<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>আবুল মনসুর আহমদ &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/author/abul-mansur-ahmad/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Wed, 15 Jan 2025 10:04:17 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>আবুল মনসুর আহমদ &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>আনন্দের জোয়ার ঈদুল-ফিতর</title>
		<link>https://rowyakbd.com/eid-ul-fitr-a-tide-of-joy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/eid-ul-fitr-a-tide-of-joy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 15 Jan 2025 01:35:26 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আনন্দের জোয়ার ঈদুল-ফিতর]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15353</guid>

					<description><![CDATA[রোজা ও ঈদ ঈদ অর্থ আনন্দ-উৎসব। ঈদুল-ফিতর অর্থ উপাস ভাংগার আনন্দ-উৎসব। এ উৎসবের আনন্দ যা-তা মামুলি আনন্দ নয়। এটা উল্লাস। যাকে বলে পুলকানন্দে ফাটিয়া পড়া। এ ঈদ আসে অনেক দিনের সাধনার পর। কি কঠোর কৃচ্ছ ও সংযম সাধনা তা। একটানা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>রোজা ও ঈদ</strong></p>
<p>ঈদ অর্থ আনন্দ-উৎসব। ঈদুল-ফিতর অর্থ উপাস ভাংগার আনন্দ-উৎসব। এ উৎসবের আনন্দ যা-তা মামুলি আনন্দ নয়। এটা উল্লাস। যাকে বলে পুলকানন্দে ফাটিয়া পড়া। এ ঈদ আসে অনেক দিনের সাধনার পর। কি কঠোর কৃচ্ছ ও সংযম সাধনা তা। একটানা ত্রিশ দিনের নিরঙ্কু উপবাস। দিনে রোযা ও রাতে এবাদত। ইন্দিয়েরা সবাই শৃঙ্খলিত বন্দী। এক মাস পরে পায় তারা মুক্তি। কি পুলক সে মুক্তিতে। সেই মুক্তির আনন্দেই এই উল্লাস। যেন বাঁধ-ভাংগা স্রোত। সেই বেগ সেই তেজ। আনন্দ-উৎসবকে গলা-ফাটানো উল্লাসের উন্মত্ততায় উদযাপন করা যদি কখনো প্রয়োজন ও সংগত হয়, তবে তা এই দিনে। এই কারণেই এই উৎসবের এই নাম। এ নাম তাৎপর্যপূর্ণ।</p>
<p>কিন্তু আমরা তা ভুলিয়া গিয়াছি। প্রতি বছর আমরা সে ভুলের পুনরাবৃত্তি করিতেছি; সে ভুল দোহরাইতেছি। প্রতি বছরে আমরা এই উপলক্ষে অনেক কিছু বলিতেছি বক্তৃতায়, লিখিতেছি বিশেষ সংখ্যার সাময়িকীতে। সবই ভক্তি গদগদ কণ্ঠের কথা। ভক্তি-রসাপ্লুত লেখা। সে সব কথার যতটুকু আন্তরিক, যতটুকু অর্থপূর্ণ, তার সবটুকু রোযার কথা, ঈদের কথা নয়। রোযার আধ্যাত্মিক দিক নিশ্চয় আছে। রমজানের রোযার আরও বেশি আছে। রোযা সংযম। রমজানের রোযা সমবেত সামাজিক সংযম। এর শিক্ষা ও কল্যাণের একাধিক দিক আছে। তা বুঝিবার ও বলিবার দরকারও আছে খুবই।</p>
<p>রোযা কিন্তু ঈদ নয়। ঈদও রোযা নয়। ঈদুল-ফিতর রমজানের রোযা নয়। কিন্তু ঈদ-সংখ্যা কাগজে আমরা ঈদের মহিমা কীর্তনে যে বিদ্যাবুদ্ধি খরচ ও পাণ্ডিত্য জাহির করি, তার সব কথা সত্য হইলেও এগুলি ঈদের কথা নয়, রমযানের রোযারই কথা। রোযা ও ঈদ ত্যাগ ও ভোগের মতোই দুইটা অ্যান্টিথেসিস, বিপরীত গুণাত্মক কাজ। রমজানের বেলা একটা শর্ত আর একটা পুরস্কার; একটা ক্রিয়া আর একটা ফল। শ্রমের পুরস্কার যেমন বিশ্রাম, অধ্যয়নের পুরস্কার যেমন প্রমোশন, ত্যাগের পুরস্কার যেমন ভোগ, রমজানে রোজার পুরস্কার তেমনি ঈদুল-ফিতর।</p>
<p>কিন্তু আমরা দুইটাকে এক করিয়া ফেলিয়াছি। আমাদের আনন্দোৎসব হইয়া উঠিয়াছে এবাদতের উৎসব। এবাদত ও উৎসব একত্রে চলিতে পারে না। ফলে আমাদের ঈদের আনন্দের স্থান দখল করিয়াছে এককভাবে এবাদত। ঈদের দিন হইয়াছে এবাদতের দিন। ঈদের সমাবেশ হইয়াছে প্রার্থনা সভা। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে এই দুর্ঘটনা ঘটে শুধুই পাক-ভারত উপমহাদেশে, বিশেষত পাক-বাংলায়। এমন হইবার ঐতিহাসিক কারণ আছে।</p>
<p><strong>নিরানন্দের জন্ম</strong></p>
<p>ছয়শ&#8217; বছরের শাসক জাতি মুসলমানরা ইংরাজের জুলুমে এক রাতে পথের ফকির হইয়া যায়। লুপ্ত রাজ্য ও স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে তারা প্রায় একশ&#8217; বছর ধরিয়া। এই সময়ে প্রাণ ধারণই মুসলমানদের জন্য কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। আনন্দ উৎসব করিবার সামর্থ্য-সুযোগ তাদের ছিল না।</p>
<p>ইংরাজ শাসকদের সর্বাত্মক জুলুমবাযি চলে বাংলার মুসলমানদের উপরই বেশি। ওহাবী আন্দোলন ও সিপাহি বিদ্রোহ গণ-বিপ্লবের আকার ধারণ করে বাংলাতেই। ওদের যুলুম নিপীড়ন যত বাড়ে, মুসলিম নেতৃবৃন্দের সংকল্প হয় তত দৃঢ়। তাঁরা নিজেরা সকল প্রকার ভোগ-বিলাস ও আমোদ-উল্লাস বর্জন করেন এবং মুসলিম জনসাধারণকে করিতে বলেন। সাময়িক বিপদেই মানুষ উৎসব-আনন্দ বাতিল করে। বিপদ দীর্ঘস্থায়ী হইলে ত কথাই নাই।</p>
<p>কাজেই মুসলমানরা জাতীয় সংকটের দিনে অস্টারিটির নীতি হিসাবেই ঈদের দিনের উৎসবও যথা-সম্ভব সংক্ষিপ্ত করিয়াছিল। আমোদ-প্রমোদ বাতিল করিয়াছিল। ধর্মীয় অনুষ্ঠানটুকু না করিলেই নয় বলিয়া অনাড়ম্বর গুরু-গম্ভীর পরিবেশে তা সম্পন্ন করিত।</p>
<p>বিপদের দিনে সকল দিক হইতে বঞ্চিত ও নিরুপায় হইলে মানুষ বেশি ধার্মিক হয়। বিপদ-তারণ আল্লাহর দরগায় মোনাজাত করে। কাজেই আনন্দ-উৎসবের স্থান এবাদত-মোনাজাতে দখল করে জাতির জীবনে এমনি দুঃসময়ে। এই কৃচ্ছ সাধনা শতাব্দী কাল স্থায়ী হওয়ায় মুসলমানদের সামাজিক জীবন হইতে সকল প্রকার আনন্দ-উৎসব এবাদতের উৎসবে পরিণত হয় এই যুগে।</p>
<p><strong>প্রতিষেধকের আবশ্যকতা</strong></p>
<p>আসলে ঈদ ঈদই, এবাদত নয়। ঈদের জমাতে দুই রাকাত নামাজের বিধান আছে বলিয়াই ঈদের সমাবেশ প্রার্থনা-সভা হইয়া যায় নাই। নামাজের বিধান করা হইয়াছে বিশেষ এক উদ্দেশ্যে, অভিনব এক ধরনে। এই নামাজের ধরন ও শরিয়তী বিধান একটু তলাইয়া বিচার করিলেই সে বিশেষ উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যাইবে। সে উদ্দেশ্যে সাবধানতা; প্রতিষেধকের ব্যবস্থা। দীর্ঘ সংযমের শেষে যখন মানুষকে ভোগের অধিকার দেওয়া হয়, তখন এই সাবধানতাটুকুর দরকার হয়। মানুষের মনের অবস্থা হয় তখন সদ্যমুক্ত দীর্ঘ দিনের কয়েদীর মতো। তার ভোগ স্পৃহা হয় খাঁচাছাড়া পাখীর মত উদ্দাম। লালসায় আসে তার প্রবল বন্যা, বিপুলা জোয়ার। মানুষ ভাসিয়া যাইতে পারে সে বন্যায়।</p>
<p>সে ইন্দ্রিয় সেবায় উন্মত্ত হইতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতে অমন অনেক হইয়াছে। ধর্মীয় আনন্দোৎসব বীভৎস অনাচারের ভৈরবী চক্রে রূপান্তরিত হইয়াছে, তীর্থস্থান ব্যভিচারের আড্ডায় পরিণত হইয়াছে, এমন নজিরে ইতিহাসের পৃষ্ঠা ভর্তি। প্রতিষেধকের সাবধানতা অবলম্বন করা হয় নাই বলিয়াই এসব ঘটিয়াছে।</p>
<p>তাই ইসলামে এই প্রতিষেধকের ব্যবস্থা করা হইয়াছে দুই রাকাত নামাজের বিধান করিয়া। ঈদের উৎসবের সাথে দুই রাকাত নামাজ জুড়িয়া দিয়া শরীয়ত মুসলমানদের শুধু এই কথাটাই স্মরণ করাইয়া দিয়াছে যে, উল্লাসের আতিশয্যে তারা যেন খোদাকে ভুলিয়া না যায়। তাই বলিয়া ঐ দুই রাকাত নামাজে আনন্দোৎসবকে এবাদতের পরব করিয়া ফেলে নাই।</p>
<p>দুই রাকাত নামাজের বিধান করিতে গিয়াও শরীয়ত যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করিয়াছে। নামাজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুরু-গম্ভীর ব্যাপার। সে অনুষ্ঠানে আমোদ-প্রমোদ করিলে ধর্মকে লঘু করা হয়। তাকে অসম্মান করা হয়। এই বিশ্বাসে মুসলমানরা ঈদের দিনে আমোদ-উল্লাস হইতে বিরত না থাকে সেই উদ্দেশ্যেই ঈদের নামাজে জুমা ও ওয়াকতিয়া নমাজের আহকাম-আরকান পুরাপুরি প্রয়োগ করা হয় নাই। এটা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।</p>
<p><strong>ঈদের নমায বনাম সালাত</strong></p>
<p><strong>এক,</strong> ঈদের জমাতের মতো বড় জনসমাবেশের জন্য মাত্র দুই রাকাত নামাজের বিধান করা হইয়াছে। মুসলমান মাত্রেই জানেন যে, দুই রাকাতের কমে নমায হয় না। কাজেই ঈদের নমায স্পষ্টতই সংক্ষেপতম করা হইয়াছে। ঈদ অনুষ্ঠানকে এবাদতের অনুষ্ঠান করিবার ইচ্ছা থাকিলে অন্তত জুমার নমাযের মতো বার রাকাত নমাযের ব্যবস্থা করা হইত।</p>
<p>জুমার নমায হয় সপ্তাহে একবার। ঈদুল-ফিতরের নমায হয় বছরে একবার। বহু জামে-মসজিদের মুসল্লীদের এবং আরও অনেকের সমাবেশ হয় ঈদের ময়দানে। বড় জমাতে এবাদত করিবার এমন সুযোগেও শরিয়তে ফরয নমাযের ব্যবস্থা করা হইল না ঈদের জমাতে। এই বিধান হইতে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় ঈদ পর্বকে এবাদতের অনুষ্ঠান করা শরিয়তের অভিপ্রায় নয়। তাড়াতাড়ি ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি সারিয়া মুসলমানরা যাতে আনন্দ-উল্লাসে শরিক হইতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই সংক্ষিপ্ততম মিনিমাম নমাযের বিধান করা হইয়াছে।</p>
<p><strong>দুই,</strong> এই মুগ্ধসর নমাযটুকুকেও ফরয করা হয় নাই। বড়জোর সুন্নাতে- মোয়াক্কেদা করা হইয়াছে। এটা লক্ষ করার বিষয় যে, ধর্মানুষ্ঠান হিসাবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ও সাপ্তাহিক এক ওয়াক্ত জুমার নমাযের যে বিধান করা হইয়াছে তার একটিও ফরয-ছাড়া নয়। শুধু ঈদের নমাযই ফরয-ছাড়া।</p>
<p><strong>তিন,</strong> ঈদের দুই রাকাত নমাযকেও সালাতের পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হয় নাই। সালাতের অনেক বাধ্যতামূলক আরকান ঈদের নমাযে নাই। যথা:</p>
<ul>
<li>ক. জমাতের নমাযের শুরুতে আযান ও একামত অবশ্যই দিতে হইবে। ঈদের নমাযে আযান ও একামত নিষিদ্ধ।</li>
<li>খ. ফরয নমায ছাড়া আর কোনো নমায জমাতে অর্থাৎ সমবেতভাবে ইমামের পিছে পড়ার বিধান নাই। কিন্তু ঈদের নমাযটুকু জমাতে ইমামের পিছে পড়িতে হয়।</li>
<li>গ. সুন্নত নমাযে জোরে কেরাআত পড়া নিষিদ্ধ। কিন্তু ঈদের নমাযে জোরে কেরাআত পড়তে হয়।</li>
<li>ঘ. ঈদের নির্দিষ্ট দুই রাকাত সুন্নতের অতিরিক্ত কোনও নফল নমায পড়া নিষিদ্ধ।</li>
<li>ঙ. হায়েজওয়ালী স্ত্রীলোকের জন্য নমায নিষিদ্ধ। অথচ তাদের ঈদের জমাতে শামিল হইবার জন্য তাগিদ করা হইয়াছে।</li>
<li>চ. জুমার নমাযের খোৎবা খোৎবায়ে-আউয়াল ও খোৎবায়েসানি দুই ভাগে ভাগ করিয়া পড়িতে হয় এবং খোৎবার মাঝখানে বসিতে হয়। কিন্তু ঈদের খোৎবা একটানে পড়িয়া ফেলা যায়।</li>
</ul>
<p><strong>চার,</strong> ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম করা হইয়াছে। অর্থাৎ এই আনন্দের দিনে কোনও মুসলমান আনন্দ-উল্লাস হইতে বিরত থাকিতে পারিবে না; ধর্মের নামেও না। তার মানে এই দিনে আনন্দ-উল্লাস করা বাধ্যতামূলক।</p>
<p><strong>আনন্দের আবশ্যকতা</strong></p>
<p>অতএব দেখা গেল, ঈদের দিনকে শরিয়ত ঈদের দিন হিসাবেই নির্ধারিত করিয়াছে, এবাদতের দিন নির্ধারিত করে নাই। তবু যে আমরা এ দেশে আনন্দের উৎসবকে এবাদতের অনুষ্ঠানে পরিণত করিয়াছি, তার কারণ ঐতিহাসিক। ইতিহাসের গতির অমোঘ আইন অনুসারেই তা ঘটিয়াছে।</p>
