<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/author/abul_ala_moududi/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Thu, 23 Apr 2026 12:08:41 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>প্রগতিবাদের ফাঁকা বুলি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Nov 2025 17:59:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16394</guid>

					<description><![CDATA[১৯৩৩ সালের জুন সংখ্যা &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় জনাব নিয়াজ ফতেহপুরী আমার সম্পাদিত &#8216;তর্জুমানুল কুরআন&#8217; সম্পর্কে এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এজন্যে আমি জনাব ফতেহপুরীর শুকরিয়া আদায় করি। সাধারণত পত্র পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে বাদানুবাদ কিংবা পাল্টা সমালোচনা করা রীতিসম্মত নয়। কিন্তু যোগ্য]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>১৯৩৩ সালের জুন সংখ্যা &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় জনাব নিয়াজ ফতেহপুরী আমার সম্পাদিত &#8216;তর্জুমানুল কুরআন&#8217; সম্পর্কে এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। এজন্যে আমি জনাব ফতেহপুরীর শুকরিয়া আদায় করি। সাধারণত পত্র পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে বাদানুবাদ কিংবা পাল্টা সমালোচনা করা রীতিসম্মত নয়। কিন্তু যোগ্য সমালোচক তাঁর নিবন্ধটিতে এমন কতকগুলো মতামত প্রকাশ করেছেন, যা তাঁর প্রগতি-ধর্মের বিশিষ্ট মূলনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত; আর এই সমস্ত মূলনীতির সংশোধন করাই তর্জুমানুল কুরআনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণেই আমি এ সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত প্রকাশের এই প্রথম সুযোগের সদ্ব্যবহার করা একান্ত জরুরি বোধ করছি। তিনি লিখেছেন :</p>
<p>এই পত্রিকার উদ্দেশ্য এর নাম থেকেই প্রতিভাত হয় অর্থাৎ কুরআনের অর্থ, তাৎপর্য ও শিক্ষাকে সঠিকরূপে লোকদের মধ্যে প্রচার করা। নিসন্দেহে এই উদ্দেশ্যের উপযোগিতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনা। কিন্তু যোগ্য সম্পাদক নিজেই যেমন স্বীকার করেছেন, বর্তমান যুগে এই লক্ষ্য অর্জনটা মোটেই সহজসাধ্য নয়। কারণ, অতীতকালে ধর্ম বলতে শুধু পূর্ব পুরুষদের অন্ধ অনুকৃতি ও পশ্চাৎমুখী ক্রিয়াকলাপকেই বুঝাতো। তখন কারো পক্ষে ধর্ম প্রচারক বা সংস্কারক সাজা মোটেই কঠিন ব্যাপার ছিলোনা। কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নিত্য নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া মানুষের &#8216;চিন্তা ও কর্ম&#8217;কে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দান করছে &#8211; তার মনমগজকে &#8216;চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা&#8217; দ্বারা সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। কাজেই আজকে শুধু পূর্ব-পুরুষদের আচরণ, কর্মনীতি ও চিন্তাধারার প্রমাণ দেখিয়েই ধর্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পূর্বে হয়তো আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে আলোচনা বা তর্কবিতর্ক করা হতো; কিন্তু আজকে আল্লাহর অস্তিত্বকেই একেবারে অসম্ভব মনে করা হচ্ছে। আগেকার দিনে রসূল সা.-এর পথনির্দেশকে হয়তো মুজিযার সাহায্যে প্রমাণ করা যেতো, আর আজকে সেই মুজিযার ভিত্তিতেই &#8216;চুম্বক বিজ্ঞান&#8217; বেশুমার নবী ও রসূল সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়েছে। অতীতে একজন বক্তা আসমানের দিকে তাকিয়ে আরশ ও কুরসিবিশিষ্ট আল্লাহকে ডাকতে পারতো; কিন্তু আজকে আসমান নামক কোনো জিনিসেরই অস্তিত্ব নেই। এমতাবস্থায় কেউ এ ধরনের কাজ করলে তা মোটেই কল্যাণকর হতে পারেনা। ফলকথা, এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানে&#8217;র দিন নেই, এখন তো অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি ঈমানের দিন এসেছে। এমনি সঙ্কটজনক সময়ে ধর্মের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা মোটেই সহজ কাজ নয়। বিশেষত আজকে ধর্মের ধারণাই লোকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য নয় বলে কাজটা আরো কঠিন মনে হয়।</p>
<p>সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি আরো লিখেছেন:</p>
<p><em>কুরআনপাক তার অর্থের দিক থেকে তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে নৈতিক শিক্ষা প্রদত্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে বিবৃত হয়েছে আকীদা বিশ্বাস। আর তৃতীয় ভাগে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনী ও উদাহরণ। পথম ভাগ সম্পর্কে বেশিকিছু লিখবার প্রয়োজন নেই এ সম্পর্কে কোনো দলিল প্রমাণ উপস্থিত করারও আবশ্যকতা নেই। কারণ সকল ধর্মের নীতিশাস্ত্রই প্রায় এক অভিন্ন। আর প্রত্যেকেই একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, ইসলামের নীতিশাস্ত্র অন্যান্য ধর্মের নীতিশাস্ত্র থেকে ভিন্ন ও নিম্নমানের নয়। অবশ্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের প্রতি বেশি আলোকপাত করা উচিত। কারণ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া এই দু&#8217;ভাগ সম্পর্কে লোকদের মনে সন্দেহ ও দ্বৈধ্যবোধের সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর সত্য বলতে কি, এসব শোবা-সন্দেহ কেউ নিরসন করতে সক্ষম হলে তিনি বর্তমান শতকের মুজাদ্দিদ বলে সাব্যস্ত হবেন। এ কারণেই আমি এ সম্পর্কে একটি স্থায়ী বিভাগ খুলবার পরামর্শ দেবো। এই বিভাগের মাধ্যমে আকীদা বিশ্বাস ও আখ্যান সম্পর্কিত তামাম কুরআনী আয়াতের পর্যালোচনা করা উচিত। অতপর এসব আয়াতের সঠিক উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিধারণ করে আধুনিক পণ্ডিত ও গবেষকদের তরফ থেকে উত্থাপিত যাবতীয় আপত্তি ও প্রতিবাদ খণ্ডন করা আবশ্যক।</em></p>
<p>উপসংহারে তিনি লিখছেন:</p>
<p>আগামীতে আমি সর্বপ্রথম ওহী ও ইলহামের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করতে তাঁকে আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ এই জিনিসটি উপলব্ধি করার ওপরেই কালামুল্লাহর মর্মোপলব্ধি নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে আখিরাত সম্পর্কিত প্রশ্নটিও আলোচিত হওয়া উচিত। কারণ এর মীমাংসার ওপরই ধার্মিকতা ও অধার্মিকতার প্রশ্ন নির্ভর করে। তিনি কালামে ইলাহী এবং আখিরাত সম্পর্কে কি ব্যাখ্যা প্রদান করেন, তাই আমি দেখতে চাই। তারপরই আমার শোবা-সন্দেহ এবং আপত্তিগুলো উত্থাপন করবো তাঁর প্রচেষ্টায় সেগুলো দূরীভূত হলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো। কারণ বর্তমানে অনেকেই &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র নিদারুণ অভিশাপে জর্জরিত। এর একটি বিরাট কারণ হচ্ছে পরকাল বিশ্বাস।</p>
<p>এই উদ্ধৃতিতে যোগ্য সমালোচক যেসব খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, সেগুলো বাদ দিয়ে আমি শুধু মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতিই আলোকপাত করতে চাই।</p>
<p><strong>তিনি কুরআন মজিদের আলোচনাকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু আমরা তাকে অনায়াসেই দু&#8217;ভাগে বিভক্ত করতে পারি। এর প্রথম ভাগের বিষয়বস্তু হচ্ছে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত। এর কোনো একটি বিষয়কেই আমরা চূড়ান্তভাবে ভুল বা নির্ভুল আখ্যা দিতে পারিনা। তাই এগুলোর ব্যাপারে কুরআন আমাদেরকে গায়েবের প্রতি ঈমান পোষণের আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় শ্রেণীর বিষয়গুলো আমাদের জ্ঞান সীমার বহির্ভূত নয় এবং এগুলো সম্পর্কে কোনো যুক্তিসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণও আমাদের পক্ষে সম্ভবপর। এই হিসেবে আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও গুণরাজি, ফেরেশতা, ওহী, খোদায়ী কিতাব, নবুয়াতের তাৎপর্য, মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন, পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি বিষয়াদি ছাড়াও ঐতিহাসিক কাহিনী ও উদাহরণ প্রসঙ্গে বর্ণিত এবং জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত সমস্ত বিষয়ই প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলো সাধারণ মানবীয় বিচার ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত হোক কিংবা বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তির ও বৈজ্ঞানিক পর্যায়ে এগুলোর সত্যতা ও যথার্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের অক্ষমতাই হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। পক্ষান্তরে ইসলামের নীতিশিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবীয় জীবন পদ্ধতি সম্পর্কিত তামাম বিষয়ই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত।</strong></p>
<p>যোগ্য সমালোচকের মতে, দ্বিতীয় ভাগ সম্বন্ধে আলোচনা করারই কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ এ সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্মেরই অনুরূপ। অবশ্য তার মতে প্রথম ভাগটি সম্পর্কে আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর সম্পর্কেই লোকদের মনে সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কেন সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি হচ্ছে? এর জবাবে তিনি বলেছেন, অতীতকালে পশ্চাৎমুখিতা ও অজ্ঞতার কারণে লোকেরা গায়েবী বিষয়ের প্রতি ঈমান পোষণ করতো। কিন্তু আজকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার উদ্ভাবনী মানুষের চিন্তা ও কর্মকে নতুন রূপদান করেছে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দ্বারা তার মনমগজকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে। এ কারণেই এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানের&#8217;র দিন নেই, বরং তার পরিবর্তে &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি ঈমান&#8217; পোষণের দিন এসেছে।&#8217;</p>
<p><strong>এই অভিমতটি কয়েকটি ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে প্রথম ভ্রান্তি হচ্ছে অতীত ও বর্তমানকালের মধ্যকার আসল পার্থক্যটা উপলব্ধি না করা। দুর্ভাগ্যবশত জনাব নিয়াজ কেবল একাই নন; বরং একটি বিরাট দল এই ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত যে, ধর্মের প্রদীপ শুধু বিগত যুগের অন্ধকারেই আলো বিকীরণ করতে পারতো; কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সূর্যোদয়ের পর তার পক্ষে আর দীপ্তিমান হওয়া সম্ভবপর নয়।</strong> অথচ যে যুক্তি বিজ্ঞানকে এরা আলোকরশ্মি বলে অভিহিত করেছেন তা এ যুগের কোনো নিজস্ব সম্পদ নয়। এসকল জ্ঞান বিজ্ঞান অতীতকালেও লোকদের দৃষ্টিশক্তিকে এভাবেই ঝলসে দিয়েছে। আর অতীতকালেও যাদের দৃষ্টি ঝলসে গিয়েছিলো, তারাও এটাই ভেবেছিলো যে, ধর্মের প্রদীপ এখন দীপ্তিমান থাকতে পারেনা। তখনকার দিনের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও তাদের মতে চিন্তা ও কর্মকে নতুন রূপদান করেছিলো এবং তা চিন্তা ও বিবেকের যুক্তি দ্বারা লোকদের মন মগজকে এমনি সুসমৃদ্ধ করে দিয়েছিলো যে, তাদের সেই আলোকজ্জল যুগে গায়েবের প্রতি ঈমান পোষণের কোনো অবকাশই ছিলোনা। হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে চতুর্থ শতক পর্যন্ত কি এই অবস্থাই বিরাজমান ছিলোনা? প্লেটো, এরিস্টটল, এপিকোরাস, জিনো, বার্কলাস, আলেকজান্ডার, * ফিরদৌসী, ক্লাটিনোস প্রমুখ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের চিন্তাধারা যখন মুসলিম দেশগুলোতে প্রচারিত হলো এবং তার ফলে দার্শনিক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষার ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা হলো, তখনো কি একদল লোক এরূপ ধারণাই পোষণ করতোনা? তখনকার দিনের চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি এবং আচরণও ধারণার নতুন রূপ কি এভাবেই লোকদের ধর্মবিশ্বাসে সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের সৃষ্টি করেনি? কিন্তু তারপর কি হয়েছিল? দার্শনিকদের যেসব মতবাদ ও আনুমানিক সিদ্ধান্তের প্রতি তখনকার লোকেরা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলো, পরবর্তীকালে তার অনেকগুলোই মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। জ্ঞান বিজ্ঞানের যে তীব্র সূর্যালোকে ধর্মের প্রদীপকে তাঁদের নিবু নিবু মনে হচ্ছিলো, যুগের একটি আবর্তনেই তা একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেলো। তাদের &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; সেকেলে বস্তুতে পরিণত হলো। তাদের নব নব &#8216;বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার&#8217; চিন্তা ও কর্মকে নবরূপ দানের শক্তি হারিয়ে ফেললো। যেসব ক্ষেত্রে তাঁরা নতুন রূপ দান করেছিলো, তা পুরনো বলে সাব্যস্ত হলো। এমনকি, সমকালীন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস ও আস্থা রেখে তারা যেসব যুক্তি প্রমাণের অবতারণা করেছিলো, এবং সেগুলোর ভিত্তিতে যেসব দার্শনিক মতবাদ দাঁড় করিয়েছিলো তার অধিকাংশকেই আজকের একজন নগণ্য ছাত্রও অর্থহীন ও অকেজো আখ্যা দিতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করবেনা।</p>
<p>এমতাবস্থায় কেউ যদি বলে, অতীতের অন্ধকার যুগেই কেবল ধর্মের প্রদীপ জ্বলতে পারতো, কিন্তু আজকের আলোকজ্জ্বল যুগে তা আর জ্বলতে সক্ষম নয়, তাহলে আমরা ভাবতে বাধ্য হবো যে, ইতিহাস নিজেই তার পুনরাবৃত্তি করছে। আজকে যেসব বিষয়কে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনী বলে অতীতের ন্যায় দাবি জানানো হবে, তার বেশির ভাগই পূর্বেকার লোকদের &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও নতুন আবিষ্ক্রিয়ার পরিণতি লাভ করবে এবং &#8216;চিন্তা ও কর্মের নব নব রূপ&#8217; ও যুগের আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ও সেকেলে হয়ে যাবে এ ব্যাপারে আমরা সুনিশ্চিত। যে সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার কারণে সমালোচক গর্ববোধ করেন, সেগুলোর প্রতি তিনি একবার গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করুন এবং ওগুলোর আসল উদ্ভাবক ও আবিষ্কারকদের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তবেই তিনি বুঝতে পারবেন যে, অতীতের জ্ঞান বিজ্ঞানের ন্যায় এগুলোর মধ্যেও নিশ্চায়ক বস্তু খুব কমই রয়েছে। এসকল জ্ঞান বিজ্ঞানের মধ্যে এমনি জিনিস প্রায় নেই বললেই চলে, যার সম্পর্কে একথা নিসংশয়চিত্তে বলা যেতে পারে যে, এটির ভ্রান্ত প্রমাণিত হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। বাকি জিনিসগুলো শুধু অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ, মতামত ও দ্বিধা সঙ্কোচের ওপর ভিত্তিশীল। এগুলো সম্পর্কে পূর্ণ দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তার সঙ্গেই বলা যেতে পারে যে, যুগের গতি যতোই তরক্কীর দিকে এগুতে থাকবে, &#8216;এসব আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;নিত্যনতুন আবিষ্ক্রিয়া&#8217; ততোই প্রাচীন ও সেকেলে বস্তুতে পরিণত হবে। এবং সেই সঙ্গে এসকল দুর্বল ও ঠুনকো জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতিগুলোও অপর কোনো নতুন পদ্ধতির জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।</p>
<p>কাজেই অবস্থা যখন এই, তখন কোনো চেতনাসম্পন্ন ও পরিণত দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের পক্ষেই ধর্মের ভবিষ্যত চিন্তায় সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনী&#8217; আজ &#8216;চিন্তা ও কর্মের নতুন ভিত্তি রচনা করেছে এবং &#8216;চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি&#8217; দ্বারা লোকদের মন মগজকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে, কাজেই ধর্মের পরিণতি কি দাঁড়াবে, খোদাই জানেন এমনি দুশ্চিন্তায় আতঙ্কিত হবারও কোনো হেতু নেই। এসব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার ওপর একবার সন্ধানী দৃষ্টি ফেললেই দেখতে পাবেন যে, ধর্মের সাথে যেসব জিনিসের বিরোধ রয়েছে, তা প্রামাণ্য ও সন্দেহাতীত কি না? তা যদি বাস্তবিকই প্রামাণ্য ও সন্দেহাতীত হয় এবং ধর্মের মৌল বিশ্বাসের সঙ্গে তার বিরোধও দেখা দেয়, তাহলে নি:সন্দেহে তার সামনে এই প্রশ্ন এসে দাঁড়াবে যে, ধর্ম এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই দু&#8217;টির কোনটির প্রতি সে ঈমান পোষণ করবে? কিন্তু তা যদি শুধু অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে নিক্ষেপকারী জিনিসই হয়, তাহলে ধর্মের সঙ্গে তার বিরোধে ঘাবড়াবার কিছু নেই। কারণ ধর্ম যদি ঈমান ও প্রত্যয়ের ওপর ভিত্তিশীল হয় তো তার মুকাবিলায় অনুমান, কল্পনা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কোনোই গুরুত্ব নেই। পক্ষান্তরে ধর্ম যদি আনুমানিক ও কাল্পনিক জিনিস হয় তো আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতবাদগুলোও তো এই অনুমান ও কল্পনার ওপর নির্ভরশীল। কাজেই উভয়ের তারতম্য বিচারের আর কি কারণ থাকতে পারে?</p>
<p>আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নিত্য নতুন আবিষ্ক্রিয়ার দ্বারা অভিভূত হয়ে ধর্মের প্রতি সংস্কার দৃষ্টিক্ষেপ করা এমন লোকের পক্ষেই শোভা পায়, যার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে যে, প্রতিটি নতুন জিনিসই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কাজেই যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাকে গ্রহণ করা কিংবা তার প্রতি ঈমান পোষণ করা একান্ত আবশ্যক। এমনকি, তা যদি শুধু আনুমানিক ও কাল্পনিক জিনিসও হয় এবং প্রগাঢ় বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নিয়ে, নির্ভুল মানদণ্ডে তা যাচাই করা নাও হয়, তবু তা বরণ করতে হবে। বস্তুত এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন লোকদের মধ্যেই আজ &#8216;চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতি রচনা&#8217;র আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ চিন্তা ও কর্মের নতুন পদ্ধতি কিভাবে রচিত হয়, কোন্ পদ্ধতিটি যুক্তিসম্মত আর কোনটি নিছক বালকসুলভ এই কথাটি পর্যন্ত তারা জানেনা। অনুরূপভাবে চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি দ্বারা সমৃদ্ধ হবার দাবিটাও এই শ্রেণীর স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের একটা বৈশিষ্টে পরিণত হয়েছে। <strong>কিন্তু তারা এতোটুকু অবহিত নয় যে, নিছক চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি একটা ফিতনা, বরং একটা ভয়ঙ্কর জিনিস। বিশেষত, তার সঙ্গে যদি প্রশস্ত ও পরিপক্ক জ্ঞান, প্রগাঢ় ও পরিণত দৃষ্টি এবং সুষম ও স্বচ্ছ চিন্তাশক্তির সমাবেশ না ঘটে, তবে তা গুরুতর আকার ধারণ করতে বাধ্য। আর এই জিনিসগুলো সম্পর্কে আজকাল যেরূপ ধারণা পোষণ করা হয়, প্রকৃতি ততোটা অকৃপণভাবে এগুলো দান করেনি।</strong></p>
<p>প্রথমোক্ত মতবাদটি থেকে যে দ্বিতীয় মতটির সৃষ্টি হয়েছে, তাহলো এই যে, এখন আর &#8216;গায়েবের প্রতি ঈমানে&#8217;র যুগ নেই, বরং এটা হচ্ছে &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যক্ষেণের প্রতি ঈমানে&#8217;র দিন। এই কথাগুলো দ্বারা বক্তা আসলে কি বুঝাতে চান, অনেক চিন্তা ভাবনার পরও তা আমার বোধগম্য হয়নি। একথার তাৎপর্য যদি এই হয় যে, বর্তমান যুগের গায়েব বা অদৃশ্য পদবাচ্য কোনো জিনিসকে স্বীকার করা এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো বস্তুকে গ্রহণ করাই হয়না, তবে তা নিতান্তই ভুল। অন্যকথায় এর তাৎপর্য দাঁড়ায় এই যে, বর্তমান যুগের মানুষ এমন একটি সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে সীমিত থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যেখানে কেবল অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই তাদের জন্যে জ্ঞানার্জনের উপায় হতে পারে এবং ইন্দ্রিয়নিচয়ই শুধু ক্রিয়াশীল থাকতে সক্ষম। এই পরিধির বহির্ভূত বিষয়গুলো সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করা এবং অনুমান অনুসন্ধান মারফত সে সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কাজ মানুষ পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু যিনি &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও নবতর আবিষ্ক্রিয়া&#8217; সম্পর্কে মোটামুটি অধ্যয়নও করেছেন, এই ভাষণকে তিনি মোটেই স্বীকার করবেননা। দর্শন ও অতি প্রকৃতিবাদের কথা ছেড়েই দিন, কারণ এ দু&#8217;টির গোটা প্রতিপাদ্যই হচ্ছে অদৃশ্য বিষয়। খোদ জড় বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার কথাই ধরুন, কারণ এর ওপর নির্ভর করেই সমালোচকপ্রবর &#8216;অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে&#8217;র প্রতি ঈমানের দোহাই পাড়ছেন। এই শাস্ত্রটির কোন বিভাগের গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান শক্তি, এনার্জি, প্রাকৃতিক বিধান, মৌলসূত্র, কার্যকারণ এবং এই ধরনের বিষয়াদির স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়? কোন পদার্থ বিজ্ঞানী এগুলোর প্রতি বিশ্বাস করেননা? কিন্তু আপনি কোনো জাঁদরেল বিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, এসবের মধ্যে কোনটির গুঢ় রহস্য তিনি জানেন? কোন্ বস্তুর কতোটুকু তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন? কোন্টির অস্তিত্ব তিনি প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হয়েছেন এবং কোন্টির সপক্ষে তিনি যথার্থ প্রমাণ পেশ করতে পারেন? বস্তুত এসব কিছুকেই গায়েবের প্রতি ঈমান ছাড়া আর কি বলা চলে?</p>
<p><strong>এ কথাগুলোর দ্বিতীয় অর্থ এই হতে পারে যে, বর্তমান যুগে কেবল এমন জিনিসই স্বীকৃত হয়ে থাকে, যা প্রতিটি মানুষের প্রত্যক্ষ করার উপযোগী এবং গোটা মানব সমাজই যা প্রত্যক্ষ ও পর্যবক্ষেণ করেছে। কিন্তু এ ধরনের কথা কোনো বুদ্ধিমান লোকের মুখ দিয়েই নিঃসৃত হতে পারেনা। কারণ, একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, কোনো মানুষই ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত মানবীয় জ্ঞানের অধিকারী নয়, বরং তার একটি বড় ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ দল ও ব্যক্তিদের বিশেষত্ব রয়েছে। এই বিশেষ জ্ঞান ভাণ্ডারের প্রতিটি বিভাগ কেবল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছে প্রত্যক্ষ, আর বাকি সমস্ত মানুষের কাছে অদৃশ্য। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষকে ঐ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও দলের প্রতিই গায়েবী ঈমান পোষণ করতে হয়।</strong></p>
<p>বক্তব্যটির তৃতীয় অর্থ এ-ও হতে পারে যে, এযুগের মানুষ কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ বিষয়কেই স্বীকার করে এবং নিজের কাছে অদৃশ্য কোনো জিনিসকেই তারা বিশ্বাস করেনা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর চাইতে অবাস্তব কোনো কথাই মানুষের মগজ থেকে বের হতে পারেনা। কারণ এ ধরনের মানুষ পূর্বে কখনো দুনিয়ায় পাওয়া যায়নি, আজো পাওয়া যাবেনা এবং কিয়ামত অবধি পাওয়া যাবার কোনো সম্ভাবনাও নেই। এমন লোক যদি বাস্তবিকই কোথাও থেকে থাকে তো তাকে খুঁজে বের করতে আদৌ কালবিলম্ব করা উচিত নয়। কারণ &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্ক্রিয়া&#8217;র মধ্যে এটিই হবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। ফলকথা, যে কোনো দিক থেকেই উক্তিটিকে বিচার করা যাক না কেন, এর ভেতর সত্যতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবেনা। খোদ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই একথার সাক্ষ্য বহন করে যে বর্তমান যুগটিও অতীতের ন্যায়ই অদৃশ্যে বিশ্বাসী আর এই অদৃশ্যে বিশ্বাস থেকে মানুষ কখনো নিষ্কৃতি পেতে পারেনা। প্রতিটি মানুষ হাজারে ৯৯৯ টিরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অদৃশ্যে বিশ্বাস পোষণ করতে বাধ্য। এখন সে যদি কেবল নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের উপরই ঈমান আনার সিদ্ধান্ত করে বসে তাহলে অন্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যে বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার সে সঞ্চয় করেছিলো, তা সবই তাকে বিসর্জন দিতে হবে। নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া জ্ঞানার্জনের তামাম উপায় ও সূত্রই তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। এমতাবস্থায় দুনিয়ার কোনো কাজ করা তো দূরের কথা, নিজের অস্তিত্বই সে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা। বস্তুত অদৃশ্যে বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার এবং অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতি পুরোপুরি নির্ভরতা যেমন এযুগে সম্ভব নয়, তেমনি এর চাইতে উজ্জ্বলতর কোনো যুগেও তার সম্ভাবনা নেই। যে কোনো যুগে এবং যে কোনো অবস্থায় মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়াই শুধু অন্যের প্রতি নির্ভর করে বহুতরো বিষয় মেনে নিতে বাধ্য। কতগুলো বিষয় শুধু প্রচলিত ধারণা হিসেবেই মানতে হয়, যেমন সেঁকোবিষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এই যে, এটি খেলে মানুষ মরে যায়। অথচ এটি ব্যক্তিগতভাবে খেয়ে সবাই পরিক্ষা করে দেখেনি কিংবা কাউকে খেয়ে মরতেও দেখেনি। কতকগুলো বিষয় আবার এক বা একাধিক নির্ভরযোগ্য লোকের বর্ণনার ভিত্তিতেই মানতে হয়। যেমন আদালতের সাক্ষ্য বিশ্বাস না করলে আইনের যন্ত্রটি এক মুহূর্তের জন্যেও চলতে পারেনা। কতগুলো ক্ষেত্রে আবার নিছক একজন পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞের কথা বিশ্বাস করতে হয়। স্কুল কলেজের ছাত্রদের বেলায় তো এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যাপার। তারা যদি বিভিন্ন শাস্ত্রের পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের গবেষণা, আবিষ্কার ও মতাদর্শের প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস পোষণ না করে, তবে জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক কদমও সামনে এগোতে পারেনা। ফলে ঐ পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের ন্যায় জ্ঞান গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধানের মতো যোগ্যতাও তারা কখনো অর্জন করতে পারেনা।</p>
