<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>এবনে গোলাম সামাদ &#8211; রোয়াক</title>
	<atom:link href="https://rowyakbd.com/author/abney-golam-samad/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<description>চিন্তার বিনির্মাণে...</description>
	<lastBuildDate>Thu, 23 Apr 2026 11:51:49 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1</generator>

<image>
	<url>https://rowyakbd.com/wp-content/uploads/2024/03/cropped-website-icon-32x32.png</url>
	<title>এবনে গোলাম সামাদ &#8211; রোয়াক</title>
	<link>https://rowyakbd.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>আহমদ ছফার “বাঙালি মুসলমান” চরিত্রের ক্রিটিক</title>
		<link>https://rowyakbd.com/criticism-of-ahmed-safas-bengali-muslim-character/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/criticism-of-ahmed-safas-bengali-muslim-character/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 08 Aug 2025 07:06:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=16023</guid>

					<description><![CDATA[[পন্ডিত আহমদ ছফা’ প্রণীত  ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক  দীর্ঘ-প্রবন্ধটি প্রকাশের পর সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল, বৈশাখ ১৩৮৩ (এপ্রিল ১৯৭৬), অষ্টাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রফেসর ড. এবনে গোলাম সামাদ একটি  প্রতিক্রিয়া হাজির করেন।] সমকালে (ফাল্গুন ১৩৮২ সংখ্যায়) আহমদ ছফার একটি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>[পন্ডিত আহমদ ছফা’ প্রণীত  ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক  দীর্ঘ-প্রবন্ধটি প্রকাশের পর সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল, বৈশাখ ১৩৮৩ (এপ্রিল ১৯৭৬), অষ্টাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রফেসর ড. এবনে গোলাম সামাদ একটি  প্রতিক্রিয়া হাজির করেন।]</p>
<p>সমকালে (ফাল্গুন ১৩৮২ সংখ্যায়) আহমদ ছফার একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি বাঙালি মুসলমানের মানসিকতা বিশ্লেষণ করে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রবন্ধটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, তথ্য ও তত্ত্বের বেশ কিছু অসঙ্গতি আছে। তাই এই আলোচনায় অবতীর্ণ হচ্ছি। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি খোলা মন নিয়ে এ প্রসঙ্গে সমকালে আরো আলোচনা হবে। আমাদের সংশয় ঘুচবে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>আর্য ও অনার্য</strong></h4>
<p>ছফা সাহেবের মতে বাঙালি মুসলমানের একটি বিরাট অংশই নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে উদ্ভূত। এরা সকলেই ছিলেন অনার্য। তার মতে ‘যেহেতু নবদীক্ষিত মুসলমানদের বেশির ভাগই ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু, তাই আর্য সংস্কৃতিরও যে একটা বিশ্বদৃষ্টি এবং জীবন ও জগত সম্বন্ধে যে একটা প্রসারিত বোধ ছিল, বর্ণাশ্রম ধর্মের কড়াকড়ির দরুন ইসলাম কিংবা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষাগ্রহণের পূর্বে সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোন ধারণা জন্মাতে পারেনি।’ ছফা সাহেবের এই উক্তির সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক গবেষণালব্ধ ফলের বিন্দুমাত্র যোগাযোগ নেই।</p>
<p>এই উপমহাদেশে দৈহিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রপাত হয় স্যার হার্বার্ট রিজলে নামক ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিকের চেষ্টায়। স্যার রিজলে ব্রিটিশ-ভারতের নানা প্রদেশ থেকে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের দৈহিক মাপ সংক্রান্ত যেসব তথ্য সংগ্রহ করেন আজও তা বিশেষভাবে আলোচ্য। বাঙালিদের দৈহিক মাপজোক সম্পর্কে সংগৃহীত রিজলের তথ্য এখনো খুবই মূল্যবান। রিজলের মাপ অনুসারে কোনো বাঙালিকেই আর্য বিভাগভুক্ত করা চলে না। তাই ছফা সাহেবের আর্যের যুক্তিটা বিশেষভাবেই অচল।</p>
<p>রিজলে সাধারণভাবে বাঙালিদের স্থাপন করেছেন মোঙ্গল-দ্রাবিড় মানবধারায় (Racial type)। রিজলের মোঙ্গল-দ্রাবিড় তত্ত্ব এখন অনেক নৃতাত্ত্বিকই স্বীকার করেন না। কারণ রিজলে যাদের দ্রাবিড় বলে চিহ্নিত করেছিলেন, এখন প্রমাণিত হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে একাধিক মানবধারা। ‘দ্রাবিড়’ শব্দটিকে বিশেষভাবেই গ্রহণ করতে হয় ভাষা পরিবারবাচক হিসেবে। বাঙালি ঠিক কোনো একটি বিশেষ মানবধারায় পড়ে না। পর্ব বাংলার অনেক বাঙালির মধ্যে মঙ্গোলীয় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু মোটের উপর বাঙালিকে কেউ মঙ্গোলীয় বিভাগভুক্তও বলতে পারে না। কারণ বাঙালির চোখের পাতায় মঙ্গোলীয়দের মতো ভাঁজ নেই, বাঙালিদের মুখে যথেষ্ট দাড়ি-গোঁফ থাকে।</p>
<p>বাঙালিদের রঙ কালো। কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে তথাকথিত আর্যদের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। তাদের মাথার আকৃতি গোল (মধ্যমাকৃতি হবার দিকে প্রবণতা আছে), আর্যদের মতো লম্বা নয়। এমনকি বাঙালি উচ্চবর্ণের মানুষদেরও (ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য) আর্য বলে চিহ্নিত করা চলে না। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের মধ্যেই গোলমাথা, সরু থেকে মধ্যমাকৃতি নাকওয়ালা মানষের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি আর্য নয়, আবার তথাকথিত অনার্যও নয়। তাই ছফা সাহেবের যুক্তি অচল।</p>
<p>অন্যদিক থেকে বলা যায়, বাঙালি অনার্য হলেও কোনো ক্ষতি নেই। আর্য মানেই উন্নত আর অনার্য মানেই হীন- এ ধরনের কোনো যুক্তি এখন আর দেয়া চলে না। কারণ বাংলাদেশে আর্যরা আসবার আগেই একটি উন্নত সভ্যতা ছিল, এ-কথা ভাববার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখন আমাদের হাতে এসেছে। বাঙালির প্রাক-ইতিহাস সম্বন্ধে বহু কিছু এখন নতুন করে লিখতে হচ্ছে, মাটি খুঁড়ে আবিষ্কৃত হওয়া নানা নতুন নিদর্শনের জন্য। বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে মাটি খুঁড়ে খুব প্রাচীনকালের নিদর্শন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে খুব বেশি দূরে অবস্থিত নয় এরকম জায়গায়- পশ্চিমবঙ্গে- এমন অনেক নিদর্শন মাটি খুঁড়ে আবিষ্কৃত হয়েছে যার ফলে বাঙালির ইতিহাস নতুন করে লিখতে হচ্ছে।</p>
<p>বোঝা যাচ্ছে, আর্যদের চাইতে অনার্যরা কিছুমাত্র কম সভ্য ছিল না। বরং আর্যদের চাইতে অনার্যরা ছিল বহুদিক থেকেই অনেক উন্নত। ছফা সাহেব বলেছেন, বাঙালি মুসলমানের উদ্ভব আর্যদের থেকে হয় নি, হয়েছে নিম্নশ্রেণির হিন্দু থেকে। কিন্তু এখন মাটি খুঁড়ে আমরা যে অতীত ইতিহাসের পরিচয় পাচ্ছি তাতে আর্যবাদের কোনো গৌরবই থাকছে না। পশ্চিম বাংলায় অজয় নদীর দক্ষিণে পাণ্ডুরাজার ঢিবি নামক স্থানে ১৯৬২-৬৩ সালে ব্যাপক খননকার্য চালানো হয়। এর ফলে সেখানে তাম্র-প্রস্তর (মেসোলিথিক) যুগের বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তামার বড়শি, নানা আকৃতির ও বিভিন্ন প্রকার নকশাযুক্ত মাটির পাত্র ও অন্যান্য প্রাচীন সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।</p>
<p>আর্যতত্ত্ব নিয়ে তাই আজ আর বড়াই করবার কোনো যুক্তি নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারে ‘আর্যবাদ’ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ছফা সাহেবের লেখা পড়ে মনে হলো তিনি এসব কথা জানেন না; অথবা জানলেও আলোচনার যোগ্য বলে স্বীকার করেন না। তার কাছে বাঙালি মুসলমানরা হীন। কারণ তাদের নেই আর্যদের মতো বিস্তারিত চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইতিহাসের অজ্ঞতা</strong></h4>
<p>কেবল প্রাক-ইতিহাস নয়, ইতিহাসের কাল সম্পর্কেও মনে হয় ছফা সাহেবের জ্ঞান খুব বেশি নয়। ছফা সাহেব বোঝাতে চেয়েছেন, বাঙালি মুসলমান নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত সম্প্রদায়। আর তাই তাদের মনে সব সময় থেকেছে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতি ভয় ও সম্ভ্রম। কিন্তু এ-দেশের মুসলিম যুগের ইতিহাস ভালোভাবে পাঠ করলে অন্য ধারণারই সৃষ্টি হয়। মধ্যযুগের ইতিহাসে দেখতে পাই, বাংলাদেশে মুসলমানরা হিন্দু ক্রীতদাস রাখতে পারতেন, কিন্তু হিন্দুরা কোনো মুসলিম ক্রীতদাস রাখার অধিকারী ছিলেন না।</p>
<p>&#8216;চৈতন্যভাগবত&#8217; পাঠে অবগত হওয়া যায়, মুসলমানরা হিন্দুদের ছোট জাত বলে মনে করতেন। কোনো মুসলমান (হরিদাস) ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করলে ‘মুলকের পতি’ তাকে বলেছেন :</p>
<p>কত ভাগ্য দেখ তুমি হঞাছ যবন।</p>
<p>তবে কেন হিন্দুর আচারে দেহ মন।</p>
<p>আমরা হিন্দুরে দেখি নাহি খাই ভাত।</p>
<p>তাহা তুমি ছাড় হই মহাবংশ-জাত।</p>
<p><strong>তাই এ-দেশের মুসলমানরা নিজেদের সব সময় হীন ভেবেছেন এ রকম কথা ধোপে টেকে না। বরং এর উল্টোটাই সত্য, তারা নিজেদের ভেবেছেন অন্যদের চাইতে অনেক উচ্চজাতি হিসেবে।</strong></p>
<p>বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি সম্পর্কে একাধিক ঐতিহাসিক একাধিক মন্তব্য করেছেন। কারো কারো মতে :</p>
<p>ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গলরাজ চেঙ্গিস খাঁ সমগ্র মধ্য এশিয়ার তুর্কী মুসলমানদের রাজ্য এবং বোখারা, সমরখন্দ প্রভৃতি ইসলামী সংস্কৃতির প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করেন। ইহার ফলে এই অঞ্চল হইতে গৃহহীন পলাতকেরা দলে দলে ভারতে তুর্কী মুসলমান রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরে তাহাদের অনেকে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করিল …। (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলার ইতিহাস : মধ্যযুগ, পৃ. ২৩৩)</p>
<p>কিন্তু ছফা সাহেব তার আলোচনায় এসব মুসলমানদের কথা আলোচনা করেন নি। কেবল বলতে চেয়েছেন, বাঙালি মুসলমান আসলে হিন্দু নিম্নবর্ণের থেকেই বিশেষভাবে উদ্ভূত। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তুর্কীদের মাথার খুলিও গোলাকৃতি। সম্ভবত তুর্কীরা বাংলাদেশে গোলাকৃতি মাথাওয়ালা লোকের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিয়েছে।</p>
<p>মধ্যযুগের বিখ্যাত মুসলমান কবি আলাওল একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। বাঙলা, ফারসি, আরবি ও হিন্দি ভাষায় তার জ্ঞান ছিল। মুসলমানদের মধ্যে যারা শিক্ষিত হতেন তারা প্রায় সকলেই একাধিক ভাষায় জ্ঞান রাখতেন। তাদের শিক্ষা সে যুগের মাপকাঠিতে নিম্নমানের ছিল না। কিন্তু ছফা সাহেবের আলোচনা পড়লে মনে হয়, সব মুসলমানই ছিলেন ‘গ্রাম্য চাষা’, বড় জোর নিছক লোকসাহিত্যের সাধক।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>ইতিহাস নয়</strong><strong>, </strong><strong>গল্পকথা</strong></h4>
<p>ছফা সাহেবে বাঙালি মুসলমান সম্বন্ধে এমন অনেক কথা বলেছেন যা নিছক বানানো বলে মনে হয়। ছফা সাহেবের মতে, ‘বাঙালি মুসলমানরা শুরু থেকেই তাদের আর্থিক ও সামাজিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্রমাগত ধর্মমত পরিবর্তন করে আসছিল। … বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের লোক। তাদের মানসিকতার মধ্যেও আদিম সমাজের চিরন্তন লক্ষণসমূহই প্রকট। বারবার ধর্ম পরিবর্তন করার পরও বাইরের দিক ছাড়া তাদের মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে নি।’ তার এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমরা একমত হতে পারি না। কারণ, প্রথমত, ছফা সাহেব যে ধরনের আদিম কৌমসমাজের কথা বলেছেন এ-দেশে সুলতানি আমলের আগেই তার বিলুপ্তি ঘটেছিল। ভূমিব্যবস্থা ও কৃষিকৌশল- উভয়দিক থেকে বিচার করলেও বাংলাদেশের কৃষকদের আদিম কৌমসমাজের অন্তর্ভুক্ত করা চলে না।</p>
<p>&nbsp;</p>
<h4><strong>বাঙালি মুসলমানের জাগরণ</strong></h4>
<p>ছফা সাহেব স্বীকার করেছেন, বাঙালি মুসলমান ঊনবিংশ শতকে দু’টি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন করেছেন। একটি হলো ওয়াহাবি ও অপরটি হলো ফরায়েজি। কিন্তু তিনি আক্ষেপ করেছেন, এ দু’টি আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে। তিনি এ দু’টি আন্দোলনকে মন খুলে প্রশংসা করতে পারেন নি। কারণ এ দু’টির মূলে ছিল ধর্মীয় প্রেরণা, কোনো আধুনিক সমাজ দর্শন নয়। কিন্তু প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, কেন এই অবজ্ঞা? ধর্মীয় অনুভূতি থাকলেই কি কোনো আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছোট হয়ে যায়? অন্য অনেক দেশেও ধর্মীয় চেতনা রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। কিন্তু আমরা এসব আন্দোলনকে অবজ্ঞার চোখে দেখি না। বাংলাদেশের বেলাতেই বা আমরা এর ব্যতিক্রম করতে যাব কেন?</p>
<p>প্রবলপ্রতাপ ক্রমওয়েল বিলাতের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন খ্রিষ্টান পিউরিটানিজমের প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু তা বলে আমরা তার সমালোচনা করি না। বরং বলি, তিনি দিয়েছিলেন বিলাতের ইতিহাসকে বদলে, দিয়েছিলেন রাজতন্ত্রকে দুর্বল করে। ফলে ব্রিটেনে সৃষ্টি হতে পারে বর্তমান গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। বিলাতের দু’টি গণআন্দোলনও- ‘ডিগারস’ ও ‘লেভেলারস’ ছিল বিশেষভাবে ধর্ম-চেতনা অনুপ্রাণিত। কিন্তু বিলাতের ইতিহাসে এখনো এদের কথা শ্রদ্ধাভরেই স্মরণ করা হয়। অথচ আমাদের দেশে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী মনে করেন, ধর্মীয় অনুপ্রেরণাযুক্ত সব আন্দোলনই প্রতিক্রিয়াশীল। আর তাই তা বিরূপ সমালোচনার যোগ্য। বিশেষ করে কোনো আন্দোলনের মূলে যদি কাজ করে থাকে ইসলাম ধর্মের অনুপ্রেরণা তবে তা কখনোই জনসাধারণের পক্ষে কল্যাণকর হতে পারে না।</p>
<p>কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যায়, ধর্ম নানা জাতির ইতিহাসেই পালন করেছে বিশেষ গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা- যাকে বাদ দিয়ে ইতিহাস বোঝা যায় না। আধুনিক সমাজতাত্ত্বিকরা নানাভাবে ধর্মের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিখ্যাত ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক এমিল দরকেইমের মতে ধর্মকে বাদ দিয়ে কোনো সমাজ-জীবনের ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ধর্ম সমাজ-জীবনের বাস্তব ভিত্তি। বিখ্যাত জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাকস বেবরের মতে, মানুষ ইতিহাস গড়তে চায় তার আপন মূল-চেতনার উপর ভিত্তি করে। আর মূল-চেতনার উৎস হিসেবে ইতিহাসে ধর্ম পালন করে প্রধান ভূমিকা। কিন্তু ছফা সাহেবের কাছে ধর্ম একটি বিচার্য বিষয়ই নয়। তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে তাই তিনি খোলামনে গ্রহণ করতে অক্ষম।</p>
<p>ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয় ভাবধারার প্রভাবে হিন্দু সমাজে নানা সংস্কারবাদী আন্দোলন আরম্ভ হয়। রামমোহন চান সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে। বিদ্যাসাগর চান বিধবা বিবাহ চালু করতে। কিন্তু মুসলমান সমাজের এসব সমস্যা ছিল না। মুসলমান সমাজে জাগরণ পরিগ্রহ করে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ। মুসলমানরা বিদ্রোহ করেন বিদেশি শাসনের বিপক্ষে। তারা গ্রহণ করেন ওয়াহাবি মতবাদ। এ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মহাশয় লিখেছেন :</p>
<p>“ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলার মুসলমানদের দুইটি বিপ্লব জনসাধারণের মনে বিশেষ ভীতি ও উদ্বেগের সঞ্চার করিয়াছিল। আরবে আবদুল ওয়াহাব নামক এক ব্যক্তি (১৭০৩-১৭৮৭ খ্রি.) মুসলমান ধর্ম সংস্কারের জন্য এক আন্দোলন উপস্থিত করেন। তাহার সম্প্রদায় ‘ওয়াহাবি’ নামে প্রসিদ্ধ। ভারতেও ওয়াহাবি ধর্মমত প্রচারিত হইয়াছিল (১৮২০-১৮৭০ খ্রি.) এবং প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল খুব প্রসার লাভ করিয়ছিল।… সমস্ত উত্তর ভারতে এই আন্দোলন শক্তিশালী হইবার পূর্বেই বাংলাদেশে দুইজন মুসলমান ইহার অনুরূপ আন্দোলন আরম্ভ করেন। ধর্মসংস্কারের জন্য আরম্ভ হইলেও ক্রমে ইহা ইংরাজ ও জমিদারদিগের বিরুদ্ধে প্রজাদিগকে উত্তেজিত করে।” (বাংলার ইতিহাস : আধুনিক যুগ, পৃ. ৫৬-৫৭)।</p>
<p>ফরায়েজি আন্দোলন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মজুমদার মহাশয় লিখেছেন :</p>
<p>শরিয়ত উল্লার সম্প্রদায়ের নাম ছিল ফরাজি। ইহাদের অধিকাংশই ছিল জমিদার কর্তৃক উৎপীড়িত প্রজা এবং বাংলার শিল্প ধ্বংস হওয়ার ফলে বেকার শ্রমিক দল। (ঐ, পৃ. ৫৮)</p>
<p>শরিয়ত উল্লার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহম্মদ মুহসিন (১৮১৯-১৮৬০ খ্রি.) ফরায়েজি আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেন। তিনি তার ডাকনাম ‘দুদু মিয়া’ হিসেবে বিশেষ প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন। দুদু মিয়া কার্যত পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শাসকে পরিণত হন। তাকে দমন করতে ইংরেজদের বিশেষ বেগ পেতে হয়।</p>
<p>দুদু মিয়া সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মজুমদার মহাশয় লিখেছেন :</p>
<p>তিনি (দুদু মিয়া) ঘোষণা করেন যে জমি ভগবানের, সুতরাং জমিদারদের খাজনা আদায় করিবার কোন অধিকার নাই। বিংশ শতাব্দীর অসহযোগ আন্দোলনের অনেক পূর্বাভাস দুদু মিয়ার আন্দোলনে পাওয়া যায়। জমিদার ও নীলকরেরা তাঁহার এই সমুদয় প্রচারের ফলে ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়া তাঁহার নামে লুটপাট, অনধিকার প্রবেশ প্রভৃতি বহু অত্যাচারের জন্য বহুবার আদালতে অভিযোগ করে, কিন্তু তাঁহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবার লোক না থাকায় তিনি প্রতিবারই খালাস পান।(ঐ, পৃ. ৬০)।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>উপরের কথাগুলি থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কত গভীর ও ব্যাপক ছিল বাঙালি মুসলমানের জাগরণ। বাঙালি মুসলমান কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে চায় নি। আর চায় নি বলেই সম্ভব হয়েছে আজকের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। যারা উইলিয়াম হান্টার লিখিত বিখ্যাত বই ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ পড়েছেন, তারা জানেন কী রকম দুর্জয় সাহস নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বাঙালি মুসলমান ওয়াহাবি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে যেত দূর পাঞ্জাবে ও সীমান্ত প্রদেশের মতো অঞ্চলে যুদ্ধ করতে। কিন্তু ছফা সাহেবের লেখায় বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের এসব দিকের কোনো পরিচয় নেই।</p>
<p>ছফা সাহেব ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে মুসলিম জাগরণ দেখা দেয় সে সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। অথচ এই জাগরণের কথা বাদ দিয়ে আজকের বাঙালি মুসলমানের মনোধারার ব্যাখ্যাই সম্ভব নয়- ভাবাই যায় না, বাংলাদেশ উদ্ভবের কথা।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/criticism-of-ahmed-safas-bengali-muslim-character/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">16023</post-id>	</item>
		<item>
		<title>স্বাধীনতার আড়ালে থেকে যাওয়া কথা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 27 Jun 2025 08:31:40 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15875</guid>

					<description><![CDATA[আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সাবেক পাকিস্তানের আমজনতার আর্থসামাজিক উন্নয়ন। কেবলমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কল্যাণ সাধন নয়। শেখ মুজিব তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজোরিটি পার্টির নেতা।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শেখ মুজিব নিজেকে সাবেক পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন। কেবলই পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন না। তিনি নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন সাবেক নিখিল পাকিস্তানকে; কেবলমাত্র বাংলাদেশকে নয়।</p>
<p>অনেকে বলছেন, শেখ মুজিব হলেন, আজকের বাংলাদেশের জনক। কিন্তু তিনি নিজে এ ধরনের কোনো মনোভাব পোষণ করেননি। তিনি চেয়েছেন সাবেক সমগ্র পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিতে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের অনেক রকম বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের একটি শুদ্ধ নমুনা পাওয়া যাবে ‘স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা’ নামক পুস্তিকায়। বইটি সম্পাদনা করেন, ফজলুল হক বাঙ্গালী, মেসবাহউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম। (প্রকাশনা ও প্রচার সংস্থা, মুজিবনগর, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত (১৯৭১)।)</p>
<p>এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রদত্ত Legal Framework Order (1970) মেনে। যাতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান হবে একটা প্রজাতন্ত্র ও ফেডারেশন। এর রাষ্ট্রিক মতাদর্শ (Ideology) হতে হবে ইসলাম এবং এই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হতে পারবেন না। এই মূলনীতিসমূহের সঙ্গে কোন অসঙ্গতিপূর্ণ সংবিধান রচিত হলে প্রেসিডেন্ট (ইয়াহিয়া) পারবেন তা বাতিল করে দিতে।</p>
<p>১৯৭১-এর পর পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই ভিন্ন হয়ে পড়েছে। ১৯৯৮ সালে ১১ মে ভারত রাজস্থানের মরুভূমিতে ভূগর্ভে তার নিজের তৈরি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে ভারতের চাইতে পিছিয়ে নেই। <strong>১৯৯৮ সালের ২৮ মে বেলুচিস্তানের মরুভূমির ভূগর্ভে পাকিস্তান ঘটায় তার তৈরি পাঁচটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ। এরপর ঐ একই সালে আরো শক্তিশালী পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় পাকিস্তান। যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় হইচই। কারণ, পাকিস্তান একটি ধনী রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তান বানাতে পেরেছে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বোমা।</strong></p>
<p>গুজব রটে পাকিস্তান খুব সস্তায় পরমাণু বোমা তৈরির কৌশল আবিষ্কার করতে পেরেছে। ভারত যা পারেনি। পাকিস্তান যদি সস্তায় পারমাণবিক বোমা তৈরি করে অন্য দেশে বিক্রি করে, তবে তার পরিণতি দাঁড়াতে পারে ভয়াবহ। কিন্তু পাকিস্তান এভাবে বোমা তৈরি করে বিদেশের কাছে বিক্রি করেনি। রেখেছে কেবল নিজের প্রতিরক্ষার জন্য সংরক্ষিত। পাকিস্তান এখন তৈরি করতে পারছে এমন রকেট, যার সাহায্যে তার পক্ষে সম্ভব ভারতের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ। সমর বিজ্ঞানের দিক থেকে পাকিস্তানকে অবহেলা করা যায় না।</p>
<p>পরিস্থিতি পাল্টেছে ঠিকই। কিন্তু সেটা যে ভারতের জন্য অনুকূল হয়েছে, এরকম ভাববার কোনো কারণ নেই। ভারত এখন মিত্রবিহীন দেশ। কিন্তু পাকিস্তান ঠিক তা নয়। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে চীন গড়েছে নৌঘাঁটি। কাশ্মিরের কাছে চীন গড়েছে এমন সড়ক, যার মাধ্যমে সে যে কোন সময় লাদাঘ অঞ্চলে সৈন্য পাঠাতে পারে। শ্রীলঙ্কার উত্তরে জাফলা অঞ্চলেও চীন নৌঘাঁটি গড়ে তুলেছে বলে প্রকাশ। নেপালের সাথে চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন হতে পেরেছে খুবই উন্নত। বেইজিং থেকে কাঠমান্ডু এখন সহজেই আসতে পারা সম্ভব। আমাদের দেশে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর দল ভারতকে যতটা শক্তিমান ভাবছেন, ভারত আসলে সে পর্যায়ে এখনো এসে পৌঁছাতে পেরেছে বলে মনে করবার কোনো হেতু নেই। আওয়ামী লীগ যদি মনে করেই থাকে যে, বাংলাদেশে সে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হতে পারবে, তবে মনে হয় সে ভুল হিসাবই করছে।</p>
<p>শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে ঠিক কী চেয়েছিলেন আমরা এখনও তা জানি না। ইন্দিরা গান্ধী একটি বই লিখেছেন My Truth নামে। বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন, স্কোয়াড্রন লিডার (অব:) মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম। তিনি বইটির নাম দিয়েছেন ‘আমার সত্যকথন’। এই বইতে ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে : ‘তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ভাবপ্রবণ, উষ্ণ হৃদয়ের লোক, যিনি একজন আইনপ্রণেতার চেয়ে পিতৃসুলভ ব্যক্তিত্বের বেশি অধিকারী ছিলেন। উপরন্তু তিনি সংগ্রামের বেশির ভাগ সময় দূরে অবস্থান করেছিলেন। আমি বলতে চাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় তার চিন্তাধারা, জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বতন্ত্র ছিল, যারা এ সকল বিষয়ে অংশ নিয়েছিলেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমি মনে করি না যে তিনি তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই তাঁরা যা কিছু করেছিলেন, তাঁর (মুজিব) নামে ও তাঁর জন্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি এ সকল লোকদের গুরুত্ব দেননি, বরঞ্চ তাদের গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। এতে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী ছিল।’</p>
<p>এখন আওয়ামী লীগ দাবি করছে, শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। এতে তিনি বলেন- তিনি যতদূর জানেন, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায়ের পথ এখনও রুদ্ধ হয়ে যায়নি। তিনি তার সেই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, শেখ মুজিব হলেন একজন মধ্যপন্থী নেতা। তিনি কোন বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত নন। শেখ মুজিব একজন মার্কিনবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিও নন। আসলে একসময় তার বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল যে, তিনি মার্কিন ঘেঁষা নেতা।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথায়- And he is not an extremist, he was a moderate person. In fact, if I may use the term, he used to be called by some others an American stooge at one time। ইন্দিরা গান্ধী তার এই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর। তার আগে নয়। শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশে ঘটেছে বিরাট গণহত্যা। বাংলাদেশে মানুষ তাই ভাবতে শুরু করে স্বাধীন হওয়ার কথা। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথা-……the cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as know, has not asked far independence, even now. but after he was arrested, after there was this tremendous massacre, it people should say: ` after this how can we live together? we have to be separate.’</p>