<p>ফলে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণামও আমাদের ভুগিতে হইয়াছে। আনন্দোৎসবকে এবাদতের অনুষ্ঠানে পরিণত করায় আমাদের জাতির ঘোরতর লোকসান হইয়াছে। ব্যক্তিগত জীবনে যেমন, জাতীয় জীবনেও তেমন, অতিরিক্ত ধার্মিক হওয়া অধর্ম। সব ব্যাপারের মতোই ধর্ম কার্যেও আতিশয্য খারাপ। খেলার সময় খেলা পড়ার সময় পড়ার মতোই এবাদতের সময় এবাদত আমোদের সময় আমোদ, এটা খাঁটি সত্য কথা এবং জীবনের অলঙ্ঘনীয় কানুন। এ কানুন অমান্য করিলে শাস্তি পাইতে হইবে। মানুষের সকল ইন্দ্রিয়-বৃত্তিই আল্লাহর দেওয়া। ও-গুলির অসদ্ব্যবহার করা যেমন পাপ, ব্যবহার না করাও তেমনি পাপ। সে পাপ শুধু পরকালের পাপ নয়, ইহকালের জন্যও।</p>
<p>মানুষের চেতনার কল তিনটিঃ মন, অন্তর ও আত্মা। এর একটিকেও বিকল করা চলে না। তিনটিরই উন্মেষ ও বিকাশ দরকার। তা না হইলে মানব পূর্ণাংগ মানুষ হয় না। আনন্দ এই তিনটি কলের উন্মেষ ও বিকাশের জন্য সমান প্রয়োজন। মানুষের আনন্দের ক্ষুধা তার পেটের ক্ষুধা ও যৌন-ক্ষুধার মতোই বাস্তব ও তীব্র। এ ক্ষুধা মানুষের জৈবগুণ। সুতরাং প্রকৃতি! এই ক্ষুধা মানুষের চেতনার তিনটি যন্ত্রেই পরিব্যাপ্ত।</p>
<p>খোদার সৃষ্টি-কৌশলই এমন যে, মানুষের মনে, অন্তরে ও আত্মায় এমন কোনও ঘটনা ঘটে না যা তার দেহে স্পন্দিত হয় না। এ অবস্থায় মানুষের আনন্দের ক্ষুধাকে দমাইয়া রাখা পেটের ক্ষুধা ও যৌন ক্ষুধা দমাইয়া রাখার মতোই প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। অধিক খাওয়াও যেমন স্বাস্থ্য-হানিকর, উপাস থাকাও তেমনি স্বাস্থ্য-নাশক। আনন্দ- ক্ষুধা সম্বন্ধেও এই কথাই সত্য।</p>
<p>এই কারণেই কোনও ধর্মই আনন্দ-উল্লাস নিষিদ্ধ করে নাই। ইসলাম ত করে নাই-ই। আল্লাহর-দেওয়া সমস্ত নিয়ামত উপভোগ করা তাঁরই নির্দেশ। জীবনের আনন্দ হইতে নিজেকে বঞ্চিত রাখার নামই বৈরাগ্য। ইসলামে বৈরাগ্য হারাম।</p>
<p>কিন্তু আমাদের সমাজ-সংস্কারকরা এক হদ ঠেকাইতে গিয়া আর এক হদে চলিয়া গিয়াছেন। এক সীমা রাখিতে গিয়া আরেক সীমা ভাংগিয়াছেন। এক সীমা রাখিতে গিয়া আরেক সীমা ভাংগিয়াছেন। আমোদ-প্রমোদের মধ্য দিয়া পাপচার আসে বলিয়া তাঁরা আমোদ-প্রমোদই নিষিদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। এ যেন আংগুরে মদ তৈয়ার বলিয়া আংগুর খাওয়া ও আংগুরের আবাদ বন্ধ করিয়া দেওয়া। আমাদের সমাজপতিরা কিন্তু তাই করিয়াছেন।</p>
<p>এইভাবেই আমাদের উপাস-ভাংগা উল্লাসের উৎসবটা হইয়া পড়িয়াছে প্রার্থনা-সভা। রোজা শেষে ঈদের আনন্দে যেখানে প্রাণ-প্রাচুর্যে আমাদের জীবনের দুকূল ছাপাইয়া পড়া উচিত ছিল সেখানে সেদিনেও আমরা ধর্মভারে নুইয়া গুরু-গাম্ভীর্যের মধ্যে দিন কাটাইবার চেষ্টা করিতেছি।</p>
<p>ধর্মোৎসবের ধর্মটুকু উৎসবের উল্লাস-ধ্বনির নিচে চাপা পড়ার নজির দুনিয়াতে মাত্র একটি। সেটি আমাদের ঈদ। ঈদের দিনে আমরা মাঠে গিয়া দুই রাকাত নামাজ পড়ি। রোদে পুড়িয়া খোৎবা শুনি। কিছু বুঝি, বেশির ভাগই বুঝি না। যা বুঝি তার সবই বহুবার শোনা কথা। মন বসে না।</p>
<p>খোৎবা শেষ হইলে দাঁড়াইয়া আশে-পাশের চিনা-জানা দু&#8217;চার-জনকে কোলাকুলি করি। ঘামে ভিজিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসি। ভিজা কাপড় ছাড়ি। ব্যস্! ঈদ শেষ।</p>
<p>অখণ্ড মনোযোগে আমরা খোৎবা শুনিয়াছিলাম বলা চলে না। নমাযে আনন্দ পাইবার মত সূফী-দরবেশে আমাদের দেশ ভর্তি, একথাও বলা চলে না। কাজেই নিরস ধর্ম-কাজ করিয়াই বাড়ি ফিরিলাম।</p>
<p>এবার খাওয়ার পালা। ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সকল মুসলমানই ঈদের দিনে যার-তার সাধ্যমতো ভাল-ভাল খায়, ভাল-ভাল পরে। এটা অবশ্য ছোট-বড় সব জাতিই করে তাদের উৎসবে। আমরাও করি। কিন্তু মন ও মস্তিষ্কের আনন্দ দিবার মতো কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আমাদের ঈদে নাই। আমাদের আনন্দ খাওয়া-পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যান্য জাতি হইতে আমাদের পার্থক্য শুধু এইখানে।</p>
<p>এই পার্থক্য কল্যাণকর নয়। আগম-নির্গমে আসা-যাওয়ায় জাতির মনে যে আলোড়ন সৃষ্টি করে বার্ষিক ধর্মীয় উৎসবের আত্মিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য শুধু সেইটুকু। সারা বছর ধরিয়া গণ-মন অধীর আগ্রহে এই উৎসবের অপেক্ষা করে। উৎসব-দিবসের নৈকট্যে মাশুকের আগমন সম্ভাবনায় আশেকের বুকের মতোই জাতির বুকে পুলক-স্পন্দন হয়। উৎসব আরম্ভে জাতির দেহের আনন্দ-শিহরণ ও মনের উল্লাস উন্মত্ততায় ফাটিয়া পড়ে। উৎসবের অবসান গণ-মনে জাতীয় চেতনার ছাপ, সংকল্পের রেখা ও কল্পনার রেশ রাখিয়া যায়। আসলে বার্ষিক ধর্মীয় উৎসবের মূল স্পিরিচুয়াল উদ্দেশ্য ইহাই।</p>
<p><strong>আনন্দোৎসবের তাৎপর্য</strong></p>
<p>যে ধর্মীয় উৎসব জাতির মনে যতবেশী স্পন্দন সৃষ্টি ও যত গভীর রেখাপাত করিতে পারে, জাতীয় উৎসব হিসাবে তা তত বেশি সার্থক। ধর্মোৎসবই সকল জতির কৃষ্টি-জীবনের বৃহত্তম উর্বর ক্ষেত্র। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের স্কেলিটনের চার পাশ ঘিরিয়া সামাজিক আচার-আচরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের যে লহ-গোশত ও রগ-রেশা গড়িয়া উঠে তারই নাম ধর্মোৎসব। এই ধর্মোৎসবের বিকাশ-বিস্তৃতিই সব জাতির কালচারের ইনফ্রাস্টাকচার। বস্তুত স্থপতি ভাস্কর্য শিল্প-সংগীত কাব্য-সাহিত্য জন্মলাভ করে এই ধর্মোৎসবকে ভিত্তি করিয়াই।</p>
<p>ধর্মোৎসবের বিশেষ গুণ এই যে, এ উৎসবের আয়োজন করে মুষ্টিমেয় ধনীলোকে, কিন্তু তার আনন্দ উপভোগ করে ধনী-নির্ধন সকলে। অন্য ধর্মের লোকও আকৃষ্ট হয়ে সে উৎসবে এবং শরিক হয় সে আনন্দে। এইভাবে উৎসব জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এই কারণেই যে ধর্মীয় উৎসব গির্জা-মসজিদ-মন্দিরের বাহিরে যত বেশি বিস্তৃত ও প্রসারিত হয় জাতীয় রূপ পাইবার সম্ভাবনা হয় তার তত বেশি।</p>
<p>এই মাপকাঠিতে বিচার করিলে আমাদের আজিকার ঈদ সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব হিসাবে প্রাণহীন এবং জাতীয় উৎসব হিসাবে সম্ভাবনাহীন। আমাদের ঈদে আনন্দ নাই, আছে বেদনা। সংস্কৃতি নাই, আছে বিকৃতি। উল্লাস নাই, আছে আর্তনাদ। সুস্থ স্বাভাবিকরূপে নির্মল আনন্দ উপভোগ করিতে না পারিয়া আনন্দ-পাগল জনসাধারণ তাই পাপের পথে আনন্দ কুড়াইতেছে।</p>
<p>সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসবের অভাবে তারা কুস্থানে গিয়া ও ক্লাবে পার্টিতে &#8216;ঈদ বল&#8217; ড্যান্স করিয়া মুসলিম কৃষ্টিকে বুড়া আংগুল দেখাইতেছে। বিকলাংগ কুষ্ঠরোগী ও বেকার ভিক্ষাজীবী ছেলে-বুড়া নারী-পুরুষ ঈদের মাঠে ও রাস্তাঘাটে ভিড় ও আর্তনাদ করিয়া আমাদের আর্থিক সমাজ-ব্যবস্থাকে ও কৃষ্টিক দারিদ্যকে ধিক্কার দিতেছে। <strong><em>যে সমাজে আনন্দের ব্যবস্থা নাই, সেখানেই পাপ ও অপরাধ বেশি।</em></strong> জেলখানার কয়েদীর সংখ্যাই তার প্রমাণ।</p>
<p>আমাদের সুধী সমাজ ও তরুণরা এটা তীব্রভাবে অনুভব করিতেছেন। তাই তাঁরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অভাব দূর করার উদ্দেশ্যে ইদানিং ঈদ-রিইউনিয়নের আয়োজন করিয়া থাকেন। খুবই শুভ সূচনা। কিন্তু এই অনুষ্ঠান আজও খানা-পিনাতেই সীমাবদ্ধ। একে সাংস্কৃতিক অলংকার পরাইয়া তরুণদের প্রমাণ করিতে হইবে যে, আমাদের আনন্দ-উৎসবের চৌহদ্দি পেট নয়।</p>
<p><strong>সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব</strong></p>
<p>অতএব ঈদ উৎসবকে আমাদের সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব ও দেশের জাতীয় উৎসবে পরিণত করা নিতান্ত প্রয়োজন। মুসলমানদের সামাজিক ও আত্মিক কল্যাণের জন্যই এটা দরকার। কাজটা তেমন কঠিন নয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুধীজনের উদ্যমে আর্ট-সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক রূপায়ণ সম্ভব। অতীতে তা হইয়াছে। আমাদের বেলায়ও তা হইতে পারে।</p>
<p>ধর্মের বিধান রদ-বদল করার মতো এখতেলাফী কাজে হাত দিবার কোনও দরকার হইবে না। মিলাদ অনুষ্ঠানের মতো কিছু কিছু বেদআতুল-হাসানার প্রবর্তন করিলেই চলিবে। গ্রগতিবাদী ওলামাসহ সুধী-সমাজ সহজেই এটা করিতে পারেন। হযরত ইব্রাহিমের কোরবানির স্বপ্ন, হযরত মোহাম্মদের নবুওত, হিজরত, মেয়ারাজ, জংগে-বদর, মক্কা বিজয়, বিদায়ী হজ ইত্যাদি স্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনাকে আর্টের অলংকারে ভূষিত করিয়া দুই ঈদের উপযোগী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানরূপে প্রবর্তন করা যাইতে পারে। ঈদ-উৎসব দুইটিকে একদিন সমাপ্ত না করিয়া আমাদের মোহরম, হিন্দুদের দুর্গোৎসব, খৃষ্টানদের বড় দিন ও বৌদ্ধদের মাঘী পূর্ণিমার মতো একাধিক দিনে ব্যাপ্ত করা যায়।</p>
<p>শুধু এইভাবেই আমরা ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে নির্মল আনন্দের অফুরন্ত প্রস্রবণে পরিণত করিতে পারি এবং সে আনন্দ-রসের আবেহায়াতে গণমনকে সঞ্জীবিত এবং সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখিতে পারি। ঈদ-রিইউনিয়ন, ঈদ-মেলা, ঈদ-জশন, ঈদ-যিয়াফত, ঈদ-মিছিল এই ধরনের যে কোনও নামে আমরা দুইটি ঈদকে প্রাণ-প্রাচুর্যের সাংস্কৃতিক আনান্দোৎসবে রূপায়িত করিয়া পাক-বাংলার আসমান-জমিন উল্লাস-মুখর ও জনগণের জীবন পুল্যকোজ্জ্বল করিতে পারি। আমাদের তরুণ চিন্তাবিদরা, লেখক-সাহিত্যিকরা এদিকে মনোযোগ দিবেন কি?</p>
<p><strong>১লা শওয়াল, ১৩৮৪ হিজরি।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/eid-ul-fitr-a-tide-of-joy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15353</post-id>	</item>
		<item>
		<title>শিল্পী-সাহিত্যিকের দায়িত্ব</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-responsibility-of-artists-and-writers/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-responsibility-of-artists-and-writers/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 15 Apr 2024 07:21:16 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[শিল্পকলা]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<category><![CDATA[art]]></category>
		<category><![CDATA[civilization]]></category>
		<category><![CDATA[literature]]></category>
		<category><![CDATA[religion]]></category>
		<category><![CDATA[আর্ট]]></category>
		<category><![CDATA[কালচার]]></category>
		<category><![CDATA[ধর্ম]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13978</guid>

