<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/author/dewan_md_azraf/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Mon, 07 Apr 2025 14:21:26 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>মানবতাবাদের বাস্তব রূপায়ণের প্রয়াস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 17 Jan 2025 06:01:30 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[অর্থনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[মানবতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15365</guid>

					<description><![CDATA[হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ) এর প্রিয়তম সাহাবী হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) জীবনী সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে দু&#8217;খানা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এ দু&#8217;টি পুস্তকে জীবনদর্শন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে আলোচনা থাকলেও বিশ্বস্তভাবে কোন আলোচনা হয়নি। বর্তমানে বাংলা ভাষায় আবু যর গিফারী]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ) এর প্রিয়তম সাহাবী হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) জীবনী সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে দু&#8217;খানা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এ দু&#8217;টি পুস্তকে জীবনদর্শন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে আলোচনা থাকলেও বিশ্বস্তভাবে কোন আলোচনা হয়নি। বর্তমানে বাংলা ভাষায় আবু যর গিফারী (রাঃ) অপরিচিত নাম না হলেও তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী পাঠক-পাঠিকার সম্যক পরিচয় নেই। যে জীবনদর্শনের আলোকে তিনি তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানকে আমীর মুয়াবিয়া (রাঃ), আমীর আমর বিন আস্ (রাঃ) ও মারওয়ানের কবল থেকে উদ্ধার করে সত্যিকারের ইসলামী শাসনব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা বর্তমানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; কেননা বর্তমানে ইসলামের নামে অনেক কিছুই প্রবর্তিত হচ্ছে।</p>
<p>কুরআন-উল-কারীমে আল্লাহকে ধারণা করা হয়েছে মালিক-উল-মুলক অর্থাৎ সমস্ত মুলকের মালিক হিসেবে। তিনি একমাত্র মালিক হলে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ, বাতাস অর্থাৎ এ বিশ্বজগতের সব কিছুরই মালিক তিনি। আল্লাহ্ সব কিছুরই মালিক হলে এ দুনিয়ায় মানুষের কি কোন সম্পদের উপর দাবি- দাওয়া নেই? তার উত্তর অতি স্পষ্ট ভাষায় দিয়েছেন সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মাওলানা মাহমুদুল হাসান মরহুম মাগফুর। তিনি একটি প্রসিদ্ধ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এ আয়াতে মানুষের অধিকারের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:</p>
<p>هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا &#8211;</p>
<p>&#8220;আল্লাহ্ পৃথিবীর সবকিছুই মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন।&#8221; অর্থাৎ সকল জিনিসই মানুষের প্রয়োজন মিটানোর জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন। কোন জিনিসই সৃষ্টিগতভাবে ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নয়। পক্ষান্তরে উহা সকলেরই সম্পত্তি বটে। যেহেতু সব জিনিসই মানুষের মঙ্গলার্থে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কারণে সকল জিনিসেই মানুষের ভোগ-দখলের অধিকার রয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যখন কোনও জিনিস কারো ভোগ-দখলে থাকবে, তাকেই কেবল এ জিনিসের একমাত্র মালিক বলে গণ্য করা হবে, অন্য কেউ তার উপর আধিপত্য খাটাতে পারবে না। তবে, কোন জিনিসের ভোগ দখলকারীর এও জেনে রাখা উচিত যে, সে নিজ দরকারের অতিরিক্ত বস্তু অনর্থক নিজ কবলে না রেখে অন্যকে অবাধে ভোগ-দখল করতে দেবে। কেননা মানুষ হিসাবে সৃষ্টির ভোগাধিকার প্রত্যেক মানুষেরই প্রাপ্য। <strong>এ</strong> <strong>কারণেই</strong> <strong>রীতিমত</strong> <strong>যাকাত</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করা</strong> <strong>সত্ত্বেও</strong> <strong>প্রয়োজনের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>সঞ্চয়</strong> <strong>করা</strong> <strong>কারো</strong> <strong>উচিত</strong> <strong>নয়।</strong> <strong>নবীগণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ধর্মভীরু</strong> <strong>লোকগণ</strong> <strong>এ</strong> <strong>কারণেই</strong> <strong>ধন</strong> <strong>সঞ্চয়</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বিরত</strong> <strong>থেকেছেন।</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কি</strong> <strong>হাদীস</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পরিষ্কার</strong> <strong>বুঝা</strong> <strong>যায়</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>সাহাবাগণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>তাবেঈগণ</strong> <strong>প্রয়োজনের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>বস্তু</strong> <strong>রাখা</strong> <strong>বা</strong> <strong>ব্যবহার</strong> <strong>করা</strong> <strong>হারাম</strong> <strong>বলেছেন।</strong> মোটের উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু সঞ্চয় বা ব্যবহার যে অনুচিত ও অসঙ্গত তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তুতে সব সৃষ্টিই মানুষের জন্য নীতি অনযায়ী সকল মানুষের দাবি রয়েছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু ভোগ-দখলকারী তার নিজের প্রয়োজনীয় অংশের অতিরিক্ত ভোগ করার দরুন অন্যায় দখলকারী বলে গণ্য হবে।</p>
<p>যুদ্ধলব্ধ মালের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। যুদ্ধলব্ধ মালেও প্রয়োজনের অতিরিক্তটুকু একই পর্যায়ভুক্ত। যুদ্ধলব্ধ মালকে বণ্টনের পূর্বে সকল মুজাহিদেরই মাল বা সম্পত্তি বলা চলে। এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল সকল মানুষেরই সম্পত্তি। যুদ্ধলব্ধ মাল প্রত্যেক মুজাহিদই প্রয়োজন অনুসারে খরচ করতে পারে। কেউ এ অর্থ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপব্যয় বা সঞ্চয় করলে সে আত্মসাৎকারী বলে অভিহিত হবে।</p>
<p>এ মতবাদের পোষকতায় নিম্নলিখিত দলিলাদি পেশ করা যায়-</p>
<p>সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনে হাজম জাহেরী (রহঃ) বলেছেন: হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ</p>
<p>&#8220;জনাব রসূলে আকরাম (সা) বলেছেন যে, যে ব্যক্তির কাছে শক্তি ও সামর্থ্যে অর্জিত সরঞ্জাম নিজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত আছে, তার উচিত ঐ অতিরিক্ত মাল দুর্বলকে দান করা। যে ব্যক্তির কাছে খাওয়া-পরার অতিরিক্ত উপাদান রয়েছে, তার পক্ষে উচিত অতিরিক্ত মাল দীন-দুঃখীকে দান করা।&#8221;</p>
<p>আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন: &#8216;নবী করীম এভাবে বিভিন্ন উক্তি করেছেন যাতে আমার এরূপ ধারণা জন্মেছে যে, আমাদের মধ্যে কারো কোন প্রকারের মালের উপর দাবি বা হক থাকতে পারে না।&#8217;</p>
<p>হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন: <strong>“</strong><strong>যে</strong> <strong>বিষয়ে</strong> <strong>আমার</strong> <strong>আজ</strong> <strong>ধারণা</strong> <strong>জন্মেছে</strong> <strong>সে</strong> <strong>সম্পর্কে</strong> <strong>যদি</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>অনুরূপ</strong> <strong>ধারণা</strong> <strong>জন্মাতো</strong> <strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>আমি</strong> <strong>কখনও</strong> <strong>দেরী</strong> <strong>করতাম</strong> <strong>না</strong><strong>; </strong><strong>বরং</strong> <strong>নিঃসন্দেহে</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>ধন</strong> <strong>এনে</strong> <strong>গরীব</strong> <strong>মুহাজিরদের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বণ্টন</strong> <strong>করে</strong> <strong>দিতাম।</strong><strong>“</strong></p>
<p>হযরত আবু ওবায়দা (রাঃ) ও তিনশত সাহাবা দ্বারা সত্য বলে গৃহীত বর্ণনা থেকে জানা যায়: কোন এক সময়ে যখন খাওয়া-পরার দ্রব্যাদি শেষ হওয়ার উপক্রম হয় তখন জনাব রসূলে আকরাম সাহাবা হযরত আবূ ওবায়দাকে হুকুম দেন, &#8220;যার যা কিছু আছে উপস্থিত করো।&#8221; তারপর সমস্ত দ্রব্য এক জায়গায় জড়ো করে সবকিছু তাদের মাঝে সমানভাবে বেটে দিয়ে তিনি সকলের জীবন ধারণের উপযুক্ত বন্দোবস্ত করে দেন।&#8217;</p>
<p>হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা&#8217;আলা ধনীদের উপর গরীবদের জীবিকা পরিপূর্ণভাবে সরবরাহ করা ফরয করেছেন। যদি তারা (গরীবেরা) ক্ষুধিত ও নগ্ন থাকে অথবা জীবিকার জন্য বিপদগ্রস্ত হয় তাহলে ধনীরা দায়িত্বশীল নয় বলেই গণ্য করতে হবে। এজন্য আল্লাহর কাছে কিয়ামতের দিন তাদের জবাবদিহি হতে হবে এবং সংকীর্ণতার জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।“ এরকম আরও হাদীস ও কুরআন-উল করীমের দলিল দ্বারা ইমাম ইবনে হাজম (রহঃ) নিম্নরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেনঃ-</p>
<p><strong>‘</strong><strong>প্রত্যেক</strong> <strong>মহল্লার</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>গরীব</strong><strong>&#8211;</strong><strong>দুঃখীদের</strong> <strong>জীবিকার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>জামিন</strong><strong> (</strong><strong>দায়ী</strong><strong>) </strong><strong>হওয়া</strong> <strong>ফরয</strong><strong> (</strong><strong>অবশ্য</strong> <strong>কর্তব্য</strong><strong>)</strong><strong>।</strong> <strong>যদি</strong> <strong>বায়তুল</strong> <strong>মালের</strong> <strong>আমদানি</strong> <strong>ঐ</strong> <strong>গরীবদের</strong> <strong>জীবিকা</strong> <strong>সরবরাহের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>যথেষ্ট</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়</strong> <strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>সুলতান</strong> <strong>বা</strong> <strong>আমীর</strong> <strong>ধনীদিগকে</strong> <strong>এজন্য</strong> <strong>বাধ্য</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেন</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>বলপূর্বক</strong> <strong>গরীবদের</strong> <strong>প্রয়োজনে</strong> <strong>গ্রহণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারেন।</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>জীবিকা</strong> <strong>সংস্থানের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>জরুরী</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>অনুযায়ী</strong> <strong>ক্ষুধার</strong> <strong>অন্ন</strong><strong>, </strong><strong>পরিধানের</strong> <strong>বস্ত্র</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ঝড়</strong><strong>&#8211;</strong><strong>বৃষ্টি</strong> <strong>রোধ</strong> <strong>ও</strong> <strong>প্লাবন</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>রক্ষা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>বাসগৃহের</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>করার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>এ</strong> <strong>অর্থ</strong> <strong>ব্যয়</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হবে।</strong><strong>‘</strong></p>
<p>হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রেওয়ায়েত (বর্ণনা) প্রসঙ্গে নানাবিধ তর্ক- বিতর্কের পর ইবনে হাজম (রহঃ) বলেন: সাহাবাদের (রাঃ) সার্বজনীন মত (ইজমা) এই যে, <strong>‘</strong><strong>যদি</strong> <strong>কেউ</strong> <strong>ক্ষুধিত</strong> <strong>অথবা</strong> <strong>নগ্ন</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>অথচ</strong> <strong>জরুরী</strong> <strong>সরবরাহ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বঞ্চিত</strong> <strong>থাকে</strong><strong>, </strong><strong>তা</strong><strong>হলে</strong> <strong>ধনীদের</strong> <strong>অতিরিক্ত</strong> <strong>মাল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>প্রয়োজন</strong> <strong>মিটানোর</strong> <strong>ব্যবস্থা</strong> <strong>করা</strong> <strong>ফরয।</strong><strong>‘</strong></p>
<p>হযরত আবু যর গিফারীও (রাঃ) উপরোক্ত অর্থনৈতিক মতবাদই প্রচার করেছিলেন। তিনি এ অর্থনীতি সংক্রান্ত মতবাদ খলীফা হযরত উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতের সময় প্রচার করে নির্বাসিত হয়েছিলেন। এ মতবাদকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় <strong>ইসলামী</strong> <strong>অর্থনীতির</strong> <strong>মূলসূত্র</strong> <strong>বর্তমান</strong> <strong>কালের</strong> <strong>পুঁজিবাদ</strong><strong> (Capitalism) </strong><strong>বা</strong> <strong>সাম্যবাদ</strong><strong> (Communism) </strong><strong>থেকে</strong> <strong>সম্পূর্ণ</strong> <strong>ভিন্নধর্মী</strong> <strong>এক</strong> <strong>আদর্শমূলক</strong> <strong>নীতি।</strong> পুঁজিবাদে ব্যষ্টিকে কল্পনা করা হয় একক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও তার করায়ত্ত সবকিছুরই মালিক হিসাবে। সে যেমন তা ইচ্ছাধীন সবকিছুই উপার্জন করতে পারে, তেমনি সবকিছু ব্যয়ও করতে পারে। <em>সুবিখ্যাত</em> <em>ইংরেজ</em> <em>অর্থনীতিবিদ</em> <em>এ্যাডাম</em> <em>স্মিথের</em> <em>মতবাদে</em><em> (Laissez Faire) </em><em>পাওয়া</em> <em>ব্যষ্টিকে</em> <em>অবাধ</em> <em>স্বাধীনতা</em> <em>দিতে</em> <em>হবে</em> <em>উপার্জনের</em> <em>ক্ষেত্রে।</em> <em>পুঁজিবাদের</em> <em>ক্ষেত্র</em> <em>রাজার</em> <em>অধীন</em> <em>রাজত্বও</em> <em>হতে</em> <em>পারে</em> <em>অথবা</em> <em>জনগণ</em> <em>পরিচালিত</em> <em>সার্বভৌম</em> <em>রাষ্ট্রও</em> <em>হতে</em> <em>পারে।</em> <em>মার্কসীয়</em> <em>মতবাদের</em> <em>ইতিহাস</em> <em>ব্যাখ্যার</em> <em>সূত্র</em> <em>অনুসারে</em> <em>ব্যষ্টির</em> <em>মালিকানার</em> <em>নীতি</em> <em>স্বীকৃত</em> <em>হলে</em> <em>এবং</em> <em>ব্যষ্টি</em> <em>মানসে</em> <em>এ</em> <em>মালিকানার</em> <em>দৈত্য</em> <em>চেপে</em> <em>বসলে</em> <em>সে</em> <em>যেমন</em> <em>তার</em> <em>প্রতিবেশী</em> <em>বা</em> <em>সর্বসাধারণ</em> <em>মানুষকে</em> <em>তার</em> <em>শরীক</em> <em>বলে</em> <em>স্বীকার</em> <em>করতে</em> <em>স্বীকৃত</em> <em>হয়</em> <em>না</em><em>, </em><em>তেমনি</em> <em>তার</em> <em>প্রয়োজনের</em> <em>অতিরিক্ত</em> <em>উদ্বৃত্ত</em> <em>সে</em> <em>রাষ্ট্রের</em> <em>হাতে</em> <em>ছেড়ে</em> <em>দিতেও</em> <em>সম্মত</em> <em>হয়</em> <em>না।</em> <em>সে</em> <em>তার</em> <em>গণ্ডির</em> <em>মধ্যে</em> <em>নিজেকে</em> <em>একক</em> <em>প্রভু</em> <em>বলেই</em> <em>গণ্য</em> <em>করে।</em> <em>এজন্যই</em> <em>সে</em> <em>যেমন</em> <em>তার</em> <em>সম্পদ</em> <em>থেকে</em> <em>অপর</em> <em>মানুষকে</em> <em>বঞ্চিত</em> <em>করতে</em> <em>চায়</em> <em>তেমনি</em> <em>রাষ্ট্রকেও</em> <em>সম্পূর্ণভাবে</em> <em>বঞ্চিত</em> <em>করতে</em> <em>চায়।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমাদের এ কথা ভুললে চলবে না যে, কোন রাষ্ট্রের গঠনে ও তার পরিচালনায় মানব-মানসে থাকে এক বিশিষ্ট আদর্শ কার্যকরী। সে আদর্শের রূপায়ণের জন্য যেসব মানুষ নিয়োজিত হয়, তাদের মানসে সে আদর্শ প্রবল থাকলে তা অনায়াসেই ফলিত হতে পারে। আদর্শে আস্থাহীন লোকের দ্বারা তার রূপায়ণের কোন সম্ভাবনা নেই। <strong>এজন্য</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>রূপায়ণের</strong> <strong>পূর্বে</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>প্রস্তুতি</strong> <strong>সর্বাধিক</strong> <strong>প্রয়োজনীয়।</strong> <strong>মানস</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>হলে</strong> <strong>অনায়াসেই</strong> <strong>রাষ্ট্র</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে।</strong> ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক সূত্রের আলোকে ইসলামী ভূমি-নীতিরও সূত্র পাওয়া যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে, হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) ইসলামের মূলনীতি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের উপর গুরুত্ব আরোপ করে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তা আলোকে নানাবিধ প্রশ্নের মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলেন। এ নীতির আলোকে বিচার করলে আমরা তাঁর ভূমি-নীতিরও মূল্য নির্ণয় করতে সমর্থ হব।</p>
<p><em>একথা</em> <em>ইতিহাসবিদিত</em> <em>সত্য</em> <em>যে</em><em>, </em><em>আরবের</em> <em>মাটিতে</em> <em>জাহিলিয়াতেও</em> <em>রাজতন্ত্রের</em> <em>বা</em> <em>সমাজতন্ত্রের</em> <em>কোন</em> <em>প্রাধান্য</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em> <em>আরবের</em> <em>মাটির</em> <em>মানুষ</em> <em>ছিল</em> <em>ত্রিবিধ</em> <em>পর্যায়ের।</em> <em>মক্কা</em> <em>বা</em> <em>অন্যান্য</em> <em>শহরে</em> <em>ছিল</em> <em>বণিক</em> <em>সমাজের</em> <em>প্রাধান্য।</em> <em>সমগ্র</em> <em>মরুভূমিতে</em> <em>ছিল</em> <em>পশুচারণকারী</em> <em>পর্যায়ের</em> <em>বেদুঈনদের</em> <em>বাস।</em> <em>তায়েফ</em> <em>বা</em> <em>অন্যান্য</em> <em>উর্বর</em> <em>ভূমিতে</em> <em>ছিল</em> <em>মুষ্টিমেয়</em> <em>কৃষক</em> <em>পর্যায়ের</em> <em>লোক।</em> <em>কাজেই</em> <em>সমগ্র</em> <em>দেশের</em> <em>লোক</em> <em>এক</em> <em>পর্যায়ে</em> <em>ছিল</em> <em>না।</em></p>
<p>জনাব রসূলে আকরাম (সাঃ) কর্তৃক ইসলাম প্রচারিত হলে এবং পরবর্তীকালে মিসর, সিরিয়া, ইরাক পারস্য প্রভৃতি দেশ বিজিত হলে সেসব দেশের সামস্ত সর্দারদের বিস্তৃত ভূসম্পত্তি খলীফা উমর (রাঃ) সেসব দেশের সর্বসাধারণের মধ্যে ভাগ করে বিলিয়ে দেন। আমর ইবনুল আস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবাগণের শত অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁদেরকে ঐসব ভূমির তিল পরিমাণ ভূমিও তিনি জায়গীরস্বরূপ দান করেননি। <strong>জনাব</strong> <strong>রসুলে</strong> <strong>আকরাম</strong><strong> (</strong><strong>সাঃ</strong><strong>) </strong><strong>ও</strong> <strong>সাহাবাগণের</strong> <strong>জীবনী</strong> <strong>পর্যালোচনা</strong> <strong>করলে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>মূল</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>শোষণবিহীন</strong> <strong>সমাজব্যবস্থার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>বিবেচনা</strong> <strong>করলে</strong> <strong>সামন্ততান্ত্রিক</strong> <strong>ভূমি</strong> <strong>বিলি</strong><strong>&#8211;</strong><strong>ব্যবস্থাকে</strong> <strong>নাজায়েয</strong> <strong>বলে</strong> <strong>অভিহিত</strong> <strong>করা</strong> <strong>যায়।</strong> বাংলা ও পাক-ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পূর্বেও ইসলাম-বিরোধী জায়গীরদারী প্রথা চালু ছিল, সেসব প্রথা বিলোপ করে লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৮৩ সালে দশশালা বন্দোবস্ত প্রথার প্রবর্তন করেন এবং এ প্রথাই ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথারূপে স্থিরিকৃত হয়। এ প্রথা জায়গীরের মত না হলেও পরোক্ষে এদেশে এক সামন্ততন্ত্রের পরে দেখা দেয় পুঁজিবাদ। কাজেই রাজগীর শেষেই পুঁজিবাদের আবির্ভাব স্বাভাবিক। তবে ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে সীমিত রাজগী (Limited Monarchy) থাকায় রাজগী থাকলেও পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসারে কোন বিপত্তি দেখা দেয়নি। সমগ্র উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজার পতাকা যেমন দেশ-বিদেশে উড্ডীয়মান হয়েছে, তেমনি ইংরেজ বণিকদের আধিপত্যও দুনিয়া জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। <strong>পুঁজিবাদের</strong> <strong>গোড়ার</strong> <strong>কথা</strong> <strong>হচ্ছে</strong><strong>, </strong><strong>ব্যষ্টি</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>ও</strong> <strong>বণ্টনের</strong> <strong>বেলায়</strong> <strong>সম্পূর্ণ</strong> <strong>স্বাধীন।</strong> <strong>তার</strong> <strong>ইচ্ছামতো</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>সে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>সে</strong> <strong>বণ্টনও</strong> <strong>করতে</strong> <strong>পারে।</strong></p>
<p><strong>অপরদিকে</strong> <strong>মার্কস</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্রদর্শিত</strong> <strong>সাম্যবাদের</strong> <strong>মূলকথা</strong> <strong>হল</strong><strong>, </strong><strong>কোন</strong> <strong>বিশেষ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>সম্পদ</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>করায়ত্ত</strong> <strong>করে</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>তার</strong> <strong>সাধ্যানুসারে</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>বিভাগে</strong> <strong>শ্রম</strong> <strong>করার</strong> <strong>সুবিধা</strong> <strong>দিতে</strong> <strong>হবে</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তা</strong> <strong>প্রয়োজনানুসারে</strong> <strong>তা</strong> <strong>যাবতীয়</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>পূরণ</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হবে।</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>যেমন</strong> <strong>তার</strong> <strong>ইচ্ছানুসারে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করার</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না</strong><strong>, </strong><strong>তেমনি</strong> <strong>বণ্টনের</strong> <strong>বেলায়ও</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> <strong>প্রকৃতপক্ষে</strong> <strong>এ</strong> <strong>রাষ্ট্রে</strong> <strong>আদি</strong> <strong>সংখ্যা</strong><strong> (unit) </strong><strong>ব্যষ্টি</strong> <strong>নয়</strong><strong>, </strong><strong>সমষ্টি</strong> <strong>বা</strong> <strong>তার</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>রাষ্ট্র।</strong> <strong>এক্ষেত্রে</strong> <strong>ব্যষ্টির</strong> <strong>খাওয়া</strong><strong>&#8211;</strong><strong>পরা</strong> <strong>বা</strong> <strong>সর্ববিধ</strong> <strong>চাহিদা</strong> <strong>পরিপূরণে</strong> <strong>রাষ্ট্রের</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>রয়েছে।</strong> <strong>এতে</strong> <strong>ব্যষ্টির</strong> <strong>কোন</strong> <strong>স্বাধীনতা</strong> <strong>নেই।</strong></p>
<p><strong>ইসলামী</strong> <strong>রাষ্ট্রে</strong> <strong>ব্যষ্টিকে</strong> <strong>এককভাবে</strong> <strong>বা</strong> <strong>যৌথ</strong> <strong>পদ্ধতিতে</strong> <strong>উপার্জন</strong> <strong>করার</strong> <strong>স্বাধীনতা</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong> <strong>এবং</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>আইন</strong> <strong>অনুসারে</strong> <strong>বণ্টন</strong> <strong>করার</strong> <strong>স্বাধীনতাও</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তবে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>সময়ই</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>এ</strong> <strong>উপার্জিত</strong> <strong>ধন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সম্পদের</strong> <strong>মালিক</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>তাকে</strong><strong> Custodian </strong><strong>বা</strong> <strong>রক্ষক</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>অনেকগুলো</strong> <strong>দায়িত্ব</strong> <strong>পালন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হয়।</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>যাকাত</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করার</strong> <strong>পর</strong> <strong>আরও</strong> <strong>যেসব</strong> <strong>হক</strong> <strong>আদায়</strong> <strong>করতে</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>তাতে</strong> <strong>তার</strong> <strong>পক্ষে</strong> <strong>পুঁজি</strong> <strong>সৃষ্টি</strong> <strong>করা</strong> <strong>সম্ভবপর</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যষ্টির স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে যদি ব্যষ্টির উপার্জিত সবকিছুই রাষ্ট্রের অপরাপর জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয়, তা&#8217;হলে ব্যষ্টির অথবা রাষ্ট্রের পক্ষে বড় বড় কল-কারখানা প্রভৃতির প্রতিষ্ঠা করে দেশে শিল্পের অগ্রগতি কিসে সম্ভবপর হবে? তার উত্তরে বলা যায়, উৎপাদনে সক্ষম লোকেরা তাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্র যেমন প্রয়োজন অনুসারে তা থেকে জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারে, তেমনি উদ্বৃত্ত থেকে রাষ্ট্রের পরিচালনাধীনে নানাবিধ শিল্প প্রতিষ্ঠানেরও ব্যবস্থা করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তা সাধ্যানুসারে উপার্জন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। গ্রাসাচ্ছাদনের উপযুক্ত উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার নানাবিধ চাহিদা পূরণের জন্য উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তিগণ যেমন দায়ী, রাষ্ট্রও তেমনি দায়ী। ধনী স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তার উপার্জনের উদ্বৃত্ত রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্র পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, অন্ধ ও অসমর্থ লোকের খোরপোশের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের সুবর্ণযুগে এ নীতিই অনুসৃত হয়েছিল। সে যুগে হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) বিখ্যাত ধনী ছিলেন; কিন্তু তিনি প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে অন্য দশজন মুসলিম থেকে পৃথক আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করতেন না। রাষ্ট্রের তলবের সময় তিনি তাঁর ধনাগার উজাড় করে অকাতরে সবকিছুই বিতরণ করতেন। কাজেই ধনসম্পদ তাঁর ধনাগারে থাকা এবং বায়তুল মালে থাকা প্রায় সমানই ছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই ছিল যে বায়তুল মালের ধন রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী অর্থনীতির মূলসূত্র ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিরই ফলশ্রুতি। ইংরেজ বণিকেরা সামন্ত জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি করেছিল এবং দেশের সর্বসাধারণ মানুষকে দাস শ্রেণিতে পরিণত করেছিল। বর্তমানে সে প্রথা রহিত হয়েছে বটে, তবে জোতদারী প্রথা রহিত হয় নাই। এক এক জন জোতদার স্বনামে ও বেনামীতে হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক হয়ে পূর্বেকার জমিদার শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। অথচ দেশে ভূমিহীন লক্ষ লক্ষ লোকের অভাব অনটনের সীমা নেই। বর্তমানে জোতদারদের পক্ষে এত বিশাল ক্ষেত্রে চাষ- আবাদ করা সম্ভবপর নয় বলে তারা এসব জমিজমা ভাগে চাষ-আবাদ করেন। কোথাও ফসলের এক-তৃতীয়াংশ, কোথাও অর্ধেক চাষীকে দিতে হয়। এ সম্বন্ধে আমাদের ফিকাহ শাস্ত্রকার তথা সাহাবাগণের অভিমত কি ছিল তা স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত রয়েছে।</p>
<p>হযরত আবু যর গিফারীর (রাঃ) মতে,</p>
<blockquote><p><em>জমিকে লগ্নিতে বা ভাগে দেওয়া নাজায়েয: কারণ যার কাছে অতিরিক্ত জমি রয়েছে এবং সে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে অসমর্থ, তার পক্ষে উচিত অপর মুসলিম ভাইকে জমি থেকে উপস্বত্ব ভোগ করতে দেওয়া। জমির মালিক খোদ আল্লাহ্ রক্ষক হিসাবে সে তার প্রয়োজন মতই ভোগ করবে। তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মতের পোষকতায় প্রথম শ্রেণির সাহাবাদের সমর্থন রয়েছে।</em></p></blockquote>
<p>এ সম্বন্ধে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেছেন: &#8220;আল্লাহর রসূল (সাঃ) ফরমায়েছেন, যার কাছে জমি আছে সে নিজেই চাষাবাদ করবে বা অন্যকে বিনা লাভে (মুফত) সহানুভূতি প্রদর্শনপূর্বক চাষ করতে দেবে। যদি এ দু&#8217;য়ের মধ্যে কোনটাতেই সে রাযী না হয়, তাহলে নিজ জমিকে সে হস্তান্তর করবে।</p>
<p>হযরত জাবের (রাঃ) বলেন: আল্লাহ্র রসূল (সাঃ) জমির পরিবর্তে কোন কিছু গ্রহণ (Exchange) বা ইজারার দ্বারা উপকৃত হতে নিষেধ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) নিজ জমিকে হযরত রসূলে আকরাম (সাঃ)-এর আমল থেকে মুয়াবিয়ার (রাঃ) আমলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত চাষীদের (কর্ষণকারীদের) লগ্নিতে বন্দোবস্ত দিতেন; কিন্তু যখন তিনি হযরত রাফে (রাঃ)-এর হাদীস শুনতে পেলেন, তখন তিনি এ কাজ এ ভয়ে ছেড়ে দিলেন যে সম্ভবত হযরত (সাঃ) তাঁর শেষজীবনে এ সম্পর্কে মীমাংসা করেছেন। তবে এ মতবাদের বিরুদ্ধেও অপরাপর সাহাবাগণ মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতবাদের আলোচনাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।</p>
<p>হানজালা বিন যায়েদ (রাঃ) বলেন: আমি রাফে বিন খাদিজকে (রাঃ) জমি ইজারা দান সম্পর্কে তাঁর মত অনুসন্ধান করলাম। এর উত্তরে তিনি বললেন, হযরত নবী করীম (সাঃ) এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রূপা ও সোনার বদলে অর্থাৎ নগদ টাকার পরিবর্তেও কি নিষিদ্ধ? তখন তিনি বললেন, এতে কোন আপত্তি নেই।</p>
<p>(বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, কিতাবুল মুজারেয়া)</p>
<p>হযরত আবুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন: নবী করীমের নিষেধের অর্থ এ নয় যে, এ কাজ হারাম বা নাজায়েয; তবে ভ্রাতৃত্ব বা সৌহার্দ প্রদর্শনের জন্য জমি ইজারা বা মুজারেয়া না দেওয়াই উচিত। মুসলমানগণ নিজে নিজের জমি চাষ করবে, অথবা তা একে অন্যের মধ্যে সৌহার্দ ও বন্ধুত্ব স্থাপনের উদ্দেশ্যে অপরের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ভাইকে বিনা লাভে দেওয়াই ভাল।</p>