<p>বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, হাজার বছরের বাঙালির কথা। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর উপরোক্ত কথা যথার্থ হলে বলতে হবে শেখ মুজিব ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামনা করেননি। শর্মিলা বসু তার ডেড রেকনিং বইতে বলেছেন- ইন্দিরা গান্ধী সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যা বলেছিলেন, সেটা ছিল একটা ধাপ্পা। কারণ তিনি নিজে নিচ্ছিলেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করার নামে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিরাট যুদ্ধের প্রস্তুতি। কিন্তু ধাপ্পা হলেও ইন্দিরা গান্ধী যা বলেছেন, তা থেকে প্রমাণিত হয় না, শেখ মুজিব চাচ্ছিলেন পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে। শেখ মুজিবের লক্ষ্য নিয়ে তার মনেও ছিল সংশয়।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে India Speaks নামক বইতে। বইটি ভারত সরকারের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে প্রচার করা হচ্ছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। আর বলা হচ্ছে শেখ মুজিব ছিলেন, এই জাতীয়তাবাদের জনক। যার ভিত্তিতে বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভব সম্ভব হতে পেরেছে। কিন্তু ১৯৭১-এর দলিল দস্তাবেজ আমরা যা হাতের কাছে পাচ্ছি, তা সমর্থন করছে না আওয়ামী লীগের দাবিকে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বলেন যে, তিনি পাকিস্তান ভেঙে দিতে যাচ্ছেন না, তিনি চাচ্ছেন বর্তমান পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Link) বজায় রাখতে। সাংবাদিক মাসকারেনহ্যাসের এই কথার প্রতিবাদ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ করেছে বলে আমার মনে হয় না।</p>
<p>ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে তার দুইজন উপদেষ্টার ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন হলেন দুর্গাপ্রসাদ দার (ধর); আর একজন হলেন পি এন হাক্সার। এরা উভয়েই ছিলেন জন্মসূত্রে কাশ্মিরের লোক। আর এরা উভয়েই ছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। এদের দু’জনের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের ২৫ বছরের শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তিনিও ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর খুবই আপন লোক। ইন্দিরা গান্ধী হয়তো ভেবেছিলেন শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে আর কখনই ফিরবেন না। তার প্রাণদণ্ড হবে। এর ফলে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ ও তার দলের লোকদের সহায়তায় করে চলতে পারবেন।</p>
<p>কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টু জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে। ফিরে আসতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁকে বাংলাদেশে আসবার জন্য; যাতে বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি। তিনি পাকিস্তান থেকে ৮ জানুয়ারি পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে করে যান লন্ডনে। সেখানে যেয়ে দেখা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথের সঙ্গে। লন্ডন থেকে তিনি ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি বিমানে করে আসেন নায়াদিল্লি। দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে।</p>
<p>তারপর ঐ একই ব্রিটিশ বিমানে করে যাত্রা করেন ঢাকায়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আপত্তি তুলেছিল। বলেছিল, ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করে ঢাকা যাওয়া ঠিক হবে না। কেননা, গ্রেট ব্রিটেন তখনও বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেনি। কিন্তু শেখ মুজিব তাদের আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করেই এসে পৌঁছান ঢাকায়। কেন তিনি এরকম করার প্রয়োজনীয়তা দেখেছিলেন, সেটা এখনও জানা যায়নি। গ্রেট ব্রিটেন বাংলাদেশকে একটা পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে।</p>
<p>শেখ মুজিব সরাসরি পাকিস্তান থেকে নয়াদিল্লিতে না আসায়, ভারতে সৃষ্টি হতে পেরেছিল দারুণ প্রতিক্রিয়া। এ সময় আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় ট্রামে বাসে লোককে বলতে শুনেছিলাম, শেখ মুজিবুর রহমানকে ইন্দিরা গান্ধীর অতটা বিশ্বাস করা উচিত হয়নি। এ রকম কথাও কথা অনেককে বলতে শুনেছিলাম যে, ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহরলাল নেহেরু সৃষ্টি করেছিলেন একটি পাকিস্তান, তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী সেই একটি পাকিস্তানকে খন্ডিত করে সৃষ্টি করলেন দুটি পাকিস্তান। যার ফলে ভারতে পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়েই পড়ল।</p>
<p>বাংলাদেশ হওয়ার পর শেখ মুজিব চান বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে কোন বিবাদ-বিসম্বাদে না জড়াতে। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। শেখ মুজিব এর পরপর যান লাহোরে। সেখানে তিনি যোগ দেন ওআইসি সম্মেলনে। এবং বাংলাদেশকে করেন ওআইসির সদস্য। শেখ মুজিব কেবল বিশুদ্ধ বাঙালি হতে চাননি। তাঁর মধ্যে কাজ করেছে একটা মুসলিম উম্মাহ চেতনা। তিনি চাননি বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিযুক্ত করে রাখতে।</p>
<p>এরপর ১৯৭৪ সালে ২৭ জুন জুলফিকার আলী ভুট্টু ঢাকায় আসেন শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে। জেড এ ভুট্টু ঢাকায় ছিলেন তিন দিন। এ সময় মুজিব ও ভুট্টুর মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্বন্ধ নিয়ে হয়েছিল হৃদ্যতাপূর্ণ আলোচনা। শেখ মুজিবকে জুলফিকার আলী ভুট্টু আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানে যেতে। শেখ মুজিব গ্রহণ করেছিলেন সেই আমন্ত্রণ। বর্তমানে পাকিস্তানের অধিবাসীরাও চাচ্ছেন না বাংলাদেশের সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ। বর্তমানে পাকিস্তানে এখনো বাস করছেন প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ ও তাদের বংশধর। পাকিস্তান চাচ্ছে না এদের বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিতে। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ চাচ্ছে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে রাজনীতি করতে। কিন্তু শেখ মুজিব সেটা চাননি। বর্তমান আওয়ামী লীগ আর সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগকে এক করে দেখা যায় না।</p>
<p>অন্য দিকে আর একটি কথা ভুলে গেল চলে না যে, সারা ব্রিটিশ-ভারতে মোট মুসলমানের সংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ ছিলেন বাঙালি মুসলমান। আসলে তারা চেয়েছিলেন বলেই সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভায় পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। আজ কথায় কথায় বলা হয় পাকিস্তান আমাদের ওপর চেপে বসেছিল। কিন্তু ইতিহাসে এর সমর্থন মেলে না।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/words-that-remained-behind-the-freedom/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15875</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রাজনৈতিক সংকটে উপজাতি</title>
		<link>https://rowyakbd.com/ethnic-people-in-the-political-crisis/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/ethnic-people-in-the-political-crisis/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 09 May 2025 15:01:29 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15829</guid>

					<description><![CDATA[ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারির আরম্ভ ১৮৭১ সাল থেকে। আদমশুমারির রিপোর্টে কেবল উপমহাদেশের লোকজনের হিসাবই থাকত না, থাকত এই উপমহাদেশের মানুষ সম্বন্ধে বহু তথ্য। যাদের আমরা সাধারণভাবে উল্লেখ করি ‘উপজাতি’ হিসেবে, তাদের আদমশুমারির রিপোর্টে প্রথম দিকে উল্লেখ করা হতো অ্যানিমিস্ট (Animist) বা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারির আরম্ভ ১৮৭১ সাল থেকে। আদমশুমারির রিপোর্টে কেবল উপমহাদেশের লোকজনের হিসাবই থাকত না, থাকত এই উপমহাদেশের মানুষ সম্বন্ধে বহু তথ্য। যাদের আমরা সাধারণভাবে উল্লেখ করি ‘উপজাতি’ হিসেবে, তাদের আদমশুমারির রিপোর্টে প্রথম দিকে উল্লেখ করা হতো অ্যানিমিস্ট (Animist) বা &#8216;আত্মা-উপাসক&#8217; হিসেবে। পরে ১৯৩১ সালের আদমশুমারির রিপোর্টে যাদের একসময় বলা হতো অ্যানিমিস্ট বা আত্মপূজারী তাদের উল্লেখ করা হয় ট্রাইব (Tribe) হিসেবে। (Kingsley Davis; The Population of India and Pakistan, Prenceton University Press. 1951)।</p>
<p><strong>‘ট্রাইব’ কথাটার বাংলা করা হয় উপজাতি। ‘উপজাতি’ বলতে বোঝানো হয় এমন জনগোষ্ঠীকে, যারা বাস করে প্রধানত অরণ্যে, যাদের জীবনধারা হয়ে আছে আদিম যুগের মতো। এরা অনেকে হলো আহার্য আহরক (Food gatherer), আবার কেউ হলো কিছুটা আহার্য উৎপাদক (Food Producer)। যারা আহার্য আহরক, তারা বনজঙ্গলে ফলমূল আহরণ ও পশুপাখি শিকার করে খায়। যারা কিছুটা আহার্য উৎপাদক তারা মাটিতে ফসল উৎপাদন করে; মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বীজ বপন করে। কিন্তু এরা প্রকৃত খাদ্য উৎপাদকদের মতো লাঙল দিয়ে চাষাবাদ করতে জানে না। তাদের চার পাশের জনসমষ্টি হলো খাদ্য উৎপাদক; যারা লাঙল দিয়ে চাষ করে এবং গবাদি পশু পালন করে, যাদের আছে একটা লিখিত ভাষা, যারা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে নগরজীবন বা সভ্যতা।</strong></p>
<p>ব্রিটিশ আমলে এ দেশের মানুষকে নিয়ে নৃতাত্ত্বিকরা যে গবেষণা করেছেন তাতে ট্রাইব কথাটার প্রয়োগ সবক্ষেত্রে হতে পারেনি সুস্পষ্ট। বর্তমানে নৃতাত্ত্বিকরা অনেকেই চাচ্ছেন না আর ‘ট্রাইব’ শব্দটা ব্যবহার করতে। কারণ শব্দটা হয়ে উঠেছে একাধিক অর্থবহ। ইংরেজি ভাষায় &#8216;Aborigines&#8217; শব্দটা এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। ল্যাটিন ভাষার অন মানে হলো প্রথম আর &#8216;origine&#8217; শব্দের অর্থ হলো আরম্ভ। Aborigine বলতে বোঝায় এমন মানুষদের, যারা কোনো দেশে আগে থেকে আছে; যেমন অস্ট্রেলিয়ার কালো মানুষেরা। ইউরোপ থেকে সাদা মানুষ ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে উপনিবিষ্ট হতে আরম্ভ করে। অস্ট্রেলিয়ার কালো মানুষকে তাই বলতে হয় অস্ট্রেলিয়ার Aborigine। অস্ট্রেলিয়ার Aborigine-রা পড়েছিল প্রাচীন প্রস্তর যুগের সংস্কৃতিতে। নিউজিল্যান্ডে অ্যাবরিজিন বলতে বোঝায় মাওরিদের। মাওরিরা পড়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির অবস্থায়। মাওরিদের বলা যায় নিউজিল্যান্ডের অ্যাবরিজিন। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান মানব সমষ্টিকে বলা যেতে পারে সেখানকার অ্যাবরিজিন।</p>
<p><strong>অ্যাবরিজিন শব্দটার বাংলা করা হয় আদিম নিবাসী অথবা আদিবাসী। এই অর্থে বাংলাদেশে বৃহত্তর জনসমাজকে ধরতে হয় আদিবাসী। কারণ তারা বাইরে থেকে ইউরোপীয়দের মতো এসে এ দেশ অধিকার করেনি। তারা এ দেশেরই ভূমিজ সন্তান। এই দাবির পেছনে এখন দেয়া চলে মাটি খুঁড়ে পাওয়া প্রভূত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। এক্ষেত্রে দু’টি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য। একটি হলো আদিম যুগ; আর একটি বিষয় হলো আদিম সংস্কৃতি। আদিম যুগে সব মানুষের পূর্বপুরুষই ব্যবহার করেছে প্রস্তর অস্ত্র। কিন্তু পরে কিছু মানুষ আরম্ভ করেছে ধাতু দিয়ে তৈরী অস্ত্র ও জিনিসপত্রের ব্যবহার। গড়ে তুলছে সভ্যতা বা নগরজীবন। কিন্তু অনেক জনসমষ্টি থেকে গেছে সংস্কৃতির দিক থেকে প্রস্তর যুগের জীবনধারায়। সংস্কৃতির দিক থেকে এদের আদিম বলা গেলেও সময়ের বিচারে এদের আদিম বলা যায় না। নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা যখন পড়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতিতে, তখন ইউরোপের মানুষ ব্যবহার করছিল লোহা দিয়ে তৈরী অস্ত্রশস্ত্র ও জিনিসপত্র। যদিও একসময় ইউরোপের মানুষও কোনো ধাতুর ব্যবহার জানত না, করত প্রস্তর অস্ত্রের ব্যবহার। ইউরোপের অনেক জায়গার মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে প্রাচীন নব্য প্রস্তর যুগের অস্ত্র। কিন্তু বাংলা ভাষায় এখন সময়ের দিক থেকে আদিম আর সংস্কৃতির দিক থেকে আদিম এই দু’টি ধারণার মধ্যে পার্থক্য করা হচ্ছে না। ফলে দেখা দিচ্ছে সমস্যা।</strong></p>
<p>বাংলাদেশের অনেক জায়গায় প্রস্তর যুগের হাতিয়ার পাওয়া গেছে। কিন্তু তাদের পাওয়া গেছে মাটির খুব উপরিভাগে। তাই বলতে হয় তাদের বয়সকাল বেশি নয়। এসব অস্ত্র যারা ব্যবহার করেছে, তারা সংস্কৃতির দিক থেকে আদিম হলেও সময়ের বিচারে আদিম নয়। কেন, কিছু মানুষ বনজঙ্গলে প্রাচীন সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকল আর অন্য মানুষ সৃষ্টি করল সভ্যতা, তার উত্তর এখনো দেয়া যায় না। তবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেসব মানুষ এখনো প্রস্তর যুগে পড়ে আছে বা কিছুদিন আগেও ছিল, তাদের মনোভাব হলো খুবই রক্ষণশীল। তারা সহজেই নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে চায় না। অনুসরণ করতে চায় গতানুগতিক জীবনকে। অর্থাৎ তাদের অনগ্রসরতার একটা কারণ, তাদের রক্ষণশীল মনোভাব। কিন্তু সবক্ষেত্রে এ কথা খাটে না।</p>
<p>বরফের দেশে মানুষ ধাতু দিয়ে অস্ত্র না বানিয়ে অস্ত্র বানিয়েছে পশুর হাড় দিয়ে। কারণ ধাতুদ্রব্য সেখানে সহজলভ্য নয়। সম্ভব নয় সেভাবে আগুন জ্বেলে ধাতু গলানো। অর্থাৎ মানুষের জীবনকে বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে তার প্রাকৃতিক পরিবেশ। সব প্রাকৃতিক পরিবেশের মানুষের সাংস্কৃতিক অগ্রগতি তাই সমভাবে হতে পারে না। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীরা পশু পালন জানত না। এর কারণ সেখানে ছিল না পালনযোগ্য কোনো পশু। একেকটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে একেকটি সময়কে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষের পূর্বপুরুষ ধান চাষ করেছে বহুদিন আগে থেকে। বাংলাদেশে খাল-বিলের ধারে যথেষ্ট বুনোধান দেখা যায়। এই বুনোধান থেকে বাছাই করে তারা করতে পেরেছে আবাদযোগ্য ধানের উদ্ভব।</p>
<p><strong>বাংলাদেশের মানুষ নৌকা বানিয়েছে। নৌকায় করে সে নানা জায়গায় নদীপথে আসা-যাওয়া করেছে। কেবল যে সে নৌকাযোগে নদীপথে যাতায়াত করেছে তা-ই নয়, বড় বড় নৌকা বানিয়ে করেছে সমুদ্রযাত্রা। করেছে বিদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য। গড়েছে সভ্যতা বা নগর সংস্কৃতি। এটা তারা করতে পেরেছে আপন চেষ্টায়। বাংলাদেশের মাটিতে তারা গড়েছে উন্নত সভ্যতা, এ দেশের ভূমিজ সন্তান হিসেবে। তারা থাকেনি প্রাচীন জীবন প্রণালীকে আঁকড়ে। কিন্তু এই ইতিহাসকে এখন যেন বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে সাঁওতাল ও চাকমাদের মতো উপজাতি হলো এ দেশের আদিবাসী, কিন্তু বাংলাদেশের মূল জনসমাজ তা নয়। সেটাকে সমর্থন করা যায় না। উপজাতি নিয়ে করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের রাজনীতি, যা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ বিভক্তির কারণ। সেটাকে আমরা দেশের স্বার্থে হতে দিতে পারি না।</strong></p>
<p>ভারতের একসময়ের পররাষ্ট্র দফতরের সেক্রেটারি ছিলেন মুচকন্দ দুবে। তিনি ভারতে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম India’s Foreign Policy। সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ (Nation; সেপ্টেম্বর, ২০১২), এই বইতে দুবে বলেছেন, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নত হতে পারেনি। শ্রীলঙ্কার সাথে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটার কারণ হলো, শ্রীলঙ্কার তামিল গেরিলাদের সাথে ভারতের যোগাযোগ। ভারত শ্রীলঙ্কার তামিল নেতা প্রভাকরণকে তার সংগ্রামে প্রণোদনা প্রদান করেছিল। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের একটা কারণ হলো, ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতাকামী চাকমাদের ভারতে আশ্রয় প্রদান। তার এই বই পড়ে উপলব্ধি করা যায়, চাকমা নেতা সন্তু লারমার প্রকৃত শক্তির উৎস হচ্ছে ভারত। ভারত ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের তথাকথিত উপজাতিদের নিয়ে করতে পারে বিশেষ রাজনীতি।</p>
<p>পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই জটিল হচ্ছে। ভারতের আসামে বোড়োদের একসময় বলা হতো উপজাতি। কিন্তু এখন তারা হতে চলেছে একটা পৃথক জাতি। এরা আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর করছে হামলা। কেন এরা এরকম হামলা করছে, তার প্রকৃত কারণ আমরা জানি না। কারণ আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলমানরা বোড়োদের দাবির বিরোধী ছিল না। সারা আসাম প্রদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ ভাগ হলো বাংলাভাষী মুসলমান। এরা সে দেশে বাস করছে বহুকাল ধরে। বরাবরই আসামের ধুবড়ি-গোয়ালপাড়া অঞ্চলের মানুষের সাধারণ ভাষা হলো বাংলা। আসামের কাছাড় (শিলচর) অঞ্চলের মানুষের সাধারণ ভাষা হলো বাংলা। যাকে বলে প্রকৃত অসমিয়া ভাষা, যা এখন হলো আসামের প্রাদেশিক সরকারের সরকারি ভাষা, তার উদ্ভব হয়েছে আসামের শিবসাগর ও ডিব্রগড় জেলায়। অসমিয়া ভাষা বাংলাভাষার খুব কাছের। বাংলাভাষা মানুষের পক্ষে শেখা মোটেই কঠিন নয়।</p>
<p>আসামের বাংলাভাষী মুসলমান অসমিয়া ভাষাকে আয়ত্ত করে নিয়েছে মাতৃভাষার মতোই। কিন্তু বোড়োদের ভাষা হলো তিব্বতি ভাষার মতো। তার সাথে অসমিয়া ও বাংলা ভাষার ব্যবধানটা যথেষ্ট বড়। তাই সম্ভবত বোরোদের সাথে সৃষ্টি হতে পারছে আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরোধ। বোড়োরা বলছে বাংলাভাষী মুসলমান আসলে হলো বাংলাদেশি। তাই আসামে বাস করার কোনো অধিকার তাদের নেই। তাদের চলে যেতে হবে বাংলাদেশে। অথচ ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছিল এ মর্মে, ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসের আগে যারা বাংলাদেশ (পূর্বপাকিস্তান) থেকে আসামে গিয়েছে তাদের ধরতে হবে ভারতের নাগরিক। এর পরে যারা বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়েছে তারা যদি সে দেশে একটানা দশ বছরের বেশি থেকে থাকে, তবে তারা পেতে পারবে ভারতের নাগরিকত্ব। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পরে যারা আসামে গিয়েছে কেবল তাদেরই ‘বাংলাদেশি’ বলে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে। (Outlook, 3 September 2012)।</p>
<p>বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে সব মুসলমান বাংলাদেশি নয়। কিন্তু ভারতে এখন মহলবিশেষের পক্ষ থেকে তাদের সবাইকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশি হিসেবে। পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষী মানুষের শতকরা ২৫ ভাগ হলো মুসলমান। তারাও নিকট ভবিষ্যতে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানের মতো পড়তে পারে বিপদে। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে বোড়োদের মতো কোনো উপজাতি নেই।</p>
<p><em>বাংলাদেশের সাঁওতাল ও চাকমাদের ভারতে কোনো দল অথবা সরকার ইন্ধন জোগাতে পারে গোলযোগ সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে আরো দুর্বল করতে। মুচকন্দ দুবে বলেছেন, ভারত একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীদের প্রশ্রয় দিয়েছিল। দুবে তার চাকরি থেকে অবসর নেন ১৯৯১ সালে। </em><br />
<em>আমরা অনেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নই। মোগল আমলে বাংলাদেশ অনেক প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত ছিল। একেকটি বিভাগকে বলা হতো সরকার। প্রতিটি সরকারকে শাসন করতেন একজন ফৌজদার। ফৌজদার শাসন করতেন কিন্তু ফৌজদারি মামলা ছাড়া আর কোনো মামলার বিচার তিনি করতেন না। সাধারণ মামলার বিচার করতেন কাজিরা। কাজির বিচার এলাকাকে বলা হতো জেলা। ইংরেজি District আর মুঘল আমলের জেলার ধারণা এক নয়। কিন্তু ইংরেজ আমলে District শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে জেলা শব্দটি গ্রহণ করা হয়।</em></p>
<p>১৭৬০ সালে বাংলার নবাব মীর কাশিম চট্টগ্রাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬০ সালে সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভক্ত করে করা হয় পাবর্ত্য চট্টগ্রাম মহাল, যা পরে পরিচিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম হিসেবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসিত হয়েছে অন্য জেলা থেকে কিছুটা স্বতন্ত্রভাবে; ১৮২২ সালের রেগুলেশন অনুসারে। এই রেগুলেশন অনুসারে সেই সব জেলাই শাসিত হয়েছে, যাদের অধিবাসীর জীবনধারা ছিল অন্য জেলার মানুষের তুলনায় খুবই অনগ্রসর। চাকমারা লাঙল দিয়ে চাষ করতে জানত না। তাদের মধ্যে ছিল না কোনো কুম্ভকার ও কর্মকার। তারা মৃৎপাত্রের জন্য নির্ভর করেছে বাঙালি কুম্ভকারের ওপর। লোহা দিয়ে তৈরি দা, কুড়াল, খন্তার জন্য নির্ভর করেছে বাঙালি কর্মকারের ওপর। চাকমারা যে তাঁতে কাপড় বুনেছে সেই তাঁত ছিল খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। এতে কেবল হাত দিয়ে কাপড় বুনা হয়। এতে পায়ের কোনো ব্যবহার করতে হয় না।</p>
<p><em>বাংলাদেশে যাদের উল্লেখ করা হয় ‘উপজাতি’ হিসেবে, তাদের বেশির ভাগের বাস পার্বত্য চট্টগ্রামে। এরা জীবনযাত্রার দিক থেকে একসময় পড়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির পর্বে। কিন্তু সময়ের দিক থেকে এদের বলা যায় না ‘আদিম’। এরা মাটিতে কষ্ট করে বীজ বুনে চাষ করত। যাকে বলে জুম চাষ। জুম চাষ করার জন্য এসব অঞ্চলে বন পুড়িয়ে চাষের জমি বের করা হয়। তারপর সেই জমিতে গর্ত করে বীজ লাগিয়ে উৎপন্ন করা হয় ফসল। কিন্তু এক জমিতে বেশি দিন জুম চাষ করা যায় না। কারণ, জমির ওপরে উর্বর মাটি পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যেতে থাকে। ফলে জমি হয়ে ওঠে অনুর্বর।</em><br />
<em>জুমচাষিরা বাধ্য হয় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে জুম চাষ করতে। জুম চাষ যে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা করে, তা নয়। উত্তর ভারতের উপজাতিরাও জুম চাষ করে থাকে। কিন্তু সেখানে এই পদ্ধতিকে বলে ‘দাহি’। মিয়ানমারের এই পদ্ধতিতে চাষ করাকে বলে ‘তুঙ্গিয়ান’ (Tong-gyan); ফিলিপাইনে বলে ‘গেইংএস’ (Gainges)। জুম চাষের বিষয়ে বলতে হচ্ছে কারণ, চাকমা নেতা সন্তু লারমার দাবি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করে গড়তে হবে জুমল্যান্ড। কিন্তু জুম পদ্ধতিতে চাষ কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামেই যে প্রচলিত তা নয়। ভারতের সুদূর কর্নাটক প্রদেশে উরালি উপজাতির মানুষও জুম চাষ করে থাকে। সেখানে একে বলা হয় ঝুম। উরালিরা দেখতে কতকটা সাঁওতালদের মতো। তাদের গায়ের রঙ কালো। চুল সাঁওতালদের মতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের সাথে তাদের চেহারার কোনো মিল নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা সবাই হলো মঙ্গোলীয় শাখাভুক্ত মানুষ। কিন্তু এরা তা নয়। সন্তু লারমা কি উরালিদের তার জুমল্যান্ডে ভারত থেকে আসতে দেবেন? কারণ তারাও তো করেন জুম পদ্ধতিতে চাষ। বিশেষ করে ধান চাষ। উরালিরা অবশ্য যথেষ্ট পরিমাণে বন্য ফলমূল আহরণ এবং পশুপাখি শিকার করে তাদের নিজেদের আহার্যের সংস্থান করে থাকে। আর যাপন করে অর্ধ যাযাবর জীবন। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ‘উপজাতি সংস্কৃতি’ সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এটা কি বাস্তবে সম্ভব?</em></p>
<p>উপজাতি সংস্কৃতি বন্য পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশে থাকছে না আর আগের মতো বন। যারা একসময় বনে বাস করত, তাদের সন্তানসন্ততিরা এখন লেখাপড়া শিখে অনেকেই চাচ্ছে শহরে বাস করতে। অর্থাৎ নগরজীবন গ্রহণ করতে। এ ছাড়া উপজাতিরা বিদেশি খ্রিষ্টান মিশনারিদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে খ্রিষ্টান ধর্ম। খ্রিষ্টান হওয়ার পর তারা অনুকরণ করতে চাচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে। অর্থাৎ উপজাতি মানুষ নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতি আর চাচ্ছে না ধরে রাখতে।</p>
<p>উপজাতি মানুষ বাংলা ভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া শিখছে। বাংলা হয়ে উঠেছে তাদের সাধারণ ভাষা। বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির পক্ষ থেকে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে (২০০৭)। এত বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। ‘আদি’ অর্থ হলো ‘মূল’ এবং ‘বাসী’ অর্থ ‘অধিবাসী’। সুতরাং আদিবাসী কথাটির অর্থ ধরা যায় দেশীয় লোক (Indigenous people)। সঙ্গত কারণে তাই প্রশ্ন উঠছে, আমরা অর্থাৎ বাংলাভাষী মুসলমান কি এ দেশে বিবেচিত হবো বহিরাগত হিসেবে? এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে একধরনের রাজনীতির প্রভাব। সেটাকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন দিতে পারি না। কারণ, সেটা হবে আমাদের জন্য আত্মঘাতী।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক উইলিয়াম ত্রুক (W Crooke) ১৯২৪ সালে &#8216;Islam In India&#8217; নামক বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বলেন, পূর্ব ও উত্তরবঙ্গে একসময় ছিল বহু বৌদ্ধের বাস। এই বৌদ্ধরা গ্রহণ করে ইসলাম। তাই বাংলা প্রদেশের উত্তর-পূর্ব ভাগে মুসলমানের সংখ্যা হতে পেরেছে এত বেশি। ত্রুকের মতকে অনেক দিক থেকে সমর্থন করা যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে মধ্য এশিয়ার তুর্কি মুসলমানরা এসে রাজ্য স্থাপন করেন। কিন্তু তাদের আসার অনেক আগেই সম্ভবত ইসলাম এ দেশে প্রচারিত হতে পেরেছিল। বাংলাদেশে দু’টি প্রাচীন জায়গা ছিল নওগাঁর পাহাড়পুর ও কুমিল্লার ময়নামতি। এই দু’টি জায়গায় আব্বাসীয় খলিফাদের মুদ্রা পাওয়া গেছে। পাহাড়পুরে পাওয়া গেছে খলিফা হারুন অর রশিদের স্বর্ণমুদ্রা। এ থেকে মনে হয়, আরব মুসলিম বণিকেরা এ দেশে আসতেন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। আর তাদের মাধ্যমেই প্রথমে হতে পেরেছিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইসলাম প্রচার।</strong></p>
