসহ এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে এ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এ ইসলামী সভ্যতার গর্বিত সন্তান আমরা।</em></strong></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">কোন ভিত্তি, ইতিহাস, স্বর্ণালী সভ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য কাল্পনিক রেনেসাঁ তৈরি করে নতুন ইউরোপ দাঁড় করিয়েছে; সে জায়গায় আমাদের আছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, শক্তিশালী স্বর্ণালী সভ্যতা, একটি বিশাল সালতানাত, তাহলে আমরা কেন একীভূত হয়ে অতীত আঁকড়ে ধরে সভ্যতার পুনর্জাগরণ করতে পারছি না? কেন উল্টো হীনম্মন্যতা, হতাশার প্রশ্ন তুলছি? এটা কি আমাদের চিন্তাগত দৈন্যতা নয়?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অথচ আমাদের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল মুসলমানদের মধ্যে গ্রীক, জার্মানি, ফরাসি ইত্যাদি জাতিগত পার্থক্য নেই। কোন বিদ্বেষ, বৈষম্য নেই। আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণই আমাদের শিখিয়েছে আমরা এক জাতি, এক প্রাণ; আমরা মুসলিম উম্মাহ। এটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। যেখানে আমাদের জাতি-গোত্র বিভেদ নেই, সেই পূর্বের বিশাল সালতানাত, সভ্যতার ইতিহাসকে একত্রিত করে গ্রহণ করতে এবং পুনর্জাগরণ ঘটাতে কেন আমরা হীনম্মন্যতায় ভুগবো? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এজন্য প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান বলতেন, <strong><em>&#8220;আমাদের যে স্বর্ণালী ইতিহাস, সে ইতিহাস যদি ইউরোপের, বৃটিশ জায়োনিস্টদের থাকতো, তাহলে তারা আমাদেরকে কথাই বলতে দিতো না।&#8221; কিন্তু উল্টো আমরাই হীনম্মন্য হয়ে বসে আছি !</em></strong></span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আবার আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হল নবীদের সংগ্রাম। তাদের রেখে যাওয়া সেই সভ্যতা, সিলসিলা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি, আখলাককে ধারণ করে আমরা এখনো পথ চলছি। নবীদের সংগ্রাম ও রেখে যাওয়া সভ্যতা থেকে কি আমরা নিজেদের ইতিহাসকে গ্রহণ করতে পারি না?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এক্ষেত্রে যদি আমরা মিলিয়ে দেখি তবে বুঝতে পারবো– গ্রীক সভ্যতা, ইউরোপীয় সভ্যতা প্রভৃতি মূলত ফিরাউনী সভ্যতার অংশ। ফিরাউন, গ্রিকদের থেকে যদি ইউরোপ নিতে পারে, আমরা কেন নবীদের রেখে যাওয়া ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতার মডেলকে গ্রহণ করতে হীনম্মন্য বোধ করবো?</span></p>
<ul>
<li><em><span style="font-weight: 400;"> ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সালতানাতের পূর্বে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সভ্যতা ছিল। সেই সভ্যতা গণিতের ধারণা দিয়েছে, দর্শনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, আরো অনেক ক্ষেত্রে তাদের পদচারণা ছিল। এক কথায় তারা ছিল সমৃদ্ধ। পরবর্তীতে সেই সমৃদ্ধতার জায়গা থেকে প্রতিটি বিষয়কে আরো বেশি উন্নত করেছে মুসলিম সালতানাত। অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, কৃষি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, শিক্ষাব্যবস্থা– সব ক্ষেত্রেই অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছিল উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাতগুলো। সেখান থেকে কি আমরা লাভবান হতে পারি না ? সেটাকে কি আমাদের সামনে বয়ান আকারে হাজির করতে পারি না ? </span></em></li>
</ul>
<ul>
<li><em><span style="font-weight: 400;"> কিন্তু আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করি, নিজস্ব সমৃদ্ধ ইতিহাস বাদ দিয়ে বৃটিশ একাডেমিয়া, ওরিয়েন্টালিস্টদের তৈরি করা ইতিহাসের বয়ানকে সামনে রেখে সবকিছু পাঠ করি এবং বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই তা গ্রহণ করি। দ্বিতীয়ত, যতটুকু গ্রহণ করি, ততটুকুই আবার ভারতীয় সংস্কৃতি আর সভ্যতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করি (যেটা মূলত একটা ব্রিটিশ-ব্রাক্ষ্মণ্যবাদীদের যৌথ প্রজেক্ট, উপমহাদের ইসলামী সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পুরোপরি সরিয়ে ফেলার জন্য)। কখনোই এটা ভাবি না যে, এই ভারতীয় সভ্যতার ভিত্তির অধিকাংশই গড়েছিল মুসলিম সালতানাত, যাকে আমরা গ্রহণ করতে পারছি না বা পর্যালোচনাও করছি না। </span></em></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা এ ভুল কেন করছি ? আমাদের পূর্ববর্তী ইতিহাস তো আমাদের এটা শেখায় না!</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আব্বাসীয় খেলাফতের সময় যখন সারা দুনিয়ার বিভিন্ন সভ্যতার মৌলিক গ্রন্থ, জ্ঞানসমূহ অনুবাদ করা হচ্ছিল, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দুনিয়ার জ্ঞানকে একত্রিত করা হচ্ছিল, তখন কিন্তু মুসলমানরা সবকিছু একদম ঢালাও ভাবে অনুবাদ করে ফেলেনি কিংবা সবকিছুকে গ্রহণও করেনি। তাহলে আমরা কেন চোখ বুঁজে বৃটিশ একাডেমীয়ার বয়ানকে মেনে নিচ্ছি?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এটাও সত্য যে, সেই সময় যদি মুসলমানরা অনুবাদ না করত, তবে আজকের গ্রীক, ইউরোপীয় সভ্যতার দার্শনিক, বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল, প্লেটোকে খুঁজেও পাওয়া যেত না। ইউরোপ পরবর্তীতে এরিস্টটল, প্লেটোকে গ্রহণ করেছে আরবী অনুবাদ থেকে, উসমানীয় ভাষার অনুবাদ থেকে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অনুবাদ করা, জ্ঞানগুলো সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে মুসলমানরা জানতো কোনটা গ্রহণ করা দরকার আর কোনটা সংশোধন করা দরকার। যেগুলো গ্রহণ করা দরকার করেছে, যেগুলো সংশোধন করা দরকার করেছে। যেগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলোকে নতুন রূপ দিয়ে সভ্যতাকে নতুনভাবে, নতুন দিকে জাগরিত করেছে। আর যেগুলো মানব সভ্যতার জন্য বিধ্বংসী, সেগুলোকে বাদ দিয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাহলে আমরা আমাদের ইতিহাস, অন্যান্য ইতিহাস, ওরিয়েন্টালিস্টদের ইতিহাস, ইউরোপীয় বয়ান, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বয়ানকে কেন সেভাবে পর্যালোচনা করতে পারছি না? কতটুকু গ্রহণ বা বাদ দেওয়া দরকার সেটা আমরা কেন বুঝতে পারছি না?</span></p>
<ul>
<li><strong><em> ঠিক একইভাবে যদি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে লক্ষ্য করি তবে দেখবো, আহমেদ ছফা সাহেব তার &#8216;বাঙালী মুসলমানের মন&#8217; বইটিতে লিখছেন এ অঞ্চলের মুসলমানদের আসলে কিছুই ছিল না, তারা হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনীর বিপরীতে পুঁথি লিখতো, উপন্যাস লিখতো; এখানে কোন জ্ঞানগত ভিত্তি, দার্শনিক ভিত্তি, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ভিত্তি গড়ে উঠেনি।</em></strong></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">তার এ কথা বর্তমানে বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠিত বয়ানে পরিণত হয়েছে বলা যায়। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মুঘল সালতানাত ছিল অর্থনীতিতে সমৃদ্ধশালী, প্রতিরক্ষায় ছিল শক্তিশালী, এ সালতানাতের ছিল সুন্দর ধর্মীয় সম্প্রিতি, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, সুন্দর নগর ও যুগসেরা স্থাপনা। এ সবগুলোকেই আমরা বলতে পারি একটি রাষ্ট্রের ধোঁয়ার মতো, যে রাষ্ট্রের আগুন হল চিন্তার স্বাধীনতা, জ্ঞানগত ভিত্তি, সে রাষ্ট্রের জ্ঞানীরা আর যোগ্য নেতৃত্ব। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাহলে এখানে কোন জ্ঞানগত ভিত্তি, দার্শনিক ভিত্তি, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ভিত্তি গড়ে উঠেনি বলার মাধ্যমে সে আগুনকে অস্বীকার করা হল না?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমরা যদি মানতিকের মূলনীতি অনুসারে এটাকে পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখবো কোথাও ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আমরা বলছি এখানে কোন আগুন ছিল না। অর্থাৎ উপমহাদেশের সব ধোঁয়াগুলোকে আমরা স্বীকার করছি, কিন্তু বলছি উপমহাদেশে কোন আগুন কখনো জ্বলেনি। এ কেমন পর্যালোচনা? এটা আদালতপূর্ণ কোন চিন্তা হতে পারে না, ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের পর্যায়েই পড়ে না। সুতরাং একে আমরা কেন গ্রহণ করবো?</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ঠিক একইভাবে এ বিষয়কে যৌক্তিকভাবে না খণ্ডিয়ে আমরা যতগুলো জবাব দিয়েছি, তার সবগুলোই ছিল ডিফেন্সিভ, যা আমাদের আরো বেশি হীনম্মন্য করেছে। </span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা আমাদের স্বর্ণালী অতীত জানি না। না জানার পেছনেও রয়েছে একটি বড় কারণ।</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">মানবতার ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক জাতি বৃটিশরা প্রায় দুইশো বছরের আমাদের শাসন করেছে। তারা লক্ষ লক্ষ আলেমকে হত্যা করেছে, উপমহাদেশে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত শোষণ করে যাচ্ছে, আমাদের কৃষিকে ধ্বংস করেছে, দারসবাড়ি থেকে শুরু করে মুসলমানদের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোকে ধ্বংস করেছে, স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছে, যে অঞ্চল সরাসরি ধ্বংস করতে পারেনি, ফতোয়া দিয়ে সেগুলোকে মুসলমানদের হাতেই ধ্বংস করিয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সুতরাং তারা আমাদের সঠিক ইতিহাসকে অক্ষত রাখবে বা আমাদের জ্ঞান ভাণ্ডারকে জীবিত রাখবে– এটি একটি অসম্ভব চিন্তা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ব্রিটিশরা অন্যান্য খাতের সাথে সাথে আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক জায়গাগুলোকেও ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। শুধু ধ্বংস করেই তারা বসে থাকেনি, আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে বিকল্প সংস্কৃতি এনেছে, শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা এনেছে, একইভাবে আমাদের ইতিহাসের গ্রন্থগুলো থেকে শুরু করে ইতিহাসের সমস্ত বয়ান ধ্বংস করে নতুন ইতিহাসের বয়ান এবং গ্রন্থ সৃষ্টি করেছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অর্থাৎ ভিত্তি মানে আগুন অবশ্যই ছিল, আগুন ছাড়া ধোঁয়া হতে পারে না। সমস্যা হল এই আগুনকে আমরা জানি না।</span></p>
<p><em>পরিতাপের বিষয় হল, উপমহাদেশের মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস তৈরীর ক্ষেত্রে, বয়ান তৈরীর ক্ষেত্রে স্বাধীন জ্ঞান চর্চা নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অভাবে আমাদের আত্মবিশ্বাস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?</em></p>
<p><span style="font-weight: 400;">যোগ্য, প্রজ্ঞাবান নেতা যদি জাতির মধ্যে তৈরী না হয়, আত্মবিশ্বাসের জায়গাটাও তৈরী হবে না। ফলস্বরূপ বৃটিশ পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের বয়ানও তৈরী হয়নি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">উপরন্তু নানাবিধ ফেরকাবাজি, ব্রিটিশ ইসলাম বা বৃটিশ সালাফিজম (ইতিহাস, দর্শনকে বাদ দিয়ে মূল টেক্সট বা ইলমুন নস কে একমাত্র ইসলাম দাবী করে, দিনশেষে যা একটি ধর্মীয় বয়ান ছাড়া কিছুই না) জাতীয় নতুন বয়ান হাজির করা হয়েছে, যার দ্বারা গোটা জাতি এবং প্রত্যেকটি ধারা প্রভাবিত। এ অবস্থায় আমরা কিভাবে চিন্তা করি যে একটি বয়ান দিলে তা সকলেই গ্রহণ করবে? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের কোন একটি ধারা, পন্থা, কোন একটি আন্দোলন এখনো পর্যন্ত সামগ্রিক হতে পারেনি, বহুমুখী হতে পারেনি। তাই এ কথা ভাবা একেবারেই অসম্ভব যে আমাদের আত্মবিশ্বাস অটোমেটিক ফিরে আসবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল ইসলামী সভ্যতার যে শ্রেষ্ঠত্ব, ন্যায়ভিত্তিক শাসন, যে রাজনীতি– এসবের উপর আজ অবধি কোন গ্রন্থ, পিএইচডি, থিসিস, পর্যালোচনামূলক আলোচনা, কোন প্রস্তাবনা সৃষ্টি হয়নি। এসব না থাকার কারণে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব আর পাশ্চাত্যের অসারতা বুঝা কষ্টকর হয়ে পড়েছে, যার ফলে হীনম্মন্যতা আসাটা খুব স্বাভাবিক।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু আমরা যদি সেই সত্যিকার দৃষ্টিকোণ, হাকীকতে পৌঁছানোর মহান রাস্তা অর্থাৎ ইসলামী জ্ঞানদর্শনের যে মূল লক্ষ্য, সেই লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য স্বয়ং হাকীকতের দৃষ্টিকোণ থেকেই যদি এ বিষয়গুলোকে পর্যালোচনা করি, তাহলে অবশ্যই দেখতে পাব, পাশ্চাত্যের কয়েকজন দার্শনিক ও কবি ছাড়া আর কিছুই নেই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অপরদিকে আমাদের (মুসলমানদের) আছে স্বতন্ত্র, শক্তিশালী দর্শন &#8216;ইসলামী দর্শন&#8217;, জ্ঞানভান্ডার। আমাদের রয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, পয়গম্বরগণ, রাসূল (সাঃ) এর মূলনীতিসমূহ ও ইলমুল ফিকহ। এর কোনটাই পাশ্চাত্যের নেই। অতএব আমাদের এ সবকিছুর সাথে পূর্বের সেই মহান ইসলামী সভ্যতার আলোকে নতুনভাবে জাগ্রত হওয়া, পুনর্জাগরণ ঘটানো, সে আলোকে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং শক্তিশালী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আর যদি সন্দেহ জাগে, তবে এ ঘাটতি ইসলামী সভ্যতা বা ইতিহাসের নয়, এ ঘাটতি আমাদের জ্ঞানের।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একই সাথে ভুলে গেলে চলবে না, পাশ্চাত্য চায় মুসলমানদেরকে, অন্যান্য সভ্যতাকে একটি ইতিহাসবিহীন জাতিতে পরিণত করতে! আর এক্ষেত্রে তারা আফ্রিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশীয় মুসলমানদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে সফলও হয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাই আমরা যদি আমাদের জ্ঞান, চিন্তা ও পর্যালোচনার জায়গায় শক্তিশালী হই, তবে অবশ্যই সত্যকে খুঁজে পাব। আর এ সত্য হল ইসলামী সভ্যতার নিশ্চিত বিজয়, নতুন দুনিয়া গড়া ও ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ অবশ্যই সম্ভব এবং এটা ততটাই সত্যি, যতটা সত্যি আগামীকালের সূর্যোদয়।</span></p>
<p><span style="font-size: inherit;">(বিঃদ্রঃ ছবিটি বাংলা সালতানাতের সর্বশেষ শিক্ষা ইন্সটিটিউট এর চিহ্ন। যাকে আমরা দারসবাড়ি মাদ্রাসা নামে জেনে থাকি। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত।)</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/our-history-and-victory-of-civilization-bangla-region-in-perspective/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4028</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বৃটিশ পরবর্তী বাংলাদেশ ও ফাহমিদ-উর-রহমানের &#8216;বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী&#8217;</title>
		<link>https://rowyakbd.com/post-british-bangladesh-and-fahmid-ur-rahmans-bongo-bangala-bangali/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/post-british-bangladesh-and-fahmid-ur-rahmans-bongo-bangala-bangali/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 07 Dec 2023 12:40:33 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বই পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=12981</guid>

					<description><![CDATA[আফ্রিকার ঐতিহাসিক চার্লস সেইফার্টের ভাষ্য মতে, “নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির জ্ঞান যে জাতির মাঝে নেই, সে জাতির অবস্থা শিকড়হীন গাছের সাথে তুলনীয়।” এ কথার আলোকে বিশ্লেষণ করলে আমরা খেয়াল করি যে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগত ও চিন্তার ক্ষেত্রে নিজস্ব ইতিহাসের বয়ান,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">আফ্রিকার ঐতিহাসিক চার্লস সেইফার্টের ভাষ্য মতে,</p>
<blockquote>
<p dir="auto">“নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির জ্ঞান যে জাতির মাঝে নেই, সে জাতির অবস্থা শিকড়হীন গাছের সাথে তুলনীয়।”</p>
</blockquote>
<p dir="auto">এ কথার আলোকে বিশ্লেষণ করলে আমরা খেয়াল করি যে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগত ও চিন্তার ক্ষেত্রে নিজস্ব ইতিহাসের বয়ান, পতনের কারণ বিশ্লেষণ, বর্তমান অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণ পর্যালোচনা ও বর্তমান অবস্থায় উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় কার্যকারণগুলো নির্ণয় এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতির বয়ানে বিকল্প প্রস্তাবনা প্রদানের বিষয়টি অনুপস্থিত। কোনো ঘরানাতেই এ বিষয়ে কোনো আলাপ কিংবা চিন্তা চর্চা নেই, যার ফলে বৃটিশ ব্রাহ্মণ্যবাদী ও তাদের আজ্ঞাবহ সেক্যুলার ঐতিহাসিকদের ইতিহাস বয়ান সর্বমহলে প্রভাবশালী। আমাদের চিন্তা, জ্ঞান, ভাবনাগুলো তাই আজ কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে পল্লবগ্রাহী! আজ আমাদের ৭০০ বছরের ইতিহাসের যোগসূত্রও গরহাজির!</p>
</div>
<p dir="auto">উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার পতন পরবর্তী সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বিপর্যস্ত মুসলিম সমাজের ইতিহাসের বাঁক-প্রতিবাঁকগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম মুসলিম সমাজকে বিধ্বস্ত করে দেয়ার জন্য দুটি মৌলিক উদ্যোগ গ্রহণ করে।</p>
<p dir="auto"><strong>প্রথমত,</strong> তারা ভাষা বদলে দেয়, যার ফলে চিন্তা জগত ও ভাবনা কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়ে যায়।</p>
<p dir="auto"><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> তারা বিকল্প ইতিহাসের বয়ান তৈরি করে এবং সে আলোকে সাহিত্যিক, সমাজ চিন্তক, লেখকদের গড়ে তোলে, যার ফলে আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না, নিজেদের ব্যক্তিত্বদের চিনি না, আমাদের সংগ্রামগুলোর সাথেই আমরা পরিচিত নই। আধুনিককালে সিনেমা, ডকুমেন্টারিও এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে কিংবা ওইসকল চিন্তা দিয়েই প্রভাবিত।</p>
<p dir="auto">এ অবস্থায় আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের যোগসূত্র, আমাদের ইতিহাসের ধারাবাহিক বিবরণী আর বর্তমান অবস্থার সামগ্রিক বিশ্লেষণ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।</p>
<div dir="auto">মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী লেখক ও চিন্তক শ্রদ্ধেয় ফাহমিদ-উর-রহমান স্যার “<strong>বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী</strong>” গ্রন্থে তাঁর নিজস্ব দীর্ঘ অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার বিশিষ্ট বয়ান তুলে ধরেছেন অসাধারণভাবে। বাংলা অঞ্চলের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের শিকড় সন্ধানে এটি যে একটি অসাধারণ প্রয়াস, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।</div>
<p dir="auto">এটিকে গ্রন্থ না বলে দীর্ঘ নিবন্ধ বলাই সঙ্গত। বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসগত সুলুক সন্ধান ও তার নিজস্ব সত্তার বয়ান তুলে আনতে শ্রদ্ধেয় ফাহমিদ-উর-রহমান ধারাবাহিকভাবে আলোকপাত করেছেন। একইসাথে তাঁর বয়ানে বাংলার বিকাশের পর্ব ও কালান্তর উঠে এসেছে নতুন চিন্তাভঙ্গিতে।</p>
<div dir="auto">ইসলামী সভ্যতার পতন ও বৃটিশ শোষণ পরবর্তী সময়ের চিন্তাকালগুলো পর্যালোচনা করলে এ বিষয়টি আমাদের নজরে আসে যে, হিন্দুত্ববাদী ঐতিহাসিগণ ও কলকাতাভিত্তিক সেক্যুলার/বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণের বয়ান অনেকটা এক সূত্রে গাঁথা। একইসাথে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বয়ানও যে হিন্দুত্ববাদের পরিমার্জিত সংস্করণ ও তার শিকড় যে এ সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার জমিনেই গ্রোথিত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিকল্প বয়ান দাঁড় করাতে হলে যে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসভিত্তিক মূল্যবোধের আশ্রয় নিতে হবে, তাও আমাদের সামনে স্পষ্ট। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর লেখাতে মূলত মুসলিমদের ইতিহাসের পর্যালোচনামূলক আলাপ তুলে ধরে মুসলিম চিন্তা অঙ্গন থেকে একটি বিকল্প বয়ানের প্রস্তাবনা দিয়েছেন, যা গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।</div>
<div dir="auto"><strong>প্রথমত,</strong> তিনি বাংলা অঞ্চলের উৎপত্তি ও উত্থানের সময়কাল নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এ দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা যে চিরকালই একপাক্ষিক ও এককেন্দ্রিকভাবে তাদের লেখালেখি ও চিন্তা চর্চা করে গিয়েছেন এবং তা যে চিরকালই হিন্দুত্ববাদের ছত্রছায়ায় প্রশ্রয় পেয়েছে তা তিনি তুলে ধরেছেন। একইসাথে তারা বাংলার মুসলিমদেরকে বহিরাগত হিসেবে গণ্য করে কীভাবে বিকল্প ইতিহাস বয়ান নির্মাণ করতে চেয়েছেন, লেখক এ আলাপে সে বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন।</div>
<div dir="auto"><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> তিনি এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, একটি সুগঠিত আঞ্চলিক কাঠামো ও ভাষা হিসেবে বাংলার সত্যিকার বিকাশ মুসলিম আমলের আগে সংঘটিত হয়নি। হিন্দুত্ববাদী ও তাদের আজ্ঞাবহ সেক্যুলার ঐতিহাসিকগণ যদিও এ বিষয়ে যথেষ্টই মিথ্যাচার চালিয়ে ভিন্ন বয়ান তৈরি করেছেন, তবু বাস্তবতা হলো এ অঞ্চলের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে মুসলিম আমলের ইতিহাস, ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস। এ কারণেই শ্রদ্ধেয় লেখকের ভাষায়, “বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তিভূমি ও সূচনাকাল হিসেবে ধরতে হবে মধ্যযুগের স্বাধীন সুলতানদের সময়কালকে।”</div>
<div dir="auto"><strong>তৃতীয়ত,</strong> তিনি বলেছেন, বাংলা অঞ্চলে সমাজতত্ত্ব, মনোগঠন ও সাহিত্যিক ভাবধারা এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সূচনাও মুসলিম সালতানাতের সময়ে হয়েছিলো, কারণ এ অঞ্চলে নতুন সাংস্কৃতিক জাগরণ ও উত্থান মুসলিমদের হাতেই সুসম্পন্ন হয়েছিলো। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এনামুল হকদের মতো বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা এ কথাই বলেছেন। সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাকে সুকুমার সেনের মতো পণ্ডিতরাও উৎরে যেতে পারেননি, ফলে তারা মুসলিম আমলকে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বললেও তা ইতিহাসের নিরিখে বাস্তব নয়, বরং তা সাম্প্রদায়িক ও একপেশে ইতিহাসভিত্তিক।</div>
<div dir="auto"><strong>চতুর্থত,</strong> একালে সেক্যুলার ঐতিহাসিকদের দ্বারা তৈরিকৃত একটি প্রভাবশালী বয়ান হলো “বাঙালিত্ব ও ইসলাম পরস্পর দ্বন্দ্বমুখী”। শ্রদ্ধেয় লেখক এখানে যৌক্তিকভাবে এ বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং সম্পূরক হিসেবে বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়নের ফলে তা কীভাবে মুসলিম সমাজে আত্মপরিচয় সংকটের সূচনা করেছে তা অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। সেই সাথে প্রাসঙ্গিক হিসেবে বৃটিশদের ভাষার রাজনীতি, বাংলা ভাষার ইসলামী শেকড় বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া ও সংস্কৃতায়িত বাংলার মাধ্যমে লাল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খোলস নিয়েও তিনি অসাধারণ আলোচনা করেছেন।</div>
<div dir="auto"><strong>সবশেষ বলা যায়,</strong> পুরো গ্রন্থের প্রতিটি প্রাসঙ্গিক স্থলেই লেখক পর্যালোচনামূলক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, “আমাদের চিন্তাজগতে এ একপেশে বয়ান প্রভাবশালী হওয়ার কারণ কী?” একইসাথে ইতিহাসের পাতা উল্টে এর পেছনে সক্রিয় কার্যকারণগুলো তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।</div>
<div dir="auto">দুই শতাব্দীব্যাপী বৃটিশ শোষণ, ঔপনিবেশিক বাস্তবতা, পশ্চিমবঙ্গীয় চিন্তাঙ্গনের আধিপত্যবাদী এ বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে শ্রদ্ধেয় লেখক তাঁর “<strong>বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী</strong>”-তে বিকল্প বয়ানের প্রস্তাবনা দিয়েছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন,</div>
<div dir="auto">
<blockquote><p>“<strong>বঙ্গ, বাঙ্গালা বাঙ্গালী</strong>&#8221; শব্দত্রয় উচ্চারণ করতে হলে ইসলাম, মুসলিম, মুসলমানী সমাজও সমভাবেই প্রাসঙ্গিক।”</p></blockquote>
</div>
<div dir="auto">বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস পাঠ করতে হলে ইসলামী সালতানাতের ইতিহাসকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠিত একপেশে বয়ানের বিপরীতে বিকল্প বয়ানের প্রস্তাবনা দেয়াটাই এ গ্রন্থের সফলতা। এ গ্রন্থের স্বার্থকতাও এখানেই।</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">অসাধারণ এ গ্রন্থের জন্য শ্রদ্ধেয় লেখক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মক্তব প্রকাশনের আব্দুস সালাম ভাইকে এ অসাধারণ কাজের জন্য আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন।</p>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/post-british-bangladesh-and-fahmid-ur-rahmans-bongo-bangala-bangali/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">12981</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মুসলিম জাগরণের অনন্য সাধক ও মহান কবি গোলাম মোস্তফা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/golam-mustafa-the-great-poet-of-muslim-awakening/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/golam-mustafa-the-great-poet-of-muslim-awakening/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 04 Dec 2023 16:57:41 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=12975</guid>

					<description><![CDATA[মুসলিম জাগরণের অনন্য কবি, আল্লামা ইকবালের প্রথম সারির অনুবাদক ও গীতিকার কবি গোলাম মোস্তফা। তিনি গদ্য সাহিত্যে তার অমর কীর্তি “বিশ্বনবী” লিখার পরে পল্লীকবি জসিম উদ্দিন বলেছিলেন, “কবির ‘বিশ্বনবী’ এবং অন্যান্য গদ্য রচনার অকুণ্ঠভাবে প্রশংসা করি। তাঁর মতো এমন কবিত্বপূর্ণ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">মুসলিম জাগরণের অনন্য কবি, আল্লামা ইকবালের প্রথম সারির অনুবাদক ও গীতিকার কবি গোলাম মোস্তফা। তিনি গদ্য সাহিত্যে তার অমর কীর্তি <strong>“বিশ্বনবী”</strong> লিখার পরে পল্লীকবি জসিম উদ্দিন বলেছিলেন,</p>
<blockquote>
<p dir="auto">“কবির ‘বিশ্বনবী’ এবং অন্যান্য গদ্য রচনার অকুণ্ঠভাবে প্রশংসা করি। তাঁর মতো এমন কবিত্বপূর্ণ ললিতগতিসম্পন্ন গদ্য লেখক আমাদের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একজনও নেই।”</p>
</blockquote>
<p dir="auto">অর্থাৎ গদ্য সাহিত্যের আকাশেও তিনি এক মহান তারকা।</p>
</div>
<div dir="auto">কবি গোলাম মোস্তফার জন্ম ঝিনাইদহ জেলায়। তাঁর পিতা গোলাম রব্বানী ও দাদা কাজী গোলাম সরোয়ার দু’জনেই ছিলেন জনপ্রিয় লোককবি। কাজী গোলাম সরোয়ার তৎকালীন নীল বিদ্রোহের সময়ে জাতীয় জাগরণমূলক কবিতা লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। অর্থাৎ বুঝা যায়, কবি গোলাম মোস্তফা বংশ পরম্পরায় তিনি কবি হয়ে উঠেছিলেন। ছোট বয়সেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। এ বয়স থেকেই তিনি “আল ইসলাম”, “মোহাম্মদী”, “সুলতান”, “মিহির” ও “সুধাকর” প্রভৃতি তৎকালীন প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যান নিরবিচ্ছিন্নভাবে। ১৯১৩ সালে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় তাঁর ‘আদ্রিয়ানোপল উদ্ধার’ শীর্ষক কবিতাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়।</div>
<div dir="auto">পরবর্তীতে গোলাম মোস্তফা মূলত মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত হয়ে উঠেন। তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন একজন বাংলা ভাষী লেখক, অনুবাদক, গীতিকার, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক এবং রেনেসাঁর কবি। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো–</div>
<div dir="auto">• তাঁর কাব্যের মূল বিষয়বস্তু ছিলো দ্বীনে মুবিন ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতি। তাঁর কাব্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো সহজ ও শিল্পসম্মত প্রকাশ ভঙ্গি এবং ছন্দোলালিত্য; যা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ছায়ায় ভরপুর থাকতো। এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তিনি লিখিছেন মানুষ, রাখাল খলিফা, ফাতেমা-ই-দোয়াজ দহম, আল-হেলাল, শবে বরাত, ঈদ উৎসব ইত্যাদি শত কবিতামালা।</div>
<div dir="auto">‘ঈদ উৎসব’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “আজ সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূরতি লভিয়াছে হর্ষে, আজি প্রানে প্রানে যে ভাব জাগিয়াছে, রাখিতে হবে সারা বর্ষে। এই ঈদ হোক আজি সকল ধন্য, নিখিল মানবের মিলন জন্য, শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক। খোদার শুভাশিস পর্শে।”</div>
<div dir="auto">‘রাখাল খলিফা’ কবিতায় লিখছেন, “নাছোড় খলিফা, কোন কথা তিনি তুলেন না তাঁর কানে, রাজী হল তাই অগত্যা নও কর; রাখাল চলছে উঠের পৃষ্ঠে- খলিফা লাগাম টানে। এ মহাদৃশ্য অপূর্ব সুন্দর।”</div>
<div dir="auto">• দ্বীনে মুবিন ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতির পাশাপাশি তার কবিতায় থাকতো জাতিসত্তার চেতনা। তিনি লিখিছেন স্বাধীন মিশর, হিন্দু মুসলমান, মোস্তফা কামাল, বিজয় উল্লাস ইত্যাদি বহু কাব্যমালা।</div>
<div dir="auto">তার অন্যতম কাব্যগ্রন্থ “রক্ত রাগ” এবং পরবর্তী গ্রন্থাবলীর মধ্যে “হাসনাহেনা”, “খোশরোজ”, “সাহারা”, “বুলবুলিস্তান” ও “রূপের নেশা”, “ভাঙ্গাবুক”, “এক মন এক প্রাণ” ইত্যাদি উপন্যাস বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে।</div>
<div dir="auto"><strong>অনুবাদক হিসেবেও তিনি উঠে আসেন এবং বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। আরবী ও উর্দু সাহিত্য থেকে “ইখওয়ানুস সাফা”, “মুসাদ্দাস-ই-হালী” অনুবাদ করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এছাড়া তিনি আল-কোরআন এর বাংলা অনুবাদ করেন। পরবর্তীতে তিনি মহান দার্শনিক আল্লামা ইকবালের “কালাম-ই-ইকবাল”, “শিকওয়া” অনুবাদ করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেন।</strong></div>
<div dir="auto">• তৎকালীন নানামুখী বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে তিনি রচনা করেন “ইসলাম ও কমিউনিজম”, “ইসলামে জেহাদ”, “আমার চিন্তাধারা” নামক গ্রন্থগুলো। এসব গ্রন্থ তাঁর গভীর চিন্তাধারার জ্ঞানলব্ধতারই পরিচয় বহন করে।</div>
<div dir="auto">• সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তিনি অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। গায়ক ও গীতিকার হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে ইসলামী গান, গজল ও মিলাদ মাহফিলের বিখ্যাত “কিয়ামবাণী” রচনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। গোলাম মোস্তফার রচিত গানগুলোর প্রায় সবকটাই আব্বাস উদ্দীন ও তাঁর নিজের কন্ঠে মিলিত ও এককভাবে রেকর্ড হয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি গান কবির নিজস্ব বৈশিষ্ঠ্যে ও আদর্শে রচিত। যেমন– খোদার মহিমায়, হে খোদা দয়াময় রহমান রাহিম, বাদশা তুমি দুনিয়ার, হে পরোয়ার দিগার এবং ইয়া নবী সালাম আলাইকা, ও রাব্বানা শোন শোন আমর মোনাজাত। এ গানগুলো স্বাতন্ত্র ও চিরস্থায়ী মহিমায় সমুজ্জল। তাঁর এ গানগুলোর আদর্শ চিরন্তন।</div>
<div dir="auto">• <strong>তিনি তার কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘সিরাত-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধি লাভ করেন।</strong></div>
<div dir="auto">• তিনি ছিলেন সম্পাদক। “নওবাহার” নামক সাহিত্য পত্রিকা তাঁরই এক অসাধারণ সৃষ্টি।</div>
<div dir="auto">• তিনি &#8216;কাব্য সুধাকর&#8217; উপাধি প্রাপ্ত হন।</div>
<div dir="auto">• রবিউল আউয়াল মাসে যে বিষয়টি সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে সামনে আনা দরকার, তা হলো- কবি গোলাম মোস্তফার অমর সৃষ্টি “বিশ্বনবী” গ্রন্থ। এ অমর গ্রন্থখানা গদ্যে রচিত হলেও সে গদ্য কবিতার মত ছন্দময় এবং মধুর। গ্রন্থখানা বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর একটি সার্থক জীবন চরিত। গ্রন্থটিতে হৃদয়ের আবেগ, আন্তরিক অনুভূতি যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তার তুলনা আমাদের বাংলা সাহিত্যে নিতান্তই বিরল।</div>
<div dir="auto">বলা হয়ে থাকে, “বিশ্বনবী” বাংলা সাহিত্যের হীরকখণ্ড-তুল্য গদ্যসাহিত্য। প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক ড. এম এ সবুর বলেন,</div>
<blockquote>
<div dir="auto">“গোলাম মোস্তফার অনন্য কীর্তি বিশ্বনবী। বাংলা সাহিত্যের সেরা ও জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোর একটি এই গ্রন্থ। গোলাম মোস্তফা ছিলেন রাসূল প্রেমিক এক মহান সাহিত্যিক। তিনি রাসূল (সা.) এর প্রতি অগাধ প্রেম-ভালবাসা থেকেই বিশ্বনবী রচনা করেছেন।” এ প্রসঙ্গে বইটির প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেন, “মহাপুরুষদের জীবন শুধু ঘটনার ফিরিস্তি নহে; শুধু যুক্তি-তর্কের কণ্টক শয্যাও নহে; সে একটা ভক্তি, শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও অনুভবের বস্তু, তাহাকে বুঝিতে হইলে একদিকে চাই সত্যের আলোক ও বিজ্ঞানের বিচার বুদ্ধি, অপরদিকে ঠিক তেমন চাই ভক্তের দরদ, কবির সৌন্দর্যানুভূতি, দার্শনিকের অন্তর্দৃষ্টি আর চাই প্রেমিকের প্রেম। আশেকে রাসূল না হইলে সত্যিকার রাসূলকে দেখা যায় না।”</div>
</blockquote>
<div dir="auto">প্রকৃতপক্ষে “বিশ্বনবী” গোলাম মোস্তফার ‘ইশক রাসূল’ (রাসূল প্রেম) এর ফসল। গ্রন্থটির পরতে পরতে তিনি নিজেকে ‘আশেকে রসূল’ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।</div>
<div dir="auto">প্রিয় নবীর জীবনদর্শকে স্মরণ করে কবি লিখেছেন,</div>
<blockquote>
<div dir="auto">“হে রাসুল আজিকার এই পূন্য প্রভাতে আলোকে,</div>
<div dir="auto">তোমার সালাম করি-দূর হতে পরম পুলকে।</div>
<div dir="auto">জাগিয়া উঠুক আজি এই দিনে আমাদের মনে</div>
<div dir="auto">কি অসীম শক্তি আছে লুকাইয়া মানব জীবনে।”</div>
</blockquote>
<div dir="auto">গ্রন্থখানা পাঠ করে সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত মনোজ বসু কবিকে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনার বিশ্বনবী পড়লাম। জাতির একটা বড় কাজ করলেন আপনি। মহামানুষের সর্বকাল ও সর্বদেশের সম্পত্তি। আমি ও আমার মত অনেকেই ধর্মে মুসলমান না হয়েও হযরতকে একান্ত আপনার বলে অনুভব করতে পারলাম। মহানবী (সা) কাছে পৌঁছবার এই সেতু রচনা আপনার অতুলনীয় সাহিত্য কীর্তি।” ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থটি তাঁর গদ্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এটি বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য জনপ্রিয় জীবনীগ্রন্থ। ‘বিশ্বনবী’ লিখাতে হৃদয়ের যে আবেগ, বিশ্বাস ও আন্তরিকতা; ভক্তির যে ভাবোচ্ছ্বাস তা সম্পূর্ণ অভিনব। উক্ত বইয়ের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে সাহিত্য সমালোচক শাহাবুদ্দিন আহমদ বলেছেন, “আসলে ‘বিশ্বনবী’ রচনায় তিনি একটি যুগের দাবীকে পূরণ করেছেন এবং মুসলমানদের নব-জাগরনের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর পূর্বে বাংলা সাহিত্যে রাসুল (সা) এর জীবনী লিখে বিখ্যাত হয়েছিল শেখ আব্দুর রহিম এবং মওলানা আকরাম খাঁ। সে দুটি গ্রন্থও মুসলিম সমাজে উজ্জীবনে সাহায্য করেছে কিন্তু গোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’ সেই ঐতিহ্য সৃষ্টির আকাশচুম্বী প্রাসাদ।”</div>
<div dir="auto">• মহান কবির মৃত্যু বার্ষিকীতে বলা আবশ্যক- আজ গোলাম মোস্তফা পাঠ আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন। অবক্ষয়ের এই সময়ে তাঁর লিখনিই সমাজকে অগ্রসর পথে নিয়ে যেতে পারে। গবেষক কামরুজ্জামানের ভাষায়, মুসলিম নবজাগরনের কবি গোলাম মোস্তফা, শিল্পী আব্বাস উদ্দীন ও কবি নজরুল যেন এক সূত্রে গাঁথা। তারা আপন আপন অবস্থান থেকে বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং মুসলিম ঐতিহ্যের ধারাকে সমুন্নত করেছেন। বন্ধুত্বের সূত্রে তারা আবদ্ধ ছিলেন। আর এসব বন্ধুত্বের মূলসূত্রই ছিল মানবকল্যাণ এবং আদর্শ। কেননা কবি গোলাম মোস্তফার বন্ধুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন— কাজী নজরুল ইসলাম, কন্ঠ শিল্পী আব্বাস উদ্দীন, কবি শাহাদত হোসেন, কবি জসীম উদ্দীন, কবি আব্দুল কাদির, কবি আব্দুস সাত্তার, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ।</div>
<div dir="auto">• শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও তিনি অনন্য এক উচ্চতায় রয়েছেন। &#8216;কিশোর’ ছড়া-কবিতাটির মাধ্যমে শিশু-কিশোরেরা আন্দোলিত ও উদ্বেলিত হত। ভবিষ্যত শিশু-কিশোরেরা নিজেদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার জন্য গোলাম মোস্তাফার কবিতার মাধ্যমে বহু অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে।</div>
<div dir="auto">সর্বশেষ গবেষক ড.এম এ সবুর এর কথা দিয়ে শেষ করা যায়,</div>
<blockquote>
<div dir="auto">“গোলাম মোস্তফার সাহিত্যের অধিকাংশেরই উপজীব্য বিষয় ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম ঐতিহ্য। নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি লিখেননি; বরং ইসলাম ও ইসলামী আদর্শ রূপায়নের জন্যই তিনি লিখেছেন। তিনি রসাত্মক কবিতা রচনা করলেও কুরআন-হাদিস তথা ইসলামী আদর্শ ঐতিহ্যের প্রতি ছিলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন। কোন রচনা-ই যেন ইসলাম পরিপন্থী কিংবা ইসলামের বিকৃত উপস্থাপন না হয় সে দিকে তিনি ছিলেন সদা সতর্ক। ইসলামী চেতনার রূপায়ণই তাঁর সাহিত্য-সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য এবং মুসলিম সমাজের সাহিত্য-সংস্কৃতির জাগরণ তাঁর লক্ষ্য। তিনি মুসলিম জাতির জাগরণমূলক ইসলামী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বিষয়াবলীকেই গীতি কবিতার আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন।&#8221;</div>
</blockquote>
<div dir="auto">মহান এই কবি ১৯৬৪ সালের ১৩ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।</div>
<blockquote>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">“অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি বিচার দিনের স্বামী</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">যত গুন গান, হে চির মহান তোমারি অন্তর্যামী।</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">সরল, সঠিক পুণ্য পন্থা মোদের দাওগো বলি</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">চালাও সে পথে, যে পথে তোমার প্রিয়জন গেছে চলি।”</div>
</blockquote>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">(মুনাজাত, গোলাম মোস্তফা)</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/golam-mustafa-the-great-poet-of-muslim-awakening/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">12975</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মাওলানা আকরম খাঁ : শোষিত জমিনে নবোত্থানের অনন্য দিকপাল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/maulana-akram-kha/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/maulana-akram-kha/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 07 Nov 2023 13:06:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=12888</guid>

					<description><![CDATA[বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার পতন ও পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকালব্যাপী বৃটিশ শোষণের ফলে এ অঞ্চলের মুসলমানদের ভাবজগত ও মানসক্ষেত্র যেরূপ বিধ্বস্ত ও বিকৃত হয়েছে, পূর্বাপর কোনো অভিজ্ঞতায়-ই মুসলিম সমাজের এরূপ সামগ্রিক অধঃপতন পরিলক্ষিত হয় না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দুত্ববাদী ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">বাংলা অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতার পতন ও পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকালব্যাপী বৃটিশ শোষণের ফলে এ অঞ্চলের মুসলমানদের ভাবজগত ও মানসক্ষেত্র যেরূপ বিধ্বস্ত ও বিকৃত হয়েছে, পূর্বাপর কোনো অভিজ্ঞতায়-ই মুসলিম সমাজের এরূপ সামগ্রিক অধঃপতন পরিলক্ষিত হয় না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দুত্ববাদী ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের যুগপৎ প্রভাবে মুসলমানরা তাদের পথচ্যুত হয়ে পড়ে, সেই সাথে এর প্রবল প্রভাবে খেই হারিয়ে এক ধরনের অনিবার্য স্থবিরতার মুখোমুখি হয়।</p>
<p dir="auto">বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষিতে এ স্থবিরতার বিপরীতে প্রথম অমোঘ আওয়াজ তুলেন মাওলানা আকরম খাঁ। তাঁর গভীর প্রজ্ঞা, তীক্ষ্ম জ্ঞান, পাশাপাশি রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় তাঁর অনবদ্য অবদানের ফলশ্রুতিতে বাংলা অঞ্চলে মুসলিম জাগরণের প্রভাবকদের তালিকায় তাঁর নাম স্বমহিমায় উপস্থিত। <strong>এজন্যই মুসলিম বাংলার আরেক যশস্বী ব্যক্তিত্ব আবুল মনসুর আহমদ মাওলানা আকরম খাঁর জীবনব্যাপী সাধনার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন</strong>,</p>
<blockquote>
<p dir="auto">“বস্তুত মাওলানা আকরম খাঁর জীবন ইতিহাস মুসলিম বাংলা, তথা মুসলিম ভারতের সামগ্রিক পুনর্জাগরণের পরিপূর্ণ রেনেসাঁরই ইতিহাস।”</p>
</blockquote>
</div>
<div dir="auto">সাংবাদিকতা থেকে রাজনীতি, সাহিত্য থেকে ইতিহাস প্রতিটি ময়দানেই বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আজাদীর সন্ধান চষে বেড়িয়েছেন তিনি। তিনি যে একালে বাংলার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক উজ্জীবনের অন্যতম তূর্যবাদক ছিলেন, এ কথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।</div>