<p>হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন: যেহেতু হযরতের সময়ে জমির ব্যাপারে বহু ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হতো, এজন্য নবী করীম নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইজারা ও মুজারেয়া মানুষের মঙ্গলার্থে নিষেধ করেছেন, মূলত একে রহিত করেন নি। এ বাধা মানুষের কল্যাণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বলবত ছিল।</p>
<p>(হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা-২য় খণ্ড, পৃ. ১১৭)</p>
<p>ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) বলেন: নগদ লাগান (ইজারা) জায়েয, কিন্তু জমি ভাগে বা মুজারেয়াতে দেওয়া নাজায়েয।</p>
<p>তাউস (রহঃ) ও ইবনে হাজম (রহঃ) বলেন: জমি ভাগে বা মুজারেয়াতে দেওয়া জায়েয কিন্তু নগদ লগ্নি বা ইজারাতে দেওয়া নাজায়েয। কওমের অধিকাংশ আলিম বলেন যে, জমি নগদ টাকার পরিবর্তে বা ভাগে ইজারা দেওয়া উভয়ই জায়েয এ প্রথা সালফ ও খলফ অর্থাৎ সাহাবা ও তাবেয়ীনদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। মোটামুটি এ সম্পর্কে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে সকল রকমের সিদ্ধান্তেরই সম্ভাবনা রয়েছে। কোন না কোন ফিকাহশাস্ত্রবিদের সঙ্গে যে কারো মতের মিল থাকতে পারে। নগদ লগ্নি জায়েয সম্পর্কে যেসব বর্ণনা হাদীসের কিতাবে আছে, ইমাম নাসায়ীর (রহঃ) মতে, সেসব বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় নগদ লগ্নি ইজারা দেওয়া বলেই প্রমাণিত হয়। সাঈদ বিন্ মুসায়েবের (রহঃ) বর্ণনাতে বুঝা যায়, নগদ লগ্নি না দেওয়া নবী করীমের আদেশ নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অনুরূপ যেসব ফকিহ্, জমি ভাগে দেওয়া জায়েয বলে খয়বরের ইয়াহুদী ও রসূলের (সাঃ) মধ্যকার ব্যাপারকে প্রমাণস্বরূপ উপস্থিত করেন, তাঁদের মতামত উল্লেখ করে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) উত্তর দেন যে, খয়বরের ইয়াহুদীদের জমির মালিক বলে গণ্য করা হয়েছিল একথা সত্য। এখানে সমস্যা হচ্ছে কওমের ব্যক্তিগণের মধ্যে জমিদারী (বর্তমান কালের জোতদারী) সম্পর্ক। হাদীস শরীফে এসব প্রথার সৃষ্টি সম্পর্কে পরিষ্কার নিষেধ রয়েছে।</p>
<blockquote><p>এ সমস্ত বর্ণনার সারমর্ম এই যে, <em>নবুয়তের</em> <em>সময়</em> <em>ও</em> <em>খুলাফায়ে</em> <em>রাশেদীন</em> <em>পর্যন্ত</em> <em>যদিও</em> <em>জমি</em> <em>নগদ</em> <em>লগ্নি</em> <em>বা</em> <em>ভাগে</em> <em>দেওয়া</em> <em>প্রচলিত</em> <em>ছিল</em><em>, </em><em>তবুও</em> <em>নবী</em> <em>করীম</em><em> (</em><em>সা</em><em>) </em><em>জমিদারীর</em><em> (</em><em>জোতদারী</em><em>) </em><em>এ</em> <em>সাধারণ</em> <em>ও</em> <em>সহজ</em><em>&#8211;</em><em>সরল</em> <em>পন্থা</em> <em>অপছন্দনীয়</em> <em>বলে</em> <em>এবং</em> <em>মরুয়ত</em> <em>বা</em> <em>সদ্ব্যবহারের</em> <em>দিক</em> <em>থেকে</em> <em>একে</em> <em>নিকৃষ্টতম</em> <em>পন্থা</em> <em>বলেই</em> <em>মনে</em> <em>করতেন।</em> <em>এর</em> <em>দরুন</em> <em>কওমের</em> <em>মধ্যে</em> <em>পরস্পর</em> <em>অধিক</em> <em>ঝগড়া</em><em>&#8211;</em><em>বিবাদ</em> <em>হওয়ার</em> <em>ফলে</em> <em>পরস্পর</em> <em>শত্রুতা</em><em>, </em><em>দ্বেষ</em><em>, </em><em>হিংসা</em> <em>বেড়ে</em> <em>গিয়ে</em> <em>মারামারি</em><em>, </em><em>ঝগড়াঝাটিতে</em> <em>পরিণত</em> <em>হতে</em> <em>পারে।</em> <em>অতএব</em> <em>ইমাম</em> <em>বা</em> <em>নেতাকে</em> <em>ইসলাম</em> <em>অনুমতি</em> <em>দেয়</em> <em>যে</em> <em>তিনি</em> <em>এ</em> <em>প্রথা</em><em> (System) </em><em>সার্বজনীন</em> <em>কল্যাণের</em> <em>খাতিরে</em> <em>রহিত</em> <em>করতে</em> <em>পারেন।</em> <em>যদি</em> <em>ইসলামের</em> <em>খলীফা</em> <em>সার্বজনীন</em> <em>কল্যাণের</em> <em>খাতিরে</em> <em>অথবা</em> <em>ইসলামের</em> <em>মঙ্গলের</em> <em>জন্য</em> <em>জমিগুলোর</em> <em>স্বহস্ত</em> <em>কর্ষণজনিত</em> <em>মালিকানা</em> <em>বাদ</em> <em>দিয়ে</em> <em>জমিদারী</em><em> (</em><em>জোতদারী</em><em>) </em><em>প্রথাকে</em> <em>রহিত</em> <em>করেন</em><em>, </em><em>তবুও</em> <em>রাষ্ট্রের</em> <em>অবশ্য</em> <em>কর্তব্য</em> <em>হবে</em> <em>খরিদ</em> <em>করা</em> <em>মালিকানাস্বত্বের</em> <em>জমির</em> <em>উচিত</em> <em>মূল্য</em> <em>বায়তুল</em><em>&#8211;</em><em>মাল</em> <em>থেকে</em> <em>মালিকদের</em> <em>প্রদান</em> <em>করা।</em></p></blockquote>
<p><strong>অতএব</strong> <strong>ইসলামের</strong> <strong>রাজনীতি</strong> <strong>ধারায়</strong> <strong>এরূপ</strong> <strong>জমিদারীর</strong> <strong>দৃষ্টান্ত</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong><strong>, </strong><strong>যেখানে</strong> <strong>জমির</strong> <strong>মালিক</strong> <strong>ও</strong> <strong>চাষী</strong> <strong>দু</strong><strong>&#8216;</strong><strong>জনেই</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>রূপে</strong> <strong>গণ্য</strong> <strong>হয়।</strong> পৃথিবীর প্রাচীন ও বর্তমানকালের বিরাট জমিদারী, তালুকদারী প্রভৃতিকে জবরদস্তি বন্দোবস্তের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত বলা যায়। এসবের সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। বর্তমানকালে এক একজন জোতদারের অধীনে এতগুলো জমি থাকা এবং তাকে শোষণের অবকাশ দেওয়া ইসলামী নীতিসঙ্গত ব্যাপার নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইসলামের অভ্যুত্থান থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত মুসলিম সমাজে প্রচলিত ভূমি সম্বন্ধে আলোচনা করলে নিম্নলিখিত সত্যটিই প্রকটিত হয়। <strong>জনাব রসূলে আকরাম (সাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের (রাঃ) আমলে আনসার ও মুহাজিরদের ভূসম্পত্তির মালিকানার অর্থ এই ছিল যে, যে জমি তারা জায়গীর স্বরূপ চেয়েছিলেন তা তাদের সহজ-সরল জীবনযাপনের পক্ষে ছিল পর্যাপ্ত। তারা অনাবাদী জমিকে আবাদ করে ফসল ফলানোর উপযোগী করে তুলতেন। এগুলো বর্তমানকালের জমিদারী বা জোতদারের মত বড় বড় বসতি এলাকা ছিল না, মাত্র কতক আবাদী জমির সমষ্টি ছিল। এসব জমি কোন কোন সাহাবা ইজারা দিতেন আবার কেউ কেউ নিজেও চাষাবাদ করতেন। তবে বিজিত দেশের সমূহ সম্পত্তি সরকারের অধীনে আদিম বাসিন্দাদের হাতে থাকতো এবং এর মালগুজারী বা খাজনা ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে বায়তুল-মালে পরিণত হত।</strong> <strong>যে</strong> <strong>ব্যবস্থার</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>মুষ্টিমেয়</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>হাতে</strong> <strong>জমিজমা</strong> <strong>এমনভাবে</strong> <strong>গিয়ে</strong> <strong>পড়ে</strong> <strong>যে</strong> <strong>চাষীরা</strong> <strong>পণ্যদ্রব্যে</strong> <strong>পরিণত</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>এ</strong> <strong>প্রকার</strong> <strong>প্রথার</strong> <strong>কোন</strong> <strong>আভাস</strong> <strong>ইসলামী</strong> <strong>শাসনতন্ত্রে</strong> <strong>পাওয়া</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> হযরত উমর (রাঃ) রোমানদের এ প্রকার জমিদারীকে রহিত করেন। হযরত উমরের (রাঃ) খিলাফতের সময় ইরান, রোম, মিসর, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি দেশ জয় করা হলে ইরানের বাদশাহের যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল ও মুসলিমদের যে জমি জায়গীর দেওয়া হয়েছিল তাছাড়া সাধারণ জমি কৃষকদের হাতেই ছিল।</p>
<p>যখন হযরত উমর (রাঃ)-এর সময় ইরাক ও সিরিয়া বিজিত হয় তখন সাহাবীরা আবেদন করেন যে ঐ দেশসমূহের জমি যেন তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে তাদের জমির মালিক বলে গণ্য করা হয়। হযরত বেলাল (রাঃ) ও হযরত যুবাইর (রাঃ) বিশেষভাবে এ সম্পর্কে বারবার আবেদন জানান। হযরত উমর এরূপ ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি বলেন, সমস্ত ভূমি সরকারের অধীন থাকবে এবং তার সকল আয় মুসলমানদের প্রয়োজন ও আবশ্যকীয় বিষয়াদির জন্য ওয়াক্ফ্ফ বলে গণ্য হবে।</p>
<p>ইমাম আবূ ইউসুফ (রহঃ) বলেন, হযরত উমর (রাঃ)-এর ফরমান অনুযায়ী মুজাহিদ ও বিজেতাদের মধ্যে জমি বণ্টন নিষিদ্ধ। (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ২৪- ২৯) এ নীতি হযরত ফারুকে আজম (রাঃ) কেবল মুখেই প্রচার করেন নি, কার্যেও পরিণত করেছেন। পরবর্তী মালিকগণও এ নীতির অনুসরণ করেছিলেন। হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর পরে এবং হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-এর সময়ে যে সব দেশ বিজিত হয়েছিল সে সব দেশের অধিকাংশ জমিই সরকারের অধীন থাকতো এবং চাষীদের থেকে আদায়কৃত খাজনা বা লগ্নি সরকার কর্তৃক নানাবিধ প্রয়োজনে ব্যয় করা হত। মুজাহিদ ও বিজয়ীদের বারংবার আবেদন সত্ত্বেও ঐসব দেশের জমি জায়গীর বা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি। হযরত উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের শেষের দিকে এ নীতি লঙ্ঘন করায় হযরত আবু যর গিফারী তাঁকে এ নীতির কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেন। <strong>কোন</strong> <strong>সময়ে</strong> <strong>হযরত</strong> <strong>ফারুকে</strong> <strong>আজম</strong><strong> (</strong><strong>রাঃ</strong><strong>) </strong><strong>মুসলমানদেরকে</strong> <strong>জমিদারী</strong> <strong>ও</strong> <strong>চাষাবাদ</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>এই</strong> <strong>বলে</strong> <strong>বিরত</strong> <strong>রেখেছেন</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>মুসলমানদের</strong> <strong>নিজেদের</strong> <strong>ও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>পরিবার</strong> <strong>পরিজনদের</strong> <strong>বৃত্তি</strong> <strong>বায়তুলমাল</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>দেওয়া</strong> <strong>যায়।</strong> <strong>তাহলে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কারণই</strong> <strong>থাকতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>না</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>তাঁরা</strong> <strong>খিলাফতের</strong> <strong>বা</strong> <strong>সরকারের</strong> <strong>কাজকর্মের</strong> <strong>অংশীদার</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়ে</strong><strong>, </strong><strong>জিহাদ</strong> <strong>ও</strong> <strong>আল্লাহর</strong> <strong>বাণীর</strong> <strong>সহায়ক</strong> <strong>না</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>বলদের</strong> <strong>লেজের</strong> <strong>পিছনে</strong> <strong>ঘোরাফিরা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>যাবেন।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ দীর্ঘ আলোচনার ফলে বোঝা যায়, দ্বিবিধ কারণে জমিদারী বা ভাগে চাষাবাদ করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিতান্ত গর্হিত ব্যবস্থা। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের প্রতিনিধিত্বের নীতি অনুসরণ করে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) একে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছেন। কেননা এ দুনিয়ার ধন সম্পদ ও ভূমি সবকিছুরই মালিক আল্লাহ্ তা&#8217;আলা হলে মানুষের কোন মালিকানা থাকতে পারে না। তার কাছে গচ্ছিত সম্পদ সে নিজে উপভোগ করবে, তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার অপর ভাইকে ভোগ করতে দেবে। খলীফা উমর (রাঃ) মুসলিমদের দখলে থাকার দরুন, তারা কোন পরিশ্রম না করেও উপস্বত্ব পাওয়ার দরুন, অলস ও বিলাসী মানব গোষ্ঠীতে পরিণত না হয়, সে জন্য ভাগে চাষাবাদ দেওয়া দূরের কথা, কৃষিকার্য থেকেও তাদের বিরত করেছেন। তাই দেখা যায়, উভয়ের দৃষ্টিকোণ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল একই। অর্থাৎ মানবতার কল্যাণের জন্যই তারা উভয়ে জমি থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপস্বত্ব লাভ করাকে নিষিদ্ধ করেছেন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/an-attempt-to-realize-humanism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15365</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নজরুল সাহিত্যে বিশ্ব-মানস</title>
		<link>https://rowyakbd.com/world-spirit-in-nazrul-s-literature/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/world-spirit-in-nazrul-s-literature/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 27 Aug 2024 09:50:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14708</guid>

					<description><![CDATA[বিশ্ব-সাহিত্য বলতে বিদগ্ধ মহল এ বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্যকেই মনে করেন। হোমার, বাল্মিকী, ব্যাস, তোবাহ বা ওলড টেস্টামেন্ট, রাজা আর্থারের রাউন্ড টেবিলের গল্প (King Aurthur and his round table), আরব্য উপন্যাস, শেকসপীয়র, গ্যেটে, তলস্তয় ও রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীকে বিশ্ব-সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ অবদান বলে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বিশ্ব-সাহিত্য বলতে বিদগ্ধ মহল এ বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্যকেই মনে করেন। হোমার, বাল্মিকী, ব্যাস, তোবাহ বা ওলড টেস্টামেন্ট, রাজা আর্থারের রাউন্ড টেবিলের গল্প (King Aurthur and his round table), আরব্য উপন্যাস, শেকসপীয়র, গ্যেটে, তলস্তয় ও রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীকে বিশ্ব-সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ অবদান বলে গণ্য করেন। এ তালিকাকে নিখুঁত বলে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই। যেহেতু মানব-জীবনের কোনো শেষ সীমা আজও নির্ধারিত হয়নি এবং ভবিষ্যতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরও উন্নততর অবদানের সম্ভাবনা রয়েছে- এজন্য গোঁড়া ভক্তের মতো পণ্ডিতজনের এ সংখ্যাকে সর্বশেষ বলে গ্রহণ করা যায় না। তবে এ নির্দিষ্ট সংখ্যা থেকে তাঁদের বিচারের মানদণ্ড আবিষ্কার করা যায় কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়।</p>
<p>কেন এগুলোকে বিশ্বের সেরা সাহিত্য বলে তাঁরা গ্রহণ করেছেন এবং কালের অমোঘ প্রবাহ অতিক্রম করে কেন এগুলো এখনও মানব-জীবনে টিকে রয়েছে- তার অনুসন্ধান করলে, দেখা যায়, তাতে মানব-জীবনেরই চিরন্তন রূপ প্রতিফলিত হয়েছে- এবং তাতে সে জীবনের সমালোচনা রয়েছে- এ জন্যে তারা আজও টিকে রয়েছে। হোমার বা বাল্মিকী অংকিত চরিত্রের প্রত্যেকটিই এক একটা প্রতীক (type) এবং তারা মানব- জীবনের এক একটা বিশিষ্ট দিকের প্রতিনিধি। হোমারের অংকিত ট্রয়ের রাজকুমার প্রায়াম দস্যু প্রকৃতির অদম্য দুঃসাহসী যুবক। তার বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে হেলেনকে জোর-জবরদস্তি করে অপহরণ করেছে। এ অপহরণ করার যে প্রবৃত্তি মানব-মানসে রয়েছে- সেই প্রবৃত্তি তাকে এ অপকর্ম করার প্রেরণা যুগিয়েছে। এজন্য তাকে মানব- মানসে ক্রিয়াশীল দুষ্প্রবৃত্তির প্রতিনিধি বলা যায়। রামায়ণে চিত্রিত রাজা রামচন্দ্রকে তেমনি মানব-জীবনের অপর এক বৃত্তির প্রতিনিধি বলা যায়। তিনি পিতৃসত্য পালনের জন্য চতুর্দশ বৎসর বনবাস ক্লেশ সহ্য করতেও প্রস্তুত ছিলেন, এবং প্রায়মের মতো পাপাচারী রাজা রাবণের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য তাকে বধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে তিনি ম্যাকিয়াভ্যালীর সেই নিন্দিত নীতি- The end justifies the means লক্ষ্যের যথার্থ দ্বারাই মাধ্যম গ্রহণের সার্থকতা স্বীকৃতি লাভ করে&#8217;- গ্রহণ করেছেন। এ নীতির আলোকে রাম ভ্রাতৃ-যুদ্ধে লিপ্ত বালিকে বধ করেছেন। ভ্রাতৃ-বিরোধ বিচ্ছিন্ন বিভীষণের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তেমনি গণ-মানসের সন্তোষের জন্য পতিব্রতা সীতাকেও ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি। এজন্য তাকে মানব-জীবনের একটা টাইপ বা প্রতীক বলা যায়। শেকসপীয়রের অংকিত চরিত্রগুলোতে সেরূপ প্রতীকী চরিত্র রয়েছে। হ্যামলেট নাটকের নায়ক রাজকুমার হ্যামলেট আপনার চাচা কর্তৃক নিহত পিতার সংস্রবে আসার কোনো সুবিধা পাননি। পিতৃহন্তা ও বিপিতা চাচার আশ্রয়ে প্রতিপালিত এ কুমার একাধারে প্রেমিক ও দার্শনিক। ছেলে-বেলা থেকেই সন্দেহের বীজ তার মানসে ক্রিয়াশীল। তাই মানব-জীবনের সবগুলো উত্থান পতনকে তিনি যেমন আপাতদৃষ্ট রূপে গ্রহণ করতে পারেননি, তেমনি এ বিশ্বচরাচরের রূপকে তার প্রকৃত রূপ বলে গ্রহণ করতেও তিনি সম্মত হননি। শেকসপিয়রের অপরাপর নাটকগুলোতে তেমনি মানব চরিত্রের এক একটা বিশিষ্ট প্রতীক বিশেষভাবেই ফুটে উঠেছে। অদম্য সাহসের অধিকারী অথচ উচ্চাকাঙ্ক্ষার দ্বারা সকল সময়ই পরিচালিত ম্যাকবেথ তেমনি মানব-মানসের এক অতি উজ্জ্বল প্রতীক। আরব্য উপন্যাসের নায়ক নায়িকারাও তেমনি মানব-জীবনের এক একটা বৃত্তি বা প্রবৃত্তির প্রতীক। অত্যাচারী তথাকথিত খলিফা হারুন-আল্-রশীদের শাসনকালে রচিত এ গ্রন্থখানাতে যে সব চরিত্র বর্ণনা করা হয়েছে, তারা সকলেই-প্রতীকী জীবনের পুরুষ ও নারী। সিন্দাবাদ নাবিকের জীবনে যেমন ধন-লিপ্সার বাসনা প্রকাশ পেয়েছে, এবং তা লাভ করার জন্য তিনি সাত সাগরে পাড়ি জমাচ্ছেন, তেমনি সে ধনকে অতি সহজে লাভ করার প্রতীক হিশাবে দেখা দিয়েছে- আলীবাবা। অর্থাৎ তাঁর প্রত্যেকটি চরিত্রই সে ধর্ম পালন করছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আধুনিককালে যারা বিশ্বের ক্লাসিক হিসাবে গণ্য হয়েছেন, তাদের মধ্যেও এক প্রতীক চিত্রণের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। মহাকবি গ্যেটে তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য ফাউস্টের মধ্যে একদিকে ফাউস্ট অপরদিকে মেফিস্টোফেলিসের চিত্র অংকিত করে মানব-জীবনের সে আদর্শিক দ্বন্দ্বের সত্যই প্রচার করেছেন। ফাউস্টের জীবনে অবিরাম সে মেফিস্টোফেলিসের সঙ্গে সংগ্রামে পর্যবসিত হয়েছে।</p>
<p>লেভ তলস্তয়ের উপন্যাসগুলোতে তেমনি কতকগুলো প্রতীকী চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর &#8220;আনা কারেনিনা&#8221; এক হতভাগ্য মহিলার জীবনের করুণ কাহিনী। তিনি তাঁর এক প্রেমিকের দ্বারা প্রলুব্ধা হয়ে গর্ভবতী হয়েছেন- অথচ সে অবস্থায়ও তাঁর উদার হৃদয় স্বামীকে তাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত। তবে সামাজিক জীবনে তাঁর স্থান অবশ্যিই অত্যন্ত নীচ পর্যায়ে, &#8216;অধঃগ্রামী&#8217; হবে বলে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। &#8220;রেজারেকশন” নামক উপন্যাসে মহামতি তলস্তয় তাঁর নায়িকার ক্যটুলা ম্যাসলভাকে অতিশয় পতিত জীবনের মধ্যেও মানবতার এক প্রতীক হিশাবে চিত্রিত করেছেন। মানবতার এ অভূতপূর্ব প্রতীক ম্যাসলভা তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কাব্যেই সে প্রতীকী ধর্মের রয়েছে অভিব্যক্তি। সেখানে ব্যক্তি-জীবনের যেমন প্রতিক্রিয়ার ফল রয়েছে তেমনি সমষ্টি জীবনেরও প্রতিক্রিয়ার ফল সন্নিবেশিত হয়েছে। জীবনে বিশ্ব-চরাচরের নানাবিধ বিষয়ের ক্রিয়াকলাপের যে প্রতিক্রিয়া তাঁর জীবনে দেখা দিয়েছে তার অভিব্যক্তি, রয়েছে- তাঁর বিভিন্ন রচনায়। এ রচনার প্রেক্ষাপটে যে-সৃষ্টিশীল প্রতিজ্ঞা কার্যকরী তিনি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ নন, তিনি বিশ্ব-মানবের প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ। &#8220;গীতাঞ্জলী&#8221;, &#8220;নীতিমাল্য&#8221; প্রভৃতি পর্যায়ে তিনি বিশ্ব-মানব-জীবনকে সমর্পণ করতে চেয়েছেন পরম মঙ্গলময় এবং পরম সুন্দর এক অতীন্দ্রিয় সত্তার নিকট। এ সত্তার নিকট নতি স্বীকার এবং তার সত্তায় ব্যক্তি-জীবনের অহংকার ও স্বাতন্ত্র্যের বিলোপ মানব জীবনে এক আকাঙ্খিত বিষয়। সেরূপ মানব- জীবনের আশা-ভরসা নানা আদর্শিক বিষয়ের কামনা তাঁর বিরাট রচনার মধ্যে বর্তমান। তাঁ রচিত নাটকগুলো যে প্রতীকধর্মী সে সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই। &#8220;রক্ত-করবী&#8217;র প্রধান চরিত্র নন্দিনী মানব-মানসেরই একটা সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষার রূপ নিয়ে অপ্রাকৃত জীবনের ধনমদ্রমত্তের বাসনায় অন্ধ সোনার পুরীতে অবস্থিত জাল ছিঁড়ে তাদের প্রকৃতিস্থ করতে চায়। এতে যে বলিষ্ঠ প্রতীক সৃষ্টির বাসনা প্রকাশ পেয়েছে তা বিশ্ব- সাহিত্য অনন্য।</p>
<p>এ প্রতীক যেমন সর্বসাধারণের জীবনের নানাবিধ আশা-আকাঙ্ক্ষার হতে পারে- তেমনি মানব-সমাজের মধ্যে উদ্ভুত নানা শ্রেণী, নানান জাতি, নানা কর্মে লিপ্ত মানুষের হতে পারে। যাঁরা মানব-জীবনকে তাঁদের রচনায় এভাবে প্রকাশ করেছেন তাঁদের রচনার মধ্যে আবার মূল্যবোধও প্রকাশ পেয়েছে। যদিও ধর্মগুরুদের আদেশ-নির্দেশের মতো তা প্রকাশ পায়নি তবুও মানব-চেতনার নানাবিধ বৃত্তি-প্রবৃত্তির প্রতীকগুলোর মধ্যে কোনটার পক্ষে তাদের সহানুভূতি রয়েছে তা অতিশয় কুশলী তুলির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। গভীর রাত্রিতে সমুদ্রের পারে আবির্ভূত রাজা ডানকানের প্রতি, না উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিভূ ম্যাকবেথের প্রতি শেকসপিয়রের সহানুভূতি রয়েছে তা অতি সহজেই বুঝতে পারা যায়। ম্যাকবেথের স্বগত উক্তিতে তার জীবনের গভীর তলদেশ থেকে উত্থিত নৈতিক চেতনা তাকে যখন ভীষণভাবে আক্রমণ করে পীড়িত করতে থাকে, তখন তার উক্তিতে শেকসপীয়রের মূল্যবোধেরও পরিচয় স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। এজন্য বিশ্বসাহিত্যে প্রতীকধর্মী রূপের প্রেক্ষাপটে সৃষ্টিকুশলী সাহিত্যিকেরা কবির যে মূল্যবোধ রয়েছে- তাকে অনস্বীকার্য বলা যায়। মূল্যেরও আবার তারতম্য রয়েছে। <strong>এ দুনিয়ার সমাজে মানবতাবাদ ক্রমশই বিকশিত হচ্ছে। কাজেই এককালে যা মানব-জীবনের অবশ্যম্ভাবী রূপে গ্রহণীয় ও সহনীয় ছিলো- বর্তমান কালে তা নেই। অনাগত ভবিষ্যতে আরও উচ্চ- পর্যায়ের মূল্যমান এ দুনিয়ায় অভ্যুত্থিত হ&#8217;লে-মানব-জীবনের কার্যকরী নানাবিধ মূল্যমান স্নান হয়ে যেতে পারে। অনাগত যুগের সাহিত্যে তাই ভালো-মন্দের বিচার আজকের দিনের মতোই হবে-তা বলা যায় না। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় মানবতাবাদের বিস্তৃতির ফলে যে পরিবেশে বর্তমান মানব-সমাজ রয়েছে, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে সে সমাজের অধঃপতন হবে না, হবে আরোহণ।</strong> এজন্য অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো মূল্যমানের অভ্যুদয় হবে না তার পূর্ববর্তী মূল্যমানকে বিচ্যুত করে মানব-সভ্যতার ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে। মানব-জীবনে এমন সব চিরস্তন বৃত্তি ও প্রবৃত্তি রয়েছে যে- গুলোর সন্তোষ বিধানের জন্য মানুষ চিরকালই চেষ্টা করবে এবং তাদের মধ্যে মানব- জীবনের পক্ষে অনুকূল দলের সঙ্গে প্রতিকূল দলের সংঘর্ষ অনিবার্যভাবে দেখা যাবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বিশ্ব-সাহিত্যের অপর লক্ষণের মধ্যে পাওয়া যায় স্থান-কাল-জাত-পরিবেশের প্রভাব। হোমারের মহাকাব্যে গ্রীস ও ট্রয়ের যুদ্ধে দেবদেবীগণও যোগদান করেছেন। তেমনি রামায়ণ ও মহাভারতে যেসব যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে-তাতে মানব-বংশ বহির্ভূত বীরগণ অংশগ্রহণ করেছেন। ধর্মের অংশে যুধিষ্ঠিরের এবং পবনের অংশে ভীমের জন্ম হলেও ইন্দের অংশে অর্জুনের জন্য। তেমনি অশ্বিনীকুমার দ্বয়ের অংশে নকুল ও মহাদেবের জন্ম। এরা সম্পূর্ণভাবে দেব বংশ সম্ভূত না হলেও দেব ও মানবের মধ্যবর্তী অতি-মানবিক বংশ সম্ভূত ছিলেন। রামচন্দ্র সীতা উদ্ধার কল্পে যে-সেনাবাহিনীকে গঠন করেছিলেন- তাতে বানর বংশীয় সৈন্যও যোগদান করেছিলেন। সে-যুগে দেব-দানব ও মানুষে অথবা মানুষ ও পশুতে তেমন পার্থক্য দেখা দেয়নি বলে এরূপ চরিত্র সৃষ্টিতে ব্যাস অথবা বাল্মিকী কোনো দ্বিধাবোধ করেননি।</p>
<p>তাহলে ক্লাসিক্যাল সাহিত্যে আমরা কতকগুলো লক্ষণ পাচ্ছি। তাতে মানব-মানসের কতকগুলো বৃত্তি ও প্রবৃত্তির প্রতীককে কাব্যের বা নাটকের নায়ক-নায়িকারূপে প্রদর্শন করা হয়েছে। তাতে নানা ব্যবসায় বা কর্মজীবনের পার্থক্য রয়েছে। তাতে যেমন রাজা- মহারাজা রয়েছেন, তেমনি অতিশয় দীন দুঃখী মানুষও রয়েছে। তাতে ব্যক্তি-জীবনের এক বৃত্তির সঙ্গে অপর বৃত্তির যেমন সংগ্রাম রয়েছে, তেমনি এক শ্রেণীর লোকের সঙ্গে অপর শ্রেণীর লোকেরও সংগ্রাম রয়েছে। তাতে পরিবেশের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে এবং তার মধ্যে মূল্যবোধের প্রকাশও রয়েছে।</p>
<p>এ মানদণ্ডের আলোকে নজরুল ইসলামের রচনাকে বিচার করলে তাঁকে বিশ্ব- সাহিত্যিকদের আসনে স্থান দান করা যায় কি না-তা-ই বিশেষভাবে বিচার্য। তবে তার পূর্বে নজরুলের জীবনে যে পরিবেশ কার্যকরী ছিল তাও ভেবে দেখতে হয়। কারণ আমরা পূর্বেই দেখেছি- পরিবেশের ছাপ সকল বিশ্ব-কাব্যেই বর্তমান। নজরুলের জন্ম হয়েছে অত্যন্ত দরিদ্র কিন্তু অভিজাত পরিবারে-পরিবারের মধ্যে তাঁর ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি-চর্চা থাকলেও, দারিদ্র্যের কঠোর নিষ্পেষণে তাঁকে লেটো দলে বা রুটির দোকানের চাকুরি গ্রহণ করতে হয়েছে। যে-সমাজে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন সে-সমাজের মুসলিমের অবস্থাও তখন অত্যন্ত শোচনীয়। বঙ্গদেশবাসী মুসলিম সমাজ তখন ইংরেজ সরকারের অত্যাচারে অত্যন্ত দুরবস্থায় অধঃপতিত হয়ে, উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাবে নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, মুনশী মেহেরুল্লাহ প্রমুখ নেতাদের দ্বারা পুনর্বার আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তবে জীবনের অধিক সংখ্যক ক্ষেত্রেই তারা অপর সমাজের লোকদের দ্বারা নানাভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। কেবল বঙ্গদেশে নয়, ভারতের সর্বত্রই মুসলিম সমাজের এই একই দশা। গুটিকতক করদ মিত্র রাজ্যের নওয়াব এবং বঙ্গদেশে গুটিকতক জমিদারের সৃষ্টি করে ইংরেজ সরকার বিজিত মুসলিম সমাজকে পদানত করে রেখেছে। কেবল এ উপ-মহাদেশে নয়- সারা বিশ্বেই মুসলিমদের অত্যন্ত হীন অবস্থা। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিরাট ভূখণ্ডের মালিক এবং মক্কা মদীনা তথা জাজিরাত-উল আরবের সংরক্ষণকারী তুর্কির সুলতান বলকান যুদ্ধের পরে হৃতসর্বস্ব। পরবর্তীকালে প্রথম মহাসমরের পরে একেবারে নিঃস্ব।</p>
<p>দেশের সর্বত্রই রয়েছে অনাচার অত্যাচারের প্রবাহ। ধনী কর্তৃক নির্ধনকে শোষণ সামাজিক জীবনে নির্বিবাদে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আশরাফ আতরাফের ভেদ ধর্মের বিধান বলে গৃহীত হয়েছে। হিন্দু অথবা ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সতত বিবাদ বিসংবাদ দেখা দিচ্ছে। কথাকথিত পুরোহিত বা মোল্লা সমাজের লোকেরা এই বিবাদকে ধর্মীয় প্রেরণাজাত বলে প্রচার করছেন। সত্যিকার দেশপ্রেমিক লোকেরা সমাজে কোন স্থান পাচ্ছে না। বাংলা অগ্নিযুগের বিপ্লববাদীদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে। মানবতাবাদের আলোকে তৎকালীন ভারতীয় শিক্ষালয়গুলোতে কোনো শিক্ষাদান করা হচ্ছে না। এরূপ পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে মানুষ মানবিক জীবন যাপন করতে পারে না। তার বিরুদ্ধে একমাত্র বিদ্রোহ ব্যতীত অপর কোনো পন্থা নেই। তাই নজরুল তাঁর কাব্য-জীবনের সূচনায়ই এক প্রচণ্ড বিদ্রোহের গর্জন করেছেন। সে গর্জনের পূর্ণ অভিব্যক্তি &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে দেখা দিয়েছে বটে, তবে তার অভ্যুদয় হয়েছে &#8216;শাতিল-আরব&#8217;, &#8216;মুহররম&#8217; প্রভৃতি কবিতায়। এ বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে যে আদর্শ রয়েছে বিদ্রোহের গর্জনের মধ্যেও তার আভাস ও ইঙ্গিত রয়েছে এবং পরবর্তীকালে তা &#8220;নতুন চাঁদ&#8221; প্রভৃতি কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে &#8216;বিদ্রোহী&#8217;ই নজরুল মানস-ভাণ্ডারের চাবিকাঠি। তাতে যে বিভিন্ন চিন্তার স্রোত রয়েছে সে স্রোতগুলো তাঁর পরবর্তী রচনার মধ্যে নিজের স্বকীয় রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।</p>
<p>এ পরিদৃশ্যমান বিশ্বভুবনে এবং মানব-জীবনে যত সব বিষয়আশয় রয়েছে এবং তার মধ্যে দ্বন্দ্ব-কোলাহল রয়েছে তাকে জয় করে তা থেকে উত্তরণ ছিলো &#8216;বিদ্রোহী&#8217;র লক্ষ্য। এজন্য। তাঁর এ রচনার মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে কোনো কোনো সমালোচক মন্তব্য করেছেন। যিনি &#8216;খোদার আসন আরশ ছেদিয়া&#8217; বিশ্ব বিধাতৃর বিস্ময় রূপে দেখা দিয়েছেন- তিনিই আবার &#8216;ষোড়শীর হৃদি সরসিজ প্রেম উদ্দাম&#8217; রূপে কিভাবে দেখা দিতে পারেন? অথবা তিনি বিষ্ণু বক্ষ হতে যুগল কন্যা কেন ছিনিয়ে আনবেন? তিনি &#8216;জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি&#8217;ই বা ধরবেন কেন? বা &#8216;অর্ফিয়াসের বাঁশের বাঁশরী&#8217;ই হবেন কেন? এ সকল চরিত্রের মধ্যে অধিকাংশ প্রতীক। মানব-মানসে ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ উদ্দাম প্রেমের যে স্থান রয়েছে, তেমনি লক্ষ্মী সরস্বতী নামক যুগল কন্যার অধিকারী বিষ্ণুর প্রতিও হিংসা রয়েছে। তেমনি বিরাট ও বিপুল অগ্নিপাখার অধিকারী জিব্রাইলের প্রতিও রয়েছে। এজন্য তাঁর এসব উক্তিতে অসংগতি দেখা দেয়। এ প্রতিভাসিত জগতের মধ্যে যাতে কোনো অসংগতি বা ভেদাভেদ থাকে না তার জন্যই বিদ্রোহীর এ হুংকার। তবে &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তেই নজরুল ইসলামের কার্য জীবনের নানাবিধ সংকেত থাকলেও এখানেই তাঁর কাব্য-জীবনের ইতি হয়নি। &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে প্রকাশিত এক একটা প্রতীক পরবর্তীকালে তাঁর স্বকীয় পরিধির মধ্যে &#8216;চমৎকার রূপ লাভ করেছে। &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে প্রকৃতি-প্রীতি Paganism- এর যে সুর উঠেছে এবং এ বিশ্বের স্থিতি ও ধ্বংসের মধ্যেও তাঁর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অবকাশ পেয়েছে তার পরিচয় আমরা পাই:</p>
<blockquote><p>আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা</p>
<p>কভু ধরণীরে করি বরণীয়া কভু বিপুল ধ্বংস ধন্যা</p></blockquote>
<p>তার একক পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে:</p>
<blockquote><p>আজ কাশ বনে কে শ্বাস ফেলে যায়</p>
<p>মরা নদীর কূলে</p>
<p>ও তার হলদে আঁচল চলতে জড়ায়</p>
<p>অড়হরের ফুলে।</p></blockquote>
<p>মানব-মানসে স্বাশ্রয়ী হওয়ার যে-আদিম প্রবৃত্তি রয়েছে এবং যার প্রকাশ &#8216;বিদ্রোহী&#8217;তে জাজ্বল্যমান তারই অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে:</p>
<blockquote><p>তোমার দত্ত হস্তেরে বাঁধে কার নিপীড়ন চেড়ী</p>
<p>আমার স্বাধীন বিচরণ কার আইনের বেড়ী</p>
<p>ক্ষুধা তৃষ্ণা আছে আছে মোর প্রাণ</p>
<p>আমিও মানুষ আমিও মহান</p>
<p>আমার অধীন এ মোর রসনা এই খাড়া গর্দান</p>
<p>মনের শিকল ছিঁড়েছি পড়েছে হাতের শিকলে টান</p>