<p>প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচারিত হয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে বাংলাদেশের মানুষের ছিল বাণিজ্য যোগাযোগ। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এ দেশের বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণে পেয়েছিল প্রণোদনা। তাদেরকে কেউ জোর করে মুসলমান করেনি। যেমন জোর করে ইসলাম প্রচারিত হয়নি মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মানুষের মধ্যে। তারা একসময় প্রধানত ছিল বৌদ্ধ এবং পরে গ্রহণ করে ইসলাম।</p>
<p>বাংলাদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে মানসিক দিক থেকে পার্থক্য ছিল। আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার মূলে আছে বাংলাভাষী মুসলমানের অবদান। বাংলাভাষী হিন্দু পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি। কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমান চেয়েছে। এটা সেই প্রাচীন বৌদ্ধ স্বাতন্ত্র্যবাদী মানসিকতার পরিচয়বহ। কিন্তু এই বিষয়ে আলোচনা না করে আলোচনা করতে ব্যস্ত উপজাতিদের কথা। যে আলোচনা পড়লে মনে হয় বাংলাদেশে বাংলাভাষী মুসলমান যেন একটা আগন্তুক জাতি। এই উপমহাদেশে মধ্য এশিয়া থেকে মানুষ বহুবার এসে সাম্রাজ্য গড়েছে। বাংলাদেশে কুশান সাম্রাজ্যের মুদ্রা পাওয়া গেছে। হতে পারে বাংলাদেশের উত্তর ভাগ একসময় ছিল কুশান সাম্রাজ্যেরই অংশ। মানবধারার দিক থেকে কুশানরা ছিলেন তুর্কি। ত্রয়োদশ শতাব্দীর যেসব মুসলমান বাংলাদেশ জয় করতে এসেছিলেন তারাও তুর্কি মানব ধারারই মানুষ। তুর্কি ফৌজরা স্ত্রীকে সাথে করে আনেননি। তারা এ দেশের কন্যাদের বিয়ে করে হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের মানবগোষ্ঠীরই অংশ; থাকেননি বিদেশি হয়ে। কিন্তু আজ প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাভাষী মুসলমান আসলে পরদেশি। আমরা এ ধরনের মিথ্যা ইতিহাস লেখার প্রতিবাদ না করে পারি না।</p>
<p>উপজাতি নিয়ে নানা রকম রাজনীতি হচ্ছে। খ্রিষ্টান মিশনারিরা উপজাতিদের করছে খ্রিষ্টান। তারা উদ্দীপ্ত করছে মুসলিমবিরোধী মনোভাব একটা বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। এটাকে সমর্থন করা যায় না। ব্রিটিশ শাসনামলে খ্রিষ্টান মিশনারিরা বাংলাদেশে প্রতাপশালী ছিল না। কারণ, ব্রিটিশ শাসকেরা মনে করত, মিশনারিদের প্রশ্রয় দিলে এ দেশের মানুষ এদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে পারে, যা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে এ দেশে ব্রিটিশরাজত্বের জন্য। পাকিস্তান আমলেও খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যকলাপ পরিচালিত হয়েছে অনেক সংযতভাবে। এর একটা কারণ ছিল সে সময়ের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ ছিল বিভিন্ন দেশে ইসলামী শক্তিকে সংগঠিত করে কমিউনিজম রোখা। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই।<br />
মিশনারিরা এখন বিশ্বজুড়ে ইসলামকে তাদের প্রতিপক্ষ ভাবছে। আর বিভিন্ন দেশে চাচ্ছে ধর্ম প্রচার করে ইসলামবিরোধী শিবির গড়তে। বাংলাদেশে উপজাতিদের তারা খ্রিষ্টান করছে এবং তাদের মনে গড়ে তুলছে ইসলামবিরোধী মনোভাব। এটা একটা বড় ধরনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির চক্রান্তেরই অংশ। অনেক রকম রাজনীতি হচ্ছে উপজাতিদের নিয়ে। বাংলাদেশে সাঁওতাল উপজাতি নিয়ে রাজনীতি করতে চাচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টি। তারা রাজশাহী শহরে গত মাসের ৯ আগস্ট বের করেছিল একটা বিরাট মিছিল।</p>
<p>এ অঞ্চলে বামপন্থিদের সাঁওতাল নিয়ে রাজনীতি নতুন নয়। পাকিস্তান হওয়ার পরে বাম নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানায় ঘটেছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ। সাঁওতাল রাজনীতির ফলে অনুরূপ কোনো সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটা অসম্ভব নয়। ভারতীয় অস্ত্র বাংলাদেশে যথেষ্ট অঘটন ঘটাতে পারে। ভারত চাচ্ছে আমাদের জাতিসত্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে। এর বিপক্ষে আমাদের দেশ, আমাদের জাতিসত্তার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের আত্মপরিচয় নিয়ে বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি কোনো গ্রন্থ রচনা করেছে বলে আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস নিয়ে খুব সামান্যই আলোচনা হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।</p>
<p>১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সব অধিবাসীকে বিবেচনা করা হবে বাঙালি হিসেবে। ১৯৭৩ সালের ৭ জুন সন্তু লারমার নেতৃত্বে চাকমারা গঠন করে শান্তিবাহিনী। ২০০১ সালের ৩১ মার্চ সন্তু লারমা গঠন করেন ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’। সংখ্যার দিক থেকে সাঁওতালরা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উপজাতি। এরপর আসে চাকমাদের নাম। সন্তু লারমা চাচ্ছেন চাকমা ও সাঁওতালদের এক করে রাজনীতি করতে। সাঁওতালরা সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে, কিন্তু এখন তারা বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া শিখছে। তারা সবাই বলতে পারে বাংলা। তা ছাড়া, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সাঁওতাল ভাষায় ঘটেছে প্রচুর বাংলা শব্দের অনুপ্রবেশ। চাকমাদের কোনো নিজস্ব ভাষা নেই। বাংলাই হয়ে উঠেছে তাদের মাতৃভাষা। কিন্তু তবুও তোলা হচ্ছে তথাকথিত আদিবাসীদের স্বতন্ত্র ভূভাগ গঠনের দাবি।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/ethnic-people-in-the-political-crisis/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15829</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইতিহাসের ধারায় আরাকান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 03 May 2025 11:46:29 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[রোহিঙ্গা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15811</guid>

					<description><![CDATA[যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন–ই–আকবরীতে আরাকান সম্পর্কে লিখেছেন : সুবে বাঙ্গালাহ–ও দক্ষিণ–পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>যে দেশটাকে আমরা এখনো বাংলায় সাধারণভাবে ডাকি আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) তাকে ফারসিতে বলা হতো AviLO। আবুল ফজল তার আইন–ই–আকবরীতে আরাকান সম্পর্কে লিখেছেন : <strong>সুবে বাঙ্গালাহ–ও দক্ষিণ–পূর্বে হলো AviLO রাজ্য। এই রাজ্যে অনেক হাতি পাওয়া যায়। কিন্তু অশ্ব খুবই মহার্ঘ। গাধা ও উট এখানে চড়া দামে বিক্রি হয়। এই রাজ্যে গরু ও মহিষ দেখা যায় না। এখানে মানুষ গাভি জাতীয় একপ্রকার প্রাণীর দুধ পান করে। এই দেশে মানুষ না হিন্দু, না মুসলমান। যমজ ভাতা ভগ্নীর মধ্যে এই দেশে বিবাহ প্রচলিত আছে। মাতা–পুত্র ব্যতীত আর সবার মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। এই দেশে লোকে তাদের পুরোহিতের (ওয়ালির) সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ। এখানে রাজপ্রাসাদে স্ত্রী লোক প্রহরীর কাজ করে। পুরুষ মানুষের মুখে দাড়ি হয় না।</strong></p>
<p><em>ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকান ছিল বার্মার একটি বিভাগ (Division)। এই বিভাগের ছিল চারটি জেলা। যথা : ১. আরাকান হিলট্রাক্টস, ২. আকিয়াব, ৩. সান্ডওয়ে ও ৪. কাউকপিউ। বর্তমানে আরাকান বা রাখাইন হলো মিয়ানমারের একটা প্রদেশ; বিভাগ আর নয়; কিন্তু বর্তমান আরাকান প্রদেশের আয়তন হলো আগের আরাকান বিভাগের চাইতে ছোট। এই ছোট হওয়ার কারণ, আরাকান হিলট্রাক্টসকে জুড়ে দেয়া হয়েছে মিয়ানমারের আরেকটা প্রদেশের সাথে। মিয়ানমার বর্তমানে সাতটা প্রদেশ (Constituent stats) এবং সাতটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি বিভাগে বাস করেন খাঁটি বর্মিভাষী জনসমষ্টি; কিন্তু আর সাতটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টির জনসমষ্টির মাতৃভাষা বর্মি বা ম্রনমা নয়। আরাকান হলো এমন একটি প্রদেশ, যার মানুষের মাতৃভাষা খাঁটি বর্মি নয়; কিন্তু বর্মি ভাষার খুবই কাছাকাছি। একে বলতে হয় প্রাচীন বর্মি ভাষার অনুরূপ। অর্থাৎ আরাকান প্রদেশের অবস্থান ভাষাগত দিক থেকে বর্মি পরিবারভুক্ত হলেও বেশ কিছুটা ভিন্ন।</em></p>
<p><em>আরাকানের সব লোক মঙ্গল মানবধারার নয়। এখানে অনেক মানুষের চেহারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অনুরূপ। তাদের চোখ আয়ত, নাক সরল ও উন্নত, মাথার চুল মসৃণ। তাদের পুরুষের মুখে দাড়ি গোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায়। এদের মাথা প্রধানত মধ্যমাকৃতির; কিন্তু যাদের মনে করা হয় একান্তভাবেই আরাকানীয় তাদের মাথার আকৃতি গোল, চুল ঋজু, চোখের ওপর পাতায় থাকে বিশেষ ধরনের ভাঁজ। যে কারণে তাদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট এবং বাঁকা। এদের গণ্ডের হাড় হয় উঁচু, যে কারণে এদের মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। পুরুষের মুখে দাড়িগোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায় না। এরা অনেক খর্বাকৃতির। মানবধারার দিক থেকে এদের বলা চলে, দক্ষিণ চীনের মঙ্গলধারার।</em></p>
<p><strong>ভূগোলের দিক থেকে আরাকান বার্মার (ব্রহ্ম) মূল ভূখণ্ড থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। বার্মা ও আরাকান পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণি দ্বারা। এই পর্বতশ্রেণিকে বলে আরাকান ওমা। এর মধ্য দিয়ে আছে তিনটি গিরিপথ। এই তিনটি গিরিপথের মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র একটি দিয়ে বছরে সব সময় যাতায়াত করা চলে। অন্য দু’টির মধ্য দিয়ে বর্ষাকালে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বার্মার মূল ভূ–খণ্ডের সাথে আরাকানের যোগাযোগ ছিল সমুদ্রপথে। জাপান বার্মার মূল ভূখণ্ড দখল করে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে। বার্মার মূল ভূখণ্ড থেকে জাপানিরা ১৯৪২ সালে সমুদ্রপথে স্পিডবোটে এসে করেছিল সম্পূর্ণ আরাকান দখল। আরাকান থেকে স্থলপথে এসে পৌঁছেছিল চট্টগ্রামের মহেশখালী পর্যন্ত। তবে তারা মহেশখালী দখলে রাখতে পেরেছিল না। আরাকানসহ বার্মা জাপানের দখলে ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে আরাকানে যাওয়া ছিল সহজ। বাংলাদেশ থেকে মানুষ গিয়েছে আরাকানে। আবার আরাকান থেকে মানুষ এসেছে বাংলাদেশে। এটা ঘটেছে বহু যুগ ধরেই।</strong></p>
<p>রোহিঙ্গা নামটির একটি বিশেষ ইতিহাস আছে। সংক্ষেপে তা হলো এই রকম : খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগে (১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি) নিম্ন ব্রহ্মের রাজা মেং–শো–আই আরাকান জয় করেন। আরাকানের রাজা মেং–শো-আ মউন যুদ্ধে হেরে পালিয়ে যান গৌড়ের সুলতান জালাল–আল–দীন শাহ–এর কাছে। তিনি আরাকানের পরাজিত রাজাকে অনেক সৈন্য প্রদান করেন গৌড়ের এক সেনাপতির অধীনে, যাতে করে আরাকানের রাজা মেং–শোআ মউন বার্মা রাজাকে পরাজিত করে আবার আরাকানের রাজা হতে পারেন; কিন্তু গৌড়ের এই সেনাপতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। মেং–শোআ মউন আবার বন্দী হন বার্মার রাজার কাছে। অনেক কষ্টে আরাকানের পরাজিত রাজা আবার গৌড়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এবার গৌড়ের সুলতান তাকে আর একজন সেনাপতির অধীনে আরো অনেক সৈন্য প্রদান করেন। এই সেনাপতি ও সৈন্যের সহযোগিতায় মেং–শোআ মউন যুদ্ধে জয়ী হন। তিনি আরাকানের নতুন রাজধানী গড়েন বাংলার সীমানার কাছে। এই রাজধানীর নাম দেন রোহং অথবা ম্রোহং। আরাকানের রাজা চান না গৌড়ের সৈন্য ফিরে যাক। গৌড়ের এসব মুসলমান সৈন্য থেকে যায় রাজধানী রোহং শহরে। এদেরই বংশধররা হলো রোহিঙ্গা। রোহং শহরকে বাংলা ভাষায় বলা হতে থাকে রোসাঙ্গ। একসময় রোসাঙ্গ আর আরাকানকে ডাকা হতে থাকে একই রোসাঙ্গ নামে। দৌলত কাজী তার <em>&#8216;সতী ময়নামতীতে&#8217;</em> লিখেছেন–</p>
<blockquote><p>কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী।<br />
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।।<br />
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধাচার।<br />
নাম শ্রীসুধর্ম্মা রাজা ধর্ম্ম অবতার।।<br />
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন।<br />
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।</p></blockquote>
<p>আরাকানের রাজারা গৌড়ের সাথে যোগাযোগ রেখে চলতেন। তারা তাই বাংলা ভাষা শিখতেন। আরাকানের রাজসভায় এই জন্য হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের চর্চা। <strong>দৌলত কাজী ছিলেন আরাকানের রাজসভার একজন খুবই খ্যাতনামা কবি।</strong> তিনি জন্মে ছিলেন চট্টগ্রামের অন্তর্গত বর্তমান রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে। সেখান থেকে প্রথম যৌবনে তিনি চলে যান আরাকানে। এ সময় আরাকানের রাজা ছিলেন থিরি থুধর্মা (১৬২২–১৬৩৫ খ্রি. রাজত্বকাল)। যার বাংলা নাম দাঁড়ায়, শ্রীসুধর্ম্মা। শ্রীসুধর্ম্মার লস্কর উজির (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) ছিলেন আশরাফ খান। আশরাফ খান ছিলেন চট্টগ্রামের বর্তমান উপজেলা হাটহাজারীর অন্তর্গত চারিয়া গ্রামের অধিবাসী। তিনি সেখান থেকে যান আরাকানে। তার সহায়তায় দৌলত কাজী আরাকানের রাজসভায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। দৌলত কাজী খ্যাত হয়ে আছেন <strong><em>&#8216;সতী ময়নামতী&#8217;</em></strong> নামক কাব্যগ্রন্থ রচনার জন্য। এটা তিনি রচনা করেন সাধন নামে উত্তর ভারতের একজন কবির লেখা কাব্য ময়না সৎ নামক কাব্যগ্রন্থের অনুসরণে। ময়না সৎ কাব্যগ্রন্থ লিখিত হয়েছে পূর্বী হিন্দিতে। <em>দৌলত কাজী তার কাব্য শেষ করার আগেই হঠাৎ ইন্তেকাল করেন। তার এই কাব্য সমাপ্ত করেন কবি আলাওল বেশ কিছু দিন পরে</em>। কবি আলাওলের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম <strong>&#8216;পদ্মাবতী।&#8217;</strong> এটি তিনি রচনা করেন মালিক মুহম্মদ জয়সি নামে উত্তর ভারতের একজন সুফি কবির লেখা <strong>&#8216;পাদুমাবৎ&#8217;</strong> নামক কাব্যগ্রন্থের ওপর নির্ভর করে। পাদুমাবৎও লিখিত হয়েছিল পূর্বী হিন্দিতে।<br />
বাংলা সাহিত্যের ওপর ফারসি সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাব বহুদিন আগে থেকেই পড়তে আরম্ভ করে। তবে নতুন করে আবার পড়ে সম্রাট শাজাহানের পুত্র বাংলার সুবেদার সুজার আমলে। সুজা বাংলার সুবেদার ছিলেন প্রায় ২০ বছর (১৬৩৯–১৬৬০)। সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার হাতে পরাজিত হয়ে আরাকানে প্রস্থান করেন। সুজার সময় সুবে বাংলার রাজধানী ছিল রাজমহল, যা এখন পড়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশে। আলাওল চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না। ছিলেন ফরিদপুর অঞ্চলের (ফাতেহাবাদ) লোক। তিনি তার পিতার সাথে নৌপথে কোথাও যাওয়ার সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে পড়েন। আলাওলের পিতা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় মারা যান। আলাওলকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা ধরে এনে বিক্রি করেন আরাকানে।</p>
<p><em>আলাওল অনেকগুলো ভাষা জানতেন। বাংলা, উড়িয়া, ফারসি, আরবি, পূর্বী হিন্দি ও সংস্কৃত। আলাওল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন &#8216;হফত পয়কর&#8217; ও &#8216;সিকান্দর নামা।&#8217; আলাওলের যেসব পুঁথি পাওয়া গিয়েছে, তা বাংলা অক্ষরে লিখিত নয়। সবই লিখিত আরবি–ফারসি অক্ষরে। আরাকানে সুজার সাথে আলাওলের বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। আরাকানের রাজা সুজাকে হত্যা করেন। এই হত্যার একটি কারণ ছিল আরাকানের রাজা সুজার এক কন্যাকে বিবাহ করতে চান; কিন্তু সুজা রাজি হন না। সুজার সাথে সখ্যতার জন্য আলাওলকে পড়তে হয় আরাকানের রাজার কোপে। সুজার মৃত্যুর পর তার সৈন্যসামন্ত ও লোকজন সবাই থেকে যায় আরাকানে। রবীন্দ্রনাথ ডালিয়া বলে একটি ছোট গল্প লিখেছেন। যার বিষয়বস্তু হলো– সুজার কন্যার সাথে আরাকান রাজার প্রেম। তবে এটা ইতিহাসের নিরিখে সত্য নয়; কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আরাকান রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আর কোনো লেখক আরাকান নিয়ে তার সময়ে এ রকম কিছু লিখেননি।</em></p>
<p><strong>মগ বলতে ঠিক কাদের বোঝাত, তা জানা যায় না। চট্টগ্রামে মগ বলতে একদল বাংলাভাষীকেও বোঝায়। যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই মগরা বলেন, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছিল বিহারের মগধ থেকে। দৌলত কাজী বলেছেন, সুধর্ম্মার পূর্বপুরুষও ছিলেন মগধ থেকে আগত। সম্ভবত এরা পূর্বী হিন্দি সম্বন্ধেও ছিলেন অবগত। তাই আরাকানের রাজসভায় কাব্যচর্চা করতে যেয়ে পূর্বী হিন্দিতে লিখিত বইয়ের অনুবাদ করতে হয়েছেন সচেষ্ট। সাধারণভাবে বাংলাদেশে এখনো মগের মুল্লুক বলতে, লোকে বোঝে চরম অরাজক রাজত্ব। সম্ভবত মগদের একাংশ পর্তুগিজ জলদস্যুদের সংশ্রবে এসে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর প্রকৃতির দস্যু। এই দস্যুদের সমূলে ধ্বংস করতে সক্ষম হন আওরঙ্গজেব কর্তৃক নিযুক্ত সুবেদার শায়েস্তা খান।</strong><br />
<strong>আরাকান আগে বার্মার অংশ ছিল না। আরাকান বার্মার বিশেষ অংশ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনামলে। যখন একে ব্রহ্মদেশের সাথে একটি বিভাগ হিসেবে যুক্ত করা হয়; কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলেও চট্টগ্রাম থেকে বহু মানুষ গিয়েছেন আরাকানে চাকরি করতে। বিশেষ করে পুলিশ ও শিক্ষা বিভাগে। এ ছাড়া হয়েছেন নৌপথে চলাচলকারী মোটর–বোটের সারেং ও মাঝি–মাল্লা। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আরাকানের আকিয়াব বন্দর পর্যন্ত রেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেটা সম্ভব হয়েছিল না।</strong></p>
<p>দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু ঘটনা আজকের রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্লেষণে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। <strong>জাপান বার্মাকে খুব সহজেই দখল করতে পেরেছিল। এর কারণ, কেবলই সামরিক কৌশল ছিল না। জাপান এ সময় বলেছিল, এশিয়া শাসিত হতে হবে এশীয়বাসীর দ্বারা।</strong> জাপান এশীয়। জাপানিরা ছিলেন ধর্মের দিক থেকে অনেকেই বৌদ্ধ। জাপান বলে, এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে তারা সহযোগিতা সৃষ্টি করতে চায়, যা এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রকে করে তুলবে সমসমৃদ্ধ। এর একটা প্রভাব পড়েছিল বার্মার মানুষের ওপর। তারা সহযোগিতা করেছিল জাপানের। বার্মার প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল দোবামা আসিওরে। এরা প্রথমে নেয় জাপানের পক্ষ। এরা আওয়াজ তোলে বার্মা হতে হবে বর্মিদের জন্য। এরা ছিল বিশেষভাবেই বর্মি জাতীয়তাবাদী।<br />
<strong>ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রায় দশ লাখ মানুষ সমুদ্রপথে বার্মায় গিয়েছিলেন, ব্যবসা–বাণিজ্য করতে। এরা অনেকেই বার্মায় নিয়োজিত হয়েছিলেন অসাধু ব্যবসা–বাণিজ্যে, ঠকিয়েছিলেন বর্মিদের। বর্মি জাতীয়তাবাদ তাই কেবল ব্রিটিশবিরোধী ছিল না, ভারতবিরোধীও ছিল।</strong> যুদ্ধের সময় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল এইসব ভারতীয়দের। আরাকানে এ সময় মুসলমানরা জাপানের পক্ষ নিতে চাননি। জাপানিরা বৌদ্ধ। জাপানিরা আরাকানি বৌদ্ধদের যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করবে, তারা মনে করেন মুসলমানদের জাপানিরা সে রকম করবে না। এ সময় ব্রিটিশ শাসকেরা প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তারা উত্তর আরাকানকে একটা আলাদা প্রদেশ করবে।<br />
<strong>উত্তর আরাকান মুসলিম প্রধান। কেবল তাই নয়, উত্তর আরাকানের বেশির ভাগ লোক দেখতে বাংলাদেশের অধিবাসীর মতো। উত্তর আরাকানে হাটেবাজারে চলতো চট্টগ্রামের বাংলাভাষা, আরাকানি ভাষা নয়।</strong> ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় আরাকান মুসলিম লীগ। এরা তোলে আরাকানকে বিভক্ত করার দাবি; কিন্তু আরাকান মুসলিম লীগের এই দাবি জিন্নাহ সাহেব সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, বার্মা এখন একটা পৃথক দেশ। আরাকানে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুললে ভারতে পাকিস্তান আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। <strong>আসলে আরাকান মুসলিম লীগ কখনই আরাকানভিত্তিক একটি দল ছিল না। ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক একটা দল, যাতে নেতৃত্ব দিতেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। যিনি ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের লোক। আরাকানি মুসলিম লীগ কোনো দিনই আরাকানে সাড়া জাগাতে পারে না।</strong></p>
<p>১৯৪৮ সালে বর্মা স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপর আরাকানি মুসলমানদের একাংশ কাশেম রাজার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন; কিন্তু এদের সংখ্যা খুব উল্লেখযোগ্য ছিল না। কাশেম রাজা পেশায় ছিলেন ধীবর। তিনি এক সময় সমুদ্রে মৎস্য শিকার করতেন; কিন্তু তিনি ছিলেন ভালো সংগঠক ও নেতৃত্ব গুণে গুণান্বিত। ফলে হয়ে উঠতে পারেন একজন বিশিষ্ট নেতা। তিনি গড়ে তোলেন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী। কাশেম রাজা পাকিস্তানের কাছে সাহায্য চান; কিন্তু পান না। কাশেম রাজা ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসে ধরা পড়েন ও কারারুদ্ধ হন। আরাকানে মুসলিম মুজাহিদরা হয়ে পড়েন শক্তিহীন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব চান না বার্মার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হোক। নাফ নদীর ওপারে ৫ মাইল জায়গা নিয়ে বর্মার সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। আইউব সেটা বার্মাকে ছেড়ে দিয়ে সীমান্ত সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসেন।<br />
বার্মা স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে আরাকানিরা স্বাধীন হতে চেয়েছিল; কেবলই আরাকানের মুসলমানরাই নয়। কিন্তু আরাকানের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ হলো মুসলমান। জেনারেল নে উইন ১৯৫৮ সালে বর্মায় ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন কঠোর বর্মি জাতীয়তাবাদী। তিনি মনে করেন আরাকানে রোহিঙ্গাদের প্রভাব প্রতিপত্তি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরাকান একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে। তার সময় থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গা নির্যাতন। যাতে করে রোহিঙ্গারা আরাকান ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসতে চায়। আজ যে সমস্যা আরাকানে সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ। রোহিঙ্গাদের ওপর আজ যে জঘন্য নির্যাতন হচ্ছে সেটা করছে মিয়ানমার মূল ভূখণ্ড থেকে আসা বর্মি সৈন্যরা। এর মূলে আছে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ, যার উদ্ভব হয়েছে বর্মার মূল ভূখণ্ডে, আরাকানে নয়।</p>
<p><strong>আরাকানে যা ঘটছে, তা ঘটতে পারার একটা কারণ হলো বাংলাদেশ একটা যথেষ্ট সবল রাষ্ট্র নয়। সবল রাষ্ট্র হলে বার্মার সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের ওপর এ রকম অত্যাচার করতে কখনো এতটা সাহসী হতো না। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের কাছে আবেদন জানাচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বহু মুসলমানের বাস। আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত এই দু’টি দেশের জনমতকে বিশেষভাবে পক্ষে পাওয়া। কেননা, এই দু’টি দেশ যদি বার্মার ওপর রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করে তবে তা কার্যকর হবে সবচেয়ে বেশি।</strong> তবে একান্তই যদি দেখা যায় যে, রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হচ্ছে না, তবে মনে হয় শেষ পর্যন্ত উচিত হবে রোহিঙ্গাদের স্বাধিকারের জন্য সব ধরণের সাহায্য প্রদান করা। রোহিঙ্গারা যদি হাতে অস্ত্র পান, তবে লড়াই করে তারা তাদের নিজেদের দাবি–দাবাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বলে মনে করার কারণ আছে। কেননা, মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে কারেন, শান, কাচিন প্রভৃতি জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। বর্মি বাহিনী খুব যে সুবিধার মধ্যে আছে, তা কিন্তু নয়। রোহিঙ্গাদের দমন করার জন্য মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার যদি অধিক সৈন্য পাঠাতে বাধ্য হয়, তবে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে অন্য জাতিসত্তাদের সংগ্রাম আরো জোরালো হবে। ফলে মিয়ানমারের সরকারকে পড়তে হবে যথেষ্ট জটিলতায়। মিয়ানমারের সাতটি প্রদেশেই আছে কম বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী তথা স্বাধীনতাকামী প্রবণতা। আজকের মিয়ানমার হলো ব্রিটিশ শাসনের ফল। কোনো খাঁটি বর্মি রাজা এত বড় অঞ্চলকে কখনো শাসন করতে পারেননি।</p>
<p><strong>০২ ডিসেম্বর ২০১৬</strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/arakan-in-the-history/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15811</post-id>	</item>
		<item>
		<title>উপমহাদেশে ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 24 Apr 2025 15:38:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সমাজ ও সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15787</guid>