<div dir="auto"><strong>তাঁর জীবনব্যাপী কর্মসাধনায় আমরা তিনটি মৌলিক অবদান চিহ্নিত করতে পারি–</strong></div>
<ul>
<li dir="auto"><strong>সাংবাদিকতায় অবদান</strong></li>
<li dir="auto"><strong>রাজনীতির ময়দানে অবদান</strong></li>
<li dir="auto"><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান</strong></li>
</ul>
<h5 dir="auto">সাংবাদিকতায় অবদান:</h5>
<div dir="auto">শতাব্দীকালব্যাপী বিস্তৃত বর্ণাঢ্য জীবনে মাওলানা আকরম খাঁ সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। মুসলমানদের রাজনৈতিক পতনের পর শিক্ষাব্যবস্থার ভাষা পরিবর্তন, শিক্ষাক্রম পরিবর্তনসহ ব্রিটিশদের ক্রমাগত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে মুসলমানদের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে। বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্বের সংকটের ফলে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরবে বা হৃদয়ের চাওয়ার প্রতিনিধিত্ব করবে এমন মাধ্যম বা সুযোগ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজিকে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে নির্বাচিত করার ফলে বহু বছর ধরে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী মুসলমানী ভাষাগুলো, তথা বাংলা, ফারসি, উর্দুর মতো ভাষাগুলো অচ্ছ্যুৎ বিষয়ে পরিণত হয়। এ নানামুখী চাপে মুসলমানরা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।</div>
<div dir="auto">এমন সময়ে নিজ উদ্যোগে “মাসিক মোহাম্মদী”র মতো পত্রিকা ছাপানো কওমের প্রতি মাওলানার আকরাম খাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। মাত্র ৫১ টাকা আর মুসলমানদের মুক্তির প্রতি দায়বদ্ধতাকে পুঁজি করে তিনি সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে কত অগ্নিসেতু পাড়ি দিয়েছেন, তা লিখলে এক সুবিশাল উপাখ্যান হয়ে যাবে। মাসিক মোহাম্মদীর পরে জামানা, আজাদ, সেবক, সাপ্তাহিক কমরেডের মতো পত্রিকাগুলো তাঁর উদ্যোগেরই ফসল। পাশাপাশি আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে তৎকালীন বাংলার সকল বিদগ্ধ তরুণ-পণ্ডিতের লেখা একত্রিত করে এ পত্রিকাগুলোকে মুসলমানদের হৃদয়ের আওয়াজের প্রতিনিধিত্বকারীর পর্যায়ে উন্নীত করা তাঁরই কৃতিত্ব।</div>
<div dir="auto">একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করে যাওয়া কতটা দুঃসাধ্য তা বর্তমানেও অনুভূত হয়, অথচ ১৯০৩ সালে স্বল্প টাকা পুঁজি করে তাঁর উদ্যোগ গ্রহণ, অতঃপর সুদীর্ঘকালব্যাপী তা পরিচালনা করা এবং মাসিক মোহাম্মদীর পরে ক্রমাগত জামানা, আজাদ, সেবক, কমরেডের মতো পত্রিকার প্রকাশ তাঁর বৈদগ্ধ্য ও দূরদৃষ্টিরই সাক্ষ্য দেয়।</div>
<h5 dir="auto"><strong>রাজনীতির ময়দানে অবদান:</strong></h5>
<div dir="auto">সময়ের প্রয়োজনে এক সময় হিন্দু-মুসলিম সকলেই একই প্লাটফর্মে রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেসে যোগদান করলেও অল্পকাল পরেই মাওলানা আকরম খাঁর সামনে কংগ্রেসের দ্বিচারিতা ও দ্বিমুখী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। এরপর তিনি তাঁর রাজনৈতিক ভিশনই বদলে ফেলেন। পরবর্তীতে তিনি যেখানেই রাজনীতি করেন না কেন, তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মজলুমের অধিকার আদায় ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মুসলিম লীগসহ যে সকল অঙ্গনেই তিনি রাজনৈতিক প্রয়োজনে গিয়েছেন, এক মুহুর্তের জন্যও তাঁর মূল ভিশন থেকে বিচ্যুত হননি।</div>
<h5 dir="auto"><strong>বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান:</strong></h5>
<div dir="auto">জরাগ্রস্ত ও স্থবির মুসলিম মানসকে পুনরায় উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল চেতনায় স্বকীয় করে তুলতে মাওলানা আকরম খাঁ তাঁর শতাব্দীকাল ব্যাপ্ত জীবনে অবিরাম লিখে গিয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনকালের প্রতিটি মুহুর্তই তিনি ব্যয় করেছেন বাঙ্গালী মুসলমানদের পুনর্জাগরণের স্বার্থে। তাঁর প্রজ্ঞাসমৃদ্ধ লেখনী বাঙ্গালী মুসলমানদের জাগরণের অন্যতম প্রধান উদ্দীপক হয়েছিলো এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।</div>
<div dir="auto">মাওলানা আকরম খাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে রয়েছে–</div>
<p><strong>১.</strong> <strong>সমস্যা ও সমাধান।</strong> এটি মূলত তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ।</p>
<p><strong>২. আমপারার বাংলা অনুবাদ।</strong> পরবর্তীতে তিনি সম্পূর্ণ কোরআনের বাংলা অনুবাদও সম্পন্ন করেন।</p>
<p><strong>৩. মোস্তফা-চরিত।</strong> এটি তাঁর ম্যাগনাম-ওপাস। এ গ্রন্থ শুধুমাত্র রাসূলের (স.) জীবনের গতানুগতিক বর্ণনা নয়। তাঁর মনে হয়েছিলো, পতনকালীন সময়ে এসে মুসলমানদের হীনম্মন্যতার আরেকটি বড় কারণ হলো তারা এর বাস্তবিক সমাধানের পরিবর্তে কাল্পনিক সমাধান অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এ কারণে তাদের মধ্যে প্রচুর কুসংস্কার, কাল্পনিকতা প্রবেশ করেছে যা তাদের অগ্রসরতার পথে শক্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ফলে মুসলমানরা রাসূল (স.) এর মানবিক চরিত্রকে হারিয়ে ফেলে তাকে এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যার অনুসরণ অসম্ভব ও দুঃসাধ্য। রাসূল (স.) এর এ ধরনের অতিপ্রাকৃত চিত্রায়ন তাঁর সুমহান মানবিক আদর্শগুলোকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, যার ফলশ্রুতিতে তাঁকে অনুসরণ করা আমাদের জন্য অবাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। মাওলানা আকরম খাঁ তাঁর এ গ্রন্থে রাসূল (স.) এর জীবনীকে যুক্তির ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রয়াসী হয়েছেন।</p>
<div dir="auto"><strong>৪. বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রীষ্টান ধর্ম।</strong> খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থের বিকৃতি, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ফলশ্রুতিতে কীভাবে খ্রিস্টান ধর্মের মূল সারবত্তা হারিয়ে গিয়েছে, কীভাবে খ্রিস্টান ধর্ম তার মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে তা এ গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য।</div>
<div dir="auto"><strong>৫. মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস।</strong> এটি মাওলানা আকরাম খাঁর অন্যতম সেরা কাজ। বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাসের পাশাপাশি এটি একটি মূল্যবান সমাজতাত্ত্বিক গবেষণাও। পরবর্তীতে এ বিষয়ে যতগুলো বই-ই রচিত হয়েছে, এ বইটি সবগুলো বইয়ের পূর্বসুরী হিসেবে কাজ করেছে।</div>
<div dir="auto"><strong>৬. তাফসীরুল কোরআন (১-৫ খন্ড)।</strong> এটি মাওলানা আকরম খাঁর সুবৃহৎ কাজ যা যৌক্তিক ও সামগ্রিক পন্থায় কোরআনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত।</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">কীভাবে এক শতাব্দীকালব্যাপী নিজ জাতির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়, প্রতিদানের আশা না করে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয় তার সার্থক প্রতিরূপ বাঙ্গালী মুসলমানদের তামাদ্দুনিক আজাদীর তূর্যবাদক মাওলানা আকরম খাঁ।</p>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/maulana-akram-kha/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">12888</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী: বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও জাতীয় জাগরণে আত্মোৎসর্গকারী এক মহাপুরুষ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/mawlana-moniruzzaman-islamabadi/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/mawlana-moniruzzaman-islamabadi/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 31 Oct 2023 17:19:09 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=12798</guid>

					<description><![CDATA[ব্রিটিশ শোষণ পরবর্তী সময়ে বাংলা অঞ্চলের প্রতিটি আনাচে কানাচে পরিভ্রমণ করে জাতিকে জাগানোর প্রায় অসম্ভব সাধনায় যারা লিপ্ত হয়েছিলেন- প্রখ্যাত আলেম, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও বাঙালি মুসলমানদের সাংবাদিকতার অগ্রপথিক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য মহাপুরুষ। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, সমাজসংস্কার, ধর্মপ্রচার,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">ব্রিটিশ শোষণ পরবর্তী সময়ে বাংলা অঞ্চলের প্রতিটি আনাচে কানাচে পরিভ্রমণ করে জাতিকে জাগানোর প্রায় অসম্ভব সাধনায় যারা লিপ্ত হয়েছিলেন- প্রখ্যাত আলেম, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও বাঙালি মুসলমানদের সাংবাদিকতার অগ্রপথিক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য মহাপুরুষ। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, সমাজসংস্কার, ধর্মপ্রচার, রাজনীতি, আইনসভা—সকল দিকেই তিনি তাঁর দূরদর্শী মেধা ও তীক্ষ্মধী চিন্তার প্রমাণ রেখেছেন। সাহিত্যের আসর থেকে রাজনীতির ময়দান; বিচিত্র পথে বিপুল সৃজনপ্রসূ হয়েছিল তাঁর যুগন্ধর প্রতিভা।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের অবিভক্ত পটিয়া থানার আড়ালিয়া (বর্তমান বাইনজুরি) গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মতারিখ জানা যায়নি। তাঁর পিতার নাম মুন্সি মতিউল্লাহ পণ্ডিত। পিতার প্রচেষ্টায় মনিরুজ্জামান একজন গৃহশিক্ষক মৌলভির তত্ত্বাবধানে স্বগৃহে আরবি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর তাঁর পিতা তাঁকে হুগলি পাঠিয়ে দেন। তিনি সেখানে হুগলি মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে হুগলি মাদ্রাসার সর্বশেষ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বিভাগ অধিকার করে জামায়াত-উলা পাস করেন। এসময়ে তাঁর উপর মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, নওয়াব আব্দুল লতিফ ও জামাল উদ্দীন আফগানী প্রমুখ বিশ্ব মুসলিম মনিষীদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মোদ্যেগের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মাওলানা জৈনপুরীর আদর্শে ইসলাম প্রচার, নওয়াব আব্দুল লতিফের আদর্শে শিক্ষা বিস্তার ও জামাল উদ্দিন আফগানীর আদর্শে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধে অনুপ্রাণিত হন এবং তার আলোকে কর্মতৎপরতা শুরু করেন।</p>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">পরবর্তীতে পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে মনিরুজ্জামানের সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত হয়। প্রচারক, ইসলাম-প্রচারক, নবনূর, আল-এছলাম প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা ও ইতিহাসবিষয়ক প্রবন্ধ মুদ্রিত হয়। তাঁর গদ্যভঙ্গি প্রাঞ্জল অথচ বলিষ্ঠ ছিল। মাওলানা ইসলামাবাদী বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি বড় ছোট মিলিয়ে ৪২টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য হলো, কোরআনে স্বাধীনতার বাণী, ভারতের মুসলমান সভ্যতা, ভারতে ইসলাম প্রচার, সমাজ সংস্কার, মহামান্য উসমানী সুলতানের জীবনী, খাজা নেজামুদ্দীন আউলিয়া, মুসলমানদের সুদ সমস্যা ও অর্থনীতির মৌলিক সমাধান, ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান, কুরআন ও বিজ্ঞান, আরোঙ্গজেব, মোসলেম বীরাঙ্গনা, ইসলামের শিক্ষা, হযরতের জীবনী, ইসলাম ও রাজনীতি, তাপস-কাহিনী, শিল্প ও মুসলমান, সমাজ সংস্কার, রাজনীতির ক্ষেত্রে আলেম সমাজের দান, শুভ সমাচার, স্পেনের ইতিহাস, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের জাতীয় উন্নতির উপায় ইত্যাদি। এছাড়াও লিখেছেন বহু ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা প্রবন্ধ।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">এরপর মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সাংবাদিকতার সূচনা হয় সাপ্তাহিক ‘ছোলতান’-এর মাধ্যমে। সাপ্তাহিক ‘ছোলতান’ পরে ‘দৈনিক ছোলতান’-এ উন্নীত হয়। তিনি ছিলেন এ পত্রিকার সম্পাদক। পরে আঞ্জুমানে ওলামায়ে ইসলাম বাংলা ও আসামের মুখপাত্র ‘আল-ইসলামে’র সম্পাদক হন। এই পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে তিনি অবিভক্ত বাংলার মুসলমানদের মাঝে আত্মজাগরণের প্রেরণা ছড়িয়ে দেন। তিনি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের অগ্রসর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাঙালী মুসলমানের জাতিগত ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাংলায় প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম মুসলমান সম্পাদক।</p>
<p dir="auto">পাশাপাশি তৎকালীন দুনিয়াজোড়া খ্যাতির শীর্ষে ছিল ফারসী ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র ‘হাবলুল মতিন’। আল্লামা জামালুদ্দিন আফগানীর শিষ্য ও মজলুম নেতা আগা মঈদুল ইসলামের সম্পাদনায় কলকাতায় ইংরেজীতে ‘মিল্লাত’ ও উর্দু-ফারসীতে, দৈনিক ‘হাবলুল মতিন’ প্রকাশিত হতো। আর ‘হাবলুল মতিনে’র বাংলা সংস্করণের সম্পাদক ছিলেন- মাওলানা ইসলামাবাদী। এর জন্য মাওলানা ইসলামাবাদীকে বলা হয় বাংলায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকার প্রথম মুসলমান সম্পাদক।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">সংবাদপত্রের এ জগত ও মুসলিম সাংবাদিকতায় মাওলানা ইসলামাবাদীর অবদানও তাই অপরিসীম। তাই এতিহাসিকগণ বলেন, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, সমাজসংস্কার, ধর্মপ্রচার, রাজনীতি, আইনসভা—যখন যেদিকে তিনি তাঁর প্রতিভা কর্ষণ করেছেন, মুঠো মুঠো ফসলে তাঁর গোলা ভরে উঠেছে। এমনই বিচিত্র পথে বিপুল সৃজনপ্রসূ হয়েছিল তাঁর যুগন্ধর প্রতিভা।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">মাওলানা ইসলামাবাদী অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম শিক্ষা কনফারেন্স, বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি, প্রাদেশিক মোছলেম শিক্ষা সমিতিসহ বহু কর্ম উদ্যোগের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাই নানাভাবে তিনি মুক্তি সংগ্রাম করেছেন এবং জাতিকে জাগিয়ে তুলার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p dir="auto">কিন্তু মুসলমানদের সামগ্রিক অবস্থা দেখে তিনি অনুধাবন করেন, বিভিন্ন মতাবলম্বী আলেম সমাজকে একত্রিত না করলে এ প্রয়াস সফল হবেনা। অতঃপর তিনি ফুরফুরার পীর সাহেব মাওলানা আবু বকর ছিদ্দিকী, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মাওলানা রুহুল আমিন, দৈনিক আজাদের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ও আহলে হাদিসের মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকীর সমন্বয়ে গড়ে তোলেন ‘আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলা’।</p>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<p dir="auto">১৯৩৯ সালে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে নিখিল বঙ্গ মৌলভী অ্যাসোসিয়েশনের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে স্পষ্টভাবে আলিমদের নেতৃত্বের দাবি সম্পর্কে বলেন,</p>
<blockquote>
<div dir="auto">&#8216;‘আলেমশ্রেণী ব্যতীত অন্যশ্রেণীর লোকের নেতৃত্বাধীন ইসলামের তথা মুসলিম জাতির উন্নতির পথ প্রশস্ত হওয়ার উপায় আছে বলে বিশ্বাস করিনা। যে নেতা স্বয়ং শরিয়তের বিধি-বিধানের অধীন থাকবেন না, কুরআন-হাদিস মতে বলবেন না, তার পক্ষে মুসলমানের নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার থাকতে পারে না। যদি আমরা মুসলমানদের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে না পারি বা আলেমদের মধ্যে কোমরে বা বুকে হাত বাঁধা, ‘আমিন’ ছোট করে না উচ্চৈঃস্বরে পড়বে; এই সমস্ত মাসয়ালা নিয়ে তর্ক করতে থাকি, তা হলে ইসলামের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং আত্মবিস্মৃত মুসলিম জাতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।”</div>
</blockquote>
<p dir="auto">মাওলানা ইসলামাবাদীর গভীর আস্থা ছিলো আলেম সমাজের উপর। এটি তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম সমাজের প্রতিদিনকার জীবনাচরণ অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু, বিবাহ ও প্রতিদিনকার অবশ্যপালনীয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যার পরিচালক স্বভাবতই আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতা হিসেবে জনসাধারণের উপর যাদের প্রভাব অপরিসীম। এ আলেম সমাজকে যদি সংঘবদ্ধ করে দেশ সমাজের আশু সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করে তোলা যায়, তাহলে এদের দিয়ে অসাধ্য সাধন করা যাবে। মুসলমান সমাজ যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন আর যেসব অন্তহীন বাধা-বিপত্তি সমাজকে পঙ্গু আর নির্জীব করে রেখেছে ইচ্ছা করলে এরাই তার বন্ধন থেকে সমাজকে মুক্তি দিতে পারে।</p>
<p dir="auto"><strong>আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙালাহ’ এই পরিকল্পনারই বাস্তব রূপ। সংগঠনটির মুখপত্র আল এসলাম-মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সম্পাদিত প্রথম স্বাধীন পত্রিকা, যা ১৯১৫ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।</strong></p>
</div>
<p dir="auto"><strong>আলেমদের নিয়ে এসব উদ্যোগ গ্রহণের পর ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করেন।</strong></p>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">কেননা মুসলমানদের হাত থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষমতা জায়নবাদী বৃটিশদের হাতে চলে যাওয়ার পর মুসলমানেরা জায়নবাদী বৃটিশদের চরম দমন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে মুসলমানদের অভ্যুত্থান স্থবির হয়ে পড়ে। সে সময় মুসলিম সমাজ এক দূর্বিসহ অবস্থায় নিপতিত হয়। জাতির সেই দূর্দিনে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এগিয়ে আসেন। এজন্য তাঁকে মুসলিম জাতিসত্তার অন্যতম নেতা আখ্যায়িত করা হয়।</p>
<p dir="auto">নেতা হিসেবেই নয়, শিক্ষা সংগঠন সহ নানাভাবেই তিনি মুসলিম জাতিকে সচেতন করতে থাকেন। এই জাগরনের প্রেরনায় উদ্বুদ্ধ মাওলানার কর্মজীবন ছিলো ঘটনাবহুল ও বৈচিত্রময়। তাই তিনি একাধারে রাজনীতিক, ইসলাম প্রচারক, লেখক, সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন।</p>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">শামসুজ্জমান খান তাঁর রচিত মাওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী গ্রন্থে- তাঁর শিক্ষা, সংগঠন, সাংবাদিকতা ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। নানা সংগঠনের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ও বিক্ষিপ্ত শক্তিকে সঞ্চিত করে মাওলানা তাঁকে সামাজিক অগ্রগতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন শিক্ষা বিস্তারে, প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ আয়োজন করেছিলেন একটি জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, মোছলেম শিক্ষা সম্মেলন, আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালী প্রভৃতি। তাঁর আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ছিল ধর্ম শিক্ষার ছাত্রদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও যুক্তিবাদের প্রসারের সাথে সাথে তাদের পরিশ্রমী, সংযমী ও স্বাধীনতাকামী করে গড়ে তোলা এবং এভাবে সমাজ ও দেশের বৃহত্তর কর্তব্যের দ্বারে, তাদের পৌছে দেয়া। অন্যদিকে তিনি তাঁর ক্ষুদ্র কিন্তু অসামান্য পুস্তিকা “নিম্নশিক্ষা ও শিক্ষাকর” (১৯৪০) এ বলেছেন-</p>
<blockquote>
<div dir="auto">“পৃথিবীর যত সভ্য দেশ আছে প্রায় সর্বত্রই প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপের জার্মানী ইত্যাদি স্থানে নিম্নশিক্ষা বাধ্যতামূলক; সেখানে শতকরা ১০০জন লোক লিখিতে পড়িতে জানে। ইউরোপের অন্যান্য ক্ষুদ্র, বৃহৎ রাজ্যের শতকরা ৫ জনের অধিক নিরক্ষর লোক নাই। রুশ সাম্রাজ্যেও বর্তমানে শতকরা ৯০ জন পর্যন্ত লোক নূন্যাধিক লেখা পড়া শিখিয়াছে। হতভাগ্য ভারতের অবস্থা স্বতন্ত্র। পরলোকগত দেশপ্রেমিক মি. মেখলে নিম্নশিক্ষা বাধ্যতামূলক করিবার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভায় ও মোম্বাই প্রদেশে আজীবন চেষ্টা করিয়াও সফলতা লাভ করিয়া যাইতে পারেন নাই। বাংলায় একদল জাতীয়তাবাদী ও কৃষকপ্রজা বৎসল লোক বহুদিন হইতে নিম্ন শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিবার জন্য আন্দোলন চালাইয়া আসিতেছেন।”</div>
</blockquote>
<p dir="auto">মাওলানার এই আন্দোলন ছিল মৌলিক ও নিম্নতর স্তর থেকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণের ভিত্তিস্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে সংগঠন, শিক্ষা ও সংবাদপত্র একটি সমাজকে গড়ে তোলে। তাঁর জীবন এই লক্ষ্যে স্থিত হয়েই সফলতা পেয়েছিল। মনিরুজ্জামানের কর্ম জীবনের সূচনা কবেই এ ধরণের চিন্তাধারা তাঁর মধ্যে গড়ে উঠতে থাকে। তিনি লিখেছেন,</p>
<blockquote>
<div dir="auto">“১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় নিখিল ভারতীয় মোছলেম শিক্ষা সমিতিতে যোগদানের সুযোগ পাইয়াছিলাম। তখন হইতে আমার অন্তর বাঙলাদেশের শিক্ষা বিস্তার ও ইসলাম প্রচারের উপায় সম্বন্ধে নানা বিষয়ও চিন্তাধারা উদ্ধেলিত হইতেছিল। আমার মনে হয়, ১৮৯৮ অব্দে কুমেদপুর হইতে কলিকাতার ইসলাম প্রচারক মাসিক পত্রিকার ইসলাম মিশন সম্বন্ধে একটি বিস্তৃত প্রবন্ধ লিখি। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে আঞ্জুমানে উলেমার তত্ত্বাবধানে যখন ‘আল এছলাম’ মাসিক পত্র প্রকাশিত হয় সেই পত্রের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে আমার ইসলাম প্রচারকে প্রকাশিত প্রবন্ধাবলী পুনমুদ্রিত হইয়া ছিল।”</div>
</blockquote>
<div dir="auto">আবার বসিরহাটে সাহিত্য সম্মেলনে ইসলামাবাদী বলেন,</div>
<blockquote>
<div dir="auto">‘‘প্রত্যেক জেলায় বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির শাখা গঠন, তাতে পুস্তকালয় ও পাঠাগার স্থাপন আবশ্যক। জেলার ইতিহাস, প্রাচীন কীর্তির তত্ত্ব, ওলি ও সাহিত্যিক বর্গের জীবনী সংগ্রহ ফলপ্রদ হইবে। তাঁর দর্শন, মাতৃভাষা চর্চায় অনাগ্রহ মুসলিম সমাজের অনগ্রসরতার মূল কারণ। আপনারা জানেন, মাদ্রাসার কোন উচ্চ লক্ষ্য নাই, তাই সকল মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। মাতৃভাষা বাংলার চর্চা করা আবশ্যক। অন্ততঃ একদল ছাত্রকে রাজভাষা ইংরেজি শিক্ষা দিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে।’’</div>
</blockquote>
<p dir="auto">প্রায় শতবর্ষ পূর্বে এভাবেই তিনি সাহিত্য, মাদ্রাসা শিক্ষা ও জাতীয় জাগরণে দূরদর্শীতাঁর স্বাক্ষর রেখে গেছেন।</p>
<p>জায়নবাদী বৃটিশদের থেকে মুক্তি লাভের জন্য নারী সমাজ যাতে সম্মান ও মর্যাদার সাথে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে, মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে পারে সেজন্য নারী শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক গুরত্বারোপ করেছেন মাওলানা ইসলামাবাদী। উৎপদানশীল কর্মকান্ডে নতুন প্রজন্মকে নিয়োজিত করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের শিক্ষার সম্প্রসারণে তিনি কদম মোবারক এম. ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলার মুসলমান মেয়েদের শিক্ষা ও কল্যাণের পথে আহ্বান জানিয়ে ‘আল এসলাম পত্রিকায় লিখেছিলেন,</p>
<blockquote>
<div dir="auto">‘যখন পুত্র কন্যার মা হইবে, তখন সর্বদা তাহাদিগকে শুধু অলংকার পরাইবার চেষ্টায় লাগিয়ে থাকিও না। যে অলংকার স্থায়ী নহে, তাহাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করিও, সভ্যতা শিক্ষা দিও।’</div>
</blockquote>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">কর্মবীর ও দেশপ্রেমিক এই নেতা মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে, সমাজকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন একেবারে নীচের ধাপ থেকে, যেখানে রয়েছে দেশের ও অর্থনীতির মূল শেকড়। তাই ইসলামাবাদীর একদিকে যেমন কাম্য ছিলো কৃষক শ্রমিকের উন্নতি, তেমনি যেসব অত্যাবশ্যকীয় পেশার প্রতি মুসলিম সমাজের অনীহা ছিলো, তিনি চেয়েছিলেন তার প্রতিও মুসলিম সমাজকে আগ্রহী করে তুলতে। তিনি প্রায় বলতেন, &#8220;মুসলমানরা বড় দায়িত্বের পাশাপাশি যদি কর্মকার, শিল্পী, গোয়ালা, নানা হালাল ব্যবসায় অবলম্বন করে তাহাও দেশেরই সেবা। ইহাতে হিন্দুদের অসন্তোষের কোন কারণ নাই।&#8221; এভাবে তিনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বহু প্রস্তাবণা দিয়েছেন।</p>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">যেহেতু ইসলামাবাদীর মূল লক্ষ্য ছিলো- ব্রিটিশ শাসনে পশ্চাদপদ মুসলমানদের জাতীয় চেতনা সঞ্চার ও নবজাগরণ, এবং সমাজ ও দেশ সেবার মাধ্যমে স্বাধীনতার বাণী প্রচার ও মুক্তি সংগ্রামে সকলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। তাই দরিদ্র ও অবহেলিতদের সদা অভিভাবক বা মুখপাত্রও হয়ে উঠেন ইসলামাবাদী।</p>
<p dir="auto">এভাবেই তিনি রাজনীতির অঙ্গনে অতিরিক্ত দলীয়করণ ও বিদ্বেষমূলক রাজনীতির বিরোধী প্রতীকে পরিণত হন। মানবতাবাদী, জাতীয় ঐক্য, সামপ্রদায়িক সম্প্রতি ও আর্থ সামাজিক উন্নয়ন সহ স্বাধীনতা সংগ্রামের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠেন। তিনি ‘‘আল-এসলাম’’ পত্রিকার ১৩২৫-২৬ সংখ্যায় সুস্পষ্ট বর্ণনা করেছেন, ‘‘মাতৃভাষার সাহায্যে দেশের বিভিন্ন সমপ্রদায়ের মধ্যে একতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃভাব বর্ধনের চেষ্টা করাই দেশবাসীর নেতা ও সাহিত্য সেবক গণের প্রধান কর্তব্য’’।</p>
<p dir="auto">স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের গুরুত্বের পাশাপাশি নিজেদের প্রস্তুতির দিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি ১৯৩০ সালের যুব সম্মেলনে বলেন,</p>
<blockquote>
<div dir="auto">‘‘মন ও শরীর নিয়ে এই দুই বস্তু লইয়াই মানুষ, শরীরকে সবল ও স্বাস্থ্যবান রাখার জন্য শরীর চর্চা ও ব্যায়াম কৌশলই প্রধান অবলম্বন, যুবকগণের প্রধান কর্তব্য শারীরিক উন্নতির জন্য স্থানে স্থানে আখরা স্থাপন, তাহাতে কুস্তি কছরতের সুব্যবস্থা, লাঠি খেলা, তরবারি ভাজা, ছোরা চালনা ইত্যাদির ব্যবস্থা লাগবে। ধন রক্ষা, ধর্ম রক্ষা, দেশ রক্ষা সমস্তই শারীরিক স্বাস্থ্য ও শক্তির প্রতি নির্ভর করে। আত্মরক্ষা, এছলাম রক্ষা, মোছলেম জাতির স্বার্থ সংরক্ষণকল্পে ব্যায়াম চর্চার জন্য এছলাম ধর্মে কঠোর বিধান আছে। তাই তোমরা মুক্তি সংগ্রামের জন্য নানাভাবেই প্রস্তুত হও।“</div>
</blockquote>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">এরপরই মাওলানা ইসলামাবাদী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন।</p>
<p dir="auto">আমরা জানি যে, ১৯২০ সাল পরবর্তী সময় ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, এসময়েই অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের ডামাডোল উচ্চভাবে বেজে ওঠে। কাজেম আলী মাস্টার, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন সে আন্দোলনে জে এম সেনগুপ্তের উপদেষ্টা। মহিমচন্দ্র দাশ ও ত্রিপুরা চরণ চৌধুরী ছিলেন প্রধান সহযোগী। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ নভেম্বর মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্ররা ধর্মঘট করে। জে এম সেন হলে ধর্মঘটি ছাত্র ও জনসাধারণের বিরাট জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।</p>
<p dir="auto">তিনি ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর বঙ্গীয় শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম কনফারেন্সের আয়োজন করেন।</p>
<p dir="auto">মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী নিখিল বঙ্গ জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সভাপতিও ছিলেন।</p>
<p dir="auto">১৯০৬ সালে ‘মুসলিম সাহিত্য সমিতি’ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মাওলানা প্রথম দিকে কংগ্রেসের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও ১৯২১ সালে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। ইসলামাবাদী ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের অন্যতম স্থপতি। ১৯২৯ সালে মাদরাসা ছাত্রদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত আসাম-বেঙ্গল জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালে কৃষক-প্রজা পার্টির মনোনয়নে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন।</p>
<p dir="auto">খেলাফতের পতনের কারণেই মুসলিম সমাজ আজ হতাশাগ্রস্ত ও নেতৃত্বহারা এবং খেলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ শান্তি, সমৃদ্ধি ও হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে। এমন একটি দর্শন তিনি আজীবন লালন করে গেছেন।</p>
<p dir="auto">১৯২০ সালে কলকাতায় আহূত ভারতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন যোগদান করেন ইসলামাবাদী। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ করেন। এরপর ইসলামাবাদী সংসদীয় রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন। প্রথমে তিনি জেলা বোর্ডের সদস্য, ১৯৩৭-এর নির্বাচনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ (মধ্য) নির্বাচনী এলাকা থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অসারতা প্রতিপন্ন করে আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ রচনা (১৯৪২-১৯৪৩) করেন। ত্রিশের দশকে তিনি বঙ্গীয় কৃষক-প্রজা দলে যোগদান করেন ও কৃষক প্রজা পার্টির সহসভাপতির পদ অলংকৃত করেন।</p>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে যোগদান ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের সমর্থনে এগিয়ে এসে। <strong>১৯৪২-৪৩ সালে নেতাজির সঙ্গে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে তিনি ইস্টার্ন জোনের (বর্তমান বাংলাদেশ ও আসাম) প্রধান সংগঠক ও সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। নেতাজির চট্টগ্রাম সফরকালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দেয়াং পাহাড়ে মাওলানা ইসলামাবাদীর সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় ইসলামাবাদী সেখানে ইসলাম মিশন এতিমখানা শাখা, পশুপালন খামার, মত্স্য খামার, কৃষি খামার এবং জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।</strong> তার আগে মাওলানা ইসলামাবাদী তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি হস্তান্তর করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী এবং ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের গোপন দুর্গ হিসেবে বিপুল জায়গা-জমি নিয়ে এক খামারবাড়ি স্থাপন করেন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার দায়ে ১৯৪৪-এর ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হন। এক বছর (১৯৪৪-৪৫) লাহোর সেন্ট্রাল জেলে আটক ছিলেন।</p>
<p dir="auto">দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগদান, আজাদ হিন্দ ফৌজের সাথে সম্পর্ক, ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপন, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে বার্মায় গিয়ে সাক্ষাৎ ও ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী তৎপরতার দায়ে ১৯৪৪ সালের ১৩ অক্টোবর ৭০ বছর বয়সী মওলানা গ্রেফতার হন চট্টগ্রাম থেকে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু ও অন্যান্য নেতাদের সাথে দিল্লীর লালকিল্লায় বন্দি করে রাখেন। পরে তাকে স্থানান্তর করা হয় পাঞ্জাবের ময়াওয়ালী জেলে। সেখানকার জেলের ছাদের বিমের সাথে রশি বেঁধে তাঁর উপর অশেষ নির্যাতন চালানো হয়েছিলো গোপন তথ্য জানার জন্য। প্রায় ১১ মাস কারানির্যাতন ভোগ করে মুক্তির পর মওলানা মনিরুজ্জামান কলকাতায় পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হন।</p>
<p dir="auto">কারা নির্যাতনের কারণে তার শরীর ভেঙে পড়ে। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন,</p>
<blockquote>
<div dir="auto">‘বৃদ্ধ বয়সে আমার ওপর যেভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন ব্রিটিশ সরকার করেছে, পৃথিবীর কোনো সভ্য জাতির ইতিহাসে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে না, কিন্তু তারা আমার দেশকে লুটে খাওয়ার জন্য আমাদের দেশে মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার করে চলেছেন, এই অত্যাচারের একদিন শেষ হবে, আমরা স্বাধীন হবো এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই স্বাধীনতা ভোগ করবে- এটি আমার বিশ্বাস।’</div>
</blockquote>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর জীবনের বহু স্বপ্নসাধ অসম্পূর্ণ রেখে এই অসামান্য কর্মবীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।</p>
<p dir="auto">স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের পাশাপাশি প্রাজ্ঞ পন্ডিতদের কাছ থেকে সামাজিক, মানবিক দীক্ষার ফসলও ঘরে তুলে ছিলেন ইসলামাবাদী। তাই তাঁর সারাজীবনের সংগ্রামে, শিক্ষকতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, সমাজ উন্নয়ন, সংবাদপত্র সেবাই প্রাধান্য পেয়েছিল। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন প্রকৃত শিক্ষা ব্যতীত অন্ধকারে ডুবে থাকা সমাজের মানুষকে আলোর পথযাত্রী করার কোনো উপায় নেই। ব্যক্তিগত আর্থিক দৈন্য গোছানো এবং শিক্ষকতা পেশায় দক্ষতা অর্জন ও বিষয় বস্তুর নানান দিক যৌক্তিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য রংপুর, কোলকাতা, সীতাকুন্ডসহ নানান প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে মুসলিম সাংবাদিকতার পথিকৃত হিসেবে তিনি তার চিন্তাধারা, অগাধ মনীষা ও বিপ্লবী চেতনা চারদিকে ছড়িয়ে দেন। অনলপ্রবাহের কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো আত্মসচেতন মনীষীর সাহচর্য ইসলামাবাদীকে সংগ্রামের পথে বজ্রকঠিন শপথে বলীয়ান করে তোলে। গ্রামে গ্রামে তিনি জনসেবা, আলোচনা ও পথসভা করে অধঃপতিত মুসলিম জাতিকে নবীন আলোর বন্দনা করতে শেখান।</p>
<div dir="auto"></div>
<p dir="auto">সাহিত্য ও সাংবাদিকতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজ জাতি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে যাওয়া মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তাই আমাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম আলোকমশাল। নিজ জাতিসত্তা ও উম্মাহর প্রয়োজনে কিভাবে সাহিত্যের আসর ছেড়ে রাজনীতিতে নামতে হয়, কিংবা রাজনীতির লোভনীয় পদের অফার ফিরিয়ে দিয়ে পত্রিকার দায়িত্ব কাধে তুলে নিতে হয়, কিংবা সবকিছু ছেড়ে মসজিদ-মক্তব প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করতে হয়, আবার জাতির প্রয়োজনে সবগুলো কাজ নতুন উদ্যমে শুরু করতে হয় তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। মুক্তির প্রয়োজনে যেকোন কিছু করার অটল ও অবিচল মানসিকতা, জাতির জন্য আমৃত্যু কাজ করে যাওয়ার আত্মত্যাগী চেতনা ও বহুমুখী ক্ষেত্রে একত্রে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সাহসিকতার প্রোজ্জ্বল বাতিঘর ‘মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী’। মৃত্যুর পূর্বে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সমাধিলিপি লিখে গেছেন-</p>
<blockquote>
<div dir="auto">“পথিক : ক্ষণেকের তরে বস মোর শিরে</div>
<div dir="auto">ফাতেহা পড়িয়া যাও নিজ নিজ ঘরে</div>
<div dir="auto">যে জন আসিবে মোর সমাধি পাশে।</div>
<div dir="auto">ফাতেহা পড়িয়া যাবে মম মুক্তির আশে।</div>
<div dir="auto">অধম মনিরুজ্জামান নাম আমার।</div>
<div dir="auto">এছলামাবাদী বলে সর্বত্র প্রচার।”</div>
</blockquote>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<p dir="auto">
</blockquote>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/mawlana-moniruzzaman-islamabadi/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">12798</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্বসভ্যতায় বাংলার মুসলমানদের অবদান প্রশ্নে এ প্রজন্মের চিন্তাধারা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/contribution-of-the-bengali-muslims-to-world-civilization/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/contribution-of-the-bengali-muslims-to-world-civilization/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 10 May 2023 13:43:36 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7754</guid>

					<description><![CDATA[একটি জাতির সম্মান ও মর্যাদা হলো সে জাতি বিশ্বসভ্যতায় কী অবদান রেখেছে তা। আরবী ভাষায় একটি প্রবাদ আছে, شرف المكان بالمكين অর্থাৎ “কোনো স্থানের সম্মান সে স্থানে বসবাসকারীদের উপর ভিত্তি করে নির্ণীত হয়।” এ প্রশ্নের আলোকে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">একটি জাতির সম্মান ও মর্যাদা হলো সে জাতি বিশ্বসভ্যতায় কী অবদান রেখেছে তা। আরবী ভাষায় একটি প্রবাদ আছে,</div>
<blockquote>
<div dir="auto"><strong>شرف المكان بالمكين</strong></div>
<div dir="auto"><strong>অর্থাৎ “কোনো স্থানের সম্মান সে স্থানে বসবাসকারীদের উপর ভিত্তি করে নির্ণীত হয়।”</strong></div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এ প্রশ্নের আলোকে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাংলার মুসলমানদের অবদান নিয়ে অনেকেই অযৌক্তিক সমালোচনা, নানাবিধ প্রশ্ন উত্থাপন করে যাচ্ছেন!</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">প্রশ্ন ওঠে, বিশ্বসভ্যতায় বাংলার মুসলমানদের ঠিক কী অবদান আছে? বাংলার আদৌ কোনো সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে কিনা?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বাংলায় মুসলিম শাসন বহিরাগত মুসলমানদের দ্বারা হওয়ার কারণে তা বাংলার নিজস্ব সালতানাত হতে পারেনি, বহিরাগত মুসলমান কিংবা আশরাফ-আতরাফ তত্ত্ব, বাঙ্গালী মুসলমান ইত্যকার কড়চা বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের ইতিহাস আলোচনায় নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো মৌলিক ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে আমরা কেন এ সকল আলাপেই নিমগ্ন হই? এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>প্রথমত,</strong> পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা চায় মুসলমানদেরকে ও অন্যান্য জাতিকে ইতিহাসবিহীন জাতিতে পরিণত করতে। আর এক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছে আফ্রিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের ক্ষেত্রে।</div>
<div dir="auto">একইসাথে বৃটিশ একাডেমিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থা আজ গোটা উপমহাদেশে বিদ্যমান। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস তৈরি, ইতিহাস ও সভ্যতার বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে স্বাধীন জ্ঞান চর্চা নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই! তাই আমরা বাঙালীরা নিজস্ব সমৃদ্ধ ইতিহাস বাদ দিয়ে বৃটিশ একাডেমিয়া, ওরিয়েন্টালিস্টদের তৈরি করা ইতিহাসের বয়ানকে সামনে রেখে সবকিছু পাঠ করি এবং বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই তা গ্রহণ করি।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>দ্বিতীয়ত,</strong> আমরা যতটুকু গ্রহণ করি, ততটুকুই আবার ভারতীয় সংস্কৃতি আর সভ্যতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করি (যেটা মূলত উপমহাদেশের ইসলামী সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পুরোপরি সরিয়ে ফেলার জন্য ব্রিটিশ-ব্রাক্ষ্মণ্যবাদীদের যৌথ প্রজেক্ট)। অথচ আমরা ভুলে যাই, আজকের গৌরবোজ্জ্বল ভারতীয় সভ্যতার অধিকাংশ ভিত্তিমূল মুসলিম শাসনকালের সৃষ্টি।</div>
<div dir="auto">পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সালতানাতের পূর্বে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সভ্যতা ছিলো। সে সভ্যতা গণিতের ধারণা দিয়েছে, দর্শনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, আরো অনেক ক্ষেত্রে তাদের পদচারণা ছিলো। এক কথায় তারা ছিলো সমৃদ্ধ। কিন্তু পরবর্তীতে সে সমৃদ্ধির জায়গা থেকে প্রতিটি বিষয়কে আরো বেশি উন্নত করেছে মুসলিম সালতানাত। অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, কৃষি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, শিক্ষাব্যবস্থা– সব ক্ষেত্রেই অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছিলো উপমহাদেশের মুসলিম সালতানাতগুলো।</div>
<div dir="auto">কিন্তু এসবকে আমরা অবদান হিসেবে দেখি না কিংবা তুলে ধরতে পারিনা কেন? কেনই-বা বারবার হীনম্মন্য বয়ান তথা বাঙ্গালীর ইতিহাস নেই, অবদান নেই ইত্যাদি বয়ান তুলে ধরি!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আমরা এ ভুল কেন করছি? আমাদের পূর্ববর্তী ইতিহাস তো আমাদের এটি শেখায় না!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আব্বাসী খেলাফতের সময় যখন সারা দুনিয়ার বিভিন্ন সভ্যতার মৌলিক গ্রন্থ, জ্ঞানসমূহ অনুবাদ করা হচ্ছিলো, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দুনিয়ার জ্ঞানকে একত্রিত করা হচ্ছিলো, তখনও কিন্তু মুসলমানরা সবকিছু একদম ঢালাওভাবে অনুবাদ করে ফেলেনি কিংবা সবকিছুকে গ্রহণও করেনি। তাহলে এখন আমরা কেন চোখ বুঁজে বৃটিশ একাডেমিয়ার বয়ান মেনে নিচ্ছি?</div>
<div dir="auto">আমরা আমাদের ইতিহাস, অন্যান্য ইতিহাস, ওরিয়েন্টালিস্টদের ইতিহাস, ইউরোপীয় বয়ান, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বয়ানকে কেন আমরা সেভাবে পর্যালোচনা করতে পারছি না? কতটুকু গ্রহণ বা কতটুকু বাদ দেওয়া দরকার, সেটা আমরা কেন বুঝতে পারছি না?</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>তৃতীয়ত,</strong> বিশ্বসভ্যতায় অবদান কীভাবে রাখতে হয়? সভ্যতার মৌলিক ভিত্তিসমূহ কী কী, যা দ্বারা বিশ্বসভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো জাতির অবদান পর্যালোচনা করা যায়? এগুলো হলো–</div>
<blockquote>
<div dir="auto">১. জ্ঞান।</div>
<div dir="auto">২. অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উৎপাদন।</div>