<p>এথেকে প্রমাণিত হলো যে, যেসকল ব্যাপারে আমরা অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা জ্ঞানার্জন করিনি, সেসব ক্ষেত্রে অন্য লোকের প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে আমরা বাধ্য। এখন কোন্ ব্যাপারে কার প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত কেবল এই প্রশ্নটিই বাকি থেকে যায় এবং এর ওপরই সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্ভর করে। নীতিগতভাবে এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, যে ব্যাপারে কোনো ব্যক্তি বা দলের ভালো জ্ঞান আছে এবং জ্ঞানার্জনের ভালো উপায়ও করায়ত্ত রয়েছে বলে আমাদের প্রতীতি জন্মাবে সে ব্যাপারে কেবল তার ওপরই বিশ্বাস পোষণ করা উচিত। এই সাধারণ রীতি অনুযায়ী একজন রুগী ডাক্তারের কাছে না গিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করেনা। মামলা-মোকাদ্দমার ব্যাপারে কেউ আইনজ্ঞ বাদ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের শরণার্থী হয়না। কিন্তু ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের প্রশ্নেই কেবল এ-ব্যাপারে মতানৈক্য লক্ষ্য করা যায়। কেবল সেখানেই প্রশ্ন ওঠে এসব ব্যাপারে দার্শনিক ও যুক্তি-বিজ্ঞানীদের মতামত গ্রহণ করা হবে, কি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুদের কথা শোনা হবে? আল্লাহ্, ফিরিস্তা, ওহী, ইলহাম, আত্মা, পুনরুজ্জীবন এবং পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাকার গায়েবী বিষয়ে কি কান্ট, স্পেনসর, আইনেস্টাইন, বেগর্সন প্রমুখের কথা মানা হবে, না ইব্রাহীম আ., মূসা আ., ঈসা আ. ও মুহাম্মদ স. প্রমুখের বক্তব্য শোনা হবে। &#8216;চিন্তা ও বুদ্ধির স্বাধীনতা&#8217;র দাবিদারদের মানসিক ঝোঁক প্রথম দলের দিকে। এরা তাদেরই সংগৃহীত মানদণ্ডে নবীদের কথা যাচাই করে চলেছে এবং এই যাচাইয়ের ফলে যে বিষয়টি উত্তীর্ণ হচ্ছে, সেটিকেই তারা গ্রহণ করছে। সেটিকে তারা নবীদের কথা বলেই স্বীকৃতি দিচ্ছেনা; বরং দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা তার গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট দিয়েছেন বলেই স্বীকার করা হচ্ছে। (দুর্ভাগ্যক্রমে, এই ধরনের বিষয় নিতান্তই কম, বরং একেবারে নেই বললেই চলে) পক্ষান্তরে যে বিষয়টি এই মানদণ্ডে অনুত্তীর্ণ হয় সেটিকে তারা অনির্ভরযোগ্য বলে নাকচ করে দিচ্ছে। অপরদিকে &#8216;প্রাচীন পন্থী&#8217; ও &#8216;গুরুবাদীদে&#8217;র বক্তব্য এই যে, প্রকৃতিবাদ ও যুক্তিবাদ সম্পর্কে ধর্মতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মাবাদীদের কাছে প্রশ্ন করোনা, কিংবা ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের কথা যুক্তিবাদী প্রকৃতিবাদীর কাছে জিজ্ঞেস করোনা। কারণ উভয়ের কর্মক্ষেত্রই সম্পূর্ণ আলাদা বিধায় একটি শাস্ত্র সম্পর্কে অন্য শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞের মতামত জিজ্ঞেস করা মূলতই ভুল। <strong>দার্শনিক ও বিজ্ঞানী তাদের নিজ নিজ শাস্ত্রে যতোই পারদর্শী হননা কেন, ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদে তাঁদের মর্যাদা একজন সাধারণ মানুষের চাইতে মোটেই বেশি নয়। কারণ এ সম্পর্কে জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহের যেটুকু উপায় তাদের করায়ত্ত, একজন সাধারণ লোকেরও ততোটুকু উপায়ই করায়ত্ত। প্রকৃতপক্ষে এ শাস্ত্রটি শুধু নবীদের জন্যেই নির্দিষ্ট। তারাই এ শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। এ সম্পর্কিত জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহের প্রকৃত উপায়ও তাঁদেরই করায়ত্ত। কাজেই এসব ব্যাপারে তাঁদের প্রতিই &#8216;অদৃশ্য বিশ্বাস&#8217; পোষণ করা উচিত। এব্যাপারে বড়জোর এইটুকু প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সত্যবাদী এবং ধর্মতত্ত্বে পূর্ণাঙ্গ দূরদৃষ্টির অধিকারী কিনা? কিন্তু যখনি এটা প্রমাণ হয়ে যাবে যে, তাঁরা বাস্তবিকই এ ব্যাপারে যোগ্যতার অধিকারী, তখন স্বকীয় দূরদৃষ্টি ও জ্ঞানানুযায়ী তারা যা কিছু করেছেন, তা সবই আপনাকে সত্য বলে মানতে হবে।</strong> তাঁদের প্রচারিত সত্যকে অস্বীকার এবং তার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রমাণ উত্থাপন করা আর অন্ধ কর্তৃক সূর্যের অস্তিত্ব অস্বীকার এবং চক্ষুষ্মান ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সূর্যের অস্তিত্ব বিরোধী দলিলপত্র পেশ করা একই কথা। এই ধরনের লোক নিজস্ব ধারণায় যতোবড় দার্শনিকই হোক না কেন, কিন্তু যে ব্যক্তি নিজ চোখে সূর্যকে প্রত্যক্ষ করছে, সে-যে এই অন্ধ সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করবে, তা বলাই নিষ্প্রয়োজন।</p>
<p>সমালোচক হয়তো বলবেন, নবীগণ অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান&#8217; ও &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্কার উদ্ভাবনী&#8217; দ্বারা তা সমর্থিত হয়না। এ কারণেই লোকেরা &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217; নিক্ষিপ্ত হয়ে &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র অভিশাপ ভোগ করছে। কিন্তু আমি বলবো, এসব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়ার মধ্যেই বা এমন কোন্ নিশ্চয়তাটা রয়েছে, যা ইসলামী নীতির পরিপন্থী? এমন কোনো বিষয় থাকলে তার উল্লেখ করুন যাতে করে আমরাও ভেবে দেখতে পারি যে, কুরআন শরীফ এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি, এর মধ্যে কোনটি আমরা মেনে চলবো! যদি তা না থাকে আর তা কিছুতেই থাকতে পারেনা, যেমন আপনার উক্তি &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধ&#8217; &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217; ইত্যাদি থেকেও প্রমাণিত হয় তবে কি আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক আবিষ্কার উদ্ভাবনীর অস্ত্রাগারে কেবল ধারণা কল্পনা ও আন্দাজ অনুমানের অস্ত্রই মওজুদ রয়েছে, যার ওপর ভরসা করে ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হচ্ছে? এবং সে অস্ত্রের ধারণা দেখে শুধু চাকচিক্য দেখেই &#8216;স্বাধীন চিন্তাধারা&#8217;র উপাসকরা এই আশা পোষণ করছেন যে, ধর্ম তার নাম শুনেই ময়দান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে? আপনি ঐ জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্কারাদিকে যতোই গুরুত্ব দিন না কেন, কিন্তু মনে রাখবেন, অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে তা মোটেই নিশ্চয়ক বস্তু নয়। তার প্রভাবে বড়জোর আপনি নিজে &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217; নিক্ষিপ্ত হতে পারেন এবং বলতে পারেন যে, ওহী, ইলহাম, পূনরুজ্জীবন, পারলৌকিক শাস্তি ও পুরস্কার, ফিরিশতাদের অস্তিত্ব এমনকি আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কেও আমরা ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারিনা। কিন্তু আপনাকে &#8216;দায়ে ঠেকে মুসলমান সাজা&#8217;র অভিশাপ থেকে মুক্তি কিংবা &#8216;সানন্দে কাফির সাজা&#8217;র আশির্বাদ লাভ করবার ব্যাপারে এসব জ্ঞান বিজ্ঞানের পক্ষে কিছু মাত্র সাহায্য করা সম্ভবপর নয়। কারণ উল্লেখিত বিষয়াদিকে চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করার মতো কোনো যুক্তি প্রমাণ এসকল জ্ঞান বিজ্ঞানে উপস্থিত থাকতে পারেনা। তাছাড়া কোনো জিনিসের অনস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে শুধু এটুকু যুক্তিই যথেষ্ট নয় যে, তার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, &#8216;আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও &#8216;সাম্প্রতিক আবিষ্কারাদি&#8217; আপনাকে শুধু &#8216;সন্দেহ ও দ্বৈধবোধে&#8217;র চরম পর্যায়ে নিয়েই পৌছিয়ে দিচ্ছে আর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে এ হচ্ছে একটি নিকৃষ্টতম স্থান। বস্তুত যে জ্ঞান বিজ্ঞান মানুষকে নিশ্চয়তা, নিশ্চিন্ততা ও প্রত্যয়শীলতা দান করতে পারেনা, যা তাকে শূন্যে দোদুল্যমান অবস্থায় নিক্ষেপ করে এবং কোথাও এতোটুকু স্থিরতা লাভের অবকাশ দেয়না, যা তাকে &#8216;কাফির হয়োনা, দায়ে ঠেকে মুসলমান হও&#8217; এর মতো ন্যাক্কারজনক অবস্থায় ফেলে দেয়, তা নিঃসন্দেহে অজ্ঞতার চাইতেও নিকৃষ্টতর।</p>
<p><em>এই সংস্কটাবস্থা থেকে একমাত্র &#8216;ঈমান বিল্ গায়েব&#8217; বা অদৃশ্যে বিশ্বাসই মানুষকে রক্ষা করতে পারে। একবার যদি আপনি কাউকে নবী বলে মেনে নেন এবং সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করেন যে, খোদায়ী জ্ঞানশাস্ত্রে তিনি পুরোপুরি ব্যুৎপত্তির অধিকারী এবং তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেননা, তবে আর অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে আপনার মনে কোনো সন্দেহ ও দ্বৈধবোধের অবকাশ থাকতে পারেনা। এর ফলে আপনার ধর্মমত বিশ্বাস ও প্রত্যয় এমন এক মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় যা কোনো আধুনিক জ্ঞান বা নবাবিষ্কার, চিন্তা ও কর্মের নতুন ধারা এবং &#8216;মুক্তবুদ্ধির&#8217; কোনো প্রবল প্রতাপে আহত হয়না।</em> এই কারণেই কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই কিতাব হচ্ছে মুত্তাকী লোকদের পথপ্রদর্শক। আর মুত্তাকী লোকদের প্রথম পরিচয় হচ্ছে এই যে, তারা অদৃশ্যবিষয়ে ঈমান পোষণ করে:</p>
<blockquote><p>&nbsp;</p>
<p>هُدًى لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ . (البقرة)</p>
<p>অর্থ: এই কুরআন মুত্তাকীদের পথ প্রদর্শক, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।&#8217;</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বস্তুত &#8216;ঈমান বিল গায়েব&#8217; বা অদৃশ্যে বিশ্বাসের ওপরই ধর্মের গোটা ঈমারত প্রতিষ্ঠিত। কাজেই এই মূলভিত্তিকে একবার চুরমার করে ফেললে তারপর ধর্মের এসব বুনিয়াদী মতবিশ্বাস সম্পর্কে যে গুলোর নিগুঢ় রহস্য জানার কোনো উপায়ই আপনার কাছে নেই কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আপনি পৌছতে পারেননা। এমতাবস্থায় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তার যথার্থতা সম্পর্কে আপনার নিজেরই পুরোপুরি আস্থা হবেনা এবং তার সত্যতা সম্পর্কে অন্য লোককেও আপনি আস্থাবান করতে পারবেননা।</strong> এ ব্যাপারে সর্বশেষ প্রশ্ন হলো, এক ব্যক্তি আল্লাহর নবী এবং তিনি ধর্মতত্ত্বে পুরোপুরি বি্যুৎপত্তির অধিকারী এটা জানবার উপায় কী? তিনি এতোবড় সত্যবাদী যে, তিনি অদৃশ্য বিষয়ে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধির সীমাবহির্ভূত কথা বললেও আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাস পোষণ করবো এবং তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেননা, একথা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করবো এটাই বা বুঝবো কি করে? এই প্রশ্নটির মীমাংসা দু&#8217;টি জিনিসের উপর নির্ভরশীল। প্রথম, তাঁর ব্যক্তি চরিত্র আমাদের সকল সম্ভাব্য পন্থায় এবং কঠোরতর মানদন্ডে যাচাই করে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর পেশকৃত বিষয়াদির মধ্যে যেগুলো আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচারশক্তির অন্তর্ভুক্ত, সেগুলোকে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। এই উভয় পরীক্ষায় যদি কেউ অনুপম সত্যবাদী বলে প্রমাণিত হন এবং সেই সঙ্গে মানব জীবনের চিন্তা ও কর্মের সকল দিক ও বিভাগের জন্যে প্রদত্ত তাঁর বিচক্ষণ ও কল্যাণকর ব্যবস্থার মধ্যে কোনো ত্রুটি নির্দেশ করতে সক্ষম না হয়, তবে তাকে সত্যবাদী বলে স্বীকার না করার কোনোই হেতু নেই। আর তিনি খোঁজ খবর ও জানা শোনা ছাড়াই নিছক দুনিয়াবাসীকে ধোকা দেয়ার জন্যেই আল্লাহ্, ফেরেশতা, আরশ, কুরসী, ওহী, ইলহাম, পুনরুত্থান, বেহশত ও দোযখ ইত্যাদির একটা বিরাট ষড়যন্ত্র পাকিয়েছেন (আল্লাহ মাফ করুন) বলে সন্দেহ পোষণ করারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।</p>
<p>কাজেই জনাব নিয়াজের তৃতীয় ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, তিনি কুরআনের প্রথম অংশকে (আমরা যাকে দ্বিতীয় অংশ বলে উল্লেখ করেছি) আলোচনার যোগ্যই মনে করেননা, বরঞ্চ তিনি এই ধারণা পোষণ করেন যে, &#8216;এ ব্যাপারে সমস্ত ধর্মই প্রায় একরকম এবং ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্ম থেকে ভিন্ন বা নিকৃষ্টতর নয়। পক্ষান্তরে আমাদের বক্তব্য হলো, তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী কুরআনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অংশের (কিংবা আমাদের বিশ্লেষণ অনুসারে প্রথম অংশের) সত্যতা নির্ণয় করতে হলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত্র এবং কুরআনের অদৃশ্য বহির্ভূত বিষয়াদির পর্যালোচনা করা আমাদের জন্যে অপরিহার্য। পরন্তু ইসলামী শিক্ষার এই অংশটি &#8216;অন্যান্য ধর্ম থেকে ভিন্ন বা নিকৃষ্টতর নয়&#8217; কেবল এটুকু ধারণা নিয়ে তুষ্ট থাকলেই চলবেনা; বরং সেটি তামাম অনিসলামী ধর্মের চাইতে উন্নত এবং উৎকৃষ্ট, যুক্তি প্রমাণ দ্বারা এটাও প্রতিপন্ন করা আবশ্যক। কাজেই আলোচনার এই বিষয়টি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে অন্য বিষয়ের অবতারণা করা নীতিগতভাবেই ভুল। তাছাড়া এ বিষয়টির মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য বিষয়ের মীমাংসা করাও সম্ভবপর নয়।</p>
<p>জনাব নিয়াজের ইচ্ছা হলো, আমরা যেনো &#8216;পরকাল&#8217;, &#8216;কালামে ইলাহী&#8217; এবং আকাইদ ও ইতিহাস সংক্রান্ত আয়াতগুলোর বিচার বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হই। কিন্তু আমাদের মতে, এই আলোচনার দু&#8217;টি দিক রয়েছে এবং তা দু&#8217;টি ভিন্ন দলের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রথম দলটি হলো তারা, যারা রসূলে আকরাম স.-এর নবুয়্যতের প্রতিই ঈমান পোষণ করেনা এবং এই কারণেই তারা উক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে সন্দেহ পরায়ণ। দ্বিতীয় দলটি হলো, যারা তাঁর নবুয়‍্যাতকে স্বীকার করে, কিন্তু অদৃশ্য বিষয়াদির ব্যাপারে সন্দিগ্ধচিত্ত। এই দু&#8217;টি দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পদ্ধতিও ভিন্ন। কাজেই আপত্তিকারী এর কোন দলের অন্তর্ভুক্ত, তা না জানা পর্যন্ত আমরা তাঁর সঙ্গে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে পারিনা।</p>
<p>প্রথম দলটির সঙ্গে পরকাল, কালামে ইলাহী এবং অন্যান্য অদৃশ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা একেবারেই অর্থহীন। কারণ মূল বিষয়ে মতানৈক্য রেখে খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। আমরা পরকাল, কালামে ইলাহী, এমনকি আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণরাজি সম্পর্কেও যে বিষয়গুলোর প্রতি ঈমান ও প্রত্যয় পোষণ করি, তার ভিত্তি এই নয় যে, আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা আমরা কোনো চূড়ান্ত ও নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে পেরেছি এবং তার বিরুদ্ধে আর কোনো যুক্তি প্রমাণ উত্থাপন করা যেতে পারেনা। এমনটি যদি হতো, তো নিসন্দেহে নবুয়্যত সংক্রান্ত আলোচনা করা যেতো। কিন্তু এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের অটল অনড় ঈমান প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্বাসের ওপর গড়ে উঠেছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম সত্যবাদী। তিনি আপন নবুয়্যত এবং কালামে ইলাহী সম্পর্কে যাকিছু বিবৃত করেছেন, তা সবই অভ্রান্ত। এই মৌলিক কারণেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাসী ব্যক্তির সাথে এই বুনিয়াদী প্রশ্নটিকে স্বীকার না করা পর্যন্ত কোনো খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করতে আমরা সম্মত নই।</p>
<p>দ্বিতীয় দলটির এই অধিকার আমরা স্বীকার করিনা যে, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতাও স্বীকার করবে আবার অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে কুরআন মজীদ এবং মুহাম্মদ স.-এর বর্ণনার সত্যাসত্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করবে। কারণ এরূপ ভূমিকা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তারা প্রথম দলটির সামিল হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে তাদের দ্বিতীয় দলে শামিল থাকতে হলে এ সত্য স্বীকার করতে হবে যে, কুরআনের প্রতিটি শব্দ অভ্রান্ত এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকিছু পেশ করেছেন তা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমুক্ত। অবশ্য এ ব্যাপারে সে দু&#8217;টি দিক থেকে প্রশ্ন তুলতে পারে। প্রথম এই যে, কুরআন শরীফে বাস্তবিকই এ ধরনের বিষয় বর্ণিত হয়েছে কিনা? আর রসূলের করীম স. সত্যসত্যই এরূপ কথা বলেছেন কিনা। দ্বিতীয়ত, কুরআন সুন্নায় এ সম্পর্কে যাকিছু রয়েছে, তার সঠিক অর্থ এবং মর্ম কি হতে পারে?</p>
<p>পরিশেষে আমার আর একটি কথা বলতে হচ্ছে। জনাব নিয়াজ &#8216;তর্জমানুল কুরআনে&#8217; একটি বিতর্ক বিভাগ খোলার অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি এই অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছেন যে, তাঁর যাবতীয় শোবা সন্দেহ এবং প্রশ্ন ও আপত্তি তিনি উক্ত বিভাগে পেশ করবেন। কিন্তু পেশাদারি বিতর্ক ও বাদানুবাদ থেকে আমি হামেশাই আত্মরক্ষা করে এসেছি এবং এখনো রক্ষা করতে ইচ্ছুক। কারণ যে বিতর্কের উদ্দেশ্য গুরু মস্তিষ্কের ব্যায়াম আর বুদ্ধির কসরৎ দেখিয়ে বাহবা কুড়ানো তেমন বিতর্কের আমি আদৌ পক্ষপাতী নই। তবে জ্ঞানগর্ভ ও তত্ত্বপূর্ণ আলোচনার জন্যে আমি সর্বদাই প্রস্তুত, যদি সে আলোচনার উদ্দেশ্য হয় সত্যানুসন্ধান এবং তাতে উভয়পক্ষ এমনি আন্তরিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন যে, আসল সত্য প্রমাণিত হবার পর প্রত্যেকে তা স্বীকার করে নেবেন। এই হিসেবে &#8216;নিগার&#8217; পত্রিকায় যেসব শোবা সন্দেহ ও আপত্তি প্রকাশিত হবে, তর্জমানুল কুরআনে তা পুনরুল্লেখ করা হবে এবং সেই সঙ্গে তার জবাবও দেয়া হবে। অনুরূপভাবে &#8216;তরজুমানুল কুরআনে&#8217;র জবাব সম্পর্কে জনাব নিয়াজ কোনো মন্তব্য করলে মূল জবাবটিও তার সঙ্গে উল্লেখ করবেন বলে আশা করি, যাতে করে উভয় পত্রিকার পাঠকবর্গ আলোচনার উভয় দিক সম্পর্কে অবহিত এবং সেই সম্পর্কে নিজেরাও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। পক্ষান্তরে কেবল একটি দিক উল্লেখ করা এবং অন্যদিক এড়িয়ে যাওয়াকে আপন দুর্বলতার স্বীকৃতি বলেই আমি মনে করি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-empty-rhetoric-of-progressivism/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16394</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আধুনিক কালের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/modern-disease-ridden-nations/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/modern-disease-ridden-nations/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 23 Nov 2025 17:43:12 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা ও দর্শন]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16390</guid>

					<description><![CDATA[আজ প্রাচ্য পাশ্চাত্য ও মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একই বিপদে জড়িয়ে পড়েছে। তাহলো, নিরেট বস্তুতান্ত্রিকতার ক্রোড়ে লালিত এক সভ্যতা ও সংস্কৃতি এসে সবার ওপর চেপে বসেছে। তাই সভ্যতার চিন্তা-পদ্ধতি ও কর্মকৌশল উভয়েরই ইমারত গড়ে উঠেছে ভ্রান্ত বুনিয়াদের ওপর। এর দর্শন,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আজ প্রাচ্য পাশ্চাত্য ও মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একই বিপদে জড়িয়ে পড়েছে। তাহলো, নিরেট বস্তুতান্ত্রিকতার ক্রোড়ে লালিত এক সভ্যতা ও সংস্কৃতি এসে সবার ওপর চেপে বসেছে। তাই সভ্যতার চিন্তা-পদ্ধতি ও কর্মকৌশল উভয়েরই ইমারত গড়ে উঠেছে ভ্রান্ত বুনিয়াদের ওপর। এর দর্শন, বিজ্ঞান, নৈতিকতা, সামাজিকতা, রাজনীতি, আইন কানুন ইত্যাদি প্রত্যেকটি জিনিসই এক ভ্রান্ত জায়গা থেকে যাত্রা করে এক ভ্রান্ত পথে উৎকর্ষ লাভ করে এসেছে। আর বর্তমানে সে এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, তার ধ্বংসের শেষ প্রান্ত খুবই নিকটবর্তী হয়ে পড়েছে।</p>
<p>এই সভ্যতার সূত্রপাত হয়েছে এমন লোকদের মধ্যে, যাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে খোদায়ী জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো স্পষ্ট ও পবিত্র উৎসই বর্তমান ছিলোনা। সেখানে ধর্মগুরু বা পুরোহিতদের অস্তিত্ব অবশ্যি ছিলো; কিন্তু তাদের কাছে বুদ্ধিমক্তা,জ্ঞান-বিজ্ঞান, খোদায়ী কানুন-এর কোনোটাই বর্তমান ছিলোনা। তাদের কাছে যে বিকৃত ধর্মীয় মতবাদটি ছিলো, তা মানবজাতিকে চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে সোজা পথ প্রদর্শন করতে চাইলেও তা করতে মোটেই সক্ষম ছিলোনা। বরং তা শুধু পারতো জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করতে। আর কার্যত সে তা-ই করলো। তার এই প্রতিবন্ধকতার ফলে যারা উন্নতি ও তরক্কীর জন্যে উৎসুক ছিলো, তারা ধর্ম ও ধার্মিকতার উপর আঘাত হেনে এক ভিন্ন পথে যাত্রা করলো। এ পথে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং অনুমান ও অন্বেষণ ছাড়া আর কোনোই দিশারী ছিলোনা। এ দিশারীটি ছিলো সম্পূর্ণ অনির্ভরযোগ্য এবং নিজেই দিশারী ও আলোর মুখাপেক্ষী। তবু এটিই তাদের প্রধান নির্ভর হয়ে দাঁড়ালো। এর সাহায্যে তারা চিন্তা ভাবনা, গবেষণা, অনুশীলন ও সংগঠন পুণর্গঠনের পথে অনেক চেষ্টা সাধনা করলো। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা ভ্রান্তির সূচনা করে বসলো এর ফলে তাদের সমস্ত উন্নতির গতিধারাই এক ভ্রান্ত লক্ষ্যস্থলের দিকে নিবদ্ধ হলো। তারা ধর্মহীনতা ও বস্তুতান্ত্রিকতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করলো। তারা বিশ্ব প্রকৃতিকে এভাবে দেখলো যে, তার কোনো স্রষ্টা ও নিয়ন্তা (খোদা) নেই। বিশ্বজগত ও প্রাণীজগতের প্রতি এভাবে তাকালো যে, সত্যতা রয়েছে শুধু পর্যবেক্ষণ ও ইন্দ্রিয়ানুভূতির। এই দৃশ্যমান পর্দার আড়ালে আর কোনো বস্তুর অস্তিত্ব নেই। এভাবে অভিজ্ঞতা ও অনুমানের সাহায্যে তারা প্রাকৃতিক নিয়মকে জানতে ও বুঝতে সক্ষম হলো বটে, কিন্তু প্রকৃতির স্রষ্টা অবধি পৌঁছাতে পারলোনা।</p>
<p>অনুরূপভাবে তারা বিশ্বের ব্যবহারযোগ্য বস্তুনিচয়কে নিজেদের কর্তৃত্বাধীনে পেলো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহারও করলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা যে ঐ গুলোর মালিক ও নিয়ামক নয়; বরং আসল মালিকের প্রতিনিধি মাত্র- এই ধারণা থেকেই তাদের মন মগজ একেবারে শূণ্য ছিলো। এই অজ্ঞতা ও অচেতনা তাদেরকে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির মৌলিক ধারণা সম্পর্কে অচেতন করে দিয়েছিলো। এর ফলে তাদের গোটা কৃষ্টি ও সভ্যতাই ভ্রান্ত ভিত্তির ওপর গড়ে উঠে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে &#8216;আত্মা&#8217;র পূজারী হয়ে দাঁড়ায় এবং &#8216;আত্মার&#8217; আল্লাহ্‌র স্থান দখল করে তাদেরকে কঠিন ফিত্না ও বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করে দেয়। সেই মিথ্যা খোদার বন্দেগীই আজ তাদেরকে চিন্তা ও কর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক মারাত্মক পথে টেনে নিয়ে চলছে। এ পথের মধ্যকার পর্যায়গুলো নেহাত ভীতিপ্রদ ও চোখ ধাঁধানো হলেও তার শেষ পরিণতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই ভূয়া খোদাই বিজ্ঞানকে মানুষের ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। নৈতিকতাকে আত্মপূজা, প্রদর্শনেচ্ছা, অবাধ্যতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার ছাঁচে ঢালাই করে নিয়েছে। অর্থ ব্যবস্থার ওপর স্বার্থপরতার ও ভ্রাতৃহত্যার শয়তান চাপিয়ে দিয়েছে। সামাজিকতার শিরা উপশিরায় আত্মপূজা, বিলাসপ্রিয়তা ও আত্মকেন্দ্রীকতার হলাহল ঢেলে দিয়েছে। রাজনীতিকে জাতীয়তাবাদ, স্বদেশিকতা, বর্ণ ও গোত্রের পার্থক্য এবং শক্তি পূজার দ্বারা দুষিত করে মানবতার পক্ষে এক নিকৃষ্টতম অভিশাপ বানিয়ে দিয়েছে। ফলকথা পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ আসলে যে বিষবৃক্ষের বীজ রোপন করে, কয়েক শতকের মধ্যেই তা কৃষ্টি ও সভ্যতার এক বিরাট মহীরূহে পরিণত হয়। সে বৃক্ষের ফল সুমিষ্ট হলেও আসলে তা বিষদুষ্ট, তার ফুল দেখতে সুন্দর ও সুদৃশ্য হলেও আদতে কাঁটাযুক্ত, তার শাখা প্রশাখায় বসন্তের শোভা খাকলেও তার থেকে প্রবাহিত বিষাক্ত বায়ু ভেতরে ভেতরে গোটা মানবতাকেই বিষাক্ত করে চলছে।</p>
<p><strong>যে পাশ্চাত্যবাসিগণ এই বিষবৃক্ষকে সহস্তে রোপন করেছিল</strong><strong>, তারা আজ নিজেরাই তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। কারণ সে বৃক্ষ জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে এমন বিভ্রান্তি, জটিলতা ও পেরেশানির সৃষ্টি করেছে যে, তার যে কোনো প্রচেষ্টাই অসংখ্য জটিলতা ডেকে নিয়ে আসে। তার যে কোনো ডালই তারা কেটে ফেলে দেয়, সেখান থেকে, অসংখ্য কাঁটাযুক্ত ডাল ফুটে বেরোয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ তারা পুঁজিবাদের ওপর করাত চালালো, সংগে সংগে কম্যুনিজমের অভ্যুদয় ঘটলো। গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানলো অমনি ডিক্টেটরবাদ আত্মপ্রকাশ করলো। সামাজিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে গেলো, সংগে সংগে নারীত্ববাদ ও জন্মনিয়ন্ত্রণের আর্বিভাব হলো। নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতার প্রতিকারের জন্যে আইন প্রয়োগের চেষ্টা করলো, তার ফলে আইন লংঘন ও অপরাধ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ফলকথা, কৃষ্টি ও সভ্যতার এই বিষবৃক্ষ থেকে বিকৃতি ও বিচ্ছৃংখলার এক অন্তহীন ধারা বেরিয়ে আসছে এবং তা পাশ্চাত্য জীবনকে আপাদমস্তক দুঃখ কষ্ট ও ক্লেশের এক বিরাট ফোঁড়ার জ্বালা-যন্ত্রণা প্রতিটি শিরা উপশিরা ও স্নায়ুকেন্দ্রে অনুভুত হচ্ছে।</strong></p>
<p>পাশ্চাত্য জাতিগুলো আজ সে ফোঁড়ার তীব্র যাতনায় আর্তনাদ করে উঠছে। তাদের হৃদয় মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। তাদের আত্মা কোনো অমৃত রসের জন্যে ছটফট করছে। কিন্তু অমৃতরস কোথায় পাওয়া যাবে, সে খবরই তাদের জানা নেই। তাদের অধিকাংশ লোক এখনো ভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে যে সমস্যার আসল উৎস হচ্ছে ঐ বিষবৃক্ষের শাখা প্রশাখা মাত্র। তাই ডালপালা কাটবার কাজেই তারা নিজেদের সমস্ত সময় ও মেহনত নিয়োজিত করছে। কিন্তু তবু তারা বুঝতে পারেনা যে, বিকৃতিটা ডাল পালায় নয়; বরং গাছের মূল শিকড়ে অবস্থিত। আর অসৎ বৃক্ষমূল থেকে সৎ ডালপালা বেরুনোর প্রত্যাশা করা নির্বুদ্ধিতা বৈ কিছুই নয়।</p>
<p>পক্ষান্তরে আপন সভ্যতা বৃক্ষের মূলগত খারাপীকে উপলব্ধি করতে পেরেছে, এমন একটি ক্ষুদ্র দলও সেখানে রয়েছে। কিন্তু যেহেতু তারা কয়েক শতক ধরে ঐ বৃক্ষের ছায়ায় প্রতিপালিত হচ্ছে এবং তারই ফল-ফলারি থেকে তাদের অস্থি-গোস্ত গঠিত হয়েছে, তাই এর মূল ছাড়া অন্য কোনো মূল থেকে সৎ ডালপালা বিস্তৃত হতে পারে, তাদের মনমানস এ কথা উপলব্ধিই করতে অক্ষম। ফলে উভয় দলেরই অবস্থা দাঁড়িয়েছে এক রকম। তারা অত্যন্ত ব্যাকুলতার সাথে তাদের যন্ত্রণা উপশমকারী কোনো জিনিস সন্ধান করে ফিরছে; কিন্তু তাদের অভীষ্ট বস্তুটি কি এবং তা কোথায় পাওয়া যাবে, এ খবরই তাদের জানা নেই।</p>
<p>বস্তুত পাশ্চাত্য জাতিগুলোর সামনে কুরআন ও মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শ ও কর্মনীতি পেশ করার এটাই উপযুক্ত সময়। আজ তাদের বলা দরকার, তোমাদের হৃদয় মন যে ইপ্সিত বস্তুটির জন্যে উদ্বেলিত, তা হচ্ছে এই। যে অমৃতরসের জন্যে তোমরা চাতকের ন্যায় পিপাসার্ত, তা হচ্ছে এই। এ হচ্ছে এমন পূত পবিত্র মহীরুহ, যার মূল কান্ড এবং ডালপালা উভয়টাই সৎ। এর ফুল যেমন খুশবুদার, তেমনি কাঁটামুক্ত। এর ফল যেমন সুস্বাদু তেমনি প্রাণসঞ্চারক। এর হাওয়া যেমন আরামদায়ক, তেমনি হৃদয়-মন শীতলকারী। এখানে তোমরা বাস্তব বিচার বুদ্ধির সন্ধান পাবে, চিন্তা ও দৃষ্টির একটি নির্ভুল কেন্দ্রবিন্দু খুঁজে পাবে এবং সর্বোত্তম মানবীয় চরিত্র গঠনের উপযোগী জ্ঞানের সাক্ষাত পাবে। তোমরা এখানে এমন আধ্যাত্মিকের সন্ধান পাবে, যা সন্যাসী ও সংসার বৈরাগীদের জন্যে নয়; বরং দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে সংগ্রামকারীদের জন্যে আত্মিক শান্তি ও মানসিক স্বস্তির একমাত্র উৎস। এখনে তোমরা নৈতিকতা ও আইন কানুনের এমন উন্নত ও সুদৃঢ় বিধি ব্যবস্থা দেখতে পাবে, যা মানব প্রকৃত সংক্রন্ত পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যা কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় বদলে যেতে পারেনা। এখানে তোমরা কৃষ্টি সভ্যতার এমন নির্ভুল মূলনীতির সন্ধান পাবে, যা অবৈধ শ্রেণী-বৈষম্যও কৃত্রিম জাতি-বিভেদকে নিশ্চিহ্ন করে মানব সমাজকে খালেস যুক্তিসম্মত ভিত্তির ওপর সংগঠিত করে। সে মূলনীতি সাম্য, সুবিচার, উদারতা, দানশীলতা ও সদাচরণের এমন এক শক্তিময় ও সুসংগত পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে ব্যক্তি, শ্রেণী ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে স্বার্থ, অধিকার ও প্রয়োজনের খাতিরে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও লড়াই বাধবার কোনোই অবকাশ নেই; বরং সবাই এখানে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ব্যক্তিক ও সামাজিক কল্যাণের জন্যে সানন্দেও সন্তুষ্ট চিত্তে কাজ করতে পারে। কাজেই তোমরা যদি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে এক প্রচন্ড আঘাত এসে তোমাদের কৃষ্টি সভ্যতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ইতিহাসের ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষ্টি সভ্যতাগুলোর শামিল করে দেবার আগেই ইসলামের বিরুদ্ধে তামাম বিদ্বেষকে তোমাদের মন থেকে মুছে ফেলে দাও। তোমরা মধ্যযুগের ধর্মীয় উন্মাদদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে বিদ্বেষ লাভ করেছ এবং সেই অন্ধকার যুগের তামাম জিনিসের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পরও যাকে তোমরা আজ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রয়েছ, তাকে পরিহার করো এবং উদার মনে কুরআন ও মুহাম্মদ সা.-এর মহান শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত হও, তাকে গ্রহণ করো।</p>