					<description><![CDATA[গোটা জাতীয় কালচারের ইমারত সাহিত্য। অতএব সাহিত্যিকরা সে কালচারের আর্কিটেক্ট। উপরে বর্ণিত জাতীয় কৃষ্টির বিভিন্ন রূপকে যুগোপযোগী করিয়া পুনর্জীবিত করিতে হইলে সাধক চিন্তা-নায়ক সাহিত্যিকদেরই তা করিতে হইবে। এই আসল কাজেই কিন্তু আমরা আজও আত্ম-অচেতন পরানুকারী রহিয়া গিয়াছি। চরম দুর্ভাগ্য এই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[
<p class="wp-block-paragraph"><br />গোটা জাতীয় কালচারের ইমারত সাহিত্য। অতএব সাহিত্যিকরা সে কালচারের আর্কিটেক্ট। <a href="https://rowyakbd.com/what-is-culture/">উপরে বর্ণিত</a> জাতীয় কৃষ্টির বিভিন্ন রূপকে যুগোপযোগী করিয়া পুনর্জীবিত করিতে হইলে সাধক চিন্তা-নায়ক সাহিত্যিকদেরই তা করিতে হইবে।<br /><br />এই আসল কাজেই কিন্তু আমরা আজও আত্ম-অচেতন পরানুকারী রহিয়া গিয়াছি। চরম দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা যে পরানুকারী তা বুঝিতে পারিতেছি না। মনের এই গোলামিকে আমরা উদার প্রগতিশীলতা ও বিশ্বজনীনতা ধরিয়া নিয়া গর্ববোধ করিতেছি। এই মানসিক দাসত্বের মোহ আমাদিগকে কাটাইয়া উঠিতে হইবে। স্বকীয়তা ও গুণগ্রাহিতার, আত্ম-সম্মান ও গুণীর সম্মানের, উদারতা ও হীনমন্যতার পার্থক্য বুঝিতে ও তাদের সীমারেখা চিনিতে হইবে।<br /><br />মানুষের আত্মমর্যাদাবোধই তার কালচারের প্রাণ। তার আত্মবিশ্বাসই ওর শক্তি। এই দুইটা যাদের নাই, কালচারের ব্যাপারে তারা পরগাছা মাত্র। কালচার-প্রীতি দেশাত্মবোধ ও বাপ-মা ভক্তির মতই ইমোশনের বস্তু, যুক্তিবাদ ও দর্শন-বিজ্ঞানের ব্যাপার নয়। কিন্তু কালচার-প্রীতির এ ইমোশন সহজাত নয়, অর্জিত। বেহালার তারে আঘাত করিয়া যেমন সুর আনিতে হয়, তেমনি হৃদয়ের তারে আঘাত করিয়া এই ইমোশন আনিতে হয়। কবি-সাহিত্যিকরাই সে সুর-শিল্পী।<br /><br />নিজের মর্যাদা মানে যে পরের অমর্যাদা নয়, অপরের অমর্যাদা করিয়া কেউ যে মর্যাদাবান হয় না, পরকে অভদ্র বলা যে ভদ্রলোকের খাসিয়ত নয়, পরকে তাচ্ছিল্য করার মানে যে আত্মবিশ্বাস নয়, জাতির অন্তরে এই সূক্ষ্ম শালীনতাবোধ সৃষ্টির দায়িত্বও কবি-সাহিত্যিকের। এটা তারাই পারে। আর কেউ না।<br /><br />এই সুর-শিল্পীরা যদি নেশা খাইয়া আত্মভোলা হয়, তবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ চাবুক মারিয়া তাদেরে আত্মস্থ করে। সম্প্রতি পাক-ভারত যুদ্ধ আমাদের কৃষ্টি জীবনে তাই করিয়াছে। আমরা শুধু নিজের কালচারই ভুলিয়া থাকি নাই, নিজের দেশকে পর্যন্ত ভুলিয়া ছিলাম। দেশের মাটি ও তার নদ-নদী, তার সবুজ মাঠ, পাখির গান, মাতৃভূমির সন্তান ও তাদের মুখের বুলি, তাদের সুখ-দুঃখ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের কবি-প্রাণে স্পন্দন জাগাইতে এবং লেখকের কলমে গতি যোগাইতে পারে নাই।<br /><br />আমরা কলিকাতার কৃষ্টি পশ্চিম-বাংলার পরিবেশ ও শান্তি-নিকেতনের রচনাভংগি নকল করিয়া সুখী ও বিদগ্ধ হইতেছিলাম। রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জাতীয় কবি আখ্যা দিয়া রবীন্দ্র-সংগীতের সাগরে ডুব পাড়িতেছিলাম।<br /><br />কাজেই আমাদের প্রকাশকরা পশ্চিম-বাংলার পুস্তক রিপ্রিন্ট করিয়া, বিক্রেতারা তা বেচিয়া এবং পাঠকরা তা গো-গ্রাসে গিলিয়া পাক-বাংলাকে পশ্চিম-বাংলার কৃষ্টিক উপনিবেশ, তার্ষিক সীমান্ত প্রদেশ ও সাহিত্যিক বজায় করিয়া রাখিয়াছেন। আর আমাদের কবি সাহিত্যিকরা রাস্তার পাশে দাঁড়াইয়া অসহায় দর্শকের মতই এই বেচা-কেনা দেখিতেছিলেন।</p>



<p class="wp-block-paragraph"><br /><br /><strong>ঘুম-ভাংগা দামামা</strong><br /><br />এমন সময় যুদ্ধের দামামা বাজিয়া উঠিল। আমাদের তন্দ্রা-টুটিল সরকার কয়েক শ্রেণীর রবীন্দ্র-সংগীত বন্ধ ও পশ্চিম-বাংলার বই-পুস্তক ও ছায়াছবি নিষিদ্ধ করিলেন। তবেই আমাদের জ্ঞান হইল। আমাদের রেডিও-টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে গানে- কবিতায় ছায়াছবিতে দেশাত্মবোধ ও কৃষ্টিক স্বকীয়তা ঝংকৃত হইতে লাগিল।<br /><br />দেশের জাগরণের পক্ষে এটা নবযুগ, কালচারের দিক হতে এটা সুবেহসাদেক, কিন্তু কবি-সাহিত্যিকদের জন্য এটা গৌরবের কথা নয়। এই গুণে আমরা সরকারী হস্তক্ষেপকে সাহিত্যিক রেজিমেন্টেশন বলিতে পারি না। যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো বিপর্যয় দরকার হয় জনগণের সমবেত চেতনা উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য। কবি-সাহিত্যিকদের জন্য তার দরকার হইবে কেন? তাঁরা যে চিন্তা-নায়ক। দূরে দেখা যে তাঁদের পবিত্র দায়িত্ব। পশ্চিম-বাংলা যে আমাদের দেশ নয়, কলিকাতার কৃষ্টির সাহিত্য যে আমাদের কৃষ্টি-সাহিত্য নয়, শান্তিনিকেতনী ভাষা যে আমার ভাষা নয়, এই সূক্ষ্ম তত্ত্ব হৃদয়ংগম করিতে জনগণের সময় লাগিতে পারে, কিন্তু চিন্তানায়কদের লাগিবে কেন?<br /><br />রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হইয়াও পাক-বাংলার জাতীয় কবি নন? বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার পর এটা রাষ্ট্রীয় সত্য হইয়াছে নিশ্চয়ই। কিন্তু বিভাগ-পূর্ব বাংলাতেও এটা সাহিত্যিক সত্য ছিল। <strong>পাকিস্তান হওয়ার তিন বছর আগে ১৯৪৪ সালে কলিকাতার বুকে দাঁড়াইয়া এক সভাপতির ভাষণে আমি বলিয়াছিলাম &#8220;বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব ভারতীয় বিশ্বে কতবার শারদীয়া পূজায় &#8216;আনন্দময়ী মা&#8217; এসেছে গিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে ঈদ মোহররমের চাঁদ উঠেনি।&#8221;</strong></p>



<p class="wp-block-paragraph"><br /><br /><strong>বিশ্ব-কবি বনাম জাতীয় কবি</strong><br /><br />এটা-বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশ্রদ্ধা-অসম্মানের কথা নয়। সত্য কথা। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি হইয়াও বাংলার জাতীয় কবি নন। বাংলার জাতীয় কবি নন তিনি এই সহজ কারণে যে বাংলায় কোনও &#8216;জাতি&#8217; নাই। আছে শুধু হিন্দু-মুসলমান দুইটা সম্প্রদায়। তিনি বাংলার জাতীয় কৃষ্টির প্রতীক নন এই সহজ কারণে, যে এখানে কোনও জাতীয় কৃষ্টিই নাই। এখানে আছে দুইটা কৃষ্টি: একটা বাংগালী হিন্দু-কৃষ্টি অপরটি বাংগালী মুসলিম-কৃষ্টি। সমগ্র বাংলায় মেজরিটি ছিল মুসলমান। মেজরিটি দেশবাসীর সাথে নাড়ীর যোগ না থাকিলে কেউ জাতীয় কবি হইতে পারেন না। বিশ্বের কাছে তিনি যত বড়ই হউন। এটা পশ্চিম-বাংলার কৃষ্টি- সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞাও নয়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব-কবি হিসাবে আমাদের নমস্য। সর্ব অবস্থায় তা থাকিবেন। যুদ্ধেও থাকিবেন, শান্তিতেও থাকিবেন। এই খানেই সীমা-রেখার সূক্ষ্ম জ্ঞানের প্রয়োজন। ভারতের সংগে যুদ্ধ বাধিলেই রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা নিষিদ্ধ হইবে এটাও যেমন দূষণীয়; শান্তি হইলেই রবীন্দ্র-পূজা শুরু হইবে এটাও তেমনি দূষণীয়। <br /><br />পশ্চিম-বাংলার সাহিত্য উন্নত সাহিত্য হিসাবে নিশ্চই আমাদের অনুকরণীয়; কিন্তু তা আমাদের নিজের সাহিত্য নয়। অমন মোহ যদি থাকে তবে তা ঝাড়িয়া ফেলিতে হইবে। আমাদিগকে অবিলম্বে আমাদের নিজস্ব জাতীয় ঐতিহ্য ও কৃষ্টির রিডিস্কভারি করিতে হইবে আমাদের নিজের দেশে। পাক-বাংলার গত সাতশ&#8217; বছরের ইতিহাস আবার পড়িতে হইবে নতুন জাতির মন লইয়া। সে রিডিসকভারির রূপায়ণেই আমাদের জাতীয় সাহিত্য রচিত হইবে নয়া যিন্দিগির বাণী বহন করিয়া। বাংগালী হিন্দুর রেনেসাঁ যুগের মতো আমাদের মধ্যেও বাংগালী মুসলিম রেনেসাঁর বংকিম- রবীন্দ্র ও রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের জন্ম হইতে হইবে।</p>



<p class="wp-block-paragraph"><br /><br /><strong>রিভাইভ্যাল নয়, রেনেসাঁ</strong><br /><br />তরুণরা ভুল বুঝিবেন না। এটা পিছন ডাক নয়। এটা সামনে চলার আহ্বান। রিভাইভ্যাল নয়, রেনেসাঁ। &#8211; এটা বাদশাহি আমলে বা খিলাফত যুগে ফিরিয়া যাওয়ার পরামর্শ নয়। ওটা হইবে অবাস্তব। ভ্রান্ত মরীচিকা। দুনিয়া আজ প্রগতি ও সাধনার পথে অনেক-অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছে। আমাদেরও সে প্রগতির নাগাল ধরিতে হইবে। তার শরিক হইতে হইবে। কাজেই গতি হইবে আমাদের অতিদ্রুত। আমাদের কালচারকেও আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক হইতে হইবে। এটা ফিউডাল যুগ নয়, গণতন্ত্রের যুগ। আমাদের কালচারকেও তাই গণ-ভিত্তিক হইতে হইবে। এটা কৃষি-যুগ নয়, এটা শিল্প-যুগ। কাজেই জনগণও আজ আর শুধু কৃষক নয়, তারা মিল-মজুরও বটে। শিল্পও আর শুধু আর্বান ইন্ডাস্ট্রী নয়, রুরাল ইণ্ডাস্ত্রীও তার শক্তিশালী শরিক। কালচারের ধারক যে পল্লীগ্রাম, তাও আর আগের পল্লী নাই। শহর ও পল্লীর ব্যবধান দ্রুত সংকীর্ণ হইতেছে। কালচার ও সিভিলিয়েশনের মধ্যে তাই নতুন করিয়া সমঝোতা হইতেছে। পাক-বাংলার কৃষ্টিক রেনেসাঁ হইবে এই পরিবেশে। সে কৃষ্টি-সাহিত্যের ইমারত গড়িয়া উঠিবে আধুনিক মাল-মসলাতেই। তার বুনিয়াদ হইবে পাক-বাংলার মাটিতে। রূপ-রস-গন্ধে হইবে তা অপূর্ব। সে কৃষ্টি-সাহিত্য রূপে হইবে বাংগালী, রসে হইবে তা মুসলিম, আর গন্ধে হইবে তা বিশ্বজনীন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-responsibility-of-artists-and-writers/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13978</post-id>	</item>
		<item>
		<title>কালচার কী</title>
		<link>https://rowyakbd.com/what-is-culture/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/what-is-culture/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 31 Mar 2024 11:28:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[আখলাক]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[কালচার]]></category>
		<category><![CDATA[কৃষি]]></category>
		<category><![CDATA[গ্রাম]]></category>
		<category><![CDATA[চিন্তা]]></category>
		<category><![CDATA[জাতি]]></category>
		<category><![CDATA[জ্ঞান]]></category>
		<category><![CDATA[নদী]]></category>
		<category><![CDATA[প্রকৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলা]]></category>
		<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম]]></category>
		<category><![CDATA[শল্প]]></category>
		<category><![CDATA[শহর]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13947</guid>