<div dir="auto">৩. রাজনীতি ও প্রশাসন।</div>
</blockquote>
<div dir="auto">এছাড়াও ভাষা, নগর ও স্থাপত্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাই এসব বিষয়ও আলাদা পর্যালোচনার দাবি রাখে৷</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এসব ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের অবস্থান পর্যালোচনা করা যাক।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"><strong>১. জ্ঞানের ক্ষেত্র:</strong></div>
<div dir="auto">ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, রাসূল (স.) দারুল আরকাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাহাবীদেরকে শিক্ষা দেওয়া এবং জ্ঞান যে একটি জাতি বা সমাজের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে তা উম্মতের সামনে তুলে ধরেন।</div>
<div dir="auto">পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিশু ও বন্দীদেরকে লিখাপড়া শেখানোর মাধ্যমে মুক্তিপণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেন তিনি, যার নজির দ্বিতীয়টি নেই। এরপর আসহাবে সুফফা প্রতিষ্ঠাসহ নানাবিধ সামষ্টিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আমরা জানি যে, কোরআনে ‘ইকরা’ বলতে সামগ্রিকতাকে বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ তুমি মানুষকে পড়ো, সমাজকে পড়ো, মানুষের রূহকে পড়ো, সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্বকে পড়ো– এ কথা বলা হয়েছে। এজন্যই এত দ্রুত মানব সভ্যতায় মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার সম্ভব হয়েছিলো। অথচ বর্তমান সময়ে আমরা পড়ালেখাকে কিছু নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ করায় আমাদের সভ্যতাকে পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে তুলে ধরতে পারছি না!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">জ্ঞানের গুরুত্বের বিষয়টা আমরা আমাদের সভ্যতায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখতে পাই। যেমন– উসমানী খেলাফত। উসমানী খেলাফত শুরু হয় উসমান গাজীর মাধ্যমে, যিনি ছোট একটি গোত্র প্রতিষ্ঠা করার পর সর্বপ্রথম উরহানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তৎকালীন সময়ের সেরা আলেম আল্লামা দাউদ আল কায়সারীকে সে মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন শিক্ষক। Morning Shows the day, সকালের সূর্য বলে দেয় দিন কীভাবে যাবে! উরহানিয়া মাদ্রাসাও তার ভবিষ্যৎ দেখিয়ে দিয়েছিলো।</div>
<div dir="auto">ইসলামী সভ্যতার অধিকাংশ খলিফা-ই শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। বিভিন্ন ধারার উত্থান, জ্ঞানের আন্দোলন ও গুরুত্বপূর্ণ মাদ্রাসাসমূহ তাদের পৃষ্ঠপোষকতায়-ই প্রতিষ্ঠা হতো।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এবার ভারতীয় উপমহাদেশের প্রসঙ্গে আসি। ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবরসহ অধিকাংশ সুলতানের অবদান আমাদের জন্য অবিস্মরণীয়। পাশাপাশি এ অঞ্চলে সূফী দরবেশদের মাদ্রাসাসমূহ জ্ঞানের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই মুজাদ্দিদে আলফে সানী, ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, মহাকবি আলাওল ও সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহরা উঠে এসেছেন। এখান থেকেই উঠে এসেছেন কুতুব মিনার, আতিয়া মসজিদ, আন্দরকিল্লার স্থাপত্যবিদরা। ধ্বংস্তুপে পরিণত হওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর দারসবাড়ি, মাদ্রাসাসমূহ যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এসব ছিলো মুসলিম সালতানাতের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিচিহ্ন, শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এতকিছুর পরেও বলা হয়ে থাকে, উপমহাদেশে কোনো শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো না!</div>
<div dir="auto">এক্ষেত্রে ছোট্ট একটি প্রশ্ন হলো শিক্ষাব্যবস্থা যদি না-ই থাকতো, তাহলে কীভাবে ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর মতো শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ উঠে এসেছেন? কীভাবে বাদশাহ আলমগীর উঠে এসেছেন? বাংলার বুজুর্গ উমেদ খাঁ এর মতো সেনাপতি, ইবনে হোসেনের মতো নৌ-সেনাপতি, দেওয়ান মুনাওয়ার খানের মতো বীর যোদ্ধা, বারো আউলিয়া সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ও বদর পীরসহ এ ধরনের ব্যক্তিত্বরা কীভাবে উঠে এসেছেন?</div>
<div dir="auto">কীভাবে আল বিরুনী উঠে এসেছেন? তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার অধীনস্থ মাদরাসা থেকে পড়াশোনাকারীরা কীভাবে তাজমহলের ন্যায় অনবদ্য স্থাপত্য তৈরি করেছেন? বাংলার এত এত স্থাপত্য কীভাবে তৈরি হলো? কীভাবে উপমহাদেশের অন্তর্ভূক্ত আফগানিস্তানের থেকে মানবতার ইতিহাসে সেরা আলেম ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী উঠে এসেছেন? আগা বাকের খাঁ, শায়েস্তা খাঁ, সেকান্দার গাজীদের মতো মনীষীগণ-ই বা কীভাবে তৈরি হলেন?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বলা হয়ে থাকে, বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরা নিরক্ষর ছিলো! অথচ সাড়ে সাতশো বছরের ঐতিহ্যবাহী মক্তবগুলো বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানের প্রতিটা গ্রামে গ্রামে, বাড়িতে বাড়িতে মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। যে অঞ্চলের মানুষ কোরআন পড়তে জানে, সে অঞ্চলের মানুষ কীভাবে নিরক্ষর হয়?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তারা বলে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো না, শিক্ষা ক্ষেত্রে কোনো কাজ হয়নি। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানকে তারা অস্বীকার করে নির্দ্বিধায়। আবার তারাই বলছে, এ অঞ্চলে অর্থনীতি ছিলো, কৃষি ছিলো, প্রশাসন ছিলো, রাষ্ট্র ছিলো। এগুলোকে তারা স্বীকার করে। এখন প্রশ্ন হলো এ ক্ষেত্রগুলো কি কোনো ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার সাহায্য ছাড়া এমনিতেই সচল ছিলো? অর্থাৎ তারা ধোঁয়াকে স্বীকার করছে, কিন্তু আগুনকে অস্বীকার করছে! আমরাও তার অনুসরণ করছি! এখানে কি স্পষ্ট বোঝা যায় না যে, এসব ব্রিটিশ একাডেমিয়ার ইতিহাসবিহীন জাতিতে পরিণত করার পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রের অংশ? (তবে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চমানের দ্বিধাহীন প্রশংসাও বৃটিশদের অনেকে করেছেন। যেমন– বৃটিশ জেনারেল স্লিম্যান। তিনি তাঁর লেখায় বাংলা অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থাকে অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করেছেন। বাস্তবতা হলো বাংলা অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর বয়ানের তুলনায় বহুগুণ সমৃদ্ধশালী ছিলো।</div>
<div dir="auto">সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং ইতিহাসের বিকল্প বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শক্তি, অঞ্চল কিংবা রাষ্ট্র তার নিজস্ব সংস্কৃতি অধীনস্থদের উপর চাপিয়ে দেয় এবং অধীনস্থদের সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্র ধরে নিজেদের সংস্কৃতির আদলে বিকল্প চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটায়। ফলশ্রুতিতে অধীনস্থরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বিস্মৃত হয়ে যায়। এর মাধ্যমে অধীনস্থ বা শোষিত জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বাংলা অঞ্চলের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা এ কাজটিই করেছে। এর মাধ্যমে প্রথমেই তারা বাংলায় ইসলামী সভ্যতার স্মারকচিহ্নগুলো ধ্বংস করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলারের হিসাব অনুযায়ী ব্রিটিশরা বাংলা দখল করার পরেও ৭০,০০০ প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিলো। অথচ আজ তার একটিও আমরা খুঁজে পাই না! আজ আমরা সোনারগাঁওয়ের মাদ্রাসাতুশ শরফ, দারসবাড়িগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত নই!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অর্থাৎ জ্ঞান একটি জাতি বা সমাজের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং সকল ফলাফল জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। জ্ঞান যত বেশি, প্রোডাকশন তত বেশি হয়।</div>
<div dir="auto">পাশাপাশি জ্ঞান ছাড়া কোনো সভ্যতাই নিজস্ব ভিত্তি নিয়ে টিকে থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, বাংলায় মুসলিম সভ্যতার সময়কাল ছিলো ৫০০ বছর! যদি জ্ঞান না থাকতো, তবে এ সভ্যতা কীভাবে এত দীর্ঘ সময় টিকে ছিলো?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বর্তমান সময়ের একটি সাধারণ বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রেও আমরা স্থাপত্য এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকার কারণে হুবহু পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করছি। অর্থাৎ যে সকল ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞান নেই, সে সকল ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি! এভাবে সমাজের সকল উৎপাদন ও ভিত্তিমূল জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তাই পাঁচশো বছরের বাংলা অঞ্চলের মুসলিম সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অর্থনীতি, শক্তিশালী প্রশাসন, উন্নত কৃষি ও শিল্প, সেরা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গৌরবোজ্জ্বল নগর ও স্থাপত্য ইত্যাদিই বুঝিয়ে দেয়, আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি কতটা মজবুত ছিলো, বিশ্বসভ্যতায় আমরা কীভাবে অবদান রেখেছিলাম!</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>২. অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উৎপাদন:</strong></div>
<div dir="auto">ভারতীয় উপমহাদেশে ছিলো অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। সমগ্র বিশ্বের প্রায় ২৫-৩০% GDP নিয়ন্ত্রণ করতো এ উপমহাদেশ। আমাদের কৃষি থেকে শুরু করে মসলা, কাপড় বিশ্ব-বিখ্যাত ছিলো। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমাদের বাংলা ছিলো কৃষি ও বাণিজ্যের অন্যতম মূল রাজধানী। এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, আমরা উপমহাদেশের মুসলমানগণ ও বাংলা সালতানাত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। সুতরাং এ অবদানকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করা এক প্রকার বাতুলতা!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">পাশাপাশি ইসলামী সভ্যতা একইসাথে দেখিয়েছে যে, শুধু অর্থনৈতিক উৎপাদন একটি সভ্যতাকে খুব বেশি সামনে এগিয়ে নিতে পারে না, একইসাথে সাংস্কৃতিক উৎপাদনও করতে হয়। সাংস্কৃতিক উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্ঞানের চর্চা। শহর ও গ্রামকে বসবাসের উপযোগী করে আমি যে মূল্যবোধকে ধারণ করি তার আলোকে গড়ে তোলা। অধিকাংশ শহরে সে মূল্যবোধ লালিত হবে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সে মূল্যবোধ ধারণ করে বেড়ে উঠবে। মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতিফলনের জন্য সূরা বনী ইসরাঈলের ২৬ থেকে ৩৮ নাম্বার আয়াত থেকে শিক্ষা নেওয়া হতো। এগুলো বর্তমানে আমাদের সমাজে কতটুকু বাস্তবায়িত? অর্থাৎ সাংস্কৃতিক উৎপাদন সম্পর্কেও আমরা এখন জ্ঞানহীন। যেমন– আমাদের মিউজিক, আর্ট, শিল্পকলা, স্থাপত্য, আমাদের ঘরের সাজসজ্জা কোথা থেকে এসেছে? আমার ঘরে আমার স্থানীয় সংস্কৃতি, ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ কতটুকু প্রতিফলিত হয়? এ বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোতে আমরা নজর দেই না কিংবা ইসলামী সভ্যতার গুরুত্ব-ই উপলব্ধি করি না!</div>
<div dir="auto">পুঁজিবাদী আগ্রাসনের ধাক্কায় কীভাবে টাকা উপার্জন করবো, আমেরিকান ড্রিমস কীভাবে বাস্তবায়ন করবো সেদিকেই আমরা নিজেদের ধ্যান-জ্ঞান দিয়ে রাখি! কিন্তু আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি কতটুকু শক্তিশালী সেদিকে নজরও দিচ্ছি না! সভ্যতা বা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ঘর হলো ভাষা। যেমন– সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, কিন্তু সাংস্কৃতিগতভাবে শূন্য! সেখানকার অধিবাসীরা আরবী, আঞ্চলিক মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি কথা বলে, যার ফলেই তাদের এ অবস্থা।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক উন্নতির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে “ইসলামী ডেক্লারেশন”-এ আলীয়া বলেছেন, “শুধু এককেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি জাতিকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”</div>
<div dir="auto">এ এককেন্দ্রিকতা একটি জাতিকে অধঃপতনের দিকেও নিয়ে যায়। যেমন– বর্তমান সমাজ। যেখানে আমাদের সাহিত্য, আমাদের কবিতা, আমাদের শিল্প কোনো কিছুরই বিকশিত হওয়ার সুযোগ নেই! সবই পুঁজিবাদী আগ্রাসনের হাতে বন্দী!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">যাই হোক, আমরা যদি বাংলার মুসলিম সালতানাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে এ বিষয়টি অসাধারণভাবে ফুটে ওঠে। এ সালতানাত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উৎপাদন সমানভাবে করে একটি উন্নত সভ্যতা বিশ্ববাসীকে উপহার দিলো, অসাধারণ উপমা হিসেবে পেশ করলো, তবুও আমরা বলছি বিশ্বসভ্যতায় আমাদের অবদান নেই!</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>৩. রাজনীতি ও প্রশাসন:</strong></div>
<div dir="auto">জ্ঞান ও উৎপাদনকে সঠিকভাবে বন্টন করবে রাষ্ট্রীয় আকল, কারণ এটির সঠিক বাস্তবায়ন না হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো–</div>
<blockquote>
<div dir="auto">• আদালত।</div>
<div dir="auto">• ইহসান।</div>
<div dir="auto">• সামাজিক নিরাপত্তা।</div>
<div dir="auto">• ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন।</div>
<div dir="auto">• চিন্তা ও ধর্মের স্বাধীনতা (ইসলাম কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না।)।</div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a"></div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ইসলাম যেহেতু মানুষকে মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তোলে, তাই আমাদের সমাজের ভিত্তি হলো আখলাক এবং আদালত।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">যেসব রাষ্ট্র নাগরিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা নিশ্চিত কর‍তে পারেনি, উল্টো তাদের উপর কঠোরতা আরোপ করেছে, সেসব রাষ্ট্র খুব কম সময়ই টিকে থাকতে পেরেছে। যেমন– সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র ৭০ বছর টিকে ছিলো, কারণ এ রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগনের শোয়ার ঘর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে!</div>
</div>
</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">কিন্তু একেকটি ইসলামী রাষ্ট্র ৫০০-৭০০ বছর স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে ছিলো, বাংলা সালতানাতের ইতিহাসও ভিন্ন নয়। সুতরাং বিশ্বসভ্যতায় এ অনন্য উপমা কীভাবে প্রশংসিত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা আমরা সমাজকে মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তুলেছিলাম। সে সমাজে মূল বিষয় ছিলো ইহসান। এখানে আইন, আদালত আর ইহসান হলো আখলাকের বিষয়। এজন্য আমাদের সমাজে ভিত্তি ছিলো আখলাক। এভাবে শ্রেষ্ঠত্বের নিশান উড়িয়েছিলো আমাদের বাংলা সালতানাতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাও।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>নগর, সংগীত ও স্থাপত্য:</strong></div>
<div dir="auto">একটি সভ্যতার মোহর দুই জায়গায় খুব শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–</div>
<blockquote>
<div dir="auto">১. সংগীত, মিউজিক।</div>
<div dir="auto">২. স্থাপত্য।</div>
</blockquote>
<div dir="auto">হিন্দুদের উলু ধ্বনি জাতীয় কিছু বিষয় ছাড়া নিজস্ব কোনো মিউজিক ছিলো না, এবং এখনকার যা রয়েছে, সবই অন্যদের থেকে ধার করা! হিন্দু মিউজিক বলে পরিচিত এ রকম শক্তিশালী ভিত্তিসম্পন্ন কিছু পাওয়া যায় না, বরং ভারতীয় উপমহাদেশে যতগুলো মিউজিকের ধারণা, সব মুসলমানদের তৈরি করা। কাওয়ালি, হামদ ও নাত, মারেফতী, মুর্শিদি, ভান্ডারী, সুফী সংগীত ভারতীয় উপমহাদেশের সুফীদের সংগীতের ভান্ডার। আবার নকশীবন্দী ত্বরিকাসহ সবারই আলাদা সংগীতের ধারা রয়েছে। আমির খসরু বা আখি সিরাজ উপমহাদেশের মিউজিক জগতের অন্যতম স্তম্ভ। কাওয়ালী থেকে শুরু করে বিশাল একটি ধারা উনাদের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। হাল আমলের সুরসম্রাট নুসরাত ফতেহ আলী, সামি ইউসুফও এর দ্বারা প্রভাবিত। এবং বৃটিশ শোষণ পরবর্তী নজরুলের সংগীতের যে প্রাজ্ঞতা, তা পূর্বের সালতানাতের রূহের সাক্ষ্যই বহন করে।</div>
<div dir="auto">ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলা অঞ্চলে বহু ধারার মিউজিক বিদ্যমান ছিলো। সুতরাং এ সভ্যতা শুধুমাত্র মিউজিকের ক্ষেত্রেই যদি এত কিছু করে থাকে, তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রে কী করেছিলো তা সহজেই অনুমেয়!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এখন আমরা যদি আমাদের স্থাপত্য নিয়ে পর্যালোচনা করি, সেক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের অবদান তুলনা করতে চাই। ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দুদের মন্দিরের অবকাঠামো মুসলমানরা আসার পরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে? হিন্দুদের স্থাপত্যকলায় জানালার ধারণা সে অর্থে ছিলো না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জানালা সদৃশ ছিদ্রের প্রচলন ছিলো শুধু। কিন্তু মুসলমানরা যাওয়ার পর, বিশেষ করে কুতুব মিনার তৈরির পর থেকে তারা বড় বড় জানালা বানাতে শুরু করে, এভাবে সব ক্ষেত্রেই মুসলমানদের মতো পরিকল্পিত বিষয় গড়ে তোলার চেষ্টা করে। বাস্তবতা হলো এ ধর্মগুলোর মাধ্যমে কখনোই স্থাপত্যের শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করা, ছাপ ফেলা সম্ভব নয়। যেমন– হিন্দু, জৈন ধর্মে পরিচ্ছন্নতার ধারণা পর্যন্ত গোছালো মূলনীতি আকারে নেই! সুতরাং তারা কিছু মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেও সে অর্থে তাদের দ্বারা স্থাপত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে উপমহাদেশে আমরা মুসলমানরা গর্বের সাথে বলতে পারি, স্থাপত্য, পরিকল্পিত নগর আমরাই সফলভাবে সৃষ্টি করতে পেরেছি এবং আমরাই বিশ্বসভ্যতায় এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছি। সমসাময়িক পৃথিবীতেও স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনায় আমরাই ছিলাম অতুলনীয়।</div>
<div dir="auto">বাংলা অঞ্চলের শত শত প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য, পুরান ঢাকার স্মৃতিচিহ্ন, সোনারগাঁওসহ ১২০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এসব প্রাচীন ক্ষেত্র কিসের সাক্ষ্য দেয়? সাক্ষ্য দেয়, স্থাপত্য এবং মিউজিকে আমরা সেরা ছিলাম। কিন্তু জ্ঞান ও বুদ্ধিভিত্তিক ক্ষেত্রে সমাজ তার হাফেজা তথা মেমোরিকে হারিয়ে ফেলার কারণে আমাদের মনে হচ্ছে, চিন্তাগত ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানরা বিশ্বসভ্যতায় কোনো অবদান রাখতে পারেনি। অর্থাৎ বিশ্বসভ্যতা অবদানের সংজ্ঞাই আমরা বৃটিশ একাডেমিয়ার আদলে পর্যালোচনা করছি, আর তাই হীনম্মন্যতার বয়ান দিচ্ছি!</div>
<div dir="auto">চিন্তা করে দেখি তো, একটি সভ্যতা স্থাপত্য, মিউজিক শিল্পে এত উন্নতি সাধন করেছে, অথচ এর কোনো জ্ঞানগত ভিত্তি ছিলো না– এটি কখনো সম্ভব? আবার ইদানীং বলা হচ্ছে, বাংলার কোনো চিন্তাগত ভিত্তি নেই, থাকলেও তার রেফারেন্স বা দলিল নেই, সুতরাং বিশ্বসভ্যতায় বাংলার কোনো অবদান নেই।</div>
<blockquote>
<div dir="auto"><em>প্রশ্ন হলো সূর্য যে আছে তার দলিল কী?</em></div>
<div dir="auto"><em>জবাব হলো আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কারণ সূর্যের কখনো দলিল প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ সব কিছুর জন্য দলিল প্রয়োজন হয় না, আকলী চোখ দিয়ে লক্ষ্য করলেই তা উপলব্ধি করা যায়।</em></div>
</blockquote>
<div dir="auto">আমাদের সবচেয়ে বড় দলিল হলো এ বাংলার জমিন, যে জমিনে এত বড় বড় স্থাপত্য গড়ে উঠেছে, যে জমিনে এত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে; সে সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি এত উৎকর্ষ সাধন করেছে; সে কয়েকশো বছরের শক্তিশালী প্রশাসন, রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা, যা পৃথিবীকে আন্দোলিত ও লালিত করেছে; যে সমাজের জ্ঞান ও চিন্তা, যার উপর ভিত্তি করে এত সুলতান, আলেম ও ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে। এসবই কি সবচেয়ে বড় দলিল নয়?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মূলত এক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছি জাতির হাফেজা তথা স্মৃতিভান্ডার বা মেমোরি রক্ষার ক্ষেত্রে। ইসলামী সভ্যতার শুধুমাত্র মূলনীতির উপর ভিত্তি করেও আমরা অনেক কিছু তৈরি করতে পারতাম; তুলে ধরতে পারতাম, সাংস্কৃতিক উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে শহরে, কারণ সভ্যতার প্রতিফলন শহরে, সমাজে ও মানুষের চিন্তা-চেতনায় সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু এগুলো আমাদের কোথাও নেই, আমাদের শহরগুলো আজ এক একটি ধ্বংসস্তুপ!</div>
<div dir="auto">তাই নয়া আহ্বান হওয়া উচিত, আমরা যার যার অবস্থান থেকে হলেও কাজ করবো, বাড়ি বানালে সেটা আমাদের সভ্যতার আলোকে সুন্দর করে বানাবো। আমাদের সমাজ, আবহাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত এ ধরনের বাড়ি বানাতে হবে। এক্ষেত্রে মূলনীতি হওয়া উচিৎ, আমি যদি সম্পূর্ণ করতে না পারি, তাহলে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিবো না। আমার যতটুকু সামার্থ্য আছে, ততটুকুর আলোকে করবো। এভাবে যদি আমরা আমাদের বাড়িকে সাজাতে পারি, তাহলে সময়ের ব্যবধানে অবশ্যই একটি পরিবর্তন আসবে, কারণ মানুষ সুন্দরের পূজারী। সুন্দর দেখলে মানুষ এমনিতেই আকর্ষিত হয়। তাই যা আছে, তাকে সুন্দর, সাংস্কৃতিকভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা আবশ্যক।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির পিছনে মুসলমানদের অবদান, তাদের ঐতিহাসিক ভিত্তি স্থাপনের বর্ণনা দু-চার লাইনে ব্যাখ্যা করলে তা অসমাপ্ত রয়ে যাবে এবং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধশালী ইতিহাস ও উপাখ্যানের প্রতিও অবিচার করা হবে। ভাষার সমৃদ্ধির বিবেচনায় চিন্তা করতে গেলে অন্যান্য সব অঞ্চল বাদ দিয়ে যদি আফ্রিকার দিকে তাকাই, সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো আফ্রিকার মতো বিশাল দেশে কোনো নিজস্ব ভাষা নেই বললেই চলে। মরক্কো, আলজেরিয়ায় ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যবাদের কারণে তাদের নিজস্ব ভাষা যেন আজ বিলুপ্ত। অথচ–</div>
<blockquote>
<div dir="auto">• দুইশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের শিকার হয়েও আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সগৌরবে টিকে আছে।</div>
<div dir="auto">• স্বরতন্ত্র, লিপি থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ প্যাটার্ন আমাদের নিজস্ব।</div>
<div dir="auto">• আমাদের মৌখিক এবং লিখিত ভাষায় পার্থক্য নেই।</div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এর দ্বারা বাংলা ভাষার ভিত্তি কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়।</div>
<div dir="auto">আমাদের ভাষা, জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলেও এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয়তার মূল ভিত্তি ও আত্মপরিচয়ের গৌরবময় বাহন বাংলা। এত শোষণের পরেও নজরুল, ফররুখের রচিত ভাষা ও সাহিত্যের দূর্জয় প্রকাশ সাক্ষ্য দেয়, এ ভাষা বিশ্বসভ্যতার বিবেকের ভাষা।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">বিশ্বসভ্যতায় বাংলার মুসলমানদের অবদান নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই, বিশ্বসভ্যতা বলতে কী বুঝেন? বিশ্বসভ্যতা শব্দটা কবে এসেছে এবং কোথা থেকে এসেছে?</div>
<div dir="auto">সভ্যতা যদি চিন্তা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত হয়, সেক্ষেত্রে সভ্যতায় অবদান রাখাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়।</div>
<blockquote>
<div dir="auto">১. অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখা।</div>
<div dir="auto">২. সাংস্কৃতিকভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অবদান রাখা৷</div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">উপরোক্ত আলাপে এটি ফুটে উঠেছে যে, আমাদের অবদান কতটুকু এবং আমাদের অজ্ঞতার জায়গা কোথায়!</div>
<div dir="auto">এরপরেও যদি সন্দেহ জাগে, তবে এ ঘাটতি ইসলামী সভ্যতা বা ইতিহাসের নয়, এ ঘাটতি আমাদের জ্ঞানের। অর্থাৎ সূর্যকে যদি ঢেকে রাখি, তাহলে এর আলো বন্ধ হয়ে যায়নি কিংবা সূর্য পূর্বে ছিলো না– এ কথা বলার সুযোগ নেই!</div>
<div dir="auto"><em>যেমন– প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন প্রমাণ করেছেন যে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হস্তলিখিত লাইব্রেরী হল সুলেইমানিয়া।</em> এখানে উসমানী আমলের ৮০০ জন আলেমের লিখিত বই আছে। তিনি তার ছাত্রদের দিয়ে তালিকা করেছেন, তারা গবেষণায় ৮০০ আলেম পেয়েছেন, এদের মধ্যে ৮০ জন আছেন তাঁদের প্রত্যেকের বই এর সংখ্যা ১০০ উপরে। এর মধ্যে অনেক বই আছে যেগুলো মৌলিক।</div>
<div dir="auto">চিন্তা করুন তো, ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে অনেকাংশেই মুক্ত থাকা সত্ত্বেও যদি তাদের এ অবস্থা হয়, তাহলে ২০০ বছরের শোষিত বাংলা অঞ্চলের অবস্থা কেমন হওয়ার কথা?</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<div dir="auto">আমাদের সব লাইব্রেরির বই ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে ! উসমানী খেলাফতের এত কিছু থাকার পরেও তাদের অবদান অস্বীকার করা হয় এবং বলা হয়, উসমানীরা যুদ্ধ ছাড়া কিছুই করেনি, জ্ঞান-দর্শনে তাদের কোনো অবদান নেই! এ প্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলের ঐতিহাসিকরা বলে, মানুষ অজ্ঞ হলেও চোখে পড়া উচিৎ, সুবিশাল সোলায়মানিয়া লাইব্রেরিসহ মসজিদগুলো নিজেই এক একটি সাক্ষী, যেখানে ১০ হাজার মানুষ একসাথে নামাজ পড়তে পার, অথচ এখানে তখন কোনো মাইক লাগতো না! বর্তমান বিজ্ঞানীরা আজ পর্যন্ত এর রহস্য আবিষ্কার করতে পারেনি, কারণ এর স্থপতি মিমার সীনান ছিলেন একইসাথে একজন পদার্থবিদ, রসায়নবিদ ও মিউজিকের সর্বোচ্চ চূড়া৷ বিজ্ঞানীর পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ মিউজিশিয়ান না হলে এ ধরনের স্থাপত্য নির্মাণ কখনোই সম্ভব নয়। রসায়ন না জানলে শক্ত মাটি, পাথরের উপর ভিত্তি করে এত মজবুত বিল্ডিং তৈরি করা সম্ভব হতো না। এমনকি তিনি দেয়ালের ভেতরে লিখে গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে সংস্কার করার সময় কোন কোন উপকরণ প্রয়োজন হবে বা কীভাবে সংস্কার করতে হবে, যে লিখা ৪০০ বছর পরে সংস্কারের জন্য দেয়াল ভেঙ্গেও পাওয়া গেছিলো। প্রশ্ন হলো তিনি কোন কালি দিয়ে লিখছেন যে, ৪০০ বছরেও তা মুছেনি? আর কতটা দক্ষতা থাকলে এত বছর পরের সংস্কার কাজের পদ্ধতিও তিনি বলে যেতে পারেন ?</div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">একইভাবে আমাদের অঞ্চলের স্থাপত্য, প্রাচীন শহর ও ভাষা, সুবিশাল সালতানাতের স্মৃতিচিহ্ন দেখার পরেও যদি আমরা বলি, মুসলমানদের কোনোই অবদান নেই, তাহলে আমাদের জন্য বৃটিশ একাডেমিয়ার চিন্তার দাসত্ব ছাড়া ভিন্ন কিছু করার নেই!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এজন্য ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ভালোভাবে না পড়লে কখনোই অবদান সম্পর্কে জানা সম্ভব নয় এবং অবদান রাখাও সম্ভব নয়। কোনো জাতি তার অতীতকে অস্বীকার করতে পারে না, কারণ সে জাতির বৈশিষ্ট্য অতীতের সৃষ্টি। এটিই আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত। আমাদের এ সমাজ ও সভ্যতা ছিলো মানুষের সমাজ ও সভ্যতা। নানা সংকট, উত্থান-পতনের আবর্তেই তা পরিচালিত হতো। এখান থেকে মূল শিক্ষাগুলো গ্রহণ করাই আসল পর্যালোচনা। অর্থাৎ আমরা ইতিহাসকে নিন্দা করবো না, বরং বিশ্লেষণ করবো।</div>
<div dir="auto">এসব পর্যালোচনা করে শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাসী আলাপগুলোই তুলে ধরার দায়িত্ব ছিলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক্ষেত্রে, নয়া জ্ঞান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে!</div>
<div dir="auto">এজন্য আমাদের নতুন করে সমাধানে জন্য কাজ করতে হবে।</div>
<div dir="auto">যেমন– <em>কাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে বসেও রচনা করেছেন,</em></div>
<blockquote>
<div dir="auto">“কারার ঐ লৌহকপাট,</div>
<div dir="auto">ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,</div>
<div dir="auto">রক্ত-জমাট</div>
<div dir="auto">শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।</div>
<div dir="auto">ওরে ও তরুণ ঈশান!</div>
<div dir="auto">বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!</div>
<div dir="auto">ধ্বংস নিশান</div>
<div dir="auto">উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।”</div>
</blockquote>
<div dir="auto">তিনি জেলে থেকেও নিজের সমাজকে জ্ঞানের উৎস হিসেবে নিয়েছেন এবং নিজের ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন। তখন ছিলো ইংরেজদের জয়-জয়কার, অথচ তার কবিতায় একটি ইংরেজি শব্দও নেই।</div>
<div dir="auto">মুসলমান ও ইংরেজদের সংঘাত চলাকালে তিনি বলছেন,</div>
<blockquote>
<div dir="auto">“তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!</div>
<div dir="auto">যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।</div>
<div dir="auto">ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,</div>
<div dir="auto">ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।</div>
<div dir="auto">অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন</div>
<div dir="auto">কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।</div>
<div dir="auto">হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?</div>
<div dir="auto">কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার</div>
<div dir="auto">গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,</div>
<div dir="auto">পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!</div>
<div dir="auto">কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?</div>
<div dir="auto">করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!</div>
<div dir="auto">কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,</div>
<div dir="auto">বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!</div>
<div dir="auto">ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!</div>
<div dir="auto">উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।</div>
<div dir="auto">ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,</div>
<div dir="auto">আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান</div>
<div dir="auto">আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?</div>
<div dir="auto">দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!”</div>
</blockquote>
<div dir="auto">নিজের সমাজ ও চেতনাকে উৎস বানালে যে ছোট একটি কবিতা দিয়ে শক্তিশালী বড় সভ্যতার বিপরীতে লড়াই করা যায়, তার উদাহরণ এটি। যে সাম্রাজ্যের সূর্য ডুবে না, সে সাম্রাজ্যের জেলে বন্দী থেকে যদি এমন সব কবিতা, প্রতিবাদী কথামালা তিনি রচনা করতে পারেন, তাহলে আমাদের পক্ষে এখন তা কেন সম্ভব নয়? এগুলো আমাদের সামনে জ্বলন্ত উদাহরণ, যা ব্যাপকভাবে আন্দোলিত ও প্রভাবিত করে।</div>
<div dir="auto">আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১০/১২ টি গান গোটা জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলো!</div>
<div dir="auto">যেমন–</div>
<blockquote>
<div dir="auto">“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি। &#8230;যে শিশুর মায়া হাসিতে আমার বিশ্ব ভোলে।”</div>
</blockquote>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তাই আমাদের কর্তব্য হলো আমাদের সমাজকে উৎস হিসেবে নেওয়া এবং আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করা। বৃটিশ ওরিয়েন্টালিস্টদের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে এসব বোঝা সম্ভব নয়!</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">হ্যাঁ, এটি সত্য যে, আমাদের গৌরবজ্জ্বল অতীতের কোনো কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই বা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু তা প্রমাণ করা সম্ভব! সত্যের আলাদা শক্তি আছে। সত্যকে সবার সামনে হাজির করাটাও আমাদের দায়িত্ব, যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এ শতকের মহান মুজাহিদ, আলেম ড. ফুয়াদ সেজগিন। তিনি ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। পশ্চিমা সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবঞ্চনা ও তৈরিকৃত মিথ্যা বয়ানকে তিনি যৌক্তিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেন।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তার মতোই আমাদের উপমহাদেশে, আমাদের বাংলা অঞ্চলের মানুষদের মধ্য থেকে নিজেকে উৎসর্গকারী কিছু মানুষ প্রয়োজন, যারা উপমহাদেশের ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসকে, ইসলামের জ্ঞানের ইতিহাসকে, ইসলামের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসকে, আলেম এবং দার্শনিকদের ইতিহাসকে, স্থাপত্য ও শিল্পকলার ইতিহাসকে, সমাজ ও অর্থনীতির ইতিহাসকে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ শোষণের নিকৃষ্টতম জুলুমপূর্ণ অধ্যায়কে ও ব্রিটিশ পরবর্তী হীনম্মন্যতার সময়কালকে খুব ভালোভাবে তুলে ধরে আত্মবিশ্বাসী বিজয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার মতো বয়ান সৃষ্টি করবে। অবশ্যই অবশ্যই ড. ফুয়াদ সেজগিনের মতো আমাদেরকেও নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে হবে। কেননা ত্যাগ ও প্রচেষ্টা ছাড়া এ হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আমরা যদি আমাদের জ্ঞান, চিন্তা ও পর্যালোচনার জায়গায় শক্তিশালী হই, তবে অবশ্যই সত্যকে খুঁজে পাব। এভাবেই ইসলামী সভ্যতার নিশ্চিত বিজয়, নতুন দুনিয়া গড়া ও ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ অবশ্যই সম্ভব এবং এটি ততটাই সত্য, যতটা সত্য আগামীকালের সূর্যোদয়।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/contribution-of-the-bengali-muslims-to-world-civilization/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7754</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জ্ঞানের স্বাধীনতা: প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী শিক্ষাদর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/freedom-of-knowledge-capitalist-pedagogy-in-context/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/freedom-of-knowledge-capitalist-pedagogy-in-context/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 06 Mar 2023 13:51:43 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[জ্ঞানের স্বাধীনতা]]></category>
		<category><![CDATA[জ্ঞানের স্বাধীনতা: প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী শিক্ষাদর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী শিক্ষাদর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7664</guid>

					<description><![CDATA[বস্তুবাদী জীবনধারা বর্তমানে, চরম পর্যায়ের বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের হতাশা, এমনকি জাপানের মতো উচ্চহারের শিক্ষিত দেশেও আত্নহত্যার ভয়ানক হারে বৃদ্ধি, মাদকাসক্ত যুবকশ্রেণী, পারিবারিক বিশৃঙ্খলাসহ অসংখ্য অধঃপতনে জর্জরিত এই বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে ! ফলে ক্ষুধা দারিদ্র্য আর মানসিক অশান্তির]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বস্তুবাদী জীবনধারা বর্তমানে, চরম পর্যায়ের বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের হতাশা, এমনকি জাপানের মতো উচ্চহারের শিক্ষিত দেশেও আত্নহত্যার ভয়ানক হারে বৃদ্ধি, মাদকাসক্ত যুবকশ্রেণী, পারিবারিক বিশৃঙ্খলাসহ অসংখ্য অধঃপতনে জর্জরিত এই বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে ! ফলে ক্ষুধা দারিদ্র্য আর মানসিক অশান্তির এক সমাজ কাঠামো গড়ে উঠছে চতুর্দিকে!</p>
<p>এর জন্য অন্যতম দায়ী কে?</p>
<p>কেন শিক্ষিত হয়েও বেকারত্ব, কিংবা জাপানের মত উচ্চশিক্ষিতদের দেশেও আত্নহত্যার হার বেশী?</p>
<p>কেন আমাদের জাতির বিবেকখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতাশা, বিশৃঙ্খলার কারখানায় পরিণত হল?</p>
<p>মূলত এগুলো ব্যবস্থাগত সংকটের ফলাফল। যার অন্যতম কেন্দ্রস্থল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইলেই বা শিক্ষকরা চাইলেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ, চিন্তাশীল কোনো শিক্ষক বা চিন্তা উদ্ভাবনকারী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা বর্তমান এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত নয়, বরং এই সেক্টরটা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনীতি দ্বারা! আর রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কতিপয় পুঁজিবাদী কোম্পানি বা লবির লাভক্ষতির উপর নির্ভর করে! ফলে শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে ওই সকল কোম্পানি বা লবির কর্মচারী তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ইউরোপ থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল প্রান্তের শিক্ষাব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর হাতে আবদ্ধ! এখন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর ইতিহাসে সবসময়ই কি শিক্ষা ব্যবস্থা তথা পুঁজিবাদী কোম্পানির লাভ-লোকসানের রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলো? ইতিহাসের নজির আমাদেরকে এ ব্যাপারে কী বলে?</p>
<p>জ্ঞান ও শিক্ষাব্যবস্থার ধারণাকে আমরা যদি ১২০০ বছর পৃথিবীকে পরিচালনাকারী বিশ্বব্যবস্থা তথা ইসলামী সভ্যতার আলোকে পর্যালোচনা করি, তাহলে যে বিষয়টি প্রথমেই আমাদের সামনে উঠে আসে, তা হলো, ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞানের ধারণা ও শিক্ষাব্যবস্থার অনন্য কাঠামো। ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান বরাবরই একটি স্বাধীন বিষয় ছিলো। আমাদের দেখতে পাই এই শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থনৈতিক লাভ-লসের সমীকরণ দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সু্যোগ খুব কমই ছিলো। তবে, রাষ্ট্র সেখানে অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করতো, সামাজিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতো। কিন্তু, ক্ষমতার সূত্রে রাষ্ট্রের তেমন একটা হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিলো না। এই হস্তক্ষেপহীন থাকার মূল কারণ ছিল ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি পুঁজিবাদের ন্যায় বস্তুগত উন্নতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং এখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির বিকাশে অভিভাবকের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছিল। ইসলামী সভ্যতার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেখা থাকতো &#8211; <em>“এখানে কোনো মাছকে উড়তে বাধ্য করা হয় না, কোনো পাখিকে সাঁতরাতে বাধ্য করা হয় না </em>”</p>
<p>কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান সময়ে সন্তানদেরকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরির হিড়িক ঘরে ঘরে দেখতে পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবজেক্ট চয়েজ হোক কিংবা নবম দশম শ্রেণীর বিভাগ নির্বাচন সকল ক্ষেত্রেই ভালো একটি চাকরি, ভালো বেতনকেই সর্বাগ্রে স্থান পায়। আর এই বিষয়গুলো নির্ধারণ হয় বৈশ্বিক অর্থনীতির চাহিদার উপর ভিত্তি করে। যখন যে বিষয়ের চাহিদা বাড়ে রাষ্ট্রও সেদিকে গুরুত্ব দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থাকে সেই আলোকে সাজিয়ে তোলে। অর্থনীতির কাছে শিক্ষাব্যবস্থার বন্দী-দশার সাধারণ চিত্র আমাদের সকলেরই কমবেশি জানা। শিক্ষাব্যবস্থা কেবল এখানেই বন্দী বললে ভুল হবে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিও তার প্রয়োজনানুসারে শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহারের ধারাও বর্তমান বণিক সভ্যতায় বেশ জনপ্রিয়তা। প্রায়ই দেখা যায় জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যপুস্তকে বিরাট পরিবর্তন আসে। আবার বৈশ্বিক রেজিম পরিবর্তনের সাথে সাথেও পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তনের ধারাও সমানতালে চলছে। যেমন বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার কেন্দ্রে অবস্থানের কারণে আমরা যখন ইকোনমিকস, ফিন্যান্স নিয়ে পড়তে যাই তখন বাংলাদেশ ভারত কিংবা জাপানের একজন ছাত্র থেকে অধ্যাপক সকলকেই আমেরিকার ম্যাক্রইকোনমিকস পড়তে বাধ্য অথচ আমেরিকার অর্থনীতি আর অন্যদের অর্থনীতিতে পার্থক্য রাত এবং দিনের মতো পরিষ্কার। অনুরূপভাবে সারা পৃথিবী ইউরোপের সোশিওলজি পড়তে বাধ্য।</p>
<p>এখন এই পর্যায়ে একটি প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীর জ্ঞানের ইতিহাস কি সবসময়ই রাজনীতি অর্থনীতি দ্বারা পরিচালিত ছিল?</p>