					<description><![CDATA[মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায়]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষ কথা বলা প্রাণী। মানুষ তার বাগ্‌যন্ত্র দিয়ে অনেক রকম শব্দ করতে পারে। সে সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে মনোভাব প্রকাশ করে। ভাষা রচনা করে সামাজিক বন্ধন। সৃষ্টি করে জাতীয় ভাব। ভাষাকে নির্ভর করেই গড়ে উঠতে চায় জাতিসত্তা। বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। কেননা, এক জাতি চাপিয়ে দিতে চাইতে পারে, অন্য জাতির ওপর তাদের ভাষাকে। আর অন্য জাতি চাইতে পারে, এই চাপিয়ে দেয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে এর একাধিক নজির আছে।</p>
<p>ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সনের বিখ্যাত ভাষা জরিপ (Linguistic Survey of India, 1903-1928) থেকে দেখা যায়, ব্রিটিশ ভারতে তখন ভাষার সংখ্যা ছিল ১৭৯টি। আর উপভাষা বা ডায়ালেক্টের সংখ্যা ছিল ৫৪৪টি। সে সময়ে ভারতে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলত হিন্দি ভাষায়। হিন্দির পরেই স্থান ছিল বাংলা ভাষার। গ্রিয়ার্সন এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোকে প্রধানত চারটি বড় ভাষা পরিবারে বিভক্ত করেন। এরা হলো : দক্ষিণ এশীয় বা অস্ট্রিক (Austric), চীনা-তিব্বতি (Sino-Tibetan), দ্রাবিড় (Dravidian) ও ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার খুব বড়। গ্রিয়ার্সন একে এই উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তিনটি উপপরিবারে ভাগ করেন। এরা হলো ইরানীয় আর্য (Iranian-Aryan), ভারতীয়-আর্য (Indo-Aryan), দরদ-আর্য (Dardic-Aryan)। তিনি বাংলা ও হিন্দি ভাষাকে স্থাপন করেন ভারতীয়-আর্য পরিবারে। বাংলা ভাষাকে গ্রিয়ার্সন যদিও হিন্দি ভাষার সাথে ভারতীয়-আর্য পরিবারে স্থাপন করেন, কিন্তু হিন্দির সাথে বাংলা ব্যাকরণের অমিল আছে অনেক। যেমন হিন্দিতে ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা যায় না, কিন্তু বাংলা ভাষায় যায়।</p>
<p><strong>এ দিক থেকে বাংলা ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায় দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষার সাথে। তামিল ভাষায় ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য গঠন করা চলে। দ্রাবিড় পরিবারের ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জোড়া লেগে নতুন ভাব প্রকাশকারী শব্দ গঠন। এ ক্ষেত্রে শব্দ দু’টি একত্রে মিলে যায় না। অর্থাৎ সন্ধি হয় না। এরকম জোড়ালাগা শব্দ বাংলা ভাষাতেও কিছু কিছু হতে দেখা যায়। যেমন, ছেলে এবং গুলি দু’টি পৃথক শব্দ। কিন্তু আমরা যখন বলি, ছেলেগুলি, তখন তা একটি তৃতীয় ভাবকে বোঝায়। এটাকে তুলনা করা চলে দ্রাবিড় পদ্ধতির সাথে। আমরা বাংলাতে ছেলেগুলি না বলে, বলতে পারি, ছেলেরা। এটা হলো আর্যভাষার পদ্ধতি। দ্রাবিড় ভাষায় থাকতে দেখা যায় ট ধ্বনির প্রাধান্য। বাংলা ভাষাতেও টি টা আমরা যথেষ্ট ব্যবহার করি। বাংলাদেশের পুরনো গ্রাম ও জনপদের নাম দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে অতীতে চলত দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই অভিমত প্রকাশ করেছেন তার বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা নামক বইতে। এমনিতে বস্তুগত সংস্কৃতির দিক থেকেও অনেক মিল আছে দ্রাবিড়ভাষী ও বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে। যেমন, দ্রাবিড়ভাষী মানুষ সিদ্ধ চালের ভাত খান। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত সিদ্ধ চালের ভাত খেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের মানুষ গ্রামে উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে থাকেন। তামিলভাষীরাও থাকেন একই রকম উলুখড়ের ছাওয়া মাটির ঘরে। তামিলরা তরি-তরকারি কোটেন বঁটি দিয়ে। বাংলাদেশেও মানুষ একইভাবে বঁটির ব্যবহার করে। উত্তর ভারতের মানুষের মতো ছুরি দিয়ে তরি-তরকারি কাটেন না।</strong></p>
<p>এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৩৭ সালে প্রথম ভাষা নিয়ে রক্তপাত ঘটেছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। ১৯৩৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ-ভারতে ১১টি প্রদেশ ছিল। সে সময় প্রাদেশিক আইনসভার যে নির্বাচন হয়, তাতে ১১টি প্রদেশের মধ্যে আটটিতে কংগ্রেস জয় লাভ করে মন্ত্রিসভা গঠন করে। কংগ্রেস হাইকমান্ডের আদেশ অনুসারে এই আটটি প্রদেশে হিন্দি ভাষা স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়। মাদ্রাজ প্রদেশে তামিলভাষীরা করেন-এর প্রতিবাদ। তিন বছর ধরে চলেছিল প্রতিবাদ বিক্ষোভ। এ সময় একটি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ফলে নিহত হন দু’জন। এটাই এই উপমহাদেশে ভাষার কারণে প্রথম আত্মাহুতি দান। এটা ঘটেছিল ১৯৫২ সালে ঢাকায় গুলি চালাবার প্রায় ১৫ বছর আগে অখণ্ড ভারতে। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা আটটি প্রদেশেই ইস্তফা দেয়। কংগ্রেস ইস্তফা দেয়, কারণ সে চায় না ব্রিটিশ ভারতের সরকারের সাথে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সহযোগী হতে। কংগ্রেস সরকার মাদ্রাজে ইস্তফা দেয়ার পর, মাদ্রাজের গভর্নর জেনারেল Lord Erskine ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদ্রাজের স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো আইন রদ করেন। মাদ্রাজে যখন বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি পড়ানো শুরু হয়, তখন মাদ্রাজের আইনসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপাল আচারী। গুজব রটে, আচারী যেহেতু ব্রাহ্মণ, তাই তিনি চাচ্ছেন, সংস্কৃতবহুল হিন্দি ভাষা তামিলদের শেখাতে। আর সেই সঙ্গে চাচ্ছেন, তামিলভাষীরা ধীরে ধীরে ত্যাগ করুক তাদের মাতৃভাষাকে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে উদ্ভব হয় ব্রাহ্মণবিরোধী দ্রাবিড় মুনাত্রা কাজাগাম নামক দলের, যা পরে মাদ্রাজের রাজনীতিতে হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক দল। এ সময় তামিলভাষী মুসলমানেরা যোগ দিয়েছিলেন হিন্দিবিরোধী আন্দোলনে।</p>
<p>অন্য দিকে, যেসব মুসলিম পরিবারে উর্দু ভাষা চলত, তারা নেন হিন্দি ভাষার পক্ষ। ১৯৬৫ সালে ভারতের কংগ্রেস সরকার চায় হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করতে। এ সময় মাদ্রাজ প্রদেশে (বর্তমান নাম তামিলনাড়–) দেখা দেয় প্রচণ্ড হিন্দিবিরোধ বিক্ষোভ। একটি মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ৬৮ জন। জঙ্গি-জনতা পুলিশকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ চালায়। যার ফলে দু’জন পুলিশের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী এ সময় ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, হিন্দিকে এখনোই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে না। ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। শাস্ত্রী মারা যান ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে। তার মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী হন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট আইন পাস করে, হিন্দির সাথে ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে।</p>
<p><strong>বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, পাকিস্তান হয়েছিল বলেই সৃষ্টি হতে পারে ভাষা সমস্যার। কিন্তু স্বাধীন ভারতেও দেখা দিয়েছে ভাষার সমস্যা। আরেকটি দৃষ্টান্ত নেয়া যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব ছিল একটা বিরাট প্রদেশ। ১৯৪৭ সালে বাংলার মতো পাঞ্জাব প্রদেশকেও ভাগ করা হয়। পাঞ্জাবের পশ্চিম ভাগ পড়ে পাকিস্তানে আর পূর্বভাগ পড়ে ভারতে। পাঞ্জাবের যে অংশ ভারতে পড়ে, তাতে শিখ পাঞ্জাবিরা চায় পাঞ্জাবিকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করতে। কিন্তু হিন্দু পাঞ্জাবিরা তাতে রাজি হয় না। শিখদের এই আন্দোলন ১০ বছর চলার পর ১৯৬৬ সালের ১ নভেম্বর পূর্ব পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে দু’টি প্রদেশ করা হয়। উত্তর ভাগ হয় পাঞ্জাবি সুবা আর দক্ষিণ ভাগ হয় হরিয়ানা প্রদেশ। উত্তর ভাগের প্রাদেশিক সরকারের সরকারি ভাষা হয় গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা। আর হরিয়ানা প্রদেশের সরকারের প্রাদেশিক ভাষা হয় দেবনাগরী অক্ষরে লেখা হিন্দি ভাষা। পরে শিখরা চান স্বাধীন হতে। ইন্দিরা গান্ধী কঠোর হস্তে শিখ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করেন। এতে শিখরা হয়ে ওঠেন খুবই ক্ষুব্ধ। দু’জন শিখ দেহরক্ষী ইন্দিরা গান্ধীকে তার সরকারি ভবনের প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করেন (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪)। দিল্লিতে বাধে হিন্দু শিখ দাঙ্গা। দিল্লির শিখরা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর সাথে জড়িত ছিলেন না। তারা দাঙ্গার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন না। এই দাঙ্গায় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মারা যান প্রায় চার হাজার শিখ।</strong></p>
<p>ভারতে ভাষা সমস্যা ছিল এবং আছে। কেউ বলতে পারে না, আবার তা প্রবল হয়ে উঠবে কি না। সাবেক পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছে অনেকের মতে ভাষার দ্বন্দ্বের কারণে। কিন্তু সাবেক পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন একটা ব্যর্থ আন্দোলন ছিল না। উর্দুর সাথে বাংলা পেতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। কিন্তু ভারতে হিন্দির সাথে ইংরেজিকে রাখা হয়েছে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। কোনো ভারতীয় ভাষাকে করা হয়নি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের জন্য হিন্দির সাথে সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এখানে থেকে গেছে একটা বড় রকমের ফাঁক।</p>
<p>এসব কথা মনে আসছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যা এখন পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলে কিছু কি কোথাও আছে, না হতে পারে? যেমন কোথাও নেই আন্তর্জাতিক দেশপ্রেমের অস্তিত্ব। আসলে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে সে সম্পর্কে ইউনেসকো কিছু বলেনি। ইউনেসকো বলেনি ভারতে ভাষা নিয়ে সঙ্ঘাত ঘটার কথা। সে কেবলই বলেছে পাকিস্তানে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ভাষার জন্য মানুষের শাহাদত বরণের কথা। যেটা আমার কাছে মনে হয় একদেশদর্শী এবং ইতিহাস না জানার ফল।<br />
আমাদের দেশে আমরা করেছিলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। আমাদের আন্দোলন ছিল না মাতৃভাষার আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর মাতৃভাষা আন্দোলন সমার্থক নয়। কিন্তু এখন যেন সেটাই করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ১৯৫২ সালের পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট জটিল। উর্দু বনাম বাংলা তখন সরাসরি উচ্চারিত হয়নি। খাজা নাজিমুদ্দিন জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন ঢাকায়। কিন্তু তার পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু তার মাতৃভাষা বাংলা ছিল না, ছিল উর্দু। ঢাকায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চলেছিল গুলি। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২৪ ফেব্রুয়ারিতে তদানীন্তন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে অবস্থিত হায়দ্রাবাদ শহরের এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে উর্দুই হওয়া উচিত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব বাংলায় অনেক মানুষ ছিলেন উর্দুর পক্ষে। তবে অধিকাংশ মানুষই চেয়েছিলেন উর্দুর সাথে বাংলাকে করা হোক অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। তাই আন্দোলনের আওয়াজ ছিল উর্দু বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর সাথে বাংলা চাই।</p>
<p><strong>এখন এই ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। পাঠ্যবইতে যা লেখা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, মানুষ যেন হয়ে উঠেছিল উর্দুবিরোধী। সমগ্র পাকিস্তানের মানুষের ওপর পূর্ব বাংলার মানুষ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল বাংলা ভাষার কর্তৃত্ব। কিন্তু ১৯৫২ সালে এই মনোভাব বিরাজ করছিল না।</strong><br />
<strong>ভাষাসৈনিক বলতে ঠিক যা বোঝায়, আমি তা ছিলাম না। তবে এ সময় আমি ছিলাম ছাত্র। ছাত্ররা করেছিল ভাষা আন্দোলন। তাই সে সময়ের মনোভাব সম্পর্কে আমি নিশ্চয় কিছু বলার অধিকার রাখি। যারা ভাষাসৈনিক হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকের সাথে ছিল আমার পরিচয়। যেমন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (শেলী), এস এ বারী এটি, মুহাম্মদ সুলতান, লতিফ চৌধুরী, সাদেক খান প্রমুখ। হাবিবুর রহমান, এটি বারী, সুলতান- এদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম রাজশাহী সরকারি কলেজে। এরা তিনজনই পড়তেন রাজশাহী কলেজে। পরে এরা যান ঢাকায় এমএ পড়তে। লতিফ চৌধুরী এবং সাদেক খান ছিল আমার স্কুলজীবনের সাথী। এদের পিতারা ছিলেন একসময় রাজশাহীতে চাকরি উপলক্ষে। লতিফ চৌধুরীর কথা এখন অনেকেই জানেন না। ইনি ছিলেন খুবই ভালো ছাত্র। ইনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক হন। এরপর কোনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি পেয়ে চলে যান সে দেশে। ইনি বাংলা ভাষা আন্দোলনে জেল খাটেন। লতিফ চৌধুরী ও সাদেক খান উভয়েই ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাদেক খানও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। কিন্তু রাজনীতি করতে গিয়ে ছাড়েন পড়াশোনা। গ্রহণ করেন সাংবাদিকের বৃত্তি।</strong></p>
<p>যেসব ভাষাসৈনিককে চিনতাম, তাদের মধ্যে হাবিবুর রহমানই হলেন সবচেয়ে খ্যাতনামা। ইনিও ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। জীবনের সব পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ইনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কেবল ভাষা নিয়ে রাজনীতি করেননি। করেছেন বাংলা ভাষার চর্চা। সঙ্কলন করেছেন বাংলা ভাষার প্রথম ভাব অভিধান, যথাশব্দ। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঠিক হয়েছিল ছাত্ররা আমতলা থেকে তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের গেট দিয়ে ১০ জন ১০ জন করে স্কোয়াড করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন। প্রথম স্কয়াডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান শেলী। আমি তখন ঢাকায় না থাকলেও পরে অনেকের কাছেই অনেক কিছু শুনেছিলাম। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কিন্তু যারা শাহাদত বরণ করেছিলেন, তারা কেউই ছিলেন না ছাত্র মিছিলে। তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। গুলি লেগেছিল তাদের গায়ে। তবে তাদের মৃত্যু বৃথা যায়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিণত হয় বিরাট গণ-আন্দোলনে। আর এই গণ-আন্দোলন কোনো ভাষাসৈনিকের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। আন্দোলন হয়ে উঠেছিল স্বয়ং চালিত। হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল সারা দেশে পথে। আমি জীবনে অনেক আন্দোলন দেখেছি। কিন্তু এত বিরাট আন্দোলন আর প্রত্যক্ষ করিনি ইতঃপূর্বে। এই আন্দোলন গৌরব করারই মতো।<br />
কিন্তু সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্র আজ আর নেই। এখন বাংলাদেশ একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলা ভাষার উন্নয়নে আর কোনো রাষ্ট্র প্রতিবন্ধক হতে পারে না। এখন যা প্রয়োজন, তা হলো, কেবল ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের নিজের প্রচেষ্টা। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিকতাবাদী বুদ্ধিজীবীর অভাব নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিকতাবাদ যেন চাপা পড়ে যেতে চাচ্ছে জাতীয়তাবাদের নিচে। আমরা চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি ১৫টি রিপাবলিক নিয়ে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে পড়তে। দুনিয়ার সর্বহারারা এক হতে পারল না। প্রতিটি জাতি যেন এখন পৃথক পৃথকভাবে বাঁচতে চাচ্ছে। পৃথক পৃথকভাবে যেন হতে চাচ্ছে সুখী ও সমৃদ্ধ। এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদেরও হতে হবে স্বাবলম্বী।</p>
<p><em>এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিতে অনেককে অনেক কথা বলতে শুনলাম, যা আমাকে বিস্মিত করেছে। যেমন বলতে শুনলাম, আমাদের উচিত হবে না বিদেশী ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ। অথচ চীনারা তাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রচুর গ্রহণ করছেন; তাদের ভাষাকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। ইংরেজি ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে প্রচুর বিদেশী শব্দকে আপন করে নিতে পারার কারণে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা এ দেশে এসে কথা বলতে শুরু করেন মিশ্র ভাষায়। যাকে বলা হতো Hobson-Jobson। এই হবসন-জবসন ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় গৃহীত হয়েছে প্রচুর শব্দ। একটি হিসাব অনুসারে প্রায় ৭০০ এর কাছাকাছি, যা ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা যদি ইংরেজি ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করি, তবে বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারও বাড়বে। বাড়বে ভাব প্রকাশের শক্তি। </em></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-conflict-of-language-in-the-subcontinent/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15787</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের দেশ ও সার্বভৌমত্ব ভাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 27 Feb 2025 12:01:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15554</guid>

					<description><![CDATA[ক’দিন আগে পত্রিকার একটি খবর চোখে পড়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলিম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে। তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যক্রম]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ক’দিন আগে পত্রিকার একটি খবর চোখে পড়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলিম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে। তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যক্রম শহীদদের অবমাননার শামিল। হীন এই কার্যক্রমের জন্য এদের নেতা ও কর্মীদের শাস্তি দেয়া উচিত।</p>
<p>১৯৭১ সালে আমি দেশে ছিলাম না। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে আমি চলে যাই কলকাতায়। আর সেখানেই কাটে ১৯৭১ সাল। কলকাতা থেকে দেশে ফিরেছিলাম ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দেশের বহু ঘটনাই কলকাতায় বসে যথাযথভাবে অবহিত হতে পারিনি। অনেক ঘটনার কথা জেনেছি কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল একটি ভয়াবহ ও ঘৃণ্য কাজ। কিন্তু কারা কী লক্ষ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল সেটা আমার কাছে এত দিন পরেও স্বচ্ছ হতে পারেনি। যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতনামা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, সদ্য ইন্তেকাল করা জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ভাই মুনীর চৌধুরীকে। মুনীর চৌধুরীর সাথে আমার কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কাছ থেকে একবার তার বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। বক্তৃতাটি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল বিশেষভাবেই রাজনৈতিক। সে সময় আমার কিছু সহকর্মীর মুখে শুনেছিলাম মুনীর চৌধুরী চীনপন্থী কমিউনিস্ট ভাবধারায় দীক্ষিত ব্যক্তি। আমি ঠিক বলতে পারি না তাদের এই ধারণা কতটা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার চিন্তাচেতনা যে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ধারার সাথে ছিল না, সেটা অনুমান করতে পেরেছিলাম।</p>
<p><strong>১৯৭১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>এ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>চীনপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টরা</strong> <strong>সাবেক</strong> <strong>পাকিস্তানকে</strong> <strong>ভেঙে</strong> <strong>দেয়ার</strong> <strong>পক্ষে</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>না।</strong> <strong>তারা</strong> <strong>নারাজ</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>১৯৭১</strong><strong>&#8211;</strong><strong>এর</strong> <strong>যুদ্ধকে</strong> <strong>মুক্তিযুদ্ধ</strong> <strong>বলতে।</strong> <strong>আলবদর</strong> <strong>আর</strong> <strong>রাজাকারদের</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>সে</strong> <strong>সময়</strong> <strong>বামপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টদের</strong> <strong>কোনো</strong> <strong>সঙ্ঘাত</strong> <strong>ছিল</strong> <strong>না</strong><strong>, </strong><strong>ছিল</strong> <strong>না</strong> <strong>রেষারেষি।</strong> <strong>কেন</strong> <strong>তারা</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীর</strong> <strong>মতো</strong> <strong>একজন</strong> <strong>ব্যক্তিকে</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করতে</strong> <strong>যাবে</strong><strong>, </strong><strong>সেটা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>হিসাবে</strong> <strong>মেলে</strong> <strong>না।</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীকে</strong> <strong>যদি</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>না</strong> <strong>হতো</strong> <strong>তবে</strong> <strong>এই</strong> <strong>হত্যার</strong> <strong>প্রচলিত</strong> <strong>ব্যাখ্যা</strong> <strong>আমার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>গ্রহণযোগ্য</strong> <strong>হতো।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তা</strong> <strong>এখন</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারে</strong> <strong>না</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরী</strong> <strong>নিহত</strong> <strong>হওয়ার</strong> <strong>কারণে।</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীর</strong> <strong>বড়</strong> <strong>ভাই</strong> <strong>কবীর</strong> <strong>চৌধুরী</strong> <strong>যত</strong> <strong>দূর</strong> <strong>জানি</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>দক্ষিণপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্ট</strong> <strong>ঘেঁষা।</strong> <strong>অর্থাৎ</strong> <strong>যাদের</strong> <strong>বলা</strong> <strong>হতো</strong> <strong>মস্কোপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্ট</strong><strong>, </strong><strong>তিনি</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>তাদেরই</strong> <strong>সাথে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তাকে</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়নি।</strong> <strong>হত্যা</strong> <strong>করা</strong> <strong>হয়েছে</strong> <strong>মুনীর</strong> <strong>চৌধুরীকে।</strong> <strong>১৯৭১</strong> <strong>সালে</strong> <strong>এ</strong> <strong>দেশের</strong> <strong>দক্ষিণপন্থী</strong> <strong>কমিউনিস্টরা</strong> <strong>পুরোপুরি</strong> <strong>হাত</strong> <strong>মিলিয়েছিলেন</strong> <strong>শ্রীমতী</strong> <strong>ইন্দিরা</strong> <strong>গান্ধীর</strong> <strong>সাথে।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>কেউ</strong> <strong>খুন</strong> <strong>হননি</strong> <strong>আলবদর</strong> <strong>রাজাকারদের</strong> <strong>হাতে।</strong> <strong>অন্তত</strong> <strong>আমার</strong> <strong>জানা</strong> <strong>মতে।</strong></p>
<p>১৯৭১-এর অনেক ঘটনাই তাই আমার হিসাবে মিলতে চায় না। যত দূর জানি, কবীর চৌধুরীর আরেক ভাই ছিলেন, বিশেষভাবেই পাকিস্তানপন্থী। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করার সময় তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেন বর্তমান পাকিস্তানের লক্ষ্যে। আমার মনে পড়ছে জহির রায়হানের কথা। জহির রায়হানের সাথে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না। পরিচয় হয় কলকাতায়। জহির রায়হান ছিলেন চীনপন্থী কমিউনিস্ট। কেন তিনি ১৯৭১-এ কলকাতায় গিয়েছিলেন আমি তা জানি না। কলকাতায় তার কোনো আশ্রয় ছিল না। আমি তাকে একটা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম। আমি এটা করে দিয়েছিলাম তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছায়াছবি দেখে ভালো লেগেছিল বলে; তিনি চীনপন্থী ছিলেন বলে নয়।</p>
<p><strong>জহির রায়হান ১৯৭২ সালে মারা যান রহস্যজনকভাবে। ঢাকা এই সময় ছিল ভারতীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নয়। আলবদর, রাজাকারেরা যে তাকে মেরে ফেলেনি সেটাও সুনিশ্চিত। কিন্তু তার মৃত্যু এখনো হয়ে আছে রহস্যাবৃত। জহির রায়হানকে সম্ভবত মেরে ফেলা হয় তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য। ১৯৭১-এ আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় সিপিআই (এম) সমর্থকদের বলতে শুনেছি, শেখ মুজিব হলেন মার্কিন অ্যাজেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে তিনি ধরা দিয়েছিলেন ইয়াহিয়ার হাতে। তিনি আসলে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পক্ষে নন। কলকাতায় থাকার সময় আমি পশ্চিম বাংলার গ্রামে গিয়েছি। পশ্চিম বাংলার মুসলমানেরা ছিলেন ১৯৭১-এর যুদ্ধের বিশেষ বিরোধী। তাদের বক্তব্য ছিল এটা কোনো মুক্তিযুদ্ধ নয়। ইন্দিরা গান্ধী ষড়যন্ত্র করে ভেঙে দিতে চাচ্ছেন পাকিস্তানকে। এটা আসলে হলো তার ষড়যন্ত্রেরই ফল।</strong></p>