<p>মুসলিম জাতিগুলোর অবস্থা পাশ্চাত্য জাতিগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এদের রোগ যেমন আলাদা, রোগের কারণও ভিন্ন। কিন্তু তাদের চিকিৎসা পাশ্চাত্য বাসীদেরই অনুরূপ। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর শেষ কিতাব ও শেষ নবীর মাধ্যমে যে জ্ঞান ও হেদায়াত পাঠিয়েছেন, তার দিকে প্রত্যাবর্তন করাই তাদের চিকিংসা।</p>
<p><em>যে পরিস্থিতিতে ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘাত বেধেছে</em><em>, তা ইসলাম ও অন্যান্য সভ্যতার মধ্যকার পূর্ববর্তী সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। রোমক, পারসিক, ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতার সংগে যখন ইসলামের সংঘর্ষ বাধে, তখন ইসলাম তার অনুবর্তীদের চিন্তা ও কর্মশক্তির উপর পূর্ণ মাত্রায় কর্তৃত্বশীল ছিলো। তাদের ভিতরে জিহাদ ও ইজতিহাদের প্রচন্ড ভাবধারা ক্রিয়াশিল ছিলো। আধ্যাত্মিক ও বস্তুতান্ত্রিক উভয় দিক থেকেই তারা দুনিয়ায় এক বিজয়ী জাতির গৌরব অর্জন করেছিলো এবং অন্য সব জাতির উপর নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিলো। তখন দুনিয়ার কোনো কৃষ্টি সভ্যতাই তাদের কৃষ্টি সভ্যতার মোকাবিলায় দাঁড়াতে পারেনি। তারা যেদিকে এবং যে জাতির কাছেই পৌঁছেছে, তার চিন্তাদর্শ, মতাদর্শ, জ্ঞান বিজ্ঞান, স্বভাব চরিত্র ও সমাজ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। তাদের মধ্যে বাইরের প্রভাব গ্রহণের যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বিস্তারের শক্তি ছিলো অনেক বেশি। নিঃসন্দেহে তারা অন্যদের কাছ থেকেও অনেক কিছু গ্রহণ করেছে; কিন্তু তাদের সভ্যতার মেজাজ এতোখানি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী ছিলো যে, বাহির থেকে এসে যা কিছুই তাতে যুক্ত হয়েছে, তা তার প্রকৃতির সঙ্গে একেবারে খাপ খেয়ে গিয়েছে এবং বাইরের কোনো প্রভাবেই তার মেজাজে এতটুকু পার্থক্য সুচিত হয়নি। পক্ষান্তরে সে অন্যদের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করেছে, তা একেবারে বিপ্লবাত্মক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো অমুসলিম সভ্যতা তো ইসলামের মধ্যে বিলীন হয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্যই বিলিয়ে দিয়েছে। আর যেগুলোর মধ্যে জীবনী শক্তি প্রবল ছিলো, সেগুলোও ইসলামের দ্বারা এতোটা প্রভাবিত হয়েছে যে, তাদের মুলনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। কিন্তু এ হচ্ছে তখনকার কথা, যখন মুসলমানদের ভেতর আদর্শের দীপশিখা অম্লান ও অনির্বাণ ছিলো।</em></p>
<p>মুসলমানরা কয়েক শতক ধরে লেখনী ও তরবারির সাহায্যে রাজত্ব চালিয়ে শেষ পর্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়লো। তাদের জিহাদী প্রাণশক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়লো। ইজতিহাদী শক্তি নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। যে মহাগ্রন্থ তাদেরকে জ্ঞানের রৌশনি ও কর্মের শক্তি যুগিয়েছিলো, তাকে তারা নিছক একটি পবিত্র স্মৃতিশাস্ত্র বানিয়ে গেলাফবন্দী করে রেখেছে। যে মহান নায়কের অনুসৃত নীতি তাদের কৃষ্টি ও সভ্যতাকে এক পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবধর্মী জীবনাদর্শের রূপদান করেছিল, তাঁর অনুসৃতিকে তারা বর্জন করলো। তার ফলে তাদের উন্নতি ও তরক্কীর গতি স্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রবহমান স্রোতস্বিনী হঠাৎ নিশ্চল উপত্যকায় এসে গতিরুদ্ধ হয়ে ক্ষুদ্র সরোবরে পরিণত হলো। নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসন থেকে মুসলমানরা অপসারিত হলো। তাদের চিন্তাধারা জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সভ্যতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দুনিয়ার অন্যজাতির ওপর যে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো, তার বাঁধন শিথিল হয়ে গেলো। পরন্তু ইসলামের মোকাবিলায় পাশ্চাত্যে এক ভিন্ন সভ্যতার অভ্যুদয় হলো। মুসলমানেরা জিহাদ ও ইজতিহাদের যে ঝান্ডাকে দুরে নিক্ষেপ করেছিলো, পাশ্চাত্য জাতিগুলো তাকে নিজ হাতে তুলে নিলো। মুসলমানরা আরামে শুয়ে রইলো আর পাশ্চাত্যবাসী তাদের পরিত্যক্ত ঝান্ডা নিয়ে জ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে এগিয়ে চললো। এমনকি যে নেতৃত্বের আসন থেকে তারা অপসারিত হয়েছিলো সেই আসনই এরা লাভ করলো। তাদের তরবারি দুনিয়ার অধিকাংশ এলাকাই জয় করলো। তাদের চিন্তাধারা, মতাদর্শ, জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং কৃষ্টি ও সভ্যতার মূলনীতি সারা দুনিয়ার ওপর ছড়িয়ে পড়লো। তাদের শাসন কর্তৃত্ব শুধু মানুষের দেহকেই নয়, তার দিল-দেমাগকেও অধিকারভুক্ত করে নিলো। অবশেষে কয়েক শতকের নিদ্রা থেকে জেগে উঠে মুসলমানরা চোখ মেলেই দেখতে পেলো, ময়দান সম্পূর্ণই তাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে এবং অন্য লোকেরা এসে তার ওপর জেঁকে বসেছে। এখন জ্ঞান বিজ্ঞান, কৃষ্টি সভ্যতা, আইন কানুন ও রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে যা কিছুই আছে, সবই তাদের (মুসলমানদের) হাতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তাদের কাছে রয়েছে শুধু দীপ্তিহীন এক আলোক বর্তিকা।</p>
<p>আজকে ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে এক নতুন ধারায়। নিসন্দেহে পাশ্চাত্য সভ্যতা কোনো দিক দিয়েই ইসলামী সভ্যতার মোকাবিলা করতে সমর্থ নয়। এমনকি ইসলামের সঙ্গে যদি সংঘর্ষ বাধে, তবে দুনিয়ার কোনো শক্তিই তার সামনে টিকে থাকতে পারেনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলাম কোথায়? আজকের মুসলমানদের মধ্যে যেমন ইসলামী স্বভাব প্রকৃতি ও নৈতিক চরিত্রের বালাই নেই, তেমনি নেই ইসলামী চিন্তাধারা ও কর্ম প্রেরণা। তাদের মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ কোথাও সত্যিকার ইসলামী প্রাণ চেতনা নেই। তদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন ইসলামী আইন কার্যকর নয়, তেমনি নয় তাদের সামাজিক জীবনেও। তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোন একটি শাখার ব্যবস্থাপনা প্রকৃত ইসলামী প্রণালীর উপর ভিত্তিশীল নয়। এমতাবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এক প্রাণবান, গতিশীল, জ্ঞানদীপ্ত ও কর্মচঞ্চল সভ্যতার সাথে মুসলমানদের নিশ্চল, জরাজীর্ণ ও অনগ্রসর সভ্যতার। আর এমনি অসম প্রতিযোগিতার ফলাফল যা হবার কথা, তাই হচ্ছে। মুসলমানরা ক্রমাগত পিছু হটছে। তাদের সভ্যতা পরাভূত হচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা পাশ্চাত্য কৃষ্টির মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মনমগজে দিন দিন পাশ্চাত্যপনা চেপে বসছে। পাশ্চাত্য ছাঁচে তাদের মানসিক কাঠামো গড়ে উঠছে। পাশ্চাত্যনীতির প্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা ও দৃষ্টিশক্তির পরিশীলন হচ্ছে। তাদের ধ্যানধারণা, নৈতিকতা, অর্থনীতি, সামাজিকতা, রাজনীতি ইত্যাদি প্রতিটি জিনিসই পাশ্চাত্যের রঙে রঞ্জিত হচ্ছে। তাদের নব্য বংশধরগণের মনমানসে এই ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, পাশ্চাত্য থেকে প্রাপ্ত বিধানই হচ্ছে সত্যিকার জীবন বিধান। সুতরাং এ পরাজয় হচ্ছে আসলে মুসলামানদের পরাজয় ইসলামের পরাজয় নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একে ইসলামের পরাভব বলে বিবেচনা করা হচ্ছে!</p>
<p>এই কঠিন বিপদে শুধু একটি দেশই পরিবেষ্টিত নয়। কেবল একটি জাতিই এ সংকটের মুখোমুখি নয়। আজ গোটা মুসলিম জাহানই এই ভয়াবহ বিপ্লবের পর্যায় অতিক্রম করে চলছে। প্রকৃতপক্ষে এই বিপ্লবের যখন সূত্রপাত হচ্ছিল, ঠিক তখন থেকেই সচেতন ভূমিকা গ্রহণ করা, আসন্ন সভ্যতার নীতি ও ভিত্তিমূলকে উপলদ্ধি করা এবং পাশ্চাত্য দেশসমূহ পরিভ্রমণ করে এর বুনিয়াদী জ্ঞানবিজ্ঞান অধ্যয়ন করা ছিলো আলিম সমাজের কর্তব্য। তাঁদের উচিত ছিলো, যেসব কার্যকরী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও বাস্তব প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে পাশ্চাত্য জাতিগুলো উন্নতি লাভ করছে, ইজতিহাদী শক্তির দ্বারা সেগুলোকে আয়ত্বাধীন করে নিয়ে ইসলামী নীতির আলোকে মুসলমানদের শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। এতে করে যেমন শত শত বছরের নিষ্ক্রয়তাজনিত ক্ষতি পূর্ণ হয়ে যেতো, তেমনি ইসলামের গাড়ীও আবার যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হতো। কিন্তু আক্ষেপের ব্যাপার হলো, খোদ আলিম সমাজই (ব্যতিক্রম ছাড়া) তখন ইসলামের সত্যিকার প্রাণচেতনা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে না ছিলো ইজতিহাদী শক্তি, না চিন্তা গবেষণার ক্ষমতা। তাঁদের বুদ্ধিমত্তা ও কর্ম শক্তিও লোপ পেয়েছিলো। খোদার কিতাব ও রসূলে খোদার আদর্শিক ও বাস্তব হেদায়াত থেকে ইসলামের সনাতন ও গতিশীল নীতি নির্ধারণ করে যুগের পরিবর্তির্ত অবস্থায় তাকে প্রয়োগ করার কোনো যোগ্যতাই তাঁদের মধ্যে ছিলোনা। তাদের মধ্যে পূর্ব পূরুষদের অন্ধ ও অনড় তাকলিদের ব্যাধি পুরোপুরি সংক্রমিত হয়েছিল। এর ফলে প্রতিটি জিনিসই তাঁরা এমন কিতাবাদিতে খোঁজ করতেন, যা কোনো কালোত্তীর্ণ খোদায়ী কিতাব ছিলোনা। তাঁরা প্রতিটি ব্যাপারেই এমন লোকদের মুখাপেক্ষী হতেন, যাদের মধ্যে নবীদের মতো সময় ও পরিবেশের বন্ধনমুক্ত উদার দূরদৃষ্টি ছিলোনা। কাজেই সম্পূর্ণ পরিবর্তিত অবস্থায় মুসলমানদের সাফল্যজনক নেতৃত্ব দান করা তাঁদের পক্ষে কি করে সম্ভব ছিলো? তখন তো জ্ঞানবিজ্ঞান ও কর্মসাধনার ক্ষেত্রে এমন বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, যার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা কেবল খোদার পক্ষেই সম্ভবপর ছিলো। কিন্তু যুগ যুগান্তকালের আবরণ ভেদ করে সে পর্যন্ত পৌঁছবার মতো দৃষ্টিশক্তি কোন সাধারণ মানুষের ছিলোনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>একথা নিসন্দেহ যে, আলিম সমাজ নয়া সভ্যতা ও সংস্কৃতির মোকাবিলা করার জন্যে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় উপায় উপকরণ ও সাজ সরঞ্জাম তাঁদের কাছে ছিলোনা। কারণ স্থবিরতার দ্বারা গতিশীলতার মোকাবিলা করা যায়না। তর্কশাস্ত্রের বলে যুগের গতিকে বদলানো যেতে পারেনা। নয়া অস্ত্রপাতির সামনে অকেজো মরচে ধরা হাতিয়ার কোনো কাজেই লাগতে পারেনা। আলিম সমাজ যেসব পন্থায় জাতির নেতৃত্ব প্রদান করতে চাইছিলেন, তাতে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনাই ছিলোনা। যে জাতি পাশ্চাত্য সভ্যতার বন্যা প্রবাহে বেষ্টিত হয়ে পড়েছিলো, সে চোখের ওপর ঠুলি বেঁধে এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে নিষ্ক্রিয় করে বন্যার অস্তিত্বকে কতোক্ষণ অস্বীকার করতে এবং তার প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকতে পারতো? যে জাতির ওপর আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রশক্তিসহ চেপে বসেছিলো, পরাভূত ও পদানত অবস্থায় সে তার বাস্তব জীবনকে ওই সভ্যতার প্রভাব প্রতিপত্তি থেকে কিভাবে রক্ষা করতে পারতো? বস্তুত এমনি পরিস্থিতিতে যা হবার শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরাজয় বরণের পর মুসলমানরা জ্ঞান বিজ্ঞান ও তাহযীব তমদ্দুনের ক্ষেত্রেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম জাহানের প্রতিটি দেশেই পাশ্চাত্যপনার তুফান মহামারীর বেগে ছড়িয়ে পড়েছে। আর তা বন্যা প্রবাহে ভাসতে ভাসতে মুসলমানদের নব্য বংশধরগণ ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূর থেকে দূরান্তরে চলে যাচ্ছে।</p>
<p><strong>দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে</strong><strong>, আমাদের আলিম সমাজ আজ পর্যন্ত তাঁদের ভ্রান্তি উপলদ্ধি করতে পারেননি। যে নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রথমদিকে আলিম সমাজ ব্যর্থতার গ্লানি বরণ করে নিয়েছিলেন, আজো প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশেই তাঁরা সেই একই দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই অবিচল রয়েছেন। কতিপয় ব্যক্তিক্রম ব্যক্তিত্বকে বাদ দিলে আলিম সমাজের সাধারণ অবস্থা হচ্ছে এই যে, যুগের বর্তমান গতি-প্রকৃতি ও মানসিকতার নতুন গড়নকে উপলদ্ধি করার কোনো চেষ্টাই তাঁরা করেননা। যেসব বিষয় মুসলমানদের নব্য বংশধরগণকে ইসলাম থেকে দুরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর প্রতি তাঁরা যতো খুশি ঘৃণা প্রকাশ করতে প্রস্তুত; কিন্তু সে হলাহলের প্রতিকার করার মতো ঝুঁকি গ্রহণ করতে তাঁরা অসমর্থ।</strong> আধুনিক পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্যে যে জটিল বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব সমস্যাবলীর সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর সমাধান করতে তারা হামেশাই অপারগ। এর কারণ হলো, ইজতিহাদ ছাড়া ঐ সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভবপর নয়। অথচ ইজতিহাদকে এঁরা নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছেন। বস্তুত আজকে আমাদের আলিম সমাজ ইসলামের শিক্ষা ও তার বিধিব্যবস্থা প্রচার করার জন্যে যে পন্থা অবলম্বন করছেন তা আধুনিক শিক্ষিত লোকদেরকে ইসলামের সাথে পরিচিত করানোর পরিবর্তে উল্টো তাদেরকে বীতশ্রদ্ধ করে দেয়। এমনকি কখনো কখনো তাদের ওয়াজ নসীহত শুনে কিংবা তাদের রচনাবলী পড়ে স্বতস্ফূর্তভাবেই মন থেকে বলে উঠে, খোদা যেনো কোনো অমুসলিম বা পথভ্রষ্ট মুসলিমের কান পর্যন্ত এইসব অর্থহীন প্রলাপ না পৌছান! মোটকথা, আমাদের আলিম সমাজ তাঁদের চারদিকে দু&#8217;শ বছরের পুরনো পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছেন। সেই পরিবেশেই তাঁরা চিন্তা ভাবনা করেন, তার ভেতরেই তারা বাস করেন এবং তার উপযোগী কথাবার্তা তাঁরা বলেন। একথা নিসন্দেহ যে, এই সম্মানিত ব্যক্তিদের কল্যাণেই আজও দুনিয়ার ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারের অমূল্য। রত্নরাজি সংরক্ষিত রয়েছে এবং তাদের প্রচেষ্টার ফলেই আজ ইসলামী শিক্ষা যা কিছু বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু তাঁরা নিজেদের এবং সমসাময়িক যুগের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তা-ই ইসলাম ও আধুনিক দুনিয়ার মধ্যে কোনোরূপ সম্পর্ক স্থাপনে বাধার সৃষ্টি করছে। এর ফলে যারা ইসলামী শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়, তারা আর দুনিয়ার কোনো কাজের উপযোগী থাকেনা। আর যে দুনিয়ার কাজের যোগ্য হতে চায়, সে ইসলামী শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত থেকে যায়। এই কারণেই আজ মুসলিম জাহানের সর্বত্র দু&#8217;টি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দলের অস্তিত্ব দেখা যায়। একদল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী সভ্যতার নিশানবর্দার, কিন্তু জীবনের সর্বত্র মুসলমানদের নেতৃত্ব দানে অক্ষম। আর দ্বিতীয় দল মুলসমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতির গাড়িকে চালিত করছে বটে কিন্তু ইসলামের নীতি ও ভিত্তি, ইসলামী সভ্যতার প্রাণবস্তু এবং ইসলামের সমাজ পদ্ধতি ও তামাদ্দুনিক বিধি ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, অপরিচিত ও অনবহিত। এদের হৃদয়ের কোণে ঈমানের কিছুটা আলো রয়েছে বটে; অন্যান্য সবদিক থেকে এদের এবং অমুসলমানের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। কিন্তু যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাস্তব কর্মশক্তি এই দলটিরই করায়ত্ব রয়েছে এবং এদের বাহুতেই গাড়ি চালানোর মতো শক্তি রয়েছে, এজন্যই তারা মিল্লাতের গোটা গাড়িটি নিয়ে ভ্রান্তি ও গুমরাহীর পথে দ্রুত এগিয়ে চলছে। সে পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে রাখা এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করার মতোও আজ আর কেউ নেই।</p>
<p>আমি এই পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি এবং এর ভয়ঙ্কর পরিণতিও নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছি। যদিও নেতৃত্ব দান করার জন্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা আমার নেই এবং এমনি বিকৃত পরিবেশে, এতো বড় একটি জাতির সংশোধন করার মতো শক্তিও আমার নেই, তবু আল্লাহ আমার হৃদয়ে একটি ব্যথা দিয়েছেন। আজ যে সামান্য জ্ঞান ও বিচক্ষণতা তিনি আমায় দান করেছেন, তার সাহায্যে মুসলমানদের ঐ দু&#8217;টি দলকে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতির আসল ও প্রকৃত উৎসের দিকে মনোযোগী হবার আহ্বান জানানো এবং সাফল্য ও ব্যর্থতার কোনো তোয়াক্কা না করে নিজের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্যে সেই ব্যথাই আমায় বাধ্য করছে। কাজের শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিজের দুর্বলতা দেখে আমার এই প্রচেষ্টাকে নিজের কাছেই তুচ্ছ বলে মনে হয়; কিন্তু সাফল্য বা ব্যর্থতা সবকিছুই হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর হাতে। আমার কাজ শুধু চেষ্টা করে যাওয়া। তাই সাধ্যানুযায়ী আমি আমার চেষ্টার পরিধিকে বিস্তৃত করতে চাই।</p>
<p>(তরজমানুল কুরআন: অক্টোবর ১৯৩৫ ইং)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/modern-disease-ridden-nations/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16390</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইকবাল জীবনের শিক্ষা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/teachings-of-iqbals-life/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/teachings-of-iqbals-life/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 16:13:02 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[ইকবাল]]></category>
		<category><![CDATA[ইকবাল জীবনের শিক্ষা]]></category>
		<category><![CDATA[জীবনের শিক্ষা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4139</guid>

					<description><![CDATA[নশ্বর এই ধরণীর উন্মুক্ত মনোহর ময়দান সেই আদিকাল থেকে আধুনিকতার এই যুগ পর্যন্ত বীর পূজার (Heroworship) দিকে ধাবিত হয়ে আসছে। বড় কোনো জিনিসকে দেখে “হাযা রাব্বী-এটাই আমার প্রভু”, “হাযা আকবার-এটাই সর্ববৃহৎ” বলার অভ্যাস অনেক আগ থেকেই প্রচলন হয়েছিল, আজও পর্যন্ত]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">নশ্বর এই ধরণীর উন্মুক্ত মনোহর ময়দান সেই আদিকাল থেকে আধুনিকতার এই যুগ পর্যন্ত বীর পূজার (Heroworship) দিকে ধাবিত হয়ে আসছে। বড় কোনো জিনিসকে দেখে “</span><span style="font-weight: 400;">হাযা রাব্বী-এটাই আমার প্রভু”, “হাযা আকবার-এটাই সর্ববৃহৎ” বলার অভ্যাস অনেক আগ থেকেই প্রচলন হয়েছিল, আজও পর্যন্ত তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়নি। যেভাবে দু&#8217;হাজার বছর পূর্বে বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের দাবীতে নির্বোধ সৃষ্টিকুল অন্য কোনো পন্থা উদ্ভাবন করতে না পেরে বীরের স্বীকারোক্তিতে তার আকৃতি তৈরি করে তারই পূজা-অর্চনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এমনিভাবেই আজ বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য প্রথা &#8211; দাসপ্রথা বিরোধী জাতি (রুশ) মনন-মেধা লেনিনের মাহাত্ম্যের স্বীকারোক্তির পথ ও পন্থা ছাড়া চিন্তাই করতে পারে না যে তার ব্যক্তিত্বের বাইরে মানবতার জয়গান কেউ গাইতে পারে।&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">অবশ্য, মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈকি। বীর পূজার কল্পনা তাদের মনন-মেধায় অঙ্কিত হয়ে কোনো দিকে ঝুঁকে পড়ে না। মুসলমানরা বড়দের</span><span style="font-weight: 400;">&nbsp;</span><span style="font-weight: 400;">সাথে আচরণের একমাত্র দিকই চিন্তা করতে পারে। আর তা হলো- আল্লাহ তাদেরকে জীবন-চলার সঠিক পথ দেখিয়েছেন, যার উপর চলে তারা বুজুর্গীর উচ্চতম মার্গে উপনীত হবে। সেজন্য তাদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং তাদের ন্যয়ই আমল করা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি সংক্ষিপ্ত বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমার দেশের যুবক সম্প্রদায়কে এই দিক-নির্দেশনা দিতে চাই, যে ইকবালের মহত্ত্বের বার্তা তাদের হৃদয়ে মোহরাঙ্কিত হয়ে রয়েছে, তার জীবন আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়? </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এটা সবাই জানেন যে, ইকবাল ঐ পাশ্চাত্য শিক্ষাই অর্জন করেছিলেন, যে শিক্ষা আমাদের যুব-সম্প্রদায়ও ইংরেজদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রহণ করছেন। সেই ইতিহাস, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন এবং সেই দর্শন শাস্ত্রই তিনি পড়েছেন আর এসব বিষয়েই তিনি কেবল শিক্ষানবিস ছিলেন না, বরং তিনি উল্লেখিত বিষয়ে খ্যাতিমান এবং বিশেষজ্ঞ হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। </span><span style="font-weight: 400;">বিশেষ করে দর্শনশাস্ত্রে তো তিনি এমন উচ্চতর মার্গে পৌঁছেছিলেন, অধুনাকালের খ্যাতিমান দার্শনিকরাও যার স্বীকারোক্তি করেছেন। যে শরাবের দু-চার ঢোক পান করেই অনেক লোক বিপথে চালিত হতে থাকে, মরহুম ইকবাল তাে সেই শরাবের মহাসাগরই পান করেছিলেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু, পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচারকে তিনি বাহ্যিকভাবে নিরীক্ষণ করেননি। যেমনটি আমাদের শতকরা ৯৯ ভাগ যুবক নিরীক্ষণ</span><span style="font-weight: 400;">&nbsp;</span><span style="font-weight: 400;"> করছেন। তিনি সেই সমুদ্রে</span> <span style="font-weight: 400;">নেমে প্রতিটি দিকে এত গভীরে পৌঁছেছেন, যেখানে পৌঁছে আমাদের অধুনাকালের তরুণ যুবকরা স্বীয় দ্বীন-ধর্ম, সভ্যতা-সংস্কৃতি, তাহজীব-তমদ্দুন এবং জাতীয় রীতি-নীতি বেমালুম ভুলে পশ্চাৎগামী হয়ে যান। পাশ্চাত্য প্রভাবে তারা এমনই প্রভাবিত হন যে, মাতৃভাষায় কথাবার্তা বলার রুচি পর্যন্ত তাদের লোপ পেয়ে যায়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু ঐ ব্যক্তিত্বের অবস্থা কী ছিলো? পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির মহাসমুদ্রে পা রাখার সময় </span><span style="font-weight: 400;">তিনি যেই মুসলমান ছিলেন, তার মধ্যভাগে গিয়ে তিনি আরো পাক্কা মুসলমানই বনে গেলেন। </span><span style="font-weight: 400;">সমুদ্রের গভীরে যতই সাঁতার কাটলেন তিনি ততই খাঁটি মুসলমান রূপেই নিরূপিত হয়েছেন। </span><span style="font-weight: 400;">এমনকি সমুদ্রের গভীরে যখন পৌঁছেন, তখন বিশ্ব দেখেছিল তিনি কোরআনের মধ্যেই ডুবে ছি</span><span style="font-weight: 400;">লেন। আর যা-ই চিন্তা করতেন কোরআনের নিরিখেই তার বাস্তবায়ন করতেন। যা-ই নিরীক্ষণ করতেন, কোরআনের নিরিখেই নিরীক্ষণ করতেন। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">হাকীকত এবং কোরআন তার দৃষ্টিতে ছিলো একই বস্তু। আর এই এক বস্তুর মধ্যেই তিনি এমনিভাবে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার সমসাময়িক ওলামায়ে দ্বীনের মধ্যেও এমন কোনো ব্যক্তিত্ব আমি দেখছি না যিনি কোরআনের মধ্যে বিলীন হবার ক্ষেত্রে এই দর্শনের ইমাম, এই এমএ, পিএইচডি, বার এটল’ কে উতরে গেছেন। অল্পসংখ্যক লোকই এটা জানেন যে, জীবনের শেষ দিনগুলোতে ইকবাল কোরআন ব্যতীত সমুদয় বই থেকে নিজেকে পৃথক করে নিয়েছিলেন। একমাত্র কোরআন ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো বই-ই তিনি সামনে রাখতেন না। বছরের পর বছর জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে ডুবে থাকার পর চূড়ান্ত যে মার্গে পৌঁছেছিলেন, তা হলো মূল জ্ঞান &#8211; কোরআন। আর অমূল্য এ সম্পদ যার হাতে আসবে, সে দুনিয়ার অন্য সব কিতাব হতে সম্পূর্ণ স্বাধীন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একবার ইকবালের কাছে এক ব্যক্তি দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন করে উত্তরের প্রত্যাশা করেছিলেন যে, এখন আল্লামা তাঁর লাইব্রেরির আলমারি খোলাবেন এবং বড় বড় বই বের করিয়ে উদ্দিষ্ট প্রশ্নাবলীর উত্তর তালাশ করবেন। কিন্তু তারা দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলেন যে, লাইব্রেরির আলমারিগুলোতে সেই তালাই লাগানো থাকলো, তিনি শুধু কোরআনুল কারীম হাতে নিয়েই জবাব লিখতে বসে গেলেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর তাঁর আকীদা-বিশ্বাসের বিষয়টি তো অনেকেরই জানা। সম্ভবত এটা কেউই জানেন না যে, তিনি তাঁর সম্পূর্ণ দর্শন এবং সমুদয় চিন্তা-চেতনাকে রাসুলে আরাবীর পবিত্র চরণে ক্ষুদ্র সম্পদ হিসেবেই উপঢৌকন স্বরূপ রেখে দিয়েছেন। হাদীসের যেসব দিকে শুধুমাত্র শিক্ষানবিসই নয়; লব্ধপ্রতিষ্ঠ আরবী শিক্ষাবিদও </span>কান খাড়া করেন, বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে থাকেন এই ডঃ অফ ফিলোসফি হাদীসের নির্ভেজাল ব্যাখ্যার উপরই ঈমান রাখতেন। আর এ ধরনের কোনো হাদীস শ্রবণ করার পর এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক হতো না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁর (ইকবালের) সামনে অতি বিস্ময়করভাবে ঐ হাদীসটি উল্লেখ করেন, যাতে বর্ণনা রয়েছে যে, রাসূলে করীম (স.) তিনজন সাহাবীর সাথে উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন। এ সময় উহুদ পাহাড় কাঁপতে লাগলো। রাসূল (স.) পাহাড়কে নির্দেশ দিলেন- স্থির হয়ে যাও। তোমার উপর একজন নবী, সিদ্দীক ও দুজন শহীদ আরোহণ করেছেন। হাদীসখানা শুনেই ইকবাল বললেন:</p>