<p>সমগ্র পৃথিবীকে ১২০০ বছর পরিচালানাকারী ইসলামী সভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতার বিভিন্ন আমলের সুলতান-খলিফা-শাসকগণ বিভিন্ন মতাদর্শের ছিলেন। যেমন ফাতিমিরা শিয়া, কিংবা উসমানীরা হানাফী। কিন্তু, শুধুমাত্র জ্ঞানতাত্ত্বিক ও চিন্তাগত পার্থক্যের দরুণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে শিক্ষাব্যবস্থায় সে চিন্তাকে প্যাট্রোনাইজ করা হয়েছে, এধরণের ইতিহাস থাকলেও তা ইসলামী সভ্যতায় খুব কম ঘটেছে। আর ইসলামের মাজহাব সমূহের মাঝে কিছুক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও, সবাই আখলাক ও আদালতকে কেন্দ্রে স্থাপন করতো। ফলশ্রুতিতে, মানবতা ক্ষতিগ্রস্থ হতো না। বরং যে মাজহাবই ক্ষমতায় থাকুক বা যে শিক্ষাব্যবস্থাই প্রভাবশালী থাকুক না কেন, মানবসম্প্রদায় সেটা থেকেই আদিল সমাজ ও ইরফানী সংস্কৃতি উপহার পেতো। ব্যক্তি স্বার্থে কিংবা জাতীয়ভাবে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অথবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মিথ্যা স্বপ্ন ও বস্তুবাদী আগ্রাসনের স্বীকার হয়েছে, ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া বিরল।</p>
<p>একইভাবে আমরা যদি দেখি, ইসলামী সভ্যতার বিভিন্ন সময়কালে বিভিন্ন শাসকগণ ভিন্ন ভিন্ন ধারার চিন্তা লালন করতেন। যেমন, রাষ্ট্রীয় মাযহাব হানাফী হলেও সুলতান ব্যক্তিগতভাবে শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করছেন, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় কোনোভাবেই এর প্রভাব বিদ্যমান ছিলো না। আবার, সেলজুকীরা হানাফী হওয়া সত্ত্বেও নিযামিয়া মাদ্রাসার প্রধান ছিলেন ইমাম গাজ্জালী। মাযহাব হিসেবে ইমাম গাজ্জালী হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন না। তবুও, তৎকালীন সবচেয়ে বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ছিলেন তিনি। এসবক্ষেত্রে সবাই স্বাধীন ছিলো। যেমন, ইসলামী সভ্যতার শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপারে বলা হয়। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামী সভ্যতার অসাধারণ উদারতা ও বহুত্ববাদী মনোভাব থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আখলাকপূর্ণ অবস্থান বিদ্যমান ছিলো।</p>
<p>আবার বিভিন্ন যুগে ইসলামী সভ্যতার মহান আলেমগণ জ্ঞানকে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে দূরে রাখতে রাজনৈতিক শক্তির সামনে বুক পেতে দিয়েছেন, তবুও তাঁরা মাথা নত করেননি। যাতে করে, একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাবলয়ের (regime) উৎপাদন হিসেবে ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানকে আখ্যায়িত করা না যায়। ইমাম আবু হানিফার রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ না করার কারণও ছিলো এটাই। একইভাবে, মালেকী মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় মাযহাব করার সিদ্ধান্তকে স্বয়ং ইমাম মালেক কর্তৃক প্রত্যাখ্যান করা, বিভিন্ন সময়ের বড় বড় মুজতাহিদ আলেমগণের রাষ্ট্রীয় পরিষদে অংশ না নেয়ার কারণও ছিলো এটাই। কারণ, জ্ঞান ও মূলনীতিকে যেনো স্বাধীন রাখা যায়। পাশাপাশি, শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানপদ্ধতি যেনো কোনো একটা নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণকাঠামো থেকে মুক্ত থাকে।</p>
<p><strong>০২. জ্ঞানের স্বাধীনতা ও পরাধীনতাঃ</strong><br />
এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। তা হচ্ছে, “ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান কেন স্বাধীন আর পাশ্চাত্যের বণিক সভ্যতায় জ্ঞান কেন পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ?”</p>
<p>এর জবাবে বলা যায়, পাশ্চাত্য এবং অন্য যেকোনো সভ্যতা মূলত শক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ইসলামী সভ্যতা হাকীকতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পাশ্চাত্য বা শক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা কোনো সভ্যতা জ্ঞানকে যেখানে শক্তি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে, অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতা সেখানে জ্ঞানকে হাকীকতে উপনীত হওয়ার একটা মাধ্যম হিসেবে দেখে থাকে।</p>
<p>অর্থ্যাৎ, মূলত এই দুই ধরনের সভ্যতায় জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্যগত পার্থক্যই জ্ঞানের স্বাধীনতা ও পরাধীনতার মূল কারণ।</p>
<blockquote><p>কেননা, আমরা দেখতে পাই, জ্ঞান যখন হাকীকতে উপনীত হওয়ার পন্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, জ্ঞান তখন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি কিংবা স্বার্থের বিবেচনা করে না। সে কেবল যা সত্য, তাই তুলে ধরে। অন্যদিকে, শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত জ্ঞান কেবলই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারে নিমজ্জিত থাকে। ফ্রান্সিস বেকনের Knowledge is power; বিখ্যাত এই উক্তি মূলত এই আলোচনাকেই স্বীকৃতি দেয়।</p></blockquote>
<p>ইসলামী সভ্যতার শিক্ষাব্যবস্থা মূলত মানুষকে বিকশিত করতে চায়। ইসলামের মূল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মানুষ স্রষ্টার প্রতিনিধি, তাই সে দুনিয়াকে বিনির্মাণ করবে। এজন্য তার সৃজনশীল হতে হবে। আল্লাহ এজন্যই চান, মানুষ যেনো তাঁর রঙ্গে রঙিন হয়। কুরআন এ-কারণেই মানুষকে দ্বীনের শিক্ষা দেয়, আইন ধরিয়ে দেয় না। কারণ, এরপর ব্যক্তি নিজেই দ্বীন অনুযায়ীই আইন তৈরি করতে পারবে।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতা তাঁর কার্যক্রমের মূলকেন্দ্রে আখলাককে স্থাপন করে। ফলশ্রুতিতে, এ&#8217;ধরণের জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া কিংবা নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা; মানুষ পরিচালনা করার জন্য এমন পদ্ধতিকে ইসলাম কখনও গ্রহণ করেনি।</p>
<p>অন্যদিকে, ইসলামী সভ্যতা ব্যতীত আর সবকালেই জ্ঞান ছিলো শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর শক্তি&#8217;র চাওয়া-পাওয়া হলো, জ্ঞান যেনো কেবল তার কামনা বাসনাকেই পূরণ করে। ফলে এই জ্ঞান মানুষের বিকাশ তো করেই না, বরং মানুষকে গোলামে পরিণত করে। উদাহারস্বরূপ, হাল আমলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাত্রই হলো কোম্পানির চাকর তৈরির একেকটা কারখানা।</p>
<p><strong>০৩. শিক্ষাক্ষত্রে ইসলামী সভ্যতার দর্শনঃ</strong><br />
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, জ্ঞানকে ইসলাম কীভাবে দেখা হয়েছে?<br />
দ্বীনে মুবিন ইসলাম যে বিষয়টির প্রতি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ত্ব দিয়েছে, তা হল ‘ইলম’ তথা জ্ঞান। ইসলামে জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করা হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কোরআন ও হাদিসে ইলমের গুরুত্ত্ব ও জ্ঞানবানদের মর্যাদা সম্পর্কিত অনেক আয়াত এবং হাদিস আমরা দেখতে পাই।<br />
মহাগ্রন্থ আল কোরআন ও হাদিসের এই মনোভাব মুসলমানদের মনে জ্ঞানের প্রতি গভীর এক শ্রদ্ধাবোধের সৃষ্টি করেছিলো। যার ফলে, জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখাকে তারা কোরআনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের আলোকে ঢেলে সাজিয়েছিলো। এবং বিজ্ঞানকে এনে দিয়েছিলো এক নতুন মাত্রা। যে যুগে মহান আল্লাহর অনুসন্ধান করতে গিয়ে মানুষ সৃষ্টিকে মূল্যহীন মনে করে বর্জন করেছিলো, মুসলমানগণ সে যুগে প্রকৃতি এবং ইসলামের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলো বিশেষ এক সম্পর্ক।</p>
<p>আল্লাহ এবং বিশ্বের সাথে মানুষের বহুবিদ সম্পর্ক বিরাজমান। এই সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষের মনে গভীর চেতনার উন্মেষ করাই হচ্ছে কোরআনের প্রধান উদ্দেশ্য। ইসলামে মানুষ এবং প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক হলো, কৃষির সাথে প্রকৃতির এবং মাটির সাথে কৃষকের সম্পর্কের মতো, ব্যবসায়ী এবং বাজারের মধ্যকার সম্পর্কের মতো। কিন্তু এই সম্পর্ককে ইসলাম চিরস্থায়ী বলে গণ্য করেনি। ইসলাম বলে যে, তুমি সর্বদায় যদি তোমার মায়ের কোলে বসে থাকো, তাহলে তুমি যেমন পরিপূর্ণ একজন মানুষ হতে পারবে না, তেমনিভাবে তুমি যদি সর্বদায় মাটিকে তথা পৃথিবীকে আকড়ে ধরে বসে থাকো, তাহলে তুমি মাটিতে উৎপাদিত অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর মতোই হয়ে থাকবে।</p>
<p>ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ এবং বাস্তব, এই দুটি বিরোধী শক্তি নয় যে, তাদের মিলন অসম্ভব। আদর্শকে বেঁচে থাকতে হলে বাস্তবের সঙ্গে তার পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, বাস্তবকে উপেক্ষা করলে জীবনের সামগ্রিক রূপই বিনষ্ট হয়ে যায়, জীবনের সামনে দেখা দেয় তখন নানাবিধ বেদনাময় বাঁধা-বিরোধ।<br />
মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্ত্বার প্রতিষ্ঠা সকল ধর্মেরই কাম্য। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, বাস্তব (পৃথিবী) এবং আদর্শের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এক সামঞ্জস্য তৈরি করে ইসলাম। আদর্শের সঙ্গে বাস্তবের সংযোগকে স্বীকার করে ইসলাম বস্তুজগতকে স্বাগত জানায়। আর বাস্তবসম্মত উপায়ে জীবন পরিচালনার জন্য একটি পন্থাকে অবলম্বন করে বস্তু-জগতকে আয়ত্ত্ব করার নির্দেশ দেয়।</p>
<p><strong>০৪. ইসলামে ইলমের লক্ষ্যঃ</strong></p>
<p>১। আল্লাহকে চেনা এবং তার প্রতি ঈমান আনা।<br />
ইসলাম ইলমের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কিছুর প্রতি অন্ধভাবে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়নি ইসলামে।</p>
<p>فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ</p>
<p>সূরা মুহাম্মাদ- ১৯</p>
<p>এজন্য মুসলিম মনীষীগণ জ্ঞানের একটি আলাদা শাখার উদ্ভাবন করেছেন। আর তা হচ্ছে ‘ইলমুত তাওহীদ’। আল্লাহর পরম একত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাওহীদ হচ্ছে সত্যের উৎস-সমূহের একত্বের স্বীকৃতি। আল্লাহ হচ্ছেন প্রকৃতির স্রষ্টা, যেখান থেকে মানুষ তার জ্ঞান অর্জন করে নেবে। জ্ঞানের বিষয় হচ্ছে, মহান রবের সৃষ্ট এই প্রকৃতির ডিজাইন বা নকশাসমূহ। নিশ্চয় আল্লাহ এগুলোকে জানেন। কারণ তিনিই হচ্ছেন এসবের রচয়িতা। এবং একইরূপে নিশ্চিতভাবে তিনিই হচ্ছেন প্রত্যাদেশের উৎস। তিনি মানুষকে তাঁর জ্ঞান থেকে জ্ঞান দান করেন। তাঁর জ্ঞান হচ্ছে পরম এবং বিশ্বজনীন।</p>
<p>২। তারবিয়া ও তাযকিয়া:<br />
মানুষকে তার নফসের বাসনা এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত রাখার জন্য  ইসলাম তাযকিয়া ও তারবিয়ার প্রতি অনেক গুরুত্বারোপ করেছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ তার নবীগণকেও পাঠিয়েছেন এই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। মহান আল্লাহ বলেন,<br />
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ  لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ                                                                                         (সূরা জুমুয়া-২)</p>
<p>৩। জীবিকা নির্বাহের পন্থা শিক্ষা দেওয়া:<br />
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই পৃথিবীকে মানুষের অধীন করে বানিয়েছেন। জলে-স্থলে যা কিছু আছে, সকলকিছুকে তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তবে, ইসলাম এক্ষেত্রে একটি মূলনীতি পেশ করেছে। তা হলো, এই পৃথিবীটা মানুষের কাছে একটা আমানত এবং এটাকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে যাবে না। পরবর্তী বংশধররা যেনো আরও সুন্দর ও বসবাস যোগ্য একটি পৃথিবী পায়, এ&#8217;বিষয়ের প্রতি ইসলাম বিশেষ দৃষ্টি আরোপ করেছে। এই পৃথিবীর গোপন রহস্য এবং সৃষ্ট বস্তু নিয়েও ইসলামে গবেষণা করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,<br />
أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُنِيرٍ                                         (সূরা লোকমান-২০)</p>
<p>৪। আদালত প্রতিষ্ঠা:<br />
ইসলাম আদালতের প্রতি ব্যাপকভাবে জোর দিয়েছে। ইসলামে তার অনুসারীদেরকে শত্রুর সাথে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রেও ‘আদালত’কে মূলভিত্তি হিসেবে প্রতিস্থাপন করে নিতে বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ৩০ টিরও বেশী স্থানে ‘আদালত’ বা ‘আদল’ এর কথা বলা হয়েছে,<br />
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا<br />
(সূরা নিসা-১৩৫)</p>
<p>৫। আখেরাতের চিন্তা:<br />
ইসলাম সর্বদায় আখেরাতকে দুনিয়ার উপর প্রাধান্য দিয়েছে। মহান আল্লাহর দরবারে কোনো মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা ও কর্ম সফল হওয়া নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর,<br />
ক. সে প্রচেষ্টা হবে শরিয়তের আওতাধীন।<br />
খ. ইহজাগতিক কর্ম ও প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য হবে আখেরাতের চূড়ান্ত সফলতা।<br />
সমগ্র কোরআনের প্রায় ১০ পারা জুড়ে রয়েছে আখেরাতের আলোচনা।</p>
<p>৬। উপকারী এবং অপকারী জ্ঞান:<br />
জ্ঞানকে দ্বীনী কিংবা দুনিয়াবী বলে বিভাজিত করেনি ইসলাম। জ্ঞানকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। তা হলো, উপকারী জ্ঞান এবং অপকারী জ্ঞান। যে সকল জ্ঞান উপকারী সেই ধরণের সকল জ্ঞানই হল ইসলামী জ্ঞান।</p>
<p>ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, মুসলিম উলামাগণ যত গ্রন্থই রচনা করেছেন, এই বিষয়-সমূহকে সামনে রেখেই গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘ইলম-হিকমত-মা&#8217;রেফাত’ এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে মানুষকে তৈরি করার জন্য পুস্তক রচনা করেছেন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সমূহকেও গড়ে তুলেছেন সে অনুযায়ী।<br />
এই লক্ষ্যে তিনটি বিষয়কে তারা একত্রিত করে পাঠ করেছেন। বিষয় তিনটি হলো,<br />
১। ইনসান<br />
২। মহাবিশ্ব<br />
৩। কুরআন</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার প্রানকেন্দ্র বাগদাদ, কায়রো, ইস্তাম্বুল এবং আন্দালুসিয়ার শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর দিকে তাকালেও আমরা উপরিউক্ত বিষয়-সমূহের বাস্তব উপমা দেখতে পাই। ইসলামে জ্ঞান-গবেষণার মূল উদ্দেশ্যই হলো, “ বিষয় সমূহের হাকীকত সম্পর্কে জানা”।</p>
<p><strong>০৫. শিক্ষাক্ষত্রে পাশ্চাত্য সভ্যতার দর্শন</strong><br />
এখন তাহলে প্রশ্ন হলো, পাশ্চাত্য সভ্যতা জ্ঞানকে কিভাবে দেখছে? দুনিয়াব্যাপী প্রতিষ্ঠিত তাদের এই জ্ঞানদর্শন&#8217;র ভিত্তিমূল কি?</p>
<p>আজ থেকে চারশত বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৬ শতাব্দীতে ইলম (জ্ঞান) এবং মানতিকে (যুক্তিবিদ্যায়) বিশাল এক পরিবর্তন আসে। পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিকদের মধ্যে বড় দুইজন দার্শনিক হলো ‘ফ্রান্সিস বেকন’ এবং ‘রেনে দেকার্তে’। এই দু&#8217;জন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নতুন করে গঠন করে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছে। এই দু&#8217;জনের চিন্তার প্রভাবের কারণে, বিশেষ করে বেকনের জ্ঞান-দর্শন এবং জ্ঞানের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গী, জ্ঞান সম্পর্কে অতীতের সকল ধারণাকে পরিবর্তন করে দেয়।<br />
এই পরিবর্তন পাশ্চাত্যের জ্ঞানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি এনে দেয় এবং প্রকৃতির উপরে তাদের আধিপত্যকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে, প্রকৃতিকে আবাদ করার পরিবর্তে তারা ফাসাদ সৃষ্টি করতে শুরু করে। তার এই মতাদর্শের অনুসরণে মানুষ মানুষের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু, ফ্রান্সিস বেকনের এই দর্শনটাই বা কী তাহলে?</p>
<p style="text-align: left;">বেকনের পূর্বের দার্শনিক ও জ্ঞানীরা (আলেম-উলামারা), বিশেষ করে ধর্মসমূহ—জ্ঞানকে শক্তির সেবায় নয়, বরং সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে, জ্ঞানকে তারা সত্য বা হাকীকতের অনুসন্ধানে কাজে লাগাতো। মানবিক জ্ঞানের দিকে তারা অগ্রসরমান ছিলো। তাদের ব্যবহৃত বাক্যগুলো এমন ছিলো, ‘হে মানুষ, তোমরা আলেম হও! জাগ্রত হও! কেননা, জ্ঞান তোমাকে সত্যের সন্ধান দিবে।’<br />
সত্যকে খুঁজে পাওয়ার জন্য জ্ঞান মানুষের একটি গবেষণার ওসিলা ছিল। এই কারণে জ্ঞানের তখন পবিত্রতা বজায় ছিলো। ইলম ছিলো তখন একটি মুকাদ্দেস বা পবিত্র বাস্তবতা। জ্ঞানের অবস্থান ছিলো মানুষের ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে এবং জাগতিক বিষয়াবলীর চেয়ে এর গুরুত্ব ছিলো অনেক বেশী। দুনিয়াবী সম্পদের তুলনায় জ্ঞানকে সবসময় উচ্চ একটা স্থানে আসীন করানো হতো। জ্ঞান উত্তম নাকি দুনিয়াবী যশ, খ্যাতি ও সম্পদ উত্তম; এই প্রশ্ন করা হতো সর্বদাই। আমরা এই ধরনের অনেক উপমা ফার্সি এবং আরবী ভাষায় লেখা সাহিত্যের মধ্যে পেয়ে থাকি। এই দুইয়ের মধ্যে যখন তুলনা হতো, জ্ঞানকে তখন সবকিছুর উর্ধ্বে প্রাধান্য দেওয়া হতো।<br />
যেমন কবি বলেন যে,<br />
<em>ইদ্রিসকে দেওয়া হয়েছিলো ইলম, আর স্বর্ণ ও রূপা কারুনকে;</em><br />
<em>একজন আজ মাটির নীচে, অপরজন আকাশেরও উপরে।</em></p>
<p>বেকন বলেন, &#8220;জ্ঞান মানুষের জন্য একটি খেলনা সমতুল্য। আমাদেরকে বলা হয়ে থাকে যে, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জনের পেছনে ছুটে চলো। কেননা, জ্ঞান তোমাদেরকে সত্য উদ্ভাবনে সাহায্য করবে। আর সত্য উদ্ভাবন মহাপবিত্র একটি কাজ’। আমার কাছে এটি সঠিক মনে হয় না। বরং আমি মনে করি যে, মানুষের উচিত তাদের জ্ঞানকে তাদের ব্যক্তিগত সেবা-মূলক কাজে ব্যবহার করা। মানুষের জীবনের জন্য যে জ্ঞান উত্তম, যে জ্ঞান মানুষকে প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব এনে দেয়, সে জ্ঞানই উত্তম জ্ঞান। যে জ্ঞান মানুষকে ক্ষমতাবান করে, যে জ্ঞান হলো ভালো জ্ঞান”। ফ্রান্সিস বেকনের উক্তি, Knowledge is power; পাঠকসমাজের নিকট বিখ্যাত এই উক্তিটাকে আবারো পর্যালোচনা করার অনুরোধ রইলো।</p>
<p>এভাবে তারা জ্ঞানের গতিপথকে পরিবর্তন করে দেয়। এছাড়াও, প্রকৃতিকে নিজেদের কর্তৃত্বধীন করার জন্যও জ্ঞানের গতিপথকে তারা পরিবর্তন করে নেয়। কিন্তু কেন?<br />
কারণ, মানুষ প্রকৃতির উপর যতো বেশি কর্তৃত্বশালী হবে, তার গোপন রহস্য সমূহ মানুষ ততো বেশি উম্মোচন করতে পারবে।</p>
<p>ইউরোপের অন্যতম একজন বড় দার্শনিক হলো, এই ফ্রেডরিক নিটসে। দুনিয়াব্যাপী ইউরোপের শোষণের মূলে তার চিন্তাদর্শন-ই সবচেয়ে বেশি মানবতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে! তার মতে, “ধর্ম হলো দরিদ্রদের তৈরি একটা বিষয়। দরিদ্ররা শক্তিশালীদের মোকাবেলা করার জন্য এই ধরনের একটি অদ্ভুত জিনিসের আবিষ্কার করেছে। মসীহ এবং খ্রিষ্টানদের আখলাকী দৃষ্টিভঙ্গী হলো- গোলামীর আখলাক। খ্রিষ্টান আখলাক মনিবের আখলাককে ধ্বংস করে দেয়। আজকের যে ভ্রাতৃত্ব, সমতা, শান্তিপ্রিয়তা নামে যা কিছু রয়েছে, এর মূলে আছে খ্রিষ্টান আখলাক। এ&#8217;সকল কথা মিথ্যা, আর তৈরিই করা হয়েছে মানুষকে প্রতারনা করার জন্য। এ&#8217;সকল কথা হলো, গরিব এবং দরিদ্রদের উদ্ভাবন। এ&#8217;জন্য এই সকল আখলাকী ধারণাকে উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। এর স্থলে জমিদারী বা ফিউডালিজমকে পুনরায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। দুর্বলদের সৃষ্টি করা হয়েছে মূলত ক্ষমতাবানদের সেবা করার জন্য। সবলদের বেঁচে থাকতে হলে, নতুন নতুন আবিষ্কার করতে হবে। মূলত, দুর্বলদের শোষণ করার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই, বরং এটা সবলদের অধিকার।”</p>
<p>অতএব, এই মতাদর্শের সাথে সহমত পোষণ করতে হলে স্রষ্টা এবং আখেরাতের চিন্তাকে ছুড়ে ফেলতে হবে। কারণ, এটাই এর মৌলিক প্রকৃতি। দয়া বা মমতার মতো ধরণগুলোর চিন্তাকে ছুড়ে ফেলতে হবে। দয়া-মমতা এই সকল জিনিস গরীবদের অস্ত্র। ক্ষমা করা ও নম্রতা হলো দুর্বলতা ও কাপুরুষতা। সাহসী এবং বীর পুরুষ হওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>এই ধরনের চিন্তা-মিশ্রিত অসংখ্য স্কুল গড়ে উঠেছে ইউরোপে। আমাদের সমাজে এই ধরনের কোনো চিন্তার উৎপত্তি হয়নি বলে আমাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন করা উচিত। ইউরোপের রূহ এবং সত্যিকারের রূপ হলো এটা। এই চিন্তার কারণেই তারা সারা পৃথিবীর মানুষকে শোষণ করে। এই জন্যই তারা বলতে পারে আমাদেরকে কাছে এক ফোটা রক্তের চেয়ে এক ফোটা তেল অনেক বেশী দামী। তাদের এই সকল চিন্তার মুলে রয়েছে নিটসের দর্শন।<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<p><strong>০৬. অন্যান্য সভ্যতার সাথে ইসলামী সভ্যতার পার্থক্যঃ</strong><br />
অন্যান্য সভ্যতার সাথে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, ইসলামী সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা হচ্ছে মত-ভিন্নতা, ভিন্ন প্রকৃতি ও ভিন্ন চিন্তাকে সম্মান করা, সেগুলোকে সাদরে গ্রহণ করা। ইসলাম কোনোক্ষেত্রেই মানুষের উপর সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ কিংবা কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়নি। ‘অপর’ এর অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছে। কেননা, প্রাকৃতিক বা বিভিন্ন প্রেক্ষিতে সৃষ্ট এসকল পার্থক্যকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে ইসলাম। যার প্রকৃত দৃষ্টান্ত আমরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে দেখতে পাই। এ বিশালতার দরুণ ইসলামী সভ্যতার অনেকগুলো মাযহাব, মক্তব, বিভিন্ন ধারা তৈরি হয়। এবং একেকটি ধারা একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও একই সমাজে সহাবস্থান করে টিকে-ছিলো। ইসলামী সভ্যতা এবং সমাজ এজন্য বরাবরই বহুত্ববাদী ছিলো, এবং আখলাকের আলোকে ইসলামী সভ্যতা অসাধারণ একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলো।</p>
<p>নিজেদের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দিতে মানুষের হৃদয়কে প্রভাবিত করার পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে এই সভ্যতায়, সকলকে সন্তুষ্ট করে ইসলাম ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু, ক্ষমতা ব্যবহার করে কারো উপর জোরপূর্বক ইসলামকে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে, আমরা যদি মহান দার্শনিক জ্ঞানসম্রাট আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচের অমর সৃষ্টি ‘ইসলামী ডেক্লারেশন’ খুব ভালোভাবে পড়ি, তাহলে দেখবো যে, সেখানে তিনি বলছেন,<br />
“যেকোনো বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো, সেখানের বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার সাথে জনগণের এক ধরনের হৃদয়গত সংযোগ স্থাপন করা। কেননা, এরকম একটি সম্পর্ক তৈরি হওয়া ছাড়া কোনো বিপ্লব সম্ভব নয়”।</p>
<p>আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচের এ কথাটি একইসাথে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি। যেকোনো ধরনের ইসলাহ, তাজদীদ, ই&#8217;মার, ইহইয়া কিংবা ইনশা&#8217;র জন্য ইসলাম কনভিন্স করার পন্থা অবলম্বন করে। সুলতান ফাতিহের ‘আমরা ভূখণ্ড বিজয় করার জন্য নয়, বরং মানুষের হৃদয়কে বিজয় করার জন্য বিজয়াভিযান পরিচালনা করি’ এ অসাধারণ কথাটি মূলত এরই প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>ইতিহাসের পাতায় আন্দালুসিয়ার দিকে তাকালে আমরা দেখি, ইসলামী সভ্যতার সুদীর্ঘ ৮০০ বছরের সময়কালে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো খ্রিষ্টানরা। কিন্তু, একজন খ্রিষ্টানকেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়নি। বিপরীতে বরং, আন্দালুস দখলের পর খ্রিষ্টানরা যে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে, তাঁর বিস্তারিত বিবরণ ইতিহাসের পাতাগুলিতে সংরক্ষিত আছে। একইভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে যখন ব্রাক্ষ্মণরা আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন ভিনভাষী, ভিনধর্মের সকলের উপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার সুদীর্ঘ ৭০০ বছরের ইতিহাসকালে এরকম বিন্দুমাত্র নজিরও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইসলামী সভ্যতার সময়কালে মুসলমানরা যদি এ ধরনের আধিপত্য চালাতো, তাহলে ভিন্ন কোনো ভাষা ও ভিন্ন কোনো ধর্মের খোঁজ পর্যন্ত পাওয়া যেতো না। কিন্তু, প্রতিটি ধর্ম, প্রতিটি ভাষা স্বমহিমায় টিকে ছিলো, এবং আজও রয়েছে। দিল্লি, ইস্তাম্বুলের মতো জায়গা, যা ছিলো ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রস্থল, সেখানেও যথেষ্ট-সংখ্যক ভিন্ন ধর্মের মানুষজন ছিলো, এমনকি এখনও রয়েছে। সেসময়কার কোনো ভাষা মুসলিমদের কারণে বিলুপ্ত হয়েছে, অথবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ভিন্ন ভাষা-ধর্ম-জাতির উপর গণহত্যা চালানো হয়েছে, এর সুস্পষ্ট, প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য কোনো নজির নেই।</p>
<p>মূলত এক্ষেত্রেই পশ্চিমা আধুনিকতার সাথে ইসলামী সভ্যতার পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। অর্থাৎ ইসলামী সভ্যতায় সবগুলো অঞ্চলেই ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন ভাষার লোকজন বিদ্যমান ছিলো। মুসলিমরা তাদেরকে ভাই হিসেবে সমস্ত অধিকার দিতো, একত্রে বসবাস করতো। অপরদিক, খ্রিষ্টান-হিন্দুরা মুসলমানদের ধর্ম পালন দেখে নিজেদের ধর্মকে ভালোভাবে পালন করতো এবং ধর্মকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছিলো, এক্ষেত্রে কোনো বাঁধা ছিলো না। কারণ, ইসলামী শরীয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছিলো।</p>
<p>বিপরীতপক্ষে পাশ্চাত্যের মডার্নিজম বা আধুনিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ হচ্ছে আধুনিকতা। সকল-কিছুকে তার নিজের ছাঁচে গড়ে নিতে চায় সে। একধরণের নিয়ন্ত্রণমূলক কর্তৃত্ববাদ চাপিয়ে দেয় পাশ্চাত্য, যার ফলে বিকল্প কোনো কিছু বা বৈচিত্র্য কোনো কিছুকেই সহ্য করতে পারে না সে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো দুটি বিশ্বযুদ্ধ। একই অঞ্চল, একই ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও এ বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষের জীবন খোয়া গেছে। শুধুমাত্র পার্থক্য ও বৈচিত্র্যকে সহ্য না করতে পারার দরুণ এ যুদ্ধে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যেখানে তারা নিজেদেরকেই সহ্য করতে পারে না, সেখানে অন্যান্য অঞ্চল, জাতিসত্তা কিংবা অন্যান্য ধর্মের কাউকে গ্রহণ করা অসম্ভব। এটা তাদের মূলনীতিবিরুদ্ধ!</p>
<p>কিন্তু অপরদিকে, পশ্চিমা আধুনিকতা ভিন্ন মতাদর্শের কারো সাথে সহাবস্থানের ধারণাকে গ্রহণ করে না। বরং সবকিছু আধুনিকতার তৈরিকৃত ধাঁচে গ্রহণ করতে হবে বা এমন একটি জীবনাচরণ বহন করতে হবে, এ বিষয়টি আধুনিকতাবাদ তাঁর সকল উপাদান ব্যবহার করে আমাদের অবচেতন মনে গেঁথে দেয়। আর এর সাথে থাকে ক্ষমতার সম্পৃক্ততা, যাকে ইতালির চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি আখ্যা দিয়েছেন হেজেমনি হিসেবে। (গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বের ব্যাখ্যা অনেক বিশাল, তবে আধিপত্য বিস্তার করে করে মানুষের চিন্তায় প্রবেশ করিয়ে দেয়া, কনভিন্স করা গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বের অন্যতম অনুষঙ্গ।)</p>
<p>আবার ফ্রান্সিস বেকনের ন্যায় বড়বড় দার্শনিকেরা জ্ঞানকে কেবলমাত্র ক্ষমতার আসনে আরোহণের জন্য সিড়ি কিংবা ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে, ব্যবহার করেছ। এজন্যই, পাশ্চাত্যের পন্থা মানুষকে কনভিন্স করা নয়, বরং কনভার্ট করা। অর্থাৎ মানুষের ভেতরকে প্রভাবিত করা নয়, বরং মানুষকে রূপান্তর করে বদলে দেয়া।</p>
<p>গত শতাব্দীর সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী সাম্রাজ্য হলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। এ সাম্রাজ্য এতো দ্রুত ধ্বসে পড়ার কারণ কী? কারণ, এ সাম্রাজ্য মানুষের শয়নকক্ষ পর্যন্ত তাঁর নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে রেখেছিলো। আর প্রকৃতির স্বাভাবিক একটা মূলনীতি যে, মানুষ তাঁর ফিতরাত বিরোধী কোনোকিছুকে স্থায়ীভাবে মেনে নেয় না। ফলে এ প্রবল ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্য টিকতে পারেনি।</p>
<p>আবার দেখা যায়, কম্যুনিস্টরা ক্ষমতা দখলের সাথে সাথেই লেলিনকে প্রত্যেকটা জায়গায় অপরিহার্য করে গড়ে তোলে। লেলিনের জীবনী ও তাঁর সংগ্রামকে শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার ফলে, প্রতিটা শিশু তা শিখতে বাধ্য হয়। পাঠ্যবই থেকে শুরু করে প্রতিটা ক্ষেত্রেই লেলিন, স্ট্যালিনকে হাইলাইট করা হয়। শুধু সোভিয়েত নয়, বরং সকল অঞ্চলেই এমনটা করা হয়। উপমহাদেশেও ব্রিটিশ শোষণকালে এভাবেই ব্রিটিশ বন্দনা শুরু হয়।</p>
<p>কিন্তু ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে এরকম কোন দৃষ্টান্ত নেই! উমাইয়া-আব্বাসী থেকে শুরু করে ইসলামী সভ্যতার সমস্ত অঞ্চলেই হাকীকতকে কেন্দ্রে রেখে জ্ঞান আবর্তিত হয়েছে। ফলে আব্বাসী, উমাইয়া কিংবা উসমানীদের আমলের শিক্ষাক্রমে এমনটা কখনও দেখা যায় না যে, ইতিহাস পাঠে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কিংবা মুঘলদের সময়কালে মুঘলদের পারিবারিক ইতিহাস শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন কোন নজির নেই!</p>
<p>লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, সুদীর্ঘকালব্যাপী তিনটি মহাদেশব্যাপী বিস্তৃত উসমানী সালতানাত, কিংবা বিশাল অঞ্চলজুড়ে টিকে থাকা মুঘল সালতানাত, ইরান অঞ্চলে সাফাভী সালতানাত—বিশাল সংখ্যক মানুষকে পরিচালনা করেছে। তাদের পক্ষে কি মানুষের উপর এ ধরণের সর্বময় কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়া সম্ভব ছিলো না? শক্তিশালী প্রশাসন, সেনাবাহিনী আর জ্ঞান; সবই তো বিদ্যমান ছিল। তা সত্ত্বেও তারা ভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যতা নির্মূল করেনি, ধ্বংস করেনি।</p>
<p><strong>০৭. ফলাফলঃ</strong><br />
তাদের এমন শক্তিকেন্দ্রিক জ্ঞানের দৃষ্টিকোণের আলোকে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, জ্ঞান যদি প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে, তাহলে এর ফলাফল কী হবে? অর্থাৎ আরও সুন্দর একটি জীবন কি অর্জন করা সম্ভব? মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা কি আরও ভালো হবে? যদি হয়, তাহলে কিভাবে?</p>
<p>প্রকৃতির রহস্যসমূহ উম্মোচন করে, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে সেখান থেকে মানুষের কল্যাণের জন্য কোনো কিছুর উদ্ভাবন অবশ্যই ভালো একটি চিন্তা। কিন্তু, আমরা যদি চূড়ান্ত ফলাফলকে বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাই, অবশেষে জ্ঞান তার উচ্চ মর্যাদা এবং উচ্চ আসনকে হারিয়ে ফেলবে। আবার এ জ্ঞানের ফসল হলো, পাশ্চাত্যের একক চিন্তাগত আগ্রাসন এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য। যার ফলশ্রুতিতে, পশ্চিমা চিন্তাদর্শন গোটা বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে একক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।</p>
<p>বেকনের মতে, “জ্ঞান কেবলমাত্র এবং একমাত্র ক্ষমতার জন্য”, (knowledge is power) অন্য কিছুর জন্য নয়। তবে, প্রথমদিকের অবস্থাটা এমন ছিলো না। কিন্তু ক্রমান্বয়ে, জ্ঞান-বিজ্ঞান শুধুমাত্র শক্তির অর্থাৎ ক্ষমতাবান ব্যক্তিবর্গ ও ক্ষমতার গোলামী করতে শুরু করেছে। সমগ্র দুনিয়া আজ এই ভিত্তির উপরেই পরিচালিত হচ্ছে। অথচ, এর পূর্ব পর্যন্ত জ্ঞানের কোনোদিন এতোটা অধঃপতন হয়নি। জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ জালিম ও ক্ষমতাবানদের শোষণের হাতিয়ার। অবস্থাটা আজ এমন পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে যে, যিনি যতো বড় জ্ঞানী ও বিজ্ঞানী, তিনি ততো বেশি পরাধীন। উদাহরণস্বরূপ আইনস্টাইনের কথাই ধরা যাক। তার জ্ঞান, তার চিন্তা আজ কোন কাজে লাগছে? কাদের উপকারে আসছে?<br />
আইনস্টাইন রুজভেল্টের গোলামে পরিণত হয়েছিলো। যদি সে না হতে চাইতো, তবুও সে পারতো না। কারণ, সে নিজে ছিলো পরাধীন, তার নিজস্ব কোনো শক্তি ছিলো না। পূঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদেই হোক আর কমিউনিজমেই হোক, জ্ঞান আজ ক্ষমতার ও ক্ষমতাবানদের গোলাম! কেননা, দুনিয়া আজ পরিচালনা করছে ক্ষমতাবানরা, জ্ঞানীরা নয়।</p>
<p>আজ বলা হয়ে থাকে যে, “আমাদের বর্তমান দুনিয়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুনিয়া”, “বর্তমান যুগ জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ”। মুখরোচক এমন কথাগুলো আজ শুধু মুখের বুলিই হয়ে রয়ে গিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানের এই সেক্টরের রূঢ় বাস্তবতা হলো, আজকের দুনিয়া ক্ষমতাশীনদের দুনিয়া, জ্ঞানের দুনিয়া নয়। আমাদের উচিত, এই কথাগুলোকে, দুনিয়ার এমন বাস্তবতাকে এভাবেই উপস্থাপন করা। আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান আছে, কিন্তু তা স্বাধীন নয়, তা আজ পরাধীন। জ্ঞান আজ শক্তি ও ক্ষমতার কাছে বন্দী এক গোলামের নাম।</p>
<p>পৃথিবীতে যা-কিছু আবিষ্কার হচ্ছে, সেসবকিছু আজ ক্ষমতা ও শক্তিবানদের সেবায় নিয়োজিত। সকল আবিষ্কারের আগে ক্ষমতাবানরা মানব বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করে। এরপর, সে সকল উপাদান থেকে যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহলে সেটা দিয়ে মানব কল্যাণের জন্য কিছু বানানোর চেষ্টা করে। তাও আবার সকল মানুষের জন্য না! দুনিয়ার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য।</p>
<p>আমরা যদি বিগত চারশত বছরের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, সকল বই-পুস্তক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই চিন্তার আলোকে গড়ে তোলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলতে চাই, ফরাসী নৃবিজ্ঞান (ফ্রেঞ্চ এন্থ্রোপলজি) নামে কোনো পরিভাষা নাই, কিন্তু আলজেরিয়ান এন্থ্রোপলজি রয়েছে, আফ্রিকান এন্থ্রোপলজি রয়েছে। কিন্তু ফ্রেঞ্চ সোশিওলজি নামে অনেক পরিভাষা ও বই পুস্তক রয়েছে। এর কারণ হলো, তারা নিজেদেরকে একভাবে বিবেচনা করে, আর যাদেরকে শোষণ করে তাদেরকে চিন্তা করে অন্যভাবে। কিভাবে তাদেরকে বেশী বেশী শোষণ করা যাবে, এটা নিয়ে রয়েছে তাদের বিস্তর গবেষণা।</p>
<p>এ প্রেক্ষিতে ইউরোপের অবস্থানকে যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই, এসকল যুদ্ধ বা ক্ষমতার মাধ্যমে মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা যায়। কিন্তু, মানুষ এতে তাঁর রূহকেই হারিয়ে ফেলে। মানুষ তাঁর সত্যিকারের শান্তি কখনোই খুঁজে পায় না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আজকের ইউরোপ। পরবর্তীতে তারা এ নীতি থেকে সরে আসে। কেননা, এরূপ সর্বময় কর্তৃত্বশীল সাম্রাজ্য বা সভ্যতার পতন ঘটা অনিবার্য। ব্রিটেন ও ফ্রান্স একসময় এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলো। পরবর্তীতে, আমেরিকা ভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে আমেরিকা আগে পরিবেশ তৈরি করে, পরে তাদের চিন্তা ও আইডিওলজি পুশ করে; শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতি, মিডিয়ার মাধ্যমে।</p>
<p>বর্তমান ইউরোপ হেগেলের ডায়েলেক্টিকবাদকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের এমন ফিকহ, সমাজতত্ত্বকে আমরা আমাদের উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলগুলো থেকে হারিয়ে ফেলেছি, যার ফলে ফিকহের মৌলিক পরিভাষাগুলো অনুপস্থিত। যার কারণে যেকোনো অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রথা বা উরফকেই আমরা ইসলাম ভাবতে শুরু করি, ইসলামের মৌলিক কিছু হিসেবে মান্য করা শুরু করি। যেকোনো অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রথা বা উরফকেই ইসলামের মানদণ্ড মনে করে পয়গম্বর (স) এর সুন্নত হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করি। এর মাধ্যমে বরং আরো বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব ছিলো, মৌলিক উৎসসমূহ ব্যবহার করে সামাজিক আচরণ তথা স্যোশাল বিহেভিয়ারকে বিশ্লেষণ করা। যেহেতু এই সোশ্যাল বিহেভিয়ার ব্রিটিশ ও হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের আদলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, তাই এর পরিবর্তে সেখানে নতুন প্রস্তাবনা দেয়া আমাদের বড় একটা দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু, আমরা সেটা করতে পারিনি। ফলে দুর্খায়েম, অগাস্ট কোঁৎ ও ম্যাক্স ওয়েবারের সমাজ-বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আমাদের উপর এমনভাবে চাপিয়ে রেখেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই আমরা একে মূল সমাজবিজ্ঞান মনে করে থাকি। যার ফলে মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে মুসলিমদের অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত, মুসলিমদের জীবনকে সজ্জিত করবে, কিংবা তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে; এমন কোনো সমাজবিজ্ঞান আমরা দাঁড় করাতে পারি না, দাঁড় করাতে দেয়া হয় না।</p>
<p>মাদ্রাসা শিক্ষা হোক, বা যেকোনো শিক্ষাই হোক, এ কাঠামোগুলিকে সাম্রাজ্যবাদীরা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, সেখান থেকে এধরণের সোশিওলজি দাঁড় করানো এককথায় অসম্ভব। ফলশ্রুতিতে আমরা আমাদের মূল উসূলুদ্দীন ও আমাদের ফিকহকে বাদ দিয়ে যখন সমাধান করতে যাই, তখন ঘুরেফিরে পাশ্চাত্যের মূলনীতির মধ্যেই আবদ্ধ হই।</p>
<p>অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা কিংবা আগ্রাসন চালানোর মতো কাজগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে বসে করলেও, কিংবা কমনওয়েলথের নাম দিয়ে করলেও, দিনশেষে এটা একটি উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া হিসেবেই ফাংশন করছে, যে ক্ষমতা দিয়ে মানুষেরে চিন্তা ও জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আর এর ভয়াবহতা হলো, আমাদের আখলাকী সংকট, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, রাজনীতির ক্ষেত্রে ভয়াবহ ক্রাইসিস; সর্বোপরি, আমরা আমাদের সোশিওলজি দাঁড় করাতে পারি না।</p>
<p>এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, জ্ঞানকে স্বাধীন রাখতে না পারা। জ্ঞান রাজনীতিকরণের হাতিয়ারে পরিণত হওয়া। পাশাপাশি, আমাদের জ্ঞান ও চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হওয়া। ফলশ্রুতিতে, আমরা পশ্চিমাদের তৈরিকৃত চিন্তাকাঠামোর বাহিরে কিছু ভাবতেই পারি না। আমাদের জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে এটাই মূলধারায় পরিণত হয়েছে। এর বাহিরে আমরা নতুন কিছু চিন্তা করতে পারি না, নতুন কিছু সৃষ্টিও করতে পারি না।</p>
<p>যেমন, ইমানুয়েল কান্ট এক্ষেত্রে প্রশ্ন রেখেছিলেন, আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বলে কোনকিছুর আদৌ অস্তিত্ব আছে কি-না। নাকি সবকিছুই সমাজ নির্ধারিত মানদণ্ডের ছাঁচে গঠন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে, কান্টের কথাকে আমরা বর্তমান সভ্যতার প্রেক্ষিতে এভাবে তুলে ধরতে পারি যে, মানুষের ব্যক্তিগত রুচি, সামাজিক স্ট্যান্ডার্ড, ধর্মতাত্ত্বিক প্রথা, অথবা দেশীর সংস্কৃতি-কে একটি নির্দিষ্ট চিন্তাকাঠামোর আলোকে আমরা পরখ করি। কেননা, আমাদের ব্যক্তিগত রুচি থেকে শুরু করে দেশীয় সংস্কৃতির সবটাই পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক নিগড়ে বন্দী। ফলশ্রুতিতে, পাশ্চাত্যের তৈরিকৃত কোনোকিছুর বাহিরে আমরা স্বকীয় কিছু ভাবতে সক্ষম নই!<br />
<a href="https://www.facebook.com/maktabprokashon" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 710px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/hasan-vai-1.jpg" height="117" /></a></p>
<p>জ্ঞানের এই শক্তি ব্যবহার করে তারা তাহলে আমাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে? তিনটি ক্ষেত্রকে ব্যবহার করে পাশ্চাত্য মূলত জ্ঞানের ক্ষেত্রে এরকম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।<br />
ক) মিডিয়া<br />
খ) একাডেমিয়া<br />
গ) সংস্কৃতি<br />
এক্ষেত্রে একাডেমিয়াতে ‘জ্ঞান’ উৎপাদন হয়, মিডিয়ার মাধ্যমে তা ছড়ানো হয় এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে তা সকল মানুষকে প্রভাবিত করে। জ্ঞানের লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া কিংবা জ্ঞানদর্শন বা জ্ঞানতত্ত্বের কাঠামো আগাগোড়া বদলে যাওয়ার ঘটনা হুট করে ঘটেনি। এক্ষেত্রে এবিষয়টিকে একইসাথে অনেক বড় একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।</p>
<p>আজকেও আমরা তাকিয়ে দেখি যে, যারা আগের পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করছে, তাদের মধ্য থেকে জ্ঞানের এই মর্যাদা এখনো সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়নি। আমরা যদি অতীতের মাদরাসা-সমূহ কিংবা শিক্ষাকেন্দ্র-সমূহের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষকের আলাদা একটি মর্যাদা রয়েছে। এই সকল শিক্ষাকেন্দ্রে কেউ একথা বলে না বা লজ্জার কারণে বলতে পারে না যে, আমি অর্থ আয়ের জন্য জ্ঞান অর্জন করছি।</p>
<p>কিন্তু আজ বেকনের জ্ঞান দর্শনের আলোকে যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেই ব্যবস্থা এই চিন্তাধারাকে অনেক আগেই বিদায় জানিয়েছে। পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলা হয়েছে পুঁজিবাদের উপর ভিত্তি করে, জ্ঞান যেখানে পুঁজির উপর প্রতিষ্ঠিত। আলী শরীয়তীর ভাষায় বলতে গেলে, “জ্ঞান ও অর্থ আজ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, যেখানে অর্থ হচ্ছে স্বামী আর জ্ঞান যেনো তার স্ত্রী।”</p>
<p>আজ যারা শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো, সুখী একটি জীবন যাপন করা এবং ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। আজকের শিক্ষাব্যবস্থাকে তুলনা করা যায় বাজার আর ব্যবসায়ীর মধ্যকার সম্পর্কের মতো করে। কারণ, উভয়ের লক্ষ্যই হলো- অর্থ উপার্জন। শিক্ষকদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। তারা জ্ঞান বিতরণের বদলে অর্থ উপার্জনকেই প্রাধান্য দেয়। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মনে তাদের প্রতি না আছে কোনো ভালোবাসা, না আছে কোনো শ্রদ্ধাবোধ।</p>
<p>এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কি? আমাদের সবচেয়ে বড় করণীয় হলো, ইসলামী সভ্যতার মূলনীতির আলোকে হাকীকতমুখী জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালানো। এবং শিক্ষাকাঠামো ও বৈশ্বিকভাবে বিদ্যমান জ্ঞানদর্শনের বিপরীতে হাকীকত, মাআরেফতের আলোকে নতুনভাবে একটি জ্ঞানের আন্দোলনের সূচনা করা।</p>