<p>এতদিনে ভগবান-</p>
<p>(ফরিয়াদ।)</p></blockquote>
<p>আত্ম-সংরক্ষণের উপবৃত্তি হচ্ছে আত্ম-প্রতিষ্ঠা। সে আত্ম-প্রতিষ্ঠারই এক রূপ যৌন- বাসনা। এ যৌন-বাসনার প্রকাশ কবির ভাষায় অনুপম রূপ লাভ করেছে:</p>
<blockquote><p>সখি পাতিসনে শিলাতলে পদ্ম-পাতা</p>
<p>সখি দিসনে গোলাপ ছিটে খাস লো মাথা</p>
<p>যার অন্তরে ক্রন্দন</p>
<p>করে হৃদি মন্থন</p>
<p>তারে হরি চন্দন</p>
<p>কমলী মালা</p>
<p>সখি দিস নে লো, দিস নে লো বড় সে জ্বালা!</p></blockquote>
<p>আত্ম-প্রতিষ্ঠার উপ-প্রবৃত্তির মধ্যে যুথচারী প্রবৃত্তি অত্যন্ত প্রকটমান। এ প্রকৃতিই মানুষকে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে আত্ম-প্রতিষ্ঠা লাভে উদ্বুদ্ধ করে। নজরুলের ভাষায় এ প্রবৃত্তিরই দান সাম্যবাদের প্রকাশ অনন্য:</p>
<blockquote><p>গাহি সাম্যের গান</p>
<p>যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান</p>
<p>যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রীষ্টান।</p>
<p>(সাম্যবাদী।)</p></blockquote>
<p>ঐতিহ্য-চেতনা থেকেই স্বদেশপ্রেমের সৃষ্টি, সে স্বদেশপ্রেমের মূলমন্ত্র হচ্ছে আপনার দেশ থেকে অপর জাতির শাসন ও শোষণের অবসান। নজরুল স্বদেশপ্রেমের প্রতিনিধি হয়ে বলেছেন:</p>
<blockquote><p><strong>কান্ডারী তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর</strong></p>
<p><strong>বাঙ্গালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর।</strong></p></blockquote>
<p>যে ঐতিহ্যচেতনার মধ্যে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধও রয়েছে:</p>
<blockquote><p>জুলফিকার, হায়দরী হাঁক আজও হজরত আলীর</p>
<p>শাতিল আরব, শাতিল আরব জিন্দা রেখেছে তোমার তীর</p>
<p>(শাত-ইল-আরব)</p></blockquote>
<p><strong>তাঁকে প্রায়ই অপবাদ দেওয়া হয়, তাঁর কাব্যে বা জীবনে কোনো দার্শনিক মতবাদ নেই; সে অপবাদের জ্বলন্ত প্রতিবাদ হিসাবে বলা যায়:</strong></p>
<blockquote><p><strong>আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন</strong></p>
<p><strong>খুঁজি তারে আমি আপনায়</strong></p>
<p><strong>আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি</strong></p>
<p><strong>আমারি তিয়াসী বাসনায়-</strong></p>
<p><strong>&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;&#8212;</strong></p>
<p><strong>আমারই রচিত কাননে বসিয়া</strong></p>
<p><strong>পরানু পিয়ারে মালিকা রচিয়া</strong></p>
<p><strong>যে মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া</strong></p>
<p><strong>আপনারই গলে দুলে হায়।</strong></p>
<p><strong>(আপনি-পিয়াসী, ছায়ানট)</strong></p></blockquote>
<p>আমার সঙ্গে পরমাত্মার একটা মধুর সম্পর্ক সম্বন্ধে তার বর্ণনা বিশ্ব-সাহিত্যে বিরল। পরমাত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন:</p>
<blockquote><p>আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল আমার দেউল-</p>
<p>আমারই আপন দেহ</p>
<p>আমার এ প্রাণের ঠাকুর নহে সুদূর</p>
<p>অন্তরে মন্দির সেহ।</p>
<p>(বন-গীতি)</p></blockquote>
<p>এ দেহেরই মধ্যে যে প্রাণের ঠাকুর নিত্য তার লীলায় মত্ত রয়েছেন-সে সম্বন্ধে কবি নি:সন্দেহে:</p>
<blockquote><p>এ দেহেরই রঙ মহলায়</p>
<p>খেলিছে লীলা-বিহারী</p>
<p>মিথ্যা মায়া, এ কায়া</p>
<p>কায়ায় হেরি ছায়া তারি।</p>
<p>(গুল-বাগিচা)</p></blockquote>
<p>এতে স্পষ্টই বোঝা যায় মানব-মানসের এমন কোনো বৃত্তি বা প্রবৃত্তি নেই যার সন্তোষ বিধানের জন্য তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে ত্রুটি করেননি।</p>
<p>এজন্যেই তাঁকে বিশ্ব-সাহিত্যের কবি-সভায় স্থান পাওয়ার যোগ্য বলে দাবী করা যায়। তবে এখানে একটা বিঘ্ন রয়েছে। যাঁরা ক্লাসিক হিসাবে বিশ্ব-সাহিত্যে স্থান পেয়েছেন তাঁদের রচনা নানাভাবে ছড়িয়ে পড়েছে- রামায়ণ, মহা-ভারত বা ইলিয়ড ওডিসি সমৃদ্ধভাবে গ্রন্থাকারে দেখা দিয়ে আজও রসগ্রাহী মহলে রস পরিবেশন করছে। তেমনি শেকসপীয়রের নাটকগুলোও এখনও মঞ্চে পরিবেশিত হয়ে মানব-চিত্তে নানা সমস্যার সাড়া জাগাতে সক্ষম হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীর মধ্যে নাটকগুলো এখনও অভিনীত হচ্ছে। নজরুল ইসলামের রচনাবলীতে বেশির ভাগ রয়েছে কবিতা ও গান। এগুলো পাঠ ব্যতীত অন্যভাবে পরিবেশিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই অল্প। এজন্য তার প্রচার অত্যন্ত সীমিত। তাঁর রচনাকে নাট্যাকারে প্রকাশ করে তার ভাবধারা বিশ্ববাসীর নিকট পেশ করা যায় কিনা- আজকের দিনে এ পরীক্ষা হবে আমাদের কর্তব্য। <strong>আমরা দেখতে পেয়েছি জীবনের এমন কোনো স্তর নেই যার সম্বন্ধে তিনি বিশ্বজনের প্রতিনিধি হয়ে সে সম্বন্ধে আলোকপাত করেননি। তাঁর প্রতিটি কবিতায় মানব-জীবনের কোনো- না কোনো বৃত্তির প্রতীকী রূপ দেখতে পাওয়া যায়।</strong> যে-অপূর্ব প্রতিভার অধিকারী হয়ে নজরুল এ দুনিয়ায় এসেছিলেন এবং যে প্রতিভার অপূর্ব ছটায় একদা বাংলা তথা ভারতের কাব্য-গগন আলোকিত হয়েছিলো- তার সম্যক বিকাশ হয়নি। নিদারুণ দারিদ্র্য স্বীয় সমাজের হেনস্থা ও অবহেলা তাতে মহাপ্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। চল্লিশ বৎসর পার হতে না হতে তিনি মানসিক স্তব্ধতা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। যদি তিনি দীর্ঘায়ু হতেন, তা&#8217;হলে তাঁর কাছ থেকে এ বিশ্ব আরও অনেক কিছু আশা করতে পারতো। তবুও যা কিছু তিনি দান করেছেন- তাকে বিশ্ব-সাহিত্যের পর্যায়ে অল্প আয়াসেই উত্তোলন করা যায়।<sup>*</sup></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>*অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-কানাইলাল গঙ্গোপাধ্যায়কৃত গ্যোটের তরজমা পুস্তকের ভূমিকা দ্রষ্টব্য।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/world-spirit-in-nazrul-s-literature/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14708</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মহাকবি ইকবাল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/famous-poet-iqbal/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/famous-poet-iqbal/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 08 May 2024 09:43:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14149</guid>

					<description><![CDATA[(১) মহাকালকে আত্মিক বা তাত্ত্বিক সত্তা যেভাবেই ভাবা যাক না কেনো, তার প্রবহমানতা বা গতিকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে-কালের গতি অবিচ্ছিন্ন, তার আদি অন্ত আজ মানুষের জ্ঞানের বহির্ভূত। তবু আমাদের সুবিধার জন্য আমরা তাতে রেখা টেনে ভাগ করি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h2 style="text-align: center;">(১)</h2>
<p>মহাকালকে আত্মিক বা তাত্ত্বিক সত্তা যেভাবেই ভাবা যাক না কেনো, তার প্রবহমানতা বা গতিকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে-কালের গতি অবিচ্ছিন্ন, তার আদি অন্ত আজ মানুষের জ্ঞানের বহির্ভূত। তবু আমাদের সুবিধার জন্য আমরা তাতে রেখা টেনে ভাগ করি এবং পুরাতন, মধ্য ও আধুনিক যুগ বলে তাতে তিনটে পর্যায়ের সৃষ্টি করি। আধুনিক যুগের বর্ণনা প্রসঙ্গে দর্শনের ইতিহাসবিদ মিলি বলেন,</p>
<p>&#8220;বর্তমান কালের ইতিহাসের মধ্যে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে চিন্তার পুনর্জাগরণ, সমালোচনা করার মনোবৃত্তির জন্মলাভ, গুরুবাদের ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, নির্বিশেষবাদ (Absolution) ও সংঘবাদের (Collectivum) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং চিন্তায়, অনুভূতিতে ও কার্যে স্বাধীনতার দাবী। রেনেসাঁ ও রিফরমেশনের ক্রান্তিকাল থেকে যে প্রভাব কার্যকরী ছিল, তাই পরবর্তী শতাব্দীতে রয়েছে ক্রিয়াশীল এবং এখন পর্যন্ত তা শান্ত হয়নি।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ মতবাদের পোষকতায় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ করে বলা হয়, দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাচীনকালের গ্রীক মনীষার সঙ্গে বর্তমানকালের সাদৃশ্য রয়েছে। অপরদিকে মধ্যযুগ ছিল বর্তমান কালের সম্পূর্ণ বিপরীত—ধর্মী। গ্রীকদের চিন্তারাজ্যে কোন আপ্তবাক্য (Authority) বা কোন সংঘবদ্ধ চিন্তার শাসন ছিল না। ছোট ছোট নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক মনীষীরই আপনার স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার অধিকার ছিল। এ জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে তাদের ধারণার ফল কোনো ধর্ম সংক্রান্ত প্রত্যয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়নি। সক্রেটিস, প্লেটো বা এরিস্টটলের চিন্তাধারায় তাই স্বাধীন মানসের পরিচয় পাওয়া যায়। তেমনি কাব্যে ও নাটকে সেই সাশ্রয়ী মানসের স্বাক্ষর রয়েছে। হোমার, সকোক্লিস, এসকাইলাস প্রভৃতি মহাকবি ও নাট্যকারগণের অমর অবদানে এ সত্যই বার বার প্রমাণিত হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মতামত ব্যক্ত করার প্রবৃত্তি প্রাচীনকালে ছিল—এ থিওরী সত্য হলেও প্রচলিত প্রত্যয় বা রীতি-নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা সে-যুগেও বিস্তৃতি লাভ করেছে। সক্রেটিসের জীবন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আবার মধ্যযুগেও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার উদাহরণ রয়েছে। সেলজুক বাদশাহ মালিক শাহের আমলে, তাঁর উজির নিজাম-উল-মূলক প্রতিষ্ঠিত নিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ওমর খৈয়াম তার &#8216;রুবাই&#8217;তে যে-সব আদিম ও সার্বজনীন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, তার সঙ্গে তুলনা করলে অতি আধুনিক তত্ত্ব-জিজ্ঞাসাও ম্লান হয়ে পড়ে। আবার এ বিংশ শতাব্দীতেই টি.এস. এলিয়ট তাঁর কাব্যে ধর্মাশ্রিত দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করবার প্রয়াস পেয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ বিভাজনকে তাই সাধারণ নীতি হিসাবে গ্রহণ করলেও তার মধ্যে ব্যতিক্রমের অবকাশ রয়েছে বলে স্বীকার করতেই হবে, এ বিভাজন করার মূলে রয়েছে যে মানদণ্ড, তাকে স্বাধীন বা ধর্মসংক্রান্ত প্রত্যয়শীলতা বলেও গ্রহণ করা যায় না। স্বাধীন চিন্তার মূলেও রয়েছে জীবন-দর্শনসম্ভূত প্রত্যয়শীলতা। আর ধর্মকেন্দ্রিক প্রত্যয়শীলতায় যে এক প্রচন্ড জীবনবোধ রয়েছে তা অনস্বীকার্য। কোনো জীবন-বেদ ব্যতীত যে সত্যিকার কাব্য-সৃষ্টি সম্ভব নয়, তা যে কোনো মহাকাব্যের বিশ্লেষণেই প্রমাণিত হয়। হোমার বা বাল্মীকির কাব্যে আমরা সে প্রত্যয়শীলতারই নিদর্শন পাই—ইলিয়ড ওডিসির যে প্রত্যয়শীলতা—‘সত্যের জয় এবং অসত্যের ক্ষয়’ নামক নীতির স্বীকৃতিতে তা প্রমাণিত হয়। রামায়ণেও সে নীতিরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তবে পার্থক্য এই  যে, রামায়নের সর্বত্রই প্রকৃতির মধ্যেও নীতির কার্যকারিতা দেখা যায়। সক্রেটিসের নাটকাদিতে নিয়তির অমোঘ বিধানের উপর নাট্যকারের অগাধ বিশ্বাসের পরিচর পাওয়া যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মধ্যযুগের বিশেষত্ব হচ্ছে ধর্মীয় প্রত্যয়শীলতার পটভূমিতে জীবনের সমালোচনা করার প্রবৃত্তি। এজন্যই সে যুগের কাব্যকে ধর্মীয় বাণী থেকে পৃথক করা কষ্টসাধ্য। জালাল-উদ্দীন রুমীর মসনভীতে একাধারে ধর্মতত্ত্ব ও কাব্য-রসের সন্ধান পাওয়া যায়। মরমী তত্ত্ববা</strong><strong>ণী </strong><strong>যেমন এ কাব্য থেকে তাঁর সাধনার অনুকূল প্রেরণার উৎসের সন্ধান পান, তেমনি কাব্যরস পিপাসু রসিকজন তাতে উৎকৃষ্ট কাব্যের লক্ষণ আবিষ্কার করে অভিভূত হন।</strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p>এ ধারা মধ্যযুগে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও এখনও তার ইতি হয়নি। বাঙলা  কাব্যের বৈষ্ণব পদাবলীতে সে ধারারই অনুসরণ দেখা যায়। মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির কাব্যের পটভূমিকায় এবং মীরার ভজনে সে মানসিকতাই বর্তমান। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বাউলদের গানে সে ধারার অনুবর্তন লক্ষিত হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এভাবে কাব্যের মধ্যে ধর্মীয় প্রত্যয়ও ও ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত থাকায় তাকে দু&#8217;দিক থেকেও বিচার করার সম্ভাবনা রয়েছে। তার কারণস্বরূপ বলা যায়‚ বর্তমান কালের সূচনায় জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে যেভাবে পৃথক করা হয়েছে— মধ্যযুগে সে পার্থক্য এত উৎকট হয়ে দেখা দেয়নি বলে একই মানসে তা’ কোথাও ধর্মের আবেগরূপে আবার কোথাও কাব্যের অনুরাগরূপে অপরূপ ভঙ্গিমায় প্রকাশ লাভ করেছে। সম্ভবতঃ এজন্যই মধ্যযুগীয় কাব্যসাধনা তথা ধর্মীয় প্রত্যয়শীলতার ফল Cult-এ পরিণত হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইকবাল আমার সঙ্গে কথা বললেন একজন পরামর্শদাতার মতো করে। তাঁর কবিতার মধ্যে বিপুল চিন্তাশক্তি আর ভাবপ্রবণতার আভাষে আমি স্তম্ভিত হলাম। কখনও তিনি বিশ্বস্ত সংলাপী, কখনও আবার অগ্নিময়ী বিচারকের মতো &#8216;মানুষের&#8217; জয়গান গেয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p>&#8216;তুমি গড়িয়াছ রাত্রি,</p>
<p>আমি এনেছি আলোর দিশা,</p>
<p>তুমি আমারে দিয়েছ মৃত্তিকা</p>
<p>আমি গড়িয়া তুলেছি পাত্র।</p>
<p>মরু প্রান্তর, পর্বত</p>
<p>সবি তোমারি দান,</p>
<p>উদ্যান প্রভু রচেছি যে আমি—</p>
<p>বিরাম স্থান।</p>
<p>বালুকার রাশি রূপ পেয়ে</p>
<p>হোলো স্বচ্ছ কাঁচ</p>
<p>বিষ নাশি বিষে মধু আনি দিনু</p>
<p>নতুন ধাঁচ।&#8221;</p>
<p>(&#8216;মানুষে ও স্রষ্টার মধ্যে কথোপকথন&#8217;)</p></blockquote>
<p>একথা বলেছেন তিনি সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে। এখানে তাঁর সতর্কীস্বর মানুষের ক্ষমতাবোধকে জাগিয়ে তুলেছে।</p>
<blockquote><p>“&#8230;..দিনভর শুধু ঘুমায় যে জন</p>
<p>প্রকৃতি চাহেনা তারে</p>
<p>যে মানুষ খাটে দিনটি ভরিয়া</p>
<p>সব প্রেম তার ভরে।&#8221;</p>
<p>(&#8216;দুর্দশার দৃশ্য&#8217; কবিতা থেকে)</p></blockquote>
<p>ইকবাল ডাক দিয়েছেন তাঁর দেশবাসীকে ঘুমভেঙে জেগে উঠতে, স্বাধীনতা আর ন্যায়-বিচারের জন্যে সংগ্রামে আগুয়ান হতে। অন্যায়, নিষ্ঠুরতা আর দমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তিনি তাঁর দেশের মানুষদের উপনিবেশ স্থাপনকারীদের অত্যাচার থেকে দেশকে মুক্ত করতে আহ্বান জানিয়েছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যতই আমি ইকবালের কবিতা পড়ি, তাঁর দেশের মানুষের জীবনধারাকে আরো পরিষ্কাররূপে দেখতে পাই, অনুধাবন করি তার মাতৃভূমির মহিমান্বিত রূপ আর সেই দেশের জন্যে কবির অপরিসীম ভালবাসা।</p>
<p>তার বইগুলো আমার চোখের সামনে প্রাচ্যের মানুষদের মহিমাভরা অপূর্ব জীবনধারা আর সে জীবনের দুঃখভরা দৃশ্যাবলী রূপায়িত করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<blockquote><p><em>ইকবালের কাব্যধারা সোভিয়েত পাঠকদেরও বিশেষ করে কাযাখরা, যারা কাস্পিয়ান সাগর আর উরাল পর্বতমালা থেকে অন্যদিকে আলতাই পর্বতমালা আর জুনগর দরওয়াজা পর্যন্ত এশিয়ার এক সুবিশাল বৃক্ষপত্রহীন প্রান্তরে বসবাস করে, তাদের কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাযাখদের যুগযুগের পুরাতন একটা ইতিহাস রয়েছে; ওদের সমৃদ্ধ কৃষ্টিধারা আছে তাই ওরা কাব্যজগতের মূল্য উপলব্ধি করে। কাযাখদের নিজেদের আছে মহাকাব্যের ধনাগার। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের প্রখ্যাত কবি যোদ্ধা কবি মঘোম্বেত (১৮০৪-১৮৪৬), নীতিগর্ভ উপদেশ আর প্রবাদবাক্যে ভরা কাব্যের বিখ্যাত দার্শনিক কবি আবাই (১৮৪৫-১৯০৪), এবং নামকরা মানবতার কবি মুখতার অডিএজোভের (১৮৯৭-১৯৮১) বইগুলো যদি উর্দুতে অনুদিত হতো তাহলে সেগুলো ইকবালের কাযাখ ভাষায় অনুবাদ করা কবিতাগুলির মতোই হৃদয়গ্রাহী হতো। ইকবালের মতো এদের কাব্যলিতেও আছে গভীর একটি ভাবাবেগ; মানুষের প্রতি ভালবাসা, মহৎ একটি আকাঙ্ক্ষা, মানুষের স্বাধীনতা, বিচারশক্তি এবং আলোর পথে ডাক দেওয়া।</em></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><em>আমাদের আধুনিক মানস স্বভাবতঃই স্বাশ্রয়ী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী। সেজন্য ধর্মাশ্রিত কাব্যকে সত্যিকার কবিমনের প্রকাশ বলে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। কাব্যের বয়েছে এ সার্বজনীন আবেগ। এ দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেখানেই মানুষ থাক না কেন—সেখানেই কাব্যের আদর হয় বলে তাকে সাম্প্রদায়িকতার স্পর্শ থেকে দূরে রাখা বাঞ্ছনীয় মনে করা হয়। ধর্মের বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য ও বিভিন্নতা থাকা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী ভাবধারা থাকায় কোনো বিশিষ্ট ধর্মের অনুসারীর মর্মবা</em><em>ণী </em><em>অপর ধর্মের মানুষের মনে আবেগের সৃষ্টিতে সক্ষম কি না—সে সম্বন্ধে তর্কের অবকাশ রয়েছে। আবেগের বিষয়বস্তুর উপর গুরুত্ব আরোপ করলে এবং বিধ সিদ্ধান্ত অপরিহার্য বলে প্রতিভাত হয়। </em></p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে মানব-মানসের দিক থেকে (From the subjective standpoint) বিচার করলে বুঝতে পারা যায়, ধর্মের মধ্যে বিভিন্নতা থাকলেও ধর্মের মধ্যে রয়েছে এক মহান ঐক্য। মানবমন স্বভাবতই বহির্মুখীন এবং তার স্বাভাবিক প্রবণতার দরুনই এ বিশ্বের পশ্চাদপটে বিরাজমান আদিসত্তাকে সে জানতে চায়। জ্ঞানের এ প্রেরণাই তাকে তার সীমাবদ্ধ জীবনের পরিস্থিতি থেকে  সীমাহীন সত্তার অন্বেষণে ধাবিত করে। জীবনের এ জোরালো চাহিদার তৃপ্তি সাধনে তৎপর রয়েছে বলেই মানব-মানস ধর্মমুখী। সে তৃপ্তির জন্য যে-সব পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় অথবা যে-সব ধারণার আশ্রয় লওয়া হয়, সেগুলো ধর্মের রাজ্যে মুখ্য বিষয় নয়; মুখ্য বিষয় হচ্ছে, মনের যে আদিম চাহিদা এবং তার তৃপ্তির জন্য মানব-মানসের বহির্গমন। ধর্মীয় আবেগের পরিতৃপ্তির জন্য যে সব ধারণা গ্রহণ করা হয়, সেগুলো মানব-জীবনেরই সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। কোথাও আদর্শকে প্রেমিক হিসাবে, কোথাও পিতারূণে কোথাও বা প্রেমিকারূপে গ্রহণ করে ধর্মীয় মানস স্বস্তি পায়। এসব আদর্শে উপলব্ধির পথ বিভিন্ন হতে পারে, তবে মানব-জীবনে যে আবেগের ফলে তাদের উৎপত্তি, তা&#8217; এক ও অবিভাজ্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে আদর্শের সংঘর্ষের ফল এবং সে-সব আদর্শের রূপায়ণের মাধ্যমের বিভিন্নতার দরুণ অনেক সময় ধর্মীয় অনুষঙ্গ সার্বজনীনতা লাভ করতে পারে না। এজন্যই বোধ হয় কোনো কোনো মধ্যযুগীয় কবি তাদের ধর্মীয় আবেগকে মানবিকরূপ দান করেছেন, ইরানি কবি হাফিজের কাব্য-প্রতিভার বৈশিষ্ট্য এই খানেই। তিনি অতি গুঢ় আধ্যাত্মিক ভাবধারাকে অতি সহজভাবে মানব-প্রেমের প্রকাশ ভঙ্গিমায় মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। তার &#8216;দিওয়ানের&#8217; সর্বত্রই আপাতঃদৃষ্টিতে মানব-প্রেমেরই এক লালসাপূর্ণ অধ্যায়ের প্রকাশ পাওয়া যায়,</p>
<p>“প্রিয়ারে ছাড়িয়া থেকো না হাফিজ, ছেড়ো না পেয়েলা লাল  এ যে গোলাপের চামেলীর দিন, এ যে উৎসব কাল&#8230;”</p>
<p>(তরজমাঃ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এবংবিধ উক্তির মর্মমূলে আধ্যাত্মিক সাধনার গূঢ় অর্থ থাকলেও আপাতঃশ্রুতিতে তাতে কামনাময় শারীরিক সম্বন্ধজাত আবেগের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ধরনের সৃষ্টির উদাহরণ রয়েছে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির কাব্যে। তাঁর ধারণাতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিকরূপ পরিত্যাগ করে কবি-জীবনের চরম সখারূপে দেখা দিয়েছেন,</p>
<p>“তিমির দিক ভরি ঘোর যামিনী অথির বিজুরিত পাতিয়া বিদ্যাপতি কহে ক্যায়সে গোয়াইব হরি বিনে দিন রাতিয়া।“</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে কাব্যের বিষয়বস্তু ধর্মীয় রূপ গ্রহণ করুক অথবা মানবীয় রূপেই তা প্রকাশিত হোক, তার পশ্চাদপটে বিশিষ্ট জীবন-দর্শন থাকা অবশ্যম্ভাবী। সে জীবন-দর্শনেও পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। নানাবিধ পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও মহাকাব্যে কতকগুলো লক্ষণ ফুটে ওঠে। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ লক্ষণ হচ্ছে তার অন্তর্গত নানাবিধ ভাবধারার সমাবেশ। তাতে এমন কতকগুলো ভাবধারা বর্তমান থাকে যার ফলে তার জাতি নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানব-জীবনকে সামগ্রিকভাবে দেখার ফলে তার মধ্যে নানাবিধ ভাবধারা থাকে বর্তমান, যার ফলে তত্ত্বানুসন্ধানী দার্শনিক তার মধ্যে খুজে পান দর্শনের জটিল তত্ত্বের সমাধানের প্রয়াস, মানব-প্রেমিক তার মধ্যে আবিষ্কার করেন মানব-প্রেমের বা মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>রামায়ণে বর্ণিত রাজা রামচন্দ্রের চরিত্রে যেমন আদর্শ নরপতির উদাহরণ পাওয়া যায়, তেমনি প্রজাগণের মনোরঞ্জনার্থে সীতাকে বনবাসে প্রেরণের মধ্যে প্রজাতন্ত্রের (Democracy) আদি বীজেরও সন্ধান পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ধর্মের সঙ্গে রয়েছে মহাকাব্যের সাদৃশ্য। ধর্মের মধ্যে যেমন মানব-জীবনের নানাবিধ দিকের সন্তোষ বিধানের রয়েছে উপাদান। এ দুনিয়ার সকল ধর্মের মধ্যে সমাজ-নীতি ও রাজনীতির মৌলিকসূত্র বর্তমান। এ সব নীতিকে ধর্ম- প্রবর্তকগণ কেবল প্রচার করেই ক্ষান্ত হননি, বাস্তব জীবনেও তার রূপায়ণের জন্যও চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বৌদ্ধ ধর্মকে সাধারণতঃ অহিংসার ধর্ম বলেই গ্রহণ করা হয়, অথচ বুদ্ধদেব স্বম্বন্ধে কাহিনী প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি ব্রাহ্মণ বৈশ্যদের ষড়ন্ত্রের ফলে ব্যবসায় ও বাণিজ্যে যে কর্ডনিং প্রথার সৃষ্টি হয়েছিল এবং যে জঘন্য প্রথার ফলে সর্বসাধারণের মানুষের জীবনে সংকট দেখা দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে তিনি দলবলসহ যুদ্ধ করেছেন। যীশুখৃষ্ট দাসের দল নিয়ে ইহুদিদের সুদ লেনদেনের প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করেছেন এবং হযরত মুহাম্মদ (দঃ) দাসকে মুক্ত করা তাঁর জীবনের ব্রত হিসাবেই গ্রহণ করেছিলেন। কাজেই এ সব ধর্মে জনগণের কল্যাণকে শ্রেষ্ঠ সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে অম্লান বদনে স্বীকার করা যায়। তাই দেখা যায় পারলৌকিক মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ইহলোকিক কল্যাণও এ-সব ধর্মের লক্ষ্যের বিষয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানেই মহাকাব্যের স্রষ্টাগণ অপরাপর সৃষ্টিধর্মী মানুষ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বহুধা বিস্তৃত জীবনের নানাবিধ ভূয়োদর্শনের ফলে এদের মানস এত গভীর ও সমৃদ্ধ হয় যে, মহাসমুদ্রের মত তাতে হাঙ্গর, কুমীর, তিমি থেকে শুরু করে অতি নিরীহ ঝিনুকানিও  স্থান পায়। বিচিত্র জীবনের বৈচিত্র্য প্রকাশে কৃতী বলেই তারা এ জগতে অমর হয়ে বিরাজমান।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে স্মরণ করা কর্তব্য যে, মহাকাব্য রচনায় সফল হওয়ার পূর্বে এসব অপূর্ব প্রতিভা ও মণীষার অধিকারী শিল্পীগণ নানা স্তর পার হয়ে সেই চরমস্তরে উপনীত হন। স্বজন ধর্ম স্বভাবজাত হলেও তাকে সার্থক করে তুলতে হলে সাধনার সোপান উত্তীর্ণ হতে হয়। ইকবালকে মহাকবি বলার অর্থ এই যে, তাঁর মধ্যেও মানব-জীবনের নানাদিকের নানা প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা রয়েছে। সাধনার সর্বশেষ স্তরে উপনীত হওয়ার আগে তাঁকে নানা স্তর পার হতে হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h2 style="text-align: center;"><strong>(২)</strong></h2>
<p>মহাকবি ইকবালে কাব্য-পাঠে সর্বপ্রথমেই ভেসে উঠে তার প্রতি জোরালো প্রত্যয়শীলতা। সে প্রত্যয়শীলতা প্রথমদিকে আধুনিক ভাবধারা দ্বারা বিকশিত হয়েছে এবং বিকাশের ধারায় পরবর্তীকালে ধর্মীয় ধারণার দ্বারা পুষ্ট হয়ে পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। প্রথমদিকে তাঁর ভাব প্রকাশের বাহন হিসাবে তিনি বিজাতীয় ধারণা বা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করলেও পরবর্তীকাল তিনি সম্পূর্ণ ইসলামী সংস্কৃতির ধারণার মাধ্যমে তাঁর পরিণত বয়সের চিন্তার ফল প্রকাশ করেছেন। অবশ্য উভয় পর্যায়েই তিনি আধুনিক চিন্তাধারার সমালোচনা করে তাঁর জীবনদর্শন প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মহাকাব্যের উপজীব্য বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রধান বিষয়গুলো ছিলো, সৃষ্টিশীল আল্লাহ সম্বন্ধে তাঁর ধারণা, মানব জীবনের গতিশীলতা, খুদী, তকদীর ও অমরতা। এসব ধারণায় তিনি অকস্মাৎ এসে উপনীত হননি। ক্রমবিকাশের ধারায় সর্বশেষ স্তরে তাঁর মানস এ-সব ধারণার মর্ম গ্রহণে সমর্থ হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তাঁর মহাকাব্যের বিকাশের ধারার অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাই, প্রথমে তিনি জীর্ণ-শীর্ণ এ ঘুনে ধরা সমাজের নানাবিধ গ্লানিতে অতিষ্ঠ হয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতি অধ্যুষিত এই বিশাল দেশে কোথাও প্রাণের স্পন্দন তিনি পাননি। গতানুগতিক আচার পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ সেই পুরাতনেরই আরাধনা করছে। তাতে বাইরের খোলাটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, অন্তরের কোনো সাড়া তাতে প্রকাশ পাচ্ছে না। সে যুগের ইকবাল মানসের পরিচয় হিসাবে নিম্নে উদ্ধৃত কবিতাকে শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলা যায়,</p>
<blockquote><p>শূন্য পড়িয়া আছে বহু যুগ হতে হৃদয়ের লোকালয়</p>
<p>এসো এক নূতন শিবালয় এই দেশে বসাইয়া দেই,</p>
<p>পৃথিবীর তীর্থ হইতে উচ্চ হউক আপন তীর্থ</p>
<p>আকাশের বস্ত্রাঞ্চলের সঙ্গে তাহার চূড়ায় কলস মিলাইয়া দেই।</p>
<p>(অনুবাদ: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p></blockquote>
<p>এ যুগেরই অপর এক কবিতায় তাঁর এ মনোভাবের আরও স্পষ্ট হয়ে প্রকাশিত হয়েছে—</p>
<p>ওগো ব্রাহ্মণ!</p>
<p>মন্দিরের দেবতা তোর পুরানো হয়ে গেছে</p>
<p>নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ—</p>
<p>এতো তুই তার কাছেই শিখেছিস</p>
<p>খোদাই শিখিয়েছেন ওয়াইজকে ঝগড়া বিবাদ করতে—</p>
<p>মসজিদ মন্দির কোনটাতেই আমার ভক্তি নেই—</p>
<p>ব্রাহ্মণ মোল্লা দুই-ই ছেড়েছি আমি</p>
<p>তুই ভেবেছিস পাথরের মন্দিরে দেবতা আছে</p>
<p>জন্মভূমির প্রতি ধূলিকণা কিন্তু আমার দেবতা—</p>
<p>নুতন শিবালয় তৈরি করব প্রাণের বশত ভূমিতে</p>
<p>উদার আকাশে মেলে দেবে এ চূড়ার পাখা</p>
<p>সকল তীর্থের সেরা তীর্ঘ হবে এই—</p>
<p>মানুষের মুক্তি আনবে প্রেমের ভিতর দিয়ে—</p>
<p>(নয়া শিবালয়, অনুবাদ- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এক্ষেত্রে স্পষ্টই বুঝতে পারা যায় তথাকথিত হিন্দু বা মুসলিম কোনো সংস্কৃতিতেই তাঁর আস্থা ছিল না। তিনি ছিলেন জীবনের অন্বেষণে ধাবমান। সত্যিকার জীবন কোথায়—কিভাবে তাকে আবার ফিরে পাওয়া যায়—এ-ই ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু। এ যুগের অপর একটি কবিতায় এ ভাবটি সুপরিস্ফুট। &#8216;চাঁদ&#8217; নামক কবিতায় তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়ের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়—</p>
<blockquote><p>কাহারে খুঁজিছ তুমি, কোন সে সুন্দর</p>
<p>ফিরিছ তালাশ করি আমারি মতন?</p>
<p>অনন্ত আলোকে যার মানব-অন্তর</p>
<p>আলোকিত প্রভাসিত প্রদীপ যেমন।&#8217;</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা— বাঙ-ই-দারা; তরজমা- মীজানুর রহমান)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ পর্যায়েই তাঁর মানসে স্বদেশ-প্রেম ছিল অগ্নি-শিখার মত জ্বলন্ত। অতি আধুনিক যুগে স্বদেশ-প্রেমকে অনেক মনীষীই মানব জীবনের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মহা প্রতিবন্ধকরূপে গণ্য করছেন। বার্ট্রান্ড রাসেল স্বদেশ-প্রেমের জন্ম ইতিহাস বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, তার বয়স খুব বেশী নয়। জোয়ান-অব-আর্ক কর্তৃক তা সর্বপ্রথমে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়। নেপোলিয়ন তা জার্মানীতে আমদানী করেন। মেটারনিক তাঁর বীজ ইটালীতে বপন করেন এবং শেক্সপীয়রের মতল এমন মধুর ভাষায় আর কেউই এ বিষ পরিবেশন করেননি। স্বদেশ-প্রেমের প্রথমদিকে থাকে আত্মরক্ষামূলক মনোবৃত্তি এবং পরিশেষে তাতে দেখা দেয় আত্ম-প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শোষণের প্রবৃত্তি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ভৌগলিক পরিবেশ, রক্ত, ভাষা, অর্থনৈতিক সংস্থা প্রভৃতি থেকে মানুষের মনে জাতীয়তাবোধের প্রতিষ্ঠা হয়। এ জাতীয়তার সর্বপ্রধান লক্ষ্য অপর জাতির অধিকার থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা। আবার এভাবে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হলে পরবর্তীকালে তাকে মানুষের শ্রেষ্ঠ সমাজ মনে করে এবং অপরাপর জাতির রক্ত মোক্ষণ করে আনন্দ পাওয়াটা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। এঙ্গেলস সেকসনস, ব্রিটন প্রভতি জাতির সমবায়ে যে বিটিশ জাতি বা ন্যাশন গড়ে ওঠে, তার মূল কারণ ছিলো নরম্যানসদের সাগরের অপরপারের অপরাপর জাতি থেকে নিরাপদ হওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন বোধ। আবার সংঘবদ্ধ হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করার পর এ </strong><strong>ব্রি</strong><strong>টিশ জাতিই এ দুনিয়ার সুদূর প্রান্তে কত শত জাতিকে অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করে শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষণ করে নিঃশেষিত করে ফেলেছে, তার ইয়ত্তা নেই। </strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>ইকবালের জন্ম ইংরেজ শাসনের চূড়ান্ত পর্যায়ে। এদেশবাসীকে ইংরেজরা কি অমানুষিকভাবে শাসন ও শোষণ করতো, তা তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন। কাজেই স্বদেশ-প্রেমের প্রাথমিক পর্যায়ের অনুপ্রেরণা তিনি লাভ করেছিলেন। বর্তমানকালের স্বদেশ-প্রেমের যে বিষময় ফল এ দুনিয়ার সর্বত্র দেখা দিচ্ছে তা&#8217;ও তিনি পরিণত বয়সে উপলব্ধি করেছিলেন এবং সে পর্যায়ে তাঁর কাব্যে যে বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছে, এবং তা বিশ্ব-সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য। আলোচিত পর্যায়ে তাঁর মনে স্বদেশ তথা ভারতীয় প্রেম তাঁকে কীভাবে উজ্জীবিত করছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় তারানা</strong><strong>য়ে </strong><strong> হিন্দ, মেরা ওয়তান ওহি হ্যায়, হিন্দুস্থান হামারা প্রভৃতি কবিতায়। তারানায়ে হিন্দতে তিনি গেয়েছেন—</strong></p>
<p>ধর্ম কখনও শিখায় না শত্রুতা করিতে</p>
<p>হিন্দি আমি, হিন্দুস্তান স্বদেশ আমার—</p>
<p>(তরজমা: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অথবা হিন্দুস্তান হামারাতে গর্ব করেছেন—</p>
<p>সারা জাহাঁসে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তবে স্বদেশ-প্রেম ইকবাল কাব্যের চূড়ান্ত নয়। এ স্তর তিনি অনায়াসে পার হয়েছেন তার অন্তর্নিহিত আশাবাদের উজ্জ্বল আলোকে। যে চিরন্তন সত্যের জন্য তাঁর এ যাত্রা এবং যে সন্ধানের আভাস আমরা পূর্বে পেয়েছি তাতে সফলতার আশাবাদ তিনি সর্বদাই পোষণ করতেন—</p>