					<description><![CDATA[কালচার কি আমাদের কালচারের কথা জানিতে হইলে আগে বুঝিতে হইবে কালচারটা কি? কালচারের প্রতিশব্দরূপে আমরা সাধারণত &#8216;কৃষ্টি&#8217;, &#8216;সংস্কৃতি&#8217;, &#8216;তহযিব&#8217; ও &#8216;তমদ্দুন&#8217; শব্দগুলি ব্যবহার করিয়া থাকি। ধাতুগত অর্থের দিক হইতে বিচার করিলে কিন্তু এর একটাও কালচারের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে না।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>কালচার কি</strong></p>
<p>আমাদের কালচারের কথা জানিতে হইলে আগে বুঝিতে হইবে কালচারটা কি? কালচারের প্রতিশব্দরূপে আমরা সাধারণত &#8216;কৃষ্টি&#8217;, &#8216;সংস্কৃতি&#8217;, &#8216;তহযিব&#8217; ও &#8216;তমদ্দুন&#8217; শব্দগুলি ব্যবহার করিয়া থাকি। ধাতুগত অর্থের দিক হইতে বিচার করিলে কিন্তু এর একটাও কালচারের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে না। তবে &#8216;কৃষ্টি&#8217; শব্দটা কর্ষণ, কালটিভেশন বা চাষ অর্থে কালচারের পরিভাষারূপে ব্যবহার করা হয় বলিয়া অন্য দুইটি শব্দের চেয়ে এইটাই কালচারের বেশি কাছাকাছি-ইংরেজীতে যাকে বলা হয় রিফাইনমেন্ট, আরবীতে যাকে তাহযিব বলা হয়, সংস্কৃতি শব্দটা সেই অর্থে ব্যবহার করা যাইতে পারে। তমদ্দুন শব্দটা নাগরিক অর্থে কালচার অপেক্ষা সিভিলিযেশনের প্রতিশব্দ-রূপেই অধিকতর উপযোগী।</p>
<p>কিন্তু এসব বিতণ্ডা নিরর্থক। কারণ, খোদ কালচারের অর্থ লইয়াই ইংরাজী সাহিত্য এবং ইউরোপ ও আমেরিকার পণ্ডিতদের মধ্যে ঘোরতর মত-বিরোধ রহিয়াছে। সে মত-বিরোধ এত তীব্র যে বাংলায় আমরা ঐ তিনটি শব্দের যে-কোনও একটিকে স্বচ্ছন্দে কালচারের প্রতিশব্দরূপেই বেদেরেগ ব্যবহার করিতে পারি।</p>
<p>কালচারের সংজ্ঞা দেওয়া খুবই কঠিন। এত কঠিন যে উনিশ শতকের মধ্যভাগ হইতে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পুরা একশ বছরের দীর্ঘ মুদ্দতে ইউরোপ- আমেরিকার দুইজন পণ্ডিতও এ ব্যাপারে একমত হইতে পারেন নাই। তার উপর অনেকেই আবার কালচার ও সিভিলিযেশনকে একই অর্থে ব্যবহার করিয়া বিষয়টাকে আরও জটিল ও সমস্যাটাকে আরও ঘোরালো করিয়া ফেলিয়াছেন। ফলে অবস্থা এই দাঁড়াইয়াছে যে, কালচারকে ডিফাইন করার আর কোনও উপায় নাই; বিশ্লেষণ দ্বারাই উহাকে বুঝিতে হইবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ইংরাজী সাহিত্যে কালচার শব্দটা প্রথম আমদানি করেন ফ্রান্সিস্ বেকন ষোল শতকের শেষদিকে। উহাকে ডিফাইন করার চেষ্টা করেন সর্বপ্রথম ম্যাথু আর্নন্ড ইংলণ্ডে এবং ওয়ান্ডু ইমার্সন আমেরিকায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি; কিন্তু কালচার শব্দের যে অর্থে তাঁরা উহার সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলেন শব্দটা বেশিদিন সে অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। বিশ শতকের মাঝামাঝি রবার্ট এযরা পার্ক ও টেইলার প্রভৃতি মার্কিন পণ্ডিত এবং টার্নার ও লাঞ্ছি প্রভৃতি ইংরাজ পণ্ডিতগণের লেখায় কালচার শব্দটা অনেক ব্যাপক ও গভীর অর্থে ব্যবহৃত হইতে শুরু করে।</strong> এর ফলে শব্দটা নতুন তাৎপর্য গ্রহণ করে। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটে নাই। বরঞ্চ শব্দটা ব্যাপকতর ও গভীর হইয়াছে। সম্প্রতি পশ্চিমা সাহিত্যে &#8216;কালচার&#8217; শব্দটা আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হইতে শুরু করিয়াছে। সেখানে &#8216;পলিটিক্যাল কালচার&#8217;, &#8216;এথিক্যাল কালচার&#8217;, এস্থেটিক কালচার&#8217;, &#8216;রিলিজিয়াস কালচার&#8217; ইত্যাদি কথার প্রচলন হইয়াছে। এসব কথা কিন্তু &#8216;এগ্রিকালচার&#8217;, &#8216;হটি কালচার&#8217; বা &#8216;ব্লাড কালচার&#8217; ইত্যাদি টার্মের মত অকৃষ্টিক কোন বিশেষ বিষয় বা বস্তু-জ্ঞাপক নয়। বরঞ্চ মানুষের মন ও মস্তিষ্ক বিকাশের বিশেষ স্তর-বোধক। <strong>তার মানে, কোনও সমাজ বা জাতির মনে কোনও এক ব্যাপারে একটা স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার-বিধি, মোটামুটি সার্বজনীন চরিত্র, ক্যারেক্টার, আচরণ বা আখলাকের রূপ ধারণ করিলেই সেটাকে ঐ ব্যাপারে ঐ মানবগোষ্ঠীর কালচার বলা হইয়া থাকে।</strong> এ অবস্থায় আজিকার পরিবেশে কালচার সিভিলিযেশনের সীমা-সরহদ্দ ঠিক রাখা এখন খুবই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। তবু কালচার ও সিভিলিযেশন যে এক নয়, সেটা আমাদের বুঝিতে হইবে। সভ্য জগতের মনীষীরাও সে চেষ্টা করিতেছেন। কারণ এটা যুগের দাবি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারের দ্বারা দুনিয়াটা যতই ছোট হইতেছে, কালচারের অটনমির প্রয়োজনীয়তা ততই তীব্রভাবে অনুভূত হইতেছে। ফলে কালচার ও সিভিলিযেশনের সীমা নির্ধারণ অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। এ সীমা নির্ধারণ ডেফিনিশন দ্বারা সম্ভব নয়-বিশ্লেষণ দ্বারাই তা করিতে হইবে। এখানে সে চেষ্টাই আমি করিতেছি।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালচার বনাম সিভিলিযেশন</strong></p>
<p><strong>সহজ কথায় ব্যষ্টি বা ইন্ডিভিজুয়্যালের যা ব্যক্তিত্ব বা পার্সন্যালিটি, সমষ্টি বা কমিউনিটির তা-ই কালচার।</strong> আমরা যখন কোন একজন লোক সম্বন্ধে বলি: &#8216;লোকটার পার্সন্যালিটি আছে&#8217;, তখন আমরা সেই লোকটির এমন কতকগুলি গুণ- সমষ্টির দিকে ইশারা করি, যেগুলি ঐকান্তিকভাবে তার নিজস্ব এবং যারা দ্বারা সে অপর সাধারণ হইতে পৃথক। অথচ ঐ গুণ-সমষ্টি বা পার্সন্যালিটি ঐ লোকটির বিশেষত্ব নয়। কারণ পার্সন্যালিটি আরও অনেক লোকের আছে। পার্থক্য শুধু এই যে, সকলের পার্সন্যালিটি রূপে-গুণে এক নয়। ব্যক্তিত্বে-ব্যক্তিত্বে সুস্পষ্ট পার্থক্য রহিয়াছে। এ পার্থক্যের দ্বারাই তাদেরে চিনা যায়। ঐ পার্থক্যটুকুই তাদের নিজস্বতা। নিজস্বতাই ঐ পার্থক্যের প্রাণ। ঐটুকুই ব্যক্তিত্ব।</p>
<p>ঠিক তেমনি, সকল লোক-সমষ্টিরই অর্থাৎ সব কমিউনিটি সমাজ বা জাতিরই একটা নিজস্ব সমবেত ব্যক্তিত্ব বা কর্পোরেট পার্সন্যালিটি আছে। তারই নাম ঐ লোক- সমষ্টি বা কমিউনিটির কালচার। এই লোক-সমষ্টি বা কমিউনিটিকে আমরা অবস্থা- ভেদে জাতি বা ন্যাশন, উপজাতি বা ন্যাশন্যালিটি, সমাজ বা সোসাইটি, এমন কি পরিবার বা ফ্যামিলি বলিতে পারি, বলিয়া থাকি।</p>
<p>জাতি বা ন্যাশন শব্দটা ইদানিং বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় অর্থেই ব্যবহৃত হইয়া থাকে। নৃতাত্ত্বিক এথনিক্যাল বা র‍্যাশিয়াল অর্থে ততটা নয়। ধর্মীয় অর্থে ত নয়ই। একটি রাষ্ট্রের সব নাগরিক মিলিয়াই ন্যাশন বা রাষ্ট্রীয় জাতি, নৃতত্ত্ব, ধর্ম ও ভাষার দিক দিয়া এক না হইলেও। যেমন আমরা বাংলাদেশীরা এক রাষ্ট্রীয় জাতি বা ন্যাশন, যদিও নৃতত্ত্ব ধর্ম ও ভাষার দিক হইতে আমরা এক নই। অপর দিকে, রাষ্ট্রের নাগরিক না হইলে নৃতত্ত্ব ধর্ম ও ভাষার দিক হইতে এক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের লোক হইয়াও এক ন্যাশন হয় না। যেমন পশ্চিম বাংলার লোকেরা ভাষা ও নৃতত্ত্বের দিক হইতে আমাদের গোষ্ঠী ও সমাজের লোক হইয়াও আমাদের সাথে এক জাতি বা ন্যাশন নয় এবং ভারতীয় মুসলমানেরা ধর্ম, নৃতত্ত্ব ও ভাষার দিক হইতে এক গোষ্ঠী এক সমাজের লোক হইয়াও আমাদের ন্যাশনের লোক নয়।</p>
<p>কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় জাতির পার্সন্যালিটি অর্থাৎ কালচার এক নাও হইতে পারে। একই ন্যাশনের ভিতরে একাধিক ন্যাশনালিটি থাকিতে পারে। তৎকালীন যেমন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা একই রাষ্ট্রীয় ন্যাশনের অন্তর্ভুক্ত হইয়াও পৃথক ও স্বতন্ত্র ন্যাশনালিটি এবং পৃথক ও স্বতন্ত্র কর্পোরেট পার্সন্যালিটির অধিকারী ছিল। দুই অঞ্চলের কালচারও তাই স্বতন্ত্র ছিল।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালচার ও সিভিলিযেশনের পার্থক্য</strong></p>
<p>এইখানেই আমরা সভ্যতা বা সিভিলেয়েশন হইতে কৃষ্টি বা কালচারকে আলাদা করিয়া দেখিবার মতো আলোর সন্ধান পাই। আগেই বলিয়াছি, কালচার আমাদের কর্পোরেট পার্সন্যালিটি বা সমবেত ব্যক্তিত্ব। এইবার আরেকটু সহজ করিয়া বলি- কালচার আমাদের সামাজিক আমিত্ব। আমরা যা আছি তা-ই কালচার। পক্ষান্তরে সভ্যতাটা কি? <strong>কালচারকে মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে তুলনা করিলে সিভিলিযেশনকে মানুষের সম্পদের সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ আমাদের যা আছে, তাই আমাদের সিভিলিযেশন।</strong> কথাটার আরও একটু তফসির করা দরকার। <em>&#8216;আমরা যা আছি&#8217;</em> ও <em>&#8216;আমাদের যা আছে&#8217;</em> কথা দুইটির মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদ আছে, সেদিকে আমাদের নযর দেওয়া উচিত। কাজটা বেশি কঠিন নয়। আমার আমিত্ব ও আমার সম্পত্তির মধ্যে যে পার্থক্য সুস্পষ্ট, তা মনে রাখিলেই কালচারটা বোঝার কাজ সহজ হইবে। এই দিক হইতে একটু তলাইয়া বিচার করিলে এটাও স্পষ্ট হইয়া আসিবে যে, এই কারণেই এক জাতির একাধিক কালচার থাকিতে পারে বটে, কিন্তু একাধিক সিভিলিযেশন থাকিতে পারে না। অপর দিকে তেমনি বহু জাতির এক সিভিলিযেশন থাকিতে পারে বটে, কিন্তু এক কালচার থাকিতে পারে না। কারণ কালচারের নিজস্বতা বা জাতীয় বা জাতীয় রূপ থাকিতেই হইবে; পক্ষান্তরে সিভিলিযেশনের কোন জাতীয় রূপ থাকিতে পারে না। একটা দৃষ্টান্ত দিয়া কথাটা বুঝাইবার চেষ্টা করিব:</p>
<p>আমরা যখন মিসরীয়, আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, আর্য, গ্রীক, রোমান আরব বা চীনা সভ্যতার কথা বলি, তখন কোন ভৌগোলিক দেশের বা রাষ্ট্রীয় জাতির সভ্যতার কথা বুঝাই না-বুঝাই একটা যুগের সভ্যতা। শিক্ষা-দীক্ষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে, দর্শন-সাহিত্যে, শিল্প-বাণিজ্যে, কলা-কারিগরিতে মানুষের সামগ্রিক অগ্রগতির নামই সভ্যতা। মানবমনের ক্রমবিকাশের ইহা নিদর্শন। সে কারণে গভীরতা ও ব্যাপ্তিতে প্রসার লাভ সভ্যতার স্বভাব। বনের আগুনের মতো নিজের আলোকে ও দাহিকা শক্তিতে বিস্তার লাভই ইহার অন্তর্নিহিত জীবনীশক্তি। আগুন যেমন ইন্ধন হইতে ইন্ধনান্তরে ছড়াইয়া পড়ে, সভ্যতাও তেমনি জাতি হইতে জাত্যন্তরে ছড়াইয়া পড়ে। জ্ঞান যেমন শিক্ষক হইতে আরও বড় হইয়া ছাত্রের মধ্যে বিকশিত হয়, সভ্যতাও তেমনি শিক্ষক-জাতি হইতে শিষ্য-জাতিতে অধিকতর উন্নত ও প্রসারিত হয়। সভ্যতা ক্রমবিকাশমান। জ্ঞানের মতোই সে অক্ষয়, আগুনের মতই সে অনির্বাণ। কাজেই অতীতের ঐ সব সভ্যতার সাথে কোন একটা বিশেষ মানব-গোষ্ঠীর নাম সংযুক্ত  থাকার অর্থ এই নয় যে, ঐ ঐ সভ্যতা শুধু ঐ ঐ মানব-গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বস্তুত ঐ সব সভ্যতার ফল ঐ ঐ মানব-গোষ্ঠীর বাহিরের লোকেরাও ভোগ করিয়াছিল। প্রদীপ যার আংগিনাতেই জ্বলুক, পথচারীও সে আলোকের সুবিধা ভোগ করিবে।</p>