<blockquote><p>“এতে আশ্চর্য হবার এমন কী আছে? আমি একে রূপক বা অবাস্তব কিছুই মনে করছি না; বরং একে নিরেট বাস্তব বলেই মনে করছি। এ ঘটনাকে মেনে নেয়ার জন্যে আমার কোনো ব্যাখ্যা-প্রমাণের প্রয়োজন নেই। তোমার কাছে মহাসত্যের সন্ধান যদি থাকতো, তা হলে তুমি বুঝতে পারতে কিভাবে একজন নবীর পদতলে এসে বড় বড় পাহাড়ের চূড়া প্রকম্পিত হয়ে যেতো, এ কম্পন রূপক কম্পন নয়, বাস্তব ঘটনা বৈ কি”।</p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">ইসলামী শরীয়তের যেসব আহকামকে অনেক স্বচ্ছ ধারণাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব বিস্মৃত ও পচনযুক্ত </span><span style="font-weight: 400;">কানুন বলে মনে করেন, আর যেসব কানুনের বিশ্বাস করা তাদের নিকট এক ধরনের অন্ধকারে </span><span style="font-weight: 400;">ডুবে থাকার শামিল যে, সভ্য সমাজে এর সাহায্য করা একজন শিক্ষিতের জন্য ডুবে মৃত্যুবরণ</span><span style="font-weight: 400;">&nbsp;</span><span style="font-weight: 400;">করার চাইতেও নিকৃষ্টতর &#8211; ইকবাল শুধু সেগুলো মানতেনই না এবং সেগুলোর উপর আমলই </span><span style="font-weight: 400;">করতেন না; বরং প্রকাশ্যে এগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আর কারও সামনে এগুলো সহায়তা করার ব্যাপারে তার ভয়-ভীতি ছিলো না। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এর সাধারণ একটি উপমা শুনুন। একবার ভারতীয় গভর্নমেন্ট তাকে স্বীয় এজেন্ট করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠাতে চেয়েছিল। তাঁর কাছে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো, কিন্তু সাথে একটি শর্ত ছিলো এই যে, তিনি তাঁর স্ত্রীকে পর্দা </span><span style="font-weight: 400;">করাতে পারবেন না। আর বক্তব্যের সময় তাঁর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে শরীক হতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইকবাল সংশ্লিষ্ট শর্ত সম্বলিত এই পদ গ্রহণ করার কথা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্বয়ং লর্ড ওলংডনকে বলেছিলেন-</span></p>
<blockquote><p><span style="font-size: 16px; font-weight: 400;">“নিঃসন্দেহে আমি একজন গুনাহগার মানুষ। ইসলামী হকুম-আহকাম পালনের ব্যাপারে অনেক অলসতাই আমার হয়ে থাকে। কিন্তু এ লাঞ্ছনা তো গ্রহণ করতে পারি না যে, আপনার নগণ্য পদ-পদবী গ্রহণ করার লোভে শরীয়তের হুকুমকে ছিন্ন করবো”।</span></p></blockquote>
<p><span style="font-weight: 400;">ইকবাল সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণার রটানো হয়েছে যে &#8211; তিনি শুধু আকীদার দিক থেকেই মুসলমান ছিলেন, আমলের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিলো না। এই ভুল ধারণা সৃষ্টির পেছনে তাঁর প্রকৃতিগত কিছু উপাদানও দায়ী। এর সাথে সংযুক্ত হয়েহে ছিদ্রান্বেষীদের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা। অথচ বাস্তবে তিনি মোটেও আমল বিমুখ ছিলেন না। কোরআন তেলাওয়াতে ছিলো তাঁর গভীর অনুরাগ। ফজরের নামাজের পর পাক কালাম তেলাওয়াতে নিবিষ্ট হয়ে যেতেন। কিন্তু জীবনের শেষপ্রান্তে এসে স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে তেলাওয়াতের সময় অবিরত কান্নার ভারে তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতো, তেলাওয়াতে আর এগোতে পারতেন না। নামাজও পড়তেন তিনি গভীর অভিনিবেশের সাথে নীরব পরিবেশে। কিন্তু সাধারণ্যের মধ্যে রটে গিয়েছিলো &#8216;কথার গাজী বলে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">তাঁর সাদামাটা জীবনমান এবং তবিয়তের অবস্থা তাঁর ইন্তেকালের পরপরই মানুষের মধ্যে </span>ছড়িয়ে গিয়েছিলো। এর আগে স্বাভাবিক ধারণা ছিলো যে, &#8216;স্যার&#8217; সাহেবরা আর পাঁচজন যেমন, ইকবাল তদ্রুপই হবেন। আর এর উপর ভিত্তি করে অনেকে বিচার বিশেষ না করেই লিখেও দিলেন যে, আলাহর দরবারে তাঁর ক্ষমা কিভাবে হতে পারে! কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো এই ব্যক্তিত্ব মানুষের ধারণার বাইরে রিক্ত নিঃস্ব ও সাদাসিধা জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। <span style="font-weight: 400;">যেমনটি তাঁর ইন্তেকালের পর মানুষও খবরের কাগজে বর্ণনা করে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একদিনের কাহিনী শুনুন। এর দ্বারা এই নাইট এবং ব্যারিস্টারের তবীয়ত সম্পর্কে আপনারা ধারণা</span><span style="font-weight: 400;">&nbsp;</span><span style="font-weight: 400;">করতে পারবেন। পাঞ্জাবের এক বিত্তশালী জমিদার একটি আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য ইকবাল ও স্যার ফজলে হোসাইন মরহুম সহ আরও দু&#8217;জন প্রসিদ্ধ </span>আইনজ্ঞকে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানান। তার তৈরি বিলাসবহুল প্রাসাদে তাঁদের থাকবার ব্যাবস্থা করেন। রাত্রে ইকবাল নির্ধারিত রুমে বিশ্রাম করতে গিয়ে চারদিকে বিলাস সামগ্রী দেখে এবং তার পীঠের নীচে দামী নরম বিছানা পেয়ে সাথে সাথেই মনে মনে ভাবলেন, যেই রাসূলে পাক (স.) এর জুতোর সদকায় আজ আমাদের এই মর্যাদা নসীব হয়েছে, তিনি তো খেজুর পাতার উপর শুয়ে-বসেই জীবনাবসান ঘটিয়েছেন। এ চিন্তা করতে করতে তাঁর নয়ন যুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। ঐ বিছানায় শোয়া তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে গেলো। তিনি উঠে বসলেন এবং সামনের গোসলখানায় গিয়ে একটি চেয়ারে বসে পড়ে অবিরত কান্না আরম্ভ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে মন কিছুটা হালকা হলে স্বীয় ভৃত্যকে ডেকে তার লাগেজ খোলেন এবং একটি চৌকি ঐ গোসলখানায় বিছিয়ে যতদিন পর্যন্ত ওখানে ছিলেন ঐ গোসল খানাতেই তিনি শুতেন। এটা মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বেকার ঘটনা। যখন বাইরের দুনিয়ায় তাঁকে স্যুট-বুটে সচরাচর দেখা যেতো, কেউ জানতোই না যে, ঐ স্যুটের মধ্যে যে ব্যক্তিত্ব লুকায়িত রয়েছে তার প্রকৃত ব্যক্তিত্ব স্বরূপ কী! তিনি ঐ সব মানব দরদীর পর্যায়ভুক্ত ছিলেন না, যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাদাসিধা এবং ফকিরি জীবন যাপনের ঘোষণা দিতো। আর সোশালিস্ট সেজে গরীব-নিঃস্বদের দুঃখে দুঃখী হবার ফাঁকা বুলি আওড়াতো, কিন্তু জনগণের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে তাদের জীবন যাপন হয়ে উঠতো বাদশাহী এবং অভিলাষী।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">ইকবালের নাইটবুট এবং স্যার সফী মরহুমের ন্যায় ব্যক্তিত্বের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক দেখে </span>সাধারণ্যে এই ধারণা ছিলো আর এখনো বিদ্যমান যে, তিনি কবিতা রচনাতেই শুধু স্বাধীন ছিলেন, আমলী জীবনে স্বাধিকার তাকে ঘেঁষতেও পারেনি, অধিকন্তু তিনি ছিলেন ইংরেজদের দাস। কিন্তু প্রকৃত সত্য ছিলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। যারা তাঁর সাহচর্যে ছিলেন, ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, আর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে জানেন, তারা অবশ্যই জ্ঞাত যে, ব্রিটিশ রাজনীতি হতে তার চিন্তাধারা এবং আমল দুটোই কঠোর বিরোধী। শাসনযন্ত্র হতে তিনি ছিলেন অতি অতি দূরে। সরকার এবং তার চাটুকার উভয়ই তাকে দেখতো বাঁকা চোখে। আর তাঁর ব্যক্তিত্বকে তারা তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির অন্তরায়ই ধরে নিয়েছিলো।</p>
<p><span style="font-weight: 400;">রাজনীতিতে তাঁর চিন্তা-ধারাই শুধু স্বাধীন ছিলো না, বরং তিনি স্বাধীন হিন্দুস্তানে দারুল ইসলামকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। এজন্যই তিনি এমন কোনো পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন না, যা একটি দারুল কুফরকে আরেকটি দারুল কুফরে বদলে দেবে মাত্র। শুধুমাত্র এ কারণেই তিনি রাজনীতির মাঠে সব লোকের সাথে বাধ্য হয়ে সহায়তা করেছেন, যারা রাজ্যের ছায়াতলে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করছিলো। সে যা-ই হোক উদ্দেশ্যের নিরিখে তাঁর মধ্যে এবং ঐ তবকার মধ্যে কোনো সংযোগ ছিল না। তবে হ্যাঁ, এই বিবেচনায় তাকে এই দলের সাথে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন যে, যত সময় পর্যন্ত মুসলমান যুবকদের মধ্য দারুল ইসলামের একটি স্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে না উঠবে, আর যুব সম্প্রদায় যতক্ষণ না এ ত্যাগ-তিতিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্যূন বিস্ময়ের ধারা বিপরীত দিকে ধাবিত করার চাইতে এ ধারাকে ধরে রাখা যায়। এ কারণেই তিনি একদিন তার কবিতার দ্বারা মুসলিম যুবকদের অন্তরে এই রূহ ফোকার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যে ব্যাপারে সবাই সম্যক ওয়াকিফহাল। অন্যদিকে রাজনীতির বাস্তব ময়দানে এই পথ অবলম্বন করেছেন, যার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হতে কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব ব্যতীত কেউ ওয়াকিফহাল নন। আর বাহ্যিক দিকের নিরিখে তিনি স্বয়ং অতি আপনজনেরও তিরস্কার পর্যন্ত শুনেছিলেন।</span></p>
<p><strong>অনুবাদ: ড. আব্দুল ওয়াহিদ</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/teachings-of-iqbals-life/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4139</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সংস্কার ও পুনর্গঠনের সঠিক পন্থা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/correct-approach-to-reform-and-reconstruction/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/correct-approach-to-reform-and-reconstruction/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 15:29:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইসলামী চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কার ও পুনর্গঠনের সঠিক পন্থা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4130</guid>

					<description><![CDATA[সংস্কার-সংশোধন ও বিপ্লব উভয়ের লক্ষ্যই বিকৃত অবস্থার পরিবর্তন সাধন। কিন্তু উভয়ের প্রেরণা ও কর্মপন্থায় রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। সংস্কার প্রচেষ্টার সূচনা হয় চিন্তা ভাবনা থেকে। সেখানে শান্ত মনে ভেবে চিন্তে মানুষ অবস্থা পর্যালোচনা করে, বিকৃতি ও বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে, বিকৃতির]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span style="font-weight: 400;">সংস্কার-সংশোধন ও বিপ্লব উভয়ের লক্ষ্যই বিকৃত অবস্থার পরিবর্তন সাধন। কিন্তু উভয়ের প্রেরণা ও কর্মপন্থায় রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। সংস্কার প্রচেষ্টার সূচনা হয় চিন্তা ভাবনা থেকে। সেখানে শান্ত মনে ভেবে চিন্তে মানুষ অবস্থা পর্যালোচনা করে, বিকৃতি ও বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে, বিকৃতির চৌহদ্দি পরিমাপ করে, তার নিরসনের পন্থা উদ্ভাবন করে এবং তা দূর করার জন্যে যতোটা শক্তির প্রয়োগ একান্ত অপরিহার্য, কেবল ততোটুকু শক্তিই প্রয়োগ করে। পক্ষান্তরে বিপ্লবের সূচনা হয় প্রবল রোষাগ্নি ও তীব্র প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে। তাতে এক বিকৃতির জবাবে অন্য এক বিকৃতি আমদানি করা হয়। যে অ-মিতাচারের ফলে বিকৃতির উদ্ভব হয়েছিলো, তার মোকাবিলা করা হয় অন্য অ-মিতাচারের দ্বারা যা অকল্যাণের সাথে সাথে কল্যাণেকেও নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ে। একথা নি:সন্দেহ যে, একজন সংস্কারবাদীকেও কখনো কখনো এমনসব কাজ করতে হয়, যা একজন বিপ্লববাদীর পক্ষে মানানসই। উভয়েই দেহের পচনশীল স্থানে অস্ত্রোপচার করে। কিন্তু পার্থক্য হলো, সংস্কারবাদী প্রথমেই অনুমান করে নেয় যে, বিকৃতি কোথায় এবং তার পরিধি কতোটুকু। অতপর বিকৃতি দূরীকরণের জন্যে যতোটা প্রয়োজন, ঠিক ততোটুকু পরিমাণেই সে অস্ত্র প্রয়োগ করে। পরন্তু অস্ত্রোপচারের পূর্বে সে ঘা শুকাবার ঔষধের ব্যবস্থা করে রাখে। কিন্তু বিপ্লববাদী তার ক্রোধের অতিশয্যে একেবারে অন্ধভাবে অস্ত্র চালাতে থাকে এবং ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সবকিছুই সে কেটে চলে যায়। এভবে যখন অনেক কাটা-ছেঁড়া করা হয় এবং দেহে একটি বেশ সুস্থ অংশ বিলুপ্ত করার পর নিজের ভ্রান্তি অনুভব করতে পারে, তখনি হয়তো তার ঔষধের কথা মনে আসে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সাধারণত যেখানে বিকৃতি মাত্রাতিক্রম করে যায়, সেখানেই লোকেরা ধৈর্য স্থৈর্য খুইয়ে বসে। বিকৃত পরিবেশ থেকে যে দুখ কষ্ট তারা ভোগ করে, তাতে শান্ত মনে, ভেবেচিন্তে সংস্কার প্রচেষ্টা চালানোর অবকাশই তারা পায়না। এ কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত সংস্কারবাদী আন্দোলনের পরিবর্তে বিপ্লববাদী আন্দোলনই তীব্রতা লাভ করে। রক্ষণশীল ও বিপ্লববাদী দলগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘাত দানা বেঁধে উঠে। এর ফলে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আগুন আরো বেশি ইন্ধন লাভ করে। উভয় পক্ষই একগুঁয়েমি ও হঠকারিতার চরম প্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়। উভয়ই সত্য ও সততার গলায় নির্মমভাবে ছুরি চালিয়ে দেয়। একপক্ষ সত্যের পরিবর্তে মিথ্যার প্রতিরক্ষা করতে গিয়ে চরম শক্তি নিয়োজিত করে, অপর পক্ষ সত্য মিথ্যা নির্বিশেষে সবার ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত বিপ্লববাদীরা যখন জয়লাভ করে, তখন সত্য মিথ্যা, ভলো মন্দ নির্বিশেষে রক্ষণশীলদের প্রতিটি জিনিসকেই ধ্বংস করে ছাড়ে। বস্তুত বিপ্লব ঠিক বন্যার বেগে এগিয়ে চলে। ভালো-মন্দ নির্বিচারে সবাইকে সে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ঠেলে দেয় বিলুপ্তির মুখে। অতঃপর অনেক ভাঙাচুরার পর যখন বিচারবুদ্ধি স্বস্তি ও স্থিতি লাভ করে তখন পুনর্গঠনের প্রয়োজন অনুভূত হয়। কিন্তু বিপ্লবী মানসিকতা এখানেও অভিনব পন্থা খুঁজে বের করে। পুরনো রক্ষণশীলদের প্রতিটি জিনিসকেই সে বর্জন করার চেষ্টা করে। একটা জিনিস যতোই সঠিক হোক না কেন, কিন্তু প্রাচীন ব্যবস্থপনার সঙ্গে সেটি সম্পর্কযুক্ত ছিলো- বিপ্লবের দৃষ্টিতে এর চাইতে বড় দোষ আর কিছুই নেই। এভাবে বেশ কিছুকাল ধরে বিপ্লবী নীতির ওপর জীবনের ইমারত গড়ে তুলবার জন্যে প্রচেষ্টা চলে। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা নিরীক্ষা ও ব্যর্থতার ফলে বিপ্লবী মস্তিষ্ক যখন অবসন্ন হয়ে পড়ে, তখন কোনো না কোনো দিক দিয়ে সে ভারসাম্যের পথে আসতে বাধ্য হয়, যা শুরু থেকেই সংস্কারবাদীদের সামনে ছিলো। অন্যকথায়, বুদ্ধিমান লোকেরা যা করে, নির্বোধ লোকেরাও তাই করে থাকে, তবে পানি অনেক ঘোলা করার পর।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমান যুগে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব। রাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় যে চরম বিকৃত সমাজ-ব্যবস্থা বর্তমান ছিলো, তা যখন দেশবাসীর পক্ষে একবারে অসহনীয় হয়ে উঠল, তখন তার প্রতিক্রিয়ায় একটি বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে উঠে। ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক মতবাদগুলো রাশিয়ায় বিকাশ লাভ করতে থাকে। পক্ষান্তরে রাজবংশ এবং তাদের তাবেদার শ্রেণিগুলো নিজেদের অবৈধ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে স্বৈরাচারী শক্তি ব্যবহার করে। এর ফলে শুধু রাজকীয় একনায়কত্ব এবং সম্পদের অসম বন্টনের বিরুদ্ধেই নয় বরং শতাব্দী কাল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে তামুদ্দুনিক ব্যবস্থা চলে আসছিলো তার বিরুদ্ধেই প্রবল রোষানল জ্বলে উঠে। অবশেষে কার্ল মার্কসের আত্মা লেলিনের মূর্তি পরিগ্রহ করে। জার শাসনকে সমূলে উৎখাত করা হলো। সেই সঙ্গে যে সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, তামদ্দুনিক, নৈতিক ও ধর্মীয় নীতির ওপর বিপ্লব পূর্ব যুগের সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিলো, যুগপৎ তা সবই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো। এই ব্যাপকতর ধ্বংসলীলার পর সম্পূর্ণ নতুন কম্যুনিস্ট নীতির ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ গঠনের কাজ শুরু হলো। এই নতুন সমাজ প্রাসাদে বুর্জোয়া শ্রেণীর পরিত্যক্ত কোনো একটি জিনিসও যাতে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে, তজ্জন্যে নয়া সংগঠকরা তাদের সমগ্র মানসিক শক্তি নিয়োজিত করল। এমনকি, আল্লাহকে পর্যন্ত সোভিয়েট রাশিয়া থেকে বেরিয়ে যাবার নোটিশ দেয়া হলো। কিন্তু দিন যতই অতিক্রান্ত হতে থাকে, গঠনমূলক বুদ্ধি ততই বিপ্লবী উম্মাদনার স্থান দখল করতে থাকে। এভাবে বিপ্লবের সূচনায় যে চরম বলশেভিকবাদ সক্রিয় ছিলো, ক্রমে ক্রমে তা ভারসাম্যের পথে ফিরে আসতে থাকে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই ধরনের প্রান্তিকধর্মিতা ফরাসী বিপ্লবকালেও দেখা দিয়েছিলো। তখনো বিপ্লবের ভাবোচ্ছাসে অতীতের সবকিছুই নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা চলছিলো এবং নতুন নতুন বিপ্লবী নীতি উদ্ভাবন করে তার প্রবর্তন করা হয়েছিলো। কিন্তু এহেন চরম বিপ্লবী মানসিকতার ফলেই আজ পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক প্রকৃতিতে পুরোপুরি ভারসাম্য স্থাপিত হতে পারেনি। আজকে তার জাতীয় জীবনের কোনো একটি দিক ও বিভাগেই বৃটেনের ন্যায় স্থিতিশীলতা বর্তমান নেই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এর আর একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে তুর্কী বিপ্লব। সেখানেও এমনি বিপ্লব মানসিকতাই একটি জাতিকেই যাদু বলে রাতারাতি ভিন্ন জাতিতে পরিণত করার প্রয়াস পেয়েছিলো। এই প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে দেশে রোগাক্রান্ত অংশের ওপর অস্ত্রপ্রয়োগের সাথে তুর্কী দেহের একটি বেশ সু্স্থ অংশও কেটে ফেলে দেয়া হয় এবং তার পরিবর্তে ইউরোপ থেকে কিছু নতুন অঙ্গপ্রতঙ্গ ধার করে এনে লাগিয়ে দেয়া হয়। এমনকি পুরোনো মস্তিষ্কের পরিবর্তে নতুন টুপিযুক্ত একটি নয়া মস্তিষ্কও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লববাদী তুর্কীরা ক্রমেই এই শিক্ষা লাভ করেছে যে, যে কোনো পুরোনো জিনিসই মন্দ এবং যে কোনো নতুন জিনিসকেই ভালো মনে করবার যে সাধারণ নীতি তারা গ্রহণ করেছিলো, তা মোটেও অভ্রান্ত নয়। তাই অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা প্রচুর ক্ষতি সাধনের পর তাদেরকে বাড়াবাড়ির পথ থেকে ভারসাম্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হচ্ছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ কথাগুলো বলবার কারণ হলো, বর্তমানে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে এক চরম বিপ্লবী মানসিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই চরমাবস্থার মন্দ পরিণতি দেখা দেবার আগেই আমরা প্রাচীন পন্থী ও বিপ্লবাবাদী উভয় দলকেই চিন্তা ভাবনা করবার আহবান জানতে চাই।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রকৃত পক্ষে তুরস্ক এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে যে বিকৃতাবস্থা বিরাজমান ছিলো এবং এখানো রয়েছে, এখনকার পরিস্থিতিও ঠিক তদ্রুপ। গত কয়েক শতক ধরে যে দলটির হাতে আমাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব করায়ত্ব রয়েছে, তারা ইসলামকে একটি অচল নিষ্ক্রিয় বস্তুতে পরিণত করেছেন। সম্ভবত হিজরী ছয় সাত শতকের পর থেকে তাদের কাছে কালের অগ্রগতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। তারা তাদের দর্শন ও ন্যায়শাস্ত্রের আলোচনায় অবশ্য এটাই পড়তেন এবং পড়াতেন যে, বিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং প্রত্যেক পরিবর্তনই হচ্ছে একটি নতুন জিনিস। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বিশ্বের পরিবর্তন, যুগের বিবর্তন এবং কালের অগ্রগতি ও নতুনত্বের প্রতি তারা চোখ বন্ধ করে রেখেছেন। দুনিয়া পরিবর্তিত হয়ে কোথা থেকে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে; দুনিয়ার অবস্থা, ধ্যান ধারণা, ভাবধারা, মতাদর্শ ইত্যাদিতে কত কী পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটেছে। সামাজিক বিষয়াদি ও সমস্যাবলীতে কতো যে ওলট পালট হয়েছে! কিন্তু আমাদের ধর্মনেতারা এখনো নিজেদেরকে সেই পাঁচ ছয়’শো বছর পূর্বেকার পরিবেশেই মনে করেছেন। তাঁরা যুগের অগ্রগতির সাথে কোনোই তরক্কী লাভ করলেন না! নিত্য নতুন পরিবর্তন থেকে তারা প্রভাবমু্ক্ত রইলেন! জীবনের নতুন সমস্যাবলীর সাথে তাঁরা কোনোই সম্পর্ক রাখলেন না। তাঁরা আপন জাতিকে ও যুগের সাথে এগিয়ে চলতে বাধা দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন; বরং তাদেরকে ভবিষ্যত থেকে অতীতের দিকে টেনে নিয়ে চললেন। এমনি চেষ্টা কিছুদিনের জন্যই সফলকাম হতে পারত এবং তাই হয়েছিলো। কিন্তু চিরদিনের তরে এ ধরণের প্রচেষ্টার সাফল্য লাভ অসম্ভব ব্যাপার। দুনিয়ার সঙ্গে যে জাতির মেলামেশা ও সম্পর্ক সম্বন্ধ রয়েছে, সে কতদিন দুনিয়ার চিন্তাধারা ও জীবনের নতুন সমস্যাবলীর প্রভাবমুক্ত হয়ে থাকতে পারে? তার নেতৃবৃন্দ যদি অগ্রবর্তী হয়ে নতুন বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব ধর্মী পথে তাকে চালিত না করেন, তবে সে স্বাভাবিকভাবেই আপন ঘাড় থেকে তাদের নেতৃত্বের জোয়াল তুলে দূরে নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">আসলে এই বিকৃতির মূল শিকড় হচ্ছে অন্য একটি জিনিস। আমাদের আলেমদের বড় একটি অংশ খুঁটিনাটিতে এতদূর লিপ্ত হয়ে পড়েছেন যে, তার ফলে মূলভিত্তিই তাঁদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। অতপর খুঁটিনাটিই মূলনীতির জায়গা দখল করে নিয়েছে এবং তার থেকে আরো অসংখ্য খুঁটিনাটি বেরিয়ে এসেছে আর এগুলোই প্রকৃত ইসলাম বলে আখ্যা পেয়েছে। অথচ ইসলামে এগুলোর আদৌ কোন গুরুত্ব ছিলো না। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী জ্ঞানের প্রাসাদটি এই ধারাক্রমের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যে, প্রথমে কোরআন মজীদ, তারপর সুন্নতে রাসূল (সা.) এবং সর্বশেষে জ্ঞানী ও মনীষীদের ইজতিহাদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই ধারাক্রমকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়া হয় এবং এইভাবে নতুন ধারাক্রম রচনা করা হয় যে, প্রথমে একটি বিশেষ যুগের মনীষীদের ইজতিহাদ, পরে সুন্নতে রাসুল (সা.) এবং সবশেষে কোরআন মজীদ! এই নয় ধারাক্রমেই হচ্ছে সমস্ত জড়তা ও স্থবিরতার জন্যে দায়ী, যা ইসলামকে একটি অকেজো ও নিস্ক্রিয় বস্তুতে পরিণত করেছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">ফিকাহ্ শাস্ত্রকার, কালামশাস্ত্রবিদ, তাফসীরকারক ও মুহাদ্দিসগণের জ্ঞান-গরিমা ও তাঁদের অবদানের কথা কেউই অস্বীকার করতে পারেনা। কিন্তু তাঁরা মানুষ ছিলেন। তাঁদের জ্ঞান অর্জনের উপায় ও পন্থা সাধারণ মানুষের মতই ছিলো। তাঁদের কাছে ওহী আসতো না বরং আপন বিচার বুদ্ধি ও ব্যুৎপত্তির সাহায্যে কালামুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূল (সা.) সম্পর্কে চিন্ত‍া গবেষণা করতেন। এভাবে যে সব মূলনীতি তাঁদের কাছে নির্ভুল বলে মনে হতো, তার ভিত্তিতেই আইন কানুন ও আকাইদের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তাঁরা নির্ধারণ করতেন। তাঁদের এই সকল ইজতিহাদ আমাদের পক্ষে সহায়ক ও পথ নির্দেশক হতে পারে; কিন্তু এটাই মূলনীতি ও ভিত্তি হতে পারেনা। মানুষ নিছক তার বিচার বুদ্ধির সাহায্যে ইজতিহাদ করুক অথবা কোনো প্রত্যাদেশমূলক কিতাব থেকে আহরিত তথ্যের সাহায্যে ইজতিহাদ করুক কোনো অবস্থাতেই তার ইজতিহাদ দুনিয়ার জন্য স্থায়ী বিধান ও অটল নিয়মের মযাদা পেতে পারেনা। কারণ মানুষের জ্ঞান ও বিচার বুদ্ধি হামেশাই স্থান ও কালের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">স্থান ও কালের সমস্ত গন্ডি থেকে ঊর্ধ্বে  একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তাঁর কাছেই রয়েছে প্রকৃত জ্ঞান ভান্ডার। কালের আবর্তনে তাঁর জ্ঞান রাজ্যে অণু পরিমাণ পরিবর্তনও সূচিত হয়না। সে জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে কোরআনের আয়াত এবং তার ধারক ও বাহকের পবিত্র বক্ষদেশে। প্রকৃতপক্ষে এ হচ্ছে এমন এক জ্ঞান উৎস, যেখান থেকে প্রত্যেক যুগের মানুষই তার বিশেষ অবস্থা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তত্ত্ব ও বিধি ব্যবস্থা আহরণ করতে পারে। যতদিন আলেম সমাজ এই উৎস ও ভিত্তিমূল থেকে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন এবং নির্ভুল চিন্ত‍া শক্তি ও বিচার বুদ্ধি দ্বারা ইজতিহাদ করে আদর্শিক ও বাস্তব সমস্যাবলীর সমাধান করেছিলেন, ততদিন ইসলামও যুগের সাথে সাথে গতিশীলভাবে চলছিলো। কিন্তু যেদিন থেকে কোরআন সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা পরিহার করা হলো, হাদীসের সত্যানুসন্ধান ও বিচার বিশ্লেষণ বন্ধ হয়ে গেল, নির্বিচারে পূর্ববর্তী ‍তফসীরকারক ও মুহাদ্দীসগণের অন্ধ অনুকরণ শুরু হলো, অতীতের ফিকাহশাস্ত্রকার ও কালামশাস্ত্রবিদদের ইজতিহাদকে অটল ও চিরস্থায়ী বিধানে পরিণত করা হলো এবং কোরআন ও সুন্নাহর নীতিকে পরিত্যাগ করে আলেমগণের উদ্ভাবিত খুঁটিনাটিকেই মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হলো, সেদিনই ইসলামের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে গেলো। তার সম্মুখগতির পরিবর্তে পশ্চাদ্ধাবন হলো। তার ধারক ও বাহকগণ জ্ঞান ও কর্মের নব নব ক্ষেত্রে দুনিয়ার পথ নিদেশের পরিবর্তে প্রাচীন বিষয়াদি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেই লিপ্ত হয়ে পড়লো। ছোটখাট খুঁটিনাটি বিষয়ে বাক-বিতন্ডায় নিরত রইলো। নিত্যনতুন মাযহাব সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিতর্কমূলক ব্যাপারে ফিরকা সৃষ্টি করে চললো। এমনকি, এর পরিণামে মুসলমানদের উপর মুক্ত হস্তে কুফরী ও ফাসিকীর ফতোয়া জারি হলো। দুনিয়ার মানুষ (লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করছে)এর পরিবত (লোকেরা আল্লাহর দ্বীন থেকে দলে দলে বেরিয়ে যাচ্ছে) এর তামাশা দেখতে পেলো। </span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ হচ্ছে উল্লেখিত আচরণের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যা আজ আমরা এক ভয়াবহ বিপ্লবরূপে দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানেরা যখন দেখছে যে, তাদের ধর্ম নেতারা তাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছে না, বরং তাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার পরিবর্তে উল্টো পিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তখনি তারা তাদের কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। অতপর একটি ছত্রভঙ্গ সৈন্যদলের ন্যায় তারা ইতস্তত বিচরণ করতে শুরু করেছে। একদল ধর্মের পতাকাবাহীদের সমস্ত ভ্রান্তি ও দুর্বলতার অভিযোগ খোদ ধর্মের ওপরই চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের প্রগতির পথে ধর্মকেই সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধক বলে ঘোষণা করেছে। ধর্মকে বজন করে ’উন্নত‘ জাতিগুলোর অন্ধ অনুকৃতির কথা খোলাখুলি বলতে শুরু করেছে। অন্যদল আলেম সমাজ ও ধর্মনেতাদের গালাগাল করাকে নিজেদের অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছে, যেন এই গালিগালাজ ও গলাবাজির মধ্যেই মুসলমানদের কল্যাণ ও উন্নতির চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে। আর একদল উঠেই ধর্মের কাটছাঁট শুরু করে দিয়েছে। কেউ আবার ইমাম ও ফিকাহশাস্ত্রবিদদের সম্পকে কুৎসা রচনা আরম্ভ করেছে। আবার কেউ ফিকহর সঙ্গে হাদীসকে ও একই পর্যায়ে ফেলে দিয়েছে। কে‌উ আবার কোরআনী শিক্ষা দীক্ষা ও বিধি ব্যবস্থায় সংশোধনের প্রয়োজনবোধ করেছে। আবার কেউ দীন ও দুনিয়াকে পৃথক করবার ওকালতি করেছে। এদের মতে, ধর্মের সম্পক থাকবে শুধু আকাইদ ও ইবাদতের সঙ্গে, আর পার্থিব ব্যাপারে ধর্ম বা ধর্মীয় বিধি ব্যবস্থার কোন কর্তৃত্ব থাকবেনা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এভাবে ঐ বিকৃতাবস্থার পরিবতনের জন্যই বিভিন্ন দল উপদল তৈরী হয়েছে। কিন্তু তাদের আগ্রহ আকর্ষণটা সংস্কারের দিকে নয়, বরং বিপ্লবের দিকে। তারা শান্ত মনে চিন্ত‍া করেই দেখেনি, </span></p>
<ul>
<li style="font-weight: 400;"><strong>আসল বিকৃতিটা কি? </strong></li>
<li style="font-weight: 400;"><strong>কোথায় তার উৎস? </strong></li>