<p>কিন্তু তবু, ভ্রাম্যমাণ চিরকাল জীবনের জাহাজ</p>
<p>মানবের দৃষ্টির আড়ালে—</p>
<p>কখনো হারিয়ে যায়, হয়ত বা যেতে পারে তবু</p>
<p>ধ্বংস তার নেই কোনো কালে—</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা—রাভীতীরে; তরজমা— মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পরবর্তীকালে যে অমরতার বাণী তিনি মানবকে শুনিয়েছেন তার সূত্রও এখানে পাওয়া যায়—</p>
<p>জীবন জাহাজ চিরকাল ভ্রাম্যমাণ। সে কখনও বা হারিয়ে যায়, কখনও বা দৃষ্টির বাইরে চলে যায়, তবে তার ধ্বংস নেই কোনোকালে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতার মধ্যে বিশেষভাবে তাঁর তত্ত্বজ্ঞানের প্রবণতার নিদর্শন পাওয়া যায়। অবিনশ্বর জীবনের যে ধারণা পূর্বতন পর্যায়ে পাওয়া যায়, তাই আরও পাকা দানা বেঁধেছে তার মানসে। এ পর্যায়েই বিশেষভাবে স্থিতির নিন্দা ও গতির উচ্চ প্রশংসা তাঁর কাব্যে পরিলক্ষিত হয়–</p>
<p>গতি হইতে জগতের জীবন</p>
<p>ইহাই ইহার প্রাচীন রীতি</p>
<p>এই পথে অবস্থিতি লুক্কায়িত</p>
<p>চলনশীল নিষ্কৃতি পাইয়াছে,</p>
<p>যে একটু থামিয়াছে বিধ্বস্ত হইয়াছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ গতিবাদ বা DYNAMISM জগতের চিন্তাধারার ইতিহাসে নতুন নয়। গ্রীক দর্শনে হিরাক্লাইটাস এ-গতিবাদ প্রথমে প্রচার করেন। তাঁর চিন্তাধারাকে ইলিয়াটিক (ELEATIC) চিন্তাধারার ব্যত্যয় বলা যায়। ইলিয়াটিক চিন্তার মর্ম কথা হচ্ছে, গতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এ দুনিয়ায় অপরিবর্তনশীল সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করা। মননশীলতার দিক থেকে বিচার করলে গতিশীলতাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের ভ্রান্তি বলেই ধরে নিতে হয়। এ চিন্তাধারার প্রতিনিধি পারমিনাইডিসের (Parmenides) প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল—চিন্তা ও স্থিতির ঐক্য। জিনো (Zeno) গতির অবাস্তবতা প্রমাণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কোনো গতিশীল তীরকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যেতে হলে তার মধ্যবর্তী অনন্ত বিন্দুর ভিতর দিয়েই যেতে হবে। অনন্ত বিন্দুর মধ্যে দিয়ে তার পক্ষে যাওয়া সম্ভবপর নয়। হিরাক্লাইটাস এ চিন্তার প্রতিপক্ষীয় মতবাদ প্রচার করেন। পরস্পর বিরোধী বস্তুর দ্বন্দ্বই সকল বস্তুর প্রকৃত সত্তা এবং তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পাচ্ছে অগ্নিতে। তবে এ গতির কোনো লক্ষ্য নেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অতি আধুনিক দর্শনে এ গতিবাদ প্রচার করেছেন ফরাসী দার্শনিক বের্গসোঁ (Bergsou)। ডারউইন বা লেমার্ক বর্ণিত জীব-জগতের বিবর্তনের ব্যাখ্যার সমালোচনা প্রসঙ্গে বের্গসোঁ মন্তব্য করেন, ওঁরা বাইরের দিক থেকে ক্রমবিকাশের ধারাকে বর্ণনা করেছেন। ওঁরা দেখিয়েছেন কিভাবে জীব-জগতে বিবর্তন হচ্ছে—তবে কেন এ বিবর্তন হচ্ছে এ প্রশ্নটা ওঁরা তোলেননি। তাঁর মতে, এ বিবর্তনের কারণ হচ্ছে তার পশ্চাতে রয়েছে এমন একটি শক্তি যা নিত্যনূতন নব নব সৃষ্টি করেই চলে। এ শক্তির ধাতুই হচ্ছে নব নব সৃষ্টিতে পর্যবসিত হওয়া। এজন্যই কালকে বের্গসোঁ বলেছেন বিশ্বসত্তা। কালে যেভাবে কোন স্থিতি নেই—গতিই একমাত্র সত্য—তেমনি এ বিশ্বে স্থিতিশীল বলে কোনো কিছুই নেই। কালের বা বিশ্বসত্তার স্বাভাবিক ধর্ম গতিশীলতা হলেও—তাতে কোন লক্ষ্য নেই। অর্থাৎ কোনো আদর্শের বাস্তবায়নে বা কোনো লক্ষ্যের পানে পৌঁছার জন্য সে গতিরও কেউ নিয়ন্ত্রণ করেনি। গতির ফলেই ক্রমবিকাশের ধারায় নিত্য নতুন নানা মূল্যমানের সৃষ্টি হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ইকবাল গতিবাদকে স্বীকার করে তাকে সংশোধিত আকারে প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতবাদ অনুসারে ক্রমবিকাশের ধারার লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সৃষ্টি এবং তার মাধ্যমে প্রকৃত জীবনের সন্ধান। বিশ্ব প্রকৃতিতে মানুষের উৎপত্তি এক মহান ব্যাপার। মানুষকে হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে আল্লার প্রতিনিধি বা খলিফা। সে খলিফার প্রকৃত কর্তব্য হচ্ছে এ দুনিয়ায় আল্লার রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করা। কাজেই সেই আল্লার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকল্পেই বিবর্তনের ধারা ছুটে চলেছে এবং মানুষের মাধ্যমেই তা এ দুনিয়ার বুকে বাস্তবায়িত হবে। এই ভাবধারাকেই ইকবাল প্রকাশ করেছেন তাঁর অনবদ্য ভাষায়—</p>
<p>ঝরণা চায় নদীতে মিশতে</p>
<p>নদী চায় সমুদ্রে মিশে যেতে</p>
<p>সমুদ্রের ঢেউ কামনা করে চাঁদের জ্যোৎস্নাকে</p>
<p>জীবন রহস্যের সন্ধান নাও খিজিরের কাছে থেকে</p>
<p>দুনিয়ায় কারোর আশাই তো পূর্ণ হলো না।</p>
<p>(কোশেশ-ই-না তামাম; অনুবাদঃ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, যদিও ইসলামী ভাবধারায় খিজির আলায়-হিস-সাল্লাম এখনও জীবিত এবং তাঁর কাছে থেকেই জীবন-রহস্যের সন্ধানের ইকবাল তাগিদ করছেন, তবু শেষ পংক্তিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে কারোর আশাই তো পূর্ণ হলো না। এখানে স্পষ্টই বুঝতে পারা যায় খিজিরের কাছে জীবনরহস্যের সন্ধান পেলেও কারো আশাই পূর্ণ হবে না। সারাটা জীবনব্যাপী তাকে উপলব্ধি করার জন্য অন্বেষণ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তৃতীয় পর্যায়ে কবি-মানস আরও সমৃদ্ধতর হয়ে দেখা দিয়েছে। এ পর্যায়ে তিনি তার বিখ্যাত অভিযোগমূলক কাব্য শেকোয়া ও তার জওয়াব প্রকাশ করে। মানবাত্মা সম্বন্ধে তাঁর ধারণাও আসরারে খুদীর মধ্যে ব্যক্ত রয়েছে। শেকোয়া বা অভিযোগমূলক কাব্যের প্রবর্তন এ-দুনিয়ার ইতিহাসে নতুন নয়। ইকবালের বহু পূর্বে ওমর খৈয়াম তার অপূর্ব বচনভঙ্গিমায় মানুষের পক্ষ থেকে অভিযোগ করেছেন। সাধারণভাবে মানুষকে তাঁর পাপের জন্য দায়ী করা হয়, কিন্তু পাপের সৃষ্টি তো খোদা আল্লাহর দ্বারাই হয়েছে। কাজেই মানুষ সর্বতোভাবে ক্ষমার যোগ্য—</p>
<p>পাপের কালো মূর্তি নিয়ে জীব জগতে ঘুরছ হায়,</p>
<p>মানুষ তোমায় করছে ক্ষমা তুমিও দেব ক্ষমিয় তার।</p>
<p>(রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম, তরজমা: কান্তি চন্দ্র ঘোষ)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ অভিযোগ করেছেন-</p>
<p>এ দুনিয়ার সৃষ্টির উপাদান শুধু মৃত্তিকা। একে নন্দনকানন করে গড়ে তোলেননি ভগবান। সে গড়ার সম্পূর্ণ ভার দেওয়া হয়েছে মানুষকে, অথচ মানুষের হাতে স্বাভাবিক কোনো যন্ত্র নেই যে, তার মাধ্যমে সে এ মাটির পৃথিবীকে সুন্দর ও শোভন করে তুলে। তবু সে ভার মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে—</p>
<p>তুমি তো গড়েছো শুধু এ মাটির ধরণী</p>
<p>তোমার মিলাইয়া আলোকে আঁধার</p>
<p>শুন্য হাতে সেখা মোরে রেখে</p>
<p>হাসিছ আপনি সেই শুন্যের আড়ালে</p>
<p>গুপ্ত থেকে দিয়াছ আমার পরে ভার</p>
<p>তোমার স্বর্গটা রচিবার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ-সব অভিযোগকে সার্বজনীন অভিযোগ বলা হয়। এ দুনিয়ার সকল মানুষের প্রতিনিধি হয়েই ওমর খৈয়াম বা রবীন্দ্রনাথ এ-সব অভিযোগ করেছেন। ইকবাল অভিযোগ করেছেন এ দুনিয়ার এ বিশিষ্ট মতবাদে বিশ্বাসী এক মানব গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। তবে এ ক্ষেত্রে ভাববার বিষয় এই, মুসলিমদেরকে একটি আদর্শবাদে প্রত্যয়শীল দল বলেই তিনি গ্রহণ করেছেন। ইসলামের ঐতিহ্যের আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যায়, আদি যুগ থেকেই মুসলিমেরা এ দুনিয়ায় আল্লার ওহদানীয়ত বা ঐক্য এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিরুদ্ধমতবাদী লোকের সঙ্গে সংগ্রাম করেছে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে ও আল কুরআনে সে সংগ্রামের কাহিনী লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইব্রাহিম খলিল থেকে এ দুনিয়ায় আল্লাহর ওহদানীয়ত ও সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সূচনায় কাফের বাদশা নমরুদের শত্রুতা থেকে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিলো এবং যে সংগ্রাম এখনও চলেছে অত্যাচারী রাজা বাদশাহ বা তথাকথিত জননেতার বিরুদ্ধে, সে সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী একটি বিশিষ্ট মানব গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়েই তিনি এ অভিযোগ করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ মানবগোষ্ঠীর জীবনে কোনো বংশের বা গোত্রের প্রতিষ্ঠা বা স্বার্থ আদায় করার প্রবৃত্তি ছিলো না। এরা ছিলো এক বলিষ্ঠ জীবন-বোধে অনুপ্রাণিত। এ দুনিয়ায় কোনো বক্তির নয়, কোনো জাতির নয়, কোনো অধিপতির নয়— খোদ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠায় এরা ছিল উন্মুখ। ওরা চেয়েছিল আল্লার সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা করে এ দুনিয়ার সম্পদ সমানভাবে ভোগ করার নীতি প্রতিষ্ঠা করতে। এজন্যেই পরবর্তী-কালে ওরা কেবল বিধর্মীর সঙ্গেই যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি, বরং তথাকথিত মুসলিম নামধারী শাসক ও শোসকদের বিরুদ্ধেও সংগ্রামে জান কোরবান করেছে। কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেনের (রাঃ) জেহাদ বা জাহাঙ্গীরের ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিরোধকল্পে মুজাদ্দিদে আলফে সানী শেখ আহমদ সিরহিন্দের বিদ্রোহও সেই মানসিকতার পরিচায়ক। কাজেই এ স্থলে মুসলিম শব্দ ব্যাপক বা সাধারণ অর্থে ইকবাল ব্যবহার করেননি। এক বিশিষ্ট জীবনদর্শনে প্রত্যয়শীল আদর্শবাদী এক মানুষ গোষ্ঠী সম্বন্ধে তিনি এ শব্দ প্রয়োগ করেছেন। তার ব্যাখ্যার কারণ স্বরূপ বলা যায়, যে জাতি সারাজীবন ভরে আল্লার আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে অবিরাম বিরুদ্ধবাদী প্রতিপক্ষীয় শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করেই গেলো, তার পতন বাস্তবিকই ইনসাফের দিক থেকে সহনীয় নয়—</p>
<blockquote><p>কেহ কি তোমার মহিমার লাগি করেছিল তেগ উত্তোলন</p>
<p>বিকল তোমার সৃষ্টি যন্ত্রে বাঁধিল নিয়মে কোন সে জন?</p>
<p>তব নাম লয়ে বুজিয়াছি একা আমি মুসলিম অমিত বল</p>
<p>কখানা ভুলতে মেতেছি সমরে, আলোড়িয়া কভু সিন্ধু জল।</p>
<p>(মোহাম্মদ সুলতান; শোকোয়ার তরজমা থেকে)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>তার প্রতিদানে আল্লাহ মুসলিমদের কি দান করেছেন? আপাতদৃষ্টিতে কিছু নয়। বরং যারা তাঁর নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে না তাদের তরেই বর্ধিত আল্লার যত নিয়ামত কণা—</p>
<blockquote><p>নহে অভিযোগ দিয়াছ বলিয়া ধনাগার করি পূর্ণ তার</p>
<p>তব সনে যার কহিতেও কথা নাহিক চিহ্ন ভদ্রতার</p>
<p>আফসোস হায় হুরীসহ তারা করিছে রম্য হর্ম্যে বাস</p>
<p>মুসলিম তরে রাখিয়াহ বাকী কেবল হুরীর প্রাপ্তি আশ।</p>
<p>(তরজমাঃ মোহাম্মদ সুলতান)</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম জীবনের এতো সব দৈন্যের মধ্যেও কবি তাঁর আশ্যবাদ বর্জন করেননি। জওয়াবে শেকোয়াতে মুসলিম জীবনের এ অধঃপতনের জন্য আল্লাহ খোদ মুসলিমদেরই দায়ী করেছেন এবং কোন পদ্ধতিতে তারা আবার তাদের লুপ্ত গৌরব ফিরে পেতে পারে তার পথও দেখিয়েছেন—</p>
<p>ধর্মযাজক বিশ্বাসহীন ধর্মে নাহিক আস্থা হায়</p>
<p>বিদ্যুৎ সম নাহি সে স্বভাব নাহি উষ্ণতা বক্তৃতায়,</p>
<p>বেঁচে আছে শুধু আজানের প্রথা কোথা সে বেলাল ভক্তিমান</p>
<p>দর্শন আজি পুঁথির বিধান গাজ্জালীর নাই শিক্ষাদান। (পূর্বোক্ত)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তব মুসলিম জীবনে নিরাশাবাদের কোন স্থান নাই—</p>
<p>জ্ঞানের বর্মে শোভিত অঙ্গ প্রেম-তরবারি হস্তে ঝলে</p>
<p>হে মোর বিরাগী তব খেলাফত রহিবে অটুট বিশ্বতলে</p>
<p>বহ্নিতুল্য তকবীর উজলিবে সারা সৃষ্টি খান</p>
<p>তদবীর হতে তকদীর তব হওগো সাচ্চা মুসলমান। (পূর্বোক্ত)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এখানেও লক্ষণীয় বিষয়, এই পরবর্তীকালে তকদীর সম্বন্ধে যে মতবাদ তিনি প্রকাশ করেছেন তার ইঙ্গিত এ কবিতায় রয়েছে। মানুষ নিয়তির হাতের ক্রীড়নক নয়—সে তার ভাগ্য আপনি সৃষ্টি করে। বিকাশের ধারায় তার চেষ্টাই তাকে সফল করে। এ পর্যায়েই কবি-জীবনে খুদি তত্ত্ব পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। খুদি তত্ত্বের একটি বিশিষ্ট পংক্তি এখন পাকিস্তানের সর্বত্রই উচ্চরিত হয়—</p>
<p>“খুদি কো কর বুলন্দ কে হর তকদীর সে পহেলে খুদ খোদা বান্দা সে পুছে কে বাতা তেরি রিজা কিয়া হ্যায়&#8230;”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ কোন জাতীয় খুদি?</p>
<p>সাধারণতঃ ইউরোপী ধারণায় Indivdualism বা ব্যাষ্টিবাদ বলে যে মতবাদ প্রচলিত রয়েছে, এ খুদিকে তারই অপর এক নাম বলে ভুল ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ নামেও এ মতবাদ পরিচিত। ফরাসী দার্শনিক রুশো ও ইংরেজ দার্শনিক জন লক এ-মতবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছেন। এ মতবাদকে সমষ্টিবাদ বা Collectivism-এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বলা যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে, আধুনিক যুগের বিশেষত্ব হচ্ছে নির্বিশেষবাদ (Absolution) ও সংঘবাদের (Collectivism) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাতে। পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রাচীনকালে গ্রীকদের ছোটো ছোটো রাষ্ট্রে সংঘবদ্ধ বলে বিশেষ কিছুই ছিলো না। ব্যাষ্টিকে স্বাধীনভাবে তার মতামত প্রকাশ করার অধিকার দেওয়া হতো। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতনেরও নজির পাওয়া যায়, তবু মোটামুটিভাবে মানুষের চিন্তার ও বাক্যের স্বাধীনতা ছিল বলতেই হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>রেনেসাঁর পর থেকেই ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতি স্বীকৃতি লাভ করে এবং মধ্যযুগীয় ধর্ম রাজ্যের পোপের আধিপত্য বা চার্চের শাসন থেকে মানুষ মুক্তি লাভ করে, আপনাদের স্বাধীন চিন্তাপ্রসূত মতামত প্রকাশ করার বাসনা পোষণ করে। এ মতবাদের পোষকতায় বলা হয় মানুষ তার স্বকীয় ভুয়োদর্শনের ফলে যে-মতবাদ গঠন করতে সমর্থ হয় তাই তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানের উপাদান বাইরের পৃথিবী থেকে আহরিত হয় এবং সে-সব উপকরণের ভিত্তির উপর আমাদের মানস একটা সৌধ গঠন করে। সে সৌধের মধ্যে গুরু বাক্য বা আ</strong><strong>প্ত</strong><strong>বাক্যের (Authority) কোন স্থান নাই। প্রাকৃতিক রাজনীতিকে স্বীকার করতে বাধ্য হলেও মানুষ অপর মানুষের দ্বারা প্রতারিত হতে বা প্রচলিত কোনো নীতি মানতে বাধ্য নয়। সে তার নিজের সুখ- সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখে আপন মতবাদ গঠন করতে পারে। </strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানকে মানব-জ্ঞানের মূল উপকরণ বলে স্বীকার করলে মানুষের পক্ষে আপনার সুখ-শান্তির আকাঙ্খা ছাড়া আর কোনো কিছুই কাম্য হতে পারে না। কাজেই ব্যাষ্টিবাদ তার পরিণতিতে সুখবাদ বা Hedonism-এ পরিণত হয়। জন লক যে ধারণা প্রচার করেছিলেন, তার পরিণতিতেই ইংল্যান্ডে সুখবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং জন স্টুয়ার্ট মিল ও বেনথাম তাকে একটু পরিবর্তিত আকারে প্রচার করে তাঁদের দেশের তথা তৎকালীন সভ্যজগতের প্রশংসা লাভ করেন। প্রাচীন কালে গ্রীকদের মধ্যে যে সুখবাদ প্রচলিত ছিলো, তাতে ব্যাষ্টির পক্ষে সর্বতোভাবে তার নিজের সুখস্বাচ্ছন্দ্যই কামনা করার নীতি গৃহিত হয়েছিলো। মিল ব্যাষ্টির নিজস্ব সুখের স্থলে নীতি হিসাবে প্রচুরতম লোকের প্রভুততম উপকার (Greatest good of the greatest number)-কে মানব জীবনের লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। এতে ন্যায়শাস্ত্রের সুস্পষ্ট নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে। তা দর্শনের ছাত্র মাত্রই অবগত আছেন। প্রত্যেকে তার সুখ চায়, কাজেই সকলেই সকলের সুখ চায়, একটা মস্ত বড় তর্ক শাস্ত্রীয় ফাটলের উপর প্রতিষ্ঠিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জন লকের ধারণা ছিলো মানুষ একক হিসাবেই জন্মগ্রহণ করে। একা তার পক্ষে এ জীবনে টিকে থাকা সম্ভবপর নয়, তাকে বাধ্য হয়ে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজ গঠন করতে হয়। এক্ষেত্রে তার মননশীলতার দ্বারা চালিত হয়েই সে সমাজ গঠনে অগ্রসর হয়। রুশো তার বিখ্যাত বাণীতে বলেছিলেন- Man is born free but everywhere he is in chains. মানুষ স্বাধীন হয়েই জন্মগ্রহণ করে তবে সবখানেই সে বন্দী। তার ধারণা ছিলো লকের ধারণারই অনুরূপ। মানুষ এক জন্মায় এবং ব্যাষ্টি সমাজের আদি সংখ্যা, তবে তার নানাবিধ প্রক্ষোভ (emotion) অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য করে। বাধ্য হয়েই সে তার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতি গঠন করে বটে, তবে যতই সে এসব সংস্থা গঠনে অগ্রসর হয়, ততোই সে তার জন্মগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। জন লক ও রুশোর মতবাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এইখানেই। লক মানুষকে বৃদ্ধি-প্রধান আর রুশো প্রক্ষোভ-প্রাণ বলেছেন। মানুষ স্বভাবতই আত্মকেন্দ্রিক হলে তার পক্ষে নিজের সুখ-সুবিধার আদায় করা বা সে-সবের জন্য প্রাণপণ করেও চেষ্টা করা মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক বৃত্তি ছাড়া কিছুই নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাক্তি স্বাতন্ত্রবাদের অপর এক উদাহরণ পাওয়া যায় জার্মান মনীষী নীটশের চিন্তাধারায়। তার ধারণা ছিলো জ্ঞান অর্জন মানুষের জীবনের লক্ষ্য নয়, উপমা মাত্র। জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ জীবন-আহবে (Struggle for existence) টিকে থাকরে পারে। জ্ঞান মানুষের পক্ষে জীবন-যুদ্ধে টিকে থাকার অস্ত্রবিশেষ। এজগতে কেবল শক্তিশালীই টিকে থাকে। যারা পঙ্গু, যারা বিকলাঙ্গ তারা অচিরেই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। কাজেই, মানুষের শক্তি আহরণ করা উচিত এবং এমন সব গুণের অধিকার হওয়া উচিত যাতে সে মহামানবে পরিণত হতে পারে। শক্তির অধিকারী হতে হলে আমাদের নৈতিক ধারণার পরিবর্তন করতে হবে। ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে খৃষ্টান-জগৎ প্রেম, দয়া, মমতা প্রভৃতিকে শ্রেষ্ঠ গুণাবলী বলে স্বীকার করেছে। প্রকৃতপক্ষে এগুলো দাস জাতির গুণাবলী। বীরের গুণাবলী হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে উর্ধ্বে আরোহণ করার শক্তিমত্তা। সর্বসাধারণ মানুষ অতি মানুষের কাছে যন্ত্র সদৃশ। ক্রমবিকাশের ধারায় অনিবার্যভাবে অতিমানুষের সৃষ্টি হচ্ছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>নীটশের ভাষ্য থকে বুঝা যায়, তিনি হিটলার বা মুসোলিনীর মত নাৎসী ধারাকেই অতিমানব বলে ধারণা করেছিলেন এবং ক্রমবিকাশের গতি যে ঐরূপ মানুষের সৃষ্টিতে তা তিনি তাঁর দিব্যচক্ষুতে দেখেছিলেন। ইকবাল খুদির বিকাশ বলতে লকের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদকে বা রুশোর ব্যাষ্টিবাদকে ধারণা করেননি। নীটশের মত অতি পাষণ্ড অতি মানুষ তৈরির কোন পরিকল্পনাও করেননি। তাঁর খুদির অর্থ ছিল মানব-জীবনে আল্লাহর যে-সব গুণাবলী রয়েছে সে-সব রহমানী গুণাবলীর বিকাশ শয়তানী গুণাবলীর বিকাশ নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ সম্বন্ধে তাঁর চিন্তার অনুসরণ করতে হলে তাঁর পূর্ববর্তী চিন্তানায়ক অপর মহাকবি জালালউদ্দিনের অহমবাদের আলোচনা করতে হয়। জালালউদ্দিনের চিন্তাকে গ্রীক বা ভারতীয় চিন্তার তীব্র প্রতিবাদ বলা হয়। থেলিস (Thales) থেকে গ্রিক চিন্তাধারার সূচনা হয় এবং তার পূর্ণ পরিণাম প্লেটোর দর্শন। এরিস্টটল প্লেটোর নানাবিধ ভাবধারার সামঞ্জস্য বিধান করেছেন। এ চিন্তায় নির্বিশেষই চূড়ান্ত স্থান লাভ করেছে প্লেটোর কাছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এরিস্টটল নির্বিশেষকে বিশেষের মধ্যে রূপায়িত করার চেষ্টা করেছেন, তবু মর্যাদার দিক থেকে নির্বিশেষই উচ্চ স্থানের অধিকারী বলে পরিগণিত হয়েছে। প্লেটো মানবাত্মার অমরত্ব স্বীকার করেছেন এবং নির্বিশেষের সঙ্গে তার যোগসূত্রের জন্য এ জীবনে কীভাবে মানবাত্মা অধীর আগ্রহ প্রকাশ করে তাও চমৎকার ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে গরজটা মানবাত্মার দিক থেকেই প্রকাশ পায়, নির্বিশেষ এসে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানবাত্মার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয় না। ভারতীয় দর্শনেও তেমনি দেখা যায়, শংকরাচার্য-কৃত বেদান্ত ভাষ্যে ব্রহ্মকেই চরম স্থিতি বলে গণ্য করা হয়েছে। জ্ঞানের মাধ্যমে মানবাত্মা সে ব্রহ্মেই আপনার চরম স্থিতি খুঁজে পায় এবং এতে তার মোক্ষ লাভ হয়। কাজেই গ্রীক দর্শনের মত ভারতীয় দর্শনেও ঐক্য চেতনা মানব-আত্মা থেকেই আসে এবং ব্রহ্ম-জীবনে স্থান লাভ মানব-জীবনের চরম ও পরম কার্য। এ সব চিন্তার প্রতিবাদ হিসাবে রুমী ঘোষণা করেন মানবাত্মা এক ও অবিভাজ্য। এ সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর মানব জীবনেরই বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকাশ। তার এ অহমবোধকে তাই দার্শনিক জগতের এক অভিনব অবদান বলা যায়। কি উদাত্ত স্বরে রুমী তা এ আত্মচেতনা প্রকাশ করেছেন—</p>
<blockquote><p>মৃত্তিকার অন্ধকার তলে</p>
<p>আমার সত্তা ছিল মিশে</p>
<p>প্রস্তর আর লৌহ পিণ্ড সাথে</p>
<p>স্তব্ধবাক বর্ণ, গন্ধ হীন,</p>
<p>তার পর একদা প্রভাতে</p>
<p>প্রাণের স্পন্দন এলো</p>
<p>মাটির আধারে</p>
<p>আমার সত্তা পেল রূপ রস প্রাণ</p>
<p>বিচিত্র রঙের ফুলে হেসে উঠিলাম</p>
<p>প্রাণ পেল গতি আর</p>
<p>মাটির বাঁধন গেল টুটে</p>
<p>শুরু হল ভ্রাম্যমান জীবনের</p>
<p>পথ পরিক্রমা</p>
<p>সন্তরণ, উড্ডয়ন</p>
<p>হামাগুড়ি আর পায়ে চলা</p>
<p>শেষ হলো</p>
<p>শুরু হলো আরেক জীবন</p>
<p>আমার সত্তা পেল নবতর রূপ</p>
<p>দৃষ্টি পেল—যে দৃষ্টিতে এসে</p>
<p>বিশ্বের রহস্য দিল ধরা;</p>
<p>এই দৃষ্টি মানুষের</p>
<p>&#8230;..এই দূর আকাশের পারে মৃত্যুহীন</p>
<p>ফেরেশতার লোকে আরো দূরে রাত্রিদিন</p>
<p>জন্ম আর মরণের বাহিরে</p>
<p>দৃশ্য অদৃশ্য আর সকল অস্তিত্ব যেখানে</p>
<p>একাকার লীন হয়ে গেছে</p>
<p>আমার গন্তব্য সেই মৃত্যুহীন অমৃতের পানে।</p></blockquote>
<p>এই দর্শনের ভিত্তিতেই ইকবাল তার খুদি-তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। যে সত্তার সর্ব প্রথম প্রকাশ মৃত্তিকার অন্ধকার তলে এবং বিবর্তনের ধারায় যে সত্তার কাছে বিশ্বের রহস্য ধরা দিয়েছে- সে সত্তার অধিকারেই সব। রুমীর অনুসরণ করে ইকবাল সে সত্তাকে মানব জীবন থেকে পৃথক কোনো সত্তা বলে স্বীকার করেননি। সেই সত্তাকে উপলব্ধি করার জন্য সাধনা করবার জন্যও তিনি কাউকে উপদেশ দেননি। তার বিকাশের জন্য ইসলামের বিধানকেই তিনি চরম পন্থা বলে জ্ঞান করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ চিন্তাকে অহমবাদী চিন্তা বললেও একে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মূলক চিন্তাধারা বা অতিমানব সম্বন্ধীয় চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ পৃথকরূপে পরিচয় করা যায়। কারণ এখানে ব্যাক্তি তার স্বীয় বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করতে বা তার আনুষঙ্গিক সুখ-সুবিধা ভোগ করতে লালায়িত নয়, তেমনই অতিমানব রূপে বিকশিত হয়ে সে অপরাপর মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায় না। এ অহমবাদের মর্ম কথা হচ্ছে আত্মপরিচয় লাভ এবং তারই মাধ্যমে এ বিশ্ব-চৈতন্যে আপনার প্রকৃত স্বরূপের উপলব্ধি। এ অহমবাদের পরিচয় পাওয়া যায় আসরারই খুদির ছত্রে ছত্রে। এ ধারণা ছিল এ পাক-ভারত মানুষকে নির্জীব-করণে ক্রিয়াশীল, মানুষের জানকে যেখানে মনে করা হতো মায়াময় মরীচিকা ভ্রম বৈ আর কিছুই নয়, ব্রহ্মজ্ঞান লাভে যে জানের ভ্রান্তি সহজেই ধরা পড়ে, জীবাত্মাকে অসহায় ও ভাগ্যের ক্রীড়নক হিসাবে যেখানে করা হয়েছে অথর্ব ও পঙ্গু; ইকবাল তারই প্রতিবাদ করে জ্বালাময়ী ভাষায় ঘোষণা করেছেন-</p>
<blockquote><p>পানি আর কাদা বলে</p>
<p>নিজেকে ভাবছো কেন</p>
<p>কেন ছোট করে ফেল মন?</p>
<p>এই হীনমন্যতায় কতকাল কাটাবে জীবন;</p>
<p>তোমার কর্দম হতে সৃষ্টি কর জ্বালাময় নতুন সিনাই।</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা- আসরার-ই-খুদী); তরজমা, আ.ক.শ. নূর মোহাম্মদ)</p></blockquote>
<p>সক্রিয়, জীবন্ত, চঞ্চল ও গতিশীল আভার উদ্বোধনের জন্য তিনি আবেগময়ী ভাষায় &#8216;রমুজে বেখুদী&#8217;তেও মানব সমাজকে আহ্বান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর চোখে আমাদের সমাজের সুফীদের ধারণা অত্যন্ত গর্হিত বলে প্রতিভাত হয়েছিলো। তারা মানবাত্মার অসহায় অবস্থা ও তার পরিণতি সাহিত্যে ও কাব্যে প্রচার করেছিলেন। তাতে রুজ-ই-আলন্তে মানুষের ভাগ্যলিপির নির্ণয় ও তার ফলে পুতুলের মতো জীবন-নদের স্রোতে তাদের ভাসমান অবস্থার জন্য বিলাপ করেছিলেন। মহাকবি হাফিজ তাঁর অনবদ্য ভাষায় মানুষের এ করুণ চিত্র এঁকেছিলেন। ইকবাল তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ঘোষণা করে বলেছিলেন ফার্সি ভাষায়-</p>
<p>মানবগণ যাহারা আফিমের নেশায়</p>
<p>বিভোর হয়ে এ জগৎকে নীচ বলে ঘৃণা করছ</p>
<p>উঠো জাগো, চোখ খোলো, এ জগতের দুঃখ দর্দশার</p>
<p>নিন্দা করো না-</p>
<p>এ দুঃখ-দর্দশা মুসলিমদের সমাজ জীবনকে</p>
<p>গঠন করার জন্য ও</p>
<p>তাদের অন্তর্নিহিত শক্তির</p>
<p>স্ফুরণের জন্য নির্দিষ্ট হয়েছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>রমুজ-ই-বেখুদীর অন্যত্রও তিনি বলেছেন-</p>
<p>বিচিত্র ছন্দে ও তালে সঙ্গীত তাহার</p>
<p>মৃত পৃথিবীতে করে প্রাণের সঞ্চার</p>
<p>তাহার নিকট থেকে আলোর আস্বাদ</p>
<p>পৃথিবী ভ্রমণ করে নূতনের সাধ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এই তো সে আদর্শ, যার প্রতীক্ষায় আকাশ বাতাস জল স্থল অন্তরীক্ষ সবই অপেক্ষা করছে। সবল সরল মেরুদণ্ডের অধিকারী উন্নত শীর্ষ মহামানবের অপেক্ষায় সতত সৃষ্টিশীল কর্মচঞ্চল বিশ্বসত্তা আজও অপেক্ষা করছে। তার এ উন্নত অবস্থার পটভূমিতে রয়েছে তাওহীদে তার শিক্ষা। তাওহীদের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই সে উন্নত শীর্ষ মহামানব এ জগতের বুকে করে আদর্শ পূণ্য ভূমির প্রতিষ্ঠা-</p>
<blockquote><p>তওহীদের মূল-সূত্র তাহার শিক্ষায়</p>
<p>তাহার নিয়ম পূর্ণ শৃঙ্খলা প্রথায়-</p>
<p>অমিতাচারী উচ্ছৃঙ্খল মানুষ সে নয়-</p>
<p>তার প্রত্যেক কথায় ও কাজে রয়েছে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা।</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>পরবর্তী বা শেষ স্তরে ইকবাল-মানস তত্ত্বজ্ঞানের দিকে বিশেষ করে ঝুঁকে পড়ে। &#8216;পয়ামে মশরিক&#8217; বা প্রাচ্যের বাণী ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয়। তথসীয়ে ফিত্রৎ বা সৃষ্টির অধিকার নামক খণ্ডকাব্য এর অন্তর্ভুক্ত। এ কাব্য জার্মান দেশীয় দার্শনিক কবি গ্যেটের DEST WESTERLICHE DIWAN-এর উত্তরে রচিত।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কড়া যাহার খাদ্য যোগায় ভাই,</p>
<p>জানি একদিন উঠবে আকাশ-পথে</p>
<p>হয়া-আবর্ষ ছেড়ে পাবে রোশনাই।</p>
<p>কেন জিজ্ঞাসা করছো আমার কথা?</p>
<p>মানুষের কথা ভাবো, আর দেখো চেয়ে।</p>
<p>এ হৃদয় আরো উন্নীত,</p>
<p>হলে পর হবে যে মহান স্বর্ণ-ধারায় নেয়ে।</p>
<p>সময় মতন মামুলি চিন্তাধারা</p>
<p>যদি বিকাশের মহান সুযোগ পায়</p>
<p>তবে তার স্থান আনন্দ উচ্ছাসে হবে</p>
<p>নিশ্চয় খোদার মনের ছায়।</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমা: আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষের সকল আশা ও আকাঙ্খা, প্রেম-ভালবাসা সব কিছুরই মূল্য রয়েছে বিশ্বে। এর কণামাত্রও নিরর্থক নয়, বিকশিত হলে এ সবের প্রত্যেকটিরই রয়েছে স্বতন্ত্র ভাব। মানবতার বিকাশের পথে কিন্তু চাই সত্যিকার ঈমান। মাটির খুলির গড়া ও কায়াকে স্বর্গীয়ভাবে দীপ্তিমান করে তুলতে হলে তাকে ঈমানের রশ্মিতেই উজ্জ্বল করতে হবে-</p>
<p>জীবন্ত এই আত্মাখানির</p>
<p>ঈমানটুকু বাজে স্বপ্ন নয়-</p>
<p>ছড়ানো এ ধুলো দিয়েই</p>
<p>নকসা গড়া অধিক শক্তিময়-</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমা: আবদূর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ঈমানের রোশনীতে উদ্দীপিত আত্মার পক্ষে তাই এগিয়ে চলাই হচ্ছে সারতত্ত্ব। ধূলিময় এ পৃথিবীতে অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা তার পক্ষে উচিত নয়। মানুষকে কান পেতে শুনতে হবে পৃথিবীর অদম্য চলার গান। মানুষকে ভাবতে হবে অতীতের কথা— শুধুমাত্র নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগসূত্র রাখার জন্য। তাকে প্রস্তুত হতে হবে ভবিষ্যতের জন্য, আগ্রহভরে অপেক্ষা করতে হবে অনাগত দিনগুলোর জন্য, তাই তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলছেন-</p>
<p>পৃথিবীর জনপদে আমিও তো</p>
<p>ধুলির মতন কাহার কোমল গান</p>
<p>তারপর শুনেছি এ বুকে:</p>
<p>সময় নদীর উৎস খুঁজে পাবে আমার ঝর্ণায়</p>
<p>অতীত কেবল মোর শৌর্যবীর্য হারানো দিনের</p>
<p>এখন আগ্রহভরে ভবিষ্যতের প্রতীক্ষা আমার।</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমাঃ আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষের ধুলি তার কর্ম-জীবনের দ্বারাই উজ্জ্বল হয়ে লোক থেকে লোকান্তরে নিম্নতর পর্যায় থেকে অধিষ্ঠিত হয়, যাতে ফেরেশতারাও ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে—</p>
<p>সবচেয়ে উঁচু মণ্ডল পরে</p>
<p>এমনি গতি যে মোর ফেরেশতাগণ</p>
<p>তা দেখে আমায় ধরিতে লাগায় সোর</p>
<p>মানুষের ধুলি নিত্য নূতন কর্মে উজ্জ্বল হয়</p>
<p>পুরানো দিনের মত চাঁদ তার, এখনো আলোকময়</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমাঃ আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানুষ তার তেজদীপ্ত বাহুকে বাজুবন্ধ পরে শক্তিহীন করেছে, তাই তাকে আবার প্রাণময় করার জন্য খুদির প্রদীপ জেলে আপনার প্রকৃত সত্তার পরিচয় লাভ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে খুদির বিকাশের পথে তাকে রসুল নির্দেশিত পথেই হতে হবে অগ্রসর-</p>
<p>বাজুবন্ধের আড়ালে যেহেতু মানুষ লুকালো</p>
<p>আনি মুসার হাতকে, তাই জ্বালি মোর প্রদীপখানি</p>
<p>এসো গো নামাজে, শাহজাদা দ্বারা দিও না ধর্না</p>
<p>আর তাই ছিল মোর পূর্ব পুরুষ পুরাকালে এ-ধারার</p>
<p>(ইকবাল চয়নিকা, তরজমাঃ আবদুর-রশীদ খান)</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<h1 style="text-align: center;">(৩)</h1>