<p>একেবারে ঘরের কাছের নযির লওয়া যাক। বর্তমান যুগের সভ্যতাকে আমরা কিছুদিন আগে পর্যন্ত ইউরোপীয় সভ্যতা বলিতাম। ঐ সভ্যতার নেতৃত্ব এখন আমেরিকার হাতে চলিয়া যাওয়ায় উহাকে আমরা এখন ওয়েস্টার্ন সিভিলিযেশন বা পশ্চিমা সভ্যতা বলিয়া থাকি। মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে এই সভ্যতা অচিন্তনীয় উন্নতি বিধান করিয়াছে। পাকা রাস্তা, মোটরগাড়ী, রেলগাড়ী, হাওয়াই জাহাজ, পোস্ট-টেলিগ্রাম, টেলিফোন, রেডিও-টেলিভিশন ইত্যাদি যোগাযোগ ব্যবস্থায়, ক্যামেরা, মুভি ক্যামেরা, টেক্সিকালার, থ্রি ডাইমেনশন, মঞ্চ ও পর্দা ইত্যাদি চারুশিল্পে, রোটারি মেশিন, লাইনোটাইপ, মনোটাইপ ইত্যাদি। জ্ঞান ও শিক্ষা বিস্তারের সাজ-সরঞ্জামের আবিষ্কারে, শিল্প-সাহিত্যের উন্নতিতে, ইঞ্জেকশন- অপারেশন, রেডিওলজি, কার্ডিওলজি প্রভৃতি চিকিৎসা প্রণালীতে, স্টিলফ্রেমের শতাধিক তলার আকাশ-চুম্বী ইমারতে উঠানামার জন্য লিফট-এস্কেলেটার স্থাপনায়, বিদ্যুৎ ও এটম শক্তিকে মানবের সেবায় নিযুক্তিতে, শূন্যলোকে গ্রহ-উপগ্রহ পরিভ্রমণের বাস্তব আয়োজনের সাফল্যে মানব-মনের যে অভাবনীয় বিকাশ লাভ ঘটিয়াছে এবং ফলে মানুষের বৈষয়িক জীবনে যে সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং তাদের নৈতিক জীবনে যে উন্নতি (অথবা যদি বলিতে চান অবনতি) হইয়াছে, তার সামগ্রিক নামই বর্তমান যুগের সভ্যতা। পশ্চিমা জাতিসমূহ এই সভ্যতার স্রষ্টা বলিয়া এর নাম পশ্চিমা সভ্যতা। কিন্তু তাই বলিয়া এই সভ্যতার ফল কি আমরা পূরবীরাও ভোগ করিতেছি না? পশ্চিমাদের আবিষ্কৃত যন্ত্রাদি ও তাদের তৈরী জিনিস-পত্র ব্যবহার করিয়াই শুধু আমরা সন্তুষ্ট থাকিতেছি না। নিজেরাও সে সব তৈরী করিতেছি। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, আর্টে-সাহিত্যে, শিল্প-বাণিজ্যে, আমরা পশ্চিমাদের সমান ও মতন হইবার চেষ্টা করিতেছি। স্বয়ং পশ্চিমারাও আমাদের সব শিখাইবার ও আমাদের মান উন্নত করিবার জন্য সযত্নে ও সাগ্রহে চেষ্টা করিতেছে। ফলে এই সভ্যতার সুযোগ ও সুবিধা পশ্চিমাদের মতোই আমরাও ভোগ ও ব্যবহার করিতে পারিতেছি। যে যেই পরিমাণে তা পারিতেছে, তার জীবনের মান ও মনের দিগন্ত সেই পরিমাণে উন্নত ও প্রসারিত হইতেছে। সেই হেতু ও সেই পরিমাণে দেশ ও জাতি-নির্বিশেষে গোটা দুনিয়ার মানুষ বর্তমান সভ্যতার অংশীদার। কাজেই পশ্চিমা সভ্যতাটা নামে পশ্চিমা ও অবদানে ইউরোপ-মার্কিন হইলেও আসলে এটা কোন এক জাতির বা জাতি-সমষ্টির সভ্যতা নয়, বর্তমান যুগের সভ্যতা। এইভাবে সভ্যতাটা আসলে যুগেরই বৈশিষ্ট্য, কোন জাতি বা দেশের বৈশিষ্ট্য নয়। বর্তমান যুগের সভ্যতা সম্বন্ধে যা সত্য, অতীতের সভ্যতা সমূহ সম্বন্ধেও তা-ই সত্য ছিল।</p>
<p>কালচারের ধারক পাড়াগাঁ কিন্তু কৃষ্টি সম্বন্ধে এ কথা বলা যাইতে পারে না। আগেই বলিয়াছি, কৃষ্টি সামাজিক ব্যক্তিত্ব। সামাজিকতা পল্লী-জীবনের বৈশিষ্ট্য। এই দিক হইতে কালচারের ধারক ও বাহক পল্লীগ্রাম। শহরে সামাজিক জীবনের অভাব। সেখানে প্রতিবেশিত্ব গড়িয়া উঠিতে পারে না। শহরের বাসিন্দাদের অধিকাংশই ভাসমান জনতা। আজ এ এখানে, কাল ও ওখানে। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরির সমাবেশ হইতেই শহরের পত্তন ও প্রসার। তাতে নিত্য-নূতন লোকের আমদানি। পুরাতনের রফতানি। ওদের মধ্যে প্রতিবেশিত্ব গড়িয়া উঠিবার সময়ই হয় না। শহরের বুনিয়াদী বাশিন্দাদের মধ্যে মহল্লায়-মহল্লায় যে একটা প্রতিবেশিত্ব চালু ছিল, তাও ভাংগিয়া গিয়াছে বা যাইতেছে। শহরের উন্নতি শ্রীবৃদ্ধি ও পুননির্মাণের বন্যায় ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের থ্রাস্ট বা ধাক্কায় ঐ সব যে কোথায় ভাসিয়া যাইতেছে, তার ঠিক-ঠিকানা নাই। পক্ষান্তরে পাড়াগাঁয়ে এই প্রতিবেশিত্ব স্বাভাবিক। সেখানে এক বাড়িতে একজনের অসুখ হইলে সারা গ্রামে রটিয়া যায়। শহরে পাশের বাড়িতে লোক মরিয়া গেলেও কেউ খবর রাখে না। পাশের বাড়িতে কে বা কারা থাকে, তাদের পরিবারে লোক কত, কে কি করে, অনেক সময় তাও আমরা জানি না। জানিতে পারি না। জানিবার অবসর নাই। শহরের সবাই আমরা কাজের লোক। অতিমাত্রায় ব্যস্ত।</p>
<p>পারতপক্ষে কেউ পায়ে হাঁটিয়া চলে না। রিক্সা-ট্যাক্সি-মোটরে ছুটাছুটি। দৌড় ছাড়া গতি নাই। নষ্ট করিবার সময় নাই। এই পরিবেশে প্রতিবেশিত্ব বা আত্মীয়তা গড়িয়া উঠিতে পারে না। পরিচয় যা ঘটে, তা নিতান্ত বৈষয়িক সংক্ষিপ্ত, দুই দণ্ড বসিয়া আলাপ করিবার সময় নাই। যাদের আছে তারা ক্লাবে যায়। ক্লাব প্রতিবেশিত্ব নয়। কাজেই শহরবাসীর চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্র, ভাব গতিক এক হইতে পারে না। ফলে শহরের বাশিন্দারা হয় মাল্টিকালার; শতরংগা; রং-বেরং এর লোক। পক্ষান্তরে পল্লীর লোকেরা হয় ইউনিকালার বা একরংগা। শহরের জনতার পরিবর্তন ঘটিতেছে প্রতিদিন, প্রতি ঘন্টায়, প্রতি মিনিটে। পল্লীর লোক দাদা-পরদাদার আমল হইতে চৌদ্দ পুরুষ ধরিয়া একই জায়গায় একই ধরনে বসবাস করিতেছে। এই কারণেই পল্লী-গ্রামের লোকদের মধ্যে সুখে দুঃখে হাসি-কান্নায় একটা আন্তরিক সমবেদনা ও আত্মীয়তা গড়িয়া উঠিয়াছে। এই আত্মীয়তা হইতে তাদের আনন্দে-উল্লাসে, আমোদ-প্রমোদে, শোকে-মাতমে, অভাবে-অনটনে, আচারে-ব্যবহারে, পোশাকে-পরিচ্ছেদে, চিন্তায়-ভাবনায়, প্রথায়-সংস্কারে, কাহিনী-কিংবদন্তিতে, এমন কি ভূত-প্রেত দর্শনে-শ্রবণে, একটা একাকারত্ব বা ইউনিফর্মিটি দানা বাঁধিয়া উঠিয়াছে। পল্লী-জীবনের অচঞ্চলতার মতই এই ইউনিফর্মিটি অচঞ্চল ও স্থায়ী। উপরে বর্ণিত সামাজিক আচারের সমাবেশ ও সমষ্টিই জাতির কালচার।</p>
<p><strong>পল্লী-জীবনের ঐ ইউনিফর্মিটিই কালচারের</strong> <strong>বুনিয়াদ। এই জন্যই কালচারটা মূলত এবং প্রধানত পল্লীর সম্পদ। পল্লী জীবনই সে সম্পদের ধারক ও রক্ষক।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>শহর কালচারের স্রষ্টা</strong></p>
<p>অপর দিকে শহর শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা-সাহিত্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার কর্ম-কেন্দ্র। ঐ সব কাজ কর্ম উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশের হরেক রকমের লোকের সেখানে সমাবেশ। তাদের ধর্ম-ঈমান, আচার-অনুষ্ঠান, চিন্তা ভাবনা, খোরাক-পোশাক, চাল-চলন, বিদ্যা-বুদ্ধি এক নয়। এদের আলাপ-পরিচয় মিলামিশাও স্থায়ী নয়। এমন পরিবেশ ইউনিফর্মিটি ঐক্য ও আত্মীয়তা, এক কথায় কালচার, গড়িয়া উঠার অনুকূল নয়-সে কথা একটু আগেই বলিয়াছি। কিন্তু এর একটা ভাল দিকও আছে।</p>
<p>নিত্য-নতুন লোকের আসা যাওয়া, কাজ- কর্মে তাদের আলাপ-পরিচয় ও পরস্পরের ভাবের আদান-প্রদান হয় শহরে। তাতে নিত্য-নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ হয় তাদের। তাদের সকলের দৃষ্টিভংগিতেই আসে একটা উদারতা। এক জায়গায় বসিয়া বায়স্কোপে বিদেশে দেখার মতোই শহরের লোকেরা ঘরে বসিয়া দুনিয়া দেখে। নিত্য-নতুন সমস্যার সৃষ্টি ও সমাধান দেখে তারা চোখের সামনে। এইভাবে আসে তাদের মধ্যে নতুন চিন্তাধারা। তাতে বিচার-বুদ্ধিতে তাদের আসে উদারতা। মনে আসে প্রসারতা। তারা লাভ করে বিদেশীর ভাল জিনিস গ্রহণ করিবার ক্ষমতা, আর নিজেদের খারাপ জিনিস বর্জন করিবার সাহস। পল্লী- জীবনে যেসব বিশ্বাস থাকে তাদের ঈমানের অংগ, শহর-জীবনে বিজ্ঞান-প্রভাবিত মুক্তবুদ্ধির বিচারে সে সবই হইয়া পড়ে নির্বোধ কুসংস্কার। তাই পাড়াগাঁয়ে যারা সন্ধ্যা বেলায়ই বাড়ির পাশের ছোট শেওড়া গাছটিতে ভূত-প্রেত দেখে, তারাই শহরে আসিয়া বড় বড় বটগাছে অমাবস্যার রাত্রেও ভূত-প্রেত দেখে না।</p>
<p><strong>বহুদর্শনের ফলে শহরবাসীর এই যে মনের বিকাশ ও দৃষ্টির প্রসারতা, এটা তারা লাগাইতে চায় নিজের সমাজের ও দেশের কাজে। অপরের দেখাদেখি নিজের লোককে ভাল করিয়া তুলিবার প্রবল ইচ্ছা জাগে তাদের অন্তরে। তারা হইয়া উঠে রিফর্মিস্ট।</strong> তারা নিজেদের চাল-চলনে, আচার-ব্যবহারে, ঈদে-পার্বণে, এমনকি ধর্ম-বিশ্বাসে, এক কথায় নিজেদের কালচারে, সংস্কার প্রবর্তন করিয়া সেটাকে করিতে চায় অধিকতর ভব্য, শালীন সুন্দর। শিক্ষা-কেন্দ্র, সাহিত্য-সংঘ সংবাদপত্র-পত্রিকার অফিস, রংগমঞ্চ, ক্লাব-রেস্তরাঁ, মসজিদ-মন্দির, গির্জায় প্রাচুর্য থাকে শহরেই। এই সব জায়গা হইতেই নতুন নতুন ভাব চিন্তা জন্ম ও প্রসার লাভ করে। রাস্তাঘাট, টেন, মোটরবাস, ডাক-তার ইত্যাদি যানবাহনের ক্রমবর্ধমান বিস্তারে ঐ সব নতুন চিন্তাধারা ছড়াইয়া পড়ে মফস্বলে। মফস্বলের লোকেরা সকল চিন্তা ও কাজে অনুকরণ ও অনুসরণ করে শহরবাসীকে। এইভাবে শহরে কালচার সৃষ্টি হইয়া বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছুরিত হয় পল্লী-জীবনে। শহরে করে যা সৃষ্টি, পল্লীকরে তা ধারণ ও পালন।</p>
<p><strong> </strong></p>
<p><strong>কালচার ও সিভিলিযেশনের সীমারখা</strong></p>
<p>অতএব দেখা গেল, শহর সভ্যতা-ভিত্তিক এবং পল্লী কৃষ্টি-ভিত্তিক-এ কথাও যেমন নিরাধারা বলা যায় না, সভ্যতা শহরবাসী এবং কৃষ্টি পল্লীবাসী-একথাও তেমনি চোখ বুজিয়া কওয়া যায় না। এই কারণেই সিভিলিযেশন ও কালচারে সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা এত কঠিন। এ ছাড়াও আরেকটা অসুবিধা আছে। এমন অনেক ব্যাপার আছে, যার খানিকটা কালচার, আর খানিকটা সিভিলিযেশন। উদাহরণস্বরূপ বিয়ার কথাটাই ধরা যাউক। বিয়া-প্রথাটা সভ্যতা। যে দেশ ও সমাজে বিবাহ প্রথা চালু নাই, সে দেশ ও সমাজকে সভ্য বলা যায় না। সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্ররা জানেন যে, আদিকালে মানুষের মধ্যে বিবাহ-প্রথা ছিল না। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংগ হিসাবে একরূপ আইনে পরিণত হইয়াছে। কাজেই বিবাহটা সভ্যতা। কিন্তু বিবাহের রসুম বা প্রণালী সভ্যতা নয়, কালচার মাত্র।</p>
<p>বিয়ার রসুমের খুঁটিনাটি এক-এক দেশে এক-এক জাতিতে এক-এক রকম। এক দেশে দুলা-দুলহান নিজেরা দেখাশোনা ও কোর্টশিপ করিয়া বিয়া করে, আরেক দেশে দুলা-দুলহানের দেখাশোনা হয় না। তাদের বাপ-ভাই মুরুব্বিরাই বিয়া ঠিক করেন। এক দেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে বিয়া হয়, আরেক দেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিয়া হয়। এক দেশে বা এক জাতিতে বরপক্ষ দেয় কাবিন ও দেনমোহর, আরেক জাতিতে কন্যাপক্ষ দেয় পণ ও যৌতুক। এক দেশে পুরুষ-নারীকে বিয়া করে, আরেক দেশে নারী করে পুরুষকে। এক দেশে একই সময়ে একাধিক বিয়া করা বেআইনী, আরেক দেশে এক সঙ্গে চার বা তারও বেশি বিয়া করা যায়। এক দেশে তালাক বা বিবাহ-বিচ্ছেদের দস্তুর আছে, আরেক দেশে তা নাই। এক দেশে বিধবারা বিয়া করতে পারে, আরেক দেশে পারে না। এক দেশে আত্মীয়-অনাত্মীয় নির্বিশেষে যে কেউকে বিয়া করা যায়, আরেক দেশে তা চলে না-এই সব নিয়ম-কানুনের একটা সিভিলিযেশনের প্রশ্ন নয়, কালচারের প্রশ্ন মাত্র। তার মানে এই সব নিয়ম কানুনের পার্থক্যের দরুন কোন জাতি সভ্য বা অসভ্য বিবেচিত হয় না, বরং এ সবই বিভিন্ন সত্য জাতির নিজ নিজ বিশেষ সামাজিক বা ধর্মীয় ব্যবস্থা; সুতরাং তাদের কালচারের অংগ।</p>