<p>মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, ইসমাঈল রাজী আল ফারুকী, ড. হামীদুল্লাহ এবং সাইয়্যেদ নকীব আল আত্তাসদের পথ ধরে পুনরায় একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক আন্দোলনের জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া ছাড়া জ্ঞানকে স্বাধীন ও হাকীকতমুখী করার আর অন্য কোনো পন্থা নেই।</p>
<p>তথ্যসূত্রঃ<br />
আলী শরীয়তির আধুনিকতা সংক্রান্ত আলোচনা<br />
The Political use of knowledge in the policy process, Falk Davitar</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/freedom-of-knowledge-capitalist-pedagogy-in-context/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7664</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শিক্ষা (জ্ঞান ও আখলাক) আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণে শাহীদ ইনসান হিসেবে আমাদের করণীয়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/shiksha-andoloner-vitti-nirmane-shahid-insan-hisebe-amader-koronio/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/shiksha-andoloner-vitti-nirmane-shahid-insan-hisebe-amader-koronio/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 04 Nov 2022 07:30:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7525</guid>

					<description><![CDATA[প্রতিটি সৃষ্টিকেই মহান আল্লাহ কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা ফিতরাত দিয়েছেন। এ অনুসারে মানুষেরও ফিতরাত রয়েছে। যেমন– মানুষ ক্ষুধা লাগলে খাবার খায়, ঘুম পেলে ঘুমায়, আবার জাগ্রত হয় ৷ একইভাবে মানুষের ফিতরাত হলো সে জানতে চায়, সে অন্বেষী হয়ে জানে ও]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">প্রতিটি সৃষ্টিকেই মহান আল্লাহ কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা ফিতরাত দিয়েছেন। এ অনুসারে মানুষেরও ফিতরাত রয়েছে। যেমন– মানুষ ক্ষুধা লাগলে খাবার খায়, ঘুম পেলে ঘুমায়, আবার জাগ্রত হয় ৷ একইভাবে মানুষের ফিতরাত হলো সে জানতে চায়, সে অন্বেষী হয়ে জানে ও শুনে। এটি মানুষের খুব সাধারণ একটি ফিতরাত। কিন্তু গত কয়েকশো বছরে সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাব্যবস্থার আগ্রাসন এবং মুসলমানদের ব্যর্থতার দরুণ আমরা জ্ঞানকে সেভাবে তুলে ধরতে পারছি না। ফলশ্রুতিতে মানুষ জানার সুযোগও পাচ্ছে না। এই আগ্রাসন জ্ঞানকে পুজিঁর স্বার্থে বা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করায় জ্ঞান তার সত্যিকারের রূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছে না।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">একইভাবে বর্তমান শিক্ষা কাঠামো আমাদেরকে কোম্পানির দাস বা তাদের সিস্টেমের গোলাম হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। সেই লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে দিয়ে কিছু তথ্য বা অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে জ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে, ফলে জ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়। আর এ কারণে ফিতরাত থাকা সত্ত্বেও মানুষ এ বৈশিষ্ট্যকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছে না।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে যে বিষয়টি আমাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে, তা হলো পৃথিবীর ইতিহাসে ইসলামী সভ্যতাই একমাত্র সভ্যতা যা জ্ঞানার্জনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এবং জ্ঞানার্জনের পরেই মানুষের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা তথা খাদ্য, বাসস্থান এবং অর্থনৈতিক মুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ সকল বিষয়ে এত গুরুত্বারোপ করার কারণে প্রতিটি যুগেই মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলো।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">ইসলামী সভ্যতাই জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করেছে। ফলে শুধু মুসলমানরাই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বা জাতিগোষ্ঠীও এর দ্বারা উপকৃত হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহ ইসলামী সভ্যতাকে জ্ঞানভিত্তিক একটি সভ্যতা হিসেবে মানুষের সামনে হাজির করতে পেরেছে।</div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<blockquote>
<div dir="auto">আমরা যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিকালের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো যে, বর্তমানে দুইটি সভ্যতা বিদ্যমান।</div>
<div dir="auto">&#8211; পাশ্চাত্য সভ্যতা</div>
<div dir="auto">&#8211; ইসলামী সভ্যতা।</div>
</blockquote>
<div dir="auto">পাশ্চাত্য সভ্যতা তার শক্তি বলয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং পরিচালনাকারী শক্তি হিসেবে তারা তাদের চিন্তাধারাকে সকল স্তরে প্রয়োগ করছে। ফলশ্রুতিতে তাদের আইডিওলজি বর্তমানের ক্ষমতাসীন আইডিওলজি এবং এটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী আইডিওলজি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আর এ আইডিওলজি জ্ঞানকে ব্যবহার করে শোষণ ও ক্ষমতার জন্য, এ জ্ঞান দর্শনের ডায়লগই হলো knowledge is power, অর্থাৎ জ্ঞানের মধ্য দিয়ে তারা শক্তি অর্জন করবে ও মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে। অপরদিকে মুসলমানদের জ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো হাকীকত অন্বেষণ, আমানতের সংরক্ষণ এবং মানব সভ্যতার কল্যাণ। সুতরাং স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে, ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজস্ব জ্ঞান দর্শনকে নিজেদের স্বার্থ বা পুজিঁবাদী আগ্রাসন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে৷ ফলশ্রুতিতে মানুষ পাশ্চাত্যের শিক্ষা কাঠামো থেকে কথিত জ্ঞানার্জন করলেও তাদের তৈরিকৃত সিস্টেমের গোলাম হিসেবে বা কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে নিজেদের তৈরি করা ব্যতীত ভিন্ন কিছু অর্জন করতে পারে না। তাদের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যই যেন মুখলেস ও আন্তরিক দাস হয়ে, আধুনিক কোম্পানির কর্মচারী হয়ে সুন্দর ফ্ল্যাটে বসবাস করা। এর ফলাফল স্বরূপ মুসলমানরা ভুলেই গিয়েছে যে, জ্ঞান দিয়েই আসমানী কিতাব কোরআনের যাত্রা শুরু হয়েছে, আল্লাহর রাসূল (স) জ্ঞান দিয়েই মানবতার মুক্তি সংগ্রামের সূচনা করেছেন, আল্লাহ পাক আমাদের শিখিয়েছেন কোরআনের সবচেয়ে ওজনদার দোয়া “রাব্বি যিদনি ইলমা”। এ সবকিছুর মর্মার্থ আমরা মুসলমানরা ভুলে গিয়েছি। সব মানুষ তার স্বাভাবিক ফিতরাত হিসেবেই, জ্ঞান অর্জন করতে চাইছে তথা জানতে চাইছে, মুসলমানদের আবেগ সেই জ্ঞানের দিকেই বারবার ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু এ আবেগকে আমরা বাস্তবে রূপ দান করতে পারছি না। এটি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">একইসাথে যদি লক্ষ্য করি, মুসলিম উম্মাহর সদস্য প্রায় ২০০ কোটি, যা পৃথিবীর জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে, যে ৩০ শতাংশ সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন না করলে গোটা মানব সভ্যতা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, ৪০০ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকালেই যা বুঝা যায়। এজন্য সর্বপ্রথম আমাদের দায়িত্ব ছিলো মুসলমান হিসেবে, শাহীদ ইনসান হিসেবে ইসলামকে, সত্যিকারের জ্ঞান দর্শনকে বিশ্ববাসীর সামনে, মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরা। কারণ মুসলমানদের অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই হলো শাহীদ উম্মাহ হিসেবে মানুষের সামনে এই সত্যকে তুলে ধরবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto" style="text-align: center;"><em>প্রশ্ন আসে, “কেন আমরা পারছি না?” বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি যুবকদের অধিকাংশের মধ্যেই যে সংশয়টি বিরাজ করছে, তা হলো এ চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, জ্ঞানচর্চা কি আদৌ মানুষ গ্রহণ করবে? আদৌ কি মানুষের কাছে তা পৌঁছাবে? কী হবে এসব চর্চা আর প্রচেষ্টা দিয়ে?</em></div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এর মানে হলো আমরা ভুলেই গিয়েছি যে, এটি মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাত। ভুলে যাওয়ার কারণ কী? কারণ আমাদের কাছে জ্ঞানার্জনকে চাপিয়ে দেওয়া বস্তুবাদী গাধার বোঝার মতো মনে হয়, আর সার্টিফিকেট অর্জনকেই জ্ঞানের সফলতা, জীবনের স্বার্থকতা মনে হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">মুসলিম উম্মাহর সদস্য হিসেবে আমাদের মনে রাখা আবশ্যক যে, এ সকল চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, জ্ঞান চর্চা সরাসরি মানুষের ফিতরাতের সাথে সম্পৃক্ত। আমরা যদি এটিকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মানুষ তা গ্রহণ করবেই। এছাড়া ভিন্ন কোনো পথ মানুষের সামনে খোলা নেই।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">দ্বিতীয়ত, জ্ঞান ও চিন্তার নিজস্ব ডানা রয়েছে। এ ডানা মূলত মানুষকে মুক্তির দিকে ধাবিত করে। বর্তমান মানবসভ্যতা একটুখানি মুক্তির জন্য হাহাকার করছে। সুতরাং আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে আমাদের চিন্তা-বিশ্বাসকে আমলী ও নাজারী দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে পারি, তাহলে অবশ্যই মানুষ তা গ্রহণ করবে। আর এটি তুলে ধরা মুসলমানদের দায়িত্ব। এ সময়ে শাহীদ ইনসান হিসেবে এ দায়িত্ব আমাদেরই। কারণ আজকের বাংলাদেশের দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাই, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অস্থিরতা, কর্তৃত্ববাদীতা, শোষণ, জুলুম, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংঘাত, মানবাধিকার লংঘন, নারীদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা, পাশ্চাত্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীলতা– এভাবে প্রতিটি মানবিক সমস্যার সারনির্যাস আমাদের সামনে বিদ্যমান। এ সকল সমস্যা থেকে মুক্তির অন্যতম ওসিলা হলো জ্ঞানতাত্ত্বিক সচেতনতা। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সচেতনতাই আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার দিকে ধাবিত করবে। আমরা যদি জ্ঞানকে সেই অর্থে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মানুষও তা গ্রহণ করবেই।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এরপর যে আলোচনাটি আমাদের সামনে আসে, তা হলো আমাকেই কেন করতে হবে? এর সবচেয়ে বড় জবাব হলো একজন মুসলমান হিসেবে এ যুগে খেলাফতের দায়িত্ব পালনের কাজ আমাকেও শুরু করতে হবে, মুক্তির আওয়াজ আমাকেও তুলতে হবে। কেননা প্রতিটি যুগেই কেউ না কেউ এই আওয়াজ তুলে ধরেন, আযান দিয়ে যান। কোনো না কোনো গ্ৰুপ এজন্য সংগ্ৰাম করে যায়। আমরাও যদি বর্তমান যুগের প্রেক্ষিতে ব্যক্তি হিসেবে কিংবা জনগোষ্ঠীর সন্তান হিসেবে নিজেদের সে অর্থে তুলে ধরতে পারি, তাহলে এটিই আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। এজন্য আল্লামা রাগেব ইস্পাহানি বলেছেন, “আমরা যদি দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী হতে চাই এবং পৃথিবী বিনির্মাণ করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে এ দায়িত্বটি পালন করতেই হবে। এবং মুসলমান হওয়ার কারণে আমরাই এ দায়িত্ব পালন করবো, পালন করে যাচ্ছি।” তাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেকে এ সংগ্ৰামের দিকে ধাবিত করা আমাদের আবশ্যকীয় কর্তব্য।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এরপর প্রশ্ন আসবে, এত বিশাল সংকট, দারিদ্র<span class="xxymvpz xgzva0m xat24cr xhhsvwb xdj266r x1fcty0u x1j61x8r x3nfvp2">‍</span>্য, বঞ্চনা, জুলুম-শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে উত্তরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়ে এক সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন করার জন্য আসলেই আমাদের অবস্থান থেকে কী কী করা প্রয়োজন? এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর জবাব হলো–</div>
<div dir="auto"><em>&#8211; ইসলামী সভ্যতার চৌদ্দশো বছরের ইতিহাসকে ধারণ করে, সে মুকতাসাব আকলকে সামনে রেখে এ সকল সংকটের চ্যালেঞ্জ গ্ৰহণ করতে হবে।</em></div>
<div dir="auto"><em>&#8211; শত্রুর সাজে সজ্জিত হতে হবে (অর্থাৎ শত্রুর সকল কর্মপরিকল্পনা বুঝে তার আক্রমণ মোকাবেলা করার ও বিজয়ী হওয়ার শক্তি অর্জন করতে হবে), তাদের বিপরীতে সবোর্চ্চ কার্যকরী শক্তি অর্জন করে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নতুন এক জাতিসত্ত্বার বিকাশ ঘটাতে হবে।</em></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><em>তাই চিন্তাগত দিক থেকে আমাদেরকে যে বিষয়টি সব সময় স্মরণ রাখতে হবে, তা হলো আমাদের আইডিওলজিক্যাল দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের মদদপুষ্ট বিভিন্ন চিন্তাধারা ইসলামের দুটি বিষয়ের উপর চরমভাবে আক্রমণ করেছে। বিষয়গুলো হলো–</em></div>
<div dir="auto"><em>&#8212; তরিকত বা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা</em></div>
<div dir="auto"><em>– ফিকহ</em></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এই দুটি বিষয়ে আক্রমণ করার ফলে আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক রূহকে যেমন হারিয়ে ফেলেছি, তেমনি আমাদের ব্যবস্থাগত সংকট মোকাবেলা করার অস্ত্রও হারিয়ে ফেলেছি।</div>
<div dir="auto">সেটি‌ কীভাবে?</div>
<div dir="auto"><strong>প্রথমত তরিকত বা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা-</strong></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">প্রথমত তরিকত বা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গে আসা যাক। আমরা যদি আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাই, যেমন– আলজেরিয়া, সেখানে ফ্রান্সের শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ কারা গড়ে তুলেছিলো? সূফীগণ, খানকাভিত্তিক আন্দোলনসমূহ। রাষ্ট্রব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে চলে যাওয়ার পরে সংগঠিত শক্তি হিসেবে এ আধ্যাত্মিক আন্দোলনগুলো, তরিকতপন্থী সূফী ও আলেমগণ মুক্তির সংগ্ৰামের নেতৃত্ব দিয়েছেন, এ সংগ্রামের বার্তা তুলে ধরেছেন।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এভাবে প্রতিটি অঞ্চলেই এর নজির দেখতে পাওয়া যায়। তাই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এ আধ্যাত্মিক খানকা, দরগাহগুলোর বিরুদ্ধে নিউ সালাফিজমের মাধ্যমে, ওহাবিজমের মাধ্যমে সর্বপ্রথম ফতোয়া দেয় এবং এটিকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করে। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে তারা খুব ভালোভাবেই এক্ষেত্রে সফলতা পেয়েছে। নানাবিধ প্রচারণার মাধ্যমে তরিকতের ব্যাপারগুলোকে সব সময়ই নেতিবাচক, হারাম, কুসংস্কার ও বিদআতের অর্থে যুবশ্রেণির সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। হ্যাঁ! বর্তমানে হাকীকতপন্থী তরিকত, দরগা, খানকার খুব অভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এ জাতীয় নেতিবাচক প্রোপাগান্ডার কারণে আমরা আধ্যাত্মিকতা, হাকীকতপন্থী তরিকত, খানকা ও দরগাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি রূহবিহীন কাঠখোট্টা ধর্ম চর্চার দিকে ধাবিত হয়েছি।‌</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto"><strong>দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় হলো ফিকহ-</strong></div>
<div dir="auto">ফিকহের উপর এত আক্রমণ কেন হলো? কারণ আমাদের সভ্যতার সবকিছু ফিকহ নির্ভর। আমাদের কাছে যদি জীবন্ত একটি ফিকহ থাকে, তবে ব্রিটিশরা, ফরাসিরা কিংবা সাম্রাজ্যবাদী কোনো শক্তিই তাদের জুলুম, শোষণ দীর্ঘস্থায়ী করতে পারবে না। ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি যদি সচল থাকে, তারা কখনোই পূঁজিবাদী আগ্রাসনকে মানবতার সামনে নিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের অর্থনীতির সাথে সমাজতত্ত্বকে যদি আমরা ভালোভাবে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে তাদের চাপিয়ে দেওয়া সোশিওলজি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য হতে পারবে না, রাজনীতির মাইলফলক হতে পারবে না, এটি অসম্ভব। তাই তারা ফিকহকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রসহ সকল ক্ষেত্রে ফিকহকে অপ্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। এক্ষেত্রেও সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে তাদেরই মদদপুষ্ট নিউ সালাফিজম। তারা বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি উম্মাহর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে পর্যন্ত তারা অস্বীকার করেছে। যেমন– ইলমুল কালাম তো ভ্রান্ত জ্ঞান! দর্শন বলতে ইসলামে কিছু নেই! হাদীস থাকতে ফিকহের কেন প্রয়োজন! এভাবেই তারা ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মিরাসগুলোকে অস্বীকার করে, নব্য বিতর্কের জন্ম দিয়ে মুসলমানদেরকে ভিন্ন ব্যস্ততার দিকে ধাবিত করছে। যার ফলে পাশ্চাত্যের কঠিন চ্যালেঞ্জ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ মোকাবেলার পরিবর্তে আমাদের অভ্যন্তরীণ ধর্ম ও জ্ঞান চর্চাকেই আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এ প্রেক্ষাপট কি শুধু পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে বিরাজমান? না, এ প্রেক্ষাপট আমাদের বাংলাদেশেও বিদ্যমান। অধিকাংশ তরুণ কিংবা বিভিন্ন জ্ঞানের ধারা, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্দোলনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো, তারা তাসাউফ, আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রগুলো জানে না, ফিকহকে ভালোভাবে উপলব্ধি করে এর সামগ্ৰীকতা নিয়ে চর্চা করে না, এমনকি বড় অংশ তাসাউফ ও ফিকহকে শত্রু মনে করে, অপ্রয়োজনীয় মনে করে। তারা ফিকহের কিছু খন্ডিত অংশ পাঠ করে ফিকহকে জটিল একটি দূর্বোধ্য জ্ঞানতত্ত্ব হিসেবে লাইব্রেরীতে তুলে রাখে। এসবের মাধ্যমে যে আমরা ভয়াবহ অপরাজনীতির শিকার হচ্ছি, তা আমরা আজও উপলব্ধি করতে পারছি না।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এ দুটি বিষয়ের সাথে আরেকটি তৃতীয় বিষয় ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যখন আধ্যাত্মিকতা এবং ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মিরাস ও সম্পদ ফিকহকে আমরা দূরে ঠেলে দিচ্ছি, তখন খুব সহজেই ওরিয়েন্টালিস্টদের মদদপুষ্ট ইতিহাসবিদরা আমাদেরকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে। অন্যসব অঞ্চলের মতো বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরাও ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে। আমাদের লেখকগণ, পাশ্চাত্যপন্থী শিক্ষাবিদগণ রাষ্ট্রব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জাতিকে ইতিহাসবিহীন জাতি হিসেবে উপস্থাপন করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আমাদের বারোশো বছরের সোনালী সভ্যতাকে, বাংলা অঞ্চলের পাঁচশো বছরের সালতানাতকে সাধারণ একটি ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা রাষ্ট্রীয় কিছু দ্বন্দ্ব নির্ভর একটি গতানুগতিক সাধারণ ইতিহাসে রূপান্তরিত করেছে, বয়ান সৃষ্টি করেছে। এগুলোর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে আত্মবিশ্বাসী করতে তো পারছিই না, বরং হীনম্মন্যতায় ডুবে যাচ্ছি। অথচ এ সভ্যতা আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এ প্রতীক যদি সামনে না রাখি, সেভাবে যদি ইতিহাসের মেলবন্ধন তৈরি করতে না পারি, তাহলে কখনোই বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">উপরোক্ত পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মূলত যে বিষয়টি আমরা আলোচনা করতে চাই, তা হলো- এ সকল সংকট আমাদের সবচেয়ে ভয়াবহ একটি সংকটের দিকে ধাবিত করেছে। এ সংকট হলো আমাদের সভ্যতার অন্তর্দ্বন্দ্ব। সভ্যতার অন্তর্দ্বন্দ্ব এ মুহূর্তে আমাদের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">• বিশ্বব্যাপী যে ইসলামী আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিলো, বর্তমানে সেগুলো এক ভয়াবহ পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। তাদের দেখানো ভিশনকে যুব সমাজের কাছে আস্থাহীন করে রাখা হয়েছে। নানাবিধ মতভেদ, ভাঙ্গন, ইসলামপন্থীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইসলামী ধারাসমূহের একে অপরকে ঘায়েল করে দেওয়ার মানসিকতা ইত্যাদি যুব সমাজের সামনে ইসলামের ভিশনকে আস্থাহীন করে তুলেছে।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">ফলশ্রুতিতে, এ প্রতিটি ধারাই আজ মৃত দেহের মতো পড়ে আছে। দেহের সবই আছে কিন্তু রূহ নেই। এ ভয়াবহ পরিস্থিতে আমরা ভালোভাবেই উপলব্ধি পারছি যে, মুসলমানদেরকে যদি এ রূপ বিভাজন থেকে বের করে নিয়ে এসে জ্ঞানগত বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করা না যায়, তাহলে কখনোই মুক্তি সম্ভব নয়। ঠিক একইভাবে এ সভ্যতার অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে আসতে পারে দুটি মাত্র উপায় রয়েছে।</div>
<div dir="auto">&#8211; আমাদের বিশ্বাস</div>
<div dir="auto">&#8211; আমাদের জ্ঞানগত সম্পদসমূহ</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আমাদের বিশ্বাস তথা ঈমানী ঐক্য সকলের মধ্যে রয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। তাই জ্ঞানগত বিষয়সমূহ নিয়ে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, অন্য কোনো বিষয় দ্বারা ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। এটি ছাড়া আমরা সর্বোচ্চ একে অন্যকে শত্রু বানিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে পারবো, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি কোনো বন্ধন সৃষ্টি করতে পারবো না। আর দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধন সৃষ্টি করতে হলে হাকীকত অন্বেষী জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই তা দাঁড় করাতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, এ জ্ঞান কোন জ্ঞান? এ জ্ঞান হলো ইসলামের জ্ঞানের শাখাসমূহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উসূল এবং মাকাসিদ। প্রশ্ন আসতে পারে উসূল কেন প্রয়োজন? এর জবাব হলো উসূলের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহীর আলোকে আল্লাহ ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সাথে পৃথিবী ও প্রকৃতির সম্পর্ক ইত্যাদিসহ সমাজের সকল সমস্যা, কর্মসূচি এবং প্রত্যেকটি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি ও ব্যাখ্যা। সে আলোকে যদি আমরা মূল মিহওয়ারে ফিরে আসতে পারি, তাহলে অবশ্যই এ জ্ঞান আমাদেরকে ঐক্যের দিকে, মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ফিকহকে নতুন করে বিনির্মাণ। কেননা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এ কাঠামো মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে এ বিশ্বব্যবস্থা অন্টোলজিক্যালি, এপিস্টোমোলজিক্যালি ইসলামের সাথে ফাংশনাল নয়। তাই আমরা যদি ফিকহকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করতে পারি, ফিকহকে উসূল এবং মাকাসিদের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে ইসলামী সভ্যতা ইতিহাসের নানা সংকটের মধ্যেও যেভাবে পুনর্জাগরিত হয়েছিলো, একইভাবে বর্তমান সময়েও আমাদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে আমরা রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে আবার নতুন প্রস্তাবনা হাজির করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">এরপর গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো আমরা, বর্তমান সময়ের মুসলমানরা নানাবিধ অভিযোগ ও বিতর্কের উপর ভিত্তি করে ইসলামকে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, اعتراض বা অভিযোগের উপর ভিত্তি করে কখনো নিজেদের অস্তিত্ব দাঁড় করানো যায় না। নিজেদের অস্তিত্ব যদি দাঁড় করাতে চাই, তাহলে অবশ্যই তাকলিফ তথা প্রস্তাবনা নিয়ে আসতে হবে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">কিন্তু আমরা কীভাবে ইসলাম চর্চা করছি? পাশ্চাত্যের নারীবাদ যখন আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন আমরা আমাদের ইসলামের নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলছি। পুঁজিবাদী সভ্যতা যখন নানাভাবে আমাদের শোষণ করছে, তখন ইসলামী অর্থব্যবস্থার কিছুদিক নিয়ে আমরা ডিফেন্স করছি। অথচ আমাদের ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির স্বতন্ত্র প্রস্তাবনা রয়েছে, নারীদের ব্যাপারে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা রয়েছে, রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিজীবন সর্বস্তরে আদালতের প্রস্তাবনা রয়েছে, সমাজ সংস্কৃতির ব্যাপারে ইসলামের প্রস্তাবনাও সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু সেগুলোকে আমরা বর্তমান সময়ের আলোকে তুলে ধরতে পারছি না। অথচ এ সকল প্রস্তাবনা ব্যতিত কখনোই মুক্তি আনয়ন সম্ভব নয়, যার নজির রয়েছে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সেই বাদশা নাজ্জাশির সামনে জাফর বিন আবু তালিবের প্রস্তাবনা, পারস্য সম্রাটের সামনে মুসলিম সেনাপতির প্রস্তাবনা, এভাবে প্রতিটি প্রস্তাবনার শিক্ষাকে হাজির করার মধ্য দিয়ে জাতির রূহকে উপলব্ধি করে এবং কারো বিরোধিতা কিংবা বিতর্কের জন্য নয়, বরং হক্ব বা হাকীকত হিসেবে জ্ঞানকে তুলে ধরার জন্য আমরা তাকলিফ করবো। তখন অবশ্যই সে জ্ঞান মানুষের গ্ৰহণ উপযোগী হিসেবেই জাতির সামনে উপস্থাপিত হবে‌। মানুষ তখন তার ফিতরাতের আলোকেই এ বিষয়গুলোকে গ্ৰহণ করতে থাকবে। এটিই প্রাকৃতিক ব্যাপার।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">তাই আমাদের অন্যতম ইশতেহার হলো- দ্বীনে মুবিন ইসলামের মৌলিক চিন্তাসমূহকে কীভাবে যুবসমাজের চিন্তায় রূপ দেওয়া যায়, কীভাবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাকাঠামো, শিক্ষাপদ্ধতি ও বিভিন্ন ধারার শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামী চিন্তা-দর্শনকে, ১৪০০ বছরের মূল চিন্তাধারাকে জাতির মূল চিন্তায় পরিণত করা যায়।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">আর এ ইশতেহারকে বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে যে বিষয়গুলো সামনে রাখতে হবে–</div>
<div dir="auto">১. ব্যক্তির অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জন ও ত্যাগের অন্যতম উপমা হিসেবে জাতির সামনে, পরবর্তী প্রজন্মের সামনে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হলেন প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও আখলাকবিদ নুরুদ্দিন তুপচে, যিনি ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আখলাকের উপর পিএইচডি করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার প্রস্তাবনা ফিরিয়ে দিয়ে নিজ দেশে গিয়ে সাধারণ কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। অতঃপর তিনি চিন্তাকে প্রসারিত করাসহ জাতি গঠনের জন্য প্রতি মূহুর্তে কাজ করেছেন, আমৃত্যু এর উপর নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন। ফলশ্রুতিতে জাতির বিকাশে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাকে আখ্যা করা হয়। আমরাও যদি এভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম সেভাবেই গড়ে উঠবে। আর কাজ করলে আল্লাহ বরকত দেন, বরকত দিবেন, ইনশাআল্লাহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">২. জ্ঞান ও আখলাকের আন্দোলনকে খুব ভালোভাবে ধরণ করা এবং সে আলোকেই সকলের সামনে উপস্থাপন করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইমাম আবু হানিফার জ্ঞানের আন্দোলন। সেটি অনেক বড় পরিসরে হয়েছিলো, যা বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে গত কয়েকশো বছরে ভারতীয় উপমহাদেশে বড় বড় অনেক শিক্ষা আন্দোলন এখানেও গড়ে উঠেছে। যেমন– দেওবন্দি আন্দোলন (দেওবন্দি শিক্ষা কাঠামোর মডেল)। একইভাবে আলিগড় শিক্ষা আন্দোলন (যা তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম মডেল ছিলো)। এ শিক্ষা আন্দোলনগুলো শুধুমাত্র শিক্ষা আন্দোলনের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো, কিন্তু এ আন্দোলনগুলো থেকে বের হয়েছেন বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আলেম কিংবা বড় বড় আন্দোলনের কর্ণধার। বর্তমানেও জাতির সামনে তারা তারকার ন্যায় অমলিন হয়ে আছেন। এ ধরনের বহু শিক্ষা মডেল আমাদের সামনে রয়েছে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">আবার একইভাবে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে বড় বড় মক্তব গড়ে উঠেছে, যেমন– ইমাম গাজ্জালী, ইমাম রাযী নিজেই একটি মক্তব। এ সকল ব্যক্তি নিজেরাই একেকটি ধারায় পরিণত হয়েছেন, শিক্ষা আন্দোলনে পরিণত হয়েছেন। যেহেতু একজন ব্যক্তি একটি ধারায় পরিণত হয়েছেন, তাহলে আমরা কেন সম্মিলিতভাবে একটি শিক্ষা আন্দোলন দাঁড় করাতে পারবো না? চেষ্টা করলে আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকেও দিবেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৩. তালকিহুল ফুহুল, অর্থাৎ জ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্রিক যে আন্দোলন আমরা দাড়ঁ করাবো, তার অন্যতম দাবী হলো নিজেরা যোগ্য চিন্তাবিদ হয়ে চিন্তা তৈরি করতে হবে, অর্থাৎ চিন্তা সৃষ্টি করা এবং চিন্তাগুলোকে জাতির মনে গেঁথে দেওয়া, মানুষকে প্রভাবিত করা, সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করা। আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠিত করতে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে ও স্থায়ীত্ব দান করতে এটি অন্যতম দাবি।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৪. দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে ইস্তেকামাতের উপর টিকে থাকা। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের দিবেন এ বিশ্বাস নিয়ে টিকে থাকলে বরকত আসবেই। কখনোই তাড়াহুড়ো করা যাবে না।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৫. আন্দোলনকে জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করা, আর জ্ঞান ও আখলাককে আন্দোলনের কেন্দ্রে স্থাপন করা। এ জ্ঞান হতে হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ বা আটকে থাকা যাবে না, সামগ্রিক ও বৈপরীত্য মুক্ত হতে হবে। হবেও, ইনশাআল্লাহ।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৬. চ্যালেঞ্জ গ্ৰহন করা। উপমহাদেশে গত কয়েকশো বছরে বহু আন্দোলন, শিক্ষা কাঠামো, ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং এগুলোর অধিকাংশই ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাস যদি বার বার আমরা সামনে রাখি, তাহলে হতাশ হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমি ব্যর্থ হবো কি সফল হবো তা এ মুহূর্তের আলোচ্য বিষয় নয়। আমি মুক্তির জন্য পথ চলছি, টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে সংগ্ৰাম করে যাচ্ছি, এটিই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অর্থবহ।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">অনেক প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে অন্যের সহযোগিতা নিয়ে কিংবা পাশ্চাত্যের আদলে, এর কোনোটিই আমরা গ্ৰহন করছি না। আমরা নিজেরাই দাঁড়াবো। এক্ষেত্রে শত্রুর সাজে সজ্জিত হয়ে, জামানার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে যোগ্য সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব হয়ে তাদেরকে মোকাবেলা করে মুক্তির ইশতেহারের কাব্যগাঁথা রচনা করবো– এটিই আমাদের ডায়ালগ হওয়া উচিত।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৭. নানাবিধ ব্যর্থতা, নানাবিধ সামাজিক দৈন্যতা আমাদের সামনে রয়েছে। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা যে, বাংলা অঞ্চলে পূর্বের কাজসমূহে চিন্তাগত যে অপরিপক্কতা ছিলো, যে মানবীয় দূর্বলতা ছিলো, সেগুলোকে পূর্ববর্তীদের দোষ হিসেবে না দেখে সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, সে আলোকে সামনে অগ্ৰসর হওয়াই আমাদের প্রধান কর্তব্য।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">আমরা বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিগত কারণে, নানাবিধ বিষয়ের বদৌলতে বহু নেয়ামত পেয়েছি, এর মধ্যে প্রধান হলো আমরা সময়ের সবচেয়ে উন্নত চিন্তা, চৌদ্দশো বছরের মুকতাসাব জ্ঞানসহ শিক্ষক ও উম্মাহর ভাইদের পাশে পেয়েছি। এ নেয়ামত আল্লাহ সবাইকে দেন না। যেহেতু আল্লাহ আমাদের এ নেয়ামত দিয়েছেন, অতএব আল্লাহ অবশ্যই সহযোগিতা করবেন। আল্লামা ইকবাল, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভিরা যেভাবে ব্যক্তি হিসেবে সারা দুনিয়াকে আন্দোলিত করেছেন, আমরা তাদের সন্তান হিসেবে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ক্ষুদ্র আন্দোলন হিসেবে কেন নূন্যতম অবদান রাখতে পারবো না? আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকেও দিবেন। এক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া নজরনা হলো উমরের (রা.) এর রাষ্ট্র পরিচালনা। তার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বেশি দিনের ছিলো না, কিন্তু দ্বীনের রূহ, মূলনীতি, আখলাক ও রবের রহমতের বদৌলতে সেই উমর (রা.) মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে বিশাল পারস্য অঞ্চল পরিচালনা করছেন, মানবসভ্যতার সামনে এ সভ্যতাকে সবচেয়ে সফল একটি সভ্যতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="x11i5rnm xat24cr x1mh8g0r x1vvkbs xtlvy1s x126k92a">
<div dir="auto">৮. আমরা কাজ করে যাবো। তবে সবাই সামগ্ৰীকভাবে উঠে আসবে এ রকম উচ্চাশাও করা যাবে না। আমাদের চেষ্টা, আমাদের সংগ্ৰাম, আমাদের ইখলাস ও দোয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহ কাউকে না কাউকে উঠিয়ে আনবেন। এটিই স্বাভাবিক। যদি আমরা পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রেও দেখি, তারা ছয়শো বছর যাবৎ ইউরোপের দর্শন চর্চা করছে, এত কাজ করছে, তাদের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আলাদা ডিপার্টমেন্ট রয়েছে, হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক গড়ে তোলার জন্য তারা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গত কয়েকশো বছরে তাদের কতজন দার্শনিক উঠে এসেছে? হাতে গোনা বিশ-ত্রিশ জন দার্শনিক আমরা দেখতে পাই।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সুতরাং এত কাজের মধ্যে দিয়ে যদি তাদের মাত্র বিশ-ত্রিশ জন দার্শনিক উঠে আসে, তাহলে আমরা অল্প কাজ করে বেশি ফলাফল আশা করাটা আমাদের নিজেদের প্রতিই অবিচার করা হবে। এজন্য আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো, কখনো হাল ছেড়ে দিবো না। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের মধ্য থেকে বড় বড় ব্যক্তিত্ব, রাসেখ আলেমদের উঠিয়ে আনবেন। তারাই মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতকে কাজে লাগিয়ে মুক্তির ইশতেহার রচনা করে নতুন এক সভ্যতার সূর্যোদয় ঘটাবেন, ইনশাআল্লাহ।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/shiksha-andoloner-vitti-nirmane-shahid-insan-hisebe-amader-koronio/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7525</post-id>	</item>
		<item>
		<title>চিন্তার সংকট থেকে রাজনৈতিক সংকট; পরিণতি: অস্তিত্বের সংকট</title>
		<link>https://rowyakbd.com/crisis-of-thought-to-political-crisis-the-result-an-existential-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/crisis-of-thought-to-political-crisis-the-result-an-existential-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 26 Aug 2022 09:08:13 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7314</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতার বিখ্যাত দার্শনিক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আল-মাওয়ারদীর তত্ত্বের আলোকে সালাহুদ্দুনিয়া বা সমগ্র বিশ্বে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আদালত সম্পন্ন একটি নিজাম যদি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে দুটি পর্যায়ে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আদালত সমানভাবে থাকতে হবে। ১। বৃহত্তর পর্যায় ২। ক্ষুদ্রতর পর্যায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী সভ্যতার বিখ্যাত দার্শনিক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আল-মাওয়ারদীর তত্ত্বের আলোকে সালাহুদ্দুনিয়া বা সমগ্র বিশ্বে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আদালত সম্পন্ন একটি নিজাম যদি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে দুটি পর্যায়ে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আদালত সমানভাবে থাকতে হবে।<br />
১। বৃহত্তর পর্যায়<br />
২। ক্ষুদ্রতর পর্যায়</p>
<p>আর এ দুটি বিষয় মূলত ছয়টি মূলনীতি বা বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। যথা:<br />
১) الدين المتّبع<br />
২) سلطان قاهر<br />
৩) عدل شامل<br />
৪) أمن عام<br />
৫) خصب دار<br />
৬) أمل فسيح</p>
<p>যেখানে &#8220;الدين المتّبع&#8221; অর্থাৎ এমন একটি দ্বীন সমাজের মধ্যমণি হিসেবে থাকতে হবে, যা অনুসরণযোগ্য।</p>
<p>মূলনীতিগুলোকে &#8216;Normative values&#8217; নামে অনুবাদ করা হয়ে থাকে, অর্থাৎ মানুষ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে এমন একটি বিষয়। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবো, বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলে দ্বীন হিসেবে ইসলামকে সবাই মেনে নিচ্ছে। তারা দ্বীন কতটুকু পালন করছে বা গ্রহণ করছে, তারচেয়েও বড় বিষয় হলো তারা সবাই দ্বীন অনুসুরন করার চেষ্টা করছে, তাদের মাঝে দ্বীন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে মূল আলাপ হল, তা অবশ্যই অনুসরণ যোগ্য হতে হবে, এবং যদি তা অনুসরণ যোগ্য না হয় তবে তা কখনোই দ্বীনুল মুত্তাবাআ হতে পারবেনা।</p>
<p>বাকি মূলনীতিগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে সামগ্রিক আদালত, সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সমাজে মালের প্রাচুর্যতা থাকার ব্যাপারে এবং শেষে বলা হয়েছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তবধর্মী স্বপ্ন থাকার ব্যাপারে, যে স্বপ্ন মানুষের মাঝে ভিশন ও ভবিষ্যৎকে তুলে ধরবে।<br />
এভাবেই আল মাওয়ার্দী তার তত্ত্বটিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এবং এটি বাস্তবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য। যদি মুসলিম উম্মাহ এটিকে গ্রহণ বা যেকোনো জাতি, গোষ্ঠী যদি এটিকে পালন করে তাহলে সেখানে শান্তি, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।</p>
<p>যেমন তিনি সর্বশেষ যে বিষয়টি এনেছেন, তা হলো ‘আমানুন ফাসিহুন’, অর্থাৎ ভবিষ্যত সম্পর্কে বাস্তবিক স্বপ্ন বা জাতিকে ভবিষ্যৎ দেখানোর জন্য তিনি যে গুরুত্বারোপ করেছেন। এই মূলনীতি থেকে শুরু করে অনুসরণ যোগ্য একটি দ্বীনের আলোচনা পর্যন্ত সবগুলি বিষয় একটি জাতির মধ্যে চিন্তাগতভাবে থাকতে হবে অন্যথায় এই বিষয়টির গুরুত্ব আমরা সত্যিকারার্থে কখনোই উপলব্ধি করতে পারবে না।</p>
<p>আর বর্তমান বাংলাদেশে যে সংকট বিদ্যমান, আমরা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি যে, এ সংকট সামগ্রিক রাজনৈতিক সংকট, আদালত ও আখলাকের সংকট।<br />
কিন্তু এ সংকট সৃষ্টির কারণ কী? কিসের ফলাফল স্বরুপ আমরা এ সংকটে নিপতিত?<br />
একটু চিন্তা করলেই আমরা এর উত্তর পেয়ে যাবো।</p>
<p>উপরোক্ত মূলনীতিগত বিষয়গুলো আমাদের চিন্তারাজ্যে হাজির নেই, এগুলো নিয়ে সেই অর্থে কোনো চর্চা নেই, সমাধানকল্পে কোনো বাস্তবধর্মী প্রস্তাবনাও নেই! অর্থাৎ আমাদের মাঝে এক প্রকট চিন্তাগত সংকট বিদ্যমান, যা আমাদেরকে একটি ভয়ানক রাজনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত করেছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসের সাক্ষ্যও বলে দেয়, যুগোপযোগী ও দুরদর্শী চিন্তার সংকট একটি জাতিকে সর্বদাই রাজনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত করে। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই জাতির সামগ্রিক সংকট ‘রাজনৈতিক সংকট’ মোকাবেলার জন্য শক্তিশালী চিন্তা এবং সমাধানযোগ্য প্রস্তাবনা হাজির করতে হবে, ইতিহাসই যার প্রমাণ।</p>
<p>যারা চিন্তাগত সংকট মোকাবেলা করতে পেরেছে, তারাই রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে পেরেছে; যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ মোঙ্গল আক্রমন পরবর্তী সময়ে ইসলামী সভ্যতার জাগরণ, সেলজুক পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের জাগরণ এবং ক্রুসেডারদের আক্রমণ পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের জাগরণ। নিমাজ-উল-মূলক, ইবনে খালদুন, ইমাম গাজ্জালীরা যেভাবে জাতির সামনে সমাধানসূচক মূলনীতি ও ইশতেহার হাজির করেছেন, সে আলোকে পরবর্তীতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের লক্ষ্যপানে পৌঁছানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং জনগণকে ভবিষ্যৎ উপলব্ধি করিয়ে সেদিকে ধাবিত করতে পেরেছেন, যার ফলে সমাধান সম্ভবপর হয়েছিলো। পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি তখনো চিন্তা তৈরি করতে পারেনি, বরং নিজাম-উল-মূলক, ইবনে খালদুনের মতো ব্যক্তিরা ও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোই চিন্তা তৈরি করেছিলো। বর্তমানে ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেই তাদের ন্যায় এগিয়ে আসতে হবে।</p>