<p>প্রকৃতপক্ষে ইকবালের কায়া সত্তাকে আর তুলনা করা যায় না। নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টি বা সৌন্দর্য পুজার সাধনা তিনি করেননি। শিল্পের জন্যই শিল্পের সৃষ্টি (Art for at sake) করার চেষ্টা তিনি কোনোকালেই করেননি। অস্কার ওয়াইলডের এবং বিশ্ব ভাবধারা দ্বারা তিনি কোনোকালেই প্রভাবান্বিত At in Calydon-এ নিসর্গ পূজার যে অতি স্পন্দনয়ায় নিদর্শন পাওয়া যায়, তার কোনো প্রভাবই ইকবালের কাব্যে পড়েনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>বাঙলা কাব্যে রবীন্দ্রনাথ বা বিশেষ করে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নানাবিধ কবিতায় নিসর্গবাদের যে চমৎকার নিদর্শনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎলাভ হয়, ইকবালের কাব্যে তার কোন উদাহরণই নেই। তার ভাষা ও ছন্দের একত্র সমাবেশে বাঙলা কাব্যে উর্বশী যে অপূর্ব স্থানের অধিকারী, সেরূপ প্রতিমধুর বা মায়াময় রূপ সৃষ্টিধর্মী কবিতাও ইকবাল সাহিত্যে বিরল। মহাকাব্যের বিরাট পটভূমিতে যেভাবে নানা মানুষ ও নানা চরিত্রের সমাবেশ রয়েছে ইকবাল কাব্যে, তার কোনো আভাষই নেই; খণ্ড কবিতার স্বল্পপরিসর আলোর মাঝে জীবনের কোনোমবিশিষ্ট দিক বা ভাবও তাতে মূর্ত হয়ে উঠেনি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কাব্যের গোড়াতেই রয়েছে এক তীব্র প্রতিবাদ। সে প্রতিবাদ সবপ্রথমে দেখা দিয়েছে প্রচলিত সংস্কারের বিরদ্ধেএবং ক্রমবিকাশের ধারায় তা পূর্ণ পরিণতি লাভ করেছে মানব-জীবন সম্বন্ধে দীর্ঘকাল শোষিত নিরাশাবাদের বিরুদ্ধে। এ প্রতিবাদ বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করেছেন তাঁর নিজস্ব অভিমত প্রচার করার উদ্দেশ্যে এবং তাতে তিনি সফল হয়েছেন অপ্রত্যাশিতভাবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>যদিও নজরুল ইসলামের মত তিনি মানবিকত্বকে সার্বিক ও পরম শান্তিময় রূপদানে কুন্ঠিত ছিলেন; জগদীশ্বর, ঈদ, পুরষোত্তর সত্য বলে তিনি দাবি করেননি, তবু তাঁর সীমিত ভাষায় মানব-জীবনের পূর্ণ পরিণতির যে আশ্বাস দিয়েছেন, বিশ্ব-সাহিত্যে তা অনবদ্য। তার দার্শনিক মতবাদের বৈশিষ্ট্য হিসাবে বলা যায় ব্রহ্ম-কেন্দ্রিক বা পরমাত্মা কেন্দ্রিক; মানব-সৃষ্টির স্থলে তিনি মানব-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠায় ছিলেন দৃঢ়-সংকল্প।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এজন্যই এই মাটির মানুষকে তিনি জ্যোতির্ময় ফেরেশতাদের উপরেও স্থান দিতে একটু ইতঃস্তত করেননি। এ ক্ষেত্রে তাঁর এ বৈপ্লবিক পদক্ষেপ রবীন্দ্রনাথের পদক্ষেপের পরিপূরক বলা যায়। ব্রহ্মবাদের অতল তলায় তলিয়ে যাওয়া মাটির পৃথিবীতেই রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন ব্রহ্মাস্থান—&#8217;এ মাটির বেড়ার প্রান্ত হতে অমূর্তের পেয়েছি সন্ধান&#8217;—খেয়ালী কবির কল্পনা-বিলাস নয়। এ বক্তব্য মহাধ্যানীর জীবন-সাধনার সিদ্ধিজাত ফল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মাটির পৃথিবীতে স্বর্গের সব উপাদান বিরাজমান বলে ধারণা করা রবীন্দ্র-দর্শনের পরিণত ফল। সেই মাটির মানুষের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার বিভিন্ন রূপ তিনি সাধ্যমত তুলিকা-স্পর্শে অমর করে তুলেছেন। শ্রেণী-সংগ্রামের পর্যুদস্ত অসহায় নির্বিত্তের করুণ চিত্রও তিনি দূর থেকে দেখেছেন। আফসোসও করেছেন। তবে মানুষকে এ-সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে কোনো অনুপ্রেরণা দান করেননি। ইকবাল এক্ষেত্রে আরও অগ্রসর হয়েছেন এবং মাটির ধারার অধিবাসী আপাতঃদৃষ্টিতে নানাবিধ দুর্যোগে সম্পূর্ণ অসহায় পঙ্গু ও অশক্ত মানব নামধারী একদল জীবকে তাদের &#8216;খুদী&#8217; তার প্রকৃত সত্তার পরিচয় লাভ করার জন্য উদাত্ত স্বরে আহ্বান জানিয়েছেন। এখানেই তাঁর কাব্যের বিশেষত্ব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>শুধু মাত্র আনন্দ পরিবেশনই তাঁর কাব্যের লক্ষ্য নয়, মানুষকে এক বিশিষ্ট জীবনাদর্শে উদ্বোধিত করে তোলা এবং তার মধ্যে আত্মপ্রত্যয়ের প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল আদর্শ। তাকে মহাকবি এজন্যই বলা যায়। নতুনভাবে জগৎ ও জীবনকে দেখার প্রেরণা ও পদ্ধতি উভয়ই তার কাব্যে পাওয়া যায়। মুসলিম জীবনের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগের জন্য নিকলসন (Nickolson) প্রমুখ সমঝদারেরা তাঁকে মুসলিমদের কবি বলে একটি বিশিষ্ট জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ওঁরা ভুলে গেছেন ইসলাম ও মুসলিম জাতি এক নয়।<strong> ইকবাল বার বার বলেছেন এ দুনিয়ার নানাবিধ সংকটের সময় মুসলিমরা ইসলামকে রক্ষা করেনি বরং ঠিক উল্টোভাবে ইসলামই মুসলিমদের রক্ষা করেছে। ইকবাল ইসলামকে শুধুমাত্র প্রত্যয় হিসাবে গ্রহণ করেননি বরং এক অভিনব পূর্ণাঙ্গ জীবন-দর্শন ও জীবন-পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। সে পূর্ণাঙ্গ জীবন-দর্শনের অনুশীলনের ফলে মানুষ &#8216;ইনসানে কামিল&#8217; বা পূর্ণ বিকশিত মানুষে পরিণত হতে পারে। সে জীবন-দর্শনে প্রত্যয়শীল মানুষ গোষ্ঠীকেই তিনি সত্যিকার মুসলিম বলে ধরে নিয়েছিলেন এবং শেকোয়াতে সেই আদর্শবাদী মানুষ গোষ্ঠীর তরফ থেকেই তিনি আল্লার দরবারে অভিযোগ পেশ করেছেন। বর্তমানকালের নাম-সর্বস্ব মুসলিমদের জন্য তিনি আল্লার কাছে আহাজারি করেননি।</strong></p>
<p><strong> </strong></p>
<p><em><strong>-ঋণ স্বীকার: মাহে নও, এপ্রিল ১৯৬৯।</strong></em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/famous-poet-iqbal/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14149</post-id>	</item>
		<item>
		<title>মহানবী (সা)-এর মানবতাবাদ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/humanism-of-the-holy-prophet-pbuh/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/humanism-of-the-holy-prophet-pbuh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 06 May 2024 14:23:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14133</guid>

					<description><![CDATA[মানবতাবাদ সম্বন্ধে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভিন্নমুখী ধারণা প্রচলিত রয়েছে। পাশ্চাত্যে মানবতাবাদের সহজ ও সরল অর্থ হলো, এ দুনিয়ায় মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার মৌলিক ভিত্তি হলো মানবতাবাদ। অপরদিকে প্রাচ্যে মানবতাবাদের অর্থ হলো, মানুষে মানুষে মৈত্রী ও সমবেদনার প্রকৃত কারণ প্রদর্শনই মানবতাবাদ।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানবতাবাদ সম্বন্ধে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভিন্নমুখী ধারণা প্রচলিত রয়েছে। পাশ্চাত্যে মানবতাবাদের সহজ ও সরল অর্থ হলো, এ দুনিয়ায় মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার মৌলিক ভিত্তি হলো মানবতাবাদ। অপরদিকে প্রাচ্যে মানবতাবাদের অর্থ হলো, মানুষে মানুষে মৈত্রী ও সমবেদনার প্রকৃত কারণ প্রদর্শনই মানবতাবাদ।</p>
<p>প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে মানবতাবাদের বিবর্তন সম্বন্ধে সুবিখ্যাত ফরাসী মনীষী অধ্যাপক সিলভালেতীর বেশ কয়েকটি মতবাদ রয়েছে। তিনি ১৯২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সারগর্ভ বক্তৃতা করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে Humanism in the East and West নাম দিয়ে প্রকাশ করেছেন। আচার্য লেতী তাতে উভয় মানবতাবাদের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে কীভাবে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে এ মানবতাবাদ বিকাশ লাভ করেছে তার ধারা তিনি বর্ণনা করেননি।  ঐতিহাসিক দিক থেকে আলোচনা করলে দেখা যায় যে, কোনো মানবতাবাদের পটভূমিতে রয়েছে দীর্ঘকালের বিবর্তনের ধারা আর এ ধারাকে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি না করলে সে মতবাদকে সম্যকভাবে বুঝা যায় না।</p>
<p>পাশ্চাত্যের মানবতাবাদের উৎপত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করলে দেখা যায়, সুদূর অতীতে মনীষার ক্ষেত্রে মানব-মনের যে প্রকাশ, তাতে মানব-জীবনই জ্ঞানের প্রধান লক্ষ্যবিষয় ছিলো না। গ্রীক চিন্তাধারা এ বিশ্বের আদি-সত্তার রূপ নিয়েই গবেষণায় ব্যাপৃত ছিলো। সোফিস্টগণই সর্বপ্রথমে মানব-কেন্দ্রিক আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ে তার মোড় ঘুরিয়ে দেন। পরবর্তীকালে সক্রেটিস সত্যিকার নীতির অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়ে এ ধারাই অনুসন্ধান করেছেন বটে, তবে তার সুযোগ্য শিষ্য প্লেটোর নিকট আবার বিশ্ব-সত্তাই সর্বপ্রধান জ্ঞান-কেন্দ্ররূপে দেখা দিয়েছে। মানবাত্মার স্বরূপ ও তার অমরত্ব প্লেটো বা এরিস্টটল স্বীকার করলেও মানব-জীবনকে তারা উভয়েই এ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় বলে স্বীকার করেননি। গ্রীকদের চিন্তাধারার পতনযুগে এপিকিউরিয়ান, স্টোয়িক বা সন্দেহবাদিগণ যেসব মতবাদের অবতারণা করেছেন তাতে মানব জীবনের মূল সত্যই ছিল জ্ঞানের সর্বপ্রধান বিষয়বস্তু। তবে তাদের চিন্তায় মৌলিক কোনো কিছু না থাকায় এবং সেসব চিন্তায় ব্যাপকতাও না থাকায়, সেগুলো এ বিশ্বে কোন আলোড়নের সৃষ্টি করেনি। সীমিত পরিধিতে সেগুলো বিশিষ্ট অনুসারীদের মধ্যেই ছিলো সীমাবদ্ধ।</p>
<p>আদি যুগের অন্তে এবং মধ্যযুগের সূচনার পূর্বে গ্রীকদের চিন্তাধারায় সংস্পর্শে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টধর্ম আসার পর যে অভিনব মিশ্র মতবাদের উৎপত্তি হয়, তাতে ভগবানের সঙ্গে এ পৃথিবীর সম্বন্ধ, এ পৃথিবীর উৎপত্তি, মানবজীবনের গতি ও লক্ষ্য সম্বন্ধে আলোচনা হলেও এ বিশ্বে মানুষের স্থান নির্ণয়ের কোন প্রয়াস দেখা যায়নি। ইয়াহুদী পণ্ডিতদের মধ্যে এবিস্টবুলাস গ্রীকদর্শনকে তাদের ধর্মগ্রন্থেরই এক নতুন সংস্করণ বলে মন্তব্য করেছেন। প্লেটো, হোমার প্রমুখ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষীর ধ্যান-ধারণাকে তাদের শাস্ত্র থেকে ধার করা বিষয় বলে পরিহাস করেছেন। প্লোটিনাসের নব্য-প্লেটোবাদে যদিও আদর্শ হিসাবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভকে গ্রহণ করা হয়েছে তবু এ বিশ্বে মানব-জীবনের স্থান নির্ণয়ের জন্য কোনো সাধনা করা হয়নি। মানব-জীবনের খ্রিস্টধর্ম সর্বপ্রথম গ্রীকদর্শনের সংস্পর্শে আসার পর থেকেই মানবজীবনের বিশ্বের একটি বিশিষ্ট মর্যাদা লাভ করে। পেটরিসটিক যুগে যীশুখ্রিস্টের ব্যক্তিত্বকে সর্বোচ্চ মান দেওয়ায় এবং ত্রিত্ববাদের বা Trinity-এর উৎপত্তি হওয়ায় যীশুখ্রিস্টের সঙ্গে সঙ্গে মানুষও এ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করে।</p>
<p>এপোলোজিস্টদের চিন্তাধারার মধ্যে খ্রিস্টধর্মের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ প্রভৃতি নিয়ে আলোচনায় অথবা গড় থেকে লগোজে (Logos) পৃথিবীর উৎপত্তির বিবরণ পাওয়া যায়। পেটরিসটিক চিন্তাধারার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি সেন্ট অগাস্টিনের মনীষায় ইতিহাস-দর্শনের আলোচনা একটি বিশেষ মর্যাদালাভের যোগ্য। এ&#8217;দর্শনে তিনি ইতিহাসের গতির নির্দেশ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে,  ভগবান মানুষের ইতিহাসকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছেন, কতকগুলো লোক মুক্তিলাভ করে এবং কতকগুলো লোক লয়প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীকালে অর্থাৎ স্কলাস্টিক যুগে মানবমানসের চিন্তাধারা চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বিবর্তিত হয়েছে। প্রত্যয় ও যুক্তির সম্বন্ধ, ইচ্ছা ও বুদ্ধির সম্বন্ধ, প্রকৃতি ও ভগবানের অনুগ্রহের সম্বন্ধ এবং নির্বিশেষগুলোর সত্যিকার রূপ—এ&#8217;চার নিয়েই সে-যুগের চিন্তাধারা ছিলো পর্যবসিত। মধ্যযুগে পোপের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এবং মানব-মানসকে কেবলমাত্র খ্রিস্টধর্মের শাসন ও অনুশাসনের গণ্ডির মধ্যে চিন্তার স্বাধীনতা দেওয়ায় মনীষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে এবং মানব-জীবন কারণের অনুসন্ধিৎসা রুদ্ধ হয়ে পড়ে।</p>
<p>পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালীতে রেনেসাঁ আন্দোলনের পূর্ব-পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপে মধ্যযুগীয় পণ্ডিতীবিদ্যা অনুশীলনেই ছিল মগ্ন। পূর্বেই বলা হয়েছে, এ রেনেসাঁ আন্দোলনের কালেই এ-দুনিয়ায় ব্যষ্টি-মানসের চিন্তার স্বাধীনতার নীতির স্বীকৃতি লাভ করে।</p>
<p>প্রাচ্যের মানবতাবাদ সম্বন্ধে পূর্বেই বলা হয়েছে, সে মানবতাবাদের লড়াই ছিল মানুষের মধ্যে প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য। ভারতীয় সাহিত্যে এ মানবতাবাদের যে ধারণা পরিবেশন করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, এ বিশ্বের মূলে বিরাজমান রয়েছল সর্বমূলাধার একটি সত্তা, সে সত্তা থেকেই এ বিশ্বের উৎপত্তি। এ বিশ্বের উৎপত্তির মূলে রয়েছে মায়া, যার অবস্থান সদৃশ ও অদৃশ্যের মাঝে। কেননা, এক হিসাবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই, আবার মূলসত্তা না হলেও তার একটি স্থিতি রয়েছে। তবে ব্রহ্ম ও জীবের সম্বন্ধ নির্ণয় প্রসঙ্গে উপনিষদের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার শংকরাচার্য মন্তব্য করেছেন-</p>
<p>ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা</p>
<p>জীবে ব্রহ্ম পরাপর</p>
<p>জীব মাত্রেই ব্রহ্মের অংশ হলে মানুষে মানুষে তো বটেই মানুষ ও ইতর প্রাণীর মধ্যে, এমনকি মানুষ ও বৃক্ষাদির মধ্যেও মৈত্রীর সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বাঞ্ছনীয়। অতি আধুনিককালে বেদান্তের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, মানুষে মানুষে কেন প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপিত হবে? তার উত্তর পাওয়া যায় সকল ধর্মেই, কেননা সকল মানুষের একই সৃষ্টিকর্তা। তবে মানুষ কেন ইতর জীবকে ভালবাসবে? তার উত্তর কেবল বৈদান্তিক ধর্মেই রয়েছে। কারণ উপনিষদে বলা হয়েছে, নির্গুণ ব্রহ্ম থেকেই এ জগতের সকল কিছুর উৎপত্তি কাজেই যেহেতু, একই ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ নিয়ে এ জগতের বিভিন্ন প্রাণি দেখা দিয়েছে এবং তাদের গোড়ায় রয়েছে একই ব্রহ্মের স্থিতি, এজন্যই তারা পরস্পরের সঙ্গে প্রেমের সম্বন্ধ আবদ্ধ হতে বাধ্য।</p>
<p>ভারতীয় সাহিত্যে মানুষের সঙ্গে ইতর জীবের মধুর সম্পর্কের এবং ইতর জীব কর্তৃক উচ্চতর নৈতিক আইনের সমর্থনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় রামায়ণ ও মহাভারতে, কাহিনী আকারে তা বর্ণিত হয়েছে এভাবে যে, পিতসত্য পালন করার জন্য রাজা রামচন্দ্র চতুর্দশ বৎসর বনবাস-ক্লেশ সহ্য করেন। ছদ্মবেশী রাবন সীতাকে হরণ করে পুষ্পক রথে রাজধানী লংকাতে গমন করাকালে শরূণরূপী জটাযুতার সঙ্গে যুদ্ধ করে সীতাকে মুক্ত করার চেষ্টা করে নিহত হয়েছে। বানর সেনার অধিনায়ক সুগ্রীব সর্বতোভাবে রামচন্দ্রকে সাহায্য করেছে।</p>
<p>রামায়ণ-মহাভারত ব্যতীত মধ্যযুগীয় সাহিত্যেও তার নিদর্শন পাওয়া যায়। কালিদাসের শকুন্তলা ইসলাম ও মানবতাবাদ নাটকে প্রকৃতির সঙ্গে শকুন্তলার যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে তা পরিস্ফুট হয়েছে মনুষতার পতিগৃহে যাবার প্রাক্কালে শকুন্তলা কেবল তার সাথী অনসূয়া ও প্রিয়ম্বদার নিকট থেকেই বিদায় গ্রহণ করেনি, আশ্রয়ের মৃগশিশু, লতা, হলু প্রভৃতি সকল বৃক্ষরাজির নিকট থেকেও বিদায় গ্রহণ করেছে।</p>
<p>ভারতীয় সাহিত্যে রাজা ভর্তৃহরি এখনও একটি বিশিষ্ট পদমর্যাদার অধিকারী। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-</p>
<p>“অয়ং নিজে পরবেতি গণনা লঘু চেতসাম উদার চরিতানামতু বসুধৈব কুটুম্বকং”</p>
<p>অর্থাৎ লমুচিত্ত লোকেরাই নিজেকে ও অপরকে ভিন্ন মনে করে, উদার চরিত্রের লোকের কাছে সমগ্র বসুধাই কুটুম্বের মত.</p>
<p>কেবল ভর্তৃহরিই নন, ভারতীয় সাহিত্যে আরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। মানুষে মানুষে প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে তুলশী দাস বলছেন-</p>
<p><em>“তুলসী যব জগমে আয়ো</em></p>
<p><em>জগ হাসে তুম রও</em></p>
<p><em>এয়সা করনে কর চলো</em></p>
<p><em>কেতুম হাসে জণ বও”</em></p>
<p>অর্থাৎ হে তুলসী, তুমি যখন এ জগতে এলে, তখন সকলেই হাসলো, কেবল তুমিই কাঁদলে। এমনভাবে জীবনযাপন করো, যাতে তুমি হেসে হেসে মরতে পারো, আর এ দুনিয়ার সকল লোক তোমার জন্য কেঁদে সারা হয়।</p>
<p>হিব্রু ধর্মগুলোর যে মানবতাবাদ বিকাশ লাভ করে তার প্রকৃতি কিন্তু অন্য ধরনের। হিব্রু ধর্ম বলতে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মকেই গণ্য করা হয়। এ তিন ধর্মের মধ্যে রয়েছে যোগসূত্র এবং এদের আদি প্রবর্তক হচ্ছেন হযরত ইব্রাহীম খলীল-উল্লাহ (আ)। তাঁর জীবনে যে মানবতাবাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, তা হচ্ছে প্রকৃতি পূজার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। তিনি এক আল্লাহর ধারণার আলোকে এ জগতে নানাবিধ বস্তুকে পরীক্ষা করে, তাদের উপাসনার অযোগ্য বলে পরিত্যাগ করেছেন। এতেই সর্বপ্রথম এ জগতে মানবজাতির মুক্তি ঘোষণা করা হয়। তখন পর্যন্ত সূর্য, চন্দ্র বা নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তির নিকট মানুষ মাথা নত করতে অভ্যস্ত ছিল। তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে সর্বপ্রথমে প্রমাণ করেন মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব, মানুষ মাথা নত করবে একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহরই নিকট অন্য কারো কাছে নয়।</p>
<p>পরবর্তীকালে আল্লাহ সম্বন্ধীয় ধারণা আরও পরিষ্কার হয় হযরত মুসা (আ)- এর প্রবর্তিত ধর্মে। এ ধর্মেও মানুষকে সৃষ্টির সেরা করে একমাত্র আল্লাহকেই উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তবে আল্লাহর নীতিকে প্রচার করা এই অত্যন্ত কঠোর রূপে।</p>
<p>চোখের পরিবর্তে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত (Eye for eye and tooth for tooth) হচ্ছে তখনকার মানব-জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করে তোলার মাধ্যম। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষের ফলে যে কোলাহলের সৃষ্টি হয়, তারই প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীকালে এ নীতি জীবন বিকাশের পথে সংকীর্ণ বলেই প্রতিভাত হয়। হযরত ঈসা (আ) উদাত্ত স্বরে ঘোষণা করেছেন, &#8216;যদি তোমার ডান গালে কেউ আঘাত করে তা হলে তার কাছে তুমি বাম গাল ফিরিয়ে দাও।&#8221; আবার বলেছেন, &#8220;তোমার প্রতিবেশীকে তুমি ভালবাসো।&#8221; কাজেই এ ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপন করার জন্য রয়েছে বিপুল প্রয়াস। এ প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপন করতে যেয়ে হযরত ঈসা (আ) নিজেও নির্যাতিত হয়েছেন।</p>
<p>ইয়াহুদী ও খ্রিস্টধর্মের আলোচনা করলে দেখা যায়, এ দুই ধর্মের প্রবর্তক হযরত মূসা (আ) ও হযরত ঈসা রুহুল্লাহ্ (আ) উভয়েই নির্যাতিত মানুষের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে সর্বদাই প্রস্তুত ছিলেন। হযরত মূসা (আ) নির্যাতিত বনি ইসরাইলদের পক্ষ অবলম্বন করে অত্যাচারী রাজা ফিরাউনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং সর্বশেষে বনি ইসরাইলদের নিয়ে তিনি মিশর ত্যাগ করেছেন। তেমনি হযরত ঈসা (আ) দাসদের মুক্তির জন্য চেষ্টা করেছেন এবং ইয়াহুদীদের সুদের ব্যবসাও নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তবে মানবতাবাদের যে সূচনা হযরত ইব্রাহীম খলীল উল্লাহ (আ)-এর জীবনে দেখা দেয়, তা হযরত ঈসা (আ) প্রবর্তিত প্রেমের মর্যাদার মধ্যেই সম্পূর্ণ বিকাশ লাভ করেনি। আরও নানাবিধ মূল্যমানের বিকাশের ফলে পরবর্তীকালে এ মানবতাবাদের ব্যাপ্তি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেবলমাত্র ন্যায়বিচার বা প্রেমই মানুষের জীবনে কাম্য নয়, বরং মানুষে মানুষে ঐক্য ও চেতনা বা মানুষের মধ্যে এ দুনিয়ার সম্পদ সমানভাবে বণ্টনের যৌক্তিকতা প্রভৃতি মূল্যমানগুলোর অভ্যুদয়ের ফলে আল্লাহর ধারণার মধ্যে এগুলো পূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। হযরত মুহম্মদ মোস্তফা (সা) প্রবর্তিত ইসলাম ধর্মে তাই আল্লাহর গুণের মধ্যে এগুলোকে স্বীকার করে নিয়ে মানব-জীবনকে পূর্ণ বিকাশের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে সাধনা।</p>
<p>বর্তমানকালে আমরা মানবতাবাদের ফলশ্রুতি হিসেবে যেসব মতবাদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, তাদের মধ্যে গণতন্ত্র, নারীর সমান অধিকার, চিন্তাজগতে ব্যষ্টির স্বাধীনতা ও এ দুনিয়ার সম্পদের উপর মানুষের সমান অধিকার প্রস্তুতি নীতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমরা পাশ্চাত্যের মানবতাবাদের উৎপত্তি প্রসঙ্গে লক্ষ্য করেছি ব্যক্তি-স্বাধীনতা লাভের জন্যই তার উৎপত্তি হয়েছে এবং পরবর্তীকালে ধর্ম ও রাজনীতিতে তা প্রভাব বিস্তার করেছে।</p>
<p>প্রাচ্যের মানবতাবাদের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষে মানুষে প্রেম, মৈত্রী ও করুণার প্রতিষ্ঠা। সে মানবতাবাদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি মহাকাব্যে।</p>
<p>হিব্রু ঐতিহ্য থেকে যে মানবতাবাদ বিকশিত হয়েছে তার মধ্যে উত্তরবিধ ভাবধারা বর্তমান। ঐতিহ্যের মধ্যে একদিকে রয়েছে মানুষে মানুষে মৈত্রীর প্রতিষ্ঠা, অপর দিকে রয়েছে আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করার ব্যবস্থা। সে মানবতাবাদ চরম বিকাশ লাভ করে জনাব রসূলে আকরাম (সা)-এর জীবনে এবং তাঁর বাণীতে। তিনি সে মানবতাবাদ কেবল প্রচার করেননি, নিজের জীবনেও তার রূপায়ণের চেষ্টা করেছেন এবং মদীনাতে আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে জগৎ সভ্যতাকে দেখিয়েছেন কিভাবে সে-মানবতাবাদকে জীবনে রূপায়িত করা যায়।</p>
<p>তাঁর বাণীতেই আমরা সে মানবতাবাদের বীজমন্ত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাই প্রথমেই তিনি আল্লাহর সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধের স্বরূপ পরিষ্কার করে দিয়ে বলেছেন,</p>
<p>&#8220;আমি আল্লাহর রসুল, অর্থাৎ আল্লাহর অবতার, তাঁর পুত্র অথবা অংশীদার নই&#8221;।</p>
<p>তিনি যে মানুষ এবং মানুষেরই সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না প্রভৃতির অংশীদার তা পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করেছেন,</p>
<p>&#8220;আমি মানুষ ব্যতীত অতিরিক্ত কিছুই নই, আমি যখন তোমাদের ধর্মসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কিছু আদেশ করি, তখন তা গ্রহণ করবে এবং এ দুনিয়াব কোনো বিষয়ে আদেশ করলে, তখন আমি কোন মানুষ থেকে অতিরিক্ত কিছুই নই&#8221;।</p>
<p><em><strong>এসব উক্তির মাধ্যমে তিনি সর্বপ্রথম তাঁর মানবিক সত্তার প্রতিষ্ঠা করে মানুষের মধ্যে ঐক্য চেতনা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে বলেছেন,</strong></em></p>
<p><em><strong>&#8220;আল্লাহর সৃষ্ট সকল জীবই তার অন্তর্ভুক্ত এবং সে-ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়, যে আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সবচেয়ে অধিক মঙ্গল সাধন করে।&#8221;</strong></em></p>
<p>আবার তিনি বলেছেন-</p>
<p><em><strong>&#8220;কে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর অনুগ্রহভাজন? সেই ব্যক্তি যার কাছ থেকে তার বান্দারা সবচেয়ে বেশি মঙ্গল লাভে সমর্থ হয়।”</strong></em></p>
<p><em><strong>&#8220;সেই ব্যক্তিই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, যার কাছ থেকে মানুষেরা নানাবিধ কল্যাণ লাভ করে।&#8221;</strong></em></p>
<p>এভাবে মানব-সাধারণের কল্যাণ সাধনের জন্য তাদের মানসকে প্রস্তুত করে যাতে তাদের বাস্তবজীবনেও সে ভাবের রূপায়ণ হয়। এজন্য তিনি &#8220;কোন কাজগুলো সর্বোৎকৃষ্ট?” প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, কোনো মানুষের হৃদয়কে সন্তুষ্ট করা, কোনো ক্ষুধার্তকে আহার দান করা, কোনো বিপদগ্রস্ত লোককে সাহায্য করা, কোনো ব্যথিত লোকের ব্যথার উপশম করা এবং কোনো অন্যায়ভাবে কষ্টপ্রাপ্ত লোকের কষ্টের প্রতিকার করা।&#8221;</p>
<p>এ সকল উক্তির সারমর্ম থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি, সকল মানুষই সমান, তারা একই পরিবারভুক্ত লোকের মতো। মানুষের কল্যাণ-সাধন মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য। এসব বাণী থেকেই পরবর্তীকালে সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে জনাব রসুলে আকরাম (সা) এবিশ্বে গণতন্ত্রের বীজ বপন করে গিয়েছিলেন। মদীনাতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি অতি সহজেই সে রাষ্ট্রের রাজাধিরাজ বলে আপনার নাম ঘোষণা করতে পারতেন, তবে তা তিনি করেননি এবং যাতে তা বংশানুক্রমিক রাজত্বে পরিণত না হয় তার জন্য তার বংশের অপর কোনো মানুষকে তাঁর স্থলবর্তী হিসেবে মনোনয়ন করেননি।</p>
<p>নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে সর্বপ্রথমে তখনকার দিনের সমাজ-ব্যবস্থার উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। রসূলে আকরাম (সা)-এর জন্মের সময়ও আরব দেশের ইয়ামন প্রভৃতি প্রদেশে মাতৃকেন্দ্রিক (Maternal) সমাজ ছিল বর্তমান। এ দুনিয়ার সমাজ গঠনের ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মাতৃপ্রধান সমাজ-ব্যবস্থা থেকে কালের ধারায় পিতৃ-প্রধান সমাজের উৎপত্তি হয়েছে। বহুযুগ পর্যন্ত পুরুষেরা নারীদের অধীন থাকায় পুরুষদের সমাজে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তার ফলেই প্রায় সকল সমাজে নারী নির্যাতন একটা ফ্যাশন হয়ে পড়ে। আরবের মাটিতে, সে নারী নির্যাতন রসূল করীম (সা)-এর অবির্ভাবের পূর্বে চরমরূপ লাভ করে। কোনো সম্পত্তিতে নারীর তো কোনো অধিকার ছিলই না, উপরন্তু একসঙ্গে বহু নারীকে বিয়ে করতে কোনো বাধাবিপত্তিও ছিল না। নারীকে পণ্যের মত পুরুষের ভোগের সামগ্রী হিসেবে গণ্য করা হতো। এমন পরিবেশেও সে যুগে জন্মগ্রহণ করেও আল্লাহর রসুলের মনে কোন প্রতিহিংসামূলক মনোবৃত্তি দেখা দেয়নি বরং তিনি নারীর বন্ধন মুক্তির জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো,</p>
<p>&#8220;আমি কাকে সম্মান প্রদর্শন করবো?&#8221;</p>
<p>তার উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘তোমার মাকে&#8217;</p>
<p>এরূপ তিনবার উত্তর দানের পর বলেছেন, &#8220;তোমার বাবাকে”।</p>
<p>এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, সন্তানের কাছে মায়ের স্থান বাপের তিন গুণের মতো। আবার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,</p>
<p>&#8220;বেহেশতের স্থিতি মায়েদের পদতলে”</p>
<p>এসব সাধারণ নীতি যাতে সমাজ-জীবনে চালু করা হয় তার জন্য বলেছেন,</p>
<p>&#8220;আল্লাহর আদেশ-তোমরা তোমাদের নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা তারাই তো তোমাদের মাতা, কন্যা ও ফুফু বা খালা। নারীদের অধিকারগুলো পবিত্র। দেখো কোনো মতেই যেনো তাদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়।&#8221;</p>
<p>আল-কুরআনের ভাষায় তিনি পরিবারে ও সমাজে নারীর অধিকার ঘোষণা করেছেন।</p>
<p>চিন্তার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তাঁর বাণীগুলো বিশেষভাবেই প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহ যুক্তির চেয়ে উৎকৃষ্টতর কোনো কিছুই সৃষ্টি করেননি, অথবা (যুক্তি থেকে) অধিকতর ত্রুটিহীন অথবা সুন্দরতর কোন কিছু সৃষ্টি করেননি। এর মাধ্যমেই আমাদের জ্ঞানের উৎপত্তি। আবার, যুক্তি যাদের নেই তাদের পাপ-পুণ্যের কোনো বিচারও নেই। যুক্তি বা সজ্ঞানকৃত কর্মেরই মানুষ ফললাভ করে।</p>
<p><em><strong>যুক্তি-জ্ঞানের প্রতি এতো গুরুত্বরোপ তাঁর পূর্বে কোনো নবীই করেননি। এ যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধার ফলেই পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপে রেনেসাঁ আন্দোলন দেখা দেয়। প্রকৃতপক্ষে ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে জনাব রসূলে আকরাম (সা) যুক্তিকে এ জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যযুগের অন্ধকারের মধ্যেও নির্দেশ দান করেছিলেন।</strong></em></p>
<p>বর্তমানকালে মানবতাবাদের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্র হচ্ছে, এ দুনিয়া থেকে শোষণের অবসান, যেকোনোভাবেই এ দুনিয়া থেকে শেষকদের উৎখাত করে যাতে এ দুনিয়ার সম্পদ দুর্বল মানুষ সমানভাবে ভোগ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করাই এ যুগের মানবতাবাদীদের মূল লক্ষ্য। এ মানবতাবাদেরই এক বিশেষ প্রকাশিয় রূপ সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজবাদ ও চীন দেশের নব্যগণতন্ত্র। এ দুনিয়ায় সম্পদ কোনোকালেই বা কোনোভাবেই কোনো ব্যক্তির, কোনো গোত্রের, কোনো দলের বা কোনো শ্রেণির কুক্ষিগত না হয়, সেজন্য আল-কুরআন এ দুনিয়ার সম্পরের মালিকানা শুধুমাত্র আল্লাহরই বলে ঘোষণা করেছে। সে মালিকানার অর্থ হলো, যেভাবে চন্দ্র-সূর্যের আলো, আকাশ-বাতাস, নদ-নদী, খাল বিল প্রভৃতির পানি ভোগ করার অধিকার প্রত্যেক মানুষের রয়েছে, তেমনি এ পথিবীর সম্পদ ভোগ করার সমান অধিকার রয়েছে। এ দুনিয়ার সম্পদ বলতে খনিজ-ধাতব পদার্থ, বনজবৃক্ষাদি ভূমি থেকে উৎপন্ন শস্যাদি সবকিছুই বুঝা যায়। এসব বিষয়বস্তুতে সকল মানুষের সমান অধিকার থাকলে কলহ-কোন্দল প্রভৃতির সৃষ্টি হতে পারে বলে যাতায়াত ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বা ভৌগোলিক ব্যবধানের জন্য মানুষের মধ্যে বিভিন্ন দেশ গড়ে উঠেছে। ফলে, সেই দেশের সম্পদের উপর সেই দেশের মানুষের বিশেষ অধিকার রয়েছে সত্য, তবে সেই দেশে উদ্বৃত্ত থাকলে সে দেশের মানুষের পক্ষে সেই উদ্বৃত্ত অপর দেশের বা ঘাটতি অঞ্চলের লোকের জন্য রিজার্ভ করে রাখা অবশ্য কর্তব্য বলে আল্লাহ তা&#8217;আলা সূরা ইউসুফে নির্দেশ দিয়েছেন।</p>
<p>এ দুনিয়ার সম্পদ, যার একমাত্র মালিক স্বয়ং আল্লাহ তা&#8217;আলা, যাতে সর্বাবস্থায় কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দল ভোগ না করে তার জন্য তাদের পক্ষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু আত্মসাৎ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হযরত উসমান গণী (রা)-এর খিলাফতকালে শাহানশাহী ভোগ-বিলাসের বিরুদ্ধে এবং অযথা একদলের মধ্যে আল্লাহর সম্পদ ভাগ-বণ্টনের প্রতিকার করে হযরত আবূ যর গিফারী (রা) বিপ্লবী আন্দোলন প্রবর্তন করেছেন। পরবর্তীকালে যাহিরী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ইবনে হাজম মানুষের প্রয়োজনেরও সীমা নির্দেশ করেছেন। মহল্লায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, একজন মানুষের প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে তার শরীরকে টিকিয়ে রাখার জন্য পুষ্টিকর আহার্য; তার লজ্জা নিবারণের জন্য ও শীত গ্রীষ্মাদি বিভিন্ন ঋতুতে তার শরীর রক্ষার জন্য উপযুক্ত পোশাক, বিভিন্ন ঋতুতে ঝড়-বৃষ্টি, বাদল বা শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে পারে এমন বাসগৃহ।</p>
<p>তাই স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, হযরত রসূলে আকরাম (সা) যে মানবতাবাদের প্রবর্তন করেছিলেন এবং তার যে বীজমন্ত্র দিয়েছিলেন, তার আলোকেই বর্তমান কালের মানবতাবাদ আবর্তিত বা বিবর্তিত হচ্ছে। হযরত রসূলে আকরাম (সা)-এর মানবতাবাদ ছিল বাস্তবধর্মী। সে মানবতাবাদ কেবল নীতি নির্দেশ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে বাস্তব-জীবনে রূপায়ণের জন্যও প্রেরণা দান করেছেন। আজকের দুনিয়া তাঁর সে নীতি গ্রহণ করলে অনেক দ্বন্দ্বেরই অবসান হত, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/humanism-of-the-holy-prophet-pbuh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14133</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কালচারের মর্মকথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-essence-of-culture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-essence-of-culture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 02 May 2024 14:09:06 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[Bangla]]></category>
		<category><![CDATA[bengal]]></category>
		<category><![CDATA[civilization]]></category>
		<category><![CDATA[literature]]></category>
		<category><![CDATA[কালচার]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14062</guid>