<li style="font-weight: 400;"><strong>বিকৃতির পরিধি কতটুকু এবং তার নিরসনের সঠিক পন্থা কি? </strong></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">নিছক অনুমানের সাহায্যেই এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, বিকৃতির অস্তিত্ব রয়েছে। আর তা দূরীকরণের জন্যে উম্মাহর দেহে অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে রোগের সঙ্গে রোগীর ও যে সবর্নাশ ঘটতে পারে, এটুকু তলিয়ে চিন্তা করা হচ্ছেনা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">স্বাধীন দেশগুলোতে অবশ্য একথা বলা যেতে পারে এবং বললে কতকটা সঙ্গতও হবে যে, বিপ্লবী কার্যক্রম ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নেই। কারণ সেখানে একটি মাত্র দলের হাতে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা নিবদ্ধ থাকে। অন্য কোন দলের পক্ষে সে ক্ষমতার অবসান ঘটাতে হলে এক প্রচন্ড বিপ্লবী কার্যক্রম ছাড়া সাফল্য লাভ করা নাও যেতে পারে। সেই সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে, বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের ওপর যখন কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ে, তখন যুগের অভিজ্ঞতা খুব শীঘ্রই তাদের বিচার বুদ্ধিকে সংহত করে দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে তাদেরকে বাড়াবাড়ির পথ বর্জন করে ভারসাম্যর পথ অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু এ কথা আমাদের ভুললে চলবে না যে, বর্তমানে [এটি ১৯৩৪ সালের কথা। তখনকার ব্রিটিশ–ভারত আর আজকের স্বাধীন বাংলা পাক-ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।] আমরা পরাধীনতার মধ্যে কালাতিপাত করছি। আমাদের পরিস্থিতি স্বাধীন দেশগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রথমত কোনো বিপ্লবী কার্যক্রমের প্রয়োজন নেই। কারণ এখানে এমন কোন প্রচন্ড ও শক্তিশালী প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কা নেই, যার মোকবিলায় একটি ‍ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কার আন্দোলন সফলকাম হতে পারেনা। দ্বিতীয়ত, কোনো বিপ্লবী কার্যক্রম শুরু এবং তা সফলকাম হলে দীর্ঘকাল পর্যন্ত তার ভারসাম্যের পথে আসবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কারণ বিপ্লবের ঝান্ডাবাহীদের কোনো বাধ্য-বাধকতাপূর্ণ দায়িত্বভার ন্যস্ত হবে না, যা তাদের প্রান্তিকধমিতাকে ভারসাম্যের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। কাজেই এখানে কোনো বিপ্লবী কাযক্রম যথার্থ নয়। বরং সত্য বলতে গেলে নানা ধরণের বিপ্লবী কাযক্রম বেশি দিন জারী থাকলে তার পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে দাঁড়াবে। ফলে যে ভিত্তি ভূমির উপর মুসলিম সমাজটি দাঁড়িয়ে আছে, তা টলে উঠবে এবং তার পরিবর্তে এমন কোনো সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, যার ওপর একটি নয়া সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। পরন্তু যে জাতি আগে থেকেই পরাধীনতা ও দাসত্বের মধ্যে রয়েছে, তার সমাজ ব্যবস্থাকে এভাবে চুরমার করে ফেলা হলে নৈতিক অধপাতের কোন গভীর অতলে সে নিক্ষিপ্ত হবে, তাও ভেবে দেখবার বিষয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ কারণেই আমরা কখনো কখনো রক্ষণশীলদের চাইতে ও বেশি কঠোরতার ‍সাথে বিপ্লববাদীদের মোকাবেলা করতে বাধ্য হই। নচেত বিকৃতাবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আমরাও তাদের সাথে একমত। ইসলামের মধ্যে যে জড়তা ও নিষ্কিৃয়তার সৃষ্টি করা হয়েছে, তাকে গতিশীলতায় রূপান্তরিত করতে আমরাও ইচ্ছুক। কিন্তু আমাদের মতে, এই গতিশীলতা সৃষ্টির জন্য ইসলামী রীতি-নীতি বর্জন করে ফিরিঙ্গীপনা আঁকড়ে ধরা কোনো নির্ভুল পথ নয়; কিংবা কোনো জ্ঞান গবেষণা ও চিন্তা ভাবনা ছাড়াই অন্ধভাবে ধর্মের কাটছাট শুরু করে দেয়াও কোনো সঠিক পথ নয়। অথবা প্রাচীনকালের মুজতাহিদগণ কঠোর শ্রম ও সংগ্রাম-সাধনা করে যে বিশাল ইমারত গড়ে তুলেছিলেন, তাকে অযথা ভূমিস্মাৎ করে দেয়াও কোনো যথাথ পথ নয়; কিংবা হাদীসের গোটা ভান্ডারকে আগুনে নিক্ষেপ করা ও কোনো অভ্রান্ত পথ নয়। অথবা বিচার বুদ্ধি দ্বারা কালামে ইলাহীতে কোনোরূপ সংশোধন ও পরিবর্তন করাও সত্যিকার পথ নয়। বস্তুত এগুলো সংস্কারের কোনো পথই নয়; বরং এ হচ্ছে আগের চাইতে ও মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টির পথ। এর সঠিক প্রতিকারের একমাত্র পথ এই যে, যে ধারাক্রমকে পাল্টে দেয়া হয়েছে, তাকে আবার সোজা করতে হবে। পূবে কোরআন যে নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিলো, সেই মর্যাদা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। নবুওয়াতের যুগে রাসূলে আকরাম (সা.) এর সাহাবাগণ তাঁর কথা ও কাজকে যে মর্যাদা দিতেন আজ হাদীসকে সেই মর্যাদা দান করতে হবে। ফিকাহশাস্ত্রকার, কালামশাস্ত্রবিদ, তফসীরকার ও মুহাদ্দিসগণ তাঁদের নিজস্ব কর্মকান্ডকে যে মর্যাদা দিয়ে গিয়েছেন, আমাদেরকেও কেবল সেই মর্যাদাই দিতে হবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মোটকথা, এদের সবার কাছ থেকেই উপকৃত হতে হবে। যে জিনিসগুলো বদলাবার প্রয়োজন নেই, সেগুলো যথারীতি বহাল রাখতে হবে। কিন্তু এটা কখনই ধারণা করা যাবেনা যে, মনীষীরা যা কিছু লিখে গিয়েছেন, তা অটল ও অপরবিতনীয় বিধান; কিংবা লিখিত কিতাবাদি আমাদেরকে কোরআন মজীদ সম্পকে চিন্তা ভাবনা এবং হাদীসে রসূলের সত্যানুসন্ধান করার প্রয়োজনীয়তা শেষ করে দিয়েছে। অথবা কোরআন ও সুন্নাহ থেকে সরাসরি জ্ঞান আহরণের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এই ধারাক্রম যদি আবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে ইসলামের বর্তমান স্থবির অবস্থা পুনরায় গতিশীলতায় রূপ নিবে। কারণ নিশ্চলতার আসল কারণই হলো, ইঞ্জিনকে গাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন করে পিছনে ফেলে রাখা হয়েছে। ড্রাইভারকেও ইঞ্জিন থেকে সরিয়ে নিয়ে পিছনের কোনো এক বগিতে বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সবচাইতে অগ্রবর্তী বগিটির ওপর এই ভরসা পোষণ করা হয়েছে যে, সে নিজেও যেমন চলবে, তেমনি সমস্ত গাড়িও চালিয়ে নেবে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কিন্তু একাজে রোষাবেগের কোনো প্রয়োজন নেই। রোষ কেবল সেখানেই হতে পারে, যেখানে কেউ স্বেচ্ছায় যুলুম করেছে। কিন্তু এখানে যা কিছ হয়েছে, স্বেচ্ছাকৃতভাবে হয়নি। এ কথা কেউ বলতে পারবে না যে, আলেমরা কোথাও কোনো সম্মেলন করে এই সিদ্ধান্ত করে ছিলেন যে, আমরা ইসলামের ওপর জড়তা ও নিষ্কৃয়তা চালিয়ে দেব এবং তার চলমান গাড়িকে বাধা দান করাবো। প্রকৃতপক্ষে হিজরী ছয় সাত শতক থেকে মুসলিম জাতিগুলোর রাজনৈতিক, সামরিক, অথনৈতিক ও তামদ্দুনিক শক্তির সঙ্গে তাদের মানসিক, বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে ক্রমাগত যে অধঃপতন সূচিত হয়েছে, এ হচ্ছে শুধু তারই পরিণতি মাত্র। সে অধঃপাত মুসলমানদের সংগ্রামী ভাবধারাকে যেরূপ নিস্তেজ করে ফেলেছে, তেমনি তাদের ইতিহাস ও উদ্ভাবনী চেতনাকেও মরচে ধরিয়ে দিয়েছে। জীবনের গোটা সমস্যাবলী সম্পকে যেমন মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছে, তেমনি ধর্মীয় ও শিক্ষাগত ব্যাপারেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবতন ঘটেছে। ফলে ধীরে ধীরে অবচেতনভাবেই তাদের গোটা মানস শক্তির ওপর মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এসেছে। এর জন্য আলেম সমাজ বা তাদের অনুগামী কাউকেই অভিযুক্ত করা যায় না। এর জন্যে বড়জোর প্রকৃতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা যেতে পারে। কিন্তু এ অভিযোগ করে যেমন কোনো ফলোদয় হবে না, তেমনি রোষানল ও ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি দ্বারা ও কোনো কল্যাণ সাধিত হবে না। কল্যাণ বা সংস্কারের একমাত্র নির্ভুল পন্থা হলো, শান্ত মনে বিকৃতির কারণ এবং তার পরিধি নির্ণয় করতে হবে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে বিকৃতির স্থলে সুকৃতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে।</span></p>
<p><strong>অনূদিত</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/correct-approach-to-reform-and-reconstruction/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4130</post-id>	</item>
		<item>
		<title>একটি সত্যনিষ্ঠ দলের প্রয়োজন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/a-loyal-team-is-needed/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/a-loyal-team-is-needed/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 15:28:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[একটি সত্যনিষ্ঠ দলের প্রয়োজন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4129</guid>

					<description><![CDATA[পৃথিবীতে বর্তমানে একটা মহাপ্রলয় চলছে। এর উদ্দেশ্য কি কেবল বিশ্ববাসীকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া অথবা প্রলয়ের পর ভালাে একটা কিছু সৃষ্টি করা—তা আমরা জানি না। তবে বাইরের লক্ষণ দেখে আঁচ করা যায়, এ যাবৎ যে সভ্যতার ধব্জাধারীরা মানব জাতির নেতৃত্ব]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পৃথিবীতে বর্তমানে একটা মহাপ্রলয় চলছে। এর উদ্দেশ্য কি কেবল বিশ্ববাসীকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া অথবা প্রলয়ের পর ভালাে একটা কিছু সৃষ্টি করা—তা আমরা জানি না। তবে বাইরের লক্ষণ দেখে আঁচ করা যায়, এ যাবৎ যে সভ্যতার ধব্জাধারীরা মানব জাতির নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে, তাদের আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে এসেছে। তাদের পরীক্ষার মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। আল্লাহর শাশ্বত বিধান অনুযায়ী তাদেরকে ও তাদের এ জাহিলী সভ্যতাকে পৃথিবীতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থেকে হটিয়ে দেয়ার সময় আগত প্রায়। পৃথিবীতে তাদের দায়িত্ব পালনের যেটুকু সুযোগ পাওয়া দরকার ছিল তা তারা পেয়েছে। নিজেদের যাবতীয় গুণপনা এবং সমস্ত প্রচ্ছন্ন যােগ্যতা ও প্রতিভাকে তারা সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগিয়েছে। তাদের ভেতরে হয়তাে এমন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই যা প্রকাশ পায়নি। তাই মনে হচ্ছে, খুব শিঘ্রই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে তারা অপসারিত হবে। বিশ্বব্যাপী তাদের এ ব্যাপক পরাজয়ের মহড়া সম্ভবত এজন্যেই চলছে, যাতে করে তারা নিজেদের মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা নিজেরাই করে রেখে যেতে পারে। এরপর সারা দুনিয়ায় আবার একটা অন্ধকার যুগও এসে যেতে পারে, যেমন সর্বশেষ ইসলামী আন্দোলনের পতন ও বর্তমান জাহেলী সভ্যতার আবির্ভাবের মধ্যবর্তী সময়ে এসেছিল। আবার এ ভাঙ্গার ভেতর দিয়ে নতুন করে একটা গড়ার পালাও শুরু হতে পারে।</p>
<p>পুঁজিবাদী গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র [National Socialism] এবং কমিউনিজমের যে শক্তিগুলাে আজ পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত, তারা আসলে আলাদা আলাদা সভ্যতার ধারক নয়। তাই তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে ভালােটিকে রাখার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে এরা একই সভ্যতার তিনটি শাখা। বিশ্ব প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কে এদের সকলের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। একই জীবন দর্শন ও একই নৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে এদের কাঠামাে তৈরী হয়েছে। &#8216;মানুষকে পশু মনে করা, বিশ্বজগতকে স্রষ্টা বিহীন হিসেবে উপস্থাপন করা , প্রকৃতি-বিজ্ঞান থেকে মানব জীবন পরিচালনার জন্য আইন আহরণ করা এবং অভিজ্ঞতা, স্বার্থপরতা ও লালসাকে নৈতিকতার ভিত্তি রূপে গণ্য করা&#8217;- এসবই হলাে এ তিনটি সংঘর্ষশীল আদর্শের সাধারণ উপাদান। এদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এ জাহেলী সভ্যতা সর্বপ্রথমে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বাতন্ত্রের বীজ বপন করেছিল। তার ফলে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে এবং দীর্ঘকাল ব্যাপী মানব জাতি এর হাতে নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত হতে থাকে। এর জুলুম ও নিষ্পেষণ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে তখন ঐ একই সভ্যতা সমাজতন্ত্রকে তার প্রতিকারের উপায় হিসেবে পেশ করে। কিন্তু এ প্রতিকার যে মূল রােগের চেয়েও মারাত্মক তা অল্প দিনেই প্রকাশ হয়ে পড়ে। অবশেষে সেই একই সভ্যতার পক্ষ থেকে ফ্যাসিবাদ অথবা জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র নামে প্রতিকারের দ্বিতীয় উপায় উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে যে, জাহেলিয়াত জননীর এ সর্বশেষ সন্তানটি নাশকতা ও বিপর্যয় সৃষ্টিতে আগের দুই সন্তানকেও হার মানিয়েছে।</p>
<p>এভাবে যে সভ্যতা মানুষকে লাগামহীনভাবে বিচরণশীল পশু মনে করে দুনিয়ার বুকে আপন দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেছে এবং মানুষকে পররাজ্য গ্রাস থেকে শুরু করে জঘন্যতম নৃশংসতা পর্যন্ত কোনাে মানবতা বিধ্বংসী ব্যাধি উপহার দিতে বাদ রাখেনি,তাকে পরীক্ষা করে দেখার আর কোনাে অবকাশ নেই। এ সভ্যতা বাস্তবিক পক্ষে তার সকল শাখা-প্রশাখা সমেত স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির শেষ প্রান্তে উপনীত হয়েছে। তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। তার কাছে এখন আর এমন কোনাে দাওয়াই অবশিষ্ট নেই, যা সে মানব জাতির সমস্যা সমাধানের জন্য দিতে পারে। তবুও যদি ধরে নেয়া যায় যে, নিজের আয়ুষ্কাল আরাে কিছুটা বাড়িয়ে নেয়ার জন্য সে আরাে একটা ‘ইজম’ বা মতবাদ হাজির করবে, তাহলেও আল্লাহ নিজের গড়া পৃথিবীটাকে নৈরাজ্য দিয়ে ভরে তােলার আরাে সুযােগ তাকে দেবেন, তা মনে হয় না হতে পারে, বর্তমান সংঘর্ষের পর এর শাখা-প্রশাখাগুলাের মধ্যে কোনােটা অবশিষ্ট থেকে যাবে। তবে তা যে খুবই ক্ষণস্থায়ী হবে, তাতে কোনাে সন্দেহ নেই। সেই শাখার মধ্য থেকে শীঘ্রই আগুনের শিখা বের হবে এবং সেই আগুনেই সে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হলাে, এ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর দুনিয়াতে কি আবার কোনাে অন্ধকার যুগ শুরু হবে, না নতুন কোনাে গঠন প্রক্রিয়া দানা বাঁধবে? এ প্রশ্নের মীমাংসা নির্ভর করে দুটো জিনিসের ওপর।</p>
<p>বর্তমান নিরেট জাহিলিয়াতের ব্যর্থতার পর আগেকার ভ্রান্ত মতবাদগুলাের চেয়ে ভালাে কোনাে মতবাদ মানুষের হস্তগত হবে কিনা, মানুষ যার কাছ থেকে কল্যাণ লাভের আশা করবে। যার ভিত্তিতে একটি শক্তিমান ও জীবন্ত সভ্যতা গড়ে ওঠা সম্ভব হবে!</p>
<p>একটি নতুন মতাদর্শের ভিত্তিতে নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক জিহাদ পরিচালনার যে যােগ্যতা ও ক্ষমতা প্রয়ােজন এবং যে প্রখর শক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তির দরকার সেই শক্তি ও যােগ্যতা সম্পন্ন একটি মানব গােষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটবে কিনা!</p>
<p>এ মানব গােষ্ঠীর নৈতিক গুণাবলী বর্তমান সহিষ্ণু সভ্যতার ধারকদের ঘৃণ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের তুলনায় অনেক ভালাে ও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হবে এ ধরনের কোনাে একটা মতাদর্শ যদি সত্যিই সময় মত হস্তগত হয়ে যায় এবং তার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের জন্য একটি অভীপ্সিত সত্যনিষ্ঠ দল তৎপর হয়ে উঠে তাহলে অবশ্যই মানব জাতি আবার একটা অন্ধকার যুগের খপ্পরে পড়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে। অন্যথায় এ অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হওয়ার হাত থেকে তাকে রক্ষা করার ক্ষমতা কারাের নেই।</p>
<p>আজ মানবজাতি এক অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মানুষ মানুষের সাথে বন্য পশুর চেয়েও হিংস্র আচরণ করছে। আদিম ও অসভ্য যুগেও মানুষ এ ধরনের নির্মমতা ও নৃশংসতার আশ্রয় নেয়নি। মানুষের আজকের নিষ্ঠুরতা ও হৃদয়হীনতার নজীর বন্য পশুদের মধ্যেও পাওয়া যাবে না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরমােৎকর্ষের ফল দাঁড়িয়েছে বােমা মেরে দেশের পর দেশ জ্বালিয়ে দেয়া এবং ট্যাংক চালিয়ে নিরীহ জনগণকে পিষ্ট করা। মানুষের সাংগঠনিক যােগ্যতাকে আজ সভ্যতা বিধ্বংসী আগ্রাসী সেনাবাহিনী সংগঠনের কাজে লাগানাে হচ্ছে ভয়াবহ মারণাস্ত্র তৈরী আজকের শিল্পোন্নতির অন্যতম ফসলে পরিগণিত হয়েছে। প্রচার যন্ত্রগুলাে পৃথিবী ব্যাপী মিথ্যা রটনা ও জাতিতে জাতিতে রেষারেষি, হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির চরম পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে। এসব কিছু মিলে আজ যে বিভীষিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনাে মানুষকে হতাশার গভীর আবর্তে তলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। এ অবস্থা মানুষকে ভগ্নহৃদয় করার এবং নিজের সমস্ত যােগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে তাকে চরম নৈরাশ্যে নিমজ্জিত করার ক্ষমতা রাখে। আর এ নৈরাশ্যের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে মানবজাতি চরম বিতৃষ্ণায় বহু শতাব্দীকালের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন ও অচেতন হয়ে যাবে।</p>
<p>আমি আগেই বলেছি যে, এহেন শােচনীয় ও বেদনাদায়ক পরিণতি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলাে, একটি গঠনমূলক মতাদর্শের সক্রিয় হয়ে ওঠা ও একটি সত্যনিষ্ঠ জনগােষ্ঠীর আবির্ভাব। কিন্তু সেই সম্ভাব্য মতাদর্শ, যা আজকের পরিবেশে সাফল্যমণ্ডিত হতে সক্ষম,তা কোনটি?</p>
<p>এ ক্ষেত্রে যদি আদিম অংশীবাদী জাহিলিয়াতের কথা পর্যালােচনা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, প্রাচীন যুগে বহু বড় বড় সভ্যতা জন্ম দেয়া সত্ত্বেও তা এখন মৃত। এর পুনরুজ্জীবনের আর কোনাে সম্ভাবনা নেই। শিরক বা অংশীবাদ নির্মূল হয়ে গিয়েছে। অজ্ঞ মানুষের জীবনে এর কিছু প্রভাব থাকলেও বুদ্ধিমান ও জ্ঞানীজনদের এখন আর এতে বিশ্বাস নেই। বিশ্বজগতের পরিচালনায় অনেকগুলাে মাবুদ নিয়ােজিত রয়েছে এবং দেবদেবী বা আত্মাদের হাতে মানুষের কল্যাণ অকল্যাণের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে এমন অলীক খেয়ালে তারা আর মত্ত থাকতে প্রস্তুত নয়। তাছাড়া অংশীবাদী ধ্যান-ধারণা দ্বারা মানব জীবনের জটিল সমস্যাবলীর সমাধান হতে পারে না, এটা একটা বাস্তব সত্য। সমাধান তাে দূরের কথা এর ফলে সমস্যাগুলাে আরাে জটিল হয়ে পড়ে। আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা মানব জাতির মধ্যে ঐক্য ও সংহতির অভাব। অংশীবাদ এ সমস্যার কোনাে সমাধান তাে করেই না, বরং তা অধিকতর অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টিতেই নিয়ােজিত। সুতরাং কোনাে অংশীবাদী মতাদর্শের আজকের বিশ্বে প্রতিপত্তি ও আধিপত্য লাভের কোনােই অবকাশ নেই।</p>
<p>এরপরে আসে বৈরাগ্যবাদের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা। বৈরাগ্যবাদ কোনাে শক্তি বলে গণ্য হয়নি, এখনাে হতে পারে না। &#8216;জন্মান্তরবাদ&#8217;, &#8216;অহিংসবাদ&#8217;, &#8216;সর্বেশ্বরবাদ&#8217; ইত্যাকার মতবাদগুলাের— যা মানবাত্মাকে হিমাগারে পাঠিয়ে দেয়, সাহস ও উৎসাহকে স্তিমিত ও নিস্তেজ করে এবং মানুষের চিন্তাশক্তিকে অলীক কল্পনার উন্মত্ততায় মাতিয়ে অকর্মণ্য ও নির্জীব করে রাখে- এতটা জীবনী শক্তিই নেই যা পৃথিবীর কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব ও পরিচালনাভার গ্রহণে সক্ষম কোনাে সভ্যতা জন্ম দিতে পারে। কোনাে যাদুকর এগুলাের মৃত দেহে প্রাণ সঞ্চারের হাজারাে চেষ্টা করলেও এগুলাে কখনাে জ্ঞান, তপস্যা ও ত্যাগের স্তর ছাড়িয়ে একটি গৌরবােজ্জ্বল সভ্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে না। কাজেই এসব মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া একমাত্র মৃত ও পতনােন্মুখ জাতির পক্ষেই সম্ভব। কোনাে জীবন্ত ও উদীয়মান জাতি এর প্রতি কোনাে রকম আকর্ষণ অনুভব করতে পারে না। আর নিরেট জাহিলিয়াতের [যা আদৌ কোনাে আধ্যাত্মিকতা ও অতি প্রাকৃতিক সত্তায় বিশ্বাস করে না এবং জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বস্তু নির্ভর মনে করে] পর্যালােচনায় গেলে এ সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে হয় যে, এ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর এতবেশী তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, তারা অচিরেই এ থেকে চূড়ান্তভাবে নিরাশ হয়ে যাবে। নিরেট জাহেলিয়াতের দরুনই মানুষ নিজেকে পশু ভাবতে শিখেছে আর সে জন্য পশুদের জীবন থেকেই আহরণ করেছে সে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম, প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং যােগ্যতমের বাঁচার অধিকার ইত্যাকার মতবাদ। নিজেকে পশু ভাবার কারণেই বস্তুগত স্বার্থ উদ্ধার ও জৈবিক লালসা চরিতার্থ করাকে সে জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য হিসেবেই নির্ধারণ করেছে, অভিজ্ঞতা ও স্বার্থ সিদ্ধিকে গ্রহণ করেছে নৈতিকতার উৎস ও ভিত্তি হিসেবে, আর মানুষের চেয়ে উচ্চতর কোনাে সার্বভৌম শক্তির কর্তৃত্ব না মানাই হয়েছে তার নীতি। এর ফল যা হবার তাই হয়েছে এবং তা অত্যন্ত বিষময় হয়েই দেখা দিয়েছে। এসব মতবাদের দরুন মানুষের মধ্যে জাতীয় ও বর্ণগত আভিজাত্যবােধ ও একদেশদর্শিতার প্রসার ঘটেছে। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্ম হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও অর্থনৈতিক শোষণের মত মারাত্মক আপদ মাথা তুলেছে। নিজস্ব ব্যাপারে ব্যক্তি থেকে শুরু করে বড় বড় জাতি ও সাম্রাজ্য পর্যন্ত নৈতিকতার কোনাে তােয়াক্কা করে না। সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার এই যে, মানুষ সত্যি সত্যি পশুর মত কাজ করা শুরু করেছে এবং অন্যান্য মানুষের সাথে পাশবিক ও যান্ত্রিক আচরণে প্রবৃত্ত হয়েছে। এসব মতবাদ সমাজে হয় গণতন্ত্রের নামে একজনের ওপর আর একজনের অত্যাচারের, অবৈধ আয়ের এবং অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা করার অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে, নয়তাে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের নামে মানুষকে ছাগল ভেড়ার পালের মত একটি স্বৈরাচারী দলের হাতে সঁপে দিয়েছে, যেন তাদেরকে যেদিক খুশি তাড়িয়ে নেয়া যায় অথবা তাদের সাহায্যে যেমন খুশী স্বার্থ উদ্ধার করা যায়। এ মতবাদগুলাের এই যে পরিণতি দেখা দিয়েছে তা কোনাে আকস্মিক ভুল-ভ্রান্তির ফল নয় বরং ঐ বিষবৃক্ষেরই স্বাভাবিক বিষফল। সুতরাং মানুষ যেমন এ যাবত এগুলাে থেকে কোনাে কল্যাণ লাভ করতে পারেনি, তেমনি ভবিষ্যতেও পারবে না। বস্তুত মানুষ সম্পর্কে এরূপ পশুসুলভ ধারণা, জীবন ও জগত সম্পর্কে এমন জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গী এবং এহেন অভিজ্ঞতা ও স্বার্থপরতা ভিত্তিক নৈতিকতার ভিত্তিতে এমন কোনাে সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠা সম্ভবই নয়— যা মানুষের জন্য যথার্থ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। এসব মতবাদ ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর মানবজাতি একমাত্র এমন একটি মতবাদ থেকে সার্বিক কল্যাণ আশা করতে পারে যার বৈশিষ্ট্য হবে নিম্নরূপ:</p>
<ul>
<li>সে মতবাদ মানুষকে মানুষই মনে করবে, পশু নয়। মানুষকে নিজের সম্পর্কে ভালাে জ্ঞান পােষণে উদ্বুদ্ধ করবে। পাশ্চাত্যের জড়বাদী দর্শন যেমন মানুষকে নিছক পশুরূপে গণ্য করে, খৃষ্টবাদ যেমন তাকে ‘জন্মগত পাপী’ বলে মনে করে এবং হিন্দু দর্শন যেমন তাকে ‘পুনর্জন্মবাদের শৃংখলাবদ্ধ’ মনে করে, —এ মতবাদ তেমন মনে করবে না, বরং তাকে এসবের অনেক ঊর্ধ্বে মনে করবে।</li>
<li>সে মতবাদ মানুষকে চরম স্বেচ্ছাচারী ও লাগামহীন জীব মনে করবে, বরং তাকে বিশ্ব সম্রাটের ক্ষমতার অধীন ও তার কাছে দায়ী বলে ঘােষণা করবে।</li>
<li>সে মতবাদ মানুষকে এক বাস্তব ও কার্যোপযােগী নৈতিক বিধানের আওতাধীন করবে এবং তাকে সেই নৈতিক বিধানে আপন প্রকৃতির খেয়াল-খুশীমত রদবদল করতে দেবে না।</li>
<li>সে মতবাদ বস্তুগত ভিত্তিতে মানবজাতিকে বিভক্ত করবে না বরং তার পরিবর্তে মানবজাতির ঐক্যের জন্য এমন একটা আখলাকী ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি গড়ে তুলবে, যার ওপর মানবজাতি সত্যিকারার্থেই ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম।</li>
<li>সমাজ জীবনের জন্য সে মতবাদ যেসব মূলনীতি দেবে তার আলােকে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে ও জাতিতে-জাতিতে সুষ্ঠু ও ভারসাম্যপূর্ণ সুবিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।</li>
<li>সে মতবাদ মানুষকে আত্মতুষ্টি ও আত্মপূজার চেয়ে উচ্চতর জীবন লক্ষ্য এবং জীবনের জড়বাদী ও বস্তুবাদী মূল্যবােধের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর মূল্যবােধ শিক্ষা দেবে।</li>
<li>সর্বোপরি সে মতবাদ মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতাগত উন্নতিতে শুধু সাহায্যই করবে না, বরং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নির্ভুল পথনির্দেশও দেবে। মানবজাতিকে আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত উভয় দিক দিয়ে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।</li>
</ul>
<p>এ ধরনের মতবাদ ইসলাম ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মানবজাতির ভবিষ্যত এখন ইসলামের ওপরই নির্ভরশীল। মানুষের নিজের রচিত সমস্ত মতবাদ ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। সেসব মতবাদের একটিরও আর সাফল্যের কোনাে অবকাশ নেই। এমনকি মানুষের মধ্যে এখন সেই উৎসাহ-উদ্দীপনাও নেই যে, নতুন করে কোনাে মতবাদ রচনা করবে এবং তার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিজের ভাগ্যকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেবে। এমতাবস্থায় যে মতবাদ ও মতাদর্শের ওপর মানুষ নিজের সার্বিক কল্যাণের জন্য নির্ভর করতে পারে, যে মতবাদ সমগ্র মানবজাতির জন্য এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থায় পরিণত হতে সক্ষম এবং যে মতবাদ গ্রহণ করে মানব জাতি সর্বগ্রাসী ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে, তা একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর অন্য কিছুই হতে পারে না। তাই বলে একথা ভেবে নেয়া ঠিক হবে না যে, পৃথিবীটা ইসলামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত হয়েই আছে; কেবল ইসলামের গুণাবলী বর্ণনা করে ইসলামের ওপর ঈমান আনার জন্য একটা দাওয়াতনামা প্রচার করতে পারলেই হলাে, তাহলেই এশিয়া, ইউরােপ, আফ্রিকা ও আমেরিকা একে একে তার বশ্যতা স্বীকার করতে শুরু করবে।</p>
<p>যে সভ্যতা একদা জাঁকালােভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলাে তার পতন হঠাৎ এমন আকস্মিকভাবে হয় না।</p>
<p>অনুরূপ পরবর্তী সভ্যতার উত্থানও এমন নাটকীয়ভাবে হয়না। কাল যেখানে ধু ধু মাঠ ছিল, আজ সেখানে রাতারাতি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের জোরে এক সুবিশাল প্রাসাদ গড়ে উঠলাে, এমনটি হয় না। একটি পতনােন্মুখ সভ্যতা আপন ধ্যান-ধারণা ও রীতিনীতির বদৌলতে সুদীর্ঘকালব্যাপী মানুষের মন-মগজ, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সমাজ-সভ্যতার ওপর প্রভাবশীল থাকতে পারে। সে প্রভাব আপনা-আপনি দূর হয়না, শক্তি প্রয়ােগে দূর করতে হয়। অনুরূপভাবে পতনােন্মুখ সভ্যতার ধারক-বাহকরা অবধারিত পতনের মুখেও বহু বছর যাবৎ পৃথিবীর ওপর আপন আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। তারা স্বেচ্ছায় হটে যায় না, তাদেরকে হটিয়ে দিতে হয়। একইভাবে নতুন সভ্যতার রূপরেখার ওপর একটি সভ্যতার প্রাসাদ গড়ে তােলাও চাট্টিখানি কথা নয়। আরাম কেদারায় বসে তা গড়া যায় না। সে জন্য প্রয়ােজন হয় শক্তিশালী আন্দোলনের, প্রয়ােজন হয় কঠোর সমালােচনা এবং জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ও নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার অক্লান্ত ও অব্যাহত প্রয়াসের। নতুন জ্ঞান ও চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে একদিকে পুরনাে ব্যবস্থার মূলােৎপাটন করতে হয় অপর দিকে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখাকে নির্দিষ্ট চিন্তাধারার আলােকে নতুন করে গড়ে তুলতে হয়। এভাবে সমগ্র সমাজের মনােজগতে এমন আধিপত্য বিস্তারের প্রয়ােজন হয় যার ফলে সকলেই সেই বিশেষ পদ্ধতিতেই ভাবতে ও অনুভব করতে আরম্ভ করে। আগে যে মূল্যবােধ ও মানদণ্ডে মানুষকে যাচাই করা হতাে, তা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে নতুন মূল্যবোেধ ও মানদণ্ড চালু করতে হয়। তার ভিত্তিতে নতুন চরিত্র ও নতুন প্রকৃতি সম্পন্ন মানুষ তৈরী করতে হয়। একদিকে পুরনাে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সমূলে উৎখাত করতে ও অপরদিকে নতুন মূলনীতির আলােকে গােটা সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।</p>