<p>একইভাবে আরও একটি বিষয় হলো যখন কোনো জাতি রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে পারে না, ভবিষ্যতের ইশতেহার রচনা করতে পারে না, তখনই তারা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয় এবং ভয়ংকর অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়। এ ব্যাপারে ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দিয়েছে। এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। তাই আমরাও যদি এ সংকট মোকাবেলা করতে না পারি, তাহলে আমরাও একই অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হবো এবং এটিই পৃথিবীর চরম বাস্তবতা।</p>
<p>এজন্য যুগশ্রেষ্ঠ মুজাহিদগণ বলেছিলেন, “যদি তুমি টেবিলের যুদ্ধে হেরে যাও, কলমের যুদ্ধে হেরে যাও এবং নিজেকে রক্ষা করতে না পারো, তাহলে নিশ্চিত থাকো, একদিন তুমি হেলমেট, লৌহ বর্ম পরেও জাতি এবং অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারবে না।” এর দ্বারা আমরা স্পষ্টতই বুঝি যে, জাতির অর্থনীতি, রাজনীতি রক্ষা না হলে গোটা জাতি ভয়ংকর অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত হবে।</p>
<p>এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে, রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা না করলে যে আমরা অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হবো– এটিই আমরা কতটুকু বুঝতে পারছি? হয়তো আমরা সত্যিই বুঝতে পারছি না, কিন্তু আমরা যদি একটু পেছন ফিরে ইতিহাসের দিকে দেখি, যে সময়ে বৃটিশরা আমাদের অঞ্চলে আগমন করছিলো, গোটা বিশ্বে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করছিলো, ইউরোপের কেন্দ্রে বিভিন্ন বিপ্লব সাধন করছিলো, সে সময়ে আমরা মুসলমানরা আমাদের চিন্তার গতিশীলতা হারিয়ে ফেলেছিলাম এবং এখনো স্থবির অবস্থায়ই রয়েছি। আর এ কথা আল্লামা ইকবাল বারবার স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন।</p>
<p>আমরা মুসলমানরা আমাদের চিন্তার গতিশীলতা হারিয়ে ফেলার ফলেই কিন্তু সেই সময়ে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো চিন্তা হাজির করতে পারিনি। ড. আলী শরীয়তির ভাষায়, “মুসলমানরা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কিছু দাঁড় করাতে পারছিলো না বলেই মার্ক্সবাদ বিশ্বব্যাপী জাতির বিবেক হিসেবে অর্বিভূত হতে শুরু করেছিলো।” তখন লেলিলের মতো ব্যক্তিরা বলতে শুরু করেছিলো যে, পুঁজিবাদের শীর্ষবিন্দু হলো সাম্রাজ্যবাদ। আর আমরা সেই সময়ে নিজেদের সভ্যতার যে গতিশীলতা, আদিল যে ব্যবস্থা তা সে অর্থে মানবতার সামনে তুলে ধরতে পারিনি!</p>
<p>যখন ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের দখল করছিলো, তখন আমরা বিতর্ক করছিলাম বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ করবো নাকি তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করবো। সেই সময়ে আমরা হজ্জ করে শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত হলেও অন্যান্য দেশে গিয়ে উচ্চতর প্রযুক্তি তৈরি করতে নিজেদের উজ্জীবিত করতে পারিনি, যুদ্ধ করতে পারিনি। আমরা বুঝতেই পারিনি যে, সময়ের আলোকে যুদ্ধ হবে সে সময়ের সর্বোচ্চ টেকনোলজি দিয়েই। আমরা বুঝতেই পারিনি যে, দারুল হারব, দারুল ইসলামের ব্যাখ্যা ফিকহের দৃষ্টিতে কেমন হওয়া উচিত, এ সকল বিষয়ের পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা কেমন হবে এবং পর্যালোচনা থেকে সুষ্ঠু ইশতেহার কীভাবে প্রদান করতে হবে। আমাদের আলেমদের একটি বড় অংশ তা বুঝতে পারলেও সেভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেননি!</p>
<p>অর্থনীতির ক্ষেত্রে যখন নানাভাবে শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, নানা তত্ত্ব উদ্ভাবন হচ্ছিলো, ইয়াল্টা কনফারেন্সের মাধ্যমে নতুন করে পৃথিবীকে ডিজাইন করা হচ্ছিলো এবং গত ৮০ বছরে পৃথিবীর অর্থনীতি, সংস্কৃতি আমাদের থেকে বিশাল একটি দূরত্বে অবস্থান করছিলো, সেই সময়ে এসেও আমরা বীমা করা হালাল না হারাম, ব্যাংকে টাকা রাখা যাবে কি যাবে না, সিনেমা হালাল নাকি হারাম– এ জাতীয় তর্কে নিমজ্জিত হয়েছি।</p>
<p>জ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই কথা। যখন বৃটেন, জার্মানী, ফ্রান্স বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে আমাদের ইবনে সিনা, গাজ্জালীদের পাঠ পর্যালোচনা করেছে, তখন আমরা নিজেদের জাগরিত করার জন্য ইমাম শাতিবির রেখে যাওয়া “আল মুয়াফাক্কাত”কে অপ্রাসঙ্গিক মনে করেছি, এমনকি এ মনোভাব বিরাজমান ৪০০ বছর ধরে। গত তিন/চারশত বছর যাবৎ আমরা ফিকহ, আখলাকি বয়ানকে নতুন করে হাজির করা এবং সামনে ধাবিত হওয়ার গুরুত্বই উপলব্ধি করে পারিনি!</p>
<p>ফলশ্রুতিতে চিন্তাগত দিক থেকে, রাজনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেক পেছনে পড়তে নিজেরাই নিজেদের বাধ্য করেছি। একইসাথে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে নিজস্ব ভাষা, জ্ঞানগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করেছি এবং হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছি।</p>
<p>দ্বিতীয়ত এ সকল চিন্তা, আখলাক এবং গতিশীলতার মধ্য দিয়েই কিন্তু ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে এবং এ ব্যক্তিত্ব, প্রতিষ্ঠানগুলোই নেতৃত্বের জন্ম দেয়, রাজনৈতিক মুভমেন্টগুলোর ইশতেহার রচনা করে, আর এ আলোকে মুক্তি ও কল্যাণের কর্মসূচি জাতির সামনে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছি; আমরা নেতৃত্ব তৈরি ও ভবিষ্যৎ ইশতেহার রচনা করতে পারিনি। এ কারণেই গত কয়েকশো বছরে আমরা মহান সালতানাতগুলো হারিয়েছি, আমাদের স্বর্ণালী সভ্যতাকে নতুন করে বিনির্মাণ করার স্বপ্ন পর্যন্ত ভুলে গিয়েছি।</p>
<p>উপরোক্ত সংকটের কারণে বর্তমান বাংলাদেশে যে সমাধান দরকার ছিলো, আমরা সেই সমাধান থেকে দূরে অবস্থান করছি! চিন্তাকে বিকশিত না করতে পারার ফলে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমরা আটকে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা স্থবির হয়ে গিয়েছি। আর এই স্থবিরতা জাতিগত অস্তিত্ব সংকটের অন্যতম আলামত।</p>
<p>এরপরে যদি প্রশ্ন করা হয়, বর্তমান সময়ে আমরা কি নিজস্ব চিন্তা দিয়ে, নিজস্ব জাতিসত্তার রূহ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি? বর্তমান সমাজবিজ্ঞান, সংস্কৃতি আদৌ কি আমাদের? সামাজিক নিরাপত্তা কি আছে? রাষ্ট্রীয় সম্পদ কি আমরা রক্ষা করতে পারছি? এ সকল ক্ষেত্রে উত্তর আসবে, “না, আমরা অনেক ক্ষেত্রে ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি।”</p>
<p>আমাদের সমাজ কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, সত্যিকারার্থেই এগুলো নিয়ে চর্চা হচ্ছে কি-না? এর উত্তর পাবার জন্য পত্র-পত্রিকা, স্যোশাল মিডিয়ার দিকে তাকালেই বুঝতে পারব যে কোন সকল বিষয় নিয়ে ব্যস্ত আছি! কি নিয়ে বির্তক হচ্ছে, ভাইরাল নিউজ হচ্ছে!<br />
অথচ নেতৃত্ব তৈরি ও ভবিষ্যৎ ইশতেহার রচনার আলাপ ব্যাতীত মুক্তি অসম্ভব।</p>
<p>এজন্য আল-মাওয়ারদী&#8217; মূলনীতির আলোকে মহান সভ্যতা ইসলামি সভ্যতার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, শুরু থেকে রাসূল (সাঃ) তিনি গোটা জাতির সামনে তৎকালীন সময়ের সমস্ত চ্যালেজ্ঞকে গ্রহণ করে মুক্তির জন্য একটি ওয়াদা দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠার ওয়াদা। কেননা একটি জাতি বেচে থাকে তার আগামীদিনের ওয়াদার উপর ভিত্তি করে। এজন্যই রাসূল (সাঃ) আঁকাবার শপথের নিশ্চয়তা বা যে সকল চিঠিগুলো প্রেরন করতেন সেগুলোর মধ্যেও নিশ্চয়তা দিতেন এবং রাসূল (সাঃ) এর সাহাবিদের প্রত্যেকটি ভাষণও হলো আগামীদিনের নতুন সভ্যতার নিশ্চয়তা, আদালত ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, কিন্তু আমরা কি আদৌ সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছি? আমরা কি সেই ডায়লগ তৈরি করতে পারছি?</p>
<p>কিন্তু তৈরি না করতে পারলে সমাধাণও আমাদের সামনে আসবে না। আবার এটার জন্য যে শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ প্রয়োজন সেই ভিত্তি নির্মাণের জন্য জ্ঞানসম্রাট আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচ বলতেন, শক্তি ও সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস হচ্ছে আমাদের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা, এটার মধ্য দিয়েই বিজয় আসবে, এটার মধ্য দিয়েই সমস্ত সংকট দূরীভূত করে নতুন এক সুবহে সাদিকের জন্ম দেয়া সম্ভব, এটাই সুন্নাতুল্লাহ্, এছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা আমাদের সামনে খোলা নেই।</p>
<p>তাই আমরা আমাদের চিন্তাকে, চিন্তার গতিশীলতাকে অগ্রভাগে রেখে এবং সেই চিন্তার মাঝে হাকীকত অন্বেষী জ্ঞান, মানবতার কল্যাণ, খলীফা হিসেবে ইমারতের দায়িত্ব, এগুলিকে কেন্দ্র বিন্দুতে স্থাপন করতে পারি তাহলে চিন্তার গতিশীলতা আরও বেশি গতিশীল হবে। পরবর্তীতে এসকল চিন্তা একটি প্রজন্ম থেকে অন্য একটি প্রজন্মে পৌছবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম এসে এর ফল ভোগ করতে শুরু করবে। এটিই পৃথিবীর বাস্তবতা।</p>
<p>তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শিক্ষা কাঠামোকে ইসলামি সভ্যতার মূলনীতির আলোকে সাজিয়ে সুন্দর বাংলাদেশ গঠন সম্ভব, সেই বাংলাদেশের ভিত্তি আখলাক ও জাগতিক দুই দিক থেকেই শক্তিশালী ভিত্তি রচনা সম্ভব, তা যৌক্তিকভাবে তুলে ধরতে পারি তবেই যুব সম্প্রদায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। একইভাবে যদি বাংলা ভাষাকে দাঁড় করাতে পারি, ডেভলাপ করতে পারি তাহলেও মুসলিম উম্মাহও দ্বীতিয় বৃহৎ ভাষা বাংলা ভাষা নেতৃত্ব দেয়ার জন্য জেগে উঠবে। যেই হিব্রু ভাষার ৫ হাজার বছর পর্যন্ত কোন খবর ছিলনা, সেই হিব্রু ভাষাই আজকে একটি আন্তর্জাতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। ইবনে সিনার বই অনুবাদ উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষায় নেই, অন্য কোন ভাষায়ও দেখা যায়না। সেখানে তাদের ইব্রানি ভাষায় ১৬ টি আলাদা আলাদ অনুবাদ করা হয়েছে। অথচ তাদের জনসংখ্যা মাত্র এককোটি! ১০০ বছর আগেও দুনিয়াতে তাদের কোন বাস্তবতা ছিলো না, তারা তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বেও কল্পনা করেনি যে তারা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু ২৩ বছর বয়সী যুবক যখন সেই সপ্ন তাদের সামনে তুলে ধরলেন এবং পরবর্তীতে ৫০ বছর সময়ও লাগেনি বাস্তবায়ন হতে। তখন কিন্তু &#8216;ইমাম হাসান আল বান্নার&#8217; সেই কথাটি বাস্তবায়িত হতে দেখলাম, তাহল- &#8220;আজকের স্বপ্নই আগামীকালের বাস্তবতা, এজন্যই হে যুবকেরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো। অর্থাৎ যে যুবকেরাই প্রস্তুতি গ্রহণ করবে সেই যুবকেরাই তাদের জাতির কল্যাণ কল্যাণ নিয়ে আসতে পারবে এবং এটিই যুগে যুগে হয়েছে।</p>
<p>তাই আমরাও বাংলা ভাষাকে, বাংলাদেশকে সেভাবে সাজাতে পারবো ইনশাআল্লাহ্‌।</p>
<p>এরপর বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের বাজেট, সামাজিক নিরাপত্তা, গার্মেন্স ফ্যাক্টরী, কৃষির ভয়াবহ সংকট, আমাদের শ্রমিক এবং ইনড্রাষ্ট্রিগুলোতে যেই ভয়াবহ জুলুম প্রতিষ্ঠিত! এ প্রত্যেকটি সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক সংকট! আমাদের খাদ্য, চিকিৎসা, পরিবেশ, নগরায়ণসহ মেডিসিনের মতো সকল জায়গায় আগ্রাসণ উপনিবেশ শাষণামল থেকে বেশি মাত্রায় হচ্ছে! এটির কারণও কি রাজনৈতিক সংকট নয়? সুতরাং এই রাজনৈতিক সংকটকে মোকাবেলা করতে না পারলে যেইরকম অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হব একইভাবে এই রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে চিন্তাগত সংকট মোকাবেলা করা। তাই যেকোনো মূল্যে এ বিষয়গুলোকে কেন্দ্রে রেখে আমরা আমাদের নিজেদের যোগ্য করার জন্য সর্বাত্নক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং যার কোনই বিকল্প নেই। আমাদের জীবনে ভালোবাসা, অভাব ও সংকট সবই আসবে, এক্ষেত্রে আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যকে, ভিশনকে, হাকিকতকে কেন্দ্রে স্থাপন করে এগিয়ে যেতে পারি তাহলে অবশ্যই চিন্তাগত সংকটকে মোকাবেলা করা সম্ভব। আমাদের প্রজন্মে মোকাবেলা করা সম্ভব না হলেও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাব কারণ চিন্তার যুদ্ধটি একটি জাতির, প্রজন্মের ও একটি সভ্যতার যুদ্ধ।</p>
<p>এজন্য শপথ করতে হবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই চিন্তা পৌছে দেয়ার। আর যদি এই চিন্তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌছে দিতে পারি তাহলে অবশ্যই বিজয় আমাদের এবং এই ব্যাপারে আল্লাহ নিজে ওয়াদা করেছেন।</p>
<p>সর্বশেষ তালুত-জালুতের ঘটনাকে সামনে রেখে যদি শিক্ষা নিই যে, অনেক সংকট ও কঠিনতম পথ আমাদের পাড়ি দিতে হবে, সেই পথে বহুধরনের চ্যালেঞ্জ আসবে ও বাধা আসবে কিন্তু আমাদের ভিশনকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে, বড় একটি অংশ ঝড়ে পড়লেও যে অংশটি নবীর সাথে বিজয়ের ঝান্ডা উড়িয়েছিলো; সেই বিজয়ের ঝান্ডা উড়ানোর একজন কর্মী হিসেবে জাতির সামনে নিজেদেরকে তুলে ঊরতে পারব। আর এই প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়েই সমাজ ও রাষ্ট্র উভয় দিক থেকেই সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, পারষ্পরিক ভ্রাতৃত্য, রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থাপনায় প্রভাব পরবে ইনশাআল্লাহ্।</p>
<p>অস্তিত্ব সংকটে পড়ার পূর্বেই চিন্তায় গতিশীলতা ও চিন্তাগত ভিত্তি নির্মাণ করে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সংগ্রাম করে যেতে হবে। এটাই হোক আমাদের ইশতেহার।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/crisis-of-thought-to-political-crisis-the-result-an-existential-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7314</post-id>	</item>
		<item>
		<title>জাতির মূলস্তম্ভ দ্বীন ও ভাষা; বাংলাদেশে আমাদের জাতিসত্তার ইশতেহার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/religion-and-language-manifesto-of-our-political-nationhood/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/religion-and-language-manifesto-of-our-political-nationhood/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 22 Aug 2022 16:31:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজবিজ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7292</guid>

					<description><![CDATA[বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছি যে, বর্তমান অবস্থাকে বুঝতে হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখতে হয়। ১. বিশ্বজনীনতা ২. আঞ্চলিকতা এ দুটি বিষয়কে সামনে রাখার কারণে একটি মূলনীতিকে গ্রহণ করতে হয়, তা হলো ‘বিশ্বজনীন হওয়া ব্যতীত স্বীয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছি যে, বর্তমান অবস্থাকে বুঝতে হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখতে হয়।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">১. বিশ্বজনীনতা</div>
<div dir="auto">২. আঞ্চলিকতা</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এ দুটি বিষয়কে সামনে রাখার কারণে একটি মূলনীতিকে গ্রহণ করতে হয়, তা হলো ‘বিশ্বজনীন হওয়া ব্যতীত স্বীয় অঞ্চলকে ধারণ করা যায় না। ফলশ্রুতিতে আমাদের পন্থা, আমাদের লক্ষ্যমাত্রার সাথে একটি বিষয়কে জড়িয়ে নিতে হয়, সেটি হলো আমাদের বর্তমান দুনিয়া কোন অবস্থায় আছে তা নির্ণয় করা, নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে পর্যালোচনা করে সংকট এবং ভবিষ্যতের সমাধান নিয়ে সর্বদা সচেতন থাকা। আর যদি ইসলামী সভ্যতার সন্তান হিসেবে, সম্মানিত জাতির সন্তান হিসেবে বিশ্বের সামনে আমরা বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা না দাঁড়াতে পারি, আমাদের অধিকার ও মর্যাদাকে তুলে ধরতে না পারি, তাহলে উম্মাহকে জাগিয়ে তোলা অনেকটাই অসম্ভব। কারণ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় একশো কোটি মুসলমানের বসবাস, আর এ মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যকই কথা বলে বাংলা ভাষায়। এ সংখ্যা ত্রিশ কোটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই একশো কোটি মুসলমানের কেন্দ্রবিন্দু এ বাংলা অঞ্চল-ই। সুতরাং যদি আমরা, ত্রিশ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান এ অঞ্চল থেকে জাগ্রত না হই, তাহলে একশো কোটি মুসলমানকে জাগ্রত করা অসম্ভব।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এজন্য আমাদের ভবিষ্যত ও নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠা বা শান্তিপূর্ণ একটি বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আল মাওয়ার্দীর তত্ত্বকে সামনে হাজির রাখতে হবে। এ তত্ত্বের মধ্যে তিনি ছয়টি বিষয় সম্পর্কে বলেছেন, যার একটি হলো الدين المتّبع, অর্থাৎ এমন একটি দ্বীন সমাজের মধ্যমণি বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে থাকতে হবে, যা অনুসরণযোগ্য।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">ইমাম মাওয়ার্দীর মূলনীতিগুলোকে &#8216;Normative values&#8217; হিসেবে অনুবাদ করা হয়ে থাকে, যার অর্থ মানুষ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে এমন একটি বিষয়। নরম্যাটিভ ভ্যালু মূলত এমন মূল্যবোধ যা সকল পর্যায়ের মানুষ গ্রহণ করে নেয়। এটি সহজাত মূল্যবোধ যা গ্রহণ করতে প্রশ্ন বা চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয় না। আল মাওয়ার্দীর মূলনীতিসমূহকে এ নামকরণের কারণ হলো তার উত্থাপিত মূলনীতিসমূহ সহজাত, যা মানুষের আকল স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে নেয়। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবো, বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলে দ্বীন হিসেবে ইসলামকে সবাই মেনে নিচ্ছে। তারা দ্বীন কতটুকু পালন করছে বা গ্রহণ করছে, তারচেয়েও বড় বিষয় হলো তারা সবাই দ্বীন অনুসরণ করার চেষ্টা করছে, তাদের মাঝে এ দ্বীনের গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে মূল আলাপ হল, তা অবশ্যই অনুসরণ যোগ্য হতে হবে, এবং যদি তা অনুসরণ যোগ্য না হয় তবে তা কখনোই দ্বীনুল মুত্তাবাআ হতে পারবে না।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সুতরাং আমরা যে অঞ্চলেই থাকি না কেন, এটি আমাদের জন্য আবশ্যকীয় একটি বিষয়। এটির সাথে পরবর্তী বিষয়গুলোও সম্পৃক্ত, অর্থাৎ সামগ্রিক আদালত, সামগ্রিক নিরাপত্তা, সমাজে সম্পদের প্রাচুর্য ও সুষ্ঠু বন্টন থাকা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তবধর্মী স্বপ্ন থাকা, যে স্বপ্ন মানুষের মাঝে ভিশন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে তুলে ধরবে। এভাবেই আল মাওয়ার্দী তার তত্ত্বটিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং এটি বাস্তবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য। যদি মুসলিম উম্মাহ কিংবা বা যে কোনো জাতি, গোষ্ঠী এটি পালন করে, তাহলে সেখানে আদালত, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই আমরা যদি দ্বীনুল মুত্তাবাআকে জাতির সামনে সঠিকভাবে হাজির করতে না পারি, তাহলে বুঝতেই পারছি যে, সেই শান্তিপূর্ণ দুনিয়ার দিকে, সত্যিকারের জাতিসত্তা বিনিমার্ণের দিকে আমরা হাঁটতে পারবো না, জাতির রূহকে উপলব্ধি করতে পারবো না। এজন্য আমাদের অন্যতম কাজ ও প্রধান স্তম্ভ হলো–</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<blockquote>
<div dir="auto">জাতির সামনে দ্বীনের সঠিক ব্যাখ্যা হাজির করা। যুগ, সময় এবং স্থানের প্রেক্ষাপটের আলোকে দ্বীনকে সুন্দরভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, চিন্তাকে নবায়ন করা। তাই আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার মহান উসূলী ধারা<strong> ‘আহলুর রায়’</strong> ধারাকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি, একইভাবে এ ধারার ছয়জন মহান ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে আমরা আমাদের পরবর্তী ব্যক্তিত্ব তৈরি এবং সেই লক্ষ্য পানে এগিয়ে চলার চেষ্টা করতে পারি, তাহলে অবশ্যই নতুন এক দিগন্তের পুনঃউন্মোচন হবে, ইনশাআল্লাহ্‌।</div>
</blockquote>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">সেই ছয়জন মহান ব্যক্তিত্বরা হলেন</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"><strong>• হযরত উমর (রা.)</strong></h3>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">প্রথমত আল্লাহর রাসূলের (স.) সহচরদের মধ্যে তিনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছেন। তার হাত ধরেই মূলত আহলুর রায় ধারার চিন্তা বিকশিত হয়। তার যে চিন্তা, তা অর্ধ পৃথিবীর চেয়েও বেশি জায়গা জয় করছে, কুদুস জয় করছে, এমনকি সে সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সভ্যতাগুলোর পতন হয়েছিলো এবং সেগুলো ইসলামের ছায়াতলে এসেছিলো। দ্বিতীয়ত তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি সমগ্র পৃথিবীতে আদালতের ধারণাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করছেন যে, আজ পর্যন্ত তার মতো কোনো শাসক আসেননি এবং কারো শাসন তার শাসন ও ন্যায়পরায়ণতার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারে। তৃতীয়ত তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামী সভ্যতাকে ধারাবাহিকতা দান করার জন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্মাণ করেছেন। চতুর্থত তিনিই সর্বপ্রথম ইজতেহাদকে সুস্পষ্ট ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন। পঞ্চমত তিনি জ্ঞানের বহু শাখার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। এভাবে উমর (রা.) আমাদের জন্য বিশাল একটি দ্বার উন্মোচন করেছেন।</div>
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম আবু হানিফা (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">তিনি হযরত উমর (রা.) এর ধারাকে অনুসরণ করে, আরও উন্নত করে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানদর্শন ও জ্ঞানতত্ত্বে নতুনভাবে রূহ সঞ্চার করেছেন। ইসলামের বিশ্বজনীনতাকে সামগ্রিকভাবে সামনে নিয়ে আসায় তাকে ‘ইসলামের বিশ্বজনীন রূপের প্রখর দৃষ্টিমান সাধক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পরবর্তী মুতাফাক্কির মুজতাহিদগণ!</div>
</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto"></div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম গাজ্জালী (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">তিনি তার আগের চারশো বছরের সারসংক্ষেপ করে পরের ছয়শো বছরকে প্রভাবিত করেছেন। এজন্য তাকে<strong> ‘ইসলামী সভ্যতার সারমর্ম’</strong> হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। চিন্তকেরা অনেকেই ইসলামী চিন্তা দর্শনের ইতিহাস লেখার সময় ‘ইমাম গাজ্জালী পূর্ববর্তী’ আর ‘ইমাম গাজ্জালী পরবর্তী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন! (যদিও এ সংজ্ঞায়ন যৌক্তিক নয়, তবুও এর দ্বারা ইমাম গাজ্জালীর প্রভাব সম্বন্ধে আন্দাজ করা যায়)</div>
</div>
<div dir="auto"></div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম শাতেবী (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">যে সময়ে আমাদের ট্র্যাডিশনাল, ক্লাসিকাল ফিকহ non functional হয়ে যাচ্ছিলো, আন্দালুসিয়ার পতন ঘটছিলো এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ মোঙ্গলদের আক্রমণে একদম নাস্তানাবুদ হয়ে গেছিলো, সবাই কিয়ামতের জন্য অপেক্ষা করছিলো, সে সময়েই তিনি তার অমর গ্রন্থ<em><strong> “মুয়াফাকাত”</strong></em> এর মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্বের অংশ ‘ফিকহ’ এর ক্ষেত্রে মাকাসিদের মাধ্যমে নতুন ডাইমেনশন সৃষ্টি করেছেন।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto"><strong>• ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (র.)</strong></h3>
<div dir="auto">ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর জন্ম ১৭০৭ সালে, যে সালে সুলতান আওরঙ্গজেব মৃত্যুবরণ করেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই মুঘল সালতানাতের পতন শুরু হয়। ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর ৫৭ বছরের জীবন কাটে এ ভয়াবহ সংঘাতপূর্ণ সময়েই। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৭৬৫ সালে। জীবদ্দশায় তিনি পাশ্চাত্যের ক্ষমতায়ন ও ডেভেলপমেন্টকে খুব ভালোভাবে দেখেছিলেন, তখন তিনি বলেন, <strong><em>“বর্তমানে আমাদের বিদ্যমান যে ধারণা, তা দিয়ে আর ইসলামী সভ্যতাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।” তখন তিনি তার অমর গ্রন্থ “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা” রচনা করেন।</em></strong> বড় সুফি হওয়া সত্ত্বেও তিনি বলেন, “কায়িম বিল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর নামে আমি টিকে থাকবো৷” (সুফিবাদের ধারণা ছিলো ‘ফানাফিল্লাহ’, অর্থাৎ আল্লাহর অধীনে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া।) শুধুমাত্র এ কারণেই সমগ্র পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলন তার ছাত্রদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছিলো। এমনকি পরবর্তীতে তৈরি হওয়া সকল মুক্তি আন্দোলনও এ ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছিলো।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto"><strong>• আল্লামা ইকবাল</strong></h3>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">তিনি পাশ্চাত্যের গগণবিজয়ী আধিপত্যকালীন সময়ে মুসলিম উম্মাহর সুদীর্ঘ সময়কার চিন্তাগত স্থবিরতা, জড়গ্রস্ততার বিপরীতে জ্ঞানকে যুগের সমালোচনার নিরিখে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জিহাদ ও ইজতেহাদের কাঠামো বয়ান সামনে নিয়ে এসেছিলেন তার অমর গ্রন্থ &#8220;Reconstruction of the Religious Thought in Islam&#8221; এর মাধ্যমে। এ গ্রন্থের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ জাগ্রত হয়।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এভাবে যদি আমরা ছয়জন ব্যক্তিত্বকে দেখি, তাহলে আমাদের পথ-পন্থা কী হবে, আমরা কীভাবে অগ্রসর হবো, আমাদের জাতিকে কী দিতে হবে– এসব কিছুই আমাদের সামনে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে। এ ব্যক্তিদের সামনে রেখেই আমরা আমাদের জ্ঞান চর্চা চালিয়ে যাবো। আমরা যা শিখবো, তা জাতির কল্যাণে কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখবো, চিন্তা করবো এবং বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবো। সেক্ষেত্রে আল্লাহ অবশ্যই ফলাফল দিবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। পাশাপাশি যদি আমাদের সোশিওলজি, সোশিওকালচারকে বুঝতে চাই এবং সেই রূহকে ধারণ করতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের এ অঞ্চলকে খুব ভালোভাবে পাঠ করতে হবে। এ মাটি, এ আবহাওয়া, এ পরিবেশ, এ সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করা ব্যতীত কখনোই ধার করা কোনো বিষয় দিয়ে আমরা এ সমস্যার সমাধান করতে পারবো না, জাতির সামনে দ্বীনুল মুত্তাবাআকে সামগ্রিকভাবে উপস্থাপন করতে পারবো না। যেমন আমরা যদি লক্ষ্য করি, ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী তার “হুজ্জাতুল্লাহুহিল বালিগা” দিল্লিতে বসে লিখলেও তা সমগ্র উপমহাদেশের সোশিওলজির সাক্ষ্য দেয়। “ফতোয়ায়ে আলমগীরি” আরবী ভাষায় লিখা হলেও তা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের রূহের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা, ব্রাহ্মণরা ওয়েস্টার্ন সিভিলাইজেশানের সোশিওলজিকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং সেগুলোকে পাঠ করতে বাধ্য করেছে, ফলশ্রুতিতে আমরা সমাধানের দিকে ধাবিত হতে পারছি না। এজন্য আমাদের জাতির রূহকে বুঝতে হলে নিজেদের ফিকহ বা বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞানকে, অঞ্চলের মানুষ ও ভূমিকে খুব ভালোভাবে বুঝে সেই আলোকে ইশতেহার রচনা করতে হবে। এটি দ্বীনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<h3 dir="auto"></h3>
<h3 dir="auto">‘বাংলা ভাষা’ তথা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা</h3>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">বিগত ৩০০ বছর যাবত বাংলা ভাষা নিয়ে প্রকৃত অর্থে কোনো কাজ হচ্ছে না। এজন্য নতুন করে বাংলা ভাষাকে পুনর্জাগরিত করা, বাংলা ভাষাকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হতে হবে, এর কোনোই বিকল্প নেই। এক্ষত্রে আশার দিক হলো এত জুলুম, অত্যাচারের মাঝেও বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়নি, বরং সে তার আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তার নিজস্ব হরফে এখনো তাকে চর্চা করে যাচ্ছি, নতুন করে পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি যা পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে নিভে যায়নি আমাদের বাংলা ভাষার স্বকীয়তা!</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">বাংলা ভাষার অবস্থান অনেক উচ্চে। এখনো স্ব-মহিমায় বলতে পারা যায়, “বাংলা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা।” আরবী ছিলো সাধারণ একটি কওমের ভাষা, কিন্তু সেটি একটি বিশ্বজনীন ভাষায় রুপান্তরিত হয়েছে। আমরা বাংলা ভাষাকে বিশ্বজনীন করতে চাই না, তবে–</div>
<div dir="auto"></div>
<blockquote>
<div dir="auto">৪০ কোটি মানুষের ভাষা হিসেবে নতুন করে জাগরিত কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে চাই।</div>
<div dir="auto">জাতিসত্তাকে বোঝার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে প্রস্ফুটিত করতে চাই।</div>
<div dir="auto">আমাদের সংস্কৃতিকে বহনের সর্বপ্রধান মাধ্যম হিসেবে নতুন করে উত্থান ঘটাতে চাই। আর এ উত্থানকাব্যে বড় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করবে আমাদের যুবকরা, ইনশাআল্লাহ।</div>
</blockquote>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এটি কীভাবে সম্ভব? সেক্ষেত্রে উল্টো প্রশ্ন হলো, কেন সম্ভব নয়?</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">যে হিব্রু ভাষার গত ৬ হাজার বছরে কোনো অস্তিত্ব ছিলো না, সে হিব্রু ভাষাকে কি নতুন করে জাগরিত করে আন্তর্জাতিক ভাষায় পরিণত করা হয়নি?</div>
<div dir="auto">উসামানী ভাষার হরফ পরিবর্তন করে আজকের তুর্কি ভাষা তৈরি করা হয়েছে, মাত্র ৮০ বছরের ব্যবধানে সকল জ্ঞানকে তুর্কি ভাষায় রূপায়ন করে জাগরিত করা হয়নি?</div>
<div dir="auto">আজ থেকে কয়েকশো বছর আগেও চাষীদের বা গ্রাম্যদের ভাষা ছিলো উর্দু। এটি কি এখন একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা নয়?</div>
<div dir="auto">আজ থেকে দেড়শো বছর আগেও হিন্দি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না, সেই হিন্দি ভাষা কি আজ উপমহাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে না?</div>
<div dir="auto">শেক্সপিয়ার কি একাই ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করাননি?</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">তাহলে কেন হাজার বছর ধরে চলে আসা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা এবং সেই সাথে ৪০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে কেন আমরা নতুন করে দাঁড় করাতে পারবো না? কেন তা সম্ভব নয়? আমরা অবশ্যই পারবো। যদিও হতাশার দিক রয়েছে, কিন্তু এ ধরনের হতাশার দিক সকল অঞ্চলেই রয়েছে।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">বড় বড় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, বৃটিশদের দ্বারা প্রভাবিত পণ্ডিতরা আমাদের প্রতিনিয়তই বোঝানোর চেষ্টা করে যে, বাংলা ভাষা মুসলমানদের ভাষা নয়, বাংলা ভাষায় মুসলমানদের তেমন কোনো কাজ হয়নি, কোনো মৌলিক জ্ঞান চর্চা হয়নি, তাই এর দ্বারা জাগরণ সম্ভব নয়! কিন্তু বাস্তবতা যা, তা একটি উদাহরণের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে। উসমানীদের নিজেদের লিখিত ১৮ লক্ষ পৃষ্ঠার ইতিহাস তাদের সামনে আছে, সুলাইমানীয়া লাইব্রেরি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মাত্র একজন লেখক উসমানী আমলে প্রতি ১০০ বছরে মাত্র ৫০ জন করে চিন্তকের তালিকা দেখিয়েছেন, যাদের প্রায় প্রত্যেকের কমপক্ষে ৮০ টি করে বই আছে! যে সুবিশাল উসমানী খেলাফত ছয়শো বছর গোটা বিশ্বকে সবেচেয়ে বেশি প্রভাবের সাথে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের সম্পর্কেই বলা হয় যে, উসমানীদের সাধারণ তলোয়ার চালানো ছাড়া ভিন্ন কোনো কিছু করার যোগ্যতা ছিলো না বা ওই অর্থে কোনো কিছু ছিলো না!</div>
<div dir="auto">উসমানীদের তুলনায় বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরা কোনো ডকুমেন্ট রেখে যেতে পারেনি, দুইশো বছরের ব্রিটিশ আগ্রাসন আমাদের সবকিছুকে নিঃশেষ করে দিয়েছে! উসমানী অঞ্চল বা তুর্কিশ অঞ্চল, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনই প্রতিষ্ঠা হয়নি, সে অঞ্চলের ইতিহাসকেই যদি এভাবে অস্বীকার করা হয়, মিথ্যা ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে দুইশো বছর শোষণের শিকার আমাদের বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের ইতিহাস, ডকুমেন্ট তো মুছে ফেলা হবেই। আর যেহেতু কোনো ডকুমেন্ট অবশিষ্ট নেই, তাই তা অস্বীকার করা হবেই এবং আমাদেরকে নানাভাবে হীনমন্য করা হবেই! এবং এটিই স্বাভাবিক!</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">পাশাপাশি আমরা এটিও দেখতে পাই, ওরিয়েন্টালিস্ট ও ব্রাহ্মণ্যদের লেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস সর্বাবস্থায়ই আমাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গায় আঘাত করেছে। তারা আমাদের ইতিহাসবিহীন জাতিতে পরিণত কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে চাচ্ছে, এটিই তাদের উদ্দেশ্য।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">আমরা যদি এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে নতুন করে ডায়ালগ সৃষ্টি করতে পারি; বাংলার ত্বহা আব্দুর রহমান তৈরি কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে পারি, আল্লামা ইকবাল তৈরি কর<span class="bq6c9xl4 ms56khn7 kjdc1dyq ewco64xe m8h3af8h gh55jysx b2rh1bv3 fxk3tzhb">‍</span>তে পারি; ইমানুয়েল কান্টের তত্ত্ব খন্ডন করে নতুন এক তত্ত্ব বাংলা ভাষায় দাঁড় করাতে পারি, তাহলে অবশ্য-অবশ্যই বাংলা ভাষাকেও সেভাবে হাজির করতে পারবো। আর বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অনুবাদ, ক্লাসিক গ্রন্থের বাংলা ব্যাখ্যা, ক্লাস, গবেষণা প্রবন্ধ, প্রস্তাবনাসহ নিজেদের যোগ্য করার মধ্য দিয়ে ক্লাসিক গ্রন্থ লেখার দিকে ধাবিত করা এখন আমাদের অন্যতম ইশতেহারে পরিণত হয়েছে। একইসাথে মৌলিক চিন্তা ও জ্ঞানের দিক দিয়ে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করতেও বাংলায় বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার তৈরি আমাদের অন্যতম ভিশনে রূপ নিয়েছে।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto">দ্বীন এবং ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আমরা যে যে আন্দোলন শুরু করেছি, তার নাম দিয়েছি ‘জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের আন্দোলন’। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের নিকট ভবিষ্যৎ নিকট অতীতের চেয়ে অনেক ভালো হবে, ইনশাআল্লাহ।</div>
</div>
<div class="l7ghb35v kjdc1dyq kmwttqpk gh25dzvf jikcssrz n3t5jt4f">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">পরিশেষে, যে বিষয়টি বলতে চাই, দ্বীন এবং ভাষা যেহেতু জাতির মূল স্তম্ভ, আর এ দুটি বিষয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি, তাই পুনরায় নিখিল ভারতের ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের চিন্তা এবং ভিত্তি নির্মাণের সংগ্রাম এ বাংলা অঞ্চল থেকেই শুরু হবে, তার ভিত্তি প্রস্তর এ ভূমিতেই হবে– এটিও আমরা বিশ্বাস করি। এজন্যই আমরা বলতে চাই, ৭০০ বছরের সালতানাতের সাক্ষ্য বহনকারী দারসবাড়ি, আতিয়া মসজিদ এবং আন্দরকিল্লার সন্তান হিসেবে, ঈসা খাঁ, উমিদ শাহ ও শরীয়তুল্লাহর উত্তরসূরী হিসেবে এ অঞ্চলের যুবকদের মধ্যে ঈমান গ্রোথিত রয়েছে, তাদের মধ্যে সেই চেতনার রূহ এখনো বিদ্যমান। তাই আমরা যদি জাতির উপর পড়ে থাকে আস্তরণ বা ছাই সরিয়ে দিতে পারি, তাহলে জাতির ভিতরে লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি নতুন করে জেগে উঠবে। এ আগ্নেয়গিরি হবে আগামীর মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার, ভবিষ্যৎ নির্মানের অন্যতম স্তম্ভ এবং আমাদের পুনর্জাগরণের মিনার, ইনশাআল্লাহ।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/religion-and-language-manifesto-of-our-political-nationhood/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7292</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনৈতিক বিজয় স্থায়ীকরণের পন্থা ও চ্যালেঞ্জ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/how-to-establish-political-victory/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/how-to-establish-political-victory/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 03 Jul 2022 01:38:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7224</guid>

					<description><![CDATA[মানবসভ্যতার ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, যে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে তা টিকিয়ে রাখা এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে গতিশীল রাখা সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। রাজনৈতিক বিজয় অর্জন বা রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই কেবলমাত্র কোনো রাজনৈতিক চিন্তা বাস্তবায়নের পটভূমি তৈরি হয়।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">মানবসভ্যতার ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, যে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে তা টিকিয়ে রাখা এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে গতিশীল রাখা সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। রাজনৈতিক বিজয় অর্জন বা রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই কেবলমাত্র কোনো রাজনৈতিক চিন্তা বাস্তবায়নের পটভূমি তৈরি হয়। কিন্তু তার মানে এই নয়, বিজয় অর্জন মাত্রই সে চিন্তার বাস্তবায়ন হয়ে যায়। এজন্যই মুসলিম উম্মাহর বড় বড় আলেমগণ তাদের চিন্তাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও সভ্যতার পুনর্জাগরণকে একত্রে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ জ্ঞানকে কেন্দ্র করে চিন্তা আবর্তিত হবে, সেই চিন্তার আলোকে গড়ে উঠা রাজনৈতিক শক্তি সমন্বিত বিপ্লবের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। এভাবে জ্ঞান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রার দিকে সমান তালে ধাবিত হবে।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এক্ষেত্রে রাসূল (স.) এর জীবনের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা এই বিষয়টিই দেখতে পাই। মূলত রাসূল (স.) এর মাদানী জীবন হলো তাঁর রাজনৈতিক জীবন এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিকব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সূচনাকাল। মাদানী জীবনের দশ বছরে রাসূল (স.) মদীনায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও মজবুত ভিত্তির উপর স্থাপন করেন। পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে বিকল্প প্রস্তাবনা দেন, বিদ্যমান সমাজ-ধারণার বিপরীতে নতুন সমাজব্যবস্থার মডেল হাজির করেন। মদীনায় তার প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা এমন এক টেকসই ও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়ায়, যার উপর ভর করে ইসলামী সভ্যতা সুদীর্ঘ ১২০০ বছর ন্যায়ভিত্তিকভাবে গোটা দুনিয়া শাসন করে।</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">এখন প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক বিজয় পাকাপোক্ত বা স্থায়ী করতে হলে কী প্রয়োজন? কিংবা রাজনৈতিক বিপ্লব স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে কোন বিষয়টি আবশ্যক?</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">এক্ষেত্রে এটি সুস্পষ্ট যে, ৩ টি বিষয়ের সামগ্রিক সমন্বয় ছাড়া একটি রাজনৈতিক বিজয় বা রাজনৈতিক বিপ্লব পাকাপোক্ত করা বা স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা কখনোই সম্ভব নয়। বিষয় তিনটি হলো–</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">• <strong>হাকিকতমুখী ‘বুদ্ধিবৃত্তি’</strong></div>
<div dir="auto"><strong>• ইরফানমুখী ‘সংস্কৃতি’</strong></div>
<div dir="auto"><strong>• আদালতমুখী ‘অর্থনীতি</strong>’</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এ বিষয়গুলো একটি গাছের শিকড়ে সাথে তুলনীয়। গাছের শিকড় সাধারণত সবদিক থেকে সমান তালে বৃদ্ধি পায়, ফলে গাছের গোঁড়া মজবুত ও পাকাপোক্ত হয়। সময় যত অতিবাহিত হয়, গাছের শিকড়ও তত বিস্তৃত হয় এবং জমিতে গাছের স্থায়ী আসন গড়ে উঠে।</div>
<div dir="auto">ঠিক তেমনি যদি রাজনৈতিক বিজয়ের স্থায়ীত্বের সাথে সম্পৃক্ত তিনটি কার্যকারণ, অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের যে কোনো একটি শক্তিশালী হয় এবং অপরটি দুর্বল হয়, তাহলে বিজয় স্থায়ী হবে না। গাছের একদিকের শিকড় যদি মাটিতে বাড়তেই থাকে, আর অপরদিকে না বাড়ে, তাহলে সামান্য বাতাসেই গাছ ভেঙে পড়বে; রাজনৈতিক বিজয়ের স্থায়িত্বের বিষয়টিও তেমন। এর একদিক শক্তিশালী ও অপরদিকে দুর্বল হলে বিজয় ব্যর্থ হবে। বাস্তবতা হলো এর প্রতিটি দিকই একে অপরের পরিপূরক। এ কারণে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন একটি জাতি যদি বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাগতভাবে পরাধীন কিংবা পরনির্ভরশীল হয়, তাহলে তাদের পক্ষে রাজনৈতিক স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, বরং তা হবে কথিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা!</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">একইভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিজস্ব অবস্থান ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা না থাকলে একটি জাতি দারিদ্রতা ও আত্মপরিচয়ের সংকটে নিপতিত হয়। ফলশ্রুতিতে তারা আত্মবিশ্বাস ও বিজয়ী চেতনা হারিয়ে ফেলে।</div>