					<description><![CDATA[দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের ফলে এ দুনিয়ার অনেক বিষয়ের সংজ্ঞাতেই কোনো একতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্য অনেক বিষয়ের মতোই কালচার সম্বন্ধেও হয়েছে নানাবিধ ধারণার উৎপত্তি। বাধ্য হয়েই কালচারের তুলনামূলক আলোচনা করে কালচারের বিবরণ দিতে হয়, তবুও তার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবপর হয়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের ফলে এ দুনিয়ার অনেক বিষয়ের সংজ্ঞাতেই কোনো একতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্য অনেক বিষয়ের মতোই কালচার সম্বন্ধেও হয়েছে নানাবিধ ধারণার উৎপত্তি। বাধ্য হয়েই কালচারের তুলনামূলক আলোচনা করে কালচারের বিবরণ দিতে হয়, তবুও তার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবপর হয় না। সত্যতা ও কালচারের আলোচনা প্রসঙ্গে প্রতীয়মান হয় যে, একটি বিষয়েরই উহ্যরূপ হচ্ছে সভ্যতা এবং তার বাহ্যরূপ হচ্ছে কালচার। সভ্যতার বিচার হয় কালচারের প্রকাশ-ভঙ্গিমায় বা তার বিষয়বস্তুর উৎকর্ষের মানদণ্ডের মাধ্যমে। যেকোনো সভ্যতার উন্নতি বা অবনতি প্রকাশিত হয় তার কালচারের মধ্যে। সভ্যতাকে একটা বিমূর্ত ধারণা বলা যায়, তার মূর্ত ক্রিয়া হচ্ছে কালচার এবং মূর্ত রূপ হচ্ছে কালচার দ্বারা সৃষ্ট বিষয়বস্তু।</p>
<p>সাধারণত উভয় অর্থেই কালচার শব্দটা ব্যবহৃত হয়। কোনো কোনো বিষয়ের রূপায়ণের ভঙ্গিমাকে যেমন বলা হয় কালচার, তেমনি রূপায়িত বিষয়কেও বলা হয় কালচার। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প, সাহিত্য বা অন্যান্য চারু ও কারুশিল্প প্রকাশের পদ্ধতিকে যেমন বলা হয় কালচার, তেমনি সে-পদ্ধতির মাধ্যমে রূপায়িত বিষয়বস্তুকেও বলা হয় কালচার। তাজমহলের গঠন-নৈপুণ্যও যেমন কালচার, তেমনি তাদের বিশিষ্ট আকার ও প্রকারকেও বলা হয় কালচার। প্রকৃতপক্ষে একটি উপায়, অপরটি লক্ষ্য। যেহেতু কোনো একটি বিষয়বস্তু কলাকৌশলের মাধ্যমেই রূপায়িত হয়, অতএব কলাকৌশলকেই প্রথমে কালচার বলা হয়। তবে কলাকৌশল অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এ কারণে তাদের রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ। মানসিক দিক থেকে অবশ্য একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করে দেখা যেতে পারে, তবে বাস্তব জীবনে তাদের মধ্যে রয়েছে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ।</p>
<p>এ কালচার শব্দটি আবার সংস্কৃতি-সহ বিভিন্ন নামে ব্যবহৃত হয়, এমন ভিন্নতার সঙ্গত কারণও রয়েছে। সংস্কৃতি বলতে কোনো বিষয়কে সংস্কৃত (refine) করা বুঝায়। তাকে ইংরাজিতে তরজমা করলে refinement হয়ে দাড়ায়। পূর্বে যা ছিল অসংস্কৃত বা অশোভন তারই পরবর্তী পরিণীত ব্যবস্থাকে বলা হয় সংস্কৃত। যে পদ্ধতির মাধ্যমে তা রূপায়িত হয়, তাকে বলা হয় সংস্কৃতি। এতে কালচাবের উপায় বা রূপায়ণের পদ্ধতিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্কৃতের ভেতরে বিষয়বস্তুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। একটি নিছক ক্রিয়ামূলক পদ অপরটি বিষয়বস্তুমূলক শব্দ।</p>
<p>অন্য আরও একটি দিক থেকে কালচারকে সংস্কৃতি বলাতে রয়েছে ত্রুটি। যেকোনো কালচারের ইতিহাসের আলোচনা করলে দেখা যার তার মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিকতা। কালের দিক থেকে বিচার করলে কালচারের অন্তর্গত বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অধ্যায়কে বলতে হয় অসংস্কৃত, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পরবর্তী অধ্যায়কে বলতে হয় অসংস্কৃত। ঠিক কোন পর্যায়ে এসে একটা বিশিষ্ট পদ্ধতি সংস্কৃত হচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে সে আবার বর্বরতার স্তরে চলে যাচ্ছে, তা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে পরিবর্তন তো নিত্যই হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনটা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী হলেই কেবল তা দৃষ্টিগোচর হয়। কাজেই সংস্কৃতি শব্দের পরিবর্তে ব্যাপক অর্থে কালচার শব্দটির প্রয়োগই বাঞ্ছনীয়। কৃষ্টিও সংস্কৃতির মতোই ক্রিয়ামূলক শব্দ, একারণেই তা অপরিসর গতির জন্য পরিত্যাজ্য।</p>
<p>এ কালচারের উৎপত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করতে হলে মানবজীবনের আলোচনাতেই ফিরে যেতে হয়। কারণ মানবজীবনই কালচারের মূল উৎস। কালের আবর্তে মানবজীবন এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এ পরিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রহণ ও দানের ফলেই গড়ে ওঠে মানুষের কালচার। পৃথিবী থেকে অপরিসীম সম্পদ আহরণ করে মানুষ হয়েছে ধনী আর তার মূল্য হিসাবে পৃথিবীকে সে যা দান করে, তারই স্বাক্ষর রয়েছে মানুষের কালচারের। কালচারের উৎপত্তি তাই ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াজাতের ভেতরেই রয়েছ এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের সঙ্গে তার রয়েছে সংযোগ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্য দশটি প্রাণীর মতো মানুষকে আহারের সংস্থান করতে হয়। কেবল আহার নয়, তার পক্ষে পোশাক-পরিচ্ছদ বা আচ্ছাদনেরও প্রয়োজন পড়ে। নানা প্রবৃত্তির দাবি রয়েছে তার জীবনে। সেগুলো অবসান করা তার পক্ষে সহজ নয়। প্রেম বা কাম দ্বারা চালিত হয়ে মানুষ বাধ্য হয়েই আত্মকেন্দ্রিক জীবনের ক্ষুদ্র পরিসর ত্যাগ করে বৃহত্তর পারিবারিক জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা শ্বাপদ হিংস্র অন্তরের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাকে সমাজের অন্য দশজনের সাহায্য নিতে হয়। মূলত জৈবিক প্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হলে পরিশেষে তাকে পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে সুস্বভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিছক আত্মসুখ বর্জন করতে হয়। আবার তার মানসজাত ভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে বেঁচে থাকার পদ্ধতি সে আবিষ্কার করে এবং তাকে রূপদান করে নিজেকে সার্থক মনে করে। আদর্শের প্রতি আস্থা ও তার আকর্ষণ যেমন একদিকে তাকে এ পৃথিবী থেকে নানাভাবে বিষয়বস্তু আহরণের জন্য প্রেরণা দান করে, তেমনি এই দুনিয়াকে তার পছন্দমতো সাজানো গোছানোর দায়িত্বও সে গ্রহণ করে। এ গ্রহণ ও দানের বাহ্যিক রূপই তার কালচার।</p>
<p>নানা ক্রিয়া প্রকাশিত হয় বলে তার মধ্যে রয়েছে নানা বিষয়বস্তু। মানুষের এ গ্রহণ ও দান আবার নানাবিধ কারণ বা ফ্যাক্টরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। খাদ্য নির্বাচনের ব্যাপার, আহার করার পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদের প্রয়োজনীয়তা ও নানাবিধ শিল্পসমূহ অনেকটা পরিবেশের উপর নির্ভর করে, ভারতের কোনো এক প্রদেশের খাদ্য নির্বাচন বা গ্রহণ করার পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশবাসী লোকদের আহার্য বা তার গ্রহণ করার কায়দা থেকে ভিন্ন। অত্যন্ত শীতপ্রধান বলে সে অঞ্চনের পোশাক-পরিচ্ছদের স্টাইল গ্রীষ্মপ্রধান আফ্রিকার লোকদের পোশাক-পরিচছদ থেকে অনিবার্য কারণে ভিন্ন হয়েছে। মেরু অঞ্চলে সহজলভ্য ভল্লুকের লোম থেকে সে-দেশবাসীর বস্ত্রাদি যে তৈরি হবে তাতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঝড়-ঝঞ্জা বা তুষারপাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাদের তুষারেই ঘর তৈরী করতে হয়। মরুভূমিতে বিচরণশীল বেদুঈনের জন্য বৃক্ষপত্রহীন বালুকারাশিতে চামড়ার শিবিরের মধ্যেই আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। বৈচিত্র্যময় জীবনের নানাবিধ প্রয়োজনে এভাবেই মানুষের কালচারে বৈচিত্র্য দেখা দেয় এবং এই বৈচিত্র্য থেকে প্রথমে স্বাদেশিকতা এবং পরবর্তীকালে প্রাদেশিকতার উৎপত্তি হয়। জাতীয় চরিত্র গঠনে পরিবেশের প্রভাব তাই অত্যন্ত শক্তিশালী।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পরিবেশ ব্যতীত কালচারের বিবর্তনের মূলে অর্থনৈতিক কারণও ক্রিয়াশীল। আবার অর্থনীতির মানসজাত নানাবিধ মানেরও (value) রয়েছে সম্বন্ধ। এসব মান (value) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে থাকে ক্রিয়াশীল এবং উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গুহামানব প্রথমে তার নিজের প্রয়োজনের জন্য বন্য পশু শিকার করতো। যৌন-জীবনের তাগিদে নারীর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রচণ্ডভাবে স্বীকৃত হওয়ার ফলে সে তার লক্ষ্য পরিবর্তনে বাধ্য হয়। তখন শুধু নিজের জন্য নয়, তার নিজের ও যৌন-সঙ্গীর জন্য শিকার করা তার পক্ষে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পশুচারিক পর্যায়ে কেবল যৌন-সাথী নয়, দলের অপরাপর লোকের সুখ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখাও তার পক্ষে কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে জীবনের নানা দাবির ফলে বিভিন্ন মানের উৎপত্তি ও পরিবর্তনের ফলে মানুষ তার উৎপাদন-ব্যবস্থা ও তার লক্ষ্য পরিবর্তন করে। অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণগুলোর মধ্যে যে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ রয়েছে, সে সত্য অনস্বীকার্য।</p>
<p>তবুও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে মানুষের মৌলিক ঐক্য থাকে বলেই বিভিন্ন মানুষের জীবনে ও তার প্রকাশ-ভঙ্গিমায় রয়েছে সাদৃশ্য। যূথচারী প্রবৃত্তি (Gregarious instinct) আছে বলেই মানুষ কাজে ও অকাজে একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয় এবং একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে স্বীকার করে। মাতৃ স্নেহ, পিতৃ-স্নেহ বা অপত্য স্নেহ, প্রেমিক-প্রেমিকার আসক্তি সকল দেশেই একই ভাবে প্রকাশিত। প্রেম, স্নেহ, মমতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো সকল দেশের মানুষকেই সমানভাবে আকর্ষণ করে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব মানের (value) উৎপত্তি হয়, তাদের দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বণ্টনের পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন দেখা দেয়, মানবজীবনে আদর্শের উৎপত্তির পরে তা আরও প্রকট হয়ে পড়ে। আদর্শের পার্থক্যের ফলে কোনো একটি আদর্শের রূপায়ণকে যদিও বা একদল মানুষ অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করে, সেই আদর্শকেই অপর একদল মানুষ অবশ্য পরিত্যাজ্য বলেই গণ্য করে।</p>
<p>এ দুনিয়ায় সাধারণভাবে নানা আদর্শ প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, সর্বোপরি কেউ না কেউ নানা আদর্শ প্রচার করেছেন এবং যে সব আদশের রূপায়নের জন্য আজীবন সাধনা করেছেন। মহামতি সক্রেটিস আদর্শ প্রচার করেছেন বলেই হেমলক পান করতে বাধ্য হয়েছেন। স্পিনোজা রক্ষপতির সন্তান হয়েও অম্লানবদনে পিতৃস্বত্ব পরিত্যাগ করেছেন। মুডি উলটের সত্যের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করে সর্বস্ব ত্যাগ করে আত্মীয়-স্বজন ও পুত্র-কন্যার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করেছেন। এসব আদর্শের কার্যকারিতা মানবজীবনের পটভূমিতে পরোক্ষভাবে ক্রিয়াশীল। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে এরা তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করেনি।</p>
<p>ধর্মের প্রবর্তনও এক হিসেবে আদর্শেরই অভিনব পদ্ধতির রূপায়ণ। তবে ধর্মাশ্রিত আদর্শের রূপায়ণের জন্য মহামানবেরা অমানুষিক দুঃখ কষ্ট ও অভূতপূর্ব নির্যাতন সহ্য করেছেন। মুখ্যত মানবজীবনের মুক্তির জন্য সিংহাসন ত্যাগ করে বুদ্ধদেব যে বাণী প্রচার করেছিলেন, তার আদর্শিক প্রেরণার উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল মানুষ অভিনব জীবন-পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে পাক-ভারতের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন বৌদ্ধবিহার। সংগ্রাম-উৎসাহী জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সম্রাট অশোক সহিংস নীতি পরিত্যাগ করে অহিংসার প্রচারকরূপে এজগতে স্থায়ী শ্রদ্ধার আসন লাভ করেন। সে আদর্শের প্রেরণাই তাঁকে নানা স্থানে বাণী প্রচারের জন্য ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করেছে।</p>
<p>তেমনি সহায় সম্বলহীন নিরীহ মেষপালক যীশুর বাণী শুনে অপর একদল মানুষের জীবনে দেখা দিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আহার-বিহার, পোশাক-পরিচ্ছদ অর্থাৎ সোজা কথায় মানব-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে দেখা দেয় অভূতপূর্ব কালচার। সে কালচার যেমন ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি ও ম্যাডোনা চিত্রে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি রোমান ক্যাথরিকদের গলায় ঝুলানো ক্রসের প্রতীক বা চার্চের গঠনশিল্পেও প্রকাশ পেয়েছে। এ দুনিয়ার সন-তারিখ গণনার ক্ষেত্রেও সে কালচারের রয়েছে ছাপ। আজও খৃষ্ট-পরবর্তীতে এসে এ&#8217;দুনিয়ার কাল-কে যেমন বিভক্ত করা হয়েছে, তেমনি খৃষ্ট-পূর্ব সে কালের গণনাও চলেছে যীশুখ্রীষ্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে। সে কালচার নানা দেশে নানারূপ পরিগ্রহ করলেও তার রয়েছে এক সাধারণ পরিচয়।</p>
<p>ইসলাম ধর্ম আরবের বুকে প্রচারিত হয়েছে অশিক্ষিত মূর্তি-পূজক, কলহপরায়ণ, গোত্র-সর্বস্ব, নানাদলের মানবের মধ্যে। অল্প সংখ্যক নগরবাসী ব্যবসায়ী ও নানাবিধ গোত্রের লোকের মধ্যে প্রচারিত হলেও, এ ধর্ম-ভিত্তিক আদর্শ আলোর মতো পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আরববাসী সাধারণ মানুষের আহার্যের বস্তু বা পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদ এ দুনিয়ার সকল ইসলামপন্থী মানুষ গ্রহণ করেনি, করতেও পারবে না। তবে আদর্শের ক্ষেত্রে এ দুনিয়ার সকল মুসলিমের মধ্যে রয়েছে ঐক্য-সূত্র। তাদের জীবনের মুল্যমানগুলোও সে আদর্শের আলোকেই বিবর্তিত হয়েছে।</p>
<p><strong>সুদূর</strong> <strong>স্পেনের</strong> <strong>পুরাতন</strong> <strong>স্মৃতিবিজড়িত</strong> <strong>কর্ডোভার</strong> <strong>মসজিদ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ঢাকার</strong> <strong>যেকোনো</strong> <strong>মসজিদ</strong> <strong>একই</strong> <strong>আল্লাহর</strong> <strong>উপাসনার</strong> <strong>উদ্দেশ্যে</strong> <strong>নির্মিত</strong> <strong>বলে</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>বোঝা</strong> <strong>যায়।</strong> <strong>এদের</strong> <strong>গঠন</strong><strong>&#8211;</strong><strong>নৈপুণ্যের</strong> <strong>এবং</strong> <strong>কলা</strong><strong>&#8211;</strong><strong>কৌশলে</strong> <strong>যথেষ্ট</strong> <strong>পার্থক্য</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>সত্যি</strong><strong>, </strong><strong>তবুও</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>সাধারণ</strong> <strong>পরিচয়</strong> <strong>লাভে</strong> <strong>কোন</strong> <strong>কষ্ট</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>লুঙ্গি</strong> <strong>পরিহিত</strong> <strong>সুমাত্রা</strong> <strong>বা</strong> <strong>জাভার</strong> <strong>মুসলিম</strong> <strong>ও</strong> <strong>কোট</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্যান্ট</strong><strong>&#8211;</strong><strong>টাই</strong> <strong>পরিহিত</strong> <strong>ইংল্যাণ্ডের</strong> <strong>নব্য</strong><strong>&#8211;</strong><strong>দীক্ষিত</strong> <strong>মুসলিমের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>বেশভূষা</strong> <strong>বা</strong> <strong>চালচলনে</strong> <strong>পার্থক্য</strong> <strong>থাকতে</strong> <strong>পারে</strong><strong>, </strong><strong>তবে</strong> <strong>জীবনের</strong> <strong>উদ্দেশ্য</strong> <strong>ও</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>সম্বন্ধে</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>ধারণায়</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>ঐক্য।</strong> <strong>এখানেই</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>ধর্মীয়</strong> <strong>আদর্শের</strong> <strong>ভিত্তিতে</strong> <strong>গঠিত</strong> <strong>কালচারের</strong> <strong>সঙ্গে</strong> <strong>অন্যান্য</strong> <strong>আদর্শের</strong> <strong>উপর</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong> <strong>কালচারের</strong> <strong>প্রভেদ।</strong></p>
<p>মানবজীবনের ঐক্য-সূত্রের আবিষ্কার ও তার প্রচারণা কেবল দার্শনিকেরা করেননি। সাহিত্যিকদের দ্বারাও সে-সত্য প্রচারিত হয়েছে। মানবজীবনের কৃতকার্যের ফল ভোগের জন্য পরলোকের অপেক্ষা করতে হয় না, ইহলোকেও সে বিচার হয় এবং এ-বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে তারা তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ এ-জীবনেই করে, যার প্রচারণা মহাকবি হোমার বা বাল্মীকিও করে গেছেন। ট্রয়-ধ্বংস বা রাবণের পুরী নাশ এ নিয়মেই হয়েছে বলে হোমার-বাল্মীকি সুললিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। সুদূর অতীতের সাহিত্য ছাড়াও ঐতিহাসিক সাহিত্যেও তার প্রমাণ রয়েছে। কালিদাসের শকুন্তলা বা শেক্সপীয়রের নাটকাদিতেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। এতে মানবজীবনের সাধারণ পরিণতি সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।</p>
<p>দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ফলে পরবর্তীকালে কোথাও অমোঘ নিয়তি কর্তৃক মানবজীবনের লাঞ্ছনা, কোথাও মানুষের দ্বারা মানুষের বিড়ম্বনার ইতিহাস চিত্রায়ণের মধ্যেও সেই একই মানুষের পরিণতি দৃষ্টিগোচর হয়। তাতে একদিকে যেমন মানবতাবোধের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছে, তেমনি মানবতাবাদেরও উদ্ভব হয়েছে। তবে ধর্মীয় জগতের আলোড়নের মতো এসব মতবাদ মানুষের জীবনকে তেমন প্রচণ্ডভাবে পরিবর্তন করতে সমর্থ হয়নি।</p>
<p>তার কারণও সুস্পষ্ট। <strong>ধর্মের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>রয়েছে</strong> <strong>সামগ্রিকতা।</strong> <strong>ধর্ম</strong> <strong>শুধুমাত্র</strong> <strong>প্রত্যয়শীলতার</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>সীমাবদ্ধ</strong> <strong>নয়।</strong> <strong>ধর্মের</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>মননশীলতা</strong><strong>, </strong><strong>আবেগ</strong><strong> (emotion) </strong><strong>ও</strong> <strong>ইচ্ছাশক্তির</strong><strong> (will) </strong><strong>পরিস্ফুটন</strong> <strong>ও</strong> <strong>বিকাশের</strong> <strong>উপাদান</strong> <strong>রয়েছে।</strong> <strong>দর্শন</strong> <strong>বা</strong> <strong>সাহিত্য</strong> <strong>যেভাবে</strong> <strong>মানবজীবনের</strong> <strong>চিন্তাশীলতা</strong> <strong>বা</strong> <strong>আবেগ</strong> <strong>নিয়ন্ত্রণে</strong> <strong>সমর্থ</strong> <strong>হয়</strong><strong>, </strong><strong>সেভাবে</strong> <strong>মানবজীবন</strong> <strong>নিয়ন্ত্রণের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>রীতিনীতি</strong> <strong>মানব</strong><strong>&#8211;</strong><strong>মানসে</strong> <strong>প্রতিষ্ঠিত</strong> <strong>করতে</strong> <strong>সামর্থ্য</strong> <strong>হয়</strong> <strong>না।</strong> <strong>এজন্যই</strong> <strong>বর্ষ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>প্রবর্তনের</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>মানবজীবনে</strong> <strong>দেখা</strong> <strong>দেয়</strong> <strong>প্রচণ্ড</strong> <strong>বিপ্লব</strong>।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মানবজীবনের সামগ্রিক বৃত্তিসমূহের সন্তোষবিধানে সক্ষম বলেই ধর্ম থেকে প্রচারিত আদর্শ জীবনের নানাক্ষেত্রে নানাভাবে প্রকাশিত হয়। চিত্রশিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি নানাক্ষেত্রে সে আদর্শ রূপায়ণের মাধ্যম মাত্র। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক কারণগুলো আদর্শিক কারণের তুলনায় হীন ও দুর্বল এবং ধর্মীয় আদর্শিক কারণের তুলনায় আরও ক্ষীণ বলেই স্থান, কাল, জাতি, বর্ণ প্রভৃতির গণ্ডি পেরিয়ে ধর্মীয় আদর্শের প্রেরণায় মানুষ ঐক্যসূত্রে নিজেদের গর্বিত করতে এতো আগ্রহ প্রকাশ করে।</p>
<p>অপরদিকে বিভিন্ন ধর্মের দ্বন্দ্ব এবং সংজ্ঞা নিয়ে যে বিবাদ রয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তিকামী মানবতাবাদীদের একান্ত সাধনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বিভিন্ন ধর্মের আচারগত রূপ পরিত্যাগ করে তাদের অন্তর্নিহিত মানবতাবাদের মৌলিক রূপটি সর্বসাধারণ মানুঘের সামনে তুলে ধরাতে। অন্যদিকে বর্ণের, ভাষার বা ভৌগোলিক পরিবেশের অবস্থা অস্বীকার করে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভিত্তিতে মানবগোষ্ঠীকে ভাগের কারণে সৃষ্ট এ বৈষম্য নিরসনের জন্য নানাদিক থেকেও আসছে আহ্বান।</p>
<p>একেও মানবতাবাদের অন্য সংস্করণ বলা যায়। তবে ভেবে দেখবার বিষয় যে, উভয় মানবতাবাদই মানুষের মৌলিক ঐক্য আবিষ্কারে সক্ষম হলেও সে মানবতাবাদকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতির উত্তরে তারা একমত হতে পারেনি। এ-কথা অবশ্য অনস্বীকার্য যে পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্য ব্যতীতও এ দুনিয়ার জীব হিসাবে মানুষের রয়েছে সাধারণ পরিচয়। জীবনের নানাক্ষেত্রে কীভাবে জীবন পরিচালনা করলে দুনিয়ার সকল মানুষই সন্তোষ লাভে সামর্থ হবে, সে পদ্ধতি আবিষ্কারই বর্তমান জগতের একমাত্র কার্য। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্য মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানে সক্ষম হলেও মানুষের সামগ্রিক জীবনের বিধানারোপের ক্ষেত্রে সমর্থ হবে কিনা তাই প্রণিধানযোগ্য বিষয়।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-essence-of-culture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14062</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সাহিত্য ও সমাজ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/literature-and-society/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/literature-and-society/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 29 Mar 2024 10:24:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[আর্ট]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[শিল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13927</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্যের সঙ্গে যে মানব-জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে সে সম্বন্ধের রূপ নিয়ে। নানাভাবে এ সম্বন্ধের নির্ণয় হতে পারে। মানব-জীবন যেমন ব্যাপক তেমনি সাহিত্যের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপকতা। কাজেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এদের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সাহিত্যের সঙ্গে যে মানব-জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে সে সম্বন্ধের রূপ নিয়ে। নানাভাবে এ সম্বন্ধের নির্ণয় হতে পারে। মানব-জীবন যেমন ব্যাপক তেমনি সাহিত্যের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপকতা। কাজেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এদের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা হতে পারে। সাধারণত বলা হয়, সাহিত্য হচ্ছে মানব-জীবনের অভিব্যক্তি। মানব-জীবনে যেসব সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্না দেখা দেয়, তারই শিল্পসম্মত অভিব্যক্তি হলো সাহিত্য।</p>
<p>সাহিত্যের মাঝে সমাজ তার নিজের ছবি দেখতে পায়। সে ছবি সুখেরও হতে পারে, ব্যথা-বেদনারও হতে পারে। তবে এতেও একটি ত্রুটি থেকে যায়। কেননা, তখন আবার সাহিত্যকে মনে করা হয় নিছক Recreational বা অবসর-বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে। মানুষের হাতে যখন কোনো কাজ থাকে না তখন মানুষ একখানা নাটক, উপন্যাস বা কবিতার বই নিয়ে বসে এবং চিত্তবিনোদনের জন্য তা পাঠ করে। একথাটিও সত্যি। তবে চিত্তবিনোদন ব্যতীত সাহিত্যের অপর একটি রূপ রয়েছে-তাকে বলা হয় Recreative বা পুনঃসৃষ্টিকারী। পাঠক-পাঠিকার মনে নতুন একটা ভাব বা নতুন একটা চিন্তা গেঁথে দেওয়াও প্রকৃত সাহিত্যের কাজ। শুধু শুধু মানস-বিনোদনই যদি সাহিত্যের লক্ষ্য হতো, তাহলে এ জাতীয় পুস্তক-পুস্তিকাতেই সাহিত্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তো। বাস্তবে কিন্তু সাহিত্যের অমোঘ কার্যকারিতা দেখা যায়। একখান ডিটেকটিভ উপন্যাস ও একখানা যুগান্তকারী উপন্যাস পাশাপাশি পাঠ করলেই তাদের তারতম্য স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়।</p>
<p>রোমাঞ্চকর কাহিনী কল্পনার দুয়ার খুলে দিয়ে মনকে অত্যাশ্চর্য জগতে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু পুস্তকখানা পাঠ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক অবাস্তবতা হাসির উদ্রেক করে। অপর পক্ষে প্রকৃত সাহিত্য মনের সামনে এমন এক জগতের সন্ধান দেয়, যাকে বাস্তবায়িত করা অবশ্য কর্তব্য বলেই মনে হয়। স্যার আর্থার কেনান ডয়েলের &#8216;এ্যাডভেঞ্চারাস অব শার্লক হোমস&#8217;র মধ্যে ডিটেকটিভ শার্লক হোমসের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও গবেষণাকৌশল পাঠককে মুগ্ধ করে নিঃসন্দেহেই। তবে বাস্তব জীবনে তার প্রত্যক্ষ কোনো প্রভাব নেই। অপরদিকে, যোয়ান বোয়ারের &#8216;গ্রেট হাজার&#8217; অথবা টলস্টয়ের &#8216;রিজারেকশন&#8217; বা &#8216;আনাকারেনিনা&#8217; কেবল সমাজ-জীবনের চিত্রাঙ্কনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সুস্থ ও ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ-জীবনের রূপায়ণের তাগিদের ইশারাও বহন করে। এ হিসাবে বিচার করলে Recreational and Recreative- এদুটিকেই সাহিত্যের দু&#8217;টি অবিচ্ছেদ্য অংশে হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।</p>
<p>সাম্যবাদী মহলে আর্টের সংজ্ঞা নির্দেশ করে বলা হয়,</p>
<blockquote><p>“আর্ট হচ্ছে সমাজ-জীবনের অন্তর্গত সত্তার যথার্থ প্রতিফলন। অর্থাৎ সমাজ-জীবনের যা কিছু আশা-আকাঙক্ষা সুখ-দুঃখ-সবকিছুই আর্টে প্রতিফলিত হয়।”</p></blockquote>
<p>তবে আর্টের অপর একটি সংজ্ঞায় বলা হয়,</p>
<blockquote><p>“আর্ট হচ্ছে শ্রেণী-সংগ্রামের একটি ধারালো অস্ত্র।”</p></blockquote>
<p>বলা বাহুল্য, শেষোক্ত সংজ্ঞার আলোকে বিচার করলে এ দুনিয়ার বহু আর্টই এ নামের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য। শ্রেণিবিভাজন সকল দেশে, সকল সমাজেই রয়েছে। কেবল বিত্তবান (Haves) ও বিত্তহারা (Have nots) নিয়েই সমাজ গঠিত নয়। একই ব্যক্তি, মননের দিক দিয়ে বিত্তহারার এক পর্যায়ভুক্ত হতে পারে, আবার অন্যদিক দিয়ে অন্য শ্রেণীভুক্তও হতে পারে। টলস্টয় ছিলেন বিত্তহারার দরদী বন্ধু এবং এজন্য নিজে বিত্ত ত্যাগ করে সাধারণ কৃষকের জীবন যাপন করতে তাঁর দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মানসে কিন্তু এ রূপায়ণ ছিলো ধর্মীয় সাধনারই এক অঙ্গ। কাজেই তাঁকে একদিকে যেমন বিত্তহীন শ্রেণীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন সাধনায় মগ্ন লোকেদের শ্রেণীভুক্তও বলা যায়, তেমনি বলা যায় তাঁর সৃষ্ট সমগ্র সাহিত্যে রয়েছে ব্যষ্টিজীবনের যথার্থ স্বীকৃতি। এ ব্যষ্টি জীবন একদিকে যেমন কোথাও বা নিবিত্ত/বিত্তহারা আবার কোথাও বা বিত্তবান হয়েও মানসের দিক থেকে সর্বহারা। কাজেই আর্ট কেবল যে শ্রেণীসংগ্রামের ধারালো অস্ত্রই হবে তার কোনো অর্থ হয় না।</p>
<p>আর্ট কোথাও বা শ্রেণীসংগ্রামের ধারালো অস্ত্ররূপে দেখা দিতে পারে। তার উদাহরণ রয়েছে ম্যাকসিম গোর্কির &#8216;মা&#8217; নামক উপন্যাসে। তবে সর্বত্র আর্ট এই একই উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হবে বলে পূর্বস্বীকৃতি সম্পূর্ণ বাস্তবতা বর্জিত। আর্ট সম্বন্ধে এমন ধারণা পোষণ করার ফলেই সাহিত্য সম্বন্ধেও অন্য ধারণার সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক, তবে এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে সাহিত্যের রূপ।</p>
<p>সমগ্র জীবনের অন্তর্ভুক্ত একটি সত্তার যথার্থ প্রতিফলন রূপেই হোক অথবা শ্রেণী-সংগ্রামের ধারালো অস্ত্রের রূপেই হোক, সাহিত্যকে পুনঃসৃষ্টিকারী (Recreative) বা অবসর-বিনোদনের সহায়ক (Recreational) হিসেবে ধারণা করাটাও বিচারযোগ্য। শ্রেণীসংগ্রামের ধারালো অস্ত্রের মন্ত্র নিয়ে দেখা দিলেও ম্যাক্সিম গোর্কির &#8216;মা&#8217; Recreative বা পুনঃসৃষ্টকারী সাহিত্যরূপে সর্বত্র স্বীকৃত। কাজেই আর্টের সাহিত্যিক রূপের মধ্যে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে তার কার্যকারিতা এবং মানব ও মানব-মানসের উপর তার প্রতিক্রিয়া।</p>
<p><strong>এজন্যই বোধহয় ইকবাল উদাত্ত স্বরে ঘোষণা করেছিলেন:</strong> <strong>There is no opium eating in Art- অর্থাৎ আর্ট বা শিল্পের রাজ্যে আফিমের জুড়ি নেই।</strong> অর্থাং শিল্প বা সাহিত্য সম্বন্ধে পূর্ববর্তী যে সব ধারণা সাহিত্যিক মহলে প্রচলিত ছিলো এবং ইংরেজ কবি অস্কার ওয়াইল্ডের (Oscar Wilde) একটি বচনের দোহাই দিয়ে যারা বলতেন-Art for Art&#8217;s sake-শিল্পের জন্যই শিল্প—তার তীব্র প্রতিবাদ স্বরূপই ইকবাল সপ্তম সুরে বলেছিলেন-শিল্প জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মতবাদ নয়।</p>
<p>এ বাণী আজ সর্বত্রই স্বীকৃত। অস্কার ওয়াইল্ডের ধারণাটি আজ সাহিত্যিক মহলেও এতোটা প্রচলিত নেই। তবে ওস্কার ওয়াইল্ডের মন্তব্যের মধ্যেও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। আর্ট জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মানস-বিলাস নয়, জীবনের সঙ্গে তার অচ্ছেদ্য যোগাযোগ রয়েছে। তবে আর্ট আবার সেবাদাসীও নয়, আর্টের রাজ্যে তার স্বকীয়তা-স্বাধীনতাও রয়েছে। কোনো বিশেষ শ্রেণি, বিশেষ মানুষ বা বিশেষ গোত্রের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণা আর্টের কাম্য হতে পারে না। সমগ্র মানব-জীবনই আর্টের পটভূমি। এজন্যই যে ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দলের প্রচারণার মাধ্যম হয়ে আর্ট দেখা দেয়, তখন স্বস্থান বিচ্যুতির ফলে আর্ট খেলো হয়ে পড়ে।</p>
<p>সাহিত্যের মূল বিচারে আরও একটি দিক বিশেষভাবেই বিবেচনার যোগ্য। মানব-জীবন অখণ্ড ও সামগ্রিক হলেও তাতে রয়েছে বিভিন্ন বৃত্তি ও প্রবৃত্তি। সেগুলোর ধরণ অনুযায়ী পূর্বোল্লেখিত চিত্তবিনোদনকারী সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সন্তোষদান একই জাতীয় সাহিত্যের মাধ্যমে সম্ভব না। &#8216;ঠাকুরমার ঝুলির&#8217; গল্প অবোধ শিশুদের মনে আগ্রহ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করতে পারে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক লোকের কাছে তা&#8217; সর্বদাই হাসির খোরাক জোগাবে। অপরদিকে পরিণত বয়স্ক লোকেরাও Thrillers পাঠে মনের মধ্যে অভূতপূর্ব সংবেদন অনুভব করে। তেমনি পুনঃসৃষ্টকারী (Recreative) সাহিত্যের নানাদিক থাকতে পারে। মানব-মানসে নব চিন্তার উন্মেষ, নব ভাবের প্রেরণা দানে বা নব ইচ্ছাশক্তি বলে বলীয়ান করাতে এজাতীয় সাহিত্য সক্ষম হ&#8217;তে পারে। মোদ্দাকথা, মানব-মানসের প্রতিটি স্তরের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি যদি সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু হয়, তাতেই আসে সাহিত্যের সার্থকতা আর এটাই সাহিত্যের চরম উৎকর্ষতা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্পিনোজার সারবস্তু (Substance) মননশীল জগতে যে ভাবনা-চিন্তার উদ্রেকে সফল হয়েছে, জোকোবির (Jacobi) প্রার্থনা ঠিক তেমনিই ভক্তদের কাছে এক নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে। ওয়ালট হুইটম্যানের (Walt Whitman) আহ্বান তেমনি মানব মনের ইচ্ছাশক্তিকে এক অভিনব দোল দিয়েছে।</p>