<p>সুতরাং বিশ্ববাসীকে সম্ভাব্য অন্ধকার যুগ থেকে বাঁচাতে ও ইসলামের অমূল্য রত্নে ভূষিত করতে হলে এ সুষ্ঠু ও নির্ভুল মতবাদটি হস্তগত হওয়াই যথেষ্ট নয়— সেই সাথে তার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নিষ্ঠাবান ও সৎ মানব-গােষ্ঠীর এগিয়ে আসাও প্রয়ােজন। এজন্য প্রয়ােজন এমন একটি কর্মী বাহিনীর যাদের ঐ মতাদর্শের ওপর সত্যিকার ঈমান ও অবিচল আস্থা রয়েছে।</p>
<p>তাদেরকে সবার আগে প্রমাণ করে দেখাতে হবে ঐ মতাদর্শের প্রতি তাদের নিজেদের ঈমান কতখানি মজবুত। যে শক্তি ও কর্তৃত্বের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে, আগে নিজেরাই তার অনুগত ও ফরমাবর্দার হবে। যে নীতি ও নৈতিকতাকে তারা সঠিক ও বিশুদ্ধ বলে বিশ্বাস ও প্রচার করছে আগে নিজেরাই হবে তার যথার্থ অনুসারী। যে জিনিসকে তারা ফরয বা অবশ্য করণীয় বলে জেনেছে প্রথমে নিজেরাই তা মেনে চলবে এবং যাকে তারা হারাম বা অবৈধ মনে করছে আগে নিজেরাই তা বর্জন করে চলবে। এভাবে ঐ আদর্শের প্রতি নিজেদের নিষ্ঠা আগে প্রমাণ করে দেখাতে না পারলে তার ওপর তাদের আস্থা আছে কিনা, সেটাই হয়ে পড়বে সন্দেহযুক্ত। তেমন হলে অন্যেরা তাদের অনুকরণ ও অনুসরণ করতে এগিয়ে আসতে চাইবে না। কিন্তু শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়, এ পতনােন্মুখ সভ্যতা, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যত বিদ্রোহ ঘােষণা করে তার সাথে ও তার অনুসারীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদও করতে হবে। এ ব্যবস্থার সাথে তাদের যে সুযােগ-সুবিধা, স্বার্থ, আশা- আকাঙ্খা ও আরাম-আয়েশ জড়িত রয়েছে তাও পরিত্যাগ করতে হবে। এভাবে একটা প্রতিষ্ঠিত বিজয়ী সভ্যতার সাথে সংঘাত ও বিদ্রোহের অনিবার্য ফল হিসেবে যেসব ক্ষয়-ক্ষতি, বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে, তাও ক্রমে ক্রমে বরদাশত করে নিতে হবে। একটা জুলুমপূর্ণ ব্যবস্থার আধিপত্য উৎখাত করতে ও তার জায়গায় একটা সুষ্ঠু ও ভালাে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে যা যা করা দরকার তাও তাদের করতে হবে। এ ধরনের একটা বিপ্লবাত্মক কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে বহু মূল্যবান সম্পদ ও সময় ব্যয় করতে হবে। মস্তিষ্ক ও শরীরের সবরকমের শক্তি প্রয়ােগ করতে হবে। জেল- যুলুম, নির্বাসন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং পরিবার-পরিজনের জান-মালের সর্বনাশ হওয়ার আশংকাও দেখা দেবে এমন কি সময়ে প্রাণও দিতে হবে। এসব পথ অতিক্রম না করে পৃথিবীতে কোনাে বিপ্লব কখনাে সাধিত হয়নি, আজও হতে পারে না। একটা সুষ্ঠু ও সুন্দর মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এরূপ নিবেদিত প্রাণ একদল লােক যতক্ষণ এগিয়ে না আসবে, ততক্ষণ সে মতবাদ যতই উঁচুদরে হােক না কেন, বই কিতাবের পাতা থেকে নেমে সরাসরি মাটিতে শিকড় গেড়ে বসতে পারে না। কোন আদর্শ বা মতবাদের প্রতিষ্ঠার জন্য তার নীতিমালার শক্তিমত্তা যতখানি প্রয়ােজন, উক্ত মতবাদে বিশ্বাসী মানুষগুলাের চরিত্রের বলিষ্ঠতা, কর্মোদ্দীপনা এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার সমন্বিত শক্তিও ঠিক ততখানি প্রয়ােজন। জমিতে ফসল উৎপাদনের প্রক্রিয়া এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভালাে ফসল উৎপাদনে সুষ্ঠু কৃষি পদ্ধতি, উত্তম বীজ, সামঞ্জস্য পূর্ণ আবহাওয়া—এসবেরই যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু মাটি শুধু এতেই সন্তুষ্ট হয় না। সে এতটা বাস্তববাদী যে, কৃষক যতক্ষণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অটুট ধৈর্য ও অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা তার ওপর নিজের অধিকার প্রমাণ না করে ততক্ষণ সে তাকে সােনালী ফসলে পরিপূর্ণ মাঠের ডালি উপহার দিতে রাজী হয় না। এভাবে পরিপূর্ণ নিষ্ঠা এবং কুরবানী ও আত্মত্যাগের প্রেরণা প্রত্যেক মতবাদের প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য, চাই তা সত্য হােক অথবা বাতিল। কিন্তু বাতিল মতবাদের তুলনায় সত্য মতবাদ প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রয়ােজন অনেক বেশী। বস্তুত সত্য এক অতি সূক্ষ্মদর্শী ও দক্ষ স্বর্ণকার। সে বিন্দুমাত্র ভেজালও গ্রহণ করতে রাজী হয় না। সে চায় একেবারে নির্ভেজাল খাঁটি সােনা কঠিন অগ্নী পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সমস্ত মেকী পুড়ে গিয়ে খাঁটি সােনা বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত সে তাকে বাজারে ছাড়তে দিতে ও তার নামে চালু হতে দিতে প্রস্তুত হয় না। মেকীর দায়িত্ব নিতে সে নারাজ।</p>
<p>কেননা সে সত্য। সে বাতিলের ন্যায় জাল মুদ্রা বা ভেজাল সােনা বাজারে ফেরী করে বেড়াতে পারে না। এজন্যই কুরআন একাধিকবার বলেছে-</p>
<blockquote><p>مَّا كَانَ اللّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَآ أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّىَ يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ</p>
<p>&#8220;তােমরা যে অবস্থায় রয়েছো, মু’মিনদেরকে সেই অবস্থায় থাকতে দেয়া আল্লাহর রীতি নয়। [অর্থাৎ মু’মিন ও মুনাফিক মিলেমিশে থাকা] খাঁটি ও মেকী বাছাই না করে আল্লাহ ক্ষান্ত হবেন না। (৩.আলে ইমরান:১৭৯)&#8221;</p>
<p>اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَکُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ ہُمۡ لَا یُفۡتَنُوۡنَ وَ لَقَدۡ فَتَنَّا الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ فَلَیَعۡلَمَنَّ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡکٰذِبِیۡنَ</p>
<p>&#8220;লােকেরা কি ভেবে নিয়েছে যে, ‘ঈমান এনেছি’ বললেই পরীক্ষা না করেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে? অথচ তাদের পূর্ববর্তীদের [অর্থাৎ যারাই ঈমান আনার দাবী করেছে] আমি পরীক্ষা না করে ছাড়িনি। কাজেই এটা অবধারিত সত্য যে, কে সত্যবাদী কে মিথ্যাবাদী তা আল্লাহ নির্ণয় করবেনই। (২৯.আনকাবুত:২-৩)&#8221;</p>
<p>أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُواْ الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْاْ مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاء وَالضَّرَّاء وَزُلْزِلُواْ حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُواْ مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللّهِ</p>
<p>&#8220;তােমরা কি মনে করেছ যে, এখনই তােমরা বেহেশতের ছাড়পত্র পেয়ে যাবে? অথচ তােমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর দিয়ে যে অবস্থা গিয়েছে তােমাদের ওপর দিয়ে তা এখনও যায়নি। তাদের ওপর এমন বিপদ মুসিবত এসেছে যে, তারা নাজেহাল হয়ে পড়েছে এবং রাসূল ও তাঁর সাথী মু&#8217;মিনরা চিৎকার করে বলে উঠেছে: আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? (২.বাকারা:২১৪)&#8221;</p>
<p>اَمۡ حَسِبۡتُمۡ اَنۡ تُتۡرَکُوۡا وَ لَمَّا یَعۡلَمِ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ جٰہَدُوۡا مِنۡکُمۡ وَ لَمۡ یَتَّخِذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَ لَا رَسُوۡلِہٖ وَ لَا الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَلِیۡجَۃً ؕ وَ اللّٰہُ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ</p>
<p>&#8220;তােমরা কি মনে করেছ যে, তােমাদের এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে? অথচ এখনও আল্লাহ যাচাই করে দেখলেন না তােমাদের মধ্যে কে জিহাদের দায়িত্ব পালন করেছে এবং আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের ছাড়া আর কারাে সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখেনি। (৯.তাওবা:১৬)&#8221;</p>
<p>وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ وَلَئِن جَاء نَصْرٌ مِّن رَّبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ أَوَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ. وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ.</p>
<p>&#8220;কিছু লােক এমনও রয়েছে যারা বলে আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি। কিন্তু যখনই আল্লাহর পথে তাদের নির্যাতন করা হয়েছে, তারা মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মত ভয় করেছে। আবার যদি তােমার প্রভুর পক্ষ থেকে বিজয় আসে, তাহলে ঐ লােকেরাই এসে বলে, আমরা তােমাদের সাথেই ছিলাম। আল্লাহ কি দুনিয়াবাসীর মনের অবস্থা অবগত নন? আসল ব্যাপার হলাে, মুমিন কে, আর মুনাফিক কে, তা আল্লাহ অবশ্যই নির্ণয় করে ছাড়বেন। (২৯.আনকাবূত:১০-১১)&#8221;</p>
<p>وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفْ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمَوَالِ وَالأنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُواْ إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ. أُولَـئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَـئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ</p>
<p>&#8220;আমি অবশ্যই তােমাদের ভীতিকর অবস্থা, ক্ষুধা এবং জানমাল ও উৎপাদনে ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়ে পরীক্ষা করবো। এসব অবস্থার মধ্যেও যারা ধৈর্যধারণ করে এবং বিপদ-মুসিবত এলেও যারা বলে, আমরা আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও। এ ধরনের লােকদের ওপর তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা ধারা বর্ষিত হয় এবং তারাই হয় সুপথপ্রাপ্ত। (২.বাকারা:১৫৫-১৫৭)&#8221;</p></blockquote>
<p>এসব কথা বলার সাথে সাথে কুরআন এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে যে,</p>
<blockquote><p>وَلَوْ يَشَاء اللَّهُ لَانتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لِّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ</p>
<p>আল্লাহ যদি চাইতেন তবে নিজেই তাদের পর্যুদস্ত করে দিতেন। তবে তােমাদের এক দলকে দিয়ে অন্য দলকে পরীক্ষা করাই আল্লাহর রীতি। (৪৭.মুহাম্মদ:৪)</p></blockquote>
<p>অর্থাৎ এরূপ ভেবোনা যে, আল্লাহ নিজে তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীদের দমন করতে পারেন না বলে তােমাদের সাহায্য চান। তিনি এমন শক্তিশালী যে, ইচ্ছা করলে চোখের ইশারাতেই তাদের ধ্বংস করে দিতে পারেন এবং নিজের মনােনীত জীবনব্যবস্থা নিজেই কায়েম করে দিতে পারেন। কিন্তু এ জিহাদ, পরিশ্রম এবং ত্যাগ ও কুরবানীর দায়িত্ব তােমাদের ওপর এজন্যই অর্পণ করেছেন যে, মানুষকে দিয়ে মানুষের পরীক্ষা নেবেন এটাই তার ইচ্ছা ও লক্ষ্য। বাতিলপন্থীদের সাথে মু’মিনদের সংঘাত ও সংঘর্ষ না ঘটা পর্যন্ত এবং সেই সংঘর্ষের ফলে বিপদ-মুসিবত, দুঃখ-কষ্ট ও ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত কে সত্যিকার মু’মিন এবং কে মিথ্যা ঈমানের দাবিদার তা নির্ণীত হওয়া সম্ভব নয়। আর যতক্ষণ অযােগ্য লােকদের মধ্য থেকে যােগ্য লােকেরা বাছাই হয়ে বেরিয়ে না আসবে ততক্ষণ খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে পারে এমন একটা সংগঠন তৈরী হওয়াও অসম্ভব।</p>
<p>সুতরাং একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, একটা সঠিক ও নির্ভুল মতবাদ হস্তগত হবে কি হবে না সেটা সমস্যা নয় এবং দুনিয়ার ভবিষ্যত তার ওপর নির্ভর করছে না। কেননা তেমন একটা নির্ভুল মতবাদ যথারীতি বিদ্যমান। আসল সমস্যা হলাে, ঈমানের শক্তিতে শক্তিমান এমন একদল মানুষ সংঘবদ্ধ হবে কিনা যারা প্রতিজ্ঞায় অটল, লক্ষ্যে অবিচল এবং আল্লাহর পথে সর্বস্ব বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত নয়। বস্তুত এ প্রশ্নের জবাবের ওপরই দুনিয়ার ভবিষ্যত নির্ভরশীল।</p>
<p>কেউ কেউ আমাদের বলেন, এমন চরিত্রের লােক এ যুগে কোথায় পাওয়া যাবে? এ জাতীয় লােক ইতিহাসের এক শুভ মুহূর্তে পয়দা হয়েছিল। তারপর স্রষ্টা আর তেমন লােক তৈরী করেন না। মানুষ তৈরীর সেই মডেলটি অতঃপর চিরদিনের জন্য পরিত্যক্ত হয়েছে। কিন্তু আসলে একথা ঠিক নয়। এটা একটা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। নিজেদের ব্যাপারে যারা নৈরাশ্যে ভােগেন কেবল তাদের মনেই বাসা বেঁধেছে এ অলীক ধারণা।</p>
<p>সকল যুগেই সব ধরনের যােগ্যতার অধিকারী লােক দুনিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে। মুনাফিক প্রকৃতির লােক এবং আয়েশী ও দুর্বলচেতা লােক যেমন সবসময়ই পাওয়া যেত এবং আজও পাওয়া যায়, তেমনি একটি মতাদর্শের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার পর তাকে বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারে এমন লােকও প্রত্যেক যুগেই পাওয়া যেত এবং আজও পাওয়া যায়।</p>
<p>আজ প্রত্যেকেই স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে, হিটলারের প্রতিও জার্মান আধিপত্যবাদের ওপর ঈমান আনার কারণে একজন দুজন নয় বরং হাজার হাজার লােক উড়ােজাহাজ থেকে সরাসরি শক্রর দেশে লাফিয়ে পড়ছে। অথচ তারা জানে যে, সেখানে অসংখ্য দুশমন শিকারীর ন্যায় তাদের জন্য ওঁৎ পেতে রয়েছে। রুশ বিপ্লবের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, হাজার হাজার মানুষ বিপ্লবী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে একাধিক্রমে অর্ধ শতাব্দী ব্যাপী সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাদের সাইবেরিয়ার কনসেনটেশান ক্যাম্পে পাঠানাে হয়েছে। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানাে হয়েছে। নির্বাসন দণ্ড নিয়ে তারা দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছে। ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ ও আশা-আকাঙ্কার মুখে ছাই দিয়ে ভিটেবাড়ী থেকে উচ্ছেদ হওয়াকে তারা হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছে। অথচ তখনাে জার সাম্রাজ্যের পতনের কথা কারাে কল্পনায়ও আসতাে না। দূরে যাওয়ার প্রয়ােজন নেই, খােদ ভারতবর্ষের কথাই ধরা যাক। রক্তপাত ও সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করা যাবে এ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে এখানকার একদল তরুণ সবরকমের ঝুঁকি নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের খাতিরে তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করা সহ যে কোনাে রকমের মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে কুণ্ঠাবােধ করেনি। এমন কোনাে বিপদ মুসিবতের কথা উল্লেখ করা যাবে না যা তারা বরণ করে নেয়নি। কারাগারে লােমহর্ষক নির্যাতন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ফাঁসির কাষ্ঠে প্রাণ বিসর্জন কোনােটাই বাদ যায়নি। তাদের কর্মপদ্ধতি ভুল ছিল কি নির্ভুল ছিল, সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর। তবে জীবনের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করার পর তার পেছনে জানমাল ও ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেয়া এবং সীমাহীন দুর্ভোগ ও দুঃখ-যাতনা ভােগ করতে প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার দুর্লভ গুণ যে আজও মানুষের মধ্যে একেবারে অনুপস্থিত নয়, সেটা এ থেকে অবশ্যই প্রমাণিত হয়।</p>
<p>গান্ধীজির অসহযােগ আন্দোলনের সময় এ ভারতবর্ষেরই কত লােক পুলিশী জেল-যুলুম, সহায়-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেছে; তার ইয়ত্তা নেই। বারদুলীর কৃষকদের জমিজমা, সহায়-সম্পদ, গবাদি পশু এমনকি ঘরের আসবাবপত্র ও ঘর-বাড়ি পর্যন্ত নিলাম ও বাজেয়াপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা তাতে বিচলিত হয়নি। ধীর শান্তভাবে সবকিছু বরদাশত করেছে। এ ইতিহাস কার অজানা। এরপরও কোন যুক্তিতে বলা যায় যে, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কুরবানীর যে গুণ আগেকার মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, আজকের যুগের মানুষ তা থেকে বঞ্চিত? হিটলার, কার্ল মার্কস ও গান্ধীর ওপর ঈমান এনে মানুষ যদি এতসব অসাধ্য সাধন করতে পারে, তাহলে আল্লাহর ওপর ঈমান এনে কি কিছুই করতে পারে না? স্বদেশের মাটির প্রতি যদি মানুষের এতবেশী আকর্ষণ থেকে থাকে যে তার জন্য মানুষ জানমালের ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের প্রতি কি এতটুকু আকর্ষণও সৃষ্টি হতে পারে না!</p>
<p>কাজেই ভীরু, কাপুরুষ ও দুর্বলচেতা লােকদের একথা বলার কোনােই অধিকার নেই যে, এ মহৎ কাজ সমাধা করতে যেসব বীর পুরুষের প্রয়ােজন, তা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য নিজেদের বেলা তারা হযরত মূসা আ.-এর সহচরদের ভাষায় বলতে পারে:</p>
<blockquote><p>فَاذْهَبْ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ</p>
<p>&#8220;যাও তুমি আর তােমার রব লড়াই করছে, আমরা এখানেই বসে রইলাম।&#8221;</p>
<p>(৫.মায়েদা:২৪)</p></blockquote>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/a-loyal-team-is-needed/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4129</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইকবাল ছিলেন আমার আধ্যাত্মিক সহায়</title>
		<link>https://rowyakbd.com/iqbal-was-my-spiritual-helper/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/iqbal-was-my-spiritual-helper/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 13:07:54 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতা]]></category>
		<category><![CDATA[ইকবাল]]></category>
		<category><![CDATA[ইকবাল ছিলেন আমার আধ্যাত্মিক সহায়]]></category>
		<category><![CDATA[ছিলেন আমার আধ্যাত্মিক সহায়]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4121</guid>

					<description><![CDATA[[পাকিস্তানের একটি খ্যতনামা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক মাসিক পত্রিকা “সাইয়ারা” ১৯৬৩ সালের মে মাসে &#8216;ইকবাল সংখ্যা&#8217; প্রকাশ করে। জনাব গোলাম হোসাইন আজহার&#160; মাওলানা মওদূদীর আলোচ্য সাক্ষাৎকারটি উক্ত বিশেষ সংখ্যার জন্য গ্রহণ করেন। এ সাক্ষাৎকার কয়েকবার দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।]&#160; মাওলানা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p style="text-align: center;"><span style="font-weight: 400;">[পাকিস্তানের একটি খ্যতনামা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক মাসিক পত্রিকা “সাইয়ারা” ১৯৬৩ সালের মে মাসে &#8216;ইকবাল সংখ্যা&#8217; প্রকাশ করে। জনাব গোলাম হোসাইন আজহার&nbsp; মাওলানা মওদূদীর আলোচ্য সাক্ষাৎকারটি উক্ত বিশেষ সংখ্যার জন্য গ্রহণ করেন। এ সাক্ষাৎকার কয়েকবার দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।]&nbsp;</span></p>
<p><strong>মাওলানা মওদূদী লিখলেন_ <em>“ইকবাল আমার আধ্যাত্মিক সহায় ছিলেন..”</em>।</strong></p>
<p><span style="font-weight: 400;">কয়েক বছর আগে মাসিক তরজমানুল কুরআনের পাতা উল্টাতে গিয়ে উপরোক্ত বাক্যটি আমার চোখে পড়ে। আমার মনে হল, বাক্যটিতে প্রবল আবেগ অনুভূতির ছোঁয়া রয়েছে। এ বাক্যটির মূলে কোন মনস্তাত্ত্বিক রহস্য রয়েছে, যা জানা দরকার ছিল। বহুবার মনে হয়েছে মাওলানার সাথে এ বিষয়ে কথা বলি। কিন্তু প্রতিবারই মাওলানার ব্যস্ততার কথা মনে পড়তেই সে ইচ্ছা চাপা পড়ে যায়। এবার যখন সাইয়ারার ইকবাল সংখ্যার প্রয়োজন পড়েছে, আমি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বহু দিনের অপূর্ণ ইচ্ছাটা মাওলানাকে জানালাম।&nbsp;</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মাওলানা আমাকে কোন একদিন বিকেলে তার কাছে যেতে বললেন। আমি ১৪ ই এপ্রিল বিকেলে উপস্থিত হলাম।&nbsp; </span><span style="font-weight: 400;">নিম্নে মাওলানার সাথে আমার কথোপকথন এর সারসংক্ষেপ তুলে ধরছিঃ</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> মাওলানা, আপনি একবার লিখেছিলেন যে, ইকবাল আমার আধ্যাত্মিক সহায় ছিলেন। এর পটভূমিকা কি?&nbsp;</span></p>
<p><b>মাওলানাঃ </b><span style="font-weight: 400;">ডক্টর ইকবাল আমাকে পাঠানকোট যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তুমি যদি এখানে চলে আসো, কাজের আঞ্জাম দাও; তাহলে আমিও বছরে ৬ মাস এখানে এসে কাটাবো।&nbsp; </span><span style="font-weight: 400;">এ আহ্বানে এমন একটা আকর্ষণ ছিল যে, আমি তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করে নেই এবং হায়দারাবাদ থেকে পাঠানকোট চলে আসি। আল্লামা আর আমি একত্রে কাজ করবো, কি এক অনুভূতি। </span><span style="font-weight: 400;">কিন্তু এ ঘটনার বেদনাদায়ক দিক এই যে, আমি মার্চ মাসে পাঠানকোটে স্থানান্তরিত হলাম। আর এপ্রিলে ডক্টর সাহেবের ইন্তিকাল হয়ে গেল। সে সময় এ ঘটনায় আমি নিদারুণভাবে মর্মাহত হই। তখনকার সেই অনুভূতি আমাকে এই বাক্যটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করে।</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> মাওলানা! আপনার মধ্যে ও মরহুম আল্লামা ইকবাল এর মধ্যে এ ব্যপারে যে আলাপ আলোচনা বা বিভিন্ন ব্যাপারে বহু চিঠির আদান-প্রদান হয়, তা বিশদভাবে জানালে ভালো হয়।&nbsp;</span></p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> সেই চিঠিপত্রগুলো তো আমার কাছে নেই, অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। তবে অন্যান্য বিবরণ দিচ্ছি। এব্যাপারে (মাওলানা স্বীয় স্বভাবসুলভ ধীর আওয়াজে বলতে শুরু করলেন) বললেনঃ</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">চৌধুরী নিয়াজ আলী সাহেব ইসলামের সেবার উদ্দেশ্যে একটি প্রতিষ্ঠান কায়েম করার লক্ষ্যে জমি ওয়াকফ করেন এবং দালান কোঠা বানাতে আরম্ভ করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কি ধরনের হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তার কোন সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল না, তিনি আমার কাছে পরামর্শ চান যে, কি ধরনের প্রতিষ্ঠান কায়েম করা উচিত। আমি একটা পরিকল্পনা লিখে দেই। এটি পরবর্তীকালে আমার দারুল ইসলামের পরিকল্পনাটিরই অনুরূপ ছিল। </span><span style="font-weight: 400;">ইতিমধ্যে তিনি আল্লামা ইকবালের কাছেও পরামর্শ চেয়ে চিঠি লিখেন। এ চিঠি লেখালেখির পুরো বৃত্তান্ত আমার জানা নেই। তবে চৌধুরী নিয়ায আলী সাহেবের কাছ থেকেই আমি জেনেছি যে, আমার পরিকল্পনাটি তিনি আল্লামা ইকবাল মরহুমকে দেখিয়েছিলেন এবং আল্লামা ইকবাল তা পছন্দ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এ ধরনের কাজই বর্তমান সময়ের দাবী। এ সংক্রান্ত যাবতীয় চিঠিপত্র চৌধুরী নিয়াজ আলী সাহেবের নিকট সংরক্ষিত হয়েছে এবং তার কাছ থেকে তা সংগ্রহও করা যেতে পারে। বরঞ্চ আমার যতদূর মনে পড়ে, তিনি একবার তা প্রকাশও করেছেন।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সম্ভবতঃ ১৯৩৬ সালেরই কথা। আল্লামা ইকবাল এ বছর সর্বপ্রথম নজীর নিয়াজী অথবা মিয়া শফী সাহেবকে দিয়ে আমাকে হায়দারাবাদ ত্যাগ করে পাঞ্জাবে স্থানান্তরিত হবার অনুরোধ করে চিঠি লেখান। কিন্তু তখন আমি সেই অনুরোধ রক্ষায় অক্ষমতা প্রকাশ করি। কেননা, তখন আমি হায়দারাবাদেই থাকার চিন্তা-ভাবনা করেছিলাম। আর যে ধরনের প্রতিষ্ঠান কায়েম করার প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন, সে ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান কায়েম করার লক্ষ্যে হায়দারাবাদে আমি জমিও খরিদ করেছিলাম।</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> আল্লামা ইকবাল আপনাকে পাঞ্জাব চলে আসার জন্য অন্য কোনো বিশেষ কারণও লিখেছিলেন নাকি?</span></p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> শুধু এ বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন যে, আমি যেন পাঞ্জাবে চলে আসি। এর চেয়ে কিছু লেখেননি। তখন তো আমি বুঝতে পারিনি এর পেছনে কি কল্যাণ চিন্তা সক্রিয় ছিল। তবে ১৯৩৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ আমি স্বতস্ফুর্তভাবে অনুভব করতে থাকি যে, ভারতের দক্ষিণ অঞ্চল ত্যাগ করে আমার উত্তর ভারতে চলে যাওয়া উচিত। সেই সময় চৌধুরী নিয়াজ আলী সাহেব আমাকে পাঞ্জাব সফর করার জন্য পীড়াপীড়ি করেন এবং একটি ইসলামী প্রতিষ্ঠান কায়েম করার জন্য যে জায়গাটি তিনি ওয়াকফ করেছিলেন, অন্তত সেই জায়গাটি দেখার জন্য আমাকে জোর অনুরোধ করেন। আমি নিজেও ভাবছিলাম, উত্তর ভারত সফর করে এমন একটি জায়গা আমার বাছাই করা উচিত যেখানে আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুসারে কাজ করার সুযোগ পাব। এ চিন্তা-ভাবনার ফলেই ১৯৩৭ সালে সম্ভবতঃ আগস্ট মাসের শেষের দিকে পাঞ্জাব সফর করি এবং জলন্ধর ও লাহোর হয়ে পাঠানকোট উপনীত হই। এ সফরে মরহুম আল্লামা ইকবালের সাথে আমার বিস্তারিত আলোচনা হয়। তিনি আমাকে অনুরোধ করেন যে, চৌধুরী নিয়াজ আলী সাহেব যে জায়গা ওয়াকফ করেছেন, সেটাই যেন আমি বেছে নেই এবং চৌধুরী সাহেবের কাছে যে পরিকল্পনা আমি পাঠিয়েছিলাম, সে অনুসারে একটি প্রতিষ্ঠান যেন তৈরি করি।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">&nbsp;</span><b>সাইয়ারাঃ</b> উত্তর ভারতকে কেন্দ্র করে কাজ শুরু করার ইচ্ছা আপনার কেন হল?</p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> আমি উপলব্ধি করলাম যে, দক্ষিণ ভারতে কাজ করার সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। আর মুসলমানদের ভবিষ্যতের ফয়সালা অনেকাংশে উত্তর ভারতেই হবে।&nbsp;</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> আপনার ও আল্লামা ইকবালের মধ্যে যে বিস্তারিত আলোচনা হয় তার কোন কোন বিষয়ে হয়েছিল?</span></p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> সে সময় যে কথাবার্তা হয়েছিল, তার বিষয়বস্তু ছিল এটাই যে, বর্তমানে মুসলমানদের জন্য কি ধরনের গঠনমূলক, স্থায়ী কাজের প্রয়োজন, ভিত্তি প্রয়োজন। এ ব্যপারে আমার ও মহুম আল্লামা ইকবালের চিন্তাধারা প্রায় একই রকম ছিল। এ কাজের জন্য আমি যে রূপরেখা দিয়েছিলাম, সেটাই তার মনোপুত ছিল।&nbsp; </span><span style="font-weight: 400;">ঐ রূপরেখাই কিভাবে বাস্তবায়িত করা যায়, সেটাই আমার চিন্তা-ভাবনা করছিলাম। বহু চিঠিপত্র বিনিময়ও করেছিলাম।</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ </b>ভারতে একটা ইসলামী আন্দোলন চালানো কি তখন আপনাদের লক্ষ্য ছিল?</p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> সে সময় আন্দোলন আমাদের লক্ষ্য ছিল না। সে সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল দু’টো। প্রথমতঃ যে তাত্ত্বিক ও জ্ঞানগত শূন্যতার কারণে বর্তমান যুগের মানুষের চোখে ইসলামী জীবনব্যবস্থা অসম্পূর্ণ ও অকার্যোপযোগী বলে মনে হয়, সেই শূন্যতা পূরণ করা। দ্বিতীয়তঃ এমন কিছু লোক তৈরি করা, যারা মুসলমানদের তাত্ত্বিক ও বাস্তব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে। একটা নির্ভেজাল ও সর্বাত্মক ইসলামী আন্দোলনের ধারণা তখন আমাদের সামনে ছিল না।</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ </b><span style="font-weight: 400;">আল্লামা ইকবাল তখন তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে কোন কোন কাজের উপর অধিক গুরুত্ব দিতেন?</span></p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> বিস্তারিত ভাবে মনে নেই। ইসলামী আইন ও দর্শনের পুনঃসংকলন তার কাম্য ছিল। সে সময় এটিই ছিল আলোচ্য বিষয়।&nbsp;</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ</b> মাওলানা, শুনেছি আল্লামা ইকবাল তরজুমানুল কোরআন বিশেষভাবে অধ্যায়ন করতেন?</p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> এটা আমি পরে নাযীর নিয়াজী সাহেব ও মিয়া শফী সাহেবের কাছ থেকে জেনেছি যে, আল্লামা মরহুম অত্যন্ত মনোযোগের সাথে &#8216;তরজুমানুল কোরআন&#8217; পড়তেন। তাছাড়া “আল জিহাদ ফিল ইসলাম” পড়ে শুনিয়েছিলেন এবং খুবই পছন্দ করেছিলেন। প্রাণভরে দু&#8217;আ করতেন।</span></p>