<p>যৌন-সমতার প্রশ্নটাও তাই। নারীকে নরের অধীন দাসী-বান্দী গৃহপালিত জীব বা পণ্য মনে করা অসভ্যতা। কি পারিবারিক সামাজিক জীবনে উভয়ের কর্তব্যের পৃথকীকরণটা অসভ্যতা নয়, কালচারের পার্থক্য মাত্র।</p>
<p>বিয়ার বেলা যেমন, জন্মের বেলায়ও তেমনি। সন্তান জন্মের সময় বিভিন্ন দেশে ও ভিন্ন-ভিন্ন জাতিতে বিভিন্ন প্রথা চালু আছে। কোনও দেশে ও জাতিতে সন্তানের জন্মে আকিকা দেওয়া হয় এবং আকিকা দেওয়ার সময়েই নাম রাখা হয়। আরেক দেশে সন্তানকে ধর্মস্থানে ধর্মযাজকের কাছে লইয়া যাওয়া হয় এবং সেখানেই তার নামকরণ হয়। এক দেশে প্রতিবছর সন্তানের জন্মবার্ষিকী পালন করা হয় এবং আত্মীয়-স্বজন তাকে উপহার-উপঢৌকন দেয়, আরেক দেশে সন্তানের জন্ম-তারিখটি আলগোছে ভুলিয়া যাওয়া হয়। এক দেশে ছেলেদের খৎনা করান হয়, আর এক দেশে হয় না।-এ সবই কালচারের অংগ, সিভিলিযেশনের অংগ নয়। কিন্তু সন্তান জন্মের সময় ছেলে- সন্তান রাখিয়া মেয়ে সন্তানকে নদীতে ভাসাইয়া দেওয়া হইলে তাকে আর কৃষ্টি- অকৃষ্টির প্রশ্ন বলা যায় না। -তা হইয়া পড়ে সভ্যতা-অসভ্যতার প্রশ্ন।</p>
<p>জন্মের সময় যা, মৃত্যুর সময়েও তাই। এর খানিকটা সভ্যতা, খানিকটা কৃষ্টি। যেমন ধরুন, মৃত্যুর পর লাশটার গোশত খাইয়া ফেলিলে বা শিয়াল-কুত্তার ও চিল-শকুনের খাওয়ার জন্য ফেলিয়া দিলে সেটা হইবে অসভ্যতা। আর সযত্বে সাড়ম্বরে সে লাশটারে সৎকার করাটা হইবে সভ্যতা। এই সৎকারেরও আবার বিভিন্ন রূপ হইয়া, থাকে। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন-ভিন্ন জাতিতে বিভিন্ন প্রণালীতে তা করা হয়। সে প্রণালীগুলি হইবে ঐ ঐ দেশ বা জাতির কালচার। এই ধরুন, কোন দেশে বা জাতিতে লাশ পুড়াইয়া ফেলা হয়; কোন দেশে বা জাতিতে তা মাটিতে পুঁতিয়া ফেলা হয়। পুড়াইয়া ফেলা ও পুঁতিয়া ফেলাও আবার ভিন্ন-ভিন্ন রকমের হইতে পারে। কেউ কাঠ-লাকড়িতে পুড়ায়, কেউ বিজলির তাপে পুড়ায়। পুঁতিবার বেলাও তেমনি এক জাতি লাশ সযত্বে ধুইয়া-মুছিয়া নয়া কাপড় পরাইয়া খুশবু লাগাইয়া দাফন করে; আরেক জাতি লাশটি কাঠের বাক্সে ভরিয়া মাটিতে চাপা দেয়। এক জাতি তাদের মৃত ব্যক্তিদেরে বিশালায়তনের ফুল-বাগিচাওয়ালা গোরস্থানে পৃথক পৃথক সমাধি দখল করিতে দিতেছে; আর এক জাতি তাদের মৃত ব্যক্তিদে&#8217;র স্বল্পায়তনের শ্মশানঘাটের ছাই হইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে বাধ্য করিতেছে। এ সবই বিভিন্ন জাতির বা মানব-গোষ্ঠীর কালচারের অংশ। সিভিলিযেশনের সংগে এ সবের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু এই কালচারই একদিন সিভিলিযেশনের প্রশ্ন হইয়া উঠিতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যদি ভবিষ্যতে প্রমাণিত হয় যে, এই দুই প্রথার কোনও একটি বা উভয়টি মানব-স্বাস্থ্যের পক্ষে অকল্যাণকর, তখন উহা আর কালচারের প্রশ্ন থাকিবে না; হইয়া উঠিবে উহা সিভিলিযেশনের প্রশ্ন। দৃষ্টান্তস্বরূপ সতীদাহের কথা বলা যায়। মৃত স্বামীর চিতায় বিধবা পত্নীকে পুড়াইয়া ফেলা একদা কোন কোন জাতির কালচারের অংগ ছিল। কিন্তু উহা সিভিলিযেশনের পরিপন্থী বিবেচিত হওয়ায় এখন পরিত্যক্ত হইয়াছে। কাজেই দেখা গেল, এই সব ব্যাপারের খানিকটা কালচার আর খানিকটা সিভিলিযেশন।</p>
<p><strong>মানুষের ভাষা, উপাসনা-প্রণালী এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিরও খানিকটা কালচার, আর খানিকটা সিভিলিযেশন।</strong> বর্ণমালাযুক্ত ভাষা মানুষের সভ্যতার নিদর্শন; কিন্তু হরফের আকৃতি ও ডাইনে-বামে উপরে নিচে লেখার প্রণালী কালচারের নিদর্শন। গির্জা-মন্দির-মসজিদে প্রার্থনা-উপাসনা করা, রোযা-নামায পড়া, সন্ধ্যা-আহ্নিক করা, বুকে ক্রস ঝুলান, ধর্মস্থানে গমন, কবর যিয়ারত, এমনকি পীরের দরগায় শিরনী ও কালীবাড়িতে কবুতর মানত করা ইত্যাদি ইত্যাদি সবই মানুষের কালচারের অংগ। সিভিলিযেশনের সংগে এর কোন সম্পর্ক নাই; অর্থাৎ এই সব ক্রিয়া-কলাপ এইরূপে করিলে সভ্যতা হইবে, আর ঐ ধরনে করিলে তা অসভ্যতা হইবে, এমন কোন কথা নাই। কিন্তু এই সব কালচারের প্রতিপালনে পূজা-অর্চনা বা ইবাদত-বন্দেগি করিতে গিয়া উপাস্য দেবতার ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য প্রাণী বলি দিলে উহা আর কালচারের প্রশ্ন থাকে না, হইয়া পড়ে তা সিভিলিযেশনের প্রশ্ন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ধর্ম ও কৃষ্টির সীমারেখা</strong></p>
<p>এইখানে ধর্ম ও কৃষ্টির সীমারেখা সম্বন্ধে দুই একটা কথা নিতান্ত প্রাসংগিক হইয়া পড়িতেছে। কারণ উপরে যে সব ক্রিয়া-কলাপের দিকে ইশারা করা হইল, তার অনেকগুলিই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংগ। রিলিজিয়ান ও কালচারের বাউন্ডারি নির্দেশ এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। কালচার ও সিভিলিযেশনের সীমা নির্ধারণই ইহার প্রতিপাদ্য। তবু কালচারের কথা বলিতে গেলে ধর্মের কথা স্বতঃই আসিয়া পড়ে বলিয়া এখানে অতি সংক্ষেপে ধর্ম ও কালচারের সীমা নির্দেশের চেষ্টা করিতেছি।</p>
<p><strong>ধর্ম ও কৃষ্টির সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়; কিন্তু তা হইলেও দুইটা এক বস্তু নয়। এক কথায় বলা যায় ধর্ম কালচারের নির্যাস; পোটেনটাইড্ কালচার দার্শনিক ম্যালিনস্কির ভাষায় &#8216;মাস্টার ফোর্স অব হিউম্যান কালচার&#8217;। কাজেই ধর্মের সবটুকুই কালচার, কিন্তু কালচারের সবটুকুই ধর্ম নয়। </strong>সহজে বুঝিবার জন্য কালচারকে গাছের সংগে তুলনা করিলে ধর্মকে গাছের ফলের সঙ্গে তুলনা করিতে হয়। গাছ হইতে রিলিজিয়ান ও রিলিজিয়ান হইতে কালচারের উৎপত্তি। গাছ কিন্তু ফলের মত নিটোল ও অনাবিল নয়। তেমনি ভাল-মন্দ ও ফুল-কাঁটা লইয়াই কালচার।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>কালচারের ব্যাপকতা</strong></p>
<p>এমনিভাবে মানুষের গৃহনির্মাণ পোশাক-পাতি, রান্না-বান্না, খেলা-ধূলা, নাচ-গান, মায় ওয়ারিসী আইন-কানুন পর্যন্ত সব ব্যবস্থার মধ্যেই খানিকটা কালচার ও খানিকটা সিভিলিযেশন রহিয়াছে। মানুষ আদিকালে বনে-জংগলে-গুহায় বাস করিত। স্থায়ী বাসগৃহ নির্মাণ করিয়া তারা সভ্য হইয়াছে। স্থপতি বিদ্যার উৎকর্ষ সাধন করিয়া অধিকতর সভ্য হইয়াছে। কাজেই আবাসগৃহ নির্মাণ সভ্যতা। কিন্তু স্থাপত্যের রূপ কি হইবে, দালান-ইমারত চূড়াওয়ালা বা গম্বুজওয়ালা হইবে, না চৌকোণা বা চ্যাপ্টা হইবে, ইট-পাথরের হইবে, না কাঠ বাঁশের হইবে- এ সব কালচারের ব্যাপার। কাপড় পরা-না-পরাটা সভ্যতার প্রশ্ন। কিন্তু কি ধরনের পোশাক পরা হইবে, প্যান্ট না পাজামা, কোট না কোর্তা, শাড়ি-সেলওয়ার, না স্কার্ট-গাউন সেটা কালচারের প্রশ্ন। মাছ-গোশত-তরকারি রাঁধিয়া খাইবে, না কাঁচা খাইবে-এটা হইবে সভ্যতার প্রশ্ন। কিন্তু কি প্রণালীতে রান্না করিবে, কোন্টা খাইবে, আর কোল্টা খাইবে না, কোন্টা হালাল, কোল্টা হারাম, কি ধরনের পাক-প্রণালী পছন্দের, পেস্টিপ্যাটিস ভাল, না রসগোল্লা-সন্দেশ ভাল-এ সব কালচারের প্রশ্ন। খেলা-ধূলাকে মানুষের কর্মজীবনের স্বাভাবিক অংগ স্বীকার করা সভ্যতা। কিন্তু খেলার বিভিন্ন রূপ ফুটবল না রাগবি, ক্রিকেট না বেসবল, পলো না ঘোড়দৌড়, হকি না ডাংগুলি-এসব সভ্যতার প্রশ্ন নয়, কালচারের প্রশ্ন মাত্র। সংগীত ও নৃত্যকে চারুশিল্পের অন্তর্গত করা সভ্যতা। কিন্তু নাচ-গানের বিষয়বস্তু, ধরন ও প্রণালীটা কালচারের ব্যাপার। সম্পত্তির মালিকানার স্বীকৃতি সভ্যতার নিদর্শন। কিন্তু সে সম্পত্তির ওয়ারিস নির্ধারণ ও বণ্টন-প্রণালীটা কালচার মাত্র।</p>
<p><strong>কালচারের উৎস</strong></p>
<p>উপরের আলোচনা হইতে ইহা প্রমাণিত হইতেছে যে, <strong>যে মন ও মস্তিষ্ক মানুষকে অন্যান্য জীব-জন্তু হইতে পৃথক করিয়াছে, সেই মনের বিকাশের নাম কালচার, মস্তিষ্কের বিকাশের নাম সিভিলিযেশন।</strong> আগের আলোচনা হইতে এটাও স্পষ্ট হইয়াছে যে, এই নির্ধারণও নিক্তির ওজনে নিখুঁত নয়, মাত্র মোটামুটিভাবে সত্য। সভ্যতা বুদ্ধির বস্তু বলিয়াই সে নিজের জোরে রাজ্য জয় করে। প্রসার ও বিস্তার লাভ করে। হৃদয়ের সাথে সভ্যতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য নয়। তাই গ্রহণকারীকে অন্তর দিয়া সভ্যতা গ্রহণ করিতে হয় না। তার কোনও দরকারও নাই। এ্যারোপ্লনকে শয়তানের কল বলিয়াও অনেকে হাওয়াই জাহাজে চড়িয়া হজ করিতে যাইতেছেন। অন্যান্য সব সম্পদের মতোই সভ্যতার সাফল্য তার প্রয়োজনে।</p>
<p>আজিকার যান্ত্রিক সভ্যতাই তার প্রমাণ। প্রয়োজনের তাকিদেই সারা দুনিয়া এই পশ্চিমা সভ্যতা গ্রহণ করিয়াছে। মস্তিষ্কের ব্যাপার বলিয়া ইহা গ্রহণ করিতে কারও কোন অসুবিধা হয় নাই। দুনিয়ার সব দেশেই ইহা খাপ খাইয়া গিয়াছে। প্রকৃতির বিধানেই ইহা ঘটিয়াছে। কথাটা সহজে বুঝিবার জন্য আমরা সভ্যতাকে ইমারতের সংগে তুলনা করিতে পারি। আর কালচারকে তুলনা করিতে পারি এবং আগেই করিয়াছি, গাছের সংগে। ইমারত মাটি হইতে রস গ্রহণ করে না। কাজেই যে-কোন সরঞ্জামের যে-কোনও প্লানের ইমারত যে-কোনও দেশে নির্মিত হইতে পারে। কিন্তু গাছকে মাটি হইতে রস সংগ্রহ করিয়া বাঁচিতে হয়। সেজন্য যে-কোনও গাছ দুনিয়ায় যে কোনও দেশে লাগান যায় না। মাটি রস সংগ্রহের উপযোগী না হইলে চারা লাগাইলেও তা বাঁচে না।</p>
<p>কালচার সম্বন্ধেও এই কথা। <strong>যে-কোন দেশের কালচার, তা যতই সুন্দর হউক না কেন, অন্য যে-কোন দেশে চালান যাইবে না। স্থানীয় রসের অভাবে তা মারা যাইবে। কারণ আগেই বলিয়াছি কালচারটা মনের বস্তু, মস্তিষ্কের বস্তু নয়। এই দিক হইতে বিচার করিয়া বলা যায় সিভিলিযেশন একটা র‍্যাশনাল কনস্ট্রাকশন; আর কালচার একটা ইমোশন্যাল গ্রোথ।</strong></p>
<p>ঠিক এই কারণেই দুনিয়ার লোককে যত সহজে পশ্চিমা সভ্যতা গ্রহণ করান গিয়াছে, তত সহজে পশ্চিমা কৃষ্টি গ্রহণ করান যায় নাই। সভ্যতা প্রসার লাভ করে বিজয়ীর বেশে। পশ্চিমা জাতিসমূহ রাজ্য বিস্তারে ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে তিনশ&#8217; বছর ধরিয়া সারা দুনিয়ায় প্রভুত্ব করিয়াছে। এই উপলক্ষে তারা জগতবাসীর কাছে নিজেদের সভ্যতা প্রচার করিয়াছে। বিশ্ববাসী তা গ্রহণও করিয়াছে।</p>