<p>শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক কী চেয়েছিলেন আমার কাছে এখনো তা স্বচ্ছ নয়। তিনি ৭ মার্চ রমনা ময়দানে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাতে তিনি দাবি করেন, তিনি হলেন পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু দলের নেতা। তাই তার আছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অধিকার। কিন্তু ইয়াহিয়া সেটা হতে দিচ্ছেন না। তাই এবারের সংগ্রাম হয়ে উঠেছে মুক্তির সংগ্রাম। আমার মনে হয়, ইয়াহিয়া যদি আইনানুসারে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতেন তবে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে পড়ত না।</p>
<p>১৯৭১-এ যা ঘটেছে সেটা ঘটতে পেরেছে তদানীন্তন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার রাজনৈতিক ভুলের কারণেই। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পান পাকিস্তানের কারাগার থেকে। কিন্তু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেননি। তিনি ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে যান গ্রেট ব্রিটেনে। সেখানে দেখা করেন গ্রেট ব্রিটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-এর সাথে। কেন তিনি পাকিস্তান থেকে গ্রেট ব্রিটেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা এখনো রয়েছে অজ্ঞাত।</p>
<p>সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ : এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে বলেছেন, শেখ মুজিব তাকে (মাসকারেনহাস) বলেন যে, তিনি (শেখ মুজিব) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছেদ চাচ্ছেন না। রাখতে চাচ্ছেন একটা বিশেষ রকমের সংযোগ (Link)। তবে এই সম্পর্কে তিনি বিস্তারিতভাবে কিছু আলোচনা করতে ইচ্ছুক নন, যা বলার তা তিনি বলবেন বাংলাদেশে যেয়ে, তার সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করার পরে।</p>
<p><em>শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে চার দিন পাকিস্তানে ছিলেন। এই ক’দিন তার সাথে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর অনেক আলোচনা হয়েছিল। এসব আলোচনার একটা প্রভাব সম্ভবত পড়েছিল তার ওপর। ভুট্টো তাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ দখল করেছে ভারতীয় বাহিনী। একমাত্র শেখ মুজিব তার বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে পারেন। না হলে বাংলাদেশ কার্যত চলে যাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। প্রকৃত পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য শেখ মুজিব যান ব্রিটেনে। বিলাতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে অবগত হতে চান তিনি। শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফেরার পর তাজউদ্দীনের সাথে তার গুরুতর মতভেদ ঘটে। একপর্যায়ে তাজউদ্দীন বাদ পড়েন মন্ত্রিপরিষদ থেকে।</em></p>
<p>অনেক ঘটনাই নেপথ্যে ঘটেছিল। ১৯৫৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তদানীন্তন পাকিস্থানের হয়েছিল একটি গোপন চুক্তি। এই চুক্তির কারণে, ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর কয়েকটি মার্কিন রণতরী ও বিমানবাহী জাহাজ এন্টারপ্রাইজ এসে পৌঁছায় বঙ্গোপসাগরে। মার্কিন চাপে ভারত বাধ্য হয়েছিল যুদ্ধ থামাতে এবং প্রধানত মার্কিন চাপেই ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারত তার সৈন্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা ছিল ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্য ঘটতে পেরেছিল অনেক ঘটনা। ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ছিল এক অক্ষে।</p>
<p>এখন অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। কমিউনিজম এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো সমস্যা নয়। এখন তাকে পেয়ে বসেছে জঙ্গি ইসলাম আতঙ্কে। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে এই আতঙ্ক রাখছে বিশেষ প্রভাব। ইসলাম এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বরাজনীতির একটা উল্লেখযোগ্য উৎপাদক (Factor)। যেটা ১৯৭১-৭২ সালে ছিল না। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অবস্থান করছে একই অক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক দিকে যেমন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইসলাম আতঙ্ক দিয়ে, অন্য দিকে তেমনি আবার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে চীন আতঙ্ক দিয়ে। এই দুই আতঙ্ক নির্ধারণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ভারতকে দিয়ে এশিয়ায় চীনকে সংযত রাখতে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ভাবা উচিত অনেক ভিন্নভাবে। কিন্তু আমরা সেটা করতে যাচ্ছি না। আমরা এখনো থাকতে চাচ্ছি ১৯৭১-এর যুগে। আমাদের চিন্তা থেমে আছে ১৯৭১-এর জগতে। সেটাকে বলতে হবে জাতির অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক।</p>
<p>ভারতের পত্রপত্রিকার খবর অনুসারে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে নাকি প্রায় দুই কোটি লোক চলে গিয়েছেন ভারতে। যারা ভারতের জন্য হয়ে উঠেছেন বিশেষ সমস্যার কারণ। সুব্রামনিয়ান এক সময় ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট। এখন তিনি হলেন ভারতের বিজেপি দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেছেন যে, ভারতের উচিত হবে খুলনা ও সিলেট অঞ্চলের কিছু জায়গা দখল করা। এই জায়গা দখল করে সেখানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসা দুই কোটি লোকের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া। সুব্রামনিয়ান ভারতের একজন সাধারণ নাগরিক নন। তার চিন্তাধারা ভারতকে তার নীতিনির্ধারণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। আমাদের দেশে কথিত বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতরা এই ব্যাপারটি নিয়ে কোনো কিছু ভাবছেন কি না আমি সে সম্পর্কে জ্ঞাত নই। পত্রপত্রিকায় প্রচার চলছে ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি না দিলে বাংলাদেশ আবার পরিণত হবে পাকিস্তানে। ছড়ানো হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তান-বিদ্বেষ। কিন্তু পাকিস্তান-বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করা যাবে না।</p>
<p><strong>আমাদের ভাবতে হবে বর্তমান পরিস্থিতির উপযোগীভাবে। কোনো জাতির জীবনে একটি যুদ্ধই শেষ যুদ্ধ হয় না। অনেক যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয় একটা জাতিকে। আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে শেষ যুদ্ধ ভাবার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। এ দেশের মানুষ এখন আর একাত্তরের মতো ভারতপ্রেমী হয়ে নেই। দেশে ভারতবিমুখী প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির কারণে নয়। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ব্যবহার এ দেশের মানুষের মনোভাবকে করে তুলছে ভারতবিমুখী। এটা কোনো পাকিস্তান-প্রবণতার পরিচয় বহন করছে না। পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে। সে আর আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টিকারী দেশ নয়। কিন্তু ভারত আছে আমাদের তিন দিক ঘিরে। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে এ দেশের মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে এবং হয়ে উঠছে সন্দিহান। তারা চাচ্ছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে। দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে নয়। খবরে প্রকাশ, চীন পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে প্রয়োজনে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারে। ভারত বাংলাদেশকে কব্জা করতে চাইলে চীন কী নীতি গ্রহণ করবে সেটা আমাদের কাছে এখনো জল্পনারই বিষয়।</strong></p>
<p>তবে মনে হয় এই উপমহাদেশে একটা বড় রকমের যুদ্ধ হতে পারে। আর আমাদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন এই যুদ্ধের জন্য। প্রাচীন যুগে যুদ্ধ হয়েছে রাজায় রাজায়। যুদ্ধ সীমাবদ্ধ থেকেছে দু’টি রাজার সেনাবাহিনীর মধ্যে। কিন্তু এখন যুদ্ধ হয় দেশে দেশে। যুদ্ধ হয়ে ওঠে ‘টোটাল ওয়ার’ বা সামগ্রিক যুদ্ধ। এতে জড়িয়ে পড়ে একটি দেশের সমগ্র জনসমষ্টি। যুদ্ধ একটি ক্ষতিকর ভয়াবহ ঘটনা। কিন্তু এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় একটি দেশের প্রতিটি নাগরিককে। আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/thinking-of-our-country-and-sovereignty/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15554</post-id>	</item>
		<item>
		<title>আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ</title>
		<link>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 09 Feb 2025 13:56:53 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<category><![CDATA[রাজনীতি]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15531</guid>

					<description><![CDATA[বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জাতিসত্তার একটি উপাদান হলো ভাষা। আর একটি উপাদান হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ২০১২ সালে প্রকাশ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতিসত্তার উপাদান দু’টি। একটি হলো বাংলা ভাষা]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জাতিসত্তার একটি উপাদান হলো ভাষা। আর একটি উপাদান হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ২০১২ সালে প্রকাশ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলমানের জাতিসত্তার উপাদান দু’টি। একটি হলো বাংলা ভাষা আর একটি হলো ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা। আওয়ামী লীগের জয় বাংলা আওয়াজের সাথে শেখ মুজিবের এই ধারণা মনে হচ্ছে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই বাংলা আসলে কোন বাংলা; আর বাঙালি বলতেই বা ঠিক কাদের বুঝতে হবে। কেননা বাংলাভাষী মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশ বাস করেন বাংলাদেশে আর ৪০ শতাংশ বাস করেন ভারতে। এর মূলে আছে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। ১৯৪৭ সালে বাংলা প্রদেশ ভাগ হয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে।</p>
<p>যার উদ্ভব এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে হতে পেরেছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, মুসলিম লীগে দ্বিজাতিতত্ত্ববাদ ছিল সঠিক। অথচ এখন আওয়ামী লীগের কিছু তাত্ত্বিক বলছেন, ধর্মকে রাজনীতির সাথে জড়ানো ছিল প্রতিক্রিয়াশীলতা। এদের কথা মানলে শেখ মুজিবকেও বলতে হয় একজন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদ। এ উপমহাদেশে কাকে বলব জাতীয়তাবাদ আর কাকে বলব সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় মনোভাবের অভিব্যক্তি, সেটি নির্ণয় করা খুবই কঠিন। ভারতে শিখেরা এখন চাচ্ছে স্বাধীন হতে। একটা পৃথক রাষ্ট্র গড়তে, যা তারা ইতঃপূর্বে চাননি। এই শিখ জাতীয়তাবাদের মূলে আছে শিখ ধর্মবিশ্বাস। আছে গুরুমুখী অক্ষরে লেখা পাঞ্জাবি ভাষা, যা প্রধানত শিখরাই বিশেষভাবে চর্চা করে থাকেন। ১৯৪৭ সালে ভাগ হয় ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশ; আর ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব প্রদেশ। পূর্ব পাঞ্জাব পড়ে পাকিস্তানে আর সাবেক পাঞ্জাব প্রদেশের পশ্চিম ভাগ পড়ে ভারতে।</p>
<p>ভারতের পাঞ্জাব বিভক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে দু’টি প্রদেশ। একটির নাম হচ্ছে পাঞ্জাব। যেখানে বাস করেন প্রধানত শিখরা। যার সরকারি ভাষা হলো পাঞ্জাবি। আর তা লেখা হয় গুরুমুখী অক্ষরে। অন্য দিকে সাবেক পাঞ্জাবের হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে এখন গঠিত হয়েছে ভারতের হরিয়ানা প্রদেশ, যার সরকারি ভাষা হয়েছে সংস্কৃত শব্দবহুল হিন্দি ভাষা। তা লেখা হয় দেবনাগরি অক্ষরে। ভারতে জাতিসত্তার সমস্যা এখনো মেটেনি। শিখ জাতীয়তাবাদকে কেউ বলছেন না ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা কথাটি যেন কেবল মুসলমানদের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারছে। এর মূলে আছে ভারতের একসময়ের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও পরে প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর চিন্তাচেতনা। যার একটা প্রভাব থাকতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের তাত্ত্বিকদের ওপর। এদের প্রভাবেই আওয়ামী লীগ বলছে, বিশেষভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। গ্রহণ করছে না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণাকে।</p>
<p>আমাদের বর্তমান জাতীয় নির্বাচনে দু’টি প্রধান ইস্যু হচ্ছে, বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, আর একটি হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চর্চাকে আবার ফিরিয়ে আনা। এর কোনোটাই কাম্য নয় আওয়ামী লীগের। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। যা আগে এ অঞ্চলে ছিল না। তার এই শক্তি সঞ্চয়ের মূলে কাজ করছে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য চেতনা, যা হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্যতম উপাদান।</p>
<p>বাংলাদেশের মানুষের নৃ-জাতিক ইতিহাস এখনো যথাযথভাবে পরীক্ষিত হয়নি। এর বেশির ভাগই হয়ে আছে অজানা। একসময় মনে করা হতো বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে ইসলাম প্রচার প্রধানত ঘটেছিল নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে; উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে নয়। উচ্চবর্ণের হিন্দু বলতে বোঝায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের। বাংলাদেশে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে কায়স্থদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ১৯৪১ সালে জার্মান ইহুদি মহিলা গবেষক (J. W. E. Macfarlan) পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমানের রক্তের গ্রুপের হার নির্ণয় করেন। এবং দেখেন, তার মিল হচ্ছে নিম্নবর্ণের হিন্দু বলে কথিতদের রক্তের গ্রুপের সাথে। এর ফলে ভাবা আরম্ভ হয়, নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়ার ধারণা সঠিক। কিন্তু পরবর্তীকালে দিলীপ কুমার সেনের গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের হার হলো তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরেই অনুরূপ। (দ্রষ্টব্য, Indian Anthropology. Edt T. N. Madan and Gopala Sarana; Asia publishing House, London 1962)।</p>
<p>তাই আগের মতো আর বলা যায় না যে, কেবল নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই উচ্চবর্ণের ঘৃণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এখন জানা গিয়েছে, কুমিল্লা অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন প্রথমে দেব ও পরে চন্দ্র বংশের রাজারা। এরা হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন বৌদ্ধ। এদের রাজত্ব দক্ষিণবঙ্গেও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশে তাই হিন্দুরা নন, বৌদ্ধরাই সম্ভবত দলে দলে গ্রহণ করেন ইসলাম। যেমন তারা গ্রহণ করেছেন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার জনসমষ্টিকে একত্র করলে আমরা দেখতে পাই, এ অঞ্চলেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলমানের বাস। সম্ভবত আরবি ভাষার পরই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলমান কথা বলেন বাংলা ভাষায়। বাংলাদেশ টিকে থাকলে একদিন বাংলা ভাষাকে বিশ্বে মুসলমানের ভাষা হিসেবে গণ্য করা হবে। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন পড়েছে বাংলাদেশের মানুষের ওপর।</p>
<blockquote><p>বঙ্গ নামটি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। ভারতের খ্যাতনামা মহিলা নৃতাত্ত্বিক Irawati Karve (ইরাবতী কার্ভে), তার মতে, <strong>বঙ্গ শব্দটি আর্য ভাষা পরিবারের নয়। নামটি এসেছে চীনা পরিবারভুক্ত কোনো ভাষা থেকে। চীনা পরিবারভুক্ত ভাষায় ‘য়ং’ ধ্বনি সাধারণত নদীর নামের সাথে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। যেমন- ইয়াংসিকিয়ং, হোয়াংহো, সাংপো প্রভৃতি। বঙ্গ ছিল একটা নদীর নাম। আর তার তীরবর্তী মানুষদের বলা হতো বাঙালি। এরা চীনাদের মতো একই পদ্ধতিতে ধান চাষ করত। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখি, মুসলিম নৃপতিদের শাসনামলে বঙ্গ নামটি একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাস বইয়ে উল্লিখিত হতে। ফারসিতে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বলা হতো মুলুক বাঙ্গালাহ।</strong> এর মধ্যে পড়ত রাজধানী গৌড়। মুসলিম শাসনামলের আগে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতো না।</p></blockquote>
<p>মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৮৫ সালে তার ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের প্রস্তাবনায় লিখেছেন-</p>
<p><em>‘অলীক কূনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে</em><br />
<em>নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।’</em><br />
অর্থাৎ <strong>মাইকেল মধুসূদনের সময়ও সাধারণত বাংলা ভাষায় বঙ্গ বলতে বুঝাত পূর্ববঙ্গকে। আর পশ্চিমবঙ্গ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো রাঢ় নামটি।</strong> পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নামের পরিবর্তে প্রদেশটির নাম করতে চাচ্ছেন কেবলই বঙ্গ। আমার মনে হয়, এ রকম নামকরণ করলে আমাদের ইতিহাস রচনায় হতে পারবে যথেষ্ট বিভ্রান্তি। এমনকি আমাদের জাতিসত্তার রূপ নিয়ে সৃষ্টি হতে পারবে অস্পষ্টতা।</p>
<p>একসময় বলা হতো বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার হতে পেরেছে প্রধানত বল প্রয়োগের মাধ্যমে। মুসলমান নৃপতিরা জোর করে হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু এখন এই মতকে আর আগের মতো ধরে রাখা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারি শুরু হয় ১৮৭১ সাল থেকে। এ সময় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল বেশি। এরপর আদমশুমারি হয় ১৮৮১ সালে। এই আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা কমতে এবং মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে। এরপর থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ক্রমেই মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে। কেন এমন হতে পেরেছে, তার কারণ জানা যায় না।</p>
<p>তবে একটি মত হলো হিন্দুদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে বহু ব্যক্তি গ্রহণ করতে থাকেন কেরানির চাকরি। রুদ্ধঘরে কেরানিগিরি করতে গিয়ে ঘটে এদের স্বাস্থ্যহানি। কমে এদের প্রজননক্ষমতা। কিন্তু মুসলমানেরা লেখাপড়া শিখে কেরানি হতে চাননি। তারা মুক্ত প্রকৃতিতে করেছেন ক্ষেতখামারে কাজ। হয়েছেন নৌকার মাঝিমাল্লা। মুক্ত প্রকৃতিতে তাদের স্বাস্থ্য থেকেছে অটুট। কমেনি তাদের প্রজননক্ষমতা। তাই বাড়তে পেরেছে হিন্দুর তুলনায় মুসলমানের সংখ্যা।</p>
<p>এই ধারণার কিছুটা সমর্থন পাওয়া যায় এ ঘটনা থেকে, যেসব মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছেন তাদের গর্ভে অধিক সন্তানের জননী হওয়া থেকে। ইংরেজ আমলে জোর করে হিন্দুকে মুসলমান করার সুযোগ ছিল না। তাই বলা চলে না বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ হিন্দুদের বল প্রয়োগ করে মুসলমান করা।</p>
<p>সারা দেশ এখন নির্বাচনে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। মহলবিশেষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় এলে এ দেশে হিন্দুরা বাস করতে পারবেন না। কিন্তু কোনো ইসলামপন্থী দলই এ দেশ থেকে চাচ্ছে না হিন্দু বিতাড়ন করতে। কারণ, এ দেশে এখন হিন্দু আর বেশি নেই। তা ছাড়া যেসব হিন্দু আছেন, তাদের মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুর চেয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুই বেশি। যারা ভারতে চলে যেতে এমনিতেই ইচ্ছুক নন। থাকতে চান এ দেশের মাটিকে আঁকড়ে ধরে। সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছে জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনীতি করার জন্য। তাদের মারদাঙ্গা করে ক্ষমতা দখল করার ইচ্ছা থাকলে তারা কখনোই নির্বাচনে অংশ নিত না। সেই পথেই চলার জন্য সুসংগঠিত হতে থাকত।</p>
<p>গণতন্ত্রের একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবেই। ব্রিটেনে আছে একাধিক রাজনৈতিক দল। ব্রিটেনে প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র। নির্বাচন আরম্ভ হয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধি হওয়ার জন্য। আর এ জন্যই বিলাতে প্রথম সৃষ্টি হতে পারে রাজনৈতিক দল। কিন্তু বিলাতের আইনে রাজনৈতিক দলের কোনো স্বীকৃতি নেই। রাজনৈতিক দল সেখানে হলো আইনের বাইরে বাড়তি প্রতিষ্ঠান। তা আইনিও নয় আবার বেআইনিও নয়। রাজনৈতিক দলকে বলে Extra Legal Growth। বিলাতের কোনো লিখিত সংবিধান নেই। বিলাতের শাসনব্যবস্থা চলেছে বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টকৃত কতগুলো অ্যাক্টের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে লিখিত সংবিধান। তাতেও নেই কোনো রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি। সেখানেও রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে এক্সট্রা লিগ্যাল গ্রোথ হিসেবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের আইনি নিবন্ধন ব্যবস্থা কেন করা হয়েছে, আমার কাছে তা স্বচ্ছ নয়। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী একটি সংবিধানসম্মত দল নয়। তাই সে পারছে না জাতীয় নির্বাচনে দল হিসেবে অংশগ্রহণ করতে।</p>
<p>অথচ এ দেশেও সেটি পেরেছে একসময় দল হিসেবে দাঁড়াতে। কেবল তাই নয়, হতে পেরেছে মন্ত্রিসভার সদস্য। জামায়াত দল হিসেবে দাঁড়াতে না পারলেও, জামায়াতের প্রার্থীরা কম করে ২৩ জন দাঁড়িয়েছেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে। এ ছাড়া, বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়েছেন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীকে আইনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি। জামায়াতে ইসলামীকে সমালোচনা করা হচ্ছে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী দল হিসেবে। কিন্তু সে যদি জঙ্গিবাদ চাইত, তবে নির্বাচনে অংশ নিত না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা আমার বোধগম্য নয়। কেননা, যে বামপন্থী দল একদিন চেয়েছিল বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব করতে; অর্থাৎ সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করতে, তাদের কিন্তু সংবিধান পরিপন্থী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না।</p>
<p>আওয়ামী লীগ একদিন করেছিল বাকশাল প্রতিষ্ঠা। বাকশাল ছিল একটা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখনো আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থার জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ করেনি। কিন্তু তাকে পোহাতে হচ্ছে না কোনো আইন-আদালতের ঝঞ্ঝাট। ইলেকশন কমিশনার বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর যেসব সদস্য নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অথবা নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, তারা নির্বাচন করতে পারবেন। তার এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই মনে হবে গণতন্ত্রের অনুকূল।<br />
ধর্ম কেবল যে আমাদের দেশের রাজনীতিতেই সংযুক্ত হতে পারছে তা নয়। ইউরোপের বহু দেশেই আছে ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল। বিশেষ করে জার্মানিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বিভক্ত হয় পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানিতে। পশ্চিম জার্মানিতে ক্ষমতায় আসে খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল। আর তাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে গড়ে ওঠে পশ্চিম জার্মানি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। এখন পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানি একত্র হয়েছে।</p>
<p>জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তিনি হলেন একজন খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী হওয়ার কারণে কেন তাকে একটি অনিবন্ধিত দল হতে হবে, সেটি বোঝা যথেষ্ট কঠিন। ধর্ম মানুষকে একটা উৎসর্গের মনোভাব প্রদান করে, যা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে সেবামূলক রাজনীতিতে।</p>
<p>আমাদের রাজনীতির একটা বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এই রাজনীতি যতটা না সেবামূলক, তার চেয়ে অনেক বেশি হলো দাবিমূলক। যদিও দেশে সেবামূলক রাজনীতির প্রয়োজনই বেশি। রাজনীতিতে থাকতে হয়, যাকে বলে পাবলিক স্পিরিট এর প্রাধান্য।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/the-nature-of-our-nationhood/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15531</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলাদেশের সমুদ্র আইন ও সমসাময়িক ভাবনা</title>
		<link>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 02 Feb 2025 13:13:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[আন্তর্জাতিক রাজনীতি]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও লেখা]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15511</guid>