<p><b>সাইয়ারাঃ </b><span style="font-weight: 400;">মাওলানা, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইকবালের শ্রেষ্ঠত্বের মূল কারণটি কি?</span></p>
<p><b>মাওলানাঃ</b><span style="font-weight: 400;"> সেই সময় আসলে এমন একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল; যিনি পাশ্চাত্য শিক্ষায় গর্বিত সাধারণ লোকদের চেয়েও বেশি শিক্ষিত এবং পাশ্চাত্য বিদ্যায় তাদের চেয়েও দক্ষ ও পারদর্শী হবেন, তারপরও এত জোরদার ভাষায় ইসলামী জীবন পদ্ধতিকে সমর্থন করবেন, যে পাশ্চাত্য পূজারীরা তার সামনে কথা বলারই সাহস পাবে না। সেই দুর্লভ ব্যক্তিত্ব ছিল ইকবালের। সেকালে পাশ্চাত্য জ্ঞান- বিজ্ঞানের প্রবল প্রতাপ ছিল এবং এরূপ সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে আপোষ (compromise) করা এবং পাশ্চাত্য মতবাদগুলোর সাথে ইসলামী দর্শনের সমন্বয় সাধন করা অপরিহার্য। আল্লামা ইকবাল এ ধারণা খন্ডন করেছিলেন। এটিই ইকবালের আসল অবদান। এ দিক থেকে দেখতে গেলে আল্লামা ইকবালের ব্যক্তিত্ব ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সহায় ছিল। সামগ্রিকভাবে তিনি যে অবদান রাখেন, তা অত্যন্তঃ গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান।</span></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>(সাইয়ারা, মে, ১৯৬৩ এর সৌজন্যে)</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/iqbal-was-my-spiritual-helper/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4121</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/bisswo-islami-andolone-chatro-somajer-bhumika/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/bisswo-islami-andolone-chatro-somajer-bhumika/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 04 Mar 2021 11:02:42 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন]]></category>
		<category><![CDATA[বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.rowyak.com/?p=4106</guid>

					<description><![CDATA[প্রসঙ্গ কথাঃ  (আজকের মুসলিম বিশ্ব নামে পরিচিত ভৌগোলিক এলাকাসমূহ দীর্ঘদিন ধরে পাশ্চাত্য শাসনের নাগপাশে বন্দী ছিল । বিশ শতকের প্রথমভাগে মুসলমানরা আজাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে। যার পরিণতিতে আজ বিশ্বে প্রায় অর্ধশত স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র জন্মলাভ করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<ul>
<li><b>প্রসঙ্গ কথাঃ </b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">(আজকের মুসলিম বিশ্ব নামে পরিচিত ভৌগোলিক এলাকাসমূহ দীর্ঘদিন ধরে পাশ্চাত্য শাসনের নাগপাশে বন্দী ছিল । বিশ শতকের প্রথমভাগে মুসলমানরা আজাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে। যার পরিণতিতে আজ বিশ্বে প্রায় অর্ধশত স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র জন্মলাভ করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,, মুসলমানরা এই সব দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও তাদের নিজস্ব সভ্যতা সংস্কৃতির মৌলিক নীতির ভিত্তিতে তাদের জাতিসত্তা গঠিত। হয়নি। যদিও কম বেশী মুসলিম বিশ্বের সকল দেশের বেলায় এ কথা সত্য যে এটা অর্জনের প্রেরণা নিয়ে মুসলিম জনগণ আজাদী সংগ্রামে অংশ-নিয়েছে। এ কাঙ্ক্ষিত জাতিসত্তা যদি গঠন করতে হয় তবে জনগণকে ইসলামী আদর্শের আলোকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। পাশ্চাত্য আদর্শ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলোকে শিক্ষিত করে এটা অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর পাশ্চাত্য আদর্শের প্রাধান্য বিদ্যমান । মুসলিম উম্মাহ হিসেবে টিকে থাকতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন ইসলামী আদর্শের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা। আর এ দায়িত্ব বর্তায় মুসলিম দেশসমূহের সরকারের উপর। ‘সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী’ ছাত্রদের সামনে প্রদত্ত এক ভাষণে এই দিকটার গুরুত্ব তুলে ধরার সাথে সাথে তার দিক নির্দেশও করেছেন। কিন্তু যাদের উপর এ দয়িত্ব তারা যদি তা পালনে এগিয়ে না আসেন তবে দেশের তরুণ ছাত্র সমাজই দ্বিতীয় কার্যকরী শক্তি যারা তাদের নিজেদের প্রচেষ্টায় তা কার্যকরী করতে পারে । আর এ জন্যে ছাত্র সমাজের করণীয় সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সুচিন্তিত নির্দেশিকা দিয়েছেন)</span></p>
<ul>
<li><b>মুসলিম বিশ্বের পুনর্গঠনে ছাত্র সমাজের ভূমিকাঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা এবং উপস্থিত সুধীমণ্ডলী, যে বিষয়ে আমাকে এখন বক্তব্য পেশ করতে হবে সে পর্যায়ে কিছু বলার পূর্বে আমি আন্তরিক সন্তোষ প্রকাশ করছি যে মুসলিম বিশ্বের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রায় সর্বত্রই এমন সব যুবক বর্তমানে আছে যাদের হৃদয় ঈমানের নির্মল আলোক প্রভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। যারা মুসলিম হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন, সাথে সাথে তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ইসলামের প্রাণ প্রবাহ সৃষ্টির জন্য কম বেশী চেষ্টা করে চলেছেন। মুসলিম বিশ্বের কল্যাণকামী কোন ব্যক্তিই এই অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট না হয়ে পারেন না। এটা কারো জন্যে ক্ষতিকর তো নয়ই বরং তা মহান আল্লাহরই রহমত। কেননা মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উপর পাশ্চাত্য চিন্তা, বিশ্বাস, মতাদর্শের প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অনুরূপ যুবক মওজুদ রয়েছে এবং তারা প্রবল প্রতিকূলতার মোকাবিলায় নিজেদের কর্তব্য পালন করে যাচ্ছে।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">মুসলিম দেশসমূহের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে ছাত্রদের কি ভূমিকা হওয়া বাঞ্ছনীয় তাই হচ্ছে আমার আজকের বক্তৃতার আলোচ্য বিষয়। এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই, যে সকল মুসলিম দেশের ছাত্ররা পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশ শাসনের গোলামীতে বন্দী কিংবা পাশ্চাত্য জাতিসমূহের নিকট প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পরাজয় বরণের পর তাদের চিন্তাধারা ও সভ্যত-সংস্কৃতির প্রভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে এবং যাদের শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণসহ জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগ পাশ্চাত্য থেকে প্রাপ্ত মতাদর্শ ও জীবন পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে চলছে, আমার এই ভাষণ তাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত হচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে এই সমস্ত দেশের অবস্থা প্রায় অভিন্ন এবং তারা একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন । এদিক দিয়ে তাদের পরস্পরে তেমন কোন পার্থক্য নেই ।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">এ পর্যায়ে আরো স্মরণ রাখা দরকার, &#8220;মুসলিম বিশ্ব&#8221; বলতে এর জমিন, পাহাড় কিংবা নদনদীকে বুঝায় না বরং সেখানে বসবাসকারী জনসমষ্টিকেই বুঝায় । মানুষ মাত্রই মরণশীল। নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল শেষে প্রত্যেককে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হবে। এই সব দেশে আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং জীবনব্যবস্থাকে অক্ষুন্নভাবে টিকিয়ে রাখার একটি মাত্র পথ আছে। আর তা হচ্ছে আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে প্রাপ্ত উত্তরাধিকার পরবর্তী বংশধরদের নিকট যথাযথভাবে পৌছে দেয়া এবং তাদেরকেও উক্ত উত্তরাধিকার পরবর্তী বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করার যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলা।</span></p>
<ul>
<li><b>জাতীয় স্থিতি ও বিনাশের তাৎপর্যঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">দুনিয়ার ইতিহাসে যেসব জাতি ও সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে তার অর্থ এই নয় যে তাদের সমস্ত বংশধর নিঃশেষ হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্বের বিলুপ্তিই তাদের ধ্বংস হওয়ার সঠিক তাৎপর্য । দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, আমরা যখন বলি, ব্যাবিলন সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, মিশরের ফেরাউনী জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আমরা এ কথায় বুঝাতে চাই যে ব্যাবিলনীয় ও ফেরাউনী জাতি যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ছিল তার বিশেষত্ব ও সারবত্তা নিঃশেষ হয়ে গেছে, তাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুণাবলীর অবসান হয়েছে। ব্যাবিলনীয়দের বংশধররা এখনো বেঁচে আছে কিন্তু তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য বিলীন হয়ে গেছে। প্রাচীন মিশরীয়দের বংশধররা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে কিন্তু ফেরাউনী ও কিবতী সভ্যতা-সংস্কৃতি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে অস্তিত্বহীন । তার কারণ হচ্ছে, এই জাতির বংশধররা তাদের পরবর্তী বংশধরদের নিকট নিজেদের জাতীয় বিশেষ উত্তরাধিকারকে হারিয়ে ফেলেছিল। কোন জাতির নতুন বংশধররা যদি নিজেদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্ব হারিয়ে ফেলে অতঃপর অপর কোন বিশেষত্ব গ্রহণ করে তা হলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে সেই জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বনী ইসরাইলীদের দশটি গোত্র বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যাদের আজ কোন হদীস পাওয়া যায় না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে এবং এজন্য তাদের অস্তিত্ব ও বংশধারা খতম হয়ে গেছে। বরং তার অর্থ হচ্ছে তাদের মধ্য থেকে ইসরাইলী হওয়ার অনুভুতি শেষ হয়ে গেছে এবং এদের বংশধররা নিজেদেরকে ইসরাইলী বংশধর বলে মনে করছে না। ইসরাইলী বিশেষত্ব ও ইসরাইলী সভ্যতা সংস্কৃতির পার্থক্যপূর্ণ গুণাবলী হারিয়ে ফেলার পর তারা দুনিয়ার অপরাপর জাতিসমূহের মধ্যে মিলে একাকার হয়ে গেছে। তারা যে ইসরাইলী একথা তাদের বংশধররা আজ জানেই না। এই দৃষ্টিতে বলা যায় যে, একটি জাতির টিকে থাকা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে জাতির পরবর্তী বংশধরদের নিজেদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্বকে টিকিয়ে রাখার মত যোগ্যতা সম্পন্ন করে গড়ে তোলার উপর। এখানে আমি এ বিষয়টির গুরুত্ব আপনাদের নিকট বিশ্লেষণ করতে চাই।</span></p>
<ul>
<li><b>সভ্যতার উত্তরাধিকার হস্তান্তরকরণঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">মুসলিম দুনিয়া নামে পরিচিত বিশাল ভৌগোলিক এলাকাসমূহ আমাদের পূর্বপুরুষরা কেবলমাত্র ইসলামী সভ্যতা ও আমরা যে জীবন ব্যবস্থার দাবীদার তার প্রতিষ্ঠা করার এবং যে সমস্ত আইন বিধান ও জীবন যাত্রাপ্রণালীকে আমরা নির্ভুল বলে বিশ্বাস করি তা কায়েম করার জন্যেই অর্জন করেছিলেন।  অপরাপর জাতিগুলোর মত মুসলিম উম্মাহর স্থিতির জন্য ইসলামের নামে পরিচিত সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবন যাত্রা প্রণালীর যে উত্তরাধিকার আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের নিকট থেকে লাভ করেছি এবং যার দরুন আমরা অন্য জাতি থেকে এই মুসলিম নামক ভিন্ন জাতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি তা যথাযথভাবে ভবিষ্যত বংশধরদের পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। পরবর্তী বংশধররাও একই রঙে রঙিন হয়ে উঠবে এবং তাদেরও আমরা সেই নীতি ও আদর্শে গড়ে তুলবো যাতে করে মুসলিম জাতি টিকে থাকতে পারে। ব্যক্তি হিসাবে কোন মুসলমান চিরঞ্জীব নয় কিন্তু মিল্লাত হিসাবে মুসলিমরা চিরঞ্জীব থাকতে পারে। এ জন্যে শর্ত হচ্ছে তাদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যেন তারা সভ্যতার এ উত্তরাধিকারকে হস্তান্তরিত করতে পারে এবং বংশানুক্রমিকভাবে হস্তান্তরের এই ধারা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে । পার্থক্য সৃষ্টিকারী এই বৈশিষ্ট্যসমূহ যদি আমরা অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম না হই এবং আমাদের পরবর্তী বংশধররা যদি বিদেশী ও বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতির অনুসারী হয়ে গড়ে উঠে তাহলে ভবিষ্যতে মুসলিম জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন এই মুসলিম জাহান সেই নামেই অভিহিত হতে থাকবে যে আদর্শে তা গড়ে উঠবে। তখন আমাদের ঔরসজাত বংশধররা অবশ্য বেঁচে থাকবে কিন্তু আমাদের আদর্শিক উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যাবে । যে উদ্দেশ্যে মুসলিম জাহান সৃষ্টি হয়েছিল, ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতির অনুপস্থির কারণে তার নাম চিহ্ন কোথায়ও অবশিষ্ট থাকবে না বরং তখন তা ভিন্নতর এক সভ্যতা সংস্কৃতির লীলাভূমিতে পরিণত হবে। যার ফলে আমাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি ঘটবে । এখন এই আলোচনা থেকে আপনারা অনুধাবন করতে পারেন যে, প্রকৃতপক্ষে ছাত্রদের সমস্যা কী এবং তা কতবেশী গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু শিক্ষা সমস্যাই নয় বরং এ হচ্ছে আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও স্থিতির সমস্যা। মুসলিম উম্মাহ হিসাবে আমরা কেবল এ ভাবেই বেঁচে থাকতে পারি যদি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠরত ও গড়ে ওঠা তরুণ বংশধররা ইসলামী সভ্যতার ধারক ও বাহক হয়ে বসবাস করতে পারে।</span></p>
<ul>
<li><b>উত্তরাধিকার হস্তান্তর করার দুটি পদ্ধতিঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এ লক্ষ্য অর্জনের দুটি মাত্র পথ আছে। একটি হচ্ছে <strong>ছাত্রসমাজ</strong>। নিজেরাই সেজন্য চেষ্টা চালাবে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে, <strong>সরকার এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে সহায়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করবেন</strong>। এখন আমি এই দুটি পদ্ধতি সম্পর্কে পৃথকভাবে আলোচনা করবো।</span></p>
<ul>
<li><b>ছাত্রদের অবলম্বনযোগ্য পদ্ধতিঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">আল্লাহর মেহেরবানীতে আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অধ্যয়নরত ছাত্ররা সচেতন, বোধশক্তি সম্পন্ন এবং নিজেদের ভালমন্দ পার্থক্য করার যোগ্যতা সম্পন্ন । তারা যতটুকু জ্ঞানই লাভ করেছেন তার সাহায্যে তারা অন্তত নিজেদের জানতে চাইলে জানতে পারেন এবং নিজেদের কল্যাণের পথ খুঁজে নিতে পারেন। এইজন্য সমস্ত দায়-দায়িত্ব কেবলমাত্র সরকারের উপরই বর্তায় না বরং তা ছাত্রদের প্রচেষ্টার উপরও অনেকখানি নির্ভর করে। আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের এ কথা গুরুত্ব সহকারে অনুভব করতে হবে যে, তারা মুসলমান এবং এই ভূমিতে তাদেরকে মুসলিম হিসেবেই টিকে থাকতে হবে। মুসলিম উম্মাহর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যাবলী অর্জন ও সংরক্ষণের প্রতি তাদের নিজেদের মধ্যেই এমন প্রেরণা ও আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া দরকার, যা হারিয়ে গেলে মুসলিম উম্মাহর স্বাতন্ত্র্য থাকতে পারে না।</span></p>
<ul>
<li><b>ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হচ্ছে তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত। প্রত্যেকেরই এ কথা ভাল করে অনুধাবন করা উচিত যে এই তিনটি কিংবা এর কোন একটির ব্যাপারেও সন্দেহ জন্মালে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন যাপন করা সম্ভব হতে পারে না। এই বিষয়ে সন্দেহ উদ্রেককারী প্রত্যেকটি জিনিসই ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি বিনষ্টকারী। ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতি অবশিষ্ট না থাকলে কোন মুসলিম দেশ টিকে থাকতে পারে না এবং ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতিও অবশিষ্ট থাকতে পারে না যদি না এর মধ্যে তাওহীদ, রিসালাত এবং আখেরাতের বুনিয়াদী ধারণা বিদ্যমান থাকে।</span></p>
<ul>
<li><b>এই বিশ্বাসসমূহের সংরক্ষণ অপরিহার্যঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বেশী যেদিকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার তা হচ্ছে আমাদের ইসলামের অনুভূতি সম্পন্ন সচেতন যুবকরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে নাস্তিকতা, খোদা বিমুখতা ও সংশয় সৃষ্টিকারী যেকোন আন্দোলনকে প্রতিহত করবে এবং এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গলে তুলবে। তারা ইসলামের মৌল আকিদা বিশ্বাস পরিপন্থী আন্দোলনকে দানা বেধে উঠার অবকাশ দিবে না। মুসলিম বিশ্বের স্থায়িত্ব ও মুসলিম মিল্লাতকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে এ জাতীয় আন্দোলের মোকাবিলা করা অত্যাবশ্যক। যদি এই তিনটি মৌল বিশ্বাস সম্পর্কে কেউ সন্দেহ সংশয়ের সৃষ্টি করে তা হলে সে একটি কুফরী কাজই করছে না প্রকৃতপক্ষে সে মুসলিম মিল্লাতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে এবং সে মুসলিম জাহানেরই শিকড় কাটার ষড়যন্ত্র করছে। এই অনুভূতিকে খুব গভীরভাবে অন্তরে গেথে নিতে হবে। এ যাবত এ ব্যাপারে ত্রুটিবিচ্যুতি যাই হয়ে থাকুক না কেন ভবিষ্যতে যাতে এর আর পুনরাবৃত্তি না হয় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের দেশের কোন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসায় যাতে নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শ প্রচারিত হতে না পারে এবং ইসলামের মৌল আকীদা বিশ্বাসে সংশয় সৃষ্টিকারী কোন দর্শন গজাতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।</span></p>
<ul>
<li><b>ইসলামী নৈতিকতা ও সভ্যতা সংস্কৃতি আকড়ে ধরাঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের ছাত্রসমাজের দৃষ্টি দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া দরকার তা হচ্ছে আমাদের জাতীয় সত্তার স্থিতি যেমন ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল অনুরূপভাবে তার নির্ভরতা ইসলামী নৈতিকতা ও আখলাকের উপরও। বস্তুত বিশ্বাস ও নৈতিকতার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি অপরটির জন্য অপরিহার্য। ইসলামী বিশ্বাসবোধ-ই আমাদেরকে নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন হতে বাধ্য করে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে দীর্ঘদিন ধরে নৈতিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে দারুণ উদাসীনতা ও গাফিলতি প্রদর্শন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইসলামী ধ্যান ধারণা ও তার সমগ্র নৈতিক মতাদর্শের পরিপন্থী এক ধরনের মতাদর্শ লালন ও উৎকৃষ্ট সাধন এখানে শুরু হচ্ছে। আমাদেরকে এ কথা খুব ভালভাবেই বুঝতে হবে যে পাশ্চাত্য জাতিসমূহ যেসব চারিত্রিক বিশেষত্ব নিয়ে উন্নত হতে পারে আমরা সেই নৈতিকতাকে ভিত্তি করে উন্নতির দিকে অগ্রসর হতে পারি না। ইসলামী নৈতিকতাই হতে পারে আমাদের উত্থান ও উন্নতির একমাত্র অবলম্বন। পাশ্চাত্য দেশের মানুষ নৃত্য গীত, মদ্যপান ও ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়েও নিজেদের দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হতে পারে । কেননা যেসব জড়বাদী দর্শনের উপর তাদের নৈতিকতা গড়ে উঠেছে এসব আচরণ তার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু মুসলিমগণ খুব ভাল করেই জানেন যে, এসব জিনিসকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (স) হারাম করে দিয়েছেন। তারা যদি সে সংস্কৃতিকেই গ্রহণ ও পাশ্চাত্য জীবনধারা অবলম্বন করে তা হলে প্রকৃতপক্ষে তারা ইসলামের মূল শিক্ষাকে পরিত্যাগ করেই তা করে থাকে। পাশ্চাত্যের এক ব্যক্তি এসব করে স্বীয় নৈতিক বিধানসমূহ লংঘন করে না। কিন্তু সে সংস্কৃতি গ্রহণ করলে আমরা সেই সব মৌলনীতিসমূহই লংঘন করে বসি যার উপর আমাদের নৈতিকতার ভিত্তি সংস্থাপিত। একজন মুসলমান মদ্যপান ও একজন পাশ্চাত্য দেশীয়ের মদ্যপানে অনেক পার্থক্য যদিও মদের দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি সব মানুষের জন্যেই সমান, সেই ব্যক্তি মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম। কিন্তু কাফের ব্যক্তির জীবনাদর্শে মদ্যপান হারাম নয় বলে সে যখন তা পান করে তখন সে একটা ক্ষতিকর পানীয়ই ব্যবহার করে মাত্র। তার বিশ্বাসের উপর সে পদাঘাত করে না। কিন্তু একজন মুসলিমের ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সে কোন হারাম কাজ করতে ততক্ষণ পর্যন্ত উদ্ধত হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না খোদা ও রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও পরকাল সম্পর্কে বেপরোয়া ভাবধারা তার মনে প্রবল হয়ে উঠে। অতপর সে শুধু একটা হারাম কাজ করেই ক্ষান্ত থাকে না, সমস্ত হারাম কাজ করতে এবং নৈতিকতার সমস্ত সীমা লংঘন করতে উদ্ধত হয়ে উঠে। তার নিকট কোন কিছুই এমন পবিত্র থাকে না যা বিনষ্ট করা থেকে সে বিরত থাকবে।</span></p>
<ul>
<li><b>ইসলামী সমাজে ইসলাম বিরোধী সংস্কৃতির ক্ষতিঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, একটি মুসলিম সমাজে ইসলাম বিরোধী সংস্কৃতি প্রচলিত হয়ে পড়লে তার ক্ষতি একটি অমুসলিম সমাজে তার প্রচলিত হওয়ার ক্ষতির তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশী। অমুসলিম ব্যক্তির উপর সে সংস্কৃতির খারাপ প্রভাব ঠিক ততটুকুই পড়ে যতটা একটা জাতি কিংবা একজন ব্যক্তির উপর প্রতিটি খারাপ জিনিসের প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু আমরা মুসলমানরা যদি কোন ফাসেকী সভ্যতা গ্রহণ করি তাহলে এর সাথে আমাদের ঈমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন আমাদের মধ্যে খোদা ও রাসূলের আনুগত্যের পরিবর্তে বিদ্রোহের ভাব সৃষ্টি হয়। এই বিদ্রোহ সৃষ্টি হওয়ার পর দুনিয়াতে কারোর প্রতি প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং কোন নিয়ম শৃংখলার অনুসরণ করা অসম্ভব হয়ে উঠে। কেননা যার প্রতি প্রতিশ্রুতি পালন ও আনুগত্য করা আমাদের উপর সর্বাধিক কর্তব্য ছিল তার প্রতি আমরা পূর্বেই বিদ্রোহ করে বসেছি। এই কারণে একজন মুসলিম যখন ইসলামের কোন বিধান লংঘন করে তখন একটি নাফরমানি করে সে ক্ষান্ত থাকে না বরং একটির পর একটি নাফরমানি করতেই থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত তার মধ্যে কর্তব্যজ্ঞান বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না এবং সে কোন আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না। তার নৈতিক অধঃপতন কোনো সীমায় পৌছে থেমে যায় না। আপনারা একটু চিন্তা করে দেখুন, একজন মুসলিম যখন আল্লাহকে আল্লাহ, তার রাসূলকে রাসূল এবং কোরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও এমন কাজ করে যে কাজ সম্পর্কে সে জানে যে তা করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন, কোরআন তাকে হারাম ঘোষণা করেছে এবং পরকালে আজাবের ভয় দেখিয়েছে তখন কোন জিনিস তাকে নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে বাধ্য করতে পারে? কোন আইন পরিষদ তাকে আইনের প্রতি সে আনুগত্য থাকতে পারে যাকে সে খোদা বলে মানতে পারে না? কোন জাতি কিংবা কোন দেশের জন্য সে স্বীয় সত্তা ও কামনা বাসনাকে কিভাবে ত্যাগ করতে পারে, যার কোনটিকে সে মাবুদ মনে করে না? কেননা তার মধ্যে তো সবার্ধিক পবিত্র জিনিসগুলোর প্রতিও অশ্রদ্ধা ও অসম্মানের ভাব সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে আইন লংঘন করার মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর তার ঈমানের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ আইনকেই সে লংঘন করে বসেছে। এই আইন লংঘনকার্য কোনো সীমায় পৌছে ক্ষান্ত হবে না । উপরন্তু সে আইন লংঘনের একটা স্থায়ী রোগে আক্রান্ত হতে থাকবে। অতপর সে কোন আইনের অনুগত থাকবে বলে আশা করা যায় না। এইরূপ ব্যক্তি কোন সাধারণ সভ্য সমাজের সদস্য হবারই যোগ্য নয়, মুসলিম সমাজের সদস্য হওয়া তো অনেক দূরের কথা।</span></p>
<ul>