<p>নিজেদের সভ্যতার সাথে সাথে পশ্চিমারা নিজেদের কালচার প্রচারে চেষ্টাও কম করে নাই। কিন্তু শহরের মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া সাধারণভাবে দুনিয়ার সব দেশের জনগণ পশ্চিমা কালচার গ্রহণ করে নাই। শাসক জাতির কালচারের প্রবল স্রোতের মুখেও তারা নিজেদের কালচার মজবুত হাতে ধরিয়া রাখিয়াছে। এটা মানুষের দর্প নয়, প্রকৃতির দর্প। সব দেশের মাটি পশ্চিমা কালচারের চারা গাছের রস যোগাইতে পারে নাই বলিয়াই এইরূপ ঘটিয়াছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈচিত্র্য অপরিহার্য</strong></p>
<p>এটা কি অন্যায় হইয়াছে? পশ্চিমা কালচার গ্রহণ না করিয়া পূরবীরা কি ভুল করিয়াছে? এটা কি তাদের কুসংস্কারী মনোভাবের জন্য হইয়াছে? এটা কি তাদের সংস্কার-বিরোধী নস্টালজিয়া? তারা কি জানে না, কি জিনিস তারা হারাইতেছে? না, প্রকৃত অবস্থা তা নয়। মানব জাতির কল্যাণের খাতিরেই তা ঘটিয়াছে। যে বৈচিত্র্যে বিশ্বের সৌন্দর্য নিহিত, স্রষ্টার কারিগরির অসাধারণত্বের যা নিদর্শন, তারই খাতিরে প্রকৃতি এরূপ ঘটাইয়াছে।</p>
<p>ধরুন, এমন যদি না হইত, দুনিয়ার সব জাতি যদি পশ্চিমা কালচার গ্রহণ করিত, তবে অবস্থা কি দাঁড়াইত? সভ্যতার দিক হইতে দুনিয়া যেমন একাকার হইয়া গিয়াছে, কালচারের দিক হইতেও তেমনি সব জাতি একরংগা হইয়া যাইত। দেহের রং অবশ্য এক হইত না। কিন্তু মনের রং এক হইয়া যাইত। তাতেও কার কি লোকসান হইত?</p>
<p>মানবতার লোকসান হইত দুই দিক হইতে। প্রথমত, দুনিয়ার বৈচিত্র্য নষ্ট হইত। বিভিন্ন জাতির জাতীয় বৈশিষ্ট্যের অবসান ঘটিত। হাজার ফুলের বাগিচা যে দুনিয়া, সেটা পরিণত হইত এক রংগা গেন্দা ফুলের ক্ষেত্রে। দুনিয়ার সব জাতি নকল পশ্চিমা জাতিতে পরিণত হইত। লাখ লোকের সমাজের মধ্যে দুই-চারজন মাত্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন থাকিয়া বাকী সব লোক ব্যক্তিত্বহীন হইলে সমাজের অবস্থা যা দাঁড়াইবে, দুনিয়ার সব জাতি নিজ নিজ কালচারের স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়া পশ্চিমা কালচার গ্রহণ করিলে বিশ্ববাসীর অবস্থা দাঁড়াইবে ঠিক তাই।</p>
<p>দ্বিতীয়ত, দুইচারজন লোক বা শ্রেণীবিশেষ বাদে সমাজের আর সব লোক ব্যক্তিত্বহীন হইলে সে সমাজ সচেতন সমবেত গণ-জীবন থাকিবে না, হইয়া যাইবে রাখালের পরিচালনায় একপাল গরু। স্বকীয় কালচার বা ব্যক্তিত্বহীন জাতিসমূহ ঠিক তেমনি পশ্চিমা রাখালের অধীনে গরুর পাল হইয়া যাইত। ফলে পশ্চিমা জাতিসমূহ ছাড়া আর সব জাতি হারাইত স্বাধীন চিন্তা, কর্মোদ্যম ও সৃষ্টির অভিলাষ। বিশ্ব সভ্যতায় তাদের কোনও অবদান থাকিত না। কার্যত তারা পরিণত হইত প্রাণহীন যন্ত্রে।</p>
<p>কাজেই দেখা গেল, লোক-সমাজে আদর-কদর, মান-ইয্যৎ পাইতে হইলে যেমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হইতে হয়, তেমনি বিশ্ব-সমাজে আদর-কদর ও মান-মর্যাদা পাইতে হইলে আমাদের জাতিকেও হইতে হইবে সমবেত ব্যক্তিত্বের, মানে নিজস্ব কালচারের অধিকারী। নিজস্ব কালচারের প্রয়োজন এইখানেই।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈচিত্র্য স্বাভাবিক</strong></p>
<p>মনে রাখা দরকার, ব্যষ্টির ব্যক্তিত্ব যেমন, জাতির ব্যক্তিত্বও তেমনি, কদাচ নিখুঁত, ত্রুটিহীন হইতে পারে না। মারিয়া-পিটিয়া যেমন ব্যক্তিত্ব হয় না, ছাঁচে ঢালিয়া তেমনি কালচার হয় না। আগেই বলিয়াছি, কালচারটা ডিযাইন করা কনস্ট্রাকশন নয়। ওটা গাছের মতই ন্যাচারেল গ্রোথ। বলা যায় ওটা প্রকৃতির তৈরী নদী। মানুষের হাতে-কাটা খাল নয়। দুই কূল ছাপিয়া দুই পাড় ভাংগিয়া ইচ্ছামতো চলাই নদীর ব্যক্তিত্ব। কৃত্রিম খালের মতো তার দুই পাড় শানে-বাঁধা নয়। এই জন্যই দোষে-গুণে যেমন ব্যক্তিত্ব, ভাল-মন্দেই তেমনি কালচার। দুনিয়ার সব কালচারের শুধু গুণগুলি বাছিয়া লইয়া একটা নিখুঁত সুন্দর কালচার গড়িবার চেষ্টা করিয়া দেখুন, পারিবেন না। সেটা কালচার হইবে না, হইবে বড় জোর কালচারের ল্যাবরেটরি। মিউযিয়াম হইবার সম্ভাবনাই বেশি।</p>
<p>এর কারণও সুস্পষ্ট। মানুষ ফেরেশতা নয়। দোষে-গুণেই তারা মানুষ। তাদের এ দোষ-গুণের বিশেষত্ব এই যে এক দিক হইতে যেটা দোষ, আর এক দিক হইতে সেটাই সবলতা। ধরুন, মানুষের রাগের কথা। এক সময়ে এটা দোষ। কিন্তু সময়ান্তরে এটাই গুণ। নিষ্ঠুরতারই আর এক নাম বীরত্ব। কাপুরুষতাকেই সময়বিশেষে সহিঞ্চুতা বলা হয়। আহাম্মকির সাধু নাম সরলতা।</p>
<p>কালচারের বেলাও তাই। একের জন্য যা দোষ, অপরের জন্য তাই গুণ। এটাই তাদের পার্থক্য। এই পার্থক্যটুকুই যার তার বৈশিষ্ট্য। হুবহু ব্যষ্টির ব্যক্তিত্বের মতোই। একটা দৃষ্টান্ত লওয়া যাউক। হাত-পা, চোখ-মুখ, নাক-কান, খানা-পিনা, হাগা-মুতা এবং জন্ম-মৃত্যু কোনও ব্যাপারেই জানোয়ার ও মানুষের মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই। মন ও মস্তিষ্কের দোহাই দিয়া তাহাদের মধ্যে যে পার্থক্য করি, তাও বড় ক্ষীণ। বানরের বেলায় সে পার্থক্যের সীমা কোথায়। শুধু মন-মস্তিষ্কের নয়, তাদের অন্তরও আছে। তাহারা ও হাসে-কাঁদে। ভাষাও তাদের একটা আছে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বৈশিষ্ট্য কি?</strong></p>
<p>তথাপি মন-মস্তিষ্ক ও অন্তরের এক স্তরে জানোয়ার ও মানুষের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। সে পার্থক্য স্থূল দৃষ্টিতে যতই ক্ষীণ হউক না কেন ঐ পার্থক্যটুকুই মানুষের নিজস্বতা। ঐ টুকুই তার বৈশিষ্ট্য।</p>
<p>ব্যক্তিত্ব ও কালচারের বেলাও অবিকল তাই সত্য। হাজার বিষয়ে এক ও সদৃশ হইয়াও সামান্য দুই-এক বিষয়ে তারা পৃথক স্বতন্ত্র ও অসদৃশ। দেখা যাইবে সবই ত এক। তবে আর পার্থক্যটা কি? হাঁ, আছে। ঐ যে মানুষের ভিড়ের মধ্যে মাত্র এক ইঞ্চি বেশি লম্বা একটা লোক দেখা যাইতেছে, ঐ দৈর্ঘ্যটুকুই তার বিশেষত্ব। হাতে পায়ে রং চেহারায় কথাবার্তায় সব ব্যাপারেই আর সবার সাথে তার মিল আছে। কারণ সেও মানুষ। মানুষ না হইয়া সে যদি একটা খুঁটি বা উট হইত, তবে তার উচ্চতা তার বৈশিষ্ট্য হইত না।</p>
<p>তেমনি আগে কালচার হইতে হইবে। তারপর আসিবে কালচারের বৈশিষ্ট্য। সব কালচারের মধ্যে ঐক্য মিল ও সাদৃশ্য থাকিবে হাজার। আর পার্থক্য থাকিবে মাত্র দুই একটি। ঐ পার্থক্যটুকুই তাদের বৈশিষ্ট্য। অপরের চোখে বা বিজ্ঞানের বিচারে সে পার্থক্যটুকু তুচ্ছ হইতে পারে। কিন্তু ঐ কালচারের জন্য তুচ্ছ নয়। খুব ছোট দৃষ্টান্ত দিয়াই বিচার করা যাউক। মুসলমানের নূরের দাম হিন্দু-খৃস্টানের কাছে যা, হিন্দুর টিকির দাম মুসলিম-খৃস্টানের কাছে তাই। আবার খৃস্টানের ক্রসের দামও হিন্দু-মুসলমানের কাছে তুচ্ছ। ইহুদি-মুসলমানরা তাদেরা ছেলেদের কেন খৎনা করায় এটা হিন্দু-খৃস্টানরা বুঝিতে না পারিলেও ইহুদি মুসলমানরা কিন্তু কাজটাকে তাদের কালচারের ফান্ডামেন্টাল মনে করে। বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ পোশাকে অত বাবু ও চেহারায় তাত সুন্দর হইয়াও মোচ দিয়া তাঁর অমন সুন্দর মুখখানা ঢাকিয়া রাখিতেন। সে জন্য আমরা তাঁর মুসলমান-খৃস্টান ভক্তদের অন্তরে দুঃখের অন্ত ছিল না। সম্রাট শাহজাহান ও স্যার সৈয়দ আহমদের মতো না হউক, মার্কস-এংগেলের মতো মোচ তিনি রাখিলেন না কেন? কারণ ওটা কালচার।</p>
<p>ঠিক তেমনি দাড়ি-গোঁফের বেলা হিন্দু-খৃস্টানেরা এত বিলাসী ক্লিনশেভার হইয়াও বগলতলা ও নাভির নিচে সম্বন্ধে অত সঞ্চয়ী কেন, মুসলমানরা তা বুঝে না। পোশাক-পাতিতে অত টাকা-পয়সা খরচ করিয়াও পশ্চিমা মেয়েরা পিঠ ও হাঁটুর নিচ ঢাকিবার কাপড়ের পয়সা জুটাইতে পারে না কেন, আমরা পূরবীরা তার কারণ খুঁজিয়া পাই না।</p>
<p>পক্ষান্তরে আমরা আমাদের মেয়েদের অত-অত কাপড়ে আপাদমস্তক ঢাকিয়া রাখি কেন, তা বুঝাও পশ্চিমাদের পক্ষে কম কঠিন নয়। পশ্চিমাদের ক্লাব-লাইফ ও ঢিলা-ঢালা দাম্পত্য জীবন দেখিয়া তাদের মেয়েদের জন্য আমরা কত আফসোস করি। কিন্তু আমাদের এক সংগে একাধিক বিবি লইয়া ঘর করিতে দেখিয়া পশ্চিমারাও আমাদের নারীজাতির জন্য কম আফসোস করে না। আমরা মুসলমানরা আরবী-ফারসীতে সুন্দর-সুন্দর অর্থপূর্ণ নাম রাখি। হিন্দুরা সংস্কৃত-হিন্দীতে সুন্দর অর্থজ্ঞাপক নাম রাখে। কিন্তু পশ্চিমা খৃস্টানরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও সভ্যতা-ভব্যতায় অত উন্নত হইয়া যা তা অর্থহীন ও কদর্য নাম রাখিতে লজ্জা পায় না। আমরা যাকে অখাদ্য মনে করি, অনেক সভ্যজাতি তাই খায় পরম লযযতের সাথে। বিজ্ঞানী দার্শনিকের কাছে এ সব ব্যাপারে যতই ছোট হউক না কেন, এ সবের মধ্যেই নিহিত কালচারের পার্থক্য। আসলে এ সবের সমষ্টির নামই কালচার। এই সব ব্যাপার দিয়াই আমাদের কালচারের বিচার করিতে হইবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>[‘বাংলাদেশের কালচার’ থেকে গৃহীত] </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/what-is-culture/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13947</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ধর্মানুষ্ঠান ও আর্ট</title>
		<link>https://rowyakbd.com/religious-festivals-art/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/religious-festivals-art/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আবুল মনসুর আহমদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 27 Mar 2024 14:32:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13923</guid>

					<description><![CDATA[কালচারেল অনুষ্ঠানের আনন্দোৎসবের মধ্যে দিয়াই জাতির সমবেত মন বিকশিত হয়। মানুষের আনন্দ-পিপাসু অতৃপ্ত মন আনন্দরসের আবেহায়াতের তালাশে অজানা স্বপ্নের দেশে উড়িয়া যায় কল্পনার বোরাকের ডানায় চড়িয়া। মন-পবনের নাওয়ে চড়িয়া মাশুক শাহযাদীর তালাশে সে পার হইয়া যায় সাত সমুদ্দুর তের নদী।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>কালচারেল অনুষ্ঠানের আনন্দোৎসবের মধ্যে দিয়াই জাতির সমবেত মন বিকশিত হয়। মানুষের আনন্দ-পিপাসু অতৃপ্ত মন আনন্দরসের আবেহায়াতের তালাশে অজানা স্বপ্নের দেশে উড়িয়া যায় কল্পনার বোরাকের ডানায় চড়িয়া। মন-পবনের নাওয়ে চড়িয়া মাশুক শাহযাদীর তালাশে সে পার হইয়া যায় সাত সমুদ্দুর তের নদী।</p>
<p>এই মানসিক এ্যাডভেনচারেই মানুষ সাক্ষাৎ পায় নিত্য-নতুন সত্য-সুন্দরের। তাকেই তারা বাঁধিয়া রাখিতে চায় আর্টে-সাহিত্যে। সুরতের সংগে সিরতের, বহিরাকৃতির সাথে অন্তর-প্রকৃতির, ব্যক্তের সাথে সত্যের এপিয়ারেন্সের সাথে রিয়্যালিটির সার্থক সমন্বয় ঘটানই আর্টের কাজ। এই সমন্বয়ের সার্থকতা রসসৃষ্টিতে। তার সাফল্য সত্য ও সুন্দর লাভে। উভয়ের সমন্বয়ে যা, হয় তাই সত্য-সুন্দর। এটাই সুফী ধর্মের সাফল্য। সমস্ত কৃষ্টি-সংস্কৃতির চরম উৎকর্ষ। কারণ সত্য ছাড়া সুন্দর নাই। সুন্দর ছাড়া সত্য নাই। সত্যহীন সুন্দর নিম্নস্তরের রস মাত্র। আর সুন্দরহীন সত্য অকিঞ্চিৎকর ঘটনা মাত্র। এই সত্য সুন্দরের অস্তিত্ব গোড়াতে থাকে মানুষের কল্পনায়। আজিকার কল্পনাই আগামীকালের বাস্তব। আজ যা সত্য, গতকাল তাই ছিল অসত্য। আজিকার ধর্ম, গতকাল ছিল অধর্ম, দণ্ডনীয় পাপ। সমস্ত ধর্ম-প্রবর্তক ও সত্য-আবিষ্কারকের জীবনই এর প্রমাণ। সত্য ও সুন্দর লাভের চিরন্তন ইতিহাসই এই। বর্তমানে অতৃপ্তিই মানসিক এ্যাডভেনচারের বুনিয়াদ। বাস্তবের বাইরে যাওয়ার নামই কল্পনা। এ যেন শূন্যে আসমানে স্পেসে লাফ দেওয়া। একমাত্র অতৃপ্ত ক্ষিধাই এমন সাংঘাতিক ঝুঁকি নিতে পারে। কাজেই যে জাতির এ ক্ষিধা নাই, সে অসুস্থ। যে জাতির কল্পনা নাই সে মৃত। দুনিয়াকে দিবার কিছু নাই তার।</p>