					<description><![CDATA[আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ জাতির অধিকারের ব্যাপার হতে পারে না। সমুদ্রে থাকতে হবে সব জাতির জাহাজ চলাচলের সমান অধিকার। কিন্তু একটা দেশের কাছে অবস্থিত সমুদ্রে কিছু দূর পর্যন্ত থাকা উচিত সে দেশের কর্তৃত্ব। কারণ তা না থাকলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশটির নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। প্রত্যেকটি জাতি চায় তার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা চাওয়া হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। যেকোনো আইনে তাই একে নিতে হবে বিশেষ বিবেচনায়।</p>
<p><strong>গ্রোশিয়াসের এই প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা নিয়ে সূত্রপাত ঘটে সমুদ্র আইনের। ঠিক হয় একটা সমুদ্র তীরবর্তী দেশ, সেই দেশ থেকে কামানের গোলা ছুড়লে তা যত দূর গিয়ে পড়বে, সেই দূরত্বের মধ্যে সমুদ্র সীমানা হবে তার নিজের। সেখানে থাকবে তার কর্তৃত্ব। সে সময় কামানের গোলা খুব বেশি দূর যেত না। সাধারণত কামানের পাল্লা ছিল পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু ক্রমেই কামানের পাল্লা বাড়তে থাকে। আর সমুদ্র আইনে দেখা দেয় জটিলতা। এখন একটা দেশের সমুদ্র নিয়ে হয়েছে অনেক সুস্পষ্ট আইন।</strong> আইন না বলে একে আসলে বলা উচিত কনভেনশন বা প্রথা। গঠিত হয়েছে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল &#8220;International Tribunal for the Law of the Sea&#8221;, সংক্ষেপে (ITLOS)। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই এই ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত। এই দুই দেশই মেনে নিয়েছে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের অধিকার।</p>
<p>বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার জন্য এই ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল মিয়ানমারের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবরে। মামলার রায় এখন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বিরোধ ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার। আর মিয়ানমার পেয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। এই রায়ে এই দুই দেশের কেউ-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হারজিত হয়নি কারো। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে বলছে, এই রায়ে বাংলাদেশ জিতেছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।<br />
সমুদ্রতীরবর্তী একটা দেশের ভূমির কিছুটা অংশ থাকে সমুদ্রের পানির মধ্যে। এখানে সমুদ্রের গভীরতা সাধারণত থাকে ১৮০ মিটারের কাছাকাছি। সমুদ্রের পানির মধ্যে একটা দেশের ডুবে থাকা এই অংশকে বলে মহীসোপান (Continental Shelf)।</p>
<p>মহীসোপান ঢালুভাবে নেমে যায় সমুদ্রের মধ্যে। এই ঢালু জায়গাকে বলা হয় মহীঢাল (Continental Slope)। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে দু’ভাবে। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়। বিশেষ করে ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ ডাঙার যে অংশে এসে আছড়ে পড়ে সেই অংশে। কারণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ডাঙার এই অংশ ক্ষয় হয়। এখানে এসে জমতে পারে সমুদ্রের পানি অগভীরভাবে। আবার মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে জমে। <strong>আমাদের দেশে সমুদ্র উপকূলে মহীসোপান বেড়ে চলেছে। এটা হতে পারছে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে এসে জমার ফলে। পলিমাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে সমুদ্র। ফলে বাড়ছে বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ। বাংলাদেশ সমুদ্রের যে অংশ পেল, নদীবাহিত পলিমাটি জমে সমুদ্র ভরাট হয়ে একদিন সেখানে জেগে উঠবে মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি। সেটা হবে বাংলাদেশেরই অংশ।</strong> আপাতত সমুদ্রের যে এলাকা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ পেতে পারল, সেখানে বাংলাদেশের জেলেরা গিয়ে অবাধে মাছ ধরতে পারবে, যা অনেক পরিমাণে পূরণ করবে বাংলাদেশের মৎস্যের চাহিদা। সমুদ্রের পানির নিচে এখন যে অংশ আছে, সেখানে পাওয়া যেতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল, যা উঠাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে পারবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ।</p>
<p>ভারতের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেনি। কারণ ভারত চায়নি এই ট্রাইব্যুনালে যেতে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হেগে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। এই আদালত যে রায় দেবে ভারত তা না-ও মানতে পারে। কারণ কোনো দেশ এই আদালতের সালিশ মানতে সেভাবে বাধ্য নয়। বাংলাদেশ তাই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার সমুদ্রের ওপর অধিকার যেভাবে পেতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে তা পেতে পারবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে গিয়ে ভুল কাজ করেনি। কারণ তার নৌবহর এমন শক্তিশালী নয় যে, সে সামরিক শক্তিবলে ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের তাই নির্ভর করতে হবে আন্তর্জাতিক সালিস আদালতেরই ওপর।</p>
<p>মিয়ানমার ও ভারতের ইতিহাস ভিন্ন। মিয়ানমার বা বার্মা একসময় ছিল ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। যেমন প্রদেশ ছিল বাংলা। মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ-ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কিন্তু মিয়ানমার ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। থাকে না আর ব্রিটিশ-ভারতের একটি প্রদেশ হয়ে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ-ভারত থেকে হতে পেরেছিল পৃথক। যদি সে এভাবে পৃথক হতে না পারত তবে ভারত হয়তো এখন দাবি করত মিয়ানমারকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। যেমন সে দাবি করছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে।</p>
<p>মিয়ানমারের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমানা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশকে যেমন ভারত তিন দিক থেকে ঘিরে আছে, মিয়ানমার সেভাবে ঘিরে নেই। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ নেই। কিন্তু ভারতের সাথে বাংলাদেশের আছে ঐতিহাসিক বিরোধ। মিয়ানমারের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের চার গুণের বেশি। কিন্তু মিয়ানমার তা বলে চাচ্ছে না বাংলাদেশকে দখল করে তাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু ভারত স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। তাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে উঠছে কঠিন। ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা হওয়াও তাই যে সহজ হবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। সেখানেও দু’টি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ বাধার সৃষ্টি করতে পারে।</p>
<p>মিয়ানমারের যে প্রদেশকে আমরা বলি আরাকান, আর মিয়ানমার এখন বলে রাখাইন, তার সাথে আমাদের আছে সাধারণ সীমানা। কিন্তু এই সীমানা নিয়ে এখন আর কোনো বিরোধ নেই। এটা নিষ্পত্তি হতে পেরেছে পাকিস্তান আমলে। আরাকানি মুসলমানদের সাধারণভাবে বলা হয় রোহিঙ্গা। সাধারণ বৌদ্ধ আরাকানি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের ফলে ১৯৯১ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, যাদের অনেকে এখনো আরাকানে ফিরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে এদের যাপন করতে হচ্ছে খুবই করুণ জীবন। তবে বার্মার সাথে এ নিয়ে বাংলাদেশ জড়াতে চাচ্ছে না বিবাদে। <strong>ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের দোহাজারী রেলস্টেশন থেকে আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ স্থাপনের একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান মিয়ানমারকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে। আরাকানসহ সমস্ত মিয়ানমার ১৯৪২ সালে চলে যায় জাপানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকেছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। এরপর বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের।</strong> এ রকম রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে ভৌগোলিক কারণে বাড়বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমাণ। আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।</p>
<p><strong>আরাকানের সাথে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এখনো সহজ হতে পারেনি। বাংলাদেশের সাথে আরাকানের রেল যোগাযোগ হলে আরাকানে ব্যবসায়-বাণিজ্য তাই বাংলাদেশের সাথে বেড়ে যেতেই চাইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য সৃষ্টি করবে উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর বিশেষ পরিবেশ। ভারত সম্ভবত চাচ্ছে না এ রকম মৈত্রীর বন্ধন গড়ে ওঠা। তাই বাংলাদেশে ভারতঘেঁষা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিল, মিয়ানমার মানতে ইচ্ছুক নয় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়।</strong> মিয়ানমার সৈন্যসমাবেশ করছে আরাকান-বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন্তু আরাকানে এ রকম সৈন্যসমাবেশ মিয়ানমার ঘটায়নি। এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমরা মিয়ানমারের সাথে কোনো সংঘাত চাই না। আমরা কোনো সংঘাত চাই না ভারতেরও সাথে।</p>
<p>তাই আমরা মামলা করেছি আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। আইনের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আসতে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন আসলে কোনো আইন কি না তা নিয়ে আছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক। কারণ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারী দেশকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শাস্তি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আইনের পক্ষে শক্তির সমর্থন না থাকলে আইনের বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হতে বাধ্য। সমুদ্র আইন আছে, কিন্তু সমুদ্র আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তি প্রদানের কোনো ব্যবস্থা এখনো নেই।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/maritime-law-of-bangladesh-and-contemporary-thought/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15511</post-id>	</item>
		<item>
		<title>সিপাহি অভ্যুত্থান</title>
		<link>https://rowyakbd.com/soldier-rebellion/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/soldier-rebellion/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 28 Apr 2024 11:18:34 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=14050</guid>

					<description><![CDATA[১৮৫৬ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলাত থেকে আমদানি করে এনফিল্ড রাইফেল। এই রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হতো তার গায়ে দেওয়া হত চর্বির একটা বিশেষ প্রলেপ। এই চর্বির প্রলেপ দেবার কারণ ছিল, কার্তুজ যাতে পানিতে ভিজে নষ্ট না হতে পারে। এই]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>১৮৫৬ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলাত থেকে আমদানি করে এনফিল্ড রাইফেল। এই রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হতো তার গায়ে দেওয়া হত চর্বির একটা বিশেষ প্রলেপ। এই চর্বির প্রলেপ দেবার কারণ ছিল, কার্তুজ যাতে পানিতে ভিজে নষ্ট না হতে পারে। এই কার্তুজ এনফিল্ড রাইফেলে ভরবার আগে ওই চর্বির আবরণ দাঁত দিয়ে কেটে ফেলে দিতে হতো। জানাজানি হয়, ওই চর্বির আস্তরণ প্রস্তুত করা হয় শূকর ও গরুর চর্বি মিশিয়ে। মুসলমান সৈন্যরা এটা জেনে ক্ষুব্ধ হন, কারণ শূকর তাদের ধর্মে খাওয়া নিষিদ্ধ (হারাম)। অন্যদিকে হিন্দু সৈন্যরাও এটা জেনে ক্ষুব্ধ হন, কারণ গো-মাংস তাদের ধর্মে খাওয়া নিষিদ্ধ। গো-চর্বি তাই তারা দাঁতে কাটতে পারেন না। প্রথমে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে এই কার্তুজ ব্যবহারের অস্বীকৃতি জানান সৈন্যরা। পরে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২৯ মার্চ বারাকপুর সেনানিবাসে মঙ্গল পাণ্ডে নামে একজন ব্রাহ্মণ সৈনিক প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েকজন ব্রাহ্মণ সৈন্য। এভাবেই বাংলায় প্রথম শুরু হয় সিপাহি অভ্যুত্থান। অবশ্য এই সৈন্যরা বাঙালি ছিলেন না। প্রথমে এই বিদ্রোহের কারণ ছিল ধর্মীয় আবেগ। কিন্তু পরে এই বিদ্রোহ পরিগ্রহ করে রাজনৈতিক রূপ। প্রথমে সৈন্যদের মধ্যে কোনো পরিকল্পনা ও সংগঠন ছিল না। কিন্তু বিদ্রোহ আরম্ভ হলে তা গড়ে উঠতে শুরু করে। কেবল তাই নয়, উত্তর ভারতের বড় বড় শহরের সর্বসাধারণ সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে সিপাহিদের। সিপাহি অভ্যুত্থান উত্তর ভারতের বড় বড় শহরে গ্রহণ করে গণআন্দোলনের বিশিষ্ট রূপ।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>১৮৫৭ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ছিল ২,৩৮,০০০ সৈন্য। এদের মধ্যে ৩৮,০০০ ছিল ইউরোপীয় সৈন্য। বাদবাকি ছিল এই উপমহাদেশের। এসময় ইউরোপীয় সৈন্যদের মধ্যে ১৩,০০০ ছিল পাঞ্জাবে। বাংলা ও মিরাটের মাঝামাঝি অঞ্চলে কোনো ইউরোপীয় সৈন্য ছিল না। বারাকপুরে যে সৈন্যরা প্রথম বিদ্রোহ করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন উত্তর-ভারতের হিন্দিভাষী ব্রাহ্মণ। যারা গরুর চর্বি দাঁত দিয়ে কেটেছেন জেনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বাংলা থেকে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে উত্তর-ভারতের নানা জায়গায়। বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে ৮৬ বছর বয়স্ক নাম মাত্র মোগল বাদশা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে দেশের প্রকৃত বাদশা বলে ঘোষণা করেন। অর্থাৎ সিপাহিদের মাথায় যেকোনো রাজনৈতিক বুদ্ধি ছিল না, তা নয়। <strong>বাংলাদেশে এই বিদ্রোহ তেমন জোরালো না হলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও শ্রীহট্টে হতে পেরেছিল। চট্টগ্রামে এই বিদ্রোহ হতে পেরেছিল ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকায় সিপাহিরা বিদ্রোহ করেন।</strong> সিপাহি বিদ্রোহ দমিত হয়েছিল, কিন্তু তখনকার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি, ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ভেঙে পড়েছিল। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সরাসরি ব্রিটেনের রাজত্ব। মহারানি ভিক্টোরিয়াকে ঘোষণা করা হয়েছিল ভারত সম্রাজ্ঞী। শেষ মোগল বাদশা বাহাদুর শাহ (দ্বিতীয়)-কে ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহের আগেই অপসারণ করে। কিন্তু ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহিরা দিল্লি অধিকার করে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ফের সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। পরে ইংরেজরা পুনরায় দিল্লি অধিকার করে বাহাদুর শাহকে বন্দী করে। এবং নামমাত্র বিচার করে তাকে রেঙ্গুনে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করে রাখে। সেখানে বন্দী অবস্থায় ৮৬ বছর বয়সে ঘটে তার মৃত্যু।</p>
<p>পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তার The Discovery of India বইতে বলেছেন, এই বিদ্রোহ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে এ দেশবাসীর কোনো দেশপ্রেমের অভ্যুত্থান ছিল না। এর পিছনে ছিল না কোন গণসমর্থন। এটা ছিল একটা সামন্তবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ষড়যন্ত্রেরই ফল। কিন্তু <strong>আধুনিক গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সিপাহিদের পক্ষে ছিল বিরাট গণসমর্থন। আর এই অভ্যুত্থানকে বলা চলে না একটি প্রতিক্রিয়াশীল সামান্ততান্ত্রিক ষড়যন্ত্রেরই ফল। কেননা, সে সময়ের অধিকাংশ সামন্ত এই অভ্যুত্থানে কোনো অংশগ্রহণ করেননি।</strong> উপরন্ত, করেছেন কোম্পানীর শাসকদেরই সাহায্য সহযোগিতা। তখনকার বাংলায় যাদেরকে ধরা হতো প্রগতিশীল শক্তি হিসাবে, তারা অবশ্য সকলেই সমর্থন করেছিলেন কোম্পানির রাজত্বকে। কিন্তু উত্তর-ভারতের বড় বড় শহর, দিল্লি, আগ্রা, এহলাবাদ&#8217; কানপুর, লাখৌ শহরে সর্বসাধারণ এসে দাঁড়িয়েছিলেন সিপাহিদের পাশে। কলকাতা শহর তখন ছিল সারা ভারতের রাজধানী। <strong>এখানে হিন্দু বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা বিশেষভাবেই গ্রহণ করেছিলেন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ। কবি ঈশ্বরগুপ্ত ১৮৫৭ সালের ২০ জুন সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লেখেন,</strong></p>
<blockquote><p>জয় জয় জগদীশ, জগতের সার।</p>
<p>লহ লহ লহ নাথ, প্রণাম আমার ॥</p>
<p>করি এই নিবেদন, দীন দয়াময়।</p>
<p>বাঞ্ছা ফল পূর্ণ কর, হয়ে বাঞ্ছাময় ॥</p>
<p><strong>চিরকাল হয় যেন, ব্রিটিশের জয়।</strong></p>
<p><strong>ব্রিটিশের রাজলক্ষ্মী, স্থির যেন রয় ॥</strong></p>
<p>বিদ্রোহী সিপাহীগণ, করি নিবেদন।</p>
<p>ছাড় দ্বেষ রণবেশ কর সম্বরণ ॥</p>
<p>কার কথা শুনে সবে, সেজেছ সমরে?</p>
<p>পিপীলিকার পাখা উঠে, মরিবার তরে ।</p>
<p>এখনই ছেড়ে দেও, মিছে ছেলে খেলা।</p>
<p>আকাশের উপরেতে, কেন মার ঢেলা ॥</p></blockquote>
<p>&nbsp;</p>
<p>সিপাহি অভ্যুত্থান হিন্দু অথবা মুসলমান সিপাহিদের অভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল সিপাহিদের একটা মিলিত অভ্যুত্থান। কিন্তু যেহেতু সিপাহিদের মধ্যে সংখ্যায় মুসলমানরাই ছিলেন বেশি, তাই এর চেহারাটা উত্তর-ভারতের অনেক জায়গায় হয়ে উঠেছিল কিছুটা মুসলমানী। বাংলাদেশে মুসলমানরা যাতে সিপাহি অভ্যুত্থানে কোনো অংশগ্রহণ না করতে পারে, সে জন্য ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে ১৮৫৭ সালে তাকে জেলে রাজবন্দী রূপে রাখা হয়। ১৮৬০ সালে বাহাদুরপুরে হয় তার মৃত্যু। ১৮৫৭-এর সিপাহি অভ্যুত্থান মুসলিম অভ্যুত্থান ছিল না। কিন্তু ভারতে ১৯৫৭ সালে এর শতবার্ষিকী পালন করা হয় না। অনেক হিন্দু বুদ্ধিজীবী বলেন, এটা ছিল একটা মুসলিম ষড়যন্ত্র। এর লক্ষ্য ছিল মুসলিম বাদশাহীকে ফিরিয়ে আনা। যে জন্য দিল্লি দখল করে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ঘোষণা করা হয়েছিল, হিন্দুস্তানের সম্রাট হিসেবে। কিন্তু এটা করা হয়েছিল শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখার জন্য। কারণ, মোগল বাদশাহী ছাড়া দিল্লিতে তখন আর কোনো বাদশাহী ছিল না। তাই বলা চলে না, এটা ছিল একটি মুসলিম ষড়যন্ত্র। কিন্তু ১৯৫৭ সালে সাবেক পাকিস্তানে সিপাহি অভ্যুত্থানের শতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। ঢাকায় রানি ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম বদলিয়ে রাখা হয়েছিল বাহাদুর শাহ পার্ক। যে নাম আজও বদলানো হয়নি। এই দিনটি উপলক্ষে ঢাকায় করা হয়েছিল মিছিল, সভা- সমাবেশ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/soldier-rebellion/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">14050</post-id>	</item>
		<item>
		<title>নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী</title>
		<link>https://rowyakbd.com/nabab-faijunnesa-chwoudhurani/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/nabab-faijunnesa-chwoudhurani/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 22 Apr 2024 14:44:43 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13998</guid>

					<description><![CDATA[নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী (১৮৩৪-১৯০৩) শিক্ষা প্রবর্তক, সমাজ সেবিকা ও সাহিত্যিকা হিসেবে খ্যাত হয়ে আছেন। তিনি জন্মেছিলেন কুমিল্লা জেলার (তখনকার ত্রিপুরা জেলায়) লাকসামের (বর্তমানে উপজেলা) পশ্চিমগাঁও নামক গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে। তাঁর পিতা আহমদ আলী চৌধুরী ছিলেন পশ্চিমগাঁওয়ের জমিদার।]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী (১৮৩৪-১৯০৩) শিক্ষা প্রবর্তক, সমাজ সেবিকা ও সাহিত্যিকা হিসেবে খ্যাত হয়ে আছেন। তিনি জন্মেছিলেন কুমিল্লা জেলার (তখনকার ত্রিপুরা জেলায়) লাকসামের (বর্তমানে উপজেলা) পশ্চিমগাঁও নামক গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে। তাঁর পিতা আহমদ আলী চৌধুরী ছিলেন পশ্চিমগাঁওয়ের জমিদার। তাঁরা নিজেদের দাবি করতেন মোগল রাজবংশের সঙ্গে একসময় তাঁদের সংশ্লিষ্টতা ছিলো। ফইজুন্নেসা বাড়িতে একাধিক গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8216;আমি বাল্যাবস্থায় বয়স্যাদিগের সহিত ক্রীড়াকৌতুকে নিমগ্ন থাকিয়াও যথাসময়ে শিক্ষক সান্নিধানে অধ্যয়নাদি সম্পন্ন করিতাম।&#8217;</p></blockquote>
<p>ফইজুন্নেসার বিবাহ হয় তাঁর ফুফাতো ভাই মুহাম্মদ গাজীর সঙ্গে। যিনি ছিলেন কুমিল্লার একজন বড় জমিদার। ফইজুন্নেসা ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। গাজীর ঔরসে ফইজুন্নেসার দুই কন্যার জন্ম হয়। কিন্তু তিনি বিবাহিত জীবনে সুখী ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ফইজুন্নেসা ফিরে আসেন তাঁর পিতৃগৃহে। এ সময় তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যকীর্তি &#8216;রূপজালাল&#8217; নামক গ্রন্থ। গ্রন্থটি অর্ধেকের বেশি পদ্যে লিখিত। বাদবাকি অংশ লিখিত হয়েছে সাধু বাংলা গদ্যে। বইটির কথা আগে তেমন জানা ছিল না, পরে জানা যায়। রূপজালাল প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। বইটি কিছুটা তাঁর আত্মজীবনীমূলক। বইটিতে আছে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব। মুসলিম বাংলা সাহিত্য আর হিন্দু বাংলা সাহিত্য ঠিক এক ঐতিহ্যবহ নয়।</p>
<p>এ বিষয়ে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলা দেশের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে বলেছেন,</p>
<blockquote><p>&#8216;বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকেরা এমন একটি নতুন বস্তু দিয়াছেন, যাহা হিন্দু লেখকেরা দিতে পারেন নাই। ধর্মনিরপেক্ষ বা লৌকিক কাব্য এবং বিশুদ্ধ প্রণয়মূলক কাব্য প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে তাঁহারাই প্রবর্তন করিয়াছেন। হিন্দুরা প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের যে সমস্ত ধারায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন, তাহাদের প্রায় সবই ধর্মমূলক, কারণ হিন্দুরা সাহিত্যকে ধর্মচর্চার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতেন। কিন্তু মুসলমানরা সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়া ধর্মচর্চার বিশেষ প্রয়োজন অনুভব করেন নাই; এজন্য তাঁহারা ধর্মনিরপেক্ষ বা বিশুদ্ধ প্রণয়মূলক বিষয় অবলম্বনে বহু কাব্য রচনা করিয়াছেন। অবশ্য ধর্মমূলক বিষয় অবলম্বনেও তাঁহারা লিখিয়াছেন।&#8217; (বাংলা দেশের ইতিহাস; দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৯২। প্রকাশক : শ্রীসুরজিৎচন্দ্র দাস; জেনারেল প্রিন্টার্স য়‍্যান্ড পাব্লিসার্শ প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা। ১৩৮০ বঙ্গাব্দ)।</p></blockquote>
<p>মুসলমান লেখক ও লেখিকারা ফারসি রোমান্টিক কাব্যের অনুসরণ করতে চেয়েছেন। যার মধ্যে পড়ে &#8216;লাইলী মজনু&#8217; এবং &#8216;ইউসুফ জুলেখা&#8217;র কাহিনী। ইউসুফ জুলেখার কাহিনীতে ইউসুফ নবিকে খুবই সুপুরুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মেয়েরা তাঁকে দেখে হতেন আকৃষ্ট। চাইতেন তাঁকে বিবাহ করতে। ইউসুফ জুলেখার কাহিনীর সাথে বেশকিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় &#8216;রূপজালাল&#8217;এর কাহিনীর। &#8216;রূপজালাল&#8217; নায়ক জালাল হলেন খুবই সুপুরুষ। তাঁকে দেখে মেয়েরা সহজেই আকৃষ্ট হতে চায়। এতে আছে তাদেরই আকৃষ্ট হবার বিশেষ বর্ণনা। রূপজালাল হলেন রাজপুত্র। তাঁকে দেখে প্রথমে আকৃষ্ট হন দুই নারী, রূপবানু এবং হুরবানু। তিনি এদের বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর জীবনে আরও নারী আসতে চায়। এই নিয়ে হলো রূপজালালের কাহিনী। <strong>রূপজালাল ছাড়াও ফইজুন্নেসার আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ আছে। একটির নাম হল &#8216;সঙ্গীতসার&#8217; ও &#8216;সঙ্গীতলহরী&#8217;।</strong> কিন্তু ফইজুন্নেসার সাহিত্যিক খ্যাতি লাভ ঘটেছে রূপজালাল গ্রন্থের জন্য। তাঁকে বাংলা একাডেমি ২০০৪ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করে তাঁর এই সাহিত্যকৃতির জন্য। নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী একাধিক বাংলা পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। যাদের মধ্যে &#8216;বান্ধব&#8217;, &#8216;ঢাকা প্রকাশ&#8217;, &#8216;মুসলমান বন্ধু&#8217;, &#8216;সুধাকর&#8217; এবং &#8216;ইসলাম প্রচারক&#8217; বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এসব পত্রিকা সে সময়ে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজ জীবনে এনে দিয়েছিল এক বিশেষ জাগরণের জোয়ার। কিন্তু ফইজুন্নেসা কেবল সাহিত্য চর্চা করেননি, তিনি বিশেষভাবে খ্যাত হয়ে আছেন তাঁর বিভিন্ন সমাজসেবা ও জনহিতকর এবং শিক্ষাবিস্তারমূলক কাজকর্মের জন্য।</p>
<p>তিনি কুমিল্লায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল করেন। যা এখন পরিণত হয়েছে নবাব ফইজুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি মেয়েদের জন্যপশ্চিম গাঁওয়ে একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যা এখন উন্নীত হয়েছে নবাব ফইজুন্নেসা ডিগ্রি কলেজে। ১৮৯৩ সালে তিনি গরিব অসহায় মেয়েদের জন্য কুমিল্লায় একটি হাসপাতাল স্থাপন করেন। যা পরে খ্যাত হয় ফইজুন্নেসা হাসপাতাল হিসেবে। এছাড়া তিনি পথঘাট নির্মাণ, পানীয় জলের জন্য দিঘি (তালাব) খননে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। <strong>তাঁর এই জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মহারানি ভিক্টোরিয়া ১৮৮৯ সালে তাঁকে নবাব উপাধিতে ভূষিত করেন। মেয়েদের মধ্যে এই উপমহাদেশে তিনিই প্রথম এই সম্মাননা লাভ করেছিলেন।</strong></p>