<div dir="auto">বৃটিশ পরবর্তী বাংলায় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা মূলত এ তিনটি ক্ষেত্রে ধ্বংস সাধনের মাধ্যমেই তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের শৃঙ্খল, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য চাপিয়ে দেয়, যার ফলে মুসলমানরা হীনমন্য হয়ে পড়ে।</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এখানে ভিন্ন আরেকটি দিক আছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য দুটি বিষয়ের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন, তা হলো–</div>
<div dir="auto">• <strong>ক্যারিশম্যাটিক লিডার এবং</strong></div>
<div dir="auto"><strong>• শক্তিশালী সংগঠন</strong></div>
<div dir="auto">এ দুইয়ের উপস্থিতি থাকলেই তা করা সম্ভব। আর তাই রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াটাই রাজনৈতিক বিজয় বা রাজনৈতিক বিপ্লবের স্থায়ীত্বের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন নয়। সভ্যতাগত অবস্থান বা শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণের জন্য যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক পরনির্ভরতা কাটিয়ে উঠা আবশ্যক। চিন্তাগতভাবে কোনো জাতি যদি অপর জাতির অনুকরণ করতে শুরু করে, তাহলে সে জাতির সৃজনশীলতা ও স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে সে জাতির তৈরিকৃত যে কোনো কিছুই পরনির্ভর ও অনুকরণমূলক হয়ে ওঠে।</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">একইভাবে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখতে না পারলে জাতীয় চিন্তা ও মন-মগজ ভিন্ন সংস্কৃতির অনুবর্তী হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে বাহ্যিকভাবে সে জাতির বর্ণ ও ভাষা ভিন্ন থাকলেও তারা অভ্যন্তরীণভাবে হুবহু অন্য জাতির মডেলে পরিণত হয়। এ প্রেক্ষিতে গত শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক মুহাম্মদ আসাদ বলেছিলেন,</div>
<blockquote>
<ul>
<li dir="auto"><strong>“নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি না থাকলে কোনো চিন্তা অপর চিন্তার সম্মুখে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে না কিংবা ভিন্ন পরিচয় বহন করতে পারে না।”</strong></li>
</ul>
</blockquote>
<div dir="auto">অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনুরূপ। অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে রাজনৈতিক বিজয় বা রাজনৈতিক বিপ্লব পাকাপোক্ত করা বা স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। ইতিহাসে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট। একজন ফরাসি চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক বলেছিলেন, <strong><em>“অর্থনৈতিকভাবে যার কোনো ভিত্তি নেই বা যে দরিদ্র অবস্থায় আছে, তার মাধ্যমে কোনো আর্ট কিংবা সৃজনশীল কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ যার খাবার ও সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু অন্য কারো কাছ থেকে আমদানি করা, অর্থাৎ নিজের উৎপন্ন নয়, সে উপকরণগুলো ব্যবহার করে তার তৈরিকৃত কোন কিছু কি সৃজনশীল আর স্বকীয় হতে পারে?”</em></strong> আবার এ বিষয়টিও এখন সমভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, বর্তমান অর্থনীতি মানুষের জীবনের শতকরা ৮০ ভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট। অতএব, অর্থনৈতিক ভিত্তি না থাকলে কখনোই রাজনৈতিক বিজয় বা রাজনৈতিক বিপ্লব পাকাপোক্ত করা বা স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না, কারণ অর্থনৈতিক ভিত্তি বাদ দিলে মানুষের জীবনের বৃহদাংশই আওতাবহির্ভূত থেকে যায়!</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">এখন জিজ্ঞাসা হলো এ তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়? এক্ষেত্রে পদ্ধতি কী?</div>
<div dir="auto">পদ্ধতিগুলো হলো—</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">• <strong>সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা</strong></div>
<div dir="auto"><strong>• মন-মগজের বিস্তৃতি</strong></div>
<div dir="auto"><strong>• বুদ্ধি ও চিন্তার লালন</strong></div>
</div>
<p><a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অবশ্যই ক্রমাগত নিজেদেরকে নবায়ন করা, যুগের প্রেক্ষিতে চিন্তা করা, সময়ের আলোকে সর্বোচ্চ আপডেট হওয়া সবচেয়ে জরুরী বিষয়; যে বিষয়টিকে যুগের গাজ্জালী খ্যাত মহান আলেম ও দার্শনিক আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বলেছেন <em><strong>‘তায়াক্কুল’ ও ‘তায়াম্মুল’</strong></em>।কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো–</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">• মানবতার মুক্তির দূত রাসূল (স.) মদীনা রাষ্ট্রেও সবচেয়ে আপডেটেড ও উন্নত পরিকল্পনা পেশ করেন। তিনি স্বতন্ত্র শিক্ষা, আদালত ও প্রশাসনের জন্য মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, দরিদ্রতা দূরীকরণকারী ও মানুষের মুক্তিকামী অর্থনীতির জন্য বিকল্প বাজার প্রতিষ্ঠা করেন।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">• সুলতান ফাতিহ তার সময়ের সবচেয়ে আপডেটেড পরিকল্পনা ও উন্নত প্রযুক্তির প্রস্তাবনা দিয়ে ইস্তাম্বুল বিজয়ের দিকে ধাবিত হন।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">• এ শতাব্দীর নাজমুদ্দিন এরবাকান শুধু একজন নেতা নন, তিনি একজন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং তার গঠিত আন্দোলনেও ছিলো শিক্ষাবিদ আর বিজ্ঞানীদের সমন্বয়। তিনি যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তার নির্বাচনী মেনিফেস্টো তৈরি করিয়েছিলেন ৫০০ জন আন্তর্জাতিক মানের অধ্যাপকের মাধ্যমে। এ যুগের গ্রেট পরিকল্পনা তথা নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরিকল্পনাও এই আন্দোলন থেকেই উঠে এসেছে। সুতরাং, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ব্যতীত কোনকিছুই সম্ভব নয়।</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">আবার, মন-মগজের বিস্তৃতির জন্য জ্ঞানগত ক্ষেত্রে গ্রহণের মানসিকতা, উদারতা এবং বিস্তৃত ভঙ্গিতে চিন্তা করা আবশ্যক। কারণ উপরোক্ত সব পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এই বিষয়ের উপরেও নির্ভরশীল।</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">আর এ দুটি পদ্ধতির সমান্তরালে বুদ্ধি ও চিন্তার লালন, ক্রমাগত বিকাশ একইসাথে গুরুত্ববহ; যাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও মন-মগজের বিস্তৃত অবস্থান বুদ্ধি ও চিন্তাগত দিক থেকে লালন করা যায়। কম্যুনিস্ট তাত্ত্বিক লিও ট্রটস্কি তার “The Permanent Revolution” গ্রন্থে এ পদ্ধতিগুলোই তুলে ধরেছেন। একইসাথে ট্রটস্কি এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন, এ পদ্ধতিগুলোর সমন্বয় না হলে কোনো বিপ্লব আর যাই হোক, পার্মানেন্ট বা স্থায়ী হবে না।</div>
</div>
<div class="cxmmr5t8 oygrvhab hcukyx3x c1et5uql o9v6fnle ii04i59q">
<div dir="auto">আর এসবের মাধ্যমেই মূলত বিপ্লবের ভিত্তি আত্ম-শক্তি-প্রবুদ্ধ মানুষেরা গড়ে উঠেন এবং সভ্যতাকে স্থায়ীত্ব দিয়ে থাকেন। আত্ম-শক্তি-প্রবুদ্ধ ব্যক্তিত্ব তথা যুগের ইবনে খালদুন, আল মাওয়ার্দী, আল্লামা ইকবালরা উঠে না আসলে টিকে থাকা অসম্ভব এবং অসম্ভব।</div>
<div dir="auto"></div>
<div dir="auto">সুতরাং পদ্ধতিগুলোর সমন্বয়ে তিনটি বিষয়কে সামগ্রিকভাবে অগ্রসর করার মাধ্যমেই কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক বিজয় বা রাজনৈতিক বিপ্লবকে জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের বয়ানগত মাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব। না হয় সে রাজনৈতিক বিজয় বা রাজনৈতিক বিপ্লব শুধুমাত্র কথিত আলাপ অথবা কাল্পনিক রোমান্টিকতায়ই থেকে যাবে, কখনোই একটি বিশ্বজনীন বয়ানে পরিণত হবে না।</div>
</div>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/how-to-establish-political-victory/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7224</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সুদ, বেকারত্ব ও ঋণের উপাখ্যান ; জনস্বার্থ বিবর্জিত বাজেট ২০২২-২৩</title>
		<link>https://rowyakbd.com/budget-analysis-2022-23/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/budget-analysis-2022-23/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Jun 2022 08:42:33 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বেকারত্ব ও ঋণের উপাখ্যান ; জনস্বার্থ বিবর্জিত বাজেট ২০২২-২৩]]></category>
		<category><![CDATA[সুদ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7192</guid>

					<description><![CDATA[করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট যে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে, তাতে সমাধানের সামগ্রিক চিন্তাকে উপেক্ষা করে দেশের সকল সংকট ও সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই সমাধান আসবেনা, তাই হয়তো এবারের বাজেট ‘‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’’ শ্লোগানকে সামনে রাখা হয়েছে। গত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট যে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে, তাতে সমাধানের সামগ্রিক চিন্তাকে উপেক্ষা করে দেশের সকল সংকট ও সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই সমাধান আসবেনা, তাই হয়তো এবারের বাজেট <strong>‘‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’’</strong> শ্লোগানকে সামনে রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মধ্যে দিয়ে দিনপাত করেছে, সেটিই যখন সামলে উঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা; এমন পরিস্থিতিতেও প্রস্তাবিত নতুন বাজেটকে আমরা ‘জনগণের বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিতে পারছিনা, বরং ‘সুদ, বেকারত্ব, ঋণনির্ভর ও জনস্বার্থ বিবর্জিত’ বাজেট হিসেবে তুলে ধরতে হচ্ছে।</p>
<p>অবাক হয়ে বলতে হচ্ছে- যে বাজেটের উপর গোটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়, সেটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই, যৌক্তিক প্রস্তাবনাও নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকেও নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা! অনলাইনে যতটুকুই দেখা যায় বা কাজ আছে, তার সবই তথ্যনির্ভর পত্রিকালাপ! কেননা ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা ও সমালোচনা অসম্ভব; যদি না নিম্নোক্ত বিষয়ে পারদর্শী হয়-</p>
<blockquote><p>• Philosophy of Politics.<br />
• International Economics.<br />
• Political Economy.<br />
• Philosophy of Economics.<br />
• General Economy.<br />
• Economic System of Islam.<br />
• মাকাসিদ আশ-শারিয়িয়্যাহ।</p></blockquote>
<p>এসব বিষয়ে কোনো পারদর্শীতা কিংবা জ্ঞান আমার নেই। তবুও কিছু ব্যক্তিগত চিন্তা ও আলোচনা তুলে ধরছি-</p>
<p>স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে ৫১ তম বছর অতিবাহিত করছে বাংলাদেশ। এরই মাঝে সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে দেশের ৫১ তম অর্থনৈতিক বাজেট। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে, দেশের জনগণেরর আর্থ-সামজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বাজেট কতটুকু যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে।</p>
<p>বিশেষজ্ঞদের দাবী অনুযায়ী, এবারের বাজেটে সংগত কারণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও শিক্ষাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী একটি বাজেট প্রস্তাবনার প্রয়োজন ছিল। যে বাজেটে প্রাধান্য পাওয়া আবশ্যক ছিল-</p>
<blockquote><p>• ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে আনা।<br />
• সুদের শোষণ থেকে মুক্তির চিন্তা।<br />
• রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধি।<br />
• বেকারত্ব ও দারিদ্র্য।</p></blockquote>
<p>কেননা এসব ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা বিভিন্ন খাতে শুধু অর্থ ব্যয় করে কখনোই সমাধান সম্ভব নয়।</p>
<p>এখন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সত্যিই বেড়েছে না-কি ঋণের কারণে মাথাপিছু আয় বেশি দেখাচ্ছে! সেটা নিয়েও পর্যালোচনা জরুরী। মূলত ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আমরা জানি যে, বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত <strong>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ঋণকেও আয় হিসেবে ধরা হয়ে থাকে! হর্তাকর্তারা উচ্চ সুদে ঋণ এনে উন্নয়নের নামে দুর্নীতির মহোৎসব চালিয়ে আবার এই ঋণের সুদ দেওয়ার জন্য নতুন করে ঋণ নেয়।</strong><br />
অথচ প্রতি বছরই বাজেটের বিশাল অংশ জুড়েই থাকে সুদ এবং সুদ। এ বছরের বাজেটেও দ্বিতীয় সর্ব বৃহৎ খাত হলো সুদ!! টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১১.৯ শতাংশ।</p>
<p>যেখানে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থার দরূন,</p>
<p>&#8212; দেশের ৪২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে।</p>
<p>&#8212; যেখানে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক বেকার, (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ জরিপ মতে, বেকার সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ ৮০ হাজার। বর্তমানে এই সংখ্যা কোন অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু করোনার সময়েই বেকারের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরো কয়েক কোটি যুবক। এমনকি শিক্ষিতশ্রেণির প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার। যার মাঝে স্নাতক পর্যায়ে উত্তীর্ণ রয়েছে প্রায় ৩৭% এবং স্নাতকোত্তর রয়েছে প্রায় ৩৪%)</p>
<p>&#8212; যেখানে খাদ্য সংকটে ভুগছে অর্ধেক জনগোষ্ঠী,<br />
সেখানে মোট বাজেটের এত বিশাল একটা অংশ শুধু সুদের পেছনেই ব্যয় হচ্ছে!!</p>
<p>• অথচ<strong> শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটের মাত্র ১২.০১%। জিডিপির হিসেবে যার পরিমাণ ১.৮৩%।</strong> জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ গতবারের তুলনায় কমেছে। বিশ্বে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম।</p>
<p><strong>ইউনেস্কো ও আইএলও’র তথ্যমতে, যেকোনো দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মান মোট বাজেটের ২০ শতাংশ আর জিডিপির ৬ শতাংশ।</strong> এর তুলনায় যে নগণ্য বরাদ্দ আমাদের বাজেটে যে দেয়া হয়েছে, তা দিয়ে কীভাবে একটি শিক্ষিত প্রজন্ম আশা করা যায়? গবেষণার জন্য তো আলাদা বাজেট নেই-ই। আবার, শিক্ষাখাতে বাজেট দেয়া হলেও &#8211; বর্তমান সময়ে যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা-কার্যক্রমের জন্য প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল, সেখানে অপটিক্যাল ফাইবারের</p>
<p>মতো আইটি পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ১০ শতাংশ এবং ল্যাপটপ আমদানিতে ভ্যাট বসানো হয়েছে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ সকল ধরনের প্রযুক্তি-পণ্যের দাম বেড়েছে। এ জাতীয় সকল সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ দ্বৈতনীতিরই নামান্তর। ডিজিটালাইজেশনের এই সময়ে এসে এমন পদক্ষেপ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।</p>
<p>• চিন্তা করুন এবারের বাজেট পেশ করা হয়েছে<strong><em> &#8220;কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন&#8221;</em></strong> শিরোনামে। এই কোভিড পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্যখাতে যে পরিমাণ ধ্বস নেমেছে তা কাটিয়ে ওঠা সহজসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য না রেখে <strong>স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৫.৪%</strong>। এই খাতে বাজেট যেখানে বাড়ানোর কথা, সেখানে না বাড়িয়ে এর বিপরীতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে সম্পৃক্ত দ্রব্যাদির মূল্য বাড়ানোতে প্রহসনেরই প্রমাণ মেলে।</p>
<p>• <strong>বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ৩.৮%, পরিবহন ও যোগাযোগে ১২%</strong> বরাদ্দ রেখে বাজেট করা হলেও তা কি আদৌও বাস্তবায়ন হয়!! এই খাত দুটির সাথে প্রক্রিয়াধীন ও প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট জড়িত। যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ছেই। কখনো কখনো তা একই ধরণের প্রকল্পে উন্নত রাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে কাঁচামালের যোগান সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। এক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা ও উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা মোটেও নেই। প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে বিদেশীদের। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও কোনো দেশি কোম্পানির কাছে নেই। প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই হচ্ছে বিদেশি। আর শ্রমিকদের মধ্যে দেশীয় যারা, তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধাও নিতান্তই সামান্য। তাহলে কার পেছনে ব্যয় হচ্ছে এত অর্থ?</p>
<p>বিদ্যুৎ উৎপাদনে ছোট-বড় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াট হলেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৭৮২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তার উপর এই অংশ থেকেই বিতরণ লস হয়েছে ৮.৪৮%। যার ফলাফলস্বরুপ এখনো ২১ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে।</p>
<p>• পরিবহন ও যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত নগরজীবনে মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। যানজটের ফলে দীর্ঘ একটা সময় অপচয় হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রের সময় নষ্ট হচ্ছে। নগরবাসীদের অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তো দিন দিন বাড়ছেই। কেবল ২০২১ সালেই সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৮৫১৬ জন। একটা প্রতিবেদনে এরকম দেখালেও মূলত বাস্তব পরিসংখ্যান এর চেয়ে অনেকবেশি।</p>
<p>বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে রেল ও নৌপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিলো। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নৌ-পথ অর্ধেকের বেশি কমেছে। রেলপথ গুরুত্ব পায়নি। বরং রেলযাত্রার উপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সড়কপথ বাড়লেও এসবের মান ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।<br />
<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a><br />
• অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারের বাজেটও সম্পূর্ণ ঘাটতি বাজেট। <strong>মোট বাজেটের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা হলেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা।</strong> বাকী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা পুরোটাই ঘাটতি থাকছে। যা মোট বাজেটের ৩৬.১৪ শতাংশ। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েই এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ঋণ নেয়ার ধারাবাহিকতা আজ নতুন নয়। প্রতিবছরই ঋণের বোঝা বাড়ছে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩২ ডলারে। টাকার হিসেবে যার পরিমান ৪০ হাজারেরও বেশি। সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুটির উপরও এই ঋণের ভার বর্তাবে।<br />
বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি নিরাপদ সীমার মাঝে পড়ে। অথচ ২২-২৩ অর্থবছরেরই ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫.৫ শতাংশের বেশি। এই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ঋণ ও প্রতিবছর যে ঘাটতি বাজেট করতে হচ্ছে, এ নিয়ে বাজেট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তো লক্ষ্যণীয় নয়ই, বরং নামেমাত্র বাজেট পেশ করতে হবে, এজন্যই বাজেট পেশ করা হচ্ছে।</p>
<p>কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, ‘আর্থিক বিবৃতি প্রদান একপ্রকার ধর্মীয় আচার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে এবং তার সম্ভাব্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রভূত বাকচাতুরীর দ্বারা উচ্চকিত রূপে পাঠ করা হয় (যা কখনোই পাঁচ ঘণ্টার নিচে সম্পন্ন হওয়ার নয়) অর্থাৎ নানাবিধ নর্তন, কুর্দন, ভাব ও ভঙ্গিমার সঙ্গে চার ঘণ্টার একটি বক্তৃতা প্রদান করা হয়।’</p>
<p>• প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ-পাচার যে হচ্ছে, এতকাল পরে সরকারিভাবে এই প্রথম তা স্বীকার করেছে। কিন্তু বিদেশে পাচারকৃত অর্থ বৈধ করার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে মূলত এই অর্থপাচারকে বৈধতাই দেয়া হয়েছে। অর্থ-পাচারকারীরা বরং আরো সুযোগ পেয়ে গেলো এই অবৈধ কাজের! ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, <strong>প্রতি বছর বাংলাদেশে থেকেই ১০০০ থেকে ১৫০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়।</strong></p>
<p>ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইনন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে<strong> সোয়া চার লাখ কোটি টাকা</strong> পাচার হয়।</p>
<p>এই বিপুল পরিমাণ দেশীয় অর্থ বিদেশে পাচার হওয়া ঠেকাতে উপযুক্ত কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং এবারের বাজেটের আলোচনায় এই কাজের প্রতি উৎসাহিত করা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়ংকর অশানি সংকেত!</p>
<p>• একটু ভালোভাবেই লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাজেটটি সম্পূর্ণ বিত্তবান, ব্যবসায়ী, মুনাফাভোগী ও অর্থ পাচারকারীদের স্বার্থ মোতাবেকই হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছু রাখা হয়নি। পুঁজিবাদের নিয়ম অনুযায়ী এবারের বাজেটও হয়েছে অর্থবিত্তদের জন্য সুখকর এবং সাধারণ জনগণকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। রেমিট্যান্স এর উপর আড়াই শতাংশ প্রণোদনার সুযোগে শুধু মানি লন্ডারিংয়ের সাথে জড়িত ব্যাক্তিরাই উপকৃত হচ্ছে।</p>
<p>এ নিয়ে পরপর ৩ বছর কর্পোরেট কর কমানো হয়েছে। শুধু এ বছরেই কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর উপর আরোপিত করের ২.৫ শতাংশ কমানো হয়। এতে করে বড় ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলোই লাভবান হবে বেশি। তাদের ব্যয় সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর খাবারের দাম কমানোতে বিলাসিতার প্রতি প্রাধান্য দেয়ার ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে সাধারণ জনতাদের উপর কর আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বাজারে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার উত্তরণের চিন্তা না করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কাটিয়ে উঠার প্রতিও ভ্রুক্ষেপ নেই। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও বাড়বে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। ট্রেন-চলাচলের খরচ বেড়ে গেছে। অর্থাৎ এই বাজেটে ধনীদেরকে আরো ধনী হওয়ার সুযোগ এবং গরিবদেরকে আরও গরিব হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।</p>
<p>• এদিকে সরকারের আয়ের চেয়ে ঋণ বেশি। সরকার দাবী করে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কম। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে সরকার করের টাকার প্রায় ২০% আউট স্ট্যান্ডিং দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের খাতেই খরচ করে। এটাই বটম লাইন। ঋণের সুদ পাঁচ বছর আগেও এক অংকে ছিল। অর্থাৎ ৮-৯% সুদ বাবত খরচ মাত্র কয়েক বছরেই ১৯% ছাড়িয়েছে। বুঝা যাচ্ছে পরবর্তি যে কোন সরকারের জন্য বাজেট খরচ কতটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে?<br />
চলমান অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সরকারের আয় ছিল ২ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে সরকার শুধু অভ্যন্তরীণ ঋণ করেছে ২ লক্ষ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ হিসেব করলে পরিমাণটা আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থাৎ সরকারের আয়ের চেয়ে ঋণ ঢের বেশি।</p>
<p>এর পাশাপাশি লক্ষ্য করলে দেখবো যে,</p>
<p>• রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল ও দিক-নির্দেশনা নেই। সরকারি ব্যয় ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপটে উচিৎ ছিল ১০ শতাংশ কমানো।</p>
<p>• দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি গুরুত্বহীন থেকে গেছে। বাজার-অর্থনীতিতে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কী করতে পারে? বেসরকারি খাতের সঙ্গে ব্যাক্তি খাতের উপর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কীভাবে তা করবে সেই নির্দেশনা বাজেটে নেই। ভোক্তা অধিকার ও পণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য চাহিদার পরিমাণ জানা জরুরি। এর উপর ভিত্তি করে যোগানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু দ্রব্যমূল্যকে একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখানো হলেও বাজেটে এ সমস্যা সমাধানের জন্য কোন উদ্যোগ নেই।</p>
<p>• বড় বড় প্রকল্প গুলোর টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও চাহিদা মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে না, আমরা দেখছি চীন, ভারতের তুলনায় &#8211; এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়ও আমাদের নির্মাণ খরচ বেশি।</p>
<p>• দেশের অন্যতম বড় সংকট হচ্ছে- সামাজিক নিরাপত্তা। কিন্তু এই খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের দেড় শতাংশ বরাদ্দ, যা খুবই নগণ্য। এর উপর সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতনকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে দেখানো হয়। অন্যান্য খাতের ভর্তুকিও এই খাতে দেখানো হয়।</p>
<p>• কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেট দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬.২%। এদিকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে বর্তমানে ধান ছাড়া মোটামুটি সব ধরণের খাদ্যদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। আবার যেগুলো দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, কৃষকরা তার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকটে দিনাতিপাত করছে তারা। অথচ এ কৃষিই আমাদের সাড়ে সাতশো বছরের ইতিহাসে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।</p>
<p>• নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, জনগণের আয় বাড়েনি। গত কয়েকবছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো হয়নি বরং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নষ্ট করা হয়েছে। করোনার মধ্যে ২৫টি পাট কল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, একের পর এক চিনিকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যায় করলে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব পাটকল, চিনিকল চালু করা সম্ভব। এতে কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান ফিরে পাবে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, হাসপাতালে নার্স, ডাক্তারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে</p>
<p>প্রায় লক্ষ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব। এসব নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণে বাজেটে কোন বরাদ্দ বা নির্দেশনা নেই।</p>
<p>• আবার আবাসন খাত নিয়ে কোন কথা নেই। একইভাবে সংস্কৃতি ও ধর্ম খাতে মাত্র ০.৮% বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি কত বড় দৈন্যতা! এ দেশের যুব সমাজের নৈতিক চিন্তাগত অবস্থানের ভবিষ্যৎ তাহলে কী?</p>
<p>এইভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভয়াবহ অসামঞ্জস্য লক্ষণীয়। সুদের হার বাড়ছে, কিন্তু মৌলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোর বাজেট দিনকে দিন কমছে। ফলশ্রুতিতে একটি ফাঁদ তৈরি হচ্ছে!</p>
<p>এ বাজেট মূলত একটি মৌখিক বাজেট। মৌখিক কিছু আয় দেখানো হলেও তা মূলত মিথ্যা, কারণ তা ব্যাংক ঋণের সাথে মিলছে না। তবুও যদি এ মৌখিক বাজেট বাস্তবায়িত হতো, তাও একটি কথা ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরের বাজেট পর্যালোচনা দেখলে বোঝা যাবে বাস্তবায়নের হার ধীরে ধীরে কমছে তো কমেই যাচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের ৮১% বাস্তবায়ন হয়েছে, যেটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসে ৭৬% হয়ে গেছে আর গত অর্থবছরে নেমে এসেছে ৬০%-এর কমে। এভাবে অপচয়, অবৈধভাবে অর্থলুট, দুর্নীতির কারণে বাস্তবায়নের হার ক্রমেই কমছে, অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবতা নেই। অপরদিকে যে বিশাল অঙ্কের সুদ, তা যদি দেশের উন্নয়নের কাজে লাগানো যেতো, তাহলে পরিস্থিতি কেমন হতো তা খুব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কিছুই হবে না!</p>
<p>কোনো রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা, বড় ব্যক্তি এসব মৌলিক বিষয় নিয়ে সঠিক পর্যালোচনা তুলে ধরছে না। ফলশ্রুতিতে বাজেট সঠিকভাবে পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনার যে গুরুত্ব ও আবশ্যকীয়তা রয়েছে, যুবসমাজ ও জনগণ তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বাজেটের বিষয়টি একটি একাডেমিক তত্ত্বীয় বিষয় হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আমরা কেউ ভ্রুক্ষেপ করছি না, আর দেশের অবস্থা যা হওয়ার তাই হচ্ছে।</p>
<p><strong>৯০% মুসলমানের দেশে ১১.৪% রাষ্ট্রীয় সুদ দেওয়া হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই;</strong> অথচ এক ঢাকা শহরেই প্রতিরাতে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে বস্তিতে ঘুমায়। শহরগুলোতে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পায়। দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোন তাদের শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, পতিতাবৃত্তি করছে শুধুমাত্র দু’বেলা খাবারের জন্য। দারিদ্র্যতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দূরত্ব। কর্মসংস্থান তো বাড়ছেই না, বরং কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানুষ প্রতিদিন বেকার হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে, করোনাকালীন পরিস্থিতিতে যা চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার যে সকল জায়গাতে দুর্নীতি বেশি, যেমন– সামাজিক নিরাপত্তা খাত, সে সকল জায়গাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে সত্যিকার্থে জনগণ কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে, নাকি অনিরাপত্তা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে? এ ক্রান্তিকালেও সেনা বাজেট বাড়ানো হচ্ছে কেন?</p>
<p>যে কৃষি আমাদের ঐতিহ্য, যে কৃষি আমাদের দিয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদা, সে কৃষিকে ধ্বংস করা হয়েছে, বরাদ্ধকৃত বাজেটই যার প্রমাণ। অথচ সুদের পেছনে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। শুধু কি তাই? এ সুদের পরিমাণ আমাদের শিক্ষা বাজেটের কাছাকাছি! সুদ পরিশোধ করতে হবে, মূল ঋণ তো আছেই! কিন্তু আমাদের আয় কোথায়? আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই তো বেহাল দশা, মূল ঋণ আমরা কখন পরিশোধ করব? অথচ আমাদের দেশের যে সম্ভাবনা, আমাদের খনিজ সম্পদ, আমাদের কৃষি, আমাদের বনাঞ্চল, আমাদের যুব-সম্পদ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর– এসব নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক বছরে সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের দেশকে পৃথিবীর অন্যতম ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী একটি দেশে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারছি না।</p>
<p>সুদভিত্তিক পুঁজিবাদীরা সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকালে এমন এক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির কারণে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, জেনে হোক বা না জেনে সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছি, জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতে মানুষের মুক্তি তো দূরের কথা, গোটা দুনিয়ার ৭০-৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, অনাহারে, অসুখী অবস্থায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদের কারণে পাশ্চাত্য তাদের বাজারকে ঠিক রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ টন খাবার ধ্বংস করছে, আবার একই সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে।</p>
<p>পুঁজিবাদীদের শাসনের ফলাফলের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এ জুলুম ও শোষণ এখনও সমানভাবে বিদ্যমান। অর্থাৎ আমাদের দুর্দশার অন্যতম মূল কারণ সুদ। অথচ এটি নিয়ে আমরা কেউ কথা বলি না, উল্টো সুদকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।</p>
<p>সুদের ব্যাপারে ইসলাম কত সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী মূলনীতি দিয়েছিল, তা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর বিদায় হজ্জের ভাষণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাসূল (সাঃ) আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার পরেই যে সকল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সুদ। তিনি সবাইকে সুদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব, ইসলামের আলেমগণ, নেতাগণ সবসময়ই সুদের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। তারা জনগনকে সুদবিহীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। কারণ এ সুদ ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য যেভাবে ডেকে নিয়ে আসে, সুদ বন্ধ করা ব্যতীত তা কখনোই মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অর্থনীতি পঙ্গু। এ অর্থব্যবস্থায় সুদ হলো তেলের মতো। তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, সুদ ছাড়াও এই অর্থনীতি চলবে না। আবার এটি থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট হবেই। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শোষণ, সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, বৈদেশিক রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা, বৈদেশিক ঋণ, সামাজিক অবক্ষয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পশ্চাৎপদতা, ঘুষ, দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয়সহ সুদের ৭০টির বেশি অপকারিতার কথা বলেছেন রাসূল (সাঃ)।<br />
এসব বর্তমানে আমাদের দেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।</p>
<p>এভাবে যদি একটি দেশ, একটি জাতি চলতে থাকে, তাহলে সে জাতির মধ্য থেকে কীভাবে মুক্তিকামী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে? রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে ধাবমান করা, সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারকদের হাতের পুতুল বানানো, চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি– সবই ভিন্ন দেশের লবিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক!</p>
<p>এজন্য আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথ অনুযায়ী আমাদের মুক্তির পর্যালোচনা, আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পর্যালোচনা ও সুদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিশন তুলে ধরা আবশ্যক। আমাদের সচেতনতা ও সংগ্রাম ছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অসম্ভব, সংকট থেকে মুক্তিও মিলবে না।</p>
<p>ঋণ ও সুদনির্ভর অর্থনীতির নিগড় থেকে বের হয়ে, কথিত উন্নয়নের ডায়ালগ বাদ দিয়ে আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি, কৃষি, বন্দর, প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ছোট শিল্প, ছোট উদ্যোগ, মৎসশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের বন্দর, আমাদের প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক আয় সবকিছু নিয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল কমিটি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কমিটি, প্রতিরক্ষা কমিটি, নগর ও স্বাস্থ্য রক্ষা কমিটি এবং জাতীয় উন্নয়ন কমিটি করে আগাতে হবে।</p>
<p>আমাদের রয়েছে–</p>
<blockquote><p>• ১৩ কোটি কর্মক্ষম মানুষ<br />
• তারুণ্যদীপ্ত প্রতিরক্ষা খাত<br />
• ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রিক বিশাল সম্ভাবনা<br />
• দুনিয়ার সেরা কৃষি (যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষে দশ বছরে সেরা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব)<br />
• গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর<br />
• বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ<br />
• বনাঞ্চল<br />
• মৎসশিল্প ইত্যাদি</p></blockquote>
<p>এসব নিয়ে মাত্র বিশ বছর ভালোভাবে কাজ করলে এ দেশের বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকটসহ যাবতীয় সংকটের সমাধান তো হবেই, যাকাত নেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না; ইসলামী সভ্যতা যার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/budget-analysis-2022-23/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7192</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শহরের রূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/spirit-of-city/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/spirit-of-city/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 12 Jun 2022 19:15:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[শহর ও স্থাপত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=7176</guid>

					<description><![CDATA[ইসলামী সভ্যতার অনন্য সামগ্রিকতা, বিশালতা ও অনন্যতার প্রকাশক তার বাহ্যিকতা নয়, বরং তার রূহ। তাই কোনো কিছুর বাহ্যিক কাঠামোর চেয়েও তার রূহ কতটা ইসলামী, সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু ইসলামী সভ্যতার অংশ কিনা বা ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামী সভ্যতার অনন্য সামগ্রিকতা, বিশালতা ও অনন্যতার প্রকাশক তার বাহ্যিকতা নয়, বরং তার রূহ। তাই কোনো কিছুর বাহ্যিক কাঠামোর চেয়েও তার রূহ কতটা ইসলামী, সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু ইসলামী সভ্যতার অংশ কিনা বা ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করে কিনা তা তার রূহ কতটা ইসলামী তার সমানুপাতিক। কারণ ইসলামী সভ্যতা হলো নববী হিকমতকে ধারণকারী একটি বিশ্বব্যবস্থা, যা গোটা মানবসভ্যতাকে আদালতপূর্ণভাবে পরিচালিত করেছে। সুতরাং, কোনো কিছু ইসলামী সভ্যতার অংশ কিনা বা তা ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করে কিনা তা নিরুপণের অন্যতম মাপকাঠি হলো তার রূহ। রূহ যতটা ইসলামী, কোনো কিছু ঠিক ততটাই ইসলামী সভ্যতার নিকটবর্তী, ঠিক ততটাই ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করে।</p>
<p>আর ইসলামের এ রূহানী প্রভাব ও সামগ্রিকতা জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ব্যাপ্ত। ইসলামী সভ্যতাকে ধারণকারী যেকোনো কিছুর  ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বৃহৎ ক্ষেত্র পর্যন্ত ইসলাম বিদ্যমান। এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামী সভ্যতায় শহরেরও রূহ আছে, কলব আছে। কোনো শহর কতটা ইসলামী তা শুধুমাত্র সে শহরের অধিবাসীদের ব্যক্তিগত ইবাদত কিংবা পোশাকের উপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে সে শহরের রূহ ইসলামকে কতটা ধারণ করে তার উপর।</p>
<p><strong>শহরের রূহ নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে শুরুতেই আমাদের নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে–</strong></p>
<p><strong>• শহর কী? </strong><br />
<strong>• রূহ কী?</strong><br />
<strong>• শহরের রূহ কী?</strong></p>
<p>ইবনে খালদুনের ভাষায়,“নগর এমন একটি আবাসস্থল যা মানুষ বসবাস ও প্রয়োজন পূরণের জন্য অবলম্বন করে থাকে। শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই তারা নগর নির্মাণ করে। এক্ষেত্রে অকল্যাণ (ফাসাদ) প্রতিরোধের ব্যবস্থা এবং কল্যাণ ও উপযোগিতার বন্দোবস্ত থাকা প্রয়োজন। নগরকে অবশ্যই সুরক্ষিত হতে হবে এবং তা নির্মাণের ক্ষেত্রে সুরক্ষিত স্থানকে প্রাধান্য দিতে হবে। একইসাথে আবহাওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, তা যেন মানুষের বাসোপযোগী হয়, রোগ কম ছড়ায় এবং মানুষের স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে।”</p>
<p>ইবনে খালদুনের সংজ্ঞার আলোকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই, ইসলামী সভ্যতার চিন্তার আলোকে তিনি যে নগর প্রস্তাবনা দিয়েছেন, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য চারটি। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো–</p>
<p>• শান্তি ও নিরাপত্তা<br />
• মাফসাদাত প্রতিরোধ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা<br />
• সুরক্ষিত অবস্থান<br />
• বসবাসযোগ্য পরিবেশ</p>
<p>উপরোক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য যে স্থানে পাওয়া যাবে, সে স্থানই ইসলামী সভ্যতায় শহর হিসেবে গণ্য হবে।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি শহরে কি মানুষের পক্ষে ভালোভাবে দ্বীন পালন করা সম্ভব? নাকি যে শহরে শান্তি ও নিরাপত্তা নেই, শৃঙ্খলা নেই, সুরক্ষা নেই, বসবাসযোগ্য পরিবেশ নেই, সেখানেই একজন মানুষের পক্ষে ভালোভাবে দ্বীন পালন করা সম্ভব?</p>