<p>এই স্বপ্ন কল্পনাকে গণ-জীবনে প্রয়োগ সার্থক ও সফল করার প্রধান, এমন কি প্রায় একমাত্র পথ ধর্মোৎসবের আনন্দোল্লাস। হিন্দুর দুর্গোৎসব জন্মাষ্টমীর, বৌদ্ধের মাঘী-পূর্ণিমার, খৃস্টানের বড়দিনের আনন্দোৎসবের জীবন-প্রাচুর্যে তা সুস্পষ্ট। কিন্তু পাক-বাংলার [১] গণ জীবনে সে আনন্দোল্লাস কই? কোথায় ঈদ? কোথায় মোহররম। এ সব উৎসব-পরবে পাক-বাংলার মনের আকাশে জীবন-প্রাচুর্যের লক্ষ তারকা জ্বলিয়া উঠে কি? আমাদের জীবন-সাগরে কর্ম-চঞ্চল্যের ঝড় উঠে কি? আমাদের দেহের শিরায়-শিরার নবজীবনের দ্যোতনার বিদ্যুৎ-প্রবাহ ছুটে কি? প্রাণ-রসের উচ্ছলতায় আমরা ফাটিয়া পড়ি কি? প্রাণের প্রাচুর্য ত  কোথাও দেখি না। যা কিছু প্রাচুর্য সবইত দেখি খানা-পিনায়। শুধু পোলাও-কোর্মা আর সিমাই-যর্দা এই আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি? আমাদের কালচার কি শেষে খানা-পিনায় সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িল?</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>ঈদুল</strong><strong>-ফিতরের নযির</strong></p>
<p>ঈদুল-ফিতরের কথাটাই ধরা যাক। এই ঈদ আসে ত্রিশ দিন রোযার পরে। রোযার ত্রিশ দিনকে যদি সংযম কৃচ্ছ্র সাধনার মুদ্দত ধরা যায়, তবে রোযা-শেষের ঈদের দিনে প্রাণ-প্রাচুর্যের বাঁধ-ভাংগা বন্যায় আমাদের জীবনের দুকূল ছাপাইয়া পড়া উচিত।</p>
<p>ঈদ অর্থ আনন্দোৎসব। কিন্তু আমাদের ঈদ আর তা নাই। ধর্মোৎসবের ধর্মটুকু উৎসবের উল্লাসের নিচে চাপা পড়ার নযির আছে দুনিয়ায় অনেক। কিন্তু ধর্মের নিচে উৎসব চাপা পড়ার নযির দুনিয়াতে মাত্র একটি। তা আমাদের ঈদ। আনন্দ-উল্লাসের উন্মত্ততায় আমরা খোদাকে ভুলিয়া না যাই-এই উদ্দেশেই ঈদ উৎসবের শুরুতে দুই রাকাত সুন্নত নামাযের বিধান করা হইয়াছিল।</p>
<p>তার কারণ ছিল। উল্লাসের উন্মত্ততায় সব উৎসবই আখেরে পাপাচারের ভৈরবীচক্রে পরিণত হয়। ইতিহাসের শিক্ষা এই। তাই ঈদে এই সাবধানতা অবলম্বন করা হইয়াছিল। ঈদের সমাবেশকে ইবাদতের জামাতে পরিণত করার উদ্দেশ্য তাতে ছিল না।</p>
<p>সেইজন্যই এতে নমাযের অনেক আহকাম ও আরকান-যথা: অযু, আযান একামত ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয় নাই। হায়েযওয়ালী মেয়েদেরেও ঈদের জমাতে শামিল হওয়ার তাকিদ এই কারণেই করা হইয়াছে। গৌরবের যুগে মুসলমানরা ঈদের উৎসবকে ঈদরূপেই পালন করিয়াছে। স্বাধীন ও প্রগতিশীল মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে আজো তাই করা হইতেছে। বাংলা ও ভারতে মুসলিম আমলে আমরাও ঈদকে জাতীয় আনন্দোৎসব হিসাবেই পালন করিতাম।</p>
<p>এই আনন্দোৎসবকে আমরা প্রার্থনা-সভায় পরিণত করিয়াছি আমাদের পতনের যুগে। স্বভাবতই এটা ঘটিয়াছে। সাময়িক বিপদেও মানুষ তার আনন্দোৎসবকে সংক্ষিপ্ত ও সঙ্কুচিত করে। স্থায়ী বিপদে ত কথাই নাই। দুর্দিন দীর্ঘস্থায়ী হইলে মানুষ অদৃষ্টবাদী ও অতিরিক্ত ধার্মিক হইয়া পড়ে আমরাও তাই হইলাম। প্রায় দুই-দুইশ&#8217; বছর কি বিপদটাই না গেল আমাদের উপর দিয়া। জান-মাল, মান-ইযযত কিচ্ছু ছিল না। সর্বাত্মক যুলুমে প্রাণ রাখিতেই আমাদের প্রাণান্ত। আনন্দোৎসব করিব কখন? তাই ঈদের দিনের ধর্মের যে বিধানটুকু না করিলেই নয়, সেইটুকু শুধু করিলাম, পারিলে ময়দানে গিয়া নয় ত মসজিদেই। আর বেশির ভাগ ঘরের কোণে বসিয়া বিপদ-তারণ আল্লাহ দরগায় কান্নাকাটি করিয়া কাটাইলাম দুই-দুইশ&#8217; বছর। এই সময়েই আমাদের জীবন হইতে গেল স্বাচ্ছন্দ্য, সমাজ হইতে গেল উৎসব, ঘর হইতে গেল আনন্দ। সেই সঙ্গে গেল আর্ট ও সাহিত্য। আর্ট-সাহিত্য-সংস্কৃতি কাকে বলে, তা যেন আমরা ভুলিয়াই গেলাম। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সর্বাপেক্ষা উর্বর ক্ষেত্র ‘ঈদ-পর্ব’ সৃজনীশক্তির দিক দিয়া হইয়া গেল বন্ধ্যা। আমাদের আর্টে-সাহিত্যে নামিয়া আসিল সন্ধ্যা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>নিরানন্দের পরিণতি</strong></p>
<p>ফলে, আজ আমাদের ঈদে আনন্দ নাই, আছে বেদনা। সংস্কৃতি নাই, আছে বিকৃতি। উল্লাস নাই, আছে আর্তনাদ। আনন্দের ক্ষিধা মানুষের পেটের ক্ষিধা ও যৌন ক্ষিধার মতোই তীব্র। সুস্থ ও স্বাভাবিক পথে নির্মল আনন্দ না পাইলে মানুষ পাপের পথে গিয়াই আনন্দ উপভোগ করে। তার উপর পরবাদিতে মানুষের আনন্দ-ক্ষুধায় আসে জোয়ার। এই সময় সাংস্কৃতিক আনন্দ-অনুষ্ঠানে সে ক্ষুধার তৃপ্তি না ঘটাইলে মানুষ কুপথে গিয়া সে পিপাসা মিটাইবেই। আমাদের জীবনে তাই হইতেছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নির্মল আনন্দের অভাবে ঈদের দিনের প্রাণের জোয়ার থামাইতেছি আমরা সিনেমা দেখিয়া, কুস্থানে গিয়া এবং ক্লাবে &#8216;ঈদবল&#8217; নাচিয়া। এটা বেদনার ও বিকৃতির নযির।</p>
<p>আর্তনাদের নযিরটা আরও প্রত্যক্ষ। মুসলমানদের মধ্যে কত যে বিকলাংগ, কুষ্ঠরোগী ও বেকার ভিক্ষুক ছেলে-বুড়া, নারী-পুরুষ আছে, তার প্রদর্শনী করি আমরা ঈদের দিনে, সদর রাস্তায় ঈদের ময়দানে। বিকলাংগ, কুষ্ঠরোগী, ভিক্ষাজীবী কমবেশী অপরাপর জাতির মধ্যেও আছে। ধর্মস্থানে দান-খয়রাত উপলক্ষে তাদের ভিড়ও হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু জাতীয় আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠানে এদের বিভৎস ভিড় হওয়ার ব্যবস্থা বোধ হয় আর কোনও জাতিতে নাই। সমাজ-দেহে ঘা-পাঁচড়া অল্পবিস্তর সব জাতিতেই আছে। বিশেষত শোষণবাদী ধনতন্ত্রী সমাজ দেহে তা বেশি করিয়াই থাকে। কিন্তু জাতীয় আনন্দোৎসবের দিনে ঘটা করিয়া তার প্রদর্শনী খুলে না কেউ। সভ্য মানুষ শরীরের খোস-পাঁচড়া মলম-পট্টি দিয়া ঢাকিয়াই রাস্তায় বাহির হয়। দেহের ঘা বড় ও বিদকুটে করিয়া, গুপ্তস্থানের ঘা কপালে ছড়াইয়া ক্ষতের ডিমনস্ট্রেশন করে শুধু তারাই, পরের দয়ার উদ্রেক করিয়া ভিক্ষা করিয়া খাওয়া যাদের পেশা। যে জাতি ভিক্ষাকে কালচারে সমুন্নত করিয়াছে, তারা ছাড়া আর কেউ এটা পারে না। আমরা পারি, পারি বলিয়াই আমাদের কচি শিশু ছেলে-মেয়েরা ভিক্ষাকে পেশা করিয়াছে। ঈদের দিনে এইসব বিকলাংগ ভিক্ষুকের যে সমবেত আর্তনাদের জবাবে আমরা দুহাতে ফেরা-যাকাতের পাই-পয়সা বিলাইয়া কড়ির মূল্যে বেহেশত কিনিতেছি, সেটা আসলে ভিখারির আর্তনাদ নয়, আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিরই আর্তনাদ।</p>
<p>আমাদের তরুণরা এটা তীব্রভাবে অনুভব করে বলিয়াই তারা সম্প্রতি ঈদ রিইউনিয়নের আয়োজন করিতেছে। এটা শুভ সূচনা। কিন্তু এখনও এ অনুষ্ঠান খানা-পিনাতেই সীমাবদ্ধ। একে সাংস্কৃতিক অলংকার পরাইয়া আমাদের প্রমাণ করিতে হইবে যে, মুসলমানের কালচারের চৌহদ্দি পেট নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মোহররমের জীবন</strong><strong>-প্রাচুর্য</strong></p>
<p>একমাত্র মোহররম পর্বেই মুসলমানেরা অন্যান্য কালচার গ্রুপের সাথে খানিকটা প্রতিযোগিতা করিয়াছে। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে ঢাকার জন্মাষ্টমী ও কলিকাতার বড়দিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিত একমাত্র কলিকাতার মোহররম। দশ লক্ষ মুসলমানের এই উৎসব পঞ্চাশ লক্ষ বাশিন্দার কলিকাতা নগরীকে পায়ের বুড়া আংগুলে খাড়া রাখিত দশ-দশটা দিন।</p>
<p>তৎকালে বাংলার শহরে-বন্দরে পাড়াগাঁয়ে দশ দিন ধরিয়া ঢাকঢোল-সানাই ও কাড়া-নাকাড়া-দামামার গুরু-গম্ভীর আওয়ায আসমান-ফাটাইয়া পাতাল কাঁপাইয়া ঘোষণা করিত: এই আসিয়াছে মুসলমানের উৎসব মোহররম। প্রতি গাঁ-মহল্লা হইতে এক বা একাধিক আখড়া বাহির হইত। লাঠি-তলোয়ার, সড়কি-বল্লম ও ছুরি-রামদাও ইত্যাদি খেলার বুক কাঁপানো সাংঘাতিক প্রতিযোগিতা করিত তারা। হাজার-হাজার লোক অবাক-বিস্ময়ে দেখিত সে অস্ত্রের খেল্।</p>
<p>কাতল্-মনযিলেরা দিন যতই ঘনাইয়া আসিত খেলোয়াড় ও দর্শকদের উত্তেজনা-উদ্দীপনা ততই বাড়িয়া যাইত। যেন &#8216;দিকে দিকে চলে কুচকাওয়াজ&#8217; সত্য-সত্যই। এ যেন &#8216;শহিদী সেনারা&#8217; সত্য-সত্যই সাজিয়াছে। যেন নিজ কানে শুনিতেছি ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণী তল।&#8217; কাজেই &#8216;চন্দ্রে চল্&#8217; না বলিয়া যেন উপায় নাই। খেলা-রত চলমান আখড়ার পিছনে পিছনে চলিত উদ্দীপিত জনতা।</p>
<p>আখড়াগুলি ক্রমে জমায়েত হইত শহরে-বন্দরে। কাতলের দিনে সমবেত আখড়াসমূহের বাছাই করা খেলোয়াড়দের মধ্যে হইতে দ্বন্দ্বযুদ্ধ প্রতিযোগিতা। সে কি রোমাঞ্চকর লড়াই! মুগ্ধ বিপুল জনতা দেখিত সে অস্ত্র চালনার উস্তাদি। দর্শকরা চাঁদা করিয়া শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের দিত খেলাত-পুরস্কার।</p>
<p>বড়দের এই প্রাণ-মাতানো সাহসিকতার খেলা দেখিয়া ছোট ছোট ছেলেরাও কাঠের তলোয়ার, তালপাতার ঢাল ও টিনের ঢোল বানাইয়া এযিদ-ইমামের লড়াই করিত। আখড়ার লাঠিখেলা ছাড়াও আগের দিনে বিভিন্ন পর্ব উপলক্ষে পাড়াগাঁয়ে ঘোড়দৌড়, নৌকা-বাইচ, ডন-কুস্তি-কসরত ও হরেক রকম বীরত্বপূর্ণ খেলা হইত। পর্বোপলক্ষ্যেই সমবেতভাবে এইসব খেলা হইত বটে, কিন্তু এ সবের প্রস্তুতি চলিত প্রায় সারা বছরই।</p>
<p>তাতে আমাদের মধ্যে একটা জংগী ঐতিহ্য ও সামরিক কালচারও গড়িয়া উঠিয়াছিল। এইসব অনুষ্ঠানে মুসলিম-বাংলার আকাশ-বাতাস জীবন-প্রাচুর্যে মুখরিত হইয়া উঠিত। শুধু স্বদেশবাসী ভিন্ন সমাজের লোকেরাই নয়, বিদেশী আগন্তুক ও পরিব্রাজকেরাও বুঝিত মুসলিম-বাংলার গণ-জীবনে কৃষ্টির প্রাণ-প্রাচুর্য রহিয়াছে এবং সেটা জীবন্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আজ আর তা নাই।</p>
<p><strong>[‘বাংলাদেশের কালচার’ বই থেকে গৃহীত]</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>টীকাঃ </strong></p>
<p>১. স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে লেখা হওয়ায় লেখক বাংলাদেশ বুঝাতে পাক-বাংলা শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। এর ব্যাখ্যা তিনি ভূমিকাতেও দিয়েছেন। লেখার রূপ অক্ষুণ্ণ রাখতে এখানেও হুবহু পাক-বাংলা রাখা হলো।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/religious-festivals-art/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13923</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