<p>ব্যষ্টির দিক থেকে হোক অথবা সমষ্টির দিক থেকে হোক, সাহিত্যের সঙ্গে সমাজের রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ। সাহিত্য ব্যষ্টি বা শ্রেণীতে আনন্দ পরিবেশন করে। সাহিত্য আবার কোনো একটি বিশেষ ভাবাদর্শে মানব-জীবনকে উদ্বুদ্ধ করে। মানব-জীবন ব্যাপক হওয়ায় তার সাহিত্যেও রয়েছে ব্যাপকতা। কোথাও বা আনন্দদানকারীরূপে সে মানব-জীবনের একটি বিশেষ দিককে আনন্দ পরিবেশন করে আবার কোথাও একটি বিশেষ দিকের আদর্শের প্রতি সমাজ-মানসকে উদ্বেলিত করে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/literature-and-society/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13927</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আদালত প্রতিষ্ঠায় ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টান্ত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/exemplary-of-islamic-civilization-in-establishing-adalaat/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/exemplary-of-islamic-civilization-in-establishing-adalaat/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 19 Feb 2024 06:18:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13697</guid>

					<description><![CDATA[আল-কুরআন প্রদর্শিত জীবনযাপন করার পক্ষে কতকগুলো মূল্যবান অপরিহার্য বস্তু রয়েছে। আল-কুরআনে আল্লাহ্ সম্বন্ধে বর্ণনা প্রসঙ্গে তাঁকে সকলকিছুর সারসত্তা (Essence) হিসাবেও সকল গুণের মহান অধিকারী হিসাবে ধারণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ তিনিই সকলকিছুর মহান সৃষ্টিকর্তা। সারসত্তা হিসাবে আল্লাহ্ মানবজ্ঞানের বহু]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আল-কুরআন প্রদর্শিত জীবনযাপন করার পক্ষে কতকগুলো মূল্যবান অপরিহার্য বস্তু রয়েছে। আল-কুরআনে আল্লাহ্ সম্বন্ধে বর্ণনা প্রসঙ্গে তাঁকে সকলকিছুর সারসত্তা (Essence) হিসাবেও সকল গুণের মহান অধিকারী হিসাবে ধারণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ তিনিই সকলকিছুর মহান সৃষ্টিকর্তা। সারসত্তা হিসাবে আল্লাহ্ মানবজ্ঞানের বহু ঊর্ধ্বে বিরাজমান। তাঁর যাত সম্বন্ধে কোন মানুষের সম্যক ধারণা হওয়া সম্ভবপর নয়; একইসাথে তিনি অবাঙমানস-গোচর। তবে তাঁর গুণাবলী এ দুনিয়ার সর্বত্র রূপায়িত। এগুলো একদিকে যেমন আল্লাহর গুণাবলী বা মূল্যবান, তেমনি অপরদিকে চিন্তার মাধ্যম বা Category-ও বটে। এদের আলোকেই আল্লাহ্ সম্বন্ধে মানুষ কিছুটা ধারণা করতে সমর্থ হয়। চিন্তার মাধ্যম হিসাবে কেবল এদের সার্থকতা নয়; বরং বাস্তব জগতেও তারা সত্য বলে তাদের Subjective ও Objective দুই-ই বলা যায়। এক্ষেত্রে গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল তাঁর দ্বাদশ চিন্তার মাধ্যমকে বিষয়ীমুখ (Objective) বলে ধারণা করতেন। অপরদিকে কান্ট তাঁর দ্বাদশ মাধ্যমকে আত্মমুখ (Subjective) বলে নিশ্চিত ছিলেন। আল-কুরআনুল কারীম তাদের উর্ধ্বে অনন্য আবিষ্কার করে মানব-মন-সাপেক্ষ তাদের মর্যাদা লঘু করেনি বরং আল্লাহ্‌ গুণাবলী বাস্তব জগতেও সত্য বলে ঘোষণা করেছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এসব গুণের সংখ্যা সর্বশুদ্ধ নিরানব্বই। আর-রহমান, আর-রাহীম, আল- করীম, আস-সাত্তার প্রভৃতি আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোকে দার্শনিক পরিভাষায় মান (Values)-ও বলা যায়, আবার মানব-চিন্তার মাধ্যম(Category)ও বলা যায়। এ মাধ্যমগুলো আবার এ দুনিয়ার নানা ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত, এদের মধ্যে আবার যোগসূত্র রয়েছে। আল্লাহ্ এ দুনিয়ার সৃষ্টিকর্তা বলে প্রত্যেকটি গুণের সঙ্গে তাঁর এ সৃষ্টির গুণ অচ্ছেদ্যভাবে বিজড়িত। তিনি রহীম (দয়ালু); তবে অন্য কোন সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে তিনি দয়ালু নন। তাঁরই সৃষ্ট এ মখলুকাতে তিনি দয়ালু। তেমনি তিনি আস্-সাত্তার অর্থাৎ আচ্ছাদনকারী। তবে তাঁর এ গুণ তাঁর সৃষ্ট দুনিয়াতেই প্রকাশিত হচ্ছে। তেমনি তিনি আদিল অর্থাৎ ন্যায় বিচারক। তবে তাঁর এ বিচারও তাঁরই সৃষ্ট জগতে কার্যকরী। তাই দেখা যায় প্রত্যেকটি গুণের পটভূমিকায় আল্লাহর সৃষ্টিধর্মী গুণ &#8216;খালিক&#8217; নামক গুণ বিদ্যমান। ন্যায়বিচারের অনুষঙ্গ হিসাবে আবার নানা বিষয় উহ্য রয়েছে। &#8216;বিচার&#8217; শব্দ থেকে সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন প্রভৃতির প্রসঙ্গও আলোচনা ক্ষেত্রে দেখা দেয়। মানুষ সামাজিক জীব। সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করতে পারে না। আবার সমাজ জীবনেও অন্য দশজন থেকে পার্থক্য বজায় রাখতে না পারলে ব্যষ্টি হিসাবে তার অস্তিত্ব লোপ পায়। কাজেই তার সামাজিক বা যুথচারী প্রবৃত্তির (Gragarious instinct) সঙ্গে তার অসামাজিক (Unsocial) প্রবৃত্তির সংঘর্ষ দেখা দেয়। এ উভয় প্রবৃত্তির মধ্যে সমঝোতা সাধনের জন্য যুগে যুগে নানাবিধ বাণী নিয়ে পয়গম্বর, পীর দরবেশ, সাধু-সন্ন্যাসী আবির্ভূত হয়েছেন। আদল হচ্ছে এ দু&#8217;টো প্রবৃত্তির সামঞ্জস্য বিধানের নীতি।</p>
<p>তার উপর প্রকৃতির কোলে বিরাজমান জীব-জন্তু, গাছপালা বৃক্ষাদির যে বৃহত্তর জগৎ রয়েছে, তাদের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ নির্ণয়ও অতিশয় প্রয়োজনীয়। তাদের দান মানুষ কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে এবং প্রতিদানে তাদের কি দিতে হবে তাও নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজনীয়। কাজেই আদল বা আদালতকে ব্যাপক অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। আদলের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে এতেদাল বা সমতা। মুসলিম জীবনের নীতির উৎস আল-কুরআনুল কারীমে আদল সম্বন্ধে নিম্নোক্ত তাগিদ দেওয়া হয়েছে- &#8220;হে মু&#8217;মিনগণ! তোমরা সুবিচার প্রতিষ্ঠাকারী হও, যদি তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে অথবা তোমাদের পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হয়, তবুও যে-কোন মূল্যে ন্যায়বিচার কায়েম করো।&#8221;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>অন্যস্থলে বলা হয়েছে-</p>
<blockquote><p>&#8220;নিশ্চয়, আল্লাহ্ পাক সুবিচার ও পরোপকারের আদেশ দিচ্ছেন, আত্মীয়-স্বজনকে অর্থ সম্পদ দান করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অশ্লীল-অন্যায় কাজ সম্পর্কে তিনি নিষেধ করেছেন, তিনি তোমাদের নসিহত করেছেন, হয়ত তোমরা সে নসিহত গ্রহণ করবে।&#8221;</p></blockquote>
<p>এই আয়াতে <strong>&#8216;আমর বিল আদলে&#8217;</strong> শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, অর্থাৎ সুবিচার কায়েম করার আদেশ দিচ্ছেন আল্লাহ্ পাক।</p>
<p>এ সুবিচার আবার কুরআন প্রদর্শিত নীতির ভিত্তিতেই হওয়া চাই। প্রকৃতপক্ষে আল-কুরআন মানব-জীবনের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের জন্য যে সব নীতি প্রতিপালন করার নির্দেশ দিয়েছে, সেসব নীতি যথাযথভাবে পালন করাই ইসলামের দৃষ্টিতে আদল বা ন্যায়বিচার। এতে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে তা ন্যায় বিচারসঙ্গত বলে গণ্য হবে না। কুরআনুল কারীম প্রদর্শিত পথে এ দুনিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, তাই তিনটি ক্ষেত্রে ন্যায়-নীতির প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। প্রথমত ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবে। দ্বিতীয়ত সামাজিক জীবনে তা প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হবে, এবং তৃতীয়ত প্রকৃতি বা পরিবেশের মধ্যেও সে নীতি প্রতিষ্ঠায় তাকে অংশ গ্রহণ করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার অর্থ সংযত জীবনযাপন। আমাদের প্রত্যেককেই আল্লাহ সুবহানাহু তা&#8217;আলা-সীমা লঙ্ঘন না করতে আদেশ দিয়েছেন। তার সরল অর্থ-এই জীবনের কোন প্রবৃত্তিকেই অস্বীকার না করে-তার যথাযথ সন্তোষ-বিধান। তবে এ সন্তোষ যেন বিলাসিতায় পর্যবসিত না হয়। কামবৃত্তি মানব-জীবনে সহজাত। তাকে অস্বীকার করলে যৌন জীবনে বিকৃতি দেখা দিতে পারে। তাই ইসলাম প্রত্যেক নর-নারীকেই কতকগুলো শর্ত আরোপ করে যৌন-ক্ষুধা পরিতৃপ্তির অনুমতি দিয়েছে। তবে যাতে সর্বাবস্থায় এ স্বাভাবিক পরিতৃপ্তি অতিরিক্ত মাত্রায় যৌন বিলাসে পর্যবসিত না হয়, তার প্রতি সাবধান করে দিয়েছে। তেমনি অন্যান্য সহজাত বৃত্তি ও প্রবৃত্তির বেলায়ও যাতে সন্তোষ বিধানের সীমা লঙ্ঘন করা না হয় তার নির্দেশ দিয়েছে। সামাজিক আইন-কানুনগুলো মানব-জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম বলে আল-কুরআন পরিষ্কার ভাষায় তা পালনের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের বিশেষত্ব এই যে, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যে কোন পার্থক্য স্বীকার করা হয়নি। যা ব্যক্তিগত জীবনে পরিহার্য, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও অপরিত্যাজ্য। এই জন্যই আদল বা ইতেদাল একই সূত্র অবলম্বন করে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি জীবনের নানাবিধ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>হযরত রাসূলে আকরাম (সা)-এর জীবনে আদালত প্রতিষ্ঠার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবনে, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের জীবনে সে প্রচেষ্টার নিদর্শন পাওয়া যায়। উমাইয়া বা আব্বাসীয় শাসনকর্তাদের জীবনে এবং মোঘল ও উসমানী সুলতানদের মধ্যেও আদালত প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে আরও প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে, মুসলিমদের আধিপত্যের সময় শাসন বিভাগ (Executive), বিচার বিভাগ থেকে সব সময়ই পৃথক ছিল। কাযীর বিচার এখনও জনসমাজে আদর্শ হিসাবেই পরিগণিত। হযরত রাসূলে আকরাম (সা)-এর জীবনে আদল বা ন্যায়বিচারের প্রতি কি অপরূপ নিষ্ঠা ছিল, তা একটিমাত্র উদাহরণেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। একদা বনি মঞ্জুম গোত্রের একজন মহিলাকে চুরির অপরাধে প্রিয় নবী (সা)-এর দরবারে হাজির করা হলো। তিনি চুরির শাস্তি হস্ত-কর্তনের আদেশ দিলে তাঁর সমীপে সেই মহিলাকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা হিসাবে রেহাই দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রিয় নবী (সা) তখন রাগান্বিত হয়ে আল্লাহর শপথ করে বলেছিলেন- “যদি আমার কন্যা ফাতেমাও এই অপরাধ করতো, তবে আমি তাকেও অনুরূপ শান্তি দিতাম।” আর একবারের ঘটনা, প্রিয় নবী (সা)-এর দরবারে জনৈক ইহুদী একজন মুসলমানের বিরুদ্ধে নালিশ করলো। তিনি সত্য ও ন্যায়ের খাতিরে সে ইহুদীর পক্ষে রায় দিয়ে সুবিচার কায়েম করার ক্ষেত্রে এক অনুপম আদর্শ স্থাপন করেছেন। প্রকৃতিতে অবস্থিত নানাবিধ জীব-জন্তুর সঙ্গে কিভাবে ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার করতে হয় তারও উদাহরণ রাসূল (সা)-এর জীবন থেকে পাওয়া যায়। একদা এক সাহাবী কয়েকটি পাখীর ছানা খুব উল্লাসের সঙ্গে হযরতের জন্য নিয়ে এলেন। পক্ষী-দম্পতি ছানার মায়ায় তাকে অনুসরণ করে হযরতের কাছেই এসে করুণ বিলাপ জুড়ে দেয়। রাসূলে আকরাম (সা) রাগান্বিত হয়ে ছানাগুলোকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য সঙ্গে সঙ্গেই আদেশ দিলেন। এতে বুঝা যায়, অনর্থক কোন প্রাণীকেও কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবনে সেই আদল প্রতিষ্ঠার জন্যই ঐকান্তিক আগ্রহ &#8211; দেখা দেয়। রাসূলে আকরাম (সা)-এর ইন্তেকালের পর ইয়ামেনের অধিবাসীরা যাকাত আদায় করতে বিরত হলে প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন অর্থাৎ ইসলামের একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গকে পরিত্যাগ করায় এদের শাস্তি দেওয়া অবশ্য কর্তব্য বলেই গণ্য করেন। <strong>তেমনি রাসূলে আকরাম (সা)-এর ইন্তেকালের পরে তাঁর একমাত্র কন্যা হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রা) খায়বার ও ফিদক বা ফাদাকের সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসাবে দাবি করলে তিনি তাঁর এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমি রাসূলে আকরাম (সা)-কে বলতে শুনেছি, নবী-রসূলদের কোন উত্তরাধিকারী নেই।”</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা)-এর জীবনে আদল প্রতিষ্ঠার নীতি বিশেষভাবেই ফুটে উঠেছে। তাঁর গোটা জীবন-ই আদলের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। সদ্য ধর্মান্তরিত মুসলিম নরপতি জাবলা হজ্জ উপলক্ষে তাওয়াফকালে এক দরিদ্র বৃদ্ধের আঘাত লাগে; তাতে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে ঐ বৃদ্ধকে চপেটাঘাত করেন। হযরত উমর এই অন্যায়ের জন্য তাকে শাস্তি দিতে মনস্থ করেন। তার জন্য সমর-সভা (War Council)-এর সকলেই ইসলামের শৈশবাবস্থা স্মরণ করে এই আসন্ন সংগ্রাম থেকে খলিফাকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু খলিফা তাঁর সংকল্পে অচল ও অটল রইলেন।</p>
<p>নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তি যে পদের-ই অধিকারী হোক না কেন, তাকে শাস্তি দিতে কোনদিনই খলিফা উমর (রা) ইতস্তত করেন নি। তিনি যখন শুনতে পেলেন যে, পারস্যের বিলাসিতা গভর্নর সা&#8217;দকে স্পর্শ করেছে এবং তিনি একটি প্রাসাদ তৈরি করে তাতে খসরুর প্রাসাদ থেকে একটি তোরণ এনে সংযোগ করেছেন, তিনি তৎক্ষণাৎ লিখে পাঠালেন, “আমি শুনতে পেলাম তুমি খসরুগণের অনুকরণ করে নিজের ব্যবহারের জন্য অত্যুচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছ এবং তাতে একটি কপাট এনে লাগিয়েছ। তোমাদের উদ্দেশ্য পারস্য সম্রাটগণের মত দ্বারবান (প্রহরী) রাখা তাতে বিচার ও সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তিদের বিঘ্ন ঘটবে। তুমি এভাবে হযরত (সা)-এর পথ ত্যাগ করে খসরুগণের পন্থা অবলম্বন করছ। মনে রাখবে, খসরুগণ প্রাসাদ থেকে গিয়ে কবরে বিলুপ্ত হয়েছে, আর হযরত (সা) তাঁর সামান্য কুটির হতে সর্বোচ্চ বেহেশতে আরোহণ করেছেন। আমি মুহাম্মদ বিন মুসলিমকে তোমার প্রাসাদ ধ্বংস করতে আদেশ দিয়েছি। এ দুনিয়ায় দুটো ঘরই তোমার জন্য যথেষ্ট-একটি বাসগৃহ অপরটি খাজাঞ্চিখানা।” আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত দিয়ে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর আদল প্রতিষ্ঠার প্রতি অবিচলিত শ্রদ্ধার প্রমাণ পেশ করা যেতে পারে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.), আমির মুয়াবিয়া, আর ইবনুল-আস ও মারওয়ানের পরামর্শে পরিচালিত হতেন বলে একটি শ্রুতি এখনও চলতি রয়েছে। তবে জীবনের অন্তিম সময় তিনি আত্মোৎসর্গ করে প্রমাণ করেছেন যে, ন্যায়-বিচারকেই তিনি আদর্শ নীতি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। মারওয়ানের শঠতায় যখন মিসরের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের প্রাণ সংশয় দেখা দিয়েছিল তখন ক্ষিপ্ত বনু হাশিম সম্প্রদায় তাঁর জন্য মারওয়ানের প্রাণের দাবি করেছিলো। ইসলামী বিধান মতে তিনি তাদের এ প্রস্তাবে সম্মত হননি বলে অকস্মাৎ ঝড়ের বেগে বনু হাশিম গোত্রের লোক তাঁকে আক্রমণ করে বসে। তিনি ইচ্ছা করলে বনু উমাইয়া গোত্রের লোকদের আহ্বান করে মহাযুদ্ধের সূচনা করতে পারতেন; তবে যাতে মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দের খুনে মদীনার মাটি তাঁর ওসিলায় রঞ্জিত না হয়, এ জন্য তিনি নিজে শাহাদাত বরণ করেন। আদল প্রতিষ্ঠায় অপারগ হয়ে এরূপভাবে শাহাদাত বরণ আদল প্রতিষ্ঠারই এক অতি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।</p>
<p>মহান খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর জীবনে আদল প্রতিষ্ঠার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক দিন খলিফা আলী (রা) খুতবা পাঠ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি আপতিত হল পুত্র হাসান ও হুসেনের দেহের উপরে। তাঁরা দামী চাদর পরিধান করে মসজিদে আগমন করেছেন। খলিফা খুতবা দানে ক্ষান্ত হলেন। তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ চাদর তাঁরা কোথায় পেয়েছেন। তিনি অবগত হলেন কোন এক ধনী ব্যক্তি তাঁদেরকে এগুলো উপঢৌকন দিয়েছে। চাদর দু&#8217;টি সঙ্গে সঙ্গেই হাসান (রা) ও হুসেন (রা)-এর দেহ হতে অপসারিত হয় এবং বায়তুল মালের খাজাঞ্চির হাতে চলে যায়। হযরত আলী (রা)-এর একটি লৌহবর্ম ছিল। সিফফিনের যুদ্ধে বর্মটি হারিয়ে যায়। কিছুকাল পরে লৌহ বর্মটি কুফায় এক ইহুদীর পরিধানে লক্ষ্য করেন। তিনি তাকে বলেন এ বর্মটি আমার। ইহা আমি বিক্রয় করিনি বা কাউকে দেইনি। তুমি এ বর্ম কোথায় পেলে? ইহুদী জবাব দিল যে, বর্মটি তারই। অগত্যা খলিফা কুফার কাজী শারিহ-এর আদালতে মামলা দায়ের করেন। কাজী খলিফাকে তাঁর পক্ষের সাক্ষী উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলে, তিনি পুত্র হাসান (রা) ও ভৃত্য কাম্বারকে কোর্টে হাজির করেন। দু&#8217;জনেই বর্মটি ভালভাবে চিনতেন। কিন্তু কাজী দু&#8217;জনের সাক্ষ্যই অগ্রাহ্য করলেন। কারণ, একজন বাদীর পুত্র ও অপরজন বাদীর ভৃত্য। বিচারে পরাভূত হয়ে খলিফা বিনা বাক্য-ব্যয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। আইন-আদালতের প্রতি মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য ও কাজীর নিরপেক্ষ বিচারে ইহুদী অভিভূত হয়ে যায়। সে খলিফার নিকট অপরাধ স্বীকার করে বর্মটি ফিরিয়ে দেয়, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ইসলামী জীবনে দীক্ষা গ্রহণ করে। কোন এক জিহাদে একজন ইহুদীকে পরাভূত করে হযরত আলী (রা) তার বুকে সওয়ার হয়ে যখন তার গলায় খঞ্জর হানতে চাইলেন; তখন সে ইহুদী তাঁর মুখে থুথু নিক্ষেপ করলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাকে কেন মারলেন না-এ প্রশ্ন যখন সে করলো। তখন তিনি জওয়াব দিলেন-এখন তোমাকে মারলে ব্যক্তিগত জিঘাংসার বশবর্তী হয়েই মারবো, এটি আমাদের দীনের বহির্ভূত। আগে তোমাকে মারতে চেয়েছিলাম আল্লাহর দীনের প্রতিকূলতা দূর করবার জন্য। তাঁর এ আচরণে মুগ্ধ হয়ে ইহুদী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাঁকে লক্ষ্য করে একদিন উসমান ইবনে হানিফ বলেন, “আপনি বিত্ত-সম্পদের সমবণ্টন নীতি অনুসরণ করেছেন। এ নীতির মাধ্যমে আপনি সমাজের মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামিয়েছেন, নিগ্রো এবং পারসিয়ানদেরকে সমান মর্যাদা দিয়েছেন। আপনি দাস ও মালিককে বায়তুলমাল হতে সমপরিমাণ অংশ দিচ্ছেন, ধনীদেরকে তাদের জায়গীর হতে বঞ্চিত করছেন, তাদের বিশেষ মর্যাদা লোপ করছেন। এ নীতির দ্বারা আপনি খিলাফতের ও নিজের কল্যাণের চেয়ে সর্বনাশকেই ডেকে আনছেন। আর এ কারণেই প্রভাব ও সম্পদশালী আরবগণ আপনাকে পরিত্যাগ করে আমীর মুয়াবিয়ার দলে যোগ দিচ্ছে। দরিদ্র, অক্ষম লোকজন আপনার কোন উপকারই করতে পারবে না। অসহায় বিধবা ও দাসগণ আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারবে না।” খলিফা প্রত্যুত্তরে বলেন-“অসম ধন বণ্টনের মাধ্যমে আমি এক বিত্তশালী সম্প্রদায় সৃষ্টি করে তাদের দ্বারা শোষণের পথ প্রশস্ত করতে পারি না। সমাজের এক শ্রেণি কর্তৃক অপর শ্রেণির শোষণের কোন পন্থাই আমি মুহূর্তের জন্যও অনুমোদন বা বরদাশত করতে পারি না।” খারেজি আবদুর রহমান ইবনে মুলজামের আঘাতে কুফার মসজিদে ধরাশায়ী হয়েও তিনি তাঁর অন্তিম উপদেশে বলেছিলেন, “আমার মৃত্যুর পর খারেজিদের সন্ধানে ও হত্যার মানসে ধাবিত হয়ো না। পাপ-পঙ্কিল জীবনযাত্রা এবং মানবতা বিরোধী কার্যকলাপে জীবন অতিবাহিত করার চেয়ে সত্য পথ অনুসন্ধানে বহির্গত পথভ্রষ্ট হওয়া শ্রেয়।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>সাহাবিদের অন্যতম প্রধান ছিলেন হযরত আবু যর গিফারী (রা)। তাঁর আদল বা ন্যায়নিষ্ঠা ছিল অতি-মানবিক। খলিফা উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতের সময় এক ব্যক্তি চুরি ও নরহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে প্রাণ দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হয়। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ করা হয়েছে, মদিনার এক ফলের বাগানে একটি চোর প্রবেশ করে ফলাদি চুরি করতে আরম্ভ করলে বাগানের মালিক তার পুত্রগণসহ চোরকে তাড়া করলে সে দৌড়ে বাগানের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করে। প্রবেশ পথে বাগানের মালিক তাকে ধরে ফেলে। তবু চোর ঝাপটা-ঝাপটি করে তাকে ফেলে দিয়ে চলে যায়। এতে বাগানের বুড়ো মালিকের মৃত্যু হয়। তখন সময় ছিল ভোর বেলা। ফজরের আযান শুনে মুসল্লিগণ নামায আদায় করার উদ্দেশ্যে মসজিদে রওয়ানা হচ্ছেন, এমন সময় ঐ চোর মালিককে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করলে সকলে মিলে চোরকে ধরে ফেলে। চোর কিন্তু অপরাধ স্বীকার না করে বলে, প্রকৃত চোর আগেই পালিয়ে গিয়েছে। আসল চোর পালাবার সঙ্গে সঙ্গে এসে উপস্থিত হওয়ায় তাকে চোর বলে ভ্রম হয়েছে। যারা তাকে পাকড়াও করেছে তারা কিন্তু সকলেই এক বাক্যে তাকেই চোর বলে সাব্যস্ত করে সাক্ষ্য প্রদান করে। কাজেই চুরি ও হত্যার অপরাধে খলিফা উমর (রা) তার প্রাণ দণ্ডাদেশ দেন। লোকটির বাড়ি ছিল সিরিয়ার পথে। সে মদিনায় এসেছিল কোন কাজ উপলক্ষে। তাই খলিফাকে মিনতি করে বলে, “আমি তো চুরি করিনি; তবু যে কোন কারণেই হোক চোর বলে সাব্যস্ত হয়েছি, আমাকে সময় দিন। আমি বাড়িতে গিয়ে আমার শাস্তির কথাটা বলে আমি আমার অবর্তমানে ওরা কিভাবে চলবে তাও তাদের কাছে বলে আসি।” মহান খলিফা তার উত্তরে বলেন, “এভাবে খুনের আসামীকে তো মুক্তি দেওয়া যায় না-তুমি যে আবার ফিরে আসবে তার কোন প্রমাণ নেই। তুমি যদি উপযুক্ত ও বিশ্বাসী লোককে জামিন দিতে পারো-তাহলে তোমাকে সুযোগ দেওয়া যায়।”</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ লোকটার জামিন কে হবে? যদি সে ফিরে না আসে তবে তার পরিবর্তে জামিনদারকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে। কেউই এগিয়ে এলো না। বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হযরত আবু যর গিফারীর (রা) লোকটার বিবরণ শুনলেন। তার মুখ দেখে তার কথায় আস্থা স্থাপন করে তিনি এগিয়ে এসে বললেন-“আমি এ লোকটার জামিন হতে রাযী আছি।” তাঁকে এ জামানতের মর্ম সম্যকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি অবিচলিতভাবে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করলেন। লোকটার জামানত মঞ্জুর করা হল এবং তাকে দেশে যেতে অনুমতি দেওয়া হল। নির্ধারিত তারিখে ও সময়ে ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হল। লোকটার কিন্তু কোন পাত্তাই নেই। অগত্যা হযরত আবু যর গিফারী ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করে খলিফার আদেশ প্রতিপালন করার জন্যে প্রস্তুত হলেন। তবে সকলে একটু সময় অপেক্ষা করতে খলিফাকে অনুরোধ করেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কিছু সময় পরে দেখা গেল বহু দূরে একটি ইঁদুরের মত জীব মদিনার দিকে এগিয়ে আসছে। তারপর সে জীবটাই আরও বড় হয়ে বকরির আকারে দেখা দিল। কিছু সময় পর দেখা গেল এটি বকরি নয় ঘোড়া। দেখতে দেখতে প্রকাণ্ড আরবী ঘোড়ায় চড়ে লোকটি উপস্থিত হয়ে ঘোড়া থেকে নেমেই ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত হয়ে জল্লাদকে কাজ সমাধা করতে অনুরোধ করে। জল্লাদ প্রস্তুত হতে না হতে, প্রকৃত চোর বেরিয়ে এসে বলে- “এই লোকটি নিরপরাধ, আমিই প্রকৃত চোর; তবে আমি চুরি করার অবসর পাইনি। ওরা বাপ বেটা বেরিয়ে এসে আমায় তাড়া করলে আমি দৌড়ে পালিয়ে যাই। বুড়া আমার পথ আগলালে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাতেই তার মৃত্যু হয়।” চোরের এভাবে আত্মপ্রকাশ করায় নিহত ব্যক্তির ছেলেরা মুগ্ধ হয়ে তাকে মাফ করে দেয়। এমন ভাবে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন রক্ষা পায়। হযরত আবু যর গিফারী তার জন্য জামিন না হলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে লোকটির ফাঁসি হয়ে যেত এবং খলিফার তরফ থেকে ইনসাফের ত্রুটি দেখা দিত। এজন্যই হযরত আবু যর গিফারী স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে জামিন হয়ে এ পরিস্থিতিতেও আদল প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিলেন।</p>
<p>উমাইয়াদের শাসনকালের সূচনায় মুসলিমেরা ক্রমশই ইসলামের প্রতি বিমুখীতার ভাব প্রদর্শন করলেও তাদের মধ্যে কারো কারো জীবনে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি যে শ্রদ্ধা ছিল আজকার দিনে তা দুর্লভ। আমীর মুয়াবিয়াকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ইসলাম জগতে শাহানশাহী আমদানী করার জন তাকে দায়ী করা হয়। অথচ তার মধ্যেও আদলের অভাব ছিল না। সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষে জারকা বিনতে ওহী নাম্নী একজন মহিলা প্রচণ্ডতম সংগ্রাম করে মুয়াবিয়ার সেনাদলতে পর্যুদস্ত করলেও আমীর মুয়াবিয়া পরবর্তীকালে রাজাধিরাজের ক্ষমতালাভ করেও তার কোন ক্ষতি করেন নি; বরং বন্ধুগণের নিকট তার প্রশংসা করেছেন। তাকে দামেশকে ডেকে এনে তার কটুক্তি শ্রবণে ক্রুদ্ধ না হয়ে তাকে পুরস্কৃত করেছেন।</p>
<p>আমীর মুয়াবিয়ার দক্ষিণ হস্ত স্বরূপ আমর ইবনুল-আস্ ইসলাম জগতে নানাবিধ ইসলাম বিরোধী প্রথার প্রবর্তন করলেও মিসরের গভর্নর থাকাকালীন সময়ে তাঁর সুবিচারের জন্য তিনি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তাঁর অবস্থানকালে একদল লোক খ্রিস্টানদের উপাস্য একটা পাথরের মূর্তির নাসিকা ছেদন করেছিল। তাদের পাদ্রী এ অপরাধের জন্য আমর ইবনুল আস (রা.)-এর কাছে বিচারপ্রার্থী হলে তিনি সাক্ষী আনবার জন্য পাদ্রীকে বলেন। এ ঘটনার কোন সাক্ষী ছিল না, তাই অপারগ পাদ্রী বিরক্ত হয়ে বলেন, “এভাবে আমাদের উপাস্য মূর্তির অবমাননা হলে আমরা কিভাবে ধর্ম পালন করতে সমর্থ হব?”</p>
<p><strong>আমর তার এ তিক্ত মন্তব্য শুনে একখানা থালা ও একখানা ধারালো ছুরি আনবার আদেশ দেন। ধারালো ছুরিখানা পাদ্রীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, “আমার কর্তৃত্বাধীন রাজ্যে যখন এমন অঘটন ঘটেছে, তখন আপনাদের মূর্তির নাসিকা কর্তনের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আমার নাসিকা কর্তন করে নিন।”</strong> বলা বাহুল্য, পাদ্রী ও তার অধীন খ্রিস্টান সমাজ তার এ আদেশ পালন করেনি। তবে তাঁর এ সুবিচার তারা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উমাইয়াদের পতনের পর বাগদাদে আব্বাসী খিলাফতের প্রতিষ্ঠার পর আব্বাসী শাসনকর্তাদের আচরণে ইনসাফ ও আদলের প্রতি নিষ্ঠা দেখা যায়। আল-মনসুরের মত শাসনকর্তাও কুফার কাজীর সমন(নথি) পেয়ে আদেশ পালন করতে পরানুখ হননি। পূর্বেই বলা হয়েছে, ইসলামে শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক থাকায় ব্যক্তিগত অভিযোগের প্রতিকারকল্পে সবসময়ই সুবিচার হত। তারও পরে মোঘল সুলতানেরা ভারতে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলা অঞ্চলের অন্যতম শাসক গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের নাম এ অঞ্চলে সুবিদিত, তিনি যে কিভাবে সাধারণ অপরাধীর মত এক নিরপরাধ বিধবার ছেলেকে হত্যা করার অপরাধে কাজীর আদালতে উপস্থিত হয়ে দোষ স্বীকার করেছিলেন, তা আজ এ অঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে প্রচারিত।</p>
<p>মোঘল সুলতান জাহাঙ্গীর নানা ভুল কাজকর্মে লিপ্ত থাকলেও ইনসাফের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও কঠোর। ইতিহাস আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে, দিল্লী, আগ্রা, লাহোর অথবা যে কোন স্থানে তিনি উপস্থিত থাকুক না কেন, তার দুর্গের একপাশে একটি ঘণ্টা বাঁধা থাকতো। কোন মজলুম সে ঘণ্টায় ধ্বনি তুললে তিনি স্বয়ং বের হয়ে এসে তার অভিযোগ শুনতেন। একদা সুদূর বাঙাল মুলুক থেকে এক মজলুম পিতা গিয়ে অভিযোগ করে যে তৎকালীন বাঙলার নওয়াব ফয়েজ উল্লাহ নগর পরিক্রমণ কালে তার শিশু পুত্রকে হস্তী পদতলে পিষ্ট করেছেন। শাহানশাহ্ অভিযোগ শোনামাত্রই কাসেদ মারফত ফয়েজ উল্লাহকে তলব করেন। তিনি তলব পাওয়ামাত্রই শাহানশাহের দরবারে উপস্থিত হননি। তারপরে এক সাময়িক কর্মচারীর মারফতে সংবাদ দিলে তিনি দিল্লীতে উপস্থিত হয়ে যমুনার অপর পারে তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিতে আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত রইলেন। পরদিন প্রভাতে সুলতানের সঙ্গে মোলাকাত করবেন বলে তাঁর মতলব ছিল। তবে সুলতান তাঁকে সে অবসর দেননি। তার আগমন সংবাদ শুনেই মজলুম পিতাকে হাতির উপর তুলে সুলতান এক সামরিক অফিসারকে নওয়াব ফয়েজ উল্লাহর শিবিরের উপর হস্তী চালনা করতে নির্দেশ দিলেন। বলা বাহুল্য, ফয়েজ উল্লাহ যেভাবে ছেলেটিকে হত্যা করেছিলেন সেভাবেই তিনি মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হলেন। এভাবে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস থেকে বিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। মুসলমানেরা ইসলামী নীতি থেকে ধীরে ধীরে বহুদূরে সরে যাওয়ায় এক দিকে যেমন ইসলামী জীবন পদ্ধতি তাঁদের জীবনে কার্যকরী থাকেনি, তেমনি আদালত ও ইহসান তাঁদের জীবন থেকে অন্তর্হিত হয়েছে!</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/exemplary-of-islamic-civilization-in-establishing-adalaat/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13697</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী চিন্তাধারার মূল্যমান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/values-of-islamic-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/values-of-islamic-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[দেওয়ান মোহাম্মাদ আজরফ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 05 Mar 2021 05:29:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4182</guid>