<p>ফইজুন্নেসা অনেক মসজিদ এবং সেই সঙ্গে মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তিনি ১৮৯৪ সালে মক্কায় হজ করতে যান। সেখানেও তিনি একটি মসজিদ ও সেই সঙ্গে মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য প্রচুর অর্থ প্রদান করেন। তিনি তাঁর মৃত্যুকালে তাঁর সম্পত্তির অধিকাংশটাই ওয়াকফ করে যান। যা থেকে এখনও গরিব ছাত্ররা বৃত্তি পেতে পারছে। নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর পিতার এবং মাতার কাছ থেকে বিরাট সম্পত্তির উত্তাধিকারী হয়েছিলেন। এর অধিকাংশটাই তিনি দান করে গেছেন জনহিতকর কর্মে। ধনদৌলতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ব্যক্তিগত ছিল না যেমন থেকে থাকে অনেক জমিদারের। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় হয়ে ওঠেন কিংবদন্তী নায়িকা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>এ সময় কুমিল্লা শহর ও লাকসাম ছিল দুর্গম অঞ্চল। ১৯০৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আসামের বাংলা রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। আসাম বাংলা রেল কোম্পানি আসামের লামডিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ খোলে। আসাম থেকে রেলপথে চা চালান যেতে শুরু করে বিলাতে। লাকসাম হয়ে ওঠে খুব বড় রেলওয়ে জংশন শহর। নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণীর সময় এই অঞ্চলে কোনো রেলপথ ছিল না। যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল খুবই কষ্টকর। কিন্তু সেই অবস্থাতেও নবাব ফইজুন্নেসা অক্লান্ত চেষ্টা করেছেন শিক্ষা বিস্তারের জন্য। অর্থ ব্যয় করেছেন জনকল্যাণে। তিনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন মহিয়সী নারী। যার মধ্যে মানবকল্যাণের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হতে পেরেছিল ভেতর থেকেই; বাইরের কোনো প্রভাবে নয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>কোনো একজন লেখক তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি উর্দুতে সাহিত্য চর্চা না করে বাংলাতে করেছেন। নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী উর্দু জানতেন বলে আমাদের জানা নেই। তাই উর্দুতে সাহিত্য করার প্রশ্ন ছিল না। বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলমান নারী ও পুরুষ চিরকাল বাংলা ভাষাতেই সাহিত্য চর্চা করেছেন, উর্দু ভাষায় করেননি। লক্ষ্য করবার বিষয় যে, পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল বিভিন্ন আঞ্চলিক বাংলা ভাষা। কিন্তু লিখিত ভাষা ছিল সাধু বাংলা। সাধু বাংলাতেই চলেছে লিখিত সাহিত্য চর্চা, এককালের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের সর্বত্র। বাংলা গদ্যের ইতিহাস নিয়ে এখনও চলেছে অনেক বিতর্ক। পর্তুগিজ খ্রিস্টান মিশনারিরা পূর্ব বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করবার জন্য বাংলাগদ্যে বই লিখেছেন। কিন্তু তারা এই লিখবার কাজে ব্যবহার করেছেন রোমান বর্ণমালা, পর্তুগিজ উচ্চারণে। তাদের এই বাংলা যথেষ্ট প্রাঞ্জল। তারা এই বাংলা শিখেছিলেন পূর্ব বাংলা থেকেই। তাই মনে করবার কারণ আছে যে, সপ্তদশ শতকের শেষে ও অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এবং সম্ভবত এর আগেই একটি প্রাঞ্জল সাধু বাংলা গদ্যের উদ্ভব ঘটেছিল। যা ছিল সাহিত্যের উপযোগী। পর্তুগীজ মিশনারিরা প্রথম বাংলা গদ্যের ব্যাকরণ রচনা করেন এবং সংকলন করেন বাংলা পর্তুগিজ এবং পর্তুগিজ বাংলা অভিধান। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রথম বাংলা গদ্যের চর্চা শুরু হয়েছিল এই মতকে এখন আর যথেষ্ট আদ্রিত বলে ধরা যায় না। সম্ভবত নবাব ফইজুন্নেসা চৌধুরাণী যে গদ্য লিখেছেন সেটার উৎস ছিল পূর্ব বাংলায় প্রচলিত সাধু বাংলা গদ্যেরই ঐতিহ্যবহ।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/nabab-faijunnesa-chwoudhurani/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13998</post-id>	</item>
		<item>
		<title>বাংলার ইতিহাসে সুলতানী ও বাদশাহী আমল</title>
		<link>https://rowyakbd.com/sultanate-and-badshah-period-in-the-history-of-bangla/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/sultanate-and-badshah-period-in-the-history-of-bangla/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 18 Apr 2024 05:50:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ইতিহাস]]></category>
		<category><![CDATA[উপমহাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলাদেশ]]></category>
		<category><![CDATA[Badsah]]></category>
		<category><![CDATA[Badshah]]></category>
		<category><![CDATA[Bangla]]></category>
		<category><![CDATA[bengal]]></category>
		<category><![CDATA[History]]></category>
		<category><![CDATA[Sultan]]></category>
		<category><![CDATA[Sultanate]]></category>
		<category><![CDATA[ইসলাম]]></category>
		<category><![CDATA[খিলাফত]]></category>
		<category><![CDATA[বাদশাহ]]></category>
		<category><![CDATA[বাংলা]]></category>
		<category><![CDATA[মুসলিম উম্মাহ]]></category>
		<category><![CDATA[মোগল]]></category>
		<category><![CDATA[রাজত্ব]]></category>
		<category><![CDATA[রাজ্য]]></category>
		<category><![CDATA[সভ্যতা]]></category>
		<category><![CDATA[সম্রাট]]></category>
		<category><![CDATA[সংস্কৃতি]]></category>
		<category><![CDATA[সাম্রাজ্য]]></category>
		<category><![CDATA[সুলতান]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13986</guid>

					<description><![CDATA[দিল্লির সালতানাত চলেছিল ১১৮৬ থেকে ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কিন্তু দিল্লির সালতানাত এতদিন টিকলেও তা ভেঙে একাধিক অঞ্চলে সৃষ্টি হতে পেরেছিল আরও কয়েকটি বিভিন্ন স্বাধীন সালতানাত। এদের মধ্যে বাংলা, মালব, গুজরাট ও কাশ্মির হলো উল্লেখ্য। এদের মধ্যে আবার বাংলার সালতানাত (১৩৩৮-১৫৩৮]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দিল্লির সালতানাত চলেছিল ১১৮৬ থেকে ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কিন্তু দিল্লির সালতানাত এতদিন টিকলেও তা ভেঙে একাধিক অঞ্চলে সৃষ্টি হতে পেরেছিল আরও কয়েকটি বিভিন্ন স্বাধীন সালতানাত। এদের মধ্যে বাংলা, মালব, গুজরাট ও কাশ্মির হলো উল্লেখ্য। এদের মধ্যে আবার বাংলার সালতানাত (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রি.) হয়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ। আজকের বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য বুঝতে হলে স্বাধীন সুলতানী আমলের ইতিহাসকে নিতে হয় বিশেষ বিবেচনায়। কারণ, এ সময় বাংলার একটি নিজস্ব স্থাপত্যরীতির উদ্ভব ঘটে। ঘটে বাংলা ভাষা সাহিত্যের বিশেষ বিকাশ। সুলতানী আমলের আগের কোনো প্রকৃত বাংলাভাষার পুঁথি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। এর একটি কারণ হলো বাংলাদেশের হিন্দুরা বাংলা ভাষার চর্চা সেভাবে করতেন না। করতেন সংস্কৃত ভাষার চর্চা। সংস্কৃততেই তাই সাহিত্য রচিত হতো; বাংলাভাষায় নয়। কৃত্তিবাস প্রথম সংস্কৃত রামায়ণ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। এজন্য তাঁকে গোড়া হিন্দুদের কোপানলে পড়তে হয়। তারা চান কৃত্তিবাসকে হত্যা করতে। কিন্তু সুলতান রোকন-উদ-দীন বারবাক শাহ বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন কৃত্তিবাসের জন্য। রোকন-উদ-দীন বারবাক শাহ ২১ বছর রাজত্ব করেছিলেন (১৪৫৫-১৪৭৬ খ্রি.)। এ সময়ের মধ্যে কৃত্তিবাস সংস্কৃত থেকে বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন বলে ধরা হয়।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>সুলতানী আমল</strong></p>
<p>সুলতানী আমলে বাংলার শাসনব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট মজবুত। দেশে ছিল মোটামুটিভাবে শান্তি-শৃঙ্খলা। আর তাই ঘটতে পেরেছিল আর্থ-সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি। উর্বর ভূমি ছিল বাংলার সম্পদ। এখানে সহজেই কৃষিকাজ করা যেত। প্রচুর ধান উৎপাদন করা যেত অনেক সহজেই। <strong>সুলতানী আমলে আখের চাষ হতো। আখের রস থেকে প্রস্তুত হতো গুড় ও চিনি। যা বিদেশে রফতানি হতো। বাংলাদেশে তৈরি হতো বড় বড় সমুদ্রগামী কাঠের নৌকা এবং জাহাজ। যাতে করে বাংলাদেশ থেকে মানুষ যেতে পারত অনেক দূরদেশে সওদা নিয়ে বাণিজ্য করতে।</strong> বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল সওদাগরের দেশ। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে রেশম উৎপন্ন হতো। রেশমী বস্ত্র বিক্রি হতো বিদেশি বাজারে। সুলতানী আমলে এক পর্যায়ে চীন থেকে এসেছিলেন মা হুয়াং নামে একজন চীনা মুসলিম পর্যটক। তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন যে, রেশম উৎপাদনের জন্য এদেশে যত্ন করে তুতগাছ লাগানো হয়।</p>
<p>বাংলাদেশের রাজ্য ব্যবস্থায় সুলতানের ছেলে সাধারণত সুলতান হতেন। কিন্তু কাউকে সুলতান হতে গেলে প্রয়োজন হতো আমির ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের সমর্থন। তাদের সমর্থন ছাড়া কেউ সুলতান হতে পারতেন না। <strong>সুলতানের ছেলে না হয়েও বাংলাদেশে সুলতান হবার দৃষ্টান্ত আছে। বাংলার বিখ্যাত সুলতান আলা-উদ-দীন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৮খ্রি.) ছিলেন উচ্চ রাজকর্মচারী কর্তৃক নির্বাচিত সুলতান।</strong> তিনি সুলতানের পুত্র হিসেবে সুলতান হননি। তার পুত্র নাসির-উদ-দীন নূসরত শাহ (১৫১৮-১৫৩২ খ্রি.) সুলতান হবার সময় উচ্চ রাজকর্মচারীদের সাধারণ অনুমোদন লেগেছিল। অর্থাৎ সুলতানী আমলের বাংলায় এক ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা অনুসরণ করা হতো। কাউকে সুলতান হতে গেলে লাগতো সে সময়ের উচ্চ রাজকর্মচারীদের অনুমোদন বা ভোট। সুলতানী আমল একেবারেই স্বেচ্ছাতন্ত্র বা স্বৈরশাসন ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সুলতানের মৃত্যু হবার আগে তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র তাঁর সঙ্গে সহসুলতান হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করছেন। এভাবে বাংলায় একজন সুলতান চাইতেন তার পুত্রকে রাজ্য পরিচালনায় দক্ষ করে যেতে।</p>
<p>সুলতানী আমলে সেনাবাহিনী ছিল চার ভাগে বিভক্ত: অশ্বারহী, গজারহী, পদাতিক এবং নৌবহর। পদাতিক সৈন্যদের বলা হতো &#8216;পাইক&#8217;। দশজন অশ্বারহী নিয়ে একটি করে দল গঠিত হতো। যাকে বলা হতো &#8216;খেল&#8217;। খেলের নায়ককে বলা হতো &#8216;সর-ই-খেল&#8217;। বাংলার নৌবহরের অধিনায়ককে বলা হতো &#8216;মির বহর&#8217;। বাংলার গজবাহিনী খুব বিখ্যাত ছিল। বাংলার সৈন্যরা নিয়মিত বেতন পেতেন। সৈন্যবাহিনীর বেতনদাতার উপাধি ছিল &#8216;উজির-ই-লস্কর&#8217;। বাংলার সৈন্যরা অনেক আগেই পর্তুগিজদের কাছ থেকে কামান চালাতে শিখেছিলেন। তারা বাবরের সাথে যুদ্ধের সময় কামান ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। বাবর বাংলা জয় করতে পারেননি। নূসরত শাহ&#8217;র সঙ্গে সম্মানজনক সন্ধি করেছিলেন। বাবর তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীতে নূসরত শাহ&#8217;র খুব প্রশংসা করেছেন। নূসরত শাহ&#8217;র ছিল ১৮ টি পুত্র সন্তান। নূসরত শাহ তার প্রত্যেকটি ভাইকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বাবর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, এরকম ভাতৃপ্রেম রাজাদের মধ্যে দেখা যায় না। বাবরের অন্যতম পূর্বপুরুষ তৈমুর লং বলেছেন, রাজাদের কোনো বন্ধু থাকে না। রাজাদের একমাত্র সম্বল তাঁদের নিজ বাহুবল। বাবরও এরকম নীতিতেই ছিলেন আস্থাবান। বাবর নূসরত শাহকে বলেছেন, “বাঙালি”। এর আগে কোন সুলতানের নামের পরে কেউ বাঙালি কথাটা যোগ করেননি।</p>
<p><strong>খাজনা আদায়ের অঞ্চলকে বলা হতো মহল। কয়েকটি মহল নিয়ে গঠিত হত একটি শিক। শিকের কর্তাকে বলা হতো শিকদার। এ থেকেই বাংলা ভাষায় শিকদার উপাধির উদ্ভব হতে পেরেছে।</strong> যা এখনও চলে আসছে (যেমন শিরাজ শিকদার, দেবেন শিকদার)। সুলতানী আমলে অনেক মহল ছিল। সুলতানী আমলে ঘটেছিল বেশকিছুটা নগর বিপ্লব। গড়ে উঠেছিল শহর। দুর্গযুক্ত শহরকে বলা হতো &#8216;খিটাহ্&#8217;। আর দুর্গবিহীন শহরকে বলা হতো &#8216;কসবাহ্&#8217;। সীমান্ত ঘাঁটি শহরকে বলা হতো থানা।</p>
<p>সুলতানী আমলে বহু হিন্দু উচ্চ রাজ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। চাকরির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ছিল বিশেষ মাপকাঠি। অনেক হিন্দু চাকরি করেছেন মুসলমান রাজকর্মচারীর উপরে। করেছেন তাদের নিয়ন্ত্রিত। সুলতানী আমলে ধর্মীয় গোঁড়ামি সেভাবে ছিল না। বহু প্রমাণ আমরা পেতে পারি তাঁর এ সময়ের ইতিহাস অনুশীলন করলে। হিন্দুরা সুলতানী আমলে দুর্গাপূজা করতে পারতেন অবাধে। তাদের দুর্গাপূজায় কোনো বাধা ছিল না। আসলে দুর্গাপুজার উদ্ভব হয়েছে সুলতানী শাসনামলে, বর্তমান রাজশাহী জেলার তাহেরপুর নামক স্থানে। গৌড়ের সুলতানের এক সামন্ত রাজা কংস নারায়ণ প্রথম, এখন যেভাবে দুর্গাপুজা হয়, প্রচুর অর্থ ব্যয়ে তা প্রবর্তন করেন। তাঁর প্রবর্তিত দুর্গাপুজার রীতি এখনও চলে আসছে। বাংলায় যেভাবে দুর্গাপুজা হয়, অন্যত্র সেভাবে হয় না। কংস নারায়ণ অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা তাঁকে বলেন, যেহেতু তিনি সামন্ত রাজা তাই তিনি অশ্বমেধযজ্ঞ করবার অধিকারী নন।</p>
<p>বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় গোড়ামি সেভাবে না থাকলেও, তারা হিন্দু রাজার অধীনে থাকতে চাননি। গণেশ ছিলেন একজন আমির। তিনি পরে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু মুসলমানরা তাঁর অধীনে থাকতে চাননি। গণেশের পুত্র যদু, ইসলাম গ্রহণ করেন, এবং হন সুলতান জালাল- উদ-দীন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৪-১৪৩১ খ্রি.)। তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী সুলতান। আরাকানের (রাখাইন) এক রাজা (মেং সোআন) মধ্যব্রহ্মের (মিয়ানমার) রাজার কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসে জালালউদ্দিন-এর কাছে আশ্রয় নেন। জালাল-উদ-দীন তাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন। তিনি দখল করতে পারেন আরাকান। আরাকানের এই রাজা কৃতজ্ঞতাবশে হন জালাল-উদ-দীনের সামন্ত। যেসব সৈন্যরা এসময় গৌড় থেকে গিয়ে আরাকানে বসতি স্থাপন করেন, তাদের বংশধরকে বলা হয় রোহিঙ্গা। কারণ এসময় আরাকানের রাজধানী ছিল রোহং। বাংলা ভাষায় একসময় আরাকানকে বলা হতো রোসাঙ্গ। রোহং থেকেই হতে পেরেছিল রোসাঙ্গ নামের উদ্ভব।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>বাদশাহী আমল </strong></p>
<p>বাংলায় যার আরম্ভ হতে পারে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এবং যা চলেছিল বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হওয়া পর্যন্ত, তা বাংলার মানুষের কাছে কখনই খুব প্রিয় ছিল না। মোগল শাসনকে বাংলার মানুষের কাছে মোটামুটি মনে হয়েছে বিদেশি শাসন। বাংলায় এবং বিহারে আকবরের ধর্মীয় উদারতার বিপক্ষে হয়েছে প্রতিবাদ। পরে বাংলাদেশে আবির্ভাব হয়েছে বারো ভূঁইয়ার। যারা মানতে চাননি মোগল শাসনকে। এরা অনেকেই পেয়েছেন জনসমর্থন। মোগল আমলে বাংলা শাসিত হয়েছে দিল্লি থেকে। মোগল শাসনব্যবস্থায় সুবে বাংলার মানুষ বিশেষ কেউ পায়নি উচ্চ সরকারি পদ। কেউ পায়নি ১০০০ সৈন্যর বেশি সৈন্য পরিচালনার ভার। যে দুই একজন ১০০০ সৈন্য পরিচালনার ভার পেতেন তাদের বলা হত হাজারি। বাংলায় হাজারি ছিলেন হাতে গোনা। মোগল আমলে বাংলাদেশে ফারসি ভাষার প্রভাব আগের তুলনায় বেশি বাড়ে। শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা সুজা প্রায় ২১ বছর (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রি.) বাংলার সুবেদার ছিলেন। এ সময় বাংলা ভাষা সাহিত্যের ওপর পড়তে পারে ফারসি সাহিত্যের বর্ধিত প্রভাব। এ সময়ের কবি আলাওল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ কারেন &#8216;সিকান্দার নামা&#8217; ও &#8216;হস্ত পয়কর&#8217;। সুলতানী আমলেও সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসিই চলত। বাংলার বিখ্যাত সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তার রাজসভায় অতিথি হতে। হাফিজ তাকে একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন। দুঃখ করেছিলেন আসতে না পারবার জন্য। মোগল শাসনের আগেও এদেশে ফারসি ভাষা সাহিত্যের কদর ছিল। কিন্তু শাহজাদা সুজার সময় ফারসি ভাষার কদর হতে পেরেছিল আরও বেশি। সরকারি ভাষা ফারসি হবার জন্যে হিন্দুরাও ফারসি শিখতেন। কিন্তু তাদের ওপর ফারসি ভাষার প্রভাব মুসলমানদের মতো পড়েনি। কারণ, হিন্দুরা ধর্ম চর্চা করেছেন সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলার মুসলমানরা তাদের ধর্ম চর্চাও করেছেন প্রধানত ফারসি ভাষার মাধ্যমে। একসময় আল্লাহর চাইতে খোদা শব্দটির প্রচলন বাংলার মুসলমান সমাজে ছিল বেশি। আমরা বলেছি, নামজ, বেহেস্ত, দোজখ শব্দগুলো আরবি ভাষার নয়। এই শব্দগুলো বাংলা ভাষায় এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। দরবেশ শব্দটিও ফারসি ভাষার। সুলতান শব্দটি আরবি। শব্দগত অর্থে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। <strong>সুলতানরা সকলেই বাগদাদের খলিফাকে মানতেন। তারা বলতেন, তারা ক্ষমতা লাভ করেছেন বাগদাদের খলিফার সম্মতির মাধ্যমে। দিল্লি এবং বাংলার অনেক সুলতানের মুদ্রায় তাই সুলতানের নামের সঙ্গে মুদ্রিত থাকতে দেখা যায় বাগদাদের খলিফার নাম।</strong> কিন্তু মোগল বাদশারা খলিফা মানতেন না। তারা বলতেন, সব ক্ষমতার শেষ উৎস হচ্ছেন আল্লাহ। যিনি বাদশা হন তিনি সেটা হতে পারেন আল্লাহর সম্মতিতে। বাদশা বহন করেন আল্লাহর ছায়া। মোগল বাদশারা তাদের এই ধারণাটি অবশ্য লাভ করেছিলেন ইরানের প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তা থেকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মোগল আমলের প্রায় শেষভাগে বাংলার দেওয়ান হয়ে আসেন মুর্শিদকুলী খাঁ। মুর্শিদকুলী খাঁর জীবন ইতিহাস খুবই বিচিত্র। তিনি জন্মেছিলেন এক তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাকে ক্রয় করেন একজন শিয়া মুসলিম ইরানী সওদাগর। এবং নিয়ে যান ইরানে। তিনি তাকে মানুষ করেন নিজের পুত্র সন্তানের মতো। মুর্শিদকুলী খাঁ ইরানে লেখাপড়া শিখে মোগল দরবারে আসেন চাকরির খোঁজে। তিনি উচ্চ সরকারি পদ পান তার দক্ষতার গুণে। এক পর্যায়ে বাদশা আওরঙ্গজেব তাকে বাংলায় পাঠান দেওয়ান হিসেবে (১৭০১ খ্রি.)। আওরঙ্গজেব মারা যান ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে। মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলায় দেওয়ান হয়ে এসে তিনি বেশকিছু সংখ্যক হিন্দু ব্রাহ্মণকে প্রদান করেন খাজনা আদায়ের অধিকার। যারা পরে হয়ে ওঠেন জমিদার। সাধারণত মনে করা হয়, ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দুরা বাংলায় হয়ে উঠতে থাকেন জমিদার। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। মুর্শিদকুলী খাঁর আমল থেকেই উদ্ভব হতে শুরু করে হিন্দু জমিদারদের। হিন্দু জমিদারদের সেরেস্তায় কাজ করতেন অনেক হিন্দু কর্মচারী। যাদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠে একটি হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এদের সঙ্গে পরে বিবাদ বাধে বাংলার মুসলিম কৃষক প্রজাদের (রায়ত)। কেবল অর্থনৈতিক কারণে নয়, ধর্মীয় কারণেও ঘটেছিল বিরোধ। <strong>ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু জমিদাররা মুসলমান প্রজাদের বাধ্য করতেন দুর্গাপুজার চাঁদা দিতে। যেটা দিতে চান না মুসলমান প্রজারা (রায়ত)। এই বিরোধ খুব প্রবল হয়ে ওঠে ফরায়েজি আন্দোলনের সময়।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>মোগল ও পাঠান</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>পাঠান বলতে বোঝাত পশতু ভাষাভাষী মানুষকে। পাঠান ও আফগান শব্দ দুটি সমার্থক। বাংলাদেশে আফগান বংশের একাধিক রাজা রাজত্ব করেছেন। এদের মধ্যে শেরশাহ্ শুর ও দাউদ করানী (করলানী) বিশেষভাবে খ্যাত হয়ে আছে। বাংলাদেশে মোগল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হতে সময় নেয়। এদেশের বড় বড় ভূস্বামী বা ভূঁইয়ারা মোগল শাসন মানতে চাননি। এই সমস্ত ভূঁইয়াদের অনেকেই নিজেদের দাবি করতেন পাঠন বংশোদ্ভূত হিসেবে। যেমন ইশা খাঁ, মুসা খাঁ, বাহাদুর গাজী প্রমুখ। মোগল শাসনকে বাংলার মানুষের কাছে মনে হয়েছে বিদেশি আগ্রাসন। বার ভূঁইয়ারা মোগল শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই পেয়েছেন বিশেষ সমর্থন। অনেকে মনে করেন, দূর সীমান্ত প্রদেশের সঙ্গে (বর্তমানে পাখতুনিয়া) বাংলার মানুষের সম্পর্ক কতটুকু।</p>
<p>কিন্তু একসময় বাংলাদেশের মুসলমানদের একটা বড় অংশ নিজেদের ভেবেছেন পাঠান হিসেবে; মোগল হিসাবে নয়। আমার আত্মপরিচয়ের সন্ধানে একথাটিও মনে রাখতে হবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/sultanate-and-badshah-period-in-the-history-of-bangla/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13986</post-id>	</item>
		<item>
		<title>ইসলামী দৃষ্টিতে সাহিত্য বিচার</title>
		<link>https://rowyakbd.com/literary-judgment-from-islamic-point-of-view/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/literary-judgment-from-islamic-point-of-view/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 06 Apr 2024 09:57:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=13961</guid>

					<description><![CDATA[সাহিত্য ভাষানির্ভর। হেজাজে ইসলাম-পূর্ব যুগেই আরবি একটা শক্তিশালী লিখিত ভাষায় পরিণত হয়েছিল। হেজাজের আরবদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আরবিতে পড়তে, লিখতে ও গুনতে পারতেন। তাই সেই সময়েই হেজাজের আরবদের একটা নিরক্ষর জাতি বলা যেত না। মক্কার কাছে, ওকাজ নামে একটি]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>সাহিত্য ভাষানির্ভর। হেজাজে ইসলাম-পূর্ব যুগেই আরবি একটা শক্তিশালী লিখিত ভাষায় পরিণত হয়েছিল। হেজাজের আরবদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আরবিতে পড়তে, লিখতে ও গুনতে পারতেন। তাই সেই সময়েই হেজাজের আরবদের একটা নিরক্ষর জাতি বলা যেত না। মক্কার কাছে, ওকাজ নামে একটি জায়গা ছিল। যেখানে প্রতি বছর বসত একটা বিরাট মেলা। মেলাতে থাকত নানা আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। হতো দৌড়-ঝাঁপের প্রতিযোগিতা। এই মেলায় আসতেন অনেক কবি। এসব কবি তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনাতেন মেলায় উপস্থিত কবিতার শ্রোতাদের। যাদের কবিতা ভালো লাগত, মেলায় উপস্থিত শ্রোতারা করতেন তাদের পুরস্কৃত। যাদের কবিতা খুবই ভালো বলে বিবেচিত হতো, তাদের কবিতা সমাদর করে লেখা হতো কাবাগৃহের প্রাচীরে। যার কিছু নিদর্শন এখনো বিদ্যমান আছে। <strong>সে যুগের কিছু কবির নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন : ইমরুল কায়েস, তারাফা, জোয়াহির, আন্তারা প্রমুখ।</strong> কবিতার মাধ্যমে গল্পও বলা হতো। যার নিদর্শন এখনো টিকে আছে। যেমন হাতেম তাই। কাহিনীটি ইসলামী না হলেও মুসলিম সমাজে তা হয়ে আছে শ্রদ্ধার। কেননা, হাতেম ছিলেন দানবীর। যা কিছু মানুষের কল্যাণ করে, তাই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হলো শ্রেয়।</p>
<p>কুরআন শব্দটি এসেছে আরবি ইকরা শব্দ থেকে। ইকরা বলতে বোঝায় পড়া অথবা আবৃত্তি করা। ইসলাম একটি লিখিত ধর্ম। তাই অনেক সুনির্দিষ্ট। কুরআনে প্রথম নাজিল হওয়া সূরা হলো আলাক। যদিও সূরাটির ক্রমিক সংখ্যা হলো ৯৬। যাতে বলা হয়েছে:</p>
<blockquote><p>পাঠ করো তোমার মহা প্রভুর নাম উচ্চারণ করে।<br />
যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেন রক্ত জমাট করে।<br />
তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন লেখনীর ব্যবহার।<br />
যার মাধ্যমে তিনি তাকে দিয়েছেন জ্ঞান, নানা অজানার।</p></blockquote>
<p>আল কুরআনের একটা নাম ফুরকান। ফুরকান শব্দের অর্থ আলো। অর্থাৎ কুরআন মানুষকে অজানাকে জানতে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করতে উৎসাহ জুগিয়েছে। কুরআনের এই অনুপ্রেরণা মুসলমানদের সভ্যতার স্বর্ণযুগে দিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ।</p>
<p>গ্রিক দার্শনিক প্লাতো (আফলাতুন) তার আদর্শ রাষ্ট্রে কবিকে স্থান দিতে চাননি। কেননা, কবিরা কল্পনাবিলাসী। তাই তারা হলেন শেষ পর্যন্ত সত্যবিদ্বেষী। আদর্শ রাষ্ট্রে সত্যবিদ্বেষীদের স্থান হতে পারে না। <strong>কুরআন শরিফে কবিদের সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তি-বুদ্ধিকে বাদ দিয়ে কবিদের কথার কুহকে না পড়তে (সূরা ২৬: ২২৪)।</strong> <strong>অন্য দিকে আল কুরআনে লোকমান হাকিমকে খুব উচ্চস্থান দেয়া হয়েছে। কারণ, যদিও তিনি নিছক গল্প বলেছেন, কিন্তু তিনি তা বলেছেন মানুষকে নীতিশিক্ষা দেয়ার জন্য। যা কিছু মানুষকে নৈতিক করে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তাই হলো শ্রেয় (সূরা ৩১ : ১২)।</strong> এই সূরায় আরো বলা হয়েছে, গাধার মতো চিৎকার না করতে। মূল্য দেয়া হয়েছে সুকণ্ঠের। বলা হয়েছে গর্বিত না হতে। যা থেকে মনে হয় কুরআনের শিক্ষা হলো, লেখক হিসেবে অহঙ্কারী না হতে।</p>
<p><strong>ইসলাম ও সাহিত্য প্রসঙ্গে যথেষ্ট বিশদভাবে আলোচনা করেছেন কবি দার্শনিক ইকবাল (১৮৭৩-১৯৩৮), যা আমার মনে হয় এখনো আমাদের জন্য হয়ে আছে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে দু’টি সম্প্রদায়ের উদ্ভব হতে পারে। যার একটিকে বলে ‘জাবরিয়া’। আর অপরটিকে বলা হয় ‘কাদরিয়া’। জাবরিয়ারা বলেন, যেহেতু কোনো কিছুই অকারণে ঘটে না, তাই সব কিছুই ঘটে পূর্বাবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে। এখানে মানুষের কিছু করণীয় নেই। অর্থাৎ এরা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাস করেন না। শেষ পর্যন্ত এরা হয়ে উঠতে চান ভাগ্যবাদী (তকদির)। অন্য দিকে কাদরিয়ারা বলেন, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা না থাকলে কোনো অপরাধের জন্য তাকে দায়ী করা চলে না। দেয়া যেতে পারে না কোনো শাস্তি।</p>