<p>এমন একটি যুক্তি আমরা সব সময় শুনি যে, ভালোভাবে দ্বীন পালন না করাই মানুষের সকল বিপদের উৎস। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমাদের শহরগুলোতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কারণ হিসেবেও আমরা এটাই মনে করি। একইভাবে বৈরাগ্যবাদী বয়ানে প্রভাবিত হয়ে এ বিষয়টিও আমরা অনেক শুনি যে, শহরের জীবনে চাকচিক্য বেশি, তাই শহর ত্যাগ করে নির্জন এলাকায় বসবাস করা উচিত, যাতে ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা যায়। কিংবা শহরে থাকার কারণে মানুষের মন দুনিয়াবী জাঁকজমকের ফিতনায় পড়ে যায়। অথচ মানুষের দ্বীন পালন করার পরিবেশও ভালভাবে এসব শহরেই তৈরি হওয়া সম্ভব!<br />
কামালিয়াতপূর্ণ শহর, অর্থাৎ পরিপূর্ণ শহরের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো:</p>
<ul>
<li>সম্পদের সহজলভ্যতা থাকা, বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা থাকা।</li>
<li>দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপত্তা থাকা।</li>
<li>তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় ও চিন্তাগত স্বাধীনতা থাকা।</li>
</ul>
<p>এসব বৈশিষ্ট্য আছে যে শহরে, সে শহরে ইবাদত পালন করা বেশি সহজ নাকি যে শহরে এসব বৈশিষ্ট্য নেই, সে শহরে ইবাদত পালন করা বেশি সহজ? অবশ্যই যে শহরে এসব বৈশিষ্ট্য আছে, সে শহরেই। ইসলামী সভ্যতার মহান দার্শনিক আলেম আল ফারাবীর ভাষায়, “মানুষ তার আখলাকী কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) শহরের মাধ্যমেই লাভ করে।” আর এ ধরনের শহর অবশ্যই ইসলামী সভ্যতার শহর। কেননা, উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ছাড়া কখনোই আখলাকী পরিপূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয়।</p>
<p>এ পর্যায়ে প্রশ্ন হলো, শহরের রূহ কী? রূহ (روح) শব্দটি কোরআন এবং হাদীসের অনেক স্থানেই বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পারিভাষিক সংজ্ঞা অনুযায়ী রূহ মূলত একটি ‘ইলাহী প্রেরণা’ বা ‘জীবনীশক্তি’। জীবন আর মৃত্যু সংজ্ঞায়িত হয় রূহের ধারণার উপর ভিত্তি করে। কোনো কিছুর ভেতরে রূহ না থাকলে তাকে মৃত বলা হয়। রূহসম্পন্ন সকল কিছুকেই জীবিত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।<br />
কোরআনের এ আয়াতের “و نفخ من روحه” (তিনি তাঁর রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন) আলোকে অনেক চিন্তক মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে রূহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।<br />
অনেক দার্শনিক শহরকে মানুষের উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন: আল ফারাবী তাঁর নগরের ধারণায় শহরের কেন্দ্রকে কলবের সাথে, এর পথ এবং রাস্তাগুলোকে শিরার সাথে, এর শাসককে মস্তিষ্কের সাথে তুলনা করে তুলে ধরেছেন। এবং এ সকল নগরতত্ত্বীয় ধারণাগুলোতে শহরের যে একটি চালিকা শক্তি, অর্থাৎ মানুষের ন্যায় একটি রূহ রয়েছে, এ বিষয়টি বারংবার উঠে এসেছে।</p>
<p><strong>এক্ষেত্রে শহরের রূহ মূলত কী?</strong></p>
<p>একটি সভ্যতার শহরের প্রতিটি ক্ষেত্র, যথা:<br />
&#8211; শহরের ইতিহাস,<br />
&#8211; পরিকল্পনা ও পরিছন্নতা,<br />
&#8211; সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ,<br />
&#8211; স্থাপত্য ও প্রতিষ্ঠান<br />
&#8211; মিউজিক,<br />
&#8211; সাহিত্য ও ভাষা<br />
&#8211; শিল্প ও চারুকলা<br />
&#8211; লোককাহিনী,<br />
&#8211; বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সম্পদ<br />
&#8211; এবং শহরের অধিবাসীরা হলো শহরের রূহ।</p>
<p>এ সকল বিষয় যে চিন্তার আলোকে তৈরি হবে, সে রূহ শহরের প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। এগুলো বিহীন নগরকাঠামো চিন্তা করলে আমরা পাথরের স্তুপ আর বিরাট অট্টালিকা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না। অর্থাৎ রূহহীন শহর শুধুমাত্র ইট-পাথরের স্তুপ ব্যতীত কিছুই নয়। এক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় হলো একটি শহরকে রূহসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে মানুষের তৈরিকৃত। অর্থাৎ, একটি শহরের রূহ তৈরি করে সে শহরের অধিবাসীরা।<br />
মানুষ শহর তৈরি করে এবং এর রূহও মানুষের মাধ্যমেই তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে মানুষ তথা শহরের অধিবাসীদের পরিবর্তনের অর্থ হলো শহরের রূহ পরিবর্তিত হওয়া। পরিবর্তিত শহরের মানুষ মুসলমান হলে শহরের রূহ হয় ইসলামী, খ্রিস্টান হলে শহরের রূহ খ্রিস্টান ধর্মের চিন্তার আলোকে তৈরি হয়, বৌদ্ধ হলে শহরের রূহ তৈরি হয় বৌদ্ধ ধর্মের চিন্তার আলোকে।</p>
<p>একটি শহরকে দূর থেকে অবলোকন করলে যদি সেখানে মিনার দেখা যায়, তবে তা ইসলামী শহর; যদি সেখানে চার্চের টাওয়ারগুলোকে বিদ্রোহীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তবে তা খ্রিস্টানদের শহর; যদি তা প্যাগোডা দিয়ে সজ্জিত দেখা যায়, তবে তা বৌদ্ধদের শহর; আর যদি তা মূর্তি, মন্দির দিয়ে সজ্জিত দেখা যায়, তবে তা হিন্দুদের শহর। অর্থাৎ, একটি শহরের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মধ্যকার রূহ সে শহরের রূহের প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো শহরের আজান, চার্চের ঘন্টা, মন্দিরের শাঁখের আওয়াজ কিংবা মঠের স্থাপত্যশৈলী সে শহরের রূহের প্রতিনিধিত্ব করে।</p>
<p>শহর একটি ক্রমাগত অগ্রসরমান এবং পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে। এই পার্থক্য আমরা বহির্কাঠামোর পরিবর্তন থেকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি। রাসূল (স.) এর ফাতহে মক্কা, মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত বিজয়, তারিক বিন যিয়াদের স্পেন বিজয়, ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বঙ্গবিজয়, আল্প আরসালানের মালাজগিরতের যুদ্ধ, সুলতান ফাতিহ কর্তৃক বিজিত ইস্তাম্বুল কীভাবে একটি শহরের রূহ পরিবর্তিত হয় তাঁর উজ্জ্বল নিদর্শন। রাসূল (স.) কেন মক্কা বিজয়ের সাথে সাথেই কাবা প্রাঙ্গনের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন কিংবা সুলতান ফাতিহ ইস্তাম্বুল বিজয়ের সাথে সাথেই কেন আয়া সোফিয়ার কাঠামো বদলে দিয়েছিলেন তা আমাদের সামনে স্পষ্ট। কিংবা, মুসলমানগণ বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে সাথে সাথেই মসজিদ নির্মাণ করার সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো সে শহরের রূহকে পরিবর্তন করা।</p>
<p>কিছু শহরে এমন জায়গা বা ব্যক্তিত্ব রয়েছে যা শহরের রূহকে জাগ্রত রাখে।<br />
মদীনায় পয়গম্বর (স.), বায়তুল মাকদিসে বহু পয়গম্বরের কবর, কুফায় আলী (রা.), ইরাকে হযরত হোসাইন (রা.), মাওয়ারাউন নাহারে ইমাম মাতুরিদী (র.), আদিয়ামানে বায়েজিদ বোস্তামী (র.), ইস্তাম্বুলে আবু আইয়ুব আল আনসারী (রা.), সাইপ্রাসে উম্মে হালা থেকে শুরু করে বঙ্গভূমির সিলেটে শাহজালাল (র.), শাহ পরাণ (র.), ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে শাহ আলী (র.) এভাবে ইসলামী সভ্যতার শহরগুলোতে মহান পয়গম্বরগণ, সুফী, আলেম, মুজাহিদ, দরবেশদের কবরগুলোও সে শহরগুলোর প্রাণকেন্দ্র, আধ্যাত্মিকতা ও রূহকে প্রভাবিত করেছে।</p>
<blockquote><p><strong>তাই ইসলামী সভ্যতাকে ধারণকারী শহর আর পাশ্চাত্য সভ্যতাকে ধারণকারী শহরগুলোর মাঝে আকাশপাতাল তফাত বিদ্যমান। কেননা, যে শহরের প্রতিবেশী অভুক্ত আছে কিনা, কেউ কোনো সমস্যায় আছে কিনা সে চিন্তা না করেই উদ্দাম বিলাসিতার আয়োজন করা হয়, যে শহরে মানুষ বিশুদ্ধ পানি পায় না, অপরদিকে হাজারো লিটার পানির অপচয় হয়, যে শহরে হাজারখানেক মানুষের চেয়েও একজন মানুষের ব্যক্তিগত প্রসাধনীর ব্যয় বেশি হয়, সে শহর কখনোই ইসলামী হতে পারে না, ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করতে পারে না।</strong></p></blockquote>
<p>আমির ইবরাহীমের মতে, কোনো শহরকে রূহসম্পন্ন হতে হলে নিম্নলিখিত চারটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে।</p>
<p>• <strong>ব্যবস্থা এবং সামঞ্জস্য:</strong> এমন শর্ত প্রদান করা যাকে আমরা সংগঠন এবং সাদৃশ্য বলতে পারি। এ আইনগুলো বেশিরভাগ দ্বীন কর্তৃক নির্ধারিত হয়। মানুষ এবং মানুষের মধ্যে সিস্টেমের সমন্বয়ে, অথবা মানুষ এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্যের মধ্যকার সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরে।</p>
<p>• <strong>পরিচ্ছন্নতা:</strong> এটি আধ্যাত্মিক এবং বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা উভয়কেই বোঝায়।</p>
<p>• <strong>ব্যবহারযোগ্যতা:</strong> শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যা শহরের কার্যকারিতা নিশ্চিত করে পারস্পরিক দায়িত্বের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে।</p>
<p>• <strong>সৌন্দর্য, অর্থাৎ সৌজন্য:</strong> এটি সেই অভিক্ষেপ যা শহর থেকে মানুষের রূহের উপর পড়ে। মানুষের রূহের সাথে শহরের রূহের সামঞ্জস্য, মানুষের পরিচয়ের মাধ্যমে শহরের পরিচিতি তৈরি হওয়া এক্ষেত্রে বিবেচ্য।</p>
<p>ইসলামী সভ্যতাকে ধারণকারী রূহসম্পন্ন একটি শহরই প্রকৃত রূহসম্পন্ন শহর। এ শহরে মানুষের দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায় মানুষকে গোপনে উপকার, সহযোগিতা করার মাধ্যমে। এ দায়িত্ববোধ শহরের মধ্যকার ইখওয়ান (ভ্রাতৃত্ব) এর প্রতিনিধিত্ব করে। এ শহরে কোনো মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায় না, কোনো বোন পেটের দায়ে তাঁর সম্মান বিক্রি করতে বাধ্য হয় না; এ শহরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিদ্যমান; এ শহরের প্রতিটি স্থাপত্য হয় চোখের প্রশান্তি, যা তার প্রতিবেশীর হক নষ্ট করে তৈরি হয় না; এ শহরের প্রতিটি অধিবাসী অপর অধিবাসীর প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও রহমপূর্ণ আচরণ চর্চা করে, রহমানী আখলাকের অধিকারী হয়। এজন্যই সময়ের মুতাফাক্কিরগণ বলেন, “সভ্যতার পুনর্জাগরণে সর্বপ্রথম প্রয়োজন ব্যক্তির জাগরণ বা জাগ্রত ব্যক্তিত্বের। কেননা ঘুমন্ত ব্যক্তির মাধ্যমে কখনো জাগ্রত সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দরকার হলো রূহের জাগরণ। অতঃপর চিন্তা ও বিশ্বাসের জাগরণ। কেননা, রূহ জাগ্রত না হলে ব্যক্তি জাগ্রত হবে না, আর চিন্তা ও বিশ্বাসের জাগরণ না হলে অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি কোনো ক্ষেত্রেই পুনর্জাগরণ আসবে না।”</p>
<p>আর এ ধরনের রূহসম্পন্ন শহর কেবলমাত্র একদল রূহসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের হাত ধরেই গড়ে উঠতে পারে।<br />
বাংলা অঞ্চলের সাতশো বছরব্যাপী মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে তাই রূহসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তৈরির আন্দোলনের ইশতেহার ঘোষণা আমাদেরকেই করতে হবে, নতুনভাবে সমগ্র বাংলাদেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে হবে।</p>
<p>আমরা আমাদের শহর ও স্থাপত্যসমূহের হারিয়ে যাওয়া রূহের পুনর্জাগরণের প্রত্যাশায়…</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/spirit-of-city/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">7176</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রমজান হোক পুনর্জাগরণের মাস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/may-ramadan-be-the-month-of-renaissance/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/may-ramadan-be-the-month-of-renaissance/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 28 Mar 2022 18:00:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[রমজান হোক পুনর্জাগরণের মাস]]></category>
		<category><![CDATA[রমজান হো্‌ পুনর্জাগরণের মাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6098</guid>

					<description><![CDATA[প্রচন্ড খরা শেষে বৃষ্টির আহ্বান নিয়ে ছুটে আসা শীতল বাতাস যেমন, রমজানের আহ্বানও যেন ঠিক তেমন। অথবা রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটার ছোঁয়ায় সৃষ্টি হওয়া সোঁদা ঘ্রাণের মতো। রমজান এমন এক আধ্যাত্মিক সময়কাল, যে সময়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে রুহানি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>প্রচন্ড খরা শেষে বৃষ্টির আহ্বান নিয়ে ছুটে আসা শীতল বাতাস যেমন, রমজানের আহ্বানও যেন ঠিক তেমন। অথবা রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটার ছোঁয়ায় সৃষ্টি হওয়া সোঁদা ঘ্রাণের মতো। রমজান এমন এক আধ্যাত্মিক সময়কাল, যে সময়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে রুহানি বাতাস বইতে থাকে। সেহরি-ইফতারের আমেজ, তারাবিহ, ইফতারির ঘ্রাণ, রহমত-বরকত-মাগফিরাতের সওগাত, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির নতুন খুশবু মিলেমিশে জান্নাতি এক অনুভূতি প্রবাহিত হতে থাকে প্রতিটি মুসলিমের অন্তরে, যা শুধুই অনুভবের। আর এ অনুভূতির দাবিতেই কেবল সকল বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি রুহানি অন্তর পারে আরেকটি অন্তরের কাছে ‘পুনর্জাগরণ’ এর অনুভূতিকে পৌঁছে দিতে। সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার পূর্বপুরুষগণ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। আমরা যদি সে শিক্ষার ইতিহাসকে পর্যালোচনা করি, তবে সুস্পষ্ট দেখতে পাই–</p>
<p>•<strong> রমজান ‘انشاء الأخلاق’ এর মাসঃ</strong></p>
<p>মুসলিম উম্মাহর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ‘আখলাকী পতন’। রাষ্ট্রীয় আখলাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আখলাক পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই এ সংকট ফুটে উঠেছে প্রবলভাবে। রমজান বিশ্বজনীন এ সংকট মোকাবেলার শিক্ষাই দিয়ে যায় আমাদের।</p>
<p>• <strong>রমজান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির মাসঃ</strong></p>
<p>সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি জ্ঞান ও বাণিজ্য। বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকালে মুসলিম উম্মাহর এ কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা উচিত। কেননা এ রমজানেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কোরআন নাযিল করে আমাদের সাবধান করেছিলেন,</p>
<p>ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﺑَﻌْﻀُﻬُﻢْ ﺃَﻭْﻟِﻴَﺎﺀُ ﺑَﻌْﺾٍ ۚ ﺇِﻟَّﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮﻩُ ﺗَﻜُﻦ ﻓِﺘْﻨَﺔٌ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﻓَﺴَﺎﺩٌ ﻛَﺒِﻴﺮ<br />
যারা সত্য অস্বীকার করেছে, তারা পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে৷ যদি তোমরা এটা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি হবে ও বড় বিপর্যয় দেখা দেবে৷ (সূরা আনফাল: ৭৩)<br />
এ আয়াত স্পষ্টই দিকনির্দেশনা দিচ্ছে কোন কোন ব্যাপারে আমাদের পারস্পারিক সাহায্য করা আবশ্যক। সেগুলো হলোঃ</p>
<p>১) জ্ঞানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা<br />
২) অর্থনৈতিক সহযোগিতা</p>
<p>অথচ আজ মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়েই প্রচণ্ড রকম ঘাটতি! তাই রমজানকে কেন্দ্র করে সকল বিভেদ ভুলে গড়ে উঠতে পারে ‘ইসলামিক ইউনিয়ন’ বাস্তবায়নের নতুন দুয়ার। রমজানে সকল হৃদয়ে আধ্যাত্মিক ছোঁয়া ও রুহানি পরশের সম্মিলনে সে সম্পর্ক সৃষ্টির আবেশ থাকে; শুধু প্রয়োজন আমাদের প্রচেষ্টার।</p>
<p><strong>• রমজান আকলের সত্যিকার ব্যবহার ও গুরুত্বারোপের মাসঃ</strong></p>
<p>ওহী এবং আকলের সমন্বয় ঘটিয়ে ইমাম মাতুরিদীর মতো আলেম, ইমাম গাজ্জালীর মতো মুতাকাল্লিম, মিমার সিনানের মতো বিজ্ঞানী গড়ে তোলার উদ্যোগ ও শপথ নেওয়ার মাস এ রমজান।</p>
<p><strong>• রমজান ক্বলবকে পরিচ্ছন্ন করার ও তাকওয়া অর্জনের মাসঃ</strong></p>
<p>মহান প্রভুর সাথে একান্ত আলাপন, জিকির, তিলাওয়াত, নফল ইবাদতের মধ্য দিয়ে ক্বলব পরিছন্ন করার উৎকৃষ্ঠ সময় রমজান। তাকওয়ার কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন,</p>
<p>ﻭَﻟَﻮْ ﺃَﻥَّ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟْﻘُﺮَﻯ ﺁﻣَﻨُﻮﺍْ ﻭَﺍﺗَّﻘَﻮﺍْ ﻟَﻔَﺘَﺤْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢ<br />
ﺑَﺮَﻛَﺎﺕٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ</p>
<p>আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান<br />
আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে<br />
আমি তাদের প্রতি আসমান ও জমিনের সমস্ত বরকতসমূহের দরজা খুলে দিবো। (সূরা আরাফ: ৯৬)<a href="https://www.facebook.com/Mihwar.bd" target="_blank" rel="noopener"><img decoding="async" class="aligncenter" style="width: 734px;" src="https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/05/mihwar-6.jpg" height="121" /></a></p>
<p><strong>• রমজান জিহাদ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাসঃ</strong></p>
<p>জুলুম উৎখাতের আন্দোলন, আদালত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং দ্বীনের জন্য না খেয়ে থেকে জীবন দান করার ‘বদর যুদ্ধ’ এ মাসেই হয়েছে। ইখতিয়ার উদ্দিনের বঙ্গবিজয়ও এ মাসেই। তাই রমজানকে কেন্দ্র করে সকল যুবকের চিন্তারাজ্যে উপলব্ধি হওয়া উচিৎ যে, প্রতিটি যুদ্ধ-সংগ্রামই হক্ব প্রতিষ্ঠার, জুলুমের প্রতিবাদে আন্দোলনের নাম। আর সকল আন্দোলন, মুক্তির জন্য প্রধান শর্ত যোগ্য নেতৃত্ব। ইসলামী সভ্যতার পতনের কারণ ও বর্তমান মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংকটও এ যোগ্য নেতৃত্ব! সুতরাং রমজান থেকেই হাজারো সুলতান ফাতিহ, জহির উদ্দিন বাবর গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা গ্রহন করতে হবে।</p>
<p><strong>• রমজান আল-কোরআন নাযিলের মাসঃ</strong></p>
<p>ﺷَﻬْﺮُ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﺍﻟَّﺬِﻱَ ﺃُﻧﺰِﻝَ ﻓِﻴﻪِ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥُ ﻫُﺪًﻯ ﻟِّﻠﻨَّﺎﺱِ<br />
ﻭَﺑَﻴِّﻨَﺎﺕٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ ﻭَﺍﻟْﻔُﺮْﻗَﺎﻥِ ﻓَﻤَﻦ ﺷَﻬِﺪَ ﻣِﻨﻜُﻢُ ﺍﻟﺸَّﻬْﺮَ<br />
ﻓَﻠْﻴَﺼُﻤْﻪ</p>
<p>রমজান মাস হলো সে মাস, যে মাসে মানবজাতির পথপ্রদর্শক, পথ প্রদর্শনের উজ্জল নিদর্শনসমূহ এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী কোরআন নাযিল করা হয়েছে। অতএব যে এ মাস পেল, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। (সূরা বাকারা: ১৮৫)</p>
<p>তাই কোরআনকে কেন্দ্র করেই আমরা আবার ঐক্যবদ্ধ হবো, মানবতার মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাবো।</p>
<p><strong>• রমজান জ্ঞানের পুনর্জাগরণের মাসঃ</strong></p>
<p>احياء العلوم , تجديد الفكر , الإصلاح في المنهج</p>
<p><strong>জ্ঞানের পুনর্জাগরণ, চিন্তার আধুনিকায়ন, পন্থার সংশোধন– এ তিনটি ছাড়া নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ অসম্ভব।</strong> তাই রমজান প্রত্যেকটি বিষয়কে আলাদা আলাদা ভাবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। যেমন- রমজান আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি দিচ্ছে, কিন্তু জ্ঞানের মৃত্যুবরণের কারণে সেটিও আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না! সুতরাং ভয়াবহ এ ঘাটতিগুলো পূরণের সুস্পষ্ট হিকমাহ-ই তুলে ধরছে রমজান। প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজের ভাষায় ‘ইসলামী সভ্যতার বিজয়ের প্রধান শর্ত জ্ঞানের পুনর্জাগরণ’।</p>
<p><strong>• রমজান সামাজিক সৌহার্দ্যের মাসঃ</strong></p>
<p>ইসলামী সভ্যতা রমজানকে কেন্দ্র করে যুব-বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করতো, উৎসবের আয়োজন করতো, যা গোটা সমাজের সকলকেই একত্রিত করে একটি রুহানি প্লাটফর্ম দিতো এবং সাথে থাকতো ইসলামের প্রাণসত্তা, সুদূরপ্রসারী চিন্তা, উম্মাহ কেন্দ্রিক চেতনা। রমজানকে কেন্দ্র করে যে পরিবেশ সৃষ্টি হতো, রাষ্ট্রীয় উদ্দীপনা শুরু হতো, তাতে সবাই স্বজন হারানো গরীবদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেতো, নিজে গোপনে উপকার করা ও অন্যান্য যুবক, শিশুদের উৎসাহ প্রদান করা, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আনন্দ বঞ্চিত সব বন্ধুদের জন্য দোয়া করা, মুজাহিদদের জন্য দোয়া করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সাদকা করার শিক্ষা পেতো ও তা বাস্তবায়ন করতো। প্রতিবেশী, গরীবদের পাশে থাকা তো মুসলমানদের ঈমানের অংশ হিসেবেই গণ্য হতো। পাঞ্জাবী, জুব্বা, লুঙ্গি পরে সবাই মিলে তারবীহ পড়তে যাওয়া; নকশি টুপি পরা, গায়ে আতর মাখা, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে সবাইকে নিয়ে ইফতার করা আর এ উৎসবমুখরতায় অন্যান্য ধর্মের সকলকে নিয়েই একাকার হয়ে যেত মুসলিম উম্মাহ।<br />
রমজান এ শিক্ষা নিয়ে আবারও হাজির হয়েছে।</p>
<p><strong>• রমজান পারস্পরিক সম্পর্ক ও শিশু-কিশোরদের উজ্জীবিত করার মাসঃ</strong></p>
<p>চারদিক ইফতারের ঘ্রাণ, সবাইকে দাওয়াত দেওয়া, দাওয়াত খাওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে অন্য রকম সম্প্রীতি। আর তাকে কেন্দ্র করে নানা ক্যালিগ্রাফি, আর্ট, শিল্পচর্চা দিয়ে ভরে উঠুক প্রতিটি রাস্তা, বাড়ির দেয়াল। বাচ্চাদেরকে নিয়ে এসব সাজানো, নানাবিধ গান, তাকবীর, জিকিরে ভরে উঠুক চারপাশ।রমজান বিশ্ববাসীর মুক্তির সংস্কৃতি, সামাজিক আন্দোলনের নাম। রমজান এক বিশ্বজনীন উৎসবের নাম। রমজান আধ্যাত্মিক বলয় সৃষ্টিকারী প্রশান্তির নাম। রমজান গোটা উম্মাহকে রুহানি বন্ধনে আবদ্ধকারী মহান অনুভূতির নাম। রমজান বিশ্ব মানবতার মুক্তির শপথ নেওয়ার নাম।</p>
<p>হৃদ মাঝারে আজ এক রুহানি বাতাস বইতে শুরু করেছে, সে শীতল বাতাসের উপলব্ধি থেকে প্রখ্যাত কবি সেজাই কারাকোচের ভাষায় বলতে চাই, <em>“মুসলিম উম্মাহ যদি এখনও জীবিত থাকে, মূলত রমজানের কারণেই জীবিত আছে। আর একদিন যদি পরিপূর্ণভাবে জেগে ওঠে, তাহলে রমজানের মাধ্যমে জেগে উঠবে। আর সে জাগরণ শুরুও হবে রমজানের মাধ্যমেই।”</em></p>
<p>“আহলান, সাহলান, মাহে রমজান!”</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/may-ramadan-be-the-month-of-renaissance/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6098</post-id>	</item>
		<item>
		<title>&#8220;বিশ্বব্যাপী আখলাকী সংকট&#8221;</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bisshwobapi-akhlaki-songkot/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bisshwobapi-akhlaki-songkot/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 20 Jan 2022 20:32:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বই পর্যালোচনা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6485</guid>

					<description><![CDATA[সম্মানিত উস্তাদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ মুসলিম উম্মাহর প্রখ্যাত একজন আলেম, উসূলবিদ ও মুতাফাক্কির। সুদীর্ঘ ৪০ বছরের অক্লান্ত অধ্যয়ন, উম্মাহর মহান আলেমগণের সাথে যোগাযোগ, বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনের ফলে লব্ধ জ্ঞানের প্রেক্ষিতে অসাধারণ পর্যালোচনার মাধ্যমে তিনি ইসলামী সভ্যতার পতনের পেছনে সক্রিয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সম্মানিত উস্তাদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ মুসলিম উম্মাহর প্রখ্যাত একজন আলেম, উসূলবিদ ও মুতাফাক্কির। সুদীর্ঘ ৪০ বছরের অক্লান্ত অধ্যয়ন, উম্মাহর মহান আলেমগণের সাথে যোগাযোগ, বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনের ফলে লব্ধ জ্ঞানের প্রেক্ষিতে অসাধারণ পর্যালোচনার মাধ্যমে তিনি ইসলামী সভ্যতার পতনের পেছনে সক্রিয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ‘আখলাক বিহীনতা’কে। ‘আখলাক’ ইসলামী সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষার নাম। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো তার বান্দা পৃথিবীতে আখলাকের বিনির্মাণ করবে। রিসালাতে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্যও আখলাকের বিনির্মাণ। ড. মেহমেদ গরমেজের মতে এ আখলাকের মাধ্যমেই ইসলামী সভ্যতা অত্যুচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিলো, আর আখলাক হারিয়ে ফেলার কারণেই সভ্যতার পতন ঘটে এবং আখলাক বিহীনতার কারণেই আজ ইসলামী সভ্যতা পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।</p>
<blockquote><p><strong>“বিশ্বব্যাপী আখলাকী সংকট” উস্তাদ ড. মেহমেদ গরমেজের এ চিন্তার এক অনবদ্য সম্মীলন। এ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে তিনি আখলাক বিহীনতার ফলে সৃষ্ট সংকট এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় অসাধারণভাবে আলোচনা করেছেন।</strong></p></blockquote>
<p>• গ্রন্থের শুরুতেই বইয়ের নামের শিরোনামের অধ্যায়ে উস্তাদ গরমেজ মতামত ব্যক্ত করেছেন, “বিশ্বব্যাপী যে ভয়াবহ সংকট বিদ্যমান, তা হলো আখলাক বিহীনতা। আর এ সংকট এতটাই সর্বব্যাপী, পৃথিবীর কোনো প্রান্তের মানুষই তা থেকে মুক্ত নয়।” অতঃপর তিনি মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার মহান আলেম আল্লামা রাগেব ইস্পাহানীর চিন্তার আলোকে তার আলোচনা তুলে ধরেছেন।</p>
<p><strong>মানব সৃষ্টির পেছনে ৩ টি উদ্দেশ্য রয়েছে। যথা–</strong><br />
<strong>১. ইবাদত</strong><br />
<strong>২. ইসতিখলাফ (খেলাফত)</strong><br />
<strong>৩. ইমারত</strong></p>
<p>উস্তাদ গরমেজ আখলাকী সংকট সৃষ্টি হওয়ার কারণ হিসেবে বলেছেন,<br />
“আজ বিশ্বব্যাপী যে আখলাকী সংকট বিদ্যমান, এটি মূলত অর্থবহতার সংকট, অর্থাৎ অর্থহীনতা থেকে সৃষ্ট একটি সংকট। বিশ্বব্যাপী আখলাকী সংকটের মূল কারণ হলো মহাবিশ্ব, মানুষ, সৃষ্টিজগতের অর্থ ও এই সকল সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে হারিয়ে ফেলা।”</p>
<p>উস্তাদ গরমেজ দেখিয়েছেন, মানুষের উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ মানুষ কেবলমাত্র আখলাক, আদালত ও মারহামাতের মাধ্যমেই পালন করতে পারে। একইসাথে এ সকল পরিভাষা অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।</p>
<p>উস্তাদ গরমেজ আরো দেখিয়েছেন, সেক্যুলার আখলাকের মৌলিক ত্রুটিগুলো কী কী এবং ইসলামের আখলাকের মধ্যে বহির্গত আখলাক কীভাবে এবং কোন ধরন নিয়ে প্রবেশ করেছে।</p>
<p>এসবের সমন্বয়ে এ অধ্যায়ে তাঁর আলাপ তুলনাহীন।</p>
<p>• গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে উস্তাদ গরমেজ আলোচনা করেছেন জ্ঞানের আখলাক নিয়ে। “জ্ঞান ও আখলাক” শিরোনামের এ অধ্যায়ে তিনি জ্ঞানের সাথে আখলাকের সম্পর্ক এবং আখলাক থেকে জ্ঞান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ফলাফল কী হতে পারে তা নিয়ে সংক্ষেপে মৌলিক আলোচনা করেছেন।</p>
<p>আখলাকের ক্ষেত্রে জ্ঞানের আখলাকের ভূমিকা, জ্ঞানের আখলাক ও নিরপেক্ষতার আলাপ, ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞানের আখলাক নিয়ে উস্তাদ গরমেজ এখানে অসাধারণ সারগর্ভ আলোচনা করেছেন।</p>
<p>• তৃতীয় অধ্যায়ে উস্তাদ গরমেজ আখলাক ও আদালত পরিভাষাদ্বয়ের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। “আখলাক ও আদালত” নামক এ অধ্যায়ে তিনি তুলে ধরেছেন, আদালতকে আমরা অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে বিবেচনা করে থাকি, অথচ আদালত একটি সামগ্রিক অর্থ দেয়, শুধুমাত্র আইন সম্পর্কীয় কোনো ধারণা নয়।<br />
<strong>এ অসাধারণ আলোচনাকে তিনি চারটি শিরোনামের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন–</strong><br />
<strong>১. আদালতের সাথে আখলাকের সম্পর্ক</strong><br />
<strong>২. আদালতের সাথে মারহামাতের সম্পর্ক</strong><br />
<strong>৩. আদালতের সাথে ইহসানের সম্পর্ক</strong><br />
<strong>৪. আদালতের সাথে আকলের সম্পর্ক</strong></p>
<p>• তারপর উস্তাদ গরমেজ আলোচনা করেছেন জ্ঞান, আখলাক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে। “জ্ঞান, আখলাক এবং বিশ্ববিদ্যালয়” শিরোনামের চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি তিনি জ্ঞানের চিন্তাকে নতুনরূপে হাজির করেছেন, যা আমি টানা চারবার পড়তে বাধ্য হয়েছি!</p>
<p>তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থান ও ক্ষমতায়ন পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়, তখন থেকে সবকিছুই প্রতিষ্ঠানের মোড়কে কাজ করতে থাকে। যার ফলে আমরা জ্ঞান বলতে আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুঝি। পূর্ববর্তী সময়কার জ্ঞানের ব্যবস্থার পরিবর্তিত রূপকেই আমরা ধারণ করি।</p>
<p>উস্তাদ গরমেজ বিশ্ববিদ্যালয়কে এখানে আক্ষরিক অর্থে উপস্থাপন না করে পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থার ধারণাকে তুলে ধরেছেন, একইসাথে আখলাকের সাথে জ্ঞান, জ্ঞানের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়, আবার তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যকার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।</p>
<p>• “পয়গামে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্য হিসেবে আখলাক” শীর্ষক পঞ্চম অধ্যায়ে উস্তাদ গরমেজ যে আলোচনা করেছেন, তার সারমর্ম করা কঠিন! প্রতিটি লাইনই একেকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। এ অধ্যায়ে উস্তাদ ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য হিসেবে আখলাকের অবস্থান এবং রিসালাতে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্য হিসেবে আখলাকের ধারণা ফুটিয়ে তুলেছেন।</p>
<p>• ষষ্ঠ অধ্যায় অর্থাৎ “কঠিন সময়ের আখলাক” উস্তাদ গরমেজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কঠিন সময়ে আখলাক রক্ষা করাটাই সবচেয়ে কঠিন এবং একইসাথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ অধ্যায়ে উস্তাদ কঠিন সময়ে আখলাকসম্পন্ন হয়ে টিকে থাকার পদ্ধতি আলোচনা করেছেন।</p>
<p>• গ্রন্থটির সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় হলো “স্ক্রিন সভ্যতার যুগে হায়ার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হওয়া”। গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ই যদিও অসাধারণ ও অত্যন্ত জরুরী, কিন্তু এ অধ্যায় তাঁর মৌলিকত্ব, স্বতন্ত্রতা ও নতুন উপস্থাপনের কারণে অবশ্যই শ্রেষ্ঠ। এটি একইসাথে উস্তাদ মেহমেদ গরমেজের এক অসাধারণ সৃষ্টি।</p>
<p>এ অধ্যায়ে উস্তাদ গরমেজ যে আলোচনা করেছেন, শুরুতেই তা গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। প্রথমত তিনি এ সভ্যতাকে আখ্যায়িত করেছেন স্ক্রিন সভ্যতা হিসেবে, যা পূর্বে কেউ করেনি। উস্তাদ গরমেজ দেখিয়েছেন, এ সভ্যতার মূল হলো স্ক্রিন (এক অর্থে টেকনোলজি)। তিনি এত অসাধারণভাবে এ বিষয়টি দেখিয়েছেন, যার ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।</p>
<p>উম্মাহর গাজ্জালী খ্যাত উস্তাদ ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তার আলোকে বিশ্লেষণ করে উস্তাদ গরমেজ দেখিয়েছেন স্ক্রিন সভ্যতা কীভাবে আমাদের প্রভাবিত করছে। উস্তাদ গরমেজের ভাষায়–<br />
“সোশাল মিডিয়া আমাদের ইদরাকী ক্ষমতাকে হত্যা করে মানুষকে তিনটি রোগের মুখোমুখী করেছে, এই তিনটি রোগই আসক্তির পর্যায়ের। যুগের গাজ্জালী নামে পরিচিতি লাভকারী মরক্কোর প্রখ্যাত আলেম ও দার্শনিক ড. ত্বহা আব্দুর রহমানের ভাষায় বললে এই রোগ তিনটি হলো–<br />
• তাফাররুজ<br />
• তাজাসসুস<br />
• তাকাশশুফ”<br />
অতঃপর তিনি প্রতিটি পরিভাষাকে ব্যাখ্যা করেছেন, সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন যা এ আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একইসাথে উস্তাদ গরমেজের যে অসাধারণত্ব, সে আলোকে তিনি শুধু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং সমাধানমূলক আলোচনাও করেছেন।</p>
<p><strong>তার মতে এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হলো হায়ার আখলাকসম্পন্ন হওয়া, যার দিকে ইসলাম সমগ্র মানবতাকে আহ্বান করে। অর্থাৎ স্ক্রিন সভ্যতার যুগে হায়ার মাধ্যমে পুনুরুজ্জীবিত হওয়া ও হায়া সম্পন্ন একটি পুনর্জাগরণ।</strong></p>
<p>এর মাধ্যমেই উস্তাদ মেহমেদ গরমেজ তাঁর আলোচনার সমাপ্তি টেনেছেন।<br />
স্ক্রিন সভ্যতার যুগে নিজেদের উজ্জীবিত করতে হলে, সংগ্রাম করতে হলে, ইসলামী সভ্যতাকে নতুনভাবে জাগরিত করতে হলে আখলাক আবশ্যক। আখলাক ব্যতীত কখনোই ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়। আর সত্যিকার আখলাকসম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থ অসাধারণ ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।</p>
<p>[উস্তাদ প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ এর কথাসমূহকে বাংলা ভাষায় আমাদের নিকট তুলে ধরার জন্য অনুবাদক শ্রদ্ধেয় Burhan Uddin ভাইয়ের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা। মক্তব প্রকাশনকেও ধন্যবাদ জানাই গ্রন্থটি প্রকাশ করার জন্য।]</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bisshwobapi-akhlaki-songkot/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6485</post-id>	</item>
		<item>
		<title>হালের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বেকারত্ব ও ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/haler-orthonitite-voyaboho-bekarotto-o-chatrosomajer-vobisshot-onishcoyota/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/haler-orthonitite-voyaboho-bekarotto-o-chatrosomajer-vobisshot-onishcoyota/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[হাসান আল ফিরদাউস]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 10 Jan 2022 07:01:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=6104</guid>

					<description><![CDATA[করোনাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে বেড়েছে তা সত্যি, কিন্তু সমাধানের চিন্তা ও আওয়াজকে বাদ দিয়ে সংকট কেন্দ্রিক সব সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই কি মুক্তি পাওয়া যাবে? ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদন মতে বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>করোনাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে বেড়েছে তা সত্যি, কিন্তু সমাধানের চিন্তা ও আওয়াজকে বাদ দিয়ে সংকট কেন্দ্রিক সব সমস্যার জন্য করোনা পরিস্থিতিকে দোষারোপ করলেই কি মুক্তি পাওয়া যাবে?</p>
<p>ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদন মতে বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য মতে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ১ কোটি ৩২ লাখ। বাংলাদেশে এখন ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশ। কিন্তু সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান কোথায়?<br />
চাকরির একেবারেই সাধারণ ছয়টি পদের বিপরীতে অনলাইন ও অফলাইনে আবেদন জমা পড়ে ৮২ হাজার ৬৫২টি! ভাবা যায় দেশের কী অবস্থা?</p>
<p>প্রশ্ন হলো এসবের জন্যও কি করোনা পরিস্থিতিই দায়ী? এসব কি একদিনেই হয়েছে? &#8216;না&#8217;।</p>
<p>আবার এখন করোনাকালীন যে অবস্থা, তাতে ভবিষ্যতে খাতা-কলমে এ সংখ্যা এবং জনজীবনের দুর্দশা যে কত গুণ বাড়বে তা হিসাবেরও বাইরে!</p>
<p>প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সময়ে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৫ লক্ষ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ সাড়ে আট কোটিতে পৌঁছাচ্ছে, যাদের দৈনিক আয় ১.৯ ডলারেরও কম। খাদ্য সংকটে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লক্ষ মানুষ। সংখ্যাগুলো কখনোই বাস্তবতাকে ধারণ করে না, তারপরও শুধুমাত্র সংখ্যার হিসেবেই পরিস্থিতি কী ভয়াবহ তা আমরা ভাবতে পারছি?</p>
<p>আবার দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মধ্যবিত্ত মানুষেরও আয় কমছে, ব্যক্তিগত সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে; সামষ্টিক বা পারিবারিক সঞ্চয় কমছে বলে ব্যক্তিগত ধার/ঋণের সুযোগ কমছে। এ সংকোচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বুঝা যায়, প্রতিনিয়তই বেকারত্বজনিত কর্মহীনতার কবলে পড়ে শিক্ষা খাতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পরিমাণ শুধু বাড়তেই থাকবে।<br />
কৃষি ও ভাসমান কাজে নিশ্চিতভাবে শিশুশ্রম বাড়বে।<br />
একইসাথে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ব্যাপকহারে বাড়বে।<br />
গ্রামীণ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশের হার কমে আসবে।</p>
<blockquote><p>তাহলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী?<br />
শিক্ষায় ঝরে পড়া বিশাল ছাত্র-সমাজকে নিয়ে কে ভাবছে? আগামীর প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের ভাবনা কী? রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে, প্রতিবাদ করে বা যে কোনো উপায়ে সংকট তুলে ধরে রাষ্ট্রকে সমাধান করতে বাধ্য করার ব্যাপারে কারোরই যেন মাথাব্যথা নেই!</p></blockquote>
<p>একটু চিন্তা করে দেখুন তো, বেকারত্ব আর ঝরে পড়ার পরিমাণ যখন বাড়বে, সামাজিক অপরাধ আর নিরাপত্তাহীনতা কি তখন কমবে? নাকি ভয়াবহ আকারে বাড়তে থাকবে?</p>
<p><strong>এদিকে অধ্যয়নরত ৪০% শিক্ষার্থীর অর্থ যোগান দেয় তার পরিবারের প্রবাসে থাকা সদস্যরা। তাদের কী অবস্থা?</strong><br />
<strong>এ আয় আমাদের রেমিট্যান্স আয়ও, যা দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ প্রবাস থেকে শ্রমিকরা ফিরে আসছে প্রতিনিয়ত! ফলে আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্সের পরিমাণও কমে যাচ্ছে । এখন পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন প্রায় ২৩ লক্ষ শ্রমিক, কিন্তু সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই!</strong></p>
<p>আবার খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে এ জাতীয় হাজারো ক্ষুদ্র শ্রেণি-পেশার মানুষদের এখন যা অবস্থা, তা তো আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পারছি ।</p>
<p>এসবের সমাধান কার কাছে?<br />
(হ্যাঁ, মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াবে । কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি পাশে না দাঁড়ায়, মানুষ কতদিন ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে সক্ষম হবে?)</p>
<p>কিছুদিন আগেও দেখেছিলাম করোনা সংকট মোকাবেলায় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক বরাদ্দ দিয়েছে যা সরাসরি এ শ্রেণি-পেশার মানুষেরা পেয়েছে। যেমন:<br />
যুক্তরাষ্ট্র ১ ট্রিলিয়ন ডলার, জার্মানি ৬১৪ বিলিয়ন ডলার, ব্রিটেন ৪১২ বিলিয়ন ডলার, স্পেন ২১৬ বিলিয়ন ডলার, কানাডা ৫৬.৮ বিলিয়ন ডলার, পোল্যান্ড ৫১.৩ বিলিয়ন ডলার, চেক রিপাবলিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, সুইডেন ২৯ বিলিয়ন ডলার, ইতালি ২৭ বিলিয়ন ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৭ বিলিয়ন ডলার, কাতার ২৩ বিলিয়ন ডলার, জাপান ১৯ বিলিয়ন ডলার, হংকং ১৫ বিলিয়ন ডলার, তুরস্ক ১৫ বিলিয়ন ডলার, সৌদি আরব ১৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে ।</p>
<p><strong>আমাদের দেশের বরাদ্দ কোথায়?</strong><br />
<strong>(হ্যাঁ, দেয়! কাদের দেয়? বড় বড় কোম্পানিগুলোকে দেয়, অর্থাৎ তেলা মাথায় তেল দেওয়া! আবার নামে যতটুকু দরিদ্রদের দেয়, তার কতটুকুই বা তাদের কাছে পৌঁছায়?)</strong></p>
<p>সব মিলিয়ে এ সংকট কবে কাটবে? কবে এ নিয়ে সরকার চাপে পড়বে? আমরাই বা কবে বৃহত্তর পরিসরে আওয়াজ তুলবো?</p>
<p>এসবের উত্তরে একটি কথা ঘুরেফিরেই শুনতে হয় &#8216;বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি দেশ, দরিদ্র্যতা এর নিত্য বিষয়&#8217;। অথচ আমাদের ৫০ এর উপরে খনিজ সম্পদ, সব বিদেশীদের হাতে ইজারা দেওয়া। ইউরেনিয়ামের মত দামী সম্পদ, যার জন্য এত যুদ্ধ, তা কিনা আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের বিনা পয়সায় দিয়ে যাচ্ছি!</p>
<p>এদিকে কৃষির ক্ষেত্রে &#8220;বণিক বার্তা&#8221;য় প্রকাশিত সবচেয়ে ভয়াবহ যে রিপোর্ট আমরা দেখেছি, তা হলো ধান ব্যতীত সকল প্রকার কৃষিদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করতে হচ্ছে আমাদের! অথচ আমরা গান গাই &#8216;ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা&#8217;..</p>
<p>গার্মেন্টস খাতে যা হচ্ছে তা নিয়ে আর কী-ই বা বলবো! লাখ লাখ মানুষ পথে বসার উপক্রম!<br />
শুধু গার্মেন্টস কেন, সব খাতেই একই অবস্থা ।</p>
<p>আচ্ছা, এ কৃষি, শিল্প, খনিজ সম্পদ, বন্দর নিয়ে যদি আমাদের সমাজের নীতিনির্ধারকরা না ভাবেন, তবে মুক্তি আসবে কীভাবে?<br />
হাজারো বেকার ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে যদি কোনো পরিকল্পনাই না থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎই বা কী?</p>
<p>জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণকারী এ শিক্ষিত বেকার ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে না ভাবলে ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই নিমজ্জিত হতে থাকবে, আর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আগামী প্রজন্মের উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলো মারা পড়বে।</p>
<p>ঈদ পরবর্তী কুরবানীর গোশত খাওয়ার আনন্দঘন সময়ে আমার বেদনার সুর বাজানোর কারণ হলো সত্যিকারের আনন্দ আমরা করতে পারছিনা। মানুষ ভালো না থাকলে কিসের আনন্দ! করোনা চলে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে– বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এ দুর্দশা বহুদিনের। এখনই পদক্ষেপ না নিলে প্রতিদিন দুর্দশা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাই আজ করোনা সমস্যা, কাল আরেক সমস্যা, পরশু অন্য আরেক সমস্যার অজুহাতে বসে থাকলে চলবে না। এ সকল সমস্যা চলতেই থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। সমস্যার অজুহাতে নির্লিপ্ত হয়ে থাকলে অবস্থার উন্নতি কখনোই হবে না, বরং দিনকে দিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে থাকবে।</p>
<p>কিন্তু আমরা যদি আমাদের প্রত্যেকটি খাতকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং সে আলোকে কাজ করে যাই, তাহলে সকল সমস্যা ও সংকট মোকাবেলা অবশ্যই সহজ হয়ে যাবে এবং এতে করে স্থায়ী মুক্তির দিকেও ধাবিত হওয়া সম্ভব হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/haler-orthonitite-voyaboho-bekarotto-o-chatrosomajer-vobisshot-onishcoyota/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">6104</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