					<description><![CDATA[এক. অখণ্ড সামগ্রিক সত্তা হিসাবে এর মধ্যে এক অনিবার্য গতি আছে বলেই সে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে অপ্রতিহত শক্তিতে অগ্রসর হচ্ছে এবং মৃত্যুতে তার জীবনের লয় হয় না বরং জীবন অন্যরূপে রূপান্তরিত হয়। যে মূল্যমানবলে এ জীবনে মহত্তর বলে]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>এক.</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অখণ্ড সামগ্রিক সত্তা হিসাবে এর মধ্যে এক অনিবার্য গতি আছে বলেই সে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে অপ্রতিহত শক্তিতে অগ্রসর হচ্ছে এবং মৃত্যুতে তার জীবনের লয় হয় না বরং জীবন অন্যরূপে রূপান্তরিত হয়। যে মূল্যমানবলে এ জীবনে মহত্তর বলে পরিগণিত, জীবনান্তরে মানুষ তাদের মধ্যে সে মহত্তর গুণেরই সন্ধান পাবে ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিভিন্ন স্থানে “মূল্যমান” শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। কথাবার্তায় বা অর্থনীতি শাস্ত্রে ‘মূল্য’ শব্দটি কোন বস্তুর দাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রায়োগিক উপযোগিতা ব্যতীত নানাবিধ দৃশ্য ও সুরকে মূল্যবান বলে গ্রহণ করা হয়। কারণ, সেগুলো মানব-মানসে সুখদায়ক সংবেদনের সৃষ্টি করে। গোলাপকে অথবা কোন সঙ্গীতের সুরকে মূল্যমান বলা হয়, কেননা তাদের দ্বারা আমাদের মানসে প্রীতিকর সংবেদনের উৎপত্তি হয়। এগুলো ব্যতীত ন্যায়-বিচার, দান, প্রেম, দয়া, সহানুভূতি প্রভৃতিকেও মূল্যমান বলা হয়। এগুলোর মাধ্যমে প্রীতিপ্রদ সংবেদনের উৎপত্তি হয় না সত্যি, তবুও সমাজ জীবনের সুষ্ঠু গতি ও উর্ধ্বতনের জন্য ওগুলোকে অপরিহার্য বলে গণ্য করা হয় ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বুদ্ধিবৃত্তিক বিচারে ঐক্য, সংহতি ও সুসামজ্ঞকে মূল্যমান বলে গণ্য করা হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এগুলোর উদ্ভব হয়েছে, এবং চিন্তারাজ্যে তাদের উচ্চতর মূল্যমান বলে গণ্য করা হয়। আধুনিককালে এসব মূল্যমানকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়।</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> বুদ্ধিজাত</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> সৌন্দর্যভিত্তিক</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> নৈতিক</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এ তিন বিভাগে তারা বিভক্ত। ধর্ম জগত ও দর্শনের আলোচনায় দেখা যায় এগুলোর মানব-মানসে ক্রমশ অভ্যুদয় হয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনেরও প্রয়াস হয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রাচীনকালের দর্শনের আলোচনা করলে দেখা যায়, প্লেটোর দর্শনের পূর্ববর্তী চিন্তানায়কদের ধ্যান-ধারণাজাত অবদানের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করা হয়েছে। তার ফলে মানবজাত সৌন্দর্য বৃত্তিজাত ও নৈতিকজ্ঞান-সঞ্জাত মূল্যমানের সমন্বয় তাতে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যায়, ভগবানের ধারণার মধ্যে বিভিন্ন যুগে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে এবং তার কারণ রয়েছে বিভিন্ন কালের মূল্যমানের উৎপত্তিতে সত্য, শিব ও সুন্দরকে এখন সর্বপ্রধান মূল্যমান হিসাবে গণ্য করা হয়। তবে এগুলো হঠাৎ এসে মানব-মানসে উপস্থিত হয়নি। এগুলোর আবিষ্কারে মানব-মন দীর্ঘকাল নিয়োজিত ছিল। এ সবের আলোকে ভগবানের ধারণাকে পুনর্গঠনে দীর্ঘতর কাল অতিবাহিত হয়েছে এ ক্ষেত্রেও ভাববার বিষয় এই, এসব অতি প্রয়োজনীয় মূল্যমানকে সমান মর্যাদা দান করা হয়নি। কোথাও সত্যের উপর, কোথাও সৌন্দর্যের উপর, আবার কোথাও শুভ বা শিবের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সম্বয়ের সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করা হয়েছে সত্যি, তবে সে সমন্বয় স্থায়ী হয়নি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সৌন্দর্যজ্ঞানের তরফ থেকে সৌন্দর্যকে চরম মূল্যমান বলে রোমান্টিক যুগের কবিরা ধারণা করেছেন। সে যুগের প্রতিনিধি স্বরূপ কীটস ঘোষণা করেছেন, ‘সৌন্দর্যের আধার বিষয়বস্তু চিরন্তন আনন্দ স্বরূপ ‘(A thing of beauty is a joy for ever)’।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে-এ উক্তির মধ্যে দুর্বলতা দৃষ্ট হয়। মানব মানসে ইতিহাসের সূক্ষ্ম আলোচনা করলে দেখা যায়, কোনো এক বিশেষ শ্রেণির মূল্যমানকে প্রাধান্য দেওয়ার মূলে রয়েছে মানব ব্যক্তিত্বের খণ্ডিতকরণের ফল। ধর্মজীবনের বৈশিষ্ট্য এই যে, এতে মানবজীবনের প্রত্যেকটি দিকে সন্তোষ দানের চেষ্টা রয়েছে । ধর্মীয় মূল্যমানের ক্রমবিকাশের ইতিহাস পাঠে দেখা যায় এতে ঐক্য, ন্যায়-বিচার ও প্রেম একে একে অভ্যুদিত হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে অন্য মূল্যমানগুলো এদের পরে বিবর্তিত হয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ভগবানের ধারণারই আলোচনা করা যাক। সর্বপ্রথম Animism, তারপর বহু দেবতাদের Polytheism স্তর থেকে দ্বৈতবান ও সর্বশেষে একেশ্বরবাদের উৎপত্তি হয়েছে মানব জীবনে। বিচার-বুদ্ধির উৎপত্তিতে মানুষ স্পষ্টই বুঝতে পারে, গাছ, বৃক্ষ পাথর অথবা প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী স্বয়ংনির্ভর নয়। তারা সামাজিক মানুষের মত পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। এজন্য মূলে মানুষ বহু দেবতাবাদে দীক্ষা গ্রহণ করে বহু দেবতাবাদের প্রাকৃতিক আইন-কানুন ও শক্তিগুলোকে স্বতন্ত্র দেবতা হিসাবে পূজা করার নীতি গ্রহণ করা হয়। তবে বহু দেবতাবাদে ঐক্য ও ন্যায়নীতি নামক মূল্যমানের সন্তোষ বিধান সম্ভবপর হয়নি পরস্পরের সঙ্গে কোন্দলরত বহু দেবতাদের কি করে পূজা করা যায়? কিসেই বা তাদের সমান করা সম্ভবপর? এজন্য-ই বহু দেবতবাদ দ্বৈতবাদে পরিণত হয়। এ নতুন ধর্মের আবিষ্কারক জরথুস্ত্রই দুজন পরস্পর-বিরোধী দেবতার ব্যক্তিত্বে, মঙ্গল ও অমঙ্গলের সবগুলো গুণ একত্রিত করে তাদের স্বকীয় আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আহরা-মাজদার মধ্যে রয়েছে সবগুলো মহৎ গুণের সমাবেশ। তিনি এ দুনিয়াকে মহত্তর পর্যায়ে উত্তোলন করতে সতত প্রয়াসী। আহরিমান কিন্তু সর্বদাই এ দুনিয়াকে অতল তলে তলিয়ে দিতে তৎপর। তবে এ ধর্মে ধারণা করা হয় পরিশেষে আহুরা- মাজদার জয়ই অনিবার্য। তার ফলে তৎকালীন মূল্যমানগুলোর বিচার ও পুনর্গঠনও অনিবার্য হয়ে পড়ে যদি সত্যিই মহৎ গুণের প্রতিষ্ঠাতা আহরা-মাজদার জয়ই হয় এবং অমঙ্গল বিধানকারী আহরিমনের পরাজয় হয়, তাহলে একই ভগবানের দুটো গুণের দ্বারা তা বাস্তবায়িত হবে না কেন? তিনিই-তো এ পরস্পর বিরোধী গুণাবলীর আধার রূপে তাদের একটির অপরটির নিরসন সম্পন্ন করতে পারেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিশ্বের চিন্তাধারায় ইসলামের বিশিষ্ট অবদান হচ্ছে এই ইসলাম মানব জীবনকে দ্বিখণ্ডিত করেনি। এতে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক বলে দু’টো বিভাগ ইসলামে জীবনকে ধারণা করা হয়েছে। </span></p>
<p><strong>দুই.</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইসলামী চিন্তাধারার মূল উৎস আল-কোরআন। কোরআনের সূরা থেকেই আল্লাহ সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ ধারণা গ্রহণ করা হয়েছে। এ আল্লাহর ধারণা থেকে ইসলাম-জগতে অন্যান্য মূল্যমানের উৎপত্তি হয়েছে ফলে এ ধারণার মধ্যেই মূল্যমানগুলো উহ্য ছিল বলে স্বীকার করে নিতে হয়। তবে স্বয়ং আল্লাহ-ই আল কোরআনে মানুষকে চেষ্টা করে হিকমত বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করতে এবং প্রকৃতি ও ইতিহাস থেকে জ্ঞানার্জন করার জন্য আদেশ করেছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আল্লাহর ধারণা থেকে মুসলিম চিন্তানায়কেরা বহু সিন্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং বহু মূল্যমান স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁরা আল-কোরআনের নির্দেশ মত প্রকৃতি ও ইতিহাসের ধারা পাঠ করেছেন তার ফলে মুসলিম-জীবনে বহু মূল্যমানের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের যথাক্রমে কোরআনিক ও মৌলিক মূল্যমানগুলোর সঙ্গে কোরআনিক মূল্যমানের কোন সংঘর্ষ দেখা দেয়নি। বরং, তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, ব্যক্তিগত গবেষণাপ্রসূত মূল্যমানগুলো ছিল কোরআনিক মূল্যমানের সহায়ক ও দীর্ঘস্থায়িত্ব দানে সম্পূরক।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ কথা অবশ্য ঐতিহাসিক সত্য যে, ইসলাম গ্রীক চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসেছিল তার ফলে মুসলিমেরা ইসলামকে যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এ সংযোগের পূর্বে মুসলিম জগতে কতকগুলো রাষ্ট্র নৈতিক মূল্যমানের অভ্যুদয় হয়েছিল। আধুনিক জগতে প্রজাতন্ত্রকে সর্ব সাধারণ মানুষের জন্মগত অধিকার বলে স্বীকার করা হয়। একে গ্রীক চিন্তাধারার অবদান বলেই গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় এই- গ্রীকদের সভ্যতায় যে গণতন্ত্র দেখা দিয়েছিল তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত অপরিসর। ফরাসী রাষ্ট্র-বিপ্লবে তা আবার পুনর্জীবন লাভ করে। তবে পরবর্তীকালে এ গণতন্ত্রে তার মূল আত্মাই বিনষ্ট হয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রকৃত গণতন্ত্রের কিছুটা সন্ধান পাওয়া যায় খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে বিশেষ করে দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুক (রা)-এর শাসনকালে। যদিও প্রচলিত প্রথায় খলীফাকে হয়ত বা নির্বাচিত অথবা মনোনীত করা হতো, বাইয়াত প্রথাতে প্রমাণিত হয় খলীফার নির্বাচন বা মনোনয়ন সর্বসাধারণ মুসলিম কর্তৃক গৃহীত হওয়া প্রয়োজনীয় ছিল। এতে প্রমাণিত হয় খিলাফতের ভিত্তিমূলে খলীফার জনপ্রিয়তা থাকা অত্যাবশ্যক। খলীফা নির্বাচন সংক্রান্ত হযরত উমরের নির্দেশে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, গণতন্ত্রই সে সুবর্ণ যুগে মুসলিমদের আদর্শ ছিল। এতে ফরমান জারি করা হয়েছে-</span></p>
<blockquote><p><i><span style="font-weight: 400;">“যদি কেউ কারো কাছে সমগ্র মুসলিম সমাজের সম্মতি ব্যতিরেকে বাইয়াত গ্রহণ করে, তাহলে যে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং যে বশ্যতা স্বীকার করে, তাদের উভয়েরই মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত” ।</span></i></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">গণতন্ত্রের প্রতি মুসলিমদের এ শ্রদ্ধা পরবর্তীকালে আরও বিকশিত হয়। এ শ্রদ্ধারই চরম প্রকাশ পাওয়া যায় সিফফিনের যুদ্ধে হঠাৎ হযরত আলী (রা) মুয়াবিয়া (রঃ)-এর সঙ্গে সন্ধির প্রস্তাবে সম্মত হওয়াতে খারেজিদের বিদ্রোহে। যদিও গোড়াতে খারেজিরা হযরত আলীর মহাভক্ত ছিল, তবুও দুই পক্ষের নেতাদের সন্ধিতে তাদের অনুসারীদের পক্ষে সে সন্ধি স্বীকার করাতে কোন বাধ্যবাধকতা তারা স্বীকার করেনি। যদিও ধর্মীয় জীবনে তারা অত্যন্ত গোড়া ছিল এবং অন্যান্য মতাবলম্বী মুসলিমদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করতো, তবুও গণতন্ত্র সম্বন্ধে তাদের ঐ অনমনীয় শ্রদ্ধা আজও আমাদের কাছে বিস্ময়ের বিষয়। গণতন্ত্র ব্যতীত আল্লাহর সার্বভৌমত্বও মুসলিম সমাজের উপর ছিল বিশেষভাবে কার্যকরী কোরআনের ধারণা অনুসারে আসমান-যমীনের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এবং এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একই সার্বভৌমত্ব কেবল মাত্র তাঁরই এতে ব্যক্তিগত মালিকানা লোপ পায় এবং মানুষের পক্ষে কেবল তাদের অধিকারে পাওয়া জিনিসের উপর আমানতকারী হিসেবে সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বর্তে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">পরবর্তীকালে মুসলিম অধ্যুষিত স্পেনে জাহেরী মতবাদের ইমাম ইবনে হাযম এ মূল্যমানের আলোকে ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিমদের অধিকার বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন-</span></p>
<blockquote><p><i><span style="font-weight: 400;">প্রত্যেক নাগরিককে এমন খাদ্য পরিবেশন করতে হবে যাতে হবে সে বেঁচে থাকতে পারে ও তার কাজ করার সামর্থ্য থাকে, তাদের এমন পোশাক-পরিচ্ছদ সরবরাহ করতে হবে, যাতে বিভিন্ন ঋতুর প্রকোপ থেকে তারা আত্মরক্ষা করতে পারে। তাদের এমন সব বাসগৃহ দিতে হবে, যাতে তার সকল ঋতুতে সুখে বাস করতে পারে।</span></i></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">এ নীতির অনুসিদ্ধান্ত অনুসারে বলা যায়-এতে রাষ্ট্রের পক্ষে এবং বহুবিধ বিষয়াদি সরবরাহ করা কর্তব্য হয়ে পড়ে। তবে এতে বিলাসিতার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়। এ নীতির মুখ্য উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের বাসিন্দা সকল নাগরিকের জন্য একই মানের জীবনযাত্রা নির্বাহ করার ব্যবস্থা করা। একে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নীতির অগ্রসূরী স্বচ্ছন্দেই বলা যায়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আধুনিক যুগের শোষণমূলক উগ্র স্বদেশিকতার স্থলে ভ্রাতৃত্বমূলক মনোভাব সৃষ্টির জন্য ইসলাম গোড়াতেই চেষ্টা করেছে। তত্ত্বজ্ঞানী ইবনে খালদুন সমাজের উৎপত্তি বিকাশ, ধ্বংসাবস্থা ও মৃত্যু সম্বন্ধে স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছেন। তার মতবাদ অনুসারে বিলাসিতাই সমাজ জীবনের ধ্বংসের মুখ্য কারণ। ‘কাজেই সমাজ-জীবনকে সুস্থ ও সবল রাখতে হলে সর্বতোভাবে বিলাসিতাকেই বর্জন করতে হবে’ ; তার এ মতবাদে ত্রুটি থাকতে পারে, তবে সমাজ-জীবনের বিকাশের সূত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পথপ্রদর্শক বলা যায়।</span></p>
<p><strong>তিন.</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সর্বপ্রথম গ্রীক চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসার পরে মুসলিমরা তাদের প্রত্যাদেশকে যুক্তিসম্মত করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করে। তবে এ সংযোগের পূর্বেও ইচ্ছার স্বাধীনতা সংক্রান্ত বাকবিতণ্ডায় প্রত্যেক পক্ষই তার মন্তব্য প্রতিষ্ঠায় যুক্তির সাহায্য গ্রহণ করে জাবরিয়া বা নিশ্চয়তাবাদীরা আল্লাহর সর্বশক্তির উপর নির্ভর করে মানব-ইচ্ছার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। অপরদিকে নৈতিক জীবনকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য কাদরিয়াগণ মানব-ইচ্ছার স্বাধীনতা মুক্ত কণ্ঠে ঘোষণা করে। গ্রীকদের চিন্তাধারা দ্বারা সর্বপ্রথমে অনুপ্রাণিত হয়ে মুতাযিলারা। নৈতিক মূল্যমানের রক্ষাকল্পে তারা ইচ্ছা স্বাধীনতার পক্ষে রায় দান করে। এক্ষেত্রে তাদের আচরণ থেকে মনে হয় ইসলামে বিশ্বাসী হলেও তাদের মতবাদে প্লেটোর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। ইখওয়ান-উস-সাফার দার্শনিক গুরুত্ব ছিল সমধিক। প্রয়োগাবলী (Empiricists) ও যুক্তিবাদীদের  (Rationalists) দ্বন্দ্বের বহু পূর্বে তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় ও যুক্তির দানকে স্বীকার করেছিলেন। পূর্বোক্ত ইমাম ইবনে হাযম জ্ঞানবিদ্যা (Epistemology) সংক্রান্ত মতবাদে তাদের অনুসরণ করেছিলেন। এজন্যই তিনি ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান (শাহদাতুল হাওয়াজ) ও প্রাথমিক যুক্তির (আউয়াল আল আাকল) অর্থাৎ অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ জ্ঞানের (A Priori Reason) উপর সমান গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। তিনি এগুলোর সঙ্গে প্রমাণকে (বুরহান) যোগ করেছেন । প্রমাণের সঙ্গে একদিকে ইন্দ্রিয় নিচয়ের অপর দিকে প্রাথমিক জ্ঞানের যোগ রয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">দার্শনিকেরা প্রধানত এরিস্টটলের দর্শনের ভাষ্য রচনা করাতেই লিপ্ত ছিলেন। তাদের সম্বন্ধে আলোচনাকালে আমাদের ভুললে চলবে না, যদিও নিও-প্লেটোনিজম বা নব্য-প্লেটোবাদের মতানুসারে তারা বিচ্ছুরণবাদ (Theory of Emanation)-কে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, তবুও তার মধ্যে তারা মস্ত বড় ফাটলও আবিষ্কার করেছিলেন। পরম ব্রহ্ম থেকে অকস্মাৎ এ পৃথিবীর উৎপত্তি তাদের কাছে ছিল আকস্মিকতারই এক নিদর্শন। আল্লাহ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী কোন কিছুর অস্তিত্বের স্বীকৃতি তাদের কাছে ছিল অপরিহার্য। এজন্য নব্য প্লেটোবাদের এ মতকে তাঁরা সংশোধন করে আল্লাহ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী নানা বিষয়ের স্থিতি স্বীকার করেছেন তাদের মতানুসারে সৃষ্টিকর্তার মধ্য থেকে প্রথম বিচ্ছুরিত হয় প্রাথমিক বুদ্ধি। তা থেকে দ্বিতীয় বুদ্ধি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ দ্বিতীয় বুদ্ধি থেকেই জড় পদার্থের উৎপত্তি। তাদের এ সমাধানের মধ্যেই তাদের প্রকৃত গুণের পরিমাপ হয় না বরং ভগবান ও এ পৃথিবীর মধ্যে একটা প্রকাণ্ড উপসাগরের মত যে ব্যবধান মুখব্যাদন করে রয়েছে সে সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি ছিল বলেই তাদের প্রতিকার প্রশংসা করতে হয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তবে দার্শনিকদের মধ্যে সকলেই এরিস্টটলের দর্শনের ভাষ্য রচনাতেই কিন্তু ছিলেন না। তাদের মধ্যে নিজস্ব ধ্যান-ধারণাও ছিল। ইবনে মিসকাওয়া বহু পূর্বেই ক্রমবিকাশবাদের চারটি স্তরের সন্ধান পেয়েছিলেন। ‘খনিজ পদার্থ, বনস্পতি, প্রাণী ও মানুষ’ -এ চারটে পর্যায়ে তিনি বিবর্তনকে ভাগ করেছেন। তিনি পর্যায়ক্রমে মারজান (coral), খেজুর ও বানর এ তিন স্তরে ভাগ করেছেন। খনিজ পদার্থ ও বনস্পতি ও প্রাণীর মধ্যবর্তী এবং প্রাণী ও মানব রাজ্যের মধ্যবর্তী বলে তিনি তাদের লক্ষ্য করেছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বিবর্তনের ধারণা বর্তমানে আর তেমন জোরালো নয়। বিবর্তনের এখন অনেকেই ব্যাখ্যার একটা সুবিধাজনক মাধ্যম মনে করেন। তবু এ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দান করে বিবর্তনের ধারণা একটা মস্ত কাজ সমাধা করছে। বাস্তবে বিবর্তন সত্য নাও হতে পারে। তা সত্ত্বেও অন্য কোন শক্তির সাহায্য নিয়ে এবং বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে একটি যোগসূত্র স্বীকার করে বিভিন্ন প্রজাতির উৎপত্তির ব্যাখ্যা করে এ ধারণা এখনও আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে সমর্থ। মিসকাওয়াকে তাই ডারউইন ও লেমার্কের পূর্বসূরী বলা যায়। </span><strong><i>জালালউদ্দীন রূমীকে সাধারণত কবি বলেই গ্রহণ করা হয়। তা সত্ত্বেও ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে তার ধারণা মনীষার রাজ্যে এক অভিনব অবদান। মুসলিম হিসাবে তিনি ছিলেন আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ছিল আল্লাহর অস্তিত্ব থেকেই এ দুনিয়ার সব কিছুর উৎপত্তি। তবে তিনি আল-কোরআনের সৃষ্টিতত্ত্বকে হবহু আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেন নি। তিনি প্লটিনাসের মতবাদ দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, এ দুনিয়ার সব কিছুই স্বর্গীয় আত্মার স্থিতি থেকে উৎসারিত। কিন্তু প্রত্যেকটি বিষয় বা প্রত্যেকটি আত্মা অনিবার্যভাবে তার মূল উৎসের পানে প্রত্যাগমনের জন্য ব্যাকুল। এ ব্যাকুলতাকেই রূমী নাম নিয়েছেন প্ৰেম।</i></strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ ব্যাকুলতাই ক্রমবিকাশের মূলসূত্র। এ দুনিয়ার স্থিতির মধ্যে রয়েছে স্তর ভেদ এক পর্যায়ের আত্মাগুলো অন্য পর্যায়ের আত্মার চেয়ে হয় হীনতর না হয় উন্নততর। সবগুলো আত্মার সার আধ্যাত্মিক। কারণ একই দিব্য জীবন থেকে তাদের উৎপত্তি। রূমীর দর্শনে তাই আদমের পতনের পূর্ণ ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে। যে মৌলিক অবস্থা থেকে আদমের পতন হয় তা ফিরদাউস বাগান বা কোন স্রোতস্বিনী নয়, সেটা হচ্ছে দিব্য জীবনের একক পরিস্থিতি। তাকে রূপকের আকারে বর্ণনা করা যায় যে, জড় পদার্থের রাজ্যে উদ্ভিদের ক্ষেত্রে অথবা প্রাণীজগতে বিদ্যমান আত্মাগুলো ভূপতিত ফেরেশতাগণ। তারা প্রাণপণ চেষ্টা করে আবার তাদের দিব্য জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্যে প্রয়াস করছে। বাস্তবিক পক্ষে বিবর্তন ও ব্যষ্টিকরণ সম্বন্ধে এ ধারণা এক অপূর্ব অবদান। গ্রীক এসব ভারতীয় চিন্তাধারায় জৈববিবর্তনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তবে ‘কেন এ বিবর্তন’ তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, অথবা জাগতিক বিবর্তনেরও কোন উদাহরণ পাওয়া যায় না। রূমী সর্বপ্রথমে বিবর্তনবাদের অপর দিক এবং তার ব্যাখ্যা দান করে এক অভিনব চিন্তাধারার প্রবর্তন করেছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সুফীরা ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানের উপরও প্রত্যয়শীল ছিলেন না। বুদ্ধিবৃত্তির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণেও তাদের আস্থা ছিল না। তাদের কাছে ‘কলব’ বা ‘দিল’ই ছিলো জীবনের উচ্চতর মূল্যমান গ্রহণের স্থল।  প্রথমে আল্লাহর ক্রোধের ভয়ে ভীত হয়ে তারা এই দুনিয়ার সকল বিষয়-বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন এক সমাজের অন্যান্য লোকদের নিকট থেকে দূরে সরে পড়েন। প্রথম পর্যায়ে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আত্মনির্যাতনের মাধ্যমে মোক্ষলাভ। তবে কালে জীবন-সমস্যা কল্পে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে তারা বুঝতে পারেন যে, সব মাধ্যম বা ধারণার দ্বারা মননশীল ক্ষেত্রে অথবা বাস্তব অভিজ্ঞতায় মনের ভাব ব্যক্ত করা যায় সেগুলো যথোপযুক্ত ও পর্যাপ্ত নয়। এজন্য এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাবেয়া বসরী একটি নতুন মাধ্যম প্রবর্তন করেন। তার ধারণা ছিল কেবলমাত্র আত্মসম্পর্কের মাধ্যমেই মানুষ সেই চিরন্তন সত্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে। চিন্তাধারার বিকাশের ফলে সুফীদের ধারণা জন্মে চারটে বিভিন্ন মাধ্যমে আল্লাহর ওহদানীয়ত সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ হয়। শাকিক বলখী ও ইব্রাহিম আদহম তাকে পরম ইচ্ছা শক্তি- রূপে; মনসুর হাল্লাজ, সবিস্তাবী, রূমী ও হাফিম তাকে পরম সৌন্দর্যরূপে; ইশরাকী তাকে আলোকরূপে গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে মুহিউদ্দিনের অবদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি অন্য সুফীদের পথ পরিত্যাগ করে সারসত্য সম্বন্ধে তাঁর ধারণা যুক্তির আলোকে আলোচনা করেছেন। তার মতে দিব্য জীবনের সারকে দুটো দিক থেকে দেখা যেতে পারে,</span></p>
<ul>
<li><span style="font-weight: 400;"> তাকে খাঁটি সরল সার রূপে ধারণা করা যায়</span></li>
<li><span style="font-weight: 400;"> তাকে নানাবিধ গুণের আধার রূপে ধারণা করা যায়</span></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য-নিরপেক্ষভাবে ধারণা হলে আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুরই সম্বন্ধ নেই। সুতরাং, তার সম্বন্ধে কোন জ্ঞানলাভেরও সম্ভাবনা নেই। তিনি সেই নব্য প্লেটোনিক অচিন্তনীয় ও অনির্বচনীয় সত্ত্বা। এই দৃষ্টিতে থেকে বিচার করলে তিনি আল্লাহই নন। এ প্রসঙ্গে তিনি ইমাম গাযালীয় মতবাদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেনঃ গাযালীর ধারণা ছিল এ পৃথিবীর সঙ্গে সংশ্রববিবর্জিত হিসাবে আল্লাহর ধারণা করা সম্ভব। চিরন্তন সার সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞানলাভ সম্ভবপর তবে তাকে আল্লাহ বলে অর্থাৎ আরাধনার পাত্র বলে জানা যায় না-যতক্ষণ পর্যন্ত না তার যৌক্তিক প্রতিপক্ষ মলুহকে জানা না যায়। আল্লাহ তাঁর সত্তার দিক থেকে তাঁর সৃষ্টজীবের উপর নির্ভরশীল নন। তবে তাঁর দিব্য জীবনের জন্য সৃষ্টজীবের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাঁর অস্তিত্ব অন্য-নিরপেক্ষ অপরপক্ষে তার সৃষ্ট সবকিছুই আপেক্ষিক ও অন্য নির্ভর । অর্থাৎ আল্লাহর সত্ত্বাই নানাবিধ সম্বন্ধে আবদ্ধ হয়ে একক বস্তু বা বিষয়ে প্রতিভাত হয়। এজন্যই সকল বিষয় আল্লাহর গুণাবলী। এক্ষেত্রে শায়খ মুমহীউদ্দীন আমাদের সামনে যান্ত্রিক ন্যায়শাস্ত্রের সূত্র প্রবর্তন করেছেন। এ দ্বান্দ্বিক ন্যায়শাস্ত্রই পরবর্তীকালে আমরা ব্রাডলি ও বোসাষফের মধ্যে পূর্ণ বিকশিত দেখতে পাই। যদিও আল্লাহর ধারণা সম্বন্ধে সুফীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে এবং মনসুর নিজকেই ‘সত্য’ বলে ধারণা করেছেন, তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে এক জায়গায় ঐক্য রয়েছে। তারা সকলেই প্রার্থনার কার্যকারিতা সম্বন্ধে একই ধারণা পোষণ করেছেন। তবে তাদের প্রার্থনা সাধারণ প্রার্থনা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ধরনের। তারা সকলেই আল্লাহকে এক অসীম শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিসত্তারূপে ধারণা করেছেন। এজন্যই সত্যিকার প্রার্থনা সর্বাবস্থায়ই কার্যকরী বলে তারা স্বীকার করেছেন। খুব সম্ভবত সত্যের জন্য তাদের আন্তরিক অন্বেষণের ফলে তারা সত্যের কোনও একটি দিকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন এবং সেদিককেই আল্লাহর সর্বপ্রধান গুণ বলে উপস্থাপিত করেছেন। তবে তাদের কেউই অন্বেষণজাত অভিজ্ঞতার সমন্বয় করেন নি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">গাযালী এদের প্রত্যেকের অবদানের যথাযথ মূল্য নির্ণয় করেছিলেন। তিনি তাদের অবদানের সার সংগ্রহ করে তারই ভিত্তিতে এক অভিনব জীবন দর্শন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি মুসলিম দার্শনিকদের স্থান-কাল সম্বন্ধীয় মতবাদের মধ্যে ত্রুটি আবিষ্কার করে তাদের মতবাদ থেকে পৃথক মতবাদ গঠন করেন। তিনি স্পষ্টতই বুঝতে পারেন, দার্শনিকেরা যে ভাবে মনে করেন, এ পৃথিবী স্থানের দিক থেকে সসীম অথচ কালের দিক থেকে অসীম তা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। তার স্পষ্ট ধারণা ছিল স্থান-কাল বলে কোন স্বতন্ত্র সত্তা কিছুই নেই। তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করে প্রমাণ করেন, স্থান-কাল হচ্ছে বস্তুর সম্বন্ধ মাত্র। তাদের উৎপত্তি স্থল বস্তুরাজি। বর্তমান কালে ওয়াইট হেডের মতবাদে তার মতের পোষকতা পাওয়া যায়। ওয়াইট হেডের মতবাদ অনুসারে স্থান হচ্ছে ঘটনাবলীর সুশৃঙ্খলার-ই অপর এক নাম। তার নিজস্ব কোন সত্তা নেই। তিনি স্থান-কালকে অভিজ্ঞতার আকার বলেই ধারণা করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি কান্টের পূর্বসুরী। দার্শনিকদের মতের বিরুদ্ধে তার ধারণা ছিল কার্যকরণ পরম্পরা নীতিকে সময়ের এক ধারা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর মতে-তাকে প্রত্যেকের ব্যক্তিসত্তার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হয়। দার্শনিকদের মতানুসারে বাসনা বা ইচ্ছাশক্তির মূলে রয়েছে অভাব। কাজেই আল্লাহর কোন অভাব নেই। সুতরাং গতিকে তার সারসত্ত্বা চিন্তা বলেই ধারণা করতে হবে। গাযালী ইচ্ছাশক্তিকে আবার স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেন এবং একে মানব-জীবনের প্রাথমিক বৃত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা করেন। তার এ প্রচেষ্টায় তিনি ছিলেন ভুন্ডের পূর্বসুরী। গাযালীর বক্তব্যের প্রকৃত মূল্য রয়েছে পঞ্চেন্দ্রিয়ালব্ধ জ্ঞান ও যুক্তির আপেক্ষিকতা প্রদর্শনের মধ্যে। প্রথম দিকে তাঁর এ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল, নাস্তিকদের মতের প্রতিবাদ স্বরূপ তার নিজস্ব মতবাদের প্রতিষ্ঠা। তাদের বক্তব্য ছিল, “</span><i><span style="font-weight: 400;">যুক্তির মাধ্যমেই সত্যের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করা যায়”।</span></i><span style="font-weight: 400;"> তবে উদ্দেশ্য যাই হোক, এতে দর্শন পাঠের পক্ষে একটা বিশেষ পটভূমির প্রস্তুতির পক্ষে সুবিধা হয়েছে। ইতিপুর্বে দার্শনিকগণ তত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধীয় নানাবিধ আলোচনায় প্রবৃত্ত হতেন। গাযালীর এ অন্বেষণকে তাই জ্ঞানতত্ত্ব সংক্রান্ত বিশ্লেষণ বলা যেতে পারে । এ বিশ্লেষণেই পরবর্তীকালে হিউম প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে গাযালীর উদ্দেশ্য ইন্দ্রিয়জাত অথবা যুক্তিলব্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভর করা একদেশদর্শিতা বই আর কিছুই নয় এ সত্যটি প্রমাণ করা। চিন্তা-জগতের এ ত্রুটির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করাই ছিল গাযালীর মুখ্য উদ্দেশ্য। তিনি সুফীদের সঙ্গে এ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ একমত ছিলেন যে, ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান ও যুক্তিলব্ধ জ্ঞান ব্যতীত জ্ঞানের অপর একটি তৃতীয় উৎস রয়েছে এবং সে উৎসের জ্ঞানই সবচেয়ে নিশ্চিত জ্ঞান।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">গাযালীর বহুবিধ রচনা থেকে এ কথাটিই বিশেষভাবে প্রমাণিত হয় মুসলিমদের চিন্তাধারায় যে উৎসারণবাদ (Theory of Emanation) অনুপ্রবেশ করেছে তা প্রকৃতপক্ষে একটি নেতিবাচক ধারণা। এতে আল্লাহর ইচ্ছা ও কর্মশক্তিকে অস্বীকার করা হয়। গ্রীক চিন্তাধারায় উত্তরাধিকার-সূত্রে প্রাপ্ত এ উৎসারণকে ত্যাগ করে আল্লাহকে চিরন্তনভাবে নতুন মূল্যমান সৃষ্টিতে ব্যস্ত বলে ধারণা করা ন্যায়সঙ্গত। অতি আধুনিককালে পরলোকগত অধ্যাপক আলবার্ট আইনস্টাইনও বস্তুর স্থানুত্ব থেকে ঘটনা বা কর্মের প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর মতে এ জগতে স্থানু পদার্থ বলে কিছু নেই। এতে রয়েছে অনেকগুলো ঘটনার সমাবেশ। এদিক আবার ঘটনাগুলোর চিন্তা থেকে ইচ্ছা শক্তির সঙ্গে সাযুজ্য রয়েছে। হুবহু না হলেও আইনস্টাইনের চিন্তাতে গাযালীর মতবাদের সমর্থন পাওয়া যায়। যদিও গাযালী সৃষ্টিতত্ত্ব পরিত্যাগ করার জন্য দার্শনিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তা সত্ত্বেও তিনি সব বস্তুকে একই সারিতে বসিয়ে দেন নি। তাঁর মতবাদ অনুসারে সৃষ্টিতে বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। প্রত্যেকটি পর্যায়কেই তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের আলোকে বুঝতে হবে এবং বিশ্বসত্তায় তার স্থান নির্দেশ করতে হবে। গাযালীর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল-মানবের ব্যক্তিসত্তার সবগুলো দিকের পুনর্মিলন এবং প্রত্যেকটি দিকের স্থান ও মূল্য নির্দেশ। গ্রীক চিন্তাধারার সমালোচক হিসাবে তাঁর আবির্ভাব হলেও তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল আদর্শ মানব বা ইনসান-ই-কামিল সৃষ্টি করা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">উপসংহারে চুম্বকভাবে বলা যায়, ইসলামী চিন্তাধারার সর্বপ্রধান মূল্য হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা, বিবর্তনকারী ও প্রতিপালক ও সার্বভৌম সত্তা হিসাবে আল্লাহর ধারণা। এগুলো থেকেই ন্যায়নীতি, সকল মানুষের সমান মর্যাদা, দয়া প্রভৃতি মূল্যমানের উৎপত্তি হয় এবং পৃথিবীর সম্পদের উপর সকল মানুষের সমান অধিকার বর্তে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অন্য যেসব মূল্যমান মুসলিম চিন্তাধারা থেকে উদ্ভূত তাদের যথাক্রমে জ্ঞান আহরণের জন্য বিভিন্ন উৎসের স্বীকৃতি, আরোহ পদ্ধতির স্বীকৃতি ও ব্যবহার বলা যেতে পারে। এগুলো থেকে সামাজিক ও জৈবিক বিবর্তন সম্ভবপর। মানব-জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে ইনসান-ই-কামিলকে গ্রহণ করা হয়েছে। তার জীবনে ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ হয়। তারই ব্যক্তিত্বে দিব্য জীবনের গুণাবলী সম্যকভাবে বিকাশ লাভ করে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কাজেই একথা ন্যায়সঙ্গতভাবে বলা যেতে পারে যে, আল্লাহর ধারণা থেকেই ইসলামী চিন্তাধারার সবগুলো মূল্যমানের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের দুভাবেই উৎপত্তি সম্ভবপর। আল্লাহর ধারণা থেকে তাদের উদ্ভব সম্ভবপর। না হয় স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ফলেই তারা মানবমানসে প্রতিভাত হয়েছে আধুনিক দর্শনের পরিভাষায় বলতে গেলে ইসলামী চিন্তাধারায় আল্লাহর ধারণা সবগুলো মূল্যমানের উৎস, ভিত্তি ও মূল।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>তথ্য সংকেতঃ</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">১, Shaik Mushir Hussain Kidwai-Pan-Islamism and Balshevism</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">২, Ibn Hazam, Mahalla, Vol 6</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">৩, History of Muslim Philosophy Vol 1</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">৪, History of Musim Philosophy Vol 2</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">৫, Bertrand Russell- The New Hopes for a Changing World</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">৬, Charles Laswai- An Arab Philosophy of History</span></p>
<p><strong>সূত্রঃ “ইসলাম ও মানবাতাবাদ” গ্রন্থ থেকে সংকলিত।</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/values-of-islamic-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4182</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