<p>ফলে সমাজে দণ্ড-ভয়ের অভাবে বেড়ে যেতে পারে অপরাধপ্রবণতা। সমাজ হয়ে উঠতে পারে বাসের অযোগ্য। তাই অপরাধীকে দিতে হবে শাস্তি। বলতে হবে, সে ইচ্ছা করেই করেছে অপরাধ। সে অপরাধ না করলেও পারতো। এই দুই মতকে সমন্বিত করবার একটা চেষ্টাও হয়েছে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে। এদের বক্তব্য, বন্যা হয় প্রাকৃতিক কারণে। কিন্তু মানুষ নদীতে বাঁধ বাঁধে বন্যা নিবারণের জন্য। মানুষ তার বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। এখানেই আছে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার মূল্য। স্বাধীন ইচ্ছা প্রাকৃতিক নিয়মকে অস্বীকার করে না। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা প্রাকৃতিক নিয়মকে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আর কুরআনে সূরা হিজর-এ বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ হজরত আদম আঃ-কে সৃষ্টি করেছিলেন কাদামাটি দিয়ে। কিন্তু পরে তিনি তার মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেন নিজের নিঃশ্বাস। একে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে যে, আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টি-শক্তির অংশ।</p>
<p>মানুষ কালের পুতুল নয়। সে তার জীবনকে নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলতে চায় এবং বেশ কিছু পরিমাণে পারেও। সেই সাহিত্যই শ্রেয়, যে সাহিত্য মানুষকে তার নিজের জীবনকে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। তাকে করে তোলে না বিষণ্ন আর নিরাশাবাদী। এ হলো ইসলামের সাহিত্য বিচারের আরেকটি দিক। ইসলামে মানুষকে ভাবা হয়েছে সৃষ্টি-শক্তিসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে। এখানেই ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে ইসলামের বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব। অবশ্য অন্য ধর্মেও যে অনুরূপ কথা একেবারেই বলা হয়নি, তা নয়।</p>
<p>কবি দার্শনিক ইকবালের মতে, যেহেতু আল কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মর্তের খলিফা হিসেবে (সূরা ২ : ৩০)। তাই ধরা চলে আল্লাহ মানুষকে মর্ত্যের ঘটনাবলিকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিয়েছেন। আমাদের কর্তব্য হবে এই শক্তিকে যথাযথভাবে প্রয়োগ। ভাগ্যবাদী হয়ে চুপ করে বসে থাকা নয়। তিনি তাঁর ‘বাঙ্গেদ্বারা’ (ঘণ্টার আওয়াজ) কাব্যগ্রন্থে বলেছেন :</p>
<blockquote><p>খুদহি কো কর বুলন্দ ইতনা কি হর তকদীর সে পহেলে<br />
খুদা বান্দা সে খুদ পুছে বান্দা তেরী রজা কেয়া হ্যায়?</p></blockquote>
<p>নিজেকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তোলো। যেন বিধাতা তোমার ভাগ্যলিপি রচনার আগে তোমাকে জিজ্ঞাসা করেন, বলো তুমি কী চাও, কী তোমার সত্তার অভিপ্রায়।</p>
<p>কবি ইকবাল চেয়েছেন মানুষকে সক্রিয় করে তুলতে। তিনি ছিলেন শক্তিবাদের কবি। মুসলিম জনসমাজে তিনি চেয়েছিলেন আবার শক্তিবাদে প্রত্যয়ী করতে। কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) ইন্তেকাল করলেন। তিনি ছিলেন আমার একজন আন্তরিক বন্ধু। তার সাথে আমার বহু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যার মধ্যে সাহিত্যে ইসলামের প্রভাব কেমন হওয়া উচিত, সেটিও ছিল উপজীব্য। কিন্তু আমি তার সাথে এ ক্ষেত্রে একমত হতে পারিনি। কেননা আমার মনে হয়েছে তিনি পারলৌকিক ইসলামের ওপর যে পরিমাণ আকৃষ্ট, ইহজাগতিক ইসলামের ওপর তা নন। তার চিন্তা থেকে ইসলামের ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি হতে চলেছে অপসৃত। মনে হয়েছে তার বয়োবৃদ্ধি এর একটি কারণ। কেননা বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে মানব মনে ভিড় করে মৃত্যুচিন্তা; আর পারলৌকিক চিন্তা-ভাবনা।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>ক’দিন আগে ভারতের খ্যাতনামা লেখিকা অরুন্ধতী রায় (জন্ম ২৪ নভেম্বর ১৯৬১) ঢাকায় এসেছিলেন। তার নামটি খাঁটি বাঙালি হিন্দু। কারণ তার পিতামহ ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশের বরিশাল জেলার অধিবাসী। কিন্তু তার মাতা হলেন ভারতের কেরেলা (কেরল) প্রদেশের লোক। কেরেলা প্রদেশ গঠিত হয়েছে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫৬ সালে। কেরেলা গঠিত হয়েছে কোচিন ও ত্রিবেন্দম নামক দু’টি দেশীয় রাজ্য এবং মালাবার নামক ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলকে একত্র করে। <strong>ব্রিটিশ শাসনামলে মালাবার ছিল তখনকার মাদ্রাজ প্রদেশের সাথে যুক্ত। মালাবার অঞ্চল ছিল মুসলিমপ্রধান। মালাবারের মুসলমানদের বলা হয় মোফলা।</strong></p>
<p><strong>এখানে ইসলাম প্রচারিত হয় আরব মুসলমান বণিকদের দিয়ে, প্রথম হিজরিতে।</strong> অর্থাৎ প্রথম ইসলাম প্রচারিত হয়, মালাবারে দক্ষিণ এশিয়ায়। মালাবারের কাছেই হলো লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীরাও হলেন মোফলা মুসলমান। লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ ভারত সরকার কর্তৃক কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল হিসেবে শাসিত হয়; কোনো প্রদেশ হিসেবে নয়। কেরেলায় অবস্থিত কালিকট (কজিকোট)। এখানে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কোদাগামা এসে অবতরণ করেছিলেন ১৪৯৮ সালে। যার আগমন পথ অনুসরণ করে এই উপমহাদেশে সমুদ্রপথে আগমন শুরু হয় ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজদের। যাদের আগমনে বদলে যায় আমাদের ইতিহাসের ধারা। <strong>কেরেলার ভাষা হলো মালয়লাম। মালয়লাম দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষা। ভাষাটি তামিল ভাষার খুবই নিকট সম্পর্কীয়। কিন্তু কেরেলায় বহু মানুষের ভাষা এখন হয়ে উঠছে কার্যত ইংরেজি। এর একটা কারণ সমুদ্রপথে এরা যান নানা দেশে জীবিকার অন্বেষণে। অরুন্ধতী রায় সাহিত্য চর্চা করেছেন মালয়লাম ভাষায় নয়; ইংরেজি ভাষায়। এর কারণ ইংরেজি হলো তার মাতৃভাষারই মতো।</strong></p>
<p>অরুন্ধতী রায়ের বয়স যখন ২ বছর, তখন তার মাতার সাথে তার পিতার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তার মাতা তাকে নিয়ে যান কেরেলায়। সেখানেই তিনি মানুষ হন। তিনি বাংলার বিন্দু-বিসর্গও জানেন না। পড়েও বুঝতে পারেন না। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন তার প্রপিতামহর দেশকে খোলামেলাভাবে দেখতে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তার বাদ সাধলেন। কেন তার সাথে এ রকম রূঢ় ব্যবহার করা হলো, আমরা জানি না। হতে পারে এর একটা কারণ হলো, তিনি কাশ্মিরিদের স্বাধীনতার পক্ষে।</p>
<p>অরুন্ধতীর সাহিত্যের মূল্য নিয়ে আলোচনা করা এখানে বান্তর হবে না। তবে তার ‘দি গড অব স্মল থিংস’ বইটির মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে একটা সর্বজনীন বিষন্নতাবোধ। কেরেলা একটি বামপন্থী আন্দোলনের জায়গা। সারা ভারতের মধ্যে কেরেলায় কমিউনিস্টরা প্রাদেশিক পরিষদে প্রথম ক্ষমতায় আসেন ১৯৫৭ সালে, ভোটের মাধ্যমে। যা সে সময় সারা বিশ্বে হয়ে উঠেছিল বিশেষ আলোচ্য। অরুন্ধতীর ওপর কোনো বাম চিন্তার প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয় না। অরুন্ধতী তার বই ‘দি গড অব স্মল থিংস’-এর জন্য বুকার পুরস্কার পান ১৯৯৭ সালে। বুকার পুরস্কার দেয়া হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ ট্রাস্টি থেকে, যার প্রতিষ্ঠা করে যান বুকার ভ্রাতারা। বুকার প্রাইজের সম্মান বিশ্বজুড়ে। যদিও ঠিক নোবেল প্রাইজের মতো নয়। আমরা আশা করব, অরুন্ধতী রায় ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশে আসবেন এবং খোলামেলাভাবে দেখতে পারবেন তার প্রপিতামহের দেশকে।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>আমরা বাংলাদেশে তার বিষন্নতাবাদকে অনুসরণ করব না। আমরা অনুসরণ করব ইকবালের শক্তিবাদের দর্শনকে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এই দেশ ইসলামী ঐতিহ্যকে অনুসরণ করবে, সেটাই স্বাভাবিক।</p>
<p><strong> </strong></p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/literary-judgment-from-islamic-point-of-view/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">13961</post-id>	</item>
		<item>
		<title>রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শন</title>
		<link>https://rowyakbd.com/rabindranath-thakur-education-philosophy/</link>
					<comments>https://rowyakbd.com/rabindranath-thakur-education-philosophy/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[এবনে গোলাম সামাদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 07 Mar 2024 23:58:03 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[ব্যক্তিত্ব]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://rowyakbd.com/?p=15567</guid>

					<description><![CDATA[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স যখন ৩১ বছর, তখন তিনি ‘শিক্ষার হেরফের’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। যাতে তিনি বলেন, &#8220;বাল্যকাল হইতে যদি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিক্ষা হয় এবং ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জীবনযাত্রা নিয়মিত হইতে থাকে,]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স যখন ৩১ বছর, তখন তিনি ‘শিক্ষার হেরফের’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। যাতে তিনি বলেন, &#8220;বাল্যকাল হইতে যদি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিক্ষা হয় এবং ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জীবনযাত্রা নিয়মিত হইতে থাকে, তবেই আমাদের সমস্ত জীবনের মধ্যে একটা যথার্থ সামঞ্জস্য হইতে পারে- আমরা বেশ সহজ মানুষের মতো হইতে পারি এবং সকল বিষয়ের একটা যথাযথ পরিমাণ ধরিতে পারি।&#8221; তিনি তার এই প্রবন্ধে কিছু আগে আরও বলেন যে, &#8220;চিন্তাশক্তি এবং কল্পনাশক্তি জীবনযাত্রা-নির্বাহের পক্ষে দুইটি অত্যাবশ্যক শক্তি তাহাতে আর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ যদি মানুষের মতো মানুষ হইতে হয় তবে ওই দুটো পদার্থ জীবন হইতে বাদ দিলে চলে না। অতএব বাল্যকাল হইতে চিন্তা ও কল্পনার চর্চা না করিলে কাজের সময় যে তাহাকে হাতের কাছে পাওয়া যাবে না এ কথা অতি পুরাতন।&#8221;</p>
<p><strong>রবীন্দ্রনাথ</strong> <strong>ঠাকুরের</strong> <strong>মতে</strong> <strong>তার</strong> <strong>সময়ে</strong> <strong>যে</strong> <strong>শিক্ষাব্যবস্থা</strong> <strong>দেশে</strong> <strong>চলেছিল</strong><strong>, </strong><strong>তাতে</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারত</strong> <strong>না</strong> <strong>চিন্তা</strong> <strong>ও</strong> <strong>কল্পনাশক্তির</strong> <strong>বিকাশ।</strong> <strong>তাই</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>তার</strong> <strong>পরবর্তী</strong> <strong>জীবনে</strong> <strong>বিশ্বভারতী</strong> <strong>বিশ্ববিদ্যালয়ে</strong> <strong>এমন</strong> <strong>একটি</strong> <strong>শিক্ষাব্যবস্থার</strong> <strong>প্রবর্তন</strong> <strong>করতে</strong> <strong>চান</strong> <strong>যে</strong><strong>, </strong><strong>তাতে</strong> <strong>বিশ্ববিদ্যালয়ের</strong> <strong>ছাত্রদের</strong> <strong>হতে</strong> <strong>পারবে</strong> <strong>চিন্তা</strong> <strong>ও</strong> <strong>কল্পনাশক্তির</strong> <strong>বিকাশ।</strong> <strong>তার</strong> <strong>কাছে</strong> <strong>শিক্ষার</strong> <strong>মূল</strong> <strong>উদ্দেশ্য</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>দাঁড়ায়</strong> <strong>ছাত্রদের</strong> <strong>কেবলই</strong> <strong>কিছু</strong> <strong>তথ্য</strong> <strong>প্রদান</strong> <strong>করা</strong> <strong>নয়</strong><strong>; </strong><strong>তথ্য</strong> <strong>নিয়ে</strong> <strong>ভাবতে</strong> <strong>শেখানো।</strong> <strong>যুক্তি</strong> <strong>বলতে</strong> <strong>বোঝায়</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>ঘটনাবলির</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>সম্বন্ধ</strong> <strong>নির্ণয়কে।</strong> <strong>শিক্ষার</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>হতে</strong> <strong>হবে</strong> <strong>বিভিন্ন</strong> <strong>ঘটনাবলির</strong> <strong>মধ্যে</strong> <strong>সম্বন্ধ</strong> <strong>নির্ণয়ের</strong> <strong>ক্ষমতা</strong> <strong>বাড়ানো।</strong> <strong>রবীন্দ্রনাথ</strong> <strong>শিক্ষার</strong> <strong>হেরফের</strong> <strong>প্রবন্ধে</strong> <strong>ইংরেজি</strong> <strong>ভাষার</strong> <strong>পরিবর্তে</strong> <strong>বাংলা</strong> <strong>ভাষার</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>শিক্ষাদানের</strong> <strong>প্রস্তাব</strong> <strong>রাখেন।</strong> <strong>কারণ</strong><strong>, </strong><strong>এর</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>জ্ঞান</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>তাদের</strong> <strong>চেতনার</strong> <strong>অংশ</strong> <strong>হয়ে</strong> <strong>উঠবে।</strong> <strong>ফলে</strong> <strong>অনেক</strong> <strong>সহজেই</strong> <strong>পারবে</strong> <strong>তার</strong> <strong>প্রয়োগ</strong> <strong>ঘটাতে।</strong></p>
<p>রবীন্দ্রনাথ তার <strong>‘</strong><strong>শিক্ষার</strong> <strong>হেরফের</strong><strong>’</strong> প্রবন্ধে লেখেন রাজশাহী শহরে বসে (রামপুর, বোয়ালিয়া)। তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন তদানীন্তন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের এক সভায়। যা অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী সরকারি কলেজের একটি কক্ষে। রাজশাহী সরকারি কলেজ তখন বিবেচিত ছিল একটি উৎকৃষ্ট শিক্ষপ্রতিষ্ঠান হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ রাজশাহী শহরে এসেছেন অনেকবার। এসেছেন প্রধানত তার জমিদারির কাজে। রাজশাহী জেলা ছিল তখন রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ মিলিয়ে। রাজশাহী শহর ছিল রাজশাহী জেলার সদর।</p>
<p>রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি ছিল নওগাঁর কালীগ্রাম মৌজায়। কালীগ্রাম মৌজার একটি গ্রামের নাম হল পতিসর। যেখানে অবস্থিত ছিল কালীগ্রাম মৌজার জমিদারির তহশিল। কালীগ্রামের জমিদারি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান জমিদারি। যা তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর কালীগ্রামের জমিদারি ক্রয় করেন ১৮৩০ সালে। রবীন্দ্রনাথ রাজশাহী শহরে বসেই কেবল যে ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তা নয়। লিখেছিলেন তার একাধিক বিখ্যাত কবিতা। যেমন- <strong>‘</strong><strong>সুখ</strong><strong>’</strong>, <strong>‘</strong><strong>ঝুলন</strong><strong>’</strong>, <strong>‘</strong><strong>এবার</strong> <strong>ফিরাও</strong> <strong>মোরে</strong><strong>’</strong> এবং <strong>‘</strong><strong>সমুদ্রের</strong> <strong>প্রতি</strong><strong>’</strong>। আমি এসব কথা বলছি কেননা, এসব কবিতা তিনি যেসব জায়গায় বসে লিখেছিলেন, আমি আমার বর্তমান প্রবন্ধটি লিখছি তার খুব সন্নিকটস্থ মাটিতে বসে। তাই আমার মনে আসছে এসব কবিতার কথা। যদিও তার শিক্ষাদর্শনের সাথে এসবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।</p>
<p>রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শন নিয়ে আমি কিছু লিখছি, কেননা আমাদের প্রধানমন্ত্রী ক’দিন আগে গিয়েছিলেন বিশ্বভারতীতে; সেখানে বাংলাদেশের টাকায় নির্মিত বাংলাদেশ ভবন উন্মোচনের জন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে কলকাতা থেকে ১০০ মাইল দূরে বিরভুম জেলার বোলপুর স্টেশনের কাছে কিছু জমি কিনে স্থাপন করেন শান্তিনিকেতন আশ্রম। পরে রবীন্দ্রনাথ সেখানে স্থাপন করেন <strong>‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’</strong> নামের একটি বিদ্যালয়। এরপর ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি ওই জায়গায় স্থাপন করেন বিশ্বভারতী নামে বিশ্ববিদ্যালয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্থাপিত ব্রহ্মচর্যাশ্রমে কেবল মাত্র পড়তে পারত ব্রাহ্ম ও উচ্চ বর্ণের হিন্দু ছাত্ররা। মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্ররাও নয়। উচ্চ বণের্র হিন্দু বলতে বোঝাত, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ এবং বৈদ্য বর্ণের হিন্দুদের। রবীন্দ্রনাথ এ সময় বর্ণাশ্রম জাতিভেদ প্রথায় আস্থাবান ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বিশ্বভারতী স্থাপন করেন, তখন তিনি এর দ্বার উন্মোচিত করেন সবার জন্যই।</p>
<p><strong>রবীন্দ্রনাথ</strong> <strong>মনে</strong> <strong>করতেন</strong> <strong>লেখাপড়ার</strong> <strong>উদ্দেশ্য</strong> <strong>হলো</strong> <strong>মননশক্তি</strong> <strong>বাড়ানো।</strong> <strong>কিন্তু</strong> <strong>তিনি</strong> <strong>বিশ্বভারতীর</strong> <strong>সাথে</strong> <strong>যুক্ত</strong> <strong>করেন</strong> <strong>শ্রীনিকেতন</strong> <strong>নামে</strong> <strong>একটি</strong> <strong>প্রতিষ্ঠানকে।</strong> <strong>এর</strong> <strong>লক্ষ্য</strong> <strong>হয়</strong> <strong>কৃষির</strong> <strong>উন্নয়নের</strong> <strong>মাধ্যমে</strong> <strong>পল্লীর</strong> <strong>উন্নয়ন।</strong> <strong>এর</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>প্রয়োজনীয়</strong> <strong>অর্থ</strong> <strong>সংগৃহীত</strong> <strong>হয়েছিল</strong> <strong>মার্কিন</strong> <strong>যুক্তরাষ্ট্র</strong> <strong>থেকে।</strong> <strong>এর</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>পরিচালক</strong> <strong>ছিলেন</strong> <strong>লেনার্ড</strong> <strong>কে</strong> <strong>এল্মহার্স্ট।</strong> <strong>রবীন্দ্রনাথ</strong> <strong>শ্রীনিকেতন</strong> <strong>স্থাপন</strong> <strong>করেছিলেন</strong> <strong>১৯২২</strong> <strong>সালে।</strong> <strong>এটাকে</strong> <strong>ঠিক</strong> <strong>বিশ্বভারতীর</strong> <strong>অংশ</strong> <strong>বলা</strong> <strong>যায়</strong> <strong>না।</strong> <strong>কারণ</strong><strong>, </strong><strong>এখানে</strong> <strong>বিদ্যাদানের</strong> <strong>ব্যাপারে</strong> <strong>পাশ্চাত্য</strong> <strong>পদ্ধতিকে</strong> <strong>অনুসরণ</strong> <strong>করা</strong> <strong>হতো</strong> <strong>এবং</strong> <strong>এখনও</strong> <strong>হয়</strong><strong>; </strong><strong>বিশ্বভারতীর</strong> <strong>মতো</strong> <strong>তপবনের</strong> <strong>পরিবেশে</strong> <strong>নয়।</strong> অবশ্য বিশ্বভারতীর সেই আদি তপবনের পরিবেশ এখন আর নেই। বিশ্বভারতী চলেছে প্রধানত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালীগ্রামের জমিদারির আয় থেকে। কিন্তু কালীগ্রামের কৃষক প্রজারা এর দ্বারা কোনোভাবেই উপকৃত হতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ ১১ বার বিশ্বভ্রমণ করেছেন। তারও অর্থ জুগিয়েছে প্রধানত কালীগ্রাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার এই জমিদারিতে মনে রাখার মতো কিছু করেননি। তিনি তার প্রজাদের শিক্ষিত করে তুলতে চাননি। ভেবেছেন কৃষক প্রজারা শিক্ষিত হলে বাড়বে কৃষক প্রজার অসন্তোষ। কঠিন হবে জমিদারি রক্ষা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল জমিদার হিসেবে খুবই প্রজা-পীড়ক। এদের প্রজা-পীড়নের খবর ছাপান কাঙ্গাল হরিনাথ, তার ‘গ্রামবার্তা’ পত্রিকায়। যা পড়ে ক্ষুব্ধ হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ভাড়াটে গুণ্ডা নিযুক্ত করেন কাঙ্গাল হরিনাথকে খুন করার জন্য। কিন্তু সফল হতে পারেন না।</p>
<p>বাংলাভাষী মুসলমানের মধ্যে সর্বপ্রথম খুব উন্নতমানের বাংলা গদ্য লেখেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। তিনি বাংলা গদ্য লিখতে শেখেন কাঙ্গাল হরিনাথের কাছ থেকে। অর্থাৎ বাংলাভাষী মুসলমানের সাহিত্য সাধনার আছে একটা পৃথক ইতিহাস। কিন্তু আজ প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাভাষী মুসলমানের সাহিত্য সাধনার পেছনে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশেষ দান। যেটা ঐতিহাসিক সত্য নয়। যেমন সত্য নয়, বাংলাভাষী মুসলমানের ওপর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব। ১৯১১ সালে ৪ সেপ্টেম্বর স্থাপিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। এই সমিতি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে ১৯১৩ সালে। সমিতির অফিস স্থাপিত হয় কলকাতায় ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। করাচি থেকে&nbsp;হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম&nbsp;এসে ওঠেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে। কেননা, তার কলকাতায় থাকার কোনো জায়গা ছিল না। <strong><em>বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিকে নির্ভর করে অগ্রসর হয়েছে বাংলাভাষী মুসলমানের সাহিত্য চর্চা। এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এখন প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ নাকি ছিলেন আমাদের সাহিত্য চর্চার মূল অনুপ্রেরণা। যা আদৌ সত্য নয়।</em></strong> রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এখন শুরু হয়েছে এমন এক রাজনীতি, যা হতে পারে বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট অমঙ্গলজনক।</p>
<p>জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে কেবল যে মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে লেখাপড়া হয়েছে, তা নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ তার বড়ো ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিলাতে পাঠিয়েছিলেন আইসিএস হবার জন্য। তিনি ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম আইসিএস। তিনি রবীন্দ্রনাথকেও বিলাতে পাঠিয়েছিলেন আইসিএস হবার জন্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তা হতে পারেননি। ঠাকুর পরিবার একদিকে বলেছেন, ব্রিটিশ বিরোধী কথা, আবার অন্যদিকে হতে চেয়েছেন তার শাসনযন্ত্রের অংশ। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু নিজের ছেলে রথিন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইলিনয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান পড়তে। রথিন্দ্রনাথ সেখান থেকে জীববিজ্ঞানে বিএস ডিগ্রি নেন। রবীন্দ্রনাথ একদিকে বলেছেন, পাশ্চাত্য শিক্ষা বিভ্রান্তিকর। কিন্তু সেই সাথে আবার নিজ পুত্রকে পাঠিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষালাভ করতে। ভরসা করেননি বিশ্বভারতীতে তার উচ্চশিক্ষা লাভ হতে পারবে বলে। <em>রবীন্দ্রনাথ</em> <em>ঠাকুরের</em> <em>মধ্যে</em> <em>অনেক</em> <em>ব্যাপারেই</em> <em>থাকতে</em> <em>দেখা</em> <em>যায়</em> <em>আত্মসঙ্গতির</em> <em>অভাব।</em> <em>সাবেক</em> <em>পাঞ্জাবের</em> <em>অমৃতসর</em> <em>শহরের</em> <em>জালিয়ানওয়ালাবাগ</em> <em>নামক</em> <em>স্থানে</em><em> (</em><em>১৩</em> <em>এপ্রিল</em><em>, </em><em>১৯১৯</em> <em>সালে</em><em>) </em><em>ব্রিটিশ</em> <em>শাসনামলে</em> <em>বৈশাখী</em> <em>মেলায়</em> <em>চলেছিল</em> <em>গুলি।</em> <em>মারা</em> <em>গিয়েছিল</em> <em>বহুলোক।</em></p>
<p><em>রবীন্দ্রনাথ</em> <em>জালিয়ানওয়ালাবাগের</em> <em>এই</em> <em>গুলি</em> <em>চলার</em> <em>প্রতিবাদ</em> <em>করে</em> <em>ছেড়েছিলেন</em> <em>তার</em> <em>স্যার</em> <em>উপাধি।</em> <em>কিন্তু</em> <em>ব্রিটিশ</em> <em>সরকার</em> <em>যখন</em> <em>শরৎচন্দ্র</em> <em>চট্টোপাধ্যায়ের</em><em> ‘</em><em>পথের</em> <em>দাবি</em><em>’ </em><em>উপন্যাস</em> <em>বাজেয়াপ্ত</em> <em>করে</em><em>, </em><em>রবীন্দ্রনাথ</em> <em>তখন</em> <em>প্রতিবাদ</em> <em>করতে</em> <em>অস্বীকার</em> <em>করেন।</em> <em>বলেন</em><em>, </em><em>প্রবল</em> <em>প্রতাপ</em> <em>ব্রিটিশ</em> <em>রাজের</em> <em>বিপক্ষে</em> <em>শরৎচন্দ্রের</em> <em>এরকম</em> <em>উপন্যাস</em> <em>লেখা</em> <em>মোটেও</em> <em>উচিত</em> <em>হয়নি।</em> <em>রবীন্দ্রনাথ</em> <em>নন</em><em>, </em><em>শরৎচন্দ্র</em> <em>বাংলাভাষী</em> <em>মুসলমান</em> <em>পাঠকের</em> <em>মনে</em> <em>অনেক</em> <em>গভীরভাবে</em> <em>নানা</em> <em>বিষয়ে</em> <em>রেখাপাত</em> <em>করেছিলেন।</em> <em>কিন্তু</em> <em>তাকে</em> <em>নিয়ে</em> <em>আজ</em> <em>সেভাবে</em> <em>আলোচনা</em> <em>হচ্ছে</em> <em>না।</em> এক রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে মূল্যায়ন করার চেষ্টা হচ্ছে সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে। আমরা আলোচনা করছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন এখন আর ভারতে আদ্রিত নয়। কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতীতে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে করলাম <strong>‘</strong><strong>বাংলাদেশ</strong> <strong>ভবন</strong><strong>’</strong>। জানি না কিভাবে বাংলাদেশ এর দ্বারা উপকৃত হতে পারবে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://rowyakbd.com/rabindranath-thakur-education-philosophy/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
		<post-id xmlns="com-wordpress:feed-additions:1">15567</post-id>	</item>
	</channel>
</rss>