<li><b>মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে অনৈসলামী সভ্যতা সংস্কৃতির প্রভাব; একটি ভয়াবহ সংকটঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এ বিষয়টিকে যথার্থভাবে অনুধাবন করা হলে সহজেই বুঝতে পারা যাবে যে যারা আমাদের বিদ্যালয়সমূহে আমাদের ছাত্র সমাজকে চরিত্রহীন বানাচ্ছে, ইসলাম পরিপন্থী সংস্কৃতির প্রচলন ঘটাচ্ছে ও ইসলামী নৈতিকতার বন্ধন চূর্ণ করার ব্যাধি ছড়াচ্ছে তারা কত বড় অপরাধ ও দেশের কত মারাত্মক অকল্যাণই না সংঘটিত করে চলেছে! আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজকে স্বয়ং এর ক্ষতি অনুধাবন করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকেরা যদি অজ্ঞতাবশত এ ভুল করে, এমতাবস্থায় আমাদের ছাত্র সমাজেরই কর্তব্য নিজেদেরকে যথাসম্ভব এ ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এ জন্যে একটা সাধারণ জনমত গড়ে তোলা কর্তব্য যেন ছাত্ররা নিজেরাই এই ভ্রান্ত সভ্যতা সংস্কৃতি গ্রহণ না করে এবং সমাজে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এর প্রচলন হতে দেয়। বস্তুত ছাত্রদের মধ্যেই যদি এই সাধারণ জনমত সৃষ্টি হয় এবং তারা নিজেরাই এর বিরোধী হয়ে উঠে তবে জোর করে এর প্রচলন করার সাধ্য কার আছে? এটা পরিষ্কার যে পুলিশের সাহায্যে তো আর ছাত্রদেরকে এ ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করা যায় না এবং আইন করেও অনৈসলামী সভ্যতা সংস্কৃতি অবলম্বনে বাধ্য করা যেতে পারে না। এ জন্যে সাধারণত প্ররোচনা-প্রোপাগাণ্ডা চালানো হয় এবং তাদের অভ্যাস ও চরিত্র বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়। তাদেরকে একটা রোগে আক্রান্ত করা হচ্ছে বলে যদি ছাত্ররা মনে করে তাহলে তারা নিজেরাই এর থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে পারে এবং নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এ জাতীয় অকল্যাণের প্রসার রোধ করতে পারে। ছাত্রদের মধ্যে এই জনমত সৃষ্টির প্রচলন চলুক এটাই আমার কামনা।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">উপরে বর্ণিত কাজ দুটি সম্পর্কে আমার বিশ্বাস যে ছাত্ররা নিজেরাই এই কর্তব্য পালন করতে পারে। তারা যদি এই কাজ দুটি করতে পারে তাহলে আমাদের শিক্ষালয়সমূহে বর্তমানে প্রচলিত দোষ ত্রুটিসমূহ দূর করতে সক্ষম হবে। সেই সংঙ্গে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত ত্রুটির কারণে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের দিক দিয়ে যে অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে তার প্রতিবিধানে ছাত্রসমাজকে সচেষ্ট ও মনোযোগী হতে হবে। এ পর্যায়ে সরকারের করণীয় সম্পর্কে আমি পরে আলোচনা করবো। মনে করুন সরকার এ দিকে কোন লক্ষ্য দিচ্ছে না। তাই বলে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের যে দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে আপনার উপর বর্তে তা থেকে আপনি নিষ্কৃতি পেতে পারেন না। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমেরই, যার চেতনা রয়েছে, যে নিজ ইচ্ছামত কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেছে – তার কর্তব্য হচ্ছে, যে ইসলামের সে প্রবক্তা ও যে ইসলামের কারণে সে নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দিচ্ছে, তা যথার্থভাবে জানার জন্য সে চেষ্টা চালাবে। ইসলামের সার নির্যাস তো অতি সহজেই এবং সামান্য চেষ্টার ফলেই মানুষ অর্জন করতে পারে। আপনার মাতৃভাষায় ইসলাম সম্পর্কে যে সব বই পত্র পাওয়া যায় প্রথমে তা পড়ুন এবং কমপক্ষে এতটুকু জ্ঞান অর্জন করুন যে মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য কী, কোন মৌলিক জিনিসের কারণে একজন কাফের মুসলমান হয়, একজন মুসলমানকে কোন সব বিষয়ের উপর ঈমান আনতে হয়, মুসলিম হিসাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য কি কি, কোন কোন জিনিস বা কাজ মুসলমানের জন্যে হারাম, তার জন্য অবশ্য পালনীয় নৈতিকতার মূল নীতি কি কি, দৈনন্দিন জীবন যাপনের জন্য ইসলামে কি পন্থা নির্ধারণ করেছে যা একজন মুসলমানের জন্য অবশ্য পালনীয়। এটা এমন দুরূহ ব্যাপার নয় যার জন্য আপনাকে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বছরের পর বছর দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে হবে। সামান্য মনোযোগ ও সামান্য প্রচেষ্টার ফলে আমাদের যুবকেরা ইসলাম সম্পর্কে এতটুকু জ্ঞান অর্জন করতে পারে, উপরন্ত বিভিন্ন ভাষায় এর পর্যাপ্ত উপকরণ মওজুদ রয়েছে। আমি কামনা করি যে আমাদের প্রত্যেক যুবক এই জ্ঞানের প্রয়োজন অনুভব করে তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে, এই গুণ আপনার পরীক্ষায় পাস কিংবা ডিগ্রী অর্জনের জন্য নয় বরং মুসলমান হবার স্বার্থেই প্রয়োজন।</span></p>
<ul>
<li><b>মুসলিম দেশের সরকারসমূহের প্রথম কর্তব্যঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের সরকারকে চিন্তা করতে হবে সমাজে যে এতটা ব্যাপক দুর্নীতি ও অনাচার পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে তার কারণ কী? এমন কি কারণ রয়েছে যার ফলে যাবতীয় প্রচেষ্টা, আইন-কানুন, দুর্নীতি দমন বিভাগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি কমার পরিবর্তে বেড়েই চলেছে। দুর্নীতি আমাদের গোটা আইন ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। দুর্নীতি সংশোধনের নিমিত্ত যত আইনই রচনা করা হয় তা শুধু আইন প্রয়োগকারীদের দুর্নীতির কারণে নিস্ফল হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, আইনের প্রত্যেকটি কড়াকড়ি দুর্নীতির নুতন দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এই ব্যাপারটি শুধু এতটুকু ক্ষতি সাধন করেই ক্ষান্ত থাকে না। এই দুর্নীতির কারণেই আমাদের উৎপাদিত হাজার হাজার টন খাদ্যশস্য আমাদের দুশমনদের হাতে চলে যায়। আমাদের দেশের বুভুক্ষ জনতার জন্য সাহায্য স্বরূপ বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার বস্তা খাদ্যশস্য বিদেশের খোলা বাজারে বিক্রি কতে দেখা গেছে। এভাবে দুর্নীতি শত্রুদেরকে আমাদের খরচেই প্রতিপালিত করছে। আরো অগ্রসর হয়ে ভেবে দেখুন তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন যে কেউ যদি দেশের নিজ ভাই থেকে একশত টাকা নিয়ে বেঈমানী করতে পারে, তাহলে সে দুশমন থেকে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের নিকট আমাদের গোপন তথ্য কেন বিক্রি করতে পারবে না? যখন কোন জাতির মধ্যে গোপন তথ্য বিক্রি ও অনাচারের মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, আর হাজার হাজার লোক যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাতি, দেশ, দ্বীন ও ঈমান বিসর্জন দিয়ে দেয় তাহলে নিজেদের দেশের স্বার্থান্বেষী লোকেরা যেমন স্বার্থের বিনিময়ে এই সব লোকদের ব্যবহার করতে পারে, অনুরূপভাবে বাইরের শত্রু পক্ষও তাদেরকে ব্যবহার করতে পারে।</span></p>
<ul>
<li><b>বিশ্বাসভঙ্গ ও দুর্নীতি এত ব্যাপক কেন?ঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">এখানে গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার এই দুর্নীতির মূল উৎস কোথায়? এটা পরিষ্কার যে আমাদের দেশে দুর্নীতি, ঘুষখোরী ও বিশ্বাসভঙ্গ যা সংঘটিত হচ্ছে তাতো করছে আমাদের দেশের শিক্ষিত লোকেরাই। কেননা দেশের গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র ও অর্থ ব্যবস্থা পরিচালনা করছে এই শিক্ষিত লোকেরাই। দেশের অশিক্ষিত লোকেরা তো আর তা পরিচালনা করছে না। এই শিক্ষিত লোকেরা তো দেশের ঐ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষিত হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই এমন সব ত্রুটি রয়েছে যা এত বিপুল সংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি তৈরী করে ছেড়ে দিচ্ছে। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সমস্ত ক্রটি রয়েছে তন্মধ্যে সবচাইতে মৌলিক ত্রুটি হচ্ছে, আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতি ও আমাদের নৈতিকতা যেসব মৌলনীতি ও বিশ্বাসের উপর সংস্থাপিত, আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা তাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে। অথচ নিজেদের বিশ্বাসের বুনিয়াদ দুর্বল করা ব্যতীত এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন এমন লোকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। চিন্তা করার বিষয় আমাদের শিক্ষিত লোকদের অধিকাংশেরই যদি ইসলাম উপস্থাপিত মৌলিক বিশ্বাসসমূহে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে এমন কোন প্রতিষেধক দিয়ে তাদেরকে নৈতিক বিধানের উপর টিকিয়ে রাখা যাবে? খোদার ভয় ও আখেরাতে জবাবদিহীর অনুভূতি যাকে বিরত রাখতে পারে না, তাকে দুর্নীতিবাজ, বিশ্বাসঘাতক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়া থেকে কোন জিনিস বাধা দিতে পারে? যে ব্যক্তির ভেতর নিজের উর্ধ্বের কোন শক্তির আনুগত্য করার মানসিকতা নেই সে কি করে তার ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে? এ জন্যে কোন না কোন উচ্চতর শক্তির আনুগত্য ও তার ভয় থাকা একান্তই অপরিহার্য। মুসলিম ব্যক্তি প্রধানত কেবলমাত্র আল্লাহ, রাসূল ও মুসলিম মিল্লাতের প্রতিই ঐকান্তিক ও নিষ্ঠা সম্পন্ন হতে পারে। এই আনুগত্যটিকে দুর্বল করে দিলে নিঃসন্দেহে লোকদের মধ্যে স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাই প্রবল হয়ে দেখা দেবে এবং সে নিজ স্বার্থ ও প্রবৃত্তির লোভে যে কোন জিনিসকে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠা বোধ করবে না।</span></p>
<ul>
<li><b>জাতীয় সংশোধনে ইসলামী আদর্শই কার্যকর নীতিঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">কেবলমাত্র আল্লাহর আনুগত্যকে মজবুত করার মাধ্যমে সত্য, ন্যায় ও সততার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার যোগ্যতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। কেবল খোদার ভয় ও পরকালের জবাবদিহির অনুভূতি তীব্র হলেই মানুষ অবৈধ কাজ করা থেকে বিরত থাকতে পারে, যদিও সে কাজের ফলে এই দুনিয়ায় তাকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে হয় না। আর শুধু খোদা ও দ্বীন ইসলামের প্রতি ঐকান্তিক আনুগত্য থাকলেই মানুষ এমন সব বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারে যার দরুন বাহ্যত সে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ধ্বংস করছে বলে মনে হবে। দুনিয়ার অন্যান্য জাতির জন্য তাদের আনুগত্য ও নৈতিক মূল্যমান ভিন্নতর। তারই উপর তাদের নৈতিকতার প্রাসাদ নির্মিত হয়েছে। এই আনুগত্য ও মূল্যমান যদি মুসলমানদের মধ্যে করতে চান তাহলে পঞ্চাশ বছর ধরে এই জাতিকে অনুশাসনের মধ্যে আনার প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং কমপক্ষে আরো অর্ধ শতাব্দীর প্রচেষ্টায় তাদের ভেতর খাটি বিজাতীয় চরিত্র সৃষ্টি করা যাবে কিন্তু শর্ত হচ্ছে সে পর্যন্ত যদি দেশটি টিকে থাকে। কিন্তু ইসলামের ভিত্তিতে লোকদের চরিত্র গঠনের কাজ আপনি আজই শুরু করতে পারেন এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এর সুফল লাভ করতে পারেন। আল্লাহ, রসূল ও পরকালে বিশ্বাস তো মুসলিম যুবকেরা জন্মগত সূত্রেই লাভ করে। মুসলিম সমাজের সামগ্রিক পরিবেশ ও মুসলমানদের জাতীয় ঐতিহ্যের মধ্যেই এ বিশ্বাস বিদ্যমান রয়েছে। প্রথম থেকে এই জমিনে বিশ্বাস ও নৈতিক ভিত্তির যে শিকড় গেঁথে আছে এতে সামান্য পানি সিঞ্চন দ্বারাই তা সঞ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে ও ফলদান করতে পারে। আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চরিত্রের প্রতি ইংরেজদের কোন আগ্রহ ছিল না। পক্ষান্তরে আমাদের মুসলিম হওয়াটাকে তারা ভীতির চোখে দেখতো, এই কারণে তারা এখানে এমন এক শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল যার প্রভাবে আমাদের ঈমান দুর্বল হয়ে পড়েছে, কমপক্ষে আমাদের বিশ্বাসে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করেছে এবং নিজেদের চোখেই আমাদেরকে ইসলাম থেকে যতটুকু সম্ভব দূরে সরিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের রাজনৈতিক স্বার্থের দাবী । অতপর একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জিত হবার পরও যদি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা পূর্বানুরূপ থাকে তাহলে তার অর্থ হবে আমরা নিজেরাই আত্মহত্যা করছি। সত্যিই কি আমরা আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত?</span></p>
<ul>
<li><b>ইসলামের প্রতি সংশয় সৃষ্টিকারী শিক্ষকরা বিশ্বাসঘাতকঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আজকাল এমন সব শিক্ষক রয়েছ যারা দিন-রাত শিক্ষার্থীদের মনে সন্দেই সংশয় সৃষ্টি করে চলেছেন। তারা প্রতিনিয়ত ছাত্রদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করার চেষ্টা করছেন যে, &#8220;ইসলামের কোন সভ্যতা-সংস্কৃতি নেই, ইসলামের কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বা জাতীয় বিশেষত্ব নেই, ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেই এবং ইসলামের অর্থনীতি যদি কিছু থেকেও থাকে তাও এযুগে অচল । ইসলামের আইন-কানুন সেই বর্বর যুগের উপযোগী, তা আজকের উন্নত যুগে চলতে পারে না। ইতিহাসে মুসলমানদের কোন গৌরবোজ্জ্বল অবদান নেই। দুনিয়ায় আগত ‘হিরো’দের সবাই অমুসলিম ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সকলেই ছিলেন অমুসলিম।ঃ আমি স্পষ্ট বলতে চাই, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে যে সমস্ত শিক্ষক আমাদের তরুণদেরকে এ ধরনের সবক দিচ্ছেন এবং তাদের মগজে এসব ভ্রান্ত চিন্তা বদ্ধমূল করে দিচ্ছেন-তাদের তুলনায় মুসলিম বিশ্বে বড় বিশ্বাসঘাতক দ্বিতীয় আর কেউ নেই। তারা আসলে আমাদের মূলে কুঠারাঘাত হানছেন। সেই জাতির কতই না দুর্ভাগ্য যাদের ভবিষ্যত বংশধররা এ ধরনের শিক্ষকদের নিকট শিক্ষা লাভ করছে। দুর্ভাগ্য এখানেই শেষ নয়, বহুমুসলিম দেশের উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এম, এড ও সমাজতত্ত্বের (sociology) শিক্ষার গোটা বিভাগটাই হয়তো আমেরিকান নতুবা আমেরিকান প্রভাবিত (তথা পাশ্চাত্য প্রভাবিত) শিক্ষকদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা আমাদের শিক্ষা ও সমাজ সম্পর্কে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের ধারণা বিকৃত করার বিরাট অভিযান চালাচ্ছে। এটাকে আত্মহত্যা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?</span></p>
<ul>
<li><b>বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি বিচ্যুতিঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে মৌলিক ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে তা কিভাবে পূরণ করা যায় এ ব্যাপারে সরকারকে চিন্তা করতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেসব বিষয়ে শিক্ষা দান করা হয় এগুলোর মূল বিষয়বস্তুতে কোন ত্রুটি নেই। ত্রুটি বিচ্যুতির মূলে রয়েছে এমন সব খোদাদ্রোহী লোক যারা শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে। আর তা রচিতও হয়েছে এমন পদ্ধতিতে যে তা পাঠ করলে শিক্ষার্থীদের মন মানসে এক সৃষ্টিকর্তাহীন বিশ্বের চিন্তা জন্মলাভ করে। তাদের মনে বিশ্বাস জন্মে যে এই বিশ্বজগত নিজ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে ও সর্বশক্তি বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছে। তার স্রষ্টা ও পরিচালক বলে কোন খোদা নেই। দ্বিতীয়তঃ এসব জ্ঞান বিজ্ঞান প্রণয়ন ও বিরচন এই ধারণার ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে যে, মানুষ নিজেই নিজের চালক ও পথ প্রদর্শক। কোন স্রষ্টার নিকট থেকে পথ নির্দেশের কোন প্রয়োজন নেই এবং এই জাতীয় পথ নির্দেশ কোন খোদা থেকে আদতেই আসে না। বস্তুত এই দুটি ধারণা ও বিশ্বাস আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি বিনষ্টকারী । আমাদেরকে এর পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যে জ্ঞান বিজ্ঞান প্রণয়ন ও বিরচন পদ্ধতির পরিবর্তন করে তাকে খোদাবিশ্বাসের উপর ঢালাই করতে হবে। আমাদেরকে বিজ্ঞান, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের সব শাখার জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং মানুষের আয়ত্তাধীন যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যদি আমরা মুসলিম হিসাবে বেঁচে থাকতে চাই তাহলে জ্ঞান বিজ্ঞানের এ সমস্ত শাখাকে ইসলামের আলোকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। অন্যথায় আমরা চাই বা না চাই এই শিক্ষা এর বর্তমান পদ্ধতির ত্রুটির কারণে আমাদেরকে অমুসলিম বানিয়ে ছাড়বে। বস্তুত আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার এটাই হচ্ছে মৌলিক সমস্যা। এটা আমরা যত দ্রুত অনুভব করব ততই আমাদের জন্য কল্যাণ।</span></p>
<ul>
<li><b>ইসলাম ও বিজ্ঞানঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">অনেকে ইসলামের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্কের প্রশ্নে পেরেশান হয়ে পড়েন। অথচ তাদের চোখের সামনে রাশিয়ান বিজ্ঞান’ এর উদাহরণ স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। আপনিই বলুন ইসলামের সাথে বিজ্ঞানের যদি কোন সম্পর্ক না থাকে তবে মার্কসবাদের সাথে এর সম্পর্ক কি করে থাকতে পারে? কোন কমিউনিস্টই কমিউনিস্ট সমাজের লোকদেরকে বুর্জোয়া বিজ্ঞান, বুর্জোয়া দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রভৃতি পড়ানোকে পছন্দ করে না। বরং তারা এই সব জ্ঞান মার্ক্সবাদের রঙে রঙিন করিয়ে পড়িয়ে থাকে। যেন সমাজে কমিউনিস্ট বিজ্ঞানী ও জ্ঞান বিজ্ঞানে কমিউনিস্ট বিশেষজ্ঞ গড়ে উঠতে পারে । বুর্জোয়া দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত জ্ঞান বিজ্ঞান পড়িয়ে কখনো কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সত্যি কথা হচ্ছে, যে জাতির নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতি রয়েছে, যার আছে নিজস্ব জীবন দর্শন, সে জাতি কখনই সে দর্শন বিরোধী ভিন্ন আদর্শের লোকদের প্রবর্তিত জ্ঞান বিজ্ঞানে নিজেদের। তরুণ বংশধরদেরকে শিক্ষা দান করতে পছন্দ করে না। কেননা পড়ানোর অর্থ এই দাঁড়ায় যে স্বজাতি নিজস্ব জাতীয় স্বাতন্ত্র্যকে ধ্বংস করতে এবং অন্যদের মধ্যে নিঃশেষে লীন হয়ে যেতে চায়।</span></p>
<ul>
<li><b>বিজ্ঞানের দুটি শাখাঃ</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">যদি বলা হয় যে, বিজ্ঞান সার্বজনীন ও সর্বাত্মক, কোন দ্বীন ধর্মের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই, তবে বস্তুতপক্ষে এটা নিদারুণ একটা ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলত বিজ্ঞানের একটা দিক হচ্ছে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ বাস্তব’ (Facts) এবং আরেকটি হচ্ছে প্রাকৃতিক আইন (Natural Laws)। এ দিকটা নিঃসন্দেহে বিশ্বজনীন । কিন্তু সেই সংঙ্গে এর দ্বিতীয় দিকটা হচ্ছে, সেই মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গী যা সে সব বাস্তব’ &#8211; সত্য তত্ত্ব ও তথ্যকে সুসংবদ্ধ করে তার আলোকে মতবাদ ও মতাদর্শ (theory) গড়ে তোলে। আরও রয়েছে সে মতবাদ প্রকাশ ও বিশ্লেষণ করার ভাষা। এগুলো সাধারণ ও বিশ্বজনীন নয়। বরং এতে প্রত্যেক সভ্যতা সংস্কৃতির অনুসারীদের ভিন্নতর পদ্ধতি ও ভঙ্গি রয়েছে। এহেন ভিন্নতা ও পার্থক্য থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক। আমরা বিজ্ঞানের এই দ্বিতীয় দিকটিতেই পরিবর্তন আনতে চাই, প্রথমটিতে নয়।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টিকে পরিষ্কার করা যেতে পারে। এটা একটা বৈজ্ঞানিক সত্য যে, দুনিয়ার প্রায় সব জিনিসই শীতল হয়ে সংকুচিত হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু পানির অবস্থা এর থেকে ভিন্নতর। পানি শীতল হতে হতে যখন জমে যাওয়ার পর্যায়ে আসে তখন তা প্রসারিত হয়। ও বরফ হয়ে হালকা হয়ে যায়। এই কারণে বরফ পানির উপরিভাগে ভাসতে থাকে। এটা একটা বাস্তব সত্য (fact)। এখন একজন তো এ ব্যাপারটি বর্ণনা দেয় এ ভাষায় যে পানি নিজস্ব বিশেষত্বের কারণে এরূপ হয় এবং এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। আর অপর একজন তা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলে, মহান আল্লাহ তাঁর নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও রবুবিয়াতের অধীন পানির মধ্যে এই বিশেষত্ব এজন্য রেখেছেন যেন পুকুর, নদী ও সমুদ্রের প্রাণীগুলো বেঁচে থাকতে পারে। তিনি যদি এরূপ ব্যবস্থা না করতেন তাহলে পানি জমে জমে নীচে বসে যেত। ফলে সমস্ত নদী, সমদ, বিল ও পুকুর। বরফ হয়ে যেত এবং তাতে কোন জীব বা প্রাণী বেঁচে থাকতে পারত না । দেখুন, একই বাস্তব ঘটনাকে দুই ব্যক্তি নিজস্ব দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন। ফলে দুধরনের বিশ্লেষণ ভঙ্গীর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া লোকদের উপর ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। মূল ব্যাপারটির বর্ণনা এক পদ্ধতিতে দিলে পাঠক মাত্রেরই মনে খোদার একত্ব, তার সৃষ্টিকুশলতা এবং লালন পালনের ধারণা ও বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়। আর অপর ধরনের বর্ণনাভঙ্গী দ্বারা এই ঘটনাটির ব্যাখ্যা দিলে কারোর মনে আল্লাহ সম্পর্কে কোন ধারণাই জাগে না। বরং লোকদের মনে এই ধারণা জেগে উঠে যে, এই সমস্ত কিছু স্বয়ংক্রিয় ও আপনা আপনানিই ঘটে থাকে। তার পশ্চাতে কোন বিজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার মহা কৌশল ও কোন শক্তিমান প্রতিপালনকারীর প্রতিপালন ব্যবস্থার কার্যকারিতা বর্তমান নেই। এই আলোচনা থেকে আপনারা সহজেই ধারণা করতে পারেন যে, একপ্রান্তিক ভঙ্গী ও পদ্ধতিতে বিজ্ঞান পড়ানো হলে এর ফলে একজন জড়বাদী বিজ্ঞানী তৈরি হবে। এই বিজ্ঞানই যদি ভিন্ন এক ভঙ্গী ও পদ্ধতিতে শিখানো হয়, তাহলে একজন মুসলিম বিজ্ঞানী তৈরি হওয়া অবশ্যই সম্ভব।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সত্য কথা হচ্ছে, বিজ্ঞানের কোন বিভাগই এমন নেই যা মানুষের অন্তরে ঈমানকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেয় না। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, শরীরবিদ্যা (Physiology), শবব্যবচ্ছেদ বিদ্যা (Anatomy), জ্যোতিঃশাস্ত্র (Astronomy) যে বিদ্যারই কথা বলা হোক না কেন, তার মাধ্যমে এমন সব সত্য উঘাটিত হবে, যা মানুষকে প্রকৃত ঈমানদার বানাবার জন্য যথেষ্ট। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের তুলনায় মানুষের হৃদয় মনে অধিক ঈমান সৃষ্টিকারী দ্বিতীয় কোন উপাদান নেই। এগুলোই তো হচ্ছে ঐসব ‘আয়াত’ বা নিদর্শন যার প্রতি কোরআন মজীদ বার বার পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যেহেতু, বিজ্ঞানের এসব তত্ত্ব ও তথ্য খোদাদ্রোহী বিজ্ঞানীরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে সুসংবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করেছে এবং বিশ্লেষণ করেছে সেই কারণেই এসব পাঠ করে মানুষ উল্টো জড়বাদী ও নাস্তিক হয়ে যায়। আমি কামনা করি যে, আমাদের সরকারসমূহ এই পার্থক্যটা অনুধাবন করুন এবং এই ব্যাপারে নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন করার জন্য চেষ্টা করুন। বলাবাহুল্য, আমরা খোদাহীন বিজ্ঞান, খোদাহীন দর্শন ও সমাজ বি জ্ঞানসমূহ শিক্ষা দিয়ে খোদানুগত মানুষ বানাতে পারবো না। মুসলিম উম্মাহ হিসেবে যদি আমাদের বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে অতিশীঘ্র এমন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা আবশ্যক যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমস্ত শাখার বর্তমান বিন্যাসের পরিবর্তন সাধন করবে এবং উপরোক্ত সমস্ত বিষয়ের উপর ইসলামী দৃষ্টিকোণের আলোকে উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় পাঠ্য বই তৈরি করবে। এই কাজটি সুসম্পন্ন না করা পর্যন্ত শুধুমাত্র আমাদের দ্বীন ও ঈমানই নয় বরং আমাদের দেশসমূহের অস্তিত্বও বিপন্ন হতে পারে ।</span></p>
<ul>
<li><b>আমাদের সরকারসমুহের দ্বিতীয় কর্তব্যঃ-</b></li>
</ul>
<p><span style="font-weight: 400;">দ্বিতীয় যে বিষয়টির দিকে আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা হচ্ছে, চারিত্রিক প্রশিক্ষণ দান। নৈতিক চরিত্র সৃষ্টির এই প্রশিক্ষণ যদিও সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন তবে বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারী দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য লোক তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ব্যবস্থা একান্তই অপরিহার্য। চাই তা সামরিক প্রশিক্ষণ কিংবা পুলিশের প্রশিক্ষণ অথবা সিভিল সার্ভিসের প্রশিক্ষণই হোক না কেন। এইসব প্রতিষ্ঠানে ইসলামের নৈতিক চরিত্র ও ইসলামী শিক্ষা ব্যধ্যতামূলক করা আবশ্যক, ইসলামের বিশ্বাসকে তাদের অন্তরে দৃঢ়মূল করে বসিয়ে দেয়া দরকার। ইসলামের বিধান ও হুকুম-আহকাম পালন করার জন্য তাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে এবং পাপ প্রবণতার যাবতীয় রাস্তা বন্ধ করে দিতে হবে। দেশকে সুদৃঢ় ও মজবুত করার এটাই হচ্ছে কার্যকর পন্থা। আমরা যখন একজন পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেই তখন মনে করি যেহেতু তার নাম ‘আবদুল্লাহ’ ‘আবদুর রহমান’ সেহেতু সে মুসলিম চরিত্র সম্পন্ন না হয়ে পারে না। এজন্য আমরা তাকে শুধু পুলিশের কর্তব্য পালনোপযোগী করে গড়ে তুলি। তাকে মুসলিম বানাবার কোন প্রচেষ্টা চালাই না। দুনিয়ার অন্যান্য দেশে একজন পুলিশের প্রশিক্ষণে যা করা হয় আমরাও ঠিক ততটুকু করেই ক্ষান্ত হই। এর ফলে প্রশিক্ষণ লাভের পর সে একজন পুলিশের দায়িত্ব পালন করার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠলেও তার মধ্যে ইসলামের নৈতিক চরিত্র বর্তমান থাকে না। তবে কারোর মধ্যে যদি এর ব্যতিক্রম দেখা যায় তা শুধু আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ মাত্র। আমাদের অবহেলা ও উদাসীনতা সত্ত্বেও তার মধ্যে ইসলামী নৈতিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকার কারণ তা অন্য কিছু থেকে আগত। এমতাবস্থায় পুলিশের দ্বারা, তাদের ছত্রছায়ায় যদি অপরাধ সংঘটিত হয় ও ব্যাপক হয়ে উঠে সেজন্য অভিযোগ করা যায় না। কেননা আপনি এমন কোন প্রচেষ্টাই চালাননি যার মাধ্যমে আমাদের পুলিশের ইসলামী নৈতিক চরিত্র সিল হতে পারে। বিভিন পর্যায়ের কর্মচারী তৈরির যেসব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আমাদের দেশে চালু রয়েছে তার ও অমুসলিম জাতির অবলম্বিত ব্যবস্থার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই কারণেই লােকেরা এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যখন বড় বড় দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্তহন তখন এদের মধ্যে ইসলামী নৈতিকতা ও চরিত্র সম্পন্ন লােক ব্যতীত অন্যের ভাল ও যােগ্য অফিসার বলে পরিগণিত হন না।</span></p>
<p><span style="font-weight: 400;">সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যাপারে বলা যায় যে, কোন কোন মুসলিম দেশের সামরিক বাহিনীর লোকেরা উত্তম অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন এবং তাদের প্রবল বিক্রম, শাহাদত বরণের আগ্রহ ও মুজাহিদ সুলভ আত্মদানের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এইরূপ মুজাহিদ বানাবার জন্য আমরা সামরিক প্রশিক্ষণে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি? আসলে এর উৎসমূলে রয়েছে তাদের ঐ সমস্ত মা যারা তাদের কানে আল্লাহ ও রাসূলের নাম ঢেলে দিয়েছিলেন। এর মূলে রয়েছে সেই মুসলিম সমাজ ও সে সমাজের বিলীনাবশিষ্ট ঐতিহ্য ও রীতি-নীতিই যা তাদের মনে মগজে আল্লাহ, রাসূল, পরকাল, জিহাদ ও শাহাদতের ধ্যান ধারণা দৃঢ়মূল করে বসিয়ে দিয়েছে এবং ইসলামের প্রতি ভালবাসার বীজ বপন করেছে। এসব জিনিস আমাদের সমাজে ইসলামী শিক্ষার  বিদ্যমান ছিল বলেই এই জাতীয় বিপাকে তা আমাদের বিরাট কাজে এসেছে। কিন্তু আমরা যদি এই সমাজকেও প্রতিনিয়ত বিকৃতির দিকে ঠেলে দিতে থাকি তাহলে এই প্রভাব কতক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে? ভবিষ্যত বংশধরদের উপর এই প্রভাব ক্রমশ কমতেই থাকবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে বর্তমানে প্রশিক্ষণরত মহিলাদের ক্রোড়ে লালিত পালিত হয়ে যে বংশধর গড়ে উঠবে তাদের মধ্যে এই প্রভাব অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট কম। এই প্রভাব দেখা গেছে সেইসব লোকদের মধ্যে যারা নিজেদের ঘরে আপন মায়েদের নামাজ ও কোরআন পড়তে দেখেছে এবং তাদের থেকে আল্লাহ ও রসূলের নাম শুনেছে। কিন্তু বর্তমানে যেসব নতুন মা তৈরী হচ্ছে তাদের মুখে ছায়াছবির অভিনেতাদের নাম, নবাগত ছায়াছবির পর্যালোচনা ও খেলাধুলার উল্লেখ শুনতে পাওয়া যায়। তাদের মুখে আল্লাহ ও রসূলের নাম কদাচিই উচ্চারিত হয়। তাদের ক্রোড়ে লালিত-পালিত হয়ে উঠা যুবকের নিকট আল্লাহ ও রসূলের উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করার আশা করা যায় কি? এবং বর্তমান আমাদের যুবকদের নিকট শাহাদতের আগ্রহ ও ইচ্ছে কি আদৌ পাওয়া যাবে যার উপস্থিতির ফলে তারা এ গৌরবোজ্জ্বল ত্যাগ স্বীকার করতে পেরেছিলেন? বাস্তবিক পক্ষে, আমরা যদি মুসলিম দেশসমূহ ও এর জীবন পদ্ধতির জন্য উৎসর্গীকৃত যুবক তৈরি করতে চাই তাহলে আমাদেরকে সর্বোত্তম সামরিক প্রশিক্ষণ দানের সাথে সাথে সর্বোৎকৃষ্ট ইসলামী শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দানেরও চিন্তা করতে হবে । যার ফলে তাদের মন-মগজে ঈমান দৃঢ়মূল হয়ে বসবে। তাদেরকে এহেন আকীদা, বিশ্বাস ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা ভবিষ্যতে এর চাইতেও অনেক বড় আত্মত্যাগের উপযোগী হয়ে গড়ে উঠে। আমাদের তুলনায় শতগুণ বড় ও শক্তিশালী শত্রুর মুকাবিলায় কেবলমাত্র, এই জিনিসই আমাদেরকে জীবিত রাখতে পারে ।</span></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/bisswo-islami-andolone-chatro-somajer-bhumika/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">4106</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
